Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Cherontani

Das, Motilal · 2009/09/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

চিরন্তনী
(নাটিকা)
শ্রীমতিলাল দাশ
প্রকাশক :-
দি বুক কোম্পানী
কলেজ স্কোয়ার,
কলিকাতা।
মূল্য আট আনা মাত্র।

কুষ্টিয়া নিম্বসার প্রেস হইতে মহঃ আজিমউদ্দিন বিশ্বাস কর্তৃক মুদ্রিত

প্রতিমান
শ্ৰীযুত রাজেন্দ্রনাথ দাশের
করকমলে-
হে বন্ধু !
দুঃখ দগ্ধ জীবনের ক্লান্ত যাত্রা মাঝে
দিয়েছ প্রীতির সুধা দুহাতে ছড়ায়ে,
পৃথিবীর সুখে দুখে জয়ে আর লাজে,
সেই প্রীতি অনুক্ষণ রাখুক জড়ায়ে।
কুষ্টিয়া
রথ-দ্বিতীয়।
-
প্রীতিমুগ্ধ
শ্রীমতিলাল দাশ
১৩ঃ৩

No text on this page.

চিৰন্তনী
[ নাকা ]
[ প্রথম দৃশ্য ]
[ কৌশাম্বীর রাজপুরােদ্যানের একাংশসময় গােধূলি, সমাগত প্রায়
বসন্ত উৎসবের আয়ােজনের মূক সমারােহ রঙ্গমঞ্চে চলিয়াছে। রাজসভার
তরুণ কবি বৎসরের এই প্রিয় উৎসবকে সমৃদ্ধ করিবার ভার পাইয়াছেন।
তৃণাসনে বসিয়া বীণা লইয়া কবি গাহিতেছেন ]
জ্যোতি-ছটা ঝলে, আজি ঝলসে,
নীল নভসে।
মধু-মাখা ছবি-আঁকা ধরণী
মধু-তরণী,
ফুলে ফুলে ওঠে দুলে
শ্যামবরণী।
সুরধারা জাগে বুকে আয় সজনি !
চিত-হরণী !
বাঁধি বীণা সুরে, গাব হরষে
মধু পরশে।

চিরন্তনী যুবরাজ। কবি । কবি । কুমার ! যুবরাজ। কি গান গাইছ ? কবি । বসন্ত উৎসবের নূতন পালা বেঁধেছি, তারই গান। মধু-পূর্ণিমার ডাক এসেছে, সেই ডাক শুনে হৃদয় সখিকে ডাকছি, ওঠো জাগাে, বসন্তকে গ্রহণ কর যুবরাজ। আচ্ছা কবি! তুমি যে গান বাঁধ, সে কি তােমার কথার হেঁয়ালি নয় ? কবি । কেন কুমার ? যুবরাজ। আমার মনে হয়, ওটা শুধু কথার স্বপ্নজাল, এই যে ভরদ্বাজ ! তুমিও বােধ হয় বলবে, কবিতা শুধু কল্পনার কুহক- =

চিরন্তনী
৩
কবি।
ভরদ্বাজ শুধু কাব্যকে নয়, জীবনকেও একটা মস্ত
ভ্রান্তি বলবে।
যুবরাজ।
তাই কি ?
ভরদ্বাজ।
তাই কুমার, জীবন-খেলাটা একটা প্রচণ্ড মায়া।
যুবরাজ।
মায়া !
ভরদ্বাজ।
মায়া, একেবারেই নিছক মায়া, রজ্জুতে সর্পভ্রমের মত
বিরাট ভ্রম !
যুবরাজ।
কিন্তু বুঝতে পারিনে ত।
ভরদ্বাজ।
সেইটাই সাধনা, মায়া যদি সহজেই বােঝা যেত,
তাহলেই একমুহূর্তেই খেলাঘর ভেঙ্গে যেত।
যুবরাজ।
কবি তুমি কি বল ?

০
চিরন্তনী
কবি ।
আমি খেলাঘরকে খেলাই মনে করি, তার তত্ত্বের
সন্ধান করিনে-
যুবরাজ।
তার মানে ?
কবি।
তােমার খেলা-ঘরের মাঝে,
তােমার বাঁশী বাজে,
ভােরের আলাে ফোটায় কুঁড়ি,
সাঁঝের আঁধার এলে যুড়ি
খসেই পড়ে লাজে,
চলাচলের এই যে দোলা,
নয়রে কঁকি ওরে ভােলা,
নয়রে মিছে সাজে,
এই ক্ষণিকের খেলা-ঘরে
রূপের মাঝে রূপান্তরে
তারই বীণা বাজে।
ভরদ্বাজ।
তত্ত্বকে কঁকি দিলে, মানুষের চলে না কুমার,
সে অজ্ঞাতেই এসে পড়ে।

চিরন্তনী যুবরাজ। তত্ত্ব থাক ভরদ্বাজ, আমার মন ভাল নেই, আমি বলছি তােমার পালা এবার থাক কবি । কবি। কেন কুমার ? আমার পালা যে বসন্তেরই পালা, সে পালা ত চুপ করে থাকবে না, সে চলেছে, পুষ্পে তার পটভূমিকা—পাখীর গানে তার বােধন- = যুবরাজ। সে কথা তােমাদের বলিনি। কবি। কি কথা বন্ধু ? যুবরাজ। যতদিন ছিল সে সুখের সৌরভ, আমি ভেবেছিলাম সে আমি গােপন রাখব, সে আমার নিভৃত মনের নিভৃততম সত্য হবে, সে আমার নিশান্তের স্বপ্ন হবে, দিনান্তের কামনা হবে—একান্ত গােপন—একান্ত রহস্যময়-- বসন্তের মাতাল স্পর্শ যুবরাজের মনকে রঙীন করেছে দেখছি -

৬
চিরন্তনী
যুবরাজ।
তা করেছে, এ বসন্তেরই অন্তরের কথা, এ আমার
ভালবাসার গাথা।
কবি।
তা হলেই বাসন্তী পূর্ণিমা সার্থক, কুমার, সব পাওয়াই
মিছে যদি ভালবাসাকে না পাওয়া যায়, তাকে যখন
পেয়েছ, তখন সবই পেয়েছ—আজ আমার গান
মধুরতর লাগবে, আমার
আমার নাট্যকলা রুচিরতর
লাগবে-
ভরদ্বাজ।
এ যদি যৌবনের লালসা পঙ্কিল কামনা হয় তাহলে
এ শুধু বাঁধবে, যে ভালবাসা অক্ষয়কে বরণ না করে,
সে যে পদে পদে লাঞ্ছিত হয়।
কবি ।
হােক,
এই মরতের ধূলির মাঝে, ফুটল অমর ফুল,
ভালবাসা, ভালবাসা,
নাই যে তার তুল।
ছোঁয়াও প্রাণে আদর-ভরা তােমার পরশ মণি,
খােলল প্রীতির খনি
করাে অমর অতুল।

চিরন্তনী ৭ ভুল করিনে, জানি হে ঠিক, তুমি নিখিল শ্রেয়, ভালবাসা, ভালবাসা, তুমি পরম প্রেয় ; তােমার মিলন-তটের লাগি জীবন-নদীর কূল চলছে নেচে নেচে আবেগ আকুল। ভরদ্বাজ। সে চলা যখন সীমায় বাধা পড়ে, তখন তা শূন্য হয়ে ওঠে, ভালবাসা যখন অসীমকেই পায় তখন সে সার্থক। যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন- যুবরাজ। যাজ্ঞবল্ক্য মাথায় থাকুন, যে ভালবাসার কথা বলছি, সে পেয়েছি এক শরীরিণী মত্ত মানবীর কাছে কুমার! কে সে হৃদয়ময়ী ? যুবরাজ তার নাম চিত্রা, সে থাকে কলনাদিনী শিপ্রা তীরে, মণ্ডলপতি যুধাজিতের কুঞ্জবাটিকায়, কুঞ্জলতার মত পেলব, কুঞ্জলতার ফুলের মতনই গৌরী চিরন্তনী কবি । কার কন্যা ? যুবরাজ। মণ্ডলপতিরই কন্যা–তার ললাটে আভিজাত্যের টীকা নেই, রাজবধূর কুলমৰ্য্যাদা তার নেই, কিন্তু তাকেই আমি ভালবেসেছি—সমস্ত প্রাণ মন দিয়ে, আমি তাকেই বিয়ে করব। ভরদ্বাজ, তােমরা ত ধৰ্ম্মবিধান দিচ্ছ, মানুষে মানুষে এই যে বিরােধ ও দ্বন্দ্ব, এই যে ঘৃণার ব্যবধান—এই যে দম্ভের অসহ গ্লানি—মনুষ্যত্বের এই লজ্জা কি দূর করতে পার না? ভরদ্বাজ। আমাদের ধর্ম কেই বা শুনছে আর কেই বা মানছে ? নিখিল ভুবনকে আত্মময় করে দেখবার লােকোত্তর বাণী ত ঋষিরা প্রচার করেছেন- কবি । ছন্দ-পতন হচ্ছে, কুমার! মন যখন প্রেমায়ন শুনতে উদ্গ্রীব, তখন তত্ত্বসমাস ভাল লাগে না, কিন্তু ভাল- বাসার ইতিহাস যুবরাজ। সে এক আশ্চর্য কথা। আমি সে বছর শিকারে

