Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prachin Asami Haite
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
+
প্রাচীন
আসামী
হইতে
M
প্রাচীন আসামী হইতে
শ্রীপ্রমথনাথ বিশী
রঞ্জন প্রকাশালয়
২৫-২, মােহনবাগান রে
কলিকাতা
বঙ্গাব্দ ১৩৩৭
প্রিন্টার-প্রবােধ নান
শনিরঞ্জন প্রেস
২৫-২, মােহনবাগান রে।
কলিকাতা
মূল্য বারো আন।
বন প্রশাসনের পক্ষ হইতে
এৰােধ নান কর্তৃক প্রকাশিত
হে ধানশ্রীতীববাসিনি,
ব্ৰহ্মপুত্ৰতীববাসী কবিব
স্মৃতিব অঞ্জলি
গ্রহণ কবা
No text on this page.
আজি আমি বুঝিতেছি কাননে কাননে
ফুটেছে যে লক্ষ ফুল—এক লক্ষ্য তার ;
আজি আমি বুঝিতেছি কি গুপ্ত কারণে
নক্ষত্রের চলাফেরানভঃ পারাপার।
আজি আমি বুঝিতেছি এ ব্যর্থ-জীবনে
একটি উদ্দেশ্য আছে, নাহি বেশি আর ;
আমি যে তােমার কবি-জনমে মরণে
একটি সঙ্গীতে রচি গীতালি তােমার।
সমগ্র জীবনে মাের একটি সাধনা
সকল-সার্থক-করা একখানি গান
ঝটিকাতে ছিন্ন এক কমলের প্রায়
লুটাবে তােমার পায়ে ; তােমার খেলনা
হয় যেন জীবনের যত কিছু দান।
হাস্য মুখে লবে তুমি আছি সে আশায়
পশ্চিম-দিগন্ত আমি, জ্বলন্ত রবির
বাসনার চিতা-শয্যা'; তুমি সখি দূর
পূৰ্ব্ব বনান্তের রেখা-অতল গভীর
রহস্যের অধিনেত্রী! মােরে দগ্ধ করি
জ্বালাই বহ্নির শিখা—তারি দৃপ্ত রাগে
হেরিতেছি কান্তি তব মূচ্ছায় বিধুর!
মিলিয়াছে তব অঙ্গে দিবস-শর্বরী,
দেখা-না-দেখার প্রান্তে তব মূর্তি জাগে
কোথা তুমি, কোথা আমি, শূন্যতা অগাধ,
বুকে বুকে পরশন—ঘটিল না কভু।
কেবল চুলের গন্ধ, শয্যা ক্ষুধাতুর,
শুধু সৌন্দর্যের কশা-কষায় মধুর !
উঠিল গভীর রাত্রে দ্বাদশীর চঁাদ—
অখণ্ড দিগন্তে হেরি ঘেরা দোহে তবু।
L
এ প্রেম সুন্দর
সখি, এ প্রেম সুন্দর!
আর কিছু নাই হােক—এই যে একদা
দেখা হয়েছিল পথে, ক’য়েছিলে কথা,
চলে যেতে নয়নেতে জল ভর-ভর।
এ প্রেম সুন্দর সখি, এ প্রেম সুন্দর ।
বহে নিয়ে এল কোন্ রসাতল হতে
এ যে কার অভিলাষ।
প্রদীপ্ত আলােতে
শিশির-মসৃণ কুঁড়ি একটি কুন্দর !
এ প্রেম সুন্দর সখি! জানি না কোথায়
কেমন সে সার্থকতা! তবু বা কি কম!
মুহূর্তের স্বপ্ন লাগে অনন্তের প্রায় !
দু’দণ্ডের পরিচয়ে হলে প্রিয়তম।
যুগল গ্রহের মত স্থির মহিমায়
চির প্রদক্ষিণ-রত! বিস্ময় পরম ।
৪
L
তােমার কল্পনা সখি, বাতাসে বাতাসে
ছড়ায়ে পড়েছে, বহু বনান্তরবাহী
গন্ধসম:; হেরিতেছি স্বপ্নে অবগাহি,
অজ্ঞাত এ বিশ্বপানে সলজ্জ উল্লাসে
যৌবন-পীড়িত দুটি বক্ষ আছে চাহি
সঙ্কোচে উন্মুখ ; বাণী নাহি নাহি
অকিঞ্চন অধরের ; খুজে মরে কথা
লাবণ্য-মসৃণ দুটি ব্যগ্র বাহ-লতা।
ও
হেরিতেছি কল্পনায় ব্রহ্মপুত্র-তীরে
একা তুমি ; সন্ধ্যা হলে বাঁধিতেছ চুল,
ললিত ভঙ্গিমাভরে, বাঁকাইয়া ধীরে
বাহু দুটি; গ্রীবাস্পন্দে দোলাইয়া দুল
আঁকিছ সিন্দুর ভালে—তখন তিমিরে
প্রথম মুঞ্জরি ওঠে তারার মুকুল।
৫
গ্রীষ্ম-ক্ষীণ তিস্তা-সম, তন্বী তব আজি
দেহের অস্তিত্ব গেছে কোথায় নামিয়া।
কোথা সে চটুল লাস্য, লীলামীন রাজি।
তনুতটিনীতে ওই আছে প্রকাশিয়া
যুগ যুগান্তরবাহী আদিম অক্ষয়--
নিগুঢ় সে সূত্ৰখানি! যার গ্রন্থিতলে
লক্ষ কোটি জীব আর অনন্ত সময়
একটি অখণ্ড সত্যে পরিণত হয়।
ধ্যাননেত্ৰ-স্তব্ধ ওই শান্ত সরােবরে
পড়েছে আলােকচ্ছটা সায়াহ্ন রবির ;
আমি বসে হেরিতেছি কি বিস্ময়ভরে
ধীরে ধীরে স্বচ্ছ ছায়া হতেছে গভীর ।
এক বর্ণ অলক্ষিতে আরেকের সনে
কেমনে মিলায়ে যায়, অন্তিম গগনে
স্তন-মঞ্জরীর ভারে আনম্ৰ তনুকা,
লঘু পদ হানি যাও যে-নব শাদ্বলে
পলকে মিলায় তাহা, সাহারার তলে
ক্ষণ-বৃষ্টি সম ; অয়ি ভাবের বেণুকা,
বিরহের রন্ধ্রে রন্ধে, বিশ্বের নিঃশ্বাস
ধ্বনিয়া তুলিছে নিত্য অখণ্ড কি সুর ;
কখনাে নয়ন তব স্বপ্ন-ভারাতুর,
কভু তীক্ষ্ণ অসিম মূর্ত সৰ্ব্বনাশ!
