Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Rupayatan Ed.1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
রূপায়তন
বীরেন্দ্র কুমার গুপ্ত
প্রকাশক ও প্রাপ্তিস্থান
কি এম. লাইভেী
২ কর্ণোঙ্গালিশ দই,
কাশ
গোপালদাস মজুমদার
ভি, এম, লাইব্রেরী
৪২ কর্ণোয়ালিশ জীট
কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
১৩৪১
দাম একটা।
প্রিন্টার
বিজয় নারায়ণ দাস পাল
জন প্রিন্টিং ওয়ার্কল
৪৪ বাদুড় বাগান এই
কবি-নন্দগোপাল সেনগুপ্তকে -দিলাম সূচী ১ ৪ ১৭ মদনের প্রেম আমার প্রথম প্রেম হে মাের সোনার মেয়ে আমন্ত্রণী রাতের বাদুড় পৃথিবীর পথে মাটির মেয়ে সম্পূর্ণ ভুলিয়া গেছি মানসী-প্রতিমা হে প্রিয়া বিদায় আজি একটি কথা একেকটি দিন যায় যে-পাখী হারালাে গতি ওগো লীলাময়ী আমার সেতার রূপায়তন মধুপায়ী মধুকর কবিতা ও প্রিয়সী আদিম-নায়িকা হে প্রিয়া আমার নির্বাচনী কাহারে বেসেছ ভালাে যদি নাহি দিলে ভালবাসা প্রথমা ক্রন্দসী ভীরু চাদ সে তারা নিভিয়া গেছে একদিন এসেছিলে ২৭ ৩৫ ৪০ ৪১ ৪২ ৪৩ ৪৪
মনের প্রেম
প্রথমপ্রণয়ভীরু আমি তব উন্মত্ত মদন;
তােমার যৌবন-দ্বারে অতর্কিতে হানি করাঘাত,
আমার আকাশে জ্বলে অবিচ্ছিন্ন চঁদিনী-প্রপাত ;
মদিরমধুরতম বুকে ওঠে ঈপ্সিত স্পন্দন।
তব তনু-সিন্ধুতীরে কৈশােরের উঞ্ছ স্বপ্ন-কথা
বিক্রান্ত তাণ্ডব নৃত্যে গর্জমান, অমিয় মধুর ;
তােমারেবেসেছিভালাে, অতিন্দ্রীয় সর্ব সার্থকতা
উদগার জীবনে মাের, স্বতঃস্ফুর্ত লাবন্যা বধূর
বসন্তের মুখ পদ্ম প্রস্ফুটিত, শিহর বক্ষের ;
নূপুর ঝঙ্কার শুনি অপূৰ্ব্ব অশ্রুত কল-ধ্বনি,
তােমার দেহের বৃক্ষে বিজড়িত প্রেমের বন্ধনী ;
প্রচুর মিলন প্রার্থী সঙ্গ-লুব্ধ আমি আনন্দের।
কৃষ্ণাঙ্গী অন্তর-পাখী তােমা লাগি উদ্দাম চঞ্চল,
লজ্জালুনমিতনেত্ৰা আঁখি তােলো সুস্নিগ্ধ শীতল।
আমার প্রথম প্রেম ৬ মনের আকাশে মাের অজস্র নক্ষত্র মাঝে তুমি শুভ্র চঁদ- জ্যোতির্ময়ী স্নিগ্ধস্ফীতি বহ্নিমান, অপূৰ্ব বিস্ময় ; আঁখির মুকুরে আজ মূৰ্ত্তিমূৰ্ত আবিষ্কার, প্রথম প্রণয়; আমার প্রেমের মাঝে নবজন্ম করি লাভ সমুদ্র-উন্মাদ সম তুমি আনন্দতরঙ্গাঘাতে মন্থর-ব্যাকুল, তব হৃদি-তন্ত্রী হতে সঙ্গীত উৎক্ষিপ্ত হয় অস্থৈর্য সুন্দর, অশ্রুত মূচ্ছনা যার লীলায়িত প্রেমক্লান্ত হৃদয়ের অসহ শিহর। আনন্দের চঞ্চলতা চোখে তব প্রসবিলাে শ্রাবণের ঝঙ্কা ও সঙ্কুল, আমার প্রথমপ্রেম প্রত্যাশিত স্পর্শ-সুধা ওগাে কুঙ্গিনী লজ্জা-সিক্ত আরক্তিম প্রসবদনাসখি তুমি মাের যৌবন-সঙ্গিনী ; অস্ফুট সঙ্গীত-শব্দে আমি হেরি তব চতুর্দিকে ফুট হর্ষের পর্বত, নয়নে বিস্ফার স্বপ্ন, ছন্দময় অকথিত আমার জীবন, আকাশে তারার মেলা রূপােজ্জ্বল, অভিনব এলো শুভক্ষণ;
হে মাের সােণার মেয়ে প্রজাপতি পাখা মেলে, কাক্ষিত প্রেয়সী, এসসা সঞ্জীবিয়া মােরে তােমার অমৃত স্পর্শে অন্তর-ঊর্বশী। কোন কথা কহিবনা দুলভ মূহূর্তে আমি স্পন্দহীন একটি মৃতের মত রবাে মৃতবৎ- তােমার মুখের পানে চেয়ে, ওগগা পৃথিবীর নতনো প্রেম-সঞ্চারিণী মেয়ে। হে মাের সােনার মেয়ে তােমার সােণালী মুখে সেদিন করিয়াছিনু একটী চুম্বন, মন-পারাবত মাের আনন্দে মেলিয়াছিল রূপালিয়া ডানা, লজ্জালুনমিতদৃষ্টি অস্তগামী সূৰ্য্য সম কুঙ্কুম চন্দন, কোমল ওষ্ঠের প্রান্ত মন্থর মদির ছন্দে দোলে হাসুহানা। নিবিড় আগ্রহ ভরে বলেছিনু ভালবাসি বল্লরী-বন্ধনে, হে মাের সােণার মেয়ে লজ্জার সমুদ্রে তুমি স্তুপীকৃত ফেণা, একমাত্র পরিচিতা তুমি মোর আর কেহ তােমা জানিবেনা, মাটির পৃথিবী’ পরি শ্রেষ্ঠ আবিস্কার মাের তুমি চন্দ্রাননে। তব চারু পদতলে উর্বশী মেনকা রম্ভা শিহরিছে শ্বসি’ শ্যামলিমা নভস্থলে আকুলিয়া উঠিতেছে রূপদীপ্ত চাদ, তব রূপ-সিন্ধুতীরে আমি এক হতভাগ্য হয়েছি উন্মাদ, গাঢ় অমাবস্যা রাত্রি, পলায়িত ভীরু পদে গর্বিত উষসী। একমাত্র সত্য শুধু তােমার আমার প্রেম আর কিছু নয়, আঁখির আকাশে সখি তােমা সাথে হয়েছিল মাের পরিচয়।
আশ্রণী
উদ্বেল যৌবনাবর্তে কুরঙ্গ চঞ্চল তুমি,
তাই মােরে করেছ আহবান,
আমার আগম লাগি অমাবস্যা আকাশের
বিস্ফুরিত আলাের সুষমা,
মন্থর বায়ুর বক্ষে তােমার কম্পিতকণ্ঠ
লীলাচ্ছলে যেন গর্জমান,
প্রকৃতির রূপ-সিন্ধু উৎসারিত নগ্নকান্তি-
মমরিলাগি ওগাে প্রিয়তমা।
তােমার ভবনে এ অনুচ্ছিষ্ট এ-দেহের
যৌবন-জ্যৈষ্ঠের দ্বিপ্রহরে,
অনাবিল আনন্দের উন্মাদনা স্ফীত মোর
তেজঃমত্ত নদীর মতন,
কোন আকাঙ্ক্ষার গ্লানি ক্লেদাক্ত করেন মন
কামহীন মূচ্ছিত নয়ন,
তােমার মধুর ছায়া অতি সন্তর্পণে আজি
শিহরিত নিভৃত অন্তরে।
ঘুমন্ত পাখীর মতাে স্বপ্নাবিষ্ট প্রাণ-জীবী-
সুকোমল মাংসের পর্দায়,
শিরায় শশাণিত-স্রাব নিঃশব্দ-সঞ্চারী-প্লুত :
একটী দুৰ্বল সরীসৃপ,
তােমার মদির আত্মা আমারে বাসিয়া ভালো।
মৃত্যুহীন জ্বালালাে প্রদীপ,
সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল এতদিন সে-কথার
প্রতিধবনি মজ্জায় মজ্জায়।
একটী নারীর প্রেম চেয়েছিনু প্রত্যহের
প্রত্যাশিত দীপ্ত প্রতীক্ষায়,
সে অংশ সার্থক মাের যেদিন করিয়াছিলে
আমন্ত্রণ তোমার শয্যায়।
রাতের বাদুড়
সাগরের পাখী উড়ে চলে গেছে অসীম আকাশ পানে-
পাখা মেলে গেছে আর ঈগলের দল,
আমি নীচে বসি’ হেরিনু সচঞ্চল,
মনের সাগরে ব্যথা-বুদ্বুদ উতলা মায়ার টানে।
দিবসের আলাে, সূর্যের আলাে নৈশ-অন্ধকারে
ফুকারিয়া ওঠে বেদনায় নিঃশ্বসি’
অমা-শর্বরী নিদ্রিত ক্রন্দসী ;
নীচের পৃথিবী নিদ্রাবিহীন বিরহের ফুৎকারে।
সহসা শুনিনু সাগরের বুকে ঘূর্ণি আর্তনাদ,
তড়িৎ-ছন্দে উছলে ঢেউ ও ফেণা,
আমি জেনেছিনু তুমি আর আসিবেনা,
পায়ের নূপুর বাজিবেনা আর পেয়েছিনু সংবাদ।
সাগরের ঝড়, বিদ্যুৎ-ঝলা তােমরা দেখেছ কেউ?
