Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Sthal-kamal
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
স্থল-কমল
গুরুপদ বন্দ্যোপাধ্যায়
!
প্রকাশক-শ্ৰীগােপালদাস মজুমদার
ডি, এম, লাইব্রেরী
৪২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
মূল্য-এক টাকা
প্রিন্টার-শ্ৰীশশিভূষণ পাল
মেটকাফ, প্রেস ;
৬নং রাজকৃষ্ণ লেন, কলিকাতা।
উৎসর্গ
বি, এন রেলওয়ের সুপারুিটেনডেন্ট, জেনারেল,
“মরমী” “গােপনব্যথা”
—প্রভৃতি।
কাব্যগ্রন্থ প্রণেতা,
সুকবি
শ্ৰীযুক্ত অমিয় চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
মহাশয়,
করকমলেষু
হয়ত গাঁথা হয়নি ভালো স্থল-কমলের রঙিন্ দলে,
ক্ষুদ্র কবির ছিন্ন-মালা, পূজ্য তােমার দিলাম গলে।
গুণমুগ্ধ;
রপ
১৮
নিবেদন
৫
স্থল-কমলের অনেকগুলি কবিতা, ভারতী, মানসী-মৰ্ম্মবাণী,
প্রতিভা, ঝরণা, মাতৃমন্দির, বাঁশরী, নবযুগ, ভারতবর্ষ, বসুমতী
প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছে।
প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত কবিতাগুলি একত্রে গ্রন্থাকারে
প্রকাশ করিলাম
আদর-বি-এন আর
শুভ বৈশাখ ১৩৪৫
স্থল-কমল
মানসী
?
প
চমকে দেখি, আজকে তুমি পথের মাঝে চলছিলে,
আমার দ্বারের পাশ দিয়ে গাে আমনে কী পথভুলে ?
অলসকালাে অলকরাশি,
মুখের মৃদু মিষ্টি হাসি,
শিউলি ফুলের রঙ ছােপান বক্ষ ঢাকা অঞ্চলে,
আমার দ্বারের পাশ দিয়ে যে আজকে তুমি ছিলে !
চপলচারু-চরণ-চালি লাক্ষা-রাগের গৌরবে,
ভােরের বাতাস উঠলাে ভেসে স্থল কমলের সৌরভে।
আঙুর ছােয় ওষ্ঠে তােমার মতির নােলােক দুন্দুলি,
দোদুল দোদুল দুলিয়ে কাণে ঝুমকো লতার ফুলগুলি ;
রঙিন গালে লাগলাে ভালাে
এক ফোটা তিল একটু কালাে,
কাজল কালাে চাউনি চোখের পথ হারানাে বুলবুলি ;
আমার দ্বারের পাশ দিয়ে আজ চলছিলে কী পথ ভুলি ?
স্থল-কমল
}
কোথায় যাবে কাহার লাগি ওগাে অরূপ সুন্দরী ?
ঘর ছাড়ানাে মন্তরে পা’র নূপুরগুলি গুঞ্জরি !
অজানা ওই রূপ যে তােমার নিত্য দেখি স্বপনে,
অশােনা সে কোন বাণীতে ডাক দিয়ে যাও গােপনে ?
আজকে যদি এলেই প্রিয়া,
দাও ভ'রে মাের শূন্য হিয়া ;
আপনি যদি দিলেই ধরা সবার দিঠির অন্তরালে,
আঁচল কেন চপল হাতে সরিয়ে পালাও হাত বাড়ালে ?
পরিচিতা
H
মানসী মাের আসলে যবে একলা ঘরের
আদুরী,
চপলচারু-চরণ-ক্ষেপে উছলে উজল
মাধুরী ;
সেই রূপেরি একটু খানি,
দুচোক ভ'রে চুমুক টানি,
শুষক বুকে ফুল বাগিচা, এমনি পরশ
যাদুরী।
গত দিনের গােপন কথা সকল চটুল
আঁখিতে,
সােনার ভাষে উঠলাে ফুটে সরম সােহাগ
জড়িতে।
আমায় প্রিয়া ছলতে এসে,
আপনি ধরা পড়লে হেসে,
আঙর ছােয়া ঠোঁটের ফঁাকে বিজলি চমক
চকিতে।
ভাবছ প্রিয়া তােমায় আমায় আজকে দেখা
প্রথমে,
বিবশ তনু শিথিল বসন, নত বদন
সরমে!
স্থল-কমল
অচিন্ আমার নওকো প্রিয়ে,
লজ্জা নূতন করছে কী-এ?
আজও তােমার মুখের ছবি জাগছে গােপন
মরমে!
প্রথম আমার পরশ পেয়ে উঠলে যবে
কাঁপিয়া,
রইছে মনে, মু’জলাে ধীরে কাজোল জোড়া
আঁখিয়া ।
কোন ফাগুনের সঙ্গোপনে,
মিলন আমার তােমার সনে,
আজও তাহাই তেমনি অটুট বিশ্ব-ভূবন
ব্যাপিয়া।
বর্ষ হাজার অতীত তবু সােহাগ স্নেহের
চুমারি,
মলিন রেখা রইছে আজো নিটোল গালে
তুমারি ;
কাহার হাতের পরশ সে টু
গৌরবে তাের ভ’রলাে রে বুক ?
জনম জনম ব্ৰত তােমার ভাঙনু আমি
কুমারী ;
মানসী মাের আদুরী !
৪
প্রিয়ার ঘুম
গৃহ কোণে মিটি মিটি
জ্বালায়ে বাতি,
প্রিয়া মাের জেগে কাটে
সারাটি রাতি !
চঞ্চল আঁখি দুটী
ঘুমালসে পড়ে লুটি,
মাের আসাপথ পানে
ফিরে ফিরে চায়,
বঁধু নাই কাদে প্রাণ
বেদনা ব্যথায় ।
“বউ কথা কও” পাখী
উঠিলে
“এলে কি ?” বলিয়া প্রিয়া
চাহে চমকি।
কত কথা, কত গীতে
ঠাই নাই আর চিতে,
ভাষা তার কেঁদে মরে
মনের দ্বারে,
গােপন কথাটি বল
বলিবে করে ?
৫
স্থল-কমল
প্রিয়া পাশে আমি নাই
বহু যে দূরে,
মন তার মাের পিছে
মরিছে ঘুরে ।
নব ঊষা আলাে রাশি,
জানালায় এল হাসি,
সারা নিশি জাগি প্রিয়া
পড়িল ঢ'লে,
মাের লাগি জ্বালা দীপ
তখনাে জ্বলে।
৬
উন্মনা
শীতল বকুল বায়ে ভেসে এল কী ?
এই বুঝি ভালবাসা ? নয় তবে কী ?
শিহরিল ফুল গুলি,
শাখা শাখী উঠে দুলি,
ঘুম ভাঙ্গি আঁখি তুলি
ডাকিল পাখী।
আমি কেন গৃহ কোণে
একা বসে আনমনে,
ছুটে যাই তা’র সনে,
যে গেল ডাকি,
ভুলে যায় সব যাহা
ভুলিতে বাকী ?
যারা ছিল আপনার ভুলিল তারা,
কে আমারে ভালবেসে আপন হারা ?
নানা কাজে নানা ছলে
কে আমারে দেখা দিলে ?
বুকে ওঠে দুলে দুলে,
চরণ সাড়া।
আমি যে গাে রে জানি,
চেনা তার মুখ খানি,
অমিয়
মধুর
বাণী
সুধার ধারা,
মাের পানে চেয়ে থির
আঁখির তারা
•ঃ০:
পল্লী
বধূ
পল্লী বধু,
ক্ষণেক শুধু
মুখটী তুলে
চাওতাে গাে,
তােমার ছবি,
আঁকবে কবি,
শুনবে কথা
কওতাে গাে।
রঙিন মুখে ঘােটা তলে,
কাজল জোড়া
আকুল করা
নীল আঁখি,
পড়লে ছায়া দিঘীর জলে,
কমল মাঝে
ভ্রমর লাজে
রয়না কী ?
সুগােল চারু যুগল করে,
শখের বালা,
মিষ্টি জুলি
ঘ কাকে,
আলতা পায়ে ধূলার পরে
বাজিয়ে মল,
চলে চপল
পথ বাঁকে।
৮
স্থল-কমল
অলস কালাে অলক রাশি
বকুল বায়
ছড়িয়ে যায়
আন্ মনে,
ওষ্ঠ ভরা মিষ্ট হাসি
চম্কে নাকি
ডাকলে পাখী
আম বনে।
চরণ ক্ষেপে তরল সােনা
উছলে পড়ে,
মুক্ততা ঝরে
হাসলে সে,
সজল রেখা আলিপনা
আঁকন্ বাঁকন,
শিক্ত বসন
আসলে যে !
মেঠো হাওয়ায়
উড়িয়ে নে যায়
অলস চিকণ
নীল সাড়ী,
}
পথের মাঝে
নিঠুর লাজে
মুখটী রাঙা
হয় তা'রি।
প্রিয়া
কুঞ্চিত কুন্তল, শ্যামল বর্ণা,
শিষ্টা, নিষ্ঠা-ভক্তির ঝর্ণা !
সুমধুর দৃষ্টি কাজল চক্ষে,
অমৃত উৎস উচল বক্ষে!
সর্ব সমর্পি আপনি রিক্তা,
বেদনায় দরদী অঞ শিক্ত !
অপমানে নয়নে বহ্নি বৃষ্টি,
সমাদরে সুন্দর স্নিগ্ধ দৃষ্টি।
পরিহাসে প্রেয়সীর অপরূপ ভঙ্গী,
বিপদে বরাভয়, ছায়াসম সঙ্গী!
সম্পদে হর্ষ, বাসনায় তৃপ্তি,
অবসাদে উৎসাহ,আঁধারে দীপ্তি।
ব্রীড়া অবন, চঞ্চল হর্ষে,
দুঃখে ম্রিয়মান অশ্রু বর্ষে।
সুবিনীত চিত্তা, ধীর প্রশান্তা,
মাের লাগি বিধাতা নিরমিল কান্তা !
১০
চপলা
নৃত্য অধীরগতি বেপথে ধেয়ে,
বার বার আসে যায় চপল-মেয়ে ;
চূর্ণ অলক দোলে কপােল তলে,
পথ’পরে অঞ্চল লুটায়ে চলে !
বকুলের তলে তার ভােরের বেলা,
সুরু হয় দিবসের প্রভাতী খেলা ;
মুখে চোকে তুলতুলে নিটোল গালে,
রাঙা নব আলােকের ফাগের লালে।
কেয়া কুঞ্জের ফাঁকে মারিয়া উকি,
কুসুম কুড়ায়ে ফেরে কমল মুখী ,
কোয়েল ডাকিলে দূরে আমের বনে,
ব্যঙ্গ সে করে তারে আপন মনে।
এপার ওপার ভরা নদীর বানে,
সাঁতার সে কাটে মানা কারাে না মানে ;
চঞ্চল সখিটীর হরষ হেরি,
তালে তালে নাচে ঢেউ তাহারে ঘেরি ।
ঝর ঝর নিঝর ধারার মত,
খালি খালি হাসে কথা কয় সে যত ;
সদা তা'র হয় ভুল সকল কাজে,
মুখ তবু নয় নীচু সরম লাজে।
১১
স্থল-কলল
পুতির মালা আর কাচের পুতুল,
কৌটা ভরা তার বিও অতুল ;
সাজায়ে তা’ নানামতে খেলার ঘরে,
সহসা ভাঙ্গিয়া ফেলে ক্রোধের ভরে !
কজ্জ্বল কালাে দুটি ডাগর চোকে,
স্বপ্ন সে দেখে চেয়ে কল্প লােকে ;
আপন খেয়ালে রয় আপন মনে,
ডাকিলে না সাড়া দেয়, কথা না শশানে !
চপলা দুলালী বালা জানিনা কবে,
কা'র বাহু বন্ধনে বন্দী হবে ;
চঞ্চল আঁখি দুটি নিমেষ হারা,
মুখ পানে চেয়ে রবে পড়িয়া ধরা !
প্রিয়ার আধ্যাত্মিকতা
ঐ যে শেফালিটি
ফুটিল সন্ধ্যায়,
নিশিথে নিদ্রিত
অলি কি টের পায় ?
ভরিয়া কচি বুকে
কত না আশা রে,
ঝরিল অভাগী
প্রভাতে আহা রে !
জীবন মরণের
বিষম মাঝখানে,
দাড়ায়ে আছি তব
চাহিয়া মুখ পানে ;
চুমাতে রেঙে দাও
আজি এ দুটি গাল,
হয়ত খুঁজে মােরে
পাবেনা তুমি কাল !
