Makardah Saraswat Library, Howrah
Upanyas Kusum
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
উপন্যাস কুসুম।
क
অর্থাৎ
( ফুলজানি বেগম, কনােঙ্গ কুসুম, কুমুমিকা, দেবী ন:
পিশাচী, ভাই ভাই, আমার মৃণাল, স্বামীপূজা,
লক্ষ টাকা ও অদ্ভুত রহস্য।)
**
এই নয়টী উপন্যাস।
১১৮ নং অপর চিৎপুর রোড অৰ্য পুস্তকালয় হইতে
শ্ৰীবৈষ্ণবচরণ বসাক কর্তৃঃ সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
কলিকাতা,
৫৪২১ নং গ্রে স্ত্রীট, আৰ্যযন্ত্রে,
গিরিশচন্দ্র ঘােষ দ্বারা মুদিত।
সন ১২৯৬ সাল।
No text on this page.
আৰ্য-পুস্তকালয় কলিকাতা, ১১৮ নং আপার চিৎপুর রােড। এই বহুকাল প্রতিষ্ঠিত সৰ্ব্বজনপরিচিত ভারত বিখ্যাত পুস্তকালয়ে নিম্নলিখিত এবং সর্ব প্রকার ইংরাজী, বাঙ্গালা ও সংস্কৃত কি স্কুলের পাঠ্য গ্রন্থ, কি শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, কি নাটক নভেল প্রহসন, কি ডাক্তারি ও কবিরাজি প্রভৃতি সৰ্ব্ববিধ পুস্তকই বিক্ৰয়ার্থ প্রতিনিয়ত উপস্থিত থাকে। শ্ৰীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা- সাগর, ৩ অক্ষয়কুমার দত্ত, ৬ মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু, মিত্র, শ্রীযুক্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন ঘােষ, মতিলাল রায়, গিরিশ্চন্দ্র ঘােষ, রাজকৃষ্ণ রায়, রজনীকান্ত গুপ্ত, মনােমােহন বসু প্রভৃতি যাবতীয় খ্যাত নামা সুলেখকগণের পুস্তক হইতে যাবতীয় অপরিচিত গ্রন্থকার- গণের পুস্তকই আমাদের নিকট পাওয়া যায়। (অর্ডার) কাৰ্য্য পত্র পাঠ মাত্র অতি সুচারুরূপে সমাধা হইয়া থাকে। এজন্য মফঃস্বলের সর্বত্রই আমাদের বিশেষ সুখ্যাতি আছে। পুস্তক সম্বন্ধে যখন যাহার যাহা আবশ্যক হইবে স্পষ্টাক্ষরে নাম ধাম ও কি কি পুস্তক আমাদিগকে লিখিলে তৎক্ষণাৎ ভ্যালুপেএলেও পাঠাইয়া থাকি। অর্ধ আনা ষ্ট্যাম্প সহ আবেদন করিলে আৰ্য- পুস্তকালয়ের বিস্তৃত তালিকা (ক্যাটালগ ) পাঠান যায়। জ্ঞানভাণ্ডার—১ম, বিংশতি খণ্ডে সম্পূর্ণ মূল্য ৬ স্থলে ১০। জ্ঞানভাণ্ডার-২য়, বিংশতি খণ্ডে সম্পূর্ণ মূল্য ৫ স্থলে ১০ সচিত্র গুপ্ত গৃহ ৮ খানি উপহার পুস্তক ও দুই খানি চিত্রসহ মূল্য ২৭ স্থলে ১া। কলিকাতা রহস্য তিন পর্বে সম্পূর্ণ সুলভ মূল্য দুই টাকা। সঙ্গীত কল্পতরু—নানাবি বাদ্য, গীতাদি সব্দ প্রকার সঙ্গীত শিক্ষার চূড়ান্ত পুস্তক প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠায় মূল্য ১৩, সচিত্র গল্প পুষ্পাঞ্জলী সেক্সপীয়র, মিণ্টন, বায়ত্বণ, স্কট প্রভৃতি ইউ- রােপীয় প্রধান প্রধান পণ্ডিতগণের ১৮ খানি গ্রন্থের বাঙ্গালায় মূল্য ১||• | রসভাণ্ড অর্থাৎ বােকাশিশুর মাদিরস ঘটিত ৩০টী বসাল গল্প মূল্য ১০ স্থলে ॥০, রমণী ঐশ্বৰ্য্য-স্ত্রীশিক্ষার চূড়ান্ত পুস্তক ১৩, প্রেমতত্ব, (Science of love) প্রেমরঙ্গ, (Pleasures of love) প্রেমরহস্য (Tales of love) এই তিন পুস্তকের মূল্য ৩৮০ কিন্তু একত্রে লইলে ১y• দেওয়া যায়। বিশ্ব- চিকিৎসক- হােমিওপ্যাথিক, এলােপ্যাথিক, হাকিমি, পাৰ্বতীয় ও গাড় ড়ি প্রভৃতি সৰ্ব্ববিধ মতের সর্ব প্রকার সুলভ চিকিৎসা পুস্তক মুল্য ১০। মন্দারালা—অর্থাৎ কালিদাস, ভবভূতি, শ্রীহর্ষ, মাঘ, ভারবি, ভর্তৃহরি, ঢাণক্য, বিষ্ণুশর্মা প্রভৃতি মহা- কবিগণের রচিত উদ্ভট ও খণ্ড কাব্য সংগৃহীত আদিরস ঘটিত এবং অন্যান্য নানাবিধ শ্লোক, তুলসীদাসের দোহা ও তদীয় বঙ্গানুবাদ মূল্য ১০ টাকা। রবিশনকুশাের আশ্চৰ্য্য ভ্রমণ বৃত্তান্ত।। কৌতুক চতুরঙ্গ বা সরঞ্জ বিজ্ঞান মূল্য ১১, পাচটী মেয়ে মূল্য ১০ স্থলে ৮৩, সৃপরিচয় ১০, প্রণয়কাহিনী মূল্য ॥৩, স্ত্রীর সহিত কথােপ কথন ১ম ও ২য় ভাগ ১৩, প্রেমের দরবার, যৌবন রত্ন বা যুবক যুবতী 10, দেবযানী নূতন উপন্যাস মূল্য ১১। ১১৮ নং আপার চিৎপুর রােড, কলিকা। বৈষ্ণবচরণ বসাক।
উপনাম ফুলজানি বেগম। আমেদাবাদের সন্নিকটে একটী ভগ্নাবশেষ উদ্যান এখনও দেখিতে পাওয়া যায়। সকলেই বােধ হয় অবগত আছেন যে, মহারাষ্ট্ৰাধিপতি শিবজীকে দমনে রাখিবার জন্য মহাপরাক্রান্ত আরঞ্জিব, বৎসরের অধিকাংশকাল দিল্লিতে না থাকিয়া আমেদ- বাদে বাস করিতেন। আজ পর্যন্ত আমেদাবাদের নিকট তাহার সামান্য কবর দৃষ্টিগােচর হয়। যে উদ্যানের কথা বললাম, ঐ উদ্যান আরঞ্জিব বাদসাহের জনৈক বেগমের বাস ভূমি ছিল। ঐ উদ্যানের মধ্যস্থলে একটী ভগ্নাবশেষ “ফুয়ারা” এখনও দেখিতে পাওয়া যায়, ঐ ফুয়ারার নিয়ে একটু বিশেষ করিয়া দেখিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, একটী শ্লোক পারসিভাষায় লিখিত আছে। শ্লোকটী অনুবাদ করিলে প্রায় এইরূপ হয়। “বালিকার হৃদয়ে এত প্রেম জানিতাম না, জানিলে কখন এ ফুল ছিড়িতাম না।” এই দুই ছত্র পাঠ করিয়া স্বভাবতঃই মন অতিশয় কৌতুহলঃ- ক্রান্ত হইল ও তৎপরে বিশেষ যত্নের দ্বারা এই শ্লোক কে [ ২ ] লিখিয়াছিল, কাহার জন্য লিখিয়াছিল, কেন লিখিয়াছিল জানিতে পারিয়াছিলাম। পাঠকদিগের কৌতুহলও নিবৃত্ত করিব। যে উদ্যান এক্ষণে ব্যাঘ্রাদির আবাসস্থল হইয়াছে দুই শত বৎসর পূর্বে ইহা ইন্দ্রের নন্দনকানন অপেক্ষাও সুন্দর ও মনাে- হর ছিল, যে “ফুয়ারা” এক্ষণে ভাঙ্গিয়া পড়িয়া বিষাদে কাঁদিতেছে ঐ “ফুয়ারা” একদিন গােলাপজল উদগীরণ করিত। যে অট্টা- লিকা এক্ষণে ভগ্নস্তুপ মাত্র, এক সময়ে ঐ অট্টালিকা বিলাস ভূমির আকর ছিল। যেখানে এক্ষণে দিবসে শৃগাল রব করি- তেছে, এক সময়ে সেইখানে অপ্সরী বিনিন্দিতা রমণীগণ সঙ্গীত ও বাদ্যে মন মাতাইয়া তুলিত। সংসারের লীলাই এইরূপ ; আজ সধবা কাল বিধবা। দুই শত বৎসর পূর্বে যখন আরঞ্জিব আমেদ নগরে বাস করিতেছেন, যখন এই উদ্যান বিলাস সাগরে ভাসিতেছে আমি সেই সময়ের কথা বলিতেছি। একদিন সন্ধ্যার ঠিক প্রাক্কালে উদ্যানের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ একটী মনােহর নিকুঞ্জ মধ্যে একটী যুবক একমনে বসিয়া কি ভাবিতেছেন। যুবকের বয়স অষ্টাদশের কিছু উপর, শরীরে যথেষ্ট বল আছে, বেশ মহারাষ্ট্রীয়দিগের ন্যায়, কোমরে কেবল একখানি ক্ষুদ্র ছুরিকা। হিন্দু-বীর কোন্ সাহসে আরঞ্জিবের বেগম মহলে প্রবেশ করিয়াছে ? সহসা অলঙ্কারের মধুর শব্দ শ্রুত হইল, সহসা যেন চতুর্দিক আললা করিয়া একটা চতুর্দশ-বর্ষীয়া বালিকা ধীরে ধীরে সেই নিকুঞ্জ মধ্যে প্রবেশ করিল। যুবক চমকিত হইয়া উঠিয়া রমণীর দিকে অগ্রসর হইলেন। যুবকের নিকট হইতে দূরে সরিয়া দাঁড়াইয়া সুন্দরী [ ৩ ] কহিলেন, “পুরন্দর, আমি অস্পৃশ্য আমাকে ছুইওনা।” পুর- দর সে কথা না শুনিয়া যুবতীর গণ্ডে পাগলের ন্যায় শত সহস্র চুম্বন করিলেন, উভয়ের গণ্ড বহিয়াই অবিরল ধারে নয়না ঝরিতেছিল। পুরন্দর বলিলেন “ফুল,—শরীর অপবিত্র হইয়াছে কিন্তু হৃদয় তাে হয় নাই, তােমার হৃদয় আমার। শরীর তত কখনও দেখি নাই, চাহি নাই। আজ তােমারই অনুরােধে সে শরীর হইতে হৃদয় বিচ্ছিন্ন করিতেও তে আসিয়াছি।” পুরন্দর রাওয়ের হৃদয়ে মস্তক রাখিয়া ফুল কান্দিতেছিল, পুরন্দর ও কান্দিতেছিলেন। এইরূপে নীরবে দুইজনে কতক্ষণ কান্দিলেন, তাহা দুইজনের কেহই জানিতে পারিলেন না। রমণী হৃদয়কে সকলে কোমল কহে, কিন্তু রমণীর ন্যায় কষ্টসহিষ্ণু হৃদয়ও আর কাহারও নাই। ফুল প্রথম কথা কহিল, তখন আর চক্ষে জল নাই, ফুল বলিল “এ অপবিত্র দেহ রাখিব না স্থির করিয়াছি ; যদি এ হৃদয় আমার হইত তাহা হইলে এতক্ষণ ইহাকে এ শরীর হইতে বিচ্ছিন্ন করিতাম। কিন্তু পুরন্দর যখন ছেলে মানুষ তখন হইতেই এ হৃদয় তােমার, এ শরীরও তােমার ছিল। কিন্তু বলে মহাপাতকী এ শরীরকে কলঙ্কিত করিয়াছে। এ শরীর আর রাখিব না। তােমাকে ডাকিয়া বিপদকে আনিয়াছি, আর বিলম্ব কেন, চল যাই” পুরন্দর ধীরে ধীরে কটিবন্ধ হইতে শাণিত ছুরিকা বাহির করিলেন, “বলিলেন মায়া দয়া সকল বিসর্জন দিয়া আসিয়াছি, মরিয়া দুইজনে মিলিব। তবু যে—” ফুল একটু বিষাদপূর্ণ হৃদয় বিদারক হাসি হাসিয়া বলিল “ছি, তুমি আমাকে নরক যন্ত্রণা হইতে স্বর্গে লইয়া যাইবে ভাবিতেছ ?” পুরন্দর ফুলকে হৃদয়ে লইয়া অসংখ্য চুম্বন করিয়া বিকট স্বরে কহিলেন [ ৪ ] “চল, আর বিলম্ব কেন ?” ফুল হৃদয় পাতিয়া দিল, শাণিত ছুরিকা উঠিল। সেই মূহুর্তেই ফুল অপেক্ষাও কোমল ফুলের হৃদয়ে ছুরিকা আমুল বিদ্ধ হইত কিন্তু তাহা হইল না। নিকুঞ্জ পার্শ্ব হইতে একজন মহা বলবান কৃষ্ণকায় খােজা এ ঘটনা দেখিতেছিল। যুবককে ছুরিকা তুলিতে দেখিয়া সে আসিয়া ক্ষিপ্র হস্তে যুবকের হস্ত ধরিল। উভয়ে চমকিত হই- লেন। সহসা ফুলের ভাব পরিবর্তন হইল। সিংহিনীর ন্যায় ফুল খােজার দিকে ফিরিলেন, বলিলেন “মসরুর, জান আমি কে ?” খােজা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হইয়া গম্ভীর ভাবে কহিল ; “আপনি বেগম ফুলজানি।” ফুল বলিলেন “আমি আজ্ঞা করি- তেছি তুমি এই মুহূর্তে এই যুবকের হস্ত ত্যাগ কর ইনি আমার একজন আত্মীয়” “বেগম সাহেবের আজ্ঞা শিরােধার্য্য করিয়া এই কাকেরের হস্ত ত্যাগ করিলাম, কিন্তু যে বেগম সাহেবের প্রাণ নাশে উদ্যত হইয়াছিল বাদসাহের হুকুম ভিন্ন তাহাকে ছড়িতে পারি না।” “তবে পার বন্দীকর” এই বলিয়া ফুল সজোরে ভূমিতে পদাঘাত করিলেন, অমনি দেখিতে দেখিতে পুরন্দর যেখানে দাঁড়াইয়াছিলেন, তিনি হাত মুক্ত পাইয়া খােজাকে আক্ৰমণ করিতে যাইতে ছিলেন, কিন্তু সেই স্থানে তাহার পদ নিম দিকে চলিয়া গেল। দেখিতে দেখিতে পুরন্দর মৃত্তিকা নিম্নে অন্তর্ধান হইলেন, দেখিতে দেখিতে আবার যেরূপ স্থান সেইরূপ হইল। তখন সিংহিনীর ন্যায় মন্দ গমনে ফুলজানি বেগম কুঞ্জ হইতে বাহির হইলেন। বাহিরে আসিয়া যাইতে যাইতে বলিলেন, যদি ইচ্ছা হয় এ সংবাদ বাদশাহকে দিও। খােজা দেখিয়া শুনিয়া অবাক হইয়াছিল। বলিল “সে সাধ [ ৫ ] বড় নাই; একটা বালিকা আমাকে ঠকাইল। স্বয়ং পেয়গম্বর স্ত্রীলােকের নিকট ঠকিয়াছিলেন আমি কোন্ ছার। যাহা হউক কাফেরকে ধরিতে হইবে।” এই বলিয়া খােজ। মসরুর বংশ ধ্বনি করিল, অমনি দুই জন খােজা আসিয়া সেলাম করিল। মসরুর কহিল “তােমরা জান এখান হইতে কোন সুড়ঙ্গ পথ আছে কি না?” একজন খােজা কহিল “আছে, বাদসাহের শয়ন গৃহ হইতে নগর পর্যন্ত একটী পথ মাটির নীচে দিয়া আছে।” মসরুর বলিল “সত্বর যাও, এই সুড়ঙ্গ দিয়া একজন মাহাট্টা গিয়াছে, তাহাকে ধরিতে হইবে।” তাহারা দ্রুত পদে চলিয়া গেল। তখন মসরুরও ভাবিতে ভাবিতে সে স্থান ত্যাগ করিল। ফুল ও পুরন্দরের কিছু পরিচয় দিব। আমেদাবাদের পাঁচ ক্রোশ দূরে দেবীগাওন নামে একটা ক্ষুদ্র পল্লি ছিল, এক্ষণে ইহার কোন চিহু নাই। এই পল্লিতে নারায়ণ-রাও নামে এক জন মধ্যবিত্ত লােক বাস করিতেন, পুরন্দর তাহারই একমাত্র সন্তান। ঐ গ্রামে একটা দুঃখিনী বিধবা রমণী বাস করিত, ফুলবাই তাঁহারই কন্যা। লােকে বলিত এই দুঃখিনী বিধবা কোন রাজপুত রাজার মহিষী, সত্য মিথ্যা বলিতে পারি না বােধ হয় ফুলের অনেক অসামান্য রূপ ও রাজরাজেশ্বরীর ভাব দেখিয়া লােকে এ জনরব রটাইয়াছিল। বাল্যকাল হইতে ফুল ও পুরন্দর একসঙ্গে থাকিত। কারণ পুরন্দরদিগের বাটীর পার্শ্বেই ফুলের মাতা বাস করিতেন। যখন ফুল প্রায় চতুর্দশ- বর্ষে পড়িল, তখন পুরন্দরের পিতা পুরন্দরকে ফুলের সহিত বিবাহ দিলেন। বিবাহের দুইদিন পরে ফুলের মাতার প্রাণ ;
[ ৬ ] বিয়ােগ হইল। সুতরাং প্রেমময় দুইটা অদয় মিলিয়াও বিমল সুখে থাকিতে পারিল না। কিন্তু যে দুইটা হৃদয় যেন পরস্পরের জন্যই জন্মিয়াছিল ও যাহা এই কয়দিন মাত্র একত্রিত হইয়াছে, হায়! সেই দুইটী হৃদয় আবার বিচ্ছিন্ন হইল। বিবাহের ঠিক এক মাস পরে একদিন আরঞ্জিব বাদশাহ শীকারে আসিয়া দেবীগাওনে ফুলকে দেখিলেন। তৎক্ষণাৎ হুকুম জাহির হইল, বাদশাহের হুকুম অমান্য করে শিবজী ভিন্ন এমন ভারতবর্ষে আর কেহ জীবিত ছিল না। সুতরাং ফুল অবাধে বেগম মহলে প্রেরিত হইল। সেখানে ফুলজানি বেগম নামে অভিহিত হইয়া মনােহর বিলাস পূর্ণ হয়েঁ ফুল বাস করিতে লাগিলেন। ফুল ও পুরন্দরের মনের ভাব আমি বর্ণনা করিতে যাইব না, পুরন্দরের পিতা মাতার ক্রন্দনও লিখিব না, সমস্ত গ্রামবাসীর দুঃখ বর্ণনও করিব না। এক মাস মতিবাগ নামক উদ্যানে ফুল বাস করিল। সেই শত্ৰুপুরেও তাহার একটী সখী জুটিল। এই রমণী একজন বাদি । সকলে ইহাকে “জুমেল” বলিয়া ডাকিত। ফুল জুমেলের সাহায্যে পুরন্দরকে একখানি পত্র পাঠাইল। ঐ পৰে তাহার অবস্থা বর্ণন করিয়া তৎপরে সেইখানে আসিয়া তাহার প্রাণ নাশ করিতে তাহাকে অনুরােধ করিয়া পাঠাইল। সে লিখিয়াছিল, ‘‘যদি আমার প্রতি তােমার বিন্দুমাত্র ভালবাসা থাকে, তবে আইস দুইজনে এক সঙ্গে মরি? মরিলে আর এ পাপ পৃথি- বীতে থাকিতে হইবে না। স্বর্গে গিয়া দুইজনে সুখে থাকিব। এ নরক হইতে উদ্ধারের যখন অন্য উপায় নাই, তখন আইস, তােমার শাণিত ছুরিকা আমার হৃদয়ে বসাইয়া আমায় মারিয়া L ফেলিয়া বাঁচাও।” পুরন্দর তেজস্বী মাহাট্টা। নিজ স্ত্রীকে পাপপঙ্কে মগ্ন হইতে দেওয়া অপেক্ষা তাহার প্রাণ নষ্ট করা ভাল বিবেচনা করিয়া ফুলের সহিত সাক্ষাৎ করাই স্থির করিলেন। জুমেলের বুদ্ধি কৌশলে অজ্ঞাতসারে যে বেগম মহলে তিনি প্রবেশ করিতে পারিয়াছিলেন, তাহা পাঠক অবগত আছেন। তাহার পর যাহা যাহা ঘটিয়াছিল তাহাও জানেন। সহসা মৃত্তিকা নিয়ে অন্ধকারময় গহ্বরে পতিত হইয়া পুর- দর স্তম্ভিত হইলেন। এত শীঘ্র এই সকল ঘটনা ঘটিয়াছিল যে, তিনি ব্যাপার কি ভাল বুঝিতে পারিলেন না। কিংকর্তব্য বিমূঢ় হইয়া দাড়াইয়া রহিলেন। কিন্তু তাহাকে অধিকক্ষণ ভাবি- তেও হইল না। একটী কোমল হস্ত তাহার পৃষ্ঠ স্পর্শ করিল। তিনি চমকিত হইয়া ফিরিলেন, কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। জিজ্ঞাসা করিলেন “কে ?” যেন স্ত্রীকণ্ঠে উত্তর হইল “যুবক সত্বর পলায়ন কর, নিকটে শত্রু আছে। বেগম ফুলের একান্ত অনুরােধ সত্বর পলাও। অন্য কথা জিজ্ঞাসা করিও না। যদি বাঁচিতে পার ফুলের সহিত দেখা হইবে। পলাও, সুড়ঙ্গ মুখে সুসজ্জিত অশ্ব দেখিবে।” স্বর ক্রমে অন্ধকারে অর্থ- সর হইলেন। তাঁহার সুড়ঙ্গ মুখে আসিতে অনেক বিলম্ব হইল। কিন্তু বাহির হইয়া দেখিলেন যে একটী অশ্ব সত্য সত্যই দাড়াইয়া আছে। লম্ফ দিয়া অশ্বারােহণ করিয়া অশ্ব ছুটাইলেন। কিছুদূর যাইয়া তিনি বুঝিলেন যে, তাঁহাকে দুই জন অশ্বা- রােহী অনুসরণ করিতেছে। অশ্বকে আরও বেগে ছুটাইলেন, কিন্তু যেমন তিনি একটী পথ ফিরিবেন অমনি প্রবল বেগে দুইটা তীর আসিয়া তাহার দক্ষিণ হস্তে বিদ্ধ হইল। তিনি সে দুঃসহ || ৮ ] যন্ত্রণা অগ্রাহ করিয়া অশ্বকে পুনঃ পুনঃ পদতাড়না করিতে লাগিলেন। কিন্তু তা দেখিলেন যে, তাহার পশ্চাতস্থ অশ্ব- রােহীদ্বয় ক্রমেই নিকটস্থ হইতেছে। তখন তিনি লম্ফ দিয়া অশ্ব হইতে পড়িয়া অশ্বকে কষাঘাত করিলেন, অশ্ব প্রবল বেগে ছুটিয়া চলিয়া গেল, তিনি অন্ধকারে এক গৃহ পার্শ্বে লুকাইলেন। দেখিতে দেখিতে পশ্চাতস্থ অশ্বারােহীদ্বয় আসিয়া পড়িল। সম্মু- খস্থ অশ্বে যুবক আছেন ভাবিয়া তাহারা সেই অশ্বের অনুসরণ করিল। ক্রমে ক্রমে অধের পদ শব্দ বাতাসে মিলাইয়া গেল। যখন চতুর্দিক নীরব হইল, তখন যুবক বাহির হইলেন। এ কোথায় আসিয়াছেন, কত রাত্রি হইয়াছে, ইহার কিছুই তাঁহার দেখিবার এতক্ষণ সময় হয় নাই। এখন দেখিলেন আমেদাবাদের একটী জনশূন্য স্থানে তিনি আসিয়াছেন, রাত্রি প্রায় নয়টা হইয়াছে। যুবক তখন সবলে বাহ হইতে তীরদ্বয় তুলিলেন, তীরের সহিত তীরবেগে রক্ত ছুটিল। নিজ উষ্ণীষ বস্ত্র দিয়া বাহু বেস মর্দন করিলেন, কিন্তু রক্ত তাহার সমস্ত বস্ত্রাদি দেখিতে দেখিতে ভিজাইল। পুরন্দর তখন গৃহে যাইবার মনন করিয়া অগ্রসর হইলেন, কিন্তু অধিক দূর যাইতে হইল না। রক্তপাতে শীঘ্রই দুর্বল হইয়া পড়িলেন। মস্তক ঘুরিতে লাগিল, তিনি কষ্টেপড়িতে পড়িতে একটা পথ পার্শ্বস্থ গৃহ-সােপানে বসিলেন। বসিবামাত্র জ্ঞান শূন্য হইয়া মূচ্ছিত হইলেন। যখন পুরন্দর সংজ্ঞালাভ করিলেন তখন তাঁহার বােধ হইল তিনি স্বপ্ন দেখিতেছেন। এক সুবৃহৎ গৃহে তিনি হস্ত পদ রজুতে দৃঢ় বদ্ধ পড়িয়া আছেন। গৃহে শত শত স্বর্ণদীপে সুগন্ধি তৈল পুড়িতেছে ও সেই গন্ধে গৃহ মাতাইয়া তুলিয়াছে। পুষ্প 1 w ] হার প্রতি স্তম্ভে জড়িত, পুষ্প নির্মিত সুবৃহৎ পাখা উপরে দুলি- তেছে। সম্মুখে স্বৰ্ণ সিংহাসনের উপর দিল্লীশ্বর, পার্শ্বে-শত শত বৃশ্চিক তাহাকে দংশন করিল, পার্শ্বে তাহারই ফুল। তিনি বন্ধন ছিন্ন করিতে চেষ্টা করিলেন কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা। বাদ- সাহের সম্মুখে দ্বাদশ জন মনােমােহিনী সঙ্গীত ও নৃত্য করিতেছে। এই সকল দেখিয়া তাহার ঘাড় হইতে আবার প্রবল বেগে শোণিত নির্গত হইল, তিনি আবার মূচ্ছিত হইলেন। পুনরায় যখন তাহার সংজ্ঞলাভ হইল, তখন দেখিলেন যে, তিনি বাদসাহের সিংহাসনের নিকট আনীত হইয়াছেন, তাহার নিকট চারি জন খােজা শাণিত ছুরিকা হস্তে দণ্ডায়মান আছে, গীত বাদ্য বন্ধ হইয়াছে ; রমণীগণ সারি দিয়া বাদসাহের পশ্চাতে দাড়াইয়া আছে। এতক্ষণে তিনি বুঝিলেন যে, তঁাহার বিচার। যুবকের সরলমূৰ্ত্তি দেখিয়া কঠোর প্রাণ আরঞ্জিবের হৃদয়ও একটু নরম হইয়াছিল, নতুবা এতক্ষণ তাহাকে যমপুরে বাস করিতে হইত। আরঞ্জিব কহিলেন, “যুবক তােমার সাহস অতিশয় ; যে বেগম মহলে পক্ষী পৰ্য্যন্ত প্রবেশ করিতে পারে না, তুমি সেই স্থানে প্রবেশ করিয়াছিলে ? যদি তুমি কাহার নিকট আসিয়াছিলে বল ; তাহা হইলে তােমাকে ক্ষমা করিতে পারি।” যুবার পক্ষে তাহা বলা অসম্ভব। তিনি মরিতেই সে দিন আসিয়াছিলেন—সুতাং মৃত্যু। ভয়ে তিনি ভীত ছিলেন না। ইহাও বেস জানিতেন যে, তিনি মরিলে ফুলও মরিবে, আর এ বিশ্বাসও তাহার ছিল যে, মরিলে তাঁহারা দুই জনে স্বর্গে মিলিবেন। এই সকল কারণে পুরন্দর কহিলেন “বাদসাহ অপরাধ করিয়াছি প্রাণদণ্ড হইবে, প্রাণ ১০ ] দণ্ড করুন; কিন্তু কিছুতেই কাহার নিকট আসিয়াছিলাম বলিব না। বাদসাহের সম্মুখে এরূপ কথা কে কখন বলিতে সাহস করে নাই। আরঞ্জিবের মুখ লােহিত বর্ণ হইল, তিনি ক্রোধে কম্পিত হইতেছিলেন। খােজাদিগকে আজ্ঞা করিলেন “এখনি এই পামরের প্রাণ নাশ কর। এ মহলে যে যে বাস করে সক- লেই এখানে দাড়াইয়া আছে। কোন্ বদির প্রণয়ার্থে এ যুবক এখানে আসিয়াছিল ?” কেহই উত্তর করিল না। তখন আর ঞ্জিব আরও রাগত হইয়া উঠিলেন, রাগ হইলে আরঞ্জিবের জ্ঞান থাকিত না। আজ্ঞা করিলেন “এখানেই এই পামরকে নাশ কর, তাহার প্রণয়িণী দেখিয়া সুখী হউক।” আজ্ঞা মাত্র চারি খানি শাণিত ছুরিকা উঠিল, বিদ্যুতের মত চকিল, তৎপরে একটী হৃদয় বিদারক চীৎকারে গৃহ, উদ্যান ও আকাশ কম্পিত হইয়া উঠিল। বাদশাহ স্বয়ং অসি হস্তে সিংহাসন হইতে লম্ফ দিয়া নিম্নে নামিলেন। যাহা দেখিলেন,—যে লোমহর্ষণ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখিলেন—ফুলজানি বেগম গিয়া সেই শাণিত ছুরিকার সম্মুখে হৃদয় পাতিয়া দিয়াছেন। দুই খানি ছুরি তাহার হৃদয়ে আমূল বিদ্ধ হইয়াছে, কিন্তু তাহাতেও পুরন্দর বাঁচে নাই, আর দুই খানি পুরন্দরের হৃদয়ে বিদ্ধ হইয়াছে। বাদসাহ যথার্থ ফুলকে একটু ভাল বাসিতেন, দুঃখে কহিলেন “ফুল করিলে কি ?” ফুলের এজীবন পৃথিবীতে অধিকক্ষণ আর নাই, ফুল বাদসাহের দিকে চাহিয়া কহিলেন “দাসীকে ক্ষমা করিবেন। স্বামীকে বুক দিয়া স্ত্রীলােকের রক্ষা উচিত তাহাই করিয়াছি।” এই কয়টী কথা মুমু পুরন্দরের কর্ণে গেল, তাহার বাক্শক্তি রহিত হইয়াছে, তত্ৰাচ কয়েকটী কথায় যেন তাহার শরীরে বল আসিল, তিনি [ ১১ ] ; ফুলের মস্তক মুখের নিকট লইয়া গণ্ডে চুম্বন করিলেন, ফুল প্রত্যাবর্তন করিলেন। উভয়ের চক্ষু মুদিত হইল; আর এ পৃথিবীতে খুলিল না। যাও ফুল যাও, প্রেমের যদি মাহাত্ম্য থাকে, তবে তুমি চির সুখে স্বামীসঙ্গে বৈকুণ্ঠে বাস করিবে। বাদসাহের পাষাণ প্রাণও এই দৃশ্যে দ্রবীভূত হইল। আজ্ঞা করিলেন, “সাত দিবস আমেদ নগরের সকল লােকে শােক চিঃ ধারণ করুক। এই প্রাসাদের সম্মুখে ইহাদের দুই জনকে একত্রে কবর দেও। ঐ কবরের উপর শ্বেত প্রস্তরের অদ্যই এক ফুয়ার। নিৰ্মাণ কর। ঐ ফুয়ারা যেন দিবারাত্রি গােলাপ জল বর্ষণ করে, আর ঐ কবরের নিম্নে ইহাদের স্বর্গীয় প্রণয়ের স্মরণ লিপি স্বরূপে একটী শ্লোক লিখাও।” দিল্লীশ্বরের আজ্ঞায় এক দিবসে নগর হইয়াছে, এ সামান্য কাৰ্য্য হইবে আশ্চৰ্য্য কি? পর দিবস সন্ধ্যাকালে ফুল ও পুরন্দরের কবরের উপরস্থ ফুয়াৱা গােলাপ জল বর্ষণ করিতেছে, বাদশাহ আসিয়া স্বয়ং একটী গােলাপ বৃক্ষ কবরের উপর রােপণ করিলেন। প্রায় তিন শত বেগম ও তাহা দের প্রায় দেড় সহস্র বাঁদি ও সহচরী সেই সময়ে সকলেই এক একটী পুষ্প হার সেই কবরের উপর স্থাপন করিলেন। তখন বাদসাহ বলিলেন “শ্লোক পাঠ কর, কে রচনা করিয়াছে।” তখন একজন কহিল “জাহেনা জাহেন, ফুলজানি বেগমের বাদি জুমেল ইহা লিখিয়াছে।” বাদসাহ জুমেলকে পাঠ করিতে আজ্ঞা করিলেন, জুমেল পড়িল, “বালিকার হৃদয়ে এত প্রেম জানিতাম না, জানিলে কখন এ ফুল ছিড়িতাম না।”
কনােজ কুসুম। সুনীল আকাশে পূর্ণশশী বিরাজমান ; রজতনি উজ্জ্বল জ্যোৎস্নামালায় তমােময়ী-রজনী আজি সুচারুবেশে ভূষিতা ; অপরাহ্নে পশ্চিম-গগনে দিনমণি যে মলিন-মুখখানি তুলিয়া অৰ্দ্ধ জগতে ক্ষণে ক্ষণে যে হীনপ্রভ-রশ্মিজাল বিকীর্ণ করিতেছিলেন, এক্ষণে তাহার চিহ্নমাত্রও নাই। কালস্রোতে সে সমুদয় ধৌত হইয়া গিয়াছে, নভােমণ্ডলের সর্বত্র সমভাবে পরিদৃশ্যমান হই- তেছে, তারকা-নিকর যথা সময়ে যথাস্থানে স্বাভাবিক প্রভায় প্রভান্বিত হইলেও, পূর্ণিমা যামিনীর সুচিকণ সুধাংশু কিরণে হীনভ ও নিস্তেজ-মূর্তি ধারণ করিয়াছে। চকোর চকোরী প্রীতি-প্রফুল্ল মনে চন্দ্র-সুধাপানে বিহ্বল হইয়া নিশাপতির চতু র্দিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। কনােজের দুর্গন্থ নিভৃত-কক্ষে এক অলৌকিক রূপ-লাবণ্য- বতী বালিকা একাকিনী সুচারু পালঙ্কোপরি উপবিষ্ট ; কবরী বন্ধনের শৈথিল্য প্রযুক্ত সুদীর্ঘ কৃষ্ণকেশদাম গণ্ডস্থল, গ্রীবা ও স্কন্ধদেশের স্থানে স্থানে বিকীর্ণ হওয়ায় কুমারী মনমােহিনী ভাবে বসিয়া আছেন, অকস্মাৎ পরিধেয় বস্ত্র অংশু-রেখা পতিত দর্শনে বিস্মিত হৃদয়ে তিনি গবাসমীপে উপনীত হইলেন। তথা হইতে প্রকৃতির বিচিত্র শােভ সন্দর্শনে মৃগনয়না নয়নযুগল পরিতৃপ্ত করিলেন, কিন্তু তাহাদিগের দুর্গস্থিত বিবিধ বৃক্ষলতাদি- পূর্ণ উদ্যান দর্শনে অভিলষিত হইয়া দুর্গের বহির্ভাগে প্রাকৃতিক [ ১৩ ] সৌন্দৰ্য রাশি দেখিবার নিমিত্ত উৎসুক হইয়া সেই সকল বিষ- য়েরই কল্পনা করিতেছিলেন। আহা কি মধুর যামিনী ! এ সময়ে মনােমত ব্যক্তি সহ সুশী- তল চন্দ্রকিরণে ভ্রমণ কি তৃপ্তিজনক। এরূপ আবন্ধাবস্থায় দিনাতিপাত আমার কষ্টকর হইয়া উঠিয়াছে ; দিবা রজনী অলসভাবেই ক্ষেপণ করি। হায় এমন এক জনও আপনার লােক নাই যে, তাহার সহিত কথাবার্তায় সময় অতিবাহিত হয়। কুমারী এইরূপ গােপনে মনােবেদনা প্রকাশ করিতেছেন, এমন সময়ে রাজমহিষী গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া বলিলেন, “অন- সূয়ে ! তােমার অভিলাষ পূর্ণ হইবে, আমি তোমাকে লইয়া বেড়াইতে যাইব।” রাজকুমারী জননীকে গৃহমধ্যে প্রবেশ করতে দেখি গাত্রোত্থানপূর্বক তাহার পদধূলি গ্রহণ করিয়া অভিলষিত ভ্রমণােদ্দেশে বেশ-ভূষায় সজ্জিত হইলেন। মাতা কন্যাকে সঙ্গে লইয়া নিশার সৌন্দৰ্য-দর্শনে গৃহ হইতে নিন্তা হইলেন। যাইতে যাইতে কনােজ-কুসুম সুকোমল অঙ্গুলি দ্বারা চান্দ্রলােক- চুম্বিত বিবিধ কুসুমদাম হইতে কয়েকটা গােলাপ চয়ন করিয়া সুবাস গ্রহণানন্তর কবরীদেশে সংস্থাপন করিলেন। অনন্তর উদ্যানভাগ অতিক্রম করিয়া ক্রমে উভয়ে ক্ষেত্রে উপনীত হই, লেন ; তথা হইতে অদূরে স্রোতস্বতী জাহ্নবীর সলিলে, তারকা- মণ্ডল পরিবেষ্টিত শশধরের মনােহর প্রতিমূর্তি অঙ্কিত দৃশনে পরম প্রীত হইলেন। তাহারা যেরূপ নয়ন ও চিত্তবিনােদনাথ পূর্ণিমার বাটী হইতে বহির্গত হইয়া ভাগীরথী তীরে বিচরণ করিতেছিলেন, সেইরূপ কত শত নরনারী সুশতল সমীরণ
[ ১৪ }
সেবন হেতু গঙ্গাতীরে আগমন করিয়াছিল। কোথাও বা বৃদ্ধগলের
ঈশ্বরস্তোত্র, কোথাও বা যুবকবর্গের বিরহ সঙ্গীত, কোথাও বা
শিশুদিগের উৎসব ধ্বনি, এইরূপ নানাস্থান হইতে নানা ভাবের
কথাবার্তা, মৃদুমন্দ সঞ্চারিত সমীরণ স্থানান্তরে বহন করিতেছিল।
যে স্থানে রাজকুমারী ও তাহার মাতা বেড়াইতেছিলেন, তাহার
অনতিদুরে দুইটী বৃদ্ধা নিন্মলিখিত ভাবে কথাবার্তা কহিতেছিল।
“দেহ্ বােন্! এত দিনে আমাদের পাড়ার সেই মুচিনীর
বন্ধু বলে মেয়েটার বর স্থির হয়েছে।”
“ওমা! এ কথা তুই আমায় বললি? কেন, মেয়েটা যে
যােল বছর পার হয়ে সতেরয় পা দিতেছে, তার আবার বর
কোথায় জুটল ? ওমা, ঘরে অত বড় মেয়ে আইবুড় তবু ত কর্তা
গিন্নির বে দেবার গা নাই ?”
