Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Dip O Dhup

2009/11/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দীপ ও ও ধূপ
‘আলাে ও ছায়া’- প্রণেতৃ প্রণীত
মূল্য ২১
দুই টাকা

নির্মলেন্দু রায় বি, এ,
২/এ, হাদরা রােড, কলিকাতা
একমী প্রেস,
১৫/সি, আমহাঃ জট কলিকাতা হইতে
সত্যেন্দ্র নাথ বসু দ্বারা মুক্তি।

সূচিপত্র পৃষ্ঠা দীপ ও ধূপ ০ ০ ০ অলজ্জিত সাফল্য ০ ০ ০ . . . স্বন-সঙ্গে ভাইরে আমার ভাই ৭ + ++ *** অমৃতের পথে । ৫০ ০ ০ ০ ও ০৮ তিন অক্ষরের নাম তীর্থ পরিক্রম গীত স্পর্শ বেঁচে রব ১৮ . বাক্য ভীত ২। যাবার আগে ও ০১ ০ ০ ০ . ২৮ ৫ ০ ০ ? ? ৮০ ০ যুগ প্রভাত জাগরণী সঙ্গীত নব জাগরণ দুর্বলের ক্রন্দন এরা নর্মদার শিল্প ওরে তােরা ভবিষ্যের দল তাহারি জয় হােক . ০৮০ yo পৃষ্ঠা মুক্ত বন্দী ••• . ০ ০ ০ ••• ৩০০ ৪৬ সত্যগ্রাহী এরা যদি জানে সেবা ধর্ম তারকেশ্বরীয় অসহযােগ প্রচারকের প্রতি ৪৭ ০ ০ ০ ০০ ০ ••• ৪৮ ৫ . . ২ ৩ . . a st ৬ ••• ... ৬১ ০ ০ ০ . ••• ০০ ০ ••। t tv সহযােগ বিপথ অলীক দেবতা দেশ-সেবকের প্রার্থনা ধরায় দেবতা চাহি নবীনা জননীর প্রতি অনুকারীর প্রতি নারী নিগ্রহ নারীর দাবী নারী জাগরণ ঠাকুরমার চিঠি নাতিনীর জবাব নাতবৌর জবাব শােকে আশীর্বাদ শ্মশানপথে দেশবন্ধু সিরাজদ্দৌলার সমাধি দর্শনে প্রণতি নিশানা ৭১ ••• ৭৬ ৮২ * * ... . . . ৯ ১১ ••• ••• এ এ ১৫ পৃষ্ঠা ০ ০ ৫০০ ১০৪ ১৮ ০ ০ ০ • ০ ০ ৫ ০ ০ ১১৮ E ১২১ r ••• p / বরিশালের মাঝি গাব্দ যে মােরে বােলায় দীঘির পাকে শুভদৃষ্টি বঞ্চিত। বালবিধবার বিবাহ দিনের স্মৃতি মানযাত্রা সেকালের তীর্থযাত্রী মন্দির প্রতিষ্ঠা অনাদৃতার আশা স্মৃতির দংশন দুহিতৃ বিদায় পথের চিহ্ন হবে দেখা সংশয় বাণী প্রত্যয় বাদী ভীরু কবি স্বামী ও সন্তান---আলােচনা প্রবীণার অভিজ্ঞতা সমবেদনায় পত্নী শঙ্কিতা জননী পরিব্রাজক দূরের আহ্বান শিমুল কালবৈশাখীতে পাতার নৃত্য t ••• •• ও এ ১২৮ ••• ১৩ ০৮ ১৩৪ ০ ০ ০ * ০ ০ . ১৮ ০৩ ১১ ১২ pr • পৃষ্ঠা , . ০ ০ ১৪; ১৪৬ ••• ১৪৭ ০ + ০ ১৮ ০ ০ ০ ১২ আমি রব সয়ে হাসনুহানা জীবন আন আর আশীর্বাদ বধূ বরণ অভি’র জন্মদিনে পরিচিতা আশীলিপি মায়ের আশা সংশয়ে আশা প্রভাতের প্রার্থনা নিশ্চিন্তে নীরবে তাই হােক তবে ছাড়িয়া চলিলে ভবে . . . ••• . ১৪ ০ ০ ৮ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ f ৪ ০ ০ ৬ ০ ০ ••• ১৫ . . . . হাতের কাজ + + + • ১১ ••• ••• মরণের ডাক গৃহদ্বারে দিওনা অর্গল হিসাবী দান বেহিসাবী দান স্মৃতির ছবি ••• ••• ••• ১৬ অবেক্ষণ, ১৭ . ৮ ০ ০ ক।

নিবেদন নানা স্থানে বিক্ষিপ্ত, অযত্নে নষ্টয় আলো ও ছায়া রচয়িত্রীর বিভিন্ন সময়ের লিখিত, বিভিন্ন ভাবের কতকগুলি কবিতা দীপ ও ধুপ নামে প্রকাশিত হইল। নানা কারণে সঙ্কলন কার্যে অনেক টা রহিয়া গিয়াছে। রচনা কালের ক্রমানুসারে অথবা বিষয় অনুসারে কবিতা গুলির স্থান নির্দিষ্ট হয় নাই, তারিখ থাকা সত্ত্বেও অনেক স্থানে অনবধানতা বশতঃ তাহা মুদ্রিত হয় নাই, মুদ্রনের পূর্বে সংগৃহীত কবিতা হইতে নির্বাচনের ও কোন চেষ্টা হয় নাই। শেষােক্ত বিষয়ে কৰি স্বয়ং নিরুৎসুক ছিলেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলিয়াছিলেন- যে যাত্রার পর প্রত্যাবর্তন নাই, তাহার জন্য উন্মুখ হইয়া আছি ; বাছাবাছির দিকে এখন মন দিতে পারিতেছিনা। দেশান্তরে যাইবার সময় কেহ যেমন বহুদিনের সঞ্চিত অনেক কাজের এবং অকাজের সখের জিনিষ প্রতিবাসীদের মধ্যে বিলাইয়া যায়, তাহাদের দামের কথা ভাবেনা, অন্তত কিছুদিন কাজে আসিবে বা ভাল লাগিবে এই মনে করিয়াই খুসী হয়, আমার এই কবিতা গুলি ও সেই ভাবেই দিয়া আমি খুসী।” ৩ বর্তমান প্রকাশকের প্রধান উদ্দেশ্য জীর্ণ খাতা ও ছিন্ন পত্রাদি হইতে কবির বিচ্ছিন্ন চিন্তাগুলি গ্রন্থবদ্ধভাবে সংরক্ষণ। সেইজন্যই ঠাকুরমার চিট ক্ষুদ্র পুস্তিকাকারে ইতিপূর্বে প্রকাশিত হইলেও দীপ ও ধূপ মধ্যে পুনরায় নিবদ্ধ হইল।

}
এই পুস্তকে কবির, কতকগুলি অপ্রকাশিত ‘সনেট’ ব্যতীত,
ইংরাজী ১৮৯৩ সন হইতে বর্তমান ১৯২৯ সন পর্যন্ত লিখিত তাহার
অধিকাংশ খণ্ড কবিতা পাওয়া যাইবে । সকল গুলির মধ্যেই
তাহার অনুরাগী পাঠক তেল-সলিতার ‘সেকেলে প্রদীপের স্নিগ্ধ
আলাে ও ধূপ ধূনার মৃদুগন্ধ পাইবেন আশা করা যায়। যেখানে
ধূপের গন্ধ উবিয়া গিয়াছে, সেখানেও বোধহয় কিঞ্চিৎ আলােকের
অভাব ঘটিবে না। ইতি।
প্রকাশক
কলিকাতা
১৫ই আগষ্ট, ১৯২৯

দীপ ও ধূপ
সন্ধ্যা নামে, ওগো কুটীরবাসিনি,
ত্বরায় তােমার প্রদীপ জ্বালো,
তব সদনের সম্মুখের পথে
পড় ক তা হতে একটু আলো।
ধুনাচি তােমার আগুণে ভরিয়া
খােলা দরজার আড়ালে রেখে
টালাে তাহে ধূপ, দিক তার ধুয়া
বাহিরে বায়ুরে সুবাস মেথে।
কখনাে পথিক আঁধার নিশায়
সােজা পথ ছাড়ি বেড়ায় ঘুরে,
লােকালয় খুজি না পেয়ে নিশানা
কাছ হতে যায় ক্রমশঃ দূরে।

দীপ ও ধূপ
ক্ষীণ প্রদীপের এ আলাে তােমার
বহি দৈবগুণে নিশান হয়,
তােমার ধূপের সুবাসে চমকি
যদি ক্ষণতর দাড়ায়ে রং,
বার ধীরে ধীরে তােমার দুয়ারে
পথের ঠিকানা সু ধাতে আসে-
ঈষৎ আড়ালে রাখ ধূপ-কান,
খোল, কপাটের ডাহিন পাশে।
হােক ক্ষও অলো, তেল সলিতা;
ভবে রাখ তবু প্রদীপ পানি,
অন্ধকার রাতে কে ধে পথ চলে,
কোথ; গিয়ে পড়ে কেন জানি
•শে সেপ্টেম্বর, ১৯২৫
আশ্বস্ত
আমি যবে আরাধনা করি ভক্তিভরে,
কম্ব! ভীত, বার বার ডাকি আর্তস্বরে,
সে কোথা কেহ নাই, কাণে না শুনিতে পাই
কাহারো চরণ ধ্বনি, পেনে অশ্রু ঝরে
আঙ্গিণে অবশমনে মুদি নন,
শুন্য আকাশের তলে রয়েছি শয়ান

আখত
- - - - - -
তৃণদলে চাপি বুক—সহসা তুলিয়া মুখ
চকিতে শিয়রে হেরি এ কার বন ?
মেহময়ী মার বেশে কে আমার শিয়ােদেশে
আশীর্বাদ স্পর্শ রাখি করিছে প্রয়াণ।
কাণে প্রাণে গুরিয়া উঠে কার বাণী,
আধেক দুস্কর বােঝা, সােজা আধখানি,
সেই টুকু মনে রেখে, গেয়ে উঠি থেকে থেকে,
মেলে কি না মেলে ছন্দ কিছুই না জানি।
এ বাণী তোমারি বাণী, আর কারো নয়,
তুমি ভয়াতুর প্রাণে দিয়াছ অভয়।
মুক্ত আকাশের তলে শষ্য। পাতি দুৰ্ব্বাদতে
ভেবেছিনু মাতৃহীন আমি নিরাশ্রয়
ভেবেছিনু জীবনের নাহি কোন কাজ,
কেন মিছা গান গেয়ে পথে পাই লা?
স্নেহ দিতে কেহ নাই, কার কাছে গান গাই ?-
তুমি চাই মাের গান শুনায়েছ আজ।
হে দেব, তােমারে আমি শুনাইব গান?
তবে পদতলে তব দাও দীনে স্থান,
তোমার বীণার মাঝে যে সুধা সঙ্গীত ৰাজে
তাহে মিলাইয়া কণ্ঠ হই ভাগ্যবান।

দীপ ও ধূপ
অলজ্জিত
কণ্ঠ মাের নাহি ফোটে সুর,
বীণা হাতে বাজেনা মধুর,
কি দিয়া তুষিব সবে,
কি কাজে লাগিব ভবে,
এ শােচনা কর প্রভু দূর।
আমারে গড়েছ নিজ হাতে,
আশীষ বরষি মাের মাথে।
যত কিছু তুমি গড়
ভিন্ন মাপে, ছােট বড়,
বিচিত্র হয়েছে বিশ্ব তাতে।
এ বিপুল বিচিত্র সংসারে
সার্থক করিব আপনারে।
আসি নাই এ জগতে
আর কারো মত হতে
এ কথা সরিব বারে বারে।
ক্ষুদ্র হই লজ্জা কি তাহাতে ?
নদী,: সিন্ধু, হ্রদে ও প্রপাতে
যে পার্থক্য, তার মাঝে
যে মঙ্গল বিধি রাজে,

অলজ্জিত
-
নিশা, সন্ধ্যা, দিবা ও প্রভাতে,
সে শুভ বিধানে তৰ
আমি ক্ষুদ্ররূপে বৰ
নগণ্য নগণ্য জন সাথে।
ব্যক্ত আমি রব আপনাতে,
অলজ্জিত, তব দৃষ্টি পাতে।
যারা দীন, মৌন মুখে
খাটে নিত্য দুঃখে সুখে,
হত জিয়া তাহাদের হাতে,
কথা কব সহজ ভাষাতে।

দীপ ও ধূপ
সাফল্য
আমার শত কথার মাঝে একটু যদি বাজে
অন্তর কানে, হঠাৎ কারো—ত। যদি আসে কাজে
আমার এই ভাঙ্গা গলার সহজ সুরে গান
দিনের শেষে শীতল করে করে তাপিত প্রাণ ;
আমার গুপ্ত দুঃখের অশ্রু দেয়গা ভিজাইয়া
অলক্ষিতেই কোমল করি কোন কঠিন হিয়া ;
আমার ব্যর্থ চেষ্টাও যদি কারো নৈরাশভার
সরায়ে ফেলে কৌতূহলের দেয় করে সঞ্চার,
ক্ষণেক ভরে একটু তারে ভাবের ভাবী করে,
বড় আঘাত ভুলিয়ে দিয়ে ছোট ব্যথায় ভরে ;
কাঙ্গাল মাের দানের সাধ দেখে, যদি ধীরে
দুঃখীর ফোটে স্নেহের হাসি ওফ অধর তীরে ;
আমার মত অকিঞ্চনের সেইতো ভাগ্যবল,
সকল চিন্তা, সকল চেষ্টা, দুঃখে চোখের জল,
আশার স্বপ্ন, হবের ঢেউ, ভাঙ্গা গলার গান
ফল হবে-ধন ক'রবে আমায় ভগবান্।

স্বজন-সঙ্গে সবাই হেথা চেনা জানা, সবাই আপন জন,. তাইতো গাহে কণ্ঠ মাের, হার্য নাচে মন, আমার হর্ষে নাচে মন। হৃদয়ের দুই ফুল ছাপিয়ে, ছুটছে ভালবাসা, উঠছে প্রাণে হাজার খেয়াল, হাজার নব আশা, হাজার হাজার নব অাশ।। সবাই হেথা আমার স্বজন, কেহ নাইকো পর প্রাণের ভাষা ফুটছে মুখে সত্য হিতকর সত্যই নিত্য হিতকর। 3} যাহা, শ্রেয়ঃ যাহ!, 'য়ি হবে তাই, -দ্র হতে মিথ্যা কথা ববে কেন ভাই- মিথ্যা বলবে কেন ভাই? সবাই হেথা আপন জন, নাইকা কেহ পর একের সুখে উঠছে ভরে সকলের অন্তর, সুখী সকলের অন্তর। একের দুঃখে সবাই দুঃখী, একের মানে মান, তাইতাে হেথা অসাথে নিত্য জয়-গান, ওঠে নিত্য জয়গান। মার্চ, ১৯২৬ দীপ ও ধূপ ভাইরে, আমার ভাই ভাইরে, আমার ভাই, পাহাড় পথে যেতে যেতে আপন সুখে দুঃখে মেতে, যখন যে গান গাই, আমার শুধু আধেকখানি, বাকী আধেক তােমার জানি, গাইনা সে যাহা-ই, ভাইরে, আমার ভাই। ভাইরে, আমার ভাই, দেখি একলা আছি, চলি, কি পড়ি, মরি, কি বাঁচি, খুজিতে কেহ নাই- তখনো জানি, আগে কি পাছে, দরদী কেহ আছেই আছে, ডাকিলে কাছে পাই, ভাইরে, আমার ভাই। ভাইরে, আমার ভাই, কেহবা কিছু এগিয়ে থাকে, আড়াল পড়ে পথের বাঁকে, পিছেও সাড়া পাই;

ভাইরে, আমার ভাই
পথের ভীতি ভাবনা ভুলে
কণ্ঠ আমার দিইগো খুলে
দুয়েরি পানে তাই,
ভাইরে, আমার ভাই।
ভাইরে, আমার ভাই,
আগে যে জন, থাক সে আগে,
চোখে না হােক চিত্তে জাগে
উচ্চে তােমার ঠাই ;
চরণ চিহু দেখব খুজে
পিছ কোথা ফেলব বুঝে-
ছুটতে কোথায় নাই,
ভাইরে, আমার ভাই।
ভাইরে, আমার ভাই।
এই যে দাগ-গড়িয়ে ছিলে ।
তাই তাে মােরে দৃষ্টি দিলে,
সাবধানেতে যাই।
বেন না পেয়ে বাড়ালে জ্ঞান,
উঠে আশায় ভরালে প্রাণ,
আমার কণ্ঠের সকল গান
তোমারেই পাঠাই,
ভাইরে, আমার ভাই।
জুলাই, ১৯২৩

দীপ ও ধূপ
অমৃতের পথে
দেখি কৰ্মজগতের দীর্ঘ পথ দিয়া
নানা জন নানা দিকে যাইছে চলিয়া,
চাহি দূর লক্ষ্য—দূর ?
? সকলেরি নয় ;
চলিছে সবাই ; পথ চলিতেই হয়।
শ্রোতােমূখে শূন্য তরী সে তাে নাহি ভাবে
কোথা গিয়া পাবে তীর, কত দুরে যাবে।
নী অই চলে দৃপ্ত, মত্ত ধন-মদে,
ভাবিতেছে চির স্থির ক্ষণিক সম্পদে,
পিতার অর্জিত ধন উড়া খেলায়,
দেয় যদি মুষ্টিভিক্ষা, দেয় সে হেলায় ;
দঃ নাহি, দায়িত্ব সে করেন। স্বীকার,
সে জানে সংসারে তার নাহি কোন ধার;
চাহে আপনার সুখ, পায় কি না পায়,
সন্ধানে ঘুরিছে তার ;-জীবন ফুরায় ।
শান্ত দৃষ্টি চলে জ্ঞানী, অচঞ্চল চিতে,
খুলি গুপ্ত জ্ঞান-খনি, দিতে আর নিতে।
কেহ লয়, কেহ যায় অবজ্ঞার 'ভূরে,
নাইবা চিনিল আজ, চিনিৰেক পরে,
এই বলি প্রবােধিয়া মন আপনার
চলে বিজ্ঞ, নবতত্ব করিতে উদ্ধার।

অমৃতের পথ
১১
---
;
ৰী চলে কার আনন্দে বহিয়া ;
সাধু চলে অবিচার নীরবে সহিয়া,
অপরের দু:খতাপ করিবারে শেষ
নিজ বক্ষ পাতি লয় অপমান ক্লেশ ;
জ্ঞান দিয়া, প্রেম দিয়া, দিয়া সেবা আর
ধি চলে জনমের এরা ঋণ ভার।
ভিক্ষুক কেবলি লয় পাতি রিক্ত হাত,
ওষ। তার অপমান, বাচা আত্মঘাত।
কবি সে বিশ্বের প্রাণে মিলাইয়া প্রাণ
সুখে দুঃখে সকলেরে শুনাইছে গান ;
তার বুকে বাজে যাহা শুধু নহে তার,
শুনি তাহে শত প্রাণে উঠিছে ঝঙ্কার।
রুদ্রের সুন্দর করে, তিক্তে সুমধুর,
ব্যথারে আনন্দ, তার অন্তরের সুর;
তার অন্তরের আলাে মৃত্যুমুখে পড়ি
অমৃতের জ্যোতিমূর্তি দেখাইছে গড়ি।
চলে যেন স্বপ্নাবেশে, সুপ্ত কিন্তু নহে,
অপরে যা শশানে নাই তাই শােনে, কহে--
অজানান, অনন্তের অফুরন্ত বাণী ;
ধরারে সে ব্রিদিবের কাছে দেয় আনি।
সঙ্গীতে বাদনে যারা মানব অন্তরে
স্নেহে করুণায় বীর্যে বৈরাগ্যেতে ভরে,

১২
দীপ ও ধূপ
যে বৈরাগ্য ক্ষুদ্র স্বার্থ আসক্তি তেয়াগি,
অল্পে তুচ্ছি, ফিরে নিত্য ভূমানন্দ লাগি,
যে করুণা, বীৰ্যময়ী, জগতের হিতে
হেলায় আপন প্রাণ পারে বলি দিতে,
সে বৈরাগ্য, সে করুণা দুদণ্ডেরে তরে
মানব হৃদয়ে যারা সঞ্চারিত করে,
ধন্য তারা, ধন্য কণ্ঠ, যন্ত্র ধন্য হয় ;
জানে কি না জানে তারা, দীন তারা নয়।
অলস কি চিত্র শিল্পী ? আনি দেয় কাছে
অলক্ষিত যে মাধুরী বিশ্ব ভরি আছে ।
বাহিরে যা, সুদুরে যা, পৌছায় সে ঘর ;
বিশ্বতেরে অতীতেরে সঞ্জীবিত করে
তুলিকায়, অস্ফুটেরে করে ক্ষুটতর,
দেহে ফুটাইয়া তােলে নিভৃত অন্তর ;
ক্ষণিক সৌন্দর্য্যে করে চির আয়ু: দান,
তার চক্ষু অচদূরে করে চম্মান।
কপর্দকহীন, তবু দরিদ্র সে নয়,
অরে শােভার খনি যদি তার রয় ।
সেও দাতা, মানবেরে সেও দিয়া যায়,
পায় যাহা ভিক্ষা নহে, যদি কিছু পায় ।
কৃষক অজ্ঞাত গ্রামে কর্ষে ভূমি তার
দেহে সহি খর রৌদ্র ধারা বরষার ;

অমৃতের পথে
সে যে খাটে, শস্য কাটে, তার মাঝ খানে
কি গৌরব, জানিনা সে জানে কি না জানে।
মূখ হােক, দুঃখী হােক, নহে সে ভিখারী,
সে আমার অন্নদাতা, নিত্য উপকারী।
কেহ লেখে, কেহ খােদে, প্রাসাদ নির্মায়,
খাটে কেহ ঘাটে বাটে, মােট বহি খায়,
কুকার, সূত্রধর, কামার, চামার
মাঝি মাল্লা, ঔাতি জোলা, সবাই আমার
নমস্য—সবাই মােরে কিছু করে দান,
সুখ দেয়, দুঃখ হতে করে পরিত্রাণ।
বারে চিনিনা, তবু দানের বন্ধনে
বাধা আছি নানা দিকে সকলের সনে।
আমি এই ধনধান্যময়ী পৃথিবীতে
আজন্ম ভিখারী রব ভিক্ষা কুড়াইতে?
এ বিশ্বের ঐশ্বর্য্যের সৌন্দর্যের মাঝে
বেড়াব আলস্য সুখে, লাগিব না কাজে ?
অতি দুর অতীতের চিন্তা চেষ্টা শ্রম,
জ্ঞানালোক, মানবের সভ্যতা সম্রম
সকলের ভাগ লব, দিব না কো কিছু,
ছুটিব কি চিরদিন আপনার পিছু?
অবিচার, অত্যাচার, দারিদ্র যথায়
অনান, অধৰ্ম্ম করে দাসত্ব প্রথায়

১৪ দীপ ও ধূপ কঠিন শৃঙ্খলে দৃঢ়, মনুষ্যত্ব মাের জাগিবেনা ভাঙ্গিতে সে দাসত্ব কঠোর বজ্র হন্তে ? দেহে রক্ত ছুটিবেনা ধেয়ে মেলি আঁখি চিত্রমূর্তি শুধু রব চেয়ে ? কিম্বা প্লাবিষ্ট সম কহিব প্রলাপ, অদৃষ্টেরে, বিধাতারে বরষব শাপ, তারপর ধীরে ধীরে করিব শয়ন কোমল শয্যাপ্ত সুখে? মুদ্রিত-যু দেখিবন। চারিদিকে দৃশ্য দুঃখম- কে যে ব্যথা সহি দেয়, কে যে সুখে লক্ষ অন্ন বস্ত্র, জ্ঞানালােক, দেহের অরাম, চলে মনুষ্যত্ব গর্বে পূর্ণ সঝকা ? যুগে যুগে দুঃখ সহি এ নর সমাজ লভিয়াছে যে সৌভাগ্য, যেই শক্তি, আজ আমি বাছাই তারে। এই বর্তমানে আছে প্রেমী, সাধু, কর্মী, শিল্পী যে যেখানে, আছে মা, ঋজু শির নহে ভিক্ষানত, তাহাদের সহকর্মী, বিশ্বসেবা বৃত, আমি দাড়াইব গিয়া তাহাদের পাশে। আসুক না অপমান, ভাই যদি আসে প্রেমের, সেবার । হে আমাৰ প্ৰধু, কে আমার প্রেরয়িতা, আসি নাই কভু

তিন অক্ষরের নাম
১৫
শুধু বহিবারে ঋণ। ওহে বিশ্বরাজ,
তব কর্মচারী আমি, আছে মাের কাজ
তােমার বিপুল রাজ্যে। সুখ দুঃখ দয়া
দিয়া জরা মৃত্যু শােক, পাঠালে বরিয়
সেনাপতি, দুঃখ ভয় করিবারে জয়
পলায়নে লজা, দুঃখে মরণেতে নয়।
দুঃখ দেছ, মৃত্যু দেছ, দোহে করি রৎ
চলিৰ আলােকে নিত্য অমৃতের পথ ।
সেপ্টেম্বর ১৯২৩
তিন অক্ষরের নাম
নামটা আমার থাকে কি না থাকে
ভেবে আমার হয়না। হর্ষ ভয়।
তিন অক্ষরে ডাকতো সে যে কাকে-
তিনশো বছর হলে পরে কয়,
চেষ্টা করে হয়তো ভাবতে হবে
আমারেই তা-অপরের কা কথা?-

দীপ ও ধূপ
-~-
আমার প্রাণে কোনাে করবে
জাগাবেনা যখন হর্ষ ব্যথা;-
আমার জন্য থাকবে না কো চেয়ে
আছে বলে পথের দিকে কেউ,
প্রাণের কূলে আসবেনাকে। ধেয়ে
অপর একটা ব্যাকুল প্রাণের ঢেউ।
যাদের কণ্ঠে আমার নামটা বাজে,
তারা যদি দেশান্তরী হয়,
আমার নামটা আমার কোন কাজে
লাগবে কিনা জানিনা নিশ্চয়।
একেবারে যেতে চাইনে রে,
রাখব কিছু আশা রাখছি প্রাণে,
একেবারে যায়না কিছু কৰু,
ছড়িয়ে যেতে পারে নানা স্থানে।
প্রতির পবন যায় যদি মোর থেকে,
বহে জগৎ-প্রাণের উপর দিয়া,
ফুলটি যেমন ফলটিরে যায় খে,
বীজ হতে ফের আসে বাহিরিয়া,
নব জীবন, শােভা, সৌরভ লয়ে
তেমনি আমার চিন্তা সে অমর,
*ব রসে নিত্য সিক্ত হয়ে,
রবে লাভ নব জন্মান্তর।

তিন অক্ষয়ের নাম
নূতন রূপে থাকব আমি জেগে,
ফুটব নিত্য, ফোটে যেমন ফুল,
চ’ব আমি নদীর মত বেগে,
থাকব নাকো তিন অক্ষরের ভুল।
না হয় আমার হ’লই নামান্তর
তাতে আমার কোনই ক্ষতি নাই,
গন্ধরাজে ডাকিলে টগর
ক্ষতি কিসের, সৌরভ যদি পাই ?
পাের যদি ফ্য নামই হয়,
বালুর নীচে প্রবল জলের ধার
লুকাবেন জেনাে তা নিশ্চয়।
জিনিষট। যা তাইতো স্বরূপ তার।
তিন অক্ষরের নামটা খােয়াইয়া
থাকুক যাহা থাকে গেলেও দেহ,
আশা থাক্‌ সে সঙ্গীতে বাচিয়া,
থাকুক বিশ্বে বিশ্বব্যাপী স্নেহ।
'প্টেম্বর, ১৯১৩

