Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Andher Josti Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
9
men
Coleman
No text on this page.
অন্ধের যষ্টি
*
43,8:{' {}
30,27
শ্রীপ্রভাসচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
Published by:
Sudhangshu Mukherji for
M. C. FRIENDS & CO,
2/1, Baghbazar Stroet, Calcutta.
প্রথম সংস্করণ
১৩৪৪ সাল।
( সৰ্ব্ব সত্ব সংরক্ষিত)
Printer-Manindra Nath Mazumder,
NABAJIBAN PRESS,
1, Shib Şankar Mullick Lane,
CALCUTTA.
মূল্য আট আনা।
.
৯. .•* *
দুটী কুই
ভূমিকা আমি লিখবে না। অল্প দুটী কথা বলবার আছে,
সেইটুকু বলেই নিবৃত্ত হবে। আমাৰ সাহিত্য-সাধনায় বিশেষ
ভাবে যার উৎসাহ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে প্রবীণ সাহিত্যিক
শ্রদ্ধেয় যুক্ত দেবেন্দ্র নাথ বসু, শ্ৰীযুক্ত পান্নালাল মুখােপাধ্যায়,
বি-এল, বন্ধুবর প্রফেসার হীরেন্দ্র নাথ বসু, এম্-এ প্রভৃতির কাছে
আমি বিশেষ ভাবে ঋণী। এদের উৎসাহ এবং সহানুভূতি আমার
ক্ষুদ্র জীবনের অনেক নীরব মূহুৰ্ত্তকে মুখর করে তুলেছে। আমার
অন্যতম বন্ধু প্রাণকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীসুধাংশু মোহন মুখো-
পাধ্যায় বিশেষ ভাবে উযোগী না হলে এত শীঘ্র পুস্তক প্রকাশ
কব। নিশ্চয়ই সম্ভব হতাে না, সেইজন্য তাদের কাছে আমি
দ্বিতীয় কথা কল্পনার ওপর গল্পটীর ভিত্তি এবং
এতে আমি
চবিত্রাবলীর যে সব নামকরণ ক’বেছি সবই কল্পনা-প্রসূত।
সমাজের কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিশেষকে আক্রমণ করা
আমার উদ্দেশ্য নয়।
গ্রহকার
চণ্ডীঠাকুর! একথা কি সত্যি? রামীকে সঙ্গে করে তুমি নাকি কলকাতায় এসে এক ডাইং ক্লিনিং খুলে বসেছে? সে যুগে ঠাকুরকে বড়ই অপদস্ত হতে হয়েছিল ঐ খােপানীটাকে ভালবেসে। এ যুগে তােমার সে ভয় নেই। দেশের যুবকমণ্ডলী আদর করে তােমায় বরণ করে নেবে। গ্রন্থকার প্রণীত নবীন-চণ্ডীদাস কৰিবরের অভিনব জনমের অভিনব বার্তা বহন করে এনেছে। চারি আনা মাত্র দক্ষিণাতেই আমাদের নবীন চণ্ডীদাস সষ্ট হবেন। প্রাপ্তিস্থান-এ, সি, ফ্রেঞস এণ্ড কোং, ২১, বাগবাজার ফ্রীট, কলিকাতা। আর বলেন- ছায়াচিত্রে চণ্ডীদাসকে লইয়া যে নকড়া ছকড়া করা হইয়াছে তাহা কে বহু সুধীজনের হৃদয়ে ব্যথা দিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু এ পর্যন্ত তাহার কোনও ঔষধ আমরা কাহাকেও প্রয়ােগ করিতে দেখি নাই। पई ক্ষুদ্র প্রহসন খানিতে তাহারই প্রয়াস পরিস্ফুট। শ্লেষ-ব্যঙ্গের মারফতে গ্রন্থকার তাহার প্রয়াসকে সাফল্যমণ্ডিত করিবার চেষ্টা করিয়াছেন আনন্দের বিষয়, তাহা সাফল্যমণ্ডিত হইয়াছে।
পরম পূজনীয়
পিতৃদেব স্বর্গীয় রাখাল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
শ্রীচরণকমলেষু
পিতা,
সাহিত্য সেবায় আপনি আমাকে সর্বদাই উৎসাহিত
করতেন। আমার এই “অন্ধের যষ্টি” শ্রীচরণে অর্ঘ্য দিলাম।
আশা করি আমার স্নেহের দান আপনি আদর করে তুলে নেবেন।
ণতঃ
আপনি কি বছরে ৩৬৫ টাকা
ঘাচাতে চান্?
প্রতি সংসারে ডাক্তার এবং ঔষধ খরচ গড়ে প্রতিদিন ১,
টাকা। এই গুরুব্যয় আপনি অতি সহজে লাঘব করতে
পারেন। আপনি নিজেই যদি ডাক্তার হন্ আর মাটা, জল,
হাওয়া, রৌদ্রই যদি ঔষধ হয় তবে কেন আপনি অর্থ ব্যয় করে
পরের পিছনে ছুটতে যাবেন ?
স্বর্গীয় রাখাল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বি-এল
প্রণীত
নিম্নলিখিত পুস্তকগুলি আপনাকে সকল প্রকার রে'গের সহজ
চিকিৎসা প্রণালী শিক্ষা দেবে।
মূল্য ১০
১। হাইড্রোপ্যাথি বা জলচিকিৎসা
২। হাইড্রোপ্যাথি মতে ক্ষতচিকিৎসা
৩। হাইড্রোপ্যাথি মতে স্ত্রীরােগচিকিৎসা
১৩
১) ১০
প্রাপ্তিস্থানঃ-এ, সি, ব্রাদার্স এণ্ড কোং,
২১, বাগবাজার টু,
কলিকাতা।
{ 4 শীতেব রাত , নিস্তব্ধ নিশুতি। কনকনে দমকা বাতাস যেন অস্থি মজ্জা পৰ্যন্ত ঝাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ কলকাতার বিবাট চওড়া বাজপথ খা খা করছে। জন মানবেব চিহ্ন মাত্র নেই। মােড়ে মােড়ে এক একটা পুলিশ যেন গভীব নীববতার সাক্ষীর মত দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঝিমুচ্ছে। বাত তখন প্রায় দশটা কি তার চেয়ে কিছু বেশী হবে। একটা ভদ্রলোক সেই নির্জন পথে মােটা একটা লাঠি হাতে ধীর পদক্ষেপে রাসবিহাবী এভিনিউ ধরে চলেছেন। চলনটা তার একটু অদ্ভুত। পাগুলাে ঠিক সমান ভাবে পড়ছে না। মােড়ের মাথাব পুলিশটা হঠাৎ ভদ্রলােককে দেখে সন্দিহান হয়ে উঠলাে। তঁাব দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন কবলে, “আপ, কোন্ হায় ? এতনা রাতমে কিধাব যাতা?” ভদ্রলােকটা জবাব দিলেন—“এটা তাে রাসবিহারী এভিনিউ ? এখানে আমার এক বন্ধু আছেন-ডাঃ শরৎ ঘােষ, তার বাড়ী যাচ্ছি।” বিলেত ফেরৎ ডাঃ শরৎ ঘােষের নাম শুনে পুলিশটা চমকে উঠলো। লােকটা বলে কি? ডাক্তার ঘােষের বন্ধু? অত বড় লােকের বস্তু ২ অন্ধের যষ্টি অথচ এত হীন বেশে? পরণে তার বিএ একটা ময়লা কাপড়, গাঙ্কে একটা শতছি, চাদর, জুতােটা ছেড়া-হাতের লাঠিটাও একান্ত কদর্য। কথাটা পুলিশ বিশ্বাস করতে পারলে না। সন্দেহ তার আরও বেড়ে গেল। বল্লে, “চলাে আমার সাথ, ডাক্তার বাবুকে। কোঠিমে। মালুম হােত তো চোট্টা যায়।” লােকট তখন ভাবছেন—কি সুন্দর দারিদ্রের পরিণতি। সাজ পােক দেখে এমনই একটা অবান্তর ধারণা পুলিশ পােষণ করতে পারলে। যাক, এক পক্ষে ভালই হলাে! রাত্রিবেলা হাতড়ে হাতড়ে বাড়ীটা খুজে নেওয়া যথেষ্টই শক্ত হতাে। পুলিশটাকে সঙ্গে পেয়ে তিনি যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। একটুও ইতস্ততঃ না করে জবাব দিলেন, “চল সাহেল -আমি চোট্টা কি অন্য কিছু এখনই প্রমাণ হয়ে যাবে।” কানও দ্বিধা সঙ্কোচ না করে পুলিশটা লােকটার হাত ধরেই পথ 5 নৃতে সুরু করলো। লােকটীর মনে তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ডাঃ ঝন অবশ্য তার বাল্যবন্ধুকে নিশ্চয়ই চিনতে পারবেন। কিন্তু যার জন্যে তার কাছে যাওয়া—ছিঃ ছিঃ কথাটা ভাবতেও যেন মাথা কাটা যায়। জীবনে এই প্রথম তিনি ভিক্ষা করতে অগ্রণী—কি লজ্জা কি হীনতা! আত্মীয়দের দ্বারস্থ হওয়ার চেয়ে তিনি বন্ধুর কাছে যাওয়াই শ্রেয় বলে মেনে নিয়েছেন। এক বন্ধুরই অনুগ্রহে ক'টা পয়সার সংস্থান হয়েছিল বলে আমার থেকে বালিগঞ্জ পৰ্যন্ত আসতে সমর্থ হয়েছেন। একখানি দ্বিতল বাগানওলা বাড়ীর সামনে এসে পাহারাওলাট বলে, “ডাকো তােমরা দোস্তকে। কেয়া-পছন্তা নেই উসকো কোঠি?”
অন্ধকারের অন্তরে লােকটা একটু থতমত খেয়ে জবাব দিলেন, “না বাবা, রাত্তির বেলা ঠিক ঠাওর হচ্ছে না।” তারপর গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে ডাক দিলেন, “শরৎ বাড়ীতে আছে ?” পুলিশটাও সঙ্গে সঙ্গে হাঁকা- হকি লাগিয়ে দিলে, “ডাক্তার সাব, কোঠিমে হায় ?” বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হলাে না। দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে ডাঃ ঘােষ সাড়া দিলেন, “কে? এত রাত্তিরে কে ডাকে?” ভদ্রলােকটা কোনও কথা কইবার আগেই পাহারাওলা বলে উঠলাে, “ইয়ে আদমী বােতা আপকো দোস্ত, হয়—মালুম হােত। কই চোট্টা কেয়া মাতুয়ালা হােগা। দেখিয়ে তো?” তারা তখন বাড়ীর সামনের ছােট বাগানটীর ভেতর গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাঃ ঘােষের আজ্ঞায় মালী বেরিয়ে এসে নীচের বকের ইলেকট্রিক আলােটা জ্বেলে দিলে। লােকটীকে দেখেই ডাঃ ঘােয় বলে উঠলেন, “আশুতােষ? এত রাত্তিরে কি মনে করে ? বাবুকে ছেড়ে দাও পাহারাওলা, ও আমার দোস্ত।” ব্যাপার দেখে লজ্জিত পাহারা ওলা আগেই তাৰ হাতটা ছেড়ে দিয়েছিল; এখন নির্বিবাদে আস্তে আস্তে গেট পার হয়ে রাস্তা ধরে রওনা হলাে। পরক্ষণেই ডাঃ ঘােষ নীচে নেমে এসে আশুবাবুকে সারে বাইরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। উজ্জ্বল আলােকে তার পােক দেখে তিনি একটু আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন, “একি দশা তােমার আও? কি ব্যাপার বলতাে ভাই?” আশুবাবু একটু মৃদু হেসে বল্লেন, “ব্যাপার যা দেখছে। তাই । দুঃখে আমার অবধি নেই। পেটের ভাত জােটাতে পারিনা তাই আর যষ্টি তােমার দারস্থ হয়েছি। এত দিন যা কিছু ছিল ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে চালিয়েছি। এখন একান্ত রিক্ত তােমাদের দয়ার প্রার্থী। তার অভিব্যক্তিহীন চক্ষু দুটীর দিকে চেয়ে এবং ভনিতাবিহীন কথাগুলি শুনে ডাঃ ঘােষ কিছু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। একটু চুপ করে থেকে বল্লেন, “এমন দশা তােমার কেন হলো আশু? তুমি তো বুদ্ধি- মান-জ্ঞানী কি মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে আশুবাবু বল্লেন, “কিন্তু কিছুই ক’বতে পারলুম না ভাই। বিধাতা অামার শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। তোমার কথা শুনে যদি তখন ডাক্তারীটা পড়তে যেতুম—তা হলে হয়তো এ দশা হতো না।" পুরাণে স্মৃতি মনে উঠতেই ডাঃ ঘােষ বলে উঠলেন, “হ্য। তা হলে চোখগুলােও হারাতে হতো না—আর এমন করে লােকের দ্বারস্থও হতে হতো না।” ছেলেবেলা থেকেই আশুবাবু একটু বেশী অভিমানী। শেষের কথাটা তার বুকে গিয়ে তীরের মত বিধল। কাৰ্য কারণ বিচার করবার অবসরও যেন তিনি বিয়ে ফেলেন। দুর্দমনীয় অভিমানে বলে উঠলেন, “না হয় তােমার কাছ থেকে চলেই যাচ্ছি ভাই। কিন্তু এই নিরম দরিদ্রকে অন্ততঃ আগেকার বন্ধুত্ব স্মরণ করেও তােমার শ্লেষ করা উচিত হয়নি।” ডাঃ ঘােৰ বন্ধুর হঠাৎ ভাব পরিবর্তনে একটু কুষ্ঠিতভাবে বলে উঠলেন, “আমি শ্লেষ করবার জন্যে কিছুই বলিনি ভাই। তুমি কথাটাকে অমন ঘুরিয়ে ধ'রাে না। আমি শুধু বলছিলুম বড়
অন্ধকারের অন্তরে
সায়েন্টিষ্ট, হ’বার বৃথা আকাঙ্খটা যদি তুমি ত্যাগ করতে পারতে
এ কথাটা যেন আশুবাবুকে আরও বেশী রকম চকিত করে দিলে।
“বৃথা আকাঙ্খ ?” সেখানে বসে আর তিলার্ধ সময় অপেক্ষা করা
যেন তার অসহ্য মনে হলাে। মােটা লাঠিটার ওপর ভর কোরে তিনি
উঠে দাড়ালেন।
ডঃ ঘােষ বল্লেন, “ওকি—উঠলে যে?”
ততক্ষণে আশুবাবু দরজার দিকে এগিয়ে পড়েছেন। वसन
“আমি চল্লম।
আশা করিনি শরৎ, তোমার এখানে এসে এতখানি
ব্যথা নিয়ে ফিরবাে।”
ডাঃ ঘোষ ব্যস্তভাবে বল্লেন, “তােমার দেখছি মাখা খারাপ হয়ে
গেছে। এই রাত্তিরে যাবে কোথায় একলা ?”
“যদি পারি চুলােয় যাবে ভাই।” বলেই আশুবাবু দরজার বাইরে
বেরিয়ে পড়লেন।
পেছন পেছন বেরিয়ে এসে ডাঃ ঘােষ বল্লেন “যেতে হয় কাল সকালে
যেও, আজ রাত্তিরটা অন্ততঃ থেকে যাও।”
তার কথায় কর্ণপাত না করে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে আশুবাবু
গেটের বার হয়ে গেলেন। ডাঃ ঘােষ ব্যাপারটা প্রথমে কেমন যেন বুঝে
উঠতে পারলেন না। পরক্ষণে ভাবলেন, হয়তো আশুর মস্তিষ্ক বিকৃত
হয়েছে। কি করা যায়? ওকে কি গিয়ে ফিরিয়ে আনবেন? কিন্তু
তাও বড় সােজা কাজ নয়। যে রকম গো ভরে ও চলেছে। অবশেষে
তিনি স্থির করলেন, পরের দিন তার বাসাতে গিয়েই গােলমালটা
অন্ধের যষ্টি পারবে। মিটিয়ে আসবেন। একটু সময় গেলে ও তার নিজের ভুলটা বুঝতে সাত পাঁচ ভেবে দরজাটা বন্ধ করে তিনি যখন সিড়িতে উঠতে শুরু করেছেন হঠাৎ মনে হলাে-তাইতাে তাকে যে শ্যামবাজার অবধি যেতে হবে। বাসে উঠবার পয়সা নিশ্চয়ই তার কাছে নেই। তার ওপর সে অন্ধ। এই শীতে এত রাত্রে একজন কপর্দকহীন অন্ধকে একলা পথে ছেড়ে দেওয়া কোনও ক্রমেই উচিত হবে না। ডাঃ ঘােষ ওপরে না উঠে তাড়াতাড়ি রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। যতদুর দৃষ্টি যায় আশুবাবুকে দেখা গেল না, এদিক ওদিক তন্ন তন্ন করে খুজলেন-অন্ধের পাত্তা নেই। o = (২) পথে এসে আশুবাবু কেমন যেন গুলিয়ে গেলেন। কোনদিকে যাবেন কিছুই যেন ভেবে পেলেন না। তবু যেতে হবে তাকে—যেতে হবে দূরে, অতি দুরে যেখানে বন্ধুর শ্লেষ নেই, আত্মীয়ের অবহেলা নেই- সব চেয়ে বড় পেটের চিন্তাটাও নেই। অন্ধ চোখে হঠাৎ যেন আলো ভেসে উঠলাে। উপায় পেয়েছেন তিনি অবশেষে—পােড়া হেটা নিয়েই তাে যত গােল ! জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার আশা আর নেই, বাঁচার জন্যে মিছে লাঞ্ছনা কুড়িয়ে হবে কি?
অকারের পর ভাবতে ভাবতে তিনি পথে চলেছে। বাড়ীর দিকে না গিয়ে বিক্ষিপ্ত মনে তিনি সােজা বালিগঞ্জ ষ্টেশনের দিকেই এগিয়ে চল্লেন। হঠাৎ একটা লােকের গায়ে বা খেয়ে থমূকে পড়লেন। পথিক কক্ষস্বরে বলে উঠলেন, “আচ্ছা ভদ্রলােক তো মশাই, একটু দেখে পথ চলেন না ?” আশুবাবু একটু সঙ্কুচিত হয়ে জবাব দিলেন, আর্থনা করবেন, আমি অন্ধ তাই- পথিক নরম সুরে বল্লেন, “আপনি অঙ্ক ? তাহলে আমাকেই মার্জনা করবেন। কিন্তু আপনার চোখ দেখে তো প্রথমে যােঝাই যায় না! তা এত রাত্রে একলা চলেছেন কোথা এদিকে?” অন্ধ প্রশ্ন করলেন,-“এটা কোন জায়গা বলুন তো?” “আপনি প্রায় বালিগঞ্জ ষ্টেশনের কাছে চলে এসেছেন। আপনি যে দেখছি ভয়ানক কাপছেন? আপনার বাড়ী কোন দিকে?” শ্যামবাজার- বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে পথিক বলে উঠলেন, “সর্বনাশ-এত রাত্রে সেখানে ফিরে যাবেন কেমন করে?” আশুবাবু খেয়ালের বসে বলে ফেল্লেন, “ফিরে যাবার ইচ্ছে মােটই নেই।” তবে রাত কাটাবেন কোথায়?” “পথেই। যার তিন কুলে কেউ নেই পথই তাে আর সম্বল।” পথিক একটু আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, “দেখুন, কিছু যদি মনে না করেন, আজ রাতটা আমার বাড়ীতে কাটিয়ে যান। আমার
অন্ধের যষ্টি
মনে হয় আপনি খুব অভাবগ্রস্ত। আমার একটু কাজ করে দিলে
উপরন্তু আজ রাতেই আপনার দশ টাকা রােজকারও হয়ে যাবে।
কি
বলুন,
রাজী ?”
আশুবাবু একটু ভাবলেন। মন কি—শীতে কাঁপতে কাপতে রাস্তার
রাত কাটানাের চেয়ে একটা আশ্রয়ে থাকা যাবে। তার ওপর আবার
দশ টাকা বােজকার। বল্লেন-“বেশ রাজী। কিন্তু আমি তো দেখতে
পাই না। আপনার কি কাজ আমার দ্বারা সম্ভব হবে ?”
পথিক বল্লেন, “সম্ভব হবে বলেই তো বলছি। আসুন আমার
আপনার মত লােকেরই আমার দরকার। ভগবান দয়া করেই
আনাকে মিলিয়ে দিয়েছেন।”
লােকটা এগিয়ে এসে আশুবাবুর হাত ধরলেন। তিনি তার স্পর্শ
থেকেই অনুভব করলেন লােকটা যেন বেশ বিপন্ন। ভয়-বিজড়িত স্পর্শে
চকিত হয়ে অন্ধ প্রশ্ন করলেন, “আমায় কি কাজ করতে হবে
আগে বলুন-তবে আমি যাব।”
“এমন কিছুই নয়। শুধু চুপ করে একটা চেয়ারে বসে থাকতে
হবে-আর কিছু নয়।”
“এরই জন্যে আপনি দশ টাকা দেবেন?” সন্দেহ আরও ঘনীভূত
হয়ে উঠলো।
“আপনি বুঝি ভাবছেন এর ভেতর কিছু গােলমাল আছে?
সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনি কোনও ফাসাদে পড়বেন না।
আমি চাই মাত্র রাত্রির জন্যে একজন সঙ্গী-বুঝলেন? একান্ত একল
দেখুন, তা হলে আর কিছুই আপত্তি নেই ?”
অন্ধকারের অন্তরে অগত্যা আশুবাবু রা হলেন। আর যদিই বা এতে কোনও বিপদই শাকে—তাতে তাঁর কি আসে যায় ? ঘৃণ্য জীবন নিয়ে তােত তিনি বেঁচে থাকতেই চান না। পথিকের সঙ্গে গিয়ে তার বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। ভদ্রলােকট তাঁকে নিয়ে গিয়ে একটা দোতলার ঘরে গদি ওরাল চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলেন, “আপনার বােৰ হয় খাওয়া হয়নি ?” না।” সঙ্গে সঙ্গে একজন চাকরকে ডেকে তিনি খাবার নিয়ে আসতে হুকুম করলেন। খাওয়া দাওয়ার পর লোকটা বলেন, “এখন আপনাকে বুঝিয়ে দিই আপনার কাজটা। আজ আমার কাছে একটী ভদ্রলােকের আসবার কথা আছে। তিনি এলে আমি তার সঙ্গে ঠিক এর পাশের ঘরে বসে কথা কইবাে। আপনার কাছ থেকে আমি শুধু চাই আপনার উপস্থিতিটুকু তাকে জানিয়ে দিতে। আপনাকে অবশ্য পাশের ঘরে যেতে হবে না। এইখানে বসেই কাগজপত্র একটু নাড়াচাড়া করবেন আর খুব বেশী দু’একবার কাশ বেন; আর কিছু নর। তবে এসব যা কিছু করবেন, আমি সঙ্কেত করবার পরে।” সঙ্কেতটা কি রকম হবে?” “ধরুন—আমি টেবিলের ওপর নিটে টোকা মারবো। আচ্ছ- এখনই সেটা পরখ করে দেখা যাক্, আপনি ঠিক শুনতে পান্ কি না। বলেই ভদ্রলােকটা গিয়ে পাশের ঘরের টেবিলের ওপর ভিটে টোকা মেরে ফিরে এসে প্রশ্ন করলেন, “শুনতে পেয়েছিলেন?”
“ঠিক হয়েছে। ঐ সঙ্কেতই তা হলে ঠিক রইলাে।” এই কথা
বলেই লােকটা আশুবাবুকে একলা বসিয়ে রেখে চলে গেলেন। কোথায়
গেলেন বা কি করতে গেলেন, আশুবাবু কিছুই জানতেন না। জানবার
প্রয়ােজন বােধ হয় তার ছিল না। এমনই ভাবে বসে যে কতক্ষণ
সময় বয়ে গেল অন্ধ তা ধারণা করতেও পারলেন না। হঠাৎ তার
কানে কতকগুলো চাপা গলার শব্দ ভেসে এলাে। পর মুহূর্তেই একটা
দরজা বন্ধ করার আওয়াজ হলাে। তারপর কিছুক্ষণ ফিস্ ফিস্ করে
কথা হতে লাগলাে। তার বর্ণাক্ষরও অন্ধ বুঝতে পারলেন না।
বােঝবার চেষ্টাও করলেন না। কেবল উগ্রীব হয়ে সঙ্কেতের প্রতীক্ষায়
বলে রইলেন।
সহসা পাশের ঘরে গােলমাল শােনা গেল। অন্ধ কান খাড়া করে
শুনতে লাগলেন।
একজন উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, “তা হলে আপনি মনে করেন
যে আমাকে উপযুক্ত জায়গায় পেয়েছেন?”
অপর ব্যক্তি বল্লেন, “সেটা সম্পূর্ণ আপনার উপর নির্ভর করছে।”
এর মানে ? কেমন করে ?”
আপনার মত লােকের পক্ষে এ প্রশ্ন করা সাজে না।”
“সাজে না ?
তা বটে—অন্তত আপনার মত অমানুষের কাছে।”
“মানুষ অমানুষ বুঝি না। যে ব্যাপার নিয়ে আমি এসেছি
সেটার মীমাংসাই আমি চাই। এতে গুলিয়ে যাবার আছে কি?”
“গুলিয়ে আমি যাচ্ছি না। তার জন্যে প্রস্তুত হয়েই অপেক্ষা
অফার এনে ১১ নেই। করছিলুম। তা হলে এখন কাজের কথাই কম্বা যাক।” শেষ কথা কয়টার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের ওপর তিনটে পরিক্ষার টোকা মারার শব্দ শােনা গেল। আশুবাবু সঙ্গে সঙ্গে একটু কেশে কাগজ নাড়তে আরম্ভ করনে। পাশের ঘুরে আবার কথা হতে লাগলাে। “কিসের শব্দ ?” “আমি এখানে একা আপনি আসবেন বলেই আরও একজনকে উপস্থিত রেখেছি।” “ও—এই ব্যাপার? কন্তু জানেন কি-কত বড় ভুল করেছেন এখানে ?” হঠাৎ পায়ের খস্ খস্ শব্দ—একটা সার্সি ভাঙার আওয়াজ টেবিলটাকে যেন জান্দার ধারে ঠেসে দেওয়া হলাে--তার পরই একটা চিৎকার—“খবরদার—খবরদার- আশুবাবু যেন কেমনতর হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট অনুভব করলেন—লােকটী বিপন্ন হয়ে পড়েছেন। তাই তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে হাতড়ে হাতড়ে দরজার দিকে এগুতে লাগলেন। মনে হলাে যে লােকটা তাকে ডেকে এনেছিলেন—তিনি যেন তার সাহায্য চাইবার জন্যেই এগিয়ে আসছেন। কিন্তু তিনি অন্ধের ঘরে আসার আগেই একটা বিকট আওয়াজ হলাে। -আর্তের চিৎকারের চেয়ে ঢের বেশী বীভৎস সে শব্দ। অন্ধ বুঝলেন। একটু থকে আবার এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। একজন বলে উঠলাে, “পাপিঠটা এই ঘরের দিকেই আছে।” সেই সময়
কথাটা শুনে পাছে নিজেকেও আবার গুলি খেতে হয়--তাড়াতাড়ি
বসে পড়লেন। সেইখানটাতেই মাটীর ওপর একটা লােক পড়ে।
গায়ে হাত বুলুতে গিয়ে তার হাতটা তপ্ত রক্তে ভিজে গেল। মুহূর্ত
আগের জীবন্ত মানুষের পরিণতি দেখে আশুবাবু শিউরে উঠলেন ।
বাঁচবার জন্যে দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে তিনি দরজা খুজতে লাগলেন।
মৃত্যু-ছায়াচ্ছন্ন নীরবতা ভঙ্গ করে সেই সময় একজন বলে উঠলাে,
না-না-ওকে আর নয়।”
নারী কণ্ঠ ? এর ভেতর আবার নারী ? সেই সময় একজন কে
এসে তার চুলের মুঠি ধরে বলে উঠলাে, “একে ও শেষ করে গেলে
আমি নিরাপদ হতে পারবাে।”
আসন্ন মৃত্যুক্ষণে আশুবাবু গুলিয়ে গিয়ে বলে উঠলেন, “না-
না—আমায় নয়—আমার দিকে চেয়ে দেখুন-আমি-” সেই সময়
মাথায় একটা প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে অন্ধ মেজের উপর লুটিয়ে পড়লেন।
0
(৩)
অন্ধের যখন জ্ঞান হলাে—মাথার ভেতর কেমন যেন একটা শব্দ
হচ্ছে। মনে পড়লো কে একজন তার মাথায় আঘাত করেছিল।
তারপর ?—তারপর আর কিছু মনে পড়ে না। তিনি কোথায় যেন
চিৎ হয়ে পড়ে আছেন। অবসাদে সারা দেহ ছেয়ে আছে। উঠে
অকালের অন্তরে
বসতে গেলেন-শক্তি নেই। ঘটনা সম্বন্ধে শত রকমের চির ধীরে
ধীরে মনের মধ্যে বয়ে যেতে লাগলাে। কেন মরতে তিনি দশটা
টাকার লােতে এই বীভৎস কাণ্ডের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন।
নিজের উপরই ঘৃণায় মনটা ভরে উঠলাে। অদ্ভুত মানুষের মন।
কিছুক্ষণ পূৰ্ব্বে যে দেহটার ওপর কোনও মমতা তার ছিল না, কিছুক্ষণ
পরে সেইটাকেই বাঁচাবার কি প্রখর প্রচেষ্টা। কিন্তু কিন্তু হঠাৎ
তিনি আপন মনেই চেঁচিয়ে উঠলেন, “এগিয়ে এসেছিল আমার
দ্বারে-সে মৃত্যু কেন তুমি কেড়ে নিলে ভগবান?”
