Makardah Saraswat Library, Howrah
Nimai Sanyash Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
=
সুহৃদ সম্মিলনী ।
শ্রীমানীপাড়া, মাকড়দহ,হাওড়া।
No text on this page.
নিমাই সন্ন্যাস নাটক ( মষ্ঠী অপেরা কর্তৃক অভিনীত ) শ্রীপশুপতি চট্টোপাধ্যায় প্রণীত। মাতৃকুটীর- কল্যাণপুর, হাওড়া। দ্বিতীয় সংস্করণ। মূল্য ১, টাকা।
প্রকাশক
ঐক্ত জগন্নাথ দাস
জগন্নাথ লাইব্রেরী হইতে
প্রকাশিত।
১৬২ নং নিমুগোস্বামীর লেন, কলিকাতা ;
প্রকাশক ও সব
“নিউ পপতি প্রেস”
৩০ নং হরীতকী বাগান নে হইতে
এনার ব্যবস্থাপক কৰু
মুদ্রিত।
নাট্যোল্লিখিত কুশীলবগণ পাত্র । গম । নদীয়া নিৰাসী ব্রাহ্ম), বিশ্বরূপ' নিমই ঐ পুত্রদ্বয়) নত্যানন্দহত), অদ্বৈত আচাৰ্য, প্রবাস, মুকুন্দু (চৈত- ভতরে ভক্ত, জগাই, মাধাই ( পাষণ্ডৰ । মেঘমালা মুরারি ( জনৈক বৈদ}, ভক্তগণ, কলি, মুনিঋষিগণ ইত্যাদি। পাত্রী। •ীৰেী; নিমাইয়ের মত), লক্ষ্মীদেবী, বিষ্ণুপ্রিয় ( নিমাইয়ে পী) পাতা । মেমালীর রক্ষিতা ৰেখা ) ,মাগণ, দেবদেবীগণ ইত্যাদি।
উৎসর্গ
শ্রীমান, বিমলেন্দুভূষণ মিত্র বি. এস, সি
করকলে।
কল্যাণপুর,
১৩৪৩
ক্তি;
হাওড়।।
নিমাই-সন্ন্যাস
প্রস্তাবনা
[ পথ ]
ভক্তগণ আসীন।
গীত ।
এস সেইরূপে দয়াময় ।-
যুগে গে হরি যেই রূপ ধরি,
‘খলে দিয়েছ মুত তয় ।
এস "জ্জন-দ। শাসিতে, এস কলি-কলব নাশিতে,
: মুছে যাক সব সন্তাপ তব প্রেম-করুণ-বারিতে ;
তোমার আশায় যাপি নিশি দিন
তবে কবে প্রভু তব শুভোদয়।
তুমি অাসিবে বলিয়ে তোমার আশায়,
নপি নিশি দিন ওহে লীলাময়,
চিত-বিনােদন আর কতদিন,
ষাে-নিজাৰশে রবে ভাবে লীন
জগ প্রভু কর সাধুজন-ত্রাশ, নহিলে কে অার নাশিবে ভয়।
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
গােলােক।
শ্রীকৃষ্ণ ও আরাধ আসান
শ্রীরাধা ।
কৃষ্ণ। ঐ শোন নারায়ণি, ধরার রোদন,
অসহ বেদন তার সহিবারে নারি ।
কহ নাথ, কোন দুঃখে ধরা মিয়মাণ ?
কি শােকে বিহ্বল চিত্ত ?
সুধাংশু-কিরণ-শুভ্র শারদ-আকাশ,
কেন অাজ হেরি মেঘাবৃত ?
আবার কি কোন বৈরী
করিয়াছে বিদ্রোহ সৃন ?
কোন মূঢ় জন
বজ্রবল করিতে ধারণ -
অবহেলে পাতিয়াছে মস্তক তহার।
শ্ৰকৃষ্ণ। এবে প্রিয়ে পাপ কলি হয়েছে প্রবণ
আসমুদ্র হিমাচল করত তার ।
-
নিমাই-সন্ন্যাস। ভক্তি-ভব-মেহীন সংসার এখন অনর্থ প্লাবনে কোরাণ, পুরাণ, বেদ- বেদান্ত দর্শন করিয়াছে একাকার। দেব দেবী মনে নাহি কেহ, বিসজ্জিত সব যেন অধৰ্ম্ম সাগরে। “মসি” মহাৰাক্যে মায়েছে সবে, জীব তাই বি ব্ৰহ্ম'- এই মত করিছে প্রচার। স। সবি তব ইচ্ছ:--ইচ্ছাময় তুমি। তােমারি ইচ্ছায় প্রভু কলির জন। কালের নিয়মে সবে কাল চক্র পরে ঘুরে তর। ঈঙ্গতে তােমার। তাহে কেন চিত্ত তৰ ব্যকুল নেহারি ? ঐকৃষ্ণ | সত্য বটে – সত্য-তো-দ্বাপরের পরে কালের নিয়মে কাল কলির উদয়। কিন্তু দেবি ! সেই কলির পীড়নে পীড়িত আমার ভক্ত সমুদয় ; কাতরে তাহারা ডাকে ভকত-বসলে, স্থির হবে থাকিব কেমনে?
নিমাইন্ন্যাস। = ঐ দেখ, ঐ দেশ রাধে, কিবা অঘটন ঘটছে পরাতে ! মহাবনে ভর দাবন সম- বাড়িছে বিদ্যুৎবেগে ব্যাপিয়া জগৎ অধম্মের পূর্ণ অধিকার ! নাহি আৰু মৰ্থ-জ্ঞানী ভেদাভেদ ! ভুলে ভুল সবার এখন। এরাধ। কৰা তবে কর্তব্য এখন ? সাব আমি জগৎ মাঝারে, পরা ভার করিতে লাঘব । এক অভিনব ধর্মের প্রচারে, পিপাসা জন গণে দিব আমি সুশীতল জল! উদারতা ভিত্তিমূলে এই ধৰ্ম্ম হইবে স্থাপিত, সঙ্কীর্ণতা অভিমান থাকিবেন। ইথে ! परे भरा मा অচণ্ডাল ভূদেব ব্রাহ্মণ কিংবা বিধর্মী যবন-দুক্ষন, সকলের সম অধিকার। এই ধৰ্ম্ম হইলে প্রচার, অগ্নির প্রভাবে স্বর্ণ উজলে যেমতি, ক্তির প্লাবনে সব জন্ত, তেমতি-
নিমাই-সন্ন্যাস।
৯
তিগন্ধময় কলির সংসার -
সৃণ হবে স্বর্গের সৌরভে।
হরিনাম মধুর ধ্বনিতে
প হবে “সোহঃ, সােহ”।
নামে মুক্তি দুটিবে সবার।
শরব।। বিচিত্র তোমার লীলা,
লীলায় হায় !
ও লীলা বশে নহে,
শোধিতে তােমার ঋণ,
যেতে হবে ধরার মারে।
রব। আমার কি ঋণ ?
মনে নাই রাধে দ্বাপরের লীলা ?
তুমি বুকভ নন্দিনী রাধিকা
আমি ননসুত শ্রীকৃষ্ণ গােপাল !
আমায় বিরহে তুমি সয়েছিলে--
নিদারুণ অসহ যাতা!
তাই আমি করেছি পণ,
বাহিরে রাধার ভাব
কৃষ্ণ করিয়া ধারণ
তুঞ্জিব প্রেমের স্বাদ তােমার মতন।
রাধা ভাবে খামে আমি করিব ন
প্রকৃষ্ণ।
নিমাই-সন্ন্যাস।
তাই সেই পূর্ব প্রতিজ্ঞা বক্ষণে
বাব আমি নবদ্বীপ ধামে,
নন্দ-পিতা জগন্নাথ গৃহে,
যশােমতী-শচী দেবী কোলে
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নামে।
আমার সাহায্য হেতু
দেবগণ পূৰ্ব্ব হতে লভেছে জনম,
নিজ নিজ শক্তি অংশে তাঁর।
দাদা বলরাম হয়েছে নিতাই,
অদ্বৈতগাচার্য; রূপে বৈষ্ণব শঙ্কর,
ব্ৰহ্মা অংশে ভক্ত হরিদাস,
শ্রীবাস পণ্ডিত রূপে দেবর্ষি নারদ
হনুমান অংশে মুরারি গোঁসাই
আর কেন রাই বিলম্ব জামার?
শ্রীরাধা। আবার কি কাদাবে আমায় ?
সহিব কেমনে এবে বিরহ তোমার ?
এক। কিন্তু এযে সারা বিশ্ব কাদে।
যন্ত্রণা নিষ্পিষ্ট সব ভজন,
মায়। মেঘে ঢেকেছে ভাস্কর,
সেই মেবে মিথ্যা সৌদামিনী,
মহাজ্যোতি করিয়া বিকাশ,
নিমাই-সন্ন্যাস। ১১ করিছে বিনাশ পান্থে বিপথে ইয়া! মুহুর্মুহঃ বজের আঘাতে কত প্রাণ হতেছে বাহির ! রা। অামি হইব তব লীলার সঙ্গিনী, হ তব চরণ সেবিকা। কোন বাধা নাই আহে, সহায় তুমিও রাধে লীলা অবতারে কিন্তু নহ ভাবে সেবিকার। আমি দীনহীন কাঙ্গালের রূপে প্রবেশিব সংসার মাঝারে, কাঙ্গালে তুলিয়া ৰ কাঙ্গালের কোলে তুমিও সংসারের মাঝে সারীর রূপে যদি বেশিবে হবে না সংসারী ! নিলিপ্ত জীবন বাপি, সংযম শিখাবে রাধে পরার মানবে ঐ ঐ পুনঃ আকর্ষণ, যাই--বাই- নাহি ভয় দিতেছি অভয়, লভি জন্ম বিশ্বম্ভর নিমাই নামেতে, তরাইব পাপিকুল। ভক্তিমূল মধু হরিনামে-
নিমাই-সন্ন্যাস।
ওরে করিব দমন ।
এই এবে অবতীর্ণ হই ধর পর।
লভি আমি শগৌরাঙ্গ রূপ।
( ক্রীগৌরাঙ্গ মুক্ত পরিগ্রহ ও অম্বান
শ্রীকৃষ্ণের লীলা সানী গণের প্রবেশ।
সীত।
ধন্য হবে ধরার জীৰ চৈতন্য নারে।
। বল হরি হরিবােল )
পাপী তাপী উদ্ধারিতে প্রভু নাম-গানে ।
( বল হরি হরিবােল )
আয় সবে মিলি যাব ধরাতলে
হইৰ সকলে প্রভুর লীলা-সঙ্গিনী।
হরিনাম গানে শ্রবণ কীর্তনে
ভাবে ভাব প্রকাশিৰ অামরা ভাবি,
হাইব প্রেমের বন্যা সকলের প্রাণে।
( বল হরি হরিবােল )
•
দ্বিতীয় দৃশ্য। ভাগীরথী-তীরন্তু মেমালীর কুটার । পার্বতী ও জনৈক। হতবদ্ধা রমণ। পাতী। যাও মা, তুমি মুক্ত। রমণী । কে মা তুমি ? এত দয়া তোমার হৃদয়ে পরের জন্য তোমার নিজের বিপদের দিকে একবার ফিরেও চেয়ে দেখছ না ! ভাব দেখি ম', যখন উন্মত্ত দ্য মেঘমালী আবার অন্বেষণ করে কোথাও দেখতে পাবে , তখন ত তোমার উপর ধােরর নির্যাতন করবে। পাবৎ সহচরের। তাদের কাম পিপাসা মিটল না বলে তোমার উপর অযথা অত্যাচারেও কুণ্ঠিত হবেন—তখন কে তোমায় রক্ষা করবে ? তাই বলি মা, আমি তােমাকে এই বিপদের মধ্যে কেমন করে ফেলে রেখে নিজের তুচ্ছ জীবনটাকে নিরাপদ করবাে ! এইরূপ ভয়াবহ নিৰ্যাতনই যদি আমার অদৃষ্টের ফল হয়, তা হলে কার সাধ্য আমার দুর্গতি খণ্ডন করবে? অপরাধ মার্জনা কর না। দেবী তুমি, তােমার অন্তরে ব্যথা দিয়ে আমি বড় পাপ কাৰ্য্যই করেছি, কিছু মনে করনা। পাতী। পাগলী মেয়ে ! দুরারােগ্য রোগে রোগীর মৃত্যু নিশ্চয় জেনেও কি গৃহস্থ তার চিকিৎসা কতে পরীমুখ হয় ? প্রবল বন্য নগর গ্রাম ভাসিয়ে দিয়ে আছে বলে কেউ কি তাতে দেবে না ?
৪
নিমাই-সন্ন্যাস।
রমণী। কেন মা। তোমার শান্তির সংসারে বিষের গুন জ্বালিয়ে
দিয়ে নাব? তুমি ত বেশ আছ।
পাঠী। বেশ আছি ! নিজের ধৰ্ম্ম-জাতি-কুল-মন জলাঞ্জলি
দিয়ে বেশ আছি মা ! নারীর নারীত্ব টুকু বিসর্জন দিয়ে বেশ দিন
কাটাচ্ছি মা! কিন্তু ভাবছি এ আর কয়দিন ? উঃ কি করেছি। তখন
কি বিষ ছিলনা-পুকুর ডােবার জলও শুকিয়ে গিছল ! হার আমার
কি হবে! (সহসা নিম্নস্বরে) না-না-কথায় কথায় বেলা বেড়ে উঠলাে।
দাও মা! আর মুহূর্ত বিলম্বে তোমার রমণী জীবনের গৌরব-রত্ন সতীত্ব
টুকু পাষণ্ডের ক্রীড়নক হয়ে দাড়াবে! এখনও আমার কথা শােন।
আমি নিজের সর্বনাশ ত করেছিই, তবু যদি আমার দ্বারা ভগবানের
সৃষ্ট একটি ক্ষুদ্র জীবের মঙ্গল সাধিত হয় হােক, তুমি এই পথ
ধরে চলে যাও মা! একবার গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করতে পারলে আর
তােমার কোন ভয় থাকবেনা।
তবে তাই হােক মা! তুমি কে হও, তােমার প্রত্যেক
কথা দৈববাণীর মত আমি মাথায় ধরে নিলুম ! নারাইন, শক্তি দাও।
মা শক্তিময়ী ঈশনি, রক্ষা কর মা
{ দ্রুত প্রস্থান।
সহসা শক্তির বিকাশ।
রমণী।
গীত।
ভাবনা কি মা সতীরাণি হয়ে থাক শক্তিময়ী,
সতীর অঙ্গ স্পর্শ করে এমন কে মা ভুবনজয়ী ?
নিমাই সন্ন্যাস।
আমায় যে গো ডাকতে পারে সদাই ঘুরি তারি দ্বারে,
বুকের মাঝে রাখি তারে আমার যে মা কাজই ওই ।
বিপদ-মাঝে বেবা ডাকে কোথায় গো মা ব্রহ্মময়ী,
তখনই মা ছুটে আসি আমি থাকতে পারি কই ?
( অদ্ধান।
দ্রুতপদে মেঘমালার প্রবেশ।
মেমালা। কইকাথায় গেল সে রমণী ?
পাতী। সে পালিয়েছে।
বে। পােিয়চে 'কেমন পালাল ? কে তার
হস্তপদের বন্ধন খুলে দিলে?
পবিতা। অামিই দিয়েছি।
মেন মালা ।
পাবতী। তার করুণ ক্রননে পাষাণেরও বুক ভেঙ্গে যায়।
অামি তে নারী।
মেমালী। এর জন্য তোমাকে শাস্তি গ্রহণ করতে হবে জান?
পার্বতী। তা হানি।
মেমালী। তা হলে প্রস্তুত হও পার্বতি। তুমি কি মেঘমালীকে
চিন না ? তুমি অামার রক্ষিতা-তাই ভালবাসায় আজ আমি
তোমার নিকট দুর্বল ! কিন্তু মেঘমালীর দোর্দণ্ড প্রতাপে নীর
বাল-বৃদ্ধ-বুব। সদাই শঙ্কিত। যার নামে অতি বড় বীরের হৃদয়ও
বিচলিত হয়ে উঠে,-তুমি দুর্বল। অসহায় নারী হয়ে আজ তারই
বিপক্ষে দাড়িয়েছ-আশ্চৰ্য্য।
১৬ নিমাই-সাস। পার্বতী। সংসারে আশ্চৰ্য কিছুই নাই দসু! অতি বড় দুৰ্ব্বন- সেও শত্রুর পীড়নে সবল হয়ে উঠে। তােমার অত্যাচারে প্রীতি দুর্ভাগিনী নারীর মুক্তি বিনিময়ে আমাকে কঠোর শাস্তি ভোগ কতে হবে জেনেও আজ আমি তাকে মুক্তি দিয়েছি। মেঘনালী। স্পর্ধা বটে! তুমি জান বোধ হয় পার্বতি, মেঘনালীর আততায়ীর শান্তি কত কঠোর ! তোমার দেহের প্রতি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ শাণিত ছুরিকায় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করবো। তারপর-তারপর তাতে লবণ সিঞ্চন করে আমার এই তীব্র প্রতিহিংসার তর্পণ করবো ! তোমার মৰ্ম্মভেদী যন্ত্রণার কাতর চীৎকারে পাষাণের হৃদয় বিগলিত হবে—কিন্তু আমার নয়ন-কোণে একবিন্দু অশ্রু দেখা দেবেনা ! অামি স্থিরচিত্তে আমার বিদ্রোহীর শাস্তি দর্শন করবো। পার্বতী। তােমাকে ধন্যবাদ ব্য। আমি ভেবেছিলাম আমার শান্তি আরও কত কঠোর হবে । এ আমার শান্তি নয় ঘাতক-৪ অামার শান্তি ! মেঘমালী। না-না-তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দোৰ না, বুঝেছি, মৃত্যুই জীবের মুক্তি। মুর্তেই তার পাপ পুণ্যের সব শেষ হয়ে যায়। তা হবে না সে সুখে তুমি বঞ্চিত হবে। তুমি বিশ্বাস-হন্ত্রীর কাজ করেছ, আমার লালসা-বহ্নিতে বারি সিঞ্চন করে হন্তারক হয়েছ- তার শাস্তি দেখ কত ভয়াবহ। পার্বতী। কামােন্মত্ত পিশাচ দ্য ! যে দিন তুমি আমাৰ সর্বনাশ করেছ, আমার না জীবনের শ্রেষ্ঠ রত্ন সতীত্বের মহামুকুট তোমার পদতলে লুটিয়ে দিয়েছি, সেই দিন হ'তে আমি সর্বস্ব হারিয়েছি নিমাই-সন্ন্যাস। ১৭ একজন নিরপরাধিনীর সর্বনাশ করে ও তৃপ্ত হলেন। ঘাতক-আবার একটি অবসাকে তার স্বামীর ক্রোড় হতে বলে অপহৃত করে তার সর্বন!পে অগ্রসর হয়েছিলে? তােমার বড় স্বার্থের অন্তরায় হয়েছি- নয়? তাই আজ ঘাতকের রোবদীপ্ত চক্ষু নিয়ে নির্মিত সিংহের মত অামাকে হত্য। ক'রতে অগ্রসর হয়েছ ? রূপােন্মত্ত অন্ধ ! বেশ্যা হলেও আজ আমার মাতৃশক্তি জেগেছে। ভগ্নীর অপমানে ব্যথা বােধ করূতে শিখেছি। রাএি দিন এ অত্যাচার চোখে দেখতে পাচ্ছিনা। বেশ্য। আমি, নরকের কীট অমি, পথের আবর্জনা আমি-সতীর নয়ন জলে অামারও হৃদয় বিচলিত হয়ে উঠেছে। উঃ- কি অত্যাচার! স্ফুটনােন্মুখ কুসুম কলিকাকে সবলে তার স্নেহাশ্রয় হ'তে অপহরণ করে এনে তাদের জীবনের চির সুখ-শান্তি নষ্ট কছো। সেই সর্বহারা মলিন কুসুমকলিকাদের পানে চাইলে অশ্রুজল যে আর রোধ করতে পারিনা! বেশ্যা আমি, আমারও দৈর্ঘ্যের সীমা অতিক্রম করেছে ! মেঘমালা। কি করবি পিশাচিনী! পার্বতী। তুমি নারীকে চেন না মেঘমালি! পৈশাচিক ক্ষমতায় তুমি শ্রেষ্ঠ বলে ভেবনা নারী শক্তিহীনা ! মেঘমালী। আর পুরুষ হৃদয়েও দুর্বলতা প্রশ্রয় পায়না। ( সজোরে পার্বতীর গলা টিপিয়া ধরিল ) দ্রুতপদে মদ্যপাত্র হস্তে উন্মত্ত জগাই ও মাধাইয়ের প্রবেশ । জগাই। আরে মঘা ভাই—ছাড়া ছাড়াে-এ যে মেয়েমানুষ! ( ছাড়াইয়া লইল) এখন এসব বাদ বিসম্বাদ বাদ দাও বাৰা-সেই
১৮
নিমাই-সন্ন্যাস।
মােলায়েম খুপ সরৎ গােছের মেয়েমানুষটা কোথা বল দেখি? ঘূৰ্ত্তি
করা যাক্ বাবা ! আরে এ শলা যে চলতেই পারে না!
মাধাই। দেখ বেওয়া-তুই শালা নেহাৎ পাঠা-ভাই কখনও
শালা হয় ?
জগাই। আরে দুত্তোর-গাধা! তাের কি সে বুদ্ধি ঘটে আছে ?
মেগের ভাই শালা এই যুগে সবার চেয়ে অপনার! বাপ জেঠার
কদর হােক না হােক, শালার চাই কড়ায় গণ্ডায়।
ভাই যে
কত আপনার তা জানিসনি? ঠিক এই মেগের ভাই শালার মত।
যা ও সব বাদ দে। এখন মঘাভাই, মেয়েমানুষটা কোথায়
তা বল।
মাধই। মেয়ে মানুষ পরে হবে এখন মাল কোথায় বার কর ।
মেঘমালী। সোৎ ভাই, সর্বনাশ হয়েছে। পার্বতী চুড়ি সে
মেয়ে মানুষটাকে ছেড়ে দিয়েছে ।
জগাই। য়া——ছেড়ে দিয়েছে-ছেড়ে দিয়েছে কেন?
মেঘমালী। শালীরা সব সতীকন্ঠের পুষ্যি পুত্তর।
জগাই। তুমিই তাে ছুড়িটাকে অত বাড়িয়েছ ভাই, না হলে
ওর বাবার সাব্যি কি যে কেউটে সাপের সঙ্গে খেলা করে ?
মাধাই। আমি তো জানিই—এ শালার মেয়ে মানুষকে মাথায়
তুললেই বিপদ।
জগাই। বুড়ো, ছেলে, অার এই মেয়ে মানুষ, এদের নাই দিয়েছ
তত একবারে মাথায় উঠে বসে আছে। এই মধ—চল এখন জিভে
তুলসী পাতা দিয়ে খসে পড়া যাক্।
নিমাই-সন্ন্যাস । পাই। হিঁচড়ে শালী রমা বষ্টনীর মুখ দেখে বেরিয়েচি, জানি আজ অদৃষ্টে পরম্ভাটা ! জগাই। যাক্, মা ভাই, এই বারবেলায় অজি আর কোথা কার আঁদাড়ে পাঁদাড়ে ঘুরে বেড়াব ? তার চেয়ে রমা বষ্টমী শালীর দই ঢোকা যা চল। মপাই। দাদা শালার পিত্তির ঘরে কে ঘি ঢেলে দিয়েছে, তা না হলে একটা বড়ো থুবড়ো চোপ সঃ-গালী মাগীকে নিয়ে স্মৃত্তি জমাতে চায় ! জুগা; তুই তার কি বুঝবি ? পুরণো চাল ভাতে বাড়ে! আহার ওসুধ দুই। অায় ভই মঘ!, অয় যাই। { মেঘমালীকে লইয়া প্রস্থান। মাধই। আমি আর এক কোখা প'ড়ে থাকবো, এ শালাদের পিছুই নিই। [ প্রস্থান। পাৰ্বতী। দূর হও নরকের কৃমি! পাপের জলন্ত মূর্তি পিশাচের দল । ভগবন্! এত অত্যাচার- তোমার সৃজিত এই ভব রাজ্য মাঝে ? দর্পহারী হরি ! অবতরি তুমি—এই পাপ পূর্ণ বসুন্ধরা কর পুণ্যের আশ্রম ! মাগাে ভাগীরথি। পুণ্যােয় কলুষ-নাশিনি,
২০
নিমাই-সন্ন্যাস।
তুমিও কি মাতা,
সন্তানের মেচ্ছ-ব্যবহারে
গেছ দূরে রক্ষিবারে গৌরব অপন
মা-ম', পতিতা বলিয়ে আমি
ধৰ্ম্মভ্রষ্ট। পাপিষ্ঠার ঘোর অত্যাচারে,
তাই কিগে। মাতা কন্য-বক্ষব্যথা,
শ্রবণ-বিবরে পশে নাই তব ।
ক্ষম দেবি ।
জান তুমি চিরদিন অবলা রমণী
পুরুষের অমিত বিক্রমে
অতি তুচ্ছ নারীর ক্ষমতা।
নতুবা কে কোথা--
অমূল্য সতীত্ব-ধনে দের জলাঞ্জলি
পর-পুরুষের পদে।
নেপথ্যে জনৈক নারী।
রক্ষা কর, রক্ষা কর, আছ কে কোথায় ?
অবলার সর্বস্ব যায় !
পাৰ্বতী। ঐঐ দুবৃত্তগণ কোন নিরপরাধিনীর সর্বনাশে সমুদ্যত
হয়েছে, ভগবান্ নিরাশ্রয়। দুৰ্বলা নারীকে রক্ষা করতে শক্তি দাও।
[ বেগে প্রস্থান ।
लौसमृष्य | জগন্নাথের বাটী } জগন্নাথ ও শচীর প্রবেশ । এখন নিমাইকে নিয়ে কি করবে কর ? আমি নিমাইয়ের কল্যাণ কামনায় আমাদের অভাষ্ট দেবতা বাল-গোপালের পূজার জন্য নৈবেদ্য প্রস্তুত করে যেই বাবার ঘরে নিয়ে যাবে।অমনি নিমে কোথা হ'তে ছুটে এসে সেগুলো উচ্ছিষ্ট করে দিলে। জগন্নাথ। আমি শুনে,ি তুমি তিরস্কার করতে নিমাই বলে আমি খেলেই গােপাল তুষ্ট তা কি তুমি জাননা? শচী। অবাক করেছে ! পাঁচ বছরের ছেলে এমম তো কই বাপ- চোদ্দ পুরুষে কারো দেখিনি। দেশ, সত্য বছি নিমাইয়ে কাৰ্য কলাপ দেখে আমি যেন অার অামাতে থাকি না। জগন্নাথ। সত্যই গৃহিণ! নিমাই আমার সামান্য বালক নয় ! সে দিন তােমাকে ত প্রত্যক্ষ শুনিয়েছি আমি যখন নিমাইকে গৃহ মধ্য হতে পুথি খানি আনবার জন্য পাঠালুম, তখন বাছার রুণু রুণু পূর ধ্বনি শুনে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলুম। আরও অনেক সময় বাছার পায়ে আনি ঐ নূপুরধ্বনি শুনতে পাই। তার পর সে দিন নিমাই-সন্ন্যাস। নিমাই আমার হাতে পুথি খানি দিয়ে লিখতে বেরিয়ে গেল, আমি পুথি খানি রাখতে গৃহমধ্যে প্রবেশ কলুম, দেখলুম সে এক অপরূপ দশ্য। নিমাইয়ের আমার ক্ষুদ্র পদাঙ্কের ধ্বজবজ্রঙ্কুশ চিহ্ন পড়ে রয়েছে ! কি হবে গৃহিণি। দুর্ভাগ্যের ঘরে এ সৌভাগ্য চন্দ্রের উদয়-তাই আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছি। শচী। নিমাইয়ের আমার সবই অপরূপ ! তা না হলে তিন বছরের ছেলেকে ভীষণ কালভুজঙ্গের সঙ্গে খেলা করতে কেউ কি কখন দেখেছে। সেদিন অতি প্রত্যুষেই বাল গােপালের গৃহ মার্জন কছি এমন সময় নিমই আমার কাছে গিয়ে বল্পে— ! আমার ক্ষিদে পেয়েছে, আমি বলুম বাছা একটু অপেক্ষা কর, স্নান করে এসে শুদ্ধ হয়ে তবে তাে হাড়ি কঙ্গী হ’তে খাবার বার করবো ! নিমাই রেগে উঠলাে। তারপর ঐ বাঁশ বনের অশুচি জায়গায় বসে বল্পে এবার আমি তােমার ঘর কন্নার সব জিনিস শুদ্ধ করে দিচ্ছি ? আমি ভরে বতে লাগলুম, রক্ষা কর বাবা, স্নান করে আয় তবে ঘরে ঢুকবি ! কার কথা কে শুনে, সে ছুটে এল, আমি কঁাতে লাগলুম ; তখন বাছা আমার কি বল্লে জান ? “চি অশুচি জগতে কিছুই নাই ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম এই পঞ্চভূতে জগৎ নিৰ্ম্মিত তা ছাড়া জগতে আর কিছুই নাই, ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যখন সর্বত্রই বিরাজিত, তখন আবার শুচি অশুচি ভেদ কেন ? জগন্নাথ। আশ্চৰ্য্য-তারপর শচী। তারপর অনেক বুঝিয়ে গঙ্গাস্নান করতে নিয়ে গেলুম, তবু বাছার সেই এক কথা, শুচি অশুচি কিছুই নাই। সুনান্তে বাছাকে নিমাই সন্ন্যাস। মত যখন কোলে করলুম তখন নিমাইয়ে মুখখানি মেঘের গম্ভীর ভাব ধারণ করলে। বাছার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হতে যেন কোটী কোটী দিবাকর তেজ দীপ্তি পেতে লাগলাে ! তখন যদি বাছকে দেখতে—মনে হত নিমাইয়ের রূপের সঙ্গে জগতের কোন সৌন্দর্যের তুলনা হয় না ! দ্রুতপদে বিশ্বরূপের প্রবেশ। বিশ্বরূপ । মা-না-সৰ্ব্বনাশ হয়েছে ? নিমাই আজ অবির এক নূতন খেয়ালে উন্মত্ত হয়েছিল। সে এত ক্রন্দন করছিল—আমি কিছুতেই তাকে নিবৃত্ত করতে পারছিলাম না, এমন কি মাঝে মাঝে মূচ্ছিত হয়ে পড়ছিল । শচী। কেন, কেন, বাছার আমার কি হয়েছে ? বিশ্বরূপ। হঠাৎ সে বলে উঠলাে আজ একাদশী। হিরণ্য ভাগবত আর জগদীশ পণ্ডিত তাদের অভীষ্ট দেবতার পূজার জন্য যে নৈবেদ্য সজ্জিত করে রেখেছে আমি সেই নৈবেদ্য ভক্ষণ করবে। তারপর আমি তাদের বাড়ী গিয়ে এই কথা বলতে তারা সেই নৈবেদ্যের থালা হাতে নিয়ে আমাদের নিমাইকে দিয়ে প্রণাম করে চলে গেল। আর বলে গেল বালকের শরীরেই ভগবান বিরাজিত। এই নাও ঠাকুর, নৈবেদ্য গ্রহণ কর। শচী। ওমা, সে কি কথা! হায় নারায়ণ, দাসী পুত্রের অপরাধ গ্রহণ করবেন না ! চল বিশ্বরূপ, অবােধ নিমাই কোথা গেল দেখিগে চল! নিমাইনিমাই-
২৪
নিমাসন্ন্যাস।
নৈবেদ্য পাত্র হস্তে নিমাইয়ের প্রবেশ ।
গীত।
নিমাই।
রাধার বরণে অঙ্গ আবরি নদীয়া বিহারী কানাই তাের,
নন্দদুলাল আজ শচীলাল ধন্য জননী সাধনা তাের।
হরিনাম দানে পাতকী রাতে, গোলােক হইতে এসেছি ধরতে
(তাই) দেবতার পূজা আমারই ত পূজা
সবারই ইষ্ট রূপটা মাের।
আমি কভু হই বাল গোপাল, কভু সাজি কালী করে করবাল,
ভুবনমােহিনী আমার গৃহিণী, বাঁধে ভক্ত মােরে দিয়ে প্রেমডাের।
শচী। ওমা! আমার যে ভয় পাচ্চে ! ভগবান! কেমন করে
তবে আমার নিমাই বাঁচবে।
নিমাই। ভয় কি মা? আমিই ত নারায়ণ ! ভগবানে আর
আমাতে প্রভেদ কি ?
