Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Colambas

Dasgupta ,gangacharan · 2010/01/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

প্রসিদ্ধ
দেশ-পর্যটকদিগের
আবিষ্কার-কথা
কলাম্বাস

ঐগঙ্গাচরণ দাসগুপ্ত বি. এ., বি. টি.
প্রণীত
অনুরূপ গ্রন্থাবলী
মার্কো পােলাের জীবন-কথা
১২ খানি ছবি, তার ৪ খানি তিন রঙের
(২)
ক্যাপটেন্ কুকু
১২ খানি ছবি, তার ৪ খনি তিন রঙের

No text on this page.

1
Ruchpuc collection,
काम
In the Metropolitan Museum of Art, Neu l'ork; the gift of llr, l'ierpont Jorgan.
Signed" Schrstinn I'mnctus for it 1519."

5QQ৫০
প্রসিদ্ধ দেশ-পৰ্যটকদিগের আবিষ্কা
ত
কলাম্বা
শ্রীগঙ্গাচরণ দাসগুপ্ত, বি.এ., বি.টি,
*~*
ম্যাকমিলান্‌ এণ্ড কোং লিমিটেড
২৯৪ নং বহুবাজার স্ত্রীট, কলিকাতা
১৯২৯
E

সর্ব-স্বত্ব সংরক্ষিত
Printed by N. Mukherjee, at the Basanti Press,
71, Sashi Bhusan Dey Street, Calcutta,

ভূমিকা পাঁচশাে বছর আগে পৃথিবীর অবস্থা কি ছিল কল্পনা করা বড়াে সহজ নয়। তখন যারা নতুন দেশের খোঁজে বেরিয়ে নতুন নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করেছেন তাঁদের কত সাহস, কত ধৈৰ্য্য ছিল, তার ধারণা করা যায় না। এই পাঁচশাে বছরের সভ্যতার ফলে যা আমরা খুব সােজা মনে করছি, তা তখনকার দিনে লােকেরা কল্পনাতেও আনতে পারত না। এই বইখানিতে এমন একটি বীরের কথা বলা হয়েছে যিনি তখনকার মূখতার বাঁধন কেটে, জীবনের মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়েছিলেন—নতুন দেশের টানে। তিনি যা আবিষ্কার করেছেন- যে নতুন জগতের দিকে লােকের চোখ খুলে দিয়েছেন—তার ফলে আজ আমেরিকা এত বড়! এই ছােট বইখানি পড়ে আমাদের দেশের ছেলে মেয়েরা যদি বুঝতে পারে কলম্বাসের জীবন কত বড় ছিল, তঁার মত সাহস, ধৈৰ্য্য, সহিষ্ণুতা নিয়ে যদি তারা পৃথিবীর নানাদিকে বেরিয়ে পড়ে তবে মনে করবাে আমার শ্রম সার্থক হয়েছে।

•••
০ ০ ০
৭
০ ০ ০
a . a 5
C
छौ
সােনার দেশের খোঁজে
অসাধারণ সকল
পর্তুগালে কলাস
রাণী ইসাবেলা
প্রথম যাত্রা-পশ্চিমমুখে
ওয়েষ্ট ইণ্ডিজ দ্বীপে-কলম্বাস
যশের চুড়ায়-কলম্বাস
আবার পশ্চিমমুখে-(দ্বিতীয় যাত্রা)
দক্ষিণ আমেরিকায়-কলাস
(তৃতীয় যাত্রা)
ডেরিয়েন যােজকে-কলম্বাস
(শেষ যাত্রা )
মৃত্যুর পরে
৪১
.
Cb
০৮
৭০
= ৪ ০
০০

ছবির সূচী
কলাস
মুখপত্র
৪ ০ ০
২৩
. .
০ ০ ০
!
৩৩
৩৫
জেনােয়া—যেখানে কলাম্বাস জন্মেছিলেন
স্পেনের রাণী ইসাবেলা...
কলম্বাসের জাহাজ তিনখানি
“জমি। জমি। জমি।” কলাস জাহাজ থেকে
শুনলেন যে জমি দেখা গিয়েছে
পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ প্রথম দেখা যাচ্ছে
কলাস গুয়ানাহানিতে প্রথম নেমেছেন
ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার নিকট হতে কলাস বিদায়
নিতেছেন
কিউবা দ্বীপের একটি নদী
কলাস পশ্চিম দিকে চলেছেন
জন ও সিবাস্তিয়ান ক্যাবােটের প্রথম সমুদ্র যাত্রা
৩৭
৫৭

জন কৰােটর গনুষ।
১৭ -
* - - - -
জবােটের সমুদ্রমা
১০৯৮
অাজো
খবৰ: এ
বাহামা দ্বী-পু
এম সমুদ্রযাত্রা ১৯০৮
कागति
অথম সমুদ্র,
৩ষ্টাও
**হী
រិ ទីធធារ
য় সমুgয়া
১৯৯৮
উমিদা
ত্রিনিদাদ
বিষয়রেখা
প্রশান্ত
মহাসাগর
পলির
৪)
কলাম্বাসের সমুদ্র যাত্রার মানচিত্র

কলাম্বাস
সােনার দেশের খোঁজে
প্রায় ৫৩০ বৎসর আগে মধ্য-এসিয়া হ’তে ঝড়ের মতাে
ছুটে এসে যখন খোঁড়া তৈমুর লং দিল্লীর পুতুলরাজার
সিংহাসন কেড়ে নিলে, যখন সে পঞ্চাশ হাজার হিন্দুমুসলমানের
রক্তে এ দেশ রাঙিয়ে দিয়ে, খিজির খাঁকে দিল্লীর রাজতক্তে বসিয়ে,
তার রাজধানী সমরকন্দে ফিরে গেল, ঠিক সেই সময় ইউরােপের
দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পর্তুগাল রাজ্যের লােকেরা সােনার দেশের
স্বপ্নে উতলা হয়ে উঠেছিল। তােমরা মানচিত্র খুললে দেখতে
পাবে, ঐ রাজ্যের পশ্চিমে আর দক্ষিণে আলান্টিক মহাসাগর ;
তার হাজার হাজার ঢেউ, আর ঝড়াে হাওয়া দিনরাত ওদেশকে
মুখর করে রেখেছে।

২ কলাস পর্তুগালের রাজা ছিলেন তখন প্রথম জন। তাঁর মতাে বড় রাজা সে দেশে আর হয়নি। যেমন রাজা, তেমনি তার ছেলে যুবরাজ হেী। বুদ্ধিতে, সাহসে, ধৈর্য্যে আর দৃঢ়তায় তিনি তাঁর বাপের চেয়েও বড় ছিলেন। তাঁর বয়স যখন সবে মাত্র বিশ, তিনি জাহাজে চেপে আফ্রিকার উপকূলে গিয়ে মূরদের খুব বড় একটি সহর জয় করেন। তাতে তার নাম সারা ইউরােপে ছড়িয়ে পড়ে! ইংলণ্ডের রাজা পঞ্চম হেরী তাকে বলে পাঠালেন,—“তুমি আমার সেনাপতি হও।” জৰ্মান্ সম্রাট তাঁকে মন্ত্রীর পদ দিতে চাইলেন। যুবরাজ হেী কিছুই নিলেন না। তার মন তখন কেবল সােনার দেশের স্বপ্ন দেখছিল। মার্কোপােলাে প্রভৃতি তাঁর অনেক আগেকার লােকেরা চীন, পারস্য, ভারত প্রভৃতি দেশে স্থলপথে গিয়ে পূব দেশের ধনরত্নের যে সব কাহিনী ইউরােপে প্রচার করেছিলেন, তাতে হেন্ত্রীর মন মুগ্ধ হয়ে যায়। ঐ সব সােনার দেশে জলপথে কি করে যাওয়া যাবে, তিনি কেবল তাই ভাবতেন। তার দৃষ্টি তখন সাগরের ঐ সাগরের বুকের ওপর দিয়ে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে সেই সব সােনার দেশে পৌঁছান যায় কিনা,—এই ছিল তার একমাত্র সাধনা। পর্তুগালের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সেন্ট ভিনসেন্ট, অন্তরীপ। ওখানে জমি ক্রমশঃ সরু হয়ে আলান্টিক মহাসাগরের দিকে এগিয়ে গেছে। ঐখানে সাগরের ঝড়াে, কনকনে হিম হাওয়া দিনরাত হু হু করে ছােটে, তাতে গাছপালা কিছুই জন্মাতে পারে না; দিকে।

সােনার দেশের খোঁজে
যতদূর চোখ যায়,কেবলি
ধূ ধূ ধূ
বালি। এই বালির ঢেউ
আর সমুদ্রের অশান্ত ডাকাডাকি, মাতামাতির মধ্যে হেরী তার
নতুন সহর বসালেন। এই খানেই তার নৌবহরের আড্ডা হ’ল।
তখনকার দিনে আক্লান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে পশ্চিম বা
দক্ষিণ মুখে যাবার কথা কেউ মনে আনতে পারতাে না। লােকদের
ধারণা ছিল, ওসাগরের তল নেই, কূল নেই;—তার বুকের
ওপর কেবল ঝড়ের দাপট আর ঢেউয়ের মাতামাতি, কুয়াস
আর মেঘের গুমােট; তার পরপারে প্রেতলােকের মত সীমাহীন,
নিরেট অন্ধকার !
বিপুল সাহস ছিল হেন্ত্রীর। সাগর পারের এই জমাট আঁধার
ভেদ করতেই হবে,—এ’ছিল তার সংকল্প। সােনার ভারতের
খোঁজে বেরতেই হবে। তাই তিনি গণিত, জ্যোতিষ শিখতে
লাগলেন। অকূল সমুদ্রে পাড়ি দিতে হলে ওসব
জানতে হয়। দেশের পণ্ডিতদের ডেকে এনে তিনি কাছে রাখলেন,
—তাঁর আশা ছিল, এঁদের কাছ থেকে অনেক খবর মিলবে।
তিনি ভূগােল শিক্ষার এক স্কুল বসায়ে পর্তুগাল আর ইতালীর
অনেক সাহসী যুবকদের এনে নৌ-বিদ্যা শেখাতে লাগলেন।
কিছু দিনের মধ্যেই তিনি জাহাজের বহর তৈরী করে
আফ্রিকার উপকূল ধ’রে দক্ষিণ মুখে তার শিষ্যদের পাঠাতে সুরু
করলেন। তাদের একজন সায়েরা লিওন্ পৰ্য্যন্ত পৌছে যখন
খানিকটা সােনার রেণু আর ত্রিশটি নিগ্রো নিয়ে পর্তুগালের
রাজধানী লিসবনে ফিরল, তখন সকলের মনে নতুন ভরসা

৪
কলাম্বাস
জাগল,—ওপথে যেতে যেতে সােনার ভারতে পৌঁছান যাবেই
যাবে।
ইতালীর নাবিকরা এসব খবর শুনে দলে দলে এসে হেীর
অধীনে চাকরী নিলে। ইতালীর তিন দিকে সমুদ্র ; উহার
উত্তর-পশ্চিম উপকূলে জেনােয়া নগরী ; উত্তর-পূর্ব কোণেতে
ভিনি বন্দর। প্রথম থেকেই জেনােয়া, ভিনিসের নাবিকরাই
পর্তুগালে আসতে লাগল। যারা নতুন নতুন দেশ দেখে তার
খবর হেল্পীকে দিত, তিনি তাদের খুব পুরস্কার দিতেন।
হেন্ত্রীর শিষ্যদের একজন—নাম মােনীস্ পেরেষ্ট্রেলােপাের্টে।
শান্তো নামে এক দ্বীপ আবিষ্কার করেন। হেল্পী তাকে সে
দ্বীপের গভর্ণার করেন। এর মেয়েই কলম্বাসের প্রথমা
স্ত্রী ছিলেন।
পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝখানে হেী দেহত্যাগ করেন, তাঁর
সেই নতুন সহরে। কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে
যাত্রা করে নতুন দেশ খোঁজবার যে উৎসাহ তিনি জাগিয়েছিলেন,
দেখতে দেখতে তা পর্তুগাল, স্পেন, ইতালী, হল্যাণ্ড প্রভৃতি দেশে
ছড়িয়ে পড়ল।
হেন্ত্রীর মৃত্যুর ২৬ বৎসর পরে আর একজন পর্তুগীজ নাবিক
বার্থলােমিউ দায়াজ—সােনার দেশের খোঁজে বেরিয়ে উত্তমাশা
অন্তরীপ ঘুরে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল পর্যন্ত এসে পৌছেছিলেন।
আর কিছু দূর পূবে আসতে পারলেই তিনি ভারতে এসে পড়তেন।
তখনকার দিনে সমুদ্রযাত্রা যে কত বিপদের ছিল আজকাল

সােনার দেশের খোঁজে ৫ লােকেরা তার ধারণাই করতে পারে না। না ছিল তখন ষ্টীমার, ছিল কোন যন্ত্রপাতি, না ছিল সমুদ্রের কোনাে মানচিত্র ! কাঠের বড় বড় জাহাজ তৈরী করে, লম্বা লম্বা মাস্তুলে ছােট বড় বহু পাল তুলে, কেবল হাওয়ার জোরে জাহাজ চালাতে হত। উল্টা হাওয়ার ঠেলায় কোথাকার জাহাজ কোথায় গিয়ে ঠেকত, তার ঠিক ঠিকানা ছিল না। যন্ত্রের মধ্যে ছিল মাত্র দুইটী,—দিগদর্শন যন্ত্র—যাকে কম্পাস বলা হয়, আর সূৰ্য- যন্ত্র (Quadront); একটি দিয়ে মােটামুটি দিক ঠিক করা হত ; অপরটি দিয়ে দুপুর বেলায় সূৰ্য্য আকাশে কতখানি উঠেছে তা মাপা যেত। এই মাপের ফল নিয়ে নানা আঁক কষে জাহাজ সমুদ্রের কোন জায়গায় রয়েছে তা নির্ণয় করা হত। তখনকার জাহাজও জাহাজও ছিল খুব ছােট ; যাতে দু’তিন হাজার মণ জিনিষ ধরত,—সে হচ্ছে তখনকার খুব বড় জাহাজ। আজকাল সমুদ্রে যে সব ষ্টীমার বাণিজ্য করতে যায় তার অনেক জাহাজেই চার পাঁচ লাখ মণ জিনিষ বােঝাই হতে পারে। আজকাল সমুদ্রযাত্রা খুব সহজ, আর খুব আরামের হয়ে পড়েছে। এক একখানি বড় ষ্টীমার যেন সুন্দর সাজানাে, ছােট খাটো এক একটি সহর ; তার দোতালা, তেতালায় অসংখ্য ঘর, তার মাঝে বিজলী বাতি, পাখা প্রভৃতি বিলাসের কত আসবাব সাজানাে; তাতে খেলবার আঙিনা আছে, লাইব্রেরী, হাসপাতাল, ক্লাব, টেলিফোন, রেডিও, বেতার টেলিগ্রাফের যন্ত্র, আরাে কত কিছু রয়েছে। তা ছাড়া কত কল-কজা, যন্ত্রপাতি, আর সমুদ্রের নিখুঁত

কলম্বাস
মানচিত্র আছে,—জাহাজ ঠিক পথে চালাবার জন্য। কোথায়
ডুবাে-পাহাড়, কোথায় বা ঘূর্ণিবায়ু, কোন্ মাসে কোন্ দিকে বাতাস
বইবে, সব নির্দিষ্ট করা মানচিত্র রয়েছে। আজকাল নাবিকদের
এ সব ভাল মতেই জানতে হয়।
কিন্তু আমরা যখনকার কথা বলতে যাচ্ছি, তখন এসব
কিছুই লােকে জানতাে না। সেই সময় যিনি অসীম সাহসে
ভর করে আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে নতুন জগত আবিষ্কার
করেছিলেন, তার নাম খ্রষ্টোপার কলম্বাস। তার অসাধারণ
জীবনের কথাই এই বইতে বলা যাচ্ছে।

২ অসাধারণ সংক ইতালীর উত্তর-পশ্চিম কোণে জেনােয়া উপসাগর। এই সাগরের তীরে জেনােয়া সহর। নেপলস্ সহরের মতাে উহা সমুদ্রের উপকূলে একটি ছােট্ট পাহাড়ের উপর দাঁড়ানাে। পাহাড়ের গায়ে বড় বড় রাস্তার দু'ধারে সারি সারি অসংখ্য দালান কোঠা, তিন, চার, পাঁচ তলা। দূর সমুদ্র হ’তে সুন্দর সুন্দর বাগানের মধ্যে এই সব প্রাসাদ ছবির মতাে সুন্দর দেখতে। চমৎকার সুন্দর সহর জেনােয়া,অতি পুরানাে; যাদুঘর, টাউনহল, মিউনিসিপাল আফিস, চিত্রশালা, স্কুল, ব্যাঙ্ক, বড় বড় লােকের প্রাসাদ,—সব মর্মর পাথরে গড়া ;-এক একটি এ দেশের বড় বড় রাজা মহারাজার বাড়ীর মতাে অপরূপ, সুন্দর! এই সব বাড়ীর ভিতর ঢুকলেই দেখতে পাবে কত রকমের ছবি আর পাথরের পুতুল দিয়ে এক একটি ঘর সাজানাে,দরজা জানলায় সুন্দর কারুকাজে ভরা নানা রঙের পর্দা ঝুলাননা। এক সময়ে ধনসম্পদে, ব্যবসাবাণিজ্যে জেনােয়ার খুব নাম ছিল,“লােকে এই সহরটিকে “ভূমধ্যসাগরের রাণী” বলত। ভিনিস্ নগরীর মতো এই সহরের লােকদের হাতে এসিয়ার, মিশরের প্রায় সমস্ত বাণিজ্য ছিল। অনেক পুরানাে হলেও আজকালও জেনােয়ার ব্যবসাবাণিজ্য বড় কম নয়। সমুদ্রের খানিকটা অর্ধ- কলাম্বাস চন্দ্রের মতাে এই বন্দরের কাছ দিয়ে ঘিরে রয়েছে। এখানে সেই প্রাচীনকাল হতে আজ পর্যন্ত কত হাজার হাজার জাহাজ-নৌকা আশ্রয় নেয় তার সংখ্যা নেই। হাজার হাজার লােক আজও এই বন্দরে এসে সহরটিকে সরগরম করে রেখেছে। সমুদ্রের উপকূলের কাছ দিয়ে ছােট একটি রাস্তা ঘুরে ঘুরে গিয়েছে, তা থেকে অনেক গলি বেরিয়েছে, কোনটা সহরের দিকে, কোনটা বা সমুদ্রের দিকে। ঐ সব সরু গলিতে প্রাচীন কালের মতাে অনেক নাবিক, বণিক তােমরা দেখতে পাবে ;-কেহ পূর্বদেশ হতে রেশমের কাপড়, কেহ মখমল, কেহ জরীর ফিতে, কেহ বা সােনারূপার বহু কারুদ্রব্যের ব্যবসা চালাচ্ছে। সেখানকার গৃহস্থ যারা, তাদের কাউকে দেখতে পাবে ঘরের দুয়ারে বসে ফলের দোকান পেতেছে, কেউ বা দুয়ারে আত-তরমুজের খােসার মধ্যে বসে বসে গল্প-তামাসা জুড়ে দিয়েছে। এরূপ ছােট বড় নানা রকমের দৃশ্য তােমাদের চোখে পড়বে ;-মৰ্ম্মর পাথরের প্রাসাদ আর কাদার দেওয়ালঘেরা কুঁড়ে ঘর, সুন্দর সাজানাে বাগান আর আবর্জনা ভরা আঙিনা;—কিন্তু এসব দালান-বাগান-কুঁড়ে ঘরের উপর দিয়ে সমুদ্রের হাওয়া শো শো করে ছুটেছে দিনরাত। হাওয়ার ডাকে সেই উদার ঘন-নীল সাগরের বুকে মনপ্রাণ উতলা হ'য়ে ছুটতে চায়। পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝখানে এই জেনােয়া সহরে একজন তাঁতি থাকতেন, তাঁর নাম ডােমিনিকো কলাম্বাে; তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল,—সুসান্না। তারা থাকতেন তাঁতিদের পাড়ায় ; সেই পুরানাে

No text on this page.

৫। '
এ
.
ম
৪
'l
•• •w
জয়তে এইখনে কথা উন্মেছিলেন

অসাধারণ সংকল্প ৯ ; সহরের সদর দরজা, সাঁ আঁন্দ্রিয়ার বাহিরে। তখনকার দিনে বড় বড় সহরের চারধারে উচু দেওয়াল এবং তার গায়ে বড় বড় ফটক থাকত; ‘স। আঁন্দ্রিয়া’ ওরকমের একটি ফটক। ১৪৪৭ খ্রীষ্টাব্দে তাদের প্রথম ছেলের জন্ম হয়। এই ছেলের নাম খ্রীষ্টোপার কলম্বাস। তার তিন ভাই ও এক বােন ছিল। ভাই তিনটির মধ্যে কলম্বাসের ছােট ভাই অল্প বয়সেই মারা যায় ; অপর দুইটির একটি কলম্বাসের চেয়ে বয়সে ৩ বৎসর ছােট, নাম বার্থোলােমিউ; সকলের ছােট্টটির নাম ছিল জিয়াকোমাে বা জেমস্, তিনি কলম্বাসের চেয়ে ২১ বৎসর ছােট। বার্থোলােমিউ তার দাদার সঙ্গে সঙ্গেই থাকতেন ; জিয়াকোমাে ছােট হলেও কলাম্বাসের শেষ জীবনে তার খুব সেবা করেছিলেন। চৌদ্দ বছর বয়সের সময় হতে কলম্বাস নাবিকের কাজ শুরু করেন। ভূমধ্যসাগরের উপকূলে তিনি অনেক স্থানে যেতেন এবং কে কে বাড়ী এসে তার বাবার কাজে সাহায্য করতেন। তা ছাড়া তিনি খুব পড়াশােনা করতেন ;-ইতিহাস, ভুগােল, ভ্রমণকাহিনী যখন যা পেতেন পড়ে ফেলতেন। স্মরণশক্তি তার অসাধারণ ছিল, যা একবার পড়তেন সহজে ভুলতেন না। ক্রমে ক্রমে তিনি জাহাজ চালাবার কাজে খুব নিপুণ হ'য়ে সুন্দর সুন্দর মানচিত্র, নক্সা তৈয়ার করতে পারতেন। প্রায় ৫০ বৎসর পরে তিনি তার এই সময়কার কথা নিজেই এরূপ লিখে গেছেন – “ছেলে বয়স থেকে নাবিকের কাজ ধরেছি; এই কাজে যারা ঢােকে, তাদের মনে পৃথিবীর নানা রহস্য জানবার খুব ঝোঁক হয়।

কলাম্বাস এই ৪০ বছর ঘুরে ঘুরে আমি গ্রীক, ফরাসী, মূর, ইংরেজ প্রভৃতি ছােট বড় অনেক জাতের ললাকের সঙ্গে মিশেছি, তাদের অনেক বিষয় জেনেছি, বুঝতে পেরেছি। জ্যোতিষ, জ্যামিতি, গণিতের জ্ঞান লাভ করে নৌবিদ্যাতেও বিশেষ নিপুণতা লাভ করেছি। ভগবানের দয়াতে এমন বুদ্ধি ও লিপি-কৌশল আমার হয়েছে যা দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্র এঁকে তার মধ্যে নদী-নগর, দ্বীপবন্দর যথা- স্থানে বসাতে পারি। এই কয় বৎসরে ইতিহাস, দর্শন, ভূতত্ত্ব ও অনেক জ্ঞানবিজ্ঞানের বই, যা হাতে এসেছে তার কিছুই আমার বাদ যায় নি।” কলাম্বাস অনেক সময় জেনােয়ার পােতাশ্রয়ে যেতেন। সেখানে শুড়িখানাতে অনেক নাবিক, খালাসী, পােতাধ্যক্ষ এসে জুটত। তাদের মুখে নানা দেশের কাহিনী, নানারকম গুজব শুনে তার কল্পনা জেগে উঠত। কেউ বলত,—আয়াণ্ডের পশ্চিমে ব্রাজিল নামে এক দ্বীপ আছে। কারাে মুখে শােনা যেত,—সেন্ট- ভিসেন্ট, অন্তরীপের কিছু পশ্চিমে এমন সব খােদাই করা কাঠ পশ্চিম সমুদ্র হ’তে ভেসে আসতে দেখেছি, যা নিশ্চয়ই মানুষের হাতে গড়া। কেউ বা বলত,—পৰ্তুগালের রাজার মুখে শুনতে পেয়েছি,খুব বড় বড় ঘাসের মত একরকম গাছড়া পশ্চিম থেকে ঐ সব দ্বীপে ভেসে আসে। কেউ বা বলে ফেত,-এমন দুটো লােকের মৃতদেহ পশ্চিম হ’তে ভেসে ভেসে ফ্লোরেস্ দ্বীপে এসে পড়েছিল, যাদের চেহারা তখনকার জানা কোনাে দেশের লােকের মতাে নয়!