চিরন্তনী
৯
চলেছি অশ্বের পদাঘাতে বৃদ্ধ পথিক উৎক্ষিপ্ত হয়ে
পড়ল, সে দিকে লক্ষ্য করবার মত হৃদয় বা সময় ছিল
, হঠাৎ দেখি নিপুণ হস্তে কে আমার অশ্ববল্প।
ধরেছে-
কবি ।
তরুণী কিশােরী ?
যুবরাজ।
সুন্দরী কিশােরী, সেইই আমার ধ্যানলক্ষ্মী চিত্র,
কিন্তু তার বিকচ কমল রূপই আমার নয়ন ভুলায়নি,
তেজোদীপ্ত তার ভৎসনা আজও আমার মনে
বাজছে—“যুবরাজ ! নিষ্ঠুরতা মহত্ত্ব নয়, হৃদয়বানই
বীৰ্যবা”
কবি।
তাই হৃদয় দিয়ে দিলে--?
যুবরাজ।
সেই মহীয়সী কুমারীর মহত্ত্বের কাছে আমি পরাজিত
হলাম, ভালবাসা হয়ত এমনই চকিতে জাগে,
বিদ্যল্লেখার মত ক্ষণিকেই তার দীপ্তি ফোটে, যে
পরিচয় হ’ল বিরােধে, সে সমাপ্ত হল প্রেমের
পরম পরিপূর্ণতায়-
২ (ঘ)

১০
চিরন্তনী
কবি।
ভালই হয়েছে, কুমার, আজ আসুন চিত্রাদেবী
আমাদের গানের তিনিই হবেন নায়িকা, আজিকার
উৎসবের উৎসবশ্রী—
ভরদ্বাজ।
তা মন্দ হবে না, যুবরাজ, মর্ত্য প্রেমের যে আনন্দ
অনুভব করছ, তা অমর্ত্য প্রেমেরই ক্ষোদিষ্ট
কণিকামাত্র—এই প্রেম-দৃষ্টি বর্ধিত হােক, বৃহত্তর
ভূমাকে আলিঙ্গন করুক,
কবি।
না, না, এ আমাদের কথা নয়, আমরা বলি, :--
মমাদের ছােট বুকে, জাগছে ছােট আশা,
আমরা অল্প নিয়েই বাঁধি বাসা,
এই ধূলারি কান্না সুখের হাসি গানের পাল,
আমরা ভালবাসি,
ঝরা বকুল দিয়ে মােরা, গাঁথি প্রেমের মালা,
প্রেমে
বাজাই বসে বাঁশী ।
এই সীমারি কূলে কূলে, ঘােরে মােদের ভাষা,
ঘােরে মােদের রঙীন আশা,
তুচ্ছ ওরে নয়রে তবু, সুধা-রসেই ঠাসা
তুচ্ছ মােদের ভালবাসা।

চিরন্তনী
১১.
খণ্ডকে যারা মানছে, তারা অখণ্ডের আনন্দ জানতে
পারে না,
কবি।
সে কথা যাক, কুমার অনুমতি কর, আজ আমাদের
সুরলক্ষ্মী হবেন চিত্রা দেবী—তারই সুধাসরস কণ্ঠে
আমার প্রাণহীন গান আজ প্রাণবন্ত হবে।
যুবরাজ।
তাই হােক বন্ধু, যা বলেছ, সে যেন মূর্তিমতী
রাগিণী—তার নাচের ছন্দে যেন বিশ্ব চলেছে-
তার গানের ছন্দে যেন ভুবন নন্দিত হচ্ছে—আজ
আমি তাকে মালা দেব।
কবি।
বেশ হবে ভাই, চিত্রা হবেন নায়িকা, তুমি হবে
নায়ক।
যুবরাজ।
পারব ত? সময় সংক্ষেপ
কবি ।
ভয় নেই, ভাব যখন মনে থাকে, ভাষা কণ্ঠে আপনা
আপনি আসে—শ্রুতিধর থাকবে—তাহলে দূত
পাঠাই

১২
চিরন্তনী
ব্যবহারিক বিপত্তির কথা ভাবছ কি বন্ধু ! কূটবুদ্ধি
মন্ত্রীর খরদৃষ্টির কথা—
যুবরাজ।
তা ভাবতে পারিনে বন্ধু, আমাদের চারিপাশে
বন্ধনের যে আড়ষ্টতা, সে বিকট হয়ে উঠছে, তাকে
মানলেই সে বড় হয়ে ওঠে-ভাঙতে হবে মিথ্যার
এই দম্ভ--ভাঙতে হবে গর্বের এই নভােস্পর্শী
স্পর্ধা
কবি ।
আর মিলনই তা পারে। প্রেমের শক্তিই মিলনের
শক্তি, আমরা সেই দুর্জয় প্রেমেরই উপাসনা করি--
আমরা প্রেমের পথে চলি,
প্রেমের কথা বলি,
নিখিল ভুবন মাঝে, প্রেমের বেদন বাজে,
আমরা পরি. তারি রঙীন্ পাখী
আকাশ রঙে প্রেমের রঙে, বাতাস বহে গন্ধে,
আমরা তারি, রক্ত আবীর মাখি ।
এই নিখিলের মৰ্ম্ম-কোষে, উঠল পদ্ম ফুটি,
রসে দুলি, রূপে জ্বলি,

চিরন্তনী
তারই গােপন অন্তরেতে জ্বলছে প্রেমের শিখা,
আমরা প্রেমের পথে চলি ।
ভরদ্বাজ।
রূপে যা জ্বলে, তা দগ্ধও করে, তাই অরূপের
সন্ধান করাও দরকার,
যুবরাজ।
কিন্তু আমার মনে যে শঙ্কা জাগছে ভাই ।
কবি।
কেন ?
যুবরাজ।
কাল নিশীথ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল, চেয়ে দেখি
বাতায়নের ফঁাকে চঁাদের বিলােল আলো, কোলে
পড়েছে, কিন্তু মন কেন জানিনা এক অকারণ
বিষাদে বিষন্ন হয়ে উঠল, দূর থেকে ভেসে আসছিল
‘চোখ-গেল’ পাখীর করুণ তান—আমি ভাবছি-
ভরদ্বাজ।
কুসংস্কারকে পােষণ করলেই সে ভয় দেখায়,
কবি।
কিন্তু ব্যাথাটিই দেখেছ—নিশীথ রাত্রির মৌন
স্তব্ধতায়, আলােছায়ায় ঝিলিমিলির মাধুৰ্য্য কি

১৪
চিরন্তনী
অনুভব
করনি ?
(সূত্রধরের প্রবেশ)
সূত্রধর।
দেখ, রঙ্গসজ্জার আয়ােজন শেষ।
কবি।
সে আয়ােজনে চলবে না, নূতন করে, নূতন রূপে
তাকে রূপায়িত করতে হবে-
যুবরাজ।
সম্ভব হবে ত ?
কবি ।
এই খানেই তার মাহাত্ম অনুভব করি রাম না হতে
রামায়ণ হয়েছিল—তােমার জন্যই যেন আমার
নাটক স্মৰ্ত্ত হয়েছিল—
যুবরাজ।
দাও বন্ধু, তােমার পুথি, চল ভরদ্বাজ, প্রাসাদে বসে
নাটক পড়বে।
[ যুবরাজ ও ভরদ্বাজ একদিকে চলিলেন--
কবি ও সূত্রধর অন্যদিকে চলিলেন ]

চিরন্তনী
দ্বিতীয় দৃশ্য
| কৌশাম্বীর চিরাচরিত বসন্ত উৎসবের পরিসমাপ্তি নাট্যাভিনয়ে
উৎসবতৃপ্ত নর ও নারী ভিড় জমাইয়াছে—অভিনয় শুরু হয় নাই,
নেপথ্যে দর্শক-মহলে কলগুঞ্জন চলিয়াছে ]
(নেপথ্যের একাংশ)
মন্ত্রী।
মহারাজ
রাজা।
সুবুদ্ধি !
মন্ত্রী।
বসন্ত উৎসবের কৌতুক শুধু কৌতুক থাকছে না—
অভিনয় শুধু অভিনয় নয়,
রাণী।
কেন ?
মন্ত্রী।
সে কথা গােপন রাখতে চাই, রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য
মহারাজের বিনানুমতিতে হস্তক্ষেপ করেছি—তজ্জন্য
মার্জনা ভিক্ষা করি—