১৩
প্রথম রাতি
মনে কী পড়ে সখী সে শুভ মধু রাতে,
ঘােমটা ঘেরা মুখে মিলন মাের সাথে,
কত না লাজে ভায়ে মৃদুল চরণে,
প্রথম বাসরে সে আসিলে শয়নে ;
কুণ্ঠা-দ্বিধা-ভয়-ভাবনা ভরা মনে,
আমারে পিছু করি দাড়ালে গৃহ কোণে!
সরম মাখা দুটী আনত চক্ষে,
কাপন ঘন ঘন উচল বক্ষে,
তৈল পিচ্ছল চিক চারু চুলে,
কসন অঞ্চল রহে না যায় খুলে ;
নিপুণ ছাদে বাঁধা বসন গুষ্ঠিতা,
জড়িত পদে আসি দাড়ালে কুষ্ঠিত।
কুমারী জীবনের সে শেষ রজনীতে,
মিলন-মঙ্গল-মধুর-সঙ্গীতে,
সকল অন্তর ভরিয়া প্রেম-ডালা,
আমারি লাগি তুমি আনিলে যদি বালা,
নীরবে নত মুখে গৃহের কোণে শুধু,
দাড়ায়ে থাকা তব সাজে কী ওগাে বধূ ?
হেরিতে আঁখি ভরি তােমারি মুখ খানি,
করেছি কতবার আঁচল টানাটানি,
১৪
স্থল-কমল
মানিনি কোন মানা কাতর ইঙ্গিতে,
হেসেছি শুধু তব অরূপ ভঙ্গিতে ;
সােহাগে সম্ভাষি গলেরি ফুলহার,
মােরি গলে দিনু প্রথম উপহার!
প্রথম পরশনে পুলক কম্পনে,
পড়িলে বাঁধা মাের বাহুরি বন্ধনে।
শুধালে নানাছলে, “আমি কে তােমারি ?
কহিলে আঁখি তুলে, “তুমি যে আমারি !”
চকিতে রাঙা মুখে প্রথম চুমটি,
ফুদিয়ে দিলে তুমি নিবায়ে দীপটি !
বিদায়া
কজ্জ্বল কালাে দুটি
নয়ন কোণে,
যদি আসে জল সখী
বিদায় খণে ;
আঁচলে মুছিয়া হায়,
ফেলিতে কি হয় তায় ?
কল্যাণ কামনায়
মনের দ্বারে,
পূর্ণ কলস সম
রাখিও তারে !
ছল ছল আঁখি দুটি
অশ্রু সজল,
হেরিয়া হবে যে মাের
যাত্রা সফল ;
দরদীর আঁখি জল,
ঝরে যদি অবিরল,
অশুভ যা কিছু সব
লুকাবে লাজে,
ফিরিব সফল হয়ে
আপন কাজে ।
•ঃ
প্রিয়ার পত্র
কত লাজে ভয়ে নীরব নিশীথে প্রেয়সীর লেখা পত্র,
ছােট বড় বাঁকা অক্ষরে ঢাকা মােটে গুটিকয় ছত্র ;
কচি আঙুলের ছাপ সারা গায়ে দোয়াতের কালি শেষ,
মানচিত্রের অনুরূপ প্রিয়া পাহাড় এঁকেছে বেশ!
মােটা মােটা সব অক্ষরগুলি আপন অঙ্গ ভারে,
রথ যাত্রার ভিড়ের মতন পড়েছে কে কার ঘাড়ে ;
কাগজের রং যায়নাকো জানা সাদা কি বেগুনি, লাল,
আলতা সিদুরে, পানের খয়েরে, তেলে ভিজে বাঘ ছাল !
দুর্গার শ্রী বিশ্রী বড়ই, সহায় চাহিতে গিয়ে,
মােটা এক ফোটা কালি পড়ে গেছে, মুছেচে আঁচল দিয়ে,
এমন অঙ্কে লিখেছে তারিখ, মাসের নাম ও সাল
ধারাপাতে নাই, পাঁজিতে খুজিয়া মিলিবে না কোন কাল ।
।
প্রিয়, প্রিয়তম, কান্ত, দয়িত, সকলি লেখার পরে,
একে একে সব কালির আঁচড়ে কেটেছে সরম ভরে ;
নিবেদন শুধু করেছে অধীনা, স্বাধীনা নহে তত সে,
উত্তর দিতে দেরী তা’র খামে ঠিকানা লিখিবে কে ?
মা, আমি, দিদিমা, পিসীমা,ন’খুড়ী সকলেই ভাল আছে,
একটীও আম ধরেনি এবার পূবের ভিটার গাছে ;
১৭
স্থল-কমল
ঝন্টুর জ্বর, মণ্টর খােস্, আমাশয়ে ভােগে হাসি,
বীণার সে দিন বর এসেছিল, জ্যেঠুমা গিয়াছে কাশী।
তােমার কুশল সংবাদ দিও, গরমের ছুটী হ'লে,
মাথা খাও যেন একদিনও দেরী করােনা আসিও চলে ;
সিদুর কৌটা ভাল দেখে দুটি, আলতা দু’ শিশি এনাে,
উত্তর দিতে দেরী হলে কিছু হবে নাকো ভাল জেনাে !
আচ্ছা যা হােক লােক তুমি হাগা, শুধায়েচ মােরে যাহা,
চিঠিতে সে সব লেখা যায় ছি ছি, কেমনে লিখিব তাহা ?
সাক্ষাতে তুমি শুনিবে সকলি দিন কত পরে আসি,
প্রণাম চরণে চুম নিও, ইতি। চির অনুগতা দাসী।
অতীতের কথা পাথরে পাহাড়ে, তামায় খােদায় করা,
সে পড়া সহজ, বড় সুকঠিন প্রিয়ার পত্র.পড়া ;
প্রিয়ার প্রাণের দুরূহ ভাষার অক্ষর পরিচয়
হয়নি এখনাে, তবু পড়িয়াছি চিঠিখানি বার ছয় !
১৮
নিমেষের দেখা
( চীনাকবি, লাে-তুং )
পর্দার ফঁাকে তার চাদপানা মুখটি,
চকিতের চাউনিতে কম্পিত বুকটি ;
টুকটুকে মুখখানি সিদুরের টোপ তায়,
শরতের নীল মেঘে বিজলীও লাজ পায়।
অলস চিকণ কালাে কুন্তল গুচ্ছ,
চাদটিরে ঘিরে নাগ কালিয়ার পুচ্ছ ;
টানাটানা চারু ভুরূ, বল আর কব’কী ?
রসে ভরা ঠোট দুটি বেদানার রােয়াটি।
এই ছিল, এই নাই, পলকের পরিচয়,
সারাটি জীবন তবু করে গেল মধুময়।
দ্বিধা
শুধু দুটি কথা ক'ব তাহারি আশে,
বার বার ফিরে আসি তােমারি পাশে ;
কি যে কথা শুনাইব, সে ভয়ে পাছে
তুমি যাও দূরে সরে, রহনা কাছে ?
ইঙ্গীতে কী যে কহ বুঝিনা মানে,
থির চোকে চেয়ে রই মুখেরি পানে ;
কঙ্কণ কিনি কিনি চরণ সারা,
মােরে শুধু করে ই পাগল পারা !
শিথিল বসন খানি চপল বায়ে,
ভেসে এসে যদি লাগে আমারি গায়ে,
সেই সুখ-পরশন আশার লাগি,
তব বাতায়ন তলে রজনী জাগি।
জাগ্রতে নয়, মম স্বপন ঘােরে,
চুপি চুপি আসি’ ধরা দাও যে মােরে
শেফালির রঙে রাঙা বসন খানি,
রেঙে যায় মাের শুধু যুগল পানি !
মাের যাওয়া আসা পথে ধূলার পরে,
ফুল কেন ফেলে যাও, কিসের তরে ?
সে ফুল কুড়ায়ে নিলে আদর করে,
মাের পানে চেয়ে রহ গরব ভরে !
২০
স্থল-কমল
রিরাগ না অনুরাগ যায়না জানা,
সঙ্গ চাহনা তবু ক’রনা মানা;
ছলনা ক’রনা জানি ছলিতে এসে,
মুখটি ফিরায়ে নাও মধুর হেসে !
যােজনের বাধা কেটে ছুটিয়া যদি,
সাগরের বুকে এসে মিলিছে নদী ;
তবে কেন দ্বিধা তব, সরম কিসে ?
এস সখী দুটি প্রাণে রহিব মিশে।
ঃঃ
২১
অনুপমা
ইষ্টিসানের সামনে গাড়ী যখন এসে দাড়ায় প্রিয়া,
কেমন করে ব’লবাে কি সে ব্যথায় ক'রে আকুল হিয়া ;
মন লাগেনা কোনই কাজে,
অজানা সব লােকের মাঝে
নিমেষ হারা চক্ষে তােমার তুল্য বদন বেড়ায় খুঁজি,
কেউ ভাবে লােক কেমন ধারা, ইতর কিম্বা পাগল বুঝি!
এক সাথে সই পাইনা তােমার ছড়িয়ে পড়া রূপের রাশি,
চক্ষে কারাে দৃষ্টি তােমার, ওষ্ঠে কারাে মিষ্টি হাসি,
গােলাপ গালে তিলের দাগে,
তােমার মতই দেখতে লাগে ;
সি দূর রাগে রাঙা বদন আমনে কেউ ঘােমটা খুলি,
মাের পানে চায় অধর টিপে তােমার মতন নয়ন তুলি !
সাজ সকালে নিত্য যখন গাড়ী আসার ঘণ্টা বাজে,
কেমন করে ঘরের কোণে থাকবে তখন মগ্ন কাজে ?
ওগাে আমার মনের মাণিক,
তােমার রূপের আভাস খানিক
খুঁজে বেড়ায় কা’র মুখে পাই, কে চোখে চায় তােমার মত,
নয়নে লা’গলে নয়ন অমনি তখন মুখখানি কা’র সরম নত!
২২
স্থল-কমল
পাঁচশত ক্রোশ দূরের পথে, একলা কাটি’-কাল প্রবাসে,
তােমার মধুর মুখটী আমার মন মুকুরে সদাই ভাসে ;
এখন সখি বুঝেছি তাই,
তােমার রূপের তুলনা নাই !
কতই মধুর হয়ে যে মাের জাগছাে তুমি আঁখির আগে,
সে কথা সই মিলন রাতে ব’লবাে নিবিড় অনুরাগে !
দুটী আঁখি
ও দুটী কাজল নয়নে তােমার কত হাসি, কত জল,
চঞ্চল-চারু-চকিত-চাউনি কত কৌতুক ছল ;
বুঝিতে আজিও পারি নাই প্রিয়া,
তাই নিরখিয়া,
ও দু’টী সুনীল সায়েরে খুঁজিয়া পাইনা অতল তল,
নিৰ্বাক শুধু বিস্ময়ে হেরি ঢেউগুলি ঢ ঢ !
মুগুধ কেবলি
চাহি সুন্দর
হৃদয়-কুঞ্জ-কুটীরে তােমার পুষ্পিত ফুল বনে,
পুলকিত প্রাণে মঙ্গল গানে শঙ্খের নিঃস্বনে,
অবনত আঁখি,
সরম কাতর, নিলে যবে ডাকি,
সে দিন সাজের অল্প আঁধারে গােধূলির মধুক্ষণে,
হেরিনু প্রথম ও দু’টী নয়ন পরিচয়ে মাের সনে।
মন-মৃগ-মম মরমে বিধেছ ও দু’টী নয়ন বাণে,
চমকিয়া উঠি চকিত দিঠিতে প্রেম বিহ্বল প্রাণে।
চঞ্চল চারু
চকিত আঁখিয়া,
কত কৌতুক ছলনা ঢাকিয়া,
পল্লব তলে রাখিয়াছ প্রিয়া, চপল দৃষ্টি দানে,
চুম্বক সম টানিয়া আমারে বাঁধিয়াছ প্রাণে প্রাণে ?
২৪
স্থল-কমল
কজ্জ্বল-কালাে-সুনীল-নয়নে হানি’ উজ্জ্বল আলাে,
আমার আঁধার অন্তরে তুমি দীপ শিখা সখী জ্বালাে।
বৃথা অভিমান
ব্যথা ভরা মনে,
হেরি জলভার
চক্ষের কোণে
ও দু’টী কাজল নয়নে কখনাে মঙ্গল ধার ঢাললা,
সহসা হাসির ঝরণা আলােকে শােভে সুন্দর ভালাে !