অজানা হাঁসের দল অলৌকিক ডানা
নীরবে সঞ্চার করি’ সান্ধ্য সরােবরে
অন্ধকারে মিশে যায় ; শুধু ক্ষণে ক্ষণে
অযুত বর্ণের ছায়া দিয়ে যায় হানা,
ভাবে নিমীলিত আঁখি সরসীর পরে,
গােধূলির মন্ত্র-পড়া সায়াহ্ন-গগনে।
-
বৃষ্টি-ধৌত দিগন্তরে যায় আজি দেখা সুদূর ত্রিকূট চূড়া; যেন মন্ত্রবলে সহসা এলাে সে কাছে ; সূক্ষ্ম-পথ-রেখা প্রচ্ছন্ন ছিল যা ধূলি-কুঙ্কটিকা-তলে ফুটিয়াছে অসংশয়ে; পশ্চিমেতে চাহি মনে হল, ওই গিরি ওই নীল বন, মাঝে কোনাে দিগন্তের বাধা আর নাহি হাত বাড়ালেই পাব কামনার ধন? অশ্রু-লঘু চিত্তমাঝে তাকানু সহসা, হেরিলাম কুহেলিকা-গুণ্ঠনটি খসা, স্মৃতির পদাঙ্ক-আঁকা স্বপ্ন-গূঢ়-পথ- তােমার অস্তিত্ব খানি; যবে মুগ্ধবৎ বাড়ায়ে দিলাম হাত উদ্দেশে তােমার, বাধা দিল বাসনার দিগন্ত অপার।
৮
ওগাে মাের জীবনের কৃত্তিকা-মণ্ডল
এবার বিদায় দাও; প্রতিদিন সাঁঝে
পশ্চিম দিগ্বধূ যবে
গভীর
কুন্তল
বিয়ে বাধিত একা, আধাে ত্রাসে লাজে
তােমরা যে দিতে দেখা, স্নিগ্ধ অচপল
বকুলবীথির শিরে ; রাত্রি যত বাজে
জাগিতে পলকহীন, সপ্তর্ষি সু-ধীরে
নামিত স্নানের লাগি’ মানসের তীরে।
এবার কোথায় দেখা হবে কে তা জানে,
কোন্ দূর বনান্তরে, কোন্ নদীতীরে ।
গ্রীষ্ম-ক্ষীণ হ্রদে হেথা দিবা অবসানে
সূৰ্যাস্তবরণচ্ছটা নামিয়াছে নীরে,
যেন দেব-বালিকারা রত সন্ধ্যাস্নানে ;
—সন্ধ্যাতারা সকৌতুকী চেয়ে আছে ধীরে।
আর কিছু না-ই হ’ল ; এই যে তােমার
এসেছি নিকটে এত,
পারি পরশিতে
শ্রান্ত অঞ্চলের কোণ; এই যে আবার
রহস্য-উদাস কেশ, একটি ইঙ্গিতে
অকস্মাৎ-সন্ধ্যা-সম উপত্যকা মাঝে
খসে যায় অতর্কিতে; অধীর অঙ্গুলি
জানি কেমন ভঙ্গে, শত তুচ্ছ কাজে
নিজেরে সবার সাথে গাঁথিতেছে তুলি।
•
সত্যেরে কে দেখিয়াছে! শুধু অন্ধ হাত
মিছে করে অন্বেষণ ! চেয়ে আছি সখি,
রহস্য-অগাধ তব অস্তিত্বের পানে।
কভু চোখে পড়ে তব চম্পক-সম্পাত
মৃণাল ভঙ্গুর দেহ; কখনাে ঝলকি
লুপ্ত বিশ্ব-আত্মখানি চক্ষে দীপ্তি হানে।
১০ • ভালাে বেসেছিলে সখি একদিন তাই আজিও আমার হবে, হেন স্বপ্ন না-ই ভাবিলাম মনে। যে প্রেম একদা, খর- সূৰ্য্য তীব্র-রসােচ্ছ্বাসে করেছে ভাস্বর দিবসের দিগন্তর—সে আসে আজিকে মল্লিকা-মেদুর-স্পর্শে জ্যোৎস্না-লিপি লিখে, অর্ধরাতে তন্দ্রা-সাথে খিড়কি খুলিয়া নীলাভ নীরব চন্দ্রে। একাকী বসিয়া ডুবারী যেমন ভাবে, সমুদ্রের তলে কোন্ ক্ষণে, কেমনে বা ত্রস্ত হাত স্থলে, পড়িল যে মণি খানি, কি মূল্য তাহার, কি বরণ, কিবা দীপ্তি, কেমন আকার ! তমনি ভাবিব বসি দণ্ড পল গুণি কেমনে হারানু তবু চুম্বনের চুণী।
১১
সে অঞ্চল-ভঙ্গীখানি থাকিয়া থাকিয়া,
হৃদয়-সীমান্তে আজো উঠিছে কঁপিয়া,
ঝড়ের মেঘের প্রান্তে তীব্র বিদ্যুতের
করুণ রেখার মত ; স্মলিত চুলের
মদির অধীর গন্ধ, আৰ্ত্ত অলি প্রায়
কাঁদিয়া ফিরিছে আজো তারে ঘিরে হায়!
শুক্তি-পাণ্ডু কপােলতে ওঠে দ্যুতি ভেসে,
অতি গুপ্ত বাসনার ক্ষণিক আবেশে।
তি
অতীতের কশাঘাতে আমি যে পাগল,
লুষ্ঠিতে লেগেছি আজ স্মৃতির প্রাসাদ।
মুক্তা-ভ্রমে লই যত শিশিরের জল,
সম্ভব লাগিছে যত সু-দুর্লভ সাধ।
সেই যে উন্মুখ গণ্ড, কবরী চঞ্চল,
হায় সেই গন্ধ, আর হায় সেই স্বাদ।
১২
আর কোনােদিন সখি, রক্তরুচি বাসে
আসিবে না বীথিপথে—মাের জীবনের
প্রথম উষার মত পূবের আকাশে
এই খেদ রয়ে গেল ক্ষুধিত মনের।
আর কোনােদিন সখি, অলকে তােমার
পরিবে না করবীর শঙ্কিত মঞ্জরী।
আর কোনদিন সখি, স্বপ্ন-রস-সার
আনিবে কি অকথিত দুটি নেত্ৰ-ভরি ?
স্মরণের মধুচক্র ভাঙিয়া সহসা
মুখর হয়েছে মত্ত মধুপের দল ;
নিঃশেষ করিয়া মধু, এখন কি দশা,
আপনার বিষে তারা আপনি চঞ্চল।
বিস্মৃতির কালাে জলে সােনার প্রতিমা
ডুবাইয়া, পাবদা নাকি এ দুঃখের সীমা।
• -
তুমি ছিলে কৈশােরের পাষাণ-পুরীতে,
আপনারে না জানিয়া তন্দ্রাতলে লীন ;
আমি এনু অকস্মাৎ ঘুরিতে ঘুরিতে
অপূৰ্ব্ব-পথিক-পথে, পান্থ উদাসীন।
যৌবনের স্বর্ণকাঠি খেলিবার ছলে,
সহসা রাখিনু সখী শিথানে তােমার,
অজ্ঞান তুষার গলি নয়নের জলে,
শ্যামলতা প্রকাশিল গিরিশ্রণী তার।
চরণের চঞ্চলতা রাজিল নয়নে,
কৈশােরের প্রান্তে এলে প্রথম গােধূলি,
অলক্ষ্য বীণার তারে যেন ক্ষণে ক্ষণে,
কেঁপে ওঠে মূচ্ছনায় দশটি অঙ্গুলি।
মনে রেখাে, আমিই সে দিয়েছিনু বলে
তুমি নারী—সৰ্ব আগে—এই বিশ্ব-তলে।
১৪
ওই পূর্ণ শশী-পানে চেয়াে সখী চেয়াে,
আমিও চেয়েছি জেনাে ওরি মুখ পানে।
দু’জনে দোহার কাছে আজিকে অজ্ঞেয়,
কোথায় রয়েছি দেহে—কেহ নাহি জানে।
তবু ওই পূর্ণ শশী, এক গুপ্ত টানে
টানিতেছে লক্ষ হিয়া—জেনাে সখী জেনাে ;
কাহারাে অমৃত আছে, বিষ কারাে প্রাণে,
তােমার যা থাকে সখী, মাের তরে এনাে।
মােরা সখি ইন্দ্রধনু, কল্পনা-সম্বল,
এক ফোটা হাসি আর অশ্রু ভেঙে গড়া।
ভাবিলে ভাবিতে পারো নিতান্তই জল!
