Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Debendra-giti-mala Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দেবেন্দ্র-গীতি-নালা।
No text on this page.
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য
বিরচিত সঙ্গীত-সমৃহের সমবেত।
বইগ্রাম
“দেবেন্দ্র-গীতিমালা কুটীর” হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।
প্রথম সংস্করণ।
শুভ ১লা বৈশাখ [ ১৩৩৯ বাসন্তী-মহাষ্টমী
( সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
{ মূল্য ১ টাকা ]
শান্তিনিকেতন প্রেসে
রায় সাহেব শ্রীজগদানন্দ রায় কর্তৃক মুদ্রিত।
পাের শান্তিনিকেতন, বীরভূম
উৎসর্গ
[ তৎসৎ ]
বিচিত্র-বাণী-কাননে তুলি পুষ্প সযতনে
বিশ্ব-কণ্ঠ-বিলাস-কারণ—
গাঁথিয়া সারাটি বেলা
এ “দেবেন্দ্র-গীতিমালা
“বিভুপদে” করিনু অর্পণ।
বটগ্রাম
বিভুচরণাশ্রিত
এদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য।
শুভ ১লা বৈশাখ, ১৩৩৯ সাল।
No text on this page.
উপহার করকমলে আমার হৃদয়ের গভীর নিদর্শন- স্বরূপ এই ‘দেবেন্দ্র-গীতিমালা' পুস্তকখানি সাদরে সমর্পণ করিলাম। তাং
No text on this page.
সূচীপত্র পৃষ্ঠা ০০০ ১ ••• ••• এ ৪ ০ ১২৪ ••• ••• বিষয় অনন্ত মহিমা তর আঁখিতে মিলিতে আঁখি আজি এসেছি আজি এসেছি আজি প্ৰীতি-ফুলহারে সাজাব তােমারে আন্ জবা তুলে সচন্দন-ফুলে আপন ভাবিয়া রে আমরা কলির মেয়ে দিদি আমরি আমরি শােন্ সহচরি আমরি কি গুণ ধরে আমরি কি মধুর তানে আমার মন নিয়ে সই আমার মনের মানুষ পালিয়ে গেল আমি একলা এসেছি একা চলে যাব আমি গাইতে জানিতো গান আমি তারে ভালবেসেছি আমি নিত্য যদি পাঠা খেতে পাই গাে আমি বাবুর বাড়ীর চাকরাণী শুধু আছি প্রিয়ে আমি সারা বিকালটি বসে বসে ৩৮ प ••• ৫ । • ৯ ৮৫ :
৫ বিষয় ৮৭ ••• ••• ৪ ০ ২৮ আয় আয় আয় আয়রে নেমে আয় আয় প্রাণপ্রিয় পাখী তােরে শয়রে পাখী লেদুঝোলা আয় সবে মিলে মন প্রাণ খুলে আর কবে হায় অনিতে উনায় আর কিছু তোরে চাইনে শ্যামা আর কেন মূট শন আসবে বলে আশা দিয়ে আসি আসি বলে কোথা যাবে আসি ব'লে সারা নিশি আসিল না কাল বাসি হ’ল ২৮ অাসে যেন এখানে করায় আহ কিবা মানিয়েছে রে ৬৪ আহা দেখলে তারে কেমন করে উমা আমার এলে এবার ঊষার আলােকে পরম পুলকে এক বার তেমনি তেমন তেমনি একলা এই অবেলা একল, এ স বলতে একলা ঘরে রইতে নারি ০ ০ ০ এখনো সে এলন যে হয় এত অংশ ভালবাসা এত করে চাসনে ও পানে বিষয় এতদিন পরে আজি ••• ৮৪ ১০ ৫ ০ এবার তুমি জাবে শ্যামা এস এস এস সখা এস করুণা-সাগর গৌরহরি এসনা দেখবে, যদি এস হৃষিকেশ-মানস-মােহিনি ঐ গো ঐ গগ ঐ গাে কাল। ঐ বাজে গো বাঁশরী ও কে গো নদীয়াতে ৪ কে গো বঁশরী বাজায় ওগো একি হ’ল কাল ৪১ ••• a , ০ । • ... ওগাে কত সাধনায় ৩১ । ওগাে তােরা দেখবি যদি ওগো তােরা দেখে যা’ না ওগো সখি একি দেখি ওগাে সখি একি রূপ হেরি ওগে। সাধ করে কি পাগল ওরে আমার সখের প্রাণখানি ওহে পশুপতি শঙ্করী সম্প্রতি বই এল সই প্রাণের কাল। কত আশে আছি বসে ••• ১৩৪ * * * ৬১ ৭৮ ৪ । ২৭ কতবার এসে এসে কবে রে শারদ শশী • পৃষ্ঠা ••• ১২৮ . এ বিষয় কমল-আসনে কমল-ভূষণে করল-বদনা কালী কত্ত। গিন্নি দু'জনাতে কঁাদার্কাদি সাধাসাধি কাটে। পাঠ। রাধা পাঠ। কার তরে আর গাঁথুবি মালা কালী কলুষহরিণী কালী কালভয়নাশিনী ৪৬, ••• ১৪ কালাে ভালাে বলে কালােরূপে ••• ১১৫ কালো মেঘ নেমেছে কিনে নে রঙ্গীন ফুলন তেল কি সুরে বাজাও বাঁশী কি হবে দীনের গতি ১০০ কুহুম্বরে উহু মরি ••• কৃষ্ণ বলে রাধে তুমি কে এলরে কামিনী কে কামিনী সমরে ১৪. কে গো নবজলধর কে জানে না হরর কে তুমি কদমতলে কে তুমি দশভুজা কে তুমি জালে বাশী কেন তাঁর আশে আকুল D ।
/০ বিষয় পৃষ্ঠা কেন মন চায় তারে কেন মন দিলি তারে ০ ০ ৫৪ ১৮ 'কেন রাধে এত করেছ ••• ৪১ ৫০ ১৩২ ০ ০ ০ কে প্রসূতা কারে সুতা কে বলিবে হায় আছে সে কেমন করে ফিরাই তারে কেমনে ফিরাবি তারে কে যাবিগাে যমুনায় কোথায় লুকালে তুমি কোথারে প্রাণের উম। কোন্ গরবিনী আমার কোন প্রাণে উমা আজি খুজিয়া খুজিয়া যত খুব হয়েছে আবার কেন গহন কুঞ্জ মাঝে গাওরে সঘনে সবে গাও গান গাওয়া মাের হল গেঁথেছি যতনে কত গেয়ে ছিল কবে সে যে গােকুলে আকুলা তুমি গােঠে হ'তে এই তাের গােপনে তারে আপন ভেবে ৬১ ••• ৪ ... ১৪ ? ৪৫ ৫০০ ৭৪ ২৯ ঘরে আর মন সরে না le বিষয় পৃষ্ঠা চল চল চল সকল মিলে চলে দল বেঁধে আজ চনালো সকাল করে ৭১ চ'লে যাব আপন মনে ••• চাবনা তার পানে চেনা তার পানে ••• ••• ১০৮ ১৭ ৮. ••• bo ৪৬ ছাড়াছাড়ি করে রে প্রাণ ছি ছি ছি ভালবেসে ছি ছি মরণ নাইকো তাের ছিল একটা কালাে কুকুর ছুটেছে মনখানি জয় গােবিন্দ গােকুলানন্দ জয় জগত-বন্দন জয় পরমেশ্বর সর্বগুণাকর জয় বৃন্দাবন-বিপিনবিহারী জয় শিব শঙ্কর শম্ভু জানি না তারে আমি জেনেছি এবার তােমা বিন ডুম ডুম ডুম বাজিয়ে দিচ্ছি ডেকনা ডেকনা পাখী তাই লােকে আমায় তারা ভ্রাসিত তনয়ে ৬ ••• . * * ১৮ ••• ••• ৯ তারে বলােনা কালাে ৯৭ ০ পৃষ্ঠ। ••• ••• ৪৩ ক ১২১ ০৮ ••• ৭ ••• ১০৮ + c । ৪৫ ০০০ ৪৮- বিষয় তুই গো আমার পাগলিনী মা তুমি কোন্ বনের পাখী তুমি ভুলে গেছ তাই তুমি মম প্রাণসখা তুলে নাও প্রেমের ছবি তােমা বিনে কে আছে মা তােম বিনে বৃথা এ জীবন তােমারি আশে এ ভব তাের চিনির পানা মুখ খানিতে তাের নিসে আয় নিসে আয় ত্রিলােক-তারিণী তারা দাত যে পড়ে গেল শ্যামা দিদি লাে কে পুষেছে দু’চার ডাকে সাড়া দিবি দুরে থেকে লুকিয়ে শুধু দেখবি যদি গাে আমার দেখা দে মা দয়াময়ি ধন্যা তুমি অন্নপূর্ণা ধর ধর শ্যাম নধর অধরে নমাে নমাে নারায়ণ নমাে নমো নারায়ণি জননি নমো নমাে নারায়ণি মাতঃ নাচরে নাচ, নাচরে নাচু ••• ২১ ••• १२ ৪৪. ১১৭ ০ ০ ০ ৩৪. . ১২৭ ১৭ ৪ • : ২ ••• • • • • পৃষ্ঠা ১২৬ ০ ০ ০ ৪৭ ••• ••• ৭ . ৫৮ বিষয় নাচিয়ে নাচিয়ে বেণু বাজাইয়ে না দেখিলে থাকি, ভাল না বুঝে সে নটরাজে নিমেষের দেখা নিমেষে ঘুচাল’ পতিতপাবনি গঙ্গে পথপানে চেয়ে চেয়ে পরিণাম স্মরি অনুরাগ ধরি পাগলি মেয়ে শিখলি পুঞ্জে পুঞ্জে কুসুম-কুঞ্জে প্রণমি জনমভূমি জননী প্রণমি প্রথমপতি প্রণমি পদে সর্বশুভপ্রদে প্রাণ ভরি হরি হরি প্রাণের কালাচাঁদে ১১৪ ••• bre ০ ০ ২ প্রেম-বিভাের। গােরা ফিরে চাও ফিরে চাও ফুটেছে নানাজাতি ফুল ফেলা ফেলা ফেলারে বেটি ফলে বিশ্বের গুরু বরিষার মেঘগুলি, বলি বলি ক'রে মরমের কথা বলােনা বলােনা তারে বসিয়া বিজনে আপনার মনে ০ ০ ০ ।
পৃষ্ঠা ৭৩ ১৩৫ ০০০ ১৪ pu বিষয় বাঁশরীতে কে গো বাশী বাজায়ােনা আর বশী মজালে আমায় বাছিয়া বাছিয়া কুসুম বাজিয়ে বাঁশী কালশশী বাজিল শ্যামের বাঁশরী বাহিরে থেকে ডেকে ডেকে বিরহ যাতনা অতিশয় বিরহ যাতনা সখি বেলা গেল সন্ধ্যা হল বেলা হ’ল ভাই চলরে কানাই বােঝনি অধীরে অধিনী-কুটিরে ভজরে অবিরাম ৭১ ৯৪ ১২২ ।। ৫৮ # ০ ০ ৩৪ ভালবাসা কথার কথা নয় ভালবাসা জানিনে কেমন ভালবাসা ভালবাসা ০ ১১০ ভালবাসা ভালো কে বলে ভালবাসি বলে আসি। ভালবাসে তাই ত আসে ৫ । ১ ৪৪ ভালবেসে অবশেষে २२ ৪১ ভালবেসে একি ঝকমারি ভুলনা কথার ছলে ভুলিতে বলােনা সখি ৭৮ *) ১০৪ ॥y০ পৃষ্ঠা ••• ৩৪. ১৩২ ১২৫ ••• ৭২. ৮৭ ০ ০ ০ ১৩ ০ ০ ০ ১৯ ১৩ বিষয় ভুলি ভুলি করি তারে ভুলে কি গিয়েছ সে দিনের ভুলেছ কি ভালবাসা মধুর রজনী খেলে নিশামনি মন ফিরে দিয়ে চলে যায় মন রে মিছে ভবে এলি মনে মনে মন সপেছি মনের মত মানুষ পেলে মরমের কথা চিরদিন মম মরি কি অতুল শােভা মরি কে কামিনী মরালগামিনী মাইরী মাইরী মাইরী মালী মানভরে আমি তারে মায়ের ছেলে মা’য় না পেলে মায়ের মত মা হলে কি মিলন মাের জীবনের সাধ মিটে গেল রান্না-খাওয়া মৃদুল অনিলে মেতে মােহন বাঁশী বাজায়ে কালা যদি নিমিষের তরে যদি পরাণে না জাগে যমুনাতে যা তাের সব যাও গিরি ত্বরা করি ••• ৮১ ... ৪ ৩১ ০ ০ ০ ০ ০ ১২৮ ২১ ৫৭ . পৃষ্ঠা ৪১ ৯ ৫০ ১২৬ বিষয় যাবনা সাজের বেলা যেওনা যামিনী আজি যেওনা যেওনা যেওনা হে বঁধু যেচে প্রাণ দিনে তারে যে দিনে দীন-তারিণি যে যাতনা মনে মনে সই রাধা নামে সাধা বঁাশী ১৪ ১৩ঃ ১৮ • রাধে রাধে রাধে রাধা ৪২ শঙ্কর শশিশেখর ৬০ ২৭ ১৮ ১০৪ ••• ১১৮ ০ ০ শয়নে স্বপনে জাগরণে শিব অশিব-হারী শুধু চোখের দেখা দেখতে শ্বেতশতদল’পরে শ্মশানে কেন মা ঈশানমােহিনি শ্যামা গো আমার এই শ্যামের বাঁশি বেজেছে শ্রীচরণে দিও গাে আশ্রয় শ্রীনন্দগােপনন্দন শ্যাম সই সই সই সইলো মােদের সকলি দিয়েছ তুমি সখা দেখে যেন রেখে মনে সখি তারে ফিরায়েগাে আন্ সন্দেশ খেতে পারি যে আমি ৩৮ ৬৮ ৮৪ পৃষ্ঠা বিষয় সরে যাও হে ও কালাচঁাদ সারা নিশি জেগে থেকে • • • ৬৭. সুন্দর প্রাণে সুন্দর তানে ১৪ সূয্যি মামা ডুবু ডুবু সে কথা কেউতো জানে না ০ ০ ০ ৩৭. ০ সে কালরূপে কেন 2. ২২ সে কেন আমারে কঁাদায় সে দিনে এ দীনে শ্যামা ১৯. সে মন কেন এমন হল ••• ১৪. ০০০ । সে যে আমার মনের মতন সে যে এই আসি বলে গেল হরি বল হরি ব হরি বলে ডালিনা মন হরি হরি হরি বল মন হরি হরি হরি বলে হাসিতে হাসিতে এ মধুর হাতে ধরে বলে গেছে সে হের গাে রাণি তােমারি ৪ ০ ০ • । ৮ ong ১১৪
বিশেষ দ্রষ্টব্য
অনেক অনেক সুপ্রসিদ্ধ, গায়ক এবং স্বনামখ্যাত ব্যক্তি,
মৎ প্রতি স্নেহপ্রকাশ পূৰ্বক, স্বেচ্ছাক্রমে, আমার অনেক অনেক
গান প্রথম-রচনাতেই জনসাধারণে প্রচার করার পর, অনেক
গানের অনেক শব্দ পরিবর্তন করা হইল। সহৃদয় মহােদয়গণ,
আমার ত্রুটী মার্জনা করতঃ পুস্তক-দৃষ্টে গানগুলি সংশােধন
করিয়া লইবেন।
অপিচ, ছাপার কার্য সুচারুরূপে পরিদর্শন—আমার পক্ষে
বিশেষ অসুবিধাবশতঃ, পুস্তকখানি বিশুদ্ধভাবে ছাপা হইল না।
ইহার অনেক স্থলে দোষ লক্ষিত হইতে পারে। যদিও ইহার
নিমিত্ত শুদ্ধিপত্রের বিশেষ কিছু প্রয়ােজন হইত না, তখাপি,
কয়েকটী বিকৃত-শব্দজনিত একখানি শুদ্ধিপত্র পুস্তকের শেষে
প্রদত্ত হইল । আশা করি, সুধীগণ এতদ্বিষয়েও আমাকে ক্ষমা,
করিবেন।
বিনীত
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।
No text on this page.
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
গঙ্গাধরঃ শশিকলাতিলক-স্ত্রিনেত্রঃ,,
সর্পৈৰ্ব্বিভূষিততনুর্গজকৃত্তিবাসঃ,
ভাস্বত্রিশূলকর এষ নৃমুণ্ডধারী,
শুভ্রাম্বরে জয়তি ভৈরবরাগরাজ।
No text on this page.
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
সূচনা
রাগ-ভৈরব-ঝাঁপতাল।
অনন্ত মহিমা তব, তুলিয়া অনন্ত তান,
ধরিয়া অনন্ত যুগ গাহিছে অনন্ত প্রাণ।
তথাপি কণিক। সম, বণিতে লভেনি ক্ষম।
“তুমি,জ্ঞান-বাক্যাতীত বিশ্ব-স্রষ্টা ভগবান !”
অনন্ত জগদাধারে, বিচিত্র অনন্তাকারে,
তােমার প্রভাব যত রহিয়াছে বিদ্যমান ;-
সে সৌন্দৰ্য-সুধাধারা, করিয়াছে আত্মহারা,
“কি আমি গাহিব বিভো-তােমার মহিমা-গান !
২
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
ইমন-বেহাগ-ঝাঁপতাল ।
!
বন্দে বিশ্বের গুরু, দেব গজানন !
পূর্ণব্রহ্ম, পরমেশ, পাৰ্বতীনন্দন।
খৰ্ব্বস্কুলকলেবর, চতুভুজ, লম্বােদর,
সিন্দুরাভ-শােভাকর, ধরণী-রঞ্জন ।
তুমি অগতির গতি, ত্রিনয়ন, গণপতি,
তরুণ-অরুণ-জ্যোতি, পতিত-পাবন ;
পূজা-হোম-যােগ-যাগে, তােমার অর্চনা আগে,
সৰ্ব্ব-সিদ্ধিদাতা তুমি,-বিঘ্ন-বিনাশন ;
অকৃতি অধমজমে, হেরম্ব ! হের নয়নে,
রাতুল চরণে তব লয়েছি শরণ!
ইমন-আড়াঠেকা।
নমাে নমো নারায়ণি ! জননি! বাগ্নাদিনি!
অবিদ্যা-নাশিনি ! বাণি ! বেদ-বিদ্যা-প্রদায়িনি
শ্বেতাঙ্গী, শুভ্রবসনা, সৰ্ব্ব-রত্ন-বিভূষণা ;
শ্বেতপদ্ম-সমাসীনা, বীণা-পুস্তক-ধারিণী ।
ভৈরবী—একতালা।
মরি কে কামিনী, মরালগামিনী, মরম-কাননে ভ্রমে একাকিনী।
এ হেম-প্রতিমা, কার প্রিয়তমা, রূপে অনুপমা বিশ্ব-বিননাদিনী।
সাজি ফুলহারে মুখে মৃদু হাসে, যেন রাঙ্গা-মেঘে বিলী বিকাসে;
হেরি সে মাধুরী,-নবভাবরাশে, ফুটিল হরষে মানস-নলিনী ।।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
কেদারা-তেতালা।
জয় পরমেশ্বর, সৰ্বগুণাকর,
‘জ্ঞান’-রূপী হর, স্মরহর শঙ্কর !
জয় হে যােগীবর, শুভ্রকলেবর,
শশাঙ্কশেখর, দেব দিগম্বর।
জয় বৃষভাসন, বিভূতিভূষণ ;
কর সুশােভন ত্রিশূল ভীষণ ;
পাৰ্ব্বর্তী-রঞ্জন, ভব-ভয়-ভঞ্জন
দেহি মে শ্রীচরণ শিব ! শুভঙ্কর।
মিশ্র-পুরবী-কাওয়ালী ।
খুজিয়া খুজিয়া যত বন-উপবন
যতনে করিব কত কুসুম-চয়ন।
আশা-নিরাশায় খালি,
মন-প্রাণ দিয়ে ঢালি,
গাঁথিব সারাটি বেলা মালটি কেমন।
ধরিয়া নধর-করে সে সাধেরি ফুলহার,
সাদরে হরষ-লাজে দিব তারে উপহার
সে কি রে ধরিবে গলে ?
ভেসে যাব আঁখিজলে ।
ছাড়িব না ভাই বলে প্রাণের সাধন
৪
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
ভূপালী-আড়াঠেকা।
নমাে নমাে নারায়ণ !
( সৃষ্টি-স্থিত্য-কারণ!)-
নমস্তে কমলাকান্ত, কৃতাভয়বারণ ।
নমো নীলকলেবর, বিশ্বপিতা, পীতাম্বর ;
নমস্তে পরমেশ্বর, পরব্রহ্ম-সনাতন !
ত্রিলােক-পালক হরি, নমামি ত্রিগুণধারী,
কৃষ্ণ, কেশব, কংসারি, সুরেশ, স্মরমােন ;
জয় দেব দামােদর, দিতিত-দর্পহর,
দুস্তর ভব-সাগর—নিস্তার দীনতারণ ।
কাফিসিন্ধু-কাওয়াল।
গাওরে সঘনে সবে গাও!-গাও ! গাও!
সুললিত সঙ্গীতে জগত জাগাও !
সপ্ত সুর সঙ্গে আলাপি তিন গ্রাম,
ছয় রাগ, ছত্রিশ রাগিণী শুনি নাম,
গমক, মূচ্ছনা, তান, তাহাতে যােগা ও !
সা গা রে গা রে সা নি সা নি সা রে সা,
সা গা রে মা গা পা মা ধা পা নি ধা সা নি সা রে স্য,
মা পা পা পা নি নি ; না দে তাে দের তাদের দানি ;
বা কেটে তেরেকেটেতা গদিঘেনে,
ক্রাণ-ধা ধা কেটে দানি ;
সু-তরঙ্গে চতুরং রঙ্গ লাগাও!
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
হিণ্ডোল-একতালা।
প্রণমি শ্রীপদে, সৰ্ব্বশুভপ্রদে,
জগদম্বে, শিবে, বিপদনাশিনি ।
দে মা পদছায়া, ওগাে মহামায়া,
ইও মা সদয়া সৌভাগ্য-দায়িনি।
ওমা আদ্যাশক্তি, সংসার-প্রসূতি,
অকৃতি সন্তানে দাও মা সুমতি
তব শক্তি বিনে কি সাধ্য মা সতি,
সাধিতে স্ব-সাধ্য ;-সৰ্বার্থ-সাধিনী।
;
বারোয়া–দার।
ফুটেছে নানাজাতি ফুল।
জাতী, যূথী, শেফালিকে, মল্লিকে, বকুল,
চামেলি, চাপা, গােলাপ, জবা,
-শােভা কি অতুল ।।
ছড়ায়ে হাসি কুসুমরাশি এ ওর পানে চায়,
হাওয়ার তালে হেলে দুলে কতই কি পেলায়,
সােহাগে সৌরভ বিলায়,
সৌরভে প্রাণ-মন ভােলায় ;
মধু-লােভে গুন্ গুন্ রবে উড়ে আসে অলিকুল।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
সুরট-মল্লার-ঠুংরী।
জয় বৃন্দাবন-বিপিনবিহার,
ব্রজেন্দ্রনন্দন, বনমালাধারী !
কালীয়-দমন ব্ৰহ্মণ্য, বামন,
শ্রীরাধারমণ, মুনি-মন-চারী !
শ্যামসুন্দর, শ্রীধর, বংশীধর,
অনাথ-বান্ধব, মাধব, মুরহর,
রমেশ, রাঘব, কৈটভঘাতন,
বিরিঞ্চিবাঞ্ছিত, সত্য-সনাতন,
মানস-রঞ্জিনী মানিনী গােপিনী-
প্রাণেশ,-প্রেম-ভিখারী ;
এ অতি অভাজনে, কৃপাবলম্বনে,
বিতর পদ-বিপদহী।
;
শঙ্ক রাখে।।
ভালবাসা, ভালবাসা, ভালবাসা, ভালবাসা!
যে জেনেছে,-বুঝেছে সে, কি মধুর কাদা-হাস।
সে যদি না ভালবাসে, সে যদি না চায়,
সে যদিরে করে ঘৃণা, সে যদি কাদায় ;
চেয়েছ একান্ত যারে, ভালবাস তায়,
এবারে নয় ফিরেবারে পাব বলে রাখ আশা।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
কাফিসিন্ধু-কাওয়ালী।
তােমা বিনে কে আছে মা আর? ( ওমা তারা।)
তারিতে অকুল বারি ভব-পারাবার ।
দিনান্তে যেই জন তারা বলে তােরে ডাকে,
কি জীবনে কি মরণে তার কি মা ভয় থাকে ;
তুমি ব-ভয়-হরা, ভবানী, ভবের দারা,
নিখিল-মূলাধার, অখিলের সার।
কত দিনে এ দীনের সে দিন আসিবে হায়,
অবিরাম তারা-নাম জপিৰ মা রসনায় ;
দিনে দিনে দিন গত, নিকটে শমনাগত,
দেবেন্দ্র শরণাগত চরণে তােমার।
কমিক।
বিভাষ-একতালা।
আমি গাইতে জানিতে গান।
কেবল একটুখানি ঐ কি জানেন ?—বুঝিনা তাল-মান
বেশী,কি আর বলবাে আমি,
তান সেধেছি দামী দামী ;
তবে, গলার কায়দা শুনে অর্মি ঢাকতে হবে কান।
অতএব, বলি-সবিনয়ে
মাফ কৰ্বেন এ বিষয়ে ;
নয় তো বলুন যাই পালিয়ে ছাড়িয়ে এ স্থান ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
বাগে—আড়াঠেক।।
হরি হরি হরি বলে ডাকরে অবােধ মন ।
হরিনামে পরিণামে ঘুচিবে ভব-বন্ধন ॥
নিদান-বান্ধব হরি, হরি ভবান্ধি-কাণ্ডারী,
গতি-মুক্তি সে মুরারি, জেনে রেখাে সর্বক্ষণ।
এসে অনিত্য সংসারে, ভজ হরি সারাৎসারে ;
পাবি শান্তি চিরতরে, লভি শ্রীহরি-চরণ।
জংলা-দারা।
আমার মন নিয়ে সই হ’ল একি দায়।
কিছুতে সে রয়ন। বশে,
কে জানে কখন কি চায় ।
কভু ফুলের সনে হেলে দুলে
গেলে মলয়-বায়,
কভু নীলাম্বরে চাদের কিরণ
করে ধরতে চায়,
কভু আপ্নি হাসে, আপ্নি কঁাদে,
আপ্নি নাচে গায়,
"আকার, আপনহারা হয়ে যেন
কার ভাবেতে মিশে যায় ।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
থ
হাম্বির-মিশ্র—কাওয়ালী ।
সে কালরূপে কেন মন মজিল।
নয়ন ভুলিল, পরাণ দুলিল,
অমিয় প্রেম-গীতি মরমে জাগিল ।
সকাল বেলাতে, রাখাল-মাঝেতে,
হেরিনু বেণু করে ধেনু-সনে যেতে ;
কুসুম-নিরমিত, তনু সুললিত,
নিরখিতে চিত কুল পাসরিল ।
খাধাগ্য।
আঁখিতে মিলিতে আঁখি, প্রাণে প্রাণে বিনিময়,
কি মােহ-মদির-ঘোরে হয়ে গেছে সে সময় ।
সে নিমেষে কত কথা, নীরবে মরম-ব্যথা,
ক’য়েছি দুজনে তথা, সে যে কত সুখময় ।
বারোয়া-দারা।
আমি তারে ভালবেসেছি।
প্রতিদান পাব বলে আশা কি আর রেখেছি
কে জানে কি মােহের ঘােরে,
কি চোখে দেখেছি তারে,
মন প্রাণ তায় জন্মের তরে যত্ন করে সঁপেছি ।
১০.