সেই ময় একটী কোমল হাতের স্পর্শে তিনি যেন চমূকে
উঠলেন।
“কোনও নেই আপনার। আপনি এখন সম্পূর্ণ
নিবাপদ।”
নাবী ? কে এই প্রহেলিকাময়ী? তবে এই কি সেই, যে তাকে
গুলি করতে মানা করেছিল? স্মৃতিটাকে যেন কিছুতেই ভাল
করে ফিরিয়ে আন্তে পারছেন না। মাথার ভেতরের শব্দটারও বিরাম
নেই-একটানা হয়েই চলেছে। তিনি ফিদ ফিস করে প্রশ্ন
ক’ললেন, ‘পাপিষ্ঠটা গেছে ?”
রমণী কোনও উত্তর দেবার আগে খুট কোরে একটা আওয়াজ
হ'লল। তিনি শঙ্কিত হয়ে বলে উঠলেন, “তােমার কাছেও কি
পিস্তল আছে? আমায় খুন করবে ?”
“ন, আপনি ঘুমুবার চেষ্টা করুন। আপনি কেমন আছেন
দেখবার জন্যে আলােটা জেখেছিলুম।
ওটা সুইচের ।
১০
অন্ধের যষ্টি
আর কথা কইবেন না।
আমাকে আবার মার দিকে দেখতে
তিনি চুপ করে শুয়ে রইলেন। মেয়েটার কথাগুলো যেন ঠিক
বােধগম্য হয় না। রাস্তার দিকে দেখতে হচ্ছে কেন? গাধাটার
ভেতর অসহ্য যাতনাতার সঙ্গে সেই শব্দটা।
, তিনি ভুল
করেছেন ; যাতনাটা মাথার ভেতরের বটে কিন্তু শব্দটা বাইরে থেকে
আসছে। বােধ হয় এটা মটরের শব্দ। রমণী কি তা হলে
তাকে মটরে কোরে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে? অন্ধের অজানিতে যেন
এক স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলাে।
আর একবার সুইচের শব্দ হলাে; আশুবাবু জিজ্ঞাসা করলেন,
আবার তুমি আলাে আছো ?”
“না, হেড লাইটা নিভিয়ে দিলুম। সকাল হয়ে গেছে কিনা।”
তঁায়। তখন বােধ হয় একটা গ্রাম্যপথ দিয়ে চলেছেন। মাঝে
মাৰে পাখীর কলকণ্ঠের কলরব কানে ভেসে আসছে। তিনি শুয়ে
ভরে শুনতে লাগলেন। হঠাৎ পাখীর গান যেন মিলিয়ে গেল।
কনে বাতাস সর্বাঙ্গ যেন কাপিয়ে দিতে লাগলাে। সেই সময়
রমণী বলে উঠলাে, “কেন-কেন আপনি এই সব খারাপ লােকেব
সঙ্গে মেশেল ? চেহারা দেখে তো আপনাকে খারাপ বলে মনে
“মুখটা দেখে ফেলেছে এর মধ্যে? এত আলাে ফুটে গেছে ?”
“উঠে বলে দেখুন না-গাছের ফাকে ফাকে কি সুন্দর আলাে ?
উনার এই মধুময় আলাে—আর আয়-তার সঙ্গে পাখীদের গান-”
অন্ধকারের পরে
হঠাৎ একবার হর্ণটা বেজে উঠলো। পথে বােধ হয় কোনও
লোক ছিল। মেয়েটা একটু চুপ করে থেকে আবার বলে,
“আপনাদের মত লোেক বােণ হয় এসব কিছুর তােয়াকা রাখেন না?”
“রাখলেও এখন আর রাখতে পারি না।”
আগে তা হলে রাখতেন? দেখুন, আপনাকে কি খুব
একজন খারাপ লােক বলে ভাবতে আমার ইচ্ছা হয় না। আপনার
হৃদয় নিশ্চয়ই খারাপ নয়।”
“দেখ, আমার হৃদয় কেমন, তা নিয়ে তুমি অত বেশী ব্যস্ত
হ’যাে না। মুখটা আমার যেমন দেখতে তার চেয়ে হৃদয়টা বােধ
হয় মােটেই ভাল নয়। কিন্তু, এখন আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
শুনি?”
আর বেশী দূর নয়। এইখানেই পথে আপনাকে ছেড়ে দেবো।”
“পথে ছেড়ে দেবে ? কেন ?”
“আপনার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্যে।”
“লােকটী কি মারা গেছেন।”
“নিশ্চয়ই। দেখুন, পুলিশ যদি আপনাকে না ধরতে পারে,
আপনি বেঁচে যাবেন।”
“ও—আমার বাচাটাই বুঝি বেশী দরকার? খুব বুদ্ধিমতী তুমি।"
*এ কথা ব’চেন কেন?”
“জিজ্ঞেস কর নিজেকে। তুমি ভাবছে যা ব’লবাে? তুমি
গৰছে আমি হত্যাকারীকে দেখেছি—আর আমি যদি পুলিশের হাতে
পড়ি তা হলে সেই লােকটার পক্ষে লুকিয়ে থাকা সহজ হবে না।
আমি এমন করে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে যেতে পারবাে না-আপনি
মটরে উঠে আসুন।”
*এতই মমতা তােমার হৃদয়ে ?”
“মমতাও বুঝি না, আব নিৰ্ম্মমতাও বুঝি না
আসুন—উঠে আসুন ব’ছি।”
মিনতিবা আজ্ঞাটা তার আশুবাবু যেন ইচ
করতে পারলেন না।
Ola
3' ৫
“এ ঘরটা আপনার কেমন লাগছে
“সুন্দর। আমি যেমনটা চাই। বেশ দক্ষিণ খােলা। সকালে
ও সন্ধ্যায় যখন মধুব বাতাস বাইরের মাঠে ঘাসের গন্ধ বয়ে আনে,
মন আনন্দে নেচে ওঠে। চোখ দুটো থাকলে হয়তো গ্রামের সৌন্দর্য
আরও বেশী কোরে উপভােগ করতে পারতুম।”
মেয়েটা আনমনে বলে ফেলে, “চোখ দুটো থাকলে যে কি হ'তে
তা’ বলা শক্ত।
হয়তো-
“হয়তো আমি বেঁচে থাকতুম না এতক্ষণ, নয় কি?”
বি এল করে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে যেতে পারে না-লেনি
পরে উঠে আসুন।”
*এতই ক্ষমতা তাের হৃদয়ে?”
“মমতাও বুঝি না, আর নির্মমতাও বুঝি না। আপনি উঠে
আন—উঠে আসুন ব’ছি।”
মিনতিভা আজ্ঞাটা তার আশুবাৰ যেন ইচ্ছাসত্ত্বেও অবমাননা
করতে পারলেন না।
Old
ন
“এ ঘরটা আপনার কেমন লাগছে
“সুন্দর। আমি যেমনটা চাই। বেশ দক্ষিণ খোলা।
ও সন্ধ্যায় যখন মধুর বাতাস বইয়ের মাঠের ঘাসের গন্ধ বয়ে আনে,
মন আনন্দে নেচে ওঠে। চোখ দুটো থাকলে হয়তাে আয়ের সৌন্দর্য
আরও বেশী কোরে উপভােগ করতে পারতুম।”
মেয়েটা আনমনে বলে ফেলে, “চোখ দুটো খাল যে কি হতে
“হয়ত্মে আমি বেঁচে খাতুম না এতক্ষণ, নয় কি?”
১৮
অন্ধের যষ্ঠি
“না, ঠিক তা নয়। হয়তো আপনাকে এমন কোরে কাছে পাওয়া
সম্ভব হতো না।”
সানের চেয়ারটীতে বসে মেয়েটা চুল আঁচড়াচ্ছিল। চিরুণীর
শব্দ থেকে অন্ধ তার কেশের দৈর্ঘ্য আন্দাজ করে নিচ্ছিলেন। রমণী
বােধ হয় সুন্দরী। কথাবার্তা থেকে বােঝা যায় শিক্ষিতা। যে কদিন
আবার এখানে আছেন তাঁর সেবা যত্নের কোনই ক্ৰটী নেই। মেয়েটা
সর্বদাই কাছে কাছে থাকে। গল্পগুজব কোরে সময়টা
কোরে সময়টা এক রকম
মন্দ কাটে না। কথা কইতে কইতে মেয়েটী হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে
আশুবাবুর পাশ দিয়ে জাল্লার ধারে গিয়ে দাড়ালাে। একটু ইতস্তত
করে তিনি প্রশ্ন করলেন, “দেখ, ক’দিন তােমার সঙ্গে কাটালুম
কিন্তু আজ পর্যন্ত তােমার নামটাও জাতে পারলুম না। তুমি কি
সম্পূর্ণভাবে গােপন রাখতে চাও?”
"জেনে আপনার গাভ? আচ্ছা আপনার বয়স কত আশুবাবু?”
“সেটা জেনেই বা তােমার লাত কি
? কত বয়স তুমি আন্দাজ
“বােধ হয় ২৭২৮শের বেশী নয়।”
“তা’ 'লে তাই। তােমার কত ?”
মেয়েটী চুপ কোরে রইলো। আবাবু আবার বলে, “বুঝেছি।
সেটাও তুমি আমার কাছে লুকিয়ে রাখতে চাও। তােমার কোনও
কিছুই আমাকে জানতে দেবে না? বেশ !”
“রাগ করলেন আপনি?
“না-রাগ কেন করবাে। তারই ওপর মানুষ রাগ করতে
অন্ধের যষ্টি করেছেন শুধু তার বয়স হবে ১৯২০ বছর। সে যখন সরে যায় ফিরে আসতে প্রায় ঘণ্টা তিন চার দেরী হয়। তা হলে তিনি সহর থেকে খুব বেশী দূরে নেই। কি মতলব করলে জানা যায় অন্ততঃ গ্রামটাব নাম । তা হলে তো পাপিষ্টগুলােকে একদিন না একদিন বিচারকের সমুখে নিয়ে গিয়ে দাড় করানো যাবে। কৌশল করতে হবে। মেয়েটার সঙ্গে আরও বেশী ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়তে হবে। মেয়েটা ফিরে এসে একেবাবে তব গা ঘেসে চেয়ার টেনে বসলাে। “দেখুন তাে এটা পড়তে পারেন কিনা। আমি অবশ্য সব চেয়ে সহজ বইখানাই কিনে এনেছি।” “দেখ, আমার মনে হয় কি এটা না হয় পরে চেষ্টা করবাে। তুমি বরং একটু খবরের কাগজ পড়ে আমাকে শােনাও। বিশ্বের সমস্ত সম্পর্কের বাইরে বাস কবে জীবনটা যেন দুর্বহ হয়ে উঠেছে।” “বেশ, তাই যদি আপনার ইচ্ছা হয় শুনুন।” টেবিলের ওপর থেকে খৰবের কাগজটা টেনে নিয়ে সে পড়তে সুরু করলাে। আশুবাবুও চুপ কোবে শুনতে লাগলেন। বাইরে থেকে এক একটা দক। বাতাস ছুটে এসে মেয়েটীর চুলগুলি উড়িয়ে দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে এক, এক থােকা সুবাসিত কুন্তল উড়ে এসে আন্ধের কপােল স্পর্শ ক’ৰছিল। মেয়েটা পড়ে যাচ্ছিল। দক্ষিণ কলিকাতার হত্যা রহস্য “সে রাতের অদ্ভুত হত্যা-রহস্য আজিও রহস্যই রহিয়া গেল। শত চষ্টাতেও পুলিশ এখনও তাহার কোন কিনারা করিতে পারে নাই
অন্ধকারের অন্তরে
জানিয়া আমরা দুঃখিত। এত বড় একটা কাও কি শেষ পর্যন্ত অমীমাং
সাত থাকিয়া যাইবে? আমরা সে সম্বন্ধে যথেষ্টই সন্দিহান। হত্যাটি
সাধারণ ভাবে সঘটিত হয় নাই। ইহার তদও সাধারণ ভাবে
করা যাইবে না। আমরা এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি বিশেষ ভাবে
‘গকর্ষণ করিতেছি। কোনও অসাধারণ গােয়েন্দা নিয়ন্ত্রণ করিতে না
পাবিলে পুলিশকে যে অন্ধকারেই ঘুবিয়া মরিতে হইবে একথা আমরা
দৃঢ়
বিশ্বাসের সহিত বলিতে পারি।”
“এটা তুমি আমায় শোনালে কেন?”
“আপনি শুনতে চাইছিলেন বলে।”
“ঠিক কি তাই? আমি তাে অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলুম।
সৰ তুমি গােপন করে গেছে। এমন কি তােমার নামটা—তাও তুমি
জানতে দিতে চাও না।
“অথচ এন এটা পড়ে শােনাতাম কেন ? সত্যি কথা ব’তে,
আপনাকে পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিতে যে এখনও কিছুই ধরা পড়েনি
সুতাং আপনি শীঘ্রই নিবাপদে নিজস্থানে ফিরে যেতে পারবেন আল
আমি ও আমাৰ পথ দেখতে পারবাে।”
ব’তে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে বল্লে, “আৰ কণ নয়, আমাৰ
সেই বন্ধুটী আসছে। আপনাকে আবার লুকিয়ে পড়তে হবে।”
মেযেটী তার হাতটা ধরে একরকম টানূঙ্গে টাতে
পাশের ছোট
ঘবটায় নিয়ে গিয়ে বন্ধ করে রাখলে। এ ব্যাপার অবশ্য আশুবাবুর কাছে
নূতন নয়। যে ক’দিন তিনি এখানে আছেন, প্রায় প্রতিদিনই একবার
২২ অন্ধের ষষ্ঠি কোরে অকে এমন অজ্ঞাতবাস করতে হয়েছে। বাইরের জন প্রাণীকেও মেয়েটা আঁ অবস্থিতি সম্বন্ধে জানতে দিতে চায় না। মেয়েটার সঙ্গে নবাগতার কি কথা হলাে আশুবাবু বিশেষ কিছুই জানতে পেলেন না। কেল বহু চেষ্টায় দু'চারটে কথা মাত্র বােধগম্য হলাে। একটা বিশেষ প্রয়ােজনীয় কথা তিনি জেনে ফেল্লেন, মেয়েটার নাম। নবাগতা ব’ছে, “আচ্ছা সুবর্ণা, এবারে দেখছি তুই যেন কেমন 'য়ে গেছি, সর্বদা বাড়ীর ভেতর বসে থাকিস, একবার ভুলেও আমাদের বাড়ীমুখো হ’ না, ব্যাপার কি বলতাে? একলা একলা বসে করিস কি ? এবারে তার ওপর তাের মাকেও সঙ্গে আনিস নি- মাত্র এই ঝি চাকর সম্বল। ওরাই যা করে।” সুবর্ণা জবাব দিলে, “তা’ কি করবাে ভাই, মাকে আসতে বন্ধু, এলাে না। অথচ আমারও মনটা সহরে যেন কিছুতেই টেক্তে চাইছিল । বাবাকে বল্লম, তিনিও কাজের তাড়ায় আসতে পারলেন না। কাজেই “তােদের সহরের মেয়েদের বেশ মজা । একলা একলা যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, মটর চালাচ্ছি, নিজেই ; বেশ আছিস, ভাই কিন্তু।” অন্ধ আর বিশেষ কিছু শুনতে পেলেন না। মনে হলাে সুবর্ণ। যেন তার বন্ধুরীকে একরকম জোর করেই সে ঘর থেকে বার করে নিয়ে গেল। তিনি মনে মনেই হাসলেন। খুব চালাক মেয়ে। পাছে তিনি কিছু শুনে ফেলেন—তার ওপর মেয়েটা যে রকম আরম্ভ করেছিল ;
অন্ধকারের অরে
হয়তাে তার মুখ থেকে আরও কিছু দরকারী কথা বেরিয়ে আসতে
পারতাে।
কিছুক্ষণ পরে মেয়েটা
যখন ফিরে
पाम
মুক্ত
করে দিলে, হাসতে হাসতে তিনি বল্লেন, “মেয়েটাকে তুমি অমন
তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বার করে নিয়ে গেলে কেন?
পাছে আমি
কিছু জেনে ফেলি তােমার সম্বন্ধে ?”
“দেখুন, আপনি আমাকে অমন পদে পদে খেচাবেন না। যদি তাই
আপনার মনে হয়ে থাকে, আমাবও সে কথা স্বীকার করতে আপত্তি নেই।”
“যে মেয়েটী এসেছিল ওব নাম কি বলতো? সেটা ব’তে বােধ হয়
কিছু আপত্তি নেই ?”
“ওব নাম কল্পনা। কিন্তু সেটাই বা আপনি জানতে চান কেন?”
এমনি খেয়ালের বশে। কল্পনার বন্ধুর নামটা যদি সুবর্ণা হয় তো
আমার বেশ ভাল লাগে।”
মেয়েটা চম্কে বলে উঠলাে,
বলে উঠলাে, “সৰ্ব্বনাশ!
ফেলেছেন
বুঝি আমার নামটা !”
“তােমার নাম বুঝি সুবর্ণা ? বাঃ, নামটা অতি সুন্দর।”
“কি করে জানলেন আপনি ?”
“তুমিই এইমাত্র জানিয়ে দিলে। তুমি ভয় পাচ্ছে ? ভয় পাবার
কি আছে সুবর্ণা ? আমার পক্ষে তােমার বিরুদ্ধে যাওয়া বােধ হয়
সম্ভব হবে না কখনও।"
সেই সময় হঠাৎ বাইরের দরজাব কাটা নড়ে উঠলাে। সুবর্ণা বলে,
“ভাল জ্বালা, আবার বোধ হয় কল্পনাটা ফিরে এলো।”
অন্ধের যষ্টি
এ
আশুবাবুকে তেমনই ভাবে লুকিয়ে রেখে সে দরজা খুলতে বেরিয়ে
গেল। একটু পরেই আশুবাবু তাদের কথােপকথন শুনতে পেলেন।
“তাহ বলি কেন তুই অমন ব’তে গেছিস। বাড়ী থেকে বেরুব্বেই
চা, না! তাের সঙ্গীটী কে বলতাে?”
“তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে কল্পনা ? সঙ্গী আবার কে ?”
“মনে করছিস, আমি দেখিনি ওকে? তবে শােন্-একটা সুন্দর
যুবক। তার মত সুপুরুষ বােধ হয় হাজারে একটা মেলে। একটু
আগে চুল আঁচড়াতে আচড়াতে যখন তুই জান্নার ধরে উঠে গেছ,লি-
আমি ঠিক খড়খড়িটার পাশেই লুকিয়ে ছিলুম!”
সুবর্ণা দেখলে এর কাছে আর আশুবাবুর উপস্থিতিটা কোনও
ক্রমেই লুকুনো চলবে না। অথচ তাকে কোনও অাত্মীয় বলে পরিচয়
দিলেও সেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না। একটু চুপ কোরে থেকে সে
বল্লে, “দেখ, ভাই, তুই যখন জেনেই ফেলেছিস জিনিষটা আমি আর
লুতে চাই না।
তবে দোষনীয় কিছু যেন ভেবে নিনি।”
“না দোষনীয় কি ভাবতে পারি ভাই ? একজন যুবকের সামনে
যদি কোন যুবতী নিতান্ত অসংবৃতভাবে চুল আঁচড়ায়, তাতে
‘যা তা বলিস নি কল্পনা। ও যে আমার স্বামী।”
উপায়ান্তর না
দেখে কলঙ্কের হাত থেকে বাচবার জন্যে সুবর্ণ। চট করে কথাট।
ব'লে ফেলে।
“তোর স্বামী ? কই তাের বিয়ের কথা তাে আমরা কিছুই
শুনিনি?”
“আমি কাউকে জানাইনি। ভালবেসে ফেলেছিলুম-তাই ওকে
অন্ধকারের অন্তরে
গােপনে বিয়ে করেছি। বাবা মা পর্যন্ত এখনও জানেন না কথাটা
তাের পায়ে পড়ি কল্পনা, একথা যেন আর কেউ না জেনে ফেলে।”
‘‘আমি কাউকে বল্বাে না। আমায় তুই তেমন ভাবিস নি।
কিন্তু এইটুকু যা দুঃখুজিনিষটা তুই আমার কাছেও লুকিয়ে রাখতে
গিছ লি।”
“আমায় দোষ দিস নি ভাই তাতে। আমি লজ্জায় বলিনি।”
কথাটা শুনে আশুবাবু একটু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
৫
-0-
(৫)
ক'দিন পরের কথা। তিন দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি হবার পর
সেদিন একটু ধরেছে। আবার সুবর্ণার যত্নে বেশ পরিতৃপ্তি লাভ
করেছেন। এক একবার ভাবেন হয়তাে সবটাই তার অভিনয়। খুনীর
মন্ত্রণায় হয়তাে তার প্রতি এই আচরণ দেখায়। অথচ সময় সময় তার
ব্যবহারে যেন প্রাণের স্পন্দন অনুভব করা যায়। সুবর্ণা সেদিন সহ
গিছলাে। তিনি একলা বসে বসে এমনই সব অবান্তর চিন্তা
করছেন। আর সময় সময় সুবর্ণার দেওয়া অন্ধ-পাঠ্য বইখানির
লেখাগুলির ওপর দিয়ে হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ ঘরের মধ্যে
অন্ধের যষ্ঠি
খস খস, পায়ের শব্দ শােনা গেল। অন্ধ বলে উঠলেন, “ফিরে এলে
সুবর্ণা ?”
“এলুম। আচ্ছা আপনার কোনও আত্মীয় স্বজন আছেন কি?
তিনি আপনার খবর করতে পারেন ?”
“আত্মীয় আছেন বটে অনেক কিন্তু আমার খবর নেবার মত কেউ
নেই। সে কথা তাে তোমাকে আগেই বলেছি।”
“তবে নিশ্চয়ই এ পুলিশের ব্যাপার। শুনুন, আজ খবরের কাগজে
যা বেরিয়েছে—অবশ্য নিরুদ্দেশ কলমের ভেতর-”
আশুতােষ বসু কিছুদিন আগে দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী
এভিনিউ হইতে রাত্রি সাড়ে দশটার সময় নিরুদ্দেশ হইয়াছেন। যদি
কেহ তাহার সংবাদ দেন যথেষ্ট পুরষ্কার পাওয়া যাইবে।”
আশুবাবু শুনে একটু চমকে উঠলেন। পুলিশই যদি হয়, কেমন
করে তারা তার নাম জালাে ? তারা কি তঁাকেই খুনী সাব্যস্ত
করেছে ?
“কি বলেন আশুবাবু ?
“কি ব’বাে সুবর্ণা ?”
“দেখুন, আজ যখন সহর থেকে ফিরছিলুম দু'একজন নতুন লােককে
গ্রামের ভেতর ঘুরে বেড়াতে দেখলুম। মটরটা সবেমাত্র গেটের ভেতর
চুকিয়েছি, কল্পনা ছুটতে ছুটতে এসে বল্লে, সে নাকি একজন লােককে
অন্ধকারের অন্তরে
२१
আমাদের বাগানের ভেতর লুকিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।
এ সব কি
আশুবাবু ?”
“বুঝতে পারছে না সুবর্ণা? পুলিশ ছাড়া আর কি হতে পারে?
“তাই যদি হয় তা হলে উপায়?”
“উপায় এখান থেকে পালানাে ভিন্ন আর কিছু নেই।”
“কিন্তু কোথায় যাবে?
“সেটা তুমিই ঠিক কর।”
অস্থিরভাবে খবরের কাগজখানা নাড়তে নাড়তে মেয়েটা বলে
উঠলো, সৰ্ব্বনাশ-এ আবার কি?”
“কি হলো তােমার সুবর্ণা ?”
‘‘আমি এটা আগে দেখিনি-শুনুন,
দক্ষিণ কলিকাতার হত্যা রহস্য
শীঘ্রই আসামী গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা
“এতদিন ধরে আমরা এই হত্যা ব্যাপার সম্বন্ধে একান্ত অন্ধকারে ছিলাম।
আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতার নিকট হইতে মাত্র এইটুকু জানা গিয়াছে
যে এই ব্যাপারে একটা পুরুষ ও একটী নারী সংশ্লিষ্ট আছে। আরও
প্রকাশ এই যে বােধ হয় ২৪ ঘণ্টার ভিতর তাহাদের গ্রেপ্তার করা
সম্ভব হইবে। ইহার অধিক যাহা আমরা জানি তাহা প্রকাশ করায়
এখন পুলিশের আপত্তি আছে। সুতরাং অদ্য এইখানেই আমাদের
চুপ করিতে হইল।”
অন্ধের খছি পড়েই সুবর্ণা বলে উঠলাে, “আর উপায় নেই আশুবাবু, বোধ হয় 'আমরা ধরা পড়লুম।” “অত গুলিয়ে যাচ্ছে কেন? শােনো, আমার প্রশ্নের জবাব দাও। কল্পনা যে লােকটাকে দেখেছে তার সম্বন্ধে তার ধারণা কি?” “সে বলে বােধ হয় বাবা আমার চরিত্রে সন্দিহান হয়ে লােক নিযুক্ত কোরে আমার গতিবিধি লক্ষ্য করছেন।” ‘পুলিশ বলে কোনও সন্দেহ সে পােষণ কবে না?” “না।” “তা হলে এখনই এখান থেকে পালাবাব ব্যবস্থা কব। তােমাকে আমাকে এক সঙ্গে ধ’বলে রক্ষা নেই। তা হলে তুমি যাকে বাচাবাব জন্যে এত কষ্ট ক’বছো-তাকে লুকিযে বাখা সম্ভব হবে না।” “’ হলে আমাদের তাে কোথাও গিয়ে এক সঙ্গে থাকা ও সম্ভব নর।” “নিশ্চয়ই ন্য। সেই মত ব্যবস্থাই তােমাকে ক’বতে হবে । নইলে উপায় নেই।” “তবে চলুন, মটরে কোবে আপনাকে কোনও দূব দেশে রেখে আসি।” “সে মন্দ যুক্তি নষ। কিন্তু সুবর্ণা, তুমি যেন আমায় কেমনতব কবে দিয়েছে। তােমাব একটা ঠিকানা কিন্তু আমায় দিয়ে যাও। যাতে ভবিষ্যতে কোনও দিনও আমি সন্ধান কোবে তোমার সান্নিধ্য লাভ কবিতে পারি।” “একে এই ভয়ানক ব্যাপার মাথায় তার ওপর আমার বাবা আছেন, মা অাছেন-তা হয় না আশুবাবু।”
অন্ধকারের অন্তরে
সুবর্ণা ! তুমি হিন্দু?”
“নিশ্চয়ই।”
“কল্পনার কাছে তুমি আমায় স্বীকার করেছ স্বামী বলে ?”
সুবর্ণা শিউসে উঠলো।
“সে আমার মুখের কথা আশুবাবু, প্রাণের কথা নয়। আর দেরী
করবেন না অনুন।”
আশুবাবুর হাত ধ’বে সে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গ্যারেজের দিকে চলতে
সুরু ক'লো।
কুণ্ঠিত কণ্ঠে তৰ্দ্ধোচ্চারিত ভাষায় আশুবাবু বল্লেন, “আর যদি সত্যি
প্রাণের কথা হয় সুবর্ণা ?”
“চুপ করুন-চুপ করুন। আশুবাবু, আপনি না অন্ধ ?”