চিরন্তনী
রাজা।
সুবুদ্ধি, তােমার নিষ্ঠার পরিচয় পেয়েছি, কিন্তু তুমি
আমাদের কৌতুহলী করে রাখছ ।
মন্ত্রী।
মগধ রাজকুমারী কৌশাম্বীর
রাজবধূ হবে—সে
পথে কোনও অন্তরায়ই রাখা চলে না—
রাজা।
তা চলে না।
রাণী।
কিন্তু তার সাথে অভিনয়ের সম্পর্ক কি?
মন্ত্রী।
মহারাণি। প্রত্যক্ষই দেখবেন
রাজা।
রাণি ! অস্থির হয়াে না, সুবুদ্ধির ক্ষুরধার বুদ্ধি
চঞ্চল হয়ে তার মনীষাকে অসম্মানিত করো না
(নেপথ্যের অপরাংশ)
চিত্ররথ ।
ভাই, চঁাদ অনেকক্ষণ উঠেছে, মহুয়ার পাতার
আড়ালে তার বােধ হয় এতক্ষণ ঘুমই পাচ্ছে
কিন্তু এদের পটই উঠছে না,

চিরন্তনী
১৭
বসুভূতি।
ব্যস্ত কেন ভাই, ধৈৰ্যই শ্রেয়কে আনে, শুনছি
এবারের পালা আনকোরা নূতন হয়েছে, যেমন ছবি
তেমনই ঢং আর তেমনই গান, তেমনই রং,
পুণ্যকাম
কিন্তু আমাদের অবসর অখণ্ড নয়,
চিত্ররথ ।
তা ঠিক, শুধু অভিনয় দেখেই ত আর তৃপ্তি হবে না,
এমন রাত্রির সৌন্দর্য নিরালা উপভােগ করতেও
হবে-
বসুভূতি।
নিরালা ভাল হবে না-এমন রাতে প্রিয়ার সাথে
যুগল আঁখি মেলি’
পুণ্যকাম।
এটা তাের ভুল হল ভাই, বিয়ের মন্ত্র তুই নিশ্চয়ই
ভুলেছিস—‘যদিদং হৃদয়ং তব তদিদং হৃদয়ং মম’
কাজেই সেখানে দুই কোথায় থাকবে
চিত্ররথ ।
আরে চুপ ভাই, পট উঠছে

১৮
চিরন্তনী
[ পট উত্তোলন ]
( বাউল দলের প্রবেশ )
আমরা বাউল, আমরা ক্ষ্যাপা, বিশ্ব খেলার সাথী
আনন্দ প্রমাথী
আমের মউল গন্ধে উতল,
আকাশ রেখা রূপে উজল
ফুলের বাসে ভুবন উছল
আজকে মধুরাতে।
আজকে মােরা মাতব ওরে পঞ্চ শরের সাথে।
আমরা আকুল, আমরা ভােলা হাতে গানের বাতি,
সাথী মধু মাসের রাতি,
গান করে যাই
সুরে সুরে,
নাচ করে যাই ঘুরে ঘুরে,
আমরা নিকট আমরা দূরে
সুরের নিঝরিণী।
ভয় করিনে ভর করিনে, আমরা খেলায় মাতি
বিশ্ব-চলার সাথী।
সূত্রধর।
আৰ্যে, আজ মধু পূর্ণিমায় এই পরিষদকে তােমার

চিরন্তনী
১৯
গন্ধৰ্ব্বত্য একবার দেখিয়ে দাও।
নটী।
আৰ্য, আমার মন ব্যাকুল হয়ে আছে—পল্লীবালা
ক্ষণার ব্যথা আমার অন্তরে ঝঙ্কৃত হচ্ছে—আমার
সুর আজ বসন্ত রাগিণীর সাথে বের হয়ে উঠবে।
সূত্রধর।
তা হবেনা, ব্যথার নিঃশেষত যেখানে আনন্দের
শতদল সেখানেই ফোটে—গাও তােমার দরদ
ভরা গান—তােমার অপরূপ নৃত্যের সাথে-
( গান ও নৃত্য )
ধূপ-সৌরভে পুড়িছে হিয়া ধূপ-সৌরভ সম,
হে অনুপম !
গিয়াছ ভুলে হয়েছে ভালাে
নিঠুর তব যাতনা কালাে
হয়েছে মম হয়েছে আলাে
হে প্রিয়তম !
বুঝিনু আজি বেদন দিয়ে তুমি হে চির মম
মৰ্ম্মের মর্ম সম।
দিয়েছ ব্যথা দিয়েছ সখা বেজেছে বুকেরি মাঝে
শাণিত বর্জোপম,

চিরন্তনী
তুমিহে তবু হে মাের প্রিয়, তুমিহে অন্তরতম,
হে চির-অনুপম
সূত্রধর।
কিসের এ গভীর ব্যথা?
নটী।
বিদর্ভ রাজকুমার জয়ধ্বজ ক্ষণাকে ভালবাসেন,
কিন্তু রাজবধুর মর্যাদা তার নেই তাই পরিণয়ে বাধা
অন্মে, রাজপুত্র শত্রু জয় করে দেশের চিত্তহরণ
করেছেন—তাই রাষ্ট্রসভার অনুমতি পেয়েছেন,
বিরহ-ক্ষীণ। ক্ষণাকে চমকিত করবার জন্য বিদূষককে
নিয়ে ওই আসছেন—চলুন আৰ্য ।
[ প্রস্থান ]
[ জয়ধ্বজ বেশী যুবরাজ ও বিদূষকের বেশে কবির প্রবেশ ]
জয়ধ্বজ।
কোথা ছিল বন্ধু !
এই প্রেম, এই প্রীতি নিঃসীম বিরাট,
আজ মনে হয়, খুলে গেল দৃষ্টি হতে
মায়া-যবনিকা, হেরি তাই চারিভিতে
সুষমার বিপুল প্লাবন, নীলাকাশে
হাসে শশী,—তারকার দিব্যকুঞ্জে বসি,
মনে হয় প্রেমাতুর ব্যাকুল ঈর্ষায় ;

চিরন্তনী
২১
রসালের শাখে, লুকায়ে বিহগ গাহে,
মনে হয় তার গান প্রীতি প্রস্রবণ,
কোথা ছিল সুপ্ত প্রেম কেন অন্ধকারে ?
বিদূষক।
সত্য বন্ধু!
প্রেম-জ্যোতি অমরায় অমর আলােক,
স্পর্শে তার ফোটে প্রজ্ঞা, খােলে বদ্ধ আঁখি,
যে মিথ্যার মায়া-লােক, রয়েছে ঘিরিয়া,
ঘুচে যায় সে বন্ধন, সত্যপূত-দৃষ্টি
সত্যের গভীর সত্য করে অনুভব।
মগ্ন হয় আনন্দের অনাবিল স্রোতে
প্রবুদ্ধ চেতনা লয়ে।
জয়ধ্বজ ।
কিন্তু ভাই,
এই প্রেম একি শুধু লালসার শিখা,
রূপের অনলে দগ্ধি হৃদয়-পতঙ্গ,
পােড়ায়ে নিঃশেষ করে--একি শুধু হীন
কামনার হীন ভাবােচ্ছাস?
বিদূষক।
নহে সখা নহে,
নারী সে যে বিধাতার অপরূপ দান,
৪

২২
চিরন্তনী
স্নেহ দিয়ে, মায়া দিয়ে, দিয়ে ভালবাসা,
মানুষের মহত্ত্বের খুলে দেয় পথ,
চালায় নির্বিঘ্ন গতি জীবনের রথ।
জয়ধ্বজ।
ভােগের লালসা তবু,
জাগে বুকে, জাগে প্রাণে প্রমত্ত কামনা,
সে কি মিথ্যা মরীচিকা ?
বিদূষক।
মরীচিকা নয়,
ভােগ সত্য, সত্য কামনার দীপদাহ,
মানুষের নয় সে গৌরব। কাম যবে
প্রণয়ের পথে ওঠে দিব্য প্রেমলােকে,
মানুষ মহত্ত্বে জাগে, জাগে মহিমায়
সেই আত্মরতি জাগুক জীবনে তব,
স্ফুট হােক সেই দিব্য প্রীতি
জয়ধ্বজ ।
দেখ নাই তারে,
সে নহে অপ্সরা শুধু মর লাবণ্যের
মর্ত্যের মানবী নহে—সে শুধু কল্পনা
বিধাতার অন্তরের।তার মৃদু ভাষ,

