Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Madal

Sen,dineshchandra · 2009/12/1

PDF Proofread

Front matter

মাদল শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন

প্রকাশক-সুকোমল বং
৫৩ হ্যারিসন নােভ,
কলিকা
অশ্বিন-১৩৩
দাম আট আনা
প্রিন্টার-ঐশশধর ভট্টাচার্য্য
মাসপয়লা প্রেস
১৯৭১ ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা

ভুমিকা শ্ৰীযুক্ত চাদমলের ‘মাদল’ নামক পুস্তকের কতকগুলি কবিতা পড়িয়াছি। কবি একজন তরুণ যুবক--কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি, এ, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতেছেন। ইনি রাজপুতনার অন্তর্গত বিকানির জেলার রাজগড় পল্লীর অধিবাসী। ইহার পক্ষে বাঙ্গলায় কবিতা লেখার উদ্যম কতকটা সাহসিকতার পরিচায়ক, সন্দেহ নাই। কিন্তু ইহার ভাষা ও ছন্দে এমন একটা স্বাভাবিকত্ব আছে, যাহাতে লােকে ইহাকে সহজে বিদেশী বলিয়া ধরিতে পারিবে না। যে কবিতাগুলি পড়িয়াছি, তাহার মধ্যে একটিমাত্র শব্দ বাঙ্গলা অভিধানে নাই এবং উহা বাঙ্গালী পাঠকের অনধিগম্য। তের পৃষ্ঠার শেষ দিকে “মুঝেছে” শব্দের অর্থ শুকাইয়া পড়িয়াছে, কিন্তু এটি হিন্দী শব্দ—বাঙ্গলায় ইহার প্রচলন নাই। কিন্তু বিদেশী শব্দের বিরুদ্ধে আমরা কখনই দ্বার বন্ধ করিয়া রাখি নাই, চলিত ভাষা সর্বত্রই বিদেশী উপকরণে পুষ্ট হইয়া থাকে তবে সেইরূপ উপ- করণের আমদানী করিতে হইলে কতকটা নিৰ্বাচনী শক্তি প্রয়ােগের দরকার। আমাদের তরুণ কবি এক স্থানে লিখিয়াছেন “রচিনু মরম-গীতি বিদেশী ভাষায়” কিন্তু তাহার বাঙ্গলা ভাষার বনিয়াদটি বেশ পাকা, তাহাতে বিদেশীয়ত্ব কিছু পাইতেছি না। তাহার কতকগুলি কবিতায় নৈসর্গিক সৌন্দৰ্য-ফুল, লতা, নক্ষত্র প্রভৃতির বর্ণণা লইয়া একটু বেশী নাড়াচাড়া করিয়াছেন; তরুণ কবিদের অনেকেই এইরূপ করিয়া থাকেন,-দোষ এই যে এই ধরণের কবিতায় বাক্যপল্লব একটু বেশী হইয়া পড়ে, এবং কবিতার ছাঁচটা একরূপ,-এবং কতকটা একঘেয়ে হয়। কিন্তু এই কবি রবীন্দ্রবাবুর ‘কথার’ অনুকরণে যে কয়েকটি নাতিদীর্ঘ পল্লী-গল্প কাব্যছন্দে লিখিয়াছেন, তাহা পড়িয়া মনে হয় বর্ণনামূলক কবিতা লিখিয়া ইনি প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারিবেন। ইনি আমাকে জানাইয়াছেন, রাজপুতানার পল্লীগা যেগুলি প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা ছাড়াও চারণদিগের কাছে আরও শত শত অপ্রকাশিত পল্লী-গাথা আছে। ইনি সেইগুলি বাঙ্গলায় অনুবাদ করিবেন স্থির • করিয়াছেন। চারণদিগের গাথার মধ্যে যেগুলি ঐতিহাসিক, তাহাই ছাপা হইয়াছে, কিন্তু নানারূপ প্রণয়-ঘটিত ও সামাজিক কাহিনী লইয়া যে সকল উৎকৃষ্ট গাথা রচিত হইয়াছিল—তাহা এখনও কেহ প্রকাশ করেন নাই। ইহাদের পদ্যানুবাদ করিলে তাহা বঙ্গভাষায় একটি স্থায়ী কীত্তি হইবে। আমরা আশান্বিত হৃদয়ে এই ভাণ্ডার প্রাপ্তির জন্য অপেক্ষা করিয়া রহিলাম। এই মহাকাৰ্য তাহার দ্বারা সম্পন্ন হইলে, তাহাকে আর আমরা বাঙ্গলার বাহিরের লােক বলিয়া মনে করিব না, বঙ্গ-বাণীর কুঞ্জে তঁহার জন্য আমরা একটি বিশিষ্ট পুষ্পসন পাতিয়া রাখিব। এই কবিতাগুলি—বিশেষ প্রতিশােধ’ শীর্ষক কাহিনীটি পড়িয়া আমার ধারণা হইয়াছে, যে কাৰ্যে ইনি ব্রতী হইয়াছেন, তাহাতে তিনি সফলতা অর্জন করিবেন। এই ছােট কাব্যটিতে ইনি বাঙ্গালা ছন্দ ও শব্দের উপর যথেষ্ট অধিকার প্রতিপন্ন করিয়াছেন। এই বিদেশী তরুণ বন্ধুটিকে আমরা বঙ্গসাহিত্যের আসরে সাদরে অভ্যর্থনা করিতেছি। আর একজন বিদেশী লেখক বঙ্গ সাহিত্যের জন্য প্রাণপণ পরিশ্রন করিয়াছিলেন ; সেই মহারাষ্ট্র ব্রাহ্মণটি তাহার মাথার পাগড়ি খুলিয়া ফেলিয়া বাঙ্গালীর ধূতি চাদর পরিয়া ঠিক বাঙ্গালী ব্রাহ্মণ সাজিয়াছিলেন। তাহার বাঙ্গালা যেমনই পরিশুদ্ধ, তেমনই স্বাভাবিক হইয়াছিল। বঙ্গ- ভারতী সখারাম গণেশ দেউস্কর মহাশয়কে তাহার অন্তরঙ্গ ভক্তের পর্যায়ে স্থান দিয়াছেন। আশা করি চঁাদমল অচিরে সেই পংক্তিতে স্বকীয় গুণ-লব্ধ আসন গ্রহণ করিবেন। বেহালা ২৬ শে সেপ্টেম্বর ১৯৩১ শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন আমার কথা শৈশব হইতেই সাহিত্য আমার প্রিয় বস্তু। কিন্তু আমার মত ভিন্ন-ভাষা-ভাষীর পক্ষে বাঙ্গলার সাহিত্য-কাননে প্রবেশ করা সহজ ছিল না। ভাগ্যক্রমে কয়েকটি সম্ভ্রান্ত বাঙ্গালী পরিবারের সঙ্গ- লাভে বাঙ্গলা ভাষার প্রতি আমি আকৃষ্ট হইলাম এবং এই ভাষায় আমার প্রগাঢ় অনুরাগ জন্মিল। এই সময় হইতেই কবিতা লেখার নেশা আমাকে পাইয়া বসিল অদম্য উৎসাহে কয়েকটা কবিতা লিখিয়া ফেলিলাম। আজ আমায় কাব্যের কুঁড়ি যতটুকু প্রস্ফুটিত করিতে পারি- য়াছি তাহা সর্বতােভাবে আমার অগ্রজপ্রতিম সুকবি শ্ৰীযুক্ত সুনির্মল বসুর অপার অনুগ্রহে। তাহার উৎসাহ ও স্নেহ ব্যতিরেকে আজ আমার কবিতাগুলিকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করিতে সাহসী হইতাম না। এই সূত্রে সুনির্মলবাবুর ভাই সাহিত্যিক শ্রীসুকোমল বসুর নিকটও তাহার সাহায্য এবং উৎসাহের জন্য আমি ঋণী। বন্ধুবর শ্রীযুক্ত শৈলেন্দ্র মজুমদার ও মাসপয়লার সুযােগ্য সম্পাদক শ্রীক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টচাৰ্য মহাশয় আমাকে নানাভাবে সাহায্য করিয়াছেন। ইহাদের সকলকেই এই সুযােগে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইতেছি। লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় রায় বাহাদুর ডাক্তার দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় আমার পুস্তকের একটি সুন্দর ভূমিকা লিখিয়া আমাকে কৃতার্থ করিয়াছেন। মাদলের দু একটি লেখা রামধনু ‘মাসপয়লা’ ও ‘পাপিয়া'তে প্রকাশিত হইয়াছিল। মাদল আমার হাতে নিখুৎ বাজিবে না তাহা জানি। কিন্তু আমার এ ক্ৰটী মার্জনীয়। কারণ আমার সাধনার এই সূত্রপাত। সর্ববতােপরি আমি বিদেশী বাদক। আশা করি সহৃদয় পাঠক- বর্গের উৎসাহে ভবিষ্যতে আমার এ ক্ৰটীটুকু সংশােধন করিতে পারিব। বিনীত ন বিদেশী কিশাের, দূর মরু-চারী,—আপনার মহিমায় বাজালাে মাদল তালে তালে আজি বাংলার আঙিনায়। শ্যামলী মায়ের সােমার স্বপন চোখেতে জুড়ালাে তার বিদেশী গালায় বাউলের গানে বাজে তাই বার বার। দৰ মাছ বার মিতালী কৰিল ০২ ৮nt -১ wer - * * * ইয়া * বাঙলা * ৪ ৭ আয় কবুবা এমন সুন্দর কবিতা লিখিয়াছেন :নাৰ !! fথ ৯ ৬৪, পনি বাঙলা ভাষার সঙ্গে 1$ নিংড়" ---লীswগছেন।' অলংকে না জানিলে } }, { if ??? কবি পারতাম। *** সিলেঃ + ১. ক + ষ্টি আছে। - শপন “মম" }দেৰ থেকে নিই অনুরণন নিয়াছি । ", "নং স্টাবর কামনা কৰি --- নজরুল ইসলাম ও পাড়ার বুড়ী এপাড়ায় এসে ঝুড়ি ভরে তােলে শাক। বিদেশীর ছেলে স্বপন দেখেছে—প্রাণ তার ভরপুর- বিদেশী মাদলে তাই সে বাজায় খাঁটি বাংলার সুর। শ্ৰীসুনির্মল বসু

