Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prachin Aryaramaniganer Itibritti
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
AN HISTORICAL SKETCH OF THE
ARYAN-HINDU WOMEN
of the Vedic, Upanishadic and Puranic Period,
BY
Mahendranath Roy Vidya nidhi
Author of Liſe of Hahnemann, Life of Babu
Akshay kumg'r Datta in Bengali,
Introduction to Bengali
Grammar &c.
প্রাচীন আৰ্য্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত
(বেদ, উপনিষৎ, পুরাণ ও ইতিহাসদি বর্ণিত হিন্দুরমণগণের জীবনী)
& মহেন্দ্রনাথ রায় বিদ্যানিধি-প্রণীত,
ভূতপূৰ্ব্ব হিন্দুদর্শন-সম্পাদক
শ্ৰী বিধুভূষণ মিত্র দ্বারা সঙ্কলি
কলিকাতা,সিমলা, ২নং সুকিয়া
বিজ্ঞান যন্ত্রে
শ্রীগণেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দ্বারা মুদ্রিত
Published by Bhabatácharan Mitra,
No. 71, Pathuria'Gha'ta Street, Calcutla.
১২১৪ সাল।
মুল্য ১• সাড়ে ছয় আনা।
No text on this page.
AN HISTORICAL SKETCH OF THE
A RYAN-HINDU WOMEN
of the Vedic, Upanishadic and Puranic Period,
BY
Mahendranath Roy Vidya nidhi
Author of Life of Hahnemann, Life of Babu
Akshay kuma'r Datta in Bengali,
Introduction to Bengali
Grammar &c.
প্রাচীন আৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত
(বেদ, উপনিষৎ, পুরাণ ও ইতিহাসদি বর্ণিত হিন্দু রমণীগণের জীবনী)
মহেন্দ্রনাথ রায় বিদ্যানিধি-প্রণীত,
ভূতপূৰ্ব্ব হিন্দুদর্শন-সম্পাদক
ঐবিধুভূষণ মিত্র দ্বারা সঙ্কলিত
কলিকাতা,সিমলা, ২নং কিয়াস ষ্ট্রীট,
বিজ্ঞান যন্ত্রে
শ্রীগণেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দ্বারা মুদ্রিত।
Published by Bhabadácharan Mitra,
No. 71, Pa'thuria' Ghata Street, Calcutla.
১২৯৪ সাল।
No text on this page.
উৎসর্গ । স্বর্গীয় গােপীনাথ রায় পিতৃদেবের মনস্কামনা সু- সিদ্ধির নিমিত্ত কলিকাতাস্থ সংস্কৃত কলেজের প্রধান অধ্যক্ষ অশেষ-সম্মানভাজন, মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন সি, আই, ই, সুধী মহােদয়ের কর- কমলে এই পুস্তক খানি পরম আগ্রহ সহকারে অর্পিত হইল। ১৮৭৮ শক, ১৫ই চৈত্র । গ্রন্থকার।
No text on this page.
বিজ্ঞাপন। আজ স্ত্রীজাতির আনন্দের দিন। স্ত্রীশিক্ষামােদী ব্যক্তি বর্গেরও আনন্দের দিন। স্ত্রীলােকে বেদ মন্ত্র রচনা করিয়াছিলেন, ইহা অবগত হইলে, কাহার না আনন্দ হইবে ? অসংখ্য বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণের সমক্ষে যদি কোন নারী নিজ তর্কশক্তি, শাস্ত্রজ্ঞা- নাদির পরিচয় দেন, তাহাতেই বা কিরূপ আনন্দ উপস্থিত হয়, সকলেরই হৃদয়ঙ্গম হইতে পারে। আবার যখন দেখিতে পাওয়া যায় আবিষ্টমনে প্রাচীন কালীন রমণীগণ ধর্মতত্ত্ব শ্রবণ করিতেছেন, তদ্বিষয়ে স্ব স্ব মতামত প্রকাশ করিতেছেন, পুত্র বা স্বামীর নিকট রাজনীতি ও ধৰ্ম্মনীতি-সংক্রান্ত বিষয় কীৰ্ত্তন করিতেছেন; তখন নরনারীর হৃদয়ে কি অপার আনন্দ জয়ে তাহার কি ইয়ত্তা করা যায় ? এইরূপ নিতান্ত হিতজনক ও শিক্ষাপ্রদ বিষয়ক কোন গ্রন্থ বাঙ্গালা ভাষায় প্রচারিত হইতে দেখিলে, সকলেরই মনে হর্যোদয় হইবে, তাহার সন্দেহ নাই। বাঙ্গালা ভাষায় স্ত্রীজাতির উন্নতি-বিধায়ক অনেক পুস্তক রচিত হইলেও, অপেক্ষাকৃত গৌরবজনক বিষয় অবলম্বন করিয়া কেহ অদ্যাপি পুস্তক প্রণয়ন করেন নাই। আমরা চিরদিনই ইতিহাস লিখনে বিরত। পূৰ্ব্ব কীর্তিকলাপ লইয়া গৰ্ব্ব করিব, এরূপ উপকরণ আমাদের যাহা কিছু আছে, তংপ্রতি আমরা চিরকালই ঔদাসীন্য প্রকাশ করিয়া থাকি। সেইরূপ বিষয়ে যিনি হস্তৰ্পিণ করেন, তিনি আমাদের প্রীতির পাত্র। এই জন্যই “প্রাচীন আৰ্য-রমণীগণের ইতিবৃত্ত”- প্রণেতা পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত মহেন্দ্রনাথ রায় বিদ্যানিধি আমাদের ধন্যবাদের যােগ্য। স্ত্রীশিক্ষার হিতচিকীষুগণ নিজ নিজ মত সমর্থনের এই এক খানি ধারাবাহিক ইতিহাস প্রাপ্ত হইয়া কি উন্নত মত প্রকাশ করিবেন, বলিয়া শেষ করা যায় না। পাশ্চাত্য দেশবাসীরা যে সংস্কৃত শাস্ত্র অবলম্বন করিয়া কত কত প্রাচীন বিষয় উদ্ধার [ ৮ ] করিতেছেন, যেই অমূল্য ধন আমাদের গৃহকোণে আবর্জনা রূপে পড়িয়া আছে। আমরা ভ্ৰম-ক্রমে এক বারও তৎপ্রতি দৃষ্টিপাত করি না, এ কি কম মনস্তাপের বিষয়। পুস্তকের নাম পাঠ করিলেই, ইহার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য উপলব্ধি হইবে। বেদ, উপনিষং, পুরাণ ও ইতিহাসাদি অব- লম্বন করিয়া ইহা লিখিত হইয়াছে। যে যে মহিলা স্বীয় অমা- নুষী শক্তি-ৰুলে সংস্কৃত শাস্ত্রে, রাজনীতিতে ও সাধারণ বিষয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়া নিজ নিজ নাম অক্ষয় ও অমর করিয়া গিয়াছেন, সেই সমস্ত প্রাতঃস্মরণীয় বামার বিবরণ এই পুকে প্রকটিত হইয়াছে। এই গ্রন্থে গ্রন্থকারের বহু গবে- ষণা ও অসাধারণ পরিশ্রমের পরিচয় পাওয়া যায়। দৃষ্টান্ত- স্বরূপ উল্লিখিত হইতে পারে, যংকালে বামাবােধিনী প্রত্রিকায় বৈদিক সময়ের নারীগণের বৃত্তান্ত প্রচারিত হয়, তাহার অনেক পরে বাবু রমেশচন্দ্র দত্তের ভানুবাদিত ঋগ্বেদ-সংহিতা মুদ্রিত হয়। সুতরাং দত্ত মহাশয়ের পুস্তক হইতে বিদ্যানিধি মহাশয় সে বিষয়ে কোন উপকার প্রাপ্ত হন নাই। সাহিত্যানুরাগী, স্ত্রীশিক্ষামােদী, বামাবােধিনী কাৰ্য্যাধ্যক্ষ শ্ৰীযুক্ত বাবু নৃত্যগোপাল সরকার মহাশয়ের আগ্রহে, এবং অামার ও কতিপয় বন্ধুর উদ্যােগে ইহা পুস্তাকারে প্রকাশিত হইল। এক্ষণে আমাদের একান্ত ইচ্ছা, ইহা মধ্য ও উচ্চ- শ্ৰেণী বালিকা বিদ্যালয়ের ও অন্তঃপুর-শিক্ষার পাঠ্য পুস্তক- রূপে নিৰ্বাচিত হয়। তাহা হইলে, গ্রন্থকর্তার উৎসাহ বর্ধিত হয়, আমাদের আশা চরিতার্থ এবং স্ত্রী-শিক্ষানুরাগীদিগেরও উদ্দেশ্য সফল হয়। ১২৯৩ সাল, ১৫ ই চৈত্র। বিধু ভূষণ মিত্র।
মুখবন্ধ। বিগত ১৮৭ শকের (১২৯২ সালের ১ বৈশাখ মাস হইতে বামাবােধিনী পত্রিকায় আৰ্য রমণীগণের বিষয়ে যে প্রস্তাব-নিচয় প্রকটিত হইতেছিল, তাহাই উদ্ধৃত করিয়া এই পুস্তক প্ৰস্কৃত হইল। কতক গুলি প্রস্তা- বের অনেকাংশ পরিবর্তিত ও অপ্রয়ােজনীয় বােধে সুন- বিশেষে বিবর্জিত হইল। অবশিষ্ট প্রস্তাব গুলিরও কোন কোন স্থান প্রবর্ধিত ও সংশােধিত হইল। একটী সন্দর্ভ ভিন্ন বামা- বােধিনীতে এ পর্যন্ত প্রকাশিত আর সমুদায় সন্দৰ্ভই এই গ্রন্থে বিনিবেশিত হইয়াছে। তদ্ব্যতীত, কয়েকটী নৃতন প্রবন্ধ ও সং- যেজন করা গেল। বেদ ও উপনিষ হইতে যে সকল মহিলার প্রদত সংস্কৃত বচন বামাবোধিনীতে মুদ্রিত হইয়াছিল, তাশ প্রয়োজনীয় বােধ না হওয়াতে, তং সমস্ত এই পস্তকে নিবদ্ধ করা হইল না। কেবল স্থানে স্থানে প্রয়ােজন মত মূল সংস্কৃত ভাগ টীকায় প্রদত্ত হইয়াছে। এই পুস্তকে যে সকল কামিনীর জীবনী নিপিবদ্ধ হইল তাহার অধিকাংশই এই মাত্র প্রথম বাঙ্গালা ভাষায় বিবৃত হইল। দুই একটা প্রবন্ধ কোন কোন পুস্তকে লিখিত হইয়াছে বটে, কিন্তু তাহা নারীজাতির শিক্ষার্থ গ্রন্থ নয়। নারীদিগের শিক্ষা- দানার্থ এবং কাল যত পুস্তক বিরচিত হইয়াছে, লীলাবতী ও লােপামুদ্রা ব্যতীত আর কোন প্রস্তাবই কোনও পুস্তকেই সমাবেশিত নাই। উভয় সন্দর্ভই, পুৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক পরি- মাণে পরিবর্ধিত আকারে এই গ্রন্থে লিখিত হইল। অধ্যয়ন অধ্যাপনার সৌকৰ্য্যার্থে প্রবন্ধ প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া নিৰ্বাচন করিতে হইয়াছে। ভারতীয় মহিলাকুলেৰ বিদ্যাশিক্ষা, শ্লোক রচনা, নানাশাস্ত্র- পারদর্শিতা বিচারশক্তি,পরিণয়-ক্রিয়া, সচ্চরিত্রতা, আদর্শ-জীবন, উপচিকীর্ষা, কৰ্ত্তব্য জ্ঞান ইত্যাদি বিদ্যাসংক্রান্ত, সমাজ-বিষয়ক ও শতি-সম্পৰ্কীয় বিষয়ে কীদৃশ অ্যুদয় হইয়াছিল, বহু প্রয়াস ও প্রযত্ন সহকারে যত দূর সঙ্কলন করিতে পারা যায়, এই গ্রন্থে [ ১ ] । } তাহা প্রকাশ করিতে যথােপযুক্ত আয়াস স্বীকার করিয়াছি। তাহাতে কি পরিমাণে কৃতকার্য হইয়াছি, জন-সাধারণ বিচার করিবেন। ভারতের প্রকৃত পুরাবৃত্ত উদ্ধার করা, এক প্রকার দুর্ঘট কাণ্ড। ইতিহাসের যথাযথ তথ্য নির্ধারণ করিবার পক্ষে কত যে অন্তরায় রহিয়াছে, তাহা বলিয়া শেষ হয় না। নিগৃঢ় অনুসন্ধানে ও প্রগাঢ় পরিশ্রমে যেরূপ হইতে পারে, তদ্বিষয়ে কিঞ্চিত্রও ন্যন ঘটে নাই। এই পুস্তক-সংগ্রহে অামাকে মূল সংস্কৃত গ্রন্থেরই অধিক আনুকূল্য লইতে হইয়াছে। তদ্ভিন্ন স্বনামখ্যাত, স্বর্গীয়,সুপণ্ডিত বাবু অক্ষয়কুমার দত্ত-বিরচিত ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, মহামান্য সত্যব্রত সামশ্রমী পণ্ডিতবরের প্রকাশিত সানুবাদ সাম- বেদ, অগ্রজক, মানাস্পদ কালীবর বেদান্তবাগীশের প্রবন্ধাদি ও পুরাতন বামাবােধিনী পত্রিকা হইতেও কিছু কিছু সাহায্য পাইয়াছি। সিটি কলেজের প্রধান অধ্যক্ষ, সম্মানভাজন, বামা- বােধিনী পত্রিকা সম্পাদক বাবু উমেশচন্দ্র দত্ত বি এ. মহাশয় মধ্যে মধ্যে আমাকে অনেক সৎ পরামর্শ দিয়াছেন, তন্নিবন্ধন তাহার সন্নিধানে বাধিত রহিলাম। পুস্তক মুদ্রাঙ্কনের শেষাবস্থাঘ সুপ্রসিদ্ধ শ্ৰীযুক্ত বাবু রমেশচন্দ্র দত্তের অনুবাদিত ঋগ্বেদ- সংহিতার ও কিঞ্চিৎ সাহায্য পাইয়াছি। এই গ্রন্থে বাঙ্গলা সম্বােধন পদ-সম্বন্ধে যে রীতি প্রবর্তিত করা গিয়াছে, তাহার বিবরণ সবিশেষ জানিতে ইচ্ছা হইলে, মং-প্রণীত “ বাবু অক্ষয়কুমার দত্তের জীবন-বৃত্তান্ত আলােচনা করিলে, অক্ষয় বাবুর মত ও মদ্রচিত বাঙ্গলা ব্যাকরণ পাঠে আমার অভিপ্রায় অবগত হওয়া যাইবে। রমেশ বাবুর ঋগ্বেদ-সংহিতায় ঐরূপ সম্বােধন প্রযুক্ত দেখিয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইলাম। এই পুস্তকের প্রতি শিক্ষানুরাগী মহােদয়েরা কটাক্ষপাত করিলে, আমার তাবং শ্রম ও আশা সার্থক হয়। ৯৮৮, ১৫ই চৈত্র। রাধানগর-খানাকুল- শ্রীমহেন্দ্ৰনাথ শৰ্ম্মা। জেলা হুগলী। }
সূচী।
বিষয়
প্রথম পরিচ্ছেদ।
পৃষ্ঠা
১। দেবজি
২। মদালসা
৩। বিশিষ্ট।
৪। জটিল।
৩৮৪১
৫। লেখা
৪২-৪৪
৬। সুলােচনা
৪৫-৪৮
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
১৯৫৪
৭। মৈত্রেয়ী
৮। লীলাবতী
১। মুরুচি
১০। বাপুষ্ট।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
১১। গাগী
-৩-৮৬
-৯৩
১২। কমেডি
১৩। বিশ্বরা
১৪। দোমি
১৫। বাক্
১-১০৪
উপসংহার।
১৪-১৫
১৬। অদিতি
১৭। অপালা
১৮। যী
১৯। উর্বশী
২। রােমশ
২১। লােপামুদ্রা
১৬-১৭
পরিশিষ্ট।
অরুগ্ধতী
অনসূয়া
সেখর সাঙ্খ
নিরীশ্বর সাভ
শঙ্করাচাৰ্য
প্রাচীন
আৰ্য রমণীগণের
ইতিবৃত্ত।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
দেবহূতি ।
বেদের স্ত্রীগণ যে শ্রেণীর, উপনিষদের স্ত্রীগণ সে শ্রেণীর
নহেন। বৈদিক সময়ের নারীরা বেদবাক্য রচনা করিয়াছেন।
উপনিষৎ কালের কামিনীকুল যে যে বিষয় প্রণয়ন করেন,
তাহা বেদ-বাক্য-তুল্য প্রামাণ্য বটে, কিন্তু সাক্ষাৎ সম্বন্ধে তাহা-
দের বিরচিত লিপি আমরা পাই নাই। অন্যান্য লােকে তাহা-
দের বচন লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু ইহারা বৈদিক
কালের কামিনীগণ হইতে কোন অংশে হীন ছিলেন, বলা যায়
না। পুরাণ, স্মৃতি প্রভৃতির সময়ের রমণীরা আবার সাধারণতঃ
ভিন্ন প্রকারের। উত্তরােত্তর এ বিষয়ের অনুশীলন দ্বারা তাহা
সম্যক্ প্রতীত হইবে।
সরস্বতী ও দৃষদ্বতী নদী-দ্বয়ের মধ্যবর্তী ব্ৰহ্মাৰ প্রদেশের
রাজা স্বায়ম্ভুব মনুর ঔরসে ও শতরূপা রার গর্ভে দেবহূতি
১৪ প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত। জন্ম গ্রহণ করেন। প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ * নামে দুই প্রসিদ্ধ রাজা দেবহৃতির ভ্রাতা ছিলেন। তিনি দেবর্ষি-নারদ-মুখে কর্দম মুনির স্বভাব-চরিত্র ও আচার-ব্যবহারাদি বিদিত হইয়া অবধি মনে মনে তাহাকেই পতিত্বে বরণ করেন, ও নিজ পিতা মাতার সমভিব্যাহারে ঋষিবরের আশ্রমে গিয়া উপনীত হন। এ দিকে ঠিক সেই সময়েই কর্দমও, ব্রহ্মচর্য-সমাপনান্তে গৃহস্থ- শ্রমে প্রবেশ করিতে মনােযােগী হইয়াছিলেন। সুতরাং দেব- হতির ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলিতে হইবে। তিনি যেমনই রূপবতী, তদনুরূপ বা তদধিক গুণবতী নারী। এটিও তাহার বিবাহ কাৰ্যের অনুকূল হইল। উভয়ে যথানিয়মে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন; পরিণয়ের পর হইতেই, তিনি ভর্তার অভি- মতানুযায়ী ক্রিয়ায় নিরত রহিলেন। ব্ৰতােপবাসের কঠোর নিয়ম পরিপালনে ও উৎকট পরিশ্রমে তাহার তনু অনুদিন বিবর্ণ ও শীর্ণ হইয়া আসিতে লাগিল। তখন ঋষি-প্রবর তঁাহার প্রতি কৃপাপরবশ হইয়া সদয় ব্যবহারে তঁাহার সন্তোষ সাধন করিলেন। অতঃপর ক্রমে ক্রমে তঁাহার ৯ নয়টী কন্যা জন্মিল । তদনন্তর তদীয় স্বামী যখন বনপ্রস্থানােদ্যত হইলেন, দেবহুতি তখন কহিতে লাগিলেন, “আপনি সংসারশ্রম পরিত্যাগ করিয়া গেলে,কে এই কন্যাগণের উপযুক্ত পাত্র অন্বেষণ করিয়া দিবেন ? আর, আপনার অভাবে কেই বা আমাকে জানােপদেশ প্রদান করিবেন? আমার তত্ত্বজ্ঞান-শিক্ষার্থ কাহাকেও নিযুক্ত না করলে, আমার নানা অনিষ্ট উৎপন্ন হইবে।" ইহাতে মুনিবরের অন্তরে * ইনিই পুরাণোক্ত ধ্রুবের পিত। সুতরাং দেবতুতি ধ্রুবের পিসী দেবহুতি। কারুণ্যরসের আবির্ভাব হইল। তিনি মহিষীকে ঈশ্বরােপাসনায় চিত্ত সংযম করিতে উপদেশ দিলেন এবং কিছু দিনের জন্য বন গমন স্থগিত রাখিয়া, গৃহাশ্রমে অবস্থিতি পূৰ্ব্বক কলা, অনসূয়া, শ্রদ্ধা, হবিভূ গতি, ক্রিয়া, খ্যাতি, অরুন্ধতী, শান্তি ১ নয়টী তনয়ার সহিত ক্রমান্বয়ে মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, ভৃগু, বশিষ্ট, এবং অথৰ্ব্ব এই ৯ নয় ঋষির উদ্বাহ কাৰ্য্য সম্পাদন করিলেন। এই দুহিতাদের মধ্যে অরুন্ধতী ও অনসূয়া বিলক্ষণ প্রসিদ্ধ। স্থলান্তরে তাহাদের বৃত্তান্ত বর্ণন করা যাইবে। সে যাহা হউক, অতঃপর দেবহূতির গর্ভে কপি- লের উৎপত্তি হইলে, কর্দম-মুনি বিজন বিপিনে গমন করেন। কপিল নামে দুই ব্যক্তি ছিলেন। এক জন প্রাচীন, অপর ব্যাস- দেবের পরবর্তী। প্রথন, সাংখ্যসূত্ৰকৰ্ত্ত। দ্বিতীয়, সগর- রাজের পুত্রগণকে দাহ করেন। তিনিও সাংখ্যদর্শনশাস্ত্রের সবিশেষ প্রচার-পক্ষে অনেক সহায়তা করিয়াছেন,-কেহ কেহ এইরূপ অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। এ স্থলে যাহার বৃত্তান্ত চলি- তেছে, তিনি অপেক্ষাকৃত অপ্রাচীন অর্থাৎ দ্বিতীয় কপিল। কালক্রমে কপিলদেব বয়ঃপ্রাপ্ত ও সমধিক প্রজ্ঞাবান হইয়া উঠিলেন। তিনি জননীর অভিপ্রায়ানুসারে তাহাকে শাস্ত্র শিক্ষা প্রদানে ব্যাপৃত হইলেন। জননীও অবহিতচিত্তে তাহার উপদেশ শ্রবণ করিতে লাগিলেন। কপিল-মহর্ষি-প্রদত্ত উপ- দেশ সংক্ষেপে উল্লেখ করিলেই, দেবহূতির বিষয় সমাপ্ত হইবে। কপিল মুনি মাতাকে যেরূপ বলিতে আরম্ভ করেন, এবং দেব- তুতিও তদ্বিষয়ে যেমন কথােপকথন করেন, নিম্নে বর্ণিত হইল।
প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত। কপিল।-“অামার মতে যোেগই মুক্তি-সাধনের প্রধান উপায়। সেই যােগ-সাধন, মনঃসংযম অর্থাৎ অন্তঃকরণের একাগ্রতা ব্যতিরেকে কস্মিন্ কালেও সম্পাদিত হইতে পারে না। মনকে যে দিকে চালিত করা যায়, উহা সেই দিকেই ধাবিত হইতে থাকে। চিত্তবৃত্তি ভােগ্য বস্তুতে আসক্ত হইলে, জীবের নিতি লাভের সম্ভাবনা নাই। কিন্তু উহা ঈশ্বরে প্রতিষ্ঠিত হইলে পর অজ্ঞানতা, পাপ, প্রলােভনাদি হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। পরাৎপরে আত্মসমর্পণ বিনা যােগিগণের ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভের আর দ্বিতীয় পথ বিদ্যমান নাই। সাধুসঙ্গই ঐ সমুদায়ের মূলীভূত।” দেবহুতি।-“বংস! ভগবাকে কিরূপ ভক্তি করা কৰ্তব্য, অবগত নহি। আমি স্ত্রীজাতি, ঈশ্বরের প্রতি আমাকে কি প্রকার ভক্তিপ্রকাশ করিতে হইবে, এটী বিশেষ করিয়া বল । ফলতঃ ভক্তিযােগে ঈশ্বর-পদ প্রাপ্ত হইতে পারিলেই, আমার জন্ম সার্থক হয়। আমি জ্ঞানহীন সামান্যা নারী মাত্র ; অত- এব ঐ দুর্বোধ অথচ উৎকৃষ্ট তত্ত্বে যাহাতে সহজে আমার প্রতীতি হইতে পারে, তাদৃশ বিশদ প্রণালীতে তাহা কীর্তন কর।” কপিল।-“বেদোক্ত কৰ্ম্ম করিলেই, ভগবদ্ভক্তির উৎপত্তি হয়। এই ভক্তির প্রভাবেই মােমার্গ সুগম হইয়া আইসে । কিন্তু জননী! অনেকেই এইরূপ প্রণালীতে পরিতৃপ্ত নহেন। তাহারা মুক্তি অপেক্ষা ভক্তিযােগে পরমেশ্বরানুভব-জনিত অধিক তর আরাম আছে বলিয়া, তাহাতেই লিপ্ত থাকেন। মহর্ষি স্বীয় মাতাকে যে বিষয় অবলম্বন করিয়া উপদেশ দেন, তাহা সেশ্বর-সাংখ্যদর্শনের অন্তর্গত অতি উৎকৃষ্ট তত্ত্ব। A দেবহুতি। ১৭ পাঠক পাঠিকারা ধীরভাবে এ বিষয় আলােচনা করিলে, ইহার গুরুত্ব কত, অনুভব করিতে সমর্থ হইবে। কপিল পুনরপি কহিতে লাগিলেন, নবী! যাহা দ্বারা হৃদয়- গ্রন্থি শিথিল ও বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়,-পরমাত্মার সন্দর্শন সম্পা- দিত হয়, -মােক্ষলাভাৰ্থ সুধীগণ যে বিষয়ের নির্দেশ করিয়া থাকেন, সেই জ্ঞান-সম্বন্ধে কিছু বলিতেছি, শ্রবণ করুন। যিনি আত্মস্বরূপ, আদিরহিত, স্বয়ং-প্রকাশিত এবং গুণ ও প্রকৃতি- সঙ্গ-বিহীন, নিখিল ব্ৰহ্মাণ্ড যাহার প্রভাব-বলে প্রকাশ পাই- তেছে, তিনিই পরম পুরুষ। প্রকৃতি, যিষ্ণু-শক্তির প্রতিরূপা ও অব্যক্ত গুণশালিনী। তিনি লীলাক্রমে বিষ্ণুর নিকটবর্তিনী হইলে, বিষ্ণু তাহাকে গ্রহণ করিয়া থাকেন। যে সমুদয় ক্রিয়া প্রক- তির গুণ প্রযুক্ত নিপাদিত হয়, প্রকৃতির সঙ্গে উৎকট সম্বন্ধ আছে বলিয়া, তংসমস্ত তাহার কৰ্ত্তব্যসাধ্য,এইরূপ মনে করেন। জননী! পুরুষ স্বয়ং সাক্ষী-মাত্ৰ-সুখস্বরূপ। কোন কর্মেই তাহার প্রভূত্ব নাই। প্রকৃতিই-কাৰ্য, কারণ ও কর্তৃত্বের মূলী- ভুত হেতু। আর, পুরুষ কেবল সুখ-দুঃখের উপভভাক্তা। দেবহূতি।—এই প্রত্যক্ষ-পরিদৃশ্যমান বিশ্বের সূক্ষ্ম ও স্থূল কাৰ্য, প্রকৃতি ও পুরুষ হইতে সমুভূত হইয়াছে বুঝিলাম বটে,-কিন্তু, হে প্রিয়দর্শন! সম্প্রতি তুমি উহাদের লক্ষণ বর্ণন পূৰ্ব্বক অামার গােচর কর । কপিল।-মাতঃ! সনাতন, সত্ত্বরজস্তম-গুণেপেত, অব্যক্ত কাৰ্য-কারণস্বরূপ, নিৰ্বিশেষ ও সকলের আশ্রয়ভূত যে বস্তু, তাহাই প্রকৃতি। সলিল, ভূমি, আকাশ, বহ্নি, বায়ু—এই পঞ্চ ভূত ; রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ-এই পঞ্চ তন্মাত্র ; শ্রুতি, !
