Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Satyabrater Pariksha Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সত্যব্রতের পরীক্ষা
( খণ্ড কাব্য )
দ্বিতীয় সংস্করণ
বৃহন্নারদীয় পুরাণ, গুরুগীতা, ব্রহ্মসংহিতা প্রভৃতি
গ্রন্থের অনুবাদক
শ্রীপূর্ণচন্দ্র সেন কর্তৃক
প্রণীত।
১৩৩৪ সন
প্রকাশক
সুরেশচন সেন বি, এল
মাণিকগঞ্জ
মূল্য আনা।
Printed at Manikganj Press.
By D. C. Banerji, Manikganj Dacca
No text on this page.
মুখবন্ধ আমার প্রথম জীবনে প্রায় ৪০ বৎসর পূর্বে “সত্যব্রতের পরীক্ষা” একবার মুদ্রিত করিয়াছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ পুস্তকখানা এরূপ খারাপ ভাবে মুদ্রিত হইয়াছিল যে তখন তাহা সাধারণের সম্মুখে উপস্থিত করিতে সাহস হইনাই। তথাপি সে সময় ঐ গ্রন্থখানা কৃতবিদ্য ব্যক্তিগণ পাঠ করিয়া বিস্তর প্রশংসা করিয়াছিলেন এবং আমাকে এই কাব্যখানা পুনরায় মুদ্রিত করিতে অনুরােধ করেন। এত দিন অর্থাভাবে মুদ্রিত করিতে পারি নাই । এইক্ষণ আমার জীবনের সন্ধ্যায় এই পুস্তকখানা পুনরায় মুদ্রিত করিলাম। এই পুস্তকখান যখন প্রথম লিখা হইয়াছিল তখন বঙ্গ সমাজ কেশবচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র প্রভৃতি মনাষিব্যক্তি- গণের ভাবে অনুপ্রাণিত ছিল। এবং এই পুস্তকখানাও সেই সময়ের ভাব-প্রণােদিত। তথাপি ইহাতে যে সমস্ত বিষয় বিবৃত করা হইয়াছে তাহা সার্বভৌমিক। বর্তমানে দেশের নূতন আদর্শে প্রণােদিত দেশবাসিগণের নিকট পুস্তকখানা আদৃত হইবে কিনা জানি না; তাই সন্দিগ্ধচিত্তে পুস্তকখানা লইয়া সুধীবর্গের সমীপে উপস্থিত হইলাম। ইতি
No text on this page.
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
প্রথম সর্গ
মঙ্গল স্বরূপ বিভু করুণা নিদান,
সময়ের প্রয়ােজন চিন্তি কোন কানে
প্রেরিলা ধরায় এক মনুজ প্রবর,
বিশেষ মঙ্গল কিছু সংবিধান তরে।
শোভিল সুরূপ তার জননীর কোলে
সরসার কোলে যথা প্রফুল্ল কলি,
পূণ্যব্রত পিতা তার বসন। যেমন
রাখিলা সয়েহে শুভ সহ্যব্রত নাম।
সতারতের পরীক্ষা।
লাবণ্যযুত গৌর তাঙ্গের বরণ,
কমল-পলাশ-অক্ষি শ্রু-গন্ধ-জ্যোতি,
মৃদুহাসি বিকশিত মুখ সুরুচির
শৈশবে মােহিল তার বান্ধব স্বজন। ৩
চতুর গম্ভীর ভাবে প্রিয় ব্যবহারে
সচরগণ সহ গামেদ কৌতুকে
সর্বজন সন্তোষিয়। চিত্ত কর্ষিয়
নিশ্চিন্তে কৈশোর তেঁহ করিলা কর্তন। ১
আইল যৌবন কাল, সামান্য মানব
যৌবনে প্রবেশে যবে, হয় পূর্ণ কাম
পায় যদি কঞ্চিৎ ধন মন যশ ;
পূরে যদি কঞ্চিত প্রণয় তিয়াস। ৫
কিন্তু তার মহাচি, মৌবন আগমে,
বাসনায় আন্দোলিত ঝড়ে সিন্ধুপ্রায়
বসুধারে গণে যেন খেলর কন্দুক
শিশুক্রিড়া হেন মানে নর চেষ্টা যত। ৬
প্রথম সর্গ
যথা লোকে হাসে খেলে করে নানা কাজ
ভ্রমেও তথায় তার না চলে চরণ
নদীকূলে পাঠাগারে অথবা বিপিনে,
একাকা বসিয়া এই চিন্তে অনুক্ষণ। ৭
“রূপ চাই, কোথা রূপ নিত্য মনোরম ?
ধন চাই, কোথা ধন অক্ষয় অব্যয় ?
যশ চাই, কোথা যশ কলঙ্ক বিহীন ?
না পৃরে এ সবে মম মন-অভিলাষ। ৮
এ জগতে যত কিছু জন স্পৃহনীয়
সকলি চঞ্চল তাহা সকলি নশ্বর,
স্থির অবিনাশী নিত্য অনন্য মহান
কি হ'ছে এহেন ? তাহা কোন স্থানে পাই।
কি আছে এ হেন তাহা কোন স্থানে পাই
ভাবিয়া চিন্তিয়া তার না পাই উদ্দেশ
দেখিলাম সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থাদি খুঁজিয়া
সবে দেখি কান্ধক'রে লােষ্ট্র নিক্ষেপিত। ১০
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
কি আছে এহেন তাহা কোন্ স্থানে পাই ?
জজ্ঞাসিমু তারে যার পণ্ডিতাভিমান,
দেখি তিনি তর্ক চক্রব্যুহের ভিতরে
হইছেন বিড়ম্বিত পথ হারাইয়া। ১১
‘ক কাছে এহেন তাহা কোন স্থানে পাই ?
জজ্ঞাসিনু লোকমান্য ধর্মোপদেশকে
• তিনি নিজে অন্ধ, অন্ধ শিষ্য সবে
লিছেন শুঙ্গ পত্রে মরুত যেমতি।” ১২
হেনরূপ ভাবনায় সত্যব্রত ধার,
ছাড়িলা আহার নিদ্রা আমোদ প্রমে:ছ ;
চন্তামগ্ন সংজ্ঞা শূন্য বিষঃ মানসে
সেখানে সেখানে বসি কাটে দিবানিশি। ১৩
এইরূপ একদিন চিন্তার সাগরে
নিমগ্ন চেতস যুবা, দেহ চেষ্টাহীন ;
নিশ্চেষ্টা প্রকৃতি যথা গভীর নিশীথে
প্রগাঢ় গম্ভীর ভাবে হয় নিমজ্জিত। ১১
S
প্রথম সর্গ।
সে নিশীথ কালে যথা মৃদু বংশীধ্বনি
অপঘুমে কর্ণ পথে প্রবেশে মরমে,
তেমতি পশিল তার হৃদয় কন্দরে
স্বরগ মধুর এক ধ্বনি সুললিত। ১৫
বগা নিরুদ্দেশ-জন-সংবাদ-বাহাকে
ব্য গ্রমনে শুনে যত তার প্রিয়জন,
তেমতি উৎকণ্ঠা যুত একাগ্র মানসে
কর্ণিল সত্যব্রত সে মধুর বাণী । ১৬
শুনিলা “কেন হে যুবা হেন ম্রিয়মান ?
অম্বেষ আপন চিত্ত নির্জনে যাইয়া
বাঞ্ছিতের প্রতিকৃতি তথা প্রতিভাত
সমুদ্রের বক্ষে যথা তানন্ত আকাশ।” ১৭
“স্বপ্ন নহে নহে এই মানস বিভ্রম
এরূপ সজাগ আমি জাগ্রতেও নহি
অবশ্য দেবতা মেরে হইয়া সদয়
কহিল হিতার্থে এই উপদেশ বাণী। ১৮
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
অতএব যাই আমি নিবিড় নির্জনে
ভোগ লিপা যথা নাহি বিলয় চিত,
দেখিব প্রশান্ত মনে কিবা সে প্রতিভ।
দেখি নাই তবু যায় অকর্ষিছে মন"। ১
এত চিন্তুি সঙ্কল্পের সুদৃঢ় বন্ধনে
সাফি মানস নিজ, কটিবন্ধে যথা
বঁধে কটিতট যোদ্ধা যুদ্ধের প্রাক্কালে ,
রহিলা সংকল্প করি চাহি অবসর। ২৪
একা যামিনী যোগে নিদ্রার প্রস্থ
অচেতন জীবকুল জড় বস্তু প্রায়
নিস্তব্ধ প্রকৃতি যেন ধ্যানে নিমজ্জিত
জাগে মাত্র সত্যব্রত আকুল অন্তরে।।
এই ত সময় ভাৰি নিঃশব্দে উঠিয়া
নিঃশব্দে গৃহের দ্বর করি উন্মােচন
বহিরা, দ্রুতপদে চলিলা ধার,
বঁধ ভাঙ্গি চুলে যথা রবেগে না।
প্রথম সর্গ।
প্রভাতে না হেরি তারে আত্মীয় স্বজন
ব্যস্ত মনে চারিদিকে নিম্ফলে খুজিয়া
নিবৰ্ত্তিল। একে একে বিষাদে বিলাপি
পূরিল দারুণ শোক সবাকার মন। ২৩
৬।
কিন্তু তার চিত্ত ব্যস্ত নহে। অাশয়ে
তা। পর শোক দুঃখ কিছু নাই জ্ঞান ;
উদ্ভান্ত পথিক প্রায় ভ্রমি দেশে ঔদশে
উত্তরিলা হিমালয় শৈলেন্দ শিখরে। ২৪
হিমালয়, ঈশ্বর বিগ্রহ ধরাধামে
মহান অন ক য় গাম্ভির্য্য ব্যঞ্জক,
ঈশ ধ্যানে উদে দে যে ভার প্রগাঢ়
ইহার দর্শনে পাই তার প্রতিরূপ। ২৫
এই হেতু যােগেশ্বর ইহার শিখরে
নিয়ত নিমগ্ন ছিল। স্বানুভব সুখে ;
ই
হেতু
নিবসিত হেথা ঋষিগণ ;
এই হেতু সত্যব্রত অইন্না এখানে। ২৬
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
উচ্চ চূড়ে, হিংস্র জন্তু-ঝটিকা-তাণ্ডব
না উঠে যেখানে, যথা চিন্তা অনুক
নিশীথ নারব-শান্ত-নিশ্চল প্রকৃতি
নিৰ্ম্মল নভস যথা উর্দ্ধে সদা ভাতে। ১৭
••
হেন চূড়া শিলাতলে পদ্মাসনে বসি,
ছাড়িলা সুদীর্ঘ শ্বাস আনন্দ পূরিত,
অনন্ত আকাশ পানে চাহিতে চাহিতে
পুরিল হৃদয় তার অনন্তের ভাবে। ২৮
অনন্ত আকাশ, স্থির-নিশ্চল আকাশ
দেখেছ কি হে মানৰ স্থির মনে চেয়ে
কি ভাতি বিভাতে তায় ফুরে কোন ভাৰ
কি গীতি হিল্লোল তায় বহিছে মধুর ! ২.
তার মন সমুন্নত বা সেই স্থান ;
তার মন শান্ত যথ। সে আকাশ;
আকাশের প্রাণ তার প্রাণ পরশিল ;
সে নিগুঢ় গানে আর মাতিল শ্রবণ। ৩০
;
প্রথম সর্গ।
ভুলিলা শরীর ধীর, ভুলিল আপনা ;
ঝির ঝির ঝির দেহে বহিল তড়িৎ ;
গভীর আগ্রহে আর একতান মনে
স্বভাবের সুগভীর সে গীতি শুনিলা। ১
শুনিলা “এই যে কান্ত অনন্ত অসীম
আকার আমার, নহে এ প্রকৃত রূপ,
আমি ছায়া, নহি আমি অনন্ত মহান্ ;
অনন্ত মহান্ তিনি, আমি যাঁর ছায়া। ৩২
তার রূপে সুশােভিত এই মম দেহ,
তাহারি আনন্দে ফুল্ল আমারি এ প্রাণ ;
সাহসিত হয়ে তার বিপুল উৎসাহে
চলেছি অনন্ত পথে আমি অবিরাম। ৩৩
ওহে জীব! নিষ্কপটে মাের প্রাণে প্রাণ
দেও মিলাইয়া, ধর মাের সনে তান,
সমস্বরে বিঘােষিয়া তাঁহার মহিমা
এস, জীব, এস লভি পুরুষার্থ সীমা” }
৯
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
অনাহত এই গান উঠে সৰ্বদিশে,
সুদূর গগনে আর সমুদ্র কল্লোলে,
উচ্চ গিরি-চূড়ে আর গভীর করে ;
শুনে' সেই, দিব্য কর্ণ প্রবোধিত যার। ৩৫
স্বভাব গম্ভীর ধ্বনি শুনিতে শুনিতে,
অনন্তের ছায়া তায় হেরিতে হেরিতে,
অগাধ গন্তীর আর অনন্ত বিস্তার
ভাবেতে হইল পূর্ণ হৃদয় তাহার । ৩৬
এ ভাব সাগর পানে মানস-নয়নে
রহিলা সুধীর চেয়ে স্থির অনিমেষ,
এ হেন সময়ে অহাে ! সে নয়ন পথে
কোন একজন যেন হইলা পথিক। ৩৭
ভ্ৰমিলা যাঁহার তরে দেশ দেশান্তর
তেঁহ যেন হৃদাগারে আপনা প্রকাশি
"এই আমি, হের হেথা, নহি কভু দূরে,
এই কথামৃত যেন আভাসে ভাসিলা। ৩৮
১০
প্রথম সর্গ।
অচিন্ত্য অবাচ্য রূপ, সস্নেহ মহিমা
বিভাতে বিভায় তঁার, মুর্তি অপরূপ,
যুগপৎ ভক্তি-ভয় প্রেম উদ্দীপক ;
রহিলা চাহিয়া ধীর নিশ্চল নয়নে। ৩৯
অলক্ষিতে ক্রমে ক্রমে সে কান্ত মূরতি
হইল বিলয়, যেন আকাশের পটে,
ইন্দ্রধনু প্রকাশিয়া ক্ৰমে হয় লয় ম;
সুপ্তোত্থিত প্রায় যুব মেলিলা নয়ন। ৪০
মেলিলা নয়ন, স্কুল নির্জীব নিস্তেজ
এ জড় জগৎ তার বাধিল নয়নে ;
উড়িয়া ভ্রমিতেছিলা মুক্ত মনােবব্যামে,
জড়ের দেউল যেন সে গহি রােধিল। ৪১
কিছু ক্ষুন্ন হয়ে ধৈৰ্য্য বাঁধিয়া হৃদয়
সুধীর সুদৃঢ় চিত্ত সমুৎসুক মনে,
গবেষণা তুলাদণ্ডে তুলিলা যতনে
প্রকৃতি আদরে তারে দিল যেই ধন! ৪২
১১
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
দেখিলা নশ্বর এই চঞ্চল জগৎ
নহে সৎ, বটে মাত্র ভান, সৎ যিনি,
অচল অটল ভাবে এর অভ্যন্তরে,
দেহেতে চৈতন্য প্রায়, করেন বিরাজ। ৪৩
দেহ পানে চাহি যথা দেহী অনুভূত
সেই মত বিশ্বপানে একাগ্র মানসে
চাহে যেই, তারি কাছে সেই জগৎ প্রাণ
অাপন মোহন রূপ করেন প্রকাশ। ৪১
০
তার ভাব সর্বজন চিত্ত বিমােহন;
তঁাহাতে ভাবিত বলি এ বিশ্ব
সুন্দর
বিশ্বের মােহন রূপে আকৃষ্ট মানব
সুখ আশে ব্যগ্র মনে চাহে তঁার পানে। ৪৫
তামনি সে বিশ্বপ্রাণ বিশমধ্য দিয়।
প্রকাশিয়া, বরষিয়া করুণ অমিয়া,
করেন ব্যাকুল জনে শান্ত সুশীতল ;
তৃতি চাতকে যথা ধন দেয় জল। ৪৬
১২
প্রথম সর্গ।
আহা রে মানবে করে কতটুকু আশা।
কতটা বা ইচ্ছা তায় করয়ে চঞ্চল ?
অনন্ত আকাঙক্ষাময়ী এই যে প্রকৃতি
নহেন কি পূর্ণ ইনি তাঁর কৃপাবলে ?৪৭
এই কৃপাময় আজি” ভাবিল সুধীর,
“পৃরিলা আমার মন ভাবামৃত দানে ,
পাইব কি তঁারে পুনঃ ? কেননা পাইব ?
তিনিও যেহেতু বাঞ্ছা করেন আমায় ।৪৮
নতুবা জগত রূপ, আমার হৃত্তাপ
কি হেতু ? কি হেতু সেই রূপ দেখাইয়া
মোহিলা আমার মন ! কি হেতু বা ভবে
কিছু না করল মম আকাঙক্ষা সমান ?৪৯
এমন দয়াল তিনি : কেন ভ্রান্ত জাব
তাকে ছাড়ি দহে জ্বলি সংসার অনলে ?