No text on this page.

. বিদেশী কিশাের, দূর মরু-চারী,—আপনার মহিমায় বাজালাে মাদল তালে তালে আজি বাংলার আঙিনায়। শ্যামলী মায়ের সােনার স্বপন চোখেতে জুড়ালাে তার বিদেশী গলায় বাউলের গানে বাজে তাই বার বার। দূর মাড় বার মিতালী করিল বাংলার সাথে ভাই- পরদেশী গাহে বাংলার গান, প্রাণ মেতে ওঠে তাই। বিদেশীর হাতে বাজিছে মাদল—সুরে ভাটিয়াল টা আকাশে বাতাসে ধ্বনিল সে সুর,—অপূর্ব অবদান। বাংলার ছবি ভাসিল নয়নে-বাতাস দিয়েছে দোল,- ধানক্ষেতে যেন দুলে দুলে সারা—কাশবন উতরােল নীল দরিয়ায় তরী ভেসে যায়,—মাঝি গেয়ে যায় গান গােধূলী বেলায় রাখাল বাজায় বাঁশের বাঁশরীখান। আলিপনা দেয় বাংলার মেয়ে,-মল বাজে পায় পায়, ঘােমটায় ছাওয়া চটুল চরণে বধূ জল নিতে যায়। শিউলী ঝরানাে পেঁয়ােপথে যেন ছুটে আসে ভাই বােন্ আকাশ ছাপিয়া উঠিছে কাপিয়া পাপিয়ার আলাপন। মাঠে গেছে ছেলে—ফিরে এসে খাবে মা ঢেকে রেখেছে জাউ মাচায় মাচায় লতিয়ে উঠেছে কুমড়াে, ধুল, লাউ, খড় কুটো খুঁজে ফিরিছে চড়াই,—ওড়ে শালিখের ঝাঁক, ও পাড়ার বুড়ী এপাড়ায় এসে ঝুড়ি ভরে তােলে শাক। বিদেশীর ছেলে স্বপন দেখেছে—প্রাণ তার ভরপুর- বিদেশী মাদলে তাই সে বাজায় খাটি বাংলার সুর। শ্রীসুনির্মল বসু উৎসর্গ আমার প্রথম প্রকাশিত সাপ্পের বইটি যাহার হাতে তুলিয়া দিলে যিনি সব চেয়ে সুখী হইতেন সেই মমতাময়ী মা আজ মর্তধামে নাই। ‘মা’র হাতে এইটি তুলিয়া দিব এই ছিল আমার সব চেয়ে বড় সাধ । হতভাগ্যের সে সাধ মিটিল না তবু আজ সেই ‘মা’য়েরই উদ্দেশে বইটি উৎসর্গ করিলাম। -লেখক সূচীপ% ৪ ৬ ••• ••• ১৭ ২৪ বিষয় অশা-অর্ঘ্য তােরা দেখবি যদি আয়। অবেলায় প্রতিশােধ পথ-চারী বুলবুলি ফুলবাণ অন্ধসাধক মুসাফির দুটিফুল পুরাতন স্মৃতি নূতন পথিক আবাহনী অস্পৃশ্য মাতৃহীনা বিশ্রাম পাহাড়ীর বাচ্চা হুসিয়ারী উল্লাস মালির মেয়ে জাগরণী । । । ••• ৫১ ৪৫ ৪৭ ৪৯ ৫১