দেবেন্দ্র-গীতিমালা ।
পিলু-পােন্তা।
একবার তেমনি তেমনি তেমনি করে নেচে আয় মা কালি,
ব্ৰজে যেমন নেচে ছিলি হয়ে বনমালী।
ললিতত্রিভঙ্গঠামে, রাইকিশােরী ল’য়ে বামে,
বাজায়ে শ্রীরাধা-নামে মােহন-মুরলী,
ললিতাদি-সখী-সঙ্গে, নেচে আয় প্রেম-তরঙ্গে,
হেরে আমরা মনােরঙ্গে দিই মা করতালী ।
সিন্ধু-মিশ্রখো।
এসনা দেখবে যদি ফুলের বুকে অলির খেলা।
কোথায় আর দেখতে পাবি এমন মধুর প্রেমের মেলা।
প্রাণে প্রাণে মিশে যে রে, চুমােচুমি সােহাগভরে ;
কি কথা ও গুন্গুন্ স্বরে, শােন্ কত সুধা-ঢালা।
এমনি করে হৃদয়-ধনে, হৃদে নে খেলি যতনে,
তবেই তো সুখের তুফানে ভাবি সারা জীনবেলা ।
খাম-ষং।
কেন মন চায় তারে কে জানে।
মােহন-মুরতি তরি বুঝি গাে মজালে প্রাণে
হেরিলে সে রূপরাশি,
প্রেমনিধি-নীরে ভাসি,
মনে করি দিবানিশি হৃদয়ে রাখি যতনে ।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
১১
ঝিঝিট-মি-দারা।
কালো মেঘ নেমেছে কদম্বতলে।
যাশনে লাে সজনি এখন ঘষুনার জলে।
ঐ মেঘে সই বর্ষে যদি জল,
এ কূল ও কূল দুকূল ডুবে যাবে রসাতল,
কেমন করে আসবি ফিরে বল,
ওলো, দেবি শেষে কুল হারায়ে ভাবি অকুলে।
কমিক।
আহা কিবা মানিয়েছে রে।
যেমন, পােলাও সঙ্গে ঝিঙ্গে-পােস্ত,-বড়ি তাতে গণ্ডাদশ ;
( অগ্নিমা হলে)
আবার, বাবার সঙ্গে 'দাবা খেলা, দাদার সঙ্গে রঙ্গরস।
( বাহবা রে বাহবা )
যেমন, বাঁশীর গানে ঢাকের বাদ্য, স্বামীর মুখে স্ত্রীয়ের যশ ;
(ভবে ধন্য হতে )
আবার, সাদা-গায়ে মরি মরি কাদা মেখে রঙ্গরস।
( বাহবা রে বাহবা )
যেমন, পাকা-চুলে বকা-সিতে-দিনে রেতে লাগার কস;
( শােভার বালাই যাইরে )
আবার, শ্যামের বামে কুজারাণী, হরিনামে রঙ্গরস।
( বাহবা রে বাহৰা )
১২
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
গােউর-সঙ্গীত।
( মাদল-বাদ্যে নাম-সঙ্কীৰ্ত্তন)
===
-
ও কে গাে নদীয়াতে জাহ্নবী-কূলে,
হরি বলে নাচে দুটি বাহু তুলে।
চন্দনে মণ্ডিত হেম-কলেবর,
কোটী চন্দ্র জিনি বদন সুন্দর ;
সুধাতে গঠিত নধর অধর,
চপল চমকে উঁচর-চুলে।
রসনাতে ভাষে “হরি হরি,
দু’নয়নে ঝরে প্রেম-বারি,
গলে বনমাল আহা মরি,-
বক্ষে করে খেলা হেলে দুলে ।
আপাদ-লম্বিত পট্টবাসে,
প্রভাত-প্রভাকর-কর বিকাসে
রূপের কিরণে ভুবন হাসে,
নিরখি মদন-মন ভুলে ।
রাঙ্গা চরণে কি বা সােনার নূপুর,
রুণু রুনু ঝু ঝুনু বাজে মধুর ;
ত্রিদিব-সম্পদ করি সুদূর,-
দেবেন্দ্র স্থান আগে ও পদ-মূলে,
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
১৩
ললিত--আদ্ধা।
কবেরে শারদ-শশী উদিবে নীল-গগনে।
শারদাশশী আমারি আসিবে গিরিভবনে ॥
আশ্বিনে সে কা-কালে, শুভ সপ্তমী-সকালে,
পাইব সুভাগা-ফলে প্রাণ-কন্যা উমাধনে
সেদিন কবে বা হবে, দুঃখরাশি দূরে যাবে,
গৌরীর
সুধাংশু-মুখে “মা” কথা শুনি শ্রবণে ;
কন্যারে লইয়া কোলে, ধন্য হব ধরাতলে,
ক্ষীরসর করে তুলে দিব সে চঁাদ-বদনে।
বিভাষ-মি-একতালা।
মরমের কথা, চিরদিন মম,
মরমেই গাথা রহিল।
বলি বলি বলি, হৃদয়ে কেবলি,
কি যেন তরাস বহিল।
অবশ প্রাণ যে ভেবে নেছে সার,
সে হবে আমার, আমি হব তার ;
জেনে শুনে এ যে করে ব্যবহার,
আমি ব'লে তাই সহিল ।
১৪
দেবেন্দ্র-গীতিমালা ।
কাফিসিন্ধু-মধ্যমান।
কে কামিনী সমরে শব’পরে শােভা করে,
ঘন ঘন হুহুঙ্কারে, দনুজ-কুল সংহারে।
মুক্তকেশী, করে আসি,
নবীনা বামা যােড়শী,
অট্টহাসি বিমল অধরে,
টলমল ধরাতল সুবিশাল-পদ-ভরে।
ভীমপলশ্রী–দারা।
যেচে প্রাণ দিনে তারে, আপ্নি ফাসি নিসনে গলে।
সেধে সেধে জন্ম যাবে, ভাবি কেবল নয়ন-জলে।
হ’সনে সই অপন-হারা, করে দেবে জান্তে মরা ;
যে তােরে দিবে না ধরা, ধরে শুধু রাখবে ছলে।
মিশ্র-ইমন-খেটা।
সে যে আমার মনের মতন, তাই ত তারে সঁপেছি মন।
সারাটি বিশ্বমাঝে-দেখতে যে আর পাইনি তেমন।
যে যা বলে বলুকু আমায়, লোকের কথায় কি আসে যায়,
ভেবেছি আমিরে তায় প্রাণের অধিক অমূল্যধন ।
যদি সে না ভালবাসে, না যদিরে কাছে আসে,
তারি ধ্যানে থাকূবব মিশে, যদ্দিন দেহে রবে জীবন।
দেবেন্দ্র-গতি-মালা।
ভৈরবী-দারা।
শ্যামের বাঁশি বেজেছে।
বাঁশরীতে ‘রাধা রাধা বলে ডেকেছে।
বাই যাই ত্বর করি, যেখানে সে বংশীধারী,
আর কি ঘরে রইতে পারি,প্রাণ টেনেছে,
বলে আসি-তােমার বাঁশী আমার সব হ’রেছে,
হৃদি, মন, প্রাণ, সব কেড়েছে।
মিশ্র--কাওয়ালী ।
হাসিতে হাসিতে, এ মধুর নিশিতে,
এসেছি প্রাণবঁধু তুষিতে তােমায় ।
যা কিছু আমার বলে, আছে এই ধরাতলে,
তােমারে বিয়ে দিতে এনেছি হেথায়।
এস সপা ধর মম হৃদয়-প্রাণ-গন,
যতনে তােমার করে করিতেছি বিতরণ ;
কি জীবনে কি মরণে, স্বপনে কি জাগরণে,
তব অনুগামী হয়ে রহিবে সহায়।
ধর বঁধু মধুময় যৌবন-ফুলহার,
দিতেছি তােমার গলে আজি প্রেম-উপহার ;
প্রেম-পিয়াসে যবে, পরাণে আকুল হবে,
বিতরি বিমল-সুধা নাশিবে তৃষায় ।
১৬। দেবেন্দ্র-গীতিমালা সাহানা—কাওয়ালী। প্রণমি জনমভূমি জননী আমার। পুণ্য প্রমােদিনী, নিখিলবন্দিনী, আর্য্য-প্রসবিনী, অবনীর সার। তেত্রিংশৎ-কোটি দেবতা ভক্তিধারে, নিত্য পূজিত যথা বিবিধ উপহারে ; ব্ৰহ্মমুখােদ্ভূত, বেদ-মন্ত্র যত, ব্যোম প্রকম্পিত করে অনিবার। ক্ষেত্র প্রপূরিত শস্য সুশ্যামল, ফল-ফুল-শােভিত তরু-লতা সকল ; অলিদল-গুঞ্জিত-শতদল-রঞ্জিত- বাপী অগণিত, সুধা-জলাধার। কুঞ্জে কুঞ্জে কিব। বিহঙ্গ কূজিত, পতিব্রতা-সতী প্রতি-গৃহ পূণিত ; হেম-মরকত-রত্ন-খনি কত, গর্ভে সুরক্ষিত উজল-আকার । নিয়ত প্রবাহিত পুষ্প-পরিমল, ত্রিদিব-নিবাসী-দেব-লীলাস্থল কাশী-নীলাচল-গঙ্গা-তীর্থ-ফল, লভে দুষ্কৃতি-কুল মুক্তি নির্ধার। অসংখ্য গিরি-নদী-বন-উপবন- সুরম-নগর বক্ষ শোভন ; তপন-তাক্বা-শশী, নীল-নভসে হাসি, তরে আলোরশি দিবস-নিশার।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
বিশ্বমাঝে মা তুমি পূর্ণশান্তিধাম,
‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’ তাই তব নাম ;
আকাঙ্ক্ষিত অতি, দেবেন্দ্ৰ দুৰ্ম্মতি,
স্থান যেন পায় চির চরণে তােমার।।
কমিক।
পাহাড়ী—দা।।
কে তুমি কদমতলে রসিকনাগর বংশীধারী
রংটি দেখে ঢংটি করে কোকিলেও কি দেয় টিটকারী ।
শ্ৰীঅঙ্গ ত্রিভঙ্গ-বাঁকা,
বিধির সৃষ্টি গড়ন পাকা,
গুণে নিয়ে লক্ষ টাকা কার সাধ্য এ সােজা করি।
চঁচির-চুল যে ফুলে ফুলে,
চৌদিকে পড়েছে ঝুলে,
খোপাখানি বেঁধে দিলে, খুলে যেত বাহার ভারি।
ময়ুর-পাখা কুড়ায়ে তার,
চূড়াটি করেছ মাথার ;
লেখা তাহে নামটী রাধার, সাধূ তাে তােমার বলিহারী
ঘূর্ণিপাক জলের মতন,
ঘুরছে দু’বাকানয়ন ;
তুমি একটী ‘দুলাভ-রতন’ ভঙ্গি দেখে বুঝতে পারি ।
,
১৮
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
সুরট-মিশ্র-একতালা।
জেনেছি এবার, তােম বিনে আর,
কেহ যে আমার নাই গো।
জীবনে মরণে, তােমার চরণে,
শরণ লইং তাই গাে ।
এ ভব-ভবন করিয়া ভ্রমণ,
পাইনি কাহারে মনের মতন;
তােমারে কেবল বলিতে আপন,
মনের মাঝারে পাই গো ।
যাদের লাগিয়া প্রমােদে জাগিয়া
সারাটি দিবস থাকি,
বিভাবরী হলে তারা যায় চলে
সলিলে ভাসায়ে আঁখি ;
সে-সময় রও তুমি তো কেবল,
মুছাতে আদরে নয়নের জল ;
নিখিয়ে তব মুখকমল,
শােক-তাপ ভুলে যাই গাে ।
হাম্বির-যৎ।
ষে যাতনা মনে মনে সই, বল কারে কই।
বিম বিরহ-শরে মরমেতে মরে রই ।
আপনা সপেছি যারে, ফিরে কি পাব তাহারে ;
ভুলেছে যে সে আমারে, আমি কেঁদে সারা হই ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
১৯
মূলতান-আড়াঠেকা।
সে দিনে এ দীনে শ্যামা ঠেলন মা পায়।
ভব-লীলা সাঙ্গ করি’ যে দিনে ত্যজিব কায় ।
যে-কালে কাল-কিঙ্করে, বাঁধিতে আসিবে করে,
সে-সময়ে অভাগারে রেখে গাে শমন-দায়।
ঘের্বে যবে মহাঘুমে, সে দিনে দেখো গো উমে,
অধম-তারিণী নামে, কলঙ্ক রটেনা তায় ;
দেখে মা থেকনা ভুলে, তুমি যেন নিয়ে কোলে,
যবে আত্মীয়-সকলে দিবে গো চির-বিদায়।
ভৈরবী-দাদা।
মনের মত মানুষ পেলে যেচে বিলাই প্রাণ,
যেচে বিলাই প্রাণ, যেচে বিলাই প্রাণ।
রই সদা তার যত্ন নিয়ে, ভাসিয়ে দিয়ে কুল-মান ।
মিলে যদি ব্যথার ব্যথী, করি তারে প্রাণের সাথী,
প্রাণে প্রাণে প্রেম-গানে মিশে থাকি দিবারাতি,
সেই চরণে হয়ে দাসী এ জীবন করি অবসান।
ভীমপল-কাওয়ালী ।
আসি বলে সারা নিশি জাগালে আমায়।
যদি আসিবে তবে কি ভাবে এত ভাবায়।
আসিছে আসিছে করি, পােহল ঐ বিভাবরী,
তবু দেখা নাহি তাৰি বলিহারী সে জানায়।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
মল্লার-কাওয়ালী ।
বরিষার মেঘগুলি, করি কত কোলাকুলি,
লুকাইল একে একে গগন-তলে।
নির্মল নভােমণ্ডল, শ্যামল ধরণীতল,
বিভূষিতা বসুন্ধরা বিটপী-দলে ।।
ক্রমশ শারদ-শশী, আকাশে প্রকাশে হাসি,
বিকশিত সরােজিনী সরসী-জলে ;
দেবেন্দ্র-প্রিয়-সম্পদ-পূজিতে অম্বিকাপদ ;
জাগিল মানব-প্রাণ নূতন-বলে ।
কানাড়া-মি-একতালা।
বােঝনি অধীরে, অধিনী-কুটারে,
পথ ভুলে সখা এসেছ।
এ নহে গো তার, প্রমােদ-আগার,
এবে যারে ভালবেসেছ।
দেখা হ’ল যদি, শুনি গো সেখানে,
চলিছে আলাপ কি নূতন তানে,
নয়নে বয়ানে, হৃদি-মন-প্রাণে,
দুটিতে কেমন মিশেছ।
শুনে সুখী আমি, বল প্রাণধন,
সে কেমন করে তােমারি যতন ;
বল প্রিয়তম, সেখানে এখন,
কত সুপস্রোতে ভেসেছ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
ভীমপলশ্রীখো।
যমুনাতে যা তােরা সব চাসনে লাে কেউ শ্যামের পানে।
দেখলে যে তার নয়ন দুটী, চমক লেগে যাবে প্রাণে।
চা-পান তার মুখের সাজে, মধুর হাসি সদাই রাজে;
মন ব’সবেনা কোনাে কাজে, সে অধরের সুধার টানে।
প্রকাশ করে বলি স’বি, আর কি তাের কুলে রবি,
মনে হলে সে প্রেম-ছবি, তান ছেড়ে দে মাতৃবি গানে।
কমিক।
সে মন কেন এমন হ’ল তােমারি ?—সুন্দরি !
কেন বিমনে রয়েছ বসি, বলনা প্রকাশ করি।
বল কে কি বলেছে, ও কে মন্দ করেছে,
কার বা এমন মাথার উপর মাথা হয়েছে,
আমি জান্তে যদি পারি তবে রানা বাকি তারি।
প্রিয়ে তােমা বিনে আর, বল কে আছে আমার,
দেখলে তােমার মলিন বদন হেরি সব আঁধার,
আমি তােমার কথায় ভাই বাপ মা’য় এখনি ছাড়তে পারি।
আজি বলনা কি চাই, আমি যেখানেতে পাই,
অবিলম্বে হাজির করে দিব তােমার ঠাই,
আমি তােমার তরে এ সংসারে হয়ে আছি সংসারী।
কিসে ভাঙবে তােমার মান, ওগাে বল তার বিধান,
এ ভাব তােমার দেখে আমার দেহে রয়ন প্রাণ
প্রিয়ে একবার হেসে কও না কথা, তােমার দুটী পায় ধরি ।
।
২২
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
ভৈরবীকাওয়ালী ।
হরি বল্ হরি বল্ হরি বল হরি বল।
সময় থাকিতে সবে পথের কর সম্বল।
নিদান-বান্ধব হরি, হরি দুর্বলের বল,
হরিনামৌষধে নাশে ভব-যন্ত্রণা প্রবল।
কিসে নিবারিবি বল, ভীষণ কাল-কবল,
হরিনাম-সুধা-পানে আপনে কর সবল।
দুস্তর ভব-জলধি তরাতে আছে কে বল্,
কলিতে তারকব্রহ্ম হরের্নামৈব কেবল।
বারোয়া-দাদরা ।
সে কেন আমারে কাদায় ।
কথায় কথায় ছুত করে বিরহ বাধায়।।
আমি তারে ভালবাসি,
তারি চির-অঙিলাষী ;
নির্দয়ে তাই নিতি নিতি এতই কি সাধায় ।
;
খাম্বাজ-যৎ।
ভালবেসে অবশেষে অশেষ যাতনা দিলে,
মন প্রাণ নিয়ে মােরে চিরতরে পাসরিলে।
তুমি যে নিঠুর এত, আগে বল কে জানিত,
হতে হ’ল প্রবঞ্চিত তােমার ছলনে ভুলে।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
পিলু-মি-দারা।
বেলা হ’ল ভাই, চলরে কানাই,
যাই গো-চারণে।
বিপিন-মাঝে, রাখাল-সাজে,
সাজাবাে তােরে অতি যতনে ।।
গাঁথি মালা কত বনফুলে,
পরাব রে তাের কালাে গলে ;
আয় ত্বরা করি বংশীধারী,
এখনো কেন মায়ের কোলে ;
শুনে তাের মােহন-মুরলী,
ধবলীর পাল যায়না বনে।
ভৈরবী-থেষ্ট।
আয়রে পাখী লেজবােল,
তােকে দেব দুধ-ছােলা,
শাবি দাবি কলকলাবি, খােক নিয়ে কবি খেলা।
রাখবাে তােরে বুকে বুকে,
চুম দোব তাের রাঙ্গামুখে,
থাকবি কত মনের সুখে, ভুলে যাবি সব জালা ।।
পরাব তােরে সােনার, রাশি,
দেখায়ে আনবে। গয়া-কাশি,
কিনে দোব মােহন-বাঁশী গান শুনাবি দু'বেলা ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
সাহানাদা'।
বাজিয়ে বাঁশী কালশশী মজিয়ে দিলে মন।
কেমন, মিষ্টি করে তানটি ধরে ঘটায় অঘটন।
দোপর-বেলায় বাজে বাঁশী, আমি তখন রান্তে বসি,
তরকারীতে নুন দিয়ে দি তিনটিবার তেমন।
খাবার সময় একি জ্বালা, বাজায় বাঁশী চিকণকালা,
মুখের গাটি হয় না গেল। ভুলে যাই এমন ॥
বিকেল-বেলায় থাকি কাজে, বাজলো বাঁশী বনের মাঝে,
সকল কাজটি রেখে আগে জল-আনা তখন।
এমনটি তাে ছিলাম না হায়, কালা যে কি করলে আমায়,
ভাবি আবার পর হয়ে যায় ঘরের সে রতন।
ভৈরবী-কাওয়ালী ।
সুন্দর প্রাণে, সুন্দর তানে,
সুন্দর গানখানি গেয়ে গেছে সে।
সুন্দর সাজে, সুন্দর লাজে,
সুন্দর আঁখি মেলে চেয়ে গেছে সে ।
সুন্দর বয়ানে, সুন্দর হাসি,
সুন্দর বলেছে “ভালবাসি”
;
সুন্দর শােভাতে, সুন্দর প্রভাতে,
সুন্দর ‘মর ছেয়ে গেছে সে।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা ।
ভীমপলশ্র—খেটা।
ফেলা ফেলা ফেলারে বেটি, হাথেকে তাের খাঁড়াখানা।
ও-খানাকে রাখলে হাতে, ছাড় যিনা তুই দিতে হানা।
গেছিস লাজের মাথা খেয়ে, বসন পর ওগাে মেয়ে,
আর কত কাল ন্যাংটা হয়ে নাচ বি শ্যামা ত্রিনয়না ।
সন্তানের রক্ত খেতে, বড্ড যে পড়েছিস মেতে,
মুণ্ডগুলাে গলায় নিতে কিছু ত তাের বুক টলেন।।
মর্দানিটা দিয়ে জুড়ে, হু-চেতন সব গেছে উড়ে,
পদতলে ভােলা পড়ে সেটাও বুঝি নাইকো জানা।
কমিক।
যদি পরাণে না জাগে নগদ কিছুর কথা,
শুধু হাতে বঁধু হেথা এসনা।
সৰ্বস্ব দিয়ে যদি দুঃখ পাও সখা,
পায়ে ধরি আর ভালবেন না।
একলাটি কাটাবাে সারাটি দিন আমি
হারমােনিয়মে গান গাহিয়ে,
সারা রজনী যাবে বিলাতী-সুধা-ঘােরে,
দুয়ারে সজোরে খিটি লাগিয়ে ;
যাহা চাহ সখা দিব ফিরায়ে, তবে
স্মৃতিটুকু ছাড়া কিছু চেও না।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
*
গােষ্ঠ-লীলা।
( মাদল-বাদ্যে আপরাহিক নগর-সঙ্কীৰ্ত্তন)
সূর্যি মামা ডুবু ডুবু চেয়ে দেখ ভাই,
এই বেলা ধেনু ল’য়ে চল ঘরে যাই।
খেলা ছেড়ে একবার ও ভাই কান্ত,
কা
বাজারে তেমনি তাের মােহন বেণু,
ঐ রব শুনে বনে যত ধে,
অমি, ‘হাম্বা রবে এসে মিলবে সবাই।
** ( আপন বৎস সঙ্গে) { কত রঙ্গে ভঙ্গে)
আগে আগে যাবে গোধনের পাল,
পিছে পাঁচনী হতে যাব সব রাখাল,
হৈ হৈ শব্দে উঠবে তরঙ্গ বিশাল,
আমরা, মাঝে লব প্রাণের কানাই বলাই।
( ওরা,সিঙ্গা বেণু বাজাবে ) ( “ভে। ভা ভা, রাধা রাধা” )
গােধূলি-ধূসর-কলেবরে,
নেচে নেচে আমরা যাব ঘরে ;
পথে আছে বড় আশা করে,
বিজ, দেবেন্দ্র দাড়ায়ে দেখবে রে তাই।
(কত মনের আনন্দে ) (হরির গােষ্ঠ-লীলা)
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
২৭
বেহাগ-আড়াঠেকা।
শিব ! অশিব-হারী ।
শুভ্র-সৌম্য-কলেবর, ত্রিশূল-ধারী।
ভস্ম ভূষা, দিশার,
বিষাণবাদনপর,
ঈশান, পরমেশ্বর, শ্মশান চারী।
সিন্ধু-মি-দাদরা।
কে তুমি বাজালে বাঁশী, ওগো রসের কালােসােনা।
তােমার বঁাশী শুনে বনে ছুটে আসতে পথ পাই না।
বশী নয় ওটা কেবল, যুবতী-ধরা-কৌশল,
পেতেছ এ ভালো ছল মজাতে গো ব্রজাঙ্গনা
হাম্বির-মি-টিমেতেতালা।
কত আশে আছি বসে তুমি-সে আসিবে বলে।
এসেছ গো—দুটো কথা না শুনে যেওনা চলে।
যতনে তােমারে রাখি’ হৃদয়-কমলাসনে,
প্রীতি-পুষ্প-উপহারে পূজিতে বাসনা মনে ;
এত আশা প্রাণসখা যাবে কি চরণে দলে? •
২৮
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
ভীমপলশ্র“একতালা।
আর কবে হয়, আনিতে উমায়,
যাবে গিরি শিব-সদনে।
বিচলিত মতি, হ'য়েছি সম্প্রতি,
সতীরে না হেরি’ নয়নে।
কবে সে বিজয়াদশমী-বাসরে, .
সপেছ কুমারী মহেশের করে ;
না জানি সে উমা, প্রাণের প্রতিমা,
আছে কত মনােবেদনে।
দিনে দিনে গত হ’ল সম্বৎসর,
আর যে সান্ত্বনা মানে না অন্তর ;
হইয়ে উদ্যোগী, শঙ্কর-সােহাগী,
ত্বরা লয়ে এস ভবনে।
মিশ্র-ইমন-দারা।
আসবে বলে আশা দিয়ে কেন এলনা—কেন এলনা
সে নইলে রইতে নারি সে কি জানে না,
জেনে শুনে কোমল-প্রাণে দেয় গাে বেদনা।
আমার মন যেমন, তার ত নয় তেমন,
মনে মন মিলে কি আর হয় কখন এমন
সে যে ভুলে রৈতে পারে, আমি পারি না,
প্রাণ যে মানে না মন যে বােঝে না ।
'দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
a
ইমন-কল্যাণ-টুংরী।”
গােপনে তারে আপন ভেবে, মন প্রাণ সঁপেছি।
‘নবীন-বিনােদ-ছবি' দেখে মজেছি।
সখিরে !