চঞ্চল-চারু-লােচনে তােমার মৃদু অঞ্জন শােভে,
মম-আঁখি-অলি মরমে ব্যাকুলি সহসিজ মধু লােভে,
চকিত চকোর
সম আঁখি মাের,
খুঁজে ফেরে ওই
আঁখি দুটী তাের;
আবরণে ঢাকি রাখিওনা আঁখি, ধেয়ে আসি সুধা লােভে,
ফিরালে নয়ান, ব্যাকুলিত প্রাণ, নিরাশায় মরি ক্ষোভে !
কবির প্রিয়া
কবির ঘরণী তুমি, কবির প্রিয়া,
সেই সে গরবে সখী ভরিও হিয়া
মিছে সখী পাও লাজ,
আভরণে কিবা কাজ ?
হীরকের হার বৃথা, সােণার বালা,
নিত্য গাঁথিয়া দেবব কথার মালা।
মৰ্ম্মর হৰ্ম্মেতে কী কাজ প্রিয়ে ?
নাচিয়া ফিরিও মাের ভগ্ন গৃহে।
ছিন্ন চালের ফাঁকে,
মুখে চোকে গালে নাকে,
জ্যোছনার আলো এসে লাগিবে ভালাে,
কী কাজ জ্বালিয়া দীপ উজল আললা ?
শতেক অভাবে যদি সবার মাঝে,
বক্ষে বেদনা জাগে নিঠুর লাজে,
মাের পানে চেয়ে তবে,
ক্ষণেক দাঁড়ায়ে রবে,
বিষাদ মলিন তব করুণ ছবি,
মরম পরতে আঁকি লইবে কবি
২৬
স্থল-কমল
হর্ষে নয়নে তব মাণিক জ্বলে,
বেদনায় আঁখি জলে পাষাণ গলে ;
ঠোটে হাসি চোখে জল,
আলাে ছায়া অবিরল,
তারি মাঝে বসি শুধু দিবস যামি,
তব বন্দনা গীতি গাহিব আমি।
এ মরজগতে সখী দুখের বােঝ,
মাথায় বহিয়া সুখ যায় কী খোজা ?
আকাশের গায়ে গায়ে,
প্রভাতের মৃদু বায়ে,
কল্লনা লােকে দূর শূন্য পথে,
ভ্ৰমিয়া ফিরিব মােরা পুষ্প রথে !
০৯:০:
২৭
স্মৃতির ব্যথা
এই সে গৃহখানি,
এই তো আঙিনা,
সকলি আছে শুধু
তাহারে দেখি না।
যেখানে যাহা ছিল,
সেখানে আছে তাই,
যাহারি লাগি এত
সে শুধু গৃহে নাই।
ঐ যে এক কোণে
মঞ্চ তুলসীর,
ঝরেছে পাতা তার
ভেঙ্গেছে মন্দির।
কে তা’রে তােষে বল
প্রভাতে বারি ঢালি,
কে দেবে নিতি সাজে
সন্ধ্যা দীপ জ্বালি ?
নিমমরি হাহাকার
বাতাসে বয় ধীরে,
শিশিরে ভেজা ফুল
বেদনা আঁখি নীরে,
২৮
স্থল-কমল
মাধবী কেঁদে মরে
বেদনা হাহাকারে,
কাহারি খোজে যেন
ব্যাকুলি কেঁদে মরে।
পড়িছে ঝরে ঝরে
শেফালি ফুলগুলি,
বসন রাঙিবারে
কেহ না লয় তুলি।
মধুর স্মৃতি তার
রয়েছে কত লেখা,
কোমল মাটীপ’রে
চপল পদ রেখা।
বরষ কেটে গেছে
বাদল বরিষণ,
মােছছনি আজো তার
লােহিত পরশন
সিথির সিন্দুর
কবে সে আমনে,
দেওয়ালে মুছে গেছে
রঙিল পরশনে,
২৯
স্থল-কমল
লেগেছে কত ধূলা,
বয়েছে কত ঝড়,
মােছেনি আজো আছে
ল সুন্দর!
দিঘীর কালাে জল
করিছে টম
কঁপিছে, কঁদিছে গাে,-
কোথা সে বল্-ব ?
বাবলা কাটা বনে
করিছে কানাকানি,
অলস অঞ্চল
করিবে টানাটানি ;
গ্রামের বাঁকা পথ
খুঁজিয়া মরে হায়,
চরণ চঞ্চল
পরশ মধু চায় !
লােহার কাটাখানি
তাহারি মাথা বাঁধা,
লুকায়ে রাখি রে
দিয়াছি কত ধাধা ;
;
স্থল-কমল
ফিরিয়া এস ওগাে,
রেখনা অভিমান,
বুকেরি কঁাটা আমি
মােরে দিব দান।
তােমারি বক্ষের
গন্ধ বুকে করি,
ত্যক্ত বাসখানি
রয়েছে আজো পড়ি,
শীতল পরশন,
মিলন দুরাশায়,
তাপিত বুকে তাহা
আকাড়ি ধরি হায় !
অলস এলােমেলাে
শিথিল কেশপাশে,
বাঁধিয়া রেখে গেছ
গুচ্ছ অবকাশে
আজিও ভেসে আসে
তৈল বাস তায়,
শয়ন গৃহে মােরে
ডাকিছে ইসারায়।
৩১
স্থল-কমল
মরণ মধু চুমে
পড়েছ তুমি ঢ'লে,
ঐ
যে ওইখানে
মলিন গৃহতলে ;
ভরসা আজো প্রাণে
সহসা উকি মারে,
তােমারি কঙ্কণ
ধ্বনিবে গৃহ দ্বারে !
কবে সে, কতদিনে ?
শুধু যে ভাবি তাই,
তােমারে পাব আমি
ফিরিয়া পুনরায় !
৩২
মৃত্যু বরণ
( উৰ্দ)
রাজকবি আসি প্রণমিল যবে,
নৃপতি শুধাল ধীরে,
“বহুদিন তব শুনি নাই গান,
মৌন কেন হে কবি ?”
কবি কহে, “রাজা, ভেঙ্গে গেছে বীণা,
ভুলে গেছি গান সব-ই,
ছলছল দুটী নয়নের জলে
মরিচা ধরেছে মীড়ে।”
হাসিয়া ভূপতি কহিল, “পাগল কোন রূপসীর রূপ,
অন্তরে তব জ্বালাল দারুণ প্রেম-পিয়াসার ধূপ ?”
কহে কবি তবে আনত বদনে,
“নাহি জানি মহারাজ,
শ্বেত পাথরের ঝরণার পাশে
কেয়া কুঞ্জের ফাকে,
ভুলি নাই আজো স্মৃতি তুলি যেন
বুক কেটে মাের আঁকে,
ছলছল দুটী কাজল নয়ন
দেখিয়াছি সেই সাজ !”
স্থল-কমল
রােষানলে রাজা সহসা জ্বলিয়া কহিল, “বুঝেছি কারে,
দেখিয়াছ সেই নবীনা আমার বন্দিনী কারাগারে।
আমার প্রেয়সী যে রূপসী, তুমি
তাহার বিরহে দহ ?
ঘাতক হানিবে অসি তব শিরে ?
পাষাণ তলায় পিষে ?
শ্বাসরােধ হয়ে ? আগুনে পুড়িয়া ?
মাটিতে পুঁতিয়া ? বিষে ?
মৃত্যু তােমার শাস্তি তা হ'লে,
কেমনে মরিবে কহ ?”
“একবার দেখি অর্ধ যে মৃত, আরবার দেখে কভু,
কহে কবি তবে, “কিবা প্রয়ােজন, আপনি মরিব প্রভু!”
-*:-
“আমি দিনা যেতে
(R. Bridges )
সারাটি মাসের ভালবাসা তুমি এমনি করিয়া ভাঙ্গি,
অধরে অধর পরশি’ ক্ষণেক জাগা’য়ে সুখের রেশ,
একটি মধুর চুম্বনে মাের গণ্ড দু'খানি রাঙ্গি',
মাগিছ বিদায় ? সে কি হয় হায়! যাইতে দিবনা দেশ ।
আবার আসিব বলি,
কচি কিশলয়ে হরষ জাগা'য়ে, মৃদুল দখিন হাওয়া ;
ফোটেনি এখনাে আমার আশার শতেক কুসুম কলি,
যাওয়ার সময় হয়নি তােমার, এখন হবে না যাওয়া ।
উদয় অচলে যদি গাে তপন আর নাহি ওঠে হাসি,
অস্তাচলের আড়ালে লুকায় চিরতরে মান বেশে,
মিথ্যার কোলে সত্যের আলাে যদি নাহি ওঠে ভাসি,
হয়তাে তখন তােমারে যাইতে দিতে পারি তব দেশে ।
।
নীল নভ তলে চেয়ে দেখ ওগাে ভিড় করে তারা গুলি,
বাহারা হয়ে আমাদের পানে চেয়ে আছে তারা বেশ,
প্রহরীর মত কত কাছে কাছে হাজার নয়ন তুলি ;
কি সাহসে হায় বলগগা তােমায় যেতে দিব আমি দেশ ?
স্থল-কমল
চাদেরে হেরিয়া কয়েছি আমরা কত কটুকথা তারে,
আমাদের পানে চেয়েছে যখন ম্লান মুখে মৃদু হেসে,
এখনাে তাহার আজ দেখা নাই, সহসা উঠিবে ভেসে,
কেমনে তােমায় দিব গাে বিদায়, যাইতে বলিব দেশে?
গাছে গাছে যবে কুঁড়িগুলি সবে নয়ন মেলিয়া চায়,
আশে পাশে ’র ফোটা ফুলগুলি রূপ গৌরবে হেসে,
ভাবে আমাদের হয়েছে সময় চরণে লভিব ঠাই,
তবে কেন বল তােমারে বিদায় দিব আমি যেতে দেশে ?
শত বন্ধনে বাঁধিয়া তােমারে রাখিব আমি যে আজ,
তুমি যদি বল, বিদায় এখন আশা দিয়ে অবশেষে,
বাহু দুটি আমি বাড়ায়ে ধরিয়া রাখিব বুকের মাঝ,
আমি দিবনা তােমারে চলিয়া যাইতে তােমার আপন দেশে।
মধু
বাসর
বাসরে ছিল বর, বধূটী ছিল পাশে,
বাহিরে উৎসুক সখীরা মৃদু হাসে;
বিকল অর্গল, শিকল দিয়ে দ্বারে,
মুক্ত বাতায়নে গােপনে উকি মারে।
রঙিন রেশমীর বসন গুষ্ঠিতা,
শয়ন পাশে বধু সরম কুণ্ঠিতা ;
ঘরের কোণে ক্ষীণ প্রদীপ আলাে রেখা,
তখনাে মুখখানি যায়নি ভালাে দেখা।
সহসা ধরণীর বক্ষ কেঁপে উঠে,
যে যেথা পায় পথ প্রাণের ভয়ে ছােটে ;
সমুখে মৃত্যুর ভীষণ ছায়া হেরি',
শিকল খুলে দিতে সহেনা কারাে দেরী!
বক্ষমাঝে বর বধূরে নিল তুলি,
কেমনে যাবে হায়, বদ্ধ দ্বার খুলি ?
সহসা গৃহখানি ভাঙ্গিয়া হ'ল চুর,
বাতাসে গেল মিশে করুণ চাপা সুর !
স্থল-কমল
কতেক দিন পরে ভগ্ন স্তুপ রাশি,
মজুর একদল সরা’তে দেখে আসি,
মাংস গলে গেছে, বসন অঞ্চলে
জড়ায়ে আছে দুটী শুষ্ক কঙ্কালে।
রসাল তরু গায়ে মাধবী লতাসম,
বাহুর বন্ধন নিবিড় গাঢ়তম,
কত না নিরাপদে জড়ায়ে বাহু দুটি,
বধূর কঙ্কাল বরের বুকে লুটি'।
রক্তধারা ঝরি’ বরের বক্ষের,
কাজল সাথে মিশে বধূর চক্ষের,
ধরার ভাঙ্গা বুকে আঁকিয়া আলিপনা,
রাখিয়া গেছে শেষ বিদায় স্মৃতিকণা।
সকল জীবনের সােহাগ একঠাই,
এমন করি কোন সােহাগী বল পায় ?
যদিও জেগেছিল মরণ ভয় বুকে,
মরিল তবু তারা মিলন মহাসুখে !