দেখিব বষিয়া তার চরিত অমিয়
পারি কিনা শীতলিতে তা সবার হিয়া ॥৫০
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
কিন্তু আগে সাধনায় আত্ম বিশোধিয়া,
লভিয়া সামর্থ্য কাৰ্য-সাধন-সমর্থ
নামিব করম ক্ষেত্রে হৃদে ধরি তঁায়
অনুষ্ঠিতে মনুজের কল্যাণ সাধন । ৫১
নির্দেশিয়া সাধ্য নিজ, সাধনার তরে
শান্ত সমাহিত চিত্তে ধেয়ানে আবার
নিমজ্জিল, আবার দেখিলা সেই রূপ
মেহ মধুময় শান্ত গম্ভীর উজ্জ্বল। ৫২
C
খরস্রোতা নদী যথা সাগর সঙ্গমে
নিবিড় নিশ্চল শান্ত পরিতৃপ্ত প্রাণ ,
সেই ভাবে এই রূপ ধরিয়া হৃদয়ে
রহিলা নিশ্চল চিত্ত ধীর সত্যব্রত। ৫৩
১৪
“সত্যব্রতের পরীক্ষা”
দ্বিতীয় সর্গ
দৃশ্যমান জগতের অভ্যন্তর দেশে
বিরাজে জগত অন্য আধ্যাত্ম আখ্যান,
গৃঢ় গতিবিধি তার গৃঢ় তার ভাতি,
অন্যবিধ চক্ষু চাই দেখিতে তাহায়। ১
রাজে তার উৰ্দ্ধদেশে এক রম্য পুরা,
সকলি সুন্দর তথা সকলি নিৰ্ম্মল ।
অলৌকিক শােভা তার করে পরাভব
কবির লেখনী আর চিত্র তুলিকা। ২
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
: নাহি তথা রােগ শােক দুঃখ দুর্বলতা,
নাহি তথা রাগ দ্বেষ মৎস্য হিংসন,
অহিত অসুখকারী যত জীবদ্রোহী,
এত উর্ধ্বে উঠে কারাে নাহিক শকতি ,
অশিক্ষিত স্বতঃসিদ্ধ তথা তত্ত্বজ্ঞান,
উচ্চ ভাৰচয় তথা সহজে প্রল,
তেজোযুত শান্তি তথা অক্রোধ উৎস।
নাহি দ্বন্দ্ব হিতে সুখে,শ্রেয়ে তার পেয়ে
প্রস্ফুটিত আধ্যাত্মিক ভাব সমুচ্চয়ে
সাদা সমুজ্জ্বল এই ত্রিদিব নিলয় ;
বিহরে এখানে নিত্য দীপ্ত দেবগণ ;
প্রদীপ্ত এ স্থান সদা মধ্যাহ্ন সদৃশ ৫
দেবগণ প্রাণ, মন মগ্ন দেবদেৰে
বহিরঙ্কে সবে ব্যস্ত জীবের মলে ;
যত শুভ তত দেৰ অধিষ্ঠাতৃ রূপে
সাধেন জীবের শুভ অখিল জগতে। ১.
দ্বিতীয় সর্গ।
ঊর্ধস্রোতা ঈশ-প্রেম মন্দাকিনী জলে
যে কেন না দেয় ছাড়ি জীবন তরনী,
অন্তিমে লাগিবে আসি ত্রিদিবের ঘাটে ;
অহহ! মম ভাগ্যে ইহা কভু কি ঘটিবে '৭
এই দিব্যধাম হ’তে দূর নিম্নদেশে,
আধ্যাত্ম জগত অন্য সীমান্ত ব্যাপিয়া
আছে আর এক স্থান মহা ভয়ঙ্কর,
আঁধারিয়া চতুর্দিক গভীর তামসে। ৮
সৰ তথা বিপরীত বিকৃত স্বভাব,
“মলিন, বীভৎস দৃশ্য, ঘৃণ্য কদাকার ;
যেন বা বীভৎস ভয় পূর্ণ প্রকটিতে
বিরচিলা আদি কবি বিরিঞ্চি এ দেশ। ৯
জ্ঞান ভাব আদি দিব্য জ্যোতিষ্ক মণ্ডল।
কভুনা বিকাশে কর এ ভীষণ পুরে ;
দূর পরাহত হেথা শান্তির নিরাগ,
নির্মল আনন্দরূপ স্নিগ্ধ সমীরণ।১০
১৭
গ
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
অজ্ঞান তিমির মোহ ঘোর ঘনঘটা,
নিয়ত আচ্ছন্ন করে রেখেছে আকাশ;
প্রমত্ত ইন্দ্রিয় বায়ু ঝটিকা তুলিয়।
করিতেছে এই দেশ নিত্য উপপুত।১১
গাঢ়তর করি এই গাঢ় অন্ধতম
গাঢ় কাল কলেবর প্রগাঢ় তামসে
মূর্তিমান জাবলােক অশুভ স্বরূপে
বিহরে নিয়ত হেথা ভূত দৈত্যচয়। ১২
০
যথা বিভীষণ দেশ তথা দেশবাসা,
বিকট করল মূর্তি প্রচণ্ড দুর্বার,
কল্পনা জল্পনা কাৰ্য জগত অশুত ;
অশুভ বিস্তারি এরা ভ্রমে বিশ্বধাম। ১৩
ঝড়বৃষ্টিবিতাড়িত অমাবস্যা নিশি
সিংহ ব্যাঘ্ৰ অজগর পূরিত গহনে
যেই ভাব, সেই ভাব নিত্যস্থায়ী ভাব,
প্রেতের নিবাস এই ভাষণ রৌরবে। ১৪
১৮
দ্বিতীয় সর্গ ।
নিশীথ হইতে কাল মধ্যাহ্নে উৎ:ক্রমে,
মনোহর উষা রূপ ধরে মধ্যে যথা ;
বিষম রৌরব হ’তে ত্রিদিবে উঠিতে,
পাই এক রম্য স্থান মনুষ্যত্ব তথ। ১৫
প্রভাতে যেমতি আলো তামস মিশ্রিত,
মানুষে তেমতি মিশ্র জ্ঞান অগেয়ান ;
সুখ দুঃখ, পাপ পুণ্য, কুমতি সুমতি,
শমিত খৰ্য সবে পরস্পর যোগে।১৬
মনুষ্যত্ব স্বরগ নরক প্রান্তদেশ
তাই নিত্য দ্বন্দ্ব হেথা দেবতা দনুজে
কভু বা দেবের জয় দৈত্য সিমদ্দি,
কভু দৈত্য পরাক্রমে ক্ষোভিত দেবতা।১৭
শুভময় দেবগণ প্রবল যে কালে
পূরেণ এ দেশ তঁারা সরগীয় ভাবে ;
যখন নারকী তেজ শাসে দেচয়ে,
নারকীয় জঘন্যতা পরে এই স্থান। ১৮
১৯
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
কিন্তু অমঙ্গল নহে সৃষ্টির উদ্দেশ্য,
বর্ধিতে মঙ্গল শুধু আসে অমঙ্গল ;
আসুরি দৌরাত্মে ক্ষুন্ন জীবগণ যবে
প্রতিকার হেতু ধাতা করেন উপায় । ১৯
কালক্রমে নরলােকে অসুর পীড়ণে
হইলা বিচ্যুত স্বত্ব দেবগণ যত
নরকের গাঢ়তম, গাঢ় মলিনতা,
মানব প্রকৃতি ঢাকি আচ্ছন্ন করিল! ২৩
চিন্তিয়া বিধাতা তবে করিলা সৃজন
দেবভাব পরিপূর্ণ দৈব শক্তিধর,
মানব আকারধারী একটী পুরুষ ;
পুনরায় স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিতে ভবে। ২১
এই সে পুরুষ এই, হিমালয় চূড়ে
ধ্যানমগ্ন সত্যব্রত নিস্পন্দ শরীর
বিধাতার অভিপিত সাধনের তরে
ভুবায়েছে মন প্রাণ সাধনা সাগরে। ২২
দ্বিতীয় সর্গ।
দিবা নাই, রাত্রি নাই, নাহি ক্ষুধা তৃষা,
নাহি জ্ঞান, এ জগত আছে কি নাই
মহান্ পুরুষ এই, এখানে, আমাতে,
সুধু এই বােধে মাত্র ব্যাপ্ত তার মন। ২৩
তাহার সাধনা হেরি দেবতা মণ্ডলী
পূরিলা ত্রিদিব ধাম ধন্য ধন্য রবে;
ভাবিলা অসুরগ্রস্ত মনুষ্যত্ব পুরে
ইহা অবলম্বি পুনঃ লভিব আশ্রয়। ২৪
অসুরেরা ত্রস্তচিত্ত নরক প্রদেশে
ভৰিল, “যে দেখি এর তেজ ভয়ঙ্কর
বুঝি বা আয়াসলব্ধ নব রাজ্য পুনঃ
অচিরে অদৃষ্ট বশে এ হ'তে হারাই”।২৫
বলে সবে “এস দেখি কৌশল করিয়া
পারি কিনা এ পুরুষে ছলে প্রতারিতে
তবে সে অক্ষুন্ন থাকে মােদের প্রতাপ
সুখ-সেব্য মানুষের চিত্ত অধিকারে”। ২৬
২১
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
কিন্তু দেখি সবে তার জ্বলন্ত প্রভাব
সংকল্প সাধনে কেহ নহে অগ্রসর
“তুমি যাও তুমি যাও” বলে পরস্পরে ;
মাজ্জারে বাঁধিতে যথা মূষিক মণ্ডলে।২৭
কতক্ষণে বিলাসিনী নামেতে প্রেতিনী
প্রগষ্ঠ অধীরা ধৃষ্টা ঘাের কুহকিনী,
উঠিয়া বলিলা সবে “কেন চিন্ত এত ?
কিবা কাজ বল ছলা সামান্য মানবে ? ২৮
মাের ছলে ধা ধায় তনয়ার পাছে
ইন্দ্র হয় ছাগু মুস্ক, মৃগাঙ্ক চন্দ্রমা,
বিশ্বামিত্র আদি কত তেজস্বী তাপস
লভেছে কি গতি জান মোর ফাঁদে পড়ি?২৯
কোন্ ছার এই নর ? ইহারে ছলিতে
এত কি ভাবনা ? কেন এত গবেষণা ?
গুটী দুই মৃদু ভাষ এটুকু হাসি
একটী কটাক্ষে একে ভুলাব এখনি।”৩০
२२
দ্বিতীয় সর্গ।
“বেশ কথা যোগ্য তুমি এ কাৰ্য্য সাধনে
তােমার কুহক জাল খ্যাত চরাচর ;
বেন্ধেছ যাহায় কত গর্বিত মানবে ;
সাও তুমি" একবাক্যে সবে নিদেশিলা ।৩১
সত্যব্রতের পরীক্ষা
(+)
তৃতীয় সর্গ
ধরণী বিলাসবতী বসন্ত আগমে
সাজিলা পল্লব বেশে পুষ্প আভরণে ;
আচল দুলিয়া মৃদু সমীর তুলিয়া
নাচিতে লাগিলা ধনী সুতানে গাইয়া। ১
তার হাবভাব তার গায়ন নৰ্ত্তনে
আনন্দে দোলিত মৃদু জগজ্জন মন ;
অনুকুল কাল এই, ভাবি মনে মনে
চলিলা বিলাসবতী হেলিয়া দুলিয়া। ২
২৪
তৃতীয় সর্গ।
চলিলা বিলাসবতী হেলিয়া দুলিয়া,
উদ্দীপিয়া আশাবহ্নি সঙ্গিগণ মনে ;
কোন ছলে মােহিব এ মনুজশাৰ্দলে,
অবিরত এই কথা ভাবি মনে মনে। ৩
ভাবিলা :-
খেলে যথা মৃদু মৃদু সুরভি পবন,
থাকি থাকি পিক করে মধুর নিক্কণ ;
এ হেন বিজন দেশে রম্য উপবনে
বিরাজিত সুসজ্জিত প্রমােদ ভবনে। ৪
চন্দ্ৰমাশালিনা রমা বাসন্তী নিশায়
বকুল সুচতুরা বিলাস কলায়
নাচিয়া নাচিয়া মন নাচায়ে নাচায়ে
সুরায় সঙ্গীত মদে মাহিয়া মাতায়ে। ৫
নারিবে কি নারিবে কি বশিতে ইহায় ?
পরিবে, পারিবে, কিন্তু এক অন্তরায় ;
নিবৃত্তি পাপিনা এর বেন্ধেছে হৃদয়,
সে বাঁধ শিথিল করা সহজ ত নয়। ৬
च
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
না হোক সহজ, মম মােহন ছলনে,
ভোলে কে আছে হেন এ মর ভুবনে ?
জগৎ আমার বশ, এই ছার নর,
এত কি শকতি ধরে হবে স্বতন্তর। ৭
দেখি একে মহাতেজা উদ্ধত প্রকৃতি
মােহিতে ইহারে যােগ্যা মুগধা যুবতী,
তাই দেখি বিচলিতে এ তাপস হিয়া
পারি কিনা মৃদু মুগ্ধা মধুরা সাজিয়া। ৮
এত চিন্তি মায়াবিনী সাজিল মােহিনী
নবীনা যােড়শী বালা ব্ৰীড়ানম্ৰাননা
বাড়াইয়া রূপ শোভা সুরুচির বেশে
সত্যব্রত পানে চাহি রহিল দাড়ায়ে। ৯
কতক্ষণে সত্যব্রত উপ-শ্রান্ত-মন
চাহিলা নিশ্চল দৃষ্টি স্বপনে যেমতি
চাহে শিশু সংজ্ঞাহীন জননীর কোলে ;
মায়াময়ী মূর্তি তার ভাতিল নয়নে। ১০
তৃতীয় সর্গ।
নয়নে নয়ন পাতে কুট কুহকিনী
‘সলজ্জ রক্তিমরাগে রঞ্জিয়া কপোল
স্নিগ্ধ কান্তি চক্ষু মুখ করি অবনত
পদ-বৃদ্ধাঙ্গুলে ক্ষিতি লাগিল। ক্ষোদিতে। ১১
হেরি তায় চমকিলা তপ-শান্ত-মনা
বিচলিল নিবিচল হৃদয় তাহার ;
নিৰাত তরাগ যথা লােষ্ট্র নিক্ষেপণে;
সুপিলাকে তুমি? কেন এখানে আগত?'১২
উত্তরিল! নম্রমুখী গৰ্ধস্ফুট স্বরে
পুনঃ পুনঃ তৃষাযুত কটাক্ষ নিক্ষেপি
“এই শৈল অধিপতি গন্ধর্ববঈশ্বর
তাহার কুমারী আমি তার গৃহে বসি। ১৩
বাসন্তি মলয়ানিল কুসুম সুরভি
সেবন মানসে আমি ফিরি বনে বনে
হো হেথা অপরূপ মনােহর রূপ
বিস্ময়ে এসেছি হেথা, কে বট, জানিতে।” ১৯
२१
সত্যব্রহের পরীক্ষা।
এত বলি কৈতবিনা রহিলা নীরবে
অন-বিলাস-স্নিগ্ধ-রূপ বিকাশিয়া
সুরভি পবনে, খর কোকিল নিকণে,
করিল সেরূপ আরাে স্পাহনীয়তর । ১৭
ঠিক যেন হৈমবতী হরে বিমােহিতে
দাড়াইলা সৌন্দর্যের পূর্ণতা সাজিয়া
কে আছে ভুবনে হেন বশী মহাজন
ওরূপ দর্শনে যার না টলে মানস। ১৬
তুপ-ম-ম কত তাপস মাত
হয়েছে নিবদ্ধ হেন রূপ-ফাদে পড়ি।
খেলেছে শৃগাল প্রায় হেন যাদুবংশে
ওজস্বীতা দীপ্ত কত পুরুষশাল। ১৭
কিন্তু সদা চিত্ত-গত-চক্ষু সত্যব্রত
দৃঢ়তার বঁাধ যেই হেরিলা শিথিল
অমনি মুদিলা নেত্র স্মরিয়া ঈশ্বর
তবু সেই রূপ ভাতি মৰ্ম্মে প্রবেশিল । ১৮
২৮
তৃতীয় সর্গ
কি বিষম, হে রমণ! হৃদয় ঈশ্বর
তোমার পবিত্র ধাম হের কলঙ্কিত
বলিতে বলিতে ধার নিমজ্জিলা পুনঃ
অগাধ অতলস্পর্শ ধেয়ান-অর্ণবে। ১৯
কোথা র’ল বিলাসিনী মায়িক চাতুরী
চকোরে কি ভুলাইবে ক্ষুদ্র খদ্যোতিকা ?