কে না তারে চায়,
হেরিলে সে কায়, আঁখি কার না জুড়ায় ;
যে নিধি বাসব-বিধি সাধিয়ে না পায়,
ভােলানাথ যার নাম পঞ্চ মুখে গায়,
জাহ্নবী উদ্ভবে যার পায়,
সে কালায় সহজে কে পায় ;
সাধে কি তাহারি তরে গােকুলে কুল ত্যজেছি।
কমিক।
ঝিঝিট-পপাস্তা।
দাত যে পড়ে গেল শ্যামা,
কি সুখে আর আনবো তােরে।
এমা, সিদ্ধ একটু কম হলে আর
চিবানাে যায়না মেড়ের জোরে ।
জল দিয়ে দিই যদি গিলে,
পেট খুচে ওঠে মা ঠিলে ;
এমা, প্রসাদে তৃপ্তি না পেলে,
ভক্তি আসে কেমন করে ।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালী।
অটু-মি—ঝাঁপতাল।
কালী কলুষহারিণী, কালভয়নিবারণী ;
মহেশ-হৃদি-বিহারিণী মা ত্বং ত্রিলােক-তারিণী
কৈবল্যদায়িনী, কুল-কল্যাণী, কপালিনী,
লােলরসন, কমলাসনা, বাম, বিপদবারিণী,
ক্ষমা-রূপা, ক্ষেমঙ্করী, খরখগধারিণী,
ভক্তমাতা, মুক্তকেশী, রক্তবীজবিনাশিনী!
ব্ৰহ্মাণ্ডভাণ্ডারী, নরমুণ্ডমালিনী,
শ্মশানবাসিনী শ্যামা, শরণাগত-পালিনী ;
শমন সমাগত দেখি’ ডাকি গাে তােরে সর্বাণী,
রক্ষ দাসে দক্ষ তে! বিরূপাক্ষবিলাসিনী ।
তপনসুত-তাপে তনু কাপে অসিতবরণী,
ত্রাসিত জনে কুপা-নয়নে হের গো হরঘরণী,
ভীষণ ভব-নীরধি-নীরে দেহি চরণ-তরণী,
ব্রাহি দীন দেবেন্দ্রনাথে সদানসােহাগিনী।
;
ভীমপল-কাওয়ালী ।
মানভরে আমি তারে দিয়েছি বিদায়।
জানি সে অভিমানে অশ্রুটি মুছে কোথায়।
সজাগে স্বপনে ধ্যানে, আমা ছাড়া সে কি জানে,
ছি ছি আমি অকারণে সে জনে ঠেলেছি পায়।
যাই ছুটে কাছে ভারি, সাধিগে চরণে ধরি,
সে বিনে প্রাণ আমারি অন্য কিছু নাহি চায়।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
পিলু-দারা।
মিটে গেল রান্না-খাওয়া, ঘরের যা’ কাজ সেরে নিয়ে,
কখন্ এবার বাজবে বাঁশী, থাকি বনে কান বাজিয়ে।
ভাবে বাঁশী রাধা রাধা, মান্বােন আর কোনাে বাধা,
কলসী কাকে ছুটবাে সােজা, বাসি-জল সব ফেলিয়ে দিয়ে ।
দেখতে ‘শ্যাম’-শােভারাশি, মরি সে কি ভালবাসি ;
ইচ্ছা করে শুনতে বাঁশী, দাসী হই তার চরণে গিয়ে।
কাফিসিন্ধু-যৎ।
মনে মনে মন সপেছি—ভাল বেসেছি।
তারি লাগি সর্বত্যাগি, উদাসিনী সেজেছি।
সে প্রেম-মুরতিখানি, যতনে মানসে আনি,
ভাবিতে দিবা-যামিনী, আপনারে ভুলেছি।
বিভাষ-মিশ্র-একতালা।
ওগাে, কত সাধনায়, বিজন-বেলায়,
মিলায়েছে বিধি তােমারে।
আজি, করিব প্রকাশ, চির-অভিলাষ,
যা আছে মরম-মাঝারে ।
চাহিনি তােমার প্রেম-ভালবাসা,
প্ৰাণ পাব বলে করিনি দুরাশা ;
হাসি-মুখখানি দেখিবার আশা,
করােনা নিরাশা আমারে।
৩২
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
খাম্বাজ- যৎ।
কে গো নব-জলধর ভ্ৰমিছ নিকুঞ্জ-বুনে,
ত্রিভঙ্গ-মুরতি ধরি, চপলা শ্রীরাধা-সনে।
কালো-অঙ্গে একি জ্যোতি, আলো করে বসুর্ধতী,
ত্যজে পতি কুলবতী ছুটে তােম। দরশনে।
বাঁশরী-সঙ্গীত-ছলে, গরজিছ ‘রাধা বলে,
যমুনা উজানে চলে সে ধ্বনি শুনি শ্রবণে ।
মধুর ব্রজমণ্ডলে, দাড়ায়ে কদম্বতলে,
তােষিতেছ গােপীদলে প্রেম-সুধা বরিষণে ॥
মি-ইমন-কাওয়ালী ।
কুহু-স্বরে উছ মরি হু হু করে প্রাণ।
সহেনা সহেনা আর, দারুণ বিরহ-ভার
রহেনা রহেনা বুঝি কুল-শীল-মান।
দোলায়ে নবীন-লতা মলয় মৃদুল বায়,
আবেশে হৃদয় হতে দুকূল খসিয়া যায় ;
রতিপতি প্রতি পলে, গােপন মরমতলে,
দূরে থেকে হানে ফুলবান।
ওই হের মধুকর ছড়ায়ে মধুর তান,
‘দুলে দুলে ফুলে ফুলে করিতেছে মধু পান ;
বৃিনে সে হৃদয়-বঁধু, এ হৃদি-কমল-মধু,
বল সখি কারে দিব দান ॥
দেবেন্দ্র-গীতিমালা ।
কমিক।
আজি এসেছি, আজি এসেছি, এসেছি বঁধুহে
নিয়ে বিড়ি সিগারেট পান।
আজি আমার যা কিছু আছে, গিয়ে দোকানীর কাছে,
তাহারে করেছি সব দান ॥
আজি তােমার চরণতলে রাখি এ জিনিসগুলি,
একটা একটা করে তব মুখে দিই তুলি,
পান-খিলি গালে ভরি, অধরে চুর ধরি,
মার বঁধু ক’সে তায় টান ;
আজি জীবনের সব আশা, সব সুখ ভালবাসা,
ইহাতেই হ’ক অবসান !
ঐ ভেসে আসে বাজারের লুচিভাজা সৌরভ,
ভেসে আসে রাস্তার গাড়ী-চলা কলরব,
ভেসে আসে পাশাপাশি, ইঞ্জিনের ধূয়রাশি,
ভেসে আসে সে বাশীর তান ;
আজি এমন ইলেকট্রিক্-আলাে, মরি যদি সেও ভালো,
সে মরণ বরগ সমান ।
আজি তােমার বুকের তলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাই,
তােমার সরল গলে লাফিয়ে ধরিতে চাই,
তােমার বিছানালে, শয়ন লভিব বলে,
আসিয়াছি তােমার নিধান;
আজি সব ভাষা সব বাকু, নীরব হইয়া যাক,
ঘুমে শুধু মিশে থাক্ প্রাণ।
৩৪
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
খাজযৎ।
দেখা দে মা দয়াময়ি কাতর-পালিনি কালি
তনয়ে পাঠায়ে ভবে, ভবানি কোথা লুকালি ।
জন্মাবধি এত ক'রে, ডাকিতেছি শ্যামা তােরে,
পাতকী বলে কি মােরে ভুলি রবি চিরকালি ।
পতিত-তারিণী নামে খ্যাত তুমি ধরাধামে,
আমা লাগি হররমে সে নামে কি দিবি কালি ॥
হাম্বির-মিশ্র-চিমে-তেতালা।
ভুলি ভুলি করি তারে ভােলা সে কেমনে হয়।
সে ছবি মরম থেকে তােলা ত সহজ নয়।
হৃদয়-সুবিনিময়ে প্রথম-মিলন যবে,
ভেবেছি কি এ জীবনে এ প্রেমে বিচ্ছেদ হবে ;
কে জানে অমিয় সনে, গরল রবে গােপনে,
আঁকা সে যে প্রাণ-মনে যাবত নহে প্রলয় ।।
বারোয়া-দারা।
ভালবাসা কথার কথা নয়।
মমটি জেনে সযতনে মন যােগাতে হয়।
হয়ে তারি অভিলাষী;
মুখে বলে ‘ভালবাসি’ ;
সে যে.কি চায়, কার এত দায় অত খোজে রয় ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
কেদারা-কাওয়ালী।
কি সুরে বাজাও বাঁশী, আমি বড় ভালবাসি,
শুনিতে তােমার বাঁশী ছুটে আসি কাননে।
শুনি বলে ওই বঁাশী, প্রতিবাদী প্রতিবাসী,
র’বনাকে। গৃহবাসী তাই বুঝি জাননে।
বাজাও বাজাও বাঁশী, মজাও সে ব্রজবাসী,
শুনিয়া মােহন-বাঁশী ভুলে যাবে কুলবাসী;
হয়ে সবে বনবাসী, দেখে যাবে বাজে বাঁশী,
বড় ভাল সাজে বাঁশী ও মধুর আননে।
মিশ্র-খাম্বাজ-একতালা।
সে যে, এই আসি ব'লে, গেল কোথা চলে, ফিরে তো এলনা আর।
আসিবে যদি সে চলে যাবে কেন, বুঝিবারি এ যে ভুল আমার।
সারাটি যামিনী আকুল-নয়ানে,
চেয়ে থাকি, আমি তারি পথ-পানে ;
সে এখন কোন্ হৃদিমাঝখানে শােভিছে দোলিছে রতনহার ।
মিছে গাঁথা হ’ল কুসুমের মালা,
কুসুম-শয়ন হেরে বাড়ে জ্বালা,
এ বিরহ-নিশি হবে কি সকালা, মুছে মুছে কত নয়নধার।
ভেবেছি প্রণয়ে সুখ অবিরল,
সুধাভমে এ যে পিয়েছি গরল ;
জীবন হারানো এর প্রতিফল, এতদিনে তবে বুঝেছি সার।
.
দেবেন্দ্র-গতি-মালা
.
;
মিশ্র-খাম্বাজ-কাওয়ালী ।
এস, করুণা-সাগর গৌরহরি ।
এস, সাঙ্গপাঙ্গসনে, হরিসঙ্কীৰ্ত্তনে,
নদীয়া-নগর পরিহরি ।
এস জগবদন, শ্ৰীশচীনন্দন,
বিশ্ব-বিনােদন-বেশ ধরি ;
চন্দন-রঞ্জিত হেমনু সজ্জিত,
কোটা-বিধু লজ্জিত জ্যোতি নেহারি ।
এস বিশ্বম্ভর, দেব দ্বিজবর,
ব্ৰহ্ম পরাৎপর, দণ্ডধারী ;
আপাদ-লম্বিত পাটপটাবৃত,
উত্তরীয় ধৃত সঙ্গে তারি।
এস মহামতি, বিষ্ণুপ্রিয়াপতি,
জীবগণ-দুর্গতি-ধ্বংসকারী ;
চিকুর-রচিত মুক্তা-বিভূষিত
চূড়া সুশােভিত শিরােপরি ৷
এস সদাতন, পতিতপাবন,
প্রেম-নিকেতন, পাপহারী ;
গলে সমুজ্জ্বল সুগন্ধি-ফুল-মালা,
বক্ষে হেলাদোলা কিবা মরি ৷
এস হরি বলে, দুটা বাহু তুলে,
তালে তালে তালে নৃত্য করি ;
স্বর্ণ-নূপুর তায়, বাজিবে রাঙ্গাপায়,
কর্ণে পশিবে হায় সুধা-লহরী।
।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা। ৩৭ এস বালক-বেশে, হরি-ভাবাবেশে, হেরি সবে হরষে নয়ন ভরি; এস প্রভু ত্বরিতে, ভবাৰূি তারিতে- দেবেন্দ্রে বিতরিতে চরণ-তরী । খাম্বাজ-দাদরা। খাম্বাজ- সে কথা কেউ তো জানে না। চুপিসাটে দেখাদেখি, চোখে চোখে কথাটি নানা। সে আমার আমি যে গাে তার, দুজনে সঙ্গোপনে লুটবো সুধা প্রেম-ভালবাসার, লােকে কেন সন্ধি পাবে তার ; যে না জানে এ চাতুরী, সে তো প্রেমের ধার ধারে না। কমিক। । ডুম ডুম ডুম বাজিয়ে দিচ্ছি ঢােল। একটা মজার কথা শুনবি যদি, করিসনাকে। গােল। চুপ চুপ, চুপ, ঐ কে কাড়ে রা, . বল্লে কথা শুনিস না, ছি! বেহায়া তাের, আকথাটা পাকথাটা একবার না হয় ভােল। শুবে যদি আসল-কথাটী,- সত্যি বলছি খরচ লেখে আগে মাথাটা এ যে, যার কথা সেই বুঝবে ভালাে,তােদের প্রাণে মইবে ঘােল । ••
৩.
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
ইমন-ভূপালী-ঢিমে-তেতালা।
চরণে দিওগাে আশ্রয়, হে করুণাময়!
তােমারি করুণা হ'লে ভবে কি অপূর্ণ রয়?
দীনবন্ধো! জানি ভাল তুমিহে দীনের গতি,
সৰ্ব্বজ্ঞ ! জানতাে আমি পুণ্য-হীন দীন অতি
আমারে করিলে দয়া, এ কীৰ্ত্তি হবে অক্ষয়,
মহিমা-গৌরবে তব ভরিবে ভুবন-চয়।
কলুষিত-কর্মে চির লিপ্ত হয়ে সুনিশ্চিত,
প্রধান পাতকী বলে আছি ভবে পরিচিত ;
‘পাতকী-তারণ’ তুমি, এও ভাল জানি আমি,
যাচি হে জীবন-স্বামী ঠেলনা সে অসময় ।।
সাহানা-খো।
আমরি কি মধুর তানে গেয়ে গেল গান ।
তানের ভিতর তুলে গেল সে কি অভিমান।
আর যে তুমি গাচ্ছােনাকো, চুপ দিয়েগো কেন থাকো,
কি বাধাতে সাধে এত হতাশ হ’ল প্রাণ।
কি ধীর আনে তােমার তানে, গানের কি ভাষা,
যতই শুনি-শুনতে কেমন বেড়ে যায় আশা;
আবার তুমি তেমনি গানে, সুধা বর্ষণ কর প্রাণে,
দক্ষিণ তার কি যে এ আর পাইনে যে সন্ধান।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
ভৈরবী-একতাল।
তুই গাে আমার পাগলিনী মা, আমি মা তাের পাগলা ছেলে।
বাবা আমার পাগল ভােলা, এমনটি আর কোথায় মেলে।
তাের যেমন টান ছেলের প্রতি,
মা’র প্রতি মাের তেমনি মতি,
সে যেন এক বিষম ক্ষতি তােমার স্মৃতি মনকে এলে।
তুই মা কেমন দিনে রেতে,
রণ-রঙ্গে আছিস মেতে ;
আমিও বেশ মায়ার স্রোতে রঙ্গে দিইছি প্রাণটি ঢেলে ।
চিরদিনটে এমনি ক'রে,
কাটলো মা পাগলামীর ঘােরে ;
শেষের দিনে দেখিস মােরে চরণ হতে দিসনে ঠেলে ।
কাফিসিন্ধু-যৎ।
।
কে যাবিগাে যমুনায়,
আয় আয় বেলা বয়ে যায় ;
ওই গুন কালশশী ৰিপিনে বাঁশী বাজায়।
গৃহকৰ্ম্ম পরিহরি,
চল গাে কুলকুমারি,
নিতম্বে ধরি গাগরী,
বারি আনিবার ছলে হেরিব সে শ্যামরায়
৪০
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
ঝিঝিট-একতালা।
আয় সবে মিলে, মন প্রাণ খুলে
হরি হরি বলে ডাকিরে।
যার কৃপাবলে, এসেছি ভূতলে,
তঁারে কেন ভুলে থাকিরে ।
নাচিয়ে নাচিয়ে করতালি দিয়ে,
ভ্রমি পথে পথে হরি-গুণ গেয়ে,
প্রেমময়-প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে,
তন্ময় জগত দেখিরে.৷৷
জয়ী হবি যদি তপননন্দনে,
হরিনাম-সুধা পিওরে বদনে,
শিব মৃত্যু-জয়ী যে নামের গুণে,
শুকদেব সদা সুখীরে ।।
হরি ভিন্ন ভাবে কি আছেরে গতি,
হরি আমাদের সহায় সঙ্গতি ;
তাই বলি সেই অগতির গতি-
হরিপদে মতি রাখিরে ॥
খাম্বাজ-যৎ।
'।
আপন ভাবিয়া যারে সঁপেছি জীবন মন,
বুঝিতে পারিনা সে যে কঠিন কেন এমন।
হেবো শুধু আঁখি ভ'রে, থাকি কত আশা করে,
দিবেনা দেখা আমারে সে বুঝি করেছে পণ।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
৪১
আশাবরী -- আড়াঠেকা।
কে প্রসূতা কারে সুতা ভেবেছ রাণী অন্তরে।
জাননা জগজ্জননী জন্মেছে 'তব জঠরে
বিরিঞ্চি বাসব হরি, যে উমার আজ্ঞাকারী,
মােহ-ঘােরে নগেশ্বরি চিনিতে পারনি তারে।
ত্যজিয়া সংসার-মায়া, শূলপাণি শব-কায়,
সে শুধু শঙ্করী-পদে নিবাস-বাসনা-তরে ;
তােমার গৌরী নন্দিনী, গতি-মুক্তি-প্রদায়িনী,
ধন্য করিতে ধরণী উদিতা ভূধর-ঘরে ॥
কমিক।
পুরবী-খো।
যাবনা সাজের বেলা একলাটি যমুনা-জলে।
ও-পাড়ার কালো ছোড়া দাড়ায় গিয়ে কদম-তলে ॥
ছোড়াটা ফচকে ভারি, চোখ দেখে বুঝতে পানি,
কোন দিনে মালাটি ধরি দুলিয়ে দেবে হৃৎ-কমলে।
বারোয়াদারা।
ভালবেসে একি ঝকমারি ।
সেধে সেধে জীবনান্ত, তবু কি মন পাই তারি।
প্রথম সে যে মিলন-ছলে, স্বর্গ যেন ধরাতলে,
কে জানে এ শেষের ফলে সার হবে নয়ন-বারি ।
৪২
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
মাদল-বাদ্যে নাম-সঙ্কীর্তন।
রাধে রাধে রাধে রাধা-গােবিন্দ বল,
গােবিন্দ বল্ রাধা-গােবিন্দ বল।
আশি লক্ষ জন্ম করে ভ্রমণ,
মানব-জনম পেয়েছ এমন,
ভ’জে নে শ্রীরাধা-রাধারমণ,
ওরে, সাধের জনম যদি কবি সফল।
( রাধাগােবিন্দ বরে) ( মনের অনুরাগভরে )
রাধাগােবিন্দ-নাম-সুধা-পানে,
পরম আনন্দ পাবি প্রাণে,
বদনে বল নাম শােনােনা কানে,
ও তাের, দেহ মন প্রাণ হবে শীতল ।
( ঐ নামের গুণে) (শ্রবণে কীৰ্ত্তনে )
দু’দিনেরি তরে এসেছ ভবে,
দু’দিন পরে তােরে যেতে হবে,
রাধাগােবিন-নাম ববি কবে,
ও তুই, কেমনে এড়াবি কালের কবল।
( ও সেই নিদানের দিনে) { রাধাগােবিন্দ-নাম বিনে)
অনিত্য সংসারে সকলি অসার,
ধন জন কিছু নহে তােমার,
দুৰ্ম্মতি দেবেন্দ্র করে সার,
মধুর, শ্রীরাধাগােবিন্দ নামটি যুগল।
জীবন-মরণের সম্বল }( মায়ার সংসারে কেবল )
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
সাহানা-কাওয়ালী ।
বাজিল শ্যামের বাঁশরী ।
বাজ, বাঁশী বাজ বাজ, থাক আজ গৃহ-কাজ,
প্রাণ ভরে শুনি তাের স্বর-লহরী ।
বাজে বাঁশী কোন্ সুরে, কোন্খানে কত দুরে,
তানখানি ভেসে এসে বসিল মরম জুড়ে,
ছুটে গেল অভিমান, প্রাণে উঠে প্রেম-গান,
আর বুঝি কুল-মান রাখতে নারি ।
বুঝেছি বংশীধারী তােমার চাতুরী যত,
মজাতে গােকুল-বালা ছলনা করিবে কত
যায় যাবে জাতি-কুল, হও কাল। অনুকূল,
জীবনে মরণে দাসী আমি তােমারি ।
পিলু-মিত্র-একতালা।
তুমি, ভুলে গেছ তাই চিনিতে পারনা,
চিনেছি হে সখা তােমারে।
আঁকা আছে ওই চাৰু ছবিখানি,
গোপন ময়ম-মাঝারে ॥
সে দিনের কথা পড়ে কিনা মনে,
প্রবেশিয়ে যবে প্রণয়-কাননে,
হৃদয়-শয়নে, নয়নে নয়নে,
রেখেছিলে সখা আমারে।
৪৪
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
সিন্ধুড়াযৎ।
মায়ের মত মা হলে কি এত করে ডাকতে হত।
সাড়া পেয়ে ত্বরা করে কাছে এসে দেখা দিত।
বাতনা পেলে সন্তানে, বেজে উঠে মায়ের প্রাণে,
আগে তাে ছিলনা মনে এ মায়ের প্রাণ পাষাণ এত।
নামটি শুনি জগন্মাতা, এই কি রে মায়ের মমতা,
মা হয়ে বল কে কোথা কালের করে সঁপে সুত।
মিশ্র-ঝিঝিট-দাদরা।
ভালবাসে তাই ত আসে যায়।
সে যে, আমায় পেলে ভূমণ্ডলে আর কিছু না চায়।
মনটি তােষে কত ছাদে, আমি, হাসলে হাসে কালে কাদে,
অভিমানে কতইনা সাধে,
আবার, আদর করে হাতে ধ'রে আসি বলে নেয় বিদায় ।
ভীমপলশ্রী—কাওয়ালী ।
দূরে থেকে লুকিয়ে শুধু চোখের দেখা দেখে যাই ।
এ দেখায় জানিনা আমি কি আনন্দ প্রাণে পাই ।
কেন এত ভালবাসি, কি আশাতে ছুটে আসি,
মুখখানি তার হাসি-হাসি সদাই যেন দেখতে চাই ।
হলে নাকি জানাজানি, দেখা সে দিবেনা, জানি,
সে যে এত অভিমানী বুঝেও কেন বুঝি নাই ।
দেবেন্দ্র-গীতি-মাল।।
৪৫
বেহাগ-খাম্বাজ-ঢিমে-তেতালা।
গেঁথেছি যতনে কত কানন-কুসুম-হার;
সােহগে শ্যামের গলে দিব প্রেম-উপহার।
আজি সখি ফুল-সাজে, সাজাব কিশাের-রাজে,
সবে তারে রাখি মাঝে দেখিব সৌন্দৰ্য্য সার ।
মােরা যত ব্রজবালা, শ্যামে ল’য়ে সারা বেলা,
বনে বনে কত খেলা খেলাব গাে সঙ্গে তার ॥
কমিক।
==
পু। তাের চিনির পান। মুখখানিতে একটি চুমু খাই।
স্ত্রী। দূর হয়ে যা’, দূর হয়ে যা’, ওরে ও বালাই ।
পুঃ। চটছো কেন চঁাদ-বদনা প্রেয়সী আমার,
স্ত্রী। ওরে পােড়ামুখো মুড়ে জেলে মুখে দিই তােমার ;
পু। আমি করবাে তবে মান,
স্ত্রী। আমি ধরবাে এই কান,
পু। আরে ছাড়, ছাড়, তাের টানুনীতে বেরিয়ে যায় যে প্রাণ ;
স্ত্রী। তবে মারবাে গালে চড়,
পু। বাবারে বাবারে একটি চড়ে গেছি যমের ঘর ;
স্ত্রী। বল করবােনা এমন,
পু। তুমি হৃদয়মাঝে এস দেখি ও হৃদি-রতন;
স্ত্রী। মর মর মর হচ্ছিরে লজ্জা কি তাের নাই।
৪৬ দেবেন্দ্র-গীতি-মালা। মিশ্র-ভায়রো-কাওয়ালী জয় জগত-বন্দন, দশরথ-নন্দন, রাম নারায়ণ, লােক-পতি। জয় কৌশল্যা-অঞ্চল-নিধি, নীল, নিম্মল, সূৰ্য-কুলােজ্জল, দীন-গতি। জয় লক্ষ্মণ-অগ্রজ, রাজ-রাজের ; জীবন অনুজ রাজছত্ৰ-ধর; জীব-অন্তর্যামী, জনকসুতাস্বামী ; বামে বিরাজ। তুমি সীতাসতি। জয় পিতৃসত্য-প্রতিপালন-তৎপর, ধনুর্বাণধারী ক্ষত্রিয়-বীরবর; জানকী-উদ্ধারণ-কারণ প্রণাশন- সবংশ-দশানন দুষ্টমতি । জয় লব-কুশ-জনক, জগজন-পালক, হনুমান-সেবিত, শরণ্য,-তারক ; দৃঢ় ভক্তি মাগি, চির-অনুরাগী, দেবেন্দ্র শ্রীচরণে করে নতি । শঙ্কর-দারা। কাদার্কাদি সাধাসাধি কেন তারে কেন এত । চিরদিনের তরে সখি, তােমার প্রেমে বাঁধা সে ত । যেখানে বায় যান চলে, কোনো কথা কাজ কি বলে, পিপাসাটি উদয় হলে আপ্নি এসে সাগবে কত।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
৪৭
পুরবী-একতালা।
কই এল সই প্রাণেরি কালা।
কেবা নিল হরি, বল ত্বর করি,
হরি বিনে প্রাণ হল উতালা ।
আসিবারি কত আশা দিয়ে প্রাণে,
কেন গুণমণি' এলন কাননে ;
পেয়ে বুঝি তারে পথ-মাঝখানে,
ধরে নেছে কোন্ গােপেরি বালা।
যাহার লাগিগাে চিরদিন-তরে,
ডুবেছি সজনি কলঙ্ক-সাগরে;
হারা হয়ে সেই স্যাম-সুধাকরে,
এ নিশি কি আর হবে সকাল ।
সুখ-আশে আসি নিকুঞ্জমাঝারে,
ভাসি যে দারুণ দুখেরি পাথারে,
কি করিব সখি বলে দে আমারে,
বিরহ-কাতরে মরে অবলা ।
খাম্বাজ-যৎ।
দেখিলে থাকি ভাল, দেখিলে যে এ কি হয়,
কি যেন বলিতে গিয়ে এসে পড়ে লাজ-ভয়।
জানাবে সে কি আকারে, কত ভালবাসি তারে
সে যদি না চাহে ফিরে, এত কি রে প্রাণে সয় ?