বিরহহীন সেই মিলন মহাপীঠে,
প্রকৃতি মাথাকে কঁদিছে ভাঙ্গা ইটে,
দারুণ অনুতাপে মানিছে পরাজয়,
বেতাল বায়ে বাজে শঙ্খ জয়! জয়।
৩৮
বাধা
সারাটা দিন শুধু বহে সে কয়লা,
কুলির কালাে মেয়ে,
সারাটী দেহ ছেয়ে
ভরিয়া গেছে ধূলা, কালি ও ময়লা।
অলস খোপা বাঁধা চিকণ অলকে,
মাথাতে বারবার
তুলিয়া লয় ভার,
ফেলিয়া আসে দ্রুত আঁখির পলকে।
যৌবনােদয় সারা দেহটী ব্যাপিয়া,
কঁচের মালা গলে,
উচ বুকে দোলে,
নিটোল দেহ উঠে বিবশে কঁপিয়া।
হলুদে রাঙা বাস ঘেরিয়া অঙ্গে,
নিপুণ ছাঁদে বাঁধা,
বক্ষ ঢাকি আধা,
গমন চঞ্চল অরূপ রঙ্গে।
স্থল-কমল
‘পরশ ভাবি কা’র, চলিতে থমকি,
আপন বাস গায়ে
লাগিলে মৃদু বায়ে,
পিছনে চায় ফিরে সহসা চমকি।
মহুয়া নেশা জাগে আয়ত নয়ানে,
পাণের রসে রাঙা
অধরে ভাঙা ভাঙা
বিকাশে মৃদু হাসি ফুল্ল-বয়ানে।
বিলাসপুরি কুলি শ্যামলী কন্যা,
কয়লা বহে যদি
কাটিবে নিরবধি,
বিফল যৌবন গরব ধন্যা !
চপল দিঠি মিছে কাজল আঁখিতে,
যদি না আঁখি বাণে
কঁাপন কভু আনে,
তরুণ কোন প্রাণে শায়ক হানিতে।
‘হপ্তাবারে’ যায় সকলে বাজারে,
সখীরা খুঁজে ফিরে
আপন বঁধূটীরে,
বাসনা তারাে জাগে হৃদয় মাঝারে।
৪০
স্থল-কমল
পাহাড় সম বাধা সমুখে তাহারি,
যে জনা ভালবেসে
পালাল অবশেষে,
মালাটী গলে দোলে, দেওয়া যে তাহারি
নিগুঢ় বন্ধন রয়েছে ঘিরিয়া
মনের চারিধারে,
কেমনে বল তারে
সহসা অবহেলে ফেলিবে ছিড়িয়া ?
কেমন করে “ভাব” অপর জন সাথে,
বিদেশী বঁধুয়ায়
যদি না দেখা পায়,
যদি না ফিরে দেয় মালাটী তার হাতে ?
৪১
স্মৃতির দাগ
প্রবাসে কতদিন সহিয়া কত ক্লেশ,
ফিরিয়া এনু যবে আপন গৃহদেশ,
গ্রামের বাঁকা পথে, সাঁজের দীপ হাতে,
শুধাল শুধু হেসে “ছিলে তত ভাল বেশ” ?
সেদিনও সাঁজে পুনঃ গ্রামেরে পিছু রাখি,
প্রবাসে ফিরি যবে চমকি চাহি দেখি,
কলস ছিল কঁাকে, সলাজ জোড়া আঁখে,
সজল ভাষে মােরে বিদায় দিল ডাকি।
কভু সে বাঁকা পথে ফিরেছে যদি আর,
এখনাে মনে হয় দেখা কি পাব তার ?
শিবের ভাঙ্গা মঠে, নদীর বাঁধা ঘাটে,
“অভাগী বেঁচে নাই” কে বলে বার বার ?
আলােক উজ্জ্বল তাহারি রাঙা মুখ,
কি রঙে রেঙে গেল আমার এ সার৷ বুক ?
সলাজ জোড়া দুটী
কাজল আঁখি-জল
বুকে যে জ্বেলে গেল দারুণ দাবানল।
এখনাে ক্ষণে ক্ষণে পিছনে চেয়ে দেখি,
কুশল কিছু মাের, শুধাবে কেহ না কি ?
ওই যে দীপ হাতে,
ওই যে চলে যায়,
দেখিনু এই যেন, আর না দেখি তায় !
8२
জাপানী আয়নাখানি।
অনাদরে আজ
রয়েছে পড়িয়া
জাপানী আয়নাখানি,
অতীতের ভা’র
গৌরবে ভরা
বহু কথা আমি জানি।
পীত সাগরের
পার হ'তে এসে
বাঙলা দেশের ঘরে,
সমাদরে বড়
পেয়েছিল ঠাই
শ্যামলী বালার করে।
জন্মতিথীর
বিবরণ কিছু
পিঠে ছিল তার লেখা,
ঢাকা পড়িয়াছে
যায় নাকো ভাল দেখা
ধূলা ও বালিতে
কাঠের ফেরে
শিথিল হয়েছে
ধূলায় ভরেছে বুক,
আর নাই তার
সেই আগেকার
রূপের গুমাের টুক।
৪৩
স্থল-কমল ( ২ ) আজ কত কথা, প্রাণে দেয় ব্যথা, হেরিয়া আয়নাটিরে, বুকের তাহার জমাট আঁধার ধুতে চাই আঁখিনীরে । বাহুতে জড়ায়ে কাচখানি তার ধরিয়া রাখিতে চাই, রেখা তার বুকে হেরি যেন আবছায় ! প্রিয়ার মুখের বুক ফেটে গেছে মুখ ফোটে নাই, বলিতে পারেনি যাহা বক্ষে তাহার নীরব ভাষার লিপি লেখে গেছে প্রিয়া, শত স্মৃতি রাঙা একখানি ভাঙা পুরাতন আয়নায়, মাের প্রেয়সীর শুভ-দৃষ্টির আঁখির ঠিকানা পাই। ( ৩ ) শুভ বিবাহের অধিবাসে প্রিয়া, প্রথম পেয়েছে যাহা, নিরজন বাসে অনাদরে আজ পডিয়া রয়েছে তাহা। ৪৪ স্থল-কমল সমুখে পাতিয়া বাঁধিত অলক সিথিতে সিদূর দেছে, যতনে কপালে আঁটিত টিপটি কঁচপােক বেছে বেছে। খোপাটি সাজাতে টগর মালাতে হােত নাকো ভুলচুক ; পান রসে রাঙা হাসি ভাঙা ভাঙা, হেরিয়াছে নিজ মুখ। পিছল্ আঙুলে আমলার তেলে বুক ভরা তার দাগে, আজো যে প্রিয়ার কেশ রচনার অবসর মনে জাগে। সরসীর জলে পেয়ে কমলে মৃণালের ছায়া হেরি, মম আঁখি অলি কঁদিছে ব্যাকুলি, শেষ স্মৃতি তার ঘেরি। যৌবন যার পড়েছিল বাঁধা নিরম তার বুকে, সে যে আজ নাই তাই কি ব্যথায় ম্লান হয়ে গেছে দুখে ? ৪৫
পতি
১
৩ ।
রূপের পসরা বহিয়া মাথায়
গৃহের বাহিরে এসেছি কবে ?
দরদী বন্ধু শুধালে যখন,
তখন তােমারে বলিতে হবে।
অতীত দিনের কাহিনী যতেক,
একটী নিশার অতিথি মাের,
শুনিতে তােমার হবে অবসর ?
পােহাবে রজনী, হবে যে তাের।
যে আশায় তুমি এসেছ হেথায়,
লালসায় ভরা চিত্ত নিয়ে,
মম-যৌবন-মধু আহরণে,
ফিরে যাবে কেন গরল পিয়ে ?
বােতলের লাল সিরাজীর রঙে
রঙিন ভোেমার প্রমােদ নিশা,
আমার বিষাদ সিন্ধুর নীরে,
হয়তাে ব্যথায় হারাবে দিশা।
রূপের পণ্য রেখেছি সাজায়ে
মম যৌবন বিপণি ভরি,
যদি কুতূহলে মাের উপকুলে
অজানা বন্ধু ভিড়ালে তরী,
৪৬
স্থল-কমল
রূপের বণিক অভিসারে এসে
নিরাশায় কেন ফিরিয়া যাবে ?
হয়তাে অদ্য রজনীর ক্ষতি
স্মরিয়া প্রভাতে লজ্জা পাবে !
শুনিবে তবুও ? তবে শােন বলি,
আমার কাহিনী তােমার পা
নিয়তি হয়তাে নিরালায় আজো
মাের পানে চেয়ে নীরবে হাসে।
পল্লীর বালা, পল্লীর বুকে,
শান্ত নিবিড় সুখের গেহে,
আমিও ছিলাম আর সবাকার
মতন মায়ের আদুরী মেয়ে ;
ভােরের বেলাতে কুসুম কুড়া'তে
আলােকে আঁধারে চলিতে ছুটে,
যদি কোন দিন কেঁদেছি ব্যথায়
পথের কাটাটি চরণে ফুটে,
আদরে বক্ষে তুলে নিত পিতা,
ভাই এনে দিত ফুলের রাশি,
চঁদের জ্যোছনা স্নান করে দিত,
বলিত সকলে আমারাে হাসি।
89
স্থল-কমল
করেছি কতই কুমারীর ব্রত,
শিবের চরণে দিয়েছি ফুল,
আজ মনে হয়, হয়তাে তাহার
সকল মন্ত্র বলেছি ভুল !
আমারাে সিথীতে সতীর সিদূর
নবারুণ রাগে শেভিত ভালাে,
স্বামী কল্যাণ কামনায় নিতি,
তুলসী মঞ্চে জ্বেলেছি আলাে।
দোষ নাই মাের সে কথা বলিলে,
বিশ্বাস কেন করিবে তা ;
ব্যাধের শায়কে বিদ্ধাহরিণী
বিপথে কেন সে বাড়ালে পা ?
কিন্তু বন্ধু, তুমিও পুরুষ,
পুরুষের হ'য়ে বলিতে পারাে,
আমারে বিপথে আনিল যে জন,
দোষ কি কিছুই নাহিক তারাে ?
গরীবের ঘরে গরীবের বধু,
কেন সে ফেলিয়া স্বর্ণজাল,
বিপথে ভুলায়ে আনিল আমারে,
ভাঙ্গিল কপাল সৰ্বকাল ;
৪৮
স্থল-কমল
হয়তাে সে আজ সংসার মাঝে
সুখে করে বাস সবার সাথে,
আমি কেন পথে কঁদিয়া বেড়াই
রূপের পসরা বহিয়া মাথে ?
আমিও হয়েছি জননী, কিন্তু
বুকের মাণিক নীরবে লাজে,
জঞ্জাল সম ফেলিয়া দিয়াছি
নিশার আঁধারে পথের মাঝে ;
পীযূষ গালিয়া পয়নালা পথে
নিত্য দিয়াছি কত যে ফেলে,
এক ফোটা তার পেলে কচি মুখে,
হয়তাে চাহিত নয়ন মেলে।
৪
যুগে যুগে নারী পতিতা ত্যক্তা,
নর কভু হায় পতিত নয়,
নারীর সর্বনাশের সাধনে,
তাইত নরের জাগে না ভয়।
তাদের আসন রহে অবিচল,
সুখ নীড় ভেঙ্গে বেড়ায় যারা,
নারীরা চপল ছলনায় ভরা,
সমাজের ক্ষমা পায় না তারা।
নর এনে নারী ঘরের বাহিরে
সুখে ফিরে যায় আপন বাসে,
৪৯
৪
স্থল-কমল
পিছু ফিরে আর কভু কি তাকায়
স্রোতের তৃণটি কোথায় ভাসে?
দিনের ঘৃণিতা, রাতের বণিতা,
পঙ্ক তিলক ললাটে আজ,
পতিতা নারীরে হেরিয়া কখনন
পতিত নরেরা পায় কি লাজ ?
চঞ্চল কেন ? চলে
যাবে বঁধূ ?
দাড়াও খুলেদি বদ্ধ দ্বার,
বৃথা এলে আজি আমার কুঞ্জে,
ফিরে লহ তব মুদ্রা চার।
পরমতীর্থ
১
বিন্দুর মা’র আর কেহ নাই, দুখিনী বিধবা মেয়ে,
বিঘে দুই জমি, কোন মতে কাটে আধ পেটে দু’টো খেয়ে ;
অবসর-কালে পৈতা কাটিয়া, পেটে সহি ক্লেশ কত,
সারা জীবনের সঞ্চিত পূজি টাকা দেড় দুই শত !