অথবা সরমা কামকলা বিস্তারিয়া
আকর্ষিবে পশুরাজ সিংহের মানস ? ২০
বুঝিল। প্রেতিনী হ’ল ছিন্ন মায়াজাল
রূপের কুহকে কভু নহিবে এ বশ
ইহা ভিন্ন নাই তার তান্য কোন বা
তথাপি ভাবিল দেখি পুনশ্চ চেম্বিয়া। ২১
এদিকে কঠোর তপা প্রগাঢ় ধেয়ানে
জগতের প্রাণে প্রাণ দিল মিলাইয়া
ভাবে ভাব জ্ঞানে জ্ঞান বাসনা বাসনে
অহো ধন্য সত্যব্রত হেন সম্মিলনে। ২২
২৯
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
এই যােগবলে ধর জানিলা সহজে
গম্যপথে বহু বিঘ্ন, এও অন্যতর,
অন্যে অন্যে ক্রমে ক্রমে উদিবে সকলে
নাহি রক্ষা সতর্কতা চক্ষু নিমিলিলে। ২ ৩
প্রশিলে শিশুজনে ছল বিভাষিক
ভয়াকুল ননে বায় জননী উৎসঙ্গে
সেই তার দুর্গাশ্রয়ে হইয়া নির্ভর
ভয় প্রদর্শক পানে চাহে সগরনে। ১৮
সেইমত এ তপস্বী ভয় বিমুঞ্চিত
বিশ্বশ্রয় সমাশ্রয়ে বলিষ্ঠ মানসে
হেরিলা মেলিয়া আঁখি দুটা প্রেতিনার
নির্বিষ সাপিনী হেন নিষ্প্রভ মলিন। ২৫
বলিলা “চিনেছি তােমা বৃথা চেষ্টা তব
মে পরে তব শক্তি নিতান্ত দুর্বল
নমে কি খৰ্জ্জুর বৃক্ষ লতিকাকর্ষণে ?
বন্ধ কি পাষাণ বক্ষ কুসুমের শরে ?” ২৬
তৃতীয় সর্গ।
০
ভূমে
বিলাসিনা :
চিন নাই তুমি মােরে কহিনু নিশ্চয়
তােমার অহিত নহে মম অভিপ্রায়
সংসারে সন্তাপে দগ্ধ মানব নিচয়ে
শীতলিতে আমি করি বিচরণ। ২৭
অর্থ চেষ্টা, জ্ঞান চর্চা, বিশুদ্ধ বিষয়ে,
মজিয়া মানব মন শুষ্ক মরু প্রায়
প্রেমের শীতল বারি করিয়া সিঞ্চন
করি আমি তা সবারে সরসতা দান। ২৮
পৃথিবীতে আছে যত সুখের আস্পদ
ধুর মনােজ্ঞ আর জন মনোহর
আমার বিলাস লীলা সেই সমুদয়
সুখ বিতরিয়া আমি বিহার জগত। ২৯
সত্যব্রত
রূপের ছলনা ছাড়ি বাক্যের ছলনে
বৃথা চাও মায়াবিনি! মােরে প্রলােভিতে
তব উপাসক যত লম্পট মাতাল
জানি নাকি সে সবার ঘোর পরিণাম ? ৩০
৩১
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
রূপজাত মোহে ভুলি ক্ষণিক বিলাসে
মজিয়া অবােধ জন হয়ে আত্মহারা
ভোগে শেষে এ জীবনে দুর্গতির শেষ
দারিদ্র্য বেয়াধি তাপ অকাল মরণ। ৩১
সুখ তুমি পাবে কোথা ? দিবে বা কেমনে
জানি তত্ত্ব তব, তুমি মােহ মূর্তিমতী,
হব পথ অনুসরি বিভ্রান্ত মানব
প্রেম ভ্রমে ধেয়ে মরে মােহ মরীচিতে। ৩২
অােতঃ মুখের লােভে প্রলােভি মানাবে
অন্তিমে করহ নাশ ধনে মানে প্রাণে,
মােহিয়া নাশিতে জীবে চেষ্টা তব সদা
কিন্তু চেষ্টা মম পরে অনর্থ তােমার। ৩৩
বিলাসিনী!
জগতের সার বস্তু রূপজাত প্রেম
তাহে মগ্ন বিষ্ণু লক্ষ্মী, শঙ্কর পার্বতী
সুপ্রবীনা অরুন্ধতী বশিষ্ট সুবশী
সবে রূপ-অনুরাগী রূপ-মত্ত মন। ৩৯
তৃতীয় সর্গ।
তুমি আজ মর্কট বৈরাগী কহিতেছ
রূপবতী সহ প্রতি মোহ মরীচিকা ;
তােমা হেন বীত রাগ হইলে বিধা,
কিভাব ধরিত হবে বিশ্ব চরাচর ? ৩৫
তবে, শরত চন্দ্রমা, প্রভাত তরুণ,
তারকা মণ্ডিত নভঃ ;
কুসুমিত বন,
সরসী শোভন,
কমল কোমল প্রভ। ৩
শ্যামল সুন্দর
তরুণ পাদপ,
ললিত সুরূপা লতা
মদন মােহন,
সুকান্ত পুরুষ,
রমণী লাবণ্য যু। ৩৭
থাকিত কোথায় ?
কোথায় থাকি
মানসী সুষমাচয়---
স্নেহ, দয়া, মায়া, প্রণয়, শীলতা,
মােহন মাধুরী নয় ? ৩৮
ও
সত্যব্রহের পরীক্ষা।
হইত জগত
অনন্ত সাহারা
হৃদয়ও হইত তাই
তােমার যুকতি করিয়া বিস্তার
এইত মীমাংসা পাই। ৩৯
রূপের মহিমা তুমি ক্ষুদ্র নর
কেমনে বুঝিবে বল ?
আপনি শঙ্কর
নাহি পায় অন্তস্তল। ৪০
যুগান্ত সাধিয়া
পূর্ণ ঈশ্বরের কি আছে অভাব
কিহেতু সৃজিলা ভব
বিজ্ঞানে দর্শনে ইহার উত্তরে
নিয়ত রহে নীরব। ৪১
চিত্তের শিরস
সংশয় বায়ুতে
নিয়ত হতে ঘূর্ণিত
যদি নাহি রূপে
ভিষক হইয়া
মীমাংসা ঔষধ দিত। ৪২
৩৪
তৃতীয় সর্গ।
পূর্ণ ভগবান, রূপের পূর্ণতা
জগজ্জন বিমোহন,
অাপনার রূপে আপনি মােহিত
সেরূপ আস্বাদে মন। ৪৩
অাপনি আপন মাধুৰ্য সম্ভোগে
কভুনা মিটে তিয়াস
আপন রূপাংশ
পরিগৃহি তাই
পূরিতে হৃদয় আশ। ৪৪
সৃজিলা প্রকৃতি সৌন্দৰ্য্য আগরী
রূপ রাগ রসে ভরা
সত্ব রজঃ তমঃ
শরীর তাহার
অন্তর মাধুর্যে গড়া। ৪৫
এই সুরূপার
রূপ আস্বাদনে
পানে মাধুৰ্য রসাল
নিয়ত নির
পরম দেবতা
অনাদি অনন্ত কাল। ৪৮
৩৫
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
এরূপ খেলায়
হইল উদ্ভূত
বিনােদ সুন্দর ভব;
সে ভব ভূষিতে রূপ খেলা দিয়া
তাহাতে সৃজিলা জৗব। ৪৭
গড়িলা পুরুষ
পরম পুরুষ
পৌরুষ্যে শােভিয়া তায় ;
প্রকৃতি আপন
ললিত রূপ শােভায়।.৪৮
গড়িল রমণী
উভয়ের রূপ
উভয়ে যেমন
আস্বাদে তৃষিত মন,
করিলা তেমনি
অন্যে অন্যে বিমেহন! ৪৯
রমণী পুরুষ
যখন ইহারা
প্রণয় খেলায়
প্রগাঢ় প্রমত্ত হয়,
উচ্চেতে থাকিয়া
প্রকৃতি পুরুষ
হাসি হাসি দেখে তায়। ৫০
৩৬
তৃতীয় সর্গ।
জীবের প্রণয়
হেরিয়া তাদের
বড়য়ে প্রণয় আশ,
অধিক প্রগাঢ়
প্রণয় সম্ভোগে
মিটায় সেই তিয়াস। ৫১
এই ধুর
রূপের খেলায়
সৃজিত চালিত ভব,
মা ও মদ্যপ
রূপরে এখন
এখনি থামিবে সব। ৫২
এখনি পামিবে
সময়ের চক্র
ঋতুর পৰ্যায় গতি,
এখনি হইবে
সংসার সরিতে
জীব-স্রোতের বিরতি। ৫৩
করই এখন
রূপের বিলয়
জলদে তড়িত প্রায়,
আপনি প্রকৃত
লয়ে এ জগত
হবে লীন ব্রহ্মকায়। ৫৪
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
থাকুক এ সব
নর বােধাতীত
জগত রহস্য গৃঢ়
দেখহ বিচারি
মানব অন্তর
তুমি হে চিন্তা-চতুর। ৫৫
দেখ চেয়ে মনে
হয় কি না হয়
সুখের প্রবল বল
করম
গেয়ান অর্জন
সুখের আশে সকল। ৫৬
সুখ সে রূপের ছায়া ;
হৃদয় সলিলে
হয় প্রতিভাত
সুখরূপ রূপ কায়া। ৫৭
চিন্তার নয়নে
দেখহ চাহিয়া
যতদূর দৃষ্টি যায়
সুখ ছাড়া রূপ
রূপ ছাড়া মুখ
দেখই আছে কোথায়। ৫৮
তৃতীয় সর্গ।
তুমি যে বিরক্ত এসেছ এখানে
সেও ত’ সুখেরই তরে,
সেও সুখ চাও
জগ বিমােহন
রূপ নিধি রূপ হেরে। ৫৯
রূপজ সুখের
আশায় মানবে
ঢালে স্বাভাবিক বলে,
স্বভাব(ই) ঈশ্বর
গুঢ় অভিপ্রায়
প্রকাশে ভব মণ্ডলে। ৬০
এ স্বভাবে যেই করে অতিক্রম
শরীরে কিম্বা অন্তরে
আধি ব্যাধি তায়
করয়ে পীড়িত
দুঃখে সেই জ্বলি মরে। ৬১
যেরূপ লালসে
উৎবেজিত মন
তুমি হে আছ এখানে,
মিটে সে বাসনা
স্বভাব নিয়মে
রমনী সহ মিলনে। ৬২
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
তুমি হে সুরূপ
সুরূপা তােমায়
অবশ্য হৃদয় দিবে ;
তুমি সহৃদয়
আপনি তাহার
প্রাণে প্রাণ মিশাইবে। ৬৩
উভয়ে উভয়ে হেরিয়া হেরিয়া
ভুলিয়া সময় গতি
মধুর মধুর
কথােপকথনে
মজিবে দিবস রাহি। ৬৪
সুখের সাগরে মনিরূপে দোহে
রমিবে মাতি উল্লাসে
স্বভাব নিয়মে,
ঈশ্বর আদেশ,
যাহে ধরায় প্রকাশে। ৬৫
দেখ আর এক স্বভাব চাতুরী
বিধির সৃষ্টি কৌশল
অতীব দুরূহ
কৃত্যের সাধন
কেমন স্নিগ্ধ কোমল । ৬৬
৪০
তৃতীয় সর্গ।
সহজ প্রবল
ইন্দ্রিয় লালসে
একে অন্যে নরনারী
করে আকর্ষণ
সে আশা তর্পণে
প্রথমে মিল সবারি। ৬৭
ক্রমে এ বন
অতিক্রমি দেহ
বাঁধে অন্তরে অন্তরে
তখন উভয়ে
আপনা ভুলিয়া
জীয়ে একে অন্যতরে। ৬৮
হেনরূপে শিখি
আত্মায় আত্মায়
কিভূত সদ্যোগ রীতি
হয় যােগ্য নর
পরাত্মা সঙ্গমে
নিমজ্জিতে নিজ মতি। ৬৯
হেনরূপে আর
প্রিয়জন গুণে
হইয়া মােহিত মন
গুণ পক্ষপাতী
হয় নিরন্তর
সৰস প্রেমিক জন। ৭০
৪১
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
গুণে অনুরাগ, দোষে বীতরাগ,
পাপে ঘৃণা, পূণ্যে প্রীতি
লভে ক্রমে ক্রমে
হেনরূপ উচ্চ নীতি। ৭১
সহজে প্রেমিক
এরূপে যেরূপ খেলায় বিস্তারে
জগত সৃজন কাজে
এরপে যেরূপ সহায়ে মুখাশা
চালায় জীব সমাজে। ৭২
পুরুষাৰ্থ দিকে
অতর্কে লইয়া যায়,
গরবে ফুলিয়া
তুমি অর্বাচীন
অব করহ তায়। ৭ত
কভু না দ্রোহিতা
সহিবে স্বভাব রাজ ;
তাহারে লজিয়া
গিয়াছে অক্ষত
দেখি জগত মাঝ। ৭৪
৪২
তৃতীয় সর্গ।
তেজোমদে মাতি
উল্লক্ষিয়া কূলে
যে দশা ভােগয়ে মীন
তুমিও সে দশা
নির্জনে কুর্দনে
ভােগিয়া হইবে ক্ষীণ। ৭৫
যথা অবর্ষণে
নদী, হ্রদ, কূপ,
শুকায়ে শ্রীহীন হয় ;
তেমতি বিশুদ্ধ নিবৃত্তি প্রভাবে
হইবে তব হৃদয়। ৭৬
নাহি পাবে সুখ
পাবে ঈশ্বর
জড়তা পাইবে চিত,
কি করি কি করি ভাবিয়া ভাবিয়া
করিবে কাল যাপিত। ৭৭
তখন যদ্যপি
সংসার করিতে
জনমে মানসে আশ
জানিও নিশ্চয় তাহাতে নিশ্চয়
নিস্ফল হবে প্রয়াস। ৭৮
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
তপ-তাপ-দগ্ধ
বিশু বদন,
বিশুষ্ক হৃদয় যার,
বিহীন যে জন
বসন ভূষণ আর। ৭৯
গৃহ ধন জন
বল কোন নারী
কি সুখ আশায়
হৃদয় দিবে তাহায় ?
জল অন্বেষণে বল দেখি কেব
অনীর মরুতে ধায় ?৮০
এরূপে তােমার স্বভাব শাসনে
একুল ওকুল যাবে
দেখহ অন্বেবি ইতিহাস পটে
হেন চিত্র বহু পাবে। ৮১
কিন্তু যে আমায় মায়াবী বলিয়া
হয়েছে তােমার জ্ঞান
আমার কথায়, হবে বিপরীত
শবে হবে সন্দিহান। ৮২
তৃতীয় সর্গ।
করহ সন্দেহ
যা হবার হবে
অলঙ্ঘ্য বিধি লিখন ;
মরণ ঔষধ
শ্রবণে বাঁধিলে
কে করে মৃত্যু বারণ? ৮৩
এইরূপে বাজাল করিয়া বিস্তার
তাপসের দুঃখ ভাবি যেন ম্রিয়মান
হেন ভাব মায়াবিনী বদনে প্রকাশি
থামিয়া রহিল চেয়ে সত্যব্রত পনে। ৮৪
ভেবেছিলা সে তাপস এ ক্ষুদ্র প্রেতিনা
গুটীই দৃঢ়ভাষে পালাইবে ত্রাসে
কিন্তু সে চটুলা হেন সুনিগুঢ় ছলে
মরম পরশি তায় ফেলিলা চিন্তায়। ৮৫
ক্ষণকাল নিরখিয়া চিত্ত আপনার
দিবালােকে হেন যায় প্রকাশে সকল
মায়াবিনী ভ্রান্তি যত সহজে হেরিয়া
ধীরে ধীরে সুগম্ভীরে উত্তরিলা ধীর। ৮৬
৪৫
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
অয়ি পাপে মায়াবিনি! বলিছ কি তুমি ?
উলটি পালটী, একে আর বাখানিয়া
মিশাইয়া সদসতে অধমে উত্তমে
পাপে উত্তোলিয়া উচ্চে পুণ্যে নীচে আনি ।৮৭
ভুলি নাই যদি তব রূপের কুহকে
ভুলিব কি অল্পপ্রাণ বাক্য ছলনায় ?
কটাক্ষে নিস্ফল যবে, কটাক্ষিী চায়
যুঝিতে তর্কের শরে, শুনি হাসি পায়। ৮৮
বাসন্তী পূর্ণিমা নভঃ, দেবঋষি মন
প্রশান্ত নির্মল স্নিগ্ধ, ঐশ্বৰ্য্য ভাণ্ডার ;
ঢাকে মােহের মেঘে, কামের পবন,
উদিয়া না ভাঙ্গে সেই শান্তি মনােরম। ৮৯
তাহাদের সুগম্ভীর, কাম গন্ধহীন,
প্রণয় ব্যাপার বটে তেমতি শােভন ;
যথ শােভে সদা শান্ত নিৰ্ম্মল আকাশে
তারকায় তারকায় শান্ত সম্মিলন। ৯০
৪৬
তৃতীয় সর্গ।
প্ৰবলা লালসাময়ী তুমি, মায়াবিনি।
আরােপ সকল কার্যে লালসা কারণ ;
ভাব অসম্ভব কাৰ্য লালসা ব্যতীত,
তাই কহ কামমুগ্ধ দেবঋষি মন। ৯১
কহ তাই বিশ্বহেতু পুরুষ প্রকৃতি
অবশ অধীর মত্ত লালসার বশে ;
লালসা-তর্পণে শুধু ইচ্ছাশক্তি বিনে
জনমিল জনপ্রাণী সহ এ সংসার। ৯২
মানবে ও নিন্দনীয় যেমন চরিত
ঈশ্বর চরিতে তাহা করি আরােপণ
সাধুজন মৰ্ম্মভেদী অশ্রাব্য কথনে
আপনার জঘন্যতা শুধু প্রকাশিছ। ৯৩
•
জানিজন হেরি ভবে শক্তিহীন জড়
স্থাপে তার হেতু শক্ত অবশ ঈর
লালসার বশ যদি হয়েন ঈশ্বর
ঈশ্বরত্ব তবে কভু নাহি থাকে তায়। ৯৪
৪৭
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
কি ছিল আদিতে কেন বিশ্ব জনমিল
কে জানে, কেবা তাহা জানিতে সক্ষম,
সৃষ্ট মুখে সৃষ্টিকথা প্রলাপ বচন ;
অপ্রত্যক্ষ অপ্রমাণ বলে বিজ্ঞজন। ৯৫
অতীত যে অবিজ্ঞেয় না চাহি জানিতে
অলস কল্পনে কেন আত্ম বিড়ম্বিব ?