৪৮
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
বেহাগ-আড়াঠেকা।
ত্রিলােক-তারিণী তারা তার তনয়ে ।
নিতান্ত ডাকি মা তোরে কৃতান্ত-ভয়ে
দয়াময়ি, দীনহীনে—
কে তারিবে তােমা বিনে,
কিঙ্করে কৃপা-নয়নে হের অভয়ে ।
পাপে জীর্ণ মন-তরী,
ভাবে কিসে তরি,
দে মা শ্রীচরণ-তরী সদয়া হয়ে।
জংলা-কাওয়ালী ।
শুধু
চোখের দেখা, দেখতে আসি,
নইলে যে রৈতে পারিনে।
হৃদয়-দেবতা সে যে গো আমারি,
এ ছাড়া কিছু তাে জানিনে ।
মিলায়ে সে ধনে হৃদি-উপবনে,
প্রীতি-পুষ্প-হারে পূজিব যতনে,
জনমে জনমে করিনি সে ভাগ্য,
কাজেই এ ভাবনা ভাবিনে ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
পিলু-মিশ্র—দারা।
ঐ গাে ঐ গাে ঐ গাে কাল। বাজায় বাঁশরী।
সেই ত বটে বংশীবটে--
বটে বটে নটবর মুরারি।
ওই যে ওই যে পেয়েছি শুনিতে,
রাধা রাধা রাধা বলে বঁাশীতে,
মরি মরি মরি নিঠুর হরি-
হ'রে নিল প্রাণ মুরলীধ্বনিতে ;
ওগো ওগাে সখি হ’ল একি দায়,
মজালে মজালে কুলকুমারী।
কমিক।
মিশ্ৰ-ভৈরবী-খো।
আহা দেখলে তারে কেমন করে প্রাণ।
সে যে, গুমরে মরি, শেষ কি করি,ধরে ফেলি গান।।
তারে যে কি ভালবাসি, বলতে গেলে একটা রাশি,
( ওগাে) চাদমুখে তার মুচকি হাসি করে সুধা দান ।
শুলে তার দুটো কথা, দূর হয়ে যায় মনের ব্যথা,
(ওগো) সে যে আমার মৰ্ম্মে গাঁথা, কে জানে সন্ধান।।
তারি তরে বলবাে কি রে, ভাসছি দুটী নয়ন-নীরে,
(ওগাে) তবু একবার চায়না ফিরে, এমি সে পাষাণ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
মিশ্র-খাম্বাজ-কাওয়ালী ।
এস হৃষিকেশ-মানস-মােহিনি !
এস, শ্বেত-সরােজ’পরে, বিনােদ-বীণা করে,
বেদ-মাতা অবিদ্যা-নাশিনি ।
এস মা সরস্বতি, ভগবতি, ভারতি,
করুণা করি মম কণ্ঠে কর বসতি ;
দুর করি দুৰ্ম্মতি, তনয়ে দাও সুমতি,
এ মিনতি পদে বাগ্ধাদিনি।
অজ্ঞানতমােছঘারে হ’তেছি মা চঞ্চল,
দেখায়ে জ্ঞানের আলাে হৃদি কর উজ্জ্বল
দুর্গম সমাধি-পথে, ল’য়ে চল সাথে সাথে,
পতিতে ঠেলনা গতি-দায়িনি।
খাম্বাজ-যং।
কেমনে ফিরাবি তারে, সে যে কত কেঁদে কেঁদে,
ধরে ও চরণ দুটি গেল তােরে কত সেধে।
কি মানে যে মজেছিলি, তারে পায়ে ঠেলে দিলি,
সে-কালে কি রেখেছিলি নিয়ে হৃদয়ে বেঁধে।
বারেক চাহিলে ফিরে, সে কি কভু যেত ফিরে,
সামান্যেতে মানিনিরে এ প্রমাদ গেল বেধে
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
মিশ্ৰ-ভৈরবী-একতালা।
ওগাে, একি হ’ল কাল, কালি সে বিকাল,
কালােরূপখানি হেরিয়া।
করে স্বশী লয়ে, ছিল সে দাড়ায়ে,
বনখানি আলাে করিয়া ।
কি ক্ষণে
গেলাম যমুনার জলে,
দেখা তারি সনে তমালেরি তলে,
বাকা-চোখে চেয়ে সে বুঝিগো ছলে,
সকল নিয়েছে হরিয়া ।
সাধ হয় মনে, সে কালাে-রতনে,
রাখি’ হৃদিমাঝে পরম যতনে,
দিবস-যামিনী বসিয়া বিজনে,
নিরখি নয়ন ভরিয়া ।
বারেয়া-পেটা।
তােরা নিসে আয় নিসে আয় গােলাপী-মিশি।
সুবাস-ভরা, মার্কামারখটী স্বদেশী ।
এ মিশিতে দাতটি ধুলে,
রূপের চমকূ যাবে খুলে,
দেখতে কত বাহার হবে চাদমুখের হাসি।
আমার মিশির এনি গুণ,
দূর হয়ে যায় মনের আগুন,
প্রাণের বঁধু অনুগত রয় দিবানিশি ।
দেবেন্দ্রগীতিমালা।
( মাদল-বাদ্যে সঙ্কীৰ্ত্তন-গান)
বাঁশরীতে কে গাে ও প্রাণ-সই,
রাধা রাধা বলে ডেকেছে ওই ।
ব্রজে তো রয়েছে কত জনা,
রাধা বিনে সে কি নাম জানে না ;
তুমি গিয়ে তারে কর মানা,
আমি, কুলাঙ্গনা কাজে আকুল হই।
( বাঁশ নাম ধরে বাজে ) (কত সুরের ভাজে )
জানিনা ও বাঁশী কি গুণ জানে,
তারি পানে শুধু প্রাণকে টানে ;
বল সখি আমি যাই কেমনে,
হেথা, গুরুজনের মাকে সদাই যে বই।
( ছার সংসারের কাজে) ( এই গােপ-বধূ-সাজে)
যখন তখন শুনি, সে জন কে বল,
রাধা ব'লে বাঁশী বাজায় কেবল ;
দেবে বলে “তায় কবি কি ব,
ওগো, তার যে পছন্দ নয় রাধা-নাম বই।
( সে যে ব্রজেন্দ্র-তনয় } ( কবে মিলবে প্রণয় )
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
কাফিসিন্ধু—একতালা।
শ্যামা গাে আমার এই বাসনা।
প্রাণান্তে তাের পদপ্রান্তে স্থান যেন পাই শবাসনা।
যখন নিকট হবে শমন,
মহাঘুমে ক’বাে শয়ন,
ঘুমের ঘােরে যেন তখন কালী-নাম বলে রসনা।
সাঙ্গ করি মানব-লীলা,
ভবপারে যাবার বেলা,
পারের ঘাটে ল’য়ে ভেলা দেখা দিস্ মা দিসনা।
কমিক।
খাম্বাজ-কাওয়ালী ।
কোথায় লুকালে তুমি, হে লুচি সুধাময়,
তােম বিহনে প্রাণ দেহে বা নাহি রয় ।
একে এ বিষম শীত, তাহে ক্ষুধা বিপরীত,
এ সময়ে অন্তর্হিত হওয়া কি উচিত হয়।
কেমনে তােমাধনে ভুলিব ভাবি তাই,
সে সৌম্য-মূৰ্ত্তি মনে জাগিছে সর্বদাই ;
সাঙ্গপাঙ্গ-পরিবৃতে, এসহে রসনাটীতে,
আনন্দের সরসীতে ভাসু মম হৃদয়।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
খাম্বাজ-যং।
কেন মন দিলি তারে, ভালবাসা সে কি জানে?
ভুলে গেলি কুলবালা মােহন-মুরলী-তানে।
আগে না বুঝিয়া প্যারি, বিকালি চরণে তারি,
লম্পট সে বংশীধারী কত ব্যথা দেবে প্রাণে।
মিশ্র-ভূপালী-একতালা।
কে বলিবে হায়, আছে সে কোথায়,
মন যারে ভালবাসে।
নাহি জানি কোন্ নব-উপবন,
মােদিত সে-ফুলবাসে ।
সে মন-মােহন-মুরলীর গান,
কোন্ দিন হয়ে গেছে অবসান,
এখনাে যে তার সুধাময় তান,
মরমে মরমে ভাসে ।
আসে যায় কত শারদ-যামিনী
চঁাদিম-কিরণে হাসিয়া,
গেয়ে যায় পিক ললিত রাগিণী
বসন্ত-সমীরে ভাসিয়া,
কত সাজে সাজি’ স্বভাব-নিচয়,
আসে-ধরা কত করে শােভাময় ;
যে বিনে নিখিল নিরখি প্রলয়,
সে শুধু কেন না আসে।
---
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
'শঙ্করা-দাদরা।
মায়ের ছেলে মা’য় না পেলে, চায় কি কিছু আর ?
জানিনে জগজ্জননি এ কেমন তাের ব্যবহার।
মা মা বলে এত ডাকি, শুনতে শ্যামা পাচ্ছি না কি,
ওরে ও ছেলে-খাকি সাড়া দে একবার।
এত যদি ছিল মনে, ঠেলে দিবি কু-সন্তানে,
প্রসব করে ছিলি কেনে জবাব কর মা তার ।
গজল।
এস এস এস সখা, সহসা কি মনে করে।
এলে যদি দিলে দেখা, এস কাছে এস স’রে ।
ভালছিলে বলো বলো, সে তাে তােমার আছে ভালাে,
মন প্রাণ চিরকাল সপেছ যার হাতে ধরে ।
আজি কি ভাগ্যেরি লেখা, বহুদিন পরে দেখা,
জানুতে কি এসেছ সখা আছি কি গিয়েছি ম'রে ॥
বারোয়-দাদরা।
এত করে চাসনে ও-পানে।
রূপের নেশা ধরে যাবে চোখে পরাণে ।
প্রথম ববি “তা কি হয় ছি!”
পরে ববি “দোষই বা কি?”
শেষে হবে “কখন পাব বুকের মাঝখানে ।*
দেবেন্দ্রগীতিমালা।
বাগেশ্রী-আড়াঠেকা।
ওগাে সখি একি দেখি যমুনারি কূলে।
নবীন-নীরদ নাকি নেমেছে ভূতলে।
নীরদে চপলা-হাসি, বরষে পিযুষ-রাশি,
আজি বুঝি কুল নাশি ভাসাবে অকুলে।
মরি কি মেঘেরি শােভা, মানস-চাতক-লােভা,
সঘনে গরজে কিবা ‘রাধা রাধা বলে ।
মিশ্র-বিভাষ-একতালা।
তােমারি আশে, এ ভব-নিবাসে,
উদাসিনী-বেশে রয়েছি।
তােমারি ভাবনা, ভেবে এ দেখনা,
কত শীর্ণ-তনু হয়েছি।
সুখ-সাধ-সে তাে কবে গেছে চলে,
বেঁচে আছি এ যে জানিনে কি বলে,
নিশি-দিন কত ভেসে আঁখিজলে,
বিরহ-বেদনা সয়েছি।
বিফল জনম বৃথা এ সংসার,
তুমি যদি সখা না হলে আমার ;
হৃদয়ে এসহে হৃদয়েরি হার,
চির-শাধ প্রাণে ব’য়েছি ।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
কাফিসিন্ধু-যৎ।
যাও গিরি ত্বর করি শঙ্করী অানিতে ঘরে।
না হেরি প্রাণের উমা দু’নয়নে বারি ঝরে ।
দেখেছি স্বপন গত নিশাকালে,
উমা যেন কত কেঁদেছে ‘মা’ বলে ;
সে অবধি নিরন্তর, অধীর মম অন্তর,
বিনা উম-সুধাকর বল কে সান্ত্বনা করে।
কমিক।
ভীমপলশ্ৰদা।
সরে যাও হে ও কালাদ, দাড়ায়ােনা মধ্যপথে।
তােমার মুখের আড়বাঁশটি লাগবে আমার টানা-নথে।
কিবা তােমার রঙের বাহার,
আলাে-জায়গা করে আঁধার,
নূতন-ধােয়া কাপড় আমার ময়লা হবে ঠেলে ওতে !
শ্রীঅঙ্গ ত্রিভঙ্গ-বাঁকা,
নয়ন বাকা, চূড়া বাঁকা,
ও বাকার আঁচ, লাগলে ফাকা, মন বাঁকাবে সেইক্ষণেতে
৫৮
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
কেদার-তেওরা.।
ভজরে অবিরাম, তারক-ব্রহ্মনাম,
বল বদন ভ’রে কৃষ্ণ,-হরে,-রাম’!
কলির দুদ্দিনে, চলি মায়াধীনে,
নিস্তার পাবিনে বিনে সে হরিনাম।
হরে মুরারে মধু-কৈটভারে,
গােপাল গােবিন্দ মুকুন্দ শৌরে ;
ডাক করুণ-স্বরে, কোথাহে কংসারে,
পূর্ণ হবে অচিরে চির-মনস্কাম।
ভজ নারায়ণ,ভবাৰূি-তারণ,
শমন ভয়-হর শ্রীমধুসুদন ;
কি ভাবে ভবে এসে, ভাবো সে হৃষিকেশে,
অন্তে অনায়াসে পাবি রে মােক্ষধাম ।
;
পিলু-দাদর।
• পথপানে চেয়ে চেয়ে বয়ে গেল সারারাতি,
এলনা আসিব বলে ;-এমিরে পুরুষ-জাতি।
আশা দিয়ে হাতে রেখে, মিলায়েছে কোথা থেকে ;
ঘুমের অলস চেঁকে চেঁকে, ফুলে গেছে আঁখির পাতি।
কত আশে ভারি তরে, থাকি আমি মর্মে মরে ;
সে এখন কার বুকের পরে জেলে দেছে রত্নবাতি।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
সাহানা-একতলা।
ওগাে তােরা দেখে যা’না, শ্যামা মায়ের কাণ্ডখানা।
করে ফেল্লে লণ্ডভণ্ড প্রকাণ্ড ব্রহ্মাণ্ডখানা।
কি রণে মেতেছে বেটী, এ র ত যায়না জানা,
অসি ধরে অসুরগুলো কেটে করলে খান খান'।
সাবাসী ঐ সৰ্ব্বনাশী 'কিছু নাকি লাজ বাসেনা,
রণবঙ্গে নাচে কেমন হয়ে বাম দিগ্বসনা !
রক্ত খেয়ে মুক্তকেশীর লহ লহ করে রসনা,
সর্বাঙ্গে রুধিরের ধারা, বেশ ধরেছে বিভীষণ।
কাটা-হাত সব গেঁথে নিয়ে করেছে কটীর গহনা,
মুণ্ডমালা গলায় পরে আহলাদেতে কি আটখানা।
দেবেন্দ্র আর বলবে কত পাগলী বেটীর গুণপনা,
এত ঠাই থাকতে এবার বাবার বুকে করেছে থানা।
খাম্বাজ-কাওয়ালী।
চাবনা তার পানে, সে কি প্রেম জানে,
সে জানে ব্যথা শুধু দিতে সরল প্রাণে।
চা’লে সে আঁখি-পানে, কি যেন অভিমানে,
ফিরায়ে মুখখানি বুকে বরশা হানে।
হেরিতে ভালবাসি সে হাসিমুখখানি,
শুনিতে অভিলাষী সে মুখে মৃদু বাণী';
যে দেখি হায় তার নিঠুর-ব্যবহার,
নিরাশে ফিরি নিতি কতনা হতমানে।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
দেশ-মিশ্র—ইংরী।
জয় শিব, শঙ্কর, শম্ভু, পিনাকধারী,
পার্বতীরঞ্জন, শ্মশান-বিহারী।
ভব, শুভঙ্কর, হর, পরমেশ্বর,
শশাঙ্কশেখর, স্মর-সংহারী ।
ঈশ, দিগ্বসন, ভস্ম-বিভূষণ,
ঈশান, ভীষণ, ভব-ভয় নাশন ;
শিরে সুরধুনী-বারি কুলু কুলু ভাষণ,
নয়ন ঢুলু ঢুলু জ্বলিত হুতাশন ;
রণ-উন্মাদিনী যােগিনীসঙ্গিনী-
তারিণী-চরণ-ভিখারী;
নীল কালকূট ক সুশােভিত,
নিখিল-বন্দিত, নিৰ্বাণকারী ।
মিশ্র-কাওয়ালী ।
ছুটেছে মনখানি কত আশে।
দেখাে যেন রেখাে মান, করােনা গাে অপমান,
একটুকু দিও স্থান মনেরি পাশে।
চিরদিন জানি ভাল নিজ-বশে ছিল মন,
সহসা আজিগগা কেন অবশ হ’ল এমন ;
কি শােভাতে দেখা দিলে, মােহে মন টেনে নিলে,
ফিরায়ে দিওনা তায় ঘাের-পিয়াসে।
-
৫
দেবেন্দ্র-গীতি-মাল।
ভৈরবী-খো।
গহন কুঞ্জ মাঝে, ঐ সখী বাঁশী বাজে।
চল তুরা করি, দেখিতে শ্রীহরি, পরিহরি লােক-লাজে ।
হেরিয়ে প্রাণ বিনােদ-কালা,
ভুলিব সজনি প্রাণের জ্বালা,
বন-ফুল তুলি, লয়ে বনমালী, সাজাব চিকণ-সাজে।
পঞ্চমে বাঁশী তুলিগাে তান,
পুলকে মুগ্ধ করে যে প্রাণ,
মরমে উথলে প্রেম-তটিনী, শুনি ও মােহন মুরলী-গান ;-
কুলের গরিমা আর কি থাকে,
অকুলের সখা ওই গো ডাকে,
চল কুলবালা হৃদি-ফুল-মালা সাঁপিগে কিশাের-রাজে ॥
কমিক।
ঝিঝিট-মি-দাদরা
ওরে আমার সখের প্রাণখানি।
একবার তেমনি করে তানটি ধরে গাওনা কেন গানখানি।
হ’ কেন বেতালা তুই, নাই বা তৈল সুর,
আমার কানে শুতে সে যে বড়ই সুমধুর,
তাের গান শ্রবণে হয় যে মনে কতই সুখের আমদানী ।
হ’কুনা লােকে ঝাল-পালা, করুনা বিদ্রুপ,
কোনােমতে গান গাওয়াতে দিসনেরে তুই চুপ,
ওরে কান পেতে তাের কাজ কি শুনে লােকের সে নীরস-বাণী ।
৬২
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
ইমন-আড়াঠেকা।
আর কেন মূঢ় মন,
ভ্রম ভবে অকারণ,
সে দিন নিকট হ’ল হের একবার।
শমন আসি সত্বরে,
বেঁধে লয়ে যাবে তােরে,
কোনােমতে তারি করে পাবিনা নিস্তার ॥
এখনাে উপায় বলি,
ভক্তিভরে ভজ কালী,
জপ কালী-নামাবলী মুখে অনিবার ;-
কালী নামের প্রভাবে,
কাল-ভয় দূরে যাবে,
চরমে পরম গতি হবেরে তােমার।
মিশ্র-একতালা।
নিমেষের দেখা নিমেষে ঘুচাল’
সম-জঞ্জাল এসে।
সে কি অতুলন স্বপন-মাধুরী,
প্রণে প্রাণে গেল ভেসে।
তিলেকের সেই সুখময় ছবি,
মরম লুটিয়া নিয়ে গেল সবি
তবুও সে বলি, যেওনা গো ছলি,
মনে রেখাে ভালবেসে ।
;
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
কফিসিন্ধু-মধ্যমান।
ঐ বাজে গো বাঁশরী, কিশােরী নাম ধরি ;
বন কি মন মাঝে বুঝিতে নাহিক পারি।
বাঁশীতে কি গুণ জানে,
মজালে মধুর তানে,
প্রেম-গানে প্রাণ নিল হরি ;
কেমনে রহিব ঘরে, না হেরে সে বংশীধারী।
ভৈরবী-দারা।
তুমি কোন্ বনের পাখী।
মৃদুল-হাওয়ায় উড়ে কোথায় যাচ্ছ একাকী ॥
কি শােভাতে দেখা দিলে, প্রাণটি আমার কেড়ে নিলে,
তােমায় পেলে হৃৎ-কমলে সদাই যে রাখি।
ছায়ানট-কাওয়ালী ।
জানিনা তারে আমি কেন এত ভালবাসি।
ও কনকরূপরাশে, কি নব হরষ হাসে,
তাই কি দরশ-আশে শত বাধা ঠেলে আসি।
কিবা মুখশতদল, মাখা কত পরিমল,
উজল কুন্তলদল, সুকপােলে ঝলমল,
ফুলধনু যুগল, লাজ-আঁখি ঢলঢল,
আমরি সে বড় ভালাে অধরে ও মৃদু-হাসি ॥
৬৪.
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
:
প্রভাতী-একতালা।
উষার আলােকে, পরম পুলকে,
শাখে শাখে পাখী ধরেছে গান।
এখনো কেনগো ঘুমেরি আবেশে,
এ নব-প্রভাতে রহ শয়ান।
সদ্য-প্রস্ফুটিত-পুষ্প-গন্ধ-মিশা-
মদ-সমীরণ-প্রবাহিত দিশা
পূৰ্বদিগ ভাগে, সুরক্তিম রাগে,
করিছে ঘােষণা ‘নিশাবসান।
জাগিয়া প্রথম বসি শয্যা’পরে,
বিশেশ-চরণে নম ভক্তিভরে
দিনের কর্তব্য সাধিতে সুচাৰু,
বর মাগি লহ তঁারি নিধান ।
;
;
ভীমপলশ্ৰকাওয়ালী ।
আমরি কি গুণ ধরে শ্যামের বাঁশীতে।
বাঁশী শুনে উদাসিনী আমরা কুলবাসীতে।।
পঞ্চম-সুরে যবে বাজে সেই বশী,
গৃহবাস ত্যজে মােরা হই বনবাসী,
শুনিয়ে বাঁশীর গান থাকি উপবাসী,
বাশীতে করেছে দাসী কৃষ্ণে ভালবাসিতে।
দেবেন্দ্রগীতি-মালা।
A
কমিক।
(মাদল-বায়ে নাম-সঙ্কীৰ্ত্তন)
কোন্ গরণিী আমার গােউর কাদালে,
জানিস যদি তােরা কে গাে বলে।
মর মর মরম ও তুই পােড়ামূখি,
গােউর কাদায়ে কত হলি মুখী ?
তাের মত কামিনী পাষাণ-বুকী,
সে যে, জমেনি জগতে কোনােকালে।
( আমি চিরকাল বলবে।) ( দয়ামায়াহীনা ভােরে )
গােউরাদ আমার সুবােধ অতি
কখনো কারাে ত করেন। ক্ষতি ;
জানিনা কেন সে রসবতী,
এভ, ভাসায়েছে চাদে নয়ন-জলে।
{ সে কি আর জায়গা পায় নাই) ( তার রসের সিন্ধুর ঢেউ তুলতে)
কেঁদে সারা হ’ল গােউরহরি,
বলেনাতাে কিছু ব্যক্ত করি ;
তাইগো আমি এত ভেবে মরি,
ও সেই, রঙ্গিনী কুরঙ্গ কি ঘটালে ।
( কিছু বুঝতে পারি না) ( সেই মায়াবিনীর মায়া)
দ্বন্দ বাধায়ে রৈলি সঙ্গোপনে,
গোউর কাদা বন্ধ করি কেমনে ;
দেবে বলে,—নি ধরি চরণে,
ওরে, মােক্ষের ধনে নিসে বলে তুলে।
( নইলে শান্ত হবেনা){ তাের সােহাগ না পেলে গােটা)
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
ভৈরো—আড়াঠেকা।
হেরগাে রাণি তােমারি কুমারী আসিল ঘরে।
দশভুজা-রূপ ধরি দশদিক আলো করে।
সঙ্গে গুহ, গণপতি, সিন্ধুসু, সরস্বতী;
সিংহ’পরে ভগবতী, রূপে জগ-মন হরে।
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডবাসী, যাঁর কৃপা অভিলাষী,
সে উমা নিকটে আসি,মা বলে ডাকে তােমারে ;
বিশ্ব-প্রসবিনী সতী, তুমিগে তঁারি প্রসূতী,
তব তুল্য ভাগ্যবতী কে আছে মা ধরা’পরে।
বারোয়া-দারা।
ভালবাসা জানিনে কেমন ।
এত করি তবু তারি পাইনেতাে মন ।
এ জীবন তার প্রয়ােজনে,
দিতে পারি সযতনে,
যদি একবার সরল-মনে করে আলাপন।
পিলু-মিশ্রখো।
একলা ঘরে রইতে নারি মন কেমন করে।
নিশিতে কু-স্বপ্ন দেখে চুমকে উঠি ঘুমের ঘােরে।
যদি পাই প্রেমিক-রতন, প্রাণ সপে তায় করি যতন,
রেখে তারে হৃদ-মাঝারে বিধিমতে যােগাইরে মন,
চিরজীবন আপন ভুলে বাধা রই তার প্রেমের ডােরে।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
খাম্বাজ-ষৎ।
সারা নিশি জেগে থেকে প্রভাতে ঘুমাল রাই,
জাগায়ােনা কঁাচা-ঘুমে ওহে নিঠুর কানাই ।
চুপে চুপে হে শ্রীহরি, স্বস্থানে কর শ্রীহরি,
লম্পট তুমি মুরারি বুঝিবারি বাকি নাই ।
আসিতে কু-সদনে, মানা তব জেনাে মনে;
সরে পড়ে। মানে মানে, শ্ৰাপদে মিনতি জানাই।
মিশ্র-শঙ্করা-একতালা।
শয়নে স্বপনে জাগরণে,
সেই মুখখানি জাগে মনে।
যে মুখের আঁখি, প্রীতি-অশ্রু মাখি,
নিরখি গিয়েছে আঁখি-পানে।'
আলােকে আঁধারে, প্রাসাদে পাথারে
যে ভাবে যেখানে রই,
দিবস-যামিনী সেই মুখখানি
ভেবে ভেবে সারা হই;
শুধু, সে মুখের পানে সুদীন-নয়নে
চাহিয়ে সঘনে কই,
“ওগাে দেখ দেখ চেয়ে,তােমারি বিরহে,
কত ব্যথা সয়ে আছি প্রাণে
দেবে-গীতিমালা
ভৈরবী—একতালা।
নন্দগােপনন্দন শ্যাম, বৃন্দাবনচারী।
রাধানন্দবর্ধন, গােবর্ধন-গিরিধারী
মদনমােহন, মােহন-বেশ,
শিখি-পুচ্ছ-পাখা- সুশােভিত কেশ,
সুচাৰু কপালে, তিলক উজলে,
বকা দুটি আঁখি,-গােপী-মন-হারী ।
শীতবসন, চিকন-কালা,
হাসরােজে দোলে বনমালা ;
চৌদিকে বেড়িয়া ও ব্রজবালা,
নবজলধরে বাচে প্রেম-বারি
চরণে নূপুর কানু নেচে চলে,
অধরে মুরলী বাজে বাধা বলে ;
নিকুঞ্জ-কাননে প্রেম-লীলাছলে,
গােপী-সঙ্গে মিলে বিহরে হরি।
T
হারি—চিমে-তোলা।
আসে যেন এখানে রায়, ওগাে ব'লে তায়।
মানে মত্ত হয়ে তারে বলেছি দুটো অন্যায়।
জানাগ্নে মিনতি ভাষে, তাৰি দুটা হাতে ধরে,
‘তােমারি বিরহে বঁধু আছে সে মরমে মরে ;
বলো, 'আজিকেরি মত ক্ষম। সে মেগেছে পায় !