অসাধারণ সংকল্প কলম্বাস এ সব শুনতেন, আর তার কল্পনাতে কত কিছু জাগত। তিনি ভাবতেন,ঐ যে বড় বড় ঘাস, ও হচ্ছে বাঁশের টুকরা, যার কথা টলেমি তার বইতে লিখেছেন,—ভারতবর্ষেই ওরূপ বাঁশ জন্মে। ঐ যে মরা লােক দু’টি, ওরাও হয়ত ভারতের লােক হয়ত ভারত আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে,—বেশী দূরে হবে। নয়। s কিন্তু তখনকার দিনে খুব সাহসী নাবিকরাও পর্তুগালের উপকূল হ'তে পশ্চিম মুখে বেশী দূর যেতে সাহস করেনি। অনেকেই ওসব দ্বীপের গুজব শুনে মনে করত, সেগুলাে নাবিকদের দৃষ্টির বিভ্রম মাত্র, দিগন্তের মেঘ ছাড়া ও আর কিছুই নয়। কলাম্বাস কিন্তু জানতেন পৰ্তুগালের প্রায় ৮০০ মাইল পশ্চিমে আঝাে দ্বীপ;-১৪৩১ খ্রীষ্টাব্দে একজন পৰ্তুগালের নাবিক, গঞ্জালাে ক্যাব্রেল তার নাম,উহা আবিষ্কার করেন। চার বৎসর পরে পৃথিবীর মানচিত্রে ওদ্বীপ দেখানাে হয়। কলম্বাস ঐ মান- চিত্র দেখে ছেলে বেলা হ’তে ঠিক করেছিলেন,—“ঐ আঝাে দ্বীপ তখনকার জানা পৃথিবীর পশ্চিম সীমা।” তার মনে হত, আঝাে দ্বীপে যারা রয়েছে, তারা ঠিক অজানা জগতের তীরে দাড়িয়ে ;—তিনি ওখান থেকেই অজানা পশ্চিম দিকে পাড়ি দেবেন। তার অটল বিশ্বাস হয়েছিল, তিনি এই পশ্চিম দিগন্তের দিকে ছুটে গেলে ভারতে নিশ্চয়ই পৌছতে পারবেন। তখন তিনি দিন রাত ব'সে ব'সে কেবলি ভাবতেন,—“পৃথিবী যে একটি গােলক তাতে তাে কোন সন্দেহ নেই; তা হলে একজন লােক • ১২ কলম্বাস যদি ঠিক পূবমুখে, আর একজন পশ্চিম মুখে একই স্থান থেকে যাত্রা করে, তারা দু’জনে পৃথিবীর ওপিঠে গিয়ে মুখােমুখী হবেই। তখনকার জানা পৃথিবীর পশ্চিম সীমা আঝাের দ্বীপ। পূব সীমাতে থিনী * সহর ; এ দু’ জায়গার সময়ের ব্যবধান ১৬ ঘণ্টা বলে প্রাচীনেরা হিসাব করেছেন ; পৃথিবী যখন ২৪ ঘণ্টাতে নিজ অক্ষ- রেখার ওপর একবার ঘুরে আসে, তা হলে পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ তাে জানা হয়ে গেছে, বাকী এক ভাগ মাত্র অজানা। এই এক তৃতীয়াংশ পশ্চিম সমুদ্রের উপর দিয়ে যেতে পারলেই তাে ভারতে গিয়ে পৌঁছান যাবে।” এরূপ তিনি কত কথাই ভাবতেন! চীন, জাপান, ভারত যে সােনার দেশ!—সে সব দেশের ঐশ্বর্যের কত স্বপ্ন তাঁর মনপ্রাণকে মুগ্ধ করে রাখত! তার প্রায় দু'শাে বছর আগে মার্কোপােলাে ভারত, চীন প্রভৃতি এসিয়ার ওসব দেশে এসেছিলেন ; সে সব বর্ণনা প’ড়ে পড়ে তার মনে জাগত, চীনের সম্রাট কুবলাই খার ধন-দৌলত, প্রতাপের কথা, চীনের নিকটে জিপাঙ্গু (জাপান) দ্বীপের সােনার পাতমােড়া রাজবাড়ীর কাহিনী! তা ছাড়া ট্রাব, এরিষ্টোট, বেকন প্রভৃতি বিজ্ঞলােকদের নানা বর্ণনা পড়ে প’ড়ে পশ্চিম মুখে সাগর পারে সে সব সােনার দেশে যাবার জন্য তার মন আকুল হয়ে উঠেছিল। কলাম্বাসের মনে হত,মার্কোপােলাে পূবমুখে স্থলপথে ভারত, চীন প্রভৃতি দেশে গিয়ে যেমন তাঁর মাতৃভূমি ভিনি নগরীর * থিনী (Thinae বা Sinae) চীনদেশের প্রাচীন নাম। ;

অসাধারণ সংকল্প গৌরব বাড়িয়েছেন, তিনিও পশ্চিম মুখে সমুদ্রপথে ভারতে যাবার রাস্তা বের করে তাঁর মাতৃভূমি জেনােয়ার মুখ উজ্জ্বল করবেন। আটলান্টিক মহাসাগর পার হলেই তিনি ভারতে পৌছবেন, এ ধারণা তার দিন দিন দৃঢ় হচ্ছিল। তিনি প্রাচীন গ্রীকলেখক প্লিনির (Pliny) কথা,-“পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরে আসা সহজ”— “ভারত পৃথিবীর একতৃতীয়াংশ স্থান যু’ড়ে রয়েছে”—এসব মনে মনে আলােচনা করতেন, আর ভাবতেন,—“হয়ত এ সত্যি হবে, ভারত ইউরােপের অদূর পশ্চিমে হয়ত অনেকখানি জায়গা যু’ড়ে আছে।” এই ধারাতে সব সময় চিন্তা করতে করতে তাঁর সেই পশ্চিম-মুখে ভারত যাবার সংকল্প অটল হয়ে উঠল। আর তার মনের চোখে তখনকার জানা পৃথিবীর এই ছায়াচিত্র ভেসে উঠত ;-তঁার মনে হত অন্ধকারের মেঘের ভিতর থেকে এক একটি দেশ, মহাদেশের আকার যেন স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে। তিনি খুব সংযমী ছিলেন; মনের দৃঢ়তাও ছিল তার খুব; লােক- জনকে বশে রেখে কাজ করার কৌশলও তার বেশ ছিল। সমুদ্রের ও নৌ-বিদ্যার অসাধারণ জ্ঞানও ছিল তার ঢের। সব চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তার প্রাণের অদম্য সংকল্প ছিল, যার বলে তিনি অজানা, অচেনা দেশের সকল বিপদ-বিপর্যয়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্ধকারের কবল হতে নূতন দেশ বের করতে পারতেন। সংকল্প করা সহজ। সংকল্প সাধনের জন্য মন, প্রাণ প্রস্তুত করাও খুব শক্ত নয়। কিন্তু অত বড় কাজে নাবতে হলে তাে অর্থ চাই। তিনি ছিলেন নিজে গরিব ; পরিশ্রম করেই তাকে জীবিকা উপার্জন ১৪ কলাস করতে হত ; দূর সমুদ্রে যাবার মতাে জাহাজের বহর তৈরী করা তঁার সাধ্য ছিল না। তখনকার দিনে কি সাহিত্যে, কি শিল্পে, কি দূরদেশে পৰ্য্যটনে, যে কোন দিকে একটি বড় কাজ করতে হলে দেশের ধনী লােক কিংবা উচ্চ রাজপুরুষদের আশ্রয় নেওয়া দরকার হত। চলতি কথা আছে,সময়ে সব হয়, মানুষের বুদ্ধি খােলে, অনুকূল অবস্থার সমাবেশ হয় ; নতুন নতুন দিকে মানুষের মনের গতিও ছােটে। কলম্বাসের বেলাও তা হয়েছিল। পৃথিবী যে কত বড় তা জানবার যেন তখন সময় উপস্থিত হয়েছিল। তখন ইউরােপ মধ্যযুগের ঘুম হ’তে সবে মাত্র জাগছিল ; যেমন একদিকে গ্রীস-রােমের সাহিত্য-দর্শনের এক নতুন মনাে-জগতের দিকে একদল লােকের দৃষ্টি যাচ্ছিল, তেমনি অন্য দিকে আর একদল লােকের মন পৃথিবীর অজানা দেশের খোঁজে ছুটে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। ইউরােপের নানা দেশের লােকের এই মনের গতি যেন কলম্বাসের চিন্তা, চেষ্টা ও সংকল্পকে চালিত করেছিল। জেনােয়াতে এমন কেউ তখন ছিল না যার কাছে কলাম্বাস সাহায্য পেতে পারতেন। আগেই বলা হয়েছে, তখন নৌ-যাত্রায় পর্তুগালের খুব নাম। জেনােয়া হ’তে গিয়ে অনেক সাহসী, দক্ষ নাবিক যুবরাজ হেরীর নেতৃত্বে অনেক দেশ আবিষ্কার করেছে ; হেীর মৃত্যুর সময় কলম্বাসের বয়স মাত্র ১৩ বৎসর। বালক- কাল হ’তে হেীর বিপুল চেষ্টার কথা শুনে শুনে কলম্বাসের মন পর্তুগালের দিকে খুব আকৃষ্ট হয়েছিল। তাই তিনি পর্তুগালে গিয়ে

অসাধারণ সংকল্প
তার সংকল্প সাধনের উপায় খুঁজবেন এই স্থির করে পর্তুগালের
দিকে যাত্রা করলেন।
তখন তার বয়স সাতাশ কি আটাশের বেশী নয়। এই সময়কার
একটি গল্প আছে। তিনি একটি বিদেশী জাহাজে চড়ে যখন
পর্তুগালে যাচ্ছিলেন, ভিনিসের চারখানি ছােট জাহাজের সঙ্গে
তার জাহাজের লড়াই হয়। সে যুদ্ধে কলম্বাস যােপ দেন।
দু’পক্ষের জাহাজ হাত-বােমর আগুনে পুড়ে যায়। কলম্বাস এক
খানি কাঠে ভর দিয়ে ভেসে ভেসে পর্তুগালের তীরে গিয়ে
পৌছেন।
তখন ১৪৭৬ খৃষ্টাব্দ। তার বাপ-মা তখন জেনােয়াতে। এই
সময়েই তার ছােট ভাই জিওভানি মারা যায়। পর্তুগালে গিয়ে
তিনি দশ বছর ধরে চেষ্টা করতে লাগলেন কি করে তার সেই
অসাধারণ সংকল্প কার্যে পরিণত করবেন।

; পৰ্তুগালে–কলাম্বাস কলাম্বাসের তখন পূর্ণ যৌবন। তার চেহারা ছিল খুব সুন্দর। রঙ খুব ফর্সা—তার ওপর একটু লাল আভা খেলত; শরীর দীর্ঘ, বলিষ্ঠ ; চোখ দুটি উজ্জ্বল সাদা, চোখের তারা একটু পিঙ্গল ; তার চাহনির মধ্যে এক অপূর্ব মহিমা ছিল—যেমন উদার, তেমনি মধুর ! মুখের গড়ন ঈষৎ লম্বা ধরণের ; গালের হাড় দু’টো একটু উচু ; নাক দীর্ঘ, উন্নত, অগ্রভাগ ঈষৎ বক্র। মুখে, কপালে আনন্দের দীপ্তি সৰ্ব্বদাই লেগে থাকত। চুলগুলি হালকা সােনালি রঙের ছিল, কিন্তু নানা চিন্তায়, অভাবে, কষ্টে তার ত্রিশ বছর বয়সেই সব চল রূপাের মত সাদা হয়ে গিয়েছিল। তিনি আহার বিহারে খুব মিতাচারী ছিলেন ; পােষাক-পরিচ্ছদ তাঁর খুব সাদাসিদে ছিল। কথাবার্তায় তিনি সহজেই লােকের মন ভােলাতে পারতেন,—তার কথা বলার ভঙ্গী অত সরল, অত মধুর ছিল । অজানা লােকও তাঁর নির্মল ব্যবহারে মুগ্ধ হত। তাঁর প্রাণভরা ভালবাসায় বাড়ীর সব লােক তার অনুরক্ত ছিল। মেজাজ একটু কড়া হলেও তার উদারতা ও বিনয়ে লােকে তা ভুলে যেত। তাঁর মুখ হ’তে কখনও নিন্দা বা গালি বের হ’ত না। ধর্মভাব ,তাঁর খুব গভীর ছিল ; ধৰ্ম্মজীবনের সরল উৎসাহ তঁার সকল কাজে ফুটে উঠত। ;

পৰ্তুগালে–কলাম্বাস ১৭ পৰ্তুগালের রাজধানী লিসব। সেখানে “অ-সেইন্ট- আশ্রমের” এক গির্জাতে তিনি উপাসনা করতে যেতেন; এই আশ্রমের একটি যুবতীর সহিত এ সময় কলম্বাসের পরিচয় হয়। তার নাম “ফিলিপা মােনিজ।” আগেই বলা হয়েছে, ইনি যুবরাজ হেীর একজন বিখ্যাত নাবিক পেরেষ্ট্রেলাের মেয়ে। কলাম্বাস কিছুদিন পরে এঁকে বিবাহ করেন। বিবাহের কিছুদিন আগেই পেরেষ্ট্রেলাে মারা যান। বিবাহের কিছুদিন পরে কলম্বাস স্ত্রীকে নিয়ে তার শাশুড়ীর কাছে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি পেরেষ্ট্রেলাের অনেক বই, নক্সা, সমুদ্রযাত্রার বিবরণ পড়তে পান ; তা প'ড়ে তখনকার দিনে পর্তুগীজরা যে সব সমুদ্রপথ আবিষ্কার করেছিল, তার বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান লাভ করেন। এ সময়ে তিনি মানচিত্র, নক্সা তৈয়ারী ক'রে যা উপার্জন করতেন তা দিয়ে তার নিজের আর ভাইদের পড়ার খরচ তঁাকে চালাতে হ'ত। জেনােয়াতে বুড়াে বাপ ছিলেন, তাকেও ভঁর দেখতে হত। পাের্টে। শান্তো দ্বীপে তার শ্বশুরের কিছু বিষয় ছিল; সেখানে তিনি গিয়ে কিছুদিন ছিলেন। সে সময় তার ছেলে জেমসের জন্ম হয়। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পর্তুগালে ফিরে আসেন। তখন দ্বিতীয় জন পর্তুগালের রাজা ; ইনি যুবরাজ হেীর কাকা। কলাম্বাস তখনকার একজন প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ্‘প’ল টসকেনেলী’র কাছে তাঁর অভিপ্রায় জানিয়ে এক পত্র লিখেন। তাতে তিনি শ। ২ কলাম্বাস পশ্চিম সমুদ্রপথে গিয়ে ভারতে পৌঁছাবার যে সংকল্প করেছেন- তার কথা স্পষ্ট জানিয়ে দেন। টসকেনেলীর বাড়ী ছিল ফ্লোরেন্সে ; তখন তার খুব নাম। টসকেনেলী কলাম্বাসকে এই জবাব দিলেন,—“কিছুদিন আগে পর্তুগালের রাজা সমুদ্রপথে ভারতে পৌঁছাবার নতুন পথের খোঁজ করেছিলেন আমার কাছে। আমি ঐ পথের একটি না দিয়ে রাজাকে দেখিয়ে দিয়েছি কোন দ্বীপ হ’তে যাত্রা শুরু করতে হবে,—বিষুব-রেখা আর উত্তর মেরু হ’তে ওপথ কতদূর দিয়ে কোন কোন দিকে যাবে। আমার ধারণা,—ঐ পথ ধ’রে গেলে ক্যাথে (চীন) দেশের উপকূলে পৌঁছান যাবেই। আমি জিপাঙ্গু (জাপান) দেশের কথাও জানিয়েছি ;-আমার মতে এই দেশ লিসবন থেকে আড়াই হাজার মাইল, চীনদেশ সাড়ে ছয় হাজার মাইল দূরে হবে।” অমন বড় লােকের কাছ থেকে এই জবাব পেয়ে কলম্বাসের মনে খুব বল-ভরসা জাগল। তার আশা হল,হয়ত পৰ্ত্ত গালের রাজা তঁার সংকল্প-সাধনে সহায় হবেন। রাজা-রাজড়াদের কাছ হতে কাজ আদায় করা তত সহজ নয়। সাতাশ বছর বয়সের সময় কলম্বাস পর্তুগালে এসে দশ বৎসর রাজার অনুগ্রহের আশায় কাটান। এর মাঝে তিনি একবার গিনী উপকূলে, আর একবার উত্তর দিকে আইসল্যাণ্ড, পৰ্যন্ত গিয়েছিলেন। প্রবাদ আছে,-বহু পূর্বে নরওয়ের লােকেরা সমুদ্রপথে

১৯
পৰ্তুগালে–কলাম্বাস
গ্রীনল্যাণ্ড, নিউফাউণ্ডল্যাণ্ডে গিয়েছিল। তাই কতকগুলি লােক
বলে,-কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে বিশেষ কিছুই
নতুন করেন নি। এদের এরূপ ধারণার কোন মূল্য নেই।
যত বড় বড় আবিষ্কার জগতে হয়েছে, সব কিছুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট
দু’চারটি ছােট খাটো ঘটনার আবিষ্কার আগেই হয়ে থাকে।
কিন্তু সে সব ছােট বিষয়ে লােকদের নজর সহজে পড়ে না। যখন
কোন বড়লােক নিজ বুদ্ধি ও সাধনার বলে আগেকার বিচ্ছিন্ন জ্ঞান
ও সংস্কারগুলি মিলিয়ে এক নতুন আকার দেন, তখন তার দিকে
জগতের দৃষ্টি পড়ে। আলান্টিক মহাসাগরের পরপারে যে অত বড়
একটি মহাদেশ ছিল তা কেউ জানত না। কলাম্বাসের সমুদ্রপথ
আবিষ্কারের ফলেই ঐ মহাদেশের দিকে ইউরােপের দৃষ্টি যায়।
কলাম্বাস পর্তুগালে এসে অনেক চেষ্টার পরে রাজা দ্বিতীয়
জনের সঙ্গে দেখা করেন। রাজার সমুদ্রযাত্রাতে উৎসাহ ছিল খুব;
যুবরাজ হেরীর প্রভাব তার উপর খুব পড়েছিল। কলম্বাস
রাজাকে বললেন,—“আপনি যদি আমাকে জাহাজ আর লােজন
দিয়ে সাহায্য করেন আমি পশ্চিম সমুদ্রপথে সহজেই চীন, জাপান
প্রভৃতি সেই সব পূব দেশে পৌছতে পারব ; সেখানকার খুব
বড় সম্রাট—যাকে “গ্রাণ্ড খা” বলে সবাই জানে,--তাঁর সঙ্গে
আপনার পরিচয় হতে পারবে।” টকেনেলী তাকে যে
চিঠি দিয়েছেন তার কথাও তিনি রাজাকে বললেন।
রাজা খুব মনােযােগ দিয়ে কলম্বাসের কথা শুনলেন। তার
সভায় যে সব পণ্ডিত লােক ছিলেন তাদের আদেশ দিলেন

২০ কলাম্বাস কলাম্বাসের প্রস্তাবটি পরীক্ষা করতে ; তারা সবাই বলে উঠলেন, “এ প্রস্তাবের মূলে কেবল কলম্বাসের কল্পনা—আর অনুমান। এ কোন দিন কাৰ্যে পরিণত হবে না—হতেও পারে না।” রাজা কিন্তু এদের এই কথায় সায় দিলেন না। তার রাজ্যের বড় বড় বিজ্ঞ লোেকদের আর এক বৈঠক ডাকালেন। সেখানেও কলম্বাসের প্রস্তাব উপেক্ষিত হ'ল। রাজা কিন্তু এতেও খুসি হলেন না। এই বৈঠকে একজন খুব ধূৰ্ত্ত পাদরী ছিল,—নাম “ক্যাজাদিলা”। সে রাজার কানে কানে বলল,-“কলম্বাসের না, পুঁথিপত্র—যা সে সংগ্রহ করেছে, তা আমরা পরীক্ষা করব বলে প্রথম চেয়ে নিই ; তার পর আমরা গােপনে কলম্বাসের নির্দিষ্ট পথে জাহাজ পাঠিয়ে ঐ সব দেশ যদি নিজেরা বের করতে পারি, তা হলে আবিষ্কারের সব নাম, সুযােগ, সুবিধা আমাদেরই তাে হবে ; কলম্বাসের মতাে একজন বিদেশীকে তখন তার অংশ দিতে হবে না।” রাজার মতিভ্রম হয়েছিল। তাই তিনি এই নীচ মতলবে সায় দিলেন। কলম্বাসের প্রস্তাবের যােগ্যতা পরীক্ষা করার ছলনা করে তার মানচিত্র, না, বই প্রভৃতি যা যা ছিল, সব চেয়ে নেওয়া হ’ল ; ক্যাজাদিলার পরামর্শ শুনে রাজা গােপনে গােপনে পশ্চিম সমুদ্রে জাহাজ পাঠালেন। ঐ জাহাজ আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে কিছুদূর গিয়ে, অজানা সমুদ্রে ঝড়, বাদলার চোটে এগােতে পেরে, দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হ’ল। তখন রাজার এই হীন চেষ্টার কথা দেশময় জানাজানি হয়ে যায়।

শ
পর্তুগালে–কলাম্বাস
২১
এই ব্যাপারের খবর যখন কলম্বাসের কানে পৌছল, তখন
রাগে, ঘৃণায় আর অভিমানে তিনি বিচলিত হয়ে স্পেনে চলে
যাবেন ঠিক করলেন। তখন তাঁর ছেলে জেমসের বয়স মাত্র
সাত বছর ; তার স্ত্রীও তখন পরলােকে।
তাঁর স্ত্রীর এক বােন ছিল, সে থাকত তার স্বামীর কাছে,
পর্তুগাল রাজ্যের সীমায় স্পেন দেশের দক্ষিণ উপকূলে এক পাড়া-
গাঁয়ে। শিশু ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে কলাম্বাস ওখানে গিয়ে দেখেন
ওরা কিছুদিন আগেই ও জায়গা ছেড়ে চলে গেছে। ঐ গ্রামের নিকটে
খ্ৰীষ্টান সন্ন্যাসীদের ‘লা র্যাবিদা” নামে এক মঠ ছিল। শিক্ষার
জন্য তিনি ছেলেটিকে ওদের হাতে দিলেন। কথাবার্তায় সন্ন্যাসীরা
কলাম্বাসের সংকল্পের কথা জানতে পেরে তাদের মঠের মার্চেনা
নামে একজন বুড়াে সন্ন্যাসীকে জানায়। তাঁর মন ছিল উদার ;
অন্যান্য সন্ন্যাসীর মতাে কুসংস্কারে ভরা ছিল না। তিনি
কলাম্বাসকে খুব উৎসাহ দিয়ে বললেন,-“তােমার এই যে
সংকল্প, এতে ইহ জগতের লাভ তো হবেই; যদি ওসব নতুন
দেশে খ্ৰীষ্টধর্মের প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে অসংখ্য
লােকের মুক্তির উপায়ও হয়ে যাবে।”
তখন কলম্বাসের বয়স প্রায় চল্লিশের
কাছাকাছি ; —এত
নিরাশা ও দুঃখের মধ্যে ঐ মঠের সন্ন্যাসীদের প্রীতিময় ব্যবহারে
তিনি সব ভুলে গেলেন। তিনি তাঁর ছেলে জেমসকে ঐ আশ্রমে
রেখে স্পেনের রাজার সঙ্গে দেখা করতে চললেন।

৪ রাণী ইসাবেলা ১৪৮৫ খ্রীষ্টাব্দে কলম্বাস স্পেনে আসেন। তখন স্পেন রাজ্যের ভারি বিপদ। আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমাংশে এক মুসলমান জাতি বাস করে। তাদের মূর বলা হয়। এই মূরেরা এসে স্পেন রাজ্য অনেক দিন থেকে দখল করে বসেছিল ; স্পানিয়ার্ডরা মূরদের সঙ্গে লড়াই করে তাদের স্পেনের দক্ষিণাংশে তাড়িয়ে দেয়। মূরেরা ওখানে গ্রানাডা নগরে তাদের রাজধানী বসায়। এই স্থান থেকেও মূরদের তাড়িয়ে দেবার জন্য তখন স্পেন দেশের লােকেরা প্রাণপণ লড়ছিল। স্পেনের রাজা ছিলেন ফার্দিনান্দ; রাণীর নাম ইসাবেলা। এই দু’জনের বিবাহের পরে স্পেনের অধিকাংশ স্থান এদের অধিকারে আসে। মূরদের সঙ্গে লড়াই করতে সুবিধা হবে মনে করে ফার্দিনান্দ, স্পেনের রাজধানী মাদ্রি ছেড়ে কর্ডোভা নগরে আসেন, যেখানে মুরদের সঙ্গে লড়াই হচ্ছিল তার অনেকটা কাছে। সে সময় সবাই যুদ্ধের জন্য বিব্রত; রাজা স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে ; রাণীও রাজার শিবিরে যাতায়াত করছেন। তখন তাঁদের সঙ্গে কলম্বাসের দেখা করা সম্ভব ছিল না। ; ;

No text on this page.