‘থা ভাই, আর কথায় কাজ 'নাই, বন্ধুর জোর কপাল
বলতে হবে, এত দিনের পর সােনারচাঁদ বর পেয়েছে। আহ
ছেলেটী দেখতে যেন কার্তিক। তাহার চেহারা দেখে আমাদের
বালিকা সাজতে ইচ্ছা হয়।”
“আমি তােমার কথা শুনে আশ্চর্য হলেম, কিন্তু বােন্ তুমি
কি প্রকারে এ সব কথা জানতে পাল্লে ?”
“এর আবার জানা জানি কি ? পাড়ার সকলেই ত জানে
যে, প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় একজন দীর্ঘাকৃতি সুপুরুষ ঐ মুচি-
নীদের বাটীতে আসিয়া রাত্রি যাপন করে এবং তার পর দিন
প্রাতঃকালে তাহার নিজের কাজ কৰ্ম্ম করিতে বাহির হইয়া
যায়; পুনরায় রাত্রিতে আসিয়া ঐ খানে থাকে। কেন চোক
থাকিলেই দেখিতে পাওয়া যায়। আবার লােকের মুখে আমি
[ ১৫ ] এমনও শুনেছি যে সেই যুবক এক জন রাজপুত্র, এখানে হীরা জহরত প্রভৃতি মণি মাণিকের বাণিজ্য করিতে আসিয়াছে।” “আচ্ছা ভাই, তুমি যাহা বলিলে সমস্তই সত্য মানিলাম, কিন্তু তুমি কি করে জানিতে পারিলে যে সেই সুশ যুবকের সহিত বন্ন র সম্বন্ধ স্থির হয়েছে ?” “যদিও স্থির না হয়ে থাকে, শীঘ্রই হইবে; 'ও একই কথা। যে হেতু এক রকম স্থির স্থার হইয়া গিয়াছে।” “না ভাই, এক সঙ্গে বাস বা একত্রে রাত্রি যাপন কৰিলেই তাহাকে বিবাহ বলা যাইতে পারে না, আমি আশ্চর্য্য হচ্চি, মুচিনীই বা কি প্রকারে এরূপ কাজে সম্মত হয়েচে, ললাকে জানিতে পারিলে তাহাকে যে এক ঘরে করাবে।” এই সময়ে অকস্মাৎ গম্ভীর নিনাদে সকলে স্তম্ভিত হইল । কোথা হইতে ঐ বিকট চীৎকার কর্ণগােচর হইল, কেহই তাহা অবধারণ করিতে না পারিলেও গায়কদিগের গীত ধ্বনি, বৃদ্ধ- দিগের মন্ত্র পাঠ, শিশুগণের আমােদ প্রমােদ সমস্তই ক্ষণকাল মধ্যে স্থগিত হইল। যে দুইটী বৃদ্ধা প্রতিবেশীর নিন্দাবাদে সময় ক্ষেপণ করিতেছিল তাহাদিগেরও কথাবার্তা বন্ধ হইল। রাজ মহিষী ও কুমারী সহসা এইরূপ পরিবর্তন দর্শনে চকিতের ন্যাস চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। গঙ্গাতীরে যাহারা এতক্ষণ সুখে ভ্রমণ করিতেছিলেন, সকলেই যেন সন্দিগ্ধচিত্ত সতর্কতার সহিত কালক্ষেপ করিতে লাগিল। পুনরায় সেই বজ্রধ্বনি-সদৃশ ভীষণ চীৎকার শব্দ, তত্রস্থ নরনারীর হৃদয়ে আশ- স্কার সঞ্চার করিয়া প্রতিধ্বনিত হইল। জনৈক যুবাপুরুষ এত ক্ষণ পবিক্রসলিলা ভাগীরথী-তটে অঙ্গ বিস্তারিত করিয়া সুখে [ ১৬ ] নিদ্রা যাইতেছিলেন, তাঁহার পার্শ্বভাগে হংধনু-সদৃশ বৃহৎ ধনু- খণ্ড তৃণাধার-সহ রক্ষিত ছিল, এই বিকট চীৎকারে তাহার নিদ্রা ভঙ্গ হইল। অনন্তর লােক পরম্পরায় শ্রুত হইল যে, রাজাবাহাদুরের শ্বেতহস্তী কঠিন শৃঙ্খল হইতে উন্মুক্ত হইয়া সাধীনভাবে বিচরণ করিতে করিতে সম্মুখে যাহা কিছু দেখিতে পাইতেছে কাহারও প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া মহানিষ্ট-সংঘটন করিতেছে। অনতিবিলম্বে সেই মহাকায় মাতঙ্গ যথায় রাজ- কুমারী জননী সহ দণ্ডায়মান ছিলেন, তৎসন্নিকটে উপনীত হইল। ধনুর্ধারী পুরুষ মুহূৰ্তমাত্র অপেক্ষা না করিয়া অলক্ষ্যে তাহার প্রতি শরসন্ধান করিলেন, গভীবনাদী ধনুষ্টঙ্কার-শব্দে গঙ্গাতট কম্পিত হইতে লাগিল, কিন্তু তাহাতেও হস্তী ভূতল- শায়ী হইল না দেখিয়া পুনরায় ধনুকে তীর যােজনা করিয়া সেই ভীষণ জন্তুর মস্তিষ্ক নির্দেশ করিয়া অব্যর্থ তীরক্ষেপ করিলেন। বিষম ব্যথায় প্রপীড়িত হইয়া করী দুই চারি বার এদিক ওদিক পদক্ষেপ করিয়া ধরাশায়ী হইল, তাহার পতন-শব্দে তত্রস্থ সক লেই ভয়াকুল হইয়াছিল। আমাদিগের রাজকুমারী জননী সহ- ইতিপূৰ্বেই মূচ্ছিত হইয়াছিলেন। অনন্তর বারণ-বিজয়ী সম্মুখে একটা রমণী-রত্ন নিস্পন্দাবস্থায় ধরাতলে পতিতা দর্শনে, তাহাদি- গের সন্নিকটস্থ হইলেন এবং অপরূপ রূপরাশি দর্শনে বিমুগ্ধ হইয়া ক্ষণকাল পুত্তলিকাবৎ নিস্পন্দ রহিলেন, পরিশেষে গঙ্গাতীর হইতে অঞ্জলিবদ্ধ করিয়া পুনঃ পুনঃ বারি আনয়ন- পূৰ্ব্বক তাহাদিগের মুখে প্রদান করায় ক্রমে ক্রমে উভয়ের চেতনা সঞ্চার হইল। রাজমহিষী সংজ্ঞা লাভানন্তর সম্মুখে জনৈক অপরিচিত ব্যক্তিকে তাঁহার শুশ্রুষায় নিযুক্ত দেখিয়া ভয়-
[ ১৭ ]
কাতরস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহাশয় আপনি কে? কি
নিমিত্ত এখানে আগমন করিয়াছেন ? এখানে কুমারীকেও
দেখিতে পাইতেছি, এ কি স্বপ্ন ?”
অনসূয়া। মা ! স্বপ্ন নহে,
ঐ
দেখুন সম্মুখে পৰ্বতাকৃতি
হস্তীর মৃত দেহ পড়িয়াছে, উহার প্রতি এখনও দৃষ্টিপাত করিলে
হৃদয় কম্পিত হয় ।
কন্যার কথায় বাধা দিয়া মহিষী আগন্তুকের প্রতি দৃষ্টিপাত
করিয়া বলিলেন ; “তবে কি মহােদয় আমাদিগকে এই আসন্ন
মৃত্যু হইতে রক্ষা করিয়াছেন? আপনার বলবীৰ্য্য প্রশংসনীয়,
এক্ষণে আপনি আমাদিগের যে উপকার করিয়াছেন, কি রূপে
তাহার প্রতিশােধ হইতে পারে ?”
আগন্তুক। মাননীয় ! আমি যে উন্মত্ত হস্তীর আক্রমণ
হইতে আপনাদিগের উভয়কে রক্ষা করিতে পারিয়াছি, ইহাই
আমার যথেষ্ট আনন্দের বিষয়, অন্য পুরস্কারের প্রত্যাশী নহি।
রাজমহিষী। না, তা কখনই হইতে পারে না। তাহা হইলে
সমস্ত জগৎ আমাদিগকে কৃতঘ্ন বলিয়া ঘােষণা করিবে। অন্য
আপনাকে আমাদিগের গৃহে আতিথ্য স্বীকার করিতেই হইবে,
এবং তথায় আপনার সাহসের প্রশংসাস্বরূপ উপযুক্ত পারি-
তােষিক প্রদত্ত হইবে। আমার কথা অগ্রাহ্য করিবেন না,
তাহা হইলে আমরা ধৰ্ম্মাহত হইব।
“মহিলা, আপনার কথা আমার শিবােধাৰ্য” এই কথi
বলিয়া যুবক রাজকুমারীর প্রতি সংগােপনে কটাক্ষপাত করি-
লেন। অনসূয়া রক্ষাকর্তার প্রতি নয়ন উন্মীলন করিয়াই
পরক্ষণে লজ্জাভরে অধােবদন হইলেন। কিন্তু তাঁহার হৃদয়ে
[ ১৮ ] কৃতজ্ঞতা ও বাধ্যতার লক্ষণ ক্ষণে ক্ষণে প্রতিফলিত হইতে লাগিল। রাজমহিষী, কন্যা সমভিব্যবহারে এক্ষণে গৃহাভিমুখে যাত্রা করিলেন, পুনঃ পুনঃ অনুরােধে অপরিচিত ব্যক্তি তাঁহাদের অনুগামী হইলেন। অনন্তর তাঁহারা ক্রমে ক্রমে পথ ঘাট অতিক্রম করিয়া, যে পথ দিয়া গ্রামে উপনীত হইতে হইবে, সেই পথে অগ্রসর হইতেছেন, এমন সময়ে অজ্ঞাত ব্যক্তি কৌতূহলাবিষ্ট হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আর কত দূর যাইতে হইবে, এই কথা শুনিয়া রাজমহিষী উত্তর করিলেন, “এই পথে আর গৃহাদি নাই, ওই যে সম্মুখে অট্টালিকা দেখিতে পাইতেছেন, উহাই আমাদিগের বসতি স্থান।” যদিও আমি এখানে সম্প্রতি আসিয়াছি, তথাপি ঐ বাটীটী বাজপ্রাসাদ বলিয়া আমার অনুমান হইতেছে। “, রাজপ্রাসাদই বটে, এবং উহাই আমার ভগৃহ।” রাজমহিষীর পরিচয় জ্ঞাত হইয়া অপরিচিত ব্যক্তি কোন প্রকার সম্মান প্রদর্শন করিলেন না, কিন্তু কুমারীর প্রতি সতৃষ্ণ- নয়নে দৃষ্টিপাত করিয়া, রাজরাণীকে বলিলেন “আপনি অদ্য আমাকে বিদায় প্রদান করুন। বিশেষ কাৰ্যবশতঃ স্থানান্তরে যাইতে হইবে; অন্য দিবস আসিয়া আপনাদিগের প্রাসাদে আতিথ্য স্বীকার করিব।” রাজমহিষী এই কথা শ্রবণে তাঁহাকে বহুমূল্যের পারি- তােষিক প্রদানের অঙ্গীকার করিয়া, অনুগামী হইবার জন্য বিশেষ অনুরােধ করিতে লাগিলেন। তিনি মহিষীর কথায় উত্তর করিলেন, “মহিষী! আমরা গৃহস্থ লােক, রাজসম্মানের [ ১৯ ] কদাচ উপযােগী হইতে পারি না ; অদ্য আমাকে ক্ষমা করুন, যেহেতু যে স্থানে যাইব বলিয়া পূৰ্বে অঙ্গীকারাবদ্ধ হইয়াছি, এক্ষণে আমাকে সেই স্থানে যাইতেই হইবে, কোন মতে তাহার অন্যথা করিতে পারিব না। আপনারা যে আমাকে প্রত- প্রফুল্লভাবে সম্ভাষণ করিয়াছেন, তদপেক্ষা আমার আর গৌরবের বিষয় কি হইতে পারে ?” অপরিচিত ব্যক্তির এইরূপ রাজসম্মানে বীতস্পৃহা দর্শনে রাজমহিষী সন্দিগ্ধচিত্তা হইলেন। অনন্তর কোন মতেই তিনি আতিথ্য গ্রহণে স্বীকৃত হইলেন না দেখিয়া, পরিশেষে তাহার সবিশেষ পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। অপরিচিত ব্যক্তি কহিলেন, আমার নাম বেনশাপুর, বসতি ইরান প্রদেশে, আমি জনৈক বণিকপুত্র, বাণিজ্য হেতু পণ্য দ্রব্য লইয়া আপনাদিগের রাজধানীতে এক্ষণে অবস্থিতি করিতেছি। অনন্তর রাজমহিষী কন্যাসহ গৃহাভিমুখে অগ্রসর হইলেন। বেনশাপুরও তথা হইতে গন্তব্য স্থানে প্রস্থান করিলেন। রাজকুমারী অনসূয়া প্রাণ-রক্ষকের সরলতা ও বদান্যতা দর্শনে পূৰ্বেই তাহার প্রতি আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন, এক্ষণে গৃহে যাইলে নিদ্রাবস্থায় দিবাভাগের ঘটনাবলী তাঁহার স্মৃতিপথে উদিত হইল। পরদিবস প্রভাতে রাজদরবারে পথে ও ঘাটে সকল স্থানেই বেনশাপুরের বলবীৰ্য্য কাহিনী ঘােষিত হইল। কনােজাধিপতি বাসুদেও, ওমরাও, সচিব, অমাত্য ও পারিষদবর্গে পরিবেষ্টিত হইয়া রাজসিংহাসনে সমাসীন হইয়া, সকল কাৰ্য কর্ম পরিত্যাগপূৰ্ব্বক [ ২ ] তাহার মহিষী ও কুমারীর রক্ষাকর্তা সেই বেনশাপুরের গুণ- কীৰ্ত্তন করিলেন। অনন্তর যে ব্যক্তির অতুল সাহস ও বিক্রমে তাঁহার পরিবারবর্গ আসন্ন-মৃত্যু হইতে উদ্ধার হইয়াছেন, তাহাকে রাজসভায় প্রকাশ্যভাবে সম্মান প্রদর্শন উদ্দেশে নগরপাল ও কোতােয়াল প্রভৃতি প্রহরীগণকে তাঁহার অনুসন্ধানাথ নিযুক্ত করিলেন। দেখিতে দেখিতে দুই চারি দিবস গত হইল, কেহই সে বীরপুরুষ সম্বন্ধে কোন সংবাদ প্রদান করিতে পারিল না। রাজা তঁাহার দর্শন লালসায় উৎকন্ঠিত ভাবে কালক্ষেপ করিতেছেন, এমন সময়ে, জনৈক বৃদ্ধা আসিয়া, কোতােয়াল সমীপে নিবেদন করিল যে, সেই ব্যক্তিকে তিনি রাজসমীপে নীত করিতে প্রস্তুত আছেন। তাঁহার মনে মনে সংস্কার ছিল যে, অবশ্যই বেনশা- পুর কোন গুরুতর অপরাধে অপরাধী হইয়াছে এবং নৃপতির তাহার প্রতি দণ্ডবিধান উদ্দেশেই এরূপ লােক জন দ্বারা সন্ধান লইতেছেন, এইরূপ সিদ্ধান্ত করিয়া ঐ বৃদ্ধা কোতােয়ালকে বলিলেন যে, সে ব্যক্তি প্রতিদিন সন্ধ্যাকালে হানিকার গৃহে আগমন করে এবং তথায় রাত্রি যাপন করিয়া পর দিবস প্রাতেই কাজকর্ম ছলে বাহিরে চলিয়া যায়, সবিশেষ বিবরণ বন্ন, রমণীর নিকট জানিতে পারিবেন। বন্ধু, কে ? সে ওই হানিকার অবিবাহিতা কন্যা, দেখিতে কৃষ্ণবর্ণ এবং স্বভাব চরিত্র বড় ভাল নহে। বৃদ্ধার প্রমুথাৎ সবিশেষ বিবরণ জ্ঞাত হইয়া কোতােয়াল সন্দিগ্ধচিত্ত হইলেন। যে ব্যক্তি উন্মত্ত হস্তীকে শর বিদ্ধ করিয়া [ ২১ ] ধরাশায়ী করিয়াছেন, যাহার সুখ্যাতি ধনী, গৃহস্থ ও দরিদ্র সক লের মুখেই প্রশংসার সহিত ঘােষিত হইয়া থাকে, তিন কি এইরূপ হীনপ্রকৃতি হইবেন? যাহা হউক, তিনি বৃদ্ধাকে পারিতােষিক প্রদানের অঙ্গীকার পূৰ্ব্বক বিদায় প্রদান করিয়া, যে পল্লীতে সেই হানিকার বাটী ছিল, তাহার সন্নিকটেই ছদ- বেশধারী দুই চারি জন প্রহরী রাখিয়াছিলেন এবং সন্ধ্যাকালে কোন অপরিচিত যুবক আসিয়া তথায় রাত্রিকাল অতি বাহিত করে কি না, সন্ধান লইতে বলিয়া দিলেন। বাজার শান্তি বিধান, অত্যাচার নিবারণ প্রভৃতি গুরুতর কার্যভার প্রহরীদিগের প্রতি ন্যস্ত থাকে, তাহাদিগকে সর্বদা সতর্কতার সহিত কাৰ্য্য করিতে হয়। অনন্তর দুই তিন দিবস অনুসন্ধানের পরেই তাহারা সেই অপরিচিত যুবককে রাজদরবারে আহ্বান করিয়া আনিল। ভূপতি বাসুদেও দূর হইতে সেই দুহিতা ও ভাৰ্য্যার রক্ষাকর্তার যােগী তুল্য দিব্যকান্তি দর্শনে পরম পুলকিত হইয়া তৎক্ষণাৎ প্রহরীদিগকে তাঁহার বন্ধনাদি খুলিয়া দিতে আদেশ প্রদান করিলেন এবং তাঁহাকে সাদরসম্ভাষণে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহাশয় ! আপনার অনুগ্রহেই আমার পরিবারবর্গ উন্মত্ত হস্তীর আক্রমণ হইতে উদ্ধার পাইয়াছে, এক্ষণে অভিলাষমত পুরস্কার প্রার্থনা করুন, এইদ্দণ্ডে তাহা পূর্ণ করিতে আমি বাধ্য আছি।” বেনশাপুর রাজসমীপে দণ্ডায়মান হইয়া নৃপতির প্রতি যথাযথ ভক্তি সম্মানাদি কিছুই প্রদর্শন করেন নাই। অধিকন্তু তাঁহার মুখশ্রীতে গভীর অহঙ্কার ও প্রগলভতার চিত্র অঙ্কিত ছিল ; এক্ষণে তাহার প্রতি ভূপতির আদেশ শ্রবণে স্মিতবদনে [ ২২ ] উত্তর করিলেন, “রাজন্ ! আপনার নিকট আমার অভাবের কথা কি জানাইব? ধন, মান ও সন্ত্রম আর কিছুতেই প্রয়াে- জন নাই, তবে যদি একান্ত আমাকে পুষ্মের গ্রহণের নিমিত্ত অনুরােধ করেন, তাহা হইলে, অন্যান্য অপরিচিত বণিকের প্রতি আপনি যেরূপ সদয় ব্যবহার করিয়া থাকেন তাহাই করুন, অন্য আবেদন কিছুই নাই।” এত অতি সামান্য কথা। তুমি ইহা ব্যতীত অন্য বিষয়ের জন্য অনুরােধ কর। আমি পূৰ্বেই অঙ্গীকার করিয়াছি যে, তােমার আবেদন অবশ্য পূর্ণ হইবে। ভূপতির প্রমুখাৎ এই সকল কথা শ্ৰণ করিয়া বেনশাপুর সানন্দচিত্তে উৎসাহ সহকারে রাজসমীপে জ্ঞাপন করিলেন যে, যে রাজকুমারী তাহার হস্তে সে দিবস মহিষীর সহিত রক্ষা পাই- য়াছেন, এক্ষণে তিনি তঁাহার পাণিগ্রহণে একান্ত অভিলাষী ; অতএব যদ্যপি তাহার আবেদন পূর্ণ করিতে একান্ত মানস থাকে তাহা হইলে ললনাকে তাহার হস্তে প্রদান করিলে তিনি কৃতার্থ হইবেন। বাদেও আগন্তুকের এইরূপ অহঙ্কার পূর্ণ বাক্য শ্রবণে প্রচ্ছ- লিত অনলশিখাবৎ কুপিত হইলেন। সভাস্থ ওমরাওগণও তাহার প্রতি ঘৃণাব্যঞ্চক দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল। কিন্তু উপ- কারকের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করিলে ধৰ্ম্মে পতিত হইতে হইবে জানিয়া, ভূপতি জোধ সম্বরণপূৰ্ব্বক বেনশাপুরকে সম্ভাষণ করিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, আমি স্বজাতীয় ধর্মের ও আত্মীয় স্বজনের উপেক্ষা করিয়া, যদ্যপি কুমারীকে তােমার হস্তে সমৰ্পণ করি, তাহা হইলে, পরিণামে বালিকার দশা কি হইবে? পরিচয়ে [ ২৩ ] জ্ঞাত হইয়াছি যে, তুমি জনৈক বণিক পুত্র, রাজকুমারী লইয়া স্বচ্ছন্দে দিনাতিপাত করিবার তােমার ক্ষমতা কোথায় ? উৰ্ব্বর ক্ষেত্ৰজাত লতিকা, স্থানান্তরিত করিয়া, মরুভূমিতে রােপন করিলে, তাহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কোথায় ?” নৃপতির কথা কর্ণগােচর হইবামাত্র, বেনশাপুর সদর্পে উত্তর করিলেন, “ভূপতি! মাননীয় ও ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের কথার স্থিরতা নাই, আপনি এই মাত্র আমার প্রার্থনা পূর্ণ করতে প্রতিশ্রুত হইয়া, পরক্ষণে তাহার বিপরীতাচরণ করিলেন, তবে এই মাত্র বলিতে পারি যে, রমণীরত্ন আমার হস্তে অর্পিত হইলে, তঁাহার চিত্তবিনােদনে কোন অংশেই ত্রুটি করা হইবে না। আর আপনার গৃহে সে যেরূপ সুখসচ্ছন্দে আছে, আমার নিকটেও সেইরূপ থাকিতে পারিবে। যাহা হউক এক্ষণে ম. শগের সমীপে আমার অন্য কোন প্রয়ােজন নাই, স্থানান্তরে চলিলাম।” এই কথা বলিয়া, বেনশাপুর রাজসভা হইতে নিষ্টান্ত হইয়া চলিয়া যাইতেছেন দেখিয়া, ওমরা ওগণ তাঁহাকে বাতু: বিবেচনায় দুই একটী পরিহাস-সূচক উক্তি প্রয়ােগ করিলেন । তিনি তাহাদিগের কথায় কর্ণপাত না করিয়া, স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। অনন্তর বাসুদেও যথাসময়ে রাজকাৰ্য্য নিৰ্বাহ করিয়া সভা- স্থলে গীতবাদ্যাদির আয়ােজন করিতে আদেশ প্রদান করিলেন । নৃপতির অনুমতিক্রমে বাদ্যকর, গায়ক ও নর্তকী দলে সহ পূর্ণ হইল। তৌত্রিক আমােক প্রমােদে সময় অতিবাহিত হইতেছে, মধ্যে মধ্যে রহস্য স্থলে দুই একটা কথার উত্থাপন হইয়া [ ২৪ ] সভাগৃহ বিকট-হাঙ্গের ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হইতেছে, এমত সময়ে নৃপতি, তাঁহার বৃদ্ধ পারিষদ-মণ্ডলীর প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া, শিমন্ত নামক জনৈক সহচরকে সম্ভাষণান্তর জিজ্ঞাসা করিলেন যে, আজি তাহার চিত্ত কিছুতেই প্রসন্ন হইতেছে না। সঙ্গীত বাদ্য প্রভৃতি আমােদ প্রমােণ সমুদায়ই তাহার বিরক্তি- জনক বােধ হইতেছে, এক্ষণে নুতন কিছু সংবাদ জানিতে উৎ- সুক হইয়াছেন। ভূপতির প্রমুখাৎ এই সকল কথা শ্রবণ করিয়া শিমন্ত নৃপ-সন্নিধানে গমনান্তর নিবেদন করিল যে, তাহার নিকট নূতন সংবাদ আছে, কিন্তু সকলের সম্মুখে সেই সকল কথা উল্লেখ করার তঁাহার ইচ্ছা নাই। বাসুদেও এই কথা শুনিয়া, তদ্দণ্ডে সভাভঙ্গের আদেশ প্রদান করিলেন। ওমরাও সচিব, অমাত্য, পারিষদ প্রভৃতি সভাস্থ পুরুষবর্গ সকলেই তথা হইতে, স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিল এক্ষণে কেবল মাত্র সভাগৃহে রমণীবর্গ ও শিমন্ত রাজসমীপে উপস্থিত রহিল । অনন্তর নৃপতি শিওমস্তকে গুপ্ত কথা প্রকাশ করিতে অনু- বােধ করিলেন। তাহাদিগের উভয়ে পরস্পর কি কথা বার্তা হইল, সভ্য মণ্ডলী তাহার বিন্দুমাত্রও জ্ঞাত হইল না; দুই এক জন সচিব সবিশেষ বিবরণ জানিবার জন্য উৎসুকচিত্তে রাজ- সমীপন্থ বার্তাবহুদিগকে নিকটে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কিন্তু তাহারা যে দুই চারিটী কথা তাহাদিগকে জ্ঞাপন করিল, তাহাতে কোন বিষয়ের সমস্ত বিবরণ প্রকাশ পাইল না; তাঁহারা এই মাত্র জানিতে পারিলেন যে কোন ব্যক্তির পরিচয় নৃপতি [ ২৫ ] শিমন্তকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন। এই সময় হইতে মধ্যে মধ্যে সংগােপনে ভূপতির সহিত শিওমন্তের প্রায় কথাবার্তা হইত ; এক দিন তাহারা নিভৃত গৃহে পরস্পর কথা কহিতেছেন এমত সময়ে নগরপাল গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট হইল। রাজা তাঁহার এবম্বি গর্হিত কাৰ্য্য দর্শনে সাতিশয় বিরক্ত হইয়া ক্রোধান্বিত ভাবে নগর পালের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। নগরপাল অতীব অন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছেন, ইতিপূর্বেই বুঝিতে পারিয়াছিলেন । এক্ষণে ভূপতির সহিত সাক্ষাৎ হওয়ায় কৃত অপরাধের নিমিত্ত ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া সভয়চিত্তে নৃপতি সন্নিধানে জ্ঞাপন করিলেন যে, একজন বিধর্মী পুরুষ মহাদেবের মন্দির মধ্যে রাত্রিতে শয়ন করিয়াছিল এবং রাজলক্ষ্মীর পূজার কারণ যে, প্রস্রবণ নিম্মিত আছে, তাহার জলধারায় হস্তপদাদি প্রক্ষালন করিয়াছিল ; এক্ষণে জনৈক প্রহরীর হস্তে তাহাকে সংরক্ষণ করিয়া রাজসমীপে এই সংবাদ প্রদান করিতে সত্বর বেগে উপস্থিত হইয়াছি। নৃপতি নগরপালের কথায় ক্রোধান্বিত হইয়া বলিয়া উঠিলেন নরাধম ! তুই সেই পাপিষ্ঠকে এখনও জীবিত রাখিয়াছি, আচ্ছা এই দণ্ডে তাহাকে আমার সম্মুখে লইয়া আয়, আমি অসি প্রহরে তাহাকে ও তােকে যমালয়ে প্রেরণ করিয়া হৃদয়ক্ষোত নিবৃত্ত করি। বাসুদেওর কথায় নগরপাল তথা হইতে তড়িতের ন্যায় প্রস্থান করিয়া অনতিবিলবে সেই অপরাধীকে ধৃত করিয়া নৃপতি সন্নিধানে উপনীত হইল। অনন্তর রাজা দূর হইতে অপরাধীকে তাহার সেই উপকারী ব্যক্তি জানিতে পারিয়া বন্ধন উন্মােচন করিতে আদেশ প্রদান করিয়া তাহাকে সন্নিকটে লইয়া আসিতে [ ২৬ ] বলিলেন। অপরাধী নৃপসমীপে নীত হইলে, তিনি তাহাকে সম্ভাষণন্তির জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি যবন ! হিন্দুর পবিত্র দেব- মন্দিরে কি নিমিত্ত রাত্রিকাল অতিবাহিত করিলে? আমরা লক্ষ্মী- দেবীকে ভাগ্য দেবী বলিয়া পূজা করিয়া থাকি, তাঁহার পূজার কারণ যে জল সঞ্চিত ছিল, তাহাতে হস্তপদাদি প্রক্ষালন করিয়া অপবিত্র করিবার কারণ কি? বেনশাপুর কহিল রাজন্ ! আপনি নিগ্রহগ্রহসমর্থকারী ; যাহার প্রতি যেরূপ আদেশ বিধান করিবেন, তদ্দণ্ডে তাহা সাধিত হইবে। ইচ্ছা করিলে আমাকে এই দণ্ডে কাল গ্রাসে নিক্ষিপ্ত করিতে পারেন, কিন্তু আমি মৃত্যু ভয়েও শঙ্কিত নহি ; যেহেতু ইহসংসারে এই নশ্বর দেহের পতন হইবে, পরমাত্মার লর নাই ; এক্ষণে কৃপা করিয়া সবিশেষ বিবরণ জ্ঞাত হইয়া আমার প্রতি দণ্ডজ্ঞা করুন, আমি প্রসন্ন চিত্তে এ জীবন উৎসর্গ করিতে প্রস্তুত ; আছি। নৃপতি এই কথা শুনিয়া তাঁহাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন “আচ্ছা! তােমার এই গর্হিত কাৰ্য্য করিবার কারণ নির্দেশ কর, আমি তােমার প্রতি যথাযথ প্রতিবিধান করিব। তজ্জন্য চিন্তিত হইও না।” বেনশাপুর কহিলেন, “রাজন্ রাত্রি যাপনের স্থান লাভে বঞ্চিত হইয়াই আমি সেই পবিত্র মহাদেবের মন্দিরে শয়ন করিয়া- ছিলাম, আর লক্ষ্মীদেবীর পূজার নিমিত্ত যে সলিলরাশি সঞ্চিত ছিল, তাহা আমি জ্ঞাত ছিলাম না, তাহা হইলে কদাচ তাহা স্পর্শ করিতাম না; এক্ষণে কৃতাপরাধের কারণ অনুতাপিত চিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।” ;
[ ২৭ ] অন- বেনশাপুর এইরূপ ভাবে কাতরােক্তি করিতেছেন, দেখিয়া জনৈক প্রহরী তঁাহার কথায় আপত্তি উত্থাপন করিয়া বলিল— “রাজন্ ! আপনি ও মহাপাতকীর কথায় বিশ্বাস করিবেন না।” কিন্তু বাসুদেও তাহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না। স্তর মন্দিরের পুরােহিতকে ডাকাইয়া গঙ্গাসলিলে মন্দির ও প্রস বণের সমস্ত ভাগ ধৌত ও তথায় বেদ, শ্রীমদ্ভাগবতাদি অধ্যয়ন এবং মহাদেব ও লক্ষ্মী দেবীর অভিষেক করণে আদেশ প্রদান করিলেন। বেনশাপুর এতাবৎকাল সন্দিগ্ধচিত্তে কালক্ষেপ করিতে ছিলেন, এক্ষণে নৃপতি পুনরায় তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভাল, শুনিয়াছি তুমি এখানে আসিয়াবধি জনৈক মুচির বাটীতে রজনী যাপন করিতে, এক্ষণে কি নিমিত্ত এরূপ হইল।” বেনশাপুর। রাজন্ ! সকলই অদৃষ্টের উপর নির্ভর করে, যে স্থানে এ কয়েক দিন রাত্রিকালে থাকিবার নিমিত্ত আশ্রয় পাই- ছিলাম ; গতকল্য হইতে সে আশ্রয়ে বঞ্চিত হইয়াছি, গৃহস্বামী আমাকে তথায় যাইতে নিষেধ করিয়াছেন। এইরূপ কথা বার্তা চলিতেছে, এমন সময়ে যে ব্যক্তির গৃহে বেনশাপুর গত কয়েক দিবস নিশাকালে আশ্রয় পাইয়াছিলেন, সেই হানিক, ভূপতি সমীপে উপনীত হইয়া নিবেদন করিল, “মহা- রাজ! বেনশাপুর নিরীহ ভদ্রলােক, তিনি বাণিজ্য সূত্রে এই স্থানে আগমন করিয়া আমার বাটীর একটী গৃহ ভাড়া লইয়া রাত্রিকালে তথায় শয়ন করিয়া থাকিতেন, কিন্তু পল্লীস্থ লােক- দিগের কুচক্রে তাঁহার পবিত্র নামে কলঙ্ক অর্পিত হইয়াছে।
[ ২৮ ] লােকে এইরূপ ঘােষণা করিয়াছে যে, উক্ত ব্যক্তি আমার কন্যা বন্ধুর প্রতি আসক্ত, স্ত্রীলােকের চরিত্র দর্পণের সদৃশ, একবার ভঙ্গ হইলে তাহার সংস্কারের আর সম্ভাবনা নাই। এক্ষণে যথাযথ বিচার করিয়া রাজধর্ম পালন করুন।” নৃপতি সবিশেষ বিবরণ জ্ঞাত হইয়া কাহারও প্রতি কোনরূপ দণ্ড বিধান করিলেন না; জনমানবের সমাগম অপেক্ষাকৃত হ্রাস হইয়া পড়িল ; এই সময়ে বেনশাপুর নৃপসন্নিধানে বিদায় গ্ৰহণানন্তর প্রস্থান করিবার উদ্যােগ করিতেছিলেন, এমত সময়ে শিমন্ত রাজাকে সম্ভাষণানন্তর বলিল, “মহারাজ! আর বেনশা- পুর সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাই, তৃতীয় সাপুরের পুত্র বায়রাম ঘাের পারস্যে অবস্থিতি করেন,ইনি সেই মহাপুরুষ। আপনার পিহার কাৰ্য্য নিবন্ধন কতবার আমি উহার সমীপে গমন করিয়া- ছিলাম, তৎকালে বেনশাপুর দশ বার বর্ষ বয়স্ক বালক মাত্র, বহু দিন পরে সাক্ষাৎ হইল বলিয়া এতাবৎকাল জানিতে পারি নাই। শিমন্ত প্রমুখাৎ বেনশাপুরের বিবরণ জ্ঞাত হইয়া কনােজা- ধিপতি সিংহাসন হইতে অধিবােহণানন্তর স্বীয় উষ্ণীষ ও পরি- চ্ছদে ভূষিত করিয়া বেনশাপুরকে সিংহাসনারূঢ় করাইয়া যথেষ্ট প্রতি সন্দর্শন করাইলেন ; এক্ষণে আনন্দ উৎসবে রাজধানী প্রতিধ্বনিত হইল। কিন্তু কনােজকুমারী বহুকালাবধি বেনশাপুরের সহিত বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হইবেন মনে মনে সঙ্কল্প করিয়া অবশেষে পিতার অনুমতি অনুসারে সাশানিয়ান বংশীয় জনৈক যুবককে পতিত্বে বরণ করিলেন। দম্পতীর পরস্পর কিরূপ সদ্ভাবে দিনাতি- পাত হইয়াছিল, তাহার সবিশেষ পরিচয় ইতিহাসে উক্ত নাই।
( ৩ )
কুমিকা।
- ০ ০ ০
প্রথম পরিচ্ছেদ
গােবিন্দপুরের প্রান্তরের মধ্য দিয়া একদিন চৈত্রমাসের দুই
প্রহরে দুই ব্যক্তি যাইতেছিলেন। দুইটিই যুবক, বয়স আন্দা
২৫/২৬ বৎসর। একজনের পরিধান রেলির থান, একটা সদা-
ধৌত কানিজ, উহাতে হাতের ও গলার নােম নাই, !
