Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Thakurer Chithi Vol.2

2010/04/28

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

"
ও তৎসং
ঠাকুৱেৱ চিঠি
শ্ৰীমদাচাৰ্য স্বামী নিগমানন্দ পরমহংসদেব কর্তৃক তদীয়
শিষ্য-ভক্তগণকে লিখিত অমূল্য উপদেশপূর্ণ
১০০ এক শত চিঠির সমাবেশ
প্রকাশক
০
শ্রীহরপ্রসাদ রায়
১৩৩৯ বঙ্গাব্দ
সৰ্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
[মূল্য ১১ টাকা মাত্র

==
প্রাপ্তিস্থান :
উর বাঙ্গালা সারস্বত আশ্রম
বগুড়া
এই গ্রন্থের সমগ্র আজ
উত্তর বাঙ্গালা সারস্বত আশ্রমের
রক্ষা ও উন্নতিকল্পে ক্যয়িত হইবে
বগুড়া কমলা মেনি প্রেসে
তুলচন্দ্র মজুমদার কর্তৃক মুদ্রিত

প্রকাশকের নিবেদন ; ঠাকুরের কৃপায় “ঠাকুরের চিঠি”র দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হইল। অদূর ভবিষ্যতে দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের কোন আশা প্রকাশকের মনে ছিল না; তাই পূর্ব প্রকাশিত ঠাকুরের চিঠিকে কোন খণ্ডে অভিহিত করা হয় নাই। কিন্তু তার কোন্ এক অজ্ঞাত অঙ্গুলিহেলনে যে এই দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের সুযােগ ও সুবিধা ঘটিয়া গেল, তাহা বাস্তৱিকই আমার মত তার একজন গণ শিষ্যের বুদ্ধির অগােচর। এখনও পূর্ব- প্রকাশিত প্রথম খণ্ডের যথােপযুক্ত সমাদর হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না, কিন্তু তবুও তারই প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হইয়া তার অমৃতময়ী বাণী—যাহা পরবর্তী কালে আমাদের হস্তগত হইয়াছে, সাধারণে প্রকাশ করিলাম। ইহাতে গানব জীবনের সর্বাবস্থায়ই ঘাত প্রতি ঘাতে উদ্ভূত সুখ ও দুঃখের সম্মুখীন হইবার উপযোগী সকল প্রকার সূক্ষ্ম তত্ত্বের বিশ্লেষণ রহিয়াছে। ঘাের অমানিশার কোলে যে ক্ষীণ আলােক বিচ্ছুরণ মুমুক্ষুর জ্ঞান-নয়নে প্রতিভাত হইতেছে, তাহাতে সাধকের চিত্তকে দৃঢ়ভাবে আকৃষ্ট রাখিয়া, সত্যের পথে ত্যাগের পথে-বিবেক-বৈরাগ্যের পথে তাহাকে পরিচালিত করিবার উপ- যােগী সর্ববিধ তত্ত্বের সহজ-সরস সমাবেশে এই চিঠিগুলি পূর্ণ। কালের অতিহত গতিতে আঁধারের পর আলল, আলাের পর আঁধার আত্মপ্রকাশ করিয়া চলিয়াছে। আজ এই যুগ সন্ধিক্ষণে সকলেই স্তব্ধ, মুগ্ধ ও, আত্মহারা ! সত্য এবং তত্ত্বের সন্ধানীবিবিধ মতবাদ ও সাম্প্রদায়িক পুষ্পিত বাক্যজালে বিভ্রান্ত। তাই এই দুঃসময়ে সাম্প্রদায়িকতাদোষবর্জিত সত্য অমৃতবাণী ঠাকুরের এই চিঠিগুলি মুমুক্ষু সাধারণের পথান্বেষণে সহায়তা করিবে আশায় প্রকাশিত হইল। উপদেশচ্ছলে পুস্তকাকারে প্রকাশের জন্য এই পত্রগুলি ঠাকুর কর্তৃক লিখিত হয় নাই। এগুলি সংসারে নানাভাবে ফ্লিষ্ট তঁার গৃহী, ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী শিষ্যগণকে প্রয়ােজনানুরােধে লিখিত প্রকৃতই কতকগুলি চিঠি। আর “ঠাকুরের চিঠি” এইরূপ কয়েকটী চিঠিরই সমাবেশ। কাজেই ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে বিভিন্ন সময়ে লিখিত হইয়াছে বলিয়া জীবন-সমস্যার সমাধান স্বরূপ ইহাতে একই উপ- দেশের পুনরাবৃত্তি পরুিলক্ষিত হওয়াও অসম্ভব নহে। আশা করি পাঠকগণ ইহাকে পুনরুক্তি দোষের মধ্যে গণ্য না করিয়া শ্রবণাগুণ রূপেই গ্রহণ করিবেন। গ্ৰন্থখানিকে যথাসম্ভব সৰ্বসাধারণের উপযােগী করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। তদনুকল্পে বিষয়-বিভাগ ক্রমে চিঠিগুলি সাজাইয়া যথােপযুক্ত স্থানে সন্নিবেশিত করা হইয়াছে। কতকগুলি বিশিষ্ট চিঠির স্বাতন্ত্র রক্ষা করিয়া যে যে চিঠির মধ্যে অধিকাংশ স্থলে সাম- ঞ্জস্য দেখিতে পাইয়াছি, তাহাদিগকে এক এক শ্রেণীভুক্ত করিয়া অব- শিষ্ট বিমিশ্র চিঠিগুলিকে “বিবিধ” পৰ্য্যায় ভুক্ত করিয়াছি। ইহাদের সংস্থান বিষয়ে সাধারণত এরূপ প্রণালী অবলম্বিত হইয়াছে যে, স্থল- বিশেষে বিভাগক্রমে ধারাবাহিক ভাবে যেগুলি পড়িয়া গেলেও পাঠকগণ তাহার মধ্যে একটা সামঞ্জস্যের সূত্ৰখুঁজিয়া পাইবেন। গ্রন্থের প্রতি দক্ষিণ পৃষ্ঠায় দক্ষিণ শীর্ষে শ্রেণী বিভাগানুযায়ী প্রত্যেক চিঠির মূল বিষয় উল্লিখিত হইয়াছে এবং গ্রন্থের প্রারম্ভে বিষয়গুলির একটী বর্ণানুক্রমিক সূচীও প্রদত্ত হইয়াছে। ইহাতে যে গ্রন্থখানির উগযােগিতা প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি পাইয়াছে, তাহা বলাই বাহুল্য। পরিশেষে নিবেদন, তাড়াতাড়ি প্রকাশের চেষ্টা করায় গ্রন্থ- খখানিকে মুদ্রাকর ভ্ৰম-প্রমাদের হস্ত হইতে আশানুরূপ মুক্ত রাখিতে পারি নাই।, তজ্জন্য পাঠকগণের ক্ষমা-দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি। কিমধিকমিতি سه শাহরপ্রসাদ রায়। ২রা পৌষ, ১৩৩৯ সাল।

বিষয়-সূচী [ বর্ণানুক্রমিক ] বিষয় ক্রমিক সংখ্যা পৃষ্ঠা pE ৭৭-৭৮ অবিদ্যার খেলা অভয়বাণী ৪ ৭-১০ ০ ১৫৩-১৫৯ অভাব ও আত্মহত্যা : জ ৬৯-৭০ ১০ ৩-১০৮ ৭১ ১০৮-১১০ १२ ১১-১১৪ আম ও সেবক আশ্রম স্থাপনের উদ্দে আশ্রমের স্মৃতি কর্তব্যে উৎসাহ কর্মের প্রভাব গার্হস্থ্য ও সন্ন্যাস গুরু ও ইষ্ট অভিন্ন ১০২-১c ৮৮-৯৫ ৭৬-৭৭ ১১৯-১২১ { গুরু ও শিষ্য ৭৮-৮৭ : ১২১-১৩৬ ৪৩ ৬৪-৬৫ ৪৮ ৭১-৭২ ৩০-১০ ৫ - ৬ ৭৮-৮১ চিৎ ও অনিন্দ জীবের স্বরূপ দীর্ঘায়ুর সার্থকতা। নির্ভরতা পতনে আশ্বাস পরলােকের অস্তিত্ব প্রারব্ধ ও আত্মহত্যা বলিদানে মন্তব্য বিজয়ার আশীর্বাদ ... বিদ্যালয়ের পরীক্ষা ৪ । ৫ ৪ *৫০-৫২ ৭৪-৭৬ ক্রমিক সংগ} পৃষ্ঠাঙ্ক ১১-১৩ ১১ ৯-১০ ••• ১৪-১৬ ৪৫ ৬৬-৬৮ ৪৬-৪৭ ৬৮৭১ ৮৮-৯৬ ১৩৭১৫৩ ৪৪ ••• ৮৩-৮৪ বিষয় বিধবার কর্তব্য বিপদই সম্পদের নিদান বিপদে কর্তব্য বিপদে সান্ত্বনা বিবাহ বিধিনির্দিষ্ট বিবাহে কৰ্ম্মের প্রভাব বিবিধ বীজমন্ত্রের উচ্চারণ বৃত্তির-বৈপরীত্য ব্রহ্মচারীর কঠোর নিয়ম ভক্তি ও ব্যাকুলতা ভক্তের দৌরাত্ম্য ভক্তের রােগ ভগবানের দয়া মঙ্গলময়ী মৃত্যু ও শ্রদ্ধ মৃত্যু- বার ত্যুতে সান্ত্বনা রমণীত্ব ও জননী রােগের প্রতীকার ১০ ০ -১০২ ১-২ * * * ২৬-২৭ ৩৯- ৪৩ ৪১ ৪৯ ৭২-৭৪ ১৮-২১ ২৮-~-৩৩ ১২-১৩ ১৭-২০ ১৪-১৭ p ৪২ ••• ২৮-২৯ সংযম ও ত্যাগ ৬৬, ৯৯--১০০ সন্ন্যাসীর সাধনা ৬৪ স্বামীই ইষ্টদেবতা সেবা-মাহাত্ম ৭৩-৭৫ ১১৪-১১৯

No text on this page.

TELL The Kamula Machine Press-Bugi.i.

No text on this page.

ভাকুরের চিতি
দ্বিতীয় খণ্ড
১) '
কল্যাণবরেষু—-
প্রিয়বি, তুমি যে স্বপ্ন দৈখিয়াছ, স্থূলভাবে তাহা সত্য
না হইলেও আধ্যাত্মিক ভাবে তাহা সত্যে পরিণত হইবে।
স্থূলভাবে পূর্ণ হওয়া অসম্ভব নহে । তবে সমগ্ন অল্প,--
সে অল্প সাংসারিক অনেক দিন। ভবিষ্যতে যে অভিনয়
হইবে, জীবকে আশ্বাসের জন্য ভগবান্ পূৰ্বেই সে চিত্র
জীবকে দেখাইয়া থাকেন।
ভগ্নবান প্রাপ্তির একমাত্র উপায় ব্যাকুলতা।
ব্যাকুলতা কিরূপে হয়, সাধক তাহা জানিতে পারে না।
অন্যে তাহা উপলব্ধি করিয়া আশ্চর্য্য হয়।
নিজে না
বুঝিতে পারাও বানের কৃপা, নতুবা অহং আসিয়া উচ্চ
উচ্চতর উন্নতির পথ বন্ধ হইয়া যাইত। আর যে সকল

ফল ঠাকুরের চিঠি বাধা বিপ্ন আছে বা হইবে, সরল ভাবে তাহার নিকট প্রার্থনা করিলেই তিনি সে সকল বাধা বিপ্ন অপসারিত করিয়া লইবেন। নিজে ইচ্ছা করিয়া বন্ধন মুক্ত করিবার প্রয়ােজন নাই, সময়ে তিনিই মুক্ত করিয়া দিবেন। পাকিলেই আপনা হইতে বৃক্ষ হইতে পতিত হয়। তিনি যেরূপ ইচ্ছা সেরূপ ভাবে জীবকে লইয়া লীলা করেন, ফলে সাধক বাসনা-কামনা ভুলিয়া প্রাণের প্রার্থনা সরল- ভাবে ব্যাকুল কণ্ঠে তাহাকে জানাইলে তিনি সব ঠিক করিয়া দিবেন। আমাদের কিছুই করিবার দরকার নাই, তবে ভাবের ঘরে কপটত। না থাকিলেই হইল। প্রার্থনায় পাটোয়ারী বুদ্ধি না আইসে। তঁাহাকে কেবল ডাক, তঁার জন্য যাহাতে ব্যাকুলতা 'আইসে তজ্জন্যই প্রার্থনা কর। সরল ভাবে হৃদয় অন্বেষণ । হৃদয় অন্বেষণ করিয়া দেখ কোন্টা অভাব, পরে সেই দৈন্যতা তাঁহাকে জানাও, সব ঠিক হইয়া যাইবে। বিশ্বাস কর, অবশ্য ভগবান্ কৃপা করিবেন। নির্ভরতায় নিশ্চিন্ত হও। ইতি সতত শুভাধ্যায়ী- শ্ৰীস্বামী নিগমানন্দ ২ ভক্তি ও ব্যাকুলতা ( ২ ) নীলাচল কুটীর স্বর্গদ্বার—পুরী ৮|৩|৩৪ কল্যাণীয়াসু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্র যথাসময়ে পাইয়া পরম প্রীতিলাভ করিয়াছি। তােমার অবস্থা যাহা লিখিয়াছ, তাহাতে তুমিত পরম মঙ্গলের পথেই উন্নীত হইতেছ! “যত তােমায় পাই আরও তত যাচি”, ইহা ত ভক্তি-সাধনের লক্ষণ, তাই তােমারও আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়া যাইতেছে । প্রেম- ভক্তির পথে, ভগবাকে পাইতে হইলে দুঃখ-জ্বালা-যন্ত্রণা সহিতেই হইবে; ক্রমশঃ সংসার বিষবােধ হইবে, সব ভালবাসা তাহার দিকে যাইবে। কাজেই সংসারে কোন বস্তুতে আর তৃপ্তি পাওয়া যাইবে না, চিত্ত একমুখী হইয়া কেবল একজনের দিকে ধাবিত হইবে। আর তঁাহার জন্য প্রাণটা ছিন্নকণ্ঠ কপােতীর ন্যায় ছটফট করিবে, তবে না তাহার প্রেমলাভ হইবে ? রাধারাণীও দারুণ দুঃসহ বিরহ বেদনা শত বৎসর ভুগিয়া তবে চিরদিনের জন্য শ্যাম- সুন্দরকে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ওগগা! তােমারও কতকটা সেই লক্ষণ প্রকাশ পাইতেছে, তাই প্রেমাস্পদের জন্য কাতরা বিরহ-বিধুরা হইয়া উঠিতেছে। 'তােম্বার যে ঠাকুরের চিঠি প্রেম ত অপচয় হয় নাই, প্রাণের ঠাকুরের জন্য ভাণ্ডার • করা ছিল ; এখন আপন জনের সন্ধান পাইয়াছ, তাই তাহার তরঙ্গ দেখিতে পাইতেছ। তাহার জন্য পাগল না হইলে, জীয়ন্তে মরা না হইলে কি কেহ তাহাকে পায় ? ব্যাকুলতা-আকুলতাই যে তাহাকে পাইবার একমাত্র পথ ! এই বিরহ-আগুনে মানবত্ব যতই দগ্ধ হইবে, ততই ভাবময় দেহ পুষ্ট হইবে। ভাবময় দেহ পরিণত হইলে, তবে কৃষ্ণ- সঙ্গ-সুখ লাভ হয় এবং অন্তিমে প্রেমসেবােত্তরা গতি হইয়া থাকে। তুমি ধ্যানকালে ইষ্টদেবতার" পার্শ্বে যে তোমার নিজ মূর্তি দেখিতে পাও, উহাই তােমার ভাবময়ী তনু। ও চিন্তার কালে উহা ঔ হয়। তুমি যে প্রেমময়ের কৃপাপাত্রী তাহাতে সন্দেহ নাই, তুই এত অল্প সময়ে তােমার ভাবদেহ ফুটিয়াছে। এবার যখন দেখা হইবে, তখন এই সব তত্ত্ব বিশেষ ভাবে বুঝাইয়া দিব, কারণ এখন তুমি এই তত্ত্বের অধিকারিণী হইয়াছ। আমি কৰ্ম্মক্ষেত্র হইতে অবসর লইয়াছি, কাহাকেও পত্রাদি লিখি না তবে তােমার অবস্থা আমাকে লিখিয়া জানাতে বাধা নাই। কুশলাদি সংবাদ সেবকের। জানাইবে। আর রােগ-শােক সংসারের নিত্য ঘটনা—কৰ্ম্মফলানুসারে ভােগ করিতেই হইবে।' তঁাহার দান বলিয়া সুখ-দুঃখকে সম- ভাবে গ্রহণ করিতে অভ্যাস করিও। আমি বর্তমানে ৪

অভাব ও আত্মহত্যা
শারীরিক ভালই আছি। অন্যান্য মঙ্গল।
আমার আশীৰ্বাদ জানিবা। ইতি-
শুভানুধ্যায়ী
ঠাকুর
( ৩ )
সারস্বত মঠ
৩৫২৩
স্নেহাস্পদে
বহুদিন পরে তােমার পত্র, পাইয়া বিস্তারিত সমাচার
অবগত হইলাম। তুমি সাংসারিক অভাব অনটনে বড়ই
উৎপীড়িত হইয়া পড়িয়াছ, নানারূপ প্রতিকূল ঘটনায়
পড়িয়া গিয়া ঘাবড়াইয়া গিয়াছ । বৎস! এ সংসারে
অভাবের তাড়নায়, অস্থির স্নহে কে?
সকলেই কোন না
কোন রূপ তাভাবগ্রস্ত হইয়া অশান্তি ভােগ করিতেছে।
এ সংসারট। যে অভাব দিয়া গড়া! এ অভাব কাহারও
মেটে নাই, মিটিবার সম্ভাবনাও নাই। মােগল বাদশাহগণ
মণিময় ময়ূর সিংহাসনে বসিয়াও অভাব মিটাইতে পারেন
নাই। সুতরাং সকলকেই আপন অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিতে
প্রতিপাল্য পরিবারগণকেও সে অবস্থায় সুখী
হইতে বাধ্য করিতে হইবে। নিজকে কর্তব্যের কঠোর
ভিত্তিভূমির উপর খাড়া রাখিতে হইবে। পারিবারিক
গঞ্জনায় সামাজিক লাঞ্ছনায় বিচলিত হইলে চলিবে না।
হইবে।

ঠাকুরের চিঠি তবে সৎভাবে ও সৎপথে থাকিয়া নিজের আয় বৃদ্ধির চেষ্টা ও আশ্রিত জনগণের যথাসাধ্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যত্ন করা কর্তব্য। কিন্তু সমাজের সহিত প্রতিযােগিতায় নিত্য নূতন অভাবের সৃষ্টি হইবে। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভাবও বাড়িয়া যাইবে। আবার ইচ্ছা করিয়া মরিলেই অভাবের তাড়না হইতে রক্ষা পাওয়া যায় না। মরিলে যদি জ্বালা জুড়াইত, তবে জ্ঞানীমাত্রেই আত্মহত্যা করিতেন। জানিয়া শুনিয়া আর রক্ত মাংসের পচা দেহে বসিয়া থাকিতেন না। বরং তাহারা জানিয়াছেন—বিধাতার শৃঙ্খলা ভাঙ্গিলে জ্বালা বাড়িবে বই কমিবে না। কয়েদী জেল ভাঙ্গিয়া বাহির হইলে নিস্তার নাই, বরং দণ্ড বৃদ্ধি হইয়া থাকে। তাই জ্ঞানীরাও শির অবনত করিয়া প্রাক্ক ভােগ করিয়া থাকেন। কোন অবস্থায় একথা বিস্মৃত হইও না। আর যে সংসারে নিরাশ হইয়া মরিতে পারে, সে একবার ভগবানের জন্য চেষ্টা • করিয়া মরে না কেন ? • সুতরাং বৎস! দুঃখ-কষ্টে পড়িয়া মরার সঙ্কল্পও হৃদয়ে স্থান দিও আত্মা মরেন না; সৰ্বশক্তিমান হইলেও তাহার মরিবার শক্তি নাই। সুতরাং যারা মরে, প্রকৃত তারা মরে -কৰ্ম্মফলের বহর বাড়াইয়া লয় মাত্র। * * * ইতি আশীৰ্বাদক- ঠাকুর ৯ { 1

প্রারব্ধ ও আত্মহত্যা
( ৪ )
পুরী
২০৫৩৩
কল্যাণবরে
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র পাইয়া দুঃখিত হইলাম। সংসারে কেহ
সুখ-শান্তি ভােগ করিতেছে বলিয়া বিশ্বাস করি না—একটা
একটা অভাব বা দুঃখ সকলেরই আছে। তবু যাহারা
আপনাকে সুখী বলিয়া মনে করে, তাহারা অবিদ্যা-
বিমােহিত মােহমুগ্ধ পশু মাত্র। যে যেমন প্রারব্ধ লইয়া
আসিয়াছে, তাহাকে তাহা ভােগ করিতেই হইবে।
সংসারটী যুদ্ধক্ষেত্র ; অজীবন যুদ্ধ করিয়াই যাইতে হইবে।
আত্মহত্যা করিবার কাহারও অধিকার নাই।
আত্মহত্যা
করিলে যদি যন্ত্রণা এড়াইতে পারিত, তবে আর ভাবনা
ছিল কি? ধীর ও স্থিরভাবে প্রারব্ধ ভােগ করিয়া যাও।
স্ত্রী-পুত্ৰাদিও প্রারব্ধ অনুসারে সম্মিলিত হয়, সুতরাং কোন
বিষয়ে ক্ষুন্ন না হইয়া যথাসাধ্য কৰ্ত্তন প্রতিপালন করিয়া
যাও। . কৰ্তব্য-জ্ঞান নষ্ট হইলে সত্যলাভের জন্য বাহির
হইয়া পড়।
কিন্তু সাবধান! আত্মহত্যার সঙ্কল্পও মনে
স্থান দিও না। এসব তত্ত্ব সাক্ষাতে আলোচনা কর।
যাইবে। আপাততঃ তােমার তিনটি প্রশ্নের উত্তর
দিতেছি ।

ঠাকুরের চিঠি
*
শ
(১) বিপদের মাঝে আত্মসম্মান বজায় রাখিয়া কি
ভাল চলা যায় ? আত্মসম্মান কথাট। পাশ্চাত্য জগতের
আমদানী। মান-অপমানের দাবীটা "সংসর্গ ও শিক্ষার
উপর নির্ভর করিতেছে। সত্য পথে থাকিয়া সদ্ভাবে জীবন
যাপন করিলেই আত্মসম্মান বজায় থাকিল । সমাজের
লােকের সঙ্গে পাল্লা
পাল্লা দিয়া বৰ্ত্তমান সভ্যতার অনুসরণ
করিলে আত্মসম্মান বজায় রাখা কঠিন।
* • * নিজে
বলবান্ হও।
অসঙ্গত খেয়াল গ্রাহ্য করিও
— -সৰ্ব্বপ্রথমে নিজে স্বাস্থ্য লা কর। তােমার শরীরটা
অত্যন্ত ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। শরীর “বলশালী না হইলে কি
করিয়া খাটিয়া খাইবে এবং কর্তব্য পালন করিবে ?
(২) *
(৩) #
সাক্ষাতে আমার সঙ্গে এসব বিষয়ের আলােচনা
করিও। জ্ঞান, হইলে প্রারব্ধ ভােগ করিয়াও আনন্দ
পাওয়া যায়। অত্র শুভ। আশীৰ্বাদ করি তুমি শান্তি
লাভ কর। সাংসারিক আঘাতে উদ্ভ্রান্ত হইও না।
ইতি
।
শুভানুধ্যায়ী--
শ্ৰীনিগমানন্দ

কৰ্ম্মেরু প্রভাব (৫) নীলাচল কুটীর পুরীধাম কল্যাণবরে- শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্রপাঠে সবিশেষ জ্ঞাত হইলাম। জীবন- নাটকের পট পরিবর্তন ফলে সুখসূর্যের উদয়াস্ত ঘটে। জীব কৰ্ম্মসূত্রে বদ্ধ। শুভাশুভ কৰ্ম্মজনিত পুণ্য-পাপের ফলস্বরূপ সুখ-দুঃখ প্রিয়াপ্রিয় সংযােগ ঘটে। জীব দৈবা- ধীন এবং দৈব অনতিক্ৰমণীয় জানিয়া বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি দুঃসময়েও উদ্বিগ্ন, বিষন্ন বা মুহমান হয় না। দৈবের অমােধ বিধান নতশিরে মানিয়া লইয়া স্থির-ধীর বুদ্ধিতে শ্রেয়াে- লাভার্থ ইষ্ট সাধনে যত্নবান্ হয়। লােকে দুঃখের প্রতি স্বাভাবিক বিদ্বেষ বশতঃ তদন্তরালে সেই পরম মঙ্গলময়ের মঙ্গল হন্ত লক্ষ্য করিতে পারে না। কৰ্ম্মফলভােগান্তে শেষ হয়। দুঃখ-তাপে পরিতপ্ত হইয়া দেহী অনঘ হয় এবং দেহ- মন-বুদ্ধি মার্জিত ও পরিশুদ্ধ হয়। গুদ্ধিলাভ ফলে মঙ্গল- ময়ের মঙ্গল ইচ্ছা বুঝিবার ও ধারণা করিবার শক্তিলাভ করিয়া আপনাকে ধন্য ও কৃতার্থ জ্ঞান করে। দুঃখ মানবের সহ্যশক্তি বাড়াইয়া দিয়া যায়। দুঃখ সহিতে পারিলেই দুঃখ জয় করা যায়। ভয় পাইও না, বিমূঢ় হইও না। নেত্রে তাহার দয়া ও করুণাকণার ভিখারী হইয়া বুদ্ধিপূৰ্ব্বক করুণ-

ঠাকুরের চিঠি
বর্তমান কাৰ্য্য করিয়া যাও। তাহাতেই শ্রেয়ােলাভ
করিবে, অভ্যুদয় হইবে। বর্তমান সময়টীও বড় খারাপ
যাইতেছে। দেশব্যাপী অর্থকৃচ্ছ তা পরিদৃষ্ট হইতেছে। বুঝি
কালের প্রভাব সংশােধনের সর্বচেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিতেছে।
শুভদিনের প্রতীক্ষায় থাক, শুভকালে শুভ লাভ করিবে।
আমার শরীরটা তত ভাল নাই। আমার আশীর্বাদ
জানিবে ও অন্যান্য শিষ্য-ভক্তদের জানাইবে। ইতি
শুভানুধ্যায়ী-
এনিগমানন্দ
}
(৬)
पर्छ
২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩২২
স্নেহাস্পদে
পরম শুভাশিষাং বাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র যথাসময়ে পাইয়াছি। যে যাহা বলে,
সে যদি তাহার প্রতিকার না করিয়া দিতে পারে, তবে সে
কথার মূল্য অতি অল্প। 'তােমাদের যার তার কথায় উদ্বিগ্ন
হওয়া আর এখন কর্তব্য নহে। সন্তান আসিয়াছিল সত্য,
কিন্তু, মাতার অত্যধিক উদ্বগ আশঙ্কায় জ্বণাবস্থায় তাহা

• বিপই সম্পদের নিদান শুষ্ক হইয়া যায়; জগন্মাতা তাহা তােমাদের দেখাইয়াছেন। তােমরা জগন্মাতার রক্ষিত, তুচ্ছ মানবের কথায় কি আর তােমাদের অমঙ্গলের আশঙ্কা থাকিতে পারে? যাহা হইয়াছে, নিজু কৰ্ম্মফলেরই পরিণাম স্বীকার করা কর্তব্য। অন্যের ঘাড়ে নিমিত্ত চাপাইয়া কষ্ট পাইও না। সব ভগব- দিচ্ছা জ্ঞানে তাহার জয় গাহিয়া যাও। তাহার প্রেম লাভ করিতে পারিলে কোন অভাবেই পীড়ন করিতে পারিবে না। আশ্রমের ৭৫ জন সেবক, দু’একটা ছেলে জ্বরে শয্যাগত। অন্যান্য কুশল। তােমরা আমার আশীর্বাদ জানিও এবং ভক্তবৃন্দকে জানাইও। ইতি শুভানুধ্যায়ী- নিগমানন ( ৭ ) p পুরী ৩১১৩৮ স্নেহাস্পদেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম। শ্রীভগবান্ কাকে যে কিরূপ ভাবে কৃপা করেন, তাহা বুঝিয়া উঠা কঠিন। পুরাকাল হইতেই দেখা যাইতেছে, প্রকৃত ঠাকুরের চিঠি ভক্তদেরই তিনি নানা বিপদে ফেলিয়া কঠোর অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়া লইয়াছেন, তাঁহাদের ড্রঢ়িষ্ঠ ও বলিষ্ঠ করিয়া দিয়াছেন । সাধুর বিপদ সম্পদেরই নিদান। কাজেই সম্পদে-বিপদে সুখে-দুঃখে রােগে-শােকে কোন অবস্থাতেই লক্ষ্যচ্যুত হইও না, তাহাতে নির্ভর করিয়া তাহারই জয়গান করিতে অভ্যাস কর, একদিন তাহার মহিমা বুঝিয়া ধন্য ও কৃতার্থ হইবে। অবশ্য স্ত্রী-পুত্র লইয়া অভাবে পড়াও কম দুঃখের কারণ নহে। সেজন্য যথাসাধ্য চেষ্টা কর। কৰ্ত্তব্য- চ্যুত হওয়াও তাঁহার অভিপ্রেত নহে, তবে চেষ্টা যত্ন করিয়াও অভাব না মিটিলে তুমি কি করিবে? কৰ্তব্যাভিমান চূর্ণ হইয়া যাইবে, সত্যের আলাে প্রকাশিত হইবে। আমি রুগ্নদেহ ও ভগ্নস্বাস্থ্য লইয়া•একরূপ আছি। চিকিৎসাতেও কিছু হবে বলিয়া বিশ্বাস নাই। কিছুদিন যাবৎ বাতের আক্রমণে অচল করিয়া ফেলিতেছে। আর আর কুশল। তােমরা আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবা ও অন্যান্যকে জানাই। ? শুভানুধ্যায়ী এনিগমানন্দ ১২ বিপদই সম্পদের নিদান লে ( ৮ ) সারস্বত মঠ ৪৬২৩ হইবে। কল্যাণ বরেষু। তােমর পত্র পাইয়া অবগত হইলাম । বিপদাদির, কথা, মিথ্যা মােকদ্দমার বিবরণ আমি অন্য প্রকারেও অবগত আছি। জীব দোষী না হইয়াও যদি উদ্বেগ ও অশান্তি পায়, তবে তাহা অনিবার্য কৰ্ম্মফল বুঝিণ্ঠে যেমন সালসার সেবনে শরীরস্থ ব্যাধি বাহিরে ফুটিয়া বাহির হয়, গুরুকৃপা পাইয়াও সৎপথাবলম্বী প্রথমতঃ তদ্রুপ সঞ্চিত কৰ্ম্মফলে বিব্রত হইয়া পড়ে। কারণ কৰ্ম্ম থাকিতে জ্ঞান কখন স্বরূপ প্রকাশ করিতে পারেন না। সুতরাং সাধুর বিপদ ভবিষ্যতে সম্পদেরই কারণ হইয়া থাকে। আশীর্বাদ করি কোন অবস্থাতেই লক্ষ্যচ্যুত হইও না। তােমাদের ন– ধাৰ্ম্মিকা হইবে। বৃদ্ধ পিতা-মাতার দায়িত্ব ঘাড়ে থাকিতে তােমরা নিরুদ্বিগ্ন হইতে পারিবে না। তবে বিবেচনা দ্বারা বিপদাদিতে স্থৈর্য ও ধৈর্য ধারণ করিয়া থাকিতে হইবে। ইতি আশীৰ্বাদক- শ্ৰীনিগমানন্দ ঠাকুরের চিঠি (৯) পুরী ২৮৫৩৪ = ; কল্যাণীয়াসু পরম শুভাশীরাস্তাম্বিশেষঃ- তােমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম। পুত্র-কন্যা নাতি-নাতনী প্রভৃতি পাঁচটা লইয়া ঘর সংসার করিতে গেলে রােগ-শােক বিপদ-আপদ অবশ্যম্ভাবী। পুরাণ ইতিহাস হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত কেহ—এমন কি পুণ্য- শ্লোক ব্যক্তিগণ পৰ্যন্ত—আরামে সংসার করিতে পারেন নাই; মরজগতে তাহা অসম্ভব। সুতরাং অসম্ভব আশা করিলে পদে পদে হতাশ হইতে হইঝে সন্দেহ নাই। বরং জ্ঞানচক্ষু ফুটিয়া যাহাতে সংসার-লীলা বুঝিতে পার, তজ্জন্য প্রার্থনা করা কর্তব্য। বিপদে-সম্পদে ভগবানের মঙ্গল ইচ্ছা বুঝিয়া যাহাতে মাথা পাতিয়া তাহার দান গ্রহণ করিতে পার, ধৈৰ্য্য ও সহিষ্ণুতা সহকারে জীবনের লক্ষ্যপথে অগ্রসর হইতে পার, এইরূপে জীবন গঠন করিতে চেষ্টা কর। আশীর্বাদ করি শুভবুদ্ধি উদয়ে তােমাদের নিষ্ঠা দৃঢ় হউক, বিপদে- সম্পদে শান্তি ও সান্ত্বনা লাভ কর। সঙ্কল্প ভঙ্গ করিয়া তােমার পত্রের উত্তর দিলাম, ভবিষ্যতে আর কখন আমার কথা অগ্রাহ করিও না। বিশ্বাস থাকিলে মনে মনে প্রার্থনা ১৪ বিপদে-সান্ত্বনা ; করিও ; নতুবা পত্র লিখিলে কোন ফল হইবে না, কারণ ফলদাতা মাত্র একজন জানিবা। আমার শরীরও ভাল নাই, শীঘ্রই আসামের দিকে রওনা হইব। অন্যান্য কুশল। তােমরা সকলে আমার আশীৰ্বাদ জানিবা । আশীৰ্বাদক- এনিগমানন্দ সারস্বত মঠ ১৭ই আশ্বিন, ১৩২১ স্নেহপদাসু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু বিশেষঃ- মা। বহুদিন পরে তােমার পত্র পাইয়া সমস্ত সমাচার অবগত হইলাম। রােগ, শােক, দুঃখ, কষ্ট সংসারের নিত্য ব্যাপার, ইহাতে বিচলিত হইলে চলিবে,কেন? হিন্দুর মেয়ে, রামায়ণ,মহাভারতের, কত কথা শুনিয়াছ, কেহই ত সাংসারিক দুঃখের হাত এড়াইতে পারে নাই। এ সংসারটা যে অভাব- অশান্তি-দুঃখ দিয়া গড়া—এখানে সুখ-শান্তির আশা বিড়ম্বনা মাত্র। তাই সুখস্বরূপ ভগবান্ ব্যতীত আর সুখ কোথায় ? তিনি যখন যে অবস্থায় রাখেন, তাহাই মঙ্গলের কারণ ভবিয়া ঠাকুরের চিঠি তঁাহার জয়গান করিও। তাহার ইচ্ছায় তােমার ক্ষুদ্র সঙ্কীর্ণ ইচ্ছা মিশাইয়া দাও। ভগবান্ প্রদত্ত দান লইয়া বা প্রাপ্ত দানে বঞ্চিত হইয়া দুঃখিত বা আনন্দিত হইও না। সংসারে সুখ বা দুঃখ উভয়ের মূল্যই এক। কারণ পরিণামে নিশ্চয় একাকী নিঃসম্বলে চলিয়া যাইতে হইবে। দু’দিনের জন্য সংসারে আসিয়া চঞ্চল হইলে চলিবে কেন ? যখন যেখানে যে অবস্থায় থাক, সকল সময়ে তঁাহার স্মরণ মনন করিতে ভুলিও না। তিনি সুখস্বরূপ ও শান্তিময়, তাহার নামে নিশ্চয় শান্তি পাইবে। লা—রও পত্র পাইয়াছি। অত্র মঙ্গল। তােমরা আমার বিজয়ার আশীর্বাদ জানিও। তবে ভানুধ্যায়ী— ঐনিগমানন্দ । (১১) নীলাচল কুটীর-স্বর্গদ্বার পুরী—( উড়িষ্যা ) ৫৩৩২ ইং কল্যাণবরেষু- পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য পর পর তােমার সকল চিঠিগুলিই যথাসময়ে পাই- য়াছি। বিপ-সম্পদ সুখ-দুঃখ সমস্তই তঁাহার দয়ার দান