চিরন্তনী
হাসি তার, বাঁশী তার, কলকণ্ঠে গীতি
সকল তুচ্ছতা হতে নেয় তুলি মাের
আনন্দের রসূলােকে। তারি প্রেমশক্তি
সমর প্রাঙ্গণে, ছিল পাশে নিরন্তর
দৈব-শক্তি সম।—আমার বিজয় বন্ধু !
ক্ষণারি বিজয়,
যাও সখা, বল তারে
বিদর্ভ অঞ্জলি লয়ে করিছে বরণ
ক্ষণা হবে রাজলক্ষ্মী। ওই কুঞ্জতলে
মাধবীর শ্যাম ছায়ে—রব প্রতীক্ষায়।
যাত্ত বন্ধু যাও।
[ মাধবীর প্রবেশ ]
মাধবী
কাহার সন্ধানে এলে
হে কুমার ? নিদাঘের তপ্ততাপে
জ্বলেছে পুড়েছে যেই ফুল্ল কমলিনী
তারে তুমি কেমনে বাঁচাবে বরষার
বারিধারা দিয়ে ?
বৈরাগিনী সখী মাের
ত্যজেছে সকল আশা পড়ে আছে মৃত

২৪
চিরন্তনী
দগ্ধ লতা সম, নাহি ফল,
নাহি ফল
সন্ধানে তাহার
জয়ধ্বজ ।
মাধবী! মাধবী!
বলােনা নিঠুর কথা, জীবনের পথ
গােলাপ-বিছানো নয়, আছে তীক্ষ কঁাট।
বেঁধে পায় পায়, দৈব দোষী নহি আমি,
যাও সখি বল তারে কাতর বচন,
যাও বন্ধু যাও প্রতি সমাচার মম
ক্ষণারে জানাও।
বিদূষক।
বন্ধু ।
প্রণয়ের দূতনহে ভালল-নহি পটু
প্রেমােচ্ছাস বাক্যের বিন্যাসে।
জয়ধ্বজ।
মাধবীর হাতে
সমর্পিণু তােম—সে শিখাবে ভাষা !
মাধবী।
হে কুমার !
আমার অনেক কাজ, আছে দিবারাত্রি,

চিরন্তনী
মর্কট পালন--নহে সাধ্য মম।
বিদূষক।
হে ললনে,
নাহি জান বিদ্যা মম, না জান পৌরুষ,
তুচ্ছ করাে এ অন্যায়
মাধবী ।
হে পুরুষ!
পৌরুষের পরিচয় দেয় নর সদা,
নারীর চরণ তলে। নারী হস্তে রয়
সােণার শিকল, পুরুষ নাচিয়া খেলে।
বিদূষক।
হে রসিকা !
আমি ভাবিতাম, নারী শুধু ক্ষীণ। লতা,
পুরুষে আশ্রয় করি পায় সার্থকতা,
সে বিশ্বাসে সাধিতেছ বাদ
মাধবী।
হে রসিক!
অনুভবে নাহি আলাে, আলাে তবু রহে
নারীর মাহাত্ম্য কথা, সৰ্বকাল কহে।

৬
চিরন্তনী
বিদূষক।
সে নহে গৌরব সখি !
সে তব লাঞ্ছনা। পুরুষের ভাবালুতা
করেছে মােহিনী তােমা।
তােমরা যুগল হবে
একান্ত:সুন্দর-কল্পনার চেয়ে বড়
কিন্তু সখি ! জাননা, বিরহীর ব্যথা জানাে,
ক্ষমা দাও, তপ্ত চিত্তে, আননা সখি আনাে,
তামৃত-প্রলেপ
মাধবী।
চল তবে বাক্য-দাস
বিদূষক।
নহি দাস, তুমি দাসী, আমি প্রভু তব
মাধবী
আজ্ঞাবহ প্রভু
ঘর্ম জলে অন্ন আনি আনি প্রসাধন,
মুখপানে চেয়ে রবে সতৃষ্ণ নয়ন
বিরল প্রসাদ যাচি ভিখারীর মত।
= =
( উভয়ের প্রস্থান)

চিরন্তনী
২৭
নেপথ্যে
চিত্ররথ ।
মাধবীর কথা সত্যই ভাই, আমরা সত্যই দাস হয়ে
আছি-
পুণ্যকাম।
এ জ্ঞান কি এতদিনে জাগল ?
বসুভূতি।
এইটার একটা প্রতিকার হওয়া উচিত—নারীরা যে
এমন করে ফাকি দিয়ে মাথায় বসে খাচ্ছে—এটা
কুশাগ্রবৃদ্ধি চাণক্যের মাথায়ও ঢােকেনি।
চিত্ররথ ।
ব্যাপারটা মােটেই তুচ্ছ নয়, ফঁাকি বলে ফঁাকি, আমরা
ঠিক কলুর বলদের মত, চোখ ঢাকা রয়েছে, তাই
ঘুরছি আর ঘুরছি—
পুণ্যকাম।
সেই জন্য শাস্ত্র পড়া দরকার, সংসারের এই নাগর
দোলার হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার মন্ত্রণা সেখানে
পাওয়া যায়-
চিত্ররথ ।
অত উঁচুতে উঠতে পারব না ভাই, সংসারও থাকবে

চিরন্তনী
অথচ বন্ধন থাকবে না—এমনই একটা ব্যবস্থা
বসুভূতি।
যা বলেছ ভাই, বনে গেলে মানুষের কোনও ব্যবস্থারই
দরকার হয় না, তাই বলে ত আর গৃহলক্ষ্মীদের ত্যাগ
করে বনে যেতে পারছিনে-ওদের বােঝা অসহ,
কিন্তু ছাড়াও চলে না
পুণ্যকাম।
কিন্তু ফাকি দিয়ে সত্য লাভ হয় না, পাও বাড়াবিনে
আর চলবি এ ব্যাপার সংসারে হয় না ভাই
( নেপথ্যের অপরাংশে )
শ্যামা।
গৌরী দিদি ! কথাটা শুনলি ত, দাসীপণাকে তুই যে
সতীধৰ্ম্ম বলে ব্যথা করিস—সে ভাল নয়, হাল ছাড়লে
নৌকা চলে না, শক্ত করে ধরতে হয়
গৌরী।
তা নয় গেল, বিলিয়ে দিয়ে যে জয় সেই পরম জয়,
প্রেমের দীনতা দিয়েই নারীর মহিমা,
ক্ষমা।
দিদি, ও সব কাব্যি মােটেই ভাল নয়, ও চলে গল্প
নাটকে, সংসারে চাই শক্ত হাত, রাশ আলগা দিয়েছ

চিরন্তনী কি মরেছ—পুরুষে আবার নারীর দুঃখ বােঝে, যতই ওদের সেবা করবে, ওরা নেবে—ওরা দিতে জানে না -ওরা যে ক্ষুধাতুর রাক্ষসের জাতি- শ্যামা। রাক্ষস বলতে রাক্ষস, আমরা আছি জড়পিণ্ড হয়ে, তাই ত ওদের বাহাদুরি বেড়েছে, ওদের অত্যাচার যতই সইবে ততই ভার বইতে হবে। গৌরী। তাের। এই যে দ্বন্দ্ব ও বিরােধের কথা বলছিস, এ যে একটা প্রচণ্ড মিথ্যা বােন্—তােরা যে আকাশেই ঢিল ছুড়ছিস—পুরুষ ও নারী যেখানে মেলে প্রেমে ও ভালবাসায়, সেইখানেই ঘর-সংসার সে মিলন মধুর- তার, ঐক্যের ও বিকাশের—সেখানে কলহ কোথায়? ক্ষণা। নিছক কাব্য বােন্ নিছক কাব্য—শুনতে ভাল লাগে বললে বাহবা মেলে, কিন্তু কাজে খাটানো চলে না— [ ক্ষণার বেশে চিত্রার প্রবেশ—পুষ্প শশাভিত বসন্তলক্ষ্মীর মূর্তি ] (গান) ঝরে যায় ফুল কাল বােশেখির ঝড়ে, ঝরে যায় মরণ চুমে,

চিরন্তনী
গান থেমে যায়, সুর পেয়ে যায় লয়,
না জানি কোন অলস ঘুমে?
হে অভয় ! হে অভয়, তুমি বরাভয়!
তােমারি গাহি জয়।
আলাে নিভে যায় উতল বাতাসে
ঘর ভরে যায় নিবিড় ধূমে,
নিখিল ভুবনে জাগে অমারাতি
আর্তি জাগে মর্ত্য ভূমে
হে অভয় ! হে অভয়, তবু নাহি ভয়
তােমারি গাহি জয়।
জয়ধ্বজ ।
ক্ষণা! ক্ষণা!
ক্ষণা।
কুমার!
জয়ধ্বজ।
আমি ভাবি, ক্ষণা
তুমি মর ধরণীর প্রথম বিম্ময়!
রেখেছ ভরিয়া কান্তি কম-দেহ মাঝে
অমর লােভন ! চিত্ত তবু বীৰ্যময়
অসহ দুর্জয় !