প্রতিবেশিনীগণের প্রবেশ।
১ম প্রতিবেশিনী । ওগে। নিশ্ৰগিন্নি। আমরাও ভাল বলে মনে
কচ্ছি না, এক কাজ কর ! মা ষষ্ঠী দেবীর ষােড়শােপচারে পূজা
দাও; তবে যদি তােমার নিমাইয়ের মাথা ঠাণ্ডা হয়।
২য় প্রতিবেশিনী। ওরে বাপরে! হিরণ্য ভাগবতের ঠাকুর
কঁচা খেকো দ্যাবতা! প্রতি একাদশীর দিন চেয়ে ভােগ নেয়,
সেই
ঠাকুরের মন্নিতে এবার নিমাই পড়েছে ! কি হবে মা-
নিমাই-সন্ন্যাস।
শচ। ( জনান্তিকে ) চুপ কর মা! চল, নিমে যেন শুনতে না
পায় ! বাছার কল্যাণে মা ষষ্ঠী দেবীর পূজো দিতে কি সব দরকার
তোমরা আমায় বলে দেবে। ( প্রকাশ্যে ) চল, নিমাই, ধন আমার
'ঘরে চল।
প্রতিবেশিনগণ। নিমাই ! বাব। আমরা তােমাকে তেমনি করে
কোলে বসিয়ে গীর এর খাওয়াব। সেই রকম গান গাইতে গাইতে
একটি বার নাচোতাে !
গীত।
নিই।
আজ নাচিব রঙ্গে প্রেম ভাঙ্গে, খেয়া বিনোদ খেলা।
মুনা পুলিনে সখাগণ সনে কটাৰ সারাটি বেলা।
ধেনু গুণে লয়ে বিজন বিপিনে, কুঞ্জে কুঞ্জে ভুমিব গােপনে,
মধু বন ফল খাব সনে, সাজাব গোষ্ঠ মেলা।
রাঙা রবি ধীরে ডুবিল গগনে বেনু লয়ে মোরা যাব বৃন্দাবনে,
যশোমতী মায়ী চুমিবে বদনে আমি ব্ৰজ পুরে নন্দলালা।
[ জগন্নাথ ও বিশ্বরূপ ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
জগন্নাথ। বৎস বিশ্বরূপ।
অপরূপ নিমাইয়ের জ্যোতি।
মনে নায়-
••••
যশোদানন্দন
অবতীর্ণ কুটিরে আমার।
সৰ্ব্ব কলেবর উঠে শিহরিয়া-
२७ নিমাই-সন্নাস। - প্রাণ মন উল্লাসে ভরিয়া - করে উল্লম্ফন, নিশ্চয়—নিশ্চয়--- পূর্ণব্রহ্ম নটবরে— পুত্ররূপে লভিয়াছি আমি। নারায়ণ ! কোন্ রঙ্গ সাধিবারে দাসেরে ছলনা ? বিশ্বরূপ। নাহিক সন্দেহ, পিতা, ভবকর্ণার সারাৎসার- ভ্রাতৃরূপে মাের উদয় জগতে । জগন্নাথ। এস বিশ্বরূপ। প্রাণভরে হেরি নিময়ে আমার । যােগী ঋষি- যে পদ লভিতে যােগে- যুগ যুগ করিছে সাধনা, সে ধন গৃহেতে মাের কালেরূপ-গৌরাঙ্গরূপেতে। [ প্রস্থান। বিশ্বরূপ। নারায়ণ ! নারায়ণ ! বনমালী প্ৰেম অবতার ! আর কেন হরি মায়ার বন্ধন। দুর কর আসক্তি আমার, নিমাই-সন্ন্যাস। २१ মােহ জাল ছিন্ন কর । ভাই! ভাই—প্রাণের নিমাই। তুমি ভগবান! আর ডরি করে ? ভবার্ণবে ত্রাণ কৰ্ত্ত তুমি ? তুমি হও অনুজ আমার, দুভাগ্য ভ্রাতার- আর কেন এ সব জঞ্জাল । হরি! হরি! যাত্রা করি তােমার স্মরণ ! ( গমনােত) দ্রুতপদে লােকনাথের প্রবেশ। লােক। বেশ, দাদা! তুমি একাই যে বেরিয়ে পড়েছ ? বিশ্বরূপ। না ভাই, তুমি যে আমার ছায়ার ন্যায় অনুবী ! ছায়া ছেড়ে কি কায়া থাকতে পারে ? আর বিলম্ব করবার প্রয়োজন নাই। অসার অনিত্য সংসারের মোহ ক্রমে আমাদিকে আচ্ছন্ন করবার চেষ্টা করছে। পিতৃদেব আমার বিবাহের জন্য নিতান্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। লােক। —এই মাত্র ঘটক ঠাকুর পিসিমার কাছে গেলেন ! কাল পিসিমা বছিলেন-বাছার বৈরাগ্য দিন দিন যেরূপ বর্ধিত হচ্ছে আর বিবাহ না দিলে চলে না! আজ নিশ্চয় একটা স্থির হয়ে যাবে।
২৮
নিমাই সন্ন্যাস।
বিশ্বরূপ। লােকনাথ ! তবে আর এক মুহূর্তও বিলম্ব কর্তব্য
নয়! পিতা কিম্বা মাতা আমাকে বিবাহের জন্য অনুরােধ করবার
ব্দেই আমি গৃহ ত্যাগ করবো! কারণ মাতাপিতার আদেশ দেবতার
আদেশের চেয়েও মূল্যবান। আমি তা কিছুতেই উপেক্ষা করতে
পারবো না! চল ভাই! আহারান্তে শয়ন করিগে, তারপর সকলে
নিদ্রা গেলে গভীর নিশাযোগে ভগবানের পাদপদ্মে এই নশ্বর
দেহ উৎসর্গ করে বৈরাগ্য পথের যাত্রী হব ।
হরিবােল ।
হরিবােল !
লােকনাথ। চল দাদা! ত্রেতা অবতারে রামচন্দ্রের
রামচন্দ্রের সঙ্গে
রামানুজ লক্ষ্মণ যেমন বনগমন করেছিলেন, অনিও তােমার পরিচর্যার
জন্য অনুগমন করবো, হরিবল ! হরিবোল! হরিবােল ।
[ উভয়ের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য
[ পথ ]
চিন্তারত কলিদেব দণ্ডায়মান।
কলি।
চারিদিকে একি নাম ধ্বনি
গলিত সীসকসম কর্ণে পশে মাের ।
সৰ্ব্ব অঙ্গ উঠে শিহরিয়া-
শিরায় শিরায় মম একি এ কম্পন !
অনন্ত রাজব মোর---
কাপে যেন বিষম তরাসে !
কোথা হতে এল এরা ?
কোথা হতে আনিল এ নাম?
নাম-শক্তিবলে
নিস্তেজ সকলে যেন কলি-সহচর।
কি হবে উপায়?
মধ্যাহ্ন ভাস্কর কিরে ঘন মেঘঘদিয়ে
ডুবিবে আঁধার ঘােরে চিরদিন তরে ?
তাও কিরে সম্ভব এখন?
নাম মন্ত্রবলে শুধু জিনিৰে এ কলি-শক্তি-
করিবে নিস্ফল মাের মায়াজাল
নিমাই-সন্ন্যাস
কোথা তেরা মিথ্যা, অহঙ্কার,
কোথা হিংসা কামকলা অনর্থ আকার,
নতুন উদ্যমে অয় রাজত্বে আমার।
বাড়াও বাড়! ও পুনঃ
মদ্যপান, প্রাণিহত্যা কাম বিলাস
অহঙ্কারে পূর্ণ কর পণ্ডিতের মন,
ভুলাইতে জ্ঞানীজন পাত ছলা কলা।
ভাসুক সংসার পুনঃ বিলাসিতা স্রোতে ;
নাহি ভয় ---তাহলেই পূর্ণ মনস্কাম।
জীব ব্ৰহ্ম ভাবি মনে,
নাম গান ভুলিবে সবাই।
বাড়িয়া উঠিবে ক্রমে কামিনী কাঞ্চন,
অধম্মের অন্তর উল্লাস।
নেপথ্যে ভক্তগণ। বা হরি, হরিবােল !
কলি। ঐ-ঐ-সেই বজ্রের হুঙ্কার
ব্ৰহ্মাণ্ড ভেদিয়া উঠে, প্রলয় গর্জন।
ঐ আসে বৈরীদল মাের!
বধির কর্ণ যাই অন্তরালে !
শ্রীবাসপ্রমুখ ভক্তগণের প্রবেশ ।
শ্রীবাস।
বল, আবার সকলে মধুর সুরে বল হরি হরিবােল
ভক্তগণ। বল হরি হরিবােল।
নিমাই-সন্ন্যাস ৩১ শ্ৰবাস। অ মরি, মরি, কি মধুর নাম ! কি সুবা-ভরা নাম ! যেন জগতের সমস্ত মাধুৰ্য্য সংগ্রহ করে এই নামের মধুরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেন সংসারের সকল আনন্দ নিংড়ে এই পরমাননের সৃষ্টি হয়েছে। এত মধু—এত রস, এত অনিন আর কি কোথাও অাছেরে ! এ যে অমর বাঞ্ছিত অমিয় নিধি! স্বর্গের দেবগণ এই নামসুধা পানের জন্য উদগ্রীব। এ নাম গান করলে সকল গ্লানি দরে যায়। এ নাম সুধা পান করলে জরা মরণ দূর হয়। সমস্ত পাপতাপ সূর্যোদয়ে অন্ধকারের মত পলায়ন করে। গাও, গাও, ভক্তগণ- হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। গীত। ভক্তগণ। গাও হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। হরি হরিবোেল, হরি হরিবোল, বল সবে প্রাণভরে। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ অবিরাম তার স্বরে ॥
নিমাই-সন্ন্যাস
শ্রাবাস
কি
মধুর !
কি
মধুর !
হরি নামে ঝরে অমিয়ের ধারা।
গান করে অখিল ভুন।
পান করে সুধা প্রাণ,
তবু যেন মেটেনাকে। আশা।
যত পার, তত বল নাম,
যত গাও তবু কর গান,
প্রাণ ভরা ঐ নামে হার মানে মুরলী ঝঙ্কার
আবার আবার গাও মুখে শুধু নাম ল ও
মনে প্রাণে শুধু ডাক হার।
আপনি মুরারি-
আসিবেন ভক্তের আহ্বানে।
ভক্তগণ।
হরে মুররে মধু কৈটভারে !
জয় জয় জগবন্ধু করুণা সিন্ধু কংসারে।
এস অগতির গতি ত্রিভুবন পতি।
গতি বিহীন জনে তার রহে দুস্তারে ।
এস দুষ্ট জন দর্পহারী,
পরব্রহ্ম বংশীধারী,
করুণা করি এস শমন শাসন সংহারে।
নিমাই-সন্ন্যাস এস দীন দু:খ নাশিতে ত্রাসিতে তুষিতে, ভকত বৎসল হরি নিজগুণ বিস্তারে; [ গাহিতে গাহিতে প্রস্থান। পীড়ন করিতে করিতে দুইজন বৈষ্ণবকে লইয়া জগাই ও মাধাইয়ের প্রবেশ। মাধাই । জগাই । জগাই । বল-আর ও নাম করবি না ? বল্ এখনি ঐ অক: অার তুলসীর মালা আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিবি ? জগাই। নইলে এ জগাই- মাধই। মাধাই এদের হাত থেকে নিস্তার নাই। ১ম বৈষ্ণব । হরি, হরি একি বিড়ম্বনা। শুধু নাম গানে এত উৎপীড়ন। থাকিতে জীবন এ নাম ভুলিব ? তবে কি লয়ে থাকিব বল এ মরু সংসারে ? জগাই। আমরা কি নিয়ে অছি ? মেয়ে মানুষ আর মদ । এর চেয়ে সেরা জিনিব কি আর আছে বাবা। তা না হলে চৈতন চুটকি আর মালার বুচকি । ও চলবে না বাবা! ছাড় হরিনাম । নৈলে টিকিত টিকি, ও টিকির শিকড় শুদ্ধ উপড়ে তুলে ফেলে দেব। যদি ভাল চা, ছাড় নাম, কাট, টিকি ছিড় মালা !
নিমাই-সন্ন্যাস
১ম বৈষ্ণব। একি লীল। নন্দলাল তব •
বুঝি প্রভু পরী- বিষম ।
অরে রে দুর্জন,
দেখায়ে প্রাণের ভয়
এ নাম ভুলাবি?
যায় যাবে প্রাণ
তথাপি এ নাম কভু না ছাড়িব ।
জগাই। তবে রে বেটা ! নেংটা নেড়ার দল! (প্রহার করিল।
বৈষ্ণবদ্বয়। হরিবােল ! হরিবোল ।
মাধাই। তবে টেনে তোল! টেনে তেল ।
( উভয়ের শিখ। ধরিয়া আকর্ষণ।
জগাই।
এখনও বছি ছাড় বেটার। হরিনাম! নৈলে কাজী
সাহেবের হুকুম
১ম বৈষ্ণব । কে সে কলির অবতার কাজী সাহেব ? কেন
আমরা তার হুকুম মানতে যাবাে ? জান না কি তােমরা তােমাদের
কাজী সাহেবের উপরেও একজন আছেন ?
মাধাই। তিনি ত গৌড়ের রাজা।
১ম বৈষ্ণব । গৌড়ের রাজার উপরে ও আর একজন
আছেন।
জগাই। তিনি ত দিল্লির বাদশা?
১ম বৈষ্ণব। সেই বাদশারও বাদসা ।
জগাই।
সে আবার কেরে?
।
নিমাই-সন্ন্যাস ৩৫ জগাই। বেটাদের চোদ্দ পুরুষ। ১ম বৈষ্ণব। তিনি সকল রাজার রাজা! তিনি সকল বাদসার বাদস। তারই হুকুমে জগৎ সংসার চলছে। আমরাও র হুকুমে তার নাম করছি। তােমরা কেন আমাদিগকে তার নাম করতে নিষেধ করছ ? তােমরা বারন করবার কে ? জগাই ও মাধাই। আমরা তােদর সাত গুষ্ঠির যম। তবেরে বেটারা । ( পুনরায় প্রহার করিতে লাগিল ) ২৪ বৈষ্ণব। মারমার যত পার করহ প্রহর। প্রাণ চা'ও প্রাণ লও- প্রহারের বিষম পাড়নে ! তথাপি এই দুর্দিনে, ভকত বৎসল দীনবন্ধু ধনে, নাহি বিস্মরিব, গাব তার নাম গুণগান, পাব ত্রাণ পাপের সংসারে। হরি যে রে ভবপারে একমাত্র ভেলা ! ২য় বৈষ্ণব। হরি! হরি ! দীনবন্ধু ! যায় প্রাণ, দাও স্থান চরণে তোমার অন্তিমে মাধব। (দুইজন মুর্হিত হইলেন) নিমাই-সন্ন্যাস জগাই। সাবাড়—সাবাড়–মুখ দিয়ে রক্ত উঠছে। চল-চ- মাধ! আর কোথা কে আছে দেখিগে। মাধাই। চল দাদা। আরে বেটাদের কি গেরো বল ? কোথায় সর্ব দুঃখ নিবারিণী মাতঃ ধান্তেশ্বরীর শরণ নিয়ে দুনিয়ার কেয়া মজা লুটুবি তা না হয়ে চিসে বেটাদের কেবৰ হরিহরিনাম! বেটারা স্বর্গে গিয়ে দু পা তুলে হরিনাম কগে যা। জগাই। দে শালাদের মুখে একটু মদ ঢেলে, মদের গন্ধে স্বর্গের দেবতাগুলােও একটু চাকে উঠুক । [ উভয়ের প্রস্থান। অন্তরাল হইতে কলির পুনঃ প্রবেশ। কলি। থাকিতে অামার এই সহচরগণ, ভয় অকারণ সম্ভবেন। আর! এদের প্রভাবে প্রতিষ্ঠিত রাজ্য মম সদ। নিরাপদ, সাধ্য হেন কার কলি রাজ্যকালে আমার প্রভাব খর্ব করে অবহেলে। { প্রস্থান । হরিনাম করিতে করিতে অদ্বৈত আচার্যের প্রবেশ। অদ্বৈত। কিবা সঞ্জিবনী সুধা প্রভুনাম গানে ! বল জীব উচ্চৈঃস্বরে ম; ঝঙ্কারে, হরি হরিবােল।
নিমাই-সন্ন্যাস
৩।
পান কর নিত্যধাম সুধা,
থাকিবেনা। ক্ষুধা ভুল ভ্রান্তি --
অশান্তির ভােগ !
শােক দুঃখ মনের বিকার,
যাবে টুটে চিরদিন তরে ।
অন্ধ দৃষ্টি দিব্য জ্যোতি লভি,
দেখিবে গােলােক অংলাে--
মধুর এ নানে।
হরিবোল হরি!
বৈষ্ণবদ্বয়। হরিবােল হরিবােল হরি।
অদ্বৈত কে তােমরা বৈষ্ণর দু’নে,
রক্তাপ্লত তনু,
ধূলিশয্যা করেছ অহয় ?
ওষ্ঠাগত প্রাণ তবু অবিরাম
কর প্রভু নাম গান
এত প্রতি কোথায় শিখিলে ?
কোথা পেলে ভক্তি অভিন?
দাও-দাও—এককণা দাও
কিংবা দাও কণা হতে কণা,
ঘুচে যাবে সংসার কামনা,
বৈষ্ণব প্রসাদে।
বৈষ্ণবদ্বয়। বল প্রভু বল হরিবােল।
নিমাই-সন্ন্যাস
অদ্বৈত।
অদ্বৈত।
হরি হরিবােল !
১ম বৈষ্ণব। আয় চলে জগাই মাধাই,
আবার জেগেছি মােরা হরিনাম গানে,
আবার আবার করিব মাের।
অবিরাম শুধু নাম গান
সাধ্য থাকে কর বাধা দান।
বৈষ্ণবের পুণ্য অঙ্গে করি হস্তক্ষেপ,
গেল চলে নরকে দু’জন !
নাহি পরিত্রাণ আর।
এস এস বৈষ্ণব প্রধান,
দাও আলিঙ্গন,
জীবন সফল কর দীন অভাগার।
এস প্রভু দানের আশ্রয়ে,
করিব বৈষ্ণব সেবা আনন্দিত ননে।
[ সযত্নে উভয়কে দুইহস্তে ধারণ করিয়া প্রস্থান
ঐকতান বাদন।
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
জগন্নাথ মিশ্রের বাটা।
অগ্রে অগ্রে নিমাই পশ্চাতে দ্রুতপদ বিক্ষেপে শচীর প্রবেশ।
শচী। নিমুনিনু -- রক্ষে কর বাবা! অার ছুটি না! ওমর
ইপ লেগে গেল।
নিমাই। তবে বল আমাকে কিছু বলবে না?
শচী। নারে না ?
নিমাই। সত্যি।
শচী। হ্যারে হা! দাড়। বাবা-
নিমাই। না তুমি মারবে ? আগে তিন সত্যি কর যে তুমি
আমাকে কিছু বলবে না ?
শচী। ওরে করেছি--করেছিরে - রক্ষে কর বাবা! তাের সঙ্গে
বকে বকে আমার নাড়ীতে ব্যথা ধরে গেল !
না তুমি আমাকে মারবে ? (পশ্চাৎ হাঁটিলেন)
শচী। না, আর তােকে আমি কিছু বলবাে না।
নিমাই। হু—যাচ্ছি যদি মার আর কখনও তােমার একটা কথাও
শুনা। ( শচীর সম্মুখে যাইলেন)
শচী। এইবার তুমি কার বাছা; হারে নি ! একি তাের
স্বভাব হ’ল ! বাড়ীতে এক ঘর দোর খাবার থৈ থৈ করছে, আর
নিমাই ।
নিমাই-সন্ন্যাস
তুই বামুন পিসীর কড়া উচ্ছিষ্ট করে তার সব দুধটুকু খেয়ে পালিয়ে
এসেছি ! পরে এ অত্যাচার সহ্য করূবে কেন? এ কি দুষ্টমি বাব
নিমাই। পর কে ? সবই যে আপনার। আমার যে পর কেউ
নাই মা!
শচী। দুঃখিনীর ধন, আর দুষ্টমি করন!, পাঁচ জনে পাঁচ কথা
বলে আমি সহ্য করতে পারি না।
জগন্নাথ মিশ্রের প্রবেশ ।
জগন্নাথ। শচি! শচি! সর্বনাশ ঘটেছে মােদের !
শিরে বাজ হানি,
বিশ্বরূপ গৃহ ত্যজিয়েছে বৈরাগ্য ।
চারিধারে অন্বেবিও তারে
সবে বলে কোপন পরণে--
নগ্নপদে এই পথে দেখেছি যাইতে !
কি হবে কি হবে সতি,
যাই কোন পথে-
কোথা পাব হৃদয়ের নিধি বিশ্বরূপে !
শচী। ওগো ! কি নিঠুর তুমি !
এখনও রহ দাঁড়াইয়া ?
পদে ধরি ঠাকুর গোসাই, দাও অনুমতি
যাই দ্রুতগতি খুঁজে আনি সৰ্বশ্বে আমার!
নিমাই-সন্ন্যাস, ৪১ জগন্নাথ। স্থির হও প্রিয়ে। নারী তুমি কোথা যাবে কোথা অন্বেষিবে বিশ্বরূপ হয়েছে সন্ন্যাসী । সন্ন্যাসীর নির্দিষ্ট স্থান নাহি স্থির কোথা, সারা বিশ্ব তার বাসভূমি! হে অাচার্য ! শচী। ফেটে যায় বুক- মনে পড়ে একে একে জন্ম হ'তে আজও তার সেই চন্দ্রমুখ ! হায় সন্তানের পিতা! কোন অভিশাপে তোমার জনম । জগন্নাথ । [ প্রস্থান । শচী। কই-কই কইরে নিমাই! (নিমাইকে নিকটে লইলেন।) কোথা বিশু কোথা গেলি বাপ । কি করিলি অঞ্চলের নিধি । কঠোর নিয়ম সন্ন্যাসী ধরম দুধের কুমার তুই কেমনে সাবিবি। কোন দোষে দোষী দুঃখিনী জননী, অবহেলে গেলি চলি একবার না সুধালি কোন কথা যাদু।
৭২
নিমাই-সন্ন্যাস
নিমাই।
নাই। নিমাই!
চল বাপ! আঁধারে আলােক তুই
করে ধরে তাের যাব বনবাস.
পাতি পাতি করে অন্বেষিব বিশুরে আমার
দাদা-দাদা-
কোথা গেলে তুমি !
অার কে আদরে মােরে
ভাই রে নিমাই বলে লবে কোলে তুলি।
নিমাইনিমাই।
ওগাে-ওগো-কে আছ কোথা!
ছুটে এস করা, বুঝি বা নিয়ে হারাই।
মৃচ্ছা .
শচী।
বিরূপ! বাপরে আমার !
দ্বিতীয় দৃশ্য
অদ্বৈত আচার্যের গৃহ প্রাঙ্গন।
ভক্তগণ গাহিতেছিল।
গীত।
অমল ধবল গৌররূপে নয়ন ওয়াছে লাগিয়া গাে ।
বিন্দু বারি বরিষণ আশে চিত চতক গিয়াছে মাতিয়া গো।
তুমি দয়ার আধার প্রেমের হ!র মােদের আঁধার কর হে দূর।
তব শান্তিময় পদতলে টানি বাজাও তোমার সুর।
তুমি দীনেরবন্ধু করুণাসিন্ধু বিন্দু বিতর হানে হে ;
তব অভয় চরণ করিয়াছি সার হৃদয়ে নিয়েছি টানিয়া গাে ।
একবার এসহে গৌর, এনহে গৌর, এসহে গৌর,
তব শান্ত স্নিগ্ধ ছায়ার তলে কত প ত পরাণ লভিছে বিরাম।
( ত্ৰিতাপ তা লিয়া হে;)
তুমি দিয়েছ তাদের হরি নাম সুধা
তারা তাই নিয়ে তাছে নজিয়া হে।
তুমি পতিতপাবন তাই কোলবে না পায়ে ঠেণিয়া গাে।
অদ্বৈত ও সীতার প্রবেশ ।
অদ্বৈত। তারপর—তারপর সীতা ।
সাঁতা। তারপর নাথ, মিশ্র মহাশয় বিশ্বরূপকে সমস্ত দেশ তন্ন
তন্ন অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছেন, কোথাও বাছার সন্ধান করে উঠতে
পারছেন না! পুত্রশােকাতুরা শচী দেবীর করুণ
ক্রন্দনে নীরস
৪৪ নিমাই-সন্ন্যাস পাষাণেরও বক্ষ হতে ধারা বিগলিত হচ্ছে। কি হবে কি হবে নাথ, কেমন করে বিশ্বরূপের সন্ধান পাওয়া যাবে ! অদ্বৈত। হা বিশ্বরূপ ! কি করলে? নদীয়া অন্ধকার করে আবার কোন দেশে তােমার উজ্জ্বল প্রভা বিস্তার ক’তে চলে গেলে ! যাবার সময় একবার দীন দরিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেলে না। তোমার মনে এই ছিল। তাই তুমি মধ্যে মধে: আমাকে বলতে দেব ! আর আমার আবশ্যক নাই, আমার অভাব দূর করূতে-ভগবান স্বয়ং আমার সহােদর রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। লীলাময় ! এ আবার কোন লীলার অবতরণিকা । গােবিন্দ ! কি হল ! আর কে আমাদের তেমন করে মধুর কৃষ্ণ নাম শুনবে ! কে অার প্রাণের প্রাণময়ী আবেগ নিয়ে ভক্তির উচ্ছ্বাসে ভাগবতের ব্যাখ্যা করবে ? কৃষ্ণভক্ত প্রাণাধিক বিশ্বরূপ ! কি মধুর তােমার শ্রীমুখ-নিঃসৃত বাণী ! এখনও তােমার সুমধুর বাক্য আমার কর্ণকুহরে যেন অমৃত বর্ষণ করছে! সীতা- সীতা—আর স্থির হতে পাচ্ছি না ! তুমি যাও, মিশ্র মহাশয়ের শােক সন্তপ্ত। পত্নীকে সান্ত্বনা বাণী প্রদান করে স্থির হয়ে থাকতে বলগে ! আমি বিশ্বরূপের অনুসন্ধানে যাবো! পৃথিবীর মধ্যে সে যে কোন দূরগম্য স্থানে থাকুক আমি তাকে অনুসন্ধান করে বাড়ীতে আবাে ! যদি না পারি, আমিও তার সঙ্গে সন্ন্যাসী হয়ে সংসারের নিকট হতে দূরে অবস্থান করবাে। জয় শ্রীহরি ! জয় শ্রীহরি ! দ্রুতপদে জগন্নাথ মিশ্রের প্রবেশ। জগন্নাথ। কই কোথা অদ্বৈত গো সাই। সুধাই তােমায় নিমাই-সন্ন্যাস বিশ্বরূপ কোথা ? প্রত্যুষে বালক হয়েছে বাহির, গৃহে নাহি ফিরে পড়েছি ফাপরে গতপ্রায় মধ্যাহ্ন সময় ! অদ্বৈত। শুনিয়াছি মিশ্র মহাশয় ! পত্নী মুখে সকল কাহিনী। কঁদিছে পরাণি কোথায় বাছনি তত্ত্বকথা ভাবে রয়েছে বিভাের। জগন্নাথ। না-না-দেশে নাই বিশ্বরূপ আর! পাতি পাতি নদীয়ার প্রতি গৃহ- ধৰ্ম্মসভা দেবালয়ে করেছি সন্ধান, বিশ্বরূপ ত্যটি লােকালয় নিরালয় বনমাঝে করেছে গমন, সাধনের হেতু! হয় ! হায়! কি হ’ল আমার । কেন আমি প্রাণের রতনে শাস্ত্র অধ্যয়নে করিয়া নিয়ােগ এ দুর্ভোগ ঘটয়েছি আপন ললাটে । অদ্বৈত। ধৈৰ্য সংযম বিহিত হয়, বিপদের কালে । জগন্নাথ। হে পণ্ডিত স্নেহ অতি নীচ যুক্তি তর্ক মীমাংসার অপেক্ষা না রহে।
৪ ৬
নিমাই সন্ন্যাস
অদ্বৈত। বিপদ কাণ্ডারি মুরারি
নাম স্মরি, হরি বলি যাত্ৰা করি-
চল দ্বিজ, কৃষ্ণভক্ত প্রেমিক সুজনে--
আনিব আবাসে !
দ্রুতপদে শচী ও নিমাইয়ের প্রবেশ
শচী।
স্বামি ! কোথা মাের প্রাণের রতন,
পেয়েছ কি তারে আচার্য্যের ঘরে
শাস্ত্র পাঠে রত
সুধীর সংযত হৃদয়ে কেয়ারে।
একি স্তব্ধ কেন সব !
সবে নিরুত্তর।
কহ দেবী আচাৰ্য ঘরণী
বিদুষী রমণী সীতা,
বির বারতা
বাছা কিগাে এসেছিল হেথা ?
হায় দুর্ভাগিনী মাতা।
মৰ্ম্ম ব্যথা জনাব কাহারে ?
বিও মাের দুই দিন আসে নাই ঘরে।
আঁধার চৌদিক
ওই শূন্য বেদী—তিতি অশ্রুজলে
বাছার প্রতীক্ষা করে
সীতা।
নিমাই সন্ন্যাস
১৭
শুনিবারে কৃষ্ণ নাম গাথা।
সর্বত্যাগী মাের
ত্যজি সৰ্ব্বস্ব হেলায়-
ছাড়ি গৃহবাস গেছে বনবাসে ।
কিবা কব দেবী
চক্ষু হতে অশ্রুপে রক্তধারা ঝরে
হায় বিশ্বরূপ কোন অপরাধে
অপরাধী করিলে মােদের !
নিমাই। মামা -- দাদা ।
অদ্বৈত। ( স্বগতঃ ) অন্তৰ্য্যামি-
মত্তে এসেও হয়েচ বিভোর ভ্রাতৃপেমে।
দাদা বিশ্বরূপে এখনও পারনা ভূণিতে !
অন্তরের গুপ্তধনে
শতধারে-
আপনার শক্তিরূপে করেছ প্রকাশ !
হে পীতবাস ! ধন্য অজি শঙ্কৰ সাধনা
হরিবােল! হরিবােল। হরিবােল !
তৃতীয় দৃশ্য
ভাগীরথীর তীর।
দ্রুতপদে বিশ্বরূপ ও লােকনাথের প্রবেশ।
বিশ্বরূপ। এস ভাই লােকনাথ ! এই নিশীথেই গঙ্গা সন্তরণে
ভাগীরথীর পরপারে উত্তীর্ণ হই। কি জানি যদি স্নেহময় পিতা
আমাদের পশ্চাৎধাবন করেন তা হলে আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির অনেক
অন্তরায় ঘটবে।
লােকনাথ। তাই চল দাদা! ঐ অদূরেই পুণ্যতােয়া ভাগীরথী
কল কল নাদে প্রবাহিত ! আমরা একবার নদীর পরপারে পৌছতে
পারলে আর কোন বন্ধন নাই।
বিশ্বরূপ। হা-ভাই, যত শীঘ্র এখন বন্ধন ছিন্ন করতে পারি
ততই মঙ্গল।
পার্বতীর প্রবেশ।
পার্বতী। এতরাত্রে কে তােমর বাছা! কোথা হতে আছ ?
যাবে কোথায় ?
বিশ্বরূপ। পরিচয় জেনে কোন লাভ নাই না। তবে এই মাত্র
জেনে রাখাে আমরা দেশ পৰ্য্যটনে বেরিয়েছি।
পার্বতী। আমি তােমাদের সঙ্গে যাবে !