যৌবনে মাের লেগেছে সাগর দোলা;
সুদূর নিবাসী—হে চির আত্মভোলা,
তুমিতাে জাননি সাগরের জ্বালা শুধুই গুণেছ ঢেউ।
আকাশে জমেছে কালাে মেঘগুলো আলকাতারার মত,
আমার বুকেও গাঢ় হয়ে জমে তাই ;
অন্তর জুড়ে ভাবি তুমি কাছে নাই,
পৃথিবীর বুকে আর মাের বুকে একটা গভীর ক্ষত।
রূপায়তন
;
রাতের বাদুড় চিৎকারি’ মরে মাটির বিছানতলে,
বুকে তার শুধু ক্রন্দন উছলায় ;
আমিও কঁদি এ-কালের ঘূর্ণায়,
আমার আকাশে শিহরি’ গুমরি’ ব্যথার তারকা জ্বলে।
পৃথিবীর পথে
ঘূর্ণমান কালচক্রে লভিয়াছি প্রেয়সীরে মাের,
যাহারে হারায়েছিনু ধূলি-ম্লান পৃথিবীর পথে ;
যেদিন সেচলে যায় অভিমান বেদনা-বিভাের,
সেদিন ভাঙ্গিয়া পড়ে নীলাকশি মাের যাত্রারথে।
আঁখি দিয়ে ফেণা হয়ে ঝরেছিল অশ্রুর তুফান
উত্তাল তরঙ্গ তুলি’ আজি নাই গাঢ় অমানিশি ;
নিৰ্ম্মল অতন্দ্ররাত, তারাপুঞ্জ গীত-স্পন্দমান
নীরব উচ্ছাসে ভরি’ বিক্ষিপ্ত আলােকে দশদিশি
করিয়াছে দীপ্তমঞ্জু ; ফিরে পেনু প্রিয়ারে আবার,
জিজ্ঞাসা করিনি কিছুঃ কেন তুমি গিয়েছিলে চলে?
কেনবা ফিরিয়া এলে? স্পষ্ট করি তনুর ঝঙ্কার।
শুধুমাত্র পূর্ণদৃষ্টি দু’জনার গিয়েছিল গ'লে
নিঃশব্দ প্রেমের মসে; তাহারে টানিয়াছিনু বুকে,
নিঃশ্বাসে পেয়েছি ঘ্রাণ দেহ-গন্ধ স্ফুরিত মুকুল,
একটি চুম্বনশব্দে গাঢ় প্রেম উৎসর্গিয়া মুখে
আনন্দে মাতিয়াছিনু, মুখে গুচ্ছ পড়েছিল চুল।
v
নাতি মেলে চুম্বন-রঞ্জিত নয় শুভ্র তব স্ফীতওষ্ঠাধর- মসৃণ পেলব, প্রেম-ক্লান্ত হৃদয়ের কী-অধীর দুরন্ত শিহর, দুর্দৈব প্রসব। রুখুৰুখু চুলগুলি উড়িতেছে সায়াহ্ন বাতাসে, বুকে জাগে তৃষা, আঁখিরঅলক্ষ্যেঘণি’ আসেউড়েনীলাভআকাশে গাঢ় কৃষ্ণ নিশা। প্রেমের জোয়ার গজ্জি’ উছলায় তব হৃদি-তীরে, দিলে ভালবাসা, অমৃত-চোয়ান-হাত প্রসারিলে অতি ধীরেধীরে, স্ফুরিত পিপাসা। চোখে ইসারার ঢেউ, উচ্ছল উদ্দাম দুর্নিবার নিঝরিণী সম, অব্যক্ত ব্যথার চাপে তােমার নয়নে অশ্রুভার মত্ত তুরঙ্গম।
পায়তন
মন্থরকম্পিতষ্ঠ, আঁখি-পাতা ভাবে বায় বুজে,
রেখা কঁপে জ্বর,
বর্ধিষ্ণু বসন্ত ঝড় মদোন্মত্ত বাসা পেল খুঁজে
বিরহ-বিধুর।
আমারেবেসেছভালো, তাইতব সীমাক্রান্তক্ষতি,
প্রচুর বেদনা,
মাের রূপ-মুগ্ধা তুমি, অবসন্ন ওগাে অশ্রুমতি
নিরবগুণ্ঠনা।
নিবিড় প্রচ্ছায় ঢাকা আকাশের মেঘের সম্ভারে
নীল নভ-তল,
সমুদ্র গর্জনােচ্ছ্বাস রহি’ রহি’ অপূৰ্ব্ব ঝঙ্কারে
বাহিরে কেবল।
ঘূর্ণি বাত্যা-আরব কানে বাজে বজ্ৰ সুগম্ভীর,
আমার আত্মায়,
অদৃশ্যনিবাসীস্রষ্টা শান্ত করে। প্রেম-প্রত্যাশীর
লিঙ্গা ও আশায়।
পুষ্পিত ঠোটের পাতে ফুটিয়াছে বানীবস্তুকুঁড়ি
মদ-গন্ধময়,
প্রেম-সিক্ত সৌরভের গন্ধাতুর কী-রহস্য জুড়ি
আমার হৃদয়।
যৌবন-বীণার তারে আঘাতিয়া চম্পক অঙ্গুলি
সদা-স্পন্দমান,
মৃত্যুর বেদনা সম অনুচ্চার কেঁদনা আকুলি
দেহ নৈশম্লান।
{
মাটির মেয়ে
কাল-বৈশাখীর ঝঞ্চা মাঝে শুনি মদির মধুর
মিনতি-বিদ্যুৎ,
কামান-বিস্ফার-ধ্বনি লীলায়িত হৃদয়ে বঁধুর,
আমি অবিভূত।
নয়নে অশ্রুর ফেণা উদ্বেলিত অশান্ত উদ্বেগ,
প্রেমার্ত্ত বিলাস,
কৃষ্ণাভ মাটির মেয়ে, লুপ্ত হােক প্রচণ্ড আবেগ,
তব দীর্ঘশ্বাস।
সম্পূর্ণ ভুলিয়া গেছি
সম্পূর্ণ ভুলিয়া গেছি, যেদিন তােমার বুকে মর্মরি’আঘাত
অনাদরে ঘৃণাভরে পশ্চাতে ফিরিয়াছি, সেদিনের কথা
তােমার চোখের কোণে সেদিন নাচিয়াছিল প্রেমের সভঘাত,
নিশ্বসিত অজগর তব নাসারন্ধ, মাঝে করি’ বদান্যতা
সপ্তর্ষিমণ্ডলনভে ব্যাকুলিয়া উঠেছিল মৃত্যু-বিমলিন,
শীতক্রান্ত বায়ুস্তর ভীড় করে এসেছিল জীবনে আমার,
মনের সমুদ্রে ঢেউ ওঠে নাই উদ্বেলিয়া প্রচণ্ড ব্যথার ;
নিঃসঙ্গ জীবন-বত্মে অসংঙ্কোচে ডানা মেলে ছিনু উদাসীন।
বুকের গুহায় মাের তােমার অঙ্গের স্পর্শে ঘৃণার উদ্রেক,
ক্রোধার্ত সাপের বিষ সঞ্চারিত মাের বক্ষে উদ্বেল ধ্বনিয়া,
লক্ষ রণ-তূর্ষধ্বনি আমার স্পর্ধার ছন্দে চঞ্চল স্পন্দিয়া,
ঘৃণায় ফিরায়ে মুখ নির্বাক ছিলাম আমি তুমি ছিলে ভেক।
সমস্ত অন্যায় মেরি আজি তুমি স্মিতহাস্যে ক'রাে মােরে ক্ষমা,
আকাশ চঁদিমা স্রোতে ভেসে যা বিশ্বপ্লাবি’ বন্দি’ মনােরমা।
মানসী-প্রতিমা
তােমার দেহের কিনারে-কিনারে নাচে শিহরিয়া সুধা,
আমার বুকের ঢেউ উছলায় গভীর মদির ক্ষুধা।
সােনালী মাটির পৃথিবীর’পরে ঝরে জ্যোৎস্নার মধু,
লজ্জায় নুয়ে মাের কাছে এসাে অবগুণ্ঠনা বন্ধু।
লাবণ্যময়ী প্রিয়া,
মাের হৃদি আজ ও-তনু-গন্ধে উঠেছে উচ্ছ্বসিয়া,
পায়ের তলায় পৃথিবী কাঁপিছে, আকাশে প্রকম্পন,
দু’জনার বুকে চকিত-শিহর ফেনিল রােমন্থন। ?