দীপ ও ধূপ
তীর্থ পরিক্রম
অনন্ত জ্ঞানের সিন্ধু, নাহি, নাহি তীর,
গভীর রহস্য হতে আরো সুগভীর
অন্ধকারে নয়,
আলােকে খুজিতে হবে আত্ম পরিচয়
খুজিয়া চলিবে নিত মহসিন্ধু বুকে ।
হেথা হো দ্বীপ অভি, আরামের সুখে,
ভউ: এই এলই। নেই,
শিখি মন : ১ নিরুদাম,
জড়তরে কে বলি, রশু ; ।
মাছ ব , কবে :
তাই ভেবে অsীবন কে ম স
জন্ম এনেছি তোম। চিনাতে ধরায়,
শেষ হলে পরিচয় ঘৰে পুনরায়
নবতীর্থে, এ তীর্থের সয়ে পুণ্যফল ;
জ্ঞান, প্রেম, কশ, কিছু হবেন। বিফল ।

গীতস্পর্শ
গীতস্পর্শ
যশ আমি চাহি নাই, চেয়েছি স্নেহ,
চেয়ে ছিনু একখানি শান্তি ভর গেহ,
নহে কলরব পূর্ণ সভা সম্মিলনে
সহস্র চক্ষের দৃষ্টি। নীরবে, বিজনে
রচি যদি কোন চিত্র, গাহি যদি গান,
সে কেবল জীবনের দান-প্রতিদান ।
পাখী যথা বনফলে পুষ্ট, মুক্তাকাশে
হরৰে বিহরে, গাহে সহজ উল্লাস,
পূণ করি বনভুমি ; লতিক ফুট
পুষ্পরাশি প্রাণদাত্রী ধরণীর গায়,
সমীরে ঢাগিয়া দেয় সৌরভ আপ,
আলােকে দেখায় বর্ণ, ৩ার দত্ত ধন ;-
মাের গান মোর চিত্র নেইকপ জানি;
যদি ভাল লাগে কামো, জগ বল মানি
দুঃখ নাহি মাের, যদি কেহ তুচ্ছ করে।
যার যাহা ভাল লাগে তাহা তার তরে,
তার মােগা, তাও ভােগ। পাখা আছে যা
উড়ে সে আকাশে, মীর দেয় সে সাতার,
কেহবা চলিছে দৃঢ় মাটির উপর,
সৰ্বৰ চলার সুখ, বিশ বারে

দীপ ও ধূপ সর্বত্র চলার ঋন ; বর্ণপগান নানা রূপে নানা রসে জুড়াইছে প্রাণ। আমার এ গান যদি ভাল লেগে থাকে, হে সুহৃৎ, সাধুবাদ কোরনা আমাকে। নিভৃত অন্তরে তব আছে যেই কান সেথায় নীরবে কত ঘুমাইছে গান, একটি যে গীতস্পশে উঠেছে জাগিয়া আমার সে গীত ছিল তাহারি লাগিয়া। ৩০শে এপ্রিল, ১৮১৪। বেচে রব “কিছু করে যাব, যেতে দিবনা বিফলে দুর্লভ এ জন্ম মম।” ভাসি অশ্রুজলে কহিয়াছি—“কোথা তুমি ওহে জ্ঞানময়, জীবনের সার্থকতা কিসে মাের হয় জানাও দাসেরে।” গেল কত সংসর বিনা কালে, ভয়ে লাজে। প্রাণের ভিতর প্রচ্ছন্ন বাসনা মাের কাদিত কেবল- আমার জীবন যে গাে হইছে বিফল।”

বেঁচে রব
২১
সখ এল। কহিলাম-*এ সুখের তরে
নহে শুধু জন্ম মাের !” অতৃপ্ত অন্তরে
বিমুখ করিনু সুখে।
দুঃখ সে কঠোর
এল যদি, কহিলাম—“এ জীবন মাের
দগ্ধ, ক্ষত, কেমনেই লাগাইব কাজে ?
যেথা যাই প্রতিপদে বুকে ব্যথা বাজে।
আশা বিনা, হর্ষ বিনা বর্ষ মিছা যায়
বর্ষ পরে, কৰ্ম্ম সুপ্ত বাসনা শয্যায়।
সুখ দুঃখ আসে যায়, আশা হয় হত,
জন্মে পুন: নিদ্ৰাগর্তে পনের মত,
এমনি কাটিছে কাল ; পৃথিবীর দিন
আসিতেছে ফুরাইয়া : চক্ষে দৃষ্টি ক্ষীণ,
হাতে নাহি বল আর ; কে করিবে কাজ?
উষা দিয়া যায় চেষ্টা, সন্ধ্যা দেয় লাজ
ব্যর্থতার।
অবশেষে চিন্তা চেষ্টা যৰে
ফেলিয়া দিলাম দুরে, তুমি এলে তবে।
তুমি এলে। অবারিত অসীম সার
মহাকাশে নিলাম বচন তােমার
মেঘমতে, বৃষ্টিধারে, নদী কলতানে
বৃক্ষপত্রে, ফুলে ফলে, বিহঙ্গের গানে,

২২
দীপ ও ধূপ
ভ্রমর গুনে আর উজ্জ্বল তারায়-
“সার্থক জীবন তার আপন হারায়
জগৎ জীবনে যেই। জীবনের কাজ
জীবন জাগায়ে রাখা।” বুঝিলাম আজ।
দীপ সার্থক হয় প্রদীপ হইয়া,
আপনারে প্রকাশিয়া আর আলো দিয়া ।
নদী বহে যায় ধূ সাগরের পানে,
যেতে যেতে দুই কূল ভরে ধনে ধানে,
কি করিব, কি করিব, ভাবি পথে পথে
ধায়না সে হেথা হেথা, ফিরেনা পর্বতে।
জীবন দিয়াছ তুমি, মুখ চেয়ে তব
যে কদিন রাখ ভবে আমি বেঁচে রব।
** এপ্রিল,

বাক্য ভীত
বাক্য ভীত
বেশী কথা বলিওনা বলায়ােনা মােরে
কথা না দেখায় পথ। প্রদীপটি ধরে
চল আগে আগে ভাই, চ ওরে বােন,
কান পেতে চিত্ত মাঝে শােন, ওরে শোেন
দেৰতর মৃদু বাণী। ফেনিল উচ্ছ্বাসে
রাশি রাশি শূণ্য গর্ভ কথা ভেসে আসে
সমুদ্রের ঢেউ
যেন, লয় ভাসাইয়া
কুল হতে, কভু ফিরে যায় তীরে দিয়া,
কভু বা অকূলে লয়ে ডুবাইয়া মারে,
ভয়ে ভয়ে চলি তাই কথার কিনারে।
ধীরে কহ, উর্ধে চাহ, জীবনের তরী
ভাসাবে, ভাসাও তবে পুণ্য কর্ণ ধরি
ওই দিন ক্ষণ দেখি। কোথা ধ্রুব তারা,
তাদেরে দেখাও পথ, সিন্ধু বুকে যারা;
স্বচ্ছ হৃদয়ের পাতে কর প্রতিভাত
তােমার আলােক লেখা, অন্তর্যামী নাথ।
মে, ১৯১৪

২৪
দীপ ও ধূপ
দুঃখে সুখ
নিরাশার ব্যথা ভরে সংশয় জিজ্ঞাসা করে--
হে করুণা-বিগলিত হিয়া,
এত বড় ধরণীরে,
তুমি কি রাখিবে ঘিরে
দুটি ব ক্ষীণ বাহু দিয়া ?
অবিচার, অত্যাচার
দারিদ্র রােগের ভার
পাপতাপ হতে আশুলিয়া,
দুটি তব ক্ষীণ বাহু দিয়া ?
মুচ্ছি পড় রহিয়া রহিয়া,
শক্তি নাহি, আছে সাধ,
এ তব দুর্বল কাধ
কত ভার মরিবে বহিয়া?
চলিতে পারনা সোজা লয়ে আপনার বােঝা,
ঝটিকার তাড়না সহিয়া,
স্থলে পদ বহিয়া রহিয়া।
নিরাশায় মরিছ হিয়া,
তবু শুনি ভগবানে
ডাকিছ আকুল প্রাণে
কি পেয়েছ তঁাহারে কহিয়।
জগতের সমাচার ?
কি আছে অজানা তার?
নির্বিকার নিকরুণ হিয়া
গলাইবে কি কথা কহিয়া ?

দুঃখে সুখ
२९
*** *** **
- - - - - - * *
••
মন বলে-থাকি থাকি ডাক আসে, তাই ডাকি
জানিনা সে নির্বিকার হিয়া
মানবে কিসের লাগি
পরসুখ দুঃখভাগী
করে দেছে। আপনারে নিয়া
চলিতে পারিনা সােজা, কেন দিলা দুনা বােঝা
কিম্বা মােরা লয়েছি যাচিয়া,
দুঃখ মাঝে সুখে আদিয়া?
জানিনা এ শাপ কিম্বা বর,
এই জানি, দুঃখে সুখে
সকলেরে লয়ে বুকে
আছে এক আনন্দ-সাগর।
সে আনন্দ-ভাগ নিতে চলেছি তৃষিত চিতে
এক সাথে মােরা বিশ্বর।
আসে সমুদ্রের ঢেউ, কেউ হাসে, কাদে কেউ,
কেউ পড়ে, কেউবা নাচিয়া
ঢেউ ডিঙ্গাইয়া যায়,
কেই সুখে সাঁতরায়
দুঃখে সুখ রয়েছে বাঁচিয়া।

২৬
দীপ ও ধূপ
যাবার আগে
ছড়ায়ে মাের খাতার রাশি
যখন বসে থাকি,
জানালা পারে তখন আসি,
চোখের কোণে একটু হাসি’
আঙ্গুল দিয়ে পথ দেখায়ে,
যায় সে মােরে ডাকি।
যেতেই হবে, যেতেই চাই,
কিসের ডাকা ডাকি ?
আসিতে ফিরে বাসনা নাই
যাবার আগে, ভেবেছি তাই,
কারেও যেন ভুলেও আমি
না দিয়া যাই ফাকি।
অনেক কিছু গিয়েছি ভুলি
আমি তা বুঝিনা কি ?
তাই বুঝেই দপ্তর খুলি
দেখছি বসে হিসাব গুলি,
কি ছিল জমা, খরচ কত,
রইল কিবা বাকী

যাবার আগে
২৭
খােলাসা করে হয়নি’ লেখা
আছে অনেক কিছু ।
ণের’পরে ৭ বাড়ায়ে,
বন্ধুক জমী না ছাড়ায়ে,
সুদের লোভে মূল হারায়ে
ছুটেছি আশার পিছু।
পরিশােধ কি সংশােধনের
সময় বেশী নাই।
আর কিছুনা, আপন জনের
ক্ষয় যা হ’ল পিতৃ-ধনের
পূরিয়ে দিতে উপায় শুধু
একটু লিখে যাই।
এ যদি হয়-কাহারও লাগি
করিনি কিছু জমা,
লাভ ক্ষতিতে ভাগের ভাগী,
আমার লজার দাগে দাগী,
একানুষের কাছে মাগি
মা-কেবল ক্ষমা।
সময় হলে ছাড়তে তরী
বাজবে যখন বাঁশী,

২৮
দীপ ও ধূপ
তার আগেই হিসাব ছাড়ি
উঠব গিয়ে তাড়াতাড়ি,
বলব না কো,-“দাড়াও সারে,
কাজটা সেরে আসি।
জুলাই, ১৯২৩
যুগ প্রভাত
সবার আগে পূরব জাগে,
সােণার আলো চোখে লাগে,
সুপ্তি ভেঙ্গে যায়,
এতে চাহে বুঝতে চাহে,
অসীম যে কি গানটি গাহে ;
কে তারে বুঝায় ?
আলাে দিয়া দৃষ্টি আনে
যে জন, সেই তো অন্তুর কানে
শুনায় আপন গান।
তারি সুরে সুর মিলায়ে
তারি পায়ে প্রাণ বিলায়ে
ধন্য মানব প্রাণ।

জাগরণী সঙ্গীত
জেগেছিল পূরৰ আগে,
আজো কি সে তেমনি জাগে ?
দেখতো রে বােন, ভাই,
চক্ষু যারা আছিস মেলে
জাগা ডেকে, জাগা ঠেলে,
বল—“ঘুমােতে নাই -
নূতন যুগে প্রভাত নব,
আবার আমরা বাহির হব,
গেয়ে নূতন গান ;
দেশের সাথে মিলবে দেশ
কালের ঘুচবে কালাে বেশ
আলােয় করে খান।
মার্চ, ১৯২৩
জাগরণী সঙ্গীত
জাগরে আমার আমি,
জাগরে দেহের স্বামী,
নূতন আলােকে ফুর্ত,
জাগো জাগো

দীপ ও ধূপ জাগরে শকতি সুপ্ত জাগরে চেতনা শুধু এ যে রে | মুহুর্ত জাগো জাগে ! কি আছে তােমার মাকে, লাগুক ভবের কাজে, বােলনা কিছুই নাই- जानन •{ে } এ চিত্ত অধৰা দেই, নিখুলে যাবেন। কেহ, আসেনহে মিহাই- জেনে { গে! মাের ভিতরের আনি, বিশ্বের আনন্দ কামী, নিখিল মরণ মাগে। আখি মাগে। অল্পে করিয়া তুচ্ছ দৃষ্টি করিয়া উচ্চ, অক্ষ আলােকে জাগে- আজি জাগো!

নব জাগরণ
= = = = =
নব জাগরণ
হে ভারত, জেগেছিলে সকলের আগে,
নেহারি প্রভাত সূৰ্য, উচ্ছসিত চিতে
আনন্দ বিস্ময়ে মুগু, আশা অনুরাগে
ভরে ছিলে চারি দিক নব নব গীতে ।
তারপর দিবালােকে যবে অন্য সব
ৰাহিরিল দিশি দিশি, আপনার নাম
বিজয় উদ্ধার রবে নাইতে ভবে,
তুমি কি গাে অন্ধকারে বুজিলে আম?
কিম্বা শেছিলে ধীরে আসু-অন্তঃপুবে
সৃষ্টির রহস্য গুপ্ত করিতে উদ্ধার ?
দৃষ্ট ঐহিকের ইষ্ট সব ফল দূরে,
খুঁজেছিলে জন্মান্তের কুট সমস্যার
সমাধান?
সেইকালে ধানের পশ্চাতে
আসিল কি ঘাের তা, করিল বপন
ম ত. ক্রিয়া কাও, ক্লান্ত শক্তি যাতে
নিতি নিকি রাখি জাগায় স্বপন ?
ক্রমে সেই স্বপ্নালস, নিতুর দেহে
দাসত্ব নিগড় বাঁধি গেল বৈরী যত,
এ নিগড় নিজ হাতে পড়ে ছিলে গেহে,
কে বৈরী তোমার ছিল আপনার মত?

৩২
দীপ ও ধূপ
ক্ষুধার পীড়নে আর পর পদাঘাতে
এত দিনে ভাঙ্গিল কি মােহ নিদ্রা তাের ?
ধুয়ে গেল দরদর তপ্ত অপাতে
স্বপ্নের কুহক, মাগে ? হল কিগাে ভাের
দুর্ভাগ্য আঁধার যুগ ? তবে এইবার
দাড়াও মা, আপনার পায়ে করি ভর,
চেয়ে দেখ, দেখ চেয়ে পূৰ্ব্ব সিন্ধু পার
উদিছে নবীন ভা, অপূর্ব ভাস্কর।
মুক্তকণ্ঠে, যুক্ত করে, অন্তর ব্যাকুল,
পিতা ননইসি ৰলে আজ ফিরে গাও গান,
যাবে ভয়, হবে ক্ষয় অতীতের ভুল,
জ্ঞানে, প্রেমে, কম্মে দৈন্য হবে অবসান।
বুঝে নও, হে প্রাচীনা, কোন উৎস হতে
অনন্ত জীবন ধারা যৌবন অক্ষয়
বহি আসে, অবগাহি কোন্ মহাশ্রোতে
সমবর্ণ সর্বনর—দ্বিজ শূদ্র নয়।
জীবনের ইহকুলে যা করণীয়
কর আজ, থাকে যা থাক্ পরপার ,
মান দাও মানবেরে—সে যে বরণীয়,
মনে তার দাও ঞ্জান, অম মুখে তার।
এপ্রিল, ১৯২৩

দুর্বলের ক্রন্দন
দুৰলের ক্রন্দন
নিদ্রিত দেবতা, জাগো,
তোমার জগতে বো; শােক জরা,
তোমার জগৎ অত্যাচারে ভর,
উঠি, প্ৰতীকারে লাগে।
নিদ্রিত দেবতা, জাগো
বধির দেবত, শুন
দৃপ পাষণ্ডর বিজয় বন্দন,
নত নির্দোষার নিভৃত ক্রন্দন,
অপমানে পুনঃ পুন:-
বধিৰ বেতা, শুন ।
তুমি নাকি ধৰ্ম্মরাজ?
মানুষের মনে যে ন্যায় বিচার
হে পূর্ণ, তােমাতে স্থান নাহি তার?
দুবৃত্তেরে দিবে মান-সম্ভার,
পুণ্যাত্মারে দিবে লাজ ?
পক্ষপাতী ধৰ্ম্মরা।

দীপ ও ধূপ
=
ওহে , প্রকাশ,
ৰচাৰ আসন দিলে দুরাচারে,
শৃঙ্খলিত সাধু চলে কারাগারে,
স্বার্থ পরের স্বার্থ সে বাড়ে,
নিঃস্বার্থের সর্বনাশ
কেন, শুদ্ধ প্রকাশ ?
তুমি না আনন্দময় ?
খেলিছ কি খেলা লুকাইয়া মুখ ?
এ কি সৰ মায়া, কেবল কৌতুক?
এ রঙ্গ নহিলে নয়--
হে দেব আনন্দময় ?
দেখা হে বিশ্বনাথ
যে হতে গড়িলে জননীর হিয়া,
পুষ্প নিমিলে যেই হাত দিয়া
সেই আশীৰ্বাদ-হাত
বিশ্ব পিতা, বিশ্বনাথ।
-

এরা
. . . ৮*
এরা
পাইছে নৃতন প্রাণ,
চাইছে নূতন স্থান,
প্রভাত-আলােকে আঁখি ইহাদের
হেরগাে জ্যোতিষ্মন্।
জানেনা কোনই ভয়,
মানেনা ক্ষতি কি ক্ষয়,
সম্মুখে চাহিয়া আনন্দে ধাইছে
গাহি ধৰ্ম্মের জয়।
এরা
এরা
এরা
শােনে
তাই
কাহার পতাকা হেরিছে সম্মুখে,
কাহার আহ্বান কানে,
সারি সারি সারি চলে দ্রুত তালে,
কোনই বাধা না মানে ?
কি মহাযজ্ঞের পুণ্য অনলে
এসেছে করিয়া স্নান,
পুড়িয়া বার্থ, ভােগের বাসনা,
মূক্ত করিয়া প্রাণ ?
কি অমৃত হ্রদে আপন হৃদয়
রেখেছে মজমান,
গুন নির্বিচারে সেবা আর প্রেম
দুহাতে করিছে দান

দীপ ও ধূপ
***
তোমরা
পার, কি না পার সঙ্গে যাইতে,
যেতে চাও, নাহি চাও,
এমনি করিয়া ভবিষ্য বরিয়া,
সম্মুখে চলিতে দাও।
এদের
নর্মদার শিষ্য
পাধর কাটিয়া, নৰ্ম্ম। ছুটিছে, গহ্বরে নিয়াছে বঁাপ ;
সেখ। ঘুরে ঘুরে ঠেলে পথ করে, গর্জে লক্ষ কোটা সাপ
যেন এক সাথে ; বেন ভেঙ্গে চলে মাতঙ্গী শাবক হার
qন বন পথে যত কিছু বাধা,-চলে সে তেমনি ধারা।
এ মানুষ গুলি শিষ্য নর্মদার, আবেগে ছুটিরা যায়
লক্ষ্য অভিমুখে, ভেদিয়া ভাঙ্গিয়া যত কিছু অন্তরায়।
সমতল ভূমে সরােবর সম, শা, স্বপ্নসুখেলীন
আছে কত জন, জানেন। আবেগ, দিন আসে যায় দিন।
এরা কি খেলিছে? কেনরে ফেলিছে ছিল যা সাধের সাজ
এরা যে চলেছে উন্মাদের বশে তুচ্ছ করি লােক লাজ।
অনহার কেশ করে না ক্লিষ্ট, পাথর করেছে দেহ;
প্রহারে সুরি, চাহেনা করুণা, চাহেনা মমতা স্নেহ ;
ছাড়িয়াছে গেহ, এজনের মেহ, পদের মানের জাতের ছাপ,
ভগিনী কি ভাই এদের কি নাই, মাতা স্নেহময়ী, স্থবির বাপ
সব ছেড়ে যায়, ফিরেও না চায়, সংকর মানেনা শােক,
জলের বদলে আগুন মে ঢালে এদের কঠিন চোখ।

ওরে ভোরা ভবিষ্যের দল
» - - - - - - -
ওরে তােরা ভবিষ্যের দল
যাহাদের বিলাপ সম্বল,
বর্তমানে চেয়ে দুঃখ করে যারা,
কি হ’ল কি হবে বলে ভয়ে সারা,
তাদেরে আশার বাণী বল,
ওরে তােরা ভবিষ্যের দল।
পিছের বাঁধন ভাঙ্গতে যাদের
চমে আসে জল,
সামনের দিকে কি যে মুক্তি
তাদের কাছে বল ।
‘রে তাের দূরদৃষ্টির দল।
অলস লােকের অনেক কথা,
কথাই সে কেবল,
কথায় কাজে মিলন তোদের
তাতেই ফলে ফল,-
ওরে তােরা নব সৃষ্টির দল।
-
দৃপ্ত তােদের পদভরে যাগে রসাতল
অতীত যা’, পতিত যা’, নাই যাহাতে বল,
বর্তমান সে প্রাণের বেগে করুক টলমল,
এগিয়ে ধর ভবিষ্যতের আলােক উজ্জ্বল,
ওরে তোর পথ দেখাবার দল।

দাপ ও ধূপ
মৃতু্যবরণ করি’ যারা মৃঢ়রে জয় করে,
কাটার মুকুট হতে যাদের নিত্য আলাে ঝরে,
তাদের মত ভাষা তােদের, তাদের মত হাস,
তাদের জয়-মাল-গন্ধে শৃখল সুবাস।
থাক না হাতে হাতকড়া, থানা বেড়ী পায়ে,
যাকনা নিয়ে কারাগারে, দি না ধূলা গায়ে,
পিছে যারা আসছে তারা উদ্দেশে নমিয়া,
ব’লবে—ধন্য জন্মভূমি এদের জনম দিয়া।
হারি জয় হােক
মা জননি,
ও ছেলেটি তোমার একার নয়।
‘আমার’ বলে শক্ত করে,
ওরে ঘরে রাখবে ধরে,
মা জননি, তাও কি কভু হয় ?
Pশর তরে দেশের তরে,
বিশ্ব লাগি বিশ্ব ঘরে
শুভক্ষণে যারা জনম লয়,
ঘরের পরের নাইকো কান,
সবার ব্যথায় ব্যথিত প্রাণ,

তাহারি জয় হােক
সবার কাজটা আপন ভাবে,
সবার বো ,
নাইকো কুল, নাইকো জাতি,
দেহেরই হবে জাতি,
নিজের পণ্যে পরের পাপ করে যার ক্ষয়
একটি ঘরের গণ্ডী মাঝে
তারা কি মা রয়?
অনেক মায়ের ছেলে যে সে
একলা তোমার নয় ।
সেইতে তোমার পরম গর্ব
মুছে ফেল চোখ,
প্রাণ বা হারায় বলে কেন
আগেই কর শােক
যাহার হাতে সবারি প্রাণ
তােমার মাণিক ভারি তো দান
তাৰ কোলেই এ কুল ও কুল,
ইহ পরলােক,
মা জননি, তঁাহারি জয় হোক।

দীপ ও ধূপ
মুক্ত বন্দী
প্ৰমান্ চিত্তরঞ্জন ও ঐমান্ সুভাস বসুকে
কারাগারে দেখিয়া আসিয়া )
স্বপন বপন কৰি ভাবিতাম মনে
স্বপ্ন মাের অশ। মাের কোন শুভক্ষণে
সত্য হলে কোন অতি দূর ভবিষ্যতে।
জন্মে বটে বনস্পতি ক্ষুদ্র বীজ হতে ;
ধীরে বাড়ে; যায় মাস, সম্বৎসর কত
নিঃশব্দে ৰাছিয়া যাবে বৃক্ষ পরিণত,
কে কহিবে অঙ্কুরে সে বাহিরিল কবে?
যদি কেই দেখে থাকে নাহি সে এ ভবে।
যে আশা অঙ্কুর ছিল, আজ রু রূপে
সে কি দেখা দিল চক্ষে বাড়ি চুপে চুপে?
লৌহদ্বার কারাগারে আজি অকস্মাৎ
মনে হয় ভবিষ্যের পেয়েছি সাক্ষাৎ,
মনে হয় ভারতের ভাগ্য-লিপি খানি
বিধাতার হতে ক্ষণ তরে পানি
কে মােরে দেখায়ে গেল।
একি দৃশ্য নব!
ৰুমনা সুপন সব গানে পরাভব।

মুক্ত বন্দী বিয়ে সংশয়ে ভাই আন্দোলিত মন- একি জাতের দৃষ্টি, অথবা স্বপন? কারা এরা অস্তুহীন, নিস্বরে বরি চলিয়াছে স্থির ধীর, সাহসে অটল, বৈর দুর্গ কারাগারেতুচ্ছি দেহবল ? কারা এরা দর্পভরে সহে অপমান হাস্য মুখে ? নম্র চিত্তে সতের আহ্বান শুনি, চলে উড়াইয়া সত্যের নিশান? কারা এরা? আমাদের প্রাণের সন্তান। কোথায় আমার সেই কৈশোরের প্রাণ ? ভুলে গেছি কি সুরে সে গাহিত যে গান--- নিভৃত মৰ্ম্মের কথা-আনন্দ আশায় ভূবয়ে বেদনা ভয়। আজ সে ভাষায় সেই সুরে, এর ঢেলে দেছে অগ্নিময় নিজ প্রাণ, কল্পিতেরে করি সুনিশ্চয় ; তাই অন্তুরের দৃষ্টি যত দূর চলে হেরে নব সূর্যোদয় দু:খে সিন্ধু জলে। হে চিত্তরঞ্জন আজ, উদ্বেলিত চিতে শ্নেই আশীর্বাদ সং আসিয়াছি দিতে তোমারে আমার এদ্ধা। মতে বা চিন্তায় ও যদি দিতে পারি পরিপূর্ণ সায়,

৪২
দীপ ও ধূপ
ভৰু তব হৃদয়ের মহত্বের স্বাদ
লভিমাছি, অমৃত সে, করি ধন্যবাদ।
ভীতিহীন চিত্ত তব, বিত্ত তুচ্ছ করি,
প্রীতি তব দারিদ্রেরে লইয়াছে বরি
কোন দিন ভােগে মুক্তি ভেবেছিলে মনে,
আজ তুমি ত্যাগে মুক্ত, বসি দেৰাসনে।
৩।
সত্যগ্রাহী
( বাইক:ম সত্য গ্রহ উপলক্ষে ;
১
বাহির অঙ্গনে
ওরা এত জনে
বাহির নে
কেন রাখে সারা বেলা ?
দেবের আমু
সবারি কি নয়?
খােল দ্বার দিয়ে ঠেলা ।
যে পূজিতে চায় পশিবে দেখায়,
বাসিবে ভক্তের মেলা।
খােল দ্বার ফিয়ে ঠেলা।

সত্যগ্রাহী ওঠ তাের ভাই, আর ভয় নাই, দেখিয়া লইবি, আয়, দেবতা যে আছে পিয়া তার কাছে জেগে সে, কি নিদ্রা যায়। সুধাইবি তারে কেন আপনারে লুকায়ে রাখিতে চায়। জেগে সে কি নিদ্রা যায় ? শূদ্র কি ব্রাহ্মণ धनौ कि निधन সে কি তা বিচার করে ? সর্বান্তঃকরণে তাহার চরণে শূদ্র যদি পূজা ধরে, বর্ণ তার দেখি ফিরায় তা সে কি, অবহেলা ঘৃণা ভরে ? कि मानि নৈবেদ্য ও বলি পূজা উপচারচয় অপরেরে দিয়া দিৰ পাঠাইয়া তাই মনােনীত হয়? সে যে বিশ্বপিতা সকলের মিত। এ কথা কি সত্য নয় ? আয় দেখে যাই আছে কিবা নাই দেবতা করুণাময়, কিছুই না জানি শুধু বহে আনি ব্যথা ভরা এ হদয়।

৪
মানব অন্তরে
দেবের মন্দির গুপ্ত মানৰ অন্তরে
তারে সেথা হতে দূরে দিলে নির্বাসন,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহ রচি ইষ্টকে প্রস্তরে
রাখিলে করিয়া বন্দী ? তাৰ দিব্যাসন
দেখিছনা সূৰ্য্যে সুয্যে, গ্রহ উপগ্রহে
সমুজ্জল, সীমাহীন কালে আর দেশে ?
তার শক্তি জ্ঞানে প্রেমে মিশি নিত্য বহে
সর্বজীব ময়শ্বর।
জাতি নির্বিশেষে
না মানিয়া দ্বিজ শূদ্র তার এই ধরা
ধরিছে আপন বুকে নিলি মানবে,
বায়ু জলে ফুলে ফলে কপে বসে ভরা,
তাপে তেজে পুষিতেছে তুষিতেছে সবে।
হে উদ্ধঃ বি, অন্ধ নিজ অহঙ্কারে,
বসায়েছ ক্ষুদ্র গৃহে *শষাণের শু প,
দেবতার নাম করি পূজিছ সে কারে ?
কার করে এ নৈবেদ্য এই দীপ ধূপ,
এই কর্ণভেদী বাদ্য, এই কলরব ?
টানাটানি ছেড়াছি বড় বল কার লাগি।
দেবতা অর্থের বশ? এ বিশ্ব বৈভব
হারা েসে অাজ, হায়, তব দৈন্যভাগী ?

