Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Ishacharitamrita Ed.2nd

Sharma ,chiranjib · 2010/01/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নমঃ সচ্চিদানন্দায় হয়ে
ঈশাচরিতামৃত।
পূৰ্ব্ববিভাগ।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
“পিতৰ্যস্মি পিতাময়ি।
যুয়ৎমষ্যস্মি যুম্মা ।”
[ জন, ১৪২৩ ]
চিরঞ্জীব শৰ্মা কৰ্ত্তক
বিরচিত ।
মঙ্গলগঞ্জ মিসন প্রেসে শ্ৰপাৰ্বতিচরণ সরকার দ্বারা
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
শকাৰ ১৮৯। পৌষ।
All Rights Reserved.
মূল্য ৭০ বার আনা

No text on this page.

সূচীপত্র পৃষ্ঠা ১ • বিষয় ঐতিহাসিক সমালোচনা য়িহুদী জাতি জন্মবিবরণ ১৮ ২৭ ও ও ও ৩১ এ । বাল্যকাণ কৈশাের ও গুপ্তযৌবন সাময়িক ধৰ্ম্ম ও জ্ঞানের প্রভাব ৩৭ জলসংস্কার ••• ••• বনপ্রস্থান ও প্রলােভনয় প্রচার আরম্ভ লোকসমারোহ ও আশ্চর্যক্রিয়া পৰ্বতােপরি উপদেশ প্রথম প্রতিঘাত শিষ্যনিৰ্বাচন প্রচারকার্য্যের বিস্তৃতি অাখ্যায়িকার আকারে উপদেশ গালিল, দেশের শেষ ক্রিয়া স্বদেশ পরিত্যাগ ১০ ১৫ . * * *

No text on this page.

হােৎসর্গ। পরম প্রেমাস্পদ প্রেরিত দরবারস্থ ভ্রাতৃমণ্ডলী • ঐচরণেষু। প্রিয় ভ্রাতৃগণ ! মা অনিন্দময়ীর প্রসাদী নৈবিদ্য এই “ঈশাচরিতামৃত” অন্য আপনা- দিগকে উপহার দিবার জন্য আমি পবিত্র দরবারের দ্বারদেশে উপস্থিত হইতেছি। জগতের প্রায়শ্চিত্তাৰ্থ নিহত এই স্বর্গীয় মেষশিশু আপনাদেরই উপভােগ্য। ভক্তলােলুপ পিশাচস্বভাব যিহুদী ধর্মযাজকগণ যাহার শােণিত পাত করিয়া চির কলঙ্ক সাগরে নিমগ্ন হইল, সেই পুণ্যবতার যিশুর পুণ্যশােণিত পান করিয়া প্রেরিত সাধুগণ নবজীবন লাভ করিলেন। বৰ্ত্ত- মান যুগেও সেই য়িহুদীপ্রকৃতি মােহান্ধ অবিশ্বাসী মানবেরা আপনাদিগের দুরাচার দ্বারা মহাত্মা যিশুকে পুনঃ পুনঃ ক্রুশাহত করিতেছে এবং ভগবদ্ভক্ত- গণ তাহার চরিতপীযুষ : পানে বলিষ্ঠ হইতেছেন। “প্রেরিতদরবার” এই অমৃতশােণিত পানে সতত পিপাসু জানিয়া আমি আজাদ সহকারে আপনাদের হস্তে ইহা অৰ্পণ করিতেছি। ধৰ্ম্মপথে আপনারা আমার প্রধান সহায়। আপনাদের ভ্রাতৃবাসৎল্য এবং সাধু দৃষ্টান্তে আমাকে দরবারের নিকট চিরকৃতজ্ঞতা পাশে বাঁধিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু তদ্বিনিময়ে এ পর্যন্ত আমি কিছুই প্রত্যর্পণ করিতে পারি নাই। এক্ষণে যােগিবর যিশুকে দেশীয় পরিচ্ছদে সজ্জিত করিয়া মনে বড় অভিলাষ হইল যে ইহা আপনাদের নামে উৎসর্গ করি। পৃথিবীতে ইহা ব্যতীত এমন সামগ্রী আর কি আছে যাহা ধর্মবন্ধুদিগকে দিয়া কৃতজ্ঞ হৃদয় পরিতুষ্ট হইতে পারে? তাই আজ এই “ঈশাচরিতামৃত” আপনাদের হতে সমর্পণ করিতে উৎসাহী হইলাম, গ্রহণ কয়িলে কৃতার্থ হই। চিরানুগত ঐচিরঞ্জীব শৰ্ম্মা।

No text on this page.

ভূমিকা। মহাযোগী ঈশার অনুপম চরিত রচনা করিয়া বঙ্গীয় ভক্তসমাজকে উপহার দিব ইহা আমার অনেক দিনের সাধ ; কিন্তু শারীরিক দুর্বলতা, বিশে- ষতঃ চক্ষের ক্ষীণদৃষ্টি নিবন্ধন এত দিন সে সাধ পূর্ণ করিতে পারি নাই। যখন দৃষ্টিশক্তি এক প্রকার রহিত হইল, লিখন পঠনের আর কিছুমাত্র ক্ষমতা রহিল না, তখন মনে মনে ভাবিলাম, “হায় ! প্রদীপে তৈল থাকিতে কি আলােক নির্বাণ হইবে ?” কিন্তু ধন্য মা দয়াময়ীর দয়া! তাহার প্রেম- বিকসিত প্রসন্নানন কোন দিন আমাকে নিরাশার কথা বলে নাই। বরং আমি ইহাই প্রত্যক্ষ করিলাম এবং তাহা স্মরণ করিয়া আমার হৃদয় যখন তখন আশা ও কৃতজ্ঞতারসে উচ্ছসিত হয় যে, যে পবিত্র কাৰ্যে তিনি এ দাসকে ব্ৰতী করিয়াছেন ঘোর পরীক্ষার মধ্যেও তাহা বাধা পাইল না। পৰ্যায়ক্রমে অতি আশ্চর্য নিয়মে দুইটী চক্ষু তাহার সেবা করিতেছে। আমি স্পষ্ট দেখিলাম, তিনি একটি ঢাকিয়া আর একটি খুলিয়া দিলেন, আবার একটি খুলিয়া দিয়া অপরটি ঢাকিয়া রাখিলেন ; এক সঙ্গে দুইটি অকৰ্ম্মণ্য হইল না। চিকিৎসালয়ে যাইবার পূর্বে এবং তথায় থাকিবার সময় এই মানস করিয়াছিলাম যে, “মা, পুনরায় যদি চক্ষু পাই, তবে সর্বাগ্রে তােমার প্রিয় পুত্র যিশুর চরিত্র লিখিয়া তােমায় পূজা দিব।” জননী আনন্দময়ী আমার সে আশা পূর্ণ করিয়াছেন, এইজন্য বহুল অযােগ্যতা সত্ত্বেও আমি এই মহাগুরুতর অনুষ্ঠানে আত্মােৎসর্গ করিতেছি। অসাধারণ প্রকৃতি দেবাত্মা যিশুর জীবনচরিত রচনা করা যে কি দুরূহ কাৰ্য, তাহা আমি বিলক্ষণ অবগত আছি। যদিও তঁাহার জীবনলীলা সাদ্ধ তিন বৎসর কালমাত্রব্যাপী, কিন্তু এই অল্প কালের জীবনপ্রহেলিকা 'উনিশ শত বৎসরেও অদ্যাপি সম্পূর্ণরূপে পরিস্ফুটিত হইল না। সময়ের অন্ধুতায় কি যায় আসে ? যে সমস্ত সারগর্ভ গভীর সত্য তিনি প্রচার করিয়া গিয়াছেন তাহার এক একটি বাক্য অবলম্বন করিয়া এ কাল পর্যন্ত কত লােক কত গ্রন্থই লিখিল ! কিন্তু তথাপি উহার তত্ত্ব নিঃশেষিত হইল না। এক একটি ভাব ও চিন্তা যেন মধুচক্রের ন্যায় সহস্র সহস্র প্রকোষ্ঠে সংর- চিত। যখন এই মহাপুরুষের জীবনলীলা অনুধ্যানে প্রবৃত্ত হই, তখন ভাবের বিপুল তরঙ্গমধ্যে মন একেবারে ডুবিয়া যায়। এমন সকল অর্থযুক্ত সার কথা তিনি বলিয়া গিয়াছেন যাহার মর্মাভাস উপলব্ধি হইবা মাত্র হৃদয়- ফলকে রাশি রাশি প্রতিবিম্বচ্ছটা বিকীর্ণ হইয়া পড়ে। কতই বা তাহা ধারণ করিব! আর কতই বা তাহা লিখিব। মূল অভিপ্রায়ের নিকট পেীছিতে না পৌঁছিতে মন যেন আর এক রাজ্যে গিয়া উপনীত হয়। তঁাহার যে সমুদায় সত্য অনন্ত জীবনের সঙ্গে সমব্যাপী, এবং যে দৃষ্টান্ত মানবচরিত্রের আদর্শ তাহা কি এক খণ্ড ক্ষুদ্র পুস্তকে পর্যবসিত হইতে পারে ? এই সকল চিন্তা করিয়া ভয় হয় যে, পুস্তক বর্ধিত কলেবর হইলেও হয়তাে মনঃক্ষোভ থাকিয়া যাইবে। যিনি যখন এই গুরুতর কার্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন তাহাকেই স্বীকার করিতে হইয়াছে যে, যিশুচরিত এক প্রকাণ্ড সাগর সমান। মহা মহা বিজ্ঞ পণ্ডিতদিগের যখন এই কথা, তখন এক জন সামান্য বঙ্গবাসী যে খ্রীষ্টধর্মী নহে, খীষ্টীয় ধর্মশাস্ত্র সকল রীতিমত পরিশ্রমের সহিত অধ্যয়নও করে নাই, তাহার পক্ষে ইহা কত দূর দুঃসাহসের কাৰ্য্য সহজেই হৃদয়ঙ্গম হইতে পারে। বিশে- যতঃ এই মহাপুরুষের জীবনের প্রায় প্রতি ঘটনায় এক দিকে ঐতিহাসিক ভ্রান্তি এবং প্রচলিত কুসংস্কার, অপর দিকে যথার্থ ভাব গ্রহণে নিজের দু - লতা ও অদূরদর্শিতা, উভয়বিধ প্রতিবন্ধক অতিক্রম করিয়া আমাকে অগ্রসর হইতে হইযাছে। বৈদেশিক প্রাচীন ইতিহাস এবং বিজাতীয় স্বভাবের দুর্ভেদ্য অবরণের ভিতর হইতে ঈশারতের প্রকৃত ছবি বাহির করা, তঁাহার মনুষ্যত্ব এবং দেবত্বের বিভিন্নতা অবধারণ পূৰ্ব্বক ব্রহ্মেতে তাহার অভেদত্ব দর্শন করা সামান্য জ্ঞান বুদ্ধির পক্ষে সব নহে। তথাপি যে আমি এ কার্থে সাহসী হইয়াছি তাহার কারণ আছে। মায়ের বলে বলী হইয়া আমি এ পথে পদার্পণ করিয়াছি। এই নিমিত্ত উপরিউক্ত প্রতিবন্ধক সফল আমাকে ভগ্নোৎসাহ করিতে পারিতেছে না। প্রতিবন্ধ • ; নাঙ্গা বেদবাণী আমাকে বুকাইয়া দিয়াছেন, তাহার প্রিয় সন্তান যিশুর সঙ্গে আমাদের একটি অতি নিকট সম্পর্ক আছে। তিনি মনুষ্যবংশের পরম গৌরব এবং আমাদের পূর্বপুরুষ ; তাহা হইতে বিশ্বাস এবং পুণ্যের শােণিত- ধারা প্রবাহিত হইয়া বর্তমান, ভক্তসমাজকে পােষণ করিতেছে। আর একটি কথা এই যে, যে সমুন্নত উৰ্ব্বরা ভূমিতে এবং নিৰ্ম্মল জলবায়ুর মধ্যে ঈশাজীবন পরিবর্ধিত হয়, বর্তমান সময়ে সেই পুণ্যক্ষেত্রে আমরা এখন বাস করিতেছি। দুই সহস্র বৎসর পূর্বে পৃথিবী ঘুরিতে ঘুরিতে নৈসর্গিক নিয়মে সূর্যের যত নিকটবর্তী হইয়াছিল, এক্ষণে উহা তত দূরে আসিয়া উপনীত হইয়াছে। তৎকালে ব্ৰহ্মতেরূপ নববিধানসূর্য্য যেমন প্যালে- ষ্টাইন ভূভাগে সমৃদিত হইয়া সমস্ত পৃথিবীকে আলােক দান করে, অদ্য ভারতকাশে সেই নবসূৰ্য্য অভূদিত হইয়া নববিধানজ্যোতি জগতে বিতরণ করিতেছে। দেশ কাল, জল বায়ু এবং জাতিগত অসমতা এই নববিধানের উচ্চ ভূমিতে সমতা প্রাপ্ত হইয়াছে বলিয়া আমি ইহাতে সাহসী হইয়াছি। কথিত আছে, যোগাচাৰ্য্য শ্রীকৃষ্ণদেব রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় মহাযজ্ঞে নিমন্ত্রিত জন্য এবং ব্রাহ্মণবর্গের পদধৌত কার্যে নিযুক্ত ছিলেন ; মা ব্রহ্মা- ণ্ডেশ্বরীর বর্তমান নববিধান দরবারে তেমনি সুরেন্দ্রপূজিত মহাযোগী যি ও স্বীয় শোণিত দ্বারা এক্ষণে ধীবর চণ্ডাল ধনী দরিদ্র জ্ঞানী মুখ •র নীর পদুধৌত করিবার জন্য দণ্ডাযমান রহিয়াছেন। বিদ্যাশক্তি জননী যখন এই সুন্দর ছবি চিপটে অঙ্কিত করিলেন, তিনি যখন মহাযোগমন্ত্রে বিদেশকে মমি, য়িহুদীকে অযোগিরূপে পরিণত করিলেন, তখন কেনই বা আমি এ কাৰ্য্যে সাহসী হইব না? অনুদার চরিত খীষ্টধর্মাবলম্বী কেহ যদি ইহাতে বিরক্ত হন, কি করিব ? যিশু যেমন তাহাদের আদরের সামগ্রী, আমাদেরও তেমনি ; এ কথায় কিছু মাত্র অত্যুক্তি নাই। অতএব আমি জয় মা জগদীশ্বরী বলিয়া এখন যাত্রা করি।-দেশ কাল জাতি সম্প্রদায়ের ব্যবধান ছিন্ন করিয়া তীর্থযাত্রী ভক্তদলের পশ্চাতে পশ্চাতে যাত্ৰা করি। এবং নববিধানের প্রেমের দরবারে অমরবৃন্দপরিবেষ্টিত অমৃতচরিত যিশুর অপরূপ অলােকমান্ত রূপ দর্শন করিয়া তাহার চরিতলীলা বর্ণনে D প্রব্রত হই।

এই মহৎ এতে ব্ৰতী হইবার পূর্বে একবার সেই ঈশাণ মহাত্মাকে ভক্তিসহকারে স্মরণ ও প্রণিপাত না করিয়া থাকিতে পারিলাম না, যিনি স্লেচ্ছকুলােদ্ভব ঈশাকে যােগিবেশে সজ্জিত করিয়া এই সঙ্কীর্ণ হৃদয় হিন্দু- বংশের শাণিতমধ্যে প্রবিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। তিনি যদি পথ পরিস্কার করিয়া না রাখিতেন, তাহা হইলে কেই বা ঈশাকে চিনিত, কেই বা তাহার মধুর চরিত বর্ণনে উৎসাহী হইত।. খ্ৰীষ্টীয়ধৰ্ম্মযাজকগণ এবং দেশীয় খ্ৰীষ্টীয়ান ভ্রাতৃমণ্ডলী যাহা পারেন নাই, ইহা দ্বারা তাহা সম্পন্ন হইয়াছে। খঞ্জীয়ানধর্মাবলম্বী মহাত্মারা যিশুর চরিতাখ্যান যেরূপ উৎসাহের সহিত পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তার করিয়াছেন তাহা ভাবিলে আর মনে হয় না যে এ সম্বন্ধে অন্য কাহারাে কিছু করিবার আছে। এমন কোন লিখিত ভাষা দেখা যায় না যাহাতে ইহা বর্ণিত হয় নাই। এমন কোন দেশও নাই যেখানে ইহা প্রচারিত না হইয়াছে। ঘাের অসভ্য পৰ্বতবাসী মনুষ্য- দিগের মুখেও যিশু নাম শুনিতে পাওয়া যায়। অনেকে মনে করিতে পারেন, তবে আর এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিবার প্রয়ােজন কি ? অপিচ, লেখক যখন আপনাকে অন্য ধর্মাবলম্বী বলিরা নিজমুখে স্বীকার করিতেছেন তখন এ কাৰ্য তাহার পক্ষে অনধিকার চর্চা মাত্র। এ কথার উত্তরে এই মাত্র বলা যাইতে পারে, যিশুচরিত নিরপেক্ষ ভাবে সহজ বঙ্গ ভাষায় লিখিবার আবশ্যকতা আছে। ইহার প্রচলিত বাঙ্গলা অনুবাদ এমন জটিল এবং অরুচিকর যে তাহা পাঠে মনে এক প্রকার অসুখ জন্মে ; ভাল বুঝিতেও পারা যায় না। যিশুর সুন্দর সুমিষ্ট চরিত অনুবাদের দোষে যে বহু পরি- মাণে বিকৃত হইয়া রহিয়াছে তাহাতে আর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই। বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা লেখকের পক্ষে অনধিকার চর্চাও নহে। কারণ পৃথিবীর লুপ্তপ্রায় সাধুজীবন সকলকে পুনরুদ্ধার করা এবং সত্যের বিমল বর্ণে তঁাহাদিগকে চিত্রিত করা বর্তমান নববিধানের এক মহৎ সঙ্কল্প।, ভরসা করি বঙ্গীয় পাঠকগণের এবং প্রকৃত খী তত্ত্বানুসন্ধায়ী ভাগবতগণের পক্ষে এই গ্রন্থ পাঠোপযোগী হইবে। মা দয়াময়ীর চরণে অবশেষে আমার এই প্রার্থনা যে, তাহার অাদর্শ পুত্র নদেব যিশুর মাহাত্ম্য অামার বঙ্গবাসী ভাতা ভগিনীদিগকে তিনি • বুঝাইয়া দিন। এবং এই পুরাতন দাসকে আশীর্বাদ করুন, যেন সে তাহার কৃপাবলে উপস্থিত কাৰ্য্যে সফলকাম হয়। স্বর্গলােকবাসী দেবকুল এবং আমার সহযাত্রী ভক্তমণ্ডলীও আমার সহায় হউন! হে মাতঃ। সাধুজননি, ভক্তবীরপ্রসবিনি, তােমার পবিত্র আলােকে এক বার সেই মানবকুলপাবন সৎপুত্র যিশুর প্রকৃত স্বরূপ আমাকে দেখাও। জামি 'তােমার প্রেমকক্ষে তাহাকে দেখিয়া তাহার রূপ গুণ বর্ণনা করি।

No text on this page.

ঈশাচরিতামৃত ঐতিহাসিক সমালােচনা। ঈশার জীবন ও ধর্মোপদেশ এবং তাহার ঐতিহাসিক মুলতত্ত্বসম্বন্ধে বিগত দুই সহস্র বৎসরের মধ্যে এত অধিক গ্রন্থ রচিত হইয়াছে এবং সে সমস্ত পরস্পর পরস্পরের এত বিরােধী যে, প্রকৃত অমিশ্র তত্ত্ব তাহা হইতে উদ্ভাবন করা একটি মহকষ্টসাধ্য ব্যাপার। যদিও এ সকল জঞ্জাল ভেদ করিয়া তাহার স্বর্গীয় জ্যোতির ছটা দীনাত্মা মানবদিগকে বহু দিন হইতে সংপথ দেখাইয়া আসিতেছে, তজ্জন্য ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির সমালোচনা পড়ি, বার প্রয়ােজন হয় না; কি স্ক তথাপি ঐতিহাসিক মূলসম্বন্ধে যত দূর সম্ভব নিঃসংশয় হওয়া প্রার্থনীয়। কারণ, বিশ্বাসযােগ্য ইতিহাসের দিকে সহ- জেই আমাদের দৃষ্টি পড়ে, তৎসম্বন্ধে উদাসীন থাকা অসম্ভব। অধিকন্তু যখন প্রাচীন ইতিহাসের ভূমিতে দণ্ডায়মান হইয়া আমরা এই দিব্য জীবন জ্যোতি অবলােকন করিতেছি, তখন কেবল ভাবুকতার পক্ষপাতী হইতে পারি কৈ ? যে সকল ব্যক্তি আপনাদের চক্ষু কর্ণের বহিভূত প্রদেশের রাণিক টন। মাকে কেবল অবিশ্বাসের চক্ষে দেখিতে শিখিয়াছেন, ভূতকালের ইতিহাস পদে পদে যাহাদিগের মনে কেবল সন্দেহ উৎপাদন করে, তাহাদিগের সহিত আমার কিছুমাত্র সহানুভূতি নাই। পক্ষান্তরে যাহার। বিগত সময়কে স্বর্গ কল্পনা করত তাহার যাবতীয় যৌক্তিক অযো- ক্তিক ঘটনাকে অভ্রান্ত জ্ঞান করেন, তদ্বিষয়ে কেহ সন্দিহান হইলে তাহার প্রতি খঙ্গহস্ত হন, তাহাদিগের সঙ্গেও আমি ঐক্যমত হইতে পারি না। যাহা স্বাভাবিক এবং সঙ্গত, এবং যাহা অবিশ্বাসীর স্কুল দৃষ্টতে কল্পনাসভূত २ ঈশাচরিতামৃত। ভ্রান্তিমাল, অথচ অধ্যাত্ম জগতের বিশ্বাসী ভক্তের দিব্যজ্ঞানে সুসঙ্গত, সেই নিরাপদ ভূমি অবলম্বন পূৰ্ব্বক এক দিকে জ্ঞানসর্বস্ব বিচারপ্রিয় রেনা, অপর দিকে প্রচলিত বিশ্বাসের পক্ষপাতী ক্যাননু ফেরার, এবং মধ্যপূথবী, ডাক্তার সেঙ্কুেল,, এই তিন গ্রন্থকারের সংগৃহীত তত্ত্ব মথি মার্ক লিউক জনের রচিত মূল ধর্মগ্রন্থচতুষ্টয়ের সহিত মিলাইয়া এই জীবনচরিত লিখিত হইবে। ফরাসীয় পণ্ডিত রেনা বহুল প্রাচীন ইতিহাস অধ্যয়ন করিয়া বিস্তৃত টীকা টিপ্পনির সহিত যে পুস্তক প্রণয়ন করিয়াছেন, তাহাতে তত্ত্বানুসন্ধানের আর তিনি কিছু বাকী রাখেন নাই। জাৰ্ম্মণ পণ্ডিত ডাক্তার সেঙ্কেলও পূৰু বৰ্তী প্রসিদ্ধ গ্রন্থকারগণের পরিশ্রম জাত ফল পরিপাক করিয়া *ীয় গ্রন্থের পুষ্টিবর্ধন করিয়াছেন। ইংরাজ পুণ্ডিত ক্যান ফেরারের গ্রন্থ আবার ঐ সকল গ্রন্থের উপার্জিত তত্ত্বের শেষ পরিণতি। শেষােক্ত গ্রন্থে প্রাচীন তত্ত্বের ভূরি ভূরি প্রমাণ এবং ব্যাখ্যা সন্নিবিষ্ট আছে। কিন্তু এই সমুদায় বৃহৎ পুস্তকে অবান্তরিক ঘটনা- পুঞ্জ এত অধিক এবং তৎসম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থকারের এত মতভেদ যে তাহার ভিতরে পড়িলে আপনাকে হারাইয়া ফেলিতে হয়। আমার উদ্দেশ্যসিদ্ধির পক্ষে তত্তাবতের বিস্তৃত বিস্তৃত সমালােচনা নিষ্প্রয়ােজন। ঈশ্বরের অনুগত অমর পুত্র যিশু পৃথিবীকে যে শাস্ত্র শিক্ষা দিতে আসি- ছিলেন এবং যাহা সপ্রমাণের জন্য তিনি প্রাণ উৎসর্গ করেন, তাহারই তাৎপৰ্য্য বুঝিতে পারিলেই আমাদের মনােরথ পূর্ণ হইবে। বিস্তারিত সমস্ত ঘটনার আদ্যোপান্ত ইতিবৃত্ত যদি আমরা যথাযথরূপে নিরূপণ না করিতে পারি, তাহাতে বিশেষ কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নাই। ধৰ্ম্মজীবনের পক্ষে যাহা ফলপ্রদ, সেই প্রকৃত জীবনরত্ন লাভ করিতে পারিলেই পাঠক এবং লেখকের আশা সফল হইবে। যিশুর সৰ্ব্বাঙ্গসুন্দর পুণ্য প্রতিমা সঙ্গঠনের জন্য তত্ত্বানুসন্ধারী জ্ঞানিগণের নিকট যে কিছু সাহায্য পাওয়া যায় তাহাই লইব। আমাদের প্রধান অবলম্বন মূলগ্রন্থচতুষ্টয় । ঈশাচরিত ও খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মের যাবতীয় শাস্ত্র এই ভিত্তির উপর সংস্থাপিত। ধন্য আদিগ্রস্থ প্রণেতা সাধুগণ! তাহার প্রথমে যদি ঐ চাৰিখণ্ড বিধান- পুরাণ না লিখি যাইতেন, তাহা হইলে সােণার ঈশাকে কি আমরা ঈশাচরিতামৃত। পাইতাম ? পরবর্ত্তী সময়ের কল্পিত রচনাবলী ইহার মধ্যে যতই কেন প্রবিষ্ট হউক না, মলিনতাজড়িত স্পর্শমণির ন্যায় তাহার ভিতর হইতেও মহা- পুরুষােত্তম যিশুর জীবনজ্যোতি উদ্ভাসিত হইতেছে । এক্ষণে প্রশ্ন এই, উল্লিখিত মূলগ্রন্থচতুষ্টয়ের লিখিত ইতিহাস কি সমস্ত বাস্তবিক ? উহাদিগের আশ্রয় লইলে আমরা কি সহজে ঈশার জীবনরাজ্যে প্রবেশ করিতে পারি ? পরবর্তী ইতিহাসসমালোচকদিগের মতবিবাদের চক্রে পড়িলে যেমন পথ হারাইতে হয়, আদিগ্রন্থ কয়েকখানির বিভিন্ন রচনার মধ্যেও আমা- দিগের প্রায় সেই দশা ঘটে। মূল গ্রন্থ আবার কোন মূলের উপর সংস্থাপিত, ইহার ভিতর কোন্ কোন্ গ্রন্থই বা সত্যানুসন্ধায়ী বিজ্ঞসমাজে বিশেষ আদৃত,, কাহার পর কোন্ সময়ে কোন্ খানি প্রচারিত হইয়াছে, গ্রন্থকার সাধু চারি জন কি অবস্থার লােক, সংক্ষেপে এ সকল অবগত হওয়া কষ্টসাধ্য নহে। ভরসা করি তদ্বিষয়ে কিছু পৰ্যালােচনা করিলে উহা কাহারাে বিরক্তির কারণ হইবে না। যে চারি জন গ্রন্থ কত্তার নাম জগতে প্রসিদ্ধ আছে, তঁাহার বর্তমান প্রচলিত ধৰ্ম্মগ্রন্থের প্রণেতা বলিয়া কত দূর গৃহীত হইতে পারেন, সে সম্বন্ধে বিচক্ষণ পণ্ডিতগণের মধ্যে বহু প্রকার মতভেদ লক্ষিত হয়। না, ঈশার জীবনচরিত এবং প্রবচনাবলী মূলতঃ যেরূপ রচিত হইয়াছিল, কালসহকারে ক্রমে ক্রমে শ্রুতি ও কল্পিত প্রবাদবাক্য দ্বারা তাহার কলে, বর বহুপরিমাণে বর্ধিত হইয়াছে। ইহার কোন একখানি গ্রন্থ ঈশার জীবিত কালের রচনা নহে, সমুদায় গুলি, অন্ততঃ প্রথম তিন খণ্ড, প্রথম শতাব্দীর মধ্যে প্রচারিত হইয়াছিল । মানবসমাজের আদিমাবস্থায় লিখিত ধৰ্ম্ম- গ্রন্থের প্রতি আদর প্রায় কোন দেশেই দেখা যায় না। শ্রুতিপরম্পরায় ধৰ্ম্মবিধিসকল প্রচলিত থাকে, শব্দ এবং ভাষা অপেক্ষা ভাবের প্রতি তখন লােকের অধিক, অনুরাগ প্রকাশ পায়। সকল দেশে এবং সকল জাতির ভিতরেই প্রাচীনকালে এই রীতি প্রচলিত ছিল। বেদসম্বন্ধেও আৰ্যদিগের মধ্যে ইহার প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। বিশেষত আদিম খ্রষ্টধৰ্ম্মিগণ মনে করিতেন, পৃথিবী ধ্বংস হইয়া যাইবেই, তবে আর ইতি- হাদ লিখিয়া রাখিবার ফল কি? ধৰ্ম্মবিধিসমস্ত কষ্ঠস্থ থাকা প্রার্থনীয়। * ৪ ঈশাচরিতামৃত। এই সংস্কারের পরতন্ত্র হইয়া প্রথমে তাহার কিছুকাল চলিয়াছিলেন । অনন্তর ঈশার স্বর্গারােহণের অনুমান ত্রিশ বৎসরের পর মার্ক লিখিত সুস মাচার লিপিবদ্ধ হয়। মথিলিখিত হিব্রু ভাষায় রচিত “লগিয় ” নামক গ্রন্থ সর্বাগ্রে প্রচায়িত হইয়াছিল, এইরূপ অনেকে বলেন। এক্ষণে যেমন “বাইবেল” গ্রন্থের প্রত্যেক অক্ষর অভ্রান্ত ব্ৰহ্মবাণী বলিয়া খ্রষ্টীয় সমাজে গৃহীত হইয়া থাকে, আদিমাবস্থায় সেরূপ ছিল না। তখন ঈশার জীবনপ্রভাব জীবন্ত ছিল,কেহ তাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছে, কেহ বা সহচর শিষ্যগণের মুখে শুনিয়াছে, সুতরাং গ্রন্থের কোন প্রয়ােজন হয় নাই। পরে যত দিন, যাইতে লাগিল, ততই সে স্বর্গীয় জ্যোতি বিস্মৃতি ও ' বিকৃতির অন্ধকার মধ্যে আচ্ছন্ন হইতে লাগিল; এবং সেই পরিমাণে কর্মকাণ্ড এবং প্রাণহীন ভাষার উপর সাধারণের নির্ভরও বাড়িল । পরিশেষে এখন এত দূর পর্যন্ত দাঁড়াইয়াছে যে, বাইবেলের সকল কথাই অভ্রান্ত। ধর্মগ্রন্থপ্রচার আর শু হইলে নানা জনে নানা বিপ শাস্ত্র সংগ্রহ করিতে লাগিল। তাহার মধ্যে প্রকৃত ঘটনাও ছিল, আবার কল্পনা উপন্যাস অলৌকিক বৃত্তান্তও অনেক ছিল। যখন বহু শাস্ত্র বিভিন্ন মত নানা স্থানে বিস্তার হইতে লাগিল, তখন নূতন নূতন সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হইল। এমন কি, প্রথম শতাব্দী গত হইতে না হইতে “নাষ্টক” নামে এক সম্প্রদায়ের সূত্রপাত হয়। ব্রাহ্মধৰ্ম্ম যেমন প্রথমে হিন্দুশাস্ত্রের অবলম্বনে হিন্দু আকারে প্রচারিত হয়, পরে সর্বজনীন মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়াছে ; এবং ইহার ভিতর যেমন রক্ষণশীল ও উন্নতিশীল নামে দুই দল আছে, খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম য়িহুদী ধৰ্ম্মের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়া পিটার ও পলের পশ্চাতে তদ্রপ প্রণালীতে কিছু দিন চলিয়াছিল। পরিশেষে রক্ষণশীল পিটারের সঙ্কীর্ণতা পলের ঔদা- ৰ্যের মধ্যে বিলীন হইয়া যায় । অতঃপর ঈশাসম্বন্ধে নানা জনে নানা মত প্রকাশ করিতে লাগিল দেখিয়া যাবতীয় সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মযাজকগণ এক মহাসভা আহ্বান করেন। তাহাতেই স্থিরীকৃত হয় যে অন্যান্য সকল গ্রন্থ ভ্রান্ত, কেবল এই চারিখানি অভ্রান্ত। সেই অবধি ইহা সাক্ষাৎ ব্রহ্ম- বাণী বলিয়া চলিয়া আসিতেছে।

ঈশাচরিতামৃত। দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষার্ধ্বভাগের পূর্ব পর্যন্ত খ্ৰীষ্টীয় নববিধানের কোন গ্রন্থ অভ্রান্ত বােধে গৃহীত হয় নাই। পরে যখন কাথলিক চার্চ সঙ্গঠিত হইল, তৎকালে তাহারা এক ধৰ্ম্মওস্থ নির্ধারণ করিয়া লইলেন। যিশুর আগম- নের ১৭০ বৎসর পরে বাইবেলের নিউটেষ্টমেন্ট বিভাগ পরম পবিত্র এবং প্রত্যাদিষ্ট বলিয়া পরিগণিত হইয়াছে। দ্বিতীয় শকের শেষার্ধভাগে যে সকল গ্রন্থ নিৰ্বাচিত এবং নির্ধারিত হয়, তাহার মধ্যে মথি মার্ক প্রভৃতি চারি জনের গ্রন্থ আর প্রেরিতদিগের ক্রিয়া ও পত্র ছিল। কিন্তু শেষােক্ত গ্রন্থের সমুদায় গুলি তখন সঙ্কলিত হয় নাই। কোন্ স্থানে কিরূপে ইহা নির্বাচিত ও নির্ধারিত হয় তাহার নিশ্চয় তত্ত্ব জানিবার কোন উপায় নাই। আসিয়া মাইনরের কোন স্থানে উক্ত সভা হইয়াছিল এইরূপ অনু- মান। ৩৬৩ খ্রীষ্টাব্দে এই বিষয় মীমাংসার জন্য আর একটী সভা হইয়াছিল। অবশ্য যখন শত শত খ্ৰীষ্টীয় পুরাণের মধ্যে এই চারিখণ্ড মাত্র গৃহীত হইয়াছে, তখন সহজেই মনে হয় যে, বৎসরের পর বৎসর এমন অনেক দিন চলিয়া গিয়াছিল যে সময়ে আমি খ্ৰীষ্টীয় সমাজ কোন গ্রন্থবিশেষকে অভ্রান্ত বলিয়া গ্রহণ করেন নাই। পুল, পিটার জন্ ইহারা বিনা গ্রন্থে ধৰ্ম্ম প্রচার করিয়া গিয়াছেন। প্রকাশ্য সভা কর্তৃক যদি অভ্রান্ত ধৰ্ম্মপুস্তক নির্ধারিত হইয়া থাকে, তাহা হইলে মনুষ্যের বিবেক ধৰ্ম্মবুদ্ধি গ্রন্থের উপরে হইল। এই জন্যই আমরা বলিয়া থাকি, মানবের আত্মপ্রত্যয়সিদ্ধ সহজ জ্ঞান, বিবেক, এবং সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা, এই সকল প্রত্যা- দেশের দ্বার। ইহার ভিতর দিয়া অন্তর্যামী প্রভু পরমেশ্বর সকলকে নিজ অভিপ্রায় অবগত করেন, তাহার পরে ধৰ্ম্মপুস্তকে তাহা লিপিবদ্ধ হয়। যাহাই হউক, ফলতঃ ঈশার জীবন ও ধৰ্ম্ম জগতে প্রতিষ্ঠিত রাখিবার পক্ষে অপেক্ষাকৃত উপরিউক্ত চারিখানি পুস্তক যে বিশেষ উপযােগী এবং বিশ্বাস্য তাহাতে আর সন্দেহ হইতে পারে না। ইতিহাসসমালােচক পণ্ডিতগণ মার্ক লিখিত গ্রন্থকেই সর্বাপেক্ষা অধিক মূল্যবান মনে করেন। কারণ, ইহা অনুমান প্রথম শতাব্দীর ষষ্টিবর্ষ মধ্যে লিখিত হয় এবং ইহাতে অসঙ্গত অলৌকিক বর্ণনা বা কল্পিত প্রবাদ বাক্যের ‘ভণ্ড আধিক্য নাই; ভাষা সরল এবং তাহ। অলঙ্কার ও আড়ম্বরবিহীন। সময়ের ঈশচরিতামৃত। উপযোগী সত্যমূলক রচনা বলিয়া ইহা বহু পরিমাণে সমাদৃত হয়। সাধু মার্ক ঈশাকে স্বচক্ষে দেখেন নাই, কিন্তু তিনি পিটারের প্রিয় শিষ্য এবং ধৰ্ম্মপুত্র ছিলেন, পলের সহচর বার্ণাবাস্ তাহার মাতুল। জেরুশালম নগরে মার্কের বাস ছিল, পিটার তথায় সদা সর্বদা যাতায়াত করিতেন। মার্ক কিছু দিন পল ও বার্ণাবাসের সহিত প্রচারক্ষেত্রে ভ্রমণ করিয়াছিলেন। পিটার যংকালে রােমনগরে যিশুর মহিমা ঘােষণা করেন, তখন মার্ক তাহার সঙ্গে থাকিতেন এবং তাহার প্রচারিত উপদেশাবলী সংগ্রহ করিয়া লইতেন। যিশুর জীবন- চরিত তখন এক মাত্র উপদেশের বিষয় ছিল। মার্ক ক্রমে ক্রমে সে সমস্ত সংগ্রহ করেন, কিন্তু যাহার পর যে ঘটনা বিধিপূৰ্ব্বক তাহা সম্বদ্ধ করিতে পারে। ই। অথচ যাহা কিছু তিনি লিখিয়া গিয়াছেন তাহা যে যিশু- সহচর পিটারের প্রত্যক্ষ জ্ঞানের কথা সে বিষয়ে কাহারাে দ্বিমত দেখা যায় না। মথির হিব্রু লগিয়া” মার্কের সহায়তা করিয়াছে ইহাও অনেকে বলেন। সেন্ট মথি অবশ্য ঈশার এক জন সঙ্গী এবং অনুগত শিষ্য ছিলেন, কিন্তু ইহার নামে যে গ্রন্থ এখন চলিত আছে তাহা পরবর্তী সময়ে অনু- বাদকগণের অতিরিক্ত রচনার সহিত মিশ্রিত। গ্রীকৃ ভাষায় লিখিত প্রথম ধৰ্ম্মগ্রন্থ যাহা মথির বলিয়া প্রসিদ্ধ, তাহা যে যিশুৰ শিষ্য, মথির রচনা নয়, ইহা তত্ত্ববিদ পণ্ডিতগণের বহু অনুসন্ধানে স্থির সিদ্ধান্ত হইয়াছে। হিব্রু “লগিয়া” মথির মূল গ্রন্থ, তাহাতে যিশুপ্রদত্ত কতিপয় উপদেশ লিপিবন্ধু হয়। পরে ঐ সকল উপদেশ নানা জনে নানা ভাষায় অনুবাদ করেন, এবং তৎসঙ্গে তাঁহারা নিজ নিজ সংগৃহীত শ্রুতি ও প্রবাদবাক্যও সংযােগ করিয়া নে। বর্ধিত অংশের মধ্যে সত্য এবং কল্পনা উভয়ই সন্নিবিষ্ট হইয়া গিয়াছে। পুরাতন বাইবেলে ডানিয়েল প্রভৃতি ভবিষ্যদ্বক্তাগণ ভাবী মাহাপুরুষ সম্বন্ধে যে সকল ঘটনা ও লক্ষণের কথা লিখিয়া যান, তাহা ঈশার সম্বন্ধে লিখিত হইয়াছিল এই বিশ্বাসে আদিম খ্রীষ্টবাদিগণ নৃতুন বাইবেলে এমন সকল কথা ক্রমশঃ সংযােগ করিয়াছেন, যাহার সত্যতাবিষয়ে অনেক সন্দেহ হয়। এরূপ কেহ কেহ বলেন যে, ঈশ। ঐ সমুদায় ভবিষ্যদ্বাণী আপনাতে মিলাইয়া লইতেন এবং তদনুসারে কাৰ্যও করিতেন। কিন্তু ঈশ্যচরিতামৃত। ৭ তাহা হইলেও সমস্ত শাস্ত্রবাক্য যে তাহার জীবনে অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হই আছে ইহা বলা যায় না। যাহারা তাহা মিলাইতে চেষ্টা করিয়াছেন তাহাদের দ্বারাই অন্যের মনে সংশয় উৎপাদিত হইয়াছে। যাহা হউক, মথির গ্রন্থে যিশুর অনেক উৎকৃষ্ট উপদেশ শ্রেণীবদ্ধরূপে প্রাপ্ত হওয়া যায়। মথি করসংগ্রাহক ছিলেন, কিছু কিছু লেখা পড়া জানিতেন, পরে যিশুর সঙ্গ গুণে সেই সামান্য জ্ঞান বুদ্ধি বহুমূল্য সুসমাচার গ্রন্থকে প্রসব করিয়াছে । মার্ক এবং মথিব গ্রন্থকে অবলম্বন কপি লিউক আপনার গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। ইহা জেরুশালম নগর ভগ্নের পর অর্থাৎ খ্রীষ্টাব্দের সপ্ততিবর্ষ কালের রচনা, গ্রন্থপাঠে তাহা বুঝা যায়। লিউক বৈদ্য ছিলেন, পলের শিষ্য হইয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে ফিরিতেন। ইহার গ্রন্থে ঘটনাসকলের পরস্পর সম্বন্ধ, একতা এবং বিচার বুদ্ধির নিদর্শন আছে। সঙ্কলন ব্যতীত ইনি নিজেও অনেক সত্য ও কলিত ঘটনা গ্রন্থবদ্ধ করিয়াছেন। সেট জনের গ্রন্থ সকলের শেষে। এমন কি, ইহা দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমেও ভালরূপে সাধারণ্যে প্রচারিত হয় নাই। যিশুর শিষ্যগণের মধ্যে জুনু বহু দিন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, সকলের পরে ইহার লােকান্তর প্রাপ্তি হয়। কিন্তু প্রাগুক্ত তিন পুস্তকের সঙ্গে জনের লেখার এত বৈষম্য, ইহাতে ঐতিহাসিক তত্ত্বের এত ভিন্নতা যে, তাহা দেখিয়া সত্যপ্রিয় জ্ঞানিসমাজ ইহাকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রায় দিতেই চাহেন না। অথচ এই গ্রন্থে যোগর্ধি ঈশার যােগজীবনের অধ্যাত্ম গৃঢ় তত্ত্ব যেমন বিশদরূপে বিবৃত হইয়াছে, এমন অন্য কোন গ্রন্থেই দেখা যায় না। কেহ কেহ বলেন, প্রথম তিন গ্রন্থে যাহা কিছু অভাব ছিল পরে জন তাহা পুরাইয়া দিয়াছেন। কেহ বলেন, ‘নষ্টিক’ নামক বিরােধী সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় কালে ইহার আবশ্যকতা হইয়াছিল। কাহারাে কাহারো মতে এই গ্রন্থের রচনা প্রণালী এবং বিবরণসকল যিশুর প্রিয় সহচরের উপযুক্ত নহে! যে ব্যক্তি য়িহুদী কুলে জন্মিয়াছে, প্রথম হইতে যিশুর সঙ্গে সঙ্গে অবস্থিতি করি- য়াছে, স্বচক্ষে সমস্ত ব্যাপার দেখিয়াছে, সে কি কখন এ ভাবে লিখিতে পারে? অসম্ভব। তবে হয় তাে গ্রন্থকার জন, সে শিষ্য জন নহে, তাহার ঈশাচরিতামৃত। নাম দিয়া আর কেহ ইহা লিখিয়া থাকিবে। গুরুজন কিংবা সাধু ব্যক্তির নামে গ্রন্থ প্রচার করা রীতি সেকালে সৰ্ব্বদেশেই প্রচলিত ছিল। সেঙ্কেল এবং রেনানের মতে জনের শেষ কতকগুলি পরিচ্ছেদ অপরের সংযােজিত। সেঙ্কেল বলেন, জনের লেখা চিন্তাশীল বিজ্ঞানীর ন্যায়, ইতিহাসলেখকের মত নহে। ঈশাকে ঈশ্বরের সঙ্গে এক পদার্থ জানিয়া তদনুসারে জন প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত যাবতীয় বৃত্তান্ত অলৌকিক প্রণালীতে লিখিয়া গিয়া- ছেন। ইহাতে মানবীয় সভাবের স্বাভাবিক বিকাশ বর্ণিত নাই। এই জন্য তিনি ঈশার পরীক্ষা প্রলোভনের অংশটি পরিহার করিয়াছেন। কিন্তু যিনি যাহা বলুন, পরিশেষে সকলকে ীকার করিতে হইয়াছে, যে এই গ্রন্থের চিন্থা ও কল্পনার মধ্যে ঈশাজীবনের অমূল্য তত্ত্বসকল সন্নিবিষ্ট আছে। আমরাও ইহা সাহস পূৰ্ব্বক বলিতে পারি, জনের গ্রন্থ প্রচার না হইলে ঈশার প্রকৃত মহিমা এবং সৌন্দৰ্য কেহ বুঝিতে পারি না। এই চারি গ্রন্থে পরস্পর অনেক বিষয়ে অনৈক্য দৃষ্ট হয়। পরবর্তী শাস্ত্রকারের এক গ্রন্থের রচনা অন্য গ্রন্থের সঙ্গে বিনিময় করিয়াছেন, সেই জন্য আবার পরস্পরের মধ্যে অনেক বিষয়ে একতাও আছে। ফলতঃ এক্ষণকার প্রচলিত ধৰ্ম্মপুস্তকের মধ্যে একখানিও অবিমিশ্র মূল গ্রন্থ নাই, উহা শতাব্দীর পর শতাব্দী নানা জনের দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছে। একেত মানুষের আন্তরিক ভাব ভাষায় প্রকাশিত হইবার সময় কিছু রূপান্তরিত হয়, তদনন্তর লিপিবদ্ধ হইবার কালে তাহা এক মূর্তি ধারণ করে, পরে মূল ভাষাকে আবার ভাষান্তরিত করিতে গেলে মূল অভি, প্রায় একবারেই বিভিন্ন রূপে পরিণত হইয়া উঠে। ক্রমে যত দিন যায় তত বিচিত্রতারও উন্নতি হয়। এইরূপে প্রায় উনবিংশ শতাব্দী গত হইতে চলিল, এখন ইহার ভিতর হইতে প্রকৃত ঈশাকে কে অনুসন্ধান করিয়া বাহির করিবে ? কিন্তু তজ্জন্য কোন আশঙ্কার বিষয় নাই। সে মহারত্ন লুপ্ত হইবার বা গুপ্ত থাকিবার নহে। দেশ কালের দুরতিক্ৰমণীয় ব্যব- ধান ছিন্ন করিয়া এই সুদূর বঙ্গরাজ্যে এত দিন পরে যদি ইহা আসিয়াছে, তবে আর বিলুপ্ত হইবার সম্ভাবনা নাই। যাহারা ঈশার অখণ্ড অমর জীবন, হৃদয়ের পুত্তলিকা করিয়া রাখিবার জন্য তৃষিত এবং ব্যাকুল্পিত ঈশচরিতামৃত। হন, অসার প্রশংসা ধন্যবাদ দিবার জন্য নহে, কিন্তু জীবনের শোণিত আত্মর অনুপানরূপে তাহাকে পরিণত করিতে চাহেন, তাহারা এই নিবিড় সাহিত্যারণ্য মধ্যে তঁাহাকে পাইয়া কৃতার্থ হইবেন। কিন্তু যাহা- দিগের পথদর্শক বা আদর্শ সাধুজীবনের কোন প্রয়ােজনীয়তা বােধ নাই, নরকাবর্তে পতনােন্মুখ হইয়াও যাহারা নিজ দুর্গতি অনুভব করিতে অক্ষম ; কিংবা যে সকল ভ্রান্ত জীব নিৰ্ব্বদ্ধিতা বশতঃ পুত্রকে পিতা বলিয়া তাহার স্কন্ধে সমস্ত পাপভার প্রদান পূর্বক আপনারা বিলাসরসে মগ্ন থাকিতে সমুৎসুক, তাহার কোন কালে এই মহাপুরুষের যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইবে না। ২ য়িহুদী জাতি মানবতত্ত্বদর্শী পণ্ডিতবর মহাত্মা করল। বলিয়াছেন, পৃথিবীর মহঃ লােকদিগের জীবনচরিত জগতের মানবসাধারণের সার্বভৌমিক ইতিহাস। এই কথাটী নরােত্তম ঈশার জীবনে যেমন সংলগ্ন হয়, এমন আর কাহারো, সম্বন্ধে নহে। সেই পথের ভিখারী অপমানিত সূত্রধরতনয়, আজ কি না। পৃথিবীর সভ্যতম জাতির হৃদয়সিংহাসনে বসিয়া রাজত্ব করিতেছেন! স্বর্গ- লােকে দেবমণ্ডলীর মধ্যে তাহার কত গৌরব তাহা কে বুঝিবে ? যাহারা কেবল স্বদেশের এবং স্বজাতির সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে অবস্থিতি করত আপনা- দিগের ধৰ্ম্মমত ও ধৰ্ম্মজীবন সঙ্গঠন করিতে উৎসাহী হন, এবং আর্য ঋষি- দিগের মৌখিক গুণানুবাদ দ্বারা দেশহিতৈষণার উচ্চ দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেন, সাধারণ নরকুলের সহিত তাহাদিগের সম্বন্ধ কেবল পার্থিব বিষয় বাণিজ্যে সম্বন্ধ, কিন্তু ধৰ্ম্মনীতিসম্বন্ধে তাহা কদাপি প্রসারিত হইতে দেখা যায় না। আহা! অম্মদেশীয় পণ্ডিত ও ধৰ্মচাৰ্যগণ যদি খ্ৰীষ্টকে ঘৃণা করিতে না শিখিতেন, তাহা হইলে হিন্দুসমাজ এক জন আসিয়াবাসী মহাযােগীর জীবনসম্পদ লাভ করিয়া এত দিন মহা সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠিত। নিতান্ত পরিতাপের বিষয় যে সে শরীরের পুষ্টি ও সৌন্দৰ্য্যবর্ধনের জন্য বিদেশজাত সকল সামগ্রী লইল, কেবল ঈশাকে গ্রহণ করিল না ;—আত্মার ভূষণ বল- বীৰ্য ঈশার মূল্য বুঝিল না। তিনি বিদেশী ম্লেচ্ছ নহেন, আমাদের পর- মাত্মীয়। এদেশের আর্য ঋষিরা হিন্দু জাতিকে যােগধৰ্ম্ম শিখাইয়াছেন, ইনি সমস্ত নবজাতিকে মহাযােগ শিক্ষা দিয়াছেন। যােগচক্ষে যিশুচরিত পাঠ করিলে এ কথা প্রমাণিত হইবে। ধন্য য়িহুদী জাতি যে সে মহা- যোগী ঈশাকে গর্ভে ধারণ করিয়াছিল! ধন্য প্যালেষ্টাইন্ এবং নাশরখ । কেন না তাহারা যিশুর পবিত্র পদ বক্ষে ধারণ করিয়াছে। প্রাচীন অৰ্যজাতির ন্যায় য়িহুদী জাতি একটী পূরাতন মহজাতি। ইহাদিগের জাতীয় ইতিহাস, ধৰ্ম্মনীতি, আচার ব্যবহার অতীব মনােহর ঈশাচরিতামৃত। ১১ পাঠ্য। অনেক রাজর্ষি মহর্ষি মহাপুরুষ বড় বড় সাধু এই বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়া অশেষ কীৰ্ত্তি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। এব্রাহেম, দাউদ, সলিমান, ষােব, মুসা, আইজেয়া, এলিয়াস, জেরিমায়া, ডানিয়েল, স্পাইনােজা প্রভৃতি মহাত্মাগণ এক এক জন জাতীয় উন্নতির স্তন্তস্বরূপ ছিলেন। বহু পুরাকালে আর্যসমাজে বিশেষ বিশেষ জ্ঞানিমণ্ডলীতে অদ্বিতীয় ব্রহ্মজ্ঞানের যেরূপ আলােচনা হইয়াছিল, য়িহুদ জাতির ভিতরে তেমনি সাধারণভাবে একেশ্বর বাদ মত প্রাধান্য লাভ করে। আমি ব্ৰহ্ম বাদ যেমন ইহাদিগের জাতীয় প্রকৃতির মধ্যে স্থান পাইয়াছে, হিন্দুসমাজের মধ্যে সেরূপ দেখা যায় না মহম্মদ প্রচারিত কঠোর একেশ্বরবাদের ধর্ম এই জাতির পরিণাম ফল। পশ্চিম আসিয়ার অন্তর্গত আরব পারস্য এবং সমস্ত ইউরােপ যখন পৌত্ত- লিক ধর্মের অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল, তখন কেবল একমাত্র প্যালেষ্টাইন দেশে ইস্রায়েলবংশীয়দিগের মধ্যে “একমেবাদ্বিতীয়ং” নাম পরিঘোষিত হইত । প্রাচীন ব্রহ্মবাদী মুসা প্রথমে এই জাতিকে মিসরাধিপতি ফেয়াের দাসত্ব হইতে উমােচন করিয়া অঙ্গীকৃ ত সুখরাজ্যে আনয়ন করেন, এবং তাহাদিগকে ঈশ্বরের দশ আজ্ঞা শিক্ষা দেন ও পৌত্তলিকতার হস্ত হইতে রক্ষা করেন। পুরাকালে যে সকল জাতি যাযাবরের ন্যায় নানাস্থানে ভ্রমণ করিয়া বেড়া- ইত, যিহুদীরা তন্মধ্যে একটি। ইহারা কোন প্রকার সামাজিকতার বদ্ধ বায়ুর মধ্যে আবদ্ধ না থাকিয়া নক্ষত্রখচিত প্রমুক্ত আকাশতলে বিস্তীর্ণ প্রান্তর মধ্যে পটমণ্ডপে বাস করিত, এবং ইচ্ছামাত্র স্থানান্তরে চলিয়া এক ঈশ্বরের দুরবগাহ মহান্ ভাব অঙ্কুরিত হইবার পক্ষে ইহাদের জীবন সম্যক উপযোগী ছিল। অন্যান্য জাতির ন্যায় জাতিপক্ষপাত ও বিজাতিবিদ্বেষ ইহাদিগকে অনুদার করিয়া রাখিয়াছিল সন্দেহ নাই কিন্তু মহান্ জিহােবার মহিমান্বিত আদর্শ পাইয়া ইহার অনেক বিষয়ে উন্নত হইয়া উঠে। য়িহুদী ধৰ্ম্ম সর্বজনীন ধৰ্ম্ম, জেরুশালেম নগর স্বর্গরাজ্যের রাজধানী, ইস্রায়েলবংশ ঈশ্বরের বিশেষ মনােনীত, সমস্ত মানবজাতি এক দিন য়িহুদী হইবে, জিহােব। সর্বোপরি একমাত্র রাজা হইয়া স্বীয় চিহ্নিত ইস্রায়েলবংশ ;ীর সমস্তু জগৎ শাসন করবেন, বহুকাল পূর্বে এইরূপ আশা যাইত।