মনের কোনায় কোথা যেন ফোটে বেদনার শতদল,
আমি হতবাক্ মূঢ় পরূরব। সৌরভে বিহ্বল।
নয়নে জেগেছে নভের স্বপন নীলিমার মেদুরতা,
ওগাে তুমি আজ অধরে ফোটাও চপল প্রেমের কথা।
একটী রূপালী পাখী,
ফুকারিয়া ওঠে গাছের শাখায় প্রেম-মদ-রস মাখি।
সবুজ:নয়নে কোথা ইঙ্গিত মমতামধুরতম,
মাের বুকে নড়ে বেদনার পাখা মানসী-প্রতিমা মম।
আকাশে ঘনাল মেঘ,
আমার হৃদয়ে ব্যথার কাকলী বিদ্যুৎ-উদ্বেগ।
মােদের আকাশ সীমন্তলােভী সুন্দর-সিন্দুরে,
মৌচাক-ভাঙ্গা মৌমাছি আমি, কঁাদি প্রেম-অঙ্কুরে।
নর ও নারীর চেয়েছিনু প্রেম, উলঙ্গ নভ আর,
নয়নে যমুনা জলকল্লোল, বুকে ব্যথা ফুৎকার।
মানণী এতিমা
নাশিসাসের গ্লানি,
আমার হৃদয়ে চল-চঞ্চল, প্রেয়সীর সন্ধ্যানী।
তব তনু-তীরে রক্ত সাগর করে কল-গর্জন,
আবেশে মাতিয়া উঠেছে আমার উদ্বেল যৌবন।
মেঘ-বিহঙ্গ আকাশের মাঝে ছেয়েছে কাজলপাখা,
সুদূরনিবাসী প্রেয়সী আমার নয়নে মমতা মাখা।
হাতের পিয়ানু শুনি আর আমি অনুরাগে নিঃস্রাব,
মিলন-সন্ধ্যা আসিবেনা আর সুগভীর সম্ভাব?
পিয়াসা ছলছল,
আমার হৃদয় বিধুর-নিথর, কল্পনা সম্বল।
আকাশে ফুটেছে জ্যোৎস্না ও চাদ শুভ্র আলিম্পন,
মেঘের আড়ালে উকি-ঝুকি দেয় উঁদিমা-প্রস্রবন।
শুভমিলনের ফুলশয্যার অমিয় মধুর গীতি ।
আজো মনে পড়ে একদা তােমার একটা স্বপন স্মৃতি,
ভাবের জোয়ারে নয়নে আমার যে-কথা উদ্ভাসিত,
শুনিবেনা তুমি? ওগগা হৃদয়ের প্রচুর প্রত্যাশিত।
শুধু-কী ধরায় এ ?
আমার বেদনা পিপাসা ও ক্ষুধা এখানে রাখিয়া গেনু।
কেন বাতায়নে বসি’
তােমার আলুল কুন্তল হ’তে সুষমা পড়িছে খসি।
তব তনু-তটে লক্ষ নারীর বসন্ত উচ্ছল,
শীতল জ্যোৎস্না তব তদুপরি একটী নীলােৎপল।
আর্টেমিসের মতন তােমার রূপালী তনু ও হাসি,
ওগাে নিরূপমা একবার এসাে, ঐরূপ ভালবাসি।
১১
রূপায়তন
করেছি কী অন্যায়।
নয়নে সাগর আকুলিয়া ওঠে বেদনার বন্যায়।
মােরে ভালবেসে চোখে চোখ রেখে করিও প্রগলভতা,
তােমার পরশে দূরে যাবে মাের ব্যাকুল নির্জনতা;
জীবনের মাঝে লুটায়ে পড়িবে আনন্দ-পূর্ণিমা,
বল্লরী-ভূজ সুখ-বন্ধনে আমি হবাে অরুনিমা।
মাের প্রেমে হিমালয়,
বিন্ধ্যা যেখানে পাবে নাকো ঠাই, জানি সুনিশ্চয়,
অভিমানীনির অভিসারে কেন অভাব গরজি’ ওঠে,
সাহারার মাঝে সৌরভ লয়ে কভুকী কুসুম ফোটে।
মাের হৃদি-নভে বনের পাখী ও গাঙ, শালিকের দল
ভীড় করে নাই ঘুঘুর বাজায়ে নয়নে ফটিকজল,
আকাশের চোখে দীপ নিভে গিয়ে ঝরিল নিঝরিণী,
ৰাব লার ডালে বুলবুলি বলেঃ হে প্রেম-সঞ্চারিণী-
আমার অধর পরে,
তােমার ঠোটের একটি চুমায় যেন স্নেহ সন্তরে।
আমার নয়নে সদা জাগ্রত তব রূপ-মােহ ছবি,
মনের খেয়ালে সেইটুকু লভি’ ক্ষণ-সুখ অনুভবি।
অরফিয়াসের মত,
মাের হৃদয়ের বাঁশী ডাকে তারে যে-প্রিয়া অস্তগত।
১২
হপ্রিন্না বিলায় আজি হে প্রিয়া বিদায় আজি, নিঃশব্দ-সঞ্চার-পদে মাের অভিসার, আমার চলার পথে তােমার সুন্দর মুখ কেন বারম্বার উদ্ভসি উঠিছে মনে সন্তর্পণে অন্তর দর্পণে ? সম্পূর্ণ ভুলিয়া যাও সৰ্ব্ব স্মৃতি একদা গােপনে তােমার আমার সাথে যে-প্রেম জন্মিয়াছিল হৈমন্ত-সন্ধায় আমার চুম্বন চিহ্নে যে-মুখ কলঙ্ক-ক্লান্ত যৌবন-শয্যায়, তাহারে মুছিয়া ফেললা অন্তর্দাহ দিয়া অভিশাপ, মােরে ভাবি ঘৃণার অতুচ্চশীর্যে বিসর্পিল উগ্ৰ এক সাপ। ; উদ্বেল যৌবন তব আমার লাগিয়া হবে আঁধার-মলিন, আত্মার আনন্দ-স্পৃহা হেলায় নিহত হবে বীতস্পৃহহীন, সে-কথা যদিও জানি অর্ধাঙ্গিনী নেপথ্যনায়িকা, আমার বিদায় তবু নিৰ্বাক-মন্থর-ছন্দে, আমি অগ্নিশিকা। পিছনে পড়িয়া রবে ক্লান্ত-কীৰ্ত্তি অর্থহীন ধূসর আকাশ, অনাবৃত বেদনার মৌন-মগ্ন অনাবিল ক্ষুদ্র অভিলাষ ; তুমি কঁদিয়ােনা তবু, যদিবা ঝরিয়া যায় চাদের আলােক- যদিবা ঝরিয়া যায় বাত্যা-স্পর্শে পাখীর পালােক, বক্ষে তব আত্মগ্লানি আনি ওগাে রাজেন্দ্রাণী। সকলি চলিয়া যাবে সর্পিল স্বপ্নের সম অলখ্যে ঋলিয়া নিবন্ত সূর্যের মতাে ফেণগন্ধি জ্বলে জ্বলে আঁধারে স্পন্দিয়া,
রূপায়তন
পিছু ফেলি লবণাক্ত পরিপৰু স্মৃতির কঙ্কর
তীব্ৰ ভয়ঙ্কর।
সে-কথা পড়িছে মনে যেদিন আসিয়াছিলে জীবনে আমার,
সৰ্বস্ব উজাড়ি’ তব আমার চরণ প্রান্তে সবুজ আত্মার
প্রথম প্রেমের মােহে, আরক্তিম চারুশীলা যৌবনবন্দিতা,
ভুলি নাই দীপ্ত স্মৃতি, সঙ্গ-লিঙ্গ, প্রজ্ঞাপারমিতা,
সেদিনের প্রতি কথা নিবিড় সুরভি আত্মীয়তা,
ভুলে যাও মন্ত্র-মন্দ চারু চঞ্চলতা,
কর্প বিক্রম-স্পক অতীত রচনা,
ভুলিবেনা? হে প্রিয়া বলনা।
করিয়ােনা ক্ষোভ,
একটি হৃদয় লাগি সীমাক্রান্ত উচ্চারিত কেন এত লােভ ?