সত্যগ্রাহী
তুমি নিষ্করুণ, তব দেবতা পাষাণ,
সে পাষাণ পুলের অনুগ্রহ করে
মুখের, দুঃখীর আর শােকার্ডের দান
হে ধূর্ত, ভাণ্ডার তব নিত্য পূর্ণ করে !
সত্য পূজা
ছেড়ে অয়, ছেড়ে আয়, ওরে দুঃখী ভাই,
কে দেখাবে দেবতারে নিজে না দেখিলে ?
ভিতরে বাহিরে তার দেখা যাতে পাই
করি সে সাধনা, তারে সাধনায় মিলে।
সে দেবতা প্রাণরূপ অন্তরে বাহিরে,
হেরি তাৰ সৰ্বময় সৰ্বাতরুণ
তারে দিই সৰ্ব্বস্থানে, অবনত শিরে,
হৃদয়ের ভক্তি অর্ঘ্য, সচলন ধূপ।
প্রীতি গতি মুখরিত সানন্দ হৃদয়,
আনরে চরিত্র শুদ্ধ ; মানবের হিতে
যদি নিশেষিত, যদি দও সে হয়,
ধূপ চন্দনের মত পারে গন্ধ দিতে।
রিপুকুলে সংহারিয়া কে দিবেরে বলি
আপনার ভিতরের পশুরে সদাই,
দেবতার চরণে কে দিবে অলি
নিজের দােষত্বটুকু—সত্য পূজা তাই।

দীপ ও ধূপ
এরা যদি জানে
এদেরেও গড়েছেন নিজে ভগবান,
নররূপে দিয়াছেন চেতনা ও প্রাণ ;
সুখে দুঃখে হাসে কানে মেহে প্রেমে গৃহ বাঁধে
বিঁধে শল্য সম হৃদে ঘৃণ। অপমান,
জীবন্ত মানুষ এরা মায়ের সন্তান।
এরা যদি আপনারে শেখে সানিতে,
এরা দেশ-ভক্তরূপে জন্মভূমি হিতে
মরণে মানিবে ধর্ম, বাক্য নহে-দিবে কৰ্ম্ম ;
আলস্য বিলাস আলো ইহাদের চিতে
পারেনি বাধিতে বাসা, পথ ভুলাইতে।
এরা হতে পারে দ্বিজ-যদি এরা জানে,
এরা কি সভয়ে সরি রহে ব্যবধানে ?
এরা হতে পারে বী, এরা দিতে পারে শির
জননীর, ভগিনীর, পত্নীর সম্মানে ;
ভবিষের মঙ্গলের স্বপনে ও ধ্যানে-
যদি এরা জানে!

সে ধর্ম
৪৭
.
-
- - - * = # ।
উ কুলে জন্ম ৰূলে কত দিন আর
ভাই বি, রবে ভব এই অহঙ্কার?
কৃতান্ত সে কুলীনের রাখেনা তাে মান,
তার কাছে দ্বিজ শূদ্র পারিয়া সমান।
তার স্পর্শে যেই দিন
পঞ্চভুতে দেহ লীন
ব্রাহ্মণে চণ্ডালে রহে কত ব্যবধান?
সেবা ধৰ্ম
ওরে সূত্র, বাত, ওরে শূদ্র ভাই,
দেবত্বের পথে যেতে কারাে বাধা নাই।
নিজ দোষে, পর-রােষে, পাপে, কি শাপে
জন্মিয়াছ হীন কুলে-এহেন প্রলাপে
পাতিওনা কর্ণ তৰ। চন্দ্র সূৰ্য্য যার
জ্ঞানের রচনা, সেই বিশ্ব বিধাতার
পুত্র তুমি, আছে তব উত্তয়াধিকার
তার আনধনে, প্রেম পুণ্যধনে আর।
তােমার যে সেবা ধর্ম তুচ্ছ তাহা নয়,
সেৰিছেন সৰ্ব্ব জীবে প্রেমানন্দময়
বিশপতি, অবিরাম, প্রতি নিশিদিন।
সেবা অর্শ দেব, নাহি করে হীন,
প্রীতির আহ্বানে যদি আসে, নহে লােভে
সুখের বা ঘরগের-নহে ভয়ে ক্ষোভে।

দীপ ও ধূপ
তারকেশ্বরীয়
। ১৯২৪)
১
কোথায় দেবতা ?
কোথায় দেবতা? এই দেবালয়
পাপ দুর্গ বই আর কিছু নয়।
স্বার্থ, দ, আবু জাতি-অভিমান
রয়েছে জুড়িয়া দেবতার স্থান
হেথ! হাতে চলে আর ।
পুরােহিত কোথা?
পিশাচের দল
করিছে প্রতুত্ত্ব, প্রকাশিছে বল
অন্ধ দীন আর অবলার প্রতি।
সৰ্ম্ম সে রাখিবে পাপে যার মতি ?
দেখে চিত্ত জলে যায়-
লালসার কীট নামে ব্রহ্মচারী,
সরল মানুষ আসিছে ভিখারী
রি চরণের ধূলার লাগিয়া
দেবতা মানিয়া, প্রসাদ মাগিয়া
হৃত বিত্ত চলে যায় !
হায়, হায়!

তারকেশ্বরীয় ৪৯ হেথা নাহি দে, নাহি দেবালয়, হেথা পূজা দিলে পুণ্য হবে ক্ষয়, ভেকে সবে বল ভাই- দেবতা আছেন গৃহস্থের ঘরে, আছেন সদয় বিশুদ্ধ অন্তরে, হেথায় দেবতা নাই। দানব-পুরী এ আছে মাথা তুলি, এত জন আসে হেথা পথ ভুলি নীরবে দেখিবে তাই? w দানৰ কাড়িবে দেবের আসন, মান। পর হবেনা শাসন ? গৃহলের বন্ধু আসি দলে দলে বাঁধা পড়ে যাবে পাপের শিকলে, ঘণ্যা কুলহীনা, অকূলে ভূবিবে, তােমরা ধাৰ্মিক ডুবে যেতে দিবে, এ ধর্মে কি হবে ছাই ?

দীপ ও ধূপ
২ মানুষ হইবি আয়
মন্দিরের চূড়া করে ফেল গুড়া,
সত্যের নিশান তদুপরি উড়া,
মিছার সাধন হােক অবসান
ছিড়ে ফেল ভেক, ধৰ্ম্মের ভান,
মানুষ হইবি আয়।
মানুষের মত দাড়া সােজা হয়ে
কেনরে মরিস মিছা বােঝা বয়ে ?
অতীতের শব, শুষ্ক প্রাণহীন,
জীবন্ত বলিয়া রাখিবি ক’দিন ?
সঁপে দে তারে চিতায়।
সহজ সত্যেরে লয়ে চল বুকে
মনে যাহা, ঠিক
বল
তাই মুখে।
পরে যে ভুলাতে চায়
আপনি সে পড়ে ভুলের গহ্বরে,
লােহার নিগড়ে বাঁধা রয়ে মরে,
সত্য তারে ছেড়ে যায়।
মানুষ হইবি আয়।

তারকেশ্বরীয়
থাক্ যে থাকিতে চায়
অতীতে মন্দির, আজিরে সমাধি,
কি হইবে ফল তার নাশ সাধি ?
থাকু।
ফেলে চলে আয়।
আছে এ পাষাণে লগ্ন অতীতের
সাধু সুজনের, পাপী পতিতের
কত ভক্তি, ব্যথা, আশা অনুরাগ,
বিদ্ধ হৃদয়ের শােণিতের দাগ ;
কত হাহাকার অনুতাপ বাণী,
কঠোর প্রতিজ্ঞা কতই না জানি
হয়তো বা শােনা যায়
এ রুদ্ধ বাতাসে,-প্রতিধ্বনি রূপে
কাহারাে বা প্রাণে পশে চুপে চুপে।
থাক যে থাকিতে চায়
বহু শতাব্দীর আধার মন্দিরে,
বাতায়ন খুলে দিয়ে ধীরে,
ঝাঁটাইয়া ফেলে আবর্জনা স্তুপ,
জালায়ে প্রদীপ, জ্বালাইয়া ধূপ
আজি যুগ-সন্ধ্যায়।
ভয় যদি পায় চাহিতে সন্মুখে,
অতীতের ছৰি চেপে ধরে বুকে,
বাকৃ, যদি সুখ পায়।

দীপ ও ধূপ
অসহযােগ প্রচারকের প্রতি
(Non-co-operation উপলক্ষে)
একান্ত এধারে ফিবা নিতান্ত ওধারে
মধ্য পথ ছেড়ে দিয়ে যারা যেতে পারে,
তারা বীর, তারা সাধু, স্বদেশানুরাগী
আলায়ে পরের স্বার্থ তারা স্বার্থত্যাগী
হতে পারে। মাের মনে জাগে বারেবার,
এ জগতে মৈত্রী যারা করিলা প্রচার
সেই যত পুণ্যশ্লোক, প্রেম-অবতার
বলেছেন, এজগতে মধ্যপথ সার।
তাই সৰ্ব আতিশয্য দেখি মরি ডরে ;
অতি প্রেম, অতি হিংসা দুইই নাশ করে
মানবের স্থির বুদ্ধি। জটিলতা ভরা
জীবনের পথ গুলি ; বিস্তীর্ণ এ ধরা;
এক পথ সকলেরি চলিবার নয়।
ভিন্ন রুচি, ভিন্ন জ্ঞান ; কর্তব্য নির্ণয়
প্রত্যেকে করিবে নিজে। যদি বাহুবলে,
স্পষ্ট অত্যাচারে কিম্বা গােপন কৌশলে
তােমার ঈপ্সিত পথে লয়ে যাও সবে
কর্তব্যের পথ বলি, তাহাদের হবে
কর্তব্য পালন কিম্বা কাপুরুষকার ?
অপ্রেমে যা বহে সেতো দাসতেরি ভার।
বিদেশী দাসত্ব হতে উদ্ধারিতে হায়
নূতন দাসত্ব বন্দু বাঁধিছ গলায়।

সহযােগ
শিক্ষা দিবে ?-ক্ষতি করি, ব্যথা দিয়া চিতে,
শীর্ণ রাখি উপবাসে?
অনাবৃত শীতে,
অনাহারে শিটিরে মরিতে দেখিয়া
কি শিক্ষা লইবে পিতা ? জননীর হিয়া
কত দিন এ বেদন। পারিবে সহিতে ?
আগে অন্ন দাও, পরে যেও শিক্ষা দিতে।
তুমি কর উদ্বাস, তুমি যদি পার,
মর নিজে, যদি পার, অতে যদি মার
আমি বলি তাহে তুমি হবে পাপভাগী,
এ অসহ-যােগ নহে সকলের লাগি।
সহযোেগ
আমি চাহি মহতের সহযােগী হতে
আপনার দেশে, কি বিদেশে,
ভাসিতে চাহিনা কভু মত-জনস্রোতে
আপনারে হারায়ে নিঃশেষে।
গৃহ মাের অতি প্রিয়, পূজিত সমাজ,
প্রিয় মাের দেশবাসী নর,
এদের মঙ্গল মানি জীবনের কাজ,
যু এরা আছে নিরন্তর।

দীপ ও ধূপ
যুক্ত আছে সৰ্ব্ব নর, দেশদেশান্তরে,
যুক্ত আছে গত, বর্তমান,
অন্ধ সে, যে এ বন্ধন অস্বীকার করে,
আনে হিংসা, আনে অকল্যাণ।
স্বদেশীরে ভালবাসি বিদেশীরে তাই
নাহি মাের অপ্রীতি বিদ্বেষ,
মানব সৰ্বত্ৰ দুঃখী মানবের ভাই,
সর্বত্র দারিদ্র, পাপ ক্লেশ।
দুঃখের ভিতর দিয়া কাটায়ে অজ্ঞান
মানব হইছে অগ্রসর,
একের জালিত দীপ আলো করে দান
অন্য সবে দূর দূরান্তর।
আসিছে ললিত কলা বহি সিন্ধু-হ্রদ,
বাদ্য যন্ত্র, সুগন্ধ সম্ভার,
আসে পণ্য খণিজাত, আসে পরিচ্ছদ,
আসিছে বিলাস ব্যাধি আর
তাও জানি ; আসে নব স্বার্থের সাধন
কদাচার সভ্যতার নামে,
ধর্মের প্রচাচ্ছলে বিত্ত-আরাধন
দেখিতেছি দক্ষিণে ও বামে।
অধৰ্ম্মেরে, অসত্যেরে কথা-চিন্তা-কাজে
প্রাণপণ করিব বর্জন,
হোক বিদেশী বা দেশী, গৃহে বা সমাজে
দেউলে বা। করিব অর্জন,

সহযােগ -- বিদেশীরে বর্নি গুরু, বিজ্ঞান কৌশল, কৰ্ম্ম নিষ্ঠা লব পারি যত, ভীতিহীন, কুণ্ঠাহীন প্রতিজ্ঞার বল, দুঃসাধ্য সাধনে যবে বৃত। বীর কৰ্ম্ম, প্ৰেম ধৰ্ম্ম যেথা বহমান হােক অতি দূরে কিম্বা কাছে, পুণ্য তীর্থ মানি তাহে করি নান পান- তীর্থের কি বিদেশী আছে ? জ্ঞানে ধীর, প্রেমে স্নিগ্ধ, উদার গম্ভীর, যেথা যত আছে মহাপ্রাণ, বিশ্বনাথ পদতলে নত করি শির ধ্যান করে বিশ্বের কল্যাণ। তাদের হৃদয়ে স্থান সকলের তরে জেতা জিত, শ্বেত কৃষ্ণ নাই, ন্যায়ের বিচার, প্রীতি দেয় সর্ব নরে এরা বিশ্ব মানবের বন্ধু, জ্যেষ্ঠ ভাই। ইহাদের সহযােগী, সম-ব্ৰত-ধারী হই যেন প্রেমে নিৰ্বিবাদ, দেবতার সহকর্মী হতে যেন পারি, দেবতা করুন আশীর্বাদ।

দীপ ও ধূপ
বিপথ
ক্ষা হও, ভ্রান্ত দল, দেশের কল্যাণ
হবেনা এপথে। যদি চাহ শিখাইতে
মনুষ্যত্ব, সর্বোপরি-সত্যে দাও স্থান।
আজ যে রজত মূল্যে দিলে বিকাইতে
নির্লজ্জ মিথ্যারে, ছি! ছি। দেশপ্রীতি বলি
কিনিলে সে দেশতি, আপনারে ছলি।
বরাজ ধর্মের নামে লইছ দক্ষিণা ;
কে চাহে স্বরাজ ? সে কি ? স্বরূপ তাহার
দেখিয়াছ, দেখায়েছ? পুরস্কার বিনা
মিলেনা সেবক যার, দাসত্বের ভার
সে ঘুচাবে ? ঘুষখাের করিছ প্রস্তুত
স্বাধীন যুগের ওগাে ভ্রান্ত অগ্রদূত !
পদ প্রভুত্বের লােভে চিরলুব্ধ জন
আজ তােমাদের দ্বারে ; পূৰ্বে কিম্বা পরে
করেছে, করিবে পুন চরণ লেহন
বৈদেশিক প্রভুদের, প্রফুল অন্তরে।
এরা দেশ দেশ করি' নহে চিন্তকুল,
হবে যদি তেৰে থাৰু নিতান্ত সে ভুল।

বিপথ
সন্ন্যাসী নাহি কি দেশে? যে কজন আছে
ডেকে আন-নহে ভণ্ড, লোভী বা অলস,
ভিক্ষা ব্যবসায়ী—কিন্তু যাহাদের কাছে
সত্য বড়, নহে যারা ব্যর্থ পরবশ,
দেশের মানুষে যারা ভালবাসে খাটী,-
দেশ তাে মানুষ দিয়া নহে দিয়া মাটা।
দেশের মানুষে যারা সত্য ভালবাসে
স্বদেশীর মনুষ্যত্বে তারা এদ্ধা করে,
আপনারে বাড়াবার একান্ত প্রয়াসে
হল দলাদলি ঘেষে দেশ নাহি ভরে।
সে কি দেশ-প্রেম যাহা ক্ষিপ্ত মত-ভেদে,
হারাইলে নেতৃপদ মরে সা খেদে?

৫
দীপ ও ধূপ
অলীক দেবতা
হে শক্তি-সাধক, ভক্তিহীন,
শক্তি যবে পেলে,
প্রতিদিন
দেবােদ্দেশে পূজা, বলি,
নৈবেদ্য কুসুমাঞ্জলি
পূজারীর প্রাপ্য বলি
আপনার গৃহে লয়ে গেলে ।
তার পর ক্রমে ক্রমে
জ্ঞাতসারে কিবা ভ্রমে,
দেবের আসন খানি মেলে
আপনি বসিলে তাতে,
ধীরে ধীরে বাম হাতে
দেব মূর্তি অন্ধকারে ঠেলে
কতদুরে, কোথা দিলে ফেলে
সুখে দিন যাইছে চলিয়া।
প্রতিষ্ঠিত আজি দেবাশনে,
দেব বেশে,
হলি অজ্ঞ বিজ্ঞ বহুজনে,

অলীক দেবতা
সর্বশেষে
বলিতেছ আপনা ছলিয়া-
“মানৰত্ব হল অবসান।
এ বেদী অমারি বেদী,
উঠিতেছে অভ্রভেদী,
মম স্তব গান,
আমি মর্ত্যে দেবতা বলিয়া।
হে নিঃশ, হে প্রতাপবান্
তব পদে নত শত প্রাণ,
ভক্তি কত উঠে উছলিয়া!
দেবতা হইলে ভবে।
সুখে দিন যাবে কি চলিয়া ?
নিত্য পূজা চাহ যদি, তবে
সত্যই দেবতা হতে হবে,
ক্ষুধা তৃষ্ণা নিঃশেষে দলিয়া ;-
সুখ স্বার্থ কাম্য কেন রবে ?
কি অভাব দেবতার?
চাহিতে হবেনা, তার
দিতে হবে মর্ত্যের মানবে,
ভক্ত সৰে ধু দিতে হবে।

৬০
দীপ ও ধূপ
পূজা আসে প্রত্যাশার সাথে!
এই তব ভক্তদল, হায়,
উচ্চ কণ্ঠে তব স্তব গায়,
আনন্দ কম্পিত হাতে
বাঁধিছে মুকুট মাথে
প্রণমিয়া, জয়মাল্য পরায় গলায়।
তারপরে আশাভরে
হাত পানি পাতে ।
এরা যে ভিখারী-কিছু চায়!
উচ্ছ্বসিত অনুরাগে
গােপনে কামনা জাগে,
যদি না তা পায়-
( সব আশা মিটে কি ধরায় ?)
কি করিবে বলা নাহি যায়।
হয়তো এক অকস্মাৎ
বস্ত্র দৃঢ় উহাদেরি হাত
মুকুটে পাড়িবে ভূমিতলে ;
ঐ পুষ্পমাল্য খানি
তােমারে নামাতে টানি
লােহার শৃঙ্খল হৰে, আকষিতে বলে
দেবতা কি হওয়া যায় ছলে
বা বলে, অথবা কৌশলে ?
•

দেশ-সেবকের প্রার্থনা ৬১ দেশ-সেবকের প্রার্থনা হে জীবন-দাতা, জীবন পালক হে বিশ্ববিধাতা, বিশ্বের চালক, তোমার আদেশ কহ। বিচিত্র বিপুল এ নর জগৎ নানা দিকে তার গেছে নানা পথ দুর্গম, ভয়াবহ। বলে দাও মােরে কোন পথে গেলে যাহা দিতে চাও যাবনা তা ফেলে, সিদ্ধি যাহা মম জীবনে তা মেলে; পাঠালে যে কাজে মানব সমাজে, সে কা কামে লহ। অমৃতে গরলে দুঃখে আর সুখে পাত্র ভরি ভরি রেখেছে সম্মুখে, হৃদয়ে দিয়াছ ক্ষুধা, দিয়াছ পিপাসা ; কৰি যশঃ পান অতি চাহিছে বাঁচাইতে প্রাণ, শক্তি কি দাড়াৰে না যদি সে পাৰে কোন খানে প্রেম- ৬২ দীপ ও ধূপ ৭ জগতে যাহারা সুখ দুঃখ ভাগী দুঃখ ব্যথা সহি তাহাদেরি লাগি ; তা যদি না জানে তারা, তবু যেন পারি তাহাদের হিতে তনু মন ধন যশােমান দিতে, পীড়া অপমান শৃঙ্খল বহিতে, বরণ করিতে কারা। * * তুমি জীবনেশ, জীবন চালক, শান্তা দুর্জনের, সজ্জন পালক, তাহাই বুঝিতে চাই। আমি শান্তা নাই, রাজ-দণ্ড তব থাক তব হাতে; মাথা পাতি লব আমার যা সাজা তাই- যদি চাটুবাদে অহঙ্কারে ফুলি তব রাজাসনে আপনারে তুলি, তােমারে ভুলিয়া যাই। হে বিশ্ব-বিধাতা বিশ্বের চালক তোমার আদেশ কহ, আনিলে যে কানে মানব সমাজে সে কান করায়ে সহ।

বয়ায় দেবতা চাহি
ধরায় দেবত। চাহি
ত্রিদিবে দেব নাও যদি থাকে
ধরায় দেবতা চাহি গাে চাহি,
মানব সবাই নহে গাে মানব,
কেহৰ দৈত্য, কেহ বা দানব,
উৎপীড়ন করে দুর্বল নরে,
তাদের তরে যে ভরসা নাহি
ধরায় দেবের প্রতিষ্ঠা চাহি।
সেকালে দেবতা গােলােক তেয়াগ্নি,
মাটার ধরায় মরে গেহে,
লইত জনম নর শিশুরূপে;
বাড়িয়া উঠিত নারীর স্নেহে;
ধূলা বালু লয়ে খেলিয়া বেড়াত
আর দশজন শিরি মত ;-
আসিলে সময় দৈব বলে বলী,
দানবে দলিতে যাইত সে চলি,
হেলায় সংহারি দুরাচারগণে,
নিরাতঙ্ক করি সাধু সজ্জনে,
ফিরিয়া আসিত অপরাহত।

দীপ ও ধূপ
ত্রিদিব তেয়াগি আসে কি না আসে,
নরের আলয়ে নারীর কোলে,
আজিও দেবতা নয় জন্ম লয়,
ধরণীর গ্লানি, গ্লানি করি ক্ষয়,
আলােকের দিকে টানিয়া তােলে।
ঐশ্বৰ্য্য আরাম চাহে ভুলাইতে,
স্নেহ প্রেম কত বাঁধিতে চায়
মা কাদে, জায়া শিশু দেয় কোলে
সকল বাধন কাটিয়া যায়।
বাহিরে বাতাসে যেই আৰ্তনাদ,
যে রােদন ধ্বনি বহিয়া যায়,
শুনিতে নিতে অভ্যাস বশে
সকলে যাহা না শুনিতে পায়।
তাই ডেকে লয় নর দেবতায়
সংগ্রামে পশিতে দানব সাথে,
দানব-সংহার মানবেরি কাজ,
দধীচির হাড় ইন্দ্রের হাতে
বদ্ধ হয়ে আছে, রবে চিরদিন
;
মানবেরে দিয়া দেবের জয় ;
ত্রিদিবে দেবতা নাও যদি থাকে
ধরায় দেবতা নহিলে নয়।

নবীনা জননীর প্রতি নবীনা জননীর প্রতি হে নব জননি কর নিরীখন তােমার শিশুর ললাট খানি, বিধাতার হাতে আছে যে লিখন- ভবিষ্ণু যুগের আশার বাণী। তােমার শােণিত, অস্থিমজ্জা দিয়া গঠিত এ শিত। আনন্দ ভরে লিছ যে স্নেহ করুণা মাখিয়া তা যেন না তারে দুর্বল করে। আজ যে তােমার সাধের পুতুল, জীবন খেলনা, ফুলের মালা, এমনি বহিবে, করনা সে ভুল, জীবনে নিয়ত নূতন পালা। টলমল পদে তােমারে ধরিয়া পাড়ায়ে যে আজ হরষ লভে, জীবন সংগ্রামে বহুদূরে গিয়া দৃঢ়পদে তারে যুঝিতে হবে। ভেঙ্গে দিও ভয়, আরামের মােহ, বাড়ে যেন ধীরে বুকের পাটা, আরােহিবে সে যে গিরি দুরারােহ, কাটিয়া পাথর, দলিয়া কাটা। -

দীপ ও ধূপ
লভিঘবে সাগর-তরঙ্গ ভয়াল,
এড়ায়ে আবৰ্ত্ত চালাবে তরী,
সম্মুখের ঘন কুয়াশার কাল
আত্মার আলােকে ছেদন করি।
সুখী হবে কি না?-হয় তত হবে না,
পাবে আর কিছু সুখের বাড়া;
আজ যাহা সুখ সুখ তা' রবেনা
কাল। কোথা মুখ বেদনা ছাড়া ?
পারিনা বলিতে সুখী হবে কিনা ;
জগতের মুখ বাড়াতে পারে ;
খেলনা না করি কর ওরে বীণা,
বাজাও উহার নবীন তারে
যা কিছু রাগিনী
মধুর
গম্ভীর
তোমার মনের দেউলে বাজে,
যে মােহন তানে প্রাণ টেনে আনে
ছােট হতে বড় আশার মাঝে।

নারী নিগ্রহ
অনুকারীর প্রতি
পাখীর মত
নটের মত
পরের ভদী
মুছে সেটুকু
পরের মুখে
শেখা বুলি
কেন বলি?
নকল করে
কেন চলিস?
তাের নিজ সর্বাঙ্গে তাের দিলেন ধাতা আপন হাতে,
‘বাজে’ হলি, গৌরব কিছু বাড়ল তাতে?
আপনারে যে ভেঙ্গে চুরে
গড়তে চায় পরের ছাঁচে
অলীক, ফাকি, মেকি সেজন, নামটা তার ক’দিন বাঁচে?
পরের চুরি
আপন মাঝে ডুবে যারে
শটি ধন যা
সেই পাবি আর কোথাও পাবি না রে।
ছেড়ে দিয়ে
নারী নিগ্রহ
হে বাক্য-বণি ধিক, শত ধিক।
কি কর দেশের কাজ?
কাগজে কলমে, বক্তৃতায় গানে
দেশ-প্রেম তব মহা বন্যা আনে,
পাষণ্ডেরা যবে প্রবেশিয়া ঘরে
স্বদেশি বন্ধুরে অপমান করে,
তখন পাওনা লাজ ?