চিরন্তনী
ক্ষণা।
পরিহাস কেন যুবরাজ!
জয়ধ্বজ।
পরিহাস!
ক্ষণা।
বুনন কপােতীর বুকে নিঠুর কেন হানিলে তীক্ষ্ণ শর
সে যে ব্যথায় জরজর
সে যে কাঁপিছে থরথর।
সবুজ বনের গােপন ফঁাকে
আপন মনে লুকিয়ে থাকে
জানে ভয়, না জানে ডর
তাহারে মিছে বিধিলে বীর,
শাণিত তীর
ব্যথিতা সে না পাবে ঘর,
বুনন কপােতীর বুকে নিদয় হয়ে হানিলে তীক্ষ্ণ শর।
নেপথ্যে
ফুঙ্গেরি বুকে
রাণী।
দেখেছ মহারাজ, ক্ষণার কি রাজেন্দ্রাণীর মত রূপ,
কি চমৎকার কণ্ঠ, কি মাধুৰ্য্যময় কথা, মন্ত্রী, কুমার
বুঝি এই ক্ষণাকেই ভালবাসে?

চিরন্তনী
মন্ত্রী।
সত্য মহারাণি !
মহারাণী।
কুমারের ভালবাসা অপাত্রে পড়েনি
রাজা।
কিন্তু আভিজাত্য, বংশ, সন্ত্রম,
মন্ত্রী।
মহারাণি ! নিষ্কলঙ্ক নিষ্কলুষ বিদর্ভ রাজবংশ তার
গৌরবচূড়াকে ধূল্যবলুষ্ঠিত দেখতে পারে না,
রাণী।
মহারাজ, মানুষে মানুষে এই যে অসাম্যের ভেদ এই
যে ঘৃণার আড়াল, সে কি মিথ্যা নয়, সে কি দম্ভ নয়
রাজা।
জানিনে, আমি বিচার করিনে, আমি শুধু বিধানকেই
মেনে চলি,
রাণী।
মহারাজ, কুমারের হৃদয়—যৌবনের প্রথম আবেগে-
চ্ছাস প্রীতি সেও কি দেখবার নয়--
রাজা।
না রাণি ! এই পৃথিবীতে নিরন্তর সংগ্রাম চলেছে--

চিরন্তনী
সেখানে হৃদয়ের স্থান নেই, মমতা নেই, মায়া নেই,
নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী রণতাণ্ডব
রাণী।
না, না, একথা বলো না, মানুষের মনের মাঝেই
অমৃতের উৎস আছে—মানুষ মৈত্রী দিয়ে, প্রেম দিয়ে
পৃথিবীকে ধন্য করতে পারে।
রাজা।
সে কাব্যের কল্পনা দেবী, জীবনের রুদ্ৰ নিৰ্মম যাত্রায়
তার কোনও পরিচয়ই পাই না-
-
জয়ধ্বজ।
হে অভিমানিনি!
সংবর গভীর মান, স্মিত হাস্যে তব
চাহ একবার, পূর্ণ করি চিত্ত মম,
অমরার সুধারসে। গিয়াছে দুর্দিন,
তুমি হবে রাজলক্ষ্মী—অয়ি বনবালা
আনিয়াছি প্রেমময়ী মল্লিকার মালা,
দেহ অনুমতি, পরাগ কোমল তব
পরাইব গলে।
ক্ষণ।
যুবরাজ
৭

৩ঃ
চিরন্তনী
নাহি হব শুধু তব নৰ্ম্ম সহচরী,
তােমার বাসর কক্ষে বন্দিনী কামিনী।
যে প্রেম গােপন রয়, রয় অন্ধকারে
কল্যাণের দিব্য দ্যুতি নাহি জ্বালে তারে
মঙ্গলের আশীর্বাদ, নাহি শিরে তার
জয়ধ্বজ ।
হে প্রগলভে !
তুমি হবে অন্তরের মহিম সম্রাজ্ঞী
দুর্গম যাত্রার পথে হবে অশঙ্কিনী
বাজাবে কোমল কণ্ঠে বরাভয় শঙ্খ,
তুমি হবে দীপ্ত দীপ অন্ধকার পথে,
অস্ফুট প্রাণের তুমি হবে সখি ! হবে
অফুরন্ত আশা
ক্ষণ।
যুবরাজ!
মিথ্যা তব চাটু বাক, ভুলতে পারে না,
অলক্ষ্মী হতে পারি, নহি রাজলক্ষ্মী
যে সংসারে আছি মােরা, নহে কল্পলােক,
সেথায় রয়েছে মিথ্যা, দম্ভ অত্যাচার,
নাহি মানে প্রীতি, নাহি মানে ভালবাসা,
হৃদয় নিয়েছ বটে দাও তা ফিরায়ে।

চিরন্তনী
জয়ধ্বজ !
কি হেঁয়ালি তব,
ক্ষণা! ক্ষণা! ক্ষমা করাে, মাের অবহেলা,
রুদ্ধ ছিল শুদ্ধ প্রেম, শুধু ক্ষণতরে
দুর্গম বাধার মাঝে—মুক্ত সে প্রবাহ,
বিদর্ভ আহ্বান করে, হবে রাজ-বধূ
কল্যাণ দীপিতা।
ক্ষণা।
রাজবধূ বটে,
অন্তপুরে বিলাসের ক্ষণ-সহচরী।
[ নেপথ্যে ]
চিত্ররথ ।
একি ভাই, পালায় ত এমন কথা নেই—মিলনান্ত
যে বিয়ােগান্তের দিকে চলেছে।
পুণ্যকাম।
যা আছে সেটা বললে ত আর সৃষ্টি নয়, সত্যিকার
অভিনয় তাই, যেখানে বাক্য আপনি রসায়িত হয়ে
ওঠে।
বসুভূতি।
গল্পটা বেশ জমাট বাঁধছে, মালা দিয়ে শেষ হলে ত

চিরন্তনী
শেষই হয়ে যেত এখন একটা অশেষ কল্পনার সুযােগ
পাওয়া যাচ্ছে।
চিত্ররথ ।
তা নয় ভাই, মন্ত্রীর পার্শ্বচর আমার বন্ধু—আমি
জানতে পেরেছি—কিন্তু কথা ত গােপন রাখবে?
পুণ্যকাম।
নিশ্চয়ই
বসুভূতি।
নিশ্চয়ই
চিত্ররথ ।
ক্ষণা যে সেজেছে, সে যুবরাজের প্রণয়িণী
পুণ্যকাম।
তাহলে ত ব্যথা সহজ, জলের মত স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে
পুথির বাঁধিগৎ এখানে চলবে না-
বসুভূতি।
যুবরাজের নির্বাচন যুবরাজেরই মত,
চিত্ররথ ।
কিন্তু এ নিয়ে প্রণয়-লীলা চলে—তার বেশী নয়
পুণ্যকাম ।
কেন রাজার মেয়েই মেয়ে, আমাদের মেয়ে মেয় নয়,
৩

চিরন্তনী
চিত্ররথ ।
তা ত নয়ই, সাম্য জগতে নেই, এখানে যে বড় সে
ছােটকে ঘৃণা করেই বড় হয়েছে।
বসুভূতি।
যা ভাই চুপ কর, কাব্যানন্দ রস-ঘন হয়ে উঠছে
এখন তর্ক সমর থাক্।
-(২)-
জয়ধ্বজ ।
তুমি হবে মৰ্ম্ম সহচরী
তােমার উদাত্ত প্রেম, দিব্য ভালবাসা,
অশরীরি বাণী সম, দীক্ষা দিয়ে মােরে
বিকাশের মাঝে, নিত্য নিত্য নব নব
রূপে রসে হব স্নিগ্ধ, হে আত্মরূপিণী
তুমি দেবে মহাশক্তি, হব ঋদ্ধ সতি!
অজেয় আনন্দ মাঝে।
ক্ষণ।
যুবরাজ !
যে প্রেম বীর্যের মত করে জাগরূক
সে প্রেমে প্রবুদ্ধ হয়ে হও অগ্রসর

চিরন্তনী
মুছে ফেল পৃথিবীর সঞ্চিত কালিমা,
মুছে ফেল বিভেদের মিথ্যা নাগপাশ
মুছে ফেল বীর।
আকণ্ঠ করেছি পান
তীব্র হলাহল, মৃত্যু-ছায়া নেমে আসে
তােমার প্রেমের বলে করিয়াছি পান,
কর আশীর্বাদ-এ প্রেম সঞ্চিত হােক
লােক লােকান্তরে।
জয়।
মিথ্যা অভিনয়ে
শঙ্কিত কৰােৰা ক্ষণা, হের নীলাকাশে
হাসিছে চন্দ্রমা, হামে স্নিগ্ধ তারাদল,
প্রকৃতি লাবণ্যময়ী। হে লাবণ্য রাণি।
প্রণয়-সুরভি মত-লও মালা মম
ক্ষণ।
দাও তবে,
যতক্ষণ কণ্ঠে আছে ক্ষীণা ভাষা মাের
যতক্ষণ আছে চোখে, ক্ষীণতমা দৃষ্টি
ততক্ষণ হেরি তব প্রশান্ত-বদন
ভরুক ব্যথিত চিত্ত। সত্য পরিণয়