প্রাচীন আৰ্য্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত। রসন, ত্বক, নাসিকা, নয়ন, বাক্য, পাদ, ইত্যাদি,-এই ১• দশ বহিরিন্দ্রিয় ; অহঙ্কার, চিত্ত, মন, বুদ্ধি—এই ৪ চারি অন্তরিন্দ্রিয়,-মােটে এই ২৪ চতুর্বিংশতি তত্ত্ব। ইহা সগুণ ব্রহ্মের সন্নিবেশ স্থল। কাল’ লইয়া, ২৫ পঞ্চবিংশতি তত্ত্ব পরি- গণিত হয়। কাহারও কাহারও মতে ‘কাল’ এক স্বতন্ত্র পদার্থ নহে। তাহারা বলেন,—উহা বিশ্বপতির প্রভাব বৈ আর কিছুই নয়। আর, পুরুষ-সূর্যের সদৃশ নিগুণ, নির্বিকার, ও কর্তৃত্ব- বিবর্জিত। আমি কা'-- যে মুহূর্তেই পুরুষ এই অভিমান করেন, তদণ্ডেই তিনি প্রকৃতিতেই সমাসক্ত হইয়া পড়েন ; সুতরাং নিরানন্দ ও অনয়াত্ত হন। অর্থ ব্যতিরেকে সংসার-যাত্ৰা নিৰ্বাহ হওয়া দুর্ঘট। এদিকে আবার, বিষয়-বাপারাদিচিন্তনে ব্যাপৃত থাকিলে, পুরুষের রাশি রাশি অনিষ্টোৎপত্তি ঘটে। এই নিমি- ওই বলি,-চিত্তবৃত্তি অসাধু মাগে ধাবমান হইলে পর, প্রগাঢ় ভক্তি ও বৈরাগ্য দ্বারা তাহাকে বশতপন্ন কর কর্তব্য। অপর, যম-নিয়মাদি যােগ দ্বারা চিত্ত আয়ত্ত করিয়া, শা বিশিষ্ট হইয়া, ঈশ্বরে আত্মসমর্পণ, সমগ্র ভূতে সমদৃষ্টি, মৌন অবলম্বন, স্বধর্মের অনুষ্ঠান, বিষয়নিস্পৃহতা, বিজন-স্থানে অব- স্থিতি, ব্রহ্মচর্য ও প্রকৃতি-পুরুষের জানালাভার্থ জ্ঞানার্জন করিতে পারিলেই, ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার লাভে কৃতকার্য হওয়া যায় ভগবতী! জলস্থিত সূর্যের প্রতিবিম্ব, ভূভাগস্থ ভাস্কর- বিম্ব দ্বারা পরিলক্ষিত হইয়া থাকে, এবং সলিলস্থ ভানু-প্রতিবিম্ব সহযােগে যেরূপ গগনতল-স্থিত রবি দৃষ্ট হন--ইন্দ্রিয়, ভূত ও মননাময় আত্মার প্রতিবিম্ব দ্বারা সেইরূপ ত্রি গুণাত্মক অহঙ্কার, দেবহূতি। ব্রহ্মের প্রতিবিম্ব-রূপে অবলােকিত হইলে, সেই অহম্বর দ্বারা পরমার্থ-পরিজ্ঞান-রূপ আত্মার সাক্ষাৎকার ঘটে। দেবহৃতি।—বংস! প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়েই যে নিত্য এবং উভয়েই উভয়ের যে আশ্রয়স্বরূপ, তাহা আমার প্রত্যয় হইল। ক্ষিতি ও গন্ধ যেমন পরস্পর বিভিন্ন হইয়া থাকিতে পারে না,- 'রস ও নীরের যাদৃশ অভেদ্য সম্বন্ধ, অর্থাৎ পরস্পর বিশ্লিষ্ট হইয়া, যেমন উহারা স্বতন্ত্র ভাবে অবস্থান করে ,-ত দ্রুপ প্রকৃতি পুরুষ সংপৃক্ত, অর্থাৎ অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে সংবদ্ধ। কপিল।এক্ষণে সাবলম্বন যােগ বর্ণন করিতে প্রবৃত্ত হই- লাম। উহা দ্বারা মন মলারহিত ও সম্মার্গে প্রধাবিত হইতে অকে। যথাশক্তি নিজাতি ধৰ্ম্মানুষ্ঠান, ধাৰ্ম্মিকগণের বন্দন, নির্বাণ-প্রাপ্তির কারণ অনুরাগপ্রকাশ, অপবিত্র দ্রব্য ভক্ষণ না করা, পরিমিতাহার, জনশূন্য স্থানে অবস্থান, অহিংসাদি উৎকৃষ্ট ত্ৰত গ্ৰহণ, সত্যকথন. তপস্যা, বহ্মচর্যা শুদ্ধাচার, ঈশ্বরের আরাধনা এবং প্রাণায়ামাদির সহায়ত-বশে অন্তঃকরণকে যােগা- ভিমুখে ধাবিত করিতে হয়। বহ্নি ও বাত দ্বারা স্বর্ণের বিশুদ্ধ লাভের ন্যায়, যােণী শ্বাস প্রশ্বাস নিরােধ করিতে পারিলেই, শুদ্ধা- ওর হন। প্রাণায়াম দ্বারা বাত-পিত্ত-শ্লেষ্ম দোষ,-ধারণা দ্বারা মনোমালিন্য,--ও ধ্যান দ্বারা নাস্তিকতা বিদূরিত করিতে হয়। অতঃপর যােগমাহাত্মে চিত্তপ্রবৃত্তি অমল ও সুসমাহিত হইলে পর, নাসিকাগ্র ভাগে দৃষ্টি সংস্থাপন পূৰ্ব্বক ব্ৰহ্মপতির চিন্তার মনঃসংষম করা কর্তব্য। ভক্তগণের হৃদয় মনই তাহার উপবেশ- নােপমুক্ত একমাত্র আসন।
২ প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত। দেবহুতি।-সাংখ্যদর্শন গ্রন্থে প্রকৃতি পুরুষ প্রভৃতির বৃত্তান্ত যেরূপ কীৰ্ত্তিত হইয়াছে, তুমি তাহার উল্লেখ করিয়াছ। অধুনা তাহার মূল-স্বরূপ ভক্তি-যােগের বিষয় বর্ণন কর। উহা শ্রবণ করিলে, জীব, সংসারিক ব্যাপারে নিস্পৃহ হইয়া পড়ে। তুমি যেরূপ তত্ত্বোপদেশ প্রদান করিয়াছ ও করিতেছ, তাহাতে আমার মনে হয়, তুমিই যেন যােগ-প্রকাশক দিনমণি। কপিল।-দেবী! ভক্তিযােগ ভিন্ন ভিন্ন প্রকার । দশীয় যোগ-তামস, অর্থাং নিকৃষ্ট যােগ ; ধন-মান বা খ্যাতি- প্রতিপত্তির আশায় যে যােগ সমাহিত হয়, তাহা রাজস যােগ নামে অভিহিত হয়, অর্থাং তাহাও উত্তম যােগ নহে, মধ্যবিধ যােগ। কিন্তু পাপ ধ্বংস করা উচিত, জগদীশের প্রতি প্রীতি প্রকাশ না হইলে, জীবের গত্যন্তর নাই, এবষ্কৃত বােধ হওয়াই, সাত্ত্বিক যােগ এবং ইহাই সৰ্বশ্রেষ্ঠ। ইহার অন্য নাম নিগুণ ভক্তি-যােগ। যেমন সুরধুনী-বারি, সমুদ্র-নীরে নিপতিত হইলেই, সাগর-সলিলের ধর্ম প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ নিষ্কাম মনােগতি (অর্থাং ঈশ্বরের নিকটে পার্থিব কামনাহীন প্রার্থনা) সেই ভাব লাভ করে, সুতরাং তাহা নিতান্ত প্রশংসনীয় পদার্থ। কপিলদেবের মহাৰ্হ শিক্ষা লাভ করিয়া, কর্দম-দয়িতা দেব- তুতির প্রকৃত তত্ত্ব-দৃষ্টি জন্মিল। জননী ও সন্তানে পরস্পর কি উচ্চ বিষয়ের কথাবার্তা হইয়াছিল, পাঠিকাগণ আবিষ্ট মনে বিশেষরূপ অনুধ্যান না করিলে, ললনা-রত্বের গুণাবলির প্রাধান্য অবধাৰণে সমর্থ হইবেন না। কপিলের যশে তাহার গর্ভধারিণী যশস্বিনী, আপাততঃ এই প্রকার বােধ হইতে পারে। কিন্তু বস্তুতঃ প্রসূতির গুণেই সন্ততি গুণান্বিত হয়। দেবহূতির
দেবহুতি।
প্রথমাবস্থায় চরিত-বিবরণে তাহাই সুব্যক্ত:পে প্রতিভাত হইতে
থাকে। বীর নেপােলিয়ন্ এক সময়ে বষীয়সী কোন ফরাসী
কামিনীকে ‘ফান্সের অভ্যুদয়ের কারণ কি ? জিজ্ঞাসা করিয়া,
ন্সদেশের বীর-প্রসূ বরাৱোহাগণের লােকোত্তর ক্ষমতাই
তাহার হেতু”—যেমন এই সদুত্তর পাইয়াছিলেন, আমাদিগকে
সেই রূপ যদি কেহ জিজ্ঞাসা করেন, কপিল যে “আদি বিদ্বান্”
নামে পরিচিত, ‘সাংখ্য শাস্ত্রের তুল্য আর শাস্ত্র নাই’*–স্তাহার
গ্রন্থের যে এরূপ অসাধারণ আদর,-তাহার কারণ কি?
তদুত্তরে আমরা বলিব, কপিল-মাতা দেবহূতিই তাহার অদ্বিতীয়
হেতু। এতদ্ভিন্ন অ
এতদ্ভিন্ন অন্য পরিচয়ও উল্লিখিতরূপ গৌরবজনক।
ইতি পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে, তিনিই ভক্ত-প্রবর ধ্রুবের
পিতৃসা (পিসী)। তাহার জ্যেষ্ঠা সহােদরা ‘আকৃতি ' ও
কনিষ্ঠা ভগিনী প্রসূতির সম্বন্ধেও তিনি অল্প শ্লাঘ্য নহেন।
কন্যাবর্গের ভর্তৃকুলের সংস্রবও বিলক্ষণরূপ শ্লাঘা-স্থল। আর,
তাহার স্বীয় পতির সদগুণ উপমাহীন বলিলেও চলে। পুত্রের
গরিমার তাে পরিসীমাই হয় না।
দেবহৃতির চরিত্র আলােচনা দ্বারা দুইটা বিষয় প্রতীতি
হইতে থাকে। প্রথমতঃ তাহার পরিণয়-ব্যাপার, গান্ধৰ্ব্ব
বিবাহের এক প্রধান উদাহরণ। দ্বিতীয়তঃ, এই উদ্বাহী
বাল্যবিবাহ-পরিচায়ক কাৰ্য্য নহে; প্রত্যুত, উহা বয়ঃস্থ অবস্থায়
সমাহিত হয়।
এ স্থলে, কপিল-বৃত্তান্ত-সংক্রান্ত একটা গুরুতর বিষয়ের
-
“নাপ্তি সাংখ্য-সমং জ্ঞানং।'
প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত। মীমাংসা অবশ্যক হইয়াছে। প্রস্তাবের প্রারম্ভে দেবহূতি-নন্দন কপিলকে যে আমরা অপেক্ষাকৃত অপ্রাচীন,অর্থাৎ দ্বিতীয় কপিল বলিয়াছি, বেদান্ত-দর্শনের শারীরিক ভাষ্যে শঙ্করাচাৰ্য্য তাহার আভাস দিয়াছেন। শঙ্করদেবের উক্তিতে দ্বিতীয় কপিলের নামান্তর “ বাসুদেব ” প্রাপ্ত হওয়া যাইতেছে। দেবহূতি-কুমা- রের যে অপর নাম বাসুদেব’,তাহার অন্য প্রমাণাভাব। পক্ষান্তরে এই কপিল সাংখ্যদর্শনের মতই শিক্ষা দিয়াছেন। সুতরাং তিনি সাংখ্যমূত্রকার প্রাচীন কপিল ও তঁাহার অপর আখ্যা- “আদি বিদ্বান্।” নিরীর গর সাংখ্যদর্শন-প্রণেতা প্রথম কপিল- কেই পুরাণকারেরা সেশ্বর-সাংখ্যকারভাবে নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন। পুরাণকর্তারা মূল বেদ, উপনিষৎ, দর্শনশাস্ত্র প্রভৃতি হইতে মূল বিষয় সংগ্রহ পুরঃসর যে কিছু কিছু পরিবর্তন করিয়া থাকেন, তাহা সময়ান্তরে বিলক্ষণ প্রমাণ করা যাইবে । :0ঃ- মদালসা। দেবহূতির প্রবন্ধে আমরা বলিয়াছি, মাতার গুণ-প্রভাবেই সংপুত্রের উদ্ভব হয়। সেই বিষয় দৃঢ়ীকরণ-মানসে পুনৰ্ব্বার ঐরূপ চরিত্রের একটি মহিলার বৃত্তান্ত সঙ্কলিত হইল। সেই অলৌকিক-গুণবতী সুপ্রসিদ্ধ নারীর নাম মদালসা। মদালসার পিতা গন্ধৰ্ব্ব-জাতির রাজা ছিলেন। ঋতধ্বজ নামক এক বিখ্যাত মহীপতির সহিত তাঁহার পরিণয় ক্রিয়া সম্পাদিত হয় । রাজা ঋতধ্বজ যুবাবয়সে নিজ রূপ-গুণের অনুরূপা কামিনীকে পত্নীত্বে গ্রহণ করিতে পারিয়াছিলেন বলিয়া,
মদালসা।
৩
তাহাকে ভাগ্যবান্ পুরুষ বলিতে যইবে। কালক্রমে ঋতধ্বজের
ঔরসে মদালসার গর্ভে বিক্রান্ত, সুবাহু, শক্ৰবৰ্ধন ও অলক এই
কুমার চতুষ্টয় জন্ম পরিগ্রহ করেন। তন্মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও
তৃতীয় সন্তান জননী-সকাশে ধর্মোপদেশ লাভ করিয়া, কিশাের
কাল হইতে সন্ন্যাসব্রত অবলম্বন করেন।
কোন সময়ে বিক্রান্ত রােদন করিতে করিতে, স্বীয় মাতার
সমীপে সমাগত হইয়া, এইরূপ কহিতে লাগিলেন,-“ জননী।
জন কয়েক বালক আমাকে যার পর নাই কটুক্তি ও প্রহার
করিয়াছে, আপনি জনকের গােচর করিয়া, ইহার প্রতিবিধান
করুন। আমি নৃপতি-তনয় হইয়া, কেন তাহাদের সমক্ষে তির
সূ ত হইব?’
মদালসা।“ বৎস! তুমি শুদ্ধাত্মা। আত্মার প্রকৃতি,
নাম দ্বারা কলুষিত হয় না। তােমার বিক্রান্ত ' এই আখ্যা
বা ‘রাজতনয় ' এই উপাধি প্রকৃত পদার্থ নহে,-কল্পিত মাত্র।
অতএব নরনাথ-নন্দন বলিয়া অভিমান করা,তােমার পক্ষে শােভা
পায় না। তােমার এই দৃশ্যমান শরীর পাঞ্চভৌতিক। তুমি
এই দেহ নহ। সুতরাং দেহের বিকারে ক্রন্দন কেন কর?
ভক্ষ্য ও সলিলাদি দ্বারা দেহ পরিবর্ধিত হয়। কায়-স্থিত
ভােতিক পদার্থ নিস্তেজ হইলে, শরীর জীর্ণ হইতে থাকে।
হে বলহীন বা বলবা হইলে, তােমার আত্মার হ্রাস-বৃদ্ধি
হইবে না। অতএব তিরস্কার প্রহারাদি দ্বারা তােমার কষ্ট
হইবার কোন কারণ নাই। আত্মার তেজঃস্বরূপ পরাংপুরকে
অনুসন্ধান করা তােমার পক্ষে একান্ত কর্তব্য কৰ্ম্ম ।
“মুড়ে সংসারের জ্বালা-যন্ত্রণা দূরীকরণার্থ আমােদ প্রমোদ
প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত। র সম্ভোগ করাই, খজনক বলিয়া বােধ করে। কিন্তু, সুখ দুঃখ যে অস্থায়ী, এটী তাহারা অবগত নয়, ইহা কি অল্প পরিতা- পের বিষয়!' মদালসার উল্লিখিত উপদেশপরম্পরা শ্রবণ পূর্বক বিক্রা- ন্তের তত্ত্বজ্ঞান জমিল। তৎপরে তিনি বনবাসাশ্রয় করিলেন। অগ্রজের দৃষ্টান্তে অনুজ সুবাহ ও শত্রুমর্দনও সংসারে বীতশ্রদ্ধ হইয়া উঠিলেন। এই ঘটনা নির্দেশ কালে চৈতন্য ও তঁাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বিশ্বরূপের বিবরণ আমাদের স্মৃতিপথে সমারূঢ় হইল। ভক্তপ্রধান চৈতন্য, বিশ্বরূপের সন্ন্যাশ্রম গ্রহণের কথা শুনিয়া, যেমন সংসারত্যাগে কৃতসঙ্কল্প হন, সেইরূপ শত্রু- মর্দন ও সুবাহরও সংসারে বৈরাগ্য জন্মে। যদি কেহ পুত্রগণের প্রতি মদালসাপ্রদত্ত শিক্ষা অপ্রকৃত মনে করেন, তবে তাহাকে এই মাত্র বলি, ধৰ্মাত্মা পল , লুথার, থিওভাের পার্কার প্রভৃতির জননীর বৃত্তান্ত এক বার মাত্র পাঠ করুন্। মদালসার উপদেশের গুণে পুত্ৰয় অরণ্যবিহারী হইলেন দেখিয়া, রাজা ঋতধ্বজ ভাবিতে লাগিলেন, ক্রমে ক্রমে তিনটা সন্তানই তাে রাজ্যভার গ্রহণে পরায়ুখ হইল। এখন কি উপায়ে সর্বকনিষ্ঠ ও একমাত্র ভরসাস্থল অলর্কের সংসারে অবস্থিতি ঘটে। তিনি একদা স্বীয় পত্নীকে যেরূপ ভাবে মিনতি করেন, ভাহা পশ্চাৎ লিখিত হইল। ঋতধ্বজ। প্রিয়তমা। তােমার শিক্ষা-প্রভাবে তিনটী তনয় সংসারবিমুখ হইল। এখন চতুর্থকে আর সেরূপ শিক্ষা দিও না। ধৰ্ম্ম উত্তম বস্তু, তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু মদালসা । ২৫ এই কুমারকে ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা দিবার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি-বিষয়ক এমন উপদেশ প্রদান কর, যাহাতে সে রাজ-গুণােপযুক্ত হইতে পারে।” মদ লিসা।–“মহীপাল ! যাহাতে আপনাকে আর আক্ষেপ করিতে না হয়, আমি তদ্বিষয়ে মনােযােগিনী হইলাম। আপনার অনুজ্ঞানুসারে অলককে রাজনীতি ও ধৰ্ম্ম- তত্ত্ব উভয়ই শিক্ষা দিব। কিন্তু ধৰ্ম্মনীতির প্রতি আমার অধিক দৃষ্টি থাকিবে, বলাই বাহুল্য মাত্র। ধৰ্ম্মই কেবল মনুষ্যের লক্ষ্যস্থল। সেই ধর্মের প্রতিপাদ্য ঈশ্বর আবার মনুষ্যের আশা-ভরসাস্থল ; তিনিই একমাত্র শান্তির নিদান। জননী যদি পুত্রের পারত্রিক কল্যাণ কামনা না করেন, তবে আর কে করিবে? কেবল গৃহ-কৰ্ম্ম শিক্ষা দিবার জন্য বিধাতা জননী সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করেন নাই। অতঃপর অলক আর বালক নহেন। এখন তিনি কৌমারা- ৰস্থা অতিক্রম করিয়া, যৌবন-দশায় উপস্থিত। সুতরাং তাহার মাতাও এক্ষণে আর তঁাহার কেবল প্রতিপালিকা নহেন। এখন অপত্যের হাতে ধৰ্ম্মজ্ঞান জন্মে, সেই দিকে তাহাকে চিত্ত সমাবেশ করিতে হইল। এস্থলে আমরা মদালসার প্রদত্ত উপদেশের কিয়দংশ প্রকটন করিলাম। মদালসা।–বংস! তুমি এমন মধুর ভাবে রাজ্য শাসন করিবে যে, তদ্বারা কেহই তােমার যেন বিপক্ষতাচরণ করে। সুশাসনপ্রভাবে পৃথিবী পালন করিতে পারিলেই, তুমি পুণ্যজনিত মুখ সন্তোগ পুরঃসর পুলকিত হইবে। “যদি কোন রাজা কোন উৎসব-পুত্রে তােমার ভবনে সমাগত প্রাচীন আৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। হন, তবে সদাচরণ দ্বারা তাহাকে আপ্যায়িত করিবে। নিকট কুটুম্বগণকে যাহাতে কোন রূপ অভাব অনুভব করিতে না হয়, তদর্থ সতত যত্নপর হইবে। সৰ্ব্বদা পরহিত-চিন্তায় নিরত রহিবে। পরস্ত্রী-চিন্তা স্বপ্নেও মনােমন্দিরে স্থান দিও না।” “তাত অলক। যাগ যজ্ঞ করিয়া পণ্ডিতদিগের সন্তোষ সাধনের চেষ্টায় থাকিবে। বিস্তর বিত্ত বিতরণান্তর শরণাগত জন ও ব্রাহ্মণকে পরিতৃপ্ত করিবে। নিজ পত্নীর প্রাণগত কামনা অবিলম্বে সাধন করিও, এবং অরাতিকুলকে সমর-ক্রিয়ায় প্রীত রাখিও।” মদালসার প্রদত্ত সুশিক্ষায় অলর্কের জ্ঞান-নেত্ৰ উন্মীলিত, হইল । অনন্তর ঋতধ্বজ, পুত্রের উপনয়ন কার্য সম্পাদন করিলেন। অলক,যজ্ঞােপবীত গ্রহণ করিয়া,জননী-চরণে প্রণিপাত পূৰ্ব্বক কহিলেন, “মা! পরকাল ও ইহকালের সুখ ও মঙ্গলের নিমিত্ত কি কি কৰ্ম্ম করা উচিত, আমায় সম্প্রতি সে বিষয়ের উপদেশ দিন।” মদালসা।-“প্রিয়তম! রাজ্যাভিষেকের অব্যবহিত পর হইতেই প্রজাপালনে প্রবৃত্ত থাকিবে। ধৰ্ম্মশীল নৃপের পক্ষে প্রজারঞ্জন অপেক্ষা আর উৎকৃষ্টতর পুগ্যক্রিয়া নাই। ধৰ্ম্মনীতি হইতে রাজনীতি বিভিন্ন পদার্থ নহে। যিনি প্রকৃত ধার্মিক নহেন, তাহারই নিকটে ঐ দুই স্বতন্ত্র বলিয়া বিবেচিত হইয়া থাকে। নিঃস্বার্থ ভাবই পুণ্যের প্রাণ, ইহা হৃদয়ঙ্গম হইলে পর, আর ঐ উভয়ের মধ্যে কোন বিভেদ লক্ষিত হইবে না। পাশ- ক্রীড়া, পানদোষ, পরগ্লানি, দিবস-নিদা, অনর্থক পথ-পৰ্যটন, ভােগাভিলাষ, ব্যভিচার, পশুহত্যাদি নিন্দনীয় কাৰ্য কোন মতেই হৃদয়ে স্থান দিবে না। লােভ-মােহাদ ৬ ছয় রিপু মদালসা। ২৭ হইতে, সর্বদা দূরে অবস্থান করিবে। মন্ত্রণা যেন ষটকর্ণে অর্থাৎ তিন ব্যক্তিতে গমন না করে। গুপ্তচর দ্বারা মন্ত্রিগণের পরামর্শ অবগত হইবার উদ্যােগ করিবে; অন্যথা রাজ্যস্থিতি ও আত্মরক্ষা দুরূহ হইয়া উঠিবে। কোন সচিব, দৈবযােগে তােমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিলেও, তাহার প্রতি এরূপ সদাচরণ ও শিষ্ট ব্যবহার প্রদর্শন করিবে যে, তারা সে ৰিমােহিত না হইয়া থাকিতে পারিবে না। তখন সে আর রাজদ্রোহী হইবে না। দেশ-পরিরক্ষণার্থ জ্ঞাতি-কুটুম্বকে প্রত্যয় করা যুক্তিসঙ্গত নহে। রিপুজয়ী হওয়া, নরপতির সর্বপ্রথম করণীয় বিষয়। তৎপরে, অমাত্য ও অন্যান্য ভৃত্যদিগকে স্ববশে আনয়ন করা একান্ত কর্তব্য। এরূপ না হইলে, অরাতি-নিপাতে সমর্থ হওয়া যায় না। রাজতন্ত্রের বন্ধন উল্লিখিত রূপ সুদৃঢ় না হইলে, রাজত্বভােগ এক প্রকার বিড়ম্বনা মাত্র হইয়া উঠে। কোপ, মতা, অজ্ঞানতা, লােভ, কাম, অত্যন্ত আমােদ প্রমােদ, অভিমান প্রভৃতি রাজকুলের ধ্বংসের হেতু। পাণ্ডু, অনুদ, ঐল, বেণ, বলি, ভূপবরেরা যথাক্রমে কাম, ক্রোধ, লােভ ও অভিমান দ্বারাই নিহত হইয়াছেন। পুরন্দর, ঐ সমস্ত বিপু পরাজয় করাতেই, সংসারে তাহার বিজয়পতাকা সংস্থাপিত হইয়াছিল। রাজাদের কর্তব্য যে, তঁাহারা পিককুলের সুস্বর বচন, মধুকরের সার গ্রহণ-শক্তি, কূরঙ্গের সাবধানতা ও ক্ষিপ্র- কারিত্ব এবং বায়সের মন্ত্রণারহস্য-রক্ষা শিক্ষা করেন। তিরিক্ত পিপীলিকা ও কীটের সদনেও কিঞ্চিৎ শিক্ষণীয় আছে। পিপীলিকার গুণ এই,-কোন কৰ্ম্মের সূত্রপাতের পর, তাহা হঠাৎ ত্যাগ করে না, যত ক্ষণে তাহাতে সিদ্ধমনােরখ না হয়, এতদ্ব্য- ২৮ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। তত ক্ষণ তাহার আর ক্রিয়াস্রোত অপ্রতিহত প্রভাবে চলিতে থাকে। আর, কীট অজ্ঞাতসারে নিগূঢ় ভাবে মহীরূহের ত্বকে প্রবিষ্ট হইয়া, নীরবে যেরূপ তরুত্ব সচ্ছিদ্র ও সারশূন্য করিয়া আনে, রাজারও উচিত, ঐ রূপে স্বীয় অভীষ্ট-পূরণে উদেবাগী থাকেন। মহী-মণ্ডুলে পাকশাসনের নীর-ধারা-সম্পাত দর্শন করিয়া, ধন-বিতরণ-বিষয়ে রাজাকে মুক্তহস্ত হইতে হইবে। ভাস্করের রস-সংগ্রহ-কাৰ্য পৰ্য্যবলােকন করিয়া, প্রজাপুঞ্জের সকাশ হইতে মহীশ্বরের অর্থাহরণ শিক্ষা করা বিধেয়। প্রিয়ই হউক, আর অপ্রিয়ই হউক, দণ্ডনীয় হইলেই, যথােচিত শালি না দেওয়া, নরপতির পক্ষে ঘােরতর অকীৰ্ত্তিকর। পবন, যেমন অদৃশ্যভাবে সৰ্ব্বস্থানে গতিবিধি করেন,ভূমিপতি স্বয়ং না গিয়া গৃ? চর দ্বারা বলীয়ান্ হইয়া, সেইরূপ সৰ্ব্বত্রগামী হইবেন।” অলর্ক।—মাতঃ! আপনার সদুপদেশ-সংবলিত সার- গর্ভ হিতকর শিক্ষাবলে আমার আত্মদৃষ্টি জন্মিল। বর্ণাশ্রম- সংক্রান্ত কিছু কিছু হিতােপদেশ দিয়া, এক্ষণে আমার মােহ দূরীকৃত করুন, এই আমি প্রার্থনা করি। মদালসা।–“প্রিয়দর্শন অলক ! আমি যদ্রুপবলিয়া যাই, তুমি অনাবিষ্ট না হইয়া, তাহা শুন। যজ্ঞ, দান ও অধ্যয়ন দ্বিজাতির ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম-মধ্যে পরিগণিত। দান-গ্রহণ, যজন ও যাজন তাহাদের উপজীব্য। ক্ষত্রিয় জাতির কর্তব্য কৰ্ম্ম-দান, অধ্যয়ন ও যাগ। করণীয় কাৰ্য-বিষয়ে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রের কোন বৈষম্য নাই। উপজীবিকাতেই পার্থক্য দৃষ্ট হয়। প্রজারঞ্জন ও বণানুষ্ঠানই, রাজনগণের উপজীবিকা। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়ের যাহা পরম ধৰ্ম্ম, বৈশ্যেরও তাহাই ধৰ্ম্ম বটে; কিন্তু ইহাদের উপ- মদালসা। জীবিকা-কৃষিকাৰ্য, পশুপালন ও বণিক্-বৃত্তি। যজ্ঞকাৰ্য্য ও দান করা এবং বিপ্র, ক্ষত্র, বৈশ্য এই ৩ তিন বর্ণের সেবা করা, শূদ্রের অবশ্য প্রতিপাল্য কাৰ্য। শিল্প, ইহাদের প্রধান জীবনােপায়।” কি সাধারণ হিতশিক্ষা, কি রাজনীতি, কি বর্ণাশ্রম-বিষয়ক উপদেশ-মদালসার এ সকলই মধুর, মনােহর ও নীতিমূলক। মাতা মদালসা কর্তৃক উক্তরূপে শিক্ষা প্রাপ্ত হইলে, অলর্কের উদ্বাহ সম্পন্ন হইল। মদালসা-কুমার অলর্কের চরিত অধ্যয়নে • এই উদ্বোধ হইতে থাকে, প্রাচীন সময়ে রাজতন্ত্রে ও ধর্মতত্ত্বে সুপণ্ডিত না হইলে, ক্ষিতিপতি-নন্দনের পরিণয়ের অধিকারী হইতেন না। একে মদালসার শিক্ষা, তাহার উপর অলর্কের সদৃশ উপযুক্ত পাত্র, তাহার শ্রোতা। এ দুইটী মণিকাঞ্চন-সংযােগ-বৎ পরম উপাদেয় ফল উৎপাদন করিল। অনিয়মে, সুশাসনে অলর্ককে রাজ্য পালন করিতে দেখিয়া, মদালসা, পতি সহিত কাননে যােগসাধনার্থ গমনােদ্যত হইয়া, যাত্রাকালে একটী অঙ্গুরীয়ক তাঁহাকে দিয়া বলিয়া গেলেন,-“যখন তােমার বন্ধুবান্ধব-বিরহ- জনিত ক্লেশ দুঃসহ হইবে, বৈরপ্রপীড়িত হইয়া, নানা যন্ত্রণায় পড়িবে, বা কোন প্রকারে চিত্তবৃত্তির স্থৈর্য বিনষ্ট হইয়া যাইবে,-তৎকালে এই অঙ্গুরীয়ে যাহা লেখা আছে,একাগ্রতা- সহকারে পাঠ করিবে।” মদালসার সংসর্গ, প্রজাপুঞ্জের কত প্রীতিকর ছিল, একটা মাত্র কথায় তাহা সপ্রমাণ হয়। তাহার রাজ্য-ত্যাগে নগরীর অভ্যন্তরভাগে হাহাকার পড়িয়া গেল। অলর্কের বনপ্রস্থিত ভ্রাতা সুবাহু, সৰ্বানুজ অলর্কের খ্যাতি প্রাচীন আর্যরাণীগণের ইতিবৃত্ত। বাদে ঈর্ষাপরতন্ত্র হইয়া, অলর্কের পরম বৈরী কাশীরাজের আশ্রিত হইলেন। কাশীরাজ, দূত দ্বারা অলককে জানাই- লেন, “তােমার ভ্রাতা রাজত্বাভিলাষী; অতএব তঁাহার রাজ্য তঁাহাকে প্রত্যর্পণ কর।' অলক, সহজে রাজ্য পরিত্যাগের পাত্র ছিলেন না; সুতরাং যুদ্ধ অনিবার্য হইয়া উঠিল। অবশেষে অর্ক পরাভূত ও তাড়িত হইলেন। এই বিপদের সময়ে মাতৃ- দত্ত অঙ্গুরীয়কের বৃত্তান্ত অলর্কের স্মৃতিপথারূঢ় হইল। সেই হিতােপদেশের ফলিতাৰ্থ এই :- “মনুষ্যের সহবাস পরিবর্জন করাই সর্বতােভাবে শ্রেয়ঃ- কল্প, যদি ইহা অসাধ্য হয়, তৰে সাধুসঙ্গ ধর। বিষন্নতার ঔষধ এমন আর কুত্রাপি নাই। সৰ্ববিধ কামনা দূর করাই বিধেয়। ইহাতে অশক্ত হইলে, কেবল মােক্ষের বাসনা করা ভাল। মুক্তিপ্রাপ্তি, বিষাদের অব্যর্থ ভেষজ।” মদাসলার মাহাত্ম-পরিচায়ক কত কথা বলিব ? মার্কণ্ডেয় পুরাণে উল্লিখিত হইয়াছে,—“মদালসার গর্ভে পরিপুষ্ট ও মদা- লসার স্তন্যে পরিবর্ধিত সন্তান কখনও কি অন্য নারীর গর্ভজাত তনয়ের মার্গানুসরণ করে ? কখনই না।”* মদালসার চরিত্র সবিশেষ বিশ্লেষ করিবার আবশ্যকতা নাই। কেননা, মদালসার হৃদয় স্বভাবতঃইধৰ্ম্ম-পিপাসু। কেবল ধৰ্ম্মে নহে,রাজনীতিশাস্ত্রেও তিনি পারগামিনী ছিলেন। ফলতঃ তিনি কেবল নিজ সম্প্র- দায়ের গণনীয় নহেন, ভারতের রাজ্ঞীদিগের আদর্শ। তাহাকে পুনঃ পুনঃ স্মরণ করিলে,মানব, অপার্থিব ভাবের অধিকারী হয়। . উ। মদালসাগৰ্ত্তে পী। স্যাস্যথা স্তনং। নানামীতৈয়ত: বঙ্গ’ যাত্বত পার্থিব ।