অনন্তের অন্ত কেবা চাহে নির্দেশিতে
বাতুল শুক্তিতে চায় সাগর সিঞ্চিতে। ৯৬
বর্তমানে পূর্ণ মম তনু মন প্রাণ
বর্তমান ভেদি দৃষ্টি চলে আমার,
এখনি—এখানে—এই, মূলমন্ত্র মাের
‘এখনি এখানে এই বাক্য সারাৎসার। ৯৭
‘এখনি এখানে এই গায় সমীরণ
‘এখনি এখানে এই ধ্যায়িছে আকাশ
‘এখনি এখানে এই উচ্চ নিনাদিয়া
নাচিছে উচ্ছাসে ভাসি শশাঙ্ক তপন। ৯৮
৪৮
তৃতীয় সর্গ
আছে যত জীব, জড়, স্বরগে মরতে
আনন্দ উৎসাহে মাতি, বরযাত্র বেশে,
চলিছে অনন্ত পথে, পূর্ণ সমারােহে,
‘এখনি এখানে এই’ ধ্বনিয়া নির্ঘোষে : ৯৯
অবিচল সুনিৰ্ম্মল শান্ত জ্যোৎস্নাময়
এই সৎ এই রাজে আপন প্রভাবে,
এখনি এখানে এই, আছে আর যত
ফেন, বি, হেন ভাসে এ সভা সাগরে ১০০
এর জ্ঞান পরিণত জগত শৃঙ্খলে,
জগত মাধুৰ্যময় এর রসাশ্রয়ে,
জগতের ক্রিয়া এর ইচ্ছ৷ পরিণতি,
ইহার শিবম্বে ভবে মঙ্গল বিধান। ১০১
চাহিব ?
দীপ্যমান এই সৎ হেরি বিদ্যমান
অতীত ভবত পানে কি
বল কে আপন জন সহ সম্মিলনে
অতীত ভৰত ভাবি হয় মুহ্নমান ? ১০২
৪৯
ছ
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
অহো ধন্য ভাগ্যবান সেই মহাজন ।
এই সত্তা সূৰ্য্য যার অন্তরে প্রকাশি,
প্লাবে তার প্রাণ মন আনন্দের করে ;
কি সুখ বারিধি মাঝে সে নিত্য সন্তরে ?:০০
কিবা সুখ লােভ তুমি দেখালে আমায় ?
নহে কি সে মােহ ঘুমে ক্ষণিক স্বপন ?
নহে কি সে মােহ মেঘে বিজলি চমক ?
সন্তাপ আঁধারে যায় ফেলে ক্ষণ পরে। ১৫ ২
সুন্দরে না করি নিন্দা আমি কদাচিৎ,
নিয়ত করি গাে আমি সৌন্দর্য্যের পূজা,
এ ভব সুন্দর বলি আমি এর বশ,
সৌন্দর্য্যে সৌন্দৰ্য্যাধারে সঁপেছি এ প্রাণ।
পুরুষ সুরূপ আর রূপসী রমণী
হেরি আমি হই সদা পরিতুষ্ট মন।
নিস্কাম নিৰ্ম্মল মনে যে হেরে সুরূপ
নিৰ্ম্মল আনন্দে হয় ফুল্ল তার মন। ১০৬
তৃতীয় সর্গ।
তুমি আসি উদ্দীপিয়া লালসা দারুণ,
কর জাৰে ব্যতিব্যস্ত ভােগ বাসনায়
পাপের সাগরে জীব সে তৃষা তর্পণে
ডুবে, কিন্তু নাহি হয় পরিতৃপ্তি তার। ১০৭
কহিনু তােমারে তাই মােহ মরিচিকা ;
প্রলোভিয়া মুগ্ধনরে করহ বিনাশ ।
হৃদয় আনন্দ রূপে না করি নিন্দন
নিন্দি আমি মােহ রূপা তােমা শতবার। ১০৮
••
কহিলে প্রমত্ত মনে রমণী সঙ্গমে
লভে নর ক্রমে মুক্তি আর উচ্চ নীতি,
সংসার প্রমত্তে ধায় রমণীর পাছে
একটীও সাধু তায় কেন নাহি পাই ? ১০৯
জানি আমি কৰ্ম্ম অনুসারে ফলে ফল ঃ
অজ্ঞানে অন্ধতা ফলে, পাপেতে সন্তাপ,
গেয়ানে আনন্দ ফলে, শান্তি নিবনে,
মােহ তমে মুক্তি আলাে কেমনে ফলিবে?১১০
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
হেরিয়াছি সাধুজন সাধুতার বলে
করিয়া লয়েছে সাধু প্রণয় ব্যাপার ;
কিন্তু কভু দেখি নাই সাধু জন শােভা
ধরিয়াছে কেহ ডুবি ব্যসন কর্দমে। ১১১
মানব কৰ্তব্য সার এই জানি আমি
আপনার অনীশতা হেরিয়া নিয়ত
ঈশ পদে আপনায় করিয়া অর্পণ
চলিবে নিয়ত তার নির্দেশিত পথে। ১১২
চলিবে নিয়ত তার নির্দেশিত পথে
বেষ্টিয়া তাহায়, তার আলােকে রঞ্জিয়া,
স্বজন বান্ধব সহ, যথা গ্রহচয়
উপগ্রহ সহ চলে তপনে বেষ্টিয়া। ১১৩
তুমি উপদেশ তারে প্রমত্তে ধাইতে
বাসনার কেন্দ্র হীন উচ্ছল পথে,
কে ধরে গ্রহেরে বল কক্ষ তেয়াগিলে ?
শ্রেয় ত্যাগে রক্ষে জীবে কে আছে এমন ?
১১৪
তৃতীয় সর্গ।
আসুরি চরিত হয় মাদকতাময়
মাতাইয়া ভুলাইয়া ডুবায় নরকে।
শুদ্ধ স্নিগ্ধ শান্ত ভাবে, জ্ঞানে উদ্বোধিয়া
ত্রিদিবে ত্রিদশে তােলে দুর্বল মানবে। ১১৫
দেবতার অনুগ্রহে জানিয়াছি তােমা,
জানিতেছি কিসে হবে মঙ্গল আমার,
সেই আচরিব আমি কায় মন প্রাণে
যাহে জানি জনমিবে দেবের সন্তোষ। ১১৬
স্বভাব নিদেশ আমি নাহি লঙ্ঘি কভু,
স্বভাবের আজ্ঞা নহে সর্বত্র সমান,
তুঙ্গবৃক্ষে তায়িতে কহেনা ভাব
প্রবীণে কহেন পুনঃ বাল্য অচরিতে। ১১৭
স্বভাব নিদেশে গিরি অভ্রভেদি উঠে;
স্বভাব নিদেশে দুর্বা ভূতলে গড়ায় ;
স্বভাব নিদেশে ধায় নদী বেগবতী
নিশ্চল ঘুমায় হ্রদ স্বভাব নিদেশে। ১১৮
৫৩
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
স্বভাব নিদেশে গায় বেয়াস বাল্মীকি,
কপিল করয়ে চিন্তা, যুঝে ভৃগুবীর,
বুদ্ধদেব ছাড়ে গৃহ, বশিষ্ঠ ধেয়ায়,
স্বভাব নিদেশে আমি করি এই ব্রত। ১১৯
নহিব বিশুষ্ক এতে নহিব কাতর,
নিদেশ লঙ্ঘনে যার শাস্তি ভােগে জীব
তিনিই আবার স্নিগ্ধ জননী হইয়া
তােষেন পােষেন জীবে কত মেহদানে।১২
অহঙ্কারী আত্মম্ভরী যে মুগ্ধ মানব
এই মায়ে উপেক্ষিয়া চলে আত্ম ভরে,
ত্রিশঙ্কুর হেন দশা ঘটয় তাহার
শুষ্কতা সংশয় শূন্যে হয় তার স্থান। ১২১
এসব প্রলােভে ম চিত্ত না চলিবে,
এই সব ভয়ে মম মন না টলিবে,
তােমার বচন চেষ্টা আমায় তেমন,
কৃপণের কাছে যথা ভিক্ষুক স্তন।১২২
৫৪
তৃতীয় সর্গ।
নিস্ফল প্রয়াস তব নিস্ফল প্রয়াস
ছাড়ই অামার অশ, ছাড় মই পাশ
?
অথবা যাও বা শাক যাহা লয় মন
কাট পতঙ্গেও তোম। না করি গণন। ১২৩
প্রেতিনার সঙ্গে কথা বলিতে বলিতে
উদিল হৃদয়ে তার প্রিয় সঙ্গ তৃষা ;
ভকত-জন-বাঞ্ছিত সেরূপ মোহন
পাইল হৃদয়ে, প্রাণ নিমজ্জিল তায়। ১২৪
ভাতিল অপূর্ব জ্যোতি বদন মণ্ডলে ;
দেবতা সম্পশে যথা মর্কটার রূপ,
তেমতি পিশাচী রূপ সে জ্যোতিপ্ৰভায় ;
অসূয়ায় ক্ষুন্নতি হইল পিশাচা। ১২৫
বৃথা রহি কেন আর এখনে দাড়ায়ে,
হরিনু, হাসানু লােকে, দর্প হল চুল,
বিকৃত বদনে এই ভাবিতে ভাবিতে
মন্দ পদে বিলাসিনী চলে মােদেশে। ১২৬
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
যেমন লঙ্কেশ স্বসা দুষ্টা শূর্পণখা
নাসা কর্ণ ছিন্ন হলে ক্ষমণ আয়ুধে,
নির্লজ্জ ক্ষোভিত চিত্তে বিকৃত কদনে,
ক্ষীণ পদক্ষেপে যায় দশানন স্থানে। ১৭
সতাব্রতের পরীক্ষ
--0)(০:——
চতুর্থ সর্গ।
উৎকণ্ঠায় অসুরেরা আছে পথ চেয়ে
হেন কালে বিলাসিনী আইল তথায়,
তার ভাবে বুঝি তার চেষ্টা পরিণতি
নানা জনে নানা কথা লাগিলা কহিতে।'
চণ্ডক নামেতে এক প্রচণ্ড তার
প্রকাণ্ড মুরতি তার বিকট ভয়াল
অগ্নি অক্ষি দেহরাগ ঘোর ঘনঘটা
বাক্য বজ্রনাদ, শ্বাস প্রলয় ঝটিকা। ২
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
যথা যায়, যায় সেই দিক আঁধারিয়া ;
জগজ্জনে গণে ক্ষুদ্র পতঙ্গ সমান ;
তার দাপে বসুন্ধরা কত শত বার
শশানিতে প্লাবিত হয়ে, হয়েছে কম্পিতা।
কহিলা ভীষণ সেই দেবারি প্রধান
বঁড়ীতে বিদ্ধ যদি হত তিমিজিল
বড়শার নাম হ'ত অলীক কল্পনা
তেজস্বী তাপস’পরে কি শক্তি ইহার ? ৪
}
আকর্ষিয়া নিত্য নিত্য
যুবক সফরি
হয়েছে গরবে অন্ধ মুগ্ধ বিলাসিনী
সাধ্যের অতীত কাৰ্যে আবিতর্কে ধায়,
সমুচিত শান্তির হয়েছে এখন। ৫
;
বিরাট-মানস যুবা প্রকাণ্ড হৃদয়,
প্রবল বাসনা এর দুর্দম্য শকতি ;
আমি মাত্র শক্ত এর গতি ফিরাইতে,
উচ্চাশা মদিরা মদে মােহিয়া মাতায়ে। ৬
৫৮
চতুর্থ সর্গ।
দেখ বশ করি এই প্রচণ্ড ৰায়বে
বিপ্লৰ তুফান তুলি কাঁপাইয়া ধরা
ব্যয় ধর্মাশ্রম এত দেই উড়াইয়া
দৃঢ়ীভূত করি আরাে মােদের প্রতাপ। ৭
বলিয়া উড়িলা দৈত্য আঁধারি আকাশ
মলিন তপন মুখ রাহু গ্রাসে যথা;
কিন্তু যে তপন গ্রাসে চলিলা চগুক
দগ্ধ মুখ হবে তার মহাতপ তেজে।৮
••
বা চক্রে নিয়তির অন্য শাসনে
মীনে ছাড়ি সূর্যদেব মেষে সংক্রামিল
এধর প্রচণ্ড রশ্মি করি বিকীরণ
উদ্ধত যুবক ইব মুরতি ধরিল। ৯
সঙ্গে সঙ্গে বাসন্তীয় কৈশাের মুরতি,
কোমল মধুর জন-মনন-মুগ্ধকর
তেয়াগিয়া, প্রভাময় যৌবন গরিমা
রিলা স্বভাব এই বিশ্ব চরাচরে। ১০
৫৯
সত্যত্রর পরীক্ষা ।
দহমান ইন্ধনের পরশে ইন্ধন
জুলে যথা সেই মত স্বভাবের ভাবে
উদ্দীপয় অনুরূপ ভাবের না
ভাবগ্রাহী সহৃদয় জনগণ-হৃদে। ১১
এই
অসুর প্রতিভাবলে চগুক দুৰ্ম্মতি
গুঢ় জীবতত্ত্ব আছে পরিজ্ঞাত,
নিদাঘ ওজস্বিভাবে দীপ্ত তপশীরে
ঔদ্ধত্যে মাতিতে তাই আশংসি চলি। ১২
পূর্ববৎ তপমগ্ন তপস্বি প্রবর,
কভু যােগে রত, কভু তত্ত্ব নিরণয়ে
প্রগাঢ় নিবিষ্ট চিত্ত, কভু ব্যস্ত ভাবি
কি উপায়ে জগজ্জনে করিবে উদ্ধার।১৩
অকস্মাৎ বজধ্বনি শুনিলা আকাশে
বিস্ময়ে চাহিলা উদ্ধে, মেঘাচ্ছন্ন হেরি
নিয়ে সে দেশ সদা তকিলা মানসে
প্রকৃতির ব্যভিচার নহে সুলক্ষণ। ১৪
৬০
চতুর্থ সর্গ।
গাঢ়তম-বজনাদ, বিকট তড়িত,
ঝটিকায় বিকম্পিত গিরিশৃঙ্গচয় ;
মহাশব্দে দিণ্ডল হইল ধ্বনিত
যেন বা প্রলয় কাল হ’ল উপস্থিত। ১৫
ভীষণতা মাঝে ডুবি “ভীষণ ভীষণে”
নিরখিছে সত্যব্রত বিস্ফারিত আঁখি,
মহাশকে একস্তম্ভ জলস্তম্ভ প্রায়
নামিল সম্মুখে তার হেরিলা তাহায়। ১৬
বিশাল মূরাত এক, মহা ভয়ঙ্কর,
প্রলয় বিষাণধারী মহেশ সদৃশ ;
দেখি তায়, সত্যব্রত শান্বিত চিতে,
দৃঢ় করি আয়িল নিখিল আশ্রয়ে। ১৭
মেঘনাদে সেইরূপ গম্ভীরে ধ্বনিল,
“নহ জীব ভীত চিত্ত মাের ভীমরূপে
নির্ভয়, যাহারা হয় অধীন আমার
তাহাদের ভয়ে কাঁপে বিশ্ব চরাচর। ১৮
৬১
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
আমার আশ্রিত বৃত্ৰ নৈকষেয় শুর
কত কি করেছে তাহা জগতে বিদিত,
মথেছে মেদিনী তারা দলেছে স্বাগ
রেখেছে অতুল কীর্তি এই ধরাধামে। ১৯
আমি রুদ্র, অগ্নিবীৰ্য, ব্ৰহ্মাণ্ড মগুলে
কটাক্ষে চাহিয়া ভস্ম করিতে পারি,
মহামনা জাবচয় মমদত্ত বরে
অর্জয় অতুল কীর্তি, দোর্দণ্ড প্রতাপ। ২০
তােমাতেও দেখি সব মহত্ত্ব লক্ষণ
উচ্চ আশা, মহাশক্তি, মহা তেজস্বিতা,
চাও যদি মহত্ত্বের তুঙ্গশৃঙ্গে স্থান
লও হে মানব তবে আমার আশ্রয়। ২১
ৰত উড়ে উঠে তব আকাকার চুড়া
ততােধিক উচ্চে তােমা কৰি উন্নত।
উ দৃষ্টে সবিস্ময়ে তব পানে চাহি
বিতর্কিবে সবে, তুমি যে কি মানব। ২২
৬২
চতুর্থ সর্গ।
লহ বর, হবে তুমি অজেয় জগতে;
লহ মন্ত্র, যাহে তুমি হবে সিদ্ধকাম,
বীর অবয়ব তুমি ধরি বীরবেশ
নাম ভূমে বীর যােগ্য সুখ্যাতি লভিতে।২৩
ধরাধামে আছে কত রাজ্য অরাজক,
নাহি যায় ব্যয় ধর্ম আচার বিচার
প্রপীড়িত প্রজাবৰ্গ হয়িছে উখিত
ঝটিকা তাড়িত ক্রুদ্ধ সাগৰােৰ্মি প্ৰায়। ২৪
•••
••
যাও হেন কোন রাজ্যে, মম মন্ত্র বলে
সেই রাজ্য-চক্রবর্তী হইবে অচিরে
পরস্পরে বিসম্বাদী প্রকৃতি নিচয়
দেখিৰে নিশ্চয় তৰ পাদপ্রান্তে নত। ২৫
এই মন্ত্র পড়ি তুমি দিও হুহুঙ্কার,
দেখিবে অসংখ্য সৈন্য প্রচণ্ড দুর্বার
তেজশদে বীর দর্পে প্রমও হইয়ে
আসিয়া জুটিৰে তৰ পতাকার তলে। ২৬
৬৩
সত্যব্রহের পরীক্ষা।
এই মন্ত্র পড়ি তুমি দিও হুহুঙ্কার
সবে তুমি দিগ্বিজয়ে নামিবে ভূতলে,
এমন যে মার্নী রাজা দুর্ধষ দুৰ্যোধ
গরুড়ে ফণীর প্রায় নোয়াইবে শির . ; ,
পশিবে সমরে যবে করি মহামার
অগ্রসর, অঞ্জসর, সােৎসাহে ধ্বনিয়া,
নাশিবে নিমিষে যবে শত্ৰু লাখে লাখ
কেমন উল্লাসে তুৰ নাচিবে হৃদয়। ২৮
বাত্যাপদে নত যথা বিটপি-নিচয়
রাজ্যপরে রাজ্য হবে তব পদে নত,
বার দিয়া বসি জিত নৃপতি মণ্ডলে
দেখিও তখন নিজ গৌরবের সামা”। ২.