ঈশাচরিতামৃত। এবং সংস্কার য়িহুদীদিগের মনে বদ্ধমূল হয়। তাহারা বিশ্বাস করিত, জেরুশালেম নগর এবং ইহার দেবমন্দির এমন এক উচ্চ পর্বতের উপর সংস্থাপিত যাহার, অভিমুখে ফিরিয়া পৃথিবীর সকল মনুষ্য দৈববাণী শ্রবণ করিবে এবং এই স্থান হইতে মানবসাধারণের অবলম্বনীয় যাবতীয় বিধি ব্যবস্থা প্রচারিত হইবে। এই নগর আদর্শ সাম্রাজ্যের মধ্যবিন্দু, এবং এইখানে সকলে পূনরায় অরােদ্যানের আনন্দ সম্ভোগ করিবে। বেনিইস্রায়েলগণ যখন ইজিপ্ট হইতে আসেন, তখন পৌত্তলিকতার প্রতি ঋণার ভাব লইয়া আসিয়াছিলেন। মুসা ঈশ্বরের যে দশটা অজ্ঞা ইহ- দিগকে শিক্ষা দেন, তাহা একেশ্বরবাদ ধৰ্ম্মবিধির মূলভূমি। এই বিধির গর্ভে সামাজিক নীতি ও সমতার মহাশক্তিশালী বীজ নিহিত ছিল। ইস্রায়েলগণ ভ্রমণকালে আপনাদিগের ধর্মগ্রন্থ, প্রাচীন স্মরণীয় পদার্থ- পুঞ্জ এক, সিন্ধুকে পূরিয়া তাহা স্কন্ধে লইয়া দেশে দেশে ফিরিত। এই সিন্ধুকের মধ্যে প্রাচীন গ্রন্থ, আপনাদিগের ভ্রমণ বৃত্তান্ত ইত্যাদি যত্নে রক্ষিত হইত। মনুষ্যের সহিত ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ ব্যবহার, দৈনিক জীবনে, জাতি ও ব্যক্তিগত বিশেষ ঘটনায় তাহার বিধাতৃত্ব ক্রিয়া এবং লীলা- বিহার সম্বন্ধে যিহুদীদিগের বিশেষতঃ ইস্রায়েলবংশের বিশ্বাস অতিশয় জীবন্ত ছিল। উপরােক্ত ধর্মগ্রন্থসংরক্ষণের ভার যাহাদিগের উপর ন্যস্ত থাকিত, অবিলম্বে তাহারা মান্য গণ্য সৰ্ব্বপ্রধান হইয়া উঠে। কিন্তু পরবর্তীকালের ধর্মবিধি এবং নৈতিক নিয়মাদির প্রবর্তক ইহার নহে। য়িহুদী ধর্মযাজক- গণের অবস্থা প্রাচীন কালের অন্যান্য পুরােহিতগণের সঙ্গে অধিক প্রভেদ ছিল না। অপরাপর স্বর্গরাজ্যপ্রিয় জাতির মধ্যে ইস্রায়েলদিগের এই এক প্রধান স্বভাব দৃষ্ট হইত যে তাহাদিগের দেশের অধীন ছিল। ইহা ব্যতীত প্রত্যাদিষ্ট মহাজনগণের এখানে যথেষ্ট আধিপত্য প্রকাশ পাইয়াছে। ক্রমে এই নবি বা প্রফেটদিগের এক একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায় গঠিত হয়। ইহারই পরিশেষে সর্বোপরি ক্ষমতা লাভ করেন। ইস্রায়েল, ইস্রায়েল, জাতি অন্য কোন জাতির সঙ্গে মিশিয়া না যায়, প্রাচীন কালের সাধারণ তন্ত্রের শাসনপ্রণালী চিরপ্রতিষ্ঠিত থাকে, তদ্বিষয়ে নবিগণ সৰ্ব্বদা সতর্ক থাকিতেন, এবং কোন প্রকার রাজনৈতিক সম্প্রদায় যাহাতে পৌরহিত্য আত্মজ্ঞানসভৃত দৈব- == ঈশাচরিতামৃত। হইতে পারে, তাহার জন্য ধনীদিগের প্রতিকূলে নিয়ত সংগ্রাম করিতেন। এই সকল ব্যক্তিকে প্রকৃত পক্ষে য়িহুদী জাতির পরিচালক বলিয়া জানিতে হইবে। আপনাদিগের রাজনৈতিক ভ্রান্ত মত দ্বারা নীত হইয়া যখন ইহরা এসিরিয়া ক্ষমতা কর্তৃক পরাভূত হন, তখন হইতে পূৰ্বোল্লিখিত আশাবাক্য প্রচার হইতে আরম্ভ হয়। অনন্তর ঈশার ন্যায় ধৰ্মার্থনিহত বিশ্বাসী জীবন প্রস্তুত করিবার জন্য এই জাতির মধ্যে দুর্বোধ্য মহাবাক্যসকল প্রচারিত হইতে লাগিল। সকল ভবিষ্যদ্বক্তার শােণিতে জেরুশালেমের রাজপথ কলঙ্কিত হইয়াছিল, তন্মধ্যে একজনের সম্বন্ধে জনৈক প্রত্যাদিষ্ট সাধু এইরূপ ভবিষ্যদ্বাণী লিখিয়া যান “তিনি শুষ্ক ভূমিসস্তৃত তরুমূলের ন্যায় এবং সুকোমল বৃক্ষের ন্যায় উৎপন্ন হইবেন। তিনি শ্রীসৌন্দৰ্যবিহীন; তিনি মনুষ্য কর্তৃক পরিত্যক্ত ও ঘণিত ; আমরা তাহা হইতে মুখ লুকাইব। তিনি অপমানিত হইলেন, আমরা তাহাকে সম্মান করিলাম না। নিশ্চয় তিনি আমাদিগের ক্লেশভার বহন করিয়াছেন এবং দুঃখ লইয়া গিয়াছেন। তথাপি আমরা এই মনে . করিয়াছি যে তিনি ঈশ্বর কর্তৃক প্রহাৱিত এবং নিপীড়িত। কিন্তু আমাদের অপরাধের জন্যই তাহার অঙ্গ ক্ষত বিক্ষত, আমাদের পাপেতে তাহার দেহ, ভগ্ন, আমাদের শান্তির জন্যই তাহার শাস্তি। তাহার প্রহারভােগ আম- দিগের আরােগ্যের কারণ। মেষপালের ন্যায় আমরা সকলে পথভ্রষ্ট হইয়াছিলাম, ঈশ্বর তাহার মস্তকে আমাদের পাপভার স্থাপন করিলেন দুঃখ ক্লেশ পাইয়াও তিনি মুখ খুললেন না; ঠিক যেন মেষশিশুর ন্যায় আপনার হন্তার নিকট আনীত হইলেন। যেমন মেষ তাহার হত্যাকারীর নিকট নিৰ্বাক্, তিনিও তদ্রুপ। দুর্জনদিগের পার্শ্বে তাহার সমাধি হইল যখন তুমি পাপের জন্য তাহাকে বলি উপহার দিবে, তখন তিনি আপনার বংশ দেখিতে পাইবেন, কালকে দীর্ঘ করিবেন, এবং তাহারই হস্তে ঈশ্বরের সুখ বৃদ্ধি হইবে।” এই কালে মুসাপ্রতিষ্ঠিত ধর্মবিধি সমুদায় রূপান্তরিত হইল, এবং তাহার নামে নৃতনবিধ নিয়মাবলী জন্ম গ্রহণ করিল; সুতরাং য়িহুদী সমাজের সে প্রাচীন ভাব আর রহিল না। এই পরিবর্তনের প্রধান ফল কঠোর নিয়ম- ১৪ ঈশাচরিতামৃত। পরায়ণতা এবং অন্ধবিশ্বাস ভিন্ন আর কিছুই নহে। মান্ধ বিশ্বাসিগণ এই সময় হইতে এত দূর পর্যন্ত উন্মত্ত হইয়া উঠিল যে কেহ ধৰ্ম্মনিয়ম অতিক্রম করিলে তাহাকে মহাষণা প্রদান করিত। পরিশেষে তাহারা এ ক সাধারণ বিধি বাহির করিল যে, যদি কেহ জাতীয় ধৰ্ম্মবিরােধী হয় তাহাকে বধ করা হইবে। এই বিধি অনুসারে পরে ঈশার প্রাণদণ্ড হয়। ধর্মের নামে দয়া এবং জিঘাংসা কেমন একত্র অবস্থিতি করিতে পারে, ইহা তাহার এক দৃষ্টান্ত। এই রূপ অন্ধোৎসাহ আসিয়া য়িহুদী সমাজে প্রত্যাদিষ্ট ভবিষ্য- দ্বাণীর স্রোত খুলিয়া দিল, পৃথিবী স্বর্গধাম হইবে, এই বিষয়ে লােকের মানসিক গতি মহাবেগে ধাবিত হইল, এবং তাহা জাতীয় নীতিশাস্ত্রে বিধানরূপে বদ্ধ হইয়া গেল। হেজি কায়া, জোসিয়া, এবং জেরিমা প্রভৃতি প্রাচীন মহাজনদিগের হৃদয়ে যে প্রধানতন্ত্র মতের ধর্মনীতি রাজত্ব করিত, তাহা এক্ষণে “পেণ্টাটিউক” নামক মুসার ধর্ম গ্রন্থের অঙ্গীভূত হইয়া সাধারণ জনসমাজকে শাসন করিতে লাগিল। বৰ্তমান সময়েও এই নীতির একাধিপত্য দৃষ্টিগােচর হয়। উপরি উক্ত বিধিপুস্তক যাই প্রচারিত হইল, অমনি তৎসঙ্গে যিহুদী প্রকৃতির গতি প্রভূত বেগে বিস্তৃত হইয়া, পড়িল। তদনন্তর পশ্চিম আসিয়ার ভীষণ রাজবিপ্লবসকল একটার পর একটা ইহাদিগের চিরপােষিত পার্থিব স্বর্গরাজ্যের কামনা চূর্ণ করিয়া সকলকে দুরাশা এবং স্বপ্নের মধ্যে নিক্ষেপ করে। সেই স্বপ্নের ধৰ্ম্ম য়িহু- দীগণ মহা অনুরাগের সহিত অদ্যাবধি পােষণ করিয়া আসিতেছে। অতঃ- পর তাহারা আপনাদের রাজকীয় স্বাধীনতা ভােগ-লালসায় জলাঞ্জলি দিগ্না বিদেশীয় শাসনাধীন হইল। কেবল জাতীয় ধৰ্ম্ম এবং আচার ব্যবহার সম্বন্ধে স্বাধীনতা থাকে, এই মাত্র তখন প্রার্থনার বিষয় রহিল। এই সময় হইতে ঈশ্বরের একত্ব, প্রচলিত নিয়মাবলী এবং ধর্মোৎসাহী প্রধানেরা এ জাতির সর্বস্ব হইয়া দাঁড়ায়। প্রাগুক্ত নিয়ম এবং ধর্মবিধি সমস্ত সম্পূর্ণরূপে নৈতিক এবং সামাজিক। মনুষ্যের বর্তমান জীবনের উচ্চ আদর্শ এই নিয়মে অায়ত্তীকৃত হইবে, নিয়ম- প্রবর্তকগণের এই বিশ্বাস ছিল। তঁাহারা ইহাও বিশ্বাস করিতেন যে মুসার বিধি ভালরূপে পালন করিতে পারিলে সৰ্বাঙ্গীন সুখলাভ হইবে। স্বর্গ- ঈশাচরিতামৃত। । রাজ্য আসিবে, জিহােব সকলের রাজা হইবেন, এই অাশা ও সংস্কারে য়িহু- দীগণ চিরকাল বদ্ধ ছিল। বহুল ত্রুটি দুর্বলতা সত্ত্বেও ইস্রায়েলগণ এই নীতি সমভাবে রক্ষা করিয়া আসিয়াছে । ঈশার পূর্বপুরুষ ইজরা নিহিমায় অনিয়াস্ ম্যাকে- বিজ, প্রভৃতি ধৰ্ম্মনেতাগণ আপনাদিগের এই জাতীয় ধৰ্ম্মনিয়ম চিরদিন দৃঢ়তার সহিত প্রতিষ্ঠিত রাখিয়া গিয়াছিলেন। ইস্রায়েল বংশ ঈশ্বরের চিহ্নিত পবিত্র লােক, তিনি ইহাদিগের নিকট অঙ্গীকারে বদ্ধ, এই বিশ্বাস ক্রমে দৃঢ়বদ্ধ হইয়া ইহারা অনেক আশা করিত। পৃথিবীর অন্যান্য জাতীয় লােক ভূত কালকে স্বর্গ কল্পনা করে, কিন্তু য়িহুদীদিগের সুখের আশা ভবিষ্যতের দিকে। রাজর্ষি দাউদের গীতিমালা ঈদৃশ আশা বিশ্বাসের প্রতিপােষক। বাস্তবিকই ইস্রায়েলদিগের ধর্ম অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ এবং উন্নত ছিল, এ সম্বন্ধে ইহাদিগকে ঈশ্বরের লােক বলিলে নিতান্ত অন্যায় , হয় না। কারণ, বাবিলনিয়া, পারস্য, ইজিপ্ট, সাইরিয়া, এমন কি সুসভ্য গ্রীশ, রােমের পর্যন্ত তখন ধৰ্মসম্বন্ধে অতি হীনাবস্থা ছিল; সকলেই পৌত্তলিকতা ও ভ্ৰমান্ধকারে বাস করিত। প্রথম শতাব্দী হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধর্মের নামে খ্ৰীষ্টসমাজে যেমন কেহ প্রাণ দিয়াছে, কেহ বা অন্যের প্রাণ নাশ করিয়াছে ; য়িহুদীরা ঈশার জন্মের পূৰ্ব্ব দুই শতাব্দীতে তদ্রুপ দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করে। উহাদের ধর্ম স্বেচ্ছাচার, কুসস্কার ও জড়- বাদের ভয়ানক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। বস্তুতঃ য়িহুদীরা, ধর্মপ্রচারবিষয়ে সর্ব প্রথমে অন্য জাতি অপেক্ষা ঔদার্যের পরিচয় দেয়। গ্রীক ভাষার বিস্তার, ভূমধ্যসাগরের সীমা হইতে সীমান্ত পর্যন্ত যিহুদীদিগের ভ্রমণ ও বসবাস প্রচার কার্যের অনেক সহায়তা করিয়াছিল। ধৰ্ম্মনেতা ম্যাকেবিজের সময় পর্যন্ত য়িহুদীধৰ্ম্ম অপরাপর ধর্মের ন্যায় সঙ্কীর্ণ ভাব ধারণ করে। তৎকালে ইস্রায়েলগণ অন্য ধর্মকে ঘৃণা করিত এবং সত্য ধৰ্ম্ম কেবল তাহাদেরই জন্য হইয়াছে এইরূপ বিশ্বাস করিত। কিন্তু কেহ য়িহুদী পরিবার-ভুক্ত হইলে সে জিহােবর উপাসনায় অধিকার পাইত। এব্রাহে দত্ত পৈতৃক সম্পত্তি এই ধৰ্ম্ম, ইহাতে অন্য জাতি আসিতে পাইবে না এই বিশ্বাস ছিল। অনন্তর ইজরা ও নিহিমায়ার পরে পােরে- ' ঈশাচরিতামৃত না। ম হিত্য ভাবের উন্নতি হয় এবং তাহা পুনরায় এই ধর্মকে দৃঢ় ও যৌক্তিক রূপে সংগঠন করে। এইরূপে যখন ইহা উন্নত এবং বিশুদ্ধ আকার ধারণ করিল, তখন বহু লােক যাহাতে ইহার অন্তর্গত হয় তদ্বিষয়ে কর্তব্য বােধ জন্মিল। মহর্ষি জন্ কি ঈশা কি পলের ন্যায় অবশ্য উদার ভাব তখন দেখা যায় নাই, বরং বিজাতির প্রতি বিদ্বেষ এমন ছিল যে, য়িহুদীরা যাহাদি- গকে স্বধৰ্ম্মে আনয়ন করিত তাহাদিগকেও ঘণীর চক্ষে দেখিত। এই জন্য ঈশা ভৎসনা করিয়া বলিয়াছিলেন, লােক আনিবার জন্য ইহাদের কত আগ্রহ, কিন্তু পরে তাহাদের পানে একবার ফিরিয়াও চাহে না। কিন্তু এই সময় হইতে মহােচ্চ ধৰ্ম্মের গুণে য়িহুদীরা কিছু উদারচিত্ত হয়। পৌত্তলিক ব্যক্তি কৃপার পাত্র বলিয়া গণ্য হইত। ক্রমে কুসংস্কার কল্পনা দ্বারা ধৰ্ম্মবিশ্বাসকে উহারা এমনি করিয়া তুলিল যে বিধিবদ্ধধৰ্ম্মনিয়ম- সৰ্বস্ব হইয়া দাড়াইল, ভিতরকার ভাবের প্রতি আর কাহারো দৃষ্টি রহিল এই ধর্মবিশ্বাস পরিশেষে অন্ধতা ও উন্মত্ততায় পরিণত হয়। সার্ধ দ্বিসহস্র বৎসর পরে দুৰ্বত্ত সম্রাট নিবরা যেরূপ নিষ্ঠুর আচরণ করিয়া- ছিল, য়িহুদীদিগের ধৰ্ম্মেক আচরণ তদনুরূপ হইয়া উঠে। ক্রোধাভিমান এবং নিরাশ। উহাদিগকে একেবারে স্বপ্ন কল্পনার রাজ্যে লইয়া গিয়াছিল। তদনন্তর ডানিয়েল নামক নবির ভবিষ্যদ্বাক্য প্রচারিত হয় এবং তাহা, পূৰ্ব্বপােষিত ধৰ্ম্ম মতকে পূনর্জীবিত করে। ঈশ্বরপ্রেরিত স্বর্গদূত ধরাতলে অবতীর্ণ হইবেন তৎসম্বন্ধে ইনি শেষ কথা বলেন। ইহার মতে সেই প্রত্যা- শিত মসি প্রাচীন ধৰ্ম্মরাজ সলিমা বা দাউদের মত নহেন, তিনি মনুষ্যপুত্র, [ স্বর্গবাসী অমরগণের সমষ্টি আত্মা, ] তিনি মানবাকার, অলৌকিক জীব, মেঘের উপর আরােহণ করিয়া সমস্ত জগৎ শাসন কয়িতে আসিবেন, এবং সত্য যুগের প্রভু হইবেন। ৫. খ্ৰীষ্টীয়ান জগতে ধৰ্ম্মমতসম্বন্ধে যেমন আঁটা অাটি য়িহুদী, সমাজে, তাদৃশ মনিষ্ঠা ছিল না। ঈশ্বরের ব্যক্তিত্ব, স্বর্গদূত, মানবজীবনের উদ্দেশ্য বিষয়ক মত কেহ পরিষ্কাররূপে বুঝিত না, সুতরাং সে সঙ্কন্ধে কেহ কাহাকে নিপীড়িতও করিত না। কিন্তু মুসার বিধিপালনবিষয়ে ভয়ানক অনেকানেক মতবিবাদ ইহাদের সমাজে সময়ে সময়ে উপ- ।

ঈশাচরিতামৃত ১৭ স্থিত হইত বটে, কিন্তু তাহা ধর্মমত বা তত্ত্ব জ্ঞানসম্বন্ধে নহে; এই জন্য তাহা বিন্নি প্রকারে মীমাংসা হইয়া যাইত। প্রচলিত নিয়ম ও বিধি শাস্ত্রে পাবদশী যে কান ব্যক্তি সিগেগে [ ধর্মমন্দিরে ] অাচাৰ্য্য উপদেষ্টা হইতে পারিত। কিছু দিন পরে হেরোদের শেবাজত্বকালে মহা আন্দোলন উঠে, এবং তাহা হইতে অনেক গুলি ধৰ্ম্ম সম্প্রদায় জন্ম গ্রহণ করে। বাহ্য ক্ষমতা যে পরিমাণে ধৰ্ম্মনিরপেক্ষ হইয়া অবিশ্বাসীদিগের হস্তগত হইতে লাগিল, সেই পরিমাণে য়িহুদীরা পার্থির প্রভুত্বের আশা পরিত্যাগ করিয়া অবশেষে আপনাদিগের আন্তরিক কল্পনাতরঙ্গে এবং দুরাশাব সাগরে ডুবিয়া গেল। এই সময়ে রাজ্যমধ্যে অপেক্ষাকৃত শান্তি সংস্থাপিত হয় এবং সাময়িক ধৰ্ম্মনেতৃগণ কিছু কবিতৃকল্পনাপ্রিয় হন। এই কারণে লােকসকল বিপুল আশাতে পুর্ণ হইয়া উঠে। এই ভাবী আশা জুডিয়া- বাসীদিগের অন্তরে যখন শেষ সীমা প্রাপ্ত হইল, প্রাচীন মহন্ত সাইমিন ও ফ্যানিউয়েলের পবিত্র কন্যা যানা প্রভৃতি ধৰ্ম্মায়রা যখন উক্ত আশা সফলের জন্য দেবমন্দিরে উপবাস এবং প্রার্থনাদি করিতে লাগিলেন, তখন ভবিষ্যৎ নবি আগতপ্রায় ইহা সকলের মনে হইতে লাগিল। এইরূপ অাশা এবং ভগ্নোংরাহ, মতবিবাদ ও কোলাহলের মধ্যে মহাতেজা পরম ভাগবত যিশুীষ্ট অব ‘র্ণ হইয়া পিতৃকুলের চিরপোষিত মহৎ অভিলাষ পূর্ণ কবিলেন। নবদ্বীপে চৈতন্যের জন্মের অব্যবহিত পূর্বে অদ্বৈতাদি ভক বৈষ্ণকগণ হরিভক্তি ও হরির অবতরণের জন্য অবিকল এইরূপে উপবাস ও পূজা প্রর্থনাদি করিয়াছিলেন। কিন্তু তৎকালে শাক্ত হিন্দুসমাজ যেরূপ ভক্তিহীন দুর্দশাগ্রস্ত হইয়াছিল তদপেক্ষা শত গুণে অধিক দুর্নীতি এবং দুবচারে যিহুদিসমাজ অধােগতি প্রাপ্ত হয়। এ সময়ে ইহারা পাপ দুৰ্ম্মের শেষ সীমায় যে উঠিয়াছিলি যিশুর জীবনচরিতের প্রত্যেক ঘটনায় তাহা । সপ্রমাণিত হইবে। ঘােরতর কলুষান্ধকার মধ্যে মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায়। । মুহাভাগ যি সমুদিত হন, এবং দৈববলে সমস্ত মানবজাতির মুক্তির দ্বার উদঘাটন কবিয়া দেন। ইহার আগমনে যিহুদিকুল ধন্য হইয়াছে, পাপী জগৎ নবজীবন লাভ কবিয়াছে। । } জন্মবিবরণ। । যিশুর আদ্যোপান্ত জীবন একটী ঘােরতর প্রহেলিকা। জন্ম হইতে সর্গারােহণ পর্যন্ত এমন সকল ঘটনার উল্লেখ আছে যাহার তাৎপর্য বুঝিয়া উঠা যায় না। কিন্তু বােধনুলভ না হইলেও ইহার অদ্ভুত প্রভাব কেহ অতিক্রম করিতে পারিবেন না। মহাপুরুষের আগমনে পৃথিবীতে যুগান্তর উপস্থিত হয়, এ কথার যদি কোন অর্থ থাকে তবে তাহা এস্থলে স্পষ্ট অভিলক্ষিত হইয়াছে। সচরাচর জীবনচরিত লিখিতে গেলে, অমুক শকে অমুক দিবসে তিনি জন্মিয়াছিলেন । এইরূপ লিখিতে হয়, কিন্তু ইহার সম্বন্ধে তাহা খাটে না। ইনি যুগপ্রলয়ের বীজ হন্তে লইয়া পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন, এবং যে খ্ৰীষ্টীয় শক দ্বারা সভ্যতম দেশ মহাদেশ সকল অধিকৃত হইয়া রহিয়াছে তাহাকে জন্ম দান করেন। যিশুর উদয়ে ভূমণ্ডলে যে জ্ঞান সভ্যতা ধৰ্ম্মনীতি বিষয়ে এক অভিনব যুগ প্রবর্তিত হইয়াছে, ভারতের বর্তমান সৌভাগ্যই তাহার প্রমাণ স্থল। বাস্তবিক তিনি যেন একটা নূতন রাজ্য স্থাপন করিয়া তন্মধ্যে বিরাজ করিতেছেন। এই জন্মবৃত্তান্তসম্বন্ধে ভূরি ভূরি অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত আছে। বিশ্বাসী দল ইহাকে অসাধারণ রূপে প্রচার করিবার জন্য কষ্ট অদ্ভুত অনৈ- সর্গিক কথারই অবতারণা করিয়াছেন । পক্ষান্তরে অবিশ্বাসী ভক্তিবিরােধীরা আবার বিপরীত পথে দণ্ডায়মান হইয়া তাহার অযৌক্তিকতা দেখাইয়া দিয়াছে। উভয় পক্ষের আন্দোলনের মধ্যে পড়িয়া কেহ কেহ যিশুর অস্তিত্বে পৰ্যন্ত সংশয় প্রকাশ করেন। এক্ষণেও সেরূপ বিদ্যালয়ের ছাত্র বিরল নহেন যাহারা অম্লান বদনে বলেন, যিশুখী বলিয়া কেহ ছিল না, এ সমই কল্পনা। এ প্রকার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সহজ সন্দেহ নহে। এখনও কেহ কেহ বলেন, আমাদের নন্দতনয় গােকুলবিহারী শ্রীকৃষ্ণকেই পাদরী সাহেবের খ্ৰীষ্ট বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। উভয়ের জন্মকালীন কতিপয় ॥

এমন ঈশচরিতামৃত। ঘটনার সাদৃশ্য ইহার প্রবল যুক্তি। এ বিষয়ের দীর্ঘ সমালোচনায় আমা- দিগের প্রবৃত্তি হয় না এবং ধৈৰ্যও থাকে না। প্রাচীন ইতিহাসে যাহা বর্ণিত আছে এক্ষণে তাহারই অনুসরণ করা যাউক। মথিলিখিত গ্রন্থের রচনুসারে য়িহুদীদিগের প্রধানতম পূর্বপুরুষ এব্ৰাহেমের সঙ্গে যিশুর বিয়াল্লিশ পুরুষ দূরবর্তী মগন্ধ। বর্তমান প্রচলিত খ্রীষ্টাব্দের পাঁচ বৎসর পূর্বে ইনি জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা জোসেফের সহিত যংকালে জননী মেরীর পরিণয়সম্বন্ধ স্থিরীকৃত হয়, তখন উভয়ে একত্র ঘর কন্না করিবার পূর্বেই প্রচারিত হইল যে কুমারী মেরী পবিতায়া কর্তৃক গর্ভবতী হইয়াছেন। সুবিবেকী জোসেফ মনে করিলেন, এ প্রকার কুমারীর পাণিগ্রহণ করিলে জনামাজে দৃষ্টান্ত দেখান হইবে। এই ভাবিয়া তিনি মেরীকে গােপনে পরিত্যাগ করিতে কুতসল্প হইলেন। সময় স্বপ্নযােগে স্বর্গদূত আদেশ করিলেন, “হে দাউদের পুত্র ! তুমি মেরীকে বিবাহিত পত্নীরূপে গ্রহণ করিতে ভীত হইও না; কারণ তঁাহার গর্ভে যিনি আছেন তিনি পবিত্ৰাত্মা। তােমার পত্নী যে সন্তান প্রসব করিবেন তঁাহাকে তুমি যিশু [ পবিত্রাঘ্র ) বলিয়া ডাকিবে । তিনি মনুষ্য মনুষ্য দিগকে পরিত্রাণ দিবেন।” ইহা দ্বারা প্রাচীন গ্রন্থের লিখিত ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হইয়াছে। সপ্নাদেশানুসারে জোসেফ সমস্ত কাৰ্য্য করিলেন। কিন্তু যে পর্যন্ত মেরী পুত্ররত্ন প্রসব না করিয়াছিলেন তত দিন তিনি স্বীয় ভাৰ্যাকে বুঝিতে পারেন নাই। জুডিয়া দেশে জেরুশালেমের সন্নিহিত বেথহ্যাম নগরে মহাত্মা যিশু জন্ম গ্রহণ করেন। হেরোদ এ সময়ে ঐ দেশের রাজা ছিল। হঠাৎ একদা পূৰ্বাঞ্চলের কতিপয় জ্ঞানী লােক তাহাকে আসিয়া বলিল, “যিহুদীদিগের রাজা কোথায় জন্মিয়াছেন ? পূর্ব দিকে তঁাহার নক্ষত্র দেখিয়া আমরা তাহাকে পূজা করিতে আসিয়াছি।” এই বাক্য শ্রবণে হেরােদ তটস্থ হইল এবং রাজ্যের পণ্ডিত অধ্যাপদিগকে ডাকিয়া কহিল, “কোথায় খ্রীষ্টের জন্মিবার কথা আছে বল ?” তাহারা বলিল, “ভবিষ্যদ্বক্তা শাস্ত্রে এই রূপ লিখিয়া গিয়াছেন;'—হে জুডিয়াদেশস্থ বেথহ্যাম্!. জুড়িয়ার রাজপুত্রদিগের মধ্যে তুমি সামান্য নই। কেন না তােমার ভিতর হইতে ঈশাচরিতামৃত একজন শাসন কর্তা জন্ম গ্রহণ করিয়া আমার লােকদিগকে (ইস্রায়ে বংশকে] শাসন করিবে।” ইহা শ্রবণে রাজা পূৰ্ব্বদেশের জ্ঞানীদিগকে গােপনে ডাকিল এবং কোন্ সময় এই নক্ষত্র আকাশে দৃষ্টিগােচর হইয়াছে তদ্বিষয়ে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। অনন্তর হাদিগকে বেথলহামে পাঠাইয়া বলিয়া দিল যে, “তােমরা যাও এবং সেই যিশুকে ভালরূপে, অনুসন্ধান করিয়া দেখ। যখন তঁাহার সাক্ষাৎ পাইবে তখন আসিয়া সংবাদ দিবে, যেন আমিও গিয়া তাহার পূজা করিতে পারি।” পরে তাহারা প্রস্থান করিলেন এবং উক্ত নক্ষত্রের পশ্চাতে পশ্চাতে চলিতে লাগিলেন। যে স্থানে যিশু প্রসূত হন তথায় অাসিয়া নক্ষত্রের গতি স্থগিত হয়। নক্ষ- ত্রের সঙ্গে জ্ঞানিগণ মহানন্দে গম স্থানে উপনীত হইলেন এবং মেরীর ক্রোড়স্থ শিশু যিশুকে দেখিয়া রজত কাঞ্চন ও গন্ধ দ্রব্য দ্বারা তঁাহার পূজা করিলেন। পরে ঈশ্বর তাঁহাদিগের প্রতি এইরূপ স্বপ্নাদেশ করেন যে, তাহারা পুনরায় হেরোদের নিকট না গিয়া যেন অন্য পথে স্বদেশে ফিরিয়া যান। উইরা চলিয়া গেলে স্বর্গদূত স্বপ্নযােগে জোসেফকে বলিলেন, “উঠ। এবং স্ত্রী পুত্র লইয়া ইজিপ্ট দেশে পলায়ন কর। যে পর্যন্ত আমি সংবাদ না দিব তত দিন সেখানে বাস করতে থাক; যেহেতু হেরােদ এই শিশুর প্রাণবধর্থ অনুসন্ধান করিবে।” রজনীযোগে উঠিয়া জোসেফ আদেশ মত কাৰ্য্য করিলেন। ইহা দ্বারা “আমি ইজিপ্ট হইতে অামার সন্তানকে ডাকিয়া আনিয়াছি” এই ভবিষ্যদ্বাণী সফল হইল । হেরােদ যখন দেখিল যে পূর্বদেশীয় জ্ঞানীরা তাহাকে উপহাস করিয়া চলিয়া গেল, তখন সে মহা ক্রোধান্বিত হইয়া অনুচরদিগকে আদেশ করিল, “বেথহ্যাম নগর এবং তাহার সীমার মধ্যে দুই বৎসর বয়সের যত শিশু আছে সকলের শিরছেদন কর।” এ বিষয়েও শাস্ত্রে ভবিষ্যদ্বাক্য লিখিত ছিল।. অতঃপর হেরোদের মৃত্যু হইলে স্বর্গদূত পুনৰ্ব্বার স্বপ্নযোগে জোসেফকে বলিলেন, “উঠ! এক্ষণে স্ত্রী পুত্র লইয়া ইস্রায়েল, দেশে প্রত্যাগমন কর । যার। শিশুর প্রাণ বধ করিতে চাহিয়াছিল তাহাদিগের মৃত্যু হইয়াছে।” ৩খন জোসেফ স্বদেশে চলিয়া আসিলেন। কিন্তু যখন তিনি শুনিলে, ঈশাচরিতামৃত। হেরোদের পুত্র - অর্কেস্ পিতৃসিংহাসনে বসিয়া জুডিয়া দেশ শাসন করিতেছে, তখন তঁাহার মনে ভয় হইল। শেষ সপ্নাদেশ অবহেলা করিয়া গালিল দেশস্থ নাশরথ নগরে গিয়া তিনি বাস করিতে লাগিলেন। শাস্ত্রে লেখা ছিল, তঁাহাকে সকলে. নেজারিন্ বলিয়া ডাকিবে, তাহাও মিলিয়া গেল। এইরূপ মথিলিখিত গ্রন্থে জন্মবিবরণের তাবৎ ঘটনা প্রাচীন শাস্ত্রের ভবিষ্যদ্বাণীর সহিত ঐক্য দেখা যায়। সাধু মার্ক এ সম্বন্ধে কিছুই লেখেন নাই। তিনি নিজ গ্রন্থে, একবারে জলসংস্কারক জনের প্রচারসময়ের ঘটনা আরম্ভ করিয়াছেন। নিতান্ত দুঃখের বিষয় যে, যাহার রচনা সর্বাপেক্ষা অধিকতর বিশ্বাসযােগ্য, তিনি ঈশার প্রথম জীবনের কোন কথাই লিখিয়া যান নাই। অনেক সম্ভব যে, যিশু নাকি অজ্ঞাতকুলশীল সামান্য শ্রমজীবীর গৃহে জন্মিয়াছিলেন, এই জন্য তাহার প্রথম জীবনের আনুপূর্বিক ঘটনা কেহ জানিতে পারে নাই, পরে বহু অনুসন্ধানে কিছু কিছু বাহির হইয়াছে, তৎসঙ্গে অনেক কাল্পনিক বিবরণও মিশিয়া গিয়াছে। লিউক লিখিত সুসমাচারে এবিষয়ে বাহুল্য বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়। তিনি যিশুকে কেবল পবিত্ৰাত্মজাত সন্তান বলেন নাই, তদীয় অগ্রবর্তী দেবর্ষি জকেও সেইরূপ বলিয়া গিয়াছেন। জনের বৃদ্ধা মাতা পবিত্ৰাত্মার যােগে যখন ছয় মাস অন্তঃসত্ত্বা, তখন স্বর্গদূত জেব্রিল কুমারী মেরীকে বলিলেন, “হে ঈশ্বরানুগ্রহীতা! নারীকুলের মধ্যে তুমি ধন্যা! পরমেশ্বর তােমার সঙ্গে আছেন।” মেরী চ্ছ বণে বিস্মিত হইলেন, এবং কি কথা বলিয়া জেব্রিলকে সম্মান করিবেন তদ্বিষয়ে ভাবিতে লাগি- লেন। তখন পুনরায় জেব্রিল বলিলেন, “ভয় করিও না, তোমার প্রতি ঈশ্বরের অনুগ্রহ হইয়াছে। যিশু নামে তুমি এক সন্তান লাভ করিবে তিনি অতি মহৎ হইয়া দাউদের রাজসিংহাসনে বসিবেন, এবং চিরকাল জ্যাকোবের বংশে রাজত্ব করিবেন। তঁাহার রাজ্য অসীম হইবে।' মেরী উত্তর করিলেন, “আমি কুমারী, তাহা কিরুপে ঘটিবে ?” জেব্রিল, কহিলেন, “তােমার উপরে পবিত্ৰাত্মা অবতীর্ণ হইবেন, এবং পরম শক্তি তােমাকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিবেন। অতএব যে পবিত্র বস্তু তােমাতে জন্মিবে তিনি ইশাচরিতামৃত ঈশ্বরপুত্র নামে উক্ত হইবেন। দেখ, তােমার বন্ধ্যা ভগিনী এলিজাফেথ, বৃদ্ধ বয়সেও অন্তঃসত্ত্বা হইয়াছেন, ঈশ্বরের নিকট কিছুই অসম্ভব নহে।” তখন মেরী আপনাকে ধন্য মানিয়া বলিয়া উঠিলেন, “দেখ, আমি কেমন ঈশ্বরের দাসী,! আপনি যাহা বলিলেন তাহাই আমাতে সম্পন্ন হউক।” স্বর্গদূত স্বস্থানে গমন করিলে, মেরী তদ্দণ্ডে জুডানগরে জ্যাকেরিয়ার ভবনে প্রবেশানন্তর ভগ্নী এলিজাফেথকে অভিবাদন করিলেন। মেরীর দর্শন পাইয়া জনের মাতা অতিমা আনন্দিত হইলেন এবং তাঁহার গর্ভস্থ সন্তানও অফিদে নাচিয়া উঠিল। অনন্তর পবিত্ৰাত্মার প্রভাবে এলিজা- ফেথ, উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, “কি! আমার প্রভুর জননী এখানে আসিয়াছেন! নারীকুলে তুমি ধন্যা! এবং তােমার গৰ্ভজাত ফল ধন্য!” মেরী বলিলেন, “আমার আত্মা ঈশ্বরকে মহিমান্বিত করিল। পরিত্রাতা পরমেশ্বরেতে আমি আনন্দিত হইয়াছি। তিনি এই সুদীনা দাসীকে গৌরবান্বিত করিলেন। তাহার নাম পবিত্র হউক! যাহারা বংশ পরম্পরায় তাহাকে ভয় করে, তাহাদের মস্তকে সঁহার করুণা বর্ষিত হউক। তিনি বলপ্রকাশ করেন এবং পৰ্ব্বতকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেন। তিনি বড়কে ছােট করেন, এবং ছােটকে উচ্চ পদে তুলিয়া দেন। ক্ষুধার্তকে উৎকৃষ্ট ভােজ্য দানে পরিতৃপ্ত করিয়া ধনীকে শূন্য উদরে বিদায় করেন। এইরূপে আহলাদ প্রকাশ করিয়া তথায় তিন দিবস কাল তিনি অবস্থিতি করিলেন। পরে নিজালয়ে ফিরিয়া যান। অনন্তর যথাকালে উভয়ের গর্ভুে জন্য এবং যুিশু নামে দুই দিব্য সুকুমার সন্তান প্রসূত হইল। রােমীয় সম্রাট, সিজার আগষ্টাসের রাজত্বকালে একবার দেশের সমস্ত প্রজাবর্গের উপর অতিরিক্ত করভার অর্পিত হয়। সেই জন্য লােকসংখ্যাগণনার আবশ্যক হইয়াছিল। প্রত্যেক প্রজা অাপনাপন নগরে উপস্থিত থাকিবে এই আদেশানুসারে জোসেফ সস্ত্রীক আপনাদের পৈতৃক বাসস্থানে গমন করেন। য়িহুদীদিগের প্রতি বিশেষ সম্মানের জন্যই হউক, কিংবা প্রাচীন রীতি বলিয়াই হউক, ভঁহাদিগকে স্বজাতির সঙ্গে দাউদের রাজধানী পুরাতন বেথলহাম নগরে এই কারণে যাইতে হইয়াছিল। তৎকালে মেরী পূর্ণগর্ভা। বেথলহামে এক পান্থশালায় গিয়া তাহার প্রসব বেদনা উপস্থিত হইল। লােকের ঈশচরিতামৃত। জনতা হেতু তাহার ঘরের মধ্যে স্থান পাইলেন না, এক অশালায় আশ্রয় লইলেন। সেই স্থানে রজনীকালে ভুবনবিখ্যাত পবিত্র যিশুর জন্ম হইল। সন্তান প্রসব হইব। মাত্র প্রান্তরস্থিত পশুপালক রাখালদিগকে স্বর্গদূত এই সংবাদ গােচর করিলেন যে অদ্য এই নগরে পরিত্রাতা যিশু জন্মিয়াছেন। পরে ঐ স্থানে অকস্মাৎ আকাশের তারকাগণ নামিয়া আসিল, এবং সকলে মিলিয়া “স্বর্গধামে ঈশ্বরের মহিমা মহীয়া হউক! পৃথিবীতে শান্তি এবং মানবগণের মধ্যে মঙ্গল ইচ্ছার জয় হউক।” এই বলিয়া ঈশ্বরের জয়গীত গাইতে লাগিল। রাখালেরাও তথায় আসিয়া সদ্যোজাত যিশুকে দেখিল এবং সেই কথা নগরের যথা তথা প্রচার করিয়া দিল তদনন্তর অষ্টম দিবসে ত্বকচ্ছেদ এবং নামকরণ হয়। পরে যথানিৰ্দিষ্ট সময়ে মুসার বিধি অনুসারে মেরী জেরুশলমে দেবমন্দিরে পূজা উপহার প্রদান করেন। মন্দিরবাসী পুণ্যাত্মা সাইমিয় ও য়া। এই সন্তানকে ঈশ্বরপ্রেরিত লোক- পরিত্রাতা বলিয়া তৎকালেই চিনিতে পারিয়াছিলেন। তাহারা ঈশ্বরকে এবং নবশিশুর পিতা মাতাকে ধন্যবাদ দিয়া বলিলেন, “ইস্রায়েলদিগের ভাবী কল্যাণ যাহা দ্বারা হইবে তাহাকে দেখিলাম। এক্ষণে ঈশ্বর আমা- দিগকে পৃথিবী হইতে বিদায় দিন।” অতঃপর জোসেফ ও মেরী নাশ- রথ নগরে ফিরিয়া আসিলেন, তথায় ঈশ্বরপ্রসাদে নব শিশু দিন দিন জ্ঞান শক্তিতে বীৰ্য্যশালী হইয়া উঠিল। সেন্ট জনের পুস্তকে জন্মবিষয়ে কোন কথার উল্লেখ নাই। তিনি শব্দব্রহ্মের ব্যাখ্যা দ্বারা গ্রন্থ আরম্ভ করিয়াছেন। যিশু সৃষ্টির পূৰ্ব্বে অনন্ত কাল ঈশ্বরেতে অপ্রকটভাবে ছিলেন, পরে জীবের উদ্ধারের জন্য দেহ। ধারণ করিলেন, এই মাত্র ইহাতে পাওয়া যায়। ক্যানন্ ফেরার জন্মবিষয়ক কোন কোন অলৌকিক ঘটনার যৌক্তিক অর্থ ব্যাখ্যা করিয়া তাহার সম্ভবনীয়তা দেখাইয়া দিয়াছেন। কিন্তু কত দূর কৃতকার্য হইয়াছেন বলা যায় না। যিশুর জন্মসূচক নক্ষত্ৰদৰ্শন তাহার মতে বিজ্ঞানবিরােধী নহে। কারণ পুৰ্ব্বদেশের লোকেরা প্রেরিত মহা- পুরুষের আগমন প্রত্যাশায় তৎকালে নিতান্ত অধৈর্য হইয়া উঠে, এবং জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত কেপলার পরে গণিয়া দেখিয়াছেন, তৎকালে আকাশে ঈশাচরিতামৃত। কোন জ্যোতিষ্কেরও বিশেষ আবির্ভাব ঐ অঞ্চলে হইয়াছিল। অতএব .উহা যুক্তিযুক্ত ঘটনা। পণ্ডিতেরা বিদ্যার বলে কুসংস্কার ভ্রান্তিকে কেমন সত্যরূপে প্রতিপন্ন করিতে পারেন, ইহা একটি তাহারি দৃষ্টান্ত। কিন্তু ইনি পবিত্ৰাত্মা কর্তৃক গর্ভাধান কিম্বা অন্যান্য অনৈসর্গিক ঘটনাসম্বন্ধে কোন মন্তব্য প্রকাশ করেন নাই। রেনানের মতে নাশরথেই যিশুর জন্ম হয়। সস্ত্রীক জোসেফের বেথলহ্যাম যাওয়া, লােকসংখ্যাগণনার জন্য রাজবিধি বাহির হওয়া এবং জন্মের দিবস সম্বন্ধে তিনি সন্দেহ করেন এবং সে বিষয়ে যুক্তি ও প্রমাণও দিয়াছেন। কিন্তু ইহা স্বীকার করিয়াছেন, রােমীয় শকের ৭৫০ বর্ষে যিশুর জন্ম হয়। ঠিক সময় জানিবার কোন উপায় আমরাও দেখিতে পাই না। জন্মবিষয়ক জন্মবিষয়ক ঘটনার সহিত শাস্ত্রীয় ভবিষ্য- দ্বাক্যের অধিকতর একতাই অনেকের পক্ষে সন্দেহের কারণ হইয়াছে, নতুবা সকল ঘটনাই কিছু অসম্ভব নহে। যিনি যাহা বলুন, যিশু যে পৃথিবীতে এক দিন জস্মিয়াছিলেন তাহাতে আর কোন সংশয় নাই। অবশ্য যখন তিনি মনুষ্যদেহধারী, তখন নিশ্চয়ই বিধাতা প্রতিষ্ঠিত স্বাভাবিক নিয়মের অনুগামী হইয়া তাহাকে শরীর পরিগ্রহ করিতে হইয়াছে, প্রাকৃতিক সাধারণ নিয়মের অধীন হওয়াতে তাহার যে কিছু অগৌরব হইয়াছে ইহাত মনে হয় না, বরং তাহা ঈশ্বরের বাধ্য সন্তানের উপযুক্ত কাৰ্যই হইয়াছে বলিতে হইবে। ইহাতে কিছুমাত্র অবমাননাও নাই। ট্যাক্স দিবার উপলক্ষে বেংহ্যামে যাওয়া, অশ্বশালায় যিশুর প্রসব হওয়া, হেরােদের ভয়ে ইজিপ্ট দেশে পলায়ন করা, শিশু সন্তানগণের প্রাণ দণ্ড, এসকল কিছুই অসঙ্গত কিংবা অসম্ভব নহে। বাস্তবিকই দুঃখের সন্তান যিশুর জীবন মৃত্যু কেবল দুঃখ শােকেই পরিপূর্ণ। যিনি এক দিন রাজ- রাজেশ্বর মহাগুরু হইয়া নরজাতির হৃদয়সিংহাসনে বসিবেন, বিদেশে অসহায় অবস্থায় এক সামান্য অশ্বশালায় তিনি ভূমিষ্ঠ হইলেন, নৃশংস হেরোদের ভয়ে দূর দেশে গিয়া লুকাইয়া রহিলেন, জোসেফ এবং মেরী তৎসম্বন্ধে দৈব- বাণী শুনিলেন, ইহাতে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশিত হইল। তিনি যে দীনহীন সূত্রধর তনয়কে লোকপাবন নরােত্তম করিলেন, ইহার ভিতরেই তঁাহার অদ্ভুত,অলৌকিক শক্তির পরিচয় আমরা পাইতেছি। কিন্তু যিশুর মত ঈশাচরিতামৃত। মহাপুষও যে অনায়াসে প্রাকৃতিক নিয়মে জস্মিতে পারেন তাহার অনেক প্রমাণ আছে । কল্পনাপ্রধান ভারতের আৰ্যকুলে অধের জন্ম, অলো- কিক ঘটনা বিশ্বাসের বিদ্যালয়ে আমরা শিক্ষিত এবং প্রতিপালিত, সুতরাং মহং লােকদিগের জীবন ও জম্মদি সম্বন্ধে কেন যে এ প্রকার অত্যুক্তি পচারিত হয় তাহা আমরা বিলক্ষণ বুঝিতে পারি। এ দেশের সাধু মহা- পুরুষদিগের সম্বন্ধে অবিকল ঐরূপ—উহা হইতে অধিকতর আশ্চর্য ঘট- নার উল্লেখ আছে। চেষ্টা করিলে বিজ্ঞান যুক্তির সঙ্গে তাহার দুই এক- টার সামঞ্জস্যও দেখান যাইতে পারে। কিন্তু ইহার উপর সাধুর মত অতি অল্পই নির্ভর করে। রেন যে বলেন, যিশুর জন্ম ব সরে লােকসংখ্যা- গণনার রাজবিধি ঘোষিত হয় নাই, যদি তাহা নাই হইয়া থাকে, তাহাতে আমাদের বিশেষ কিছু ক্ষতি দেখিতেছি না। দিব্যলাবণ্য সুকুমার শিশু যিশুকে পাইয়াই আমরা সন্তুষ্ট হইয়াছি । অলৌকিককৰ্মা ভগবান্ ইহাকে দরিদ্রের গৃহে নিতান্ত হীনাবস্থায় প্রেরণ কবিয়া পরে যে অত্যাশ্চর্য কীর্তি দেখাইলেন, এবং তাহাতে তাহার যে অত্যদ্ভুত অনির্বচনীয় মহিমা প্রকাশ পাইয়াছে, আকাশের তারা, স্বর্গের দূত, কি রাখালগণের স্বপ্নাদেশ প্রভৃতি ঘটনাপুঞ্জ তাহার কণামাত্র বৃদ্ধি করিতেও পারে না, তংসমুদায়ের অভাবে সে স্বর্গীয় গৌরবের কিছুমাত্র হ্রাসও হয় না। প্রাকৃতিক সাধা- রণ এবং পুরাতন নিয়মের মধ্য দিয়াই ঈশ্বর মহৎ কাৰ্য সকল সম্পন্ন কবেন, তজ্জন্য অনৈসর্গিক ক্রিয়ার কোন প্রয়ােজন হয় নাই। যিনি বলি- তেন, আমি প্রাচীন ব্যবস্থা বিনাশ করিতে আসি নাই, পূর্ণ করতে আসি- য়াছি, তঁাহার জীবনে যে বিধাতার চিরপ্রতিষ্ঠিত মঙ্গলময়ী ইচ্ছ। অব্যাহত রূপে সুসম্পন্ন হইয়াছে ইহা অপেক্ষা অলৌকিক ক্রিয়া আর কি হইতে পারে আমরা জানি না। শূন্য হইতে যিনি বিচিত্র জগং বাহির করেন, ঘোরান্ধকার মধ্যে যাহর ইচ্ছামাত্র চন্দ্র সূর্য উদিত হয়, তিনি যে বিনা আড়ম্বরে তঁাহার প্রিয় পুত্রকে পাঠাইয়া জগতের মঙ্গল সাধন করবেন, ইহাতে বিস্ময়ের বিষয়ই বা কি আছে ? অতএব যিশুর দেহধারণসম্বন্ধে কোন নূতন নিয়ম কিংবা আশ্চর্য প্রণালী বিধাতা প্রবর্তিত করেন নাই। কিন্তু তাহার অভ্যুদয় বাস্তবিক অসাধারণ।