িিশষ্টা। 00- । জননীর মাহাত্ম থাকিলেই, পুত্র মহাত্মা হন, দেবহূতি ও মালসার চরিত্রে তাহা প্রমাণিত হইয়াছে। পুনরায় ঐ শ্রেণীর আর একটী মহিলার বিবরণ লিখিত হইল। দেবহূতি ও মদালসা পৌরাণিক সময়ের,বিশিষ্টাদেবী তদপেক্ষা অপ্রাচীন কালের হই- লেও,ইতিহাসসাল্লিখিত কালের কামিনী; সুতরাং আধুনিক নহেন। ‘াহার বিষয় আশেচনায় অনেকেই আমােদিত হইবেন। দাক্ষি- পাত্যের অন্তঃপাতী কেরল প্রদেশে চিদম্বর নামক গ্রামে বর্তমান সময়ের ১১০০ একাদশ শত বর্ষ পূৰ্ব্বে শিবগুরু নামে এক বিপ্র বাতি করিতেন। তিনি মালব দেশের নাম্বুরি-অভিধেয় ব্রাহ্মণ-কুলােদ্ভব ছিলেন। তঁাহার অন্য নাম বিশ্বজিং। এই প্রবন্ধে আমরা কখন শিবগুরু, কখন বা বিশ্বজিংহার এই ২ দুই নামই উল্লেখ করিব। এস্থানে যে মহিলার মহত্ত্ব কীৰ্তিত হইতেছে, তিনি সেই দ্বিজররের গৃহলক্ষ্মী। তিনি মঘমণ্ডন নামে এক প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণের কন্যা। তাহার নাম বিশিষ্টা। গ্রন্থ-বিশেষে তাহার নামান্তর শ্রীমহাদেবী বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। তিনি এক অসামান্যা নারী ছিলেন। তাহার গর্ভে ও শিব গুরুর ঔরসে,৩৮৮৯তিন হাজার আটশত উননব্বই কলিগব্দে (অর্থাৎ ৭১• সাত শত দশ শকে ৭৮৮ খৃষ্টাব্দে ) জগৎপূজ্য শঙ্করাচাৰ্য জন্ম পরিগ্রহ করেন। শঙ্করাচার্যের জন্ম-সম্বন্ধে ২ দুইটী কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। প্রথম এই যে,-অপত্য-কামনায় দেবী বিশিষ্ট মহাদেবের তপস্যায় দেহ ৩২ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। ক্ষয় করিয়া ফেলেন। কিন্তু এই কঠোর সাধনায় তিনি সিন্ধি লাভ করিতে পারেন নাই। ও দিকে বিশ্বজিং অপুত্রক হওয়ায়, সংসার পরিত্যাগ করিয়া, চিদম্বরস্থিত শিবের আরাধনায় নিযুক্ত হইলেন। এরূপ প্রবাদ,বিশিষ্টা দেবীর উৎকট তপশ্চরণে পরিতুষ্ট হইয়া, চিদম্বরের মহেশ্বর তাহার গর্ভে প্রবিষ্ট হন। এই উপলক্ষে চিদম্বরের লােকেরা তাহার চরিত্রে সন্দিহান হইয়া, তাহাকে জাতিচ্যুত করিয়া দেয়। তিনি বিশুদ্ধসভাবা হইলেও, জনাপবাদে আপনাকে লজ্জিত ও ঘৃণিত স্থির করিয়া, জন্মের মত দেহ বিসর্জন পূৰ্ব্বক লােক-লাঞ্ছনা হইতে, নিষ্কৃতি লাভ করিবেন, মনে মনে সঙ্কল্প করিলেন। এই সময়ে এক দিন বিশিষ্ট। দেবীর পিতার প্রতি স্বপ্নে প্রত্যাদেশ হইল,—তােমার কন্যা বিশুদ্ধচারিণী। সাবধান, যেন কোন ক্রমেই তাহার গর্ভপাত না ঘটে। তোমার তনয়ার গর্ভে মূৰ্ত্তিমা ব্যোমকেশ আবিভুত হইয়াছেন। দ্বিতীয় জনশ্রুতি-অনুসারে শিবগুরু সংসারাশ্রম পরিত্যাগ পূরঃসর কখনই অরণ্যবাসী হন নাই। মৃত্যুকাল পর্যন্ত গৃহধামে থাকিয়া, সপত্নীক তপশ্চৰ্য্যা দ্বারা শরীর পাত করেন। অবশেষে একদা ভূতভাবন ভগবান্ ভবানীপতি, দম্পতির পুরা- ভাগে উপস্থিত হইয়া, বর প্রদান করিতে চাহিলেন। বিশিষ্ট। দেবীর ভর্তা, সৰ্ব্বগুণ-সমলস্কৃত পুত্র প্রাপ্তির প্রার্থনা জানাই- লেন। মহাদেব তথাস্তু বলিয়া, তিরােহিত হইলেন। অনন্তর মহাভাগা দেবী, স্বামি-সমক্ষে এই বৃত্তান্ত বিদিত হইয়া, প্রহৃষ্টা- তঃকরণ স্ব-ভবনােদ্দেশে প্রস্থান করিলেন। যথাকালে সুলক্ষণা- ক্রান্ত, তেজঃপুঞ্জ এক কুমার ভূমিষ্ঠ হইলেন।
বিশিষ্টা। এই দুই ঘটনার মধ্যে কোন্ কোন্ অংশ বাহুল্য-বৰ্ণন- দোষে দূষিত, পাঠিকার। পাঠমাক্ত প্রতীতি করিতে পারিবেন, এজন্য, এস্থলে ঐ বিৰরণ অবিকল লিখিত হইল। এই শঙ্কর দেব যেরূপে উত্তর কালে অদ্বৈত-মত প্রবর্তন করেন, ক্রমশঃ তাহা সঙ্কলন করিয়া, বিচারিত হইতেছে, মাতাপিতার উদ্যেগে ৮ অষ্টম বৎসরে শঙ্করের উপনয়ন ব্যাপার সম্পন্ন হয়। অতঃপর তঁাহার বেদ-শিক্ষার সূত্রপাত হয়। ৪ চারি বৎসর মাত্র শ্রুতি-শাস্ত্রাধ্যয়নে পর্যবসিত হয়। এই সময়ে তাহার জনক, কলেবর পরিত্যাগ করেন। ১২ দ্বাদশ বং- সর বয়সের সময় প্রয়ােজনীয় তাবং শাহনুশীলন সাঙ্গ হয়। এই ঘটনাটা অস্বাভাবিক, সুতরাং অবিশ্বাস্য,অনেকে এই প্রকার মনে করিতে পারেন। যাহারা এ বিষয়ে সংশয়াপন্ন হইবেন, তঁাহার সুবিখ্যাত জ ষ্টুয়ার্ট মিলের শিক্ষা বিষয় পাঠ করিয়া দেখিবেন। সে যাহা হউক, বিশ্বজিতের অবর্তমানে শঙ্কুর-জন- নীই স্বীয় সন্ততির সর্ববিষয়ের একমাত্র ভরসাস্থল হইলেন। ভর্তৃ- বিয়ােগের পরেও যে,আচাৰ্য শঙ্করের শাস্ত্রপাঠ বন্ধ হয় নাই,শিব- গুরু-বনিতার অত্যুত্তম উদ্যম তাহার একমাত্র কারণ, তৎপক্ষে কিছুমাত্রও সন্দেহ হইতে পারে না। এই সময়ে অর্থাৎ১৬ষােড়শ বৎসর বয়ঃক্রম কালে শঙ্করাচাৰ্য্য প্রাচীন প্রসিদ্ধ ১৩ দশ উপ- নিষদের * ও বেদব্যাস-প্রণীত ব্ৰহ্মসূত্র গ্রন্থের ভাষ্য রচনা করেন। এই সময়েই হউক, বা ইহার অল্পকাল পরেই হউক, ৩ * ঈশ, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ড, মাণ্ডুক্য,তৈত্তিরীয়, বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য, ঐতরেয় এই ১ দশ উপনিষদ।
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। সন্ন্যাসশ্রম পরিগ্রহ করিবার বাসনা তাহার অন্তঃকরণে বল- বতী হইয়া উঠে। কেবল স্বীয় জননীর অনিচ্ছা প্রযুক্ত তাহা সফল হইতে পায় নাই। মাতা, পুত্রকে পরিণয়-পাশে আবদ্ধ করিবার কারণ প্রাণপণ চেষ্টিত থাকেন। ইহাতে পুত্রের সন্ন্যাসশ্রম গ্রহণের প্রথম প্রয়াসের ন্যায় তাহারও মনােরথ ব্যর্থ হয়। পরিশেষে যে ঘটনাচক্রে শঙ্করের সন্ন্যাসাবলম্বন ও গৃহধাম পরিবর্জন সংঘটিত হয়, তাহা এই, একদা নিজ মাতাকে সমভিব্যাহারে লইয়া শঙ্করদেব, কোন আ ত্মীয়ের ভবনে গমন করেন। তথা হইতে প্রত্যাবর্তন-সময়ে পথ-মধ্যে দেখিতে পাইলেন, গমনকালে যে তটিনী অনায়াসে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন, তখন তাহা বৃষ্টিজলে পরিপূর্ণ। তরঙ্গিণীর প্রবল প্রবাহের খৰ্ব্বতা হউক, তৎপরে পর পারে গমন করিব,এই স্থির করিয়া, প্রথমতঃ কিঞ্চিং কাল প্রতীক্ষা করিয়া,জননী ও পুত্র নদীতে অবতরণ করিলেন। বলবতী স্রোতস্বতী-গর্ভে গমন করিতে করিতে, শঙ্করের কংদেশ জলমগ্ন হইয়া আসিল। তখন তিনি সুন্দর অবসর পাইয়া কহিলেন, ‘মা! যদি আমায় সন্ন্যাস ধর্মাবলম্বনের অনুজ্ঞা না দাও, তবে উভয়কেই সলিল-নিমগ্ন হইতে হইবে। আর যদি আমাকে সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণে অনুমতি প্রদান কর, তাহা হইলে, পরাৎপরের অর্চনা করিয়া, দুই জনে- রই প্রাণযাত্রা-বিধানের সদুপায় সমুদ্ভাবন করিতে পারি। * শঙ্কর-জননী বিষম বিপাক দেখিয়া, অগত্যা তনয়ের মতে কেহ কেহ লিখিয়াছেন,-মাতার মরণ পৰ্যন্ত শঙ্কর গৃহস্থাশ্রমে বসতি করিয়াছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ গ্রন্থে এই মত স্বীকৃত হয় নাই।
বিশিষ্টা ৩৫ মত দিলেন। তখন শঙ্কর, মাতাকে স্বকীয় পৃষ্ঠে আবােহিত করিয়া, সন্তরণ দ্বারা, নদীর পর পারে গিয়া সমুপস্থিত হইলেন। প্রণাম প্রদক্ষিণ পূৰ্ব্বক সংসারাশ্রমের নিকট হইতে চিরবিদায় লইয়া, স্বাভিলষিত কৰ্ম্ম-ক্ষেত্রোদ্দেশে মনের আনন্দে যাত্রা করি- লেন। এই সময় তিনি নানা দেশ, কত শত জনপদ-মণ্ডল ও ভূরি ভূরি রাজ্য পরিভ্রমণান্তর শৃঙ্গাখ্য অদ্রিমধ্যে সুরেশ্বরা- চাৰ্য প্রভৃতি শিষ্যপরম্পরা পরিবৃত হইয়া, বেদান্ত শাস্ত্রের অনু- শীলন করিতে থাকেন। সেই সময়েই বিশিষ্টা দেবীর অন্তিম সময় সমাগতপ্রায় হয়। একে স্বামিবিহীনা হওয়ায়, যার পর নাই দরিদ্রবেশধারিণী, তাহাতে আবার তিনি বর্ষীয়সী হইয়া ছিলেন। এই শশাচনীয় অবস্থায় নিপতিত হইয়া, একমাত্র আশা ও সান্ত্বনার স্থল প্রিয় কুমারকে স্মরণ করিতে লাগিলেন। সৌভাগ্যক্রমে কোন সুযােগে শঙ্করাচাৰ্য, জননীর সেই দুর্দশার কথা শ্রুতিগােচর করিবামাত্র মাতৃ-সন্নিধানে আগমন করিলেন। শিষ্য-প্রশিষ্যদিগকে আশ্বাস দিয়া, কাল্পী গ্রামে যথায় বিশিষ্ট। দেবী ছিলেন, তথায় শঙ্করাচাৰ্য উপস্থিত হওয়াতে, তাঁহার জননীর আত্তস্বর,বিলাপধ্বনি, মৰ্ম্মবেদনা প্রভৃতির অবসান হইল। বিশিষ্ট দেবী, পুত্র-দর্শন-রূপ অভাবনীয় সৌভাগ্য ভােগে আশ্বস্ত হইলেন। পরে তিনি শ্রদ্ধান্বিত হইয়া, পুত্রকে এইরূপ বলিতে লাগিলেন :- বিশিষ্টা।-“বৎস! আমার তাে চরম সময় সমাগত। আমি অজানা নারীমাত্র। এ অবস্থায় আমার যাহা করা বিধি- সঙ্গত ও পরমার্থকর, তাহার উপদেশ দাও। জননীর বাক্যাবসানে শঙ্কর, নিরাকার ব্রহ্মতত্ত্ব কহিতে প্রাচীন আৰ্য্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। লাগিলেন। জ্ঞান-প্রধান ও অনধিগম্য তথ্য বিশিষ্ট। দেবীর অন্তর ধারণা করিতে সমর্থ হইল না। তিনি যেরূপ বলিতে থাকি- লেন, এস্থলে তাহা যথাবৎ প্রকটন করা গেল । বিশিষ্টা।—সেই দুরধিগম্য নিরাকার ব্রহ্মকে আয়ত্ত করিতে পারি,আমার এমন সামর্থ্য কি? আমি মহােচ্চ ধৰ্ম্মতত্ত্বের অনধিকারিণী। আধ্যাত্মিক বিষয়ের উচ্চ অঙ্গের অনুধ্যান করিতে পারা, আমার সাধ্যাতিরিক্ত। কেন না, আমি কোমলমতি, ধর্ম- বলহীন—সামান্যা নারী। অতএব আমারে শিব,সুন্দর, স্নিগ্ধমুর্তি, সগুণ ব্রহ্মের বিষয় বর্ণন দ্বারা আমার উপকার সংসাধন কর। শঙ্করাচাৰ্য প্রথমতঃ মাতাকে মহাদেবের রুদ্রমুৰ্ত্তির উপদেশ দিলেন। তাহাতে তঁাহার চিত্তের তৃপ্তি হইল না দেখিয়া, প্রশ- অদর্শন বিষ্ণু দেবতার স্তোত্র পাঠ দ্বারা নিজ মাতার আনন্দ বিধান করিলেন। অতঃপর বিশিষ্টাদেবী মর্ত্যধাম পরিত্যাগ করি- নেন। এরূপ এবাদ ষে,--মালবের লােকেরা শঙ্কর-মাতার অন্ত্যে- ষ্ঠির নিমিত্ত অগ্নি প্রদান বা শবদাহ কাৰ্যে কোন প্রকার আনু- কূল্য করে নাই। তাহারা শঙ্করাচার্য্যের প্রতি বই অপ্রসন্ন ও বিরূপ ছিল। তাহার কারণ,তিনি প্রচলিত ধৰ্ম্মমতের উপর ধাের- তর আঘাত করিয়াছিলেন। সেই আঘাতের প্রতিঘাতে তাহার ঐ দুরবস্থা সংঘটিত হয়। দেশ,ধৰ্ম্ম ও সমাজ-সংস্কারকগণকে যে চিরন্তন মর্মপীড়া পাইতে হইয়াছে, শঙ্করের ভাগ্যে তাহা না ঘটাই বিচিত্র। শুদ্ধ ঐ প্রতিকূলীচরণই যে একমাত্ৰ মৰ্ম্মশূল, তাহাও নয়। শঙ্করদেবের উৎপত্তি-সম্বন্ধে যে দোষারােপ শুনা যায়, তাহা ঐরূপ লােকদিগেরই কপােলকল্পিত ৰৈ আর বিশিষ্টা। ৩৭ কিছুই নয়। মহাত্মা ঈশার জন্ম-সম্বন্ধেও অবিকল এই প্রকার অখ্যাতি শুত হওয়া যায়। ধৰ্ম্মবীর বিশিষ্ট। দেবীর অখ্যাতি কদাচ সন্তাবিত ও বিশ্বাস্য নহে। দেবহুতি ও মদালসার সহিত তুলনা করিলে, বিশিষ্টা, তাহাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, বা তাহাদের সমকক্ষ হইবেন না। না হউন, দেবী বিশিষ্ট যে,একটা নানাগুণ-বিশিষ্টা রমণী, তদ্বিষয়ে কোনই দ্বিধা নাই। তঁাহার পুল শঙ্করাচাৰ্যই তাঁহার মুখ চিরকাল উজ্জ্বল করিয়া রাখিয়া- ছেন। শঙ্করাচাৰ্য কিরূপ ক্ষমতাপন্ন অসাধারণ দার্শনিক হইয়া উঠিয়াছিলেন, এই পুস্তকের স্থলান্তরে সবিশেষ আলােচনা করা যাইবে। এখানে তাহার বিস্তারিত বর্ণনা করিতে গেলে, অপ্রাসঙ্গিক হইয়া পড়ে।
প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত। জটিল। যে গ্রন্থ অবলম্বন করিয়া, এই উৎকৃষ্টস্বভাবা কামিনীর বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করা যাইতেছে, তাহা এক খানি সুপ্রাচীন গ্রন্থ। তাহার নাম রামায়ণ। ইহার তুলনায়, মনুসংহিতা ও মহাভারত, অপেক্ষাকৃত অপ্রাচীন। মহাভারতের মূল অংশ বৰ্ত্ত- মান সময়ের * ৪••• চারি সহস্র বৎসর পূর্বের রচিত। অতএব বাল্মীকি-প্রণীত মূল রামায়ণ তাহার পূৰ্ব্ববর্তী গ্রন্থ,তদ্বিষয়ে কোন সংশয় নাই। এ বিষয়ে সাহেবেরা যাহা বলেন, তাহা বিশ্বাসযােগ্য নয়। প্রস্তাবের উপক্রমণিকায় অধিক বাক্যাড়ম্বর না করিয়া, একবারেই প্রকৃত বিষয়ের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইলাম। উল্লিখিত প্রমাণে বিদ্যমান সময়ের ৪০০০ চারি হাজার বর্ষ পূৰ্ব্বে জটিল জীবন ধারণ করিয়াছিলেন। তিনি তপশ্চরণ পুরঃসর দিনাতিপাত করিতেন। কিছুকাল পরে রাম ও লক্ষ্মণ, সীতার অন্বেষণে দণ্ডক ও পঞ্চবটী ভ্রমণ করিতে করিতে,অবশেষে জটিলার আশ্রমে গিয়া উপনীত হন। জটিলা, এক অসামান্যা তপস্বিনী; তিনি শবরী হইলেও,মতঙ্গ মুনির শিষ্যগণের পরি- চারিকা ছিলেন। তাহার চরিত্র অনুশীলনে বুঝা যায়, মৃত্যু সময়ে তাহার বয়ঃক্রম অত্যন্ত অধিক হইয়াছিল। ইহা ভিন্ন তাহার জীবনী-সংক্রান্ত অন্য তথ্য জানা যায় নাই। তাহার আশ্রম, পম্পা নদীর সমীপবর্তী ও বহুবিধ-তরুরাজি-বিরাজিত হওয়ায়, নিতান্ত নির্জন ও মনঃসংযমের উপযুক্ত স্থান ছিল। ; , ১৮ শকের। । শবরী শব্দের অর্থ ব্যাধ-দুহিতা। অধিকাংশ স্থলেই জটিলা, শবরী, সিদ্ধা শবরী" আখ্যায় পরিচিত। তন্নিবন্ধন আমরাও স্থলবিশেষে তাহাকে শবরী” সজ্ঞায় নির্দেশ করিতাম।
জটিল।। তিনি, রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণকে তপোবন-মধ্যে সমাগত দেখিয়া, সসমে গাত্রোখান পূৰ্ব্বক তাহাদিগকে অভিবাদন করিলেন ও পাদ্য-অর্ধাদি দ্বারা তঁাহাদের উভয়ের অভ্যর্থনা করিলেন । তদনন্তর রামচন্দ্র, তাহাকে এইরূপ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, অম্নি তাপমী ! তােমার তাে কোন বিপদ নাই ?. তপস্যা বৃদ্ধি হইতেছে তাে ? ভােজন ও ক্রোধ, তােমার স্বশে নিয়ন্ত্রিত হইয়াছে কি ? তুমি অন্তরের সুখলাভ করিয়াছ কি না? তুমি গুরুর যে পরিচর্যা করিয়াছ, তাহা ভাে সার্থক হইয়াছে ? জটিল।-“আপনার সন্দর্শন হেতু অদ্য আমার তপসিদ্ধি হইল ; আমার জন্মধারণ ও তপঃসাধন সফল হইল। হে পুরুষােত্তম রাম ! আজি আপনার পূজা করিলেই, অামার লাভ ঘটিবে। অামি যে ধৰ্ম্মজ্ঞানসম্পন্ন মহাতেজাঃ মুনিগণের শুশ্রুষায় নিরত ছিলাম, আপনি অতুলপ্রতাশালী বিমানযোগে চিত্রকূটে উপস্থিত হইলে পর, তাহারা ত্রিদিরূঢ় হইলেন এবং বাইবার কালে কহিয়া গেলেন, শ্রীরামচন, এই আ ণমে পদার্পণ করিবেন। তাহাদের আদেশক্রমে অামি আপনাদের ২ দুই জনের অতিথ্য সেবায় অভিলাষিণী হইয়াছি। আমি আপনাদিগের নিমিত্ত পম্পাতীরােপন্ন ভূরি ভূরি অরণ্য ফল, ল, কন্দাদি আহরণ করিয়াছি।” তৎপরে রামচন্দ, শবরীকে কহিলেন “তপস্বিনী! আমি দনুর সকাশে তপীদিগের মহিমা শ্রবণ করিয়াছি। যদি তুমি সম্মত হও, তবে এক্ষণে সেই মাহাত্ম্য প্রত্যক্ষ দেখিতে বাঞ্ছা করি।” জটিল।। -“নিবিড়-মেষ-সদৃশ, মুগ-পক্ষি-পরিপূর্ণ-মঙ্গ- বন এই দেখুন। এখানে ধর্মাত্মা তাপস-কুল মন্ত্রোচ্চারণ. পূৰ্ব্বক ৪ ০ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। প্রজ্বলিত বহ্নিতে নিজ নিজ দেহ অাহুতি দিয়া গিয়াছেন। এই দেখুন, প্রত্যকৃস্থলী নামক বেদী। লােকারাধ্য সেই মহর্ষিরা এই বেদীতে কুসুমােপহার দিতেন। এই বেদী আজ পর্যন্তুও কেমন শােভা বিস্তার করিতেছে ! তঁাহারা স্নানের পর বৃক্ষোপরি যে বল রক্ষা করিতেন, দেখুন, অদ্যপি তাহা শুষ্ক না হইয়া, কেমন অবস্থায় আছে! মুনিগণ, পদ্ম ও অন্যান্য যে সকল পুষ্প দিয়া, দেৰাৰ্চনা করিয়াছিলেন, এখনও সে গুলি ম্লান হইয়া যায় নাই। দেব! সমগ্র বনভাগ আপনাকে দেখাইলাম। আপ- নার যাহা শুনিবার বিষয় ছিল, তৎসমস্ত শুনাইলাম। এক্ষণে আপনি অনুজ্ঞা প্রদান করিলেই, আমি তনুত্যাগ করিতে পারি । যাহারা এই তপােবনের অধিকামী ছিলেন, এবং আমি যাহা- দিগের সেবা করিয়াছি, এখন তাহাদের সন্নিহিত হইবার কামনা করিতেছি।” সিদ্ধা শবরী জটিলার পর্বে লিখিত বচন-পৰম্পরা শ্রবণ করিয়া, দাশরধি, অপরিসীম হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন। তিনি বলিতে লাগিলো,-“ তুমি আমাদের যথোপযুক্ত অভ্যর্থনা করিয়াছ, অধুনা স্বীয় বাতি স্থানে স্বচ্ছন্দে গমন করিতে পার।” অতঃপর কোসীন-ধারিণী ব্যাধকন্যা জটলা, রামচন্দের আদেশ প্রাপ্তির অব্যবহিত পরেই, অগ্নিকুণ্ডে স্ব-শরীর পাতিত করিলেন। অনলে দগ্ধ হইবার সমকালে বিদ্যুৎবং তঁাহার দেহের অত্যুজ্জ্বল দীপ্তি বিভাসিত হইল। তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্য হইতে একরূপ অপূৰ্ব্ব সান্ধ উদত হইতে লাগিল। মহাভারত-মধ্যে আর এক জটিলার উখে দেখিতে পাওয়া যায়। তিনি, গৌতম বংশীয় এক ধৰ্ম্ম-পরায়ণা কন্যা। তিনি, ।
জটিল। ৪১ ৭ সাত জন ঋষিকে বিবাহ করিয়াছিলেন। এই জটিলাও অতি পুরাকালের। কারণ, মহাভারতকার বলিয়াছেন, পুরাতন পুরাণে তঁাহার বৃত্তান্ত নির্দেশিত আছে। যাহা হউক, এই জটিলা, রামায়ণোক্ত জটিলা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্ । রামায়ণের জটিলা, চিরকৌমার্য ব্রত অবলম্বন পূৰ্ব্বক জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন, পাঠমাত্র প্রতীতি হইতে থাকে। দ্বাপরে কৃষ্ণের সমসাময়িক এক বৃদ্ধা জটিলার প্রসঙ্গ দৃষ্ট হয়। সেই প্রবীণা পূরন্ধীও রামায়ণ-বর্ণিত জটিলা হইতে নিতান্ত স্বতন্ত্র। আশ্চ- য্যের বিষয়, যেখানেই জটিলার প্রসঙ্গ আছে, সেই খানেই তাহার বর্ষীয়সী মূর্তি আমাদের নয়নপথে পতিত হইয়াছে। ইতিপূৰ্ব্বে ধর্মিষ্ঠা বিশিষ্ট দেবীর চরিত্র চিত্রিত হইয়াছে। এখন বিবিধ-গুণ-শীলা জটিলার বিবরণ আলােচিত হইল। জটিলা, ধর্ম ও গুরুশুশ্রষা বিষয়ে অনেকেরই আদর্শ-স্থল। তিনি, হীনজাতীয় ব্যাধৰমণী হইয়াও, ব্রহ্মচর্য গ্রহণের অধিকারিণী হইয়াছিলেন। ইহাতে প্রমাণীকৃত হইতেছে, এই সময়ে দ্বিজ ভিন্ন অন্যান্য জাতিরাও ধৰ্ম্ম যাজন করিতে পারিতেন। ফলতঃ, জটিলা শবরী এক অদ্ভুত কামিনী। তপঃ-এভাৰে যিনি হুতাশনে প্রবেশ পূৰ্ব্বক স্বকীয় তনুপ্ৰভায় চারি দিক প্রদীপ্ত করিয়া,পুণ্যলােকে গমন করিতে পারিয়াছেন, যিনি জন্ম কাল হইতে মৃত্যু পর্যন্ত অবিবাহিত অবস্থায় ছিলেন, তঁাহার অলােক- সামান্য প্রভাবই তাহার নাম জগতে দেদীপ্যমান রাখিয়াছে ও চিরযুগ তদ্রুপ রাখিবে, তদ্বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। উপস্থিত ক্ষেত্রে যে ব্রহ্মচর্য্যের স্রোত চলিয়াছে, অকপটহৃদয় জটিল। প্রভৃতির চরিত্রই তাহার মূলীভূত।
৪২ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। চন্দ্রকলা। ইদানীং ২ দুইটা ধার্মিক নারীর বৃত্তান্ত বৰ্ণন করিতেছি। একের নাম চন্দ্রকলা, অপরের নাম সুলােচনা। সুলােচনা রাজ- কুমারী ও রাজমহিষী; চন্দ্রকলা তাহারই দাসী। দাসী হই- য়াও, তিনি স্বীয় কীর উপর স্থান পাইয়াছেন, ধৰ্ম্মজ্ঞানে তিনি সুলােচনাপেক্ষা গরিষ্ঠা ছিলেন, এই তাহার মহত্ত্বের কারণ। প্রভূর অগ্রে ভৃত্যের সম্মাননার হেতু পাঠিকারা নিজে নিজেই বুঝিতে পারিবেন বলিয়া, মূল বিষয়ে প্রবৃষ্ট হওয়া গেল। তালধ্বজ নামক প্রদেশে বিক্ৰম রাজা রাজত্ব করিতেন। তাহার মাধব নামে এক সন্তান ছিল। মাধব ভূপতি এক দিন স্বীয় দল-বল-সহকারে শিকারে নিষ্ক্রান্ত হন। সৈন্য সামন্তকে পশ্চাতে ফেলিয়া, অতি প্রচণ্ড বেগে তিনি এক লক্ষ্যের দিকে ধাবমান হইতে লাগিলেন। ক্রমে নিবিড় বিপিনের অভ্যন্তরে গিয়া সমুপস্থিত হইলেন। সেই নির্জন নিস্তব্ধ বন-খণ্ডে একটী মাত্ৰও অনুচর বা সহচর তাহার সঙ্গে নাই। এই সময়ে তিনি সম্মুখ ভাগে এক লাবণ্যময়ী মণী-মূৰ্ত্তি দেখিতে পাইলেন। সেই মহিলার নাম চন্দ্রকলা। চন্দ্রকলা সেই বনভ্যন্তরস্থ জলাশয় হইতে জল আনয়নের কারণ আসিতেছিলেন। তিনি বীরবাহু নামক এক ক্ষত্রিয়ের প্রিয়তমা। তালধ্বজ পুরীই তাহার বসতিস্থান। তিনি প্ল দ্বীপের অন্তর্গত দ্বীব্যস্তী নগরীর অধিরাজ গুণাকরের সুলােচনা নাম্নী কন্যার সখীর কাৰ্য্য ত্যাগ করিয়া তালজ পুরীতে অবস্থিতি করেন। মাধব নৃপতি প্রথমতঃ নিঃসহায় অবস্থায় তাঁহার সন্দর্শন লাভে ভীতিমুক্ত হইয়া আশ্বস্ত হই-
চন্দ্রকলা।
৪৩