বিপদে কর্তব্য
ভাবিয়া মাথা পাতিয়া লইতে হইবে। তঁাহাকে নির্ভর করিয়া
নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হও। যিনি পরীক্ষায় ফেলিয়াছেন, তিনিই
হাত ধরিয়া উত্তীর্ণ করিয়া দিবেন। তাঁহার মঙ্গল বিধানে
অবিশ্বাস করিও না। তাহার নাম ভুলিও না। সৰ্ব্বদা
তাহার জয় উচ্চারণ কর।
আপদ কালে বােগে শােকে বিধি নিয়ম রক্ষা করিতে
না পারিল প্রত্যয় হয় না, শাস্ত্রেরই আদেশ। যতদিন
সম্পূর্ণ সুস্থ হইতে না পারিতেছ, ততদিন চিকিৎসকের আদেশ
মত চলিও ও আহারাদি করিও। তাহাতে কোন অপরাধ
হইবে না। অপারেশমের পর সুস্থ হইয়া কেমন থাক
জানাইও। অত্র মঙ্গল। আমার আশীর্বাদ জানিও। ইতি--
শুভানুধ্যায়ী
ঐনিগমানন্দ
(১২)
পুরী
১৭১৩৩
কল্যাণবরেষু
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তোমার পত্র যথাসময়ে পাইয়া পরম প্রীত হইয়াছি।
মৃত্যুকে ভয় না করিলেই তাহাকে “মৃত্যুঞ্জয়” বলা যাইতে
* ১৭

ঠাকুরের চিঠি পারে। তােমার প্রার্থনা যথাসম্ভব নিশ্চয়ই পূর্ণ হইবে। তোমার কথা নিয়ত আমার স্মরণ থাকিবে। তােমার বয়স ও অবস্থানুসারে এক্ষণে বানপ্রস্থ অব- লম্বন পূৰ্ব্বক কোন তীর্থ বা আশ্রমাদিতে জীবনের বাকী কয়টা দিন কাটাইতে পারিলে ভাল ব্যবস্থা হইত সন্দেহ নাই। কিন্তু তােমার তেমন সঙ্গতি নাই, বিশেষতঃ বােগাদির সময় সেবাও প্রয়ােজন। এই সকল বিবেচনা করিয়া আমি তােমাকে সে অনুমতি প্রদান করিতে পারিলাম না । রােগাদির যন্ত্রণা একটু তীব্র ভাবেই তােমাকে ভােগ করিতে হইবে আমি জানিতেছি; কাজেই এইরূপ অবস্থায় বাড়ী বা দেশ ছাড়িয়া অন্য কোথাও যাইতে আদেশ দিতে পারিতেছি । কিছুদিন শয্যাগত হই থাকিতে হইলে বাড়ীতে থাকাই সঙ্গত। আত্মীয় স্বজন না হউক পাড়া-প্রতিবাসীও দেখিবে শুনিবে এবং সেবা-যত্ন করিবে। আত্মীয়স্বজনের ব্যবহারে মায়ার বাঁধন ছুটিয়া যাইবে, মােহাদি দূর হইবে। শুদ্ধ মন-প্রাণ লইয়া মায়ের কোলে উপস্থিত হইবে । সুতরাং বাড়ী থাকিয়াই যাবার জন্য প্রস্তুত হও। যাত্রা করিয়া বসিয়া থাক। হঠাৎ না গিয়া কিছু পূর্ব প্রস্তুত থাকা কর্তব্য। তাহা হইলে মৃত্যুর আনন্দ সম্যক্‌ অনুভব করিতে পারা যায়। আমি যথাসময়ে সে সংবাদ তােমাকে জানাব। নিজেও গিয়া হাজির হইবআর যাহাতে রােগের তীব্রতা কম হয় এবং তােমার সহ করিবার পূৰ্ব হইতেই ১৮ মৃত্যু, বাসরে ক্ষমতা হয়, এখন হইতে তদ্বিষয়ে যত্ন করিব। অবশ্য কর্ম- ফলে কোন প্রতিবন্ধক জন্মব না, কারণ এখানকার কর্ম এখানেই ভােগ হইয়া যাওয়া সর্বতােভাবে মঙ্গল। আমার কথায় বিশ্বাস না হইলেও বিশ্বাষের জন্য কোন পন্থা অবলম্বন করাও এখন আর সম্ভবপর নহে। বি-র মাতামহী আমার শিষ্য। না হইয়াও যদি মৃত্যুকালে আমার দর্শন পাইয়া থাকে, তবে তােমার সম্বন্ধে আর কথা কি? বিশ্বাস হউক আর না হউক, আমার কর্ত্তব্য আমি যথাসময় পালন করিব। অন্যান্য সমস্ত কুশল। তােমরা আমার আশীর্বাদ জানিও। ইতি শুভানুধ্যায়ী— শ্রীনিগমানন্দ (১৩) সারস্বত মঠ ৭২৩০ D পরম কল্যাণবরেষু, পরম শুভাশীরাস্তাম্বিশেষঃ তােমর শারীরিক অবস্থা অবগত হইলাম। তুমি সকল অবস্থার জন্যই প্রস্তুত আছ জানিয়া আনন্দিত হইলাম।

ঠাকুরের চিঠি তুমি জীর্ণ দেহ ছাড়িয়া নূতন জীবনে উন্নীত হও, ইহাতে দুঃষুের কারণ কিছুই নাই। কিন্তু জগতের কাৰ্য্যে তােমাকে আমার বিশেষ প্রয়ােজন ছিল। বাহিরের কাৰ্যে তােমার উপরই নির্ভর করিতেছিলাম। তুমি চলিয়া গেলে আমি অনেকটা শক্তিহীন হইয়া পড়িব দেখা যাউক মায়ের কিরূপ ইচ্ছা ! তুমি নিরুৎসাহ হইও না। যদি নিতা- স্তই তােমাকে না রাখিতে পারি, তােমার প্রার্থনা অবশ্যই পূর্ণ হইবে। যথাসময়ে যথাস্থানে দর্শন দিয়া তৈমার গন্তব্য পথ নির্দেশ করিয়া দিব। জন্ম-মৃত্যু কিছুই চিন্তা না করিয়া আত্মসমাহিত ভাবে অবস্থান করিও। আমার প্রাণভরা আশীৰ্বাদ জানিবা । ইতি-- = আশীৰ্বাদক- তােমার ঠাকুর ( ১৪ ) সারস্বত মঠ ২৪৮৩৪ কল্যাণবরেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য-- সু- আমার স্নেহের সু! গতকল্য তােমার কার্ড- খানা পাইয়াছি। অসময়ে প্র-র এই মহাপ্রস্থানে তােমাদের মৃত্যুতে সান্ত্বনা হৃদয় বিদীর্ণ হইয়াছে, এই বয়সে মর্মে দারুণ আঘাত পাইয়াছ, আমি তাহা প্রাণে প্রাণে বেশ অনুভব করিতেছি। ছুটিয়া তােমাদের কাছে যাইতে ইচ্ছা হইতেছে। এই প্রথম আঘাতের সময়–দারুণ দুঃসময়ে তােমাদের কি বলিয়া সান্ত্বনা করিব তাহার ভাষা জুটিতেছে না। প্রার্থনা করিতেছি, শ্রীগুরুদেব তােমাদের প্রাণে শান্তি ও সান্ত্বনা দিন। মায়ার যবনিকা তােমাদের চক্ষু হইতে অপসারিত হউক, শ্রীভগবানের লীলা তােমাদের সম্মুখে উদঘাটিত হউক। বৎস! তােমাদের প্র— আমারও স্নেহের পাত্রী, আমাকেও সে ভালবাসি। সে জীবিত থাকিলে আমাদের নয়নানন্দ বর্ধন করিত,-“তােমাদের প্রাণ তাজা থাকিত। কিন্তু আমাদের এই স্বার্থ ভূলিয়া তাহার বিষয় স্থিরচিত্তে একবার ভাবিয়া দেখি, তাহা হইলে তাহার প্রতি ভগবানের অপার করুণা উপলব্ধি করিয়া শােকার পরিবর্তে আনন্দাশ্রু বর্ষণ করিবে। এবারও তুমি আমাকে বলিয়াছিলে ‘প্রর আশ্চৰ্য্য অদৃষ্ট ! বিবাহের পর হইতে তাহার নানারূপ দুঃখ- কাহিনী তােমার মুখে শুনিয়া আসিতেছি। এবারের কাহিনী যেমন সাংঘাতিক, তেমনি ঘৃণাহ। অবশ্য তাহার পিতা- মাতার স্নেহের অভাব ছিল না, কিন্তু পিতা-মাতার স্নেহাদরে নারীজীবন সার্থক হয় না। স্বামীর প্রেম, স্বামীকে দেবতা- জ্ঞানে আত্মনিবেদন করিয়া তাহার সেবাই হিন্দু রমণীর একমাত্র কাৰ্য। প্ৰ- আজীবন একরূপ স্বামীপ্রেমে বঞ্চিতা,

।
ঠাকুরের চিঠি
তদুপর নানারূপ নিৰ্যাতন। তবুও স্বামী যদি ধার্মিক ও
চরিত্রবান্ হইত, তাহার ধ্যান-ধারণায়ও গৌরব অনুভব
করিতে পারিত। কিন্তু সেই চরিত্রহীন পশুতুল্য স্বামীকে
জোর করিয়া দেবতার আসনে আসন দেওয়া, কি সহজ?
বাস্তব জগতে অসম্ভব। সুতরাং তাহার মর্মান্তিক কষ্ট অনু-
ভব কর। আজীবন হৃদয়ে শত বৃশ্চিক দংশন যাতনা সহ্য
করিয়া তাহার বাঁচিয়া থাকা কি বাঞ্ছনীয় ? অথচ ইহা
অদৃষ্ট লিপি-কৰ্ম্মফলের অচ্ছেদ্য বিধান। তাই দয়াময়
ভগবান্ দয়া করিয়া এই যন্ত্রণার হাত হইতে তাহাকে উদ্ধার
করিয়া তাহার অমৃতময় ক্রোড়ে ডাকিয়া লইয়াছেন।
নূতন জগতে নূতন দেহে জগৎ-স্বামীর উদ্দেশে নূতন আনন্দে
ছুটিয়াছে। তােমরা নয়নজলে তাহার গন্তব্য পথ পিচ্ছিল
করিয়া দিও না, তাহার মঙ্গলের জন্য মঙ্গলময়ের নিকট প্রাণ
ঢালিয়া প্রার্থনা কর।
আর একটা কথা, এবার তােমার বাড়ী হইতে আসি-
বার কালে প্র—র মা আমাকে বলিয়াছিল, “বাবা! আমি
তােমার কাছে কখন কোন প্রার্থনা করি নাই, এবার তুমি
প্র—কে রক্ষা করিও।” হায়! হায় !! আমি ত আমার
মেয়ের প্রার্থনা পূর্ণ করিতে পারিলাম না। তাহার সহিত
দেখা করিতে যে লজ্জায় আমার মাথা উঠিবে না।
সে মা,
মায়ের প্রাণে যে কি, আঘাত লাগিয়াছে, তুমিই তাহা ভাল
বুঝিবে। সুতরাং তুমি সর্বাগ্ৰে ধৈৰ্য্য ধরিয়া তাহাকে সান্ত্বনা

মৃত্যুতে সান্ত্বনা === দিবে। সর্বদা ভগবৎ প্রসঙ্গে তাহাকে ভুলাইয়া রাখিবে, জয়গুরু নামে উদ্বুদ্ধ করিবে। রােগে-শােকে-দুঃখে জীবের তমােভাব বাড়ে আবার চিত্তশুদ্ধিও হয়। আশাকরি এই দারুণ শশাকে তোমাদের চিত্ত স্বচ্ছ হইবে--কালের যবনিকা ভেদ করিয়া দৃষ্টি প্রসারিত হইবে। মায়া-মমাহে যেন আর অভিভূত করিতে না পারে। অমৃতের সন্তান তােমরা, মর- জগতের মােহে চিরদিন মুগ্ধ থাকিও না। জাগ—ওঠ- সম্মুখে অগ্রসর হও, পশ্চাতে চাহিও না। আমার সন্তানকে আমি শােক-মােহে আবিষ্ট দেখিতে চাই না। চিরদিন ভগবানের অনুকূল দয়াই ভােগ করিয়াছ—এবার প্রতিকূল দয়া অনুভব কর। ইহা কঠোর শাসন নহে, ইহাও দয়া তবে কঠোর বটে। প্রআনন্দে আছে, তােমাদের ক্ষুদ্র দৃষ্টি, তাই দেখিতে পাইতেছু না। জন্মে আনন্দ-মৃত্যুতে দুঃখ তােমাদের সাজে না। কর্তব্যে ত কোন ত্রুটী কর নাই, তবে ভগবদ্বিধানে অবিশ্বাসী হইয়া শােকাভিভূত হইবে কেন? আশীৰ্বাদ'করি তােমাদের সত্য দৃষ্টি ফুটিয়া উঠুক। ইতি শুভানুধ্যায়ী নিগমানন্দ ২৩ ঠাকুরের চিঠি (১৫ ) নীলাচল কুটীর * ১৯৩৮ ! কল্যাণবরেষু- শুভাশিষং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য শ্ৰীমান্ ক্ষের পত্রে অবগত হইলাম, তােমার পিতৃ দেব সহসা গঙ্গা লাভ করিয়াছেন। তোমার পক্ষে এ বৎসরটা খুবই দুর্বৎসর সন্দেহ নাই। একে চাকরি বাকবি নাই, তদুপর পিতৃদশায় পড়িলে ! পিতা বৃদ্ধ ইহলেও তঁাহাব আশ্রয়-ছায়ায় স্নিগ্ধ ছিলে, এখন "সকল দায়িত্বই তােমাকে বহন করিতে হইবে। স্নেহচক্ষে তােমার পক্ষে তাকাইবার আর কেহ রহিল না। কি ইহ জগতের নিত্য ঘটনা, পিতা-মাতা লইয়া কেহ চিরকাল সংসার করিতে পারে না। ভােমার বৃদ্ধ পিতা তােমাদের রাখিয়া উপযুক্ত সময়েই জীর্ণ- দেহ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক নূতন দেহে নূতন জগতে উন্নীত হইয়া- ছেন। ইহা তাহার পক্ষে সুখেরই কথা; তুমি ইহা স্মরণ করিয়া আনন্দিত হ। পিতাকে হারাইয়া মুহ্যমান হইও ন', তাহার পারলৌকিক মঙ্গল উদ্দেশ্যে ইষ্টদেবের নিকট প্রার্থনা কর। যাহা অবশ্যম্ভাবী, তাহার জন্য সাধারণের ন্যায় অধীর হইও না। জগৎপিতার মঙ্গল দৃষ্টি তােমার উপর স্নেহময় রহিয়াছে, ইহা ভুলিও না। তােমার পিতার সদ্গতির ভার আনার উপর অর্পণ করিও। ' ২৪

মৃত্যুতে সান্ত্বনা
শ্ৰীমান্ জি-- জানিতে চাহিয়াছে, “ত্রিশূল আসনের
কোন্ স্থানে গাড়িতে হয়। আসনের বামদিকে সুখের
কোণে পূজারীর দক্ষিণ দিকে আসনের দ্বিতীয় স্তরে ত্রিশূলটী
বসাইবার নিয়ম, আসনের উপরে নহে। বরং দ্বিতীয় স্তরে
কোনরূপ অসুবিধা হইলে আসন ঘেষিয়া মেজেতেও বসাইতে
পারা যায়। চি— এসব জানে। যথাসময়ে প্র— আসিলে
তাহার দ্বারা আসন প্রতিষ্ঠা করিও; নতুবা চি বা পূ-
করিতে পারিবে। আমি ৯ই বৈকালে হালিসহর আশ্রমে
পৌঁছিব। তবে ৮ই প্রাতে হাওড়া উপস্থিত হইয়া ফর
বাড়ী থাকিব। তােমরা আমার আশীৰ্বাদ জানিবা । ইতি-
শুভানুধ্যায়ী—
নিগমানন্দ
(১৬)
নীলাচল কুটীর
পুরী
৮৩৩৫
কল্যাণবরেষু
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
স্নেহের সু! শান্তি শান্তিধামে চলিয়া গিয়াছে।
মঙ্গলময়ের মঙ্গল বিধানে তাহার অবশ্যই ভাল হইবে।
২খ

••
ঠাকুরের চিঠি
তাহার জন্য আর কোন দুঃখ নাই; কিন্তু তুমি সংসার পথে
যাহাকে সঙ্গিনী করিয়া এই কয়টা বৎসর কাটাইয়াছ, সে
সহসা চলিয়া যাওয়ায় তুমি সংসারে নিঃসঙ্গ ও একক হইলে,
প্রথম জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই রহিয়া গেল ; তাই
আজ পুনঃপুনঃ তােমারই কথা মনে হইতেছে, দুঃখও হইতেছে,
কিন্তু ভরসা আছে তুমি সংষত ও ধীর, এই ঘটনায় তােমাকে
ততদূর অভিভূত করিতে পারিবে না। যে ঘটনা সংসারে
নিত্যই সংঘটিত হইতেছে, তাহার জন্য অনুশােচনা বৃথা।
তুমি ঈশ্বর বিশ্বাসী, তঁাহার মঙ্গলময় বিধানে বিশ্বাস আছে।
তিনি যেই মঙ্গল উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা করিলেন, অবশ্য
একদিন বুঝিতে পারিয়া শ্রদ্ধায় কৃতজ্ঞতায় তাহার উদ্দেশ্যে
বার বার মস্তক অবনত করিবে। আশীৰ্বাদ করি, এই
ঘটনায় তােমার চিত্ত দৃঢ় ও ব্ললিষ্ঠ হউক, শান্তির প্রেম
তােমাকে শান্তিময়ের দিকে আরও অগ্রসর করিয়া দিউক,
বাহিরের শান্তি হারাইলেও তােমার প্রাণের শান্তি চিরস্থায়ী
এই কয়দিন ধরিয়া রােগী সেবা শুশ্রুষার জন্য তােমার,
দেহ-মন নিশ্চয়ই শ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছে, তােমার বিশ্রামের
প্রয়ােজন। কিছুদিন এদিক ওদিক ঘুরিয়া আসিলে বােধ
হয় সব দিকে ভাল হইত। আমি মধ্যে কয়েক দিন ভাল
ছিলাম, আবার অসুস্থতা অনুভব করিতেছি। রথ উপলক্ষে
ভক্তের ভিড়ও হইয়াছে। এই মাসের শেষ দিকে বাঙ্গালায়

মৃত্যুতে সান্ত্বনা
যাবার ইচ্ছা আছে। তােমার মনের অবস্থা জানাই।
আমার আশীর্বাদ জানিবা। ইতি--
শুভানুধ্যায়ী
শ্ৰীনিগমানন্দ
(১৭)
পুরী
১৫।৪৩৪
কল্যাণবরেষু—
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃসন্ত নিত্য
দে—রমার সতীলােক প্রাপ্তি সংবাদ জানিয়াছি। ।
শ্ৰীমান্ সু-র পত্রে তােমার ধৈৰ্য-স্থৈৰ্য্যের বিষয় জানিয়া
আনন্দিত হইয়াছি। অনিত্য সংসারে যাহা অবশ্যম্ভাবী
ঘটনা, তাহার জন্য অধীর হইলে চলিবে কেন ? বিপদে-
সম্পদে সবই তঁাহার দান ভাবিয়া মাথা পাতিয়া গ্ৰহণ করিতে
হইবে। দে-র মার জন্য কোন দুঃখ হয় না। ছেলে-মেয়ে
রাখিয়া, স্বামীর পায়ে মাথা রাখিয়া যে নারী মরিতে পারে,
সে ত ভাগ্যবতী ! কিন্তু তােমার ও তােমার ছেলে-মেয়েগুলির
কথা ভাবিলে দুঃখ হয়। ছােট বালক-বালিকাগুলি মাতৃ-
স্নেহ হারাইয়াছে, তাহাদের • মুখ চাহিয়া আরও দৃঢ় হইতে
২৭

ঠাকুরের চিঠি
হইবে।
তােমার দুঃখ চিন্তা দূর করিবার তােমার অবসর
কৈ ? এখন পিতা-মাতার উভয় কৰ্ত্তব্য তােমাকে পালন
করিতে হইবে। অবশ্য যিনি এ ভার দিলেন, তিনি বহিরও
শক্তি দিবেন। তােমাকে বাক্যে আর কি বুঝাইব ? আশী-
ৰ্ব্বাদ করি, যিনি তােমার হৃদয়ে থাকিয়া তােনাকে মঙ্গলের
পথে পরিচালনা করিতেছেন, তিনি তােমাকে সান্ত্র ও শান্তি
প্রদান করুন। সু ও শ-র পত্র পাইয়াছি।
আমার
এখন মঠে যাইবার সম্ভাবনা নাই। শরীর সুস্থ, দাতের
অসুখেই কষ্ট পাইতেছি, সম্প্রতি দুইটা দাত তুলিয়া ফেলি-
য়াছি।
অন্যান্য কুশল।
সকলে আমার স্নেহাশীৰ্বাদ
জানিবে। ইতি-
।
শুভানুধ্যায়ী
নিগমানন্দ
।
( ১৮ )
পুরী
২৮৯৩২
কল্যাণবরেষু
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র যথাসময়ে পেয়েছি। তােমার পিতৃ-
দেবকে পৌষ মাসের এই কয়েকটা দিন দেহে রাখিতে আমি
==
২৮

মৃত্যু ও শ্রাদ্ধ
চেষ্টা করিয়াছিলাম, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারিলাম না।
দক্ষিণায়নে, -কৃষ্ণপক্ষে-সন্ধ্যার পর যখন দেহত্যাগ
করিয়াছেন, তখন “পিতৃযান পথেই তঁাহার গতি অনিবার্য
ইহা বােধ হয় তুমি অবগত আছ। যথারীতি শ্রাদ্ধাদি করা
এবং যথাকালে গয়ায় পিণ্ডদানই তােমার পক্ষে করণীয়।
তবে তুমি সন্ধ্যা বন্দনা কালে তাহার মঙ্গল কামনায় ভগবদু-
দ্দেশে প্রার্থনা করিও। তিনি যাহাতে প্রেতদেহ বা পিতৃ-
লােকে অধিক দিন কষ্ট না পান এবং সত্বর যাহাতে সদ্বংশে
তঁাহার জন্ম হয়, আমি সেজন্য চেষ্টা করিব। আমাকে অধিক
কিছু বলিতে হইবে না। তিনি আমার যাের বাবা একথা
ভুলিব না। আমি এখনও সুস্থ হইতে পারি নাই। প্রবল
কাশী হইয়াছে। অন্যান্য কুশল। তােমরা সকলে আমার
আশীর্বাদ জানিবা। ইতি-
শুভানুধ্যায়ী—
এনিগমানন্দ
(১৯)
পুরী
১১১১৩২
কল্যাণবরেষু-
তােমার পত্র যথাসময়ে পাইয়া সমস্ত সমাচার অবগত
ও প্রীত হইয়াছি। জীব দেহত্যাগের পর মহানিদ্রায় অচেতন

ঠাকুরের চিঠি
অবস্থায় থাকে, তৎপরে আদ্যশ্রাদ্ধের দিন পূরক পিণ্ড হইয়া
গেলে প্রেতদেহ প্রাপ্ত হয়। পরে বৎসরান্তে সপিণ্ডীকরণ
হইলে পিতৃলােকে উন্নীত হয় ইত্যাদি। নিরালম্ব অবস্থা
হইতে প্রেতদেহ প্রাপ্ত হইয়া জীব স্বপ্নের ন্যায় মূঢ়াবস্থায়
নানারূপ ভােগ করিয়া থাকে। তােমার পিতৃদেবের যাহাতে
ঐরূপ অবস্থা না হয়, নিরালম্ব অবস্থায় থাকিয়া প্রেতদেহ
ভােগ করিতে না হয়, সেজন্য ঐ গিরগিটীর আবির্ভাব হইয়া-
ছিল। দেহত্যাগ করিয়া ঐ গিরগিটীটা অকলম্বন করিয়া-
ছিলেন, সুতরাং প্রেশ্রাদ্ধের পর তিনি আর প্রেতদেহ ভােগ
করিয়া একেবারে পিতৃদেহে উন্নীত হইয়াছেন। অতএব
তিনি সুখে ও শান্তিতে আছেন ; তাহার জন্য তােমাদের আর
কোন উদ্বেগের কারণ নাই। পত্রে আর বিশেষ কিছু জানিতে
চাহিও না। কৌতূহল থাকিলে; যখন দেখা হইবে, জানিও।
আমি চৈত্র মাসের শেষ কিম্বা বৈশাখের প্রথমে কলিকাতা
হইয়া আসাম যাইব। আমি পৌষ মাসে যে সর্দি-কাশী
লইয়া পুরী আসিয়াছিলাম, তাহ। এখনও সারে নাই।
হাঁপানীর মত হইয়া কষ্ট পাইতেছি। অন্যান্য কুশল।
আশীর্বাদ করি তােমার প্রার্থনা পূর্ণ হউক। প্রেরিত টাকাও
পাইয়াছি। সকলকে আমার আশীৰ্বাদ জানাইও। 'ইতি—
শুভানুধ্যায়ী
শ্ৰীনিগমানন্দ

মৃত্যু ও শ্রাদ্ধ ( ২০ ) শান্তি শ্রম ৭৮১৩১৯ কল্যাণবরেঘু- পরম শুভাশীরাস্তাম্বিশেষঃ— তােমার পত্র পাইয়া সমাচার অবগত হইলাম। তােমার পিতৃদেব তােমাদের রাখিয়া উপযুক্ত সময়ে যােগ্য- লােকে গমন করিয়াছেন। আমি প্রার্থনা করি, তাহার আত্মা শান্তিলাভ করুন। তুমিও ভঁহার আশীর্বাদে সংসারের কর্তব্য যথায়থ সম্পাদন করতঃ মরণের পথে নব জীবনে সঞ্জীবিত হইয়া উঠ। শ্রাদ্ধাদি হিন্দুর অবশ্য কর্তব্য, পিতার প্রতি পুত্রের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযােগ্য অবসর। কিন্তু আমাদের দেশের লােক নিন্দা ও প্রশংসার বিচার করিয়া শ্রাদ্ধে অগ্রসর হয়। অনাবশ্যক আড়ম্বর করে। অবশ্য সাধ্য থাকিলে পিতা- মাতার পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য যথাসাধ্য ব্যয়ে দরিদ্র নারায়ণের সেবা বিধেয়। কিন্তু তুমি দরিদ্র, বিশেষতঃ ঋণগ্রস্ত। এরূপ অবস্থায় লােকৈর উত্তেজনায় আর কতগুলা ঋণজালে জড়িত হও,ইহা আমার অভিপ্রেত নহে। ব্রাহ্মণ পুরােহিত লইয়া শাস্ত্রানুযায়ী শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করিবে। জ্ঞাতি ৩১ ঠাকুরের চিঠি তাে আছেন, আর পার ত কিছু অক্ষম দরিদ্রের একবেলা ষেবা করিও। মায়ের উপর সব ভার দিয়া তাহার নামে মত্ত হইয়া কর্তব্য করিয়া যাও। অত্র মঙ্গল হাত- শুভানুধ্যায়ী— শ্রনিগমানন্দ (২১ ) পুরী ৩১৪৩১ কল্যাণবরেষু পরম শুভাশিং রাশয়ঃ 'সন্তু নিত্য বহুদিন পরে তােমার পত্র পাইয়া সমাচার অবগত হইলাম। বৃষােৎসর্গ শ্রাদ্ধ করিলে যদি জীবের মুক্তি হইত, তবে ভাবনা ছিল কি? শ্রীগুরু কৃপায় জ্ঞান বা প্রেম-ভক্তি লাভ করিতে না পারিলে মুক্তির আর দ্বিতীয় উপায় নাই। শ্রাদ্ধাদি সামাজিক ব্যাপার ; ইহাতে প্রেতের তৃপ্তি হয়। । এইজন্য আপন আপন শক্তি মত শ্রাদ্ধ করিতে হয়, কিন্তু বৃযােৎসর্গ বা চন্দনধেনু করিতে হইবে এমন কোন কথা নাই। শ্রদ্ধা পূর্বক অবস্থানুসারে যে কোন শ্রাদ্ধ করাই বিধি। সুতরাং ধার-কর্জ করিয়া বৃষােৎসর্গ করিবার কোন প্রয়ােজন নাই।

পরলােকের অস্তিত্ব তােমাদের আর কি উপদেশ দিব? মুখে তােমরা শ্রীগুরুর আশ্রিত ৰল বটে, কিন্তু কাৰ্যে ‘অহ; গুরুর’ শা- গত! তাই খােদার উপর খােদকারী করিয়া থাক। সত্য- স্বরূপ গুরুকে,ছলনাময় ভগবান্ বলিতে কুণ্ঠা হয় না। যার যেমন ভাবনা সিদ্ধিও সেইরূপ। আমি তােমাদের ভাল- বাসিয়াছিলাম, তাই দাগাও খুব পাইলাম। তােমরা নিজের ভাল নিজেই বােঝ, তাই ভয় হয়, উপদেশও দিতে গেলে বা “ছলনা করিতেছি লিখিয়া বসিবে । সম্বন্ধে তােমাদের ব্যবহার বুঝিয়াছি, আমার উদ্দেশ্য বা উপদেশ মত গঠিত হওয়া কেহ প্রয়ােজন মনে কর না। সাক্ষাতে সব বলিব। আশীৰ্বাদ করি তােমাদের শুভবুদ্ধি উদ্ধ হউক। শুভানুধ্যায়ী— এনিগমানন্দ p ( ২২ ) p প্রিয় সু ইদানীং তােমাদের কোন পত্রাদি পাইতেছি না। সম্প্রতি তােমার বাবার এক পত্র পাইয়াছি। প্রবন্ধ ফেরৎ দেওয়ায় তোমার পিতা ক্ষুন্ন হইয়া কারণ জানিতে চাহিয়াছেন। তাই অন্য পত্রে দু’একটা কারণ বাধ্য হইয়া লিখিতে হইল।

ঠাকুরের চিঠি
যদিও সম্পাদকগণ কারণ জানান না, তবে তােমার বাবা
সম্বন্ধে সে রীতি খাটে না।
আমরা মাসে মাসে বড় বড়
পণ্ডিত ও নামজাদা লেখকদের প্রবন্ধ ফেরৎ দিতেছি। যাহা
হউক ‘মূলখানা তােমার বাবাকে দিবা-নিও বুঝাইয়া
বলিবা!
বৎস! তােমার বাবা যে জন্মান্তর বিশেষতঃ পরলোকে
অবিশ্বাসী, তাহা বুঝিয়া বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইলাম। পরলোক
মানিলে বে জড়বাদ আসিয়া পড়ে, এ যে ভীষণ চার্বাক
মত! পরকীয়া প্রেমের উচ্চাধিকারী জানিয়া যে ধারণা পােষণ
করিতেছিলাম, তাহা কি পরলোক-অবিশ্বাসীতে সম্ভব ?
পরলােকে মিলনের সম্ভাবনা না থাকিলে সে কি প্রেম ?
দৈহিক ব্যভিচারের নামান্তর মাত্র। তিনি লিখিয়াছেন—
পরলােক তজ্ঞ লােকের সান্ত্বনা মাত্র। কি ভয়ানক কথা।
মুসলমান, খ্রীষ্টান, ব্রাহ্ম, স্পিরিচুয়ালিষ্ট প্রভৃতি জন্মান্তর মানে
বটে, কিন্তু পরলােক-অবিশ্বাসী কোন সম্প্রদায় এই উন্নত
যুগে আছে বলিয়া শুনি নাই। ব্যক্তিগত ভাবে আছে বৈ
কি ? কিন্তু সে কি ভীষণ লােক! সুতরাং তােমার বাবা-
যদি বাস্তবিক পরলােক-অবিশ্বাসী হয়েন, তবে তোমার মত
পুত্রের অনেক কর্তব্য আছে। ভগবান্ না মানিলে বরং ক্ষতি
নাই, কিন্তু পরলােক গেলে আর থাকে কি ? আমার নিকট
প্রকৃত নাস্তিকের ব্যাখ্যা শুনিয়াছ, সুতরাং এই মৃত্যু বাসরে
তোমার পিতার মনে যাহাতে পরলােক-চিত্র দৃঢ়ভাবে অঙ্কিত
৩৪

বিধবার কর্ত্তব্য
p
হয়, তাহার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিবে। অন্যান্য বিষয়
সাক্ষাতে বলিব। তুমি আমার আশীৰ্বাদ জানি এবং
অন্যান্য ভক্তগণকে জানাবে। কাজ-কর্মে বড়ই ব্যস্ত তুমি
চাকরীতে যােগদান করিয়াছ কি না, শারীরিক অবস্থা কিরূপ,
স্বাস্থ্যলাভ করিতে পারিলে কিনা জানাইবে। অত্র শুভ।
তােমাদের
ঠাকুর
D
(২৩)
সারস্বত মঠ
তাং ১০ই পৌষ, সন ১৩১৩ সাল
স্নেহাস্পদা-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র পাইয়া অবগত হইলাম। আমি নিরা-
পদে যথাসময়ে আশ্রমে আসিয়াছি। রাস্তায় ঠাণ্ডা লাগিয়া
সর্দি, কাশি, বুকে-পিঠে বেদনা হইয়া, কয়েকদিন কাতর
ছিলাম। এক্ষণে সুস্থ হইয়াছি বটে, কিন্তু কাশিটা সম্যক
সারে নাই। এদেশে ভয়ানক শীত পড়িয়াছে।
তােমার মাকে আমার আশীর্বাদের সহিত জানাবে,
যখন একবার তাহাদের শিষ্যারূপে গ্রহণ করিয়াছি, তখন
যেখানেই থাকি না কেন, তাহাদের মঙ্গল চিন্তা করি। তবে

ঠাকুরের চিঠি
তাহারা তাহাদের কর্তব্য হইতে যেন চ্যুত না হন, জীবনের
লক্ষ্য যেন ভুলিয়া না যান।
তুমি ব্রাহ্মণের ঘরে বিধবা, অবশ্য মঙ্গলময় বিধাতা
মঙ্গলােদ্দশ্যেই এ জীবনে তােমার ভােগপথ, রুদ্ধ করিয়া
দিয়াছেন। এই সুযােগে জীবনের পবিত্রতার উদ্বোধন করাই
তােমার জীবনের লক্ষ্য হওয়া কর্তব্য। স্বামীকে যতদিন
জগৎস্বামীরূপে না ধরিতে পারিবে, ততদিন গৃহে, থাকিয়াও
নির্লিপ্ত ভাবে—সন্ন্যাসিনীর ন্যায় জীবন যাপন করিতে হইবে।
পিতা-মাতার সেবাও ধৰ্ম্ম। তদ্ব্যতীত সকলকেই সন্তান
জ্ঞানে সেবা করিবে। শত্রু-মিত্র যেই হউক, বিপদে সাহায্য
করিবে--পীড়ায় সেবা করিবে--শােকে সান্ত্বনা দিবে, পতিতাকে
ঘৃণা না করিয়া তাহাকে সৎপথে আনিতে চেষ্টা করিবে।
জীবমাত্রেই ভগবানের সন্তান, সুতরাং তুমি তাহাদের মায়ের
স্থান অধিকার করিতে যত্ন করিবে। আব অন্তরে কবে তার
সহিত মিলন হইবে, সেই দিনের অপেক্ষা করিয়া সৰ্ব্বদা
তাহার নাম লইবে। ভাল-মন্দ, সুখ দুঃখ, রােগ-শােক,
সর্বাবস্থায় তাহার জুয় উচ্চারণ করিবে। সৰ্বম্ব তাহাতে
সমৰ্পণ করিয়া তাহারই শরণাগত হইয়া জীবনের বাকী কয়টা
দিন কাটাহয়া দিবে। এ সম্বন্ধে বিশেষ উপদেশ ও শিক্ষা
আমি সুযােগ ও সুবিধা মত তােমাদের দিব। তােমার ঘােট
বােনটীকেও তােমার পথেই পরিচালিত.করিবে এবং তদনু-
সারে শিক্ষাদি দিবে। সর্বপ্রকার প্রলােভন হইতে নিজকে