Rislerle Collection
স্পেনের রাণী ইসাবেলা
rom the wivinti m the latinal linklis 17.

রাণী ইসাবেলা . 5; রাণী ইসাবেলা তখন মধ্য বয়সে পড়েছেন। তাঁর সরল, উন্নত দেহ, প্রশান্ত মুখশ্রী ও সৌম্য দৃষ্টি তার মনের দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা ও উদারতার পরিচয় দিত। রাজাও ধীরতায়, সাহসে ইসাবেলার যােগ্য স্বামী ছিলেন। কলাম্বাস রাজা ও রাণীর সহিত তখন দেখা করতে না পেরে বসে থাকলেন না। তিনি দেশের বড় বড় লােকদের সঙ্গে দেখা করে তার সংকল্পের কথা সবাইকে জানাতে লাগলেন। দিনের পর দিন যত বেশী লােকের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা হতে লাগল, অনেকেই তঁার সরল, মধুর ব্যবহারে, তার সংকল্পের দৃঢ়তায় তাঁর প্রতি অনুরাগ দেখাতে লাগল। এই সময়ে রাজবাড়ীর শিক্ষক আলেক- জেলার জিরালডিনীর সহিত তাঁর আলাপ হয়। এরি সাহায্যে টোলিড়াে নগরীর প্রধান পাদরী কার্ডিনাল মেণ্ডোজার সঙ্গে তিনি দেখা করেন। কার্ডিনাল রাজসভার একজন প্রধান লােক ছিলেন; রাণীর উপর তার খুব প্রভাব ছিল। তাঁর অনুগ্রহে কলাম্বাস রাজা ও রাণীর সঙ্গে দেখা করেন। কলাম্বাস রাজা ও রাণীর কাছে উপস্থিত হয়ে খুব ধীর, স্থির ভাবে তঁার সংকল্পের কথা বললেন। তখন তার মনে হচ্ছিল যেন কোনও অলৌকিক শক্তি তাঁর প্রাণে নতুন বল, নতুন প্রেরণা জাগাচ্ছিল। তাঁরা কলম্বাসের কথা মনােযােগ দিয়ে শুনে আদেশ দিলেন,-রাজ্যের বড় বড় পণ্ডিত ও জ্যোতির্বিদের এক বৈঠক ডাকা হােক, সেখানে কলম্বাসের প্রস্তাব পরীক্ষা করা হবে। কলাম্বাসের কথা শুনে রাণীর ধারণা হয়েছিল,—“কলাম্বাসের ২৪ কলাম্বাস ; বৈঠক বসল। সংকল্প অতি সুন্দর ; উহা ফলিয়ে তুলতে পারলে স্পেন রাজ্যের অনেক উপকার হবে।” কলম্বাস সেখানে উপস্থিত। নানা পণ্ডিত নানা মত প্রকাশ করলেন। তা নিয়ে খুব তর্কের ঝড় চলতে লাগল। কলাম্বাস চুপ করে সব বাদ-প্রতিবাদ শুনে সবার সামনে দাড়িয়ে খুব সরল, নির্ভীক মনে তার কথা বললেন। প্রতিকূল যে সব মত প্রকাশ করা হয়েছিল তিনি খুব সাহসের সহিত তারও জবাব দিলেন। তার প্রতিভাদীপ্ত মূৰ্ত্তি, ওজস্বী বাভঙ্গী, মধুর বিনয়, সরল ব্যবহার, শান্ত দৃষ্টি—সব কিছুর মধ্যে এমন ঐকান্তিকতা, ধর্মানুরাগ ফুটে উঠছিল যে উপস্থিত পণ্ডিতদের কেহ কেহ তার যুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু অধিকাংশ লােক ছিল খুব গোঁড়া ও অন্ধবিশ্বাসী। তারা কলাম্বাসের বিপক্ষে উঠে পড়ে লাগল। তাদের জ্ঞান পুরানাে পুথির পাতা ও ধর্মশাস্ত্রের জীর্ণ সংস্কারের বাহিরে যেত না। কাজেই সে পণ্ডিত সভার মত কলাম্বাসের অনুকূল হ’ল না। যখন এই সভার মত সবাই জানতে পারল, কলাম্বাসকে পাগল ব’লে তখন সবাই বিদ্রুপ করতে লাগল। তিনি রাস্তায় বের হলে ছেলেরা দলে দলে তার পিছু পিছু ছুটে তঁাকে ঠাট্টা করত। এই সময় কলম্বাসের একজন বন্ধু জুটে। ইনি স্যালামাস্কা সহরের সঁ ইষ্টিভান্ মঠের অধ্যক্ষ,—জেমস্ দি দেজা। তিনি কলাম্বাসকে তার মঠে নিয়ে যান। সেখানে বহু পণ্ডিত লােকের সাথে তার পরিচয় হয়।

রাণী ইসাবেলা ২৫ ; ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে কলম্বাস রাণীর সঙ্গে দেখা করতে কর্ডোভায় গিয়েছিলেন। এই সময় তার সঙ্গে আরেনা পরি- বারের পরিচয় হয়। কিছুদিন পরেই এই পরিবারের এক মেয়ে বিয়াট্রীস্ আরেনার সঙ্গে কলম্বাসের বিবাহ হয়ে যায়। এই কয় বছর রাজা ও রাণীর অনুগ্রহ পাবার আশায় কলাম্বাস ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন; কিন্তু কাৰ্যত কিছুই হ'য়ে উঠে নি। তিনি তার ভাই বাথোলােমিউকে ইংলণ্ডের রাজা সপ্তম হেনরীর কাছে পাঠিয়েছিলেন, সেখানে কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার কিছু সুবিধা হয় কিনা দেখতে। হেনরী খুব বিষয়ী লােক ছিলেন ; তিনি অত টাকা পয়সা খরচ করে অনির্দিষ্ট পথে জাহাজ পাঠাতে নারাজ হলেন। তার পর বার্থোলােমিউকে ফরাসী দেশে পাঠানাে হ’ল, সেখানেও কলম্বাসের প্রস্তাব উপেক্ষিত হয়। এই কয়েক বৎসরের এত চেষ্টাতেও কোন ফল হ’ল না। সব জায়গায় বিফল হ'য়ে তার মন একেবারে বিগড়ে গেল। ১৪৯১ খ্ৰীষ্টাব্দে রাজা ও রাণী যখন মূরদের রাজধানী আক্রমণ করতে যাচ্ছেন, সে সময় কলম্বাস রাজা ও রাণীর কাছে শেষ জবাব চাইলেন। তাদের আদেশে আবার এক বৈঠক বসল ; তাতেও কোন ফল হল না। কলাম্বাস মনে করলেন,—স্পেন দেশ ছেড়ে ফরাসী দেশে গিয়ে তাঁর ভায়ের সঙ্গে মিলবেন। দু’জনে মিলে আর একবার ওদেশে চেষ্টা করা যাবে। এই ঠিক করে যাবার পথে তিনি র্যাবিদা মঠে গেলেন, তার ছেলে জেমসকে দেখতে। মঠের অধ্যক্ষ জুয়া কলাঘাস । ; পেরেজ, আগেই মঠের সন্ন্যাসীদের মুখে কলম্বাসের কথা শুনেছিলেন। সাত বছর পরে কলাম্বাসকে নিরাশ হয়ে ফিরতে দেখে তাঁর মনে বড় দুঃখু হ’ল। তিনি রাণী ইসাবেলার গুরু ছিলেন ; রাণী তার কথা শুনতেন। তিনি রাণীর নিকট খুব জোরাল ভাষায় কলাম্বাসের বিষয়ে একখানি চিঠি লিখলেন ; তার মর্ম এই ঃ- “তােমার রাজ্যের নতুন সম্মান ও গৌরবের সুযােগ এসেছে। কলাম্বাসকে উপেক্ষা করে সে সুযােগ হারিও না। তুমি নতুন নতুন কত সাহসের কাজে অকাতরে অর্থব্যয় করছ,—কলাম্বাসের এই সামান্য ব্যাপার,—যাতে দু’খানি জাহাজ আর হাজার ত্রিশ মুদ্রা লাগতে পারে, এই সামান্য বিষয়ে কেন তুমি নজর দিচ্ছ না বুঝতে পাচ্ছি না; এ আমার কাছে বড়ই আশ্চৰ্য্য ঠেকছে। কলাল্বাসের সংকল্প সফল হলে স্পেনের নাম খুব তাে হবেই, ছাড়া খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মের আলাে যে সারা জগতে ছড়িয়ে পড়বে।” 'রাণী তখন যুদ্ধক্ষেত্রে রাজার সঙ্গে মূরদের রাজধানী গ্রানাডা নগরীর অবরােধে উপস্থিত ছিলেন। চিঠি পেয়েই তিনি সাধু পেরেজকে ডেকে পাঠালেন,—কলাম্বাসের প্রস্তাব নিয়ে আলােচনা করার জন্য। সাধু পেরেজ একটি খচ্চরের পিঠে চড়ে দুর্গম বন, পাহাড়ের ভিতর দিয়ে অনেক কষ্ট সহ্য করে রাণীর কাছে এলেন। রাণী সব কথা খুব আগ্রহে শুনে বললেন,—“কলম্বাসের প্রস্তাব আমার প্রথম থেকেই খুব ভালো লেগেছে। যদি স্পেনের রাজকোষ হতে টাকা না জুটে, আমি আমার গয়না, জহরত সব বেচে কলম্বাসের উপায় করে দেব। যুদ্ধের হাঙ্গামাতে এতদিন রাণী ইসাবেলা ২৭ কিছুই করা যায় নি।” রাণী কলাম্বাসকে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন, যাতে একটি খচ্চর আর ভাল পােষাক কিনে কলাম্বাস শীঘ্র এসে রাজার কাছে পৌঁছতে পারেন। কলম্বাস ফরাসী রাজ্যে না গিয়ে আবার রাজা-রাণীর দরবারে চললেন। সতের বছরের এত চেষ্টার পর এই অনুগ্রহ পেয়ে উৎসাহে কলাম্বাসের বুক যেন ভরে গেল। রাণী কলাম্বাসকে জিজ্ঞাসা করলেন,—“তুমি কি কি সৰ্ত্তে পশ্চিম মুখে যাত্রা করতে চাও?” কলাম্বাস বললেন,—“যে নৌবহর আমায় দেওয়া হবে, তার ওপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকবে আমার ; যে সব নতুন দেশ আবিষ্কৃত হবে, সে সব স্পেনরাজের প্রতিনিধি হয়ে আমি শাসন করব ; ওদেশ থেকে যা আয় হবে, তার দশমাংশ আমি রেখে বাকী সব রাজকোষে দেব।” রাণীর কল্পনাশক্তি ছিল খুব প্রখর ;—তাঁর দূরদৃষ্টিও কিছু কম, ছিল না। তিনি ভাবলেন,—“কলম্বাস যা চাচ্ছে ও তেমন বেশী কিছু নয়। কলম্বাসের সংকল্প সফল হলে স্পেন রাজ্য সব চেয়ে বড় হয়ে দঁাড়াবে ; তার জন্য কলম্বাস সামান্য পুরস্কার চাইছেন বইত নয়।” তিনি ব'লে পাঠালেন,—“গ্রানাডা, নগরীটি দখল হয়ে যাক্‌; তখন কলম্বাসের প্রস্তাব মত কাজ করা যাবে।” ১৪৯২ খ্ৰীষ্টাব্দের জানুয়ারি মাস। তখন গ্রানাডা স্পেনের অধিকারে এল। রাণী তখন কলম্বাসের প্রস্তাব রাজদরবারে উঠালেন। রাজকর্মচারীরা বলে উঠল,-“কলম্বাসের সর্তগুলাে নিতান্ত অসঙ্গত,—ও আলােচনার যােগ্যই নয়।” ;

২৮
কলাম্বাস
রাজসভার এই মত শু’নে কলম্বাস খুব ব্যথা পেলেন বটে,
কিন্তু তিনি তার জন্য কারাে ওপর দোষ দিলেন না। এই সতের
বছর ধরে কত নিন্দা, কত উপহাস, কত নৈরাশ্য তিনি সহ্য করে
এসেছেন! তার ধীরতা, সহিষ্ণুতার সীমা ছিল না। তিনি স্পেন
রাজ্য ছেড়ে চলে যাবেন, ঠিক করলেন।
তিনি নিজে খুব গরিব ছিলেন। একটি খচ্চরের পিঠে চড়ে
তিনি ধীরে ধীরে চলেছেন,—সেই পাহাড় বনের ভেতর দিয়ে একা
একা,—“শান্তা ফী’ নগর হ’তে কর্ডোভার দিকে। পথে গ্রানাডা সহর
পড়ে। কয়েক বছর আগে তিনি কত আশা, ভরসা নিয়ে রাণীর
সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তখন কত নতুন নতুন রাজ্যের স্বপ্ন
তাঁর প্রাণের ভেতর ঝিলিক মেরে যাচ্ছিল,আর আজ দারিদ্র্য,
নিরাশার ভারে পীড়িত হয়ে তিনি সে দেশ থেকে বিদায় নিচ্ছেন।
তার হৃদয়, মন সে সময় এক অজানা বেদনায় ভরে উঠছিল।
তিনি গ্রানাডার ৬ মাইল দূরে একটি ছােট পুল পার
হচ্ছিলেন। এমন সময় একটি ঘােড়-সওয়ার পিছু হ’তে ছুটে এসে
তাকে রাণীর এক পরওয়ানা দিয়ে বলল,—“রাণীর হুকুম, আপনাকে
তাঁর কাছে যেতে হবে এখনি।”
রাণী ইসাবেলা রাজসভার প্রতিকূল নত শুনেই ঠিক
করেছিলেন,—“এই অসাধারণ লোেকটির জীবনের সাধনা আমি
ব্যর্থ হতে দেবাে না। তাই তিনি কলম্বাসকে ডেকে এনে বলে
দিলেন,—“তােমার কাজ এবার হবেই হবে।” তা শুনে কলাম্বাস
অনেকটা স্থির হলেন। রাণীর ওপর কলম্বাসের যেমন ভক্তি

রাণী ইসাবেলা
২৯
ছিল, কলম্বাসের ওপরেও রাণীর তেমন শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস
ছিল।
রাণীর গয়নাপত্র কিছুই বিক্রী করতে হ’ল না। তিনি ধার
করে টাকা তুললেন। তার মনের দৃঢ়তা এত ছিল, তিনি যা স্থির
করতেন, তা তৎক্ষণাৎ করে ফেলতেন। ১৪৯২ খ্রঃ ১৭ই এপ্রিল
কলম্বাসের সৰ্ত্তমতে সব বন্দোবস্ত ঠিক হ’ল।
কলাম্বাস প্যালো বন্দর হতে যাত্রা করবেন। সে বন্দরের
লােকেরা কলাম্বাসের জন্য দুখানি জাহাজ
দেবে,—এই
অদেশ হ’ল।
এ সময় কলম্বাসের দ্বিতীয় ছেলের জন্ম হয়। স্পেন রাজার
নামে তার নাম দেওয়া হ’ল-ফার্দিনান্দ। এ ছেলে তার মার
কাছেই রইল। বড় ছেলে জেম্স্ যুবরাজ জনের অনুচর হয়ে
রইল। কলম্বাস অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে চললেন—পশ্চিম মুখে
আটলান্টিক মহাসাগরের অজানা পরপারের দিকে।

C
প্রথম যাত্রা-পশ্চিম মুখে
কলম্বাসের জন্য তিনখানি জাহাজের বহর, তৈরী হ’ল।
জাহাজ তিনটির নাম সান্তা মেরিয়া, পিণ্টা, আর নিনা।
সান্তা মেরিয়া সব চেয়ে বড় ; উহাতে প্রায় সাতাশ শশা মণ
বােঝাই ধরত। উহার গড়ন সেকেলে,-পেছনের দিকটি বেজায়
বড়, আর খুব উচু, দেখতে এদেশের খুব বড় ভাউলিয়া নৌকার
মতত। খুব বড় বড় পাল তিনটি লম্বা মাস্তুলের গায়ে রশি দিয়ে
খাটানাে। জাহাজের পেছন দিকটাতে খালাসীদের জন্য ছােট
ছােট
কুটরী, সামনের দিকে জাহাজের কর্মচারীদের ঘর, সবি
কাঠের তৈরী।
খুব প্রাচীন, বিচক্ষণ নাবিক না হলে এমন জাহাজ নিয়ে
ভূমধ্যসাগরের উপকূল দিয়েও বেড়াতে কেউ সাহস করত না;
আর আটলান্টিক মহাসাগরের পাহাড়ের মতাে বড় বড় ঢেউ কেটে
ওজাহাজ নিয়ে পাড়ি দিতে যাওয়া কত বড় দুঃসাহসের কাজ,
আমরা ধারণাই করতে পারি না।
আকারে পিণ্টা সান্তা মেরিয়ার প্রায় আধাআধি হবে।
এলােঝে পিঝন্ ছিলেন এই জাহাজের কাপ্তান। এই জাহাজের
সব সাজ সরঞ্জামের খরচ কলাম্বাস নিজে দিয়েছিলেন।

কলম্বাসের জহজ–সম্ভ। মেরিয়া, পিন্ট। ও নিন। Mom Jeorrs" Colin', a pesar ESWOR J the long hon Jlifhin (

No text on this page.

প্রথম যাত্রা—পশ্চিম মুখে নিন। জাহাজটি সব চেয়ে ছােট। ওতে হাজার মণের বেশী বােঝাই ধরত না। খুব ছােট হলেও জাহাজখানি কলম্বাসের সব চেয়ে বেশী কাজে লেগেছিল। এই তিন জাহাজে মাঝি-মাল্লা, কাপ্তান নিয়ে সব সুদ্ধ ৮৮ জন লােক ছিল। এদের একজন ছিল ইংরেজ, একজন ছিল আইরিশ। সবাই কিন্তু জাহাজের কাজে পাকা ছিল। যে সব লােক পশ্চিম সমুদ্রে প্রথম পাড়ি দিয়েছিল, তাদের সকলের নামের তালিকা এখনও রয়েছে। ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দের ২রা আগষ্ট এই তিনটি জাহাজের লােকজন প্যালাে বন্দরে সেন্ট জর্জ গির্জাতে উপাসনা করল। সবাই সাধু পেরেজের আশীষ মাথায় করে নিয়ে ঐ দিনই পাড়ি দিলে। কলাম্বাস প্রথমে কেনেরী দ্বীপে পৌঁছেন। অতদূর পর্যন্ত সমুদ্র-পথ তখনকার দিনে লােকের জানা ছিল। ওখান হতে গ্রাণ্ড কেনেরী দ্বীপে পৌছে পিণ্টা জাহাজের হাল বিগড়ে গেল। সেখানে জাহাজটি সারিয়ে টেনারী অন্তরীপের পশ্চিমে গােমেরা দ্বীপে তারা পৌছলেন। ওখানে খাদ্য ও জল সংগ্রহ করতে চার দিন কেটে যায়। তার পর অজানা পশ্চিম মুখে যাত্রা শুরু হল। এই তিন জাহাজের মাঝি-মাল্লা, নাবিক সব বাছাই করা লােক,—এক একজন জীবনের বহু বছর সমুদ্রে কাটিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ৯ই সেপ্টেম্বর যখন তারা অজানার অন্ধকারে পাড়ি দিচ্ছিল, অনেকেরই বুক তখন কঁপছিল। কলম্বাসের ধারণা ছিল, জাপান প্রায় দু’হাজার মাইল পশ্চিমে; কিন্তু যদি তিনি জানতেন ৩২ কলাম্বাস জাপান প্রায় বারাে হাজার মাইল দূরে, তা হলে ওরূপ ঘােট জাহাজ নিয়ে তিনি পশ্চিমমুখে পাড়ি দিতে সাহস করতেন কিনা সন্দেহ। তখনকার দিনে অমন দূর সমুদ্রযাত্রার অসুবিধা ছিল কত ! আজকাল যেমন বরফের ভিতর করে, কিম্বা টিনের কৌটাতে পূরে নানা রকম খাবার জিনিষ অনেক দিন রাখা যায়, তখনকার দিনে লােকেরা এ সব উপায় জানতাে না। বড় বড় কাঠের পিপাতে পূরে লােণা মাছ, আর শূয়ােরের মাংস রাখা হত। ও সব বেশী দিন থাকত না। সে মাছ মাংস অনেক দিন খেলে নানা অসুখ দেখা দিত। সমুদ্রের মাঝে মিঠাজল ফুরিয়ে গেলে লােকদের মিঠাজল পাওয়া অসম্ভব হত। দৈবাৎ বৃষ্টি হলে বৃষ্টির জল ভিজা পাল বেয়ে যা পড়ত, তা সংগ্রহ করে রাখা হত; তা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় ছিল না। তার ওপর কত আজগুবি কথায় তখনকার দিনে লােকেরা বিশ্বাস করত। অনেক পণ্ডিত লােকেরও ধারণা ছিল,—পৃথিবী যখন গােলাকার, সমুদ্রের পিঠও ত গােলাকার হবে ; বাতাসের ঠেলায় না হয় সমুদ্রের কুঁজের ওপর ওঠা গেল; কিন্তু কুঁজের ঢালু দিকে নামবার বেলাতে যে জাহাজ ডিগবাজী খাবে ! এ সব অদ্ভুত গল্প শুনে দূর সমুদ্রে পাড়ি দিতে কেহ চাইত না। দিনের পর দিন কতদূর অগ্রসর হচ্ছেন, কলম্বাস তার একটা হিসাব নিজে রাখতেন। তার লােকদের জন্য আর একটা হিসাব রাখতেন, তাতে দুরতার মাপ খুব কম করেই দেখানাে হত যেন লােকদের মনে কোন ভয় না জাগতে পারে। ••

No text on this page.