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
কাফিসিন্ধু-যং।
মিটুলনা মাের জীবনের সাধ, মিছে কেন আছি বেঁচে।
ঐ, এলােকেশ সর্বনাশ, আমার, সাধে বড় বাদ সেধেছে
মনে ছিল সাধ-মাতৃচরণতলে,
থাকবে পড়ে সদাই ডাকবাে ‘মা মা বলে ;
সে সুখ-সাধে ঢেলে কালি, আমায়, সংসারী করেছে কালী,
জানিনা সে মুণ্ডমালী ভাগ্যে শেষে কি লিখেছে ।
ভীমপলশ্রী-কাওয়ালী।
বলােনা বলােনা তারে ব’লােনগাে কটুকথা।
শুনিতে অংশ তারি প্রাণে বড় লাগে ব্যথা।
সে যে মম প্রিয়তম, তারি গুণ অনুপম,
কপালেরি দোষে মম অযত্ন ঘটেছে তথা
কমিক।
কালাংড়াদারা।
দিদিলো, কে পুষেছে কালাে বেড়াল-ছানা।
আটপর প্রায় গয়লা-পাড়ায় করে আনাগােনা।
বেড়ালটা চতুর খুবি,
ঢুকবে ঘরে চুপি চুপি,
চুরি করে নিত্যি খাবে দুধ যি ননী ছানা,
শেষে, ভাড় ভেঙ্গে দে পালিয়ে যাবে, মারে তায় কোন্না।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা ।
খটু-মি-ঝাঁপতাল।
পতিতপাবনি গঙ্গে, গতি-মুক্তি-প্রদায়িনি,
ভগবতি, বসু-প্রসূতি, দুর্গতি-বিনাশিনি !
বিষ্ণুপাদ-সমুদ্ভবে, শিবানি, সৰ্বপূজিতে,
শ্বেতবরণি, ত্রিনয়নি, ব্রহ্ম-কমণ্ডলুস্থিতে,
‘পূত-সলিলা’-অভিহিতে, ত্রৈলােক্য-সুপ্রবাহিতে,
মকরাসন-সংস্থিতে, শঙ্কুশিরবিলাসিনি !
সূর্যবংশে ভগীরথ-ভূপ বহু তপােবলে,
স্বর্গ হতে তােমারে মা গাে আনিল এ ধরণীতলে,
ভক্তে কৃপা প্রকাশিলে, পাতালপুরে প্রবেশিলে,
সাগর কুল উদ্ধারিলে অশেষ-গুণ-ধারিণি।
তব তরঙ্গে অবগাহন-যে তব জল পান করে,
কলুষ নাশি,-পুণ্যরাশি ধরে কি তার চরাচরে ;
তব গর্ভে ত্যজিলে প্রাণ, তার তুল্য-কে ভাগ্যবান,
বৈকুণ্ঠে সে পায় চির-স্থান ওমা বৈকুণ্ঠ-নিবাসিনি।
জীবনান্তে জীব-দেহ ত্যজে যবে বন্ধু-সকলে,
‘যথার্থ-জননী’ তুমি আদরে তারে ধর কোলে,
তব দেহ পরশ ফলে, ধ্বংসি সে পাতকদলে,
অমরধামে চলে সবলে অমর-কুল-আরাধিনি !
পশু-পক্ষী-মীনাদি যদি হয় তব তীরে কি নীরে,
পুণ্যবলে সেও ভূতলে বন্দনীয়, নতশিরে ;
তব হীন দেশে বসতি, কোটি-করীশ্বর-নৃপতি,.
সেও মা অসঙ্গত অতি জগতে ঘােষে এ কাহিনি।
.
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
৭১
তব নাম কথনে তব দরশে নীর-পরশনে,
কোটিজন্মজ্জিত পাপ শমন-তাপ বিনাশনে ;
এ দেবেন্দ্র ভাগ্যহীনে, তারিবে কে মা তােমা বিনে,
স্থান দিও ঐ চরণে জননি! জগতরিণি !
০
পুরবী-দাদা।
চালাে দল বেঁধে আজ যমুনায় জল আনতে যাব।
এই অবেলায় কদমতলায় প্রাণের শ্যামে দেখতে পাব।
শ্যামকে আজ টেনে নিয়ে, যমুনার জলকে গিয়ে,
হাতে তার হাত জড়িয়ে নির্ভয়ে সাঁতার খেলাব ।
আমরা যত কুলবতী, পতি-প্রতি রাখি মতি,
শ্যাম যে মােদের খেলার সাথী, এ খেলায় কি কুল হারাব ?
সাহানাযৎ।
বিরহ যাতন। অতিশয়, সখি সে তো নয়।
থাকে যদি ভালবাসা, বিচ্ছেদে বল কি হয় ।
মিলনে কেবলি সখি, সে যে ঐ ‘একটি’ দেখি ;
বিচ্ছেদে সদা নিরখি তন্ময় ভুবনময় ।
আশাটি হৃদয়ে এটে, জন্ম জন্ম যাবে কেটে,
বিরহান্তে মিনেতে কি অপূর্ব সুখােদয় ।
৭২
দেবে-গীতিমালা।
পাজযৎ। .
দু’চার ডাকে সারা দিবি তুই বেটা কি তেমনি মেয়ে,
সত্যি নাকি ছেলেপাকি গেছিস কানের মাথা খেয়ে।
মা মা বলে ডাকছি কত, শুনেও বেটি শুনিনা ত ;
বেড়েছে তাের গরব এত, বাবার বুকে উঠতে পেয়ে।
মিশ্র-বসন্তু-একতালা।
মধুর রজনী, খেলে নিশামণি,
কুমুদিনী ধনি সনে।
থাকিয়া থাকিয়া, ভকে ‘পিয়া পিয়া,
পাপিয়া আপন মনে।
উঠে ফুলকলি সােহাগে ফুটিয়া,
বহে সমীরণ সুরভী লুটিয়া,
ধায় মধুকর পুলকে ছুটিয়া
কুসুমিত-উপবনে।
রজত-বরণ চাদের কিরণ
ধরণী মেখেছে গায়,
বিমল গগনে উজল নয়নে
তারাগুলি হেসে চায় ;
মরমের তলে তুলে প্রেম-গান,
ছাড়ে পিক-কুল ‘কুহু কুহু তান ;
প্রমােদে উথলে প্রেমিকের প্রাণ
বিরহী প্রমাদ গণে
দেবেন্দ্র-গতি-মালা।
বেহাগ--আড়াঠেকা।
বাণী বাঙ্গামােনা আর।
ঐ বাঁশীতে কুল-মান হ'রেছে রাধার।
কি সুরে বাজে বাঁশরী,
শুনিলে কুল পাশরি,
ছুটে আসি বংশীধারী নিকটে তােমার।
- - -
কমিক।
পিলু-পােস্তা।
কৰ্ত্তা গিয়ি দু’জনাতে মিলেছিল উনিশ-কুড়ি,
কর্তা যদি ধরতেন হুকো ত গিন্নি তখন ছুড়তেন মুভী ॥
পাগ, না পা’গ ‘বাপরে বলে,
কৰ্ত্তা অমি পড়তেন ঢ’লে ;
গিন্নিও কেঁদে ‘মাগো বলে, লােক জমাতেন ছাত্তৰুড়ি ॥
তারপর এইত উভয়েতে,
পড়লেন পৃথক বিছানা পেতে;
কে কারেই বা ডাকে খেতে, মুখ যেন ঠিক গােবর-কুড়ী
বলে যাবে তােমরা সবে,
দু’চার দিন ত এনি রবে;
খানিক পরেই মিল অভাবে ছাড়তেন দু-জন আড়িমুড়ি।
বক্তব্য উপসংহারে,
পালিয়ে যেতে পারে,
দোতলায় ঠিক সন্ধ্যার পরে শুনে হাস্যের হুড়ােহুড়ি।
৭৪
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
গােষ্ঠ-লীলা।
( মাদল-বাদ্যে সায়াহিক নগর-সঙ্কীর্তন)
গােঠে হতে এল তাের নীলমণি,
দে মা আমায় খেতে ক্ষীর সর ননী ।
গিয়েছিলেম খেয়ে কোন্ সকালা,
ফিরে আসতে হ’ল সন্ধ্যেবেলা,
বেড়েছে যে বড় ক্ষুধার জ্বালা,
ওগো, আমায় কৃপা কর মা নন্দরণি ।
( আর সইতে পারি না) ( দারুণ ক্ষুধার জ্বালা যে )
সারাটি দিন আমি রাখাল-সনে,
ফিরেছি ধেনু ল’য়ে বনে বনে ;
কতবার মা তােরে পড়েছে মনে,
আমি, ভুলিনি তাের মধুর “বাছা” বাণী ।
( হৃদে গাঁথা ছিল( মা তাের সােহাগগুলি )
আদর করে আমায় নে মা কোলে,
মুখানি মুছায়ে দে অঞ্চলে ;
দেবেন্দ্র বলে,-“তুই সকল ভুলে,
আগে, গােপালকে খাওয়াগে। ও জননি ।
( আর বিলম্ব করিনা)
{ ব্রজের রাখাল-রাজকে খাওয়াতে ”
দেবেন্দ্র-গীতি-মাল।।
৭
সাহানা-কাওয়ালী।
হরি হরি হরি বল মন।
কলিতে তারক-নাম কি আছে এমন.।
প্রেমানলে বাহু তুলে, ভাক হরি হরি বলে,
নাম-শৌর্যে অবহেলে জয়ীবি শমন |
ক্ষুধা নিদ্ৰা পরিহরি, মুখে বল হরি হরি,
হরিনাম-সুধাবারি পিও অনুক্ষণ ;
ভব-ঘূণি-পারাবারে, হরি বিনে কেবা তারে,
ভজ সত্য ভক্তিভরে সুখ-মােক্ষধন :
মি-দারা।
আমি বাবুর বাড়ীর চাকরণ
দিনের বেলায় বাসন মাজি,
রাত হলে হই রাজরাণী ।
মাইনে আমার পাঁচটি টাকা,
তাতে কি হয় মেজাজ বাঁকা,
পাঁচে শূন্য দিলে যা হয় তা ;--
এমন, গয়না কাপড় ছাড়া সেটা,
আমার, বাক্সতে মাসিক আমদানী ।
।
৭৬
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
মালকোষ—আড়াঠেকা।
মরি কি অতুল শোভা হল গােকুল-কাননে।
ভূতলে যুগল-শশী, পূর্ণিমা-শশী গগনে
শ্রীরাসবিহারী হরি, বামে রাধা রাসেশ্বরী,
কোটি-শশি-শােত ধরি বিহরিছে একাসনে।
হেরি মুখ পরস্পরে, ভাসে প্রেম-সুখ-সরে,
বাঁশরী শ্যামের করে কিশােরী বলে সনে
সখীগণ কুতুহলি, সঞ্চয়ি কুসুমাঞ্জলি,
জয় রাধাকৃষ্ণ” বলি’ যুগলে সপে যতনে।
৩০
বিষ-মিশু -একতালা।
বসিয়া বিজনে, আপনার মনে,
কত কত গান গেয়েছি।
আশার ছলনে, আকুল নয়নে,
কত পথপানে চেয়েছি।
কত গাথা-মালা গিয়েছে কায়ে,
কত সাধ প্রাণে পড়েছে লুকায়ে,
নিতি নিতি কত কুসুম-শয়ন
হশ ভাঙ্গিয়ে ফেলেছি ;-
ওগো, কোন ভাগ্যফলে, হৃদয়-কমলে,
তােমা ধনে আজি পেয়েছি।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
৭৭
কমিক।
আমি সারা বিকালটি ব'সে ব'সে এই
কবিতা-গানটি লিখেছি।
আমি প্রতি-উপহারে, তুষিতে তােমারে,
কবিতাটি এই লিখেছি।
আমি সারা বিকালটি করি নাই কিছু,
করি নাই কিছু বঁধু আর,
শুধু গালে হাত দিয়ে ভাবিয়ে ভাবিয়ে,
কবিতাটি এই লিখেছি।
তখন দাড়াইয়ে দ্বারে সুকৰুণ-রে
ডাকিতেছিল সে ভিখারী,
চাহিতেছিল গো মুষ্টি-ভিক্ষা
বার বার কত ফুকারী ;
তখন খুজিতেছিল সে সঙ্গিনীরা এসে
তাস খেলিবার লাগিয়া,
আমি সব তেয়াগিয়ে তেতলাতে গিয়ে
কবিতাটি এই লিখেছি।
কবিতাটি শুধু লেখা নয় বঁধু
এ কথা সে কথা ধরিয়া,
আছে আদর-সােহাগ প্রীতি-অনুরাগ
সার কবিতাটি ভরিয়া
আছে সবার উপর আহ কি সুন্দর
তি-সুখকর মিল গো,
ওন একবার কবিতা আমার
তোমারি কারণে লিখেছি।
০
৭৮
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
--
বিভাষ-একতালা।
ওহে পশুপতি, শঙ্করী সম্প্রতি,
চাহে অনুমতি চরণে তােমার।
তিন দিনের তরে, যাব গিরিপুরে,
পুরাও হে সাদরে বাসনা আমার।
দেখেছি নিশিতে দারুণ স্বপন,
মা আমার লাগি করিছে রােদন,
হ'য়ে পাগলিনী, বলে এই বাণী,
কোথারে ভবানী দেখা দে একবার ।”
গতিশক্তিহীন পিতা মহামতি,
হেরি আমারে লভিছেন দুর্গতি ;
তাই হ’ল অতি বিচলিত মতি,
করিতে প্রণতি পদে তাহার ।
সপ্তমী অষ্টমী নবমী বাসরে,
বঞ্চিমা জনক-জননী-গােচরে,
দশমী-প্রত্যুষে, 'ত্যজি গিরিবাসে,
কৈলাস-আবাসে আসিব আবার।
;
পাহাড়ী-দারা।
ভুলনা কথার ছলে, ব্যথার ব্যথী কেউ হবে না।
যে মনে আজ মন মজাবে, সে মনটিতে। কাল রবে না
প্রেমের সই এমনি রীতি, নূতন নূতন বড়ই প্রীতি,
তৃষা মিটলেই হবিরে “ছি”, দেখাটীউ চোখে সবে না।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
ভূপালী-কাওয়ালী ।
তারা আসিত তনয়ে কর ত্রাণ।
তপনতনয়-ভয়ে কাপে সদা প্রাণ।
জানি মা তুমি তার কৃতান্ত-দলনী,
কাতরে তাই তােরে ডাকিগগা জননি,
নিজ গুণে এ নিগুণে হও কৃপাবন।
পাতকী আমি অতি অবনী-মাঝারে,
পতিত-তারিণী মা—তুমি গাে সংসারে,
দেবেন্দ্র যাচে' তােরে চরণে স্থান ।
খাম্বাজ-যৎ।
কার তরে আর গাঁথবি মালা ওরে কালা-কলঙ্কিনি ;
বুঝে নে সার কাল এবার হ’লরে তোর কি কালফণি ॥
ব্রজের খেলা শেষ করি সে, মথরাতে গেছে মিশে,
এখন তার বিরহ-বিষে জলে মধু দিবা-রজনী।
বারোয়া-দারা।
সখি তারে ফিরায়েগাে আন্।
হেরি তার সজল-আঁখি দূরে গেল মান।
সে যে আমার হৃদয়-নিধি,
সদয় হয়ে দেছেন বিধি;
তারে ছেড়ে কভু কিরে ধীর মানে প্রাণ ।
দেবেন্দ্র-গুতিমালা ।
বসন্ত-চৌতাল।
শঙ্কর, শশিশেখর, পিনাকি, ত্রিপুরারি।
বানেশ্বর,ব্যোমকেশ, গঙ্গাধর, গিরিজাপতি,
নীলকণ্ঠ, শূলধারী ।
মৃত্যুঞ্জয়, শিব, অনাদি, প্রমথাধিনাথ,-
পঞ্চানন, বামদেব, রামগুণ-গানকারী।
=
জংলা-কাওয়ালী ।
ফিরে চাও ফিরে চাও, মাখা খাও কথা কও,
কেন র ও অধোবনে।
অগাধ উদাসভাবে, আছ সখা কি অভাবে,
কি ভাবনা ভেবেছ মনে।
নয়নে প্রেমের ছবি মুছায়ে কে দিল হয়,
অধরে হাসির রেখা কেন না প্রকাশ পায়,
বিষাদ-জলদ-কাশি, বল কোথা হতে আসি,
উদিল হৃদয়-গগনে
ঐ যে হাসিছে শশী কুমুদিনী-সঙ্গে,
অই হের তরু’পরে বসিয়া প্রমােদভরে
বিহগ-বিহগী গাহে বঙ্গে;
কেন তবে হৃদি-সখা তুমি হে এত নিদ,
প্রফুল-কমলে হেরি অলি কি নীরবে রয়,
এস সখা এস প্রাণে, প্রেম-অমি-দানে
তােমারে তুষিব যতনে ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
৮১
ইমনদাদ ।
ঘরে আর মন সরেনা এতো বড় বিষম-জালা।
জানিনে গােপনে কি গুণ করেছে চিকণকালা ।
হেরিতে সে কালশী, কেন এত হই উদাসী,
দু’বেলা তাই ছুটে আসি জল আনিবার করে ছল।
গৃহ-কাজে ঘুরি ফিরি, মনে জাগে বংশীধারী,
ইচ্ছা হয় সকল ছাড়ি সার করি এই কদমতাল।
কমিক।
মাইরী মাইরী মাইরী মালী তুই বড় পাগল ।
আরে পাগলি তাের মুখটি দেখে,
কার মনে না লাগে গেল।
তুই কেন বল কথায় কথায়,
ধরেথাকিস্ কামিনীর পায় ;
এমন প্রাণপ্রতিমার মন মেলাতে
বল কে কি না করতে চায়,
ওরে, ঐ জন্যে ত রাধার পায়
ধরেছিল নীলকমল ।
তুই কেন নির্লজ্জ এমন,
ফিরিস নারীর পেছন পেছন ;
এমন অমূল্য-ধন ছেড়ে কি আর
স্থির থাকে কার মন,
ওরে, সাধে কি শিব শ্যামা-ধনে সাজায়েছেন বক্ষস্থল।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
গােউর-সঙ্গীত।
( মাদল-বাদ্যে নাম-সীৰ্ত্তন)
প্রেম-বিভােরা গােরা নেচে নেচে যায় ;
দেখবি যদিগাে তাের আয় আয় আয় ।
অধরে আধ’ আধ’ ‘রাধা বুলি,
নাচে গােরা দুটা বাহু তুলি,
পথে যেতে কেঁদে পড়ে ঢলি,
গােরার, নয়ন-জলে ভাসে নধর কায়।
(তাের মুছায়ে দিসে আয় )
( চাদ-গগাউরের নয়ন-জল মুছায়ে দিসে আয় )
(গােউর কেঁদে সারা হ’ল, মুছায়ে দিসে আয় )
( চঁাদ-গােউরের দবদন মুছায়ে দিসে আয় )
(বসন-অঞ্চলে জল মুছায়ে দিসে আয় )
চরণে রুনু রুনু নূপুর বাজে,
বন-ফুলমালা গলে সাজে ;
সঙ্কীৰ্ত্তনে হরি-ভক্ত-মাঝে,
কিবা, ভাবের ভরে গােরা ধরা লুটায়।
(তােরা কোলে তুলে নিসে আয় )
(গােউর গড়াগড়ি যায়, কোলে তুলে নিসে আয় )
সােনার হাতে সােনার কায় কোলে তুলে নিসে আয়)
(ধূলা ঝেড়ে গােউরনে কোলে তুলে নিসে আয় )
(ও তের, সুন্দর কোল আলাে করে গােউর কোলে নিসে আয়)
( চাদ-বদন চুম্বন করে গােউর কোলে নিসে আয় )
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
( আদর করে সােহাগভরে গােউর কোলে নিসে আয় )
( ভাবের ভাবে মিশিয়ে নিয়ে গােউর কোলে নিসে আয় )
উজ্জল ঝলমল চাচর কেশ,
ভুবন-মনােহর-গৌর-সুবেশ ;
দেবেন্দ্র বলে, এ যে সেই পরমেশ,
আজি, দ্বারে দ্বারে যেচে প্রেম বিলায়।
(তাের নিসে আয় নিসে আয় )
(গৌরাঙ্গ প্রেম বিলায় নিসে আয় নিসে আয় )
{ দ্বারে দ্বারে প্রেম বিলায় নিসে আয় নিসে আয়
( বিনামুলে বিমল-প্রেম নিসে আয় নিসে অয় )
( গৌরাঙ্গের প্রেম তােরা নিসে আয় নিসে আয় )
( যত চাবি ততই পাবি নিসে আয় নিসে আয় )
( অফুরন্ত প্রেম তােরা নিসে আয় নিসে আয় )
( এমন সুযােগ আর হবেনা নিসে আয় নিসে আয় )
.( হৃদয়-ভাণ্ডার পূর্ণ করে নিয়ে আয় নিসে আয় )
(প্রেমময়ের প্রেম তােরা নিসে আয় নিসে আয় )
খাম্বাজ-কাওয়ালী ।
ধাশী মজালে আমায়।
রাধা রাধা বলে কেন ডাকে উভরায় ॥
ত্যজে এত ব্রজবাসী, রাধা বলে বাজে বাঁশী,
হব কি গাে বনবাসী বাঁশীর জালায়।
-
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
ভৈরবী-একতালা।
এবার তুমি জানবে শ্যামা আমি তােমার কেমন ছেলে।
ধ’রবে। জোরে চরণ দুটি, ভুলবােনা আর ভয় দেখালে।
বিবেকেরে করে সাথী, খুজবাে তােরে দিবারাতি,
জেলেছি মা জ্ঞানের বাতি আঁধারে লুকাবি বলে ।
বেঁধে শক্ত ভক্তি-পাশে, বন্দী ক’বুবাে হৃদিবাসে,
মন প্রহরী রাখবে শেষে, পলাতে পারবিনা ছলে ;
ইহ-লীলা সাঙ্গ করে, যাব যেদিন অপার পারে,
তরণী বাহিয়ে তােরে পার করাবে ভবের জলে
;
সিন্ধু-খাম্বাজ-দারা।
সখা দেখে যেন রেখো মনে।
দিবস-নিশিতে, তৃষিত-আঁখিতে,
চেয়ে র’ব পথপানে ।
শূন্য করিয়া হৃদি,
তুমি, চলিলে হে গুণনিধি ;
সুখ-সাধ যত, জনমের মত,
যেতেছে তােমারি সনে ।
তুলিয়া বিরহ-তান,
বিরলে বসিয়া, ও রূপ ভাবিয়া,
সতত কঁদিবে প্রাণ ;
না মরিতে যেন দেখা দিও এসে,
এ মিনতি ও চরণে।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
৫
কমিক।
আমি নিত্য যদি পাঁঠা খেতে পাই গাে ।
বে, এ ভবেতে রাজা হতে কি জন্যে আর চাই গো ।
এই, প্রত্যহ দিবসে রেতে,
লুচি কি ভাতের সঙ্গেতে,
কি তৃপ্তি সে আহারেতে কেমনে জানাই গাে।
এই, ঝােলে আর মাসে খাঁটী,
পরিপূর্ণ একটি বাটী,
বড়-রকম না হলে সেটা মনকে কি বুঝাই গো;
সকল-রকম মসলা দিয়ে,
অতিরিক্ত গাওয়া ঘিয়ে,
সু-পাকের সুগন্ধ পেয়ে মুগ্ধ হয়ে যাই গাে॥
এই, শুদ্ধস্থানে সুখাসনে
বসিয়া একাগ্র-মনে,
সরাম্ সরা শব্দ যবে সঘনে উঠাই গাে,-
হাড়ে হ’তে মাংসগুলি,
কত চেষ্টায় দন্তে তুলি,
কচি দেখে অস্থিগুলি—তাও কি চিবাই গো ।
এই, ভােদন অবসানে প্রায়,
হলে সে গলায় গলায়,
বাটী থেকে মেটে-মাংস বেছে বেছে খাই গাে ,
ঝােলটুকু শেষ করি পান,
জল-পান, গাত্রোখান,
ঢেকুর তুলে মহন্ত উদরে বুলাই গো।
৮৬.