কিন্তু কি ভাবিতে নায়কা—এই বসুন্ধরা
প্রেমের কপােল বিন্দু অশ্রু ছল ছল,
প্রেমের অধরে হাসি—আলাে সূৰ্য-ভরা।
}
আর কি
সুন্দর
আছে বল তার চেয়ে।
কুণ্ঠিতা কিশােরী এক, লাবণ্য-মুকুল
থর থর ; উঠিবারে যেন চায় বেয়ে
দুর্গম এ বিশ্বতরু; সরম-দুকূলা,
গুষ্ঠিতা পুলকে শুধু ; গৌরীশৃঙ্গ-শিরে
সনাতন স্পর্শহীন তুষারের মত
বক্ষ দুটি—মগ্ন আজো রহস্য তিমিরে
নিজেই জানে না তন্বী মূল্য তার কত!
তারপরে একদিন অকস্মাৎ এলো
শানিত নিঃশ্বাস এক ; উঠিল নড়িয়া।
কৈশাের-স্বপন-ভিত্তি ; ঝঞ্চা এলােমেলাে
সকলি উলটি দিল ; তৃষা-ক্ষুব্ধ হিয়া
জাগিয়া উঠিল ধীরে—আসিল চুম্বন,
এলাে প্রেম, এলো জন্ম, আসিল মরণ।
১৬
আমি ভালবাসি সখী, স্তব্ধ ফেনিলতা
মুক্ত কুন্তলের তব, পড়ে যবে ঝরি !
তাররা চেয়ে ভালবাসি তন্বী বেণীলতা
মহুয়া-মদিরা তব গ্রীবাটি আবরি”।
আমি ভালবাসি সখি, আলস্য-রভসে
ভাবনা-মন্থর তব ভাবুক-চরণ,
তারো চেয়ে ভালবাসি অবকাশ-রসে
অসম্বত অঞ্চলের মত্ত বিচরণ।
আমি ভালবাসি সখি, স্বপ্ন-লঘু-রবে
শুক্তি-শুভ্র হাসিটুকু অধরে তােমার ;
তারে চেয়ে ভালবাসি সেই হাস্য যবে
চকিত ময়ুর করে কলাপ বিস্তার।
আমি ভালবাসি সখি তােমার ও তনু,
তাররা চেয়ে ভালবাসি যা তব অতনু।
১৭
| সেই ভালাে ছিল সখী—দুজনে যখন
আধেক সংশয়ে ছিনু আধাে পরিচয়ে,
ভুলেও তাে কেহ কারাে চাহি নাই মন
খেলা ভেবে দুইজনে ছিনু মত্ত হয়ে।
সেই ভালাে ছিল সখী দুজনে তখন
দিয়েছি নিয়েছি ফুল কতনা সময়ে
সে ফুলে কখনাে মালা করিব রচন
এ কথা স্মরিয়া কত হেসেছি উভয়ে।
অচ্ছেদ নদীর নীরে উপল সমান
দুজনের মন আজি
দুজনের চোখে-
অতি-পরিচয়ে আজি দুইটি পরাণ
বারে বারে কেঁদে ওঠে অতৃপ্তির ঝোকে।
গােধূলি-গুণ্ঠন
তলে প্রথম প্রদোষে
তাহারেই খুঁজি পুন যে আছিল ব’সে।
২
১৮
এ নহে মাটির ঢেলা আঘাতে তােমার
ভেঙে যাবে শতখণ্ড। জ্বলন্ত অঙ্গার
যতই আঘাত তারে করিবে সুন্দরী
উঠিবে অপূৰ্ব্ব হ’য়ে ইন্দ্রজালে ভরি।
তােমারে পেয়েছে যারা হাতের মুঠায়
তাহারা পেয়েছে শুধু ধূলা বালি হায়!
আমি দেখিয়াছি সেই মানস-প্রতিমা
কালে কালে দেশে দেশে নাহি যার সীমা
আমি দেখিয়াছি সেই আনন্দ-সঘন
বিশ্বের আদিম চেষ্টা -যে প্রাণ এখনাে
স্বচ্ছন্দ ছন্দের ভরে যুগে যুগে চলে
নব নব জীবনের খিলানের তলে,
আপনি না পায় অন্ত আপন মহিমা
আমি দেখিয়াছি সেই আনন্দ-প্রতিমা।
১৯
পড়িবে পড়িবে মনে এই কথা সখী,
সুতীক্ষ্ণ স্মৃতির অসি সেদিন ঝলকি
অতীতের খাপ হতে উঠিবে সহসা ;
সেদিনের সন্ধ্যাখানি মনে হবে ঘষা
সুবৰ্ণ-মুদ্রার মত পশ্চিমের দিকে,
ওই রক্ত বাসখানি মনে হবে ফিকে ;
হেমন্তের হৈম আলাে কঙ্কণে আসিয়া
মূরছি পড়িয়া যাবে উঠিতে হাসিয়া।
অবসন্ন দিবসের বিষন্ন প্রদোষে,
নির্জন বলভিতলে সঙ্গোপনে বসে,
কাহারে উদ্দেশ করি নক্ষত্রসভায়
মৰ্ম্ম-বিগলিত গান গাবে একা হায় !