২
ফাল্গুন মাসে ব্রজবাসী এক পাণ্ডা আসিল গাঁয়,
ভক্তি-প্রণত গ্রামবাসী সবে জুটিল তাহার ঠাই ;
তীর্থে এবার কে-কে যাবে দেখ, উঠিল যখন কথা,
সকলের আগু বিন্দু-জননী আসিয়া জুটিল তথা ।
শুভদিন দেখি মুড়ি-চাল বাঁধি জন কুড়ি এক সাথে,
গাড়ী ধরিবারে বাহির হইল শ্রীহরি স্মরিয়া প্রাতে;
গ্রাম-সীমানায় এসে দেখে তারা দীন কাসেমের কুঁড়ে,
দগ্ধ ছাইয়ের স্তুপ একরাশি—বেবাক গিয়াছে পুড়ে ।
৪
ছেড়া-কথা আহা তাও গেছে পুড়ে, কাঁসার দু'খানি থাল,
ঘড়া ঘটী যাহা ছিল সব হল পােড়া পিতলের তাল ;
ছেলেগুলাে কঁদে ক্ষুধার তাড়নে, কাসেম ভাবিছে বসে,
হায় ভগবান, শাস্তি এ দিলে কোন্ জনমের দোষে ?
হল-কমল
৫
মুখে নাই কথা, বুকভরা ব্যথা কাসেমের আঁখি ফুটি;
পরমানন্দ তীর্থ-গামীর চরণে পড়িল লুটি...
ডাকিতে সাহস হয়না পিছনে, এগুতে সাহস তার,
বুকে নাই বল, শুধু আঁখি জল, বুকভরা হাহাকার।
৬
থমকি দাঁড়ায়ে বিন্দুর মাতা জানিনা কি নিজ মনে
নিমেষের মাঝে ভাবিয়া লইল, অতঃপর সেই ক্ষণে,
অঞ্চল হ'তে খুলিয়া বাঁধন যাহা ছিল কিছু তার,
কাসেমের হাতে সব দিল দান, দেখিল না আরবার।
৭
পাণ্ডা কহিল, “ক্ষেপেছিস নাকি? তীর্থের নামে কড়ি,
যবনেরে দান, মরিবি এখুনি রক্ত যে বমি করি•••!”
নীরবে সহিয়া বিন্দুর মাতা সেথােদের উপহাস,
কহিল হাসিয়া, “ফিরিলাম আমি, তােরা যেতে হয় যা।”
৩
৮
গৃহ হীনে যদি গৃহ পায় বাবা, নারায়ণ সেথা বাঁধা,
সুদূর তীর্থে কাজ নাই গিয়ে, মিটিয়াছে সব ধাঁধা ;
কে যেন বলিল, কাসেমের কুঁড়ে পুরী, প্রয়াগের সম,
তীর্থের সেরা তীর্থ সে হবে পরম তীর্থ মম!”
বিষ্ণুপ্রিয়া
ভ্রমর-কৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশ মুণ্ডিত শিরে দীর্ঘ শিখা,
শুভ্র-ললাটে জুলিছে দীপ্ত কেশবভারতী-দত্ত টীকা
কঙ্করময় রাজ পথে পথে নৃত্যে চরণ কমল ক্ষত,
নিমাই ফিরেছে নদীয়ায় পুনঃ, নগরবাসীরা ছুটিছে যত !
বিরহ অনলে জ্বলিয়া কেটেছে কতনা দীর্ঘ দিবস রাতি,
বিষ্ণুপ্রিয়াও স্বামী দরশনে সবাকার সাথে হয়েছে সাথী ;
নিতাই আসিয়া কহিল কঁদিয়া নয়ন সলিলে ভাসায়ে বুক,
“নিঠুর গৌর করেছে আদেশ, হেরিবে না দেবী তােমার মুখ
।”
“প্রভুর আদেশ এই পথ হ'তে তুমি শুধু গৃহে ফিরিয়া যাও,
যে বেদনা দিনু অভিশাপ তা'র শির পেতে ল’ব জননী দাও।”
মন্থরগতি চলে গেলে সতী নীরবে শূন্য কুটীরে ফিরে,
লুটায়ে পড়িল স্বামীর ত্যক্ত পাদুকা দু'খানি ধরিয়া শিরে।
ত্রিজগৎ হ'তে পৃথক আমারে বর্জন যদি করিল স্বামী,
তবে কেন তা’র পূণ্যের পথে কণ্টকসম রহিব আমি ?
বল্ল আমি সব চেয়ে তা'র, তাই মােরে ত্যাগ করেছে আগে,
গৌরব সে যে আমারি সকলি, মিছে কেন প্রাণে বেদনা জাগে ?
ওগাে প্রিয়তম, সন্ন্যাসী তুমি, সংসার ত্যাগী বিরাগী আজ,
আমারে হেরিয়া সাধনা তােমার বিফল হলে যে আমারি লাজ ;
সাধনা আমার আরাে সুকঠিন, ফেলিবনা ভুলে নয়ন জল,
প্লাবনে তা’র হয়তাে তােমার ভেসে যাবে যত মনের বল।
স্থল-কমল
আপনার আছে অধিক বলিয়া, তাইতাে আমার অসীম ধন,
সবাকারে আমি বিলায়ে দিয়াছি তৃপ্ত করিতে জগৎ জন
চরণ ধূলার পরশে যাহার পাপী তাপী পায় হেলায় ত্রাণ,
আমি যে তাহারি শ্রীচরণরেণু ভাবিয়া নাচিছে পুলকে প্রাণ!
চাহিনা চোখের মিথ্যা মিলনে, জগৎ তােমারে হেরিবে যবে,
শতেক নয়নে আমারি কাতর করুণ মিনতি হেরিও তবে ;
অন্তর মাঝে পূর্ণ ভাবে যে তােমারে পেয়েছি হৃদয় স্বামী,
জীবনে মরণে ও দু'টি চরণে ধূলি সম হ'য়ে রহিব আমি !
৫৪
বৃদ্ধকবি
VICTOR PLARR 1
১
বৃদ্ধকবির মর্মব্যথায়
নয়নভরাজল,
শাঙন মাহের ভরাগাঙের
দুকূল ছল্ ছল
২
আরতাে রে হায় যায়না দেখা
লক্ষ যুগের চিহ্ন রেখা,
সবুজ শ্যামল পথটী বাঁকা
শিশির টলম !
নবীন কবির নিঠুর পরশ
তুলির ছোয়ানি,
ফেলে মুছে সকল তাহার
অতীত কাহিনী।
৪
চোক রাঙিয়ে বলে পাগল,
ফে ছিড়ে সব দুৰ্বাশ্যামল,
নূতন রকম বাঁধি পিছল
পাঁথর থনি।
৫৫
স্থল-কমল
৫
বৃদ্ধকবির কণ্ঠ নীরব,
অশ্রুভরা চোক,
ভাবে কেবল অতীত ভােলা
এই কী নবালােক ?
দেবপূজ
( কবির।
ভক্ত কহিল, “দেব, তােমার স্বর্ণ দেউল হবে,
হীরক খচিত মূর্তি বিশাল দিক উজলিয়া রবে।”
দেবতা কহিল, হাসিয়া, ভক্ত, এই কি তােমার ভক্তি
কেমনে সহিব সে পূজা তােমার ভক্তির ছলে শক্তি!”
ভক্ত কহিল, “দেবতা, তােমারে কেমনে পূজিব বল ?
দেবতা কহিল, “অনাথ আতুরে প্রেম সুধা শুধু ঢাল
শূদ্র
বেদের অর্থ বুঝিতে ব্যর্থ দ্বিজ যবে কাটে দিন,
তর্ক ন্যায়ের কূট জালে পড়ি ভেবে মিছে তনুক্ষীণ ;
মুক্তির পথে যুক্তির কথা মিলিল না খুঁজে তার,
পাহাড়ে পাথরে মাথা ঠুকে ফেরে রুদ্ধ সকলি দ্বার !
•
নীচ কুলজাত হীন অধম তুমি ? কোথা পেলে হেন যুক্তি,
‘শিব সব জীব’, তাহারি সেবায় মহা এ কারার মুক্তি ;
সারা এ-বিশ্ব তব মহারাজ, তুমি শুধু দাস তার,
নিয়েছ মায়ের কোটি
পুত্রের
জীবন মরণ ভার।
কত অপমান কত ধিক্কার, কত পদাঘাত বক্ষে,
মৌন হে মুনি সহেছ সকলি সজল আনত চক্ষে ;
লােভ দ্বেষ হীন মহাবীর তুমি, বিনয়ের অবতার,
ব্ৰহ্মপদের অংশ যে তুমি, তােমারে নমস্কার !
ব্রাহ্মণ কবি নতশিরে তাই তব পাশে মাগে ভিক্ষা,
বিনয়ের মহামন্ত্রে হে গুরু, দাও জগতেরে দীক্ষা !
৫৭
নারী
ভূতলে অতুল সৃষ্টি ধাতার ও তােমার সৃষ্টি নারী,
স্নিগ্ধ আঁচল ছায়ায় করেছ বিশ্বেরে সংসারী,
স্বর্গের দেবী মর্তের ঘরে তুমি যে জ্বালাও আলাে,
তােমার স্নেহ ও প্রীতির পরশ সকল হইতে ভালাে ।
তােমার মহিমা চির অজ্ঞাত, বিধাতার আজো ভুল
তােমারে বুঝিতে পারিল না কভু, তুমি যে কিসের মূল
বহুরূপে তব বহুরূপ দেখি, শান্ত করুণ মূর্তি ;
রক্তলিপ্ত অঙ্গে তােমার রণােন্মাদের ফুৰ্ত্তি ।
তুমি যে জননী, প্রেয়সী, ভগিনী, তুমি যে সচীব সখী,
ধন, সম্পদ, জীবন আমার, তােমারে ভরসা রাখি ।
সুখে দুখে তুমি সােহাগী দরদী, তােমার অশ্রুজল
বিপুলা ধরার বুকে বাজে তাও, দুলে উঠে টলমল !
পুত্রের লাগি হেসে দাও তুমি বুকের রক্ত চিরে,
অঞ্চল দিয়ে বেঁধেছ নয়ন অন্ধ বঁধূর তরে।
দুর্গম বনে কান্তের সনে সহেছ কতই দুখ,
রাজনন্দিনী ভিখারী স্বামীরে লভিয়া বরেছ সুখ !
জীবন হইতে শ্রেষ্ঠ তােমার সতীর গরিমাখানি,
অপমানে তার স্বামীরেও তুমি দেখাও খড়গপাণি ।
শান্ত স্নিগ্ধ নয়নে তােমার আগ্নেয়গিরি জ্বলে,
মহাদেবী তুমি, দৈত্যদানব পিষিত চরণ তলে!
স্থল-কমল
তুমি শুধু নারী ? শক্তিরূপিনী দুৰ্বলে দাও বল,
অমৃত যাও বরষিয়া তুমি পরশিয়া অঞ্চল ।
স্নেহময়ী তুমি অন্নপূর্ণা, তােমার প্রসাদ পুণ্য,
বসুধা মিটায় ক্ষুধা আপনার সকল অভাব দৈন্য ।
মা’র মন্দিরে বাজেনি এখনাে শঙ্খনাদের রব,
জাগেনি বসুধা রহিয়াছে তায় ঘুমায়ে এখনাে সব,
আসিবে সেদিন জাগিয়া উঠিবে শক্তিরূপিনী নারী,
কুসুম কোমল চরণে পিষিয়া মরিবে অত্যাচারী ।
:-
কবিগুরু
কবির গুরু, কবির গুরু, তােমায় করি নমস্কার,
পূত পদের পূণ্য ধূলি, তাইত দীনের পুরস্কার !
ভক্ত যখন রিক্ত হাতে তােমার দ্বারে দাড়িয়ে,
সুবাস ভরা “গীতাঞ্জলি দিলে দু'হাত ভরিয়ে !
তােতাপাখীর মতই তাহা কণ্ঠে কেবল গুঞ্জরে,
তাহাই দিয়ে ধ্যান করেছি মানস ধাতার অন্তরে,
বাঙলা মায়ের মনের মানিক, বুক জুড়ানাে ধন,
কাজল আঁখির অশ্রু আঁকা সােনার “বিসর্জন!”
“গােরা” তােমার ঘরে ঘরে লক্ষ গােরা কৰ্বে না ?
“চোখের বালি' কুড়কুড়িয়ে হিংসুকেরা মৰ্ব্বে না ?
বাঙলা মায়ের অনেক ছেলে, এইতাে কথা সত্যি গাে,
সবাই দেখায় আপন আপন প্রাণের যেমন ভক্তি গাে।
কে শুনেছে “মুক্তধারা মায়ের এমন মিষ্টি বুলি
সােনা বলে মাতৃপদের মাথায় তুলে পূণ্য ধূলি
দেশ-বিদেশে করলে প্রচার মায়ের গানের রাগরাগিনী,
স্তব্ধ হয়ে শুয়ে বসে পাতাল দেশের নাগ-নাগিনী ।
চীন জাপানে মগের দেশে এইতাে মােটে দিন কত,
বিলিয়ে এলে মায়ের মুখের পারিজাতের বাস যত!