--
5hE
জমি : জমি ! জমি !
বধ স জ ই জের ঘর থেকে শুনলেন যে জমি দেখা গিয়েছে
un thu 09/ITUNG by Gulluk.

-
জমি !
প্রথম যাত্রা-পশ্চিম মুখে
১৩ই সেপ্টেম্বর কলাম্বাস বাণিজ্যবায়ুমণ্ডলে গিয়ে পড়লেন।
তখন তার জাহাজ দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে সােজাসুজি চলতে লাগল।
তাতেও কিন্তু তার ললাকেদের মনে ভয় হ’ল ফিরবার পথে উলটা
হাওয়া ঠেলে কি করে দেশে আসা সম্ভব হবে।
জাহাজ খুব জোরেই দিনের পর দিন এগিয়ে চলতে লাগল।
সমুদ্রের এমন এক জায়গায় গিয়ে জাহাজ পেীছল, যেখানে
কোনও স্রোত নেই—রাশি রাশি সমুদ্রের ঘাস ভাসছে।
প্রায় তিন সপ্তাহ পরে পিণ্টা জাহাজের একটি লােক এক
সন্ধ্যাবেলা চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“জমি
ঐ ত জমি দেখা যাচ্ছে। প্রথম নতুন
দেশ দেখার পুরস্কার আমিই পাবে!”
দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে জমির মতাে একটা কিছু যেন দেখা
যাচ্ছিল।
কলাম্বাস ওখবর শুনে লােকজন নিয়ে হাঁটু গেড়ে
ঈশ্বরের উপাসনা করলেন। সারা রাত সে দিকে জাহাজ চালানাে
ভােরর আলােয় দেখা গেল, দেশ কোথাও নাই—যতদূর
দৃষ্টি যায় অকূল, অতল সমুদ্র। ঢেউএর পর ঢেউ দিগ্‌ দিগন্তে
গড়িয়ে যাচ্ছে। সবাই তখন বুঝতে পারল,-সন্ধ্যার আকাশে
দিগন্তের মেঘগুলােই হয়ত দেশের মতাে দেখাচ্ছিল।
হঠাৎ নিরাশ হয়ে জাহাজের লােকগুলো বিদ্রোহী হয়ে
বলে বসল, তারা আর পশ্চিম মুখে এগােবে না। তিনি সবাইকে
পুরস্কার দেবেন বলে নানা মিষ্টি কথায় তাদের ঠাণ্ডা করলেন।
৭ই অক্টোবর সকলের বিশ্বাস হ’ল,—তারা যেন কোনও দেশের

৩৪
কলাঘাস
কাছে এসে পৌঁছেছে। ঝাকে ঝাকে পাখী দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে
যাচ্ছে, অনেক পাখী এসে জাহাজের চার ধারে উড়ে বেড়াচ্ছে, সবুজ
টাকা ঘাস জলে ভেসে আসছে। ১০ই অক্টোবর সন্ধ্যায় যখন
সমুদ্রে সূর্য ডুবে গেল, আর নতুন দেশের কোন চিহ্ন মিলল না,
তখন জাহাজের মাঝিমাল্লা সব একজোট হয়ে বলে বসল,—“জাহাজ
ফিরায়ে চালাও, পশ্চিম মুখে আমরা এক পাও আর এগােবে না।”
এবার কলম্বাস তাদের যতই মিষ্টি কথায় বােঝাতে চাইলেন,
তারা ততই ক্ষেপে উঠছিল ! কলম্বাস তখন সুর বদলালেন।
তিনি দৃঢ়স্বরে বললেন,—“ফিরে যাবে কোথা ? রাণীর আদেশে
ভারতবর্ষ খুজবার জন্য বেরিয়েছ, নতুন দেশের খোঁজ না করে
স্পেনে ফিরলে কারাে মাথা রাখবে না।” স্পেনে ফিরলে সবাইকে
বিপদে পড়তে হবে, এই ভয়ে তারা এবারও চুপ করে রইল।
সান্তা মেরিয়া জাহাজখানি খুব বড় ছিল বটে, কিন্তু বড় ধীরে
চলত ; উহা এতই পিছিয়ে পড়ত যে আর দু’টি জাহাজকে
দাড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করতে হত। কলম্বাস নিয়ম করেছিলেন
রাতের বেলায় জাহাজ তিনটি কাছাকাছি থাকবে।
১১ই অক্টোবর রাত্রে কলাম্বাস তার জাহাজের উচু লেজের
দিকটাতে উঠে একটা আলাে দেখতে পেলেন,—দূরে—অনেক দূরে
দিঙমণ্ডলের কাছে ; আলােটি এদিক সেদিক নড়ছিল। তিনি
জেমস আরেনাকে ওআলাে দেখালেন ; আর জাহাজগুলি ঐ
আলাের দিকে চালাতে আদেশ দিলেন।
পিণ্টা জাহাজখানি খুব জোরে এগিয়ে চলল। পরদিন শেষ
-
;

No text on this page.

17
{
<b: 54 : 1 Lớp

প্রথম যাত্রা পশ্চিম মুখে
রাত্রে দু’টোর সময় এই জাহাজ থেকে বােডারিগাে ট্রায়েনা চাদের
আলােয় নতুন দেশ স্পষ্ট দেখতে পেলে। তখন আনন্দে তােপের
আওয়াজ করা হল।
রাণী ইসাবেলার হুকুম ছিল,-যে লােক প্রথম নতুন দেশ
দেখতে পাবে, তাকে অনেক টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। দেশে
ফেরার পর এই লােকটি পুরস্কারের দাবী করল; কিন্তু কলাম্বাস
প্রথমে ওদেশের আলাে দেখেছেন বলে তাকেই পুরস্কার দেওয়া
হয়। ট্রায়েনা তাতে খুব রেগে যায় । সে খ্ৰীষ্টধর্ম ছেড়ে মুসলমান
হয়। পুরস্কারের টাকা পেয়ে কিন্তু কলম্বাসের অনেক অভাব
ঘু’চে গিয়েছিল।
তিনি তা দিয়ে তার স্ত্রী ও পুত্রের কিছু
ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন।
নতুন দেশে পৌঁছতে পেরে কলম্বাসের আনন্দ দেখে কে ?
কত কথা তাঁর মনে জাগতে লাগল! আলাে দেখে তাঁর মনে
হচ্ছিল,এদেশে নিশ্চয়ই লােক রয়েছে ; ওদেশের হাওয়ার
সঙ্গে কি এক সুগন্ধও নাকি তাঁর নাকে এসে লাগছিল।
এ নতুন
দেশের লােক কি সুন্দর, সভ্য হবে, না অসভ্য জানােয়ারের
মতাে হবে ? ভারত সাগরের কোন দ্বীপে এসে তিনি পৌছেছেন
জিপাঙ্গু (জাপান) দেশে এসেছেন, এ সব কথা তার মনে
তােলপাড় করছিল।
ভােরের আলােতে জাহাজ ডাঙ্গার একটু দূরে নােঙ্গর করল।
তখন স্পষ্ট দেখা গেল তারা একটি দ্বীপের নিকট পৌঁছেছেন।
জমি খুব সমতল, সবুজ ঘাসে ঢাকা; সুন্দর সুন্দর গাছের ঝােপ

কলাশ্বাস এখানে ওখানে রয়েছে। অনেক লােক তীরে জড় হয়েছে, সবাই লেংটা, তাদের শরীরের রঙ তাম্রবর্ণ, দাড়ি গোঁফ নেই, চুল মােটা, কোকড়ান নয়, কানের ওপর দিয়ে ছাঁটা; পিছনের চুলের গােছ কাঁধের ওপর ঝোলান, সারা গায়ে নানা রঙের ছবি আঁকা ; কপাল উচু, চোখ উজ্জ্বল, সুন্দর ; শরীরের গড়ন মাঝারি রকমের। সেদিনকার লােকদের মধ্যে একজন স্ত্রীলােক ও ছিল,—সেও তার সঙ্গীদের মতাে লেংটা। দেখতে কিন্তু সে ভারি সুন্দর ছিল। লােকগুলােও দেখতে খুব শান্ত ও নিরীহ। তাদের অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল কাঠের তৈরী বর্শা,—ওগুলাের আগাতে এক টুকরা ধারাল পাথর বা মাছের কাটা লাগান। অতবড় জাহাজ তারা কখনাে দেখেনি। ভােরের আলােতে হঠাৎ অত বড় বড় তিনখানি জাহাজ দেখতে পেয়ে তারা অবাক্ হয়ে গেল। জাহাজের বড় বড় পালগুলি হাওয়াতে নড়ছিল তাতে তাদের ধারণা হ’ল, জাহাজগুলি এক একটি বড় দৈত্য- সমুদ্রের ভেতর থেকে হু হু করে বেরিয়ে পড়েছে। যখন জাহাজ থেকে কতগুলি লােক ডাঙ্গায় উঠে তাদের কোনও উৎপাত করলে না, তখন তাদের ভয় চলে গেল। তারা নাবিকদের কাছে এসে কেহ তাদের পােষাক, কেহ দাড়ি, কেহ গায়ের উজ্জ্বল সাদা চামড়া, কেহ ঝকঝকে তলােয়ার, কেহ বন্দুক ধরে ধরে দেখতে লাগল। তখন তাদের ধারণা হ’ল অমন সুন্দর সুন্দর মানুষগুলো পালের বড় বড় পাখা দিয়ে নীল আকাশ থেকে জাহাজদ্ধো নেমে এসেছে।

No text on this page.

JE কস ও নহনিতে প্রথম মেছেন

৩৭
প্রথম যাত্রা-পশ্চিম মুখে ।
দ্বীপে নেমেই কলম্বাস হাঁটু পেতে বসে মাটিতে চুমাে দিয়ে
ঈশ্বরের উপাসনা করলেন। তাঁর সঙ্গীদেরও আনন্দের সীমা ছিল না।
তার পর কলম্বাস উপাসনা হতে উঠে খাপ থেকে তলােয়ার
বাহির করে স্পেনরাজের পতাকা ওদেশে উড়ালেন। তিনি
তঁার লােকদের বললেন,-“আমায় তােমরা এ অঞ্চলে তােমাদের
নেতা ও স্পেনরাজের প্রতিনিধি বলে মানবে—এই প্রতিজ্ঞা কর।”
তারা তাই করল। এখন থেকে কলম্বাস এড়মিরাল উপাধি
নিলেন।
কলাম্বাস জানতেন না তিনি কোন্ দেশে এসে পৌঁছেছেন।
তার ধারণা ছিল তিনি এসে পড়েছেন ভারতের উপকুলে কোন
এক দ্বীপে ; তাই তিনি সে দেশের লোেকদের নাম দিলেন
“ইণ্ডিয়া”। সেই ভুল নাম হ'তে ঐ দ্বীপপুঞ্জের নাম হল
“ওয়েষ্ট ইণ্ডি” বা “পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ।”
এই দ্বীপগুলাে কেনেরী দ্বীপ হতে প্রায় তিন হাজার মাইল
পশ্চিমে। লােকদের শান্ত প্রকৃতি, নির্ভীক চলাফেরা দেখে
কলাম্বাসের বিস্ময় জন্মেছিল। তাদের কথাবার্তা বােঝা যেত না,
তাদের ইসারা,. ইঙ্গিত দেখে সাহেবরা প্রথম প্রথম লােকদের
মনের ভাব কিছু কিছু বুঝতে চেষ্টা করত।
কলাম্বাস যে দ্বীপে প্রথম নামলেন—সে দেশের লােকেরা
তাকে গুয়ানাহানি বলত ; কলাম্বাস তার
তার নাম দিলেন
সঁ স্যালভেদ; এখন উহাকে ওয়াটিং দ্বীপ বলে। উহা বাহামা
দ্বীপপুঞ্জের একটি।

কলাম্বাস •• এই দ্বীপের লােকেরা সাহেবদের দেখে ভারি খুসি। তখন তারা জানত না এই নতুন অতিথিরা তাদের শেষে কি সর্বনাশ করবে। গরিব, সরল লােকগুলাে কলম্বাস ও তার সঙ্গীদের মধুর ব্যবহারে একেবারে গলে গিয়েছিল। সাহেবদের কাছ থেকে ফটিকের দানা, ঘণ্টা, লাল টুপী, পুতি প্রভৃতি পেয়ে তারা খুব খুসি হত ; তার বদলে তারা তূলা, টীয়াপাখী, শিমুল, আলুর তৈরী রুটি এনে সাহেবদের যােগাত। তাদের নৌকা ছিল বিস্তর। এক একটি এত বড় যে সত্তর, আটাত্তর জন পঁাড়ী তাতে থাকত। এডমিরাল এখানে কাছাকাছি অনেক দ্বীপ আবিষ্কার করলেন, -কোনটার নাম দিলেন সান্তা মেরিয়া, কোনটার নাম ফার্দিনান্দ, কোনটার বা জুয়ান্। জুয়ানকে আজকাল কিউবা বলে। এই দ্বীপটি বড় ; কলম্বাস এ দ্বীপের শেষ দেখতে না পেয়ে মনে করে ফেললেন তিনি এসিয়া মহাদেশে এসে পড়েছেন। তাঁর ধারণা হ’ল এদেশের কোন জায়গায় হয়ত সেই গ্রা খাঁর রাজধানী হবে। তিনি তিন দিন ওখানে ঘুরা ফেরা করে জানতে পারেন কিউবা একটি দ্বীপ—ও মহাদেশ নয়। চারিদিকে ঘুরতে গিয়ে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটি নতুন দ্বীপ আবিষ্কার করলেন ;—উহার নাম হেইতী। তখন অক্টোবরের প্রায় শেষাশেষি। তখনাে কিউবা দ্বীপটি গাছপালাতে খুব সবুজ দেখাচ্ছিল ;-বড় বড় পাহাড়ের গায়ে গভীর বন,-নীল সমুদ্রের মাঝে সবুজ দ্বীপটি যেন একটি বড় পান্নার মতাে ভাসছে। নানা পাখীর গানে দ্বীপটি মুখরিত।

প্রথম যাত্রা—পশ্চিম মুখে
৩৯
দেশের লােকেরা ক্যারিব নামে এক জাতীয় জলদস্যুর ভয়ে সর্বদা
ভীত থাকত। ক্যারিবরা নাকি এক একবার হঠাৎ এসে
আক্রমণ করে তাদের কতকগুলােকে বন্দী করে নিয়ে যেত, আর
কতকগুলােকে কেটে খেয়ে ফেলত।
এ সব দেশের লােকেরা নদীর বালি হ'তে সােনার রেণু কুড়িয়ে
এনে কলম্বাসের লােকদের দিত ; আর তার বদলে একটি বােতল
বা চীনেমাটির বাসন পেলে খুব খুসি হয়ে চলে যেত! এডমিরাল
গুয়ানাহানি দ্বীপ থেকে দু’টি লােককে স্পেনভাষা শিখিয়ে সঙ্গে
রাখতেন ; তাদের দিয়ে অন্যান্য দ্বীপের লােকের সাথে কথাবার্তা
চালাতেন।
এই দু’টি লােকের ধারণা হয়েছিল,-সাহেবরা আকাশ থেকে
এসেছে। তাই অন্য লােকদের সাথে দেখা হলেই
প্রথমেই তারা সবাইকে ওকথা জানিয়ে দিত; তাতে সাহেবদের
দেখে ওসব দেশের লােকরা তেমন ভয় পেত না।
হেইতী দ্বীপে প্রথম প্রথম বেশী লােকজন দেখা গেল না।
কয়েকজন সাহেব এদেশে নেমে একটি বালিকাকে ধরে নিয়ে এসে
তাকে নানা জিনিষ উপহার দিয়ে ছেড়ে দিলে। এর পরে ওদেশের
অনেক লােক নৌকা করে জাহাজের কাছে উপস্থিত হত। ১৮ই
ডিসেম্বর তাদের সর্দার জাহাজে এসে কলম্বাসের সঙ্গে দেখা করে
অনেক পুরস্কার নিয়ে গেল।
সােনার জন্য কলাম্বাসের নিজের বিশেষ লোভ ছিল না। তবে
তিনি মনে করতেন, এই প্রথম যাত্রাতে বেশী পরিমাণ সােনা নিয়ে
নেমে
;

৪০
কলম্বাস
দেশে ফিরতে না পারলে স্পেনের লােকেরা তাঁর এ যাত্রা বিফল
হয়েছে মনে করবে। তাই তিনি যখন শুনতে পেলেন—এই দ্বীপের
কিছুদূরে এক জায়গায় খুব সােনা পাওয়া যায়, তখন তিনি
ওদিকে কিছুদূর এগোতে লাগলেন।
এর মধ্যে কয়েকজন লােক এসে তাকে বলল,—ও দেশের এক
সর্দার—গুয়াকানাগারী তার নাম,—সে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে
চায়। এডমিরাল তাতে রাজি হয়ে সেই সর্দারের বাড়ীতে
গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করলেন।

ওয়েষ্টইণ্ডিদ্বীপে-কলাম্বাস
এ সময় এমন এক বিপদ হ’ল যাতে এই নতুন দেশে পানি-
য়ার্ডদের কয়েকজনকে বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। তখন খ্রীস্মাস ডে
অর্থাৎ সাহেবদের বড়দিন। সান্তামেরিয়া জাহাজখানি খুব ধীরে
ধীরে এগােচ্ছিল। সমুদ্রের হাওয়ার জোর একেবারেই ছিল না।
তার পূর্বে দুইদিন আর একরাত কলম্বাস নিজেই জাহাজ
চালিয়েছেন। তাঁর শরীর ছিল খুব ক্লান্ত ; -ও দেশের লােকদের
কাছ থেকে তখন কোনও বিপদের আশঙ্কাও ছিল না। তাই
তিনি জাহাজ চালাবার ভার একটি লােকের উপর দিয়ে নিজে
ঘুমােতে গেলেন। এই লােকটি ছিল অলস। একটি ছেলের
হাতে জাহাজের হাল ছেড়ে দিয়ে সেও গেল ঘুমােতে। শেষরাত্রে
দু’টোর সময় সমুদ্রের স্রোতের ঠেলায় জাহাজ গিয়ে ঠেকল
এক চড়ার ওপর।
দূম করে এক ধাক্কায় জাহাজ কেঁপে উঠল। ছেলেটি চীৎকার
করে উঠল। তার চীৎকারে এডমির্যা বাহির হয়ে এসে দেখতে
পেলেন স্রোতের ঠেলায় জাহাজখানি এক চড়াতে ঠেকে কাৎ হয়ে
যাচ্ছে। কলম্বাস কতকগুলি মাল্লাকে হুকুম দিলেন, একখানি নৌকা
নিয়ে দূরে নােঙ্গর ফেলে রশি দিয়ে টেনে জাহাজকে সােজা
করে রাখতে। লােকগুলাের মনে আগেই বিদ্রোহের ভাব

৪২
কলাসি
;
জেগেছিল ; তখন তাদের প্রাণের ভয়ও হয়েছিল খুব। তাই তারা
এডমিরালের কথা না শুনে নৌকায় চেপে নিনা জাহাজের দিকে
পালিয়ে গেল। কিন্তু নিনার কাপ্তান তার জাহাজে তাদের উঠতেই
দিলেন না তিনি ওখান থেকে ওদের তাড়িয়ে দিলেন।
যখন তারা সান্তা মেরিয়ার কাছে ফিরে এল, তখন জাহাজ
বালুর চড়াতে এমনভাবে ব'সে গিয়েছে, যে আর উহার নড়াচড়ার
সাধ্যি ছিল না। জাহাজটি হালকা করার জন্য মাস্তুল কেটে
ফেলা হ’ল। বােঝাইগুলি সব সরিয়ে দেওয়া হ’লকিন্তু কিছুতেই
কিছু হ’ল না। জাহাজের তলা গেল ফেঁসে।
সর্দার গুয়াকানাগারীর বাড়ী ছিল কাছে। গুয়াকানাগারীর
কাছে লােক পাঠানাে হল। এই সর্দার
সর্দার স্পানিয়ার্ডদের
খুব বন্ধু ছিলেন। তিনি তাঁর অনেক লােকজন পাঠিয়ে
জাহাজের মালপত্র নামাতে সাহায্য করলেন ;
ওদেশের
লােকদের কাছে সাহেবদের সব জিনিষ এত মূল্যবান বলে মনে
হয়েছিল যে তারা একটি আলপিন পৰ্যন্তও নষ্ট হতে দিলে না।
জাহাজের লােক-লস্কর সবাই মিলে স্থির করল—ওখানে ওদের
একটি উপনিবেশ স্থাপন করা হোক। এই ঘটনা খ্রীষ্টানদের বড়দিনে
হয়েছিল বলে ও জায়গার নাম রাখা হ’ল—“লা নেভিদা”।
ভাঙা জাহাজটির কাঠ এনে একটি ছােট খাটো কেল্লা তৈরী
হ'ল; তার মাঝে তাদের খাদ্যদ্রব্য, বাণিজ্যের জিনিষপত্তর সব
মজুত করা হ’ল। কলম্বাস গিয়ে গুয়াকানাগারীর সঙ্গে আবার দেখা
করলেন এবং তার বাড়ীতে ভােজ খেলেন। সেই ভােজে তিনি

ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপে-কলম্বাস
৪৩
এক রকমের গােল আলু দেখতে পান। সেই আলু এনে তিনিই
প্রথমে ইউরােপে প্রচলিত করেন। আমরা যাকে বিলাতীআলু
বলি উহা কলাম্বাসই প্রথম ওদেশ থেকে ইউরােপে আমদানী
করেছিলেন।
কলম্বাস ঠিক করলেন তিনি আর দেরী না করে স্পেনে ফিরে
যাবেন। কিছুদিন পূর্বে পিণ্টা জাহাজখানিও তার কাছ থেকে
স’রে পড়েছিল। তাঁর হুকুম ছিল তিন খানি জাহাজ কাছাকাছি
থাকবে। কিন্তু এই কয়দিন এই জাহাজখানির কোন খোঁজ না
পেয়ে তার আশঙ্কা হচ্ছিল যে নিশ্চয় কোন না কোন বিপদ
ঘটেছে।
কিন্তু আসল কথা হচ্ছিল, -পিন্টার কাপ্তান কলাম্বাসকে
মনে মনে খুব হিংসা করতেন ,দেশজুড়ে কলাম্বাসের নাম হবে—
আর তার কিছুই হবে না—এই ভাবনা তাঁর অসহ্য হয়েছিল। তাই
তিনি কলম্বাসের আদেশ না মেনে নিজের খেয়ালমতত সােনার
খোঁজে সরে পড়েছিলেন।
সান্তা মেরিয়া যখন ভেঙে গেল, নিনার মতাে ছােট একটি
জাহাজে এতগুলো লােক নিয়ে স্পেনে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে
দাড়াল। কলম্বাস তাই তাঁর সব লােকদের ডেকে বললেন,
“তােমাদের মধ্যে যারা এই কাঠের কেল্লায় স্বেচ্ছায় থাকতে চাও
বল, আমি শীঘ্রই ইউরােপে গিয়ে ফিরে এসে তােমাদের নিয়ে
যাবাে। নিনাতে এতলােক নিয়ে পাড়ি দিলে সবাই মারা পড়ব।”
প্রায় চল্লিশ জন থাকতে রাজী হ’ল-রাজী হবার কারণও ছিল
অনেক ; ওদেশের জলবায়ু তাদের খুব চমৎকার লাগছিল, খাবার

৪৪
কলাম্বাস
করলেন।
জিনিষও সেখানে প্রচুর, আর কাজকর্মততা কিছুই নেই। আর তারা
সবাই মনে করেছিল,-স্পেন থেকে ফের জাহাজ আসবার এই
কয়মাস তাদের ছুটি হবে,তারা এ কয়দিন সােনা কুড়াবে, আর
খুব ফুর্তি করে ওদেশে দিন কাটাবে।
এডমির্যা তার আত্মীয় আরেনাকে হেইতীর গবর্নর নিযুক্ত
দেশের নাম দিলেন হিসপেনিওলা ( Hispaniola)
বা ছােট্ট স্পেন। তাদের সকলকে তিনি বলে দিলেন,—“সবাই
একসঙ্গে কেল্লাতে থাকবে; ওদেশের লােকদের প্রতি খুব ভাল
ব্যবহার করবে। তারা যদি কোন অত্যাচার করতে চায়, তবে
তাদের নানা রকমের উপহার দিয়ে ঠাণ্ডা রাখবে।”
১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দের ৪ঠা জানুয়ারী কলম্বাস নিনা জাহাজে চেপে
ইউরােপের দিকে যাত্রা করলেন। তাঁর সঙ্গে ছয়জন ওদেশের
লােক নিলেন। তাদের স্পেনে নিয়ে, স্পেনিস্ ভাষা শিখিয়ে,
খ্ৰীষ্টান করে আবার দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলে ওদেশের
লােকদের শিক্ষার খুব সুবিধা হবে এই ছিল কলম্বাসের উদ্দেশ্য।
কলাম্বাস এই ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ অঞ্চলে প্রায় ৩ মাস ছিলেন।
অনেকগুলি দ্বীপ তিনি আবিষ্কার করেছিলেন বটে, কিন্তু আমেরিকা
মহাদেশ তখনন তার অজানা ছিল।
ওদেশের লােকেরা এক রকম পাতা মুড়ে নলের মত করে এক
দিকটাতে আগুন ধরিয়ে, অপর দিকটা মুখে দিয়ে টেনে ধোঁয়া বের
করত; তাতে বেশ এক রকমের নেশা হত। এই গাছের পাতাকে

৪৫
ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপে—কলাম্বাস
ওরা টুবেকো বা তামাক বলত। কলম্বাসই তামাকের কথা প্রথমে
ইউরােপে প্রচার করেন।
কলাম্বাস এ দেশের লােকদের কথা এরূপ লিখে গেছেন,—“এরা
বুদ্ধিমান, দয়ালু; এরা দোলনা তৈয়ার করে তাতে ঘুমায়, সূতাের
কাপড় বুনে।
কোন কোন দ্বীপের লােকেরা একেবারে লেংটা
থাকে; আবার কোথাও বা কৌপীন পরে। তারা পচা কাঠের
ভিতরকার মােটা মােটা পােকা হতে শুরু করে সাপ,বেঙ, টিকটিকী,
বুননা জানােয়ার, সবই খায়। তারা সবাই
কুকুর পুষত,
কিন্তু ওদেশে ঘােড়া বা খচ্চর কিছুই ছিল না। তারা লােহা, তামা
প্রভৃতি কোন ধাতুদ্রব্যের ব্যবহার জানত না ; কাঠ বা বাঁশ দিয়ে
বর্শা ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরী করত। তাদের স্নেহমমতা ছিল খুব,
লােভ কাকে বলে তারা জানতাে না ; সামান্য মিষ্টি ব্যবহারে তারা
গ'লে যেত। তারা তাদের প্রতিবেশীদের নিজের মত ভাল
বাসত, তাদের মুখে সৰ্ব্বদা হাসি,—কথাবার্তা ভারি মিষ্টি।”
কলাম্বাস ইউরােপের দিকে যাত্রা করার দু'দিন পরে পথে
পিন্টার সঙ্গে দেখা হ’ল। এই জাহাজখানিও কলম্বাসের সঙ্গে
চলল। ওসব দেশে সমুদ্রে ভােবা পাহাড়, চড়া এত ছিল যে পদে
পদে বিপদের আশঙ্কা করে কলম্বাস নিজেই জাহাজ চালাতেন
এবং সমুদ্র পথের নক্সা তৈরী করতেন, যেন আবার আসবার
সময় নিরাপদে জাহাজ চালানাে যেতে পারে।
১৩ই জানুয়ারি কলাম্বাস্ হেইতী বা হিস্পানিওলা দ্বীপের পূর্ব
প্রান্ত ছেড়ে এমন এক জায়গায় এসে পড়লেন, যেখানকার লােক

৪৬ কলাম্বাস খুব হিংস্র প্রকৃতির বলেই তার বিশ্বাস হ’ল। তিনি মনে করলেন এরা হয়ত ক্যারিব জাতি হবে। জাহাজ থেকে ছয়জন লােক ওদেশে নামবামাত্রই প্রায় পঞ্চাশ জন ইণ্ডিয়ান এসে তাদের আক্রমণ করল। কলম্বাসের লােকদের অনেক অস্ত্রশস্ত্র ছিল ; যুদ্ধে অনেক ইণ্ডিয়ান মারা পড়ল ; কলম্বাসের দু’জন লােক তীরের ঘায়ে আহত হয়। পরের দিন এই ইণ্ডিয়ানদের সর্দার জাহাজে এসে সব মিটমাট করে যায়। পরের রবিবার সূর্যগ্রহণ ছিল। গ্রহের অবস্থান দেখে কলম্বাস গুণে ঠিক করলেন যে কয়দিন আবহাওয়ার অবস্থা খুব খারাপ থাকবে। তাঁর সঙ্গে খাদ্যদ্রব্য ও জল বেশী ছিল না ; তাই ওখানে কিছুদিন অপেক্ষা করে ভাল দিন দেখে যাত্রা করা সম্ভব হ’ল না। তিনি ১৬ই জানুয়ারি আবার রওয়ানা হলেন। যাত্রা শুরু করতে না করতেই পিণ্টা জাহাজের মাস্তুল একটি বিগড়ে গেল। উহা সারতে আরাে দু’দিন দেরী হয়ে যায়। এই সময় একটি হাঙ্গর ও কতকগুলি সমুদ্রের মাছ পাওয়া গেল, তাতে তাদের বেশ একটি বড় রকমের ভােজের যােগাড় হয়। আবার কিছুদূর যেতেই সমুদ্রের প্রবল হাওয়া আর ঢেউয়ের মাতন সুরু হল। আকাশ মেঘে অন্ধকার,ছােট ঘােট জাহাজ এমনভাবে এদিক ওদিক দুলছিল, যে জাহাজের অবস্থান ঠিক করা অসম্ভব হয়ে দাড়াল। ১২ই ফেব্রুয়ারি তুমুল ঝড় উঠল ; প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঢেউ নিনার পাটাতনের উপর ভীষণ শব্দে ভেঙে পড়ে গড়িয়ে যেতে লাগল। হাওয়া উত্তর দিক হতে ছুটছিল ; • ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপে—কলাম্বার 89 পিন্টার কাপ্তান এতদিন কলম্বাসের সঙ্গে সঙ্গে আসছিলেন ; উত্তরের হাওয়া ঠেলে উত্তর মুখখা যাওয়া অসম্ভব মনে করে তিনি দক্ষিণ-দিকে জাহাজ চালিয়ে দিলেন ; দেখতে দেখতেই সে জাহাজ অদৃশ্য হয়ে গেল। কলম্বাস উত্তরপূর্বমুখে জাহাজের গতি ঠিক রেখে চলেছিলেন, তার ধারণা ছিল উত্তরপূৰ্ব্বদিকে যেতে যেতে তিনি স্পেনে পৌছাবেন। কিন্তু জাহাজের জিনিষপত্র সব ফেলে আসাতে জাহাজ খুব হালকা হয়ে পড়েছিল—তাই ঢেউএর ধাক্কায় জাহাজ খুবই দুলছিল ; তখন তিনি কৌশল করে জাহাজের খালি পিপেগুলিতে সমুদ্রের জল পূ’রে নিলেন ; তাতে জাহাজ কিছু ভারী হ’ল; তখন স্থির ভাবে জাহাজ চলতে লাগল। ঝড় যখন খুব বেশী হয়ে উঠেছিল,তখন কলম্বাস স্পেনের গুয়া- দালুপ নগরে পৌছে সেণ্টমেরীর মন্দিরে ২৷ আড়াই সের ওজনের এক বাতি জ্বালাবেন মানত করলেন ; আর লােকজন সবাইকে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন—তারা এই বিপদ থেকে বেঁচে প্রথমে যে দেশে গিয়ে পৌঁছাবেন, সেখানেই সবাই মিলে নিজেদের জীবনরক্ষার জন্য এক মন্দিরে গিয়ে ঈশ্বরের উপাসনা করবেন। এই সময় কলম্বাসের জাহাজের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছিল। তার মনে হত ঢেউয়ের ঘায়ে জাহাজের তলার তক্তা- গুলো টুকরাে টুকরাে হয়ে আলগা হয়ে যাচ্ছে, যে কোন মুহুর্তেই জাহাজ তলিয়ে যাবে। তাই তিনি যা আবিষ্কার করেছিলেন ও দেখেছিলেন তার একটি বর্ণনা লিখে এমন'একটি কাঠের খাপের মধ্যে পুরে রাখলেন, যার মধ্যে কোন রকমে জল ঢুকবে না; আর

৪৮
কলাম্বাস
জাহাজখানি তলিয়ে গেলেও অন্ততঃ এই খাপটি সমুদ্রের জলে
ভেসে ভেসে তার দেশে গিয়ে পৌঁছাবে।
তিনদিন পরে হাওয়ার জোর কমে গেল, তখন তিনি আবােরস্
দ্বীপ দেখতে পেলেন। উহা পর্তুগালের অধীন ছিল।
স্পেন আর পর্তুগালে কোন বিবাদ ছিল না। কলম্বাস ওখানে
থেমে—জাহাজের রসদ নেবেন, মালপত্র যা দরকার তা কিনবেন,
-আর সকলে মিলে যে উপাসনা করবার সংকল্প করেছিলেন তা
পূর্ণ করবেন,-এই ঠিক করে তার লােকজনদের প্রায় অর্ধেককে
ওদেশে নাবিয়ে দিলেন। পর্তুগীজরা এই লােকগুলােকে আটক
করে রেখে একখানি নৌকায় চড়ে এসে জাহাজখানি ধরে নিতে
চাইলে। কলাম্বাস তাদের খুব ধমক দিয়ে বললেন,—“আমার
লােকজনদের এখনি ফিরিয়ে দাও ; নইলে তােমাদের সর্বনাশ
করব।” তাতে তারা খুব ভয় পেয়ে কলম্বাসের লােকজনকে ছেড়ে
দিলে ।
সেখান থেকে তিনি টেগা নদীর মুখে গিয়ে নােঙ্গর করলেন ও
এখানে পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জনের সঙ্গে দেখা করে তাঁর
আশ্চৰ্য্য আবিষ্কারের কথা সব জানালেন। নিজের দুর্ব্যবহারের
কথা মনে করে লজ্জায়, দুঃখে রাজার মাথা হেঁট হয়ে গেল।
১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই মার্চ নিনা জাহাজ সেন্টভিনসেন্ট, অন্তরীপ
ঘুরে সাতমাস পরে প্যালাে বন্দরে উপস্থিত হল। আশ্চর্যের কথা,
সেই দিনই পিণ্টা জাহাজ খানিও কেমন করে সেই বন্দরে এসে
হাজির হয়।

৪৯
ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপে—কলাম্বাস
যখন জাহাজ দু’টি ফিরে এল, তখন স্পেনের লােকদের কত
উল্লাস, কত বিস্ময়। তখন টেলিগ্রাফ ছিল না ; জাহাজের সংবাদ
আগে থেকে জানানাে সম্ভব হয়নি। সবাই জাহাজের লােকদের
মুখে নতুন দেশের কাহিনী শুনবার জন্য ছুটল। চারধার থেকে যে
কত প্রশ্নের বৃষ্টি হচ্ছিল তার আর সীমা নেই।
কলাম্বাসযে সব ইণ্ডিয়ানদের সঙ্গে এনেছিলেন, জাহাজেই তাদের
কয়েকজন মারা যায়। যারা বেঁচেছিল তারা অবাক হয়ে দেখছিল,
-কত শাদা লােক তাদের চারিদিকে ভিড় করে তাদের পানে
তাকিয়ে আছে !
এডুমির্যা স্পেনে নেমেই সেন্ট, র্যাবিদা মঠে ঈশ্বরের উপাসনা
করতে গেলেন। সেখানে সাধু জুয়ান পেরেজের সঙ্গে তার
দেখা হল। সে দেখাতে দুজনের কত আনন্দ!
কলাম্বাস যখন ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপপুঞ্জে ছিলেন, তখন ব'সে ব'সে
সেই সব দেশে যা যা দেখেছিলেন, সব কিছুর বর্ণনা করে স্পেনের
রাজা ও রাণীর কাছে খুব লম্বা এক চিঠি লিখে রেখেছিলেন; কারণ
তিনি জানতেন, স্পেনে ফিরলে তাঁর ভ্রমণের ওরূপ কাহিনী লিখবার
আর অবকাশ ঘটবে না। তাই যখন ১৫ই মার্চ তিনি ওদেশে
নাবলেন, তখনি ওই চিঠিখানি তিনি একজন লােক দিয়ে রাজা
ও রাণীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
৪

৭
-
যশে চড়ার কলম্বাস
১৪৯৩ খ্ৰীষ্টাব্দের এপ্রিল মাস। স্পেনরাজের দরবার বসেছিল
বার্সিলােনা নগরীতে। রাস্তাঘাট, বাড়ীঘর সাজানাে হয়েছে নানা
রকমের লতাপতা, ফুল আর নিশান দিয়ে। দু’ধারে প্রত্যেক
জানালা দরজায় কত নর-নারী মুখ বাড়িয়ে রাস্তার পানে তাকিয়ে
বয়েছে। বাড়ীর ছাদের ওপর, গাছের ডালে কত লােক উঠে কেবলি
পথের পানে অপলকে চেয়েছিল। রাস্তায় লােকে লােকারণ্য,
সকলের মুখে খুব উল্লাস ; সকলের মন যেন কার প্রতীক্ষায় অস্থির
হয়ে উঠেছে।
খুব সমারােহে সার বেঁধে একদল লােকের মিছিল ধীরে
ধীরে আসতে দেখা গেল ;—সকলের আগে এডমিরাল,চুল তার
বরফের মতাে সাদা, মুখখানি নবীন যুবকের মতাে উজ্জ্বল গােলাপী
আভায় স্নিগ্ধ ; তার চেহারা খুব গম্ভীর, প্রশান্ত ; দীর্ঘ, ক্ষীণদেহ ;
তার দৃষ্টি হতে যেন করুণ স্নেহ বিগলিত হচ্ছিল।
তিনি অবাক হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছিলেন। এই সাত মাসে
তিনি ওদেশের কত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন! এই পথেই
তিনি দীনবেশে কত ঘুরেছেন, তিনি কত উপেক্ষিত, অবজ্ঞাত
হয়েছেন। রাস্তার ছেলেরাও তার পিছু পিছু ছুটে তাকে কত
ব্যঙ্গ করেছে।

জন্য,
যশের চূড়ায়—কলাম্বাস
আর আজ ? তিনি স্পেন রাজ্যের একজন বড় বীরপুরুষ!
সেদিনকার এত আয়ােজন, সমারােহ তার সম্মানের
তাঁকে অভ্যর্থনা করার জন্য। তার পিছু পিছু আসছিল
তাঁর সব কাপ্তান, নাবিক, খালাসী—যারা তার সাথে গিয়ে নানা কষ্ট
ভুগেছে, আবার কখনাে কখনাে বিদ্রোহী হয়ে তাকে অনেক
কষ্টও দিয়েছে। তাদের হাতে সবুজ আর লাল রঙের টীয়াপাখী, বড়
বড় গােসাপ—যেগুলাে ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপে গাছে চড়ে বেড়ায়, আর
ফল খায়! সব চেয়ে বেশী নজর পড়ছিল সেই কয়জন ইণ্ডিয়ানদের
ওপর,—যাদের সে দেশ থেকে কলম্বাস সাথে করে এনেছেন ;-
তাদের ছিল রঙ-বেরঙের পােষাক, গায়ের কটা রঙ, তার ওপরে
সারা গায়ে উল্কির ছবি আর সােনার গহনা। সে দিন স্পেনের
লােকেরা নতুন দেশের নতুন মানুষ দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিল।
সেই মিছিলের মধ্যে দু'জন লােক ছিলেন ;-এক জনের
নাম লা ক্যাসা;—ইনি শেষে ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপে গিয়ে সে যুগের
খুব বড় ইতিহাস লিখে গেছেন। আর এক জনের নাম ছিল
ওভিডা,ইনি স্পেনের একজন বড় ঐতিহাসিক,-কলম্বাসের
আবিষ্কারের ইতিহাস লিখবার জন্য তাঁকে রাজসভায় সেদিন ডাকা
হয়েছিল।
সেদিন কলম্বাস যখন রাজসভায় গিয়ে পৌঁছলেন,—ফার্দিনান্দ,
ইসাবেল সিংহাসন থেকে উ' ঠে, হাত বাড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা
করলেন। রাজার মন্ত্রী, অমাত্য, সভাসদ, যারা সেখানে উপস্থিত
ছিলেন, সবাই কলম্বাসের এই আশাতীত সম্মানে অবাক্ হয়ে

কলাম্বাস রইলেন। স্পেনরাজ্যের কোন রাজা, কোন রাণী কলম্বাসের মতাে বিদেশী, দরিদ্র, অখ্যাত পরিবারের লােককে কখনাে এমন সম্মান দেখান নি। রাজা ও রাণীর এরূপ অভ্যর্থনা ও সম্মান ঠিক যােগ্য পাত্রেই দেওয়া হয়েছিল। কারণ কলম্বাসের এই আবিষ্কারে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার নাম পৃথিবীর ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে রয়েছে। এমন গৌরব পৃথিবীর কোন রাজার কপালে কোন দিন ঘটে নি । সেদিন রাজসভাতে স্পেন দেশের অনেক বড় লােক উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের পরিবারের অনেক মহিলাও সেই উৎসবে যােগ দিয়েছিলেন। মেয়েদের অপূৰ্ব্ব মুখশ্রী, নানা রঙের রেশমী পােষাকের ওপর জরির কাজ, মণিমুক্তার গহনা, পাখীর পালক দিয়ে সাজানাে সুন্দর টুপী,—সব নিয়ে সেদিনকার সভায় উৎসবের আনন্দ যেন কানায় কানায় ভরে উঠেছিল। কলম্বাসকে একটু দেখবার জন্য যখন সবাই রাজদরবারে মাথা তুলে দাঁড়ালেন, সেই সময় উপাসনার স্তবগান গেয়ে গেয়ে লাল আলখাল্লা-পরা পাদরীর দল এসে রাজসভাতে ঢুকল ; তাদের পিছনে সাদা পােষাকে শিশুর সারি ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল। সে দৃশ্য যে দেখেছে সে আর কখনাে ভুলতে পারে নি কলাম্বাস আগেই তার স্ত্রী বিয়াটীস ও ছেলে দু’টির সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন। বড় ছেলে জেমসের বয়স তখন বিশ; সে যুবরাজের সাথে সাথে থেকে খুব শিষ্টাচার শিখেছিল। ছােট ছেলে কার্দিনান্দের বয়স তখন হবে ছয় কি সাত। এ ছেলে বড় হয়ে

উহা প্রথমে
যশের চূড়ায়-কলাম্বাস
কলম্বাসের জীবনের নিখুঁত বিবরণ লিখেছিল ।
স্পেনিস্ ভাষায়, পরে ইতালীয় ভাষায় লিখা হয়। শেষের বইখানি
এখনও সেভি নগরীর লাইব্রেরীতে রয়েছে।
পরে আরও অনেকবার রাজা ও রাণীর সঙ্গে দেখা করে
কলাম্বাস নতুন দেশের অনেক খবর তাদের বলেছিলেন। সেই
নতুন দেশের জিনিষ—পাখী, জীবজন্তু, ফল, সােনা আর সেই
সব ইণ্ডিয়ান—এ সব দেখতে রাজা ও রাণীর কত আগ্রহ, কত
উৎসাহ!
দিলেন ;
সে দেশে আবার যাবার জন্য তাঁরা কলাম্বাসকে খুব উৎসাহ
তাদের ইচ্ছা ছিল, কলম্বাস সেই নতুন দেশে গিয়ে
স্পেন-রাজের প্রভুতা অটুট করে তুলবেন।
কলাম্বাসের ফিরবার পথে পর্তুগীজরা যে দুর্ব্যবহার করেছিল
সে কথা রাজা ও রাণী যখন জানতে পালেন তখন তাদের মনে খুব
আশঙ্কা হ’ল যে ওরা ওদেশে গিয়ে একটা ঝঞ্জাট বাধাবে।
এর আগে পৰ্ত্তগীজরা পােপ থেকে এক ফরমান বের করেছিল—
পশ্চিমে যে সব দেশ আবিষ্কৃত হবে—সে সব দেশের মালিক
হবে পৰ্তুগীজরাই ;—এক সন্ধিতে স্পেন ঐ ফরমান মেনে
নিয়েছিল।
স্পেনের রাজা তখন মনে মনে এক উপায় বের করলেন।
সেই সময় যিনি পােপ ছিলেন, তিনি স্পেনের অধিবাসী ;-
তাই ফার্দিনান্দ পােপের অনুগ্রহ পাবার জন্য পােপের কাছে
গােপনে কয়েকজন লােক পাঠিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে ওয়েষ্ট ইণ্ডিস