লংক্লতের মােটা মুড়ি সেলাইকরা চাদর, পায় চটা। অপরে
পরিধান পেণ্টলান, অল্পিাকার চাপকান ও চোগ।
সবই শ বিলম্বিত, চক্ষে চসমা।
একজনের নাম বিনােদ, অপরের নাম গোপাল। উভয়ে
স্বদেশ উদারত্ৰতে জীবন দান করিয়া বহুদিন হইতেই গৃহত্যা
বিনোদ বাবু ভারতে সত্য নিরাকার ব্রহ্মের পূজা প্রচার মান
বহুকাল হইতেই হিন্দুর পুতুলদিগের যথেষ্ট কুৎসা গাই
আসিতেছেন। গােপাল বাবু দেশে রাজনৈতিক আন্দো-
উত্তোলিত করিয়া ভারতকে হিমালয় হইতে কুমারিকা পৰ্য্য
কম্পিত করিবেন, তঁাহার হুঙ্কারে ইংরেজগণ তটস্থ হইবে অব
শেষে ভারতের উদ্ধার হইবে—এই কঠিন ও মহব্রুতে তিনি
জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন।
[ ৩ ] চৈত্র মাসের রৌদ্র,দারুণ উত্তাপ। জীব জন্তু বৃক্ষ-ছায়ায় আশ্রয় লইয়াছে। প্রান্তরে একটী কৃষক ও নাই, কেবল দুরে একটা প্রান্তরে একজন কৃষক চাষ করিতেছে। গােপাল বাবু ছাতির অভাবে রৌদ্রে নিতান্ত উৎপাড়িত হইয়া বলিলেন, “একটা ছাতি থাকিলে ভাল হইত।” এই কথা শুনিয়া বিনােদ বাবু একেবারে চমকিত হইয়া বলিলেন, “ছি ! ছি ! গােপাল, ওকথা বলিও না। যে ভারত উদ্ধারব্রতে ব্ৰতী হইয়াছ তাহাতে রৌদ্রের ভয় করিলে চলিবে না। এইরূপ রৌদ্রে কত যুদ্ধ করিতে হইবে” গােপাল লজ্জিত হইয়া বলিলেন, “আমি ঠিক তা বলিতেছিলাম না।” বিনােদ তাহার কথায় কর্ণ- পাত না করিয়া বলিতে লাগিলেন, “এই দেখ না, ঈশ্বরের কাৰ্য্যেই আমরা এমনই নিমগ্ন হইয়াছি যে, আমাদের আর শীত গ্রীষ্ম বোধ নাই। আমরা যে সাধনায় সিদ্ধ হইয়া গিয়াছি। গােপাল ! যদি ভারত উদ্ধার করিতে চাও, তবে আমাদের মত শরীরের অস্তিত্ব ভুলিয়া যাও।” গােপাল। তুমি যা বলিলে, বিনােদ, সকলই সত্য। ভারত উদ্ধারে আমি সক্ষম কি না, আইস পরীক্ষা কর। আস্তেন গুড়াও, কম অন ফাইট। যুদ্ধং দেহি। এই দুপুর রৌদ্রে দেখ আমি কেমন ফাইট লড়িতে পারি। বিনােদ। বাখানি সাহস তাের, রে ভাবী গৌরব, ভারতের ধন্য সুত, বিনােদবিহারি। কিন্তু বিবাদে প্রয়ােজন নাই, আমরা যুদ্ধ করিব না। আমাদের ধৰ্ম্মের মূল মন্ত্র “অহিংসা পরমং ধৰ্ম্মং” তখন দুইজনে অদূরস্থিত গ্রামাভিমুখে যাত্রা করিলেন। গ্রামের নিকট আসিয়া গ্রাম
[
৩১ ]
বাসীদিগকে দেখিয়া গােপাল দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলি-
লেন, “বিনােদ, দেখ দেখ, অভাগাদের দুর্দশা দেখ। এদের
দুঃখ দেখে বুক ফেটে যায়। কারও গায়ে জামা নাই, কাট
পেন্টলানের কথা তত দূরে থাক—কারও পায় জুতা মােজ।
নাই। আহা, লেডীদের সুদু পায় চলে যেতে না জানি কি
কষ্ট হচ্চে? ইংরেজ, রে পাষণ্ড ইংরেজ, তােরা দেশের কি
সর্বনাশ করেছি দেখে যা। বিনােদ! ভারত হতে ইংরেজকে
দূর কর্তে পাল্লে । আমার আর নিদ্রা নাই।” এদিকে বিনােদ
বাবু ভেউ ভেউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন, কঁদিতে কাদিতে
বলিলেন, “ভাই গােপাল, দেশের লােকের কুসংস্কার দেখ ;
ঐ দেখ একটা বট গাছের গায় সিঁদুর লাগাইয়া ঐ গাছটাকে
দেবতা ভাবিয়া পূজা করিতেছে। সয়তানের পূজা করিতেছে,
আর আমার বাবার কথা একবারও ভাবিতেছে না। আর
করুণাময় পিতাকে ভুলিয়া আছে। একি আমার প্রাণে সয় ।
নাথ, আমার হৃদয়ে বল দেও, দীনবন্ধু, তুমি কোথায় ! নিন
দয়াল, একবার দেখা দাও”। এই বলিয়া বিনােদ বাবু চক্ষু
মুদিত করিয়া উপাসনা আরম্ভ করিলেন।
এই সময়ে সেই পথ দিয়া একটী পল্লিবাসিনী অবগুণ্ঠন
বদনাবৃত করিয়া চলিয়াছেন দেখিয়া, গােপাল বাবু বিনেদ
বাবুকে ধাক্কা মারিলেন, তিনি চমকিত হইয়া চক্ষু মেলিয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন, “ব্যাপার কি ?”
গােপাল। একজন লেডী এই দিকে আসিতেছেন।
বিনােদ। পথ ছাড়িয়া দাও, পথ ছাড়িয়া দাও। লেীর
সম্মান সৰ্ব্বদা রক্ষা করিতে হইবে।
[ ৩২ ]
গােপাল। লেডীকে ডান দিকের পপ ছাড়িয়া দিতে হইবে
ব দিকের পথ ছাড়িতে হইবে।
বিনােদ। এই যে আমার পকেটে বটনসের এটিকেটের
বই খানা রয়েছে। দেখে এখনই বলিয়া (তেছি।
বিনােদ বাবু পকেট হইতে বই লিয়া পাতা উল্টাইতে
লাগিলেন। ইতিমধ্যে রমণী ও তাহাদের নিকটস্থ হইলেন।
গত রজনীতে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছিল। পথের মধ্যে একস্থানে
একটু কর্দমও জমিয়াছিল ; দেখিয়া গােপাল বাবু দুঃখিত স্বরে
কহিলেন, বিনােদ, লেভী এই কাদার উপর দিয়া কেমন
করিয়া নাইবেন ? তাও কি কখন সম্ভব ? তবে আমরা
এখানে উপস্থিত আছি কেন ? আমরাতাে অসভ্য গ্রাম্য পশু
নই। দি গেলা িণ্ট শিখিলাম না, তবে ব্যালের লাইক পড়িয়া-
ছিলাম কেন ? সার ওয়ালটার র্যাবে, রাণী এলিজাবেথকে
দেখি বাহা করিয়াছিলেন, আমি অজ তাহাই করিয়া অমর
হইব। এই বলিয়া গােপাল বাবু সত্বর পদে সেই কমের
নিকটস্থ হইয়া দাড়াইলেন। যেমন রমণী কর্দমের সম্মুখে
আসিলেন, অমনি মুহুৰ্ত মধ্যে নিজ চোণ। খুলিয়া সেই কদ:-
নের উর পাতিয়া দিয়া বিনােদ বা বলিলেন; “ঐ ঢোগার
উপর নিন! যান। আসুন, আমি হাত ধরিয়া আপনাকে পার
করিয়া দিতেছি। আর যদি অনুমতি করেন, তাহলে আমি
মােষ্ট ছিলি আপনাকে এসকট করে বাড়ী রেখে আসিব।”
রমণী পরপুরুষ কর্তৃক এরূপ ভাবে সম্ভাষিত হইয়া চীৎকার
করিয়া উঠিল। মুহূৰ্ত মধ্যে গ্রামবাসী চাষাগণ লগুড় হস্তে
সেই দিক ছুটিল। তাহারা নির্দয়ভাবে বিনােদবাবু ও গােপাল
বাবুকে গােবেড়েন করিল। বিনােদ বাবু চীৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন, “বন্ধু সকল, সভ্য মহােদয় সকল, আমরা আপনাদের বন্ধু,আমরা আপনাদের কষ্ট দূর করিতে আসি, য়াছি।” গােপাল বাবু নিরুপায় ! কেবল আর্তনাদ করিতে লাগিলেন। “শালারা, মেয়েছেলের সঙ্গে ন্যাকরা ?” এই বলিয়া চাষার দুই স্বদেশ হিতৈষীকে বেদম প্রহার দিয়া গৃহে ফিরিল । সেই দিনই প্রচার কাৰ্য্য ত্যাগ করিয়া বন্ধুদ্বয় সন্তপ্ত হৃদয়ে কল- কাতায় পলাইলেন। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সিমলার হেদোর ধার। একটী মধ্যম গােছের অট্টালিকা। এই বাটীতে বৃদ্ধ রাম বাবু বাস করেন। রাম বাবুর একটী ছেলে মার একটি মেয়ে। ছেলেটীর নাম প্রফুল্ল, মেয়েটীর নাম কুসু মিকা। বৃদ্ধ রামবাবু যদি স্বাধীন হইতেন তবে ছেলে মেয়ের এরূপ ঔপন্যাসিক নাম হইত না। তাঁহার স্ত্রী শিক্ষিতা, তিনি ‘রাম মাণিক্য” বা “ত্রিপুৱাসুন্দরী” নাম প্রাণ থাকিতেই রাখি বেন না। যাহাই হউক, যাহবার তা হইয়া গিয়াছে,এখন রাম বাবুর স্ত্রী স্বর্গে গিয়াছেন, সুতরাং তাহার উপর রাগ কর। কর্তব্য নয়।
[ ৩৪ ] রাম বাবু সুখী নন। তাহার অতুল ঐশ্বৰ্য্য, কিন্তু তাতেও তিনি সুখী নন,-কারণ তাঁহার মেয়েটী অল্প বয়সে বিধবা হইয়াছে, ছেলেটী হিন্দুধর্ম ত্যাগ কবি ব্রাহ্ম হইয়া গিয়াছে। উপায় নাই, উপায় থাকিলে রাম বাবু বৃদ্ধ বয়সে এত কষ্ট পাই- তেন না। বলা বাহুল্য দাদার দেখাদেখি কুসুমিকাও সভ্য- তার আলােক পাইয়াছে, তাহার বয়স এই ১৫/১৬ মাত্র। প্রথম পরিচ্ছেদের উল্লিখিত ঘটনার এক সপ্তাহ পরে এক দিবস দুই প্রহরের সময় গােপাল বাবু আসিয়া রাম বাবুর বাড়ী দেখা করিলেন। রাম বাবু তখন অহিফেন সেবনে ফুরসির নল মুখে করিয়া সুখে নিদ্রাদেবীর অর্চনা করিতেছিলেন। দেখিয়া গােপাল বাবু টিপিয়া টিপিয়া প্ৰকুল্লের বসিবার ঘরে চলিয়া গেলেন। প্রফুল্ল বাড়ীতে ছিলেন না। কুসুমিকা এক খানা ইজি চেয়ারে বসিয়া দুই দিকে পা তুলিয়া দিয়া ষ্টেটম্যান কাগজ পড়িতেছিলেন। গােপাল বাবু গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া গুড মর্নিং বলায় কুমিকা মৃদু হাস্য করিয়া বলিলেন, “ওয়েল কাম, ডিয়ার ফেণ্ড। কোথায় ছিলে এতদিন?” গােপাল বাবু হস্ত বিলােড়ন করিয়া পার্শ্বে বসিয়া বলিলেন, “আপনি কি শুনেন নাই, মাই ডিয়ার ফেণ্ড ?” কুসু। কই কিছুই না। আপনিই তাে আমাকে বন্ধু বলে মনে করেন না। গােপাল। আর ও নির্দয় কথায় আমার বুকে যেন তীর বিদ্ধ হ’ল। আপনাকে আমি কিছু বলি না। এ সংসারে তবে আর কাহাকে বলিৰ ?
[ ৩৫ ]
কুসু। আমি জানি আপনি আমাকে ভাল বাসেন।
| যদি দেখাবার হত তা দেখাতেম।
গোপাল। আমার বােধ হইতেছে যেন, আপনার কথা।
সঙ্গে সঙ্গে আমি স্বর্গে যাচ্চি।
কুসু। যাহক, এখন কোথায় গিয়াছিলেন, তাই বলুন।
গােপাল। এবার পল্লিগ্রামে মিসনে গিয়াছিলাম । অ'হা
fড়াগেয়ে লােকের কি দুর্দশা। মাইডিয়ার ফ্রেণ্ড তাদের
দুর্দশা বর্ণনা করা যায় না।
কুস্থ। আপনার গায়ে এসব দাগ কিসের ?
গােপাল। আপনাকে সে এডভেনচারের কথা এখনও বলা
যাই ? পথে প্রায় দুইশত ডাকাত আমাদের উপর পড়ে। আমি
প্রায় দুঘণ্টা সেই নর রাক্ষসদের সঙ্গে লড়াই করে, তবে তাদের
রি করেছি।
কুসু। আমার একটী বন্ধুর এরূপ বীরত্বের কথা শুনে আমার
প্রকৃতই এন্টাসি (আনন্দ) হচ্চে।
গােপাল। হবার কথাও বটে। প্রফুল্ল বাবু কোথায় ?
কুসু। তিনি বােধ হয় লেডী স্কুলে পড়াতে গেছেন।
গােপলি। তা হলে, বন্ধু এখন যাই।
মৃদু। যাই বলিবেন না, আসি বলুন।
গােপাল বাবু প্রস্থান করিতে না করিতে বিনােদ বাবু সেই
গৃহে প্রবেশ করিলেন। কুমিকা তাহার হস্ত বিলােড়ন করিয়া
সাদর সম্ভাষণের পর বলিলেন “আসুন, আসুন, আমার ভোর
ডিয়ার ফ্রেণ্ড আসুন। আপনাকে এই কদিন না দেখে To
speak the truth আমার হৃদয়ে একরূপ বেদনা হয়েছিল।
৩
[ ৩৬ ]
বিনােদ। কি সৌভাগ্যবান্ পুরুষ ! কি সৌভাগ্যবান্ পুরুষ
আমি! ভগিনী, আমায় অনুমতি কর, আমি একবার করুণা-
ময়কে ইহার জন্য ধন্যবাদ দি।
এই বলিয়া বিনােদ বাবু সেই খানে জানু পাতিয়া বসিয়া চক্ষু
মুদিত করিয়া বিধাতাকে ধন্যবাদ দিতে আরম্ভ করিলেন। এই
সময় তথায় আর একজন প্রবেশ করিলেন, ইনি প্রফুল্ল বাবু।
বাবু টলিতেছেন। তাঁহার মুখ হইতে সুরার কঠোর গন্ধ
নির্গত হইয়া সমস্ত গৃহ দুর্গন্ধময় করিল। তিনি বিনােদ বাবুকে
দেখিয়া সানন্দে তাঁহার নিকটে আসিয়া তাহার গলা জড়াইয়া
তাঁহাকে চুম্বন করিলেন। তৎপরে বলিলেন, “কোথায় ছিলে,
আমার নয়নের মণি ?” বিনােদ বাবু চমকিত হইয়া চক্ষু মেলি-
লেন। দেখিয়া প্রফুল্ল হাসিয়া বলিলেন, কুসুম,—সেই বােতলটা
লার করে ফ্রেণ্ড বিনােদকে একটু ঢেলে দাও।”
বিনােদ। প্রফুল্ল বাবু, আমি তাে সুরাপান করি না।
প্রফুল্ল। ইউ ষ্টুপিড,--আমরাও কি খাই ?
কুসুম বােতল গ্লাস বাহির করিয়া টেবিলের উপর রাখিল।
দেখিয়া বিনােদ বাবু প্রলােভিত হইয়া বলিলেন, “ডিয়ার ফেও
কুসুম। আমার আজ একটু অসুখ হয়েছে ?”
প্রফুল্ল। বটে? তবে মেডিসিন ভােজ, খাও।
বিনােদ বাবু কুসুমিকার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “আপনি
কি বলেন। মেডিসিন ডােজে খেলে কি দোষ আছে ? শাস্ত্রে ও
বলে ঔষধার্থে সুরাপান, ন দোয়।”
কুষ। না, তাতে আর দোষ কি?
বিনােদ। তবে আপনি অগ্রহ করে গ্লাসে টাতে পারেন।
[ ৩৭ ]
কুসুম আউন্সটাক গ্লাসে ঢালিল, দেখিয়া বিনােদ বাবু বলিলেন
“মেডিসিন ডােজ হয়েছে কি ? বােধ হয় না। একটু কম হয়েছে
বলে বােধ হয়। কি বল প্রফুল্ল ?
প্রফুল্ল। ঠিক বলেছ ? আরও ঢাল।
কুসুম প্রায় অর্ধ গ্লাস ঢালিল। বিনােদ বাবু গ্লাসটা তুলি
লইয়া দূরে ধরিয়া বেশ করিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিয়া বলিলেন
“এও ঠিক মেডিসিন ডােজ হয় নি? কি বল প্রফুল্ল ? একটু
কম হয়েছে না?”
প্রফুল্ল কুসুমের হস্ত হইতে বােতল কাড়িয়া লইয়া গ্লাস পূণ
করিলেন; পরে নিজের গ্লাসও পূর্ণ করতেন। তৎপরে দুই
জনে পান করিয়া নাচ আরম্ভ করিলেন। কুমিকা পিসানে।
বাজাইতে লাগিল।
মৃত্যের গােলযােগে বৃদ্ধ রাম বাবুর নিদ্রা ভাঙ্গিয়া গো ।
তিনি ছেলের বাপান্ত করিতে করিতে চাকরকে তামাক দিয়া
যাইতে বলিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
গােপাল বাবু নিজ বাটীতে বসিয়া চিন্তা করিতেছেন
তিনি ভাবিতেছেন, “আর দেরি করা নয় ? কি জানি শেষ কি
হইবে। বিনােদটাও আমার হৃদয়ের রত্ন কুসুমিকাকে কোর্ট সিপ
কচ্চে। শেষ যদি ও আগেই প্রপােজ করে ফেলে ! যদি তাহলে
[ ৩৮ ]
আমার হৃদয়শশী ওরই পাণিগ্রহণে সম্মত হইয়া পড়েন। তা
হলে তাে আমি আর বাঁচিব না। কেমন করে প্রপােজ কর্তে
হয়, তাও যে ছাই জানি নে ? এত নভেল নাটক পড়লেম,
সকলই কি বৃথা হ’ল। এত এটিকেটের বই আনিলাম, কিছু
তেই কিছু হ’ল না। এই যে এই যায়গাটা মুখস্থ করে গিয়া
তার সম্মুখে ঠিক ঠিক বলতে পাল্লেই হবে।”
এইরূপ ভাবিয়া গােপাল বাবু বিবাহের প্রস্তাব কালে যে
রূপ কথা কহিতে হয়, বিটন সাহেবের পুস্তক হইতে তাহা মুখস্থ
করিতে আরম্ভ করিলেন।
গােপাল বাবুর বিবাহ হয় নাই। গােপাল বাবুর দিন দিন
মতের পরিবর্তন ঘটিতেছে দেখিয়া, তাঁহার পিতা তাহার বিবা-
হের জন্য তৎপর হইয়াছিলেন। তাঁহার পিতা জানিতেন যে,
ভারত উদ্ধার রােগের একমাত্র ঔষধ বিবাহ। বিবাহ দিলে
ছেলে ক্রমে সিদে হইয়া যায়। এইরূপ ভাবিয়া তিনি ছেলের
বিবাহের জন্য ঘটক লাগাইয়া দিয়াছিলেন,-ছেলে যে বিধবা
কুমিকাকে বিবাহ করিবার জন্য পাগল তাহা বিন্দু মাত্র ও
জানিতে পারেন নাই।
যখন গােপাল বাবু নিজ প্রকোষ্ঠ মধ্যে বসিয়া কুমিকার
নিকট কিরূপে বিবাহের প্রস্তাব করিবেন তাহাই মুখস্থ করিতে
ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে তাহাকে দেখিবার জন্য বাগবাজারের
মিত্র মহাশয়েরা আসিয়াছেন। তিনি তাহা জানিতে পারেন
নাই। পিতা ডাকিতেছেন শুনিয়া নিতান্ত বিরক্তভাবে পুস্তক
খানি বন্ধ করিয়া বৈঠকখানায় আসিলেন, কিন্তু তথায় অপরি-
চিত লােক দেখিয়া কিছু স্তম্ভিত হইলেন। তিনি ফিরিয়া যাইবার
[ ৩৯ ]
হইয়।
উপক্রম করিতেছিলেন,—এমন সময়ে তাঁহার পিতা বলিলেন,
“গােপাল, এস, বসাে এরা তােমাকে দেখতে এসেছেন।
গােপাল কুটী করিয়া বসিলেন।
যাহারা দেখিতে আসিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে একটা
ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাবাজির
নাম ?” এই কথা শুনিয়া গােপাল বাবু একেবারে তেলে বেগুনে
জ্বলিয়া গেলেন। এ ভারতবর্ষে তাহার নাম কে না জানে ?
তিনি ক্রোধিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কোন্ দেশের
লােক ? বােধ হয় তুমি ভাঙ্কোবার দ্বীপের লােক,-না, তাও
নয়। সেখানকার লােকেও যে আমার নাম জানে।” সকলে
শুনিয়া অবাক্। গােপালের পিতা লজ্জিত ও ক্রুদ্ধ
বলিলেন, গােপাল, তােমার বুদ্ধি সুদ্ধি কি একেবারে গেছে?"
গােপাল পিতার ইম্পাটিনেণ্ট প্রশ্নে রাগে ফুলিতে লাগিলেন,--
কোন উত্তর দিলেন না।
কন্যার পিতা যাহাই হউক, বরের গুণ আর একটু পরীক্ষা
করিয়া দেখিবার জন্য বলিলেন, “আপনার পড়া শুনা কতদূর
করা হয়েছিল?” গােপাল বাবু একেবারে আশ্চর্যান্বিত হইয়া
তাঁহার দিকে চাহিলেন। তৎপরে বলিলেন, “আপনি আমার
পড়া শুনার কথা বলিলে কি বুঝিবেন ? আপনি বেকন পড়িয়া-
ছেন? আপনি সেক্সপিয়ার বুঝিতে পারেন ?” এই বলিয়া
গােপাল পিতার দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “ডিয়ার ফাদার,
অনুগ্ৰহ করিয়া ঐ ক্যান্টোর ফিলজফি খানা এই দিকে দিন।”
পিতা ত্রস্ত হইয়া পুস্তক খানি দিলেন। “থ্যাঙ্কইউ, শ্যাম বাবু”
বলিয়া গােপাল বাবু পুস্তক খানি খুলিয়া কন্যার পিতার দিকে
[ ৪ ]
চাহিয়া বলিলেন, “ইগাে, আর নন ইগাের থিওরি আপনি কিছু
বুঝিতে পারেন ?”
কন্যার পিতা একেবারে দণ্ডায়মান হইয়া উঠিলেন, বলি-
লেন ‘মহাশয়, আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমার কন্যা মূখা,
আপনার ন্যায় পণ্ডিতের সঙ্গে তাহার বিবাহ কিরূপে হইবে।”
শুনিয়া গােপাল বাবু ক্রোধে লম্ফ দিয়া উঠিলেন, বলিলেন
“ইউপিড়, কে তােমার কন্যাকে বিবাহ করিতে চাহে।
এখনই তুমি এ বাড়ী হইতে গেট আউট হও,নতুবা এখনি
ঘুসা মারিয়া তোমার নাক ভাঙ্গিয়া দিব।”
তাঁহারা বিনা বাক্য ব্যয়ে গৃহ পরিত্যাগ করিলেন। তখন
গােপালের পিতা শ্যাম বাবু ক্রোধে কঁপিতে কাপিতে বলিলেন,
“দূরহ, কুলাঙ্গার ; আমার সম্মুখ থেকে দূর হ। আমি তাের
মুখ দেখিতে চাহি না।” গােপাল বাবু আস্তেন গুড়াইলেন,
বলিলেন, “আমরা ভারত উদ্ধার ব্রতে ব্ৰতী সিংহ, আমাদের
রাগাইও না।”
শ্যাম বাবু। চুপ কর, গাধা!
গােপাল। হােল্ড ইওর টং, ইউ ওল্ড ফুল ।
শ্যাম। বেটা, পাজি— এখনই তােমাকে-
গােপাল। এখনই তােমাকে কি ফাইট করিব।
শ্যাম। রামা, রামা, পাজির গলাধরে বার করে দে তাে।
গােপাল। ছছ, ছছ! কাউয়ার্ড। আবার লােক ডাকি-
তেছ, লজ্জা করে না? কাম অন ফাইট।
ক্রোধে শ্যাম বাবু সে স্থান পরিত্যাগ করিলেন।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
কুসুমিকা বিনােদ বাবুর সহিত শিবপুরের বােটানিকাল
গার্ডেনে বেড়াইতে গিয়াছেন। উভয়ে হাত ধরাধরি করিয়া
বৃক্ষ কুঞ্জের মধ্যে পদচারণ করিতেছেন। বিনােদ বাবু কুসুমি-
কাকে বৃক্ষ শ্রেণীর শোভা দেখাইয়া বিধাতার মহিমা কীর্তন
করিয়া বুঝাইতেছেন, কুসুমিকা তাহাকে মৃদুমধুর কথা শুনাইয়া
স্বর্গ সুখ দান করিতেছে।
ক্রমে উভয়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া সরােবর তীরে উপবিষ্ট
হইলেন। তখনও বিনােদ বাবু কুসুমিকার হাত খানি ধরিয়া
আদরে হাত লইয়া ক্রীড়া করিতেছেন। কি যেন বলিবেন
বলিবেন করিয়া বলিতে পারিতেছেন না।
বাধিয়া বলিলেন, “প্রিয় বন্ধু, তােমাকে একটা বিশেষ কথা
বলিতে ইচ্ছা করি।”
কুসুম। তাহার জন্য এত ভূমিকা কেন? কবে তােমার
কথা আমি শুনি নাই ?
বিনােদ। তা নয়, তবে কিনা। কথাটা গুরুতর।
কুসুম। এমন কি কথা, মাই ডিয়ার ফ্রেণ্ড! আমার যে বড়
কিউরিয়সিটী হচ্চে।
বিনােদ। না,—এমন কিছু নয়।
কুসুম। বিনোদ বাবু শেষ কি আপনার উপর আমি রাগ
অবশেষে বুক
করিব?
বিনোদ। আবার আপনি কেন ?
* "
[ ৪২ ]
কুসুম। অপিনি বলিব না কেন? আপনি তাে আমাকে বন্ধু
বিবেচনা করেন না। করিলে কখনও কি কথা বলিবেন তাহা
বলিতে এত বিলম্ব করিতেন না।
বিনােদ। রাগ করো কেন, বন্ধু। এখনই বলিতেছি।
কুসুম। তবে বল।
বিনােদ। এই—এই—এই কিছু নয়।
কুসুম। তবে আপনি আসুন, আমি চলিলাম। তখন মুহূর্ত
মধ্যে বিনােদ বাবু কুমিকার পদতলে জানু পাতিয়া বসি-
লেন,-কাঁদো কাঁদো স্বরে বলিলেন, “প্রিয়তমে কুসুম,আমি
তোমার জন্য পাগল। বল, বল, বিধুবনী, তুমি আমাকে বিবাহ
করিয়া সুখী করিবে?”
কুসুম। দি বাবু, আপনি যে প্রস্তাব করিলেন,এ প্রস্তাব
সত্যই বড় গুরুতর। আপনি যে দাসীকে এরূপে সন্মিলিত
করিতে প্রস্তুত, ইহাতে আপনার মহৎ হৃদয়ের পরিচয়ই প্রকাশ
করা হইল; কিন্তু আমাকে একটু সময় দিন,-আমি বিবেচনা
করিয়া দেখি।
বিনােদ। যত সময় ইচ্ছা লও,—কেবল আমার আশা
আছে কি না তাহাই বল।
কুসুম। আশা অবশ্যই করিতে পারেন,তবে নিশ্চিত উত্তর
এখন দিতে পারিতেছি না।
বিনােদ। ইহাতেই আমি চরিতার্থ হইয়াছি।
কুসুম। তবে চলুন, এখন বাড়ী যাই।
উভয়ে কলিকাতায় আসিলেন,—বিনােদ বাবু কুমিকাকে
বাটীর দ্বারে গাড়ী হইতে নামাইয়া দিয়া গেলেন। বৈটকখানার
[ ৪৩ ]
জানালা হইতে গােপাল বাবু এ দৃশ্য দেখিয়া একেবারে স্তম্ভিত
হইলেন, ভাবিলেন, “শালা বিনােদ আমার আগেই প্রপােজ
করিল নাকি? যা থাকে কপালে, আজ এখনই আমি প্রপােত
করিব।” এইরূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া গােপাল বাবু প্রকোষ্ঠ মধ্যে
কুমিকার অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।
তিনি গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া গােপাল বাবুকে দেখিয়া মধুর
হাসি হাসিয়া বলিলেন, “গােপাল বাবু, আমায় একটু ক্ষমা
করুন,আমি কাপড় ছাড়িয়া এখনই আসিতেছি।”
বলিয়া কুমিকা চলিয়া গেলেন। গােপাল বাবু ভাবিলেন
“ভালই হইল, একটু সময় পাওয়া গেল ! এই সময়ের জন্য
আর একবার মনে মনে কথা গুলা আওড়াইয়া লইতে পারিব ।
যতক্ষণ না কুসুমিকা আসিলেন ততক্ষণ গােপাল বাবু মনে মনে
মুখস্থ করিতে লাগিলেন। পাছে ভুলিয়া যান এই ভয়ে তিনি
যেই আসিলেন, অমনি তথায় জানু পাতিয়া বসিয়া কৃতাঞ্জলি পুটে
বলিতে লাগিলেন, “আমার হৃদয়ের একমাত্র নক্ষত্র, আমার
জীবনের দেবতা, তােমার প্রেমে আমি উন্মত্ত হইয়াছি। দেবি ?
দয়া করিয়া দাসের প্রতি কৃপা কর।” কি সৰ্ব্বনাশ,—এত দূর
বলিয়া গােপাল বাবু থত মত খাইয়া বাকি কথা গুলি ভুলিয়া
গেলেন,-তখন হতাশ হইয়া বলিলেন, “মাই ডিয়ার ফেণ্ড
কুসুম আমায় একটু সময় দেও,আমি কথাগুলি ভুলিয়া
গিয়াছি। কিন্তু এখনই মনে পড়িবে।”
কুমিকা হাস্য সম্বরণে অক্ষম হইয়া তাহার হাত ধরিয়া
তুলিল, বলিল, “গােপাল বাবু, আপনি যে প্রস্তাব করিবেন তাহা
আমি বুঝিতে পারিয়াছি। আপনার কৃপাপূর্ণ প্রস্তাবে আমি
[ ৪৪ ]
বিশেষ আপ্যায়িত হইয়াছি। কিন্তু আপনি তাে জানেন
যে বিষয়টী বড়ই গুরুতর। সহসা না ভাবিয়া চিন্তিয়া ইহার
একটা জবাব দেওয়া কর্তব্য নয়। আমায় ভাবিবার জন্য একটু
সময় দিন।”
গােপাল। যত দিন ইচ্ছা সময় লও,কিন্তু আমার আশা
আছে কি ?
কুসুম হাসিয়া বলিল, “আশা না থাকিবে কেন ? যাহা হউক
আমাকে এই চিন্তা করিবার অবসর দিন।
গােপাল বাবু মূহূর্তের মধ্যে অন্তর্হিত হইলেন।
শ্রীমথ নাথ শ্রীমানি
m.cnail
পােঃ মাকড়, পূৰ্বন ওপাড়াপঞ্চম পরিচ্ছেদ
জেলা হাওড়া।
গােপাল বাবু ডাকের প্রথম ডিলিভারিতে নিম্নলিখিত পত্র
পাইলেন।
“প্রিয় গােপাল বাবু,
আপনি গত কল্য অনুগ্রহ করিয়া যে প্রস্তাব করিয়াছিলেন,
সে বিষয় আমি বিশেষ চিন্তা করিয়া দেখিয়াছি। অদ্য দুই প্রহরে
সাক্ষাৎ করিলে যাহা স্থির করিয়াছি বলিব। ইতি।
আপনার অনুগ্রহাকাঙ্কিনী
কুমিকা।
[ ৪৫ ]
ঠিক ঐ সময়ে ঠিক ঐরূপ আর এক খানি পত্র বিনােদ বাব
পাইলেন। প্রভেদের মধ্যে
সময়ের। কুসুমিকা বিনােদ
বাবুকে সন্ধ্যার পর সাক্ষাৎ করিতে বলিয়াছে।
উভয়ের আর আনন্দ ধরে না। দুই প্রহর হইতে না হইতে
গােপাল বাবু কুসুমিকার সহিত সাক্ষাতে চলিলেন। সাক্ষাৎ
হইল। তাহাদের উভয়ের যে কথােপকথন হইল তাহাই আমরা
নিম্নে লিখিতেছি।
গােপাল। দাসের দরখাস্তে কি হুকুম হইল ?
কুসুম। গােপাল বাবু, আপনি আমাকে অনাথিনী দেখিয়া
যে আমার প্রতি দয়া করিয়া আমাকে আশ্রয় দিতেছেন, ইহাতে
আমি চিরকালের জন্য আপনার নিকট কেনা থাকিলাম, আর
অধিক বলিব কি ?
গােপাল। প্রিয়তমে, আমার আনন্দে যে বুক ফেটে যায়।
তবে কি সত্যই তুমি আমাকে বিবাহ করিবে ?
কুসুম। অারও কি স্পষ্ট করিয়া বলিতে হইবে, কিন্তু
গােপাল,
গােপাল। কিন্তু কি ?
কুসুম। কিন্তু দূর নয়,তবে কথা এই বার তাে
এ বিবাহে মত নাই—তিনি কুসংস্কার পূর্ণ হিন্দু। তাহার কথা
ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। দাদারও এ বিবাহে মত নাই ।
গােপাল। তা হলে কি হবে ?
কুসুম। আমি একটা উপায় ভেবেছি। আমাদের কেবল
সিভিল বিবাহ করিলেই চলিবে। আজ রাত্রে আটটার সময়
আপনি আমাদের বাটীর পেছনে গলির ভিতর অন্ধকারে
[ ৪৬ ]
দাড়িয়ে থাকবেন,-আমি গিয়ে আপনার সঙ্গে মিশিব। তার
পর গাড়ী করে রেজিষ্ট্রারের বাড়ী গিয়ে পরে রেজিষ্টারি করে
ক্রমেই হবে। একবার বে হয়ে গেলে আর কে কি করিবে? এক
বার বিবাহ বন্ধন ঘটিলে কেহ আর তাহা খুলিতে পারে না।
গােপাল। ঠিক বলেছ। কুসুম, তােনার প্রস্তাবে আমার
সম্পর্ণ অভিমত আছে। আমার বাপ বেটাও ভয়ানক ওল্ড
ফুল। কোন রকমে যদি রাকেল এই বের কথা জাতে
পারে, তবে কিছুতেই এ বে হতে দেবে না। এ বে খুব গােপনে
হওয়াই উচিত।
কুসুম। তবে আমি 7ে প্রস্তাব কল্পে ম, তাতে তােমার
কোন আপত্তি নেই।
পাল। তােমার প্রস্তাবে কবে আপত্তি আমার আছে ?
কুসুম। তবে সব ঠিক। শুক্রবার রাত্রি ৭টার সময় তােমার
গলির ভিতর আসা চাই।
গােপাল। অবশ্য আসিব।
কুসুম। দেখ ভুল না।
গােপাল। এ কি ভুলবার কথা প্রিয়তমে ?
কুসুম। তবে এখন যাও,-তােমার সঙ্গে আমাকে অনেক
ক্ষণ থাকতে দেখে লােকে সন্দেহ কৰ্তে পারে।
গােপাল। তবে আমি চলিলাম।
গােপাল বাবু চলিয়া গেলেন। কুসুমিকা হাসিতে হাসিতে
যাইয়া ইজিচেয়ারে বসিল। সন্ধ্যা হইবার আর অধিক বিলম্ব
নাই।
সন্ধ্যা হইতে না হইতে বিনােদ বাবু আসিয়া দেখা দিলেন।
[ ৪৭ ]
উভয়ের সাক্ষাৎ হইল, উভয়ে কথােপকথন হইল। আমাদের
সে কথােপকথন পুনরায় লিখিবার কোন আবশ্যকতা দেখিতেছি
না; কারণ সে কথােপকথনের সহিত পূৰ্ব্ব কথােপকথনের কোন
প্রভেদ নাই
কুসুম বিনােদ বাবুকে বিবাহ করিতে সম্মত হইল। উভয়ের
গােপনে বিবাহ হওয়াই স্থির হইল। কেবল মাত্র রেজিষ্টারি
করিয়া সিভিল বিবাহ হইবে তাহাও ধাৰ্য্য হইল । রাত্রে গলি।
ভিতর বিনােদ বাবু অপেক্ষা করিবেন, তাহার সহিত যাইয়:
কুমিকা সন্মিলিত হইবে।
হায়! হায়! বৃদ্ধ রাম বাবু বা শ্যাম বাবু, ইহার কিছুই
জানেন না। এমন কি প্রফুল্ল পৰ্যন্ত এবিষয়ের সম্বাদ পাই
লেন
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
শুক্রবার রাত্রি ৭টা বাজিয়াছে। রাম বাবুর বাটীর পশ্চাতক
ক্ষুদ্র গলি অন্ধকারে আচ্ছন্ন। ইহা কোন প্রকাশ্য রাজপথ নহে,
—এ পথে কেহ কখন চলিত না, কেবল রাম বাবুর খিড়কির
দরজাই এই গলির ভিতর ছিল। খিড়কীর দ্বারের উপরেই
একটী গবাক্ষের ভিতর দিয়াই গলিতে আলো আসিবার সম্ভাবনা,
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আজ গবাক্ষ ও রুদ্ধ। রাম বাবুর বাড়ী
নিস্তব্ধ, যেন বাটীতে জন মানব নাই।
[ ৪৮ ) কিন্তু বাটীতে মানুষ নাই এরূপ নহে। একটা প্রকোষ্ঠের মধ্যে কুমিকা ব্যথভাবে পদচারণ করিতেছিলেন। অবশেষে ঝিকে ডাকিলেন। ঝি আসিলে তিনি বলিলেন, “সে কাজটা করেছিস?” ঝি। হ্যা, উনুনে উঠিয়ে দিয়ে রেখিছি। কুসুম। দেখিস যেন খুব টগবগ করে ফুটে। আর এখন যেন উনুন থেকে নাবাস নে। যখন আমি আন্তে বলিব তখনই আবি। ঝি। বেশ, আমায় ডেকো। কুসুম। কোথাও যাসনে যেন? ঝি। আর কোথায় যাইব? ঝি চলিয়া গেল। কুমিকা আবার সেইরূপ পদচারণ করিতে লাগিলেন। এদিকে গােপাল বাবু হাতড়াইতে হাতড়াইতে অন্ধকারে গলির ভিতর প্রবেশ করিলেন। এক হাত দূরে তােক দেখা যায় , এমন অন্ধকার তাে তিনি জন্মেও দেখেন নাই। এ অন্ধ- কারে তঁাহার হৃদয়ানন্দদায়িনী কেমন করিয়া আসিবেন ? যদি না আইসেন ? বিনােদ তত সন্ধ্যার সময় গিয়া তাহার মত পরিবর্তন করিয়া দিল না ! কি অন্ধকার। বহুকষ্টে গােপাল বাবু অন্ধকারে চলিয়া খিড়কির দ্বারের নিকট আসিলেন। বহুক্ষণ নীরবে অপেক্ষা করিতে লাগি লেন—কোথাও কোন শব্দ নাই। নানা চিন্তায় তাহার হৃদয় আলােড়িত হইয়া উঠিল, তিনি একবার ভাবিলেন, হয় তাে কুসুম আর আসিল না। হয় তাে সে আমার কথা ভুলিয়া গিয়াছে
[ ৪৯ ]
হয়তাে বিনােদ বদমাইস তাহাকে ভুলাইয়া লইয়া অন্য কোন
খানে গিয়াছে। আবার ভাবিলেন, “এই অন্ধকারে আমি
একলা চোরের মত পরের বাড়ীর পাশে দাঁড়াইয়া আছি। যদি
কেহ আমাকে চোর বলিয়া ধরে, তাহা হইলে আমি কি
বলিব ? আমি তাে তাহা হইলে জেলে যাইতে পারি। না,
এখানে থাকিয়া কাজ নাই। আমি পালাই।” এই ভাবিয়া
গোপাল বাবু পলাইবার উদ্যম করিলেন। কিন্তু এই আবাৰ
অদূরে কাহার পদ শব্দ হইল।
তিনি উন্নত কর্ণে শুনিতে লাগিলেন। আর কে আসিবে?