বিধির সৃষ্টি ন্যায় বিধান, অবাক্ এ যে করলে জয়,
পাঁচটা ঋতুই উল্টে গিয়ে ফাগুন নিয়ে বক্ষয় !
স্থল-কমল
তােমার বনের করবী ফুল স্বর্ণ চাপায় চোখ ঠারে,
“ঘরে বাইরে” বাজছে কি সুর “বৈলিকের” “একতারে ?”
তােমার গানে গাইছে কোয়েল হর্ষে কানন প্রান্তরে,
শুষ্ক ডালে ফুলের ডালি তােমার গানের মন্তরে !
ওগাে গুণিন, কে তুমি গাে, কোথায় তােমার ঘর,
স্বর্গ হতে দেখতে এলে মর্ত্য কেমনতর?
তােমার পূত পায়ের ছোঁয়ার মর্ত্যও যে স্বর্গ গাে,
বিমল গানের নিঝর ধারায় অলক নদী বইছে গাে !
৬১
অযাচিত দান
বৃদ্ধ জাল ফেলে নদীর জলে,
মেয়েটি তীরে বসে তরুর তলে ;
বিশ্ব সংসার
শূন্য সব তার,
সকলে একে একে গিয়াছে চলি,
বৃদ্ধ বেঁচে শুধু মরণে ছলি ।
কি যেন মনে করে করুণা ঢালি,
রেখেছে ভগবান কুটীরে জ্বালি
বংশে আলােক্ষীণ,
বয়স মােটে তিন
ক্ষুদ্র নাতনীটি, শ্যামল বর্ণা,
বুড়াের মরু বুকে মধুর ঝরণা
ছায়ার সম সাথে সতত থাকে,
দেখে নাই পিতারে, জানেনা মাকে ;
বুক ভরা মমতা,
‘দাদু তা'রে দেয় তা,
মায়ের কোল দিয়ে, পিতার স্নেহে,
রাখিয়াছে বালিকার অঙ্গ ছেয়ে !
ভাদ্রের মাঝা মাঝি বাদল করি,
নদীতে এল বান দুকুল ভরি ;
স্থল-কমল
বালুচরে যাব আজ,
তাের গিয়ে নাই কাজ,
সদা বাদলে, ধানের ক্ষে
পড়ে যাবি, পারবি না তুই যে যেতে।
“বিলি ও কলিরে” দিচ্ছি বলে,
তাদের সাথে খে, যা জলে ;
হাটের পথ ঘুরি
আনিব রাঙা চুড়ি,
পরিয়ে তা দেব তাের কোমল করে,
সন্ধ্যা না হতে আমি ফিরিব ঘরে।
খেয়ার পরে খেয়া দেয় সে খালি,
মাছ নাই উঠে শুধু কাদা ও বালি ;
ঘরে ফিরে কেমনে,
যাবে চুড়ি না কিনে ?
সূৰ্য ঢলে পড়ে অস্তাচলে,
ও পারের কুটীরে সন্ধ্যা জ্বলে !
সহসা লাগে ভারী জালটি তা'রি,
মােটা মাছ ?
বৃদ্ধের হর্ষ ভারি ;
কৌশলে জাল তুলি,
দেখে সে আঁখি খুলি,
শ্যাওলা মাখা মুখে চোকেও গালে,
নাতনীর মৃতদেহ ধরেছে জালে !
৬৩
স্থল-কমল
আকাশের পানে বুড়াে নয়ন তুলে,
কহিল, হে ভগবান, কি দিলে ভুলে ?
সব আশা অবসান,
অযাচিত অবদান,
যাহা তুমি দিলে আজি আমারে স্মরি,
নিষ্ঠুর লহ ফিরে করুণা করি ।
-০.
নিবৃত্তি
[ ভক্তমাল ]
ক্ষীণ দীপশিখা গৃহ কোণে জ্বলে,
রামানন্দের পাদুকার তলে
নির্জনে বসি’, ভাসি’ আঁখি জলে
কবীর জপিছে নাম ।
সহসা শুনিল পশ্চাতে তার,
যেন কঙ্কণ মৃদু ধ্বনি কার,
খর নিশ্বাস বহে বারব' র
নাচা'য়ে অলক দাম।
নয়ন ফিরায়ে দেখে যদি চেয়ে,
পিছনে দাড়ায়ে সুন্দরী মেয়ে,
যৌবন সারা অঙ্গটি ছেয়ে
নাচিছে পুলক লাস্যে,
স্থল-কমল
উচ বক্ষে শােভে নীলবাস,
চপল্ চক্ষে জাগে পরিহাস,
অধরে মধুর হাসির বিকাশ
ফুল নিন্দিত আসে।
চিত্র পুতুলি যেন আঁকা পটে,
সুনীল সায়েরে শতদল ফোটে,
নীরবে দাড়ায়ে কথা নাই ঠোটে,
কমল নয়নে চাহি।
কবীর সুধা'ল, “কেগাে তুমি এলে,
অঙ্গনে মম অমৃত ঢেলে,
আঁধারে রূপের শত শিখা জ্বেলে,
জ্যোছনায় অবগাহি ?”
অধরে মধুর বঙ্কিম হেসে,
গদগদ মধু সুমধুর ভাষে,
কহে সুন্দরী সম্মুখে এসে
বীণানিন্দিত স্বরে,
“হে ঠাকুর তুমি আমারে জাননা,
আমি নগরের নাগরী প্রধান,
শত শেঠ মাের করে আরাধনা
আমারি প্রেমের তরে ;
৬৫
স্থল-কমল
মমিরকত, ভূষণ, বসন,
কাঞ্চন আনি দেয় অগনন,
যদি চাহি শুধু তুলিয়া বদন
ভালবাসিবার ছলে !
অভয় যদিগাে দাও তুমি তবে,
মনের বাসনা এ অধীনা কবে-
একটি রজনী শুধু হেথা রবে
তব শয্যার তলে।
দাও মােরে তব সহবাস দান,
বিনিময়ে তার মম মন প্রাণ,
রূপ-যৌবন সন্ত্রম-মান
ওই পদে দিব ডালি—
কবীর কহিল, যােগাসন ছাড়ি,
“ভুল করিয়াছ তুমি সুন্দরী,
সে বাসনা তব মিটা’তে কি পারি
আমি বৈরাগী খালি ।
ফিরিয়া চলেছ ? নিরাশিত মনে,
ছলছল দুটি সজল নয়নে।
রমনীমােহন আছে গৃহ কোণে,
তােমারে মিলা’ব আমি ।
রসিক নাগর সেথা পীতবাসে,
গলে বনমালা মৃদু মধু হাসে,
যাও নারী ওই নটবর পাশে
বঞ্চহ মধু যামি।”
সারাটি বরষ পূজি নটবর,
ফাগুনের এক সন্ধ্যার পর,
চঞ্চল তার সারা অন্তর,
কামনা জাগিল মনে,
পাষাণ ঠাকুরে পূজিবে না আর,
সঙ্গম সুখ প্রাণ চাহে তার,
আকুল বাসনা মনে বারবার
মিলিতে কবীর সনে।
=
পায়ের নূপুর রেখে দিল খুলি,
বদন ঢাকিল অঞ্চল তুলি,
ধীরে কবীরের গৃহদ্বার খুলি
দেখে বিস্ময়ে শেষে,
কোথায় কবীর ? সেততা নাই ঘরে,
“ভূবনমােহন” দিক আলাে করে
পাষাণ ঠাকুর শয্যার পরে
নবজলধর বেশে।
৩৭
স্থল-কমল
“কবীরে চেয়েছি মন প্রাণ ভরে,
তাই দেখা প্রভু দিলে তুমি মােরে,
ফিরিব না ঘরে, দিলে দয়া করে
অন্ধনয়ন খুলি,
কবীরে ঠাকুরে ভেদ কিছু নাই,
হে ঠাকুর ভাল বুঝালে আমায়,
এ দেহ আমার তােমার সেবায়
যদি লাগে লহ তুলি !”
যাচনা (সাদী)
তােমার ভূবনে,
দূরে এক কোণে,
রহিয়াছি দেব পড়িয়া,
লােকালয়ে তবু
যাবনা হে প্রভু
দুদিনের লাগি সরিয়া ।
সেথায় সকলি
ছলনা কেবলি,
ভালবাসাবাসি মিছে,
সুখের আশায়,
শুধু দুখ পায়,
তুমি সুখ দিও পিছে।
,
বাংলার চাষী
পায়ে পড়ি, খ জি, আজ ফিরে যাও, এই মাসে শেষ দিকে,
শােধ দেব দেনা বেচিয়া হালের পেয়ালা বলদটিকে,
দশ টাকা দিয়ে কুড়ি টাকা নেবে, সুদে ও আসলে ধরি,
গলা টিপে তবে মেরে দাও মিয়া, তিলে তিলে কেন মরি ?
বিরাট ওই বুকে নাই দয়া মায়া, মিঠে বুলি নাই ঠোটে,
কাবলী পাহাড়ে দেখনি সাহেব ঝরণার ধারা ছােটে।
বাপ পিতামহ জন্মে যেথায় বড় হ’ল হামা টানি,
কত পুরুষের চরণের ছাপে পুণ্য সে কুঁড়ে খানি;
ভূস্বামী তুমি বাকী খাজনায় নীলামে উঠালে তায় !
ছেলে মেয়ে নিয়ে কোথা কাটি কাল এই ভরা বরষায় ?
দীনের দয়াল গরীবের বাপ, পায়ে পড়ি রাজা তাের,
ধৰ্ম্ম দেবেন ধন, যশ, মান, কুঁড়েটুকু দাও মাের!
বােছি-মশায় বাঁচবার আর কোন আশা মাের নাই,
এই কালাজ্বরে মরেছে সে দিন ছিদামের ছােট ভাই।
ম্যালেরিয়া হ’ল পেট জোড়া পিলে, জোটেনা ওষুধ পথ্য,
ঘরে ঘরে জ্বরে একে একে মরে, কে লয় কাহার তথ্য ?
“ভিজিট” তােমার কোথা পাব বল? মরণের মুখে ফেলে,
সম্মান তব হ’ল না’ক ঠিক বলিয়া যেওনা চলে ।
বড় ছিল আশা হবে দুটো ধান, পাওনাও দেনা দিয়ে,
সুখে দুখে দিন কাটিবে দু'বেলা এক সন্ধ্যাও খেয়ে,
পুতবার মুখে হ’লনাক জল, পাকবার কালে রােদ,
যাহ’ল ফসল, বেচিয়া সকল রাজারই খাজনা শােধ।
ঢাকিতে লজ্জা জোটেনা কখনাে ছিন্ন বসন বই,
মরণ অভাবে বাংলার চাষা আমরাই বেঁচে রই।
প্রতিভাস
শার্দল পাড়ে নাম তার বটে পশ্চিমা ভােজপুরী,
বিশাল বিপুল আকৃতি হেন দশ গাঁয়ে নাই জুড়ি;
মুণ্ডিত শিরে বিরাট পাগড়ী, চোখ দু’টি সদা লাল,
লম্বা গোঁফের ফাকে হাসি কেহ দেখে নাই কোন কাল।
এক হাতে দেয় গোঁফে সদা চারা আর হাতে মােটা লাঠি,
নৌকার মত নাগরা চরণে, চলনে কঁপায় মাটি ;
মানুষে কুকুরে সমভাব তার বড় নিষ্ঠুর প্রাণ,
জমিদার বাড়ী দেউড়ীতে তার কৰ্ম্ম পাহারা দান !
সেই গ্রামে থাকে দুখিনী বিধবা আছে কাঠা চার ভূই,
রাজার খাজনা বৎসরে তার ধার্য্য মুদ্রা দুই
বৎসর তিন পড়ে আছে বাকী, পারে নাই শােধ দিতে,
কাছারীতে তাই তলব হয়েছে রাজার শাস্তি নিতে।
নায়েব কহিল, ‘সব টাকা তােরে মিটা’তে হইবে আজ,
বিধবা কহিল, “দয়া যদি কর, শুধিব করিয়া কাজ ;”
নায়েব করিল হীন ইঙ্গিত, সভাসদগণ হাসে,
বিধবা কঁদিয়া দিল অভিশাপ তাহার সর্বনাশে।
নায়েব হাঁকিল, “শার্দল পাড়ে, স্পর্ধিতা মেয়েটারে,
লাঠি পেটা করে মেরে ফেল, মাথা রেখনা উহার ঘাড়ে” ;
উঠাইল লাঠি, সহসা পাঁড়েজী নায়েবে মারিল ছুড়ে,
তৈল শিক্ত লাঠিখানি এল দুইখান হয়ে ঘুরে।
স্থল-কমল
দ্বিতল হইতে কহে রাজা বাবু, “একি কাজ তব পাড়ে ?”