ব্যর্থ গান আসিবেক তব কাছে ঘুরে
সেদিন সেজন রবে কত কত দূরে
२०
জানি আর স্বর্ণপদ্ম ফোটে না ধরায়,
কমল-উন্মুখ প্রাতে পম্পাতীরে হায়
লঘু-পায়ে অপ্সরীরা স্নান সাঙ্গ করি
অবসন্ন-কেশ হতে মন্দার-মঞ্জরী
ফেলে রেখে নাহি যায়; সুন্দরীসমাজ
স্বৰ্গমন্দাকিনীকূলে স্বপ্ন শুধু আজ।
আসন্ন আশ্বিনে এই ভােরের আঁচল
ভরি তােলে বারে বারে শিশির-উজ্জল
ক্ষণস্বর্ণশস্যকণা; দিগন্তের পরে
পরিপক্ক রৌদ্রগুচ্ছ পূর্ণতার ভরে
আনমিত ধান্যশীর্ষ ।
এই কিবা কম।
সবারে করিয়া পূর্ণ আছ প্রিয়তম
স্খলিত অঞ্চল আর গলিত কবরী,
ললিত কৌতুকে দুটি কলনেত্র ভরি।
২১
এই যে ছুঁয়েছি আজি তােমার অঙ্গুলি,
গীতি-ক্ষুব্ধ বক্ষ তব হে স্তুতি-চঞ্চলা,
দীপশিখাসম কম্প্ৰ নাড়ীতে আকুলি
বিরহ-মিলন-বাৰ্তা করে ফেরা-চলা।
এই যে কপােলে তব প্রভাতেরাে আগে
উষার আভাস কঁপে পূৰ্ব্বরাগসম,
রহস্য-গভীর তব কুন্তলের রাগে
অন্ধকার মূরছায়—এই কিবা কম।
জানি জানি গ্রহ সূৰ্য্য কিসের পিয়াসে
পুঞ্জনীহারিকা হতে সূত্র তুলি তুলি
আলােকবসন বােনে ; জানি জানি সখী,
চিহ্নহীন কোন পথে বর্ষে বর্ষে আসে
শিশিরকুণ্ঠিত শাখে ভ্রান্ত ফুলগুলি,
হঠাৎ-সৌরভ যার দেয় রে চমকি।
२२
শেফালি-বিমুগ্ধ আর শিশির-মসৃণ,
আলােক-চিক্কণ এই শরতের দিন
পড়ে আছে পক-প্রায় ধান্যক্ষেত্র পরে,
আলস্য-আবেশময় আনন্দের ভরে
প্রসারিয়া সুবিপুল পক্ষ দুটি তার
স্বর্ণ-ঈগলের মত। মনে লাগে আর
ভােরের যে সরােবরে প্রথম কলস
এখনাে হয়নি ভরা, মৌন নিরলস
তারি মত প্রভাতটি।
সব মিলে আজ
আলােক, শেফালি, ধান্য, শিশিরের লাজ,
ঘন কালাে বনরেখা দূর-দিগন্তের,
তার চেয়ে কালাে কত দৃষ্টি নয়নের,
মধুভারে ভগ্নচাক মৌমাছির প্রায়
চিত্তে মাের গুঞ্জনের খঞ্জনী বাজায়।
-
ফুল যদি বন্ধ হয়ে হয় পুন কুঁড়ি! সতেরাে বছর তব যদি গিয়ে ঘুরি বাহিরে আসিতে চলি বালিকা-বয়সী। উদ্ভিন্নযৌবন তব হৃদয়েতে পশি ঘুমায়ে পড়িত নদী-তরঙ্গ সমান বাতাসের অবসানে। আনিতাম দান যা কিছু বলিত ভালাে অবােধ নয়ান- একটি ধানের গুছি শিশির-স্থলন, নাবালক শেফালিকা ; পথ গিয়া ভুলি অবাক দাড়াতে মুখে পূরিয়া অঙ্গুলি। দেখিতে বিস্ময়ে-তব হাস্য কোলাহলে চকিত কাঠবিড়ালী শালছায়া তলে দূরে গিয়া তব পানে রহিত চাহিয়া। আজি আমি জাল বুনি সেই স্বপ্ন দিয়া।
২৪
+:
এই যে তােমারে আজি হেরিতেছি চোখে
বাসনা-বিশাল দুটি আঁখির আলােকে,
এই যে পলক লাগি পারি পরশিতে
তােমার আঁচলখানি; ফুল খুলে দিতে
কবরী খসিয়া পড়ে, আকাশের পথে
নীড়গামী বলাকার ক্লান্ত পাখা হতে
স্বচ্ছ আঁধারের মত, গােধূলির পরে ;
শিশির-বাঞ্ছিত দুটি অকলঙ্ক করে
আপনারে নানাভাবে তুলিতেছ পূরি,
নিজের রূপের সনে এই লুকোচুরি,
এই ক্ষণে ভরে-দেওয়া, এই পুনরায়
অঙ্গের সীমান্তে অঙ্গ মিলায় মিলায় ;
কিছু যার দেখিয়াছি কিছু দেখি নাই,
একদিন মনে হবে অপূৰ্ব্ব ইহাই।
শিশির-মসৃণ কেশ খুলে দাও সখী
দেখি বসে তারা ঝরা ; মুক্তাস্বচ্ছ হাতে
ভীরু ভঙ্গিমায় আঁকো আকাশের পাতে
আন্দোলন আলিম্পন ; উঠুক ঝলকি
তমালতরল ঘন নয়নে ছলকি
বিরহ-সঙ্কেত-রেখা বসনে, শয্যাতে,
নিজেরে ছড়ায়ে যাও সকলের সাথে,
আমি তাই খুটে ফিরি পরখি’ পরখি।
পারাবতপদপাণ্ডু চন্দ্রের হ’ল কি।
গলে’ গেল নভপ্রান্তে। সপ্তর্ষি সভাতে
শিশির-মার্জিত আঁখি জাগে বেদনাতে
একা অরুন্ধতী ক্ষুব্ধ জগতে নিরখি।
হে আমার অরুন্ধতী স্বপ্নহীন চোখে
দেখিছ কি সৃষ্টি চলে মাের মর্ত্যলােকে।
তােমারে বেসেছে ভালাে কতই না লােকে।
বাসনা-বিশাল কত আঁখির তুলিকা
সৰ্ব্ব অঙ্গ ঘিরি তব লিখিয়াছে লিখা
তৃপ্তিহীন কামনার অক্ষয় আলােকে।
আমি বেসেছি ভালাে অন্তরে তােমার
যুগল ভুরুর কালাে খিলানের তলে
আত্মার রহস্য-দীপ বহিয়া যে চলে
সেই তীর্থ-পথিকারে চির-যাত্রা যার।
যদি কোনাে দিন সখী কালের অঙ্গুলি
ক্ষুন্ন করে রূপ তব মহুয়া-মদির,
অনির্বাণ আলােকেতে সেই শিখাটির
তােমারে চিনিয়া লব--যাবে নাকো ভুলি।
দিগন্তের বাহুপাশ কাটাইয়া ক্রমে
চির ছায়াপথে যাত্রা কর প্রিয়তমে।
२१ নূতন বন্ধুর মাঝে পাবে তুমি ঠাই নূতন নদীর কূলে নব তৃণতীরে, নূতন ভাষায় কথা কহিবে সদাই কত না নূতন মুখ তােমা সখী ঘিরে, সত্য মিথ্যা কভু হেসে কভু অশ্রনীরে। সে সময় মনে রেখো চিরঅস্তহারা পুরাতন গৃহে তব ওঠে সন্ধ্যাতারা। নূতন বসন্তে সাজি ভরিবে তােমার মালিকা গাঁথিতে পাবে নব নব ডাের- মনে রেখাে সে সময় হেথাও আবার ফুটেছে নূতন ফুল সুগন্ধি-বিভাের, মুকুল-বিলাসী নব পিক গাহে জোর। সেদিন নূতন চুলে গুজি যদি ফুল রাগিয়াে না জেনাে তাহা নূতনের ভুল।
২৮
যাবে সখী চলে যাবে—যাবে শুধু তুমি
আর সবি পড়ে রবে—যাহাদের সাথে
মিলিয়া সম্পূর্ণ ছিলে—এই বনভূমি
মূৰ্চ্চনায় মূৰ্ছাতুর—তব পদপাতে।
ইহাদের বাদ দিলে কতটুকু তুমি!