বিশ্ব। সে কি মা! তুমি নারী ! তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে-
তুমি সধবা ! অপরাধ মার্জনা কর মা ! কেন তোমার এ বৈরাগ্যের
নিমাই সন্ন্যাস ৪১ পার্বতী। বংস ! সন্তান তুমি! আমি মহাপাপিনী- শুধু এইটা মাত্র জেনে রাখো! কাল যৌবনের উদ্দাম গতিতে নরকের পিচ্ছিল পথে পড়ে আজ আমি সংসারের চক্ষে ঘৃণিতা, বজ্জিত, অস্পৃশ্য । অামাকে উদ্ধার কর। বিশ্বরূপ। বুঝতে পেরেছি মা! কিন্তু তুমি অামাদের সঙ্গে যাবে কোথায়? আর আমরা ক্ষুদ্রাক্ষুদ্র ভগবানের সৃষ্ট মনুষ্য আমাদের কি সাধ্য যে তোমাকে উদ্ধার করব ? পার্বতী। এক কথা বলই বৎস? তোমার সরল সুন্দর যােগীজন-লাঞ্ছিত মূর্তি দেখে আমার মনে হচ্ছে তুমি সামান্য মানব নয়, আমার মত মহাপাপিনীকে উদ্ধার করূবার জন্যই তােমার ধরাতলে বিশ্বরূপ। ম! অনুতাপই পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এত অল্প সময়ের মধ্যে তুমি যখন তোমার নিজের ভুল বুঝতে পেরেছ তখন আর তােমার কোন ভয় নাই, আজ আমি তোমাকে যে মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে যাচ্ছি, শয়নে স্বপনে, নিদ্রায়, জাগরণে তুমি সেই অমূল্য মুলমন্ত্রটা কখনও বিস্তৃত হয়োনা। পার্বতী। তাই করবাে ! বল বল সন্তান কি সে অমিয় নাম! যে নামে আমার মত মহাপাপিনী কলঙ্কিনীর সমস্ত পাপরাশি ধৌত হবে বিশ্বরূপ। সে নামে মা–সকল পাপই ধুয়ে মুছে পােড়া সােণায় মত খাটা হয়ে যায় । পার্বতী। বল দয়াময় আর বিলম্ব করে না। আর আমি আমার পাপের বােঝা মাথায় বইতে পারছি না ! উঃ অন্তর্দাহী যন্ত্রণা। ০ নিমাই-সন্ন্যাস বিশ্বনাথ। তবে এস মা! (কর্ণে হরিমন্ত্র দিলেন। বল ম! হরিবোল ! হরিবােল ! হরিবােল! পার্বতী। হরিবােল! হরিবােল! হরিবােল । লােকনাথ। হরিবােল! হরিবােল । বিশ্বরূপ। লােকনাথ ! আর নয় ঐ দেখ রাত্রি প্রভাতের আর অধিক বিলম্ব নাই [ গমনোহত। পাবতী। ( বাধাদিয়া) গুরু ! গুরু। কোথায় যাচ্ছ, দীন দাসী কন্যাকে একটা দর কবলে রেখে কোথা যাবে দয়াময় । আমাকে উদ্ধার কর। বিশ্বরূপ। কোন ভয় নাই দেবি! তােমাকে যে মূল মন্ত্র প্রদান করেছি সে নামের গুণে—এ জগতে আর তােমার কেউ কোন অনিষ্ট সাধন কতে পারবে না। অতি সামান্য দম্যর শক্তি মা, এই নাম- মন্ত্রবলে হিরণ্যকশিপু-নন্দন প্রহলাদ সকল বিপদ হতে পরিত্রাণ পেয়ে- ছিল। তবে শােন ম; হিরণ্যকশিপু হরিনামদ্বেষী দৈত্যরাজ, তাঁর পুত্র প্রহলাদ হরিভক্তি পরায়ণ, সে জন্য হিরণ্যকশিপু মহকুদ্ধ হয়ে প্রদকে মৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত করেন। দু'জন ঘাতক শাণিত তরবারি নিয়ে গেল প্রাদকে বধ করতে-সেই তরবারি শতধা চুর্ণ হয়ে গেল, মদমত্ত হস্তীর পদতলে প্রহলাদকে নিক্ষেপ করলে পশু হন্তী বালকের মুখে অমিয় হরিবােল ধ্বনি শুনে তাকে মাথায় তুলে নিলে। এলাদের বক্ষে শিলা বেঁধে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হ’ল শিলাসহ প্রহলাদ সমুদ্রের উপর হরিবােল বলতে বলতে ভাসতে লাগলাে। তারপর মা
নিমাই-সন্ন্যাস
পাহাড়ের উপর দিকে তুলে নিয়ে ফেলে দেওয়া হ'ল, প্রহলাদ
হরিনাম মন্ত্রবলে নৃত্য করতে করতে তার মাতা কয়:ধূর বক্ষে শােভা
পেতে লাগলো, তাই বলছি পাগলি মেয়ে—আমি যে নামে তােমাকে
দীক্ষা দিয়েছি-তােমার আর কিছুরই আবশ্যক হবে না। হরিবােল!
হরিবােল ।
হৰিবােল ।
[ সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য
মিশ্রের বাটি।
শচী। তা হলে আমার বিশ্বরূপকে আর পাওয়া যাবে না ?
জগন্নাথ। কই আর পাওয়া গেল ! শুনলুম সে সন্ন্যাস ধৰ্ম গ্ৰহ
করেছে।
শচী।
ওগো! বিশ্বরূপ যে আমার ছেলে মানুষ। এখন
ষােল বছর পার হয়নি : তুমি এক কাজ কর, আমার হৃদয়ের রত্নটী
একটাবার আমার কাছে এনে দাও, আমি তাকে বুঝিয়ে সুঝি
আবার যজ্ঞোপবীত ধারণ করাব !
জগন্নাথ । প্রিয়ে ! সৌভাগ্য আমাদের, তাই এমন পুত্ররত্ন লা
করেছিলাম। সে যখন এই কুমার বয়সেই সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেছে
তখন ভগবানের নিকট প্রার্থনা কর তার যেন সেই পৰ্ম্মেই মতি
অক্ষুন্ন থাকে। যে বংশের সন্তান সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করে সে বং
শচী। হ। বাবা বিশ্বরূপ ! কি করলি বাবা, তাের মনে এই ছিল
( রােদন )
জগন্নাথ । মোদন পরিত্যাগ কর সতি! নিয়তির অখণ্ডনী:
লিপি খােধ করবার সাধ্য কি ? এখন প্রাণের প্রাণ নিমাই এর দিকে
একবার চেয়ে দেখছ কি? বুঝছে না—বিশ্বরূপের গৃহত্যাগর পর
দিবস হতেই আমাদের নিমাইয়ের আমূল পরিবর্তন। কি জানি দগ্ধ
অদৃষ্টে ভগবানের লিপি কত কঠোর।
শচী। আমি তো দেখার অবকাশ পাই না সত্য কিন্তু নাথ,
তােমার বাক্য এক বর্ণও মিথ্যা নয়, নিমাই যেন আমার সে নিমা
নিমাই-সন্ন্যাস নাই। বাছা আমার ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলে গেছে, সদা সর্বদা পাঠ অভ্যাসে দিন কাটাচ্ছে। পড়াশুনা ছেড়ে এক দণ্ডও ক’দিন খেতে পৰ্যন্ত যায় না। জগন্নাথ। এক পুত্র সর্বশাস্ত্র বিশারদ হয়ে সংসার অসার ভেবে সন্ন্যাসাম গ্রহণ করলে আবার নিমাইয়ের পাঠানুরাগ দর্শনে মনে হচ্ছে কোন্ দিন সেই সর্বনাশের দিন সমুপস্থিত হবে। গৃহিণি ! গৃহিণি ! এক কাজ কর, অাজ হতে নিমাইয়ের পাঠ বন্ধ কর। তার পুস্তক গুলিকে ভালরূপে বন্ধন করে সুরধুনীর মধ্যে নিক্ষেপ করে এস, আর তার বিদ্যাশিক্ষার প্রয়ােজন নাই । দেখছে কি—ভাবছো কি- নিমাইও যদি শাস্ত্রজ্ঞান সম্পন্ন হয়—তাহলে বজ্র মাথার উপরে- এক পুত্র বিদ্বান্ ছিল, তাকে নিয়ে খুব সুখ সচ্ছন্দে সংসার-আশ্রম প্রতি পালন করছি—আর বিদ্বান পুত্রের প্রয়ােজন নাই! অামার মুর্থ পুত্ৰই বাঞ্ছনীয়। নিমাই যদি আমার মূর্থ হয়েও গৃহাশ্রম ৩বলম্বন করে বাড়াতে থাকে সেও আমাদের সৌভাগ্য। হা বিদ্বান পুত্র! তুমি বুঝলেনা-যে আমরা এখন ও বেঁচে আছি । সে কি গো ! বাবা বলনে মুখ পুত্র যমের স্বরূপ! ছেলে মুখ হয়ে থাকবে—সে কেমন কথা! জগন্নাথ। নানা শচি না নিবার মােরে। আর পড়ে কাজ নাই নিমায়ের মোর ? কোথায় নিমাই-ডাক তারে, আমি দিব পাঠ বন্ধ করে। নিমাইনিমাই। শচী।
নিমাই-সন্ন্যাস
পুস্তক হস্তে দ্রুতপদে নিমাইয়ের প্রবেশ।
নিমাই। বাবা-বাবা !
জগন্নাথ।
দাও বৎস পাঠ্য গ্রন্থ তব,
নিক্ষেপিৰ এরে সুরধুনী জলে !
আজ হতে পাঠ বন্ধ তব,
যাও তুমি ইচ্ছামত সঙ্গী লয়ে
ক্রীড়া কর সুরধুনী তীরে—
লেখা পড়া লক্ষ্মীছাড়া কথা !
নিমাই। তাই হবে পিতা।
পিতৃ বাক্য বেদ সম গণি!
শচী। মা জগদখে! এ কি করলে ! অদৃষ্টে আর ও কত কি
আছে।
[ প্রস্থান।
প্রস্থান।
জগন্নাথ। নারায়ণ !
একি তব লীলা !
হেন ছল। দরিদ্র ব্রাহ্মণ সনে
সহিব কেমনে শিরে এই বজ্রাঘাত।
সক্রোধে মুরারী গুপ্তের প্রবেশ।
মুরারী। বলি মিশ্র মহাশয় ! হুনেন-হুনেন-অাপনার গর্ভস্রাব,
লক্ষ্মীছাড়া পােল৷ নিমাই ঘোরা কোন পথে যান। কহেন তো-
আজ তাহার একদিন কি মোর এক দিন ।
নিমাই সন্ন্যাস
জগন্নাথ। কেন গুপ্ত মহাশয়, নিমাই আপনার কি করেছে ?
মুরারী। অহে—সেটা তােমার বংশে পশু জন্ম গ্রহণ করি-
য়াছে, আমি করিছি জীব ও বগবান একই বস্তু! হতচ্ছায়া ঘেরা
এই মাত্র আমার বারীতে যাই। আমার আহারে প্রস্রাব ত্যাগ
কইরা পলাইয়া আইছে। বালকের এতদূর স্পর্ধা; আজ তাহারে ভাল
মতে শিক্ষা দিমু ।
জগন্নাথ । মৰ্জনা করুন! উদ্ধত দুষ্ট বালক নিমাইকে আমি
আজই যথেচিত শাস্তি প্রদান করবাে!
মুরারী। আপনি উপযুক্ত বলােক! তাই আপনার মুহের
দিকে চাহিয়া নিমাইকে ক্ষমা করলাম। বারান্তরে সতর্ক কইর্যা
দিবেন।
ক্রোধন্মত্ত জনৈক ব্রাহ্মণের প্রবেশ ।
জনৈক ব্রাহ্মণ। কৈ কেথায় জগন্নাথ মিশ্র? এতদূর স্পা-
এতটুকু ফোচকে ছোড়-গলা টিপলে দুধ বেরোয়—তার কিনা এত
অত্যাচার! আমার ছপায় পুরুষের শ্রীধর বিগ্রহ তাঁকে কিনা হত।
ছাড়া মাটীতে ফেলে দিয়ে সেই সিংহাসনে বসে আছে। হায় !
হায়! ক'লে কি ? কলে কি মিশ্র মহাশয়। এখনও বলছি
ছেলে বাধােতা-না হলে নিমাইয়ের আশা ত্যাগ কর! কি বলবাে-
ছোড়া ছুটে পালাল, তা নইলে আজই তার গায়ের চামড়া ফাটির হাড়
অন্যান্য ব্রাহ্মণগণের প্রবেশ।
২৪ ব্রাহ্মণ। কই কোথা মিল!
নিমাই সন্ন্যাস
চাই প্রতিকার,
নিমাইয়ের হেন অত্যাচার
সব সবে আর কতদিন !
৩য় ব্রাহ্মণ। বড় অত্যাচারী নিমাই তােমার,
শোন মিশ্র পুত্র ব্যবহার,
পৃঙ্গাসনে বসি
জরত আমি,
হেন কালে তোমার নিমাই--
কোথা হতে আসি দ্রুতগতি
পূজার নৈবেদ্য হতে
মিষ্টান্ন কদলী লয়ে গেল পলইয়া ।
মুরারী। হুনেন—মিশ্র মহাশয়! আপনকার দুৰ্ম্মতি পুত্রের ব্যবহার।
২য় ব্রাহ্মণ। বয়সে প্রবীণ আমি,
দেখিয়াছি কত লক্ষ ছেলে,
হেন কুলাঙ্গার শিশু-
পড়েনি নয়নে কতু!
জগন্নাথ। মহামান্য দ্বিগণ !
কর ক্ষমা মােরে
অশান্ত দুৰ্ম্মতি পুত্রের কারণে।
ঈশ্বরের নিষ্ঠুর বিচারে,
পুত্র পিতা আমি !
পাই মনস্তাপ তাই প্রতি পদে পদে।
নিমাই সন্ন্যাস হল কয়দিন গত বিশ্বরূপ ত্যজেছে সংসার! আর এই কুলাঙ্গার- তিলে তিলে দগ্ধ করে মোরে ! আজিকার মত ভিক্ষা চাই অশান্ত বালকে-- চরম নিগ্রহে, প্ৰতীকায়ে হব যত্নবান! ১ম ব্রাহ্মণ। তা হলেই হল! এখন এস হে যে যার কাজে যাই। ২য় ব্রাহ্মণ। বাবা এমন ছেলে বাপ চোদ্দ পুরুষে যেন কারাে না হয়। ৩য় ব্রাহ্মণ। তিথি নক্ষত্রের দোষে যদি বা হয়—গলায় নুন দিয়ে দষ্ট সদ্য যমের দক্ষিণ দুয়ারে পাঠাতে হয়। জগন্নাথ। হায় ভগবান্। এত বিষময় কৰ্ম্মফল ললাটে আমার । শচি-শচি । তােমার অঞ্চলের নিধি নিমাইরে আমার দেয় ইচ্ছামত কটুগালি সবে । কত সবে- নারায়ণ-এও ছিল ভাগ্যেতে আমার। শচীর প্রবেশ। অন্তরাল হ’তে শুনিয়াছি সব। শচী।
৫৮
নিমাই সন্ন্যাস
স্থির হও দেব !
মহামায়া জগৎতনিণি !
কোন্ মহাপাপে
এই মাতা পিতা লভে গাে জনম !
জগন্নাথ। ওই হের শচি-
আসে ছুটে বামাকুল
নিময়ের তব লয়ে অভিযােগ !
কতিপয় রমণীর প্রবেশ।
১ম রমণী। কই কোখ। শচী মাতা! শোন কথা-
এখন যদি চাও ভাল,
নিময়ে শাসাও;
নতুবা অনৰ্থ অচিরে ঘটিবে।
২য় রমণী। দেখ বাপু! একদিন দুইদিন ভাল,
নিতি নিতি কেবা সবে এত আবদার।
নিমাই আচার অতীব গর্হিত।
আমি হই কুলের কামিনী,
সবে জানে মেরে বিদূষী রমণী,
অত টুকু ছোঁড়া দেয় চোখ নাড়া,
বলে আমি কৃষ্ণ, তােরা লাে গােপিণী ।
কাননে ৬: 9
নিমাই-সন্ন্যাস
জগন্নাথ। ক্ষমা কর মা ! ক্ষমা কর, নিমাই আমার ছেলে
মানুষ। দুষ্ট প্রকৃতি-কুসঙ্গে মিশে আজ তার এই অধঃপতন। আমি
এই মুহূর্তেই তাকে ধরে আছি ! আজ হতে তাকে বন্ধন করে
রাখবাে।
भौ মা অপরাধ নিয়ােনা। নিমাই অামাদের নয়—তােমাদের।
( সকলের প্রস্থান।
"মাবড়
হাওড়া
* সত---. স. ৩৭ বল ?
সম্মলন
পঞ্চম দৃশ্য মেঘমালীর কুটির প্রাঙ্গণ। পার্বতী। গুরু তুমি আমায় যে মন্ধে সঞ্জীবিত করেছ, এই যে আমার সেই অভীষ্ট দেব। হরি! তােমার শ্যামসুন্দর মূর্তি স্পর্শ অবধি অামি উন্মাদ হয়েছি। আমায় আর একবার ভাববার অব কাশ দাও-তুমি কে? আহা-হা-অনন্তদেব কি সুন্দর তুমি ! যত- দূর তোমাতে আমার আমিত্ব মিশিয়ে একাগ্রচিত্তে নিরীক্ষণ করি ততদূর দেখতে পাই তুমি অনন্ত-অসীম। হরি! শ্রীগােবিন্দ-এ আনৰ হ’তে এতদিন কোন নরকের বিষ্ঠাময় পথে এ দাসীকে ফেলে রেখেছিলে। আজ গুরুর কৃপায়-তােমার ক্ষুদ্র করুণ! লাভে আমি যে আনন্দ উপলদ্ধি করছি-বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডর কোন রমণীয় বস্তুতে এ আন- ন্দের লেশ মাত্র নাই। যে আমন্দ লাভ করতে কত মুনি ঋষি যােগী যুগ যুগান্তর কঠোর সাধনায় তোমার অন্ত পর্যন্ত পায় না—আর আমি বিশ্বের বর্জিত কুলত্যাগিনী পাপিনী রমণী হয়ে এত অল্প সময়ের মধ্যে তোমার নিকট সেই অমূল্য রতন লাভ করেছি। কে বলে আমি ভাগ্যহীনা। আমার মত সৌভাগ্যশালিনী রমণী জগতে কয়জন অাছে। গুরু এত কৃপা তোমার! তােমার কৃপায় ভক্তের ভগবানকে এত স্বল্পায়াসে পাওয়া যায়। সংসার ভারে প্রপীড়িত অন্ধ মানব। একবার ভেবে দেখ না যে গুরু কে? গুরুই নরাকারে ভগবানের অভিন্ন মূর্তি। যদি সংসারে থেকে বিন্দু মাত্র শান্তির প্রত্যাশা কর- তাহলে কায় মন প্রাণ গুরু পাদপদ্মে উৎসর্গ কর! গুরুই একমাত্র ভব কর্ণধার। বিষয় বিষে জরিত সংসারি ! যদি অনিত্য সংসারের -
নিমাই-সন্ন্যাস
দুচ্ছেদ্য মায়া শৃঙ্খল হাতে মুক্ত হতে চাও—তবে গুরু সেবায়, গুরুর তুষ্টি
সাধনে আপনকে উৎসর্গ কর ।
গীত।
অসার তবে সারাৎসার গুরু পদ তরণী যার।
বংস-পদ-নীর স্থির ভবপারাবার তার।
গুরুপদ বিশ্বাসী হলে, অপ্রাপ্য কি ভবতলে,
সাধন ধন আপনি মিলে নিধন ভয় থাকে কি আর ।
হরি হর কিম্বা ধা দেব রােষে গুরু শ্রাতা
বিপদে অভয়দাতা ঐপদ সম্পদ তার ।
নিমাইকে স্কন্ধে লইয়া মেঘমালীর প্রবেশ ।
নিমাই। হরিবােল! হরিবােল ! হরিবােল।
মেঘমালী। একি হল ? আমার সর্ব অঙ্গ রোমাঞ্চিত হচ্ছে কেন?
এই বালকে হত্যা করে-বালকের মুল্যবান অলঙ্কার অপহৃত
কবার জন্য গঙ্গাতীর হতে লুক্কায়িত ভাবে নিয়ে পালিয়ে এসেছি।
নরহন্তা নৃশংস দ্য আমি! বালকের অঙ্গ স্পর্শে আমার যেন দিব্য
জ্ঞান ফিরে আসছে। -না—দর অনুতাপ—বৈরাগ্যের সঞ্চার
হয় কেন ? আমি একে হত্যা করবে—এই মূল্যবান অলঙ্কারে আমার
দারিদ্র্যের মোচন হবে। এস বালক । তােমার অলঙ্কার উন্মোচন
করে-মায়ের নিকট বলি দেব
নিমাই। একবার হচিবােল বল ! হরিবোল! হরিবােল।
পার্বতী। দ্য! দাও, দাও, অমার অভিষ্টদেব বালককে
७२ নিমাই-সন্নাস একবার আমার কোলে দাও। হরি, হরি, এই যে আমার অভিষ্টদেব । মেঘমালী। পার্বতীকে এ যাদুকর! তুমি কি একে চেন? পার্বতী। এ যে বিশ্বের পরিচিত ! দস্ত! তুমি একে চিন না ? একবার দিব্য চক্ষে চেয়ে দেখ দেখি ঐ যে আমার গুরু প্রদত্ত অভীষ্ট দেবের প্রতিমূর্তিতে আর এই বালকের সাদৃশ্যে কোন প্রভেদ আছে কি ? মেঘমালী। তোমার বিগ্রহ মূৰ্ত্তি ত ঘাের কৃষ্ণ বর্ণ। আর এ যে গৌরবর্ণ। পাৰ্বতী। আবার চেয়ে দেখ—ঐ কৃষ্ণবর্ণ ই শ্রীগৌরাঙ্গ। মেঘমালী। পার্বতী, পার্বতী, একি ? কি জ্যোতির্ময় মহা- জ্যেতিঃ বালকের অঙ্গ প্রত্যঙ্গে! তবে কি সত্য সত্যই এই কালই অর, গৌরই কালো! আহা কি সুন্দর। কি দেখছি ? যন বিশ্বের সমস্ত সােন্দর্য বালকের উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় বর্ণকে চিত্রিত করেছে। পাৰ্বতি! পাৰ্বতি। হরি বল হরিবােল! হরিবােল ? যেন আজীবনের সঞ্চিত পাপরাশি এক হরি ধ্বনিতে কোন মহাশূন্যে অন্তহিত হয়ে গেল। কে আছ কোথায় ছুটে এস, ছুটে এস, এ অপূর্ব জ্যোতির এক কণা লাভ করে নয়নের জীবনের তৃপ্তি সাধন কর। হরি, আজ দম্বর মুক্তির জন্য গঙ্গাতীরে দাড়িয়ে দাড়িয়ে আমাকে অলঙ্কারের প্রলোভন দেখাচ্ছিলে ! চতুর! আর কেন চতু- আজ তােমাকে চিনেছি, গৌরাঙ্গ স্পর্শ আমার সমস্ত পাপরাশি ধৌত হয়ে গেছে। পাৰ্বতী তুমি তােমার নিস্পল চেতন- হীন অভীষ্ট দেবের সাধনা কর, আমি আমার মূর্তিমান জীবন্ত দেব- গৌর, রালি।
নিমাই-সন্ন্যাস তার পূত প্রতিমূর্তিখানি স্কন্ধে করে প্রভুর নির্দিষ্ট স্থানে রক্ষা করে আসি। তারপর দুজনে একত্র অভীষ্ট দেবের উপাসনা করব। হরি- বােল, হরিবােল, হরিবােল। নমঃ কমলকান্তা নমস্তে কলশায়িনে। নমস্তে কেশবানন্ত বাসুদেব নমােহস্তুতে। বাসনা বাসুদেব বাসিতং ভুবনত্রয়ং। সর্বভুতনিবাসিনং বাসুদেবং নমােহস্তুতে। নমাে ব্রাহ্মণ্যদেবায় গােব্ৰাহ্মণহিতায়। জগদ্ধিতায় শ্রীকৃষ্ণায় গােবিন্দায় নমাে নমঃ। ( প্রণাম ) পাধ্বতী। যশোদা দুলাল- এস নন্দলাল, কাঙালিনী মার বুকে এস। খেয়ে যারে ননি ওরে নীলমণি, তুই ফেরে মাের ননীর কাঙাল। ( নিমাইকে কোলে গ্রহণ ) নিমাই। তাই চল মা ! তােমার কাছে ক্ষীর ননী খেয়ে বাড়ীতে যাবাে ওগো তুমি দাড়িয়ে আছ কেন? হরি হরি বলনা। হরি নামেই যে জীবের মুক্তি। মেঘমালী। হরিবােল হরি। মায়ার পুত্তলি তুমি দেব নারায়ণ, আমি ব্রাহ্মণ নন্দন,
৪
নিমাই-সন্ন্যাস
এতদিন অন্ধকারে পড়েছি--
নরক নিবাসে
দয়া পরবশে, যদি এসে
দিলে নব প্রাণ,
তােমার মহিমা কেশব বুঝিব কেমনে?
সৃষ্টি স্থিতি লয় তোমাতে উদয়
জীব এড়ে শমন তাড়নে,
সেই হরি তুমি দানিছ অভয়
কি ভয় আর মুকুন্দ মাধব !
হরিবােল! হরিবােল।
পার কর ভবকর্ণধার।
( সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
জগন্নাথ নিৰে বাটী।
অগ্রে জনৈক অতিথি, পচাতে শচী ও জগন্নাথ মিশ্রের প্রবেশ।
জগন্নাথ। হে অতিথি নারায়ণ । মার্জন।
করুন!
রক্ষা করুন :
মার্জনা ভিন্ন আমি ঘোরতর পাপে লিপ্ত হবে।।
শচী। বাবা আমি তােমার কন্যা, কন্যা প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন না।
আবার আমি অনতি বিলম্বেই আপনার বন্ধনের উদযোগ করে দিচ্ছি।
এইবার দুষ্ট নিমাইকে আমি গৃহমধ্যে বন্ধন করে রেখেছি-অরি
আপনার অন্ন উচ্ছিষ্ট হবে না।
অতিথি। মা ! বার বার দুইবার তোমার নিমাই আমার প্রস্তুত
অন্ন উচ্ছিষ্ট করে অাহারে বিঘ্ন দান করূছে। অার কেন ? অাপনার
দুঃখিত হবেন না ! মঙ্গলময় ভগবানের ইচ্ছা নয় সে আজ অন্ন ভক্ষণ
করি—তাই বালক একবার নয় দুইবার তাতে বাধা দান করছে।
জগন্নাথ। হে ব্রাহ্মণ ! কৰুণার অবতার! অজ্ঞানের অপরাধ
মার্জনা করুন। আমি প্রাণ থাকতে সহ করতে পাবাে না যে
আমায় গৃহ হতে অতিথিরূপী নারায়ণ শুষ্ক মুখে প্রত্যাগত হবেন।
নিমাই সন্ন্যাস
শচী।
চল নারায়ণ দাসীর বাসনা পূর্ণ করবেন।
অতিথি। তাই চল মা! তােমার
তােমার ঐকান্তিক ভক্তির বন্ধনে
আমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করেছে।
জগন্নাথ ও শচী (সাগ্রহে । তবে আসুন দেবতা।
( সকলের প্রস্থান।
নিমাইয়ের প্রবেশ।
গীত।
আমার নামে বাঁধন ছােটে তবুও আমি বাধা রই.
ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণ তরে সকল ব্যাথা নিজে সই।
সদাই সবার কাছে থাকি আমায় বুঝিতে পারে কই,
আমায় যে যা বলে ডাকে সেই ভাবেতে তারই হই,
যে ভার যে জন আমায় দেয় সে ভার আমার মাথায় বই।
নিমাই। ঐ-ঐ-ভক্ত তার, সযত্নে প্রস্তুত অন্ন আমাকে উৎসর্গ
কছে। যাই—এই ভক্ত, তােমার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে।
[ প্রস্থান ।
নেপথ্যে অতিথি। একি, একি! আবার তুমি আমার অন্ন
উচ্ছিষ্ট করে দিলে?
নেপথ্যে নিমাই। এই যে তুমি আমায় ডাকলে।
নিমাই সন্ন্যাস
*)
অতিথিসহ নিমাইয়ের প্রবেশ।
অতিথি।
তবে কেবা তুমি হরি।
নর দেহ ধরি,
পুনঃ পুনঃ ছলহে জমায়।
বুঝিয়াছি এবে দয়াময়,
কোন জন তুমি ধরায় উদয় !
ত্রৈলােক্য পূজিত না
সদা বিজয় বৰ্ধন
শান্তিং কুরু গদাপানে,
লক্ষ্মীনাথ নমহস্তুতে !
পাপহং পাপ কৰ্ম্মাহং
পাপষ্ম পাপ সবং ;
ত্রাহিমা পুণ্ডরীকাক্ষ
সর্বপাপ হর হরি।
নিমাই। এই তো তােমাদের দোষ। মই—দেখি আবার কে
থায় নৈবিদ্দি নিয়ে মাথা কুড়াকুড়ি করছে।
; স্থান।
অতিথি।
ধন্য ধন্য হরি ।
মদনমােহন! হেন রূপ নাহি কোথা হেরি,
রূপে গনে। মন প্রাণ
প্রেমের তুফান আপনি প্রবাহে,
ধন্থহে করুণা,
নিমাই-সন্ন্যাস
সার্থক নদীয়া আগমন মাের,
হেরিনু গৌরাঙ্গ
ভাব রঙ্গে প্রভু মাের দিয়েছেন দেখ।
এই নবদ্বীপে
অন্ধ কিরে সবে?
চিনিবারে নাহি পারে-
চিন্তামণি ধনে ?
অবতারে যাহা প্রয়োজন,
হেরি মিশ্রের নন্দনে
সে সব লক্ষণ।
নিশ্চয়—নিশ্চয়—পূর্ণব্রহ্ম নটবর ধরায় উদয় ।
( গমনােদ্যত
দ্রুতপদে জগন্নাথ মিশ্র ও শচীর প্রবেশ।
জগন্নাথ। ঠাকুর এ বারেও আপনার আহার হয় নাই ! শ
শচী, সর্বনাশ হয়েছে। দুর্ভাগ্যের গৃহ হতে আজ অভুক্ত অতি
প্রত্যাগত হচ্ছেন!
অতিথি। ব্রাহ্মণ, আপনি ভাগ্যবান্। পূর্ণব্রহ্ম আপনার পুত্র
গৃহে বিরাজিত ! আর আমার আহারের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই
নিমাইয়ের উচ্ছিষ্ট অনুই-মহা প্রসাদ ! আমি এই বার বার তিনব।
যেমন আহারে উপবেশন করে আমার ইষ্টদেবকে অন্ন উৎসর্গ কর
যাই তখনই মনে হয় আমার ইষ্টদেব প্রসন্ন হয়ে বালক নিমাই
আমার অন ব্যঞ্জন ভক্ষণ করছেন। তােমার পুত্রই আমার ইষ্টদেব
নিমাই-সন্ন্যাস
শুধু আমার কেন তোমার নিমাইয়ের আগমনে আজ নদীয়া ধন্য হয়েছে।
দেখবে তােমার ঐ পুত্ৰই এই বিশ্ব ব্রাহ্মণ্ডকে পবিত্র
করবে ! ধন্য তােমরা ! ধন্য তোমাদের সাধনা। পুত্ররূপে
গবানকে লাভ করেছ। এখন এক কাজ করতোমরা দেব
দেবী আমার সম্মুখে দাড়িয়ে আমার বাসনা চরিতার্থ কর—আমি
তােমাদের প্রণাম করে বিদায় গ্রহণ করি।
[ প্রণাম ও প্রস্থান।
শচী! অাচাৰ্য ! আচাৰ্য !
অত নেহারি সকাল নিয়ে !
থ। বুঝিবারে নারি
অবোধিনী নারি।
নাহি আর নিময়ের আশা ।
বিশ্বরূপ গেছে
ভঙ্গিয়াছে হৃদয় পঞ্জর,
অস্থিমাত্র সার,
নিমাই আবার কখন কি করে বসে !