লেন। কিছু ক্ষণ পরেই তাহার অন্তঃকরণে কলুষময় ভাবের
আবির্ভাব হইল।
রাজতনয়, গান্ধৰ্ব্ব বিধানে কন্যার পাণিগ্রহণেচ্ছু হইয়া,
তাঁহার নিকট ভিলাষ ব্যক্ত করিলে, তিনি চিন্তা করিতে
লাগিলেন, পণ্ডিতেরা যে বলিয়া থাকেন, ধৰ্ম্ম স্বয়ং ধাৰ্ম্মিককে
বিপদ হইতে রক্ষা করেন,'—এই মহাবাক্য অদ্য এই দণ্ডেই
পরীক্ষিত হইবে। তৎপরে তেজস্বিনী ধৰ্ম্মশীলা চৰ কলা কি কি
মুক্তিগর্ভ বচন প্রয়ােগ করিয়া, রাজকুমারকে শামিত ও পাপচেষ্টা
হইতে নিবৃত্ত করিয়াছিলেন, পাঠিকারা শ্রবণ করুন।
চন্দ্রকলা।-হে নৃপবর ! রাজার সুশাসনে রাজ্যের
তাবং লােক দুঞ্জিয়া ও কলুষাদি হইতে বিমুক্ত হয়, ইহা অপেক্ষা
রাজার শ্লাঘ্য আর কি আছে ? সংস্বভাব ভূপতিগণের রাজত্বে
ঐরূপ ঘটিয়া থাকে।
সমস্ত শাসনক। যদি আপনার
মত দুনীতির প্রশ্রয় দিতে থাকেন, তবে আর কে তাহাদিগকে
সৎপথে চালিত করিবে ? বিরল স্থল পাইয়াছেন বলিয়াই,
ওরূপ প্রস্তাব করা আপনার সদৃশ ব্যক্তির উচিত হয় নাই।
পরাপর ঈশ্বর সর্বজ্ঞ ও সৰ্ব্বত্র বিদ্যমান, ইহা আপনি নিশ্চয়ই
অবগত আছেন। মহাভাগ ! আমাকে অনুঢ়া ভাবিবেন না।
আমি বীরবাহ ক্ষত্রিয়ের ভাৰ্যা, সলিল আনয়নার্থে এখানে
আগমন করিয়াছি; এই বিভীষিকা-সঙ্কুল স্থলে অন্য কোন
প্রয়ােজন সিদ্ধির কারণে আসি নাই। আপনি স্ববংশানুরূপ ও
রাজাচিত বাক্য না বলিয়া, তদ্বিপরীত কেন করিলেন, বুঝিতে
* “জল্পন্তি সূরয়ঃ সর্বে ধৰ্ম্মে ক্ষতি ধাকিং।
এতই জ্ঞাতব, মদৈব মিত্র চ ভৰিষতি।”
৪৪
প্রাচীন আৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত।
পারিতেছি না। ভবদ্বংশীয়গণ পরস্ত্রী বিষয়ে ক্লীববৎ আচরণ করি-
তেন। আমি একে অবলা কুলবালা, তাহাতে এক্ষণে অসহায়।
আপনি একাকী হইলেও, ভীম-পরামশালী, পরম বীর।
আমার পাতিব্ৰত্য নষ্ট করিলে, আপনার অযশ বৈ সুযশ হইবে
। মনৰ-জন্ম অতি দুর্লভ। সেই দুষ্প্রাপ্য জন্ম লাভ করিয়া,
অকীৰ্ত্তিকর ক্রিয়া-কলাপে মুগ্ধ থাকা, বিজ্ঞজনােপযুক্ত কাৰ্য্য নহে।
বিবেচনা করিয়া দেখিলে, বুঝিতে পারিবেন,লােভ লইতে
ইচ্ছা, ইচ্ছা হইতে পাপ, পাপ হইতে মরণ, মরণ হইতে নরক
হয়। অতএব মনে মনে লোভের প্রশ্রয় দেওয়া আদৌ কৰ্ত্তব্য
নহে। মংস্য যেমন অজ্ঞতা-দোষে মাংসাচ্ছন্ন বড়িশ গ্রাসে
মুত্যু আলিঙ্গন করে, আপনি সেইরূপ লােভাধীন হইয়া,
মােহান্ধতা বশতঃ পাপ-পঙ্কে নিমগ্ন হইবেন না। বিবেকই
সম্পদের মূল এবং তদ্বিপর্যয় অর্থাৎ অবিবেক, আপদ, আনয়ন
করে।
হে ক্ষিতীশ। প্ল দ্বীপান্থ ৰ্বত্তা দীব্যস্তী নগরে অশেষ
গুণবা গুণ কর’ নরপালের সুলােচনা নাম্নী কন্যার আমি দাসী
ছিলাম। যদি অতিরুচি হয়, তবে আপনি তাহার পাণি গ্রহণ
করিতে পারেন। অদ্যাবধি তাহার উদ্বাহক্রিয়া সম্পন্ন হয় নাই।
তঁাহার তুল্য রূপ-গুণবতী সতী কন্যা কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না।
তাহাকে পতীত্বে গ্রহণ করিতে পারিলে, আপনার মনােবস্থা
সর্বাংশে ফলপ্রসূ হইবে।
[ ৪৫ ] সুলােচনা। চন্দ্রকলার বিবরণ সমাপন করিয়া,সম্প্রতি সুলােচনার আখ্যান বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইলাম। প্লক্ষ দ্বীপে দীবন্তী পুরীতে তিনি জন্ম পরিগ্রহ করেন। ঐ নগরের অধিপতি গুণাকরের ঔরসে ও তৎপী সুশীলার গর্ভে তাহার উদ্ভব হয়। তদীয় রূপ, গুণ, ভাব, পাণ্ডিত্যাদি বিষয় কিরূপ ছিল, বর্ণনা করা এক প্রকার দুর্ঘট। পূর্বে যে ধৰ্ম্মশীলা চকলার বিষয় কীৰ্ত্তন করিয়া আসিয়াছি, সেই কন্যা তাহার পরিচারিকা ছিলেন। তালবজ নগরস্থিত বীরবাহু নামক বিয়ের প্রণয়িনী হইবার পর,তিনি দীবন্তী হইতে নিজ স্বামীর নিকেতন তালধ্বজ প্রদেশে গমন করেন। পরিণয়ের পূর্ব পৰ্যন্ত যত দিন চকলা, সুলােচনার প্রিয়তমা সহচরী ছিলেন, তত দিন তাহাদের উভয়ের কি সুখেই দিন যাপন হইত। উভ- য়ের ধর্ম-মত কত যে মহােন্নত ছিল, এই অঙ্গনার জীবনীর আদ্যন্ত পর্যালােচনা করিলে,তাহা সুস্পষ্টজাত হইতে থাকিবে। চন্দ্রকলার পূৰ্বোল্লিখিত সঙ্গত কথানুসারে মাধব রাজা, সমুদ্র উত্তীর্ণ হইয়া, দীব্যস্তী নগরে উপস্থিত হইলেন। সুগন্ধা নামক এক মালাকার-বনিতার হস্তে নামাঙ্কিত এক সূর্ণাঙ্গুরীয় ও তংসহিত এক লিপি প্রেরণানন্তর স্বীয় মনােরথ বিজ্ঞাপন করিলেন। লিপির মৰ্ম্ম এই প্রকার ছিল,‘সুন্দরী! তােমার দাসীর মুখে তোমার রূপ, গুণ, বিদ্যা, চরিত্রাদির মহত্ত্ব অবগত হইয়া, সাগর-পারে তােমার সন্ধানে এ নগরীতে আগমন করি- ৪৬ প্রাচীন আৰ্য্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। য়াছি। এক্ষণে আমার ইচ্ছা,তােমার সহিত আমার পরিণয় বন্ধন স্থাপন হয়। মালাকার-কামিনীর কর-বাহিত পার্থ অবগত হইয়া সুলোচনা, তাহার নিম্ন লিখিত প্রত্যুত্তর প্রদান করেন। সুলােচনা।-হে ভূপ! আপনার পরে তাৎপৰ্যার্থ পরি- জ্ঞাত হইয়াছি। এখন তংসম্বন্ধে আমার বক্তব্য এই, আপনি অবধারিত জানিবেন, অদ্য আমার অধিবাস-দিবস (অর্থাৎ বিবাহের পূর্ব দিন),আগামী কল্য বিবাহ হইবে। আমার পিতার অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে কার্স করা বিধেয় নয় । অতএব আপনাকে কোন দুঃসাধ্য কার্যে লিপ্ত হইবার পরামর্শ দিতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। ক্রিয়া সফল না হইলে, পণ্ডশ্রম মাত্র হয় এবং তদর্থ মনুষ্যের অনর্থক উদ্যম-ভঙ্গ ঘটে। আপনি কেবল আমারই প্রাপ্তি নিমিত্ত সাগর উত্তরণ পূৰ্ব্বক বয়াস স্বীকার করিয়াছেন। কি উপায়ে আমার সঙ্গে আপনার বিবাহ সংগটন হইবার সম্ভাবনা, তাহা আপনাকে এখন হইতে জানাইয়া রাখি। আমি বসন-ভূষণে সুসজ্জিত হইয়া, মনােনীত বর স্থির করিবার জন্য যখন প্রদক্ষিণ করিব, তৎকালে আমার বাম হস্ত ঊর্ধ্বে রক্ষা করিব। যিনি আমার ঐ হস্ত ধরিয়া, আমাকে লইতে সমর্থ হইবেন, তাহাকেই আমি পতিত্বে বরণ ও গ্রহণ করিব, ইহাতে অনুমান ও সংশয় নাই। এই লিপি খানি হলোচনা,মালাকার-গেহিনীর হস্তে অৰ্পণ করি- লেন। ওদিকে মালাকার-ভাৰ্যার নিকট পত্ৰাৰ্থ অবগত হইয়া, মাধব ভূঁপ তদনুরূপ উদ্যোগ করিলেন। বলা বাহুল্য, তদুপলক্ষে তাহাদের শুভ পরিণয়-ব্যাপার বিনা বাধায় সম্পন্ন হইয়া গেল।
সুলোচনা। ৪৭ এই খানেই প্রস্তাবের উপসংহার ভাগে আমরা উপনীত হইলাম। এই সন্দুর্ভের বর্ণিত দীব্যস্তী ও তালধ্বজ প্রদেশ কোথায়, আমরা স্থির করিতে পারি নাই। উহাদের বর্তমান । নাম না পাইয়া, অনেকে হয়তাে উহা কাল্পনিক আখ্যা ভাবিতে পারেন। ফল কথা, মাধ, সুলােচনা, ও চন্দ্রকলার নাম হিন্দু- শাস্ত্রানুশীলনকারীদের মধ্যে এত পরিচিত ও বিখ্যাত সংজ্ঞা যে, এক্ষণে উহাকে অবাস্তবিক ঘটনা বলিয়া অস্বীকার করা এক প্রকার হঠকারিতা বলিয়া বিবেচিত হয়। দীব্যস্তী বা তাল- ধ্বজ অবাস্তবিক আখ্যা, তর্কের অনুরােধেই যদি স্বীকার করা যায়, তথাপি মূল উপাখ্যানটী অলীক বলা যায় না। সে যাহা হউক, চন্দ্রকলার ভর্তা ‘বীরবাহু’ প্রকৃত মহাবল-পরাক্রান্ত বীরবাহ। এখানে শারীরিক তেজের প্রশংসা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আর চন্দ্রকলাও ঐ বীরবাহু “বীরবাহুরই ' সার্থক প্রিয়তমা। তিনি স্বীয় কায়িক বলে এ প্রতিপত্তি লাভ করেন নাই, কিন্তু অতুল মনস্তেজ—সাধু-চরিত্র-প্রভাবে অপার- সাধারণের নয়ন-যুগল বিস্ময়রসে বিস্ফারিত করিয়া দিয়াছেন। এদিকে দেখ, সুলােচনা, নামেও যেমন সুনয়না, কাৰ্যেও তেমন সৌভাগ্যবতী। অন্য তিনি সরলা চন্দ্রকলার মত কামিনীকে কি সখীর কাৰ্য্যে পাইতেন? আর, তিনি যে বাল্যকালের সুমন্ত্রণাদায়িনী চন্দ্রকলার নির্বাচিত পুরুষকে প্রাণ-সমর্পণের যোগ্যপাত্র স্থির করেন, ইহাও তাহার ভবিষ্যৎ সুখের নিদান হইয়াছিল। মাধৰ ভূপবরকে আমরা ‘সুপুরুষ” বলায়, কেহ কেহ ভাবিবেন, ধৰ্মনাশক রাজা ৰদি ‘সু’ হন, তবে ‘দু' কে ? বস্তুতঃ মাধব রাজা এক জন পাষণ্ড ছিলেন না।
৪৮ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। কলাকে অপরিণীতা ভাবিয়া, তিনি ঐরূপ প্রস্তাব করেন। সে প্রস্তাবও নিন্দনীয় প্রস্তাব নয়। গান্ধৰ্ব্ব-বিবাহ-বিধি তংকালে প্রচলিত ছিল। যদি তিনি সতীত্বধ্বংসকারী হইতেন, তবে তিনি চন্দ্রকলার বচন-পরম্পরা শ্রবণ করিয়া, বধিরবৎ আচরণ করিতেন। তাহার চরিত্রের স্বপক্ষে নিরপেক্ষ ভাবে শেষ বক্তব্য যে, তিনি অসৎ হইলে, কখনই চন্দ্রকলা কর্তৃক সুলােচনার সন্নিধানে প্রেরিত হইতেন না। অতএব সুলােচনা সুযােগ্য ভর্তা লাভে যে কৃতার্থ হইয়াছিলেন, এটা নিঃসন্দেহ। তিনি গুণাকর পিতার গুণবতী কন্যা এবং পুণ্যশীলা মাতার সুশীলা দুহিতা। পিতা, মাতা, ভর্তা, দাসী প্রভৃতি সমস্তই তাহার শুভাদৃষ্টের প্রবল সহায়। চন্দ্রকলা ও সুলােচনা শব্দ দুটী যেমন শ্রুতিমধুর, তেমনই সাবােদ্দীপক। চন্দ্রকলার স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। তাহার কাৰ্য, তাহার জ্ঞানের সম্যক্ পরিচায়ক। তিনি উপদেশ ও পরামর্শ প্রদান বিষয়েও অদ্বিতীয়।
{ ৪৯ ] দ্বিতীয় পরিচ্ছে। মৈত্রেয়ী। বেদশাস্ত্র, আর্যজাতির অসাধারণ শ্লাঘার স্থল, তাহার সন্দেহ নাই। তদপেক্ষাও যেটী হিন্দুজাতির ধৰ্ম্মোন্নতি ও সূক্ষ্ম ধীশক্তির পরিচয় দেয়, তাহা উপনিষদ। সেই শ্ৰেষ্ঠ-বিদ্যা উপনিষদ গ্রন্থে যদি কোন কোন বরাবরাহার বিবরণ প্রদর্শন করতে পারা যায়, তবে তাহা নিঃসন্দেহ বিলক্ষণ গুরুতর ও মহাগৌরবজনক বিষয় বলিয়া নির্দেশ করিতে হইবে। অতএব সেই বৃত্তান্তের অনুশীলনে মনােনিবেশ করা গেল। যজ্ঞবল্ক্য মুনি, শুক্লযজুর্বেদ-সংহিতাকার। তিনি, বৃহদা- রণ্যক উপনিষদেরও রচয়িতা। ঐ উপনিষদের মধ্যে মৈত্রেয়ীর কথা যেরুপ প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে, পশ্চাৎ বিবৃত হইতেছে। মৈত্রেয়ী, যাজ্ঞবল্ক্য মহষির ভাৰ্য্যা। কাত্যায়নী নামী তাহার এক সপত্নী ছিলেন। তনধ্যে মৈত্রেয়ী জ্যেঠা। মৈত্রেয়ীর কোন সন্তান-সন্ততি হইয়াছিল কি না, জানা যায় নাই। কাত্যায়নীর সহিত কোন কালে কোন উপলক্ষে তাহার কলহ বিসংবাদ বা মনােবাদ উপস্থিত হয় নাই। না হইবারই কথা। যেহেতু তিনি উচ্চবিদ্যার পারদর্শিনী হইয়াছিলেন। উভয়ের মধ্যে ৰাজ্ঞবন্ধের কাহার প্রতি স্নেহ-মমতা অধিক ছিল, স্পষ্ট বুঝিবার সুযোগ নাই। তবে কোন সূত্রে যাহা কিছু বােধগম্য হয়, নিম্নলিখিত বৃত্তান্তে তাহা পরিস্ফুট হইবে। } } প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। A । একদা যাজ্ঞবল্ক্য দুই বনিতাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, ‘আমার যাবতীয় বিষয়-বিভব তােমরা উভয়ে অংশ করিয়া লও। কারণ, আমার শেষবস্থা উপস্থিত। এ সময়ে কাননে গিয়া ঈশ্বরসেবায় জীবন যাপন করা, আমার কর্তব্য বােধ হই- তেছে। কাত্যায়নী ইহার প্রত্যুত্তর-স্বরূপ কোন বাক্যই প্রয়ােগ করেন নাই। তিনি গৃহকৰ্ম্মাদিতে কেবল নিপুণা ছিলেন। মৈত্রেয়ী বিত্ত-গ্রহণের প্রস্তাব শ্রুতিগােচর করিবামাত্র ভর্তাকে যাহা যাহা বলিয়াছিলেন, এবং তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্যও যাহা বলেন, বােধসুলভ করিয়া, তংসমই বৃহদারণ্যক উপ- নিষদের ৪ চতুর্থ অধ্যায়ের কতিপয় ব্রাহ্মণ* হইতে পরস্পরের কথােপকথন-প্রণালী-ক্রমেই লিপিবদ্ধ করা যাইতেছে। এস্থলে কেবল মৈত্রেয়ীর বাক্য গুলিরই মুল সংস্কৃত, টীকায় প্রদত্ত হইল। মৈত্রেয়ী।-হে ভগবান! এই ধরণী যদি ধন দ্বারা পরিপূর্ণ হইয়া আমার আয়ত্ত হয়, তাহাতে কি আমি নিৰ্বাণ- পদ লাভ করিব ? । যাজ্ঞবল্ক্য।-না। তোমার জীবন, ধনবান্ লােকের জীবন সদৃশ হইবে। অর্থ দ্বারা অমর হওয়ার আশা নাই। মৈত্রেয়ী ।-যাহাতে আমার অমর হইবার সম্ভাবনা নাই, তাহা লইয়া আমার কি হইবে? যদ্বারা অমরত্ব লাভ * ব্রাহ্মণ, উপমিদের বিভাগবিশেষ। । ' হে!বাচ মৈত্রেয়ী, যম ইয়গো সা পৃথিবী বিনে পূর্ণা ং, কিমহ" তেনামৃত স্যামিতি। ১।
মৈত্রেয়ী। } করিতে পারি, এরূপ ব্রহ্মজ্ঞান আপনি আমায় উপদেশ করুন। * যাজ্ঞবল্ক্য —“মৈত্রেয়ী! তুমি একে তাে আমার প্রিয়, তাহার উপর আবার প্রিয়তম পরমেশ্বরের কথা জিজ্ঞাসা করিয়া ও তাহার বিষয় পরিজ্ঞাত হইতে অভিলাষ করিয়া, আমার প্রিয়- তর হইলে। তুমি আমাকে যে প্রশ্ন করিলে, তাহার প্রকৃত উত্তর দিতেছি। আবিষ্ট মনে শুন ও হৃদয়ঙ্গম কর। কোন স্ত্রীই স্বামীর ইচ্ছানুসারে তাহার প্রিয়পাত্র হইবার বাসনা রাখে না; কিন্তু অাত্মার কামনানুরূপ ভর্তার প্রীতিভাজন হয়। অর্থাং পত্নী নিজের অভিলাষ পরিপুরণ হইলেই সন্তুষ্ট থাকেন। পতির নিকট যদি তঁাহার সুখে থাকা, উত্তম অলঙ্কারাদি পরিগ্রহ করা না ঘটে, তবে তিনি স্বামীর প্রতি অনুরক্ত থাকেন না। সেইরূপ নিয়মেই পন্নী, স্বামীর প্রিয় হন। পত্নী যদ্যপি পতির অবাধ্য হন, তবে তিনি স্বামীর বিরক্তিভাজন হইয়া পড়েন। পৃগণ যে পিতার প্রিয় হয়, তাহার ও ঐ প্রকার কারণ পুল দ্বারা ভবিষ্যতে পিতা, সুখী হইতে পারেন, এজন্য পিতা, পুত্রকে স্নেহ করেন। পুল, পিতার অবশীভূত হইলে, কদাচ সে পিতার স্নেহাস্পদ হয় না। অগ, গাে প্রভৃতি জন্তুও উল্লিখিত নিয়মে মানবের প্রতিপাত্র হয়। যখন তাহারা, স্ব স্ব কর্মে (লাঙ্গল চালনায় ও শকট-বাহ-কাৰ্যে) অক্ষম হয়, তখন আর তাহারা প্রভর সন্তোষভাজন হয় না। “বেদ যে লোকের প্রিয়, তাহার হেতু এই,-যে তাহা অধ্যয়ন করে,সে বেদের কিছু প্রয়ােজন আছে,এ জ্ঞানে করে এমন নহে, * “সা হােবচ মৈত্রেয়া, যেনাহং না তা স্যাং, কিমহং তেন কুং যদেব ভগবান ৰে, দেব নে ক্রীতি। ৩।
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। কিন্তু বেদ পড়িলে, ইহ লােকে সম্মান, পরলােকে সুখ ইত্যাদি প্রয়ােজনের উদ্দেশেই লােকে বেদকে প্রিয় মনে করিয়া থাকে। “লােকে, যজ্ঞকে প্রিয় জানিয়া তাহার অনুষ্ঠান করে ; তাহারা যজ্ঞের প্রয়ােজন আছে, এমত জ্ঞানে করে না; কিন্তু যজ্ঞ করিলে স্বর্গ হইবে, আপন প্রয়ােজনােদ্দেশেই করিয়া থাকে। ৰে যে বস্তু যাহার প্রিয় হয়, সেই সেই বস্তুর প্রয়ােজনের নিমিত্ত সেই সমুদয় লােকের প্রিয় হয়, এরূপ নহে; তাহা লােকের বিশেষ বিশেষ প্রয়ােজনােদ্দশেই প্রিয় হইয়া থাকে।” এ সকল বাক্যের তাৎপর্থে ইহা প্রতীত হইল, আন্না অপেক্ষা প্রিয় কেহ নাই, অং হ্লাই যথার্থ প্রিয়, আর পুল ' ভাৰ্যাদি যে প্রিয় হয়, তাহা আত্মার উপকারের উদ্দেশেই জানিবে, আত্মা বৈ বাস্তবিক তন্তু কেহ প্রিয় নহে। ঋষি কহিতে লাগিলেন, হে মৈত্রেয়ী ! পরমাত্মার সাাং প্রার্থনীয়। উপায় প্রথমতঃ আয়ার প্রতিপাদক বেদ শ্রবণ করিবে, পরে যুক্তি দ্বারা তদর্থের মনন করিবে, পশ্চাং নিদিধ্যসনা অর্থাৎ তাহার অর্থ উত্তমরূপে ধ্যান করিবে, পরমাত্মা শ্রুত, এবং বিজ্ঞাত হইয়া, পরমাত্মতত্ত্বের সাক্ষাৎকার হইলে, এই সমুদয় জগৎ বিদিত হয়। অতএব কামনাব্যঞ্জক সেই আত্মাই দর্শন, মনন, শ্রবণ ও ধারণার উপযুক্ত। মেত্রেরী ! আমাদের অন্তরে এই আত্মার মধ্যে) যে লােক, সেই মহঃ অাত্মাকে দেখিতে পায়, সেই লােক, সমস্তই জানিল, দেখিল, শুনিল, মনন করিল এবং ধারণা করিল। “এক বস্তু বিদিত হইলে, অন্য বস্তু কি প্রকারে বিজ্ঞাত মৈত্রেয়ী। হয়? পরমাত্মা ব্যতিরেকে আর কিছুরই সত্তা নাই। যদিই কিছু থাকে, তাহা পরিজ্ঞাত হইবার নয়। ফলতঃ অন্য কিছু মাত্রও নাই, পরমাত্মাই সৰ্বস্ব। অতএব আত্মা হইলেই তাবং পরিজ্ঞাত হইয়া থাকে। “আহত দুন্দুভির এবং বীণার শব্দ শ্রবণে যেমন দুন্দভি- আঘাতের ও বীণা-তাড়নের শব্দও শ্রুত হওয়া গিয়া থাকে, তদ্রুপ পরমাত্মা জ্ঞাত হইলে, সকলই জ্ঞাত হওয়া যায়। ‘সাগর, সকল সলিলের কেবল আশ্রয়স্থল ; ত্বক, স্পর্শের একমাত্র আধারস্বরূপ; রসনা, রস-সমুদায়ের আস্বাদকারিণী ; নামিকাই, সমস্ত গন্ধ-গ্রহণের আয়তন; যদি নাসিকা,না থাকিত, তাহা হইলে, ঘ্রাণেন্দিয়ের কাৰ্য চলিত না। কর্ণই শব্দের আশ্রয়-ভূমি। চিত্ত, যাবতীয় বাসনার নিলয় ; হৃদয়, তাবৎ বিদ্যার আলয়-স্বরূপ ; হস্তই নিখিল কৰ্ম্মের আশ্রয় ; মারুত- সমগ্ৰ নৈসর্গিক বস্তুর আগার-ভূত, বাক্যই শ্রুতির অবলম্বন- স্থান; বাক্য না থাকিলে, বেদ থাকিতে পারিত না। এই পদার্থ-সমূহের আশ্রয়-গুলিরও আবার আশ্রয় আছে ; সেই আশ্রয় —ব্রজ। মৈত্রেয়ী! তুমি এই ব্রহ্মকেই অবলম্বন পূর্বক জীবিত রহিয়াছ।” মৈত্রেয়ী।—-ভগবান্ ! আপনি যে মহৎ আত্মার কথা কহিলেন, তাহা কি মােহাভিভূত হইতে পারেন ? * যাজ্ঞবল্ক্য।—না। সেই অাত্ম—অবিনাশী, স্থিতি-হীন । ‘সা হোবাচ মৈয্যেবৈব মা ভগবানুমুন্ন প্রেত-সংজ্ঞীতি ?"১৩।
৫৪ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। ও ভঙ্গ-রহিত। অজ্ঞানতা, আত্মাকে কদাচ স্পর্শ করিতে সমর্থ যাজ্ঞবল্ক্য ও মৈত্রেয়ীর আধ্যাত্মিক তত্ত্বরিত,বচন-পরস্পরা শ্রবণ করিলেই, মৈত্রেয়ী কিরূপ বিদ্যাবতী, মেধাবিনী ও ব্ৰহ্মপরায়াণা ব্ৰহ্মবাদিনী ছিলেন, বিলক্ষণ হবােধ হইতে থাকে। যে নারী উ;িখিত-রূপ উচ্চ অঙ্গের ধৰ্ম্মসংক্রান্ত তত্ত্বজ্ঞানােপদেশ নিবিষ্ট অন্তঃকরণে শুনিতে পারেন, তিনি কত কত গণ্য মান্য পুরুষ অপেক্ষাও কীদৃশ ধন্যবাদের পাত্রী, তাহার ইয়ত্তা করা দুরূহ। মৈত্রেয়ীর বিদ্যা, বুদ্ধি নিতান্তই বিশাল ; ধৰ্ম্ম-প্রবৃত্তিও তদনুরূপ। তজ্জন্যই উপনিষদ্-মধ্যে তাহার উক্তি, বেদ-বাক্য-তুল্য শ্রদ্ধেয়। কাত্যায়নী ও মৈত্রেয়ী এই নারী-যুগলের মধ্যে শেষােক্ত রমণী, ব্রহ্মবাদিনী হইয়াছিলেন, শ্রুতিতে তাহার নিদর্শন রহিয়াছে + কেন না, ঈশ্বরের তত্ত্ব জানিবার স্পৃহা হার অত্যন্ত বলবতী ছিল। । • *: হি মৈত্রেয়ী হ্মদি !" (তি।)
[ ৫ ] লীলাবত। লীলাবতী নামে ৩ তিনটা রমণীর উল্লেখ দৃষ্ট হইতেছে। এক লীলাবতী ভারাচাৰ্য-দুহিত ; উদয়নাচার্যের কন্যাও লীলাবতী নামে পরিচিত। তিনি ও ভাস্কর-সুতা অভিন্ন কি না, নিঃসংশয়ে কিছু বলা যায় না। স্মৃতিশাস্ত্রে আর এক লীলাবতীর নিণ আছে। তিনি, কোন মন্দ কাৰ্য করিয়া- ছিলেন, তজত অজস্র লবণ দান করিয়া, তাহার প্রায়শ্চিত্ত করেন। এই কামিনীর সহিত আমাদের প্রস্তাবের কোনই সম্বন্ধ নাই। প্রথমােল্লিখিত নারীই আমাদের আলােচ্য। কেহ কেহ বলেন,লীলাবতী ভাস্করাচার্চের ভাৰ্য। লীলাবতীর “লাল- কুর-লাল-নয়ন' বিশেষণ দেখিয়া, অনেকে ঐ মত প্রচার করেন। এরূপ সম্বোধন উপস্থিত সময়ে রীতিবিরুদ্ধ বটে, কিন্তু হংকালের পক্ষে উহা দূষ্য নহে। কাহার কাহার মতে ভাস্করা- চার্যের লীলাবতী নামে বনিতা ও দুহিতা ছিলেন। এ বিষয়ে বিশেষ প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।* সুপ্রসিদ্ধ গণিতশাস্তুবো ভাস্করাচার্যের কন্যার নাম লীলা- বতী। তাহার পিতা, সাদ্রির উপকণ্ঠে কোন স্থানের অধিবাসী ছিলেন। ঐ স্থান বর্তমান সময়ের বিদর নগর। তিনি শক রাজার ১৩৬ এক হাজার ছত্রিশ বৎসরে + জন্মগ্রহণ করেন। * কেননা “লীলাবতী" পুস্তকে ‘অয়ে বালে tীলাবতি!' ৰলিয়া সুস্পষ্ট সম্বোধন আছে। t :১.৫ খ্রীষ্টাব্দে।
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। সুতরাং লীলাবতীও ঐ সময়ের কিছু কাল পরেই ভূমিষ্ঠ হন। লীলাবতী ভিন্ন ভাস্করাচার্যের অন্য পুত্র বা কন্যা থাকার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর্য ভাস্কর, কন্যাকে যে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন, তাহার প্রমাণ,—তিনি স্বীয় কন্যার নামানুসারে নিজের এক খানি গণিত পুস্তকের * লীলাবতী ” নামকরণ করেন। পাটীগণিত ও পরিমিতি, এই পুস্তকের অন্তর্গত লীলাবতীর পিতামহের নাম মহেশ্বর। লীলাবতী, সুবিখ্যাত, অতি প্রাচীন শাণ্ডিল্য মুনির গােত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। এরূপ প্রবাদ প্রচলিত আছে,-ভাস্করাচাৰ্য গণনা করিয়া দেখিয়াছিলেন, তাহার নন্দিনী, বিবাহের অল্প কাল পরেই, স্বামি- হী হইবেন। পিতা, দুহিতার এই ভবিষ্য বিপদ নিবারণার্থে সর্বদাই চিন্তিত থাকিতেন। পরিশেষে তাহার মনে এক সদুপায় উপস্থিত হইল। তিনি উদ্বাহের লগ্ন এরূপ সময়ে নির্ধারিত করিবেন, সঙ্কল্প করিলেন যে, সেই লগ্নে পরিণীতা হইলে, কন্যা বিধবা হইবেন না। তদনুসারে লগ্ন-নির্ণয়ার্থ জলপূর্ণ এক পাত্রের উপরি ভাগে সূক্ষর বিশিষ্ট এক ভাবি * স্থাপন করিলেন। যখন ঐ ভাবি, ক্ষুদ্র ছিদ্র দ্বারা জলে পরিব্যাপ্ত হইবে, তখনই বর-কন্যার বিবাহ হইবে, আচাৰ্য ভাস্কর, এইরূপ স্থির করিয়া রাখেন এবং সভাস্থ সকলকেই তাহা বিজ্ঞাপন করিয়া দেন। দৈবের কৰ্ম্ম দেখ,-লীলাবতী,ক্রীড়া-কৌতুক বশতঃ হউক, আর চাঞ্চল্য প্রযুক্তই হউক, ঐ তাবির মধ্যে কিরূপে জল প্রবেশ হইতেছে, সন্দর্শন করিতেছিলেন। ইত্যবসরে অকস্মাৎ * এপ্রকার সচ্ছিদ্র যন্ত্র। যৎকালে ঘটিকা যন্ত্রের নিতান্ত প্রাদুর্ভাব হয় নাই, তখন উহা দ্বারা সময় নিরূপিত হইত।