দীপ ও ধূপ
হে ভণ্ড ধাৰ্মিক, ধিক শত ধিক!
ধর্ম কাহারে কয় ?
প্রস্তর প্রতিমা, ইষ্টকের ঘর
তার চেয়ে শতগুণে পূতর
রমণীর মান—নারীর সন্তান,
এ কথা হৃদয়ে নাহি পায় কান ?
গৃহে রমণী প্ৰেম-পুণ্য-খনি
সে কি রক্ষণীয়া নয় ?
যায় দিন রাত গুটাইয়া হাত
শুধু পয়মুখ চাও;
হিন্দু ধর্মের করিছ বড়াই,
হিন্দু-সভ্যতার বল তুলা নাই ;
সতী অতুলনা ভারতের নারী
বলি গর্ব করি’ ছাড়ি’ অত্যাচারী,
সে সতীরে শান্তি দাও।
যােগ্য শান্তি থাকে দাও আপনাকে,
আপনার দুক্ৰিয়ার।
পােষ পাখী সম রুধিয়া পিঞ্জরে,
রেখেছ আজন্ম উড়ে যাবে ভরে,
তাই বঙ্গনারী পঙ্গু পক্ষাঘাতে,
তাই সে নিজেরে পারেনা বাঁচাতে
সে দোষ তো নহে ভার।

নারীর দাবী নারীর দাবী নব শক্তি রথে চান দীপ্ত পৰে তরুণ বাঙ্গালী ভাই, কে চলিছ আজ, উৎসাহে অধীর, শত্রু দুর্নীতির, সত্য-যুদ্ধে বীর, উদার হৃদয়, তোমাদের কাছে দেশের নারীর দাবী যাহা আছে আমি তাহা গেয়ে যাই- তরুণ বাঙ্গালী ভাই। খুলিয়া শৃঙ্খল ভাঙ্গিয়া পি, শিখাও চলিতে ধরি তার কর, দ্ধি নাহি বাড়ে অন্ধ কারাগারে। উন্মুক্ত বাতাসে আলােক মাঝারে তাহার ও যে আছে ঠাঁই বিধি ও নীম ঠাই। তােমার ভগিনী, তােমার প্রেয়সী, তাদেরে বাঁচাতে লেখনী ও মসী নহে গাে যথেষ্ট চাহি বীৰ্য্য-অসি চরিত্রের তে চাই।

৭০
দীপ ও ধূপ
নের আলােক, ন্যায়ের বিচার
মানবের জন্মগত অধিকার
তারে দিতে হবে ভাই।
সে সুখ আশে, হারাবার বাসে
রাখিয়া নিরুদ্ধ সংকীর্ণ আবাসে,
রাখিয়া অজ্ঞান, রাশিয়া দুর্বল
পুষেরে বল গেছে রসাতল,
নিৰীৰ্য্য হয়েছে দেশ;
দৃঢ় হতে দাও তার দেহ প্রাণ,
রাখিতে শিখাও আপনার মান,
চিরদিন ডরে না মরিতে মরে,
তাই নির্যাতিতা দুৰ্ব্বত্তের করে,
এ দুর্গতি হােক শেষ।

নারী জাগরণ
৭১
নারা-জাগরণ
নারী-আত্মা এইবার জাগে,
প্রলয় আগুন,বুঝি লাগে ।
রেখেছিল যারে অন্ধকূপে,
জগদ্ধাত্রী জগন্মাতা রূপে
দাড়াবে সে সন্তানের আগে,
এই বার নারী আত্ম জাগে।
কঁদিবে কই চুপে চুপে
আপনার গৃহ অকূপে,
দীন, হনা, সৰ্ব্ব স্বত্ব ত্যাগে ?
আজ সে যে আপনারে মাগে।
দাসত্বের ভেন হা হক
শাসনের ছিড়ে দড়ি দড়া
ছুটিয়াছে মুক্তি-অনুরাগে
যার বেদীর পুরােভাগে।

৭২
দীপ ও ধুপ
ঠাকুরমার চিঠি
পরম কল্যাণীয়া
শ্ৰীমতী *
চিরায়ুমতীষু
তােরা নাকি সভা করে রমণীর স্বত্ব
সাব্যস্ত করিতে ব্যস্ত ? চিরন্তন তত্ব
ছিল যাহা এত দিন, আজ তাহা শব্দ ?
এসেছে সাম্যের যুগ, স্বাতন্ত্রের অব্দ ?
বিভিন্ন পুরুষ নারী, কোথা ঠিক সাম্য ?
দুয়ে মিলে পূর্ণ এক, বিধাতার কাম্য।
তােরা মাতা, তােরা জায়া, তােরা যে রে ভগ্নী,
গৃহে জালা বাতি তােরা রন্ধন শালে অগ্নি ;
ততাদের সুখে রাখবে বলে খাটে পতি পুত্র,
বিপথ হতে টেনে নিতে তাের পুণ্য সূত্র।
পিতা পতি পরিজনের তােরা মধ্য বিন্দু,
ফিরে যেমন দিবা নিশি ধরা চাহি ইন্দু,
তেমনি চলে কর্ম পথে তােদর দিকে দৃষ্টি ;
দুই প্রেমে রক্ষা পায় দুই প্রেমের সৃষ্টি।
নিজের রক্ত মাসে গড়া প্রাণের বাড়া পুৰ
মায়ের বক্ষ ছাড়া হবে নিরাপদ কুত্ত ?

ঠাকুরমার চিঠি
৭৩
মা-বহিন বিনা তারে দিয়া সর্ব শক্তি
কে শিখাবে সত্যে প্রীতি, ভগবানে ভক্তি?
কে শিখাবে—এই গৃহ, স্বজন, বংশ,
স্বদেশ, স্বজাতি, যার সেও এক অংশ ?
শ্যামা ধরা, নীল নভ, সলিল তরঙ্গ,
নিত্য যেথা তুষ্ট করে তার সর্ব অঙ্গ,
আজন্মের পরিচিত সে ভূমির তক্ত
কে শিখাবে তার হিতে দিতে নিজে রক্ত ?
কে শিখাবে আলস্য ও ভিক্ষায় কি লজা,
কে শিখাবে কত তুচ্ছ বাহ সাজ সজ্জা ?
কনিষ্ঠেরে দিতে মেহ, আনুগত্য জ্যেষ্ঠে,
দুৰ্ব্বলে করিতে ক্ষমা, সম্মানিতে শ্রেষ্ঠ,
অসমৰ্থে দিতে অন্ন, অশিক্ষিতে শিক্ষা
কে শিখাবে ? কোথা হবে দ্বিজত্বের দীক্ষা ?
তােরা মাতা, তােরা জায়, তােরা ভগ্নীর,
প্রাণ দিয়া প্রিয়জনে দিস্ সেবা যত্ন ;
তােদের হাতে মানুষ যারা খেলে যার সঙ্গে
মনে তাদের যায় না কিছু ?-সেবা মিলায় অঙ্গে?
দেহের সাথে ওরে নারী চাহিস মনের ঋদ্ধি,
তবেই মাতা ভগ্নীরূপে নারী জন্মের সিদ্ধি।
আপন মায়ের স্নেহ স্মরি পরের মায়ের দুঃখ
দেখে চিত্ত আদ্র হবে, হােক না যত কক্ষ ;

৭৪
দীপ ও ধূপ
মনে করি আপন বােনের মুখ নিষ্কলঙ্ক,
শিহরিবে পরের বােনের গায়ে দিতে পঙ্ক।
পায়নি যে গেহ সুখ, স্নেহের সৌভাগ্য,
জানে না মমত-ব্যথা, দেশ মাতা শ্লাঘ্য
তার কাছে হবে নারে, জেনে রাখ সত্য;
মা যে কি, তা মারই কাছে শিখিবে অপত্য
আলস্যেতে বিলাসেতে তােরা হলে মগ্ন,
গৃহ হবে লক্ষ্মীহারা, পরিবার ভগ্ন।
গৃহ দেবালয় হতে তুলে নিয়ে নেত্র,
হাট, ঘাট, রাজপথ করি কর্মক্ষেত্র,
ধূলিলিপ্ত, স্বার্থ-অন্ধ, ঈর্ষা ও দ্বন্দ্বে
ভুলে যাবি রমণীর গতির সুছন্দে।
‘ফ্যাশানের ব্যসনের বিষপানে মুগ্ধ
বিষাক্ত হবেরে হায় জননীর দুগ্ধ ।
ওরে যিনি জগন্মাতা, যিনি জগদ্ধাত্রী
তার কর্মসংসাধনে নির্বাচিত পাত্রী
তঁার প্রতিনিধি তাের , নহ তােরা তুচ্ছ,
ভিতরে বাহিরে পাতা সিংহাসন উচ্চ ;
মনে রাখ সেই কথা, শ্রদ্ধায় বিনম্র,
বাৎসল্যে কোমল চিত্ত, শুভ কর্মে ক।
আশর্ধাদিকা
ঠাকুরমা।

ঠাকুরমার চিঠি
৭৫
পুনশ্চ।
বেছে বেছে মিঠা বুলি
পারি নাই লিখতে,
বুড়া কালে সময় বা কৈ
নূতন করে শিখতে ?
মনের চিন্তা জানাতে চাই,
কথার ফুলের মাল্য
গাঁথুক সুখী সৌখীনের
আছে যাদের বাল্য।
পােক্ত মােটা কাপড় যেমন,
নাহােক সৌখীন সজ্জা,
শীত নিবারে, ঢাকৃতে পারে
কুলবধূর লজ্জা,
মােটা চিন্তা তেমনি নব
উচ্ছলার মধ্যে,
তােমার যেন লাগে কাজে
অয়ি অনবদ্যে।
.

দীপ ও ধূপ
নাতিনীর জবাব
পরমারাধ্যা
শ্ৰীযুক্ত। পিতামহী দেবী
ঐশ্রীচরণকমলেষু
ঠাকুরমা গাে, যা বলেছ, সব কথাই ঠিক,
তবে কিনা-থাকতে পারে আরও একটা দিক
নবীনাদের হাতে পারে আরও অনেক আশা,
জায় আর মা হতেই শুধু ভবে আসা
মনে করতে চায় না সবে। মধ্য বিন্দু হয়ে
থাক না গৃহ গ্রহে নারী, পতি পুত্ৰ লয়ে
( কন্যারে না হেলি!) কিন্তু ঘরের বাহিরে
স্বৰঃশ, স্বজাতি কিম্বা আর যারা ফিরে
জ্যেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ কিবা দীন-যাহাদের দিকে
শ্রদ্ধা মৈত্রী শিখাইতে হবে পুৱটিকে
নারীরূপে স্বতঃ কিছু তাহাদের প্রতি
কোনই দায়িত্ব নাই? বিনা পুত্র পতি
ভাবিবায় নাহি কিছু? নিজ পুত্র হিতে
সহস্ৰ পুত্রের কথা হয় না ভাবিতে ?
যে দেশ আমার দেশ তাহার কল্যাণ
শুধু গৃহ-কোণে বসি যদি করি ধান,

নাতিনীর জবাব
৭৭
তাহাই যথেষ্ট হবে ?—এতকাল তবে
কেন এ সতীর দেশ এত হীন ভাবে ?
জানি, এই মর্ত্যধামে মাতৃত্বের মত
কিছু নাই রমণীরে রাখিতে সংষত,
শুদ্ধির শান্তির পথে। পূত সে অনল
আত্মােৎসর্গ মহাযজ্ঞে , সেই দেয় বল
অবলার ক্ষীণ দেহে; গৃহপরিবার
সমাজ, স্বদেশ, সবই সৃষ্টি ছিল তার।
কিন্তু হায়! গৃহ যাহা, যদি কালে কালে
কারাগার রূপ ধরে, যজ্ঞাগ্নির জালে
যদি মার দেহ আত্মা হয় ভস্মসার,
তবু সরি’ দাড়াবার নাহি অধিকার ?
জননীর স্থান গৃহে, মানি শতবার,
এও জানি, রুদ্ধদ্বার গৃহে আপনার
কুঞ্জ করি, পঙ্গু করি, স্নেহের খাঁচায়
অন্ধ কাপুরুষ করি, সন্তানে বাঁচায়
অন্ধ স্বদেশিনী তব দাশ তরে ;-তা কি
হে বরেণ্যে বর্ষীয়সি, জানিবার বাকী ?
যৌবনে সন্তান যবে বিবেকের ডাকে
ছুটি চলে, পিছে টেনে কে তাহারে রাখে
অবােধ স্নেহের বাঁধে, ঢালি অ-ধার?
এই সব প্রতি নিধি জগৎ মাতার।

৭৮
দীপ ও ধূপ
কে না বলে বর্জনীয় বিলাস, ব্যসন,
.আলস্য জড়তা ? কিন্তু স্বতন্ত্র আসন
রাষ্ট্রে ও সমাঙ্গে, নারী যদি দাবী করে,
তাহারে বলিবে কেন-“রহ নিত্য ঘরে,
ভগ্নী জায়া মাতারূপে; পতি পুত্র ভাই
তােমাদের প্রতিনিধি, যা করিবে, তাই
হবে তােমাদেরি কর্ম ; দুলায়ে দুলালে
মাতা মাতামহীরূপে শিশুটির ভালে
লেখ বসি রাজটীকা ?” সন্তানেরি তরে
চাহি মার দূর দৃষ্টি। সঙ্কীর্ণ এ ঘরে
চিন্তা রহে সীমাবদ্ধ ; স্নেহ, শঙ্কাময়,
সন্তানেরে মুক্তি দিতে সদা পায় ভয়
কয়েদীর পায়ে যেই লােহার শিকল,
অন্যে দিতে পারে ভেঙ্গে, যদি থাকে বল ,
আত্ম ঘিরে চিন্তা-চেষ্টা-দৃষ্টিশক্তিহারী
অজ্ঞানের যে শৃঙ্খল পরিছে নারী
ভাঙ্গিতে তা হবে তার আপনারি হাতে,
হতে হবে পরিচিত জগতের সাথে।
ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম মানবের শুধু গৃহে নয়,
ভ্রাতা আর পতি সহ যদি যেতে হয়
দূরে ক্ষেত্রে, যাবে নারী আনন্দে নির্ভয়,
তাহে তার নারীত্বের নাহি অপচয়।

নাতিনীর জবাব
৭১
পিচ্ছিল বহুল পথ, আর্থ-ধূলি-জালে
ভরা বহু কর্মক্ষেত্র—তাই সর্বকালে
নারীরে রাখিবে তুলে সন্দেহে সভয়ে
জড়ত্ব প্রতিষ্ঠা করি, গৃহ দেবালয়ে
পূজার প্রতিমারূপে? সেই
পূজা, হায়,
প্রতি মাই লয় কিম্বা পূজারীই পায় ?
নারী সচেতনা, নহে মৃন্ময়ী প্রতিমা,
শিখুক সে স্বাধীনতা সংযমের সীমা।
আপনারে রক্ষা করি স্বাধীন যে রহে,
সুরক্ষিত। সেই নারী, মনুও তত কহে।
নারীর যে সিংহাসন উচ্চে, তাহা জানি
বহী আর বক্তৃতায় । যিনি মহারাণী
গৃহ সিংহাসনে তার স্বত্ত্ব কতখানি,
কত দিন? বৈধব্য ও দারিদ্র আসিলে
কত খানি রাজপূজা তার ভাগ্যে মিলে ?
আর, দেখনা কি নিত্য কন্যার দুর্গতি-
পিতৃ-অর্থে ক্রীত নরে বরে যে সে পতি ?
এরূপে বাড়িছে শ্রদ্ধা আপনার প্রতি !!
পত্নীরূপে, মাতৃরূপে গৃহধৰ্ম্ম বিনা
সর্বথা নারীত্ব ব্যর্থ, একথা মানি না।
বিজ্ঞান কি শিল্প যদি করে আকর্ষণ,
অ-নারী সে নহে যদি সঁপে তাহে মন

৮৫
দীপ ও ধূপ
অসহায় শিশুটীর মাতা যেই আজ
চিরদিন রহিবে না একই তার কাজ।
গৃহরক্ষা, শিশুচৰ্য্যা রহিবে কি স্থির
মাতামহী, পিতামহী, প্রবীণ নারীর ?
বিধবার, অপুত্রার, অনুঢ়ার তরে
সেবার সুযােগ যদি নাহি থাকে ঘরে,
পাবে না সে অনুমতি হতে সৰ্বত্যাগী
সমাজের দেশের কল্যাণের লাগি ?
নারী কন্যা, নারী মাতা, নারী ভগ্নী জায়া,
মুক্ত হস্তে বিশ্বনাথ স্নেহ দয়া মায়া
ধৈৰ্য্য ধন দিয়াছেন তাহার অন্তরে,
বিশ্ব শিশু মানবের পালনের তরে।
গৃহ তার কর্মভূমি আরামের স্থান
স্বভাবতঃ, তাই বুকে চাপায়ে পাষাণ,
শৃঙ্খল পরায়ে পায়ে, রাখে যদি ঘরে
পিতা, ভ্রাতা, পতি-আর পুত্র তার পরে,
কোথা রহে রমণীর মাতৃত্ব গৌরব,
তার আত্ম-উৎসর্গের সৌন্দৰ্য্য সৌরভ ?
জায়া মাতা হতে সবে পারি কি না পারি,
সৰ্ব্বাগ্রে আমরা নারী সৰ্বশেষে নারী।

নাতিনীর জবাব
আমাদের আত্মা আছে, দেহে আছে প্রাণ,
অমৃতের পুত্রী মােরা আলােক-সন্তান।
আত্মার বিকাশ চাহে নানা দিক দিয়া
এ নব যুগের নারী, ভীতি বিসর্জিয়া।
শুচি রুচি তােমাদের আশীর্বাদ বলে
ইহাদের আশা যেন সুপথেই চলে।
আশীৰ্বাদাকাঙ্কিনী
নাতিনী

৮২
দীপ ও ধূপ
*.
৬।
নাতবৌর জবাব
শ্রীশ্রীচরণকমলেষু
ঠাকুমা, লিখেছ চিঠি নাতিনীর কাছে,
ভুলে গেছ মুখ এক নাত-বৌ আছে ;
বিদ্যা বেশী নাই তার, কলেজে পড়েনি,
বনের বড় কোন আদর্শ গড়েনি,
তােমার পৌত্রীর মত; কিন্তু গৃহকাজে
চিরকাল ছিল দক্ষ। এবে মাঝে মাঝে
‘ফ্যাশানের ব্যসনেতে ঢালি আপনারে
খুজিছে নৃতন পথ, খুসী করিবারে
পৌত্তে তব। নিজ হাতে রন্ধনশালায়
সেকালের মত নাহি উনান আলায় ;
বিজলির বাতি আর গ্যাস রেঞ্জ জলে
বিনা কাঠ সলিতায়। পাখ। যদি চলে,
কেদারায় বসে রাধা সে বড় আরাম,
চোখেতে লাগেনা ধোয়া, মুখে নাই ঘাম।
তবু যবনের বঁধা ইংরাজের খানা
স্বামী সঙ্গে খায় সবে ; করিবে কি মানা?.
“যে না খায়, স্বামীসহ সর্বত্র না যায়,
খেলেন টেনিস, ব্রিজ, সে তো মাথা খায়
আপনারি-স্বামী তার হবে তা ছাড়া
শুনে ভয়ে ভয়ে মরে ; কাণ রাখে বাড়া

নাতবৌর জবাব
!
শিখিতে ইংরাজী বুলি মেয়েদের সুরে,
রাখে সাবধান দৃষ্টি নিকটে ও দূরে,
বেশ, ভঙ্গী, হাব ভাব, দস্তুর সকল,
শ্লীলতা ও অশ্লীলতা করিতে নকল।
বধূর সলজ্জ দৃষ্টি, মুখ বুজে থাকা,
তাই লজ্জাকর এবে ; কথা পাকা পাকা,
তুরস্ত, জবাব দিতে পারে যেই নারী
তাহারি সুখ্যাতি আর সমাদর ভারী
ঠাকুরমা গাে, আগেকার মত দেশকাল
কিছু নাই। দাস দাসী থাকে এক পাল,
তারা দেখে শিশুদের ; শিক্ষয়িত্ৰী আছে
এ ছাড়া ; তবেই বল, মা বােনের কাছে
বেশী কি শিখিবে ? আর সময় বা কত
মার কিম্বা ভগিনীর ? দিন যায় যত
ঘরের বাহিরে বাড়ে কর্তব্য-তালিকা,
ব্যস্ত থাকে পিতামাতা, বালক বালিকা।
আছে সভা, সম্মিলন, খদ্দর প্রচার,
গীতি সংঘ, নীতিপীঠ ; আছে থিয়েটার,
বায়স্কোপ, স্বদেশীয় -জীবনটা নেহাত
নহে নিরানন্দ পূজা-চাহি যাতায়াত
ইংরাজ দোকানে। পরি উপরের শাড়ী
মােটা খদ্দরের বলে, হাথ ওয়ের বাড়ী
যেতে নাই, ভেবনা তা। নতুন ফ্যাশানে
রাউস বানাব, তাতে দোষ কোন খানে ?

৮৪
দীপ ও ধূপ
আশ্চৰ্য্য ফ্যাশান বস্তু । সে যে বহুরূপী
অখণ্ড, অভিন্ন সত্য। আসে চুপি চুপি
বিস্মৃত অতীত বেশে। তােমাদের আগে
যা ছিল এ বাঙ্গলায়, আজ অনুরাগে
তাহাই শােভন বলে য়ুরােপীয় নারী-
{ আমরাও বলি তাই—নিত্য অনুকারী )
চোখ ঝলসান, অতি উজ্জ্বল বরণ,
স্বল্প আৰরণ আর বহু আভরণ।
‘কালচার' ( কুল চূর ?) চলেছে বাড়িয়া,
‘আর্টের’ উৎকর্ষ পদে দিয়াছি ছাড়িয়া
পূৰ্ব সংস্কারের যত ‘ভাল মন্দ বুলি
যে না পারে তাকাইতে চোখে দিক তুলি।
ঠাকুমা, বলিতে গেলে কথা চলে বেড়ে,
খােসা ফেলে দানা ক’টি লও তুমি ঝেড়ে।
আসল কথাটি এই-পুরুষে যা চায়
নারী তাই হতে পারে, তাই হয়ে যায়।
তারপর সেই হওয়া চালায় তাহারে
স্বর্গে কি পাতালে, গতি রােধিতে সে নারে।
“নিজ লক্ষ্য স্থির রাখি চলুক না নারী
স্বাধীন সঙ্গিনী ?”—তাতে প্রশ্ন ভারী ভারী
এস পড়ে ; এ বিদ্যায় কুলায় না তার
সুমীমাংসা-চিঠি সাঙ্গ হােক এইবার।
প্রণতা সেবিকা
নাতবৌ

নাতবৌর জবাব ৮৫ পুন। আমার এ চিঠি থেকে যদি বুঝে থাক, দূষিয়াছি পৌত্রে তব, তবে শুনে রাখ, শিব সম স্বামী মম, স্নেহময় অতি, অমল উদার প্রাণ। আমি ভাগ্যবতী। বৌ পুনঃ পুনশ্চ- ঠাকুরমা, চিঠি লিখিছেন দেখি চুপি চুপি এসে পিছে থেকে পড়ে নিয়ে মরিতেছি হেসে। যে সার্টিফিকেট খানি বধূ, বুদ্ধিমতী, দেছেন পুনশ্চ জুড়ি, মূল্যবান্ অতি। পৌত্র স্নেহবশে তুমি পাছে কর রােষ তাই এই স্তুতিটুকু, আগে দিয়া দোষ। ঠাকুমা একথা গুলি বুঝাও তাে তারে কে কি চায়, কি যে পায়, কে চালায় কারে তােমার স্নেহের পৌত্র

দীপ ও ধূপ
শােকে আশীর্বাদ
(মমতী বাসন্তী দেবীর প্রতি)
ওগাে পতিপ্রাণা, আজ চাও মুখ তুলি,
আজ যাও ক্ষণিকের বিচ্ছেদেরে ভুলি।
এ নহেগাে তিরােধান। এযে অধিষ্ঠান
লক্ষ বক্ষে, লভি নব, নবতর প্রাণ।
তােমার বিজয়ী বীরে পুস্পাঞ্জলি দিয়া
হেরগাে, সমগ্র দেশ লইছে বরিয়া
সে নহে তােমারি শুধু। তারে ভালবাসি
লয়েছে আপন করি তব দেশবাসী,
তোমারেও করিয়াছে তাই আপনার,
বটিয়া লইছে তব বেদনার ভার।
তাহাদের দুঃখ দৈন্য লও বুকে তুলে
আজ হতে; মৃত্যু শােক যাও তুমি ভুলে।
কার মৃত্যু ? লক্ষ বক্ষে যে পেয়েছে ঠাই
সে কি মরে দেহ নাশে? মৃত্যু তার নাই
তুমি যার ছিলে জায়া, সখী ও সচিব,
বঙ্গের হৃদয় গেহে সে যে চিরঞ্জীব।
অয়ি পতি-ভাগ্যবতি, অয়ি অবিধবে,
পতির আরব্ধ যজ্ঞ সমাপিয়া, ভবে

শ্মশানপথে দেশবন্ধু
৮৭
ধন্য হােক্ জন্ম তব। কর তুমি বাস
ইহ পর দুই লেকে। হােক পরকাশ
সেথাকার প্রেমালেক হেথা অন্ধকারে
এ আশীষ, হে কল্যাণি, করি বারে বারে
জুন, ১৯২৫
শ্মশানপথে দেশবন্ধু
দেশবন্ধু, দেশ তব আজ মূর্তি ধরি
শােকাতুর জনতার, ভক্তি নম্র চিতে
বাড়াইয়া লক্ষ বাহু, আসিয়াছে নিতে
প্রাণহীন দেহ তব। দ্বিধা পরিহরি,
বাল বৃদ্ধ যুবা নারী, পথ ঘাট ভরি,
দাড়াইয়া। ব্যাকুলতা আঁখিতে আঁখিতে,
জন্মশােধ প্রিয় মূর্তি বারেক দেখিতে ;
তাই উদ্বেলিত অঞ রাখিছে সম্বরি।
মুদিত প্রতিভা দীপ্ত উজ্জ্বল নয়ন,
ও মুখে নাহি সে ভাষা উদ্দীপনাময়ী,
দেশহিত তপস্যায় ভগ্ন দেহখানি
পুষ্প স্তুপ মাঝে আজ করিয়া শয়ন
চলেছে শ্মশানপথে। দেশ চিত্তজয়ী,
কোন্ মন্ত্রে লক্ষ প্রাণী আনিলে আম্বানি ?