পড়ে কহে “
ইহার খাজনা বাকী আছে লহ আমার বেতন আছে,”
বিধবারে কহে,“ভয় নাই মাগাে, আমি আছি তাের কাছে।”
দুর্বাসা সম বচনে যাহার সদা দুৰ্ব্বচ ভাষা,
অন্তরে তার সহসা কেমনে পাপিয়া বাঁধিল বাসা ?
মরুভূমি হ’ল সহসা সজল কিসের স্পর্শ পেয়ে,
নিঠুর বক্ষে “তুলসীর দোহা” আজি কে উঠিল গেয়ে ?
জাগাে বৃহন্নলা
নূপুর কঁাকণ দূরে পরিহরি, বৃহন্নলা হে ধনুক ধর,
দুঃসময়ের শেষ হ'ল আজি, আর কেন নাম গােপন কর?
শমীর শীর্ষ দেশ হ'তে তব শবের আকার আধার খুলি,
সঞ্জীবনীর মন্ত্রে জাগাও আবার তােমার অস্ত্র গুলি !
ঊর্বশী অভিশাপ তব প্রাণে আশীষ হইয়া উঠেছে ফুটি,
সত্যের আলাে দেখায়েছে পথ নিরাশার ঘন আঁধার টুটি,
বন্ধুর জয় যাত্রার পথে পিচ্ছলে আর কিসের ডর ?
নৃত্য কুশল চরণ চালিয়া হও তুমি আজি অগ্রসর।
সফল হয়েছে জীবন তােমার দ্বাদশ মাসের অভিজ্ঞানে,
ভয় কম্পিত বক্ষ, চক্ষে অবসাদে কভু ঘুম না জানে ;
কোথা রাজাসন ? ইন্দ্রপ্রস্থ ? ধন-সম্পদ-বিভব রাশি ?
পঞ্চভ্রাতা যে পরের ভৃত্য, ধৰ্ম্মপত্নী হয়েছে দাসী।
?
৭১
স্থল-কমল
পদে পদে যত লৌহ শিকল বেজেছে, জেগেছে মর্মাঘাতে,
নিয়ত যে শত হীন অপমানে রুদ্ধ ক্রোধের বহ্নিপাতে,
কীচকের হাতে লাঞ্ছিতা সতী সৌরিন্ধীর অশ্রুজলে,
তােমার যাত্রা পথের বাধার পাহাড় আজ যে গিয়াছে গ'লে।
রাজার কুমার ক্রীতদাস হয়ে বুঝেছ দাসের বেদনা কত,
আবার উচ্চে তােল শির তব অজ্ঞাতবাস হয়েছে গত ;
মর্মে মর্মে অনুভব করি হীন পরবাস যন্ত্রণা,
আজি শুভদিনে ভাই পাঁচজনে কর মুক্তির মন্ত্রণা।
দূরে উত্তর গাে-গৃহে আজি সমবেত কুরু অহঙ্কারে,
জ্ঞান-গরিষ্ঠ পিতামহ সবে নির্বাক, রাজ অত্যাচারে ;
নবজীবনের পুণ্য প্রভাতে তরুণ পরাণে তুলিয়া শির,
রমণী-সুলভ-স্বভাব ত্যজিয়া নববলে চল যুদ্ধে বীর !
বীণা ত্যজি “দেবদত্ত” শঙ্খ আবার উচ্চে ঘােষণা কর,
ফেলি’ অলক্ষ্যে কঁাচলি, বক্ষে আবার লৌহ বৰ্ম্ম পর :
নহ তুমি ক্লীব নর্তকী আজ, গাণ্ডীবধারী ধনঞ্জয়,
ধনু টঙ্কারে হুঙ্কারে কর যুদ্ধ ঘােষণা ভারতময় !
-ওঃ-
স্বাগত
বাংলা মায়ের রত্ন হারের হারানাে মধ্য মণি,
“স্বাগত সুভাষ ?” অযুত কণ্ঠে উঠিছে হর্ষ ধ্বনি ;
মায়ের আশীষ, ভগ্নীর স্নেহ, সখার আলিঙ্গন,
শতেক ভক্ত শিযয্যর লহ প্রণাম আকিঞ্চন!
E
৭২
।
স্থল-কমল
আলিপনা আঁকা আসা পথে পথে কাতর অশ্রুজলে,
চঞ্চল ছেলে ফিরে এল দীনজননীর অঞ্চলে ;
আজি শুভদিনে এ মিলন ক্ষণে উৎসব আঙিনায়,
কঁদে প্রাণ কত তাহাদের লাগি আর যারা আসে নাই।
দুৰ্বল দু’টি বাহুতে বহিয়া অযুত বাহুর বল,
সজল নয়ন ভরিয়া এনেছ হাজার আঁখির জল ;
রুগ্ন মলিন আননে জাগিছে শত ব্যথিতের ভাষা,
আঁধার পথের বর্তিকা তুমি এলে নিরাশার আশা।
কত যে মাণিক কোথায় হারা’ল চরণ তলায় পিষে,
হীরের টুকরাে কত হ’ল গুড় পথের ধূলায় মিশে ;
শুক্তির মাঝে মুক্তার মত,
কত যে হীরক হারায়ে গিয়াছে দুর্গম পথ পরে ।
পঙ্কিল বালুচরে,
হারা’ল যে ধন, কোথায় কখন ঝা-বাদল রাতে,
কাঙালের মত খুঁজে ফিরি তাই সজল দৃষ্টিপাতে ;
ছিন্ন সুতাটি রয়েছে পড়িয়া, হারানিধি এল ফিরে,
যতনে গাঁথিয়া রাখিব আবার মায়ের কণ্ঠ ঘিরে।
কত প্রিয়জন আঁখির আড়ালে রয়েছে কত যে দেশে,
তুমি শুধু প্রিয় সবাকার হয়ে সমুখে দাঁড়ালে এসে ;
তােমারে হেরিয়া কেঁদে ওঠে হিয়া ফিরিয়া পাওয়ার সুখে,
তবু বহু ঠাই ভরে দিলে হায় সর্বহারার দুখে।
গুল-কমল
স্বাগত কহি সে আগত দিনেরে, মা’র মন্দিরটিরে,
সকল পূজারী আসিয়া আবার যেদিন দাড়াবে ঘিরে ,
তােমার চলার পিছে পিছে যারা গিয়েছিল তব সাথে,
তব পিছে তারা আসিবে যেদিন নব নিৰ্ম্মল প্রাতে।
“অশান্ত”
প্রণমি তােমারে হে মাের পল্লী, হে মাের জন্মভূমি,
হয়তাে জননী অভাগা ছেলেরে ভুলিয়া গিয়াছ তুমি !
তাের কোল ছেড়ে দূর কারাগারে পাথরের ঘেরা কোণে,
বসিয়া আঁধারে তােরে বারে বারে পড়িছে আমার মনে।
দুষ্ট ছেলেরে ধরিয়া জঠরে পেয়েছ যে কত জ্বালা,
নিত্য নূতন সহেছ বক্ষে উপদ্রবের পালা।
আজ আমি নাই, যাব কি না যাব জানিনাক আর ফিরে,
শান্ত সুবােধ ছেলেগুলি মাতা, অঞ্চলে রাখ ঘিরে,
চির অশান্ত, চির অবাধ্য, চির বন্ধনহীন,
আমি জানি শুধু কেমনে জননী কারাগারে কাটি দিন ।
আষাঢ়ের সেই তুফানে নদীর বক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে,
সাঁতারিয়া পার হয়েছি দুধার, আনিয়াছি তীরে ধরে
সলিল মগ্ন ছছাট ডিঙ্গিখানি, জেলেদের কেটে জাল,
হাসি মুখে শুধু শুনেছি সবার কত ভৎসনা গাল।
যেখানে কখনাে কেহ উঠে নাই পাহাড়ের চূড়াপরে
অবহেলে আমি উঠেছি সেথায় কত কৌতুকভরে ;
৭৪
স্থল-কমল
চোকে নাই
ঘুম,
ঝরিছে বৃষ্টি গভীর নিশীথ রাতে,
পথে পথে আমি ছুটেছি পাগল মাতাল হাওয়ার সাথে ।
কত দিন বৃথা কেটেছে আমার শালবনে গান গেয়ে,
জননী তােমার মলিন কাতর অঙ্গের পানে চেয়ে।
ছাগ-শিশুটারে ছাড়িয়া দিয়াছি ফঁাক পেয়ে চুরি ক'রে,
বলির বদলে দিয়েছি দেবীরে ফুল অঞ্জলি ভরে ;
মন্দির দ্বার খুলিয়া দিয়াছি—“আয় ডােম, আয় হাড়ি,
কেহ নাই যার, জননী তাহার সবচেয়ে আপনারি !
মেথরের সেই ছােট ছেলেগুলি সব চেয়ে প্রিয় যারা,
আমার অভাবে নিশ্বাস ফেলে এখনাে কঁদে কি তারা ?
গ্রীষ্মের সেই দারুণ গরমে কলেরায় যদি মরে,
কেহ কি সেবার ভার নিয়ে আজো যায় যবনের ঘরে ?
আগুণ লাগিয়া যদি পােড়ে ঘর, গৃহহারা দুঃখীদীন,
চাদার খাতাটি হাতে নিয়ে কেহ ফেরে কিগাে নিশিদিন ?
সম্রম ভুলে মিশেছি সঙ্গে অতি নীচ হেয় যারা,
বিদ্রুপ কত করেছে নিত্য গাঁয়ের পাণ্ডা তারা;
এক সাথে মােরে দেয়নি বসিতে করেছিল পরিহার,
মানুষ নামের যােগ্য নহি যে, অতি নীচ ব্যবহার।
‘মানুষ হইতে ইচ্ছা আমার’ তাহারি গর্বভরে,
মাথায় চরকা বহিয়া ফিরেছি পল্লীর ঘরে ঘরে,
বিদেশী বস্ত্র কিনিতে নিষেধ” শােন গান্ধীর কথা,
জনে জনে আমি কয়েছি কাঁদিয়া চরণে লুটায়ে মাথা,
দিশালে
পুলিসের সাথে করেছি দারুণ গালাগালি মারামারি।
স্থল-কমল
কৃপণ “যদুর” ঘরে দিয়ে হানা ভূতের মুখােস প'রে,
চুরি করে ধন বিলায়ে দিয়েছি গরীবের ঘরে ঘরে ;
শান্ত সুবােধ ছেলেগুলি তাের হাসিয়া দেখেছে রঙ্গ,
জমিজমা যত বেচিয়া যেদিন গড়িনু স্বরাজ-যু ।
বিদ্রুপ কত করিল জননী তোর বড় ছেলেগুলি,
দেশের অভাগা জুটায়ে যে দিন দিনু আশ্রম খুলি,
পুলিসে যে দিন ধরে নিয়ে গেল, আজীবন কারাবাস,
আশ্রম হেরি হয়তাে তুমিও করিয়াছ পরিহাস।
আমারে তাড়ায়ে বেঁচেছ জননী, বেঁচেছে গাঁয়ের লােক,
আমার অভাবে হবে না সিক্ত জানি যে কাহারাে চোক ।
বামুন মেয়ের মাঠ
( কথা )
ধূলি কঙ্কর মরু প্রান্তর ধূ-ধূ করে মাঠ যােজন জুড়ে,
প্রখর তৃষায় জ্বলে যেন সদা তিলে তিলে গেছে অঙ্গ পুড়ে ;
বেতাল বাতাস বিরহীর মত সদাই উদাস শূন্য মনে,
হু-হু কেঁদে ফেরে হাহাকারে কুল বাবলার ঘন কাটাবনে।
বেতের নিবিড় আড়ালে বিরলে কে যেন ত্ৰস্তা বেড়ায় ছুটে
পদভরে তাই শুখনাে পাতায় মৰ্ম্মরধ্বনি সেথায় উঠে।
শাল্মলী শিরে শকুনি শিশুর বিকট বেসুর ক্রন্দনে,
বেউল বাঁশের কচি পাতাগুলি নড়ে উঠে ভয় কম্পনে ।
আকাশ ভরিয়া সেথা উড়ে সদা ঘূর্ণি বাতাসে লাল ধূলি,
মাথাঠুকে মরে কঠিন পাথরে কণ্টকারির ফুলগুলি ;
আঁকাবাঁকা পথ বহু পথিকের চরণ চিহ্ন বক্ষে ধ'রে,
বুক চেয়ে তার ছুটেছে দূরের শ্যামল পল্লী লক্ষ্য করে।
“বামুন মেয়ের মাঠ” কারে কয় আশে পাশে যত গাঁয়ের লােক,
মাঠের কাহিনী শুনিতে সজল স্নেহময়ী কত মায়ের চোক
শুনে সে কাহিনী নিশ্বাস ফেলে গাঁয়ের তরুণ যুবক জন,
অজানা অচেনা মুখ একখানা চঞ্চল করে সবার মন।
এখনাে আঁধারে কত যে পথিক চলিতে সে বাঁকা পথের মাঝে,
শােনে যেন কার মৃণাল বাহুর কঙ্কন ধ্বনি মধুর বাজে ;
দিবসে দুপুরে যায় না সে পথে কেহ কভু এই বিশ্বাসে,
মাঠের বাতাসে বিষ আছে মিশে বামুন মেয়ের নিশ্বাসে।
বেদনা ব্যথিত ব্যাকুল কণ্ঠে কে যেন কঁদিয়া কাতর স্বরে,
নিবিড় আঁধারে নীরব নিশীথে মরুপ্রান্তর মুখর করে,
একাকী সেথায় নিত্য নিশায়, গাঁয়ের পাগলা তরুণ কবি,
শুধু রয় ব'সে দেখিবার আশে যেন কা’র স্নান করুণ ছবি !