চিরন্তনী
আজি মধু পূর্ণিমার মধুময় রাতে
তােমাতে আমাতে—পরিণয় চিরন্তন
জন্ম-জন্মান্তরে।
জয়ধ্বজ।
হে রহস্যময়ি ।
ছল তব, কলা তব অনন্যা অপূৰ্ব্বা
তবু ব্যথা দেয়—তবু শঙ্কা জাগে
ক্ষণা।
ক্ষম প্রিয়তম,
মরণের কোলে আজ হােক পরিণয়
মিথ্যা নয়, মিথ্যা নয়, সত্য বন্ধু সত্য
করেছি গরল পান
জয়ধ্বজ।
চিত্রা । চিত্রা
নয় অভিনয়, বল মােরে সত্য করি
সত্য কথা কিংবা অভিনয় ?
চিত্র।।
যুবরাজ
অভিনয় বটে, মর্মান্তিক অভিনয়
আমি চিত্রা তব মণ্ডল পতির কন্যা

৪০
চিরন্তনী
কিন্তু নহি যােগা তব ।
হের রাজলিপি
বসন্ত উৎসবে তব এল নিমন্ত্রণ
পুলকে পূরিল অঙ্গ, সরম আবেশে
কপিল ব্যাকুল তনু, সাথে এল লিপি
রাজকন্যা শুধু রাজ বধু হতে পারে
মিথ্যা দুরাশার পানে বামনের মত
নাহি যেন ছুটি, হতে পারি বিলাসিনী
নহে রাজ লক্ষ্মী।
যুবরাজ।
চিত্রা! চিত্রা।
বসন্তের অন্তরের হে গােপন লক্ষ্মী।
একি শিক্ষা দিলে তুমি কঠিন কঠোর
দম্ভোরে অবজ্ঞা করি, মিথ্যারে উপেক্ষি ।
কিন্তু হায় প্রিয়ে, গভীর ব্যর্থতা শুধু
জীবনের লক্ষ্য হবে মাের।
চিত্র।
নহে বন্ধু, নহে,
অবসন্ন হয়ে আসে সকল শরীর
নয়নে নামিছে ধীরে নিদ্রার জড়তা,
কণ্ঠে জাগে অস্পষ্টতা, তবু বলে যাই

চিরন্তনী
৪১
যদি ভালবেসে থাক, অভাগী চিত্ৰারে
সেই ভালবাসা হােক অমােঘ দুর্জয়
যাও বীর জীবনের গ্লানিময় পঙ্কে,
বৈষম্যের ক্লেদ যেথা আছে পুঞ্জীভূত
বিষ বাষ্প সম, আনন। সেথা আনাে প্রিয়
পরিপূর্ণতার বাণী, ফোটাও সাধনা দিয়ে
প্রেমের বিকচ পদ্ম মানুষে মানুষে
জাগাও সহজ মৈত্রী, সমবেদনার
স্পর্শমণি দিয়ে, কর যুক্ত, কর শুদ্ধ,
যত ভেদ আছে—যত চাপ, যত শাপ
দূর কর তারে, হও নব ভগীরথ
প্রেম-গঙ্গোত্রীর
পুণ্য
উৎস ধারা হতে
আনি সুধা, কর সঞ্জীবন।
যুবরাজ।
চিত্রা, চিত্রা,
দিওনা দিওনা ভার, তােমার বিহনে
একান্ত দুৰ্বল আমি।
চিত্রা।
প্রিয়তম! প্রিয়তম!
মৃত্যু আসে ছেয়ে-একবার লও কোলে

৪২
চিরন্তনী
মরণ-মিলন তটে—দাও সখা দাও
মৃত্যু-আলিঙ্গন।
[ চিত্রা মূচ্ছিতা হইয়া পড়িলেন যুবরাজ তাহাকে ধরিয়া বুকে লইলেন—
ধীরে ধীরে পট পড়িয়া গেল ]
[ তৃতীয় দৃশ্য ]
[ পুষ্পস্তবক শশাভিতা চিত্রা মৃত্যুশয্যায় শায়িতা, মাধবী পাশে বসিয়া
আছেন, কবি ও ভরদ্বাজ যুবরাজকে সান্ত্বনা দিতেছেন ]
যুবরাজ।
চিত্র।
চিত্রা!
কবি।
ও কথা বলবে না-আর বলবে না বন্ধু,
যুবরাজ।
কথা বলবে না চিত্রা, অভিমানিনি কথা বলবে না?
কিন্তু কেন বলবে না? আকাশে চাঁদ হাসছে, পাখীত
ডাকছে, ঝরণা ত বইছে, তুমি কেন কথা কইবে না
মাধবী।
শান্ত হন কুমার, এই ছিল তার ললাটলিপি

চিরন্তনী
যুবরাজ।
ললাট-লিপি! কে লিখল সে লিপি, মানুষের সে
অহঙ্কার ষড়যন্ত্র করে এই অম্লান পুষ্পকোরককে
অকালে ঝরিয়ে দিল—সেই অজ্ঞাত শক্তিও কি এমনই
নিষ্ঠুর—এমনই পাপাচারী ? কবি ! তােমার গানে
কি মরণ-হরণ শক্তি নেই—ভরদ্বাজ, তােমার দর্শনে
কি মৃত্যুজয়ী মন্ত্র নেই ?
মাধবী।
উতলা হয়ে লাভ নেই বন্ধু!
যুবরাজ।
উতলা হব না মাধবী ? কোথায় সান্ত্বনা পাব? এই
যে চোখে দেখা জগৎ, সে দিচ্ছে ফঁাকি, সে জাগাচ্ছে
বিরােধ, সে তিলে তিলে মৃত্যুবিষ করছে উপায়ন,
তাই দেখব আর চুপ করে থানা না তা সম্ভব
নয় মাধবী।
কবি।
ভাই সান্ত্বনাহীন বেদনা, কিন্তু তবু সান্ত্বনা নিতে হবে
যুবরাজ।
কেন? কোন প্রয়ােজনে ? তােমার নাটক চমৎকার
হয়েছে কবি, এইত চরম কাব্য, এইত জীবনের

৪৪
চিরন্তনী
পরম পরিসমাপ্তি—এইত তােমার সুর ছন্দ বেশ
লয়ে এসে মিশেছে, কবি বাঁধাে গান, মাধবী আনন
বীণা
কবি।
বন্ধু ! বন্ধু !
যুবরাজ।
, না, কবি আমায় থামিও না, আমায় কাঁদতে দাও,
আমায় বুকভরে কঁদতে দাও, চিত্রা, চিত্রা, সােহাগিনী,
আদরিণী, কল্যাণি, একি শাস্তি, একি কঠোর
অভিশাপ ! ভরদ্বাজ !
ভরদ্বাজ।
ভাই,
যুবরাজ।
না, না আমরা আর সইব না, আমরা সইব না, এই
নির্মম অত্যাচার, এই নিষ্ঠুর আঘাত, এই নির্দয় শেল
ভরদ্বাজ।
সইব না ভাই
যুবরাজ।
সইবে না? কিন্তু কি করবে—পারবে নূতন বেদ
অনুভব করতে, নূতন শাস্ত্র গড়তে, নূতন স্মৃতি লিখতে

চিরন্তনী
৪৫
ভরদ্বাজ।
পারব বন্ধু!
যুবরাজ।
তা হলে লেখ ভাই, যে ফঁাকি মানুষ মেনেছে, মেনে
মেনে তার শক্তিকে বাড়িয়েছে, সেই বৈষম্যের
ফঁাকিকে চূর্ণ করতে পারবে ?—কিন্তু মানুষ মাবে
কেন ?—বিধাতা মানেনি—মানুষ মানবে না কবি
কবি। ভাই!
যুবরাজ !
আচ্ছা, সৃষ্টির এই অপচয় কোন সয়তানের জান কি ?
কবি।
শয়তানের নয় ভাই, বাধা ও অপচয়ের মাঝেই ত
জীবন ; যে চলার গান করি, জানি মৃত্যু তার বিচ্ছেদ
ঘটায়, কিন্তু তাকেই চরম বলে মানতে পারিনে, তার
পিছনে আছে এক অজানা কল্যাণ
যুবরাজ।
কি সে কল্যাণ ? কি সে রহস্যময় মঙ্গল ?
কবি।
সব ত জানিনে ভাই, তবে যিনি গাওয়ান, তিনি
যে প্রেরণা দেন, ছন্দ যখন লয়ে এসে শেষ হয়,