তাহারই হৃদয় রত্ন আসিতেছেন! ক্রমে পদ শব্দ নিকটস্থ হইল,
তখন গোপাল বাবু দুই হস্ত বিস্তৃত করিয়া প্রিয়তমাকে আলি
ঙ্গন করিবার জন্য উদ্যত হইলেন। অনতিবিলম্বে এক ব্যক্তি
আসিয়া তাহার বাহবন্ধনে বদ্ধ হইল, তিনি সাদরে সপ্রেমে
বলিলেন, “হৃদয় রত্ন, হৃদয়ে এস।” এই বলিয়া তিনি আত্ম
হারা হইয়া প্রেয়সীকে চুম্বন করিতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু
যেন তাঁহার মুখে সর্প দংশন করিল। তিনি আশ্চর্যান্বিত
হইয়া উঠিলেন “এ যে সাপ !” যে ব্যক্তিকে তিনি বাহু পাশে
করিয়াছিলেন, তিনিও বলিয়া উঠিলেন, “এ যে
দাড়ী !” তথন গােপাল বাবু, ক্রোধে কম্পিত হইয়া বলিলেন,
“তুই কে শালা?” সে ব্যক্তি ক্রোধে চীৎকার করিয়া বলিয়া
উঠিল “তুই কে শালা ?”
গােপাল। আমি গােপাল।
বিনােদ। আমি বিনােদ।
গােপাল। বিনােদ, ইউ ট্রেটর পাজি।
}
[ ৫ ] বিনােদ। শালা, আমার সঙ্গে বদমাইসি করে তােমার এই কাজ ! এখন অন্ধকারে দুইজনে ঘাের মল্লযুদ্ধ আরম্ভ হইল। উভ- য়ের শরীর রক্তাক্ত হইয়া গেল। এ যুদ্ধের বিরাম নাই। এই সময় রাম বাবুর বাটতে কুমিকা ‘ঝকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকিলেন। ঝি ছুটিয়া আসিল। কুমিকা কহিল, “শীঘ্ন গরম জলটা নিয়ে আয়।” ঝি জল আনিত ছুটিল। কুস্তু- মিকা গরম জল লইয়া গিয়া গবাক্ষ উন্মুক্ত করিয়া নিয়ে গলির ভিতর জল ঢালিয়া দিল। উত্তপ্ত জল যুদ্ধে প্রবৃত্ত বিনােদ ও গােপালের শরীরে পতিত হইয়া তাহাদের অঙ্গ দগ্ধীভূত করিল। “ও বাবা, পুড়ে মলুম, পুড়ে মলুম” বলিল উভয়ে উভয়কে পরিত্যাগ করিয়া আর্তনাদ করিতে লাগিলেন। বাটীর পশ্চাতে মহা গোলবােগ শুনিয়া রামবাবু, চাকর এবং দ্বারবান সঙ্গে লইয়া সেইখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন । কয়েকজনে যাইয়া গােপালকে ধরিল, কয়েকজন বিনোদকে ধরিল। গােপাল কাদিতে কঁদিতে বলিতে লাগিলেন, “ওরে পুড়ে মরেছি, আর মেরে হাড় ভাঙ্গিস নে। আর কোন্ শালা বিধবা বিবাহ কৰ্বে। ঘাট হয়েছে বাবা, ছেড়ে দাও।” আর বিনােদ বাৰু চক্ষু মুদিয়া ঈশ্বরকে ডাকিতে লাগিলেন, বলিলেন, “দীনবন্ধু দয়ালহরি, পতিতপাবন, বিপদভঞ্জন, বিপদে আসিয়া রক্ষা কর নাথ ! সন্তান যে কাতরে ডাকে, পিতা! তুমি না রক্ষা করিলে আর অবােধ সন্তানকে দয়া করে কে ?” রাম বাবু। শালা, অবােধ ছেলে। ছেলে যেন কিছু করেন নাই। পরের মেয়ে বার কতে এসেছেন, আবার বলেন
[ ৫১ ]
আমি অবােধ ছেলে। রাম সিং শালার কান মলে দে তাে।
বিনােদ। প্রাণ দণ্ড করিতে চাও, কর, কিন্তু সময় দেও
উপাসনাটী শেষ করিয়া নি।
রামবাবু। শালা, জেলে গিয়ে উপাসনা করাে।
এই সময়ে প্রফুল্ল গোলযােগ শুনিয়া সেই স্থানে উপস্থিত
হইলেন। তিনি তখনও টলিতেছিলেন, বলিলেন, “কি বাবা,
এখানে গােলমাল কেন ? কামড়াব যে।”
গােপাল। ভাই, বিপদে রক্ষা কর।
বিনােদ। ভাই প্রফুল্ল ! বন্ধুর কাৰ্য্য কর। শাস্ত্রে বলে,
বিপদে য তিষ্ঠতি স বান্ধব।
প্রফুল্ল। কুছ পরওয়া নাই বাবা, পালাও।
গােপাল। তা অার তোমায় বলতে হবে না।
উভয়ে উৰ্দ্ধশ্বাসে অন্তর্হিত হইলেন। পশ্চাতে সকলে উচ্চ
হাস্য করিয়া উঠিল।
(৪)
দেবী না পিশাচী।
“তুমি যা ইচ্ছা কর প্রভু। আমার হাতে কথা নাই ।
পড়াশুদ্ধ তােমাকে দোষী বলে, কিন্তু তােমার দোষ কি তাত
আমি জানি না। তুমি স্বামী আমি পত্নী। আমার চক্ষে তােমার
গুণ দেখিতে পাই, অথবা তােমার দোষ দেখিবার আমার ক্ষমতা
নাই। কিন্তু প্রাণাধিক ! তুমি বড় নির্দয়। তুমি যেখানে
সেখানেই থাক তাহাতে আমার কষ্ট নাই। দিনান্তে তোমায়
একবার দেখিতে পাইলেই আমি কৃতার্থ হই। প্রভু ! এই এক
মাস হতে তাও পাই না। অধিনীর প্রতি এত নিদয় কেন
প্রভু কথাটা গায়ে মাখিলেন না। প্রভুর সময় বহিয়া যায়।
এক মাসের পর আফিস ফেরৎ বাটী আসিয়াছেন। কাৰ্য্য,
শ্রীমন্দিরে যাইতে হইবে, গাড়ীতে বােতল রহিয়াছে ছিপি আঁটা।
কতক্ষণে শ্রীমন্দিরে পৌছিবেন, কতক্ষণে ছিপি খুলিবেন, কতক্ষণে
পঞ্চমকার যােগে রত হইবেন সেই চিন্তায় আকুল। পত্নীর প্যান
প্যানানী আর সহ্য হয় না। বলিলেন “ আঃ। কি বিপদেই
পড়লুম। তােমার হুকুম না হয় রাখা যাবে, এখন সুবিধা মতে
আসা যাবে। এখন ছাড়।”
পত্নী হেমাঙ্গিনী আর আপত্তি করিলেন না। প্রভু তিনটী
[ ৫৫ ] পায়ে পড়ি অামাদের মাকে দোর খুলতে বল। আমরা খেতে চাইনি মাকে দেখতে চাই। বিনােদের চক্ষু জলে ভরিয়া গেল। চক্ষু মুছিলেন, দর আঘাত করিলেন,—উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগলেন। অনেক ক্ষণ বুঝিয়াছিলেন, ডাকা বৃথা। বলিলেন “তােরা এইখানে থাক, আমি আসছি। নেই মাকে দেখতে পাবি এখন।” বিনােদ থানায় খবর দিলেন। বাড়ী রাস্তা লোকে ভবিয়। গিয়াছে। ইনেস্পেক্টর বাবু শেষ দরজা ভাঙিয়া গৃহে প্রদেশ করিয়া দেখিলেন, গৃহতলে একটী পরিষ্কার শয্যায় মশারী টাঙ্গা- ইয়া কে শুইয়া রহিয়াছে। মশারী খুলিয়া দেখিলেন শখ্যোগরি এক স্বর্ণ প্রতিনা শয়ানা। মৃত নহে জাবিতা; কিন্তু ক্লিষ্ট নিশ্বাস বহিতেছে সেই নিশ্বাসের বেগে সৰ্ব্ব শরীর কম্পিত। আর দেখিতে হইল না। রমণীর পার্শ্বে আধখানি শালপাতা পড়িয়া রহিয়াছে তাহাতে আফিমের গন্ধ। শালপাতার পাশে এক- টুকু কাগজ। তাহাতে লেখা “প্রভো! ক্ষমা করিবে। আপনার কষ্ট সহ্য হয়। কিন্তু মা হইয়া ছেলেকে আহার না দিয়া কেমন করিয়া থাকিব। আজ এক-পয়সাও আর নাই । তাই এই মহাপাপ করিলাম। প্রভু ক্ষমা করিও। তুমি ক্ষমা করিলে আমার পাপ খণ্ডিবে। জন্মে জন্মে যেন তােমায় পাই । —দাসী হেমাঙ্গিনী।” পুলিস ডাক্তার ডাকিতে গেল । •• একটী রমণী গঙ্গাস্নান করিয়া গাড়ীতে বাটী ফিরিতে ছিল। দ্বারে গােলমাল দেখিয়া গাড়ী থামাইল। একটা [ ৫৬ ] স্ত্রীলােককে জিজ্ঞাস করিয়া সকলই অবগত হইল। তখন বলিল, “যাও। জলদি বাড়ী যাও।” গাড়ী দ্রুতবেগে চলিয়া গেল। বেলা দুই প্রহর। ডাক্তারের ঔষধে হেমাঙ্গিণীর উপকার হইয়াছে। হীরালালের অঙ্কে হেমাঙ্গিনীর মস্তক স্থিত। বিষম উংকাব্যঞ্জক চক্ষে হীরালাল পত্নীমুখ প্রতি চাহিয়া আছেন । সে গৃহে অন্য লােকের মধ্যে ডাক্তার বাবু ও ইনেস্পেক্টর বাবু। অকস্মাৎ দ্বার খুলিয়া গেল, একটী রমণী পাগলিনীয় ন্যায় গৃহে প্রবেশ করিল। সকলের দৃষ্টি তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইল। হীরালাল বাবু চীৎকার করি উঠিলেন। তখন রমণী বলিল “চীৎকার করিও না হীরালাল বাবু মনে করে দেখ, আমায় বলিতে তোমার স্ত্রী পুত্র কেহ নাই। না হলে আমি যে বেশ্যা আমারও প্রাণ আছে, তােমার মত পাপিষ্ঠ ন ধিম নহি। এখন জানিলাম আমিই এই সর্তী পীর এই বিড়ম্বনা,—এই প্রাণ- নাশের কারণ। কিন্তু ঈশ্বর জানেন, আমি নিরপরাধিনী। তবু এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে আমি প্রস্তুত। এই লও আমি আমার সর্বস্ব বিক্রয় করিয়া অর্থ আনিয়াছি। হীরালাল ! এ সকলই তোমার। কিন্তু ইহাই প্রায়শ্চিত্ত নয়। আমার প্রায়শ্চিত্তের কথা পরে শুনিবে। কথা শেষ না হইতে না হইতে রমণী উৰ্দ্ধশ্বাসে পলাইল। সকলে অবাক হইয়া রহিলেন। পরদিন প্রাতে গঙ্গাকূলে একটী শব পাওয়া গেল,-শব স্ত্রীলােকের। অনুসন্ধানে স্থির হইল, শব হাড়কাটা গলির কোন বেশ্যার,নাম কুসুম।
[ ৫৩ ] লম্ফে সিঁড়ি পার হইয়া রথারূঢ় হইলেন জলদী যাও হারকাটা গলি।” যতক্ষণ গাড়ী দেখা গেল, যতক্ষণ চাকার ঘড় ঘড় শব্দ শুনা গেল ;-হেমাঙ্গিনী ততক্ষণ জানালায় দাঁড়াইয়া রহিলেন। তারপর চক্ষু মুছিলেন কি জ্বালা চক্ষু মুছিয়া ও মুছা হয় না। তারপর, গৃহকাৰ্য্যে, রন্ধন কার্যে ব্যাপৃত হইলেন। রন্ধন হইলে শিশু সন্তান গুলিকে খাওয়াইলেন তাহারা নিদ্রা গেল। হেমাঙ্গিনী সমস্ত রাত্র রােদন করিয়া কাটাইতে লাগিলেন। গাড়ী হাড়কাটার গলি জলদী পৌছিল ; কড় কড় কড় দরজা খুলিয়া গেল। আবার তিনটী লাফে সিঁড়ি উত্তীর্ণ হইয়া হীর লাল স্বর্গ হাত বাড়াইয়া পাইলেন। তখন ইন্দ্রালয়ে লীলাতরঙ্গ খেলিতে লাগিল। মদ মেয়েমানুষ মৎস্য মাংস মুদ্রায় নিশার প্রতি পল হীরক খচিত করিল। “যে যাহারে ভাল বাসে সে যাইবে তার পাশে” মদন রাজার বিধি হীরালাল লঙ্গন করিলেন না। “কুসুম! কুসুম! তােমা বই আর আমার কেউ নাই।” আমার প্রাণের কথা চুরি করে বলছ “হীরু।” প্রভাতে শয্যা ত্যাগ করিতে আর মন চাহে না। ছেলেরা মা! মা! করিয়া ডাকিয়াছে খাবারের জন্য। মা নিদ্রিত দেখিয়া মাকে আর বিরক্ত না করিয়া সকলে পাঠশালে গেল। মা কিন্তু ঘুমান নাই, কেবল চক্ষু মুদিয়া ছিলেন। ছেলেরা যাইলে ধীরে বারে উঠিলেন, উঠিয়া বাক্স খুলিলেন। বাক্সে আর কিছু নাই - আধলা পয়সাটীও না। তবু এ খােপ ও খােপ অনুসন্ধান করিতে
[ ৫৪ ]
লাগিলেন,—যেন বিশ্বাস হইয়া ও বিশ্বাস হয় না। নাই বটে, বাক্স
ত্যাগ করিলেন, বাক্স খােলা পড়িয়া রহিল। গৃহের চতুর্দিকে
খর দৃষ্টি করিলেন কোন দ্রব্যই নাই। ভূষ বাসন বসন যাহা
কিছু ছিল, সকলই বিক্রীত। অদ্য প্রভাতে বিক্ৰী করিবার
আর কিছুই নাই।
পেটরায় কেবল একখানি ধােয়া কাগ ছিল ; হেমাঙ্গিনী
সেই কাপড় খানি পরিলেন, সিঁথার সিন্দুর উল করিয়া দিলেন ।
একখানা ফরসা বিছানার চাদর ছিল তাহা পাতিলেন। মশারি
ফেলিলেন। তখন দ্বার বন্ধ করিয়া বিছানায় শুইলেন।
ওমা দোর খােল না মা। বড় খিদে পেয়েছে খাবার দেনা
না। সকালে যে কিছু খাইন, মা খাবার দেনা, পেট যে
জ্বলে গেল।”
“দরজা বন্দ করে কি করছিস, মা? খােলনা মা। খিদে
পেয়েছে বল্লে যে, অমনি খাবার দিস্ আজ তাের কি হয়েছে।
এত ডাচি এত করে খেতে চাচ্চ ; তাের সাড়াও নেই।”
“ওমা আমাদের বড় ভয় কচ্ছে, তুই দোর খােল মা।
আমরা খেতে চাই না তুই দোর খােল।”
দ্বার খুলিল না। তখন বাল
তখন বালকবৃন্দ উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া
উঠিল। লােদন শুনিয়া সম্মুখের বাটীর একটী বাবু দৌড়িয়া
আসিলেন। “কিরে কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে ?” এই মা
ঘরে দোর দিয়ে কি করূছে, কত ডাছি সাড়া দেয় না। আমরা
আজ সকালে খাইনি, খাবার চাচ্চি তবুও মা দোর খুলছে না।
বিনোদ কাকা, তুমি একবার ডাক না। বিনােদ কাকা, তােমার
ভাই ভা দেবনারায়ণ ঘােষ শ্রীপুরের ধনাঢ্য প্রবল প্রতাপ জমীদার ; কমলাকান্ত বসুর দেওয়ান ছিলেন। কমল বসু যেমন সদাশয় প্রভু ছিলেন, দেবু ঘােষ তেমনই প্রভু ভক্ত ভৃত্য ছিলেন। বিশ বৎসর দেওয়ানী করিয়া চরিত্র গুণে প্রভুর নিতান্ত আত্মীয়ের মধ্যে পরিগণিত হইয়া ছিলেন। কমল বােস সমস্ত বিষয় সম্পত্তি চক্ষু মুদিয়া দেওয়ানের হস্তে অৰ্পণ করিয়াছিলেন । দেওয়ানের কাৰ্য্য দক্ষও অসাধারণ ছিল। প্রজাকে সন্তুষ্ট রাখিয়া ও বিশ বৎসর মধ্যে জমীদারির আয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি করিয়া - ছিলেন। ইহাতে কোন্ প্রভুর না ভৃত্যের উপর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস জন্মে ? এক কথায় দেবু ঘােষ ও কনল বােসে সময়ে প্রভু ভৃত্য ভাব তিরােহিত হইয়া সখ্যভাব দাড়াইয়াছিল । শশাকে তাপে দেবু ঘােষের এরূপ চরিত্র গঠন হইয়াছিল কি না বলিতে পারি না। জীবনে দেবু ঘােষ শােক পাইয়াছিলেন। যৌবনের প্রারম্ভে দেবু ঘােষের প্রথমা ভাৰ্য্যা কাল কবলিত হন। তিন বৎসর কালে শােকাবেগের তীক্ষ্ণতা কমিলে তিনি দ্বিতীয় বার দার পরিগ্রহ করেন। কিন্তু বিবাহের চতুর্থ বর্ষ শেষ না হইতে যৌবনে পদার্পণ করিয়াই তাহার দ্বিতীয়া পত্নী অকস্মাৎ ইহলােক পরিত্যাগ করি- লেন। ইহাতে দেবু ঘােষের সংসারে বৈরাগ্য জন্মিল। সাত বৎসর গৃহ শূন্য হইয়া রহিলেন। শেষ প্রভুর বারম্বার অনুরােধে
* [
৫৮ ]
আবার সংসার পাতিলেন। এবার যেন ঘোষার বিবাহ বিভ্রাট
একরূপ চুকিল বলিয়া বােধ হইল,—বুঝি এ বিবাহে তিনি সুখী
হইবেন। দেবু থােষ বুক বাঁধিলেন।
কিন্তু মঙ্গলময়ের দুর্ভেদ্য লীলা কে বুঝিবে ? রূপবতী ভাৰ্য্যা
ক্রমান্বয়ে চারিটী সুন্দর পুত্র সন্তান প্রসব করিলেন। কিন্তু চারি-
টীর মধ্যে একটীও বাঁচিল না। শােক সন্তপ্ত দম্পতি পুত্র
ধনে হতাশ হইলে একটী কন্যা জন্মিল। কিন্তু বিড়ম্বনা দেখ ।
সূতিকারে দেবু ঘোষের তৃতীয় পত্নী বিষম জরে সংসারের কষ্ট
এড়াইলেন। কন্যাটী বাচিন। নিরাশ পিত। কন্যার নাম রাখি-
লেন,-আশা।
মহা বৈরাগ্যে ও ধাত্রী রাখিয়া কন্যাকে সত্নে লালিত করিতে
লাগিলেন বটে, কিন্তু দেবু দোষ এবার পরম পুরুষের পদে চিত্ত
অৰ্পণ করিলেন। কাৰ্য ও পূজা দিতে তঁহার জীবন কাটিতে
লাগিল।
কমল বসুর দুই পুত্র সুরেশ্চন্দ্র ও যােশ্চেন্দ্র। দুইটী পুত্রই
রূপবান, বুদ্ধিমান, গুণবান। কমল বােসের আনন্দের আর
সীমা নাই। কিন্তু সচ্চিদানন্দই সে আনন্দ কাল সীমা বদ্ধ করি-
লেন। সুরেশ যখন অষ্টাদশবর্ষীয় ও যােগেশ যখন ষােড়শবর্ষীয়
তখন তাহাদের মাতার
মৃত্যু
হইল।
পত্নী কৈলাসমণির মৃত্যুতে কেবল কমল বসুই ও তাঁহার
পুত্ৰৰয়ই শোকান্বিত হইলেন না। অশা, আর একটী মা
হারাইল। এই কারণে দেবু ঘোষের ও সন্তপ্ত হইবার কথা,
কিন্তু শোক তাপ আর দেবু ঘোষকে স্পর্শ করিতে পারে না।
তিনি হরিপদপ্রসাদে অাত্মাকে উন্নত করিয়াছেন। কৈলাশমণির
[ ৫৯ ]
পতির সহিত শেষ কথা, “আশাকে যদি সুরেশের বধূ করিয়া
ঘরে না আনা হয়, তবে আমি মরিয়াও দুঃখ পাইব।”
কমল বসুর ও এই ইচ্ছা অনেক দিন হইতে বলবন্তী। এমন
কি এই প্রস্তাব অনেকবার দেওয়ানজীর কাছে করিয়াছিলেন ।
দেওয়ানজীর এক উত্তর—“প্রভু আমি যেমন আপনার আশা ও
তেমনি আপনার। আশার বিবাহের ভার আপনারই উপর ।
তবে আমার মৃত্যু নিকট। আমার মৃত্যু হইলে আশার বিবাহ
দিবেন তদগ্রে নহে, কেবল এই অনুরোধ ।”
মেয়ে যে বড় হইয়াছে, আরত রাখা যায় না।
বলিবে ? “প্রভু লােকের কথা ভাবিবেন না। আপনি এ স্থানে
সৰ্ব্বে সৰ্ব্বা। আপনাকে কে কি বলিবে ? আর বিলম্ব নাই,
আমার দিন ফুরাইয়াছে। যোগ রত দেবনারায়ণ আপন ২3
দিন পর্যন্ত পরিজ্ঞাত। মৃত্যু দিন আসিল, তিনি গাশার
শিশ্চ স্বন করিয়া হরিনাম করিতে করিতে নয় নিন।
হইলেন।”
আরও এক বৎসর কাটিল, আশা দিন দিন কাশঃ কলার
ন্যায় অপার্থিব সৌন্দর্য বিকীর্ণ করিয়া যৌবনে নাও করল ।
বিড়ম্বনা দেখ ! এখনও শােকা শেণ হয় নাই, কাল বসু
জ্বরাক্রান্ত হইয়া শয্যাশায়িত হইলেন। মান্ত না হইতে
হইতেই কমল বসু, পত্নী ও দেওয়ানার পাশা হইলেন ।
মৃত্যুর সপ্তাহ কাল পূৰ্ব্ব হইতে বসুজা সংজ্ঞা হারাইয়া ছিলেন।
সুতরাং বিষয় সম্পত্তি বা আশার বিবাহের কৃপা কিছুই বলিয়া
যাইতে পারেন নাই।
মহাসমারােহে কমল বসুর শ্রাদ্ধ হইল। শ্রাদ্ধ শান্তির পর
[ ৬ ] ভ্রাতৃদ্বয় বিষয় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যে মন দিলেন। উভয়েই বুদ্ধিমান্ উভয়েই সদাত্মা, উভয়েই দয়াবান মিষ্টভাষী;—প্রজাগণ, কর্মচারীগণ বরাবর সুবিচার ভােগ করিয়াছে, সকলেই সন্তুষ্ট কৃতজ্ঞ। সুরেশ ও যােগেশের বিষয় বুদ্ধিতে বিষয় কাৰ্য্যে সম্পাদনে, অর্থ সংগ্রহে, কোন গােল হুইল না। পিতা ও দেওয়ানজীর পুণ্যে তাঁহাদের ধর্ম সংসার। ধর্মের সংসারে অশান্তি ঘটে না। কিন্তু এই পার্থিব জগতে মনুষ্যের কোন ধারণারই নিশ্চয়তা নাই। আমরা যাহাই দৃঢ় মনে করি, দেবলীলা তাহা একদিন উল্টাইয়া পাল্টাইয়া আমাদের ভ্রম ঘুচাইয়া দেয়। ক্ষুদ্র কীটাণু- কীট মনুষ্যের ক্ষমতা পৰ্যালােচনা করিলে হাসিতে হয়। ছি, ছি, এত বড় জীবকে এত ক্ষুদ্র কেন করিলে প্রভু! ভাইয়ে ভাইয়ে বড় স্নেহ অটল অনন্ত স্নেহ। গৃহে দুই ভাই—আর আশা। আশা ও তাহার ধাত্রী দেবু ঘােষের মৃত্যুর পর তাহাদের বাটীতে বাস করিয়াছে। আশা ভ্রাতৃদ্বয়ের অন্তঃ- পুরের আলাে। আশা না সুরেশের বধূ ? কি জানি, আগেত তাহাই ঠিক ছিল, এখন যে সব বেঠিক হইতেছে ; নির্বিবাদে সুদিন কাটিতে কাটিতে আজ একটী কুদিন আসিয়া উপস্থিত। আজ বড় ভাই জানিয়াছে, ছছাট ভাই যােগেশ বহুদিন হইতে আশার প্রাণমন্দিরে নিজ বলি স্বরূপ অর্পিয়াছে। অর্থাৎ এক দেবীর সমক্ষে, এক দেবীর প্রসাদার্থে, যুগ্ম বলি এককালে এক হাড়িকাষ্ঠে বহুদিন হইতে স্থাপিত। এই জোড়া বলি স্নেহময় সহােদর ভ্রাতৃদ্বয়। খাঁড়া ত উঠাই- য়াছে,বিকট জয় ধ্বনি ও উঠিয়াছে, খাড়া পড়িবে কি ? ;
[ ৬১ ]
শৈশব হইতে উভয়ের হৃদয়ে আশার মুর্তি গভীর খাতে
অঙ্কিত,-আশীর রূপ প্রজ্বলিত। পিতা বা মাতা বা কেহ
আশার বিবাহের কোন রূপ উদ্দেশ করেন নাই,তাই আশা
সে হৃদয়াগ্নি উত্তরােত্তর উজ্বল হইতে উজ্জ্বলতর,-আ
উজ্জ্বলতম। অগ্নি যেমন উজল হইয়াছে, তেমনি তাহার দত।
শক্তি ও বৃদ্ধি পাইয়াছে,-ভ্রাতৃ স্নেহে নৈরাশ আসিয়া হ',
দুংকার দিয়াছে। আজ উভয়েরই জীবন রক্ষা সুকঠিন।
অন্তরের অন্তরে লুকাইয়া ভালবাসা ( বিপদের ।
শঙ্কা নাই, বিপদ নাই,-সুখ আছে। প্রাণ ভরিয়া, আশ মিটাই ,
জগৎ ব্যাপিয়া ভাল বাসার বাধা কোথায় ? কিন্তু অনর্গল ? -
বাস মহাবলবান হইয়া পড়ে, তখন মন হৃদয় , সকল *
ভূত হয়। শেষ অবস্থা অতি ভয়ানক! ২৭ণ ও না ।
বেগবান হয়, যে মনুষ্য নিমেষের মধ্যে ভাণ সাংঘাতিক ** :
করিতে কিছুমাত্র কুষ্ঠিত হয় না, কারণ আত্মত্যাগ এনে
অসম্ভব। উভয় ভ্রাতার হৃদয়েরই এই দশা উপস্থিত।
বুদ্ধিমতী আশা তাহা বুঝিলেন। উভয়েই তঁাহার প্র' .