ঈশচরিতামৃত।
প্রকৃত ঈশ্বর পুত্রের জন্ম যে পবিত্ৰাত্ম কর্তৃত হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ
স্বয়ং ভগবতী ব্রহ্মাণ্ডেশ্বরীর গর্ভে তাহার জন্ম হইয়াছিল।
যিশু মাংস অস্থি শােণিত মজ্জার সমষ্টি নহেন, তিনি পরমাত্মজাত
চিদাত্মা।
নাই।

বাল্যকাল। আসিয়া মহাদেশের পশ্চিম প্রান্তে প্যালেষ্টাইন নামে এক দেশ আছে। সেই দেশের অন্তর্গত গালিল প্রদেশ নাশরত্ নগরে যিশুর বা ও যৌবনকাল অতিবাহিত হয়। গালিল, দেশকে য়িহুদীরা ঘৃণার চক্ষে দেখিত। এই দেশ বিংশতি নগরে বিভক্ত ছিল। গালিল, অর্থে গােলা- কার বৃত্ত বুঝায় । রাজা সলিমান যখন জিহােবার বিখ্যাত মন্দির নির্মাণ করেন, তৎকালে হিরাম নামে কোন ব্যক্তি সাল কাষ্ঠ দ্বারা এ কাৰ্য্যে যথেষ্ট সহায়তা করে, তাহার পুরস্কারের স্বরূপ রাজা তাহাকে উপরিউক্ত ভূভাগ প্রদান করেন। হিরাম ইহাতে অসষ্ট হইয়া ঐ ঘৃণাসূচক নামে উহাকে অভিহিত করিয়াছিল। সেই হইতেই য়িহুদীরা গালিল, প্রদেশকে ঘৃণা করিত। এ স্থানে তখন ফনিসিয়া, আরব এবং গ্রীক প্রভৃতি নানা জাতির বাস ছিল, এই জন্য তৎপ্রতি য়িহুদীদিগের ঘৃণার ভাব আরো বৰ্ধিত হয়। যিশুর জন্মের অল্পকাল পরে দুবৃত্ত নরপতি হেরােদ পরলােক গমন করে, তাহার এক পুত্র আন্টিপাস গালিল বিভাগের এবং আর্কে- লাস নামক আর এক পুত্র জুডিয়ার শাসনকর্তা হয়। দুই জনেই অত্যন্ত পশুপ্রকৃতি দুরাচারী রাজা ছিল। কথিত আছে, আর্কেলা পিতৃসিংহাসনে বসিয়াই দেবমন্দিরে তিন সহস্র স্বদেশবাসীর মস্তক ছেদনে অনুমতি দেয়। সম্রাট, সিজার অগষ্টাসের নিয়ােজিত পাষণ্ড আন্টিপা- সের শাসনাধীনে যিশুকে অনেক দিন থাকিতে হইয়াছিল। নাশৱখনগর-একটি অতীব রমণীয় স্থান। ইহা পৰ্ব্বতােপত্যকায় স্থাপিত এবং ক্ষুদ্রগিরিমালায় পরিবেষ্টিত। ইদানীন্তন যে সকল ভ্রমণকারী উহা পরিদর্শন করিয়াছেন তঁাহারও বলেন, তথাকার প্রাকৃতিক শোভা, নন্দন, কাননের সদৃশ। এই স্থানের চতুষ্পার্শ্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পৰ্ব্বতশ্রেণী, নদী এবং সাগর, উপসাগর, হ্রদ দৃষ্টিগােচর হয়। উত্তরে তরুলতাসমাকীর্ণ মনােহর ঈশাচরিতামৃত। ক। গিরিশৃঙ্গ, পূর্বভাগে নিৰ্ম্মলসলিল সুন্দর হ্রদ, পশ্চিমে সন্নত পৰ্বতমালা ও শােহি সাগর, দক্ষিণে জুডয়ার বনরাজা এবং তৃণপওবিহীন শৈলশ্রেণী । উচ্চ গিরিশিখরে দণ্ডায়মান হইয়া চতুর্দিগের এই শোভা সন্দর্শন করলে পথিকের মনে এক অপূৰ্ব্ব ভাবরসের আবির্ভাব হয়। যে দিকে নেপাত কর, সেই দিকে দাড়িম্ব ও উম্মুর বৃক্ষরাজী এবং হরিদ্বা দ্রাক্ষাক্ষেত্র সকল ফলফুলে সজ্জিত রহিয়াছে দেখিতে পাইবে। বসন্তসমাগমে যখন সমস্ত তরু- কুঞ্জ সুকোমা নবীন পল্লবে এবং বিচিত্র কুসুম স্তবকে সুশোভিত হয়, অমল শ্বেত বর্ণের কপােত ও অন্যান্য বিহঙ্গকুল দলে দলে তন্মধ্যে বিচরণ করে, বিমল স্নিগ্ধ সমীরণ, বহিতে থাকে, তখন ঐ সকল স্থান অমর উদ্যানের তুল্য ঐ ধারণ করে। গিরিপার্শে কোথাও প্রস্রবণৰারি বহিতেছে, কোথাও শরীয় রমণীগণ কুপতটে দণ্ডায়মান হইয়া জল সংগ্রহ করিতেছে, কোথাও বা প্রিয়দর্শন বা কবৃন্দ ইতস্ততঃ ধাবিত হইতেছে । এস্থা•ের জল বায়ু অতীব স্বাস্থ্যপ্রদ এবং স্ত্রীপুরুষ বালক বালিকাগণের দেহ কান্তি ও মুখ লাবণ্য সমধিক নয়নানন্দকর। প্রকৃতিদেবীর এই সুরম্য কাম্যধনে প্রেমিকবর মহাত্মা যিশু বাল্যসহ চরগণ সঙ্গে লীলা বিহার করতেন। তিনি স্বভাবের সন্তান, স্বভাবের ছাত্র, এবং স্বভাবের শিষ্য ছিলেন। গিরিবঙ্গে বিরাজিত এই সুন্দর ক্ষুদ্র নগর এক্ষণে যে ভাবে প্রকাশ পাইতেছে, যথেষ্ট সম্ভব যে উহা প কালেও তদ্রুপ ছিল। নগরটি অতি ক্ষুদ্র, অনুমান পাঁচ সহস্র প্রজা তথায় বসতি করি। লোকদিগের বাস- ভবন তাদৃশ শ্ৰীসম্পন্ন নহে, অধিকাংশ ব্যক্তিই সামান্য অবস্থার মধ্যবিধ শ্রেণীর গৃহস্থ। স্ এধরব্যবসায়ী জোসেও এক জন সামান্য গৃহস্থ ছিলেন। যে ঘরে তিনি থাকিতেন, সেই খানেই স্বীয় জাতীয় ব্যবসায় নির্ধাহ করি- নে। মহামতি ফি ও বাল্য ও যৌবন কালে পৈতৃক ব্যবসায়ে পিতার সহকারী এবং বাধ্য অনুচর ছিলেন। যে স্থানে এখন বালকগণ ক্রীড়া করে, নারীগণ জল আনিতে যায়, সেই সেই স্থানের মৃত্তিকা ও উপণখণ্ড যে যিশু এবং মেরী দেবীর চরণ চুম্বন করিয়াছে, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ গালিল, দেশ নমগ্ৰ, সুতরাং তদনুগত নাশরখও যিহুদীদিগের ঈশচরিতামৃত। ২৯ অশ্রদ্ধেয় স্থান ছিল। এই কারণে তখন ঐ নগরে অন্য নগরের ন্যায় বিদ্যালয় স্থাপিত হয় নাই। কিন্তু য়িহুদী পরিবারের স্ত্রী পুরুষ বালক বালিকা সকলে আপনাদের ধর্মবিধি অধ্যয়ন করিয়া তাহা কাস্থ রাখিত। জ্ঞানধৰ্ম্ম সম্বন্ধে ঈদৃশ অবস্থার বালক যাহা শিখিতে পারে, যিশু পিতা মাতার নিকট তাহা শিখিয়াছিলেন। জাতীয় ধৰ্ম্মের শাস্ত্র বাক্য অনেক তঁাহার খস্থ ছিল। কিন্তু তাহার হৃদয়ক্ষেত্রে যে দিব্যজ্ঞানের অমৃততরু উৎপন্ন হইয়া জগতে মােক্ষফল বিতরণ করিয়াছে, তাহা স্বয়ং ভগবান্ কর্তৃক রােপিত এবং পরিবর্ধিত হয়। জনশ্রুতি প্রবাদবচনে এবং কোন কোন গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে যিশু বাল্যকালে বড় দুরন্ত ছিলেন ; কাহারো কথা শুনিতেন না, মৃতদেহের উপর অখাত করিয়া তাহাকে অভিশাপ দিতেন, দোষের প্রতিশােধ লইতেন, বয়স্য বালকদিগকে অজাশাক সাজাইয়া খেলা করিতেন, পিতা জোসেফকে ধমক দিতেন। এই সমস্ত দৌরাত্ম্যের জন্য প্রতিবাসীরা শেষ এত দূর বিরক্ত, হইয়াছিল যে মেরী তন্নিমিত্ত স্বীয় সন্তানকে গৃহে বদ্ধ করিয়া রাখিতে বাধ্য হন। আমাদের নদীয়ার চাদ শ্রীগৌরাঙ্গ ও বাল্যকালে এইরূপ দুরন্ত ছিলেন। মুসলমানদিগের * কোরাণে এবং অন্যান্য পুস্তকে বলে, যিশু শৈশব কালে অনেক অদ্ভুত কৰ্ম্ম করিতে পারিতেন। তিনি মাটির চটক। পক্ষী নিৰ্মাণ করিয়া হাতে তালি দিতেন, আর তাহারা আকাশে উড়িয়া যাইত। ক্ষুদ্র কাষ্ঠখওকে টানিয়া দীর্ঘ করিতেন, রংওয়ালার দোকানে এক গামলার মধ্যে কাপড় ডুবাইয়া যে কোন বর্ণে তাহা ছোবাইয়া লইতেন। এবংবিধ বহুতর আশ্চয্য গল্প লোকবিশেষের মধ্যে প্রচলিত আছে। একদা তিনি বয়স্য বালকগণকে চারিদিকে সাজাইয়া তন্মধ্যে আপনি রাজবেশে উপবিষ্ট হন। তাহারা নিজ নিজ গাত্রাবরণ ভূমিতে বিছাইয়া তদুপরি যিশুকে বসাইল, তাহার মশুকে ফুলের মুকুট পরাইল, এবং আপনারা রাজামুচরের ন্যয় দক্ষিণে বামে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া দণ্ডায়মান রহিল। নিকট দিয়া যাহারা যায় তাহাদিগকে ডাকিয়া এবং বলপূৰ্ব্বক ধরিয়া বলে, তােমরা এই দিকে মাইস, এবং রাজাকে সম্মান কর, তাহার পর চলিয়া যাও। রাজলক্ষণ বাস্তবিকই তঁাহাতে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু পার্গিব রাজ্য সম্পদ - D ঈশাচরিতামৃত। তাহার চক্ষে এইরূপ বাল্যক্রীড়ার ন্যায় চির দিন প্রতীত হইত। যিশুর শৈশব কিংবা বাল্য যৌবনের ইতিহাস জানিবার কোন সুবিধা নাই। কিন্তু তিনি নির্দোষচরিত্র বালক, পিতা মাতার অনুগত ছিলেন, শিবর্ষ বয়ঃক্রম পৰ্যন্ত জাতীয় ব্যবসায় দ্বারা সংসারযাত্ৰা নিৰ্বাহ করিয়াছেন, এ বিশ্বাস অনে- কেরই আছে। জোসেফের সাংসারিক অবস্থা স্বচ্ছল না থাকিলেও তিনি একজন সুখী গৃহস্থ ছিলেন। নাশরথীয় লােকেরা সামান্যতঃ কেহই ধনী ছিল না, অথচ প্রায় সকলেই মনের সুখে কালযাপন করিত। তাহাদের অভাবের উপযােগী আয় ছিল। তদবস্থায় প্রতিপালিত হইয়া যিশু বাল্য কালে সাধারণ বালকবৃন্দের মত নাশরথের পথে এবং পর্বতগাত্রে খেলা করিয়া বেড়াইতেন, যৌবনে পিতা মাতার অধীনে গৃহকাৰ্যে সাহায্য করিতেন। তৎকালে তাহার সেই গুপ্ত জীবনের মধ্যে অদ্ভুতকৰ্ম্মা ভগবান্ কি স্বর্গীয় অগ্নি প্ৰধুমিত করিতেছিলেন তাহা আমরা শীঘ্রই দেখিতে পাইব।

কৈশাের ও গুপ্ত যৌবন । যে সকল ইতিবৃত্তলেখক যিশুর জন্মবিবরণকে এত বাহুল্যরূপে বর্ণন করিয়া গিয়াছেন, তাহারা এই মহাপুরুষের কৈশোর ও যৌবনকালের কোন বৃত্তান্ত প্রাপ্ত হন নাই ইহা অতিশয় আশ্চর্যের বিষয়। সকলেই প্রায় এবিষয়ে নিৰ্বাক্, কেবল সেন্ট লিউকের গ্রন্থে একটা মাত্র ঘটনার উল্লেখ আছে। বাস্তবিক ইহাও এক ঘোর রহস্য যে এত বড় প্রেরিত মহাজনের ত্রিশ বৎসর কাল একবারে অন্ধকারাচ্ছন্ন। যা হউক, কোন কল্পনাপ্রিয় কবি এই সুদূর প্রসারিত শূন্য স্থান যে কল্পিত উপন্যাসের দ্বারা পূর্ণ করেন নাই ইহা সৌভাগ্যের বিষয়। হইতে পারে যে জ্ঞাতব্য কোন ঘটনা এ কাল মধ্যে সংঘটিত হয় নাই। কিন্তু লিউক লিখিত দ্বাদশ বর্ষ বয়সের বিবরণটি পড়িলে একথা আর বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা হয় না। যিনি স্বাদশ বর্ষ বয়ঃক্রমে এমন আশ্চৰ্য্য ধৰ্ম্মকথা বলিলেন, তিনি তাহার পর অষ্টাদশ বর্যকাল যে সাধারণের ন্যায় উপেক্ষিত ছি,ে ইহাত মনে লাগে না। আহা! আমরা যদি তাহার গুপ্ত যৌবনের ইতিহাস জানিতে পারি- তাম তাহা হইলে কতই সুখী হইতাম । • অথবা যাহার তিন বৎসরের ব্ৰহ্মতেজ পৃথিবী সহ্য করিতে পারে না, তাহার তেত্রিশ বৎসরের, কিরূপে সহ্য করিবে। বােধ হয় তিন বৎসরব্যাপী ব্ৰহ্মতেজ ঐ সময়ের মধ্যে ঘনীভূত হইতেছিল। বিধাতা ক্রমে ক্রমে না দেখাইয়া সহসা এক- বারে জগৎকে চমৎকৃত করিলেন। যে কারণেই হউক, খ্রীষ্টান জগৎ এবিষয়ে নিতান্ত নিরুপায়। ইয়ােরােপের তত্ত্বানুসন্ধায়ী কত শত পণ্ডিত প্যালেষ্টাইনের অন্তর বাহির তন্ন বিতন্ন করিলেন, জেরুশালমের ভূগর্ভ খনন করিয়া কত করিয়া কত লােক এখনাে পর্যন্ত প্রাচীন কীৰ্ত্তি সকল আবি: স্কার করিতেছেন, কিন্তু যাহার অনুরােধে জ্ঞানীদিগের এ বিষয়ে এত আগ্রহ, ৩২ ঈশঃতরিতামৃত। ইহার ত্রিশ বৎসরের প্রচ্ছন্ন জীবনগর্ভে কেহই প্রবেশ করিতে পারিলেন না। যিশুর কৈশাের জীবনের এই একটা মাত্র ঘটনা পাওয়া যায় যে তিনি সময়ে সময়ে পিতা মাতার সঙ্গে জাতীয় পৰ্ব্বোপলক্ষে জেরুশালম তীর্থে যাইতেন। উক্ত নগর নাশরথের দক্ষিণ চল্লিশ ক্রোশ অরে সংস্থাপিত। যে পথ দিয়া তথায় যাইতে হয়, তাহা সুরম্য কানন উপবন গিরি নদী নিরে অলঙ্কৃত। বসন্তকালে নিস্তারপর্বের সময় ঐ সকল বনবাজী ফল পুষ্পে অতীব শোভনীয় হইত। প্রেমিক ঈশা এই স্থানের ভিতর দিয়া তীর্থে গমন করিতেন। প্রকৃতির মনােহারিণী শোভা অবলােকন করত তাহার চিত্তসরােবরে কত ভাবের তরঙ্গ উঠিত তাহা কে বলিতে পারে ? যিশু যখন দ্বাদশ বর্ষীয় বালক, একদা তৎকালে তিনি জোসেফ এবং মেরীর সঙ্গে জেরুশালমে গমন করেন। পধ্ব দেখিয়া দেশে ফিরিয়া আসিবার সময় পিতা মাতা হঠাৎ দেখিলেন যে পুত্র সঙ্গে নাই । পথে দলে দলে স্ত্রীপুরুষ বালক বালিকা চলিতেছে, কোন ছেলের দলে তিনি পশ্চাতে আছেন কিংবা অগ্রসর হইয়াছেন এই মনে করিয়া তাহারা সে দিন আর বিশেষ ভাবিত হইলেন না। অনন্তর দিবস।বসানে যখন দেখিলেন পুত্র কোন দলের সঙ্গে নাই, তখন দুই জনকে পুনরায় নগরাভিমুখে ফিরিয়া আসিতে হইল। দ্বিতীয় দিবসেও কোন অনুসন্ধান পাওয়া গেল না, জন্য পিতা মাতার হৃদয় শােকে নিতান্ত অধীর হইয়া উঠিল বহু অনুসন্ধানের পর তৃতীয় দিবসে তাহারা দেখিলেন, এ ধৰ্ম্মন্দিরে পণ্ডিত- মণ্ডলী মধ্যে পুত্র বসিয়া ধৰ্ম্মালাপ করিতেছে। যিশু যে সকল বিষয়ে প্রশ্ন উত্তর করিতেছিলেন তচ্ছ বণে মন্দিরাধ্যক্ষ পণ্ডিতগণ অতিশয় চমৎকৃত হন। দ্বাদশ বর্ষীয় য়িহুদী বালক দেশীয় প্রথানুসারে যদিও কতকটা সাবালগের ন্যায় গণ্য, কিন্তু এত অল্প বয়সে এরূপ সারগর্ভ ধৰ্ম্মপ্রসঙ্গ তঁাহার মুখ হইতে বাহির হইবে ইহা কেহ প্রত্যাশা করিতে পারে না। মাতা মেরী সহসা ঈদৃশ অভাবনীয় দৃশ্য দর্শনে বিপন্ন হইলেন। যে সকল সুবিজ্ঞ শুভশ্মশ্রুধারী প্রাচীন অধ্যাপকগণের নিকটে দাড়াইতে তাহারা শঙ্কিত হন, তাঁহাদিগের মধ্যস্থলে বসিয়া বালক যিশু নির্ভয়ে ধৰ্ম্মালাপ করিতেছে।

ঈশাচরিতামৃত। তখন মেরী বলিলেন “হে পুত্র ! আমাদের সঙ্গে কি তােমার এইরূপ ব্যবহার করা উচিত ? তােমার অনুসন্ধানে দেখ আজ আমরা তিন দিন হইতে নানা স্থান ভ্রমণ করিতেছি।” জননীর স্নেহের অনুযােগ শুনিয়া পুত্রবর যিশু বলিয়া উঠিলেন, “কেন তােমরা আমাকে অনুসন্ধান করিতেছিলে ? আমার পিতার গৃহে আমি অবশ্য থাকিব ইহা কি তােমরা জানিতে না?” এইরূপ উত্তর পাইয়া পিতা জোসে বুঝিলেন যে আমি ব্যতীত ইহার আর এক জন পিতা আছে। কিন্তু সে কথার প্রকৃত তাৎপর্য তাহাদিগের হৃদয়ঙ্গম হইল না। উপস্থিত পণ্ডিতমলীও তাহা কত দূর বুঝিয়াছিলেন বলা যায় না। তদনন্তর পিতা মাতার অনুগত হইয়া যিশু ঈদেশে প্রতিগমন করেন। কোন কোন শাস্ত্রকার বলেন, যিশুর অাপনার সহােদর সহোদরা ব্যতীত আর কয়েকটি বৈমাত্রেয় ভাই ভগিনী ছিল, বিবাহের পর তাহারা স্বতন্ত্র অবস্থান করিত। তিনি যখন উনিশ বৎসরের যুবা তখন জোসেফ পরলােক গমন করেন। জনকের লােকান্তর হইলে তাহার মস্তকে সংসারের সমস্ত ভার নিপতিত হয়। কোন কোন শুদয় একেশ্বরবাদী যিশুর প্রতি এই জন্য বিরক্ত যে তিনি বিবাহ করেন নাই, পারিবারিক, কৰ্ত্তব্য, সন্তান- পালন, লৌকিক ধৰ্ম্ম ইত্যাদি বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। যদিও তিনি এ সকল কাৰ্য তােমার আমার মত না করুন, কিন্তু ত্রিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত সংসারেই ছিলেন, জাতীয় ব্যবসায় দ্বারা আত্মীয় স্বজনকে প্রতিপালন করিয়াছেন। কাহার কাহার মতে যিশুর অপার ভাই ভগিনী কেহ ছিল না। যে সকল ভ্রাতৃগণ প্রথম শতাব্দীতে খ্ৰীষ্টীয়ানমণ্ডলীর উচ্চপদে অভিষিক্ত হন তঁাহারা সহােদর নহেন, মাসীর পুত্র। মেরী নামে তঁাহার এক মাতৃষ ছিলেন, তাহার কয়েকটি পুত্র ছিল, তাহারাই পরে যিশুর শিষ্য হয়। এ সম্বন্ধে নানা প্রকার মতভেদ আছে, প্রকৃত তত্ত্বনির্ধারণের কোন উপায় নাই। এইমাত্র সিদ্ধান্ত হয় যে, যিশুর আত্মীয় কুটুম্ব অনেক ছিল, তাহারা প্রাচীন প্রথার পক্ষপাতী থাকিয়া প্রথমে আপনাদের কুলপাবন ভ্রাতাকে উপেক্ষা করিত। বাল্য কিংবা পোগণ্ড অবস্থায় আমাদের প্রিয় যিশু রীতিমত শিক্ষা লাভ করেন নাই। পিতা মাতা প্রতিবাসীর মুখে পৈতৃক ধৰ্ম্মের উপদেশাদি যাহা ঈশাচরিতামৃত। শুনিতেন তাহাই মুখস্থ করিতেন। স্থানীয় ধর্মমন্দিরে গিয়া সময়ে সময়ে শাস্ত্রীয় বচন শুনিয়া আসিতেন। তিনি যে যথারীতি বিদ্যাভ্যাস করেন নাই তাহার এক প্রধান প্রমাণ এই, যখন তিনি জলাভিষিক্ত হইয়া ধৰ্ম্ম- প্রচারে ব্রতী হন, তখন পরিচিত প্রতিবাসীরা বলিয়াছিল, এ ব্যক্তি লেখা পড়া না শিখিয়া কিরূপে এমন শাস্ত্র ব্যাখ্যা করিতেছে ? আরো প্রমাণ এই, তিনি যে সকল জলন্ত গভীর সত্য প্রচার করিতেন তাহা তৎকালপ্রসিদ্ধ শাস্ত্রের সঙ্গে ঐক্য হয় না। নৈতিক উপদেশাবলীর সহিত অবশ্য য়িহুদী- দিগের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের অনেক একতা আছে, কিন্তু যিশু তৎসমুদায়কে নবজীবনের নব ভাব এবং নবীন অর্থের দ্বারা প্রাণ দান করেন। তাঁহার পবিত্র শােণিতে অনুরঞ্জিত হইয়া অনেক পুরাতন কথাও সম্পূর্ণরূপে নূতন হইয়া উঠিয়াছিল । আলেকজাণ্ডিয়া দেশে বিখ্যাত ফাইলে তৎকালে জীবিত ছিলেন, কিন্তু তঁাহার বৈজ্ঞানিক মত যিশুর সুগীয় জ্ঞানের নিকট পেীছিতে পারে নাই। য়িহুদী সমাজে ফিরুশী সদুসী বা স্কাইবদিগের আচার ব্যবহার ধৰ্ম্মনীতি তঁাহার হৃদয়ে স্থান পাইত না। তিনি সাময়িক জ্ঞান ধর্মের অতীত এক অভূতপুর্ন ধৰ্ম্মবিধান পৃথিবীতে আনিয়াছিলেন। এ পরা বিদ্যা তিনি কোন দেশে কাহার নিকটে শিখিলেন ? এ পৃথিবীতে নহে; সেই বিজ্ঞানঘন সর্বজ্ঞ ঈশ্বর নিজেই তাহার শিক্ষক, হৃদয়মন্দির তঁাহার বিদ্যামন্দির, বিবেক তঁাহার ভাষা এবং ব্যাকরণ, ব্ৰহ্মকুপা অভিধান । বাহিরে স্বভাবের প্রকাণ্ড গ্রস্থ, অন্তরে আত্মার সুগভীর শাস্ত্র উঁহার প্রথম এবং শেষ পাঠ্য ছিল। পূর্ববর্তী ভবিষ্যদা মহাজনেরা তাহার মহাধ্যায়ী ছিলেন। সরলস্বভাব নির্দোষ প্রকৃতি সূত্র ধবনয় গৃহে বসিয়া কৃষিযন্ত্র প্রস্তুত করিতেছে, দীনাবস্থায় গোপার্জিত অর্থে আত্মীয় স্বজনের সেবা করিতেছে, দুঃখের অন্ন সুখে ভােজন করিয়া কঠিন শয্যায় তাকাতরে নিদ্রা যাইতেছে, তাহার ভিতর বিলাস, সভ্যতা, বিদ্যা সমের বিকৃত উষ্ণতাও নাই, অথচ দারি- দ্রের তীক্ষ্ণ শলাকা প্রাণকে বিদ্ধও করে না, এইরূপ রমণীয় অবস্থার মধ্যে ভাবী বংশের ধর্মাচাৰ্য শিক্ষিত হন। এক দিকে মাতৃভূমির নৈসর্গিক শােভা, অপর দিকে আন্তরিক প্রেমোচ্ছাস, উভয়ের মধ্যে বিধাতার প্রত্যক্ষ হস্ত কাৰ্য্য ৩ ও ঈশাচরিতামৃত। করিতেছে ইহা তিনি স্পষ্ট দেখিতেন, অার অন্তরের অন্তরতম স্থানে মানব- জাতির উপভােগ্য প্রেম পুণ্য ভক্তি বিশ্বাস সঞ্চয় করিতেন। ব্রহ্মাণ্ডপতির প্রত্যেক রচনা তাহাকে গোপনে গােপনে সংশিক্ষা প্রদান করিত। এইরূপ নিগূঢ় প্রণালীতে শিক্ষা লাভ করিয়া গুণধাম যিশু পিতা মাতার অধীনে কৈশোর কাল অতিবাহিত করিয়াছিলেন। তিনি দেশীয় প্রাকৃতিক ভাষা এবং সত্যতম গ্রীকৃ ভাষাও বােধ হয় কিছু কিছু জানিতেন। জাতীয় ধৰ্ম্মশাস্ত্রে তাহার এক প্রকার সংস্কার বােধ ছিল। কিন্তু তাহা তিনি পুরাতন ভাবে বাহ্য দৃষ্টিতে দেখিতেন না, তন্মধ্যে আপনার মুখচ্ছবি অবলােকন করিতেন। সহজ জ্ঞান, প্রতিভাশক্তি অতিশয় উজ্জ্বল ছিল, সুতরাং যাহা কিছু দেখিতেন তাহার অভ্যন্তরিক সারবত্তা হৃদয়ে একেবারে অঙ্কিত হইয়া যাইত।. তাহার নিকট পরিদৃশ্যমান জগতের বাহ্য দৃশ্য কেবল ভগবানের অভিনয়গৃহের স্বচ্ছ যবনিকা মাত্র ছিল। তােমার আমার চক্ষে তাহা ভৌতিক পদার্থ ও প্রাকৃ- তিক নিয়মের স্কুল আবরণে আবৃত, কিন্তু তঁাহার অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে উহা অতীব স্বচ্ছ রূপে প্রতীয়মান হইত। এই কারণে তিনি সর্বদা চক্ষের সম্মুখে কেবল স্বর্গরাজ্যের ছবি দেখিতে পাইতেন। মানবদেহ, জড় ব্রহ্মাণ্ড, সৰ্ব্বগত চিৎশক্তির প্রকাশ এবং সমস্ত বিশ্ব চিন্ময় ব্রহ্মের গাত্রাবরণস্বরূপ এই তিনি জানিতেন। কৈশাের হইতে ত্রিশ বৎসর কাল এই ভাবে গন্য হয়। এই সময়ের মধ্যে তাহার শরীরও দিব্য লাবণ্যে, পবিত্র শোৰ্য্য বীর্যে দীর্ঘ এবং বলিষ্ঠ হইল, আত্মাও প্রভাবশালী তেজস্ব হইয়া উঠিল। এই গুপ্ত যৌবনের গভীর রহস্য কেবল বিশ্বাসী সাধুরাই উদঘাটন করতে পারেন, অন্যের সাধ্য নহে। এত দিন তিনি কি ভাবে কোথায় জীবন কাটালেন, মনে মনে কি ভাবিতেন, তাহা জানিবার জন্য আমাদের অন্তরে কতই কৌতুহল হয়! কতবিধ কল্পনাতরঙ্গ আসিয়া হৃদয়কে আঘাত করে। রণকুশল সেনাপতি যেমন অরাতিপক্ষের বিনাশসাধনের জন্য বহু দিবস হইতে সংগো- পনে দুর্গমধ্যে সাংঘাতিক আগ্নেয় অস্ত্রসকল সঞ্চয় করিয়া রাখে, ভূভার- হারী ভগবান্ পাষণ্ডদলনের জন্য তেমনি এই মহাবীরের প্রাণদুর্গে অব্যর্থ ব্ৰহ্মাস্ত্র সমুদয় ত্রিশ বৎসর কাল ক্রমাগত সংগ্রহ করিতেছিলেন। তিন ঈশাচরিতামৃত। বৎসর অবিশ্রান্ত সংগ্রাম হইল, কিন্তু তাহার আয়ােজন করিতে ত্রিশ বৎসর লাগিয়াছিল। শিশু সন্তান না ঘুমাইলে বাড়ে না, ঈশ্বর পুত্র যিশু ঠিক যেন সিংহশাবকের ন্যায় তেমনি এই দীর্ঘকাল গিরিকরে ঘুমাইয়াছিলেন । আমাদের গ্রন্থপূরণের জন্য কোন প্রকাশ্য ঘটনা উহাতে নাই সে জন্য আর দুঃখই বা কি! ঈশ্বরের অব্যক্ত এবং ব্যক্ত উভয় কাৰ্যই আমাদের অধ্যয়ন এবং চিন্তার বিষয়। প্রভু গােপনে নীরবে একাকী বসিয়া জীবের ভাবী কল্যাণের জন্য যে সমস্ত আয়ােজন উদ্যোগ করেন তাহার ভিতরে তাহার বিধাতৃত্ব মঙ্গলশক্তি দর্শন করিয়া অামরা কৃতার্থ হই। তাহার লীলাসম্বন্ধে অনেক বিষয় আমরা যে জানিতে পারি না ইহাতেও যথেষ্ট আমােদ বোধ হয়।

সাময়িক ধৰ্ম ও জ্ঞানের প্রভাব। মনুষ্য মাত্রেই ভূতের সন্তান, ভবিষ্যতের পিতা; মহৎ লােকদিগের সম্বন্ধে এ সত্য আরো উজ্জ্বল। ভাবীকালেই ইহারা বাস করেন এবং তদুপযােগী কথা বলেন। মনুষ্য যাহা হইয়াছে তাহার প্রতি না চাহিয়া যাহা সে হইবে তাহাই কেবল ইহারা দেখেন। কিন্তু যদিও এই সকল অসাধারণ প্রকৃতির লােকেরা ভাবী কালের বহুদূরস্থিত জ্ঞান ধৰ্ম্ম লইয়া ধরাতলে অবতীর্ণ হন, তথাপি ভূতকাল তাহাদের প্রসূতি ও ধাত্রী, সাময়িক অবস্থার গর্ভ তাহা- দের জন্মস্থান, সুতরাং তাহার প্রচলিত শুভাশুভ ঘটনশৃঙ্খলকে তঁাহারা কিছুতেই অতিক্রম করিতে পারেন না। ভৌতিক দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেরূপ স্থানীয় জল বায়ুর সহিত উপযােগিতা রক্ষা করে, আধ্যাত্মিক প্রকৃতিও সেইরূপ সাময়িক ধৰ্ম্মনীতির ক্রোড়ে প্রতিপালিত এবং বর্ধিত হয়। ঈশার ন্যায় পুরুষোত্তমের জীবন একটী অভিনব সৃষ্টি সন্দেহ নাই, কাৰ্যকারণের সাধারণ সম্বন্ধ এখানে অতি অল্পই দেখা যায়; কিন্তু তাহা যে সাময়িক অবস্থার পঙ্কিল জলমধ্যে জন্মিয়া পূর্ববর্তী কারণসমূহের অবিশুদ্ধ প্রভাবের প্রতিকূলে সুকোমল পদ্মের ন্যায় ক্রমে ক্রমে বিকসিত হইয়াছে তাহা কে অস্বীকার করিবে ? যাদৃশ ধৰ্ম্মমতের আশ্রয়ে যিশুচরিত পরিপুষ্ট হয়, য়িহুদী জাতির প্রাচীন ইতিহাস তাহা সহজে বুঝাইয়া দিবে। তঁাহার সময়ে কত প্রকার সম্প্রদায় ছিল, রাজনীতিসম্বন্ধে লােকে কিরূপ সংস্কার পােষণ করিত, বৈদেশিক জ্ঞান সভ্যতা বিষয়ে তাহাদিগের কি প্রকার রুচি ছিল, ধৰ্ম্মনীতির স্রোত কোন প্রণালীর ভিতর দিয়া প্রবাহিত হইত এবং যিশু তন্মধ্যে কি ভাবে বিচরণ করিতেন, এ সকল তত্ত্ব অবগত হইবার জন্য মনে স্বভাবতই কৌতূহল জন্মে। তদানীন্তন গ্রীকৃ ও য়িহুদী জাতির জ্ঞান ধর্মের অবস্থা এবং রােমীয় সাম্রাজ্যের প্রভাব আলােচনা করিলে আমরা সে কৌতু- হল কিয়ৎ পরিমাণে চরিতার্থ করিতে পারি।

ঈশাচরিতামৃত। গ্ৰীশীয় তত্ত্বশাস্ত্রসম্বন্ধে যিশুর জ্ঞান লাভের সম্ভাবনা অতি অল্পই ছিল। কারণ য়িহুদী পণ্ডিতগণ তৎপ্রতি ঘৃণ। প্রদর্শন করিয়া বলিতেন, “সন্তানকে। শ্ৰীশীয় দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা দেওয়া আর শূকর পালন করা একই কথা। ইহা বিপজ্জনক নীচতম শিক্ষা, কেবল স্ত্রীজাতির পক্ষে ইহা উপযােগী।” তঁাহা- দের পক্ষে ব্যবস্থাশাস্ত্ৰই এক মাত্র অধ্যয়নের বিষয় ছিল। কোন য়িহুদী, অধ্যাপককে এক জন জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “কোন্ সময় বালককে গ্রীকৃ বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া উচিত ?” তাহাতে তিনি এই উত্তর দেন যে “দিব: সেও নয়, রজনীতেও নয়; কারণ শাস্ত্রে বিধি আছে তুমি দিবা নিশি ব্যবস্থা শাস্ত্র পাঠ করিবে।” যে জ্ঞানালােকের দ্বারা মন পাণ্ডিত্যের অহঙ্কারে স্ফীত ও বিকৃত হয় যিশু তাহা হইতে একেবারে বিমুক্ত ছিলেন। জাতীয় ধৰ্ম্ম- জ্ঞানের মধ্যেই তঁাহার সমস্ত শিক্ষা বদ্ধ ছিল। এসেীদিগের বৈরাগ্য ধৰ্ম্ম কিংবা আলেকজাণ্ডিয়াবাসী ফাইলের ধর্মমত যদিও তাহার সমকালবর্তী, কিন্তু তিনি তদ্বিষয়ে কোন সংবাদ রাখিতেন না। ফলতঃ তঁাহার অযত্নসম্ভূত স্বর্গীয় প্রতিভাশক্তিকে কোন অসার বিদ্যাভিমানে কলঙ্কিত বা হীনপ্রভ করিতে পারে নাই। ঈশ্বরপ্রেম, দয়া, ঈশ্বরনির্ভর প্রভৃতি কতিপয় বিষয়ে ফাইলের সঙ্গে তাহার সাদৃশ্য দৃষ্ট হয়, কিন্তু ইহা দুই স্থানে এক অবস্থায় স্থাপিত দুই জনের ভিতর হইতে স্বাধীনভাবে উৎপন্ন হইয়াছিল, কেহ কাহারো নিকট হইতে গ্রহণ করেন নাই। তৎকালে জেরুশামে পণ্ডিত- মণ্ডলীতে যে তত্ত্ববিদ্যার আলােচনা হইত, তাহাও যিশুকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। বরং তিনি সে অসার জ্ঞানাভিমান দর্শনে অতিশয় ঘুণা প্রকাশ করিতেন। কিন্তু অধ্যাপক হিলে প্রবর্তিত কোন কোন মতের সহিত তাহার ঐকমত্য দৃষ্ট হয়। হিলে বিনয় বৈরাগ্য সারল্য প্রভৃতি সাধুগুণে যিশুর সমভাবী ছিলেন। যথেষ্ট সম্ভব যে তাহার শিক্ষা এবং সাধুতা মেরীতনয়ের পােষকতা করিয়াছিল। পুরাতন বাইবেলের অন্তর্গত “প্যাণ্টা.. টিউ” এবং “প্রফেট,” এই দুই গ্রন্থােল্লিখিত আশাবাক্য এ সময় সাধারণ্যে একটি প্রধান, জল্পনার বিষয় ছিল। দাউদের গীত এই ভাবী আশা এবং সুখকল্পনায় পরিপূর্ণ। প্রেরিত মহাজন শীঘ্র অবতীর্ণ হইয়া ইস্রায়েল বংশকে উদ্ধার করিবেন এই আশায় লােকে নিতান্ত অধীর হইয়া দিন গণনা ঈশাচরিতামৃত। । করিত। মহাত্মা যিশু পুরাতন বাইবেলের এই সমস্ত কবিত্ব কল্পনারস পান করিয়া তন্মধ্যে আধ্যাত্মিক স্বর্গরাজ্যের শােভা সন্দর্শন করিতেন। কিন্তু নীরস বৈধী ধর্মের অনুষ্ঠান তঁাহার মধুর কোমল স্বভাবকে কোন দিন আকর্ষণ করিতে সক্ষম হয় নাই। দাউদপ্রণীত সঙ্গীতের ভাবলহরী এবং আইজেয়া প্রভৃতি ভবিষ্যদ্বক্তার প্রহেলিকাবৎ আদেশ বাণী তাহার হৃদয়তন্ত্রীতে প্রতি, ধ্বনিত হইত। প্রাচীন ধৰ্ম্মপুস্তক ব্যতীত অাধুনিক কোন কোন গ্রন্থ, বিশেষতঃ ডানিয়েলের গ্রন্থ তাহার পাঠ্য ছিল। য়িহুদীরা যে সকল ভাবী সুখের কল্পনায় প্রমত্ত হইয়া প্রত্যাশিত মহাজনের আগমন প্রতীক্ষা করত, সে আশা এবং সে কল্পনা যে যিশুর হৃদয়ে স্থান পায় নাই তাহা নহে; কিন্তু তাহার সুখ সৌভাগ্যের আদর্শ অন্য প্রকার ছিল। অলৌকিক ঘটনা। এবং দৈবক্রিয়া তাহার নিকট অতি সহজ এবং স্বাভাবিক কাৰ্য বলিয়া মনে হইত। যিশুর যে স্থানে বাম, যেরূপ শিক্ষা তাহাতে ইহা কখন সম্ভব নহে যে তিনি তাৎকালিক পৃথিবীর এবং অপর সভ্যতম দেশের অবস্থা অবগত ছিলেন। তিনি নিজেই এক প্রকাণ্ড জগৎ, বাহিরের রাজ্যের তত্ত্ব লইবার অবসর কোথায় ? সামান্য এক ক্ষুদ্র নগরবাসী সূত্ৰধরতনয় রোমীয় সাম্রা- জ্যের রীতি ব্যবহার, ঐশ্বৰ্য বীৰ্য পরাক্রমই বা কিরূপে জানিবে ? সিজার নামে এক জন নরপতি আছে, তাহার দরবারের লােকেরা উত্তম পরিচ্ছদ পরিধান করে, এইমাত্র তাহার জানা ছিল। গালি দেশে তিনি যে সকল রাজকীর্তি দেখিতেন, তাহাতে তাহার মনে কিছু মাত্র আলাদ হইত না। মাতৃভূমির গ্রাম্য শােভা, বৃক্ষশাখায় এবং শৈলগাত্রে পক্ষীদিগের বাসা, বন উপবন, কৃপ, সমাধিমন্দির এই সমস্ত তাহার প্রীতিকর ছিল। তঁাহার সময়ে গ্ৰীশদেশে বিজ্ঞানৰ্শনের ভূরি আলোচনা হয়। বিশ্বরাজ্য অপরি- বৰ্ত্তনীয় নিয়মে চালিত হইতেছে, তজ্জন্য ব্যক্তিবিশেষের হস্তক্ষেপ নিস্প্র যােজন, অস্বাভাবিক বা অলৌকিক কাৰ্য ইহাতে ছুই নাই, এই বিশ্বাস বহু দূর বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছিল । বেবিল ও পারস্য দেশীয় লােকেরা পর্যন্ত এ তত্ত্ব অবগত ছিল। কিন্তু য়িহুদীরা তাহার কোন সংবাদ রাখিত না। তাহারা অনৈসর্গিক, অলৌকিক বিষয়ে সদা ডুবিয়া থাকিত। জাতি- ঈশাচরিতামৃত। সাধারণ কুসংস্কার ' জ্ঞানতা সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিকে অম্লাধিক পরিমাণে অাশ্রয় করে, যিশুর সম্বন্ধেও সে নিয়মের কোন ব্যতিক্রম ঘটিয়াছিল এমন বােধ হয় না। কিন্তু দার্শনিকের চক্ষে আপাততঃ ইহা যেরূপ মহা ভ্রান্তি এবং অনিষ্টকর, যিশুর সম্বন্ধে তদ্রুপ সিদ্ধান্তের কোন কারণ নাই। তাহার সারগ্রাহী নিৰ্ম্মল আত্মা প্রচলিত ভ্রান্ত সংস্কারের মধ্যে কেবল ঈশ্বরের সহিত মনুষ্যের নিকট সম্বন্ধ অনুভব করিত। মানবীয় বুদ্ধি কল্পনা, পার্থিব সুখ বাসনার অতীত স্থানে তিনি সদা অবস্থিতি করিতেন। বিজ্ঞান দর্শন বা গণিতশাস্ত্র শিক্ষা দিতে তিনি অাসেন নাই, সে বিষয়ে যদি কোন ভ্রম কল্পনা এখন বাহির হয়, তাহা ধরিয়া বিচার চলিতে পারে না। যে জ্ঞান পুস্তকে পড়িতে বা বিজ্ঞানবিদ পণ্ডিতের মুখে সচরাচর শুনিতে পাওয়া যায় না সেই জ্ঞান শিক্ষা দিবার তাহার ভার ছিল। পৃথিবী সঙ্গঠিত হইবার প্রাক্কালে ভূগর্ভনিহিত অনলরাশি যেরূপ * মহাবেগে আন্দোলিত হয়, মহাবীর যিশুর দিস্থিত ব্ৰহ্মাগ্নি তেমনি স্বর্গরাজ্য নির্মাণের জন্য ভীষণ প্রতাপে আলােড়িত হইতেছিল। দুঃখ বিরক্তি কুসং- স্কার অন্ধবিশ্বাস এবং অশ। নৈরাশ্যে য়িহুদীসমাজের আভ্যন্তরীন অবস্থাও তখন অগ্নিময় প্রতীত হইত। পৃথিবীর ইতিহাসে এইরূপ অসাধারণ পরি- বর্তনের কাল একটি মহা প্রলয়ের কাল। এ সময় একদিকে যেমন মানব- প্রকৃতিজাত সদগুণরাশি স্পষ্টীকৃত এবং সমুজ্জ্বলিত হয়, পক্ষান্তরে তেমনি লােকের অসদভিসন্ধি কুটিল ব্যবহার ও বিকটমূৰ্ত্তি দানবের ন্যায় মস্তক উত্তোলন করে। কিন্তু নূতন সমাজ সঙ্গঠনের জন্য এই উভয়েরই প্রয়ােজন। কেন না উভয়বিধ মানবচরিত্র জাতীয় ইতিহাসপটে অঙ্কিত হইবার ইহা একটি উত্তম সুযােগ। রাম রাবণের যুদ্ধ না হইলে সীতার উদ্ধার হয় না। খ্ৰীষ্টীয়ান রাজ্য স্থাপনের অব্যবহিত পূৰ্ব্বে ঈদৃশ অবস্থা ঘটিয়াছিল। পূৰ্ব আসিয়ানিবাসী অৰ্য্যধৰ্ম্মপ্রবর্তকগণ যেমন গভীর চিন্তা এবং তত্ত্বজ্ঞানের পক্ষপাতী, পশ্চিম প্রদেশস্থ মহাত্মাগণ তেমন নহেন; তাহাদের জীবনে কাৰ্যপ্রধান ধৰ্ম্মের কিছু প্রাবল্য দেখা যায়। মুসা কি মােহম্মদ ইহার কাৰ্যানুষ্ঠানে বিশেষ তৎপর ছিলেন এবং তারা লােকচরিত্র শাসন = ---। ঈশাচরিতামৃত। ৪১. করিয়া গিয়াছেন। যিশুও সেই প্রকৃতির মনুষ্য। তিনি বৈজ্ঞানিক বা ধর্মতত্ত্ববিদ পণ্ডিত হইয়া মানবজাতিকে কোন প্রকার বিধিবদ্ধ প্রণালীগত ধৰ্ম্ম শিক্ষা দিতে আসেন নাই। এই এই মত স্বীকার কর, এই এই মত পরিত্যাগ কর, এরূপ তাহার ধর্ম নহে; ঐকা ন্তিক প্রেমেতে উঁহার আনুগত্যধীকার, স্বর্গপ্রবেশের দ্বার ছিল। তিনি ঈশ্বর, পরকাল, অনুতাপ, প্রার্থনা কি পাপ পুণ্যের বিজ্ঞান লইয়া তর্ক করি- তেন না, এ সকল বিষয়কে প্রত্যক্ষ হামলবৎ জানিতেন। যােল অনা সত্য পূর্ণ বিশ্বাসের সহিত পালন কর, এই তাহার ধৰ্ম্ম, এবং ইহাই তাহার উপদেশ। যে শক্তি দ্বারা অদ্যাপি সভ্যসমাজ নিয়মিত হইতেছে, সেই জীবন্ত দৈবশক্তি তিনি সংক্রামিত করিয়া গিয়াছেন। কাৰ্যদক্ষতাসম্বন্ধে তঁাহার পিতৃবংশও সবিশেষ উৎসাহী ছিল, মতামত লইয়া তাহারা অধিক তর্ক বিবাদ কবিত’ না; কিন্তু মুসার বিধি অকপটে পালন করিবার জন্য তাহারা ইদানীং একবারে উন্মাদবৎ হইয়াছিল। মানবজাতি এক অখণ্ড পদার্থ, তন্মধ্যে স্বতন্ত্র নাই, কালে সকল একাকার হইয়া যাইবে এইরূপ তাহারা বিশ্বাস করিত। গ্ৰীশীয়ানেরা যদিও সভ্য, কিন্তু এ প্রকার উদার প্রশস্ত মত তাহ- দের ছিল না। পারস্য হইতে এই মতের আভাস প্রথমে প্রচারিত হয়। তাহার অধিবাসীরা বলিত, পৃথিবীতে বহু বার যুগ প্রলয় হইবে এবং প্রত্যেক যুগে এক এক জন অবতার রাজত্ব করিবেন। পরিশেষে স্বর্গ রাজ্য আসিবে। তখন এক ভাষায় সকলে কথা কহিৰে, এক শাসনে শাসিত হইবে, এবং সমস্ত জগৎ এক অখণ্ড ভাব ধারণ করিবে। যিহুদীদিগের মধ্যে অল্প লোকেই মানবজাতির অভেদত্ব মত মানিত, কিন্তু সেই অল্পসংখ্যক লোক দ্বারা জগতে এক মহৎ সত্য প্রচারিত হইয়াছে। পৃথিবীতে সময়ে সময়ে যে সকল শুভকর পরিবর্তন এবং অভিনৰ বিধানের আবির্ভাব হয়, তাহা প্রথমে অতি অল্প লোকেই মানে, পরে তাহার। সে জন্য প্রাণ দিলে জাতিসাধারণে তাহা গ্রহণ করে। ইহা প্রমাণের জন্য এথেন্সবাসীরা সক্রেটিকে বিষপ্রয়ােগ করিল, ষিহুদীরা ধৰ্ম্মমন্দির হইতে স্পাইনােজাকে বিদায় করিয়া দিল, এবং ঈশাকে মারিয়া ফেলি। য়িহুদীরা যদিও আত্মাভিমানী, নিষ্ঠুর কুটিল ৪২ ঈশাতরিতামৃত, অন্ধবিশ্বাসী, কিন্তু উহাদিগের দ্বারা মানবসাধারণের অনেক মঙ্গল হইয়াছে। এক মহা একাণ্ড স্বপ্ন এবং দুরাশার ধৰ্ম্ম এই জাতির মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী নৰ নৰ ৰ্ত্তি লাভ করে। কাৰ্যতঃ যে পরিমাণে তাহা নিষ্ফল হইয়াছে, ভাবেতে আশাতে লােকে সেই পরিমাণে অন্ধোৎসাহী হইয়া, উঠিয়াছে। ইহাদের মধ্যে মানবের অমরত্বে প্রথমতঃ কেহ বিশ্বাস করিত । পরলােকে বিশ্বাস ইহাদের কোন একটি গুরুতর ধর্ম বলিয়া বোধ ছিল না। প্রত্যেক ব্যক্তি পরলােকে গিয়া কৰ্ম্মফল ভােগ করিবে গ্রীকের। এ মত প্রচার করে। য়িহুদীরা স্বজাতির একত্ব ভিন্ন ব্যক্তিত্বের উপর কোন মতামত স্থাপন করিত না। শরীর হইতে আত্মা পৃথক পদার্থ, দেহের অন্তে ভাহা জীবিত থাকিয়া ফলাফল ভােগ করে এ সম্বন্ধে য়িহুদী ধর্মশাস্ত্রে কিছু মাত্র উল্লেখ নাই। যেখানে জাতিসমষ্টির উপর ধর্মমত স্থাপিত, সেখানে ব্যষ্টি- গত ব্যক্তিত্বের মত স্থান পায় না; কাজেই ঈদৃশ মতাবলম্বী সাধু যখন পাপ- প্রবণ সময়ে সমাজমধ্যে স্থিতি করেন, তখন তাহাকে জনসাধারণের পাপভার মন্তকে বহন করিতে হয় ইহা পুরাকালের প্রধানতন্ত্রণালীর মত, কালে মলিন হইয়াছিল। কি কতকগুলি লোক মনে করি, “কি ! যে সকল ব্যক্তি ধর্মের জন্য বিনা দোষে নিহত হইয়াছে তাহাদিগকে জিহােবা কি একবারে বিস্মৃত হইবেন? তাহার কি সমাধিগর্ভে মৃত্তিকাসাৎ হইয়া বাইবে? সদুকী সম্প্রদায় এ বিষয়ে উদাসীন ছিল। উন্নতমন সাধুরাও পরলােকে কোন পুরস্কারের প্রত্যাখা না রাখিয়া কাৰ্য্য সাধন করিতেন। কিন্তু জনসাধারণত তাহাতে সন্তুষ্ট থাকিতে পারে না; তাহারা পরকাল ও পুরস্কারসম্বন্ধে নানাপ্রকার মত পােষণ করিতে লাগিল। ফিকশী . সম্প্রদায় সশরীরে পুনরুত্থানের মত মানিত। সংকীরা কিছুই মানিত না। ফলতঃ পরকালসম্বন্ধে য়িহুদী সমাজে কোন কঠোর শাসন ছিল না, নানা জনে নানারূপ বিশ্বাস করিত। এইরূপ আরাে অনেক বিষয়ের ভিন্ন মতের আঘাত প্রতিক্ষাতে তখন ত্মিহদী সমাজ আন্দোলিত ছিল। ইহার দূষিত এবং বিশুদ্ধ বায়ু যিশুর অজে লাগিত। তিনি ইহারই ভিতরে আপনার নূতনবিং চরিত্র সঙ্গঠন করিয়া লইতেন। বিশ্বসপ্রধান যুগের লােকেরা E ঈশাচরিতামৃত। সন্দেহ তর্ক করিতে ভাল বাসে না, সর্বত্র ঐশী শক্তির আবির্ভাব দেখিয়া তাহারা কেবল বিশ্বাস করিয়া চলিয়া যায়। তাহার ভিতর ভ্রম কল্পনা, সত্য সারবত্তা উভয়ই বর্তমান থাকে। কিন্তু অবিশ্বাসীর নীচ স্বার্থপরতা তন্মধ্যে স্থান পায় না। আত্মত্যাগী যিশু যৌবনের প্রান্তে ফলাফলচিতাবিহীন হইয়া “তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হউক” কেবল ইহাই বলিতেন। প্যালেষ্টাইনের নিৰ্ম্মল আকাশ, নাশরথের উপত্যকাভূমি, গালিলের স্থির হ্রদ, আঁহাকে ঈশ্বরের মঙ্গল ইচ্ছা সম্পন্ন করিবার জন্য সদা সর্বদা প্রমত্ত করিয়া তুলিত। বাহিরের সীমাবদ্ধ দৃশ্য, সাম্প্রদায়িক মানবচরিত্র কখন তঁাহাকে সাধারণ নবজাতি হইতে একটি বিচ্ছিন্ন পদার্থ বলিয়া বুঝিতে দেয় নাই। “আমি পিতাতে, পিতা আমাতে, এবং সমস্ত বিশ তাহার ভিতরে”. এই বিশ্বাস তাহার স্বাভাবিক ছিল। সাময়িক রাজকাৰ্যবিষয়ে তিনি নিরপেক্ষ থাকিতেন, তৎসংক্রান্ত সংবাদ বড় রাখিতেন না। দেশের রাজা ও রাজকর্মচারিগণ এমন এক প্রকৃতির লােক ছিল যে তাহার সঙ্গে তাহাদিগের কোন প্রকার সংশ্রব না থাকিবারই কথা। যিশুর জম্মবৎসরে হেরোদের মৃত্যু হয়। তাহার তিন পুত্র ছিল, তাহারা রােমীয় সম্রাটের অধীনে ভারতের স্বাধীন রাজাদিগের ন্যায় রাজ- প্রতিনিধির কাৰ্য করিত। আন্টিপাসের হন্তে গালি প্রভৃতি দেশের শাসনভার অর্পিত হয়, যিশু তাহাৰি প্ৰজা ছিলেন। ফিলিফ নামে তদীয় অপর এক ভ্রাতা আর এক বিভাগের শাসনকর্তা ছিল, তাহার অধিকার মধ্যেও যিশু সময়ে সময়ে প্রচার করিতে যাইতেন। জুভিয়া বিভাগের রাজপ্রতিনিধি আর্কেল যখন মরে, যিশুর তখন বয়ঃক্রম 'দশ বৎসর। ইহার মৃত্যুর পর উক্ত ভূভাগে স্বাধীন রাজা আর কেহ হয় নাই। সম্রাট, আগষ্টস্ উহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া জুডিয়া দেশকে সাময়িয়া এভৃতি দেশের সহিত সাইরিয়া রাজ্যের অধীনে আপনার নিয়ােজিত স্বা পুরুষ দ্বারা শাসন করিতেন। যিশুর বয়স যখন ছাব্বিশ বৎসর তখন ঐ কার্যে পন্তিয়া পাইলেট, নিমুক্ত হয়। একেশ্বরবাদী তেজস্বিতার খ্রিহীগণ পৌত্তলিক সম্রাটের অধীন হইয়া অবধি এক দিনের জন্যও সুখী হইতে পারে নাই। রাজবিদ্ৰোহানল তাহাদিগের অন্তরে সর্বদা প্রজ্বলিও ৪৪ ঈশাচরিতামৃত। থাকিত। জেরুশালন নগর তৎসংক্রান্ত আন্দোলনের প্রধান স্থান ছিল। কত শত ব্যক্তি পতঙ্গের ন্যায় এই রাজবিদ্রোহানলে পুড়িয়া প্রাণ হারাই য়াছে। রােমীয় জয়পতাকা, হেরােদপ্রতিষ্ঠিত কীৰ্ত্তিন্ত দর্শনে য়িহুদীরা জুলিয়া উঠিত। ঐ সমস্ত পৌত্তলিক চিহ্ন বিদ্রোহালের ইন্ধন রূপ ছিল। পৌত্তলিক রাজাগণের পৌত্তলিক চিহ্ন বিলােপ করিবার জন্য হারা এইরূপ প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়াছিল যে সে জন্য প্রাণ দিতেও কেহ কুণ্ঠিত হইত না। জুডস্ এবং ম্যাথিয়াস নামে দুই ব্যবস্থাপক পণ্ডিত বিদ্রোহী দলের প্রধান নায়ক ছিল। এই সময়ে জাতীয় ধৰ্ম্মবিধির শাসন প্রভাবও সাধারণের উপর অত্যন্ত প্রবল হইয়া উঠে। এমন কি ইহার বিরােধাচারীদিগকে বধ করিবার নিমিত্ত কয়েক জন ধর্মান্ধ ব্যক্তি হন্তার পদে অভিষিক্ত হয়। কিছু দিন পরে “জুডস্ দি গলোনাইট” নামা জনৈক মহাপ্রতাপ- শালী রাজদ্রোহী মস্তক উত্তোলন করে। তাহার রাজনৈতিক আন্দোলন যিশু বােধ হয় জানিতেন। তৎকালে রাজবিধির মধ্যে প্রজাগণনার বিধিকে য়িহুদীরা বড় ঘৃণা করিত। যে ট্যাক্সের পীড়নে এক্ষণে ভারতবর্ষ অস্থির, প্রজাগণনা তাহারই পূৰ্ব্বক্রিয়া, এই জন্য উহার বিধি এত অপ্রিয় ছিল। এদেশের প্রজাকুল ট্যাক্সের প্রতি এই জন্য বিরক্ত যে তারা হৃদয়শােণিত অর্থ শােষিত হয়, কিন্তু য়িহুদীরা সে জন্য ইহাকে ঘৃণা করিত । তাহাদের বিশ্বাস ছিল, ঈশ্বরই একমাত্র রাজা এবং প্রভু, মনুষ্যকে রাজস্ব দেওয়া আর তাহাকে প্রভুত্বপদে বরণ করা সমান কথা। ঈশ্বর ব্যতীত কেহ প্রভু নাই, স্বাধীনতা জীবন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বস্তু, এই মতে দীক্ষিত হইয়া উহার করবৃদ্ধির বিরুদ্ধে মহা সংগ্রাম করিত। য়িহুদী সমাজে ধৰ্ম্মনীতিসম্বন্ধে ফিকশী, সদুকী এবং এসেনী নামে যেমন তিনটি দল ছিল, গ্যামেলা নগরবাসী জুডা তেমনি রাজদ্রোহীদিগের নেতা হইয়া একটি সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করে। এই সকল উষ্ণমস্তিষ্ক বিদ্রোহীদিগের দুর্দশা অপ- মান দেখিয়া বোধ হয় যিশু এ মম্বন্ধে অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া থাকি বেন। তিনি অমর স্বর্গরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, সুতরাং এ প্রকার লােকের সঙ্গে তাহার সহানুভূতি হইবার সম্ভাবনা কোথায় ? ড়িনি, ।