হইতে পিশাচের বচন নিঃশেষ
বিশ্বায় সমায়ে বীত-শঙ্ক মনে
কহিলা তপস্বিবর সুস্থিরে চাহিয়া
দুর্গাশ্রিত জন যেন দুর্গ আক্রমীরে। ৩০
৬৪
চতুর্থ সগ।
অসিতে বনপি হেথ। দিন দুই আগে
বুঝি বা পারিতে তুমি ভুলাতে আমায়,
পার্থিব গৌরব ছৰি আকৰ্ষয় মন
বথার্থ মহত্ত্ব জ্ঞান না জন্মে যদ্যপি । ৩১
তৰ বাক্যে প্রতারিত কত না মানব
উৎসর্গয়া দয় মায়া দুরাকাঙ্গা পদে,
মেছে ধরায়, নাশি মাননিচয়ে
উন্মত্ত শার্পল যথা ক্ষীণ মেষপালে। ৩২
কিন্তু হায়! তাহাদের পরিণাম স্মরি
শক্রজন.মন হয় দয়ায় ঐবিত,
কেহ এলােকে হেরে সেলােৰু সূচনা
ভারবহ প্রাণ কেহ হাড়ে দূর দ্বীপে। ৩৩
* মারে সাথে কৃত ভারতবর্ষের ইতিহাসে
আওরঙ্গজেব বাদশাহের একখানা পত্র উদ্ধত হইয়াছে
তাহাতে সারা জীবন দুর্শের জন্য তিনি শেষ বয়সে
যে অন্তর্জাল লেগ করিতেছিলেন তা বিস্তারে
বিবৃত করিয়া এই বলিয়া উপসংহার করেন যে, তোকে
পরলোকে কি গতি হবে অহা জানে । কিন্তু আমি
ইহাকেই পরলােকের সূচনা পাইতেছি।
। নপােয়ািন শেষ জীবন সেলেনা দ্বীপে
বন্ধভাবে কাটাইয়াছিলেন ইঃ ইতিাস প্রসিদ্ধ
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
অবস্থা তুষার ভূপে অচল বিভ্রমে
উঠি যেই করে স্থির নিবাস কল্পনা
দুর্ভাগ্য মার্কণ্ডে যবে সে তুষার গলে,
. যায় তার প্রাণ ডুৰি অতল সাগরে। ৩৪
বিধাত-সৃজিত এই ভব-রম্যবন
একটী পরাণী তায় একটী কুসুম
বন শােভা নাশে সেই ছিড়ি ফুলচয়
অসুর বিনে কোথা মহত্ত্ব তাহার। ৩৫
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে এই ধরা মসীবিন্দু
ধরামাঝে মসীবিন্দু আমি ক্ষুদ্র জীব
বিশ্বেশ তুলনে আমি আছি কিবা নাই
আমার কি সাজে বল মহত্ত্ব গরিমা ? ৩৬
মানিহে সার্থক আমি এই ক্ষুদ্র প্রাণ
আভাসে জানিহে যদি “মহতােমহতে”
ভার ভাবে বিহলিত উন্মত্ত হইয়া
পারি যদি জগজ্জন মন বিমােহিতে। ৩৭
চতুর্থ সর্গ।
আসুরি মহত্ত্ব তব অসুরি উল্লাস
শোভা পায় তথা মৃত মানবের চিতে
শকুনি গৃধিনী যথা মৃত দেহপরে
বিকট জঘন্য দৃষ্টি ন্যক্কার জনক। ৩৮
এ মহত্ত্ব এ উল্লাস দেখায়ে আমায়
পারিবে না পারিবে না প্রলোভিতে মোরে,
অযাচিত মন্ত্র হল অপ্রার্থিত বর
চাহি না চাহি না ওহে তামস নিবাস ! ৩৯
শুনি হেন বাক্যচয় উদ্ধত চণ্ডক,
সম্ভবতঃ ক্রোধে হবে হুতাশন প্রায় ;
কিন্তু চিত্র। হেরি তায় বিষন্ন মলিন
হনিতেজা জরাগ্রস্ত সিংহ তনুরূপ। ১০
কহিলা নিয্যে যথা অভিনয়ে ক্রোধ
ওরে রে অবাধ, মন্দ অদৃষ্ট তােমার,
যুগান্ত সাধয়া যাহা নাহি পায় নরে
উপচি দেই তােম। এ হেন সম্পদ । ৪১
৬৭
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
কিন্তু তুমি ভুলি ঘাের ভ্রান্তির কুহকে
মনের ছায়ায় ভাবি সর্ব সত্ত্বা সার ;
পুরুষার্থ গণি সেই ছায়ার অর্জন,
ক্ষিপ্ত বাতুলের প্রায় উপেক্ষহ হ
উপেক্ষহ, শাস্তি এ পাকে হতে হতে
উঠিবে মানবকূল বিরুদ্ধে তোমার,
মনে যবে ভেক ধরি মনুজ নিলয়
বতুলিতে আত্মবৎ মুগ্ধ নর-রা।
মাছে যত যন্ত্রণার যন্ত্র মনুষ্যের
অনিবার নিষ্পেষিত হইবে তাহায়,
অবশেষে অপমানে দনুজন প্রায়
ৰাজদখে প্রাণ দণ্ড ঘটিবে তােমার। ৪৪
প্রথমে ভীষণ দর্প গৰ্ব রৌদ্রু ভাব,
মশজের প্রায় শেষে অভিসম্পাতন ;
লক্ষিয়া তপস্বিবর ঈষৎ হাসিলা,
স্কৃঢ় বচনে ধীর তরে উত্তরিলা। ৪৫
চতুর্থ সর্গ।
মহতের ছবি অহে তামস দুৰ্ম্মতি,
আঁকিলে যে নাহি তাহে মহত্ত্বের লেশ ;
তেমতি যে বিভীষিকা চিত্রিছ এখন
না হেরি বিভীতি তায় তিল পরিমাণ। ৪৬
ঈশ্বর ঐশ্বৰ্য্যে যার পড়েছে নয়ন,
লৌকিক ঐশ্বৰ্য্য সেই লােষ্ট্র হেন মানে,
ঈশ্বর মাধুরী-মদে যে চিত্ত বিভাের,
দৈহিক ব্যথায় কভু বথে কি সে জনে ?৪৭
যে ভীতি অতঙ্কে মোরে চাহ বিচালিতে
চলিব কি ? গণি হায় সৌভাগ্য আস্পদ ;
এ বিপ্ন বিপত্তি যদি আসে ভাগ্য বশে,
সফল মানিব তবে এ ছার জীবন। ৪৮
আমার চরিহ যদি নাহি রােধে লােকে
কেমনে বুঝিবে তারা মহিমা তাহার
লব মাত্র, লভি যর উদার আশ্রয়
তৃণবৎ উপপক্ষিক বিপ্ন পীড়া যত। ৪৯
৬৯
সত্যব্রহের পরীক্ষা।
অহো মৃত্যু! হবে কি এ হেন ভাগ্য মোর ?
নরলােকে প্রচারিত মাহম। তঁাহার
যাবে এই তুচ্ছ প্রাণ যাদ হেন ঘটে
উৎসর্গিব প্রাণ তব আনন্দে শমনে। ৫০
দেখিৰে ই তবে পরে পূর্বব ঘটনা
যেই অমা ক:ছিল লোষ্ট্র নিক্ষেপণ,
যেই দিয়াছিল বিধি বধিত আমার
ফিরিয়াছে তাহাদের জীবনের গতি। ৫১
আমা হতে অত্যধিক ব্যাকুলিত মনে,
মহেশ-মহিমা-মােহ-মোহিত-মানসে.
প্রচারিছে তার নাম নগরে নগরে
উন্মাদিয়া যুবা বৃদ্ধ নর-নারী ৰত। ৫২
এ দেহ নিস্ফল তরু ফেলি উপাড়িয়।
এ ভব উদ্যানে আমি যে কল্প পাদপ
যাইব রােপিয়া, তায় ফলিকে অমৃত,
আপ্রলয় জীবে তাহা সুখে আস্বাদিবে। ৫৩
৭
চতুর্থ সর্গ।
এক প্রাণ যাবে মাের অনন্ত পরাণে
বসব মানব স্মৃতি পূত নিকেতনে ;
অর্ডিবে তথায় তারা প্রেম ভক্তি ভরে
জ্যেষ্ঠ ভাই শ্রেয়াে মার্গ প্রদর্শক বলি। ৫
শত স্থানে আছে নর অাছে যত কাল
রবে সবে বশ মাের প্রেমের শাসনে,
যে রাজ্য-প্রলোভ তুমি দেখালে আমায়
কোন ছার তাহা বল এর তুলনায় ? ৫৫
তোমার আশ্রিত যত দাম্ভিক নৃপতি
হীরাও মম নামে হবে নত শির,
কিন্তু এতে নাহি কিছু গৌরব অামার
তাহার গৌরব ইহ। যার লীলা খেলা। ৫৬
ব্ৰক্ষতেজ স্থূলসূক্ষম অনলে প্রকাশ,
স্কুল যিনি, তিনি স্কুল জাত পাবন
সূক্ষ যে অনল সূক্ষম অন্তর প্রকাশ
মাত্মক অশুভ যত কারেন দাহন ? ৫৭
৭
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
তামস মালিন্যে পূর্ণ মলিন অত্মায়
শােধিতে যে বহ্নি এলে দীপ্ত ধরাতলে ;
আমাতেও উদ্দীপিত সে মহা অনল
দহিছে সে বহ্নি মম যত পাপ মল। ৫৮
• ৯
আত্মিক বেয়াধি ওহে তুমি মায়াবিন
পলাহ, পলাহ, শতু দহিবে এখনি
বলিতে বলিতে ব্ৰহ্মতেজোদীপ্ত ধর
পূর্ণ বিকসিত নেত্রে রহিলা চাহিয়া। ৫৯
সহস্রাংশু অংশু যেন প্রকাশিল তায়
সভয়ে চণ্ডক হ’ল বায়ুতে বিলীন ;
যথা হয় কুজঝটিকা আকাশেতে লয়
প্রখর প্রকাশে যবে তপন কিরণ। ৬০
१२
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
•)*
পঞ্চম সর্গ।
প্রগাঢ় কালিমাময় অন্ধতম পুরে
ফিরিল প্রচণ্ড চণ্ড নির্বিন্ন মানসে ;
বিষাদ মালি মিশি ঘাের অন্ধকারে
রোরার রৌরব বাড়াল অধিক। ১
উঠিল বিকট দু'ভদুঃস্থ,
কি দিব তুলনা তার এ রম্য ভুবনে,
ভয় শত শত বায়সের রব
কোকিল নিক্কণ গণি সে ধ্বনি তুলনে!
৭৩
এe
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
বিষাদে নৈরাশ্যে হেন রৌরবেয় গণ
নিশ্চেষ্ট নিস্তেজ হয়ে ছিল কতকাল ;
মন্দীভূত হ’ল যবে বিষাদের বেগ,
পুনরপি সত্যব্রত জাগিল অন্তরে। ৩
অহাে চিত্র দুরাশার অদ্ভুত কুহক !
শুধু কি মানবে ভুলে তার ছলনায় ?
নরকেও সে নারকী প্রকাশে কৌশল
ছলনা আর যারা তার ছলে বশ। ৪
তার ছলে অভিভূত তামসেয় যত
আশা নাই তবু সবে এক মিলিয়া
সত্যব্রত দীপ্ত সত্ত্ব তামস কর্দমে
নিভাইতে নিমজ্জিত গাঢ় ভাবনায়। ৫
অবশেষে একজন, যার অবতার
বিহগে বায়স, আর শাপদে গােমায়ু,
উরগ শরীর সৃপে, কৌরবে শকুনি,
কাপট্য মীতে যেই ঢাকে সর্ব হৃদি। ৬
৭৪
পঞ্চম সর্গ।
কহিলা “ভণ্ডক আমি বৃথা নাম ধরি
ভাণ্ডাইতে নারি যদি সামান্য মানবে
তপস্যা গৌরবে যবে গর্বে স্ফীত হবে
আঁকে বাঁকে থাকি একে ফেলিব বিপাকে”।৭
এত বলি পক্ষ মেলি, শকুনি সদৃশ,
উড়িলা তামস সেই, পূতি গন্ধময়,
হেরি সেই ভূতযােনি বায়স নিচয়
কা কা রবে উড়ি চারিদিক আতঙ্কিল। ৮
যেই শৃঙ্গে সত্যব্রত যােগ ধ্যানে রত
তার উপত্যকা দেশ পরম সুন্দর ;
যদিও বন্ধুর স্থান অতীব দুর্গম ;
বৈচিত্র বৈভব তার ভাব নিকেতন : ৯
বালিকা হৃদয় হেন নিৰ্ম্মল সলিলা,
বালিকা স্বভাবে সুখে গেয়ে কুলকুল,
চলিছে কোথাও মৃদু নাচিয়া তটিনী,
শীতলিয়া সন্তপ্তের সন্তপত মন। ১০
৭৫
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
কোথাও গভার নদে বিকট তাণ্ডবে
ঘাের বেগে পরিতেছে ভাম প্রস্রবণ
উৎসাহে উৎফুল্ল করি বীরের হৃদয় ;
বিস্ময়ে মাতায়ে শান্ত ভাবগ্রাহা জনে। ১১
কোথাও বা মহা দের নিবিড় তামসে
আবৃত অতল স্পর্শ, অতি ভয়ঙ্কর
বিষাক্ত মরুত পূর্ণ বিশাল গহ্বর,
নরকের ছায়া প্রায় আছে বিস্তারিত। ১২
কোথা পুনঃ রাজে তরু নিয়ত শ্যামল,
নিত্য কুসুমিত রম্য গুল্মলতায়,
কলকণ্ঠ পিক আর মৃদুল সমীর,
মরতে প্রকাশ যেন স্বর্গ প্রতিভাস। ১৩
এই ক্লম দেশে ছিল তপস্বী আশ্রম
নিবসিত তথা সদা যােগী সাধুজন
ছিল তথা সেই কালে যােগ তপে রত
সুপণ্ডিত কতিপয় সন্ন্যাসী প্রবর। ১৪
৭৬
পঞ্চম সর্গ।
ধরণীতে অরোহিতে ভগুক পামর
পড়িল সে ন্যাসীচয় নেত্রপথে তার,
বিদ্যা অভিমানে ভরা হেরি তা সবায়
অলক্ষ্যে সবার চিন্ত করিলা মােহিত। ১৫
ছিল সবে জ্ঞানানন্দ উৎসে নিমজ্জিত
সংশয় অবর্ষে এবে হইল তাপিত ;
তত্ত্ব কথা আস্বাদিতে মিলিত সকলে,
জয়েচ্ছায় শুষ্ক তর্কে এৰে সবে মিলে। ১
দীনভাবে যদুদ্দেশে থাকিত মৌনেতে
এবে তারে বিদ্যাবলে চাহে নির্দেশিতে,
শিশু তুল্য ঋজুভাব নিস্কপট ভুলি
হইলা সকলে দম্ভমানের পুতলি। ১৭
হেনরূপে ন্যাসীবৃন্দ তামস প্রভাবে
হইয়া বিকৃতচিত্ত আছে সে আশ্রমে
একদিন সন্ধ্যাকালে অনল বেষ্টিয়া
সবে মিলি আরলি ঘের তর্ক রণ। ১৮
৭৭
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
কেহ বলে “সৃষ্টিমূল পরমাণু বিনা
ন:হি দেখি আর , জড়, চেতন, উদ্ভিদ ;
পরমাণু শক্তিক্রমবিকাশ সকলি ;
১ানুষ আত্মও পরমাণু পরিণতি”। ১৯
“দৃশ্যে যদি পাই আমি উপযুক্ত হেতু
কি কাজ করিয়া তবে অদৃশ্য স্থাপন ?”