বিধবার কর্তব্য স সাবধানে দূরে রাখিবে। চিত্ত বেশী চঞ্চল বা নীচের দিকে যাইতে চাহিলে প্রাণপণে ভগবানের নাম লইবে। নিজকে রক্ষা করিতে তাহার উপরই ভার দিবে। আশ্রমের উপযুক্ত সেবকগণ কেহই মঠে নাই, সকলেই বাহিরে। আমি ফাল্গুন মাসের এদিকে আর বাহির হইব না। অন্যান্য কুশল। তােমরা আমার আশী- ৰ্বাদ জানিবে। ইতি-- শুভানুধ্যায়ী শ্ৰীনিগমানন্দ ( ২৪ ) সারস্বত মঠ ২৮৯২৩ কল্যাণীয়া — তােমার পত্র পাইয়া অবগত হইলাম। তুমি তােমার কন্যা সম্বন্ধে যাহা লিখিতে চাও জানাইবে। ইতিপূর্বে কুচ- বিহরি হইতে তােমার ছােট ভগ্নী এক পত্র লিখিয়াছে। তােমার পত্রেই তাহার সম্বন্ধে আমার,মনােভাব জানাইয়াছি। তাহাকে তাহাই অবগত করাইবে। এখন আর পৃথক্ পত্র লিখিলাম না, আবশ্যকও নাই। সময়ে তাহাকে পত্র লিখিব। তাহার “ভোদা” ভিন্ন কোন পােষাকী নাম থাকিলে আমায় জানাবে। তাহাকে সংযমের পথে পরিচালিত করিবে। ৩৭ ঠাকুরের চিঠি ভােগের আশা মিটিবার নহে। রাজ রাজেশ্বরীরও মেটে না। সংযমের নিরাবিল শান্তিময় পথেই গমন শ্রেয়। একবার প্রবৃত্তি সন্সার হইতে ফিরিয়া শ্ৰীশ্রীভগবমুখী হইলে অনন্ত শান্তি ও তৃপ্তি। অত্র মঙ্গল। তােমরা আমার আশীর্বাদ জানিবে। ইতি- আশীৰ্বাদক- শ্ৰীনিগমানন্দ সারস্বত মঠ ৫ . ১৭৫২৫ কল্যাণীয়াসু— পরম শুভাশীরাস্তাম্বিশেষঃ- বহুদিন পরে তােমার ও তোমার দিদির পত্ৰ পাইয়া সমাচার অবগত হইলাম । এবার যখন উত্তরবঙ্গে যাইব, তখন তােমাদের দীক্ষা-শিক্ষা সম্পাদন করিব। শিব পূজা লইয়াছ ভালই। মন দিয়া পূজা কর। ধ্যানকালে শিবের-- স্থলে তােমার স্বামীর মূর্তি চিন্তাতে কোন দোষ নাই। শিবই জগৎ স্বামী। তােমার দিদির অসুখ হইয়াছে বলিয়া তাহাকে আর স্বতন্ত্র পত্র দিলাম না। তাহাকে সাবধানে রাখিবা.। সর্বদা মাথার উপর সাদা বরফের পাড় ও তদুপরি শিব উপবিষ্ট ৩৮,

ভক্তের রােগ
চা—কে সর্বদা এইরূপ ধ্যান করিতে বলিবা। অধিক মাত্রায়
ভাবুকতা তার ব্যাধির নিদান। ঐরূপ চিন্তায় চিত্তরি ও
মস্তিষ্ক শীতল হইবে।
আমি সত্বর নিম্নআসামে যাইব, সুতরাং পূজার পূর্ব
আর পত্রাদি লিখিও না। এখানকার অন্যান্য কুশল। তােমর।
আমার আশীর্বাদ জানিবে। ইতি
আশীৰ্বাদক
শ্রীনিগমানন্দ
( ২৬ )
শান্তি আশ্রম
৩১শে ভাদ্র, ১৩২১
ভাগবতােত্তমেষু
প্রিয় গি— বাবু! আপনার পত্র পাইয়া আনন্দিত
হইলাম। আপনার পীড়ার সংবাদেও নিরানন্দের কারণ
নাই। আপনার জীবন-মৃত্যু সকল অবস্থাই এখন আনন্দময়।
আপনি সর্বস্ব ছাড়িয়া দীনবৃত্তি’ অবলম্বন করিয়া ভগবানের
চরণ সার করিয়াছেন, সুতরাং আপনার পক্ষে জীবন-মৃত্যু
তুল্য আনন্দদায়ক।
ভগবন্নির্ভরপরায়ণ ব্যক্তির বিপও যে
সম্পদের কারণ ! আপনার পবিত্র জীবনে পুনঃপুনঃ রােগ
আক্রমণ অবশ্য মঙ্গলেরই কারণ, সুতরাং আপনার জন্য
৩৯

ঠাকুরের চিঠি আমার ভাবিবার প্রয়ােজন নাই। জীবনের শেষ মুহূর্ত পন্থ ভাগ্যচক্র অভীতি পথে চালিত করিতে চেষ্টা করুন এবং সর্বাবস্থায় সর্বান্তঃকরণে ভগবানের জয় উচ্চারণ করিতে থাকুন। যে জীবন তার চরণে—তার সেবায় তার কাজে উৎসর্গ করিয়াছেন, সে জীবনের মঙ্গলামঙ্গলের জন্য আপনার চিন্তা কি ? যার উপর ভার আছে, তিনিই মঙ্গলের পথে চালাইয়া লইবেন। ভগবান্ যে তাঁর একান্ত অধীনকে বােগ-শােক দেন, তাহার কারণ এই যে, যাহাকে তিনি কোলে তুলিয়া লইবেন, পূর্বে তাহার ময়লা মাটী ঝাড়িয়া লন, তাই সাধু-ভক্তে রােগাদি ভােগ করেন। তাপ পাইলেই পাপাদি মলা মাটী পুড়িয়া জীব খাঁটী হয়। -তখন ভগবৎ- সান্নিধ্য লাভ হয়। আপনার ন্যায় পবম ভাগবতের রােগের কারণও তাই। অত্র মঙ্গল। আপনার আফিসের ভক্তদের আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানাইবেন এবং আপনিও জানিবেন। = - ভক্তপদারবিন্দভিক্ষু শ্ৰীনিগমানন্দ

ভক্তের রােগ
(২৭ )
কল্যাণবরেষু
শ্ৰীমতী জ্ঞা—র একখানা পত্র পাইয়া সমাচার"অবগত
হইলাম। সে তােমার ব্যাধি প্রতিকারের প্রার্থনা করিয়া
পত্র লিখিয়াছে। যখন তােমার ঐ ব্যাধি প্রথম প্রকাশ পায়,
আমি কি বলিয়াছিলাম স্মরণ আছে কি? যদি আমার দ্বারা
প্রতিকার হইত, তবে সেই সময়ই করিতাম। আমার সন্তান
ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া সাধারণের ঘৃণ্য হউক, এটা কি আমার সাধ ?
এ কর্মভােগ শেষ না হইলে পরলােকে পরিত্রাণ নাই। তাই
জানিয়া শুনিয়া আর কৰ্ম্মফলের বহর বাড়াইয়া দিতে ইচ্ছা
করি না। ঐ ব্যাধি তােমাকে ভােগ করিতেই হইবে। উহা
পাপজ ব্যাধি, ব্যাধি ভােগ না করিলে পাপ দূর হইবে না।
বরং ঈ— ভট্টাচার্যের মত ব্রাহ্মণের দ্বারা পঞ্চগব্য প্রস্তুত
করাইয়া প্রত্যহ একটু খাইলে ও ব্যাধিস্থানে লেপন করিলে
শীঘ্র পাপ দূর হইতে পারে। একদিন পঞ্চগব্য শাস্ত্রমত
তৈয়ার করাইয়া ৫৭ দিন ব্যবহার করা চলে।
এই শরীর ব্যাধি-মন্দির। কাহার কখন কোন্ রােগ
ফাটিয়া বাহির হইবে ঠিক নাই। ইহাতে লজ্জা বা ঘৃণার
কথা কি আছে? আমাদের অশিক্ষিত সমাজ বুঝে না বলিয়াই
মানুষকে ঘৃণা করে। সনাতন গােস্বামী শ্রীগৌরাঙ্গের কৃপা
পাইয়াও কুষ্ঠরােগগ্রস্ত হইয়াছিলেন। দাক্ষিণাত্যের পরম
ভক্ত বাসুদেব ভট্টাচাৰ্য ভীষণ গলিত কুষ্ঠে আক্রান্ত হন।
৪১

ঠাকুরের চিঠি আর সেদিন পুরীর গােবর্ধন মঠের শঙ্করাচাৰ্য্য শ্ৰীমৎ মধুসূদন স্বামী কুষ্ঠরােগে মারা গেলেন। এইসব লােকের যদি এমন ব্যাধি হইতে পারে, তবে আমাদের হাতে লজ্জা বা ঘৃণার কথা কি আছে ? বরং ঐসব ঐহিক দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া যাহাতে আর জন্ম না হয়,—আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক, আধি- ভৌতিক কোন রােগে যাহাতে আক্রমণ করিতে না পারে সেই চিন্তা কর। ভগবানের কৃপা তােমার উপর আছে। তাই সংসারের বাঁধন তােমার আন্ধা। সন্তান-সন্ততি নাই। স্ত্রী দুইটী ধর্মপরায়ণা, বিশেষতঃ জ্ঞা- মায়ের বিশেষ কৃপার পাত্রী। সুতরাং স্ত্রী দুইটী তােমার বন্ধনের কারণ নহে; বরং যথার্থ সহধর্মিণী। তাহাদের লইয়া ভগবৎপ্রসঙ্গে জীবনের বাকী কয়টা দিন কাটাইয়া দাও: তােমার যেটুকু সংসার- আসক্তি আছে, তত্ত্ববিচার ও প্রার্থনা দ্বারা তাহা দূর করিয়া ফেল। আমার সন্তানরূপে জগতে পরিচিত হও। মাকে আত্মসমর্পণ করিয়া মায়ের নাম লইয়া আনন্দে দিন কাটাও। আশীৰ্বাদ করি মায়ের কৃপায় তােমাদের শুভবুদ্ধি সঞ্জাত ; হউক। আমি শারীরিক ভাল আছি। জ্ঞা—র চরিত্রে আমার অন্তরঙ্গ অনেক ভক্ত আনন্দিত হইয়াছে। কারণ সে ময়না- মতী আশ্রমে গিয়া ঠাকুরের প্রসঙ্গ ছাড়া কাহারও সহিত বাজে আলাপ করে নাই। বাজে আলােচনাতেও যােগদান বা আগ্রহ প্রকাশ করে নাই। শিষ্য-ভক্তের কেহ প্রশংসা ৪২ * রােগের প্রতিকার করিলে আনন্দে প্রাণ গলিয়া যায়। অন্যান্য কুশল। সকলে আমার আশীৰ্বাদ জানিও। ইতি শুভানুধ্যায়ী শ্ৰীনিগমানন্দ ( ২৮ ) কল্যাণবরেষু- পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্র পাইলাম। তুমি, কয়েক মাস যাবৎ নানারূপ অসুখে ভুগিছে, অথচ ঔষধাদি সেরূপ ব্যবহার কর না, দৈব নির্ভর করিতে অভ্যাস করিতেছ---আলিপুরের লােক সেজন্য-ঠাট্টা-বিদ্রুপ করিয়া আমার নিকট মাঝে মাঝে পত্র লিখে। তােমার পত্রেও তাহার প্রমাণ পাইলাম। আমি জগতে যে সাধুত্বের প্রতিষ্ঠা করিতে চাই—শিষ্য তাহার অন্যথা চায়, তাই বাঙ্গালা ছাড়িয়া আসামের জঙ্গলে চলিয়া আসি। দৈহিক বা মানসিক সুখের সম্ভাবনা থাকিলে আমি ত্যাগ-বৈরাগ্য প্রচার করিতাম না-বেচারাদের স্ত্রী-পুত্র ছাড়াইয়া সন্ন্যাস মন্ত্রে দীক্ষিত করিতাম না। নিজেও স্ত্রী- পুত্র লইয়া গােস্বামীদের মত গুরু সাজিয়া শিষ্যেরও দেহ-মন- প্রাণের কুশল চিন্তা করিতাম। কি আর লিখিব—উপদেশে তত রােগ সারিবে না! কারণ আমার মধ্যে উপদেশের চুবড়ী আছে কিন্তু বােগ ছাড়ে না। “গুরু বেটা আমায় এত কৃপা ৪) ঠাকুরের চিঠি করিল, বিশ্বাস-ভক্তি-জ্ঞান সব দিল, কিন্তু রােগ ছাড়াইতে পারিল না। সুতরাং তােমাদের আর আমি কি করিব ? আমার যাহা নাই, তাহা তােমরা পাইবে কিরূপে? বাপু! মেয়েবুদ্ধি ছাড়িয়া পুরুষকারের পথে চল, ব্যারাম হয় ডাক্তার কবিরাজ দেখাও, ভাল না হয় পড়িয়া পড়িয়া ভগবানের নাম লােক হাসাইও না, আমারও আলিপুর যাওয়া বন্ধ করিও না। ইতি— আশীৰ্বাদক- শ্রনিগমানন্দ ( ২৯ ) সারস্বত মঠ ৩ ১৭ই আষাঢ়, ১৩২১ স্নেহাস্পদে পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য বহুদিন পরে তােমার পত্র পাইয়া অবগত হইলাম। শরীরটা অবসন্ন ও অসুস্থ হইয়াছে, সুতরাং তজ্জন্য সুচিকিৎ সার প্রয়ােজন। রােগের প্রতি ঔদাস্ত করা কর্ত্তব্য নহে। কারণ তাহা পরিণামে ভীষণাকার ধারণ করিতে পারে। ভগবানে নির্ভরতা ভুলিও না। সর্বাবস্থায় তাহাকে স্মরণ মনন করিও। দু’দিনের জন্য সংসারে আসিয়া আসল কথা ভুলিয়া যাইও না। আমি সম্ভবতঃ অগ্রহায়ণ মাসের মধ্যে ৪৪

নির্ভরতা
উত্তরবঙ্গে যাইব। সেই সময় তুমি দেখা করিতে চেষ্টা
করিও। সুবিধা ও সুযােগ হইলে ডােমারও যাইতে পারি।
অত্র মঙ্গল। আমার বিজয়ার আশীৰ্বাদ জানিও। রাণাঘাট
হইতে মেয়েরও পত্র পাইয়াছি। ইতি--
শুভানুধ্যায়ী –
নিগমানন্দ
(৩০)
শান্তি আশ্রম
২২৭১৯
কল্যাণবরে
আজ কয়েক দিন হইল, তােমার স্ত্রীর একখানি পত্র
পাইয়া বিস্তারিত অবগত হইয়াছি, কিন্তু কাৰ্য্যের ঝঙ্কাটে
উত্তর দিতে পারি নাই। বিশেষ কি যে উত্তর দিব তাহাও
ভাবিয়া পাই না। যাহা হয় হইয়াছে, হইতেছে, সবই
ভগবানের ইচ্ছায় হইয়া, থাকে। সাধুর ইচ্ছাও ভগবানের
ইচ্ছার সহিত সংযুক্ত।
স্বতন্ত্র ইচ্ছা যাহার, সে এখনও
সাধারণ শ্রেণীতে। সুতরাং ভগবানের ইচ্ছায় যাহা হইতেছে
তাহাতে ব্যস্ত হইলে চলিবে কেন ? তাহারই উপর নির্ভর
করিয়া বসিয়া থাক; ব্রহ্মাণ্ডের লােক কাণ ঝালাপালা করি-
লেও তাহার মঙ্গল ইচ্ছার ব্যতিক্রম হইবে না। কে তাহা রােধ

।
ঠাকুরের চিঠি
করিবে ? রক্তস্রাব হউক বা না হউক গর্ভলক্ষণ বুঝিতে পারিলে
ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া বসিয়া থাক—বিশ্বাস বলে
নিশ্চিন্ত হও। আর যদি গর্ভ হইয়া থাকে তবে ত কথাই
নাই। তবে বিপদটা যে কি বুঝিতে পারিলাম না। গর্ভ
হইয়া সময়ে সন্তান না হইলে বিপদ বটে, তবে যাহারা
ভগবৎকৃপার উপর সন্তান কামনা নির্ভর করে, তাহাদের
সামান্যে অস্থির বা চঞ্চল হইলে চলিবে কেন ?, সুতরাং
এরূপ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা কর্তব্য।
যেরূপ তাঁহারা বলেন করিও। তাহারা পরীক্ষা করিলেই
সব ব্যাপার বুঝিতে পারিবেন। এ সম্বন্ধে আমাকে পুনঃপুনঃ
চিঠি লিখিলে কি হইবে?
নির্ভর অর্থে কি জান? একজনের উপর ভর দিয়া
নিশ্চিন্তে বসিয়া থাকা। আমি তােমাদের পুনঃপুনঃ চিঠি
পাইয়া এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছি যে, আমার উপর
নির্ভর করিয়াই তােমরা বিপদগ্রস্ত হইয়াছ। আমি কিন্তু
ভগবান্ ব্যতীত তুচ্ছ মানুষের উপর নির্ভর করিতে কাহাকেও
পরামর্শ দেই না। আমি সরল অন্তঃকরণে বলিতেছি,
তােমর বিজ্ঞলােক ও সুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে কাৰ্য্য
কর। আমি কোন পরামর্শ দিতে সম্মত নই। কারণ গুরু
আমাকে বিশ্বাস ও নির্ভরতা ব্যতীত কিছুই শিখান নাই।
যাহারা কিছু চায় না--এমন কি-স্ত্রী-পুত্রাদি ছাড়িয়া আমাকে
৪৬

নির্ভরতা আশ্রয় করিয়াছে, হায়! আমি তাহাদেরই কোন উপকার করিতে পারিলাম না! আমার ন্যায় শক্তিহীন সাধুর সমাজে বাস বিড়ম্বনা মাত্র। আমি আশীৰ্বাদ করি, তােমাদের সর্ব- প্রকারে মঙ্গল হউক, ইহা ব্যতীত কোন শক্তি সম্বল নাই। শুভানুধ্যায়ী শ্ৰীনিগমানন্দ পুঃ -আমি সন্ন্যাসী হইয়াও অবগত আছি, ১৩১৪ মাসে এমন কি দেড় বৎসরেও সন্তান প্রসূত হইয়াছে। সংসারী লােক হইয়া কেহ কি তাহা শশানে নাই ? (৩১) শান্তি আশ্রম কল্যাণবরেযু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য বহুদিন পরে তােমার পত্র পাইয়া অবগত হইলাম। আমি পত্র না লিখিলেও তােমাদের ভুলি নাই। সৰ্ব্বদাই তােমাদের মঙ্গল কামনা করিয়া থাকি। আমি যতই দূরে অবস্থিতি করি না কেন, কখন তােমরা আমার স্নেহ হইতে দূরে থাকিবে না। সংসারে জল্পে স্বতন্ত্র কোথা? সর্বস্ব ৪৭

ঠাকুরের চিঠি
অর্থাৎ ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ সমস্তই তাহার চরণে অর্পণ কর,
সর্বাবস্থায় তাহাকে স্মরণ কর, নিয়ত তাহার জয় উচ্চারণ
কর, তাহা হইলেই মানবজীবন ধন্য হইবে। বিন্দুমাত্র অহং-
অভিমান ‘বশতঃ মােহপ্রাপ্ত হইয়া ‘আমি’ ‘আমার’ করিয়া
জড়াইও না। তুমি তােমার এই মূলমন্ত্র ভুলিও। প্রাণ
খুলিয়া অকপটে প্রার্থনা করিও, তিনি সব ভা'র লইবেন।
অত্র মঙ্গল। আমি ৪৫ দিনের মধ্যে মুর্শিদাবাদ যাইব,
ফিরিবার কালে ঢাকা হইয়া আসিতে পারি। আমার
আশীৰ্বাদ জানিও। ইতি
৫
শুভানুধ্যায়ী—
নিগমানন্দ
t
.
( ৩২ )
শান্তি আশ্রম
২৯৮১৬
৫
স্নেহের ধী,
তােমার পত্ৰখানা যথাসময়ে পাইয়া অবগত আছি-
কিন্তু নানা কারণে উত্তর দিতে পারি নাই। সম্প্রতি অজয়
ও দামােদর নদের বন্যায় পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক লােক
গৃহাশূন্য,তদুপরি নিউমােনিয়া ও কলেরা প্রভৃতি রােগের
৪৮

নির্ভরতা প্রকোপ। তাই শ্রীগৌরাঙ্গ অনাথনিকেতনের ডাক্তার ও সেবকগণ লইয়া আশ্রমের ম্যানেজার তথায় গিয়াছে। আর্ত সেবায় বহু অর্থ ব্যয় হইতেছে। আশ্রমের যে কাৰ্য ৩ জনে সম্পাদন করিত, আমাকে মাত্র একজনের দ্বারা তাহা সম্পন্ন করিতে হইতেছে। একদণ্ড অবকাশ নাই। মন-প্রাণ বর্ধমানে পড়িয়া আছে। তাই এই পত্রে বিশেষ কিছু লিখিতে পারিলাম না। সময় মত সবিশেষ জানাইব। আমি তােমাকে যে কাৰ্য্য দিয়াছি তাহাতে প্রাণায়াম করিবার বিধি নাই, সুতরাং তােমার ঐসব করিবার প্রয়ােজন নাই। তুমি কেবল ধ্যান ও জপ করি। তৎপরে পুনরায় সাক্ষাৎ হইলে—তুমি সুবিধা ও সুযােগ মত এখানে একবার আসিলে অন্যান্য বিষয় সম্বন্ধে উপদেশ দিব। কেবল কতক- গুলা কৰ্ম্মানুষ্ঠানে জীবনের পূর্ণত্ব লাভ হয় না। ভগবানে আত্মনির্ভর করিতে অভ্যাস কর। সর্বস্ব হাতে সমর্পণ করিয়া তাহার শরণাগত হইয়া সুখে-দুঃখে, রােগে-শােকে, সম্পদে-বিপদে তাহার জয়গান করিও, নাম লইয়া পড়িয়া থাকিও। আকীট ব্ৰহ্ম পর্যন্ত একই ভগবানের বিকাশ জানিয়া সৰ্ব্বভূতের হিতসাধনে জীবন উৎসর্গ করিও। মানব- জীবন ধন্য হইবে, পবিত্র আনন্দের অধিকারী হইবে। আমি ভাল আছি। আমার আশীৰ্বাদ জানিও। ইতি শুভানুধ্যায়ী নিগমানন্দ এক

ঠাকুরের চিঠি
-
(৩৩)
t
সারস্বত মঠ
১০১১।২৫
কল্যাণীয়াসু
পরম শুভাশীরাস্তাম্বিশেষঃ---
তােমার পত্র পাইয়া আনন্দিত হইলাম। আমি
কলিকাতা যাইব ইচ্ছা করিয়া ঢাকা যাই। তথায় জানিতে
পারি কলিকাতায় খুব জ্বর হইতেছে, কলেজাদি বন্ধ, সেবকগণ
অধিকাংশ কলিকাতায় অনুপস্থিত। • তাই আর কলিকাতা
যাইলাম না। বাঙ্গাল দেশ বেড়াইয়া ১১ই মাঘ আশ্রমে
ফিরিয়া আসিয়াছি। আবার সুবিধা মত যাইতে চেষ্টা
করিব।
তােমাদের হৃদয়ে আমার আসন। সুতরাং তােমাদের
নূতন ঘরে তােমরা বাস করিলেই আমার বাস করা হইল।
আমাকে প্রত্যক্ষ মনে করিয়া সংসার করিবে। সুখে-দুঃখে
রােগে--শােকে সম্পদে-বিপদে মায়ের নাম ভুলিও না।
এ সংসারে কেহ নিরুদ্বেগে নিশ্চিন্তে বাস করিতে পারে না।
যত বড়ই ক্ষমতাশালী হউক না কেন। কেবল ভগচ্চরণে
নির্ভরশীল বিশ্বাসী ভক্ত," দীনহীন হইলেও সুখে-দুঃখেও
শান্তিতে কালযাপন করে। আশীৰ্বাদ করি তােমাদেরও
সেইরূপ বিশ্বাসের দৃঢ়তা as • নির্ভরতা প্রতিষ্ঠিত হউক।

নির্ভরতা এখানকার মঙ্গল। দেশের অবস্থা বড়ই শােচনীয়। ইতি আশীৰ্বাদক- শ্রীনিগমানন্দ ( ৩৪ ) সারস্বত মঠ ৫ই আষাঢ়, ১৩২২ পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্র পাইয়া অবগত হইলাম। আমি প্রায় ৬ মাস পরে গত ২৫শে বৈশাখ আশ্রমে আসিয়াছি। উৎসবের পর আশ্রমের সেবকগণের মধ্যে অনেকেই জ্বরে শয্যাশায়ী হইয়াছিল, এখনও স্ব--- প্রভৃতি সম্পূর্ণ সারিয়া উঠিতে পারে নাই। তদুপর একমাস যাবৎ অত্যধিক বর্ষণে চারিদিক ভাসিয়া গিয়াছে। নানা অসুবিধা এবং কার্যের বিশেষ বিশৃঙ্খল হইয়াছে। অন্যান্য কুশল। তুমি সার্ভে স্কুলে কি করিতেছ লিখ নাই। যাহাই কর নিজ লক্ষ্যচ্যুত হইও না। সংসারের দু’দিনের জন্য সুখ-দু খে কাতর হইয়া কৰ্ত্তব্য ভুলিয়া যাইও না ক’দিনের সংসার ? সুখ-দুঃখ মায়া মরীচিকা ! মৃত্যু-অন্তে রাজা-প্রজার এক গতি। বরং ভগবানের দত্ত সুখ-দুঃখ বা কৰ্ম্মফলে বিচলিত না হইয়া তাঁর চরণে সৰ নির্ভর করতঃ সকল অবস্থায় তাঁর জয়ােচ্চারণ করিয়া যাইতে পারিলে একদিন চরম শান্তি লাভ করিতে পারিবে। !

ঠাকুরের চিঠি সংবাদাদির জন্য প্রয়ােজন হইলে চি- প্রভৃতি “বৈকগণের নিকট পত্র লিখিয়া আশ্রমের মঙ্গলামঙ্গল সংবাদ তাবগত হইও। কারণ আমার সব সময় পত্র লিখিবার সুযােগ ও সুবিধা ঘটে না। তুমি আমার আশীর্বাদ জানিও। শুভানুধ্যায়ী— শ্ৰীনিগমানন্দ ৫ (৩৫) শান্তি আশ্রম ১৯১২১৯ কল্যাণীয়াসু- স্নেহের যাে-, বহুদিন পরে তােমার পত্রখানি পাইয়া বিস্তারিত অবগত হইলাম। কিন্তু তােমাকে কি লিখিব ভাবিয়া পাই না। লিখিতে বসিলে স্তব্ধ হইয়া যাই। হায়! অশুভক্ষণে তােমার সহিত আমার দেখা হইয়াছিল, তুমি সাংসারিক শান্তি হারাইলে, অথচ কোনরূপ, আধ্যাত্মিক আনন্দ তােমাকে দিতে পারিলাম না। বাস্তবিক আমার উপর আমার বড় ঘৃণা হয়, কাহারও কোন উপকার করিতে পারিলাম না। অথচ অনেকেই অশান্তির দাবদাহে জ্বলিয়া মরিতেছে। কিন্তু ইহা নিশ্চয় জানিও-সংসারের ভােগ- বিলাসে তাহাকে ভুলিয়া থাকা অপেক্ষা তাহার অভাবজনিত অশান্তি শতগুণে শ্রেয়ঃ । তিনি কাহাকে কি ভাবে দয়া

নির্ভরতা
করেন, কাহাকে কোন্ পথে আপন ক্রোড়ে টানিয়া লন, তাহা
সাধারণ মানব-বুদ্ধির অতীত। বর্তমান বিপদে-আপদে
অশান্তি-উদ্বেগে কিম্বা শশাকে-দুঃখে তার দয়াময় নামে যেন
সন্দেহ না আসে। দৃঢ়তা ও ধৈর্য্যের সহিত তাহাতে নির্ভর
করিলে একদিন অবশ্য তিনি সব ভার নিবেন, অভাব দূর
করিয়া দিনে। বিশ্বাস হারাইও না, তাহাকে ভুলিও না
তঁাহার নাম লইয়া পড়িয়া থাক। আমাতে বিশ্বাস থাকিলে
অবশ্য আমার উপদেশ মত চলিবে। সাধনা থাকিলে
সিদ্ধি অবশ্যম্ভাবী, ভগবান্ অবশ্য তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ
করিবেন।
তােমার আবীরে রঞ্জিত হইলাম। আমি যে তােমার
প্রাণের অনুরাগ-রাগে সৰ্ব্বদাই রঞ্জিত রহিয়াছি। এক
শক্তিরই সর্বত্র বিকাশ, সুতরাং তােমার আনন্দময়ী লীলা
আমি প্রতিক্ষণেই উপলব্ধি করিয়া থাকি। মেয়ে মায়েতে
লয় হইলেই আমার বুকে আসিবে, সুতরাং মাকে ভুলিও না।
অত্র মঙ্গল। তােমরা আমার আশীৰ্বাদ জানিবে। ইতি
শুভানুধ্যায়ী-
ঐনিগমানন্দ

== ঠাকুরের চিঠি ( ৩৬) শান্তি আশ্রম এই কার্তিক স্নেহাস্পদেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য- তােমার শরীরের প্রতি দৃষ্টি রাখিও। কিন্তু তজ্জন্য চিন্তা করিও না। ভগবাকে নির্ভর করিতে শিক্ষা কর। মানুষ চেষ্টা বা চিন্তা দ্বারা নিজের কিছুই করিতে পাবে না। সুতরাং বৃথা চিন্তা না করিয়া সুখে-দুঃখে তাহার চরণ চিন্তা ও তদীয় নামের জয় উচ্চারণ করিয়া যাও। কয়দিনের সংসার-কয়দিনের দেহ? আর মঙ্গলময়ের উপর ভার দিলে তিনিই মঙ্গল ব্যস্থা করিবেন। ডাক্তারের অস্ত্র চিকিৎসায় বাধা দিলে ক্ষত ভাল হইবে কেন ? আধ্যাত্মিক মঙ্গলের জন্যই তিনি তাহার ভক্তকে সাংসারিক কষ্ট দিয়া থাকেন। রােগ বুঝিয়া ব্যবস্থা। কিন্তু তিনি মঙ্গলময় এ কথা ভুলিও না। সেবকগণ অদ্যাপিও আসে নাই। আমার আশীৰ্ব্বাদ জানিও। ইতি- ৫ - শুভানুধ্যায়ী ঐনিগমানন্দ

নির্ভরতা
( ৩৭ )
শান্তি আশ্রম
১৭৪২০
---
স্নেহাস্পদাসু-
পরম গুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
বহুদিন পরে তােমার একখানি পত্র পাইয়া অবগত
হইলাম।
আমি রংপুরের তিস্তা ষ্টেশনে বসিয়াও
নবাবগঞ্জের লোকের নিকট তােমার অনুসন্ধান করিয়াছি।
তােমাকে আমি একদিনের জন্যও ভুলি নাই—অন্ততঃ তােমার
নামটী তোমাকে ভুলিতে দেয় নাই! তুমি হর-হৃদিকমলের
কমলিনী, স্বেচ্ছায় গৃহস্থের ঘরে আবদ্ধা, আমি তােমাকে
খু জিয়া পাইব কেন ? কোনদিনই আমার পক্ষে তাহা
সম্ভবপর নহে। সুতরাং তােমাকেই আমার নিকট আসিতে
হইবে। ভগবান্ যতদিন সে, সুযােগ না দেন, ততদিন
তঁাহাতেই নির্ভর করতঃ তাহার নাম লইয়া বসিয়া থাক।
তিনি নিরুপায়ের উপায়, সকল উপায় করিয়া দিবেন।
তােমাকে আমার দেখিবার ইচ্ছা থাকিলেও ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছার
উপর সে ইচ্ছা নির্ভর করিয়া বসিয়া আছি। বিশ্বাস রাখ
তিনি বাঞ্ছাকল্পতরু, অবশ্যই তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করিবেন।
আমি তােমাকে না দেখিয়া বা তােমার মনে কথা না শুনিয়া
কোন উপদেশ বা সাধনপন্থার ব্যবস্থা করিতে পারি না।
সুতরাং সুবিধা ও সুযােগ মত আমার সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ
করিতে চেষ্টা করি।

ঠাকুরের চিঠি আমি পূজার পর পুনরায় রংপুর অঞ্চলে যাইব। পার ত সেই সময় আমার সহিত দেখা করিও। আশীর্বাদ করি তুমি সর্বান্তঃকরণে ভগবানে অনুরক্তা হও। ইতি শুভানুধ্যায়ী শ্ৰীনিগমানন্দ ( ৩৮ ) শান্তি আশ্রম ৪া১২১৯ কল্যাণীয়াসু # আমি পত্র লিখিতে না পারিলেও তােমা- দের ভুলি না, এ বিশ্বাস রাখিও। মানে সম্পূর্ণ নির্ভর করিতে অভ্যাস করিও। সুখে-দুঃখে বিপদে-সম্পদে তাহার জয় উচ্চারণ করাই মানব জীবনের সিদ্ধি। নতুবা সব মিথ্যা, দু’দিন সংসারের খেলা; আগাগােড়া সব মিথ্যা, মাঝে দু’দিন সংসারে মায়ার অভিনয়। যে নিত্য সত্য সুখ শান্তির আধার তাহার শরণাপন্ন হও, তাঁহাকে সর্বস্ব বলিয়া জান, জীবন মধুময় হইবে, উদ্বেগ অশান্তি দূরে যাইবে। ত্বত্র মঙ্গল। তােমরা আমার আশীর্বাদ জানিও। আশীৰ্বাদক- এনিগমানন্দ

নির্ভরতা
( ৩৯ )
নীলাচল কুটীর (পুরী)
৪১১৩৮
কল্যাণবরেষু-
পরম শুভাশিষাং রশিয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র যথাসময়ে পাইয়া সকল সমাচার অবগত
হইলাম। শুধু তােমার বা তােমাদের গ্রামের নহে, অর্থাভাবে
সর্বত্রই হাহাকার পড়িয়াছে। আমরাই সেই ধাক্কা সর্বাপেক্ষা
বেশী অনুভব করিতেছি। কারণ পঁচজনেই আমাদের
প্রতিপালন করিতেছে। যাহা হউক, যাহা সৰ্বব্যাপী ও
অবশ্যম্ভাবী, তাহার জন্য হা-হুতাশ করিলে কি হইবে ?
ভগবান্ যখন যে রাখিবেন, তদনুরূপ থাকিতে ও নিজের
পরিবারবর্গকে সেইরূপ গঠিত করিতে হইবে। সবই ভগবানের
দান ভাবিয়া আনন্দে মাথা পাতিয়া লইতে হইবে। অনর্থক
ভাবিয়া চিন্তিয়া মন খারাপ করিও না। ভক্তগণকে পরীক্ষায়
ফেলিয়া তিনি পাকা করিয়া লইয়া থাকেন। অনেক সময়
বিপদ সম্পদেরই নিদান হয়। সর্বাবস্থায় হাতে নির্ভর
করিয়া তাহারই নাম কর, তাহার জয় উচ্চারণ কর। তিনি
মঙ্গলময়, হাত ধরিয়া মঙ্গলের পথে লইয়া যাইবেন। বিপদে-
আপদে লক্ষ্যচ্যুত হইও না। প্র— মঠে গিয়া আসন ঘরের
কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছে । আমার কাছে মঠের যে টাকা
ছিল পাঠাইয়া দিয়াছি। তুমি এইখানেই প্রতিশ্রুত টাকা
-৪খ

৮ ঠাকুরের চিঠি পাঠাইও। আমি এক রূপ আছি, বাতে বুঝি অচল করিয়া দিবে। অন্যান্য কুশল। তােমরা সকলে আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবা ও ভক্তদের জানাইবা। ইতি শ্ৰীমান্ বি , অত্র পত্রে আমার আশীর্বাদ জানিবা। তােমার পত্র ও প্রেরিত ৮ টাকা পাইয়াছি। তােমার লিখিত বইখানি আমার ত ভালই লাগিয়াছে'। লিখিবার প্রণালীও নূতন বটে। তবে অন্যের কিরূপ লাগিবে জানি । কিন্তু ছাপা ও কাগজ অত্যন্ত খারাপ হইয়াছে। বই বিক্রয় হইলে তােমার খরচের টাকা তুমি কাটিয়া লইও। চেষ্টা করিলে বই বিক্রয় হইবে আশা করা যায়। বই সম্বন্ধে অন্যান্য কথা সাক্ষাতে বলিব। ন- আমাকে একখানা চিঠি লিখিয়াছিল, পাঠ করিয়া সন্তুষ্ট হইয়াছি, তাহার যখন বিবাহ করিবার ইচ্ছা আছে, তখন দেওয়াই কর্তব্য। কিন্তু পরিবার প্রতিপালন করিবে কিরূপে? প্রারব্ধ কেহ রােধ করিতে পারে না। বিবাহ না করিলে আমি তাহার ভার লইতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু প্রারব্ধ তাহাকে নিজ পথে লইয়া গেল। আশীৰ্বাদক- ঠাকুর” ।