১৬
চিরন্তনী
সেখানেই
নূতন ছন্দের জন্ম হয়।
যুবরাজ।
মরণ তাহলে সত্য নয় ?
কবি।
সত্যও বটে, অসত্যও বটে,
যুবরাজ।
তার মানে,
কবি।
তার মানে ভাই বুঝানাে দায়, এটা সুরের মাঝে
অনুভব করা যায়।
যুবরাজ
যায় ভাই সত্যি যায় ? তবে গাও তােমার গান,
যে গান মরণের মাঝে কল্যাণের পুনরাবৃত্তি দেখে
কবি।
অন্ধকারের তিমির ছায়াতলে,
জ্বলেরে আলাে জ্বলে,
ঝরে যাওয়া ফুলের বাসে,
নূতন প্রাণের আবেশ আসে
হিয়ায় পদ্মকোষের দলে,
অবসানের নীরবতার মাঝে,

চিরন্তনী ৪৭ সুরের কঁাপন জাগে ঢেউ যে মিলায় সাগর-বেলায়, নূতন ঢেউয়ের আঘাত লাগে, নূতন জীবন জাগছে পলে পলে, মরণ-ছায়া তলে। যুবরাজ। ও ভাই হেঁয়ালি, ও বুঝতে ত পারিনে ভাই, ওই যে ফুলের চেয়ে কোমলা, আত্ম বিহ্বলা চিত্রা, ওর মৃত্যু কোন বিকাশ এনে দেবে ভাই! কবি। যার রঙ্গমঞ্চে আমরা খেলছি ভাই, তিনি ত সব দেখতে দেন না, যবনিকার আড়ালে যে লীলা চলছে সে লীলা যে আমরা দেখতে পাইনে ভাই- মাধবী । কুমার ! বসন্তের এই মধুরাতেই বসন্ত লক্ষ্মীর শেষ শয়ন হােক, তার চিতাশয্যায় জ্যোৎস্নার লাবণি ঝরুক—তার মরণকে বসন্তের দখিণ সমীরণ কুসুম- স্তবকে সমৃদ্ধ করুক, যুবরাজ। চিতাশয্যা ! চিতাশয্যা! চিত্রা! চিত্রা।

৪৮
চিরন্তনী
লাবণ্যময়ী! প্রেমময়ী, এই ছিল তাের মনে, না,
না, তােমায় আমি নিঃশেষ হতে দেবনা, শুনেছি
নীল নদীর তীরে মিশ্র দেশে তারা জানে গন্ধানু-
লেপন-যাতে মানুষের লাবণ্যকে অক্ষুন্ন করে রাখে,
আমি তাই করব চিত্রা, তােমার জন্য আমি মৰ্ম্মর
মন্দির গড়ব পৃথিবীর খনির সম্পদ লুণ্ঠন করে তােমার
সমাধি দেউলকে প্রােজ্জ্বল করব—আর সেখানে
তােমায় জাগিয়ে রাখব চির-যৌবনা-চির-কিশােরী
মাধবী।
তাই করুন যুববাজ ! আমি হব সে মন্দিরের প্রহরী
আমার সখীর নিদ্রাসঙ্গিনী—তার মৃত্যুর সহচরী
কবি
এ ঠিক নয় ভাই, ক্ষয়কে অক্ষয় করবার চেষ্টা ব্যর্থ
যুবরাজ।
কেন ?
কবি।
যুঁই ফোটে একটি দিনের সুষমায়, একটি দিনের
সৌরভ-সমারােহে, তার ঝরা ফুলকে গাছের সঙ্গে
রাখলে জীবনের পূজা না হয়ে মৃত্যুরই জয়ন্তী হবে।

চিরন্তনী
৪৯
মাধবী।
হােক, আমরা তােমার সেই অক্ষয় জীবনকে দেখতে
পাইনে
কবি।
কিন্তু সেই পাওয়াই আমাদের পাওয়া, আমরা চলি,
আমরা যৌবনেরি পূজারী
তারি রাঙা পায়ের তলে হৃদয় উজাড়ি!
সকল ক্ষয়ের সকল লয়ের মাঝে,
জীবন সুরের চপল ধারা বাজে,
গাই যে গান তারি,
মরণকে ভাই জীবন দিয়ে করি জীবন্ময়
আমরা চলি প্রাণের স্রোতে স্রোতে
জীবনের পূজারী,
আমরা জানি ক্ষয়ের মাঝে লুকিয়ে আছে
স্বরূপ পূর্ণতারি।
যুবরাজ।
ভরদ্বাজ, তুমি কি বল ভাই ?
ভরদ্বাজ।
নিশ্চল পাষাণ স্মৃতিকে নিশ্চল করে তুলবে, মানুষ ত
পাষাণ নয় বন্ধু!

৫০ চিরন্তনী যুবরাজ। তবে কি করব ভাই ? ভরদ্বাজ। একে আনন্দ দিয়ে পূর্ণ করে ভাই যুবরাজ। আনন্দ দিয়ে ? বল কি ভরদ্বাজ, তুমি ক্ষেপনি ত ? এ শােক অনির্বাণ, এ জ্বলবে রাবণের চিতার মত, ধিকি ধিকি তুষের আগুণের মত, এ শােক আমার চিন্তার গােপন ধন হবে, এ ব্যথা হবে আমার ধ্যানের লক্ষ্মী, আমার স্বপ্নের মাধুরী আমার জাগরণের আদর্শ— ভরদ্বাজ। অন্ধকারকে অন্ধকার দিয়ে ঢাকলে ত অন্ধকারের শেষ হয় না ভাই- যুবরাজ। তবে ? আলো জ্বাল—একটুখানি দীপশিখা, সে তােমার ঘরের জমাট অন্ধকার দূর করে দেবে।

চিরন্তনী
যুবরাজ।
সে আলাে কোথায় পাব ভাই—সে আলো যে
আমার চিত্রা নিয়ে গেছে—পৃথিবী যে আজ
আলােকশূন্য জ্যোতিহীনা তমােলােক—
ভরদ্বাজ।
এটা তােমার অজ্ঞানের কথা-
যুবরাজ।
অজ্ঞান !
ভরদ্বাজ।
রােজ ভােরে পূর্বাচলে অরুণের দীপ্তি জাগে--মনে
কর সে চলছে তার সাত-ঘােড়ার রথে আলােক
রশ্মি হাতে, সে যেমন ফঁাকি মৃত্যুও তেমনই ফঁাকি-
যুবরাজ।
ফঁাকি বল কি ভরদ্বাজ, তুমি আমার বুক চিরে দেখ,
সেখানে আগুণ জ্বলছে—বুকে হাত দিয়ে দেখ, তুমি
বলছ এ মিথ্যা
ভরদ্বাজ।
ওটা মরীচিকা, মরুভূমে তৃষ্ণার্ত পথিক দিগ্বলয়ে
দেখে—সলিল-সুন্দর উদ্যান—এও তেমনই চাই
দৃষ্টির পরিমার্জন—চাই প্রজ্ঞার পরিশােধন
-

৫২
চিরন্তনী
কবি।
তােমার কথা আমার কাছেও যে ভাই হেঁয়ালি
লাগছে-
ভরদ্বাজ।
এইটা বুঝতে হবে—ভাই, এই নূতন সুরে নূতন
বেদের গান গাইতে হবে, অমরত্বের গান—অমৃতত্বের
গান
যুবরাজ।
আমরা তােমার তত্ত্ব বুঝতে পারব না—তােমার দর্শন
আমাদের নয়-
মাধবী।
আমরা রক্ত মাংসের মানুষ, আমাদের বুক দুরু দুরু
করে—ব্যথায় আমরা শীর্ণ, শােকে আমরা জীর্ণ, দুঃখে
আমরা দীর্ণ
ভরদ্বাজ।
ওই দেখাটাই ভুল দেখা, সমগ্রতার যে সামঞ্জস্য তা
খণ্ডের লীলা-নর্তনে নাই-ও যেন নিশুতি রাতের
বুক চাপা স্বপ্ন, স্বপ্নের দৈত্য বাস্তবের কিছুই নয়—
তবু সে আৰ্ত্ত করে