উপহার
L
=
========
-~-

অ-অর্ঘ্য
তরুণ কৈশােরে মাগাে তােমারি বিয়ােগ
ভরিল তরুণ হিয়া অনাদি ক্রন্দনে ;
বিদ্রোহী হইল মন, আকস্মিক শােক
জীবন প্রভাতে আসি বাঁধিল সে মনে।
উন্মাদ বিদ্রোহী মন ছিড়িতে বাঁধন
ছুটিল অনন্ত পথে খুঁজিতে তােমারে ;
অবিরল বারিধারা ভরি’ এ নয়ন
আসিল নিভাতে সেই হৃদয় জ্বালারে।

মাদল
–
মধ্যাহ্নে মরুর মাঝে ছুটাছুটি করি-
পরিশ্রান্ত হ’ল যবে এ কিশাের দেহ,
প্রখর রৌদ্রেতে যবে পিপাসায় মরি,
একবিন্দু বারিদান করিল না কেহ।
ছুটিল নির্বোধ মন, তবু থামিল না
তােমারে হেরিতে মাগাে সুদুর্গম পথে ;
বিধাতার লীলা খেলা তবু বুঝিল না,
ফিরিল না অবিলম্বে সেই পথ হ’তে।
দাবানল শিখা সম শােকানল আসি’
করি দিল ছারখার ভগ্ন এই হিয়া ;
নৈরাশ্যের বিষমাখা বিদ্রুপের হাসি
পশিল শ্রবণে মাগাে মরম ভেদিয়া।
তথাপি এ মূঢ়-মন জানিল না ভয়,
বিবেক বুঝাল কত বুঝিল না তবু ;
বুঝিলনা একবার যারে কাড়ি লয়,
ফিরায়ে দেয় না বিধি আর তারে কভু

মাদল
সহসা ভাঙ্গিল ভুল স্থির হল মন
তােমা লাগি, স্নেহময়ী,—ছুটিল না বনে
হৃদয় মন্দির মাঝে করিল স্থাপন
জ্যোতির্ময়ী মূর্তি তব মানস আসনে।
হৃদয়ের ব্যথা যত গাঁথি এক সাথে
রচিয়াছি তাই আজ এই শােক-গাথা,
তারুণ্যের তপ্ত হিয়া আজিকে জুড়াতে
তােমারি চরণে মাগাে রাখিতে এ মাথা ;
রচিনু মরমগীতি বিদেশী ভাষায়
ঝরাতে মা শেষবার মরম যাতনা,
এ গীতি অঞ্জলি মাগাে তব রাঙ্গা পায়
হাসি মুখে দিনু আজি, পুরিল বাসনা।

তােৱা দেখবি যদি আয়
( ওই )
তােরা দেখবি যদি আয়
মত্ত মাদল
বাজিয়ে পাগল
সাঁওতাল দল যায়,
তােরা দেখবি যদি আয়।
(ওই) বনদেবীর স্নিগ্ধ বুকে ফুটল কত ফুল,
(ওই) ফুল গুজে সব কানের পাশে নাচেতে মশগুল
মুখে হাসি
বাজিয়ে বাঁশী
বন্য-বালক যায়,
তােরা দেখবি যদি আয়।
৪

মাদল
( ওই ) ঝুমুর-নাচে মত্ত সবাই সঁওতালিনী বালা
{ ওই ) সরল কালাে মুখে তাদের স্নিগ্ধ হাসি ঢালা
( ওই ) নাচের দোলা
ছন্দে ভােলা,
নুপুর বেজে যায়,
তােরা দেখবি যদি আয়।

অবেলায়
আজি কেন অবেলায়
মাতিলে ফুল খেলায়,
ভুলেছ কেন প্রিয়ায়
বরষা প্রাতে !
ময়ূরী বসিয়া বনে
খেলিছে শিশির সনে,
নাচিয়া আপন মনে
ময়ুর সাথে

মাদল
ভাব বুঝি ফুলসাথে
অরুণ-তিলক মাথে
আজি এ বরষা প্রাতে
আসি’ নটবর !
জমিয়ে দিনের মেলা
তব সাথে করি’ খেলা
ভাসাবে গানের ভেলা
ওসে মনােহর।
স্বপনে দিল কি দেখা
নয়নে কি ছিল লেখা,
গােপনে আসিবে একা
মালা পরাতে।
তারি তরে বসি আজি
সাজায়ে ফুলের সাজি,
খেল কি আশার বাজী
বেদন সাথে ।