“অন্ধ!” একটু চুপ করে থেকে আশুবাবু বল্লেন, “জানি না সুবর্ণ,
প্রেম বোধ হয় আমার চেয়ে আরও বেশী অন্ধ।”
সেই সময় তার হাতটা টেনে সুৰণা তাকে মটরের সিটে বসিয়ে
দিলে।
No text on this page.
সম্পাদকের মন্তব্য
সম্পাদকের মত নিরীহ ব্যক্তির পক্ষে অদ্ভূত
ভাবে খুন হওয়া কি সত্যই অস্বাভাবিক নয়?
খুন সম্বন্ধে যতটুকু জানা গেল—তা থেকে আসামী
ঠিক করা বড় সহজ ব্যাপার নয় ; কেউ কেউ
বলে অন্ধই খুনী। কিন্তু অন্ধ আজ কোথায় ?
No text on this page.
Old P0 DIN # ure) ( ৬ ) নিহত ব্যক্তি “অন্দর মহল” কাগজের সম্পাদক ছিলেন। আমি ছিলুম তার একজন গুণ-মুগ্ধ বন্ধু। তখন আমি সবে মাত্র একটা ছােট দৈনিক কাগজেব সহকারী সম্পাদকের পদে নিযুক্ত হয়েছি। ম্পাদনা সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান না থাকায় এবং “অন্দর মহল”-সম্পাদক ভূপতিবাবুর লেখাগুলির মাধুৰ্য উপলব্ধি কবায় আমি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ কবি। অতি সাধারণ ঘটনাকে লেখার কায়দায় লােক-চক্ষে কেমন রঙ্গীন কবে ধরা যায়, তিনিই আমাকে তা প্রথম শেখান। তাঁর নিজেরও বৈশিষ্ট্য ছিল ঐজয়েই তিনি কলিকাতার একজন প্রসিদ্ধ সম্পাদক বলে খ্যাতি অর্জন ক'বেছিলেন। কাগজখানি যদিও সাপ্তাহিক ছিল, তার দেহের পরিসর নেহাৎ মন্দ ছিল না। এক একটা সংখ্যায় কম করে ৮টী পৃষ্ঠা থাকতো। সত্য সামাজিক ঘটনাব উপর ছিল তাঁর লেখার ভিত্তি। তাঁর কলমের ভগায় কোন কিছু প্রকাশ করতে যেন বাধতে না।
তিনি যে দিন নিহত হন, সেদিন দুপুর বেলা টেলিফোন করে তিনি আমাকে তার বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করেন এবং এমন কথাও বলেন, যদি আমার আপত্তি না থাকে তা হলে সে রাত্রিটা আমি াঁর বাড়ীতেই কাটাক্তে 'বি কি না। তার এ নিমন্ত্রণ আমি খুব সাদবেই গ্রহণ করতুম কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেদিন সন্ধ্যায় কংগ্রেসের এক মিটিং থাকায় এবং আমি আপিস কর্তৃক সেখানে রিপােটার নিযুক্ত হওয়ায় বাধ্য হয়েই তা গ্রহণ করতে পারিনি। তাঁকে যখন আমার অবস্থার কথা জানালুম, তিনি বল্লেন, যদি আমি সন্ধ্যার দিকে নাও যেতে পারি---অন্ততঃ মিটিংয়ের পবে যত রাতই তােক তার সঙ্গে যেন নিশ্চয়ই গিয়ে দেখা কবি। আমি সম্মতি জানিয়ে টেলিফোন ছেড়ে দিই। মিটিং ভাঙ্গতে প্রায় রাত দশটা বেজে গেল। ভাবলুম সেখান থেকেই সটান ভূপতিবাবুর বাড়ী চলে যাই। কিন্তু শরীরটা তখন এমন খাবাপ ঠেকছিল যে বাড়ী ফিরে একটু না জিরিন্ধে আর কিছু করতে যেন সন পছিল না। এখন ভাবি, যদি আমার শরীরকে সামান্য আরাম দেবার বাড়ী ফিরে না যে তা হলে বােধ হয় যথা সময়ে গিয়ে ভুপতিবাবুব জীবন বক্ষা করতে সমর্থ হন। রাত ১২টা নাগাদ একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়ী থেকে বেরুতে যাচ্ছি এমন সময় প্রযুলবাবু এৰে চেপে ধরলেন। আমাদের কাগজে ছাপাবার ঙ্গে তিনি একটা ইতিপূর্বে সঙ্গটিত হত্যাকাণ্ডের অনেক খবর সংগ্রহ করে এনেছেন—আমাকে তার নােট লিখে নিতে হবে। প্রফুল্লৰাবু, এখন দরে লােক। তাঁর খবরগুলির জন্যে আমাদের কাগজ অনেক পয়সা খরচ করে, কাজেই কাগজ কলম নিন্থে বলে যেতে হলাে। কাজ সেয়ে চেয়ে দেখি ঘড়িতে গড়ে এগারােটা। এতে বা বেকে বেবিয়ে পড়লুম। রাত্রি প্রায় ১২টা নাগাদ রাসবিহারী এভিনিউয়ে আর ঝড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হলুম। বাড়ীটার চাবদিক অন্ধকার। আমি আশা ককেছিলুন ভূপতিবাবু নিশ্চয়ই আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন। 'ভাবলুম, এত রাত হতেই বােৰ হব তিনি বসে বলে হয়রান হয়ে শুয়ে পড়েছেন। ক’রছিল ফিরে আসি; আবার ভালু-না, যখন এসেছি, অন্ততঃ জানিয়ে যাই-নইলে তিনি হয়তো আমার ওপর অসন্তুষ্ট হলেন। আমি যে কথা রেখেছি এতাঁকে জানাতেই হবে। দবজায় কড়া নাড়তে গিয়ে দেখলুম সেটা শােলা রয়েছে। চারদিক অন্ধকার অথচ দরজা খােলা-একটু আশ্চর্য হয়ে গেলুম। তাঁর বাজীতে কোনও স্ত্রীলােক খাতেন না তাই নির্ভাবনায় ঢুকে সিঁড়ির ইলেটি কটা জেলে ওপরে উঠে গেলুম। সামনের খব খানাতে ঢুকে আরও বেস্ট অবাক হয়ে গেলুম। ঘরের ভেতর বিশৃঙ্খলা আমাকে গভীর ভাবে সন্দিহান করে তুঙ্গে। এগিয়ে গিয়ে হেখি টেবিলের পেছনে ভূপতিবাৰু মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। তিনি বিপত্নীক, গৰি দুটা চাকর ছাড়া বাড়ীতে আর জনপ্রাণ কেউ থাকতাে না। ব্যাপার দেখে ভয় পেয়ে আমি তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এসে দিলুম। কোণের ঘর থেকে দুজন চাকর চোখ রগড়াতে গড়াতে যেবিয়ে এলাে। তারা দুজনেই আমাকে চিনতাে। একজন বলে, “এই যে আপনি এসেছেন। বাবু অপৰাৰ তে ওপরে বসে আছে, চলুন।”
অন্ধের যষ্ঠি
“আমি ওপরে গিয়েছিলুম। বাবু খুন হয়েছেন। সে খবর তোমরা
রাখ না ?”
দুজনে এক সঙ্গে বলে উঠলাে, “খুন হয়েছেন ?”
“হঁ্যা, তােমাদের ভেতর একজন
ভেতর একজন চট করে থানায় গিয়ে খবর
দাও। আর একজন হিরে ডাক্তার ডেকে নিয়ে এসাে।”
বৃদ্ধ চাকরটী বলে, “কে খুন করলে বাৰু ?”
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ ইন্সপেক্টর, সাব ইন্সপেক্টর ও টী পুলিশ
সঙ্গে মটরে করে সেখানে উপস্থিত হবেন। ডাক্তারের পৌছুতে বেশী
সময় লাগলাে না। ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে মৃত দেহ পরীক্ষা করতে লেগে
গেলেন। ইন্সপেক্টর সাহেব ঘরটার চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে
লাগলেন।
পরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার বল্লেন, “যে লােকটা খুন করেছে মনে হয়
সে এ কাজে দক্ষ-হস্ত।”
কি করে জানলেন?”
‘সাধারণতঃ কাচা লােকে খুন করলে ছুরিটা নীচের দিকে ৰসায়--
এ ক্ষেত্রে সেটা ওপর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।”
“তা হলে দাগী খুনী?”
ডাক্তার ইতস্ততঃ করে জবাব দিলেন, “অসম্ভব নয়।
ইন্সপেক্টর আকার ঘরটার চারদিকে দেখতে লাগলেন। কোনও
কিছু জিনিষই তিনি স্থানচ্যুত করলেন না। কিছুক্ষণ পরে তিনি পাশের
ঘরে প্রবেশ করলেন এবং প্রায় পনেবে মিনিট পরে একটী মােটা
লাঠি হাতে করে বেরিয়ে এলেন।
সম্পাদকের মন্তব্য ডাক্তারের দিকে লাঠিটা এগিয়ে দিয়ে ইন্সপেক্টর প্রশ্ন করলেন, ডাঃ ঘােষ বলতে পারেন যে লােকটা এই রকম লাঠি ব্যবহার করে তার কত খানি লম্বা হওয়া সম্ভব ?" ডাক্তার ঘােষ লাঠিটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি মনে কবেন এটা খুনীই এখানে ফেলে রেখে গেছে ?” ইন্সপেক্টর ঘাড় নেড়ে বললেন, “পুলিশ অফিসারদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমানের ওপর কাজ করতে হয়। কোনও জিনিশই সে নির্ধাবিত ভাবে সত্য বলতে পারেনা।” ডাক্তাব ঘােষ বল্লেন, “সহজ ভাবে এমন একটা লাঠি ব্যবহার করতে হলে লােকটার অন্তত ছ' ফুট লম্বা হওয়া সম্ভব।” পুলিশের কাজ মিটতে রাত অনেক হলো আমার নাম ধাম লিশে নিয়ে আমায় ছেড়ে দিলেন। পবের দিন সকালে সবে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছি, একজন পুলিশ এসে আমার হাতে একখানি চিঠি দিয়ে সেলাম করে দাড়ালাে। ইন্সপেক্টর বাবু অনুবােধ করে লিখেছেন পত্র পাঠ আমাকে ভূপতি বাবুর বাড়ী যেতে। জামা কাপড় পরে বেরিয়ে পড়লুম। রাসবিহারী এভিনিউয়ে যখন পৌছুলুম, দেখি বাড়ীটার সামনে ভিড় জমে গেছে। তাকে সামলাবার জন্যে গেটে দু’জন পুলিশ মােতায়েন রাখা হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে আমাকে দেখতে পেয়ে ইন্সপেক্টর এগিয়ে এসে আমাকে সঙ্গে করে বাড়ীর মধ্যে অন্ধের যষ্টি নিয়ে গেলেন। বল্লেন, “ডিটেকটিক, অমর বাবু আপনার সঙ্গে দেখা কাবাব জন্যে বসে আছেন।” দোতলার ঘরে গিয়ে ঢুকলুম। ডিটেকটিভ অমব বাবু তখন একটা ম্যাগনিফল দিয়ে দেয়ালটায় কি লক্ষ্য করছেন। ইন্সপেক্টর বলেন, এসছেন।” অমরবাৰু একবার মাত্র আমার দিকে চেয়ে একটা চেয়াব দেখিয়ে দিলেন। কোনও কথা বল্লেন না। বসতে গিয়ে নজর পড়লাে প্রফুল্লবাবু একটা চেয়ারে চুপ করে বসে আছেন। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, আপনি এর মধ্যে খবর পেয়ে গেছেন।” তিনি বল্লেন, “আজ্ঞে হ্যা, কাগজে যে রিপোর্টটা আপনি পাঠিয়ে- ছিলেন সেইটা পড়েই আমি সােজা এখানে চলে এসেছি।” প্রফুল্লবাবু আব কথা কইলেন না। চুপ কবে ডিটেটিভেব কাৰ্য- কলাপ দেখতে লাগলেন। হঠাৎ আমার চোখ পড়ল চুণ কাম কৰা সাদা দেয়ালের গায়ে খানিক তফাতে তিনটে করে আঙ্গুলের কালো কালাে ছাপ বয়েছে। সেইগুলিই অমর বাবু নিবিষ্ট চিত্তে পরীক্ষা করতে ব্যস্ত। প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা পকেটে পুরে তিনি এসে আমাৰ সামনে দাড়িয়ে বল্লেন, “আপনার কাছে কিছু আমার জান্বার আছে।” “বলুন, আমি যা জানি বলতে কুষ্ঠিত হবে না।” “ভুপতিবাবু কাল রাত্রে নিশ্চয়ই আপনার প্রতীক্ষা করছিলেন?” “কি কবে জানলেন? “আমি তব চাকবদের কাছ থেকে জেনেছি।”
সম্পাদকের মন্তব্য ৩৯ “আপনি ছাড়া আর কেউ নিমন্ত্রিত হয়েছিল জানেন কি?” “সে সম্বন্ধে অব সঙ্গে আমার কোনও কথা হয়নি; সুতরাং জানিনা।” “রাত ১২টার সময় আপনি এখানে এসেছিলেন?” “১২টার দু’পাচ মিনিট পরে।” ‘‘আপনার বাঁ হাতটা দেখি।” আমি হাতটা দেখালুম ; অনেকক্ষণ ধরে তিনি জ্যোতিষীর মত সেটা নিৰীক্ষণ করতে লাগলেন। খানিক পরে হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলেন, “হযেছে, এখন বলুন তাে ঘরে ঢুকে প্রথমেই আপনি কি দেখলেন ?” টেবিলটা বিশ্রী ভাবে এক পাশে ঠেলা, চেয়াব গুলো এখানে ওখানে ছড়ানাে-মেজেব ওপব ভূপতিবাবুব মৃত দেহ।” “ব্যাপাব দেখে আপনি ভয় পেয়ে টেবিলটাকে চেপে ধরেছিলেন ?” “আমার মনে নেই।” “এটা অস্বীকার করে আপনার কোনাে লাভ নেই। এই দেখুন।” টেবিলেব ওপব একখানি খবরের কাগজ পড়ে ছিল সেটা তুলে নিতেই দেখলুম খড়ি দিয়ে চাটী দাগ মা ব’য়েছে। তিনি আরম্ভ করলেন, “এই চারটী আপনার বাঁ হাতেব আঙুলের দাগ। বুড়ো আঙুলটা কাঠের নীচেব দিকে আছে। এগুলি বেশ পবিধাব ছাপ সুতরাং আপনি যে বেশ জোর করেই টেবিলটা চেপে ধরেছিলেন তাতে আব সন্দেহই নেই। মাঝের আঙ্গুলটার ছাপ থেকে বেশ বােঝা যায় আপনি খুব বেশী ভয় পেয়ে গিছলেন।” “ভয় পেয়েছিলুম সত্যি—কিন্তু টেবিলটা যে আমি কখনই ধরেছিলুম ব’রা মনে করতে পারছি না।”
“যাক ওকথা।” বলেই তিনি গতরাত্রের লাঠিটা হাতে কবে
জিজ্ঞাসা ক’বলেন, “এটা আপনার লাঠি নয়তাে?”
“না। আমি মােটেই লাঠি ব্যবহার করি না।
“আচ্ছা বেশ ভাল কোরে লক্ষ্য করুন—ভূপতিবাবুর হাতে এটা
কখনও দেখেছেন ?”
“কখনই না। বিশেষ করে তিনি ছিলেন খাটো লেক-এতখানি
একটা লম্বা লাঠি ব্যবহার তব পক্ষে সম্ভব হতো না।”
“চাকরেও এই কথা বলেছে। তা হলে নিশ্চয়ই এটা খুনীব
লাঠি।”
অমববাবু আমাকে প্রশ্ন করতে বিবত হলেন। প্রফুলবাবুও দেখলুম
চুপ কোবেই বসে বইলেন। এই নীরবতার মাঝে আমি যেন কি বকম
অস্বস্তি অনুভব ক’বতে লাগলুম।
টেবিলেব ওপব কতগুলি জিনিষে
আমার নজৰ প'ডলাে। পুলিশের লােকেই সেগুলি জড়াে কবে এনে
সেখানে বেখেছে। একটা গবম কোট, কতকগুলাে সার্সি ভাঙা কাচ,
একটা সাদা খান, মেয়েদের চুলের সেলুলয়েডের কাটা একটা এবং সেই
মােটা লাঠিটা পরেব পব সাজানাে বয়েছে।
প্রফুল্লবাবু স্তব্ধতা ভঙ্গ করে বল্লেন, “ও বাঁচগুলাে কেন রেখেছেন
‘মবাবু ?”
তিনি জবাব দিলেন, “সার্সিটা যখন ভেঙেছে, আমার খুব আশ এর
ভেতর আসামীর আঙ্গুলেব ছাপ পাওয়া যেতে পারে।”
প্রফুল্লবাবু বল্লেন, “চাকবদের কাছে শুনলেন তো ভূপতিবাবুর কাছে
অমন অনেক লােকই লুকিয়ে লুকিয়ে রাত্রিবেলা এসে দেখা করতে
সম্পাদকের মন্তব্য
৪১
“অন্দর মহল” কাগজের লেখা সম্পর্কে। আসামী ছাড়া অন্য লােকের
হাতের ছাপও তো হতে পারে ?”
অমরবাবু বল্লেন “আমার বিশ্বাস কঁচটা ভেঙেছে খুনের সময়েই সুতরাং
আসামী ব্যতীত আর কারও ছাপ এর ভেতর আসতে পারে না।”
“আচ্ছা দেখাই যাক্।” বলে প্রফুল্লবাৰু পকেট থেকে একটা ছােট
বাক্স বার করে একখানি কাচের টুকরাের ওপর তা থেকে খানিকটা
সবুজ মত পাউডার ছড়িয়ে দিলেন এবং একটা নবম বুরুষ বেৰ কৰে
পাউডাবের ওপর আস্তে আস্তে ঘতে লাগলেন।
সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলি
আঙুলের ছাপ কাচের ওপর পরিস্ফুট হয়ে উঠলাে। ডিটেটিভের দিকে
কাচটা এগিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বল্লেন, “ছােট বড় অনেকগুলি
ছাপই ফুটে উঠেছে—এর মধ্যে কোনটা আপনার আসামীব ছাপ?”
অমরবাবু চিন্তিতভাবে কঁাচটাব দিকে চেয়ে রইলেন।
0
৭
প্রফুলবাবু বল্লেন, “যদি কিছু মনে না করেন—খুন সম্বন্ধে আপনার
সিদ্ধান্তটা আমাদের জাতে দিতে পারেন কি ?”
অমলবাবু বল্লেন, “আপনাকে জানাতে আমার আপত্তি নেই কিন্তু
এখানে যে একজন খবরের কাগজওলা বসে আছেন।” বলেই আমার
দিকে চাইলেন।
R প্রফুল্লবাবু বল্লেন, “না-এ সন্ধে উপস্থিত উনি কাগজে কোনও প্রকাশ করবেন আপনি অসকোচে ব’তে পারেন।” চেয়াটা আমাদের দিকে টেনে এনে অমরবাবু ব’তে আরম্ভ তবে শুনুন। কাল রাত্রে ভূপতিবাবু এই ঘরে বসে একজন লোকের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। অবশ্য সুশীলবাবু ছাড়া। তার প্রত্যাশিত লােকটী না আসায় তিনি প্রথমে ওপাশের সার্সিটা খুলে জালা দিয়ে লক্ষ্য করতে থাকেন। মনে হয় লােকটা“নিশ্চয়ই কাতার অন্য অঞ্চলে থাকেন। এদিকে তার বড় একটা গতিবিধি ছিল না। পাছে তিনি রাস্তা হারিয়ে অন্য কোনও দিকে চলে যান্ সেইজন্যে তিনি ব্যস্ত হয়ে দোতলা থেকে নেমে রাস্তায় দাড়িয়ে তার অপেক্ষা করতে থাকেন। বাইবে অনেকক্ষণ ঘােরাঘুরি করে ব্যর্থ মনােরথ হয়ে অবশেষে বাড়ীতেই ফিরে আসেন। গরম কোটটায় হাত দিলে এখনও বােধ হয় স্যাতসাতানি অনুভব করতে পারেন। সুতরাং এও বলা যেতে পারে যে তিনি নেহাৎ কমঙ্গণ রাস্তায় পায়চারি করেননি।” * আমি বলে ফেল্লুম, “শীতকালে তাে জামা খোলা থাকলে সাত- সাত করে।” “এটা সে রকম নয়। হাত দিলেই বুঝতে পাবেন এটা নিশ্চয়ই শিশিরে ভিজেছিল।” প্রফুল্লবাবু আমাকে ইশারা করে চুপ করতে বলেন, কাজেই মনের ভেতর অজস্র প্রশ্ন জাগলেও তারপর আমি আর একটী কথাও কইলুম না।
সম্পাদকের মন্তব্য অমরবাবুব’লে চক্সেন, ভূপতিবার বাড়ী ফিরেছিলেন একলা। যে লােকের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন, তিনি এসে পৌঁছননি। কারণ পাশের ঘরে একটা মাত্র পাত্রে যৎকিঞ্চিৎ ভুক্তাবশেষ আমি দেখেছি। এখন আমরা একবার আসামীর সন্ধান করি।” তিনি একবার মাত্র চোখ বুজে একটু ভেবে আবার আরম্ভ করলেন, “সে এসেছিল—অতর্কিতভাবে। তখন ভূপতিবাবু দরজার দিকে পেছন করে বসেছিলেন। তখন তার আবার আশা তিনি একেবাবে ছেড়ে দিয়েছিলেন।” “যে লােকটীর আবার কথা ছিল তার চেহারাটা খুব লম্বা, মুখশ্রী অত্যন্ত কদৰ্য্য এবং উপরন্তু খোড়া। লােকটী ঘরে ঢুকে প্রথমে ভূপতি- বাবুকে দেখতে পানি ধারণ চেয়ারের ঠেসান দেবার জাগাটা বিলক্ষণ, উচু এবং সুশীলবাবু বলেন তিনি বেঁটে লােক ছিলেন। ঘরে কেউ নেই ভেবে সে ভরসা করে এগােয়—সেই সময় ভূপতিবাবু খস্ খস্ শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকে দেখতে পান এবং চেয়ার ছেড়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ান। লােকটা তাকে দেখতে পেয়ে প্রথমে পালাবার চেষ্টা করে কিন্তু খোঁড়া পায়ে তা সম্ভব হয়নি। ভুপতিবাবু এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেলেন। ফলে এখানে একটা ধস্তাধস্তি হতে পাকে এবং তা থেকেই চেয়ার টেবিলগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। অবশেষে আগন্তুক জয়ী হয়ে ভূপতিবাবুর বুকের ওপর উঠে বসে—তখন উপায়ান্তর না দেখে তিনি আসামীর চুলের মুটি ধরে আকর্ষণ করেন—এত দৃঢ়ভাবে চুলগুলি তিনি ধরেছিলেন যার ফলে সেগুলি মাথা থেকে ছিড়ে উঠে আসে। সেগুলি আমরা মৃতের হাত থেকে পেয়েছি এবং খামে করে টেবিলের ওপর রেখে, দিয়েছি। ভূপতিবার চুল ধরে যখন টানেন সেই সময়ই আততায়ী তার
৪
অন্ধের যষ্টি
বুকে ছুবিটা বসিয়ে দেয়। এ কাজে সে খুব দক্ষ-হস্ত, তার পরিচয়
পাওয়া গেছে।”
এতক্ষণে প্রফুলবাবু প্রশ্ন ক’বলেন, “আব মাথার কাটাটা ?”
অমরবাবু বল্লেন, ভূপতিবাবু বিপত্নীক ছিলেন। বােধ হয় স্ত্রীর স্মৃতি
চিহ্ন স্বরূপ ওটা সৰ্ব্বদা পকেটে বাখতেন। ধস্তাধস্তি সময় কোনওক্রমে
পকেট থেকে পড়ে গিয়ে থাকবে। আমাদের খুব বেশী কষ্ট পেতে হবে না
প্রফুল্লবাবু-খুনী যথেষ্ট কাচা কাজ করে গেছে।”
“কি বকমে ?”
“দেলের দাগগুলো দেখুন। সে মত্ত মূৰ্থ তাই অমন করে দেয়ালের
গায়ে বক্ত মুছে গেছে।”
অবশেষে প্রফুল্লবাবু বল্লেন, “আপনার ধারণা অধিকাংশই ভ্রান্ত
অমরবাবু।”
“তাব মানে ?'
“লাঠিটা দেখেই আপনি লােকটাকে খোঁড়া ধরে নিয়েছেন।
পাবে সে খোঁড়া নয়।”
“তাব প্রমাণ আপনি কিছু দেখাতে পারেন ?”
“আপনি একজন মন্ত গােয়েন্দা, সুতরাং দর্শন শাস্ত্র বিলক্ষণ জানেন।
আপনাব উক্ত ধারণাটা পােষণ করতে গেলে বলতে হয় প্রত্যেক খোড়া
লােক লাঠি ব্যবহার করে।”
“নিশ্চয়ই।”
“তা হলে সেটা নিছক অন্ধ বিশ্বাসে ধ’বে নিতে হয় অমববাবু।”
“তা হলে আপনার সিদ্ধান্তটা কি রকম ?”