৫৪
কলম্বাস
থেকে আনা খানিকটা সােনা ও আরও অনেক জিনিষ উপহার
দিলেন। পােপ ঐ সব পেয়ে স্পেনের রাজাকে বলে পাঠালেন,
“আমি আর এক ফরমান জারী করছি,--যাতে আবাের
দ্বীপের ১০০ লীগ পশ্চিম দিয়ে উত্তর দক্ষিণে এক রেখা টেনে,
তার পূর্ব দিকে যা কিছু আবিষ্কার হবে সব পর্তুগালের আর
তার পশ্চিমের যা কিছু সব স্পেনের অধিকারে থাকবে।”
এই ফরমানে পােপের যা ছিল না তিনি শুধু তা দিলেন এমন নয়,
যে সব দেশের ধারণাও পােপের ছিল না তাও তিনি দান করে
ফেল্লেন !
কলম্বাসের আবিষ্কারে স্পেন রাজ্যের আয়তন অনেকটা
বেড়ে গিয়েছিল ;—সেইজন্য রাজা ও রাণীর যতখানি সাধ্য ছিল
তত সম্মান ও অধিকার কলাম্বাসকে আঁরা দিলেন;—তিনি তার
নতুন আবিষ্কৃত সব দেশের রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত হলেন, এডমিরাল
পদবীতে পাকা হলেন, আর তাকে নৌ-সেনাপতির পরিচ্ছদ দেওয়া
হ’ল। ভবিষ্যতে ওসব দেশে নিজের ইচ্ছামত কর্তৃত্ব করার ক্ষমতাও
তঁার হ’ল। এ ছাড়া রাজার ব্যয়ে ক্যাডিজ, বন্দর হতে আরও একটি
বড় নৌবহর তঁাকে দেবার হুকুম হ’ল।
দুষ্ট লােকদের মনের এমনি গতি,—যখন একজন ভাল কাজ
করে, খুব সম্মান পায়, তাদের মনে মনে একটা জ্বলা হয়; এ সব
লােকে ভাবে,—এ কাজের জন্য এত সম্মান কেন ? যে সে ত
এরূপ কাজ করতে পারত। এই সময়কার একটী গল্প আছে।
কলাম্বাস একদিন এমন এক বৈঠকে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন

৫৫ যশের চূড়ায়—কলাম্বাস যেখানে তার আবিষ্কার নিয়ে নানা ঠাট্টা, তামাসা চলছিল। একজন বলে উঠল,ভারি তত আবিষ্কার,অমন জাহাজ, আর টাকা পেলে আমরাও কত নতুন দেশ আবিষ্কার করে দিতে পারি । কলাম্বাস পকেট হতে তখনি একটি ডিম বের করে বললেন- “তােমরা ত ভাই সব পারাে; আচ্ছা ; ঠেস্ না দিয়ে এই ডিমটি টেবিলের উপর খাড়া করে রাখত দেখি।” কেউ তা পারলে না। কলম্বাস ডিমটি নিয়ে টেবিলের উপর এক ঠোকা মেরে ডিমের মাথা তুবড়ে দিয়ে তার উপর ডিমটি খাড়া ক'রে বসিয়ে দিলেন। তা দেখে সবাই বললে, “আমরাও ত ও করতে পারতুম!” কলাম্বাস হেসে হেসে বললেন, “বলা সােজা আমিও ত পারিতাম তরিতে সাগর । কিন্তু ভাই একজন পেনেছে যে, আমি সেই নর।” কলম্বাসের খবর পেয়ে ছােট ভাই জেমস্ ইতালী থেকে তাড়াতাড়ি চলে এলেন। বার্থালােমিউ কলম্বাসের দ্বিতীয় যাত্রার আগে এসে পৌঁছতে পারলেন না। দ্বিতীয় অভিযানের আয়ােজন প্রথম বারের চেয়ে ঢের বেশী হ’ল। এবার এত লােক কলাম্বাসের সঙ্গে যাবার জন্য চাইলে যে তাদের বাছাই করা শক্ত হয়ে দাড়াল। অনেক বড় পরিবারের ছেলে, যাদের অবস্থা তত ভালাে ছিল না,-পশ্চিমে গিয়ে ঢের

কলম্বাস
;
সােনা নিয়ে এসে রাতারাতি খুব বড় ধনী হয়ে উঠবে,—এই
আশায় তারা যেতে চাইলে।
এমনতর লােক—যারা কেবল অর্থের লােভে পশ্চিমে যাবার
জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিল, তারাই ঢের গােলমাল করতে লাগল।
এবার কলম্বাসের জন্য তিনখানি বড়, আর চৌদ্দ খানি ঘােট
জাহাজ সাজাবার আদেশ হ’ল। এ কাজের ভার পড়ল একজন
পাদরীর উপর। তার নাম জুয়ান্ দি ফনসেকা। এই লােকটা
ছিল ভারী শঠ ;—সে কলম্বাসের এত নাম হচ্ছে দেখে মনে
মনে খুব জ্বালা বােধ করত; শেষে এই লােকটিই কলম্বাসের
প্রধান শত্রু হয়ে দাড়ায়।
ফসেকা জাহাজগুলি সাজিয়ে দিতে নানা ছুতাে ধরে কেবলি
দেরী করছিল। যত রকমের বাধা দেওয়া তার সাধ্যি ছিল,
সবই দিচ্ছিল। কলম্বাস প্রাণপণ চেষ্টা করে কোনমতে তার
কাজ গুছিয়ে নিলেন। এবার কিন্তু কলম্বাসের সঙ্গে ১৪০০ লােক
জুটল ; শােনা যায় আরও একশত লােক জাহাজের মধ্যে লুকিয়ে
চলেছিল। এবার সঙ্গে নেওয়া হ’ল শুধু রসদ, গােলাগুলি ও
বারুদ, আর নতুন দেশে বুনবার জন্য নানারকম শস্য ও শাকসজীর
বীজ ; গরু, শূয়াের, ভেড়া, ছাগল, খচ্চর প্রভৃতি অনেক জন্তুও
ছিল।
কলাম্বাস মেরায়া গ্যালান্ত, জাহাজে তার বড় নিশান তুলে
দিলেন। এই জাহাজে প্রায় ১১ হাজার মণ বােঝাই ধরত।
সান্তা মেরিয়ার মত এই জাহাজখানি বড় ধীরে চলত।

No text on this page.

২,--
.
1
ফ, দন্দ ও ইবের নিকট হইতে কলস দিয় লইতেছেন

যশের চূড়ায়-কলাম্বাস
কলাম্বাস এবার রাজদরবারে খুব সম্মান পেয়েছিলেন। তিনি
ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার নিকট হতে এডমিরালের সাজসজ্জা পরে
খুব সসম্ভ্রমে বিদায় নিলেন।
১৪৯৩ খৃষ্টাব্দের ২৪শে সেপ্টেম্বর ক্যাদিজ বন্দরে তার দুই ছেলের
কাছে বিদায় নিয়ে কলাম্বাস জাহাজে উঠলেন। ১৩ই অক্টোবর
তিনি কেনেরী দ্বীপ ছেড়ে আবার অকূল সমুদ্রে পাড়ি দিলেন।
এবার তার সঙ্গে রইল তার ছােট ভাই জেমস্, একজন পাদরী,
একটি ডাক্তার। এলােনসস ওজেদা নামে ভদ্র পরিবারের
একটি যুবাও ছিল। ইনি পরে অনেক সাহসের কাজ করেছিলেন।

আবার পশ্চিম মুখে—দ্বিতীয় যাত্রা কলাম্বাসের ইচ্ছা ছিল তিনি সােজাসুজি হিস্পানিওলা দ্বীপে যাবেন,সেখানে তার যে সব লােক রেখে চলে এসেছিলেন তাদের দেখতে। এতদিন তারা স্পেন থেকে কোন সাহায্য পায় নি,—তাতে তাদের কি দশা হয়েছে তা জানবার জন্য কলাম্বাস খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এবার তিনি এসে পড়লেন,—ছােট ঘােট ক্যারিবিয়ান্ দ্বীপ গুলাের মাঝখানে। তিনি ৩রা নবেম্বর একটি দ্বীপ দেখতে পেলেন -ভারি সুন্দর। তার নাম দিলেন ডােমিনিকা। সারা দ্বীপে খুব বন জঙ্গল ; পাহাড়ের চুড়াগুলােও নিবিড় বনে সবুজ হয়ে রয়েছে । উপরে নীল আকাশ, নীচে সাদা টোপর পরা নীল ঢেউগুলি ছুটাছুটি করছে,—এ দু’য়ের মাঝখানে সুন্দর দ্বীপটি পরীর দেশের মত চমৎকার দেখাচ্ছিল। আরও একটু এগিয়ে একটি দ্বীপ পেলেন—তার নাম হল মেরায়া গ্যালান্ত,কলাম্বাসের বড় জাহাজের নামে। আরও কিছু দূরে নতুন আর একটী দ্বীপ দেখা গেল,তার নাম দেওয়া গেল গুয়াদালুপ। এই দ্বীপে একটি সুন্দর জলপ্রপাত তারা দেখতে পেলেন,“জলের ধারা কয়েক শাে ফিট উচু হ’তে পড়ে ফেনিল দুধের মতাে সাদা হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল।

আবার পশ্চিম মুখে—দ্বিতীয় যাত্রা
৫৯
;
জাহাজ দেখেই এদেশের লােকজন সব বনের মাঝে পালিয়ে
গেল। একদল সাহেব গিয়ে যখন তাদের কুঁড়ের মধ্যে ঢুকল, তখন
তারা যা দেখল তাতে একেবারে শিউরে উঠল। ঘরের এক
কোণায় এক রাশি তূলল, আর কতকগুলি পােষা টীয়া পাখী।
আর এক কোণেতে কতগুলাে হাত, পা, মাথা পড়ে রয়েছে।
ক্যারিব জলদস্যদের নাম কলাম্বাস আগেই শুনেছিলেন ; কলাম্বাস
মনে করলেন,-এ হয়ত তাদেরই একটি বড় আস্তানা হবে।
সেই পাড়াতে দু’টি ছেলে ও ছয়টি মেয়ে বন্দী রয়েছে দেখা গেল।
সাহেবদের দেখে তারা ভারী খুসি হল,—তাদের বিশ্বাস হয়েছিল
সাহেবরা তাদের বাড়ীতে পৌছিয়ে দেবে। তারা কলাম্বাসকে
দেখিয়ে দিলে হিস্পানিওল কোন দিকে,—আরও দক্ষিণে যে একটি
বড় মহাদেশ রয়েছে তার কথাও তারা বলল।
হিস্পানিওলাতে পৌছাবার জন্য কলম্বাস ভারি ব্যস্ত হয়ে
উঠেছেন তখন। এই আটটি ইণ্ডিয়ানকে জাহাজে তুলে নিয়ে
তিনি ওদিকে রওনা হবেন, এমন সময় জানতে পারলেন, তার একটি
ছােট জাহাজের কাপ্তান আট জন খালাসী নিয়ে ও দ্বীপের ভেতর
চলে গেছেন। অনেক খোঁজ করেও তাদের খবর পাওয়া গেল না।
ও দ্বীপের মাঝে নতুন রকমের অনেক ফল মিলল ;তার মাঝে
“আনারস” পেয়ে তাে সাহেবেরা ভারী খুসি; যেমন তার গন্ধ
তেমনি স্বাদ। এর আগে তারা কেহ আনারস দেখেনি। অনেক
নতুন নতুন পাখী, নানা রকমের পাতিহাঁস, সারস, পায়রা প্রভৃতি
সেখানে দেখা গেল।

কলাস
তার ঐ নয় জন লােকের আশা ছেড়ে দিয়ে ৮ই নবেম্বর
কলাম্বা হিস্পানিওলার দিকে জাহাজ ছাড়বেন, এমন সময়
ও লােকগুলাে ক্লান্ত, আধমরা হয়ে তাঁবুতে এসে পড়ল ! পথ
হারিয়ে এ কয় দিনের অনাহারে বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে তাদের
চেহারা একেবারে বদলে গিয়েছিল। তাদের খুব ভয় হয়েছিল,
এডমির্যা তাদের ফেলে চলে যাবেন,তা হলে ওরা ওদ্বীপেই
মারা পড়বে।
তার পর কলম্বাস ছােট বড় অনেক দ্বীপ পেরিয়ে ২৭শে
নভেম্বর ‘লা নাভিদাদে এসে পৌছলেন। যতই জাহাজ ডাঙ্গার
কাছে ভিড়ছিল সকলের মুখে ভীষণ উৎকণ্ঠার ছায়া ঘনিয়ে
আসছিল। এডমিরাল
এডমিরাল খুবই আশা করেছিলেন, নাভিদাদের
কেল্লা হ'তে সাহেবেরা হয় তাকে দেখে দূর হ’তে ইসারা করে
অভিনন্দন করবে, নয় তারা দলে দলে ডিঙ্গী চেপে এসে জাহাজের
চারধারে জুটবে। কিন্তু কারাে কোন সাড়া, কোন চিহ্ন দেখা গেল
। জাহাজ নােঙ্গর করে তিনি কামান দাগলেন—সে শব্দেও
কোন দিক হতে কোন সাড়া মিলল না।
অনেকক্ষণ পরে দেখা গেল একটি ইণ্ডিয়ান এক ডিঙ্গী বেয়ে
ধীরে ধীরে জাহাজের দিকে আসছে। সে সর্দার গুয়াকানাগারীর
আত্মীয়। সে জাহাজে উঠে কিছু রুটি ফল কলাম্বাসকে দিলে ;
তাকে সাহেবদের খবর জিজ্ঞাসা করা হল। সে প্রথমে অনেক
ইতস্ততঃ করে যা বলল তাতে বােঝা গেল নানা রােগেই তারা
মারা গেছে। অনেক প্রশ্নের পর শেষে সে জানিয়ে দিলে সেদেশের

আবার পশ্চিম মুখে—দ্বিতীয় যাত্রা এক বড় সর্দার ওদের সবাইকে মেরে ফেলেছে,সাহেবদের জন্য লড়তে গিয়ে সর্দার গুয়াকানাগারীও আহত হয়েছেন। একদল লােক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ডাঙ্গায় নেমে দেখল,—কেল্লার চারধারের কাঠের বেড়া পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, কেল্লার ভিতরকার ঘর বাড়ী সব চুরমার। সে সময় গুয়াকানাগারীর এক ভাই এসে তাদের বললে,—আপনারা এসে আহত সর্দারকে দেখে যান। সাহেবরা সেখানে গিয়ে দেখল,-গুয়াকানগারী কাপড়ের এক দোলনাতে পড়ে রয়েছে। সে সাহেবদের দেখে ভয়ে ঠ 'য়েহক গেল। সে সব কথা খুলে বলল -কলাম্বাসের যাবার পরে সাহেবরা দলে দলে সােনার খোজে বেরিয়ে ইণ্ডিয়ানদের ওপর খুব অত্যাচার করত। এমন কি স্ত্রীলোেকরাও বাদ যেত না। নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকেও তাদের নজর ছিল না,নতুন নতুন খাদ্য যা পেত খুব খেত, তাতে নানা রােগে অনেকেই মারা যায়। যারা বেঁচে ছিল, তাদের অত্যাচারের মাত্রা যখন লােকেদের অসহ্য হয়ে উঠল, ও দেশের খুব বড় সর্দার ক্যানাব তার পাহাড়ে-কেল্লা হতে বেরিয়ে এসে সাহেবদের সব কয়জনকে আক্রমণ করে মেরে ফেললে। সেই যুদ্ধে সেও একখানি পাথরের ঘা’ খেয়ে আধমরা হয়ে পড়ে রয়েছে। ক্যানাবাের শরীরে ক্যারিব জাতের রক্ত আছে কিনা, তাই সে অত বিষম দুর্দান্ত আর গোয়ার হয়ে পড়েছে। সাহেবরা এই কথায় বিশ্বাস করতে চাইলে না। কলম্বাসের ম উদার তিনি সর্দারের কথায় বিশ্বাস করলেন। কলাম্বাসের ধারণা যে ঠিক, তা শেষে প্রমাণ হয়েছিল। ছিল খুব ;

৬২ কলাঘাস প্রতিহিংসা নেবার জন্য সেই বন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে তখনি ক্যাওনাবােকে আক্রমণ করার প্রস্তাব কলম্বাস উপেক্ষা করলেন । তিনি ও জায়গাতে আরাে বড়, আরাে দৃঢ় করে এক কেল্লা তৈরী করতে ঠিক করলেন। সেখানে সমুদ্রের ধার দিয়ে কয়েক মাইল লম্বা পাথরের একটি টিলা ছিল ;-ওখান থেকে পাথর কেটে এনে সহরের মতাে একটি বড় কেল্লা তৈরী করতে শুরু করে দিলেন। ঐ সহরের নাম হ’ল-ইসাবেলা। কলাম্বাস সব কাজ এখন নিজেই দেখতে লাগলেন। লম্বা নল দিয়ে দূর হ’তে পানীয় জল আনা হ’ল, নানা রকমের শস্য বুনা হ’ল, শাক সবজির বহু চারা লাগানাে গেল,—যেন ভবিষ্যতে তাদের কোন খাদ্যের অভাব না হয় । কলাম্বাস নিজের লােকদের দিন রাত খাটাতে লাগলেন ; যে সব অলস লােক রাতারাতি বড় লােক হবার লােভ সােনার খোঁজে ওদেশে এসে পড়েছিল, তাদের এই হাড়-ভাঙ্গা খাটুনি অসহ্য হয়ে যারা কাজ করতে অবহেলা করত কলাম্বাস তাদের খাবার বন্ধ করে দিতেন—এই ছিল তাদের শাস্তি। দিনরাত বিষম পরিশ্রম, নানা চিন্তা, ওদেশের দারুণ রােদ, অনভ্যস্ত আহার—এসব কলম্বাসের সহ হ’ল না। তিনি জ্বরে পড়লেন। যেই তাঁর অসুখ হয়ে পড়ল, তার ললাকেদের একদল সেই সুযােগে বিদ্রোহী হয়ে উঠল। যে কয়জন তার বিশ্বাসী বন্ধু ছিলেন তারা তার খুব সেবা করতে লাগলেন। কলম্বাস তাতে শীঘ্রই সেরে উঠলেন। তা দেখে বিদ্রোহীরা কিছু নরম হয়ে রইল। উঠল।

আবার পশ্চিম মুখে—দ্বিতীয় যাত্রা কলাম্বাস স্থির করলেন, তার লােকদের ছােট ছােট দলে ভাগ করে নানা কাজে ওদ্বীপের নানা দিকে পাঠিয়ে দিলে ওরা ব'সে বসে ষড়যন্ত্র করার সুযােগ পাবে না, তাদের মনের গতি নানা বিষয়ে চালিত হতে পারবে। প্রথমে ছােট্ট দুটো অভিযান পাঠানাে হ’ল,—একটি ওজেদার অধীনে, অপরটির নেতা হ’ল গােরবালান। যখন তারা নিরাপদে ফিরে এল, কলম্বাস কয়েকখানি জাহাজ সােনা ও ক্রীতদাস বােঝাই করে এন্টণি টরীসের অধীনে স্পেনে পাঠিয়ে দিলেন। কলাম্বাস মনে করেছিলেন ,-“সােনা ও ক্রীতদাসগুলাে ইউরােপে বিক্রী করে যে টাকা মিলবে তাতে তাদের ওদেশের খরচ চলে যাবে।” তখনকার দিনে ইউরােপে দাস বিক্রয়ের প্রথা প্রচলিত ছিল। অসভ্য, অসহায় লােকদের জোর করে বাড়ী ঘর থেকে ধরে এনে, বিদেশে চালান দিয়ে তাদিগকে পশুর মত বিক্রী করা যে কত ঘৃণিত ব্যাপার, তা তখনকার লােকেরা বুঝত না। জাহাজগুলি স্পেনে পৌছলে রাণী ইসাবেলা যখন শুনতে পেলেন যে ওই ইণ্ডিয়ান দাসগুলো বড় নিরীহ, বড় শান্ত, তখন তিনি আদেশ দিলেন—“ওদের দেশে ফিরে পাঠিয়ে দিতে হবে।” এডমিরা জানতেন না যে হেইতী দ্বীপে পাঁচজন সর্দার থাকত। তিনি সর্দার গুয়াকানাগারী আর ক্যাওনাবাের কথাই জানতেন। কিন্তু এই পাঁচজন সর্দারের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া বিবাদ হত ; তাদের অস্ত্রশস্ত্র সামান্য ছিল ; সদ্দারদের লােকবলও প্রায়

৬৪
কলাস
সমান সমান ছিল; তাই আত্মকলহে তাদের বেশী ক্ষতি হত না।
কিন্তু ওসব দেশে সাহেবদের পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক,
গােলা প্রভৃতি ভীষণ অস্ত্রশস্ত্র, নতুন নতুন রােগ, নতুন নতুন
অত্যাচারে লােকগুলাে দিনের পর দিন উৎস যেতে লাগল।
কিছুকালের মধ্যে ওসব লােকদের সব চিহ্ন দেশ থেকে
মুছে যায়।
কলাম্বাস কিন্তু বুঝতে পারেন নি তার ওসব দ্বীপ আবিষ্কারের
ফলে দেশের আদিম অধিবাসীরা এরূপে নষ্ট হয়ে যাবে।
বুঝতে পারলে নিশ্চয়ই তার খুব কষ্ট হতাে। তিনি চার শােলােক
নিয়ে যুদ্ধের সাজে একদিন বেরিয়ে পড়লেন। তার মাঝে কয়েক
জন ঘােড়সওয়ার ছিল ; তাদের হাতে নিশান উড়ছিল।
এরা চলল বনের ভেতর দিয়ে পথ কেটে ;-সংকীর্ণ একটি
পাহাড়ে পথ নদী, ঝরণা পার হয়ে, দূরে চলে গেছে। তারা এসে
পড়ল এক বড় মাঠের ওপর ;-ওখানে কতগুলাে নিরীহ লােকের
ছােট ঘােট কুটির। এতগুলাে ফৌজ,—বিশেষতঃ ঘােড়সওয়ারদের
দেখে তাদের ভারি ভয় হ’ল ; কারণ তারা এর আগে ঘােড়া
দেখেনি। ঘােড়ার পিঠে মানুষ কি করে যে চড়ে তাও তারা
জানত না। তারা মনে করল ঘােড়সওয়ারগুলাে এক একটি
জানােয়ার—যার নীচের দিকটা জানােয়ারের মতে, উপরকার
দিকটা মানুষের মতাে। এই অদ্ভুত জানােয়ার দেখে সবাই বাড়ী
ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল। কলাম্বাস নানা কৌশলে তাদের
সাথে ভাব করে নিলেন।

No text on this page.