প্রতিশােধ
একদা রাত্রে য়ুসুফের দ্বারে আসিয়া আগন্তুক
কহিল দুঃখে বিষন্ন মুখে নত করি নিজ মুখ !
“রাজার পেয়াদা হুকি হানিছে যেথায় পালিয়ে যাই
দীন-দুনিয়ায় নাহিক যে মাের মাথা পাতিবার ঠাই।
সমাজ-তাড়িত সামজে পতিত অভাগা মানব আমি
আশ্রয় আশে আসিয়াছি হেথা ওহে শেখেদের স্বামী।”
কহিল য়ুসুফ, “স্বাগত বন্ধু! এ গৃহও তাে মাের নয়
এ-গৃহ খােদার, আমি দাস তার সেবিতে তাঁর তনয়।
মম সম তব আছে অধিকার এ গৃহের সব ধনে
কর ব্যবহার সকলি তােমার আপন ভাবিয়া মনে।”
৮

মাল
য়ুসুফ সে রাতে অতিথিরে নিজে সেবিল ঢালিয়া প্রাণ,
অতি প্রত্যুষে জাগায়ে তাহারে করিয়া স্বর্ণ দান—
কহিল—“অশ্ব আছে প্রস্তুত তব পলায়ন লাগি
সূৰ্য্য উদয় হবার পূর্বে যাও হে এদেশ ত্যাগি।”
ইব্রাহীম সে মুগ্ধ আজিকে য়ুসুফের অনুরাগে
অনুতাপে তার জ্বলিছে পরাণ বড় বিস্ময় লাগে।
আগন্তুক সে বিচলিত ভাবে য়ুসুফে ডাকিয়া কয়
“ঘারে তুমি এত করিলে করুণা—জান তার পরিচয়?
আতিথেয়তার ধর্ম দেখালে যাহারে অপরিসীম
তব পুত্রের হরেছে যে প্রাণ আমি সে ইব্রাহীম!*
শুনিয়া য়ুসুফ ক্ষণেকের তরে শুধু নির্বাক রহি’
কারুণ্যমাখা গম্ভীর স্বরে হঠাৎ উঠিল কহি–
“তবুও তােমারে ক্ষমিনু, পালাও এখুনি লইয়া প্রাণ”—
এই বলি তারে দ্বিগুণ স্বর্ণ করিল য়ুসুফ দান।
পলাতক যবে হয়ে গেল ক্রমে চোখের অন্তরাল
অতীতের কথা স্মরিল য়ুসুফ বসিয়া সে ক্ষণকাল ;
r=

মাদল
তারপর তার পুত্রের ছােট কবরের পাশে এসে
অশ্রুগলিত কণ্ঠে কহিল পুত্রের উদ্দেশে
“হে মাের দুলাল আর নাহি ভয় বিশ্রাম কর সুখে-
দিয়াছি শাস্তি তারে যে ছুরিকা হেনেছিল তাের বুকে-
কল্পনাতীত শাস্তি দিয়েছি নিষ্ঠুর নির্মম
ক্ষমেছি তাহারে,—নিঠুর শাস্তি নাহিক ইহার সম!
সব ক্ষোভ আজ মুছে গেছে মোর হৃদয়ের পট হতে
সব জঞ্জাল ঘুচে গেছে আজ পুণ্য-তোয়ার স্রোতে !”
১০

পথচারী
পথচারী ও পথচারী ভাই
ভাবছ কি আজ আনমনে
বিদায়-গীতি গাইবে কি আজ
ডাকলে কোকিল ঐ বনে ?
কোন কুহকে পড়লে আজি
কোন সে মায়ার বন্ধনে
মুক্ত-হৃদয় বন্দী হ’ল
কোন্ সে বালার ক্রন্দনে।

মৌমাছিদের ছন্দ-ভােলা গু-গুনিয়ে গানখানি আলরে তাের মনের ভিতর সুদূর দেশের কোন বাণী। কোন সে বীণার বাঙ্কারে আজ হৃদকমলের ঐ পটে অকল আজি কোন সে স্মৃতি নীল দরিয়ার ঐ তটে। কোন মাদলের করুণ সুরে দুলিয়ে দিল দিষ্টী তাের- কোন সে কেয়ার গন্ধে মাতি, পাগল-পারা মন-চকোর- চায়রে যেতে ঐ সে পথে গন্ধ-স্রোতে গা ঢেলে বিদায় গীতি গাইতে কি তাই চারে আজি সব ফেলে ? ১২

বুলবুলি
বুলবুলি লাে বুলবুলি,
কোন সে নিঠুর কর-পরশে
ক-বীণার তারগুলি
ছিড়ল আজি শীতের সাঁঝে
ঝাসিয়ে ফুল বিকুলি।
ফুল-বাগিচায় ফুলের শাখে
দেখলাে বসে ফুলরাণী,
তাের বেদনায় ভাগ বসাতে
ডাকছে দিয়ে হাত ছানি ;
তাের দুখেতেই দুলছে না লাে
তার সে এলাে চুলগুলি
বুলবুলি লাে বুলবুলি,
তােরই দুখে মুঝেছে আজ
ফুল বাগিচার ফুলগুলি।

মাল
দেখলাে চেয়ে ঐ সে পথে
যায় রূপসী বনবালা,
তার সে কোমল রঙ্গীন হাতে
ঝরা ফুলের ঐ মালা ;
মরম জ্বালা জানাচ্ছেলাে
বিন্ কারণে দোল্ দুলি।
বুলবুলি লাে বুলবুলি,
তােরই হিয়ার বেদন জেনে
যায় সে বালা পথ ভুলি।
কণ্ঠবীণা আজকে আবার
নুতন করে বাঁধনা লাে,
বিরহ-আঁধার ঘুচিয়ে দিয়ে
শূন্য হিয়ায় জ্বাল আলল
ওরে তােরই মধুর গানের লাগি
উঠছে হেনা চঞ্চলি
বুলবুলি লাে বুলবুলি
তাের তরে আজ দাঁড়িয়ে আছি
রঙমহলার দ্বার খুলি।
১৪

ফুল-বাণ
ফুল বাগিচার একটি কোণে
ফুল গােলাপ রংবাহার,
সৌরভে তার মত্ত পথিক
যায় যে ভুলে পথ, তাহার
লাল গােলাপের পাপড়ী গুলি
ডাকছে যেন হাত নেড়ে
বলছে যেন—আয়রে পথিক
যান্ন মােরে আজ ছেড়ে

বিদ্রোহী পা চলতে না চায়
ক্লান্ত দেহ যায় ঢলে
থমকে দাড়ায় পাগলা পথিক
রঙিন ফুলের এই ছলে।
==
ফুলের নেশায় ডুবিয়েছে আজ
মত্ত পথিক মনটিকে,
চল ছুটে ফুলের পানে
ধ’রতে রঙিন ফুলটীকে।