সম্পাদকের মন্তব্য “আমি এখনও কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হইনি। তবে এইটুকু আপনাকে বলতে পারি, আপনার দর্শন অভ্রান্ত নয়।" কথাটার ভেতর যে একটু শ্লেষ লুকানাে ছিল, তা বুদ্ধিমান অমরবাবু তখনই বুঝে নিলেন এবং আমার সামনে পাছে তাকে আরও বেশী অপদস্থ হতে হয় তাই তাড়াতাড়ি স্থান পরিত্যাগের ব্যবস্থা করতে লাগলেন। প্রফুল্লবাবুও ছাড় বার পাত্র নন্। তিনি বলে উঠলেন, “এরই মধ্যে যাচ্ছেন কোথা অমরবাবু ? এখনও অনেক বাকী।” “আমার কাজে আর কিছু বাকী নেই প্রফুল্লবাবু।” “আছে। অনুগ্রহ করে ধীরভাবে আমার একটা কথা ভেবে দেখুন। লােকটা যখন দেয়ালের গায়ে হাত মুছছিল—তখন ঘরের আলােটা জ্বালা ছিল, না নেভানো ছিল ? আমাৰ মনে হয় লােকটার হাত মােছর উদ্দেশ্য ছিল না--সে সুইচটা খুজছিল। দেখছেন হাতের দাগগুলাে ক্রমশঃ সুইচের কাছ অবধি গেছে। অন্ধকারে সে মােটেই বুঝতে পারেনি চুণকাম করা দেয়ালের ওপর কি বীভৎস ছবি আঁকা হয়ে যাচ্ছে। এখন ৩’ হ'লে দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যেতে পারে ঘরটা তখন নিশ্চয়ই অন্ধকার ছিল।” “আপনার এ সিদ্ধান্তও ভুল প্রফুলবাবু-কারণ সুশীলবাবু এসে আলােটা জ্বলাই দেখেছিলেন।” “তা হতে পারে; কিন্তু যে লােকটার কথা হচ্ছে সে নিশ্চয়ই সেটা ব্যালেনি। কেন না হাতের দাগ থেকে বেশ বােঝা যাচ্ছে সে সুইচ অবধি পৌছুতে পারে নি।” “আপনিও ভুল করছেন প্রফুল্লবাবুমশু ভুল।”
প্রফুল্লবাবু বলে উঠলেন, “বেশ, তা হলে আর কথা নেই। আপনিও
চলুন আমিও চলি। দেখি, কে আগে আসামীকে ধ’বতে পারে।”
“চ্যালেঞ্জ করছেন? বেশ, আমি গ্রহণ ক’বলুম। এখন তা হলে
আসি।” বলেই তিনি ইন্সপেক্টব, পুলিশ এবং টেবিলের ওপবের জিনিষ
সঙ্গে নিয়ে বওনা হলেন।
আমি বল্লুম, “চলুন প্রফুলবাবু, আমবাও যাই।”
তিনি বলেন, “আপনি যান। আমাকে আরও কিছুক্ষণ এখানে
থাকতে হবে।”
“কতক্ষণ।”
“হতে পারে দু'ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা—কি তার চেয়েও বেশী।”
(৮)
দিন দুই পবের কথা ; দৈনিক সংবাদের আপিসে আমার সিটে
ব’সে সম্পাদকীয় মন্তব্য লিখছি, কাগজের সত্বাধিকারী অতুলবাবু এসে
আমার পিছনে দাঁড়িয়ে বল্লেন, “প্রফুল্লবাবু কিন্তু কাজটা ভাল কবেননি
সুশীল। সেই ব্যাপারের পর থেকে অমরবার আমাদের কাগজে আর
কোনও খবর দিতে চাইছেন না।”
সম্পাদকের মন্তব্য ৪৭ আমি বল্লম, “ তাে দেখছি। কিন্তু এই রকমই যদি চলে তা” হলে আমাদের কাগজের দুর্নাম রটে যাবে।” অতুলবাবু বল্লেন, “দেখ তুমি এক কাজ কর। অমরবাবু আজ একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে গেছেন ছাপাবার জন্যে-এই খুন সম্বন্ধে তদন্তের ব্যাপার নিয়ে। সেটী সঙ্গে নিয়ে তুমি একবার প্রফুন্নবাবুর সাথে দেখা কর। এই ক’দিনে তিনি হয়তো কোনও নূতন তথ্যও আবিষ্কার কয়ে থাকতে পারেন।” আমি জিজ্ঞাসা করলুম, “কি লেখা আছে বিজ্ঞাপনটায়? শােন” বলে তিনি একটা ছােট কাগজ খুলে পড়তে আরম্ভ করলেন। কিছুদিন আগে রাসবিহারী এভিনিউয়ে একটী ২৮ বৎসর আন্দাজ বয়সের যুবককে দেখা গিছলাে। যুবকটী দেখতে সুন্দর, ফিটফাট, প্রায় ছ’ফুট লম্বা, ভাল কাপড় জামা, তবে একটু খুঁড়িয়ে চলে। যদি কেহ তার সন্ধান দিতে পারে, পুলিশের কাছ থেকে যথেষ্ট পুরস্কারের আশা আছে। “কিন্তু অতুলবাবু, প্রফুলবাবুর সিদ্ধান্ত একেবারে অন্যরূপ।” “তাই নাকি? তিনি তা হলে কোনও সিদ্ধান্ত করেছেন নাকি ? তার কি রকম অভিমত ?” “তা অবশ্য আমি জানি না।” “তিনি তা হলে মনে করেন অমরবাবু ভ্রান্ত ?” “শুধু ভ্রান্ত নয়—তিনি বলেন যে অমরবাবু অন্ধকারে ঢিল মারছেন।” অতুলবাবু একটু চুপ করে কি ভাবলেন। উদ্ভাসিত মুখে বল্লেন, “দেখ আমার মাথায় একটা মতলব খেলছে। প্রফুল্লবাবু বিচক্ষণ লােক, তিনি যে রাস্তা ধরেছেন তা পুলিশের থেকে যদিও স্বতন্ত্র হয়, তা হলেও তাঁর খবরগুলাে আমাদের কাগজে ছাপা হলে, সেল বেড়ে যাবার খুব সম্ভাবনা। তুমি এক কাজ কর। তাঁর সঙ্গে এখনই দেখা করে বল—তার সহায়তা করবার জন্ঠে আমরা পিছনে রইলুম।” 'আমি প্রফুল্লবাবুর সাথে দেখা করলুম। তাকে সমস্ত ব্যাপার খুলে বলুম। আমার এ কথার কোনও জবাব না দিয়ে তিনি হঠাৎ উঠে দাড়িয়ে বছেন, “চলুন—এখনই তাে কোটে যেতে হবে, দেখা যাক ব্যাপার কতদূর এগােয়।” কোর্টে যাবার জন্যে আমি প্রস্তুত হয়েই গিছলুম। দেরী না কোরে তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লুম। যখন সেখানে গিয়ে পৌছুলুম-বাইরেটাতে নেহাৎ মন্দ ভিড় হয়নি। ভেতরে গিয়ে দু’জনে দুখানি চেয়ার অধিকার কোরে বসলুম। ডিটেকটিভ অমরবাবুর পর আমার ডাক পড়লো। আমার বক্তব্য শেষ করে যখন প্রফুল্লবাবুর কাছে ফিরে এলুম, তার মুখ অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেছে। তিনি চট কবে দাড়িয়ে উঠে বল্লেন, “চলুন, আর একবার আমরা জিনিষগুলাে ভাল করে দেখে আসি।” পাশের ঘরে গিয়ে আমরা জিনিসগুলি বেশ ভাল করে দেখতে লাগলুম। লাঠিটা হাতে তুলে নিয়ে প্রফুল্লবাবু বল্লেন, “আপনার বােধ হয় স্মরণ আছে আমি বলেছিলুম-যখন হাতের দাগগুলাে দেয়ালের ওপর আঁকা হয়েছিল ঘরটা তখন নিশ্চয়ই অন্ধকার ছিল ?” “খুব মনে আছে। কিন্তু আমার মনে হয় এইখানে আপনিও আন্ত—কারণ আমি যখন সেই ঘরে গিয়ে উপস্থিত হই তখন আলােটা মালাই ছিল।”
সম্পাদকের মন্তব্য
“ভ্রান্ত আমি নই সুশীল বাবু। দেখুন--ছড়িটা ভাল করে
দেখুন, বর্ণনা করে যা ছড়িটার ভেতর কোন বিশেষত্ব আছে কি না।”
আমি বল্লুম, “এতাে একটা সাধারণ মােটা লাঠি-লম্বা-দেখতে
বি, কিন্তু কোনও বিশেষত্ব তাে দেখছি না প্রফুল্লবাবু!”
“বিশেষত্ব একটু আছে। যেমন ভাবে লােকে লাঠিটা ধরে তেমনি
ভাবে ধরুন। দেখুন, আপনি ডান হাতে ওটা ধরেছেন—আপনি
যদি এ লাঠিটা বরাবব ব্যবহার করতেন, তা হলে এর বাঁ পাশের
কোণটা ক্ষয়ে যেতো। আবার কেউ যদি এটা বাঁ হাতে ব্যবহার করতে।
তা হলে এর ডান পাশটা ক্ষয়ে যেতাে। এটা কি দেখছেন?
“এটার তাে পাশের দিকে কিছুই হয়নি ববং সােজা সাসানি
খানিকটা ক্ষয়েছে।”
“ঠিক কথা। আমি বলেছিলুম-লােকটা অন্ধকারে কাজ হাসিল
করে গেছে। আমি অভ্রান্ত সুশীল বাবু—এই লাঠিটাই তার প্রমাণ।”
কথাটা শুনে ভাবলুম প্রফুল্লবাবুর বুঝি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ।
কি আমি নিজেই হয়তো সেটা হারিয়ে বসেছি। আমাকে চুপ করে
থাকতে দেখে প্রফুল্লবাবু গম্ভীর হয়ে বলতে সুরু করলেন, “যদিও
অমরবাবু আপনার কথাটাকেই সমর্থন করেছেন, তবু আমি ঐ এক
কথাই জোর কোরে ব’তে পারি-ঘরটা অন্ধকার ছিল।”
আমি বল্লুম, “কিন্তু লাঠিটা থেকে আপনি কেমন করে সেটা
অনুমান করেছেন-আমি তাে বুঝতেই পারছি না।”
“বুঝতে পারছেন না? বুঝেও দরকার নেই তা হলে, চলন, এখনি
গিয়ে অতুলবাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
৪
অজে টি তখনই আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। - e (৯) আপিসে ফিরে আমরা তখনই অতুলবাবুর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলুম। তিনি ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, “কি খবর প্রফুল্লবাবু ?” সানের চেয়ারখানায় বসে প্রফুল্লবাবু বল্লেন, “ব্যাপার যদি ৩ান। সুশীলবাবু, আপনি কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসুন-আজ আনি যে গল্পটা বলবাে সকলে শুনে স্তম্ভিত হয়ে যাবেন।” আমি খাতা পেন্সিল নিয়ে বসে গেলুম, তিনি বলে চলেন- “প্রথমে অমরবাবুর কথাটা আমি সমর্থন করছি যে ভূপতিবা সেদিন রাত্রে সুশীলবাবু ছাড়া অন্য একজনের জন্ধ অপেক্ষা করছিলেন। অমরবাবু বলেন যে লোকটা আসতে পারেননি বা আসেননি ; সেই জন্যে তাঁকে খুঁজতে ভূপতিবাবু বাইরে বেরিয়েছিলেন কিন্তু আমার মনে হয় তিনি সুশীলবাবুকে খোঁবার জইে অত রাত্রে রাস্তায় বেরিয়েছিলেন। যে লােকটার আর কয় ছিল, কোনও কারণে তাকে তিনি ভয় করতেন অথচ এই লােকীর সম্মুখীন তাকে হতে হ’তে তাই তিনি সুশীলবাবুর উপস্থিতি একান্ত ভাবে চেয়েছিলেন। তাই তিনি অত জিদ করে যত রাতই হাে তাকে যেতে অনুরােধ করেছিলেন ফোন করে।
“দ্বিতীয়ত, ভূপতিবার যেমন একজনকে সানে রেখে আগন্তুকে সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, আগন্তুক তার কাছে তেমনি এক আসেননি। তিনিও আর একজনকে সঙ্গে এনেছিলেন।” অতুলবাবু বলেন, “একথা আপনি কেমন করে বলতে পারেন?” “যে জিনিষগুলাে পাওয়া গেছে তাই থেকেই। একজন অন্ধ পুরুষ সেলুলয়েডের কাটা মাথায় দিতে পারে না। ভূপতিবাবুর পক্ষেও তা অসম্ভব। তা হলেই বোঝা যাচ্ছে লাঠি এবং কাটার ভিন্ন ভিন্ন অধিকারী সে দিন সেই ঘরে গিছলাে।” আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলুম, “কিন্তু একজন যে অন্ধ তা আপনি কেমন করে জানলেন?” “ঐ লাঠিটা একজন অন্ধের। ওটার সামনের দিকটা সরল ভাবে ক্ষয়ে গেছে। রাস্তাটা আগে মেখে নেবার জন্ঠে লাঠিটা ব্যবহার করলে যেমন হয়। তার ওপর দেয়ালের দাগগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে একজন অন্ধ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কারণ ঐ রকমে দেয়ালের গায়ে রক্তের আঁচড় কাটা চোখে দেখে কোনও লােকের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং হয় ঘরটা অন্ধকার ছিল নয় লোকটাই অন্ধ। কিন্তু সুশীলবাবু, খুনের পর মুহূর্তেই আপনি সেই ঘরে গিয়ে দেখেছিলেন আলােটা জ্বালা, তা’ হলেই লােকটা অন্ধ না হয়ে যায় না। আমি বল্লম “তা হলে আপনি কি মনে করেন অন্ধই অপরাধী?” “সেইখানে আমি একটু সন্দিহান তবে আমার খুব বেশী মনে হয় যে সে নিরপরাধ।” আমি যেন একটু দমে গেলুম। “দক্ষিণ কলকাতার হত্যা ব্যাপারে অন্ধের যষ্ঠি অন্ধ আততায়ী” কি সুন্দর শিরোনামা লেখা যেতাে। বল্লম “তাই বা আপনি মনে করেছেন কেন?” “তার অনেক কারণ আছে। প্রধানতঃ ডাক্তারের অভিমত। খুনটা বেশ সুন্দর ভাবে করা হয়েছিল। একন অন্ধ লোকের পক্ষে অত হিসেব কোরে ছুরি বসানো সম্ভব হয় না। তারপর বিচাৰ্য ঘরেব সেই আসবাব পত্রগুলাের বিশৃঙ্খলা! যদি মৃত ব্যক্তি সেগুলাে ছড়াতেন বা তার এবং আততায়ীর মধ্যে কোন যুদ্ধ থেকে সেগুলো ছড়াতে। তা’ হ'লে মৃতদেহের ওপর কোনও না কোনও দাগ দৃষ্ট হতাে। কিন্তু তার গায়ে কোনও চিহ্নও পাওয়া যায়নি। আমার মনে হয় অন্ধেব বিক্ষিপ্ত গতিবিধি থেকেই সেটা সম্ভব হয়েছিল। তারপর সেই দেয়ালের দাগগুলো। অন্ধ পালাবার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তার আগেই তাকে ধরে নিয়ে তারা চলে গেছে ? অতুলবাবু বল্লেন, “’ হলে আপনি বলতে চান্ অন্ধকে জোর কোরে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? কিন্তু তার প্রমাণ? “আপনি লাঠিটার কথা ভুলে গেলেন ? কথায় বলে অন্ধের যষ্ঠি । ইচ্ছাপূর্বক গেলে লাঠিটা ফেলে রেখে সে নিশ্চয়ই যেতাে না। তাকে জোর করেই ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর যারা তাকে ধরে নিয়ে গেছে তারা তখন জান্তা না যে লােকটা অন্ধ ; তা জালে ধরে নিয়ে যাবার প্রয়ােজন বােধ তাদের মধ্যে আলতো না।” “তা হলে খুনী সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি রকম ?” অতুলবার জিজ্ঞাসা করলেন।
“খুনী-একজন বড়লােক—সমাজে বড়লােক—সমাজে প্রতিষ্ঠাবান—অবশ্য আমার মনে হয় এমনই। তবে একটা কথা ভাবছি-কেন সে অন্ধকে শেষ করে গেল না? অন্ধ নিশ্চয়ই তার দলের লােক ছিল না। কারণ একজন অন্ধকে সঙ্গে করে সে নিশ্চয়ই এতবড় একটা খুন করতে এগুতাে না- তা’ কেউ করে না। ভূপতিবাবু নিশ্চয়ই আক্রান্ত হয়ে কোনও চিৎকার করেছিলেন যার ফলে তাকে সাহায্য করবার জন্যে অন্ধ সে ঘরে গিছলে। এবং তার দেহের ওপর পড়ে গিয়ে হাতে ঐ রক্ত মেখে ফেলে। কিন্তু অন্ধ এখন কোথায়? তাকে তারা কি ভাবে রেখেছে সেইটাই বুঝে উঠতে পারছি না।” আমি হঠাৎ প্রশ্ন করে ফেলুম, “কিন্তু অন্ধ যে খুনীর দলের নয় তার কোনও প্রমাণ আপনি পেয়েছেন কি?” “নিশ্চয়ই। পাশের ঘরে একটা এটো থালা ছিল মনে আছে ? আপনার আগমন প্রতীক্ষা করে নিরাশ হয়ে ভূপতিবার রাস্তায় বেরিয়ে- ছিলেন। মনে হয় সেই সময় দৈৰক্রমে তিনি অন্ধকে পেয়ে যান্-এবং তাকে নিয়ে এসে ঐ পালাতে খাওয়ান।” অদ্ভুত তার ধারণা শক্তি। ভাবলুম তার একথা একেবারে অবিশ্বাস করে উড়িয়ে দেবার উপায় নেই। ও কথা মেনে নিয়ে আবার প্রশ্ন করলুম, “কিন্তু খুনী যে প্রতিষ্ঠাবান সেটা কেন মনে করছেন ?” “অসম্ভব নয়। আপনি “অলর মহল” কাগজ পড়তেন এবং ভূপতি- বাবুকেও চিনতেন। তিনি সাধারণ জনমণ্ডলীর কাছে বন্ধু কিন্তু প্রতি পত্তিশালীদের পরম শত্রু ছিলেন। এরকম কোনাে লােকের দ্বারা এই হত্যা ব্যাপার সংঘটিত হওয়া একেবারে অসম্ভব নয়।”
পরের দিন সন্ধ্যায় এবার বাড়ীতে গেলু। তিনি ব্যস্তভাবে প্রশ্ন করলেন, “খবরটা এনেছেন সুশীবা?” আজ্ঞে হ্যা। হত্যার পর থেকে কোনও অন্ধ ব্যক্তির অন্তধনের কোনও রিপাের্টই পাওয়া যানি।” “বেশ, কিন্তু কোনও জায়গায় কোনও অচেনা অজানা লােকের মৃত- দেই” “আজ্ঞে না, তেমন কোনও সংবাদও প্রকাশিত হয়নি।” প্রফুল্লবাৰু একটু চুপ করে কি ভেবে বলেন, “দেখুন যদি এমন কোনও সংবাদ প্রকাশের জন্যে আসে এর মধ্যে আমাকে না জানিয়ে সেটা পাবেন।” “আপনি কি মনে করেন অকেও খুন করা হয়েছে।” “দেখা যাক। খুনী সম্বন্ধে অনেক কিছু জানার সুবিধে হয়ে যাবে।” “আমার কি মনে হয় অন্ধ বােধ জীবিত নেই এত দিন।” সেদিন আর বিশেষ কোনও কথা হলাে না। প্রফুল্পবাবুর কথাগুলাে শুনে একেবারে অবান্তর বলে মনে হলাে না। তার ধারণাশক্তি অদ্ভুত। সমস্ত ঘটনাগুলি দৃঢ় ভিত্তির ওপর যেন মালার মত গাঁথা। মনে মনে তার আশ্চৰ্য্য শক্তির প্রশংসা করতে করতে বাড়ী ফিরলুম। পরের দিন আপিসে বসে ক কছি, বেলা ১টায় সময় ব্যস্তভাবে এবাৰ আমার ঘরে এসে ঢুকলেন। তার মুখের ভাব দেখে আমি অজ্ঞাসা করলুম “কি খৰৰ এবাৰ ।” “দেখুন, পেনিটিৰ বিৰুে আপনাদের কাগজের কোনও লােক আছে ?”
সশকের মন
“আছে বৈকি। আমাদের লােক সর্বত্রই আছে। এ কথা জিজ্ঞাসা
করছেন কেন?”
“আজ খবরের কাগজে দেখলাম একটা মােটরের ধাক্কায় একজন উড়িয়া
ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রােডের ওপর আহত হইয়াছে। আমাকে সেইটী সম্বন্ধে
বিশেষভাবে জানতে হবে।”
“এত বড় একটা খুনের ব্যাপার ছেড়ে দিয়ে আপনি এই তুচ্ছ জিনিষ
নিয়ে মাথা ঘামাতে বসলেন কেন প্রফুল্লবার?”
“হেতু আছে। আমার মনে হয় আপনাদের লােক এতে আমাকে
খুব সাহায্য করতে পারে।”
“তাকে কি করতে বলেন ?”
‘এমন কিছু নয়। মটরটা পেনিটিতে কোনখানে রাখা হয় সেই
খবরটা আপনাকে সে জানাবে। গাড়ীটা একটু অদ্ভুত রকমের।”
“গাড়ীটার বিশেষত্ব কি আমাকে বলুন-কালই কাগজে ছাপিয়ে
দেববা।”
“ঐটাই আমি চাই না সুশীলবাবু। গাড়ীর বৈশিষ্টগুলি অতি সহজে
বদলে ফেলা যায়। খবরটা আমায় গােপনে আনিয়ে দিতে হবে। এই
ব্যাপারটা নিয়ে আমি অমরবাবুর ওপর টেক্কা দিতে চাই।”
“অমরবাবুও তা হলে এর ভেতর ঢুকেছেন?”
“নিশ্চয়ই। অবশ্য আমি ঠিক
অবশ্য আমি ঠিক জানি না, তিনি হত্যার দিন গাড়ী-
খানির কোনও সূত্র পেয়েছিলেন কিনা।”
“হত্যার দিন রাসবিহারী এভিনিউএ?"
“চুপ। আর ওকথা নয়। খুব সাবধান, যেন জনপ্রাণীও না জানে,
এখন শুনুন গাড়ীখানির বৈশিষ্ট্য কি। সাধারণতঃ মটরের যেমন চাকা হয় এর চাকাগুলো তেমনতর নয়। টায়ারগুলাের ওপর ঘোড়ার গাড়ীর মত সরু সরু সলিড, রবার লাগানাে আছে। গাড়ীখানা যখন যায়, দুর থেকে সেগুলো মােটেই লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু রাস্তার ওপর যে দাগগুলো পড়ে সেগুলাে দেখলে মনে হয় কোনও ঘােড়ার গাড়ীই বুঝি গিয়ে থাকবে। রবারগুলোর জন্যে মটরের চাকার চওড়া দাগ মােটেই পড়তে পায় না।” “কিন্তু হত্যার দিন এমন কোনও দাগও যদি আপনি রাস্তার ওপর দেখে থাকেন, কি কোরে জালেন সেটা ঘােড়ার গাড়ী নয় মটর?” “ঘোড়ার গাড়ীর দাগের সঙ্গে ঘােড়ার খুরের দাগও কি লক্ষ্য করা যায় না সুশীলবাবু ? এ ক্ষেত্রে সেইটীরই অভাব ছিল।” প্রফুল্লবাবুর কথা শুনে অন্ধের জন্যে প্রাণটা যেন আকুল হয়ে উঠলাে। তার কথা থেকে যা বােঝা যায় অন্ধ বেচারী একান্ত নির্দোষ অথচ যে কবলে সে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার হওয়া বড় সহজ ব্যাপার নয়। যদি তারা তাকে খুন করে? ভাবতেও আমি যেন শিউরে উঠলুম। এ ভাব আমার কেন কিছুই বুঝে উঠতে পারলুম না। অন্ধ তাে আমার কেউ নয়-তবে? তবে সে মানুষ। একান্ত অসহায়। পেনিটির দিকে আমাদের যে প্রতিনিধি ছিলেন তাঁকে সেইদিনই চিঠি লিখে দিলুম খবরটা জানার জন্যে। সবে মাত্র চিঠিটা শেষ করেছি, সশকের মন্তব্য সে বেয়ারা এসে একটা খাম আমার হাতে দিলে। খামের ভেতর যে খবরটী এলো তাতে আমাকে একেবারে বিচলিত করে দিলে। সঙ্গে সঙ্গে বেয়ারাকে পাঠিয়ে খবর নিলুম প্রফুল্লবার চলে গেছেন কি না। এসে জানালে, বহুপূৰ্বেই তিনি অতুলবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন। বসতে পারলুম না। সঙ্গে সঙ্গে আপিস থেকে বেরিয়ে তাঁর বাড়ীর দিকে রওনা হ’লুম। ভাগ্য ক্রমে তায় দেখা মিলে গেল সেখানে যেতেই। আমি বল্লম, “আমরা বড় দেরী করে ফেলেছি প্রফুল্লৰাৰু।” তিনি বল্লেন, “দেরী করে ফেলেছি ? কি রকম ?” “পড়ুন” বলে আমি কাগজের টুকরােটা তার হাতে দিয়ে দিলুম। তাতে লেখা ছিল :- “টালার পুলের তলায় একটা বছর তিরিশ বয়সের লােককে মৃত অবস্থার পাওয়া গেছে। লােকটা দেখতে সুন্দর, কিন্তু তার নিকট এমন কিছুই পাওয়া যায়নি যা থেকে তার পরিচয় পাওয়া যেতে পারে। যে কি ভাবে হত হয়েছে তারও কোনও কিছু সিদ্ধান্ত এখনও করা যায়নি।” অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে তিনি বল্লেন “তা হলে শেষ অবধি তারা অন্ধকে খুনই করলে? এই ভম্বই আমার ছিল।” “এখন উপায়? বলে আমি তার দিকে চাইলুম।
“উপায় আর কি। একবার মৃত দেহটাকে দেখে আসিগে চলুন।”
আমিও খাবাের
নিশ্চয়ই।”
“কিন্তু কেন করে আপনি তাকে চিনবেন—কেমন কোরেই বা
জানুকে যে সে জীবিতাবস্থায় অন্ধ ছিল? মৃত্যুর পর সেটা ঠিক করাও
তাে কঠিন।”
প্রফুলবাবু বল্লেন, “যদি তার আশে পাশে কোনও ক্রমে সেই মটরের
চাকার দাগ খুঁজে বার করতে পারি তা হলে নিশ্চিত জানতে
লােকটা অন্ধ ছিল। আর এও আপনাকে বলে দিতে পারি নুশীলবাবু,
বে সেই দুও খুনীরও আর বেশী দিন নেই। শীঘ্রই তাকে ফাঁসি কাঠে
বুলতে হবে।”
এতদিন যে প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করতে পারিনি, তাঁর কথা শুনে আর
তা’ চেপে রাখতে পারলাম না। বল্লম, “এতই যখন আপনি জেনেছেন
প্রফুন্নবাবু, তা হলে নিশ্চয়ই জানেন খুনী কে। এখন বােধ হয় আমাকে
ব’তে আর বাধা নেই ?”
যথেষ্ট আছে। যাক, ওসব বাজে কথা—চলুন এখন বেরিক্ষে
পড়া যাক।”
ডাক্তার ঘােষ যা জানেন
ডাক্তার ঘােষ জানে অন্ধের সংবাদ। পুলিশের
এমনই ধারণা। কিন্তু তাই যদি সত্য হয়—আর
যদি প্রকৃতই নির্দোষী হ’-তবে
কেন তিনি তাকে লুকিয়ে রাখতে চান্?
অন্ধ
No text on this page.