চিরন্তনী
যুবরাজ।
তােমার উপমার জালে আমাদের দৃষ্টি ঘােলা হয়ে
যাচ্ছে--
==
ভরদ্বাজ।
সহজ নয় এ দেখা ভাই, সমস্তকে আনন্দের মধ্যে
ব্যপ্ত করে দেখতে হবে তাহলে যে ঐক্য সমস্ত দ্বন্দ্ব
বিরােধ মাঝে ফুটছে-তাকে দেখা যাবে-
মাধবী ।
, এ আমরা ধরতে পারিনে, তুমি মানুষের আশা
আকাক্ষাব জগতের বাইরে চলে যাচ্ছ
ভরদ্বাজ।
সেই যাওয়াতেই সার্থকতা—সমুদ্রের কূলেই বীচি-
বিক্ষোভ—সেখানেই তরঙ্গের আন্দোলন—গভীর
সমুদ্ৰ নিৰ্বাত নিষ্কম্প—ভিতর দেখতে হবে—সেই
আত্মদৃষ্টি দিয়ে—যে দৃষ্টির কাছে—সকলই আনন্দময়
হয়ে দেখা দেবে-
কবি।
তোমার কথা কিছু কিছু যেন অনুভূতির দ্বারে সাড়া
দেয়-

৫৪
চিরন্তনী
ভরদ্বাজ।
বুঝবে, আর এই বােঝাই মানুষের চরম সার্থকতা—
অস্ত্রের ঝঞ্চনা, বিক্ষোভ, বিরােধ, যখন দেখি, তখন
বুঝি সেইটাই সত্য, তা নয় তার তলে আছে অচঞ্চল
ধ্রুব সত্য।
কবি।
কিন্তু এ শান্তির বাণী ত আমাদের নয়, আমরা যে
গান করি গতির—দিক দিগন্তরে নিত্য নূতন অপ্রতি-
হত গতির—আমরা বলি-
কাল চলেছে কোন অকূলে কে জানে তার দিশা?
ভাের চলেছে রাতের পানে, ভােরের পানে নিশা,
ফোটার দিকে ফুল চলেছে জীবন বেগের লীলা
বীজের মাঝে ফুরাবে তার খেলা,
বীজ চলেছে ফুলের লাগি, নূতনতর উন্মেষে
চলাচলের এইত মধুর মেলা।
আমরা চলি প্রাণের স্রোতে নূতন বিবর্ধনে,
নূতনতর প্রকাশ লাগি,
আমরা খুজি আনন্দেরে চলার গতি ছন্দে,
চলার সুখে রইগাে জাগি,

চিরন্তনী
আমরা জানি রাতের শেষে জাগবে নূতন উষা,
নূতন দিনের পরব ভূষা,
এই প্রবাহ, এই গতি ওটা আকস্মিক, ওটা অবান্তর,
মাধবী।
কিন্তু এই গতিকেই ত আমাদের হৃদয় ও মন দিয়ে
অনুভব করছি
ভরদ্বাজ।
তা করছ—সূর্যোদয়ের মত ভুল দেখছ--
যুবরাজ।
হােক ভুল, এই ভুলই আমাদের পরম প্রেয়, যাও
মাধবী আমার পার্শ্বচর নন্দনকে ডাক—সে যাবে
মিশ্রদেশে
ভরদ্বাজ।
আমিও নন্দনকে ডাকতে বলছি—সে নন্দন শুধু
বাইরে নেই—সে আছে অন্তরে, কবি জাগাে, এই
আনন্দের বাণী জাগাও, মানুষের মাঝে যে অমৃত
অভয় আছে—তার গান গাও-চঞ্চলতার পেছনে
যে স্থির সত্য আছে—সেই ধ্রুবের জয়গান কর—

চিরন্তনী
যুবরাজ।
আমরা যে তা অনুভব করতে পারিনে-
ভরদ্বাজ।
অনুভবের সাধনা করতে হবে-তাহলে দেখবে মৃত্যুও
মিথ্যা জীবনও মিথ্যা, পরমার্থতঃ সেই আনন্দই সত্য
যুবরাজ।
এই বস্তু, এই বিক্ষোভ,
এই বিক্ষোভ, এই প্রচণ্ড প্রাণ-স্রোত
ভরদ্বাজ।
এটা স্থির আনন্দ সমুদ্রের তরঙ্গদোলা—এই ক্ষণিকের
লীলাভিনয়ের পেছনে গভীরতার অন্তস্তলে ডুবতে
হবে তাহলে সবই আনন্দময় হয়ে যাবে—তখন
দেখবে মৃত্যু ব্যথা আনে না, সে আনে গভীরতর
আনন্দ—গভীরতম প্রশান্তি-
যুবরাজ।
দাও ভরদ্বাজ, তােমার এই অমৃত মন্ত্রে দীক্ষা
মাধবী।
কবি, বাঁধ্যে এই বিজয়ের গান
কবি।
তাই বাঁধব

চিরন্তনী এই আনন্দই আমাদের মুক্তির মন্ত্র, কবি সেই আনন্দকে সুরে ঝঙ্কৃত করাে, খণ্ডদৃষ্টির অজ্ঞতা থেকে ভূমার বােধে মানুষকে দীপ্ত করে। কবি। তাই করব যুবরাজ। তাই করাে কবি ! মৃত্যুর মাঝে হােক অমৃতের উদ্বোধন, চিত্রার এই অকাল বিসর্জন আলােকের প্রকাশে প্রােজ্জ্বল হােক- ভরদ্বাজ। মৃত্যুর সেই ত চরম সার্থকতা যুবরাজ। .. জাগাে, চিত্রা, আমাদের এই ধূলি মলিন গেহে আনন্দের অন্তরাত্মা হ'য়ে, জাগো পুণ্যের দীপ্ত প্রবাহে—জাগগা সত্যের নিষ্কলুষ পাবনী শ্রীতে মাধবী। জাগাে সখি ! প্রীতির লাবণ্যের চির লাবণ্যময়ী হয়ে আমাদের শ্রদ্ধায় ও প্রেমে চিরন্তনী সুষমা হয়ে

চিরন্তনী
--
ভরদ্বাজ।
বন্ধু, তােমার প্রেম আজ সার্থক হয়ে উঠল—
প্রেম যখন বাঁধে, তখন সে ছােট হয়, যখন সে
বিকাশ করে তখনই সে বৃহতে বিলীন হয়
কবি।
আমি পেয়েছি—পরশমণির সন্ধান পেয়েছি
.
[ নন্দনের প্রবেশ ]
নন্দন।
যুবরাজ, মহারাণী আদেশ করেছেন—চিত্রার সৎকার
রাজ শ্মশানে হবে
যুবরাজ ।
যাও নন্দন, তঁাকে আমাদের শ্রদ্ধা জানাও, কিন্তু
আজ পার্থিব গৌরবের হীনতা বুঝেছি—চিত্রার শেষ
শয্যা হবে সাধারণের মত, জন-চিত্তের শ্রদ্ধাই তাকে
মহিমামণ্ডিত করবে-
মধবী।
যাও নন্দন, শব বাহকদের ডাকো-বসন্তের অকলঙ্কা
ৰ্ত্তি বাসন্তী পূর্ণিমায় আপনাকে নিঃশেষিত করবে-

চিরন্তনী
[ নন্দন বাহির হইয়া গেল, শববাহকেরা ধীরে ধীরে চিত্রার পুষ্পাচ্ছা-
দিত শব লইয়া গেল-যুবরাজ নিষ্পলক নেত্রে চাহিয়া রহিলেন—মাধবী অশ্রু
বিহ্বল নেত্রে শবনুগমন করিলেন ]
কবি ।
বন্ধু! বন্ধু !
যুবরাজ।
কবি ।
কবি।
আড়ষ্টতা নয়, সন্ধান পেয়েছি, জীবনের লুকানাে
চাবি কাঠির —ভরদ্বাজ তুমিই ধন্য—
ভরদ্বাজ।
তার লীলা-যােগের আমরা সবাই সাথী—সবাই
মিলে তাঁর লীলার আসর প্রস্ফৰ্ত্ত করি
তােমার গান নিয়ে চল কবি—চিত্রাকে আমাদের
শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি দেব--
কবি।
চলছে লীলা, চলছে লীলা চিরন্তনী,
নাইরে দেশ, নাইরে শেষ, নাই বন্ধনী।
জন্ম মৃত্যুর ছন্দ-লয়ে চলছে নিঝরিণী
আনন্দ স্বরূপিণী ।

৬০
চিরন্তনী
উন্মেষ তার আনন্দে ভাই, নিমেষ আনন্দে
চোখ মেলে তুই যােগ দে তার ছন্দে।
মরণ থেকে জীবন জাগে, জীবন মরণ মাগে,
তারই স্রোতের পিছে—অমৃত লােক জাগে,
আলােছায়ার খেলার মত, চলছে খেলা সনাতনী
যে পেয়েছে আনন্দেরি পরশমণি
তারই চোখে খুলবে ওরে খুলবে গােপন সুধার খনি
সেইত জানে সত্য চিরন্তনী।
*:
[ যবনিকা পতন ]

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Cherontani

Author
Das, Motilal
Title
Natika
File name
Cherontani
Text
OCR done
Citation
1936
Published
2009/09/22
Publisher
Book Co., Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
74
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Chitrarath
DLI number
512551
Barcode
4990010019615.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
pDYRbg1NsnM
Download PDF

Cherontani