অন্ধ-সাধক
বন পথে যায় অন্ধ-সাধক
আপনার মনে গাহি’
দুটি হাতে তার বাজে করতাল
শূন্যের পানে চাহি।
কত কাঁটা তার ফুটিতেছে পায়—
ক্ষত হ’তে বহে রক্ত,
ক্ৰক্ষেপ তাতে নাহিক’ যে তায়
কোন্ পাপে অনুতপ্ত
ভক্ত প্রবীণ কার খোঁজে আজ
হইয়াছে অনুরক্ত ?
বুকে ভরা তার কোন্ সে বেদনা
এ বুঝা বড়ই শক্ত।
১৭

মাদল
হেন কালে কালা বালকের বেশে
শুধালাে তাহারে আসি’--
“কোন্ দুখে আজি ওগাে সুরদাস
হইয়াছ বনবাসী?
এ হেন ভীষণ বিজন কাননে
ফিরিতেছ কার লাগি ?
বন্ধু বলিয়া ডাকিতেছ কারে
করুণা ভিক্ষা মাগি ?
কোন্ সে নিঠুর বন্ধু রে তাের
এ হেন কাননে আসি-
ডাকি তােমারে মৃত্যুর সনে
বাজায়ে মধুর বাঁশী ?”
বালকের বাণী শুনি’ সুরদাস
সহসা শিহরি’ উঠি
শুধালে তাহারে-“কোন্ সে কারণে
কর হেথা ছুটাছুটি।
১৮

মাল
এ ভীষণ বনে কিবা কাজ তাের
কোন্ দেশে তাের বাস ?
ভাগ্যের দোষে ভুলেছ কি পথ
হেরিতে সৰ্ব্বনাশ ?”
কহিল বালক—“ব্রজবাসী আমি
গোপাল আমার নাম,
গাভীদল লয়ে গােঠে, প্রান্তরে
ঘুরি ফিরি অবিরাম।
পালায়েছে আজ পাল হ’তে মাের
সাদা কালাে গরু দুটি,
তাদের খুঁজিতে আসিয়াছি আজ
এ হেন কাননে ছুটি।
তােমারি গানের গুন্ গুন্ ধ্বনি
পশিয়া শ্রবণে মাের
তরুণ হৃদয়ে আনিল সহসা
বিস্ময় অতি ঘোর !

মাদল
তাই ছুটে এনু তব পাশে হেথা
শুধাতে তােমার নাম।
কার ফেরে পড়ি প্রবেশিলে বনে
কোন্ দেশে তব ধাম?”
ব্রজবাসী নাম শুনিয়া সাধক
হরষে উলসি উঠি
ব্যস্ত হইয়া কহিল তাহারে
ধরি’ তার বাহু দুটি
‘তােম। সাথে আজ যাব রে গেপিলি
সাধের সে ব্রজধামে,
হৃদয়-রতন আছে যেথা মাের
মুক্তি যাহার নামে।
চির-ঋণী তোর রহিব রে আমি
নিয়ে যদি যাস্ সাথে,
অভাগার আজি ফিরেছে ভাগ্য
শুভ শারদপ্রাতে।”

মান্স
.
বাহু দুটি তার ধরিয়া অন্ধ
ভাবিছে আপন মনে
জুড়ালাে যেন এ তাপিত হৃদয়
অমৃত সিঞ্চনে।
হৃদয়ের জ্বালা চখের নিমিষে
গিয়াছে কোথায় চলি’,
বালকের বেশে ব্রজসুন্দর
অন্তর দিল, ছলি ?
ভক্তের দুখে দুঃখী হয়ে কি
ভক্তেরই ভগবান
আসিয়াছে ছুটে করিতে আজিকে
দুঃখের অবসান ?
এ হেন ভাবনা ভাবিতে ভাবিতে
সহসা ফুকারি উঠি-
কহিল অন্ধ “ছাড়িবনা আর
তােমার এ বাহু দুটি।
২১

অনেক কষ্টে পাইয়াছি তারে
যার তরে হেথা আসি-
মরণের সাথে করিতেছি খেলা
হইয়ে এ বন-বাসী”
বেদনার ভান করিয়া বালক
কহিল অন্ধে ডাকি-
“সত্যই—যাহা কহিনু তােমারে
কিছু নাহি দিনু ফাঁকি !
দেহ ছাড়ি মােরে—যাই ঘরে ফিরে
আপনার গাভী লয়ে
আপনার মনে ভজ হরিনাম
ভাবে তন্ময় হয়ে।”
এই বলিয়াই সহসা বালক
ছাড়াইল বাহু দুটি
তাহারি বেগেতে অন্ধ সাধক
ভূমিতে পড়িল লুটি,
२२

ভূতলে পড়িয়া অন্ধ-সাধক
কালারে ডাকিয়া কয়-
“বলবান বলি ছাড়াইলে হাত
নাহি এতে বিস্ময় !
কিন্তু মাধব প্রকৃত সে বীর
বলিব তােমায়, যবে
তাপিত এ হিয়া শূণ্য করিয়া
পালায়ে সুদূরে রবে

মুসাফির
(পথের)
.
এবার চরে মুসাফির,
মােছ আঁখিজল,
চল্ ফিরে চল্
নাইকো যে আখির।
এবার চরে মুসাফির
কোন্ মায়াতে ভুলিয়েছ মন,
খুঁজছ আজি কোন্ হারাধন ?
ভাবছ কি আজ প্রলয় নাচন
নাচবে সে ফকির ?
এবার চরে মুসাফির।
এ মরুর মাঝে
আজ কে সাঁঝে
হানলো মায়া তীর।
এবার চরে মুসাফির।
২৪

মন্স
(তাই)
(ওরে)
কোন্ কুমারীর এলােচুলের
পরশ আজি মস্ত ভুলের
করল সৃজন হৃদয় মূলে,-
হয়েছিস্ অধীর।
এবার চরে মুসাফির।
বাজছেরে তাের
মনের ভিতর
মন্ত্র মায়াবীর ।
এবার চরে মুসাফির।
কোন্ রূপসী ঘোমটা চিরি’
আড়-নয়নে চাইল ফিরি’
আনলাে মনে বে-ফিকিরি
শুভ্র হিমাদ্রির।
এবার চরে মুসাফির।
ভারে পাগল
মায়ার আগল,
নাইক যে আখির
এবার চরে মুসাফির।
(ওই)
(ওরে)
(পথের)