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
ইমন-আড়াঠেকা।
এত দিন পরে আজি ‘মা’ বলে কে এলি ঘরে।
এলি কি মা উমারাণি, শিব-হৃদি শূন্ট করে ।
এস কাছে হৈমবতি, হের মায়ের দুর্গতি ;
বেঁচে যে আছি সম্প্রতি, কেবলি দেখিতে তােরে।।
সবে মাত্র তুমি তারা, আমার নয়ন-তারা,
তােমার বিচ্ছেদ শিবে সহে কি অন্তরে;
অকুল সিন্ধু-জীবনে, হারায়েছি পুত্ৰধনে,
কে আছে মা তােমা বিনে ‘মা’ বলে ডাকিতে মােরে
E
আশােয়ারী-একতালা।
যেওনা যেওনা যেওয়া হে বঁধু, রাখনা রাখনা কথা।
সরল কোমল অবলার প্রাণে দিওনা দিওনা ব্যথা।
আজি এ মধুর মিলন-যামিনী,
কোথা যাবে মােরে করে অনাথিনী,
কাদায়ে কামিনী ওহে গুণমণি কি সুখ পাইবে সেথা।
হাসে শশী-গাহে পাপিয়া-সকল,
ফুলে ফুলে অলি লুটে পরিমল,
এ নৰ-বসন্তে বিরহ-অনল জেলেছে বল কে কোথা ।
এস ফিরে এস হৃদয়-শয়নে,
হের হের সখা করুণা-নয়নে,
প্রাণ মন মম জীবনে মরণে তােমার চরণে গাঁথা।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা। ৮৭. খাম্বাজ- গােকুলে আকুলা তুমি কে কামিনী কুল-বালা, কাদিছ যমুনা-কুলে হাতে ল'য়ে ফুল-মালা । উদাস উন্মাদ প্রাণে, চাহিয়া মথুরা-পানে, ভাকিছ করুণ-তানে কোথা হে প্রাণের কালা । তুমি কি ভানু-নন্দিনী, কানু-মন-বিনােদিনী, হারায়ে হৃদয়-মণি, পেতেছ দারুণ জালা । ভৈরবী-দাদর। আয় আয় আয় আয়রে নেমে আয়রে সােনার চাদ। তোরে ধরবাে বলে সাধ গিয়েছে, ওরে, তাই নাকি পেতেছি ফাদ । হৃদয়াসন পেতে দেবো, ক্ষীর-ক্ষীরসে খেতে দেবে, ফুলের মালা গেঁথে দেবে, বাটাভরে পান যােগাবো, তােমায় পেলে আপন ভুলে ভেঙ্গে দেবাে মনের বাঁধ : হাম্বির-যৎ। মন ফিরে দিয়ে চলে যায়, সখি বল তায়। ছলে বলে অবলার মন কেন সে নিয়ে পালায়। মন দিয়ে মন পাবার তরে, সঁপেছি মন তারি করে, ইষ্ট ভেবে নিষ্ঠাভরে প্রণামী ত দিইনি পায়।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
ভীমপলশ্রী-একতালা।
জয় গােবিন্দ, গােকুলানন্দ, গোপাল, গােপনন্দন!
জয় দামােদর, পরমেশ্বর, সুরাসুরনরবন !
জয় যদুবংশ-অবতংস, কৃষ্ণ, কংস-নাশন ;
জয় দেবকীসুত, পরমাদ্ভূত, অচ্যুত, গরুড়াসন!
জয় জ্যোতির্ময়, যশােদাতনয়, ভাজভয়ভঞ্জন ;
জয় গােবর্দ্ধন-গিরিধারী, যােগীহৃদয়রঞ্জন!
জয় গােপীজনবল্লভ, দেব-দুর্লভ, ভবমােচন ।
জয় প্রবল-বলরামানুজ, শ্যাম, কমললােচন!
জয় দৈত্যদর্পহারী, হরি, কালীয়দপদমন ;
জয় হৃষিকেশ, বালক-বেশ, রমেশ, রাধারমণ ।
জয় প্রেমাকর, পুরুষবর, পীতাম্বরছাদন ;
জয় বৃন্দাবন-বনবিহারী, মােহনবংশীবাদন!
জয় বাসুদেব, দিব্যমূৰ্ত্তি,-মনােভব-মনক্ষোভন ;
জয় ভৃগুমুনি-চরণ-চিহ্ন-বিনােদ-বক্ষশােভন !
জয় সচন্দন-তুলসী-পূজিত, জিষ্ণু, জগত-কারণ ;
জয় মুকুন্দ, সচ্চিদানন্দ, দীন-দেবেন্দ্রতারণ!
;
পাহাড়ী-দাদর।
তুলে নাও প্রেমের ছবি, রাজা রবি যাচ্ছে ডুবে ।
ছড়ায়ে রজত-কিরণ চাদটি কেমন উঠছে পূবে ।
ভানু-হারা কমলিনী, শুষ্ক-মুখী বিমলিনী
শশীর হাসে কুমুদিনী হাসিটি মিলায় নীরবে ।।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
ভৈরবী-একতালা।
তাই লােকে আমায় পাগল বলে।
আমার, পাগল বাবা, পাগলিনী মা,
আমি তাদের সাধের ছেলে।
বাবা আমার পাগল ভােলা,
ভূত-প্রেত ল'য়ে করেন খেলা,
সিদ্ধি-পানে হন্ বিভােলা,
পড়ে রন্ মা'র চরণ-তলে ।
মা যে আমার পাগলী-মেয়ে,
নাম শুনে যম পলায় ভয়ে ;
ক্ষ্যাপা বেটী ন্যাংটা হয়ে,
ধ্বংসে রণে দানব-দলে ।
মা-বাপের রীত সন্তানে পায়,
পাগল আমি সেই জন্যে হায় ;
পাগল-ছেলে বলে মা-বাবায়,
স্থান দেবেন চরণ-কমলে।
কমিক।
পুরবী—দারা।
একুল এ সঁজবেলাতে যমুনাতে যাসনে ধনি।
পথে আছে আড় পেতে সেই নন্দঘােষের গুণমণি।
জানিসনাকো ও সুন্দরি, বুক বেড়েছে বড় ভারি,
জমিয়ে দেবে তামাসা ভারি—‘আঁচল ধরি টানাটানি'।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
মি-দাদরা।
হরি বলে ডাকলিন মন, মিছে কেন ভবে এলি।
আমার আমার করে কেবল সত্য-কথা ভুলে গেলি।
হরিনাম-সুধার সু-তার, রসনাতে বুঝলিনা আর,
বিষয়-মদে বিভাের হয়ে হুস-চেতনের মাথা খেলি।
যে-হরিনাম করি সাধন, সৰ্ব্ব-সিদ্ধি লভে সুজন,
ভুলে রইলি সেই হরিধন, কেনরে মন এ জ্ঞান পেলি ।
আর কতদিন থাকবি ভবে, কবে ও-পার যেতে হবে,
হরির চরণ”-তরীখানি ধরে ব’সনা বেলাবেলি ।
মি-কানাড়া-একতালা।
বলি বলি করে মরমের কথা,
সরমে কেবলি বেধে যায়।
ভাবনা আবার, সে কথা শ্রবণে,
যদিগো সে মনে ব্যাথা পায়।
এ নিখিলে যেন সেইগাে আপন,
সে বিনে যেনগগ বিফল জীবন ;
কেন যে জানিনে, হৃদি প্রাণ মন,
সব ছেড়ে শুধু তারে চায় ।
কবে তারে মম অতীত-বেদন,
বলিতে বলিতে ঝরিবে নয়ন;
কত দিনে হবে সফল জীবন,
হৃদয়-মাঝারে রেখে তায়।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
ইমন-কল্যাণ—ইংরী।
মােহন বাঁশী বাজায়ে কাল। একি ঘটালে জ্বালা।
মজালে মজালে যত গােপেরি বালা।
সখিরে হ’ল একি দায়,
কদম্বতলায় বাঁশী ঐ শুনা যায় ।
কোন্ সে নৃতন তানে কি সুর ও গায়,
অমিয় প্রেম-গান, মরমে জাগায়,
বিবশ বিমােহিত মন, সেখানে মিলিবারে চায় ;
বল সখি কুল-মান কেমনে রাখে অবলা
ভীমপলশ্রী—কাওয়ালী ।
ভালবাসি বলে আসি দেখিতে তােমায়।
তুমিযে বাসিবে ভাল, আসিনাযে সে আশায়।
শশিমুখে মৃদু-হাসি, প্রাণে পরায়েছে ফাসি,
তারি টানে ছুটে আসি বাধা-রাশি ঠেলি পায় ।
বারোয়া—দাদা।
কেমন করে ফিরাই তারে বল্।
সে যে কত সেধে গেল ধরে চরণতল।
তখন মত্ত হয়ে মানে, তাড়ালি তায় অপমানে,
এখন তারে আনি এখানে করে কিসের ছল।
সারা বিশ্ব খুজে এলে, সে রত্নহার কোথায় মেলে,
ফিরাব এ কল-কৌশলে, নইলে সব বিফল ।
ক
৫ দেবেন্দ্র-গীতিমালা। রাগ—আড়াঠেকা। নমাে নমাে নারায়ণি ! মাতঃ শ্রীজগপালিনি। কমলে, কমলাঙ্গিনি, কমল-দল-বাসিনি। ঈশ্বর, বিশ্বপূজিতা, সৰ্ব্ব-রত্ন-বিভূষিতা, বিষ্ণু-বক্ষস্থল স্থিতা, সুখ-মােক্ষ-প্রদায়িনী। কমিক। ( আগমনী ) পিলু-মিশ-পােস্তা। উম। আমার এলে এবার আর তারে দিবনা যেতে ; মা আমার কৈলাসে গিয়ে ভাল-মন্দ পায়না খেতে। সকালবেলাতে উঠি, নাই সেখানে চা-পাউরুটি, ধৃতরা-বীচে সিদ্ধি ঘুটি খেয়ে রয় মা নেশায় মেতে । অন্নাভাবে শুনি সেথা, খায় দু’জনে বেলের পাতা, বলবে কি আর মুণ্ড-মাথা, সয় কি এত বালা-ধেতে। জামাই নাকি বৈষ্ণব ভারি, নিরামিষ আহার তঁারি, পাঁঠার মাংস তাদের বাড়ী ওঠেনা কোনাে কালেতে ॥ লুচি মণ্ডা ক্ষীর ছানা আর- পাওয়াব তায় কতই খাবার ; এই দেবেন্দ্র’-ছেলে যে তার, রাখিস রাণি প্রসাদ পেতে
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
১৩
খাম্বাজ-যুৎ।
বুঝে সে নটরাজে মন প্রাণ সঁপে দিয়ে,
কি দশা তাের হ’ল প্যারি দোরে তাই দেখ ভাবিয়ে ।
সে নিঠুর কালাচাদে, ভালবেসে কে না কঁদে ;
ব্রজে এখন কঁাদগো রাধে কলঙ্কিনী নামটি নিয়ে।
মিশ্র-ইমন—একতালা।
আসি আসি বলে, কোথা যাবে চলে,
কার তরে এত কেঁদেছে প্রাণ।
সােহগের হারে বেঁধে কে তােমারে,
এ অধীরে সখা দিয়েছে টান।
আজি এ মধুর চাদিমা-কিরণে,
মুখখানি কার পড়েছেগাে মনে,
কে কোথায় শুয়ে বিরহ-শয়নে,
মরম-বেদনে গেয়েছে গান।
হৃদয়-বিতানে আসন পাতিয়া,
পথপানে চেয়ে কে আছে জাগিয়া ;
কে তব চরণে মিলন মাগিয়া,
আঁখি-নীর-মালা করেছে দান।
কোন্ অভিনব কুসুমেরি বাসে,
পরাণ আকুলি উঠেছে পিয়াসে;
কোন্ উপবন প্রেমেরি বাতাসে,
মরমে তােমার তুলেছে তান ||
।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
পরজ-কাওয়ালী ।
কালী কালভষনাশিনী!
কাতরপালিনী, কঙ্কালমালিনী,
মহাকালহৃদিবিলাসিনী !
কৃষ্ণা, কৃপাময়ী, কৃপাণধারিণী,
কামদা, কামরূপা, কামান্তকারিণী,
কাননচারিণী, কৈবল্যদায়িনী,
কল্যাণী, কৈলাসনিবাসিনী।
কালী, কালদার, করালবদনী,
কৌতুকী, কলাবতী, কুমতিঘাতিনী,
কমলা, কলাধারা, কোমল-কলেবরা,
কলি-কলুষহরা, সুহাসিনী,
কাত্যায়নী, কামা, কুমারী, কৃশােদরী,
কাদম্বরীপ্রিয়া, কিশােরী, কাশীশ্বরী ;
কাল আগত দেখি, কৌশিকি তােরে ডাকি,
কিরে কর কৃপা কপালিনি!
খাম্বাজ-মধ্যমান।
বিরহ যাতনা সখি বল কত স’ব আর।
না বুঝে পরেছি.গলে পিরীতি-কুসুম-হার।
কে জানে সে ভালবেসে, কাদায়ে পালাবে শেষে,
তাহারি বিচ্ছেদ-বিষে প্রাণে বাঁচা হ’ল ভার।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
মিশ্র-ইমন-একতালা।
আমরি আমরি, শােন্ সহচরি,
শ্যামের বাঁশরী বেজেছে ওই।
তুলিয়া সুতান, টানে মন প্রাণ,
বল আর ঘরে কেমনে রই।
সাজ সাজ সাজ, রাথু গৃহ-কাজ,
ঠেলে দে তরাস-ঘৃণা-লােকলাজ,
যথা হৃদিরাজ করিছে বিরাজ,
ত্বরা গিয়ে তথা মিলিত হই ।
সারি সারি সারি এস কুলনারি,
কুলে থেকে কেন প্রাণাকুলে মরি,
গােকুলের কুল দূরে পরিহরি,
অকূল-সখার শরণ লই।
হরিযৎ।
গেয়েছিল কবে সে যে প্রণয়-পুলকে ভাসি।
বিমােহন সুধাতানে বলেছিল ভালবাসি।
বিছায়ে ললিত ভাষা, দিয়েছিল কত আশা,
চাহিতে নয়ন-কোণে, ফুটেছিল মৃদু-হাসি।
সে সুধাংশুআশে রয়ে, কত নিশি গেল বয়ে,
আজো সে তো উদিলনা হৃদয়-আকাশে আসি ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
পিলু-যৎ।
সকলি দিয়েছ তুমি, কিছুতে অভাব নাই ;
তােমারি অভাবে সখা মনে সদা ব্যথা পাই।
চাহিনাকো রাজধনে,
দারা-পুত্র-পরিজনে ;
শুধু তব চরণে শরণ লভিতে চাই।
দীনবন্ধো দয়া করি,
এস মম হৃদি’পরি ;
বিমােহন রূপ্প হেরি চিরাননে মিশে যাই ।
ভৈরবী-একতালা।
আয় আয় প্রাণপ্রিয় পাখী, তােরে প্রাণে প্রাণে মিশে রাখি।
মােহন-মাধুরী ছবিখানি তােরি, হেরি, অনিমেযি আঁখি।
সাজানাে কুঞ্জ আঁধার করিয়া, গিয়েছিলি পাখী কোথারে চলিয়া,
ছিলি এতদিন আমারে ভুলিয়া, কাহার সােহাগে থাকি ।
কত নিশি-দিন কত মাস কত বরষ গিয়েছে বাহিয়া,
অঞ্চলে মুছি আঁখিজল কত পথ-পানে আছি চাহিয়া ;
জীবনের চির-সাথীটি আমার, হৃদি-বিনােদন হীরকেরি হার,
আজি তােরে পাখী পেয়েছি আবার, দিওনারে আর ফঁাকি ।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
৯৭
বেহাগ-আড়াঠেকা।
তারে বলেন। কালাে।
কাল যে নয়নে বড় লেগেছে ভালাে।
সে যে বিশ্ব-প্রিয়তম,
দৃশ্য অতি মনােরম,
সে রূপে অন্তর মম করেছে আলো।
কমিক।
স্ত্রী। ছি ছি মরণ নাইকো তাের।
কার পিরীতে পােড়ামুখাে কবলি নিশি ভাের।
পুঃ দেখ, মুখ সামলে কইবি কথা,
স্ত্রী। কেন, তুই কি কাটুবি মাথা;
পু। এখনো বলছি চুপ,
} ।
বলবে আমি খুব ;
পু। দেখবি তবে,
স্ত্রী। কিটি খাবে ।
পু। আয় দেখা যাক কার গায় কত জোর,
চলনা আজকে খ্যাংরার চোটে
ভাঙবাে হাড়-পাঁজোর।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
মানন।
{ মাদল-বাদ্যে সঙ্কীৰ্ত্তন-গান )
কেন রাধে এত করেছ মান,
এত সাধি তবু সেই সে সমান ।
ক
আসতে বিলম্ব কিছু হয়েছে না হয়,
তার অন্যে এতটা করা ঠিক নয় ;
করতে হয়, কিশােরি যেটা বয়-বয়,
তােমার, হৃদয়খানি দেখছি বড়ই পাষাণ।
{ একটু দয়া কি হ’লন? ( আমায় কাতর দেখে }
বল যদি তুমি, কি করবাে তার,
তােমা বিনে রাধে জানিনে আর ;
বিকায়েছি আমি প্রেমে তােমার,
ওগাে, তােম। ভিন্ন কিছু চায়না যে প্রাণ।
(তুমি অকারণ দুষেছ) ( যত মন্দ-লােকের কথা শুনে )
তােমারি আশে রাই ব্ৰজপুরে,
মাঠে গােঠে বনে বেড়াই ঘুরে ;
কত অনুরাগটি হৃদে পূরে,
আমি, বাঁশীর সুরে করি রাধা-নাম গান।
(এ আর কে না শুনেছে }(আমার রাধা-নামে সাধা বাণী )
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
;
কৰ্ম্ম-ফেরে যদি ঘটেছে দোষ,
ক্ষমা কর রাধে ত্যজ এ. গােয়
একটা কথা ক'য়ে কর সন্তোষ,
আমার, মৃতদেহে কর জীবনটি দান।
( আমি, মরে যে গিয়েছি ) ( তােমায় বিরূপা হেরে )
চাইলেনা ফিরে,-তবে মানেরি দায়,
এই নাও রাধে তােমার ধ’রলেম গাে পায় ;
দেবেন্দ্র বলে-“হরি করলে কি হয়,
ভবে, তুমিই করলে নারীর পায় ধরা বিধান।
( এইবার সব মানিনীই ধরাবে ) ( কেবল তােমার উপমা দিয়ে )
,
বারোয়দারা।
।
কিনে নে রঙ্গীন ফুলন-তেল।
টাটকা-ফুলে তৈরী করা, নয়কো এ যে ভেল,
এক টাকা দাম, শিশির সুঠাম দেখে নে লেবেল ।
মিঠি মিঠি গন্ধেতে ভরা,
মাখলে বেজায় ঠাণ্ডা রাখে প্রাণ হু হু করা
আবার, খােসবে পেতে দিনে রেতে খুসি থাকবে দে।
মনে যাদের ঘাের-ঘেষাঘেষি,
মান-অভিমান নিয়ে যাদের জোর রেষারেষি,
এতে, দেখ বি কেমন মেশামেশি করে দেবে মেল ।
১০০
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
ললিত—আড়াঠেকা।
কি হবে দীনের গতি, দিন তাে গেল মা চলে
ভাবিতেছি অবিরত দাড়ায়ে ভবের কূলে।
সংসার-সুদুর-দেশে, ব্যবসা করিতে এসে,
আপন কম দোষে হারায়েছি লাভে মুলে ।
যেতে হবে নিজ-পুরে, অকূল-জলধি-পারে,
কেমনে তরিব তারা দুস্তর ভব-সলিলে ;-
নাহি মা কোনো সম্বল, ভরসা আছে কেবল,
বিতরি চরণ-তরী পরপারে নিবি তুলে
মিশ্র-ইমন-দারা।
পুঞ্জে পুঞ্জে কুসুম-কুঞ্জে গুঞ্জরে অলি-কুল,
কোকিল কুহু ডাকছে, উহু প্রাণ করে আকুল।
ফুর ফুর ফুর মলয়-বাসে, কতই কথা মনে আসে,
আবেশেতে হৃদয় হ'তে খসে যায় দুকুল।
পিউ পিউ পিউ কানে বাজে পাপিয়ারি তান,
প্রেমিক-প্রাণে জাগিয়ে আনে মধুর মিলন-গান ;
ভুবন-ভরা চাঁদের হাসি, লজ্জা-শরম দেয় গাে নাশি,
বঁধুর তরে কেমন সখি মনটি হয় ব্যাকুল
* :
দেবে-গীতিমালা।
১•১
পাহাড়ী-দাদরা।
একলা এই অবেলা যমুনাতে গেলেম কেন ?
যেতে যেতে বনের পথে কালার দেখা পেলেম কেন ?
লােকে তারে বলে কালাে,
রূপে তার জগত আলো,
আঁখির পানে চেয়ে ভালাে লাজের মাথা খেলেম কেন ?
কত গৰ্ব এনে প্রাণে,
গেলেম যে কত সাবধানে,
সে নিঠুর কালার চরণে মন হারায়ে এলেম কেন?
কমিক।
2
পিলু-পােন্তা।
ছিল একটা কালাে কুকুর
চোখ দুটো তার কটা কটা ;
কান ঝটাপ করতো সদাই,
তার যে ছিল নামটি ‘লটা।
ডাকলে তারে লটা বলে,
নেজুর নেড়ে আসতে চলে,
শুয়ে পড়তে পায়ের তলে,
সাঙ্গ এই ত আমার কথা।
১০২:
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
কেদারা-কাওয়ালী ।
কে তুমি দশভুজা,-মগেশ-ভবনে,,
দাড়ায়ে এলােকেশে মৃগেশ-বাহনে ?
রাজরাজেশ্বরী,ষােড়শী, সুন্দরী,
সশস্ত্রে সজ্জিত দনুজ দলনে ॥
দক্ষিণে কমলা,—ত্রিলােক-পূজিতা
ভাগ্য-রূপিনী সরােজে রাজিতা ;
কাৰ্য-সিদ্ধিকর-দেব লম্বােদর,
অধিষ্ঠিত তব অভীষ্ট সাধনে।
বামে বাগীশ্বরী,-বিজ্ঞান দায়িনী,
বিনোদ বীণা-গীতে বিশ্ব-বিমােহিনী ;
শিখি-পৃষ্ঠ-রুহ-শক্তিরূপী গুহ,
সঙ্গে সমাসিত প্রসন্ন-বদনে।
মহাদেব-আদি-ৱিদিব-দেবতা,
মহিষ-রণে করে তােমার সহায়তা ;
ভীষণ রিপু-ভয়ে-ভীত-চিত হয়ে,
দেবেন্দ্র শরণ ল’তেছে চরণে।
এত আশা ভালবাসা ভুলেছ যে সমুদয় ;
একেবারে এত করে অদেখা কি হতে হয় ?
দিনান্তে চোখের দেখা, তাও কি পাব না সখা,
কি দোষে হয়েছি দোষী বলনা হে নিরদয় ?
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
ভৈরবী-একতালা।
ওগাে সখি, একি রূপ হেরি ।
অতি অপরূপ,
কিরূপে স্বরূপ,
বর্ণিব ও রূপ মাধুরী।
নীরদ বরণ,
ত্রিভঙ্গ গঠন,
করেতে মােহন-বাঁশরী,
আঁখি দুটি বাঁকা,
শিরে শিখি-পাখা,
‘রাধা নাম লেখা তদুপরি ।
চঁচির চিকুর,
চরণে নূপুর,
পীত-বাসে কটি আবরি,
অলক কপালে, বনমালা গলে,
রূপে ঝলমলে ব্রজপুরি ;-
মুরলী অধরে, বাজে বারে বারে,
“কৃপা কর মােরে কিশােরি” ;
ও রূপ-সাগরে,
জনমের তরে,
মজিল আমার মন-প্তরী ॥
পুরবী-দাদর।
ছাড়াছাড়ি করে রে প্রাণ খুটিনাটি তুমিই বাড়ছে।
আমিতে। ভাবি মনে আমার তুমি তেমনি আছে।
আসা-যাওয়া নাইকো বলেভালবাসা যায় কি চলে,
বুঝবে আর কিছুদিন হলে, এখন যে নূতন পেয়েছে।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
ভীমপলশ্রী-একতালা।
শ্বেতশতদল’পরে বিহরে শ্বেতবরণী।
শ্বেতাম্বর, খেত: রত্ন-অলঙ্কারা,
পীতাম্বরধর-ঘরণী ॥
শ্বেতাঙ্গিনী শ্বেত সুধাকরে জিনি,
পদ’পরে শােভে শ্বেত-সরােজিনী,
শ্বেত-সচন্দন-পুষ্প-পূজিনী,
শ্বেতবীণাধারিণী,
শ্বেতগলে দোলে শ্বেত-ফুলহার,
শিরে শ্বেত-চূড়া সৌন্দর্যের সার,
শ্বেতাঙ্গ-কিরণে দূরি অন্ধকার,
শ্বেতাঙ্গ ধরেছে ধরণী ।
মিশ্র-ইমন-কাওয়ালী।
ভুলিতে বলােনা সখি, ভুলিব কি তারে গাে?