中

আবার পশ্চিম মুখে—দ্বিতীয় যাত্রা
সেই মাঠের মাঝখানে একটি সুন্দর নদী ছিল। এই নদীর
বালির সঙ্গে সােনার রেণু পাওয়া যেত। নদীর উজানে আরাে
বেশী সােনা মিলতে পারে এই ভেবে কলম্বাস ওখানে একটি
কেল্লা তৈরী করে তার ভার দিলেন পিটার মার্গারিট নামে একটি
লােকের ওপর। কেল্লাটির নাম হ’ল সেন্ট, টমাস। কলম্বাস তাকে
বলে দিলেন—“ক্যানাবাের বাড়ী কোন দিকে খোঁজ করবে,
এদেশের লােকজনের সঙ্গে খুব ভালাে ব্যবহার করাে ; মূল্য না
দিয়ে কারু কাছ থেকে কোন জিনিষ নিয়াে না।” তার পর
কলাম্বাস ওখান থেকে ইসাবেলা নগরে ফিরে এলেন।
কলাম্বাস আরাে নতুন জায়গা আবিষ্কার করতে বের হয়ে
পড়বেন এই ঠিক করে ওখানকার কাজ চালাবার জন্য এক
পঞ্চায়েৎ নিযুক্ত করলেন। তাঁর ভাই জেমকে পঞ্চায়েৎ সভার
অধ্যক্ষ করে দিলেন। পাদরী বইল তাঁর সহকারী রইল। এই
লােকটি শেষে খুব বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।
১৪৯৪ খ্ৰীষ্টাব্দের ২৪শে এপ্রিল এডমিরাল তার নিনা ও আর
দু’খানি জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সঙ্গে ৫২ জন লােক নিলেন।
পশ্চিম মুখে তিনি কিউবা দ্বীপে যান। আগেই বলা হয়েছে
এই দ্বীপটি ভারি সুন্দর ! পাহাড়ের গায়ে সবুজবনের ভিতর দিয়ে
অনেক নদী তর তর করে সমুদ্রের দিকে ছুটেছে। নদীর নির্মল
জলে বনের ঘন সূবুজ ছায়া পড়ে নদীগুলাে নীল আয়নার মত
দেখাচ্ছিল। দক্ষিণ উপকূল দিয়ে কিছুদূর গিয়ে শেষে তিনি
জ্যামেকা দ্বীপে পৌঁছলেন।

কলাম্বাস
•
খাবার জিনিষ ও অন্যান্য দ্রব্যের জন্য তাকে হিস্পানিওলা
দ্বীপে ফিরতে হ’ল। কিন্তু ওখানে পৌছাবার আগেই তার
আবার অসুখ হয়ে পড়ল। আগের বার জ্বরে প'ড়ে তার শরীর
দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, তার তখন বয়সও হয়েছিল বেশী ;
কাজেই রােগের সঙ্গে যুঝবার মতাে শক্তি তার ছিল না। মুমূষু
অবস্থায় ২৯শে সেপ্টেম্বর ইসাবেলা নগরীতে তাকে আনা হয়।
এর কিছু দিন আগেই তার ভাই বার্থলােমিউ তিন খানি
ছােট জাহাজ নিয়ে ওখানে এসেছিলেন। তিনি এসে দেখতে
পান পিটার মার্গারিট ও পাদরী বইল দুজন জুটে নানা ষড়যন্ত্র
পাকিয়ে তুলে জেমকে বিপন্ন করে তুলেছে।
তারা কেউ
নিজের কাজ কর্ম কিছুই করত না—কেবল সােনার খোঁজে ঘুরে
বেড়াত; আর জেমস্ যা আদেশ করতেন তা গ্রাহই করত না।
বার্থলােমিউ জাহাজ নােঙ্গর করে যখন জেমসের কাছে গেলেন,
ওরা দুজনে মিলে অনেক লােক জুটিয়ে বার্থলােমিউর জাহাজগুলি
কেড়ে নিলে; সেই জাহাজে চড়ে তারা স্পেনের দিকে চম্পট দিল।
ওদিকে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে কলম্বাস যখন দেখতে পেলেন
বার্থলােমিউ এসে পৌছেছে, তার মনে বল হ'ল। তিনি ধীরে ধীরে
সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে তার এবার পাঁচ
মাস লাগল।
রােগশয্যায় শুয়ে শুয়ে তিনি ভাবতেন,—মার্গারিট, আর
বইল দেশে গিয়ে তার বিরুদ্ধে কত মিথ্যা সৃষ্টি করে রাজা-
রাণীর মন বিগড়ে দেবার চেষ্টা করছে।
;

আবার পশ্চিম মুখে—দ্বিতীয় যাত্রা
মার্গারিট কেবল যে অবাধ্যতা প্রকাশ করে ওখান থেকে
পালিয়ে গিয়েছিল তা নয় ; সে ওদেশের লােকের ওপর এত
অত্যাচার করেছিল যে সব লােকেরা ক্যাওনাবাের সঙ্গে মিলে
সাহেবদের আক্রমণ করবে ঠিক করল। এই খবর গুয়াকানাগারী
কলম্বাসকে জানিয়ে দিলে ।
কলম্বাসের আদৌ ইচ্ছা ছিল না এসব নিরীহ অসভ্যদের সঙ্গে
যুদ্ধ করেন। একদিন এক ইণ্ডিয়ান সর্দার কলম্বাসের দশজন সৈন্য
মেরে ফেলল ; তখন কলম্বাস প্রতিশােধ নেবেন স্থির করলেন।
কলাম্বাস একদল সৈন্য পাঠিয়ে সেই দোষী সর্দারকে ধ'রে
এনে শাস্তি দিলেন।
এখন সর্দার ক্যাওনাবােকে দমন করা দরকার। সে পূৰ্বেই
সেন্ট, টমাস্ কেল্লা আক্রমণ করেছিল। কলম্বাস ওজেদার অধীনে
কতকগুলি সৈন্য পাঠিয়ে অনেক ইণ্ডিয়ানকে মেরে ফেললেন।
অধিকাংশ লােক বনে, জঙ্গলে তাদের আড্ডাতে পালিয়ে গেল। কিন্তু
ক্যাওনাবােকে ধরতে না পারলে ওদেশে শান্তি হবে না এই ভেবে
তাকে ধরবার উপায় দেখতে লাগলেন।
ওজেদা এক ফন্দী বার করলেন। তিনি মাত্র নয় জন
লােক নিয়ে ক্যাওনাবাের আড়াতে গিয়ে জানালেন তিনি সর্দারের
সঙ্গে দেখা করতে চান ; আর সর্দারের জন্য তিনি অনেক উপহার
পাঠায়ে দিলেন। উপহারের জিনিষের মধ্যে ছিল রূপাের মত চক্
চকে দু’গাছি লােহার শিকল। সে দুটি ঝন ঝন করে বাজিয়ে
সর্দারের সামনে রাখা হ’ল। সর্দার কখনও লােহার জিনিষ

কলম্বাস
•
দেখেনি,—ও শিকল দেখে লােভে সর্দারের চোখ দুটি জ্বল জ্বল
করছিল।
ওজেদা ক্যাওনাবাের নিকট গিয়ে বলল—“তােমাকে এদেশের
রাজা করতে চাই; অমন সুন্দর রাজার গহনা পরতে হলে নদীর
জলে নেমে স্নান করতে হয়। ও গহনা পরে ঘােড়ার পিঠে
চড়িয়ে তােমায় তােমার লােকদের মাঝে ঘুরিয়ে নিয়ে
আসবাে। তখন তারা তােমায় দেখে দেবতার মতাে মেনে নেবে।”
ক্যাওনাবাের লােভ হ’ল ; সে তার আজ্ঞা ছেড়ে একটু দূরে
নদীতে স্নান করতে গেল। ওজেদাও ঘােড়া ও শিকল নিয়ে
সঙ্গে সঙ্গে চলল। যখন সর্দার দুহাতের পাঁজাতে শিকল দুগাছি
পরে ঘােড়ার উপর চাপল, ওজেদা চট করে এক লাফে তার পেছন
দিকটাতে ঘােড়ার পিঠে চড়ে ঘােড় খুব জোরে চালিয়ে দিলে।
দেখতে দেখতে ওজেদা এসে নিজেদের দলে মিশল ; তখন সবাই
ক্যাওনাবােকে বন্দী করে রেখে দিলে।
এই সংবাদ শুনে গুয়াকানাগারী ছাড়া আর সব সর্দার মিলে
সাহেবদের চারদিক থেকে আক্রমণ করলে। কলম্বাসের মাত্র
দুইশাে লােক, আর শত্রুরা সংখ্যায় অনেক। কিন্তু সাহেবদের খুব
বড় বড় শিকারী কুকুর ছিল। সাহেবদের বন্দুকের গুলিতে
দলে দলে লােক মারা পড়তে লাগল। বেগতিক দেখে ইণ্ডিয়ানরা
যখন পালাতে সুরু করলে, কুকুরগুলি তাদের লেলিয়ে দেওয়া হল।
ঘােড়র পায়ের ধাক্কায় আর কুকুরের কামড়ে অসভ্যরা ছত্রভঙ্গ
হয়ে চারিদিকে পালিয়ে গেল।
••

আবার পশ্চিম মুখে--দ্বিতীয় যাত্রা
কলাম্বাসের মনে খুব কষ্ট হ’ল এতগুলাে লােক মারা পড়ল
দেখে। ওদের সঙ্গে যুদ্ধ না করলে তারা সবাই সেবার মারা
পড়তেন। অসভ্যরাই প্রথমে আক্রমণ না করলে তিনি কখনও
যুদ্ধে নামতেন না।
এডমিরাল ঠিক করলেন নিজে এবার দেশে গিয়ে এই দেশের
সব ব্যাপারের ঠিক খবর রাজা-রাণীকে জানাবেন। ইসাবেলা বন্দরে
ছয়খানি জাহাজ ছিল। কলম্বাস ওগুলাে নিয়ে দেশে যাত্রা করবেন
এমন সময় প্রবল ঘূর্ণিবায়ু উঠে ; তাতে তিনখানি জাহাজ ডুবে
যায় দু’খানি ডাঙ্গাতে ঠেকে ভেঙ্গে যায়। নিনা জাহাজখানি
কোনমতে এবার বেঁচে গিয়েছিল।
কলাম্বাস ভাঙ্গা জাহাজের একখানি সারিয়ে নিয়ে তাতে
আর নিনা জাহাজটিতে অনেকখানি সােনা ও ওদেশের নানা রকমের
পাখী, ফল, শাকসজী বােঝাই করে দেশের দিকে যাত্রা করলেন।
সেদিন ছিল ১০ই মার্চ, ১৪৯৬ খ্ৰীষ্টাব্দ।
সেই জাহাজে বন্দী সর্দার ক্যাওনাবাে ছিল। স্পেনে নিয়ে
গিয়ে তার বিচার হবে--কলাম্বাস ঠিক করেছিলেন।

ক
দক্ষিণ আমেরিকা-কলাম্বাস
(তৃতীয় যাত্রা)
অনেক কষ্ট সয়ে কলম্বাস জুনের মাঝামাঝি ক্যাদিজ বন্দরে
পোঁছলেন। পথে সর্দার ক্যাওনাবো মারা যায় । সে সময়ে
তিনখানি জাহাজ ওয়েষ্ট ইণ্ডিজের দিকে যাচ্ছিল। তিনি ঐ
জাহাজের এক কাপ্তেনের হাত দিয়ে এক চিঠি পাঠালেন তার
ভায়ের কাছে। নতুন উপনিবেশটি কিরূপে চালানাে উচিত,
ঐ চিঠিতে তার অনেক উপদেশ ছিল ।
স্পেনে পৌছে দেখলেন, তার শত্রুরা বেশী কিছু ক'রে উঠতে
পারে নি। রাজা ও রাণী তঁাকে এবারও খুব শ্রদ্ধার সহিত অভ্যর্থনা
করলেন। তার জন্য নতুন একটি জাহাজের বহর তৈরী করার
আদেশ হ’ল ; এডমিরাল উপাধি তার পরে তার ছেলেরা
পাবেন—এও ঠিক হয়ে গেল।
এবারও জাহাজের নতুন বহর সাজাবার ভার পড়ল কলম্বাসের
চির-শত্রু ফসেকার ওপর। সে তাে এখন আর সামান্য পাদরী
নয়, এখন সে একজন বড় বিসপ। যতই কলম্বাসের খুব সুখ্যাতি
হচ্ছিল, তার প্রতি ফসেকার ঈর্ষা ততই বেড়ে যাচ্ছিল।
সে জাহাজ সাজাতে কেবলি দেরী করতেছিল; আর পচা মাংস,
ভেজাল খাদ্য, পুরানাে পাল, রশি, পুরানাে পিপাতে জলােমদ
এই সব দিয়ে কলম্বাসের জাহাজ ভর্তি করে দিচ্ছিল।

দক্ষিণ আমেরিকায়-কলাম্বাস
৭১
এরূপে ফনূসেকা দু’বছর দেরী করে। ১৪৯৮ খ্ৰীষ্টাব্দের
মে মাসে কলম্বাস আবার যাত্রা করলেন। আটলান্টিক মহাসাগরের
মাঝামাঝি গিয়ে কয়েকখানি জাহাজ হিস্পানিওলাতে পাঠালেন
তার ভাইয়ের কাছে, আর নিজে চারখানি জাহাজ নিয়ে আরও
দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে নতুন দেশের খোঁজে চললেন।
জুলাই মাসের প্রথম দিন তিনি একটি দ্বীপে তিনটি পাহাড়ের
চূড়া দেখতে পান,—তাই ওদেশের নাম দিলেন ত্রিনিদাদ। এই
দ্বীপটি দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূলের খুব কাছে।
ত্রিনিদাদ ও দক্ষিণ আমেরিকার মাঝখানে যে প্রণালী রয়েছে
তার ভেতর অনেক ডােবা পাহাড় আছে ; জলের স্রোতও ওখানে
খুব বেশী । স্রোতের ধাক্কা ভােবা পাহাড়ের গায়ে লেগে সাগরের
জল টগবগ্ করে যেন ফুটছিল। অতি কৌশলে কলাম্বাসকে ওই
প্রণালী দিয়ে জাহাজ চালাতে হয়েছিল। তিনি সারারাত জেগে
জাহাজ চালিয়েছিলেন। জোয়ারের সময় সাগরের এমন একটি
চেই তিনি দেখেছিলেন যে উহা তার জাহাজের মাস্তুলের সমান
উচু ছিল!
কিন্তু তার সেই ছােট নিনা জাহাজখানি রাজহাঁসের মতাে
ঢেউয়ের তালে তালে নাচতে নাচতে ঢেউয়ের চূড়ায় চড়ে পার হয়ে
গেল। তার পরদিন তিনি গিয়ে পড়লেন প্যারিয়া উপসাগরে।
ওখানে দেখতে পেলেন সাগরের জল খুব মিঠে। তাতে তার মনে
হ’ল নিশ্চয়ই ওখানে খুব বড় একটি নদী মহাদেশ হ’তে এসে
পড়েছে,—নদীর ভাটী জল আর সমুদ্রের জোয়ার দু’দিকের

१२
কলাম্বাস
ধাক্কাতে অত বড় ঢেউ হয়েছিল। তিনি কূলের কাছে নােঙ্গর করে
রইলেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই আর সব জাহাজ সেই উপসাগরে
এসে পৌছল ; ডাঙ্গাতে গাছপালার মধ্যে অসংখ্য বানর লাফালাফি
করছিল ; প্রথমে লােকজন কিছুই দেখা গেল না। দু'তিন দিনের
পর ডিঙ্গী নিয়ে অনেক লােক আসতে দেখা গেল ; এডমির্যাল
ইসারাতে জানিয়ে দিলেন তিনি তাদের সঙ্গে ভাব করতে
চান! ওদের মুখেই তিনি প্রথম জানতে পারেন,—ও জায়গার নাম
প্যারিয়া উপসাগর।
উপকূলের কাছ দিয়ে জাহাজ চালিয়ে নেবার সময় লােকদের
সঙ্গে আলাপ হ'তে লাগল। অনেক ইণ্ডিয়ান মেয়ের গলাতে তিনি
সুন্দর সুন্দর মুক্তার হার, সােনার কলার দেখতে পান। তিনি
খোঁজ করে ওদের কাছ থেকে জানতে পারুলেন, নিকটে একটি
দ্বীপের ডাঙ্গাতে ঢের ঝিনুক পাওয়া যায় ; ওসব ঝিনুক থেকে
মেয়েরা মুক্তা কুড়িয়ে আনে; আর ওদেশের পাহাড় হতে
সােনা পাওয়া যায়। ওখানে ঘুরে ঘুরে কলম্বাস আরও অনেক
দ্বীপ দেখে নিলেন। তখনও তার ধারণা ছিল ওগুলাে এসিয়ার
পূর্ব উপকূলের দ্বীপ ; আর প্যারিয়া উপসাগরের তীরে যে জায়গা,
উহা এসিয়া মহাদেশ হবে। ওটা যে দক্ষিণ আমেরিকা তিনি
তখনাে তা জানতে পারেন নি।
এ সময় কলম্বাসের চোখের অসুখ হয়ে পড়ল। তাই তিনি
হিস্পানিওলাতে গিয়ে কিছুদিন বিশ্রাম করবেন ঠিক করলেন।

দক্ষিণ আমেরিকায়-কলাম্বাস
१७
ও সব অঞ্চলে সমুদ্রের স্রোত খুব বেশী ছিল; তাই অতি কষ্টে তিনি
পাঁচ দিন পরে হিস্পানিওলাতে পৌঁছলেন।
ওদিকে বার্থালােমিউ তার দাদার আদেশ মত হিস্পানিওলার
( হেইতী) দক্ষিণ উপকূলে এক নতুন সহর বসিয়েছিলেন, তার
নাম দিয়েছিলেন, সা ডােমিঙ্গো, তাদের বাপ ডােমিনিকোর
নামে। ঐ সহরের নাম থেকে আজকাল হেইতী দ্বীপের ওঅঞ্চলকে
সা ডােমিঙ্গো রাজ্য বলা হয়।
এই সহরটি ওরাজ্যের এখনকার
রাজধানী। নতুন সহর বসাবার সঙ্গে সঙ্গেই সাহেবরা সবাই
ইসাবেলা সহর ছেড়ে ওখানে এসে পড়ল।
কলাম্বাস প্রায় আড়াই বৎসর হিস্পানিওলার বাহিরে
কাটিয়েছেন। এ সময় ওদেশে ভিতরে বাহিরে নানা অশান্তি ঘনিয়ে
উঠেছিল। বার্থলােমিউ ইতালীর লােক বলে স্পানিয়ার্ডরা
অনেক সময় তাকে মানতে চাইত না। ওদিকে ইণ্ডিয়ানদের
পরাজিত করে তাদের দেশ দখল করেছেন বলে তিনি ইণ্ডিয়ানদের
ওপর কর বসালেন; তারা কিন্তু সাহেবদের খাজানা দিতে অস্বীকার
আগে তারা যার যেমন খুসি সামান্য পরিশ্রম করে
সুখে দিন কাটাত; এখন অত সােনা চাই, অতখানি রুটিফল মজুত
করতে হবে, অতখানি তূলল খাজনা দিতে হবে, সাহেবদের
এই সব যােগাতে তাদের খাটুনী খুব বেড়ে গেল। তাই
ইণ্ডিয়ানরা খুব বিগড়ে যেতে লাগল।
এমন সময় কলম্বাসের ওখানে উপস্থিত হওয়া খুব দরকার
হয়ে পড়েছিল। ঘরে বাইরে বিদ্রোহের অশান্তি, কারাে ওপর
করল।

৭৪ কলাম্বাস | কারাে বিশ্বাস নেই—তখন কলম্বাসের জন্য যেন সবাই প্রতীক্ষা করছিল। তার উপর এক নূতন সমস্যা উপস্থিত! কলম্বাসের অধীনে ওজেদা নামে একজন সহকারী ছিল; সে স্পেনের রাজা ও রাণীর অনুমতি নিয়ে এক নৌবহরের অধ্যক্ষ হ'য়ে কিছুদিন পূর্বেই এসে ও অঞ্চলে কলম্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাড়িয়েছিল। রাজারাণী কলাম্বাসের সঙ্গে সৰ্ত্ত করেছিলেন,—“ওদেশে যা কিছু আবিষ্কার হবে কলম্বাস স্পেন রাজের নামে তা শাসন করবেন।” ওজেদাকে দেশ আবিষ্কার করবার অনুমতি দিয়ে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখলেন না। কলাম্বাস রােগে জীর্ণ শীর্ণ হয়েই এবার হেইতী দ্বীপে ফিরে এসেছিলেন। তার আসার সঙ্গে সঙ্গেই শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে আসল। তিনি ওদেশের বিদ্রোহীদের খুব দয়া দেখিয়ে তাদের সর্দার রােলদানকে বন্দী করে রাখলেন। কলম্বাসের ফেরবার আগেই ওজেদা এই সর্দারের সঙ্গে বিষম বিবাদ বাধিয়েছিল। যে সব লােক সােনার লােভে ওদেশে গিয়ে পড়েছিল তারা দেখতে পেলে যে সােনা ত আর হাত বাড়ালেই মিলে না ; কাজেই তারা চাষবাস করতে সুরু করলে। ও দেশের জমি খুব উর্বরা ; সামান্য পরিশ্রমেই খুব ফসল লােকেরা তুলতে লাগল। ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দের মাঝামাঝি কৃষি, বাণিজ্য, শাসন ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল হয়ে দাড়াল। ওজেদা হেইতী দ্বীপে বিশেষ কোন সুবিধা করতে না পেরে ওখান হতে বাহামা দ্বীপে গিয়ে অনেক ইণ্ডিয়ানকে ধ'রে জাহাজে পূ’রে স্পেনে বিক্রী করার জন্য নিয়ে গেল। ;

দক্ষিণ আমেরিকায়—কলাম্বাস ৭৫ এখানে ওজেদার বিষয় কিছু বলা দরকার। সে স্পেনের রাজার পরওয়ানা নিয়ে ক্যাদিজ, বন্দর থেকে রওয়ানা হয়েছিল ১৪৯৯ খ্ৰীষ্টাব্দের মে মাসে। সমুদ্রে পথ হারিয়ে সে গিয়ে পৌঁছে প্যারিয়া উপসাগরে ;-সেখান থেকে আরও পশ্চিমে একটি বড় উপসাগরে গিয়ে পড়ে। সেখানকার লােকেরা অগভীর জলের মধ্যে কাঠের খুঁটি পুতে তার ওপর মাঁচা তৈরী করে বাড়ী বাঁধত ; তাই ও দেশের নাম দেওয়া হয়েছিল ছােট ভিনিস্ বা ভিনিজুয়েলা, কারণ ভিনিসের বাড়ীগুলাে জলের ওপর তৈরী। ভিনিজুয়েলা থেকে কলম্বাসের ফিরবার আগেই সে হিস্পানিওলাতে গিয়েছিল, পূৰ্বেই তা বলা হয়েছে। ওজেদার এ যাত্রায় একটি সামান্য ঘটনা হতে পশ্চিম মহা- দেশের নাম আমেরিকা হয়ে যায়। সকলের আগে কলাম্বাসই ওদেশে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু ওদেশের নাম কলাম্বিয়া হ’ল না। তার কারণ সংক্ষেপে বলা হচ্ছে। ওজেদার জাহাজে একজন রসদের দালাল ছিল—নাম আমেরিগাে ভেসপুচি। তার বাড়ী ছিল জেনােয়াতে; সে জাহাজের রসদ জোগাত। বয়স তখন তার পঞ্চাশের কাছাকাছি ; সে এবার ওজেদার সঙ্গে জুটে ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপে আসে। ওজেদার সাথে সে স্পেনে ফিরে যায় ; দেশে গিয়ে সে তার সমুদ্র যাত্রার এক চমৎকার প্রবন্ধ প্রকাশ করে। সে ওদেশে গিয়েছিল মাত্র সেই একবার, কিন্তু প্রবন্ধে প্রকাশ করে দিলে সে ওদেশে চারবার ঘুরে এসেছে। ওজেদার সঙ্গে সেই একবার ছাড়া সে ।