আমারে ভুলিতে যদি নাহি পারাে সঙ্গ-প্রার্থী কভু কোনদিন,
যৌবন-বকুল-গন্ধ উত্তেজিত করে তব মনে সীমাহীন,
ভােবাে সেই রাত
যে-রাতে হেরিয়াছিনু আমার হাতের’পরে তবপুষ্প হাত
প্রচুর প্রেমের স্বপ্নে আচ্ছন্ন নীরব,
সেই রাতে করাে অনুভব।
কটি কথা
যুগেযুগে আমি তােমার আশায়
কেঁদেছি গভীর তম।
চোখের অকাশে স্বপন ভাসায়
তব স্মৃতি অনুপম।
তোমার নয়নে ঝলকিউজল
বিদায় বেলার বাণী,
আমি মিলনের জ্যোৎস্না-শীতল
সুখ-পারিজাত আনি;
শিশিরের মতাে ঘাসের উপরে
মাটির বিছানা’পরি,
মাের হাতে সখি তব হাত সরে
অলসে পড়ুক ঝরি।
মৃতের মতন মুদিয়া নয়ন
স্মরি তব ফুল দেহ,
হর-সাগরে আমি নিমগন
একটি চপল স্নেহ।
রজনীগন্ধা অমিয়ার লাগি
আমার হাসি ও রাত,
আধারের বুকে ফুকারি’ অভাগি
জীবনে ব্যথার বাত।
রূপায়তন
বাণীর প্রেরণা তােমার অধরে
উঠুক সুরভি ভরি’
মাের হাতে সখি তব হাত সরে
অলসে পড়ুক ঝরি
আমি কঁদিবনা, কথা কহিবনা
বােবর মতটি রব,
তােমার আননে চাবােকী বলনা,
নীরবে বেদনা সব ?
দিবসের ব্যথা সাঁঝের বাতাসে
উছলিউঠিছে আজ,
সেবার তুমি রেখেছ হুতাসে
ক্ষণ অপসারি কাজ?
বেণী বঁধিয়ােনা নীল সাড়ী’পরে
রূপের জ্যোৎস্না ক্ষরি
মাের হাতে সখি তব হাত সরে
অলসে পড়ুক ঝরি।
তােমার দু'চোখে আকাশের আলাে
পড়ে শিহরিয়া গলি’
আমার হৃদয়ে বাসনা জ্বালালাে
প্রেম-নদী ছলছলি।
তুমি:প্রিয়া মাের মধু-প্রবাহিনি
জীবনের সাহারায়,
একেকটি দিন যায়
উবার লালিমা যৌবনে জিণি
কুলু নাদে উছলায়।
আঁধার ঘনালে তব দেহ ধরে
আসিও আলােক করি
মাের হাতে সখি তব হাত সরে
অলসে পড়ুক ঝরি।
AT
টি দিন যায়
একেকটি দিন যায় জীবনের আয়ু আসে কমে,
তবুও ভুলিনি তােমা বিন্দুমাত্র অয়ি প্রিয়তমে।
যৌবন সুস্বপ্ন ছবি চোখে আঁকা অপূৰ্ব্ব রেখায়,
রুচির বৈচিত্র কারু ম্লান যত দিবসের মত,
পয্যাপ্ত ফেণায় প্রেম গাঢ় হয়ে বিস্ফারিত তত ;
তােমারেবেসেছিভালাে এ-আমার একান্তগৌরব,
তব প্রেম মাের বুকে আঁখি মেলে হয়েছে সৌরভ ;
আয়ুর প্রদীপ যত নিভে আসে লইনু বিদায়
মৃত্যুর গহ্বরে ততত। ঠেলে এলাে চোখে অশ্রুজল
প্লাবণ কল্লোলে মাতি’ বুক যেন ঘন স্পন্দমান,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে ওঠে আসন্ন বিচ্ছেদ মায়াগান;
সেকথা ভুলেও কিগাে জেনেছিলে যৌবন-প্রেয়সী?
সহস্ৰ শৰ্বরী রাণী, তুমি তারা এসেছিলে খসি
নয়ন-আকাশে মাের, বিদ্যুৎ-উদ্দাম বুকে চল।
পােখী হারালাে গতি যে-পাখী হারালাে গতি, যে-নদী হারালো বেগ, আমার মৰ্ম্মের প্রেম তারে দিমু গন্তব্যের উৎসাহ আবেগ। রাতের তামসী মাঝে আমি তারা আনন্দ-উজ্জ্বল, আলাের সুষমা-স্রোতে আঁধারের সুতীব্র গরল নিঃশেষিত বিশ্ব-পাজে, হে প্রেয়সী, ছন্দহীন কেন তব জীবনের গতি ? নয়নে সূর্যের দীপ্তি, অঙ্গে তব জ্যোৎস্নার গরিমা কোথা গেল—অমৃত নিঃসৃত ভাষা, মঙুল তনিমা ; কার করে আত্ম-সমর্পিয়া তুমি অমাবস্যা-ম্লান, ধ্বংসের সমুদ্রে তব কেন মৌন-স্নান ? তােমার চলার মাঝে কোথা গেল দৃপ্ত অহঙ্কার- সহ্র ফুলের গন্ধে দেহের ফুৎকার ? অজি কেন নেমে এলাে চোখে তব ব্যথার আরতি, জীবনের আবিস্কৃত ক্ষুব্ধ পূর্ণচ্ছেদ। দেহ-যন্ত্রণার মৌন অবশিষ্ট ক্লেদ ? ১৮
যে-পাখী হারালাে গতি
যে-পাখী হারালাে গতি, যে-নদী হারালাে বেগ,
সস্নেহে মুছা তার হৃদয়ের ব্যথার উদ্বেগ।
জীবনসঙ্গিনী প্রিয়া, কেন আননা আঁখি-পাতে উষ্ণস্ফীত
অ-আবর্জনা-
বুকে তব মৃত্যুর বেদনা?
=
ছন্দহীন জীবনের আমি তব উদ্দীপ্ত উৎসাহী নিত্য
মক্ষীর গুঞ্জন সম প্রেরণা-স্পন্দন,
—অহর্নিশ সর্বক্ষণ।
.
ভুলে যাও শােক,
নয়নে জাগাও পুনঃ মৃত্যুহীন সাহস্রিক
সূর্যের আলোেক।
মলিন দেহের পাত্রে গর্জিয় উঠুক মধু সমুদ্র-উল্লাস,
সৌরভ সিঞ্চিত হাে বিষান্ত নিঃশ্বাস,
আর অন্তর্হিত হােতব বেদনার অমা,
-ওগাে প্রিয়তমা।
ওগাে লীলাময়ী
তােমার লাগিয়া প্রিয়া দেহ-বীণা গুঞ্জরিছে
স্ফীতচ্ছন্দে মদোল্লাসে মৌন অন্ধকারে,
মদির সামীপ্য মাের চাহিবেনা এত ঘৃণা?
নিঃসীম আকাশ কাদে শ্রাবণ-ঝঙ্কারে।
দুঃসহ ভূকম্প ওঠে স্থিরীকৃত পৃথ্বী-বক্ষে
চঞ্চলিয়া শ্লথশীর্ণ সমুদ্রের জল,
আমার কিশেরী প্রাণ নিশ্বসিয়া ঘূর্ণাবর্তে
জটিল তরঙ্গায়িত উচ্ছল প্রবল।
পাশবিক দণ্ড আর অবরূদ্ধ যন্ত্রনার
কারাগৃহে শ্বসিতেছে মানুষ-খেচর,
ব্যথার গ্লানিম খঙ্গে শতচ্ছিন্ন নর-পক্ষ,
বিস্মৃত আছিল যার স্মৃতি অগােচর।
প্রসন্ন পূর্ণিমা নাই, বেদনার সপ-বিষে
অমাবস্যা নভ-দৈত্য নির্জীব এখন,
কীট-ক্লীব আমার যৌবন-স্পৃহা অপমানে
নিষ্পেষিত পদপিষ্ট জন্তুর মতন।
আমারে করেছ ঘৃণা, অধরের ব্যঙ্গ-দীপ
প্রজ্জ্বলিয়া দম্ভদৃপ্ত স্পর্ধার নিশ্বাসে,
সূর্যের বিক্রমছন্দে গর্জমান দেহ-বক্সে
সৰ্ব্ব শিরা-উপশিরা তব অনুচ্ছাসে।
এত যদি ঘৃণ। তব কেন তবে দিয়াছিলে
প্রেম আর স্নেহ-ফল্ড ওগে। লীলাময়ী?