নির্ভরতা
(৪০ )
শান্তি আশ্রম
২২।১/১৪
স্নেহাস্পদে
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র পাইয়া বিস্তারিত অবগত আছি। তুমি
কোথায়ও চাকরীর সুবিধা করিতে পার নাই জানিয়া চিন্তিত
থাকিলাম। চেষ্টা কর, অবশ্যই সুফল পাইবে।
বৎস! আমি যখন তােমায় শিষ্য বলিয়া গ্রহণ
করিয়াছি, তখন যেখানেই থাকি না কেন, সর্বদা তােমার
মঙ্গল চিন্তা করিব। কোন অবস্থায় বিশ্বাস হারাইও না।
যখন যে অবস্থায় থাক—সুখে-দুঃখে বিপদে-সম্পদে ভগবানের
নাম ভুলিও না। নানারূপ অবস্থার মধ্য দিয়া তিনি জীবকে
মঙ্গলের পথে লইয়া যান। সুতরাং সাংসারিক সুখ-দুঃখে
চঞ্চল হইও না। সম্পূর্ণ তাহাতে নির্ভর করিও।
রাখিও তােমার ভার ভগবান্ লইয়াছেন। সুতরাং তােমার
চিন্তার কিছুই নাই। কেবল কর্তব্য সম্পাদন কর এবং
সর্বাবস্থায় তঁাহার নাম গান কর। সর্বদা সুখে-দুঃখে তাহার
জয় উচ্চারণ কর। জীবের এতদপেক্ষা পুরুষার্থ নাই। যখন
যে অভাব বা দুর্বলতা অনুভব করিবে, কায়মনােপ্রাণে
সরল ভাবে তাঁহার চরণে প্রার্থনা করিও-সদ্য সদ্য ফলাভ
মনে

ঠাকুরের চিঠি করিতে পারিবে। সর্বদা আনন্দে থাকিবে। অত্র মঙ্গল। আমার আশীর্বাদ জানিও। ইতি-- শুভানুধ্যায়ী নিগমানন্দ ( ৪১ ) শান্তি আশ্রম ২৫।১১১২ কল্যাণবরেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্ৰ পাইয়াছি। আমি জানি ভগবানের করুণা তােমাদের উপর অপার। তাঁর দয়া সাংসারিক হিসাবে মাপ করিও না, স্ত্রী-পুত্র বা বিষয়-বিভবের সঙ্গে তার দয়ার সম্বন্ধ নাই। পালনকর্তা বিষ্ণুর দয়াই সংসারে বিচাৰ্য্য। আর ভগবানের দয়া বুদ্ধিতে প্রকাশিত হয়। আত্মচরিত্রে তাঁর দয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। তােমার উপর আছে। বাণলিঙ্গ, যন্ত্র বিশেষ। সুতরাং সমস্ত দেবতারই তাহাতে পূজা হয়। তুমি অগ্রে শিব পূজা করিয়া পরে ইষ্ট- দেবতার পূজা করিতে পার। বই দৃষ্টে নারায়ণের পূজা করিলে ইষ্টপূজা হয় না। মন্ত্রানুযায়ী পূজা ভিন্ন ভিন্ন। সে দয়া

রমণীত্ব ও জননী
ইষ্টদেবের পূজার পদ্ধতি মন্ত্রানুযায়ী হওয়া প্রয়ােজন। অত্র
মঙ্গল। তােমরা আমার আশীৰ্বাদ জানিও। ইতি
শুভানুধ্যায়ী
এনিগমানন্দ
( ৪২ )
শান্তি আশ্রম
১৮৪২০
;
?
স্নেহের স্ব-,
তােমার পত্র পাইলাম; যােকে লিখিত পত্রও সমস্ত
পাঠ করিলাম। যাে~ কাহাকেও পত্র লিখে না, তবে কেহ
কোন বিষয় ফ্লানিতে চাহিলে কাহারও দ্বারা উত্তর লেখাইয়া
দেন। সুতরাং তােমার পত্রের আর কি উত্তর দেওয়াইবে
যো—র নিজের কিছু নাই, তার সবই ঠাকুর; সুতরাং
ঠাকুরকে ভালবাসিয়া কেহ যদি তাহাকে পদাঘাত করে, তবু
সে তাহার আপন ; আর ঠাকুর ছাড়িয়া কেহ তাহাকে শত
আদর করিলেও সে তাহার কেহই নহে। জানি না কি
কারণে তাহার বিশ্বাস জন্মিয়াছে--তােমার প্রাণ ঠাকুরময়।
তাই প্রাণে প্রাণে তােমাকে আপন বলিয়া মনে করে,
আপনার ন্যায় ভালবাসে। তবে কাহারও নিকট কোন কথা
প্রকাশ করা তাহার স্বভাববিরুদ্ধ। আমাকে সে অনেক
সময়ই বলে যে, যে প্রাণ দিয়া প্রাণ বুঝিতে পারে না,
;

সে বলে
ঠাকুরের চিঠি
তাহাকে মুখের কথায় কি বুঝাইব? আর প্রাণের কথা কি
মুখের ভাষায় বাহির হয়? বিশেষতঃ যে এখনও ঠাকুরকে
যােল আনা না বুঝিয়াছে, তাহার নিকট প্রাণের কথা খোলা
প্রগলভতা প্রকাশ বলিয়া তাহার জ্ঞান হইয়াছে।
যে—“ঠাকুরের মেয়ে ভক্তগণের মধ্যে একমাত্র স্ব—র নিকট
ঠাকুরকে রাখিয়া সে নিশ্চিন্ত হইতে পারে। সুতরাং তাহাকে
আর তােমার পত্র কি শুনাইব, কিম্বা তাহার প্রদত্ত কি উত্তর
লিখিব ? আর যিনি জগজ্জননী, তিনি ত তােমার রমণীসত্ত্ব।
সৰ্ব্বদা আত্মসত্ত্বায় মিলাইয়া লইতে ব্যাকুল ! তুমি নিজকে
পৃথক্‌ রাখিয়া ত্রিতাপে জ্বলিয়া মরিতেছ। বৎসে ! নিজকে
মায়ের মধ্যে ডুবাইয়া দে, তৎপরে মায়ের দেহ-ইন্দ্রিয় লইয়া
ঠাকুরের কাছে আসি। মায়ের সাধনা না করিলে কি
মেয়েরা মাতৃত্ব লাভ করিতে পারে? আঁর মাতৃত্ব লাভ না
করিয়া সয়তানের উচ্ছিষ্ট দেহ-মন লইয়া কি আর গুরুসেবা
চলে? তাই পদে পদে সন্তুষ্টির স্থলে বিরক্তি বােধ করিতেছ।
গুরুপ্রেম সখ্যপ্রেমে বলি দিয়াছ, গুরুবাক্য স্বামীবাক্যে
উড়াইয়া দিয়াছ, আর কি মায়ের স্নেহের আশা কর? মায়ের
জাতিতে জন্মিয়া মায়ের মর্যাদা বুঝ না?
মা কি বেশ্যা ?
—যে মা পিতার মুখে স্বামী-নিন্দা শুনিয়া দেহত্যাগ করিয়া-
ছিলেন, তার পতিবাক্য অবজ্ঞা করিয়া তাহার কোলে স্থান
পাওয়া সম্ভব কি ?
তবে উপায়?

রমণীত্ব ও জননী আর আমিই গুরুরূপে আবার উপায় করিয়া দি গুরুবাক্যে অবজ্ঞাও বুঝি সেই মঙ্গলের জন্য হইয়াছে। তােমার মুখে যখন একবার ‘মা’ বুলি ফুটিয়াছে, কায়মনাে- প্রাণে তা আর ছাড়িও না। শিশুর ন্যায় সরল প্রাণে মা মা বলিয়া ডাক, ধূলায় পড়িয়া কঁাদ, মায়ের স্বভাবে আত্মাহুতি দাও, মা তােমার সারা হৃদয় জুড়িয়া আবিভূত হইনে। তখন সব শৃঙ্খলা হইবে, চারিদিকে সামঞ্জস্য দেখিবে। বুদ্ধির বিক্ষিপ্ত অবস্থা গিয়া স্থৈর্য ও গাম্ভীৰ্য আসিবে, লঘীয়সী রমণীত্ব স্থলে গরীয়সী জননীত্ব ফুটিয়া উঠিবে। আমি তােমাকে মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত করিয়াছি, আশাও ছিল তােমার মধ্যে মায়ের দর্শন পাইয়া গুরুগিরির সার্থকতা করিব। কিন্তু আমি মায়ের মনে, এ পর্যন্ত এক স্বার্থপর ক্ষুদ্র রমণীকে দেখিয়া আসিতেছি, এ দুঃখ কি কেহ বুঝিবে ? এইবার এই ধাক্কায় যদি সামলাইয়া উঠ। তাই বলি—মা ডাক যদি ধরিয়াছ, প্রাণের সহিত সুর বাঁধ, আর বাবা বাবা বলিয়া বেসুরা বাজাইও না-কাণ ঝালাপালা হইয়াছে। তােমার গুরুদত্ত মন্ত্রে মাতৃত্ব মাখা, বাবা বলিলে চৈতন্য হইবে কেন? আগে মাতৃত্ব জাগাও, তবে বারা পাইবে। অহঙ্কারে পথ হারাইয়াছিলে, তাই , গুরুর অন্যতর মূর্তি স্বামীর উপর অবিশ্বাস জন্মিয়াছিল, যদি স্বামী চাইতে তাহা হইলে সামান্য নারীভাবে তাহার সাধনা হইত, যখন গুরুরূপে বাসনা জাগাইয়াছ তখন শক্তি সাধনায় শক্তিত্ব, মাতৃসাধনায় মাতৃত্ব

ঠাকুরের চিঠি
লাভ কর—সব ঠিক হইয়া যাইবে। ও চখে আমাকে
দেখিতে পাইবে না, মায়ের চোখ দিয়া, দেখিতে হইবে।
বােধ হয় তােমার ভাবের পথ বুঝিয়াছ, বিশেষ করিয়া
বুঝিতে হইলে আমার কাছে আসিও। যে—রও ইচ্ছা
একবার আসিয়া আশ্রম দেখিয়া যাও। কেন না যে ভক্ত
ঠাকুর চায়, এটা যে তার নিজের বাড়ী ! নিজের বাড়ী
অস্িিব না? অত্র মঙ্গল। ভক্তবৃন্দকে আমার আশীৰ্বাদ
জানাইও। ইতি
শুভানুধ্যায়ী
শ্ৰীনিগমানন্দ
(৪৩)
শান্তি আশ্রম
২৭৪২০
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্ৰখানা যথাসময়ে পাইয়া অবগত আছি।
মানুষকে চিৎ ও আনন্দ মনে করিতে পারিলে ক্ষতি নাই,
কিন্তু কাগজে কালী দিয়া সে প্রার্থনা, জানাইলে, পত্রের
মারফৎ তাহা পাইবার আশা নাই।
আমার আশ্রমভুক্ত।
যােকে ভৈরবী ভেকধাত্রিণী বলিয়া এবং শা— ব্রাহ্মণী
বলিয়া তাহাদের মা বলিতে বা প্রণাম করিতে পার, কিন্তু
কোন শিষ্য তাঁহাদের বাহিরে কেবল মুখের কথায় জগজ্জননীর
৬৪"

চিৎ ও আনন্দ সমান বাবহার করে আমি ইহা পছন্দ করি না। তাই তােমার পত্র আমি কাহাকেও দেখাই নাই। কিন্তু প্রকৃত ‘মা’ তােমার আকুল প্রাণের ব্যাকুল প্রার্থনা অবশ্য শুনিয়াছেন, প্রার্থনা অবশ্য পূর্ণ হইবে। বৎস! ভিতরে আনন্দ-উপাদান দ্বারা মায়ের মূর্তি গড়াও, এবং, চিৎশক্তিতে তাহার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিয়া শ্রীগুরুর পার্শ্বে বসাইয়া প্রাণের প্রার্থনা জানাও, মা সব শুনিকেন, সকল আশা পূর্ণ করিবেন। মা ঠিক মায়ের মত তােমার হৃদয়ে আবিভূতা হইয়া তােমায় কোলে করিয়া বসিবেন। নতুবা বাহিরে,পঞ্চাশ জনের কাছে মায়া কান্না কাদিলে কিছু হইবে না মন ঠিক কর, লক্ষ্য ঠিক কর, গুরুর উপর বিশ্বাস দৃঢ় রাখিয়া তাহার নাম একমাত্র ভরসা করিয়া পড়িয়াস্প সময়ে সব পাইবে, কেবল বচনে রচনে হইবে না। অত্র শুভ। তােমরা আমার আশীর্বাদ জানি। আশীৰ্বাদক- শ্ৰীনিগমানন্দ ( ৪৭ ) ঢাকা আশ্রম ১৬৭১৩১৮ কল্যাণবরেষু পরম শুভাশিষাংরাশয়ঃ সন্তু নিত্য প্রিয় গাে! তােমার পত্র পাইয়া বিস্তারিত অবগত ৬৫ -৫ক ঠাকুরের চিঠি হইলাম। স্তব কবচ পাঠ সম্বন্ধে পুরােহিত যাহা বলিয়াছেন তাহাই সত্য। অন্য কাৰ্য্যে কিম্বা পুস্তকে যেখানে যাহা আছে তাহা পাঠের সময় কোথাও আপন বীজমন্ত্র থাকিলে তাহা উচ্চারণে দোষ নাই। পংক্তিচ্ছন্দে উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করিয়া যাইতে স্বীয় বীজমন্ত্র উচ্চারণে দোষ হইবে না। পুরােহিতের নিকট পূজাপদ্ধতি দেখিয়া শিখিয়া অভ্যাস করিয়া তবে কালীপূজা করিও। তােমার বিবাহ সম্বন্ধে ২৬শের দিন উৎকৃষ্ট এবং ঐ দিন অনেক লগ্ন আছে, কুষ্ঠি পাঠাইলে লগ্ন ঠিক করিয়া দিব। কৰ্ম্মজীবন পরিচালন করিতে শরীরটার প্রতি বিশেষ মনােযােগ করা কর্তব্য। অত্র আশ্রমের কুশল। ম— বাবু আসিয়াছেন কি ? তাহাকে আমার আশীর্বাদ জানাইও। * ইতি- তােমার- ঠাকুর (৪৫) । পুরী ১৭১১৩৪ কল্যাণীয়াসু— পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্যম— এইমাত্র তােমার পত্রপাইয়া সকল সমাচার অবগত 4 বিবাহ বিধিনির্দিষ্ট ; হইলাম। বিবাহ প্রজাপতির নির্বন্ধ ; মেয়ের জন্মসময়েই স্বামী নির্দিষ্ট হইয়াছে ; যথাকালে মিলনও হইবে, তবে পিতা-মাতার কর্তব্য যথাসাধ্য সুপাত্রের জন্য চেষ্টা করা, তােমরাও ভাহা করিতেছ। তবে কেন ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া নিরুদ্বিগ্ন হইতে পারিতেছ না? ভাবনায় আহার নিদ্রা ত্যাগ করা কি সুবুদ্ধির কাৰ্য? কোন্ কাৰ্যটা মানব মনের মত ঠিক ঠিক করিতে পারে ? মানুষের কতটুকু শক্তি? প্রারব্ধই মানুষকে পরিচালিত করিতেছে। অজ্ঞানান্ধ অহং স্বভাব জীব অকারণ হা-হুতাশ করিয়া মরিতেছে। সুতরাং ভগবানে নির্ভয় ব্যতীত শান্তির কোন পথ নাই। অবশ্য কর্তব্যজ্ঞানানুসারে চেষ্টা করিতে হইবে। তােমার উল্লিখিত ছেলেটির জন্য ১৬/১৭ শত টাকা পর্যন্ত যখন উঠিয়াছে, তখন আর ৩৪ শতের জন্য ঐ ছেলে ত্যাগ করা কি সঙ্গত হইবে ? সুতরাং বিবেচনার সহিত আর একবার ভাবিয়া চিন্তিয়া দেখিও। পাড়া গাঁ বলিয়া ভয়, নতুবা ••••••এর বয়স এমন কি বেশী হইয়াছে। ছেলেটীরও যখন মত আছে, তখন কিছুদিন অপেক্ষা করিয়া দেখিলে বাপ- মায়ের দাবী কিছু কমাও অসম্ভব নহে। অবশ্য এদিকে অন্য চেষ্টাও দেখিতে থাকু। বিপদে-আপদে অধৈৰ্য্য হইও না, ভগদ্বিধান মাথা পাতিয়া লইতে অভ্যাস করিও। তােমরা আমার আশীর্বাদ , জানিবা। এখান্বকার সমস্ত কুশল। আমি ৬ই ফাঙ্কন পুরী আসিয়াছি, এখন এখানেই থাকিব।

ঠাকুরের চিঠি
ডাক্তারখানার গােলমাল এখনও মিটে নাই। শীঘ্রই কাজ
আরম্ভ হইবার সম্ভাবনা। ইতি
শুভানুধ্যায়ী
এনিগমানন্দ
( ৪৬ )
শান্তি আশ্রম
২৩শে কার্তিক ১৩১০
তােমার পত্র বহুদিন পরে পাইলাম, সঙ্গে সঙ্গে মাে
ও স-র একখানি পত্ৰ আসিয়াছে, কাকে উত্তর দিব ভাবিয়া
তােমাকেই লিখিতে স্থির করিলাম। স–র বিবাহ সম্বন্ধে
যাহা লিখিয়াছ, আমি তাহার উল্টা বুঝি, অর্থাৎ কেহ
কাহারও ভাগ্যের জন্য দায়ী নহে, সকলেই আপন আপন
কৰ্ম্মফল ভােগ করে। কৰ্ম্মানুযায়ী বিধাতা স্বামী-পুত্রসহ
সংযােটন করেন মাত্র। অতএব ছেলের ভাগ্য না খুঁজিয়া
নিজের মেয়ের অদৃষ্ট অনুসন্ধান করাইলে আর পাত্রের জন্য
এতদিন বিবাহ বন্ধ থাকিত না। রামচন্দ্র বা গৌরাঙ্গদেব
অপেক্ষা রমণীর প্রার্থনীয় স্বামী কি হইতে পারে। কিন্তু
সৰ্বগুণবান্ ভগবান্ স্বামী পাইয়াও তাঁহাদের মত দুঃখিনী
( সাংসারিক ভাষায়) রমণীজীবন কয়জন রমণী ভােগ
করিয়াছেন ? তাহাদের অপেক্ষা উত্তম বর কোথা পাইবে ?

বিবাহে কর্মের প্রভাব
অতএব তােমার শ্বাশুড়িকে বুঝাইয়া উপস্থিত মত একস্থানে
মেয়ের বিবাহ দিয়া ফেলিতে বল। পাত্র কাণা খোঁড়া বা
চরিত্রহীন না হয়, হিন্দু পিতা-মাতা এইরূপ পাত্রই প্রার্থনা
করিয়া থাকে। আমি সংসার-অনভিজ্ঞ, সুতরাং সে সম্বন্ধে
কোন প্রশ্ন করিলে আমার নিকট মীমাংসা পাইবার উপায়
নাই।
মাে- বাড়ীতে থাকিলে বলিবাজীবের কর্তব্য অশা-
ন্তির কারণানুসন্ধান ও প্রতিকার, সুতরাং তাহার পুরুষকারের
পথে সাংসারিক উন্নতির চেষ্টায় আমি অসম্মত নহি। ইহাতে
হয় আত্মপ্রতিষ্ঠ হইবে, নতুবা ভগবৎপ্রভাবে বিশ্বাস জন্মিবে।
আর একবার ‘ভগবৎ প্রেরণা জীবের কৰ্ম্মহেতু এ প্রত্যক্ষ
জ্ঞান জন্মিলে আত্মচেষ্টা আর সে ভিত্তি হইতে বিক্ষিপ্ত
করিতে পারিবে না। সংসারের ব্যাপার তাহারই লীলামাত্র
জানিয়া নিশ্চিন্ত হইবে। কোন অবস্থাতেই আপন বা অন্যের
স্কন্ধে কর্তৃত্বের অভিমান চাপাইয়া উদ্বেগ-অশান্তির বহর
বাড়াইবে না। সংসার পরীক্ষা ক্ষেত্র, পরীক্ষামাত্রই শিক্ষা,
সুতরাং তাহার চেষ্টা আমি সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করি। তবে
কেহ যেন ব্যথা না পায়, আর সত্য যেন ঠিক থাকে।
তােমরা আমার আশীর্বাদ জানিও। ইতি-
শুভানুধ্যায়ী—
শ্রনিগমানন্দ,

ঠাকুরের চিঠি
( ৪৭ )
পুরী
৯/৬৩৫
কল্যাণবরেষু
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্ৰ পাইয়া বিস্তারিত সংবাদ অবগত হইলাম।
হে বাবুর মেয়ের সঙ্গে যখন বিবাহ দিবে বলিয়া সম্মতি
দিয়াছ, জ্যোতিষ মতে পণ্ডিত মহাশয় যখন মধ্যম যােক
বলিয়াছেন, বিশেষতঃ শ্রীমান্ দে-ও যখন সম্মত, তখন এই
বিবাহ দেওয়া যাইতে পারে। * প্রারব্ধ-কৰ্ম্মানুসারে যখন
ভােগ নির্দিষ্ট হইয়া থাকে, তখন মেয়ের অদল-বদলে তাহা
খণ্ডিত হইবে না। মাত্র অনর্থক বিলম্বে তােমার গৃহস্থালীর
অভাব ও দের বয়স বাড়িয়া যাইবে। সুতরাং ৯ই কার্তিক
বিবাহ দিয়া ফেল। ভগবৎ বিশ্বাসীর সব ভার ভগবানেই
সমর্পিত হওয়া শ্রেয়। আমার মতে বর-কনের বয়স ৭ হইতে
১০ বৎসর পার্থক্য হওয়া সমীচীন। তবে এখন ৩৪
বৎসরের বড়তে বহু বিবাহই হইতেছে। সুতরাং বাহত
অশােভন হইলেও সামাজিক আদর্শ ক্ষুন্ন হইবে না ।
আমি
এই মাসের শেষে কিছুদিনের জন্য মধ্যভারতে বেড়াইতে
যাইব। তথা হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া কয়েক দিন বিশ্রামের
পরই বাঙ্গালায় বাহির হইব। সেই সময় সাক্ষাতে অন্যান্য
বিষয় শুনিব ও বলিব। শারীরিক ভালই আছি। অন্যান্য
(৭০

দীর্ঘায়ুর সার্থকতা
কুশল।
তােমরা আমার আশীৰ্বাদ জানি, আশ্রমের
সেবকগণ ও গৃহস্থ ভক্তগণকে আমার আশীর্বাদ জানাই।
শ্ৰীমান্ ন–র পত্রও যথাসময়ে পাইয়াছি। সাক্ষাতেই আমার
বক্তব্য বলিব বলিয়া আর পত্রাদি লিখি নাই। পত্র
লিখা একরূপ ছাড়িয়া দিয়াছি। ইতি
শুভানুধ্যায়ী-
এনিগমানন্দ
৪৮ )
=
,
পুরী
১৫১২২৪
কল্যাণবরেষু, ,
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম।
তােমাদের অসুস্থতা সংবাদ দুঃখের কারণ হইলেও, কৰ্ম্ম ছাড়া
যখন পথ নাই তখন আর কি করিবে ? এখানের কর্মের বােঝ।
এখানে নামাইয়া রাখিয়া না যাইতে পারিলে পরলােকেও
শান্তি নাই। এখানে আমরা নিরবচ্ছিন্ন সুখ ভােগ করিতে
আসি না, সুতরাং রােগ-শােক বিপদ-আপদ দুঃখ-কষ্ট দেখিয়া
ভয় পাইলে চলিবে কেন? সবই মায়ের মঙ্গলহস্তের দান
বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে। শেষ বয়সে দেহটার সঙ্গে মনও
দুৰ্বল হইয়া পড়ে সত্য, কিন্তু দুৈৰ্যের সহিত সব সই করিতে

ঠাকুরের চিঠি
পারিলে মনটা আরও ভাঙ্গিয়া পড়িবে। বয়সের সঙ্গে
সঙ্গে সংসারের অসারতা বুঝিয়া বুদ্ধিমান্ আসক্তিশূন্য হয়েন,
তাই দীর্ঘজীবন পুণ্যের ফল বলিয়া শাস্ত্রে উক্ত আছে ; নতুবা
ভােগের জন্য জীবনের সার্থকতা নহে। আশীৰ্বাদ করি
মা তােমাদের প্রাণে শক্তি ও হৃদয়ে ভক্তি দান করুন।
তােমরা হাসিমুখে বার্ধক্যের জ্বালা-যন্ত্রণা অতিক্রম করিয়া
মায়ের দিকে অগ্রসর হও। আমারও বাম অঙ্গে বাতের
আক্রমণ হইয়াছে। এখানে খুব জ্বর হইতেছে, বাসাতে কেহ
কেহ জ্বরে ভুগিতেছে। অন্যান্য কুশল। আমার আশীর্বাদ
জানিব। ইতি-
শুভানুধ্যায়ী
নিগমানন্দ
( ৪৯ )
সারস্বত মঠ
৫ই আষাঢ়, ১৩২২
স্নেহাস্পদেযু
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
বহুদিন পরে তােমার পত্র পাইয়া অবগত হইলাম।
তুমি শ্ৰীমতী যোর কথা না জানাইলেও তাহার করুণ
প্রার্থনা নিয়ত আমার কর্ণে পোঁছিতেছে। কিন্তু কি করিব ?
মঙ্গলময়ী মায়ের মঙ্গল ব্যবস্থায় প্রকৃতি যখন তাহাকে তােমা-
৭২

মঙ্গলময়ী
দের ইচ্ছার প্রতিকূল পথে লইয়া যাইতেছেন, তখন জানিয়া
কে সেই মঙ্গলময়ী ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করিবে ? জগজ্জননী
যখন তাহাকে কোলে করিবার জন্য হস্ত প্রসারণ করিয়াছেন,
তখন তাহার জন্য আমি ব্যস্ত হইব কেন? তবে সে বড়ই
দুঃখ-যন্ত্রণা পাইতেছে—পাইয়াছে সত্য, কিন্তু মা যাহাকে
কোলে লন, এইরূপেই তাহার ধূলা-কাদা ঝাড়িয়া লন।
অবশ্য সংসারভাবে বিচার করিলে তােমার দুঃখ-কষ্ট যথেষ্ট
স্বীকার করিব। যাহাকে সঙ্গিনী করিয়া স্বরূপের পথে
অগ্রসর হইতেছিলে, সহসা কিছুদূর অগ্রসর হইতে না হইতেই
সঙ্গিনীটী অগ্ৰেই স্বস্থান প্রাপ্ত হইতেছে। কিন্তু বাবা!
বিশেষরূপে বুঝিলে জানিলে দেখিবে, তাহার আদৌ অভাব
অনুভবে আসি। বরং পুর্বে যে অনভিজ্ঞ সঙ্গিনীমাত্র
ছিল, এখন সে অভিজ্ঞ লিভারের (Leader) কাৰ্য্য করিবে।
মােহ-মায়ান্ধ জীব আমরা, তাঁহার মঙ্গলময়ী ব্যবস্থা না
দেখিয়া না বুঝিয়া স্বার্থহানির জন্য ব্যাকুল হই, তাহার রহস্য
বুঝিতে চেষ্টা করি না, তাই চির-অন্ধকারে থাকিয়া যাই।
স্বার্থহানিতে ভগবাকে গৰ্য্যন্ত অবিচারক নিষ্ঠুর মনে করি।
জগতে বিপু-শােক-দুঃখ-তাপ নাই, অজ্ঞানই এই সকলের
একমাত্র জনক। বৎস! আমি যে একজন ভুক্তভােগী—
আমার কথা বন্ধুভাবেও বিশ্বাস কর যে, ভগবানের রাজ্যের
কোন ব্যবস্থাই অমঙ্গলের জন্য অনুষ্ঠিত হয় না।
বাবা !
ভগবান্ তােমার জন্য যে ব্যবস্থা করিয়াছেন—তােমাকে, যে
৭3

ঠাকুরের চিঠি
দান দিবার জন্য হস্ত প্রসারণ করিয়াছেন, তুমি হাসিমুখে
তাহা গ্রহণ কর--আর সর্বাবস্থায় তাহার নামের জয় উচ্চারণ
কর। কে কার ?
কে কার ? -কয়দিনের জন্য সংসার? ইহা ভুলিয়া
স্বার্থপর যুবকের ন্যায় ভগবানের ব্যবস্থায় অসন্তোষ প্রকাশ
করিও না, বরং ধীর স্থির ভাবে ষোকে আশ্বস্ত করিও।
সে দুঃখে-কষ্টে রোগ-যন্ত্রণায় যেন ভগবানের নাম না ভুলে
ভুলিলে তুমি স্মরণ করাইয়া দিয়া প্রকৃত স্বামীর কাৰ্য্য করিও।
তাহার শান্তি না হওয়া পর্যন্ত তুমি কাছে থাকিতে চেষ্টা
করিও। যখন যেরূপ হয় আমাকে জানাইও।
অন্যান্য কুশল। আশীৰ্বাদ:করি সব্বা-
বস্থায় লক্ষ্যে চিত্ত সংলগ্ন থাকুক। ইতি
শুভানুধ্যায়ী –
এনিগমানন্দ
( ৫০০ )
শান্তি আশ্রম
৪!১২১৯
কল্যাণবরেষু --
তােমার পত্ৰখানা যথাসময়ে পাইয়াছি। আমি ১২ই
ফাল্গুন অত্র আশ্রমে আসিয়া পৌছিয়াছি। নানীস্থানে ভ্রমণ
করতঃ শরীরটা বড়ই অবসাদগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে, কাজেরও
বড় বেশী ভিড়।
৭৪

বিদ্যালয়ের পরীক্ষা দেখ, মনুষ্যজীবনটা কেবল পাশ-ফেল লইয়া গঠিত। কেবল পরীক্ষা আর পাশ-ফেল। তাহার নিকট ইউনিভার- সিটির পাশ-ফেল কিছুই নহে। সংসার-পরীক্ষায় জীব প্রতিনিয়ত ফেল হইতেছে, তাই পুনঃপুনঃ সংসারে পরীক্ষা দিতে আসিতেছে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবে এই লক্ষ্য ঠিক রাখিয়া অন্য পরীক্ষা তাহাতে নির্ভর কর, তিনিই উত্তীর্ণ হইবার উপায় বলিয়া দিবেন। আমি জানি শ্ৰীশ্ৰভগবানের কৃপা তােমার উপর আছে, তুমি সৰ্ব্বাবস্থায় তাঁহারই শরণা- পন্ন থাকিবে এবং কৰ্তব্য কৰ্ম্ম যথাসাধ্য সম্পাদন করিয়া যাইবে, তাহা হইলেই হইল। তাহার কাজ তিনি করিবেন। ভগবান্ অহেতুক দয়াময় একথা ভুলিও না, দীনের প্রতি তার দয়া আবার ততােধিক। মহা-আনন্দে কলেজের পরীক্ষা দিবা, সংসার বা দুশ্চিন্তা আদৌ মনে স্থান দিবা না। কেবল ফলাফল তার উপর নির্ভর করিয়া তােমার কাৰ্য্য করিয়া যাও। কোন প্রকার উদ্বেগ মনে স্থান দিও না। আমি আশীৰ্বাদ করি তুমি শান্তিলাভ কর। ইতি আশর্বাদক— শ্রীনিগমানন্দ ৭৫

।
-
==
ঠাকুরের চিঠি
(৫১)
পুরী
২৭১১২৮ ইং
স্নেহাস্পদেষু-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
ভােমার পত্র পাইয়া প্রীত হইলাম। পরীক্ষার জন্য
যথাসাধ্য চেষ্টা-যত্ন করিতেছ--বর্তমানে তােমার কর্তব্যও
তাহাই। কাৰ্য্যের পূৰ্বে ফলাফলের জন্য উদ্বিগ্ন হইয়া অবসন্ন
হইও না।
ফলাফল শ্রীভগবানে নির্ভর করিয়া অকপটে
চেষ্টা-যত্ন করাই আমাদের কর্তব্য। আমরা কর্মেরই অধি-
কারী, ফলের নহে। ফলদাতা একমাত্র শ্রীভগবান্। আশা
করি শ্রীভগবানের কৃপায় সুফল লাভে কৃতকাৰ্য্য হইবে।
আমি মধ্যভারত হইতে কিছুদিন পূর্বে কলিকাতা হইয়া পুরী
আসিয়াছি। আবার এই মাসের শেষে কিছুদিনের জন্য
আসাম যাইব। শারীরিক ভালই আছি। আমার আশীর্বাদ
জানিবা। ইতি
শুভানুধ্যায়ী
ঐনিগমানন্দ
৭৬

অবিদ্যার খেলা (৫২ ) পুরী ২৫।১২৩৪ কল্যাণবরেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য বহুদিন পরে তােমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম। তােমার যে একটা না একটা উপসর্গ লাগিয়াই আছে। গ্রামে আরও লােক আছে, জমিদারও আছে, তবে তােমার ঘাড়েই ঐসব অপদেবতার ভার হয় কেন? তােমার দুৰ্ব্বলতাই এই সকল অশান্তির কারণ। আমি তােমাকে গৃহস্থ-যােগীর ন্যায় গঠিত করিতে চাহিয়া- ছিলাম, কিন্তু তুমি আপনাকে আপনি লইয়া সুখী হইতে পারিলে না, আদর্শভাবে জীবন যাপন করিতে অভ্যস্ত হইলে না, কেবল মায়ার হাতে লাঞ্ছিত হইতেছ। ঐসব অবিদ্যারই অনুচর, তাই তােমাকে পাইয়া বসিয়াছে। সাব- ধানে চল, সত্যনিষ্ঠ হও, পাপ-সংসর্গ ত্যাগ কর ; নতুবা আমিও আর তােমাকে রক্ষা করিতে পারিব না। প্রার্থনা করি, তোমার প্রাণে শক্তি ও হৃদয়ে ভক্তি প্রকাশিত হউক। অপরের ভাল-মন্দে থাকিও না, আপন আপন কর্ম সকলে ভােগ করিবে, অতএব পরের দোষাদি আলােচনা করিয়া নিজের চিত্ত কলুষিত করিও না, আমার শরীর 'লল নাই। ৭৭

ঠাকুরের ।
বাতের আক্রমণে ভুগিতেছি। অন্যান্য কুশল। সকলে
আনার আশীর্বাদ জানি। ইতি
শুভানুধ্যায়ী—
শ্ৰীনিগমানন্দ
( ৫৩ )
পুরী—উড়ি।
২৩১১৩৯
;
কল্যাণবরেষু-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্ৰ পাইয়া মর্মাহত হইলাম। আমার ও
দেশের দারুণ দুর্ভাগ্য, তাই যে ডাল ধরিতেছি, সেই ডাল
ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে ! তােমার চিঠিখানি বেশ তত্ত্বপূর্ণ ; অথচ
ভােমার মত যুবককেও যে অবিদ্যা খেলার পুতুল করিতে
করে, তাহা ধারণার অতীত। অবশ্য তােমাদের মত বয়সে
প্রবৃত্তি এবং '
ভাবপ্রবণতা খুবই প্রবল সন্দেহ নাই। আমি
জানি, তােমরা দেবসন্তান, কোন অভাব ছিল না, স্বেচ্ছায়
প্রবৃত্তি মার্গ সংসার ছাড়িয়া আসিয়াছ, আজীবন প্রবৃত্তির
সঙ্গে লড়াই করিয়া জয়ী হইবে, কিন্তু প্রবৃত্তির স্রোতে
আপনাকে ভাসাইয়া দিবে, ইহা জানিতাম না। তথাপি
আমি তােমাকে আশ্বাস ও সাহস দিতেছি। তুমিও মানুষ,
মানুষের“পতন অবশ্যম্ভাবী'; 'মুনি-ঋষিদেরও পদস্খলন হয়,
৭৮

পতনে আশ্বাস বলকে পড়িতে পড়িতেই হাঁটিতে শিখে, তাই এবারের অপ- রাধ আমি সরল ভাবে ক্ষমা করিয়া আশীৰ্ব্বাদ করিতেছি। এবারের পতনে যেন তােমার দৃঢ়তা বৃদ্ধি হয়। ভবিষ্যতের জন্য বেশী রকম সাবধান হও। যে আত্মগ্লানি ও অনুতাপ পূর্ণ পত্র দিয়াছ, তাহা অহর্নিশ প্রাণে জাগ্রত রাখ, তােমার মঙ্গল হইবে। .য উদ্দেশ্যে পিতা-মাতা প্রভৃতিকে কাঁদাইয়া ঘর ছাড়িয়া আসিয়াছ, তাহা সার্থক কলিতে আবার কৃতসঙ্কল্প হও। যদি আশ্রমে থাকিয়া সঙ্কল্প সিদ্ধ হইনার বিপ্ন মনে কর, তবে যথা ইচ্ছা চলিয়া যাও। কিন্তু আত্মহত্যার চিন্তা মনে স্থান দিও না। তাত্মহত্যায় কোন উন্নতি হইবে না, বরং আরও নরকের দিকে টানিয়া লইবে। সুতরাং জীবিত থাকিয়া দারুণ দুঃখ-কষ্টে কৃতপাপের প্রায়শ্চিত্ত সম্ভবপর হইতে পারে, কিন্তু আত্মহত্যায় সে আশা সুদূরপরাহত। আমার ইচ্ছা, তুমি আশ্রমে থাকিয়াই প্রবৃত্তি জয় কর এবং আত্মগঠন করিয়া আমার কাৰ্যে আত্মনিয়োগ কর। ইহাতে বাহিরের নিন্দা-গ্লানিও একদিন ধুইয়া যাইবে। কিছুদিন ধৈর্য্যের সহিত এইসব সূত কর। এক বৎসর পরে তােমাকেও পাঠাইবার ব্যবস্থা করিতে পারি। আর নিতান্ত যদি আশ্রমে না থাকিতে পার, আমার চিঠিতে বল না পাও, তবে কোন কারণ জানাইয়া আশ্রম ত্যাগ করিয়া নিভৃতে তপস্য। করগে। চিত্তশুদ্ধি হইলে আবার আমার আশ্রনকার্যে যােগদান করিও।