জগন্নাথ। প্রিয়ে ! অপত্যমেই এরূপ অন্ধ বটে ! তাই আমরা
নিমাইকে বুঝেও বুঝতে পারছিনা।
শচী। হঁদেখ! আমার তোমার নিকটে একটা ভিক্ষা আছে।
জগন্নাথ। ভিক্ষা আবার কি।
শচী। নিমাইকে পড়তে অনুমতি দাও! তুমি নিজে গিয়ে
টোলে ভর্তি করে দিয়ে এস।
নিমাই-সন্ন্যাস
জগন্নাথ। তাই হবে।
শচী। টোলে গেলে তবু একটু বাঁধা বধির উপর থাকবে
তা না হলে দুষ্ট প্রকৃতি নিমাই দিন রাত্রি দুষ্টামি করে বেড়ায় ।
জগন্নাথ। শট, আর একটা কথা। আমি মনে করছি এই
নিমাইয়ের উপনয়ন দোব। সে জন্য গ্রহাচার্য্যের বাড়ীতে বাবার
বিশেষ প্রয়ােজন ! আমি এখনি কিরছি ।
| প্রস্থান।
শচী। হায় বিশ্বরূপ ! কোথা তুমি :
গত কথা কত জাগে মনে,
ব্রহ্মচারী সেজে
ভিক্ষা মেগে ছিলে
আজও ভুলি না তাহা।
( রােদন)
নিমাই সহ জনৈক গণকের প্রবেশ।
নিমাই। মা-মা-এই দেখ, এক গণক ঠাকুরকে ধরে এনেছি।
বল না মা-ওকে গুণতে !
শচী। আসুন ব্রাহ্মণ ! এইখানে উপবেশন করুন।
নিমাই। ইগাে গণক ঠাকুর তোমার এই ঝুলিতে কি আছে ?
(ঝুলি গ্রহণ করিতে উদ্যত )
হারে—নিমু—একি করছিস ! ব্রাহ্মণের সঙ্গে অমন ধারা
কতে আছে। তাের কি সবটাতেই দুষ্টপনা, ব্রাহ্মণকে প্রণাম কর ।
নিমাই। গণক ঠাকুর—খুব তো জাকজমকে চেপে বসলে এখন
শচী।
নিমাই সন্ন্যাস
১
বল দেখি—আমার হাত দেখে আমি এর আগের জন্মে কি জাত
ছিলুম।
( হস্তু দেখাইলেন)
শচী। এ কিরে নিমাই ! . উপনা করছিস্ কেন ? স্থির হও না
বাবা। আগে ব্রাহ্মণ ঠাকুর একটু বিশ্রাম করুন।
গণক। ( নিমাইয়ের হস্ত দেখিয়া ) - তুমি পূর্বজন্মে গয়লার
ছেলে ছিলে ।
( সহসআশ্চর্য হইয়া )
(স্বগত) একি একি ।
লীলাময়, একি রঙ্গ দাস সনে ?
এতদিনে---
সফল জন সল করম
স্পর্শে তব ঘুচেছে বিকার ,
নিত্য নিকিকার মাধব তুমি,
তােমারি কৃপায় চিনেছি চিন্ময়।
এধিবারে রাধঋণ রায় উদয়
ত্যজি কালরূপ হয়েছ গৌরাঙ্গ সুন্দর ;
হরি! হরি !
দাও স্থান শ্ৰীপনে তােমার।
( নিমাইয়ের পদতলে পতন )
শচী। ঠাকুর, একি করছেন অন্ধের ষষ্ঠী বাছায় আমার :
অকল্যাণ হবে যে।
গণক। মাগাে ভাব চিতে অকল্যাণ কার।
৭২
নিমাই সন্ন্যাস
গুণতো ঠিক
এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড যাহার কল্যাণে
সুবিধানে হতেছে চালিত,
সেই জগৎ পৃজিত বরণ্যে ধীমান
মান্ নিমাই তব !
শচী। বেশ! ঠাকুর বেশ!
নিমাই। তা হলে তুমি বলতে পারলে না যে আমি এর আগে
কে ছিলুম ! দেখ ঠাকুর, যাত-বলে নিমাই কখনও ধুবে না।
ও সব ভাড়ামি করো--অন্য জায়গায়, গণক যদি
দোরে দোরে মাগতােনা ভিক্। এখন এক কাজ করতােমার ঐ
বুচকি ভালােয় ভালােয় রেখে নিজের পথ দেখ গে যাও!
( ঝুলি কা৬ি। লই)
শচী। ওমা!
ওমা! একিরে! ছাড়—ছাড়-হতভাগা ডিংরে ছেলে।
ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব মানতে চান। সকলের সঙ্গেই বিটলেমি। সরে আয়
হতভাগা ছেলে ! কখন কার মন্নিনে পড়বি ।
নিমাই। তবে আমি দেখাচ্ছি মজা।
(গৃহমধ্যে গমন বিষ্ণুসিংহাসন হইতে বিগ্রহ
মূর্তি ফেলিয়া দিয়া উপবেশন)
রাধা শ্যাম বসেছেন কদম্ব তলে
দেখে কার না মন উথলে ?
শ্যামের বাঁশী
বলছে রাধা,
রাধা বাসায় কাল বলে।
দেখৰে ব্ৰজ বিলাসিনি,
নিমাই-সন্ন্যাস
কুল দিব আয় কালার কুলে !
বহিছে উজানে ধারা
কুঞ্জে সারি মাতােয়ারা,
ফুলের বাণে তরবি যদি
প্রেম ফুল দে পাদমূলে।
{ জগন্নাথ মিশ্রকে দেখিয়া পলায়ন।
জগন্নাথ মিশ্রের প্রবেশ।
শচী। হের মিশ্র কিবা সর্বনাশ
ইয়েছে নিমাই তোমার ?
বাবা রঘুনাথে-
ফেলি সিংহাসন হতে
এসেছে দুর্ভাগ্য প্রভুর আসনে।
কি হবে কি হবে নাথ !
যাবে যাবে সব যাবে
দেব অভিশাপে কিছু না রহিবে
গৃহবাস সকলি মজিবে,
কোন ভাবে বাঁচাব নিয়ে !
জগন্নাথ। অহে ! বংশে শন জন্মেছে পাংশুল,
পুত্র হতে যায় জাতি মান কুল !
হেন পুত্রে শাস্তি দিব যথােচিত।
দেখি কোণ গেল দুর্ভাগা নন্দন।
( গমনােদ্ধত )
৭৪
নিমাই সন্ন্যাস
গঙ্গাদাস পণ্ডিতের প্রবেশ।
গঙ্গাদাস । কোথা যাও মিশ্র।
হয়ে ক্রোধ পরবশ ?
দেখিলাম পথে উদ্ধশ্বাসে ছুটিয়ে নিমাই,
কারণ শুধাই-শুধু বলে ওই পিতা আসে ।
জগন্নথ । হে পণ্ডিত মান ।
এক পুত্র লয়ে পড়েছি ফাপরে,
নিময়ের অত্যাচারে
না পারি তিষ্ঠিতে—
দুর্ভাগ্য সন্তান নাহি কোন জ্ঞান
সিংহাসন হতে প্রভু রঘুনাথে
ফেলি ভূমিতলে—
বসে কুলাঙ্গার প্রভুর আসনে।
গঙ্গাদাস। হে মিশ্র !
নাহি দোষ হেরি নিমাইয়ের ইথে ।
স্বভাবতঃ বালক চঞ্চল,
তাতে নিমাই তােমার--
দুষ্ট হয় কিছু!
পিতা তুমি তার,
বিদ্যা উপার্জনে হও প্রতিবাধা,
সঙ্গত নহেক ইহা !
তীক্ষ্ণ বুদ্ধি নিমায়ের তব।
নিমাই-সন্ন্যাস
একদিনে পাঠ করে যাহা,
বৎসরেও সম্ভবেন। অন্য জনে তাই ।
সেই পুত্র মুখ করি-
রেখেছ গৃহেতে,
এখনও সময় থাকিতে
দাও পাঠশালা, বিদ্যাভার বিনা---
অশান্ত নিমাই নাহি হবে স্থির।
পুত্রে তব করহ অর্পণ মােরে
নিময়ে পণ্ডিত করে দিব ফিরে আসি ।
জগন্নাথ। পণ্ডিত প্রধান !
তব উপদেশ শিরােধার্য্য মানি,
করিয়াছি স্থির
নিমায়ের দোব যজ্ঞ উপ বাত,
পরে যা হয় বিহিত করিও তুমি।
গঙ্গাদাস। তাই হবে। ইনি কেবা ?
গণক। সামান্য গণক আমি।
জাতিতে আচার্য্য !
গঙ্গাদাস। বুঝিলাম তুমি অতি বুদ্ধিমান
বল দেখি গণক প্রধান
কেবা আমি কোন সুত্রে জনম আমার!
গণক। প্রভু ! তুমি অতি ভাগ্যবান!
হইবে পূজিত জগৎ মাঝারে-
পূবনপাড! সুদ পম্মিলনী
নিমাই সন্ন্যাস
মিশ্রের নন্দনে পাঠাভ্যাস দিয়ে।
নহেক সামান্য শিশু মিশ্রের তনয়
দরাময় পরব্রহ্ম অবতীর্ণ
দীনের তারণে!
সেই হরি-গুরু হবে তুমি
এই হেতু জন্ম নদীয়ায় !
জগন্নাথ । তবে অাসি পণ্ডিত মশায়,
দেখি দুরাচার কোথা গো !
গঙ্গাদাস। 5আমরা ও যাবো।
মাকড়
সকলের প্রস্থান
'
হাওড়!
} স্থাপত- স. ০৩৩ সাল :
দ্বিতীয় দৃশ্য
পথ
নিমাইয়ের হস্ত ধরিয়া মুরারি গুপ্তের প্রবেশ ।
মুরারি। আজ দুষ্ট নিমাইকে ধরিয়াছি। আজ তুহারে দেহে
লিমু। ওরে কুলাঙ্গার মিশ্রের পলা! তুই মাের অনুপাত্রে প্রস্রাব ত্যাগ
করমু যে। তোরে হত্যা করমু।
নিমাই। বলি গুপ্তের পােলা। এত চটিছ ক্যান্। তুমি জীব ও
ব্রহ্মে এক করূতে চাও? তুমি যদিই ব্রহ্ম হইছস-তবে বিষ্টা মুত্রে ঘণ
হয় ক্যান্? বিষ্টা মুত্রকে চন্দন জ্ঞান না করলে তোমার ব্রহ্ম ভাব
আছে কেমনে? অগ্রে আমারে বােঝাও -তারপর যা হয় তা করমু?
তুমি যখন আমার উপর চটিয়া কহিলে যে ব্ৰহ্ম ও জীব একই বস্তু --তখন
তাে আমি কহিয়াছিনু তােমার ভােজন কালে দেখে লইমু ! এখন
উন্ট। গাও ক্যানে।
মুরারি। ( স্বগতঃ ) কে এ পােলা! আমার যে একটি কথা
কহিলার ক্ষমতা রহিল নাহ। -সত্যই তো জীব ও ব্রহ্মে কিরূপে
এক হইবা! এ তো হইতেই পারে না? কে কে পােলা তুমি,
তুমি তাে সামান্য নও মিশ্রের পােলা রূপে কোন দেবতার
আবির্ভাব হইছে। আহা কি মধুর জ্যোতিরে যেন অঙ্গ হইতে
ঠিকরাইয়া পড়িছে। দয়াময় ! আমায় মার্জনা কইর্য। এই অধনের
৭৮
নিমাই-সন্ন্যাস
একটা উপায় করেন। আমি বৃদ—তােমার পিতৃ তুল্য আমার অপরাধ
নমঃ নমঃ জ্যেতির্ময় নিত্য নিরঞ্জন,
নম; রাম অপরূপ সত্য সনাতন।
নমঃ নমঃ নররূপী নৃসিংহ বামন,
নমঃ নমঃ দপহারি মধুসূদন।
নমঃ নমঃ জনার্দন রাধা রমণ,
নমঃ নমঃ রামেশ্বর বৈকুণ্ঠ শােভন।
নমঃ নমঃ নারায়ণ মুকুল মুরারী,
নমঃ নমঃ আত্মারাম ভক্তির ভিখারী ।
নমস্তে অব্যক্ত রূপ অচিন্ত্য মহিমা,
নমস্তে অনন্ত শক্তি যার নাই সীমা।
{ প্রণাম ও প্রস্থান ।
নিমাই। যাও মুরারি ! তোমার এই দিব্যজ্ঞান সত্যের আলোকে
উদ্ভাসিত হোক।
জগন্নাথ মিশ্রের প্রবেশ।
জগন্নাথ। রক্ষা কর বাপ নিমাই আমার,
অনিবার কেন দিস এত জ্বালা !
বিশ্বরূপ ভেঙ্গে দেছে হৃদয় পঞ্জর ;
আর তুই তিলে তিলে দগ্ধে দগ্ধে মার।
নিমাই। না—আমি বাড়ী যাবাে না।
জগন্নাথ।
চল বাবা ।
নিমাই-সন্ন্যাস
কল দিব উপবীত
চন্দ্র তারা শুদ্ধ সব অতি শুভ দিন।
তারপর মন দিয়ে বিদ্যা শিক্ষা কর,
আদেশ আমার পুনঃ চতুষ্পাঠী যেও।
নিমাই। বাবা—আমি গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে পড়বে।
জগন্নাথ। তাই হবে বংস। এই মাত্র তিনি আমাদের বাড়ী
এসেছিলেন। আমিও তাকে বলে দিয়েছি—অাগামী কল্য নিমা-
য়ের উপনয়নের দিন স্থির ক'রেছি ! উপনয়ন ক্রিয়া সম্পন্ন হলে
আপনার চতুষ্পাঠীত নিমাইকে পাঠিয়ে দেব।
( সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য নগর প্রান্তভাগ অদ্বৈত অদ্বৈত অাচার্য্যের প্রবেশ। পাতি পাতি চারিদিক করি সন্ধান বিশ্বরূপে না হেরিনু কোথা ! যাহারে সুধাই- কেহ বলে জানি নাই, হেরি নাই সেই মধুর মুরতি ! আহ! কি অপরূপ, বিশ্বরূপ জ্যোতি। ভুলিবারে নারি সে রূপ মাধুরি- থেকে থেকে কেঁদে উঠে প্রাণ ! মিশ্রের ঘরণি রহে মম প্রতীক্ষায়, কি জানি কি হয়, কহিব যখন তারে নাহিক সন্ধান বিশুর তােমার। আহা ! বোধ হয় নারী, পুত্রশােকে হবে বিগত জীবন! ব্রাহ্মণ জগন্নাথ হইবে উন্মাদ, প্রভু নিমাই আমার ; দাদা- দাদা-
নিমাইসন্ন্যাস
৮১
উচ্চতরালে কঁাদাইবে জগতের জীবে!
সে মর্মভেদী শােকচ্ছবি হেরিব কেমনে!
আহা ধন্য সতী শচী তুমি !
পুত্র সব কৃষ্ণময় প্রাণ
হেন গুণবান সুত কার গৃহে রহে।
শ্রীবাসের প্রবেশ।
বাস। এই যে প্রভু ! বিশ্বরূপের কোন সন্ধান পেলেন ?
অদ্বৈত। না--শ্রীবাস !
কোথা পাব তারে,
সে যে রে কৃষ্ণ ভক্ত।
শ্রীবাস।
কৃষ্ণময় প্রাণ যার
এ দুর্ভাগ্য তার তত্ত্ব কেমনে করিবে ?
হায় প্রভু! তবে বােধ হয় শচীমাতা আর বাঁচবেন না।
এইমাত্র তার সঙ্গে আমার সাক্ষী হয়েছিল। আগামী কল্য নিমাইয়ের
উপনয়নের দিন স্থির হয়েছে। মা শচীদেবী বিশ্বকাপের জন্য উন্মাদিনীর মত
নদীয়ার প্রতি দ্বারে দ্বারে ছুটে বেড়াচ্ছেন--যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে—তাকেই
বছেন এই আনন্দের দিনে যদি কেউ আমার বিশ্বরূপের অনুসন্ধান করে
দেয় তাহ'লে আমি চিরদিন তার দাসী হয়ে থাকবে ।
অদ্বৈত। হয় পুত্ৰমতা ! তােমার যন্ত্রণা দেখলে পাষাণেরও বক্ষ
বিদীর্ণ হয় !
নেপথ্যে। হরিবােল! হরিবােল। হরিবােল ।
৮২
নিমাই সন্ন্যাস
অদ্বৈত। ঐবাস কে এ হরিভক্ত।
হরিদাসের প্রবেশ ।
হরিদাস ।
গীত।
হরিবল, হরিবল, দিন যে গেল রে বয়ে !
শুধু দিন নাহি যায়-তাের জীবনের খেলা যার রে ফুরায়ে।
দিয়ে করতালি আয়না সব হরি হরি বলি
আয় আয় আয়—ওরে দিন চলে যায়,
কোন কাজে কাটাইলি দিন মানব জনম লভিয়ে ।
এস রিভক্ত প্রেমিক সুজন,
দাও দাও আলিঙ্গন।
অদ্বৈত। বৈষ্ণবের চূড়ামণি
মনে গণি—হরি প্রেমে মাতােয়ারা তুমি।
দাও পরিচয় ঘুচাও সংশয়
কোন মহাজন নদীয়ায় হইলে উদয়
হরিদাস। প্রভু দাস আমি !
এইমাত্র মাের পরিচয়
জানিয়াছি বিধিমতে
এই নদীয়ায় প্রাণ কৃষ্ণরায়--
লভিয়া জনম-রহে গুপ্তভাবে !
জাগিবে স্বরূপে এবে-
মহাসুপ্তি ভাঙিবে জীবের
?
?
নিমাই-সন্ন্যাস
৮৩
অদ্বৈত।
---
শ্ৰবাস ! শ্রীবাস।
শােন-গােন-মিথ্যা নয়-
আমান মাের।
চল হে সত্বর দেখিগে ত্বরায়
নরদেহধারী গৌরাঙ্গ সুন্দরে।
বল হরিবােল-বল হরিবোনা।
বৈষ্ণবের আজি এ মিলনে
ধন্ঠ ধন্য মাের।।
বল—বল হরিবােল হরিবােল ।
সকলে। হারবাল ! হবিবা! রিবো!
চতুর্থ দৃশ্য উপনয়ন স্থল। জগন্নাথ, শচী, প্রতিবেশিনীগণ ও নিমাইয়ের প্রবেশ ১ম প্রতি। মরি মরি কি সুন্দর । নব ব্রহ্মচারী সাজে নিমাই মুরতি হারমানে সূৰ্য্যকান্তমণি। দীনমণি যেন কনক কিরণচ্ছটা-- বিকাশিছে দশদিশ। গৈরিক বসনে ঘেরা গাের অঙ্গখানি, শােভে যেন স্বর্গের বিভবে। মনে হয়—দিবানিশি হেরি এই অতুলন কান্তি মনােহর। ২য় প্রতি। আর হের দিদি, মুণ্ডিত মস্তক, শিরে শিখা, যজ্ঞ-দণ্ড করে, মৃগচর্মে যজ্ঞ উপবীত, হেরি জাগে-মনে- নিমু নহে মর্ত্যের বালক। আপনি ব্রাহ্মণ্যদেব- -
নিমাই-সন্ন্যাস
লাঘবিতে ধরাভার
উদয় অবনীতলে।
১ম প্রতি। সত্য তাই-তৃপ্তি নাহি পাই
তবার হেরি নিমাই সুন্দরে !
খি চায় সতত হেরিতে
ওই হেমতনু-প্রভাত অরুণ।
ওগাে মিশ্র দিদি নিমাই জননী তুমি ।
ভিক্ষা দাও অর্থে
নয়ন নন্দন নিময়েরে তব ;
পরে মন সাধ করি গো পূরণ মাের!:-
ভিক্ষা দিয়া নব ব্রহ্মচারি ।
জগন্নাথ। ব্রাহ্মণি ! তুমি নিমাইয়ের গর্ভধারিণী! দাও দাও তুমি
অর্থে আমার নিমাইকে ভিক্ষা দাও!
২য় প্রতিবেশিনা। শচী! তুমি আগে ভিক্ষা দাও! তারপর আমরা
দেব! তুমি নিময়ের মা, তােমায় অাগে ভিক্ষা দিতে হয়।
কাদে প্রাণ ধৈরব ধরিতে নারি!
জাগে মনে সেইদিন
এই শুভদিন আর একদিন
হয়েছিল সমাগত
বিশ্বরূপ সেজেছিল যবে এই
ব্রহ্মচারী সাজে!
জগন্নাথ। শচী! রােদন সংবরণ কর! দাও-দাও—নিমাইকে
শচী।
নিমাই সন্ন্যাস
আমার ভিক্ষা দাও ! ভিক্ষ! দাও। নিমাই বলত বাবা “ভবতি
ভি? দেহি”।
নিমাই। “ভবতি ভিক্ষাং দেহি ! ভবতি ভিক্ষা দেহি ভবতি
ভিং দেহি” ।
সহসা ছদ্মবেশিনী ভগবতীর প্রবেশ।
( সকলে নির্বাক বিস্ময়ে চাহিল—নিমাই বলিল—“ভবতি ভিক্ষ।
দেহি”। ছদ্মবেশিনী ভগবতী নিমাইকে ভিক্ষা প্রদান করি। অনুহিত
হইলেন। তৎপরে ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণবেশে দেব দেবীগ। প্রবেশ করিলেন ।
গীত
দেবগণ। নমো নমো নমো লীলময় হরি নবীন ব্রহ্মচারি।
দেবীগণ। তােমার লীলার অন্ত পাওয়া ভার মাের। জ্ঞাননি। নারী
দেবগণ। বলিরে ছলিতে হইলে শীনাথ বামন বেশধারী।
দেবীগণ। ব্রজধামে তুমি হলে ব্রজনাথ গােপিনী মনােহারী ।
দেবগণ। যুগে যুগে তুমি ধর নবরূপ কেশব মাধব কংসারি।
দেবীগণ। ধর ধর প্রভু ধরহে ভিক্ষ। প্রেম-অশ্রুবারি।
সকলে। নমঃ নমঃ নমঃ ব্রজবিহারী নবীন ব্রহ্মচারী।
( অন্তর্ধান!
জগন্নাথ ! একি ! একি! শচী! দেখ, দেখ, কি স্বর্গীয় জ্যোতি
এদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গে! চকিতে এল—বিদ্যুতের মত চকিতে অন্তর্হিত হলেন।
স্মরণ হয় কি দেবী-যে শুভমূহুর্তে নিমাই আমার জন্ম গ্রহণ করেছিল সেই
দিন এই মহাত্মাদের শুভাগমনে আমার অন্ধকারময় কুটীর খানি স্বর্গের
নিমাই-সন্ন্যাস আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল ! হায়! হায়! মৃঢ় আমি ! কি কলুম ! চিনতে পারলাম না ! যোগীর চিরঞ্জিত দেবদেবীর সাকার মৃতির অভ্যর্থনা হ'ল না ! মহাপুরুষদের আগমনে জড়ের মত স্থির নিশ্চ হয়ে পড়েছিলাম ! একটা কথা ? কইবার শক্তি হ'ল না! যাই- বাই শচা-দেখি যদি তাদের দর্শন পাই--আবার ফিরিয়ে আনছি। | প্রস্থান । শচী। অবাক্ .: কি যেন একটা কিসের অভিনয় হয়ে গেল । প্রতিবেগ ! তত—তাইত আশ্চয্য-আশ্চৰ্য্য বটে। নিমাই। | ভাদাও—ক্ষাদাও ! গীত ভিক্ষা দেনা ভিক্ষা দেন আন কে গো ব্রহ্মচারী নিভখারী । ভক্তি করে যে যা নাহ। দেয় তার দ্বারে দ্বারে ফিরি । ভক্তির শৃঙ্খলে বাপে ব্রজবাস তাই তাদেরে এত ভালবনি, (ওগাে) তাইত আসি মন মানে না কোথাও যে গো থাকতে নারি। ( ভাবে তন্ময় হওন) শচী। ওমা-ওমা-ছেলে এমন করে কেন ? নিমাই। এ-এ-কোথ। আমি । কোথা সেই বুজধান, কোথায় শরাব, কোথা সেই প্রেম বৃন্দাবন সেই নিধুবন ! বহে যেথা অননের ধারা
৮৮
নিমাই-সন্ন্যাস
শচী।
অবিরাম
কল কল্ নাদে !
কোথা সেই চিন্ময়ী শ্রীরাধে
বাধা আমি যার চরণে সতত!
ওগাে ওগো বল সবে
কোথা গেলে পাব দেখা
ভালে যার লেখা কৃষ্ণনাম শুধু
মুহূর্তে কৃষ্ণের আদর্শনে
ঝরে যার পদ্ম অাখি দুটা
কোথা দেখি সেই রাই ধনি।
কোথা রাই কোথা রাই সে আমার !
ও দিদি ! দেখ না সব ! নিমাই আমার এমন করছে
কেন ?
প্রতিবেশিনীগণ। ওগো তাই তাে গে। এ যে লক্ষণ ভাল বলে বােধ
হচ্চে না! নিমাই—নিমাই--
রাই ! রাই ! রাই!
প্রাণেশ্বরী ব্রজেশ্বরী রাই।
প্রতিবেশিনীগণ। বাবা! চুপ, কর, ঐ যে সব কে ভিক্ষা দিতে
আচে !
ব্রাহ্মণ বালিকাবেশিনী ভিক্ষাপাত্বহস্তে দেববালাগণের প্রবেশ।
গীত
আয় অয় ভাই গোরাচঁাদে ভিক্ষা দিয়া যাই।
নিমাই পাশে আয় না ঘেসে (যদি) কিছু শিখতে পাই।
নিমাই ।
নিমাই-সন্ন্যাস
নিমাই নাকি ব্ৰজের গোপাল
নবীন কাঙাল চিরদিন,
কি তাই ? প্রেমের গুরু স্নেহের অধীন,
হাতে আছে বাধার বীণ,
সেও তাে ভাল রাধার পায় ধরে যে গো প্রেমে ইনি এতই দীন।
ছিঃ ছিঃ ছিঃ লাজে মরি ওগো ও প্যারীর হরি
এখন ভিক্ষা নাও গাে ব্রহ্মচারী অামরা এবে আসি ভাই।
[ নিমাইকে ভিক্ষা প্রদান ও প্রস্থান।
জগন্নাথ মিশ্রের প্রবেশ
!
জগন্নাথ । শচী শচী দেখবে চল দেবি ! আজ অামরা পন্য হয়েচি—
তােমার নিমাইকে আশীর্বাদ করতে কত বিদেশী ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণী দরিদ্রের
কুটীরে সমাগত হয়েছে!
১ম প্রতিবেশিনী। চল ম শচিরাণি ! এখন ব্রহ্মচারীকে ঘরে নিয়ে
চল!
২য় প্রতিবেশিনী । ছেলে-যেন এমনই হয় ! এমন না হলে ছেলে!
একছেলে জগৎটা আলো করে রেখেছে।
[ সকলের প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য রাজপথ। মদ্যপাত্র হস্তে জগাই ও মাধাইয়ের প্রবেশ । জগাই । ওরে বেট! মধা । বলি—এ সব হল কি ? মাধই। শালার বৈরেগী গুলােকে কি ভূতে পেলে নাকি ? জগাই। আর তো শালাদের কিলি মিলি কাণে ঢোকে না বা ! মাধাই। কাণের পােকা বেরোবার যােগাড় হয়েছে । জগাই। আবার বুঝি শালাদের মূর্তিগুলাে দেখিনি - মাধাই। কি রকম--কি রকম- জগাই। গোপ কামিয়ে শালারা সব--এক একটা কিস্তৃত কিমাকার হয়েছে। মাধাই। ওরে ও সব শালাদের চাল ! এক কাজে শশা বেচাকে—শশা বেচা আর বষ্টমীর দল জোটান! শালারা সব বষ্টমী সেজে দাঁড়িয়ে থাকবে—আর আসল বষ্টমীর দল শালাদের দলে ভিড়বে—তা হলেই বাস-কৰ্ম্ম ফরসা ! জগাই। দেখ মধা! একটা কাজ করূলে হয়। তা হলে শালারা কিন্তু অাচ্ছা জব্দ হয়ে যায়। মাধাই। কি বতােবলে ফেল—বলে ফেল! জগাই। দেখ, আমরা দু’জন বষ্টম সাজি আয় ! খুব ভক্তির বহর দুই হবে !
নিমাই-সন্ন্যাস
দেখিয়ে মুখে হরি হরি বলে একটা মহােৎসবের জোগাড় করবো। পটার
রে। আর পাটার রক্তে চিড়ে কলা মাসাতে না ভিজিয়ে সেই গোড়াবেটা
অদ্বৈত ঠাকুরকে বলবে হে মহাপ্রভু ! প্রভুর দ্বিতীয় অবতার ! সংসার
ভারাক্রান্ত এই দীনদুজনে মোদের একটু কৃপানয়নে সন্দর্শন করুন! দীন
ভক্তের বহু যত্নে সংগৃহীত প্রভুর এই খাদ্য অর্থাৎ মালসাভােগ প্রভুকে
উৎসর্গ করে—অগ্রে আপনি মহাপ্রসাদ ভক্ষণ করতঃ—অণমদের প্রাণ
করুন! তাহলে বেটাদের জা জন্য সব যাবে! ভারি রগড় হবে কিন্তু।
মাবাই। আচ্ছ। জগা। ঠিক-ঠিক্ তাের মাথা যেন মাতা।
জগাই। এই মাথা যদি মাতা না হতো—তা হলে কি বাবা এই
নদীয়ার অদাড় পদড় ঘর ঘাট করতে পারতুম ।
মধাই : আচ্ছ। জগা তুই একটা গান গাইতে পারি ? দেখি
তাের কেমন মাতা!--কিন্তু বাবা--বলে রাখছি পুরোনাে মান্ধাত
অমলের যা তা গান গাইলে হবে না। একেলের সভ্য-ভব্য নব্য
গোছের সঙ্গীত গাইতে হবে। তবেই বুঝবে। যে ই মা-তা বটে।
জগাই। বড় দুঃখু ; মাধশাল এখনও আমার মাতার বহরটা
বুঝলিনি। শোন—দেখ—
গীত
( উচ্চকণ্ঠে কর্ণযুগলে হস্ত দিয়া)
অাহা।-প্রেমময়ী মদরে—তার জনম কোথা।
মাধাই। থামথামবেটা। ঐ সব কে আসছে, আয় আয়
আমরা লুকোই গিয়ে দেখি শালারা কে ? ওৎপেতে থাকবে, আর
নিমাইসন্ন্যাস
সুযােগ সুবিধে পেলে-শালাদের টাকে যে সিকিটা দুয়ানিটা পাওয়া
যাবে বুঝলি-
জগাই। আহা!-আমার কি সঙ্গীতটাই না মাটা করলে
(গীতের পুনরাবৃত্তি)
আহা প্রেমময়ী মদরে-
মাখাই। ( বাধা দিয়া) শালার মাথারে। নেশা চটে গেল—কিছু
জোগাড় করি 'আয়নারে।
[ জগাইকে সবলে টানিয়া লইয়া প্রস্থান।
.
ভিক্ষাঝলি স্কন্ধে দুইজন বৈষ্ণবের প্রবেশ ।
বৈষ্ণবদ্বয়। হরিবােল। হরিবােল। হরিবােল।
১ম বৈষ্ণব। বলি ভায়া আজ কি রকম হ’ল।
২য় বৈষ্ণব। প্রভুর যা ইচ্ছা ভাই, তার বেশী আর পাব কোথা।
১ম বৈষ্ণব। • মার তো আজ কিছুই নয় বল্লেই হয়। তিনটে
পয়সা আর আধ পো চাল ডাল। যাক তাতেই ভগবানের ভােগ দিয়ে
পুত্র পরিজন নিয়ে আজকের দিনটা কাটিয়ে দোব। তাের কি রকম
ভাই।
২য় বৈষ্ণব। আমারও তাই। তবে কিছু বেশী, গণ্ডা দুই পয়সা
• আধসের চাল ডাল !