ঈশাচরিতামৃত। ৪৫ কহিতেন “যাহা রাজার তাহা রাজাকে দেও, যাহা ঈশ্বরের, তাহা ঈশ্বরকে দেও।” উপরে যেরূপ আলােচিত হইল ইহা দ্বারা বুঝা যাইতেছে গালিল দেশও তৎকালে রাজবিদ্ৰোহানলের চুল্লীস্বরূপ ছিল। কিন্তু মহাবল পরাক্রান্ত অজেয় রােমীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কেহ কিছু করিয়া উঠিতে পারিত না। তাহার বিপক্ষে দণ্ডায়মান হইয়া বিদ্রোহী দল কেবল আপনাদিগকে বিনীশ করিয়া ফেলিত। এইরূপ অবিশ্রান্ত আন্দোলনের জন্যই হউক, কিংবা অন্য কোন কারণেই হউক, রাজপুরুষের য়িহুদী প্রজার উপর তত হস্তক্ষেপ করিতেন না, যতদূর সম্ভব তাহাদিগকে স্বাধীনতা দিতেন। এই জন্য ধর্মসম্বন্ধে উহাদের কিছু অধিক স্বাধীনতা ছিল। এই কারণ বশতঃ ঈশা স্বীয় সঙ্কল্প সাধনে রাজকর্মচারী কর্তৃক কখন কোথাও বাধা পান নাই। গালিল দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন মনােহর এবং রসদ, লােকের স্বভাব প্রকৃতিও তেমনি কবিত্ব প্রধান ছিল। সে দেশের জল বায়ু মৃত্তিকা তরু লতা পশু পক্ষী, পৰ্বত নদ নদী হ্রদ প্রভৃতি যাবতীয় পদার্থ প্রেমিকবর যিশুর চরিত্রসঙ্গঠনের পক্ষে বিধাতা অনুকূল করিয়া দিয়াছিলেন। জুডিয়া রাজ্যের বাহ্য দৃশ্য শােভ ঠিক ইহার বিপরীত। তথাকার লােকদিগের স্বভাবও তদনুরূপ নীরস এবং কবিত্ববিহীন। কিন্তু এই দুই বিভিন্ন প্রকৃ- তির সংঘাঁতে গালিল ও জুডিয়াবাসী য়িহুদিগণ উন্নতির সােপানে আরোহণ করিয়াছে। এইরূপ অবস্থার মধ্যে যিশুর যৌবনকাল অতিবাহিত হয়। সময়ে সময়ে তীর্থযাত্রা উপলক্ষে তিনি বিচিত্র প্রকৃতির লােকসহবাসে অনেক বিষয় শিক্ষা করিতেন। কিন্তু এ সকল বাহিরের অসার জ্ঞানে: তঁাহার স্বগীয় জীবন গঠিত হয় নাই। তিনি ঈশ্বরকে পিতা বলিয়া ডাকিতে শিখিয়াছিলেন, এই শিক্ষাই তঁাহার সকল মহত্ত্বের মূল। সন্তান যেমন অক- পটে পিতার সঙ্গে ব্যবহার করে, সেই ভাবে তিনি..স্বর্গীয় পিতার অনুগত হইয়া চলিতেন। যাহা কিছু দেখিতেন তাহার ভিতরেই সেই সৰ্বব্যাপী পরম পুরুষের আবির্ভাব উপলব্ধি হইত। পরকাল তাঁহার পিতৃভবন এবং ইহকাল স্বর্ণধামের বহিঃপ্রাঙ্গণ স্বরূপ ছিল। ঈশ্বরবিশ্বাস যে পরিমাণে । ও ৫* * = ৪৬ ঈশাচরিতামৃত। জীবন্ত বিশুদ্ধ এবং উন্নত হয় সেই পরিমাণে মানবচরিত্র মহৎ হইয়া উঠে। যিশু ঈশ্বরকে প্রাণ মন জ্ঞান বুদ্ধি বল যথাসর্বস্ব বলিয়া-বিশ্বাস করিতেন। এমনি জীবন্ত বিশ্বাস যে তাহার ভিতরে পিতা পুত্রের প্রভেদ বিলয় হইয়া- ছিল। সেই বিশ্বাসেই তাহার জন্ম, উন্নতি, মৃত্যু ; তাহাতেই তঁাহার জ্ঞান ধর্ম শিক্ষা সমুদয়ই অনুত ছিল। লােকাতীত লােক তিনি, তাহার ভিক্ষাপ্রণালীও লোকচক্ষুর অগোচর, বুদ্ধি বিচারের অগম্য।

জলসংস্কার। * - • এক্ষণে আমরা জর্দন নদীর তটে একবার যাই এবং তথাকার অরণ্যমধ্যে প্রবেশ পূর্বক নরাবর যিশুর জলাভিষেক ক্রিয়া দর্শন করি। মেরীনশন গুপ্ত জীবনের দুর্ভেদ্য অন্ধকাররাশি ভেদ করিয়া মেঘমুক্ত নিদাঘ উপ- নের ন্যায় দেবধি জনের অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। 'জননী সহােদর আত্মীয় বান্ধব সংসারক্ষেত্র পশ্চাতে পড়িয়া রহিল, চিরকোমারব্রতধারী মনুষ্যপুত্র সন্ন্যাসধৰ্ম্মের আশ্রয় লইতে চলিলেন। যুিনি জন্মসন্ন্যাসী, নিত্যসিদ্ধ মহাযােগীলােকশিক্ষার নিমিত্ত তাঁহাকেও গুরুকরণ করিতে হয়, চিরবৈরাগ্যের গৈরিক বসন পরিতে হয়। যে কালে মহামতি জন জলাভিষেক কাধে ব্রতী হন, তাহা যিহুদী সমাজের একটি মহাযুগপ্রলয়ের কাল। তখন দুরাচারী টাইবেরিয়া রাজ্যের অধিপতি, ব্যভিচারী আন্টিস্ গালিলের রাজপ্রতিনিধি, পন্তিয়া পাইলে জুডিয়ার শাসনকর্তা, এনা এবং কায়ফাস্ মহাযাজক। ইহাদের মৃশংস আচরণে এবং অসদৃষ্টান্তে লােকেরা উন্মাদ প্রায় হইয়া উঠে। নানা দুর্ঘটনায় যখন জাতীয় আশা জয়সা একবারে নির্বাণােন্মুখ হইয়াছে, ধৰ্মা যিহুদিগণ প্রতি টনায়, প্রতি মুহূর্তে প্রত্যাশিত মহাপুরুষের জন্য অধৈর্য হইয়া প্রতীক্ষা করিতেছে, পুরাতন বিধানের শেষ পরিচ্ছেদের শেষ পংক্তি সকলে পড়িতেছে, সেই সঙ্কটের কালে এ অভূদিত হইলেন। প্রাচীন ধৰ্ম্মভাবের শিথিলতা প্রযুক্ত লােক সকল তখন ঘােরর নান্তিকের ন্যায় হইয়াছিল। পাপের অত্যাচার সহিতে না পারিয়া এসেনী নামক এক দল লােক সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বন পূর্বক গিরিগুহায় গিয়া বাস করিতে লাগিল। চতুর্দিকের অবস্থা এমনি হইয়া দাঁড়াইল যে ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ না হইলে আর কিছুতেই চলে না। দুঃসহ গ্রীষ্মকাপে সন্তপ্ত হইয়া প্রজাতুল যেমন বিষম ঝটিকা বা বৃষ্টির জন্য প্রতীক্ষা করে, তেমনি এক বাের বিপ্লব আগত ।।।।। ৪৮ ঈশাচরিতামৃত। প্রায় এইরূপ সকলে মনে করিতেছিল। পুরাতন বিধানের শেষ আচার্য্য নববিধানের প্রথম সংবাদদাতা, মহর্ষি জুন এই পরিবর্তনের কারণ। তিনি গৃহাশ্রম পরিত্যাগ করিয়া মরুভূমিস্থিত এক দুর্গম কানন মধ্যে তপস্যার্থ চলিয়া গেলেন, এবং সেখানে গিয়া কিছু কাল কঠোর তপস্যা করিলেন। সেই তপােবন তঁাহার বিদ্যালয় ও ধৰ্ম্মমন্দির ছিল। গিরিকদরের অনাহত, ভেরী, নিঝর স্রোতের কলধ্বনি, তরুপল্লবের স্বন স্বন রব, পশু পক্ষীদিগের ক্রীড়া কুর্দন এবং আনন্দনিনাদ তঁাহাকে উপদেশ দিত। তিনি প্রচলিত মৃতধর্মশাস্ত্র না শিখিয়া ভগবানের মুখবিনিঃসৃত দৈববাণী শ্রবণ করিতেন। এইরূপে শিক্ষিত হইয়া এবং সাধনে সিদ্ধি লাভ করিয়া স্বদেশস্থ লােকদিগকে জলাভিষিক্ত করনার্থ তিনি প্রত্যাদিষ্ট হন এবং তদনুসারে কাৰ্য আরম্ভ করেন। জন বাল্যকাল হইতে কঠোর বৈরাগী ছিলেন। আর্য ঋষি- দিগের ন্যায় তাহার আচরণ ছিল। এসেনী নামক যে সন্ন্যাসী সম্প্র- দায়ের কথা উল্লিখিত হইয়াছে তাহারা জনের জন্মস্থানের পার্শ্বে বাস করিত। রেনা অনুমান করেন, ইহাদিগের এবং জুনের ঋষিভাব অম্মদেশীয় মুনি ঋষিদিগের অনুকরণের ফল। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বাবিল সাইরিয়া পর্যন্ত ধর্মপ্রচারার্থ গিয়াছিলেন। জলসংস্কারক জন এই ঋষি- ভাবের সন্তান। তঁাহার আলুলায়িত সুদীর্ঘ কেশজাল, বিলম্বিত শ্মশ্রু, উষ্ট লােমের অঙ্গাবরণ-এবং কটিতটস দ্ধ চর্মপটুক ভেদ করিয়া বৈরাগ্যের তীব্র জ্যোতি বিনির্গত হইত। বন্য মধু, নিরবারি এবং পঙ্গপাল তঁাহার, ভােজ্য ও পানীয় ছিল। কিন্তু তিনি এসেনী সন্ন্যাসীদিগের ন্যায় স্বার্থপর ঋষি ছিলেন না। জীবগণের হিতের জন্য নির্জন বনে তপস্যা করিতেন। বনচারী সন্ন্যাসী না হইলে ধর্মপ্রচার করা যায় না, এই সংস্কার তৎকালে য়িহুদী জাতির মধ্যেও প্রবল ছিল। প্রসিদ্ধ ভবিষ্যদ্বক্তাগণ সকলেই প্রথমে কিছু দিন পর্বতগহ্বরে বাস করিতেন। জন্য বন হইতে বাহির হইয়া প্রথমতঃ জর্দনের তীরে বেথাবারা নামক স্থানে প্রচার আরম্ভ করিলেন। এই স্থানে লােক সকল নদী পার হইত। বহুদিন পরে আবার জিহােবার প্রিয় উপাসকগণের জন্য বনমধ্যে এই মহা বাক্য উচ্চারিত হইল যে, “স্বর্গরাজ্য নিকটবর্তী, তোমরা অনুতাপ কর ঈশচরিতামৃত। ৪৯ গাবাগ্নির ন্যায় অল্পকাল মধ্যে এই শব্দ প্যালেষ্টাইনের মধ্যে বিস্তৃত হইয়া পড়িল। জুডিয়া ও গালিল, দেশের অধিবাসিগণ দলে দলে তথায় উপনীত হইয়া অভিষেক গ্রহণ করিতে লাগিল। তদীয় জীবন্ত উপদেশ বাণী শ্রবণে এবং তেজঃপুঞ্জ গম্ভীর মুর্তি দর্শনে লােকে বলিত, “জুডিয়ার বনমধ্যে এক জন সাধু আসিয়াছে তাহার উপদেশ জ্বলন্ত আগুণের মত। তাহার কথা শুনিলে এবং জীবন দেখিলে মনে হয় যেন যেন প্রেরিত আইজেয়া কিংবা এলিজা পুনরায় ফিরিয়া আসিয়াছে।” ভবিষ্যদ্বক্তা এলিয়াসের পুনরুত্থানে অনেকের বিশ্বাস ছিল। কিন্তু ফিরুগীরা ইহা না মানিয়া জনুকে অগ্রাহ্য করিত। তিনি পুরােহিত সম্প্রদায়ের নিয়ােজিত নহেন, অথচ ধর্ম প্রচার করিতেছেন এই জন্য উহাদের বিদ্বেষ ছিল। আপনাপন পাপ স্বীকাৰ পূৰ্ব্বক তঁাহার নিকট লোকে অভিষিক্ত হইতে আসিত। তিনি নির্ভয়ে মহা উৎসাহের সহিত ইহা সম্পাদন করিতে লাগি- লেন। বাগ্নির ন্যায় তাহার বাক্য ছিল। ধনী জ্ঞানী রাজা কাহাকেও তিনি ভয় করিতেন না, মুখের সম্মুখে যাহার যে দোষ সব বলিয়া দিতেন। কপটাচারী ফিরুশীদিগের বংশাভিমান ধর্মভ্রষ্টতা দর্শনে উত্তেজিত হইয়া বলিতেন, “তােমরা, এব্রাহেমের বংশ মনে করিয়া অভিমানী হইও না। যে ঈশ্বর মৃত্তিকা হইতে আদমকে উৎপন্ন করিয়াছেন তিনি এই নদী- তীর প্রস্তর খণ্ডকে এস্রাহেমরূপে পরিণত করিতে পারেন।” তাদৃশ মর্মভেদী স্পষ্টবাক্য শ্রবণে গর্বিত ব্যক্তিরা ভীত এবং সঙ্কুচিত হইত। | জনের বাসস্থান যেমন পাষাণময় নীরস মরুভূমি, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আহার পান যেমন কঠিন, উপদেশও তেমনি অন্তর্ভেদী ছিল। কিন্তু সে সমুদায় যে সময়ােপযােগী তাহা কে অস্বীকার করিতে পারে ? পাষাণহৃদয় য়িহুদী- দিগের পক্ষে তখন ঐরূপ বজ্রবাণী, উপদেষ্টা নিতান্ত প্রয়োজন হইয়াছিল। ফিরুশী ও সদুকী সম্প্রদায়ের লােকদিগকে তিনি বলিতে লাগিলেন যে, “হে কালসর্পের বংশগণ ! ঈশ্বরের ক্রোধ হইতে রক্ষা পাইবার জন্য, কে তােমাদিগকে সতর্ক করিল? আইস এখন অনুতাপের উপযুক্ত ফল লইয়া আইস। বৃক্ষের মুলদেশে কুঠারাঘাত হইয়াছে, যে বৃক্ষ উত্তম ফল প্রসব করে না তাহা ভূতলশায়ী এবং অগ্নিসাৎ হইবে। অনুতাপের এ ; ফr ৫০ ঈশাচরিতামৃত। জন্য আমি তােমাদিগকে জলাভিষিক্ত করিতেছি, কিন্তু আমার পরে যিনি আসিতেছেন তিনি আমা অপেক্ষা মহা ক্ষমতাশালী, তাহার পাদুকাবন্ধন খুলিবার যােগ্যও আমি নহি; তিনি তােমাদিগকে পবিত্ৰাত্মা, এবং, অগ্নি দ্বারা অভিষিক্ত করিবেন। তাহার হস্তে যে বিজনী আছে তাহার ব্যজনে শস্যকণিকা শস্যাগারে সংগৃহীত হইবে এবং তুষরাশি প্রজ্বলিত হতাশনে দগ্ধ হইয়া যাইবে। ঈলায়াস নামক প্রাচীন ভবিষ্যদ্বক্তা জনের সম্বন্ধে ধৰ্ম্মপুস্তকে এইরূপ লিখিয়া যান ;-“বনমধ্যে এক জনের শব্দ ঈশ্বরের পথ প্রস্তুত এবং সােজ। করিবে। তখন গিরিগর পুর্ণ হইবে, এবং পৰ্বত সকল গহ্বরে পরিণত হইবে। বন্ধুর ও বক্র পথ সরল এবং সমতল হইবে। প্রত্যেক দেহধারী জীব ঈশ্বরপ্রদর্শিত মােক্ষপথ দেখিবে।” মসি আসিবার পূর্বে এলিয়া স্বর্গ হইতে নামিয়া তাহার জন্য পথ পরিষ্কার করিবেন য়িহদীদিগের এই বিশ্বাস ছিল। এই জন্য ঈশাকে তাহারা মসি বলিয়া স্বীকার করে নাই, কারণ এলিয়াস আসেন নাই। পরিশেষে ঈশার শিষ্যগণ জনকেই এলি- য়াসের অবতার বলিয়া উক্ত সংস্কার খণ্ডন করেন। জন জলাভিষেক ও প্রচার কার্যে ব্রতী হইলে জেরুশলমের ধর্মাধ্যক্ষগণ কয়েক জন পুরােহিতকে প্রতিনিধিস্বরূপ করিয়া তাহার সমীপে প্রেরণ করিল। তাহারা আসিয়া জকে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে? ঈশা না এলিয়া, না অন্য কেহ ?” তিনি বলিলেন, 'আমি তাহাদিগের মধ্যে কেহই নহি। আমি ঈশ্বরের পথ পরিষ্কারের জন্য কেবল এক শ মাত্র।” অনন্তর তাহার সুতীব্র কঠোর উক্তি শ্রবণ করিয়া শ্রোতাগণ বলিতে লাগিল, “তবে আমরা এখন কি করিব ?” জনের ধর্মমত অনেক বিষয়ে ঈশার অনুরূপ উদার ছিল। দুঃখী স্মৃণিত পরিত্যক্ত ব্যক্তিদিগকে তিনি বড় দয়া করিছেন, এ ছােট বড় এক সমান করিতে চাহিতেন। প্রশ্ন শুনিয়া বলিলেন, "যাহার দুইটি অজাবরণ আছে, যাহার কিছু নাই তাহাকে সে একটি দান করুক। যাহার অতিরিক্ত ভােজ্য বস্তু আছে সে তাহা অনাহা- নীকে দিবে।” শ্রোতৃবর্গের মধ্যে অনেক কৱসংগ্রাহক এবং পান্থশালারক্ষক, অভিষিক্ত হইতে আসিয়াছিল। তাহারা জিজ্ঞাসা করিল, “আমরা কি ঈশাচরিতামৃত। কবি?” জন বলিলেন, “তোমরা অন্যায্য কর বা মূল্য সংগ্রহ করিও না।” রােমীয় সৈনিক পুরুষদিগকে বলিলেন, “তােমরা কোন লােকের উপর অত্যাচার করিও না, এবং কাহারাে নামে মিথ্যা অভিযােগ করিও না। আপনার প্রাপ্য বেতনে সন্তুষ্ট থাকিবে।” জনের উপদেশ শুনিবার এ রুমে বহুলােকের সমাগম হইতে লাগিল। এইরূপে জন্ যখন নূতনবিধ উপদেশ দ্বারা জুডিয়া এবং গালিল, দেশকে জাগ্ৰৎ করিয়া তুলিলেন, দলে দলে চারি দিক হইতে লোক আসিয়া তাহার নিকট অভিষেক গ্রহণ করিতে লাগিল, সেই সময় এক দিনমহাত্মা যিশু তাহার মধ্যে এক জন সামান্য লোকের ন্যায় উপস্থিত হইলেন। আগ্নেয় গিরি যেমন সময়ে সময়ে প্রচ্ছন্ন অগ্নিরাশি গর্ভে লইয়া শান্ত ভাবে অবস্থিতি করে, ব্ৰহ্মপুত্ৰ যিশুর অবস্থা এক্ষণে সেইরূপ। শত শত ধীবর চণ্ডাল দীন দুঃখী সেখানে গিয়াছে, তন্মধ্যে তিনিও এক জন অজ্ঞাত অপরিচিত শ্রমজীবী মনুষ্যরূপ ধারণ করিয়া দাঁড়াইলেন। যদিও তিনি স্বয়ং বেদ- বিধির অতীত, কিন্তু জাতীয় কোন কোন ধৰ্ম্মানুষ্ঠানে তাহার আস্থা ছিল। উন্নত আত্মা ধর্মসংস্কারকেরা মহাজনপ্রতিষ্ঠিত কোন প্রাচীন নিয়ম বা সদাচার ধ্বংস করেন না, বরং তাহার দোষ সংশােধন এবং অভাব পূর্ণ করিয়া দেন। কেন না জাতীয় সংস্কারের জন্য যেমন নূতনবিং, সদ ষ্ঠান এবং অভূতপূর্ব শাস্ত্রের প্রয়ােজন, তেমনি দেশের প্রচলিত কাৰ্য প্রণালী ও পৌরাণিক ধৰ্ম্মেরও প্রয়ােজনীয়তা আছে। নূতন এবং পুরাতন উভয় বিধ উপাদানের সমবায়ে মানবজাতির ভাবী ধৰ্ম্মমন্দির নির্মিত হয়। এই জন্য নবধর্মপ্রবর্তকেরা অভিনব মত ও অনুষ্ঠানেরও সৃষ্টি করেন, আবার তৎসঙ্গে প্রাচীন পদ্ধতির জীর্ণ অস্থিতে নবজীবন আনিয়া দেন। উভয়ের সম্মিলনে এক নূতন রাজ্য উৎপন্ন হয়। কেশব ভারতী যেমন সন্ন্যাস গ্রহণখী শ্রীগৌরাঙ্গের অনুপম রূপলাবণ্য, প্রেমমাস্মতায় মােহিত হইয়াছি লেন, মহর্ষি জ তেমনি যিশুর প্রস্ফুটোম্মুখ জীবনপ্রভা দর্শনে সহসা বলিয়া উঠেন যে, “ঐ দেখ ! স্বগীয় মেষশিশু আসিতেছেন।” জলসংস্কার প্রথা য়িহুদীধৰ্ম্মের একটি প্রাচীন রীতি বটে, কিন্তু জলে অবগাহন করিলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় এ প্রকার কোন বিধি পুৰ্বে চলিত ৯।

ঈশাচরিতামৃত। ছিল না, জন ইহা প্রবর্তিত করেন। এসেনী সম্প্রদায়ও এ প্রথার অনুস রণ করিত। জনের আচার ব্যবহার এবং দুশ্চর বৈরাগ্যব্রতের কথা শুনিলে মনে হয় যেন তিনি জটাজুটধারী এক জন বৃদ্ধ মহর্ষি। কিন্তু বস্তুতঃ তাহা নহে, তিনি ঈশার সমবয়স্ক যুবা পুরুষ ছিলেন। ধর্মভাব, প্রচারপ্রণালী, তপেনিষ্ঠা এবং বৈরাগ্যবিষয়ে উভয়ের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য দৃষ্ট হয়। জনের কতিপয় শিষ্যও উপসনাদি কঠোর ব্ৰতাচারে গুরুর গুরুর সমভাবী ছিল, তাহারা বনে তপস্যা করিত। প্রত্যাশিত প্রেরিত পুরুষ শীঘ্র আসি- তেছেন এই বিশ্বাসানুসারে জন্ জলসংস্কারে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি স্বাধীন ভাবে এই কাৰ্য করিতেন তজ্জন্য ফিরুশী ও পুরােহিত সম্প্রদায় তাহার শত্রু হইয়া উঠে। কিন্তু সাধারণ শ্রেণীর বহু লােক তাহার পক্ষে ছিল বলিয়া তাহার কিছু করিতে পারে নাই। গ্রামে নগরে যেখানে সেখানে জিনের জনের মহিমার কথা শুনিয়া এবং তাহার বাক্য ও ব্যবহারে আপনার প্রতিচ্ছায়া দেখিয়া যিশু জর্দনের তীরে উপনীত হন। দেবাত্মজ যিশু অভিষেক গ্ৰহণার্থী হইলে জন্য প্রথমতঃ তাহাতে অস- স্মত হইয়া বলিলেন, “আমি কোথা তােমা দ্বারা অভিষিক্ত হইব, না তুমি আসিয়াছ আমার নিকট অভিষিক্ত হইতে!” যিশু তাহার এই উত্তর করিলেন যে, “এখন এইরূপ হইতে দাও, কারণ আমাদের উচিত যে, আমরা সমস্ত ধৰ্ম্মনিয়ম পালন করি।” অনন্তর জনের সম্মতিক্রমে তিনি নদীগর্ভে অবতরণ করলেন। অবগাহনান্তে যখন সেই অমিততেজা মহা- পুরুষ উঠিয়া আসিলেন, তখন তাহার মুখমণ্ডল অনির্বচনীয় পুণ্যকিরণে প্রদীপ্ত হইল। বৈরাগ্যের নবীন সৌন্দর্যে ভূষিত হইয়া তিনি যেন চারি- দিকে পবিত্র জ্যোতি বিভাসিত করিতে লাগিলেন। বিমল প্রতিভা তাহাতে ধৰ্ম্মের নব উদ্যম, বােধ হইতে লাগিল যেন ভগবান্ স্বয়ং পুত্ররূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তঁাহার সেই সলিলসিক্ত বিশালবক্ষস্থল সমুন্নত দিব্যতম্ভ এবং শিরোদেশে লম্বিত সুদীর্ঘ কেশজাল দর্শকবৃন্দের চিত্তকে বিমােহিত করিতেছিল। কিন্তু তখন কে জানিত যে এই প্রেমিক সন্ন্যাসীর সুকোমল দৃষ্টি ভগ্ন হৃদয় পাপাত্মাদিগের মৃত প্রাণে অমৃত সঞ্চার করিবে ? তাহার নবজীবনের সেই প্রচণ্ড প্রভাব এক দিন একে যৌবনের ঈশাচরিতামৃত। জগতের কলুষরাশিকে দগ্ধ করিবে তাহাই বা কে, ভাবিয়াছিল? আর আর সকলে গিয়াছে অভিষিক্ত হইয়া, পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিয়া আপনাপন ঘরে ফিরিয়া আসিবে, পূৰ্ব্বে যেমন ছিল আবার তেমনি ভাবে কাল কৰ্ত্তন করিবে, কিন্তু যিশুর অভিপ্রায় অন্য প্রকার। প্রতিবাসী সঙ্গীরা যদি জানিত যে এ থুবা চিরজীনের মত সংসার ছাড়িল, আপনাকে ধৰ্মার্থ বলি দিবার জন্য অবগাহন করিল, তাহা হইলে হয়তো সকলে কঁদিয়া উঠিত। অথবা যাহার আসন্ন মৃত্যুতেও কেহ কঁদিবার ছিল না, তাহার সন্ন্যাস দর্শনে আর কে কাঁদিবে ? এ সকল অপূৰ্ব্ব ঘটনা স্মরণ করিয়া ভবিষ্যদ্বংশ অশ্রুপাত করিয়াছে এবং করিবে। যাহউক, এক্ষণে নরকুলের কলঙ্করাশি ধৌত করিবার জন্য যিনি শোণিত দান করিবেন সেই পবিত্র মেষশিশু স্নান করিয়া উঠিলেন। দুঃখের সন্তান, পাপীর বন্ধু যিশুর জলাভিষেক হইল, স্বর্গদ্বার খুলিয়া গেল, পবিত্ৰাত্মা শুভ্রকান্তি, কপােতের ন্যায় তাহার উপরে আসিয়া বসিলেন। তখন অন্তরীক্ষে এই দৈববাণী হইল, “ইনি আমার প্রিয় পুত্র, ইহাতে আমার পরম সন্তোষ।” * # , * * * * সেন্ট জনের গ্রন্থানুসারে যিশু জলসংস্কারক জনের নিকট তিনবার যান। প্রথম দিনে তাহাকে দেখিবামাত্ৰ জন বলিলেন, “ঐ দেখ ! ঈশ্বরের মেষ- শিশু পৃথিবীয় পাপহরণ জন্য আসিতেছেন। ইনি সেই, যার কথা আমি ইতিপূর্বে উল্লেখ করিয়াছি।” ঠিক তাহার পর দিনে আঙু, এবং সেন্ট জন ঐ স্থানে তাহার শিষ্যত্ব স্বীকার করেন। অনন্তর জন্য বৎ কালে জুডিয়ার মধ্যে এন নামক স্থানে অভিষেক কার্যে প্রবৃত্ত থাকেন, তখন যিশুও উহার নিকটবর্তী কোন স্থানে শিষ্যসহ ঐ কার্যে নিযুক্ত হন। অন্য তিন গ্রন্থে আছে জন কারারুদ্ধ হইলে যিশু প্রচার কার্যে ব্রতী হন। কিন্তু সেন্ট জনের লেখায় প্রকাশ যে প্রচার কার্যে ব্ৰতী হইয়া উভয়ে পরস্পর আর একবার দেখা করেন। শেষোক্ত স্থানে যিশুর নিকট বহুলােকে অভিষিক্ত • হইতে লাগিল দেখিয়া জনের শিষ্যগণ ঈর্ষাবশতঃ স্বীয় আচাৰ্য্যকে একলা জিজ্ঞাসা করে যে, “পণ্ডিত মহাশয় ! আপনার সঙ্গে যিনি জর্দনে সাক্ষাৎ বন প্রস্থান এবং প্রলােভন জয়। . - অভিষেকের পর যােগিবর যিশু এক বিষম পরীক্ষার মধ্যে নিপতিত হন। জর্দনের তীরে তিনি যেরূপ লােকসমারােহ দেখিলেন, তাহাতে মনে হইল পৃথিবী যেন পাপভারে আক্রান্ত হইয়া তঁাহার সমীপে কাতর স্বরে রোদন করিতেছে। অভিষেক গ্ৰহণার্থী মানবগণের জনতা এবং আগ্রহ ব্যাকুলতা করেন, এবং আপনি যাহার বিষয়ে সাক্ষ্য দেন, তিনি জলাভিষেক কার্যে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, বহুলােক তঁাহার কাছে যাইতেছে।” অন্ বলিলেন, “স্বর্গ হইতে না আসিলে কোন মনুষ্য কিছু পাইতে পারে না। আমি খ্ৰীষ্ট নহি তাহাত তােমরা জান ? তাহার উন্নতি হইবে আমার হ্রাস হইবে ** যিনি উপর হইতে আসিয়াছেন তিনি সর্বোপরি । যে পৃথিবীর সে পার্থিব এবং সে পৃথিবীর কথা বলে। তিনি যাহা দর্শন এবং শ্রবণ করিয়াছেন তাহারি প্রমাণ দিতেছেন। ** পিতা পুত্রকে ভাল বাসেন এবং তাহার হস্তে সকল ভার অর্পণ করিয়াছেন। তাহাকে বিশ্বাস করিলে অনন্তজীবন লাভ হয়।” যদিও জন্য পুরাতন বিধানের লােক, কিন্তু তিনি যিশুর স্বর্গীয় মহত্ত্ব বুঝিয়া তাহার প্রতি অবনত্য স্বীকার করিয়াছিলেন। ফলতঃ মতভেদ ও কার্যের তারতম্য সত্বেও ইহারা দুই জন দুই জনকে শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন। পরবর্তী ধর্মনেতার সম্বন্ধে অগ্রবর্তীর এরূপ উদার সদ্ভাব বিরল দৃশ্য সন্দেহ নাই। উভয়ে এক সময়ে জীবিত থাকিলে প্রায় দেখা যায়, নববিধানপ্রবর্তক যেমন পুরাতন বিধানপ্রবর্তককে প্রীতি ভক্তি করেন, শেষােক্ত প্রথমোক্তকে সেরূপ কয়েন না, কিন্তু জনের সে ভাব ছিল । যিশু বলিতেন বটে যে, “স্বর্গরাজ্যের সামান্য ব্যক্তিরাও জনের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ” কিন্তু তিনি প্রাচীন’মহানদিগের মধ্যে জনকে সর্বোচ্চ আসন দিয়াছিলেন।

ঈশাচরিতামৃত। দর্শনে তাহার হৃদয়সিন্ধু একবারে উথলিয়া উঠিয়াছিল। জলাভিষেক গ্রহণ তাহার পক্ষে সামান্য নিয়ম পালন নহে, উহা নবজীবনের প্রারম্ভ। এক দিকে জীবনের মহৎ কাৰ্যভার, স্বর্গের আদেশবাণী, অপর দিকে আন্তরিক গতির বিভিন্ন প্রকার উচ্ছাস ও বাহিরের প্রতিবন্ধক রাশি ইহারি সন্ধিস্থলে তিনি দণ্ডায়মান হইলেন। ভবিষ্যতে কি প্রণালীতে কাৰ্য্য করি- বেন, অদিতি মহােচ্চ আদর্শ কিরূপে কার্যে পরিণত হইবে, দেশপ্রচলিত জাতিসাধারণের প্রাচীন নীতিপদ্ধতি কত দূর রক্ষা করা উচিত, এবং অভিনব মত অনুষ্ঠান প্রবর্তিত করিবার পক্ষে কি কি উপায় অবলম্বনীয় এক্ষণে সেই সমস্ত বিষয় মীমাংসার সময়। মহাপুরুষেরা ধৰ্ম্মরাজ্য স্থাপনের জন্য যখন প্রকাশ্যরূপে সাধারসমক্ষে দণ্ডায়মান হন তৎ কালে তাহাদিগের মনের মধ্যে এক ভীষণ সমরানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠে। এক দিকে বলিতে গেলে সমস্ত পৃথিবী, অপর দিকে এক জন বিশ্বাসী বীরপুরুষ। এ সময় যে কেবল বাহিরের অবস্থাই প্রতিকুলতা করে তাহা নহে, অন্তরের রিপু ও বাসনা সকলও নিজ নিজ স্বত্ব রক্ষাৰ্থ শেষসংগ্রামে প্রবৃত্ত হয়। কেননা যে স্বর্গ- রাজ্য বাহিরে প্রতিষ্ঠিত হইবে তাহার বিজয়পতাকা অগ্রে আপনার হৃদয়- রাজ্যে উডডী হওয়া চাই, ভবিষ্যজীবনের নিয়তি স্থিরীকৃত হওয়া চাই। এই আন্তরিক সংগ্রাম অতি ভয়ঙ্কর পরীক্ষার ব্যাপার। মহাবীর শাক্যসিংহ ইহার হস্তে পতিত হইয়াছিলেন। শত্রুপক্ষ যখন জয়লাভে হতাশ্বাস হইয়া প্রাণপণে সংগ্রাম করে, তখন অপর পক্ষের যেরূপ বীরত্বের প্রয়ােজন, পাপ- বিজয়ী দেবাত্মারা সেইরূপ অসাধারণ পরাক্রমের সহিত ধৰ্ম্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্মপুস্তকে যে লিখিত আছে স্বর্গ খুলিয়া গেল, পবিত্ৰাত্মা কপােতের বেশে অবতীর্ণ হইলেন, ইহার তাৎপর্য এই যে, যিশু আপনার ভিতরে ব্রহ্মযােগের মহাশক্তি এবং জীবন্ত জ্যোতি অনুভব করিলেন; এবং সেই ভাবে নীত হইয়া তিনি একাকী এক দুর্গম মরুভূমিপরিবেষ্টিত পার্বত্য এদেশে চলিয়া গেলেন। কর্মক্ষেত্রে অবতরণ করিবার পূর্বে তাহাকে কয়েক দিন অবিশ্রান্ত প্রার্থনা এবং নির্জন সাধনে নিযুক্ত থাকিতে হইয়াছিল। এই মানসিক সংগ্রামকে খ্রীষ্টবাদিগণ একটি বাহ্যিক আকার প্রদান করি- আছেন। তাহাদের মতে সৃষ্টির প্রথমে পাপপুরুষ সয়তা যেমন আদমকে ঈশাচরিতামৃত। প্রলােভনে ফেলিয়া স্বর্গচ্যুত করিয়াছিল, তেমনি সে ঈশাকেও বিপথ গামী করিতে চেষ্টা করে; কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারে নাই। প্রথম আদম সয়তা কর্তৃক পরাভূত হইয়া মনুষ্যবংশের মধ্যে পাপস্রোত প্রবাহিত করিল, দ্বিতীয় আদম শয়তানকে দূর করিয়া দিয়া জীবের সহিত ব্রহ্মের পুনৰ্ম্মিলন স্থাপন করিলেন। ঈশাকে দ্বিতীয় আদিম বলে, কারণ তঁাহার আগমনে, মনুষ্যত্বের গৌরব রক্ষিত হইয়াছে। মানসিক অদৃশ্য ভাবনিচয় লিপিবদ্ধ হইবার কালে দৃশ্যমান আকার ধারণ করে ইহা কিছু নূতন নহে। বিশেষ পুরাকালের লােকেরা সর্বত্রই কবিত্বপ্রধান এবং রূপক বর্ণনার পক্ষপাতী ছিল। কিন্তু ইহার অন্তভূত প্রকৃত পদার্থ দ্বারা বিলুপ্ত হয় না, বরং আরাে স্পর্শনীয় হয়। কোন কবিত্বই শূন্যগর্ভ নহে। তাহার মধ্যে যেমন অত্যুক্তি অবাস্তবিকতা থাকে, তেমনি প্রকৃত সত্যও আবার অনেক পাওয়া যায়। কল্পনার বিচিত্র বর্ণে সত্যের ছবি চিত্রিত করাই প্রকৃত কবিত্বের উদ্দেশ্য। ঈশার যে তিনটি প্রলােভনের কথা উল্লেখ আছে তাহা মানসিক সংগ্রামের প্রকাশ ভিন্ন আর কিছুই নহে। য়িহুদীধৰ্ম্মপ্রবর্তকগণের স্বভাব ও লক্ষণ, তাহাদের গৌরব ও বিপদের কথা যাহা সাধারণ্যে তখন প্রচলিত ছিল তাহার সহিত উক্ত প্রলোভনয়ের বিলক্ষণ উপযােগিতা দৃষ্ট পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব মহাজনেরা যেরূপ পৰ্বতে অরণ্যে কিছু দিন তপস্যা করিয়া স্বকাৰ্য্য সাধনে প্রবৃত্ত হইতেন, যিশুও সেই প্রথার অনুসরণ করিলেন। কথিত আছে তিনি চল্লিশ দিবস অনাহারে হিংস্র জগণের সহবাসে অব স্থিতি করেন। বস্তুতঃ অভিষেকান্তে তিনি যে দুর্গম প্রদেশে চলিয়া যান তৎকালে তা ভূত প্রেতের আবাস স্থান বলিয়া লােকের বিশ্বাস ছিল। একবারে নিরস্তু উপবাস করুন বা না করুন,তাহা করিবার প্রয়ােজনই বা কি ? কিন্তু ঐ সময়ে যে তিনি অবিশ্রান্ত প্রার্থনা সাধনায় আত্মােৎসর্গ করিয়াছিলেন তাহা স্বাভাবিক এবং ঐতিহাসিক। ঘোরতর পরীক্ষার মধ্যে পড়িয়া তাহার চিত্ত আন্দোলিত হইয়াছিল। ইহাকেই দেবাসুরের সংগ্রাম বলা যায়। মানবের স্বর্ণমুখগতি এবং পার্থিব প্রকৃতি পরস্পরের অধিকার স্থাপনের জন্য এই সময় মহা বিবাদ করে। পাপপুরুষ বলিল, = 4 s ।