ঠাকুরের চিঠি
।
আমি মঠ ও আশ্রম পরিচালনের ভার ট্রাষ্টের হাতে
অৰ্পণ করিয়াছি। বিধি ব্যবস্থার ভার মঠের অধ্যক্ষ এবং
আশ্রমের কর্তারা গ্রহণ করিয়াছে। সুতরাং অধ্যাত্মগুরুর
কাৰ্য্য ছাড়া আমি আর কোন কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিব না,
করিলে আমার কথার মূল্য থাকিবে না। সুতরাং প্রকাশ্যে
তােমার সম্বন্ধে কোন ব্যবস্থা করিতে পারিব না। কাজেই
আশ্ৰমান্তরিত করিবার আদেশ আমি দিতে পারিনা।
তুমি ••••••কে লিখিয়া এবং ••••••এর সম্মতি লইয়া যদি
কোন ব্যবস্থা করাইতে পার, তাহাতে আমার কোন আপত্য
হইবে না।
সে ভার তােমাকে লইতে হইবে। তােমার
চিঠির কথা আমি ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি কেহ জানিতে পারিবে
। তবে আমার মতে .....এ থাকিয়াই তােমার ধৈর্য্যের
সহিত আত্মগঠন করা কর্তব্য। । আমি এখনও বিশ্বাস করি,
তুমি নিশ্চয় অবিদ্যাকে একদিন জয় করিতে পারিবে। যা
এ সম্বন্ধে আর অধিক লিখিব না। শরীরটাও ভাল নাই।
তােমাকে ভার দিলাম। বেশ ধীর ও স্থির ভাবে চিন্তা
করিয়া যাহা কর্তব্য বধ হয় তাহাই করিও। তুমি আশ্রমে
থাক বা অন্যত্র যাও, আমি গুরুরূপে তােমার মঙ্গল চিন্তা
করিব। কিন্তু সাবধান ! হঠকারিতা বশতঃ কোন কাৰ্য্য
করিও না, ভেবে চিন্তে কর্তব্য স্থির করিও। বাহিরেও অনেক
বিপদবহু প্রলােভম। আশ্রম তদপেক্ষা অনেকটা নিরাপদ।
আশীর্বাদ করি তােমার চিঙে দৃঢ়তা, প্রাণে শক্তি ও হৃদয়ে
৮

বিজয়ার আশীর্বাদ ভক্তি সঞ্জাত হউক, তুমি প্রবৃত্তির সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হও। আমাকে আর বিশেষ কিছু লিখিবার প্রয়ােজন নাই। যাহা ভাল বুঝ করিও। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত আমাকে জানাইও। ই~ি~~ শুভানুধ্যায়ী— শ্ৰীনিগমানন্দ (৫৪) পুরী-উড়িষ্যা তাং ৪৭৮ কল্যাণবরেষু- পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমরা আমার শুভ বিজয়ার আশীর্বাদ গ্রহণ কর। মায়ের কৃপায় তােমাদের চিত্তশুদ্ধি ও শুভবুদ্ধি উদ্বুদ্ধ হউক। নূতন বৎসরে নূতন উদ্যম-উৎসাহে গন্তব্য পথে অগ্রসর হও। পথের বিবাধা অপসারিত হউক। আমার গৃহস্থ সন্তান- গণকে আমার বিজয়ার, আশীৰ্বাদ জানাব। আজ আর কিছু লিখিব না। আমি ভাল আছি। ইতি শুভানুধ্যায়ী— শ্ৰীনিগমানন্দ

ঠাকুরের চিঠি
(৫৫)
পুরী
২৯/১১৩১
কল্যাণবরেষু-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার প্রেরিত টাকা পাইয়াছি। আমার শরীর
সুস্থ নহে। সামান্য পরিশ্রম ও বাক্যালাপে শ্বাস বন্ধ হইয়া
আইসে।
বুকে বেদনাও হয়। একখানা চিঠি লিখাও
আমার পক্ষে কষ্টসাধ্য। হৃৎপিণ্ডের দুর্বলতাই প্রধান কারণ।
বােধ হয় উৎসবের সময় মঠেও যাইতে পারিব না। যাইবার
ইচ্ছা আছে। যদি যাওয়া হয়, যথাসময়ে জানাই।
শ্ৰীমতী বর প্রেরিত ঘৃত পাইয়াছি, তাহাকে
জানাইও। অদ্য র ও জ্ঞা'র পত্র পাইলাম।
লিখিয়াছে ঈ—পত্রোত্তর না পাইয়া ত্যক্ত হইয়াছে। ঈ
কিন্তু যে বিষয় জানিতে ছাহিয়াছিল, গ-~-র পত্রোত্তরে
তাহাই লিখিত হইয়াছে। আমার অবস্থা কেহনা বুঝিয়া
ত্যক্ত হইলে আমি আর কি করিব ? আর র ও জ্ঞার
পত্র পাগলামীতে পূর্ণ । # , * আমার নামে কলঙ্ক হইবে
ভাবিয়াই তাহারা অস্থির! রােগ, পীড়া, দরিদ্রতার কথা
লিখিলে কোন ফল হইবে না, বরং আমি বিরক্ত হইব।
আমি কোন নিন্দার কাজ করি নাই, তবু ভক্ত হইতে যদি
কলঙ্কই হয়, সে আমার অষ্ট। ভক্তের দৌরাত্ম্যে মনে হয়
৮২

বৃত্তির বৈপরিত্য এখনি দেহত্যাগ করিতে পারিলে যেন বাঁচি। তাহাদের বলিও, আমি যে সাধন-ভজন দিয়াছি তাহা ছাড়া বাজে কথা লিখিলে আমার দ্বারা কোন উপকার হইবে না। শরীরের জন্য সামান্য কথাতেই বিরক্তি আইসে। আজ বিরক্ত হইয়াই এই পত্ৰখানা লিখিলাম। তােমরা দুঃখিত হইও না। আমারও দুঃখ-কষ্ট একটু বুঝিও। সকলে আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবা। , প্রার্থনা করি তােমাদের শুভবুদ্ধি ও সদিচ্ছা সঞ্জাত হউক। ইতি শুভানুধ্যায়ী শ্ৰীনিগমানন্দ (৫৩) নীলাচল কুটীর ২৫]১২৩৫ কল্যাণবরেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য বহুদিন পরে তােমার পত্ৰ পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইয়া প্রীত হইলাম। কামই প্রধান রিপু, অন্যান্যগুলি তদানুসঙ্গিক মাত্র। শ্রীগীতাতে আছে-“কাম বাধাপ্রাপ্ত হইলে ক্রোধরূপে প্রকাশ পায়” , ইত্যাদি যথা—“কামাৎ ক্রোধােহভিজায়তে।”, সুতরাং কাম’ অন্তর্মুখী বা ভগবৎ- মুখী হইলে যেমন প্রেম হয়, তেমনি ক্রোধ বা রাগ তখন

**
ঠাকুরের চিঠি
অনুরাগে পরিণত হয়, ‘লােভ’ আত্মসেবা ছাড়িয়া ইষ্টসেবায়
নিয়ােজিত হয়। অমনি ইষ্টের নাম ও রূপে জীব মুগ্ধ হইয়া
পড়ে, আর সংসার-মােহে মুগ্ধ করিতে পারে না। আপনাকে
ইষ্টের নিজ জন মনে করাই তখন মদের কাৰ্য হয়।
তখন কঁাচা আমি ছাড়িয়া ইষ্টের দাস সন্তান সখা আদিতে
মাৎসৰ্য্য’ স্থিতিলাভ করে। কামাদি রিপুর কোন কালেই
বিনাশ হয় না, এইরূপে আত্মমুখী হইরা শান্ত হইয়া যায়
মাত্র। তাই ভক্ত বলে—“কামাদি বলি না দিয়া ভগবানে
নিবেদন করিয়া দাও। আব একটী মত এই যে, আমিও
যােগীগুরুতে লিখিয়াছি, রিপু দমনের উপায় বিপরীত বৃত্তির
অনুশীলন। যেমন কামের বিপরীত বৃত্তি প্রেম, ক্রোধের
বিপরীত বৃত্তি দয়া, লােভের বিপরীত বৃত্তি দান ইত্যাদি।
সুতরাং ভক্তি, দয়া, দান প্রভৃতির যতই অনুশীলন করিবে,
ততই কামাদি রিপু নিবৃত্তিপথে ভগবমুখী হইয়া পড়িবে।
এখানকার কুশল। আমি ২৯শে চৈত্র দার্জিলিং যাইতেছি।
তােমরা আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবা। ইতি,
শুভানুধ্যায়ী
নিগমানন্দ
৮৪

বলিদানে কর্তব্য
( ৫৭ )
নীলাচল কুটীর (পুরী)
৬ই চৈত্র, ১৩৩৭ সাল
কল্যাণবরেষু
পম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য--
তােমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম।
বাহ্যিক পূজা অর্চনার—বিশেষতঃ কাম্য পূজার বিধি-পদ্ধতি
আমি অবগত নহি। নিজে কখন ঐসব করি নাই--পদ্ধতি
গ্রন্থাদিও অনুশীলন করি নাই। তুমি বলি দিয়া পূজা করিতে
বিরূপ বলিয়াই মানসিক পূজান্তে অন্ততঃ বলি উৎসর্গ করিয়া
ছাড়িয়া দিতে আমি ব্যবস্থা দিয়াছিলাম। কারণ পাঠা
উৎসর্গ করিয়া ছাড়িয়া দিতে আমি অনেক দেখিয়াছি।
যখন কথা হচ্ছে মহিষ উৎসর্গ করিয়া ছাড়িয়া দিবার
বিধি শাস্ত্রে নাই, এমন কি তাহাতে মন্ত্ৰ পৰ্যন্ত পরিবর্তন
করিতে হইবে, বিশেষতঃ শ্ৰীমতী বর যখন বলি না দিলে
মনঃপূত হইবে না, তখন আর দ্বিধা না করিয়া বলি দিবারই
অনুমতি দিলাম। তুমি গৃহস্থ, সমাজে রহিয়াছ, সুতরাং
সমাজের রীতি-নীতি, লঙ্ঘন করিয়া সমাজের ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত
বা কুলগুরুর অবাধ্য হওয়া কর্তব্য নহে। অনর্থক একটা
আন্দোলন সৃষ্টি করাও বিধেয় নহে। বিশেষতঃ মানসিক
বা কাম্য পূজা সম্বন্ধে সাবধান হইয়া বিধিনিষেধ পালন করাই
শ্রেয়। সুতরাং এবার বলি দিয়াই জগন্মাতার পূজা করিবে।

ঠাকুরের চিঠি বলির সময় তােমাকে যে সে স্থানে উপস্থিত থাকিতে হইবে, এমন কোন বিধি আছে বলিয়াও আমি জানি না। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হইবে—বাড়ীর সকলকে সাবধান করিয়া দিবে, আর যেন কেহ কখনও এমন মানসিক করে। স্বার্থপর অজ্ঞানান্ধ সংসারী বিপদে পড়িয়া পূজা মানসিক করে; কিন্তু পরিণামে ইহাতে শ্রেয় না হইয়া কৰ্ম্ম- ফলের বহরই বাড়িয়া যায়। তােমরা গোসায়ের শিষ্য হইয়া —বিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষা লইয়াও এরূপ শাক্তাচারের প্রবৃত্তি হইল কিরূপে? বড় লােকের অভিমান আছে বলিয়াই বড় মেয়ের জোড়া মহিষের কথাটাই মনে পড়িয়া গিয়াছিল। নতুবা মা আমার পাঁচ পয়সার চিনি বা বাতাসাতেই তুষ্ট হইতেন। এরূপ মােটা ঘুস দিবা দরকার হইত না। যাক এবার কিন্তু তােমাকে বলি’ দিয়াই পূজা করিতে হইবে। এই গরমে, এইরূপ দেহ লইয়া, অতদূরে শতাধিক টাকা খরচ করিয়া আমার যাওয়া অসম্ভব-অক্ষমও বটি। বিশেষতঃ ঐরূপ ব্যাপারে আমার উপস্থিতিও কর্তব্য নহে। তােমার আপন অন্তরে আমার আবির্ভাব উপস্থিতি উপলব্ধি করিয়াই পূজায় ব্রতী হইবে। আশীৰ্বাদ করি, নির্বিঘ্নে মহামায়ার পূজা সম্পন্ন হউক। ইতি শুভানুধ্যায়ী— ঐনিগমানন্দ , ৬ স্বামীই ইষ্টদেবতা ( ৫৮ ) শান্তি আশ্রম ৯১২০ স্নেহাস্পদামু- তােমার পত্র পাইয়া অবগত হইলাম। যদি তােমার চিত্ত পরিষ্কার হইয়া থাকে, মানবমণ্ডলীকে দেবতার ন্যায় চক্ষে দেখিতে শিখিয়া থাক, মানবীয় বিকার দূর হইয়া থাকে, তবে অক্লেশে স্বামীকে ইষ্টদেবীর স্বরূপ মনে করিয়া সেবা:- পূজা করিতে পার, কোন বাধা নাই। স্বামীই তাে নারীর ইষ্টদেবতা! পাশবিক ভাব অন্তর্হিত হইলে ইহাই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সাধনাভাবের সাধনা। • কিন্তু ভাবের ঘরে চুরি না হয়। তােমার স্বামী যদি ফুল বেলপাতা পায়ে দিতে দেন, তবে স্বামীকে ইষ্টদেবীর স্বরূপ মনে করিয়া বাহ্ পূজাও করিতে পার। তাহাতে তােমার কোন দোষ হইবে না। মন ঠিক থাকিলেই হইল। ইতি- আশীৰ্বাদক- নিগমানন্দ ৭

ঠাকুরের চিঠি
-
(৫৯)
পুরী
২০২৩২
কল্যাণবরেষু--
পরম শুভাশিৰাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র যথাসময়ে পাইয়া সকল সমাচার অবগত
হইলাম। বর্তমানে গার্হস্থ্য ও সন্ন্যাস এই দুইটী আশ্রম।
ব্রহ্মচর্য আশ্রমের অভাবে গৃহস্থ অত্যন্ত স্বার্থপর ও সঙ্কীর্ণচেতা
হইয়া উঠিয়াছে। তাহারা অত্যন্ত বহির্মুখী হইয়া শান্তি-
সুখ হারাইতেছে। বর্তমানে প্রকৃত জ্ঞানী কিম্বা অবিদ্যা-
মােহিত অজ্ঞান ব্যতীত সংসারে থাকিতে কাহারও সাধ্য
নাই। যাহার ‘সাম বিবেক জন্মিয়াছে, সে-ই সংসারে
অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। সুতরাং তুমি যে, সংসারে লাঞ্ছিত
ও বিড়ম্বিত হইবে, তাহাতে আশ্চৰ্য্য হই নাই। সংসারে
থাকিয়া কৰ্ত্তব্য প্রতিপালন পূর্বক মনঃস্থির করিয়া জ্ঞান লাভ
করা আমি একেবারে দুঃসাধ্য বলিয়াই মনে করি।
জ্ঞান লাভ করিতে হইলে সন্ন্যাসশ্রম অবলম্বন পূৰ্ব্বক কঠোর
সন্ন্যাসযােগ বা জ্ঞানীগুরুর সেবা ব্যতীত অন্য উপায় নাই
বলিয়া আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু কাহাকেও সন্ন্যাসাশ্রম
গ্রহণ করিতে প্ররােচনা করাও আমি সঙ্গত মনে করি না।
বীজ পক্ক হইলেই বৃক্ষ হই স্থলিত হইবে। কৰ্ম্মবীজ
পাকিলেই সংসার-বন্ধন খসিয়া যাইবে। কেহ বাধা দিতে

গার্হস্থ্য ও সন্ন্যাস সমর্থ হইবে না। জোর করিয়া সংসার ছাড়িয়া অনেকেই আবার বমি ভােজনকারীর ন্যায় পুনঃ সংসারে প্রবিষ্ট হইয়া হাস্যাস্পদ হইতেছে। কাজেই মনের জোর প্রাণের বল- শ্রীভগবানের প্রেরণা না বুঝিয়া সংসার ছাড়া অপেক্ষা সংসারে দুঃখ-কষ্ট ভােগ করিয়াও সংসার-রসে কৰ্ম্মবীজ পুষ্ট করাই কর্তব্য। তােমাকে আমি সংসারে থাকিতেও আদেশ করিতেছি না, সংসার ছাড়িতেও বলিতেছি না। তুমি শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান্। ভাল-মন্দ বিবেচনা করিয়া যে পথই অবলম্বন রিবে, আমি তােমাকে সেই পথেই সাহায্য করিব। আমার মত ও বিশ্বাস মাত্ৰ তােমাকে লিখিয়া’জানাইলাম। যদি ইহাতেও স্পষ্ট না বুঝিতে পার, কিছুদিন অপেক্ষা করিও। আমি আষাঢ়ের শেষে কিম্বা শ্রাবরে প্রথমে কলিকাতা হইয়া আসাম যাইব। সেই সময় সাক্ষাতে আলােচনা করিয়া মীমাংসা করিয়া দিব আমার আশীর্বাদ জানিবা। ইতি অত্র মঙ্গল। শুভানুধ্যায়ী- 'নিগমানন্দ

ঠাকুরের চিঠি
( ৬০ )
অাশ্রম
২৩১২৮
স্নেহাস্পদেষু
পরম শুভাশীরাস্তান্বিশেষঃ--
তােমার পত্র যথাসময়ে পাইয়াছি । মাঝে মাঝে
তােমার সংসার ছাড়িবার সঙ্কল্প উদয় হয়। ইচ্ছা করিলেই
সংসার ছাড়া যায় না, আর সংসার ছাড়িলেই মুক্তি হয় না।
সংসার-বীজ নষ্ট না হইলে গভীর অরণ্যেও তাহা অঙ্কুরিত
হয়। অবশ্য সংসার ভীষণ স্থান বটে; কিন্তু সংসারেই ত
জীবের পরীক্ষা! সুতরাং সুংসারে উত্তীর্ণ হইতে না পারিলে
মুক্তিপথে উন্নীত হওয়া যায় না। বিশেষতঃ প্রেম-ভক্তি
ভগবানের কৃপা ব্যতীত লাভ হয় না। গুরুসেবা অবশ্য
বড় কথা বটে, কিন্তু যে পিতা-মাতা স্ত্রী-পুত্রের সেবা করিতে
অক্ষম, তাহার দ্বারা গুরুসেবাও হইতে পারে না।
অতএব
আমার আদেশ, তােমাকে সংসারে থাকিয়া গুরুসেবার
উপযুক্ততা লাভ করিতে হইবে, সংসার-জ্বালা হাসিমুখে সহ্য
করিয়া ভগবানের কৃপা লাভ করিতে হইবে। নতুবা অনু-
পযুক্ত অবস্থায় আমার নিকট আসিলে আমার উপরও ভক্তি-
বিশ্বাসের গ্লানি জন্মান অসম্ভব নহে। আশীর্বাদ করি-
হাসিমুখে, সাংসারিক কর্তব্য সম্পাদন কর এবং নামের বলে

গার্হস্থ্য ও সন্ন্যাস
প্রলােভনাদি বাধা পদদলিত করিয়া অগ্রসর হও। ইতি--
শুভানুধ্যায়ী –
নিগমানন্দ
(৬১)
সারস্বত মঠ
৮ই জ্যৈষ্ঠ
স্নেহাস্পদে
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
আমি পূজার পর আশ্রম হইতে বাহির হইয়া নানা-
স্থান ঘুরিয়া হরিদ্বার কুম্ভ দর্শনান্তে ২৫শে বৈশাখ আশ্রমে
প্রত্যাগত হইয়াছি। আসিয়া তােমার সন্ত্র পাঠান্তে অবগত
হইলাম। তােম বিবাহ তােমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে,
ইচ্ছা থাকিলে বিবাহ করাই কৰ্ত্তব্য। যথাশাস্ত্রমতে বিবাহ
করিয়া গার্হস্থ্য ধর্ম পালন করিয়াও আধ্যাত্মিক উন্নতি করা
যাইতে পারে। আর এভগবান্ যাহাকে শ্রীচরণে টানিবেন,
সংসার কখনও তাহাকে বাঁধিয়া রাখিতে পারে না। বঙ্গের
শ্রীগৌরাঙ্গ তার বিশেষ প্রমাণ। তবে গৃহস্থাশ্রমেও বিধি-
নিষেধ আছে, বর্ণাশ্রম ধৰ্ম আছে। তাহার ব্যভিচার করিলে
গৃহস্থধৰ্ম্মও কলুষিত হয়। যাহা হউক ভগবানে নির্ভর
করিয়া চলিও তিনি সব ঠিক করিয়া দিবেন। আমি আষাঢ়
মাসে বগুড়া যাইব, সেই সময় আমার সহিত দেখা’করিও।

ঠাকুরের চিঠি
সবিশেষ বলিব ও শুনিব। অন্যান্য কুশল, আমার আশীর্বাদ
জানিও। আমি কাহারও নিকট বিশেষ পত্রাদি লিখি না।
শুভানুধ্যায়ী
ঐনিগমানন্দ
.
(৬২)
পুরী
১২৩৭
কল্যাণবরেষু-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু বিশেষঃ-
তােমার পত্র যথাসময়ে পাইয়াছি। পত্রে তােমার
জীবন-কাহিনী পাঠ করিয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম।
কিন্তু তুমি ঐ পত্রে যে সকল তত্ত্ব জামিতে চাহিয়াছ, পত্রে
তাহার উত্তর দেওয়া অসম্ভব। আমার দেহের পক্ষে অসাধ্যও
বটে। সাক্ষাতে ভিন্ন সে সকল কথা বুঝাইতে পারিব না।
তুমি যদি আমার সঙ্গে দেখা করিতে পার! কিম্বা কিছুদিন
অপেক্ষা কর, আমি যখন ময়নামতী আশ্রমে যাইব, তখন
দেখা করিও, সব বিষয় মীমাংসা হইবে।
যদি তুমি বিবাহ করিতে ইচ্ছা করিয়া থাক, তবে
আমি তাহাতে সম্মতি দিতেছি। যখন আশ্রমজীবন যাপন
করিতে পারিলে না, তখন বিবাহ করিয়া আদর্শ গৃহস্থ হইতে

অবশ্য গার্হস্থ্য ও সন্ন্যাস চেষ্টা কর। তুমি অর্ধযুগ অর্থাৎ ৬ বৎসর আশ্রমে ছিলে, ব্ৰহ্মচর্য্যের পর গৃহস্থ হওয়া নিন্দনীয় নহে, বরং শাস্ত্রাচার- অনুকূল। সন্ন্যাস নিয়া গৃহে গেলে সমাজেও নিন্দার কারণ, শাস্ত্রমতেও দোষাবহ, কিন্তু তুমি সন্ন্যাসী নহ, ব্রহ্মচারী মাত্র। তুমি আশ্রমে যতটুকু জ্ঞানলাভ করিয়াছ, তাহাতে তােমাকে কোন আসক্তিতে বাঁধিতে পারিবে না। অবশ্য তুমি কোন অবস্থাতে সুখী হইতেও পারিবে না। কিন্তু ইহাতে তােমার কৰ্ম্মবীজ নষ্ট হইবে। তখন পুনরায় সন্ন্যাসাশ্রমে আসিলে কোন ক্ষতি হইবে না, বরং পরিপুষ্টি লাভ করিবে। আমি তােমাকে গেরুয়া দিয়াছিলাম, কিন্তু ব্রাহ্মণসন্তান উপনয়নে গেরুয়াধারী ব্রহ্মচারী হইয়াও সমাবর্তন করিয়া গেরুয়া ত্যাগ করিয়া গৃহস্থ হয় তােমার সম্বন্ধে সেই ব্যবস্থা দিতেছি। যদি বিবাহ কর, তবে গেরুরা নদীর জলে ভাসাইয়া দিয়া গৃহস্থ-আশ্রমে প্রবেশ করিও। বৎস! আত্মহত্যা করিয়া কেহ শান্তি পায় না, বা পরজীবন্তে উন্নতি লাভ করিতে পারে না, বরং আত্মহত্যায় কৰ্ম্মফলের বহর বাড়িয়া যায়। সুতরাং স্বভাবমৃত্যু না হওয়া পৰ্য্যন্ত সুখ-দুঃখ রােগ-শােক সত্য করিয়া যাওয়াই মানবের কর্তব্য। এখানের বােঝা এখানেই ফেলিয়া যাইতে হইবে। প্রকৃতির বিধান লঙ্ঘন করিয়া কেহ’কোনদিন সুখী হয় নাই, তুমিও হইতে পারিবে না। আমার এ কথাটা ভুলিও না। তুমি যেখানেই থাক, আমি তোমার মঙ্গল চিন্তা করিব।

ঠাকুরের চিঠি বিশ্বাস করিও, আমি তােমাকে স্নেহ করি, তােমাকে ভুলিতে পারিব না। আশীৰ্বাদ করি তােমার শুভবুদ্ধি উদ্বুদ্ধ হউক। শুভানুধ্যায়ী— “ঠাকুর” (৬৩) সারস্বত মঠ ২৩৭২৫ বাং স্নেহাস্পদে- তােমার পত্র পাইয়া সমাচার অবগত হইলাম। পূর্বে চি-র পত্রে জানিয়াছিলাম তুমি স্ত্রী-পুত্রসহ মনুপাহাড়ে আশ্রম করিয়া থাকিবে এবং তােমার বড় ছেলেটীকে আমাকে দিবে। কিন্তু এবারকার পত্রে বিস্মিত হইলাম। আমাদের ২য় বার্ষিক ভক্ত-সম্মিলনীতে সর্বসম্মতিক্রমে নির্ধারিত হই- য়াছে, মঠে স্ত্রীলােক আর গৃহীত হইবে না—এমন কি এক পরিবারের দুইজনকে স্থান দেওয়া হইবে না। অনেকের ঠেকিয়া শিখিয়া সে জ্ঞানলাভ, হইয়াছে। সন্ন্যাসের সহিত গৃহস্থ আশ্রমের সামঞ্জস্য করিতে গিয়া •••মিশনের পুনরভিনয় হওয়া বিচিত্র ময়। বরং আশ্রমে যে দু’একজন মেয়ে আছে, ক্রমশঃ তাদের স্থানান্তরিত করা হইবে। সুতরাং তােমার প্রার্থনা কিরূপে পূর্ণকরিব ?

সন্ন্যাসীর সাধনা
এব স্ত্রী, পুত্র, ধন, জন, সৰ্বস্ব শ্রীভগবানে উৎসর্গ
করিয়া তাহার সেবকরূপে তাহারই আশ্রমে থাকিয়া তাহার
সেবা কর। সেখানেই তাঁর প্রকাশ দেখিয়া ধন্য ও কৃতার্থ
হইবে। অনর্থক ছুটাছুটি করিয়া লাভ কি ? সাক্ষাৎ হইলে সব
কথা বুঝাইয়া দিব। এ বিক্ষেপ-অবস্থা দূর হইবে, কিম্বা পরা-
মর্শ মতে যাহা হয় একটা করা যাইবে। # * আমার
আশীৰ্বাদ জানিবা এবং অন্যান্য ভক্তকেও জানাইবা। ইতি—
শুভানুধ্যায়ী—
শ্ৰীনিগমানন্দ
(৬২)
সারস্বত মঠ
৩০শে আষাঢ়
স্নেহাস্পদে
তােমার পত্র পাইয়া অবগত হইলাম। পূর্বের পত্রও
পাইয়াছি। কিন্তু সেই সময় বাে— আশ্রমে চলিয়া আসিতে
লিখায় আমি কোন উত্ত্বর দেই নাই। তুমি উভয় পত্রে যে
সব সাধনার কথা লিখিয়াছ, তাহা বিভিন্ন অধিকারীরর জন্য।
জীবনে একটী সাধনা অবলম্বনেই পূর্ণত্ব সাধিত হইতে পারে।
তুমি বৈদিক সন্ন্যাসী; তপ, জপ, কি কোন সাধনা যাহা কৰ্ম্ম
নামে খ্যাত, তাহা তােমার না করাই ভাল। তােমার একমাত্র
সাধনা—অপরােহ্মানুভূতি। • ব্রহ্মের সহিত আত্ম-অভেদ

ঠাকুরের চিঠি ধ্যানেই তাহা সম্পাদিত হইতে পারে। ধ্যানে অশক্ত হইলে মহাবাক্য জপ ইহাই সন্ন্যাসীর সাধনা। বিশেষতঃ পত্র দ্বারা ভাবের উচ্চাঙ্গের সাধন-তত্ত্ব বুঝাইতে যাওয়া বিড়ম্বনা। তােমার আশ্রমে থাকিতে ভাল না লাগিত, আমাকে বলিয়া নিজের জীবনের লক্ষ্য ও কর্তব্যগুলি জানিয়া যাওয়া উচিত ছিল। মাত্র ভেক লইয়াছিলে, আর ত কিছুই জান নাই। এখন পত্ৰদ্বারা ঐ সকল কঠিন বিষয় জানিবার প্রয়াস বাতুলতা মাত্র। উপযুক্ত গুরুতুল্য সন্ন্যাসী পাইলে তাহার নিকট সন্ন্যাসীর কর্তব্যাকৰ্তব্য জানিয়া লইও। নতুবা পুনরায় আমার নিকট আসিয়া সব জানিয়া যাইও। আমি শীতকালে কাশীতে থাকিব। ইচ্ছা হইলে সেই সময় তথা হইতে জানিয়া যাইতে খার। মন স্থিরপূর্বক এক বিষয়ে জীবন উৎসর্গ করিতে না পারিলে সন্ন্যাস প্রতিষ্ঠা হইল না। মনের ইচ্ছায় মতলব মত চলিলে ত্যাগের উচ্চাসন পাইবে । মনটবুদ্ধির সহিত স্কুল-সূক্ষ্মদেহ বিনাশ না হইলে স্বরূপ প্রকাশিত হয় না। শ্রীগুরুদেব তােমায় সুমতি দিন। জগতের সুখার্থে আত্মসুখ অর্থাৎ মায়িক আমিকে বলি দিয়া স্বরূপ- নন্দ লাভ কর। অত্র মঙ্গল। আমার আশীর্বাদ জানিবা। শুভানুধ্যায়ী ক্রনিগমানন্দ ৯৬

জীবের স্বরূপ
( ৬৫ )
নীলাচল কুটীর
১•১১৩৮
কল্য:ষুে
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম।
ব্রহ্মচর্য্য-জীবনে চিত্তশুদ্ধি প্রধান লক্ষ্য, চিত্তশুদ্ধি হইলে লক্ষ্য
স্থির করিয়া দেওয়া সহজ হয়। সত্ত্বশুদ্ধি লক্ষ্য করিয়া তুমি
"যাহাই করিতেছ তাহা চিত্তশুদ্ধির কারণ জানিয়া আমি তাহা
সমর্থন করিয়াছি। ইচ্ছা আছে যথাসময়ে তােমার ভাব
বুঝিয়া বিশেষ কোন সাধন-পন্থা বলিয়া দিব।
আমার মতে শুদ্ধসত্ত্ব বা স্বরূপ একার্থবাচক নহে।
শুদ্ধসত্বে রজস্তমে ময়লা না থাকিতে পারে, কিন্তু তাহাও
স্বরূপ বলিলৈ আমরা গুণাতীত অবস্থা বুঝি। আর
ব্যক্তিত্ব ও জীবত্বকে এক বলিয়া মনে করি। প্রকৃতির
গুণাবরণে ব্রহ্মই বহু ব্যক্তিত্ব বা জীবত্বে প্রকাশিত হইয়াছেন।
জীব ব্রহ্মের অংশ নহে—সুতরাং নিত্যও নহে। চিত্তে
চৈতন্যের আভাস মাত্র। আধার না থাকিলে যেমন প্রতি
কিও থাকে না, চিত্ত না থাকিলে জীবও লয় হয়।
যােগপথে চিত্ত নিরােধ করিলে জীব লয়প্রাপ্ত হয়, স্বতঃই
সাক্ষীস্বরূপ প্রকাশিত হন। ইহাই আত্মসাক্ষাৎকার ; নতুবা
ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার আত্মসাক্ষাঙ্কার নহে। আপনাকে
จ
-৭ক

যােগপথ
ঠাকুরের চিঠি
জানা আত্মসাক্ষাৎকার বলিতে পার, কিন্তু তৎপূর্কে আপনার
স্বরূপ অবধারণ করা চাই। আমার মতে, আমি ব্যক্তি নহি।
আর জ্ঞানপথে সন্ন্যাসযোগ অবলম্বন পূৰ্ব্বক ব্যক্তিত্ব (জীব
অর্থাৎ আভাস চৈতন্য ) পরিহার করিয়া, শ্রবণ, মনন নিদি-
ধ্যাসন কিম্বা ব্ৰহ্মবিৎ গুরুর সেবা, পূজা, ভালবাসায় ব্যক্তিত্ব
বিসৰ্জন করিলে ব্ৰহ্মনিৰ্বাণ লাভ করা যায়।
এবং জ্ঞানপথ বা ব্ৰহ্মবিৎ গুরুর সেবা ভিন্ন ব্রহ্মনিৰ্বাণের
(স্বরূপ মুক্তির ) আর তৃতীয় পথ নাই !
যাহারা নিৰ্বাণমুক্তি বা ব্যক্তিত্বলয়ের বিষয় ধারণা
করিতে পারে না, তাহারাই ভক্তিপথের সিদ্ধান্ত বা লক্ষ্য গ্রহণ
করিয়া থাকে। ভক্তের মতে ভগবানের একটা সত্ত্বশুদ্ধ রূপ
আছে; জীব তাহারই অংশ, সুতরাং নিত্য। জীব মলিন
অবস্থায় ( রজস্তমােহভিভূত) তাহা জানিতে পারে না।
কাজেই গুণের উৎকর্ষ দ্বারা তমঃ-রজ!" অতিক্রম করিলে
সত্ত্ব শুদ্ধাবস্থায় ভগবানে দৃঢ়াভক্তি সম্পন্ন হয়।
কাহারও সহিত কাহারও বিরােধ থাকে না।
ব্যক্তিত্বের ভাবানুসারে দাস্য-সখ্য-বাৎসল্য প্রভৃতি ভাবে
সালোক্য সারূপ্য প্রভৃতি মুক্তিলাভ করিয়া থাকে।..
সাযুজ্য মুক্তিও লাভ হইতে পারে। কিন্তু ভক্ত নিৰ্ব্বাণ দূরে
থাক সাযুজ্য মুক্তিরও বিরােধী।
যা—এই কথাগুলিতে তুমি বুঝিতে পারিবে কি না
জানি না। ইহাতে মূল বিষয়ের আভাস দিলাম মাত্র।
;
তখন
আপন আপন
চরমে

সংযম ও ত্যাগ সাক্ষাতে দ্বিস্তৃত আলােচনা করিয়া বুঝিয়া লইও। আমি তােমরা সকলে আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবে। ইতি শুভানুধ্যায়ী শ্ৰীনিগমানন্দ ( ৬৬ ) পুরী ১৬াতত কল্যাণবরেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু বিশেষ তােমার পত্ৰখানা পাইয়া ক্ষুন্ন ইমাম। তােমাদের এখন পূর্ণ যে কাল, এ সময় নানারূপ চিত্তবিক্ষেপ স্বাভাবিক। তদুপর অসুখাদিতে চিত্ত দুৰ্বল হইয়া পড়িলে বিক্ষেপ শক্তির ক্রিয়া বৃদ্ধি হইবে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বলিয়া কি হাল ছাড়িয়া দিতে হইবে ? জীবন ভাের চিত্ত- বৃত্তির সঙ্গে লড়াই করিতে হইবে। কৰ্ম্মফলানুসারে সঞ্চিত গুণে আত্মসমর্পণ করিলে চলিবে না। পুরুষার্থের হাপরে গুণকে দগ্ধ করিতে হইবে। এখনই হতাশ হইবে কেন ? নিজকে সম্পূর্ণরূপে শ্রীগুরুতে আত্মনিবেদন করিতে অভ্যাস কর। মনে বিরুদ্ধ বৃতির উদয় হইলে ‘জয়গুরু মহামন্ত্র জপ করিও-অকপটে তার নিকট প্রার্থনা করিও, মনে বল