৮৮
দীপ ও ধূপ
নিঃশেষে তােমারে তুমি, ওগাে মহাপ্রাণ,
দেশ জননীর পদে যবে সঁপে দিলে
পূজায় নৈবেদ্য রূপে, কিছু না রাখিলে
লুকাইয়া কোন খানে, সে অপূৰ্ব দান
তােমারে ভিখারী করি বাড়াইল মান
কুলের, দেশের তব। যবে ধনী ছিলে
ছিলে দূরে, দারিদ্রেরে যবে বরি নিলে,
লক্ষ দেশবাসী বক্ষে করি নিলে স্থান।
অকস্মাৎ মৃত্যু তােমা নিয়ে যায় ছিনে,
তাইতাে বিষম ব্যথা লক্ষ বুকে আজ,
আশা সূর্য অস্তমিত হেরি মধ্য দিনে,
মেঘ শূন্য নীলাম্বর হানে গুরু বাজ ।
প্রাণহীন দেহ তব লবে চিতানল,
তবু দেশ চিত্তে তুমি রবে সমুজ্জল।
জুন, ১৯২৫

সিরাজদ্দৌলার সমাধি দর্শনে সিরাজদ্দৌলার সমাধি দশনে মাতামহ পার্শ্বে প্রিয় দৌহিত্র শয়ান- দুর্ললিত, দুর্দান্ত, যে নানা অত্যাচারে করেছিল জর্জরিত, ভীত, বাঙ্গালারে ; হৃতরাজ্য, না পাইয়া দাড়াবার স্থান কৃতঘ্ন ঘাতক হস্তে যার অবসান অগৌরবে। সত্য মিথ্যা নানা কথা তারে করিয়াছে ভয়ঙ্কর। কে বলিতে পারে সে কি ছিল—সর্বদশী বিনা ভগবান? সুন্দর কিশাের তার নিভৃত হৃদয়ে কি ছিল পৈশাচ কুর, পাপের আবহ ? কিবা ছিল বালকের দীপ্ত কৌতূহল ? কি ছিল সংকল্প সাধু-গেল ব্যর্থ হয়ে যার পরিচয় লভি, বৃদ্ধ মাতামহ অতিশয় স্নেহে তারে করিলা দুৰ্বল ? -- চিত্রপটে মূৰ্ত্তি তার নহে মনােহর, ইতিহাসে সে চরিত্র কলঙ্ক মণ্ডিত, তার দুষ্কৃতির কথা শুনি শিহরিত এ দেশের বাল বৃদ্ধ যত নারী নর সার্ধৈক শতাব্দী ধরি। এত কাল পর কাল চক্র আবর্তনে হইছে খণ্ডিত

দীপ ও ধূপ
বহু অপবাদ তার। ধিক্কত, দণ্ডিত
তার তরে করুণায় ভরিছে অন্তর।
তাহার সৌন্দৰ্য্য, যাহে মাতামহ-চিত
ছিল মুগ্ধ, তুষিত কি পরের নয়ন ?
নাহি জানি। বৃদ্ধ যুবা উভয়ে সমান
রূপহীন অস্থি আজ, ব্যথা বিরহিত।
তবু দেখি কাছাকাছি দোহার শয়ন
দর্শকের দৃষ্টি করে অশ্রুজলে স্নান।
কষ্ট ভাগ্য-লক্ষ্মী
মুখ
ফিরাইছে যবে,
বিশ্বাসঘাতক দল যবে চুপে চুপে
পাতিছে বিষম ফাদ, সর্বনাশ কূপে
ফেলিতে তােমায়, ঘাের বিপদ অর্ণবে
ভাসাইতে নিজেদেরে, হে সিরাজ, তবে
বলেছিলে,—এ যাত্রায় বাচিলে, এরূপে
পালিব রাজার ধৰ্ম্ম, সকলে এ ভূপে
স্মরিবে আনন্দে, নাম ভক্তিভরে লবে।”
অশ্রুসিক্ত চক্ষে তব ক্ষণেকের তরে
নির্দয় নিষতিরূপে গেল দেখা দিয়া
অতীতের কর্মফল। পেলেনা সুযােগ
করিবারে প্রায়শ্চিত্ত অনুতাপ ভরে,
করিবারে প্রতীকার কৃতি সফিয়া,
গেলে শুধু দুস্কৃতির করি দণ্ডভােগ।
ডিসেম্বর, ১৯২৬

প্রণতি
প্রণতি
এক যিনি অদ্বিতীয়, অখিল বিশ্বের যিনি নাথ,
সকল মানব সন্তান যার, তঁারে করি প্রণিপাত,
করি বিনয়ে প্রণিপাত।
সকলের শির তঁাহার চরণে একত্র হইলে নত,
সকল গৰ্ব দম্ভ ও দ্বেষ নিমেষে হইবে হত ;
সকলের তিনি পিতা ও পালক, বন্ধু অপক্ষপাত,
অসীম জ্ঞানের, প্রাণের উৎস, আছেন সবারি সাথ।
করি তাহারে প্রণিপাত।
তারে পিতা জানি, তঁারে প্রভু মানি, চিনিব মানুষ-ভাই
তার স্নেহ কোলে হেরিব সকলে, জাতি-বর্ণ-ভেদ নাই ;
তখন ধরিব, মাগিয়া কল্যাণ, সকলে সবার হাত,
আসিছে সে শুভ পুণ্যের যুগ, আসিছে সুপ্রভাত
করি তাহারে প্রণিপাত।
জীবন্ত ঈশ্বরে ভাই হের সবে জীবনের মাঝে,
জেনাে ভাই, তার বাণী মানবের অন্তরেতে বাজে,
যুগে যুগে, দেশে দেশে। যে শুনেছে অতক্রিত চিতে
ধন্য সে হয়েছে নিজে, গেছে রেখে জগতের হিতে

দীপ ও ধূপ
৬ দ , , , ,
;
মানবের জীবনের মহত্তম শ্রেয়ঃ-সমাচার,
সহি গেছে অত্যাচার, অপমান, লাঞ্ছনা অপার,
শান্ত মনে। আত্মা মাঝে যেই বাণী শুনিয়াছে, তারে
মুখে অস্বীকার করি, চাহে নাই প্রাণ বাঁচাবারে ;
দেবতার সেনাপতি মানবেরে করে নাই ভয়,
মরেছে সত্যের তরে, সত্য তাই লভিয়াছে জয়।
এমনি যে কত দেশে কত জ্ঞানী, কত ধৰ্ম্মবীর,
আসিয়াছে যুগে যুগে, কত প্রেমী, কত সাধু পীর,
প্রেরিত, পয়গম্বর, যুগাচাৰ্য, পুণ্যশ্লোক নবী,
কত সত্য-দ্রষ্টা ঋষি, দিব্য দৃষ্টি, ভক্তিমান্ কবি ;
জনমিয়া অন্ধকারে আনিয়াছে আলােক উজ্জ্বল,
স্বর্গের নিকটতর করিয়া দিয়াছে ধরাতল।
এই মহা-মানবেরা গাঁথিয়া তুলেছে স্তরে স্তরে
সত্যের মন্দির উচ্চ, মহেশের অর্চনার তরে।
তার মাঝে মিথ্যা যদি প্রবেশিয়া থাকে ফাকে ফাকে,
পরযুগে নব ঋষি প্রাণপণে সরাইছে তাকে।
সত্য যাহা লভিয়াছি, আনত মস্তকে, তার তরে
অতীতের সর্ব সাধু জনে নমস্কার করি ভক্তিভরে।
তবু মহেশের বাণী অতীত পৃষ্ঠায় শুধু যাবনা খুঁজিতে,
পুরাতন প্রথা ধরি, বিস্মৃত ভাষায় তারে রবনা পূজিতে ;
জীবন-দেবতা যিনি বর্তমানে ধরা হতে যান নাই সরি',
ভক্তের জীবন সাথে তঁাহার প্রেমের লীলা চির সাঙ্গ করি।

প্রণতি
স্তব্ধ নহে বাণী তার; শুনিবারে নিশিদিন কে আছে উৎসুক ?
আত্মার বিজনে নামি শুনিবে সে, শুদ্ধ, শান্ত, নিত্য জাগরূক।
আজ শত কোলাহল ভেদি’ মৃদুবাণী পশিছেনা প্রাণে,
“যেথা প্রেম সেথা স্বর্গ”–শােন নাই কে আছ এখানে?
মানবেরে দিলে প্রীতি, জানিয়াছি প্রীত ভগবান ;
মন্দির জীবন শুদ্ধ, সেথা তার নিত্য অবস্থান।
চিন্তা কথা কৰ্ম্মে মােরা নিত্য যেন হই শুদ্ধতর,
আজ পরমেশ পদে মাগি সবে এই শ্রেষ্ঠ বর ।

দীপ ও ধূল
নিশানা
ধীরে ধীরে বাও, মাঝি, ধীরে ধীরে বাও,
বলে দেব, কোন্ ঘাটে লাগাবে এ নাও।
দিকে দিকে গেছে খাল,
দেখি নাই কত কাল,
নিশানা যা ছিল, জলে ভেসে গেছে তাও
ধীরে ধীরে বাও, মাঝি, ধীরে ধীরে বাও।
গাছে ভরা দুই কুল,
দিনেতে হতনা ভুল,
দেখা যেত ফাকে ফাকে আমাদের গাও;
চতুর্থী চাদের আলো, ঠাহর হয়না ভাল,
সুধাব এমন জন দেখিনা কোথাও ;
ছিল লোক যত চেনা, কেহ পথ চলিছে না,
ধীরে যাও, দুই পারে চেয়ে চেয়ে যাও।
দেখতাে কেয়ার ঝাড়, আর পূর্ব দিকে তার
বড় শিমুলের দেখা পাও কি না পাও।
সৰ্বাঙ্গ সাজায়ে ফুলে,
হিজল দাড়ায়ে কূলে,
ঝুকে মুখ দেখে জলে ? ভাল করে চাও,
বকা হিজলের মূলে বাঁধিব এ নাও,
এ আঁধারে ধীরে, মাঝি, কিছু ধীরে বাও।
৯ই এপ্রিল,

বাঙ্গাল মাঝি
১৫
বরিশালের মাঝি
সন্ধ্যার আগে নামাবে তাে ? কসে’ গুণ টান,
দেখাও দাড়ি, কেমন তুমি ডাঙ্গায় চলতে জান।
নদীর দেশে বাড়ী তােমা, সমুদ্দরের কাছে,
মনের সুখে খাও তুমি ভাতে আর মাছে ;
সামনের বাঁকে ভারী জঙ্গল, চলবে তাড়াতাড়ী,
সন্ধ্যার আগে নেমে যেন যেতে পারি বাড়ী।
ন
মাঝি।—(বাবুর প্রতি)
উজান সােতে গুণ টান্যা যাই, বদর, বদর,
দড়ি ছেড়ে, নাও ঘােরে, বাবুর লাগে ডর।
ভয় না কর বাবু সাইব বস্যা তামুক খাও,
ছইয়ের তলে চক্ষু বুজা খানিক ঘুমাও,
সাঝ না হইতে নাও ছাড়া যাবা শ্বশুর বাড়ী,
এতাে তরে তরে যাওন, আর তো নাই পাড়ি।
[ চলিতে চলিতে আপন মনে।
জলে জলে নৌকা বাই, বিলে ধরি মাছ,
জঙ্গলে জঙ্গলে গিয়া কাট্য আনি গাছ,
বাখরগঞ্জে বাড়ী আমার বড় গাঙ্গের ধারে,
ডাঙ্গার বাঘ জলের কুমৈর ভয় বা করি কারে ?

৯৬ দীপ ও ধূপ মধ্য গাঙ্গে তুফান ওঠে-মরজি দেবতার- মাঝি বসে হালটি চাপ্যা, মাল্লা ঠেলে দাড়, ঢেউর তালে নৌকা নাচে, স্ত্রীলােক কান্দা মরে, ঘুমের শিশু বুকের মাঝে শক্ত করা ধরে ; বিধবা কয় জনম হৈলে মরণ আছেই আছে, কিসের ক্ষেতি, দুদিন আগে না হৈয়া দুদিন পাছে ? শক্ত হাতে ঠেলি দাড়, গাঙ্গে দিই পাড়ি, জলের দ্যাশে বাড়ী আমার, জলের দ্যাশে বাড়ী। মায়ের কোলে চড়া আমি ডোবায় দিছি ডুব, দাদার লগে খালে নাম্য। সাঁতার শিখলাম খুব বাপের নায়ে ফেরলাম কত দ্যাশ দ্যাশান্তর, ঝড়ে পড়লাম বার সাতে ক-বদর, বদ-র। গৌর বরণ কালা হৈল, ধলা হৈল ক্যাশ একটা আছে বড় পাড়ি সকল পাড়ির শ্যাশ। এপ্রিল ১৯২১

গাঙ্গ যে মােরে বােলায়
গাঙ্গ যে মােরে বেলায়
১
গাজ, যে মােরে বােলায়, মাগাে, গাঙ্গ, মােরে বােলায়,
“আয়রে মানিক, দোল ধলা ঢেউ দোলায়।”
ঐ যে ঢেউর পাছে লেখা দেখছ না কি কেউ ?
মাথা তুল্যা,* হাত ভায়া,* গাঙ্গ, মােরে বােলায়
মাগো, গণ যে মােরে বােলায় !
ঘুম ভাঙ্গলাে ফির রাইতে বুকটা ধড়ফড়ায়
দুই চক্ষু আন্ধাৰ ঠেল্যা* গাঙ্গের দিকে চায়,
বাঁশের খুঁটা লড়তে বাড়ার ব্যাতের বাঁধন ছােটে,
তােমার কঁাদন কাটার মত কোড
এমন কালে বােলায় গাঙ্গ-“আয়রে মানিক আয়।”
মাগাে গাল, যে মােরে বােলায়!
বাখরগঞ্জের কোন মুসলমান মাঝি নৌকাডুবি হইয়া মারা যাইবার পর
তাহার বিধবা তাহার বালক পুত্রকে নৌকায় মাঝির কাজে যাইতে দিতনা। কোন
এক রাত্রে যখন সমুদ্রের সন্নিহিত নদীতে জোয়ারের জল প্রবেশ করিতেছে,
বানের শব্দে জাগিয়া উঠিয়া বালক এইরূপ বলিতেছে।
বােলায় = ডাকে। তুল্যা * তুলিয়া, তুলে। বাড়ায়্যা= বাড়াইয়া, বাড়িয়ে।
দুফর রাইতে দুপহর (দ্বিপ্রহর) রাত্রে। আন্ধার= অন্ধকার।
ঠেল্যা= ঠেলিয়া,
ঠেলে। লড়া=লফিয়া, নড়িয়া। অসমপিকা ক্রিয়া গুলির ইয়া’ অংশ তাড়াতাড়ি
উচ্চারণ করিলে যেরূপ শােনায়, অথবা, সংস্কৃত ও হিন্দীতে যা যেরূপ উচ্চারিত
হয় সেইরূপ। ব্যাড়ার বেড়ার। ব্যাতের = বেতের।
বলা বাহুল্য, পূর্ববঙ্গে ৩ ও ড় ঠিকভাবে উচ্চারিত হয় না। কেবল অস্পষ্টত।
দোষ পরিহার উদ্দেশে এগুলির শুদ্ধরূপ রাখা গিয়াছে।

abo
দীপ ও ধূপ
কালাই নদীর জলে আসছে সমুদ্দরের বান,
হাজার মশাল মাথায় লৈয়া করে কার সন্ধান ?
মাগাে, তাের এই ভাঙ্গা এর কারে তালাস করে?
একলা মুই বাপের পুত,
ঝ চায়
মাগাে গাঙ্গ, যে মােরে বাে
আমি যখন পুছি তােরে কথায়
তুই কও যে পােড়া গাঙ্গে নিছে তা পরা
তাইথে তুই ডরে মাের ধরা রা
তাইতে
মঞার নায়,
তুহ ন মােরে যাইতে দাওনা, কত পােলা যায়।
মাগাে গাঙ্গ, যে মােরে বােলায়!
সেই নাস্তা ঝড়ে যখন সমুদুরের ঢেউ
খাইয়াইল দ্যাশে, ঘরে রৈল না তো কেউ
মরণ যা ডাকে, যে যেখানে থাকে
লৈয়া = লইয়া। কুথায় = কোথায়। তান-তার। তাইথে= তাইতে।
ধরা = ধরিয়া, ধরে। 'তুইসেন= তুইই কেবল। সর্বনাশ্যা= সর্বনাশিয়া,
সর্বনেশে। ছুট্যা= ছুটিয়া ছুট। ভাস্যা = সিয়া, ভেসে। উড়ায্যা= উড়াইয়া,
উড়িয়ে। কমু কবি।
কইল আগামী কল্য, কাল।

গাঙ্গ যে মােরে বােলায়
ছুট্যা আসে, ভাস্যা আসে উড়ায্যা আসে পাখা,
হাজির হৈয়া সেলাম বাজায়, বেউথা ধরা রাখা
বেউথা মােরে যাইতে দেওনা রাঙ্গা মিঞার নায়,
মাগো গাঙ্গ, যে মােরে বেলায়
আমি যখন নায়ে; ম কমু আসা যাওয়া
বাপজান যদি ৫
করে থামবে তুফান হাওয়া,
মাগাে ধছি তে নয়ে, কাইল যাইতে দিও নায়ে-
শােন্ তো মা, কার গলা ?—“আয়রে মানিক আয়।
মাগাে গকি মােরে বােলায় ?
আমি যখন সারেঙ্গ হমু, চালামু জাহাজ,
তােমার দিলটা ঠাণ্ডা হৈবে দেখ্যা মাের কাজ,
আমার মনে লয় বাপজান যেন কয়,
“মায়ের দুঃখ ঘুচাবি তাে ঘর ছাড়া আয়-
মাগাে আবার শােনা যায়-
“আয়রে মানিক, দোল খাবিরে বলা ঢেউ দোলায় ;
গাজই মােরে বােলায়, নাকি বাপজানই বােলায়।
মাগাে বাপজানই বােলায়!
d

১০০
দীপ ও ধূপ
---
দীঘির পাঁকে
শােন্, দাদু, শােন্।
আমি তাের মায়ের পেটের বােন ;
একই মায়ের বুকের দুপড়েছে দুই মুখে,
একই কোলে হেসে
ছিলাম সুখে,
মায়ের হাতের মাখা ভাত খেছি এক থালে,
দোল খেয়েছি দুজন বসে’ হিজলএক ডালে,
একই সাথে ফুল তুলেছি, গেয়েছি গান,
আজ হে দাদা, তােমার ঘরে নাইকো মামার স্থান।
পরের ঝি সে আপন হয়, হােক না তাতে কি ?
আমি খাই সিদ্ধ পােড়, সে
খাত ঘি,
লা হাতে,
কোলের ছেলে বাড়ুক তার নিত্য দুধে ভাতে,
আমার তাতে আনন্দ বই দুঃখ কিছু নাই ;-
দুঃখ এই, যে, তুমি আমার মায়ের পেটের ভাই
আজও আমায় চিনলে নাকো। তােমার মায়ের কি,
আমি দিব কুলে কালী ? ছি!ছি! ছি!
মায়ের পেটের সাথী তােমার, চিরদিনের জানা,
তারে শেষটা চিনলে নাকো, এত বড় কাণা
পরের মেয়ের সন্দেহেতে বিশ্বাস হ’ল বেশী,
এ কুলের যে কেউ নয় সে, নিতান্ত বিদেশ।
আমার নামে নিন্দা হলে তােমার বংশে লাগে
সে কথাটা বারেক কি তার অন্তরেতে জাগে ?

দীঘির পাকে
১০১
তােমার লজ্জায় যে তার লজ্জা, তােমার মানে মান,
আমায় মারতে গিয়ে যে তার গেছে সেটুক জ্ঞান।
সত্যি হলে ও রাখত চেপে তােমার মুখ চেয়ে,
একটু যদি বাসতে ভাল কঠিন পরের মেয়ে।
তুমি ছাড়া আপন বলতে আমার কেউ নাই,
তােমার ছেলে কোলে করে মানুষ করি তাই।
তােমার যত্নে কিসের দাবী ?—খােকার স্নেহে ভাগ
কেন বসাই ? বলে তার আমার উপর রাগ ।
বলি আমি সকল কথা, শােন স্থির হয়ে,
গিছলাম আমি দীঘির পাড়ে থােকায় কঁাখে লয়ে।
কাজের সময় কাদলে খােকা বউ যে বেজায় মারে,
ভুলিয়ে তাই নিয়ে গেলাম দীঘির পূব ধারে।
দীঘির জলে বড় বড় পদ্ম ফুটে আছে,
মনে হয় ধরা যায়-পাড়ের খুবই কাছে।
ছেলে তােমার ফুল চাইছে, ভাবছি যে কি করি
এমন সময় দেখি, আসছে ওপাড়ার শ্রীহরি।
ডেকে তাকে বললাম “ভাই, এদিক হয়ে যাও,
ফুলের তরে কঁদছে থােকা, একটি তুলে দাও।
কাছে যেটা নাই ওখানে হাঁটুর বেশী জল,
হলেই বেশী কষ্টটা কি ?” হায়রে অমঙ্গল।
যেমন নামা, পাঁকের মাঝে ডুবল সারা দেহ,
উঠতে নারে। ডাকি করে ? কাছে তাে নাই কেহ।

১০২ দীপ ও ধূপ পরের ছেলে পাকের তলে তলিয়ে মরে যায়, ভাবতে আমার সর্ব অঙ্গ ভরল যে কাটায়। “থাক খােকা চুপটি করে, আমি ফুলটি আনি— বলে আমি সাঁতার দিয়ে তুলতে গেলাম টানি। কতক্ষণ সে সাঁতার ডুব, টানাটানি কত, আমার কোন হিসাব নাইকো। পাগল মেয়ের মত তুলে নাকি হেসেছিলাম, দিয়ে গড়াগড়ি, শ্রীহরির কাদামাখা পা দুখানি ধরি। বউ যে কখন বাঁধা ঘাটে তুলতে এল জল খ্যাল করিনি, দেখলাম পরে মস্ত মেয়ের দল। আনন্দ তো হয়েই ছিল, ঘুচে মহাত্রাস; বিধবার ঐ একটি ছেলে, কি যে সর্বনাশ আমা হতে হত তার, তুলতে গিয়ে ফুল, ভাব দেখি? হাঁটু জল ? আমারিতে ভুল। পরের ছেলে মারিনিতে, যা হবার তাই হােক। বউ বলেন অনেক কিছু, শশানে অন্য লােক। প্রেম কাহিনী তৈরী হয়ে বাড়ছে মুখে মুখে। ০ ০ ০ ভেবেছিলাম দুঃখের জনম, যাক না কেন দুঃখে, আর তাে কারও ক্ষতি নাইকো, নাইকো পরিতাপ- শেষটা একি হল কিন্তু? কার এ অভিশাপ ? বিনা দোষে লােকনিন্দা, কলঙ্ক-রটন, তােমার ঘৃণা আমার উপর—একি অঘটন!

দীঘির পাঁকে
ছেলেবেলা দুই দেহেতে ছিল একই প্রাণ,
আজ হে দাদু দুই মনেতে এতই ব্যবধান ?
এক ভিটাতে, এক মাটীতে, জনম একই ঘরে
তােমার আমার—দণ্ড খানেক আগে আর পরে ;
সেই বাড়ী, সেই ঘর, সেই সবই আছে,
তেমনি দেখ ঝুলছে ফুল বাঁকা হিজল গাছে,
বকুলতলা ভরে আছে ঝরা ফুলের রাশে,
খালের জলে চালতা ফুলের সাদা পাপড়ি ভাসে
হ্যা ভাই দাদু, খসে পড়া চালতা ফুলের মত
আমি যাব ভেসে ভেসে ?•••দুদিন হলে গত
ভাবনা আর, ঠেব কোথাও। বাপের ভিটায় বটে
জন্মে মেয়ে, মরণতো তার অন্যত্রই ঘটে
যাবার আগে চরণ ছুয়ে বলছি বারে বারে,
মায়ের পেটের সাথী তােমার, ভুল বুঝনা তারে।
থাকৃতে আমি চাইনা হেথা, স্থানের ভাবনা নাই,
কোথাও না হয়, দীঘির পাঁকে হবে নাকি ঠাই ?
এপ্রিল, ১৯২১

১০৪
দীপ ও ধূপ
শুভদৃষ্টি বঞ্চিতা
শুভদৃষ্টি কবে হয়েছিল,
কোন শিশুকালে,
ছেয়ে গেছে সেদিনের কথা
বিস্মৃতির জালে।
বলেছিল—“মুখ তুলে চাও
মনে পড়ে তাই,
চেয়ে কি দেখেছি মুখ তুলে ?
তাতে মনে নাই।
ভীত দৃষ্টি যদি উঠে থাকে,
চকিতে সে পড়েছিল নামি
আপনারি চেলীর আঁচলে ;
চিরদিন যিনি মাের স্বামী
মুখ তার দেখি নাই হয় ।
দৃষ্টি তার সহাস্য কৌতুকে
জানিনা চাহিয়া ছিল কিনা
কম্পমানা বালিকার মুখে।
চোখে যদি মিলিত এ চোখ
মুহূর্তেরর তরে,
দেখিতাম এতটুকু হাসি
কিশাের অধরে,

শুভদৃষ্টি বঞ্চিত
নিঃসঙ্গ এ নীরস জীবন
স্মৃতিহীন প্রীতির সাধন
ভরে যেত রসে, সরে যেত
কল্পনার চোখের বাধন ,
স্বপ্ন হত মিলন মধুর
সে শুভ দৃষ্টির সুধা নিয়া,
জাগরণ হত পূজাময়
নিত্য তার মুরতি গড়িয়া।
সতী ধৰ্ম পতির ধেয়ান
সে ধেয়ান হয়েছে কঠিন,
কোরূপে ধেয়াব না জানি।
তীর্থ পথে যদি কোন দিন
মূৰ্ত্তি কোন অচেনা জনের
চোখে লাগে অপূর্ব সুন্দর
মনে হয়, এমনি বা বুঝি
অভাগীর সে কিশাের বর
দেখা দিত যৌবনের রূপে।
সে চিন্তায় আঘাতি সবলে
ছি! ছি! পরপুরুষের পানে
চাহিও না”-মন ফিরে বলে।
জগতের যত সুপুরুষ
সকলের সৌন্দৰ্য্য আহরি

১০৬
দীপ ও ধূপ
আঁকি লব ছবি একখানি
তাও ছাই ভয়ে ভয়ে মরি।
দেবতারে স্বরূপেতে হেরি
গড়েছে কি মূৰ্ত্তি তার কেহ ?
ভক্তে দেব দেন যদি দেখা
দেখা দেন ধরি নর দেহ।
শিল্পী গড়ে দেবের প্রতিমা
জড়ের নরের রূপ নিয়া,
শুভদৃষ্টি-বঞ্চিতা বিধবা
পতিমূর্তি গড়িবে কি দিয়া ?
১২১
বালবিধবার বিবাহ দিনের স্মৃতি
আর কেউ লাল চেলী পরে
বিবাহের কনে যবে সাজে,
কণ্ঠে বুকে হীরা মােতি জলে,
হাতে পায়ে ঝুম ঝুম বাজে
দেখিতে শুনিতে ভাল লাগে।
মনে কিন্তু পড়ে, স্বপ্নে যেন,
আমার সে লাল চেলীখানা
কষ্ট বড় দিয়াছিল-কেন?