ঈশাচরিতামৃত। তুমি যদি ঈশ্বরের পুত্র হও, তবে এমন অনুজ্ঞা কর যাহাতে এই সকল প্রস্তরখণ্ড রুটী হইয়া যায়।” যিশুর দেবম্বভাব তাহার এই উত্তর করিল, “লিখিত আছে, মনুষ্য কেবল রােটিকা দ্বারা জীবন ধারণ করে না, কিন্তু ব্ৰহ্মমুখবিনিঃসৃত প্রত্যেক শব্দ দ্বারা সে জীবিত থাকে। নিয়মিত পান ভােজন পরিত্যাগপূৰ্ব্বক ক্রমান্বয়ে পাঁচ ছয় সপ্তাহ কাল যখন তিনি একাকী বনমধ্যে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন, তখন দৈহিক প্রকৃতি আপ- নার ক্ষতিপূরণের জন্য উৎপীড়ন আরম্ভ করিল। সুতরাং শরীর দুর্বল হইল, জঠরাগ্নি জ্বলিয়া উঠিল। ধৰ্মাত্মাদিগের যত প্রকার পরীক্ষা আছে তন্মধ্যে শারীরিক রােগযন্ত্রণা একটি অতিশয় গুরুতর। যত ক্ষণ পর্যন্ত উৎসাহ ব্যাকুলতায় চিত্ত উত্তেজিত থাকে, তত ক্ষণ দৈহিক অভাবে বড় কিছু করিতে পারে না। ; কিন্তু মত্ততার অবসানে উহা চতুগুণ বলের সহিত স্বীয় প্রভাব বিস্তার করে। যিশু অবিকল এইরূপ অবস্থায় পড়িয়া- ছিলেন। কিন্তু ক্ষুধারূপধারী পাপপুরুষ তাহাকে বিচলম্পন্ন করিতে পারিল। । ক্ষুধায় সচরাচর শরীর দুর্বল হয় বলিয়া যে ঈশার সম্বন্ধে ইহা একটি পরীক্ষার বিষয় হইয়াছিল তাহা নহে, ইহার ভিতর আরাে কিছু তাৎপৰ্য আছে। য়িহুদীকুলসত পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব মহাত্মার অনেক অলৌকিক নিয়মে প্রাণ ধারণ করিতেন। সাধারণের ন্যায় তঁাহাদের অাহার পানের ব্যবস্থা ছিল না। মুসার জন্য স্বর্গ হইতে অন্ন বর্ষিত হইত, তঁাহার হস্ত স্থিত লৌহদণ্ডের আঘাতে শৈলবক্ষ হইতে জল বাহির হইয়া ইস্রায়েল- দিগের পিপাসা নিবারণ করিত, প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রের এ সকল কথা ঈশা অবশ্য পড়িয়াছিলেন। তিনি নিজেও এক জন সেই শ্রেণীর প্রেরিত মহা- জন, সুতরাং এ প্রকার ভাব তঁাহার মনে উদয় হওয়া অসম্ভব নহে যে তাহার পান ভোজনের ব্যবস্থা পূর্বোক্ত নিয়মে সাধিত হইবে। যাহা হউক, শেষ ক্ষুধারূপী সয়তান ঈশ্বরপুত্রের নিকট পরাভূত হইল। প্রথম সমরে পরাজিত হইয়া সেই পাপপুরুষ অন্য আর এক রূপ ধারণ- পূৰ্ব্বক যিশুকে প্রলোভন দেখাইতে লাগিল। পার্থিব সুখ কল্পনার মহোচ্চ আকাশে তাহাকে তুলিয়া লইয়া পরে জেরুশালমের মন্দিরের শিখরদেশে স্থাপন করত বলিতে লাগিল, “যদি তুমি ঈশ্বরের পুত্র হও, তবে আপ- ঈশাচরিতামৃত। fr নাকে ধরানিপাতিত কর। কেন না, এইরূপ লিখিত আছে যে, তিনি তাহার দূতগণের হন্তে তােমার ভার অর্পণ করিবেন। পাছে প্রস্তুরাঘাতে তােমার পদ ভগ্ন হইয়া যায় এই জন্য তাহারা তােমাকে শূন্যে শূন্যে অমনি ধরিয়া ফেলিবে।” যিশু উত্তর করিলেন, “ইহাও লিখিত আছে যে তুমি তোমার প্রভু পরমেশ্বরকে পরীক্ষা করিও না।” য়িহুদী জাতির মধ্যে নৈসর্গিক নিয়মবিরুদ্ধ অলৌকিক ক্রিয়ার যেরূপ অন্ধবিশ্বাস প্রচলিত ছিল তাহা আমরা বারবার উল্লেখ করিয়াছি। এই অলৌকিক দৈবক্রিয়ার, অপব্যবহার যিশুর পক্ষে একটী মহা পরীক্ষার বিষয় হইয়া উঠে। কিন্তু যিনি ঈশ্বরের বাধ্যত্র তিনি কেন চিরপ্রতিষ্ঠিত নৈসর্গিক নিয়মের বিরুদ্ধে পিতৃস্নেহ অন্বেষণ করিতে যাইবেন ? সৰ্ব্বদাই তিনি নিজ জীবনে, ভাবের রাজ্যে, আত্মার জগতে অলৌকিক ক্রিয়া দেখিতেন এবং আপাত- দৃশ্য ক্ষণধ্বংসী ঘটনার ভিতরেও ঐশিক ইচ্ছার পূর্ণতা দর্শন করিতেন। যাহা প্রত্যক্ষরূপে বাহ্যচক্ষুর সম্মুখে ঘটিতেছে সে দিকে তঁাহার দৃষ্টি ছিল , ভবিষ্যতে যাহা ঘটিবে তংপ্রতি তিনি বিশ্বাস রাখিয়া কথা বলিতেন। অল্পদশী সাধারণের নিকট অবশ্য তাহা উন্মাদের প্রলাপবাক্য, স্থূলবুদ্ধি বিজ্ঞানী পণ্ডিতের মতে তাহা শাস্ত্রবিরুদ্ধ, কিন্তু ভবিষ্যতে যখন তাহার অর্থ প্রকাশ হয়। তখন মহতের দুরবগাহ মহত্ত্ব সকলে বুঝিতে পারে। যিশু সতত সেই ভাবরাজ্যের উচ্চ আকাশে বিচরণ করিতেন। ঈশ্বর অদ্ভুত কৰ্ম্মা ইহা বলিয়া যে তিনি আপনাকে আপনি প্রতিবাদ করিবেন এবং সেই প্রতিবাদক্রিয়া সাধুর মহত্ত্বের প্রমাণস্বরূপ হইবে, এ কথা অবিশ্বাসী মনে করিতে পারে, কিন্তু যিশুর পবিত্র আত্মা তাহা পারে না। ঈশ্বর সৰ্বশক্তিমান্, তঁাহার যাহা ইচ্ছা তিনি তাহাই করিতে সক্ষম, এই মনে করিয়া কি বিশ্বাসী ভক্ত তঁাহাকে বলিবে আমার সম্বন্ধে তােমার মঙ্গলময় অভান্ত নিয়মের ব্যভিচার হউক ? তিনি জানেন এবং দেখেন, বিধাতার অখণ্ড ব্যবস্থার মধ্যদিয়াই অলৌকিক কার্য সম্পন্ন হয়। সুতরাং অবিদ্যা নন্দন এ বিষয়েও ব্ৰহ্মতনয়ের নিকট বিফলষত্ন হইল। যিশু এক্ষণে যে উন্নত পদবীতে আরােহণ করিলেন, তাহার পার্থিব প্রলোভনও যথেষ্ট। পুৰ্ব্ব পুর্ব সময়ে তাহার মত উচ্চ শ্রেণীর লােকেরা ঈশাচরিতামৃত প্রজাপুঞ্জের মনে রাজবিদ্রোহানল প্রজ্বলিত করিয়া কিংবা সাধারণ জন- সমাজকে আত্মবশে রাখিয়া ধনৈশ্বৰ্য পদগৌরব, খ্যাতি প্রতিপত্তি লাভের জন্য যেরূপ ব্যাকুল ছিল তাহা সকলেই অবগত আছেন। এই সময়ে যে প্রেরিত মহাপুরুষের অবতীর্ণ হইবার কথা ছিল, তিনি আসিয়া ইস্রায়েল বংশকে উদ্ধার করিবেন, এবং তাহার অাগমনে পৃথিবীর রাজা- দিগের অত্যাচার দূর হইবে, স্বর্গরাজ্য আসিবে, এইরূপ সকলে আশা করিত। যিশুর সম্বন্ধে এ সমস্তই সংলগ্ন হয়; কারণ যিনি ভবিষ্যদ্বক্তা মহাজন, তিনিই রাজা এবং প্রজাকুলের পরিচালক, এ বিশ্বা, য়িহু দীদিগের শােণিতের সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছিল। ধৰ্ম্মবীর যিশু যেরূপ মহচ্চরিত্রের অসাধারণ লোক তাহাতে তিনি ইচ্ছা করিলে অতি সহজে স্বজাতির নেতা হইয়া রাজকীয় ক্ষমতা এবং প্রভুত্ব বিস্তার করিতে পারিতেন। সম্বন্ধে তাহার জীবন, সাময়িক অবস্থা, প্রাচীন ধৰ্ম্মপুস্তকের উক্তি, জাতীয় বিশ্বাস ও আশা সংস্কার, সমুদয় গুলিই অনুকূল ছিল। এই কারণে ইহা একটী পরীক্ষার মধ্যে গণ্য হইয়াছে। তৃতীয় বার সেই পাপপুরুষ তাহাকে এক উচ্চ পৰ্ব্বতের উপর স্থাপন করিয়া বলিতে লাগিল, “চতুর্দিকে এই সমস্ত রাজ্য ঐশ্বর্য যাহা দেখিতেছ, যদি ভূমিষ্ঠ হইয়া তুমি আমাকে উপাসনা কর তাহা হইলে ইহা আমি তােমাকে, দিব।” তখন যিশু এই মহাবাক্য উচ্চারণ করিলেন, “দূর হও সয়তান! ইহা লিখিত আছে যে তুমি তােমার প্রভু পরমেশ্বরকে উপাসনা করিলে, এবং কেবল তঁাহারি সেবায় নিযুক্ত থাকিবে।” এই অগ্নিময় বীরবাক্য শ্রবণ করিয়া পাপপুরুষ তাহাকে কিছু কালের জন্য ছাড়িয়া চলিয়া গেল। কু আশা এবং নীচকামনার সঙ্গে চার তর্ক না করিয়া তিনি একেবারে হুঙ্কার করিয়া বলিলেন, “দূর হও সয়তান! আমার পশ্চাতে চলিয়া যাও।” পাপ প্রলােভন জয় করিবার এই এক অব্যর্থ মহামন্ত্র তিনি পৃথিবীকে দিয়া গিয়াছেন। ঈশার পবিত্র জীবন স্মরণ পূর্বক এখনও কেহ যদি এই সিদ্ধমন্ত্র উচ্চারণ করে, পাপপুরুষের প্ররোচন বাক্যের আর কোন • উত্তর না দেয়, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ পাপপিশাচ তাহার নিকট হইতে .চলিয়া যায়। য়িহুদী ধৰ্ম্মের শাস্ত্রীয়বচন যেমন এক দিকে হাকে ; ঈশাচরিতামৃত । প্রলোভনে ফেলিয়াছিল, তেমনি তাহা হইতে উদ্ধার পাইবার উপায়ও সে বলিয়া দিয়াছিল। এখানে আমরা এই আশ্চর্য্য দেখি যে, সয়তানও শাস্ত্রীয় প্রমাণ দ্বারা মনুষ্যকে নরকগামী করিতে চেষ্টা করে। তাহার নানা প্রকার রূপ এবং বিবিধ পরিচ্ছদ আছে ; ধৰ্ম্মও তাহার এক সম্মোহিনী মূর্তি। যিশু প্রাচীন শাস্ত্রের যে কয়টি বচন শুনাইয়া সয়তানকে পরাস্ত করিলেন তাহা অতীব সারগর্ভ এবং জীবন্ত। তাহার অন্তঃকরণে যেমন রণে মত্ত পরস্পর দুইটি বিরোধী সৈন্যদল ছিল, বাহিরে তেমনি উভয়ের উপযােগী যুদ্ধাস্ত্রও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু দেবতার পক্ষে ভগবান্ চিরদিনই সহায়। সুতরাং তিনি যে পক্ষের সহায় তাহার আর বিনাশের সম্ভাবনা কোথা ? প্রভু আপনার ভক্তের অঙ্গে বৰ্ম্মস্বরূপ হইয়া রহিলেন, সকল বিপদ বিঘ্ন কাটিয়া গেল, জগতে হরিলীলার তরঙ্গ উঠিল। ভক্তরাজ যিশু ধৰ্ম্ম- সংগ্রামে জয়ী হইয়া প্রচণ্ড তপনের ন্যায় সংসার-অন্ধকার-মধ্যে প্রবেশ করিলেন। পাপপুরুষ সদলে প্রস্থান করিল, স্বর্গে দেবলােকে দুন্দুভিধ্বনি হইল, ব্ৰহ্মদূতগণ তাহাকে দেবভােগ্য ভােজ্য ও পানীয় দ্বারা শুশ্রুষা করিতে লাগিল। অনন্তর ধর্মরাজ বিশ্ব পতির উত্তরাধিকারী পুত্র যুবরাজ যিশু রাজ্যাভিষিক্ত হইয়া দিব্য রাজসিংহাসনে উপবেশন করিলেন। ৫ প্রচার আরম্ভ। ত্রিশ বর্ষ বয়ঃক্রমে যিশু স্বর্গের শুভ বিধান ঘােষণায় প্রবৃত্ত হন। তিনি জুডিয়ার অরণ্যভূমি পরিত্যাগপূৰ্ব্বক দাবানলের ন্যায় গালিল, দেশের জনপদে প্রবেশ করিবেন; নবভাবে, নববাৎসাহে অশ্রুতপূর্ব নববিধান লইয়া পাপে হত মানগণের সেবার্থ নিযুক্ত হইলেন। তখন মহর্ষি জনৃ হেরােদ আন্টিপাস্ কর্তৃক কারাবদ্ধ হইয়াছেন। প্লিহুদী ধর্মসংস্কারগণের পরিণাম যেরূপ শোকাবহ, জনের ভাগ্যেও তাহা ঘটিয়াছিল। বহুলােক তঁাহার অনুবর্তী হইয়াছে দেখিয়া দেশাধিপতি হেরােদ সন্দেহ করিতে লাগিল,জন্য একজন রাজদ্রোহী সমাজবিপ্লাবক। এই সন্দেহে সে ভঁহাকে কারারুদ্ধ করিয়া রাখে। জন্য বন্দীভূত হইলেন, তৎসঙ্গে প্রাচীন বিধানের কাৰ্য্য নিঃশেষিত হইয়া গেল। তিনি জাতীয় ধর্মের শেষ সংস্কারক হইয়া আসিয়াছিলেন, স্বকাৰ্য্য সাধন করিয়া রঙ্গভূমি পরিত্যাগ করিলেন। তদনন্তর নূতন যুগধর্মের । মঙ্গল বাদ্য বাজিল, নব বেশ পরিধান করিয়া নবীন সন্ন্যাসী যিশু নাট্য; মন্দিরে দর্শন দিলেন। প্রথমে তিনি ইস্রায়েল, বংশের মধ্যে স্বর্গরাজ্য স্থাপনার্থ কৃতসংকল্প হন। সামান্য এক ক্ষুদ্র বীজে কত বড় বৃহৎ বৃক্ষ সমুপন্ন হয় তাহা আমরা এই স্থানে দেখিতে পাইব। যে খ্ৰীষ্টীয়ান পরিবারে এখন কোটী কোটী সভ্য অসভ্য মানবাত্মা বাস করিতেছে তাহা সর্বাগ্রে কেবল চারি পাঁচটি ব্যক্তির জীবনে অঙ্কুরিত হয়। যিশু প্রচারকার্যে প্রবৃত্ত হইয়াই একটি ভক্তদল সঙ্গঠনের জন্য ইতস্ততঃ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। এক্ষণে তাহার সমভাবী সরল প্রকৃতির এমন কয়েকটি লােকের প্রয়ােজন যাহারা তঁাহার সহকারী এবং সহযােগী হইয়া সহজে পশ্চাদ্বী হইবে এবং যাহাদিগের উপর তিনিও নিঃসন্দেহ চিত্তে নির্ভর করিতে পারিবেন। ভগবান্ তাহাই মিলাইয়া দিলেন। তাহার লীলাবিহার ঠিক যেন ষড়যন্ত্রের মত প্রকাশ পায়। কিন্তু 4 ঈশাচরিতামৃত ঐ সকল সহচর তিনি কোথায় পাইলেন ? পণ্ডিত অধ্যাপক উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে ? না, সামান্য অবস্থাপন্ন ধীবর চণ্ডাল নিরক্ষর সরলমতি কৃষকশ্রেণীর মধ্যে তাহাদিগকে পাইলেন। আপনি যেমন দুঃখী শ্রমজীবী ঘরের সন্তান, সহকারিগণও তদনুরূপ ছিল। এরূপ সামান্য অশিক্ষিত সম্প্রদায়ের লােক দ্বারা এ প্রকার অদ্ভুত ধৰ্ম্মসংস্কার পৃথিবীতে কখন কোথাও দেখা যায় নাই। "উনবিংশ শকের জ্ঞান সভ্যতার উন্নত মস্তক ও অশিক্ষিত ধীবর সূত্রধরের পদে অবলুণ্ঠিত হইল । গালি দেশের জেনিসারেং নামক হ্রদের উপকূলে ঐ সকল লােকের বাস ছিল। এস্থানের প্রাকৃতিক শােভা অতিশয় রমণীয়। যে দেশের বাহ্য শোভা সৌন্দৰ্য মনুষ্যকে স্বভাবতঃ চিন্তাশীল ও ভাবুক করে, যাহার অধিবাসীদিগের অভাব অল্প অথচ ভাবনা কম, লােকের প্রকৃতি কবিত্ব- রসসিক্ত বালকবং কোমল এবং সুপ্রসন্ন সেই স্থানে যিশু আপনাকে রােপণ করিলেন এবং অচিরে ফুলবান্ বৃক্ষরূপে পরিণত হইলেন। এই উর্বরা ভূখণ্ড তঁাহার স্বর্গীয় ধর্মভাব অঙ্কুরিত এবং বর্ধিত হইবার পক্ষে বিশেষ উপ- যােগী ছিল। যিশুর প্রচারক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়াই আমরা ঐতিহাসিক বিভিন্ন রচনার এক কুটিল বত্মে পতিত হইলাম। এখন আমরা সেন্ট জনের পথে চলিব, কি মথি মার্ক লিউকের পথে চলিব, তাহা স্থির করিতে হইবে। অভিষেকের পর যিশু কি কি করিলেন, কোথায় কখন গেলেন, এ সমস্ত বিবরণ যাহার পর যেটি লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত তাহা হয় নাই। অনেক সুবিজ্ঞ লেখক এই ঘটনশৃঙ্খলের আদি অন্ত আবিষ্কার করিতে চেষ্টা করিয়াছেন, কিন্তু কেহই কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। সকলকেই অনুমান যুক্তি সম্ভবনীয়তার উপর বহু পরিমাণে নির্ভর করিতে হইয়াছে। সুতরাং আমাদিগকে ও সেই পথানুবৰ্ত্তী হইতে হইল। কিন্তু তাই বলিয়া আমরা এক কালে নিরাশ হইতেছি না। সেন্ট জনের গ্রন্থ ব্যতীত অপর তিন গ্রন্থে ঘটনাসমূহের পরস্পর স্বাভাবিক সম্বন্ধ দৃষ্ট হয়। যিশু ত্রিশ বৎসর বয়সে জনের নিকট অভিষিক্ত হইলেন ইহা প্রথম তিন গ্রন্থে বিবৃত আছে। কিন্তু জন্ জলসংস্কার এবং প্রলােভনে পতিত হওয়ার কথা একবারে পরিহার করিয়া গিয়াছেন।

ঈশাচরিতামৃত। মার্ক সংক্ষেপে এই মাত্র বলেন, মেরীয় অভিষেকের অব্যবহিত পরে পবিত্ৰাত্ম কর্তৃক বিতাড়িত হইয়া বনমধ্যে চলিয়া গেলেন, তথায় চল্লিশ দিন অনাহারে হিংস্র জন্তুর সঙ্গে বাস করিলেন, সয়তান কর্তৃক পরীক্ষিত হইলেন, পরিশেষে স্বর্গদূত আসিয়া তঁাহার সেবা করিল। তদনন্তর তিনি গালিলে সিয়া যখন ধর্ম প্রচার এবং শিষ্য সংগ্রহ করেন, তখন জলসংস্কারক জন্য কারারুদ্ধ হইয়াছেন। এ সংবাদ অবশ্য তিনি স্বীয় আচাৰ্য্য পিটারের মুখে শুনিয়া থাকিবেন। কিন্তু সেট জনের গ্রন্থে অন্য প্রকারে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, জল সংস্কারক জন্ যিশুকে প্রথম দিনে দেখিবা মাত্র মসি বলিয়া চিনিতে পারিলেন। পর দিবসে আবার তাহার সঙ্গে যিশুর সাক্ষাৎ হইল এবং জনের দুই জন শিষ্য জোসেফতনয়ের গুণানুবাদ শ্রবণ করিয়া তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে চলিলেন। এই দুই জনের মধ্যে এক জনের নাম অপু, এবং অপরের নাম সেন্ট জন্। ইহারাও যিশুকে হঠাৎ একবারে ত্রাণকর্তা এবং প্রেরিত ভবিষ্যদ্বক্তা বলিয়া চিনিতে পারিয়াছিলেন। অনন্তর আণ্ড সে কথা স্বীয় ভ্রাতা পিটারকে বলেন। পিটারকে দেখিবা মাত্র যিশু সহসা বলিয়া উঠিলেন, “তুমি জনার পুত্র সাইমম্।” পর দিনে তিনি গালিল, দেশে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে ফিলিপকে পাইয়া বলিলেন, “আমার পশ্চাদগামী হও।” ফিলিপ আপনার বন্ধু ন্যাথেনেকে বলিলেন, “যাহার আসিবার কথা ছিল সেই নবি আসিয়াছেন। তঁাহার নিবাস নাশরথে, তিনি জোসেফের পুত্র। ন্যাথেনে তাহাতে বিস্মিত হইয়া বলিল, “কি ! নাশরথ হইতে কোন ভাল বিষয় আসিতে পারে ?” ফিলিপ উত্তর করিল- “আসিয়া দেখ সত্য কি না।” ন্যাথেনেকে যিশু চিনিতে পারিলেন। সে জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি আমায় চিনিলেন কি রূপে ?” তিনি বলিলেন, “যখন তুমি ভুম্বরবৃক্ষতলে বসিয়া ছিলে তখন আমি তােমায় দেখিয়াছি।” তদনন্তর তিনি সশিষ্যে ক্যান নগরে কোন কুটুম্বভবনে বিবাহসভায় উপস্থিত হন। তথায় জননী মেরীদেবীও নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। এই স্থানে জননীর অনুরােধে যিশু জলকে মদরিকারূপে পরিণত করেন এবং তদ্বারা আপনার অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় দেন। -- ৬৪। ঈশাচরিতামৃত। মাতা, সহােদর ও শিষ্যগণের সহিত এখানে কয়েক দিবস অবস্থিত হই। খাছিল। পরে নিস্তার পৰ্বোপলক্ষে তঁাহার জেরুশালমে যাওয়ার কথা উল্লেখ আছে। তথায় গিয়া ধৰ্ম্মমন্দির হইতে ক্রেতা বিক্রেতাগণকে তিনি তাড়না ও কশাঘাতপূৰ্ব্বক বিদায় করিয়া দিয়া বলেন যে, “এই মন্দিরকে চুর্ণ করিয়া ইহাকে আমি তিন দিনের মধ্যে পুনর্গঠন করিতে পারি।” এইরূপ ব্যবহার ও বাক্যে বিপক্ষতার অগ্নি জ্বলিয়া উঠে। তাহার পর নিকো- ভিমাসের সহিত দ্বিজাত্মা বিষয়ে কথােপকথন হয়। তদনন্তর মহর্ষি জুন পরে যে স্থানে জলসংস্কারকার্যে নিযুক্ত ছিলেন, সশিষ্য যিশু তৎসন্নিহিত প্রদেশে গিয়া জলভিষেক করেন, তথা হইতে সামেরিয়া প্রদেশ হইয়া স্বদেশে অাসেন *। জোনসারেৎ হ্রদের পশ্চিম তীরবর্তী কেপারনিয়াম নগর এবং তৎপার্শ্বস্থ চারি পাঁচটি নগরে যিশু রীতিপুৰ্ব্বক ধর্ম প্রচার আরম্ভ করেন। সেন্ট লিউকের গ্রন্থে লিখিত আছে প্রলোভন জয় করিয়া তিনি একবারে জন্মুভূমি * কোন কোন পণ্ডিতের মত এই যে, ঈশার জীবনের যে যে ঘটনা প্রথম তিন গ্রন্থে লিখিত হয় নাই, সেন্ট জনৃ শেষে তাহা পূর্ণ করিয়া দিয়া ছেন। উপরিউক্ত অংশটি তাহারই মধ্যগত। প্রলােভন জয় করিয়া যিশু যদি প্রথমেই আবার জলসংস্কারক জনের নিকট আসিয়া থাকেন এবং তথায় অণ্ডপ্রভৃতি তঁাহার শিষ্য হয়, তাহাতে কোন আপত্তি উঠিতে পারে না। কিন্তু অন্য কোন গ্রন্থে ইহার নিদর্শন নাই। যদি শূন্যস্থান পূর্ণ করাই জনের উদ্দেশ্য হইত, তবে অপর গ্রন্থের লিখিত ঘটনা উহাতে পুন- ৰ্বার কেন সন্নিবিষ্ট হইয়াছে, এই কথা বলিয়া কেহ কেহ সন্দেহ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে সত্যাসত্য বিচার করিবার ক্ষমতা অন্যের যেমন আছে আমাদেরও তেমনি। আধুনিক গ্রন্থকারগণ এ সম্বন্ধে প্রথম তিন খণ্ড পুস্তককে আশ্রয় করিয়া যিশুচরিত লিখিয়া গিয়াছেন। আত্মপক্ষসমর্থনের জন্য যুক্তি প্রমাণ প্রদর্শন করিতে কেহ ক্রটি করেন নাই। সে সমুদায়ের পুনরালােচনা নিষ্প্রয়ােজন। আমরা কেবল জনৈর লিখিত প্রথম অংশটি সংক্ষেপে পাঠকগণকে অবগত করিলাম।

ঈশাচরিতামৃত। নাশপথে গিয়া উপস্থিত হইলেন; এবং তথাকার ধর্মমন্দিরে এমন সকল উপদেশ দিলেন যে তাহা শ্রবণে নগরবাসীরা ক্রোধান্ধ হইয়া তাহাকে বিনাশ করিতে উদ্যত হইল! এমন কি পৰ্ব্বতের উপর হইতে তাহাকে ভূতলে নিক্ষেপ করিতে তাহারা চেষ্টা করে। যিশু সে বিপদ হইতে দৈববলে নিষ্কৃতি পান। জন্মস্থানে গিয়া তিনি বার বার উৎপীড়িত হইয়াছিলেন ইহা অসম্ভব নহে। তথায় প্রচারকার্যের নানা প্রকার প্রতিবন্ধক দেখিয়া শেষ কেপারনিয়ামকেই প্রধান কার্যক্ষেত্র করিলেন। প্রথমে অতি অল্প- সংখ্যক লােক উপদেশ শুনিতে অসিত। তদনন্তর ক্রমে ধৰ্ম্মপিপাসু সরলহৃদয় দুই পাঁচ জনের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হইল। মৎস্যজীবী কয়েক জনের সহিত আন্তরিক একটু সহানুভূতিও জন্মিল। একাকী উদাসীন বেশে উক্ত হ্রদের কূলে কূলে যখন তিনি ইতস্ততঃ বিচরণ করতেন তখন দৈবনিয়তিক্রমে কতিপয় ধীবর যুবকের শুভ দৃষ্টিতে নিপতিত হন। আণ্ড, এবং সাইমন, জন্ এবং জেমস্ এই চারি জন তাহার প্রথম বন্ধু এবং প্রথম শিষ্য। যিশুর নূতনবিধ শিক্ষাপ্রণালী এবং জীবন্ত উপদেশাবলী ইত- পূর্বেই যে উহাদিগের চিত্তাকর্ষণ করিয়াছিল তাহা আর বলিবার প্রয়ােজন রাখে না। তঁাহার ব্যবহার আবৃণ এবং মুখশ্রীতে এমন এক মনােহারিণী শক্তি ছিল যদ্বারা সহজেই লােকে বিমুগ্ধ হইয়া পড়িত। তিনি যাহ ভাবিতেন, কি যাহা করিতেন তাহার গৃঢ় অভিপ্রায় সামান্য লােকে সহসা কিরূপেই বা বুঝিবে; কিন্তু না বুঝিয়াও তাহারা তাহার সঙ্গে সঙ্গে ফিরিতে লাগিল এবং বিষয় কর্মে এক প্রকার উদাসীন হইল; প্রিয়দর্শন যিশুর মুখ বিনিঃসৃত অমৃতবাক্য শ্রবণে তাহার একেবারে মােহিত হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, “তােমরা এক্ষণে মৎস্যজীবী আছ, আমি তােমাদিগকে মনুষ্যজীবী করিব।” তাহা শুনিয়া সকলের হৃদয়নিহিত ভস্মাচ্ছাদিত ব্রহ্মাগ্নি জ্বলিয়া উঠিল। সেই অশিক্ষিত দীনাত্মা ধীবরসন্তানদিগের রোদ্ৰবাতনিপীড়িত মুখমণ্ডলে তিনি কি মহৎ লক্ষণ দেখিয়াছিলেন তাহা তুমি আমি কি বুঝিব? তাহাদিগের অভদ্র বেশ ভূষায়, অসংস্কৃত এবং অনুৎকর্ষিত দেহ মনে কি মহামন্ত্র লিখিত ছিল তাহা কেবল তিনিই পড়িতে পারিতেন। আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন! কোথায় মৎস্যজীবী ধীরগণ মৎস্য ধরিতেছিল, কেহ বা ঈশাচরিতামৃত । ছিন্ন জাল সংস্কার করিতেছিল, না কোথায় একবারে দেবদূত হইয়া তাহারা স্বর্গরাজ্য স্থাপনের জন্য ব্যাকুল হইল; নৌকা, জাল, আত্মীয় বান্ধব, জাতীয় ব্যবসায় ছাড়িয়া চিরবৈরাগ্যের পথে প্রবেশ করিল। যিশু প্রথমে তাহাদিগের নিকট কেবল বাধ্যতা চাহিলেন। কিন্তু সে বাধ্যতা দাসের বা জড়ের বাধ্যতা নহে; স্বাধীন প্রেমের বাধ্যতা। তিনি যাদুকর বা কুটিলবুদ্ধি চক্রীর ন্যায় কোন কৌশল দ্বারা শিষ্যসংগ্রহ কয়েন নাই; তাহার কোমল নয়নের প্রেমদৃষ্টি এবং সুধাস্রাবী সত্য বচনই এ পক্ষে যথেষ্ট কার্যকারী ছিল। সরলচিত্ত ধীবরগণের অন্তরস্থ ব্ৰহ্মাগ্নি কেবল তিনি স্পর্শ করিলেন, অমনি তাহাদের মন ফিরিয়া গেল। এত দূর পর্যন্ত উৎসাহী এবং আসক্ত হইয়া পড়িল যে তাহার ইঙ্গিত মাত্র তাহারা সৰ্ব্বস্ব ছাড়িতে প্রস্তুত। দৈবনিয়ােজিত প্রীতির আকর্ষণে এ প্রকার আশ্চৰ্য পরিবর্তন সম্ভব হয় তাহা বুঝিতে না পারিয়া পশ্চাদ্বী খ্রীষ্টিয়ান লেখকগণ উক্ত ঘটনার মধ্যে প্রকৃতিবিরুদ্ধ একটা দৈবক্রিয়া সন্নিবিষ্ট করি- ছেন। “যিশুর অনুমতিক্রুমে পিটার জাল ফেলিলেন, তাহাতে বহু- সংখ্যক মৎস্য ধরা পড়িল, কাজেই ক্ষুদ্ৰপ্রাণ ধীবরের মন ফিরিয়া গেল।” এ কথা বলিলে যিশুর এবং তাহার শিষ্যবৃন্দের মহত্ত্ব কিছুমাত্র বৃদ্ধি হয় না, বরং কমিয়া যায়। ভগবদ্ভক্তের দৈবপ্রভা, প্রেমাকর্ষণ যে মৎস্যের লােভ অপেক্ষা অধিকতর প্রভাবশালী তাহা সহজেই প্রতীত হয়। আশ্চর্যক্রিয়া কিংবা অদ্ভুত ভােজবাজী দেখাইয়া এক জন সামান্য ঐন্দ্রজালিকও লােক- মান্য হইতে পারে, কিন্তু তাহাতে কি কাহারাে হৃদয় মন প্রাণ আসক্ত হয় ? যিশু লােকচরিত্রজ্ঞ ছিলেন, কাহার দ্বারা ভগবানের কোন্ কার্ঘ সাধিত হইবে তাহা তিনি সহজ জ্ঞানে বুঝিতে পারিতেন। তাহার পথের পথিক, ভাবের ভাবুক যেখানে যে ছিল তাহাদিগকে হরি আপনি মিলাইয়া দিলেন। ইহা অলৌকিক ক্রিয়া বটে, কিন্তু যাদুকরের বাজী নহে, প্রেততত্ত্ববাদের ভ্রান্তিবিলাসও নহে। স্বর্গরাজ্য স্থাপনের প্রথম আয়ােজন এবং উপাদান যদিও দেখিতে আপাতত যৎসামান্য, কিন্তু উহা কেমন পবিত্র ! ইহার ভিতর দৈবশক্তির প্রভাব কেমন উজ্জ্বল! এই আড়ম্বরহীন পবিত্র মধুর ভাবই ভবিষ্যৎ উন্নতির প্রকৃষ্ট উপায়। ৫।

ঈশাচরিতামৃত। নূতন বিধান-প্রবর্তক ঈশা প্রথমে যে যে সত্য প্রচারে ব্রতী হইলেন তাহার মর্ম গ্রহণ করিতে পারিলে স্পষ্ট বুঝা যায় যে তিনি একটা আরম্ভ করিলেন। জনের প্রচারিত ধৰ্ম্ম এবং অচরিত অনুষ্ঠানের সহিত যিশুর অনেক প্রভেদ লক্ষিত হয়। জনের ধর্ম প্রাচীন ধর্মবিধিকে জলাভিষেক দ্বারা জাগ্রং করা মাত্র। উপবাস, কঠোর তপস্যা, এবং পুরাতন রীতি অনুসরণের তিনি পক্ষপাতী ছিলেন। তাহার ঈশ্বর বিচার- পতি এবং নিয়ন্তা। জাতিসাধারণের বাহ্য ব্যবহার সংশোধনের জন্য তিনি এই মন্ত্র পড়িতেন; “আমি তােমার মস্তকে নিৰ্ম্মল জল সিঞ্চন করিব, তুমি শুদ্ধ হইবে।” আপনাপন পাপ স্বীকারপূর্বক অনুতপ্ত হইয়া এই ভাবে তঁাহার নিকট লােকে অভিষিক্ত হইত। এই কাৰ্য্য সমাধা করিয়া তিনি প্রাচীন যুগধর্মব্রত উদ্‌যাপন করিয়াছেন কিংবা কিছু অবশিষ্ট আছে, এমন সময় যিশু আসিয়া নূতন বিধানের জয়ভেরী বাজাইলেন। তিনি প্রথমে এই চারিটি সুসংবাদ ঘোষণা করিলেন। (১) সময় পূর্ণ হইয়াছে। (২) স্বর্গরাজ্য নিকটবর্তী, অনুতাপ কর। (৩) বিধানকে বিশ্বাস কর । (৪) মনকে পরিবর্তিত কর। প্রাচীন ধর্মে এরূপ শব্দ প্রচলিত ছিল, কিন্তু তাহার অর্থ অন্য প্রকার। যিশুপ্রচারিত স্বর্গরাজ্য সম্পূর্ণরূপে অধ্যাত্মিক, এবং ইহা স্বাধীন প্রেমােপাদানে রচিত। ভগবানের নিশ্বাসবায়ু হৃদয়ে বহিতেছে, তিনি নবভাবের স্রোত খুলিয়া দিয়া, মানবসন্তানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ- রূপে লীলা বিহার করিতেছেন এই প্রকার অনুভূতিকে তিনি বিশ্বাস বলি- তেন; এবং এইরূপ জীবন্ত বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্বর্গরাজ্য স্থাপন করা তাহার প্রধান সঙ্কল্প ছিল। বাহ্যানুষ্ঠান কি নৈতিক ব্যবহারবিশেষের শাখা ছেদন তঁাহার উদ্দেশ্য নহে, যাহাতে পুরাতন মনুষ্য রূপান্তরিত হইয়া নবজীবন লাভ করে, ঈশ্বরের জীবন্ত বিধানক্রিয়া স্বচক্ষে দেখিতে পায় এই জন্য তিনি আত্মার মূলদেশে অস্ত্রাঘাত করিলেন। য়িহুদীরা চির দিন ঈশ্বরকে কেবল রাজা, শাসনকর্তা বলিয়াই জানিত, তাহাকে কখনাে পিতা বলিয়া ডাকে নাই। কিন্তু যিশুর ঈশ্বর সাক্ষাৎ বৰ্তমান পিতা, তিনি পুত্ৰ নিৰ্ব্বি- শেষে সকলকে পালন করেন। তিনি বর্তমানে বিধান প্রেরণ করিয়া সাক্ষাৎসম্বন্ধে জগৎ পালন করিতেছেন এই কথা যিশু প্রচার করিতে ঈশাচরিতামৃত। লাগিলেন। তঁাহার মুখ হইতে অনর্গল ব্ৰহ্মবাণী বাহির হইতে লাগিল। এক একটি মহাবাক্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় চারিদিকে বিকীর্ণ হইয়া পড়িল। উহা শাস্ত্রের বচনও নহে, মুখের কথা মাত্রও নহে; বাক্যের সহিত বক্তার দেবচরিত্রের দুর্জয় শক্তি অনুস্থ্যত ছিল। কাহার সাধ্য যে সে বাক্যের প্রতিরোধ করে ? জলগ্নিশিখা শুষ্কদারুনিহিত প্রচ্ছন্ন অগিকে যেমন প্রজ্জ্বলিত করিয়া তােলে, যিশুর সত্য বচন তেমনি মানব স্বভাবের মস্থানে গিয়া পৌছিল। তাহা শ্রবণে জগৎ কপিল, নিদ্রিত প্রাণিপুঞ্জ জাগিয়া উঠিল, এবং ধৰ্ম্মাভিমানী ফিরুশীদল হতবুদ্ধি হইয়া রহিল। শব্দব্রহ্মের কি অদ্ভুত মহিমা তাহার পরিচয় আমরা এখানে পাইলাম। বাস্তবিকই যিশুর বাক্য সকল জ্বলন্ত আয়ুধের ন্যায় ভীম নাদে অবিশ্বাসের দুর্গমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছিল। চারি জন মাত্র শিষ্য সঙ্গে লইয়া এক জন সামান্য ধর্মাচার্যের ন্যায় তিনি প্রকাশ্যরূপে কাৰ্য্য আরম্ভ করেন। তৎকালে ধৰ্ম্মজ্ঞান প্রচার এবং উপাসনার জন্য য়িহুদী সমাজে দুই প্রকার স্থান ছিল। সিনেগ” নামে যে ধৰ্ম্মশালার কথা শুনিতে পাওয়া যায়, সেই স্থানে যিশু ধর্মপ্রচার করিতেন। ভজনালয়ে জাতীয় ধৰ্ম্মবিশ্বাস ভিন্ন অন্য কথা বলিবার কাহারী অধিকার ছিল না; কিন্তু সিনেগগে প্রধান অধ্যে ব্যতীত শ্রোতৃ মণ্ডলীর যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তি সময়ে সময়ে প্রাচীন শাস্ত্রের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করিতে পারিত।: বর্তমান খ্ৰীষ্টিয়ান চার্চ এই সিনেগগের অনুকরণে রচিত হইয়াছে। একদা বিশ্রাম দিবসে গুণধাম যিশু কেপারনিয়ামের এক ধৰ্ম্মশালায় ধর্মশাস্ত্র পাঠ করিয়া তাহার ব্যাখা আরম্ভ করিলেন। তঁাহার মুখে অশ্রুতপূৰ্ব্ব সুমিষ্ট ব্যাখ্যা শ্রবণে শ্রোতৃবর্গ চমৎকৃত হইয়া বলিতে লাগিল, “ইহার বাক্যত অন্যের মত নহে; ইহাতে যে দৈবশক্তির আবির্ভাব দেখিতেছি!” তথায় এক জন বায়ুগ্রস্ত যুবা বসিয়াছিল। সে যিশুর পরম সুন্দর মুর্তি দেখিয়া এবং তাহার প্রাণভেদী উপদেশ শুনিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিল, “আমাদিগকে একলা থাকিতে দাও! হে নাশ- রথীয় যিশু, তােমাকে লইয়া আমরা কি করিব? তুমি কি আমাদিগকে বিনাশ করিতে আসিয়াছ ? তুমি কে তাহা আমি জানি ; তুমি ঈশ্বরের । ঈশাচরিতামৃত। পবিত্র সন্তান।” যিশু গম্ভীর রবে তাহাকে এক ধমক দিলেন, তাহাতে তাহার বিকৃত মস্তক শীতল হইল, এবং সে তদণ্ডে রােগমুক্ত হইয়া গৃহে চলিয়া গেল। অনন্তর তিনি পিটারের শ্বশুরালয়ে গিয়া দেখিলেন তাহার শাশুড়ী রােগে কাতর হইয়া মৃতবৎ পড়িয়া আছে। যিশু জরকে এক ধমক দিলেন, অমনি জর ছাড়িয়া গেল, এবং তখনি সে নারী তঁাহার পরি- 'চৰ্য্যায় নিযুক্ত হইল। যিশু এক্ষণে যে মহৎ ব্রতে জীবন উৎসর্গ করিলেন তাহার প্রতিবন্ধক যে কত তাহা ভাবিলে স্তম্ভিত হইতে হয়। বর্তমান সময়ে লােকসমা- জের যে সকল মহাবুদ্ধিশালী রাজনীতিজ্ঞ পণ্ডিত রাজনীতি কিংবা সমাজ- সংস্কার কার্যে প্রবৃত্ত হন তাহারা কতই ভাবেন, আর কতই বা মন্ত্রণা করেন; কিন্তু তাহাদের বুদ্ধি এবং ফলাফল গণনাই একমাত্র বল ভরসা; প্রচুর পশুবল এবং যুদ্ধাস্ত্র না থাকিলে তাহাদিগকে আঁধার দেখিতে হয়। কুটিল কৌশল ও প্রতারণার সাহায্য না পাইলে তঁাহারা একবারে হতাশ হইয়া পড়েন। বিশ্বাসহীন দেশহিতৈষী সৰ্ব্বাগ্রে নিজ পরিবারের অন্ন বস্ত্র মুখ স্বচ্ছতার জন্য লােকানুরাগ এবং বেতনের অন্বেষণ করিবেন; তাহার পরে কার্যে নিযুক্ত হইবেন। যাহাতে ভৃতি বন্ধ না হয়, কেই নিন্দা না করে, পুত্র কন্যার বিবাহের কোন ব্যাঘাত না ঘটে এ বিষয়ে তাহার সর্বদাই দৃষ্টি। তিনি কাজ করিবেন ঈশ্বরের, কিন্তু সয়তানের বল কৌশল লইয়া। *অগ্রে অর্থ অন্বেষণ কর, তদনন্তর যাহা কিছু প্রয়াে- জন তাহা পাইবে” এই মন্ত্রে তিনি দীক্ষিত। রাজনীতি-সংস্কারকের স্বার্থ প্রবঞ্চন ধন জন পশুবল আগে, তাহার পর ন্যায় সত্য সাধুতা। একটি সামান্য দেশ শাসন বা সংস্কারজন্য এখনাে এই উনবিংশ শতাব্দীতে এত আয়ােজন উদ্যোগ আবশ্যক হয় । ধনজনবলবুদ্ধিবিহীন যিশুকে পৃথিবী সংস্কার করিতে হইবে, মনুষ্যসমাজের বদ্ধমূল প্রাচীন কুসংস্কার এবং দুর্ণীতির উচ্ছেদ সাধন করিয়া তাহার স্থানে বিশুদ্ধ নীতি এবং স্বর্গীয় ধৰ্ম প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে; কিন্তু তিনি কি সাহসে এ কার্যে ব্রতী হইলেন ? •বিনয় আর বিশ্বাস অস্ত্র কেবল তঁাহার সহায় ছিল। মরিয়া জীবন সঞ্চার কৰিব, হারিয়া জয়ী হইব, নিৰ্বাক্ থাকিয়া বিজয় ডঙ্কা বাজাইব এই তঁাহার ৭০ ঈশাতরিতামৃত। প্রতিজ্ঞা। “অগ্রে স্বর্গরাজ্য অন্বেষণ কর, পরে যাহা কিছু প্রয়ােজন সব পাইবে।” এই মূল মন্ত্র। এ প্রকার সুবুদ্ধি সুকৌশল কি কাহারাে মনে উদয় হয় ? পৃথিবীর জ্ঞান বুদ্ধি কি এ পথে কখন পদার্পণ করে? কল্পনাতেও কেহ ইহা ভাবে না। এইরূপ অদ্ভুত লােকাতীত উপায় অবলম্বন করিয়া তিনি ঈশ্বরের হন্তে সকল ভার, ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। তাহার জীবন যেমন অসাধারণ, কার্যপ্রণালীও তেমনি অলৌকিক। সম্মুখে পৰ্বত সমান বিঘ্ন বাধা, দিন নির্বাহের জন্য এক মুষ্টি উদরান্নেরও সংস্থান নাই, বিদ্যা বুদ্ধি উপাধি বংশমর্যাদাত কিছুই ছিল না, অথচ কেবল ব্ৰহ্মবলে বলীয়ান হইয়া তিনি ব্রহ্মাণ্ডকে কম্পিত করিয়া তুলিলেন। এখন ইষ্টধর্মের বাহা- ড়ম্বর কত! রাশি রাশি ধর্মগ্রন্থ, সহস্র সহ বিদ্বান্ সুপণ্ডিত ধৰ্ম্মযাজক, বিপুল অর্থাগম, কোন কিছুরই অভাব দেখা যায় না। কিন্তু কয় জন লােক এখন সাত্ত্বিকভাবে এ ধৰ্ম্মের জন্য লালায়িত হয় ? দৈবশক্তি এমনি সামগ্রী! ইহার নিকট মানবীয় ক্ষমতা অসারের অসার। পাপ, অধৰ্ম্মের প্রতিকূলে যিশু কিছু মাত্র পার্থিব বল প্রয়ােগ করিলেন না, বরং তাহাদের যত দূর সাধ্য তাহা করিতে দিলেন; পরিশেষে ধর্মের জয় হইল। ঈশ্বরের ইচ্ছা পরিণামে এইরূপে জয়ী হইয়া সাধুহা মহা পাষণ্ডকেও পদানত করিয়া ফেলে। অথবা এ কথাই বা আমরা কেন বলি? ঐশী পরাক্রমের সুখ্যাতি করাও অল্পবিশ্বাসের পরিচায়ক মনে হয়। ঘঁহার পদতলে কোটা কোটী সৌরব্ৰহ্মাণ্ড বিলুষ্ঠিত হইতেছে, যাহার ইঙ্গিত মাত্ৰ অযুত অগণ্য বিশ্ব সৃষ্ট এবং ধ্বংস হইতে পারে, তঁাহার শক্তির সাহায্যে যে যিশু জয়ী হইবেন, তাহাতে আর বিচিত্রতা কি?

লােকসমারােহ এবং আশ্চৰ্য্যক্রিয়া। অদ্ভুতকৰ্ম্মা যিশু যখন জীবন্ত ধৰ্ম্মবিশ্বাস, উদার ভ্রাতৃপ্রেম এবং স্বর্গরাজ্যের সুসমাচার ঘােষণা আরম্ভ করেন তখন তঁাহার মনে এ বিশ্বাসও ছিল যে তিনি স্বয়ং ঈশ্বরকর্তৃক তৎকাৰ্য্যে নিয়ােজিত হইয়াছেন। য়িহুদীরা যে ভাবে প্রেরিত পুরুষ এবং স্বর্গরাজ্য সমাগমের প্রত্যাশা করিত তাহার সহিত উক্ত বিশ্বাসের সহানুভূতি ছিল না। কিন্তু তাহা না থাকিলে কি হয়, সর্ব সাধারণ লােকের যখন অন্যবিধ সংস্কার তথন তঁাহার আধ্যাত্মিক উচ্চ অভিপ্রায় কে বুঝিবে ? তাহার স্পষ্ট দেখিল যিশুর বাক্যপ্রভাবে বায়ুগ্রস্ত রােগী আরাম লাভ করিল, যে নারী জরে শয্যাগত ছিল সেও উঠিয়া কাৰ্য্য করিতে লাগিল। একে তঁাহার উপদেশ জ্বলন্ত তাহাতে আবার পীড়া আরােগ্যের এইরূপ অসাধারণ ক্ষমতা, কাজেই চারি দিক হইতে দলে দলে লােক আসিয়া উপস্থিত হইল। এই স্থলে আমাদিগকে আর একটি কঠিন প্রহেলিকার মীমাংসা করিতে হইবে। ঈশার জীবনরাজ্যে প্রবেশ করিলে দেখিতে পাওয়া যায়, প্রতিপদে রাশি রাশি প্রাকৃতিক নিয়মবিরুদ্ধ অলৌকিক ক্রিয়া আসিয়া আমাদিগের গতি রােধ করে। ইহা এমনি গুরুতর বিষয় যে প্রকৃত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতে গেলে ইহাকে কিছুতেই অতিক্রম করা যায় না। আশ্চৰ্য্য ক্রিয়ার যথার্থ তাৎপর্য কি, তিনি ইহা কি ভাবে করিতেন, যদিও সে সমস্ত হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন, তথাপি এবিষয়ে কিছু আলােচনা করিয়া দেখা যাউক। তৎকালে য়িহুদীরাজ্যে চিকিৎসা বিদ্যার কিছুমাত্র উন্নতি হয় নাই। রোগ যেমন পাপের ফল, চিকিৎসাও সুতরাং তেমনি ধর্মাত্মাদিগের একটি কাৰ্য, এইরূপ বিশ্বাস ছিল। বিশ্বাসের বলে দৈবশক্তিতে রােগ সারে, ঔষধ বা চিকিৎসার প্রয়ােজন হয় না, এই সংস্কার বশতঃ লােকে সাধুর অঙ্গস্পর্শ বা মন্ত্রবল অধিকতর কাৰ্যকারী মনে করিত। বস্তুতঃ যিশুর আশাপূর্ণ মিষ্ট বচন একটি পরমৌষধ १२ ঈশচরিতামৃত। ছিল। মানসিক এমন অনেক ব্যাধি আছে যাহা উন্নত আত্মা মহাপুরুষ- দিগের প্রেম এবং সহানুভূতিতে বিমুক্ত হয়। বিমুক্ত হয়। অনেকে ঈশ্বরবিশ্বাস এবং নির্ভরের গুণে কত সময় দুরারোগ্য ব্যাধি হইতে রক্ষা পায়। বিশেষতঃ রােগী যখন স্বাস্থ্যের পথে প্রত্যাবর্তন করে, রােগের প্রকোপ হ্রাস হইয়া আসে, তখন উচ্চমন গভীরাত্মা সাধুর আশাবাক্য, কিংবা অঙ্গস্পর্শ সুস্থতা, লাভের সহকারী হয়। মনের মূর্তি উৎপাদন করিতে পারিলে অনেক স্থলে রােগীকে সুস্থ করা যায় ইহা কিছু নূতন কথা নহে। কিন্তু ইহাতে পর- স্পরের মানষিক অবস্থার উপযােগিতা থাকা আবশ্যক। সাধুর পবিত্র প্রভাব ধারণ করিতে না পারিলে ইহা ফলপ্রদ হয় না। যিশু যে সকল রােগীকে ভাল করিতেন, তন্মধ্যে অধিকাংশই বায়ুগ্রস্ত ব্যক্তি। তৎকালে য়িহুদী সমাজ যেরূপ মানসিক অশান্তি এবং উৎকণ্ঠার আবর্তে পড়িয়াছিল তাহা উন্মদােগের এক প্রধান কারণ। সমাজতত্ত্বদশী পণ্ডিতেরা বলেন সমাজবিপ্লবের কালে বহুলােক এইরূপে বায়ুরোগাক্রান্ত হয়। ধর্মশালায় যিশু যে যুবাকে ভাল করেন সে মানসিক রােগাক্রান্ত ছিল। পিটারের শাশুড়ী বােধ হয় আরােগ্যের অবস্থায় উপনীত হইয়া থাকিবেন, পরে যিশুর পবিত্র করস্পর্শে উঠিয়া বসেন। যত রােগী তাহার নিকট আসিত সকলেই যে ভাল হইত তাহা নহে, অনেক মতিচ্ছন্ন ব্যক্তি মানসিক বিকার হইতে রক্ষা পাইয়াছিল এই মাত্র। ক্রমে এই ঘটনাকে অত্যুক্তি বর্ণনায় অনুরঞ্জিত করিয়া পশ্চাদ্বত্তী গ্রন্থকারগণ কল্পনাপ্রিয় লােকসমাজের চিত্ত বিনােদন করিয়াছেন। যেখানে অনেক ছিল, সেখানে “সমস্ত” শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। অন্তর রাজ্যের এমন সকল নিগূঢ় নিয়ম আছে যদ্বারা বহুবিধ আশ্চৰ্য কার্য সম্পাদিত হয়। কিন্তু তাহাকে প্রচলিত বিজ্ঞান বুদ্ধির সহিত সহসা মিলাইতে পারা যায় না বলিয়া অবিশ্বাস করা যুক্তিসিদ্ধ নহে; যেহেতু অব্যক্ত কার্য কারণেও তাহা ঘটিতে পারে। মনােজগতের সূক্ষ্ম কার্যপ্রণালী এবং তাহার ফল কে অবধারণ করিতে সক্ষম? শাস্ত্রজ্ঞানের অতীত স্থানে বিশ্বাস এবং যােগবলে কত সময় কত অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিতেছে কে তাহার সমাচার লয়? যিশু ঐন্দ্রজালিকের ন্যায় লােকের চক্ষে বুলি দিয়া এরূপ কাৰ্য করিতেন না। তঁাহার অসাধারণ দয়া প্রেম সহানুভূতি ঈশাচরিতামৃত। দীন জনের অন্তর ভেদ করিত। এমন কি, তঁাহার গেহপুৰ্ণ কৃপা- কটাক্ষে কত রােগী সুস্থ হইয়া উঠিত। পবিত্ৰচরিত্র প্রেমিক সাধুদিগের জীবন য়ে দৈহিক ও মানসিক উভয় রােগের পরমৌষধ তাহা কে অস্বীকার করিতে পারে? কিন্তু তিনি যে ভাবেই রােগ আরােগ্য করুন, সাধারণ লােকে প্রাচীন সংস্কারের বশবর্তী হইয়া মনে করিতে লাগিল যে ইনি অদ্ভুত ক্ষমতাশালী যাদুকরবিশেষ। য়িহুদীরা রােগমত্রকে পাপের ফল, এবং মানসিক রােগাক্রান্তকে ভূতগ্রস্ত বলিয়া বিশ্বাস করিয়া আসিয়াছে ; সুতরাং যিশু যখন অধ্যাত্ম যােগবলে তাহাদের বিকৃত মস্তক প্রকৃতিস্থ করিতে লাগিলেন তখন সকলে ভূতনাথ বলিয়া তঁাহাকে গ্রহণ করিল। কিন্তু অজ্ঞ মানবদিগকে আশ্চর্য ক্ষমতা দেখাইয়া তিনি সর্বত্র মান্য গণ্য হইবেন এই কি উদ্দেশ্য ছিল ? ব্যাধি আরােগ্য করা কি তাহার ধর্ম প্রচারের একটি কৌশল ? হীনমতি লােকেরা এইরূপ মনে করে বটে, কিন্তু যিশুর পক্ষে তাহা অসম্ভব। এভাবে তাহাকে লােকে গ্রহণ করিলে যে তাহার মুখ্য অভিপ্রায় সিদ্ধ হইবে না তাহা তিনি বিলক্ষণ বুঝি- তেন। পরবর্তী ঘটনায় ইহা প্রমাণিত হইবে। যে দিনে তিনি ধৰ্ম্মমন্দিরে এবং পিটারের গৃহে দুই ব্যক্তিকে আরােগ্য করিলেন সেই দিন অপরাহ্নে শত শত রােগী চারিদিক্‌ হইতে আসিয়া তাহাকে ঘেরিল। এ প্রকার সংবাদ শ্রবণে লােকের কিরূপ জনত। হয় কলিকাতা নগরে মৌলবি সাহেব তাহার আভাস সে দিনও দেখাইয়াছেন। জ্ঞান সভ্যতার উন্নতির সময়ে যদি এই, ঈশার সময়ে তাহা হইলে কত অধিক হওয়া উচিত। অল্প ক্ষণের মধ্যে পিটারের শ্বশুরালয় এক প্রকাণ্ড চিকিৎসালয় হইয়া উঠিল। অনেক বায়ুগ্রস্থ রোগীকে যিশু সে দিন সুস্থ করেন। বস্তুতঃ পীড়িতের রােগশয্যা তাহার এক প্রধান গমস্থান ছিল। দীন দুঃখী কাঙ্গালকে কিরূপে ভাল বাসিতে হয় দয়াল যিশু তাহা জানিতেন। যিনি মানবাত্মার পাপরূপ মহাব্যাধি দূর করিয়া পৃথিবীতে স্বৰ্গ আনিবেন তাহার পক্ষে ইহা একটী কি বিষম পরীক্ষা। অথচ জগতের অধিকাংশ লােক শারীরিক রােগমুক্ত হইবার জন্য যেমন ব্যাকুল আত্মার জন্য তেমন নহে। শত শত অন্ধ খঞ্জ জরাজীর্ণ দুঃখী জীবের দুর্দশা দেখিয়া যিশুর দয়ার্ড কোমল ৭৪ ঈশাচরিতামৃত। s হৃদয় বিগতিল হইল বটে, কিন্তু তাহাকে অন্য ভাবে এক জন বৈদ্যের ন্যায় জানিয়া লােকে প্রশংসা করিতেছে ইহা দেখিয়া তিনি ভাবিত হইলেন। অন্তরের উদ্বেগ বশতঃ সে রাত্রিতে তাহার সুনিদ্রা হইল না। রােগীদের শরীর সুস্থ হইলে আত্ম ধৰ্ম্মপথে আসিবে এই আশায় এবং দয়াপরতায় যদিও তিনি অনেকের শুশ্রুষা করিলেন, কিন্তু তাহাতে চিত্তের সন্তোষ জন্মিল না। অনভর রজনী প্রভাত হইতে না হইতে একাকী এক নির্জন প্রদেশে চলিয়া গেলেন; এবং তথায় ধ্যান চিন্তা প্রার্থনায় নিমগ্ন রহিলেন। অসার অনকোলাহল তাহার সব সময় ভাল লাগিত না। এই জন্য কর্মক্ষেত্র পরি- ত্যাগ করিয়া প্রায় মধ্যে মধ্যে গিরিকাননে গিয়া একাকী বসিয়া থাকিতেন এ দিকে শিষ্য চারি জন তাহাকে না দেখিয়া মহা ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। দেশে নগরে চারি দিকে নাম সম্ভ্রম বাহির হইয়াছে, দলে দলে লোক আসি- তেছে, এত যশঃ মান গৌরব উপেক্ষা করিয়া প্রভু এ সময় কোথায় লুকাইয়া রহিলেন? অল্পবুদ্ধি শিষ্যের পক্ষে বাস্তবিকই ইহা বিস্ময়ের বিষয়। অধি- কন্তু পর দিন প্রাতে আবার নূতন নূতন আরাে অনেক রােগী তথায় আসিয়াছিল। তাহারা নিতান্ত ব্যস্ত সমস্ত হইয়া গুরুদেবের অন্বেষণে বাহির হইলেন। পুনরায় তাহাকে কেপারনিয়ামে ফিরাইয়া আনিবেন এই অভিপ্রায়, কিন্তু তাহা হইল না। ঈদৃশ লােকসমারােহ ধর্মসংস্কারকের পক্ষে একটি সামান্য প্রলােভন নহে। কিন্তু বিনষ যাঁহার অঙ্গের ভূষণ, পিতৃসেবাই যাহার একমাত্র ব্রত, অসার নিকোলাহলে তাহার মন মােহিত হয় না। স্বর্গরাজ্য স্থাপনের জন্য তাহার আগমন ইহা পরিষ্কাররূপে ব্যক্ত করিয়া শিষ্যদিগকে বলিলেন, “চল আমরা পার্শ্ববর্তী নগরসমূহে গিয়া ঐরূপে প্রচার করি ; কারণ তজ্জন্যই আমার পৃথিবীতে আসা।” এই কথা বলিয়া তিনি অন্যান্য নগরে প্রচারার্থ গমন করিলেন। যেখানে যান সেইখানেই লােকের মহাজনতা উপস্থিত হয়। সমস্ত সাইরিয়া। প্রদেশে তঁাহার মহিমার কথা বিস্তার হইয়া পড়িল। জুডিয়া জেরুশালম ডেকাপলিস্ এবং অন্যান্য দেশ ও নগর হইতে বহু প্রকারের রােগী আসিতে অনেক রােগীকে আরােগ্য করিয়া এবং শ্রোতৃমণ্ডলীকে সদুপদেশ দিয়া তিনি বহুলােকসঙ্গে এক পর্বতশিখরে জানােহ করিলেন।