১ম বৈষ্ণব। তাের সংসারে খেতে কয়জন !
২য় বৈষ্ণব। নিজে।
১ম বৈষ্ণব।
এক রকম রসে।
নিমাই সন্ন্যাস
২৪ বৈষ্ণব। তাের কয়জন?
১ম বৈষ্ণর। তাতে খুর! আমাকে ধরে পাঁচটি প্রাণী, দুবেলায়
দশটি পাত।
২৪ বৈষ্ণব। আহা! তবে তাে ভাই তােমার বড় কষ্ট, একা
দশটী প্রাণীর আহারের ভার তােমার উপর! তবে ভাই দয়া
করে যদি আমার একটা অনুােেধ রাখ, আমি তােমার উপকার জীবনে,
তুলতে পারবাে না।
১ম বৈষ্ণব । বল ভাই! যতদূর সাধ্য করবাে বৈকী!
২য় বৈষ্ণব। আমি যা বলবে-গুনবে !
১ম বৈষ্ণব। বলই না?
২য় বৈষ্ণব। তুমি আমার ভিক্ষালব্ধ এই তণ্ডুলগুলি আর এই
ইগণ্ডা পয়সা নিয়ে যাও।
১ম বৈষ্ণব। তােনার উপায় ?
২ বৈষ্ণব। সে যা হয় তা হবে ! তাই বা কেন। আমি একা,
ভক্ষায় যা পাই--তার তিন অংশ বাচে, সুতরাং গৃহে কোনও
অভাব নাই !
১ম বৈষ্ণব। তা হ'লেও যে তুমি ভিখারী! তুমি কোথা পাবে?
বা ভাই তা হয় না !
২য় বৈষ্ণব। হলেম বা ভিখারী! ভিখারী-ভিখারীর যে কি যন্ত্রণা
তা সে ভাবেই ঝে, রাজ কি ভিখারীর অভাব-তিশারীর কি
নদারুণ ক্লেশ উপলব্ধি করতে পারে ভাই! কারণ রাজা তো কখনও
এই দুঃসহ দুঃখের পাঠাগারে অধ্যয়ন করেন নাই। তাহলে তিনি
৯৪
নিমাই-সন্ন্যাস
বুঝবেন কি করে দরিদ্রের কষ্ট কি মর্মন্তুদ ! এই লও ভাই! চল আৰু
আপত্তি করােনা! (ভিক্ষা ঝুলি প্রদান )
১ম বৈষ্ণব। ভাই-ভাই! এত দয়া তােমার। ধন্য ধন্য বৈষ্ণব
তুমি । ত্যাগের নিষ্কাম মূর্তি।
দ্রুতপদে জগাই মাধাইয়ের প্রবেশ।
জগাই। আহা। যেন শালাদের দধীর দান।
মাধাই। ও সব বুজরুকি ছাড় যাদু। কই ঐ দুটো ভিক্ষের ঝুলি
আমাদের ভালোয় ভালােয় দিয়ে দাও দেখি-দেখি তােমরা কেমন
শিশুপালের বেটা দাতাকর্ণ ।
জগাই। পালাচ্চে যে। ওরে মধা শালাদের ধরতো।
মাধাই। ওরে জগা-কাড়তাে শালাদের ঝোলা-বালি।
(জগাই মাধাই বৈষ্ণবদ্বয়ের হস্ত হইতে ঝুলি কাছিয়া লইল)
জগাই। হঁ বাবা! গণতাগণতো মধ, কটা পয়সা আর
এক কাজ কর, দেখ চালগুলো কতকে বিক্রি হবে!
মাধাই। (পয়সা গুনিল) এই- এই—এক. • দুই-তিন-চার -
পাঁচ-ছয়-সাত-আট-নয়-দশ-এগার।
পহাবার। পহাবার। যা হোক বাবা-য খায় চিনি-
তার জোগান চিন্তেমণি। কি বাবা গোঁপে খেজুরের দল মিটিমিটি চেয়ে
দেখছ কি?-এখন সরে পড় নইলে শেষে খোয়ারির ধমকে বৃক্ষের
পত্ৰসার পরিধান হয়ে দাড়াবে ?
মাধাই। জগা-আর দেরী করে কাজ নি-মালের কোন বন্ধু
জগাই।
নিমাই-সন্ন্যাস
হয়ে যাবে। শেষে খোয়ারির চোটে বাড়ীওয়ালী শালীদের দোরে
দোরে ঘুরতে হবে।
জগাই। হা-বাবা দিন দিন ভিক্ষে শিক্ষে করে যা পাবে তা নিয়ে
এধার দিয়ে যেও, পয়সাগুলো সৎপাত্রে যাবে। বষ্টমাদের পেট মােটা
করে কি হবে—বাবা ! তাতে ঝঞ্চাট বাড়বে বই কমবে না !
| উভয়ের প্রস্থান।
১ম বৈষ্ণব। অাশ্চর্য! আশ্চর্য! মানুষ এমন হয় !
আমার মুখ দিয়ে আর কথা ফুটছেনা! এত পাষণ্ড
এরা ! এদের উদ্ধার কি করে হবে ?
২য় বৈষ্ণব। হা ভগবান! এদের প্রতি একবার মুখ তুলে চাও
এরা বড় দুর্ভাগ্য।
নেপথ্যে ক্রন্দন ধ্বনি) একি! একি। কার ক্রন্দনধ্বনি। আকাশ দেশ
বিদীর্ণ করে প্রতিধ্বনিত হচ্চে।
২য় বৈষ্ণব। এইতো সম্মুখেই জগন্নাথ মিশ্রের বাড়ী ! কার আবার
২৪ বৈষ্ণব।
কি হল?
১ম বৈষ্ণব। বােধ হয় দুবৃত্ত জগাই মাধাই কোন অসহায় নারী
নির্যাতনে ব্রতী হয়েছ। চল-চল-ভাই-এগিয়ে একটু দেখিগে।
জনৈক নাগরিকের প্রবেশ ।
বলি-ও ভাই ! কোথায় যাচ্ছ। বলতে পার দূরে ঐ কোন রমণীর
ক্রন্দনধ্বনি ক্ষত হচ্চে।
নিমাই-সন্ন্যাস
নাগরিক। তা বুঝি জান না! আহা! জগন্নাথ মিশ্র কি অ
বেঁচে আছে। আজ তার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে।
১ম বৈষ্ণব। চলচল ভাই। আহা মা লক্ষ্মী ঠাকরুণকে আ
বৈধব্যের সাজে সাজতে হল।
১ম বৈষ্ণব। বড় দুর্ভাগ্যবতী এই শচীদেবী। ব্রাহ্মণ কন্যার f
দুঃসহ অদৃষ্টের লিপি। পুত্রহারা, স্বামীহারা। আহা বােধ হয় না।
এই শােক সহ আর বুঝি না করতে পারে।
১ম বৈষ্ণব। আহা বালক নিমাইও বোধ হয় পিতৃশােকে কত
ক্রন্দন কমছে। চল ভাই তাদের শােক অপনােদন করিগে যাই।
নাগরিক। আর শােক। শচীদেবী এতক্ষণ আছে কি নাই ।
। উভয়ের প্রস্থান।
ঘই দৃশ্য
জগন্নাথ-মিশ্রের বহির্বাটা ।
ভক্তগণ।
গীত
বল বল হরি বল।
নামই সম্বল রে জীবের ধৰ্ম্ম অর্থ মােক্ষ ফল ।
নামের তুলনা নাহি রে ভুবনে,
পঞ্চমুখে গান মেতে পঞ্চাননে,
পরম যতনে নামামৃত পানে,
নাচে ভােলা লয়ে ভূত সকল।
এ নামের গুণে রিপু পলায় দূরে
শমন স্বঘনে ধায় নিজপরে
তাই চল চলে বলে হরি বলে,
মানব জনম করিতে সফল।
পার্বতীর প্রবেশ।
পার্বতী। বল-বল—মন প্রাণ একসঙ্গে মিশিয়ে হরি বল! হরি বল ।
বড় মধুময় নাম। এ নামের এমন গুণ-ক্ষুধা, তৃষ্ণ, সংসার কামনা
১৮
নিমাই-সন্ন্যাস
কিছুই থাকে না! বল-দাড়িয়ে রইলে কেন? মুখে শুধু হরিবােল
বল না।
কে তুমি হরিপ্রেম পাগলিনি?
পার্বতী। পাগলিনা ? ওরে এ নামে যে সবাই পাগল হয় রে !
মানুষ পাগল হয়, দেবতা পাগল হয়, রক্ষ, যক্ষ, নর, গন্ধর্ব, কিন্নর,একবার
এ নামের ভেতরে একটু ঢুকলেই পাগল হয়ে যায় ! এ নামেতে এমন
যাদু আছে, গৃহী গৃহত্যাগ করে—সন্ন্যাসী তার ললাটা কম্বলও ভার
বিবেচনা করে, এই মধুর নাম করতে করতে কোন অজ্ঞাত রাজ্যে চলে
যায় তার নির্দেশ থাকে না! বড় মধুর নাম ! বল না-বল না-এ নামের
এমন গুণ-ব্যি সুধ! হয়, মানুষ দেবতা হয়! বলবল তােমরাও দেবতা
হবে !–তোমাদের বিষময় সংসার বৃক্ষে সুধার ফল ফবে? বল বল
হরি বল-ঐ দেখ ! ঐ দেখ ! ঐ যে আমার মদনমােহন রাধিকারঞ্জন
দাড়িয়ে রয়েছে ! দেখ দেখ কেমন মধুর মূর্তি দেখ
ঐ যে আমার মদনমােহন বাঁশী লয়ে করে।
আপন নাম অপান শুতে দাড়িয়ে বাশী ধরে।
পাস না করে দেখতে তাের বল কৃষ্ণ দয়াময়।
দয়াময়ের এমনি দয়া সকল ব্যথা দূরে যায়।
ঐ দেখ না ময়ূর পাখায় ঢাকা শিরােদেশ।
ঐ দেখ না পীতধড়ায় শােভে হৃষিকেশ।
ঐ দেখ না রক্ত জবা হার মেনে যায় যুগল দু'টা পা।
পড় না ওরে পায়ের উপর ওরে অভাগীর ছা।
নিমাই-সন্ন্যাপ
৯৯
ঐ দেখ না মােহন বাঁশী লয়ে নধর করে ।
শুক্তে ডাকে আয়-আয় উচ্চৈঃস্বরে ॥
ঐ দেখ না সােনার নূপুর কেমন নাচে তালে।
ঐ দেখ না চন্দন-রাগ কেমন শােভে ভালে।
ঐ দেখ না আমার কিশাের হাসে কেমন মৃদু হাসি।
তাই তো আমার মাধব সনে এত ভালবাসাবাসি ।
[ প্রস্থান।
১ম ভক্ত। কে এ দেবি ! চল চল ভাই দেব। এ রাজ্যের নয়, নিশ্চয়
স্বর্গের দেবী মর্ত্যে গোবিন্দের নাম কানে এসেছেন।
ভক্তগণ; হরিবােল ! হরিবোল ! এখন চল মিশ্ৰঠাকুরের বাড়ীতে
হই।
[ সকলের প্রস্থান।
শচী ও শ্রীবাসের প্রবেশ।
শচী। আমার চেয়ে দুঃখিনী আর কে আছে। আমার প্রাণ প্রিয়তম
পুত্ৰ বিশ্বরূপ আমাকে ত্যাগ করেছে—সে শেল এখনও বক্ষে আমূল
বিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তার উপর তিনি--অহো! তার সকল জলার
অবসান হয়েছে। মহাপাপিনী আমি—এই সকল নরক যন্ত্রণা ভােগ
করবার জন্যই বেঁচে রয়েছি। আর কতদিন-ভগবান, আর কতদিন
দুঃখিনীকে এই যন্ত্রণা উপভােগ করতে হবে ! বালক নিমাই অামার
কর্তার পিণ্ডদানের জন্য গয়ামে যাত্রা করেছে ! তবু তাকে দেখলে
নিমাই-সন্ন্যাস । শচী। এই দুঃখের ভিতর ক্ষণিক শান্তি পেতাম! তাও বাছা প্রায় একমাস হ’ল আমার চক্ষের অন্তরাল হয়েছে ! বাস। ঠাকুরাশি! সকলই ভগবানের ইচ্ছা! এই দুঃসহ বিপদের মধ্যেও তার মাঙ্গলিক লীলা প্রচ্ছন্ন ভাবে লুক্কায়িত রয়েছে ! তােমার কোন চিন্তা নাই দেবী--এক গুণধর পুত্র নিমাই তােমার বংশের উজ্জ্বল রত্ন! তা হতেই তােমার বংশগৌরব দ্বিগুণ বদ্ধিত হবে ! তুমি পুণ্যবতী যে পুত্র জঠরে ধারণ করেছ সেই তােমার সকল দুঃখের অবসান করে দিবে। হে বৈষ্ণব চূড়ামণি ! দুর্ভাগিনীর সুখ কি কখনও হয় ? বিশ্বরূপ আমার সন্ন্যাসী হয়েছে ! নিমাইকে দেখলে মনে হয় কবে ঐ বালকও আমার গলায় ফাঁসি দিয়ে পালিয়ে যাবে! সেইজন্য আমি তাড়াতাড়ি নিমাইয়ের বিবাহ দিলুম,ভাবলুম অাজকালের ছেলে বিবাহ হলে সংসারপাটে মন বসবে ! কিন্তু তার সব বিপরীত দেখছি। বধুমাত। আমার নামেও লক্ষ্মী-কর্তব্যেও লক্ষ্মী। নিমাই বধূমাতার উপর যে দুর্ব্যবহার করে তা অসহ। বাছা আমার নিমাইয়ের কাছে গেলে নিমাই অকথ্যভাষায় গালি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। একদণ্ড বাছাকে আমার দেখতে পারে না। কেবল বলে-“মায়ের যেমন কাজ—কেবল আমার বাঁধন জড়িয়ে দেয়। আহ, অবােধ বালিকা-কাঁদতে কাঁদতে আমার নিকট পালিয়ে আসে। দেখ, নিমু আমার বাড়ীতে এলে তাকে তােমরা একটু বুঝিয়ে বলল-ধূমাতার সঙ্গে সে যেন ভাল ব্যবহার করে। দ্রুতপদে লক্ষ্মীর প্রবেশ। লক্ষ্মী। মামা- শচী! কেন লক্ষ্মীমা আমার !
নিমাই সন্ন্যাস শচী। লী। আমায় সাপে কামড়েচে।-আমার মাথা কেমন করছে আমি কথা কইতে পারছি না ! মা-উ:--কি যন্ত্রণা! প্রভু ! কোথায় তুমি—নারায়ণ। উঃ—যাই -জল। (মৃত্যু) ভগবন্! ভগব! একি হল। মা- চলে গেলি? স্বর্গের দেবী-মর্ত্যে এসে-পাপ পৃথিবীর যন্ত্রণা এক মুহূর্তও সহ্য কতে পালিনা। উঃ ! কি দুরদৃষ্ট আমার ! এমন দগ্ধভাগ্য সংসারে আর কায় হয় ? পুত্রহারা---স্বামীহার পুত্র বধূ-তারও আজ সর্পদংশনে মৃত্যু। ন্য ভগবন্! তোমাকে ধন্যবাদ ! কত জন্মের মহাপাপে আমার এই শাস্তি । চক্ষের উপর এই বিভীষিকা দর্শন করতে হচ্ছে, শ্রীবাস ! শ্রীবাস ! আর নয়, আর কি সুখে সংসারে বাস করবে। তুমি এক কাজ কর, ধূমতার সংকারের জন্য চিতা সজ্জিত কর। আমি আমার লয়ের সঙ্গে এক চিতায় প্রবেশ করে আমার সকল যন্ত্রণা উপশম করি। : না-না-আমার- ( মূচ্ছ।) বাস। হায়, হায়, কি বিপদ! কে কোথায়-ছুটে এস- অজ জগন্নাথ মিশ্রের পুণ্য গৃহ শ্মশান হ’ল! নারায়ণ-নারায়ণ ! ভক্ত বৈষ্ণবগণের প্রবেশ। বৈষ্ণবগণ। কি-কি হয়েছে ভাই, চীৎকার করছো কেন? শ্রীবাস। আর কি হবে ? মিশ্রের পুত্রবধূকে সর্পদংশন করেছে। ১ম বৈষ্ণব। আহা-তাই তাে হে—সারা দেহট। যে নীলবর্ণ হয়ে গেছে। ২য় বৈষ্ণব। আর দেরী করে লাভ কি? চল বধুমাতার সৎকারের আয়োজন করি। (লক্ষ্মীদেবীকে উত্তোলনােত)
নিমাই সন্ন্যাস
শচী। না-না--বধূমাতাকে আমার নিয়ে যেও না। নিমাই আমা
গয়া থেকে ফিরে এসে যখন বধূমাতার অন্বেষণ করবে—আমি তাকে বি
বলবাে! নিয়ে যেও না-না-ও—মাগাে-
( পুনঃ মৃচ্ছ।)
১ম বৈষ্ণব। আহা! মিশ্রঘরণী বুঝি এবার পাগলিনী হলেন
শ্রীবাস। তুমি দেবকে সাস্থনা কর, আমরা মায়ের সৎকার করি গে
[ লক্ষ্মীকে লইয়া ভক্তগণের প্রস্থান।
শচী। চলে গেছে! বৌমা-বৌম–দাড়াও, একটু দাড়াও, আমি
তোমার সঙ্গে যাবে।--বোমা—বৌমা--
( দ্রুত প্রন ।
ঐ বাস। হায়-হায়-সর্বনাশ হল ।
স্থান
।
ঐক্যতান বান ।
চতুর্থ অঙ্ক প্রথম দৃশ্য জগন্নাথ মিশ্রের অন্তঃপুর। শচী, নিমাই ও বিষ্ণুপ্রিয়া। শচী। বাবা নিমু, বিশ্বরূপকে হারিয়ে অবধি আর তােকে যেন চোখের আড়াল করতে ইচ্ছে হয় না। দুঃখিনীর সর্বস্বধন অঞ্চলের নিধি, প্রাণ কানাই, তাের চাদমুখখানি দেখলে জগৎ-সংসার ভুল হয়ে যায় । সব শোক দূরে চলে যায়, তুইও আমাকে যেন বাবা ফাকি দিয়ে চলে যাসনি। তাহলে আমি আর বাব না। তাের ঐ প্রাণ জুড়ান মুখখানি অভাগীর জীবনের একমাত্র সম্বল। নিমাই। মা তােমাকে ছেড়ে আমিও কি মুহুক্ষণ থাকতে পারি ? তােমার ঐ পাদুখানি যে আমার সাধনা—কামনা -আমার শান্তি- সুখ। (ঈষৎহাস্যেতবে কি জান জননী, যদি আমি কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে দূরদেশে যাই, তবুও আমার মন পড়ে থাকবে তােমার ঐ পবিত্র চরণ দুটিতে, যখনি আমাকে ডাকবে তখনি নন্দের দুলালের মত ছুটে এসে তােমার পদতলে বসব। তাহলে ত আর আমার অভাব তােমাকে বুঝতে হবে না। কেমন মা ? শচী। (গম্ভীরভাবে ) দেখ, নিমু, তােদিগে দেখলেই ভয় হয়, বুঝি কখন কোন্ সর্বনাশ করে পালিয়ে যাবি। বিয়ে থা করছিস, সংসারী হ, আমি নয়ন সার্থক করে শেষে একটু শান্তিতে মরি, আমি বেঁচে
১০৪
নিমাই-সন্ন্যাস
৩
থাকতে থাকতে যেন আর শােক জ্বালায় পুড়তে না হয়। দয়াময়
গােবিন্দ ! ( অঞ্চলে চক্ষুল মােচন)
নিমাই। আমারে রাখিবে বেঁধে-মাতৃত্বের
নিবিড় নিগড়ে; কে আমি, কে আমি,
ভাবি আকুল পরাণ, মনে পড়ে, মনে পড়ে
অতীতের সুখময় বাণী, সেই যশােদা দুলাল,
বৃন্দাবন কেলিকুঞ্জ, গোপিক। বিলাস
সব তেয়াগিয়া-গল চলি শ্রীরাধারমণ
মথুরার রাজ-সিংহাসনে, বাধা না মানিল
প্রাণ ফেলি, প্রাণ সপে দিল,
কন্তব্যের কঠোর নিদেশে।
কঁদে মাতা যশােমতী, কঁাদে নন্দপিতা,
কঁদে সখী-সখাগ, কঁাদে ধেনুকুল,
কি করিব কর্তব্যের কঠোর আহ্বান,
যেতে হবে সব তেয়াগিয়া,
যেতে হলে জীবের উদ্ধারে ।
হবে সেই ক্রন্দনের ঋণশােধ
একাধারে দুহু তনু লয়ে যাব—যাব ।
দাড়াও জগৎ, মাতাইব তােম। কৃষ্ণপ্রেমে,
নদীয়া নগর হতে প্রেমস্রোতে প্লাবিবে ভারত।
এস কৃষ্ণ প্রাণারাম, শ্রীরাধাবল্লভ, কৈ নাথ,
দেরি নাহি সহে, আর না পারি চাপিতে হৃদে
বিরহের সুতীব্র অনল।
নিমাই-সন্ন্যাস
(সহসা সম্মুখে এনিত্যানন্দের চন্দনচতি দিগম্বর বেশ হেরিয়া )
এস সখা, এস মাের রাধিকার প্রাণশক্তি তুমি,
এস, এস বিদেশী সন্ন্যাসী, এস মাের অন্তরের নিধি,
এসেছু মধুর সাজে, চন্দনচর্চিত বপু, বেশ দিগম্বর ;
নয়নে পলক নাই, হারায়েছ বাহ্য যে সম্বি।
কৃষ্ণপ্রেমে পরিপূর্ণ তৰু, তােমা ল’য়ে যাব দ্বারে দ্বারে,
দীন-হীন কাঙ্গালের বেশে, মাতাইব, প্রেমের কাঙাল,
মাতাই দীন। এ বসুধা,
মিটাইব হৃদয়ের অফুরন্ত ক্ষুধা।
( ভাব সম্বরণ পূর্বক) ওরে গুল, ও নিতাই, চেয়ে দেখ, দাদা
তোমার কাপড় কোথায় ? কাপড় পরিয়ে দিই এস ভাই। (কাপড়
পরাইয়া দিলেন )
শচী। বাবা নিমুরে, আজ নিতাই এর কি হল? বাছাকেও
দেখলে আমি মনে করি যেন ‘গৌরনিতাই' দুটী ভাই। আয় বাপ, নিতাই,
বড়ই অক্লান্ত হয়েছিস-ব’-একট, বিশ্রাম ক'রে জল খা।
নিমাই। ভাই নিতাই আমার, আর যে প্রাণে বিরহ সহ্য হচ্চে না।
অার যে পারি না, যাও তুমি অাজই হরিদাস সহযোগে নবদ্বীপের দ্বারে
বারে কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ কর। নবদ্বীপ মাতিয়ে দাও—কৃষ্ণপ্রেমের তরঙ্গ
নদীয়া আকুল করে দি।
যে আজ্ঞা প্রভু, আজিই আমি আপনার ইচ্ছা পূরণে
নিতাই।
বহির্গত হব।
প্রিয় দৃশ্য
রাজপথ।
হরিদাস ও নিত্যানন্দ গীত গাহিতেছিলেন।
গিত
হরিনাম সার, অসার, সংসার হরি হরি বল নিশিদিন।
দিন গােঙইলি, ফিরে না চাহিলি, শেষে তাের হ’লরে সুদিন।
অসার ভবার্ণব রঙ্গে, মাতিলি (মন) বিষ তরঙ্গে,
রঙ্গে ভঙ্গে গেল বেলা জীবন যবনিকা হলরে পতন।
রাধাকৃষ্ণ নাম রত্ন রে ছাড়িয়ে হরিনাম সুপাসিন্ধু পাসরিয়ে,
বিষয় বিযভাণ্ডে, মজিলি প্রকাণ্ডে, ভজিলি অনিত্য কামিনী কাঞ্চন।
( এই সংসার রসে মজে (মন) কি ফল পাইলি বাজে কাজে )
( তুই) কর্মবিপাকে পড়ে কাচে কিনিলি হারায়ে রতন।
রাধাকৃষ্ণ রাধাকৃষ্ণ, (বলি) এবে পারে কর ছিন্ন,
( দেখ) সাগর পরের যাত্রী হয়ে গােষ্পদ জলে না যায়রে জীবন ।
বিষম কলি যুগে নামমাত্র সার, প্রচারেন শ্রীগুরু হয়ে অবতার,
বল রাধাকৃষ্ণ ভজ রাধাকৃষ্ণ ঘুচিবে যদি রে ভবেরি বন্ধন।
চারিজন বৈষ্ণবের প্রবেশ ।
১ম বৈষ্ণব। কে ঐ মহাত্মা দু'জন! নামে অন্তরে সুধাধার বর্ষিত
হচ্চে। অনুমান করি কোন ঐশীশক্তি সম্পন্ন মহাপুরুষ।
নিমাই-সন্ন্যাস ১০৭ ২য় বৈষ্ণব। আহা হা মরি মরি ! এ নবীন বয়সে এমন সুধার আধার হরিনাম কোথায় পেয়েছ মহাপুরুষ। যেমন দিবা তপ্তকাঞ্চন: কান্তি, তেমনি সুললিত ঠাম। যেমন হরিনাম-স্বর লহরী তেমনি সুমধুর ভাবাবেশ-আজ কি ভাগ্যোদয় ! মুরারি ! বল বল দয়াময়, বল বল নদীয়ার পথে পথে অকাতরে কোন্ উদ্দেশ্যে নাম প্রচার করা হচ্চে? ৩য় বৈষ্ণব। ভাই, আয়, আর বাক্য ব্যয়ে কাজ নাই। সবাই মিলে এদের চরণে পতিত হয়ে মধুর কৃষ্ণনাম গাইতে গাইতে নবদ্বীপ ভ্রমণ করে বেড়াই। অাজ বড় সুদিন, বড় সুদিন। অনুরে আনন্দতরঙ্গ হে যাচ্চে। শরীর নামরসে পুলকিত হচ্ছে। এমন সুমধুর কীৰ্ত্তন ত জীবনে আর শুনি নাই! অজ নবদ্বীপে স্বর্গের শােভা! চঁাদের মেলা বসেছে, কে কোথায় আছ, নাগরিকগণ আপন ভুলে আজ হরিনামের কুলে কুল দিবে ত ছুটে এস । ৪র্থ বৈষ্ণব। ভাই সব, অয় সবাই মিলে এই বেলায় নামে মেতে যাই ! পাদুখানা যেন তালে তালে নেচে উঠছে, মুখ থেকে যেন নাম আপনা হতে বেরিয়ে আসছে! পন্য রে নামের মহিমা! এতদিন জপমালায় নাম জপে ত এমন নামাস্বাদ পাইনি। মহাপুরুষপ্রবর ! ধন্য তােমাদের নামদান, ধন্য কন্দর্পতুল্য স্বরূপ, ধন্য লীলা। [ অন্যান্য নাগরিকগণের যােগদান! গীত এমন পাগলকরা রাধাকৃষ্ণের নাম আনিল কে- নামে পাপী তাপী যােগী ভোগী সবাই মেতেছে-
১৮
নিমাই-সন্ন্যাস
নামে ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবশক্তি পাগল হয়েছে-
(ও নাম রে, রাধাকৃষ্ণের মধুর নাম রে)
ঐ নাম মন্ত্রে গুরুত্তে আমায় অন্ধ করেছে।
ও নাম হৃদয় দুয়ার খুলে অন্তর বিদ্ধ করেছে-
নামে আঁখির জলে, ভাবের বলে ভুবন মেতেছে
( বল জয় রাধাকৃষ্ণ জয় রাধাকৃষ্ণ জয় রাধাকৃষ্ণ জয় রাধে
এ নামের বলিহারি আর বলতেও হারি-
( বল রাধাকৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
বল হরে রাম হরে রাম রাম হরে হরে )
দূরে জগাই ও মাধাইয়ের প্রবেশ।
জগাই। আজিই এর একটা বিধান করতে হলরে মাধা,
বেটারা আবার সেই কেলেঙ্কারীর সূত্রপাত আরম্ভ করেছে। বাবা নেড়া
ভেড়ার দল এই হাতদুখানার কাছে সব চুরমার হয়ে যাবে আজ।
মাধাই। ওরে জগন্নাথ, শােন্ শশান্ শশা, হাসিও পায় আর দুঃখও
ধরে, আজ নাকি শালা রৈরেগী হরিনাম ক’তে করতে বেরিয়েছে
ঐ শােন্ ঐ শােশালাদের নাদুস নুদুস্ টুকটুকে চেহারা বেশ করে
আজ পা জাতে হবে কিন্তু। শালাদের হিম্মত কি সহজ! জগন্নাথ মাধব
দুই ভ্রাত থাকতে ব্যাভিচার কৰ্বে প্রেকাশ্য রাজপথে ?
জগাই। আয় এই সময় একটু করে মাল টেনে রক্তটা গরম করে
লিই তারপর বের হওয়া যাবে।
নিমাইসন্ন্যাস
মাধাই। তা আর বলতে, বাবা ! আয়—বােতল নিয়ে আয়
জগা।
( উভয়ের মদ্যপান।
জগাই। না বাবা, বৈরেগী টৈরেগী ঠেঙাতে হবে আরও একটু
চাই! (পুনঃ পান)— এবার ঠিক মৌতাত লেগেছে। চল চল
মাধাই। উঃ কি অসহ্য লাগছে কীৰ্ত্তনটা-ইচ্ছে হয় শালাদিকে সব
খুন করে সাবাড় করি।
জগাই। চল্ চল্ এক একটা বৈরেগীর রক্তপাত, আর আমাদের
শত জন্মের পাপক্ষয়। মার লাথি, কিল, লাঠি ! কাট টিকি, ছেড় মালা।
মাধাই। পাঠাও শালা দিগে যমের চালা! চাই বৈৱেগীয়
মুণ্ডচ্ছেদ! চল্ চল্ চল্।
জগাই। মা, মা, মা, দে খােল ভেঙ্গে, দে টিকি কেটে, দে
পেটে লাথি শালাদের।
[ জগাই ও মাধাই কর্তৃক বৈষ্ণবগণকে প্রহার, বৈষ্ণবগণের পলায়ন,
কীৰ্ত্তন ভঙ্গ ]
নিত্যা। একি, একি হেরি অচম্বিতে একি বিভীষিকা.
হরিদাস! কালসম কে ওরা পাষণ্ড ?
করে ও পয়ে,
ভক্ত অঙ্গে করে যে আঘাত ?
বহে তাহে রুধিরের ধারা।
ব্যস্ত হয়ে প্রাণ লয়ে করে তারা পলায়ন।
নিমাইয়ের এই কি আদেশ, ফলে হ’ল এবে
বৈষ্ণব প্রহৃত ? নিয়ে প্রেমরাজ্যে এই কি বিচার ?
নিমাই-সন্ন্যাস
০
সহিতে পারি এই নিদারুণ জ্বালা বাণ সম হৃদে
লাগে ভক্ত অঙ্গে আঘাত প্রচণ্ড !
চল ফিরে অতি ত্বরা, আসিতেছে শমন-কিঙ্কর
নতুবা এ স্থানে হবে দিতে জীবন আহুন্ডি।
চল ফিরি যথা আজ্ঞা দেব।
হরিদাস।
{ উভয়ের দ্রুতগতিতে প্রস্থান
তৃতীয় দৃশ্য
মিশ্রের বহিব্বাটী।
নিমাই, নিত্যানন্দ ও হরিদাস।
নিত্যানন্দ। ধন্য তোমার নামপ্রচার। শেষে নাম প্রচার করতে
গিয়ে পাষণ্ড জগাই-মাধাই হস্তে প্রাণ দিতে হয়েছিল আর কি!
হরিদাস। প্রভু, আপনার মহৎ উদ্দেশ্য কে বুঝতে পারে না।
নামপ্রচার করতে বহির্গত হ’লাম কিন্তু পথের মাঝখানে পড়ে প্রাণ
পরিত্যাগ ক’বার মত হ’ল। যত পলায়ন করি, ততই দুৰ্বত্তগণ
পশ্চাদমুসরণ করতে লাগল। ও বাবা! কি পৈশাচিক দৃশ্য, কি
অত্যদ্ভুত ব্যাপার!