দুটি ফুল
মােটে গােটা দুই
ফুটেছিল উঁই
তাও নিলি তুই
তুলিয়া,
সাধের সে ফুল,
গাঁথিতাম দুল,
কেমনে যাই তা
ভুলিয়া।
ছােটগাছ খানি
করে কানাকানি
আপনা আপনি
ঢলিয়া,

মাল
চাদের আলােতে
চায় সে ভােলাতে
হাওয়ার দোলাতে
দুলিয়া ;
ভেবেছিনু তারে
রাখিব সাদরে
বুকের মাঝারে
তুলিয়া,
সাধের সে ফুল
গাঁথিতাম দুল
কেমনে যাই তা
ভুলিয়া।
তারা ছিল ফুটি’,
যেন তারা-দুটি
চুমিতে এ মাটি
আসিয়া,
২৭

মাদল
বসিয়া ডালেতে
হরষেতে মেতে
চাহে নাহি যেতে
ফিরিয়া
;
মনের হরষে
মলয় পরশে
হাসিত সদা যে
দুলিয়া,
সাধের সে ফুল,
গাঁথিতাম দুল,
কেমনে যাই তা
ভুলিয়া।
=
২৮

পুরাতন স্মৃতি
বহুদিন পরে পুরাতন ঘরে আজিকে এসেছি ফিরে
বহু সযতনে রাখিতাম যেথা সাধের খেলনাটিরে।
ঐ সে তটিনী
তটিনী যার তটে বসি চপলা গাহিত গান
সঙ্গীতে তায় মাতিত কোয়েলা, পাপিয়া ধরিত তান
ঐ তটিনীর বালুকা চড়ায় বসিয়া চাঁদিনী রাতে
হেরিতাম শুধু তার হাসি মুখ চাঁদের সে জ্যোছনাতে !
দিবসের শেষে দিনমণি যবে ফিরিত আপন দেশে,
পাখীরা যখন করে কলরব আপন কুলায় এসে;
তুলসী তলায় ঠিক সে সময় চপলা দাঁড়াত আসি
জ্বালায়ে প্রদীপ করিত প্রণাম খেলায়ে মুখেতে হাসি।
দীপালােকে সেই রাঙ্গা লালিমায় ছাইত বদন খানি
চাতকের ন্যায় চকিত চিত্তে হেরি’ সে মুরতি আমি
২৯

মাদল
ভাবিতাম মনে কোন্ সে বিজনে আপনার মনে বসি’
গড়িল বিধাতা এ মুরতি খানি লাজাতে কোন্ সে শশী।
ক্ষণেকের তরে ভুলাতাে রে মােরে ভবের সকল খেলা,
প্রেয়সীর সেই অধর লালিমা নিত্য সঁঝের বেলা।
রাজ-দরবারে কাজ করি’ শেষে ফিরিতাম যাবে গেহে
হেরিতাম প্রিয়া দাঁড়ায়ে দুয়ারে মােরি আশা-পথ চেয়ে
দূর হ’তে মােরে নিরখি’ চপলা আসিয়া বাগানে ছুটি
মনের হরষে বক্ষে ধরিত আমায় এ বাহু দুটি ;
ভাবিতাম বুঝি আজিকে বিধাতা কৃপণতা গিয়া ভুলি
শুধু মােরি তরে সুখের খাজনা দিয়াছেন আজ খুলি’;
কিন্তু রে হায় সেই খাজনায় সহসা পড়িল চাবি
বিদ্রুপ হাসি হাসিয়া বিধাতা নিল ছিনে সব দাবী।
ওলাওঠা আসি গ্রাসিল এ গ্রাম ভীত হ’ল গ্রামবাসী
কত বাঁধা ঘর করিল উজাড় কলেরা সর্বনাশী ।
মােরও আঙিনায় প্রলয়ের ঝড় সহসা পশিল আসি’
ছাড়িয়া আমারে পালালাে চপলা মরণের কোলে ভাসি;
বিধাতার সেই ক্রুর হাসি মাের মরমে বেদনা হানি’
চ’খের নিমেষে শুখায়ে দিল রে সাজানাে বাগানখানি

মাদল
ব্যথিত হিয়ায় বেদনা জুড়াতে আপনার মনে ভেসে
চলিলাম ছাড়ি’ নিজ ঘর বাড়ী ভ্রমিতে অচিন্ দেশে।
হেরিলাম কত মনােহর ধাম কত মনােরম দৃশ্য
না জানি কেমনে কেটে গেল শীত দেখা দিল আসি গ্রী
পালা ক্রমে ছয় ঋতুর উদয় হয়েছে যে কতবার
ভুলি নাই তবু অতীতের স্মৃতি বিধির সে অবিচার !
বহুকাল পরে বহু দেশ ঘুরে এসেছি সহসা আজি
আমারি সাধের পুরাতন ধামে ফকিরের সাজে সাজি।
ভগ্ন প্রাচীরে বসিয়া পেচক বাজায়ে সে কাল-ভেরী
কহিতেছে যেন—ফিরে যা পথিক্ ! রজনীর নাহি দে
তুলসী মঞ্চে নাহি আজ আর তুলসীর কোন লেশ,
আগাছায় আসি’ করিয়াছে আজ সন্ধ্যার পূজা শেষ ;
রিক্ত হৃদয়ে বাজিছে এখনও অতীতের সেই গীতি
ব্যথিত হিয়ায় করে কষাঘাত আজি পুরাতন স্মৃতি।

নুতন পথিক
কোন পুরাতন স্মৃতির পাশে
বেঁধেছিরে মনটা তাের,
যায় যে বেলা সন্ধ্যা আসে
ভাঙরে এবার স্বপ্নঘাের।
বিশ্বমাঝে নিতুই নূতন
উঠবে জেগে মনের সাধ
পাগলা মনের বাণের স্রোতে
যাবে ভেঙ্গে সকল বাঁধ।
সামলাতে আর পারবি নাক’
পাগল। মনের বন্যা বােড়,
নবযুগের নূতন-পথিক
নূতন করেই মনটা জোড় ।