তােমর দেহের মাঝে আজি বুঝি শিথিলতা
ঝঙ্কারিয়া উঠিতেছে বরেন্দ্র-বিজয়ী।
তৰ চারু নভস্থলে কোথা গেল ভীরু চঁাদ
লজ্জালুকণ্ঠিতদৃষ্টি মােহগ্রস্ত আখি,
সেখানে নামিয়া এলে আজি হেরি অহঙ্কার
ঘৃণাস্ফীতি, অমাবস্যা কৃষ্ণাঙ্গী জোনাকী।
আমাৰ সাৰ
আলতা-রাঙা নরম গালে
হাত বুলাৰ ছন্দে,
নাচছে শিখী গজল-গানে
তােমার বুকের গন্ধে।
আমার প্রেমের সৌর নভে
জাগছ তুমি মহােৎসবে
সূৰ্য নাচে মাের ইসারায়
শােণিত-শিরার বড়ত্ম,
তুমি নাচোনাচবো আমি
এই জীবনের মর্তে।
সাপ দেখেছ? আমার প্রেমে
চমকে ওঠে ফণী,
আকাশ কালাে,কলঙ্কী চাদ,
সাপের মাথার মণি।
তুষার আমি শালা ক্ষেতে
আমায় ডাকো আঁচল পেতে
ভালবাসা কাল দিয়াে সই
আজকে পিয়াে সুরা,-
প্রেম-মদিরায় ভাসাে তুমি,
পিয়াে চুমার গুড়া।
রূপায়তন
তােমার চোখে তড়িৎ কঁপে
কঁপছে বনস্পতি,
সুর উঠেছে আকাশ ব্যাপি
ফুটছে চাঁদের জ্যোতি।
মমাদের মিলন কুঞ্জবনে
বাতাস মাতে গুঞ্জরণে
ক্ষীণবেদনার দোদুল ডানা,
পাগলা ঝােরার জল,
চোখের আকাশ কাপিয়ে তােলে,
তােমার বাজে মল।
জ্যোৎস্নাজোয়ার কাজ লা রাতে
ভীম-পলাসীর তান,
গুমরে ওঠে ফেণার মতাে,
শিহর জাগায় প্রাণ।
হাতখানি দাও আমার হাতে
সাগর নাচে চোখের পাতে
কালাে কোকিল ডাছে গাছে-
মনের সেতার সুরে,
শিশির ভেজায়—সবজী ঘাসে-
অভিন্ন বন্ধুরে।
२२
कामकन
সেদিন তামসী রাতি,
যৌবন-অঙ্গনে মম পদার্পন করেছিলে মােরে লভি সাথী।
সুনিবিড় আপ্যায়নে মাের কর স্পর্শ করি’ হরিদ্র-নয়নে
সর্বাঙ্গে চাহিয়াছিলে, উদগ্র প্রেমের নেশা উগারি’ স্পন্দনে
সীমাহীন বিস্ময়ার্ত জেগেছিল চারুচাষে উদ্ভাসি’আমার,
সৃষ্টিরহস্যময়ী তােমারে হেরিনি কভু, নিভৃত আত্মার
সামিপ্য আকৰিছিলে, রমনীরজণীগন্ধ্যা সৃজি’ মাদকতা ;
আমার আঁখির নভে অজস্র নক্ষত্র স্ফুরি’ স্বপ্ন মেদুরতা।
একটা মৰ্ম্মর সম মােরে করেছিলে তুমি বিস্মত বিল,
কল্পনা-ফানুষ আমি আকাশে উড়ায়েছি প্রতি দণ্ডপল।
রূপায়তন
হে অপরিচিত প্রিয়া,
তােমার দেহের গন্ধে একটা চুম্বক সম কেন আকর্ষিয়া
আমারে রেখেছ তুমি ? খাঁচায় আবদ্ধ পাখী স্বাধীনতা হীন;
মনের বীণায় তাই অহনিশ বেদনার রাগিণী উডডীন।
অন্যের ঘরণী তুমি। তাহারে ত্যজিয়া কেন আজি অকস্মাৎ
ডানায় করিয়া ভর মােরে ভালবেসে মিথ্যা এলে মাের সাথ,
তােমার চোখের কোনে সর্পিল বিদ্যুৎ-রশ্মি প্রচুর প্রকাশ,
কলঙ্ক-পঙ্কিল-স্নাত কেন তুমি কাছে এলে, কিবা অভিলাষ ?
আমার সৌন্দৰ্য-মুগ্ধ, তব চোখে হেরি তাই মদন-মদিরা,
সিংহের গর্জন সম আৰ্তনাদ করে মাের শিরা-উপশিরা।
শ্রাবণ-শৰ্বরী ভরি’
অপরাজিতার সম ভােমার আলুল চুলে আছিল মর্মরি।
উন্মাদ ভ্রমর আমি পাখা মেলে ঘূর্ণমান দৃষ্টির শিখায়,
দাবদগ্ধ করেছিঃ তব চঞ্জ, তমু-জ্যোতিঃ রক্তের শিরায়
উপবাসি আত্মা মাের যেদিন আছিল নিদ্রামগ্ন নিশ্চেতন,
যৌবন-মন্দিরে তুমি প্রবেশি’ তুলিয়াছিলে ঈস্পিত স্পন্দন।
লক্ষ নীহারিকা মাঝে তীব্র জ্যোতিষ্মন তুমি রূপ-তলােয়ার :
সেদিন হেরিয়াছিনু তােমার লাবণ্যদীপ্তি পৃথিবী-প্রসার।
আমারে উন্মাদ করি কপ-মঞ্জীর ছন্দে হৃদি-বাতায়নে
সহসা আসিয়াছিলে কেন তুমি অনুচ্চার অনবগুণ্ঠনে।
২০
মপায়ী মঞ্জুর
বাতাস গিয়েছে বহি
তব নিশ্বাস মদির বাতাস যায়নি এ-বুকে দহি;
মেঘভার গেছে সরি’
আমার হৃদয়ে ঝরি-
যাওনি কেৰল তুমি,
অধরে কভুনা চুমি
আঁচল দুলায়ে,আমারে ভুলায়ে আসে নাই কাছে প্রিয়া,
জলে ভরভর মাের আঁখি দু’টি, ক্ষুব্ধ আতুর হিয়া।
চঞ্চল সমীরণ,
মাতােয়ারা করে মন,
আনে বেদনার পালি,
দৈন্তের ব্যথা আলি’
পােড়াইয়া মারে মধু-অন্তরে, কঁদি আমি সারা নিশি,
রাতের ও-বুকে পূর্ণিমা জাগা, প্রসঙ্গতার দিশি।
.
রূপায়ন
আগুন জ্বলিছে ধূধূ,
তােমার দেহের আগুনের তাপ জ্বলেনি হৃদয়ে শুধু।
মধুপায়ী মধুকর
কঁদিছে নিরন্তর,
বুকে ভরা আবিলতা,
সে কহেনি হেসে কথা,
ঝর-ঝর ঝরে শ্রাবণের ধারা নয়নে প্লাবিয়া যায়,
যায়না কেবল তােমার স্নেহের আঁখি-বারি সাহারায়।
রজনী কাটিছে নাকো,
বােঝয়েছি তারে আদরে-সােহগে কথা কহি লাখো লাখাে।
বড় তার অভিমান,
শশানাবেনা হাসি গান,
তারে একুঞ্জে ডাকি,
মিলাবার লাগি আঁখি ;
রাগে গুঞ্জনে চলে যায় দূরে, কে ফিরাবে তারে আর?
বাঁশী ভেঙে গেলে সুর ভােলা শুধু মিছে করা হাহাকার।
কবিতা ও প্রহ্মসী
নিবিড় শর্বরী মাঝে আমার গৃহের বাতায়নে বসি আর
নিভৃত নিঃসঙ্গ লভি' অমূল্য মুহূর্ত গুলি
প্রথম বালার্ক সম অনুচ্চার রূপায়িত মাের কবিতায় ।
তব যৌবনের এক আহুত সম্মান
সর্পিল উল্কার মতাে উদ্দাম লেখনী মাের চলে,
যেখানে মূচ্ছিত আমি, বাহিরের অলৌকিক কথা—
আমার কানের কাছে অপ্রকাশ্য ছিল;
খাতার আকাশে আমি অদৃশ্য উড্ডীন এক পাখী,
যে-পাখী প্রিয়ার গানে উদ্বেলিত
সীমাক্রান্ত নদীর মতন।
কবিতার নভস্থলে নবােন্মেষ চাদ আর লক্ষ নীহারিকা
কবির প্রতিভা সম প্রদীপ্ত উজ্জ্বল
শাণিত খঙ্গের মতাে তীব্র জ্যোতিষ্মান।
মাের কবিতারে আমি বড় ভালবাসি
প্রিয়ার প্রেমের মতো, কল্পনা ঐশ্বৰ্য্যপূঞ্জ অপূৰ্ব্ব বৈচিত্রছন্দে
আমার খাতার’পরে স্তুপীকৃত সমুদ্র ফেনার মতাে;
রূপায়তন
ঈষৎ বঙ্কিম গ্রীবা, শব্দের সমষ্টি দিয়ে অহর্নিশ আমি
শিশুর চোখের মতাে রহিনু তােমার•••
আমার আঙুলস্ফীত সরীসৃপ সম
এঁকে বেঁকে চলিয়াছে হেরিনু নয়নে ;
আসন্ন সৃষ্টির মােহে অর্থগৃধু আকাঙ্ক্ষা নিস্তেজ অনুভব
শরীরী-শিরায় মাের প্রেয়সীর মদির সামিপ্য ;
প্রিয়ার রূপালি দেহ লজ্জিত নিষ্প্রভ যেথা।
কবিতা সৃষ্টির অন্তে আমি যবে এসেছিঃ নিকটে তােমার
চেয়েছিনু একটি চুম্বন
হেলায় ফিরায়ে মুখ দাও নাই তীব্র প্রতিবাদ তুমি
করেছিলে পাখার ঝাপটে,
আর বলেছিলে তুমি ?