লীলাবতী। ৫৭ তঁাহার শিরাদেশের আভরণ হইতে, একটা মুক্তা ঐ তাবির অভ্যন্তরে নিপতিত হইল। যাহারা ঐ কাৰ্য পৰ্যবেক্ষণের ভার লইয়াছিলেন, সেই দৈবজ্ঞগণ, তাবি জল-পরিপূর্ণ হইবার সম্ভাবিত সময় উত্তীর্ণ হইয়া গেল, তথাচ তাহা জলমগ্ন হইল না দেখিয়া, উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিলেন। তদনন্তর ঐরূপ বিলম্ব হইবার কারণ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া, তঁাহারা দেখিতে পাইলেন, রন্ধ পথে একটা ছােট মুক্তা পড়িয়া রহিয়াছে। এত- ক্ষণে লগ্ন-কল নিশ্চয়ই অতীত হইয়া গিয়াছে, তখন সকলেরই প্রতীতি জন্মিল। অগত্যা তদণ্ডেই লীলাবতীর পরিণয়-ক্রিয়া সম্পাদিত হইল। ভাস্করাচার্সের মনােরথ ব্যর্থ হইয়া গেল। পরিণয়ের কিয়ং কাল পরেই লীলাবতীকে ভর্তৃহীনা হইতে হইল। ভাস্করাচাৰ্য প্রতিজ্ঞা করিলেন, তনয়াকে পাটীগণিত, পরিমিতি, জ্যোতিষ শাস্ত্র, ও বীজগণিতাদিতে সুশিক্ষিত। করিব। এবংবিধ উ চ শাস্ত্রের আলোচনা অবলম্বন করিলে, লীলাবতী দুঃসহ বৈধব্য-যন্ত্রণা অনায়াসেই বিস্মৃত হইতে পারেন। এই ঘটনার সত্যাসত্য বিষয়ে অনেকেই সন্দিহান হইবেন, কিন্তু বৃত্তান্তটী আদ্যোপান্ত অমূলক নয়। লীলাবতীর বাল- বৈধব্য-সম্বন্ধে সংশয় করিবার কিছুমাত্রও কারণ নাই। উহা চির-প্রচলিত একটী প্রসিদ্ধ, পুরাতন কিংবদন্তী। ঐ বিবরণের উপর নির্ভর করিয়াই, লীলাবতী গ্রন্থের উৎপত্তি হই- আছে। ইহাই এই ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। লীলাবতীর জনক, যাহা ভাবিয়াছিলেন, কাৰ্যেও তাহাই ঘটিয়াছিল । লীলাবতী, মহােচ্চ শাস্ত্রের অনুশীলনে তুন্ময় হইয়া গিয়াছিলেন। ভাস্করাচার্য্য, স্বীয় কুমারীর নামে অস্ক পুস্তকের ৫৮৮ প্রাচীন আৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। . “লীলাবতী" নাম রাখিলেন। কোন সময়ে এই অত্যুৎকৃষ্ট গ্রন্থ প্রণীত হয়, “ লীলাবতী পুস্তকে তাহার কোনই নিদর্শন পাওয়া যায় না। ত-প্রণীত ৫ গােলধ্যায় ” গ্রন্থের শেষাংশ পাঠে জানা যায়, শক নৃপের স্থাপিত অব্দের ১৭২ এক হাজার বায়ান্তর বংসর “সিদ্ধান্ত-শিরােমণি” প্রণয়নের কাল। ঐ গ্রন্থ লীলাবতী, বীজগণিত,গােলাধ্যায় ও গণিতাধ্যায় ৪ চারি অংশে বিভক্ত। এক্ষণে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হইল, লীলাবতী ঐ সময়ে বা উহার অব্যবহিত পূর্বে বৈধব্যদশা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহার জন্ম ও মরণের সময় অদ্যাপি নিণীত হয় নাই। ভাস্করা- চাৰ্য উক্ত গ্রন্থে কন্যাকে সম্বোধন পূৰ্ব্বক সূত্র-সঙ্কেতাদি রচনা করিয়াছেন । ঐ পুস্তকে অঙ্ক-সমাধানের প্রকৃষ্ট প্রণালী প্রদ- র্শিত হইতেছে। সঙ্কলন, ব্যবকলন, গুণ, ভাগহার, বর্গমূল, ও হে বুদ্ধিমতী, বালিক। লীলাবতী। যদি তুমি যােগ ব্যবকলনে কুশলী হও, তবে ২, ৫, ৩১, ১৯৩, ১৮, ১•. একত্র যােগ করিলে, কত হয় বল; এবং ১০০ হইতে ঐ যােগ সমষ্টি অন্তর করিলে, দুই অবশিষ্ট থাকে, তাহা বল। বাল-কুর-চঞ্চল-নয়না কল্যাণী লীলাবতী! যদি তুমি রূপস্থানাদি গুনে কুশলা হও, •বে ১৩৫ কে ১২ দিয়া পূরণ করিলে,কত হয়,বল দেখি? * 'ময়ে বলে লীলাবতি মমিতি ঐহি সহিতা দি-পঞ্চ-দ্বাত্রিংশত্রি নবহি-শহাষ্টাদশ-দশ। শতাপে হানে তানযুত-বিযুতাংশ্চ বৰ মে যদি রক্তে যুক্ত-ব্যবকলন-মার্গেসি কুশল। ” । “বালে বা -কু রঙ্গ-লোল-নয়নে লীলাবতি। প্রোচ্যতাং পঞ্চত্রেমিতা দিবাকর-গু অঞ্চ কহি সুদি। রূপ-স্থান-বিভাগ-খণ্ড-গুণনে কল্যাসি কল্যাণিনি ছিন্নাস্তেন গুণেনতে চ গুণিহা জাতা: কতি স্য, বদ।”
লীলাবতী ঘনমূল ইত্যাদি বিষয়ের লক্ষণ ও উদাহরণও উত্তম নিয়মে লিখিত রহিয়াছে। এই পুস্তক এতাদৃশ উৎকৃষ্ট পদ্ধতি-ক্রমে বিরচিত যে, ফৈজি নামক এক প্রসিদ্ধ মুসলমান, পারস্য ভাষায় উহার অনু- বাদ প্রচার করিয়া গিয়াছেন। তৎপরে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির এক জন কর্মচারীর উদ্যােগে উহা ইংরাজীতেও ভাষান্তরিত হইয়াছে। ভাস্করাচাৰ্য-বিরচিত ‘‘লীলাবতী’ গ্রন্থের নিমিত্ত লীলাবতীর নাম চিরস্মরণীয়, কেহ যেন এরূপ কথা স্বপ্নেও মনে স্থান না দেন,—এই আমাদের প্রার্থনা। কেৰল, কথায় মিনতি করিয়া, আমরা পঠিকাদিগকে ওরূপ বলিতেছি না। সিদ্ধান্ত-শিরােমণি’ গ্রন্থের স্থানে স্থানে ভাস্করাচাৰ্য, সূত্ৰ লিখিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন, কোথায় বা কোন বিষয়টা মােটেই নির্দেশ করেন মাই। তাহার কারণেল্লেখ করিবার সময় বলিয়াছেন, সূক্ষ্মবুদ্ধি ব্যক্তিরা ওগুলি অনায়াসে বুঝিতে পারিবেন। কিন্তু বাস্তবিক সেগুলি সূক্ষ্ম বুদ্ধিদের পক্ষেও নিতান্ত দুরূহ। আর যেগুলি জড়বুদ্ধিদিগের উপকারার্থে লিখিয়াছেন, স্কুল-বুদ্ধির তাে কথাই নাই,-তীক্ষ্ণ মতিরাও তাহা ধারণা করিতে বিলক্ষণ ক্লেশ ভােগ করিয়া থাকেন। লীলাবতী ঐ সকল বিষয় পরিপাটীরূপে শিক্ষা করিয়া- ছিলেন , সুতরাং তাহার সুতীক্ষ্ণ মনীষা ও স্বভাবসিদ্ধ প্রতিভার পরিচয় পাইয়া , কত কত প্রাজ্ঞ লােকে বিস্ময়াপন্ন হন। সেই প্রশংসনীয় পুস্তকের অনেক অঙ্কের সঙ্কেতাদি ইয়ুরােপীয় পণ্ডি তেরাও গ্রহণ করিয়া, স্বদেশীয় অস্ববিদ্যার প্রভূত উপকার সাধ করিয়াছেন। তদর্থ তাহারা নিজ দেশে ধন্যবাদের পাত্র হইয়াছেন।
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। অর, তাহাদের ঔদার্য ও গুণগ্রাহিতা-গুণে আমরাও তাহাদি, গকে শ্রদ্ধাস্পদ মনে করিয়া, কতই সুখ্যাতি করিয়া থাকি। লীলাবতী যেমন গুণবতী, তেমনই বিদ্যাবতী। তিনি অসাধারণ বুদ্ধিমতী ছিলেন ; যেহেতু তদীয় জনক, তাহাকে “ মতিমতী” বিশেষণে অভিহিত করিয়াছেন। ইহার বিভীয় প্রমাণ,-তরু- তলে উপবিষ্ট থাকিয়া, তিনি বৃক্ষের ফল, পত্র, শাখা ও প্রশাখার সংখ্যা সহজে গণনা করিতে পারিতেন।* এই অসাধায়ণ শক্তি একমাত্র ঋতুপর্ণ বাজার ছিল। সমস্ত ভারতবর্ষের মধ্যে আর কাহারও এই অলৌকিক সামর্থ্য ছিল কি? যে দেশে অবলার অনাদৃত, তিরস্কৃত, সে দেশের পক্ষে ইহা কখনই সামান্য স্পর্ধার বিষয় নয়। আচাৰ্য ভাস্কর মহােদয়, লীলাবতী পুস্তক ভিন্ন বীজগণিত, গােলাধ্যায়,গণিতাধ্যায়,করণকুতূহল,প্রভৃতি গ্রন্থও প্রণয়ন করিয়া- ছিলেন। লীলাবতী, এই সমস্তই অনুশীলন করিয়া থাকিবেন । তাঁহার পিতা, ফলিত জ্যোতিষের কিঞ্চিৎ নিন্দা করিয়াছেন। তাহা নিস্ফল ও নিরর্থক এরপ অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া গিয়াছেন। এ সম্বন্ধে অাচার্যের মত এই যে, জ্যোতিষ, * এই ঘটনাটা প্রবাদ বলিয়া উপেক্ষিত হইতে পারে না। সচরাচর যথার্থ বিষয় অবলম্বন করিয়াই, জনশ্রুতি প্রচলিত হয়। । জ্যোতিষ, বিদ্যা ২ দুই ভাগে বিভক্ত। সিদ্ধান্ত জ্যোতিষ, ও ফলিত জ্যোতি। সিদ্ধান্ত জ্যোতিষে গ্রহ, উপগ্রহাদির গতি প্রভৃ’তর জ্ঞান জন্মে। ফলিত জ্যোতিষ দ্বারা গ্রহগণের গতি, স্থিতি অনুসারে মনুষের সন্তান, ধন, পীড়া ইত্যাদি ফলাফ বিজ্ঞাত হওয়া যায়। ফণিত-জ্যোতিষে যাহা শিক্ষা পাওয়া যায়, তাহাপেক্ষা সিদ্ধান্ত-জ্যোতিষের শিক্ষা গুরুতর।
লীলাবতী। শাস্ত্রের একাংশ ফলিত-জ্যোতিষ। উহা দ্বারা প্রশ্ন-বিচারের কিছুই জানা যায় না। অশেষ-যুক্তিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত-জ্যোতিষ, যে অবগত নয়, সে চিত্র-পট লিখিত রাজা বা কাষ্ঠময় সিংহবৎ।” লীলাবতী, পিতার দৃষ্টান্তের অনুসরণ করিয়া, ঐরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছিলেন,স্বতঃই বিশ্বাস হয়। কারণ,পিতার গুণাগুণ, লীলাবতীর তুল্য বিদ্যাবতী দুহিতায় বৰ্ত্তিবারই কথা । লীলাবতীর চরিত্র আলােচনায় আমাদের মনে কয়েকটা কথা উপস্থিত হইল। প্রথমতঃ, তাহার পরিণয়, নিতান্তই বাল্য- কালে বা সমধিক বয়ঃস্থ অবস্থায় সমাহিত হয় নাই, সম্ভবতঃ কৈশাের সময়ে হইয়া থাকিবে। দ্বিতীয়তঃ, তাঁহার পিতা এক জন উচ্চ ও উন্নত প্রকৃতির তত্ত্বজ্ঞ মনস্বী ছিলেন। তৃতীয়তঃ, তখন নারীজাতির সুশিক্ষায় লােকের অনাস্থা, অনাদর বা ঔদা- সীন্য ছিল না, বরং তদ্বিষয়ে সমধিক উৎসাহ, • আগ্রহ ও অধ্যবসায় দৃষ্ট হইত। তখনকার সমাজ-বন্ধন এখনকার মত এতাদৃশ বিকট-ভাবাপন্ন, সুতরাং কঠোর ছিল না। থাকিলে, আমরা আজ গুণাংশে লাবণ্যবতী, সতী, রমণীরত্ব লীলাবতীর নাম স্মরণ করিয়া পুলকিত হইতে পারিতাম না। লীলাবতী জগতের ইতিহাসে উচ্চ পদবী অধিকার করিয়াছেন এবং ভবিষ্যতেও তাদৃশ স্থানে থাকিবেন, ইহা স্মৃতিপথে সমারূঢ় হইলেই, আমাদের সৌভাগ্যগৰ্ব্ব উপস্থিত হয়। তৎকালে বিদরে সহমরণ প্রচলিত ছিল না। তাহা হইলে, লীলাবতী নিশ্চয়ই ভর্তার জ্বলচ্চিতা আয়ােহণ করিতেন। অতি প্রাচীন কালে প্রকৃত সতী কন্যারা যেরূপ বিশুদ্ধ ভাবে আত্মার ৬২ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। ঔত্য দেখাইয়া গিয়াছেন, লীলাবতীও সেইরপ নিষ্কলঙ্ক ছিলেন বলিয়া, ভারত-মণ্ডলের একটী গণনীয় আদর্শচরিত্র। পবিত্রা নারী। এক্ষণে যে ব্রহ্মচর্যের তরঙ্গ উখিত হইয়াছে, লীলাবতী তদ্বিষয়েও অনুকরণীয়। তিনি যে পুরুষের ভাৰ্য্য। হইয়াছিলেন, যদি তিনি জীবিত থাকিয়া, অতিমাত্ৰ বুদ্ধিমতী সতী, লীলাবতীর বিদ্যাবত্তা দেখিতে পাইতেন, না জানি, কতই পুলকিত হইতেন! পত্নীর গুণে তঁাহার সুনাম দেশ- দেশান্তরে বিষােষিত হইত। লীলাবতী রূপবতী ছিলেন কি , জানিবার উপায় নাই। রূপের খ্যাতি অপেক্ষা বিদ্যাজনিত প্রতিপত্তি গরীয়সী কেন পাঠক-পাঠিকারা বিবেচনা করিয়া দেখুন। কেবল আমরাই তঁাহার গুণগ্রামের ভূয়সী প্রশংসা করি, এমন নয়। ইয়ুরােপ ও আমেরিকা মহাদেশের সর্ব স্থান তাহার অপৰিসীম যশে পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে। ধন্য লীলাবতী! তুমি অমর, তুমি কামিনীকুলের শিরােমণি ।
[ ৬৩ ]
সুৰুচি।
যে নারীর বৃত্তান্ত এস্থলে প্রকটিত হইল, তিনি অপরজাতীয়।
অ সর-জাতি সচরাচর সৌন্দর্য্য ও নৃত্য-বিষয়ে বিখ্যাত।
কিন্তু এই রমণী, ধৰ্ম্মশীলতার কারণ প্রসিদ্ধ, এই হেতু তাঁহার
বিবরণ লিপিবদ্ধ করিলাম।
বিষ্ণুপুরাণােক্ত স্বায়ম্ভব মনুর পুত্র উত্তানপাদ রাজার সুরুচি
নামী যে পত্নী ছিলেন, অদ্যকার বর্ণিত মহিলা ও তিনি
নিতান্ত বিভিন্ন । এই ‘সুরুচি” অরগণের মধ্যে অত্যুত্তমা ও
অসামান্য-রূপ-গুণসম্পন্না। তিনি যখন হিমাচলের উত্ত
শৃঙ্গে আসীন আছেন, এমন সময়ে দেখিতে পাইলেন, এক জন
শূন্য মার্গ অবলম্বন করিয়া যাইতেছেন। তিনি কে?কোথায়
যাইতেছেন ? কি জন্যই বা যাইতেছেন ? এই সকল প্রশ্ন
তাহার মনে উদিত হইয়া, আকাশ-বিহারীর আদ্যন্ত বৃত্তান্ত
জানিতে তাহার আগ্রহ জন্মিল। কৌতুহল চরিতার্থ করিতে
গিয়া, সুরুচি বুঝিতে পারিলেন, তিনি ইন্দুদেবের এক দূত।
তৎপরে তাহার নিকটে কিছু শিক্ষা-গ্ৰহণাকক্ষিণী হইয়া,
তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন।
সুরুচি।--হে মহাভাগ ! আপনি কোন স্থান হইতে
আসিতেছেন ? এক্ষণেই বা কোথায় চাইবেন ? অনুগ্রহ প্রকাশ
পূৰ্ব্বক এই প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর প্রদান করুন।
।
৬৪ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। দেবদূত।--তুমি যে বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়াছ, তােমার ঔৎসুক্য-নিবারণার্থে তাহা আমি বলিতেছি। অরিষ্টনেমি নামক এক রাজা বৃদ্ধ দশায় সংসারে নিস্পৃহ হইয়া, স্বীয় আত্মজের প্রতি রাজ্যভার অর্পণ করিয়াছেন। তিনি সম্প্রতি গন্ধমাদন-গিরি-প্রদেশে দুঃসহ তপস্যায় নিযুক্ত আছেন। দেব- রাজ ইন্দ্র, নিজ ইষ্ট-সাধনার্থে উল্লিখিত নরপালের সকাশে আমাকে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তথা হইতে আমি এখন মহেন্দ্র-সন্নিধানে গমন করিতেছি। সুরুচি।—প্রভু! অরিষ্টনেমি ভূপতির সঙ্গে আপনার কি কি কথােপকথন হইয়াছিল, শুনিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। যদি কারুণ্য প্রকাশ পুরসঃর তদ্বিবরণ বর্ণন করেন, সবিশেষ চরিতার্থ হই। দেবদূত।-“ভজে ! তুমি রাজা অরিষ্টনেমি ও আমার কথাবার্তা শ্রবণের নিমিত্ত সমুৎসুক হইয়াছ, অতএব তাহা আনুপূৰ্ব্বিক কীৰ্ত্তন দ্বারা তােমার কৌতুহল নিবৃত্তি করি- তেছি, একাগ্র অন্তঃকরণে শ্রবণ কর “অরিষ্টনেমি ভূপতি গন্ধমাদন পৰ্কতে ঘােতর তপ জপ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন শুনিয়া, শচীপতি আমাকে এক বিমান প্রদান পূর্বক অনুজ্ঞা করিলেন, তুমি অবিলম্বে, অরি- ষ্টনেমির তপস্যা-স্থলে গিয় উপনীত হও এবং এই কাম- রাবতীতে তাহাকে লইয়া আইস। সেই বিমান-যােগে তথায় সমুপস্থিত হইয়া, আমি, পাকশাসনের আদেশ বাক্য রাজার শ্রুতিগােচর করাইলাম। শ্রবণমাত্র রাজা,আমাকে প্রশ্ন করিলেন, ৫।
সুরুচি। ‘দূতবর! সর্বাগ্রে আমার এক জিজ্ঞাসার উত্তর করুন, পরে আমি নিজের কর্তব্যাকৰ্তব্য অবধারণ করিয়া লইব। ভাল, বল দেখি, স্বর্গের কি গুণ এবং দোষই বা কি?” রাজার বচনাবসানে দেবদূত কহিতে লাগিলেন, “পুণ্য, উত্তম রূপ সঞ্চিত থাকিলেই, স্বর্গে সুখভােগ ঘটে। পুণ্যের পরিমাণানুসারে সুখসন্তোগেরও ইতর-বিশেষ আছে। কিন্তু স্বর্গগত ব্যক্তি, যদি বিমলানন্দ-ভােগী কোন ব্যক্তির হিংসা করেন, তবে তাহার ধৰ্ম্ম হ্রাস হইতে থাকে। ঐরূপে পুণ্য- ক্ষয় হইবার অব্যবহিত পরেই, স্বর্গস্থ ব্যক্তিকে স্বর্গভ্রষ্ট হইতে হয়।” অতঃপর দেবদূত, সুরুচিকে সম্বােধন করিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন, সুরুচি! রাজা, যুক্তিপূর্ণ গভীরার্থ উক্ত বাক্য শুনিয়া কহিলেন, “দূতবর ! এরূপ অপকৃষ্ট-ফল-সংষ্ট দেবলােকে খাকিতে আমার ইচ্ছা নাই। আমি ঘােরতম তপশ্চরণদ্বারা একেবারে পাপ-ধ্বংস করিতে অভিলাষ করি। অতএব আপনি দেবের রথ লইয়া, স্বস্থানে প্রস্থান করুন।” অতঃপর দেবদূত অগত্যা রথ-সংযােগে ইন্দ্রভবনে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। দূত, ইন্দ্রদেবকে যেরূপ বলিয়াছিলেন, সুচিকে তত্তাবৎ পুনরায় পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণন করিয়া কহিলেন,-“হে সুরুচি! অরিষ্টনেমির স্বর্গসুখ-ভােগে অনাসক্তির কথা শ্রবণ করিয়া, দেবাধিপতি একবারে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া গেলেন। তদনন্তর ইন্দ্র বলিলেন, ‘দূত! তুমি পুনৰ্ব্বার রাজার সমীপে গমন কর এবং তাহাকে সঙ্গে করিয়া, পৰ্বতত্ত্বদশী বাল্মীকির আশ্রমপদে লইয়া যাও। ঋষিবরকে বলিও, সংসার-ক্লেশ-
৬৬
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত।
ভীরু অরিষ্টনেমির যাহাতে মােক্ষ হয়, মহর্ষি যেন তাহার বিধান
করেন।”
দেবদুত পুনরপি সুরুচিকে কহিলেন, শান্তশীলে! অতঃপর
রাজা ও ঋষির একত্ৰ সংমিলন করিয়া দিয়া, আমি প্রত্যাবর্তন
করিতেছি। আমি দেখিয়া আসিলাম, বাল্মীকির সহিত রাজা,
নানাবিধ বিচিত্র কথােপকথনে প্রবৃত্ত হইলেন।
অনন্তর রাজা অরিষ্টনেমি ও মহর্ষি বাল্মীকি, পরস্পর সুদীর্ঘ
অথচ অতি প্রীতিপ্রদ কথােপকথনে ব্যাপৃত হইলেন। সেই
কথােপকথন হইতে “যােগাবাশি” গ্রন্থের সূচনা হইয়াছে।
অনাবশ্যক বােধে এখানে তাহার উল্লেখ করা গেল না। ফলতঃ
সুরুচি এক অসাধারণ কামিনী। যিনি “যােগবাশিষ্ঠ”
সদৃশ গুরুতর গ্রন্থের প্রস্তাবনার মূল, তাহাকে অলৌকিক
গুণশালিনী বলিয়া নির্দেশ না করিলে, নিতান্ত দূষ্য হয়।
যদিও আমারা সুরুচি-সংক্রান্ত অন্যান্য অনেক আবশ্যক বৃত্তান্ত
অবগত নহি, তথাপি ইহা নিঃসংশয়ে বলা যাইতে পারে,
তিনি যে যার পর নাই পবিত্ৰ-চরিত্র ছিলেন, তঁাহার নামেই
তাহা সুব্যক্ত । অপর-জাতীয় বলিয়া, তিনি রূপ
নৃত্যেই খ্যাত ছিলেন, অন্য কোন গুণই তাহার ছিল না,
যাহারা এই কথা বলিবেন, তাহাদের জানা উচিত, অগ্রজাতীয়
কোন কোন স্ত্রীলোেক কত কত উত্তমােন্তম কাৰ্য করিয়া-
ছিলেন। সুরুচি তত দূর গরিষ্ঠ কাৰ্য সাধন না করুন, ধর্মতত্ত্বজ্ঞ।
জিজ্ঞাসু হইতে পারেন, এ অংশে বােধ করি, কাহারই মনে
দ্বিধা জন্মিতে পারে না। বিষ্ণুপুরাণোক্ত উত্তানপাদ-রাজমহিষী
সুরুচি হইতে এই সুরুচি শ্রেষ্ঠ। তিনি নামে সুরুচি ছিলেন,
সুরুচি
মাত্র ; কার্যে কিন্তু তিনি কুরুচি। ধ্রুবের ন্যায়, অকপট ধর্মাত্মা
বালককেও তিনি নানারূপ উৎপীড়ন করেন। ধ্রুব, তাহার
সপত্নী সুনীতির পুল ; এই দোষেই ধ্রুব, লাঞ্ছিত হইতেন।
এই সুরুচির সে দোষ দৃষ্ট হয় না।
এই প্রস্তাবের গন্ধমাদন পৰ্বত পৌরাণিক আখ্যানমূলক
বটে; কিন্তু, অরিষ্টনেমির নাম তদ্রুপ নয় ; উহা সৰ্বসাধারণের
চির-পরিচিত। আকাশপথে গমনকেও একেবারে মন-কল্পিত
বলা যায় কি না, সকলে এক এক বার চিন্তা করিয়া দেখিবেন।
যোগবাশিষ্ঠ যংকালে বিরচিত হয়, সে সময়টা নিতান্ত
আধুনিক বা অতীব প্রাচীন নয়। তখন ভারতবর্ষের সভ্যতা
প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান ছিল। সুরুচি, “যােগবাশিষ্ঠ” প্রণয়নের
কিছু পূর্বের লােক। অতএব তাহার প্রসঙ্গ অবিশ্বাস্য বা
অসঙ্গত 'ঘটনায় পূর্ণ নহে, অবলীলাক্রমে উল্লিখিত হইতে পারে।
::)-
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। বাক্পুষ্টা। - ঃo: ৬ ভারতকর্ষের নিতান্ত প্রামাণিক ইতিহাস “ রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থে এই মহিলার প্রসঙ্গ নিবদ্ধ আছে। তিনি, কাশ্মীর-রাজ তুঞ্জীনের প্রিয়তমা। রাজা যাদৃশ পুণ্যশীল, তাহার সহধর্মিণীও তাদৃশ ধৰ্ম্মজ্ঞানশালিনী ছিলেন। এইরূপ অপূৰ্ব সংযােগ সচারচার অতীব বিরল। তুঞ্জীন, অতিমাত্র প্রভাববতী বাকৃপুষ্টার সাহায্যে প্রজাদিগকে সুখী করিয়া,রাজ্য শাসন করিতে লাগিলেন। মহারাজ তুঞ্জীন, প্রজাপুঞ্জের ক্লেশ উপস্থিত হইলে, ঘােতর কাতর হইয়া পড়িতেন। সৌভাগ্যক্রমে ঐরূপ সঙ্কটময়, ভীষণ সময়ে তাহার অর্ধাঙ্গভাগিনীর বুদ্ধিবৃত্তি ও ধৈৰ্যশক্তি কেমন অপ্রতিহত থাকিত, তাহার একটা উদাহরণ লিখিত হইতেছে। তাহারা প্রথমতঃ সুনিয়মে রাজ্য পালনৰ্ব্বক ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রাদি নানাজাতীয় প্রজার চিত্তরঞ্জন-কার্যে ব্রতী হই- লেন। একদা ভাদ্র মাসে কাশ্মীর প্রদেশে দৈবাং হিমানীপাত হইতে লাগিল। তখন শস্য-ক্ষেত্রে শস্য-সমুদায় পরিপক্ক প্রায় হইয়া উঠিয়াছিল; সুতরাং নীহার-পতনে কি ভয়ানক ক্ষতি হইতে পারে, অনায়াসেই বুঝা যাইতেছে। ইহাতে শস্য- সমূহ বিনষ্ট হইয়া গেল, প্রকৃতি কুলের আশা-লতাও সেই সঙ্গে সমূলে উৎপাটিত হইল। বলা বাহুল্য, এই সূত্রে দেশ-মধ্যে নিদারুণ দুর্ভিক্ষের সূত্রপাত হইল। । প্রথমে রাজা ও রাজ্ঞী তুর্ভিক্ষ-দমনের জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। পথ, মাঠ, ঘাট, আশ্রম, গৃহ, কানন, নদীতীর, প্রেতভূমি, আপণ, বাক্পুষ্টা। ৬৯ বিপণি বা দুর্গম স্থান—যেখানেই হউক না কেন, ক্ষুধার্ত জীব দেখিলেই, তাহারা ভক্ষ্য প্রদান পূৰ্ব্বক আনুকূল্য করিতে বিরত হইলেন না। বিশেষতঃ এই বিভীষিকামষ সময়ে বাপুষ্ট। দেবীর দয়াস্রোত অতিমাত্ৰ বৰ্ধিত হইল দেখিয়া, প্রজাপুঞ্জের আনন্দের সীমা রহিল না। এইরূপে কিছু দিন চলিতে চলিতে, রাজ-ভণ্ডার অর্থশূন্য হইয়া গেল। তখন অমাত্যদের সাহায্য গ্রহণ আবশ্যক। সেই দুদৈব কালে তাহারাও মুক্ত-হস্ত হইয়া, অকাতরে কত ধন- ধাত্যাদিই প্রদান করিলেন। ইহাতেও দুর্ভিক্ষের উপশম হইল । মহিষী এতাদৃশ অবস্থাতেও নিরুপায় বা নিশ্চিন্ত হন নাই। যে দয়া, যে মহিমা, যে কর্তব্যপরায়ণতা, ভারতীয় আর্য্য রমণীদের চির-প্রসিদ্ধ গুণ, সেই মহান্ গুণের বশবর্তিনী হইয়া, রাণী স্বীয় গাত্রাভরণ পৰ্যন্ত পরিত্যাগ করিলেন। তাহা বিক্রয় দ্বারা যে টাকা পাওয়া গেল, অম্লান বদনে জনগণের আহারীয় ব্ৰুয়ে তাহা নিয়ােগ করিলেন । ধন্যা রাজ্ঞী বাপুষ্টা! বিধাতা তােমার মত নারী-রত্নকে তুঞ্জীনের রাজ্যে প্রেরণ করিয়া কি অভাবনীয় করুণাই প্রদর্শন করিয়াছেন! ইহাতেও পর্যাপ্ত হইল না। ক্রমে লােমহর্ষণ ব্যাপার ঘটিয়া উঠিল। তখন জনক-জননী, সন্তান-সন্ততির প্রতি নির্দয় হইলেন; পতি-পত্নী পরস্পরের পবিত্র দাম্পত্য প্রেম বিস্মৃত হইয়া গেলেন। তখন ভ্রাতা, আর স্নেহময়ী ভগ্নীকে সাদর সম্ভাষণ করেন না, ভগ্নীও ভ্রাতার দিকে দৃকৃপাতের স্পৃহা রাখেন না। সংক্ষেপে বলিতে গেলে, এইমাত্র কহিলেই যথেষ্ট হয়, সকলেই স্ব স্ব উদর পাষণে বিব্রত। সুতরাং বহুসংখ্য প্রাণী, করাল-কাল-কবলে ৭০ প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত। পতিত হইতে লাগিল। বালক, বৃদ্ধ, যুবা, প্রৌঢ়, কিশাের সকল অবস্থার লােকই শমন-সদনের অতিথি হইল। অল্পমাত্র যাহারা তখনও জীবিত ছিল, তাহাদের কদাকার বিকট আকার সন্দর্শনে দর্শকের মনে উংকট-ভয়ের সঞ্চার হইতে থাকে। কাশ্মীর রাজ্যের তদানীন্তন অবস্থা পৰ্যালােচনায় উহা দ্বিতীয় যম-রাজ্য বলিয়া মনে হয়। এই বিপদসঙ্কুল সময়ে এক দিন অর্ধ যামিনীতে রাজপ্রাসাদে এক ভয়ানক আৰ্তনাদ উঠিল। একে নিশীথ, তাহাতে জনপদ-মণ্ডলে লােকাভাব, তদুপরি আবার দুর্ভিক্ষ ও তদানুষঙ্গিক মহামারী, রাজমহিষীও অভ্যাপাতে জর্জরিত আছেন,-সুতরাং তৎকালে তাহার প্রাণে বড়ই ভীতির আবির্ভাব হইল। তিনি সর্বাগ্ৰেই অভী দেবতার চিন্তা করিয়া, রােরুদ্যমান পতিকে অঙ্কে উত্তোলন করিলেন। তৎপরে শােকার্ত নরনাথ এইরূপ কহিলেন। তুঞ্জীন।