প্রার্থী, কিন্তু তিনি অকস্মাৎ কোন রূপ নিন্মাচন করিলেন না।
কাহাকে ও আশা বা নিরাশার কথা বলিলেন না। উভয়কে
বলিলেন, “দেখ, তােমরা দুই জনে এক মায়ের পেটের ভাই ;
শুধু তাহাই নহে, তােমরা উভয়েই উভয়কে প্রাণাপেক্ষা স্নেহ
কর, আমি হতভাগিনী! আমার জন্য উভয়ে বিবাদ করিও মা,--
ভ্রাতৃ প্রেম দুর্লভ পদার্থ ! এ দুর্লভ পদার্থ হারাইও না। তােমরা
দুজনে আপোষে ইহার মীমাংসা কর। মীমাংসার পর আমি
তােমাদের আজ্ঞানুবর্তিনী।”
[ ২ ] কবি বা দার্শনিক ঘটক ভাল। মিলাইতে মিটাইতে বড়ই পটু। মিলন মিটান কার্যে তাহারা কণামাত্র চিন্তা ব্যয় করেন না। স্বভাবতঃই কাজটা তাহাদের বড়ই সহজ বলিয়া বােধ হয়। কবির কল্পনারাজ্যে ও দার্শনিকের তর্ক রাজ্যে সকলই উদার,-সকলই বুদ্ধি সাপেক্ষ। কিন্তু দুঃখের কথা এই আমরা সকলেই কবি বা দার্শনিক নহি। বিপদের কথাটা এই যে, ঐ রাজ্য দুইটার সঙ্গে সংসার রাজ্যের কোন সৌসাদৃশ্য লক্ষিত হয় না থাকিলে বুঝি সংসার স্বর্গ হইত। কেহ কেহ বলেন, কামিনী ও কাঞ্চন একই মায়া। হইতে পারে,—কথাটী মন সই বটে, কিন্তু মায়াটা কামিনীতে যেন কিছু বেশী শক্ত ব্যাপার ঘটায়। আমরা কাঞ্চন ও ত্যাগ করিতে পারি, কিন্তু কামিনী ত্যাগ বড় দায়। কামিনী ত্যাগে যেন হৃৎ- পিণ্ড উপাড়িয়া যায়। ভ্রাতৃদ্বয় কেহই এই হৃৎপিণ্ড উপা- ড়িতে সক্ষম হইলেন না। কিন্তু জ্যেষ্ঠ সুরেশ একরূপ মীমাংসা করিলেন। কবিও দার্শনিক মহাশয়েরা যদি এখানে কেহ না থাকেন, তবে চুপি চুপি বলি,-এ মীমাংসাটা এই আমাদের রাম কে হরের সংসারে বড়ই মহৎ দেবতার যােগ্য। এক দিন সুরেশ যােগেশকে ডাকিয়া বলিলেন-“ভাই জানিলাম আশার প্রতি তােমার ভাল বাসা ও হায়! আমার ন্যায় বলবান। এক রমণীকে উভয়েই প্রাণপাত করিয়া ভাল বাসিয়াছি। আমি তােমার কাছে জ্যেষ্ঠত্বের দাবি করিব না । আমি যদি আশার উপযুক্ত পাত্র হই, তুমিও অনুপযুক্ত নও। আমার যেমন প্রাণ আছে তােমার ও তেমনি প্রাণ আছে। আমি [ ৬৩ ] একরূপ মীমাংসা করিয়াছি। যখন দুজনের কেহই আশার আশা ছাড়িতে অক্ষম, তখন বােধ হয় তুমি এই মীমাংসায় রাজি হইতে পার। তুমি গৃহে থাক, আমি আজ গৃহ ছাড়িয়া চলিলাম। আমি দেশে দেশে ফিরিব, দেশে দেশে ফিরিয়া আশাকে ভুলিতে চেষ্টা করিব। যদি ভুলিতে পারি, তবে তুমি আশাকে বিবাহ করিও। আশীৰ্বাদ করিব ঈশ্বর যেন তােমাদের প্রণয়ে সুখী করেন। কিন্তু যদি আত্ম যুদ্ধে পরাস্ত হই তবে,-তুমি অঙ্গীকার কর,-আমি যেমন করিলাম তুমি ও তাহাই করিবে। তুমিও এই রূপে গৃহত্যাগ করিয়া এ রােগের ঔষধ খুজিবে,-আশাকে ভুলিবার চেষ্টা করিবে ?” যােগেশ তৎক্ষণাৎ মীমাংসায় মত দিয়া অঙ্গীকার করিলেন । তখন সুরেশ শ্রীপুর ত্যাগ করিয়া গেলেন। কাশীধামেই যান আর যেখানেই যান প্রতিমার মােহিনী মূৰ্ত্তি সুরেশের পাছু পাছু গেল। আশার প্রেম স্বর্গ হইতে বিচ্যুত হইয়া,—আশার অস্তিত্বে যে স্থান সুখ ও আনন্দের বসন্ত কানন সে স্থান হইতে উদ্ভান্ত হইয়া,-সুরেশের হৃদয় অশান্তি পূর্ণ হইল। তাহার মন, হৃদয়, স্মৃতি, কল্পনা শ্রীপুরেই বাস করিতে লাগিল,- কাশীতে কেবল দেহ বাস করে মাত্র। তাহার মনে হইতে লাগিল, বুঝি শ্রীপুরে থাকিলেই মনুষ্য বাঁচে। যে স্থানে যান, বিষম জনতার মধ্যেও যেন তিনি একা,—যেন তিনি ভিন্ন আর আর মনুষ্যেরা সকলেই মৃত বা প্রেতাত্মা। গ্রীষ্ম প্রধান ক্ষেত্র হইতে বৃক্ষ লইয়া শীত প্রধান ক্ষেত্রে রােপিত করিলে যেমন, উষ্ণ বায়ু ও প্রখর রৌদ্র বিহনে বৃক্ষটী দিন দিন ক্ষীণ, শুষ্ক ও মলিন হইয়া যায়, সুরেশ ও সেইরূপ দিন দিন ক্ষীণ, শুষ্ক ও মলিন [ ৬৪ ] ? হইতে লাগিলেন। কাশীধাম পুণ্য ভূমি, হিৰুৰ ধৰ্ম্মক্ষেত্র, কিন্তু সুরেশের ধৰ্ম্মের দিকে আস্থা নাই। আশাই তাহাৱ ধৰ্ম্ম, আশাই তঁাহার একমাত্র দেবতা। :::;::: কাশধাম ত্যাগ করিয়া সুরেশ প্রয়াণে গেলেন,—সকলই বৃথা। তিনি আত্ম যুদ্ধে পরাস্ত হইলেন, দিন দিন ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইলেন, শেষে এক দিন বিষম আক্রান্ত হইলেন। পীড়া ক্রমে উংকট হইল, বৈদ্য ডাক্তার তাহার প্রাণের আশা ত্যাগ করলেন,-বিকারের ধমকে কেবল আশার নাম করেন, বকারের নিদ্রা বা স্বপ্নে কেবল আশার উজ্জ্বল ছবিই তাহার সম্মুখে প্রকটিত হয়। চিকিৎসকেরা তখন শেষ উপায় ভাবিলেন, বলিলেন আশার সঙ্গে তােমার দেখা হইবে।” অমনি রােগের গত কিনিল। সেই দিন হইতে তিনি সুস্থ হইতে লাগিলেন”, --- ‘আশার আশায় তিনি একেরে আরােগ্য লাভ করিলেন। প্রেতাত্মার ন্যায় কঙ্কাল সার, দুর্দশার প্রতিকৃতি, সুরেশ আবার শ্রীপুরে আসিয়া দেখা দিলেন। তিনি কঁাপিতে কঁপিতে টলিতে টলিতে আশার গৃহে প্রবেশ করিলে যােগেশের সাক্ষাৎ পাইলেন। যােগেশ সুরেশের চেহারা দেখিয়া শিহরিয়া উঠি- লেন। সুরেশ তাহার হস্ত মধ্যে লইয়া কম্পিত স্বরে বলিলেন, “দেখ ভাই! আমি পরাস্ত হইয়া ফিরিয়াছি। হায় ! যাইবার কালে আমার মন যা বলিয়াছিল, তাহাই ঘটিয়াছে। কিন্তু ভাই, ঈশ্বর জানেন,-আমি চেষ্টার ত্রুটি করি নাই।” বলিতে বলিতে সংজ্ঞাহীন হইয়া সুরেশ পড়িয়া যান দেখিয়া, আশা বাহু বেষ্টনে তাহাকে ধরিলেন। যােগেশ নিজ অঙ্গীকার পালনে কৃতসংকল্প হইলেন,-মাস পূর্ণ
[ ৬৫ ]
হইতে হইতে শ্রীপুর ত্যাগ করিয়া দেশ পর্যটনে আশাকে
ভুলিতে প্রস্তুত হইলেন। যাইবার কালে বলিলেন, “ভাই তুমি
প্রয়াগ পর্যন্ত যন্ত্রণার বােঝা বহিয়াছ, আমি আর ও দূরে চলি-
লাম। এখন বৃন্দাবন যাইব, প্রয়ােজন হয় হিমালয় পর্যন্ত
না আমি পৃথিবীর সীমান্তে যাইতে ও প্রস্তুত। কিন্তু ভাই।
যতদিন আমার পত্র না পাও আশাকে বিবাহ করিও না। আমি
পত্র লিখিব, তােমার কাছে এই অঙ্গীকারের খৎ চাহি না,
আমার প্রতি তােমার স্নেহই তােমার খৎ,-তােমার মুখের কথাই
যথেষ্ট হইবে। যদি এ আত্মযুদ্ধে আমি তােমাপেক্ষা কৃতকার্য
হই, ভাই! আশাকে তুমি বিবাহ করিবে। আমার সেই অনন্ত
ময় তিনি আছেন, তিনি তােমাদের আশীর্বাদ করিবেন। কিন্তু,
যদি আমি ও পরাস্ত হইয়া ফিরি, তখন সেই অনন্তশক্তি ভিন্ন
আর কে আমাদের মধ্যে মীমাংসা করিবে ? এখন বিদায় ।
পত্রখানি রাখিও। পত্ৰথানি এখন খুলিও না,আমি বহু দূরে
না যাইলে এ পত্র খুলিও না। আমি এখন প্রেমধাম বৃন্দাবনে
চলিলাম,—বিদায়।”
যােগেশ নৌকায় আরােহণ করিলেন, নৌকা বেগে উত্তর
ভিমুখে ধাবিত হইল।
অর্ধ পাগলের ন্যায় সুরেশ ও আশা নৌকার দিকে চাহিয়া
রহিলেন। নির্বাসিত যােগেশ ও এই মুহূর্তে সুরেশের হৃদয়
ভাব ঈর্ষা করিতে পারেন না। আশার প্রতি ভালবাসা ও
যােগেশের প্রতি ভ্রাতৃ প্রেম এই দুই বৃত্তিই সুরেশের হৃদয় মধ্যে
তখন ক্ষিপ্তের ন্যায় যুদ্ধ করিতেছিল। যখন নৌকা ক্রমশ
অদৃশ্য হইল,তন সুরেশ হৃদয় কতক স্থির করিলেন।
[ ৬৬ ] আর আশা,আশার কি হইল, আশা কি করিল,আশা না,-না, আশার কথা শেষে বলিল। কিছুদিন পরে সুরেশ যােগেশের পত্ৰ খুলিলেন। পড়িয়া দেখিলেন সেখানি দান পত্র। আশাকে ভুলিতে পারিলে যােগে- শের জমিদারি ও সকল সম্পত্তিই সুরেশের হইবে। কয়মাস পরে বৃন্দাবন হইতে যােগেশের পত্ৰ আসিল। পত্র এই ‘ভাই! এই স্থানে-এই আনন্দধান বৃন্দাবনে,—যেখানে রজে লুটাইয়া আমি সেই সৰ্ব্বশক্তিমান সৰ্ব্ব মঙ্গল ময়কে নিত্য প্রণাম করিয়া ধন্যবাদ দিই ;-এইখানে আমি একটী নূতন রাজ্য পাই- য়াছিনূতন আশ্রয়, নূতন বাস গৃহ পাইয়াছি। এই আনন্দ ধামে আসিয়া,-আনন্দধামে বসিয়া, আনন্দময়ের কৃপায় আমার আত্ম- ত্যাগীর বিকট আনন্দের হৃদয়ে,আমাদের উভয়ের জীবন ব্যাপী অবিচলিত ভ্রাতৃপ্রেমের নূতন আস্বাদ পাইয়াছি। এই স্বর্গ ধামে আজ অদৃষ্ট কৃপাবান। আমার হৃদয় প্রবাহ আজ অতি বিস্তৃত। হরি আমার হৃদয়ে বল যােগাইয়াছেন—আমি আজ দুর্বল নহি। তাই আজ সবল হৃদয়ে জগতে যাহা আমার সার ঐশ্বৰ্য্য ছিল, সেই ঐশ্বৰ্য ডাই! তােমার মঙ্গল ব্রতে উৎসর্গ করিলাম। আশা হায়! এ অঞ পড়িল কেন?—আর পড়িবে না। এই শেষ অশ্রু। মা-না আবার আমি সবল। আশা, সে তােমারই হউক। ভাই, তুমি যখন আমাদের দুই জনকে রাখিয়া দূরদেশে আসিয়া- ছিলে, আমি তখন তাহাকে বিবাহ করি নাই, আমার অঙ্গীকার ভিন্ন তাহার অন্য কারণ ছিল। তাহার প্রকৃত কারণ এই যে পাছে, সে আমাকে লইয়া সুখী না হয়। যদি এক দিন ও একটা * * এই এই দেখ, * [ ৬৭ ] কথার ইঙ্গিতে সে আমায় জানাইত,-আমার সে চিন্তা সে ভয় দূর করিত,-তাহাহইলে ভাইরে, আমি তােমাকে সেই রূপ বিশ্বাস করাইতে ছাড়িতাম না। ভাই, ভাবিও কি কষ্টে তুমি আশা-* না তাহাকে পাইয়াছ। তাই বলিতেছি, আমার তাহাকে যত্ন করিও, আদর করিও, ভালবাসিও,এখন তােমার হৃদয়ে তাহার প্রতি যে আদর, যে ভালবাসা,—সেই ভাল- বাসা তাহাকে চিরদিন দিও। তােমাকে যে ধন সম্পত্তি দিয়াছি তাহা ছার মাত্র, রাখিতে হয় রাখিও,ইচ্ছা হয় বিলাইয়া দিও। কিন্তু আমার এই সম্পত্তি-এই অপার্থিব ঐশ্বৰ্য—যাহা তােনাকে এই পত্রে দিলাম, তাহা ভাই! এই হতভাগ্য নির্বাসিত পর- লােক গত ভ্রাতার প্রাণের সামগ্রী ভাবিয়া,-আমার প্রতি তােমার যে অনন্ত প্রেম তাহা স্মরিয়া এবং তােমার প্রতি আমার যে অনন্ত প্রেম তাহা স্মরিয়া,-তাহাকে যত্ন করিও, আদর করিও। তােমাদের বিবাহের সময় আমাকে পত্র লিখিও না। কারণ আমার হৃদয়ের ক্ষত এখনও শুথায় নাই,-আজ ও তাহাতে রক্ত পড়ে, এখনও প্রবল স্রোতে পড়িতেছে। তােমরা যখন উভয়ে উভয়ের প্রণয়ে সুখী হইবে, তখন সেই সুখ সংবাদ লিখিও। আশীর্বাদ কর ভাই। হরি যেন আমাকে আরও বল দেন,—যেৰ এই আনন্দ-বামে আমাকে নিরানন্দ করেন না। তােমার ভাই যােগেশ।” . সুরেশে আশায় বিবাহ হইল। এক বৎসর সুরেশের পরম সুখে কাটিল। তখন অকস্মাৎ এক দিন আশা মৃত্যু শয্যায় শয়ন করিলেন। কোরকে কীট কাটিয়া কাটিয়া শুষিয়া শুষিয়া আশা
[ ৬৮ ]
কুসুমের সত্বা নিঃশেষ করিয়াছে। মৃত্যুর অবহিত পূৰ্ব্বে স্বামীর
কর্ণে মুখ রাখিয়া আশা একটী ক্ষুদ্র কথা বলিলেন। সুরেশ
চমকিয়া উঠিলেন—আশা যােগেশকে ভাল বাসিত।
আর জিজ্ঞাসার সময় নাই। চাহিয়া দেখেন চিরঘুমে আশার
নেত্র নিমীলিত। আমার প্রাণ স্বর্গে উড়িয়াছে।
দুই বৎসর পরে সুরেশ আবার বিবাহ করিলেন। দ্বিতীয়
বিবাহে পুত্র কন্যা লইয়া সুয়েশ আবার সুখী হইলেন। সুরে-
শের পুত্র রমণীমােহন আজি পুরের প্রতাপশালী জমিদার ।
*
*
আর ঐ লক্ষ তীর্থ যাত্রীর জয়নাদে যে গিরি গহ্বরের
পাষাণ ছাদ বিদীর্ণ হইতেছে,-ঐ যে গিরি গহ্বর দেখিতেছ,
ঐ গিরি গহ্বরের মধ্যে আমাদের যােগেশ বা তীর্থ যাত্রীর অটলা-
নন্দ স্বামী অর্ধ শতাব্দী সমাধিস্থ ছিলেন। অটলানন্দের মহা-
ধ্যান দৃষ্টে ইন্দ্রাদি দেবগণের শঙ্কার সীমা ছিল না। অর্ধ শতাব্দী
পরে অটলানন্দ মনুষ্য কলেবর পরিত্যাগ করেন।
আজ ঐ ইন্দ্রাসনে কে !-উনি কি যােগেশ ?
(৬)
আমার মৃণাল।
--- ০ ০ ০
এক বৎসর মাত্র আমার বিবাহ হইয়াছে। আমার মৃণাকে
আমি ছেলে বেলা হইতেই ভাল বাসিতাম,--মৃণাল আমাদের
পাড়ার মেয়ে, ছেলে বেলা থেকে তার সঙ্গে এক সঙ্গে খেলা করি-
য়াছি,-এক সঙ্গে দিন কাটাইয়াছি। আমি মৃণালকে কত ভাল
বাসিতাম,---তাহা আমি বলিতে পারি না,—তাহা আনি নিজেই
জানিতাম না। আমার সুখের মাত্রা পূর্ণ করিবার জন্যই যেন
তাহার সহিত আমার বিবাহ হইল। আমরা দুইজনে এক
বৎসর কত সুখে কাটাইলাম তাহা বর্ণনা করিতে পারি না।
আমি এমে এ বি এল পাস করিয়াছিলাম, চাকরি জুটে নাই:
ওকালতিতে আজ কাল কিছু হয় না বলিয়া আনি বাটী বসিয়া
ছিলাম,-মৃণালকে ফেলিয়া আমার কোথাও যাইতে প্রাণ চাহেনা।
বাবা কত বলিতেন,-বন্ধুগণ কত উপহাস করিতেন। সকলেই
বলিত, কলিকাতায় গিয়া চেষ্টা বেষ্টা কর, কিন্তু আমি কাহারও
কথাই শুনিতাম না। আমি মুন্সেফির জন্য দরখাস্ত করিয়া-
ছিলাম। কখন কখন মনে হইতে যে, কলিকাতায় গিয়া একবার
তাহারই একটু তদবির করি, কিন্তু বাটী আসিয়া সেই মৃণালের
হাসিমাখা সেই মুখ খানি দেখিতাম,অমনি আমি জগৎ সংসার
ভুলিয়া যাইতাম,চাকরি বাকরির কথা বিস্মৃত হইতাম। ভিক্ষা
করিয়া খাইতে হয় তাহাও স্বীকার,-আমি প্রাণ থাকিতে কখন
আমার মৃণালকে ছাড়িয়া যাইতে পারিব না।
[ ৭০ ] বিবাহের বৎসর প্রায় পূর্ণ হইয়াছে, এমন সময়ে একদিন ডাক পিয়ন আসিয়া আমার হস্তে এক খানি পত্র দিল। পত্রখানি দেখিয়াই আমার হৃদয়ে বড় আনন্দ হইল,-সকারি পত্র দেখিয়া পত্র না পড়িয়াই—আমি বুঝিলাম আমার অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন হইয়াছে। সত্বর পত্ৰ খুলিয়া পাঠ করিলাম, দেখিলাম আমি মুন্সেফ নিযুক্ত হইয়াছি,আমাকে বরিশাল জেলায় ভােলা নামক মহকুমায় যাই- বার জন্য আজ্ঞা হইয়াছে। প্রথম পত্র খানি পাইয়া বড় আনন্দিত হইয়াছিল, কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যে হৃদয়ে বিদ্যুতের ন্যায় আমার মৃণালের বিষাদপূর্ণ মুখ খানি বাঁকিল,—অমনি আমার হৃদয়ে যেন কেহ সহসা অগ্নি আলিয়া দিল,আমি দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলাম, “এ সংসারে কেহ কখন সুখী হয় না।” এতদিন পরে মৃণালকে ছাড়িয়া যাইতে হইল। এ চাকরি ততা ত্যাগ করা সম্ভব নহে। আমি সেই দূর দেশে গমনের জন্য আয়ােজন করিতে লাগিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে মৃণালকে বুঝাইতে লাগিলাম। সে যে কিছুতেই বুঝেনা,—সে যে প্রত্যহ রাত্রে কঁদিয়া কঁদিয়া চোক ফুলাইয়া ফেলিল। সে আমাকে যাইতে বারণ করে না, কেবল আমার গলা দুই হস্তে জড়াইয়া ধরিয়া, মুখ খানি আমার দিকে তুলিয়া, হার সজল নয়নদ্বয় আমার নয়নে সন্মিলিত করিয়া কাতর, স্বরে,-ব্যাকুল স্বরে বলে,—আমায় সঙ্গে করে নিয়ে যাও।” আমি কত বুঝাইলাম, “সে দেশ অনেক দূর, কত বড় বড় নদী দিয়ে যেতে হয়,আমার নিজেরই সে দেশে যেতে ভয় কচ্চে,-তােমায় কেমন করে সেই দূর দেশে, অপরিচিত স্থানে নিয়ে যাব—বরং সেখানে গিয়ে সকল দেখে শুনে এসে [ ৭১ ] তােমায় নিয়ে যাব।” কিন্তু এত কথায়ও সে কিছুই বুঝে না, সে যে এখনও বালিকা,-তাহার বয়স এখনও চতুর্দশ পূর্ণ হয় নাই। অবশেষে আমার অসহ্য হইল, আমি বালিকা স্ত্রীকে লইয়া সেই বিদেশে যাইতে মনস্থ করিলাম। একথা শুনিয়? কত জুনে কত বিদ্রুপ করিল,—পিতা কত রাগ করিলেন; কিন্তু আমি স্পষ্টই বলিলাম, “হয় মৃণালকে সঙ্গে লইয়া যাইব, নতুবা চাকরী করিতে একেবারেই যাইব না। আমার ভাবগতিক দেখিয়া কেহ কিছু বলিলেন না, কিন্তু সকলেই বিরক্ত ও দুঃখিত হইলেন। কেবল আমার মৃণালের আর আনন্দ ধরে না,-তাহার মুখে হাসি উৎফুল্ল হইয়া যেন বদন প্লাবিত করিতে লাগিল,—সত্য কথা বলিতে কি, এরূপ বিদেশে নূতন স্থানে স্ত্রীকে সঙ্গে লইয়া যাওয়া যে কত কষ্ট, কত অসুবিধা, কত বিপদ জনক তাই সমস্তই আমি ভুলিয়া গেলাম। আমার হৃদয়ে ও বড় আনন্দ হইল। পথের অসুবিধা, কষ্ট আমরা উভয়ে উপলব্ধি করিতে পারিলাম না, উভয়ে উভয়ের সঙ্গসুখ ভােগে সংসারের সকল কষ্ট বিস্মৃত হই- লাম। নৌকায় করিয়া উন্মত্তা মাতঙ্গিনী সদৃশা পদ্মা ও অন্যান্য নানা নদীর মধ্য দিয়া আমরা প্রায় ৭ দিন গেলাম। এই সাতদিন যে আমাদের কি সুখে কাটিয়াছিল, তা এ জীবনে কখনও বিস্মৃত হইব না। কিন্তু আমরা যতই আমাদের গন্তব্য স্থানের সন্নিকটবর্তী হইতে লাগিলাম,আমার মৃণালের বদমে- ততই যেন কেমন একটী বিষাদের ছায়া পড়িতে লাগিল। যাহাতে সে আমার সঙ্গে না আইসে এইজন্য বাটীর মেয়েরা তাহাকে ভয় দেখাইয়া বলিয়াছিল,-বলিয়াছিল, সে দেশ ঝড় [ ৭২ ] ও জল হয়ে ডুবে যায়। একথা মৃণাল ভুলে নাই,-আমার সঙ্গে আসিবার জন্য সকল বাধা, বিপত্তি, ভয় ত্যা করিয়াছিল। এখন কয়দিন হইতে তাহার মনে এই ঝড়ের কথা স্বতঃই উদিত হইতে লাগিল। সে মধ্যে মধ্যে আমায় জিজ্ঞাসা করে, “ঝড় বােধ হয় হবে , যদি ঝড়,” আমি হাসিয়া তাহাকে সাহস দি, বলি, “ঝড় কি বছর বছর হয়, ক্ষেপী, ঝড় হবে ? কেন আর ঝড় হলেই বা ভয় কি ? আমি তােমার কাছে থাকতে তােমার ভয় কি ?” অবশেষে নানা বিপদ আপদ উত্তীর্ণ হইয়া আমরা সেই অগম্য ভােলায় উপস্থিত হইলাম। ভােলা একটী দ্বীপ,-যেখানে গঙ্গা ও ব্রহ্ম পুত্র সম্মিলিত হইয়া সাগরে মিলিয়াছে—সেই স্থানে অবস্থিত। ইহার চারিদিকেই সমুদ্রবৎ উত্তাল তরঙ্গময়ী নদী। আমরা একটা ক্ষুদ্র বাড়া পাইলাম, সেই বাড়ীতে আমাদের দ্রব্যাদি উঠাইয়া বাস করিতে লাগিলা স্থলে আসিয়া যেন মৃণালের সে ভয় দূর হইল, তাহার মুখ হইতে যেন সে বিষাদ মেঘ অপসারিত হইল,-সে গৃহ কৰ্ম্মে মন দিল,কারণ এখানে সেই গৃহিণী। কিন্তু রাত্রে সে দুই হস্তে আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া শয়ন করিত,—নিদ্রিত হইলেও আমি তাহার বাহু পাশ হইতে মুক্তি লাভ করিতে পারিতাম না। এক দিন জিজ্ঞাসা করায় বলিল, “তুমি হাসিবে বলিব না।” আমি পীড়াপীড়ি করায় অবশেষে বলিল, “আমার কেমন মনে হয় তােমায় যেন হারাইব।” আমি বালিকার বালস্বভাবসুলভ কথায় সত্য সত্যই হাসিয়া উঠি- লাম। এক দিন রাত্রে,কত রাত্রে তাহা জানি না,সহসা আমার নিদ্রা ভঙ্গ হইয়া গেল। চারিদিক গাঢ় অন্ধকারে পূর্ণ [ ৭৩ ] মৃণাল আমার মাথা ধীরে ধীরে নাড়িতেছে ও বলিতেছে “উঠ উঠ, শীঘ্র উঠ, ঝড় এসেছে।” আমি লম্ফ দিয়া উঠিলাম, চারি- দিকে যে প্রলয় কোলাহল উঠিয়াছে। একটা কি ভয়ানক শকে সমস্ত পৃথিবী পূর্ণ হইয়াছে, আকাশে মেঘ ডাকিতেছে, মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছে, প্রবল বেগে পবন ছুটিতেছে,—প্রকৃতই ঝড় উঠি য়াছে। বাহিরে কি হইতেছে,-অপর সকলে কি করিতেছে, তাহা কিছুই জানিবার উপায় নাই,-ভয়ে মৃণাল আমার গলা দুই হস্তে জড়াইয়া ধরিয়াছে। আমি তাহাকে সাহস দিবার জন্য বলিলাম, “ভয় কি? আমি রয়েছি, ভয় কি ?” সে কাতরস্বরে কেবল মাত্র বলিল, “তোমার কাছে আমার ভয় নাই।” আমি বুঝিলাম, এ ঝড় সামান্য নহে। দেখিতে দেখিতে আমাদের ঘরের চাল উড়িয়া গেল, আমি পদে জল স্পর্শ করিলাম,-প্রথম ভাবিলাম বৃষ্টির জল, কিন্তু বৃষ্টির জল মুহূর্তে মুহূর্তে বৃদ্ধি হইবে কেন, তখন বুঝিলাম। শুনিয়াছিলাম ঝড় হইলে ভােলা সকলই ডুবিয়া যায় । এখন বুঝিলাম, আজ ভােলায় সেই ঝড় আরম্ভ হইয়াছে। আমি আমার জন্য ভীত নই,আমার মৃণাল প্রতি মাকে কি এই দূরদেশে বিসর্জন দিতে আনিয়াছিলাম ? আমি মৃণালকে হৃদয়ে টানিয়া লইয়া বলিলাম, “মৃণাল ভয় কচ্চে? তুমি ব্যাকুল হলে কিছুই হবে না। দুই জনেই মজিব,” মৃণাল কেবল বলিল, “কই, আমার তাে ভয় কচ্চে না।” তত- ক্ষণে জল প্রায় কটি পৰ্য্যন্ত উঠিয়াছে। একটা উপায় না করিলে উভয়কেই ডুবিয়া মরিতে হয়। আমি সত্বর বালিশগুলি একত্র করিয়া কাপড় দিয়া উত্তম করিয়া বাধিলাম, এক হস্তে বালিশ- গুলি ধরিলাম অপর হস্তে মৃণালকে টানিয়া বুকে লইলাম, তৎ- * [ ৭৪ ৭৪ ] । পরে ভাবিলাম, “ছেলে বেলায় এত সাঁতার শিখিয়াছিলাম, জলে ডুবিয়া কখন মরিব না, আর প্রাণ থাকিছে মৃণালকে কখন জলে ডুবিয়া মরিতে দিব না।” সে প্রলয়কাণ্ড বর্ণনা করা যায় না। সমস্ত পৃথিবী যেন ধ্বংস কাণ্ডের মধ্যে,আমরা দুইটীতে যেন ধ্বংসীভূত হইতেছি। অন্যের বিষয় ভাবিবার সময় নাই। কেবল বুঝিতেছি, প্রবলবেগে ঝড় উঠিয়াছে, সমস্ত দেশ জলমগ্ন হইতেছে, একটী ভয়ানক শব্দ কেবল কর্ণ কুহরে প্রবিষ্ট হইতেছে। কি হইতেছে আর কি না হইতেছে তাহা আমার আর জ্ঞান নাই। কিয়ৎক্ষণ পরে বুঝিলাম বালিশে ভর করিয়া আমরা ভাসিয়াছি, বায়ুবেগে কোন্ দিকে ভাসিয়া যাইতেছি ;-প্রাণের আশা একেবারেই নাই। যদি মুণাল হৃদয়ে না থাকিত তবে এতক্ষণে আমি ডুবিতাম। সহসা একটা বৃক্ষে আসিয়া আমার মত আঘাতিত হইয়া ভগ্ন হইল। তখন তাহা দেখিবার সময় ছিল না। আমি বৃক্ষের একটী ডাল ধরিলাম, বুঝিলাম সেটা একটী নারিকেল গাছ ; তখন বালিশ গুলিকে পায়ের সহিত আটকাইয়া বৃক্ষে ভর করিলাম। একবার আকুল হইয়া চীৎকার করিয়া ডাকিলাম “মৃণাল ? মৃণাল ? এক- বার কথা কও, তাহলে যে আমি আমার হৃদয়ে বল পাই।” মৃণাল কথা কহিল, সেই প্রলয়ের মধ্যে সে দুই হন্তে আমার গলা জড়া- ইয়া ধরিয়া আমাকে চুম্বন করিল,-“বলিল নাথ ? তােমার সঙ্গে আমার ভয় কি?” এই সময় বায়ুর বেগে বৃক্ষশাখা ভগ্ন হইল, আমরা উভয়ে জলে পড়িলাম। আমি বৃক্ষশাখা পুনৰ্ব্বার ধরিতে গেলাম,অমনি বাতাসের ঝটকা আসিয়া মৃণালকে হৃদয় হইতে বিছিন্ন করিয়া লইল। আমিও তৎক্ষণাৎ সেই অন্ধ [ ৭৫ ] কারে জলে ঝম্প দিলাম, দক্ষিণ হস্তে তাহার কেশগুচ্ছ ধরিয়া আবার তাহাকে হৃদয়ে লইলাম, বাম হস্তে আবার বৃক্ষ শাখা ধরিলাম। কত ডাকিলাম, “মৃণাল মৃণাল” করিয়া কত চীৎ- কার করিলাম, কিন্তু মৃণাল মূৰ্জিত হইয়াছে। সমস্ত রাত্রি সেই প্রলয়ের মধ্যে তাহাকে হৃদয়ে ধারণ করিয়া ভাসিতে লাগিলাম। আমার হাত পা, সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ক্রমে শীতল ও অবশ হইয়া আসিতে লাগিল, কিন্তু প্রাণ যায় তাহাও স্বীকার, তত্রাচ মৃণাকে ত্যাগ করিতে পারিব না। প্রভাত আর হয় না, আমার মৃণাল কি আর জীবিত নাই? তবে সে আমার কাতর স্বর শুনিতে পায় না কেন? সে তাে কখনও আমার ডাক না শুনিয়া থাকে না। আমি তাহার অবশ দেহ হৃদয়ে আরও টানিয়া লইলাম। অবশেষে সেই কাল রাত্রির অবসান হইল। ক্রমে পূৰ্ব্ব দিক পরিষ্কার হইল, সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের ও অবসান হইল। ক্রমে পৃথিবীতে আলাে দেখা দিল। আমি ব্যাকুল হইয়া আমার মৃণালের মুখের দিকে চাহিলাম ;-সে আমার মৃণাল নয় অপর একটী স্ত্রীলােক।
স্বামী পূজা মেহেতে বিমলে বড় ভাৰ। এই সবে এক বৎসর না তাহাদের বিবাহ হইয়াছে। বিবাহের প্রথম বৎসর যেরূপ প্রেমের প্রবণতা থাকে, তেমনটা আর কখনও থাকে না। বিবা- হের প্রথম বৎসর যেমন সুখে কাটে, তেমন সুখে পরে কাটিলেও সে সুখের মধ্যে সে মধুরতা টুকু থাকে না। স্নেহ ও বিমল বড় সুখেই আছে। এ সংসারে সকল সুখেই বাদ পড়ে; এমন যে গােলাপ তাহা- তেও কাটা আছে। স্নেহের যৌবন-লাবণ্য যত দিন দিন বাড়িতে লাগিল, বিমলের মনে ততই অশান্তি জন্মিতে লাগিল। স্নেহ তাহার দেবরের সহিত যেন অধিক ঘনিষ্টতা দেখায়, সে চারুর সহিত অধিকক্ষণ থাকিতে ভাল বাসে, সে যেন আর বিমলকে তত ভাল বাসে না। হয়তাে বিমলের হৃদয়ে বিদ্বেষ-রাক্ষস আসিয়া তাহার মনে এই সকল মিথ্যা বিভীষিকার উদয় করিয়া দিতেছিল। বিদ্বেষের মত মানবের মুখের শক্র আর কেহ নাই। সুখের সংসারে বিদ্বেষ প্রবেশ করিলে সে সংসার হার- খার করিয়া যায়। বিমলের এমন সুখেও দুঃখের মেঘ উদিত হইল ; তাহার হৃদয়ে দিন দিন বিদ্বেষ প্রবল হইতে আরম্ভ করিল,-তিনি দিন দিন মনে না কুভাবনা ভাবিতে লাগি- লেন। তাঁহার নয়নে কালিমার দাগ পড়িল, বদনে বিষাদের মেঘ দেখা দিল,শরীর দিন দিন ক্ষীণ হইতে আরম্ভ করিল।
[ ৭৭ ] যেন কি এক বিষাক্ত কীট তাহার হৃদয়ে প্রবেশ করিয়া তাহার হৃদয় তিল তিল করিয়া কাটিয়া ফেলিতে লাগিল। মেহ ইহার কিছুই বুঝিতে পারে না। তাহার বিমল আর সে বিমল নাই, এই বুঝে। কেন তাহার বিমলের এরূপ পরি বৰ্ত্তন ঘটিল,—তাহা ভাবিয়া পায় না। বিমলকে জিজ্ঞাসা করিলে চক্ষু আরক্ত হয়, তাঁহার মুখ হইতে যেন কি এক আগুণ বাহির হইতে থাকে। মেহ বিমলের সে মূর্তি দেখিলে ভয় পায়, সে ভয়ে আর কোন কথা কয় না। আদর করিতে গেলে,-কথা কহিতে গেলে,-স্বামী বিরক্ত হন দেখিয়া সে হৃদয়ের কষ্ট হৃদয়ে গােপন করিয়া মুখ লুকাইয়া শয়ন করে। উভয়েই উভয়কে বুঝিতে পারে না। বিমলের হৃদয়ের প্রকৃত ভাব আর এক জন বুঝিল। সে বাটীর শ্যামী ঝি। শ্যামীর বয়স অল্প, সে বিধবা,চিরকাল পাপে বৰ্ধিতা। অনেক দিন হইতে তাহার বিমলের প্রতি দৃষ্টি ছিল। বিমল বড় ভাল ছেলে, তাই সে সাহস করিয়া বিমলকে কিছু বলিতে পারিত না। নিজের মনের ভাব মনেই গােপন রাখিত। এত দিন পরে সে দেখিল বড় সুবিধা। পপি নিজ বিদ্বে-অস্ত্র দ্বারা বিমলের হৃদয়স্থ প্রেমকে নষ্ট করিয়াছে। এক্ষণে সে হৃদয়ে পাপের সিংহাসন স্থাপিত হইবে। এই তত সুবিধা ;-সে মেহের সর্বনাশের আয়ােজন করিল। মেহ স্বামীর হৃদয়ের ভাব কিছুই বুঝিতে না পারিয়া স্বামীকে নিজ হৃদয়ের দুঃখ জানাইয়া এক খানি পত্র লিখিতে বসিল। স্বামী যে মুখে বলিলে কিছু শুনেন না,-মুখে যে সকল কথা আসে [ ৭৮ ] । পত্র লিখিলে তিনি কি পড়িবেন? পড়িবেন বই কিতা হইলে তাহার হৃদয় যে বিদীর্ণ হইয়া যায়। তাহার বিমলের এমন হইল কেন? কিন্তু কয়েক লাইন লিখিয়া সে আর লিখিতে পারিল না, কি লিখিবে ভাবিয়া পাইল না। অন্য সময়ে আবার লিখিবে ভাবিয়া পত্র খানি পুস্তকের ভিতর রাখিয়া দিল। সৰ্ব্বনাশী শ্যামী সন্ধানে সন্ধানে ছিল? সে সেই পত্র খানি চুরি করিল। এত দিনে সেই পত্র খানি দ্বারা তাহার মনস্কামনা পূর্ণ হইবে। সে কোন গতিকে এক দিন সেই পত্র খানি বিম- লের সম্মুখে ফেলিল, যেন হঠাৎ হাত হইতে পড়িয়া গিয়াছে বলিয়া তৎক্ষণাৎ তুলিয়া লইল। বিমল সকল বিষয়েই এক্ষণে সন্দিগ্ধ। শ্যামীকে এ্যন্তভাবে পত্র খানি তুলিয়া লইয়া লুকাইতে দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,-“শ্যামী ও কিরে ?” শ্যামী। ও কিছুই নয়, বড় বাবু। বিমল। কার চিটি দেখি। শ্যামী। ছােট বাবুর চিটি। বিমল। কে দিয়েছে ? সে আর আপনার শুনে কাজ নেই। অমনি বিমলের হৃদয়ের মধ্য দিয়া যেন বিদ্যুৎ ছুটিয়া গেল, বিমল লম্ফ দিয়া গিয়া শ্যামীর হাত ধরিলেন। মুহূৰ্ত্ত মধ্যে পত্র খানি কাড়িয়া লইয়া পড়িলেন। প্রাণনাথ, তােমার স্নেহ কি অপরাধ করেছে যে তার উপর রাগ করেছ ? বল কি কল্লে তােমার সন্তোষ হয়। যার জন্য প্রাণ দিতে পারি, তার বিষয় মুখ কি আমার সয় মাথ- শ্যামী। ==
[ ৭৯ ]
বিমল বিদ্বেষের তাড়নায় হিতাহিত জ্ঞান রহিত হইলেন,-
পত্রে কাহারও নাম নাই, তবে মেহের হাতের লেখা। স্নেহ
পত্র কাহাকে লিখিতেছিল—তিনি তাহাও বিবেচনা করিলেন
না।তাহার চক্ষু হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতে লাগিল ।
তিনি রাগতসিংহের ন্যায় সে স্থান পরিত্যাগ করিয়া
গেলেন।
৫
“দেখাতে পারিস ?”
বিমল এই কথা বলিয়া সবলে শ্যামীর হাত ধরিলেন।
শামীতাে এই চায়। এই স্পর্শসুখ লাভের জন্য যে, সে সকলই
করিতে পারে।
সে ধীরে ধীরে বলিল” “পারি বই কি।”
বিমল।
তবে দেখা, আজই দেখা।
শ্যামী। আজ কেমন করে হবে? কাল তুমি আমার ঘরে
এসে লুকিয়ে থেক, সেই সময় আমি বৌ দিদি ডাকচে বলে ছােট
বাবুকে তার ঘরে ডেকে দেব।
বিমলের আর সহ্য হইল না। তিনি যে স্নেহকে বড় ভাল
বাসিতেন। তঁহার হৃদয় যেন বিদীর্ণ হইবার উপক্রম করিল।
তিনি দুই হস্তে শ্যামীর গলা জড়াইয়া ফুকারিয়া কাঁদিয়া
উঠিলেন।
:
মেহ স্বামীর পার্শ্বে নিদ্রা যাইতেছিল। সহসা কি স্বপ্ন দেখিয়া
চমকিত হইয়া উঠিয়া বসিল। দেখিল বিমল গৃহ মধ্যে পদচারণ
করিতেছে,তাহার হাতে এক শাণিত ছুরিকা। প্রদীপের
[ ৮০ ]
!
আলােকে ছুরিকা মধ্যে মধ্যে ঝক ঝক করিয়া উঠিতেছে। সে
স্বপ্ন দেখিতেছিল যেন তাহায় গলায় বিমল ছুয়িকা বসাইতেছেন,
তাই তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছিল। নিদ্রা ভঙ্গ হইয়াও
স্বামীকে এইরূপ ভাবে পদচারণ করিতে দেখিয়া সে একে-
বারে স্তম্ভিত ও ভীত হইল। সে যে বালিকা মাত্র। বিমল
ধীরে ধীরে তাহার নিকটে আসিলেন, বাম হস্তে তাহার
চিবুক ধরিয়া তাহার মুখ খানি তুলিলেন, বহুক্ষণ একদৃষ্টে তাহার
দিকে চাহিয়া রহিলেন, তৎপরে একবারে কঁদিয়া উঠিলেন।
এতক্ষণে স্নেহের কথা ফুটিল। সে বলিল, “বিমল? বিমল ?
তােমার কি হয়েছে আমায় বল।” অমনি লম্ফ দিয়া আসিয়া
বিমল তাহার মুখ চাপিয়া ধরিলেন, বলিলেন, “রাক্ষসি ! আর
ছলনায় কাজ নেই, তুই যে এখনও শিশু। ছি ! ছি ! স্ত্রীলােক
কে চেনা যায় না। কে ভাবিয়াছিল যে এই ক্ষুদ্র বালিকা এরূপ
কুলটা, এরূপ শঠ, এরূপ বিশ্বাসঘাতিনী,—আর মুখ দেখ, যেন
সরলতা মাখা। এ সংসারে স্ত্রীলােকের মায়া বুঝা যায় না।
তাের কিছু প্রার্থনা থাকে, বল্।”
স্নেহ বহুক্ষণ স্বামীর দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকিল ; তৎপরে
ধীরে ধীরে অতি কাতরে কহিল, হঁ্যা একটী ভিক্ষা আছে।
মরিতে আমি অনিচ্ছুক নই। তােমার যদি তাতে সন্তোষ হয়,
তবে আমি মরিব বই কি। তবে এই ভিক্ষা আজ রাত্রিটা ক্ষমা
কর ; কাল প্রাতে স্নান করে, তােমায় পূজা করে আমি নিজেই
মরিবার জন্য প্রস্তুত হব। এই আমার ভিক্ষা।
বিমল। আচ্ছা, তাই হবে। তােমার প্রাণের আশা ত্যাগ
[ ৮১ ] গেহ। প্রাণ আর কাহার জন্য রাখিব ? দুইজনে নীরবে সে রাত্রি কাটাইলেন। * অতি প্রত্যুষে স্নেহ স্নান করিতে গেল। স্নান করিয়া সে বাগান হইতে নানা ফুল তুলিয়া আনিল। সৰ্ব্বাপেক্ষা ভাল কাপড় খানি পরিধান করিল, বেশ করিয়া সিঁতায় সিন্দুর দিল, তৎপরে মন্দ মন্দ গমনে ধীরে ধীরে স্বামীর সম্মুখে আসিয়া বসিল। বিমল পালঙ্কে বসিয়া একদিকে একদৃষ্টে চাহিয়া ছিলেন, স্নেহ কি করিতেছিল, তাহা তাঁহার জ্ঞান নাই। সে স্বামীর পদতলে সমস্ত ফুলগুলি অঞ্জলী দিল, স্বামীর পদধূলি মস্তকে লইল,-তৎপরে স্বামীর চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া বলিল, “নাথ? ছুরিখানি দাও অভিষেক করিয়া দি।” এতক্ষণে বিমলের চৈতন্য হইল,-বা সম্পূর্ণ চৈতন্য হইল। স্নেহ কি করিতেছে তাহা কিছুই বুঝিতে পারিলেন না,--কেমন আপনা আপনিই ছুরিকা খানি তাহার হাতে দিলেন। মুহূৰ্ত্ত মধ্যে স্নেহ পাগলিনীর ন্যায় লম্ফ দিয়া উঠিল, মুহুর্ত মধ্যে সে নিজের গলায় ছুরি বসাইল। শরীর হইতে মস্তক প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হইল, তীর বেগে রক্ত ছুটিল,—সে স্বামীর চরণ- তলে রক্তে লুটিয়া পড়িল। নির্বোধের ন্যায় একদৃষ্টে বিমল এই ভীষণ ললাম-হর্ষণ কাণ্ডের দিকে চাহিয়া ছিলেন। এতক্ষণে তাহার সংজ্ঞা হইল। তিনি বিকট চীৎকার করিয়া উঠিলেন,-তঁাহার চীৎকার দূরে দূরে প্রতিধ্বনিত হইল। তিনি বলিলেন, “স্নেহ, স্নেহ, করিলে কি ?”