পর্বতােপরি উপদেশ অনন্তর দেবাত্মা যিশু গিরিশৃঙ্গে দণ্ডায়মান হইয়া বিশাল ভুদণ্ড প্রসারণ- পুৰ্ব্বক নিম্নলিখিত উপদেশ দ্বারা শত শত লোকের চিত্ত বিমােহিত করেন। “দীনাত্মারা ধন্য, কারণ স্বর্গরাজ্য তাহাদেরই। শােকাত্রেরা ধন্য, কারণ তাহারা সান্ত্বনা পাইবে। সুশীলেরা ধন্য, কারণ তাহারা পৃথিবীর অধিকারী হইবে। ধর্মের জন্য ক্ষুধিত এবং তৃষিত ব্যক্তিরা ধন্য, কারণ তাহারা পরিতৃপ্ত হইবে। দাবানের ন্য, কারণ তাহারা দয়া পাইবে। নিৰ্ম্মলচিত্তেরা ধন্য, কারণ তাহারা ঈশ্বরের দর্শন পাইবে। শান্তিসংস্থা পকেরা ধন্য, কারণ তাহারা ঈশ্বরের সন্তান বলিয়া বিখ্যাত হইবে। ধর্মের জন্য নিপীড়িত ব্যক্তিরা ধন্য, কারণ স্বর্গরাজ্য তাহাদেরই। আমার জন্য লােকেরা যখন প্রতারণাপূৰ্ব্বক তােমাদিগকে নিন্দা ও নির্যাতন করিবে, এবং সকল প্রকার মন্দ কথা বলিবে তখন তােমরা ধন্য হইবে। অতএব আনন্দিত এবং আহলাদিত হও, কেন না স্বর্গধামে তােমাদিগের নিমিত্ত যথেষ্ট পুরস্কার সঞ্চিত আছে। পূর্ব পূৰ্ব্ব সময়ে ভবিষ্যদ্বক্তাগণও এইরূপে নিপীড়িত হইয়াছিলেন। “ধিক্ হে ধনবন্তু ব্যক্তি। যেহেতু তুমি সান্ত্বনা পাইয়াছ। যাহারা এখন পরিতৃপ্ত হইয়াছে তাহারা ক্ষুধার্ত হইবে। যে হাসিতেছে পরে সে শােক করিবে এবং কাদিবে। যাহাদিগকে সকলে ভাল বলে তাহাদিগকে ধিক, কারণ তাহাদিগের পিতা পিতামহগণ ঐরূপে মিথ্যা ভবিষ্যদ্বক্তা- দিগের প্রশংসা করিত। “পিতা যেমন দয়ালু তদ্রুপ দয়ালু হও। অন্যকে দোষী করিও না, তাহা হইলে নিজে দোষী হইবে, ক্ষমা করিলে ক্ষমা পাইবে। “মনে করিও না যে আমি বিধি এবং ভবিষ্যদ্বক্তাদিগকে ধ্বংস করিতে আসিয়াছি। আমি বিনাশ করিতে আসি নাই কিন্তু অভাব পূর্ণ করিতে ঈশাচরিতামৃত। আসিয়াছি। সত্যই আমি তােমাদিগকে কহিতেছি, যে পর্যন্ত সমস্ত বিধি পূর্ণ না হয় তাবৎ উহার কণামাত্রও বিচ্যুত হইবে না। অতএব যে কেহ এই সমস্ত আদেশের সামান্য একটি আদেশও লজন করিবে, কিংবা অন্যকে করিতে শিক্ষা দিবে, তাহারা স্বর্গরাজ্যের মধ্যে হেয়। কিন্তু যে কেহ উহা পালন করিবে এবং অন্যকে করিতে শিক্ষ। দিবে তাহারা শ্রেষ্ঠ হইবে। আমি বলিতেছি, তােমাদের সাধুতা যদি ফিকুশী ও স্কাইবদিগের অপেক্ষা অধিক না হয় তবে কোন ক্রমেই তােমরা স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না। “প্রাচীন শাস্ত্রে কথিত আছে যে, তোমরা নরহত্যা করিও না, কেন না যে কেহ নরহত্যা করিবে সে বিচার কালে সঙ্কটাপন্ন হইবে। কিন্তু আমি বলিতেছি, যে কেহ বিনা কারণে ভাতার প্রতি ক্ৰোধ করিবে, কিংবা যে ব্যক্তি আপনার ভাইকেঅপদার্থ বলিবে তাহারও সেই দশা ঘটিবে। যে আপনার ভাইকে নির্বোধ বলিবে সে নরকাগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হইবে। অতএব পূজাবেদীর নিকট উপহার অর্পণ করিবার সময় যদি স্মরণ হয় যে কোন ভাতার নিকট তুমি অপরাধী অছি, তাহা হইলে অগ্রে গিয়া তাহার সঙ্গে সদ্ভাব স্থাপন কর, পরে বেদীর নিকট উপহার লইয়া আসিও। “তােমরা শুনিয়াছ, কথিত আছে যে তােমরা ব্যভিচার করিবে না। কিন্তু আমি বলিতেছি, যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীলােকের প্রতি মন্দ ভাবে দৃষ্টি পাত করে সে ইতঃপূর্বেই আপনার মনে সেই পাপে অপরাধী হইয়াছে। বদি তােমার • দক্ষিণ চক্ষু পাপ করে তবে তাহাকে উৎপাটন করিয়া ফেল। কেন না সমস্তু শরীর নরকমগ্ন হওয়া অপেক্ষা একটি ইন্দ্রিয় বিনষ্ট হওয়া লাভের বিষয়। দক্ষিণ হস্ত যদি কলঙ্কিত হয় তবে তাহাকেও কাটিয়া ফেলিবে। “তােমরা শুনিয়াছ ইহা কথিত আছে, যে চক্ষুর পরিবর্তে চক্ষু এবং দন্তের পরিবর্তে দন্ত ; কিন্তু আমি বলিতেছি, তােমরা অত্যাচারের প্রতিরােধ করিও না, বরং যে তােমাদের দক্ষিণ গণ্ডে আঘাত করিবে তাহাকে বাম গণ্ড ফিরাইয়া দিবে। যদি কেহ তােমার নামে অভিযােগ করে এবং অঙ্গা-৩ বরণ কাড়িয়া লয়, তাহাকে তােমার উত্তরীয় বসনও দান কর। যদি কেহ ঈশাচরিতামৃত। ৭৭ অন্ধ ক্রোশ পথ তােমাকে লইয়া যাইতে চাহে, তবে তাহার সঙ্গে এক ক্রোশ গমন কর। যে যাচ্ঞা করে তাহাকে দাও। যে ঋণপ্রার্থী তাহাকে ফিরাইও । প্রতিবাসীকে ভালবাস এবং শত্রুকে ঘৃণা কর, এই উপদেশ তােমরা শুনি- মাছ। কিন্তু আমি বলিতেছি, তােমরা শত্ৰুদিগকেও ভালবাস, যাহারা অভিশাপ দেয় তাহাদিগকে আশীর্বাদ কর, যাহারা ঘৃণা করে তাহাদের হিতসাধন কর, এবং যাহারা বিদ্বেষ ও নিপীড়ন করে তাহাদের জন্য প্রার্থনা কর। ইহা হইলে তােমরা স্বৰ্গস্থ পিতার উপযুক্ত সন্তান হইবে। যেহেতু তিনি স্বীয় সূৰ্য্যকে সাধু এবং অসাধু সকলের উপর উদিত করেন, এবং ধার্মিক অধাৰ্মিক সকলের উপরেই বারিবর্ষণ করেন। কারণ যে ব্যক্তি ভালবাসে তাহাকে যদি তুমি ভালবাস তাহাতে আর কি পুরস্কার পাইবে ? চণ্ডালেরও কি তাহা করে না। যদি কেবল আপনার ভাইকে তুমি নমস্কার কর, তাহ, অন্য অপেক্ষা আর অধিক কি হইল ? চণ্ডালেরও কি সেরূপ করে না? অতএব তােমাদের স্বর্গ পিতা যেমন পুর্ণ তােমরাও তেমনি পূর্ণ হও। “লােকদিগকে দেখাইয়া যে দান তৎসম্বন্ধে তােমরা সতর্ক থাক। নতুবা তদ্বিনিময়ে স্বর্গস্থ পিতার নিকট কোন পুরস্কার পাইবে না। কপটে যেমন প্রশংসা পাইবার জন্য রাজপথে এবং ধর্মমন্দিরে দান করে, দানের সময় সেরূপ আপনার অগ্রে ভেরী বাজাইও না। আমি সত্য বলিতেছি, তাহারা এইখানেই পুরস্কার পাইল। কিন্তু যখন তুমি দান করিবে তখন তােমার দক্ষিণ হস্ত যাহা করিতেছে তাহা যেন তােমার বাম হস্ত দানিতে পায়। গোপনে দান কবিবে; তােমার পিতা যিনি গােপনে দেখেন তিনি প্রকাশ্যে পুরস্কার দিবেন। “কপটাচারী লােকেরা উপবাস করিয়া সকলের নিকট বিকৃত শুষ্ক মুখ প্রদর্শন করে। কিন্তু তোমরা যখন উপবাস করিবে তখন মস্তুকে তৈল মাখিবে এবং হস্ত ধৌত করিবে। উপবাসের ক্লেশ কেবল ঈশ্বর দেখুন, তিনি গােপনে দেখিয়া প্রকাশ্যে পুরস্কার দিবেন। “পৃথিবীতে ধন-সঞ্চয় করিও না; তাহা হইলে উহা কীট ও মলিনতা দ্বারা বিনষ্ট হইবে, চোরে চুরি করিবে। যেখানে এ সকল দৌরাত্ম নাই ৭৮ ঈশাচরিতামৃত। না ; সেই স্বর্গলােকে উহা সঞ্চয় কর। কারণ যেখানে তােমার ধন সেইখানে তােমার প্রাণও থাকিবে। “অন্যের বিচার করিও না; তাহা হইলে তােমাকেও বিচারিত হইতে হইবে; কেন না যে বিচার দ্বারা তুমি বিচার করিবে তাহা দ্বারাই তােমাকে বিচারিত হইতে হইবে; এবং যে তুলাযন্ত্রে অন্যকে পরিমাপ করিবে, তারা, তুমিও তুলিত হইবে। ভ্রাতার চক্ষে তৃণখণ্ড দেখিয়া কেন এত ভাবিতেছ ? আপনার চক্ষে বৃহং কাষ্ঠখণ্ড রহিয়াছে তদ্বিষয়ে কেন চিন্তা কর না? নিজ চক্ষে বৃহৎ কাষ্ঠখণ্ড থাকিতে কেমন করিয়া অন্যকে বলিবে, হে ভ্রাত। আইস তােমার চক্ষু হইতে তৃণখণ্ড তুলিয়া দিই ? হে কপট ! অগ্রে নিজের চক্ষু পরিষ্কার কর, তাহা হইলে ভ্রাতার চক্ষু পরিষ্কাররূপে দেখিতে পাইবে। অতএব অন্যের নিকট তুমি যাদৃশ ব্যবহার প্রত্যাশা কর, তাহাদিগের প্রতি তুমি তাদৃশ ব্যবহার কর। “পবিত্র বস্তু কুকুরকে দান করিও না। শুকরের নিকট মুক্তা ছড়াইও কি জানি পাছে তাহার উহা পদ দ্বারা দলন করত শেষ তােমাকেও আঘাত করে। “সঙ্কীর্ণ দ্বার দিয়া প্রবেশ কর, কেন না যে পথ প্রশস্ত এবং যে দ্বার বিস্তৃত তাহা বিনাশের দিকে লইয়া যায় , এবং সেই পথেই অনেক লােক ; আর যে পথ অপ্রশস্ত এবং যে দ্বার সঙ্কীর্ণ তাহা জীবনপথে পরিচালিত করে, এই জন্য তাহাতে অল্প লােক। “আমাকে যাহারা প্রভু প্রভু বলে তাহারা স্বর্গধামে প্রবেশাধিকার পাইবে না, কিন্তু যে আমার পিতার ইচ্ছা পালন করিবে সেই কেবল তথায় যাইতে পারিবে। অনেকে সে দিনে আমাকে বলিবে, প্রভু, আমরা কি তােমার নামে ভবিষ্যদ্বাক্য বলি নাই? ভূত ছাড়াই নাই ? আশ্চৰ্য্য কাৰ্য্য করি নাই ? তখন আমি বলিব, আমি তােমাদিগকে চিনি না। রে পাপ! আমার নিকট হইতে দূর হও ! অতএব যাহারা আমার এ সকল বাক্য শুনিয়া পালন করে তাহাদিগকে আমি সেইরূপ জ্ঞানী মনে করিব, যে ব্যক্তি প্রস্ত রের উপর গৃহ নির্মাণ করিয়াছে। যাহা শুনিয়া পালন করে তাহাদের ঘর বালুরাশির উপর স্থাপিত। যখন প্রবল ঝা, ঈশাচরিতামৃত। বাৰু ৰহিৰে, বারি বর্ষিত হইবে, জলপ্লাবন আসিবে তখন উহা পড়িয়া যাইৰে।” এই সমস্ত মহাবাক্য শ্রবণে শ্রোতৃবর্গ চমৎকৃত হইল এবং বলিতে লাগিল, ইহা অধ্যাপকদিগের মত নহে, ইহাতে মহাশক্তি আছে। উল্লিখিত উপদেশের গভীর মর্ম অধ্যয়ন ও ধারণ করিতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। এক সঙ্গে একাধিক গুরুতর তত্ত্বকথা যে শিষ্যদিগকে বলিয়াছিলেন তাহা বােধ হয় না। কোন্ অবস্থায় কোন্ স্থানে তিনি কি ভাবের উপদেশ দিয়াছিলেন তাহা নিরূপণ করা সুসাধ্য নহে। মথি সমুদায় গুলিকে একত্র বদ্ধ করিয়া “পর্বতােপর উপদেশ” এই নাম দিয়াছেন। ইহার কোন কোন উপদেশ আমরা অবস্থাপযোগী স্থানে সন্নিবিষ্ট করিলাম। মহাত্মা যিশুর অন্তর আদর্শ ক্রমশঃ যেমন যেমন বিকসিত হইয়াছে, তদনুসারে তিনি তাহা ব্যক্ত করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহার কোন উপদেশই আংশিক ভাবে প্রচারিত হয় নাই, যাহা যখন বলিতেন তাহাতে পূর্ণভাব প্রকাশ পাইত। ইহার ভিতর যুক্তি তর্ক নাই, প্রত্যেক কথা যেন তীক্ষ্ণ বাণের ন্যায় সরল।

প্রথম প্রতিঘাত। •• উপদেশ প্রদানপূর্বক পুনরায় তিনি গালিল দেশের গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। যেখানে সেখানে লোকের সমা- রােহ; কেহ দেখিয়া ফিরিয়া যাইতেছে, কেহ বা সঙ্গ লইতেছে, কেহ দূর হইতে দেখিয়া চলিয়া যাইতেছে। জনৈক কুষ্ঠরােগাক্রান্ত মনুষ্য আসিয়া বলিল, “প্রভু, যদি ইচ্ছা হয় তবে আমাকে সুস্থ করুন।” যিশু তাহার দুরবস্থা দর্শনে নিতান্ত দুঃখিত হইয়া তাহাকে স্পর্শ করিলেন। স্পর্শমাত্র সে আরােগ্য হইয়া উঠিল। যিশু বলিয়া দিলেন, “এ কথা তুমি আর কাহা- কেও বলিবে না, কেবল পুরােহিতদিগকে সংবাদ দাও এবং মুসার বিধি, অনুসারে ধর্মমন্দিরে পূজা উপহার অর্পণ কর।” এখনাে পর্যন্ত তিনি প্রাচীন ধৰ্ম্মনিয়মের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দণ্ডায়মান হন নাই এবং ধর্মযাজক- দিগের সহিত সংগ্রাম আরম্ভ করেন নাই। ব্যাধিনিমুক্ত ব্যক্তি আহাদে মত্ত হইয়া যেখানে সেখানে সে কথা ঘােষণা করিল। কোথায় তিনি এ সমস্ত ব্যাপার গােপন রাখিয়া যাহাতে লােকের পরিত্রাণ হয় তজ্জন্য চেষ্টা করিতেছেন, না লােকে তাহার বিপরীত আচরণে প্রবৃত্ত হইল। এখন আর কি আত্মগোপন চলে? যতই নিজগৌরব ঢাকিবার চেষ্টা করিবেন ততই লােকের বিশ্বাস ভক্তি বৃদ্ধি হইবে। বাস্তবিক শেষ এত দূর হইয়া দাড়াইল যে তিনি লােকের ভয়ে প্রকাশ্যরূপে নগরমধ্যে প্রবেশ করিতে কুষ্ঠিত হইতে লাগিলেন। গলিত কুষ্ঠরােগী যিশুর অঙ্গস্পর্শ মাত্র সুস্থ হইল ইহার তাৎপর্য কি ? সম্ভব যে ইত্যগ্রে সে ব্যক্তি আরোগ্যোন্মুখ হইয়াছিল, নতুবা লােকালয়ে তাহার স৮েশুরূ কর ধম দরে হইবে ? শাসনবিধি অনুসারে তখন কুষ্ঠরােগীরা নগরপ্রান্তে স্বতন্ত্র স্থানে বাস করিত, আরাফ লাভ করিলে পরে জনসমাজে প্রবেশাধিকার পাইত। ইহাতেই বুঝা যাইতেছে, অবশ্য ।

। ঈশচরিতামৃত। ৮-১ শারীরিক নিয়মে কতক পরিমাণে ভাল হইয়া তাহার পর যিশুর অঙ্গ- স্পর্শে নবজীবন লাভ করিয়া থাকিবে। এ সম্বন্ধে আমরা আর অধিক আলােচনা করিব না। ইহার পর যেখানে রােগ আরােগ্যের কথা উল্লেখ হইবে, সেখানে বুঝিতে হইবে হয় ঐরূপ কোন অবস্থার যােগাযােগ ছিল, না হয় তাহার ভিতর স্বাস্থ্যজনক কোন আধ্যাত্মিক কারণ ছিল। এ সকল কারণের অভাব হলে পশ্চাদ্বী লেখকগণের অত্যুক্তি বর্ণনা আছে মানিতে হইবে। অন্যান্য নানা স্থান পরিভ্রমণের পর যিশু পুনরায় কেপারনিয়ামে প্রত্যা- গমন করিলেন। লােকেরা তাহাকে দেখিবার জন্য ব্যাকুল হইয়াছিল, যাই শুনিল যে তিনি আসিয়াছেন, অমনি পূৰ্ব্ববৎ দলে দলে আসিয়া তাহাকে ঘেরিয়া ফেলিল। যত প্রকারের রােগী ছিল সমস্ত আসিল। এ যাত্রায় তিনি কেবল এক জন মাত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত রােগীকে আরােগ্য করেন। কথিত আছে লােকের মহা জনতা বশতঃ ঘর দ্বার একবারে রুদ্ধ হইয়া গিয়াছিল। এই জন্য চারি জন বাহুক ঐ রোগীকে ছাদের উপর দিয়া ঘরের ভিতর লইয়া যায়। তদ্দর্শনে যিশু বলিলেন, “তােমার পাপ ক্ষমা হইল।” “যিহুদীধর্মাবলম্বী ইব, সম্প্রদায়ের কয়েক জন ছলদশী লােক তথায় ছিল। তাহারা এই কথা শুনিয়া মনে মনে আন্দো- লন করিতে লাগিল, কেন এ ব্যক্তি ঈশ্বরাবমাননা করিতেছে ? ঈশ্বর ভিন্ন কি কেহ পাপ ক্ষমা করিতে পারে ? তাহাদিগের মনােগত ভাব বুঝিতে পারিয়া যিশু বলিলেন, “তােমার পাপ ক্ষমা হইল এ কথা বলা সহজ; না তুমি উঠ, আপনার শষ্যা লও এবং চলিয়া যাও, ইহা বলা সহজ ?” অনন্তর তিনি রােগীর প্রতি চাহিয়া কহিলেন, “তােমরা অবগত হও যে মনুষ্য- পুত্রের এ পৃথিবীতে পাপ ক্ষমা করিবার শক্তি আছে।” পরে সে রোগী আরােগ্য লাভ করিয়া গৃহে চলিয়া গেল। যিশু যখন দেখিলেন অনেক রােগী সুস্থ হইয়াও স্বর্গরাজ্য বিষয়ে উদা- সীন রহিল, পাপ হইতে মুক্ত হইবার জন্য কেহ আগ্রহ প্রকাশ করে না, তখন তিনি দুঃখিত হইতে লাগিলেন। লােকের জনতা আর তখন তঁাহাকে সুখী করিতে পারিল না। তিনি জানিতেন পাপের অপেক্ষা আর রােগ ;

ঈশাচরিতামৃত কিছু নাই, এই কারণে উক্ত পক্ষাঘাতগ্রস্তকে, “তােমার পাপ ক্ষমা হইল,” এইরূপ বলিলেন। তাহার অন্তরে অবশ্য তিনি ধৰ্ম্মসম্বন্ধে কিছু ব্যাকুল- তার আভাস পাইয়া থাকিবেন। অনেক রােগ অমিতাচারে উৎপন্ন হয় ; এ ব্যক্তি পাপমূলক বােগ হইতে উদ্ধার হইবার জন্য অগ্রে ঈশ্বরকৃপা লাভ করিয়াছিল, পরে যিশু কর্তৃক তাহা পূর্ণতা প্রাপ্ত হইল।. ফ্লিহুদী সমাজে রােগ আর পাপ এক বলিয়া বিবেচিত হইত, তজ্জন্য যিশু রােগীকে “তােমার পাপ ক্ষমা হইল” বলিয়া আশীৰ্বাদ করিতেন। কিন্তু বিশ্বাসী • ভিন্ন কাহাকেও তিনি ভাল করেন নাই। “তােমার বিশ্বাস তােমাকে আরােগ্য করিল” এ কথাও তিনি বলিতেন। এই ঘটনা উপলক্ষে যিশু আপনার মহােচ্চ অধিকার প্রকাশ্যরূপে ব্যক্ত করিয়াছিলেন। অনন্তর সমুদ্রতটে ভ্রমণ করিতে করিতে মথি নামক জনৈক করসংগ্রা- হককে দেখিয়া তিনি বলিলেন, “আমার পশ্চাৎ অনুসরণ কর।” তৎক্ষণাৎ সে তাহার শিষ্যত্ব স্বীকার করিয়া পশ্চাদগামী হইল। যিশুর গুণের কথা অবশ্য সে পূৰ্বেই শুনিয়াছিল। তিনি যে এক জন অসাধারণ ব্যক্তি, ঘৃণিত চণ্ডালকেও গ্রহণ করেন এ কথা তখন অনেকের কর্ণে প্রবিষ্ট হইয়াছে। পাপসংগ্রামে প্রবৃত্ত মহাবীর যিশুর যুদ্ধাস্ত্র যেমন বিনয় ও বিশ্বাস, তেমনি সৈন্যদলও অতি সামান্য শ্রেণীর অজ্ঞাত কুলশাল অজ্ঞ লােক। উন্নত পদস্থ জ্ঞানী ও ধনীদিগের চিত্ত অভিমান ও বিলাসবিষে জর্জরিত, তাহাতে সরলতার মাধুৰ্য্য অতি অল্পই দেখা যায়, সুতরাং যিশুকে তাহাদের আশা ছাড়িয়া অবিকৃতমনা কৃষক ও শ্রমজীবীদিগের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিতে হইয়াছিল। দীন দুঃখী ব্যক্তিরা সাধু, দারিদ্র্য কষ্ট ধর্মের অনুকূল অবস্থা ইহা য়িহুদী সমাজের প্রাচীন সংস্কার। ধনীরা মহাপাপী, ঈশ্বর দুঃখীদিগের সহায় বন্ধু এ বিশ্বাস এক সময় অত্যন্ত প্রবল ছিল, কিন্তু ধৰ্ম্ম- ভিমানী ফিরুশীদিগের কর্তৃক ইদানীং সে বিশ্বাস বিলুপ্ত হইয়া যায়। এ সময় করসংগ্রাহক ব্যক্তিদিগকে উহারা , এতদূর ঘৃণা করিত যে তাহাদিগকে স্পর্শ করিতে চাহিত না;-চোর দ্য নরঘাতক ব্যভিচারীর মধ্যে গণ্য করিত। ট্যাক্স আদায়ের বিল সরকার বা পদাতিক সৰ্ব্বত্রই কৃতান্তের অনুচর বলিয়া প্রসিদ্ধ। যিহুদীর। তাহাদের নামে জ্বলিয়া উঠিত, কাজেই যিশুর আচরণে ঈশাচরিতামৃত। তাহারা আরাে মৰ্ম্মত পাইল। মথি যে দিন শিষ্যপদে অভিষিক্ত হই। লেন সেই দিন যিশু আপনার আশ্রমে এক ভােজের আয়ােজন করেন, তাহাতে যত রাজ্যের হাড়ি ডোম চণ্ডাল নিমন্ত্রিত হয়। দীনের বন্ধু, পাপীর সহায় যিশু তাহাদের সঙ্গে মহানন্দে পান ভােজন করিলেন, অথচ তিনি একজন প্রেরিত ধৰ্মচাৰ্য এ কথা নিজমুখে প্রচার করিয়াছেন। এই বিপরীত ভাব দর্শনে য়িহুদীধৰ্ম্মযাজকগণ মহা ক্রোধান্বিত হইল। জাতিভেদসম্বন্ধে ইহারা ব্রাহ্মণের মত অভিমানী এবং কুসংস্কারপন্ন ছিল। যিশুর উদার ধৰ্ম্মক্ষেত্রে এরূপ সঙ্কীর্ণতা স্থান পাইত না। যে ব্যক্তি পণ্যের অবতার, তাহার নিকট কি সামান্য নীতির অহঙ্কার অগ্রসর হইতে পারে ? তঁাহার পূণ্যপ্রভাবে পতিতা নারী বারাঙ্গনার পর্যন্ত পাপবিমুক্ত হইত। কৃষ্ণকায় শূদ্রমণ্ডলীর মধ্যে দ্বিজরাজ পবিত্র ঈশা, ইহা কি মনোহর দৃশ্য। যেন ধনাবলীর মধ্যে শারদীয় পূর্ণ শশধর বিরাজ করিতেছে। কিন্তু এ স্বর্গীয় দৃশ্য আত্মগৌরবে স্ফীত ফিরুশীদিগের পক্ষে অসহ্য। যাহাদি- গকে তাহারা পদতলে দলিত করিতে চায় তাহারা ধার্মিকের পদে বসিবে ? যিশুকে তদবস্থায় দর্শন করিয়া বিপক্ষে শিষ্যদিগকে জিজ্ঞাসা করিল, “তােমাদের আচার্য কিরূপে এই সকল পাপ চালের সহিত পান ভােজন করিতেছেন ?” যিশু বলিলেন “রােগীর জন্য চিকিৎসকের প্রয়ােজন সুস্থের জন্য নহে, আমি ধাৰ্ম্মিকদিগকে আহ্বান করিতে আসি নাই, পাপীরা যাহাতে অনুতাপ করে তাহার জন্য আসিয়াছি।” জনের কয়েক জন শিষ্যও ঐ দলে ছিল। উভয়ে মিলিত হইয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল, “জ এবং ফিরুশীদিগের শিষ্যেরা ধৰ্মার্থ উপবাস করে, তােমার শিষ্যেরা তাহা কেন করে না?” যিশু বলিলেন, “বরের সঙ্গীরা কি কখন উপবাস করিয়া থাকে ? বর যতক্ষণ তাহাদের সঙ্গে আছে তত ক্ষণ তাহারা উপবাস করিবে কিন্তু সময় আসিবে যখন বরকে স্থানান্তরিত হইতে হইবে, সেই সময় তাহারা উপবাস করিবে। কোন মনুষ্য নৃতন বস্ত্রখণ্ড দ্বারা পুরা- তন পরিচ্ছদের জীর্ণসংস্কার করে না। কারণ নৃতন বস্ত্রখণ্ড বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িলে ছিন্ন স্থান আরো জীর্ণ হইয়া যায়। আরাে বলি, কোন মনু য্য পুরাতন মদ্যপাত্রে নূতন রা রাখে না। কেন না তাহাতে যে না ;

৮৪ ঈশাচরিতামৃত। পাত্ৰ ফাটিয়া সুরা বাহির হইয়া পড়ে। অতএব নূতন অতএব নূতন সুরাকে নিশ্চয় নূতন পাত্রে রাখিতে হইবে। যে পুরাতন সুরা পান করিয়া মত্ত হইয়াছে। সে কি কখন নূতন সুরা পান করিতে চায়?” জনের প্রচারিত ধৰ্ম্মের সহিত ইহার নবধৰ্ম্মের পার্থক্য এ স্থলে পরিব্যক্ত হইল। উভয়ের একত্র সমাবেশ হইতে পারে না, ইহা দৃষ্টান্ত দ্বারা তিনি বুঝাইয়া দিলেন। ফলতঃ যিশুর ধর্ম পূৰ্ব্বপ্রচলিত ধর্মের ন্যায় উপবাস এবং কঠোর কৃচ্ছ সাধনের ধৰ্ম্ম নহে, প্রেমের ধর্ম। একদা বিশ্রাম দিবসে যিশু শিষ্যগণ সমভিব্যাহারে এক শস্যক্ষেত্রের মধ্য দিয়া যাইতেছিলেন। ক্ষুধার্ত শিষ্যগণ শস্যমঞ্জরী তুলিয়া হস্তে দলন পূৰ্ব্বক তাহা আহার করিতে লাগিল। ইহা দেখিয়া ফিরুশীরা বলিল, “দেখ তােমার শিষ্যেরা বিশ্রাম দিনে কেন এমন অবৈধ কৰ্ম্ম করিতেছে ?” যিশু বলিলেন, “তোমরা কি পড় নাই, দাউদ এবং তাঁহার লােকেরা ক্ষুধার্ত হইয়া কি করিয়াছিলেন ? পুরােহিতের প্রাপ্য বেদীর উপকার প্রসাদী রুটা তাহারা বিশ্রামবারে খাইয়াছিলেন। মনুষ্যের জন্যই বিশ্রাম- বার, বিশ্রামবারের জন্য কখন মনুষ্য হয় নাই। অতএব জানিবে, মনুষ্যপুত্র বিশ্রামদিনেরও কৰ্ত্তা।” হেরােদ আন্টিপাস্ এবং য়িহুদী ধর্মযাজকদিগের ষড়যন্ত্র ক্রমে যিশুর পশ্চাতে শত্রুদল এই সময় হইতেই ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করে। তিনি প্রাচীন ধর্মবিধি এবং রাজবিধির বিরুদ্ধে কিরূপ আচরণ করেন তাহার দোষ ধরিবার জন্য ইহারা সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত এবং কোন একটি নূতন ব্যবহার দেখিলেই তর্ক উখাপন করিত। কোন প্রকার ছল কৌশলে তাহাকে বিপাকে ফেলিয়া কারারুদ্ধ বা হত্যা করিতে পারে কি না এই তাহাদের অভিপ্রায় ছিল। এই সময় জাতীয় ধৰ্ম্মের প্রাণহীন অসার কৰ্ম্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যিশু প্রকাশ্য সংগ্রামে দণ্ডায়- মান হন। সদা সর্বদা বহুলােকের সঙ্গে থাকিতেন বলিয়া কেহ কিছু করিতে পারিত না। কিন্তু তাহার নূতনবিধ উপদেশ এবং লােকাচার- বিরুদ্ধ আচরণে ক্রমে ক্রমে চারিদিকে বিদ্বেষাগ্নি জ্বলিয়া উঠিতে লাগিল। নীচ শ্রেণীর লােকের সহিত পান ভোজন, সহবাস, প্রচলিত ধর্মের ঈশাচরিতামৃত। ৮৫ প্রতিকূলাচরণ, অন্তর্ভেদী অকাট্য ধর্মোপদেশ, সাধারণ লোকে উপর অসাধা- রণ আধিপত্য, এ সমস্ত দেখিয়া আর কে নিদ্রা যাইতে পারে ? সুতরাং প্রাচীনতার প্রতিনিধি ফিরুশী ও অধ্যাপকগণ সর্বক্ষণ কুপরামর্শ এবং ছিদ্রান্বেষণে প্রবৃত্ত রহিল। আর এক বিশ্রামবারে তিনি কোন এক বােগীকে আরােগ্য করেন। ইহা দেখিয়া বিরােধীরা বলিল, “বিশ্রামদিবসে এরূপ কাৰ্য কি অবৈধ নয় ?” যিশু উত্তর করিলেন, “বিশ্রামদিনে হিতকর অনুষ্ঠান করা উচিত, . অহিতকর কাৰ্য করা উচিত? কোন ব্যক্তির একটি মেষ যদি বিশ্রাম- দিবসে গহ্বর মধ্যে পতিত হয়, তাহা হইলে সে কি তাহাকে উদ্ধার করে না? তাহা যদি হইল, তবে মনে কর, মেষ অপেক্ষা মনুষ্য কত শ্রেষ্ঠ। বলিদান চাহি না, আমি দয়া করিতে চাহি, এই কথার অর্থ যদি তােমরা জানিতে, তাহা হইলে আর নির্দোষীকে দোষ দিতে না।” এই বাক্য শুনিয়া ফিরু- শীরা যিশুর বিনাশসাধনের জন্য তৎক্ষণাৎ কতিপয় রাজপুরুষের সঙ্গে মন্ত্রণা করিতে লাগিল। যিশু বিশ্রামবারে রােগীকে সুস্থ করিলেন এবং তাহাকে বলিলেন, পুন- রায় আর পাপ করিও না, তাহা হইলে আরও বিপদে পড়িবে। শত্রুদল ইহার প্রতিবাদ করায় তিনি বলিলেন, “আমার পিতা যেমন সৰ্ব্বদা কাৰ্য করিতেছেন আমিও তেমনি করিতেছি।” ঈশ্বরকে পিতা বলিলেন এবং ভঁহার সহিত আপনার অভেদত্ব ব্যক্ত করিলেন তাহাতে উহারা আরাে রােষ প্রকাশ করিল এবং তাহাকে বধ করিবার চেষ্টায় রহিল। অনন্তর যিশু তাহাদিগকে এইরূপ বলিলেন, “পুত্র পিতাকে যেমন, করিতে দেখেন তদ্রুপ তিনি করেন, তিনি আপনা হইতে কিছুই করেন না। কেন না পিতা পুত্রকে ভালবাসেন, এবং তিনি যাহা কিছু করেন সমস্ত আপনার সন্তানকে দেখাইয়া দেন। আরাে মহৎ কাৰ্য্য তিনি তাহাকে দেখাইবেন যাহা দর্শন করিলে তােমরা চমৎকৃত হইবে। পিতা যেমন মৃতকে প্রাণ দেন, পুত্ৰও তেমনি করেন। পিতা স্বয়ং বিচার করেন না, তিনি পুত্রের উপর সে ভার অর্পণ করিয়াছেন। অতএব পিতাকে সকলে যেমন সম্মান করে, তেমনি পুত্রকেও করুক। যে পুত্রকে ; ঈশাচরিতামৃত। মানে না, সে তাকেও মানে না। সত্য সত্যই আমি বলিতেছি, আমার কথা যে শুনে এবং আমার প্রেরয়িতাকে যে বিশ্বাস করে সে নিন্দিত হইবে না, কিন্তু মৃত্যু হইতে অমৃতেতে যাইবে। সময় আসিতেছে এবং আসিয়াছে যখন মৃতেরা মনুষ্যপুত্রের কণ্ঠরব শ্রবণে সঞ্জীবিত হইবে। পিতার অধি- কার এবং জীবন্ত শক্তি পুত্ৰ লাভ করিয়াছেন, তিনি সকলের বিচার করি- বেন। এ কথা শুনিয়া বিস্মিত হইও না, কারণ সময় আসিতেছে যখন সমাধিস্থিত মৃতেরা তাহার বাক্য শুনিবে, এবং সৎকর্মশীল লােকেরা পুন- জ্জীবিত হইবে; কিন্তু কুকৰ্মীরা নরকে প্রবেশ করিবে। আমি আপনা হইতে কিছু করি না, যেমন শুনি তেমনি বিচার করি। আমার বিচার ন্যায়সিদ্ধ, কারণ আমিতাে নিজের ইচ্ছায় চলি না, কেবল পিতার ইচ্ছা অন্বেষণ করি। আমি নিজে যদি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দান, তাহা সত্য হইবে না, আর এক জন আমার সাক্ষী আছেন, তাহার সাক্ষ্যই যথার্থ। জন্ আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়াছেন বটে, কিন্তু তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠ তর প্রমাণ আমার আছে। পিতা আমাকে যে কাৰ্যভার দিয়াছেন, এবং যে কাৰ্য আমি সম্পন্ন করিতেছি, তদ্বারাই প্রমাণিত হইবে যে পিতা আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন। তােমরা তঁাহার রূপও কখন দেখ নাই, তাহার বাক্যও কখন শ্রবণ কর নাই, কিন্তু তিনি স্বয়ং আমার সাক্ষী। তঁাহার বাণী তােমাদের জীবনে স্থান পাইতেছে না, কেন না তােমরা তাহার প্রেরিত সন্তানকে বিশ্বাস কর না। তােমরা ধৰ্ম্মপুস্তকে অনন্ত জীবন অন্বেষণ করিতেছ এবং তাহা দ্বারা আমাকে বুঝিতে চাও; কিন্তু আমার নিকট আসিলে জীবন রক্ষা করিতে পারিতে, তাহা করিলে না। আমি মনুষ্যের নিকট মান সম্রম গ্রহণ করি না, কারণ আমি জানি তােমাদের ভিতর ঈশ্বরপ্ৰেম নাই। আমি আমার পিতার নামে অবতীর্ণ হইলাম তােমরা আমাকে গ্রহণ করিলে না; কিন্তু যদি কেহ নিজের নামে আসে তাহাকে তােমরা গ্রহণ বরিবে। যে ঈশ্বরপ্রদত্ত 'গৌরব অন্বেষণ না করিয়া লােকের নিকট গৌরব, লয় তাহাকে তােমরা কেমন করিয়া বিশ্বাস কর ?” বিশ্রামবারে কোন কাৰ্য্য করিবে না, দুই সহস্র গজের অধিক পথ চলিবে না, ঈশাচরিতামৃত। যিহুদীদিগের এই সাধারণ নিয়ম; কিন্তু যিশু তাহা গ্রাহ্য করিতেন না। এই জন্য গালিল, ও জুডিয়া দেশের নানাস্থানে নানা সময়ে তাহাকে ফিরু- শীদিগের কোপে পড়িতে হইত। য়িহুদী সমাজে তৎকালে অনেক প্রকার অসঙ্গত আচার ব্যবহার প্রচলিত ছিল। বিশ্রামবারে উন জ্বালিবে না। কিন্তু তিন বার ভােজন করিবে। বাড়ী হইতে একটু বাহিরে গেলেই পদ- ধৌত করিয়া গৃহে প্রবেশ করিতে হইবে। যদি জল না পায় তাহার জন্য দুই ক্রোশ পর্যন্ত হাঁটিবে। ভােজ্যপাত্র এবং অঙ্গ মার্জনা, আহার কালীন হস্ত পদাদি ধৌত ইত্যাদি আচার নিয়ম হিন্দুদিগের ন্যায় অত্যন্ত দুলজ্জ্য ছিল। ফিরুশীরা অনেক ধৰ্ম্মাড়ম্বর করিত। পাছে স্ত্রীলােকের প্রতি দৃষ্টি পড়ে এই জন্য চক্ষু মুদ্রিত করিয়া পথে চলিত। সেই অব- স্থায় পথে যাইতে যাইতে কখন কখন প্রাচীর কিংবা গৃহভিত্তিতে আঘাত লাগিয়া ললাট শশাণিতাক্ত হইত। এ সম্বন্ধে ইহার লােকের নিকট উপ- হাসাম্পদ ছিল। দুষ্টলােকদিগের দুরভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া যিশু গালিলের সমুদ্রতটে চলিয়া গেলেন। জুডিয়া, জেরুশালম, সাইডন, টায়ার, প্রভৃতি দেশের বিস্তর লােক সঙ্গে সঙ্গে তথায় গিয়া উপস্থিত হইল। তাহার দেহ এবং বস্ত্রাঞ্চল স্পর্শে রােগ ভাল হয় এই বিশ্বাসে তাহার গায়ের উপর লােকেরা ঝুঁ কিয়া পড়িল। জনতার পেষণে পাছে পড়িয়া যান এই জন্য কোন ব্যক্তিকে এক খানি অর্ণবযান আনিতে আদেশ করিলেন। তাহার উপর আরােহণ করিয়া সকলকে সে দিন উপদেশ দিয়াছিলেন। অনন্তর কেপারনিয়ামে যখন তিনি ধর্মপ্রচার এবং লােকহিতসাধনে নিযুক্ত আছেন সেই সময় এক জন রােমীয় সৈনিক কর্মচারী আসিয়া বলিল, “প্রভু, আমার ভৃত্য পীড়িত হইয়াছে কিন্তু আমার বাড়ী আপনার পদার্পণের যােগ্য নহে; কিন্তু আপনি যদি একটা কথা বলেন তাহা হইলে সে বাঁচিয়া যাইবে।” তাহার দৃঢ় বিশ্বাস দেখিয়া যিশু বলিলেন, “এমন বিশ্বাসী আমি ইস্রায়েলদিগের মধ্যেও দেখি নাই। পূর্ব ও পশ্চিম দেশের বহুশত লোক এব্রার ও আইজে প্রভৃতির সঙ্গে স্বর্গরাজ্যে বাস করিবে, কিন্তু এ রাজ্যের লােকেরা বাহিরে অন্ধকারে পড়িয়া কাদিবে। অতঃপর তিনি সেই ৮৮ ঈশাচরিতামৃত। রােমীয় সেনানায়ককে আশাবাক্য প্রদান করিলেন। তঁাহার বাক্যপ্রভাবে তাহার ভৃত্য আরােগ্য লাভ করিয়াছিল। ইস্রায়েল ব্যতীত অন্য জাতীয় লােকদিগের প্রতিও তঁাহার ভালবাসা ছিল এই ঘটনা দ্বারা তাহা প্রথমে প্রকাশিত হয়। কোন ছদ্মবেশী শত্রু বলিল, “মহাশয়, আপনি যেখানে যাইবেন আমিও আপনার সঙ্গী হইব।” যিশু বলিলেন, “শৃগালদিগের গৰ্ত্ত আছে, পক্ষী- দিগের বাসা আছে, কিন্তু মনুষ্যপুত্রের মস্তক রাখিবার স্থান নাই।” বাস্তবিক পরম বৈরাগী যিশুর এ পৃথিবীতে আশ্রয় স্থান ছিল না, চির দিন তিনি পথের ভিখারী। জনৈক শিষ্য অনুমতি চাহিল “প্রভু, আমার পিতার মৃত্যু হইয়াছে, অগ্রে আমি তাহাকে মৃত্তিকাসাৎ করিয়া আসি।” তিনি বলিলেন, “তুমি আমার সঙ্গে আইস, অগ্রে স্বর্গরাজ্যের সংবাদ ঘােষণা কর, মৃতেরা মৃতকে মৃত্তিকা নিহিত করিবে।” পৃথিবীর অসার কাৰ্য মৃত ব্যক্তিরা করিবে, জীবি- তদিগকে সে জন্য ভাবিতে হইবে না এই তাহার মত ছিল। আর এক জন আসিয়া কহিল, “প্রভু, আমি তােমার সঙ্গী হইব, কিন্তু এক বার বাড়ী গিয়া পরিবারদের নিকট বিদায় লইয়া আসি,” যিশু বলিলেন, “যে ব্যক্তি হলের উপর হস্ত স্থাপনপূৰ্ব্বক ক্ষেত্ৰ কৰ্ষণ করিতে করিতে পশ্চাদ্ভাগে দৃষ্টিপাত করে সে স্বর্গরাজ্যের উপযুক্ত নহে।” কেহ যে বিষয় বুদ্ধি বা পাপের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া পুণ্যাত্মা হইবেন তাহার সুযােগ এখানে ছিল না। যিশুর ধর্ম সমগ্র, এবং অবিভক্ত। অনন্তর তিনি সমুদ্রতটে গিয়া এক অর্ণবপােতে আরােহণপূর্বক ঘুমা- ইতে লাগিলেন। অরণ্যে পৰ্ব্বতে, নগরের পথে পথে নিয়ত ভ্রমণ, সময়ে আহার নিদ্রা নাই, তাহার উপর আবার লােকের বিষম জনতা; এমন সময় ছিল না যে নিশ্চিন্ত হইয়া নিদ্রা যান। কত কত রজনী প্রান্তরে পর্বতে বৃক্ষতলে অতিবাহিত হইত। বাহিরে লােকসমারােহ, বিপক্ষের অত্যাচার এবং আন্দোলন, অন্তরে জ্বলন্ত ধর্মোৎসাহ এবং নব নব ভাবের আবির্ভাব এ অবস্থায় সমস্ত দিন থাকিলে কি মানুষ সুখে নিদ্রা যা পারে ? না তাহার যথা সময়ে পান ভােজনের ব্যবস্থা হয়? নিতান্ত শ্রান্ত হইয়া যিশু, ঈশাচরিতামৃত। ৮৯ ঘুমাইয়া রহিলেন, এ দিকে সমুদ্রে মহা তুফান অরন্ত হইল। ভীষণ তরঙ্গে জলরাশি উন্মত্ত হইয়া প্রতিক্ষণে তর্জন গর্জন করিেেছ, অথচ যিশুর “নদ্রার ব্যাঘাত নাই।' অভয়ার সন্তান জনীর নিপদ ক্রোড়ে নিদ্রিত অাছেন কে তাহাকে ভীত করিতে পারে ? কিন্তু শিষ্যেরা সশঙ্কিত হইয়া বলিতে লাগিল, “প্রভু রক্ষা কর, না আমরা মারা যাই।” যিশু তাহাদিগকে ধমকু দিয়া বলিলেন, রে আর বিশ্বাস, কেন তােমরা এত ভীত হইছে?” ধর্মগ্রন্থে উক্ত অাছে যে তার তাড়নায় ঝটিকা এবং তরঙ্গ প্রশমিত হইল, তাহা দেখিয়া শিষ্যের। অকাফু হইয়া রহিল। কিন্তু আমরা এখানে এই জন্য বিশ্বয়াপন্ন হই যে যিশু তাদৃশ তুফানের মধ্যেও নির্ভয়ে নিদ্রিত ছিলেন। যাহার জীবন মরণ ঈশ্বরের হাতে সে কি কখন ভৌতিক দুর্ঘটনায় চিন্তিত হয় ? অনন্তর যিশু জেনিসারেৎ হ্রদের পরপারে পৌত্তলিক দেশের গ্রামে গ্রামে প্রচার করিতে গেলেন। বহুলােকসমারােহ এবং অদ্ভুত কাৰ্য দর্শনে ভয় পাইয়া গ্যালারি নগরের লােকেরা তাহাকে তথা হইতে প্রস্থান করিতে বলিল। এইরূপে নানা স্থানে পথে ঘাটে প্রান্তরে ধৰ্ম্মমন্দিরে প্রচার করিতে করিতে চলিলেন। লােকের অত্যন্ত জনতা ব্যাকুলতা ও ক্লেশ- স্বীকার দেখিয়া প্রেমিকচূড়ামণি যিশুর হৃদয় ভাবরসে মত্ত হইয়া উঠিত।. চারিদিকের অবস্থা দর্শনে তাহার মনে হইতে লাগিল যেন মেষপালক অভাবে মেষযুথ ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পড়িয়াছে। শিষ্যদিগকে বলিলেন, “দেখ, শস্য বাস্তবিকই প্রচুর; কিন্তু কৃষক অতি অল্প ; অতএব তােমরা শস্য- প্রদাতা প্রভুর নিকট প্রার্থনা কর যেন তিনি শস্যক্ষেত্রে কৃষকদিগকে, প্রেরণ করেন।” ক্রমে প্রচারক্ষেত্র বিস্তৃত হইয়া পড়িল, যিশু একাকী আর পারিয়া উঠিলেন না, আরো প্রচারকের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করিলেন।