আমারেবেসােনাভালো, কবিতার প্রেম-পুজারক,
দম্ভদৃপ্ত হিংসার ফেনায়।
মৰ্মৰ নিৰ্বাক আমি বাণীহীন ছিলাম মলিন
মাের সৃষ্ট কবিতার আকাশে চাহিয়া।
২৮
আমি-নায়িকা
আজিকার এই কুহেলি-জড়িত শ্রাবণের বরিষণে
তােমার মধুর শত আলাপন আজি শিহরায় মনে,
প্রেমের নেশায় কঁপে বাহুলতা, প্রণয় বিকচ বাণী
আধারের মাঝে রজনীগন্ধা গােপনে ফুটালে রাণী।
তব সুকোমল কুসুম ওষ্ঠ পাখীর ডানার সম
কেঁপে কেঁপে সুখে উঠেছিল হেসে মনােহর মনােরম।
অপাঙ্গ চোখে ভালবেসে ছিলে প্রথম প্রেমের নেশা,
স্নেহের সুরায় মন-টলমল সুরভি আঙুর পেশা।
কালাে নয়নের একটী কিনারে ভীরু তৃতীয়ার চাদ
ফুটেছিল সখি মমতা-মধুর মােরে করি’ উন্মাদ।
পথ-পরিচিত, হৃদি-জাগানিয়া আলােকের সহচরী
সে চোখে আছিল বিদ্যুৎ নাচ মাের নভে শর্বরী।
মন-মন্দিরে তুমি অনামিকা সুশােভন পূজারিণী,
তব হৃদি-তটে কামনা কঁপিছে মােরে লভি সঙ্গিনী।
সাগরের ঢেউ, সাগরের ক্ষুধা, সাগরের দেহ-জবা,
তােমার পরশে গন্ধ-বিধুর ওগাে উচ্চৈঃশ্রবা।
মজনু আমার, লয়লীর চোখে বিশ্বের বিস্ময়,
বুকের কানায় শিহরিছে তব প্রেম-রেবা ফেণময়।
আমার নয়নে চির জাগ্ৰত শীতল সন্ধা-তারা,
নববসন্ত মন-বনতলে নিবিড়-মন্ত্র হারা।
রূপায়তন
তাজমহলের স্মৃতির সৌধ : বাদশাদী মমতাজ,
শাজাহান কাদে স্তম্ভ রচিয়া গৃহ-বাতায়নে আজ।
তােমার কুঞ্জে পাখী মাতােয়ারা ময়ুরের কেকা-নাচ,
মদনের রতি বসন্তময়ী রূপের হীরা ও কাচ।
ওগাে সাকী মাের পরাণ-পাপিয়া আদিম নায়িকা ইভ,
কালাে এলাে-চুল আজো মনে পড়ে, আমি কামনার ক্লীব
আজি সন্ধ্যায়, বাতাস মাতায় হৃদি-যমুনার জল,
মধুপসারিণী মানময়ী মেয়ে তুমি সাহারার ফল।
আমি কৃতদাস, আমি অমুদাস, চরণের মঞ্জীর,
হে মহিমাময়ী শ্রদ্ধা-আনত মাের মৃন্ময়ী শির।
এখন আকাশ ধোঁয়াটু আঁধারে ঝিমায় নিদ্রাতুর,
চোখের আষাঢ়, না-জানা ভাষার গােঙায় একটী
স্বর।
আমি মুসাফির একাকী দাঁড়ায়ে জীবনের কিনারায়,
দিবস মৃতালু, ধরা-ধূসরিমা আলােকের মােহনায়।
আমি দেখেছিনু কাজল গলান কালাে কোকিলের চোখ,
সেথা মিশেছিল মাের সাধনার একটু স্ফীতাভালােক।
বেণী-ফণীগুলাে মৃদু আন্দোলি’ আমাকে ডাকিয়াছিল,
দেহের নিবাসী প্রতিশিরা মাের আনন্দে গর্জিল।
আমাদের মাঝে কঁপে পারাবার ওপারে তােমার ঘর,
এপারে আমার কেঁদে ঢেউগুলি রচিলাে দীপান্তর ।
৩০
ইন্নিা অমান
তিমির তমসাচ্ছন্ন তখন গভীর রাত তুমি ছিলে অৰ্ধাবগুষ্ঠিত
আনন্দ নিদ্রার অঙ্কে, স্খলিত তােমার উত্তরীয়,
সৌন্দৰ্য-উলঙ্গ আঁখি বিকশিত দৈহিক-সবিতা ;
গাঢ় অমাবস্যা রাত্রি মাঝারে জাগর তব কী-অপূৰ্ব্ব
দেহদীপ্ত চাঁদ,
অন্তরে জাগিয়াছিল সাধ
নিঃসীম নির্দয় স্পৃহা সুকঠোর উঞ্ছবৃত্তি লাগি,
ওগাে প্রিয়া দেহরূপী মদির লালসা,
সহস্র বৃশ্চিক জ্বালা শিরায় করিয়াছিনু অনুভব--
কামনা সহসা ;
আলুল আছিল চুল, যৌবনের পুঞ্জীভূত মদন-মদিরা
তােমার দেহের তটে লেগেছিল ঢেউ,
জানিনা কেউ ;
আমি শুধু জেনেছিনু আর জেনেছিল মাের সর্বগ্রাসী
কামার্ত ইন্দ্রিয়,
বিকৃত আকাক্ষা স্বপ্নে তুমি বন্দনীয়
অস্থৈর্য দুৰ্ব্বার,
হে প্রিয়া আমার
রূপরতন
ঈষৎ রক্তাভওষ্ঠ, চুম্বন-পীড়িত করি কাম-প্রস্রবনে
পুষ্পকীট ক্লান্ত সম, অমাবস্যা, স্নান,
সমস্ত অন্তর মাের ঝঙ্কারিয়া উঠিতেছে কুন্তল-আম্রাণে
আত্মঅপচয় গ্লানি যৌবনের গান।
সে-গানের পিছনে ফুটিয়া ওঠে একটা নারীর মুখ
বসন্ত সৌরভস্নাত আশু আবিষ্কৃত,
প্রেমক্ষীত আকর্ষণ বিকশি’ ওঠেনি হেথা
তুমি শুধু কাম-নিষ্পেষিত ;
মাটীর নারীর ফলে, সুন্দরী অপ্সরী দেহ-রূপ-চন্দ্রিমায়
আমি এক নবাগত কন্দর্প-ভাস্কর,
সূর্যের বিক্রম স্পৃহা চিত্তলােকে গর্জিয়া উঠিছে মাের
বজ্রের সমান,
উদ্দামসযত্নস্পর্শে আমি পাই মূল্যহীন অপূৰ্ব আরাম,
তুমি আভরণহীনা, লহ তাই আমার কল্যাণ
অমানুষিক আনন্দের লীলায়িত ঘৃণ্য আচরণ,
বাণীহীন কেন তুমি, বক্ষে তব দিন আর রাত্রি ব্যাপি
কিসের ক্রন্দন।
নিৰিড়নীরবতার,
হে প্রিয়া আমার।
সন্তানসম্ভবা তুমি সৌন্দৰ্য বিশীর্ণ তব, ম্লান ওষ্ঠাধর,
সূর্যদীপ্ত-যৌবনশ্রী অন্তলীন, বক্ষের গহবর
বিদ্যুৎ-চিন্তার বিষে অহর্নিশ তব আর্তনাদ,
হে প্রিয়া অামার
অভিনব মাতৃত্বের সুন্দর গৌরবে তুমি হিমাদ্রী-অটল,
অয়ি প্রিয়া অতনুর লহ আশীর্বাদ ।
প্রথম সন্তান,
বসন্তের হিল্লোলিত দুর্নিরীক্ষা অষ্টাদশ দান
ক্ষীণকণ্ঠস্বরে তব শিহরিছে মৃত্যুর উল্লাস,
চোখের আকাশে ওঠে তড়িৎ-প্রকাশ,
জানাে নাকি প্রিয়তমে আজি হতে পূর্ণ হ’ল
তােমার যৌবনদীপ্ত বাস ও বাসনা
-ইনিভাননা।
তন্দ্রাচ্ছন্ন তব আঁখি-অমাবস্যা বিছুরিল শশী,
গাঢ়তম কুঋটিকা, মলিন-ক্রন্দসী,