এই মালতীর লতা, শিরিষের ছায়া,
এই যে মাধবী-শাখা রয়েছে কুসুমি,
সবে মিলি তবে তুমি একখানি মায়া।
যে তরুতে দিতে জল সােদরের স্নেহে,
যে দোলায় দোল খেতে অবকাশ-রসে,
শত তুচ্ছকৰ্ম্ম নিয়ে পশিতে যে গেহে,
বাতায়নে দাঁড়াইতে আলস্য-রভসে।
যেখানে বসিতে তুমি সেথা গিয়া বসি
আর কি করিতে পারি—অয়ি সপ্তদশী।
P
--
বিস্মৃতির বৈতরণী পার হয়ে সখী
চলে যাবে জানি তাহা—তবু কি ঝলকি
অতীতের সিন্ধু হ’তে স্মৃতির ঝিনুক
একটিও উঠিবে না—ভাবি এইটুকু।
মনে রেখাে বীথিপথে, শুষ্ক পল্লবের
মঞ্জীর উঠিবে বাজি-কাঠবিড়ালের
তব পদধ্বনি আশে কাটিবে সময়।
মনে রেখাে-আরাে কেহ সেথা জেগে রয়।
আরেক বসন্তে সখী ক্ষুব্ধ সমীরণ
বনের অঞ্চলে গ্রন্থি দিয়েছিল হায়,
বলেছিল—“মনে রেখাে মনে রেখাে, বন
হাসি মুখে নিয়ে ফিরে আসিব যখন।
বন কি চিনেছে তারে বুঝা নাহি যায়।
হাসিছে না কঁদে ওই তরু-মৰ্ম্মরণ।
মৃণাল-রুচির তব উন্মুখ অধরে
যদি বা অঙ্কিত করি অবলীলাচ্ছলে
বঙ্কিম চুম্বনরেখা—জেনাে প্রিয়তম
মুহূর্তে তা মিলাইবে ইন্দ্রধনুসম
ক্ষুন্ন গগনের কোণে। অয়ি অসহায়,
মৃত্যুর ইঙ্গিত-তীক্ষ্ণ-ছুরিকার প্রায়
কুষ্ঠিত গ্রীবায় তব অধরের রেখা
সে তত শুধু অস্তনভে ক্ষণিকের লেখা-
মুমুষু মণিকা এক। যাহা থাকিবার
আপনি তা থাকে—কেবা খোঁজ রাখে তার
ত্রিবলী সােপান আঁকা ক্ষীণ মধ্য তব
নিয়ে যাবে উচ্চে মােরে, যেথা অভিনব
অপূৰ্ব্ব মন্দির আছে ; তবু আজি এই
সােপানেরে ভালবাসি—তার বেশী নেই।
কারাে ভালো লাগে কেশ ; কাহারাে আবার
মহুয়া-নিটোল গাল ওঠে যা কুঙ্কুমি’
আধেক ইঙ্গিতে সখী গুপ্ত বাসনার ;
কিন্তু সখী ভালাে লাগে তােমার যে তুমি।
কারাে ভালাে লাগে সুধু গন্ধ-অনুমান
পল্লব-বিলীন বক্ষ আছে যা কুসুমি’ ;
কাহারাে বা ভালো লাগে নিশিত নয়ান :
কিন্তু সখী ভালাে লাগে তােমার যে তুমি।
;
ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রজাল দেখিয়াছি টুটি’
তাই তাে ধরিতে চাই অস্তিত্ব তােমার ;
দেহের জঞ্জাল আর ধূলি দুই মুঠি
পারিবেনা ঢাকিবারে রহস্য আত্মার ;
যে বৃন্তে ও তনুখানি উঠিয়াছে ফুটি
আমি চাই দেখা তারি---নহে কম তার।
২
তােমার সৌন্দৰ্য্য সখী, বিষতীক্ষ্ণ শর
বিধিয়াছে বক্ষে মম। বিহ্বল কেশের
মদির অধীর গন্ধে এই অভাগ্যের
আপাদমস্তক সখি পুলক-জর্জর।
ওই দৃষ্টি, ওই ওষ্ঠ, ওই যে অধর,
ওই কণ্ঠ, ওই বাহু, শ্রান্ত অঞ্চলের
তালে তালে ওঠা-পড়া মুগ্ধ ও দেহের,
পরশ-বল্লভ ওই নগ্ন পয়ােধর।
তােমার সৌন্দৰ্য সখী, তীক্ষশর সম
আমার অস্তিত্ব ভেদি করিল মােচন
স্বপ্ন-সুশীতল এক রুদ্ধ ভােগবতী।
অনন্ত কালের মাঝে আয়ু তুচ্ছ মম,
জীবনশিয়রে বসি অনন্ত মরণ,
অনন্ত পিয়াসা হায়, পাত্র ক্ষুদ্র অতি।
কুয়াশা-অঞ্চল-তলে গৌরীশৃঙ্গ-শিরে
শুভ্র তুষারের মত তব বক্ষ দুটি
লাবণ্য-রস-রসে রহিয়াছে ফুটি,
পরিপূর্ণ কামনার সুধাকল্প নীরে।
কোথা সেই ভগীরথ যে তাহারে ধীরে,
আনিবেরে ভস্ম-লীন চিত্ত-সিন্ধুতীরে !
কোথা সেই ভগীরথ যার শঙ্খধ্বনি
বিগলিত করি তারে বহাবে আপনি।
সহে না সহে না সখী পরম বিচ্ছেদ
দেহে দেহে ভাগ হয়ে প্রাণে প্রাণে মিল।
কেমনে যে ঘুচে বাধা তপ্ত ইন্দ্রিয়ের
সেই তত সমস্যা ভাবি মরিছে নিখিল।
জ্বলুক অলােক-বহ্নি যুগল দেহের
পুড়ক অরণি কাষ্ঠ হয়ে তিল তিল ॥
L.