শিষ্যনিৰ্বাচন। গালিলের নানা স্থান পরিভ্রমণানন্তর মহর্ষি যিশু একদা এক পৰ্বতশিখরে আরােহণ করিলেন এবং তথায় ধ্যান ও প্রর্থনায় সমস্ত যামিনী অতিবাহিত হইল। একাকী নির্জন গিরিশিখরে যখন তিনি প্রার্থনা ধ্যান ধারণায় নিশা যাপন করিতেন, তৎকালকার অবস্থা স্মরণ করিলেও অন্তরে প্রত্যাদেশের সঞ্চার হয়। আনন্তের বিশাল বক্ষে জীবন্ত নিশ্বাসবায়ু, বহিতেছে, তাহার সুধাময় হিল্লোলে, ব্ৰহ্মতনয় ক্রীড়া করিতেছেন, প্রতিক্ষণে প্রত্যাদেশ সমীরণ তাহার হৃদয়সিন্ধুকে উদ্বেলিত করিয়া তুলিতেছে, এই মহাযােগের মহাভাব আমরা ধারণ করিতে পারি না। পর দিন প্রাতে প্রাতে সাধারণ শ্রোতৃবর্গের মধ্য হইতে দ্বাদশ ব্যক্তিকে শিষ্যপদে বরণ তাহাদিগকে দেশে দেশে পাঠাইয়া দিলেন। দ্বাদশ শিষ্যের নাম যথা,-সাইমন অর্থাৎ পিটার, তস্য ভ্রাতা আঁও, জেমস্, তস্য ভ্রাতা জ, ফিলিপ, বার্থলােমিও, টমাস, মথি, অলিফিয়াসের পুত্র জেমস, লেবিয়া বা থাডিয়া, ক্যামেনাইট, সাইমন, জুডান্সস্কেরিয়ৎ। ইহার। সকলেই প্রায় য়িহুদীকুলসভৃত, কেবল জুডাস্ অন্যদেশীয়। তাহার জন্ম- স্থান জুডিয়া দেশের দক্ষিণ প্রান্তে। মথি কেবল লেখা পড়া জানিতেন। বােধ হয় অনেকেরই স্ত্রী পরিবার ছিল। যিশু এই দ্বাদশ জনকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “দেখ, তোমরা সামেরিটান এবং জেন্টাইদিগের নিকট ন গিয়া বরং ইস্রাযেলবংশীয় পতিত সম্ভানদিগের নিকট গমন কর এই কথা গিয়া সকলকে বলিবে যে স্বর্গরাজ্য নিকটবর্তী। আর রােগীকে সুস্থ এবং মৃতকে জীবন দান করিবে। যেমন মুক্তভাবে গ্রহণ করিয়াছ, তেমনি মুক্তভাবে দান করিতে থাক। স্বর্ণ রৌপ্য পিত্তল ইত্যাদি কোন পদার্থ সঙ্গে লইবে না। পথভ্রমণের নিমিত্ত, ব্যাগ, কি চৰ্ম্মপাদুকা, কি একাধিক অঙ্গাবরণসঙ্গে রাখিবে না। কেবল খড়ম পায়ে দিবে এবং এক { ঈশাচরিতামৃত। ১১ গাছি করিয়া যষ্টি লইবে। যে কেহ কাজ করে যে আহার পাইবার উপ- যুক্ত। যে নগরে বা উপনগরে যাইবে তথায় গিয়া প্রথমে অনুসন্ধান করিবে যােগ্য ব্যক্তি, কে আছে। যে পর্যন্ত অন্যত্র না যাও তাবৎকাল তথায় অবস্থিতি করিবে। গৃহস্বামী ভােজনার্থ যাহা কিছু দিবে তাহা আহার করিবে, তজ্জন্য বাড়ী বাড়ী ফিরবে না। গৃহে প্রবেশ করিয়াই প্রণাম করিবে। যদি সে গৃহ উপযুক্ত হয় তবে তথায় শান্তি বিস্তার করিবে, নতুবা উহা প্রত্যাহরণ করিয়া লইবে। যে নগর কিংবা যে সকল ব্যক্তি তােমাদিগকে গ্রহণ করিবে না এবং তােমাদের কথা শুনিবে না, প্রত্যাগমন কালে সেই সেই স্থানে তােমাদিগের পায়ের ধূলা ঝাড়িয়া দিয়া আসিবে। কিন্তু এ কথা বলিয়া আসিবে যে স্বর্গরাজ্য নিশ্চয় তােমাদিগের নিকট আসিতেছে। সত্য বলিতেছি, বিচারের দিনে আমি সডমু ও গােমরা নগর অপেক্ষা সেই সকল নগয়ের বিপক্ষে অসহিষ্ণু হইব। দেখ ! আমি তোমাদিগকে মেষের ন্যায় জানিয়া ব্যাঘ্রদলের মধ্যে পাঠাইতেছি; তােমরা ভুলঙ্গের ন্যায় বুদ্ধিমান্য এবং কপোতের ন্যায় নিরীহ হইবে। মনুষ্যগণ হইতে সাবধান! কারণ তাহারা তোমাদিগকে বিচারপতিগণের নিকট সমর্পণ করিবে, এবং তাহারা তােমাদিগকে ধৰ্ম্মমন্দিরে কশাঘাত করিবে। কিন্তু যখন তােমরা বিচারালয়ে সমর্পিত হইবে তখন কি বলিবে তদ্বিষয়ে ভাবিও না; কারণ যাহ। কিছু বলিবার আবশ্যক তাহা তখন বলিয়া দেওয়া হইবে। তােমাদের কিছু বলিতে হইবে না, পিতা তােমাদের ভিতরে থাকিয়া কথা কহিবেন। ভাতা ভ্রাতাকে, পিতা পুত্রকে, এবং পুৱ পিতা মাতাকে মৃত্যুমুখে নিক্ষেপ করিবে। তােমরা আমার জন্য সকলের দ্বারা ঘৃণিত হইবে। কি যে শেষ পর্যন্ত সহ্য করিয়া থাকিবে সে রক্ষা পাইবে। যখন কোন নগরে তােমরা নিপীড়িত হইবে তখন অন্য নগরে পলায়ন করিও। গুরু অপেক্ষা শিষ্য এবং প্রভু অপেক্ষা ভৃত্য কখন বড় হইতে পারে না। শিষ্য যদি গুরুর মত, ভৃত্য যদি প্রভুর মত হয় তাহা হইলেই যথেষ্ট। মনুষ্যদিগকে ভয় করিও না, কারণ তোমাদিগের নিকট কিছুই অপ্রচ্ছন্ন থাকিবে না। আমি অন্ধকারে যাহা বলিতেছি তাহা তোমরা আলাকের মধ্যে ঘােষণা কর, এবং যাহা কণে শুনিলে তাহা ছাদের উপর দাড়াইয়া ৯২ ঈশাচরিতামৃত। পৃথিবীকে বল। পর্বতের উপর যে নগর স্থাপিত তাহা কখন অদৃশ্য হয় না। দীপ জালিয়া কেহ করণ্ডিকাতলে রাখে না, কিন্তু দীপাধারের উপরেই রাখে, তাহাতে গৃহের সকলেই আলােক প্রাপ্ত হয়। মনুষ্যদিগের সমক্ষে তােমাদের আলােক উজ্জ্বল হউক, যেন তাহারা তোমাদের সাধুকাৰ্য দেখিয়া তােমাদের স্বর্গ পিতার মহিমা কীৰ্ত্তন করে। যে তোমাদের কথা শুনিবে সে আমার কথা শুনিবে ; যে তোমাদিগকে ঘৃণা করিবে সে আমাকে এবং অামার প্রেরয়িতাকে ঘৃণা কঠিবে। যহর শরীরকে হত করে, কিন্তু আত্মাকে হত করিতে পারে না, তাহাদের জন্য কোন ভয় নাই; কিন্তু যাহার। দেহ অাত্ম। উভয়কে নরক গামা করে তাহাদিগকে ভয় কর। মূল্যে কি দুইটি চটক পক্ষ। বিক্রীত হয় না? কিন্তু জানিও, তাহাদের একটি ও তােমাদের পিতার অগোচরে ভূপতিত হয় না। তিনি তােমাদের প্রত্যেক কেশ গণন: করেন। অতএব ভীত হইও না, তোমরা বহু বহু চটক অপেক্ষ: মূল্যবান্। যাহারা মনুষ্যের নিকট আমাকে করিবে তাহাদিগকে আমি আমার স্বর্গবাসী পিতার নিকট স্বীকার করিব। কিন্তু আমাকে অঙ্গীকার করিলে আমিও অস্বীকার করিব। এমন মনে করিও না যে আমি পৃথিবীতে শান্তি বিস্তার করিতে আসিয়াছি ; শাস্তি নহে, খঙ্গ দিতে আসিয়াছি। কেন না পিতার বিপক্ষে পুত্র, মাতার বিপক্ষে কন্যা, এবং শাশুড়ীর বিপক্ষে পুত্রবধূকে দণ্ডায়মান করিবার জন্য আমার আগমন। আপনার পরিবারস্থ লােকেরাই আপনার শত্রু হইয়া দাঁড়াইবে। যে আপনার পিতা মাতা পুত্র কন্যাকে আমা অপেক্ষা ভাল বাসে সে আমার পথের উপযুক্ত লােক নহে। যে ক্রুশ স্কন্ধে না লইয়া আমার পশ্চাতে আইসে সেও অামার উপযুক্ত নহে। যে ব্যক্তি জীবন অন্বেষণ করে সে তাহা হারাইবে। আমার অনুরােধে যে জীবন বিনাশ করিবে সে তাহা পাইবে। যে তােমাদিগকে গ্রহণ করে সে আমাকেও গ্রহণ করে ; যে আমাকে গ্রহণ করে সে আমার প্রেরণকৰ্ত্তাকেও গ্রহণ করে। একটি শিষ্যের অনুরােধে যে এই সকলের কোন এক জনকে একটু শীতল জল পান করাইবে সে কখন অপুরস্কৃত থাকিবে না।” অনন্তর গুরু আজ্ঞা শিরােধারণপূৰ্ব্বক শিষ্যগণ দেশ দেশান্তরে, চলিয়া ঈশাচরিতামৃত। গেলেন। বিপুল বিপ্ন বাধার মধ্যে সকলে প্রবেশ করিলেন। দুই দুই জন শিষ্য এক সঙ্গে এক এক দিকে গিয়া প্রচার কার্য আরম্ভ করেন। ইহাতে পরস্পরের মধ্যে ভাতৃভাব বৃদ্ধি হইবে এবং বিপদ প্রলোভনে এক জন অপ- রকে সহায়তাও করিতে পারিবেন এই উদ্দেশ্য ছিল। প্রেরিত আচার্যগণ যখন নানা স্থানে প্রচার করিয়া লােকদিগকে স্বমতে আনিতে লাগিলেন তখন সর্বত্র এক মহা আন্দোলন উপস্থিত হইল। হেরােদ আন্টিপাসের কর্ণে এ সংবাদ প্রবিষ্ট হয়। সে যিশুর গৌরব ও মহিমার কথা শুনিয়া তাহাকে দেখিতে চাহিয়াছিল। কিন্তু তিনি কি করিতে • আসিয়াছেন তাহা জানিত না। যােগিবর যিশু ইতঃপূৰ্বে পৰ্ব্বতের উপর যে উপদেশ দিয়াছেন এবং এক্ষণে যাহা দিলেন তারা য়িহুদী ধর্মের মূলদেশে কুঠারাঘাত করা হইল। য়িহদীর: যে পর্গরাজ্য ও প্রেরিত পুরুষের আগমন প্রত্যাশা করিত, যিশুর ধৰ্ম্ম তাহা হইতে সম্পূর্ণ পৃথকৃ। তাহাদিগের আশা ভরসা অভিলাষ সমস্ত পার্থিব সুখ সম্পদে নিবদ্ধ, যিশুর আশাবাক অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক স্বর্গসুখে পরিপূর্ণ। কিন্তু তাহার প্রদর্শিত পথে পদার্পণ করতে গেলে যে সকল বিপণ পরীক্ষা ক্লেশ নি,তন বহন করিতে হইবে তাহ। তিনি শিষ্যদিগের নিকট কিছুই সে পন রাখিলেন না। তাহার ব্যবহার আচরণ, কথা বার্তা কোন প্রকার চাতুরা কৌশল ছিল না, একবারে স্পষ্ট কথা বলিয়া দিতেন। বিষ জধঃ কর্ণে অংশ্য এ সমুদায় স্বর্গীয় বা বিষবৎ প্রতীয়মান হইত, কিন্তু তাহার হয় ন হ অন্যের নিকট ভাল লাগি। যে কয় জন শিষের কম উ: হইয়াছে তাহার মধ্যে পিটার এবং জন্য অপেক্ষাকৃত উৎসাহী এবং বুদ্ধিমা ছিলেন। ইহাসে এই দুই জনই প্রধান; এবং জেমস যিনি ”র বিষপের পদে অষিক্ত হন হাবু মম এবং বিশ্ব ঘাতক জুডার ও সাধারণ্যে পরিচ; ৩ অবশিষ্ট কয়েক জনের নাম এবং কার্য বিখ্যাত নহে। প্রথমায় প্রায় ২ কেহই গ্রেরিত পণের উপযুক্ত ধর্মভাব দেখাইতে পারেন নাই, বরং তাহার বিপরীত ভাবে নিদশই প্রদর্শন করিয়াছেন। নিঃস্বার্থ বৈরাগ্য কি আধ্যত্মিক গভীর 'প্রেম ভক্তি বিশ্বাস এ সকল কিছুই ছিল না বলিলে হয়, কেবল যিশুকে সকল ৯৪ • ঈশাচরিতামৃত । ছিলেন। ভাল বাসিতেন। এখন পর্যন্ত ইহার জাতীয় ব্যবসায় করিতেন এবং মধ্যে মধ্যে প্রচারে ব্রতী থাকিতেন। পার্থিব মুখাভিলাষ এবং স্বার্থপরতা এক এক জনের মনে এত বেশী ছিল যে তাহারা যিশুর রাজসিংহাসনের পাশে স্থান পাইবার জন্য ব্যাকুল হইতেন। পিটার যে রক্ষণশীল দুলমনা তাহা পদে পদে প্রকাশ পাইয়াছে। কিন্তু তিনি উৎসাহী এবং উন্নতমন জনের নাম “বজের সন্তান। ফলে তিনিও বেশ তেজস্বিতা প্রকাশ করিতেন। কিন্তু তাহার গতি স্বর্ণাভিমুখী ছিল না। জুডা ৰে প্রকৃতির লােক, তাহা সকলেই অবগত আছেন। কিন্তু তাহারও শিষ্যপদে অভিষিক্ত হইবার কোন কোন উপযুক্ত ছিল। শিষ্যেরা গৃহ সম্পত্তি পরিবার আত্মীয় এবং জাতীয় ব্যবসায়ের বৈধ সদ্যোগ সম্পূর্ণরূপে এ সময় পরিত্যাগ করেন নাই, কিন্তু তজ্জন্য উন্মুখ ছিলেন। যিশু নূতন অর্থে স্বর্গরাজ্যের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিতেন, আপনাকেও নূতন ভাবে প্রেরিত পুরুষ বলিয়া বুঝিতেন, তথাপি শিষ্যগণ ও অপর লােকেরা পূৰ্ব্বসংস্কারানুসারে ইহার মর্ম গ্রহণ করিত। কিন্তু আশ্চর্য এই, উক্ত দ্বাদশ জন সকল সুখে জলাঞ্জলি দিয়া গুরুদেবের পশ্চাদগামী হইয়াছিলেন। ইহাদিগকে পুরস্কারের অাশা যিশু কি দিতেন ? কেবল কি ত্যাগীকারের লােভে তাহারা প্রমুগ্ধ হইয়াছিলেন ? স্বর্গে প্রচুর পুরস্কার আছে এ কথাও যিশু বলিতেন। এই আশা সকলের জীবনসম্বল ছিল ; তাহার আকর্ষণে উহারা নানা কষ্ট বহন করিতেন। ইস্রায়েল জাতি যেমন দ্বাদশ শ্রেণীতে বিভক্ত, শিষ্য সংখ্যাও তদনুরূপ নিয়ােজিত হয়। প্রথমে স্বজাতির উদ্ধারের জন্য যিশু বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন। অন্যদেশীয় বা অপর জাতির প্রতিও তঁাহার যে স্নেহ মমতা ছিল পরে তাহা প্রকাশ পাইয়াছে। তিনি সমস্ত মানবজাতিকে ঈশ্বরের এক পরিবারভুক্ত বলিয়া জানিতেন, সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণ ভাব এখানে তিষ্ঠিতে পারে নাই। এমন কি শিক্ষিত জ্ঞানাভিমানী য়িহদীদিগের অপেক্ষা জেণ্টা- ইন ও সামেরিটান্ প্রভৃতি পৌত্তলিকদিগের উপর তিনি অধিক আশা করিতেন; কারণ তাহাদের হৃদয় কোমল ও সরল ছিল *। কেহ কেহ বলেন শিশু শিষ্যগণকে প্রচারার্থ দেশ দেশান্তরে প্রচারকার্য্যের বিস্ততি ০ শিষ্যগণের জুডিয়া দেশের নানা স্থানে ভ্রমণ কালে কারারুদ্ধ জন্ যিশুর গৌরবের কথা লােকমুখে শুনিতে পাইলেন। বৃদ্ধ মহর্ষি হাতে গলে শৃঙ্খল- বন্ধ হইয়াও জাতীয় উন্নতির আশাপথ চাহিয়া থাকিতেন। যিশু প্রত্যাশিত মসি কি না তদ্বিষয়ে বােধ হয় তিনি শেষে কিছু সন্দেহ করিতেন, এই নিমিত্ত তঁাহার নিকটে অপনার কয়েক জন শিষ্যকে পাঠাইয়াছিলেন। তাহার। যিশুকে জিজ্ঞাসা করিল, “যাহার আসিবার কথা ছিল তিনিই কি আপনি? না আমরা অপর কোন ব্যক্তির আগমন প্রত্যাশা করিব ?” যিশু বলিলেন, “যাহা তােমরা দেখিলে এবং শুনিলে তাহাই গিয়া বল । অন্ধ চক্ষু পাই- তেছে, মৃত জীবিত হইতেছে, খঞ্জ হটিতেছে, বধির শুনিতেছে, কুষ্ঠরােগী ভাল হইতেছে, এবং দুঃখীদিগের নিকট স্বর্গের নৃতন বিধান প্রচারিত হইতেছে, এই কথা জনকে গিয়া সংবাদ দাও। ধন্য তাহারা যাহারা আমার জন্য কোন মনঃক্ষোভ না পায়।” অনন্তর জনের শিষ্যগণ স্বস্থানে চলিয়া গেলে তিনি পুনরায় বলিতে পাঠাইয়া আপনি কিছু দিন একাকী ছিলেন। এই অবসরে জেরুশালমে যান এবং বেখানি প্রভৃতি স্থানে বাস করেন। প্রচারকার্যে ব্ৰতী হওয়ার পর তিনি প্রায় মধ্যে মধ্যে জেরুশামে বিশেষ বিশেষ পর্পোপলক্ষে যাইতেন এবং তথায় বিপক্ষদলের মধ্যে দাঁড়াইয়া স্বমত প্রচার করিতেন। কিন্তু এ কথা সেন্ট জনের গ্রন্থ ভিন্ন অন্য কোন গ্রন্থে প্রকাশ নাই। তিনি যিশুর প্রথম উদ্যমেই তত্ৰত্য মন্দির আক্রমণের বৃত্তান্ত যাহা সংযােগ করিয়াছেন তাহা সঙ্গত বলিয়া বােধ হয় না। তবে গুপ্তভাবে জেরুষালমে যিশুর পুনঃ পূনঃ যাতায়াত অসৰ নহে।

ঈশাচরিতামৃত। লাগিলেন, “তোমরা ইতঃপূৰ্ব্বে অণমধ্যে কাহাকে দেখিতে গিয়াছিলে ? কোমলবসন পরিধী কোন রাজপুরুষকে? না কোন ভবিষ্যদ্বক্তাকে? নিশ্চয় তোমরা ভবিষ্যদ্বক্তা অপেক্ষা এক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে দেখিতে গিয়া- ছিলে। জনের তুল্য ব্যক্তি নারীগর্ভে আর কখন জন্মে নাই; তথাপি স্বর্গরাজ্যের যে সামান্য ব্যক্তি সেও জন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।” পরে বলিলেন, “জনের সময় হইতে এক্ষণ পর্যন্ত স্বর্গরাজ্য অনেক পীড়ন সহ্য করিয়াছে। হায়! বর্তমান বংশীয় লােকদিগকে আমি কাহায় সঙ্গে তুলনা করব ? বালকেরা বাজারের মধ্যে বসিয়া আপনার সহচরদিগকে , যেমন বলে, আমি বাঁশী বাজাইলাম তােমরা নাচিলে না ; আমি তােমাদের কাছে শেক করলাম তোমরা তজ্জন্য খিদ্যমান হইলে না; উহারা তাহাদিগের মত। জন ভােজন করিতেও আসেন নাই, পান করিতেও আসেন নাই, তথাপি উহারা বলিল, তাহার সঙ্গে ভূত আছে। মনুষ্যপুত্র পান এবং ভােজন করিলেন তাহাতে সকলে বলিল যে এ ব্যক্তি উদরতরী,, মদ্যপায়ী, পাপী এবং অস্পৃশ্য চণ্ডালগের সহিত ইহার বন্ধু তা।” তদনন্তর যে যে স্থানে বিবিধ, আশ্চর্য ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হইয়াছিল অথচ তত্ৰত্য অধিবাসীদিগের মন পরিবর্তিত হয় নাই, দুঃখ ও বিষাদের সহিত সেই সেই নগরকে যিশু ভৎসনা করিতে লাগিলেন। কুটিলবুদ্ধি ফিশীরা আত্মীয়তা দেখাইয়া কোন কৌশলে তাহার মনের কথা বাহির করিয়া লইবে এবং দোষ পাইলে তাহা লইয়া কুতর্ক করিবে এই অভিপ্রায়ে সময়ে সময়ে আপনাদের বাড়ীতে যিশুকে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যাইত। শিশুস্বভাব যিশুর কাহাকেও ভয় নাই ; যে হাত পাতে তাহারি কোলে উঠেন। ডাইন রাক্ষসীর ক্রোড়েও তিনি খেলা করতেন। এক দিন কোন এক ফিরুশীর গৃহে নিমন্ত্রিত হইয়া তিনি ভােজনে বসি আছেন, এমন সময় সেই নগরবাসিনী এক পতিতা নারী আসিয়া তাহার পদতলে উপবেশন পূর্বক রােদন করিতে লাগিল, এবং নয়নজলে তাহার পদযুগল ধৌত কত মস্তকের কেশ দ্বারা তাহা মুছাইয়া চুম্বন করিতে লাগিল, এবং উহাতে সুগন্ধি তৈল মর্দন করিতে লাগিল। কোন বিপথ. গামিনী নারী যদি পূৰ্ব্ব কুঅভ্যাস পরিত্যাগ করে তাহা হইলেও ঈশাচরিতামৃত। ৯৭ কেহ তাহার সহায় হয় না; কিন্তু যিশু এ প্রকার পতিত আত্মাকে অাশ্রয় দিয়া ভাল করিতেন। তঁাহার পবিত্র সহবাসে মহাপাপী শুদ্ধ হইয়া যাইত। দুশ্চরিত্রদিগকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন না, কিন্তু মুক্ত করিতেন। ধৰ্ম্মাভিমানী ফিরুশীরা ইহা দেখিয়া বলিতে লাগিল, “এ ব্যক্তি যদি ভবিষ্যদ্বক্তা হইত, তাহা হইলে কি বুঝিতে পারিত না কিরূপ চরিত্রের স্ত্রীলােক উহাকে স্পর্শ করিতেছে ?” যিশু তখন সাইমন নাম। ঐ গৃহস্বামীকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, তােমাকে একটা কথা বলিতেছি শ্রবণ কর। কোন এক উত্তমর্ণের দুই জন অধমর্ণ ছিল। তাহারা এক জন পাঁচ শত এবং আর এক জন পঞ্চাশ মুদ্রা উহার নিকট ঋণ করে। উত্তমর্ণ যখন শুনিলেন, উহাদের ঋণ শােধ করিবার ক্ষমতা নাই তখন তিনি সরলান্তঃকরণে উভয়কে ক্ষমা করিলেন। এক্ষণে বল দেখি, দুই জনের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি ঐ উত্তমার্ণকে অধিক ভাল বাসিবে ?” সাইমন বলিল, “আমার বােধ হয়, যে ব্যক্তির অধিক ঋণ ছিল সেই তাহাকে অধিক ভাল বাসিবে।" যিশু পুনরায় কহিলেন, “তুমি যথার্থ কথা বলিয়াছ।” অনন্তর স্ত্রীলোকটির পানে চাহিয়া বলিতে লাগিলেন, “এই নারীকে তুমি দেখিতেছ কি ? আমি তােমার বাড়ীতে আসিলাম, তুমি পদধৌতের জন্য একটু জলও দিলে না; কিন্তু এ আমার পদধৌত করিয়া চুল দিয়া তাহা মুছাইয়া দিল। তুমি চুম্বন দিলে না, কিন্তু এই নারী আমি আসিয়াছি অবধি ক্রমাগত আমার পদচুম্বন করিতেছে। তুমি আমার মন্তকে একটু তৈল দিলে না, কিন্তু এ সুগন্ধি তৈল দ্বারা আমার পদসেবা করিল। অতএব যদিও ইহার পাপ অনেক, কিন্তু সে সমস্তই বিদূরিত হইল। কারণ এ নারী যথেষ্ট প্রীতি প্রকাশ করিয়াছে। কিন্তু যাহার অল্প পাপ ক্ষমা করা হইয়াছে সে অল্প প্রেম করিল।” পরে যখন তিনি ঐ নারীকে বলিলেন, “তােমার অপরাধ মার্জনা হইল,” তখন বিরােধীরা বলিয়া উঠিল, “কে এ ব্যক্তি যে পাপকেও ক্ষমা করিতে পারে ?” যিশু বলিলেন, “হে নায়ি, তোমার বিশ্বাস তোমাকে পরিত্রাণ করিল, এক্ষণে তুমি কুশলে প্রস্থান কর।” যে অনুতপ্ত এবং বিশ্বাসী হইয়া তাহার চরণ ধরিয়া কঁাদিত তাহাকেই তিনি এইরূপ আশাৰাক্য ;

ঈশাচরিতামৃত। শুনাইতেন; কিন্তু অপরিবর্তিত দুশ্চারিণীকে তিনি সমাজে তুলিয়া সমাজ- সংস্কারকের প্রশংসা গ্রহণ করিতেন না। উপরিউক্ত স্ত্রীলােকটির নাম মেরী ম্যাগডালিনী। ইহার স্কন্ধে আগে সাতটি ভূত ছিল, যিশু তাহাদিগকে বিদূরিত করেন। ম্যাগ ডালিনী পরমা- সুন্দরী বলিয়া বিখ্যাত। পরে ইনি যিশুর দাসী হইয়া শেষ জীবন স্তুতি পবিত্র ভাবে কৰ্ত্তন করিয়া গিয়াছেন। গুরুদেবের মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। নিজের যে কিছু অর্থ বিত্ত ছিল তাহাও সাধুসেবায় উৎসর্গ করেন। হয়রাদের পরিচারকের স্ত্রী জনা, এবং সনা নাম্নী আর একটা মহিলা এই তিন জন ভক্তি শ্রদ্ধা বিশ্বাস এবং সঞ্চিত অর্থ দ্বারা স্বর্গরাজ্য বিস্তারে বিশেষ সহায়তা করিয়াছিলেন। যিশুর পবিত্ৰপ্ৰভাবে যেমন শত শত পশু নরাধম উদ্ধার হয়, তেমনি কত শত দুশ্চরিত্রা নারীও জীবনূক্তি লাভ করে। বিধাতার সাক্ষাৎ বিশেষ কৃপায় অবিশ্বাসী দেখিয়া যিশু আপনার স্বজা- তীয় লােকদিগকে ভৎসনা করিলেন। তিনি উন্মাদ, ভূতগ্রস্ত, প্রবঞ্চক ইত্যাদি নানা মিথ্যা কথা বলিয়া বিপক্ষে তঁাহার মনঃপীড়ার কারণ হইয়াছিল। তাহারা নানা স্থানে বলিয়া বেড়াইত যিশু কতকগুলি ভূত পুষিয়াছেন এবং ভূতপতি বেজিবা তাহার সহায় ; তাহার সাহায্যে তিনি অদ্ভুত কার্য করেন। ফলতঃ তাহারা যিশুর সাধু সঙ্কল্প একবারে নিস্ফল করিবার চেষ্টা পাইয়াছিল। হতভাগ্যেরা আপনারাও তাহাকে বিশ্বাস করিত না এবং যাহাতে দেশের কোন লোক তাহাকে বিশ্বাস না করে, সকলে পাগল বলিয়া উড়াইয়া দেয় এই অভিপ্রায়ে দুর্ণাম করিয়া বেড়া- ইত। • সংবাদপত্র তখন ছিল না বলিয়া রক্ষা, নতুবা তাহাকে আরো কষ্ট পাইতে হইত। কিন্তু দুর্ণাম অপমানে তাহার ভয় ছিল না, কেবল সরলমতি নির্দোষ মানবকুল দুরাচারীদিগের কুমন্ত্রণায় পড়িয়া পরমার্থ ধনে বঞ্চিত হইতেছে ইহারই জন্য তিনি দুঃখিত হইতেন। ফিরুশীদিগের মিথ্যা প্রবঞ্চনা ও অন্যায় আচরণের প্রতিকুলে যিশু এ সময় প্রকাশ্য সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। তিনি বলিলেন, “ভূতেরা যদি ঘরে ঘরে বিবাদ করে, তাহা হইলে তাহাদের রাজ্য কি বিভক্ত হইয়া ঈশাচরিতামৃত। পড়ে না? সয়তান যদি সয়তানকে দূর করতে চেষ্টা পায়, তাহাতে যে উহা দের ঘর ভাঙ্গিয়া যায় ! আমি যদি ঐশী শক্তি দ্বারা ভূতকে বিদায় করি, তবেই তােমাদের মধ্যে স্বর্গরাজ্য সমাগত হইবে। বলিষ্ঠ গৃহস্বামীকে অর্থে বন্দীভূত না করিয়া কি কেহ তাহার গৃহপ্রবেশপূৰ্ব্বক দ্রব্যাদি বিনষ্ট করিতে পারে? যে আমার সঙ্গী নহে, সে আমার বিরোধী। অামার সঙ্গে যে সংগ্রহ করে না, সে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেয়। অতএব আমি বলিতেছি, মনুষ্যের সকল প্রকার পাপ এবং ঈশ্বরাবমাননার ক্ষমা আছে, মনুষ্যপুত্রের বিরুদ্ধে যে কেহ কিছু বলিবে তাহারাও ক্ষমার যােগ্য, কিন্তু কি ইহকালে কি পরকালে, পবিত্ৰাত্মার বিরুদ্ধে যে পাপ, তাহার ক্ষমা নাই। হা কালসর্পের বংশগণ । তােমরা অধম হইয়া উত্তম কথা কিরূপে বলিবে ? যাহা হৃদয়ে প্রচুর রূপে সঞ্চিত থাকে তাহাই মুখ দিয়া বাহির হয়। উত্তম ব্যক্তি আপনার হৃদয় হইতে উৎকৃষ্ণ বস্তু বাহির করে, এবং অধমেরা আপনার অধম ভাণ্ডার হইতে অধম বস্তু বাহির করে। কিন্তু আমি বলিতেছি, বিচার দিবসে প্রত্যেক বৃথা বচনের জন্য হিসাব দিতে হইবে; কারণ বাক্য দ্বারাই তােমরা দোষী এবং নির্দোষী সাব্যস্ত হইবে।” অনন্তর অালাদ সহকারে বলিলেন, “হে পিতঃ ! হে স্বর্গ এবং পৃথিবীর অধিমি! তােমাকে ধন্যবাদ, যে তুমি এ সকল বিষয় চতুরবুদ্ধি জ্ঞানী- দিগের নিকট প্রচ্ছন্ন রাখিয়া দুগ্ধপোষ্য শিশুদিগের নিকট ব্যক্ত করিয়াছ। কেন না ইহাই তােমার দৃষ্টিতে ভাল বােধ হইয়াছে। আমার পিতার সমুদয় সম্পত্তি আমার হস্তে সমর্পিত হইয়াছে। পিতাকে অতিক্রম করিয়া কেহ পুত্রকে জানিতে পারে না, এবং পুত্রকে ছাড়িয়াও কেহ পিতাকে জানিতে পারে না। হে পরিশ্রান্ত এবং ভারাক্রান্ত ব্যক্তিসকল! আমার নিকট আইস, আমি তােমাদিগকে শান্তি প্রদান করিব। আমার প্রদত্ত ভার তােমরা লও; এবং অবগত হও যে আমি বিনম্র এবং সুশীল ; তাহা হইলে তােমাদের আত্মা শান্তি পাইবে। আমার প্রদত্ত ভার লঘু এবং সহজ।” যিশুর এই সরল মধুর প্রতিবাদ শ্রবণে শত্রুকুল নিতান্ত অপ্রতিভ হইল এবং অপদস্থ হইয়া ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিল। যে অভিসন্ধিতে তাহার যিশুর ১০০ ঈশাচরিতামৃত। পশ্চাতে ফিরিতেছিল তাহা সফল হইল না। তাহাকে কোন প্রকার ছল কৌশলে জনসমাজে অপদস্থ এবং রাজদ্বারে দাহ করিবার জন্য উহারা সদা সৰ্ব্বদা সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত। যাহারা সাধারণ ঈশ্বরের সাধারণ সম্বন্ধ জ্ঞান মাত্ৰ লাভ করিয়া কোন বিষয়ে অপরাধী হয় তাহাদের সে দোষ ক্ষমার যােগ্য। কিন্তু বিধাতার বিশেষ করুণা যখন পবিত্ৰাত্মার আকারে জাতিসাধারণের নিকট স্বগীয় নববিধান প্রচার করে, এবং পাপীদিগকে নরক হইতে তুলিয়া দেবতার আসনে বসায় তখন যদি কেহ তাহাতে অবিশ্বাস সংশয় প্রকাশ করে, তবে তাহার সে পাপের ক্ষমা নাই। এই জন্য যিশু পবিত্ৰাত্মার বিরুদ্ধে পাপা- চারীকে এত ভৎসনা করিতেন। য়িহুদীরা বিধাতার বিধানে এইরূপে বার বার অবহেলা করিয়া শেষে কি দুর্গতিই না ভােগ করিয়াছে। পুনরায় একস্থানে এক দল ফিরুশী অধ্যাপক আসিয়া বলিল, “মহাশয় ! আমরা আপনার নিকট কোন অলৌকিক চিহ্ন দেখিতে ইচ্ছা করি।” যিশু বলিলেন, “ব্যভিচারী নীচ লােকেরাই অলৌকিক চিহ্ন অন্বেষণ করিয়া বেড়ায়, কিন্তু তাহাদিগকে তাহা দেখান হইবে না।” এইরূপে যখন তিনি জনকোলাহলের মধ্যে দাঁড়াইয়া নানা কথার ব্যাখ্যা করিতেছিলেন, সেই সময় এক ব্যক্তি আসিয়া সংবাদ দিল যে “তােমার মাতা ও ভ্রাতৃগণ তােমাকে দেখিবার জন্য প্রতীক্ষা করিতেছেন।” যিশু বলিলেন, “কে আমার মাতা, কেইবা আমার ভ্রাতা ?” অনন্তর শিষ্যদিগের প্রতি হস্ত প্রসারণপূর্বক বলিলেন, “ঐ দেখ ! আমার মাতা এবং ভ্রাতৃগণ। যে কেহ আমার স্বর্গবাসী পিতার ইচ্ছা পালন করে সেই আমার মাতা এবং সেই আমার ভ্রাতা ভগ্নী।” যিশু পাগল হইয়াছেন এবং সর্বদা ভূত প্রেতের সঙ্গে বাস করেন এই মিথ্যা- পবাদ শ্রবণে তদীয় মাতা ও ভাতৃগণ তাহাকে ধরিয়া লইতে আসিয়াছিলেন। বিপক্ষগণ উহাদিগকে আনাইয়া আপনাদের দুরভিসন্ধি সাধনের চেষ্টা করে, কিন্তু চিরকৌমার ব্রতধারী ঈশ্বরসন্তানের নিকট আত্মীয় কুটুম্বের অসার মায়া মমতা অগ্রসর হইতে পারিল না। যাহারা সমবিশ্বাসী, পথের পথিক তাহারা ভিন্ন যিশুর অপর কুটুম্ব কেহ ছিল না। তিনি পার্থিব রক্ত মাংসের সম্বন্ধ একবারে উড়াইয়া দিলেন, সুতরাং বিপক্ষে হতবুদ্ধি হইল ঈশাচরিতামৃত ১০১ অমরপুরবাসী দ্বিজাত্মারা কি সংসারমায়াতে কখন মুগ্ধ হন ? সাধু মহাপুরুষ দিগের উন্মাদ অপবাদ ও এ নূতন নহে। নানক চৈতন্য শাক্য পল সকলেই এই রােগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। বিধানপ্ৰবৰ্ত্তক বিধাতা স্বয়ং উম্মাদ, কাজেই তাহার অনুচর ভূতগণও সেই রােগে আক্রান্ত। কোন ব্যক্তি যদি বিষয় কাৰ্য্যের অবসানে কোন নির্জন প্রদেশে গিয়া দুই এক ঘণ্টার জন্য ধ্যান চিন্তায় মগ্ন থাকে তাহাকেই লােকে পাগল মনে করে, সাধু মহাত্মাদিগের ত কথাই নাই। কিন্তু বিষয়মদে মত্ত সংসারী জীব পাগল, কি সাধু ভক্তের পাগল এ প্রশ্নের মীমাংসা অ্যাপি হইল না। প্রেরিত দ্বাদশ জন শিষ্য নানা স্থানে সুসমাচার প্রচার এবং বহুবিধ অাশ্চর্য ক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া ফিরিয়া আসিলে যিশু তঁাহাদিগকে লইয়া এক নির্জন পার্বত্য প্রদেশে চলিয়া যান, এবং তাহারা কোথায় কি দেখিলেন, কি করিলেন তাহা শুনিবার জন্য কয়েক দিনের নিমিত্ত লোকসঙ্গ পরিত্যাগ করেন। লােকের গণ্ডগােলে সময়ে সময়ে এমন হইত যে আহার নিদ্রা এবং বিশ্রামমুখ সম্ভোগের সমূহ ব্যাঘাত ঘটিত। শিষ্যেরা আহলাদিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, “প্রভাে! আপনার নামের গুণে ভূতের পর্যন্ত আমাদের বাধ্যতা স্বীকার করিয়াছে!” যিশু বলিলেন, “তোমরা সে জন্য আহলাদিত হইয়া বরং এই জন্য আনন্দিত হও যে তােমাদের নাম স্বৰ্গমে লিখিত কয়েক দিন তাহাকে না দেখিতে পাইয়া লােকেরা নিতান্ত অস্থির হইয়া পড়ে। পুনরায় সকলে তাহাকে অন্বেষণ করিয়া বাহির করিল, এবং স্বর্গের সুসংবাদ শুনিয়া পরিতৃপ্ত হইল। কথিত আছে এই সময় যিশু পাঁচ খণ্ড রুটিতে পাঁচ সহস্র ব্যক্তির ক্ষুধা নিবৃত্ত করেন। অনেক দিন পরে তঁাহার মুখের মিষ্ট বচন শুনিয়া পিপাসু শ্রোতাগণ তৃপ্তি লাভ করিল, তদনন্তর সকলে একত্র উপবেশনপূর্বক প্রার্থনা করিয়া আহার করিল ইহাই প্রকৃত ঘটনা। যে ভােজনের মধ্যে যিশু বর্তমান, সেখানে আর আশ্চৰ্য্য রসের অভাব কি? তিনি আধ্যাত্মিক সত্যান্ন বিতরণে ক্ষুধার্তদিগকে সুখী করি- লেন, তাহার পরে প্রার্থনা করিয়া সকলকে ভোজনে বসাইলেন, এরূপ স্থলে 'জড়বুদ্ধি সহজবিশ্বাসী লোকে মনের আনন্দ আর অন্য কিরূপে প্রকাশ করিবে?

১০২ ঈশাতরিতামৃত। সেই জন্য লিখিত আছে, পাঁচ রুটিতে পাঁচ সহস্রের ভােজন। কিন্তু পাঁচ রুটিতে পাঁচ সহস্রের ভােজন কি যিশুর পক্ষে একটি আশ্চর্য কাৰ্য ? পাঁচ রুটীত দূরের কথা, বিনা রুটিতে তিনি লক্ষ লােকের ভােজন দিতে পারেন। তাহার অমৃত বচনে যখন লক্ষ পাপী নামের মন পরিবর্তিত হয়,কপা- কটাক্ষে শত শত নারকী স্বর্গে গমন করে, তখন এ আর একটা কোন সামান্য কথা! যাহারা পাঁচ রুটিতে সহস্রের ভােজন বিশ্বাস করিয়া সন্তুষ্ট থাকে তাহারা নিশ্চয় অল্পবিশ্বাসী। ঘঁহার অঙ্গাচ্ছাদন সংস্পর্শে এবং সদৃষ্টান্তে কঠিন হৃদয় দয়া হিতৈষণায় বিগলিত হইয়া যায় এবং তাহা সৰ্ব্ব- প্রকার ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবৃত্তির কারণ হয়, তঁাহার সম্বন্ধে এরূপ অকিঞ্চিৎকর ঘটনা নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক সন্দেহ নাই।

আখ্যায়িকার আকারে উপদেশ । এক দিন যিশু সমুদ্রের উপকূলে গিয়া বসিলেন, সেখানেও বহুসংখ্যক লোক ক্রমে একত্রিত হইল। অনন্তর এক অর্ণবযানে আরােহণ করিয়া তিনি এই ভাবে উপদেশ দিতে লাগিলেন। “কোন কৃষক শস্য বপন করিবার জন্য ক্ষেত্রে গেল এবং বীজ ছড়াইল। তাহার কতক বীজ পথপার্শ্বে পড়িল এবং আকাশের বিহঙ্গমগণ আসিয়া তাহা খাইয়া ফেলিল। যে সকল বীজ প্রস্তরভূমিতে পড়িয়াছিল তাহারা অঙ্কুরিত হইল বটে, কিন্তু বদ্ধমূল হইতে না হইতে সূর্যতাপে অচিরে শুকাইয়া গেল। কতকগুলি কণ্টকবনে পতিত হইয়া বৃক্ষশাখায় আচ্ছাদিত হইল। কিন্তু যে গুলি উৎকৃষ্ট ভূমিতে পড়িয়াছিল তাহা হইতে শতগুণ ফল ফলিল। যাহার কর্ণ আছে সে শ্রবণ করুক।” শিষ্যের জিজ্ঞাসা করিল, “আৰ্য! আপনি গল্পচ্ছলে কেন উপদেশ দিলেন ?” যিশু বলিলেন স্বর্গরাজ্যের রহস্য তােমরা অবগত আছ, কিন্তু অন্য সকলের নিকট ইহা অপরিজ্ঞাত। ইহাদিগকে এই প্রণালীতে উপদেশ দিতেছি, তাহার কারণ এই যে, ইহারা দেখিয়াও দেখে না, শুনিয়াও শুনে এবং বুঝিতেও পারে না। ইহাদের হৃদয় জড়বৎ কঠিন, কর্ণ অমাড় চক্ষু আবৃত। কোন সময় যদি ইহাদের চৈতন্যোদয় হয় তবে বুঝিবে এবং তখন আমি ইহাদিগকে আরােগ্য করিব। কিন্তু তোমাদের চক্ষু ও কর্ণকে ধন্য! যেহেতু তাহারা দর্শন এবং শ্রবণ করে। আমি সত্যই বলিতেছি, তােমরা যে সকল বিষয় দেখিতেছ এবং শুনিতেছ তাহা দেখিবার এবং শুনি- বার জন্য কত ভবিষ্যদ্বক্তা ও ধার্মিক ব্যক্তি লালায়িত, কিন্তু তাহাদের ভাগ্যে তাহা ঘটিল না। বাবপনের আখ্যায়িকার অর্থ তবে বলি শ্রবণ কর।” “যখন কেহ স্বর্গরাজ্যের কথা শুনিয়াও বুঝিতে পারে না তখন পাপরিপু ১০৪ ঈশাচরিতামৃত। আসিয়া তাহার হৃদয়ক্ষেত্র হইতে বীজ তুলিয়া লইয়া যায়; পথপার্শ্বস্থ ভূমির ন্যায় তাহার জীবন। যে ব্যক্তি কথা শুনিয়া তৎক্ষণাৎ আহাদের সহিত তাহা গ্রহণ করে, কিন্তু অধিক ক্ষণ ধরিয়া রাখিতে পারে না, সুতরাং বিপদ পরীক্ষা আসিলেই অমনি মন ভগ্ন হয়, তাহার জীবন প্রস্তরভূমির ন্যায় অগ- ভীর। যে সাংসারিকতা, ধনস্পৃহা এবং কামাদি রিপু কর্তৃক অধিকৃত তাহার জীবন কন্টকভূমির ন্যায় নিষ্ফল। কিন্তু যে ব্যক্তি ধৰ্ম্মের কথা সরল হৃদয়ে শ্রণ করে এবং তাহা বুঝিয়া পালন করে তাহার জীবন প্রচুর ফলপ্রসবিনী উৰ্ব্বরা ভূমির ন্যায় জানিবে । ‘বে কৃষক উত্তম বীজ ক্ষেত্রে বপন করে স্বর্গরাজ্য তাহারি মত। বীজ বপন করিয়া যখন সে ব্যক্তি রজনীতে নিদ্রিত হইল তখন তাহার শত্রু আসিয়া গােপনে সেই ক্ষেত্রে গােধুম বীজের পার্শ্বে কণ্টকের বীজ বপন করিয়া চলিয়া গেল। কালক্রমে তাহাতে শস্য এবং কণ্টক বৃক্ষ উভয়ই বাড়িয়া উঠিল এবং তাহারা ফলরা হইল। কৃষকের ভৃত্য এতদ্দর্শনে চমৎকৃত হইয়া মনিবকে জিজ্ঞাসা করিল, “মহাশয়, আপনি ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট বীজ বপন করিয়াছিলেন । তবে কন্টকবৃক্ষ কোথা হইতে আসিল ?” কৃষক বলিল, “শত্রুতে ইহা করিয়াছে।” ভৃত্য বলিল, “তবে আমরা উহাদিগকে উৎপাটন করিয়া ফেলি?” কৃষক কহিল, “না তাহা করিও না; কারণ তাহা হইলে কি জানি পাছে কণ্টকের সঙ্গে শস্যবৃক্ষও উনূলিত হইয়া যায়। অতএব যে পর্যন্ত শস্য কর্তনের সময় না আসে তাবৎকাল উভয়কেই বাড়িতে দাও। পরে আমি শস্য কর্তনের সময় ভৃত্যকে বলিয়া দিব যে সে প্রথমে কণ্টকবৃক্ষ সকলকে তুলিয়া এক সঙ্গে বাধিবে; এবং বাধিয়া তাহা অগিতে নিক্ষেপ করিবে; কিন্তু গােম রাশিকে অামার শস্যাগারে রাখিবে।” “আরে বলি, স্বর্গরাজ্য একটি ক্ষুদ্র সর্ষপ বীজের ন্যায়। ইহা অবশ্য সকল বীজের মধ্যে অতিশয় ক্ষুদ্রতম। কিন্তু যখন ইহা রােপিত হইল তখন সৰ্ব্বাপেক্ষা বাড়িয়া উঠিল, এবং একটী বৃক্ষের ন্যায় হইয়া হুঁড়া- ইল। পরিশেষে আকাশের পক্ষীরা আসিয়া ইহার শাখায় বাস করিতে লাগিল। } ঈশাচরিতামৃত ১০৫ “স্বর্গরাজ্য খামিরার ন্যায় । কোন স্ত্রীলােক তাহা ময়দার উপর রাখিল, ক্রমে সমস্ত ময়দার তালের মধ্যে উহা বিস্তৃত হইয়া পড়িল।” এইরূপে যিশু সে দিন দৃষ্টান্ত দ্বারা ক্রমাগত উপদেশ দিতে লাগিলেন। গল্পসকল যেমন সহজবােধ্য, তাহার ধর্মভাব সেইরূপ পরিষ্কার এবং উজ্জ্বল ছিল ; সেই জন্য এত সহজ ভাষায় গল্পের আকারে তাহা তিনি প্রকাশ করিতে পারিতেন। এ সম্বন্ধে তাহার যে অসাধারণ লােকাতীত ক্ষমতা ছিল তাহা পণ্ডিতবর রেনানও স্বীকার করিয়াছেন। বস্তুতঃ স্বগীয় কবিত্বরসে যাহার চিত্ত প্লাবিত হয় সে রূপক ভাষায় দৃষ্টান্ত দ্বারা আপনার হৃদগত ভাব ব্যক্ত করিতে বড় ভাল বাসে। অথবা জীবন্ত ধৰ্ম্মমাত্রেই ঐরূপ কবিত্বের আকার ধারণ করে। কিন্তু কঠোরমনা অরসিক লোকেরা ইহাতে বড় বিরক্ত হয়। তাহাদের রীতি এই যে তাহারা প্রথমে ভাষা ওজন করিবে, শব্দ অনুসন্ধান করিবে, ব্যাকরণ অভিধানের সহিত তাহা মিলা- ইবে, পরে যদি কিছু ভাব প্রকাশ করিবার থাকে তবে তাহাকে কঠিন শব্দনিগড়ে বাঁধিবে, তাহা যদি না থাকে তবে ভাষাচাতুর্যের দ্বারা কাৰ্য্য সাধন করিয়া লইবে। কবিকুলচূড়ামণি যিশুর পথ অন্য প্রকার ছিল। তিনি সুকবি, এই জন্য তঁাহার মুখে আমরা অনেক সুমিষ্ট গল্প শুনিতে পাই। অনন্তর লোকদিগকে বিদায় দিয়া সশিয্য তিনি এক জনপদে প্রবেশ করিলেন। শিষ্যেরা গোপনে জিজ্ঞাসা করিল, “সশ্যক্ষেত্রে কণ্টকর উৎপন্ন হওয়ার অর্থ কি ?” যিশু বলিলেন, “যে উৎকৃষ্ট বীজ বপন করিল সে মনুষ্যপুত্র, পৃথিবী শস্যক্ষেত্র, রাজ্যের সন্তানগণ বীজ, কণ্টকবৃক্ষ পাপের সন্তান, যে শত্রু তাহা বপন করিল সে সয়তান। জগতের অন্তিম কাল শস্য কর্তনের সময়, স্বর্গদূতেরা শস্যকৰ্ত্তনকারী। যেমন কণ্টকবৃক্ষ অগ্নিদগ্ধ হইয়া থাকে, পৃথিবীর অন্তিমকালে তদ্রুপ অবস্থা ঘটিবে। মনুষ্যপুত্র স্বর্গদূতদিগকে পাঠাইবেন। তাহারা আসিয়া তাহার রাজ্য হইতে দুষ্ট এবং পাপীদিগকে একত্রিত করিয়া যেখানে দন্তঘর্ষণ এবং 'আর্তনাদ হয় সেই অনলকুণ্ডে তাহাদিগকে ফেলিয়া দিবে। তখন পুণ্যাত্মারা পিতার রাজ্যে সূর্যের জ্যোতি বিকীর্ণ করিবে। ১৪ ১০৬ ঈশাচরিতামৃত। “স্বর্গরাজ্য এক খণ্ড রত্নগর্ভা ভূমির ন্যায়। কোন মনুষ্য যখন তাহার সন্ধান পাইল তখন সে, সে কথা গােপন রাখিয়া মহা আহাদের সহিত আর আর সমুদয় সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া তাহার মূল্যে উহা ক্রয় করিল। পুনরায় বলি, স্বর্গরাজ্য এক মুক্তাব্যবসায়ী বণিকের ন্যায়। যখন সে মহামূল্যবান কোন মুক্তার অনুসন্ধান প্রাপ্ত হয় তখন সর্বস্ব বিক্রয় করিয়া তাহা ক্রয় করে। “স্বর্গরাজ্য এক খানি জালের ন্যায়। যখন সে জাল সমুদ্রজলে নিক্ষিপ্ত, হয়, তখন তাহাতে নানাবিধ পদার্থ আবদ্ধ হইয়া পড়ে। জাল পরিপূর্ণ হইলে মনুষ্যেরা উহাকে কিনারায় আনে এবং তথায় বসিয়া ভাল ভাল সামগ্রী পাত্রে সঞ্চয় করে, মন্দ গুলি দূরে ফেলিয়া দেয়। পৃথিবীর শেষ দিনে এই ভাবে স্বর্গদূতেরা সৎলোকদিগের মধ্য হইতে অসৎদিগকে পৃথক করিয়া দিবে। এখন কি তােমরা সব বুঝিতে পারিলে?” শিষেরা বলিল, “হ প্রভু, আমরা বুঝিতে পারিলাম।”