বালবিধবার বিবাহ দিনের স্মৃতি
১০৭
বড় কষ্ট দিয়াছিল মােরে
সােনা রূপা জরােয়ার ভার,
মায়ের আঁচল মুখ মাের
মুছাইতে ছিল বার বার।
সানাই বাজিতেছিল, যেন
ব্যথা দিয়া হৃদয়ের তলে ;
একাই তো কাঁদি নাই আমি
মার ও চোখ ভরেছিল জলে।
শুভদিন বিবাহের দিন,
সুখ স্মৃতি কিছু তার নাই,
ভৈরবী, পূরবী বেহাগেতে
কেঁদে কেঁদে বেজেছে সানাই।
অবুঝ বেদনা
সেই সুর নহবত হতে
মাঝে মাঝে যবে আসে কাণে,
সেদিনের
জাগাইয়া যায় মাের প্রাণে।
সকলেরই হয় কি এমন ?
-না—তা হয়েও কাজ নাই,
আমারে জানাতে এসেছিল
আমার সে ভাগ্য দেবতাই।

১৮
দীপ ও ধূপ
স্নান যাত্রা
চমকিয়া নারী শুনিল, “উঠমা, শশাভনা, আমার কন্যা,
আজ পুণ্যতিথি, গঙ্গায় নামি হও শুচি হও ধন্য।”
স্বপনে সতী সে দেখা দিয়া গেছে, যার সুকোমল অঙ্কে
ফুটে ছিল বালা অমল কুসুম। কেন সে ঝাপিল পঙ্কে,
কঠিন কুলিশ হানি মার বুকে, বয়ে শােকের বন্যা ?
প্রতিবাসী কয়—“এমন কি হয় সতী জননীর কন্যা ?
রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী, শেষে কলঙ্কিনী মাঝে গণ্যা ?
একি সতী-মার কন্যা ?”
জনক কহিল-“মরিলনা কেন ?”—কুলের কলঙ্কে ক্রুদ্ধ,
অঝােরে ঝরিল মায়ের নয়ন, ব্যথায় বচন রুদ্ধ।
চির ক্ষমাশীল মায়ের হৃদয়, স্নেহের সুধায় পূর্ণ,
পৰ্বতভার লজ্জার তলে পিযিয়া হইল চুর্ণ।
সুদুর নগরে অভাগীর যদি বেদনা ভরিত চিত্ত,
ভুলিতে চাহিত দেখিয়া দেখিয়া সঞ্চিল যত্ত বিত্ত
দেহ ভাড়া দিয়া, হাসিটি বেচিয়া, সুমােহন করি সজ্জা;
তুতিনা কানে কে গেল শ্মশানে সহিতে না পারি লজ্জা।
কত গেছে দিন গেছে বৰ্ষমাস। আজি না পােহাতে রাজি,
জাহ্নবী তীরে চলেছে যখন অগণ্য স্নানের যাত্রী,
কে গেল ডাকিয়া-“উঠমা, উঠমা, শশাভনা আমার কন্যা,
আজ পুণ্য তিথি, গঙ্গায় নামি হও শুচি, হও ধন্যা।”
শান্ত মহিমায় বলে পুনরায়, “শােভনা আমার কন্যা,
শুদ্ধা যাহারা সুন্দরী তারা, ধরণীতে তারা বন্যা।

স্নান যাত্রা
১৯
এ শুভ উষায় আলােক ভূষায় উজ্জ্বল কর চিত্ত,
নূতন জনম, নূতন জীবন, লভিবে নূতন বিত্ত ।”
পূরব আকাশে উষা হাসি ডাকে-“সতী জননীর কন্যা!”
ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী ডেকে কহে—“আজ সতীসুতা হবে ধন্যা।”
পড়ে ছিলে বলে’ পড়েই রবেনা সাধ্বী মায়ের কন্যা,
লভিয়া আবার নূতন জনম সতীকুলে হবে গণ্যা”
শান্ত সমীর শিরে হাত দিয়া আশীৰ্বাদ যেন বর্ষে,
জাহ্নবী ধারা উছলি চলিছে যেন কি গভীর হর্ষে।
কেঁদে নারী বলে, “নামি নদী জলে দেহ করা যায় শুদ্ধ,
কে দিবে ধূইয়া কলঙ্কিত হিয়া নিরন্ধ, কারায় রুদ্ধ?”
তবুও উঠিছে স্মরি মাতৃ মুখ, কহিছে—“মায়েরি জন্য,
মায়ের দেবতা মােরে দয়া করে ভরসা তাে নাহি অন্য।”
পাছে পরিচিত কেহ চিনে ফেলে, চালায় চরণ ক্ষিপ্র,
দলে দলে চলে বিধবা, সধবা, দোকানী পসারী, বিপ্র ।
বিলাসিনী মানি কহে একজন—“দিব স্নান মন্ত্র শিক্ষা,
দরিদ্র ব্রাহ্মণ, বেশী নাহি চাই, অঙ্গরীয় দিও ভিক্ষা।”
নীরবে সে চলে। দেখে তার পানে পড়িছে যতেক দৃষ্টি,
হয় ঘৃণা ঢালে, নয় হেসে হেসে করিছে কলুষ বৃষ্টি ;
গূঢ় বেদনায় জলে নামি যায়—সে দৃষ্টির মল অঙ্গে,
তারে ধুয়ে দিবে জাহ্নবীর জলে-কারেও চাহেনা সঙ্গে।
তীর হতে যায় দূরে—আরাে দূরে—“ডুবিল! ডুবিল!” শব্দ,
কেহ জিজ্ঞাসিল, জানেকি সাঁতার ?”—কেহ রহিল স্তদ্ধ।

দীপ ও ধূপ
সেকালের তীর্থযাত্রী
(এক্ষেত্রের পথে)
জাগিস যদি থাকতে রাত, আমায় জাগা ডেকে,
যাত্রা যদি করি ভােরে যাসনে আমায় ফেলে,
জানিস তাে ভাই আমার দেরী উঠতে ঘুম থেকে,
টেনে তুলিস্ তুলতে যদি নাই পারিস্ ঠেলে ;
তবু যাসনে ফেলে, ভাইরে, যানে একা ফেলে ।
চলবে না পা, মরব পখে, সবাই চলে গেলে।
অনেক রাস্তা পেরিয়ে এনু, ভাইরে, তােদের সাথে,
পায়ের ব্যথা ভুলিয়ে দিনু গেয়ে হাসির গান,
হাতে হাতে বেঁধে রইনু কত আঁধার রাতে,
দ্যর হাঁকে, পশুর ডাকে ভয়ে কম্পমান ;
অসাড় দেহে, অঘুম চোখে, ভােরের আলাে পেয়ে,
সবার আগে নৃত্য করে’ উঠেছি গান গেয়ে।
তখন তােরা ভুলে গিয়ে রাতের ভাবনা ভয়,
দাড়িয়ে উঠে, আমার সাথে মিলিয়ে দিয়ে সুর
গাইতি জোরে—“জয় জগন্নাথ, জগন্নাথের জয়।”
বয়ে যেত আকাশ বাতাস করি ভর পূর
আলাের জোয়ার,-বুকে বুকে আনন্দের কি ঢেউ।
পড়ব পথে, মরব পথে ভাবিনিতত কেউ ।

সেকালের তীর্থযাত্রী
১১১
অনেক পথ তাে চলা হল, আরতাে বেশী নাই,
ঘর ছেড়েছি মাসেক কাল, গােটা সাতেক দিন
সামনে আছে, গেলেই মােরা পুরুষােম পাই ,
তারপর এ প্রাণটা প্রভু রাখুন কিম্বা নিন,
মােগটা বাড়ান, তােদর ছাড়ান, যা তার খুসী তাই
হােক না কেন—দর্শন পেলে আর কিছু না চাই।
(এক্ষেত্রে মৃত্যুশয্যায়)
এ
ফিরে যা ভাই সবাই তােরা, যে যার আপন দেশ,
পথ চেয়ে যে আছে তােদের ঘরের ছেলে মেয়ে,
অনেক পুণ্যে দর্শন হল, সার্থক পথের ক্লেশ,
ফিরতি পথে চবি সবে ‘জয় জগন্নাথ গেয়ে।
আমায় গেলি ফেলে,
তাতে দুঃখ করবিনে ভাই, চবি হেসে খেলে।
দেরী ;
দূর এসে
ভাবনা ছিল—পথের মাঝে কঁাধের বোঝা হয়ে
পাছে তােদের করাই এতটা
দেব দর্শন না করেই, ব্যর্থ আশা লয়ে
পড়তে হয় বা যমের হাতে, ফিরতে বা হয় দেশে ;
ঠাকুর দয়া করে,
যেতে দিলেন মন্দিয়ে তার, তােদেরি হাত ধরে।

১১২ দীপ ও ধূপ পায়ের ক্ষত, গায়ের জ্বর, বুলিয়ে পদ্ম হাত ভুলিয়ে দিলেন, এক নিমেষে, স্বয়ং জগন্নাথ। হাত নাই তঁার ?—বলি কিরে? আমার সারা গায়ে হাতের স্পর্শ প্রলেপ আছে, আমার পায়ের ঘায়ে ; আনন্দে আজ তাই বলতে পারি—আমায় ফেলে ফিরে যা সব ভাই। দেখতে কোথা চাদরখানা, ওরই একটা খুটে আছে বাঁধা মহাপ্রসাদ, যা ভাই তাের নিয়ে, আসবে যখন সবার সাথে সে অভাগী ছুটে, দি এটুকু। বলি তারে, কটু বলতে গিয়ে করেছে আশীৰ্বাদ- “মিটুক তােমার চির জন্মের পথ হাঁটার সাধ।” কথাই তার একটু কড়া, মনটা নরম আছে, অন্যায় দেখে যায় সে ক্ষেপে, শক্তি নাই ঠেকায়, সকল ক্রোধের ঠেলা সইতে আমি ছিলাম কাছে, এখন রইলেন জগবন্ধু, তরেই যেন পায়। ঠাকুর! ঠাকুর!—এখন ভাইরা তােমরা যাও সরে, জগবন্ধুর দুখানি হাত তুলছে আমায় ধরে। - মন্দির-প্রতিষ্ঠা মন্দির-প্রতিষ্ঠা বলিলেন রাজা—“প্রাসাদ-উদ্যানে তােমরা দেখিছ বটে সকল অঙ্গের পরিপূর্ণ শােভা, প্রতিমায়, চিত্রপটে, কিন্তু কোনােখানে এক নারী-দেহে এত কি সৌন্দৰ্য্য থাকে ? চিত্ৰকৰ লয়ে বিচিত্র তুলিকা কল্পনার রঙ্গে আঁকে। বহু সুন্দরীর খুঁত ছেড়ে ছেড়ে, সৌন্দর্য্য যা লয়ে তাই শিল্পী গড়ে তােলেনিখুত প্রতিমা, কোথাও যেমন নাই।” *কোথাও যা নাই ? মানি না এ কথা”-কহে এক পার্শ্বচর- “হুজুরের আছে কর্মচারী এক, খুঁজিলে তাহার ঘর মিলিবে সুন্দরী, বর্ণে কি গঠনে কারাে কাছে নহে কম- পটে বা পাথরে এখানে যা আছে, অনিন্দ্য ও অনুপম। বরঞ্চ কঠিন পাষাণের নারী, সুকোমল দেহ তার, আজ্ঞা যদি হয়, চিন্তা চেষ্টা করি লয়ে আসি একবার। দেখুন না তারে ? হেলেন, সাইকি, চাই কি ভিনাস দেবী তাদের মতন না হলে গঠন, বৃথা মহারাজে সেবি।” করিলা মন্ত্রণা কুসঙ্গীরা মিলি—“এ কাজ কঠিন নয়। রাতার নিকট নিতে যদি পারি টাকা শত পাঁচ ছয়, গােপালেরে তার অল্প কিছু দিয়া করিতে পারিব বশ, মােরা শতকরা নব্বই রাখিয়া দিব শতকরা দশ।”

১১৪
দীপ ও ধূপ
প্রভুর প্রসাদ, বিনাশ্রমে ধন, দুই লাভ হবে জানি,
গােপাল একদা প্রমােদ-উদ্যানে ভগিনীরে দিল আনি।
“পূজার লাগিয়া কত ফুল চাস? রাজার বাগানে গিয়া
যত খুসি ফুল তুলে নিবি আয়”—এই বলি ভুলাইয়া।
বাহির দুয়ার গেছে রুদ্ধ হয়ে। “ভিতরে ঠাকুর আছে”
বলি হাত ধরে রেখে গেল তারে একলা রাজার কাছে।
সে রূপ নেহারি চমকিলা রাজা। চিত্রের প্রতিমা তার
আসিল কি নামি লভিয়া জীবন?-নয়ন ফেরে না আর।
এ কি নারী ? এ কি ? ব্রাসে কম্পমানা ভাসিয়া চোখের জলে,
ভূমে পড়ি, তার ধরিয়া চরণ, রুদ্ধকণ্ঠে এ কি বলে ?
“প্রজার পালক, রাজা বাহাদুর, পায়ে পড়ি, ভিক্ষা চাই,
আমারে বাচাও বিপদ-সাগরে, আমার যে কেহ নাই।
আমি যে অনাথা। পিতা মাতা স্বামী সব গেছে—ছিল ভাই,
বিশ্বাসঘাতক সে দেছে ঠেলিয়া, অকুলে যে ভেসে যাই।
পিতা নাই যার তার পিতা হয়ে রাখ জাতি কুল মান,
আশ্রয়বিহীন অবলা বিধবা কে তারে করিবে ত্রাণ
তুমি ছাড়া তুমি রাজা আমাদের”-কাদিয়া আর কয়,
“তুমি পিতা, ওগাে আমি কন্যা তব”—জমীদার সবিস্ময়
রহিল চাহিয়া সে মুখের পানে। অতুল সৌন্দৰ্য্য তার।
রূপসী রমণী অনেকে দেখেছে, এমন দেখেনি আর!
সতীত্বের শিখা রূপরাশি তার করিয়াছে জ্যোতিষ্ম,
সূৰ্য্যরশ্মি স্বর্ণমন্দির-চূড়ায় করে যথা দীপ্তি দান।
চকিত সে রাজা। প্রজার পালক? কে রক্ষক বিধবার ?
বিধাতা দেছেন কারে গৌরবের এই মহা অধিকার ?

মন্দির প্রতিষ্ঠা
১১৫
এ কি কথা আজ শুনাইল বালা? আহা কি করুণ মুখ ।
এই কিশােরীর পিতা যে আছিল, কি ছিল তাহার সুখ!
প্রজার আলয়ে অপূর্ব রূপসী আছে কেহ যদি জানে,
কুসঙ্গীরা তার প্রসাদ লভিতে তাহারে ধরিয়া আনে,
এমন করিয়া জাগায় নি কেহ সুষুপ্ত করুণা তার,
বহু অবলার সাধি সর্বনাশ করেছে সে অহঙ্কার।
লজ্জা জেগে উঠে। অতীত জীবনে ঘৃণা এল মুহূর্তেকে,
কহিল হৃদয়—পিতৃহীনাদের পিতা আমি, আজ থেকে।
হৃদয়ে উচ্ছসি উঠিছে মমতা, আনন্দ-কম্পিত স্বর
দাড়ায় সে রাজা, আনত মস্তকে, ভক্তসম জুড়ি কর,
কহে কন্যা মাের তুমি, ওগাে দেবী, কি চাহ আমার কাছে ?
তােমারে বাঁচাতে আমি দিতে পারি, আমার যা কিছু আছে।
উঠ, মা আমার। কোথা হতে এলে ? কি পুণ্য করেছি, তাই
সন্তানবিহীন এ পাপ জীবনে তাের মত কন্যা পাই ?
কি তাের বিপদ ? কে তােরে কাদায় ? তাের একগাছি
চুল
স্পর্শ যে করিবে, আমার এ হাতে মরিবে সে, নাহি ভুল।
চ মা আমার” বলি হাতে ধরে বাহির অঙ্গনে গিয়া
ভৃত্য ও অমাত্য যারা সেথা ছিল আনিলেন ডাকাইয়া ;
কহিলেন—“দেখ এই মা আমার, বড় আদরের মেয়ে,
নিঃসন্তান ছিনু হতভাগ্য আমি, ভাগ্যবান্ এরে পেয়ে।
তােমরা জানিবে জননী বলিয়া, মানিবে দেবতা বলি।”
বলিলেন জাকি কুসঙ্গীর দলে-“দেশ ছাড়ি যাও চলি।

দীপ ও ধূপ অমি জমীদার, আমি স্বেচ্ছাচারী, এখনও মানুষ আছি, কন্যা, ভগিনীর, মায়ের সম্মান করিব য’দিন বাঁচি।” বৃদ্ধ দ্বারপালে কহিলেন-“যাও, রাণীজির কাছে চলি; মাের নিবেদন জানাবে বিনয়ে, যােড়হাতে, এই বলি- “বাগানে নৃতন হবে দেবালয়, করিতে সে আয়ােজন, মােরে দয়া করি, সত্বরে হেথায় হােক তার আগমন।” নিশীথে সংবাদ গেল অন্তঃপুরে, অতীব বিস্মিতা রাণী, চির-অনাদৃতা কহে মনে মনে—*এ কি খেলা নাহি জানি।” আসিলেন রাণী। শিবিকা খুলিয়া নামালেন তারে স্বামী, কন্যা আসি ধীরে প্রণমিলা যবে, কহিলেন-“তুমি আমি আজিকে পেয়েছি প্রথম সন্তান, সতীর প্রতিমা মেয়ে, পবিত্র হয়েছে এই পাপভূমি এঁর পদধূলি পেয়ে। হেথায় উঠিবে নূতন মন্দির, সতীর পূজার তরে, শাস্ত্রের বিধানে প্রতিষ্ঠা করিয়া তার পর যাব ঘরে।” উঠেছে মন্দির সতী দেবতার, জগদ্ধাত্রী যার নাম- ভিখারী ভােলার ঘরণী শঙ্করী, অঙ্গদা, সিদ্ধির ধাম। মন্দিরের পিছে অতিথি-নিবাস, বিলাস-ভবন সেই ; মর্মর মুরতি তৈল-চিত্রাবলী আগেকার মত নেই। নব চিত্রপট-মৃতা দক্ষতা ; উমা ও ভিখারী বর; বনে তিমুখী সীতারে লইয়া দুই ভাই জটাধর ; অন্ধ পতি পাশে আবৃতনয়না গান্ধার-দুহিতা আছে , এক বস্তুভাগে আবরিয়া তনু বৈদভী নলের পাছে ;

মন্দির-প্রতিষ্ঠা
১১৭
মৃত্যু সাবিত্ৰীরে দিয়া যায় বর, বেঁচে উঠে সত্যবান্।
স্লেচ্ছ জয় শুনি রাজপুত নারী অনলে ঢালিছে প্রাণ ;
শিশুদের লয়ে চলিতেছে পথ সাঁওতাল নারী নর ;
উষার আলােকে গাভী ও লাঙ্গল লয়ে চাষা ছাড়ে ঘর ;
দিবা দ্বিপ্রহরে কৃষাণী এসেছে বেঁধে লয়ে অল্প জল
থালায় লােটায় ভরা কি অমৃত? স্বর্গ ঐ তরুতল ?
রাখার আদেশে চিত্র এইমত ভবন প্রাচীর ছায়,
নারী পুরুষের প্রেমের মহিমা বর্ণ-তুলিকায় গায়।
হােথায় সুপ্রিয়া মুষ্টিভিক্ষা লাগি দ্বার হতে যায় দ্বার,
শিল্পী দেছে মুখে অপূৰ্ব্ব মাধুরী আশাভরা করুণার।
যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি বিত্ত আপনার দুই ভাগে দিয়া যায়,
কহিছে মৈত্রেয়ী-অমৃতা না হলে কি হবে এ নিয়া হায় !”
মহা প্রজাবতী গোতমী কাতরে বুদ্ধ মুখ চাহি কয়-
“নির্বাণের পথ মায়েরে দেখাতে নাই কি, করুণাময় ?”
ভাবিছেন রাজা "শ্রেষ্ঠ নারী নর যতেক নয়নে পড়ে,
সবার প্রাণের সৌন্দৰ্য্য লইয়া মানুষে দেবতা গড়ে।
মিথ্যা গল্প নাহি কহিনু তােমারে। আশ্চর্য্য মানব প্রাণ;
দেখ মনে নামি, স্বর্গ ও নরকে মুহূর্তের ব্যবধান।

১১৮
দীপ ও ধূপ
অনাদৃতার আশা
এ দেহ যখন পুড়ে ছাই হবে,
আনিবে ভস্ম তুলি,
তাহারি উপরে
চুম্বন
দিবে,
অঙ্গে মাখিবে ধূলি।
যেকথা শুনেও শােননা, হৃদয়ে
বাজিবে সেই গুলি,
বলিবে—হায়রে তুলি নাই কাণে
এমন প্রেম বুলি !
কাদাইয়া যাও, ফিরেও না চাও
চক্ষে বিরাগ ঠুলি,
কঁদিয়া মরিবে শােকের পরশে
দৃষ্টি যাইলে খুলি।
মরিলে স্মরিবে যাহা কিছু গুণ
শতেক দোষ ভুলি,
এ মাের শ্মশানে স্মৃতির স্তম্ভ
উঠিবে মাথা তুলি,
কালের আঘাতে তাও ভেঙ্গে যাবে,
ধূলায় মিশিবে ধূলি !

স্মৃতির দংশন
১১১
স্মৃতির দংশন
চিতায় সমর্পি তারে ফিরিয়াছি ঘরে,
আনিয়াছি বহ্নি জ্বালা গােপন অন্তরে।
আখি যত ঢালে অশ্র, মন তত দহে,
সুপ্ত স্মৃতি জেগে উঠে আজ মােরে কহে-
“তুমি স্নেহে মুখপানে চাহ নাই তার,
ডাক নাই নাম ধরে সােহাগে আদরে,
তােমার সম্মুখ দিয়া দিনে শতবার
করেছে সে আনা গােনা, কত আশা ভরে
তাহার পিপাসু দৃষ্টি ক্ষণেকের তরে
মাগিয়াছে দৃষ্টি তব, দেখে দেখ নাই।
কি দিয়াছ প্রতিদান অশ্রান্ত সেবার ?
দাসীর আহার বস্তু, থাকিবার ঠাই।
একদিন কোথা হতে অশান্ত সমীরে
ক্ষুদ্র অভিমান বীজ সে তরুণ মনে
উড়িয়া পড়িল আসি, সিক্ত অনীরে
অঙ্কুরিল, বাড়িয়া চলিল সঙ্গোপনে।
যৌবনের সবটুকু প্রাণরস পিয়া
পুষ্ট সেই অভিমান পিষিয়াছে তারে,
সকল প্রেমের সাধ বিসর্জন দিয়া
ঝাঁপ দিল উন্মাদিনী মৃত্যু
পারাবারে।”

দীপ ও ধূপ
মৃদু হাত, মৌন সেবা, আনত বয়ন,
আজ বার বার হেরি, পাণ্ডুর অধর,
ধৈৰ্য্য যথা পেতেছিল অনন্ত শয়ন;
ক্ষণিক চকিত দৃষ্টি, শুনি মম স্বর।
আজ যত মনে পড়ে, হিয়া কেঁদে কয়
ফিরে যদি আসে তারে করি সমাদর
আনন্দে বসাই পার্শ্বে, করি অনুনয়
বলি—ক্ষম অপরাধ ; চুম্বি সে অধর।
অতি মােরে ধীরে ধীরে কহে-
“সে তাে আর ফিরিবার নহে।
জীবনে মৃত্যুর চেয়ে তীব্র ব্যথা দিয়া
ঠেলিয়াছ মৃত্যু মুখে, ফিরিবে না আর।
অপমৃতা, লােকান্তরে তােমার লাগিয়া
প্রেমে না, লজ্জায় আজ ফেলে অশ্রুধার।
আত্মঘাত পাতকের প্রায়শ্চিত্ত করি
কি জানি সে কত কালে পাবে শান্তি সুখ,
কোন দূর লােকে যাবে, কোন পথ ধরি,
মােহ মুক্ত, কোন শ্রেষ্ঠ ইষ্ট অভিমুখ।”

দুহিতৃ বিদায়
দুহিতৃ বিদায়
ওগাে ওরে ছেড়ে দাও। কত দুঃখ দিতে চাও?
আর কেন? কারাবাস হােক, হােক শেষ,
ও যে আকাশের পাখী এ দেহ পিঞ্জরে থাকি
রুদ্ধশ্বাস, ভুঞ্জিতেছে দুর্বিসহ ক্লেশ।
ঔষধে কি শুশ্রুষায় কিছুতে না শান্তি পায়,
এ যাতনা চক্ষে আর দেখা নাহি যায় ;
নিজে মুহুর্মু তাহে কঁদিয়া বিদায় চাহে।
কেন রােগ যন্ত্রণারে ব্যর্থ চিকিৎসায়
করিছ ভীষণতর? এইবার দয়া কর,
দূর কর যন্ত্রপাতি, ব্যথিওনা আর ।
দণ্ড দুই, অর্ধ দিন, বাড়াইতে আয়ু ক্ষীণ
মৃত্যুরে করিছ দীর্ঘ। ছাড় এইবার।
শান্তিতে ঘুমাতে দাও, ওমা, জন্মশােধ গাও
যে গীতে লােদন শান্ত হত শিশুটির,
মুখে চোখে দাও চুম, ধীরে আসুক ঘুম,
দেহেতে বুলাও হাত, বুকে রেখে শির।
নুয়ে পড়ে মাথা, আর নাই কোন ব্যথা।
কাদিও না অভাগিনী, রহ, রহ স্থির।
মর্মভেদী হাহাকারে চঞ্চল কোর না তারে
চলেছে যে মৃত্যুপথে অমৃতের তীর।

১২২
দীপ ও ধূপ
যার হাতে পেয়েছিলে আজ তারে ফিরে দিলে,
এ যে আদরের ধন বিশ্বজননীর।
ভাল করে দেখ চেয়ে। এই দেহময়ী মেয়ে
অনল শয্যায় শুয়ে হবে অন্তর্ধান,
তাই আঁখি শুষ্ক রাখি, কর যা করিতে বাকী,
সুবাসিত জলে ওরে করাইয়া স্নান,
আঁচড়িয়া দাও চুল, আনি রাশি রাশি ফুল
সাজাও ; পরাও নব বস্ত্র পুস্পহার।
বধুরূপে পাঠাইতে যেমন সাজায়ে দিতে,
সাজাও তেমনি যত্নে--সাজাবেনা আর।
রূপে গুণে অনুপম, অনূঢ়া এ মনােরমা
উজলি ভবন তব ছিল এতকাল,
আজ সে চলিয়া যায় মরণের শিবিকায়,
আঁধারি জীবন তব, ছিড়ে স্নেহজাল
বুকে বিদ্ধ থাক্ শােক, জন্মশােধ দুই চোখ
ভরে দেখ এ প্রতিমা, হেথা যতক্ষণ,
তারপর, পার যদি, বহাইয়া অশ্রুনদী
হৃদয়ের চিতানল কোনাে নির্বাপন।
হায়রে সে চিতানন, যত ঢাল অশ্রুজল
এলিবে হৃদয়ে তব যাবৎ জীবন।

পথের চিহ্ন
১২৩
পথের চিহ্ন
হারায়ে ফেলেছি তারে জনতার মাঝে,
খুঁজে খুঁজে বেলা হয় শেষ,
আমারে যে যেতে হবে আজিকার সাঁঝে
মালিকের কাজে দূর দেশ।
* জানিনা তত দীর্ঘ পথে বিশ্রামের তরে
পান্থশালা আছে, কি না আছে ;
সে যদি আমার খোঁজে এই পথ ধরে
ঠিকানা সে পাবে কার কাছে ?
যদি অন্য পথে যায়, তবে হায়, হায় ।
মিলনের সৰ্ব্ব আশা শেষ!
দাড়াতে পারিনা তবু, বেলা চলে যায়,
যেতে হবে-প্রভুর আদেশ।
হে দোকানী, যদি দেখ যুবক সুন্দর
কারাে খোজে চাহে চারিদিক,
বলে এক প্রৌঢ়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর,
উত্তরের হয়েছে পথিক।
বলাে অশ্রু ঢেলে গেছে পথের দুধারে
লয়ে গেছে বুকেতে বিষাদ,
সেই অশ্রু-চিহ্ন পথ দেখাক তােমারে
রেখে গেছে এই আশীর্বাদ।
হাজারিবাগ
মে, ১৯২৫

১২৪
দীপ ও ধূপ
হবে দেখা
আমি
তুমি
আমি
মরণে বরিব আজ হেসে হেসে
ফেলিওন অভধার,
কত শত বার গেছি দূর দেশে,
নদী সিন্ধু হয়ে পার।
আবার মিলেছি স্বজনের সাথে,
ডুবায়ে নিঃশেষে আনন্দ প্রভাতে
বিচ্ছেদের অন্ধকার।
ফেলিওন। অশ্রুধার।
তু
মি
তােমাতে আমাতে ফিরে দেখা শােনা
হয় কি না হয়, তাই
ভেবে ভেবে তুমি পেওনা বেদনা,
দেখা হবে ভুল নাই।
মৃত্যু লয়ে যাবে যাকু না যে পথে,
আঁধারের যানে, কি আলােক রথে,
আজ আমি যেথা যাই,
সেথা তুমি ও পাইবে ঠাই।