হাসির পাথারে প্লাবি’ উদগারিল রূপ-তিলােত্তমা,
—অয়ি মনােরমা,
অসংবৃত লালসার বেপথু চরণ ঘাতে,
পূর্ণজন্ম তব,
সৃষ্টির পৃথীর পরি তুমি আজ নারী হলে
শিশু ক্রোড়ে ধাতৃ-স্বরূপিনী তুমি অমূল্য বৈভব
মােহ নির্বিকার,
হে প্রিয়া আমার।
শ্ৰেষ্ঠঅধিষ্ঠাত্রীতুমি, তােমার মহিমান্বিত কীর্তিগুলি
বিঘােষিত চতুর্দিকে লক্ষ ফণা তুলি
তবে কেন মৌনমুখ অবলুপ্ত হাসিওষ্ঠে অমা-সহচরী।
তােমার জীবননাট্যে শ্রেষ্ঠ নাট্য নবজাত শিশুর সুন্দর প্রিয়
তনিমা-বল্লরী।
শীতল পূর্ণিমা-স্নাত অঙ্গজ্যোতিঃ তরঙ্গিম গােলাপী-আঙুল
সরল শিশুর, শতসূৰ্যবিভা নতনেত্রে জানায় প্রণতি,
তব শিশু পুত্র লাগি, সমুদ্রের অসীম
পুষ্ট তার দেহ-স্রোতস্বতী,
কুম-চর্চিত-ওষ্ঠ সুকোমল রেশমের অমাবস্যা-চুল
প্রাণময় তােমার পুতুল ;
বিসর্পী:আনন্দে তব ভাগ্যবিমণ্ডিতা হােক ওগাে প্রিয়া মাের,
আমারে করিয়া শ্রদ্ধা আমি তব প্রেরণা-চকোর;
যৌবন-বিস্তার,
হে প্রিয়া আমার।
নির্বজনী
মাের যৌবনের দ্বারে যে-মেয়ে আসিয়াছিল
লক্ষ কোটিবার
ব্যাকুল প্রার্থনা করি’ আঁকড়িয়া আমার চরণ
আর উচ্চারিয়াছিল অতু প্রেমের তৃষা নিঝর-দুৰ্ব্বার,
তাহারে ফিরায়ে দেছি অবজ্ঞার গাঢ় অন্ধকারে,
উর্বশী-বিদ্যুৎ-দীপ্তি শিহরিত যার অঙ্গে
রজনীগন্ধারে।
আকাশের স্বপ্ন মােহ যাহার চোখের কোণে,
শীতের বাতাস লেগে উঠেছিল ভবি
যে-চেয়েছে হ’তে মাের প্রধানা-অপ্সরী
আর করিয়াছে মােরে অপূর্ব অনতিদীর্ঘ
একটি প্রণাম,
সুম সন্ধ্যায় তারে বিদায় দিলাম।
কলায়তন
যে-মেয়ে দৈহিক স্বপ্নে লীলাভঙ্গে বিস্ফুরিত
হয়েছিল আমার জগতে,
কামনা-গােলাপ-গন্ধে একটি মৃগের মতাে
চঞ্চলিয়া উঠেছিল সরীসৃপ-পথে ;
ফানের আমন্ত্রণ যাহার সােনলি ওষ্ঠে
স্থাপত্য সৃজিয়াছিল রূপালিয়া উঁদ,
আমি তার কাছে ছিনু সুপ্রশস্ত খাদ।
যে-মেয়ে আমার চোখে কোকিল-কাকুতি-শব্দে
সুমধুর দিয়েছিল প্রেম,
অর্থগৃধু, আকাক্ষার হৃদিশক্তি প্রপীড়িত করে নাই
যাহার মনের কেন্দ্র, আমি তারে ভালবাসিলেম ;
যে-চাহেনি বিনিময় আহত অত্যাচার,
যে-সয়েছে বৃশ্চিক-বেদনা,
লক্ষ তিলােত্তমা কঁাদে যাহার চরণ তলে,
উন্নমনা হিমাদ্রীর সম তারে করিনু কামনা।
ইন্দ্রিয়-ঈঙ্গিত যার হল অতিন্দ্রীয়,
আমার প্রথম প্রিয়া অঙ্কশায়ী সেই বন্দনীয়,
লজ্জালুনমিতনো যার ভীরু সবুজিকা চোখ,
জীবনের অন্ধকারে সেদিক আলােক ;
সে যে মাের রমা,
মনে-মনােরমা।
ও
কাহারে বসেই ভালাে
তােমার কাজের স্তুপে আজি তুমি মগ্ন হয়ে বলে,
আমার মুখের প্রতি চাহিলেনা প্রশান্ত নয়নে,
বুকের বেদনা নাচে প্রতিক্ষণ নিঃশব্দ গােপনে,
মধুর মুহূর্তগুলি কেটে গেল অলক্ষিতে গলে।
আকাশে উঠেছে উঁদ ফানের কঁপিছে বাতাস,
নবকিশলয় কঁাপে বনস্পতি দোলে রণরণি
উদ্দীপিত ভালবাসা তােমার ওঠেনি সেথা ঘনি
অন্ধ বিশ্বাসের ভরে নিশ্বসিত আমার নিশ্বাস।
তব যৌবনের ভেরী শুনেছিনু দূর হতে প্রিয়া,
বিহঙ্গের গীতি-ছন্দে হয়েছিল প্রচুর প্রকাশ,
সে কথা জাননি তুমি তম্বাকৃতি মনের বিলাস?
প্রেমের মিলন তৃষা করেছিনু নিভৃতে বসিয়া।
আমার কানের কাছে কম্পায়িত ছলনা মধুর
তব অধরেরস্ফীত স্পন্দমান মঞ্জু স্তোকবাণী
আমি চাহিনাকো তাহা, আমি চাই তব কর-পাণি
আর মাের বক্ষ’পরি স্ফীতবুক মিশুক বঁধুর।
সুনিবিড় শূন্যতার মৃত্যু হােক্ বেদন-মৰ্ম্মর,
মনের আকাশে আজি নাচিবে কী আনন্দ-পতাকা।
রূপায়তন
সঙ্কীর্ণ তােমার দৃষ্টি কেন প্রিয়া মৌন-বিষমাখা,
আমার যৌবন-রথ অনির্দিষ্ট পথে অগ্রসর।
ভালবেসে অর্থহীন ব্যথা দিলে প্রেম-সহচরী,
এখন বুঝি আমি তােমার প্রণয় শুধু ফঁাকি,
নিষ্ফল আক্রোশে কঁাদি আর কঁদে উচ্ছল আঁখি,
চৈত্রের বাতাস গর্জি সচকিত আকুলতা ভরি
মুচ্ছিত আমার মন, বেদনার আত্মার জগৎ,
বিল বিস্মিত আমি নির্বাপিত পিপাসা-প্রদীপ
বুকের গোপন ভাষা শ্বসিতেছে দগ্ধি’ কুঞ্জনীপ,
তুমি চাহিবেনা তবু মােরে ডাকি সরীসৃপবৎ।
আমারে ভুলিয়া গেলে প্রিয়তমে মায়াবিনী নারী?
কুটিল বীভৎসরূপ ছেড়ে দাও অয়ি শরীরিণী,
অকস্মাৎ আজি কেন স্তব্ধ-ম্লান প্রেম-মনস্বিনী
দেখিছন। একটি মাতাল সম হয়েছি ভিখারী।
কালাে হরিণের চোখ আমারে ভুলায়ে দেছে সখি,
মেনকার উরু হেরি আমি বিশ্বামিত্র সচঞ্চল,
জীবনের শ্রেষ্ঠতম তপস্যার ম্লান শতদল,
উচ্চকিত করে আরো তবরূপ দেহেরে ঝলকি।
অধবদনেরব্যথা প্রপীড়িত করে মাের তৃষা,
তােমার জঘণ্য কাজ ফেলে দাও জঞ্জালের মতো
শিথিল আমার তৃষা বােঝাব তােমারে আর কতাে,
অলক্ষ্যে শিহরি’ ওঠে মূর্তিমতী গাঢ় ফনিশ।
;
যদি নাহি দিলে ভালবাসা।
মাের মুকুলিত প্রেম ব্যর্থহবে মধুর সন্ধায় ?
আনন্দ-পসরাখানি এনেছিনু দীর্ঘপথহ’তে,
সকলি ভাসিয়া যাবে তব কুশ্রী মৌনতার স্রোতে?