একদিন দিয়েছিনু বিদায়ের ক্ষণে
করবীর গুচ্ছ এক ; তুমি তারে সখী
কি জানি কি ভেবে মনে কবরীর সনে
গেঁথেছিলে ; কালাে চুলে উঠিল ঝলকি
বাসনা-বিহ্বলতা; তার পরে কবে-
সন্ধ্যার কেশের মাঝে ফুল সূর্যমুখী
যেমন ঝরিয়া যায়—তেমনি নীরবে
ঝরে গেছে পুষ্প মাের—সব গেছে চুকি।
সেই হ’তে পুষ্পদল রক্ত করবীর
লভিয়াছে গুণ সখী স্পর্শ-মাণিকের ;
যেখানেতে ছোঁয় সেথা ওঠে ঝলকিয়া
বেদনা-কনক-বহ্নি; বুভুক্ষু স্মৃতির
অসংখ্য নাগিনীদল, ভেদি পাতালের
বাসনার তপ্ত গুহা ওঠে চমকিয়া।
এমন সুন্দর তুমি কে জানিত আগে। শঙ্কিত সন্ধ্যার তারা আসে রে যেমন কুষ্ঠিত গুণ্ঠন টানি’, অস্ত-রবি-রাগে আলােক-উন্মুখ চোখে পড়ে কি তখন। তারপরে একেবারে দিগন্তের কূলে বিদায়-পাণ্ডুর মুগ্ধ শশিকলা সম দেখা দিলে অকস্মাৎ—ক্ষুব্ধ আঁখি তুলে ‘ওই বুঝি’ বলিতেই গেলে প্রিয়তম। অন্তরবাসীরে কেবা দেখেছে নয়নে। দেখিয়াছি মেঘ-পাণ্ডু বসন তােমার- কুঙ্কুমকোমল কর কণিতকঙ্কণে অদৃশ্য বীণার তারে কঁপে বারম্বার। যতটুকু দেখি নাই আছ ততখানি দ্বিতীয়ার চন্দ্র বলে পূর্ণিমার বাণী।
দূরে যেতে দাও সখী, এতদিন তােরে
রাখিয়াছি চোখে চোখে—দেখেছি তােমার
কি ইঙ্গিত কি আভাস অব্যক্ত অধরে
সহসা ঝলকি ওঠে ; দেখিয়াছি আর
মুক্তা-স্বচ্ছ কপােলের অন্তরে অন্তরে
রক্তের বরণচ্ছটা, কর্ণ-অলঙ্কার
কেমনে মলিন করে ; তব নেত্ৰপরে
সহস্র বর্ণের ছায়া ভাব-বলাকার।
দূরে যেতে দাও সখী ; বুকের ধরারে
সূৰ্য আজি কত ভাবে ঘুরায়ে ঘুরায়ে
চেয়ে দেখে তৃপ্তিহীন; বিচ্ছেদ কেঁাহার
মেঘে মেঘে অপ্সরীরা আলিম্পন-ভারে
আঁকি দেয় ক্ষণে ক্ষণে ; অনন্তের গায়ে
সুপ্ত ছায়াপথ সেতু গাঁথে বারম্বার।
৩৭
*
একদিন ছিলে তুমি, ধরণীর মেয়ে
সুখে দুঃখে সমাবৃত আমাদেরি মত,
আজি স্তব্ধ নীলিমায় নিষ্পলক চেয়ে
রহস্য-সুদূর লােকে আছ নিদ্ৰানত।
শিয়রে প্রদীপ জ্বলি ধ্রুবতারকার,
সপ্তর্ষির তপােবনে, অয়ি অরুন্ধতি
কোনাে কোলাহলে তন্দ্রা ভাঙেনাকো আর,
কোনাে দুঃখে আজি তব নাহি কোনাে ক্ষতি।
তেমনি তেমনি তুমি ছিলে একদিন
নিশ্বাস-দোদুল এই বক্ষের ছায়ায়,
আজি তুমি স্বপ্নলােকে রয়েছ নিলীন
জীবনের ক্ষুব্ধগীতি পশে না যেথায়
এ পারেতে ছিলে তুমি আমারি খানিক
ওপারে তুমিই সখী ধ্যানের মাণিক।
তােমার অস্তিত্ব মাঝে রহস্য-বধির
জ্ঞানের উত্তর দ্বার, মাের কাছে সখী
রাখিয়ােনা রুদ্ধ করি ; যত হেরি তােমা
তত বেড়ে যাও তুমি, লঙ্ঘিয়া উপমা
ভাঙ্গি কল্পনার সীমা; তােমার মদির
আঁখির আলােকপাতে, সহসা ঝলকি
ওঠে দু’একটি গান, দু’একটি ব্যথা।
তবু থেকে যায় বাকি লক্ষ লক্ষ কথা।
জনমে জনমে সখী নব নব বেশে,
মরিয়াছি অন্ত খুঁজে তব অস্তিত্বের ;
ললিতা ধানশ্রী যেথা ব্ৰহ্মপুত্রে মেশে
এবার সেথায় তােমা লভিলাম ফের ;
আধখানি ইন্দ্রধনু নীলিমার দেশে
আর অর্ধ দেখ সখী ছায়াতে জলের।
৩১ এ জীবন অতি ক্ষুদ্র- -তাই সখী তােরে ভালবাসি; এ জীবন, আশ্বিনের ভােরে কম্পিত পল্লব হ’তে মুমূষু শিশির তৃণ-তলে; এ জীবন, বসন্ত-নিশির অতৃপ্ত স্বপন যেন, লয় নিদ্রা হ’রে। তাই ভালবাসি সখা তাই বাসি তােরে। সমুদ্রে তত সুধা নাই--সুধাপাত্র তাই নিয়ে টানাটানি; একবার ধরি তােমার অধর-প্রান্তে ; তুমি আবার আমার অধরে ধরাে ; এ বিদ্রুপ স্মরি’ উভয়ের কত হাসি! স্বর্গ করে ধূ ধূ শুষ্ক শূন্য ছায়া-তাম্র বৈতরণী-পার। একটি মুহূর্ত শুধু হাতে আছে ওরে, লক্ষ গুণ তাই আমি ভালবাসি তােরে।
১০
একদিন দেব দৈত্য-দাড়াইল আসি
আদিম সমুদ্রতটে মত্ত কুতূহলে ;
তারপরে অকস্মাৎ চিত্তে কিবা বাসি
ঝাঁপ দিল ভয়শূন্য মৃত্যুগুঢ় জলে।
আমিও তেমনি সখী তােমার দেহের
বাহুর দিগন্তঘেরা মত্ত পারাবারে
ঝাঁপ দিমু এইবার ; কোথা অন্ত এর
সন্ধানি দেখিতে হবে সেই সত্যটারে।
কোথা তুমি কোথা তুমি এ চির-সন্ধান
মিটিল না আজো হায়-সংশয়রূপিণী ।
অকারণে গাঁথি লয়ে বরমাল্যখান্
যার পিছে ছুটে মরি—তারে নাহি চিনি।
ইন্দ্রধনু মাঝে তুমি সেই বর্ণখানি
চোখে যা পড়ে না—তবু চিত্ত বলে জানি।
৪১ নিৰ্বাপিত অগ্নিগিরি, তবু তা'রে সখী করাে না বিশ্বাস কভু পলকেররা তরে অন্তরে কি ব্যথা তা’র উঠিছে ঝলকি বাহির হইতে তাহা কে বলিবে ওরে! নিশিত-অস্ত্রের মত এ মাের যৌবন রাখিয়াছি বিস্মৃতির কালাে: এসসা না এসাে না কাছে, কি জানি কখন তােমারে আঘাত করে সেই ভয়ে মরি। ভরি ; মাঠ-শালিখেরা কাপে ধূসর-ডানায় দধি-পাণ্ডু শশী দোলে আকাশের কোল- স্বপ্নে-পাওয়া বায়ু ফেরে শাল-বনে হায় প্রবালের রসে ভেজা পূবের অঞ্চল। নিজ মনে ভয়, তাই এমন নিশীথে তােমারে বলিতে নারি নিকটে আসিতে
8२
নেভে নাই সে আগুন! শুধু এতদিন
বিস্মৃতির অন্ধকারে সমাহিত প্রায়
ছিল সুপ্ত। কি নিষ্ঠুর কৌতুকেতে হায়
কে তারে তুলিল ধরি—সেই অগ্নি ক্ষীণ।
নেভে নাই সে আগুন! শুধু চিত্ততলে
আপনারে দগ্ধ করি রেখেছিল আলি
একটি অন্তিম শিখা। কে দিল রে ঢালি
স্মৃতির চন্দন কাষ্ঠ
ক্রুর
-
কৌতূহলে।
/ কেন তুমি এলে সখী! যে পথের পরে
হােমার চরণ-চিহ্ন নিঃশেষে মুছিয়া
জেগেছে নবীন ঘাস। ভাবিছ কি মনে
একা আমি দগ্ধ হ’ব। এ চিতাগ্নি-ভরে
আমি যাবাে, তুমি যাবে নিশ্চিহ্নে ঘুচিয়া !