& us old Ba* . Inst, d; * •. ১১, (১১) তিন চার দিন পরে একদিন সন্ধ্যার পর প্রফুল্লবাবু আমাকে সঙ্গে করে রাসবিহারী এভিনিউয়ে ডাক্তার শরৎ ঘােষের বাড়ীতে গিয়ে হাজির হলেন। ডাক্তার থােষ আমাদের উদ্দেশ্য শুনে প্রথমটায় বিশেষ ভাল ভাবে অভ্যর্থনা করলেন না। কিন্তু প্রফুলবাবু তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বল্লেন, “ডাক্তারবাবু, আপনি কেসটী সম্বন্ধে যা জানেন সেটুকু জানতে পারলে আমাদের যথেষ্ট সুবিধে হয়ে যায়। পুলিশ ভ্রান্তপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে আপনি আমাদের সাহায্য না করলে এতবড় একটা খুন চাপাই থেকে যাবে।” ডাক্তার ঘােষ বল্লেন, “বেশ, তবে শুনুন। সেদিন রাতে আশুবাবুকে একটী পুলিশ আমার বাড়ীতে ধরে নিয়ে আসে। তিনি আমার বাল্যবন্ধু। ভাগ্যবিপৰ্যয়ে একান্ত অসহায় অস্থায় আমার কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে এসেছিল সে। আগে খুবই টাকা কড়ি ছিল, কিন্তু তার পিতার মৃত্যুর পর সায়েন্সের রিসার্চ করতে করতে একটা এসিডে সে দৃষ্টি শক্তি অন্ধের যষ্টি হারিয়ে ফেলে। সেই থেকে তাকে ঘরেই বসে থাকতে হয়। সেদিন আমার কাছে সে এসে দুঃখ জানিয়ে বসে যে তার যথা সৰ্বস্ব বসে খেয়ে বিকিয়ে গেছে। অবশ্য তার যা ছিল, আমার ধারণা একটা লােক সারা জীবন ব’সে খেয়েও ফুরােবার নয়। মনে হয় এতে তার আত্মীয় স্বজনের কিছু কারসাজি আছে। কিন্তু সে সম্বন্ধে সে আমার কাছে কোনও কথাই ভাঙ্গেনি।” “তার সঙ্গে কথা কইতে কইতে আমি দু একটা এমন কথা বলে ফেলি যেগুলাে সে খুব মর্মন্তুদ ভাবে নেয়। তাকে ব্যথা দেবার জন্যে কোনও কথা না বল্লেও তার তখনকার অবস্থায় সেগুলো সে সহ করতে পারেনি। ছেলে বেলা থেকেই সে একটু অভিমানী। এখন আমার দুঃখ হয় কেন তাকে কথাগুলাে বলেছিলুম।” “আমার কাছ থেকে কোনও সাহায্য না নিয়ে সে যেমন এসেছিল চলে যায়। প্রথমটায় তার আকস্মিক ভাব পরিবর্তন দেখে আমি কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলুম। সে চলে যাবার পরে রাস্তায় বেরিয়ে তার সন্ধান করলুম অনেক কিন্তু দেখতে পেলুম না। ভাবলুম পরের দিন তার বাড়ীতে গিয়ে তাকে শান্ত কোরে আসবাে।” “সে দিন রাত প্রায় ১টার সময় অমরবাবু মটর নিয়ে আমার বাড়ীতে এসে হাজির হন্ এবং আমিও তার সঙ্গে ভূপতিবাবুর বাড়ীতে উপস্থিত হই। তার পরের সমস্ত ঘটনাই তাে আপনি জানেন।” বলে তিনি আমার পানে চাইলেন। আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালুম। তিনি বলে চল্লেন, “কেবল যে কথাটা আমি তখন আপনাদের কাছ খেকে লুকিয়ে মেখেছিলুম-আজ আর আমার সেটা বন্ধুতে কাৰ ঘােৰ স্বা’ জানেন আপত্তি নেই। পাশের ঘর থেকে অমরবাবু যখন লাঠিটা বার করে নিয়ে এলেন সেটা দেখেই আমি চিন্তে পেরেছিলুম। পাছে তা থেকে আশুর কোনও ক্ষতি হয়, তাই ব্যাপারটা আমি চেপে যাই। কিন্তু আজও কেমন ধোয়ার মত ঠেকে যে একজন নির্দোষ অন্ধ কেমন করে এত বড় একটা ব্যাপারের মধ্যে এসে পড়লাে।” “সেদিন রাত্রে বাড়ী ফিরেও কথাটা আমার বার বার মনে 'পড়ছিল। যদি তাকে আমি না যেতে দিতুম, তা হলে বােধ হয় এটা ঘটতে পেতাে না। আমি নিজেকেই এর জন্যে মস্ত বড় অপরাধী বলে ধরে নিলুম। আমি যেন আশুকে ঠেলে দিয়েছি এর মধ্যে। তবে এখন দেখছি ভগবানের কৃপায় সে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হয়নি।” “কিন্তু প্রফুল্লবাবু, একটুখানি আশ্চর্য হয়ে গেছি আমি খবরের কাগজ গুলাের রকম দেখে। তারা আর আজ কাল যেন এই খুনটা সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই লিখতে চায় না। একমাত্র দৈনিক সংবাদ যা মাঝে মাঝে লেখে তাও আমার মনে হয় বােধ হয় সুশীলবাবুর দৌলতেই। যা যা বলছিলুম, সে দিন সকাল বেলা হাসপাতালের কাজ সেরে বাড়ী ফিরছি, এমন সময় অমরবাবুর সঙ্গে দেখা। তিনি সেদিন একটা গাড়ী চাপা পড়ার কেস নিয়ে বড় ব্যস্ত ছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলুম এই কেসটার কোনও হিলে হলাে কিনা তাতে তিনি জবাব দিলেন যে এখনও কোনও কিনারাই হয়নি। কথাটার জবাবে আমি বন্ধুম, “আপনারা বােধ হয় এটাকে ছেড়ে দিয়েছেন ?” “তিনি বল্লেন, তা ঠিক বলতে পারি না ডাক্তার ঘোষ, কারণ আপনি বােধ হয় জানেন পুলিশ কখনও কোনও কেসই ছেড়ে দেয় না।
১৪ অন্ধের যষ্টি -- পাছে আমাকে কোনও কথা বলে ফেলতে হয় তাই আমি একেবারে অন্য প্রশ্ন আম। জিজ্ঞাসা ক’বলুম, “ আচ্ছা আমবাত, যে সব লোক রাত্রি বেলা লোক চক্ষের অন্তবালে এসে ভূপতিবাবুর সঙ্গে আলাপ কবে যেতো, তাদেব কাবও কিছু সন্ধান পেয়েছেন কি? উত্তরে তিনি জানালেন-পানি তবে ভাবা সেইটীব জন্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা এইটুকু বেশ ভাল ভাবে জেনেছেন যে তাদের মধ্যে অধিকাংশই ঝি চাকর আয। মাঝে মাঝে নাকি ভদ্রঘবেব দু একজন মেসে ও অস্তা- এই অবনি কথা হতই ব্যস্তভাবে কামববাবু চ'লে গেলেন নতুন কে? সম্বন্ধে তিনি যথেষ্ট ব্যস্ত ছিলেন বলে। “এব কিছুদিন আগে একটা ঘটনা ঘটে খববে কাজে একা বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল —'আপনারা দেখেছিনে কিনা জানিনা – ততে একটা চা কোম্পানি আশুতােষের সন্ধান কবে। তাতে লেখা ছিল, অশুবাবু কোম্পানীতে গিয়ে দেখা করলে বিশেষ লাভবান হতে পারবেন। তাঁকে উদ্দেশ কোবেই বিজ্ঞাপনটী লেখা হয়েছিল। আমি একটু আশ্চর্য হলে- ছিলুম এই জন্যে যে কোম্পানী তাকে অন্ধ জেনেও কেমন কোবে এই রকম বিজ্ঞাপন দিতে পাবলে । একবার ভাবলুম তাকে ধরবার জন্যেই পুলিশ বােধ হয় এক চাল চেলেছে। তবু, সাত পাচ ভেবে কোম্পানীর আপিসে গিয়ে হাজির হলুম। কাৰ্যাধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা কবে আমি জিজ্ঞাসা ক’বলুম, আশুবাবুকে আপনারা কেন চান্?” তিনি উল্টে প্রশ্ন করলেন-“আপনি কি আশুবাবু?” আমি বল্লুম, “ধরুন আমি যদি হই ?” তিনি একটু কুটী করে বল্লেন, “কিন্তু প্রমাণ ?”
ডাক্তার থােষ যা জানেন
আমি বলে ফেলুম, “দেখুন, বাজে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই—আমি
আশু নই। কিন্তু একটা কথা বলবেন কি কেন আপনারা তাকে
খুজছেন?”
তিনি বল্লেন, “আপনি কি তঁার সন্ধান দিতে পারেন ?”
আমি জবাব দিলুম “আমি তাকে খুজছি । আপনাদের কাছ থেকে
খবব করতে এলুম-আপনারা যদি কিছু জেনে থাকেন।".
ভদ্রলােক বল্লেন, “না মশাই, আমরা কোনও সন্ধান পাইনি। মনে
হয় তিনি গত হয়েছেন—নইলে-
আমি বাধা দিয়ে বল্লুম, “না মশাই সে মরেনি। অন্ততঃ কিছুদিন আগে
এক গভীর রাত্রে রাসবিহারী এভিনিউ এ তাকে দেখা গিয়েছিলাে।”
তিনি উদগ্রীব হয়ে বলে উঠলেন “তাই নাকি? কিন্তু আশ্চৰ্য্য তা
হলে আমাদের বিজ্ঞাপনটা কি তার চোখে পড়েনি?”
আমি বল্লুম, “কি করে আর পড়বে বলুন সে যে অন্ধ হয়ে
গেছে।”
“অন্ধ হয়ে গেছেন ? কি সর্বনাশ !” বলে তিনি অবাক হ'য়ে
আমার দিকে চাইলেন।
আমি বল্লম, “আজ্ঞে হ্যা, কপর্দকহীন অন্ধ অবস্থায় সে এখন ঘুরে
বেড়াচ্ছে। কিন্তু, আপনি যদি অনুগ্রহ করে জানান তাকে আপনাদের
প্রয়ােজন কি ?”
একটু চুপ করে কি ভেবে বল্লেন, “আপনি আশুবাবুর বন্ধু, এবং তা
ছাড়া আপনি যখন তাঁর শুভানুধ্যায়ী আমাদের বলতে কোনও বাধা নেই।
এই কোম্পানী যখন খোলা হয়-আশুধু আমাদের অনেক
অন্ধের যষ্টি টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন আর অনেকগুলি শেয়ারও কিনে- ছিলেন। আজ কোম্পানী খুব ভাল ভাবে দাঁড়িয়েছে। আমাদের হিসেবে ডিভিডেন্ট বাবদ তার প্রায় পনেরাে কুড়ি হাজার টাকা জমেছে। বুঝতেই পারছেন তার কাছে আমরা কি রকম কৃতজ্ঞ। আমি বন্ধুম, “তা হলে তাে দেখছি আশুতােষের বরাত সুপ্রসন্ন। যদি তার সন্ধান পাই—আপনাদের জানাবাে।” ঐ কথা বলেই সেখান থেকে আমি চলে আসি। তখন থেকে আমি নব উদ্যমে অন্ধের সন্ধানে প্রবৃত্ত হই।” “পরের দিন খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনটী নব রূপ নিয়ে প্রকাশিত হলাে, কিন্তু এখন আর আশুবাবুকে উদ্দেশ করে নয়। যদি কেহ তাব সন্ধান দিতে পারেন, কোম্পানী তাকে যথেষ্ট পুরস্কার দেবেন এই মর্মে।” প্রফুলবাবু বলেন, “তারপর আশুবাবুর আর কি সন্ধান পেলেন আপনি?” ডাঃ ঘােষ বল্লেন, “সেই থেকে আর কোনও খবর নেই। প্রফুল্লবাবু একটু জোর দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোনও খবর নেই? কোনও খোঁজ পাননি ?” ডাক্তার ঘােম ততোধিক জোর দিয়ে জবাব দিলেন, “না।” ভদ্রতাসূচক বিদায় সম্ভাষণ শেষ করে আমরা দুজনে পথে বেরিয়ে পড়লুম। পথ চ’তে চলতে আমি প্রশ্ন করলুম, “আচ্ছা প্রফুল্লবাবু, টালার পুলের তলার মৃত ব্যক্তিটা তবে কে ? . কিছু ঠিক করতে পারলেন?”
ডাক্তার ঘােষ যা জানেন
তিনি বল্লেন, “আর যেই হাে অন্ধ আশুবাবু যে নয় একথা জোর
করেই বলা যায়।”
(১২)
সেইদিন রাত্রে ডাঃ ঘােষ দূরদেশে এক রােগী দেখবার অছিলায় বাড়ী
থেকে বেরুলেন। তার মটরখানা গিয়ে সটান সেই চা কোম্পা
ম্যানেজার ব্রজেনবাবুর বাড়ীর সামনে থামলাে। সদর ঘরেই ব্ৰজেনবাবু
তার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। দ্বিরুক্তি না করে তিনি মটরে এসে
উঠলেন।
ডাঃ ঘােষ জিজ্ঞাসা করলেন, “কতদুর যেতে হবে আমাদের ?”
ব্ৰজেনবাবু বল্লেন, “বর্ধমান।”
“কি করে সন্ধান পেলেন ?”
মটর তথন চলতে শুরু করেছে। ব্ৰজেনবাবু একটু আরাম করে
হেলান দিয়ে বসে আরম্ভ করলেন, “এইবার আপনাকে সব বলছি শুনুন।
আপনি আমার সঙ্গে দেখা করবার পর আরও তিনজন লােক আশুবাবুৰ
সন্ধানে আমার কাছে আসে। তাদের মধ্যে একজনের হাবভাব দেখে
আমার খুব সন্দেহ হয় সে কোনও পুলিশের লােৰু হবে। আর দুজনকে
দেখে মনে হলাে তারা বােধ হয় আশুবাবুর পাওনাদার কি ঐ রকম কিছু
অন্ধের যষ্টি একটা। বলতে পারেন কি ডাঃ ঘােষ, আবার কোনও ক্ৰমে পুলিশ কেসে পড়েছেন কি না?” ডাক্তার মােষ তখন তাঁকে ঘটনা সম্বন্ধে সব কথাই পরিষ্কার কবে বুঝিয়ে দিলেন। ব্ৰজেনবার শুনে বিশেষ আশ্চর্য হলেন না। বল্লেন, “এ আমি অনুমান করে নিয়েছিলুম। আমি লক্ষ্য করেছি, আপনি যখনই আমাদের আপিসে এসেছেন একজন লােক আপনার পেছু নিয়েছে। আমাদের আপিসে উল্টো দিকের ফুটপাথে প্রতিবাবই আমি তাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখেছি। আবার আপনিও যেই চলে গেছেন সঙ্গে সঙ্গে সেও উধাও হয়েছে। দেখে এবং বুঝেও তখন আমি আপনাকে কিছু বলিনি। ভেবেছিলুম হয়তো ওটা আমার মনের ভ্রম। কিন্তু আজ আপনাব কাছে সব শুনে ব্যাপারটা বুঝছি। নিশ্চয়ই পুলিশ আপনার পেছু নিয়েছিল।” “কিন্তু আপনি কি করে খবর পেলেন-যে সে বর্ধমানে আছে ?” “এই দেখুন।” বলে পকেট থেকে একটা ছােট কাগজ বার করে ডাঃ খােষের হাতে দিলেন। মটরের ভেতরে আলােটা জ্বেলে দিয়ে ডাঃ ঘােষ এক নিঃশ্বাসে সেটা পড়ে ফেল্লেন-“কোম্পানী যদি বর্ধমানে বড়বাজারের কাছে হােটলে কোনও লােক পাঠান, মুক্ত অরুণকুমার ঘােষ আশুবাবুর সন্ধান করে দিতে পারেন।” এজেনবাবু জিঙ্গাসা কখন, “আপনার কি মনে হয় ?” ডাঃ ঘােয় বল্লেন, “ধাপ্পা না তাে ?” দেখাব রকমটা দেখে বাপ্পা বলে মনে হয় না। বরং আমার ধারণা,
ডাক্তার থােক যা জানেন
বােধ হয় এই অরুণকুমাবই আমাদের আশুবাবু।”
কিন্তু ব্ৰজেনবার, ছুটে তাে চম বর্ধমান, শেষ অবধি বনের মােঝ
তাড়ানাে হবে না তাে?”
“তাই যদি হয় ডাঃ ঘােষ, বন্ধুর জন্যে না হয় একটু তাড়ানােই গেল।”
“চলুন, দেখা যাক কি হয়।”
গাড়ী তখন তীব বেগে ছুটে চলেছে। গ্র্যাণ্ড ট্রাঙ্ক, নােভ রাত্রিবেলা
জনশূন্য—খা খা করছে। অনেকক্ষণ চুপ কবে থেকে ডাঃ ঘােষ বল্লেন,
“দেখুন ব্ৰজেনবাবু, আমার মনে হয় যে লােকটা আমার পেছু
নিয়েছিল সে পুলিশেব লােক নয়।”
“আমাৰ সন্দেহ হয়—বােধ হয় প্রফুল্লবাবু কি বই নিয়ােজিত কোনও
লােক। আজই সন্ধ্যাব পর তিনি আমার বাড়ীতে এসেছিলেন।
আমি আশুবাবুব কোনও খবর জানি কি না জাতে। লােকটা ভাবি
চালাক।”
“আপনি বলে ফেলেননি তাে আমার কথা ?”
“ক্ষেপেছেন? অবশ্য এই খবরের আগের কথাগুলো সবই বলেছি।
কেননা তাতে এমন কিছুই ব্যাপার নেই। আর এত লুকোছাপার মােটই
দকার ছিল না—যদি আশু একটু সরম ব্যবহার করতাে। আমি একটু
গুলিয়ে গেছি ব্ৰজেনবাবু, সত্যিই সে এ খুনের কোনও সংশষে আছে
কি না। কেনই বা সে এমন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে।”
‘‘লুন, আজই এ প্রশ্নের একটা কিছু সমাধান হয়ে যাবে আশা
ক’বছি।”
অন্ধের যষ্ঠি
“কিন্তু আমি যেন কেমন নিরাশ হয়ে পড়ছি।”
রাত প্রায় তিনটের সময় তাঁর বর্ধমানে পৌছুলেন। বড়বাজারের
হােটলটা খুলে নিতে মােটেই দেরী লাগলাে না। একটা মাত্র ছােট
হােটলে অত রাত্রে তাঁদের দেখে মালিক একটুও আশ্চৰ্য্য হলেন না। এমন
অনেক অতিথিই অসময়ে হােটেলে শুভাগমন করে থাকে।
ব্ৰজেনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “অরুণবাবু বলে এখানে কোনও লােক
থাকেন ?”
থাকেন। আপনাদেরই কি আস্থার কথা ছিল কলকাতা থেকে।
খা-কোথায় তিনি ?”
“ঘরে ঘুমুচ্ছেন।
ভাবনা কি?”
ডাক্তার ঘােষ বলেন, “না-এখন আর ডেকে কাজ নেই। কাল
সকালেই তাঁর সৰে দেখা করবাে। বরং রাতটুকু কাটাবার জন্যে
আমাদের একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিন।”
ব্ৰজেনবাবুও তাঁর মতে মত দিলেন। হােটেল ওলা ভেতরে ঢুকে একটা
ঘয় খুলে দিলেন। তাঁরা গায়ের জামাগুলাে খুলে ফেলে ছােট ছােট দুখানি
লােহার পাট অধিকার করে বসলেন।
পরের দিন সকালবেলা।
অরুণৰাৰ সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন। হােটেল ডাঃ ঘোষ এবং
জেনবাবুকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে ধরা দেখিয়ে নিন। আগে থেকেই
গার ঘােষ বা জানেন
তারা পরামর্শ করে গিছ লেন যদি দেখা যায় লােকটা অন্ধ তা হলে
ডাঃ মােষ প্রথমেই কোনও কথা বলবেন না।
ব্ৰজেনবাবু প্রথমেই আরম্ভ করলেন, “নমস্কার অরুণবাবু।”
“নমস্কার, আপনি কলকাতা থেকে আছেন?”
“আজ্ঞে হ্যা। আপনার কাছ থেকে আশুবাবুর সন্ধান করতে এসেছি।”
“তা আমি জানি। আর তীকেই বা আপনাদের এত দরকার কেন
তাও আমি অনুমান করতে পেরেছি।”
“তাই নাকি? আপনি যে আমাকে অবাক করে দিলেন। আমার
ধারণা ছিল একমাত্র আশুবাবু নিজে ভিন্ন আমাদের কোম্পানীর চায়ের
শেয়ারের কথা আর জন প্রাণী কেউ জান্তাে নয়।”
“চায়ের শেয়ার ? এ সব আপনি কি ব’ছেন?”
“আমি ঠিকই ব’ছি। একথা আশুবাবু ভিন্ন আর কেউ বুঝতে
পারবেন না।
অরুণবাবু হ হহ করে হেসে উঠলেন, “বেশ ভাল আছিলে নিয়ে
এসেছেন, মশাইয়ের নামটা কি জানতে পারি ?”
*শ্রীব্রজেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়।”
ও আপনি ওখানকার এসিষ্টেন্ট ম্যানেজার নয় ?”
“আগেই ছিলুম বটে, এখন ম্যানেজার?”
কেন প্রসাদবাবুর হয়েছে কি? তিনি কি
“তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন ; আয় তেমন খাতে পারেন না। তাই
আমাকে ম্যানেজার করে দিয়েছেন। অবশ্য এখনও তিনি শান্ত
সামান্য তত্ত্বাবধান করে থাকেন।”
৭২ অন্ধের যষ্ঠি “কিন্তু সেই বাজে শেয়ারগুলাের কথা কি বলছিলেন ?” “বাজে শেয়ার ? আপনি কি মনে করেন সেই শেয়ারগুলাে বাজে হলে এতখানি পথ আমি কষ্ট করে আসতুম ?” “না । আমি মােটেই মনে করিনা ব্রজেনবাবু। সেই জন্যেই আমি খুব সহজেই বলে দিতে পারি আপনার এখানে আসবাব কাৰণ। যাক ও সব বাজে কথা ; এখন জিনিষটা সরয় করে আনা যা। আমি অরুণবাবু নই—আমার নামই আশুতােষ আর আপনি একজন পুলিশের লােক-চায়ের শেয়ারের জন্যে আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। আপনি এসেছেন আপনি এসেছেন দক্ষিণ কলকাতা হত্যা ব্যাপারে আমাকে গ্রেপ্তার করতে।” ব্ৰজেনবাবু বলেন, “আমার বিশ্বাস করুন আশুবাবু, আমি সত্যি পুলিশের লােক নই।” আশুবাবু বলে উঠলেন, “আমি বিশ্বাস করিনা আপনাকে।” সেই সময় ডাঃ ঘােষ এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাতটা ধরে বলেন, “আশু, ভাই, আমাদের অবিশ্বাস কববার তােমার কোনও কারণ নেই।” তার স্পর্শে আশুবাবু যেন চমকে উঠলেন, কে তুমি? শরৎ ? তুমি এখানে?” "তােমার খোজেই এসেছি ভাই।” আবার ডাঃ দেবের কাপে কাখে কি বল্লেন। ডাঃ ঘােষ ব্ৰজেন- বাবুকে বাইরে যেতে অনুরোধ করলেন। গজে মধ্যে নিরিবিলিতে তাঁরা দুজনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। স্তব্ধতা ভঙ্গ করে আগুবাবু বলে উঠলেন, “আমি বুঝে উঠতে
ডাক্তার থােষ যা জানেন
৭৩
পারছি না শরৎ—সে আমাকে ঠকালে কি আমি নিজেই আমাকে
ঠকিয়েছি।”
“কে সে আশু?”
“সে ? একটা মেয়ে।”
“মেয়ে ? তার সঙ্গে তােমার সম্পর্ক কি অশু ?”
‘তা জানিনা শবৎ। ঐ প্রশ্নটা আমি নিজে শতবার করেছি সে
আমার কে ? কিন্তু মনে হয় সে যেন আমার কত আপনার! যেন
জন্মজন্মান্তর ধরে তার সঙ্গে আমি এক সূত্রে গাঁথা। তাকে নইলে
আমার চলে না—আমায় নইলে তার চলে না। না না, তার হতে চলে-
কিন্তু আমার চলে না ভাই। এক একবাব ভাবি“ভগবান লেখটাই
যদি নিলে, জীবনটা নিলে না কেন? জীবনটাকে যদি বাখলে-তা’
হলে সুবর্ণাকে তাব সঙ্গে জড়িয়ে দিলে কেন ? আর তাই যদি দিলে
হলে এমন কবে তাকে কেড়েই বা নিলে কেন ? নিৰ্ম্মম-নিৰ্ম্মমতা
“পাগলের মত কি সব ছছ আশু?"
“আমি পাগলের মত ব’ছিনা মােটই; তুমি যে লােকটাকে সঙ্গে
কবে এনেছে-সেই লোকটা বরং অনেকখানি পাগলামী প্রকাশ করে
গেলেন এই মাত্র।”
“ব্ৰজেনবাবুব কথা বলছে ? তঁাব ভেতর আবাব পাগলামীটা
দেখলে কোথায় তুমি?”
“যিনি সেই শেয়ার সম্বন্ধে কথা বলতে এসেছিলেন তিনি পাগল
ভিন্ন আর কি? দিশি কোম্পানীর শেয়ার—আমি তত জেনে শুনেই
টাকাগুলো জলে ফেলে দিয়েছিলুম।”
ধতি
“কিন্তু আজ সেই জলে ফেলা টাকা তােমায় পনেরাে কুড়ি হাজার টাকা
পাইয়ে দেবে আশু। ব্ৰজেনবাবুর পাগলামি এতে মােটেই নেই। তিনি
তােমাকে টাকাগুলি দেবার জঙ্গে প্রস্তুত। তাঁদের কোম্পানী এখন খুব
উন্নতি করেছে। আর তারা বলেন যে তােমার টাকাগুলাে সেই সময়
পেলে কোম্পানীকে নিশ্চয়ই তলিয়ে যেতে হতে।”
“তাই নাকি? তা হলে কি ভগবান এই দৈন্যের মাঝ থেকে
আমাকে তুলে ধরবেন আবার ?”
“’রবেন বৈকি আশু! ঈশ্বর করুণাময়। তাই ভাগ্য আজ তােমার
ধারে তিখারী হবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে রয়েছে।”
আশুবাবু প করে বসে রইলেন। জানিনা তখন তিনি কোন
এক স্বপ্নলােকে বিচরণ করছিলেন।
ডাঃ দােষ তখন একাগ্র মনে আশুতােষের চোখগুলি পরীক্ষা
অনেকক্ষণ পরীক্ষার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,
“আচ্ছা আশু, তুমি বলেছিলে না কি একটা কেমিক্যাল লেগে তােমার
চোখটা গেছে ?”
“কেন বলদিকি এ খবরটা জিজ্ঞাসা করছো ?”
“আমার মনে হচ্ছে, তোমার চোখ বােধ হর ফিরে পাবে।
যা দেখেছি তাতে মনে হয় তােমার কাইটি হয়েছে।
একটা অপারেশনে এ রােগ ভাল হয়ে যায়।”
“মিছে আশার
আশার আলাে দেখিয়ে কিছু লাভ
আছে কি
ডাক্তার ?”
“মিছে নয় আও, এ পরম সত্যি। আমি তােমার চোখ ভাল
ভাজার ঘােধ যা জানেন করতে চেষ্টা করবাে। বিশ্বাস কর ভাই-আজ কাল এটা সম্ভব হয়েছে ; আগে এ রােগের অবশ্য চিকিৎসাই ছিল না।” “শরৎ, সত্যি সম্ভব? যদি পার ভাই-বেশী কিছু চাই না আমি, যদি সামান্য—অতি সামান্য দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাই-যদি আর কিছু না হােক—শুধু আলো আঁধারের উপলব্ধিটুকু ক’রুতে পারি, চির জীবন আমি তােমার দাস হয়ে থাকবে ডার।” ‘আমার দাস হয়ে তােমায় থাকতে হবে না ভাই! চোখদুটী তোমায় ফিরে দিতে পারলে বরং সেদিনকার সেই ঘাের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে।” “ঘাের পাপ আবার তুমি কবে করলে শরৎ?” “সেদিন রাত্রে তােমায় অমন করে ছেড়ে দিয়ে। যার ফলে সেই খুনের সঙ্গে তুমি সংশ্লিষ্ট হয়ে গেলে।” “পাপ তুমি করনি ভাই, আমিই বরং অভিমানভরে চলে এসেছিলুম । আমার ভেতরই বা কেন অমন একটা ভাব এসেছিল তা আজ আর ঠিক করে উঠতে পারি না।” “নিয়তির অভিশাপ ভাই।” “জানিনা ডাক্তার সেটা নিয়তির অভিশাপ না আশীর্বাদ! তেমন ভাবে বেরিয়ে না গেলে হয়তাে জীবনে কখনও তার সঙ্গে দেখা হতো না। তার মধুর স্পর্শে মৰু হৃদয়ে এমন করে প্রেমের বান ডাকবার বােধ হয় অবকাশ হতাে না। চোখে দেখি না বটে কিন্তু প্রাণ আমার আলােয় আলােম ভরে গেছে। অভিশাপ? না শরৎ, সেদিনটা আমার কাছে জগদীশ্বরের এক পরম প্রসাদ !"
অন্ধের যষ্টি
(১৩)
ক'দিন পর্বের কথা। ডাক্তার ঘােষের চেষ্টায় আশুবাবু অপাবেশন
করিয়ে চোখ ফিরে পেয়েছেন। ব্ৰজেনবাবু ইতিপূৰ্বেই বিদাষ নিয়েছেন।
আশুবাবুব ইচ্ছা আরও কিছুদিন বর্ধমানে থেকে তাবপর তিনি সুবর্ণাব
খোঁজে বেকবেন। ডাঃ ঘোষ আর সেখানে অপেক্ষা ক’বতে পাবেন
, কেন না তার প্রাকৃতিসেব যথেষ্ট ক্ষতি হচ্ছে। তাই সেদিন সন্ধ্যা
বেলা গল্প করতে করতে তিনি বল্লেন, “দেখ আশু, আমি মনে ক’বছি
কালই সকাল বেলা বেরিয়ে পড়বে।
“হ্যা তােমাকে তাে যেতেই হবে ভাই। কিন্তু আর দু'একদিন
থেকে গেলে ভাল হতাে না?”
“তা আর হয় না ভাই। আমাকে যেতেই হবে। কিন্তু একটা
কথা আজ তােমায় আমি বলবাে।”
“কি?”
“দেখ তুমি যখন নিরপরাধ, পুলিশের সঙ্গে দেখা করে তখন তােমাৰ
ক'বুলে ফেলাই উচিত।”
“তার চেয়েও নিজের হৃদূপিণ্ডটা নিজে ছিড়ে ফেলাও ঢের সহজ
কাজ শবং বুঝতে পারছো, আজ যদি আমি গিয়ে পুলিশের কাছে
ধরা দিই, কাল সেই মেয়েটার কি হবে ?
“দেখ, আমার মনে হয় তুমি বৃথা মােহ কয়েছে। সে নিশ্চয়ই
তােমাকে এত ভালবাসে না।”
ডাক্তার ঘােম যা জানেন
“নিশ্চয়ই বাসে নইলে আমি তাকে এই ভালবাৰৰ কেন ?
যে অন্তর্যামী ভাই। মনই মনের ভাষা বােঝে। সে মুখে কিছু বলে না
কিন্তু অনুভূতি দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে পড়ে। তা ছাড়া যদিন সে
আমাকে এই হােটলে তুলে দিয়ে যায় সেদিন বলে গেছে যদি সে
জীবনে কখনও বিয়ে করে আমাকে ছাড়া আর কাউকে করবে না।”
“তোমার অন্ধ জেনে?”
“তা’ জেনেও।”
অদ্ভুত! দেখ, আমার মনে হয় সে একটা চালাকী খেলে গেছে।
ঐ রকম একটা মিথ্যে আশা দিয়ে তােমার মুখটা বন্ধ করে রাখতে
চায়।”
“তা হতেই পারে না। আর যদি তাই হয়তবু আমি তাকে
পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারবে না শরৎ। তার আগে তাকে খুঁজে বার
করবে। তাকে স্পষ্ট জিজ্ঞাসা করবাে-
“কিন্তু কেমন করে তাকে খুঁজে পাবে ? তার ঠিকানা তো
জানাে না ?