“যথেষ্ট কারণ পেলে ?”
বলিলা দ্বিতীয়
“কোথা? দেখ চেয়ে মনে আত্মবােধ মূলে।
নাহি তথা জড়গন্ধ লেশ ; তাই মূলে,
পরমাণু ভিন্ন বস্তু অবশ্য অছিয়”
আমি বলি “মূল দুই পুরুষ, প্রকৃতি,
দুই পরিণয়ে এই বিশ্ব সমুদ্ভুত।” ২১
“দুই মূল বল দেখি কি কাজ স্থাপিয়া
দ্বিবিধ বস্তু বা কোথা ? আমি দেখি এক ;
একই পুরুষ স্বীয় মায়া-শক্তি গুণে
দুই হেন উদ্ভাসয়” বলিলা তৃতীয়। ২২
৭৮
পঞ্চম সগ।
“নহে উদ্ভাসয় শুধু” চতুর্থ বলিলা
“লু যথা কুক্ষি হতে তন্তু বিস্তারিয়া
ইচ্ছায় পুনশ্চ করে কুক্ষিতে গ্রহণ
সৃষ্টি ক্রিয়া তথা ব্রহ্মশক্তি পরিণতি”। ২৩
“এ স্থূল জগৎ ছিল সূক্ষে লুক্কায়িত
নহে ইহা বােধগম্য”, বলিলা পঞ্চম ;
“আমি বলি শক্তিমান চিপ ঈশ্বর
ইচ্ছায় সৃজিল। এই বিশ্ব জড়ময়”। ২৪
“আঁধার অতীতে আর আঁধার তানতে
বৃথা ক্ষেপ তােমা সবে কল্পনার তীর
বিন্ধে কি না বিন্ধে লক্ষ্য কেমনে বুঝিবে ?
আমি বলি আদি কথা নর-অবিজ্ঞেয়।” ২৫
ষষ্ঠজন এইরূপে সবারে খণ্ডিল
ক্ৰমে গাঢ় অন্ধকারে ধরা আবরিল
প্রগাঢ় গম্ভীর ভাব প্রকৃতি ধরিল
নিদ্রাবশে শয্যাগত সবে ক্ষুন্ন মনে। ২৬
৭৯
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
উপাধানে শির দিয়া চিন্তিলা সকলে ;
ছাড়িয়া সংসার সুখ আইলাম বনে,
সে আশায় দেখি তাহা আকাশকুসুম
অসারতা মাঝে জীব অসারের সার ! ২৭
ভূ-বিনা ভূরুহ কভু নারে সঁাড়াইতে,
নিশ্চয়তা বিনা মন না পারে তিষ্ঠিতে ,
কিন্তু তার অন্বেষণে হায় ধিক্ ধিক্
অনিশ্চয়তা আরও বাড়ায় অধিক ! ২৮
গীত অন্তে গীত যন্ত্রে গুণ গুণ স্বরে
যেইরূপে ধীরে ধীরে ধ্বনি হয় লয়
ক্লান্তির আবল্যে তথা ভাবের উদ্বেল,
নিদ্রায় ডুবিয়া যায় ক্রমে ক্রমে কমি। ২৯
}
হেন মতে তপস্বীরা হইল নিজিত
সেইকালে ভণ্ডক তামস দুরাশয়
ইহাদের দুর্বলতা সূত্র উপাদানে
রচিলা বগুড়া এক অদ্ভূতকৌশল। ৩০
পঞ্চম সর্গ।
বিভাের নিদ্রায় যত তপস্বা-নিচয়,
তবু যেন দুঃখ ভাব জাগে মনে মনে ;
এ হেন সময় স্বপ্ন দেখে একজন
অপরূপ মূর্তি এক বসিয়া শিয়রে ! ৩১
শুশ্যাম বরণ আর হসই বদন,
চক্ষে তার ভাসে যেন গাঢ় মনস্বিতা ;
মধুরিমময় তার অঙ্গের ভঙ্গিম,
কহিতে লাগিল হে মনোহর ভাষে
উঠ উঠ উঠ বৎস উঠই সত্বর,
বাও যাও সবে মিলি শৃঙ্গের উপর
পাইবে আমায় তথা পাইবে আমায়
অবতীর্ণ হথা আমি ধরি নরকায় । ৩৩
সংশয়ে বিশুদ্ধ হেরি মনীষী-মানসে
ধরামুখ স্নান হেরি কলুষ মসে
হলেম এবার আমি ধরায় উদয়,
দুঃখ অবসান, সবে বল জয় জয় । ৩৪
৮১
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
দিব্য জ্যোতি এক মূৰ্ত্তি এই শৃঙ্গোপরে
গাঢ় নিমজ্জিত আছে সমাধি-সাগরে ।
সেই আমি নাহি ভেদ তাহায় আমায়,
হেরিবে আমায় যদি যাও হে তথায়”। ৩৫
এত বলি সেই মূর্তি হ’ল অন্তর্হিত,
বিহগে ডাকিয়া তবে তুলিল তপনে
জাগিল তপস্বীচয় অঙ্গ সঞ্চালিয়া
স্বপন বৃত্তান্ত থাসী বলিল অপরে। ৩৬
স্বপ্ন শুনি কেহ কহে “স্বপ্ন মনঃক্রিয়া
“নাহি তাহে সত্য গন্ধ” বলিলা অপরে
“নহে কেন স্বপ্ন সেই পরমাত্মা ভাষা
সচেতন আত্মা শুনে আত্মিক শ্রবণে ?” ৩৭
‘এত নহে অপরীক্ষা অদৃশ্য বিষয়
বৃথা কেন ক্ষেপ কাল বাক্য যুদ্ধ করি,
চল সবে দেখে আসি এই শৃঙ্গপরে ;
স্বপ্ন সত্য কি না তাহা বুঝিব এখনি” । ৩৮
৮২
পঞ্চম সর্গ।
বলিলা তৃতীয় তাতে দিল। সবে সায়,
কৌতুহল-দীপ্ত চিত্তে সবাই চলিলা
সপ্ন তত্ত্ব লয়ে তর্ক-বিতর্ক করিয়া
কতক্ষণে উত্তরিলা সেই শৃঙ্গোপরে। ৩
;
দেখিলা তরুণ সূৰ্য শৌর্য প্রকাশিয়া
উঠিতেছে ক্রমে ক্রমে উন্নত গগনে;
প্রভা মহিমায় পূরি আকাশ ভূতল
অাশায় উদ্যমে পৃরি মহতের মন। ৪০
কতক্ষণে, তিন দিক শিলায় আবৃত,
সম্মুখে উজ্জ্বল দৃশ্য নব সূর্যোদয়ে,
আসীন পুরুষ এক প্রস্তর আসনে,
হেরিয়া চকিতে সবে চাহে পরস্পরে। ৪১
পদ্মাসন, যােড় কর, মুদিত নয়ন,
রুদ্ধশ্বাস, দেহষ্ঠি মৃদু আন্দোলিত,
সঞ্জিত কপােল, স্ফীত কপালের শিরা,
প্রভাময় কান্তি, যেন সাক্ষাত ঈশান। ৪২
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
গেরিয়া সবাই মুগ্ধ বিস্মিত বিহবল ;
স্বপ্ন সত্য, সত্য ঈশ, এই আবিভূত,
যুগপৎ সবে এই চিত্তে মীমাংসিয়া
সভয়ে সজোড় করে দাঁড়ায়ে রহিলা। ৪৩
মনুষ স্বভাবে এক ধৰ্ম্ম সাধারণ,
অদৃশ্য অস্পৃশ্য যাহা দৃশ্যের সহিত
সংশ্লিষ্ট করিয়া মনে করয় ধারণা ;
চিহ্ন বা বিগ্রহ বলি দৃশ্যে দেয় নাম। ও
ধর্মচিহ্ন ক্রুশ, দণ্ড, কৃষ্ণ পরিচ্ছদে,
শােকের মলিন ভাব করয়ে সূচনা ;
ত্রিভঙ্গ মাধব মূর্তি ভগবদ্বিগ্রহ;
সকলেই এক সত্যের দিতেছে প্রমাণ। এ
সতেজ সৰ্জাব যার মনােবৃত্তিচয়,
ভাবময়ী প্রকৃতিকে বিগ্রহ মানিয়া
হেৰে এতে দীপ্যমান পরম সত্যায়
তার ভাবে এর ভাব সমন্বয় করি। ৪৬
৮৪
পঞ্চম সগ।
এই যে পূরবে সূর্য উজ্জ্বল কিরণে
প্রকাশিছে স্থল, জল, গ্রহ, উপগ্রহ;
আলাে তেজ বিরিয়া গুণে আকষিয়া
প্রক্ষিছে জ্যোতিষ্কচয় গগন মণ্ডলে। ৪৭
এমনি ত জ্যোতিষ্মন্ পরম পুরুষ,
এমনি অলোক দিয়া গুণে আকর্ষিয়া
রক্ষিছে মোদিছে যত জীবাত্মা-নিচয়ে
এমনি আত্মিক লোক কেন্দ্রস্থানে বসি। ৪৮
;
উষার কাকলি রবে উঠিয়া তাপস
তাম্ৰাসন ইৰ পূর্বদিকে সমাসীন ;
অরুণে বিগ্রহ হেন সম্মুখে করিয়া
হো চিন্তা হেন ভাব বিভাবি মনে। ৪৯
বসিয়াছে, দেখিতেছে অন্তর আকাশে,
সমুদিত স্বপ্ৰকাশ পরমেশ রবি
তারি করে হৃদয়-সরসে প্রফুল্লিতা,
অনুরাগে আরক্তিম ভকতি নলিনী। ৫
৮৫
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
উজ্জ্বল প্রফুল্ল শান্ত বাহিরে যেমন,
উজ্জ্বল প্রফুল্ল শান্ত অন্তর তেমন ;
মহা ভোগ মহা ভাব ইহাকেই কয়,
যোগসিদ্ধি অপবর্গ অন্য কিছু নয়। ৫১
উদিলা মার্তণ্ড দেব মধ্যাহ্ন গগনে,
মেলিলা প্রশান্ত ভাবে আঁখি সুমানস
প্রাণেশের সনে প্রাণ অন্তর মন্দিরে
কপাটে আবদ্ধ করি যেন বাহিরিলা। ৫২
পড়িল নয়নে সেই ন্যাসীবেশীচয়,
ভয়াকুল, বদ্ধাঞ্জলি দাঁড়ায়ে সম্মুখে ;
কদলীর পত্র যথা বায়ুভরে কাঁপে
তাঁর দৃষ্টিপাতে তারা তেমনি কম্পিত। ৫৩
বন্ধিত বিস্ময়ে তিনি সুধিলা সবারে,
কে তােমরা কেন এত ভয়বিকুঠিত ?
কি হেতু এসেছ ? তাহা কলহ নির্ভয়ে।
আশ্বস্ত হইয়া কহে এক ন্যাসীবর। ৫৪
৮৬
পঞ্চম সর্গ।
“দয়াময় : দয়া কর স্বপ্নে নির্দেশিয়া
আপনি আনিলা পুনঃ
कि
ছলনা ?
সংশয়ে মজিয়া মেরা মহা অপরাধী
ও বর চরণে এবে পাব কি অাশ্রয় ?” ৫৫
এত বলি সানেত্রে ঘন দার্ঘ শ্বাসে
উদ্বেলিত চিবেগে বিহ্বল হইয়া
গদ গদ ভাষে দৈন্য আর্তি পরকাশি
সবে মিলি তার পদে সাষ্টাঙ্গে পড়িল।। ৫
বিস্ময় চকিতে “এ কি ?” বলিয়া তাপস
সরি দাড়াইলা যেই চাহি স্বর্গ পানে;
আকাশ নীলিমা ভেদি এক দিব্য জ্যোতি
সাহিরি অমনি তঁার নয়ন দিল। ৫৭
চমকে মুদিলা আঁখি, শুনিলা অমনি
সুগম্ভীর ধ্বনি এক, প্রতিধ্বনি যথা
পর্বত করে; পুনঃ ঔৎসুক্যে চাহিলা,
দেখিল। সুবর্ণ মেঘ ব্যপ্ত নভোস্থল। ৫৮
৮৭
সত্যব্রতের পরীক্ষা
ভার মাঝে শুভ্র পক্ষ অলৌকিক রূপ
মৎস্য-লক্ষ্য মৎস্য-রঙ্ক সদৃশ সুস্থির
উদিত বিশাল এক অপূর্ব মূরতি ;
তারি মুখ হতে যেন ধ্বনি বাহিরিছে । ৫৯
পশিল সে ধ্বনি মুগ্ধ তার্কিক শ্রবণে ;
আস্তে ব্যস্তে সবে তারা উঠি দাড়াইলা ;
হিল চাহিয়া উর্দ্ধে সবিস্ময় চিতে;
উল্লাসে ওজস্বী ভাষে সে ধ্বনি ধ্বনিল । ৬
“ওগো বসুন্ধরে ! সুকৃতি প্রচুরে
কর জয় ধ্বনি হরিষ অন্তরে
সূৰ্য্যকান্ত হেন তব বক্ষপরে
রাজিছে ঐযে পুরুষ রতন। ৬১
অসুর দুর্বার করে অত্যাচার
দুঃখে জ্বলি জলি হইলে অঙ্গার,
দেখিয়া ব্যথিত কৃপার আধার
আইলা তােমার উদ্ধার কারণ। ৬২
but
পঞ্চম সর্গ।
ওগাে বসুন্ধরে পুণ্যবতী বরে !