কেউ রক্ষা পাবে না এ খাণ্ডব দহনে।
যে দিকে নয়ন তুলি, হেরি চিত্রবৎ
শ্যামা ধরণীর স্নেহ উঠেছে উচ্ছ্বসি’
সুনীল পৰ্বত শৃঙ্গে ; তরঙ্গিত পথ
গেছে দূরে ; ম্লান রবি, দেখা দেয় আসি’
বন্য কৃষ্ণসার সম সন্ধ্যার আঁধার
কোন্ গুপ্ত গুহা হ’তে মেলি ব্ৰস্ত আঁখি ;
পশ্চিম পৰ্বত-চূড়া ধীরে হয়ে পার
মহুয়া-পাণ্ডুর চঁাদ স্বপ্ন দেয় আঁকি।
জানি জানি কি আনন্দে ফুল হয় ফল ;
দ্বিতীয়ার ক্ষীণ শশী পলকে পলকে
ধেয়ে চলে পূর্ণিমায় ; বিশ্বের অতল
রহস্য ভেদিয়া তুমি কেমনে এ চোখে
ধরা দিলে! কে বলিবে কেমনে আবার
স্মৰ দেড় হলে একান্ত আমার।
৪৪
ভূলুণ্ঠিত কলাপের চিহ্ন দিয়ে আঁকা,
পুন্নাগের পুষ্পলীন এই বনস্থলী ;-
ফণীমনসার ফুলে হয়ে গেছে ঢাকা
কঠিন কটাক্ষে ভরা কণ্টক-আবলী।
বন্ধুর দিগন্তরেখা ধীরে হয়ে পার
খর সূর্য ডুবে গেল পীতালােক স্রোতে
বন্য হরিণের মত সন্ধ্যার আঁধার
বাহিরিল কোন্ গুপ্ত গিরি-গুহা হ'তে।
অবসন্ন কেশ বাঁধি অবলীলাচ্ছলে
অতৃপ্ত অঞ্চল টানি বক্ষের উপর
শিশির-তরল নেত্র ভরি কৌতূহলে
লঘু নৃত্যে এস সখী বনের ভিতর।
বন-চামেলির
ফুল
দিব তােমা তুলি
কি ভয় আসিলে পথে হঠাৎ গােধূলি।
৪
গােধূলির চিতাভস্ম সৰ্ব্ব অঙ্গে মাখি
চলে গেল অস্তপথে বিরাগী দিবস
মণিবন্ধচ্যুত শেষ রবি-রশ্মি-রাখী
ফেলে গেল অবহেলে বীত-সৰ্ব্ব-রস।
স্মৃতি-বিভূতিতে তব সৰ্ব্ব তনু ঢাকি
আজি আমি ঘুরিতেছি গৃহ হতে দূরে
কভু জন-কোলাহলে কখনাে একাকী
সর্বদাই চিত্ত বাঁধা তব মুগ্ধ সুরে।
বৈশাখের খর রৌদ্রে তাম্র গিরি-চূড়ে
প্রাসাদ-প্রকার জাগে অতীত-অঙ্কিত ;
ইস্পাত-ধবল গঙ্গা চলে ঘুরে ঘুরে
বালুর বন্ধন-ডােরে বড়ই শঙ্কিত।
নল-দয়মন্তী সম এ দুটি প্রাণীরে
অখণ্ড বসন-ভাগ্য কোথা টানে ধীরে।
৪৬
এই ব্ৰহ্মপুত্ৰ বারি ছুইলাম শিরে,
রাখিলাম তপ্ত ভালে অঞ্জলি ভরিয়া,
হেরিলাম ছায়া মাের এরি শান্ত নীরে,
বিছায়ে দিলাম কূলে তৃষাদগ্ধ হিয়া।
কে জানে হয়তাে কোন্ শুভলগ্নে তুমি
নেমেছিলে কৌতূহলী এরি কোনাে ঘাটে ;
অযাচিত প্রত্যাশায় অঙ্গ তব চুমি
নেচেছিলাে তরঙ্গেরা, প্রসন্ন ললাটে
অর্থহীন যত কথা বলেছিলে সখী
তাহারি প্রলাপ আজি উঠিছে ছলকি।
কে বলিবে কোনােদিন স্নানকালে তব,
অকস্মাৎ হেরি নিজ ছায়া অভিনব,
শিহরি ওঠেনি বক্ষ। সে স্মৃতি-রভস
আজি করি দেয় মাের এ অঙ্গ অবশ।
৫৭
ব্ৰহ্মপুত্র নদী যবে মাজুলির চরে
অকস্মাৎ বাধা পেয়ে চমকিয়া উঠি
কুঞ্চিত অঞ্চল হতে মুক্তা মুঠি মুঠি
ছড়ায় বিস্ময় আধাে সঙ্কোচের ভরে
পুষ্প-লঘু হাস্য তব বেপথু-অধরে
তেমনি একান্ত রস-আবেশেতে ফুটি
ঝরে যায় মরে যায় পড়ে যায় লুটি
হঠাৎ পথের বাঁকে দেখ যবে মােরে।
সাতাশ তারায় গাঁথা রাশিচক্র সম
বনমল্লিকার মালা, তব কুন্তলেরে
ঘেরে ঘন আলিঙ্গনে; বক্ষ নিরুপম
শ্যামাইয়া ওঠে ক্রমে ; ঘিরিয়া দেহেরে
কিঙ্কিণী কঙ্কণ কাঞ্চী করে কানাকানি
চক্রান্ত বিরুদ্ধে মাের জানি তাহা জানি।
৪৮
শূন্য ব্ৰহ্মপুত্ৰচর সীমান্ত অবধি
অবসন্ন একটানা ; বালুজমি পরে
বাড়িতেছে তরমুজ, যতদিন নদী
নাহি জাগে পুনৰ্বার ; ম্লান দিগন্তরে
গারাে পাহাড়ের লেখা ; সন্ধ্যার আঁধার
নামে ধীরে, ঝিল্লী ডাকে, জোনাকী চমকে,
বিলম্বিত তরণীর ঘাটে ফিরিবার
করুণ আহ্বান ক্ষীণ ; অশ্রু মাের চোখে।
রিক্ত সুধাপাত্ৰ সম অষ্টমীর শশী
স্খলিত আকাশ প্রান্তে ; হ’ল সমাধান
সপ্তর্ষির প্রদক্ষিণ ধ্রুবেরে ঘেরিয়া ;
হঠাৎ পঞ্জর ভেদি উঠিল নিশ্বসি
পুরাতন অশ্রুধ্বনি; কঁাদিল পরাণ
ওই ওই অতিদূর দিগন্তে চাহিয়া।
৪১
হিমাদ্রি মেলিয়া বাহু অনন্তের পানে
ছুটে এসে, এইখানে থেমে গেছে সখী,
অকস্মাৎ। কি আগ্রহে, মাের চিত্ত জানে,
শ্যামা বঙ্গভূমি প্রতি রয়েছে নিরখি।
বহু নিম্নে পদতলে ক্ষীণ স্বচ্ছ ধারা ;
নিশ্চপল অরণ্যানী মসি-বিন্দু-রেখা।
উপত্যকা মুষ্টিমেয় ; বনস্পতি চারা
দিগ্বলয় কুহেলীতে নাহি যায় দেখা।
/ এস এইখানে বসি, আজ শেষ বার
ওই হাত হাতে দাও, ওই দু’টি আঁখি
রাখাে মাের মুখপরে ; গাঢ় কেশভার
খুলে যাক্ ; এই মত কিছুক্ষণ থাকি।
তারপরে চিরদিন এ হিমাদ্রি প্রায়
নিলে মেলিয়া বাহু চাহিব তােমায়।