-দেবী! আমাদের পাপেই প্রজাগণের এই দুর্গতি ঘটিয়াছে। আমার দুর্ভাগ্য বশতঃ রাজ্যের ধন নিঃশেষিত হইয়া গেল। দেখ, প্রজার অমঙ্গল নিবারণের যে যে সদুপায় ছিল, একে একে সকলই গেল। আমাকে ধিক্ ! কারণ, আমি জীবিত থাকিতে ইহারা শমন-ভবনে গমন করিতে লাগিল। আমাদের সমস্ত যত্ন, সমস্ত উদ্যম ব্যর্থ হইল। আমরা জীবিত থাকিতে কি অসংখ্য প্রজাক্ষয় হইয়াছে ও হইতেছে! রাজত্বের এক স্থানে স্বামিহীনা স্ত্রী, স্বামীর নিমিত্ত করুণ স্বরে ক্রন্দন করিতেছে; অন্য স্থানে পুত্রহীন জন, অপত্যের জন্য বরাদনে নিমগ্ন। কোথায় বা অন্নের জন্য হাহাকার বব উঠিয়াছে। এ কি অল্প মৰ্ম্মভেদী ? ভাবিয়া দেখ দেখি, রত্ন-পরিপূর্ণ কাশ্মীর L বাকপুট। ৭১ অাজ শ্মশান হইরাছে কি না? চতুর্দিকে এই ভীষণ বিপদে মগ্ন প্রজাপুঞ্জের পরিত্রাণের কোন উপায় আছে কি? যেরূপ রাশি রাশি নীহার চারি দিকে পতিত রহিয়াছে ও পতিত হই- তেছে, তাহাতে কোন প্রকারে প্রাণীদিগের পলায়নের উপায় নাই। সৰ্ব্বত্রই কাতরােক্তি শ্রুত হইতেছে। আমি আর এই অসহ্য যন্ত্রণা অবলােকন করিতে পারি না। প্রজ্জ্বলিত অনলে দেহ বিসর্জন দিয়া মনের ক্ষোভ দূর করিতে ইচ্ছা করি। রাজগণ, রাত্রিকালে স্বীয় প্রকৃতিবৃন্দকে সুখে নিশা যাপন করিতে দেখেন, তাহারা ধন্য। দেবী! আমাদের কি যে ঘােতর পাক ঘটিয়াছে, তাহা বলিতে পারি না। উপরি উক্ত বচন-পরম্পরা উচ্চারণ করিয়া, মহীপতি শয্যায় নিপতিত হইয়া, মুখ বস্ত্রাবৃত করিয়া, কুন্দন করিতে লাগিলেন। বাপুষ্ট। এত ক্ষণ নীরবে স্বামীর সশস্ত কথা শুনিতেছিলেন । তিনি, পতির অচৈতন্য বিদূরিত করিবার জন্য বহু যত্ন করিয়া সংজ্ঞা লাভ করাইলেন এবং তৎপরে কহিলেন। বাক্পুষ্ট।-জীবিতনাথ ! কি হেতু আপনি এবষ্কৃত অস্থির হইলেন? এই সময়ে কি সহিষ্ণুতা অবলম্বন করা কৰ্তব্য নহে? যদি এই বিষয়েও অধৈৰ্য্য ও চৈতন্যলােপ সংঘটিত হয়, তবে আপনার মহত্ত্ব রহিল কেথায় ? আপনি সামান্য লােকের মত অধীর হইবেন না। ইন্দ্ৰই বলুন, বিধাতাই বলুন, আর যমই বলুন, ইহারা কেহই সত্যপরায়ণ নৃপতির শাসন লন করিতে পারেন না। রাজা, প্রজার পিতৃ তুল্য। মৃতপ্রায় পুত্রকে পরিত্যাগ করিয়া অসময়ে পলায়ন করা কদাপি পিতার বিধেয় নয়। পতির প্রতি শ্রদ্ধা রাখা, পত্নীর অবশ্য १२ প্রাচীন আৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। ৩ প্রতিপাল্য ব্রত। সেইরূপ রাজার কর্তব্য, ক্ষুধিত বা বিপন্ন প্রজাকে দুঃসময়ে ত্যাগ না করা। আত্মহত্যা, অবৈধ কৰ্ম্ম । যদি একান্ত পক্ষেই তাহা করিতে হয়, তাহা হইলে, এখনও হতাশ্বাস হওয়া উচিত নহে। যত ক্ষণ পর্যন্ত একটীও প্রাণী জীবিত থাকিবে, তত ক্ষণ প্রাণ বিসর্জন অন্যায়। যখন এ বিষয়েও নিরাশা উপস্থিত হইবে, অবধারিত জানিবেন, তখনই হুতাশনে আমাদের জীবনাহুতি দিবার উপযুক্ত অবসর। যংকালে বাকৃপুষ্টা ঐ সকল বাক্য প্রয়ােগ করিতেছিলেন, তাহার বদনের এক অপূর্ব শ্রী হইল। তাহার শরীর তখন মহােৎসাহে উসাহিত। তিনি একাগ্রচিত্তে দেবতার ধ্যান করিয়া তেজস্বিতা সহকারে পুনশ্চ কহিতে লাগিলেন। বাপুষ্টা।–“নাথ ! গাত্রোখান করুন। আপনাকে আর চিন্তিত হইতে হইবে না। আপনার প্রজাদের আর দুর্ভিক্ষ- ক্লেশ থাকিবে না, আমি নিশ্চয় বলিতেছি।” দেবী বাকৃপুষ্ট। যাহা বলিলেন, তাহাই ঘটিল। না হইবে কেন ? তিনি কি সামান্য নারী ? পতিব্রতা কামিনীর বাক্য কস্মিন্ কালেও বিফল হইবার নয়। শূন্যমার্গ হইতে তৎক্ষণাৎ রাশীকৃত মৃত পারাবত পতিত হইতে থাকিল। সেই সমুদায় মৃত কপােত ভক্ষণ করিয়া প্রজারা সচ্ছন্দে প্রাণ-ধারণ করিতে লাগিল। এই ব্যাপারটা অনেকের অসম্ভব মনে হইবে। আঁহারা স্কটলণ্ডের পুরাবৃত্ত অধ্যয়ন করিয়াছেন, তাহারা জানেন, ইহার অনুরূপ ঘটনা উক্ত ইতিবৃত্তে বর্ণিত আছে। যেরূপ প্রচণ্ড হিমের প্রাদুর্ভাব, তাহাতে পক্ষীদের গতিবিধি-রােধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আর, অতিমে তাহারা বিগতজীবন হইয়া বাকপুষ্ট।। ৭৩ পড়িয়াছিল, ইহাও, নিতান্তু সঙ্গত বােধ হয়। * নরপতি, মহি- যীর এই কাৰ্য্য ফুঠে মরণ সঙ্কল ত্যাগ করিলেন। কাশ্মীৰ নগরীর লােকেরা স্থির করিল, রাজ্ঞী বাপুষ্টান ধৰ্ম্মজ্ঞানে পরিতুষ্ট হইয়া, বিধা, আমাদের প্রাণ-রক্ষার এই উপায় বিধান করিয়াছেন। কিছু দিন পরে কাশ্মীরের অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন হইল। ক্রমে অপর্যাপ্ত ধন্য ও অন্যান্য শম্ভ জন্মিতে আরম্ভ হইল। অতিশয় দুঃখের বিষয়, তুঞ্জীন ভুপতি, অধিক বয়স পর্যন্ত রাজত্ব ভােগ করিতে পান নাই। যখন তঁাহার বয়ঃক্রম ৩৬ হৰিশ বৎসর মাত্র, তখন তাহার আয়ুষ্কাল পূর্ণ হয়। মহিষী স্বামীর অনুগমন করিলেন। তিনি পতির জলচ্চিতারােহণ করিলে, প্রকৃতিমণ্ডলে হাহা ধ্বনি পড়িয়া গেল। সতী বাকৃপুষ্ট যে স্থানে ভর্তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, তাহা অদ্যাপি “ বাপুষ্টাট বী আখ্যায় প্রখ্যাত আছে। উহা ভারতবর্ষের এক অতি পুণ্যপবিত্র ক্ষেত্র, ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। । * “রাজতরঙ্গিনী"প্রণেতা বলেন, কপােত পতিত হয় নাই। সাধ্বী মৰিী, পরা লােকদিগের জীবন ধারণ অন্য কোন এক অদ্ভুত বস্তুর সৃষ্টি করিয়া থাকিবেন। ইতার হেতু নির্দেশাৰ্থ তিনি কহেন, প্রাণিগণের প্রাণ রক্ষায় যাহার নিতান্ত আগ্রহ ছিল, তিনি কতিপয় প্রাণীর জঙ্গ, অন্য কতকগুলি অন্তর, বনাশ সাধন কেন করবেন? গন্থ চার, প্রবাদ-অবলম্বনে উক্ত ঘটনা পুকে নিবেশিত করিয়া বোধ হয়, ভাবিয়াছিলেন, আকাশ হইতে কপােত-পতন এস, তাই এরূপ অতিপ্রাণ প্রকটন করেন। ইহাতে ৰাষ্টার শী-হিংসার কোন পরিচয় পাওা যায় না।
৭৪ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। তৃতীয় পরিচ্ছেদ। গাগী দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রকাশিত বরণীয়-চরিত্রা মৈত্রেয়ী হইতেও পূজ্যতর একটী মহিলা বিবরণ সম্প্রতি বর্ণন, করিতে প্রবৃত্ত হওয়া গেল। ইহার নাম পাগী। গার্গী, বচ, মুনির দুহিতা, এই বিষয় ভিন্ন ইহার পরিচয়- সংক্রান্ত কোন বৃত্তান্তই জানা যায় নাই। তবে ইহার বিদ্যাধ্যয়ন- সম্বন্ধে কিছু কিছু তথ্য অবগত হওয়া গিয়াছে। ইনি বেদালাে- চনায় এতাদৃশ ব্যুৎপন্না হইয়াছিলেন যে, উত্তর কালে তদর্থ সবিশেষ খ্যাতি প্রতিপত্তি লাভ করেন। শুরু-যজুবেদান্তৰ্গত বৃহদারণ্যক উপনিষদের ৩ তৃতীয় অধ্যায়ের ৬ ষষ্ঠ ও ৮ অষ্টম ব্ৰাহ্মণে * বিনিবেশিত ইহার বচন গুলি নিতান্তই মনোহর ও উপদেশপ্রদ। তাহা বেদ-বাক্যবৎ প্রামাণ্য, সুতরাং জন- সাধারণের নিকটে অত্যন্ত মান্য ও আদরের বস্তু হইয়া উঠি- ‘য়াছে। সংস্ৰবাধীন এই উপলক্ষে নিয়ে একটা ঘটনার অব- তারণা করিতেছি, সকলে অভিনিবিষ্ট মনে পাঠ করুন। প্রাচীন সময়ে মগধদেশ নানাবিধ তত্ত্ববিদ্যা চর্চার নিমিত্ত সমধিক বিখ্যাত হইয়াছিল। বিদেহ, ঐ মগধের অন্তর্গত এক প্রদেশ। মিথিলা নগর, বিদেহ প্রদেশের রাজধানী। উহার অধ্যায়ের স্তুগত বিভাগ-বিশেষের নাম ব্রাহ্মণ। .
গা ৭৫ বর্তমান নাম ত্রিহুত । এই মিথিলায় একদা জনক রাজর্ষি বহুদক্ষিণা * নামক এক প্রকাণ্ড যাগের আয়ােজন পুরঃ- সর বহু স্থানের ধার্মিক ব্রাহ্মণবর্গকে আহ্বান করেন। সেই সূত্রে কুরু ও পঞ্চাল দেশ হইতে বেদ-বিশারদ ব্রাহ্মণকূলের সমাগম হওয়ায়, যজ্ঞ সভার এক অপূৰ্ব শােভা লক্ষিত হইতে থাকে। সেই সভায় রাজর্ষি জনকের অন্তঃকরণে এই প্রশ্ন সমুদিত হইল, যজ্ঞ-নিমন্ত্রণে সমুপস্থিত বিপ্ৰবৃন্দের মধ্যে কে সর্বাপেক্ষা ব্ৰহ্মজ্ঞ, জানা আবশ্যক। তদনুসারে তিনি আমন্ত্রিত দ্বিজকুল-সমক্ষে সভাক্ষেত্রে ১০০০ এক সহস্র গাে বন্ধন পূৰ্ব্বক তাহাদের প্রত্যেকের শৃঙ্গদ্বয় ১৩ দশ পাদ। সুবর্ণ দ্বারা হেমময় করিয়া দিলেন। তদনন্তর কহিলেন, ব্রাহ্মণগণ! আপনাদের মধ্যে যিনি সর্বাপেক্ষা ব্ৰহ্মবিদ, তিনিই এই গো সমস্ত গ্রহণ করিবেন। কেহই দানগ্রহণে অগ্রসর হইলেন না। অবশেষে যাজ্ঞবল্ক্য, স্বীয় শিষ্য সােমশ্ৰবাকে গােধনগুলি উনােচন করিয়া লইতে অনুজ্ঞা দিলেন। যাজ্ঞবল্ক্যর এবষ্কৃত আচরণে সভাস্থ অন্যান্য ব্রাহ্মণ ক্রোধ-কম্পিত হইলেন, কিন্তু কাহারই বাক্য- স্কৃর্তি হইল না। কেবল জনক রাজার পুরােহিত অশ্বলই কহিতে লাগিলেন, যাজ্ঞবল্ক্য! আপনিই কি আমাদিগ হইতে সৰ্বশ্রেষ্ঠ ব্ৰহ্মপরায়ণ ?” তৎপরে জরৎকারু-বংশীয় আর্ন্তভাগ, লহ-পুত্র ভুজ, চরকতনয় উষন্ত ও কূষীতকাত্মজ কোহল * ৬ বহুদক্ষিণা কোন কোন মতে অশ্বমেধ যজ্ঞ। সায়ণাচার্যের মতে ১ পাদ এক পলের এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ ১৫ পঞ্চ- গর্শ) অথবা এক সুবর্ণমুহা। উইলস সাহেব ১ পদকে প্রায় ১ তােলা বলেন।
প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের ইতিবৃত্ত।
2
ক্রমান্বয়ে নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন।
অনন্তর -
পরায়ণা গাগীর সহিত যাজ্ঞবন্ধের যেরূপ কথােপকথন হয়,
তাহা নিয়ে লিখিত হইল।
গাগী।—যাজ্ঞবল্ক্য। সলিলােপরি এই মহী ওতপ্রােত
হইয়া রহিয়াছে। সলিল কাহার উপর ওতপ্রােত ।
যাজ্ঞবল্ক্য।-কেন গার্গী! বায়ুতে।
গাগী।—বায়ু কাহা দ্বারা ওতপ্রোত ।
যাজ্ঞবল্ক্য।- ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুং ও ব্যোম দ্বারা।
গাগী।—উহা আবার কোন্ দ্রব্য দ্বারা ওতপ্রােত ?
যাজ্ঞবল্ক্য।-কেন ? গান্ধর্ব লােক দ্বারা।
গাগী।—উহা কিসে ওতপ্রােত ?
যাজ্ঞবল্ক্য।-হে গার্গী, সূৰ্য্য লোক দ্বারা।
গগী ।–সূৰ্য্য কাহা দ্বারা ওতপ্রোত?
যাজ্ঞবল্ক্য।-চন্দ্রলােক দ্বারা।
গাগী।—উহা আবার কাহা দ্বারা ?
যাজ্ঞবল্ক্য।-নক্ষত্র লােক দ্বারা।
গাগী।--নক্ষত্র লােক কাহা দ্বারা ওতপ্রােত?
যাজ্ঞবল্ক্য।-দেব লােক দ্বারা।
গার্গী।-দেবলােক কাহা দ্বারা ওতপ্রােত ?
* অগ্নিতে বলা উচিত। কিন্তু জল, মৃত্তিকা হইতে পৃথগভূ ইয়
হার স্বতন্ত্র সত্তা নাই, তজ্জন্য অগ্নিতে বলা হয় নাই। ( সায়ণ)।
গার্গী। ৭৭ যাজ্ঞবল্ক্য।-ইন্দ্রলােক দ্বারা। গাগী।—উহা কাহা দ্বারা আবার ওতপ্রােত ? যাজ্ঞবল্ক্য।-ব্ৰহ্ম লােক দ্বারা। গাগী।—ব্ৰহ্মলােকই বা আবার কাহা দ্বারা ওতপ্রােত ? গগীর এই শেষ জিজ্ঞাসা শ্রবণ করিয়া, যাজ্ঞবল্ক্য, কহিতে লাগিলেন, গার্গী! পরাজিত হইবার আশঙ্কায় অসম্ভব প্রশ্ন করিও না। তুমি যে দেবতার বিষয় প্রশ্ন করিলে, তিনি জিজ্ঞা- সার অতীত পদার্থ। অতএব গাগী। এ সম্পর্কে তােমার প্রশ্ন করা, কোন মতে কর্তব্য নয়। অনন্তর গার্গী কিছু ক্ষণ নীরব থাকিলেন। তখন অরুণ- ঋষি-নন্দন উদ্দালক, কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন। যাজ্ঞবল্ক, তাহারও প্রকৃত উত্তর দিলেন। গাগী তখন পুনরায় সভাস্থ সমস্তু দ্বিজাতিকে উদ্দেশ করিয়া, যেকার বলিয়াছিলেন, পশ্চাৎ বর্ণিত হইতেছে। গার্গী।—ব্রাহ্মণগণ! এই যাজ্ঞৰন্ধ্যের প্রতি আরও ২ দুইটা প্রশ্ন প্রয়ােগ করিবার আকাঙ্ক্ষা করি, যদি ইনি সেই প্রশ্ন দ্বয়ের সদুত্তর প্রদানে সমর্থ হন, তবেই আপনারা জানিবেন, কোন ব্ৰহ্মজ্ঞানীই ইহাকে পরাভব করিতে পারিবেন না। ব্রাহ্মণেরা ইহা শুনিয়া তাঁহার অভিপ্রায়ে সম্মত হইলেন। গাগী কহিতে লাগিলেন। গগী।—হে যাজ্ঞবল্ক! বিদেহপ্রদেশস্থিত বা কাশী দেশ-জাত ক্ষত্রিয় যুপ ধনুতে গুণ দিয়া, দুই তীর সংযােজন পুৰ্ব্বক বিপক্ষকে লক্ষ্য করিয়া থাকে, তদ্রুপ আমি ২ দুইটা প্রশ্ন- ।
৭৮
প্রাচীন আর্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত।
রূপ বাণযুগলে আপনাকে বিদ্ধ করিতেছি, আপনি তাহার সদুত্তর
দানে প্রস্তুত হউন।
যাজ্ঞবল্ক্য।-জিজ্ঞাসা কর।
গাগী।—নােমণ্ডলের উপরি ভাগে ও ক্ষিতিলের নিয়ে
কি আছে ? শূন্যমার্গ ও অবনীর মধ্যেই বা কি আছে ? আকাশ
ও ভূমণ্ডলই বা কি ? এবং কাহাতে এই সকল ওতপ্রােত ভাবে
বিদ্যমান রহিয়াছে ? বৰ্ত্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ কাল
কোন্ পদার্থে ব্যাপ্ত ?
যাজ্ঞবল্ক্য।-উ ঐ স্থান ও উক্ত কাল সমুদয় কেবল
মহাকাশ দ্বারা ওতপ্রোত আছে।
গাগী।-মহাভাগ ! আপনার এই যুক্তিসম্পন্ন উত্তরে
কৃতার্থ হইলাম। আমি এই সদুত্তর প্রাপ্তি নিমিত্ত
মহাশয়ের নিকট প্রণত হইলাম। অতঃপর দ্বিতীয় ভিজ্ঞাসার
প্রত্যুত্তর প্রদান করুন।
যাজ্ঞবল্ক্য।- প্রশ্ন কর ।
গার্গী।--আপনি কহিলেন, মহাকাশ দ্বারা পৃথী, উৰ্দ্ধ ও
অধঃ প্রদেশ, উভয়ের সন্ধি-স্থল-এবং ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান
কাল পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে। ভাল, সেই মহাকাশই বা কাহা
দ্বারা পরিব্যাপ্ত ?
যাজ্ঞবল্ক্য।- “গার্গী! ব্রাহ্মণেরা যাহাকে প্রণাম করেন,
তিনি অক্ষয় ব্রহ্ম। তিনি স্কুল অথবা সূক্ষ্ম, হ্রস্ব অথবা দীর্ঘ
নহেন; লােহিত নহেন, স্নেহময় বস্তুও নহেন, ছায়া অথবা
অন্ধকার, বায়ু অথষ্ট নহেন। তিনি মায়া, বস এবং গন্ধও
ন
গাগী। . নহেন; চক্ষু, কর্ণ, মন, বাক্য তেজ বা প্রাণ নহেন; তিনি মুখহীন ও উপমাবিহীন। * গার্গী। সেই অবিনশ্বর পরমেশ্বরের শাসন-বলে চন্দ্র ও সূৰ্য, ভূলােক ও দুলােক, নিমেষ, মুহুৰ্ত্ত, অহােত, পক্ষ, “হে * সহজে বুঝিবার জন্য বাবু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিম্ন- লিখিত ব্যাখ্যা উদ্ধৃত হইল। “তিনি স্কুল নহেন, তিনি অণু নহেন, তিনি হ্রস্ব নহেন, তিনি দীর্ঘ নহেন; তাহাতে কোন পরিমাণ নাই। তিনি অললাহিত,-তঁাহাতে রক্তাদি কোন বর্ণ নাই। তিনি অস্নেহ- তিনি জলীয় বস্তু নহেন; তিনি অবায়ু-বায়বীয় পদার্থও নহেন তিনি বসও নহেন, তিনি গন্ধও নহেন। ' এ সকল বাহ জড় বস্তুর স্বভাব। তিনি কদাপি জড় নহেন, সুতরাং এ সকল কিছুই তাহাতে নাই। তিনি যেমন জড়বস্তু নহেন, সেইরূপ । আমাদিগের ন্যায় জড়-শরীর-বিশিষ্টও নহেন, তাহাতে শারীরিক প্রাণ নাই, এবং তাহার মুখাদি অঙ্গও নাই। আমাদিগের যেমন শরীর আর মনেতে পরস্পর সম্বন্ধ আছে, এবং এই সম্বন্ধ জন্য যেমন আমরা দর্শন করি, শ্রবণ করি, বাক্য কহি; পরমেশ্বর তেমন শরীর-মন-মিলিত কোন জীব নহেন, সুতরাং আমাদিগের ন্যায় তিনি চক্ষু দ্বারা দর্শন করেন না, এবং মুখ দ্বারাও বাক্য, কহেন না , তিনি অচগু, অকর্ণ, অবা। তিনি মনােবিহীন, তিনি দেহ-শূন্য মনও নহেন, তাহাতে মনের কাৰ্য কিছুই নাই। তিনি অসঙ্গ -সাংসারিক সুখ দুঃখে লিপ্ত নহেন। তিনি যদি জড়ও নহেন, এবং মনও নহেন, তবে তিনি কি ছায়া, কি অন্ধকার, কি আকাশের ন্যায় কোন অবস্তু হইবেন ? না , তিনি ছায়া, কি অন্ধকার, কি আকাশের ন্যায় কোন অবস্তু নহেন, তিনি নিত্য সত্য বস্তু । তিনি অনন্ত-স্বরূপ, জ্ঞানস্বরূপ; তাহার, সহিত কাহারও উপমা হয় না।” * প্রাচীন আৰ্য্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত s মাস, ঋতু, সংবংসর স্থিতি করিতেছে। সেই অবিনাশী জগদীশ্বরের শাসনেই পূর্ব ও পশ্চিমদি বাহিনী তার্টনী খেত পৰ্বত হইতে নিঃসৃত হইয়া প্রবাহিত হইতেছে। গাগী 'যে ব্যক্তি এই অক্ষয় পরমাত্মার যথার্থ তত্ত্ব অবগত না হইয়া,কেবল বাগষজ্ঞ, তপস্যা ও হােম করে, সে কদাচ স্থায়ী ফললাভে সমর্থ হয় না। তদ্রুপ লােক কৃপাপাত্র, অতি দীন; কিন্তু যিনি তাহার তত্ত্ব পরিজ্ঞাত হইয়া, পরলােক গমন করেন, তিনিই ব্রাহ্মণ অর্থাৎ যথার্থ ব্ৰহ্মজ্ঞ। গাগী! সেই ঈশ্বরকে কেহ দেখে নাই বটে, কিন্তু তিনি সকলকেই দেখিতেছেন। কেহই তাহাকে শ্রুতিগােচর করে নাই, কিন্তু তিনি সমস্ত শুনিতেছেন, কেহ তাহাকে চিন্তা করিয়া আয়ত্ত করিতে পারে নাই, কিন্তু তিনি সকলই জানিতে পারিতেছেন। গাগী। এই দৃশ্যমান নতােমণ্ডল তাহা দ্বারা ওতপ্রােত ভাবে পরিব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে।'' . পূৰ্বদিগ্বাহিনী নদী পঙ্গা প্রভৃতি। পশ্চিমবাহিনী সিন্ধু প্রভৃতি। + “তাহার শাসনে সূর্য, সৌর জগতের মধ্যস্থিত হইয়া, প্রদীপবং তাহার অন্তর্বর্তী ভূলােক ও গ্রহাদি অন্যান্য লােককে স্বীয় জ্যোতি দ্বারা প্রকাশ করিতেছে, স্বীয় শক্তি দ্বারা তাহ- দিগকে নিজ নিজ পথে আকৃষ্ট করিয়া রাখিয়াছে, এবং তেজ বিতরণ দ্বারা পশু-পক্ষ্যাদি জন্তু ও বৃক্ষলতাদি উদ্ভিজের জীবন ধারণ করিতেছে। সকলের রমণীয় সুধাংশু চও তাহারই নিয়মে বদ্ধ থাকিয়া, শূন্যপথে বিচরণ করিতেছে; এবং প্রতি রজনীতে নৃতন নূতন বেশ ধারণ করিয়া সকলের অন্তঃকরণ প্রফুল্ল করিতেছে ও স্বীয় মনােহর আলােক প্রদান দ্বারা উদ্ভিজ- দিগকে সতেজ ও সজীব রাখিতেছে। ভূলােক ভিন্ন চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্রাদি অন্যান্য যত।
গাগী।
গাগী দেবীর মতির বিষয় আমরা স্বতন্ত্র আর কি পরিচয়
জ্যোতির্বিশিষ্ট লােক সমুদায়ের সাধারণের নাম দ্যুলােক।
আমাদের পদতলে এই যে ভূলােক, এবং মকের উপরে যে
হলােক.সকলই সেই মঙ্গল-স্বরূপ বিশ্বপাতার প্রশাসনে
নিয়ত স্থিতি করিতেছে। তাহাদের এক কণামাত্রও তাহার
নিয়মের বহিভূত হইতে পারে না।
“কালে কালে যে সমুদায় ঘটনা ঘটিতেছে, তাহা তাহারই
নিয়মে ঘটিতেছে, তাহার অনতিক্ৰমণীয় নিয়মের বহিভূত
হইয়া, স্বল্পমাত্র ঘটনাও ঘটিতে পারে না।
“পরম মঙ্গল পরমেশ্বরের নিয়মে বেগবতী নদী সকল উচ্চ
উচ্চ পৰ্বত হইতে নিঃত এবং প্রবাহ ত হইয়া, অসংখ্য
জীজদিগের অতি উপকারিণী ও কল্যাণদায়িনী হইয়াছে।
দৃষ্টিবহিত কোন পরিজ্ঞাত পতের কোন অনির্দিষ্ট স্থানে
যে জলরাশি সঞ্চিত হয়, আমরা তাহা হইতে শত শত যােজন
দূরে থাকিয়াও, তাহা অনায়াসে প্রাপ্ত হইতেছি।
মঙ্গলস্বরূপ পরমেশ্বরকে হৃদয়ে সাক্ষাৎ জানিয়া তাহার
সহিত প্রতিভাব নিবদ্ধ করিতে হইবে, জানিয়া শুনিয়া তাহার
কাৰ্যে যােগ দিতে হইবে; তবে তাহার সহবাস-জনিত অনন্ত
ফললাভ করা যায়। তাহাকে না জানিয়া অন্য মনস্ক ও বিষয়-
সক্ত হইয়া, বাহ আড়ম্বরের সহিত দিবারাত্র তাহার উপাসনা
করিলেও, বা লােক-রঞ্জন, বৃথা যাগ-যজ্ঞ-ক্ৰিয়া-কলাপে শরীর ও
মনকে নিপাত করিলেও, অথবা মান-মর্যদা, যশঃ কীর্তি প্রাপ্তির
আয়াসে আপনার যথাসর্বস্ব বিতরণ করিয়া দিলেও, ঈশ্বরের
সহিত তাহার কিছুমাত্র সম্বন্ধ নিবদ্ধ করা হয় না, সুতরাং তাহার
অনন্ত ফললাভ হয় না।
“ভূমণ্ডলে যাবতীয় জীব আছে, তন্মধ্যে কেবল মনুষ্যই
ব্রহ্ম-জান-লাভে অধিকারী। পরাৎপর পরমেশ্বরকে এবং
তাহার প্রতিষ্ঠিত ধৰ্ম্ম-সমুদায়কে জানিবার অধিকার আগে
৮২ প্রাচীন আৰ্য্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। দিব ? ইহার ধৰ্ম্মজ্ঞানেরই বা সীমা কি নির্ধারণ করিতে সমর্থ হইব? তর্কশক্তি তো অতুলনীয়। সেটা যেন বিশ্ববিজয়িনী সাক্ষাৎ মুর্তিমতী আদ্যাশক্তি। নচেৎ গুণিগণাগ্রগণ্য ব্রাহ্মণ- সভায় ইহার সর্বতােমুখী এত প্রভুতা কেন হইবে ? ফল কথা, এই অতুলনা অঙ্গনা এক অভূতপূৰ্ব অদ্ভুত বস্তু। কবে আমা- দের দেশের ভামিনী সকল এই গাগীর স্বজাতীয়া বলিয়া পরিচয় দিতে পারগ হইবেন ? ৫৫ বলিয়াই মনুষ্য নামের এত গৌরব হইয়াছে, যিনি এই পরমােৎ- কৃষ্ট মনুষ্যজন্ম প্রাপ্ত হইয়াও তাঁহাকে জানিতে না পারিলেন, তাহার অপেক্ষা হতভাগ্য আর কে আছে ? পরম প্রীতিভাজন পরমেশ্বরকে উপলব্ধি করিয়া অনির্বচনীয় আনন্দ অনুভূত হয়, যিনি তাহার স্বাদ-গ্রহেও সমর্থ না হইলেন, তঁাহার অপেক্ষা দীন আর কোন ব্যক্তি ? তিনি কৃপাপাত্র অতি দীন। তাহার জন্ম ভার-বাহক পশুজন্ম। “আমরা দর্শন শ্রবণ মনন প্রভৃতি যাবতীয় ব্যাপার দ্বারা যাহা কিছু জানিতে পারি, তাহা তিনি জানিতেছেন; এবং আমরা যাহা জানিতে না পারি, তাহাও তিনি জানিতেছেন; কিন্তু তিনি কাহারও দর্শন-শ্রবণ-মনন-বিজ্ঞানের বিষয় নহেন। তিনি আপনাকে আপনি যেমন জানিতেছেন, তেমন করিয়া তাহাকে আর কেহই জানিতে পারে না। অনন্ত-স্বরূপকে বুদ্ধি বুঝিয়া অন্তু করিতে পারে না। এই অনন্ত অক্ষয় পুরুষের দ্বারা আকাশ ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে; এমত স্থান নাই, যেখানে এই সৰ্ব্ব- ব্যাপী পরমেশ্বর নাই।