একেছি যে তারি ছবি মরম-মাঝারে গাে ।
আসে বা না, আসে কাছে, বাসে বা না বাসে ভালো,
সে প্রেম-মূরতিখানি হৃদয় করেছে আলে;
ভাবিলে সে রূপরাশি, চির-সুখ-সরে ভাসি,
তারি ধানে হাসি-হাসি যাব পরপারে পাে॥
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
কমিক।
সই সই সই সইলো মােদের কাপড়গুলো কই
দেখেছি কদম-ডালে বসে কে ওই ।
করলে কি ওই কা’ণ্টা ছোড়া, নাইকো বুঝি উওর ঘােড়া,
রজ ভেবে আগাগোড়া, আচ্ছা অবাক হই ।
কখন যে কাপড় নিয়ে, বসেছে ডালকে গিয়ে,
মমাদের পানে চেয়ে চেয়ে দেখেছে ভালই।
যমুনায় নাইতে এসে, সরম-ভরম গেল ভেসে
কাণ্ড শুনে লােকে হেসে কবে লো হৈ-চই।
ওরে ও লক্ষ্মীছেলে, কাপড়গুলি দাওনা ফেলে,
দেবাে তােমায় ঘরকে গেলে ক্ষীর নবনী দই ।
কোথা থেকে জুটলাে জ্বালা, মজালে সই গােপের বালা,
কতক্ষণ এই অবেল জলে মগন রই ॥
আজকে সই যদি তরি, এমন কাজ আর কি করি,
ছোঁড়াটাকে সহচরি কি করে ভুলই ।
শঙ্করা-দাদরা।
চ'লে যাব আপন মনে, চাইব না আর কারাে পানে।
মনের কথা প্রাণের ব্যথা রাখবাে গােপন মনে প্রাণে
পিরীতি-কুসুম-হার, গলে কভু প'ৰ্বোনা আর,
হৃদয় হ’তে ভালবাসা দূর করে দিব যতনে।
আদর-সােহাগ-ছলে, ভুলবনা আর কোনােকালে ;
পরের প্রাণে প্রাণ দে ঢেলে ফিরব না আর প্রমােদ-বনে
•
১০৬
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
গােউর সঙ্গীত ।
( ঝুমুর )
ওগো তােরা দেখবি যদি আয় গাে।
মুখে, হরিবােল বলে, দুটি বাহু তুলে,
আমার, গােউর নেচে যায় গো ।
আমরি কি রূপের ছটা,
সাজায়েছে শচীমাতা তায় গাে,
কিবা, চাচর-চুলে মুক্তা-গাঁথা-চূড়াটি মাথায় গাে।
নেচে নেচে চলে যেমন,
সােনার নূপুর বাজে কেমন পায় গাে ;
গলে, ফুলের মালা হেলাদোলা ভুবন-মন তােলায় গো।
কলিতে পাপপূর্ণ ধরা,
অবতীর্ণ আমার গােরারায় গো,
সে যে, জীব তরাতে পথে পথে হরিনাম বিলায় গাে॥
নাচে গােউর অনুরাগে,
ধুলা কত উড়ে লাগে গায় গাে;
আবার, সাঙ্গপাঙ্গ করি সঙ্গ কি রঙ্গে নাচায় গাে ।
কি কাজে সব আছি যত,
গােউর নাচাদেখলি না ত হায়গো ;
দ্বিত, দেবে আর ডাকবে কত, তার কি এত দায়' গাে৷
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
১০৭,
ভৈরবী-একতালা।
খুব হয়েছে আবার কেন, বাবা যে মা সাবার হল।
কি রণে মেতেছিস্ বেটি, মা তােমার এ রঙ্গ ভাল।
জগন্মাতা নামটি ধ'রে, এ রীতি তাের কিসের তরে,
অসি ল'য়ে অকাতরে কাটি কেন অসুরগুল।
তুইরে বেটি কুলের মেয়ে, লাজের মাথা গেছি খেয়ে,
নালি রণে ন্যাংটা হয়ে, এ কেমন তাের মনে এল।
তােরে শান্ত করবে বলে, পড়েছেন হর চরণতলে,
দেখ বুঝি তাের কর্মফলে সিথের সিদুর মুছে গেল।
মি-দারা।
ধর ধর শ্যাম, নধর অধরে,
মধুর মুরলী ।
তুলে সুধা-তান, রাধা-নাম-গান,
গাও রাধা-হৃদি-কমল-অলি ।
শুনে ও মােহন মুরলী-গান,
পুলকে ভাসিবে গােকুল-প্রাণ,
উচ্চ-পুচ্ছে নাচিবে শিখি,
ধীরে যমুনা যাবে উজান,
হাম্বা-রবে জুটিবে ধে,
ফুটিবে হরষে কুসুম-কলি।
১০
দেবেন্দ্র-গীতি-মাল।
ইমন-ভূপালী—ঢিমে-তেতালা।
তােমা বিনে বৃথা এ জীবন, হে জীবনধন।
কি গুণে হে গুণময়’ ভুলায়েছ প্রাণ-মন।
পৰাবো তােমারি গলে,-হাতে ল’য়ে মালাখানি,
পথ চেয়ে বসে আছি কতকাল নাহি জানি
তুমি তো এলে না সখা, দিলেনা দিলেন দেখা,
রহিল মানসে লেখা, এ যে আশা চিরন্তন।
জানি না সে কতদিনে এ বেদনা-গীতি মম,
তােমারি করুণাবুকে বাজিবে হে প্রিয়তম ;
কবে তুমি ভালবেসে, রাজিবে হৃদয়ে এসে,
হেরিব গাে অনিমেষে—সে মুরতি বিমােহন।
সিন্ধু-মি-দাদরা।
ছি ছি ছি ভালবেসে হ’ল শেষে কি লাঞ্ছনা।
যারে শুধু ভাবলেম আপন সেই ত করলে প্রবঞ্চনা ॥
ভেবেছিলেম দুটি প্রাণে, মিলে যাব একটি গানে,
কপাল-গুণে জনে জনে দিচ্ছে এখন কি গন।
দেবে-গীতি-মালা।
বিজয়।
বিভাষ—আড়াঠেকা।
কোথা রে প্রাণের উমা, ভিখারী-হর-ঘরণি !
ভুলেছ কি ভােলানাথে, পেয়ে জনক জননী।
বঞ্চিত করি চরণৈ, এসেছ গিরি-ভবনে,
কতক্ষণ বাচে প্রাণে মণিহারা হয়ে ফণী।
জাননা কি মহামায়া, ত্যজিয়া সংসার-মায়া,
সম্বল করেছি শুধু তব চরণ দুখানি ;-
তুচ্ছ সম্পদে শঙ্করি, বাসনা কভু না করি,
তােমার পদ ভিখারী সতত এ শূলপাণি।
কমিক।
আমার মনের মানুষ পালিয়ে গেল, আর জে এল না।
কে কোথায় রাখুলে ধরে বােঝা গেল না।
সে যে আমার প্রাণের সাথী, খেতে কত ঝাঁটা-লাথি,
বিনয় করে ব’তে নিতি, আমায় ঠে’ল না।
হয়ে যে গাে তারে ছাড়া, আমার, মন হয়েছে উড়ােতাড়া,
আবার কি সে দেবে ধরা, তােমরা বল না।
১১০
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
মিশ্র-কাওয়ালী ।
প্রাণ ভরি হরি হরি বল বদনে।
পরিণাম আছে জেনো, হরি-কথা মুখে এনে,
এম্নি যাবে দিন ভেব না মনে ॥
কবে সে আসিবে কাল, কি সকাল কি বিকাল,
মানিবে না কালাকাল স্তুতি-বচনে ;
কালভয়-নিবারি, থাকিতে দয়াল হরি,
সাধ করি ধরা কেন দিবি শমনে।
বিষয়-বিভব আর-দার-সুত-পরিবার,
কিছু নয় আপনার ভব-ভবনে ;
মুদিলে দুটি আঁখি, হয়ে যাবে সব ফাঁকি,
হরি শুধু র’বে সাথী তােমারি সনে।
মানব-জনম সার,গেলে কি পাবি আর,
করােনা অবহেলা হরি-সাধনে ;
মায়াময় সংসারে, জলপা হরে মুরারে’,
শান্তি-চিরতরে পাবি জীবনে।
বারোয়া-দাদরা।
ভালবাসা ভালো কে বলে ?
প্রেমের প্রথায় প্রায়ই ভাসায় নয়নের জলে।
আপনার যা সব বিলিয়ে দিয়ে, পরের ভাবনা প্রাণে নিয়ে,
সাধ করে এ মরণ-ফাসী পরিসনে গলে।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা। "
১১১
খাম্বাজ-খেমটা।
নাচরে নাচ, নাচরে, নাচ, নাচরে নাচরে নাচরে নাচ,
তেমনি তেমনি তেমনি করে নাচ রে গােপাল নাচরে নাচ
ধেই ধেই ধেই ধেই ধেই ধেই ধেই,
দু’হাত মিলে হেলে দুলে নাচরে গােপাল নাচরে নাচ।
তাই তাই তাই তাই, দেখে প্রাণ জুড়াই,
তালে তালে দিয়ে তালি নাচরে গােপাল নাচরে নাচ।
আয় আয় আয় আয়, লজ্জা কি রে তায়,
হাসি-মুখে বাজিয়ে বাঁশী নাচরে গােপাল নাচরে, নাচ,
ধিন্ ধিনা ধিনা ধিন্ ঝিনিতা ঝিনিতা ঝি
ঝুমুর ঝুমুর নূপুর পায়ে নাচরে গােপাল নাচরে নাচ,
ওরে জলধর, দিব রে ক্ষীর সর,
হয়ে সে ত্ৰিভবাকা নাচরে গােপাল নাচরে নাচ।
তা থই থই থই, কইরে কইরে কই,
ঘুরে ফিরে বাহার করে নাচরে গােপাল নাচরে, নাচ ।
ধুপ্পা ধুপ্পা ধুপ, দিসনেরে ধন চুপ,
দেবেন্দ্রকে দেখিয়ে দেখিয়ে নাচ রে গােপাল নাচরে নাচ,,
।
হাম্বির-যৎ।
এখনাে সে এলন। যে হায়, নিশি বয়ে যায়।
নিশ্চিত আসিব বলে কে জানে বৈল কোথায়।
কত আশা বুকে ধরি, কত কি যে ভেবে মরি,
বুঝিবা সে কে সুন্দরী ধরে নেছে পথে তায়।
১১২
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
পুরবী-দারা।
চলল সকাল করে যমুনায় জল আন্তে যাবাে।
বনের পথে যেতে যেতে তান ছেড়ে দে গানটি গাবে।
গা থেকে দুকুল উলায়ে, চলে যাব বুক ফুলায়ে,
তালে তালে বাজবে পায়ে নূপুর সাড়ায় বন জাকাকো ।
লজ্জা-ভয় কি রাখবাে কাছে, মারবে। চিল উঠবাে গাছে,
পাকা-ফল যেথায় আছে খুজে বেছে পাড়বে। খাবো।
জানিসতো সে কালাটাকে, আজ যদি পথ আগলে থাকে,
সবাই মিলে ধরে তাকে আক্কেল কিছু শিখিয়ে দেবাে।
''
০
আশােয়ারী-একতালা।
বাহিরে থেকে, ডেকে ডেকে ডেকে,
সে নাকি গিয়েছে ফিরে।
কত হেসে-ভেসে, এসে বুঝি শেষে,
ভেসে গেছে আঁখিনীরে।
এই বটে তার চরণের রেখা,
মাের প্রাণে যাহা আছে চির-লেখা,
এসে দ্রুতগতি,-যায় ভাল দেখা,
চলে গেছে কত ধীরে।
রাখিনি কুঞ্জ কেন দ্বার খুলে,
কেন কেন শুয়ে পড়েছিনু ভুলে,
কি কাল-ঘুম সে কালি নিশাকালে
এসেছিল মােরে ঘিরে ॥
দেবেন্দ্র-গীতিমালা ।
১১
কাফিসিন্ধু-খেটা।
পাগলি মেয়ে শিখলি এ কোথায় ?
কুলাঙ্গনা উলঙ্গিনী নাচলিরে হায় হায় !
নামটি মা তাের জগন্মাতা,
মায়ের কি মা এই মমতা,
ম হ'য়ে তুই ছেলের মাথা কাটলি কি প্রথায়।
সন্তানের রক্তপানে,
কি আনন্দ পা’ কে জানে,
মুণ্ডগুলাে কোন্ পরাণে পরেছি গলায় ।
বাবা নাকি শান্ত ভারি,
চেপেছিস তাই বুকে তারি,
আর কেউ হলে ক’তো গুড়ি প্রহারের দ্বারায়।
কমিক।
ঝিঝিট-পােস্তা।
আর কিছু তােরে চাইনে শ্যামা, মদের পয়সা দিস জুটিয়ে।
নৈলে, কবে কোথায় করবাে চুরি মা, কে দেবে জেলে ঢুকিয়ে।
আমি মা তাের খাটা-ছেলে, তুষ্টি নইত মিষ্টি খেলে,
এমা, সময়মত মদটি পেলে, থাকি যে তাের পায় লুটিয়ে
বাপের পঞ্চাশ বিঘা নিষ্কর, টাকা-পয়সা জিনিষ বিস্তর,
এমা, মদের নেশায় হয়ে বিভাের দিয়েছি যে সব ঘুচিয়ে ।
তাের প্রসাদের গুণ যে কত, মূর্থ যারা বােঝেনাত,
এমা, দু’ভােজ হলে উদরগত, দেয় কি ঠিক স্বর্গে উঠয়ে ।
১১৪
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
ইমন-বেহাগ-ঝাপতাল।
প্রণমি প্রমথপতি, রতিপতিবিনাশন !
বিভূতি-বিভূষিতা, বিভু, বিশ্ববিনােদন।
যােগারাধ্য, যােগীবর, শুভেশ, শশীশেখর,
ঈশান, পরমেশ্বর, বিষধর-বিভূষণ !
এ্যম্বক, ত্রিগুণধারী, ত্রিলােকেশ, ত্রিপুরারি,
ত্রিশূলী, ত্ৰিতাপহারী, তারিণীহৃদিরঞ্জন ;
কে জানে তব মহিমা, নিগমে না হয় সীম,
অনাদি, অনন্ত তুমি-প্ৰণত-প্রতিপালন ;
এ শরণাগত জনে, দিও স্থান শ্রীচরণে,
চরমে,-হে গৌরীপতি, পরম-গতি-কারণ।
হাম্বির-ঢিমে-তেতালা।
হাতে ধ'রে ব'লে গেছে সে, যেতে বিদেশে।
“ভেবনা ভেবনা তুমি, মিলিব সত্বরে এসে।”
অমল অঞ্চলখানি তুলিগাে কমলকরে,
সজল এ আঁখি দুটা মুছেছিল কি আদরে ;
ধরিয়া হৃদয়’পর, কতনা চুমি’ অধর,
সে বিদায়ে তারাে আঁখি গিছিল অশ্রুতে ভেসে।
পথপানে চেয়ে চেয়ে ভেসে দুনয়ন নীরে,
কত নিশি কেটে গেল সে তো গাে এলনা ফিরে ;
অভাগী অভাগ্য তরে, হারায়ে ফেলেছে তারে,
| ভুলে গেছে সে আমারে অন্য কারে ভালবেসে।
+:
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
১১৫
ভৈরবী-একতালা।
কালো ভালো বলে, কালােরূপে ভুলে,
কালি দিয়ে কুলে মজেছিলি রাই।
কোথা রৈল তাের সে কালো কিশাের,
মনে বুঝে তবে দেখ গাে তাই।
যার তরে ব্রজে কলঙ্কিনী নাম,
সে তো চলে গেছে ত্যজে ব্রজধাম,
নিঠুর লম্পট সে যে বঁাশ্যাম,
ভালো ত নহে গাে কালো কানাই ।
আগে তােরে কত করেছি বারণ,
সে কালােবরণে দিওনারে মন ;
সুখেরি লালসে বিলালি আপন,
চির-মুখে বুঝি পড়িল ছাই ।
মিশ্র–দারা।
চল্ চল্ চল্ সকল মিলে, পুকুরঘাটে জল আনিতে যাই।
কলসী কাকে জাকজমকে সুখের দুখের কথা.ক’য়ে ভাই ;-
শশানেনা কেউ দেখি যেন, আপন-ভােলা হ’সনে লাে সবাই।
বলনা কেন কার কেমন সে মনের মানুষটি,
মন বুঝে ঐ মনের মতন কে কেমন তােষে মনটি ;
জানলে কি আর কেহ কারাে কেড়ে নেবে ছি!
নেয় যদি হায় ক’ববে কি তায়, গলায় গেঁথে রাখবে কি সদাই ?
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
বেহাগ-আড়াঠেকা।
কে জানে মা হররমা মহিমা তোমার।
তুমি সৰ্ব্ব-সারাৎসারা বিশ্ব মূলাধার।
আদ্যাশক্তি সনাতনী, তুমি বিশ্ব-প্রসবিনী,
তােমা ভিন্ন চরাচরে কি আছে গাে আর ।
খাম্বাজ-একতালা।
কেন তারি আশে, আকুল পিয়াসে,
নিশিদিন ঘুরে থাকি।
নিমিষের তরে, সােহাগের ভরে,
সে যদি না লবে ডাকি।
গরবে যদি সে না কহিবে কথা,
না বুঝিবে যদি মরমের ব্যথা,
অকারণ ভাবে এ প্রেম-মমতা
হৃদয়ে গাথিয়া রাখি।
জেনেছি সে প্রেম-কুসুমের মালা
ধরিতে পাব না গলে,
তবু কেন চাই,ছুটে ছুটে ধাই
শুধু দেখিবার ছলে ;
হায় কোথানে, কি মােহের টানে,
“কি দেখিতে পাই উদাস-পরাণে,
বারেক সে যদি মাের আঁখি-পানে
ফিরাবে প্রেম-আঁখি।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
১১৭
কমিক।
( মাদল-বাদ্যে বৈকালিক নগর-সঙ্কীর্তন।)
দেখবি যদিগাে আমার গােউর নাচা,
খােগল্প ছেড়ে তারা শীগ্ৰী আঁচা।
আয়না-চিরুণী এখন রাখুনা তুলে,
কাজ কি গাে মােট বাক্স পােটম্যান খুলে,
জরদা-সুরতি না হয় যা আজ ভুলে,
তােরা, আয় দ’ড়ে এই করে পরিনা প্যাছা।
( যদি ভাল করে দেখবি) ( আমার গােউর নাচা)
দিতে হবেনাকো পয়সাটাকা,
করিসনা কেউ যেন মেজাজ ৰাঁকা,
যে আসে না আসে আয়গো এক,
তােরা, আনুতে ভুলিস না সে কোলের বাছা।
( নইলে শােভা হবে না )( তাইতে বারম্বার বলি)
~
আহা কি গােউরের নাচের বাহার,
কোথায় লাগে খো, বাই, থিয়েটার
দেবেন্দ্র বলে,-এ যে না দেখবি তার,
ও তার, আপশােষে ভার হবে প্রাণে বাঁচা।
( তখন মাথা খুড়ে মরবি)
( হায় হায় কেন দেখলাম ন বলে)
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
ঝিঝিট-একতালা।
শ্মশানে কেন মা ঈশানমােহিনি,
শ্যামা কেন তাের এ রণ-সাজ।
বিবসনা-বেশে শমরে নাচিছ,
প্রাণে কি তােমার নাহিক লাজ ।।
হয়ে এলােকেশী, অসি ল’য়ে করে,
নাশিছ হরষে আপন-কুমারে;
ছি ছি সৰ্ব্বনাশি, এ বিশ্ব-মাঝারে,
মা হয়ে কে করে এমন কাজ ।
লুকায়ে শঙ্করি ও বেশ-ভীষণা,
মাতৃ-সাজে দেখা দে মা শৰাসনা ;
হের গো মা তােরে করিতে সান্ত্বনা,
পদে পতিত প্রমথরাজ ।
কেদারা-কাওয়ালী ।
কতবার এসে এসে, কত কত ভালবেসে,
কত করে দেখা তবে পেয়েছি তোমারি।
চাও চাও মুখ তুলে, কও কথা প্রাণ খুলে,
আমি যে তােমারি, সখা-তুমি হে আমারি।
আর কতদিন বল তােমার বিরহ স’য়ে,
মরমে মরিয়ে র’ব প্রাণের এ বােঝা লয়ে ;
পাব কি হৃদয়-হার, হৃদিমাঝে একবার,
এত আশা বল সখা কেমনে নিবারি।
}
দেবেন্দ্রগীতিমালা
ভৈরবী-একতালা ।
রাধা নামে সাধা বশী, রাধা বলে বাজ, রে বাজ।
দিসনে বিরাম গাও রাধা-নাম কি সকাল কি বিকাল সাজ।
রাধা নাম সাধন তরে, অধরে ধরেছি তােরে,
রাধার তরে ব্রজপুরে সেজেছি এ রাখল-সাজ।
মানিনে তুই কোনাে বাধা, উচ্চৈঃস্বরে বলরে রাধা,
রাধা আমার প্রাণের আধা, হৃদয়ে করে বিরাজ।
রাধা বড় ভালবাসি, সদাই রাধা-নাম প্রয়াসী,
রাধা নাম শুনারে বাশী, পাসরি ভয় ভাবনা লাজ।
সপ্ত সুর ষড় রাগে, গাওরে মনের অনুরাগে,
শুনতে কত মিষ্ট লাগে রাধা-নাম-রাগিণীর ভাজ ৷৷
আমি রে ভক্তের ভগবান, ভক্তে সুধা করাতে পান,
বাঁশীর তানে রাধা-নাম:গান ব্ৰজে আমার প্রধান কাজ।
ভবারাধ্যা রাধাসতী, রাধা নামে যায় দুর্গতি,
রাধা জীবের পরাগতি, সুসার-কথা শশারে আজ।
ভীমপল—কাওয়ালী।
ডেকনা ডেকনা পাখী, চমকি দিও না প্রাণ।
বােঝনি এখনাে নিশি হয়নিকো অবসান।।
এখনো পূরব-দিশি, আঁধারে রয়েছে মিশি,
হের ঐ তারকা শশী সমভাবে দীপ্তিমান।
উষা প্রকাশিত হলে, হৃদি-সখা যাবে চলে,
কি ব্যথা পাব তা হলে, জানিবি কি সে সন্ধান।
দেবেন্দ্র-গীতি-মাল।
মি-খাম্বাজ-আড়খেমটা।
আন্ জবা তুলে, সচন্দন-ফুলে, দে রে প্রাণ খুলে মায়ের চরণে।
এ যােগ হবে না, সুযােগ রবে না, দুৰ্যোগ দশমী-দিবা আগমনে।
ল’য়ে বিদল, ফুল্ল শতদল,
সাজা রে মায়ের শ্রীপদ যুগল,
দুৰ্ব্বলের বল ও পদ কেবল, কররে সম্বল জীবনে মরণে।
আশ্বিনে সপ্তমী শুভ উষাকালে,
আনন্দময়ী মা এল মহীতলে,
নিরানন্দ আজি দূরে গেল চলে, বহে পূৰ্ণানন্দ ভারত-ভবনে।
হের দশভুজা অম্বিকা-মুরতি,
মহিষমর্দিনী মহাশক্তিমতী,
গুহ গণপতি, লক্ষ্মী সরস্বতী, মধ্যে শােতে সতী কেশরীবাহনে ॥
মাতৃ-আরাধনা হেরিতে ভূতলে,
মা’র সঙ্গে পােচ্ছ দেবতা সকলে;
উচ্চকণ্ঠে সবে করে “মা” বলে, বিশ্ব যাবে ট’লে সে ধ্বনি শ্রবণে ॥
এস পাপী তাপী অনাথ অগতি,
পুত্রহার। মাতা, পতিহীন সতি,
দগ্ধ-প্রাণে শান্তি পাবি শীঘ্রগতি, ব্ৰহ্মাণ্ড-প্রসূতী নিরখি নয়নে।
শমন বিপদ হবি নিরাপদ,
শুদ্ধচিত্তে সবে ভজ মাতৃপ,
পাৰি ধৰ্ম্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষপ; দেবে-চম্পদ ও পদ সাধনে।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
১২১
।
খাম্বাজ-কাওয়ালী ।
তুমি মম প্রাণ-সখা !
আঁখি-মন-বিভাের-পরমসুন্দর,
স্নিগ্ধ-সুনির্মল প্রেমমাখা ।
‘দীন-বন্ধু তুমি বিখ্যাত চরাচরে,
স্মরণে তােমার নাম সকল বিপদ হয়ে,
ফুল নয়নে নিত, করুণা উছলিত,
‘পতিতােদ্ধারণ চরণে লেখা।
পাতক জীবনে মাের শুভাশুভ সমুদয়,
সঁপেছি অভয়-করে হে চিরমঙ্গলময়
‘তুমিই যা কর’ বলে, পড়ে আছি পদতলে,
মুছেছি প্রাণের যত ভাবনা-রেখা
কমিক।
ভৈরবী-দারা।
সন্দেশ খেতে পারি যে আমি, দেয় বা কে—পাইবা কোথায়।
অমানুষ ঐ ময়রাগুলো—কিতে গেলেই পয়সাটি চায় ॥
মণ্ডা মিঠাই ছানাবড়া, রসগােল্লা রসে ভরা,
ব'লে মিছে মন খারাপ করা,
পেলে যেত বুঝতে পারা, দিয়ে পরােখ দেখনা সবায়।
১২২
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
পুরবী-আড়াঠেকা।
বেলা গেল সন্ধ্যৰ হ’ল চল নিজ-নিকেতন।
সংসার-কাননে আসি হয়েছ কি অচেতন ।
যেতে হবে বহুদূরে, অকুলজলধি-পারে,
কেমনে করিবে তুমি করেছ কি নির্ধারণ।
আগত তামসী নিশি, অন্ধকার দশদিশি,
সম্মুখে শমন বসি হরিতে জীবন-ধন ;
এখনাে মােহ নিবারি, সহ রে শরণ তঁারি,
ভব-কর্ণধার হরি-কালভয়-বিনাশন।
মিশ্র-খাম্বাজ-একতালা।
আজি, প্রীতি-ফুলহারে, সাজাব তােমারে,
মনের মতন করিয়া ।
আজি, পেয়েছি যখন, হৃদয়-তন,
হৃদয়ে রাখিব ধরিয়া ।
আজি, বহুদিন পরে এসেছ কুটীরে,
যেও না চলিয়া ত্যজি অধিনীরে,
পেয়ে নিধি যদি হারা হই ফিরে,
মরমেতে যাব মরিয়া ॥
আজি নয়নে নয়নে, বয়ানে বয়ানে,
রহিব দুজনে মিশি প্রাণে প্রাণে,
হৃদি-মন-প্রাণ,—মিলনের গানে,
প্রমােদে উঠিবে ভরিয়া ।
কাফিসিধ্যমান।
কে এল রে কামিনী, যামিনী-করণী, ভামিনী,
এলােকেশী, কয়ে আসি, ঘােড়শী, হীগামিনী।
মুখে অট্টহাসি,
আসিছে রিলােকশী,
নাচে বাম রণ-রজে ভাসি,
চরণ-নখর-জ্যোতিপ্রদীপ্ত কোটি-দামিনী।
ইমন-কল্যাণ-কাওয়ালী।
চেও না তার পানে, সে কি গুণ জানে,
আঁখির সন্ধানে ধলা মজায়।
বিকাল বেলাতে, যেতে যমুনাতে,
কদলাতে সে এসে দাড়ায়।
নীরদ-সূক্ষর নধর তনুখানি,
বঙ্কিম-নয়নে আকুল-চাহনি,
অধরে মৃদু-হাসি, ক্ষনে সুধারাশি,
রাখা বলে বঁশী সে নাকি যায় ।
যে দেখেছে ভার, সেই করেছে ভুল,
মানেনি কোনাে বাধা নাশিতে জাঙিকুল ;
ভাই কে করি মানা, ও-পথে ফেনা,
যেচে লে নিও না ফালীটি গলায় ।
২৪
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
..