আবাহনী
আজি অবেলায়
কেন সে জাগায়
শূন্য হিয়ায়
অতীত গীতি ;-
কেন ছলনা
কর ললন।
হেনে’ বেদনা
কর অনীতি
৩

মাদল
শাখে ফুলদল
হয়ে চঞ্চল
করে ছল ছল
ঝরিয়ে শিশির,
আজি আঁখিজল
বহে অবিরল,
হয়েছে উতল
মন অতিথির
ঐসে দোদুল
শাখে বু বুল
বসে করে ভুল
আপন গানে
পড়িয়া ফঁাদে
চকোরি কাঁদে
হেরি চাঁদে
গগন পানে
৩৪

মাল
থামারে পাগল
মত্ত মাদল
গরজে বাদল
গগন মাঝে,
মােছ আঁখি লে
হয়েছে যে ভাে
চল্ উঠে তাের
আপন কাবে

অস্পৃশ্য
মন্দির পরে বসিয়া পূজারী করিছে মায়ের পূজা,
গায়ে নামাবলি ডাকে ‘মা’ ‘মা’ বলি উর্দ্ধে তুলিয়া ভুজ।
হেন কালে এক শূদ্র আসিয়া দাঁড়ালাে মায়ের দ্বারে
নাহি অধিকার যাইবার তার দুয়ারের ঐ পারে,
ভাগ্যের দোষে শূদ্রের ঘরে লভেছে জনম তাই
মায়ের চরণে নাহি আজ তার মাথা পাতিবার ঠাই;
হাতে মােড়া তার কদলি পত্রে ছিল দুটি জবা ফুল
মায়ের চরণে ফুল দুটি দিবে তাই সে এত ব্যাকুল।

মাদল
ক্ষণেকের পর পূজারী ঠাকুর দাড়ালাে দুয়ারে আসি’
শূদ্রেরে হেরি’ বিদ্রুপ স্বরে কহিল ঈষৎ হাসি,
মায়ের এ পূত আঙ্গিনা মাড়াতে নাহি হ’ল তাের লাজ
দেবীর দুয়ারে পূণ্য আগারে শূদ্রের কিবা কাজ ?”
পূজারীর বাণী দিল শেল হানি’ শূদ্রের ছােট বুকে
স্তব্ধ হইয়া দাঁড়ায় শূদ্র ভাষা নাহি ফুটে মুখে,
জবাফুল দুটি হাত হতে তার খসিয়া পড়িল ভূমে,
ধন্য হইল ধরণীর বুক শূদ্রের ফুল চুমে
পুষ্প হেরিয়া পূজারীর চোখে ক্রোধানল এল ছুটি,
রক্তের রংএ রঞ্জিত হ’ল পূজারীর আঁখি দুটি
নীরব ক্ষণেক রহিয়া সহসা পূজারী গরজি উঠি
শুধালাে তাহারে--“মায়ের চরণে দিতে চাস ফুল
হেন আশা তাের ক্ষুদ্র হৃদয়ে উদিল কেমন করে ?
ভুলেছিস বুঝি জন্ম যে তাের অপবিত্রের ঘরে।”
নির্বাক হয়ে রহিল শূদ্র শুনি পূজারীর বাণী,
সজল নেত্রে হেরিতে লাগিল মায়ের মুরতি খানি।

এ দুনিয়ার
কেহ ওরে তার
নাহি কিরে আর
হবে আপন,
দুখ-পিয়ালা
ভরিয়ে জ্বালা
ছিড়লে। কি তার
সব বাঁধন।
করুণ সুরে তাই কি সে গায়
ভগ্ন হিয়ার বেদনা জানায়
কানন-মাঝে ঘুরে ফিরে চায়
খুজতে আজি
কোন্ হারা ধন।
৪ ৫

বিশ্রাম
সৈনিক হেথা কর বিশ্রাম
যুদ্ধ হয়েছে শেষ।
মুছে ফেল ঐর আহবের স্মৃতি
হৃদয়ের যত ক্লেশ।
শ্রবনেতে তোর পশিবেনা হেথা
আহবের কোন রব
যােদ্ধাগণের খঞ্জর ধ্বনি,
আহতের কলরব।
কামানের গােলা কঁপায়ে মেদিনী
আসিবেনা কভু হেথা,
রক্তের স্রোত নাহি দিবে হানি
হৃদয় মরণ-ব্যথা।
৪১

মাল
প্রলয় ঝটিকা বহিবেনা হেথা
কিম্বা মৃতেরে হেরি,
শকুনির দল আসিবেনা ছুটি,
বাজায়ে সে কলিভেরী
বারুদের ধূমে হবেনা আঁধার,
কিম্ব। অগ্নি-শিখা
এ ভাঙ্গা-হৃদয়ে আঁকিবেনা হেথ।
মৃত্যুর বিভীষিকা ।
সে রণ-দামামা বাজিবেনা আর
কিম্বা তূৰ্যনাদে,
সৈনিকগণ আসিবেনা হেথা
মাতিয়া যুদ্ধ সাধে।
কিন্তু প্রভাতে মালভূমি হতে
চাতক বাজাবে তূর্য ;
চক্ৰবাকের বাজিবে দামামা
হইলে উদয় সূৰ্য্য।
82

মাদল
এ মায়া কুটীরে শান্তির নীড়ে
বাজায়ে মধুর বাঁশী,
নট, নটী সাথে করিবে নৃত্য
নিত্য সাঁঝেতে আসি’
রাত্রি প্রভাতে দিনমণি যবে
গগন ভেদিয়া আসি’
প্রকৃতির ম্লানমুখমণ্ডলে
ঢালিয়া দিবেরে হাসি-
বনচারী দল মত্ত-মাদল
বাজায়ে মনের সুখে,
মশগুল্ হয়ে করিবে নৃত্য
বনের স্মিগ্ধ বুকে।
সৈনিক হেথা কর বিশ্রাম
যুদ্ধ হয়েছে শেষ,
মুছে ফেল ক্রুর আহবের স্মৃতি
হৃদয়ের সব ক্লেশ।