সংশয় বাদী
একি হতে পারে তােমাতে আমাতে
কখন হবেনা দেখা ?
মিলিব আমরা—বিধাতার হাতে
দু’ললাটে ছিল লেখা।
তাই ভিন্ন স্রোতে ভাসিয়া ভাসিয়া
দুজনে হেথায় মিলিনু আসিয়া,
ফের কি ফিরিব একা?
মরণের অই একই পথ দিয়া
দুজনায় হবে দেখা।
-না,
সংশয়
বাদী
দেবতা স্বর্গেই থাকে অথবা পাতালে,
ধরা নাহি পড়ে স্তুতি জালে।
দীন দুঃখী কত ডাকে,
ভক্ত অর্থ দেয় তাকে,
সাড়া কি পেয়েছে কোনকালে ?
আশা হীন, ভাষা হীন,
ক্ষুধা ও পিপাসা হীন,
আপন-মহিমালীন, সর্বঅন্তরালে,
ধরা নাহি পড়ে সুতি জালে।

দীপ ও ধূপ
তবে কেন দিশি দিশি এ স্তুতি বন্দন,
পুস্পাঞ্জলি, সুবাস চন্দন ?
যে কভু দিবেনা ধরা, তারে কেন খুজে মরা ?
তারে কেন পূজা করা?
শশানে, কি না শােনে, তবু কাতর ক্রন্দন
তাহারি উদ্দেশে ধায়, কেন যানলে, হায়,
হবিরূপে হৃদয়ের রক্ত নিন্দন?
দেবতা আছেন কি না মানি কি না মানি,
আমি আছি একথাটা ভাল করে জানি ;
পাহাড়ে আছাড় খাই, সিন্ধু জলে ডুবে যাই,
আপনারে বঁচাবারে করি হানাহানি।
দেহে যদি থাকে বল, বুদ্ধি রহে অবিকল,
মৃত্যু গ্রাস হতে রাখি আপনারে টানি।
দেবতা থাকিলে আছে মানবের প্রাণে,
সেথা নিত্য হবি দিয়া রাখ ভারে জাগাইয়া
রাখ অতি দৃষ্টি আপনার পানে ;
নালো, দিয়া তাপ দিয়া আলো,
তুমি সরে গেলে অন্যে অলিবে এখানে,
অগ্নিদেব করে বাস সকলের প্রাণে।
উৰ্দ্ধ মুখে জল,

প্রত্যয় বাদী
১২৭
প্রত্যয় বাদী
কে বলে দেবতা নাই? বাহিরে যদি না পাই
খুঁজে খুঁজে, অন্ধ আমি আপনার প্রাণে
পাই তারে। পাই তারে একথা যে বুঝাবারে
পারিনা; ভিতরে যাহা কেমনে দেখাই ?
ধীর পদে বঁধু আসে অন্ধ চিনে মৃদু হাসে
এস বলে’ বাড়াইয়া ধরে দুই হাত,
হাতের পরশ পায়
মিলনের গীতি গায়
সংশয় পােহায়ে জাগে আনন্দ প্রভাত।
দেবতা অনেক কাপে
ধরা দেয় চুপে চুপে
চোখে যবে না দেখেছি শুনিয়াছি কাণে,
অপরের সাথে এসে
সে যখন যায় হেসে
আনন্দ মূরতি এঁকে যায় মাের প্রাণে।
কত মিঠা কণ্ঠস্বরে
কণ্ঠ তার ধরা পড়ে,
বাতাস পরশ তার অঙ্গে বহি আনে,
ফুলের সৌরভে সাজে, নবের গৌরব মাঝে,
ছামা তার, কায়া তার, যে জানে সে জানে।

১২৮
দীপ ও ধূপ
ভীরু কবি
আমায় কেন অন্দর থেকে
সভার মাঝে আলে ডেকে
গুণিজনের সাথেই কেন
স্থান দিলে আমায়?
হেথায় যাদের আসন আছে,
দূরের লােক তাদের কাছে
অনেক পেতে রাখছে আশা,
অনেক কিছু পায়।
কেউ বা গায় কেহ বাজার,
আপন রূপে সভা সাজায়,
জ্ঞানের বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে
আলােক করে দান,
এদের পুণ্য পরশ লেগে
সুপ্ত জীবন উঠছে জেগে,
সুখের নদে নবীন ধারা
হয় প্রবহমান।

কবিতী
গোপন মাের আবাস থেকে
আমায় বুঝি আলে ডেকে
কাঙ্গাল মাের কই দৈন্য
বুঝাবে আজ,
তাই?
কিম্বা আমি এদের জ্ঞাতি,
না থাক্‌ বিদ্যা, না খাক খ্যাতি,
উৎসবেতে এক পাতিতে
তাইতে আমার ঠাঁই।
তবুও লাজে ভরছে বুক,
তুলতে আঁখি, খুলতে মুখ
পারছি না যে, হয়না বলা
বলতে যাহা চাই।
.

দীপ ও ধূপ
স্বামী ও সন্তান-আলােচনা
“কারে বেশ চাহ তুমি, স্বামী কি সন্তান?
এ সুরের কে তােমার বল প্রিয়তর।”
।
ভাবিয়া কহিল নারী-“দিতে পারি প্রাণ
স্বামীর মুখে লাগি; জন্ম-জন্মান্তর
পারিবেন সেবা, সুখ, শান্তি দিতে তারে,
দেবতার পূলে নিত্য এই ভিক্ষা মাগি ;
তবু আমি সরে গেলে তারে সেবিবারে
মিলবে অপর নাম এ শিশুর লাগি
সেহর মনের রক্ৰ বাল্যের রসে
শুভ্র করি, চির দিন কে পিয়াবে তারে ?
শিশু মাের অসহায়, মনে জানি, তাই
দেহে শােণিত অ: হৃদয়ের স্নেহে
বহারে বৃদ্ধি করি রেখে যেতে চাই ;
এক মাত। শিশুটির দেছে ঠাই দেহে-
“ছাড়া জরা, শয্য। সে যেমন আসে
মুক্ত বায়ু পৃথিবীর আলােকের কুলে,
টুডে সেই গো । ধাত্রী ভালবাসে
পলিত শিশুরে কত, গেছ তাহা ভুলে।
সেবিকা ও পত্নী হতে পারে একাধিক
শুরে পানিতেও পারে বহুজন।

স্বামী ও সন্তান-আলােচনা
১৩১
= = = =
= = = =
৬. ক =
“শিশুরে ফেলিয়া মৃত্যু, সে যে বিভীষিকা ;
স্বামীরে রাখিয়া যেতে নহে তো তেমন ;
একি বেশী ভালবাসি সন্তানেরে, তাই
স্বামী হারাবার আগে নিজে যেতে চাই ?”
“পুত্র রােগাতুর যবে কহ করজোড়ে
বেত, বাঁচাও পুত্রে, লয়ে যাও মােরে।”
“যারে হারাইতে বলি তারে বেশী চাই,
স্বামী প্রিয়, পুত্র প্রিয়, বেশী কম নাই।”
তুলা দণ্ডে যদি মাপ দেখা যাবে ঠিক
লঘু পতি, ভারী ক্ষুদ্র শিশুটির দিক।
স্বামীর প্রেমের সাথে আছে অভিমান
সন্তানে অক্ষয় ক্ষমা, নিরপেক্ষ দান।”
সে যে ক্ষুদ্র, নহে সে সমান
সে আমারি রক্তমাংস, ক্ষুদ্রতর প্রাণ।”
“দাম তব ভৃত্য।”
“আর একচ্ছত্র প্রভু,
আমার আশ্রয় তরু, অনাদর কভু
সহিতে পারিনা তার। এতে স্বাভাবিক।”
“যা বলেছ ঠিক কথা, অতিশয় ঠিক।
তার পর, এ সিদ্ধান্ত সহজেই হয়,
সন্তান ক্ষমার পাত্র, স্বামী তত নয় ;

দীপ ও ধূপ তাহা নহে ঋণ, যাহা সন্তানেরে দাও, আমীরে দেবার সাথে ফিরে পেতে চাও। এক দেবতার মত অহেতুক প্রীতি, আর শুধু লেনা দেনা-ধরণীর রীতি।” “শুধু লেনা-দেনা-আর কিছু নয়, ভাই?” আর জন্মভরে সুদ শেষ যার নাই- সুদ জোগাইয়া যাও অতি উচ্চ হারে, চক্র বুদ্ধি নিয়মে সে বর্ষে বর্ষে বাড়ে। সে সুদ জোগায় নারী, স্বামী দেয় ফঁাকি, প্রায় দেখি, দেন তার থেকে যায় বাকী।” “তবে স্বামী পুত্রে আর দানের কি ভেদ * *এক দান, আর দেন, তৃপ্তি আর খেদ।”

প্রবীণর অভিজ্ঞতা
প্রবীনার অভিজ্ঞতা
শােন, বাছা, আদরিণী কন্যারূপে গেহ
যা পেয়েছ মা বাপের, এ জগতে কেহ
জেনাে পারিবেনা দিতে। নবীন যৌবনে
লভিলে যে পূজা পতি চিত্ত সিংহাসনে
তাও কদাচিৎ নারী চিরদিন পায়,
অচিরে নামিতে হয় কঠিন ধরায়।
কালা দিয়া শিব গড়ি, ফুল দিয়া পূজি,
চোখে নহে, মনে দেব শেষে এই বুঝি।
সন্তানেরে বুকে চেপে ঢাকিয়া আঁচলে
করাইছ স্তনপান, ভেবনা তা বলে
একাই তােমারি সে রবে চিরদিন,
সুখে দুঃখে রবে শির তব বক্ষোলীন।
তােমার দিনার ভাগ্য, তুমি দিয়া যাও
সেবা, প্রেম, মেহ, যত, পাও কি না পাও।
আর যদি মনে কিছু করে থাকা আশা,
ভ্রান্তি তাহা, মহাভ্রান্তি, সর্বশান্তি-নাশা।

দীপ ও ধূপ
সমবেদনায় পত্নী
তোমার দুঃখ দেখি পরাণে দুঃখ পাই,
আপন মনােব্যথা সকলি ভুলে যাই।
এসহে দুঃখী এস, এ বুকে রাখ শির,
শীতল এ অঞ্চলে মুছেদি আঁখি নীর।
যে কথা বলিবার হৃদয় নাহি চায়
সে কথা বলি না, গােপনে বা তার ;
নীরবে ব আমি, বলিতে কিছু নাই,
বেদনা-ভারতৰ আধেক নিতে চাই
যে ব্যথা নিবারিতে শকতি নাহি মাের,
সে ব্যথা অতবি দিবগো অধি লেব।
এসগো, আজি এস, দু:খেতে সমপ্রাণ,
নিতান্ত সখা মাের, রেখনা ব্যবধান।
না হয় উগমে চলিয়া যেও দূরে,
ও নিশা কেটে যাক আমার মেহ-পুবে।
নবেম্বর, ১৮৯।

শঙ্কিতা জননী
শঙ্কিতা জননী
মায়ের নয়ন পথপানে চায়
বেলা চলে যায়, ছেলে যে তাহার
ফিরেনা ঘরে।
ভাের না হইতে বৃষ্টি শুরু হ'ল,
সারাটা দিন
কেলি ঝরিছে, আকাশে কৰিছে
আলােহীন।
প্রভাতের মত ছিল দ্বিপ্রহর
বেলা না যাইতে সাঁঝ,
কোনো কাজে তার লাগিছেনা মন
রজনী মনের মাঝ।
বর্ষার জলে পিচ্ছিল পথ.
এ যদি হয়,
পড়ে গিয়ে তার ভেঙ্গেছে পা খানি-
না-না-তা নয়।
বলে-ভগবান, দুঃখিনীর ধনে ফিরায়ে আন,
মায়ের মনের ভাবনা বেদনা সকলি জান।
আয়রে দুলাল, আঁধার ঘরের উজল প্রদীপ আয়,
মায়ের পরাণ তরাসে ডুবায়ে বেলা যায়-বেলা যায় !

দীপ ও ধূপ
পরিব্রাজক
নগর আমায় ডাকে বারে বারে,
যেথায় মানুষ নিত্য জেতে হারে,
ব্যবসা যেথা মরে আর মারে,
সময় পায়না চাইতে দূরের পানে।
বঁধা পথে মনে কঁাটা ফোটে,
পায়ের তলায় অশেষ ধন ললাটে,
কাড়তে সে সব কত মানুষ ছােটে,
জন কতক তার কিছু ঘরে আনে।
কেউবা মরে কাড়াকাড়ির চাপে,
মূৰ্ছা পড়ে প্রখর রোদের তাপে,
কঠিন মে কেউবা জীবন যাপে
আরামে অলিন্যে কেহ থাকে।
মুখের পাশে দুখ সেথা রয়,
অট্টহাসির তলে কান্না বয়,
খাতুর দেখে অপচয়
অ ফেলে, কেউ না তারে তাকে।

পরিব্রাজক
দীপালােকে গীত বা ৰহে,
ভােগীর্ণ শান্ত কথা কহে ।
সত্যের লাগি কেউবা দুঃখ সহে,
অাঁকড়ে থাকে কেউবা মিথ্যাটাকে
জীবন হেথা বিচিত্রতা ভরা,
ধরা হেথা নিতান্তই ধরা,
ভাল মন্দ শক্ত তফাৎ কর,
মানুষ সবাই এইটে শুধু জানি।
বিস্ময়ে তাই সবার পানে চাই,
অনেক মুখে চিহ্ন কিছু পাই
চিনি তাইতে হয় যে আমার ভাই,
বলতে চাই দুটি মেহের বাণী ।
সকল দিনে হয়না তাহা বলা,
ভিড়ের ভিতর কইে পথ চলা,
চেনা মুখ, নয়তো চেনা গলা,
ডাকতে নারি, নাম জানিনা তাই।
তবু বলি- ভাই, শােন ভাই।
তবু হেথায় করি আনা গােন,
ভরসা আছে হবে জানা শােনা,
সরস ভূমে মেহের বীজ বােনা
শক্ত নয়রে, তাই বুনেই যাই।

ীপ ও ধূপ
দূরের আহ্বান
পৰ্ব্বাহ্নে
উত্তর হইতে আইছে শীত,
দক্ষিণে বসন্ত গাইছে গীত,
কি মােহন, কি মধুর।
“চল দূর-অতি দূর।”
ফেলিয়া ত্বরিতে সুখের নীড়,
মেলিয়া পক্ষ করিয়া ভীড়,
উড়িনু সকলে, করি কলরব,
উর্ধে অধতে নীল অর্ণব,
সমুখে কাম্য পুর।
“চল দূর-অতি দূর।”
সুনীল ৰোম, সুনীল জল,
পক্ষে পশিছে অসীম বল,
বক্ষে গীতের সুর।
“চল দূর-অতি দুর।”
হেলায় চলেছি, খেলায়, রঙ্গে,
ঢালিয়া অঙ্গ বায়ু রঙ্গে,
শখ নষ্টে ঘুর।
*ধু দূর-অতি দূর।”

দূরের আহ্বান আবাহ্নে শীতল পবন, অতল জল, চরণ রাখিতে নাইকো সুল, আসিছে আধা কর। "যেতে আছে বহু দূর।” ব্যথিয়া আসিছে পক্ষ সবল, কই দেখা যায় বালুকা ধবল- সীমানা নবণাম্বুর ? সে যে দূর-বহু দূর।” চাল9-5ালাও চালাও ডানা, পড়িলে মরিবে, আছেই জান, চলিলে মিলিবে পুর- *হয় হোক যত দৃর।* পড়িছে সাগরে, মরিছে ভাই, দাড়ায়ে দিব, সময় নাই, উঠিছে তুফান প্রবলতর, চালাও পক্ষ, বাচ কি মর, পাও কি না পাও পুর। “চল আরাে কিছু দূর।”

১৪
দীপ ও ধূপ
.
ৰুে ভেকে আনিলে, গাওগাে গাও,
কুলের সন্ধান দাওগাে দাও,
আঁধার করগো দূর।
“পা, পাইবে পুর।”
চপল চমকে ধাধিয়া আঁখি,
ঝটিকা দোলায় সহস্র পাখী
পারে আসে সিন্ধু-
*পান্থ পাইছে পর।”
হাজারিবাগ,
২৫শে জুলাই, ১৯১৩

শিমুল
;
"
শিমুল
আমার প্রাচীর পাশে আছে উর্জে চেয়ে
তরুণ শিমুল উক; নগ্ন দেহ ছেয়ে
ফুটিয়াছে শত শত রক্ত রাঙ্গা ফুল,
শােকাহত-কবিচিত্ত-মথিত, ব্যাকুল,
যেন সে কবিতা মালা-বাহিরি আলােকে
উৎসবের বর্ণ দিয়া ঢাকিয়াছে শােকে।
বুকে তার কাটা, নাহি চিক্কণ পল্লব,
নির্গন্ধ কুসুমে সাজি নয়ন বল্লভ।
আমি তাের অনুরক্ত, তােরে ভালবাসি,
হে শিমুল, সুৰ্যোদয়ে তাের তলে আমি
চাহি মুগ্ধ নেত্রে তাের দীর্ঘ দেহ পানে ;
তাের রক্তসিক্ত পুষ্প সৃষ্টি মাের টানে
দিবা মধ্যে, বারবার বাতায়নে তাই
তােরে দেখিবার লাগি নীরবে দাড়াই।
বর্ণের সম্পদ তব ধরা হতে তুলি
ধরেছ মাথায় তুমি, আমি যাই ভুলি
আছে কি না আছে গন্ধ। কিবা আসে যায় ?
যা পেয়েছ ধরেছ তা দেবতার পায়,
তাই করে মানবের আনন্দ বিধান।
বর্ণ, গন্ধ, রূপ, রস, সি, অশ, গান,
যার যাহা আছে, আছে যতটুক খানি
কিছু ব্যর্থ নহে যদি নিবেদিতে জানি।
ক্রয়ারী, ১৯২৫

১৪২
দীপ ও ধূপ
কালবৈশাখীতে পাতার নৃত্য
ঝকা শুল্ক পাত! 'গুলি হের নৃত্য কৰি
চলিয়াছে ঝড়ের মুখে,
কি সুখে ? কি সুখে ?
বেতালা ঝঞ্চার গান, বজ্র বাদন,
নাহি দেবতার অশ্রু, মেঘের কান,
এ কেবল অট্টহাস উন্মাদের মুখে,
না সুপে ন! দুঃখে !
ঝরা ও পাতাগুলি হের উশ্বাসে
চলিয়াছে হাড়ি বৃক্ষতল,
ভবিষ্যের অংশ নাই, নাহি দাড়াবার ঠাই,
কেমনেই রবে অচঞ্চল :
চলি অাছে আকাশে ভানিয়া,
আপনার অদৃষ্টে হাসিয়া!
তরু হতে পড়ে ছিল ভূয়ে,
মত সম ছিল ধূলে শুয়ে,
বায়ু তরে মন্ত্র পড়ি করেছে চঞ্চল।
তাই ভাবে ছেড়ে যাবে ধরার অঞ্চল।

আমি রব সয়ে
১৪
খেলা সাৰু করি অকস্মাৎ
যাদুকর বায়ু যবে যাইবে চলিয়া,
মেঘ হতে শতধারে অ-দেবতার
পড়িবে গলিয়া ;
নৃত্যশীল পত্রাবলী ঘিরিবে কর্দমে,
সবে যাইরে দলিয়া।
হাজারীবাগ,
আমি রব সয়ে
আমারে ধরণি মাগো, দাও ধৈৰ্য্য তব,
সয়ে রব, আমি বৰ সয়ে,
দুঃসহ ভাস্কর তাপ নিদাঘ দিবায়,
ঝঞ্চাবাত শিরে যাবে বয়ে।
প্রাবৃটের জলধারা অনাবৃত দেহ
সিক্ত করি যাইবে চলিয়া,
শীতের শানিত বায়ু এ ভেদ করি
বিঁধিবে মজ্জা ও মর্শে গিয়া।

দীপ ও ধূপ
তবু আমি মৌন মুখে উর্ধশির হয়ে
প্রতীক্ষা করিৰ বার বার
নিদাঘে শীতলবারি, রৌদ্র বৰষাৰ,
শিশিরে বসন্ত পুষ্প হার।
যতটুকু সুমধুর পাই যত দিন,
হাসি মুখে লব ততটুক,
রৌদ্র আনি দিবে মেঘ, বরষা, শরৎ,
এ আশায় ভরা রবে বুক।
হাসনু হানা
প্রভাত আলােকে ধরণীবাণীরে
সাঙ্গাল রঙ্গীন সাজে,
অশােক কাঞ্চন, করবী পলাশ,
বন্ধু, শিমুল ; সিঞ্চিল সুবাস
মূথিকা মল্লিকা, চামেলী চম্পক,
গোলাপ ও গরাজে।

হাস হানা
১৫
এই রঙ্গের মেলায় সৌরভ খেলায়
আমি যে লাগি না কাজে
তাই মরে আছি লাজে।
ফুটেছিল মাের ছােট ঘােট ফুল,
গন্ধে দশদিক করিয়া আকুল,
অন্ধ আঁধার রাতে,
নীরব যখন বিহঙ্গের গান,
মানব ঘন খোজেনা অঘ্রাণ,
মগন বহে নিদ্রাতে।
শুষে লয়ে গেছে তাদের সুবাস
রজনী আপন সাথে,
এবে অরুণের হাসির আঘাতে
ঝরিয়া পড়িল প্রাতে।
কবি কহে-ওগাে সৌরভময়ি,
দুঃখ কি আছে তাহে,
অনিদ্র যে জাগে অাধারে নিশার
তব সৌরভ লাগে প্রাণে তার,
সে তব মঙ্গল গাহে।

১৪৬
দীপ ও ধূপ
জীবন আন আর
ভাবিলে হবেনা, কহিলে হবেনা,
গাহিলে মিষ্ট গান ;
পুরাইতে যদি চাহ মনােরথ
চলিতে হইবে দুর্গম পথ,
আরাম বিরাম অনেক হইবে
করিতে বলি দান।
ভাবন, বচন, হইবে বিফল,
ব্যর্থ হইবে গান ;
বাতাসে মুখের কথা ভেসে যায়,
হৃদয়ে পশিতে পথ নাহি পায়,
পুরুষের মত একটি কর্ম জাগায় শত প্রাণ,
একটি আলােকে যেমন গৃহের আঁধার অন্তর্ধান।
আন চিন্তা, ভাষা, সঙ্গীত সাথে
জীবন আন আর,
জীবন হ'তে যে বাণী বাহিরায়,
মানুষের প্রাণে যায় তাহা যায়,
উদাসী পথিক থমকি পাড়ায়
শুনিতে আর বার ;
আগুন নহিলে আগুন জ্বালায়
এমন সাধ্য কার ?

আশীর্বাদ
১৪৭
আশীর্বাদ
আমার সন্তান,
হও তুমি সত্যগত প্রাণ,
হও তুমি বলিষ্ঠ নির্ভীক।
শুভ যদি হয় মনােরথ
শিব দেখাবেন তােমা পথ,
সে পথে থাকিও সদা ঠিক,
সত্যনিষ্ঠ, বলিষ্ঠ নির্ভীক।
পিছে কেহ আসে কি না আসে,
তােমারে হাসে কি উপহাসে,
দেখিতে চেওনা চারি দিক ;
চিত্ত তব শুদ্ধ যেন রয়,
স্তুতি নিন্দা তুচ্ছ যেন হয়,
ধন্য বলে কিবা বলে ধিক্‌-
চলে যাও, বলিষ্ঠ নির্ভীক।
হাজারিবাগ
জানুয়ারী, ১৯১৩

১৫৮
দীপ ও ধূপ
বধূ বরণ
এসগো মা লক্ষ্মী, নৃতন বধূ
রসনায় দিমু দুফোটা মধু ;
মধুমতী হােক তােমার বাণী
এস সমাদৃতা, এস কল্যাণী ।
মধু দিয়া কান করিনু পরশ,
আমাদের কথা আমিষ্ট সরস
চিরদিন যেন লাগে তব কানে,
অচেনারে যেন চেনা করে আনে।
তােমার স্বামীর আপনার জন
হয় যেন সব তােমার আপন।
এ গৃহ সাম্রাজ্যে হও তুমি রাণী,
পাত ভাল করে সিংহাসন খানি
জ্যেষ্ঠ কি কনিষ্ঠ চিতে সবাকার ;
ঐশ্বর্ষে ভরিয়া উকি ভাণ্ডার,
অধরে নিয়ত খেলুক হাসি,
বিতৰি আহরি আনন্দ রাশি।

বধূ বরণ ১৪১ সহধর্মিনী স্বামীর ধৰ্ম্মে, সহকর্মিনী তাহার কর্মে, সহচরী হও কণ্টক পথে, অনাবৃত পদে, কিবা পুষ্পরথে। উৎসবে শােকে, আরামে রােগে, ভাগ লয়ে সুখ দুঃখের ভােগে, দুই বলে বলী যাইবে চলিয়া পথের বিপদ বিজ্ঞ দলিয়া। দুটি দীপশিখা লভি স্থির স্নেহ উজ্জলতর কর এই গেহ, প্রেমে মধুময় জীবনের স্বাদ হােক তােমাদের, এই আশীর্বাদ- এই আশীর্বাদ। মার্চ, ১৯২৩

দীপ ও ধূপ
অভি’র জন্মদিনে
বাণি, আমায় দয়া কর, রাজার আমার হুকুম যবে,
কলম চলে, নাইবা চলে, কবিতাটি লিখতেই হবে।
দুবছরের শিশুরাজ, জান, মা, তার প্রতাপ কত,
তার কথা কি ফেলতে পারি, প্রজা আমি অনুগত?
আমি তার গুণে বাধা, রূপে ডুবে পাইনা ঠাই,
ভাষায় কি তা আঁকতে পারি ?-আমারতাে সে আশা নাই।
জানি কেবল দেখতে পেলে ইচ্ছা করে চেয়েই থাকি,
কোলে এলে সাপটে ধরে বুকের মাঝে চেপে রাখি।
ননীর মত নরম মুখ, ভােমরা কালো উজল চোখ,
রাঙ্গা ছােট ঠোট দুখানি দেখলে জুড়ায় সকল শােক ;
সাদা মুক্তা চারটি দাত, হাসিটুকুন মিষ্টি কত,
আলাে আর মধু ভরা, ব’লব তারে কিসের মত?
ভােনের বেলায় অরুণ কিরণ, নিশীথ রাতের চাঁদের মুখ
রঙ্গীন গােলাপ, শুভ্র তুই দেয়কি চোখে এত সুখ?
তারপর তার মুখের বুলি-বেণু বীণা কোথায় লাগে ?
পাখীর মত কথা কয় সে—ময়না বুঝি ছিল আগে?
যেথায় শােনে যে কথাটি আধ আধ গমনি বলে—
টিয়া আমার ময়না আমার, এস মালা পরাই গলে।

অভির জন্মদিনে
সাত রাজার ধন মাণিক আমার, পাতাল খুড়ে, সাগর ঘেঁচে,
ই শচীর নন্দন থেকে হেথায় তােরে কে এনেছে ?
মা বাপের তাের কত পুণ্যে কোলে তাদের পড়লি উড়ে,
এলি যদি, ওরে দুলাল, থারে স্নেহের পিঁজরা জুড়ে।
বড় সাধে মা বাপ যে তাের নাম রেখেছে অভিজিৎ,
তুই তারকা, চিত্ত তাদের নিত্য রাখিস আলােকিত,
বেড়ে ওঠরে, তাের আলােকে উজল করি উভয় কূল,
শক্তি, কীর্তি, কল্যাণ হােক, আপদ বালাই নিৰ্ম্মল।
দুবছরের রাজা আমার, আজকে তােমার জন্ম দিনে
নজর আসবে থালা ভরা, আবে কত খেলনা কিনে
নয়াবাজার উজাড় করে ; আজকে তুমি সে সব ফেলে
কবিতা কি পড়বে যাদু ? নে যাও তবে। বাবা এলে
“পিসীমার কবিতা এ” বল’ তার হাতে দিয়ে,
“আমি লিখতে বলেছিলুম, তুমি পড়তে দাও শিখিয়ে।”
পিসীমা
৪ঠা জানুয়ারী, ১৯২৪