কাহারে বেসেছ ভালাে যার লাগি বাক্ব্যর্থতায়।
মপি নাহি দিলে ভালবাসা
কী-হবে তােমার কাছে গিয়ে মাের যদি নাহি দিলে ভালবাসা;
আমার বুকের মাঝে উদ্দাম আগুন জ্বলে, বহ্নিমান আঁখি,
আকাশে শ্রাবণ নাচে এলােকেশী সান্ধ্যমেঘ ঢাকিছে জোনাকী,
নিঃসঙ্গ পৃথিবী পরে আমি এক নিশ্বসিত অনন্ত পিপাসা।
জীবনের পরমায়ু খ’য়ে যায় তােমার নিগ্রহ অত্যাচারে,
উদাসী নিশীথ-মন একটানা স্বপ্নে জাগে ঝি ঝির নূপুরে,
প্রেম-গীর্জা ভাঙ্গিয়া লুটাল ভূমে সঙ্গোপনে কঁাদি হাহাকারে,
রাতের বাদুড়গুলি কর্কশ চিৎকার শব্দে বাজায় ঘুঙুরে।
আমারে চাহেনা কেউ কুৎসিৎ-কুটিল-বাক্যে ভেঙে দেয় বুক,
নিবিড় তালু মন প্রেমের নেশায় চুর মাতালের মতাে,
মাের চতুর্দিকে ঘিরি’ জমাটু কুয়াশা কাপে, আমি কঁপি যতো
বেসুরে কঁদিয়া গুঠে যৌবনের গানগুলি, কঁদিছে ডাহুক।
আঁধার সাগরে আমি হাবুডুবু খেয়ে শসি মূচ্ছার মতন,
শীতালু চোয়ান বায়ু এলায়িত চতুঃপার্শ্বে গলিত এখন।
প্রথম প্রথমা প্রিয়ার স্পর্শে প্রাণে ওঠে প্রথম হিল্লোল প্রতি রােমকূপে আনি’ রােমাঞ্চিত মৃদু-মৃদু দোল আনন্দের তীব্রোচ্ছাসে ; মরি মরি অপূৰ্ব্ব চাহনি কী-সে দেয় নন্দনের অশ্রুত বারতা ; রণরণি’ বুকে বাজে কী-হর্ষের ঘনঘন সশব্দ আঘাত, শাণিত দেহের রূপ, অঙ্গভঙ্গি জ্বলন্ত করাত- মার্জিত রুচির, হেরি হৃদয়ে জমিয়া ওঠে খালি প্রমত্ত আশার মধু, করেছি প্রেমের মিতালী তার সাথে ; আজিকার কুঞ্জবনে আলাে আর ছায়া ; গাঢ় হয় উল্লাসের নিম্প্রতি স্নেহ-হর্ষ-মায়া। নারীর অস্তিত্ব নিয়ে এ-মহীর স্পর্ধিত গঠন, সহজ সুন্দর কান্তি ; পুঞ্জ-পুঞ্জ মেঘের আসন সে নারীর অশ্রু দিয়ে, স্বর্গচ্যুত পূত নিঝরিণী ধীরে-ধীরে বহি' এলাে, মহীয়সী প্রিয়া-সিমস্তিনী।
ক্রন্দসী
কাননে বিহার করি ফুল লােভে আমি মধুকর,
সৌরভের ভক্ত আমি, অন্ধ প্রেমে বিভাের হৃদয় ;
প্রাণের নিভৃত কোণে শতদল সুগন্ধ বিলয়
কোন যাদুকর তারে সৃজি তুষ্ট অপূর্ব সুন্দর ?
,
উদগ্র আকাক্ষা তার লভিবার মাের মনে আশা,
হস্ত স্পর্শে ম্লান হয়, নিভে যায় স্ফীত ওষ্ঠে হাসি ;
সর্পিল-মাধুৰ্য-শিখা নাহি তার, তবু ভালবাসি
দূরে গেলে কেঁদে ফেলে মনে করে জনম নিরাশা।
একটা গাহিনু গান আবরিয়া চাহি তার মুখ,
শুয়ে পড়ে মাের কোলে তন্দ্রালসে নিমীলিত আঁখি ;
বিহঙ্গের হ্রস্ব-ধ্বনি হুলু দিলাে মাের প্রেমে ডাকি
জেগে ওঠে শিহরিয়া, বলে হেসে এইটুকু সুখ।
মনের সাগরতীরে তুমি ছিলে ক্ষুব্ধ উৰ্ম্মি-খুলি
নিঃসৃত সহস্র ধারা আষাঢ়ের ঝঙ্কৃত ক্রন্দসী।
৪১
ভীরু গদ
জীবন-নদীর তীরে নিঃসংঙ্কোচে তুমি বসাে এসে,
অপূৰ্ব অপরিমীত আনন্দ উদ্দেশে;
হে তরুণী, চেয়ে দেখো রূপায়িত আমার আকাশ,
ক্লান্তিহীন, শ্রান্তিহীন মদির বাতাস;
কানে যদি লাগে কোন বাহিরের স্ফীত অপমান
প্রচ্ছন্ন কলঙ্ক সান্ধ্যে, তুমি সুমহান।
;
কোন ভয় করিয়ােন। উচ্চকিত আর্ত-ক্লিষ্ট-স্বরে,
তােমার আরাধ্য আমি প্রিয়তমে সবার উপরে ;
যৌবন-শিয়রে জাগি ভেঙে ফেলল অমাবস্যা রাত,
বিষ-তিক্ত দুঃসংবাদ মিথ্যা ভেবে বিস্বাদ প্রপাত।
পৃথিবীর বালুতটে তুমি আমি মর্ত্তের ঈশ্বর,
একটি বেপথুমান আকাশের উদ্দীপ্ত ভাস্কর।
তীক্ষ্ণ তীব্র নিন্দাবাদ মানুষের উলঙ্গ বারতা,
তােমার কটাক্ষ বানে মৃত্যু হােক তাদের ক্ষিপ্রতা।
০
কেন ভীতি তন্দ্রাহত সংজ্ঞাহীন মিথ্যার জগতে ?
এসাে প্রিয়া কাছে এসে প্রতিক্ষিয়া পথে,
তব শূন্যতার মাঝে আমি আজ সামীপ্য নিবিড়,
অভ্যর্থ প্রাণের বার্তা মমতা মদির।।
রূপায়ন
আমার মিনতি-স্পৃহা শুনিবেন। ওগাে বিষাদিণী,
নিৰ্ব্বাত সঙ্কুল-গর্ভে নিঃসঙ্গ-সঙ্গিণী ?
তােমার উষার স্পর্শ মােরে দাও স্নেহা-বন্ধন,
অন্তর সপ্তম-স্বর্গে তুমি আকর্ষণ ;
;
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝে আমি ইন্দ্র প্রধান পুরুষ,
তােমার কলঙ্ক স্ফীতি করিলাম নিঃশেষে গণ্ড;
ঝিল্লীর উদাত্ত স্বরে তােমাডাকি ঈষৎ কাপিয়া,
তােমার শ্রবণ-রন্ধ্রে বাজে যদি কাছে এসাে প্রিয়া।
সে তারা নিভিগেছে
ক্ষণিক ভুলের মােহে আজি মাের ঘৃণিত শিহর;
দুর্বল মুহূর্তে আমি জেলেছিনু কলুষ-প্রদীপ,
পুঞ্জীভূত অভিশাপ তার লাগি কলঙ্কের টীপ
আমার গর্বিত ভালে; নিঃস্রাব নিহার আঁখি পর।
চতুর্দিক ধূমাচ্ছ, আকাশের অশ্রু ঝিলমিল,
খােলা বাতায়নে জাগি দৃষ্টি ফেলি অতীত আকাশে--
যেখানে স্ফুরিত তারা চাঁদ আর কলঙ্ক-মিছিল ;
মমাদের প্রেমের কথা আবিস্কার বিস্তীর্ণ বাতাসে।
সে তারা নিভিয়া গেছে, সে চাদ নিভিয়া গেছে হায়,
আজি অপবাদ শুধু, চোখে তাই বাদল মদির,
জীবনের তটপ্রান্তে মৃত্যু মাের, বিষাক্ত মন্দির ;
নিয়তি কাদিয়া যায় মাের এই দূষিত গুহায়।
রক্তস্রোত উদ্বেলিত শিরা মাঝে, বেপথু নয়ান,
কে শুনিবে মাের মানি? কায়াহীন আত্মা স্পন্দমান।
একদিন এসেছিলে নিঃশব্দ-সঞ্চার-পদে একদিন এসেছিলে জীবনে আমার, সমুদ্রের চঞ্চলতা তােমার চোখের কোণে মৃদু স্পন্দমান সানন্দে হেরিয়াছিনু, বিহঙ্গের বৈতালিকী তীব্র গর্জমান সবুজাভ আকাশের কেন্দ্রস্থলে প্রেম-প্লাবি’ নিস্তেজ আত্মার। যৌবন-উর্মিল তটে তােমার অপূৰ্ব্ব স্বপ্ন আমার নয়নে আবেগে কঁপিয়াছিল, উৎসর্গ করিয়াছিনু প্রেমের তিয়াস, তােমার যৌবন স্পর্শে রােমাঞ্চিত হয়েছিল মাের অভিলাষ ; আমার দেহের মাঝে সুৰ্য-দীপ্তি জেগেছিল অজস্র চুম্বনে। তব শুভ আগমনে আমার কলঙ্ক মাঝে ফুটেছিল শশী, বিরহ-বেদনা ম্লান হয়েছিল তব প্রেম-ঊষা প্রস্ফুটিয়া, সম্পূর্ণ আমার তুমি সেদিন আছিলে ওগগা জ্যোতিৰ্ম্ময়ী প্রিয়া ; তােমার দেহের মাঝে কেঁপে-কেঁপে উঠেছিল পূর্ণিমা-ক্রন্দসী। রজনীগন্ধার মতাে ভীরু চোখে ফুটেছিল ইঙ্গিত-অমিয়, আজি তুমি কাছে নাই, তােমার মধুর স্মৃতি মাের বন্দনীয়। .
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.