**
[ ৮২ ]
স্বামীর সাদরসম্ভাষণে যেন মেহের ছিন্ন মস্তকে প্রাণ
আসিল, তাহার বনে হাসি দেখ দিল,—সে বলিল, “আমি
তোমারই।”
পাগলের ন্যায় বিমল যাইয়া স্ত্রীর অবশ দেহ ক্রোড়ে করিয়া
তুলিলেন,-স্নেহ আর নাই ।
(৭)
লক্ষ টাকা।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
দুই প্রহর, আকাশ হইতে সূৰ্য্যদেব অগ্নি বর্ষণ করিতেছেন,
চারি বন্ধুতে আসিয়া বিস্তৃত প্রান্তরস্থিত বটবৃক্ষনিম্নে উপবিষ্ট
হইলেন,-একজন বলিলেন, “আঃ কি রৌদ্র।” অপরে বলিলেন,
“ঐ বােধ হয় সে দুর্গ, কি বল, রাম ?” রাম উত্তর করিলেন,
“ঐ বােধ হয়, একজন চাষা এই দিকে আসছে, ওকে জিজ্ঞাসা
করা যাক।”
কিয়ৎক্ষণ পরে কৃষক নিকটস্থ হইলে রাম বাবু জিজ্ঞাসা
করিলেন, “বাপু ঐ টেই কি শৈলেশ্বরের গড়?”
“আজ্ঞে হঁ্যা মশায়।”
বন্ধুদিগের মধ্যে একজন কহিলেন, “বাপু, যদি তােমার
কাজ বেশী না থাকে তাহলে এই ছায়ায় বসে একটু জিরােও,
আমাদের ঐ গড়ের বিষয়ে কিছু জানার আছে।”
“আচ্ছা, তা বসছি, আপনারা কারা ?”
রামবাবু। এর নাম অখিল বাবু, ওঁর নাম ভুবন বাবু,
নাম রমেশ বাবু, আর আমার নাম রাম। আমরা চারিটী বন্ধু ঐ
গড়ের নানা কথা শুনে একবার দেখতে এসেছি।
কৃষক ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিল, “বুঝেছি, বাবুরা ঐ গড়ের
টাকার কথা শুনে এসেছেন।”
[ ৮৪ ]
রমেশ। তােমরা কি টাকার বিষয় জান?
অখিল। একথাটা কি সত্যি?
কৃষক। চিরকাল শুনে আসছি যে,ঐ গড়ের মধ্যে বাহি-
রের একটা ঘরে অনেক টাকা আছে।
রমেশ। কত টাকা হবে?
অখিল। লাক টাকা, কি বল, লাক টাকা, এর কিছু
শুনেছ ?
কৃষক। ঐ রকম শুতে পাই।
রাম। আচ্ছা, তবে ঐ টাকা কেউ নেয়না কেন?
ভুবন। ওখানে ভূত আছে তাকি সত্যি?
কৃষক। বাবু, অত কিছু আমি জানি না, শুনেছি ওখানে
টাকা আছে,—যরি টাকা বলে আমরা কখন ওর কাছেও
যাইনে।
অখিল। তােমরা চাষা লােক, তােমাদের ভয় পাইবারই
কথা; কিন্তু আর কেউ টাকার সম্বন্ধে এসেছে দেখেছ ?
কৃষক। একজন! তােনাদের মত কত বাবু এসেছে।
রাম। তারা টাকা নিতে পারে নি ?
কৃষক।
না।
ভুবন। কেন?
কৃষক। কেন! যে ওখানে যায় সে আর ফিরে আসে না।
অখিল। কোন লােক জন ওখানে আছে ?
কৃষক। কেউ না, বাবু এখন আমি চল্লাম। আপনারা
কেন ওখানে যাবেন, গেলে আর ফিরবেন না।
এই বলিয়া কৃষক প্রস্থান করিল। সে যাইতে না যাইতে
[ ৮৫ ]
বন্ধুগণ উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিলেন। ভুবন বাবু বলিলেন, “মা-
ষের কুসংস্কার !”
অখিল। আমি আশ্চর্য হচ্ছি, মানুষ এখনও ভূতের ভয
করে ?
রমেশ। দেখা যাবে ভূতের কটা হাত কটা পা।
রাম। সকলে এক সঙ্গে যাবে,-না, একে একে ?
অখিল। একে একে যেতে হবে, তা না হলে কে
আমাদের কাপুরুষ বলবে।
ভুবন। সেই ঠিক কথা,-এক জন না :", ন হল
এক জুন চেষ্টা কৰ্বে।
রাম। তবে অখিল আগে যাও।
অখিল। বেশ আমিই যাব। তোমাদের তয় ২. :
হবে না। যখন লাক টাকা এনে সমুখে ফেলে =ে", ন হন্য
কথা,-এখন এই পর্যন্ত।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
তখন অখিল বাবু মহাদর্পে উঠিয়া শৈলেশ্বরের ড়ের দিকে
চলিলেন, বন্ধুগণ তাঁহার অপেক্ষায় সেই বৃক্ষনিম্নে বসিয়া
রহিলেন।
গড়ের নিকট আসিয়া দেখিলেন সেটা একটা স্বপ মাত্র।
তাহাতে অসংখ্য বৃক্ষ জন্মিয়া জঙ্গলাকীর্ণ হইয়ছ। একটা
[ ৮৬ ]
অর্ধভগ্ন সিংহদ্বার, গড়ের চারিদিকে জনপূর্ণ খাল, কেবল
দ্বারের সম্মুখে জল নাই। তিনি কষ্টে কষ্টে খাল পার হইয়া
ভিতরে প্রবিষ্ট হইলেন। তিনি গড়ের বহিক ভাব দেখিয়া
ভাবিয়াছিলেন যে ইহার ভিতর জন প্রাণ নাই, কিন্তু ভিতরে
প্রবিষ্ট হইয়া তাহার সে জম দূর হইল, তিনি দেখিলেন সুন্দর
সুন্দর অট্টালিকা, মধ্যস্থানে নানা দোকানে সজ্জিত বাজার,
অসংখ্য নর নারী কেনা বেচা করিতেছে। তিনি এই সকল
দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া চারিদিকে বিশেষ লক্ষ্য করিয়া
দেখিতে লাগিলেন, প্রথমে ভীত হইয়াছিলেন, প্রথমে ভাবিলেন
এ সমস্তই মায়া, ভূতের কাণ্ড; কিন্তু তিনি ভূত বিশ্বাস করি-
তেন না, বিশেষতঃ এই সকল লােক স্পষ্টই মানুষ, মানুষের
মত বেশভূষা, মানুষের মত কথাবার্তা, তাহার সঙ্গে ইহাদের
কোনই প্রভেদ নাই। তিনি তখন ভাবিলেন যে, গ্রামী লোক
নিতান্ত মুখ বলিয়াই তাহারা ভয়ে এই স্থানে আসে না, আবার
ভাবিলেন, গ্রামী লােকদিগকে দোষ দি কেন, এই সকল
লােকের মধ্যে নিশ্চয়ই গ্রানী লােক অনেক আছে। কোন
দুষ্ট কৃষক তাহাদিগের সহিত উপহাস করিয়াছে, তিনি মনে
মনে ভাবিলেন যে আবার যদি তাহার দেখা পান তবে তাহাকে
উত্তম মধ্যম প্রহার দিবেন।
চারিদিকে ঘুরিয়া তিনি সকল দেখিলেন, তৎপরে টাকা
কোথায় আছে তাহাই সন্ধান করিতে লাগিলেন। তিনি সত্বরই
দেখিতে পাইলেন যে বাজারের মধ্যস্থলে এক স্থলে পাকার
করিয়া টাকা ঢালা আছে এবং উহার নিকট এক প্রস্তর
খণ্ডে লিখিত, “লক্ষ টাকা, যে পার লও।” অখিল বাবু ভাবি-
[ ৮৭ ]
লেন, “এ লওয়া আর আশ্চৰ্য্যটা কি ?” কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়
এই যে এই টাকা বাজারের মধ্যে পড়ে আছে অথচ কেউ লয়
নাই। আমি জানি একজন একটা দিব্য দিয়াছিল বলিয়া
কেহ আর সে কাৰ্য্যটা করিত না। “এ টাকা লওয়া আশ্চৰ্য্য কি?
এখন মুটে ডেকে তুলে নিয়ে যাই।” এই ভাবিয়া অখিল বাবু
মুটের সন্ধানে গেলেন। কিন্তু সমস্ত বাজার ঘুরিয়া একটীও মুটে
দেখিতে পাইলেন না, তখন তিনি এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করি-
লেন, “মশায় এখানে মুটে কোথায় পাওয়া যায় ?” তিনি
চমকিত হইয়া ফিরিয়া বলিলেন, “আপনাকে এখানে নূতন
আগন্তুক দেখিতেছি। বেলা গিয়াছে, এখন তাে আর মুটে
পাবেন না। যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা কথা
বলি।”
অখিল। বলুন না, তার জন্য আর এত কথা কেন ?
ব্যক্তি। আপনাকে এখানে নূতন দেখিতেছি, আজ রাত্রে
কোথায় থাকিবেন?
অখিল। আপনার কাছে বলিতে কি, গড়ের বাহিরে
আমার কয়টী বন্ধু আমার জন্য অপেক্ষা কচ্চেন,—যেখানে থাকি
আমরা সকলে এক সঙ্গে থাকিব।
ব্যক্তি। সন্ধ্যা হইয়াছে,এখন এখান হতে একলা যাওয়া
ভাল নয়—এ যায়গা বড়ই খারাব।
অখিল। আমি তার জন্য বড় ভীত নই,তবে আজ কোন
কাজ হ’ল না বলেই দুঃখিত হয়েছি।
ব্যক্তি। আপনার এখানে আবার উদ্দেশ্য কি শুনিতে
পাই ?
[ ৮৮ ]
ব্যক্তি।
অখিল । আর গােপনের ফল কি ? এনে যে লাক টাক:
আছে তাই নিতে আমি এসেছি।
ও--আপনার নাম কি অখিল বাবু?
অখিল। আপনি কেমন করে জানলেন ?
তিনি একটু হাসিয়া বলিলেন, “আমার নাম রামনারায়ণ
তর্কবাগীশ। আমিই যক্ষির ঐ টাকা রক্ষা কচ্চি—যক্ষি আমাকে
বলেছিলেন যে আপনি এলে আপনাকে ঐ টাকা দিতে ; ও টাক
আপনারই।
অখিল। আমাকে আপনি কেমন করে চিনিলেন?
তর্কবাগীশ। গণনার দ্বারা।
ও টাকা আর কেউ নিতে পারে না কেন?
কবাগীশ। যক্ষি টাকা আপনাকেই দিয়াছেন, অথচ প্রকৃ
আপনি কে তাহা জানিবার জন্য আর আপনাকে এখানে আনি
বার জন্য ঐ টাকা আমাকে বাজারের মধ্যে রাখিতে বলেন
বাজারে লাক টাকা পড়িয়া আছে এ কথা শীঘ্রই দেশে দেকে
রটিবে, আর সেই টাকার সন্ধানে আপনার আসা সম্ভব।
অখিল । আর কেউ টাকা নিতে পারে নি কেন?
তর্কবাগীশ। ব্যস্ত হইবেন না, সকল কথাই বলিতেছি
যক্ষি এরূপ করিয়াছেন যে আপনি ব্যতীত আর যে কেউ ও
টাকায় হাত দিবে অমনি তাহার হাত পুড়িয়া যাইবে ।
অখিল। আমার প্রতি যক্ষি এত সন্তুষ্ট কেন বলিয়ে
পারেন ?
তর্ক। কারণ আপনি সুলক্ষণযুক্ত ব্যক্তি, সমস্ত পৃথি
বীর মধ্যে এমন আর কেহই নাই।
[ ৮৯ ]
নিজের প্রশংসা তাহাতে টাকা পাইবার আশা, অখিল বাবুর
হৃদয়ে আনন্দ আর ধরে না। তিনি ব্যগ্র হইয়া বলিলেন,
“তবে মশায় চলুন, টাকা দিবেন চলুন। আপনি এতদিন
আমার টাকা পাহারা দিয়া রাখিয়াছিলেন, আপনাকে অবশ্য
উপযুক্তরূপ সন্তুষ্ট করিব।” ব্রাহ্মণ উত্তর না দিয়া অগ্রবর্তী
হইলেন।
ব্রাহ্মণ বাজারের দিকে যান না দেখিয়া অখিল বাৰু বলি
লেন, “মশায়, কোথায় যান, টাকা যে বাজারে।”
তর্ক। সন্ধ্যার পর আর টাকা বাজারে থাকে না। আমার
বাড়ীতে সিন্ধুকে রাখা হয়, আবার দিন হলে বাজারে রাখা হয় ।
অধিল বাবু আর কোন কথা না কহিয়া ব্রাহ্মণের সঙ্গে সঙ্গে
চলিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
তর্কবাগীশ মহাশয়ের বাটী সুন্দর একটা অট্টালিকা, চাবি
দিকে পুষ্পেদ্যান, বৃক্ষে বৃক্ষে বিগিনীগণ সন্ধ্যার সঙ্গীত
গাইতেছে।
অখিল বাবু স্ফীত বক্ষে গম্ভীরভাবে ব্রাহ্মণের সঙ্গে বাটা
প্রবিষ্ট হইয়া একটী সুসজ্জিত প্রকোষ্ঠ মধ্যে উপবিষ্ট হইলেন ।
ৰাহ্মণ গৃহমধ্যস্থ একটী লৌহসিন্ধুক উন্মুক্ত করিয়া বলিলেন,
“অখিল বাবু এই দেখুন, আপনারই টাকা।”
-
[ ৯০ ]
অখিল। বার করুন, বার করুন।
ব্রাহ্মণ। এখন কেমন করে নিয়ে যাবেন, এখন মুটে পাওয়া
যাবে না, অপর রাত্রে এত টাকা নিয়ে যাওয়া কিছু নয়।
এ যায়গা বড়ই খারাব।
অখিল। আপনি ঠিক বলেছেন। এত টাকা নিয়ে যেতে
দিনের বেলায়ও আমার সঙ্গে জন কতক দরওয়ান চাই।
ব্রাহ্মণ। তা সমস্তই কাল ঠিক করে দিব। তাহা হলে
অনুগ্রহ করে আজ রাত্রি আমার বাড়ীতেই থাকুন।
অখিল বাবু টাকা পাইয়া ভাবিয়াছেন বড় লােক হইয়াছেন,
এক্ষণে তিনি ভাবিলেন যে তিনি যদি ব্রাহ্মণের বাড়ী থাকেন
তবে সে চরিতার্থ হইবে। এই ভাবিয়া গম্ভীর ভাবে উত্তর
করিলেন, “তাই হবে, সকালে আমার মুটে লােক জন ঠিক
থাকা চাই।”
ব্রাহ্মণ। যে আজ্ঞা তাই হবে।
ব্রাহ্মণ যথাসাধ্য অখিল বাবুর সাদর অভ্যর্থনা করিলেন ;
চব্য চোষ্য লেহ পেয় চতুধি আহারে তাঁহাকে পরিতুষ্ট করি-
লেন, তাঁহার জন্য সঙ্গীত বাদ্য হইল, নৃত্য গীত হইল, নানা-
বিধ আমােদের আয়ােজন হইল। অখিল বাবু মহা পরিতুষ্ট
হইয়া ব্রাহ্মণকে ভবিষ্যতে স্মরণ রাখিবেন বলিতে লাগিলেন।
নৃত্য গীত বন্ধ হইলে ব্রাহ্মণ বলিলেন, “এখনও অধিক রাত
হয় নাই, যদি ইচ্ছা করেন তােত খানিকটা খেলা যায়।”
অখিল। ক্ষতি কি, সময় তাে কাটান চাই।
খেলা আরম্ভ হইল, কিন্তু দুই একবার খেলার পরই ব্রাহ্মণ
বলিলেন, “আর খেলায় কাজ নাই, আপনি খেলিতে জানেন
[ ৯১ ] না।” ইহাতে অখিল বাবু মহা রাগত হইয়া বলিলেন, “কি বল্লি, বামন, আমি খেতে জানি নে।” অন্যান্য যাহাৱা উপ- স্থিত ছিলেন, তাঁহারা অখিল বাবুকে স্থির হইতে অনুরােধ করিয়া বলিলেন, “গােলযােগে কাজ কি ? বাজি রাখিয়া খেলুন, তাহ হইলেই জানা যাইবে কে খেলিতে পারে কেই বা না পারে ?” অখিল। খুব ভাল কথা। বামন, আমার টাকা থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে এস।তােমার টাকা আছে ? ব্রাহ্মণ । টাকা না থাকিলে আপনার সঙ্গে খেলিতে চাই ? তর্কবাগীশ মহাশয় টাকা আনিতে উঠিয়া গেলেন ; খেলায় মহা সমর হইবে প্রত্যাশা করিয়া অসংখ্য লােক সেই স্থানে উপস্থিত হইল। তাহাদের মধ্যে অখিল বাবু সম্রাটের ন্যায় বুক ফুলাইয়া বসিয়া রহিলেন। চতুর্থ পরিচ্ছেদ। খেলার বাই এমন নহে! প্রথম প্রথম অখিল বাবু প্রতি হাতে জিতিতে আরম্ভ করিলেন, তখন তিনি মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন, “তবে আর আমাকে পায় কে, আরও এক লাক টাকা অন্ততঃ জিতিব; তাদের সম্মুখে দু লাক টাকা নিয়ে ফেলতে পারলে তাহারা একেবারে আশ্চর্য হয়ে যাবে—সকলই কপাল, ভাই, সকলই কপাল!” কিন্তু এই চিন্তার পর হইতেই ; [ ৯২ ] অখিল বাবু হারিতে আরম্ভ করিলেন, তিনি যত হারেন, ততই তাহার মন খারাব হইতে লাগিল, মস্তক বিঘুর্ণিত হইতে লাগিল, তিনি ক্রমেই বাজীও বাড়াইতে লাগিলেন, দেখিতে দেখিতে তিনি পঞ্চাশ হাজার টাকা হারিলেন; তখন ব্রাহ্মণ কহিলেন, “মহাশয়, আর খেলিবেন না, আপনার পড়ত। খারাব হইয়াছে ; আর যদি খেলেন তবে সমস্তই হারিবেন, বরং কাল আবার দেখা যাবে।” কোথায় দুই লাক টাকা লইয়া যাইবেন, না ৫০ হাজার ! অখিল বাবু ভাবিলেন, “খেলায় হার জিত দুই আছে। কখনও বা হারিতে হয়, কখ- নও বা জিতিতে হয়, যা হউক আর একবার খেলে অদৃষ্ট পরীক্ষা করে দেখা যাক। আবার খেলা আরম্ভ হইল, একবার অখিল বাবু জিতিলেন, পর বারেও জিতিলেন, তিনি ভাবি- লেন, “পড় আবার পড়িয়াছে, আর তাহাকে হারায় কে ?” কিন্তু আবও ভাবিলেন, “কি জানি যদি পড়তা, আবার খানিক ক্ষণ পরে না থাকে, শীঘ্র শীঘ্র জিতে নেওয়াই আবশ্যক। এবার- কার খেলাতে আমার—এই বারেই লাক টাকা জিতে নেওয়া বা।” এই বলিয়া তিনি চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “এবার আমার বাজী লাক টাকা।” সকলে তাঁহার দিকে চাহিল, ব্রাহ্মণ এক্ষণে খেলায় নিরস্ত হইয়া বলিলেন, “মশায়, এত টাকা একেবারে ধরিলেন ?” অখিল বাবু হাসিয়া উঠিলেন, “হা, হা, হা, বােঝা গেছে, ঠাকুর, তােমার এত টাকা বাজী ধরার যাে নেই।” ব্রাহ্মণ। সে জন্য নয়, এই দেখুন টাকা আছে। আপনার ভালর জন্যই বলুচি। । •
[ ৯৩ ]
অখিল ! আমার জন্য তােমার মাথা খারাব করবার কিছু
প্রয়ােজন নেই
অন্যান্য যাহারা উপস্থিত ছিলেন, তাহারা বলিলেন, “মহ।
শয় ! হার জিত কারও হাত ধরা নয়। এত টাকা একেবারে ধরে
ফল কি ?” অখিল বাবু রাগত হইয়া বলিলেন, “আমার পাটা
আমি যদি লেজের দিকে কাটি তাতে তােমাদের কিহে বাপু?'
আর কেহই কোন কথা কহিলেন না, খেলা আরম্ভ হইল।
অখিল বাবু হারিলেন। তিনি একবার চারিদিকে চাহিমা
কপাল হইতে ঘৰ্ম্ম মুছিলেন। তাহার চক্ষু রক্তণ হইয়াছে,
মস্তকস্থ কেশ এক একটী যেন স্বতন্ত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে, রাক্ষ
ণকে উঠিতে দেখিয়া তিনি উন্মত্তের ন্যায় তাহার হাত ধরিলেন
বলিলেন, “যাও কোথা, খেল।” ব্রাক্ষ্যৎ ঈষৎ হাস্য করিয়া
বলিলেন, “টাকা কোথায় ?
অখিল। টাকা নেই, আমি তাে আছি। বসো, খেল,
আমি এবার নিজেকে ধলাম, আমার দাম লাক টাকার নীচে
নয়। যদি আমি জিতি তবে তােমাকে লাক টাকা দিতে হবে।
ব্রাহ্মণ। আপনার দাম কত কেমন করে জানিব ? লাক
টাকা সামান্য টাকা নয় !
অখিল। তুমি ঠাকুর, তুমি তাে জান পৃথিবীর মধ্যে আমি
সৰ্ব্বসুলক্ষণযুক্ত লােক,-আমার দাম লাক টাকা! কোটা
টাকা, আমি সে কথা এখন না ভেবে লাক টাকারই বাজী
রাখছি।”
ব্রাহ্মণ আবার ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, “তবে বসুন।”
আবার নীরবে খেলা চলিল, অবশেষে অখিল বাবু হারিলেন ।
[ ৯৪ ]
তখন তিনি জুয়াচোরের হাতে পড়িয়াছেন বৰিয়া উচ্চৈঃস্বরে
কাদিয়া উঠিলেন এবং ব্রাহ্মণকে কটুকাটব্য বলিয়া গালি
দিতে লাগিলেন, কিন্তু তাহার দুঃখে কেহই সহানুভূতি প্রকাশ
করিল না, সকলে হাসিতে হাসিতে তথা হইতে চলিয়া গেল।
আর টাকা পাইবার আশা নাই দেখিয়া দিতে দিতে অখিল
বাবুও ব্রাহ্মণের বাটী ত্যাগ করিতেছিলেন, কিন্তু ব্রাহ্মণ তাঁহার
হাত ধরিলেন, বলিলেন, “বাপু, কোথা যাও, তুমি তাে এখন
আমার।” অখিল বাবু কোন কথা না কহিয়া সেই খানে বসিয়া
পড়িলেন, তখন কৃষকের কথা মনে পড়িল, তখন ভাবিলেন
কৃষক সত্য বলিয়াছিল এখানে যে আসে সে আর ফিরে না,
হায়, হায়, তাঁহার অদৃষ্টে কি এই ছিল ! তখন ব্রাহ্মণ তাহার
কয়েকজন তাকে ডাকিয়া বলিলেন, “একে এখান থেকে
নিয়ে যাও।”
ভৃত্য। একে কি কাজ কর্তে দিব ?
ব্রাহ্মণ একটু ভাবিয়া বলিলেন, “মেথরের কাজ।” শুনিয়া
অখিল বাবু ফুকারিয়া কঁদিয়া উঠিলেন ; ভৃত্যগণ তাহাকে
ধরিয়া লইয়া তথা হইতে প্রস্থান করিল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
– ০ ০ ০ ০
দুই দিন গেল, তবুও অখিল বাবু ফিরিলেন না। বন্ধুগণ সে
দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃক্ষনিম্নে বসিয়া তাহার অপেক্ষা করিয়াছিলেন,
কিন্তু তিনি আসিলেন না দেখিয়া নিকটস্থ গ্রামে এক দোকানে
[ ৯৫ ]
বাসা লইয়াছিলেন, দুই দিন কাটিয়া গেল, তবুও অখিল বাধ
ফিরিলেন না দেখিয়া ক্ৰমে বন্ধুত্ৰয় গ্রামবাসীদিগের কথা বিশ্বাস
করিতে লাগিলেন ; ভুবন বাবু বলিলেন, “এখানকার লােকেরা
যা বলে তাই ঠিক, নিশ্চয়ই ওখানে ভূত আছে, যে যায় তার ঘাড়
মটকাইয়া দেয়।”
রমেশ। ফু! ভূত! দেখুলেও তাে বিশ্বাস করিনে
রাম। যখন বিপদ আছে, তখন কাজ কি ভাই আর টাকা
লােভে একজনকে তাে হারালেম।
রমেশ। তােমরা যদি এমনই কাপুরুষ হও, তােমরা ,
, কিন্তু আমি তাে যাবই যাব। টাকার জন্যে না হয়, এই
রহস্য ভাঙ্গিবার জন্য অন্ততঃ আমি যাব।
রমেশ বাবু বন্ধুদ্বয়ের বারণ শুনিলেন না, পর দিবস প্রতি
শৈলেশ্বরের গড়ের দিকে যাত্রা করিলেন। কিয়ংক্ষণ পরে তিনি
গড়ের নিকটস্থ হইয়া আসে পাশে চারিদিক বেশ পৰ্যবেক্ষণ
করিয়া দেখিলেন, কোথাও কিছু নাই, কেবলই ভগ্ন স্তুপ ও
জঙ্গল। তিনি ভাবিলেন, “অখিল এসেছিল রাতে রাত,
রাতে অনেকে তাকে মাৰ্তে পারে, সনতঃ ডাকাত এখানে
আছে। কিন্তু আমার সঙ্গে সে চালাকি চলবে না, আমি
অখিলের মত হাবা নই, আমি একটা সানলা পিস্তল এনেছি,
আর যদি সত্য সত্যই ভূত হয়, তবে এখন তাে দিন, দিন
কখনই ভূতে আমার কিছু কর্তে পাব্বে না। তিনি এই ভানিয়া
অবশেষে বুকে সাহস বাঁধিয়া খাদ পার হইলেন, সিংহ দ্বারের
মধ্য দিয়া গড়ে প্রবেশ করিলেন, কিন্তু তিনি দেখিলেন অনতি
দূরে আর একটা তাহারই ন্যায় যুবক গড়ে প্রবেশ করিতেছে।
[ ৯৬ ]
তাহাকে দেখিয়া যুবক দাঁড়াইলেন, এদিকে রমেশ বাবুও
তাঁহার নিকটে আসিলেন, তখন সেই যুবক হাসিয়া বলিলেন,
“আপনিও বােধ হয় আমার মত পাগল, টাকার সন্ধানে
এসেছেন?”
রমেশ। আজ্ঞে হঁা, অাপনার নাম জিজ্ঞাসা করিতে পারি ?
যুবক। অবশ্য পারেন বই কি ? কিন্তু আমিও আপনার
নিকট সে অনুগ্রহের প্রত্যাশা করি। আমার নাম শ্রীযাদব চন্দ্র
মিত্র।
রমেশ । আমার নাম রমেশচন্দ্র বসু।
যুবক। এখন এ ব্যাপারটা কি বলুন দেখি?
রমেশ। কিছু বুঝতে পারিনে। শে শুদ্ধ লােক এ
টাকার কথা বলে, সুতরাং বােধ হয় টাকার কথাটা মিথ্যে নয় ।
তবে এও শুনা যায় যে কেউ টাকা নিতে পারেন না, যে নিতে
আসে সেও আর ফেরে না।
যাদব। সে সব বাজে গল্প বােধ হয়।
রমেশ। তাই বা কেমন করে বলব। আমরা চারত
এই টাকার সন্ধানে এসেছি। আমাদের একটা বন্ধু প্রথম টাকার
সন্ধানে এই গড়ে আইসেন।
যাদব। তার পর ?
রমেশ। তার পর আজ তিন দিন হল তঁার আর কোন
সন্ধান নাই।
যাদব। তিনি টাকা নিয়ে অন্য পথে সরে পড়েন নি তো।
রমেশ। না, মশায়, তা কখনই হতে পারে না। আমরা
সব প্রতিজ্ঞা করে বেরিয়েছি।
[
৯৭ ]
যাদব। টাকা ভয়ানক জিনিস, এর জন্যে ছেলেয় আর বাপে
কাটাকাটি হয়। এখনই সত্য মিথ্যা জানা যাবে। চলুন সন্ধান
করা যাক।
রমেশ। প্রথমেই একটা কথা হলে ভাল হয় না।
যাদব। বলুন।
রমেশ। দেখুন, আমরা দুজনেই লাক টাকার আশায়
এখানে এসেছি, এখন ঘটনাক্রমে আপনার সঙ্গে আমার দেখা
হ’ল, দুজনে এক সঙ্গে যাচ্চি, পাই তােত দুজনেই পাব, আগেই
একটা ভাগের বন্দোবস্ত কলে হয় না? পরে বিবাদটা কিছু
নয়।
যাদব। বেশ কথা, আপনিই বলুন কি রকম বন্দোবস্ত করা।
উচিত।
রমেশ। তবে আসুন, এখানে বসে সে বিষয়ের বলো
করা যাক।
যাদব। বেশ, খানিকটা বিশ্রাম করাও হবে এখন।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
দুইজনে একটী ভগ্ন স্তুপের উপর উপবিষ্ট হইয়া ভাগের
বিবাদ মিটাইতে লাগিলেন; অনেক তর্ক বিতর্ক বা বিতণ্ডা
হইল। যাদব বাবু সমান সমান ভাগ করিতে চান, রমেশ বাবু
তাহাতে রাজি নন, অবশেষে দশ আনা ছ আনাই ঠিক হইল।
[ ৯৮ ]
তখন যাদব বাবু বলিলেন, “ঢের বেলা হয়ে উঠল, কিছু খেয়ে
নিলে হত না? কতক্ষণ খুজে তবে টাকা পাইৰ তার তত
কিছুই নিশ্চয় নেই।”
রমেশ। তা হলে ভালই হত, কিন্তু
যাদব। আমি আগে থেকেই সে কথাটা ভেবেছিলাম, তাই
কিছু সঙ্গে করে এনেছি, আসুন দুজনে আহার করা যাক।
রমেশ। আপনার উপর অনেক অত্যাচার কচ্চি।
যাদব। কিছুই নয়, এত আমােদ!
এই বলিয়া যাদব বাবু একটী ব্যাগ খুলিয়া আহারীয় বহির্গত
করিতে লাগিলেন, পরে একটা বােতলও বাহির করিলেন, দেখিয়া
রমেশ বাৰু জিজ্ঞাসা করিলেন “এটা কি ?
যাদব। আপনার নিকট আর গে’পনের আবশ্যক কি ? ওট
খুব ভাল হুইস্কি।
বােধ হয় মদের উপর কোন প্রেজুডিস নেই ।
রমেশ। না, তবে আমি কখন খাই না। খাওয়াটা অন্যা-
যও মনে করি।
যাদব। আমারও মত ঠিক ঐ, কিন্তু আমি বলি যে সময়
বিশেষে মদ একটু দরকার, যেমন ব্যেম হলে ।
রমেশ। সে কথা আমিও বলি ।
যাদব। আর যেমন এই রকম কোন ডিস্কভারি কৰ্ত্তে হলে
ইংরেজের। মদ খায় বলেই এত আশ্চৰ্য্য আশ্চৰ্য্য দেশ ডিস্কভার
কৰ্তে পেয়েছে। এই আপনি বলেছিলেন এখানে ভূতের ভয়
আছে। ভূত থাকুক আর নাই থাকুক, ভূতের কথা শুনলে
মাষের কেমন একটা ভয় হয়। কিন্তু যদি একটু মদ খান তৰে
কিানই ভয় করে না।
[ ৯৯ ]
রমেশ। সেটা ঠিক।
যাদব। আবার দেখুন, এ সব কাজে বড়ই পরিশ্রম, এ
একটু না খেলে শরীর বয় না !
রমেশ। হ্যা এ ত আমি স্বীকার করি।
দুইজনে আহার আরম্ভ করিলেন। যাদব বাবু বােতন
খুলিয়া দুইবার পান করিলেন, অবশেষে একটু গ্লাসে ঢালিয়া
রমেশ বাবুকে দিলেন, তিনি বলিলেন, “আমায় ক্ষমা করুন,
আমি কখনও খাই না।”
যাদব। মমডিসিনাল ডােজে খান, এতে আর তােত মাতাল
হতে হবে না। মাতাল হওয়াটাই অন্যায় ।
সত্য কথা
বলিতে কি রমেশ বাবুর সুরাপানে ইচ্ছা হইয়াছিল, বিশেষত
নির্জন স্থান, কোথায়ও জন প্রাণী নাই তিনি ভূতের কথা
ভাবিবেন না মনে করিতেছেন, তত্রাচ সেই কথাই তাহার মনে
হইতেছে, একটু একটু ভয় হইয়াছে, একটু মদ খাইলে যদি
এ ভয় যায় তবে ক্ষতি কি, একটু বই তত অধিক পান করি-
বেন না; সুতরাং তিনি যাদব বাবুর অনুরােধ রক্ষা করিয়া
প্রকৃত পক্ষে মেডিসিনাল ডােজে পান করিলেন, কিন্তু এই
রূপ ভােজ প্রায় ৫/৬ বার গ্রহণ করা হইল। তখন দুই বন্ধুতে
উৎফুল্ল হৃদয়ে টাকার সন্ধানে উঠিলেন।
গড়ের চারিদিকে ঘুরিলেন, প্রতি ভগ্ন স্তুপ দেখিলেন কিন্তু
কোথায় ও টাকা নাই। ঘুরিয়া ঘুরিয়া দুইজনে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত
হইয়া পড়িলেন, এদিকে রমেশ বাবু মস্তকে সুরার প্রাদুর্ভাবেই
হউক বা যে কারণেই হউক চারিদিকে ভয়ানক ও বিকট শব্দ
সকল শুনিতে লাগিলেন। কমে তাহার ভয় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।
[ ১০০ ]
তখন তিনি বলিলেন, “যাদব বাবু, আর একবার বােতলটা
বার করলে হয় না?”
যাদব। আপনি ঠিক বলেছেন, বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়া
গেছে।
এবার রমেশ বাবু আর মমডিসিনাল ডােজে পান করিলেন
গ্লাস গ্যাস উড়িয়া গেল, দুই জনে বােতলটা শেষ করিয়া
উঠলেন।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
তখন কম্পিত পদে, বির্ণিত মস্তকে উভয়ে চলিলেন।
একটা ভগ্ন স্তুপ পার হইয়াই গাৱা দেখিলেন একটী লােকা-
কীর্ণ বাজার। কি আশ্চর্য্য, এতক্ষণ এ বাজার দেখিতে পান
নাই।
বাজারে অসংখ্য লােক কেনা বেচা করিতেছে, এবং বাজা-
রের মধ্যস্থলে একস্থানে রাশি রাশি টাকা ঢালা রহিয়াছে।
টাকা অখিল বাবুও একদিন দেখিয়াছিলেন। তাঁহারা দুই জনে
টলিতে টলতে টাকার নিকট আসিলেন, রমেশ বাবু আনন্দে
নত্য করিতে করিতে বলিলেন, “মার দিয়া বাবা, কুচ পররাওয়া
নেই, যাদব ভায়া আয় বাবা তােক একবার চুমম খাই।”
তখন তাহারা দুইজনে দুইজনকে আলিঙ্গন করিয়া টাকার
চারিদিকে নৃত্য করিতে লাগিলেন। অবশেষে যত টাকা দুই
=
[ ১০১ ]
জনে লইতে পারিলেন লইলেন, তৎপরে বাজার হইতে দুইটা
লােক ধরিয়া তাহাদের মাথায় টাকা তুলিয়া দিয়া সঙ্গে সঙ্গে
চলিলেন। কিয়ৎদূর গিয়া যাদব বাবু বলিলেন, “বাবা, এত
টাকা পেয়ে একটু আমােদ না করে যাওয়া উচিত হচ্ছে না।”
রমেশ। ঠিক বলেছ। এখন কোথায় আমােদ করা যায়
বল দেখি।
যাদব। আমার সন্ধানে একটা বেশ মেয়ে মানুষ আছে চল,
তার বাড়ী যাই।
রমেশ। কুচ পরওয়া নাই, চল বাবা।
কিছু দূর আসিয়া দুইজনে একটা সুন্দর অট্টালিকা মধ্যে
প্রবিষ্ট হইয়া কষ্টে টলিতে টলিতে ধরিয়া ধরিয়া উপরে উঠি-
লেন। তাহাদের দেখিয়া একটা সুন্দর সাজে সজ্জিত যুবতী
দ্রুতপদে তাহাদের নিকটস্থ হইল, বলিল, “আজ আমার কি
সৌভাগ্য!”
যাদব। না সুন্দরী, সৌভাগ্য তােমার নয়, সৌভাগ্য আমা-
দের। আমার বন্ধু রমেশ বাবু তােমার গুণ শুনে তােমার
সঙ্গে আলাপ কর্তে এসেছেন ?