গালিল, দেশের শেষক্রিয়া। অনন্তর মহাত্মা যিশু শিষ্যগণ সমভিব্যাহারে স্বীয় জন্মভূমি নাশরথে পুনৰ্ব্বার উপস্থিত হইলেন। স্বদেশের আত্মীয় বন্ধুরা তাহাকে অগ্রাহ করিত বলিয়া সেখানে তিনি যাইতেন না। যখন দেশের নানা স্থানে তদীয় মহিমা গৌরব প্রচারিত এবং প্রতিষ্ঠিত হইল, শত শত লােক পশ্চাৎ অনুসরণ করিল, তখন তিনি জন্মস্থানের এক ধৰ্ম্মমন্দিরে প্রবেশ করত উপদেশ দিতে লাগিলেন। যিশুর অপূর্ব উপদেশ বাক্য শ্রবণে বিস্মিত হইয়া নাশরথীয় অধিবাসিগণ বলিয়া উঠিল, “এ ব্যক্তি কোথা হইতে এ প্রকার জ্ঞান শক্তি লাভ করিয়াছে ? এ কি সেই সূত্রধরের পুত্র নয় ? ইহার জননীর নাম না মেরী? জেম্স, জোজে সাইম জুডাস্ প্রভৃতি কি ইহার ভাই নয় ? ইহার ভগ্নীগণ না আমাদের সঙ্গে রহিয়াছে ? তবে এমন সকল কথা এ কোথায় শিখিল ?" তিনি পরমাত্মজাত ঈশ্বরপুত্র প্রেরিত ধৰ্ম্মাচাৰ্য, ইহা না বুঝিয়া দুঃখী সূত্রধর জোসেফের পুত্র এই ভাবেই সকলে দেখিল, কাজেই মনোমধ্যে ঈর্ষানল জ্বলিয়া উঠিল যাহা তিনি বলিলেন তাহা সকলের হৃদয়কে বিদ্ধ কৰিল, এবং তাহা যে স্বর্গের কথা সে বিষয়ে কাহারাে সংশয় রহিল না; কিন্তু মেরীর ছেলের মুখে কেন এত বড় কথা! শ্রীগৌরাঙ্গকে নবদ্বীপের পণ্ডিতের। যেমন শচীপিসীর ছেলে বলিয়া তাচ্ছিল্য করিতেন, এখানে বাল্যসহচর ও আত্মীয় প্রতিবাসি- গণের হস্তে যিশুর সেই দশা ঘটিয়াছিল। লােকপাবন যিশুর মহত্ত্ব সাধু তাহাদের সহ্য হইল না। হা পরশ্রীকাতর বিদ্বেষী জীব ! মনুষ্যত্বের গৌরব দেখিয়া কেন তােমার মনে আলাদ হয় না? দেশস্থ পরিচিত ব্যক্তিদিগকে ঈর্ষান্বিত এবং ক্ষুব্ধ হইতে দেখিয়া যিশু বলিলেন, “আপ- নার দেশ এবং পরিবার ভিন্ন ভবিষ্যদ্বক্তা কুত্রাপি অপমানিত হয়েন না।” স্বদেশীয় লোকের তাচ্ছিল্য এবং অবহেলা দেখিয়া তিনি শীঘ্রই ১০৮ ঈশাচরিতামৃত। স্থানান্তরে চলিয়া গেলেন। বিশ্বাস ভক্তি না থাকিলে ঈদৃশ মহাত্মাগণের মাহাত্ম্য কে বুঝিতে পারে ? অহঙ্কার এমনি সামগ্রী, যে তাহার অাশ্চর্য গুণগৌরব দেখিয়াও প্রতিবাসীরা তাহা স্বীকার করিতে পারিল না। জলসংস্কারক জন এই সময় হত হন। ঋষি কারাগারে থাকিয়াও এক দিনের জন্য স্বীয় মহত্ত্ব এবং তেজস্বিতা বিসর্জন দেন নাই। দুৰ্ম্মতি আন্টিপাস্ রােমীয় সম্রাটের এক জন চাটুকার ছিল। কাৰ্যোপ- লক্ষে একদা সে রােমনগরে যায়, গিয়া স্বীয় ভ্ৰাতৃভবনে বাস করে। শেষ গৃহে প্রত্যাগমন কালে ভ্রাতৃপত্নীকে হরণ করিয়া লইয়া আইসে। জন্ সময়ে সময়ে যখন রাজসন্নিধানে আনীত হইতেন তখন এই পাপের জন্য নরাধম নৃপতিকে তিরস্কার করিতেন। ইহাতে তাহার মনে ক্লেশ হইত, কিন্তু ভয়ে কিছু করিতে পারিত না। কিন্তু সেই অপহৃতা পত্নীর পক্ষে জনের তীব্র ভৎসনা নিতান্ত অসহ্য হইয়া উঠে। তাহার পূর্ব স্বামিজাত এক যুবতী কন্যা ছিল। সে এক দিন সভাস্থলে নৃত্য করে, তাহাতে রাজার মন বড় সন্তুষ্ট হয়, এবং সে কন্যাকে বলে যে তুমি যাহা চাহিবে তাহাই আমি তােমাকে দিব। রাজকুমারী মাতার কুমন্ত্রণানুসারে এই ইচ্ছা জানা- ইল যে আমি মহর্ষি জনের ছিন্ন মস্তক উপহার লইব। হতভাগ্য হেরােদ তখন মহা বিপদে পড়িল। জন্ এক জন মহা তেজস্বী সাধু পুরুষ বলিয়া তাহার মনে ভয় ছিল। কিন্তু স্ত্রীজিত কাপুরুষের মনে ধৰ্ম্মভয় কতক্ষণ স্থান পায় ? নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষ অনুচর দ্বারা সে ঋষির শিরচ্ছে- দল করে এবং তাহা এক থলের উপর রাখিয়া পাপীয়সী কন্যাকে উপহার দেয়। কিছু দিন পরে সেই ভীরু আটিপাস্ যিশুর মহিমার কথা শুনিয়া স্বীয় জামাত্যবর্গকে বলিয়াছিল, জন, পুনরায় ফিরিয়া আসিয়াছেন। কেন না জনকে হত্যা করিয়া অবধি সে সেই বিষয়ে মনে মনে অনেক আন্দোলন করিত। জন নিহত হইলে তদীয় শিষ্যগণ গুরুদেবের ঔদৈহিক ক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া সেই কথা যিশুকে গিয়া জানাইল। এই শােকাবহ বার্তা শ্রবণে তিনি কোন এক সুদূর মরুদেশে অর্ণবপেতিযােগে চলিয়া গেলেন। অত্যা- চারী নৃপতির আক্রমণ হইতে দূরে অবস্থিতি করাই তখন তঁাহার শ্রেয় - ঈশাচরিতামৃত। ১০৯ বােধ হইয়াছিল।* হইয়াছিল।* তিনি জলপথে যে দেশে গেলেন, বহুলােক ক্রমে ক্রমে পদব্রজে তথায় গিয়া উপস্থিত হইল। পরে জাহাজ হইতে নামিয়া তিনি সকলকে উপদেশ দানে কৃতার্থ করিলেন। শেষ লোক , জন সমস্ত বিদায় হইয়া গেলে একাকী সন্ধ্যার সময় এক পর্বতােপরি প্রার্থনা ও ধ্যানে মগ্ন হন। পূনরায় জেনিসারেৎ ভূভাগে যখন ফিরিয়া আসিলেন তখন আবার চারিদিক হইতে শত শত দর্শক তাহার নিকটে উপস্থিত হইল। বহু- লোকের জনতার মধ্যে এক পীড়িত নারী আরােগ্য কামনায় তঁাহার, পশ্চাদ্ভাগের বস্ত্রাঞ্চল স্পর্শ করিয়াছিল। স্পর্শমাত্র যিশু বুঝিলেন, তাহার দেহ হইতে অপর দেহে দৈবশক্তি সংক্রামিত হইল। প্রেমিক হৃদয় সাধুর প্রাণ এমনি বােধশক্তিবিশিষ্ট যে অঙ্গুলি সংস্পর্শে তাহা উত্তেজিত হইয়া উঠে। তৎক্ষণাৎ অমনি পশ্চাতের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে আমার গাত্রাবরণ স্পর্শ করিল ?” শিষ্যেরা বলিল, তােমার চারিদিকেই লােকের ভিড়, গাত্রম্পর্শের কথা আর কি জিজ্ঞাসা করিতেছ ?” কিন্তু সে নারী যে বিশ্বমহন্তে তঁাহার হৃদয়তন্ত্রী স্পর্শ করিয়াছিল তাহা আর অন্যে কিরূপে বুঝিবে? তিনি তাহাকে বলিলেন, “কন্যা! তােমার বিশ্বাস তােমাকে আরােগ্য করিয়াছে।” তাহার আশীর্বাদ এবং বস্ত্রাঞ্চল স্পর্শে সে নারী নিৰ্বাধি হইয়াছিল। বহুসংখ্যক লােক তিন দিন তিন রাত্রি ক্রমাগত সঙ্গে সঙ্গে ফিরিতেছে, কেহ আর ছাড়িয়া ঘরে যাইতে চাহে না, ইহা দেখিয়া যিশুর মনে বড় দয়া হইল। অতঃপর তিনি সকলকে একত্র বসাইয়া নিজ শিষ্যগণ দ্বারা প্রচুররূপে ভােজন করাইলেন। যিশুর মত সন্ন্যাসী মহদিগকে সাত খণ্ড রুটিতে সাত সহস্র ব্যক্তির উদর শীতল করিতে হয় না। ভােগ্য * সেন্ট জন্য বলেন, যিশু এই সময় আর একবার জেরুশালমের দিকে পলাইয়া যান। যখন যখন অধিকতর বিপক্ষতা দেখিতেন তখন তিনি লুকাইতেন এবং স্থানান্তরিত হইতেন এরূপ আভাস স্থানে স্থানে পাওয়া স্বয়।

১১০ ঈশাচরিতামৃত। সামগ্রীর তাহাদের অভাব কি ? লােকে সুখসেব্য বস্তুরাশি সাধুসেবায় অৰ্পণ করিতে পারিলে কৃতার্থ হয়। আমাদের মহাপ্রভু চৈতন্যের আশ্রমেও কত খাদ্য সামগ্রী সঞ্চিত থাকিত। ভােজনে যেমন মনুষ্য সহজে সন্তুষ্ট হয় এমন আর কিছুতেই নহে। শিষ্য এবং শ্রোতাগণ মহানন্দে ভোজন শেষ করিয়া পরস্পরে বলাবলি করিতে লাগিল, “সত্যই ইনি ভবিষ্যদ্বক্তা।” এই বলিয়া শেষ বলপূর্বক গুরুদেবকে রাজ্যপদে বরণ করিবার জন্য তাহারা ব্যস্ত হইল। যিশু তাহা বুঝিতে পারিয়া একাকী এক পৰ্বতের উপর চলিয়া গেলেন। তিনি দুঃখী জীবদিগের শরীর আত্মা উভয়েরই সেবা করিতেন। কিন্তু তাহার হস্তে যাহারা অনন্তজীবনপ্রদ সত্যান্ন ভােজন করিয়াছে তাহারা আর সে সুস্বাদ জন্মে ভুলিতে পারিবে না। কয়েক দিনের বিচ্ছেদের পর কেপারনিয়মে তাহাকে পাইয়া শিষ্যেরা বলিল, “পণ্ডিত মহাশয়। অাপনি এখানে কখন আসিয়াছেন?” যিশু বলিলেন, “তােমরা যে আশ্চৰ্য ক্রিয়া দর্শনে মােহিত হইয়া আমাকে অম্বে ষণ কর নাই, কেবল রােটিকা ভোজনে পরিতৃপ্ত হইয়াছ বলিয়া অনু- সন্ধান করিতেছ তাহা বুঝিলাম। কিন্তু মরণশীল ভােজ্য বস্তুর জন্য পরিশ্রম করিও না, চিরজীবনের উপজীব্য যে খাদ্য তাহার জন্য পরিশ্রম সে খাদ্য তােমরা মনুষ্যপুত্রের নিকট পাইবে, কারণ তিনি পিতার নিকটে তাহা পাইয়াছেন।” শিষ্যেরা কহিল, “কিরূপ কাৰ্য করিলে আমরা ঈশ্বরের কার্য সম্পন্ন করিতে পারি তাহা বলিয়া দি।” যিশু বলিলেন, “যাহাকে তিনি পাঠাইয়াছেন তাহাকে বিশ্বাস কর, তাহা হইলেই ঈশ্বরের কার্য করা হইবে।” শিষ্যেরা আবার বলিল, “এমন কি নিদর্শন আপনি দেখাইয়াছেন যাহাতে আমরা আপনাকে বিশ্বাস করিতে পারি। শাস্ত্রে কথিত আছে, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা মরুভূমি মধ্যে থাকিয়া স্বর্গচ্যুত অন্ন আহার করিয়াছিলেন। যিশু বলিলেন, “মুসা তােমা দিগকে সে অন্ন স্বর্গ হইতে আনিয়া দেন নাই, আমার পিতা তােমাদিগকে স্বগীয় সত্যায় প্রদান করিতেছেন। কারণ স্বর্গ হইতে অবতীর্ণ হইয়া যিনি পৃথিবীকে জীবন দেন তিনি ঈশ্বরপ্রদত্ত অন্ন।” শিষ্যের কহিল, “প্রভু, ঈশাচরিতামৃত। ১১) চিরকালই কি আপনি আমাদিগকে এই অন্ন দিবেন ?” যিশু বলিলেন: “আমিই জীবনের অন্ন। যে আমার নিকট আসিবে তাহার ক্ষুধা থাকিবে এবং যে আমাকে বিশ্বাস করিবে সে কখন পিপাসার্ত হইবে না। তোমরা আমাকে দেখিলে, তথাপি বিশ্বাস করিলে না। পিতা যাহাকে আনিয়া দিবেন সে আমার নিকট আসিবে, আমি তাহাকে কোনমতে পরিত্যাগ করিব না। আমি আমার নিজের ইচ্ছাধনের জন্য আসি নাই, পিতার ইচ্ছা পূর্ণ করিতে আসিয়াছি। তিনি যাহা দিয়াছেন তাহা হারাই না, শেষের দিনে তাহাকে পুনরায় সমুন্নত করিব।” এ সমস্ত কথা শুনিয়া শত্রুপক্ষীয় য়িহুদীরা বলিতে লাগিল, “এ ব্যক্তি না সেই জোসেফ এবং মেরীর পুত্র যিশু ? তবে স্বর্গ হইতে আসিয়াছি, একথা কেন মুখে আনিতেছে ?” যিশু বলিলেন, “তােমরা কিছু মনে করিও না। পিতার আকর্ষণ ভিন্ন আমার নিকট কেহ আসিতে পারে না। শাস্ত্রে লিখিত আছে, সকলেই ঈশ্বরের দ্বারা শিক্ষিত হইবে; অতএব যে কেহ পিতার নিকট শুনিয়াছে, এবং শিখিয়াছে সেই আমার নিকট আসিবে। ঈশ্বরের লোক ব্যতীত কেহ ঈশ্বরকে দেখিতে পায় না। আমি জীবনের অন্ন। তােমাদের পিতৃপুরুষেরা বনের মধ্যে স্বর্গচ্যুত অন্ন ভােজন করিয়া মরিয়া গিয়াছে, কিন্তু এই অন্ন ভােজন করিলে মনুষ্য মরিবে না। আমি স্বর্গ হইতে সমাগত জীবনপ্রদ অন্ন। আমার মাংসরূপ এই অন্ন ভােজন করিলে পৃথিবী জীবিত হইবে।” য়িহুদীরা বলিতে লাগিল, “নিজের মাংস খাইতে দিবে এ কথার অর্থ কি ? যিশু বলিলেন, “আমার মাংস ভােজন এবং শোণিত পান ব্যতীত তােমরা জীবন পাইবে না। যে আমার মাংস ভােজন এবং 'শােণিত পান করে সে আমাতে বাস করে, এবং আমিও তাহাতে রাস করি। আমি যেমন পিতাতে জীবিত, সেও তেমনি আমাতে জীবিত থাকিবে।” এই রক্ত মাংস পান ভােজনের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক গূঢ় অর্থ আছে তাহা সুলবুদ্ধি জীবের সহজে বােধগম্য হয় না। যিশুর পবিত্র জীবনের সাধুতা রূপ রক্ত মাংস পান ভােজন এখানে বুঝিতে হইবে। অর্থাৎ তাহার সগুণ মহত্ত্ব অনুচরবর্গের এমনি প্রকৃতিগত স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম হইয়া দাড়াইবে যেন তাহা দেহের রক্তমাংসস্বরূপ। যিশুর পবিত্র শােণিত অন্য চরিত্রে প্রবাহিত * ঈশাচরিতামৃত। হইয়া দুইটি আত্মা, ভাব ইচ্ছা রুচি এবং চরিত্রে একীভূত হইলে এই বাক্যের অর্থ বুঝা যায়। সাধুচরিত্রের অনুকরণপ্রয়াসী সাধক এ কথার মর্ম অবগত আছেন। জড়মতি য়িহুদিগণ যিশুর আন্তরিক অভিপ্রায় বুঝিতে না পারিয়া যে তাহাকে পাগল মনে করিয়াছিল ইহা কিছু বিচিত্র নহে। অদ্যাপি এ কথা অনেকের নিকট প্রহেলিকাবৎ মনে হয়। অভেদবাদী আত্মারাম যিশুরন্মহাভাবময়ী উক্তি সকল শুনিতে গল্পের মত, উন্মাদের প্রহেলিকাবৎ প্রলাপ বাক্যের মত। অতি সহজে যেখানে সেখানে যার তার কাছে তিনি ইহা বলিতেন। এমনি ভাবে বলিতেন যেন সকলে জলের মত বুঝিয়া যাইতেছে। কিন্তু ইহার অশ্রুতপূর্ব ভাবার্থ মহাস্বর্গের উপরে উড়িয়া বেড়া- ইত। অল্পমতি জীব ইহা শুনিয়া হাসে, উপহাস করে ; ভাবুক গভীরাত্মা সাধকেরাও ইহা শুনিয়া হাসেন, কিন্তু অন্য ভাবে। এই সমস্তু দুরবগাহ তত্ত্বকথা শুনিয়া শিষ্যেরাও বলিয়া উঠিল, “এ অতি কঠিন কথা, কে ইহা শুনিতে পারে ?” যিশু মৃদু বচনে বলিলেন, “তােমরা কি মনঃপীড়া পাইলে ? আমি আধ্যাত্মিক জীবনের কথা বলিলাম, ইহাতে আত্মা সঞ্জীবিত হয়, মাংসেতে কিছুমাত্র লাভ নাই। আমিত পুর্বেই বলি- য়াছি, পিতা শক্তিসঞ্চার না করিলে কেহ আমার নিকট আসিতে পারে না।” ইহা শ্রবণ করিয়া অনেকগুলি শিষ্য প্রস্থান করিল, অার তাহারা ফিরিল না। তখন শিষ্যবৎসল যিশু অবশিষ্ট দ্বাদশ জনকে অতীব দুঃখের সহিত বলিলেন, “তােমরাও কি চলিয়া যাইবে?” হৃদয়বান্ প্রধান শিষ্য পিটার বলিলেন, “প্রভু, কাহার নিকট আর যাইব? আমরা নিশ্চয় বিশ্বাস করি তুমি জীবন্ত ঈশ্বরের পুত্র পরিত্রাতা যিশু, অনন্ত জীবনের সম্বল।” উপরে আমরা ঈশার যে উপদেশ বিবৃত করিলাম, তদ্বারা স্পষ্ট প্রতিপন্ন হইতেছে যে, অগ্রে ঈশ্বর কোন সদুপায় এবং সাধু গুরু না দেখাইয়া দিলে মনুষ্য তাহা পাইতে পারে না। অতএব পিতার ভিতর দিয়া পুত্রের নিকট উপস্থিত হওয়াই স্বাভাবিক। তিনি শুভ বুদ্ধি প্রেরণ না করিলে তাহার, সাধু পুত্র যিশুকে কে চিনিতে পারে ? যিশু সময়ে সময়ে শত্রুর আক্রমণ হইতে দূরে থাকিতে চেষ্টা করিতেন ইহা অসম্ভব নহে। যাহার পদে পদে শত্রু সে কি কখন অসতর্ক থাকিতে ঈশাচরিতামৃত। ১১৩ *** পারে? একদা কোন পৰ্ব্ব উপলক্ষে তদীয় ভ্রাতৃগণ বলিল, “চল আমরা গালিল পরিত্যাগ করিয়া জুডিয়াতে গমন করি। তুমি যদি আশ্চর্য কৰ্ম্ম করিতে চাও তবে সকলের সম্মুখে তাহা দেখাও, গোপন রাখিলে চলিবে কেন?” ইহাদের মনে তখনও সংশয় অবিশ্বাস ছিল। যিশু তাহা শুনিয়া বলিলেন, “আমার যাইবার সময় এখনও আসে নাই, তােমাদের সময় সর্বদাই প্রস্তুত। পৃথিবী তােমাদিগকে ঘৃণা করিবে না, কিন্তু আমাকে ঘৃণা করিবে কারণ আমি তাহাদের দোষের কথা বলিয়া বেড়াই।” * একদা কোন স্থানে শিষ্যদিগকে অপোত হস্তে রুটী ভোজন করিতে দেখিয়া কুতার্কিক ফিশী ও অধ্যাপকদল বলিতে লাগিল, “কেন তোমার শিষ্যের প্রাচীন প্রথার অন্যথা অাচরণ করিতেছে ? ভােজন পাত্র এবং হস্ত ধৌত না করিয়া কেন তাহারা ভোজন করে ?” অবোধ শিষ্যবৃন্দ বিপক্ষের কোন প্রশ্নের উত্তর করিতে পারিত না। যিশু তাহাদের হইয়া বলিলেন, “তোমরা পিতা মাতাকে অবহেলা করিয়া কেন মুসার বিধি লসন কর ? এবং ঈশ্বরের অজ্ঞা অমান্য কমিয়া কেন নিজেদের মতে চল? শাস্ত্রে ব্যবস্থা আছে, তোমরা পিতা মাতাকে শ্রদ্ধা করিবে; কিন্তু তােমরা পিতৃমাতৃসেবার জন্য কিছু অর্থ দেবমন্দির ধনাগারে গচ্ছিত রাখিয়া পুনরায় আর তাহাদের একবার সংবাদও লও না; মনে কর তারা পুত্রের কর্তব্য শেষ হইল। এই প্রকার আরাে অনেক কাৰ্য তােমরা করিয়া থাক। রে কপটাচারি, তােরা আপনাদের কল্পিত ব্যবহার দ্বারা ঈশ্বরজ্ঞা বিলোপ করিস্ কি জন্য? তবে বলি শ্রবণ কর। বাহির হইতে যে * সেন্ট জন্ বলেন, এই কথার পর যিশু গােপনে জেরুশালমে আবার গিয়াছিলেন। এই তঁহার শেষ বিদায়, ইহার পর আর দেশে ফিরিয়া অাসেন নাই। জনের গ্রন্থে যিশুর উক্ত নগরে তিন বার যাওয়ার কথা আছে। যত বার তিনি তথায় যাইতেন তত বার ফিশী সদুকী ও ধর্ম যাজক দিগকে কপট ধুর্ত বলিয়া তিরস্কার করিতেন। এইজন্য উহারা তাহাকে পুনঃ পুনঃ বধ করিবার চেষ্টা করে এবং তিনিও সেই কারণে লুকাইয়া ঈশাচরিতামৃত। বন্তু ভিতরে যায় তাহা দ্বারা মনুষ্য অশুচি হয় না; কিন্তু যাহা ভিতর হইতে বাহিরে আইসে তাহাতেই তাহাকে কলুষিত করে।” শিষ্যেরা তাহার অর্থ বুঝিতে না পারায় যিশু বলিলেন, “তােমরাও কি অন্যের মত বুদ্ধিহীন ? বুঝিলে না, যাহা কিছু বাহির হইতে ভিতরে প্রবেশ করে তাহাতে মনুষ্যকে অপবিত্র করিতে পারে না; কারণ তাহা হৃদয়ে প্রবিষ্ট হয় না, উদরের মধু, দিয়া বাহিরে চলিয়া যায়। কিন্তু যাহা মনুষ্যের হৃদয় হইতে আইসে তাহ- তেই তাহাকে অপবিত্র করে ; কারণ সেই স্থান হইতে মন্দ চিন্তা ব্যভিচার- লােত প্রতারণাকুটিলতা, ঈশ্বরনিন্দা নীচ বাসনা সমস্ত বহির্গত হয়।” পরে এখান হইতে তিনি সাইড ও টাযার প্রভৃতি পৌত্তলিকদিগের দেশে চলিয়া গেলেন। কেনানিবাসিনী কোন নারী তঁাহার নিকটে কঁদিয়া বলিল, “প্রভু, আমাকে দয়া কর । আমার দুহিতা বায়ুরােগে বড় কষ্ট পাইতেছে।” যিশু প্রথমতঃ সে বাক্যের কোন উত্তর দিলেন না দেখিয়া শিষ্যেরা বলিতে লাগিল, উহাকে বিদায় করিয়া দাও। অতঃপর তিনি বলিলেন, “আমি কেবল ইস্রায়েল বংশীয় পতিত সন্তানদিগের জন্যই প্রেরিত হইয়াছি, অন্যের জন্য নহে। বালকদিগের খাদ্য কুকুরকে দেওয়া অবিধেয়।” নারী কহিল, “প্রভু, তাহা সত্য, কিন্তু প্রভুর পরিত্যক্ত উচ্ছিষ্ট কণিকা কুকুরে খাইয়া থাকে।” অচ্ছ বণে যিশু বলিলেন, “হে নারী, যথেষ্ট তােমার বিশ্বাস। তােমার ইচ্ছা সফল হউক।” উক্ত প্রদেশ হইতে ভিকাপলিসের ভিতর হইয়া পুনরায় তিনি গালি- লের সমুদ্রতটে উপনীত হইলেন, এবং বহুশত ক্ষুধিত আত্মাকে প্রেম বিতরণে পরিতৃপ্ত করত সুখী করিলেন। দর্শক এবং শ্রোতৃবর্গ স্ব স্ব স্থানে প্রত্যাগমন করিলে তিনি অর্ণবপােতারােহণে মাগৃডালা নামক নগরে চলিয়া যান। তথায় ফিরুশী ও সদুকিগণ আসিয়া বলিল, “তুমি আকাশে কিছু আশ্চর্য চিহ্ন দেখাও।” যিশু ‘তদুত্তরে কহিলেন, “সন্ধ্যাকালে আকাশ রক্তিম বর্ণ দেখিলে তােমরা বল, অদ্য বেশ পরিষ্কার দিন; এবং প্রাতে যদি আকাশ আরক্তিম এবং নিম্নগামী হয় তদ্দর্শনে বল, যে অদ্য দুৰ্যোগ হইবে। হে কপটীসকল! তোমরা আকাশের অবস্থা নির্ধারণ করিতে পার, আর সময়ের চিহ্ন দেখিয়া তাহা বুঝিতে পার না? দুরাত্মা ব্যভিচারীরা কেবল ৫ ঈশাচরিতামৃত। আশ্চৰ্য্য চিহ্ন দেখতে চায়; কিন্তু তাহাদিগকে কোন চিহ্ন দেখান হইবে না।” এ স্থলে যিশু উহাদিগের নিকট পূৰ্বোল্লিখিত কোন অদ্ভুত কার্যের কথা না বলিয়া সময়ের চিহ্ন দেখিতে বলিলেন কেন? স্বভাববিরুদ্ধ কোন অলৌকিক নিদর্শনের উপর তিনি কিছু মাত্র গুরুত্ব স্থাপন করিতেন না এই জন্য। সমুদ্রজলের উপর পদব্রজে গমন, বায়ুকে ধমক দেওয়া, পাঁচ খণ্ড রুটিতে পাঁচ সহস্রের ভােজন, উংকট রােগ আরােগ্য করণ এ সকল অবশ্য অলৌকিক শক্তির প্রমাণ, কিন্তু শত্রুমণ্ডলীকে তিনি ইহার একটা কথাও বলিলেন না। উহাদের প্রশ্ন উত্থাপন কেবল তাহাকে বিপাকে ফেলিবার জন্য, কিন্তু তাহা বিফল হইয়া গেল। তখন উহারা অন্য প্রকার অসদুপায় অন্বেষণ করিতে লাগিল। অনন্তর তথা হইতে তিনি সমুদ্রের অপর পারে চলিয়া গেলেন। যাইতে যাইতে শিষ্যদিগকে বলিলেন, “তোমরা ফিরুশী ও সদুকীদিগের খামিরার সম্বন্ধে সাবধান থাকিবে। ইহা শুনিয়া সকলে মনে করিল, সঙ্গে আহারােপযোগী রুটী আনা হয় নাই তাহাই বুঝি প্রভু বলিতেছেন! যিশু বলিলেন, “হে অল্পবিশ্বাসিগণ ! রুটীর বিষয়ে কেন তােমরা আলােচনা কতেছ ?” তখন সকলে বুঝিল যে বিপক্ষদিগের ধর্মমত সম্বন্ধে সাবধান হইতে হইবে। তদনন্তর তিনি সিজারিয়া ফিলিপি নামক স্থানে পৌছিয়া শিষ্যদিগকে বলিলেন, “লােকে আমার সম্বন্ধে কে কি বলে ?' হার। উত্তর করিল, “কাহারো মতে তুমি জন্, কেহ মনে করে তুমি এলিয়াস, কেহ জেরিমায়া, কেহবা অন্য কিছু।” যিশু কহিলেন, “তােমরা কি বল ?” তাহাতে প্রধান শিষ্য পিটার বলিলেন, “তুমি জীবন্ত ঈশ্বরের পুত্র খীষ্ট” ইহা শুনিয়া যিশু পিটারকে আশীর্বাদ করিলেন এবং তাহাকে সাপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান পূৰ্ব্বক বলিলেন, “ইহা অস্থি মাংসের দ্বারা তােমার নিকট প্রকাশিত হয় নাই, স্বর্গস্থ পিতা তােমাকে ইহা বলিয়া দিয়াছেন। এ কথা তোমরা অপর কোন লােকের নিকট ব্য করিও না।” পরে বলিতে লাগিলেন, “মনুষ্যপুত্রকে অনেক সহ্য করিতে হইবে। প্রধানেরা এবং ধৰ্ম্মযাজকের হাকে পরিত্যাগ করিবে, তিনি হত হইবেন এবং তিন দিন পরে পুনরায় D । ঈশাচরিতামৃত। উঠিবেন।” পিটার তাহা শুনিয়া তাহাকে ধমূকাইয়া বলিল, “সে কি কথা। ঈশ্বর করুন যেন তাহা না হয় !” এ প্রকার মমতার অনুযােগ যিশুর পক্ষে একটি প্রলোভন পরীক্ষা। তিনি পিটারকে ধমক দিয়া বলিলেন, “দূর হও সয়তান ! আমার সম্মুখ হইতে চলিয়া যাও ! ঈশ্বরের বিধান তােমার ভাল লাগে না, কেবল মনুষ্যের বিধান ভাল লাগে ? আমার সঙ্গে যে আসিতে, চায় সে আপনাকে অস্বীকার করুক এবং স্কন্ধে কুশভার লউক ! কারণ যে কেহ আপন জীবন রক্ষা করিবে সে তাহা হারাইবে; কিন্তু যে আমার এবং বিধানের অনুরােধে ইহা হারাইবে সে বাঁচিয়া যাইবে। আত্মার পরিবর্তে যদি সমস্ত ভূমণ্ডল প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহাতে লাভ কি? অতএব এই পাপী ব্যভিচারী বংশের মধ্যে যে ব্যক্তি আমার এবং আমার মুখবিনিঃসৃত বচনের জন্য লজ্জিত হইবে, পিতার গৌরব এবং পবিত্র স্বর্গদূতগণে বেষ্টিত হইয়া মনুষ্যপুত্র যখন আসিবেন তখন তিনিও তাহাদিগের সম্বন্ধে লজ্জিত হইবেন। অামি যথার্থ বলিতেছি, তােমাদের ভিতরে কয়েক জন স্বর্গরাজ্যের মহিমা না দেখিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইবে না। এখানে ভাবী মৃত্যুর কথা যিশু যাহা বলিলেন তাহা শিষ্যেরা ভাল বুঝিতে পারিল না। ভয়প্রযুক্ত সাহস করিয়া সে কথার অর্থ কেহ জানিতেও চাহিল না। পিটারের উত্তর শুনিয়া যিশু এই জন্য তঁাহাকে আশীৰ্ব্বাদ করিলেন যে তিনি স্বীয় আচাৰ্য- দেবের মহত্ত্ব কিছু বুঝিতে পারিয়াছিলেন। প্রচলিত সাধারণ সংস্কার- মতে তিনি রাজা, শাসনকর্তা, প্রজাতির পার্থিব গৌরব স্থাপয়িতা। পিটার যদিও ইহার বিপরীত কথা বলিলেন, কিন্তু যিশুর মহিমা তিনিও সম্পূর্ণরূপে বুঝিতে সক্ষম হন নাই। তঁাহার যে মহৎ ব্রত তাহার শেষ পুরস্কার মৃত্যু, এবং সেই মৃত্যুই জয়ের কারণ, ইহা দিব্যজ্ঞানে তাহার বােধগম্য হইয়াছিল। চারিদিকের প্রতিকূল অশুভ চিহু দর্শনে তিনি ভাবীবিপদের কথা বলেন, কিন্তু পিটার তাহা মানবীয় ভাবে গ্রহণ করত মায়ামুগ্ধ জীবের ন্যায় প্রভুকে অনুযোগ করিল এবং তজ্জন্য ধমক খাইল। এই ঘটনার ছয় দিবস পরে যিশু, পিটার জেমস এবং জনকে সঙ্গে লইয়া যামিনীষােগে এক দূরস্থিত পৰ্ব্বতােপরি অারোহণ করিলেন। এই তিন জন শিষ্য তাহার বিশেষ প্রিয় ছিল । গুপ্ত কথা ইহাদিগকেই বলিতেন। মুগা, ঈশাচরিতামৃত। ১১৭ এবং ইলায়ামের সহিত প্রেমযােগে মিলিত হইয়া বিশু এখানে এমন এক অপূৰ্ব এ ধারণ করিলেন, বােধ হইল যেন তিনি রূপান্তরিত হইয়াছেন। তাহার মুখমণ্ডলে শুভ সূর্যরশ্মি বিকীর্ণ হইয়া পড়িল, অঙ্গের বসন তুষার- মণ্ডিত ধবল অচলের ন্যায় দীপ্তি পাইতে লাগিল এবং অন্তরীক্ষে এই দৈববাণী হইল যে, “ইনি আমার প্রিয় পুত্র, ইহাতে আমি পরম সন্তুষ্ট তােমরা ইহার বাক্য শ্রবণ কর।” শিষ্য তিন জন প্রগাঢ় নিদ্রায় অচেতন প্রায় ছিল, সহসা নিদ্রাভঙ্গে এই বিচিত্রমূর্তি দর্শন করিয়া স্তম্ভিত হইল। তাহাদের বােধ হইল যেন মুসা এবং ইলায়াস্ যিশুর পার্শ্বে দণ্ডায়মান রুহি- আছেন। বস্তুতঃ তথায় যিশু ভিন্ন আর কেহ ছিল না। পরলােকগামী অমর আত্মার সহিত ইহলােকবাসী ধর্মপ্রবর্তকের যে আধ্যাত্মিক মিলন তাহারি আভাস এই ঘটনায় প্রাপ্ত হওয়া যায়। উন্নতমনা মহাপুরুষেরা যখন পৃথিবীতে আপনার ভাবের সমভাবী সহৃদয় বন্ধু না পাইয়া বিষাদিত হন, তখন স্বর্গের দেবতাগণ তাঁহাদের সাধু সঙ্কল্পের সহিত সহানুভূতি করেন। তৎকালে বিধানপ্রবর্তক সাধুর অন্তর্নিহিত স্বগীয় আদর্শ সমুজ্জ্বলিত হইয়া উঠে। ইহা বাহ্যদর্শন নহে, আত্মার যোগ, ইচ্ছা ও ভাবের সম্মি- লন। পরলোকগত ইলয়াসের সম্বন্ধে শিষ্যদিগের মনে যে মিথ্যা সংস্কার ছিল তাহা এই সময় কিছু পরিমাণে অপনীত হয়। সাধারণ বিশ্বাস এই, স্বর্গ হইতে যে প্রেরিত পুরুষ স্বজাতির উদ্ধারের জন্য আসিবেন তিনি পার্থিব ক্ষমতায় সর্বোপরি। তিনি দাউদ নরপতির বংশে বেথাল- হেম নগরে জন্ম গ্রহণ করিবেন। তাহার আগমনের পূর্বে ইলায় আসিয়া সকলকে সংবাদ দিবে। যিশু সেরূপ রাজক্ষমতাশালী মহাপুরুষও নহেন, ইয়াসের সঙ্গে তাহার সে প্রকার সম্বন্ধও নহে। গৌরবের পরি- বর্তে অপমান ঘৃণা, ক্ষমতা এবং প্রভুত্বের পরিবর্তে মৃত্যু তঁাহার অদৃষ্টে লেখা অাছে ইহা বুঝিয়া তদনুসারে তিনি প্রস্তুত হইতে লাগিলেন এবং তাহা প্রকাশ করত সহচরগণের ভ্রান্তি দূর করিলেন। পৰ্বত হইতে নামিয়া আসিলে বহুলােক সমবেত হইল। এক জন বলিল, “প্রভু, আমি আমার পীড়িত সন্তানকে তােমার শিষ্যদিগের নিকটে আনিয়াছিলাম, কিন্তু কেহ তাহাকে ভাল করিতে পারিল না।” তাহ ১১৮ ঈশাচরিতামৃত। শুনিয়া যিশু বলিলেন, “হে বিশ্বাসহীন বিকৃতমনা লোকসকল! আমি আর কত দিন তােমাদের সঙ্গে থাকিব?” এই বলিয়া সেই রোগীকে রােগগামুক্ত করিলেন। শিষ্যেরা গোপনে জিজ্ঞাসা করিল, “প্রভু, কেন আমরা ভাল করিতে পারিলাম না?" যিশু বলিলেন, “তােমাদের অবিশ্বাসের জন্য। যদি সর্ষপ কণার ন্যায় তােমাদের বিশ্বাস থাকে, তাহা হইলে এই পৰ্ব্বতকে বল যে স্থানান্তরিত হও, অমনি সে স্থানান্তরিত হইবে, এবং তােমাদের দ্বারা কিছুই আর অসম্ভব থাকিবে না।” ইহা কহিয়া পুনৰ্ব্বার ভবিষ্যৎ , দুর্ঘটনার কথা ব্যক্ত করিলেন। অতঃপর সকলে কেপারনিয়ামে ফিরিয়া আসিলে, কয়েক জন কর- সংগ্রাহক পিটারকে বলিল, “তােমাদের গুরু কি রাজস্ব দেন না ?” সে কথা পিটার যিশুকে অবগত করিবা মাত্র তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “রাজারা কাহার নিকট টোলট্যাক্স আদায় করে ? আপনার প্রজার নিকট, না বৈদেশিকের নিকট ?” পিটার বলিলেন, “বৈদেশিকের নিকট ।” যিশু বলিলেন, “তবে দেশীয় লােকেরা তাহা হইতে বিমুক্ত। তথাপি তুমি সমুদ্রে যাও, গিয়া একটি মৎস্য ধরিয়া আন এবং তাহা হইতে উহা- দিগকে ট্যাক্স প্রদান কর।” এই সময় শিষ্যেরা জিজ্ঞাসা করিল, “স্বর্গরাজ্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কোন ব্যক্তি ?” যিশু বলিলেন, “তােমাদের মধ্যে যে সকলের জ্যেষ্ঠ হইতে চায় সে কনিষ্ঠ হউক, এবং সকলের ভৃত্য হউক।” পরে তিনি এক শিশু সন্তানকে লইয়া সকলের মধ্যস্থলে বসাইলেন এবং বলিতে লাগি লেন, “তােমরা এই শিশুর মত না হইলে স্বর্গে প্রবেশ করিতে পারিবে না। যে আমার নামে একটি শিশুকে সাদরে গ্রহণ করে সে আমাকে এবং আমার প্রেরণকৰ্ত্তাকে গ্রহণ করে। কিন্তু অামাতে বিশ্বাসী কোন শিশুকে যে ক্লেশ দেয় তাহার গলদেশে শিলাবন্ধন পূৰ্ব্বক জলমগ্ন হইলে ভাল হইত। ধিক! পৃথিবীকে, যে সে এইরূপে ক্লেশ দেয়। যদিও ইহা আবশ্যক, কিন্তু সে মনুষ্যকে ধিক্ যাহা দ্বারা ইহা অনুষ্ঠিত হয়। সাবধান! ঈদৃশ সন্তানের প্রতি যেন কেহ হিংসা না করে। তাহাদের স্বর্গদূত সর্বদা স্বর্গধামে বসিয়া আমার পিতার মুখ দর্শন করিতেছে।” .

ঈশাচরিতামৃত ১১৯ যিশু যখন হইতে পিটারের প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, তােমার হস্তে স্বর্গের চাবি থাকিবে, তুমি প্রস্তর স্বরূপ, তােমার উপর স্বর্গরাজ্য স্থাপিত হইবে, তখন হইতেই বােধ হয় অন্যান্য শিষ্যের মনে কিছু মাৎসর্যের সঞ্চার হয়। এই নিমিত্ত উহারা পরস্পরে তর্ক বিতর্ক করিতেছিল যে, কে: আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ? কিন্তু শ্রেষ্ঠ হওয়ার যে লক্ষণ যিশু বর্ণন করিলেন তাহাতে সকলের অস্থি চূর্ণ হইয়া গেল। বয়াধিক্য বা বিদ্যা সম এ স্থলে উচ্চাসন পাইল না, বিনয় দীনতা শিশুর সারল্যের মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হইল। অনন্তর যিশু বলিলেন, “পতিতােদ্ধারের জন্যই মনুষ্যপুত্র অবতীর্ণ, হইয়াছেন। যদি কোন ব্যক্তির এক শত মেষের মধ্যে একটি মেষ পথভ্রষ্ট হয় তবে কি সে আর সকলকে রাখিয়া সেই একটি মেষকে অন্থে ষণ করে না? যখন অন্বেষণ করিয়া তাহাকে পায় তখন সে সর্বা- পেক্ষা তাহার জন্য অধিক আনন্দ প্রকাশ করে। তােমাদের পিতারও জানিবে তেমনি ইচ্ছা যে তঁাহার একটি ক্ষুদ্র শিশুও বিনষ্ট হয়।” “যদি তােমার ভ্রাতা কোন দোষ করে, তবে প্রথমে তােমরা উভয়ে সে বিষয় আলােচনা করিবে। যদি সে তােমার কথা রাখে তাহা হইলে তুমি একটি ভাইকে পাইলে। কিন্তু যদি সে তােমার কথা না শুনে, তবে আর দুই এক জনকে তাহা বল ; কারণ দুই তিন জনের সাক্ষ্য দ্বারা প্রত্যেক কথা সাব্যস্ত হয়। তাহাতেও যদি সে অবহেলা করে, তবে সমাজকে বল। সমাজ যদি সে না মানে তবে ঘৃণ্য চণ্ডাল বলিয়া তাহাকে জানিবে। যাহা কিছু তোমরা পৃথিবীতে সঞ্চয় করিবে বা হারাইবে তদনুসারে স্বর্গলােকে ফল পাইবে। তোমরা দুই জনে এক মত হইয়া যাহা চাহিবে তাহা স্বর্গবাসী পিতা তােমাদিগকে দিবেন। কেন না । যেখানে দুই কি তিন জন আমার নামে একত্রিত হয় তাহার মধ্যে আমি । অবস্থিতি করি।” পিটার জিজ্ঞাসা করিলেন, “প্রভু, আমার ভাতার অপরাধ আমি কত যার ক্ষমা করিব? সাত বার কি?” যিশু বলিলেন, “তুমি সপ্ততি গুণ সাত বার ক্ষমা করিবে ?” পরে দৃষ্টান্ত স্থায় বলিলেন, “স্বর্গরাজ্য এক জন ঈশাচরিতামৃত। ভূপতির ন্যায়। একদা তিনি ভৃত্যদিগের নিকট হিসাব বুঝিয়া লইতে লাগিলেন। এক ব্যক্তি তাহার নিকট দশ সহস্র মুদ্রার ঋণী ছিল, এক কপর্দকও পরিশােধ করে নাই। রাজা অজ্ঞা দিলেন, “উহাকে এবং উহার স্ত্রী পুত্র এবং সমস্ত সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া ঋণ পরিশােধ লও।” ভৃত্য তাহার পদানত হইয়া বলিল, ‘প্রভু, ধৈৰ্য্যাবলম্বন করুন আমি সমুদয় ঋণ পরিশোধ করিতেছি। ইহা শুনিয়া রাজার মনে দয়ার সঞ্চার হইল, তিনি তাহাকে ঋণমুক্ত করিলেন। কিন্তু সে ভৃত্য । যাহার নিকট শত মুদ্রা পাইত তাহাকে তৎক্ষণাৎ ধরিল এবং অত্যন্ত কষ্ট দিতে লাগিল। ঋণী ব্যক্তি অনেক কাকুতি মিনতি করিল তথাপি তাহা শুনিয়াও সে তাহাকে কারারুদ্ধ করিয়া রাখিল। এই কথা রাজা শ্রবণ মাত্র মহাক্রোধে উত্তেজিত হইয়া বলিলেন,কি দুষ্ট! আমি তাের প্রতি দয়া করিয়া এত টাকা ছাড়িয়া দিলাম, আর তুই আপনার অধমর্ণের প্রতি দয়া করিতে পারিলি না?' এই বলিয়া তিনি তাহাকে ঋণের জন্য কারারুদ্ধ করি- লেন। যদি তােমরা তোমাদের প্রত্যেক অপরাধী ভ্রাতার দোষ ক্ষমা না। কর, তাহা হইলে স্বগীয় পিতাও ঐরূপে তােমাদের সহিত ব্যবহার করিবেন।” জন্ বলিলেন, “প্রভু, এক ব্যক্তি তােমার নামে রােগ ভাল করিতেছে, কিন্তু সে আমাদের সঙ্গে থাকে না।” যি তাহার উত্তর দিলেন, “যাহারা আমার বিরােধী নহে তাহারা আমার সপক্ষ। আমার নামে যদি কেহ এক পাত্র জল তােমাদিগকে পান করিতে দেয়, আমি সত্য বলিতেছি, সে পুর- স্কার লাভে বঞ্চিত থাকিবে না।”

স্বদেশ পরিত্যাগ। মাতৃভূমি পরিত্যাগ করিবার পূর্বে কেপারনিয়ামে বসিয়া আপনার শিষ্য- লিগকে যিশু ঐ সকল উপদেশ দিয়াছিলেন। গালি বিভাগের প্রচারকাৰ্য এক্ষণে সমাপ্ত হইল। যদিও এ দেশের বহুলােক তঁাহার বাক্য শুনিতে আসিত এবং আনুগত্য প্রকাশ করিত, কিন্তু তাহাতে তিনি সন্তষ্ট হইতে পারিলেন না। সম্মুখে ভয়ঙ্কর পরীক্ষার কাল উপস্থিত, য়িহুদী ধর্মযাজক ও প্রধানতম কর্তৃপক্ষীয়ের ক্রমাগত ছিদ্রান্বেষণ করিতেছে; অপর দিকে আপ- নার শিষ্যগণ কোথায় ভাবী বিপদের জন্য প্রস্তুত হইবে, না ভাবিতেছে, কেমন করিয়া তাহার যিশুর রাজতস্কের পার্শ্বে বসিবে; কেহ বা মনে করিতেছে, এত ক্ষতি স্বীকার করিলাম অবশ্যই শুনুরূপ পুরস্কার পাইব ; কিন্তু 'কিকপে কঠোরহৃদয় ইস্রায়েল এবং পৌত্তলিকদিগের মধ্যে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিও হইবে শত্রু কুল নৃতনবিধানের আশ্রয়ে পবিত্ৰাণ পাইবে সে বিষয়ে ক। হার; এক্ষেপ নাই; এই উঞ্চয় বিধ অবস্থা আলােচনা করিয়া দেবরাজ যিশু নিতান্ত ব্যাকুল হইতে লাগিলেন। কিন্তু এই গুরুতর দুশ্চিন্তার পেষণে তাহার অন্তরের বিশ্বাস অগ্নি অারো জুলিয়া উঠিল। যে অভ্রান্ত বিশ্ববিজয়ী বিধান তাহার হৃদয়ে অঙ্কুরিত হয় তাহা আশুফল প্রত্যাশা করে না; পরিণামে দেশ কালের অতীত অবস্থায় ঈশ্বরেচ্ছার গল্প হইবেই হইবে ইহাই কেবল সে বিশ্বাস চক্ষে দেখে। কত কত মনুষ্যবংশ রুস হইবে, কত রাজা ও রাজ্য কালস্রোতে লীন হইয়া যাইবে, রাশি রাশি বিড় বিপদ পাপজঞ্জাল আসিয়া সত্যের গতিরোধ করিবে, কিন্তু অনন্তকাল স্থায়ী অক্ষয় ধ্রুব সত্য কি তাহাতে বিনষ্ট হইতে পারে। শিশু স্বকণে আপনার স্বর্গবাসী পিতার পুখে শুনিয়াছেন বিধানের জয় নিশ্চয়, সুতরাং কাল কিংবা ফল গণনা এখানে স্থান পায় না। তার কার্যপ্রণালী যেমন আত্মবলিদান, ফল প্রত্যাশা তেমনি ভগবানের অভন্তু ৰাণী। এ বিষয়ে পৃথিবীকে কি এক ঈশাচরিতামৃত নৃতন পথ দেখাইয়া গিয়াছেন। কিন্তু প্রত্যক্ষ ঘটনার মধ্যেও কি তিনি আশার সফলতা দেখেন নাই ? অবশ্য, দেখিয়াছিলেন। যৎকালে চিহ্নিত দ্বাদশ জন ব্যতীত আরাে কতকগুলি শিষ্য নানা স্থানে মুসমাচার প্রচার করিয়া আসিয়া বলিল, “আমরা সৰ্ব্বত্র জয় লাভ করিয়াছি,” তখন যিশু আনন্দে উৎফুল্ল হইলেন; এবং বলিতে লাগিলেন, “আমি সয়তানকে বিদ্যুতখির ন্যায় স্বর্গভ্রষ্ট হইতে দেখিয়াছি।” আশানুরূপ ফল খল পৰ্যন্তু ফলে নাই সত্য, কিন্তু দুঃখী ও মধ্যবিধ শ্রেণীর লােকসমাজে পরিত্রাণের বীজ রােপিত হইয়াছিল। ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ প্রমুক্ত হইয়াছে ইহা তিনি দিব্য জ্ঞানে দর্শন করলেন। গালিলদেশে অন্ততঃ কয়েক ব্যক্তির জীবনে স্বর্গরাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হইল ইহাই তাহার সন্তোষের কারণ। প্রাচারকার্য্যের প্রারম্ভে যিশু যেমন কেবল ইমেল জাতিকেই সুসমাচার 'শুনাইতেন, অন্য জাতির প্রতি চাহিতেন না, ইদানীং আর সে ভাব ছিল । কিন্তু তিনি মাতৃভূমি ও স্বজ :তিকে বে এও ভাল বাসিতেন দেশের হতভাগ্য লোকেরা তাহা বুঝিতে পাবিত না; বরং তাকে মহা মাঈকী শত্রু মনে করিয়া গুণ। কত। এই সকল দুরবস্থা স্মরণ করিয়া তিনি কেপারনিয়াম প্রভৃতি স্থানকে অভিশাপ দেন। যদি গের জন্য এত করিলেন, অনাহারে অনিন্দায় পথে পথে নগরে নারে ফিরলেন তাহারা ভাল হইল না, স্বর্গের কথা শুনল না, যিশুর কোমল হৃদয় কি ইহা সহ্য করতে পারে ? মনের গভীর দুঃখে এই জন্য দেশকে তিরস্কার করিয়াছিলেন; কিন্তু সাইডন টায়ার প্রভৃতি টায়ার প্রভৃতি পৌত্তলিক প্রধান স্থানে লোকের অবস্থা যেরূপ দেখিলেন তাহাতে আশা হইল যে য়িী অপেক্ষা উহারা হৃদয়বান। প্রচারকার্যে বহির্গত হইয়া তিনি বিচিত্র স্বভাব মানব- গণের চরিত্র অনুধাবন করিতেন, এবং শিষ্যদিগকে বিভিন্ন প্রকার অবস্থার মধ্যে লইয়া গিয়া অনেক বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। ভবিষ্যতের জন্য তাহারা কিরূপে প্রস্তুত হইবে, শত্রুর নির্যাতন কেমন করিয়া সহ্য করবে ইহা 'ভাবিয়াতঁাহার চিত্ত নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া উঠে। এত দিন অপেক্ষা নিরাপদ অবস্থায় মাতৃভূমির শীতল ক্রোড়ে বিচরণ করিলেন, সুতরাং ৩৮শ ছয় ভাবনার কারণ উপস্থিত হয় নাই। এক্ষণে প্রাচীন সমাজে। ।

হইল । ঈশাচরিতামৃত। ১২৩ অন্ধু বশ্বাসী নরঘাতক প্রধান মণ্ড পীর মধ্যে প্রবেশ করবার কাল সমুহীন বে স্থান পাপ কুসংস্কারের প্রধান দুৰ্গ তাহাকে এখন আক্রমণ করিতে হইবে। এই জন্য তিনি আপনি যেমন প্রাণদানে প্রস্তুত হইলেন, তেমনি সহচরবৃন্দকে তৎসম্বন্ধে সতর্ক করিতে লাগিলেন। কিন্তু আক্ষেপের ফি এই যে তখনও পর্যন্ত কেহ তাহার মহৎ অভিপ্রায় বুঝিতে সমর্থ হয় নাই। প্রেরিত মহাপুরুষ শক্তহস্তে নিহত হইবেন ইহা সাধারণ সংস্কা- রের বিপরীত, সুতরাং কে তা প্রতিপন্ন করিতে পারে ? যিশু সে বিষয়ে বারবার চেষ্টা কবিয়ও কৃতকা হইতে পারিলেন না। শিষ্যেরা পার্থিব সুখলালসার বশবী হই। অাপনাদের মণ্ডলী মধ্যেও অশান্তি দ্বেষ হিংসা অনিয়াছিলেন । নীচ স্বার্থপরতা কাহারে কাহারো মনে বিলক্ষণ আধিপত্য কত ভগবানের কি অনির্বচনীয় লীলা ! যিশু বিদায়কালে দুঃখভগ্ন মনে যে সকল দেশকে অভিসম্পাত করিলেন, ত্রিশ বৎসর গত হইতে না হইতে · সেই সমস্ত ভূভাগ বোমীয় সাম্রাজ্যের ঘোর অত্যাচারে একবারে ভ্রষ্ট হইয়া গেল। যে হ্রদের নির্মল বক্ষ সূর্ণ কিরণে ঝলমল করিত তাহা অধিবাসীদিগের অজস্র শােণিতধারায় রক্তবর্ণ হই। উঠে। যে সকল স্থান ফুল ফুল বৃক্ষ লতা তৃণ পত্রে অমমোদানের ন্যায় শোভা পাইত তাহ। প্রজপুঞ্জের মৃতদেহনিঃসৃত পূতিগন্ধে ভীষণ শ্মশানের আকার ধারণ করে। গলের জনপদ সকল বিষম রাষ্ট্রবিপ্লবে তৎকালে এমন দুর্দশাগ্রস্ত হয় যে তাহা বর্ণনাতীত। কোন কোন পণ্ডিত বলেন তত্ৰত্য জলবায়ুর অবস্থা পর্যন্ত এখন পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। [ পূৰ্ববিভাগ সমাপ্ত

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ishacharitamrita Ed.2nd

Author
Sharma ,chiranjib
Title
Ishacharitamrita Ed.2nd
File name
Ishacharitamrita Ed.2nd
Text
OCR done
Citation
1888
Published
2010/01/13
Publisher
Mangalgang Mission Press
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Sharma ,Chiranjib
DLI number
511100
Barcode
4990010018279.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
q69mIawoRQP
Download PDF

Ishacharitamrita Ed.2nd