অমিয়
অমিয় তােমার গন্ধেতে মেতে
ভ্রমরের মত ছুটেছি,
জানি কেমনে চখেরি মিলনে
প্রাণ মন তােমা সঁপেছি।
অতি অপরূপ তােমার স্বরূপ
তুলনা যাহার নাই,
পথে কি বিপথে থেকে তব সাথে
যেন গো শান্তি পাই।
সাগর মন্থন করে দেবগণ
তােমায় পাবার তরে
ভাবি শুধু আমি আসিবে আপনি
তুমিগাে আমার ঘরে ।
৪৪

পাহাড়ীর বাচ্চা
পাহাড়ীদের বাচ্চারে ভাই
দেখতে বড়ই কালাে,
দেহটা তার লােহার গড়া
মনটা বড়ই ভালাে।
সকাল বেলা যায়সে বনে
বাজিয়ে বাঁশের বাঁশী,
দুঃখ কি তা জানে না ভাই
গাল ভরা তার হাসি ।
৪ ৫

সারা দিন সে বনে বনে
বেড়ায় শিকার করে’
সাঁঝের বেলায় হাসি মুখে
ফেরে পাতার ঘরে।
পাহাড়ীদের পাতার কুটীর
আনন্দেরই সেরা
ভদ্রলােকের অট্টালিকা
দুঃখ দিয়ে ঘেরা।
এr
৪৮

হুসিয়ারী
পিছন ফিরে তাকাস না আর
সুমুখ পানে চল ধেয়ে
ভাষণ তুফান উবে এবার
চল এগিয়ে পথবেয়ে।
তোলপাড় সব হবে এবার
এই তুফানের ধাক্কাতে
মাথার উপর পড়লে এসে
পারবিনা আর আটকাতে
কলহ করে কাটাসন! দিন
ভীষণ বেগে যায় সময়
চোখ মেলে সব দেখরে ছুটে
আসছে এবার ঐ প্রলয়।
৪৭

মাল
দুর্গম পথ লঙ্ঘিতে হবে
বাজিয়ে মাদল মত্ততার
নির্মম ভাবে কর সংহার
রিক্ত হিয়ার স্তব্ধতার।
অতীতের সেই বিলাস বাসনা
করেছে যে আজ সব বেকার
হাসিমুখে ঘাের কষ্ট সহিতে
অকাতরে সব শেখ এবার।
বেহাগ, বাউল ভােলরে এবার
নাহি কোন লাভ দ্বন্দ্বেতে
এক সাথে সব মাতরে এবার
প্রাণমান ছন্দেতে।
সমূলে নেবার সময় আছে
থাকতে সময় সামলে নে
উঠলে তুফান ভয় পাবিনা
আসেও যদি কাল নেমে ।
৪৮

উল্লাস
দেখনা গাছে ফুল বকুল,
চলনা সবাই কুড়িয়ে ও ফুল
গাঁথবে। মালা, গাঁথবাে রে দুল
পরব হরষে।
সাজবো সবাই ফুলের সাজে,
নাচবাে আজ এই বনের মাঝে,
নিদাঘের এই স্নিগ্ধ-সাঝে
মলয় পরশে

মাদল
গাইবাে সবাই পাহাড়ী-গান
গান গেয়ে আজ ভ’রবাে রে প্রাণ,
আনন্দের আজ উড়বে নিশান
মােদের কাননে
ভুলে আজি দুঃখ সবাই,
সুখ সাগরে ভাসবােরে ভাই,
আনন্দে আয় মাদল বাজাই
পাহাড়ী বনে।

মালির মেয়ে
–
চৌধুরীদের ফুলবাগানের ঝণ্ট মালীর মেয়ে
যাচ্ছেরে দেখ ঐ সে পথে আপন মনে গেয়ে।
তার সে ছােট রাঙা হাতে দুলছে ফুলের সাজি,
শুধিয়ে তারে জানতে পেনু নামটী যে তার “রাজি’
ফুলবাগানে শিউলি-তলায় কুড়িয়ে এনে ফুল,
নিত্য গাঁথে আপন মনে দোল-চঁপার দু।
বেলফুলেতে আঁচল ভরে কদমতলায় এসে
মালা গাঁথে ঘাড় দুলিয়ে বারেক মৃদু হেসে।
শুভ্র মালা ঝুলিয়ে গলে দুলিয়ে কানে দুল,
ভােরের হাওয়ায় দৌড়ে বেড়ায় উড়িয়ে এলো চুল
ফুলের সাজে ফুলের রাণী পরীর মত মানায়,
তার সে রূপের ছটা দেখে থমকে পথিক দাঁড়ায়।
চায়নাকো সে হীরা -মানিক, চায়না জরির সাড়ী,
পাতার ঘরই ভালবাসে চায়না পাকা বাড়ী।
ফুলের মত কোমল তনু স্নিগ্ধ অভিরাম,
ফুলের সাথেই করতে খেলা চায় সে অবিরাম।

জাগরণী
ঘুমের দেশে
এবার ভাঙরে ঘুম-ঘাের
ঐ
থাকবি শেষে
ঝরিয়ে আঁখি লাের।
এবার ভারে ঘুম ঘাের
ফুলবাণ ঐ আঁখির তুণে
রাখছে সে আজ গুণে গুণে,
হাবে বলে আজ ফাগুনে
উতল হিয়া তাের
এবার ভারে ঘুম ঘোের
ফুলের বাণে
উতল প্রাণে
বাঁধবে ফুল ডাের,
এবার ভারে ঘুম ঘাের।

মাল
ঐ
বাণের ঘায়ে আপন-হারা
মও মনে হয় রে যারা
জীবন তাদের কেঁদে সারা
হয়না রাতি তাের।
এবার ভারে ঘুম ঘাের
ঐ
ঘুমের দেশে
থাকবি শেষে
ঝরিয়ে অাঁখি-লাের ;
এবার ভারে ঘুম ঘাের !

No text on this page.

No text on this page.

Madal

Author
Sen,dineshchandra
Title
Madal
File name
Madal
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2009/12/1
Publisher
Sukomal Basu,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
65
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Sen,Dineshchandra
DLI number
512863
Barcode
4990010019896.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
r0WAsvxdcLI
Download PDF

Madal