ঠাকুরের চিঠি
পাইবে। সদি সংযমের সহিত ত্যাগের সংস্কার লইয়া
মরিতেও পার, তাহাও পরজন্মে মহা সৌভাগ্যের সূচনা
করিবে। একজন্মেই আমাদের সব শেষ হইবে না। আশী-
ৰ্ব্বাদ করি তােমাদের হৃদয়ে 'ভক্তি ও দেহে শক্তি সঞ্জাত
সাক্ষাতে এ সকল বিষয়ের আলােচনা করিব।
আমরা শারীরিক ভাল আছি। সকলকে আমার আশীর্বাদ
জানাইবা। ইতি—
আশীৰ্বাদক—
তােমাদের ঠাকুর
হউক।
( ৬৭ )
পুরী
২৭২৩১
--
কল্যাণবরেষু
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্র পাইয়া জ্ঞাত হইলাম। পূৰ্ব্ব পত্ৰখানাও
যথাসময় পাইয়াছি। কিন্তু ••••••সম্বন্ধে যে অপবাদের কথা
লেখা ছিল, তােমরা তাহা উড়াইয়া দিলেও এবং আমি তাহা
বিশ্বাস না করিলেও আমার চিত্তে খুব ধাক্কা লাগিয়াছে।
“যেটা রটে কিছু না কিছু বটে।”
নিশ্চয়ই তােমাদের ব্যবহার
এমনই অসামাজিক,
যাহাতে লােকে ঐসব অপবাদ দিবার সুযােগ পাইয়াছে।

ব্রহ্মচারীর কঠোর নিয়ম সাধারণ লােকের মধ্যেই ঐ আন্দোলন চলিতেছে। চক্ষুলজ্জা নাই, সে তােমাদের মুখের উপরই বলিয়াছে! তাই তাহার ঘাড়ে দোষ চাপাইয়াছ। ••••• এর ব্যবহারে আমি মর্মাহত হইয়াছি। তাহাকে পুনঃপুনঃ ক্ষমা ও সাবধান করা সত্ত্বেও সে সংযত হইতেছে না। বিশেষ প্রয়ােজন ব্যতীত স্ত্রীলােকের সঙ্গে ব্রহ্মচারীর বাক্যালাপ নিষেধ। সে আমার উপদেশ উপেক্ষা করিয়া মাতৃভাবে বিভাের হইয়া সমাজ- বিগহিত ব্যবহার করিতেছে। আপন মা ছাড়িয়া পরের মার সুহিত এরূপ ব্যবহার বিসদৃশ। সত্যকার মায়ের নিকটও বুড়া ছেলের এত আদর-যােগ চলে না। হরিদাস বৃদ্ধার হাতে ভিক্ষা লওয়ায় গৌরাঙ্গদেব কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়। আর বগুড়ায় তােমাকে এত সাবধান করা সত্ত্বেও ব্রহ্মচারীদের এরূপ প্রশ্রয় দেওয়াকিরূপ গুরুভক্তির পরিচয় আমি বুঝিতে পারি না। গৃহীলোক সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারীর সর্বনাশ করে ; শেষে উল্টা দােষ চাপাইয়া বসে। জানি না ••••••এর কোন গুণে তােমরা মুগ্ধ হইয়া পড়িয়াছ ! তার বিদ্যাবুদ্ধি ধৰ্ম্মজ্ঞান আমার অবিদিত নহে। নিতান্ত বেহায়া বলিয়াই এখনও সে ভণ্ডামী করিতে সাহস করিয়াছে। এবার তাহাকে আমি গুরুতর খাস্তি প্রদান করিব নতুবা ত্যাগ করিব। আশ্রম না হওয়াও শ্রেয়ঃ, তবু ঐরূপ গুরুদ্ৰাহী,ভােগী সেককের দ্বারা ত্যাগী সমাজ কলঙ্কিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নহে। তােমাদের উপরও এবার আমি বিরক্ত হইয়াছি। বি-র ঘটনার পর ৬ ঠাকুরের চিঠি আমার বিশ্বাস ছিল আর কখনও তােমাদের দ্বারা অসামাজিক কাণ্ড ঘটিবে না। দুর্ভাগ্য আমার, আমি যাহাঁদের একটু ভালবাসি, তাহারাই আমার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া থাকে। ••••••এর মত অপদার্থের আদর যেখানে, দ•••••র প্রভাব সেখানে কিরূপ, তাহা এখন বেশ বুঝিতেছি। • • • • • •এর জন্য আমার লজ্জা হইতেছে। তােমাদের আর কি লিখিব ? সাক্ষাতে সে সব কীর্তি-কাহিনী আলােচনা করিব। আমি ভাল আছি। ইতি- আশীৰ্বাদক- শ্রনিগমানন্দ ( ৬৮ ) 'পুরীধাম ১, Gibica কল্যাণবরেষু- পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম। ইতিপূর্বে সুর দুইখানি পত্রে স্বর অবস্থা অবগত হইয়াছি। তাহার অবস্থা উত্তরােত্তরই মন্দ দাড়াতেছে। ৩রা পৌষ চরম মনে উপনীত হইবে। যদিও তাহাকে আর জীর্ণদেহে ধরিয়া রাখা কর্তব্য নহে, তবুও যাহাতে সম্মিলনীর পরে ‘উল সংঘটিত হয়, তাহার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা আশ্রম ও সেবক বাইব। করিতেছি। ফল কি হইবে ঠিক এখনও বলিতে পারি না। যাহাই হউক তাহার জন্য তােমরা বিচলিত না হইয়া যথাসাধ্য কর্তব্যে মনঃসংযােগ করিও। সম্মিলনী যাহাতে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় যথাসাধ্য তাহার চেষ্টা করি। অবশ্য যাহার কাৰ্য্য তিনিই তাহা করাইবেন। তােমাদের প্রাণে ধৈৰ্য্য, উৎসাহ, অধ্যবসায় থাকা চাই। আমি আগামী শুক্রবার ২৮শে এখান হইতে বাঙ্গালায় রওনা হইব। পথে পশ্চিম- বঙ্গে ও পুঠিয়ায় কয়েক দিন বিলম্ব হইবে। তৎপরেই বগুড়া সাক্ষাতে অন্যান্য বিষয় ও তােমার পারিবারিক সম্বন্ধে আলােচনা করিব। অন্যান্য কুশল। সকলে আমার আশীৰ্বাদ জানিবা । ইতি শুভানুধ্যায়ী— এনিগমানন্দ (৬৯) সারস্বত মঠ ১২ই মাঘ, ১৩৩০ কল্যাণবরেষু পরম,শুভাশীরাস্তাম্বিশেষঃ, তোমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম। শ্ৰীমান্ স্ব–র অভাবে আমাদের যে ক্ষতি হইবে তাহা আর পূরণ হইবার উপায় নাই। সুতরাং তাহাকে জগতে রাখিবার জন্য নানারূপ চেষ্টা করিয়া আসিতেছি। আত্মা আয়ত্তীকৃত . ১১৩

মৃত্যুর দ্বার
ঠাকুরের চিঠি
হইলেও দেহটাকে কর্মোপযােগী করিবার পন্থা পাইতেছি না।
দেহের প্রতি পরমাণু রােগবীজে জীর্ণ, করিয়াছে। ৩রা
পৌষের মৃত্যুই গত পূর্ণিমা পর্যন্ত হটাইয়া দেওয়া হইয়াছিল।
পূর্ণিমার দিনই আমি জানিতে পারি ঐদিন, দেহত্যাগ হয়
নাই। সুতরাং প্রতিপদ হইতে সঙ্কল্প করিরা মহামৃত্যুঞ্জয়
মন্ত্র জপ আরম্ভ করিয়াছি। ৮ই ফাল্গুন তাহা শেষ হইবে ।
এইবার চরম চেষ্টা। ইহাতেও যদি সুফল না হয়, তবে আর
ঐ দেহে তাহাকে আটকাইয়া রাখিব না।
ছাড়িয়া দিব। আর যদি সুফল পাই, তবে তখন নদীতীয়ে
বাসাদির ব্যবস্থা করিলেই হইবে। এখন দরকার নাই।
তবে আয়ুহীন দেহ, সকল সময়ই দেহত্যাগের সম্ভাবনা
রহিয়াছে। কোম আশা নাই। কাজেই অন্য কোথাও
পাঠান যুক্তিসঙ্গত মনে করি না। ইহার মধ্যে যদি কিছু
হয় তবে ৮ই ফাল্ডনের পরদিন তাহার অবস্থা আমাকে
জানাইবে।
বগুড়া আশ্রম হইয়া অবধি সেবকের অভাব আর
বিরুদ্ধ দলের কুৎসার কথা শুনিতে শুনিতে আমি বিরক্ত
হইয়া উঠিয়াছি। এ পর্যন্ত এত সেবক কোন আশ্রমে দেওয়া
হয় নাই। কিন্তু প্রাণবান্ আশ্রম-ধৰ্ম্মাভিজ্ঞ পরিকের
অভাবে কোন সেবকইটিকিতেছে না। কা—, র, দেশ,
গী প্রভৃতি কেন চলিয়া গিয়াছে তাহা তাহারা আমাকে
জানাইয়াছে।
।
১০৪

আশ্রম ও সেবক
এই মঠে দুই শ্রেণীর সেবক আছে।
একদল কর্মী ও
অন্যদল শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীকে আশ্রমের সকল নিয়ম
মানিয়া চলিতে হয়। কিন্তু কর্মীসেবক দ্বারা তাহা সম্ভবপর
নহে। অনেকে তামাক খায়; একাদশী, আমাবস্যা, পূর্ণিমাদি
পালন করে না। কিন্তু তাহারা ভিন্ন একদিনও আশ্রমের
কাৰ্য্য চলিবে আশা নাই। অবস্থা বুঝিয়া আমিই এসব
ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছি। গাজাখোর কা- দ্বারা সেবাশ্রমের
প্রতি সাধারণের যেরূপ দৃষ্টি পড়িয়াছিল, এখন পর্যন্ত কোন
সেবক তাহা পারিল না। সুতরাং যাহাদ্বারা কাজ পাওয়া
যায়, তাহার প্রতি একটু স্নেহদৃষ্টি রাখিতে হয়—তাহার
আব্দার-অভিমান অধ্যক্ষকে সহ্য করিতে হয়। নতুবা কেবল
কঠোর বিধিনিষেধ দ্বারা শাসন করিলেসেবক টিকিবে না।
আবার বাড়ী হইছে দেবত্ব লাভ করিয়া কেহ তােমাদের
আশ্রমে আসিবে না যাহারা আসিবে তাহাদিগকে দেবতা
করিয়া লইতে হইবে। র— তােমাদের আশ্রমে থাকিল না,
কিন্তু ভাওয়াল আশ্রমে সে ২ বৎসর কেমন কাজ করিতেছে
আমি দেখিতেছি। যাহা হউক এখানকার শিক্ষার্থীসেবক
বা কর্মীসেবককে তােমাদের ওখানে পাঠাইলে চলিবে না,
কারণ-পারা বাহিরের সেবা বা অর্থ সংগ্রহে অভ্যস্ত নহে।
তােমাদেরই সেবক সংগ্রহ এবং তৈরী করিয়া লইতে
হইবে। বি-র কিছু কিছু বদখেয়াল আছে জানি, কিন্তু সে
কাজের লােক। তাহাকে পরিচালিত করিতে পারিলে
১৫
৭খ

ঠাকুরের চিঠি
তাহাদ্বারা কাজ পাওয়া যাইত। তাহাকে বাহিরের কাজে
নিযুক্ত রাখ। তুমি যে সকল কাজের কথা লিখিয়াছ, তাহা
তাহাদ্বারাই সম্পন্ন হওয়া সম্ভব। তদপেক্ষা কাহাকেও
যােগ্য দেখিতেছি না। তবে যদি সে নিতান্ত অবাধ্য ও
উচ্ছল হয়, তাহা হইলে তাড়াইয়া দিও। আমার অপেক্ষার
প্রয়ােজন নাই। একখানা পত্র তাহাকেও দিলাম।
শ্রীমান্ দে- সম্বন্ধে আমার যাহা কর্তব্য, অবশ্য
করিব। এখন তােমার অদৃষ্ট। তবে সংসারের সুখ-সুবিধার
জন্য বাসনা-কামনায় আসক্ত হইয়া পড়িও না, অমৃত ভুলিয়
মৃতের জন্য উতলা হইও না। আমি ফান মাসেই বঙ্গদেশে
এখানকার কুশল। তােমরা আমার আশীর্বাদ
জানিবা। ইতি।
শুভানুধ্যায়ী
নিগমানন্দ
(৭০)
নীলাচল কুটীর
যাইব।
# A
৩১৩১
কল্যাণবরেষু
গরমে কলিকাতায় না তিষ্ঠিতে পারিয়া তানি
পুরী চলিয়া আসিয়াছি। নূতন বাড়ীতে উঠিয়াছি। গতকল্য
তােমার পত্র হাওড়া হইতে এখানে আসিয়াছে। পাঠান্তে
অবগত হইলাম।

আশ্রম ও সেবক সান্তাহারে যখন বি-- টাকা দিয়া প্রণাম করে, তখন সু-র সঙ্গে আমি কথায় ব্যস্ত ছিলাম। টাকার কথা জিজ্ঞাসা করার ও অন্যান্য কথা বলিবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু হঠাৎ ট্রেণ ছাড়িয়া দেওয়ায় আর কাহাকেও কিছু বলিতে পারিলাম না। ত্যাগী ব্রহ্মচারী সেবকগণ এগুরুর কাৰ্য্যে দেহ-মন উৎসর্গ করিয়াছে, সুতরাং তাহাদের উপার্জিত বা সংগৃহীত অর্থ সবই শ্রীগুরুর। যাহারা দেহ-মন শ্রীগুরুকে প্রণামী দিয়াছে, তাহাদের টাকা দিয়া প্রণাম করিবার প্রয়ােজন নাই। যে সেবক যে আশ্রমে থাকিবে, তাহার সংগৃহীত অর্থ সেই আশ্রম ব্যয়িত হইবে। আশ্রমগুলিও গুরুদেবের। তাহা ছাড়া সেবকের নিয়ম এই যে, তাহারা ব্যক্তিগত ভাবে অর্থ সংগ্রহ করিতে পারিবে না। করিলেও তাহা আশ্রমে জমা দিতে হইবে। বি~-র সে শিক্ষা বা জ্ঞান নাই। তাই আমাকে টাকা দিয়া বৃথা সন্তুষ্ট করিবার সে চেষ্টা করিয়াছে। তাহার হালিসহরের ব্যবহার, চরিত্র, জ্ঞান-বুদ্ধি আমার অবিদিত নহে। সংযম, ত্যাগ ও সাধু ব্যবহার ব্যতীত আমি, কোন সেবকের উপর প্রীত হইতে পারিব না। এমন কি নিজের ব্যবহার্য দ্রব্যগুলিও সেবক- গণকে কর্তৃপক্ষের নিকট চাহিয়া লইতে হইবে। এইসব কথা বি—কে বুঝাইয়া বলি। তাহার প্রদত্ত ১০ টাকার নােটখানা এইসঙ্গে ফেরৎ দিলাম। * * রাজসাহী বিভাগের নিম্নের তালিকা যাহা দিয়াছি ০৭ # ঠাকুরের চিঠি তাহা একটা খাতায় উঠাইতে ব্যবস্থা করি। বাড়ীটা বেশ মনােমত হইয়াছে। তবে এখনও প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ করিয়া অভাবাদি দূর করিয়া লইতে বেশ আনন্দেই আছি। অন্যান্য কুশল। তােমরা সকলে আমার আশীৰ্বাদ জানিবা। ইতি— শুভানুধ্যায়ী- শ্ৰীনিগমানন্দ হইবে। (৭১) সারস্বত মঠ স্নেহের র- বহুদিন পরে তোমার পত্ৰখানা পাইয়া বিস্তারিত অবগত হইলাম। পূজার বন্ধে আশ্রমে অনেক ভক্ত আসিয়া- ছিল, তাহাদের লইয়া সমর কাটিয়া গিয়াছে, শত্রাদি লিখিবার সময় সুযােগ পাই নাই। যখন সময় হইল, কোথায় উত্তর লিখিব তাহা ঠিক করিতে পারি নাই। কারণ কলেজ খােলার সময় আসিয়াছিল, তাই যথাসময়ে উত্তর দিতে পারি নাই। বৎস! পূজার সময় যে বিভ্রাট হইয়া গিয়াছে, তজ্জন্য অনুশােচনায় ফল নাই, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হইবে। স্বেচ্ছায় হউক আর অনুরােধেই হউক যে দায়িত্ব গ্রহণ করিবে তাহাতে কদাচ ঔদাস্ত • করিবে না। দায়িত্ব যাহাতে সৰ্বাঙ্গসুন্দররূপে পালিত হয়, তজ্জন্য প্রাণপণে চেষ্টা

আশ্রম স্থাপনের উদ্দেশ্য
করিবে। নিজের দায়িত্ব অপরের ঘাড়ে চাপাইবার সময়
'তাহার সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিবে। বিশেষতঃ দেবতার কাজে
অবহেলা বিশেষ গহিত। আমি সকল প্রকার দায়িত্বেই
সৰ্ব্বদা শেষ পর্যন্ত মনােযােগী হইতে উপদেশ দিতেছি।
আশা করি তােমাদ্বারা আর কোন কর্তব্যে কখনই কোন
ত্রুটী হইবে না।
আশ্রমের কাৰ্য দিন দিন বাড়িয়া যাইতেছে। সম্মুখে
স্নিগ্ধোজ্জল আলােক বিকশিত। সে আলােকে কত প্রশস্ত
পথই দৃষ্ট হইতেছে। আমি ও আমার বলিতে যাহারা আছে
তাহাদের সম্মুখে অসংখ্য কাৰ্য। পৃথিবীব্যাপী রজঃগুণের
ধ্বংসে সাত্ত্বিক গুণের অভ্যুদয় অবশ্যম্ভাবী। ভারতের ব্রাহ্মণ
সন্ন্যাসী ব্যতীত এই সাত্ত্বিক গুণের আহার জোটাইয়া কে
তাহাদের পুষ্ট করিবে ? এই উপস্থিত সাম্য ও উদার যুগে
বেদান্ত ধর্ম ব্যতীত আর কোন্ ধৰ্ম্ম সকলের সমান ভাবে
তৃপ্তি সাধন করিবে ? সেইজন্য বাঙ্গালার সুদূর প্রান্তে এই
মঠ স্থাপন করা হইয়াছে। লােক সমাজে কেবল গােলে-
হরিবােল না দিয়া যাহাতে বেদান্তবিহু গুরুর বিকাশ হয়
তজ্জন্য অনাথ আশ্রম ও মঠের প্রতিষ্ঠা•এবং জগদ্গুরু তাহার
পরিচালক। কাৰ্য্য কিরূপ হইতেছে তিনিই তাহা জানেন।
তবে এইমাত্র সূত্রপাত, এখনও পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠাই হয় নাই।
অনেক বিভাগের অনেক বিষয়ই এখনও অসম্পূর্ণ। অভাবের
মধ্যেই আমাদিগকে ভাব প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। তবে
০৯

ঠাকুরের চিঠি
যেরূপ কাৰ্যারম্ভ হইয়াছে, তাহাতে হতাশের কোন কারণ
নাই। সেবকগণের উদ্যম, অধ্যবসায় ও সেবা-প্রাণ দিন
দিন বর্ধিতই হইতেছে।
বৎস! তােমাদের মত বালক ভক্তগণের উপর আমি
অনেক আশা করিতেছি। তােমরা যেদিন শিক্ষা সম্পূর্ণ
করিয়া কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইবে, তখন আমরা সর্বপ্রকারে
পূর্ণতা লাভ করিব। দশ বৎসরের মধ্যেই এই মঠের
সেবকগণ বেদান্ত প্রচারার্থ জগতে বাহির হইতে পারিবে
বলিয়া আমি মনে করি। প্রার্থনা করি শ্রীগুরুদেব তােমাদের
প্রাণে তদনুরূপ শক্তি-ভক্তি প্রদান করুন।
আমি অতি সত্বরই বাঙ্গালা দেশে যাইব, তৎপরে
কাশী যাইব। তথায় কিছুদিন অবস্থানন্তে চৈত্রে হরিদ্বার
কুম্ভ মেলায় যােগদান করিয়া বৈশাখ মাসে উৎসবের পূর্বেই
আশ্রমে আসিব। শ্ৰীমন্ য—দের কোন সংবাদ অবগত
নহি। তুমি তাহাকে আমার বিজয়ার আশীৰ্বাদ জানাইবে
এবং নিজেও জানিলে। ইতি
ন
আশীৰ্বাদক
“ঠাকুর”

আশ্রমের স্মৃতি (৭২) বেনারেস সিটি ১৭ই পৌষ স্নেহাস্পদেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য প্রিয় রা ও সন্তানগণ! তােমাদের ছাড়িয়া—হৃৎ পিণ্ড উৎপাটিত করিয়া আমি চলিয়া আসিয়াছি। (म হৃৎপিণ্ড তােমাদের আদর-যত্ন দ্বারা রক্ষিত না হইলে বন- ফুলের ন্যায় লােকচক্ষুর অগােচরে লয়প্রাপ্ত হইবে। তােমর। কেহ একথা ভুলিও না। • শান্তি-আশ্রম’টা আমার জীবন- ব্যাপী সাধনার ফল, আশ্রমের কাছে আমার প্রাণটা তুচ্ছ- ঐ আশ্রমের জন্য আমি শতবার আমার প্রাণ বিসর্জন দিতে পারি। আশা অাছে ঐ আশ্রম হইতে কালে শত শত নিগমানন্দের বিকাশ হইবে। বৎস! তােরা আমার সেই আশ্রমের রক্ষক, আশা আছে আমার প্রাণতুল্য আশ্রমকে অবহেলা করিয়া তােরা কেহ আমার প্রাণহন্তারক হবি না। প্রার্থনা করি স— বা সু- যে লীলা করিল, তােমাদের হৃদয়ে যেন সেরূপ উপাদান সংগৃহীত না হয়। আমার আশ্রম ত্যাগে কারণ তােমরা কখনই ভুলিয়া যাইও না। ঠাকুর ঠাকুরের লােক ব্যতীত কখন অন্যের লোক লইয়া এক আশ্রমে থাকিবে না একথা বোধ হয় এবার বুঝিতে পারিয়াছ। যাহারা স্ত্রী-পুত্র ভাই-ভগ্নী পুকন্যা লইয়া অনিত্য জগতে ১১১ T = ঠাকুরের চিঠি নিত্য বাস করিতে চায়, তাহাদের সহিত জগগুরু শঙ্করা- চার্যের মতের বা সন্ন্যাসের কোন সম্বন্ধ নাই। বৎসরে! বলিব কি? -তীর্থরাজ কাশী-সৰ্ব্বধৰ্ম্মের কেন্দ্রস্থল কাশী-অন্নপূর্ণার সােণার কাশী আসিয়াও বিন্দুমাত্র শান্তি নাই। আশ্রমের স্মৃতি দাউ দাউ করিয়া সৰ্ব্বক্ষণ হৃদয় পুড়াইতেছে। সর্বদা মনে হয়, আমি আমার, কাশী ও প্রাণতুল্য তােদের ছাড়িয়া ব্যাসকাশীতে আসিয়াছি। যারা সৰ্বস্ব ছাড়িয়া আমার আশ্রয় লইল-জীবনের সমস্ত সুখ- শান্তি আমার উপর নিভর করিল, আমি তাদের ছাড়িয়া কোন্ প্রাণে এই সুন্দর স্থানে দোতালা দালানে বাস করি- তেছি! তােরা আমার স্বাসী শিষ্যতােদের লইয়া গাছ- তলায় একসন্ধ্যা ভিক্ষান্নও যে শ্লাঘ্য ছিল। তােদের লইয়া থাকিতে পাইলে আমি যে মুক্তিকেও গ্রাহকরিতাম না। যাহা হইবার হইল। কিন্তু এখনও উদ্দেশ্য নষ্ট হয় নাই— তােমরা ৫৬ জন সেবক একপ্রাণ হইলে আমি এখনও অসাধ্য সাধন করিতে পারি। জানি না শ্রীগুরু কেন আমায় কাশী আনিয়াছেন। অবশ্য তাঁহার মঙ্গল উদ্দেশ্য নিহিত আছে জানিবে। আমি যেথায় থাকি না কেন, অনুক্ষণ তোমাদের ও আশ্রমের মঙ্গল চিন্তা করি এবং সকল দিক দিয়া ঐ আশ্রমের উন্নতি চেষ্টা করিব। তােমরা রক্ষা করিতে পারিলে উহার উন্নতি অনিবাৰ্য। আশ্রমাপেক্ষা আমি এক্ষণে অধিক { ১১২

আশ্রমের স্মৃতি
চেষ্টা ও পরিশ্রম করিতেছি। শীঘ্রই কাশীতে কাৰ্যারম্ভ
করিব । আসামের, জংলীর মধ্যে আমি চুপ করিয়া বসিয়া
থাকি, ইহা বুঝি শ্রীগুরুর ইচ্ছা নহে। জানি না কেন তিনি
কাশী আনিয়াছেন। তাহার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।
যা—আমি যে নিয়মে চলিতে বলিয়াছি, সেরূপ
চলিলে কালে ঐ আশ্রম আনন্দধাম হইতে পারে, আবার
প্রেমের বন্যা বহিতে পারে। কিন্তু সাবধান! যেন ......র
নহিত আমার কোন সেবকের কোনরূপ সম্বন্ধ না থাকে।
আসিবার সময় আমি আশ্রম নন্দনকানন
দেখিয়া আসিয়াছি—যেন তােমাদের অবহেলায় তাহা মরু-
ভূমি না হয়। আমি এবার আশ্রমে গিয়া তোমাদের সম্বন্ধে
পাকা ব্যবস্থা ও বন্দোবস্ত করিব। স—ফিরিয়াছে কি না?
—তাহাদের সহিত কৈানরূপ কথান্তর না হয়।
সকলে ধীর স্থির ভাবে আশ্রমের গৌরব রাখিয়া চলিবে এবং
সাধারণের সহিত ব্যবহার করিবে। নূতন বর্ষে আৰ্য-দর্পণ
১ ফৰ্ম্মা বাড়াইতে পারিলে ভাল হয়।
সাবধানে ও সযতনে রাখিবা। কোন দুঃখ-কষ্টে সে যেন
নিরানন্দে তমের উপাদান সংগ্রহ না করে। বুঝিতেছি
তাহার বড়ই কষ্ট হইতেছে, কিন্তু উপায় কি ? শঙ্কর মিস্ত্রীকে
সহােদরের ন্যায় স্নেহ করিব, তার মরিয়ানীর ভাব—আকুল
উচ্ছাস-ব্যাকু বােদন তােমাদের অপেক্ষা প্রাণে অধিক
১১৩

* ঠাকুরের চিঠি আঘাত দিতেছে। নারায়ণতুল্য দধিরামের সেবা-পূজার ক্ৰটী না হয়। বিড়ালগুলােকে যত্ন করিও। মণির ছানা হইয়াছে কি ? মেদিনীপুরের অনাথাদল কি করিতেছে ? তােমরা আমার প্রাণভরা আশীৰ্বাদ জানিও। অন্য কাগজে লেখা সংবাদটী মাঘ কিম্বা ফাঙ্কনের আর্য- দর্পণে প্রকাশ করিও। ইতি-- শুভানুধ্যায়ী- তােমাদের ঠাকুর । (৭৩): শান্তি আশ্রম ৩০শে ভাদ্র, ১৩২০ স্নেহাস্পদেষু- পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য- মেদিনীপুর হইতে তােমার লিখিত পত্র অন্য প্রাপ্ত হইয়া অবগত হইলাম । ইতিমধ্যে বঙ্গবাসী কলেজের ঠিকানায়ও এক পত্র লিখা হইয়াছে। আশ্রমের কাৰ্য্য সুচারুরূপে চলিতেছে। # # দিন দিন আমি আশ্চর্য হইতে আশ্চৰ্য্যতর হইয়া যাইতেছি, আমাকে আমিও আর বিশ্বাস করিতে পারি না। মায়ার মূর্তিগুলিই সর্বনাশ করিতেছে। বুঝিতেছি, অথচ প্রতিকারের পন্থা পাই না। বৎস! তোমাদের অভাবে আশ্রমে আমাকে নিতান্ত দীন ১১৪

সেবা-মাহাত্ম্য
ভাবেই অবস্থান করিতে হইতেছে। আমার মন-প্রাণ তােমা-
দের নিকট পড়িয়া আছে। তােমাদের সঙ্গে সঙ্গে ফিরিতেছে।
আশা করি এতদিনে কাৰ্যারম্ভ করিতে পারিয়াছ। কাজ
কর, কাজ কর, দু’জন আৰ্ত্ত নর-নারীর সেবা করিয়াও সেবা-
ব্রতের সার্থকতা কর। তােমাদের সংসার ছাড়াইয়াছিলাম,
তাহা সফল হউক। আশ্রমের কথা ভুলিয়া নর-নারায়ণের
সেবা কর। কৰ্তব্য জ্ঞানে নহে--প্রাণের টানে। (প্রাণের
ঠাকুর আজ নিজকে নিজে বিপন্ন করিয়া ভক্ত-সেবকগণের
ভালবাসা পরীক্ষা করিতেছেন!) আমার সব ছাড়িয়া তােমা-
দের নিকট ছুটিয়া যাইতেসাধ হইতেছে, কিন্তু কি করিব?
আমি কর্তব্য শৃঙ্খলে বাঁধা পড়িয়াছি, আমার প্রাণের আবেগ
তােমরা মিটাইয়া আসিবা। এ পয্যন্ত আশ্রম দ্বারা জগতের
সামান্য কাৰ্যও হয় নাই, কেবল আভ্যন্তরীণ গােলমাল
হিংসা-দ্বেষ স্বার্থ লইয়া কাটান গিয়াছে। এবারকার সুযােগে
আশ্রম-প্রতিষ্ঠার সার্থকতা না হইলে সকল উদ্যম বৃথা।
তােমাদের শারীরিক সেবা সৰ্ব্বত্র অবারিত, অর্থ যতদূর হয়
টী হইবে না। তােমাদিগের উদ্যম ও উৎসাহ দিন দিন
বদ্ধিত হউক। বাহুতে শক্তি হৃদয়ে ভক্তির উদয় হউক,
আমি গুরুরূপে তােমাদের প্রকৃত সেবা গ্রহণ করি। #
আশ্রমের সর্বাঙ্গীন কুশল, আশ্রমের জন্য তােমরা
কোন চিন্তা করিও না; আমি যখন নিজে আশ্রমে উপস্থিত
থাকি তখন তােমাদের চিন্তার কারণ কি? বে—কেও
১১৫

ঠাকুরের চিঠি কোন কথা লিখিও না, তাহাকে বােধ হয় স—র রােগে ধরিয়াছে। মানুষ ভালভেসে যাদের এখনও সাধ মেটে নাই, তারা সন্ন্যাসের জন্য ঘর ছাড়ে কেন বুঝিতে পারিলাম না। যাহা হউক তাহার সহিত প্রকাশ্যে আমার কোন কথা হয় নাই, সুতরাং তুমি বা তােমরা এ সম্বন্ধে তাহাকে কিছু লিখিও না, বা এ সম্বন্ধে কিছু ভাবিও না। তোমরা আমার আশীৰ্বাদ জানিও। অন্যান্য মঙ্গল। ইতি - শুভানুধ্যায়ী তােমাদের ঠাকুর (৭৪) শান্তি আশ্রম ১৫ আশ্বিন, ১৩২০ - বহুদিন পরে তােমার একখানা পত্র পাইলাম। আমি এবার আশ্রমে আসিয়া পৰ্যন্ত পাগল হইয়া রহিয়াছি। বর্ধমান বিভাগের খণ্ডপ্রলয়ে আশ্রম শূন্য। ডাক্তার ও সেবকগণ আৰ্তসেবার জন্য চলিয়া গিয়াছে, কেবল বাে-কে লইয়া কাৰ্য্য করিতেছি। এ পর্যন্ত ৭৮ শত টাকা বন্যার্ত- সেবায় দেওয়া হইল, অথচ পৌষ মাস পর্যন্ত সেবা চালাইতে হইবে। আশ্রমে আধ পয়সা নাই। এক বৎসরের পুস্তকের আয়, যােগমায়া ভাণ্ডার সম্পূর্ণ শূন্য। গৃহস্থ শিষ্যগণ মেয়ে- সেবা-মাহাত্ম্য মহলে চঁাদা উঠাইয়া যথেষ্ট সাহায্য করিতেছে। ঢাকা, আলিপুর, শ্রীহট্ট প্রভৃতি শিষ্যগণের পরিশ্রমের ত্রুটী নাই। আমি কেবল চিঠি লিখিতেই আছি। এই দুদ্দিনে মায়ের প্রকৃত সন্তান তাওটী শিষ্য ভ্রাতৃ-সেবায় আত্ম-উৎসর্গ করিয়া আমাকে কিনিয়া লইয়াছে। তাহাদের উদ্যম-উৎসাহে ত্যাগ- তিতিক্ষায় আমার গুরুগিরির গৌরব বৃদ্ধি করিয়াছে। এই সময়ে তােমাদের একখানাও পত্র পাইলাম না। বৎস! এবার বঙ্গদেশে প্রকৃত বােধন হইয়াছে, বাঙ্গালী প্রকৃত মাতৃ পূজা করিতে শিখিয়াছে।. এ আনন্দ যে প্রাণে ধরে না ! বঙ্গবাসী ও বেঙ্গলীতে আমাদের কার্যবিবরণ বাহির হই- তেছে। তােমার ও গাে-র কান্না যে শুখাইয়াছে তাহার প্রমাণ বেশ পাইতেছি। কিন্তু যে সকল ভক্ত কখনও কঁাদে নাই, এবার তাহাদের চোখেও বন্যা আসিয়াছে। বাবা! সময় নাই, পরে সব বিবরণ লিখিব। তুমি ও তােমার বৌ যদি পরিধেয় পুরাণ বস্ত্র দুইখানা ছাড়িয়া আৰ্ত্তসেবার জন্য আমার হাতে দিতে, তবুও আমি মনকে প্রবােধ দিতাম, বাবার কাজে ছেলে মেয়ের শক্তি যুক্ত, হইত। বাবা! আমি তােমাদের ভুলি নাই পূৰ্ব্ববৎ ভালবাসি। তবে মায়ের আদেশ পালন করিতে, নিজের মায়ের নয়- দের খোঁজ করিতে পারি নাই। ইতি আশীর্বাদক- তােমাদের ঠাকুর -জগতের নয়- = ودد ঠাকুরের চিঠি ( ৭৫ ) শান্তি আশ্রম ২২/১০/১৩ - স্নেহাস্পদে- পরম শুভাশীরাস্তাম্বিশেষঃ- তােমাদেব উভয়েরই পত্র পাইলাম। আমি নানা কারণে যথাসময়ে উত্তর দিতে পারি নাই। আশ্রমের সেবক- গণ কঁথি রহিয়াছে। বােকে লইয়া আমাকেই কাজ চালাইতে হইতেছে। চিঠি-পত্র লেখা ও টাকার যােগাড় করিতে আমাকে হয়রাণ হইতে হইয়াছে। এক্ষণে সুন্দর- রূপেই কাৰ্য চলিতেছে। টাকা দিয়া সাহায্য করিতে আর সেবাকাৰ্য্যের জ সেবকগণের থাকিবার প্রয়ােজন হইবে না। তাহারা এই কার্তিকের শেষে বােধ হয় আশ্রমে আসিবে। ১২ই ডিসেম্বরের উৎসবের পর আমি ঢাকা হইয়া দিনাজ- পুরের ঐদিকে যাইব ইচ্ছা করিয়াছি। এবার বঙ্গদেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ ; সেবকগণের বিশ্রাম নাই। যে যাহা পার চেষ্টা কর। নরই সাক্ষাৎ নারায়ণ, নরের সেবা ব্যতীত নারায়ণের কৃপা হয় না। তাই গার্হস্থ্য ধর্মের এত মাহাত্ম্য। আপন প্রাণকে বিশ্বপ্রাণের সহিত মিশাইতে হইবে। স্ত্রী-পুত্রের দ্বারা প্রথম প্রাণে সে বীজ উপ্ত হয়, পরে বিশ্বের কীট-পতঙ্গে সমপ্রাণতা আইসে। তখন ভগবান্ যাচিয়া দয়া করিয়া থাকেন নতুবা মুখের প্রার্থনায় তাহার সিংহাসন টলে না। ১১৮ গুরু ও ইষ্ট অভিন্ন আশীর্বাদ করি তােমাদের প্রাণের দ্বার খুলিয়া যাউক, আত্মসত্ত্বা বিশ্বসত্ত্বায় পরিণত হউক, তােমরা বিশ্বের মঙ্গলে বিশ্বের সেবায় আত্মহারা পাগলপারা হইয়া যাও। তােমার নবপ্রসূতা কন্যাটীতে মাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হউক। সমস্ত কুশল। ইতি শুভানুধ্যায়ী- শ্ৰীনিগমানন্দ . (৭৬) শান্তি আশ্রম ২৬১১১৯ মেহের ন- - } বংসে! এখ: তােমার ‘পখানা যথাসময়ে পাইয়াছি, ইতিপূর্বে সকে পত্র লিখিয়াছি। আমি পূৰ্ব্ব হইতেই তােমায় ভালবাসি। স-র মুখে তােমার পুত্রশােকে ধৈর্য্যের কথা শুনিয়াছি, নিজে জননীর ন্যায় তােমার গাম্ভীৰ্য দেখি - য়াছি, তাই পূৰ্বেই তােমায় ভালবাসিয়াছিলাম। ততা আমারই হইয়াছ, সুতরাং যখন যে দুঃখ-কষ্ট আসিবে অকপটে আমায় জানাইবে। আর এই অভাবময় পৃথিবীতে রাজরাণী হইতে ভিখারিণীর সমান অভাব। ভাবের রাজ্যে পেছিলে এ অভাব কাহারও মেটে না। জীব-জগৎকে ভালবাসিতে শিখ, মাতৃত্বের বিকাশ কর, জগৎ জনন্দময় ১৯ ঠাকুরের চিঠি দেখিবে। আমার অবকাশ মত এ সম্বন্ধে বিহিত উপদেশ দিব। গুরু ও ইষ্টদেবতা অভিন্ন। তুমি গুরুকে শিবরূপে এবং দেবীকে তৎপত্নীরূপে চিন্তা করিবে। তাহা হইলে ভাব-মাধুর্যে বা জ্ঞান-ঐশ্বৰ্যে কোন প্রভেদ থাকিবে না। তােমরা আমার আশীর্বাদ জানিও। ইতি - আশীৰ্বাদক- শ্ৰীনিগমানন্দ অত্র মঙ্গল। ন ( ৭৭ ) শান্তি আশ্রম। ৫ই পৌষ, ১৩১৯ কল্যাণবরেষু পরম শুভাশীরাস্তাম্বিশেষঃ- তােমার পত্ৰ পাইয়া বিস্তারিত বিবরণ অবগত হই- লাম। তােমার স্ত্রীর এ পর্যন্ত যত স্বপ্ন শুনিয়া আসিতেছি প্রায়গুলিই সফল স্বপ্ন ; সুতরাং এ স্বপ্নটাকে অগ্রাহ্য করা চলে না। তাহাকে কাশীধাম পাঠানের ব্যবস্থা,. করিতে পারিলে ভাল হয়, এমন কি মাসাধিক কাল তথায় বাসের বন্দোবস্ত করিতে পারিলে আরও সুবিধা। গর্ভসঞ্চারের পূৰ্ব্ব হইতে দৈবের ক্রীড়া হইতেছে, তােমরাও দৈবে নির্ভর করিয়াছ। সুতরাং স্বপ্নানুসারে উভযবাহিনী গঙ্গায় স্নান একান্ত আবশ্যক। = ১২০