“ঠিক ভাবে তা জানিনা বটে কিন্তু জায়গার নাম আমি শুনে ফেলে
ছিলুম। তাই একটু ভরসা আছে।”
“কিন্তু
“কিন্তু আমার অনুরােধ ডাক্তার, তুমি বা ব্ৰজেনবাবু যেন আমার
কোনও কথা পুলিশের কাছে প্রকাশ করাে না।”
“তুমি কি পাগল হয়েছে আশু? আমরা কখনও তােমার শক্রতা
করিনি, করবােও না। কিন্তু ভাই আমার মনে হয় তুমি ভ্রান্ত হয়ে
৫
শ মেয়েটার মােহ পড়ে এত বড় একটা অপরাধকে গােপন করতে গিয়ে ভাল “ভ্রান্তই যদি হই—তুই যদি করি, তুমি আমার বন্ধু আমাকে সেই ভুলটা শুধরে নেবার অবকাশ দাও! তার পর ভেবে চিন্তে যা হর করা “বেশ তাই। কিন্তু ভাই, কেমন করে তুমি তাকে চিনবে? যাকে কখনও চোখে দেখনি।” আশুবাবু চুপ করে ভাবতে লাগলেন। সেদিন আর বিশেষ কিছুই কথা হলো না। পবের দিন প্রভাতে উঠেই ডাঃ ঘােষ মটরে কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করলেন। আশুবাবু সেই হােটেলেই আৰও কিছুদিন অবস্থিতি করতে লাগলেন। 0- (১৪) প্রফুল্লবাবুর ছােট সদর ঘরখানিতে বসে সুশীলবাবু একটা সিগারেট টান্ছৈন এবং মাঝে মাঝে পাঠনিত প্রফুলবানুর চিন্তাশীল মুখের পানে চেয়ে আপন মনেই কি কতগুলাে কথা নিয়ে ভাঙা গড়া করছেন। হঠাৎ বই থেকে মুখ তুলে প্রফুল্লবাবু বলে উঠলেন, “আচ্ছ। সুশীলবার, বলতে পারেন—বিশ্ব সংসারে বিচারের সব চেয়ে বড় অন্তরায় কি?"
আক্তার ঘােষ যা’ গানে
সুশীলবাবু মৃদু হেসে জবাব
দিলেন, “কেউ
উকিলগুলাে।”
“আবার কেউ কেউ বলে পুলিশ। কিন্তু কোনওটাই ঠিক নয়।
আমি বলি সময়। সময় দুষ্ট লােককে অনেক সুবিধে দেয়। সূত্রগুলাে
নষ্ট করে দেয়, সাক্ষীরা গুলিয়ে যায়, লােকের সঙ্গে লােকের সম্পর্কও বদল
হয়ে যেতে পারে, আরও কত কি হওয়া সম্ভব। যত সময় যায় কত
অপরাধ মানুষের চোখে ক্রমশঃ লঘু হয়ে আসে।”
“কিন্তু পুলিশ তো যত পুরােণােই হােক, কোনও কে ছেড়ে
দেয় না।”
“তা দেয় না বটে কিন্তু ভূপতিবাবুর হত্যা ব্যাপারটায় তারা একটু
গোলমেলে অবস্থায় পড়েছে।”
“তার কারণ ?”
“তার কারণ এই খুনীট সাধারণ রকমের নয়। তা ছাড়া খুন
করাটাও তার পেশা নয়। এটা দৈবাৎ করে ফেলেছে। সেইজন্যে
তাকে ধরাও রীতিমত শক্ত।”
“কি ঘরে তাে খুনটার তদন্ত করবার মত অনেক জিনিষ হত্যাকারী
রেখে গিছলো।”
“মােটেই না। হত্যাকারী তেমন কোনও অছিলাই মেখে যায়নি।
লাঠিটা বা দেয়ালের দাগগুলো সেই অন্ধের। মাথার চুলগুলি অবশ্য কার
এখনও বলা যায় না। সেলুলয়েডের কাটাটা একটা মেয়ের। মেয়েমানুষের
দ্বারা খুন হওয়াটা সম্ভব নয়। আর তেমন কোনও সুর আমরা পাইনি।
সুতরাং খুনী বেশ কার আছে।”
৮০
অন্ধের যষ্ট্রি
“কিন্তু প্রফুল্লৰাবু, আমি একটা জিনিষ ঠিক বুঝতে পাবছি না।
অমরবাবু আসল খুনীর সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর আপনি করছেন
অন্ধের সন্ধান—যে বাস্তবিক অপরাধী নয়।”
“ঐখানেই মজা সুশলবাবু। অন্ধকেই আমার চাই। তাকে পেলেই
সব ঘটনাটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
“কিন্তু আপনার কার্যকলাপ দেখে তো আমার মনে হয় না যে আপনি
কখনও অন্ধের সন্ধান করে উঠতে পারবেন।”
দেখুন পারি কি না। আর মিনিট কতক অপেক্ষা করুন। দেখুন
কি হয়।”
“তার মানে ?”
“তার মানে—এইখানে অল্পক্ষণের মধ্যে এমন একজন লােক আসবেন,
যিনি অন্ধ সম্বন্ধে অনেক কিছু তথ্যই জানেন।”
কথাটা সুশীলবাবুর যেন কেমনতর লাগলাে। তিনি চুপ কবেই বসে
রইলেন। প্রফুল্লবাবুও আর কোনও কথা বলেন না। কিছুক্ষণ পরে
হঠাৎ যেন জুতাের খস্ খস্ আওয়াজ কাণে এলাে।
এফুল্লবাবু বলে উঠলেন, “কিন্তু সুশীলবাবু, আপনি একটা কথা
কইবেন না। চুপ চাপ বসে কেবল শুনে যাবেন।”
পর মুহূর্তে ডাঃ খােধ এসে ঘরে ঢুকলেন। প্রফুল্লবাৰু চেয়ার ছেড়ে
উঠে দাড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা করলেন। ডাক্তারবাবু একখানি চেয়ার
অধিকার করে বসতে প্রফুলবাবু বল্লেন, “আপনি যে অনুগ্রহ করে
এসেছেন কষ্ট করে-
“না না, কষ্ট আর কি। আপনি দাড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন।”
ভাজার ঘােষ যা জানেন
প্রফুলবাবু এসে তার সামনের চেয়ারখানায় বসে পড়লেন।
“দেখুন প্রফুন্নবাবু, আপনার বক্তব্যটা একটু তাড়াতাড়ি সেরে নি।
এ ক’দিন আমার সময় বড় অল্প।
“নিশ্চয়ই ডাক্তারবাবু। বিশেষ আবার
বিশেষ আবার অনেক দিন আপনি
কলকাতায় ছিলেন না। কাজ একটু বেশী পড়তে পারে বইকি।
আচ্ছা, বলতে পারেন, আশুবাবুর সঙ্গে শেষ কবে আপনার দেখা
হয়েছিল ?”
“একথা জিজ্ঞাসা করবার হেতু ?”
“হেতু একটু আছে বইকি। আচ্ছা দেখুন তো এই ছবিটা।”
বলেই প্রফুন্নবাবু পকেট থেকে একখানা ছবি বার করে তাঁকে
দেখালেন।
এ ছবি আপনি পেলেন কোথা ?”
“তা হলে এটা আশুবাবুরই ছবি?”
“কতকটা সেই রকমই দেখতে বটে।”
“বেশ। এখন অনুগ্রহ করে বলুন তো আশুবাবু এখন কোথায়
লুকিয়ে আছেন?”
“তা আমি বলতে পারি না।”
“বলতে পারি না নয়-বলনে না?”
“আপনি যদি তাই বােঝেন—তা হলে তাই।”
“হু। তা হলে আশুবাবুর কোনও মতলব আছে বুঝতে
“তা থাকতে পারে—কিন্তু আমি তা জানি না।”
অন্ধেব যষ্টি
“কি ডাঃ ঘােষ, আপনি যা জানেন আমাকে বলল ভালই
“আপনাকে আমি এই অবধি বলতে পারি যে মিছে আশুবাবুকে
খুতে সময় নষ্ট করবেন না, কেন না আমার মনে হয় তাকে খুঁজে
পাওয়া খুব বেশীই শক্ত হবে। আর তা ছাড়া তিনি অন্ধ-কাজেই
কিছু দেখেননি। তাকে পেলেও আপনি বিশেষ লাভবান হবেন না।”
“আশুবাবু তো নিরপরাধ, তবে কেন তিনি লুকিয়ে থাকতে চান ?”
“তার বিশেষ কোন হেতু তত থাকতে পারে ?”
‘যদি তিনি নির্দোষী হন্ তা হলে এমন কি হেতু থাকতে
“হেতু থাকতে পারে না? ধরুন যদি কোনও মেয়ে এর মধ্যে
“মেয়ে, ঠিক ঠিক—তা হলে অবশ্য অন্ধের লুকিয়ে থাকার অনেক
হেতু খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কেন না, যখনই কোনও লােককে
খুব বেশী একটা বােকামী করতে দেখা যায় প্রায়ই তার পেছনে স্ত্রীবুদ্ধি
বিজড়িত থাকে।”
“তা হ'লে এইটুকুই শুধু জেনে রাখুন প্রফুল্ল, এর মধ্যে একজন
বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ে আছে। তবে তাকে ধরা সহজ নয়।”
“বলে যান্ডঃ ঘােৰ। তারপর
“তারপর আর কিছু আমি বলবাে না প্রফুল্লবাবু। যা আমার
বলা উচিত তার চেয়ে ঢের বেশী বলে ফেলেছি। তার ওপর আশুবাবুর
প্রতি আমার একটা কর্তব্য আছে তাে?”
“তাই নাকি? তা হলে আপনারা কনে মিলে হত্যাকারীকে
ডাক্তা ঘােষ যা জানেন
৮৩
ধরা ছোঁয়ার বাইরে রেখে দিতে চান? প্রকৃত দোষীর শাস্তি বিধান করাটা
কি মানুষের কর্তব্য নয় ডাঃ ঘােষ?”
কথাটার
দৃঢ়তায় ডাঃ ঘোেষ একটু বিচলিতভাবে জবাব দিলেন, “একশাে
বার কর্তব্য,কিন্তু দোষীকে তো আমি ঢেকে রাখতে চাইছি না
প্রফুল্লবাবু।”
“না, তা’ চাইছেন না। তবে মজাটা কেমন দাড়িয়েছে-একটু ভেবে
দেখছেন কি? আপনি ঢাকছেন আশুবাবুকে, আশুবাবু ঢাকছেন
মেয়েটিকে আর মেয়েটি ঢাকছে হত্যাকারীকে। যেন এটা একটা ষ্টেজের
ওপর অভিনয় হচ্ছে। কিন্তু ডাঃ ঘােষ, যতই আপনি জিনিষটা চেপে
রাখুন, আর এক সপ্তাহের ভেতর আমি অন্ধের সন্ধান করতে পারবাে
আশা করি।”
“তাই নাকি? কিন্তু আপনিও এটা জেনে রাখুন প্রফুলবাবু, অন্ধকে
খুজে বার করা এখন সহজ হবে না।” বলেই ভাঃ ঘােষ একটু মুচকে
হলেন।
“দেখা যাক ডাক্তার, কিন্তু আমার মনে হয় আপনার কাছ থেকে
আজ যেটুকু শুলুম তা থেকে তাকে ধরা আমার পক্ষে বেশ সহজ হয়ে
গেছে। অন্ধ আজ একটা মতলব নিয়ে যুবছেন। সেটা আর কিছু
নয়-সেই মেয়েটিকে খােলা।”
“তার মানে? আপনি কি করে জানলেন যে মেয়েটীর কাছ থেকে
অন্ধ এখন ভিন্ন হয়েই বাস করছে কি এক সঙ্গেই আছে?”
“আপনিই তা আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। কাতার আপনি
প্রায় তিন সপ্তাহ অনুপস্থিত ছিলেন। এই সময়টা আপনি নিশ্চয়ই
৮
অন্ধের যষ্টি
সেই অন্ধের সঙ্গে কাটিয়ে এসেছেন। আর সেটা যদি সত্যি বলে প্রমাণ
হয়—তাে’ মেয়েটির কাছ থেকে অন্ধ যে আলাদা ভাবে বাস করছে তা
নিঃসন্দেহ। কারণ মেয়েটা নিঃসঙ্কোচে অন্ধের সান্নিধ্যে এলেও আপনাকে
দেখা দেবে নিই।”
“তারপর ?”
“তারপর দেখুন ডাক্তারবাবু, অন্ধ কিন্তু মন্ত একটা ভুল কবে
চলেছে। বেচারী চোখে দেখে না অথচ একজন মেয়েকে সে খুজতে
বেরুচ্ছে-যার ঠিকানা পৰ্যন্ত অজানা।”
“সেটুকু হয়তাে সে জানে, নইলে কি আর এত সহজ হতাে?”
“তাই নাকি? বাঃ তা হলে অনেকটা সুবিধে বটে।
যতই সুবিধে থাক—আমি দেখতে পাচ্ছি তাকে একটা পন্থা অবলম্বন
করতে হবেই ।”
“বাক্ প্রফুল্পবাবু, আমায় উপস্থিত বিদায় দিন। তবে যাবার
সময়ও আমি আপনাকে বলে যাচ্ছি অন্ধকে ধরা এখন সুদুরপরাহত।”
“আমিও আপনাকে বলে রাখছি ডাক্তার, আশুবাবুকে বার করবে
আমিই এবং ডিটেকটিভ অমরবাবুর আগেই। শুধু তার আগেও নয়
আর একজন তাকে পাবার আগে।”
“আর একজন কে ?”
“আর একজন মানে ভূপতিবাবুর হত্যাকারী নিজে। ডাঃ ঘােষ, যদি
ব্যাপারটা আপনি তলিয়ে বুঝতেন-আপনার বয় আজ এসে মৃত্যুব কত
কাছে দাড়িয়ে আছেন-তা হলে আমি তাকে ধরতে পারবাে না ধারণায়
আপনি আনন্দ অনুভব করতেন না। বরং আমার হাতেই তাকে তুলে
Old Bones
1.
তার ঘোষ
দেবার ব্যবশত।
ভে এখেছে। অন্ধ যখন মেয়েটার সন্ধান
পাবেন এবং তাদের প্রণয়ের কথা কারী জেনে ফেলবে তখন
আবার কি বণ পরিণতি হলে জীবনে যে একবার একটা খুন
করে, জানবেন তার
একটা খুন চাপতে বড় বিশেষ দেরী
লাগে না। আপনার বন্ধু আজ কি ভয়ানক ভাবে বিপয় তা বুঝতে
পারছেন কি এখন?
“আপনি বৃথা মাথা ঘামাচ্ছেন প্রফুল্লবাবু, মেয়েটা নিশ্চয়ই আশুকে
ভালবাসে না। তা হলে সে অমন করে তাকে নিজের কাছ ছাড়া
করতাে না। আর ভূপতিবাবুর হত্যাকাবীব কথা যা বললেন তার
উত্তর এই যে আশুকে হত্যা করা যদি তার অভিপ্রায় হতে, এতদিন
তা হলে নিশ্চয় সে জীবিত থাকতাে না।”
“বেশ মন দিয়ে শুনুন। মেয়েটার পক্ষে আওৰাবুকে ত্যাগ করার
যথেষ্ট কারণ আছে এবং প্রধানতম কারণই হচ্ছে ঐ ভালবাসা।
দেখেছি এবং বুঝেছিল অন্ধ কাছে থাকলে এবং সে তাকে ভালবাসলে
তাকে বাঁচিয়ে রাখা দুরূহ হবে। শুধু হবে কেন হয়েও ছিল তাই আমার
বিশ্বাস। প্রণয়ীর জীবনের জন্যে ও তাগ স্বীকারটুকু তাকে করতে
হয়েছে।
অন্ধকে শেষ করে দেওয়াই হত্যাকারীর বরাবরের অভিপ্রায়,
শুধু মেয়েটিই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।”
ও সব কথা যা প্রফুল্পবাবু, যতই আপনি চেষ্টা করুন আর সম্বন্ধে
আর কোনও কথাই আমার কাছ থেকে জানতে পারবেন না। আপনার
মতলব আমি বুঝে ফেলেছি। নমস্কার।”
ডাক্তার ঘােষ আর অপেক্ষা করলেন না। কথাটা শেষ করেই
অন্ধের যদি ঘর থেকে বেৰিযে চলে গেলেন। তিনি বেরিয়ে যাবার পর সুশীলবাবু মুখ খুললেন। "আচ্ছা প্রফুল্লবাবু, যে কথাগুলি আশুবাবু সম্বন্ধে বললেন সেগুলাে সত্যি না ডাঃ ঘােষকে ধা দিচ্ছিলেন?” “আপনি কি বুঝলেন বলুন তাে?” “ধাপ্পা বলেই তো অমাব মনে হলো।” “দিতে গিছলুম একটা মস্ত বড় ধাপ্লাই সুশীলবাবু, কিন্তু এখন ভেবে, দেখছি মিথ্যের ধাপ্পাটা যেন জীবন্ত সত্যের রূপ নিয়ে এসে আমার সামনে দাড়িয়েছে। সত্যি আশুবাবু আজ বড় বিপন্ন।” “কিন্তু ডাঃ ঘােষের ভাবের কোনও বদলই তাে লক্ষ্য করা গেল না। তিনি এ সম্পূর্ণ ধাপ্পা বলেই প’বে নিয়েছেন তা হলে। নয় কি?” “তাই তিনি ধরেছেন কি এর মধ্যে আবও অন্য কিছু বহস্য আছে সেইটাই আমি ভাবছি। মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে গেছে। যাই হােক সুশীলবাবু, আপনি কাল সকাল বেলাই আমার এখানে আসবেন। বিশেষ কাজ আছে। অন্ধকে ধরবার কল পাততে হবে আর তাতে আপনার সাহায্য আমার খুব বেশী কবে চাই। আপনি কাল আপিসে আর যাবেন না। আমি অতুলবাবুকে ব’লে ছুটি করিয়ে নেবো এখন।” সুশীলবাবু উঠে দাড়িয়ে বললেন, “বেশ, এখন তা হলে আসি, রাত হচ্ছে।” সুশীলবাবু রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন।
অন্ধের সন্ধান
আসামীকে পাওয়া গেল-কিন্তু তাকে পাবার আগে
যে সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটলে তা শুনলে বাস্তবিক
শিউরে উঠতে হয়। আসামী ধরা ছিল। কিন্তু
আইনের কোনও ধারাতেই তাকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব
হলাে না কেন?
No text on this page.
(১৫) পরের দিন সকালবেলা মুশীলবাবু যখন প্রফুল্লৰাবুর বাড়ীতে গিয়ে জির হলেন তখন প্রায় ৮টা। তাকে দেখেই প্রফুল্লৰাবু বলে উঠলেন- “এই যে এসেছেন, আমি আপনার জন্যেই পথ চেয়ে বসেছিলুম। একটু অপেক্ষা করুন।” টেলিফোনটা তুলে নিয়ে তিনি কথা কইতে লাগলেন, “হ্যালাে কে আপনা-আমাষ্ট টু থানা ? আমি ইন্সপেক্টর যতীনবাবুকে চাই। ও আপনিই যতীনবাবু ? নমস্কার। যথার্থ অনুমান কবেছেন। লােকটার কোনও বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করতে পেরেছেন কি ? সাধারণ অন্ধেরা যেমন হয় তার চেয়েও কোনও রকম নৃতত্ব? হ্যা, আমি সেইটুকু লক্ষ্য করতে ব’লছি।” খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে প্রফুল্লবাবু আবার আরম্ভ করলেন, “কি নাম বললেন পুলিশটার-বামসিং ? এখন কি সে ঘাঁটিতে আছে ? কি বললেন-একটা অবধি তার ডিউটি ? বেশ ফিবে এলে দয়া করে আমাকে একবার ফোন করবেন।
অন্ধের যষ্টি
রিসিভারটা টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে তিনি সুশীলবাবুকে বলেন,
“সকাল থেকে কেবল ফোন্ করছি। তবু এখনও অনেক বাকি।”
“তার মানে? আপনি করছেন কি ?
আপনি করছেন কি ? এত ফোনের দরকার ?”
কলকাতার সব থানাগুলােতেই করতে হচ্ছে কিনা।”
“ও বুঝেছি। আপনি কলকাতা সহরে তা হলে কোনও অন্ধকেই
পুলিশ-চক্ষুর অন্তরালে রাখতে চাননা।”
“না, সবাইকে নয়। শুধু যাদের পুলিশ ইতিপূর্বে কোনও দিনই
দেখেনি। তিনটা এই রকম সন্ধান পেয়েছি এর মধ্যে, কিন্তু যেটিকে
আমরা খুজছি তার সঙ্গে কোনওটিই মিল পাচ্ছিনা।”
“আচ্ছ। প্রফুল্লবাবু, কেমন করে আপনি আশুবাবুর সন্ধান পেলেন
বলুন তাে! আমি তাে ভেবেই উঠতে পারিনা।”
“আপনারই সাহায্য আমি সেটা পেলুম আর আপনি জিজ্ঞাসা
করছেন?”
আমার সাহায্যে।”
“এর মধ্যেই সব ভুলে গেলেন সুশীলবাবু। আপনাকে আমি বলে-
ছিলুম না সহরে যদি কোনও লােক হারানাে সংবাদ পাওয়া যায় আমাকে
জানাবেন।
তারপর আপনিই আমাকে সেই চা কোম্পানীর বিজ্ঞাপনটা
এনে দেন।”
*কিন্তু তবু প্রফুল্ল, ঐ সামান্য সূত্র ধরে এত বড় আবিস্কার আমার
কাছে যেন অসম্ভব বলেই ঠেকে।”
“শুধু ঐটুকু সূত্র ধরে জিনিষটা বার করা অসম্ভবই বটে। কিন্তু সেই
থেকে আমি সেই চা কোম্পানীর ওপর রীতিমত নজর রাখি। ফলে ডাঃ
অন্ধের সন্ধান — ঘােসর সেখানে যাতায়াতটা ধরা পড়ে। সেই আফিসের ম্যানেজার ব্ৰজেনবাবুর ওপর পর্যন্ত আমি দৃষ্টি রাখতে ক্রটি করিনি এখন বুঝতে পারছেন-কেমন করে ব্যাপারটা বেরিয়ে এসেছে? আর একটু মজা দেখবেন ?” বলেই তিনি পকেট থেকে নােট বইটা বার করে সুশীলবাবুর সামনে খুলে ধরলেন। তাতে ছ’টা বিজ্ঞাপনের কাটিং সংগ্রহ করা ছিল। প্রথমটাতে লেখা ছিল- ‘আশুবাবু যদি অনুগ্রহ করে কোম্পানীর অফিসে এসে দেখা করেন- ইত্যাদি। দ্বিতীয়টীতে লেখা ছিল :- কিছুদিন আগে অন্ধকে গভীর রাত্রে রাসবিহারী এভিনিউয়ে দেখা গিয়াছিল•••কেহ যদি সন্ধান দিতে পারেন- ইত্যাদি।” “দু’টোর ভেতর পার্থক্য দেখছেন কি সুশীলবাবু?” ‘বিলক্ষণ। প্রথমটী আশুবাবুকে উদ্দেশ করে লেখা হয়েছিল এবং দ্বিতীয়টা জনসাধারণকে উদ্দেশ করে লেখা।” “এ থেকে কিছু বুঝতে পারা যায় কি ?” “কি বােঝা যাবে বলুন ?” “অতি সরল কথা সুশীলবাবু। প্রথম বিজ্ঞাপনটা যখন বেরােয় তখন কোম্পানী জাতে না আশুবাবু অন্ধ। তাই তঁাকেই উদ্দেশ করা হয়েছিল। তারপর ডাঃ ঘােষের কাছ থেকে সব শুনে দ্বিতীয়টা ছাপাবার ব্যবস্থা করা হয়।” “কিন্তু আশ্চর্য প্রফুলবাৰু, এটা তো এর আগে আমার চোখে পড়েনি।”
অন্ধের যষ্টি ঐখানটাতেই কেবল আপনাতে আমাতে তফাৎ। আমি সোজা চোখে যা দেখি আপনি তা দেখেন না। নইলে আপনিও মানুষ আর আমিও মানুষ । ভাষা-লালিত্য আর ঘটনা-বিপৰ্যয়ের ওপর দৃষ্টি রাখতে পারলে সম্পাদক হওয়া যায় বটে কিন্তু শীলবাবু, সব দিকে চৌকস না হলে তদন্ত করা যায় না।” “কি আশুবাবুর ছবিটা আপনি জোটালেন কেমন করে?” যেদিন আমরা ডাঃ ঘােষের সঙ্গে দেখা করতে যাই—মনে পড়ে কি সেদিনের কথা? “সেদিন কি করে ওটা পেলেন ?” “ডাঃ ঘােধের ঘরে একটা গ্রুপ ফটো টাঙান ছিল। হঠাৎ কেমন করে সেটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফটোটার তলায় লেখা ছিল সেকেণ্ড ইয়ার ক্লাস। আমার কেমন যেন মনে হয়েছিল তার মধ্যে আশুবাবুর ফটো পাওয়া গেলেও যেতে পারে। তাই ছবিটা সরাবার মতলব ভেজে ফেলি। বেশী অপেক্ষা আমাকে করতে হয়নি, কারণ সেইদিন রাত্রেই ভাঃ ঘােষ ব্ৰজেনবাবুর সঙ্গে নিরুদ্দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে যান। আমিও সুবিধা বুঝে তাঁর একটা চাকরকে ঘুষ দিয়ে একদিনের জন্য ছবিটী সরিয়ে নিয়ে গিয়ে গ্রুপের প্রত্যেকটা লােকের এক একটা আলাদা ছবি তৈয়ার করিয়ে নিই। এপটীতে আর একটা জিনিষ আমি লক্ষ্য করি। একটা লােকের কাধে হাত দিয়ে ডাঃ ঘােষ দাড়িয়েছিলেন। সুতরাং সেইটাই আশুবাবুর ছবি হওয়া খুবই সম্ভব। কাল রাত্রে তিনি এখানে আসতে প্রথমেই আমি সেই ছবিটা তাঁকে দেখাই এবং আমার আকাজের সত্যতা আপনি বসে থেকেই দেখেছেন।”
অবের সন্ধান
সেই সময় টেলিফোনের বেলটা
বে
উঠলাে। প্রফুল্লবাবু
রিসিভারটা তুলে কাণে ধ’রলেন,-“হ্যালাে, কে আপনি? ও আমহাট
খানা ? খবর কি? কোথায়? ও আমহাষ্ট স্ট্রীটের ওপর ? পার্কটার
রেলিংয়ের ধারে। বেশ।
অন্ধের বিশেষত্ব কি দেখেছেন? ও আচ্ছা।
দশটা থেকে বারটা আর চারটা থেকে ছটা অবধি বসে? আমি বাবার
আগে তাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করবার দরকার নেই। প্রয়ােজন
সব ঠিক হবে। নমস্কার ইন্সপেক্টর।”
টেলিফোনটা ছেড়ে দিয়েই প্রফুল্ল বাবু বলে উঠলেন, “আমার মনে হয়
সুশীলবাবু আজই বেলা সময় আমরা আশুবাবুর দর্শন
লাভ করবে।”
(১৬)
সেইদিন বেলা দশটার সময়।
সুশীলবাবু ও প্রফুল্লবাবু আমহাষ্ট ষ্ট্ৰীটের দিকে রওনা হলেন।
ট্যাক্সিটা যথাস্থানে পৌছুতেই তারা নেমে পড়লেন। রেলিংয়ের ধারে
অন্ধ লােকটার ওপর নজর পড়তেই প্রফুল্লবাবু বলেন, “পেয়েছি সুশীলবাবু,
এই আমাদের লােক।”
অন্ধের যষ্টি
সুশীলবাবু বল্লেন, “কিন্তু আমার মনে হয় ছবিটার লােকটীর চেয়ে এর
যেন কিছু বেশী বয়েস হয়েছে।”
“সেটা তাে স্বাভাবিক। ভুলে যাচ্ছেন কেন, ছবিটা কতদিন
আগেকার! যান আপনি গিয়ে কথা কইতে আরম্ভ করুন। আমি
এখান থেকেই লক্ষ্য করি। খুব সাবধান সুশীলবাবু-অন্ধের কর্ণেন্দ্রিয়
খুব প্রখর ; যেন কোনও ক্রমে সন্দেহ না করতে পারে।
তারা অন্ধের কাছ থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে কথা কইছিলেন।
সুশীলবাৰু দ্বিরুক্তি না করে এগিয়ে পড়লেন।
অন্ধের সঙ্গে কেমন করে কথা আরম্ভ করা যায় •••একটু ইতস্তত করে
আরম্ভ করলেন, “বাঃ তুমি তাে বেশ গড় গড় করে পড়তে পারে
দেখছি।”
অন্ধ বললে, “আপনাদের আশীর্বাদে একটু শিখেছি।”
“আচ্ছা একটু ভাল করে পড়তে শুনি।”
পাতার ওপর হাত বুলুতে বুলুতে অন্ধ পড়তে শুরু করলে। এক পাতা
পডা হতেই সুশীলবাবু তাকে থামিয়ে দিলেন, “থাক, আর পড়তে
হবে না। আচ্ছা তােমার নামটা কি ভাই।”
“নাম ? আমার নাম-শিবচন্দ্র কাসারি।”
“আচ্ছা--তুমি কি জন্মান্ধ না কোনও রকমে চোখটা নষ্ট হয়ে গেছে?”