শাপান্ত ফলিল দুরারাধ্য বরে,
অপত্য পাইলা ত্রিলােক ঈশ্বরে
বল কে সুভগা তোমার মতন ? ৬৩
হ’য়ােনা নিরাশ, ভেব না উদাস,
দেখ পিশাচেরা পেয়েছে তরাস,
এখনি পালাবে নিরয় নিবাস,
হও হও ধনি প্রফুল্লিত মন। ৬৪
বাৎসল্য ভকতি সুদুর্লভ অতি,
স্নেহেতে গৌরবে বিচিত্র সংগতি
সেই ভাবে হয়ে নিমজ্জিত মতি
লও কোলে ধনি? ও রূপ মােহন। }}
কৃতার্থ মানিয়া আনন্দে ডুবিয়া,
গত দুঃখ যত বিস্মৃত হইয়া,
একান্ত মানসে নয়ন পূরিয়া,
হের হের সতি! ও চন্দ্র বদন। ৬৬
ঠ
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
মনুসুচয় ! গাও জয় জয়
হইল তােদের সুদিন উদয়,
পাপের রজনী দুঃখ তমােময়
নাশিয়া, রঞ্জিতে পুণ্যের করে . ৬৭
আইলা আইলা তপন তাপন
ওই দেখ দেখ বর্ষিয়া কিরণ,
প্রফুল্লিছে দিক হিমাদ্রি ভবন,
অরুণিমা যথা পূর্ব ভূধরে। ৬৮
পুরাণ উকতি না হয় অন্যথা
সুধা-নিক্ষিপ্ত বাণচয় যথা,
পাপপূর্ণ হেরি ধরণী সৰ্বধা
আইলা ভক্তীশ ভকত রূপে। ৬৯
কি হেতু জন্মিলে করনা গণনা,
সুখ চেয়ে ফের কোথা তা জান না,
অভিনয় তাই শিখাতে সাধনা
অনন্ত দেবতা শরীর-কূপে। ৭০
পঞ্চম সর্গ ।
অহহ কৃপাময় ! অপূর্ব তোমার
দয়ার মহিমা অনন্ত অপার
আত্ম লুকাইয়া আপন প্রচার
করিছ আপনি সকল যুগে। ৭১
ধন্য ধন্য যত ধরাবার্সা জন
ধন্য মােরা হেরি ও লাল মােহন
কি আনন্দে আহা ! ডুবিলরে মন,
প্রণমামি দেব ও পদ যুগে। ৭২
আপন মায়ায় আপনি মােহিত
হইয়া রয়েছ স্ববােধ রহিত,
পূৰ্ব নিদেশিতে, করিতে জাগ্রত
এ দাস আগত অবনী’পরে। ৭৩
আত্মবােধ রবি, ওগো ইচ্ছাময়,
করগাে উদয় হউক বিলয়
মায়া-নিশা,সহ মোহ তমােচয়
অনন্ত গগন অন্তর স্থলে। ৭৪
৯১
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
মানৰ আকার আচার ধরিয়া
আপনার ভাবে আপনি ভাসিয়া
ভাবাবেশে ভবে আত্ম প্রকাশিয়া
তার গাে মানবে দুস্কৃতি দুঃখে। ৭৫
হউক ধরায় আনন্দ প্লাবন
ডুবুক ভাসুক তাহে জীবগণ,
আমরাও নামি জুড়াব জীবন,
ও পদ পল্লব ছায়ায় সুখে।” ৭৬
৫
থামিল সে ধ্বনি উদ্ধে উঠিল সে রূপ
জলদে চন্দ্রমা হেন গগন নামি
আবরিল ক্রমে সেই জ্যোতি অপরূপ
রহিল দাঁড়ায়ে সবে নারব নিশ্চল। ৭৭
কতক্ষণ অবধাদৃষ্টে চিন্তিত মানসে
থাকি সত্যব্রত ধীর অকস্মাৎ পুনঃ
ঈষত হাসিলা,
সনে? ভঞ্জন ভাব ভাতিল সে হাসে। ৭৮
উঠাইয়া মুখচন্দ্র
৯২
পঞ্চম সর্গ ।
সুগম্ভীর অপার্থিব মুখ দর্শনে
হয়েছিল পুরা ভয়ে ত্ৰাস্ত ন্যাসিচয়,
সুস্নিগ্ধ পার্থিব ভাবে ফুল্ল মুখ হেরি
বর্ধিত সাহসে এবে সুস্থিরে কহিলা। ৭৯
সিগণ ।
“কি বলিব দেব ! মুখে নাহি সরে বাণী,
অনাদি অনন্ত যিনি জগত আধার,
যার জ্যোতিকণা লয়ে এ বিশ্ব প্রকাশ
তারে হেরি মূর্তিমান এই বিদ্যমান। ৮০
পারি ধরিতে মােরা চিতে হেন ভাব
বিস্ময়ে জড়িত মন, ইন্দ্রিয় বিকল,
আচ্ছন্ন বিবেক বুদ্ধি, দুর্বল হৃদয়,
প্রবল ভারের ভরে যেন নিপীড়িত। ৮১
কি বলিব কি করিব নাহি পাই স্থির,
অতুলিত সুখে চিত্ত হইল অবশ;
প্রাণনাথ জগন্নাথ হেরিনু নয়নে
ভাবিতে বাতুল প্রায় বিঘুর্ণিত মন।” ৮২
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
অসঙ্গত বিগর্হিত পাক জনক
শুনি এই বাক্যচয় ব্যথা পেয়ে মনে
প্রশান্ত গম্ভীরভাবে মিষ্ট ভৎসনায়
কহিলা তপস্বিবর সন্ন্যাসি-নিচয়ে। ৮৩
সত্যব্রত।
অনন্তের অধিপতি আদি-অন্ত-হীন
অনন্ত শকতি তার অনন্ত ব্যাপক
কিরূপে সংবদ্ধ হবে মনুষ্য শরীরে
কেন বা হইবে হেন কিবা প্রয়োজন ? ৮৪
জঁবে নিস্তারিতে? আহ৷ এই তুচ্ছ কাজ
সাধিতে জগত স্রোত চলিবে উজা
কারণেতে পরিণত হবে কাৰ্য্যচয় ;
উচিত কার্যের একি উচিত কারণ ? ৮৫
ন্যাসিগণ !
“মায়াময় অনন্ত শকতি ধর তুমি,
অণু হতে অণু দেহ পারহ ধরিতে
ধরেছ মানব দেহ কিবা সে বিচিত্র
কে জানে আশয় তবকে বােঝে চরিত্র '৮৬
৯৪
পঞ্চম সগ।
তথাপি গলপ বুদ্ধে করি অনুমান
সর্বংসহা বসুন্ধরা অসুর পীড়নে
গেরিয়া পীড়িতা, দয়াবসে দয়াময়,
আইলা আপনি তার উদ্ধার সাধনে। ৮৭
ইন্দ্রিয় অগম্য গৃঢ় পরমাত্মা জ্ঞান
অতি ক্ষীণ নর বুদ্ধি ধারণে অশক্ত
রূপ-রস-গন্ধ হীন অদৃশ্য সুষমা,
বিষয় আবদ্ধ হৃদে নারে আকষিতে। ৮৮
তাই প্রভু দীনজন উদ্ধার কারণ
মনুষের অধিগম্য ঐশ্বৰ্য প্রকটি
রূপে বিমােহিয়া আর লীলায় তোষিয়া
তারিতে আইলে ভবে ইথে কি বিচিত্র ৮১
পূর্ণদেব পরব্রহ্ম অভাব বিহীন
কেবল লীলার হেতু সৃষ্টিস্থিতি খেলা
কেবল লীলার হেতু আইলে ধরণী
এ মােহন রূপ ধরি, হেন অনুমানি। ৯০
৯৫
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
মনস্বী তপস্বির এ সব বচনে
মর্মাহত হয়ে অতি কহে সুগম্ভীরে
“তােমা সবে হেরি যেন বিজ্ঞজন প্রায়
কিন্তু কহ ভষ সে অবােধ বালক।” ৯১
“অনন্ত শকতি সঁার, যাহার ইঙ্গিতে
ঘটে এই জগতের সৃষ্টিস্থিতি লয়,
সে ইঙ্গিতে নহে নদি অবনী উদ্ধার
অনন্ত শকতি তবে কোথা রহে তঁার ? ১২
জানে ঈশ্বর যেই মানুষ প্রকৃতি
পারে কি ঈশ্বর জ্ঞান তারে প্রবোধ,
জানে যে ঈশ্বর তার কিবা প্রয়ােজন
ঈশ্বরত্ব সঙ্কোচিয়া মনুষ স্বরূপে। ১৩
ঈশ্বর জানি মাত্র তার কৃপা বল,
আপনি উদিয়া হৃদে জানান আপনা,
জানি যদি, পাই তারে সর্ব ঘটে পটে,
জানিলে, নাহি হেরি কোথাও তাহায় । ১৮
পঞ্চম সর্গ ।
তাশাতে আরোপি বৃথা ঐশ্বৰ্য্য গরিমা
বল কি লাভ হল? হবে কিগাে তায ?
সন্তর্পিত সে বাসনা তা খরতর,
চায় যহে পূর্ণ সুখ, অনন্ত আনন্দ ? ৯।
মনোরমা প্রিয়তমা ভেকরূপ ধরি
আসে যদি তােম। সবে প্রণয়ে তােষিতে,
বল ৩ায় মিটিৰে কি প্রণয় লালসা,
নহে দি, ব্ৰহ্মতৃষ্ণা নরে কি তর্পিবে ? ১৬
ব্রহ্মরূপ অনন্ত অসীম অবিজ্ঞেয়
কিন্তু জীবে চায় তায় পার একরূপে
ঘটন্যব্ধি পরপারে সুস্থির অচল
কাৰ্য্যকারণোৰ্ম্মি যায় নিত্য প্রতিহত। ৯৭
পরাথ তৃষায় যার মানস তৃষিত
এবম্বিধ ভাব বিন নাহি তৃপ্তি তার ;
ধূমে কভু নাহি নিটে জলের পিপাসা
বিকৃত ঈশ্বরে ঈশতৃষা না মিটিবে। ৯৮
৯৭
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
মানুষী জননা মাের, মানুষ জনক,
নুষা শোণিত মাের বহে ধমনীতে,
পাপ তাপ শােক দুঃখে আমি অন্যসম,
অস্থাৰ মানৰীয় ক্ষৗণতা প্রকাশে। ৯৯
এই সূৰ্য্য তোম। আমা হতে যথা দূরে,
তােমা আমা হতে তথা পরাত্মা-তপন,
এমনি সমান দূরে জান সুনিশ্চয়,
দিওনা বেদনা মােরে কল্পিয়া অন্যথা।" ১০০
শাসিগণ--
দিয়াছি বেদনা যদি, চাহি ক্ষমা, দেব ।
ভৰদীয় বাক্য সত্য হইছে প্রত্যয়,
কিন্তু দিব তা সবায় কোন অভিধান
পাপ নাশি যুগধর্ম প্রবর্তে যাহারা। ১০১
অশুভ বিনাশ যুগ ধৰ্ম্ম প্রবর্তন
নবিশেষে করে, জানি না এমন ;
জানি না মানৰ কিম্বা কোন জীব জড়ে
স্বেচ্ছায় আপন বলে কোন কাজ করে।১৫২
৯৮
পঞ্চম গগ ।
সবে ঘটনার বশ, দেখহ কেমন
তুড়িতেছে ঘটনার চক্র সুদর্শন,
সে চক্রের আবর্তনে আহ্ম জগৎ
পুনঃ পুনঃ প্রকাশিয়া হইতেছে লয়। ১০৩
এই চক্র তর্জনীতে রয়েছে যাহার
তিনি সর্ব কৰ্ত্তা, কৰ্ত্তা কেহ নহে আর ;
তিনি কৰ্ত্তা তার ইচ্ছা জগৎ নিয়ম,
কে আছে তাহার ইচ্ছা করে অতিক্রম ?১০৪
তাহার কর্তৃত্ব হেরি নীনিধি হেন :--
অপার, অসীম, আর অগাধ গভীর ;
তৃণগুচ্ছ হেন হেরি এককোণে তার
উলটি পালটি ভাসে নিখিল সংসার। ১৫
সেই তাে কর্তৃত্ববশে কভু ধরা মুখ
চাকে মােহ অন্ধকারে অজ্ঞান তামসী
জীবকুল সে আঁধারে, বিষয় নিদ্রায়
রহে ঘোর অচেতন জীবন্ত প্রায়। ১০৬
৯৯
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
তিনিই আবার স্বীয় প্রসন্ন বদন
প্রকাশিয়া, প্রবোধিয়া অচেতন জীবে
পুনঃ সেই ইচ্ছাময় তাহাদের হৃদে
আপনি আপন রাজ্য করেন স্থাপন। ১০৭
নিজে না দিলে তিনি, মতি নাহি দিলে,
কার সাধ্য তার পথে আনয় মানবে ?
কার সাধ্য অনুগত যৌবনা-হৃদয়ে
প্রিয় সঙ্গ লালসার করে উদ্দীপন? ১৮
তিনি আসি আলােকিত করেন মানবে,
তঁার তেজে তেজীয়ান হয় সে মানব,
ধরা যথা প্রভাময়ী সূৰ্য সমাগমে,
লৌহ যথা দাহকর অনল সংযােগে। ১০৯
তঁাহারি আলােকে হেন হয়ে আলােকিত
নব ভাবে নব তেজে নবীন উৎসাহে,
অতুল আনন্দে মাতি আপনা ভুলিয়া
প্রাণ ভরি করে সবে তার যশােগান। ১১,
১০০
পঞ্চম সর্গ
এইরূপে কালে কালে পৰ্ম্ম প্রবর্তিত
এতে নাহি কভু কোন মানব-প্রভুত
উদে যবে সে আলােক কেহবা সে কালে
আগে দেখি, আগে আনে সেই সুসংবাদ।১১
চাও যদি সেই জানে কোন নাম দিতে
বল তারে পুৱােদশী সংবাদ বাহক,
শােন তাঁর বাণী, চাও যে দিকে সে ঢায় ;
তার সঙ্গে সে আলোক করবিলােকন। ১১১
সিগণ--
তক বাক্য সুধাকরে বিদূরিল, দেব !
আমাদের মরমের সংশয় আঁধার
হল হৃদি আলােকিত ভবৎ সমাগমে,
চিন্তামনি স্পর্শে যথা লৌহ মণিময়। ১১৩
এক নিবেদন প্রভু! ভয় বাসি মনে
প্রকাশিতে, না কহিলে না যায় সংশয় ;
এসেছে ত’ নব যুগ প্ৰবৰ্তের কাল
নহেন কি প্রভু সেই সংবাদ বাহক ?১১৪
সত্যৰতের পরীক্ষা। যে অলোকে আরঞ্জিৰে সমস্ত সংসার পুর্ণিত তাহাতে প্রভু হয়েছেন অগে অবদায় সহবাসে ধরাবাসী জন অচিরে সৌভাগ্য বসে পাইবে নিস্তার । ১১.৫ সত্যব্রত- ন্যাসিগণ ! যদি হও বান্ধব আমার বৃথা চাটুবাদে তবে বাড়াইও না আর, আমি দান, মতিহীন, পাপতাপে ক্ষীণ, অন্ধকারে ঘুরি ঘুরি অবশ মলিন। ১১৬ কোথা সে ঈশ্বর তার না পাই সন্ধান, তাহার বিরহে মম কণ্ঠাগত প্রাণ, পাপীর অধম আমি, কহি বার বার বৃথা স্তবে ব্যথা মােরে দিওনা কো অব।১১৭ এসেছে নূতন কাল নব ভাব দানে, তারিবেন জগৎগুরু জগৎবাসী জনে, পাপী তাপী দুঃখী সবে পাইবে নিস্তার, আমিও নিস্তার পাব এ আশা আমার। ১১৮ পঞ্চম সর্গ । সিগণ-- অলঙ্গ বচন হব আর না লজি, ভবদীয় কথা মোরা পুন না ভুলিব, ব কথামৃত পানে প্রগাঢ় জিয়া স্বপ্ন আর দৈব বাণী গিয়াছি ভুলিয়া। ১১৯ এতক্ষণ শুনিনু যা তাতে মনে লয় করেছে কু-চক্র কোন দুষ্ট দুরাশয়, সপ্ন দৈববাণী নহে দৈবত ঘটনা, অশুভ পারণি কেই করেছে জোটনা।১২০ সত্যৱই- যাকহিলা সত্য তাহা। আছে মুক্তিপথে বহুবিপ্ন, বহুবিধ অসুর দুর্বার নানা ছলে নানা ভাবে রােধ করে গতি স্বপ্ন দৈববাণী বটে আসুরি চাতুরি। ১২১ রেণু হযে যার পদে চাহি লগ্ন হতে আরােপি ঐশ্বৰ্য তাঁর এ কাট অধমে তেমা সৰে অবলম্বি ছলিতে আমায় নচেছিল এ বাগুরা পাপযােনি কোন। ১২২
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
আহা ! এর ছলে ভুলি কত মহাজন
আরন্তিয়া ঈশ-রাজ্য করিতে স্থাপন
বসেছে আপনি শেষে তার সিংহাসনে,
নাড়ায়েছে পাপপ্রভা ধরমের ভাণে। ১২৩
ধন্য তিনি ! তরিলাম কৃপায় যাহার
বন্ধুগণ ! যাও সবে গৃহে আপনার
কর গিয়া অহর্নিশি তার নাম গান
অচিরে করিবে প্রভু সবে পরিত্রাণ। ১২৪
পরম মধুর তিনি, মজগে তাহায়
এত বলি যােগিবর আখি নিমীলিল
কি মাধুরী প্রকাশিল তার সে বদনে
কিবা বিভাতিল তায় মহেশ মহিমা! ১২৫
ন্যাসিচয় মুগ্ধ হয়ে চাহিয়া থাকিয়া
কহিলা মানুষ বটে, মানুষের চূড়া,
চল যাই পালি গিয়া এর উপদেশ
এত বলি সবে মিলি আশ্রমে চলিলা। ১৭৬
১০৪
পঞ্চম সগ।
পাতিয় বাগুড়া ব্যাধ হরিণ পরিতে,
অলক্ষিতে অন্তরালে রহে লুকাইয়া,
মুদি বা শার্পল তায় ছিন্ন ভিন্ন করে,
দ্রুতপদে যথা সেই পালায় তরাসে; ১২।
তেমতি বিস্তারি মায়া ভণ্ডক দুৰ্ম্মতি
অলক্ষিতে অবিদূরে ছিল লুকাইয়া,
সত্যব্রত তেজোৰলে সে মায়া ভেদিলে
মনে অধোমুখে হ’ল অন্তর্হিত। ১২৮
গাইতে যাইতে পথে চিন্তে মনে মনে
এসেছে অনৗপরে মনস্বী যে সব
মম হাত এড়াইতে পারে নাই কেহ
এর দেবদেহ, ধিক! স্পশিতে নারি।১২
কিসের প্রাচীরে ঘেরা মানস ইহার
কিসের অনল ফিরে এর চতুষ্পশ ?