।
**
আজ কি কহিব কথা ! হেরিতেছি দূরে
গিরি-উপত্যকা হ'তে ওঠে ঘুরে ঘুরে
গভীর নিশ্বাস-বাষ্প ; অলক্ষ্যে কখ
আচ্ছন্ন করিয়া দেয় নিস্তব্ধ গগন
ম্লান পাইনের শ্রেণী।
ওঠে সেই মত
দীর্ঘ দুই বরষের কথা ছিল যত
সহসা বন্ধনমুক্ত ; সেই মত তারা,
মুহূর্তে ঢাকিতে পারে আকাশের তারা
পৃথিবীর পুষ্পজাল। সেই মত হায়
ঝরিয়া
এক বিন্দু অশ্রুবারি।—থাক্ তবে ভাষা,
থাক্ মিছে মৰ্ম্ম-গ্রন্থি প্রকাশের আশা।
অনন্ত তুষার-পটে থাক্ শুধু লেখা
এইখানে আমাদের হয়েছিল দেখা।
হে হিমাদ্রি, তুমি চির অগম্য বেদের।
ভারতের শিরদেশে তুমি নিত্যকাল
দিব্য সমস্যার মত! কত না যুগের
সহস্র মনস্বী যত চিন্তাক্ষুব্ধ ভাল
বসেছে তােমার পায়ে ! একদিন শেষে
না লভি উত্তর কোনাে তব রহস্যের,
নত মাথে চলি গেছে উত্তরের দেশে
উত্তরি উত্তুঙ্গ গিরি।
G
ওগাে হিমাচল
আমি তােমা বুঝিয়াছি; লভিয়াছি তল
ধ্যানসবােবর নীরে ; তারি নয়নের
অলৌকিক আলােকের অপূৰ্ব্ব
রহস্য-স্তিমিত তব কান্তি শােভা পায়।
সত্যের শুভ্র পরে প্রেমের আলােকে
সৌন্দর্য্যের শতদল ফুটিল দ্যুলােকে।
তােমারে হেরিয়াছিনু বাংলার মাঠে
অয়ি তিস্তা! বিতরিয়া প্রতি ঘাটে ঘাটে
হিমানীর সম্ভাষণ শুক্তিস্বচ্ছ জলে
অবশেষে মিলাইতে উদাস কুন্তলে
দিগন্তরে মেঘম্লান। হেরিতেছি পুন
এ গিরি-শিখরে নিত্য নৰ্ত্তন-নিপুণ
তন্বী মেনকার মত অজস্র প্রলাপে
উচ্চকি’ পাইন বন নামাে ধাপে ধাপে।
তােমারে হেরিয়াছিনু বঙ্গের প্রান্তরে
কম্পিত মল্লিকাদাম শঙ্কিতচরণা।
আজি তুমি এ কি রূপে এ হিমাদ্রি পরে
খর ববি-করে ক্ষীণ একটি ঝরণা।
হেরিতেছি আজি সখী তােমার অন্তরে
কি আকুতি অবিশ্রাম করে আনাগােনা
আমারে দেখিতে চাই তােমার মাঝারে
হে সুন্দরী অসমীয়া, আমারে বাঁধিতে
তব আলিঙ্গন ছলে, আমারে সাধিতে
দুর্গম রহস্যে তব ধাই অভিসারে।
নিজেতে নিজের সাধ মিটাতে কি পারে
রূপবুভুক্ষিত প্রাণ ! এ প্রাণ ভাঙিয়া
অর্ধাঙ্গিনী করি তােরে গড়িয়াছি প্রিয়া
আমারে তােমার মাঝে ভালবাসিবারে।
উত্তর সমুদ্রে কোন্ দিগন্তের ধারে
অস্তভীরু সন্ধ্যাসূৰ্য্য চেয়ে থাকে যথা
আপনার প্রতিবিম্বে ভুলিয়া নিখিল ;
তেমনি তেমনি সখী তােমার মাঝারে
আপন অস্তিত্ব খুজি—এত ব্যাকুলতা-
তােমার দর্শনে খুজি আপনার মিল।
৫০
মহাকাল-কর-ধৃত অক্ষমালা সম
শাশ্বত নক্ষত্ৰ-জাল রবে আবর্তিতে
তােমার উদ্বেল বক্ষ—এই বক্ষ মম
তবু কোনাে দিন হায় পাবে না ছুইতে।
স্তম্ভিত তুষার সম মহাকাল নিজে
ধীরে ধীরে গলে গিয়ে হইবে নিঃশেষ
তবুও হবেনা জানা—ওই বক্ষে কি যে
কতখানি সুধা ছিল-কতখানি ক্লেশ।
তৃষ্ণা আর তীব্র বাণে আহত হরিণ
আপন শােণিতে আঁকি মরণের পথ
আসে সরােবর কূলে ; কাণে শােনে
যেন দূর জলধ্বনি; যবে মুগ্ধবৎ
হঠাৎ ফিরিয়া হেরে শিয়রেই জল
দুর্লভ আনন্দে শেষ তখনি সকল ।
সােনার যৌৰমাের পূর্ণপাল ভরে
ধায়, অস্তাচলগামী। যেথা তুমি সুখী
অস্তমান তপনের স্বর্ণবিম্ব করে
রহস্য-গভীর তব কুন্তল পরখি
বিয়ে বাধিছ বেণী। আঁকিছ সিন্দুর
স্বচ্ছ ললাটের পটে ক্ষীণ চন্দ্র জিনি।
কার লাগি উন্মুখিয়া স্তনাগ্র-বন্ধুর
একাগ্ৰহৃদয় অয়ি, চিরসীমন্তিনী।
উন্মত্ত নাবিক।
কপিল-বিদ্যুৎ-প্রান্ত ঝটিকার মেঘে
ছুটেছে পূর্ণিমা চাদ। আছে যেথা জেগে
পশ্চিমদিঘালা
বধূ ;
বন্দরে ভিড়িবে যবে নিশান্তে পথিক
বহুক্ষণ অতিক্রান্ত বাসরের কাল।
পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র সৌন্দৰ্য-কাঙাল ।
.
ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রধনু ও তনু তােমার
তাই তারে বারম্বার করি নমস্কার।
অফুরন্ত সুধাপাত্র ও তনু তােমার
ফুরায়েও চিরপূর্ণ, করি নমস্কার ।
ও তনু-মৃণাল পরে বিশ্বের বিস্তার
তাই তারে বারম্বার করি নমস্কার ।
কনক বলয় তব, মুগ্ধ চেতনার
অপার দিগন্ত রেখা—করি নমস্কার।
নিটোল বাসনা সম ও বক্ষ তােমার
প্রণয়ের চিরবেদী—করি নমস্কার ।
আমার দর্পণ তুমি অস্তিত্ব আমার
তাই সখী তব পায়ে করি নমস্কার।
অলােকসম্ভব তনু সব তীর্থসার
তাই তােমা বারম্বার করি নমস্কার।
১
No text on this page.
No text on this page.