নিমাই। কৈ, কৈ সে দুৰ্বত্তগণ, আন আন তাদের ধরে আন,
চক্তে খণ্ড খণ্ড করে তাবিগে কর্তন করব। নাম প্রচারে বিঘ্নদান?
নবদ্বীপে পাষণ্ডের অত্যাচার ? কৈ কোথা চক্ৰী, লও তােমার চক্র।
চক্র দিয়ে তাদিগে খণ্ড বিখণ্ড করে ফেল! কৈ তার সম্মুখে এল না।
( ক্রুকুটি প্রদর্শন )
সুধাময় নামে বিঘ্ন দেয়,
হেন কে পাষণ্ড,
দেহ পরিচয়, আজি যাব সাপােলো
১১২
নিমাইসন্ন্যাস
লয়ে নববীপ পথে পথে কৃষ্ণনাম গানে।
সাজিব কীৰ্ত্তন সাজে, সঙ্গে সব নিত্যানন্দ,
গদাধর, বাসপণ্ডিত; বহুভক্ত কীৰ্ত্তনীয়া
সাথে, গাহিব হরিনাম, গাহিব সঙ্গীত
প্রাণে প্রাণে বহাইব পুলক হিল্লোল
ছুটিবে আনন্দ বন্যা মাতিবে সুজন।
দুৰ্জ্জনের পাপরাশি পলাইবে
দূরে,
কেহ নাহি রবে পাপী, তাপী. পাষণ্ড দলন হবে,
পাপী হবে কৃষ্ণভক্ত,
কলিগণ পলাইবে সুদূর প্রদেশে ।
নামদানে জন্ম মম, অযযানিজ হ'য়ে,
পাপির মুক্তির লাগি, তাপীর উদ্ধারে।
সেই নাম বিলাইব, সংকীর্তনে মাতি,
কেহ নাহি হবে রে বঞ্চিত ;
কর কর আজি আয়ােজন।
যাব লয়ে নিত্যানন্দ নামের প্রচারে।
নিত্যানন্দ। আচ্ছা তাই হবে। আজ অদ্বৈত, প্রবাস, গদাধরকে
লয়ে প্রভু সংকীর্তন রঙ্গে বাহির হবেন। তােমার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে।
আমি ত তােমারই আশ্রিত প্রভু!
হরিদাস। আজ জগাই-মাধাই উদ্ধারের উপযুক্ত সময় উপস্থিত।
প্রভুর কথার ভাবে বোঝা যাচ্চে, জগাই-মাধাই আজ উদ্ধার হবে। কি
আনন্দের দিন, কি আনন্দের দিন, প্রভু আজ পাষণ্ডকে উদ্ধার করতে
নিমাই-সন্ন্যাস পাষাণের বক্ষ ভেদ করে সুধাধারা প্রবাহিত করতে নবদ্বীপের পথে বহির্গত হবেন। এস, এস, এস ভক্তগণ, এস গৃহী, যতী, ভিক্ষু, আজ এ আনলে যােগদান করে জীবন সফল করবে চল। নিমাই। যাও আর ভক্তগণকে তােমরা সংবাদ দাওগে যেন তারা মধ্যাহ্নে বিভিন্ন দলে সজ্জিত হয়ে নগরকীৰ্ত্তনে বহির্গত হয়। আমি আজ ভক্তসঙ্গে কীৰ্ত্তনে নৃত্য করব। নিত্যানন্দ ও হরিদাস। যে আজ্ঞা প্রভু! [ প্রস্থান। বিষ্ণুপ্রিয়ার প্রবেশ। বিষ্ণুপ্রিয়া। এ সংসার যদি এমনটী হত—চাদ, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র আলাে-আকাশ-বাতাস-সব প্রভুর নাম গান করে প্রভুপ্রেমে পাগল হয়ে যেত, প্রভুর মোহন মূর্তি ভাবতে ভাবতে প্রভুর পরশে প্রভুর মত কাঞ্চনে রঙে যেত তাহলে বিষ্ণুপ্রিয়ার কত সুখ হত । দিকে যেতাম, দেখতাম আমার প্রাণকান্ত, যেরূপ হেরতাম দেখতাম আমার হৃদয়সৰ্বস্ব! যে গান হত-শুতাম গানের ছন্দে ছন্দে, বেশে রেশে, আমার হৃদয়বল্লভ নৃত্য করে আমাকে আলিঙ্গন করছেন। কিন্তু হায়, কেন মাঝে মাঝে মনে জেগে উঠে-ঐ আমার প্রভু চ'লে গেলেন’ ঐ প্রাণায়াম কঁদতে কঁাতে ধূলি ধূসরিত অঙ্গে হা কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ বলে পথে পথে ছুটেছেন, তাঁর রাঙা পাদুখানি ক্ষত হয়ে কত রক্ত ড়ছে, সোনার অঙ্গে কত অাঘাত লাগছে-অম্নি করে স্বপ্ন দেখি, ১১৪ নিমাই সন্ন্যাস কেঁদে কেঁদে উঠি। রাত্রিতে যখন স্বপ্ন দেখি, তখন ভয়ে প্রভুকে আলিঙ্গন করে জেগে উঠি, তখন আমার আনন্দও হয়, আমি কত ভাগ্যবতী ! মিশ্রবংশে রূপে গুণে, ধৰ্ম্মে, জ্ঞানে, বলে, বিক্রমে নারায়ণ যিনি, আমি তার অঙ্কশায়িনী। কিন্তু কি জানি তবু মন মানে না, বুকখানা দুরু দুরু কেঁপে উঠে, পাদুখানা থ থ করে কেঁপে অবশ হয়ে যায়-তখন মনে হয় আকাশের সব উজ্জ্বল তারাগুলি খসে পড়েছে, বাতাসে কে যেন আগুনের জ্বালা ঢেলে দিলে, জ্যোছনায় কে যেন বিষ সঞ্চার করে দিলে । নিমাই। প্রিয়তমে, আজ কেন মুখখানি তােমার এত গম্ভীর! কি ভাবছ বিষ্ণুপ্রিয়া ? বিষ্ণুপ্রিয়া। না কিছু না, মা বল্লেন, বেলা অধিক হচ্চে, শীগগির করে মানাকি সেরে নিতে, রান্না হয়ে গেছে। নিমাই। যাই; কিন্তু প্রিয়া, আমায় কোন বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করবার জন্য একবার নবদ্বীপ ছেড়ে যেতে হবে, তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পাবে ত ! দেখাে, যেন কেঁদ না, তা হলে আমারও কাজ নষ্ট হবে, কত লােক আমার কুযশ গাইবে, আর তােমাকেও সাধ্বি, অনেক ব্যথা পেতে হবে। (বিষ্ণুপ্রিয়ার মুখের দিকে তাকাইয়া হাস্য। বিষ্ণুপ্রিয়া। (জলভারাক্রান্ত চক্ষে) না, আমি থাকতে পারব না। না, না, আপনি ঘরে বসে সব কাজ করুন না। আপনার আবার কাজ কি? আমি মাকে বলে আপনার যাওয়া বন্ধ করছি! একান্ত যদি যাবেন, আমিও আপনার সঙ্গে যাব । নিমাই। তাও কি হয়, তুমি স্ত্রীলোক, তায় রূপ যৌবন সম্পন্ন। বিষ্ণুপ্রিয়া । কেম, যখন সাক্ষাৎ ভগবান্ সঙ্গে থাকবেন, তখন কা
নিমাই-সন্ন্যাস
?
সাধ্য আমাকে অপমান করে। যে ভাগ্যবতী এমন ত্রিতাপভয়হরী
স্বামীরত্ব লাভ করেছে, এ ভুবনে তার ভয় কি
নিমাই। যার এত মনের বল, সে তার স্বামীকে ত্যাগ করে সংষমে
জীবন কাটাতে পারবে না ? , মৃদুহাস্য )
বিষ্ণুপ্রিয়া। কে কোথায় দেখেছে জগতে,
স্বামীর বিরহ ব্যথা অকাতরে সহে নারী।
জানি আমি
পতিতা পুণ্য সীতা কথা,
জানি আমি দময়ন্তী শকুন্তলা গীতি,
কোন্ ইতিহাসে, কি পুরাণে লিখিয়াছে,
রমণী জীবন যাপ,
অকাতরে হৃদি বাথ
দূর
করে দেয়
স্বামী পদহার হয়ে।
জানি আমি, শুনিয়াছি গুরুজন মুখে,
নারীই স্বামীর হয় অর্ধাঙ্গভাগিনী
দেখ সাক্ষী অর্ধনারীশ্বর হরগৌরী পটে।
কে কোথায় হেন যুক্তি লয় মনে,
আপন অর্ধাঙ্গ কাটি, অপর অর্ধাঙ্গ ল'য়ে
পারে গাে বুঝিতে লােকে
বিরাট মহান্ এই প্রকৃতিরক্ষেত্রে।
শুনিয়াছি শ্ৰীমতীর পুণ্য কথা
পুণ্য পদ্মমুখে তব,
নিমাই-সন্ন্যাস বলেছিল গােবিন্দ, হাস্য পরিহাসে- রে দেবী। মাধব-জীবনরূপিণি ! কহ শুনি, প্রতি অঙ্গে, রােমকুপে, হৃদে, গাত্রে, শীর্ষে তব কোটি কৃষ্ণ রাজে, তবে কোন যুক্তি লাগি বল কান্তা, চাই মাের এ দেহ-মিলন। তদুত্তরে বলেছিলা এরাধা সুন্দরী, জানি দেব প্রতি রোমকূপে মম, কোটি কৃষ্ণ রাজে, তথাপিও চাহি আমি ঐ রূপ, ঐ দেহ, ঐ কম কামরূপ জিনি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীক্ষেত্র বিগ্রহ- চাহি ঘন আলিঙ্গন, নতুবা রাধিকাপ্রাণ যাবে উড়ে দেহকার হ'তে। নতুবা অসার কুঞ্জ, ফুল ফল-লতা গৃহ, এ বিলাস, এ সাজ পদ্ধতি, নন্দপুর হবে অন্ধকার, সব হবে শবাকার। তবে মতিমন, কোন্ যুক্তিবলে তুমি রাখিবে নিজেরে দূরে, আমারে বঞ্চিয় তব পাদ সেবনে ? নিমইে। সব বুঝি দেবি! জানি তুমি আমারই অভীষ্ট সঙ্গিনীর রূপে,
নিমাই-সন্ন্যাস
১১।
কিন্তু মনে নাই সে প্রতিজ্ঞা,
সামান্য নারীর বেশে, কেন
ছল ধর ? মনে পড়ে গােলকেতে
প্রতিজ্ঞা তােমার লবে বিষ্ণুপ্রিয়া রূপ,
কিন্তু তােম। যাপিতে হইবে, দেবী,
সংযমীর মত, সারাটি জীবন ভরি।
আমি যাব লােকশিক্ষা হেতু,
কাঙালের বেশে; দেশে দেশে
পথে পথে, প্রেম প্রচারিতে।
তুমি রবে গৃহপুরে ত্যাগে দধীচীর মত,
নারীগণে শিক্ষা দিতে. স্বামীহীন।
কেমনে জীবন বাঁধে সংযমের সাথে।
কেমনে ত্যাগের মন্ত্র প্রচারেন নারী
হয়ে গুরু, অবতার, মহাশক্তিরূপা।
মনে রেখ, আমি বাধা তােমার নিগড়ে,
তবে প্রেমে লাে সুন্দরী।
প্রেম শুরু মাের, চিবদিন প্রেমভক্ত তব;
দুদিনের খেলা খেলি প্রেম অবতার,
আবার মিলিব ঘঁহু যুগল বিগ্রহ,
ভক্তগণ হৃদি বৃন্দাবনে। দেখুক জগৎ,
জগতের শিক্ষা এ মােদের
অভিনয় লালা !
বুঝিয়াছ শ্রীগােবিন-প্রাণা?
১১৮
বনপাড। সুহৃদ
নিমাই-সন্ন্যাস
বিষ্ণুপ্রিয়া। . যা আদেশ করেন দেব, আমি তাতেই সম্মত।
কিন্তু প্রতিজ্ঞা করুন, যখন যে দেশেই থাকুন আমি স্মরণ করলেই ওই
গৌরাঙ্গরূপে অমিয় দেখা দিবেন।
নিমাই। বাধা আমি তােমারই প্রেমে,
মুগ্ধ আমি তােমারই ধ্যানে,
নাহি জানি তােমা ভিন্ন হে আদ্যাশক্তি।
তব ইচ্ছা হইবে পূরণ,
এত নহে আশ্চর্য্য বারতা ।
কথা রঙ্গে, হইয়াছে প্রথম প্রহর গত,
চল যাই স্নানাহ্নিক সারি,
আজ ভক্তসঙ্গে বাহিরিব নগর কীৰ্ত্তনে
[ উভয়ের প্রস্থান।
হাওড়া
তি- সন ১৩৩৪ লাল
চতুর্থ শ
মিশ্ৰগৃহের নিকটবর্তী পথ ।
শ্রীবাস, অদ্বৈত, নিত্যানন্দ, ভক্তগণের প্রবেশ।
গীত
একবার দয়াল শ্রীমাধবের বেশে
তোমায় আসতে হবে তে।
নৈলে এ সংসারে বিপুরে, কে অমৃত ল'য়ে,
তােমা-গত প্রাণে বাঁচাবে
( ওহে ও দয়াময় ভসখা, ওহে ও কাঙালের ঠাকুর )
তােমার আসন হৃদয় কমল, প্রেম ভক্তিভাবে করে ঝলমল,
এস এস সখা, কান্ত নিরমল, এস রাধারে লয়ে বামে।
(ওহে ও রাধারমণ ওহে ও নবনীরদবরণ)
তােমায় আশায় কতসাধুজন, দিবানিশি অশ্রু করে বরিষণ,
পাপ তাপ ভাবে আকুল পরাণ, পাপীতাপীকে উদ্ধারিবে
(এস ওহে আমার পাপকরণ, দীনশরণ বাঞ্ছাকল্পতরুবর)
কৃষ্ণনাম মধু, রাধা নামামৃত, করি পান মােরা হইব উন্মত্ত,
ভবব্যাধি নাশি দিতে মুক্তিপূত, যাব ভেসে জীব অমিয় সাগরে।
( ওহে শ্রীকান্ত প্রাণকান্ত, ওহে ও ভক্ত-অন্ত-জীবন)
নিমাই-সন্ন্যাস
বেগে নিমাইয়ের প্রবেশ।
নিমাই।
চল, চল, সখাগণ, দেরী নাহি
সহে আর, প্রাণ মাের ব্যাকুলিয়া উঠে
কৃষ্ণনামে, হৃদয়ের প্রতিতন্ত্রী করে
উল্লম্ফন, প্রত রােমকুপ আনন্দেতে
হফ পুলকিত, মরি কিবা নামের
মহিম, বল কৃষ্ণ, কহ কৃষ্ণ,
কৃষ্ণনাম সার। কৃষ্ণ জীব করিবে উদ্ধার।
গাহ আজ উদাত্ত সঙ্গীত। কর নৃত্য
গীত, ধ্বনিত হউক, বােম, উঠুক
আনন্দ নাদ-ওম্ ওহ্ ওহ্।
( সমাধিস্থ হওন )
( ভক্তগণ উচ্চেঃস্বরে কাৰ্তন করিতে লাগিলেন)
( সমাধি ভঙ্গে) কোথ। কৃষ্ণ, মায়াময় কেন গো বিরূপ,
চল চল, উদ্ধারিবে পাপীতাপী জন।
মাতিবে নদীয়া প্রেমে’ ভারতের এক প্রান্ত
হ'তে সে প্রেমের তরঙ্গ হিল্লোলে মাতিয়া
উঠিবে অন্য দিক-না রহিবে পাষণ্ড পামর
সব হবে কৃষ্ণভক্ত, বৈষ্ণব সজ্জন।
(কীৰ্ত্তন সহ নৃত্য করিতে করিতে ভক্তগণসহ নিমাইয়ের রাজপথে
অগ্রসর হন।)
পঞ্চম দৃশ্য গায়ের বৈঠক খামা। জগাই, মাধাই, ও মেঘমালী আসীন। মেঘমালী। সত্যি বলছি জগ, পার্বতাকে আমি কত প্রাণ দিয়ে ভালবাসতাম, কিন্তু সে যে কি নামমন্ত্র পেলে যে সে সব ভালবাসার আকর্ষণ ঐ কুহক যাদুমন্ত্রে ভুলে গেল। আমার প্রাণটায় মস্ত একটা দাগ রেখে গেল। পারুম না, ঘুড়িকে ধরে রাখতে পারলাম না। ও বাবা, কি তেজ, একটা অষ্টামাগীর এত তেজ কোথা ছিল রে ! এই যে হাত দুখানা দেখছিস, যাতে কত লোককে অম্লানবদনে যমপুরে পাঠিয়েছি, কত স্ত্রীলােকের সতীত্বরত্ব নষ্ট করেছি, কত ধন লুণ্ঠন করেছি, কত কোটী কোটি পাপ করেছি, সে হাতদুটো আর উঠল না! পার্বতীর কি তেজ, কি শক্তি, কি বিক্রম। যদি দেখতিস, অবাক হয়ে যেতিস—কিন্তু কেন মনটা বিগড়ে গেল বাবা, পার্বতী করে পাগল হয়ে যাব নাকি? ঐ নয়, ঐ নয়, ঐ এক একটা দমকা বাতাস প্রাণটাকে হু হু করে কঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে-বছে, পার্বতী আজ অনেক উচ্চে উঠেছে—পাপী অধম নারক, অনন্ত অন্ধকূপে ডুবে অশেষ যন্ত্রণা ভােগ করতে তুই থাক। পড়ে রইলাম , না, পার্বতী তােমার মুখখানি ভুলে থাকতে পারবনা, আমি যাব, ১২২ নিমাই সন্ন্যাস যাব, দাড়াও। পাব না—পাব না এই নিষ্ঠুর পাথরের মত হৃদয়ে তোমার অনাবিল মাধুৰ্য একটু ঢেলে দাও, আমি তোমায় বড় ভালবাসি। আমিও তােমার মত হরিনামে পাগল হ’ব, তাতে অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে। তাতেই আমার তৃপ্তি। আমাকে উদ্ধার করতে হবে না, কেবলমাত্র তােমার সঙ্গী করে নাও ! কে তােরা, যমদূত আমাকে বাধা দিচ্ছিস্? কে তোরা কলির বাহন! হাঃহাঃহাঃ- আমি মেঘমালী নই, পার্বতীর প্রেমিক। ছেড়ে দে, ধরি না ! আমার পার্বতী যে নামে মেতেছে—আমিও সেই নামে মাতববা ! হরিনাম করব, তাতে তােদের কি ? আমি প্রাণের পাৰ্বতীকে ছেড়ে থাকতে পারব না। যদি না ছাড়ি, দেখবি—দেখবি মজা দেখবি? (নিজের গল। নিজে টিপিয়া ধরিল ) জগাই। (হাত ছাড়াইয়া) সদ্দার, কর কি? বাবা! এস কত বষ্টমী জুটিয়ে দেব, ভাবনা কি। এস বাবা ধান্যেশ্বরীর ধ্যান করা যাক্, পার্বতী ত ছার, স্বর্গের অপ্সরী ধরে দোব চাদ! এস মৌতাত চড়াই। মেঘমালী। না, ছাড় জগা ! যাব খুঁজবে-নবদ্বীপ সহরের প্রতি দোরে দোরে খুঁজবাে, আমার পার্বতীকে কে নিয়ে গেল। আমি তাকে চাই, ভিক্ষে করে দিন কাটাব, বদি তাকে পাই। আমি সব সইব, সব ছাড়ব-কিন্তু তাকে ভুলতে পারব না? চাই চাই-পাৰ্বতীকে চাই ? [ বেগে প্রস্থান। মাধাই। আরে জগা, তুই শালা যেমন বােকা ও শালা তার উপর বােকা। থুবড়ী শালীর জন্যে শালা পাগল হ’ল ! যেতে দাও বাবা, ০ নিমাই-সন্ন্যাস এস দুই শালা ভেয়ে, মিলেমিশে মদ চড়াই! ঢাল, ঢাল, ঢাল, খালাও খালাও, বাবা। চাই কৃত্তি। জগাই। দে, দে, বাবা যাই। মজাই, মজাই. কুল মজাই। প্রাণ সাপাই। মেয়ে মানুষ নাচাই ! চলুক-চলুক। । ( অদূরে কীর্তনের শব্দ) মাধাই। আরে আজ আবার কাণের কাছে কানাইএর বাসা হ'ল। সেদিন, ও দিন, দুদিন ধরে সাবধান করে দিলুম বাবা, তাতেও শাল না। আজ হেস্তনেস্ত ? চল, চল, বৈরিগী দিগে আজ আড়ে পাস্তালে কেমন ? শুনছিস্ কি মিশ্রীর ব্যাটা ধিজী, আর একটা ডবগা ইয়ার মিলে হরি হরি বােল ধরেছে-থু-থু-ফার, ফরি বােলশ্যাল (মদ পাত্র- হন্তে ভঙ্গি করণ ) জগা। ম্যার, ম্যার, উহুউহু! (রােষ কষায়িত চক্ষে দেখবে, আমাদের গণ্ডীর ভিতর বে-আল্লা গিরি। হুসিয়ার বাবা, আজ দাও! আজ শেষ করব। ( বেগে কীৰ্ত্তন সম্প্রদায়ের মধ্যে উভয়ের গমন ও ভক্তগণকে প্রহার ) জগাই। ফের শালারা-কাজির রাজ্যে বােষ্টমের বে—আল্লা বাত চোর হাড়হাবাতে, চিম্সে ভিখেরী,দেখবি,ছাড়, ছাড়। ছাড় ফরিফরি, গরি হরি, দে ফেলে বেঁাচ কা—অয় সাফ, কালীর ভক্ত হয়ে মদ খা— দেখবি প্রাণে ঘূর্তি। মুরারী। (হুঙ্কার সহকারে) কি এত স্পর্ধা! হিতাহিত জ্ঞানহীন পাপিষ্ঠ দুৰ্জ্জন, ১২৪ নিমাই-সন্ন্যাস বৈষ্ণবের হরিনামে কর বাধা দান, আরে রে অজ্ঞান নাহি ভয় প্রাণে ! দিব সমুচিত প্রতিফল- এই দণ্ডে যাবি যমালয় । নিস্তার নাহিক কারো শেষ দিন আজি রে তােদের ! অারে রে পাষণ্ড- নিত্যানন্দ। কর কি, কর কি গুপ্ত ! জগাই মাধাই মাের জীবন-জীবন । প্রতি অঙ্গে উহাদের মম অঙ্গরাজে, প্রতিঘাতে মম অঙ্গ হইবে চূর্ণিত। হের ক্ষণকাল পরে, নিতাইয়ের অভিন্ন সুহৃৎ, ওই জগাই মাধাই জগত মাঝারে, কেবা কার মিত্র কেবা শত্রু ভাব, সকলেরই অন্তমধ্যে, রাজে এক মহাপ্রেম, এক আত্মা, সুনির্মল, দিব্যজ্যোতি ঘেরা। বিষ্ঠা-কৃমি হ’তে ব্রহ্মা-মহেশ্বর, বিষ্ণুভক্ত দেখিবে অভেদ। মিছ' দম্ভযােগে হের বিপরীত, সম্পর্শে, সূর্যোদয়ে ধ্বম্ভরাশি সম, হইবে বিলীন যত মদ-মােহরাজি।
নিমাই সন্ন্যাস
ভাতিবে নিৰ্ম্মল প্রেম, পরাণ উথলি ।
পাপীরে তুলিয়া লহ কল্যাণের কোলে,
বৈষ্ণবের এই ত বিধান।
জগাই। কি এবার খােসামােদ, তুই শালা আমার চেয়ে পণ্ডিত
তােরশ্রাদ্ধ পাকাই দেখ সজোরে পথপতিত কলসীকণা নিক্ষেপ )
(কলসীকণা নিতাইয়ের মস্তকে পতিত হওন, নিত্যানন্দের
শির কাটিয়া রক্তপাত, সৰ্বাঙ্গ রুধিরাক্ত।)
নিত্যানন্দ। নাচ গাও, নাচ গাও,
ডাক নিমাইয়েরে,
দেখ ভক্ত মাের দিল। উপহার,
দ্বিগুণ উৎসাহে কর হরিনাম,
হইও না বাম,
করিও না ক্রোধের সুচনা
আজ নিত্যানন্দ শিরােদেশে ভক্ত উপহার।
জগাই। ফের শালা, আজ তাের মাথা শুধু কাটা নয়, গুড়ো করব,
দেখ( হস্তোত্তলন )
মাধাই। (হস্ত ধরিয়া ফেলিল) ওরে-ওরে-
আর কাজ নাই জগন্নাথ,
কর হস্ত আকুঞ্চন।
দেখ, দেখ, ভাই চেয়ে
ঝরে যে রে অঙ্গে রুধিরের ধারা !
একি হেরি চতুর্দিকে ব্ৰহ্ম অগ্নিজালা,
নিমাই-সন্ন্যাস
ছুটিতেছে, জ্যোতির্ময় চক্র একখানি
হের নভোদেশে
কিবা ভয়ঙ্কর
নাহি ত্রাণ, নাহি ত্রাণ, নেশা গেল টুটে,
কি কুক্ষণে হেরিলাম হেন দৃশ্য
রাখ, রাখ, মারিও না, আমরা অধম।
মরি মরি, কি মাধুরী, হরিভক্ত তাের,
মদ্যক্ষিপ্ত মাতালের প্রচণ্ড ৬াঘাতে
রক্তাপ্লুত তনু, তবু শান্ত,
হে প্রশান্ত কর রক্ষা উভয়েরে।
জ্বলে গেল দেহ, নাহি তােমা ছাড়া কেহ,
করে মােরে পরিত্রাণ চক্ৰহস্ত হ'তে।
ঐ আসে, ঐ আসে সেই ভয়ঙ্কর।
কিন্তু কি কমনীয় শাস্তি ঢালা ও মুখমণ্ডলে,
কিবা কোটী চন্দ্র জিনি সুশীতল,
গাম্ভীৰ্য্য সুন্দর, ভক্তবর, কর কপা।
নতুবা এ বিপদেতে যেতে হবে শন সদন।
মােরা নরাধম, নরবেশে পশুর অধম।
কর ক্ষমা, দেহ দয়া, শান্তি
তোমা ভিন্ন পাপীদের নাহিক উদ্ধার ।
পলকেতে প্রলয়ের লীলা।
হেরি দৃশ্য পরতে পরতে,
নিমাই সন্ন্যাস
ঐ আমি, ঐ ভ্রাতা মাের জগন্নাথ
পাপকালি মাখা অঙ্গে,
শত শত কৃমি বিষ্ঠা মাখি গায়,
করে মেরে আলিঙ্গন,
শত শত বৃশ্চিক আসিয়া করিছে দংশন !
কি করেছি ভদ্রের সন্তান,
যতদিন জগত থাকিবে,
কলঙ্ক ঘােষিবে লােকে, জগাই মাধাই নামে,
পাপী দুইজন, সাধুর শােণিত পায়ী
কলঙ্ক ঢালিয়া দেছে বৈষ্ণব-পুরাণে।
একি অর্থ রাশি যাও সরো
যাও সরে সম্মুখ হইতে
এ পাপে প্রায়শ্চিত্ত, নাহি এ জগতে,
দয়াময়, অার না সহিতে পারি।
করি অাত্মহত্যা ঘৃণ্য নাম ঘুচাই।
জগৎ হইতে। ( আত্মহত্যার চেষ্টা )
সহসা নিমাইয়ের প্রবেশ।
নিমাই। এক দাদা? কে তােমার এ অবস্থা করলে ? কোথা
সুদর্শন, তাদের খণ্ড খণ্ড করে ভক্তাঘাতের প্রতিশােধ লও, এস
ঘূর্ণমান হও, জ্যোতির্ময় চক্র, এস বিদ্যুচ্ছটা ছড়িয়ে এস, দাও পাপীর
উপযুক্ত শান্তি !
১২৮
নিই-সন্ন্যাস
কলেবরে
জগাই। (সহসা কম্পিত
পদতলে অচেতনের ন্যায়
পতন ) প্রভু, প্রভু, গেলাম সর্বাঙ্গ পুড়ে যাচ্চে, অার না, তুমিই একমাত্র
শরণ্যে, বরণ্যে, অকুলের কাণ্ডারী, ভব ভয়হারী দয়াময় নিত্য নরঞ্জন।
দাও মধুসূদন আশ্রয় দাও। ও কি করেছি, ওরে বাপরে (মুচ্ছ1)
( সংজ্ঞালাভে) দাও উন্মুক্ত শাণিত খঙ্গ, আমি প্রভুপদে মস্তকচ্ছেদ
ক'রে শ্রীপাদ রঞ্জিত করে পাপের কথঞ্চিৎ শান্তি করি, আমি
পারি না
( সহসা সুদর্শনের আবির্ভাব ও জগাইয়ের পুনঃ মূচ্ছ।)
নিত্যানন্দ। কানাই, কানাই।
পতিত উদ্ধার কর পতিত উদ্ধার।
নিমাই ।
যাও দ্বিজ নিত্যানন্দ পদে
লহ গিয়া একান্ত শরণ
তুষ্ট আমি আত্মগ্লানি হেরি,
যতকাল থাকিবে জগতে,
নামমন্ত্র লতি, জপি নিশিদিন
পাপরাশি করি প্রক্ষালন
কাটাইবে জীবনের অবশিষ্ট কাল,
দেহ-অন্তে মম-পুরে লইবে বসতি।
জগাই। রা.--আমি-আমি-আমি-কে? কোথায় ভেসে
চলেছি! প্রভু প্রভু! আমার গতি কি হবে! অহে! কি করেছি-
করেছি কি, ভক্তৃ অঙ্গে শােণিতস্রোত বহিয়েছি। হায় !
হায় আমি
নিমাই সন্ন্যাস অতি অধম-পাম-আমার বুঝি পায়শ্চিত্ত নাই। (ধূলায় পতন ও যন্ত্রণায় ছটপট করণ ) মাধই। আ মরি, মরি কিবা মােহন মুরতি হেরি, গলে বনফুললালা, চন চর্চিত অঙ্গ, পরণেতে ক্ষৌম বাস, ভ্রাতা দুইজন, জলে স্থলে শূন্যে বৃক্ষে বায়ুস্তরে, পথে, গৃহে হেরিতেছি আমি বলিতেছে মৃদুস্বরে আয় ভাই জগাই মাধাই- দিব নাম, করিব না বঞ্চিত তােদের। অঙ্গে কিবা দিব্যগন্ধরাজে, বায়ুকুল হয়েছে গন্ধিত, পদে কিবা মধুনিকণ উঠে, বাঁশরীর মনভােলা স্বর সম। এত দয়া, এত কৃপা প্রেম পারাবার, কোথা আর লভিব আশ্রয়, দাও পদায় অধম সেবকে। যুগযুগ কতকাল গেছে কেটে, আনি নাই রূপের সন্ধান, আনি নাই প্রেমের কি স্বাদ, হেরিলাম কিবা ভাগ্যবলে আজ,
নিমাই-সন্ন্যাস
তােমাদের ভুবন ভুলান রূপ,
মজাইয়া দাও মােরে,
কৃপা হ’তে করােনা বঞ্চিত।
পাপী মােরা জগাই মাধাই
অয় ভাই—আয় ভাই যশোদা দুলাল
কোলে লব, হৃদয়ের জালা জুড়াইব,
প্রাণ দিয়া প্রাণেতে রাখিব।
পদে দিব অশ্রু উপহার !
গলে দিব প্রেম-গুঞ্জহার,
চরণে ঢালিয়া দিব হৃদয়ের রক্ত দিয়ে ঘেরা
এক মধ্যমণি-আত্মা নাম যার।
দাও দাও চরণ দুখানি
প্রাণ মন বুদ্ধি দানি-
অকাতরে অই পদ কমলে ।
কর দয়া-কর দয়া-
ঘাের পাপী মােরা জগাই মাধাই।
( নিতাই ও নিমাইয়ের পদতলে পতন )।
নিত্যানন্দ। উঠরে মাধাই, আয়রে জগাই,
আর দেরি নাই
পাপরাশি গেছে ধুয়ে
বল বল ওরে হরিবােল হরি।
নিমাই-সন্ন্যাস
১৩১
সার কর এই হরিনাম ধন,
অমূল্য রতন স্বপনেও না ভুলিও কভু !