গুরু ও শিষ্য
মন্ত্রদাতা গুরু, ইষ্টদেবতা ও বীজমন্ত্র একই পদার্থ ।
সুতরাং যাহাকে আপন মন্ত্র বলিতে হইবে, তাহাকেও উহা-
দের সহিত কায়মনােপ্রাণে অভেদ ভাব না হইলে, অর্থাৎ
গুরু ইষ্টস্বরূপ জ্ঞান না করিলে মন্ত্রের চিৎশক্তি নষ্ট হয়।
এজন্য অন্যকে মন্ত্র জানান শাস্ত্রের নিষেধ। আমি মন্ত্র না
জানিলে পূজার পদ্ধতি বলিয়া দিব কিরূপে ? অত্র মঙ্গল।
আমার আশীৰ্বাদ জানিও। ইতি
শুভানুধ্যায়ী-
নগমানন্দ
(৭৮)
পুরী
২০১৮৩২
কল্যাণবরেষু
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
গতকল্য তােমার পত্র পাইয়া সমাচার অবগত হইলাম।
ও ভক্তদের চরিত্রে আমাকে বিস্মিত করিয়াছে।
কাহার কথা সত্য নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। আমাকে কেহ মিথ্যা
লিখিতে পারে তাহা আমার জ্ঞানের বাহিরে। শিষ্য হইয়া
মুখে এক কথা, মনে এক কথা, ইহার মানে কি ?
লাভই বা কি হইবে? 'কামারকে ইস্পাতস্ফাকি দিলে নিজের
অস্ত্রেই যে ধার হইবে না, এই 'সাধারণ জ্ঞান কি কাহারও
১২১

ঠাকুরের চিঠি নাই ? ••••••লিখিয়াছে সে চিঠির কথা কিছুই জানে না। যা আমি আর কাহাকেও কিছু বলিতে চাই না। সবই বুঝিয়াছি। আমাকে প্রতারিত করা চলিতে পারে ; তােমাদের ফলদাতারূপে আমার হৃদয়ে যিনি আছেন, তাহার নিকট মেকী চলিবে না। তুমি অগ্রহায়ণ মাসে যে চিঠি লিখিয়াছিলে তাহাতে ত আমার প্রাণ গলিয়া গিয়াছিল। পরের চিঠিতে উহা লিখিলে কেন ? তোমাকে আমার বি—' বলিয়াই ত ভাল বাসিয়াছি। তােমার জন্যই পরে অন্যান্য ভক্ত পাইয়াছি। কিন্তু ক্রমশঃ জ-র ভক্তদের ব্যব- হারে মনটা কঠিন হইয়া উঠিতেছে। যা বর্তমানে তােমার উপর আমার কোন বিরক্তির কারণ নাই। সাবধান হইয়। সাধারণের সহিত ব্যবহার করিও। কাহারও পত্রাদি লিখিয়া দিও না। তােমার নিজের কথাই নিবেদন করিও। আশী- ৰ্বাদ জানিও। ইতি-- শুভানুধ্যায়ী- শ্রনিগমানন্দ (৭৯) পুরী ২১০৩২ কল্যাণীয়া — পৱম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্ৰ পাইয়া তবগত হইলাম। যে সকল শিষ্য ১২২

গুরু ও শিষ্য
}
আমার নামও শুনিতে পারে না, তােমরা জোর করিয়া তাহা-
দের আমার নাম শুনাইতে যাইও না। তােমরাও যে বিশেষ
কোন অবস্থা লাভ করিয়া ধন্য হইবে, তাহা ত আমি জানি
। যদি সেইরূপ কোন আশা করিয়া থাক, তবে বড়ই
ভুল করিয়াছ। কারণ সেরূপ বিশেষ কোন সাধন-ভজন বা
জীবন গঠনােপযােগী শিক্ষা এ পর্যন্ত আমার নিকট গ্রহণ
কর নাই। এতদিন আমি জানিতাম, তােমরা অক্ষম, একমাত্র
আমার কৃপাপ্রার্থী।
এ সম্বন্ধে বহুবার বহু কথা তোমাদের
সঙ্গে আলােচনা করিয়াছি। এখন জীন ফুরাইয়া গেল
যদি বুঝিয়া থাক এবং আমার মুখ চাহিয়া থাকিয়া এতদিনে
কিছুই হইতেছে না যদি বুঝিয়া থাক, তবে বিশেষ ভাবে
চেষ্টা-যত্ন কর না ! জাগ, ওঠ, লেগে পড়!
বাহার। সংসার ছাড়িয়া ২১০ দিন গুরুর নিকট
থাকতে পারে না, তাহাদের এসব কথা লজ্জাজনক। অন্ততঃ
আমি ত পত্রখানা পড়িয়া লজ্জায় মরিতেছি। রামকৃষ্ণদেবের
কথামৃতে আছে—“হাজার বৎসরের অন্ধকার ঘরে একটী
দীপশলাঁকা জ্বালাইয়া দিলে মুহূর্তে সব অন্ধকার দূর হইয়া
যায়, একদিনও লাগে না।” ' তবু যদি তােমরা অপেক্ষা
করিতে না পার, অন্য চেষ্টা কর। তোমাদের এ জাগরণও
বড় সুখের মনে করি।
কিন্তু এসব পুরুষকারের কথা
পুরুষের মুখেই শশাভা পায়, তােমার মত মেয়ের ধারণাও
কি এইরূপ ? আমার মনে হয়, তােমাকে উপলক্ষ্য করিয়া

ঠাকুরের চিঠি পুরুষ শিষ্যগণই তাহাদের কথা তােমার পত্র লিখিয়া দিয়াছে। বাস্তবিক আর কেন তােমরা আমাকে ভাল- আমি ভাল আছি। আশীৰ্বাদ জানিও। বাসিবে ? আশীৰ্বাদক- শ্ৰীনিগমানন্দ ( ৮০ ) गर्छ ৫ ১৫|১০|২৮ স্নেহের বি--- তােমার পত্র পাইয়া সবিশেষ অবগত হইলাম। তােমাকে যখন আমি শিষ্যরূপে গ্রহণ করিয়াছি, তখন অবশ্য তােমার বাসনা পূর্ণ হইবে। তবে জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার কাম, ভয়, ঘৃণা, লজ্জা প্রভৃতি দূর হইতেছে না বলিয়াই প্রেম-ভক্তি প্রকাশ হইতে পারিতেছে না। কিন্তু আমি জানি, তােমাতে প্রেম-ভক্তির বীজ নিহিত আছে। এই জন্মেই তুমি তাহা লাভ করিয়া ধন্য হইবে। আর বীকে যদি মানুষ করিতে পারি, তুমি কেন তােমার বংশ পর্যন্ত ধন্য হইয়া যাইবে। আমি বার্ষিক হিসাবাদি লইয়া ব্যস্ত আছি, বেশী ১২৪

গুরু ও শিষ্য
লিখিতে পারিলাম না।
তাত্র শুভ।
সকলে আমার আশীর্বাদ জানিবা। ইতি-
শুভানুধ্যায়ী
ঐনিগমানন্দ
( ৮১ )
ঢাকা শান্তি আশ্রম
১২ই মাঘ, ১৩১৮
প্রিয় বাে- ও চি,
তােমাদের প্রেরিত টাকা এবং পত্র পাইয়া অবগত
হইলাম। তােমরা ভগবদাদেশে বাহির হইয়াছ, সুতরাং
যথাসাধ্য অভিমান ত্যাগ করিয়া কাৰ্য্য করিয়া যাও ; তাহাতে
কৃতকার্য হও বা না হও, তাহাতে বিচলিত হইও না।
তােমাদের কর্ম করিবারই অধিকার, ফলাফলে অধিকার
নাই, সুতরাং নির্লিপ্ত ভাবে কৰ্ম্ম কর ।
তােমাদের দূরতর দেশে পাঠাইয়া আমরা সর্বদাই
চিন্তিত, তবে প্রথম পত্রখানা পাইয়া কতক আশ্বস্ত হইয়াছি।
শরীরে প্রতি ঔদাস্ত করিও না, যেখানেই থাক সুখে ও
শান্তিতে থাকিলেই আমি নিশ্চিন্ত থাকিব। তোমরা
সন্ন্যাসী, অথচ আমি তােমাদের সংসারীর সঙ্গে কর্মে নিযুক্ত
করিয়াছি, সুতরাং দুঃখ-কষ্টে আমার প্রতি বিরক্ত হইও না।
তােমরা দুজন আমার দু’হাত, তােমাদের বলেই আমি
১২৫

ঠাকুরের চিঠি
সংসারে শ্রীগুরুর আদেশ কথঞ্চিৎ পালন করিতে ভরসা
করিয়াছি। তােমরা জগৎ-সেবায় আত্মোৎসর্গ কর। --আমি
সৰ্ব্বত্র—সুতরাং আমার নিকট না থাকিলে দুঃখিত হইও না।
আমার কাৰ্য্যে আমার জগতেই তােমরা বিচরণ করিতেছ।
আশা করি অদম্য উৎসাহে কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হও। আমি
আগামী কল্য স—র নিকট আসাম যাইব।. সেবকগণের
মধ্যে কেবল র আশ্রমে থাকিল, সুতরাং তাহার নিকট
পত্রাদি লিখিয়া আশ্রমের সংবাদ লইও। আমার ঠিকানা
ঠিক হইলে র— তােমাদের জানাইবে। অন্যান্য মঙ্গল।
তােমরা আমার আশীর্বাদ জানি। আমরা আসামেই
আশ্রম করিতে মুনস্থ করিয়াছি। ইতি--
তােমাদের
ঠাকুর
(৮২)
শান্তি আশ্রম
২২৪২০
স্নেহাস্পদেষু-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
যথাসময়ে তােমার পত্র পাইয়াছি। আমার কাছে
কোন প্রকারে তােমাকে কুষ্ঠিত ও কাতর হইতে হইবে না।
সরল বিশ্বাসে কোন কাজ করিয়া দোষী হইলে জ্ঞানীমাত্রই

গুরু ও শিষ্য তাহা গ্রহণ করেন না। আর শ্রীগুরুদেব অহেতুক শিয্যের মঙ্গলকামী। তিনি বরাভয় করে সর্বদা শিষ্যকে অভয় নিতেছেন, সকল অপরাধ ক্ষমা করিয়া শিষ্যকে মঙ্গলের পথে পরিচালিত করিতেছেন। সুতরাং তাঁহার নিকট তােমাকে ভীত ও কুণ্ঠিত হইয়া কোন কাজ করিতে হইবে না। বুড়িমাকেও আমার আশীর্বাদ দিবা। যেখান হইতেই প্রণাম করুন না কেন, সকল স্থানেই তাহার প্রত্যক্ষ অব- স্থিতিতে বিশ্বাস চাই, সুতরাং প্রণাম করিতে পারেন নাই- তাহাতে দুঃখ কেন ? আমি যে প্রতাহই তঁাহার কত প্রণাম পাইতেছি! প্র ও পূকে আমার আশীর্বাদ জানাই। আশ্রমের মঙ্গল। আশীর্বাদ করি প্রেম-ভক্তি লাভ করিয়া দিন দিন স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হও।ইতি • শুভানুধ্যায়ী নিগমানন্দ (৮৩) পুরী তাং ১৩-১২-৩৫ 2 কল্যাণবরেষু- পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য আমি প্রায় এক বৎসর পরে গত ৪ঠা চৈত্র প্রাতে পুরী আসিয়াছি। তাহার পরদিনই তােমার পত্ৰখানা পাইয়া ১২৭

ঠাকুরের চিঠি
সমস্ত সমাচার অবগত হইয়াছি। আমি এখন আর কাহা-
কেও পত্রাদি লিখি না। কিন্তু এবার সঙ্কল্প ভঙ্গ করিতে
বাধ্য হইয়া ক্ষুন্নচিত্তে এই পত্ৰখানা লিখিতেছি। শ্ৰীমন্ ...
এ পর্যন্ত আমার নিকট “পীরের” কথা কিছুই জানায় নাই,
সুতরাং আমিও তাহাকে কোন পত্রাদি না লিখিয়া আমার
কথা তােমাকেই জানাইতেছি। তুমি এই পত্র তাহাকে বা
অন্যান্য আমার সন্তানদের দেখাইতে পার।
আমি আমার যে কোন শিষ্য-ভক্তকে কোন সাধু-
মহাত্মা বা মহাপুরুষের নিকট যাইতে কখন নিষেধ করি না।
তবে বহু মত বা পথ ; সুতরাং স্বগুরুর মত বা পথ ছাড়িয়া
সহসা অন্যের মত বা পথ গ্রহণ করা মঙ্গলজনক নহে।
শাস্ত্রেই এইরূপ আদেশ আছে। কিন্তু কোন শিষ্য ভক্ত যদি
কাহাকেও আমার অপেক্ষা বড় বা ক্ষমতাশালী মনে করিয়া
আপনার মঙ্গলের জন্য তাহার মত বা পথ গ্রহণ করে,
তাহাতে আমি বিন্দুমাত্র দুঃখিত হইব না। আমার যাহ।
নাই, অন্যের নিকট কেহ যদি তাহা পাইয়া আমাকে পরি-
ত্যাগও করে, তাহাতেও আমার ক্ষুন্ন হইবার কো কারণ
নাই। কিন্তু আমি যাহাদের ভালবাসি, তাহারা উন্মার্গগামী
হইয়া স্বেচ্ছায় অমঙ্গল ডাকিয়া আনিলে দুঃখের কারণ ঘটে
সন্দেহ নাই।
যে সব সাধু সহসা কিছু দেখাইয়া রাতারাতি
সিদ্ধি করাইয়া দেয়, বিজ্ঞমাত্রেরই তাহাতে একটু সন্দেহ
হয়। বেশ ভাবিয়া চিন্তিয়। সে সব সাধুর সঙ্গ করা কর্তব্য।
১২৮

গুরু ও শিষ্য
বিশেষতঃ জ—- অঞ্চলের লােকের একটু বেশী সাবধান
হওয়াই বােধ হয় স্বাভাবিক। আর সে লোেক যদি ভিন্ন
ধর্মাবলম্বী হয়, কিন্ধা সমাজদ্রোহকর মত চালায়, তবে ত
কথাই নাই! তােমরা আমার মত জানিতে চাহিয়াছ জানিয়া
সন্তুষ্টচিত্তে আমার মতামত জানাইলাম। এক্ষণে বুঝিয়া
কাৰ্য্য করিবে ।
শ্রীমান্ :: কে আমি সৰ্ব্ববিষয়ে আদর্শ জানিয়া কিছু
দিন যাবৎ তাহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিয়াছিলাম। তাহার
উন্নতিতে তােমাদের ও তােমাদের দেশের মঙ্গল হইবে বলিয়া
বিশ্বাস ছিল। তাহার ফলে একে একে অনেকেই আমার
শিষ্য হইতেছিল। বিশেষতঃ কিছুদিন যাবৎ ••••••এর
মধ্যেও ত্যাগ, বৈরাগ্য, নিষ্ঠা, ভক্তি প্রভৃতি ধীরে ধীরে
ফুটিতেছিল, তাহাও লক্ষ্য করিয়া আসিতেছি। এবার বগুড়া
সম্মিলনীতে আসিয়া জানাইল, সে আর বাড়ী ফিরিবে না।
আমি বাড়ী থাকিয়াই সব হইবে বলিয়া অনেক বুঝাইয়া
বাড়ী পাঠাইয়া দিলাম। কিন্তু গেরুয়া পাগড়ী বা কোন
গুপ্ত নাম আমি ত দিই নাই। লিখিত পীরের সঙ্গে আমার
আধ্যাত্মিক কোন যােগ আছে বলিয়াও আমি কোন অনুভূতি
পাই নাই। এক কথায় আমি সে পীরকে চিনি না। তাহার
বিকাশশান্মুখ চিত্তকে কে কিরূপে আসিয়া দখল করিয়া বসিল
তাহাও বুঝিতে পারিতেছি না। ‘পীর’ হইতে তাহার মঙ্গল
হউক- আধ্যাত্মিক উন্নতি হউক তাহাতে দুঃখিত নই, কিন্তু

ঠাকুরের চিঠি
সে গাজা খাইয়া নেশাখোর হইয়া পড়িবে, ইহা আমি কিছু
তেই সমর্থন করিতে পারিব না। বরং প্রয়ােজন হইলে
আমিই তাহাকে ত্যাগ করিতে বাধ্য হই। তবু
তবু আদর্শ ক্ষুন্ন
হইতে দিব না।
অন্যায় ও অসত্য একদিন ধরা পড়িবেই। যদি
অন্যায় ও অসত্য পথে গিয়া থাকে, একদিন সে নিজের ভ্রম
বুঝিয়া আসিবে। কিন্তু ইহাতে তাহার ও সংঘের যে
ক্ষতি হইবে, তাহা আর কিছুতেই পূরণ হইবে না।
গাঁজাখাের নামে সাধারণের উপহাস্পদ হইবে।
প্রকৃত উন্নতিও আর কেহ বিশ্বাস করিবে না। তোমরা
পরি ত তাহাকে ফেরাও, নতুবা নিজেরা সাবধান হও।
সম্বন্ধে আমি আর কিছুই বলিতে চাই না।
আমি বৈশাখ মাসেঅক্ষয় তৃতীয়ার সময় মঠে যাইয়া
ফিরিবার সময়
হইয়া আসিব এরূপ সঙ্কল্প করিয়া-
ছিলাম, কিন্তু সম্প্রতি আমি তমলুকে প্রবল জ্বরে ও ব্রঙ্কো-
নিউমােনিয়ায় আক্রান্ত হইয়া মাসাধিক কাল শয্যাশায়ী
ছিলাম। এরূপ পীড়িত জীবনে আর হই নাই। কৰ্ম্ম আছে,
তাই আবার বাঁচিয়া উঠিলাম। এখনও দুর্বলতা আছে।
মাঝে মাঝে ডানদিকের ফুসফুসে বেদনা অনুভব করি।
এরূপ পীড়িত অবস্থায় দীর্ঘ পথ বহিয়া মঠে যাওয়া সঙ্গত
কি না বুঝিতেছি না। তবে এখনও মাসাধিক কাল সময়
আছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হইলে নিশ্চয়ই মঠে যাইব।

গুরু ও শিষ্য রামানুজতুল্য শ্রীমান্নর ভাইটী শ-র মৃত্যু সংবাদে মৰ্ম্মবেদনা অনুভব করিয়াছি। গুরুশক্তিতে তাহাকে অন্তরে সান্ত্বনা দিতে না পারিলে পত্রে লিখিয়া কোন কথা বলিতে লজ্জা হয়। তােমরা তাহাকে দেখিও। আশা ছিল ••••••এর উন্নতি দেখিয়া তােমরা আনন্দে সে সংবাদ আমাকে জ্ঞাপন করিবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তদ্বিপরীত সংবাদে হতাশ হইয়া পড়িলাম। দেশের দুরদৃষ্ট সন্দেহ নাই। যদি মঠে যাই, একবার গিয়া পীর সাহেবকে দেখিয়া চক্ষু কর্ণের তৃপ্তির বাসনা রহিল । অন্যান্য কুশল । তােমরা সকলে আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবা। প্রার্থনা করি তােমার মেয়ে-জামায়ের দাম্পত্য- জীবন ধৰ্মময় ও মধুময় হউক। শুভানুধ্যায়ী— শ্রনিগমানন্দ । * ইতি-- (৮৪) : সারস্বত মঠ ২৭২২ = স্নেহাস্পদে- পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্র ও প্রেরিত দ্রব্যাদি যথাসময়ে পাইয়াছি। দেশী ধুতিখানি সুবিধামত আশ্রমে অবস্থিতিকালীন ব্যবহার ১৩১ ঠাকুরের চিঠি করিব। তােমাদের ভক্তির দান কি আমি উপেক্ষা করিতে পারি ? আমার যে তােমরাই সব। ভক্তের জন্য আমি ভগবাকে পৰ্যন্ত ভুলিয়াছি। ভক্ত লইয়াই আমি অধ্যাত্ম জগতে সংসারী, আর তােমরা দুই ভাই যে কত কাল হইতে প্রেমে মাতিয়া আমার অনুসরণ করিতেছ, আমার সেবা ও সুখ স্বচ্ছন্দতার ব্যবস্থা করিতেছ। যোগমায়ার কৌশলে নূতন করিয়া আমার আশ্রয় লইয়াছ ও কৃপা চাহিতেছ। তােমরা ভুলিলেও আমি জানি যে তােমরা আমার চির- আপনার। এ তােমার-আমার ভাৰ মায়িক নহে, পারমার্থিক। বৎস! নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে মায়ের নাম করিয়া যাও, মায়ের কৃপা-মায়ের নাম প্রচারে জীবন-মন উৎসর্গ কর, মা মা রবে জগৎ উদ্বুদ্ধ হউক। অত্র মঙ্গল। তােমর দুই ভায়ে আমার বিজয়ার আশীৰ্বাদ গ্রহণ কর এবং অন্যান্য ভক্তকে জানাও। নূতন বই “মায়ের কৃপা” দুইখান? দুই ভায়ের জন্য পাঠাই- লাম। ইতি আশীৰ্বাদক- । তােমাদের ঠাকুর (৮৫) পুরী ৪৪৩৮ স্নেহের, যে- তােমার পত্ৰখানা যথাসময়ে পাইয়া পরম প্রীতিলাভ

গুরু ও শিষ্য
করিয়াছি।' মধ্যে আমি ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হইয়া শয্যা-
শায়ী কাতর হইয়া পড়িয়াছিলাম। উৎকট কাশী ও দুর্বলতা
কিছুদিন ছিল, এখনও একটু একটু আছে, তবে ক্রমশঃ সুস্থ
হইতেছি। এ কারণে উত্তর দিতে বিলম্ব হইল, ক্ষুন্ন হইও
। ভক্ত-শিষ্যে আনেকেই ত আমাকে “তুমি” “তােমার”
বলিয়া থাকে, তবে তােমার লেখাতেই কিছু মনে করিব
কেন? সম্ভ্রমে দূরত্ব রক্ষা করে, আর “তুমি” “তােমার”
শব্দ ঘনিষ্টতার পরিচায়ক। গুরু-শিষ্য সম্বন্ধ নিকট হইতেও
নিকটতম সম্বন্ধ ; প্রকৃত গুরু-শিষ্যশ্ৰক আত্মা, কায়া ভিন্ন
মাত্র। আবার উচ্চস্তরে উঠিলে গুরুই কায়া, শিষ্য ছায়া-
মাত্র। এইরূপে একদিন ছায়া কায়ায়, মিলাইয়া যাইবে।
সুতরাং ইহা তােমার অলীক স্বপ্ন নহে, দুরাশা বা অসম্ভবও
নয় ; ভালবাসাই এ মিলনের সেতু। আমি জানি তুমি
আমাকে কিরূপ ভালবাসিতে ; সে দিনের কোন কথাই ত
ভুলি নাই। তােমরাই যে এই সন্ন্যাসীর অন্তর্নিহিত রসকে
প্রেম-প্রীতি-ভালবাসার আকর্ষণে বাহিরে ফুটাইয়া তুলিয়া-
ছিলে, কঠিনকে সহজ বাসরস করিয়াছিলে !
তোমাদের মধ্যে অনেকেই একে একে আনন্দধামে
চলিয়া গিয়াছে, তাই আজ আবার সে রস ও আনন্দ অন্তরে
লুপ্ত। বাহিৱে কঠোর কর্মী সাজিয়া কতকগুলা বালকের
সঙ্গে কর্তব্য করিয়া যাইতেছি। সে আনন্দ আর, ব্লাহিরে
প্রকাশ হইতেছে না, সজোরে বার্ধক্য আক্রমণ করিতেছে, সে

ঠাকুরের চিঠি জীবনের সাথীদের মধ্যে তুমিই অবশিষ্ট, তাই তােমার পত্র পড়িয়া আজ যুবকের আনন্দে এত কথা লিখিয়া ফেলিলাম- নতুবা প্রাণ খুলিয়া প্রাণের কথা বলিবার অর লােক নাই, ভাব ও ভাষা সুপ্ত। বৎস! নিশ্চিন্তে নিরুদ্বেগে পূর্বের ন্যায় নির্ভর করিয়া আনন্দ সাগরে ভাসিয়া চল ; মাঝে মাঝে আবর্তে পড়িলেও নিশ্চয় জানিও তাহা কখন স্থায়ী হইবে না। একদিন আমার তােমাদের লইয়া আনন্দধামে উপনীত হইয়া নিরবছিন্ন প্রেমরস-মাধুর্যের সম্ভোগে আনন্দময় হইয়া যাইব। এখানকার অন্যান্য কুশল- শ্ৰীমতী ক্ষী ও স্নে—কে আমার স্নেহাশীৰ্বাদ দিবা। তুমি আমার প্রাণভরা আশীর্বাদ জানিবা। ইতি-~- শুভানুধ্যায়ী ঠাকুর ( ৮৬ ) হাওড়া ২২৪৯ কল্যাণবরেষু পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য আমি মধ্যে স্থলে (পাবনা) গিয়াছিলাম। গত পরশ আসিয়া পর পর তােমার দুইখানা পত্র পাইয়া সমাচার অবগত .. হইলাম। ' তুমি যাহা উপলব্ধি করিয়াছ, তাহা প্রকৃতই। তুমি সাধনপথে শ্রীগুরুর সাহায্যমাত্র স্বীকার ১৩৪

গুরু ও শিষ্য
করিতে; কিন্তু তাহার কৃপায় বিনা সাধন-ভজনেও যে ভক্ত
সত্যলাভ বা আত্মদর্শন করিতে পারে, তাহা তােমার মুখে
শুনি নাই। তাই এবার শক্তি-সঞ্চারের মাহাত্ম তােমার
নিকট প্রকাশিত হইল। এখনও সময় হয় নাই, তাই শ্বাস
বন্ধ হওয়ায় কষ্ট অনুভব করিয়াছ, নতুবা এইবারই আত্মদর্শন
হইয়া যাইত। প্রাণভরা বিশ্বাস ও আকুল আকাক্ষা লইয়া
তাপেক্ষা কর এবং যথাসাধ্য সাধন-ভজন করিতে থাক, সময়ে
আত্মদর্শন হইয়া যাইবে। বৎস! নিজকে যতই বুদ্ধিমান ও
পণ্ডিত মনে কর, কিন্তু “চাৱিকাটী” শ্রীগুরুর হাতে একথা
ভুলিও না। তাহার কৃপায় অসম্ভব সম্ভব হওয়া কিছুমাত্র
আশ্চৰ্য্য নহে।
আমি একরূপ ভাল আছি। অন্যান্যকুশল। আমার
স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবে। ইতি
শুভানুধ্যায়ী
নিগমানন্দ
(৮৭)
সারস্বত মঠ
৩০শে আষাঢ়
বহুদিন পরে তােমার পত্ৰ পাইলাম। আমি দিন দিন
‘আলসে’ হইয়া পড়িতেছি। আর চিঠিখানা লিখিতে শ্রম

ঠাকুরের চিঠি বােধ হয়, উৎসাহ নাই। আশ্রমের সেবকগণ জ্বরে ২৩ বার করিয়া ভুগিয়াছে, এখনও ২৩ জন শয্যাগত। কাজ কর্মের বড়ই বিশৃঙ্খলা। আমিও অবসন্ন। কাজেই আর কাহাকেও পত্রাদি লিখি না। নানা কারণে বাঙ্গালা যাওয়া আমার ঘটিয়া উঠিতেছে । কতকগুলি জটীল কাজ-কর্ম পড়িয়াছে, আমি উপস্থিত থাকিয়া তাহা মিটাইয়া না গেলে ভবিষ্যতে গােলযােগ হইতে পারে। কাজেই বাহির হইতে পারিতেছি না। পূজার পূৰ্বে একবার নিশ্চয়ই বাঙ্গালায় যাইব। পত্রাদি না লিখুিলে আমি ভুলিয়া গেলাম এরূপ ধারণা দুর্বলতাপ্রসূত সন্দেহ নাই। বরং চুপ মারিয়া থাকিলে তােরা সারা হৃদয়টা আরও জুড়িয়া বসি। বাহিরের অভাবেই ভিতরৈর ভাব বিকাশ হইয়া পড়ে। বিশেষতঃ বাহিরটা যে একদিম মুছে যাবে—কোন সম্বন্ধই থাকিবে না। সুতরাং এখন হইতে বাহির ছাড়িয়া ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত হও। ভিতরেই ডুবিয়া যাও। গাে——কে আমার স্নেহাশীষ জানাইও, তুমিও জানিও। অন্যান্য কুশল। ল- * ! শুভানুধ্যায়ী শ্ৰীনিগমানন্দ

বিবিধ
(৮৮)
নীলাচল কুটীর
১৪১৩১
কল্যাণবরে বু-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
কয়েক দিন পূর্বে হর এবং গতকল্য গাে- ও
তােমার পত্র পাইয়া সকল সমাচার অবগত হইলাম।
ইর পত্রের উত্তর --সে ছেলেটী যদি আশ্রমের
খরচে আশ্রমে থাকিয়া আশ্রমের কাৰ্যে জীবন উৎসর্গ না
করে, তাহাকে রাখিবার প্রয়ােজন নাই। এরূপ ভাবে
কাহাকেও রাখিবে না। তবে যদি এমন ছেলে পাও, সে
ম্যাট্রিক পাশ কিম্বা সে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়াছে, তবে
তাহাকে আশ্রমে রাখিয়া টোলে কিম্বা কোন পণ্ডিতের নিকট
পড়াইয়া আশ্রমের শিক্ষা-বিভাগােপযােগী করিয়া লইতে
পার।
হর বগুড়া থাকাই কৰ্ত্তব্য।
এতদিন পরে
জন্মস্থান হইলেও সেস্থানে মনের শান্তি হইবে না।
এখানে গুরুভাইগণ মিলিয়া মিশিয়া থাকিলে পরস্পরের
সাহচর্ষে উন্নতি অবশ্যম্ভাবী। তাহার স্ত্রীর কথাও আমি
সমর্থন করি। বাসায় আত্মীয়-স্বজন ছেলে-পেলে বেশী রাখা
কৰ্তব্য নহে। তবে খরচে কুলাইলে যথাসাধ্য তাহাদের
সাহায্য করিতে পার।
-

ঠাকুরের চিঠি গাে-র পত্রের উত্তর :—আমি অর্থনীতি ভাল বুঝি না। তবু আমার মনে হয় বাসাটা রাখিতে পারিলে ভাল হয়। তাহা মর্ডগেজ রাখিয়া অল্প সুদে একস্থানে টাকা লইয়া ঐ সকল দেনা শােধ করা কর্তব্য। আর তুমি কিছু অমিতব্যয়ী। যতদিন দেনা শােধ না হয়, ততদিন খরচ পত্র সম্বন্ধে খুব কৃপণতা পূৰ্ব্বক চলিবে। ইহা আমার আদেশ বলিয়াই জানিবে। এক্ষণে তােমার কথা তুমি যে অনুভূতি পাইয়াছ, তাহা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। কিন্তু তাহা লাভ করিবার অবস্থা বা সময় এখনও হয় নাই। তবু যে মাঝে মাঝে বা এবার যে অবস্থা আসিয়াছিল, তাহা একমাত্র তাহার কৃপা। তােমার মধ্যে ধর্মের যে সকল মিথ্যা বা অন্ধ সংস্কার আছে, তাহা দূর হইয়া যাহাতে সত্য সংস্কার এবং কৃপায় বিশ্বাস জন্মে, সেই উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে এই সকল অহেতুকী কৃপা পাই- তেছ। একদিন এমন দিন আসিবে যে, সে সত্য সকল হৃদয় জুড়িয়া প্রকাশিত হইবে। অজ্ঞান-অন্ধকার চিরদিনের জন্য বৎস! আর নিরাশ বা বিশ্বাসহীন হইও দূরে পলাইবে। । শ— আমার সঙ্গে দেখা করিয়া আসাম মঠে রওনা হয়। আমি বগুড়া আশ্রম দেখিয়া যাইতে আদেশ করিয়া- ছিলা। দেখ যেন অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট না হয়। ১৮ বিবিধ তােমার প্রবন্ধটা আমি সময় মত পড়িয়া মতামতসহ স্টারণ করিব। কিছু বিলম্ব হইবে। আমি প্রতিপদ হইতে উপবাস ব্রত আরম্ভ করিয়াছি। মাত্র সময় সময় একটু জল খাইতেছি। আগামী ১৮ই পারণ করিব অর্থাৎ অন্নাহার করিব। হাত কাঁপিতেছে, ভাল করিয়া কিছু লিখিতে পারি- লাম না। সব, প্রণিধান পূৰ্ব্বক বুঝিয়া লইও। তােমরা দিন দিন যেন আমাকে কিনিয়া ফেলিতেছ। তােমরা সকলে আমার স্নেহাশীৰ্বাদ ও প্রাণভরা ভালবাসা জানিও এবং আশ্রমবাসিদিগকে আমার আশীৰ্বাদ জানাইও। ইতি- শুভানুধ্যায়ী- এনিগমানন্দ (৯) পুরী ২১৩১ কল্যদণবরেষু— পরম শুভাশিং রাশয় সন্তু নিত্য গতকল্য তােমার ও সু-র পত্র পাইয়া অবগত হই- লাম। আমি কি উপবাস দ্বারা আত্মহত্যা করিতে বসিয়াছি যে তােমরা ভাবিয়া অস্থির হইয়াছ? আমি বিশেষ বিবেচনা করিয়াই উপবাস আরম্ভ করিয়াছিলাম। আজ ৪ দিন ভাত