“ন্মান্ধ হওয়া ত ভাল ছিল মশাই।”
“কেমন করে চোখটা নষ্ট হলো ?
কারখানায় কাজ করতুম—একদিন মি সান দিতে দিতে লােহার
গুড়ো চোখে পড়ে যায়। ফলে এই দুর্গতি।”
“আচ্ছা, তোমার জীবন বৃত্তান্ত একটু আমায় বলবে?” “কেন বলুন তাে আপনি এই হতভাগ্যের কথা জানতে এত উগ্রীব?” “না, এমন কিছু নয়। আমি দৈনিক সংবাদপত্রের রিপাের্টার কিনা- তােমার জীবন বৃত্তান্ত একটু কাগজে ছাপিয়ে দিতে পারি যদি। তােমার মত দুর্ভাগ্যগ্রন্ত লােকদের যদি একটু কিনারা হয়-তা হলে এমন করে পথের ধারে ভিক্ষা করে দিনগুলাে কাটাতে হয় না।” “খবরের কাগজে ছাপিয়ে দিয়ে আমাদের কোনও উপকার করতে পারবেন না মশাই। আমাদের দেশ তেমনতর নয় মােটেই। ধন্যবাদ আপনি তবু একটু অনুগ্রহ প্রকাশ করলেন। আমার পরম সৌভাগ্য।” “তােমার জীবনের—অন্ততঃ কারখানায় চাকরী জীবনের একটু বল না শুনি। জান তাে আজকাল শ্রমিক আন্দোলন যুগে- “না মশাই আমি বলবনা। তা ছাড়া আপনার জেনেও বিশেষ কোনও ফল নাই।” সুশীলবাবু দেখলেন লােকটা একান্তই কিছু ভাঙতে চায়না। পকেট থেকে একটা দুয়ানি বার করে তার হাতে দিয়ে বল্লেন, “যাক কিছু মনে করাে না ভাই। এমনি কৌতুহল বশে তােমায় খানিকটা বিরক্ত করে গেলুম।” অন্ধ আবার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বই পড়তে শুরু করলাে। সুশীলবাবু অষণা কালক্ষেপ না করে প্রফুল্লবাবুর কাছে ফিরে এলেন। প্রফুল্লবাবু সব শুনে চুপ করেই দাঁড়িয়ে রইলেন। সুশীলবাবু বলেন, “তা হলে আপনার অনুমানটা এখানে ঠিক খাটুলল নাকি বলেন?”
অন্ধের যষ্টি “আমি কিছুই বলিনা সুশীলবাবু।” তারা আর সেখানে দাঁড়ালেন না। একটু একটু করে থানার দিকে এতে লাগলেন। রাত্রিবেলা প্রফুলবাবুর কথামত সুশীলবাবু গিয়ে তার বাড়ীতে উপস্থিত হলেন। তিনি কোনও রকম ভণিতা না করেই বলে উঠলেন, “নােটার উপর আমার খুব সন্দেহ হয় সুশীলবাবু।” সামূনের চেয়ারখানায় বসে পড়ে সুশীলবাবু লক্ষ্য করলেন সেই ছবিখানি টেবিলের ওপর পড়ে রয়েছে। বললেন, “আপনি বুঝি এখনও ভাবছেন শিবচন্দ্র সারি আশুবাবু কি না? কিন্তু আমার ত’ মনে হয় এ ছবিটার সঙ্গে তার কোন সাদৃশ্য নেই।” “আমার কিন্তু মনে হয় সাদৃশ্য যথেষ্টই আছে—আর শিবচন্দ্র নামটাও তার কি নাম নয়।” “তায় প্রমাণ ?” ‘‘আপনি কেবল কথায় কথায় প্রমাণ চেয়ে বসেন সুশীলবাবু এইটুকুই দুঃখ। এতদিন ধরে আমার সঙ্গে ঘুরেও দৃষ্টি শক্তিটার কিছু উন্নতি করা উচিৎ ছিল। অনেকগুলো কেনাের উত্তর এখন মিলছে না সুশীলবাবু। প্রথমে-কেন সে দিনের মধ্যে খানিকটা সময় ঐখানে বসে থাকে। কেন সে আপনাকে নিজের জীবন সম্বন্ধে কোনও কথা বলতে অনিচ্ছুক ? ভিক্ষা করাই যদি তার উপজীবিকা হতো তা” চলে সে দিনের পর দিন ঐখানেই বসে থাকতো। মজুরের সহজ জীবনীর তের কোনও লােকের কাছে গােপন করায় এক কিছুই থাকে না। তার ওপর যে লােক কারখানায় কাজ করে হাতগুলো অমন ভদ্রোচিত পরিষ্কারই বা থাকতে পারে কেমন কর তার হাতগুলাে দেখেই বেশ দৃঢ় ভাবে বলা যেতে পায়ে জীবনে কখনও সে সামান্য মজুরের কাজ করেনি। বিশেষ একজন মজুর কখনও অমন গতি ভাষায় কথাও বলতে পারে না। ‘মার্জিত কথা আপনি ধরলেন কেমন করে ?” “শুধু একটা কথা থেকেই বােঝা যায়। মনে আছে সে বলেছিল খবরের কাগজে তার জীবনী ছাপিয়ে আপনি কোন উপকারই করতে পারবেন না ! আমাদের দেশ তেমনতর নয় মােটেই! এইখানেই সে ধরা দিয়ে ফেলেছে সুশীলবাবু। অশিক্ষিত ছুরি সা-দেওয়া মজুরের মুখ থেকে অমন কথা বেরুতেই পারে না।” “কিন্তু তবু প্রফুল্লবাবু, এটুকু আমি বেশ জোর করেই বলতে পারি আশুবাবুর সঙ্গে এর চেহারার কোনও সাদৃশ্য নেই।” “তা থাকাও সব নয়। মনে করেন কি আপনি যে তার রূপ নিয়েই ঐখানে ববে? চেহারাটা সে মেক-আপ নিয়ে একটু বদল করেছে বৈকি। যাই হােক কাল আবার ওর কাছে গিয়ে আরও কিছু জানবার চেষ্টা করতে হবে। পরের দিন সকাল বেলা সুশীলবাবু প্রফুল্লৰাবুর বাড়ীতে গিয়ে দেন তিনি কোথায় বেরিয়েছেন। তাঁকে সেইখানে অপেক্ষা করতে বলে গেছেন। একলা ঘরে ঢুকে বসে সুশীলবাবু সময় কাটাবার জয়ে টেবিলের অন্ধের যষ্টি ও শীত মাসিক পত্রগুলি ঘটতে শুরু করলেন। তার নজর পলাে ওপরের দু’চারখানি বই ছাড়া আর সৰলই এক জাতীয় কাগজ। ৗেছুল হলাে প্রফুল্লবাবু কোন কাগজখানা নিয়মিত পাঠ করেন জার অয়ে। কাগজগুলাের ভেতর থেকে একখানা টেনে বার করে ফেলেন। “অন মহল”? প্রফুৰাবু তাহলে ভূপতিবাবুর কাগটাই যত্ন করে পড়েন। ঘাটতে ঘাঁটতে তিনি আরও জেনে ফেল্লেন ‘অন্দরমহলের জন্ম সময় থেকে আজ পর্যন্ত যত সংখ্যা বেরিয়েছে সবগুলিই টেবিলের ওপর বিমান। অনুমান করতে তাঁর দেরী হলাে না-প্ৰফুৰাৰ কাগজখানার ভক্ত হােন্ আর নাই হােন এই কেটীর জন্যেই এগুলি চেষ্টা করে গােড় করেছেন। চাকাটা এসে এক কাপ চা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সুশীলবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবু কোথায় গেছেন বলতে পারাে ?” বলে গেছেন তিনি পুলিশ আপিসে যাচ্ছেন।” “পুলিশ আপিসে ?” আহো।” চাটা চলে যেতে চায়ে চুমুক দিতে দিতে তিনি ভাবতে লাগলেন, পুলিশের হাের বিরােধী প্রফুল্লবাবু কেন পুলিশ আপিসে যেতে গেলেন ? কি কারণ থাকতে পারে এর ! এটা ওটা সেটা অনেক ভালেন, শেষে হেসে ফেলেন। এতদিনে ঠিক তার গায়ে ঐ অদ্ভুত প্রফুলবাবুব হাওয়া লেগেছে বােধ ; নইলে কেন উত্তরের কে তিনি অনেক কিছুই ভেবে ফেHেন। সসের লে বা গুণ মানুষের মনকে এমনই করে ধীরে এর অধিকার করে বসে।
অমে সান
বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হলাে না। প্রফুল্লবার এসে হাসিমুখে ঘরে
ঢুকলেন।
কতক্ষণ এসেছেন সুশীলবাবু ?”
বেশীক্ষণ নয় মিনিট পনেরাে।”
“আমাকে একবার পুলিশ আপিসে যেতে হয়েছিল।”
“তাও শুনিছি। কিন্তু পুলিশ আপিসে যে আপনি কেন গেলেন সেই
কথাটাই আমি ভাবছিলুম।”
“আচ্ছা সে ভাবনাটা এখন আর ভেবে কাজ নেই। চা-টা খাওয়া
হয়ে গেছে ? এখন বেরিয়ে পড়ি চলুন। পথেই সব ব’বাে।
সিগারেট ইচ্ছা করেন।”
প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে সুশীলবাবু মুখের সানে
ধরলেন।
আপনার যে আজ আনন্দ আর ধরছে না দেখছি। কি ব্যাপার
বলুন তো?”
“পরে বলবো ব-এখন ধোয়াটা টানুন আরাম করে এবং কষ্ট
করে বেরিয়ে পড় রাস্তায়।”
রাস্তায় যেতে যেতে প্রফুল্পবাবু বল্লেন, “দেখুন সুশীলবাবু, আজ অন্ধের
সঙ্গে একটু চালাকি খেলতে হবে। যদি ও আশুবাবুই হয় তাহলে ওর
পক্ষে সেটা জেনে ফেলা আমাদের কাজের ঘােরতর অন্তরায় হয়ে দাড়াবে।”
“আর যদি বাস্তবিক শিবচ হয়-তাহলে?”
“তাহলে ও জানলে তো বয়েই গেল। যা খুশী তাবুকগে সে। যাই
হােক, এবারও আপনি যখন ওর সঙ্গে কথা কইবেন, আমি চুপ করেই
-
বাড়িয়ে থাকবে, তবে এইটুকু কেবল লক্ষ্য রাখতে হবে-যাতে আমায় ও কোনও রকমে সন্দেহ করতে না পারে।” ঠিক দশটার সময় তারা আমহাষ্ট ষ্ট্ৰীটে পৌছুলেন। অন্ধ তেমনই ভাবে পার্কের রেলিংয়ের পাশে ফুটপাথের ওপর বসে টেচিয়ে চেঁচিয়ে বই প'ড়ছে। প্রফুল্লবাবু এদিক থেকে ওদিক ঘুরে ঘুরে এক জায়গায় দাড়িয়ে একটু একটু মুচকি বলেন, “আমাদের দেশের অন্ধেরা সাধারণতঃ গান গেয়ে বা শুধু কথায় দুঃখ জানিয়ে ভিক্ষে করে। এ আবার নতুন পন্থা অবলম্বন করেছে বই পড়া। এর ভেতর কি কোন অর্থ নেই সুশীলবাবু?” “অর্থ থাকলেও আপনি হয়তো বুঝেছেন সেটা-কিন্তু আমার কাছে সবটাই যেন দুর্বোধ্য ধোয়ার মতই ঠেছে। আগুবাবুই যদি হতঁার মত অভিমানী পােক পথের ধারে বসে ভিক্ষে করবেন-এও কি সম্ভব ?” “খুব সম্ভব সুশীলবাবু। আপনি আর দেরী করবেন না। অন্ধের সঙ্গে গিয়ে কথা কইতে সুরু করে দিন।” সুশীলবাবু গিয়ে অন্ধকে বল্লেন, “নার শিবচন্দ্র-ভাল আছছা তো ?” “নমস্কার। ভাল আছি বৈকি। নইলে আর এখানে বসতে পেরেছি ?” "কিন্তু আমি কে তা চিন্তে পেরেছে ?” “বিলক্ষণ ! আপনি কাল আমাকে একটা লেয়ানি দিয়ে গিছলেন।” “তােমার তো খুব স্মরণ শক্তি ! গলার আওয়াজ তুমি এত মনে করে রাখতে পারাে ?” ‘এতে আয় বাহাদুরি কি আছে? আপনি দাতা আমি গৃহীতা। পয়সাটা পকেটে পুরে যদি আপনাকে ভুলে যাই- অযু সাল - “তা দেখ আজও তুমি ঐ বইটা একটু পড়ে শােনাও যদি পয়সা পাবে।” অন্ধ বইখানার ওপর দিয়ে আঙ্গুল চালাতে শুরু করলে। সুশীলবাবু তাড়াতাড়ি একখানা কাগজ পকেট থেকে বার করে বল্লেন, “আচ্ছা তােমার বইটার ওপর আমি একবার হাতটা বুলুই দাওতে-দেখি লেখাগুলাের ওপর কেমন করে হাতটা চালাতে হয়।” অন্ধ বই থেকে একবার মাত্র হাতটা তুলতেই তিনি কাগজখানি পাতার ওপর খুলে ধরে বল্লেন, “নাঃ ও আমার দ্বারা সম্ভব নয়, তুমিই পড়।” শিবচন্দ্র একবার মাত্র কাগজ থানার ওপব হাত দিতেই—তাড়াতাড়ি সেটা টেনে নিয়ে তিনি পকেটে পুরে ফেল্লেন। অন্ধ বল্লে, আপনার হাতে কি জল ছিল ? অমন ভিজে ঠেকলাে কেন?” সুশীলবাবু বল্লেন, “ওটা কিছু নয় -হাতটা একটু থেমেছিল মাত্র।” অন্ধ শুক্ষেপ না করে চেঁচিয়ে চেচিয়ে পড়তে আরম্ভ করলে। সেই সময় প্রফুল্লবাবু পা টিপে টিপে এসে তার পেছনে দাড়ালেন। সুশীলবাবু হাতটা নাড়বার অছিলায় চট করে তার পাগড়ীটা খুলে দিয়ে বলেন, “আহা কিছু মনে ক’নােনা শিবচহাতটা নাড়তে গিয়ে লেগে গেল।” সেই অবসরে প্রফুলবাবু তার মাথার কাছে এক গােছ চুল বার করে মিলিয়ে নিলেন। তাঁর কাজ শেষ হয়ে ৰেতেই সুশীলবাবু পাগড়ীটা কুড়িরে অন্ধের মতে দিয়ে দিলেন। অন্ধ বলে, “দৈবাৎ লেগে গেছে+-তাতে কি হয়েছে পকেট থেকে দুআনা পয়সা বার করে তার হাতে দিয়ে সুশীলবাবু বললেন, “আজ তাহলে আসি শিবচত্র। ধবা।” ।
প্রফুলবাবু আগেই সেখান থেকে সরে পড়েছিলেন। অন্ধের কাছে বিদায় নিয়ে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে সুশীলবাবু র স ধরে নিলেন। (১৭) “আপনি বেশ ভাল ভাবে জানেন অন্ধ কিছু বুঝতে পারেনি ?” “নিশ্চয়ই।” “আপনার করনীয়টুকু তাহলে কৃতিত্বের সঙ্গেই করা হয়েছে বলা যেতে পারে। সুন্দর! একজনের হাতের ছাপ তুলে আনা গেল সম্পূর্ণতাবে তা । অজ্ঞাতসা।ে" “আচ্ছ। আপনি কি এখনও মনে করেন অন্ধটা শিবচত্র নয়?” “মনে করি কি সুশীলবাৰ? ধ্রুব সত্য শিৰচ ওর নকল না।” সুশীলর আর কোনও এ না করে পথ চলতে লাগলেন। লাে চিন্তা একসঙ্গে তার মনের মধ্যে খেলে যেতে লাগলাে। প্রফুৰা ছদ্মবেশী আশুবাবুকে ধরলেন? লােকটা সত্যই যদি আতৰা হয় কেনই বা তাকে এখনই গ্রেপ্তার করা হলাে না। ভূপতিবাবুর ঘরে পাওয়া চুলগুলাের সঙ্গে অন্ধের সম্পর্ক কি? সম্পর্কই যদি না থাকে তবে এবার কেন সেগুলাে মিলিয়ে নিতে এত চালাকি খেলেন? তবে কি শেষ অবধি কাবাবুই খুনী সাব্যস্ত হয়ে যাবেন। তার পক্ষে চুপ করে থাকা
শবের সান
যেন আর সম্ভব হলাে না। ক ত করে তিনি বলেন,
প্রফুল্লবাৰু, চুলল কি ঐ অন্ধের বলেই স্থির হলাে?”
“না।”
“হাতের ছাপ থেকে কিছু বুঝলেন?”
“এইটুকু বুঝলুম যে, অষয়বাবু যে ছাপটার জন্য মাথা ঘামানের খুনীয়
ছাপ বলে এটা সেটার সঙ্গেই মিলে যায়।”
সুশীলবাবু যেন চমকে উঠলেন, “তবে কি-অন্ধই
“চুপ। এখন আর কোনও কথা নয়।”
বাড়ীতে পেীছে একুবাবু চাকরটাকে দুকাপ চা আনতে কুয়ে
বাইরের ঘরে গিয়ে বসে পড়লেন। পেছন পেছন সুশীল প্রবেশ
কয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন তবে আশুবাবু সন্ধে আপনি কি করতে
চান ?”
“ৰেন তিনি আছেন, তেমনি ভাবেই থাকতে দিতে চাই।”
তাকে গ্রেপ্তার করছেন না কেন?”
“ওকে গ্রেপ্তার যদি করি তা হলে যে মেয়েটা একেবারে কাগ থেকে
যাবে সুশীলবাবু। ওকে দিয়েই যে তাকে ধরতে হবে। আবার তার
দৌলতে আর একজন ধরা পড়বে। বুঝলেন ব্যাপারটা ?”
“তা হলে আপনি ওর ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন বলুন।”
“রাখাে কেন—এখনই সে সর্বদা পুলিশের চোখে চোখে রয়েছে।”
১০: “রাগ করবেন না প্রফুল্লবার, অশনি না পুলিশের সাহায্য নেবেন না বলেছিলেন ?” “পুলিশের সাহায্য নেবে না মানে? অমরবাবুর থিওরিটা আমি নিইনি। তাই বলে এমন সব সাহায্য না নেবার কোনও হেতু নেই। ভাল থ। চাটা খেয়েই আপমি আপিসে চলে যা। অতুলবাবু ক’দিন সে আমাকে আলাতন করে তুলছেন কেসের স্নিপাের্টের অগে। তাঁকে গিলে বলবেন আর দু একদিনের মধ্যেই দৈনিক সংবাদের পাতাগুলি ভরে দেবার মত ম্যাটার আমি সববরাহ করতে পাবে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন আপনার হাতটাও আমি ব্যথা না করিয়ে ছাড়বাে না।” সেই সময় টেলিফোনেব বেলটা বেজে উঠলো। প্রফুল্লবাবু রিসিভারটা। তুলে নিয়ে বল্লেন, “কে?-ও-কি খবর? কি বল্লেন ? একটা মেয়ে? রাম সিং দেখেছে ?-- কতখানি দুরৈ ছিল সে? বেশ ভালই। কেউ ছিল না ?– আধা বয়সী লােক?—আচ্ছা আমি এখুনি যাচ্ছি। রাম সিং যেন খামায় উপস্থিত থাকে।” ফোন ছেড়ে দিযেই তিনি একেবারে চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে উঠলেন। “পেয়েছি সুশীলবাবু। চলুন বেরিয়ে পড়ি। এখন অব আপনার আপিসে ফেরবার অবকাশ নেই।” সঙ্গে থানায় গিয়ে প্রফুলবাবু একেবারে রাম, সিংকে আক্রমণ করে বলেন। কেমন ক'লে সে তাকে দেখলে, কি গাজী করে এসেছিল ইত্যাদি প্রশ্নের অন্ধের সন্ধান পর প্রশ্ন করতে লাগলেন। ফলে জানা গেল মেয়েটা একটা মটরে করে এসেছিল। সঙ্গে যে ভদ্রলােকটা এসেছিলেন পুলিশের কথা থেকে মনে হয় সেটা মেসেটার পি । কেন না মটরটা খামতেই সে বলে উঠেছিল, বাবা, সেই অন্ধ। মেয়েটীর রূপের বর্ণনা পাওয়া গেল-টুকটুকে রং-অনিন্দ্য- সুন্দবী। পুলিশকে ছেড়ে দিয়ে প্রফুল্লবাবু বল্লেন, “তাইতাে সুশীলবাবু, আমরা চলে আসবার দশ মিিনট পরেই তারা এসেছিল! শুধু দশ মিনিটের .তফাতে পরাধী হাজির হয়েছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য তাদের চাক্ষুস দেখাটা পাইনি। দেখা যাক-তার সকলে কি খবর দেয়।” সুশীলবাবু বল্লেন, “আর সকলে মানে?” “আপনি কি মনে করেন—শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করেই আমি বসেছিলুম। এছাড়া আমার আরও তিনটা চর সেখানে মজুত রেখেছি।” “কিন্তু কই, আমরা যখন যাই কাউকেই দেখলুম না তো?” “ আমি কিন্তু সবাইকেই দেখেছি।” “কোথায় লুকিয়ে ছিল তারা ?” * লুকিয়ে থাকবে আবার কোথায়? সামনেই ছিল। একটী লােক পার্কের বেলিংয়ে রং লাগাচ্ছিল দেখেছিলেন কি ? একটা লােক সানে কাডিসে দেশলাই বেচছিল ?” ‘তারা দুজনেই আপনার চর? আর একটা কোথায় ছিল ?” “আর একটা হচ্ছে উল্টো দিকের ফুটপাথের পানওলা।” থানা থেকে বেরিয়ে তারা তখন অন্যান্য চরের কাছ থেকে খবর জাতে বেরুলেন। পার্কের পাশে যখন পৌছুলেন, অন্ধ তখন উঠে গেছে। সকলেও পুলিশের সংবাদটীর পুনরুক্তি করলে মাত্র। কেবল পান ওলা কিঞ্চিৎ
অন্ধের যষ্টি
দূরে ছিল কালেই লোকটা যে সম্পর্কে মেয়ে কে । সেই সন্ধে কিছুই
বলতে পারলে না।
“কি আশ্চৰ্য্য এইটুকু মেয়ে কে অন্ধের সঙ্গে কথা কইলে না?
“সে তাে খাবিক। এমন কি তারা যে এসেছে বা তাকে দেখেছে
এটুকুও আনুতে না দেবার জন্য মটর কিছু দূরে থামান হয়েছিল। তাপ
অন্ধ ঠিক আশুবাবু কিনা জান্বার এ দু'জনে তার কাছ অধি
এগিয়েছি। ঠিক-তাহলে মেয়েটা আবায় এবার আসবে বােধ হয়
সুশীলবাবু।”
“তাই বা কেমন করে বলা যায়? না আসতেও তো পারে?”
“সে অাবেই ; এবং আসবে এবার একলা।”
“দেখুন প্রবাবু, কথাগুলাে যখন আপনি ভবিষ্যৎবাণীর মত বলে বা
তখন শুনলে মনে হয় পাগলামি। কিন্তু ঘটনাগুলি যখন মালার মত পাখা
হরে কথার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। বলুন তাে
এখন-কেন
করে আপনি মেয়ের একলা আসা সা ধারণা
বেশন করে আপনি অন্ধের সঙ্গে মেয়েটা কথা কইলে না বলে আচৰ্য্য
হচ্ছিলেন। অন্ধের সঙ্গে কথা না কওয়ার মধ্যেই এই খাটায় ঠিকানা
এখৰ কথা কয়নি-তাই একবার কথা কইতে তাকে আসূতেই
ৰে। বুঝলেন শীলবাবু ?”
লবার তা হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। এষাৰু
আবার বলতে শুরু করলেন, “মটরখানা সােল উত্তর দিকে গেছে।
থেকেও মনে হয় পেনিটি মটর দুটিনার সঙ্গে এর ঘনিষ্ট সম্বন্ধ।” এইটুকু
অন্ধে সন্ধান
বলেই হঠাৎ উত্তেজিত ভাবে সুশীলবাবুব পিঠটা চাপড়ে বলে উঠলেন,
“পেয়েছিপেয়েছি সুশীলবাবু আসামীর সন্ধান। আব ২৪ ঘণ্টার ভেতর
৩াবা ধরা পড়বে।”
সুশীলবাবু একটু হেসে ফেলেন, “আপনার কথাটায় মনে পড়লাে
অমরবাবুর দুরবস্থার কথা।”
“আমাকে আপনি অমরবাবুর পায়ে ফেবেন না সুশীলবাবু, আমি তাঁর
মত আগে থেকেই খবরটা কাগজে ছাপিয়ে দিতে যাচ্ছিনাকি এটা
নিশ্চিত মানুষেন আমার কথায় কখনও নড় চড় না।”
এখন তা হলে বােধ হয় আপনি বলতে পারেন অপরাধী কে?"
“নিশ্চয় পরি বন্ধু।
অপরাধী সমাজের একজন গণ্য মা তােক
তার নাম আপনাদের কাগজে পাহে একদিন করে নিশ্চিত প্রকাশিত হয় ।
খুব চেনা লােক। এর বেশী এখন আর বলবাে না। নামটা এখন
আপনিই ভেবে বার করুন। কাল সকাল অবধি সময়। যদি বাষ করতে-
পারেন, বুঝবাে আমার সঙ্গে কদিন ঘাের। আপনার সার্থক হয়েছে।”
‘আ ভেবে দেখি তারপর কাল আপনাকে বলবাে। তাহলে এখন
আপনি কোন দিকে যাচ্ছেন ?”
প্রফুলবাবু জবাব দিলেন, “বাড়ীর দিকেই যাবে মনে করছি। আপনি
কি আপিসের দিকে যাবেন নাকি ?”