১২
দীপ ও ধূপ
পরিচিত
নাম ধাম মৃধাবার আগে
পেয়েছি তােমার পরিচয় ;
নয়নে বচনে বাহিরিয়া
এল তব ভগিনী হৃদয়,
মেহ অর্ঘ্যে সাজাইয়া থালা,
হে কল্যাণ বিদেশিনী বালা।
পরিচিতা অন্তর রাজ্যের,
পূরব পশ্চিম বথা নাই,
কান প্রেম উন্নত অচলে
রচিয়াছে মিলনের ঠাই ;
যাধিতেছে নৃতন বঁধনে,
সবারে করিছে আপনার,
ভাষা পিছে নীরবে দাড়ায়ে
শুনে নব সঙ্গীত ঝঙ্কার।
কেশমা, ইটালী,
সেপ্টেম্বর, ১৯২৭

আশীলিপি
১৫৩
আশীলিপি
স্নেহাস্পদেষু
অনেক দিনের কথা সে যে, মনে বৎস আছে কিনা আছে,
গৌরবরণ সরল শিশু, অনাহুত এসেছিলে কাছে।
অনেক রকম কথা হল, সখ্য হ’ল ক্ষণিক পরিচয়ে,
বিদায় হ’লাম, ক্ষণিকের ছবি রইল তােলা স্মৃতির নিলয়ে।
শিশুর সুন্দর ফুল্লমুখ পথে যবে দেখিবারে পাই,
আনন্দ ভরিয়া লয়ে প্রাণে নীরব আশীষ রেখে যাই।
কত দেখি, কত যাই ছেড়ে, কত ৰা ভুলিয়া যাই শেষে,
জানি নাই আবার তোমার দেখা পাব কিশােরের বেশে।
পরিচিত বহুদিবসের, মেহ জাগে পুনদরশনে,
বীজে সুপ্ত তরুশিশুসম প্রাবৃটের বারি বরষণে।
তােমার কিশাের মূর্তি মাঝে দেখা দেয় শিশুর সে মুখ,
নির্মল সারল্যে সমুজ্জল, প্রাণে তাই জাগে নব সুখ।
লেখা চাও ? লিখি তবে হাতে, মনে যেই আশীর্বাদ করি,
অতীতের শিশু, হে কিশাের, পূর্ণ মনুষ্যত্বে নিও বরি।
২৭শে সেপ্টে,
১২৮

১৫৪
দীপ ও ধূপ
মায়ের আশা
যে সুরে মাের উঠেনি গান
অবাধ কঠে সে সুরে গাবে,
যে উচ্চ পথে পারিনি যেতে
সে পথে তুমি সহজে যাবে,
যে ফলে শুধু বাড়া হাত
তুমি তা পাবে, তুমি তা পাবে।
একটি ঘােট বীজে যেমন
বনস্পতি জীবন পেয়ে,
লক্ষবীজে অঙ্কুরে আর
ধরায় পারে ফেলতে ছেয়ে,
তেমনি তুমি একটা মায়ের
একটা বুকের আশা নিয়ে
লক্ষ বুকে বুনবে আশা
সাধন দিয়ে সিদ্ধি দিয়ে।

সংশয়ে আশা
১৫৫
সংশয়ে আশা
আমি উঠি নাই উচ্চ সাধনা শিখরে,
আমার হৃদয় কাঁদে প্রিয়জন তরে।
কাছে যবে পাই সবে হারাবার ভয়
আমারে আকুল করে, কত না সংশয়
উঠে নিত্য চিত্ত মাঝে। আমি বিধাতারে
কখন নিষ্ঠুর বলি, কভু করি তারে,
ধন্যবাদ ; শেষে বলি “বুঝা নাহি যায়
কি যে দয়া, কি যে ধৰ্শ, অন্ধকারে হায়
চলিয়াছি!” এই টুকু বলিৰারে পারি
মাঝে মাঝে দেখি পথ, মাঝে মাঝে ভারি
পাই যেন কর স্পর্শ, শুনি যেন বাণী
সে যে স্বপ্ন, সে যে ভ্রান্তি, কেমনে তা মানি ?
অনাগত তরে আশা কে দিয়াছে বুকে ?
কার গেহে রস যায় শিশু মুখে ?
বাহিরে রাখিলা আলাে দেহে দিলা চোখ,
অন্তরের তরে সেকি রাখেনি আলােক?
জাগিয়া রয়েছে আশা মাগিয়া মিলন,
মিলন সে যদি ফাকি, কেন জাগরণ।
১লা মে, ১৯১৪

দীপ ও ধূপ প্রভাতের প্রার্থনা জাগ্রত, জাগায়ে রাখ আমার চেতনা, কর্মক্ষেত্রে সুপ্ত নাহি থাকি, আনন, পরশি যাও আমার অন্তর, বিষাদেরে সদা দূরে রাখি। হে শিব, সুন্দর হােক কথা, চিন্তা, কাজ, দুঃখেরে করিনা যেন ভয়, অমৃত, মৃত্যুরে জানি নব জন্ম লাভ জীবনেরে অনন্ত অক্ষয়। তােমার চরণে, প্রভু, লুটাইয়া শির প্রত্যুষে এ আশীর্বাদ চাই- তুমি চিরসঙ্গী, সাক্ষী, সুকৃতি সহায় এ কথা কভু না ভুলে যাই।

নিশ্চিন্তে নীরবে
নিশ্চিন্তে নীরবে
জাতে মােরে দাওনা, প্রভু,
কখন যে কি হবে,
তাইতে আমি বসেই আছি
নিশ্চিন্তে নীরবে।
যাহাই আমি তুলি গড়ে
ঝড়ে যদি যায়ত পড়ে',
চাইনা যাহা, চোখের আগে
দাড়ায় তাহাই—তবে
বসে আমি থাকি এবে
নিশ্চিন্তে, নীরবে।
হয়তো জমে দেখে দেখে,
নিরাশার রস চেখে চেখে,
মিঠায় যেমন তিতায় তেমন
কচি আমার হবে,
বসে রই
সেই ভরসায়
নিশ্চিন্ত নীরবে।

১৫৮
দৗপ ও ধূপ
তাই হােক তবে
তাড়াতাড়ি গিয়েছ তুমি, তাই
দেরী করে আমায় যেতে হবে,
স্বর্গে হল তােমার তরে ঠাঁই,
আমি বন্দী দুঃখভরা ভবে।
তাই হােক, তাই হােক তবে।
মাঝ পথে নামিয়ে রেখে গেলে
তােমার কাজ, কে আর তুলে লবে?
যাই বা আমি কেমন করে ফেলে?
দুয়ের বােঝা একাই বইতে হবে।
দেরী, তবে অনেক দেরী হবে।
মুক্ত তুমি, চড়ি পুণ্য রথ
দেব লােকে বিচরিবে যবে,
আমার কাটা কঁাকর ভরা পথ
কাঙ্কিত, অশ্রুসিক্ত হবে।
তাই হােক, তাই হােক তবে !

ছাড়িয়া চলিলে ভবে
ছাড়িয়া চলিলে ভবে
দিন হেথাকার
বেশী নাহি আর
ছাড়িতে হবে এ ভবে,
এই শুধু জানি। আশ তৃষা গ্লানি
স্মৃতিতে রবে, না রবে,
জানিনা সে কথা। হেথাকার ব্যথা
নিশ্চয় নিঃশেষ হবে
ছাড়িয়া চলিলে ভবে।
সস্নেহে সাদরে
নিশ্চয় সে দেশে
পরিচিত বেশে
কেহ মাের আপনার
ডেকে শবে ঘরে,
বিচ্ছেদের অন্ধকার
মিলন আলােকে মিলাবে পলকে
যত ব্যথা নিরাশার।

১৬০
দীপ ও ধূপ
হাতের কাজ
বলছে মরণ, রাখরে দুয়ার খুলে,
হাতের কাজটা সেরে নে সত্বর,
হােক, না হােক, রাখবি কেন তুলে?
যতটুকু করতে পারি কর
সবটা শেষ নাই যদি হয় আজ,
আর কেউ তা করবে সমাপন,
হাজার সেবক করছে রাজার কাজ,
তুমি তাদের মাত্র একজন

মরণের ডাক
১৬)
মরণের ডাক
শুনিতে পেয়েছি প্রাণে মরণের ডাক
সেরে ফেল, সেরে ফেল তােমার যা কাজ।
থাকে যদি চিত্তে কোন ব্যর্থতার লাজ
খুলে ধৰ দিবালােকে, মরিয়া সে যা
শত-দৃষ্টি-শ-বিদ্ধ। জ্বলিয়া জুড়া
তপ্ত চিত্ত চিতানলে। রাখিওনা আজ
আবরণ, আভরণ, বাহিরের সাজ
লজ্জা যাক, খ্যাতি নিন্দ। সব পড়ে থাক,
কি দহি দেহ সাথে ভস্মেতে মিলা।
অক্টোবর, ১৯১৩
'আজিও রয়েছি বেঁচে! হাসি কান্না গান
হয় নাই আজো অবসান।
আরও কত দিন যাবে, কত ব্যথা সয়ে
রহিব পাষাণ-মূর্তি হয়ে
কিম্বা একখানা ময়, কাঠে আর তারে,
ঘটনা ৰাজায়ে যায় যারে।
তবু কেটে যাবে দিন-আয়ু কেটে যাবে,
হেথাকার জীবন ফুরাবে।
তারপর? জানিনাতাে কি যে তারপর
কত দুঃখ, ম্মি জন্মান্তর।
অক্টোবর, ১৯২০

১২
দীপ ও ধূপ
গৃহদ্বারে দিওনা অর্গল
::
দাও, দাও, দুঃখে যদি চক্ষে আসে জল,
যাহা আছে দাও আজ ক্ষুধিতের পাতে,
কাল যদি না-ই থাকে সেই ভাবনাতে
আজ আপনারে কেন হের নিঃসম্বল ?
আজ তুমি কল্পতরু। সময়ের ফল
আসে, যায় ; থাকে যবে, চল শূন্য হাতে।
ফিরা’ওনা কাহারেও আজি এ প্রভাতে
অকৃতার্থ।
গৃহদ্বারে দিওনা অর্গল।
;
আনুক যে আসে। কাল না-ই যদি থাকে
ভিক্ষা দিতে মুষ্টিমেয়, নিস্ব তব গেহে,
হয় বলিও-গেছে যা ছিল সঞ্চিত।
কে জানে, হয়তো খােলা দুয়ারের ফাকে
প্রবেশিয়া, অন্নপূর্ণা বিলাবেন স্নেহে
নিজে অন্ন, ভিখারী সে হবেনা বঞ্চিত।
মার্চ, ১৯২৯

হিসাবী দান
১৬৬
হিসাবী দান
চিরদিন ক্ষতি লাভ করিয়া গণন,
করি তৌল, সকলেরে নিজ অংশ মত
বিলাইতে প্রাপ্য যত্ন করিলি নিয়ত ;
জীবন্ত করুণা শিশু করিয়া হনন
বেঁটে দিলি নানা মায়ে
করিলি খনন
অগভীর, মাননীর
কূপ শত শত ;
ন্যায়ের বিচার সদা রাখি অব্যাহত
দিবি দণ্ড পুরস্কার করিলি মনন।
;
তারপর কি দেখিলি, ওরে মূঢ় দীন?
মিটায়ে কাহারও ক্ষুধা পারিলি কি দিতে ?
লভিলি দানের তৃপ্তি আপনার চিতে ?
দুয়ারে ভিক্ষুক রাখি সুদূরের ঋণ
পারিলি শুধিতে কভু ? বন্ধন কঠিন
মমতার, যুক্তি বলে পারিলি ছিড়িতে?
মার্চ, ১৯২৯

দীপ ও ধূপ
বেহিসাবী দান
অর্ব দ যােজন দূরে তারা লক্ষ শত
দূর দূরান্তর চাহি স্নেহভরে হাসে;
তাদের যে কত রশ্মি অসীম আকাশে
অতল শৈত্যের মাঝে হইতেছে গত
কে করে ইয়ত্তা তার? সবিতার যত
আলােক উত্তাপ এই ধরা-বুকে আসে
তার বেশী করে শূন্যে। লাভের প্রত্যাশে,
কাজে লাগাইবে বলে কে ব্যয় সতত ?
কাজ সে কি? কার কাজ? হিসাব নিকাশ
কবে, কার কাছে হবে ? আলোেক উত্তাপ
আছে যার সে-ই দেয়। নিজে দীপ্তিমান
দীপ্তিহীন অপরের করিছে প্রকাশ ;
এতটুকু দিলে চলে-বলি, পরিমাপ
করে না, যে নিজে বড়, বড় তার দান।
মাস্ট, ১৯২৯

স্মৃতির ছবি
১৬৫
স্মৃতির ছবি
আজকে আঁধার ঘরে,
স্মৃতির প্রদীপ উঠল জলে
আধ-শ বছর পরে।
আমার জীবন সাঝে
ধূপের গন্ধ আমায় ঘিরে
ঘুরছে ঘরের মাঝে।
ফুটছে ছৰি ধীরে,
আধ শতাব্দীর পলিপড়া
দূর অতীতের তীরে।
গাছের ধারে প্রথম বাড়ী-
ছােটই ছিল গ্রাম,
পাতলা ফল একটি মেয়ে-
কি ছিল তার নাম ?
ছােট দেহ ভাসছে চোখের আগে,
নাই তা স্বপ্নে যেমন জাগে,
খানিক স্পষ্ট, খানিক ঝাপসা লাগে।
এ কি সে বি ছিল ব’ত না তা কেহ।
সবারি সে আপন ছিল, পপত সবার স্নেহ।
মায়ের ডাকে আত ছুটে, পুতুল খেলা ফেলে।
চুল বাধাটা সারা হলে, বেল পড়ে এলে,

দীপ ও ধূপ
*
জলে ভেজা মালর প্রদীপ মুছে, সলতে তেলে
সাজিয়ে রেখে, সাঁঝ হতেই দিত জেলে জেলে।
মাঝের ঘরে ‘দেরকে 'পরে রেখে প্রদীপখানি
ঢালতে। ধূপ আগুন ভরা ধুনুচিটি আনি ;
কোণে কোণে ধোয়া দিয়ে ঘুরে সারা ঘর,
দরজাটার আড়ালেতে রাখত; তারপর
আর এক ‘পিৰ্দীপ’ তুলে নিয়ে যেত মায়ের কাছে,
পাছদুয়ারে রান্নাঘরে আলাে দিতে আছে।
দীপগুলি ছিল ক্ষীণ, তাতেই হত কাজ,
তেমন আলােয় চলা ফেরা চলবে নাকে আজ।
তেমন প্রদীপ এখন বুঝি সে গ্রামেও নাই,
চিত্রকরের ছবিতে আর স্মৃতির মাঝে পাই।
আঁচলে তার ধূপের গন্ধ, হাতে তার দীপ,
খােপা বাঁধা চুল, দুই ভুরুর মাঝে টপ,
-খয়ের ঘসা কালো টপ-গলায় পুথির মালা,
মাঝে মাঝে সােণার দানা—হাতে দুটি বালা।
তেল সলিতায় আল দীপ, বালা পরা হাতে
লাগতত কারও ছবির মত, তখন সন্ধ্যা রাতে ?
এখন লাগে। পারি যদি এখনই যাই ফিরে
পাড়ি দিয়ে আধ-শ বছর, শৈশবের তীরে,
মায়ের হাতের পরশ মাখা ভুরুর মাঝে টীপ,
সঁঝের বেলা জালাই গিয়ে ধূপ আর দীপ।

গবেক্ষণ
১৭
অবেক্ষণ
১
বিহঙ্গ উড়িছে শূন্যে, সাঁতরিছে মীন
জলে, বিহরিছে সুখে পশু বনেচর ;
মানব জীবন কেন বহিতেছে ক্ষীণ,
সহিয়া চলিছে যেন ভার গুরুতর ?
একি গাে আত্মার ভার, ওহে জগদীশ ?
সামর্থ্য-অতীত একি কামনার ক্লেশ ?
অমৃত লভিবে বলি, ছুটি অহর্নিশ,
ক্লান্ত পদে ফিরিছে কি মরণের দেশ ?
তুমি কি শুনায়ে তারে বাণী আপনার
জাগায়ে পাড়ালে সরে, লুকাইলে মুখ,
দুঃসহ আলােক দিয়া করি অন্ধকার,
তার ব্যর্থ চেষ্টা দেখি লভিছ কৌতুক?
জীবের অানন্দ হতে বঞ্চিবে কি তারে ?
, না, যারে জাগায়েছ সে নাহি ঘুমাবে
দেহকুলে, যত শক্ত হােক নিজ ভারে,
সে তােমারে চাবে, প্রভু, সে তােমারে পাবে।

দীপ ও ধূপ মধুর উষার হাসি পূরব অম্বরে, মধুর মেঘের যাত্রা শূন্যে মায়ারথে, মধুরে অরুণ-রশ্মি ধীরে খেলা করে অনিলের সাথে, ঘন পল্লবিত পথে। ভাল লাগে দিবাভাগে রোত্ৰ-দীপ্ত জল, কি সুন্দর আলােছায়া মৃদু সমাবেশ দিবাশেষে, ছয় যবে শ্যাম সমতল নিম্নভূমি, বনাবৃত উচ্চ গিরিদেশ। ভালবাসি পূর্ণিমায় জ্যোৎস্নাময়ী ধরা, স্নাতদেহ, শুবেশা বধূটির মত ; সুগম্ভীর, সমুজ্জল তারকায় ভরা কৃষ্ণা রজনীরে হেরি মাথা করি নত- যেন সে বিধবা নারী, কেশপাশ খুলে, ফেলে স আভরণ, বৈরাগ্য কঠোর আর পরত্রের আশা লইয়াছে তুলে আপনার ক্ষেচক্ষে দীপ্তি, নহে লাের।

বেক্ষণ
গৃহস্থের আঙ্গিনায় খেলে, শিশুদল,
পাদপ লতিকা কোলে দোলে পুস্পচয়,
চটৰু শালিখ গুলি করে কোলাহল
বাঁশঝাড়ে, উড়ে চলে সানন্দ, নির্ভয়।
নারিকেল গাছ হতে নামিতেছে চিল
দীর্ঘ চক্র বিরচিয়া, ফের উড়ে যায়
হােথা একটি কোকিল
সুদূর গগনে।
আম্র পল্লবের মাঝে কুহু কুহু গায়।
কাঠবিড়ালীর হােথা শিশুদের মত
কে আগে চুইবে “বুড়ী” বলি ছুটে যায়,
খেলা শেষে বসে আসি শান্তশিষ্ট কত,
দুটিহাত তুলি ধীরে শস্য খুটে খায়।
আলােকের জীবনের এ সুন্দর খেলা
দুই চোখে ভরে লয়ে, আমার হৃদয়
উঠিছে আনন্দে গাহি' আজ ভোর বেলা
যেথায় জীবন সেথা আনন্দও রয়।

১৭•
দীপ ও ধূপ
৪
জীবশূন্য কোথা আছে এতটুকু ঠাই ?
কোথায় জীবন আছে, কিন্তু রাত্রি দিন
সজীবতা, নিরন্তর চটুলতা নাই
কোথা জীবনের ক্রীড়া সৌন্দৰ্যবিহীন ?
?
যেথা জন্ম সেথা মৃত্যু, যেথা বৃদ্ধি, ক্ষয়।
জীবন বয়ন করে কে সে তন্তুবায়
মিশাইয়া সুখদুঃখ, আনন্দ, বিস্ময়,
জ্ঞান অঙ্গনের সূত্ৰে-অপূর্ষ শােভায় !
কোথা হতে আসে সেই ব্র্যাঘ্র-জননীর
শাবকেরে বাঁচাইতে ? নারীর অন্তর
ভয়ে ভীত, শিশু লাগি সাহসে সুস্থির
হাতে ধরি ফেলে দূরে সর্প বিষধর,
আগুনেতে ছুটে যায়, ঋপে সিন্ধু জলে ;
অকূল ব্যাকুল স্নেহ, শুদ্ধ সমুজ্জ্বল,
অনলের মত, তার হৃদয়ের তলে
কোন্ মহা-উৎস হতে ছুটে অবিরল ?

১৭
জগতের কোনাে ঠাই
অসুন্দর কিছু নাই,
ভাল করে দেখি যারে ভালবাসি তাকে,
আর উদাসীন
চলিতে পারিনা পথ,
আগে পাছে, দুই ধারে, সবে মােরে ডাকে।
আমার এ জীবনের
নীরবতা ভেদ করি
কোটা কোন
মূক
প্রাণী আজ কথা কয়,
নয়নের অগােচরে
যাহারা জনমে মরে
তাদের সৌন্দৰ্য্য হৃদে জাগায় বিস্ময়।
অদৃশ্য জীবাণু এল কত বড় হয়ে
কেবা ছােট, কেবা বড় ? সবেতে সমান
অদ্ভুত স্রষ্টার চিন্তা, সে মুদ্রাঙ্ক লয়ে
আমি ক্ষুদ্র জুড়ে আছি আমার যে স্থান।
ছােট ছােট পানামূলে এক সাথে থাকে
কোটী কোটী জীবনের অণু অণু ঢেউ,
উজ্জ্বল মুকুলসম ফুটে ঝাঁকে ঝাঁকে-
ইহাদের মুখপানে চেয়ে আছে কেউ।
Vorticelli or Bell Animalcula.

১৭২
দীপ ও ধূপ
কত না আনলে সেই আঁখি অনিমেষ
চেয়ে আছে—সৃষ্টি মাঝে যে আনন্দ রয়,
খুদিয়াছে ইহাদের প্রতি সূক্ষ্ম কেশ
কিবা সে শিল্পীর হাত, কোমলতাময়,
প্রেমভরে। প্রেম বিনা সৃষ্টি নাহি হয়।
অনন্ত শয়নে প্রভু কবে সুপ্ত ছিলা?
৫মের জলধি তিনি, আনন্দ নিলয়,
চিরদিন আছে তাহে এই সৃষ্টিশীল।
তাহার চেতন শি অচেতন সহ
ভাতৃপ্রেম করি অনুভব,
মনে হয়, ধূলি-লগ্ন। তার বিরহ
আমি যেন বুঝিতেছি সব।
মূলে মুলে বারি পিয়া কেমনে মিটায়
দূরস্থিত অগ্রের পিয়াস,
কেমনে আশ্রয় খুজি চারিদিকে ধায়,
কি আগ্রহে বাঁধে তওপাশ।
“উপরে আলােক, আমি পারিনা দাড়াতে
আপন চরণে করি ভর
বলে-“ওগাে তুলে লও আপনার সাথে,
আলাে চাই, ওগগা তরুবর।”

বেগণ
১৩
যে তারে আশ্রয় দেয় কেমন শােভাতে
রুক্ষ দেহ ছেয়ে দেয় তার,
তত আঁকড়িয়া ধরে যত প্রতিবাতে
ব্যথা পায় দেহে আপনার।
কত ভালবেসে তারে অন্তরীক্ষ ভূমি
পরাইছে অহরিৎ বাস,
সমীর সােহগে কতু দেহ যায় চুমি,
দুটাইয়া লাবণ্য উচ্ছ্বাস।
সৌন্দর্য্যের যােলকলা পূর্ণ যবে তার,
কি জানি কি আশা আসে, কি জানি কি মেহ,
জীবিত করিতে চাহে জীবন বিস্তার
ফুলে ফুলে ছেয়ে দেয় আপনার দেহ।
কোমল কুসুমরাজি, শিশু তার, হাসে যবে,
হয়তাে সে মুখ তার মায়ের মতন হবে।
অসংখ্য সােপান বাহি’ যুগ যুগ ধরি,
সজিতেছে নর উচ্চ হতে উচ্চতর
ভূমি; এই ধরিত্রীরে তুচ্ছ জ্ঞান করি'
চাহিতেছে পর্গ পানে। কোথা হে ঈশ্বর,

১৭৪
দীপ ও ধূপ
কোথা তুমি? ধরাধামে এ দেহমন্দিরে
তুমি কি দিবেনা ধরা? অধু লুকাচুরী
খেলাইবে ভক্তসাথে? নানা দিকে ফিরে
করিবে কি দিগভ্রান্ত? জ্ঞান মার্গে ঘুরি
আসে দেখ নামি শেষে, পরিশ্রান্ত হয়ে,
সংশয়ের অন্ধকারে। পরিমিত জ্ঞান
দুল্লভ-সন্ধান ছাড়ি সুলভেরে লয়ে
চাহে তৃপ্তি, দেহ সাথে মাগে অবসান
জীবনের। “পরিবৃত সুস্নিগ্ধ পল্লবে,
ভূষিত প্রসূনকূলে মহা তরুবর,
কোথা গেছে মুল তার খুজিয়া কি হবে ?
ভুর ছায়া, ভুঞ্জ ফল, শোভা মনােহর”-
কেহ কহে। প্রাণ তাহে মানে কি প্রবােধ ?
ছুটিছে উদ্দেশে তব আনন বিস্ময়,
ভক্তি কৃতজ্ঞতা প্রেম ; কে করিবে রােধ
প্রবল প্রবাহ এই? ওহে সর্বময়,
পাতিয়া বিপুল বক্ষঃ অনন্ত উদার,
বিশ্বের ব্যাকুল প্রেম, নিত্য বহমান,
কে লইবে তুমি বিনা? কে লইছে আর ?
ধরি দাও নাই ধরা, বুকে দেছ স্থান।

১৭৫
একি সব অর্থহীন
ফুল ফোটে প্রতিদিন
কত বর্ণ, কত গন্ধ, গঠনের ভেদ,
যে যাহার কাজ করে,
সৌন্দর্য্যে জগৎ ভরে,
মুখে নাই হাহাকার, হৃদে নাই খেদ ?
আমার হৃদয় হতে ঘুচে গেছে ক্লান্তি ক্লেশ,
আজ আত্মা শান্ত মাের, নির্ভর নির্ভয় ;
আমি জানি জীবনের এক উৎস পরমেশ,
কল্যাণের কল্পতরু, জ্ঞান শক্তিময়।
জ্ঞান তঁার সুনিহিত প্রতি কাৰ্যমুলে,
শক্তি তার দীপ্তি পায় ভরি চরাচর,
কোটা নক্ষত্রের মাঝে, প্রতি বিন্দু ধূলে।
শুধু তাই নহে, তিনি পুণ্যের আকর।
জ্যোতিষ্মতী শক্তি তার করি সঞ্চালন,
জড়ের আননে শােভা করিয়া বিস্তার,
সৃষ্টির আনন্দ বু হ’লনা পূরণ
সৌন্দয্য দর্শন সাধ মিটিলনা তার।
তা না হলে পুষ্পময়ী, শ্যামল-আসন
ধরণীর কোলে দেখি শিশু-জীব লীলা,
কেন না হইল শেষ সৃষ্টির বাসনা,
সৃষ্টি হতে নবসৃষ্টি কেন আরম্ভিলা ?

দীপ ও ধূপ
নীরবে রহিল এক যুগ বাৱি জাগি,
স্থূল দেহ হতে কেন সু মন খানি
ধীরে ধীরে স্তরে স্তরে ফুটাবার লাগি,
প্রতি স্নায়ু তার দিয়া যেন টানি টানি।
কত ধৈর্য্যে, আপনার পুণ্যালােকে বসি,
জাগাইলা ক্রমে ক্রমে রক্ত মাংস হতে
আত্মজ্ঞানবান্ আত্মা, রহিলেন পশি
তার মাঝে, সূৰ্যকান্তি যথা ক্ষীণ স্রোতে।
৩০শে নবে,
১৮১৩

এতৎ কবি প্রণীত
১৭
আলাে ও ছায়া (৮ম সংরণ)
মাল্য ও নির্মাল্য (২য় সংস্করণ)
১৭
১।
পৌরাণিক
১১
১১
Il
{
অশােক সঙ্গীত
শ্রাদ্ধিকী
ধৰ্ম্মপুত্র
সিমি (গদ্য নাটিকা)
ঠাকুরমার চিঠী (স্বতন্ত্র)
.
•

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dip O Dhup

Author
Not Available
Title
Dip O Dhup
File name
Dip O Dhup
Text
OCR done
Citation
1929
Published
2009/11/11
Publisher
Nirmalendu Ray,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
192
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Dip O Dhup
DLI number
512609
Barcode
4990010019667.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
pO9jLhCBilJ
Download PDF

Dip O Dhup