যুবতী। দাসীর প্রতি ওর বিশেষ অনুগ্রহ
রমেশ। না, না-হঁা,--আমি আপনার কেনা
গােলাম।
যুবতী। আসুন, বসবেন।
যাদব। যাও রমেশ, আমি আর একটী আলাপী লােকের ।
সঙ্গে দেখা করে আসি। রমেশ বাবুর হাত ধরে নিয়ে যাও,
গােলাপ।
[ ১০২ ] গােলাপ তাহাই করিল। এ দিকে যাদব বাবু অন্যত্র গেলেন। গােলাপের গৃহে আবার বােতল উন্মুক্ত হইল, রমেশ বাবু পুনঃ পুনঃ সুরাপান করিলেন, তৎপরে একেবারে আনন্দ- সাগরে মগ্ন হইলেন। এইরূপে সমস্ত রাত্রি কাটিয়া গেল। পর- দিনও কাটিল, তার পরদিনও কাটিল। গােলাপের নিঃস্বার্থ ভালবাসায় রমেশ বাবু একেবারে মুগ্ধ হইয়া গিয়া সমস্ত টাকা তাহার চরণারবিন্দে উৎসর্গীকৃত করিলেন। চারি দিন যাইতে যাইতে রমেশ বাবু কপর্দকশূন্য হইলেন, তখন কি মােহিনী শক্তির বলে টাকার সঙ্গে সঙ্গে গােলাপের ভালবাসাও অন্তহৃত হইল, যে তাহার বস্ত্রাদি কাড়িয়া লইয়া সামান্য ছিন্ন বস্তু পরিধান করাইয়া পদাঘাত করিয়া বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিল। তখন কঁদিতে কঁদিতে রমেশ বাবু বন্ধুদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে চলিলেন, কিন্তু কিয়ৎদূর গিয়া তিনি আর অগ্রসর হইতে পারিলেন না, আর এ মুখ দেখাইতে লজ্জিত হইলেন, আবার গড়ে ফিরিলেন। দুই তিন দিন অনাহারে কাটিয়া গেল, পরে উদরের আলায় ভিক্ষা আরম্ভ করিলেন, এবং ভিক্ষা করিয়া যাহা পাইতেন তাহাতে সুরা ক্রয় করিয়া ঐ বিষ অহাে- রাত্র পান করিয়া হৃদয়ের ক্ষোভ ও যন্ত্রণার লাঘব করিবার চেষ্টা করেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, যাদবকে পাইলে তাহার সহিত একবার বােকা পড়া করিবেন কিন্তু সেই পর্যন্ত আর যাদবের সাক্ষাৎ নাই।
অষ্টম পরিচ্ছেদ বন্ধুদ্বয় রমেশ বাবুর প্রতীক্ষায় এক সপ্তাহ কাটাইলেন, কিন্তু রমেশ বাবুর সন্ধান নাই; তখন তাহাদের কি করা উচিত তাহাই পরামর্শ করিতে লাগিলেন। একবার বন্ধুদ্বয়ের অনু- সন্ধান না করিয়া তাহারা কেমন করিয়া দেশে ফিরিবেন ? তঁাহাদের বাড়ী যাইয়া কি বলিবেন? এই সকল ভাবিয়া রাম বাবু ও ভুবন বাবু উভয়ে একত্রে একবার শৈলেশ্বরের গড়ের দিকে চলিলেন। সঙ্গে অস্ত্র শস্ত্র ও লইলেন, গ্রাম হইতে দুই একজন লােক সঙ্গে সইতেও ইচ্ছা করিয়াছিলেন, কিন্তু কেহই যাইতে সম্মত হইল না, তখন তাঁহারা অগত্যা দুই জনেই চলিলেন। কোনরূপেই রাত্রে থাকিবেন না স্থির করিয়া তাহারা অতি প্রাতে গড়ের দিকে যাত্রা করিলেন, পথে কেহ কাহারও সহিত কথা কহিলেন না; রাম বাবু প্রকৃতই বড় ধৰ্ম্ম প্রিয় ছিলেন, তিনি সমস্ত পথ কায়মনােবাক্যে ঈশ্বরকে ডাকিতে ডাকিতে চলিলেন, আর ভুবন বাবু, তিনি মনে মনে টাকার কথা ভাবিতেছিলেন—যদি সেই খানে একটা সুন্দর বাড়ী থাকে, আর বাড়ীর মধ্যে টাকাগুলি ঢালা থাকে, আর একটী পরমাসুন্দরী যুবতী ঐ টাকা গুলি আমাকে আনিয়া আমার হাতে দেয়, আহা তাহলে কতই সুখ ! তিনি মনে মনে কতই গড়িতেছিলেন, আবার ভাঙ্গিতেছিলেন, আবার ভাঙ্গিয়া গড়িতেছিলেন। যাহাই হউক অবশেষে দুই বন্ধুতে সেই গড়ের সিংহদ্বারে আসিয়া দাঁড়াইলেন; তখন উভয়ের মনেই
لسة
১০৪
]
কেমন ভয়ের উদ্রেক হইতে লাগিল, রাম বাবু বলিলেন, “ভুবন,
চল ফিরিয়া যাই, দরকার নেই। যদি এ গড়ে প্রবেশ কল্লে
আমরাও না ফিরি।”
ভুবন। কিন্তু রাম, এও হতে পারে যে এই গড়ের মধ্যে
ভাল ভাল সুন্দরী যুবতী অপ্সরী সব আছে, তারা পুরুষ মানুষ
পেলে ছাড়ে না।
রাম। তাতে কি ?
ভুবন। কেন তেমন একটা অপ্সরী পেলে কোন্ শালা
আর বাড়ী ফিরে যায়। বাড়ীতে এমন সুখটা কি আছে।
রাম। ছি ভুবন, আমাদের স্ত্রী পরিবার আছে, মা বাপ
আছেন, আমরা সামান্য রমণীর যৌবনের জন্য সে সব ভুলে
এখানে থাকবে? না, চল ফিরে যাই।
ভুবন। আর এমনও তাে হতে পারে যে এখানে কোন
মহাত্মা ঋষি আছেন, যে এখানে আসে তিনি তাকে শিষ্য করে
যােগ শিখান।
রাম। ঠিক বলেছ, তাও হতে পারে।
ভুবন। সে ঋষিকে অন্ততঃ দেখে যাওয়া আমাদের
উচিত।
রাম। হঁ্যা, তার জন্যে যদি আমাদের এখানে থাকতে
হয় তবে তাহাতেও ক্ষতি নেই। ধর্মের জন্য স্ত্রী পরিবার ত্যাগ
তাে কৰ্ত্তিই হয়।
ভুবন। তবে আর সময় নষ্ট করে কাজ নেই চল। উভয়ে-
গড়ের মধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। বহুক্ষণ চারিদিকে ঘুরিলেন,
কোথায়ও কিছু নাই, কেবলই ভগ্নস্তুপ ও জঙ্গল। ঘুরিয়া ঘুরিয়া
[ ১০৫ ] দুই বন্ধুতে ক্লান্ত হইয়া এক স্থানে উপবিষ্ট হইলেন। কিয়ৎক্ষণ উপবেশনের পর তঁহার নিকটে রমণীকণ্ঠনিঃসৃত করুণ ক্রন্দন- ধ্বনি শুনিতে পাইলেন। শুনিয়া উভয়েরই হৃদয় কম্পান্বিত হইল, রাম বাবু ভয়ে বন্ধুর হাত ধরিয়া বলিলেন “ঐ শােন, প্রকৃতই এখানে ভূত আছে, এস এখনও পালাই।” ভুবন। মানুষ তাে হতে পারে। রাম। কোথায়ও তাে মানুষের থাবার হান লেখি লাম না। ভুবন। যে হােক বােধ হয় নিকটই হবে, এস দেখি। এত ভয় করা কিছু নয়। এই বলিয়া ভুবন বাবু উঠিলেন, রাম বাবু ও ঈশ্বরকে মনে মনে ডাকিতে ডাকিতে উঠিলেন, তাহারা পার্শ্বস্থ ভগ্নস্তুপ উত্তীর্ণ হইয়া দেখিলেন যে জঙ্গলের অপর পার্শ্বে একটা পরমাসুন্দরী বালিকা ক্রন্দন করিতেছে, দেখিয়া রাম বাবু, বলিলেন, “এ মানুষ নয়, মানুষ এমন সুন্দর হয় না।” ভুবন। ভূতও নয়, কারণ পেত্নী এমন হয় না। রাম। হয়তাে পরী। ভুবন। হয়তাে অপ্সরী। রাম। তা যদি হয় তবে এস পালাই, সুন্দরীর মায়ায় শেষ হয়তাে পড়ে আর বাড়ী যাওয়া হবে না। ভুবন। যেই হয়, ভাই তুমি পালাও,-আমি একটু ভাল করে না দেখে যাচ্ছি না। একে মেয়ে মানুষ, তাতে ছেলে মানুষ, আমায় খাবে না। এই বলিয়া ভুবন ব্রাহ্ম বন্ধুর বারণ না শুনিয়া দ্রুতপদে বালি [ ১০৬ ] কার দিকে অগ্রসর হইলেন; তাঁহাকে দেখিয়া বালিকা যেন শঙ্কিত হইল, যেন একটু লজ্জিতও হইল, তাহাতে তাহার অনু- পম রূপ সহস্রগুণ বৃদ্ধি হইল; তেমন রূপ ভুবন বাবু কখনও দেখেন নাই, তাঁহার হৃদয়ে সে রূপ যেন অঙ্কিত হইয়া গেল । তিনি আদরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কাঁদিতেছেন কেন?” বালিকা তাহার সজল বিশাল চক্ষুদ্বয় ভুবন বাবুর দিকে উত্তো- লিত করিল, চারি চক্ষুতে সম্মিলিত হইল,-ভুবন বাবুর হৃদয়ে সেন সহসা বিদ্যুৎ ছুটিল। বালিকা বলিল, তেমন স্বর ভুবন বাবু কখন শুনেন নাই যেন মধুর বীণা বাজিল, বালিকা কহি- লেন, “আমার হীরামন পাখীটী উড়ে গিয়ে ঐ দেখুন বসে আছে। আমি উটাকে বড় ভালবাসি। আমায় কে ধরে দেবে, এখনই ও উড়ে কোথায় পালাবে।” ভুবন। এর জন্যে আর কান্না কেন ? এখনই আমি ধরে দিচ্চি। মুহূৰ্ত্ত মধ্যে ভুবন বাবু, বৃক্ষে উঠিলেন, যে শাখায়, হীরামন বসিয়া ছিল সেই শাখায় আসিলেন, কিন্তু হায় পাখী উড়িয়া গিয়া আবার আর এক বৃক্ষে বসিল। ভুবন বাবু নামিয়া আবার সে বৃক্ষে উঠিলেন,কিন্তু পাখী উড়িয়া আবার আর এক বৃক্ষে বসিল,-তুবন বাবুও তাহার অনুসরণ করিলেন। এইরূপে প্রায় দুই ঘণ্টা পরিশ্রমের পর তিনি পাখীটীকে ধরিলেন, তখন মহা- ননে পাখী আনিয়া বালিকার হাতে দিলেন।
নবম পরিচ্ছেদ
পাখী পাইয়া বালিকা বড়ই সন্তুষ্ট হইল,-বলিল, “চলুন
আমাদের বাড়ী, আপনাকে দেখিলে বাবা বড় সন্তুষ্ট হবেন।”
ভুবন। এখানে তো কারও বাড়ী দেলাম না,আপনা-
দের বাড়ী কোথায় ?
বালিকা। আমার বাবা সন্ন্যাসী, আমরা ঐ ভাঙ্গা বাটাটার
মধ্যে থাকি।
ভুবন। আর এখানে কে আছে ?
বালিকা। কেউ না, আমরা দুজনে পাকি ।
ভুবন। আপনাদের ভয় করে না ?
বালিকা। ভয় কি ?
ভুবন। আপনার নাম কি?
বালিকা। জ্যোৎস্না।
ভুবন। আপনার বেশ নাম।
সম্মুখে একটী ইষ্টক স্তুপ, উহার উপর দিয়া যাইতে হইবে।
ভুবন বাবু সত্বর ইষ্টক স্তুপে উঠিয়া হাত বাড়াইয়া দিলেন,
বালিকা তঁাহার হাত ধরিয়া উঠিল। সে কোমল নবনীত সদৃশ
হস্তস্পর্শে ভুবন বাবু যেমন স্বর্গ সুখ উপলব্ধি করিলেন, তিনি
আর সে হাত ছাড়িতে পারিলেন না, বালিকা ও আপত্তি করিল
, দুই জনে হাত ধরাধরি করিয়া চলিলেন,-বালিকা বাল
স্বভাব সুলভ সরলতার সহিত তাকে কত কথা বলিতে লাগিলেন
*. • [ ১০৮ ] ভুবন বাবু, বন্ধু রাম বাবুর কথা, এমন কি টাকার কথা সমস্ত বিস্মৃত হইলেন। উভয়ে একটী ভগ্ন অট্টালিকার মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া জটাজুট- ধারি এক সন্ন্যাসীকে দেখিতে পাইলেন। বালিকা ছুটিয়া গিয়া সন্ন্যাসীর গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল “বাবা বাবা, ইনি আজ আমায় পাখী ধরিয়া দিয়াছেন।” সন্ন্যাসী ভুবন বাবুকে অনেক প্রশংসা করিলেন, কিন্তু তিনি কে, কোথা হইতে আসিয়াছেন, ইহার কিছুই জিজ্ঞাসা করিলেন না, বলিলেন, “জ্যোৎস্না, এর আহারাদির বন্দোবস্ত কর গে !” জ্যোৎস্না ছুটিয়া আসিয়া ভূবন বাবুর হাত ধরিল, তারপরে তাহাকে লইয়া অন্য প্রকোষ্ঠে আনিল ; তথায় নানা প্রকার ফল মূলাদি ছিল, সে তাহা ভুবনকে আহার করিতে দিল। ভুবন বাবু আহারাদি করিলেন, তখন একবার তাঁহার বন্ধু রাম বাবুর কথা স্মরণ হইল, তিনি ভাবিলেন, “একবার তাহাকেও এখানে আনা উচিত।” এই ভাবিয়া তিনি বলিলেন, “আমার সঙ্গে একটা বন্ধু ছিলেন, তিনি অপেক্ষা কচ্চেন, বালিকা কহিল, বেশতে, তাঁকে এখানে আনিবেন চলুন।” ভুবন। আপনিও যাবেন ? বালিকা। চলুন না। ভুবন। আপনার হয় তত কষ্ট হবে। বালিকা হাসিয়া ভুবন বাবুর হাত ধরিয়া তাহাকে টানিয়া লইয়া চলিল। কিন্তু রাম বাবু যেখানে বসিয়াছিলেন, তথায় আসিয়া তাহার। দেখিলেন যে, রাম বাবু তথায় নাই। চারিদিকে তাঁহার অনেক
[ ১০৯ ]
;
অনুসন্ধান করিলেন, কিন্তু কোথায় ও তাঁহাকে পাওয়া গেল না
তখন বালিকা বলিল, “চলুন, বাড়ী ফিরে যাই,”
ভুবন বাবু দ্বিরুক্তি না করিয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন।
কিয়দ্র গিয়া বালিকা বলিল, “আসুন, আমার পাখীর জন্যে
ফড়িং ধরি।”
তখন দুই জনে ফড়িং ধরিতে আরম্ভ করিলেন। ক্রমে সন্ধ!
হইল। আকাশে চাঁদ উঠিল, দুই জনে হাত ধরাধরি করি
গৃহের দিকে চলিলেন। ভুবন বাবু বালিকার সাথে সকল কং
একবারে বিস্মৃত হইয়াছেন।
দশম পরিচ্ছেদ
= ০ ০ ০ ০ --
গেল ;
এই রূপে বালিকার সহিত ভুবন বাবুর এক সপ্তাহ কাটি
বালিকাকে ছাড়িয়া যাইতে তাহার প্রাণ চায় না, কে
তাহাকে যাইতেও বলে না। বরং কখনও তিনি বালিকা
সম্মুখে সে কথা বলিতে গেলে সে তাহার মুখ চাপিয়া ধরে,
কিছুই বলিতে দেয় না। ক্রমে এক মাস কাটিল,-সমস্ত দিন
নির্জনে দুই জনে বসে, জঙ্গলে জঙ্গলে ভ্রমণ করে ; ভুবন বাবু
বালিকার জন্য পাগল হইলেন, এক মুহুর্ত তাহাকে না দেখিলে
চারি দিক তিনি অন্ধকার দেখেন। এইরূপে ছয়মাস কাটি।
গেল এক দিন জ্যোৎস্নালােকে দুই জনে বসিয়া আছেন, দুই
জনের হাত দুই জনের হাতে সম্বন্ধ, দুই জনের চোক দুই
* -
[ ১১০ ]
জনের চোকে সম্বদ্ধ,ভুবন বাবু ভাবিতেছে, “জ্যোৎস্না ভিন্ন
সংসারে যেন আর কোন কিছুই নাই।” কিছুক্ষণ উভয়ে নীরব
খাকিয়া অবশেবে ভুবন বলিলেন, “জ্যোত্মা, একটা কথা
বলিব, রাগ করিবে না?”
জ্যোৎস্না। আপনার কথায় কবে রাগ করেছি ?
ভুবন। তুমি আমায় বে করবে?
বালিক। কিয়ৎক্ষণ ভুবন বাবুর মুখের দিকে চাহিয়া
থাকিয়া বলিল, “বে কি!” বন বাবু অনেক কষ্টে বালিকাকে
বিবাহ ও বে কি তাহা বুঝাইলেন, শুনিয়া বালিকা বলিল,
‘বাবার কাছে শুনেছি, বড় হলে বে হয়, কিন্তু আমি যে ছেলে
মানুষ।”
ভুবন। তোমার বয়স ১৩১৪ বৎসর হয়েছে। এই তত
বিবাহের বয়স।
জ্যোৎস্না। আপনি যখন বলছেন, তখন তাই হবে।
ভুবন। বল, আমায় বিবাহ ক ে?
জ্যোৎস্না। বাবাকে বলুন।
ভুবন। যদি তুমি সম্মত হও, তবে তােমার বাবাকে বলিব।
তােমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু কৰ্ব্বেন না।
জ্যোৎস্না। বে কল্লে আমায় ভালবাসবেন ?
ভুবন। তুমি আমার হৃদয়ের হৃদয়,-তােমাকে ভাল
বা না ?
এই বলিয়া ভুবন বাবু জ্যোৎঙ্গাকে হৃদয়ে টানিয়া লইয়া
শত সহস্র চুম্বন করিলেন।
পরদিবস দুই প্রহরের সময় ভুবন বাবু সন্ন্যাসীর নিকট
[ ১১১ ]
বসিয়া এ কথা ওকথার পর বিবাহের কথা তুললেন। সন্ন্যাসী
তাহার সকল কথা নীরবে শুনিয়া বলিলেন, “ভালই প্রস্তাব
জ্যোৎস্নার বিবাহ দিবার জন্য আমিও পাত্র খুজিতে ছিলাম,
তােমার মত সুপাত্র মিলা ভার, কিন্তু আমি জ্যোৎস্নাকে কিছুই
দিতে পারিব না, একখানি অলঙ্কারও দিতে পারিব না।
ভুবন।
জ্যোৎস্নার অলঙ্কারে দরকার কি ? অলঙ্কার
জ্যোৎস্নার অঙ্গে উঠিতে লজ্জিত হয়।
সন্ন্যাসী। যাক, তাই বলে আমি দরিদ্র ও নই ? আমার
লক্ষ মুদ্রা আছে। কিন্তু আমার গুরুতর প্রতিজ্ঞা এই যে, যখন
কেহ আমার জ্যোৎস্নাকে বে কর্তে আসবে তাকে আমি ঐ
লক্ষ টাকা দিতে চাহিব, তিনি যদি টাকা লয়েন, তবে আর
জ্যোৎস্না পাইবেন না। আর যদি জ্যোৎস্না লয়েন, তবে টাকা
পাইবেন না ।
শুনিয়া ভুবন বাবু চিন্তিত হইলেন। তখন সন্ন্যাসী উঠিয়া
বলিলেন, “বৎস, আমার সঙ্গে সঙ্গে আইস।” ভুবন বার
নীরবে সঙ্গে সঙ্গে আসিলেন। সন্ন্যাসী তাহাকে এক গৃহে
লইয়া টাকা দেখাইলেন। রাশি রাশি স্বর্ণ রৌপ্য মুদ্রা পতিত
রহিয়াছে, দেখিয়া ভুবন বাবুর টাকা লইতে মন বড়ই ইচ্ছুক
হইল, মুহূর্তের জন্য তিনি জ্যোৎস্নাকে ভুলিলেন। তখন সন্ন্যাসী
কন্যাকে ডাকাইয়া টাকার নিকট দাঁড় করাইলেন, তৎপরে
বলিলেন, “এখন বল, টাকা চাও কি জ্যোৎস্না চাও।” ভুবন
বাবু জ্যোৎস্নার দিকে চাহিলেন, চারি চক্ষে সম্মিলিত হইল,
তিনি বলিলেন, “আমি জ্যোৎস্নাকেই চাই। জ্যোৎস্নার কাছে
কি স্বর্ণ রৌপ্য দাঁড়াইতে পারে ?”
***
[ ১১২ ]
সন্ন্যাসী। বৎস, আমি তােমার প্রতি বড়ই সন্তুষ্ট হইয়াছি।
আজই তােমাদের বিবাহ হইবে ।
তাহাই হইল। সেই পৰ্য্যন্ত ভুবন বাবু সেই শৈলেশ্বরের
ডেই থাকিলেন।
একাদশ পরিচ্ছেদ ।
আর রান বাবুর কি হইল? ভুবন বার প্রস্থান করিলে
রান বাবু শঙ্কিত হৃদয়ে কিয়ৎক্ষণ বসিয়া রহিলেন, তৎপরে তিনি
আর ফিরিলেন না দেখিয়া তিনি বড়ই ভীত হইলেন, তাহার
বিশ্বাস হইল, যে কণিকা আর কেহ নয়, সই! বটে তাহারাই
এখানে যে আসে তাহাকে ভুলাইয়া রাখে। আর এখানে এক
মুহূর্তও থাকা নয়। এই ভাবিয়া যেমন তিনি উঠিলেন, অমনি
খিলেন তাহার পার্শ্বে এক জটাজুটধারি সন্ন্যাসী দণ্ডায়মান।
তাহার সাম্য মূর্তি দেখিলে ভক্তির উদয় হয়, তাহাতে রাম
বাবু চিরকালই ধৰ্ম্ম-পিপাসু, সন্ন্যাসী দেখিয়া প্রণাম করিলেন।
সন্ন্যাসী তাঁহাকে আশীষ করিয়া নিকটে বসিতে বলিলেন, তং-
পরে দুইজনে ধর্মের কথা আরম্ভ হইল। যােগে কি কি ক্ষমতা
লাভ হয়, পরে মুক্তি ও বৈকুণ্ঠ লাভে কি সুখ ইত্যাদি নানা
কথা হইতে লাগিল ; ক্রমে রাম বাবু সন্ন্যাসীর কথায় এতই
মুগ্ধ হইলেন যে তিনি বন্ধুদিগের কথা ভুলিয়া গেলেন, স্ত্রী
পরিবার, বাড়ীর কথাও ভুলিলেন, অবশেষে কঁদিতে কাদিতে
[ ১১৩ ]
সন্ন্যাসীর পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন “দেব, আমাকে দীক্ষিত
করুন।”
সন্ন্যাসী। বৎস, যাহাকে তাহাকে আমরা দীক্ষিত করি
। দীক্ষার জন্য পরীক্ষা আবশ্যক।
রাম। যে পরীক্ষা আপনার ইচ্ছা তাহাই করুন।
সন্ন্যাসী। অধিক কঠিন পরীক্ষা কিছুই তােমায় করিব না।
তুমি কিসের জন্য এখানে আসিয়াছ, তাহা আমি জানি।
রাম। আপনি সৰ্ব্বজ্ঞ, আপনি সকলই জানেন।
সন্ন্যাসী। এখানে লাক টাকা আছে শুনিয়া তুমি লইতে
আসিয়াছ।
রাম। আজ্ঞে তাই বটে।
সন্ন্যাসী। সে টাকা প্রকৃতই আছে।
রাম। এই রূপই আমরা শুনিয়াছি।
সন্ন্যাসী। আইস, আমার সঙ্গে, সেই টাকা আমি তােমায়
দেখাইব।
দুই জনে এক কুটিরে আসিলেন, তথায় কুটীর পার্শ্বে রাশি
রাশি টাকা ঢালা রহিয়াছে দেখিয়া রাম বাবু আনন্দে বলিলেন,
“এ টাকা সমস্তই আপনার ?”
সন্ন্যাসী । হ্যা, তােমাকে এ সমস্ত টাকা দিলাম, লইয়া
যাও।
রাম বাবু ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। টাকার জন্য কি
ধৰ্ম্ম পথ হারাই, টাকা তাে নশ্বর পদার্থ, থাকিবে না, কিন্তু
একবার মােক্ষ লাভ হইলে তাহা অনন্তকালস্থায়ী। তিনি
টাকার প্রলােভন ত্যাগ করিলেন। সন্ন্যাসীর উপদেশ সকল এখন
[ ১১৬ ] স্বর্গসুখ উপলব্ধি করিতেছেন। সহসা শিশু কঁদিয়া উঠিল, তিনি কত আদর করিলেন, সান্তনা করিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু শিশু কিছুতেই প্রবােধ মানিল না, তখন তিনি ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন, অমনি তাহার নিদ্রা ভঙ্গ হইল,—কিন্তু তখনও তাঁহার কর্ণকুহরে বালকণ্ঠনিঃসৃত মধুর ক্রন্দন ধ্বনি প্রবিষ্ট হইতে লাগিল। তিনি উঠিয়া বসিয়া দুই হস্তে চক্ষু মুছিলেন, কিন্তু তত্রাচ সেই ক্রন্দন ধ্বনি শুনিলেন। তখন তিনি স্ত্রীকে ডাকিলেন, “সরলা, একবার উঠ তাে। সকলই নীরব, কেহ তাহার উত্তর দিল না। প্রকোষ্টমধ্যে প্রদীপ প্রায় নির্বাণােম্মুখ, অতি অল্পমাত্র আলােক যেন প্রকোষ্ঠ মধ্যে ক্রীড়া করিয়া বেড়াই- তেছে, তাহাতে গৃহ যেন আরও অন্ধকারময় হইয়াছে। রমেশ বাবু শিশুর ক্রন্দনে অস্থির হইয়া পুনঃ পুনঃ স্ত্রীকে ডাকিতে লাগি- লেন, কিন্তু কোনই উত্তর নাই। তিনি অন্ধকারে শয্যার চারি- দিকে হাতড়াইয়া দেখিলেন শয্যায় স্ত্রী নাই। এদিকে শিশুর ক্রন্দন ধ্বনি কর্ণে আসিতেছে, ওদিকে স্ত্রী শয্যায় নাই। রমেশ বাবু, লম্ফ দিয়া উঠিলেন। সত্বর গিয়া প্রদীপ উসকাইয়া দিলেন। সমস্ত ঘর অমনি আলােকিত হইয়া গেল। সেই আলােকে রমেশ বাবু দেখিলেন তঁহার পালঙ্কের পার্শ্বে প্রকোষ্ঠের ঠিক মধ্যস্থলে এক খানি সুন্দর পীড়ির উপর একটী মনােহর শয্যায় একটী ক্ষুদ্র শিশু শায়িত,—শিশুর বােধ হয় অদ্য কি কল্য এক মাস পূর্ণ হইয়াছে মাত্র। তিনি মুহুৰ্তমাত্রে দেখিলেন যে তিনি স্বপ্নে যে সুন্দর শিশুটীকে ক্রোড়ে করিয়া স্বর্গসুখ উপ- লব্ধি করিতেছিলেন,—এ শিশু, সেই শিশু। হইয়া গিয়া শিশুকে ক্রোকে করিয়া তুলিলেন,-তাহার তিনি ব্যাকুল
[ ১১৭ ]
ক্রোড়ে আসিয়া শিশুও ক্রন্দন হইতে নিরস্ত হইল। তখন
তিনি ডাকিলেন, “সরলা, সরলা” সরলা প্রকোষ্ঠ মধ্যে নাই ।
তিনি এবার চীৎকার করিয়া ডাকিলেন, “সরল, সরল।।”
তত্ৰাচ কেহ তাহাকে উত্তর দিল না। তখন তিনি দ্বার উন্মুক্ত
করিয়া দাসীকে ডাকিলেন,—তাহার ডাকাডাকিতে একে একে
বাড়ী শুদ্ধ লােক জাগরিত হইয়া তাহার প্রকোষ্ঠে আসি,
কিন্তু তাহাদের মধ্যে সরলা নাই। সকলেই শিশুকে দেপিকা
আশ্চর্যান্বিত হইতেছিল,—তিনি বলিলেন, “আমি ছেলের কান্না
শুনে জেগে উঠে দেখি এই ছেলেটা! এ ছেলে এখানে কে
আনিল ;
এ কথার উত্তর দিতে কেহই পারিল না, সকালে
বাড়ীর কত্রীর অনুসন্ধানে গেল ! স্ত্রীকে না দেখিয়া রমেশ বাবুর
মনে মনে নানা উদ্বেগের উদয় হইতেছিল,--তিনি ও স্ত্রীর অনু
সন্ধানে গেলেন, কিন্তু তিনি বাটীর কোথাও নাই। তখন অলে!
লইয়া ভৃত্যগণ চারিদিকে ছুটিল, বার্টীর আশে পাশে সৰ্ব্বদ হয়
সন্ধান করিল, কিন্তু তাহাকে কোথাও পাওয়া গেল না। রকে
বাবু স্ত্রী বিহনে একেবারে অধীর হইয়া পড়িলেন। তার
সরলা কি হইল তাহা তিনি জানিতে না পারিয়া আরও অধিক
কাতর হইলেন। কত অনুসন্ধান করিলেন। কোথাও সরক:
নাই,তবে কি সরলা নরিল, তবে কি সরলা আত্মহত্যা করি ?
তাহা হইলে তাে তাহার মৃত দেহ পাওয়া যাইত।
বধি স্ত্রীর অনুসন্ধানে দিবারাত্রি কাটাইলেন, কিন্তু কোনই সন্ধান
পাইলেন না। এই গােলযােগে তিনি শিশুর কথা একেবারে
ভুলিয়া গিয়াছিলেন।
তিমি মাস
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
এই ঘটনার পর এক মাস কাটিয়া গিয়াছে। একদিন তিনি
বাটীর সন্মুখস্থ উদ্যানে বসিয়া বিষগ্নমনে চিন্তা করিতেছেন,
সহসা মস্তক তুলিয়া দেখিলেন একজন দাসী একটী শিশুকে
ক্রোড়ে করিয়া লইয়া উদ্যানের অন্য প্রান্তে বেড়াইতেছেন।
শিশুকে দেখিয়া তাহার শিশু কথা স্মরণ হইল,—তিনি একে-
বারে তাহার কথা ভুলিয়া গিয়াছিলেন, তিনি দাসীকে ডাকি-
লেন,-সে নিকটে আসিলে তিনি অনিমিযনয়নে শিশুর মুখের
দিকে চাহিলেন, তৎপরে শিশুকে ক্রোড়ে করিলেন। আবার
বহুক্ষণ শিশুর মুখের দিকে চাহিলেন ; এ শিশু কোথা হইতে
আসিল ! ইহার মুখের সহিত সরলার কি কোন সৌসাদৃশ্য
আছে! রনেশবাবু, কোনই সৌসাদৃশ্য দেখিতে পাইলেন না।
তখন তিনি বলিলেন “এ শিশু কে ও কোথা হইতে আসিল
এ সন্ধান আমি এতদিন করি নাই। ইহা আমার পক্ষে নিতান্ত
অন্যায় হইয়াছে। হয়তাে ইহার পিতা-মাতা ইহাকে না পাইয়া
কত কষ্ট পাইতেছে। আর হয়তাে ইহার পিতামাতার অনুসন্ধান
করিতে করিতে সরলারও অসন্ধান পাইব।” এই ভাবিয়া
রমেশবাবু অনুসন্ধান আরম্ভ করিলেন। সমস্ত সম্বাদপত্রে, তাহার
শয্যাগৃহে শিশু আগমন বৃত্তান্ত প্রকাশ করিলেন, গ্রামে গ্রামে
ঢেড়া পিটিয়া দিলেন, নানাস্থানে লােক পাঠাইলেন, কিন্তু কোথা
হইতে কোন সম্বাদ আসিল না তখন তিনি এই রহস্যভেদের
আশা একেবারে ত্যাগ করিলেন।
[ ১১৯ ]
শিশুটা একটা পরম লাবণ্যময়ী কন্যা ;-কেহ কন্যা সইতে
আসিল না দেখিয়া রমেশ বাবু কন্যাকে আপনার কন্যার !
দেখিতে লাগিলেন, মহাসমারােহে তাহার অন্ন প্রাশন ক্রয়;
সমাপন করিলেন। তাহার নাম রাখিলেন লাবণ্যবতী। যতই
সময় অতীত হইতে লাগিল ততই রমেশ বাবুর স্নেহ গাঢ় হইতে
লাগিল, অন্যান্য লােকেরাও ভুলিয়া যাইতে লাগিল যে লাবণ্য
বতী রমেশ বাবুর নিজের কন্যা নহে। আর লাবণ্য ! সে যে
রমেশ বাবুকে পিতা বলিয়া ডাকিত, তাহাকেই পিতা বলিয়া
জানিত; সে তাে আর কাহাকেও দেখে নাই চিনে নাই।
৮৯ বৎসর উত্তীর্ণ হইল। লাবণ্য যতই বড় হইতে লাগিল
ততই তাহার লাবণ্য শত সহস্র প্রকারে বিস্তারিত হইত
লাগিল। তাহার হাসি তাহার আধ আধ স্বর, তাহার রূপ,
সরলতা রমেশবাবুর বাড়ীর শােভা বৃদ্ধি করিতে লাগিল।
একদিন লাবণ্যবতী একাকিনী দুই প্রহরের সময় বাড়ীর
সম্মুখস্থ উদ্যানের মধ্যে খেলা করিয়া বেড়াইতেছেন, কখন বা
ফুল তুলিতেছিল, কখন বা আবার প্রজাপতির পশ্চাং ধাবিত
হইয়া তাহা ধরিবার চেষ্টা করিতেছিল ! দূর হইতে এই দৃশ্য
দুই জনে দেখিতেছিলেন। একজন সন্ন্যাসিনী, অপর একটা
১৪।১৫ বৎসর বয়স্ক বালক। সন্ন্যাসিনী বালিকাকে দেখাইয়া
দিয়া বালককে বলিতেছিলেন, “যাও সরল, ওর সঙ্গে খেলা কর
গে।” সরলকুমার যাইতে সঙ্কুচিত হইতেছিল, বােধ হয় সে
লজ্জিত হইতেছিল। অপরিচিত বালিকার সহিত সে কেমন।
করিয়া অবাচিত হইয়া ক্রীড়া করবে। কিন্তু সন্ন্যাসিনী
তাহাকে ঠেলিয়া পাঠাইতেছিলেন। এদিকে বালিকাও খেলা
[ ১২০
]
করিতে করিতে সেই দিকে আসিতেছিল, সহসা একটী গােলাপ
শাখার কণ্টকে তাহার অঞ্চল বাধিয়া গেল, সে ফিরিয়া অঞ্চল
মুক্ত করিতে গিয়া কাপড় কণ্টকে আরও জড়াইয়া ফেলিল।
তখন সে ভয়ে কঁদিয়া ফেলিতেছিল, কিন্তু সহসা তাহার চক্ষু
সরলকুমারের প্রতি পড়িল। বালক, বালিকার বিপদ দেখিয়া
আপনাআপনি তাহার সন্নিকটবর্তী হইতেছিল, সন্ন্যাসিনীও
বৃক্ষান্তরালে লুক্কায়িত হইয়াছিলেন। সরল লাবণ্যের নিকট
আসিলে বলিল “অামার আঁচল গাছে বেধে গেছে।”
সরল। ভয় কি, তুমি নড়াে না। আমি ছাড়িয়ে দিচ্ছি,
নড়লে আরও জড়িয়ে যাবে ।
লাবণ্য। না আমি নড়ব না।
অতিকষ্টে সরলকুমারএকটা একটী করিয়া কন্টক হইতে বস্ত্র
উন্মুক্ত করিতে লাগিলেন। লাবণ্য বলিল, 'দেখাে ভাই, যেন
আমার কাপড় ছেড়ে না। তা হলে ঝিমা মারবে।
সরল। ঝি কে ?
লাবণ্য। কেন তুমি জান না ? যে আমায় মানুষ করেছে।
সরল। কেন? আমার কি মা নাই ?
লাবণ্য। সেই যে আমার মা। তােমার ঝি-মা নেই ?
সরল কি উত্তর দিবেন ভাবিয়া স্থির করিতে না পারিয়া
বলিল, “আছে বই কি?”
লাবণ্য। এই দেখ এইখানটী ছিড়ে গেল! তুমি ভাই
কোন কাজের নও।
ক্ষুদ্র বলিকার দ্বারা ভংসিত হইয়া সরলকুমার লজ্জিত
হইলেন, বলিল, “তােমাকে কি তােমার ঝি-মা মারে ?
[ ১২১ ]
লাবণ্য। না বড় বেশী মারে না। দুষ্টুমি কল্লে মারে, -
কন্তু সে আমায় বড় ভালবাসে।
এই সময় সরলের কাৰ্য্য সম্পূর্ণ হইল। লাবণ্য মুক্তিলা
করিয়া অঞ্চল কর্টিতে জড়াইয়া লইল, তৎপরে বলিল, “আমি,
দের বাড়ী এস না ?
সরল। তােমাদের বাড়ীতে গেলে আমায় হয়তো বলে
আমি এখন বাড়ি যাই।
লাবণ্য। তােমার বাড়ী কোন্ দিকে?
সরল। আমরা ঐ ঘর খানায় থাকি।
লাবণ্য। তােমাদের ঐ রকম পােড়ঘরধড়ী
সরল। আমরা যে গরিব।
লাবণ্য। তুমি কেন আমাদের বাড়ী ঘাক না ?
সরল। আমাকে তোমাদের বাড়ী থাকতে দেবে কেন ?