কর অহােরাত্র হরিনাম ধ্বনি।
জগাই ও মাধাই। হরিবােল-হরিবােল—হরিবােল
ভক্তগণ। হরিবােল-হরিবােল-হরিবােল !
অদ্বৈত। ধন্য হরি লীলা অবতার !
অতি বড় পাষণ্ড যে জন,
সেও মত্ত তব নাম রসে !
কৃপায় তোমার হ'ল আজ পাষাণ্ড দলন!
জয় পূর্ণব্রহ্ম সত্য সনাতন,
নমঃ নমঃ ব্রহ্মরূপী গৌরাঙ্গ সুন্দর ।
নিমাই।
সত্যই গোসাই
আজি হ'ল পাষণ্ড দণ্ডন,
নিরন্তর হরিদ্বেষী যেই দুই ভাই,
আজি হতে তারা মাতোয়ারা হ’ল হরিপ্রেমে।
ধন্য ভক্ত জগাই মাধাই
আজি হতে ভারতের প্রতিগৃহে
গাহিবে জগাই-মাধাই নাম!
ভক্তগণ! চণ সবে
নগর ভ্রমণে হরি সংকীৰ্ত্তনে
পাপী জনে কোলে তুলে লই।
নিমাই-সন্ন্যাস
ভগ।
গীত
বােল হরিবােল বােল হরিবােল ভাইরে।
কি মধুর নাম এনেছে ধরায় গৌরাঙ্গ নিতাইরে।
(ওরে এ নামে ঘুচে যাবে সকল দুঃখরে)
দল নিতাই চৈতন্য নামে একবার নাচরে।
এ নামের গুণে পাপী দুই ভাই জগাই মাধাই শুদ্ধ হ’লরে
( তারা যে মাের মহাপাপী ছিলরে)
এমন দুলভ মানব জনম লভিয়ে কি করিলিরে ।
সুখে থাক দুঃখে থাক এ নাম কভু ভুলিনারে।
( জয় গদাধর নিত্যানন্দ জয় অদ্বৈত জয় )।
[ ভক্তগণের প্রস্থান
নিমাই ।
শােন ভাই নিতাই আমার ।
কেন আর মায়ার বন্ধন!
মায়াবশে পণ্ড হয় সব !
জীব দুঃখ না হয় মােচন
অকারণ সহে সবে দারুণ যাতনা।
দেখ ভাবি নানা
সহে জীব কতই যাতনা !
সংসার বনে বদ্ধ হয়ে সবে!
চল ভাই বাই দুইজন,
নিমা ই-সন্ন্যাস
দেশে দেশে হরিনাম করি বিতরণ
ত্যজি গৃহবাস ধরিয়া সন্ন্যাস,
ধরাকাৰ্য্য করি সমাধান।
নিত্যানন্দ। ইচ্ছাময় ।
ভব ভার করিতে খণ্ডন
সনাতন জনম তােমার অবনীপর
কিন্তু সুধাই শ্রীহরি
তুমি যদি ত্যজি পুরী হওহে সন্নাসী
কি দুর্গতি হইবে বৃদ্ধা মাতার তােমার।
ভাব ভাই তার সনে
পতিপ্রাণা বিষ্ণুপ্রিয়া কথা।
নিমাই। কৰ্ত্তব্য কঠোর যেরে ভাই।
যেই কর্তব্যের কঠোর বন্ধনে
ভৃগুরাম মাতৃ শিরচ্ছেদে
সেধেছিল কৰ্তব্য আপন
যেন প্রাণধন তার চেয়ে
নহে 'গুরু গৃহ ত্যাগ মাের।
এস ভাই কর্তব্যে নাহি দিও বাধা,
কালি যাব সন্ন্যাসীর বেশে গৃহের বাহিরে।
[ নিমাই ও নিতাইয়ের প্রস্থান।
১৩৪
নিমাই-সন্ন্যাস
মেঘমালীর প্রবেশ।
মেঘমালী। পাৰ্বতী আমার হৃদয় দেবী, ব্ৰহ্ম-স্বরূপিনি! আহা
তােমার দেওয়া নামখানি, কি মধুর রাধাকৃষ্ণ এ নাম আমি বুকের ভিতর
ক'রে রাখব, এ নামের যে বিনিময় নাই, কেউ শুনতে পেলে নাকি ?
শুননা, শুননা, এনাম শুলে ঝােলা সার করে ভাঙড় ভােলার মত পথে
পথে ঘুরে বেড়াতে হবে, একান্ত শুনতে চাও, আমার পাৰ্বতীর কাছে
যাও, বলে দেবে। যদি তাতে আনন্দের একটুখানি আস্বাদ পাও,
আমাকে ভাগ দিও, ভুলােনা যেন। কাঙাল ছিলাম রাজা হয়েছি,
তবুও নামের কাঙাল! নামের পাগল। বল হরিবােল, বল হরি
হরিবােল।
জগাই ও মাধাই। কে, শুনালি রে, ওরে ওরে-হৃদয়বন্ধু, প্রাণসখা
আবার বরে—আমরা পাপী দুই ভাই জগাই-মাধাই।
মেঘমালী। ( পার্শ্ব ফিরিয়া) জগাই আর মাধাই, জগাই আর
মা-ধাই (সহস; চিনেছি। আর আমি যে রে ভিখারী মেঘা ভাই।
শুধাই জগাই, প্রভু কেবা তব বল, কে দিলরে হরিনামে মতি।
ঘুচিল দুর্গতি ? আজ আনন্দ যে ধরে না রে। আয় ভাই জগাই, আয়
ভাই মাধাই, (উভয়কে আলিঙ্গন ) আজ তিন ভাই মিলে পাপের
প্রায়শ্চিত্ত করব আয় রে। আমরা জাহ্নবীর তরঙ্গতালে হরি হরি
বলে কাদব আয়, কা আয়-কা আয় ।
গীত
पाद
কাঁদব আয় সকলে কাদব আয়কঁাদব আয় ।
যতদিন বাঁচব নামে হাসব, নাচব, কাদব আয়।
নিমাই-সন্ন্যাস
জীবনে করেছি মহাপাপ' তাতে পাই হৃদে মহা মনস্তাপ,
নাম করে মাের কঁদিয়া কাদিয়া শরণ লইব রাঙা পায় ।
যদি নাহি পারি করিতে সে নাম জাহ্নবীর জলে দিবরে পরাণ,
কণ্ঠে হরিনাম জপিব সদাই, প্রাণ যেন নামে বাহিরায় ।
ঐক্যতান বাদন
সুহৃদ সম্মিলনী
পঞ্চম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
নিমাইয়ের গৃহ।
নিমাই ও শচীর প্রবেশ।
শচী।
নিমাই
একি শুনি ওরে নীলমনি!
শুনিনু বাছনি তুই নাকি
ধরা পাপ মােচন কারণ
হরি প্রেমে ভাসাতে সংসার
করিবিরে সন্ন্যাস গ্রহণ।
সত্য তাই, স্নেহময়ী জননী আমার,
কাৰ্য শেষ নদীয়ায় মাের।
গৃহে আমি নাহি রব আম।
লহব সন্ন্যাস
হরিনামে মাতাব বসুধা !
পাপীতাপী যাতে পায় পরিত্রাণ।
সেই হরিনাম করি দান
পাতকী তরা,
পাপ তাপে 9 রা এই বসুন্ধরা,
নিমাই-সন্ন্যাস
হবে মাগো শান্তি নিকেতন ?
কর আশীর্বাদ।
পুণ্যময়ী জননী আমার
মনস্কাম পূর্ণ হয় যেন!
শচী।
সে কিরে নিমাই ।
তুই যাবি ছেড়ে মােরে-
আঁধার ঘরের উজ্জ্বল মাণিক?
তবে আর কার মুখ চেয়ে
রবে বেঁচে এই দুর্ভাগিনী।
নিমাই—নিমাই!
( মূচ্ছ।)
নিমাই।
উঠগে। জননি! শোক পরিহর
মেহে কেন কর
এ দুর্ভাগ্যরে আমন্ত্রণ।
দিওনাকে বাধা,
আমি যেগো বাধা সদ।
প্রাণময় কৃষ্ণের পদে !
তুমি ত গাে জননী আমার,
সব জান অন্তরের ব্যথা।
দহিছে সদাই প্রাণ
কৃষ্ণ প্রেম অন্বেষণে!
হাখমুখে দাওগাে বিদায়
১৩৮
নিমাই-সন্ন্যাস
দেবক|ৰ্যে জনম ধরায়
বাধা তায় না দান জননি।
শচী।
না-না-মিমাই, আমি বুক ধরে তোকে ছেড়ে দিতে
পারব না। তার চেয়ে এক কাজ কর, আমাকে হত্যা কর! তােরে
যা ইচ্ছে যায় করিস-আমি আর কিছু বলতে অস্ব না ? নিমাই—ও
নিমাই-তুইও চলে যাবি! যা--যা-সব যা! কেউ আমার নেই !
আমি একাকিনী। এই মিশ্রবংশে একটা রাক্ষসী এসেছিল-সকলকে
গ্রাস কতে? ব্রত পূর্ণ হয়েচে, পুত্র গ্রাস করেছি-স্বামী গ্রাস করেছি-
পুত্রবধু তাকেও গ্রাস করেছি—কী কেবল তুই ছিলি আজ তােকেও
গ্রাস করতে বসেছি। হাঃ হাঃ হাঃ! সর্বগ্রাসী:রাক্ষসী আমি সর্বগ্রাস
কব! সরে যা--সরে যা–কালনাগিনীর নিঃশ্বাসে সব উড়ে যাবি।
যা—যা-পালাপালা-
নিমাই। মা-মা-পুত্রস্নেহে পাগলিনী হওনা। অনুমতি দাও
তুমি তাে জান দেবি এক তিলাও আমি কৃষ্ণ বিরহ সহ্য করতে পারি
! তবে কেমন করে এখানে থাকবে জননী।
শচী। হাঁতুমি কৃষ্ণ ছেড়ে থাকতে পারবে না। আর আমি
সর্বনাশী আমার প্রাণ কৃষ্ণকে জন্মের মত ছেড়ে দিয়ে কেমন করে
থাকবে।
নিমাই। অননি! কৃষ্ণ বলে কাদ—তিনিই তােমার সকল দুঃখের
মােচন করে দেবেন?
শচী। কেন আমি কৃষ্ণ বলে কঁদ্ব? সে আমার কে? কাদবে
নিমাই তাের নাম করে—তাতে তাের ধর্মে যা হবার তাই হােক!
সন্তানের জন্মই যদি মাকে কাঁদবার জন্যে হয়- তাই কঁাদববা! কেঁদে
নিমাইসন্ন্যাস
নিমাই।
কেঁদে অন্ধ হয়ে যাবে-তারপর রাক্ষসী আমি নিজের মাংস নিজে ভক্ষণ
করূবে ! দেখতে হবে না কি করছি, কে আমার আছে ? অন্ধের
রাতদিনই সমান ! তখন যার কথা কাণে শু তাকেই ভেবে নেব ঐ
বুঝি আমার নিমাই কথা কচ্চে ! ঐ বুঝি আমার নিমাই এসে মা মা
করে আমার সকল দুঃখের অবসান করে দিচ্চে ।
ত্যহ বিষাদ মাতা।
শােন কথা ! কর মায়ার !
কেবা কার
বারার যতই কাদিবে
বেদনা ৰাড়িবে-
ঘুচিবে অশ্রুজল তব !
কৃষ্ণনামে কুঁদ
কৃষ্ণে কোলে পাবে।
বিষাদ ঘুচিবে
এ মরু সংসারে
কিছু নাই সারাৎসার কৃষ্ণ নাম বিনা?
ভাব দেবি আরো
হেন সুভাগিনী কাহার জননী
চিন্তামণি কার্যভার
যাহার নন্দন করগাে গ্রহণ ?
শচী। নিমাইরে! তুই যতই কেন বােঝনা—আমার যে আর
কেউ নাই! তুই এখন এ বৃদ্ধার একমাত্র আশ্রয় ! তােরই মুখ চেয়ে বে
১৪।
নিমাই-সন্ন্যাস
এখনও বেঁচে আছি চাঁদ। অভাগিনীর সর্বস্ব তােকেও হারাব
তোকেও গ্রাস করবে—বেশ তাই হােক! সৰ্ব্বনাশিনী শচী! এখন
তাের হয়েছে কি ? ও মা কথায় কথায় যে মন্ধ্যে হয়ে এল ! এখনও
নিমুর জন্যে রান্না বসেনি! ও বৌমা—বৌমা করছ কি দেখ দেখ আমার
নিমুর আহ্নিকের যােগাড় করে দাও, আমি বাছাকে আজ নিয়ে
রেখে কাছে বসিয়ে খাওয়াব ! নিমু যে আমার পালাবে !
( দ্রুত প্রস্থান।
নিমাই। মা বুঝি এবার সত্যই পাগলিনী হ’ল। কার জন্য বন্ধনে
উদ্যােগ কবে দেবি ! পরার্থে জাবের উপকারের জন্য আজ যে আমি
কঠোর সংযমে রাত্রি যাপন করে প্রভাতের পূর্বেই সন্ন্যাস গ্রহণ
দেবকাৰ্য্যে আমাকে চিরদিনের জন্য উৎসর্গ করবো!
না--না—স্থির আর রহিবারে নারি,
অই কাদে নরনারী আকুল পরাণে
যাই-যাই-ভক্ত
পুরাইব সবার কামনা,
সাথে লয়ে নিত্যানন্দরূপী দাদা বলরামে।
[ প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য
নিমাইয়ের শয়ন কক্ষ।
বিষ্ণুপ্রিয়া।
বিষ্ণুপ্রিয়া। আজ নে থেকে থেকে আমার ডান চোখটা নেচে
উঠচে ! কিছুই ভাল লাগছে না! সৰ্ব্বদা মনে হচ্ছে আমি যেন কি
একটা জিনিষ হারিয়ে ফেলেছি। কেন আমার প্রাণ এত ব্যাকুল হ’ল !
ইত প্রভু আমার এখনও আসছেন না কেন ? সারাদিনতো সঙ্কীৰ্ত্তন
সয়ে আছেন। আমার ইচ্ছ। আমি সদাসর্বদ। তাকে আমার চোখের
পনে রাখি! চোখ জুড়িয়ে দেখি ! তা কই হয়! মানুষ যা ইচ্ছা
রে তা যদি হত তা হলে আর ভাবনা কি? ওমা! তিনি এখনই
ষ এসে পড়বেন ! এখনও বিছামা পত্র পরিষ্কার হয়নি যে !
( নিমাইয়ের শয্যা পরিস্কার করণ)
নিমাইয়ের প্রবেশ।
নিমাই।
অই—অই ফুটন্ত কোমল, অবলা বালিকা
বিষ্ণুপ্রিয়া মাের
আমাহেতু করিতেছে শয্যার রচনা,
কিন্তু লো প্রিয়ে এখনও জাননা,
নিমাই-সন্ন্যাস
স্বামী তব
করিয়াছে এক নির্মমতা যজ্ঞ আয়ােজন!
সেই যজ্ঞে দগ্ধ হবে
পুণ্যময়ী দেবী জননী আমার,
আর পতিপ্রণা তুমিললা সুন্দরী!
আহা ! এখনও নহে অতিক্রান্ত হব
বর্ষ চতুর্দশ
কিরূপে সহিবে বিরহ আমার!
প্রিয় নাহিক উপায় আর
রহিবারে গৃহবাসে !
জননী আদেশে
শুধু বিষবৎ যেপেছি সংসারে
এতকাল আমি !
যাই এবে বিষ্ণুপ্রিয়া কাছে ।
কহি তারে বিদায়ের কথা!
(বিষ্ণুপ্রিয়ার সম্মুখে আগমন)।
একি প্রিনে--
ফুল্প পজিনী আদরিণী তুমি,
কেন লােগ তবে ম্লানমুখ হেরি?
বিষ্ণুপ্রিয়া। কই-না-কিছুনা। ( চক্ষু মুছিল)
নিমাই। না—তুমি কঁছিলে ? বলবল বিষ্ণুপ্রিয়া ! কি এমন
দুঃখ তােমার—যাতে তােমার চোখে জল ? নীরব রইলে যে।
নিমাই-সন্ন্যাস
১৪৩
বিষ্ণুপ্রিয়া! প্রভু !-( কঁদিয়া ফেলিলেন)
নিমাই। আবার কাদে? কাছ কেন?
বিষ্ণুপ্রিয়া। আমার মনে হচ্ছে—আমার এই সুখ স্বপ্ন দু’দিনের !
প্রভাতের সঙ্গেই সকল সুখের অবসান হবে।
নিমাই। কেন প্রিয়ে !
বিষ্ণুপ্রিয়া । তা জানিনা। তবে মনে হচ্ছে।
নিমাই। মনকে অত আৰ্গা করলে তাে চলবে না। মনকে
বাধভে হয়।
বিষ্ণুপ্রিয়া। তা যে পারিনা। সত্যই প্রভু আমার কেবল মনে
হয়—তােমায় বুঝি আর দেখতে পাবনা।
নিমাই। (স্বগত) অনুমান নহে মিথ্যা সতি
ঘুচাইতে জীবের দুর্গতি
সত্য আমি ছেদি মায়াপাশ
লইব সন্ন্যাস জনমের মত ।
বিষ্ণুপ্রিয়। আমার মনে হয় তুমি আমার সঙ্গে প্রবঞ্চনা কৰছ ?
কেন কেন নাথ আমি কি তােমার চরণ সেবার যােগ্য নই।
নিমাই। প্রাণময়ি !
তুমি যেগাে অর্ধাঙ্গভাগিনী
নারী শিরােমণি রমণী রতন !
মিথ্যা আর না কহিব তােমার সকাশে।
শােন চারুশীলে ।
প্রমের অধীন চিরদিন আমি,
১৪
নিমাই সন্ন্যাস
প্রেমহেতু এসেছি সংসারে
আমাতে আমি যে নই
প্রেমােন্মত্ত সদা প্রাণ মাের!
ভাবিও সতি,
ইচ্ছা ক্লেশ দিতেছি তোমায়
জানিও নিশ্চয়-
সৰ্ব্বত্যাগী হব শুধু প্রেমের কারণে।
যাব আমি কৃষ্ণ অন্বেষণে
তুমি রবে মাতার নিকটে।
বিষ্ণুপ্রিয়া। সত্যবাদি! এই সত্য তব ?
-না-মিথ্যা বল।
সত্যে আর নাহি প্রয়ােজন
মিথ্যা আবরণ দিয়ে রাখ ঢেকে
ধ্রুব সত্য যাহা !
নতুবা দাসী প্রাণ বাহিরিবে—
যাবে-যাবে, ছেড়ে যাবে এ দেহ কারা হতে
মুহূর্তেতে তােমাগত প্রাণ।
হায়! হায়! কি অপরাধী আমি,
হেন শাস্তি যায় করেছ নির্দেশ।
পতি সত্বে পতিহীনা হইবে রমণী
গুণমণি এ কেমন বিধাণ ?
অতিমা! এই কি পুরুষ বিহিত ?
নিমাই-সন্ন্যাস
১৪৫
নিমাই।
ওগাে-ওগো--কহিওনা কথা
পায় ব্যথা হৃদয়ের প্রতি অন্তঃস্থল
আমা ছেড়ে কোথা যাবে তুমি ?
যদি যাবে কর তবে সঙ্গিনী আমায় ! ( ক্রন্দন।
শােন প্রিয়ে না হও ব্যাকুলা !
অকুলা জননী মাের,
অধৈর্যের কালে দিও তঁারে সান্ত্বনা বচন,
কদাচন স্বামী অজ্ঞা ক’র না ঘন !
আম তরে-
সেই ভালবাসা মােহে হইয়া বিল
অবিরল অশ্রু তুমি করিছ মার্জন,
সেই ভালবাসা বিশ্বজীবে করহ অর্পণ।
সংযুক্ত করহ আত্ম। প্রতি জীব সনে,
হে মায়া দয়া-
আমার কারণ যাহা রয়েচে সঞ্চিত
দাও ঢেলে তাহা বিশ্ববাসী প্রাণে।
সুখ শান্তি পাবে তাহে
কামনা না রবে-
টুটে যাবে মােহ অন্ধকার।
নয়ন সম্মুখে তব ভাতিবে তখন
পুত্ৰ কিম্বা ভ্রাতৃরূপে যত জীবগণ!
আমা হতে শ্রেষ্ঠ তারা সৃষ্টি বিধাতার ।
১০
১৬
নিমাই-সন্ন্যাস
সংযুক্ত করহ মন বিশ্ব কেন্দ্রসনে
হেরিবে অন্তরে তবে ব্ৰহ্ম নারায়ণে!
ক্ষুদ্র আশা কর কেন হৃদে অনিবার,
ক্ষুদ্র মােহ বাধ কেন স্বামীরে তােমার।
জ্ঞানচক্ষু একবার কর উন্মলন,
কোটী কোটী স্বামী তব হবে দরশন !
বিষ্ণুপ্রিয়। স্বামি ! স্বামি ! একি দেখছি! যেন তুমি আমার
সম্মুখে কোটী কোটী হয়ে দাড়িয়ে রয়েছ !
ভাব এবে প্রিয়ে,
ঐ কোটী রূপ রাজে প্রতি জীব দেহে।
এস নিমাইয়ের জীবনসঙ্গিনী
আজি ফুল অলঙ্কারে সাজাব তোমায়।
গলে দিব তুলসীর মালা
দেখি কেমন সাজায় ?
নিমাই।
( ফুল অলঙ্কার ও তুলসীর মালা দিয়া সাজাইতে লাগিলেন
বিষ্ণুপ্রিয়া। আর কেন ভুলাও আমায়!
মায়াময় শুধু তুমি আমারে নিদয়,
যেই জন তােমা ডাকে দয়াময়
তার মত তার কাছে হও হে উদয় ।
দিও পদশিয় অধীন কিঙ্করী
যেন হরি ভুলনা কখন'।
নিমাই-সন্ন্যাস ১৪৭ নিমাই। তােমারে ভুলিব ? হের প্রিয়ে অন্তঃস্থল মাের কাহার মূরতি রাজে, দেখ–দেখ চেয়ে শুধু একবার ! প্রেমময়ী তুমি লো সুন্দরী পরিহরি তােমা একতিল- থাকিবারে নারি ! কই কই প্রিয়ে, সাজা তেমোরে মনোমত করি তুমি ত সুন্দর সাজালে না মােরে? বিষ্ণুপ্রিয়া। কি আছে দাসীর,-হেন অলঙ্কার, যাহে প্রভু মনোনিত সাজাব তােমায় ? আপন প্রভায় আপনি সেজেছ অন্য সাজে কোন্ প্রয়ােজন ! ( নিমাইকে আলিঙ্গন ) নিমাই। (স্বগত) যোগনিদ্রে ! মাগো! ভুবনমােহিনি। হও অনুকুল, করহ আকুল নিদ্রাঘােরে প্রিয়ারে আমার! সময় বিগত, জীব কত করিছে রােদন সহিবারে নারি আর, হও মা সত্বর অন্তর আকুল অতি শ্রপতির কাৰ্য্য সাধিবারে।
১৪৮
নিমাই-সন্ন্যাস
গীত
বিষ্ণুপ্রিয়া। আমার মন যে আজ কেমন করে।
তোমারে ছাড়িতে সখা ভাসি কেন অাঁখিনীরে।
সদা মনে হয় এই বুঝি হারাই তােমায়,
( তােমার ) মিষ্ট কথায় তুষ্ট হই ভুলে যাই হয়,
এই মিনতি করিহে শ্রীপতি চিরসঙ্গিনী করিও দাসীরে।
কাদায়ে না দয়াল প্রভু, বাঁচিব না আমি তােমায় ছাড়িয়ে।
নিমাই। (অন্যমনস্কভাবে ) না—না—তোমাকে একদও আমি
ছেড়ে থাকতে পাবন!!
বিষ্ণুপ্রিয়া। একটা কথা সত্য ববে কি ?
নিমাই। কি–কি ? বল ?
বিষ্ণুপ্রিয়া। তুমি কি ভাবছ ?
নিমাই। কই কিছু ত ভাবি না! তবে-একটু নিদ্রা
আচে।
বিষ্ণুপ্রিয়া। নিদ্রা যাবে ? তাতো বল্লেই হ'ত ! এসনা-শোওনা।
আমি পদসেবা কছি—তুমি নিদ্রা যাও।
( নিমাইয়ের শয়ন ও বিষ্ণুপ্রিয়ার পদসেবা করণ)
বিষ্ণুপ্রিয়া । রজনীর সহচরি নিদ্রা মায়াবিনি!
যাও দূরে আজিকার মত,
সারারাতি চেয়ে থাকি প্রভু মূখপানে
মিটাই পিয়াস—এখনও যে নাহি মিটে আশ,
নিমাই-সন্ন্যাস
১৪
ক’রন নিরাশ মাগো
এই সৌভাগ্যে আমার !
হাহা ! এত রূপ আর কেউ ধরে।
মনের রূপ জিনি
Tণমণি যেন বিরাজেন কোটি শশী সম।
রে রে নয়ন দেখ-দেখ, ভাল করে,
নারী-জননের সন:
-গ্রহ তাের !
একদৃষ্টে নিয়ের মুখের দিকে নিরীক্ষণ ও সহসা নিদ্রিত হওন।
নমঃ।
}
চত্রে খান পূর্বক) আর কেন মন।
গদ্রি।শোরে সুপ্ত বিষ্ণুপ্রিয়া মাের,
এই অকাশে ছাড়ি গৃহবাস !
মাও ঘুমাও প্রিয়ে,
মহিলা প্রাণেশ তব চিরঋণী তব পাশে।
কি করিব দেবি !
হেরিয়ে বিদরে প্রাণ জীবের দুর্গতি।
তাই যাই দ্রুতগতি ত্যজিয়ে তােমায়।
দাও দেখা দয়াময়, দান হৃদে বল,
কাতর পরাণ হয়েচে চঞ্চল ।
মা-মা, চলিল সন্তান তাের কৃষ্ণ অন্বেষণে,
ক’র মা আশীষ
ফেলিও অশ্রুজল আমার কারণে,
৩
নিমাই সন্ন্যাস তুমি যদি ফেল নয়নের বারি দয়াময় হরি হবে মাের বাম! প্রণাম—প্রণাম—জন্মভূমি নবদ্বীপ মাের। তব বক্ষে কত উপদ্রব করিয়াছি আমি। সৰ্ব্বসংহ তুমি গাে জননী ! অকাতরে সহেছ সকলি ! নবদ্বীপ প্রবাহিনী দেবী ভাগিরথি ! প্রণাম শ্রীপদে তব, ক’র ক্ষম। অধমের সর্ব অপরাধ । -না-হইলে প্রভাত জাগরিত হবে নবদ্বীপবাসী, ঘটিবে প্রমাদ, জয় কৃষ্ণ জয় কৃষ্ণ বলি হই গৃহের বাহির। [ দ্রুত প্রস্থান । বিষ্ণুপ্রিয়া । কই কই-প্রাণেশ ! প্রাণেশ ! একি শূন্য শষ্য-শূন্য গৃহ- শূন্যময় হেরি চারিধার ! সব আছে নাই শুধু অভাগীর সর্বস্ব রতন ! বুঝেছি এবার ভেঙেছে কপাল। চলে গেছে প্রাণের মাের, ভেঙ্গে দিয়ে বক্ষের পঞ্জর। ওহে কালসপি নিমাই-সন্ন্যাস কি মহানিদ্রা ধরেছিল তাের ! কই–কই-কতক্ষণ গেলে- কোথা গেলে কোন্ পথ দিয়ে কোথায় লুকালে, ওগাে—ওগাে-দাওগাে উত্তর কই কেহ নাই, শূন্যের বাতাস শূন্যে মিশাইল ! অভাগারে বলে গে—নাই—নাই---নাই! আর নাহি পাবি তারে 'গুণমণি তােরে গেছে ফাকি দিয়ে ! মা-মা-এস ছুটে অভাগিনী, নয়নের মণি প্রাণের কোঙার তব কি সাজে সাজায়ে মােরে নবদ্বীপ ছেড়ে নদীয়। ত্যজিয়া ভ্রমে পথে পথে । মা-মা-ওঠ-ওঠ- দেখ এসে কি দুর্দশা হয়েছে আমার ? দ্রুতপদে শচীর প্রবেশ। কার কণ্ঠস্বর ! বৌমা নয় ? বৌমা—বৌমানিমাই কোথায় ? বিষ্ণুপ্রিয়া। মা-মা! সর্বনাশ হয়েছে। সর্বনাশ হয়েছে! প্রভু আমার আমাদের ফাকি দিয়ে পালিয়েছেন। শচী।
নিমাই-সন্ন্যাস শচী। সে কি মা! নিমাই আমার কোথায় গিয়াছে ! তবে কি সত্য সত্যই নিমাই আমার সন্ন্যাসী হয়ে গৃহের বাহির হয়েছে ! না-না- সে যে এমন দুষ্টপনা ছেলেবেলা থেকেই করে থাকে। নিমাই, ও নিমাই নিমাই আমার, বাবারে, আমি যে তোর বৃদ্ধা মা ! আমার যে আর কেউ নেই চাদ ! দে-দে--উত্তর দে! আর লুকিয়ে থেকে অভাগিনীকে কষ্ট দিনে ! নিমাই-নিমাই-ই। বোমা—বৌমা, নিমাই আমার কতক্ষণ গেছে-তুমি আমার তখন কি করছিলে ? তােমাকে সে কি বলে গেল? বিষ্ণুপ্রিয়া। মা, তিনি কাল রাত্রিতে সঙ্কীৰ্ত্তন করে এসে বললেন, বিষ্ণুপ্রিয়া, আমি আর জীবের দুর্গতি দেখতে পারছি না! জীবের দুর্গতি মোচনের জন্য আমি সন্ন্যাসী হ’ব! ঘরে ঘরে যাতে বিষ্ণুপ্রেমের স্রোত প্রবাহিত হয়ে পাপীতাপীর দুর্গতি খণ্ডন করূতে পারি, তার চেষ্টা করূবে ! আরও সব কত কথা বলে বললেন—আমার এবার নিদ্রা আচে ! আমি বাম, শয়ন করুন—পদসেবা করচি। তিনি নিদ্রা গেলেন তারপর আমি তার পদতলে কখন যে কালঘুম ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা জানি না। স্বপ্নে দেখলুম-প্রভুর আমার মস্তক মুণ্ডিত, দণ্ড হস্তে, কৌপীন পরিধানে পথে পথে ভ্রমণ করছেন, ভয়ে নিদ্রা ভেঙ্গে গেল, জেগে উঠলুম—দেখলুম, সত্যই আমার কপাল ভেঙ্গেছে ! বিষ্ণুপ্রিয়া ! গৃহবাসী রাখিয়া মােদের, সত্যই নিমাই হয়েচে সন্নাসী ? নিমাই—নিমাই—এই ছিল মনে তাের ? বৌমা–দেখ দেখি ভাল করে, শচী।
নিমাই-সন্ন্যাস বসে নাই বাছা ত আমার যোগর আসনে, কিম্বা একমনে হরির সাধনে, কোথাও তন্ময় প্রাণে রহে না তো অচেতন? নিমাই-নিমাই দাও বাপ উও আমায়, তোমা বিনা প্রাণ বাহিরায়, অন-'আয় হৃদয়ের নিধি বক্ষে হয় ? কইনাই-প্রত্যুত্তর নাহি পাই, কাহারে সুধাই -কোথ। যাই-- কে বা দেয় বাছার বারতা ? নিমাইরে--করে কথা মাতৃ প্রাণে আর ব্যথা দিস্ না মাণিক। নিমাইনিমাই- একি ? প্রতিধ্বনি বলে যেগাে নাই- নাই-নাই । বিষ্ণুপ্রিয়া—সব্বনাশে নাই বাকী, দিয়ে ফাকি নিমাই অামার গেছে চলে আয় মা--আয় মা’ যাই দেখি গঙ্গাতীরে, ডাক-ডাক- উচ্চৈঃস্বরে— যদি পাই ওরে নিমাইয়ের দেখা। বিষ্ণুপ্রিয়া। আমি কি বলে ডাকিব ওমা- তুমি ডাক প্রভু, প্রভু, বলি, আর আমি ডাকি নিমাই-নিমাই [ উভয়ের প্রস্থান। শচী।
তৃতীয় দৃশ্য
গঙ্গাতীর ।
জগাই, মাধাই ও মেঘমালীর প্রবেশ।
অগাই।
মেঘমালী। কে এই আঁধার রেতে দু’টা মেয়ে মানুষ নিমাই—নিমাই
বলে ছুটেছে?