আর
ঠাকুরের চিঠি
খাইতেছি। শরীর বেশ সুস্থ ও সবল আছে। আর চিন্তার
কারণ নাই।
শ, ও আর একটা ছেলেকে টোলে সংস্কৃত পড়াইবার
ব্যবস্থা করিতেছ জানিয়া সুখী হইলাম।
সু ও হ—কে বলিবা, বি— যখন কিছুতেই সুখে
আসিতেছে না, তখন তাহাকে ত্যাগ করাই কর্তব্য।
সে যখন সদ্ব্যবহারের মর্যাদা বুঝিল না, তখন তাহাকে ব্যথা
দিয়া প্রকারান্তরে ত্যাগ করা দুর্বলতার পরিচায়ক।
সুতরাং উৎসবের পর ৫াই জ্যৈষ্ঠ তাহাকে আশ্রম হইতে
চলিয়া যাইতে বলিবে,—সহজে না গেলে বলপুৰ্ব্বক বাহির
করিয়া দিবে।
স্ব-র মহােৎসবের পত্রে আছে-“আত্মার উন্নতি
কল্পে” ইত্যাদি। মহােৎসবে কি আত্মার , উন্নতি হয় ?
“আত্মার তৃপ্তির জন্য লেখা উচিত ছিল। সারস্বত মঠ ও
তাহার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যে প্রবন্ধ সু লিখিয়াছে, তাহাতে
এরূপ অসঙ্গতি অনেক আছে। অনেক উদাহরণ সুধীসম্মত
হয় নাই। ভাষারও শৰ্য্যায় রক্ষিত হয় নাই। যাহা পড়ি-
য়াছি, তাহাতেই বুঝিতেছি উহা কাটিয়া হাঁটিয়া সংশােধন
করিয়া দেওয়া এক বিরাট ব্যাপার । যাহা হউক চেষ্টা
করিতেছি।
এবার ভাদ্র মাসে যখন তােমরা রিপাের্ট বাহির
করি, তখন পরিশিষ্টে এবারকার ভক্ত-সম্মিলনীর সংক্ষিপ্ত
১৪

বিবিধ
সংবাদ দিয়া; যে মন্তব্য গৃহীত হইয়াছে অর্থাৎ যাহার এক
কপি হ—কে দিয়া আসিয়াছি, তাহা প্রকাশিত করিবে।
অন্য পত্রখানা দে-কে দিবা। অন্যান্য কুশল।
তােমরা সকলেআমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবা। ইতি-
শুভানুধ্যায়ী
শ্ৰীনিগমানন্দ
(৯০),
শান্তি আশ্রম
১১১২১
স্নেহের যো?
৪
এইমাত্র, তােমার পত্ৰখানা পাইলাম।
ইতিপূর্বে তােমার চাক্‌রীর গােলযােগ সম্বন্ধে কিছু কিছু
লিখিয়াছিল। তুমি স্বেচ্ছায় চারী ছাড়িবে কেন? সকল
বিভাগেই চাক্‌রীর সমান বিড়ম্বনা। তবে চারী ছাড়িয়া
দিলে বাঁহাদের সংসারে বিশেষ কোন অভাব হয় না, তাহাদের
চাকরী ক্ষীকার করা কখনই কর্তব্য নহে। ধীর ও স্থির
ভাবে কর্তব্য পালন করিয়া যাও, বিধাতা,যে ব্যবস্থার বিধান
করিবেন, কদাচ তাহার অন্যথা হইবে না, সুতরাং বিচলিত
হইলে চলিবে কেন ? কাহারও মন যােগাইয় চলা
কালের ধর্ম নহে, তবে তাহার ব্যবস্থা যে মঙ্গলময়ী তাহাতে
১৪১

ঠাকুরের চিঠি
সন্দেহ করিবার কারণ নাই। বিপদে-সম্পদে নাম লও,
চিত্তের একই প্রকার ভাব রক্ষা করিতে দৃঢ় হও, সর্বাবস্থায়
শরণাগত ভাবে তাহার জয় উচ্চারণ কর। বিপদ দেহীর
নিত্য সঙ্গী, মায়ার সংসারে সবই ক্ষণভঙ্গুর, কখন কোন্ দিক
দিয়া বিপদ আসিবে ঠিক নাই। জীবের সমুদ্রে শষ্যা-
সুতরাং শিশিরে অস্থির হইলে সংসার করিবে কিরূপে?
কেবল নাম লও—“আপনা হইতে গলিবে প্রাণ।
আমার স্নেহময়ী মেয়ে মন্ত্র ভুলিয়া গিয়াছে, কিম্বা
সংশয় আসিয়াছে, কিন্তু তাহা ত প্রত্যক্ষ ভাবে আর সংশাে-
ধনের উপায় দেখিতেছি না। অন্য উপায়ে সংশােধনের চেষ্টা
করিব। এক্ষণে যাহা মনে আছে তাহাই জপ করিতে বলিয়া
দিবে, নতুবা আর উপায় কি? • আমি উৎসুবান্তে একবার
উত্তরবঙ্গে যাইতে চেষ্টা করিব। সুর নাকি পিত্তশূলের
ব্যারাম হইয়াছে, সে কিছু আমায় লেখে নাই, তাহার পিতার
পত্রে জ্ঞাত হইলাম। সু- কি করিতেচ্ছে ? বৎস! আমি
তােদের লইয়া স্বেচ্ছায়-কৰ্ম্মবশে নয়-সংসার পাতাইয়াছি,
কাজেই সময়ে পত্রাদি না পাইলে এ• খেলার পুষ্টি হয় না।
অন্যান্য কুশল। তােমরা আমার আশীর্বাদ জানিও।ইতি -
শুভানুধ্যায়ী
এনিগমানন্দ
১৪২

বিবিধ
(৯১)
শান্তি আশ্রম
২৪শে ফান, ১৩২০
কল্যাণবরেষু
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
বহুদিন পরে তােমার একখানা পত্র পাইয়া অবগত
হইলাম। তােমার সাক্ষাৎ খুড়া — -কে এক পত্র লিখি-
য়ছেন, যাহাতে তােমার বিবাহে আমি অনুমতি প্রদান করি।
কেহ বিবাহ করিবে, আমি নিযেধ, করিব কেন? কাজেই
অনুমতি দিয়াছি। তুমি বালক নহ, বিশেষতঃ একবার
বিবাহ করিয়া কিছুদিন সংসারী হইয়াছিলে, সুতরাং তাহার
ইষ্টানিষ্ট সম্বন্ধে তুমি আমার অপেক্ষা অধিক অভিজ্ঞতা লাভ
করিয়াছ। নিজের দায়িক্ত জীবনের কর্তব্য—গাহঁস্থ্যের
গুরুত্ব বুঝিয়া যেরূপ স্থির করিব, তদনুসারে কাৰ্য্য করাই
পণ্ডিতের পাণ্ডিত্য। যদি বিবাহ করাই কর্তব্য বুঝ, করিয়া
ফেল; আর অকর্তব্য বুঝিলে আমার অনুরােধ পর্যন্ত উপেক্ষা
করি এ সম্বন্ধে তােমাকে আর কিছু লিখিতে পারি না।
তুমি সুংসারানভিজ্ঞ বালক হইলে, তােমার কর্তব্য নির্ধারণ
করিয়া দিতাম।
তুমি, পােষ্টকার্ডে যে প্রশ্ন করিয়াছ, তাহার উত্তর
তাহাতে দ্বাির স্থানাভাব; বিশেষতঃ ঐসকল গুরুত্বর প্রশ্নের
১৪ত

ঠাকুরের চিঠি উত্তর সংক্ষেপে দিলে তুমি ঠিক ভাব গ্রহণ না-ও করিতে পার, তাই উত্তর দিতে ক্ষান্ত থাকিলাম। সাক্ষাৎ মত বুঝাইতে চেষ্টা করিব। সম্ভবতঃ আশ্রমের উৎসবের পর আমি এক- বার ঢাকা যাইব, সে সময় ঐ সকল প্রশ্নের মীমাংসা করিয়া দিব। একটী উত্তর এই যে——নিজাকে আপনার সঙ্কীর্ণ গণ্ডীতে বাঁধিয়া পরের কাজ করা যায় না। যাহার নিজের কোন গণ্ডী নাই, সে-ই প্রকৃত পরিবারের সমাজের—দেশের সেবা করিতে পারে। আর বিবাহ করিয়া অনেক ব্যক্তি নিজের মা-বাপকেও ভাত দেয় না। বিবাহ না করিলে যে সন্ন্যাসী হইতে হইবে এমন কোন কথা নাই। লাখ লাখ টাকা উপায় করিলেও খরচের জন্য ভাবনা নাই, কারণ চারিদিকে কোটী কোটী অভাবগ্রস্ত পুত্র-কন্যা হাহাকার করিতেছে। এ সন্তান পালন ফি গার্হস্থ্য ধৰ্ম নয়? না -না নিজকে ছেলে-মেয়েতে খণ্ড খণ্ড না করিলে পালনে সুখ হয় ? তবে আত্মীয়-স্বজন বিবাহ না করিলে বিশ্বাস করেন । তাহারা ভাবেন কোন্ সময় বুঝি সন্নাসী হয়, কারণ দাম্পত্য বা বাৎসল্যরূপ দৃঢ়তর বন্ধন নাই। কাজেই তাহার মনে করেন, রমণীর কোমল করের বজ্রকঠোর বন্ধনে ঐকবার বাঁধিতে পারিলে আর যায় কোথা ? আমাদের মঙ হইয়া নাক-ফেঁড়া বলদের ন্যায় সংসার-ঘানি টানিতে থাকিবে। কিন্তু ধর্মের বন্ধনেও যে তাহা করা যায়, সে অভিজ্ঞতা সংসারীর, নাই, কাজেই প্রচলিত বন্ধনের জন্য ব্যস্ত হন ১৪৪

বিবিধ
অন্যান্য মঙ্গল।
আমার
ইত্যাদি।
আশীৰ্বাদ জানিবা।
শুভানুধ্যায়ী-
এনিগমানন্দ
পুঃ--"তুমি বিবাহ কর বা না কর, কিন্তু আমার নির্ধা-
রিত কাৰ্যে যোগদান করা তােমার কর্তব্য। বিবাহ করিলেও
তাহাতে বাধা হইবে না জানিও। তবে তুমি নির্লিপ্ত ভাবে
সংসারে থাকিতে চাও, সে হৃদয়-বল তুমিই বুঝিবা। আমি
কোন আদেশ করিলাম না।
সারস্বত মঠ
৩১৬২৩
স্নেহাস্পদেষু-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
প্রিয় ল, আমার মেয়ে ও তােমার মেয়ে ও ছেলের
সহিত আমার বিজয়ার আশীৰ্বাদ গ্রহণ কর এবং সু গাে-
ও তাদের বাসার সকলকে এবং অ— প্রভৃতিকে জানাইবে।
পত্রে অন্যান্য বিষয় যাহা লিখিয়াছ, তদুত্তরে কি
লিখিব ?, আপন চিত্ত স্বাধিকারে আনিয়া শান্তি-প্রতির
উৎস খুলিয়া ফেলার উপযােগ , সাধনা কিছুই করিতেছ না।
৪৫

ঠাকুরের চিঠি তােমাদের সাধনা—ভগবনির্ভরতা এবং অবলম্বন নাম। তবে ইহাতেও তাহার করুণা উপলব্ধি করা চাই। সময় সময় বুঝিলেও তাহা স্থায়িভাবে অনুভব করা চাই। অবশ্য করিবে বহুদিন তােমার সহিত দেখা হয় নাই। আমি সত্বরই বাঙ্গাল! দেশে যাইতেছি। বােধ হয় ৮১০ দিনের মধ্যেই সৈয়দপুর পৌছিব, পরে অন্যান্য স্থানে যাইব। এবার বগুড়া যাইবারও বাসনা আছে। অত্র মঙ্গল। সকলকে এ সংবাদ জানাবে। সৈয়দপুর পৌছিয়া পত্র দিব। ইতি-- শুভানুধ্যায়ী— শ্ৰীনিগমানন্দ (৯৩) ।। সারস্বত মঠ স্নেহাস্পদে- তােমার পত্র পাইয়া বিস্তারিত অবগত হইলাম। মা তােমার স্ত্রীকে লইয়া যে খেলা খেলিতেছেন, তাহ। উপ- নের সময় আসিয়াছে, আমিও মায়ের 'শেষ খেলা দেখিতে উদ্গ্রীব হইয়াছি। তিনি তােমাদের আদেশ দিয়াই একরূপ পরিচালিত করিতেছেন, সুতরাং তােমার স্ত্রীর ইচ্ছামতই ব্ৰত প্ৰতিষ্ঠা করা হইবে। দরিদ্র-নারায়ণের সেবা সৰ্ব্ব- সেবার সার ও শ্রেষ্ঠ, ইহা আমার প্রাণের মত, মা-ও সেইরূপ ১৪৬ বিবিধ আদেশ দিয়াছেন। কুমারীপূজাও বিহিত। অবশ্য শাস্ত্রে সকল প্রকার ব্যবস্থাই আছে ; তুমি তােমার সাধ্যা- নুসারে যথানিয়মে কার্য সম্পন্ন করিবে। মা যেরূপ আদেশ করেন, ঠিক তাহা যেন পালিত হয়। আশা আছে, মায়ের ইচ্ছায় সব মঙ্গল হইবে। আমি চট্টগ্রাম যাইবার ইচ্ছা করিয়াছিলাম, কিন্তু নানা কারণে ঘটিয়া উঠিল না। সেবকগণ ব্ৰহ্মদেশ যাইতেছে, আমি আশ্রমে না থাকিলে হইবে না। কুম্ভ দর্শনে যাইবার জন্য অনেক ভক্ত প্রার্থনা জানাইতেছে, সেজন্য মাঘ মাসেই আশ্রম ছাড়িতে হইবে। সুতরাং তৎপূৰ্ব্বে আর আশ্রম ছাড়িয়া কোথাও যাইতে পারিব না। ব্ৰত প্রতিষ্ঠার পূর্বে আমাকে জানাইও, আমি উপস্থিত হইতে পারিলাম না। চারীর গােযােগ, সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছ তজ্জন্য চিন্তার কারণ নাই। বিশ্বাস রাখিও--ভগবানের ইচ্ছা ব্যতীত মানব একপদও অগ্রসর হইতে পারে না। নির্দোষীর সহায় ভগবান্-সুতরাং তাঁহার পদে মন রাখিয়া কর্তব্য পালন করিয়া যাও, কেহ তােমার কেশ স্পর্শ করিতে পারিবে । তবু যদি বিপদ আসে, সে বিপদু সম্পদের কারণ—প্রভুর দান বলিয়া মাথায় তুলিয়া লইও। ইতি আশীৰ্বাদক- ঐনিগমানন্দ ১৪৭ ঠাকুরের চিঠি ৬৯ - - - - - (৯৪) मर ২০১০৩০ কল্যাণবরেষু— পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য তােমার পত্র পাইয়াছি, সু- ও স্বর অবস্থা জানা- ইয়া পত্র লিখিয়াছে। পূর্ণিমা পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া কিরূপ হয় তুমি বা সু— জানাই। সম্মিলনীর মধ্যে প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছিল স্ব- আগামী পূর্ণিমাতে দেহত্যাগ করিধে। আজ ৫৭ দিন যাবৎ ভক্তগণের পত্র পাইতেছি, তাহারা লিখিতেছে “বগুড়ার পত্রে জানিলাম আপনার কৃপায় স্ব- দাদা এ যাত্রা রক্ষা পাইয়া- ছেন। তিনি আরও ৪৫ বৎসর জীবিত থাকিবেন।” অনেকে কারণও জানিতে চাহিতেছে। তাই আমি বড়ই বিরক্ত হইয়া পড়িয়াছি। ভবিষ্যতে শিষ্য-ভক্ত নিজের বা স্ত্রী-পুত্রের অসুখ হইলে এই নজির দেখাইয়া বােগ আরােগ্য বা বাঁচানের জন্য কান্নাকাটা করিবে, বিলক্ষণ অশান্তি, কারণ হইবে সন্দেহ নাই। কাজেই তােমরা কাহাকেও পত্র লিখিলে সাবধানে ভাষা প্রয়ােগ করিও। সর পূর্ণিমাতে দেহত্যাগ হইবে এ কথা আমি বলি নাই। তুমি একদিন রাত্রে স্ব-র কথা বলিতে বলিতে বলিয়াছিলে, স্ব— দাদা নিজে বুঝিতে পারিয়াছে, তাহার কৰ্ম্ম শেষ হইয়াছে ; এই ১৪৮ আছে। বিবিধ পূর্ণিমাতে দেহত্যাগ হইবে। নিশ্চয় তাহা তােমার স্মরণ আমি কোনদিন বলি নাই যে ঠিক পূর্ণিমাতে তাহার দেহত্যাগ হইবে। আশ্রম ত্যাগের দিন দুই প্রহরে তােমার সাক্ষাত স্ব-র সঙ্গে কথা হয়। কিরূপে মৃত্যু হইতে পারে এবং তৎসময়ে কর্তব্য কি, সে সম্বন্ধে উপদেশ দিয়া আসি। কাজেই আমাকে কেহ কিছু জিজ্ঞাসা করিলে আমি তােমার উপর ভর দিব। কেহ পত্র লিখিলে তুমি সত্য কথা জানাবে, অর্থাৎ লিখিও-“ঠাকুর পূর্ণিমাতে দেহ- ত্যাগ হইবে বলিয়া প্রকাশ করেন নাই, এবং তাহার কৃপায় ২৪ বৎসর বাঁচিয়া গেল তাহাও জানান নাই। এ সমস্তই স্ব-র অনুভূতি।” দোহাই বাপু! অনর্থক আমার মহিমা প্রচার করিয়া আমার অশান্তি বাড়াইও না। আমি আব কখন কোন কথা বলিব না। মিথ্যা কথার ঢােল বাজাইয়া আমাকে অপদস্থ করিও না। চি-~~, গাে- আপনি আসি- য়াছিল, না স্বর, কথায় তােমরা কেহ পত্র লিখিয়াছিলে, তাহা আমি জানিতে চাই। শ্ৰীমান্ ল—র পূত্র ও প্রেরিত গুড় পাইয়াছি। আমি আর লকে পৃথক্ পত্র দিলাম না, তুমি তাহাকে সংবাদ দিবা। অত্র কুশল। তােমরা আমার আশীৰ্বাদ জানিবে । ইতি- শুভানুধ্যায়ী— শ্ৰীনিগমানন্দ ১৪৯ ঠাকুরের চিঠি ( ৯৫ ) শান্তি আশ্রম ১৪১১১৯ প্রিয় সু? ; আমি পৌষ মাসের প্রথম ভাগে আশ্রম পরিত্যাগ করিয়া নানাস্থান পৰ্যটনান্তে গত পরশ্ব দিবস সােমবার আশ্রমে পেঁৗছিয়াছি, এবং তােমার পত্র প্রাপ্তে অবগত হই- য়াছি। এ জগতে স্বার্থপরতাই একমাত্র ভীষণ নরকের সৃষ্টি করিয়াছে। স্বার্থে আঘাত লাগিলে কেহ আপনার হয় না। বৎস! একমাত্র ভগবান্ নিরপেক্ষ ; পরের জন্য—তােমার আমার জন্য ব্যাকুল। কিছুই চাহেন না। জীব তাঁহাকে ভুলিয়া স্বার্থ লইয়া ব্যস্ত ! পুত্র-কন্যা আত্মীয়-স্বজন আর বেশী কথা কি ? আশা করি তুমি তাঁহাকে কোন অবস্থায় ভুলিবে না। আশা করি শান্তি ও নিরুদ্বেগে তাহার নাম গান করিবে। অত্র মঙ্গল। মধ্যে মধ্যে পত্র লিখিও। ইতি- শুভানুধ্যায়ী ঐনিগমানন্দ বিবিধ ( ৯৬ ) শান্তি আশ্রম ৮১২১ কল্যাণবার-- প্রিয় অ-, প্রাণায়ামে তুমি অগ্রসর হইতে পারিতেছ , তাহা আমি বহু পূৰ্ব্বে বুঝিয়াছি। প্রাণায়াম দৈহিক ক্রিয়া, অথচ ১ বৎসরে তােমার দেহের কোন পরিবর্তন দেখি ৬ মাস প্রাণায়াম করিলে নূতন ভাবে শরীর গঠিত হইয়া থাকে। বিশেষতঃ তােমার চেষ্টা-যত্ন কম। নিদ্রালস্য ছাড়িতে পারি না; সৰ্ব্বদা’যােগীর ভাবে ব্যবহার কর না; চলা, বলা, বসা কিছুতেই তুমি যােগের ভাব রক্ষা কর না ; অথচ যােগী হইবার বাসনাও ছাড়িতে পারিতেছ না। আমার নিয়ম——শিষ্যের মধ্যে আত্মবুদ্ধি থাকিতে আমি তার শ্রেয়ঃ নির্দেশ করিয়া দিব না। যখন সম্পূর্ণ আমাতে নির্ভর করিবে, তখন আমি তাহার লক্ষ্য নির্বাচন করিয়া দিব। তােমার পত্রের মৰ্মে বুঝিলাম তুমি সব পথই একবার নাড়িয়া দেখিতে চাও। যােগের ন্যায় কালে তুমি বেদান্ত- শাস্ত্রেরও অনধিকারী বুঝিবে। সুতরাং সাবধান হও, সকল ছাড়িয়া ভক্তি-মার্গ অবলম্বুন কর। তঁাহার শরণাগত হইয়া তাহাতে সব সমূৰ্পণ করিয়া কেবল নাম লইতে অভ্যাস কর। একমাত্র জপ দ্বারা যােগ; জ্ঞান ও ভক্তির ফল লাভ করিতে পারিবে। যে-, সু প্রভৃতি আমােদ- --- ঠাকুরের চিঠি আহলাদের সহিত যে অনুভূতি পাইতেছে, তাহা যােগ বা বেদান্তের আলােচনায় প্রাপ্ত হওয়া সুদূরপরাহত। তুমি নিজে যখন ভিন্ন পথ নিৰ্বাচন করিয়াছ, তখনই তাহাদের হইতে সরিয়া পড়িয়াছ। সেইজন্য আশ্রমেও তাহাদের সহিত একত্র থাকার সুযােগ সুবিধা হয় নাই। যাহা হউক তুমি এক্ষণে একমাত্র জপই অবলম্বন কর। জপেও সমাধি লাভ হইয়া থাকে। যােনিমুদ্রা যােগে ঐরূপ জপ করিও। অন্য সময় মালায় জপ করিতে ইচ্ছা হইলে এক গাছি মালা সাঁথিয়া বিশ্বেশ্বরকে স্পর্শ করাইয়া লইলেই শােধন হইবে। অজপা জপ অভ্যাস করিলে মালার প্রয়ােজন নাই। বিশেষতঃ মালার মন্ত্র দীর্ঘ হওয়া প্রয়ােজন। তুলসী মালাতে হরেকৃষ্ণ প্রভৃতি তারক ব্রহ্মনাম জপই প্রকৃত ব্যবস্থা। জপের লক্ষ্য জ্ঞান বা প্রেম একটা নির্বাচন করিয়া লইও। আর সেবাকাৰ্য্য সহজ নহে। প্রকৃত ব্রাহ্মণ না হইলে কেহ সেবক হইতে পারে না। সন্ন্যাসীই প্রকৃত সেবকের আদর্শ। ব্রাহ্মণত্ব নাই বলিয়াই ব্রাহ্মণসন্তান অপরের সেবায় আত্ম- নিয়ােগ করিতে পারে না। যে ছােট, সে কি ছােটর সেবা করিতে পারে ? কাজেই জগৎ-সেবক ব্রাহ্মণ আজ সকলের সর্বনাশ করিয়া আত্ম-সেবায় মন দিয়াছে। তাই ব্রাহ্মণ আজ জগতের নিকট ঘৃণিত। সুতরাং সেবাকাৰ্য্য সহজ নহে, উচ্চাধিকারী ব্যতীত সেবাধৰ্ম্মে অন্যের অধিকার নাই। জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের একত্র "মাবেশ এবং তাহাদের পরিপুষ্টি

অভয়বাণী
হইলে তেেসবা-ধৰ্ম্মে অধিকার হয়।
সুতরাং সেবা-ধর্ম
মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। জীব: প্রথম হইতে এ
আদশ-জীবন গঠন করিয়া ইহ-পরকালে শাশ্বতী শান্তির
অধিকারী হইতে পারে। যাহা হউক তুমি যাহা স্থির করিবে
শানায় জানাইও আশ্রমের মঙ্গল। আমার আশীর্বাদ
জানিও। ইতি-
-
শুভানুধ্যায়ী-
নিগমানন্দ
(৯৭)
সারস্বত মঠ
১৭২১
স্নেহাস্পদেষু
বক্স! সম্মুখে স্নিগ্ধ আলাে বিকশিত। সে আলােতে
সুপ্রশস্ত অনেক পথ দেখিতে পাইতেছি, সুতরাং আমার ও
আমারু বলিতে যারা আছে তাদের আর জড়তার সময় নাই।
প্রতি ভাইকে হাতে ধরিয়া কঁাধে করিয়া মায়ের কোলে
তুলিয়া দিতে হইবে। রজোগুণের ধ্বংসে পৃথিবীব্যাপী
সাত্ত্বিকগুণের বিকাশ অবশ্যম্ভাবী। শ্রীগুরুর কাৰ্য্য গুরুতর
রূপে বর্ধিত হইয়া চলিল। আর অনুতাপ, অনুশােচনার সময়
নাই। কেবল মা মা মা রবে মায়ের ছেলের স্বরূপ জানাও।
-১০খ
১৫৩

ঠাকুরের চিঠি
গো— ও লর পত্র পাইয়াছি। সমষ্টিভাবে অনু-
প্রাণিত, ব্যষ্টির কথা কিছু লিখিতে পারিলাম না।
সকলকে আমার আশীৰ্ব্বাদ জানাইও। ইতি
তবে
আশীর্বাদক—
পুঃ-এইমাত্র গাে-র চিঠি পাইলাম। তাহাকে
বলিবা সে যত বােকা ও ক্ষুদ্র হউক তবু আমার সন্তান।
তবে অনুশােচনা কিসের?
(৯৮)
পুরী
তাং ২৩-১২-৩৫
কল্যাণবরেষু-
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
গতকল্য তােমার পত্র পাইয়াছি।
চঞ্চলতাই মনের
স্বভাব, প্রারব্ধানুযায়ী সময় সময় কম বেশী হয় মাত্র।
তোমরা যখন সংসারী, তখন মাঝে মাঝে বিপদ বা অশুভ
ঘটনার মধ্যে পড়িতে হইবে বৈ কি? সুতরাং সর্বপ্রকার
অবস্থার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকাই পাকা গৃহস্থের কর্তব্য।
কোন অবস্থাতেই মুহমান হইলে চলিবে না, বীরের ন্যায়
প্রস্তুত থাকিতে হইবে। রামকৃষ্ণ বলিতেন-“ছেলে বাবার
১৫৪

অভয়বাণী
হাত ধরিয়া চলিলে সঙ্কীর্ণ পথে ছেলে পড়ার সম্ভাবনা আছে,
কিন্তু বাবা ছেলের হাত ধরিয়া চলিলে আর সে ভয় থাকে
না।” বৎস! আমিও যে তােদের হাত ধরিয়াছি, সুতরাং
নিরাশ হইবার সম্ভাবনা কোথায় ? তবে জপে স্পৃহা না
থাকিলেও আমার আদেশ মনে করিয়া অভ্যাস ঠিক রাখিও,
আপনা হইতে শান্তি আসিয়া সেবা করিবে।
যে মাঝে মাঝে দুৰ্বলতা অনুভব কর, সেটা প্রারন্ধেরই
অবশ্যম্ভাবী ফল ; মূলে তােমাদের কোন ভয়ের কারণ নাই।
সে ঔষধটা প্রায় শেষ হইয়া আসিল, কিন্তু কোন
ফলই এ পর্যন্ত বুঝিতে পারিলাম না। বেদনা সমান ভাবে
আছে। একবার দার্জিলিং বেড়াইয়া আস্তি, দেখি কিরূপ
হয়। শীঘ্রই দার্জিলিং রওনা হইব। অত্র অন্যান্য কুশল।
আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবা। ইতি
শুভানুধ্যায়ী
নিগমানন্দ
(৯৯)
পুরী
১•১৩২
স্নেহাস্পদে
গতকল্য তােমায় ও অদ্য বর পত্র পাইয়া সকল
সমাচার অবগত হইয়া প্রীতি লাভ করিলাম। এতদিন আমি

* * * ঠাকুরের চিঠি তােমাদের যেরূপ ভালবাসিয়া আসিতেছি, পত্রেও, তােমাদের সেই ভাবের পরিচয় আছে। অকস্মাৎ পূর্বের রিপ্লাই কার্ড- খানা পাইয়া বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়াছিলাম। তবে পত্ৰখানা যে বর প্রাণের অভিব্যক্তি নহে, তাহা অবশ্য বুঝিতে ভুল করি নাই। কোন্ শিষ্য বিরােধী হইল, কে আমার নাম লইতে জ্বলিয়া ওঠে, এসব কথা ব-র লিখিবার প্রয়ােজন কি? বিশেষ তাহার এসব অনধিকার চর্চা। আপনার প্রতি দৃষ্টি রাখ, পরের চর্চা কেন ? বিশেষতঃ তােমাদের অধিকার বুঝিয়া তদনুরূপ উপদেশ দিয়া আসিতেছি। বার গিয়া এবং এবার ময়নামতীতে যে সব কথাবার্তা হইয়াছিল, আজিও আমার তাহা বেশ স্মরণ আছে। সহসা এরূপ পত্র লিখিবার কারণ কি ভাবিয়া পাই নাই। “কেহ কোন বিশেষ অবস্থা লাভ করিবে কি না, একদিনেই হইয়া যাইবে না কি” এরূপ ধৃষ্টতা প্রকাশ করিয়া আমাকে পত্র লিখিতে কেন, সমগ্র বাঙ্গালার কোন ভক্তের দাবী আছে কি? ভক্তগণ মধ্যে এমন ত্যাগী, বিবেকী সাধক কেহ আছে বলিয়া জানি না। বরং তাহারা সৰ্ব্বা- পেক্ষা মূঢ়, অনাচারী ও অসংযত বলিয়াই আমার ধারণা। তবে কেহ কেহ আমাকে ভালবাসে এবং আমারই দয়া-কৃপার ভিখারী। “বিষ নাই কুলাপানা চক্কর!” চিঠিখানাতেও সেই ভাবই প্রকাশ পাইয়াছে। নতুবা ভিখারীর এরূপ স্পর্ধা কেন? তােমরা ত চিঠিপত্রে এ পর্যন্ত নিজেদের ১৫৬ + + + + অভয়বাণী দৈন্যই জানাইয়া আসিয়াছ, কখনও এরূপ ঔদ্ধত্য প্রকাশ কর নাই। (চিঠিখানা পাঠাইবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু খুজিয়া পাইলাম না। যদি পাই, রাখিয়া দিব।) যাক্ চিঠিখানা যে ব বা তােমর লেখা নহে, তাহা আমি বুঝিয়াছিলাম। তবে তাহার নামের চিঠি, তাই তাহাকেই উত্তর দিতে হই- য়াছে। তােমরা প্রেমভক্তিলাভেচ্ছু অন্তরঙ্গ ভক্ত, তােমাদের দৈন্যভরা প্রত্রে আমার প্রাণ গলিয়া যাইবে, করুণার উৎস উৎসারিত হইবে, না তৎপরিবর্তে পত্রপাঠে বিরক্তিতে হৃদয় ভরিয়া গিয়াছিল। হায় রে কপাল ! তাহা আবার বর পত্রে। যা সংশয় মিটিয়াছে। আমার রূঢ় পত্রে যদি বেদনা পাইয়া থাক, তবে ভুলিয়া যাও। চিরকাল যাহা বলিয়া আসিয়াছি—আবারও বলিতেছি, যাহারা আমাকে ‘আমার’ বলিয়া আত্মসমর্পণ করিয়া শরণ লইয়াছে, তাহাদের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমিও মুক্ত হইব না। যাহারা ধৈৰ্য্য ধরিয়া অপেক্ষা করিতে পারিবে না, তাহারা আমা অপেক্ষা শক্তি সম্পন্ন গুরুর শরণ লউক, আমি বিন্দুমাত্র বিরক্ত হইব । আশীৰ্বাদ করি তােমাদের শুভ বুদ্ধি উদ্বুদ্ধ হউক, অভিমান যেন লক্ষ্যচ্যুত না করে। অত্র মঙ্গল। অন্য পত্র খানা শ্ৰীমান ঈ—কে দিবা। ইতি- শুভানুধ্যায়ী- নিগমানন্দ।

ঠাকুরের চিঠি
( ১০০ )
পুরী
২৮-১২-১৭
স্নেহাস্পদে
পরম শুভাশিষাং রাশয়ঃ সন্তু নিত্য
তােমার পত্ৰখানা যথাসময়েই পেয়েছি। তার ২৪
দিন আগেই শ্রীমান্ হ—- রওনা হইয়া গিয়াছিল, তাহার
নিকটেই এখানকার সংবাদ অবগত হইবে ভাবিয়া আর উত্তর
দিই নাই। পুরী আসিয়া অবধি " শ্বাসকষ্টটা একটু কমিয়া-
ছিল, কিন্তু পেশীতে বাতের আক্রমণ হওয়ায় দৈহিক কষ্ট,
বাড়িয়াছে। বাম হাতটী অকর্মণ্য হইয়া পড়িতেছে, কোন
দিকে ঘুরাইতে ফিরাইতে বাউৰ্দ্ধ দিকে তুলিতে পারি না।
কোন কারণে একটু ঝুঁকি লাগিলেই অসহ্য বেদনা হয়।
দেহের অন্যান্য অঙ্গেও ক্রমশঃ অনুভব করিতেছি। জানি
চিকিৎসায় ফল হবে না, তবু এটা ওটা ব্যবহার করিতেছি।
ভগ্ন স্বাস্থ্য ও রুগ্ন দেহ লইয়া বাঁচিয়া থাকা বিড়ম্বনা, 'ক্ৰমশঃ
দেহটা দুৰ্ব্বহ হইয়া উঠিতেছে। কিন্তু কোন উপায় নাই—
মালিকের ইচ্ছার উপর সব নির্ভর করিতেছে।
তােমরা সুখে আছি, আনন্দে আছ জানিলেও কতকটা তৃপ্তিতে
থাকিতে পারি। কিন্তু অপূর্ণ জগতে ব্যবহারিক পরিপূর্ণ
শান্তি কাহারও নাই। যাক—আমার দেহটা রুগ্ন হইয়া
।

অভয়বাণী
পড়িলেওঁ তােদের হাতে ধরে জোর করে নিত্যানন্দ ধামে
টেনে নিয়ে যাবার, শক্তি যথেষ্টই আছে! নিশ্চিন্তে যতটুকু
পার সংসার ভােগ করিয়া লও। তবে নির্ভরতাটুকু থাকে
অন্যান্য কুশল। তােমরা সকলে (আশ্রমী ও গৃহী)
আমার স্নেহাশীৰ্বাদ জানিও। ইতি
যেন।
শুভানুধ্যায়ী—
শ্ৰীনিগমানন্দ
কসমাপ্ত

পকুরের জিভ ( প্রথম খণ্ড । শ্রমদাচাৰ্য্য স্বামী নিগমানন্দ পরমহংসদেব কর্তৃক তদীয় শিষ্য- ভক্তগণকে লিখিত অমূল্য উপদেশপূর্ণ ১০৬ খানা চিঠির সমাবেশ। সাময়িক পত্রিকাদিতে উচ্চ প্রশংসিত। মূল্য ১০ পাচসিকা মাত্র। সম্মিলনীর চিঠি সারস্বত মঠামুষ্ঠিত ভক্ত-সম্মিলনীর ১৭শ বাষিক অধিবেশনের বিস্তৃত বিবরণ। শ্রীশ্রীঠাকুরের অজস্র উপদেশ ও অভয় আশীৰ্বাণীতে পূর্ণ। মূল্য। চারি আনা মাত্র। সারস্বত-গ্রন্থাবলী ব্রহ্মচর্য সাধন, যােগীগুরু ১০, জ্ঞানীগুরু ২৩, তান্ত্রিকগুরু ১৭, প্রেমিকগুরু ২১, মায়ের কৃপা, কুম্ভযােগ , তমালা (১ম খণ্ড) tv, তত্ত্বমালা (২য় খণ্ড) , তমালা ( খণ্ড) ৬০, সাধকাষ্টক, বেদান্ত বিবেক ॥y, শিক্ষা ১১ উপদেশ রত্নমালা •, স্তোত্র- মালা , ঠাকুরের ছবি 0,1, • আনা ও • আনা। উত্তর-বাহুল। সারস্বত আশ্রম, বগুড়া আসাম-বঙ্গীয়"সারস্বত মঠ, পোঃ কোকিলামুখ যােরহাট (আসাম)

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Thakurer Chithi Vol.2

Author
Not Available
Title
Thakurer Chithi Vol.2
File name
Thakurer Chithi Vol.2
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2010/04/28
Publisher
Haraprasad Ray, Bagura
Language
Sanskrit
Pages
176
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Letters
Keywords
Guru O Sishya
DLI number
510980
Barcode
4990010016330.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
pHvPuqEm9sx
Download PDF

Thakurer Chithi Vol.2