[ ৮৩. ] করমেতি ৰাই এ পর্যন্ত যে সমস্ত নারীচরিত বিবৃত হইল, তাহাদের কেই শাস্ত্রজ্ঞানে, কেহ বা বিচার-নৈপুণ্যে আর কেহ কেহ বা ধৰ্ম্মানু- শীলনে সমধিক বিখ্যাত। এক্ষণে যাহার বিষয় বর্ণনা কর যাইতেছে, তিনি কেবল ধৰ্ম্ম জ্ঞানে তন্ময় নহেন, কিন্তু ধর্মশীলা মহিলাকুলের মধ্যে এক জন গণনীয়া। করমেতির “বাই উপাধি দেখিয়া,তাহাকে কেহ নৃত্যকারিণী না ভাবেন, * এ কারণ প্রসঙ্গক্রমে বলিয়া রাখা ভাল, দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে উহা অতি- শয় মানাস্পদ উপাধি। বঙ্গদেশে “দেবী” উপাধি, যাদৃশ গৌরবাত্মক, দক্ষিণাবর্তে “বাই” তাদৃশ, এবং স্থলবিশেষে তদপেক্ষাও শাঘাজনক। সম্ভ্রান্ত পরিবারের কুলকামিনীরাই উক্ত আখ্যায় নির্দেশিত হইয়া থাকেন। কমেতি,দাক্ষিণাপথের অন্তর্গত খাজল নামক প্রদেশে কোন স্থানে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম পরশুরাম। তিনি উক্ত স্থানের ভূপতিকুলের কুলপুরােহিত ছিলেন। বিষ্ণুর প্রতি তাহার অচলা ভক্তি ছিল। পিতার যত্নে করমেতি ১৫ পঞ্চদশ বা ১৬ যােডশ বর্ষ অবধি শাস্ত্রালােচনা করিয়া, ব্যুৎপত্তিশালিনী হইয়া উঠেন। তিনি ক্রমে ক্রমে বৈষ্ণব-সম্প্রদায়-সম্পকীয় অধিকাংশ উত্তমােত্তম গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। এই পাঠের ফলস্বরূপ তিনি বৈষ্ণব ধৰ্ম্মে এক অদ্বিতীয় শ্রদ্ধাবতী নারী বলিয়া জন-সাধা- নৃত্যকারিণীরা বাইজি বলিয়া পরিচিত।
৮৪ প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। রণের পরিচিত হইলেন। এই ঘটনার সমকালে তাহার উদ্বাহের উদ্যোগ আর হইল অবিলম্বে এক অতি উপযুক্ত পাত্রও নিন্সিল। কন্যা যাদৃশী বুদ্ধিমতী,বরও তাদৃশ সচ্চরিত্র ও পবিত্ৰব্যক্তি। তিনি জ্ঞান ও ধর্মে পণ্ডিত। করমেতির এই পরিণয়ে নিতান্তই বিরাগ। তিনি ধর্মচিন্তায় ও বিদ্যাচর্চায় জীবন অতিবাহন করিবেন, ইতিপূৰ্বেই সঙ্কল্প করিয়াছিলেন ; সুতরাং সে বিষয়ে অত্যন্ত অসম্মতি প্রকাশ করিলেন। অবশেষে জনক- জননীর নির্বাতিশয়ে অগত্যা তাহাকে বিবাহে সম্মত হইতে হইল। কিন্তু তিনি সংসারে মনােনিবেশ করিতে অক্ষম হইলেন। যখন তাহাকে শ্বশুরালয়ে প্রেরণের আয়ােজন হইতে থাকিল, তখন তিনি বিষম বিভ্রাটে পড়িলেন। পতিগৃহে অব- স্থিতি করিয়া সংসারে আবদ্ধ হওয়া, তাহার বড়ই ক্লেশকর বােধ হইল। এই হেতু তিনি . যৎকালে সকলে নিদ্রায় সুষুপ্ত, সেই নিন্তন্ধ সময়ে একদা রাত্রি দ্বিপ্রহরে বৃন্দাবনােদ্দেশে গৃহ হইতে একাকিনী নিষ্ক্রান্ত হইলেন। ধর্মোৎসাহ এমনই পদার্থ। বৃন্দাবনে কোন্ পথে যাইতে হইবে, তাহার কিছুমাত্রও তাহার জানা নাই, তথাপি তিনি একমনে চলিলেন। এদিকে পর দিন নিশাবসানে শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া, পরশুরাম, শুনিতে পাইলেন, করমেতি গৃহে নাই। তিনি চারি দিক অন্ধকারময় দেখিলেন। মনে মনে বড়ই দুর্ভাবনা হইল। না হইবে কেন ? সন্তান-সন্ততি একেই তাে মনুষ্যের প্রাণসম। তাহার উপর বুদ্ধিমতী কন্যা, কেমন আদরের স্ব, সকলেই অবগত আছেন। নানা জনে নানা জল্পনা করিল। দেখিয়া শুনিয়া পিতা ভয়ে শশাকে ম্রিয়মাণ হইয়া, রাজার গােচরে গিয়া কমেতি বাই। আনুপূর্বিক সমস্ত নিবেদন করিলেন। রাজা, করমেতির অনু- সন্ধানে বিস্তর লােক পাঠাইলেন। কুলবালা দুঃসহ পথশ্রম ভােগ করিয়া, কত দূর যাইতে পারে, সহজেই বােধগম্য হয়। রাজার লােকেরা তাহার সন্নিহিত হইয়া পড়িল, বুঝিয়া তিনি এক মৃত গর্দভের অভ্যন্তরে সংগােপনে রহিলেন। অসং দুর্গন্ধ বশতই হউক, বা অন্য কোন কারণ জন্যই হউক, দৈবযােগে ভূপতি-নিয়ােজিত লােকেরা সে দিকে আসিল না। করমেতি, সেই সূলে কিয়ংকাল অবস্থান পূর্বক পুনরায় বৃন্দাবনাভিমুখে ধাবিত হইলেন। রাজার নিকটে সমাচার আসিল, কমেতির কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। পিতার মন সুহির হইবার নহে। তিনি একাকী বৃন্দাবনাে- দেশে পদব্রজে যাত্ৰা করিলেন। দাক্ষিণাত্য হইতে পদব্রজে বৃন্দাবন যাত্রা কষ্টস্বীকার করা,বড় গুরুর কথা। এখানে পরশু- ব, অনেক চেষ্টা করিয়া জানিলেন, তাহার প্রাণাধিকা নন্দিনী এক নির্জন পর্ণকুটীরে বসতি করিতেছেন। বসতি করিতেছেন। তিনি দেখিলেন, কন্যা নেত্ৰ মুদ্রিত করিয়া ধ্যাননিমগ্না হইয়াছেন। এই ধৰ্ম্ম- ভাবপূর্ণ অবস্থা নিরীক্ষণে পিতার অন্তরে যে মহোঙ্গাস হইল, তাহা বর্ণনাতীত। কিছুক্ষণ অতীত হইবার পর কমেতির বােগ ভঙ্গ হইল। তখন তিনি সম্মুখভাগে পিতৃদেবকে দেখতে পাইলেন। এইখানে পিতা ও দুহিতার পরস্পরের কথােপকথস লিপিবদ্ধ করিলাম। করমেতি.।-পিতঃ! আপনি আমার অন্বেষণে এত এমকেল করলেন । যদি এই ক্লেশ ঈশ্বরের উপাসনৱ জন্ত করিতেন, আপনার মােক্ষপৰ প্রাপ্তির কোনই প্রতিবন্ধক ঘটিত প্রাচীন আৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। । । আমি অতি তুচ্ছ জীব। আমার কারণ এতাদৃশ আয়াস কেন? পরশুরাম।--বৎসে! তােমার এই বাক্যে আমার • জ্ঞান সঞ্চার হইল। আমি আর তােমার ধর্মসাধনার অন্তরায় হইব না। পরশুরাম, স্বদেশে প্রতিগমন করিয়া, রাজাকে কন্যার অত্যাশ্চর্য্য ঈশ্বর-ধ্যান, যােগ; ভক্তি, জ্ঞানগর্ভ বচনাবলির বিষয় বিজ্ঞাপন করিলেন। রাজাও কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া, স্বচক্ষে ঐ ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিতে বৃন্দাবন-প্রদেশে আসিলেন। তিনি সমস্ত দর্শন ও শ্রবণ কুরিয়া,এত দূর বিমােহিত হইয়া গেলেন যে, 'কমেতির যােগ-সাধনের নিমিত্ত এক সুদৃশ্য সৌধ প্রস্তুত করিয়া দিলেন। সেই সুরম্য হৰ্ম্ম অদ্যাপি দেদীপ্যমান থাকিয়া বিশুদ্ধমতি কমেতি দেবীর চতুর্দিকে খ্যাতি ঘােষণা করিতেছে। এরূপ ধর্মপ্রাণ নারী এখন নিতান্ত দুর্লভ। কেবল ইয়ুরােপ ও আমেরিকার স্ত্রীগণ অবিবাহিতা থাকিয়া, ধর্মাচরণ করেন, যাহাদের এরূপ সংস্কার, করমেতির বর্ণনা পাঠ করিয়া, তাহাদের প্রতীতি হইবে, অবিবাহিতাবস্থায় বিশুদ্ধ- স্বভাব থাকা বরং সহজ, কিন্তু বিবাহের পর সংসারের সুখ উপেক্ষা করা সহজ কথা নহে। •10 [ ৮৭ ] বিশ্ববারা। ভারতবর্ষের ললনাকুল চিরকালই জ্ঞানহীন ছিলেন, এবং তদনুরূপ অবস্থাতেই তাহারা যাবজ্জীবন থাকিবেন, অথবা সেই রূপ হইয়া থাকাই তাহাদের উচিত, এখনও অনেকে এই মত প্রচার করিয়া বেড়ান। অধিক কি, এ দেশীয় ধর্মশাস্ত্রকার- দিগের অনেকেই নারীজাতিকে অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, বিষয়- কৰ্ম্মাদির স্বাধীনতা, বিচার-ক্ষমত, পরিণয়-স্বাধীনতা, প্রভৃতি প্রধান প্রধান অধিকার প্রদানে পরায়ুখ। হিন্দু-জাতির প্রধান -গ্রন্থ বেদ-শাস্ত্র শ্রবণে স্ত্রীলােকের কিছু মাত্রও অধিকার মাই, এ কথা আমাদের দেশের ধর্মশাস্ত্রকারদের মধ্যেই এক জন স্পষ্টাক্ষরে বলিয়া গিয়াছেন *। কিন্তু, এটা একটা বড় কৌতুকেরই ফল হইয়া দাঁড়াইয়াছে! কেন না, যাহাদ্বিগকে অতি সামান্য অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে, তাহারা তদপেক্ষাও গুরুতর কার্যের অধিকারিণী ছিলেন। যে রমণী বৃন্দকে উক্ত প্রকার নিষেধ-বচন দ্বারা বেদ-শ্রবণে অনধিকারিণী সপ্রমাণ করা হইয়াছে, কি আশ্চর্যের বিষয়, তাহারাই “স্ত্রী-শূদ্র-দ্বিজবন্ধ নাং ব্রয়ী ম শ্রুতিগােচরা। তদর্থং ভারতং চক্রে কৃপয়া পরয়া মুনিঃ।” স্ত্রীলোেক, শুভ্র, ভাট ও অগ্রদানী প্রভৃতি পতিত ব্রাহ্মণের বেদ শ্রুতিগােচর হওয়া উচিত নয়। এজন্য মুনি (ব্যাস) কৃপা করিয়া মহাভারত রচনা করিয়াছেন।
৮ প্রাচীন আক্রমণীগণের ইতিবৃত্ত। আবার বিশ্বামিত্র ও তংপুত্রগণ, বসি, বামদেৰ, দেবদত্ত, গৃৎসমদ, সদস্য, ঋষভ, মেধাতিথি, কণ, পরাশর, অগত্য, বীর্বতমা, অজিরা, কশ্যপ, ভরদ্বাজ, গর্গ, নারদ, বৈবস্বত মনু, উশনা, জমদগ্নি, দেবল, প্রজাপতি, অম্বরীষ, হিরণ্যগর্ভ, অধ মর্ষণ, প্রভৃতি ভূরি ভূরি ঋষির সহিত বেদের কোন কোন অংশ রচনা করিয়াছেন; এবং তাহাদের রচিত ৰেদাংশ সকল পাঠে কত মুনি ঋষি পরম পুরুষাৰ্থ লাভ করিয়াছেন। এই উপাদেয় তত্ব জানিতে পারিলে, বামাকুল-হিতৈষী কোন্ সহৃদয় ব্যক্তি পুলকিত না হইয়া থাকিতে পারেন ? আর যাহাদিগকে আমাদের দেশের প্রবল পুরুষেরা ‘অবলা বলিয়া থাকেন, সেই “অবলাদের’ ইহাতে কত দূর আনন্দ উপস্থিত হইবে,তাহা সহ- জেই উপলব্ধি হইতে পারে। এই জন্যই বৈদিক কালের কয়েকটা কামিনীর বিবরণ লিখিত হইল। যে, অলৌলিক রমণীর বৃত্তান্ত বিবৃত করা যাইতেছে, তিনি স্বীয় ধৰ্ম্ম ভাব জন্য বেদসংহিতা মধ্যে অতি প্রসিদ্ধ। তাহার প্রণীত বেদমন্ত্র অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করিলেই,হৃদয়ঙ্গম হয়, চিত্তের প্রশস্ততা, ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসের উচ্চতা এবং চরিত্রের নির্মাতা জন্য তিনি আজও পর্যন্ত সকলেরই শ্রদ্ধাস্পদ হইয়া রহিয়াছেন। সেই পূজনীয় রমণীয় রমণীর নাম বিশ্ববারা। ' ‘বিশ্ববারা’ শব্দের অর্থ, সমগ্র পাপরূপ শনিবারিণী। এতদ্ভিন্ন তাহার জন্মভূমি কোন্ স্থান, কোথায় ও কাহার নিকট তাহার বিদ্যাধ্যয়ন হই- ছিল, তাহার পিতা মাতার নাম কি, তাহার ভ্রাতা বা ভগিনী, পুত্র বা কন্যা ছিল কি না, কোন্ ভাগ্যবান পুরুষের গৃহলক্ষ্মী হইয়া, তিনি ভর্তৃকূলের মহিমা অক্ষয় করিয়াছিলেন, জীবন- বিশ্ববারা। বৃত্ত-সংক্রান্ত এই সমস্ত নিতান্ত প্রয়ােজনীয় বিষয় যথােচিত অনুসন্ধান করিয়াও প্রাপ্ত হই নাই; সুতরাং সে গুলি জানি- ৰার প্রত্যাশা কেহ করিবেন না। এই মাত্র নিঃসংশয়িত রূপে অবগত হওয়া গিয়াছে, অত্রি মুনির গােত্রে তাহার জন্ম হয়। ঋগ্বেদ সংহিতার ৫ পঞ্চম মণ্ডলের ২ দ্বিতীয় অবাকের ২৮ অষ্টাবিংশ সূক্তটা প্রথমাবধি শেষ পর্যন্ত সমস্তই তার রচিত । এই সূক্তে ৬ ছয়টী ঋক্ আছে। প্রথম হইতে যষ্ঠ পৰ্যন্ত (১৬) উপযুপরি ঐ কয়েকটী ঋকের * বাঙ্গালা অনুবাদ এ * ঋক, সূক্ত, অনুবাক ও মণ্ডল কাহাকে বলে, সহজ করিয়া না বলিলে, অনেকেই বুঝিতে পরিবেন না বলিয়া, এ স্থলে তৎসম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু লিখিত হইতেছে। সর্বাগ্রে মূল বেদ পদার্থটা কি,বলা আবশ্যক। যখন লেখার সৃষ্টি হয় নাই, তাহার কত শত যুগ পূর্বে যে বেদের উৎপত্তি হইয়াছে, তাহার ইয়ত্তা হয় না। সাহেবেরা বেদের সময়-সম্পর্কে যে মত প্রকাশ করুন না কেন, বেদ যে অতি প্রাচীন, তাহা আমাদিগের দেশের কোন কোন বেদজ্ঞ পণ্ডিত সাব্যস্ত করিয়াছেন। সে যাহা হউক, প্রথমাবস্থায় বেদ-শাস্ত্র, ঋষিগণের ও উহাদের শিষ্য-পরম্পরার মুখে তুখে অভ্যস্ত হইয়াছিল। এই জন্যই বেদ-বিদ্যার অন্য এক নাম শ্রুতি অর্থাৎ শ্রবণ-পরম্পরায় আগত শাস্ত্র। এখন যেমন আমরা ৪ চারি বেদ বলিয়া জানি- তেছি, ঐরূপ সময়ে এবং তাহার বহু পরেও বেদ ঐরূপে বিভক্ত ছিল না। তখন পদ্য, গদ্য ও গান এই তিন মাত্র ভাগ ছিল। তাহাও সুশৃঙ্খ-সা-ক্রমে বিন্যস্ত থাকিত না। পদ্য ও গদ্যকে তান-মান-লয় ও স্বর-সংবােগ পাঠ করাতে, একটী ভাগ হয়, তাহারই নাম গান। এইরূপ ভাবে বহু কাল গত হইলে পর, মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায় সমস্ত শ্রুতি সঙ্কলন পূৰ্ব্বক তাহা ও চারি অংশে বিভক্ত করেন। বেদকে ব্যাস (অর্থাৎ বিভাগ) করাতেই, t প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। ইলে লিখিত হইতেছে, পাঠিকারা পাঠ করিয়া দেখুন, সে গুলি কিরূপ বিশুদ্ধ ধৰ্ম্মভাবে পরিপূর্ণ ও অত্যুৎকৃষ্ট পুণ্যজনক বিষয় অবলম্বন করিয়া বিরচিত হইয়াছে। “অগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া, অন্তরীক্ষে তেজ বিস্তার করিতেছেন এবং উষার অভিমুখী হইয়া, বিলক্ষণ দীপ্তি পাইতেছেন। দেব- গণের স্তুতিকারিণী, ঘৃতপাত্রবিশিষ্টা বিশ্ববারা পূর্ব দিকে মুখ করিয়া যজ্ঞােপযুক্ত ঘৃত লইয়া, অগ্নির নিকটে যাইতেছেন। ১। হে অগ্নি! তুমি উত্তমরূপ জালিত হইয়া, অমৃতের উপর আধিপত্য কর, এবং হব্যদাতার মঙ্গলার্থ তাহার সকাশে উপস্থিত থাক; তুমি যে যজমানকে প্রাপ্ত হও, সেই যজমান পশু-ধন-রত্নাদি লাভ করেন ও তােমার অগ্রে অতিথি-যােগ দ্বতাদি দেন। ২। হে অগ্নি! আমাদের প্রভূত সৌভাগ্যের জন্য তুমি শত্রু শাসন কর। তােমার তেজ উত্তম হউক। 'হে অগ্নি! দম্পতীর . তাহার বেদব্যাস (বেদ-বিভাগ-কৰ্ত্তা) আখ্যা হইয়াছে। তাবৎ পদ্য ভাগকে ঋক্ ও গদ্য ভাগকে যজুঃ কহে এবং পদ্য বা গদ্য ভাগকে সুরে গীত করিলে, তাহাকে সাম বলে। অথৰ্ব্ব ঐ তিনের সমষ্টি। এইরূপে বেদ ৪ চারি খণ্ডে বিভক্ত হয়। ঐরূপে বিভক্ত ঋগ্বেদের প্রত্যেক কবিতা বা শ্লোকের নাম ঋক্। কয়েকটি ঋক্ লইয়া এক একটী সূক্ত হয়। আবার ২, ৩, ৪ বা তদধিক সূক্ত লইয়া একটা অনুবাক হয়। কয়েকটা অবাক লইয়া এক একটা মণ্ডল হয়। সমগ্র ঋগ্বেদ-সংহিতা এইরূপ ১ দশ মণ্ডলে বিভক্ত। মণ্ডলকে পরিচ্ছেদ, অনুককে অধ্যায়, সূক্তকে একরণ, এবং, ঋক্কে শ্লোক বা কবিতা বলিয়া বুঝিলেও, কোন ক্ষতি নাই।
বিশ্ববারা। সম্বন্ধ শৃঙ্খলাবদ্ধ কর এবং শত্রু সকলের তেজ আক্রমণ কর। ৩। “অগ্নি! যৎকালে তুমি প্রকৃষ্টরূপ তেজোবিশিষ্ট হও, তােমার দীপ্তিকে আমি বন্দনা করি। তুমি দীপ্তিয়ালী এবং ইচ্ছা ও ধৰ্ম্মাদির প্রবর্ধক। তুমি যজ্ঞে প্রজ্বলিত হও।। যজমান কর্তৃক চতুর্দিকে প্রসারিত, উত্তম-যজ্ঞ-বিশিষ্ট অগ্নি! তুমি ঔজ্জ্বল্যশালী। অগ্নি! যজমানেরা তােমাকে প্রালিত করিয়া, আহ্বান করিতেছেন যজ্ঞক্ষেত্রে দৈব সকলকে তুমি আরাধনা কর, যেহেতু তুমি ঘৃতাদির বাহক। ৫। * যজ্ঞে হ্যবাহক’ নামক অগ্নিতে হােম কর, এবং সম্যক প্রকারে তঁাহার ভজনা কর।” ৬। বৈদিক কালে স্ত্রীগণ ভর্তার সহিত যজ্ঞকার্য নির্বাহ করিতেন। ঋগ্বেদের রচনা ও সংগ্রহেও যে তাহাদের অধিকার ৰা সামর্থ্য ছিল, বিশ্ববারার বৃত্তান্ত অনুশীলন করিলেই, বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম হইতে থাকে। বিশ্ববারা যে ৬ ছয়টী ঋক প্রণয়ন করেন, তাহার প্রথমটী পাঠ করিয়া জানা যায়, তিনি দেবতাদের স্তোত্র উচ্চারণ পূৰ্ব্বক পুরােহিতের কর্তব্য কৰ্ম্ম নিষ্পন্ন করিয়া- ছিলেন। আর তৃতীয় ঋকে তিনি দাম্পত্য-সম্বন্ধ শৃঙ্খলাবদ্ধ করিতে বহ্নির সমীপে প্রার্থনা করিয়াছিলেন। তৃতীয় ঋকে যে শত্রু শব্দের উল্লেখ দৃষ্ট হইতেছে, তাহা যারা বিশ্ববারা দেবীর বিপক্ষ সূচিত হইতেছে না। অগ্নির বিদ্বেষীয় জন্য ঐ পদ ব্যবহার করা হইয়াছে। অগ্নি আৰ্যদিগের পূজ্য দেবতা; সুতরাং ঐ দেবতার প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি * নাস্তিক, তাহার আর সংশয় নাই। বেদের সময়েও যে বেদ- ৯২ প্রাচীন আৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। মতের অবমাননাকারী, ধৰ্ম্মবিরোধী লােক বৰ্তমান ছিল, উপনিষং শাস্ত্রে তাহার প্রমাণ দেদীপ্যমান। সে যাহা হউক, যে ব্যক্তিরা অগ্নি উপাসক না, তাহাদিগকেই উদ্দেশ করিয়া, এ স্থলে শত্রু শব্দ প্রযুক্ত হইয়াছে, তাহাতে কোনই সন্দেহ নাই। উল্লিখিত স্থলে অগ্নির অরাধনার বিষয় কীর্তিত হইলেও, উহা দ্বারা ধর্মসম্পকীয়, সদ্বিষয়ক তত্ত্ব-চিন্তার পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। এ স্থলে প্রসঙ্গৰিীন একটা বিষয়ের আলােচনা করা আবশ্যক বোধ হওয়ায়, সংক্ষেপে তাহার উল্লেখ করিতে হইল। বৈদিক সময়ে অরি শব্দে কেবল কাঠ-তৃণ-তৈলাদির দাহক পদার্থকেই বুঝায়, এমন নয়; অগ্নির যে প্রভা, তেজ ও ঔজ্জ্বল্য আছে, তারা নিরঞ্জন জ্যোতির্ময় ঈশ্বরকেও বুঝায়, এইরূপ অনেকেই কহেন এবং প্রত্যয় করেন। দেশ- দেশান্তর বিখ্যাত স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রভৃতি মহােদয়ের এই মতাবলম্বী। তাহাদের এই মতে দোষাৰ্পণ করিয়া, কেহ কেহ বলিয়া থাকেন, বেদশাস্ত্র হিন্দুজাতির তাদৃশ সভ্য সময়ের এ নহে। এই আপত্তি বিনা আয়াসে খণ্ডিত হইয়া যায়। কেননা, বৈদিককালী লোকেরা গ্রাম ও নগরে বসতি করিতেন ও রাজকীয় ব্যবস্থা সংস্থাপনানন্তর রাজ্য শাসন করিতেন ; স্বর্ণাভরণ, বৰ্ম ও অস্ত্রাদি নির্মাণ পুরঃসর তৎসমস্ত ব্যবহার করি- তেন, বস্ত্রবয়ন ও সূচী কাৰ্য্য দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন । ৫ ঋগ্বেদ-সংহিতা, ১ মণ্ডল, ১৩৩ সূক্ত, ১• ঋক্ দেখ। । ঋগ্বেদ-সংহিতা ১ মণ্ডল, ৩১ সূক্ত, ১৫ ঋক্ দেখ।
বিশ্ববারা।
এতদ্ব্যতীত সে কালে ঋণ, দেনাদার, মহাজন, পান্থশালা, চিকি
সা ও ঔষধ ইত্যাদি বিষয়ের ও নির্দেশ আছে, আর স্ত্রীগণ
যে বিদ্যাশিক্ষায় উংকৰ লাভ করিয়াছিলেন, তাহার আর কি
প্রমাণ দিতে হইবে ? তাহা এই “প্রাচীন আৰ্য রমণীগণের
ইতিবৃত্তে সুব্যক্ত। তাহারা পাণি গ্রহণকালে যৌতুক লাভ
করিতে সমর্থ ছিলেন। বামদিগের প্রতি স্থলবিশেষে সুবিচারও
দৃষ্টিগােচর হয়। যেমন দৌহিত্র দ্বারা মাতামহের ধনাধিকার।
তদ্ভিন্ন তাহারা যত সহায় গতিবিব করিতে পাইতেন, পুরুষের
ন্যায় দেবারাধনায় ও যী : র্ম স্পদিনেও অধিকারিণী
ছিলেন, ইত্যাদি। এই সীতি ত অবস্থার বা আদিম
সময়ে' লক্ষণ হইতে পারে না। খবেন-সংহিতায় ঈশ্বরের
একত্ব-বিষয়ক প্রমাণও বিদ্যমান। তাই বলিয়া ২ দুই দেবতা
বা ৩ তিন দেবতার শুবের ও অব নাই। ফলতঃ, দয়ানন্দ
স্বামী যে অর্থ করেন, অনেক স্থলে তাহা অসঙ্গত নয়।
সে হিতা, ১ মণ্ডল, ১১৬ , ১১ ঋ*।
৯৪ প্রাচীন আৰ্য্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। দেবজামি প্রভৃতি। ইতিপূর্বে এক একটী রমণী-চরিত লিখিত হইয়াছে, কিন্তু এবারে যে বিষয় প্রকটিত হইতেছে, তাহা একটী রমণীর চরিত-বৃত্তান্ত নহে। একাধিক কয়েকটী মহিলার বিবরণ বর্ণন করাই, এই প্রস্তাবের লক্ষ্য। ইহরা ইন্দ্র ঋষির মাতৃগণ এবং উল্লিখিত নামেই পরি- জ্ঞাত। সায়ণ মহােদয়ও, ভাষ্য-মধ্যে ইহাদের ঐ নামের উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। ইন্দ্র ঋষির জনক বহু দার পরি- গ্ৰহ করিয়াছিলেন। ইহারা কয়েকটী সপত্নী এক মিলিত হইয়া, ৫ পাঁচটী মন্ত্র রচনা করাছেই, ইহাদের এক অসা- ধারণ একতা স্পষ্ট অনুভূত হইতেছে। সচরাচর আমা দের বঙ্গ-সমাজে সপত্নীদের পরস্পরের মনের যে মিলন খাকে , তাহার প্রধান কারণ উচ্চবিষয়ক সুশিক্ষার অভাব। দেবজামি প্রভৃতির সদ্ভাব যে সুদৃঢ় অচল তুল্য অটল ছিল, তাহার অদ্বিতীয় কারণ-মহং ও সৎ ইচ্ছ। বঙ্গীয় ভগ্নীগণ জানিবেন, সৎশিক্ষা এমনই বল ধারণ করে যে, তাহার প্রভাবে মানুষের দুর্ধৰ চিরশত্রুও পরাস্ত হইয়া যায়। ইহারা দেব-বৃন্দের ভগিনী বলিয়া সর্বত্র প্রসিদ্ধ। সুতরাং কশ্যপ ঋষির ঔরসে এবং অদিতি দেবীর গর্ভে ইহাদের জন্ম হয়। ইহাদের সম্মি- লিত চেষ্টা, উদ্যোগ ও সামর্থে ঋগ্বেদ-সংহিতার ১০ দশম মত- লের ১৫৩ সূক্তের ৫ পাঁচটী খক্ প্রণীত হয়! ঐ খ গুলির পণ্ডিত সমাজে সবিশেষ সমাদর আছে। ঋষিবর বেদব্যাস ঐ / দেবজামি প্রভৃতি। ৯৫ . ; সূক্তেটীকে ঐস্থানে সন্নিবেশিত করাতে, স্পষ্টই বুঝা যায়, তিনি ইহাদিগকে আন্তরিক অকপট শ্রদ্ধা করিতেন। আমা- দের এই আনুমানিক যুক্তি যে অমূলক নহে, তাহার প্রমা- শার্থে ২ দুইটী বিশ্বাস্য নিদর্শনও বিদ্যমান রহিয়াছে ; সাধা- রণের তৃপ্তি-সাধনােদ্দেশে এই খানেই তাহা উল্লিখিত হইতেছে। প্রথমতঃ, মহামুনি ব্যাসদেব কর্তৃক সুশৃঙ্খলাক্রমে ঋগ্বেদীয় মন্ত্র সমুহের যে সংগ্রহ সম্পন্ন হইয়াছে, তাহাতে দৃষ্ট হইতেছে, এই সূক্তের পূর্বে এক জন পুরুষ” ঋষি এবং পরে স্ত্রী ঋষির বিরচিত ঋক্ বিন্যস্ত রহিয়াছে। দ্বিতীয়ত, কেবলই দ্বৈপায়ন দেব, ইহাদের প্রতি ঐরূপ সম্মান প্রদর্শন করিয়াছেন, আর কোন মুনি ঋষি বা সুধী তদ্রুপ করেন নাই, তাহা নয়। এ বিষয়ের প্রমাণস্বরূপ বলা আৰ- শ্যক যে, প্রথম ঋক্ দুটী সামবেদীয় গানের মধ্যেও পরিগণিত হইয়াছে। সাম গান ৭ সাত শ্রেণীতে বিভক্ত। তন্মধ্যে গেয় গান, আরণ্য গান, উহ গান ও উহ গান এই চারি প্রকার প্রধান ও সামবেদ-সংহিতার অন্তর্গত। দ্বিতীয় ঋকূটী ঐ গেয় গানের ৩ প্রপাঠক ২ অধ্যায়ের ১৪ চতুর্দশ, ১৫ পঞ্চদশ ১৬ ষােড়শ; অর্থাৎ ইহা তিন প্রকার সুরে গীত হইয়া থাকে। শৰ্যাত নামে এক সুবিখ্যাত ঋষি কর্তৃক উহা সুরে সন্নিবেশিত হইয়াছে। শৰ্যাত, সুরে নিবদ্ধ করিয়াছেন বলিয়া, তাহার নামানুযায়ী উহার নাম শাৰ্যাত (অর্থাৎ শৰ্যাত দ্বারা সুরে গ্রথিত ও প্রকাশিত)। কত শত ঋষি ও মুনি, যােগী ও তত্ত্ব- জ্ঞানী প্রভৃতি উহার আবৃত্তি দ্বারা নিজ নিজ দেহ মন পৰিত্ৰ করিয়াছেন, তাহার সীমা নাই বলিলেও, অসঙ্গত হয় না।