জগাই। আমিও শুনেছি-কে বল দেখি?
মাই।
কেন প্রভুর আমার কি হল? ঐ নয় কে আচে
জিজ্ঞাসা কর! জিজ্ঞাসা কর! প্রভুর সংবাদ নে!
পার্বতীর প্রবেশ।
কে মা তুমি ? তুমি বলতে পার-কে আমাদের প্রভুর
নাম উচ্চারণ করে এই অন্ধকার রজনীতে ছুটচে ?
পার্বতী। পারি। ওরে সে যে বড় সর্বনেশে কথা। নদীয়ার সূৰ্য্য
অন্তমিত হয়েছে! মধ্যাহ্নে রাত্রির সমাবেশ! প্রভু নিমাই তার মাকে
ও পত্নীকে ত্যাগ করে এই রাত্রে সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন।
মেঘমালী।
কে পাৰ্বতী ! তুমি কোখেকে এলে! পাৰ্বতী।
পার্বতী ! মেঘমালীর ইষ্টগুরু! বল, বল, প্রভুর আমাদের কি হয়েছে?
জগাই ও মাধাই। বস্ মা বল! প্রভুর সংবাদ আরও যদি কিছু
জানিস্ বল !
পার্বতী। আর বলবো! শচীদেবী পুত্রশোকে উন্মাদিনী, সাধ্বী
নিমাইসন্ন্যাস
বিষ্ণুপ্রিয়া কোথায় প্রাণেশ বতে বলতে গঙ্গাতীরে ছুটেছে। কিন্তু
আমি সেখান হতে আসছি, গঙ্গাতীরে কেউ নেই !
সকলে। চ-চ-আমরাও প্রভুর অনুসরণ করি।
[ সকলের প্রস্থান ।
দ্রুত অদ্বৈত ও সীতার প্রবেশ।
অদ্বৈত। সীতা-সীতা—এত ভোরে নিমাই—নিমাই বলে কে
চীৎকার করে ?
সীত। তাইত গো ? নিমাইয়ের জন্য শচীদেবী ও বৌমা চীৎকার
কছে শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেছে ! তবে বোধ হয় বাবা আমার
সন্ন্যাসী হয়ে আমাদের ফাকি দিয়েছে।
অদ্বৈত। আবার শিরে বজ্রপাত! ভগবন্ ! একি তােমার খেলা!
আর থাকতে পারছি না! বিশ্বরূপ একচক্ষু অন্ধ করে দিয়ে গিয়েছে
আর একটা চক্ষু ছিল, নিমাই তাও অন্ধকার করে দিয়ে এই অন্ধকারময়ী
পৃথিবীবক্ষে ছেড়ে দিয়ে পালিয়েছে। নিমাই! নিমাই! সীতা-সীতা,
চল—চল আমরাও সন্ন্যাসী হ’ব ! আজ শুধু নিমাই সন্ন্যাসী নয়-
নদীয়ার নরনারী সকলেই সন্ন্যাসব্রতে ব্ৰতী হবে ।
[ উভয়ের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য
কাটোয়া-কেশব ভারতীর আশ্রম।
কেশব ও নিমাই আসীন।
নিমাই।
গৃহে ফিরে যাও বৎস! কিশোর ৰুবক তুমি,
শাস্ত্রের নিয়ম, পঞ্চাশৎ বর্ষ পরে সন্ন্যাস আশ্রম।
বৃদ্ধমাতা গৃহে রহে
তরুণী রমণী বিষ্ণুপ্রিয়া আর ।
ভাব একবার তােমা বিন
কি দশা হয়েছে তাদের।
অপরাধ গম গুরুদেব!
পঞ্চাশংবর্ষ পূর্বে যদি হয়গো মরণ,
কিরূপে হইবে মাের অভীষ্ট পূরণ ?
পার হব কিসে ভব পারাবার ?
অদ্ভুত প্রলাপ তব,
হেরি গেম। বিদরে পরাণ,
তুমি গৃহী আমিরে সন্ন্যাসী
অতীব কঠোর সন্ন্যাসের ব্রত।
প্রভু, কৃষ্ণপ্রেমে আমি গগ। উন্মাদ,
পরমাদ না ঘটাও কভু ! কৃষ্ণ ছাড়া আমি নই,
কৃষ্ণ প্রাণ, কৃষ্ণ ধ্যান, ক ন মােন,
বল দেব, সেই কৃষ্ণে দেখা পান্তু কোথা !
কেশব।
নিমাই।
নিমাই-সন্ন্যাস
করে দিন উপায় নির্দেশ,
হৃষিকেশ চরণ আশ্রয় পাই যাতে !
কেশব। জানি আমি তোমা,
ভুবনের সারাৎসার ওহে চিন্তামণি ।
জগতের গুরু তুমি নটবর,
শুধু লােক শিক্ষ। হেতু গুরুপদে মােরে করিছ বরণ !
ইচ্ছামর তুমি
তব ইচ্ছা কোন দিন না হয় পূরণ ?
ইচ্ছায় তােমার কীৰ্ত্তি রবে চিরতরে মাের !
তবু প্রাণ কঁদে কেমনে শ্রীহরি--
ওই বেশ পরিহরি হইবে সন্ন্যাসী ।
অঞ আসে ভেসে চোখে,
বলিবে ত্রিলােকে নিষ্ঠুর পাষাণ কেশব ভারতী !
নিতাই, মুকুন্দ, বকেশ্বর, চন্দ্রশেখর ও ভক্তগণের প্রবেশ।
নিতাই। এই যে—এই যে—প্রভু আমাদের। বল হরিবােল ।
হরিবােল। হরিবোল।
নিমাই ।
তােমরা এসেছ ? এস, এস, নিমাইয়ের হৃদয়-সৰ্বস্ব,
গুরুদেব! গুরুদেব! এইবার আমাকে দীক্ষা দিন্ ! দীক্ষা দিন! ত্রাণ
কৰ্ত্তা পরিত্রাণ করুন !
কেশব। না--না-নিমাই! আমি তা পার না। আমি কেমন ,
করে দেখবাে তােমার মুণ্ডিত মস্তক, দণ্ড, কৌপীন-অহে! স্মরণ
কতেও বুক কেঁপে উঠে। আমি এত নিষ্ঠুর হতে পাবনা।
'১৫৮
নিমাই-সন্ন্যাস
নিতাই। হা প্রভু। তােমার মনে এই ছিল।
চন্দ্রশেখর। বাপ নীলমণিরে ।
বাপ নীলমণিরে। চল চল ঘরে চল। দেখবি চল
চিরদুঃখিনী তাের জননীর কি দশা হ'য়েচে। বৌমা আমার কেঁদে
কেঁদে এতক্ষণ আছেন কি নেই। আর কেন কষ্ট দিচ্ছিস্ বাবা !
সকলে
গীত।
চরে লু নদের গােরা নদেয় ফিরে চল।
ঘুচাইতে নীলমণি তাের জননীর চোখের জল।
প্রাণ ছেড়ে জীব ধরায় কেমনে থাকূতে পারে,
( তুই যে নয়নের চঁদ কেন এমন করলি বল)।
তাে বিনে সব রে আঁধার, তুই যে আঁধার ঘয়ের দীপটী
(গৌর রে) আমরা বাঁচবে কিসে তাে বিনে তুই তা ভেবে বল ।
নিমাই। গুরুদেব। উদ্ধার করুন।
কেশব। ইচ্ছাময় । এ আবার তােমার কোন্ ইচ্ছা। চল দেব,
তােমার কাৰ্য্য তুমিই কর। পরামাণিক।
পরামাণিকের প্রবেশ ।
পরামাণিক। চলুন প্রভু। অগ্রে মস্তক মুণ্ডন করে দিই। পরে
গঙ্গাস্নান করে আসবেন।
নিমাই। তাই হবে, চল।
[ পরামাণিকেরসহ প্রস্থান।
নিতাই প্রভৃতি। হায়।
হায়। হায়। আর বুঝি রক্ষা করতে পারলাম
। ওরে পরামাণিক। রক্ষে কর-রক্ষে কর-আয়-আয় সব দেখিগে।
[ কেশব ভারতী ভিন্ন দ্রুত সকলের প্রস্থান।
নিমাই-সন্ন্যাস
ধন্য লীলাময় ! তব কাৰ্য তুমিই সাধিলে,
অধম কিঙ্করে শুধু নিমিত্ত করিয়া।
পুনঃ নিমাইয়ের প্রবেশ।
নিমাই। গুরুদেব! গঙ্গাস্নান সমাপন এবে।
কোন্ কাৰ্য অনুষ্ঠান করিতে হইবে ?
সকলে। বাছা! আমাদের অনুরােধ-তুমি এ সংকল্প ত্যাগ কর।
নিমাই।
আর বাধা দিওন! সকলে,
প্রাণ খুলে বল হরিবোল স্নেহ-গণ্ডগােল মিটিবে অচিরে,
এ সংসার কদিনের তরে যবে যাবে ছেড়ে আত্মামণি
সেই হরি ভিন্ন কিসে মুক্তি হইবে জীবের!
কহি তাই সময় থাকিতে বল বল হরিবােল ।
গুরুদেব! কাৰ্য অনুষ্ঠানে হুন ব্ৰতী এবে।
ধর বাছা কৌপীন বসন,
আঐ বস্ত্র কর ত্যাগ!
( নিমাইকে বস্ত্র প্রদান )
নিমাই। সকলে হরি হরি বলে দয়া করে আমাকে অনুমতি দি।
এস বৎস! বস তুমি দক্ষিণে আমার।
এবে কোন্ মন্ত্ৰ প্ৰদানি কেশবে! ( চিন্তিত হওন)
নিমাই।
গুরুদেব! এক মন্ত্র আর দিন
পেয়েছি এক ব্রাহ্মণের ঠাঁই-কহি তাহা ! (কর্ণে কথন)
করুন বিচার কোন মন্ত্র দানিবেন মােরে!
অহহ! কি শুনিনু-কি শুনি
যেই মন্ত্র আমি অন্বেষণি পেনু তব ঠাই।
নিমাই-সন্ন্যাস
হে গোসাই, ধন্য দয়া তব ?
ভক্তগুৰু! আজি মুক্ত আমি তব কৃপাবলে?
লও মন্ত্র শক্তিপর ! অতীব গোপনে
দিলে যাহা চিন্তামণি,
সেই মন্ত্র পুনঃ প্ৰদানি তােমায় ! (কর্ণে কথন।
নিমাই। গুরুদেব! করুন গ্রহণ প্রণাম দাসের।
অখণ্ডমণ্ডলাকারং ব্যাপং যেন চরাচরম্।
তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ ।
কেশব। জ্ঞানমত মন্ত্র দিমু নারায়ণ, পুনর্জন্ম হ’ল তব,
কিবা নাম দিব আমি ভাবি অনুক্ষণ!
দৈববাণী। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য-শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্য! শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ।
( সকলে বিষ্ময়বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া রহিল ।
কেশব। হে গোসাই ! দেবতা আদেশে
আজি হতে তব নাম ঐষ্ণ-চৈতন্য!
এবে পূর্ব নাম, ধাম, পত্নী, মাতা আদি পরিজন
পূৰ্ব্ব বসন ভূষণ না রহিল তব ?
ভূমি শয্যা, অঙ্গ তৈল হীন, বৃক্ষতল হ’ল গৃহ,
বাস যথা তথা,
ছিন্ন কন্থাসার নবদ্বীপ প্রবেশের নাই অধিকার ।
ধরি দণ্ড করে বিচর পরের দ্বারে এবে চিরদিন !
উঃ কি মর্মন্তুদ দৃশ্য অতি ভয়ঙ্কর ! (দণ্ড প্রদান )
পঞ্চম দৃশ্য
মিরে অন্তঃপুর।
বিষ্ণুপ্রিয়া ও শচী।
বিষ্ণুপ্রিয়া। চল মা, মুখে একটু জল দিবে। আজ কদিন :
নিচাল উপবাসে কেটে গেল ।
শচী। বৌম! ।
এখনও রাক্ষসার ক্ষুধা ?
সোনার সংসার--
করিয়াছি একে একে গ্রাস---
মিটিয়াছে সৰ্ব্বক্ষুধা সেইদিন।
বিশ্বরূপ—নিমাই সুন্দর,
বধুমত, কর্তা,
সবে মােরে দিলা ফাকি
বাকি শুধু তুমি আছ মাতা।
সরে যাও-সরে যাও মাগে!
নাগিনীর উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে,
তুমিও যাইবে শেষে
মিশ্রবংশে বাতি দিতে কেহ নাহি রবে!
ওরে নিমাই আমার
নিমাই সন্ন্যাস।
কোথ। গেছ বাছ।
অভাগিনী জীবন রতন
প্রাণধন -
একবার—একবার কোলে মায় ঘাপ,
জুড়াই তাপিত জীবন।
একি, না-এই না-
শুনিনি। অভাগিনা কথা।
হায় ধাতা!
তবে রমনী সৃজন
সন্তানে শুধুই ধরতে জঠরে।
বিষ্ণুপ্রিয়া। মা, মা, চুপ কর, তুমি যদি এত অস্থির হও, তবে
আমরা কেমন করে ধৈর্য্য ধরে থাকবে মা! দেখ দেখিনা খেয়ে
খেয়ে তােমার দেহের কি অবস্থা হয়েছে! এমন করে বেড়ালে অার
কয়দিন বাঁচবে! যখন তিনি বাড়ীতে ফিরে এসে তােমার খোঁজ
করবেন-তখন তাকে কি বলে বােঝাব?
শচী। নিমাই আমার আবার ফিরে এসে মা বলে ডাকবে? না-
-তবে আমি মরব না। আমার আবার মরণ আছে? মার্কণ্ডের
পরমায়ু নিয়ে জন্মেছি মা, মৰৰ কেন ?-এর মধ্যে মরলে চলবে কেন ?
বিষ্ণুপ্রিয়া। মামা-অমন করবেন না, একটু স্থির
মুকুল প্রভৃতি ভক্তগণ প্রভুর অনুসন্ধানে বেরিয়েছে নিশ্চয়ই তারা তার
সন্ধান আনবেন।
হোন,
নিমাই সন্ন্যাস।
কে - কার করিবে সন্ধান।
এই বিশ্বে কেউ কারো নয় ?
তোকময় শুধু স্বার্থ কোলাহল !
নিঃসম্বল দরিদ্র আমরা,
কেবা নেবে-
কিসের কারণ নিমাই সন্ধান ?..
কিবা স্বার্থ পুরিবে তাদের তাতে।
দরিদ্রের সন্তান নিমাই,
কোন প্রয়ােজন হইবে কাহার !
ষ্ণুপ্রিয়া। সত্য মাগো দরিদ্র আমরা,
কিন্তু পুত্র তব নিজগুণে
করিয়াছে বিশ্বজয় !
লােকময় সবে ভালবাসে !
তঁার তরে-
নবদ্বীপ আজ হয়েছে আঁধার,
চারিদিকে উঠে হাহাকার !
চী। মাগাে!
সে যে মাের ভালবাসা ধন,
বাল্যে করিয়াছে-
প্রতিবেশী প্রতি কত অত্যাচার
তবু তারে সবে বাসিয়াছে ভালো,
করিয়াছে কতই যতন।
১৬৪
নিমাই-সন্ন্যাস।
সীতার প্রবেশ।
সীত।। যতনের ধন সে গৌর রতন ;
হা বাবা নিমাই,
এই ছিল মনে তাের?
শচী: দিদি ! দিদি !
নিমাই তােমার নাই তব ঘরে
রহস্যের ছলে লুকাইয়া কোথা?
দেখিয়াছ খুজি চারিধার ?
সৗতা।
আঁধার-আঁধার দিদি,
নিমাই বাহনে আঁধার আমার পুরা ।
অদ্বৈতের প্রবেশ।
অদ্বৈত । শুধু মম পুরী আঁধার নয়রে সীতা।
নিমাই বীহনে--
নবদ্বীপে ঘরে ঘরে
দিবসেও হেরি অন্ধকার।
সীত।। প্রতীকার কর তবে দেব ।
অদ্বৈত।
প্রতীকার—প্রতীকার----
নিশ্চয় করিব।
চন্দ্রশেখর, বকেশ্বর, মুকুন্দ
নিমাই সুন্দরে গিয়াছে জিতে,
নিমাই-সন্ন্যাস। স্বামি এবে হই বাহির। যদি পাই নিমাই সন্ধান, পুনঃ গৃহেতে ফিরিব, নয় এই মাের- মহামাত্র। নবদ্বীপ হতে ! সীতা ! ধূমাতা আর নিমাই-জননী-- শােকেতে বিহ্বল তুমি কি শুশ্রুষার হেতু যেন কোন ক্লেশ না হয় কাহার ! প্রস্থান। বিষ্ণুপ্রিয়া । কাকী মা, মা কয়দিন কিছুই খায়নি। চা দিদি, ঘরের মধ্যে চা। মুখে একটু জল দেবে। ( সকলের প্রস্থান। ষষ্ঠ দৃশ্য পাড়ার মধ্যস্থ। নাগরিকগণের প্রবেশ। ১১ নাগ। বলি- ওহে তােমরা তো কিছু হবে না হে! ২য় নাগ। কি আর বলবাে ! ১ম নাগ। কি আর বলবাে? কেবল দিন নাই, রাত মকান্না কাদলেই হ'ল। নাই,
নিমাই-সন্ন্যাস।
২৪ নাগ। এতে যে দেশের অকল্যাণ ;
১ম নাগ। না--এ শালার দেশে কি কেউ মানুষ আছে।
৩র নাগ। সব শালাই ভেড়ার দল।
২ নাগ। কেন তােমরা আছ? প্রতীকার করলেই তাে পার
১ম না। পারি না?—আমি সব পারি তে সব পারি ।
২র নাগ। বেশ তো-বছি প্রতীকার কর !
১ম নাগ। তাহলে তোমরা বল, আমার সঙ্গে যােগ দেবে ?
সকলে। নিশ্চয়--নিশ্চ-তুমি যা বলবে আমরা তাই করবাে
১ম নাগ। বেশ তাহলে এস ! নিমাইয়ের মাগকে আর তার মাকে
বলি চল---যে তােময়। দিন-রাত্রি কুকুরের মত ভেউ ভেউ করতে
পাবে না। যদি না আমাদের কথা শোন—তাহলে তােমাদের দেশ
ছাড়া করবাে!
২য় নাগ। আর সেই সময় যদি গোঁয়ার গোবিন্দের দল - এসে
পড়ে তাহলে যে বাড়ানে হাড় ভেঙ্গে দেবে ? তোমরা যাবে বছে।
যাও-আমি অমন কাজে নেই বাবা-
১ম নাগ। তাহলে তোমার আজ হতে হুকে বন্ধ, তুমি এক ঘরে ।
২য় নাগ। (স বরং ভালো-বুড়ো বয়সে বাড়ানের হাত হতে
তো বাঁচবাে।
দ্রুতপদে নাগরিকপড়িণের প্রবেশ ।
সকলে।
হায় হায়! ওগাে আমাদের নিমাই কোথা গেলগে।
( রােদন }
নিমাই-সন্ন্যাস।
১৬৭
১ম নাগ-পত্নী। বলি কৰ্ত্তা কোথা গো ! ও কৰ্ত্তা তুমি এখানে ?
ওগাে যাও–যাও-যেখানে আমাদের নিমাই থাকুক, তাকে খুঁজে
নিয়ে এস ! নিমাই ছাড়া নদেয় আমরা কিছুতেই বাস করতে
পারবাে না।
১ম নাগ। বলি—ও ভট চাজের পো-এখন তোমার মাগকে এক
ঘরে কর, কেন ও মড়াকান্না কাদছে।
৩য় না। রমণী-রমণী-মেই অত্যন্ত প্রবল।
২৪ নাগ। মার চেয়ে ভালবাসে সে হ’ণ ডান ! মার ছেলে গেছে,
সে কাছে তাতে হল গ্রামের অকল্যাণ, আর তােমাদের আগের সেই
নিয়ে হৈ হৈ করছে–আগে সব ওদের একঘরে কর-তবে ত তাদের
বাডান দিতে যাবে।
১ম নাগ-পত্নী। তােমর কি বছ? ওগাে, তোমরা কি রকম
পুরুষ মানুষ ! নিমাই যে দেবতা—গ্রাম থেকে দেবতা বেরিয়ে গেল--
আর তােমরা চুপ করে বসে আছ।
১ম নাগ। আর আমরা হচ্ছি ব্ৰেহ্মদত্তি! ব্রেহ্মদত্তি থাকলেই
চলবে-- হতভাগীর বেটীর সব বাতিক ধরেছে।
নাগ-পত্নীগণ। নানা -চল ! ও সব পুরুষের দ্বারা কোন কিছুর
প্রত্যাশা নাই। তার চেয়ে আমরাই খুজতে যাই চল। হা--নিমাই
হানিমাই- কোথায় গেছ বাপধন।
[ নাগ-পত্নীগণের প্রস্থান।
১ম নাগ। ও ভাই, এ আবার কি হল? সত্যই যে আমার গিন্নি
ও খেপলো।
১৬৮
নিমাই সন্ন্যাস।
২য় নাগ। তবে কি নিমাই কিছু যাদু জানে নাকি !
৩য় নাগ। চল, চল ভাই অাটকুড়ীর বেটীদের ফিরাই চল। নইলে
আবার কে কি করে বসবে।
২ নাগ। আমি সহজে ছাড়ছি না.. এক ঘরে কতে হবে।
[ সকলের প্রস্থান।
সপ্তম দৃশ্য
পথ।
নিমাই, নিতাই, বকেশ্বর, চন্দ্রশেখর প্রভৃতি ভক্তগণ।
নিমাই। কহরে নিতাই,
প্রাণ মম হয়েছে চঞ্চল,
বিলম্ব না সয়ে, বল ত্বরা-
আর কতদূর প্রেম বৃন্দাবন ।
যাব আমি সেই বৃন্দাবন
সেথা রহে নন্দনন্দন ।
ব্ৰজনাথে বারেক হেরিব,
দেখি কালাদ
চিনিবারে পারে কি না পারে ?
নিতাই। চল প্রভু এই পথ ধরে।
অই দেখা যায় দুরে
নিমাই-সন্ন্যাস।
প্রেম বৃন্দাবন
অই সেথা বহিছে যমুনা,
ধায় কৃষ্ণ প্রেমেদ্দেশে-
চলিছে বিবিধ রঙ্গে।
নিমাই। তাইত-তাইত-ঐ ত—ঐ -
সেই সে যমুনা,
স্যাম-সে'হাগিনী ভাব-গরবিনী
ওলো সখি তুমি ত জানহ,
কৃষ্ণ প্রেমস্বাদ!
বাব আমি তােমার সকাশে
দাসে কিছু করুণার কণা
দিতে হবে তােমা-
নতুবা-ছাড়িব না তােমারে কং!
দ্রুত প্রস্থান।
নিতাই।
বাহ্যজ্ঞান হারা এবে প্রভু !
হরি! হরি। হরিবোল হরি !
লীলার জান কত লীলা
;
হব ছল। ভেদিবে অধম।
বৃন্দাবন নিয়ে যাব ছলে
শান্তিপুরে যাব
মনােরথ পুৱাব সবার ;
এস হরি ভক্ত ইচ্ছা করহ পূরণ।
নিমাইসন্ন্যাস।
রাখালগণের প্রবেশ।
গীত
রাখালগণ।
“সেই-ই"--দ্বাপরে নন্দের ঘরে জনমিল সেই।
তেমনি তেমমি তেমনি গাে ।
তেমনি সুচারু অকা. দুটা ভুরু তেমনি নয়ান বাঁক।
তেমনি এদন ইন্দু-বিলাঞ্ছন পদ কোকনদ ঢাকা।
তেমনি তেমনি সবি গো।
যদি বল সেই কালো, এযে গৌর ভুষন অলো,
ওগো কালো গৌর সম কথা অভেদ তাতে কৈ।
নিমাইয়ের পুনঃ প্রবেশ।
নিশাই। এস এস প্রাপেয় রাখল ;
কই দাম প্রাণের শ্রীদাম,
আয় ভাই স্নেহের সুবল,
প্রাণ ভরে দেরে আলিঙ্গন ;
বহুদিন হয় নাই দেখা।
সখা-সথা!
বল, বল, ধেনুকুল আছে তো কুশলে ?
বল ওরে কৃষ্ণপ্রেম পাগলিনী-
রাধা, বিশাখা, আদি গােপিনী নিচয়
যমুনার তীরে
নিমাই-সন্ন্যাস । সেই কুঞ্জের ভিতরে গায় গান হা কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ কোথা গেলে বলে। চল চল ভাই, দেরী করে আর কাজ নাই বুঝি বা সবাই ধৈৰ্য্য ধরিতে না পেরে যমুনার জলে প্রাণ : বনে এতক্ষণ পড়িয়াছে কালিন্দি সলিলে । রাখালগণ। ভাই-ভাই- ১ম রাখাল ! তাই ত কে আমরা? ২য় রাখাল কে এ সন্ন্যাসী ? ৩রা রাখাল। কালশী! ওরে কালশী । সেই কালা—সব ছল তার। ১ম রাখাল। আর সে যে কালো এ যে গৌরাঙ্গ সুন্দর। ৩৪ রাখাল। যাদুকর-কেশব মােদের ? রাখালগণ। হরিহরিহরিবােল, হরিবােল । নিমাই। রাখ গণ্ডগােল, চল ভাই—বিলম্ব না সহে আর। { গমনথেতি নিতাই। কোন পথে যাও ভাই, ३९२ নিমাই-সন্ন্যাস । এ পথে নইেত সেই বৃন্দাবন, চল যাই সুপথ ধরিয়া! নিমাই ; কোন পথ ? কোন পথ ? বল বল সখ কোন পথ দিয়ে- এসেছ তােমরা কোন পথে ? কত দূর আর বৃন্দাবন। ১ম রাখাল। এ যে শান্তিপুর । বহুদূর এখান হইতে সেই বৃন্দাবন। নিমাই। না—না—তােমরা ভুল ছ! ভুল বলছ, এ বৃন্দাবন। নইলে তোমরা কোথা হতে এলে ? অদ্বৈতচায্যের প্রবেশ। অদ্বৈত। এই যে এই যে, প্রাণের নিমাই, নিমাইনিমাই- একি বেশ তব ? ক নিমাইয়ের এহেন সন্ন্যাসী বেশ, স্বচক্ষে হেরিনু। মুণ্ডিত মস্তক, অঙ্গ তৈল হীন,
নিমাই-সন্ন্যাস।
১৭ ।
পরণে ভিখারী কৌপীন,
দণ্ড হতে কাঙাল অধম,
হায় হায়,
এই ছিল মনে গৌর রতন ।
নিমাই। আচার্য্য
কেমনে তুমি মাের জানিলে সন্ধান,
সীতা. মতি' আছে ত কুশলে ?
বৃন্দাবন এতদূরে
এলে কোন পথ ধরে,
ধন্য ধন্য তুমি আচাৰ্য্য প্রদান,
দাও দাও আলিঙ্গন ।
কিঙ্করে কৃতার্থ কর ।
অদ্বৈত।
চল, চল, দীনের কুটীরে,
তব শোকে সীতা হয়েছে বিল।
একবার দেখা দিয়ে
যথা ইচ্ছা যেও নাহি দিব বাধা ।
আর শচী দেবী—তব শশাকে
আসন্ন মৃত্যুর গ্রাসে
বৃদ্ধার শেষ নিঃশাস বহে
শুধু অই চাদমুখ বারেক হেরিবে বলি ।
নিমাই। তবে চল চলি আচাৰ্য ধীমান
৭৪ নিমাই-সন্ন্যাস যাব আমি তোমার কুটীরে ? সেথা গিয়ে-মাতৃপদ করিব বন্দন; তবে অনুরােধ আছে কি না, বিষ্ণুপ্রিয়া যেন নাহি আসে সেথা, সন্ন্যাসীর নাহি অধিকার পত্নী সহ দেখা। অদ্বৈত। তাই হবে—তাই হবে ! চল তবে প্রাণের নিমাই। সকলে হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল ! { সকলের প্রস্থান। অষ্টম ম দৃশ্য অদ্বৈতের গৃহ। সীতা আসীনা। সীতা। ক, তিনি ত আজ পাঁচ দিন হ’ল বাটী হতে বেরিয়েছেন, তবে কি এখনও নিমাইয়ের কোন সন্ধান করতে পারেন নাই। হায়, এয়, তাহলে কি হবে ! শচীদেবীর যা দুর্দশা দেখে এসেছি তিনি এত- ক্ষণ আছেন কি নাই; তারও স্থির নাই, বধূমাতা বিষ্ণুপ্রিয়ার মুখখানি দেখলে অতি বড় পাষাণও যে তারও বুক ফেটে যায়। ভগবান, এ কি করলে, এ কি হল! হায়! আর জগন্নাথ মিশ্রের বংশে বাতি দিতে কেউ রইল না।
নিমাই-সন্ন্যাস।
( নেপথ্যে-ভক্তগণ ও নাগরিকগণ---হারবােল,
রবােল, ধ্বনি করিতে লাগিলেন।)
ঐ সব হরিধ্বনি করছে-তবে বুঝি আমার নিমাইকে নিয়ে সব
ফিছে। { অগ্রসর হওন)
অদ্বৈত, নিমাই, মুকুন্দ প্রভৃতি ভক্তগণের প্রবেশ।
অদ্বৈত। সাত ! দেখ হে এসেছে নিমাই।
সীত।।
ওমা একি বেশ নিমাইয়ের মাের ?
নিমাই ---নিমাই
ওগে-কেউ বাও একবার
প্রধান সংবাদ নিমাই মাতারে,
বুঝি পাগলিনী এতক্ষণ নাই ।
অদ্বৈত। গিয়াছে নিতাই
অনিবারে নিমাই মাতায়
কুটারে আমার !
সীতা। বাবারে-কি করে ভুলেছিলি,
কি কঠিন তাের প্রাণ!
নিমাই। মাগো -নিজে না কাদিলে,
তােমারা না কাদিলে
ভিখারী না হলে কি সে হবে উদ্দে পূরণ !
তাই নিজজন, মাতা, পত্নী পরিজন,
সবারে কঁাদায়ে হয়েছি সন্ন্যাসী!
১৭৬ নিমাই-সন্ন্যাস। শচী, নিতাই নাগরিকগণ ও নাগরিকগণের প্রবেশ । সকলে। কই কই-কোথায় নিমা। শচী। নিমাই রে- নিমাই। মাগো ! কুসন্তান ধরেছিলে গর্ভেতে তােমার, তাই পাও পদে পদে হেন মনস্তাপ। মা কর-কুমা কর- দেবীরূপা জননী আমার । ১ম নাগ। নিমাই—নিমাই-অামরা অতি পাষণ্ড-তােমার উপর কত অত্যাচার করেছি আমাদের ক্ষম কর! তুমি পূর্ণব্রহ্ম- স্বয়ং ভগবানের অভিন্ন মুর্তি নিমাই। অনুতাপেই তোমাদের প্রায়শ্চিত্ত। এক্ষণে এক মন প্রাণে—সকলে বল হরিবােল, হরিবােল । সকলে। হরিবােল! হরিবােল! হরিবােল ! ধন্য—ধন্য পুত্র জঠরে ধরেছিলাম ! আজ আমি ধন্য। হয়েছি। আমার নিমাই—আমার গৌর—আমার বিশ্বম্ভর। আমার শ্রীচৈতন্য--আমার গৌরাঙ্গ ! (বক্ষে ধারণ).. শচী। যবনিক
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.