পাঁচশাে বছর, তারাে চেয়ে বেশী, অতীতের দূর অন্তরালে,
ইতিহাসে তার বিবরণ কিছু খুজিয়া না পায় তারিখ সালে ;
তর্ক তাহার ওঠে নাই কভু বিশ্বাসে চির সরল মনে,
শুধু মুখে মুখে পল্লীর লােকে বামুন মেয়ের কাহিনী শােনে।
ঘুর কত শুধু ব্রাহ্মণ বাড়ী ছিল নাকি ঐ মাঠের মাঝে,
কোন ঘরে তারি একটী কিশােরী এসেছিল কবে বধূর সাজে,
অপ্সরা হতে সুন্দরী, তা'র চোক দুটী ভাল সকল চেয়ে,
কঁচা সােনা যেন আগুনে গলিয়া ঝ'রে পড়ে সারা অঙ্গ বেয়ে।
৭৭
স্থল-কমল
ঢল ঢল কচি মুখ খানি যেন ফুল ব’লে হয় অলির ভুল,
পিঠ ভরা তা’র ভ্রমর-কৃষ্ণ-কুঞ্চিত-চারু চিকণ চুল।
ভিন্ন গ্রাম হতে কত মেয়ে এসে বলে গেল দেখে বধুর মুখ,
ভিখারীর ঘরে সাজে না এ মেয়ে, নিত্য যেথায় অভাব দুখ।
বিফল করিয়া তরুণ প্রাণের যত কিছু আশা কামনা ভােগ,
বছর গত না হইতে তাহার স্বামীর হইল শক্ত রােগ ;
আপনার কেহ ছিল না তাহার, স্বামীর কঠিন যক্ষাজ্বরে,
কাতর হ’ল সে বামুনের মেয়ে, ভয় করে বড় একেলা ঘরে।
স্বামীর শুষ্ক মুখপানে চেয়ে নীরবে সে হায় কিশােরী বধু,
দিন যায় কত উপবাসে তা’র, কত নিশি যায় জাগিয়া শুধু।
ওষুধ পথ্য জোটে না নিত্য, ক্ষীণ হ'ল দেহ শােনিত ক্ষয়ে,
প্রতিবাসী কেহ না লয় তথ্য সে মহা ছোঁয়াচে রােগের ভয়ে,
যমে ও মানুষে করে টানাটানি মাস ছয় সাত হইলে গত,
কহিল সকলে, বাঁচিবেনা স্বামী, বৃথা বউ তাের যত্ন শত ।
নিরাশায় সারা বক্ষ ভরিয়া ব্যথাতুরা ভুয়ে লুটায়ে পড়ে,
ছল ছল দুটী কাজল সজল আঁখি হতে শুধু অশ্রু ঝরে।
আষাঢ় মাসের সে এক গভীর নিবিড় ভীষণ অন্ধকারে,
শিহরিয়া বধূ উঠিল সভয়ে শুনি পদাঘাত বদ্ধদ্বারে।
সহসা গৃহের জীর্ণ দুয়ার খান খান খসে পড়িল ভূয়ে,
ভয় পেয়ে বধূ রহিল পড়িয়া স্বামীর চরণ অঙ্গ ছুয়ে।
টানিয়া তাহারে আনিল কাহারা, অঞ্চল দিল বদনে বাঁধি,
স্বামীরে শুধু সে দেখা’ল কাতর মৌন মিনতি নীরবে কাঁদি ;
চেতনা বিহীন দুৰ্বল স্বামী পড়িয়া রহিল তন্দ্রাঘােরে,
নির্দয় তারা ছুটিয়া চলিল স্কন্ধে তাহারে বহন করে
৭৮
স্থল-কমল
সকালে সকলে শুনিল যখন ঘর ছেড়ে গেছে কুলের বন্ধু,
ঘৃণাভরে সবে কহিল, বংশে এসেছিল কালি মাখা'তে শুধু।
ভিতরে ভিতরে এত ছিল তার, এত যে স্বামীর যত্ন সেবা,
সব মিছে তবে সব লুকোচুরি, মিথ্যা ছলনা জানিত কেবা ?
শঙ্কিত চিতে ফিরে এল বধূ দুই রাত তিন দিনের পর,
যদি দেখে গিয়ে ভেঙ্গেছে কপাল, বেঁচে নাই স্বামী শূন্য ঘর !
বদ্ধ দুয়ার খুলিতে সভয়ে শশানে প্রতিবাসী কহিছে কেহ,
অন্তিমে তব কলুষ স্পশে অশুচি ক’রনা স্বামীর দেহ।
ফিরে যাও নারী গিয়েছিলে যেথা, কেহ তাে তােমারে
আনেনি ডাকি,
শুনে যাও শুধু স্বামীর তােমার শেষ নিশ্বাস ফেলিতে বাকী।
বহু শিব পূজা হয়েছে এ গৃহে, স্বর্গ সমান এ-পূণ্য ভূমি,
প্রবেশে তােমার নাহি অধিকার, যবন স্পশে অসতী তুমি।
গ্রাম হ'তে তা'রে দূর করে দিল, স্বামীর ভিটাতে পায়নি ঠাই,
অভিশাপ নাকি বামুণের মেয়ে দিয়েছিল বলে সকলে তাই।
লাঞ্ছিতা সতী নয়ন অনলে পুড়ে হ’ল ছাই সকল গেহ,
সপ্তাহ মাঝে মহামারী রােগে বাঁচে নাই নাকি গাঁয়ের কেহ!
সেই হতে আজো তৃষিত তাহার আত্মা সে মরু মাঠের 'পরে
স্বামীরে খুঁজিয়া কাঁদিয়া বেড়ায়, গত পাঁচ শত বর্ষ ধরে ।
৭৯
শুভ-নববর্ষ দিনে
-
সুখ দুখ শত, স্মৃতি বিজড়িত, হর্য বিষাদে পাথেয় ভরি,
বৃদ্ধ বরষ বিদায় নিয়েছে অতীতের স্রোতে ভাসায়ে তরী ;
নবীন বরষ দুয়ারে দাঁড়ায়ে নবারুণ রাগে শুভ্রবাসে,
স্বাগত তাহারে কহি সমাদরে নব উল্লাসে মধুর ভাষে।
গত দিনে কত হাজার নয়ন সজল হয়েছে অশ্রুজলে,
কতনা কোমল পরাণ ভেঙ্গেছে ব্যথা বেদনার জগদ্দলে ;
হাসি মাখা মুখে বিষাদে ছায়া এঁকেছে আমার আঁধারকালে
দুর্গম পথে নিরব নিশিথে নিয়েছে কত আশার আলাে !
দুখ দেছে তবু তার মাঝে মাঝে বিজলী চমকে সুখের রেশ,
অতীত বরষে বিগত দিবসে যারা হেসে দিন কেটেছে বেশ,
তাহারা উজানে ভেসে যেতে চায় সম্মুখ পানে মুদিয়া আঁখি ;
দুঃখ সুখের মাঝখানে মােরা নবীন বরষে সাদরে ডাকি।
ভায়ের বক্ষে ভাই হানে অসি, ভয়ে ভয়ে জাগে হিংসা আজ,
নবীন বর্ষ তােমার স্পর্শে পায় যেন মনে তাহারা লাজ ।
তব আগমনে আজি শুভক্ষণে শত ভাই মােরা সবার সাথে,
ভেদাভেদ ভুলি একসাথে চলি নব বরষের উজল প্রাতে।
}
ক
* আদর বেঙ্গলি ক্লাবের সভায়, শুভ নববর্ষ দিনে { ১৩৪৫ সাল),
প্রযুক্ত নিবারণ চন্দ্র রায় মহাশয়ের গৃহে কবিতাটি পঠিত হয়।
৮০
কেরাণীকবি
১
ফাগুনে যখন ফুল ফোটে বনে,
পাপিয়ায় তােলে মধুর তান,
মধু বসন্তে বরণ করিতে
বসিনু লিখিতে কবিতা গান।
আশেপাশে মাের অলি ঝঙ্কারে,
ফুল ফোটে কত মনের বনে,
সহসা শুনিনু বীর ভাষা কার,
যেন ভীমসেন নেমেছে রণে ;
মুদির দোকান হতে লােক এসে,
“টাকা দাও” দ্বারে কহিছে রাগে,
মধুবসন্ত গুটি বসন্ত
সম আতঙ্ক পরাণে জাগে !
=
ভাবি বিচিত্র বিধান, বিধিহে,
বুঝিতে পারি না অর্থ সব,
ঘৃত মধু নিয়ে ব্যাপার যাদের,
তাদের কণ্ঠে বজুরব ?
*
৮১
শুল-কমল
২
নিদাঘে যখন তপ্ত তপন
সংসার করে পুড়ায়ে ছাই
ভাবি তখন রৌদ্ররসের
একটা পদ্য লেখাতে চাই ।
সহসা গােয়ালা, টাকা দাও’ বলে,
হাজারীবাগের রহেন্ ওলা,
রূক্ষ তাহার, রচনে অঙ্গে
যেন এসে লাগে তপ্ত গােলা।
Y
f
হিসাব করিয়া বলেছে রজক,
কল্য প্রভাতে আসিবে ফিরে,
টাকা না মিটালে মলিন বস্ত্র
পুনঃ নাহি কভু দিবে সে ফিরে।
ভারি বিচিত্র বিধান, বিধিহে,
টাকা বিনা হায় সকলি ফাকা,
নিত্য অর্থ চিন্তার চাপে
কল্পনা শত”পড়েছে ঢাকা ।
-
৮২
৮২
স্থল-কমল
আকাশের কোলে কালমেঘগুলি
দলেদলে আসে করিয়া ভিড়,
পরাণে জাগিল বাসনা লিখিতে
কবিতা যাহােক বর্ষাটির।
f
L
আকাশে বাদল, বাতাসে বাদল,
বাদল নেমেছে ঘরের ছাদে,
ছিদ্রের পথে ঘরে পড়ে জল,
বাসকরা দায় নির্বিবাদে।
বাক্স পেট্রা বিছানাপত্র,
সকলি ভিজায় বর্ষাধারা
কবিতার মাের খাতাটি কোথায়
রাখিব ভাবিয়া হয়েছি সারা।
T
ভাবি বিচিত্র বিধান, বিধিহে,
শান্তিকুঞ্জ দিলে না যা'রে,
কাব্যরসের মদির নেশায়
মত্ত করিলে কেন গাে তারে ?
মল
৪
শরতে যখন সুনীল আকাশে,
চাদ হেসে চায় তারার দলে,
গাছে গাছে ফুল অশােক বকুল,
ফোটে শতদল দিঘীর জলে ;
মাঠে মাঠে ধান, কৃষকের গান,
শারদলক্ষী এসেছে ঘরে,
ভাবিনু লিখিব কবিতা একটি
বঙ্গমায়েরে বরণ করে ।
সহসা শুনিনু কহিছে গৃহিণী,
বচনের তার বাঁধন খুলি,
“সময় থাকিতে হয় যেন সব
পূজার বাজার বস্ত্রগুলি।”
•
ভাবি বিচিত্র বিধান, বিধিহে,
কবি-যশ আশা দ্বীনের তবু,
রবিবাৰু হ'লে রেলের কেরাণী,
হয়ত হ'তত না কবি সে কভু ।
শেষ
৮০
।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.