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। ঋগ্বেদসংহিতার মন্ত্রে গ্রথিত হওয়াতে, উহা কত কত যজ্ঞ-স্থলে ও সভা-ক্ষেত্রে পঠিত হইয়াছে,--বুধমণ্ডলী-মধ্যে অগণ্য-পণ্ডিত- কণ্ঠে উচ্চারিত হইয়া সত্ৰ উহার কীদৃশ যশঃ কীর্তি ও প্রচারিত হইয়াছে, তাহার কি সংখ্যা আছে? ইহার উপর আবার যখন সামগানের মধ্যে উহা গণনীয় গান বলিয়া সৰ্বসমক্ষে বিঘােষিত হইতে লাগিল, তখন উহার সংবর্ধনা একশেষ ঘটিয়াছিল, নিঃসদহে নির্দেশ করা যাইতে পারে। বৈদিক-কাণী সমাজে প্রমদা-জাতির উচ্চ পদবী ও উৎ কৃষ্টরূপ সমান-সমাদর, সম-মৰ্যাদা, এবং সংকার-অভ্যর্থ নাদি থাকতেই, উল্লিখিত ঋষিবর কর্তৃক উহা গীতে নিবদ্ধ হইয়াছিল, এবং তজ্জন্যই দেশ-বিদেশে সুদূর জৰ্ম্মণ-রাজ্য, ফান্স দেশ, ও ইংলণ্ড ভূমি প্রভৃতি ইয়ুরােগীয় প্রসিদ্ধ নানা জনপদে,জাপাল পি, চীন সাজ্য, ভূরুফ ও আরব দেশ ইত্যাদি আসিয়া মহদেশের স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র আছে,-এবং এমন কি, “অৰ্দ্ধ ভূমগুi” আমেরিকা খরও স্থানে স্থানে অতীত ও বর্তমান কালে সমাদৃত ও পূজিত হইয়াছে এবং হইতেছে। এবং সাহস সহকাবে, বলিতে পারা যায়, মানবসমাজে যত কাল সদ্বিদ্যায় সেসব থাকিবে, তাবৎ বেদসংহিতার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্ৰমাতৃগণের খ্যাতি প্রতিপত্তি অচলবং অটল রহিবে। বস্তুতঃ ইস্র মাতৃবর্গের অসাধারণ মহত্ব ছিল বলিয়াই, রমণীজন প্রক- টিত শ্লোক বা গান বৈদিক কালিক সময়ে শ্লাঘার বিষয় হইয়া উঠে। অন্যথা তদ্বিষয়ে উৎসাহের পরিবর্তে পুরু গণের অনাস্থা ও ঔদাসীন্য পঙ্কিলক্ষিত হইত, তাহার বিচিত্রতা কি? এই সূত্রে আর অধিক বাক্যব্যয় না করিয়া, মহর্ষিকুলের দেবজামি প্রভৃতি। চিন্নাদৃত, পরমপূজ্য, অপাদেয় সেই ঋকগুলির বঙ্গানুবাদ এই স্থানে প্রকটিত হইল। ‘নিজ কাৰ্যাভিলাষিণী ইন্দ্ৰমাতৃবর্গ স্তবাদি দ্বারা ইন্দ্রকে লাভ করিয়াছেন; যজ্ঞে প্রাদুভুত সেই ইন্দ্র দেবতার উপা- সনায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন; এবং তাহা হইতে সুবীৰ্য্য-ধন- প্রাপ্তির ও অধিকারিণী হইতেছেন। ১। 'হে ই! যে তেজে ও তেজঃ-সাধন হৃদয়তি ধীরতায় শত্রুর পরাজয় হইয়া থাকে, তােমার সেই তেজ ও হৃদয়গত ধৈৰ্য্য আছে বলিয়া, তুমি আমাদের সমক্ষে অতীব প্রসিদ্ধ হইয়াছ। হে কামনাপূর্ণকারী! তুমি শ্রেষ্ঠ ; তুমি আমাদের কামনা-সমূহের বর্ষণকারী। ২। “ইন্দ্র! তুমি বৃত্রের নিধনকারী। তুমি আকাশকে বিস্তার করিয়াছ। তুমি নিজ-ক্ষমতাবলে স্বৰ্গকে সমুন্নত করিয়া দিয়াছ। ৩। “ইন্দ্র! সূৰ্য্য তােমার সহচর। তুমি তাহাকে দুই হন্তে ধারণ কর। তুমি বল পূৰ্ব্বক বর্জকে শাণিত করিয়া থাক।। ইন্দ্র! তুমি নিজ তেজ দ্বারা সমস্ত প্রাণীকে পরাজয় করিয়া থাক। তােমার ঐরূপ প্রভাব। তুমি সহস্র স্থল আক্রমণ করিয়া আছ। ৫। প্রথম ঋকটী * সামবেদ-সংহিতার ৫ পঞ্চম প্রপাঠকের ১ অধ্যয়ের অন্তর্গত ৩২। তৃষ্ট ঋষি উহার প্রকাশক এবং সেই হেই তাহার আখ্যানুসারে উহার নাম ‘তৃস্ত্রী সাম' (অর্থাৎ তৃষ্ট মুনি কর্তৃক প্রচারিত হইয়াছে। * দ্বিতীয় ঋকের বিষয় ৯৫ পৃষ্ঠা দেখ। { প্রাচীন অৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। দ্বিতীয় ঋকের তাৎপৰ্য, ইন্দ্রের অনুকম্পায় বারি-বর্ষণ হইলেই, ইন্দ্ৰমাতৃনামক দেবগণের ভগিনীবর্গের তাবৎ স্পৃহাই চরিতার্থ হয়। বাক। এই বার এমন একটী নারী-চরিত্র কীৰ্ত্তনে অগ্রসর হই। লাম, যাহা কেবল বেদশাস্ত্রে প্রধান ও পূজনীয় নহে, কিন্তু উপনিষৎ, দর্শন, স্মৃতি, পুরাণ প্রভৃতি প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ প্রধান হিন্দুশাস্ত্রে আদর্শ চরিত্র বলিয়া গৃহীত। জগতের ইতিহাসে এতাদৃশ ধৰ্ম্ম-মহােন্নত মহিলা দুর্লভ। অতএব এই রমণীর বৃত্তান্ত, আমাদের সমাজের নিতান্তই সমাদরের বস্তু হইবে, ভরসা করিতে পারা যায়। ইহার পিতার নাম অন্তু ণ ঋষি। বেদব্যাখ্যাকার সায়ণা- চাৰ্য, ৭ সপ্তম মন্ত্রের ব্যাখ্যায় ঐ নাম নির্দেশ করেন। ইনি এত দূর ব্রহ্মপরায়ণা হইয়া উঠিয়াছিলেন যে, নিজ আত্মাতে ব্রহ্মের শক্তি উজ্জ্বলরূপে অনুভব করিতে পারিতেন এবং ব্রহ্মাণ্ডের সর্ব স্থানেই সেই শক্তির উপলব্ধি দ্বারা আত্মার চরিতার্থতা লাভ করিয়া গিয়াছেন। ইহা কর্তৃক আটচী মন্ত্র প্রকটিত হইয়াছে। সেই মন্ত্রগুলি ঋগ্বেদ-সংহিতার ১০ দশম মণ্ডলের ১২৫ সূক্তে পরিদৃষ্ট হয়। তাহাই দেবী বা কর্তৃক বিরচিত ও প্রকাশিত বলিয়া “দেবীসূক্ত” (অর্থাৎ বা দেবী প্রণীত মন্ত্রাবলি) নামে প্রচলিত হইয়াছে। ৭০ সপ্ত-শত- ।
বাক্। ৯৯ শ্লোক-সমন্বিত চণ্ডী-মাহাত্ম গ্রন্থ, বঙ্গদেশে দুর্গোৎসবে, বাসন্তী পূজায় ও স্বস্ত্যয়ন-শান্তি-কাৰ্যে সাগ্রহে অধীত হইয়া থাকে, এ কথা বােধ করি, কাহারই অবিদিত নাই। সেই “চণ্ডী”- মাহাত্ম্য-প্রকরণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত একাংশ-মাত্র। চণ্ডীপাঠের পূর্বে এই দেবীসূক্ত’ অধ্যয়ন করিতে হয়। ইন্দ্ৰ-মাতৃবৃন্দের প্রবন্ধে লিখিত হইয়াছে, তাহাদের রচিত বেদ-মন্ত্র, বৈদিক সমাজে নিতান্ত আগ্রহ-সহকারে পঠিত হইয়া- ছিল। কিন্তু ব্যক্তির সংখ্যা ধরিয়া তুলনা করিলে, অনায়াসে নির্দেশ করা যাইতে পারে, তাহাদের প্রণীত বেদমন্ত্রের যত পাঠক ছিল ও আছে, দেবী বাকের বিরচিত ৮ আটটী মন্ত্রের পাঠক, তদপেক্ষা কত গুণ অধিক ছিল ও রহিয়াছে,তাহার পরি- সীমা নাই। কেননা, সমগ্র বঙ্গদেশে মার্কণ্ডেয় পুরাণান্তর্গত চণ্ডী-মাহাত্মের যার পর নাই সমাদর। তৎ-সম্বন্ধে এই মাত্র বলিলেই পৰ্যাপ্ত হয় যে, হিন্দুধর্মাশ্রিত বাঙ্গালিরা মুখে যদিও বেদশাস্ত্রের প্রাধান্য অঙ্গীকার করেন, কার্যে কিন্তু তাহার চণ্ডীকে বেদাপেক্ষাও বরণীয় বস্তু করিয়া তুলিয়াছেন। একটা দৃষ্টান্ত দিয়া এ বিষয় বুঝাইতেছি। মনু, ব্যাস, যাজ্ঞবল্ক্য, অত্রি প্রভৃতি ১৮ অষ্টাদশ জন মুনির স্মৃতি শাস্ত্র প্রচারিত হইলে পর, বৈদিক সময়ের গৃহ্যসূত্র গ্রন্থের প্রাধান্য তিরােহিত হয়। আবার রঘুনন্দন শিরােমণির স্মৃতি-সংগ্রহের ২ অষ্টাবিংশতি তত্ব প্রকটিত হওয়ায়, উহাদের বহুল প্রচারের গতি রুদ্ধ হয়। পাণিনি মুনির ব্যাকরণ প্রচারের, পরে ইন্দ্র, চন্দ্র, ভাগুরি, ব্যাভি, প্রভৃতির ব্যাকরণ বিনষ্ট-প্রায় হইয়া যায়, এবং বােপদেবের মুগ্ধবােধ ব্যাকরণ প্রকাশের পরে আবার প্রাচীন কাৰ্য্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত। পাণিনি ব্যাকরণের প্রভূত্ব হ্রাস ব্যাসদেবের রচিত বলিয়া খ্যাত ১৮ অষ্টাদশ পুরাণ প্রকটিত হওয়াতে, বৈদিক-কালীন পুরাণ শাস্ত্রের প্রতি লােকে হতশ্রদ্ধ হইয়া পড়ে, আবার ১৮ অষ্টাদশ উপপুরাণে, ব্যাসের পুরাণের এবং কুবিন্দ কবির বিরচিত পুরাণে উপপুরাণেরও প্রভাব হ্র করিয়া দেয়। সেইরূপ চণ্ডী-মাহাত্ম্য গ্রন্থ, বাঙ্গালা দেশ- মধ্যে বেদশাস্ত্রকে খর্ব করিয়া ফেলিয়াছে। চণ্ডীগ্রন্থ দ্বারা সাধারণতঃ বেদের সমাদরের খর্ব হইয়াছে বটে, কিন্তু দেবী- সূক্ত অবলম্বনেই তাহা প্রণীত হইয়াছে ; অতএব, তাহা তাদৃশ ক্ষোভজনক নয়। যে সময়ে বা দেবী, তত্ত্বজ্ঞানগর্ভ উচ্চ অথচ গভীর ধর্ম- মত সকল প্রচার দ্বারা নর-নারীকে স্তম্ভিত, বিস্থিত ও চমকিত করিয়া গিয়াছেন, তখন কত শত সুবিখ্যাত মুনি তপস্বীর জন্ম পরিগ্রহও সংঘটিত হয় নাই। অতুল-ক্ষমতাবান্ লােকোত্তর- প্রতিভাশালী, পূজ্যপাদ শঙ্করাচাৰ্যই বা তখন কোথায় ? শঙ্করা- চাৰ্য, অদ্বৈতবাদ-মতের প্রবর্তক ও প্রথম গুরু বলিয়া জগতে খ্যাত। কিন্তু নিরপেক্ষ হইয়া অনুধাবন করিয়া দেখিলে, বিল- ক্ষণ হৃদয়ঙ্গম হইবে,-দেবী বাকের প্রণীত মন্ত-পরম্পরাই তাহার ধর্মবিচার ও ধৰ্ম্ম-প্রচারের মূলসূত্র। বেদকে মূল ভিত্তি স্বরূপ অবলম্বন করাতেই, তিনি বৌদ্ধধর্মের উপর জয়লাভ করেন ও ভারতে তদর্থই ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইয়া যায়। বৌদ্ধের বেদকে ভ্রান্ত শাস্ত্র বলিয়া উপক্ষো করিতেন, এরূপ স্থলে তাহাদের বর্ণিত সেই ভ্রান্ত শাস্ত্র হইতেই প্রমাণ দর্শাইতে পারিলে, তাহার প্রকৃত গৌরব রক্ষা হয়, আচাৰ্য্য বা। । শঙ্কর, ইহা বুঝিতে পারিয়া, তদনুযায়ী কাৰ্য্য করিয়াছিলেন এবং সৌভাগ্যক্রমে তদ্বিষয়ে সিদ্ধকামও হইয়াছিলেন। পাঠক- পাঠিকাগণকে বলিয়া দেওয়া কর্তব্য যে, বেদের অনেক স্থলেই দ্বৈতবাদের সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান রহিয়াছে। বাদই বেদে সাধারণতঃ স্বীকৃত হইয়াছে। উৎকৃষ্ট সাধকেরা বলিয়া থাকেন, ভক্তের সহিত ঈশ্বরের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ হইলেই, তিনি ভাবে গাল হইয়া, সমস্তই ঈশ্বরময় দেখেন। অদ্বৈত- বাদের ঐ ব্যাখ্যায় কাহারই আপত্তি হইবার কথা নাই। তবে সকল বস্তুরই অপব্যবহার হইতে পারে, অথবা হইয়া থাকে। অদ্বৈবাদের ভাগ্যেও তাহাই ঘটিয়াছে। আমাতে ও ঈশ্বরে কোন প্রভেদ নাই, এই মত যদবধি ঈশ্বর-ধ্যান ও ঈশ্বরচিন্তা হইতে দূরবর্তী হইতে থাকিল, তখনই লােকে তাহার দুরবস্থা ঘটাইয়া দিল। তখনই আমি এক জন ঈশ্বর, অতএব আমার কত কাৰ্য ঐশ্বরিক ক্রিয়া, সুতরাং দূষ্য নয়, এই ঘৃণিত মতের উৎপত্তি হইল। নচেৎ অদ্বৈতবাদের মূল উদ্দেশ্য অসাধু ছিল । এ বিষয়ে আর অধিক বাক্য ব্যয়ের প্রয়ােজন নাই। এখন বাকদেবীর প্রণীত বেদমন্ত্রের সরল অনুবাদ দিয়া পুনরায় প্রকৃত প্রস্তাবে মনােনিবেশ করা যাউক। “আমি (সুক্তের রচয়িত্রী অন্ত, ণ-কন্যা ‘বাকৃ) রুদ্র, বসু এই সকলের আত্মার স্বরূপে বিচরণ করি। আমিই উভয় মিত্র ও বরুণ, ইন্দ্র ও অগ্নি এবং অশ্বিদ্বয়কে ধারণ করি।১। ১২৮৭ সালের আর্শনে মৎ-প্রণীত অদ্বৈতবাদ” প্রবন্ধে এই বিষয় সবিশেষ আলােচিত হইয়াছে।
প্রাচীন অৰ্যরমণীগণের ইতিবৃত্ত
।
•
“আমিই ত্বষ্টা, পূষ ও ভগ এই সকল দেবতাদিগকে ধারণ
করি, এবং সােমকেও ধারণ করি। এই সােম কুণ্ডনে (প্রস্তর
নিষ্পীড়নে) উৎপন্ন হন। যে যজমান, যজ্ঞীয় দ্রব্য আয়োজন
করিয়া ও সােম প্রস্তুত করিয়া, দেবগণকে প্রীত করেন, সেই
যজমানকে আমিই ধন দিয়া থাকি।।
“আমি সমস্ত জগতের ঈশ্বরী, যাগফল-প্রদা ও পরম বনের
জ্ঞানশালিনী, অতএব যজমানগণের মধ্যে আমি প্রধানা। আমি
প্রপঞ্চ-স্বরূপে অবস্থিতা ও এবষ্কৃত-গুণ-বিশিষ্ট। আমাতে ভূরি
ভূরি প্রাণী প্রবিষ্ট হইয়া রহিয়াছে। সুতরাং দেবতারা আমাকেই
বাহুদেশে ধারণ করিতেছেন। ৩।
“জীব যে দর্শন করে, প্রাণধারণ করে, ও অন্নাহার করে,
তাহা আমা দ্বারাই (আমার শক্তি প্রভাবেই) সম্পাদিত হইয়া
থাকে। লােকে এতাদৃশ অন্তর্যামিরূপে অবস্থিতি-কারিণী
আমাকে অবগত হইতে সমর্থ নয়। তাহারা, ঐ অজ্ঞতা
বশতঃ সংসারে হীনদশাপন্ন হয়। হে বিদ্বান্! শ্রদ্ধাযােগ্য
বিষয় তােমাকে উপদেশ করিতেছি, শুন।।
‘আমি স্বয়ং এই ব্ৰহ্ম পদার্থের বিষয় শিক্ষা দি। আমিই
দেবগণ ও মনুষ্যগণ কর্তৃক সেবিত। আমিই সমস্ত কামনা করিয়া
থাকি। আমি লােককে স্রষ্টা, ঋষি বা বুদ্ধিশালী করিতে
পারি। ৫।
“স্তোত্র-দেষ্টা ও হিংসকের ৰধের কারণ আমি রুদ্রের ধনুতে
জ্যা ( ছিলা) সংযােগ করিয়াছিলাম। আমিই ভক্ত-জনের
উপকারার্থ বিপক্ষ-পক্ষের সহিত সংগ্রাম করিয়াছি। আমি
স্বর্গে ও পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হইয়া রহিয়াছি। ৬।
বাক্। “এই ভূলােকের উপরিস্থিত আকাশকে আমি উৎপাদন করি। সমুদ্রের ও জলের মধ্যে আমার পিতা(অন্ত ঋষি) রহিয়া- ছেন। এই প্রকার গুণশালিনী বলিয়া, আমি নিখিল অবনী- মণ্ডলে প্রবেশ করিয়া, বিবিধ বস্তুতে পরিব্যাপ্ত হইয়া আছি । এবং কারণ-স্বরূপ ও মায়াময় আমার দেহ দ্বারা সুদূর স্থানে অবস্থিত স্বর্গলােককে আমি স্পর্শ করি। ৭। “বায়ু, যদ্রুপ স্বেচ্ছাক্রমে সঞ্চারিত হয়, সেইরূপ সমস্ত ভুব- নের প্রসবকত্ৰী আমি স্বয়ং নিজ ইচ্ছানুসারে তাবৎ কার্যে প্রবৃত্ত হই। আমি এই আকাশের ও এই পৃথিবীর পরেও বিদ্য- মান আছি। আমি বিষয়-নিলিপ্তা ও ব্রহ্ম-রূপিণী। আমার স্বীয় মাহাত্ম-বলে এই সমস্তই সমুৎপন্ন হইয়াছে।” ৮। এই সকল মন্ত্রের পাঠক অতিশয় বহুসংখ্যক ছিল ও আছে, প্রস্তাবের প্রথমার্ধেই তাহা উল্লিখিত হইয়াছে। বিষয়ের পবি- তা, মতের উৎকর্ষ, ভাবের গাম্ভীর্য স্মরণ করিলেই মনে হয়, চিরমুগই ইহার পাঠক ও শ্রোতা বহুল পরিমাণে বিদ্যমান থাকি, কেবল যে শঙ্করাচাই এই সকল মন্ত্র অবলম্বন পূৰ্ব্বক স্বীয় মত প্রচার করিয়া যান, এমন নয়। তাহার জন্মের বহুকাল পূৰ্ব্বের রচিত উপনিষৎ-শাস্ত্র-সমুদয়েও উক্ত ধৰ্ম্ম-মতের সুস্পষ্ট, চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। উপনিষদে হিন্দুজাতির বুদ্ধি-বিকাশের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া গিয়া থাকে। এই উপনিষৎ শাস্ত্রকে আশ্রয়-স্বরূপ গ্রহণ করিয়া “দর্শন” গ্রন্থাবলি উৎপন্ন হইয়াছে। সে গুলির নামসাংখ্য ও পাতঞ্জল, ন্যায় ও বৈশেষিক,মীমাংসা ও বেদান্ত। এই শেষােক্ত শাস্ত্রকেই শঙ্করদেব, আবার অদ্বৈত- বাদ-পক্ষে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। পুরাণে, কাব্যে, উপপুরাণে, বেন।
১০৪
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত।
গাথায়, এমন কি, স্থল-বিশেষে নাটকেও এই দর্শন সকলের
মত ও ভাৰ, পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছে। সুতরাং ধরিতে গেলে,
বাক্ দেবীর মতই, এই সকলের পত্তন-ভূমি। এতদ্ভিন্ন মার্কণ্ডেয়
পুরাণের চণ্ডী-মাহাত্ম প্রকরণটা ত আদ্যোপান্তই বাক্ প্রণীত
মাষ্টকের বাকর্ষণে লিখিত, তাহা নির্দেশ করাই নিয়াে-
জন। বিশ্ববারা হইতেও ইহার তত্ত্ব-বিষয়ক মহত্ত্ব অধিক,
এ কথা আমরা নির্দেশ করিয়া না দিলেও, সকলেই সুন্দররূপে
প্রতীতি করিতে পারিবেন, তদ্বিষয়ে অণুমাত্রও সংশয় নাই।
. বাক্ দেবী সাক্ষাঃ বাদেবী সরস্বতী।
•00-
.
৩
উপসংহার।
অদিতি।
ইনিইন্দ্রদেবের মাতা। ঋগ্বেদ-সংহিতার ৪ চতুর্থ মণ্ডলের
১৮ অষ্টাদশ সূক্তের ৫ পঞ্চম, ৬ ষষ্ঠ, ৭ সপ্তম ঋক্ ইনি সঙ্কলন
করেন। সুপ্রসিদ্ধ ঋষি বামদেব, কোন কারণে নিজ মাতাকে
ক্লেশ দেন। তন্নিবন্ধন বামদেবের জননী, অদিতি ও ইন্দ্রকে
আহ্বান করেন। সেই সূত্রেই অদিতি ৩ তিনটা শ্লোক রচনা
করিয়া বামদেবের অবাধ্যতা দমন করেন।
অপালা।
যে অত্রিমুনির বংশে বিদুষী বিশ্ববারা জন্ম গ্রহণ পূর্বক,
অত্রির কুল উজ্জ্বল করিয়াছিলেন, ইনিও সেই অত্রির দুহিতা।
ইনি এক জন ব্রহ্মবাদিনী নারী। কোন কারণে অপালা
উপসংহার ।
১০৫
ত্ব-নােগক্রান্ত হন,তজ্জন্য স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া নিজ
জনকের তপােবনে ঈশ্বরের অর্চনা করিতেন।
অপালা ঋগ্বেদের ৮ অষ্টম মণ্ডলের ১১ একানব্বই সূক্তের
৭ সাতটী ঋক প্রণয়ন করেন। ইন্দ্রকে সােমরস অৰ্পণ করিয়া,
ইনি তাহার নিকটে বর লাভ করেন। অপালা নিরতিশয় পিতৃ-
ভক্ত ছিলেন। পিতার ক্ষেত্রে শস্য উৎপাদন হয় না বলিয়া, ইনি
ইকে জানাইয়া তাহার নিকট যে বর লাভ করেন, তাহাতে
অত্রির যথেষ্ট উপকার হয়।
যমী।
যমী,ঋগ্বেদ-সংহিতার ১ দশম মণ্ডলের দশম সূক্তের প্রথম,
তৃতীয়, পঞ্চম, সপ্তম, একাদশ ঋক গুলি ও ১৫৪ এক শত
চুয়ান্ন সূক্তের ৫ পাঁচটী ঋক রচনা করেন। শেষােক্ত সূক্ত পাঠে
জানা যায়, বেদ-বর্ণিত যম ও পুরাণ-বর্ণিত যম, পরস্পরে বিভিন্ন ।
বেদ-বর্ণিত যম, দণ্ডদাতা নহেন, তিনি স্বর্গ-মুখ দিয়া থাকেন।
যম, যমীর ভ্রাতা।
উৰ্বশী ।
ইহার প্রণীত বেদ-বাক্য ঋদ-সংহিতার ১০ দশম মণ্ডলের
৯৫ পঁচানব্বই সূক্তের দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, সপ্তম, একাদশ,
ত্রয়ােদশ, পঞ্চদশ ও অষ্টাদশ ঋকে নিবদ্ধ হইয়াছে। ইনি
অপরজাতীয়। সুরুচির বৃত্তান্তে ৬৬ পৃষ্ঠায় অগ্র জাতির যে
গরিমা কীৰ্ত্তিত হইয়াছে, উৰ্বশী তাহার এক উদাহরণ। কেহ
কেহ বলেন, উৰ্বশী প্রকৃত স্ত্রী নহেন। উৰ্বশীর অর্থ উষা।
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। রােমশ।- তঁাহার ভর্তার নাম রাজা ভাবয়ব্য। তিনি হিংসা-রহিত ছিলেন এবং কাক্ষীবনের নিমিত্ত সহস্র সােম আগের উদ্যোগ করিয়াছিলেন। ঋগ্বেদ-সংহিত্য আলােচনা 'করিয়া স্পষ্ট বােধ হয়, কাক্ষীবা, ভাবয়ব্য রাজার পুরােহিত। কেননা, রাজার প্রার্থনা মাত্র কাক্ষীবান, শত ‘নিস্ক শত-লক্ষণ- ক্রান্ত বাজি এবং শত-সংখ্যক বলীব গ্রহণ করেন ও রাজার স্থায়ী খ্যাতি লাভ হউক, এই বলিয়া আশীর্বাদ করেন। বােম- শার পুত্রের নাম নয়। সুনয়, অতিশর বদান্য ছিলেন। পুত্রের এই দাতৃত্ব, জননীর মহিমায় ঘটিয়াছিল, তাহার আর সন্দেহ নাই। রােমশার রচিত বাক্য ঋগ্বেদ-সংহিতার প্রথম মণ্ডলের ১২৬ একশত ছাব্বিশ সূক্তের ৭ সম খাকে পরিদৃষ্ট হয়। লােপামুদ্রা । --সােপামুদ্রা বিদর্ভ রাজার তনয়া। তিনি অগস্ত্য মুনির পত্নী। ঋষিবর,পিতৃগণের অনুমতি অনুসারে বংশ- রক্ষার জন্য লোপামুদ্রার পাণিগ্রহণ করেন। লােপামুদ্রার শ্বশুর মিত্রাবরুণ। কাশীখণ্ড পুরাণে তাহারই পাতিব্ৰত্যের বৃত্তান্ত সবি- শেষ বর্ণিত আছে।.সর্বাগ্রে তাহার পুরাণোক্ত আখ্যায়িকা উল্লেখ করিতেছি। তং,পরে তাহার বৈদিক সময়ের বৃত্তান্ত বিস্তৃত হইবে। তিনি প্রথমাবস্থা হইতেই বহু বৎসর তপস্যায় স্বীয় দেহ ক্ষয় করিয়া ফেলিয়াছিলেন। তিনি ছায়ার ন্যায় স্বীয় ভর্তার অনুগতা ছিলেন। স্বামী, ভােজন করিলে, তিনি ভােজন করি- তেন; স্বামী নিদ্রিত হইলে পর, তবে নিদ্রা যাইতেন; অথচ তাহার গাত্রোখান করিবার পূর্বেই, . গাত্রোখান করিতেন। পতিই তাহার একমাত্র জ্ঞান ও ধ্যানের বিষয় ছিলেন। পতি পরিশিষ্ট। কোন কারণে উহার প্রতি বিরক্ত হইলে, তিনি কোন কালেই পতির প্রতি অসন্তুষ্ট হইতেন না। গৃহ-কার্যে ব্যাপৃত থাকি- লেও, স্বামীর আদেশ পাইবা মাত্র তদ্দশ্যেই তাহার সন্নিধানে আসিয়া উপস্থিত হইতেন। নিজের ইচ্ছানুসারে কদাচ কোন, কর্মে নিযুক্ত হন নাই। স্বামীর আহারান্তে অন্ন-ব্যঞ্জনাদি ভক্ষণ করিতেন। তদ্ভিন্ন তাহার আর একটা অতি প্রশংসনীয় গুণ ছিল। তিনি এই একটী অপরিবর্তনীয় নিয়ম করিয়া রাখিয়া- ছিলেন, দেবতা, অতিথি, গে, গৃহাগত দরিদ্র ব্যক্তি ও পরি- বারস্থ অন্য সকলের ভােজন সম্পন্ন না হইলে, কোন ক্রমে অহার করিবেন না। সুখের বিষয় , আজীবন এই মহৎ ব্রত । পরিপালনে লােপামুদ্রাকে কেহ কখন বিমুখ দেখে নাই। তিনি উংসবাদি-উপলক্ষে সমাবরাহকা-ক্ষেত্রে গতিবিধি করিতেন বটে, কিন্তু অগস্ত্যের বিনা অনুজ্ঞায় তাহা কোন মতেই সম্পাদিত হইত না। লােপামুদ্রা ঋগেদের প্রথম মণ্ডলের ১৭৯ এক শত ঊনআশী সূক্তের প্রথম ও দ্বিতীয় ঋক সঙ্কলন করেন। লােপা- মুদ্রার বৈদিক ও পৌরাণিক বৃত্তান্ত নিতান্ত স্বতন্ত্র। পরিশিষ্ট। ( অরুন্ধতী ও অনসূয়া, ১৫ পৃষ্ঠার ৬ পঙক্তির পর) অরুন্ধতী লােক-বিখ্যাত বসি ঋষির প্রণয়িনী। তিনি যার পর নাই পতির কামিনী। তাহার পাতিব্ৰত্য সক লের অনুকরণীয়। বিবাহ-মন্ত্রে উক্ত হইয়াছে, কন্যা বিবাহ- কালে এইরূপ বলিবেন, অরুন্ধতী! আমি তােমার ন্যায় স্বীয় * দেবকুতির শেষাংশে বলিছি, পুরাণকারের কুল বেদাদি হইতে পৃথক এই প্রবন্ধেই তাহা দৃষ্ট হইল।
প্রাচীন আরমণীগণের ইতিবৃত্ত। . M স্বামীতে অক্তা থাকি, এই আমার প্রার্থনা। অরুন্ধতী কেমন প্রসিদ্ধ, ইহাতেই বােধগােম্য হয়। অনুসূয়া, অত্রি-বনিতা। যিনি গুণীর গুণ অস্বীকার করেন না, অগুণশালীকেও অসন্তুষ্ট করেন না এবং অন্যের দোষ লইয়া আলাদ প্রকাশ করেন না, তাঁহাকে অনসূয়া বলে। অনসূয়া শব্দের এই অর্থেই প্রতীতি হয়, তাহার মন কিরূপ মহােষ্ট ছিল। ( সেশ্বর 'সাংখ্য, ১৬ পৃষ্ঠের ২৩ পঙক্তি, ২২ নিরীশ্বর সাংখ্য পৃষ্ঠার ৮ পঙক্তি।) পতঞ্জলি-মুনি-প্রণীত যােগশাস্ত্র, সেশ্বর-সাংখ্য দর্শন নামে পরিচিত। কারণ, উহাতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিপাদিত হই- য়াছে। কপিল-রচিত-শাস্ত্র নিরীশ্বর সাংখ্যদর্শন বলিয়া সত্ৰ খ্যাত। যেহেতু, উক্ত দর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় নাই। ( ৩৭ পৃষ্ঠার ৮ পঙক্তির পর।) শঙ্করাচাৰ্য দিগ্বিজয়ে নির্গত হইয়া সর্বত্রই জয় লাভ করেন। মন মিশ্রকে বিচারে পরাস্ত করেন এবং অধিক কি ঐ ব্যাপারের স্মরণ-চিহ্নরূপ তঁাহার নাম পর্যন্তও পরিবর্তিত হইয়া সুরেশ্বরাচাৰ্য্য হয়। শঙ্করের দিগ্বিজয় কাৰ্য্যে ২৪ চব্বিশ 'বংসর মাত্র লাগিয়াছিল। আট বৎসরের সময় শাস্ত্র পাঠের সূত্রপাত হয় ও ৩২ বত্রিশের মধ্যে শেষ হয়। ইহার প্রচারিত অদ্বৈত বাদ মতের বিষয় বা শীর্ষক প্রবন্ধের ১০০ ও ১০১ পৃষ্ঠা দেখ। সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.