যেতে পারলে একবার ভাল হতো। কিন্তু, আর গা’ বইছে না ।
ঘােরাঘুরিটা হলো।”
“না না—তাহলে বাড়ীই চলে যান্ সােজা। আর কোথাও গিয়ে।
কাজ নেই। কাল কিন্তু সকাল বেলাই যেন আবার দর্শন পাই।”
(১৮) ঘটনাটা এখন এমনই অবস্থায় এসে পড়েছিল যে সুশীলবাবুকে যেন নিঃশ্বাস ফেলবার অবকাশ দিচ্ছিল না। কোনও গতিকে রাতটা কাটিয়ে ভোর বেলাই তিনি প্রফুল্লবাবুর বাড়ীতে হাজির হলেন। প্রফুল্লবাবু বলেন, “এই যে এসে গেছেন। তবে এত সকালেই আমি আপনাকে আশা করিনি। যাক ভালই হয়েছে।” কিছুক্ষণ পরে দুজনে আমূহাষ্ট স্ট্রীটে উপস্থিত হলেন। আজ অন্ধ সকাল বেলাই এসে বসেছে। সুশীলবাবু লক্ষ্য করলেন দেশলাই ওসা, বাংলা এবং পানওলা সকলেই যথারীতি কৰ্ম্মনিরত প্রফুল্লবাবু বলেন, “দেখুন আমাদের হয়তো এ বেলা এইখানে অপেক্ষা করতে হবে। চলুন ঐ দোকানটায় কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।” তারা সামনের দোকানটায় ঢুকে দুখানা চেয়ার অধিকার করে বসলেন। সেখান থেকে অন্ধকে বিশেষ নজর করা যায় না। সুশীলবাবু বলেন, “খান থেকে তো আমরা কিছু দেখতে পাবে না। যদি এর মধ্যে মেয়েটা এসে হাজির হয় ?” “তার জন্য চিন্তা নেই সুশীলবাবু। যে লোকটা রেলিংএ রং লাগাচ্ছে সে আশুবাবুর কাছ থেকে মাত্র হাত ৫৬ দূরে আছে। দেশলাইওলা হাত ১৩১২ ফুরে অপেক্ষা করছে। পানওলা উল্টো দিকের ফুটপাথে বসে আছে। এতগুলাে চোখে ধূলাে দেওয়া বড় সহজ হবে না। তা ছাড়া এই তিনটা আবার কি বকম লােক জানেন? একটা চুরি করার অপরাধে অন্ধের যষ্টি বার তিন চার জেল খেটে এসেছে, একটা বা দুই খেটেছে—আর একটা বেশ বড় দরের গাঁটকাটা।” “আপনি তা হলে কণ্টকেনৈব কন্টকম করছেন?” “ঠিক তাই। ডিটেকটিভ গমবাবু শতটা পুলিশ চর লাগিয়ে যান। করতে পাবেন আমার এই তিনটী অনুচর তার চেয়ে ঢেব বেশী কাজ দেয়।” প্রফুলবাবুর মুখখানা আজ যেন সাফল্য-গৌরবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। অনববাবু এখন হয়তো অগাধ সলিলে হাবুডুবু খাচ্ছেন। খবরের কাগজে মন ঘটনাটী প্রকাশিত হবে—তখন- সুশীলবাবু বলেন, দেখুন আমাদের কিন্তু এখানে বেশীক্ষণ অপেক্ষ। করা উচিত নয়।” ‘হপনি নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকুন। মেয়েটা এলেই তিন জনের এক জন এসে খবব দেবেই।” “কিন্তু—খবটা যদি ঠিক সময় না পৌছয় ? যদি তারা দেরী করে ফেল ? তার মধ্যেই যদি কিছু ঘটে যায় ?” কি ঘটতে পারে বলুন তাে সুশীলবাবু ?” মেযেটী যদি অন্ধকে নিয়ে পালিয়ে যায় ?” হাে হাে কবে হেসে উঠে প্রফুল্লবাবু বললেন, “আমিও কি সে ভয় না করি সুশীলবাবু ? কিন্তু সেটা যাতে না ঘটে তার জন্ম যথেষ্ট ব্যবস্থা করে রেখেছি।” তব কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই দেশলাইওলাটা ছুটে এসে খবর দিলে “মেয়েটা এসেছে। “মেয়েটা এসেছে। মটর থেকে এখনও নাবেনি। শিগগির।” খবর শুনে প্রফুল্লবাবু লাফিয়ে ফুটপাথে নেমে পড়লেন। সুশীলবাবুও অঙ্গের সন্ধান দ্বিরুক্তি না করে তার পেছু নিলেন। অন্ধের কাছ অবধি পৌছবার আগেই তাদের চোখের সামনেই মটরখানা তীরবেগে দৌড় দিলে। অন্ধও সঙ্গে সঙ্গে গাছতলা থেকে উধাও! তারা এগিয়ে যেতেই বংলাটা প্রফুল্লবাবুকে বলে উঠলো, “হুজুর অত রকমে তারা পালালাে।” “পালালাে কি বল? তােমাদের সামনে থেকে তােমাদের সামনে থেকে দিনের আলোয় একজন মেয়েমানুষ আর একটা অন্ধ পালাতে পারলে?” “ঐ কথাটা বলবেন না কত্তা। লােকটা যদি সত্যি অন্ধ হতো, নিশ্চষই এমন ভাবে পালাতে পারতো না। সে মােটেই অন্ধ নয়।” “অন্ধ নয় ?” প্রফুল্লবাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি কি ভ্রান্ত ? এতদিন ধরে কেবল একটা মিথ্যের পেছনে ছুটে বেড়িয়েছেন? অন্ধেব লাঠি-দেয়ালের গায়ে রক্তের অক্ষরে লেখা অন্ধ-অন্ধ-অন্ধ-লােকটা আজ এই সব প্রমাণের বিরুদ্ধে বলে কি? তিনি পুনর্বার ঘুরিয়ে ঐ প্রশ্নই করলেন, “অন্ধ নয় ?” না কর্তা নিশ্চয়ই নয়।” প্রফুল্লবাবুর মুখের ওপর যে কালাে ছায়াটা নেমে এসেছিল-নিমিষের মধ্যে যেন সেটা অর্জিত হয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে তিনি সা করলেন, “ব্যাপারটা কি ঘটলাে সব বললাদিকি পরিস্কার কবে ?” “মটটা এলে সামনে দাড়ালাে। আমি কাজ করতে করতে লক্ষ্য করলুম মেয়েটা একলাই এসেছিল। ভাবলুম সে নিই নেমে এসে অন্ধের সঙ্গে কথা কইবে কি তাকে নিয়ে গেলেও তার হাত ধরে গাড়ীতে চাপাতে হবে–তাই কোন ভ্রুক্ষেপ না করে কাজ করতে লাগলু !
১১১
কি নিমিষের মধ্যে ব্যাপারটা দাড়ালাে অন্য রকম। মেয়েটা গাড়ী থেকে
নামার আগেই অন্ধ ছুটে গিয়ে গাড়ীতে উঠে পড়েই বলে উঠলাে-“চালাও।
কিছু করবার অবকাশই f. এলে না।”
অন্ধের যা
ব প্রশ্ন করলেন, “কি বলেছিল? সুবর্ণা ?”
সুবর্ণা।” চোখের পলকে গাজীখান উধাও হয়ে গেল। আমাকে কোন
প্রফুৰাবু ব্যগ্রতা
রাতে ।”
“আর এ
আশুবাবুর।
হারাতে হয়
«নে নয় সুশীলবাবু, আমাদের আর সময় নষ্ট করলে চলবেনা।
জীবন এখন ঘােরতর বিপন্ন। মুহুর্ত বিয়ে হয়তো তাকে
মেনে দিয়ে একটা ট্যাক্সি যাচ্ছিল, সেটাকে দাড় করিয়ে প্রফুল্পবাবু
পবাবুকে নিয়ে চেপে বসলেন। সুশীলবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “কতদুর
; হবে এখন?”
“যাচ্ছি ডাক্তার ঘােষের বাড়ী অবধি।”
“কিন্তু অদ্ভুত কাণ্ড এটা।
কাও এটা। আশুবাবু অন্ধ না হয়েও কেন অন্ধ সেজে
বসেছিলেন-ডাঃ ঘােষ সব জেনে শুনে গােপন করে গেলেন যে তিনি অন্ধ
ন। এ থেকে কি মনে হয় আপনার ?”
এমন কথা আমার মনে হয় না যে অন্ধ কখনই অন্ধ ছিল না। বরং
সমস্ত ঘটনাগুলােকে বিচার করতে বসলে দেখা যায়-আতর আগে অন্ধ
ছিলেন, পরে চোখ ফিরে পেয়েছেন। ঠিক ; এখন আমি ডাঃ ঘােষের
কণার অর্থ বুঝতে পারছি। তিনি বলে গিছলেন যে অন্ধকে খুঁজে বার করা
খ * হবে। খুব সত্যি কথা; যে আর অন্ধ নেই তাঁকে আর অন্ধ বলে
খা পাওয়া যাবে।”
;
দোর গােড়ায় পৌছুলো
পিয়ে পড়তে আমরা
নকভাবে বিপন্ন ?
ফরতে দেবে?”
আমি ভেবে
ঔায়া নেমে পড়েই দেখলেন, ডাক্তার ঘােষ বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসছেন।
ভালই হয়ে গেল। প্রফুল্লবাবু সংক্ষেপে ঘটনাট । তাকে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন।
“আপনি যদি ঘুণাক্ষরে আমাদের জানিয়ে দিতেন। যে তিনি এখন আর অন্ধ।
অন্ধের সন্ধান
মিনিট ২০২৫ এর মধ্যে গাড়ীখানা ডাঃ ঘোষের
ন তা হলে এমন করে স্বেচ্ছায় মৃত্যুর কোলে
দিতুম না তাকে। বুঝতে পারছেন এখন তিনি কি ভয়
খুনী যখন জাবে তিনি আর অন্ধ ন তখন কি তঁাকে বেঁচে ।
ডাঃ ঘােষ কেমন যেন গুলিয়ে গেলেন। “একথাটা তত
দেখিনি প্রফুন্নবাবু!”
‘তা তাে দেখেননি। বলুন দিকি আশুবাবু মেয়েটার ঠিকানা অ
কাছে কিছু বলেছিলেন কিনা ?
“কিছুই বলেননি।
“দেখুন-এখন আর লুকুবেন না কিছু। বুঝতেই পারছেন আপনার
এখন কি অবস্থায় পড়েছেন ?”
“তা’ সবই আমি ঠিক বুঝছি প্রফুলবাবু কিন্তু সত্যিই সে আমার কাছে
ঠিকানা সম্বন্ধে কিছুই উল্লেখ করেনি।”
ডাক্তার ঘােষের কাছে কোনও সাহায্য না পেয়ে তারা আবার গিয়ে
ট্যাক্সি আশ্রয় করলেন। সুশীলবাবু বললেন, “এবার কোথায় যাবেন ?”
এখন যাবাে পেনিটির দিকে। একটু অন্ধকারে ঢিল মেরে দেখি।
চেষ্টা যদি ব্যর্থ হয় তা হলে আশুবাবুকে বাচাননা দুঃসাধ্য হয়ে যাবে । লােকট
নিজেই এমন করে আগুনের মাঝে ঝাপিয়ে পড়লাে!”
সুশীলবাবু বলেন, “অমন সুন্দরী রমণীর সান্নিধ্যকে আপ
এ
অন্ধের সন্ধান ১১৩ দিচ্ছেন, প্রফুল্পবাবু!” “মেয়েমানুষগুলো ঠিক আগুনেব মত ভয়াবহ সুশীলবাবু। তাবা প্রস হলে পুরুষকে সেই আগুনটুকু জেলে সেবা দেয় আর অপ্রসন্ন হলে তাতেই তাকে পুড়িয়ে ছাই কবে ফেলে।” “কিন্তু আপনিই তাে বলেছেন সুবর্ণা তাকে ভালবাসে।” “তাব ভালবাসাটাই হয়তাে আশুবাবুর কাল হয়ে দাড়িয়েছে।” যতদূর সম্ভব দ্রুত গাড়ীটা ছুটে চলেছে। আরােহী দুজনের হঠাৎ যেন সব কথা ফুরিয়ে গেছে। দুজনেই চুপ করে ভাবতে লেগে গেছেন। এখন শুবাবর অদষ্ট কি আছে কে জানে! (১৯) পেনিটির থানায় গিয়ে যখন গাড়ীটা থামলো তখন বেলা তিনটে। ইন্সপেক্টবের সঙ্গে কথা ক’য়ে জানা গেল সেই অদ্ভুত টায়ার লাগানাে শটটা থানা থেকে প্রায় মাইল খানেক দুবে থাকে। একটা ছােটো বাংলাে বাড়ী- চার পাশে মস্ত বড় বাগান পাচিলে ঘেরা। তারই গেটের মধ্যে ছােট একটা গারেজে মটরটী রাখা হয়। লাখবাবু গুদ্ধ করলেন, “ভাল কথা সুশীলবাবু, আপনি যে বলেছিলেন শাও:
काकद्र यति ভেবে চিন্তে আজ সকালেই আমাকে আসামীর নামটা বলবেন তার কি হলাে “যে ঠেলায় পড়া গেছে কথাটা ভুলেই গিছ লুম একেবারে। আমার মনে হয় রাজেন দাস।" ইন্সপেক্টর নামটা শুনেই বলে উঠলেন, “রাজেন দাস? তাঁরই বাড়ীতে তাে মটরটা থাকে।” প্রফুল্লবাৰু আগ্রহ সহকারে বললেন, “তারই বাড়ীতে ? তা হলে আর কিছু ভাববার নেই আমাদের। সন্ধান মিলে গেছে। সুশীলবাবু, কালে যে আপনি একজন বড় সম্পাদক হয়ে দাড়াবেন এ ভবিষ্যৎ বাণীটা এখন আমি করতে পারি।” “তা হ'লে এখন আমাদের কি করতে হবে ?” সুশীলবাবু জিজ্ঞাসা প্রফুল্লবাবু বলেন, “কিছু না। সন্ধ্যা অবধি অপেক্ষা করতে হবে।” সন্ধ্যার পর তারা রাজেন দাসের বাড়ীর দিকে এগিয়ে চলেছেন। প্রফুল্ল- বাৰু সুশীলবাবুকে সকল রকমে শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরী করে নিয়েছেন। সাপে গর্তে প্রবেশ করতে হলে ছােবলের ভয় করলে চলে না। কুড়ি মিনিটের মধ্যেই তারা গন্তব্য স্থানে পৌছুলেন। ব্যারাকপুর ট্রীয় বােড়, থেকে একটা ছােট রাস্তা সােজা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। সে থেকে প্রথম দুটো গলি ছেড়ে ডান দিকে তৃতীয় গলিটার মধ্যেই ৰােটা জ অরে সন ৮ ইন্সপেক্টর বেশ ভাল ভাবেই তাদের ঠিকানাটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কাজেই তাদের পক্ষে বাড়ীটা খুজে নেওয়া শক্ত হলাে না। বিশেষ মটরের গ্যারেজটা তাদের অতি সহজেই নজরে পড়লাে। রাস্তায় জনপ্রাণী নেই। বাড়ীটার মধ্যেও কোনও আলাে ছিল না। কৃষ্ণপক্ষের রাত—আকাশেও চাদ নেই। সুশীলবাবু বলেন, “বাড়ীতে উপস্থিত বােধ হয় কেউ নেই।” “আলাে জ্বলছে না বলে ? নিশ্চয়ই আছে সুশীলবাবু। তারা বেশ ভাল ভাবেই জেনেছে আমরা তাদের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছি। আশুবাবু সে কথাটা নিশ্চয়ই তাদের পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। সতর্ক হয়েই তারা আলাে ভালেনি। দেখুন, একটা নতুন ফন্দি আমার মাথায় এসেছে। আপনাকে যা করতে হবে বলেছিলুম সে সব কিছুই করতে হবে না। আমি একলাই বাড়ীটার সন্ধান করতে যাবে। আপনি এই অবসরে গ্যারেজে ঢুকে মটরের মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকুন। যদি তারা পালাতে যায়, আপনার হাত এভাবে না।” প্রফুল্পবাবুর কথা মতই সুশীলবাবু মটরটী আশ্রয় করে লুকিয়ে বইলেন । প্রফুন্নবাবুও অন্ধকারে বাগানের পথ ধরে বাংলােটার দিকে এগিয়ে চললেন। হঠাৎ পায়ের খস খস আওয়াজে চকিত হয়ে ফিরে চেয়ে দেখলেন-কে একজন লােক যেন বাগানে প্রবেশ করে তারই পেছনে ছুটে আসছে । তাড়াচাড়ি তিনি সামনের একটা বােপের পাশে লুকিয়ে পড়লেন। লােটী তাকে পেরিয়ে গিয়ে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করলাে। তিনিও 'ল বুকে লােরর পাশে গিয়ে পুকুলেন। সা: ভেতরে চাপা গলায় কথা হতে লাগলাে। প্রথমটায় প্রফুল্লবাবু কিছুই .
অন্ধের যষ্টি - । বুঝতে পারলেন না। পরে কথাবার্তার ভাবে এবং লােকগুলির উত্তেজনা থেকে জিনিষটা বেশ সহজ হয়ে গেল। একজন প্রশ্ন করলে, “সুবর্ণা কোথায়?” অপর ব্যক্তি জবাব দিলে, “গঙ্গার ঘাটে। আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। আমাকে পাঠিয়ে দিলে আপনাকে খবর দেবার জন্যে।” “হ সে ঠিকই করেছে। তুমিও কি আমাদের সঙ্গে যাবে মনে করেছ?” “মনে এখনও আমি কিছু করিনি। তবে সুবর্ণা বলছিল- “বুঝেছি আশু, মােগট। তােমাদের কোথায় ধরেছে। কিন্তু মনের কোনেও স্থান দি ওনা--রাজেন দাসের কন্যা কখনও তােমার গলায় মালা দিতে পাবে। তার আগে হয় তুমি-নয় সে-না, না, সে নয়, সে নয়- তুমি-তােমাকেই স’রতে হবে ইহধাম থেকে। আর তার উপযুক্ত সময়- দুম, ক'লে একটা আওয়াজ—তারপর আর একটা। প্রফুল্লবাবু আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করলেন, অন্ধকারে বারুদের গন্ধটাই শুধু নাকে লাগলাে। এত কাছে এসেও তবে কি তিনি আশুবাবুকে বাঁচাতে পারলেন না ? রাজেন দাস দরজার দিকে এগুচ্ছেন দেখে প্রফুল্পবাবু একটু পাশ কাটিয়ে দাড়ালেন। লােকটা বেরিয়ে চলে গেল। তিনি মনে মনেই একটু হাসলেন। কোথায় যাবে তুমি দাস ? মটরে চেপে যেখানেই যাও সুশীলবাবু তােমার সঙ্গে থাকবেন। লােকটা বেরিয়ে যাবার পরেই প্রফুল্লবাবু পকেট থেকে দেশলাই কি করে জেলে আশুবাবুর সন্ধান করতে গিয়ে প্রথমেই নজর ক’ সামনের দেয়ালে একটা গুলির দাগ। ত’ হলে প্রথম গুলিটা ফা p লে অন্ধেৰ সন্ধান ছিলো। আর একটা কাঠি জ্বেলে দেখলেন আশুবাবু মেজের ওপর বসে আছেন। গুলিটা তার কাধে কাছে লেগেছে। তিনি একটু স্বস্তি নিঃশ্বাস ফেল্লেন। হঠাৎ ঐ রকম দেশলাই জ্বালাতে প্রথমটায় আশুবাবু ভয় পেয়ে গিছলেন । মনে করেছিলেন রাজেনবাবু বােধ হয় ভাল করে দেখে নিয়ে তার ওপর তৃতীয় গুলি চালাবার ব্যবস্থা ক’বছেন । প্রফুল্লবাবু বল্লেন, “ভয় নেই আশুবাবু আমি আপনার শত্রু নই-বন্ধু।” তিনি যখন তার কাছে এগিয়ে গিয়ে দেহ স্পর্শ করলেন তখন আশুবাবু অজ্ঞান দেহটা মাটির ওপর লুটিয়ে পড়েছে। রাজেনবাবু বাংলো থেকে বেরিয়ে সটান গিয়ে মটরটী গ্যারেজ থেকে বার কবে পাব ঘাটের দিকে ছুটিয়ে দিলেন। একবার সেখানে পৌছুতে পারলে হয়। তাবপরই লাঞ্চে করে পালাবেন। সুশীলবাবু গাড়ীর মধ্যে পা রাখবাব জাগাটীতে শুয়ে পড়েছিলেন। যে দুর্দান্ত বেগে মটরটা ছুটছিল, তাকে কানির চাটে অস্থির করে তুলছিল। লােকটা যদি তাকে দেখে ফেলে 'লেই শেষে প্রাণটা পর্যন্ত না দিতে হয়। হঠাৎ গাড়ীর বেশমিত হয়ে এলো। তিনি মাথা তুলে দেখলেন—মটরের হেড লাটটা বাস্তার মাঝখানে দাড় করানো একটা কাঠের ওপর পড়েছে- পাওলোজড,। বাস্তা বন্ধ দেখে রাজেনবাবু গাড়ীটা একটু ব্যাক ক'রে বাঁ পাশের তাবৃ’লেই সর্বনাশ । G একটা গলির ভেতর প্রবেশ করলেন। আবার গাড়ী তীর বেগে ছুটতে লাগলো। প্রায় মিনিট দুই যাবার পরে সামনে আর একটা অনুরূপ রাস্তা বন্ধের কাঠ দেখা গেল। সামনেই ডান্ দিকে একটা গলি পেয়ে রাজেনবাবু আবার মটর চালিয়ে দিলেন। সে গলিটার শেষে গাড়ী পৌছুতেই সুশীল বাবু মাথাটা একটু তুলে দেখলেন-সামনেই জন কতক পুলিশ রাস্তা ঘিরে পঁড়িয়েছে। হেড লাইটটা হঠাৎ নিভে গেল। কিন্তু তার আগেই তিনি যেন লক্ষ্য করলেন রাস্তার ধারে ইউনিফ পরে অমরবাবু পঁড়িয়ে আছেন। অতগুলাে পুলিশ দেখে রাজেনবাবু কেমন গুলিয়ে গিছলেন। কিন্তু পরক্ষণেই কি ভেবে রাস্তা থেকে নেমে ফাকা মাঠের ওপর দিয়ে গাড়ী চালিয়ে দিলেন। তিনি তখন মরিয়া হয়ে গেছেন। মরবাে কি বাচবাে জ্ঞান নেই। অসমান মাঠে মটরখানা প্রতি মুহূর্তেই বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছিল। বাজেনবাবুব কিন্তু খেয়াল নেই; মটর ছুটেছে। হঠাৎ হেড, লাইটে সুশীলবাবু লক্ষ্য ক'রলেন সামনে একটা মন্ত নালা। মটরের বেগ কিন্তু মোটেই কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে। তার পক্ষে চুপ করে থাকা আর যেন সম্ভব হচ্ছে , লােকটা কি উন্মাদ হয়ে গেছে? তিনি কিছু বলার আগেই একটা বিকট আওয়াজ হলাে। সঙ্গে সঙ্গে মটরখানা চুরমার হয়ে গেল। সেইখানেই বুঝি সে চিরদিনের মত গতিহীন হয়ে পড়ে থাকবে কে জানে?
(২০) সুশীলবাবুর যখন জ্ঞান হলো তখন তিনি একটা সুন্দর শয্যার ওপর শুয়ে আছেন। ঘরটা তরুণ ঊষার অরুণ রাগে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে তাকে চোখ খুলতে দেখে একটা সুন্দরী তরুণী এসে তার শয্যার পাশে দাড়ালো। আগ্রহ ভরা মুখখানি হাসিতে ভরা। সুশীলবাবুর মুখে কাছে ঝুকে পড়ে সে আস্তে আস্তে বললে, “ঘুম ভাঙলো আপনার ?” সুশীলবাবু একটু চেষ্টা করে কথা কইলেন, “আপনি? আপনাকে তো কখনও- “দেখেন নি, নয় ? আমি এই হাসপাতালের নাস।” “আমি বুঝি হাসপাতালে ?” মেয়েটী সে কথার কোনও জবাব না দিয়ে একবার ঘড়িটার পানে চেয়ে নিলে এৰং টেবিলের ওপরের শিশিটা থেকে খানিকটা ওষুধ একটা ছােট কাচের গ্লাসে ঢেলে তার মুখের কাছে ধরলে। সেই সময় খাটের অপর পাশে দুটী ভদ্রলােক এসে দাড়ালেন। সুশীলবাবু ওষুধটা গলাধঃকরণ করে ঘাড়টা ফিরিয়ে তাদের দিকে চাইলেন। মেয়েটা কেমন যেন একটু লজ্জায় সঙ্কুচিত হয়ে সেখান থেকে চলে গেল। ‘প্রফুল্লবাবু, এ সব কি বলুন তো?” “মন্দ আর কি ভালই তো। বরাত আপনার সুশীলবাবু। নকুয়ার বদলে নরুন একেই বলে। সামান্য একটু আঘাতের বিনিময়ে যদি এমন সুন্দরী সেবিকা মেলে মন্দ কি ?”
'অন্ধের যষ্টি
প্রফুল্লবাবুব রসিকতাটুকু হজম করবার আগেই পাশের লােকটার ওপর
ঠার নজর পড়লো।
এই যে 'অমরবাবুও এসেছেন। বসুন-আপনারা দাড়িয়ে রইলেন
কেন ?”
অমরবাবু বললেন, “আপনি ৰাস্ত হবেন না। আমরা বসছি।”
“ভাল কথা আশুবাবুর খবর কি বলুন তো?”
প্রফুলবাবু হাতে হাতে জবাব দিলেন, “তিনিও পাশের ঘরে শুয়ে
আপনার মত এক সুন্দরীর সেবা খাচ্ছেন।”
সুশীলবাবু বললেন, “ আমি হয়তো এ সেবা খেয়ে তৃপ্তি পেতে পারি
কিন্তু তার কি-
“তঁার যে সেবাতে তৃপ্তি তাই তিনি পাচ্ছেন।
“রাজেনবাবুর মেয়ে সুবর্ণা ?”
“ঠিক অনুমান করেছেন সুশীলবাবু। আমিই তাকে গঙ্গাব বাট
থেকে ধরে নিয়ে এসে এই কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। বুঝলেন তো?
অন্ধ যদিও আর অন্ধ নেই—তার হারাণে ষষ্টিটা খুজে এনে তার হাতে
তুলে দিয়েছি।” বলে অমরবাবু একটু হাসলেন।
সুশীলবাবু বলেন, “আচ্ছ। সেদিন রাত্রে আপনাকে যেন একবার
দেখেছিলুম বলে মনে হচ্ছে।”
অমরবাবু জবাব দিলেন, “অন্যায় কিছু মনে হচ্ছে না। আমিই তো
রাজেনবাবুকে ধরবার জন্যে রাস্তাগুলাে বন্ধ করবার ব্যবস্থা করেছিলুম।
যতদিক দিয়ে পালাবার পথ ছিল সবগুলতেই এক একটি রােড, ক্লোজড
কাঠ খাড়া করা হয়েছিল।”
অঙ্কের সন্ধান “তা হলে প্রফুল্লবাবু আর আপনি একই সময় আসামীর সন্ধান পেয়েছেন বলুন ?” “ঠিক একই সময় সুশীলবাবু। সেই জন্যে কেউ কাউকে টেক্কা দিতে পারলুম না। ফলে লাভ হলাে এইটুকু যে আমরা দু’জনে জীবনের মত বন্ধুত্ব সুত্রে আবদ্ধ হলুম।” প্রফুল্লবাবুর মুখের দিকে চেয়ে সুশীলবাবু বলেন, “সেটা তো খুবই ভাল হয়েছে । কিন্তু রাজেনবাবু এখন কোথায়?” “তিনি এখন সব শান্তির বাইরে আছেন।” ‘মানে তিনি কি- 'আজ্ঞে হ্যা ঠিক তাই। আইনের কোনও ধারাতেই তাকে শাস্তি দেওয়া গেল না। লােকটি ভয়ানক অভিমানী ছিলেন। জীবন থাকতে পুলিশের হাতে তাই ধরা দিলেন না।” “কিন্তু সমাজে অত বড় একটা প্রতিষ্ঠাপন্ন লােক হয়ে কেন তিনি এই বড় একটা খুন করে বসলেন ?” “দৈবক্রমে। অন্দর মহল’ কাগজে বহুদিন ধরে ভুপতিবার তার ঘরের গােপনীয় কথা প্রকাশ করে আসছিলেন। বহুবার তিনি তাকে বিরত করবার চেষ্টা পান। কিন্তু কৃতকার্য হনি। ভূপতিবার তার কথায় কর্ণপাতও করতেন না। শেষে তিনি কাগজে এমন কতকগুলি জিনিষ ছাপিয়ে দেন যাতে রাজেনবাবুর পক্ষে সমাজে মুখ দেখানাে ভার হয়ে ওঠে।” সেই সময় নাস’টা ফিরে এসে বল্লে, “ডাক্তারবাবু বলে দিলেন,
0. ৯ইন 1
সুশীলবাবুকে এখন বেশী কথা কইতে দেওয়া উচিৎ নয়। ওঁর সবে মাত্র
জ্ঞান হয়েছে কিনা।”
সুশীলবাবু চোখ ফিরিয়ে দেখলেন, সুন্দরীর দীপ্ত মুখে আগেরই মত
স্নিগ্ধ হাসি মাখানাে রয়েছে।
গ্রন্থকার প্রণীত
হাসির নিঝর-অশ্রুর উৎস
নগ্ন-পরিষদ
| ছাগ-সাহিত্য সেবী পরিষদ খুলেন। ব্যারিষ্টার পত্নী তার
সম্পাদনা ভার গ্রহণ করলেন। কোনও এক সাহিত্যিকের সঙ্গে তার
অবৈধ প্রেম-ব্যারিষ্টারকে উন্মাদ করে দিল। নিজের দোরে তিনি আজ
কাঙ্গাল হয়ে ফিরছেন আর তঁার পত্নী অলর ভে
অশ্লীল সাহিত্যের রূপ ও সমাজের ওপর ত প্রকোপ—বিবিধ
বিশ্লেষণে, হাসি অশ্রুর সমাবেশে গ্রন্থকার ছবি ফুটিয়ে
ঘ্রই প্রকাশি
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.