লাব । কেন দেবে না? আমি বাবাকে বলব।
এই বলিয়া লাবণ্য সরল কুমারের হাত ধরিল। সণ তাকে
ভুলাইবার জন্য বলিল, “এস তােমায় ফুল তুলে দি।
লাবণ্য ইহাতে যেন বড় আহলাদিত হইল, বলি | ফুরা কাও
নেই। আমায় একটা প্রজাপতি ধরে দাও।” তখন ফুলে ফুলে।
প্রজাপতি সকল উড়িয়ে উড়িয়ে খেলা করিতেছিল, কত রঙ্গের,
কত রকম, কেমন সুন্দর সুন্দর দেখিতে। ফল সুন্দর বটে, কি
ফুলের তাে জীবনী শক্তি নাই। তাই ফুল অপেক্ষা প্রজাপতি
পাইবার জন্য বালিকা এত অধীরা হইল। তখন সরল কুমার
প্রজাপতি ধরিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু এ সংসারে
সে কাৰ্য্য সহজ কাৰ্য্য নহে। তিনি যত দৌড়িতে থাকেন
১২২
]
প্রজাপতি ও তত উড়িয়া পালায়। তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে
বালিকাও ছুটিতেছে। তিনি যেই একটী রিতে পারেন না
অমনি সে উচ্চ হাস্য করিয়া উঠে। ইহাতে সরলকুমার লজ্জিত
ও উৎসাহিত হইয়া প্রজাপতির পশ্চাৎ পশ্চা। আরও দৌড়িতে
লাগিলেন। প্রায় এক ঘণ্টা পরিশ্রম করিলেন কিন্তু তত্রাচ
একটীকে ও ধরিতে পারিলেন না। এই সময়ে পশ্চাতে লাবণ্য
আনন্দে উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল,-সে বলিল “দেখ, তুমি
পাল্লে না, আর আমি একটাকে কেমন ধরেছি।”সরলকুমার
বালিকার নিকট হারিলেন দেখিয়া লজ্জিত হইয়া ফিরিলেন,
দেখিলেন সত্য সত্যই সে একটা সুন্দর প্রজাপতি ধরিয়াছে।
সরল জিজ্ঞাসা করিলন “কেমন করে ধল্লে ?”
লাবণ্য। কেন? আমার গায় এসে বসেছিল। আমার
বে হবে।
সরল! কেন ?
লাবণ্য। কেন ? প্রজাপতি গায় বসলে বে হয় ঝি-মা
বলেছে। আমি ঝি-মাকে বলে আসি।
এই বলিয়া বালিকা দৌড়াইবার উপক্রম করিল। সরল
তাহার হাত ধরিলেন, “তােমার নাম কি আমায় বল্লে না।”
লাবণ্য। তা তুমি জান না, কেন সকলে তাে আমায়
ডাকে।
সরল। আমি তাে কখন কাকেও তােমাকে ডাকতে
শুনি নি।
লাবণ্য। কেন ?
সরল। আমি যে এখানে কাল এসেছি।
[ ১২৩ ]
লাবণ্য। আমার নাম লাবণ্য। তােমার নাম কি ?
সরল। আমার নাম সরল কুমার।
লাবণ্য। ছেড়ে দেও, আমি ঝি-মাকে বলে আসি। এই
বলিয়া বালিকা ছুটিয়া পলাইল। সরলকুমারও ধীরে ধীরে
সে স্থান পরিত্যাগ করিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
রমেশ বাবু আর বিবাহ করেন নাই। কতলােক তাঁহাকে
অনুরােধ করিয়াছিল, কিন্তু তিনি কাহারই অনুবােধ বক্ষ
করেন নাই। সরলার অন্তর্ধানের পর এই ৯ বৎসর অতীত
হইয়া গিয়াছে, তিনি এই ৯ বৎসর সরলার ধ্যানে জীবনাতিপাত
করিয়াছেন, এক মূহুর্তের জন্যও সরলাকে ভুলেন নাই।
দিন সরলকুমার ও লাবণ্য উদ্যানে ক্রীড়া করিয়াছিল সেদিন
কেমন আপনাআপনিই রমেশ বাবুর মন অস্থির হইয়া উঠিতে
ছিল।
কেন তাহার মন এরূপ বিষন্ন হইতেছিল তাহা
তিনি স্থির করিতে পারিতেছিলেন না। নয় বৎসর অতীত
হইয়া গিয়াছে,এখন তাহার মনে সরলার কথা কেবল মধ্যে
মধ্যে উদিত হইত মাত্র,—কিন্তু আজ যেন সৰ্ব্বদাই তাহার
হৃদয়ে তাহার কথা উদিত হইতে লাগিল,—যেন চারিদিকেই
তিনি সরলার সুন্দর মুখ খানি দেখিতে লাগিলেন। তিনি
কি করিবেন কিছু স্থির করিতে না পারিয়া বাটী হইতে বহির্গত
[ ১২৪ ]
ইলেন সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানে বাগানে বেড়ালেন, তৎপরে
বাটী আসিয়া আহারাদি করিয়া শয়ন করিতেন।
নয় বৎসর পূর্বে একদিন তিনি যে স্বপ্ন দেখিয়া জাগরিত
হইয়াছিলেন অদ্যও ঠিক সেই স্বপ্ন দেখিয়া সেই শিশুর কণ্ঠ
নিঃসৃত মধুর ক্রন্দনধ্বনি শুনিয়া তিনি চমকিত হইয়া জাগরিত
হইলেন। তিনি আত্মবিস্মৃত হইয়া “সর সরলা” বলিয়া
ডাকিলেন। কে যেন তাঁহাকে উত্তর দিল, কে যেন
সরলার মধুর স্বরে বলিল “কেন নাথ ?” রমেশ বাবু একেবারে
লম্ফ দিয়া উঠিলেন। প্রকোষ্ঠ মধ্যে আলােক ছিল না, কিন্তু
গবাক্ষ উন্মুক্ত থাকায় হি নিতান্ত অন্ধ কারও ছিল না।
বদেশ বাবু সেই ঈং আলােকিত গৃহে স্পষ্ট দেখিলেন, একটা
রাণী ধীরে ধীরে দ্বারের দিকে যাইতেছে। সে হাবভাব, সে
লন,—সে গঠন, নেশবাবু তো জন্মে ও বিস্মৃত হয়েন নাই।
তিনি সেই ধীরে ধীরে অপসারিত মূর্তির দিকে ধাবিত হইলেন,
কিন্তু তাঁহার আগমনের পূর্বেই মূর্তিদ্বয় উত্তীর্ণ হইয়াছে ।
চিনি ও দ্রুতবেগে প্রকোষ্ঠের বাহিরে আসিলেন, কিন্তু মূর্তি
মহত্ত্ব মধ্যে যেন বাতাসে মিশাইয়া গিয়াছে । তিনি ভৃত্যদিগকে
উৎকার কবিয়া ডাকিলেন, বাটীতে একটা মহা হুলস্থল পড়িয়া
গল। স্ত্রীলোকগণ চীৎকার করিয়া উঠিল, ভৃত্যগণ ঘুমঘরে
ছুটাছুটী করিতে গিয়া এ ওর ঘাড়ে পড়িতে লাগিল। আলো
জালিতে বিলম্ব হইল। যখন আলাে জ্বলা হইল, তখন সকলে
নিশ্চিন্ত হইয়া এ গোলযােগের কারণ কি তাহাই জিজ্ঞাসা
করিতে লালিল, কিন্তু রমেশবাবু কোন কথাই বলিতে পারেন
না। তিনি হয়তো স্বপ্ন দেখিয়াছেন, তবে কি তিনি সামান্য
2
[ ১২৫ ]
স্বপ্ন দেখিয়া এইরূপ গােলযোগ করিতেছিলেন। লােকে এ
কথা শুনিলে বলিবে কি ? তিনি কেবলমাত্র বলিলেন, “দার
কে একজন আসিয়াছিল ; হয় তত চোর হবে। তােম।
সকলে বাটীর চারিদিকে বেশ করে করে দেখ !” চোরের নাম
হইলে সকলেই কেমন আপনা আপনি ভয় পায়, ভৃত্যগণ ও ভয
পাইল! তিন চারি জনে দলবদ্ধ হইয়া লাটী ও লণ্ঠন লই।
বাহির হইল। তাহারা চারিদিক অনুসন্ধান করিয়া দেখিল
কিন্তু কোথায়ই কাহাকে দেখিতে পাইল না। এইরূপে সমস্ত
রাত্রি গেলযােগে কাটিয়া গেল, সে রাত্রে রমেশ বাবুর বাড়ীতে
কেহ নিদ্রিত হইতে পারিল না। তিনিও আর নিদ্রা যাইতে
পারিলেন না, যেন কে তাঁহার সম্মুখে বেড়াইতে লাগিল,
তিনি চক্ষু মুদিলেই যেন দেখেন কে সেইরূপ ধীর পদক্ষেপে
চলিয়া যাইতেছে ।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
– ০ ০ ০ ০=
পর দিবস একখানি কুটীর মধ্যে দুইটা রমণী কথােপকথন
করিতেছিলেন। একজন আমাদের পূর্ব পরিচিত সংগসিনা।
অপরকে দেখিলে বৈষ্ণবী বলিয়া বােধ হয়। বৈষ্ণবী বলিলেন
“তার পর ?”
সন্ন্যাসিনী। তার পর আর কি! আমি ঘরে যাবার পরে
তিনি জেগে উঠলেন ; তখন আমার আর সেখানে থাকা উচিত
নয় ভেবে আমি সে ঘর থেকে বেরুলেম ; কিন্তু তিনি লম্ফ দিয়া
[ ১২৬ ]
আসিয়া আমাকে ধরিবার উদ্যম করিলেন। আমি তখন
অন্ধকারে লুকাইলাম, তিনি চীৎকার করিয়া ভৃত্যদিগকে
ডাকিতে লাগিলেন, বাড়ীতে একটা মহা গােল পড়িয়া গেল,
সেই গােলযােগে আমি পলাইলাম।
বৈষ্ণবী। তােমার পালিয়ে আসা উচিত হয় নি। দেখা
কল্লেই হতাে।
সন্ন্যাসিনী।
কেমন আমার বুক কেঁপে উঠল! আমি
তার সম্মুখে দাড়াতে পাল্লেম না।
বৈষ্ণবী। আর এমন করে কত দিন থাকবে ?
সন্ন্যাসিনী। যত দিন বিধাতা অদৃষ্টে লিখেছেন, ততদিন
থাকতে হবে তা কে কবে খণ্ডাতে পারে।
বৈষ্ণবী। তবে আর দু চার দিন থাক, কিন্তু দেখা তাে
কর্তই হবে।
সন্ন্যাসিনী। তা না হলে আর কোথায় যাব। আর মনাে:
বাঞ্ছা পূর্ণ করিবার জন্যই তাে এত কষ্ট সহ্য করিলাম।
বৈষ্ণবী। লাবণ্য তােমায় চিন্তে পারে ?
সন্ন্যাসিনী। কেমন করে চিন্বে ?
বৈষ্ণবী। সরলে আর লাবণ্যে বড় ভাব হয়েছে। দুটীতে
যখন বাগানে খেলা করিয়া বেড়ায় তখন কেমন সুন্দর দেখতে
যেন দুটীর জন্যেই দুটীর জন্ম হয়েছে।
সন্ন্যাসিনী। সকলই বিধাতার ইচ্ছা।
বৈষ্ণবী। তুমি কিছুই বল নি! তুমি তাে সরলকে
আমাকে দেবার পর দুবছর বাড়ীতে ছিলে ! একদিনও কি
তুমি তাকে কিছু বল নি ?
[ ১২৭ ]
সন্ন্যাসিনী। তুমি সরলকে যখন নিয়ে যাও, তখন আমাণ
জ্ঞান ছিল না। আমি পরে শুলেম যে সরল বাঁচিয়া নাই ।
দাই তার মৃতদেহ নিয়ে গেছে। মনে একটু আশা হ’ল। তুম
বলেছিলে যে তুমি ছেলেটীকে নিয়ে যাবে, কিন্তু যখন সকলেই
বলিতে লাগিল যে, আমার মরা ছেলে হয়েছে,-যখন সেই অব।
আর কোথায় দেখতে পেলাম না, তখন আমার হৃদয়ে যে আশা
টুকু হয়েছিল সে টুকু গেল। তখন আর তাকে তোমার সঙ্গে
আমার যে যে কথা হয়েছিল, তা বলে আর ফল কি ভেবে তাকে
আর কিছুই বলি নি।
বৈষ্ণবী হাসিয়া বলিলেন, “তােমার অধীকারের কথা তো
ভুলি নি ?”
সন্ন্যাসিনী। সে কি ভুলিবার কথা? তুমি আমাকে
আমার হৃদয়ের রত্ন ফেরত দিয়েছ, তােমার কাছে যে অঙ্গীকার
করেছি তা ভুলিবার নয়। কিন্তু অনেক দিন থেকে তোমার
সব কথা জাতে আমার বড় ইচ্ছা যায়।
বৈষ্ণবী। যদি সময় হয় তাে অবশ্য বলিব।
সন্ন্যাসিনী। এখনই কেন বল না।
বৈষ্ণবী। না, এখন নয়। এখনও সময় হয় নি।
সন্ন্যাসিনী। এবিষয়ে অধিক তােমাকে আমি অনুরােধ
কর্তে পারি না।
বৈষ্ণবী। তুমি তােমার স্বামীর সঙ্গে দেখা কর ।
সন্ন্যাসিনী। দেখা কর্তেই তাে চাই, কিন্তু কেমন যেন ভয়
হয়।
জানি তিনি কত আমাকে দুষিবেন।
বৈষ্ণবী। কেন দূষিবেন ? যখন সকল জানিতে পারি-
[ ১২৮ ]। বেন, তখন আর দূষিবেন না? বরং তামাকে প্রশংসা করবেন। সন্ন্যাসিনী। আজই তার সঙ্গে দেখা করি। বৈষ্ণবী হাসিয়া বলিলেন, দেখাে যেন ভয়ে আজও আবার পালিয়ে এস না। সন্ন্যাসিনী। না। তখন বৈষ্ণণী অন্য কাৰ্য্যে চলিয়া গেলেন, সন্ন্যাসিনী নিজ মনে কি ভাবিতে লাগিলেন। পঞ্চম পরিচ্ছেদ। বৈষ্ণবী কুটীর হইতে কিয়ংদূর আসিয়া গ্রাম ত্যাগ করিয়া প্রান্তর দিয়া চলিলেন। তখন দুই প্রহর অতীত হইয়া গিয়াছে, আকাশে সূর্যদেব অগ্নি বর্ষণ করিতেছেন, রৌদ্রোত্তাপে উৎপীড়িত হইয়া পক্ষীগণ বৃক্ষ পত্ৰ মধ্যে লুক্কায়িত হইয়াছে, গাভিগণ ক্লান্ত হইয়া সুশীতল বটবৃক্ষতলে উপবিষ্ট হইয়া নােম- খুন করিতেছে,“প্রান্তরের কোথায়ও জন মানবের চিহ্ন নাই। কেবল সেই সূৰ্য্যোত্তাপকে অগ্রাহ্য করিয়া বৈষ্ণবী সেই প্রান্ত- রের মধ্য দিয়া দ্রুতবেগে যাইতেছিলেন। প্রান্তরের ঠিক মধ্যস্থলে একটী বটবৃক্ষ শাখা প্রশাখায় বিস্তৃত হইয়া দণ্ডায়মান—দুই একটা গরু তাহার নিম্নে অর্ধ নিদ্রিত, একটা কুকুর এক পার্শ্বে বসিয়া জিহ্বা বহির্গত করিয়া হাঁপাইতেছে। বহু সংখ্যক পাখী শাখায় শাখায় উপবিষ্ট হইয়া কোলাহল করিতেছে। সহসা বৈষ্ণবীর সেই স্থানে আগমনে
[ ১২৯ ]
যেন তথাকার নির্জন ভগ্ন হইল। গাভিদ্বয় একবার ক্লান্ত
নয়নে বৈষ্ণবীকে দেখিল, কুকুর উঠিয়া দাড়াইল, পক্ষীগণ যে
চমকিত হইয়া মুহূর্তের জন্য নীরব হইল। বৈষ্ণবী এ সকবে
কিছুই দেখিলেন না, তিনি একবার বৃক্ষোপরি দৃষ্টি নিক্ষে
করিয়া ডাকিলেন, “রাখাল, রাখাল!” এক ব্যক্তি সেই বিস্ত
বটবৃক্ষের ঘন পল্লবের মধ্যে লুক্কায়িত থাকিয়া একটা নং :
উপর উপবিষ্ট ছিল, সে বােধ হয় নিতি হইয়াছিল, তাই
বৈষ্ণবীর ডাক শুনিতে পাইল না। কিন্তু বৈ?ী পুনর
তাহাকে ডাকিতে না ডাকিতে সে চমকিত হইয়া উঠিল,
পর মুহূর্তে লম্ফ দিয়া ভূমে অবতীর্ণ হইল তাহার হস্তে এক হং
বংশ লাঠি। তাহার কাপড় মালকোচদিয়া পরিধান; মস্তকে
বাবরি চুল, গণ্ডে লম্বমান শা, লােকটাকে দেখিলে হয় হয়।
একাকী এই নির্জন প্রান্তরে লোকটাকে দেখিলে সকলেই
ভীতির সঞ্চার হয়, কেবল বৈষ্ণবীর হইল না। বৈণী সি
বলিলেন, “মানসের ভাল বিছানায় শুয়ে ঘুম হয় না, আ:1
তােমার ডালের উপর ঘুণ হয়! আশ্চর্য্য!” সেই ভীম কাস
ব্যক্তি উত্তর দিল, “মানুষ সুখী নয়, আমি সুখী।”
বৈষ্ণবী।
ও কথা শুনিলে যথার্থই আমার সন্তোষ ।
আমি দিন রাত মনে করি, না জানি তােমার কত কষ্ট হচ্চে ।
লোক। কষ্ট আবার কি ! যার এই সমস্ত ছিল, যার জয়
লােক সর্বদা সশঙ্কিত থাকিত, যার খেয়ে শত শত লােকক
সময় প্রাণ ধারণ করেছে, তার আবার কষ্ট কি ! আমার কিছু
কষ্ট নেই। তােমারই কষ্ট।
বৈষ্ণবী। প্রায় ১৩। ১৪ বৎসর হয়ে গেল, এখনও কি
৫.
[ ১৩০ ]
তারা তোমায় ধরবে, এখন কেন এসে বাজতে থাক না ।
আমরা যা পাইব তাতেই সুখে থাকিতে পারি।
লােক। ইংরেজ রাজত্বে দোষের ক্ষমা নেই। আমি
হরিশপুরের জমিদার, দাঙ্গা হাঙ্গামা করিয়া তােক খুন করেছি,
তা তাদের খাতায় লেখা আছে। যেদিন আমাকে পাবে, বিশ
বছর পরে হউক না, সেই দিনই তারা আমাকে ফাঁসি কাঠে
ঝুলাবে। তুমি কি তা দেখতে চাও?
বৈষ্ণবী। তােমায় এখন আর চিন্তে পাবে না। তােমার
সে মূর্তি আর নেই।
এই কয়টী কথা বৈষ্ণবী এত কাতরে, এত প্রেমময় স্বরে কহি.
লেন যে তাহাতে সেই ব্যক্তির হৃদয় যেন আদ্র হইল । সে দীর্ঘ
নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, “কমলা, সুখের আশা ত্যাগ কর।”
বৈষ্ণবী।
অনেক দিন ত্যাগ করেছি।
লােক। তবে আর কেন ? মেয়েটী কেমন আছে ?
বৈষ্ণবী। ভাল আছে।
লােক। তাকে একবার দেখাতে বড় ইচ্ছে করে।
বৈষ্ণবী। একবার চল না। তারা দুজনে এই সময়ে
বাগানে খেলা করে।
লােক। তুমি রমেশের ছেলেটিকে না চাইলে হয়তাে
আমাদের মেয়ের বে পৰ্য্যন্ত হত না। তুমি তাে আমাদের
আর পরিচয় দিতে পারিতে না। কে অপরিচিতা বৈষ্ণবীর
মেয়ে বে করিত।
এই বলিয়া সে আবার দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিল। বৈষ্ণবী
বলিলেন, “সকলই বিধাতার ইচ্ছা! যাবে ! এস।”
[ ১৩১ ]
লোক। না, কমলা, আজ আর যাব না। আজ আমার
মনটার মধ্যে কেমন ভয় ভয় কর্চে।
বৈষ্ণবী। আবার কবে আসবে ?
লােক। জানই তাে, এদিকে আসতে আমার প্রাণ হাতে
করে আসতে হয়।
বৈষ্ণবী। কবে আবে?
লােক। আবার এক মাস পরে আসিব।
বৈষ্ণবী। আমার কুঁড়েয় যেও না কেন? আমি লাবণ্যক
সেইখানে রাখব।
লােক। যদি যেতে পারি ভালই, না হয় তুমি এখানে
এস।
বৈষ্ণবী। এই নেও,-আমি ৩০ টাকা এনেছি।
লােকটী ব্যগ্রভাবে টাকা কয়টা লইয়া বলিল, “তুমি আমার
লক্ষ্মী! আমার মরণ হয় না? মরিলে আমাকে এ যন্ত্রণা ভােগ
করিতে হইত না!”
বৈষ্ণবী। আমি তত তােমার দাসী, চিরদাসী! দাস।
সেবা করিবে না কেন?
এই কয়টী কথায় তাহার হৃদয়ে যেন দারুণ আঘাত লাগিল ;
আর একটী কথাও না কহিয়া সেই লোেকটা সে স্থান পরিত্যাগ
করিল। যতক্ষণ তাহাকে দেখা গেল বৈষ্ণবী এক দৃষ্টে তাহার
দিকে চাহিয়া রহিলেন। তৎপরে দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া
তিনি সে স্থান পরিত্যাগ করিয়া গেলেন।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
সেই দিন রাত্রে রমেশ বাবু নিদ্রা যাইতেছিলেন। তিনি
স্বপ্ন দেখিলেন যেন তাহার ঔ গৃহে প্রত্যাগমন করিয়াছেন।
যেন তিনি তঁাহার পা ধরিয়া নত কঁদিতেছেন, বেন তিনি
কত অনুনয় বিনয় করিয়া কাতরে তাহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা
করিতেছেন। বহুকাল পরে হৃদয়রত্ন পুনঃপ্রাপ্ত হইয়া রমেশ
বাবুর হৃদয় পূর্ণ হইয়া গেল, তাহারও যেন হৃদয় ফাটিয়া ক্রন্দন
বহির্গত হইবার উদ্যম করিল,-“তিনি কঁদিয়া উঠিলেন। সেই
ক্রন্দনে তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। তখন তাহার চমক ভাঙ্গিল,
তিনি দেখিলেন তিনি স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু ঠিক এই
সময়ে তঁাহার বােধ হইল যেন দুই তিন বিন্দু চক্ষের জল তাহার
পদ প্রান্তে পতিত হইল,—তিনি বুঝিলেন নে কে তাহার
পদতলে উপবিষ্ট, তাহার ভয় হইল,-বিস্ময় জন্মিল,তিনি
সভয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে?” আবার সেই উষ্ণ অশ্রু
বিন্দু। তিনি কি তখনও স্বপ্ন দেখিতেছেন। তিনি চমকিত
হইয়া উঠিয়া বসিলেন, আবার জিজ্ঞাসা করিলেন “কে ?”
উত্তর নাই, কিন্তু তিনি অস্পষ্ট অর্ধস্ফট ক্রন্দনের ধ্বনি স্পষ্ট
শুনিতে পাইলেন, তিনি লম্ফ দিয়া উঠিলেন! সত্বর পদে দ্বার
উন্মুক্ত করিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু কে আসিয়া তাহার হাত
ধরিল,—তিনি আজি কালি সৰ্ব্বদাই সশঙ্কিত থাকিতেন,-
অন্ধকারে এইরূপ কোমল অথচ মৃদু হস্তস্পর্শে তিনি চমকিত
হইয়া ভয়ে চীৎকার করিবার উদ্যম করিলেন, তখন যিনি
[ ১৩৩ ]
তঁাহার হাত ধরিয়াছিলেন, তিনি বলিলেন, “নাথ, আমাকে
চিনিতে পারিতেছ না ?” ৯। ১০ বৎসর অতীত হইয়াছিল
সত্য, কিন্তু স্বামী কখন স্ত্রীর স্বর ভুলিতে পারে ?
বৎসর অতীত হইয়াছিল সত্য, কিন্তু এখনও ঠিক পূর্বের ন্যা
রমেশ বাবুর কর্ণে স্ত্রীর স্বর ধ্বনিত হইতেছিল। তিনি চমকিত
হইয়া বলিলেন, “তুমি! এতদিন কোথা ভুলে ছিলে। একবারটা
কি আমাদের কথা মনে পড়ে নি ?”
স্ত্রী দুই হস্তে স্বামীর দুইটী হাত ধরিয়া বলিলেন, “নাপ
দাসীর অপরাধ মার্জনা করুন,-সকল শুনিলে আর রাগ
করিবেন না
স্বামী। তােমার উপর আমার কবে রাগ হয় ? যখন
তুমি আমাকে ভাসাইয়া গিয়াছিলে, না বলিয়া হিয়া একটা
অপােগও শিশু আমার গলায় দিয়া চলিয়া গিয়াছিলে, তখন
তােমার উপর রাগ করি নি। আর এখন তুমি আমার বাড়ী
আবার আলাে করিতে আসিয়াছ, এখন তােমার উপর রাগ
করিব ?
এ কথা না জানিলে দাসী আর গৃহে ফিরিত না।
স্বামী। দাড়াও ; আমি আলাে জ্বালি,একবার হৃদয়
ভরিয়া তােমায় আমি দেখি।
স্ত্রী। আলাে জ্বালা তাে তােমার কাজ নয়, নাথ। তবে
তােমায় সে কাজ করিতে দিব কেন ?
এই বলিয়া আমাদিগের পরিচিত সন্ন্যাসিনী আলো জ্বালি-
বার জন্য প্রদীপের অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন, কোখায় কি
আছে রমেশ বাবু বলিয়া দিলেন। আলাে জ্বালা হইলে তিনি
স্ত্রী।
১২
[ ১৩৪ ]
দেখিলেন যে তাহার সম্মুখে এক সন্ন্যাসিনী! সন্ন্যাসিনীর ধীর
মূর্তি দেখিলে হৃদয়ে ভক্তির উদয় হয়। মূর্তি দেখিয়া মুহূর্তের
জন্য রমেশ বাবু স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন,-তৎপরে স্ত্রীকে
আলিঙ্গন করিয়া তাহার গণ্ডে শত সহস্র চুম্বন করিলেন।
দুই জনে গিয়া পালঙ্ক উপরে উপবিষ্ট হইলেন। ১০ বৎ
সরের কত কথা ;-সে কথার কি শেষ আছে। কেবল কোন্
কথাটী আগে বলিবেন, কোনটী পরে বলিবেন,-তাহাই উভয়ে
ঠিক করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না।
কে কোন্ কথা আগে
বলিবেন, কথার যে শেষ নাই। অবশেষে সন্ন্যাসিনীই কথা
কহিলেন, বলিলেন, “নাথ,-এতদিন কোথায় ছিলাম, কোথায়
গিয়াছিলাম, এ সকল আমার আগে বলা উচিত আপনি
বলেন তাে বলি।”
রমেশ কত কথা আছে তাহা বলিতে পারি না।
তােমাকে কি আগে বলিব বা আগে জিজ্ঞাসা করিব, তাহা
ঠিক কর্তে পাচ্চি নে। আমার মাথা ঘুচে । তুমি বল, আমি
শুনি।
তখন স্বামীর পার্শ্বে বসিয়া সন্ন্যাসিনী তাহার বিবরণ
বলিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন, “আমার ছেলে হইয়া
হইয়া মরিয়া যায়, তুমি কত চেষ্টা করিলে আমি কত ঔষধ
খাইলাম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না, তুমি হতাশ হইলে,
আমিও নিরাশ হইলাম। তােমাকে সকলে বিবাহ করিতে
পরামর্শ দিতে লাগিল, তুমি তাহাতে সম্মত হইলে না, কিন্তু
আমায় মনে মনে বড় বেদনা লাগিল। এই সময়ে সহসা এক
দিন আমাদের ফুলের বাগানে একজন বৈষ্ণবীর সঙ্গে দেখা
[ ১৩৫ ]
হল, তার সঙ্গে আলাপ হ’লতাকে আমার সব কথা খুলে
বলিলাম। তিনি বলিলেন আমার কাছে একটা অষুধ আছে,
সেটা খেলে তােমার ছেলে এবার হয়ে বাঁচতে পারে,
ছেলেকে নিজের মাই খাওয়ালে বা ছেলেকে কাছে রাখলে
ছেলে বাঁচবে না।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “তবে আমি
কি করিব।” তিনি বলিলেন, আমি এই গ্রামে থাকি, তােমার
যখন প্রসব বেদনা হবে, তখন আমাকে ডেকে পাঠিও আমাকে
ধাই বােলাে। আমি তােমার ছেলে নিয়ে এসে মানুষ কর্পো।”
আমি ঔষধ নিলাম;—সেই দিন থেকে এই বৈষ্ণবীর সঙ্গে আমার
প্রায়ই দেখা হত। ক্রমে আমার ছেলে হবার সময় হল।
তােমার বােধ হয় মনে পড়ে যে, আমি তােমায় আমাদের পুরাণ
বাইয়ের বদলে এই ধাইকে ডাকতে বলি। তার পর আমার
ছেলে হ’ল ধাই যা যা করেছিল তা তুমি জান ।
রমেশ। হ্যা।
সন্ন্যাসিনী। তার পর, প্রায় ৫ বৎসর কেটে গেল, আমি
আর বৈষ্ণবীর কোন সন্ধানই পেলাম না। তখন
আশাও ত্যাগ করিলাম ; এই জন্য এ সব কথা তােমাকেও
কিছু আর বলি নি। পাঁচ বৎসর পরে এক দিন হঠাৎ
বৈষ্ণবীর সঙ্গে দেখা হলাে আমি ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করি-
লাম। বৈষ্ণবী বলিলেন “বেঁচে আছে। কিন্তু একটা কাজ
কর তাে ছেলে দেখিতে পাও।” আমি বলিলাম “কি ?” তিনি
বলিলেন, “বেশী কিছু নয়, আজ রাত্রে আমার সঙ্গে চল, আর
আমি তােমার স্বামীর নিকট একটী এক মাসের মেয়ে রেখে
যাব, সে মেয়েটা আমার। মেয়েটীকে মানুষ করিবার আমার
[ ১৩৬ ]
•
আর ক্ষমতা নাই। তোমার স্বামী মেয়েটাকে পেয়ে নিশ্চয়ই
তাকে মানুষ কবেন।
রমেশ। তার পর ?
সন্ন্যাসিনী। তারপর তিনি বলিলেন আরও একটী কথা ।
আমি তােমার ছেলেকে বাঁচিয়েছি ; তার জন্যে আমায় তুমি
কি দেবে ?” আমি বলিলাম “তুমি যা চাইবে, আমি তাই
দিব।” তিনি বলিলেন, “আমি বেশী কিছু চাইনে, অঙ্গীকার
কর যে তুমি তােমার ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বে দেবে ।
তাতে কোন রকম আপত্তি কৰ্বে না?” আমি তখন ছেলের
জন্য পাগল, তাহাতেই সম্মত হইলাম। রাত্রি দুই প্রহরের
সময় তিনি একটা ক্ষুদ্র বালিকাকে ক্রোড়ে করিয়া আনিলেন,
আমি তাহার জন্য অপেক্ষা করিলাম। তার পর মেয়েটীকে
তোমার কাছে রেখে আমরা বাড়ী ত্যাগ কলেম।
রমেশ। তারপর ?
সন্ন্যাসিনী। তার পর আমি তার সঙ্গে একটী কুটিরে
এলাম। সেখানে একটা লােক ছিল, একটী ছেলেও ছিল।
আমি ছেলেটীকে কোলে কোরে মুখে চুমাে খেলাম, আমাকে
কারও বলে দিতে হ’ল না, আমার প্রাণ আমাকে বলে “এই
তাের হৃদয় ধন।”
রমেশ। সে কোথা, সে কই ?
সন্ন্যাসিনী। সব বচি। তার পর সেই লােকটী বলে,
আর এখানে আমরা দেরি কৰ্তে পারি নে। পুলিশ আমার
সন্ধান পেয়েছে। এখনই চল। “বৈষ্ণবী আমার দিকে চেয়ে
বল্লেন, “তবে তুমি যাও, সময় হলে ছেলে নিয়ে আসব।
[ ১৩৭
বের কথা যেন ভুল না।” ছেলেটী আমার কোল থেকে সে
চায় না, অথচ বৈষ্ণবী ছেড়েও থাকতে পারে না, তা
সকলে চলিয়া গেল,~~-আমি তখন পুত্রের জন্য পাগল হই,
সকল হিতাহিত জ্ঞান আমার লেপ হ'ল । আমি
সঙ্গে চলিলাম। বৈষ্ণবীর কোন বারণ শুনিলাম না।
বৎসর তাঁদের সঙ্গে নান' তীর্থে তীর্থে বেড়িয়ে এই ১৫ ::;
হল এখানে এসেছি। এই ১৫ দিন তোমার সঙ্গে সাক।
করিব করিয়াছি, কিন্তু সাহস হয় নাই।
কাছে আসিয়াছিলাম, কিন্তু ভয়ে পলাইয়া গিয়াছিলাম।
রমেশ বাবু শয়ন করিয়াছিলেন, উঠিয়া বসিয়া বন,
“কই, আমাদের হৃদয়ের বন্ধু কই ?” সবলকুন । যে
সঙ্গে আসিয়াছিল, সে দারের নিকট দাড়াই। নাত!
অপেক্ষা করিতেছিল,-জননী যখন ডাকিলেন, “সরণ, *
সে দ্বারের নিকট আসিয়া মুখ বাছাইল । শ। তাহাকে
আসিতে আজ্ঞা করিলেন, সে গৃহ প্রবিষ্ট হইতে না হই
বাবু তাহাকে একেবারে হৃদয়ে তুলিয়া লইলেন !
রমেশ বাবু সমাজের ভয় করিলেন না। তিনি সৈনঃ
কন্যা লাবণ্যের সহিত পুত্ৰ সৱলকুরের
হ দেও? ?
করিলেন। বিবাহ অধিক দিন বৃতি রাখাও তিনি
সঙ্গত বিবেচনা না করিয়া বিবাহের দিন স্থির করিয় সস্ত
আয়ােজন আরম্ভ করিলেন। মহাধন, কত জি ।
রােসনাই হইবে, কত নাচ গাওনা আমােক প্রমােদ হল,
গ্রামের লােকের আর আনন্দ পারে না। রমেশ বাবু পুর
বিবাহে প্রায় দশ সহস্র টাকা ব্যয় করিলেন।
[ ১৩৮ ] ।
সকল স্থির হইয়াছে ; রমেশ বাবু আপন বাগান বাড়ীতে
লাবণ্য ও লাবণ্যের মাতাকে থাকিতে দিয়াছে, সেইটী “কন্যার”
বাড়ী হইয়াছে। সকলই স্থির, কেবল কে কন্যা সম্প্রদান
করিবে তাহাই স্থির নাই। এ কথা বৈষীকে কেহ সাহস
করিয়া জিজ্ঞাসা করিতেও পারিতেছে না।
বিবাহের দিন আসিল। মহা ধূমধামে বর কন্যার বাটীতে
আসিলেন, তথায় লােকের অভাব ছিল না। রমেশ বাবুই
সমস্ত অয়ােজন করিয়াছেন। কন্যা সম্প্রদান গৃহে বাইয়া
রমেশ বাবুই সমস্ত আয়ােজম করিয়াছেন। কন্যা সম্প্রদান
গৃহে যাইয়া রমেশ বাবু দেখিলেন একব্যক্তি পট্টবস্ত্র পরিধান
করিয়া উপবিষ্ট। তিনি তাঁর দিকে চাহিয়া একেবারে
স্তম্ভিত হইয়া গেলেন, তাহার মুখ হইতে একটা কথাও বহির্গত
হইল না। তিনি সত্বর স্ত্রীর সহিত পরামর্শ করিতে গেলেন।
তাহার স্ত্রীও তখন সেই বাটীতে ছিলেন, তিনি তাহার সহিত
সাক্ষাৎ করিয়া বলিলেন, “লাবণ্য কার মেয়ে ? বৈষ্ণবী তােমায়
কিছু বলেছেন !”
স্ত্রী। কিছুই না আজ বিবাহের পর বলিয়াছেন।
রমেশ। কন্যা সম্প্রদান কৰ্বেন যিনি তাকে দেখেছ ?
স্ত্রী। দেখেছি ; উনি করাবর বৈষ্ণবীর সঙ্গে ছিলেন,
উনি লাবণ্যের পিতা।
রমেশ। উনি আমাদের কৃমিদার রাজা শশিশেখর ।
স্ত্রী। বল কি?
রমেশ। হা,–আমি ওকে বেশ চিনেছি। তুমি একবার
এ কথা বৈষ্ণবীকে জিজ্ঞাসা কর
[ ১৩৯ ]
বৈষ্ণবীকে এ কথা জিজ্ঞাসা করা হইল।
তখন তিনি
আর, গােপন করিতে পারিলেন না। বলিলেন উনি রাজা
শশিশেখরই বটে। কিন্তু দাঙ্গায় লােক খুন করায় উনি পান,
সেই পৰ্য্যন্ত আমাদের এই অবস্থা,-এ কথা যেন প্রকাশ
হয়।”
কথা প্রকাশ হইল না। বিবাহ হইয়া গেল। का
ধূমধাম মিটিয়া গেল, গ্রাম শান্তিলাভ করিল। কিন্তু রাজা
বিবাহের রাত্রি হইতেই অন্তর্ধান।
বিবাহের এক মাস পরে রাজা শশিশেখরের প্রাসাদে রাণী
দেখা দিলেন। রাজকর্মচারিগণ তাহাকে চিনিল, তিনি নিজ
হস্তে বিষয়ের ভার গ্রহণ করিলেন। এক মাস যাইতে না
যাইতে রাণী সমস্ত বিষয় কন্যা লাবণ্যপ্রভার নামে লিখিয়?
দিয়া, তাহার শ্বশুর রমেশ বাবুকে বিষয়ের তত্বাবধারক নিযুক্ত
করিয়া তীর্থযাত্রা করিলেন। সেই পর্যন্ত তিনি আর দেশে
প্রত্যাবর্তন করেন নাই।
*
:
*
১৫ বৎসর অতীত হইয়াছে। সরলকুমারের সৎব্যয়ে সন্তুষ্ট
হইয়া গবর্ণমেণ্ট তাহাকে রাজা উপাধি প্রদান কৰূিছেন।
লাবণ্যের একটী পুত্র ও কন্যা হইয়াছে।
•
মথ নাথ শনি
পােশাকড়দ, পূৰ্বনওপাড়া
জেল হাওড়া ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.