কমিক।
আমরা কলির মেয়ে, “দিদি ! আমরা কলির মেয়ে।
ঐ, সাত পাকের সে মানিকগুলির আমরা পারের নেয়ে,
কিন্তু ঘুরাই কেবলি ঘূর্ণিপাকে আমরা কলির মেয়ে।
আমরা উড়িয়ে রূপের ধ্বজা, মােদের যৌবনটা কি মজা,
আমরা ধরা কেন সরা ভাবি বুঝতে হবে সােজা,
কত সুসম্রান্ত ‘পরম শা’ মােদের বাখান খেয়ে,
নৈলে শাস্ত্র-বাক্য মিথ্যা হবে আমরা কলির মেয়ে।
আমরা কর্মে বেজায় বিগুণ, আমরা ভােজনে বেশ দ্বিগুণ
আমরা গুণের সাগর নাগরগুলােয় করেছি যে কি গুণ,
তারা যেখানে যা আনে, এই ব্রহ্মাণ্ডটা ধেয়ে,
মমাদের শ্রীপাদপদ্মে অর্পণ করে আমরা কলির মেয়ে।
আমরা সংসারে সার জানি, এই সােনার অঙ্গখানি,
মােদের লজ্জা-শরম ধরম-করম কেবল লােক-দেখানি,
মমাদের পতি-ভক্তি যা কিছু সে গয়না-কাপড় পেয়ে,
আরে নইলে সেটা মাইরী’ ব’ছি আমরা কলির মেয়ে।
আমরা স্বার্থটি বেশ বুঝি, প্রাণে হিংসাটি খুব পুজি,
মমাদের দেহের মধ্যে দয়া-মায়ার লেশ পাবে না খুজি,
আমরা বাঁচুকু মরুকু হাজুক পুডু দেখি না সে চেয়ে,
শুধু আপন-মুখে মত্ত থাকি আমরা কলির মেয়ে।
আমরা হুজুক একটু পেলে, ছুটি পেটের ছেলে ঠেলে,
আমরা পরের নিন্দা চর্চা করি সকল কাজটি ফেলে,
আমরা স্বামীর ঘরকে পৃথক আগে করি ছেয়ে পেয়ে,
মােদের এটায় একটা নাম ভারি আমরা কলির মেয়ে।
দেবেন্দ্রগীতিমালা। ১২৫ আমরা কত কায়দা ধরি, আমরা ফুলের ঘায়ে মরি, আমরা এতটুকু ছুতুস নিয়ে এত-খানা করি, মমাদের স্বরূপ-তত্ত্ব কে যথার্থ বলতে পারে গেয়ে, এখন আমরা ভবে সৰ্ব্বেসর্বা আমরা কলির মেয়ে। ভৈরবী-কাওয়ালী । মৃদুল-অনিলে মেতে, বিজন-বেলায় যেতে, প্রাণের সে গানখানি গেয়ে গেয়ে যাই। ধীর ধীরি পথ চলি, পাছে কেহ শােনে বলি, ক্ষণে ক্ষণে চারিপানে চেয়ে চেয়ে যাই। চলে গেছে চির-আশা হতাশ-নিশ্বাস ছেড়ে, আছে শুধু অভিমান বিষাদ-প্রাণটি বেড়ে, তাই এ করুণতানে, সুললিত প্রেম-গানে- উছলিত হৃদি-খানি বেয়ে বেয়ে যাই। : কি যেন গানের মাঝে আপনা হারায়ে হায়, বুঝিতে পারিনে কে যে অদূয়ে আছে কোথায়, তাই নিতি নিতি কত, সরম-মরম-হত- বিদ্রুপ-জড়িত গালি খেয়ে খেয়ে যাই। ভীমপলশ্র—দাদা। ভুলেছ কি ভালবাসা একেবারে আসা-যাওয়া ? মনে কি পড়ে না বঁধু মুখের পানটি কেড়ে খাওয়া। আর কি সথা সেদিন আছে, সুধা এখন বিষ হয়েছে। প্রাণে বড় তারিফ দেছে নূতন ফুলের নৃতন হাওয়া।
১২৬
দেবেন্দ্রগীতিমালা
খাম্বাজ-মৎ।
যেওনা যামিনী আজি গিরিপুর পরিহরি,
তব তিরােহিত-সঙ্গে হারাব প্রাণ-কুমারী।
দশমী-প্রভাত-কালে, কে রােধিবে মহাকালে,
উমা ল’য়ে যাবে চ'লে হৃদি মম ছিন্ন করি।
নগেশ-নিলয়ে সতি, কবরে চির-বসতি,
রাখ মম এ মিনতি, কাতরে চরণে ধরি।
পিলু-মি-দারা।
নাচিয়ে নাচিয়ে বেণু বাজাইয়ে
আয়রে ভাই কানাই।
দেখরে গগনে হ’ল কত বেলা,
গোঠের খেলা তাের মনেতে কি নাই ।
তালে তালে তালে পা’দুখানি ফেলি,
অধরে ধরিয়ে মধুর মুরলী,
তেমনি তেমনি তেমনি করে
নেচে আয়রে বনমালী ;
আমরা সকলে, তাের সনে মিলে,
নেচে নেচে গােঠে ধেনু ল'য়ে যাই।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
খট-মিশ্র-ঝাঁপতাল।
।
ধন্যা তুমি অন্নপূর্ণা! বিতরি মা অমরাশি,
পরম পুলকে নিত্য পালিছ ত্রিলােকবাসী।
নানা-উপহারে অন্ন পূর্ণ করি স্বর্ণথালে,
অকাতরে ক্ষুধাতুরে দিতেছ মা যথাকালে ;
পেয়ে তব সুধা-অন্ন, উদর করিছে পূর্ণ,
হতেছে সকলে ধন্য ক্ষুধার জ্বালা বিনাশি।
পরমা-প্রকৃতি তুমি,-পুণ্যতীর্থ কাশীধামে,
সদানন্দে বিরাজিতা মাতা ‘অন্নপূর্ণা নামে ;
ভিখারী ত্রিশূলপাণি, বাড়ায়ে যুগলপাণি,
অল্প মাগে শিবরাণি তােমার নিকটে আসি ।
সুরাসুর-মানবাদি যত জীব চরাচরে,
‘অল্পদে অল্প দে” বলে ডাকে গাে মা উচ্চস্বরে ;
তুমি গাে রাজ-রাজেশ্বরী, বিশ্বমাতা, বিশ্বেশ্বরী,
বিরিঞ্চি বাসব হরি তােমার অন্ত প্রয়াসী ॥
তব অঙ্গে নাশিতেছি মা’ চির জঠর-হুতাশনে,
বাসনা মহেশরমা বারেক তেমা দরশনে,
দেবেন্দ্রের হৃংপদ্মাসনে, আয় মা শিবে শিব-সনে,
‘যুগল-পদ-পরশনে শ্মশান-কায়া হবে কাশি।
*
১২৮
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
ভৈরবী-আড়াঠেকা।
করালবদনা কালী, কাল-বক্ষ-বিলাসিনী !
বিবসনা, ত্রিনয়না, শ্যামা, নৃমুণ্ডমালিনী !
মুক্তকেশী, অসি-করা, অট্টহাসা, ভয়ঙ্করা,
রুধিরাক্ত-কলেবরা, বরাভয়-প্রদায়িনী।
মিশ্র-কানাড়া-একতালা।
যদি নিমিষের তরে, হৃদয়ের পরে,
ধরিতে তােমারে পাই না।
ভরে, শুধু দেখা দিতে, কে বলে আসিত,
আমি তাে সাধিতে যাই না ।
ভুলেও যদিগাে প্রেম-অনুরাগে,
মিলনের গতি প্রাণে নাহি জাগে,
কি তােষিতে এস রচিত-সােহাগে,
আমি তাে যাচিতে ধাই না।
চলে গেছে দিন, পড়ে গেছে ক্ষীণ,
জীবনের যত আশা গো,
নিভানো অনল, জেলে এ কেবল,
কি জানাও ভালবাসা গাে ;
যাও যাও সখা,—সেখানে দু’জনে,
সুখে থেকো চির প্রেম-আলাপনে ;
মিলে গেছি ভালো আঁখিজল-সনে,
তােমারে ত আমি চাই না।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
মিশ্র-হাম্বির-কাওয়ালী ।
ও কে গাে বাঁশরী বাজায়, ঐ শুনা যায় ।
শুধায়ে আসি আয়, কি তারি অভিপ্রায়,
যৌবন কুল-মান মন কি প্রাণ চায় ।
যমুনা-কলতানে, মলয়-সমীরণে,
মিলায়ে স্বর-মালা লহরী তুলে কানে ;
কি সুরে ধরে তান, শ্রবণে কেন প্রাণ,
পাসরি প্রাণ-পতি তাহারি পাশে ধায় ।
কমিক।
সাহানাদারা।
আমি শুধু আছি প্রিয়ে সাধুতে তোমার মান।
আর, খেতে তােমার বঁাকা-মুখের চার্চেকে বাখান ।
চাদ-বদনটি ভারি করে, থাক যবে দেখি ওরে,
সুধাই কারে মাের শরীরে রয় কি তখন প্রাণ।
“এ চাই ও চাই তা চাই’ বুলি, দাও যখন মাের কর্ণে তুলি,
ডাকি তখন মৰ্ম্ম খুলি কোথায় ভগবান ।
হাজির হতে টাইম মাফিক, হলে একটু এদিক ওদিক
বা’র দুয়ারে খাড়া র’ ঠিক সে রাত্রির বিধান।
তুমি আমার মুর্তিমতী-ইহ-পরকালের গতি ;
তােমার আমি এ সম্প্রতি যে-আজ্ঞের প্রধান।
আড়-নয়নে চেয়ে সবেমৃদু-হাসি হাসবে কবে,
তাই হেরেই কি আমি ভবে মহাভাগ্যবান।
'১৩০
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
ব্রজ-বিহার।
( মাদল-বাদ্যে নাম-সঙ্কীৰ্ত্তন)
প্রাণের কালাচঁাদে ঘিরি ঘিরি,
নেচে নেচে চ সই বনে ফিরি ।
তালে তালে ফেলি পা-দুখানি,
নাচ বার ভঙ্গি কত আমরা জানি ;
হ’সনে হেথা কেহ অভিমানী,
এতে, লজ্জা কি শ্যাম যে সখি আমাদিরি।
( আমরা শ্যাম-চরণে বিকিয়েছি ) (সরল সখ্যভাবে বিহরিতে )
বাঁশীর সুরে কালশশী গাইবে রাধা-নাম,
সেই সুরে সুরে আমরা গাইব অবিরাম;
উচ্চ-সুরে বলবাে মুখে ‘জয় রাধাশ্যাম’,
কিবা, কানন-জুড়ে সে তরঙ্গ তুলবে মাধুরী।
(প্রাণে আনন্দ কি ধ’রবে?) (যে জন দেখবে কি তবে )
ঘামের বিন্দু দেখা দিলে শ্যামের বদনে, .
অঞ্চলে মুছিয়ে দেবাে কত যতনে ;
আড়-নয়নে চাইতে হবে শ্যামের পানে,
আমরা, পিয়াস মিটাব শ্যামের বদন হেরি।
(নয়ন ফিরতে কি আর চায় গাে ? ) ( শ্যামের বদনখানি দেখলে)
দেবে-গীতিমালা ।
১৩১
;
দু’পাশে বনের ফুল তুলে নিয়ে,
শ্যামের অঙ্গে দিব ছড়াইয়ে
কেউ বা শ্যামের গলে মালাটি দিয়ে,
অমি, বামে দাড়াবি হেলে বাঁশিটি ধরি। .
( যেন চিহ্ন করে দিস না) ( শ্যামের কোমল গণ্ড চুম্বিতে)
নূপুর-ঝলমল পায়েরি ঘায়,
বনভূমি থলথল হবে ধূলায় ;
দেবেন্দ্র বলে,-“ওগাে ধরি তােদের পায়,
আমায়, সঙ্গে নে গাে তােরা ব্রজ-কুমারি।
{ আমি ডিগবাজী খেলবে) (তোদের পদ-রজে লুটিয়ে পড়ে)”
খাম্বাজ-একতালা }
আমি একলা এসেছি একা চলে যাব, কারাে সঙ্গে নাই সঙ্গ।
শুধু আছি এই ভব-নাটকাভিনয় কতক্ষণে হয় ভদ।
আমি হাসবাে খেলবো আপন মনে গাইব কত গান,
আবার, তােম্ তানা না না,নােম তানা নানা’ছেড়ে দেবো দুটো তান;
তুমি, যদি না দেখ না শােনো, আমার, ক্ষতি নাই তায় কোনাে,
তুমি, বিদ্রুপ কর গা’ল দাও মারে ছাড়বে না তবু রঙ্গ।
আমি ভুলব না কারো ছলনায়, আমি নেব না কারো কিছু,
শুধু যাব এক ধার পথিক সবার আগে গাে কিম্বা পিছু ;
আমি, বুঝেছি এ তরে মন্দ নয়, এই, সংসার বড় রঙ্গময়,
আমি, জেনেছি ভালাে যাবার সময় সঙ্গে সে নবড়ই।
১৩২
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
বিজয়া।
বিভাষ—আড়াঠেকা।
কোন্ প্রাণে উমা আজি ত্যজিব মা তােমা ধনে ।
হৃদয় বিদরে তােরে পাঠাতে হর-ভবনে।
রাজার নন্দিনী হয়ে, কেমনে বল অভয়ে,
অন্নাভাবে শিবালয়ে রবে তুমি অনশনে।
কি কব সে গিরিবরে, ভিখারী শঙ্কর-বসে
সঁপিল উমা তােমারে, কিছু না বিচারি মনে ;
বলিতে লােক-সমাজে, সতত মরি গাে লাজে,
জামাতা উলঙ্গ-সাজে বিহরে পিশাচী-সনে ।
মিশ্র ইমন-একতালা।
ভুলে কি গিয়েছ সে দিনের কথা, তুলে কি নিয়েছ প্রাণ ;
দূরে থেকে তাই দেখা দিতে শুধু কর এত অভিমান।
কহিতে আসিনি প্রেমের কথা,
জানাতে আসিনি প্রাণের ব্যথা ;
আসি শুধু সেই হাসি-মুখখানি হেরিয়া গাঁথিতে গান ।
কত করে হায় কেন যে জানিনে,
ওই মুখখানি ভুলিতে পারিনে ;
তাই নিতি আসি আশার ছলনে বুকে নিতে বিষ-বান।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
১৫৩
কমিক।
( পাঠার বর্ণনা )
কাটো পাঠা, রাধে। পাঠা, খাও পাঁঠার মাস রে ।
সাধ্যপক্ষে পাঁঠার মাসটা চালাও বারমাস রে।
হলুদ লঙ্ক। পেঁয়াজবাটা তেজপাতাদি দিয়ে রে।
রন্ধনন্ত ছুকে ফেলো গরমমসলা-ঘিয়ে রে।
লুচি কিম্বা অন্নের পাশে গরম-গরম খাঁটী রে।
ঝোলে মাসে সাজিয়ে নাও বড় একটা বাটী রে ।
উদর পরিপূর্ণ করি গলায়-গলায় খাও রে ।
চিবাতে না পার যদি গিলে গিলে দাও রে ।
ভােজনান্তে বাঁ-হাত পেটে বুলাও বারম্বার রে ।
হেই হেই শব্দে বাহির কর সুগন্ধ টেকার রে ॥
নাড়ী-ভাঙ্গা বড় মজা মুড়ির সঙ্গে খেতে রে।
ঝাল-চচ্চরি মদের চাটে, প্রাণ যে উঠে মেতে রে
এমন তৃপ্তিকর সুখাদ্য সংসারে কি আছে রে।
মনুষ ত দূরের কথা, দেবতাগণ যাচে রে।
সত্য অতি সত্য-কথা বলি সবার আগে রে।
সুদে স্বর্গেরি সুধা এর কাছে কি লাগে রে ।
এ হেন অপূৰ্ব্ব-খাদ্য যে-জন না খেল রে ।
দেবেন বলে, সে-জন ভবে বৃথা এল গেল রে ।
১৩৪
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
খাম্বাজ-গং।
যে দিনে দীনতারিণি ‘মা’ বলে চিনেছি তােরে,
সেই দিনে মা ভবরমা কুল পেয়েছি ভব-ঘােরে।
বিশ্ব-মাঝে কারে ডরি, মা যে আমার বিশ্বেশ্বরী,
শমন-রাজার ভাঙ্গবো জারি শ্যামা গাে তাের নামের জোরে।
পার হ’তে সে ভববারি, মিছে কেন ভেবে মরি,
দয়াময়ি দয়া করি চরণতরী দিবি. মোরে ।
জংলা=দারা।
ওগো, সাধ করে কি পাগল হয়েছি।
পরের মন হর্তে গিয়ে,
আপন মন হারায়েছি।
আমি দেশ-বিদেশে তারি আশে
খুজি কত ঠাঁই,
আমার মন নিয়ে যে পালিয়ে গেছে
তার দেখা না পাই ;
এখন আপন-হারা, স্বপন-পারা
ভাবছি বসে তাই,
ওগো, করম-দোষে বিষের আগুন
মরমেতে জেলেছি।
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
আশােয়রী-একতালা।
আসিল না কালা, বাসি হ’ল মালা, নিশি যে পােহায়ে গেল।
নীলিম গগনে, চঁাদিমার হাসি, মলিন হইয়ে এল।
উষার আলােকে পুলকে চাহিয়া,
শাখে শাখে পাখী উঠিল গাহিয়া
কাজ নাহি আর এখানে থাকিয়া, এই বেলা ফিরে চল ।
কেন এ কুঞ্জে যমুনার তীরে,
সারাটি যামিনী জাগিনু সখিরে,
হেসে এসে শেষে ভেসে আঁখি-নীরে, ঘরে ফিরে যেতে হ’ল
মিছে সব সখি, মিছে সুখ-আশা,
কঁদিবার তরে এ যে ভালবাসা,
জীবন নাশিতে শুধু এ পিপাসা, জেনেছি বুঝেছি ভাল।
বিভাষ-মিশ্র-একতালা।
বাছিয়া বাছিয়া কুসুম তুলিয়া,
মালাটি গাঁথিয়া এনেছি।
তােমারি গলে পরাব বলে,
মনে কত সাধ করেছি।
তুমি যে হে বঁধু জীবনের সার,
তােমারে তুষিতে কি আছে আমার ;
ধর এই মম প্রেম-উপহার,
যা কিছু জুটাতে পেরেছি।
দেবেন্দ্র-গীতি-মালা।
কমিক।
( রাধা-কৃষ্ণ-সংবাদ)
কৃষ্ণ বলে—রাধে তুমি করেছ কি মান ?
রাধা বলে-কথা শুনে জুড়িয়ে উঠল প্রাণ।
( কথার বাহার কিবা)
কৃষ্ণ বলে-রাধে তুমি চটেছ যে ভারি।
রাধা বলে-পুরস্কার আজ বেত্রাঘাত দু’চারি।
(না চটবো কেন ?)
কৃষ্ণ বলে-রাধে তুমি হেসে কথা কও ।
রাধা বলেনা হয় দুটো রসের গান শুনাও।
(হাসি আসে কিসে)
কৃষ্ণ বলে—জানিনে রাই তােমা বিনে আর।
রাধা বলেষেটের কোলে মােটে যােল হাজার।
(এ কি ধরবার মতন )
কৃষ্ণ বলে-রাধে আমায় বলাে না গো অত।
রাধা বলে-তােমায় বলা কেবল মুখ নষ্ট ত ৷
(সে কি জানি না আমি)
কৃষ্ণ বলে—রাধে আমি ঐ চরণের দাস।
রাধা বলে-ও কথা ত আছেই বারমাস।
(আজ ত নূতন নয় হে)
কৃষ্ণ বলে-শােননা রাধে একটা কথা বলি।
রাধা বলে-তােমার কথা শুবে আজ কোন্ শালী।
( ভাগাে এখান থেকে)
দেবেন্দ্র-গীতিমালা।
১৩৭
কৃষ্ণ বলে—তােমার পায়ে মাথা খুড়বে প্যারি।
রাধা বলে-পাতে এত সস্তা নয় আমারি ।
(সােহাগ রাখাে এখন.)
কৃষ্ণ বলে-ঐ চরণে সদাই আমি বাঁধা।
রাধা বলে—সময় সময় চোখে লাগে ধাঁধা
( তাইতে দেখতে পাইনে।
কৃষ্ণ বলে—রাধে আমি ধ’বলেম তােমার পায়।
রাধা বলে–ছাড়ো ছাড়ো মাইরী একি দায়
( রোজ ভাল লাগে না )
কৃষ্ণ বলে কোনােমতে ছাড়বাে না ও চরণ ।
রাধা বলে-এ যে দেখছি অরাজকের ধরণ।
( কি মনে করেছ ? )
কৃষ্ণ ৰলে—রাধে আমি এমন আর করবাে না।
রাধা বলে-ও কথাতে আজি আর ভুলবাে না ।
( ওহে ও বাঁকাদ)
কুফ বলে—রাধে আমি নিলাম নাক-কান-মুলা ।
রাণ। বলে-আচ্ছ। এটা মনে থাকে কালা
(ঘক,মাফ, দিলেম আজ )
এতক্ষণে দলাদলি মিলে কৃষ্ণ-রাধার ।
এক্ষণেতে দুজনেতে সুখে করুন বিহার ।
(মােদের চলে চল )
“জয় রাধাকৃষ্ণ”
মুখে বল।
দেবে-চ্চি-মালা
ট~একতালা ।
কমল-আসনে, কমল-ভূষণে,
“যুগল’-কল রাজে।
কমলিনী-কোলে, যেন অলি দোলে,
বিমল-সরসী-মাঝে।
নীল-কমল কমাখি’-পাশে,
‘
রাধা-কমলিনী মৃদু মৃদু হাসে।
;
হেরি লুকোমল চরণ-কমল,
কমল মরয়ে লাগে।
কমল-যুগলে নয়নে নেহারি,
কোমল-কণ্ঠে বল হরিহরি ;
হৃদয়-কমলে ধরি ও মাধুরী,
সাজা কমল-কাকে।
•
নানা-খো।
মন রে মিছে তবে এলি, গাইলিনিকে। গান।
ও তুই, মর্ত্যলােকে স্বাগধা কলিনিকো পান।
মরম-কথা প্রাণের টানে, কইলিনিকে মধুর-তানে,
বইলিকিমের অভিমানে জানিনে সন্ধান।
কতই কি যে শিখবি বলে হলি অগ্রসর,
দেখ লি কত, শিখলি কতশবজায় নূতনতর।
তালের সনে সুরের খে, বুঝলিৰি কি প্রমােদ-মেলা,
ভ্রান্তি-বশে কবুলি হেলা শান্তি-বিধান।
দেবে-গ-িমালা। ৰিভাষ- মিকাওয়ালী । পরিণাম স্মরি, অনুরাগ ধরি, বদন ভরি বল হরিবোল'। শােক-তাপ ভুলে, হৃদি প্রাণ খুলে, দুটি বাহু তুলে বল হরিবােল। নিত্য নামধন, কর রে সাধন, হয়ে শুদ্ধ-মন বল হরিবােল; নব রাগ-রলে, নব নব ছন্দে, পরম আনন্দে বল হরিবোল।। অলস দূর করি, দিবস শর্বরী, আপনা বিস্মরি বল হরিবােল; ভজনে পূজনে, ভােজনে গমনে, শয়নে স্বপনে বল হরিবােল’ ॥ আলােকে আঁধারে, প্রাসাদে পাথারে, একাগ্র অন্তরে বল হরিবােল জলে স্থলে রণে, পৰ্বতে কাননে, নিখিল ভুবনে বল হরিবােল ॥ বিপদে সম্পদে, রােগে নিরাপদে, প্রতি পদে পদে বল হরিবােল; সুখে দুঃখে ব্রাসে, দৃঢ় বিশ্বাসে, নিশ্বাসে প্রশ্বাসে বল হরিবােল। কালভয়-হরণে, বাৰূি-তরণে, জীবনে মরণে বল হরিবােল; কি আর কর বল, চরম-সম্বল, দেবেন্দ্র কেবল বল হরিবােল।
১৪০
দেবেন্দ্র-গীতিমালা
মিশ্র-ভৈরবী—একতালা।
গান গাওয়া মাের হল, সমাপন,
আসি তবে আজি আসি গো।
যাই জানি আমি তাই ত গেয়েছি,
অসীম উদ্যমে ভাসি গাে ।
শােনাে বা না শােনো, চাও বা না চাও,
অভিশাপ যদি দিতে হয় দাও।
যতটুকু পারি, গাহিব তােমারি
অফুরণ গুণরাশি গােন।
জানি না যে সুর-তালের মৰ্ম্ম,
তব ভাব গাথা মাের কি কৰ্ম্ম,
প্ৰভব ভাবিয়া আত্মহারা শুধু
কত মতে কঁাদি হাসি গাে।
প্রণমি তােমার চরণে আমি,
করেছি তােমায় জীবনের স্বামী,
তোমারেই ভালবেসেছি ও যেন
তােমারেই ভালবাসি গাের
No text on this page.
No text on this page.
শুদ্ধিপত্র। পৃষ্ঠা গান পংক্তি ১১ যমুনার যে তোরে সুর্য্যি যমুনার সে তোরে সুয্যি ১৪ ১ সন্তানে: উনয়ে প্রণে প্রাণে હર কালো মেঘ নেমেছে যেচে প্রাণ দিনে তারে সুয্যি মামা ডুবু ডুবু এস হৃষিকেশ মানস নিমেষের দেখা দু’চার ডাকে কার তরে আর যেওনা যেওনা দেখবি যদিগাে আমার সারা সা ১ १२ মথুরাতে মথুরাতে ৩ যেওয়া যেওনা একা মৃদুল অনিলে ভুলে কি গিয়েছ আদুয়ে বিষ-বান অদূরে বিষ-বাণ ৮ এই পুস্তক সম্বন্ধে কোন বিষয় জানিতে হইলে, নিজ নাম- ঠিকানা সহ, নিম্নলিখিত ঠিকানায় চিঠি পত্রাদি প্রেরণ করিলে, সাদরে প্রত্যুত্তর দেওয়া হয়। “বটগ্রাম দেবেন্দ্র-গীতিমালা কুটীর” পােঃ ভেদিয়া-জেলা বর্ধমান।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.