কোন মতে কোন দিকে নারিনু পশিতে
এমন পরাস্ত আমি হইনাই কভু। ১৩০
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
বুঝি বা আসুর রাজ্য নারিনু রক্ষিতে
নারি যদি, প্রতি পদে বিপ্ন উৎপাদিয়া
অসুরি বিক্রমে, দেখাইব জগজ্জনে
কত বলে বলীয়ান অসুর সমাজ। ১৩১
গাদ্যম ভগ্ন আশ নিপট ভণ্ডক
নিরাশ আশায় হেন দুরাশার ছলে
শনিয়া আপন মন অন্যে শান্তায়িতে
মন্দ মন্দ পদক্ষেপে চলিলা রৌরবে। ১
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
ষষ্ঠ
সর্গ
হেনরূপে বিপ্রকৃত ভণ্ডক দুৰ্ম্মতি
নিবত্তি আইলা যদি, তামস মণ্ডলে
আর কেহ, এই কাজে নহে অগ্রসর ;
ভাবিয়া চিন্তিয়া শেষে, বহু বিতঙিয়।
অসাধ্য তাপস বশ সংকল্প তেয়াগি
হইল তৎপর সবে রক্ষিতে যতনে
নিজ নিজ অধিকার। এ দিকে তাপ
পূর্ণ বেগে গাঢ় যােগে নিমজ্জিল =
সত্যব্রাহের পরীক্ষা।
দিন যায়, মাস যায়, যায় সম্বৎসর,
.একতান মনপ্রাণ, একবিধ গান,
এক জ্ঞান, এক ব্যনি, একভাবে ভাের,
এক সহবাসে হেন গেল কত কাল।
তপস্বী আশ্রম বনে কুরঙ্গ যেমতি
নিঃশঙ্কে মনের সুখে করয়ে বিহার,
বিহগ ভরত কিম্বা প্রমুক্ত গগনে
যেমতি উল্লাসে গেয়ে উড়িয়া বেড়ায়,
সেইমত হেনরূপে তপস্বিপ্ৰবর
ভরপুর মুখে ভাসি আত্মায় রমিলা।
কত যে ভুঞ্জিলা তায়, কত যে লভিলা
কেমনে বর্ণিব তাহা ! বিদ্যুতের প্রায়
যেই জ্যোতিঃ ক্ষণে ক্ষণে চমকে প্রকাশি
ঘুচাইত পল তরে মানস আঁধার ;
এবে তাহা প্রভাতের অরুণ সদৃশ
রূপ ধরি আরঞ্জিছে ঊষা-সুষমায়
অন্তর নিলয় তার। যে আমি পুরা
আমি সব, আমি সার, কত কানাদে
;
১০৮
ষষ্ঠ সর্গ।
প্রভুর প্রভুত্ব এৰে দেখিতে দেখিতে
সে আমিত্ব একেবারে হয়েছে বিলাে।
স্বামী নাম উচ্চারণে পুর। সদৃশ
হয়েছে সঙ্কোচ তার “আমি” উচ্চারণে।
বহ্নির প্রভায় হয়ে পতঙ্গ মােহিত
করে তায় যথা সুখে প্রাণ বিসর্জন,
বিভুজ্যোতি মুগ্ধমনা এই সুতাপস
সেই মহাবহ্নি মাঝে আত্ম উৎসর্গিল
আহা সে অমৃত বহ্নি করে বটে দাহ
কিন্তু তায় কত সুখ কেমনে বলিব ?
কেমনে বলিব কত সুখিনী নলিনী
চাহি সূৰ্য্য পানে, প্রদাহিত হয়ে নিত্য
তীব্র খরতর তার সহস্র কিরণে।
মােময় তমে গুহা করি অতিক্রম
উত্তরি চাঞ্চল্যময় রজঃ উপত্যকা
পাইল অধীর এবে স্থির নিত্য স্থান
সত্বরূপ শান্তিময় উত্তুঙ্গ শিখরে,
অবিচ্ছেদে সেই দেশ ভাতে সমুজ্জ্বল
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
সে জ্যোতির করে, রেখা মাত্র লয়ে যান
সূৰ্য জ্যোতিষ্মন, ফুল্ল তারকা-নিচয়,
চন্দ্রদেব হসিত বদন, স্বাহাপতি
গর্বভরে গরঙ্গে ভীষণ। সে অালােকে
সমুন্নত শৈলশ্রেণী হেন চতুর্দিকে
আপনি প্রকাশে, আছে যত মানবের
জ্ঞেয়, করণীয় । নাহি তার প্রয়ােজন
তরক যুকতি আর বচন প্রমাণে
অন্ধকারে অবিজ্ঞাত বস্তু তল্লাসিয়া।
প্রত্যক্ষ সমস্ত ভার, প্রত্যক্ষ ব্যতীত
তার কথা নাই আর। এরূপে লভিয়া
বাসনানুরূপ পদ, দেবতা দুর্লভ,
চাহিলা সুধীর জগতের গতি পানে।
দয়ালু হৃদয় তার হেরিয়া মানবে
অনিত্যে নিবদ্ধ মনে হইতে নিয়ত
শােকে তাপে জর জর ভয়ে মুহ্যমান
হইল ব্যথিত অতি ; উন্নমিতে সকে
নিত্য শান্তিময় ধামে জনমিল তাঁর
ষষ্ঠ সর্গ ।
'?
প্রবল আগ্রহ। সেদপূর্ণ ডিম্বক্রমে
পক্ষাতে পূরয়, পরে সে পক্ষা যেমন,
ডিম্ব ভঙ্গি বাহিরিয়া বনদেশে যায় ;
সেই মত সত্যব্রত নিন সাধনে,
সর্বাঙ্গ সুন্দর লভি আত্মার পূর্ণতা,
কর্মক্ষেত্রে নামিবারে সমুৎসুক মন ।
একদা চন্দ্রমা উদি, পূর্ণিমা নিশায়,
নিৰ্ম্মল গগনে হর্ষে, হাসিয়া হাসিয়া,
প্লাবিছে বসুধা স্নিগ্ধ সুবর্ণ কিরণ ;
সে কর নাচিছে স্বচ্ছ সরস হিল্লোলে
হাসিছে পাদপশ্রেণী কোমল পল্লবে ;
শােভিছে নগেন্দ্র-শির উজ্জল মুকুটে
সজীব, জাগ্ৰত শান্ত প্রফুল্ল মাধুরী
সর্বত্র ধরণী’পরে ; বোধ হয় যেন
দেবতা-নিচয় নামি, অবনী উপরে,
কৌতুকে করিছে ক্রীড়া মানব অজ্ঞা
এহেন মধুর কালে মধুর অন্তরে
চন্দ্র’পরে তারা’পরে বনরাজি’পরে
সত্যব্রতের পরীক্ষা ।
শৃঙ্গ’পরে ভূমি’পরে চাহিয়া চাহিয়া
হইয়াছে সত্যব্রত তথাবিধ প্রাণ।
যাছে জড় বস্তুচয় অস্ফুট বিভাসে
দূরস্থিত দৃশ্য হেন; চিন্ময় পদার্থ
ঘত হয় প্রকাশিত সমুজ্জ্বলরূপে।
অনুভব তার যেন চৈতন্য-সাগরে
হয়েছে নিমগ্ন জড় গগন ভুতল !
অনিমিশ চক্ষে ধীর সম্মুখে চাহিয়া
আছে হেনরূপে, অকস্মাৎ দৃষ্টিপথে
হইল পথিক অপরূপ রূপ এক,
আইলা যে সে মুরতি অন্যস্থান হতে
হ’ল এরূপ জ্ঞান; শূন্য হ'তে যেন
বিকরিয়া দিব্য জ্যোতি, হইল প্রকাশ।
সে রূপ রমণী রূপ, সুশুভ্র বরণ,
সমুন্নত কলেবর ষোড়ষী মাধুৰ্য্য
সনে মিলি প্ৰবীনার গাম্ভীর্ষ গৌরব
বাৎসল্য প্রবণ ভাব করেছে তাহায়
শােভা চমৎকার। মধুময় ভক্তিরসে
বঙ্গ সর্গ।
প্লাবিল তাপস মন সে রূপ দর্শনে।
সস্নেহে কোমল কণ্ঠে কহিলা সে রূপ ;-
“নহিও শঙ্কিত, বৎস! আমায় হেরিয়া,
নহি আমি অপাে-যােনি অশুভ-জননী ;
আমি বার্না, বেদমাতা, বসি নর-হৃদে
শ্রেয়ােমার্গ শুভ সদা দেখাই তাহায় ।
প্রজ্ঞানামে আমি খ্যাত পণ্ডিত মণ্ডলে।
গুরুশক্তি বলি আমা পূজে সাধুজনে
নিৰ্ম্মল গগনে থাকি, সুন্দর ধরায়,
ডাকি আমি মনুজ-নিচয়ে, নিরক্ষিতে,
গগন ধরণীপতি বিপুল মহিমা।
এই যে চন্দ্ৰমা-রশ্মি বর্ষিছে অমৃত,
দেখ চেয়ে, শুন অবহিতে, ঋমি এতে
দেখিবে শুনিবে ; শুনি যে আদেশ তুমি
আইলা এখানে, ধীর ! সে মম উকতি।
চেয়েছিলে বৎস, নিত্য অনন্ত মহান
সারাৎসার পরম পদার্থ পাইলে তা,
পূরিল হৃদয় তব বিপুল আনন্দে।
;
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
নাম এবে ধরাধামে, দেও যেয়ে পরে,
যাহা পেয়ে হইয়াছ কৃতার্থ আপনি।
মানব-নিচয় গবে বিষয় সম্ভোগে,
বিদ্যা চরচায় আর কৰ্ম্ম অনুষ্ঠানে
প্রগাঢ় মজিয়া দেখে তায় নাহি মিটে
মনের তিয়াস ; মন যেন অনুক্ষণ
কিসের তল্লাসে ফিরি হইছে চঞ্চল।
আছে ভবে জ্ঞান কৰ্ম্ম পূর্ণ পরিমাণে
কিন্তু ভাব-রস বিনা মানবের মন
এ হেন বিশুষ্ক, আর হেন মুহ্যমান।
বৃক্ষে যথা রসে তথাচিতে করে ভাবে
সজীবতা দান ; তুমি ধীর ! পিয়াইয়া
ভাব সুধারস কুর গিয়া পুনঃ সবে
সতেজ সজীব ; ঢা দিয়া নিজ প্রাণ
ভাবের উচ্ছ্বাসে, উচ্ছসহ চিত্তবেগে
গাইয়া মহিমা তার দেখাও সবারে
কেমন মাধুরী তার কেমন প্রভাব।
কতধা সে বিকাশিয়া করে মানবের
১১৪
যষ্ঠ সর্গ ।
সন্তপত প্ৰ!ণ মন শান্ত সুশীতন।
দেখাও সবার, শান্ত-চিত্ত নেণীজন
অপ্রমেয় জোৰ্ম্মা “, হান”
ঈশ্বর উদ্দেশে চা স্মস , ওতে।
নিবাত প্রদীপ ই শ' • 'স,
কাদৃশী শান্তির সুধা 'পয়ে 'রত।
দেখাও ঐশ্বৰ্যময়ে হেরি কপঃ ময়
দাস অভিমানে ছাড়ি অত্ম গভমান,
সেবিয়া চরণ তার নিদেশ পালিয়া,
কেমন কৃতার্থ সাধু মানে আপনারে।
দেখাও সে কৃপাময়, বিপু কৃপায়,
সস্নেহ গৌরবে কত তােষেণ আদরে,
এই সখ্যভাবে মুগ্ধ ভাবুকের মন,
কেমন উৎফুল্ল হয় বিমল গৌরবে।
যবে সেই বিভু ধরি বালারুণ হেন
স্নিগ্ধ সুকোমল রূপ হয়ে প্রকাশ ;
সে রূপ হেরিয়া স্নেহ-মিশ্রিত গৌরবে
মােহিত সাধক হন তন্ময় মানস
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
বিমল বাৎসল্য-রসে দেখাও সবায়।
বাসনা নিবৃত্তিরূপ নিশা সমাগমে
চিন্তারূপ হট্টগােল ক্রমে প্রশমিলে
একান্তে অন্তররূপ বিপিন বিজনে,
হৃদয় রমণ হাতে আপনা অপিয়া
তিনি সে রমণ আহা! আমি সে মুগধা ;
এই সুমধুর ভাবে আত্ম নিমজ্জিয়া,
কেমনে লভয়ে জীব পরমার্থ সার।
আপনি ডুবিয়া এই মাধুৰ্য সু-রসে
দেখাও শিখাও সবে এতে নিমজ্জিতে।
আহা এ মধুর রসে গাঢ় নিমজ্জিলে
আত্মহারা হয়ে যায় মানব তখন
হেরেমাত্র বিশ্বময় প্রেমের বারিধি
তাহে ডুবি পরানন্দে থাকে নিমগন
হেনরূপ মধুময়, মধুময় সনে,
সম্পর্ক বাঁধিয়া যেই করে তায় দান,
আপনার ধন মান দেহ মন প্রাণ
মধুময় হয় তার উন্নত স্বভাব।
১১৬
যষ্ঠ সগ।
মধুময় সমজীবীসনে ব্যবহার,
মধুময় হেরে সেই এ বিশ্ব-সংসার,
মধুময় তার সহ একত্র নিবাস,
তৃণ হেন হয় সেই মানদ অমান।
তরু হেন হয় সেই সহিষ্ণু সুখদ।
কে আছে কঠিন এত তার কাছে আসি
নাহি হয় বিগলিত? কে হেন পাতকী,
তার সহবাসে যার নাহি টলে মন ।
পাপ-দগ্ধ বসুন্ধরা এহেন মাধুর্য্যে
শীতলিতে অসহিষ্ণু হয়ে অপেক্ষিছে ।
ও বৎস! কর গিয়ে সুশীতল তায়,
প্রেমের উচ্ছ্বাসময় অমিয় হিল্লোলে ;
আপনার সুখ দুঃখ বিস্মৃত হইয়া
প্রাণেশের মধুরিমা সন্তোগে মাতিয়া
অন্য ইচ্ছা অন্য চিন্তা সম্পূর্ণ ছাড়িয়া
অন্য চিত্তবৃত্তি ভাব অধীন করিয়া,
শুদ্ধ ভাৰ লয়ে তুমি নাম ধরাধামে,
অবিরত বর্ষ গিয়া সে অমৃত বারি,
১১৭
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
পূরুক মানব-চিত্ত, নদী, হ্রদ, কূপ,
সে অমৃত রসে। সবে সে রসে ডুবিয়
সে র ১ ভাসিয়া পুনঃ সে রস পিৰিয়।
হয় প: তৃপ্ত প্রাণ, মনুক সফল
এ ময় নব দেহ নশ্বর জীবন।
অহােব সুন্দর শােভা ধরিবে ধরণী।
যবে বৃদ্ধ যুবা, আর সম্রাট ভিখারী,
সন্যাস সংসারী, আর পণ্ডিত অবােধ,
দুর্বল তেজস্বী, আর পাপী পুণ্যশীল,
প্রণয়ে মিলিয়া, পদমর্যাদা ভুলিয়া,
একতান মন প্রাণে নাচিয়া নাচিয়া,
গভীর নিনাদে দিক্ ধ্বনিত করিয়া,
মাতিৰে তােমার সনে বিভু-গুণ গানে ।
সে সুন্দর শােভা, বৎস! দেখিবার তরে,
নামিবে দেবতাকুল অবনী উপরে।
সে গভীর নাদ শুনি আতঙ্কিত মনে
পালাবে নারকীয় নিরয় ভবনে।
উদিবে উদয়াচলে সবে দিনমণি,
১১৪
নষ্ঠ সর্গ।
কর যাত্রা সেইকালে করি জয় ধ্বনি।
রহিব নিরই গামি তােমার অন্তরে,
কহিব যখন যাহা জিজ্ঞাসিব মোরে।"
মৃদু হতে মৃদুতর নামাইয়া স্বর,
এইরূপে আসিয়া থামিল সে ধ্বনি।
সত্যব্রত, নিমিষ ফেলিতে, সে মূরতি,
হল অন্তর্হিত। ভাবাম্বুধি মাঝে ডুবি
অতর্কে রজনী কাল কাটিলা সুধার।
উদিল। তারুণ উদয় অচল।
বহিল পূবন মৃদুল হিল্লোলে।
গাইল বিহঙ্গ
মধুর
নিনাদে।
ফুটিল কমল সরসে আলাদে ।
সুবর্ণ সজ্জায় সাজিল ধরণী ।
যেন বা সুন্দরী নানা রমণী।
শুভযোগে শুভ দিনে শুভক্ষণে ।
আনন্দ উৎসাহে সমুৎফুল্ল মনে।
জয় জগদীশ তব ইচ্ছ। সার।
বলিয়া উদ্দেশে নমি বার বার ।
সত্যব্রতের পরীক্ষা।
চলিল তাপস বদন ভরিয়া।
জয় জগদীশ নাম উচ্চারিয়া ।
প্রকাশিল দি মানব-নিচয় ।
আপনা আপনি উৎফুল্ল হৃদয়।
দেবকুল মহা আনন্দে উল্লাসে।
জয় জয় রব ধ্বনিল আকাশে।
উদিল মনুজ-সমাজ গগনে।
মমুজ-তপন উজ্জ্বল কিরণে ॥
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.