৭৬
কলাম্বাস
আর কখনও পশ্চিমমুখখা হয় নি। কিন্তু সে তার কাল্পনিক
ভ্রমণকাহিনীতে ওসব দেশের বিবরণ এমন চমৎকার করে
লিখেছিল যে ফরাসী ও ল্যাটিন ভাষাতে সেই প্রবন্ধের অনুবাদ
হয়ে যায়। অনেক লােক তার সেই সব অদ্ভুত, আজগুবি
বর্ণনা পড়ে মনে করতে লাগল, আমেরিগাে বুঝি একজন খুব বড়
আবিষ্কারক হবে।
একজন জার্মান ওই প্রবন্ধের বিষয় নিয়ে
এক বইতে লিখে ফেলল,—ও মহাদেশের নাম আমেরিকা
দেওয়া হোক। তখনকার দিনে যারা মানচিত্র তৈরী করত, তার
সেই ইঙ্গিত পেয়ে নতুন মহাদেশের নাম ‘আমেরিকা” দিয়ে
মানচিত্র আঁকতে সুরু করলে। কলম্বাস যে বহুপূৰ্বে ওদেশে
গিয়েছিলেন সে কথা চাপা পড়ে গেল।
কলাম্বাসের নামের দু’এক ফোটা চিহ্ন নতুন মহাদেশের দু’
একটি জায়গাতে দেখা যায়, পানামা খালের মুখে কোলন নামে
ছােট একটি বন্দর, আর উত্তর আমেরিকায় কোলাম্বিয়া প্রদেশ।
এখন কলম্বাসের বিষয়ে ফিরে আসা যাক। তিনি জানতেন
স্পেন রাজ্যে তার শত্রুরা মিলে তাঁর কি সর্বনাশ করবার
যােগাড় করছে। যে সব লােক সােনার লােভে ওদেশে গিয়ে
হতাশ হয়ে স্পেনে ফিরেছিল—তাদের কাছ থেকে কলম্বাসের
বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অপবাদ সংগ্রহ করে কলম্বাসের শত্রু বিসপ
ফসেকা সেগুলাে দশগুণ বাড়িয়ে রাজার কানে তুলত।
কলাম্বাসের ছেলে দুটি রাণীর কাছে থাকত। রাজসভাতে
বাপের নানা নিন্দা, কুৎসা তাদের শুনতে হত; কিন্তু মুখ ফুটে

দক্ষিণ আমেরিকায়—কলাম্বাস ৭৭ তার কোন প্রতিবাদ তারা করতে পারত না। দিনের পর দিন নানা কথা শুনে রাজার মন একেবারে বদলে গেল ; রাজা ঠিক করলেন,‘কলাম্বাসের বিরুদ্ধে যা শােনা যাচ্ছে তার অনুসন্ধান করার জন্য কতগুলি লােক ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপে পাঠানাে যাবে।” রাণী কলাম্বাসকে খুব বিশ্বাস করতেন ; কিন্তু তাকেও অবশেষে রাজার প্রস্তাবে সম্মতি দিতে হল। ফনসেকার পরামর্শে রাজা বােবাডিলা নামে একজন ভারি দুষ্ট, দুর্দান্ত লােকের ওপর এই অনুসন্ধানের ভার দিলেন। রাজা- রাণীর ইচ্ছা ছিল কলম্বাসের বিরুদ্ধে যা যা শােনা যাচ্ছে তা সত্য কিনা ঠিক করা। বােবাডিলা যখন গিয়ে হিস্পানিওলাতে পৌছলেন, তখন কলাম্বাস ও দ্বীপের মাঝে দূরে এক জায়গাতে গিয়েছিলেন ; বার্থ- লােমিউও আর এক অঞ্চলে ছিলেন। তখন কেবল জেমস্ সা ডােমিঙ্গোতে। সে ছিল নেহাত ভাল মানুষ। বােবাডিলা পৌঁছেই প্রচার করে দিলে, সে রাজা ও রাণীর হুকুমে ওদেশের শাসনকর্তা হয়ে এসেছে। সে কলম্বাসের ঘরের দরজা ভেঙ্গে টাকাকড়ি, কাগজ পত্র, নকশা, বই যা কিছু পেলে সব লুঠে নিলে। সেখানকার জেল খানার দরজা খুলে দিয়ে কয়েদীদিগকে ছেড়ে দিয়ে তাদিগকে কলম্বাসের বিরুদ্ধে চালাতে লাগল। এ খবর শুনতে পেয়ে কলম্বাস ওখানে তাড়াতাড়ি চলে এলেন। কলম্বাস ইচ্ছা করলে বােবাডিলাকে ধ'রে জেলে পূরতে

৭৮
কলাম্বাস
.
পারতেন,—তখনও সেখানে তার অতখানি ক্ষমতা ছিল। কিন্তু ধীর,
স্থির ভাবে সব শুনে, রাজার আদেশ মনে করে তিনি সব মাথা
পেতে মেনে নিলেন। রাজারাণী তার ওপর সন্দেহ করেছেন এই কথা
শুনেই দুঃখে অপমানে তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু তিনি
তবুও
ধৈৰ্য্য হারালেন না। কলম্বাস, বার্থলােমিউ ও জেমস্—এই তিন
ভাইকে হাতকড়ি দিয়ে বােবাডিলা স্পেনে পাঠিয়ে দিলে।
তারা কেউ কোন প্রতিবাদ করলেন না তারা নিজে সম্পূর্ণ
নির্দোষী একথা বেশ জানতেন ; তাদের ধারণা ছিল স্পেনে পৌছে
তঁারা জগতকে জানিয়ে দেবেন—যে রাজা ও রাণীর রাজ্য ও গৌরব
বাড়াবার জন্য তারা নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে বিপদকে বরণ
করেছেন—সেই রাজা ও রাণীর কৃপায় তাদের হাতে কড়ি, পায়ে
বেড়ী পড়েছে।
ফলে তাহাই হ’ল। যখন তিন ভাইকে হাত কড়ি দিয়ে
স্পেনে আনা হ’ল, আর সে সংবাদ রাজা ও রাণীর কানে গেল, তখন
তারা বেশ বুঝতে পারলেন,—বােবাডিল কত অন্যায় করেছে।
রাণী সে সংবাদ শুনেই কেঁদে ফেললেন ।
তিনি তৎক্ষণাৎ হুকুম
দিলেন, “ওদের শিকল এখনি খুলে ফেলল।” তিনি কলাম্বাসকে
কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন, যেন ভাল পােষাক পরে তারা রাজার
দরবারে উপস্থিত হতে পারেন।
রাজদরবারে কলম্বাস যখন উপস্থিত হলেন, সে কি করুণ দৃশ্য !
এর আগের বার বিজয়ী বীরের মতাে তিনি বুক ফুলিয়ে এসেছিলেন,
—তার চোখেমুখে কি এক অপরূপ মহিমার জ্যোতি ফুটে

দক্ষিণ আমেরিকায়—কলাম্বাস
৭৯
উঠেছিল। আর এবার? তার মুখ মলিন, চোখের ওপর সংশয় ও
চিন্তার আঁধার যেন কালী ঢেলে দিয়েছে। অপমানে, ঘৃণায়,
লজ্জাতে কলম্বাসের হৃদয় যেন অসাড় হয়ে পড়ছিল।
তিনি একটি কথাও বলতে পারলেন না। তার দু'চোখ
দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি রাজারাণীর সম্মুখে এসে
হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তা দেখে রাজা রাণীর মন একেবারে
গ’লে গেল। দু’জনে সিংহাসন থেকে এক সাথে উঠে হাত ধরে
কলাম্বাসকে তুলে নিলেন। তাকে আশ্বাস দিয়ে রাণী বললেন,
“বােবাডিলা বড় অন্যায় করেছে; এমন সব কাজ করার অধিকার
তাকে দেওয়া হয় নি। তাকে পদচ্যুত করে শীঘ্রই এদেশে
এনে শাস্তি দেওয়া হবে।”
এবারও স্পেন-রাজের ভুল হ’ল। নিকোলাস ওভাণ্ডা
নামে আর একটি লােককে বােবাডিলার জায়গায় গভর্ণর করে
পাঠানাে হ’ল। সে লােকটি যেমন মূখ তেমনি স্বার্থপর ছিল ; আর
তার প্রকৃতি পশুর মত হিংস্র ছিল। অনেকগুলি জাহাজ ও লােক
নিয়ে সে চলল ওদেশের দিকে। তার সঙ্গে লা ক্যাসা নামে
একজন ঐতিহাসিক ছিলেন, তিনি ঐ সময়ের নিখুত ছবি
এঁকে গিয়েছেন।
কিন্তু এডমিরাল স্পেনে বসে থাকবার লােক ছিলেন না।
নতুন দেশের খোঁজে বেরিয়ে পড়বার নেশা তখনাে তার খুব
প্রবল,বয়স যদিও তখন পঞ্চাশের কাছাকাছি। দৃষ্টিশক্তি
তার কমে গিয়েছিল, গেঁটে বাতে শরীর প্রায় অচল হয়ে উঠেছিল।

কলাম্বাস
তবুও তার মনপ্রাণ আটলান্টিক সাগরের পরপারে অজানা দেশের
খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপের পশ্চিমে কোন্
মহাদেশ রয়েছে তা কি করে আবিষ্কার করবেন, কেবল তাই
ভাবছিলেন।
তিনি এবার নতুন জাহাজের বহর নিয়ে হেইতী দ্বীপের আরাে
পশ্চিম দিক দিয়ে যাবেন ঠিক করলেন। ওদ্বীপে তিনি বড় লাঞ্ছিত
হয়েছেন, তাই ওখানে আর যেতে ইচ্ছা ছিল না। তার টাকাকড়ি,
ধনসম্পদ সব বােবাডিলা লুঠে নিয়েছিল, তাতে তার দুঃখ
ছিল না; কিন্তু তার আবিষ্কারের সব, কাগজপত্র, নক্সা প্রভৃতি
যে নষ্ট হয়ে গেল, তাতেই তার খুব কষ্ট হচ্ছিল।
তার ভাই জেমস্ সন্ন্যাসী হয়ে কোন এক মঠে জীবন কাটাবেন,
ঠিক করলেন।
এবার কলম্বাস তার ছােট ছেলেকে সাথে নেবেন,
বড় ছেলে রাজপরিবারে আগের মত কাজ করবে এই স্থির হ’ল।
তার ছােট ছেলের বয়স তখন মাত্র ১৪ বৎসর।
তঁার যা সামান্য বিষয় ছিল তার একটা উইল করলেন।
তিনি স্পেনে এসে কিছুই সঞ্চয় করতে পারেন নি, তার কতগুলি
ফঁাকা উপাধি জুটেছিল মাত্র। টাকা কড়ির দিকে তার টান ছিলই
। যা কিছু সামান্য সম্বল ছিল তার একটা ব্যবস্থা করে নিশ্চিন্ত
মনে তিনি যাত্রা করলেন।

0 ; ডেনিয়ে মােজকে—কলাম্বাস। শেষযাত্রা এইবার কলম্বাসের জীবনে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। দেশ যু’ড়ে তার নাম র’টে গিয়েছিল বটে, কিন্তু তার হাতে টাকাকড়ি কিছুই ছিল না; তিনি অনেক কষ্টে মাত্র চারখানি জাহাজ যােগাড় করে নিলেন। তিনি নিজে উঠলেন ক্যাপিটানা জাহাজে—তাতে মাত্র আঠারাে কি উনিশ শ মণ বােঝাই ধরত ; স্যান্‌সিয়াগগা জাহাজের কাপ্তান হ’ল পােরাস্ নামে দুভাই। এরা দু'জনে মিলে খুব শঠতা করে পরে কলম্বাসের সর্বনাশ করবার চেষ্টা করেছিল। গ্যালেগা নামে আর একটি জাহাজের কাপ্তান হলেন বার্থলােমিউ। এই তিনটি ছাড়া আরাে একটি ছােট জাহাজ এই সঙ্গে ছিল। এই চারিটি জাহাজে মাত্র ১৪৩ জন লােক নিয়ে কলাম্বাস ক্যাদিজ, বন্দর হ’তে রওনা হলেন। সেদিন ১৫০২ খ্ৰীষ্টাব্দের ৯ই মে। এই সব লােকদের মধ্যে প্রায় ৬২ জন ছেলে ছিল, তাদের মধ্যে কলাম্বাসের ছােট ছেলে ফার্দিনান্দ, একজন; বয়স তখন তার ১৪ বৎসর। জুন মাসের শেষাশেষি কলাম্বাস হেইতী দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলে সা ডােমিঙ্গো সহরে এসে পৌঁছলেন। এর দুমাস আগেই ওভাণ্ডে

কলাস
ওদেশের গভর্ণর হয়ে আসে। সে ওখানে এসেই বােবাডিলা ও
রােদাকে গ্রেপ্তার করে স্পেনে পাঠিয়ে দেবার যােগাড়
করতেছিল। ঠিক সেই সময় কলম্বাস ওখানে এসে উপস্থিত হন।
এর মধ্যে কলম্বাসের গ্যালেগা জাহাজখানির তলাতে ফুটো
হয়ে খুব জল উঠছিল। উহা সারানাে দরকার মনে করে জাহাজখানি
ভাঙ্গার কাছে ভিড়াবেন আর যদি সুবিধা হয় তার বদলে ওভাণ্ডোর
কাছ থেকে একখানি নতুন জাহাজ নেবেন, তিনি ওভাণ্ডোকে
জানালেন।
বােবাডিলা কলাম্বাসের উপর অত্যাচার করেছিল বলেই তাকে
শাস্তি দেবার জন্য স্পেনের রাজা ও রাণী ওভাণ্ডোকে ওদেশে
পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কলম্বাসের এমনি দুর্ভাগ্য যে ওভাণ্ডে
নিজের কোন জাহাজ ত তাঁকে দিলেই না, আরাে ব’লে পাঠাল
কলাস যেন আর দেরী না করে ওদেশ থেকে চলে যান।
সে সময় ওভাণ্ডো সােনা ও অন্যান্য জিনিষ বােঝাই করে আঠার
খানি জাহাজ স্পেনে পাঠাবার ব্যবস্থা করছিল ; তার একখানিতে
বন্দী বােবাডিলা ও রােদাকে পাঠানাে হচ্ছিল।
ওভাণ্ডোর এই দুর্ব্যবহারে কলম্বাস মনে বড় ব্যথা
পেলেন, কিন্তু তিনি খুব স্থির হয়ে সয়ে গেলেন। যে দেশ তিনি
নিজে প্রাণপাত করে আবিষ্কার করেছেন; যাতে উপনিবেশ
বসিয়েছেন, গভর্ণর পদের সৃষ্টি করেছেন, সেই দেশে তিনি
নাবতেও পারলেন না! তিনি যাবার সময় ওভাণ্ডার কিছু উপকার
করে যাৰেন মনে করে তাকে বলে গেলেন,-“শীই ভীষণ

No text on this page.

Agal in be 2

ডেরিয়ে যােজকে—কলাম্বাস
ঝড় উঠবে, দেখা যাচ্ছে; তুমি কিছুদিন অপেক্ষা করে তােমার
জাহাজের বহর স্পেনে পাঠিয়ে দিও।” তিনি গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান
দেখে শুনে তা বলেছিলেন। তার পর তিনি চললেন পশ্চিম
মুখাে।
ওভাণ্ডে গভর্ণারের পদ পেয়ে সেই পদের নেশায় বিভাের
ছিল ; সে কলম্বাসের কথা গ্রাহ্যই করলে না; সে আঠারখানি
জাহাজে জিনিষপত্র বােঝাই করে স্পেনের দিকে পাঠিয়ে দিলে।
কলাস যা বলেছিলেন তাই ঘটল। এমন ঝড় উঠল, যে
আঠারােখানি জাহাজের মাঝে চারখানি মাত্র রক্ষা পেল,-বাকী
সব সমুদ্রে গেল ডুবে, যে সব জাহাজে সােনা ছিল, বন্দী বােবাডিলা
ও রােদা ছিল, সব তলিয়ে গেল। তিনখানি জাহাজ আধা
ভাঙা হয়ে সাঁ ডােমিঙ্গোতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। কেবল
মাত্র একখানি জাহাজ,--যাতে কলম্বাসের কিছু জিনিষপত্তর
স্পেনরাজের হুকুমে পাঠানো গিয়েছিল, সেই জাহাজখানিই
স্পেনে গিয়ে পৌঁছে।
পশ্চিম পানে যাবার বেলায় কলাম্বাসও বিষম ঝড়ে পড়ে-
ছিলেন।
এমন তুফান, আর বৃষ্টি, যেন আকাশ ভেঙে পড়বে।
সে সময় তিনি দেখেছিলেন, এক বিরাট জলস্তম্ভ ব ব করে
পাকে পাকে ঘুরে সমুদ্রের ওপর থেকে মেঘের সমান উচু হয়ে
ছুটেছিল, যেন জাহাজগুলাের ওপর চেপে পড়ে চারখানিকেই
নিমেষে তলিয়ে দেবে।
অনেক কষ্ট সহ্য করে ৩০শে জুলাই কলম্বাস হন্ডুরাস

৮৪
কলাম্বাস
;
দেশে এসে পৌছলেন। ওই দিনই আমেরিকা
মহাদেশে সাহেবদের প্রথম পদার্পণ।
কিন্তু কলম্বাস তখনাে জানতেন না ঐটি আমেরিকা মহাদেশ।
তিনি এসিয়া মহাদেশের উপকূলে এসে পড়েছেন,—তখনাে তার
এই ধারণা ছিল।
হন্দুরাসে এসে জাহাজ থামালেন। কয়েক দিন ওখানে বিশ্রাম
করে জাহাজের পাল, রশারশি, হাল, আর যা যা সারবার দরকার
সেরে নিলেন। তার পর উপকূলের কিনার দিয়ে চলতে লাগলেন।
এই সময় প্রায় ৮৮দিন ধরে ঝড় বৃষ্টি লেগেই রইল। আকাশ
রােজই মেঘে ঢাকা থাকত ; সূৰ্য্যচন্দ্র কিছুই দেখা যেত না।
ঝড়ের দাপটে জাহাজের পাল নেকড়ার মতাে টুকরা টুকরা হয়ে
ছিড়ে যায়। জাহাজের অনেক জিনিষ পত্তর এই সময় ঝড় জলে
একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
কলম্বাস এক জায়গাতে এসে নাবলেন।
ইণ্ডিয়াদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা গায়ে সােনার পাত
যে জায়গা থেকে ওরা সােনা আনতে তার নাম দিয়েছিল
“ভিরাগুয়া”। পরে কলম্বাসের ছেলেকে “ভিরাগুয়ার ডিউক”,
উপাধি দেওয়া হয়। তার বংশধরেরা আজও সেই উপাধিতে
পরিচিত।
সে দেশে ইণ্ডিয়ানরা খুব ভুট্টার চাষ করত। লাল আর সাদা
এক রকমের কলাই সে দেশে জন্মাত। ইণ্ডিয়ানদের খুসি করে
সাহেবরা সে দেশের নানা খাদ্যদ্রব্য যােগাড় করে নিত। এই
সে দেশের
পরত।

৮৫ ডেরিয়ে যােজকে—কলাম্বাস ইণ্ডিয়ানরা এক নতুন জাত বলেই তার বােধ হ’ল। তারা দেখতে তেমন লম্বা নয়, শরীরের গড়নও ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপের লােকদের চেয়ে সুন্দর ; তারা ওদের চেয়ে বেশী সভ্য ছিল; খুব উচু বাঁশের ঘর তৈরী করত, লম্বা লম্বা সিঁড়ি দিয়ে তাতে উঠতে হয়। তারা সূতাের কাপড় তৈরী করে পরত ; তাদের ধনু, তীর, লােহার বর্শা ইত্যাদি অনেক অস্ত্র শস্ত্র ছিল । অক্টোবর মাসে কলম্বাস ভিরা- গুয়াতে পৌছলেন। আজকাল যেখান থেকে পানামা খাল সুরু হয়েছে ওখানে। ঐ জায়গাতে কলম্বাস কয়েক মাস ছিলেন। ১৫০৩ খ্ৰীষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন ইণ্ডিয়ানদের এক সর্দারের সঙ্গে এক পাহাড়ের চূড়াতে উঠে ঐ দেশটি দেখে নিলেন। অমন সুজলা, সুফলা দেশ দেখে তাঁর ইচ্ছা হ’ল সেখানে একটি উপনিবেশ স্থাপন করবেন। ইণ্ডিয়ানরা যখন বুঝতে পারলে, যে সাহেবরা ওদেশে বাস করতে চায়, তখন তাদের সন্দেহ হ'ল। ভিরাগুয়ায় সর্দার কুইবিয়ান তার দলবল নিয়ে যুদ্ধের আয়ােজন করতে লাগল। বার্থলােমিউ এ সময় কলাম্বাসকে পরামর্শ দিলেন,—“যদি কোন ছলে সর্দারকে জাহাজে এনে আটক করে রাখা যায়, তা হলে সর্দারের লােকেরা সহজেই বশে আসবে।” বার্থলােমিউ খুব কৌশলে কুইবিয়ানকে জাহাজে এনে আটক করে রাখলেন ; তারপর নিজে তার লােকজনদের সঙ্গে বােঝাপড়া করার জন্য ডাঙ্গায় নেমে গেলেন। এদিকে সর্দার কিন্তু জাহাজ থেকে পালিয়ে তার দলে গিয়ে জুটল। ;

কলাম্বাস
এর মধ্যে সাহেবরা ওখানে একটি কেল্লা তৈরী করে ফেলে-
ছিল। বার্থলােমিউ সেখানে ছিলেন। কুইবিয়ান তখনি তার
দলবল নিয়ে সেই কেল্লা ঘিরে ফেললে।
কলাম্বাস দেখলেন বার্থলােমিউর ভারি বিপদ। তিনি এক
নৌকাতে করে কতকগুলি লােক তার ভায়ের কাছে পাঠালেন।
ইণ্ডিয়ানরা তাদের একজন ছাড়া আর সব ক’টিকে মেরে ফেলে।
কলম্বাসের কাছে মাত্র আর একখানি নৌকা ছিল,ঐ নৌকায়
করে আর একদল খুব সাহসী লােক মেণ্ডেজের অধীনে পাঠানাে
হ'ল। ওরা অতি কষ্টে বার্থলােমিউকে উদ্ধার করে। কলাম্বাস
নিতান্ত নিরাশ হয়ে হিস্পানিওলার দিকে ফিরলেন। তাঁর নতুন
মহাদেশের আর আবিষ্কার করা হ'ল না।
এ যাত্রাতে তাকে ভীষণ ঝড়ের ভিতর দিয়ে ফিরতে হল।
এমন সাংঘাতিক সমুদ্রের ঢেউ তিনি আগে আর কখনাে দেখেন
নি। এক একটি ঢেউ পাহাড়ের মতাে ফুলে উঠে ভীষণ শব্দে
তুলাের মত একরাশি ফেণা উদ্গার করে চৌচীর হয়ে ফেটে
পড়ছিল। এক একবার জাহাজগুলি রসাতলে যাচ্ছে, এমন মনে
হত। বড় বড় আগুনের চুলাের ওপর প্রকাণ্ড কড়ায় জল যেমন
করে টগবগ করে ফুটতে থাকে, সমুদ্রের জলও তেমন করে দিগ,
দিগন্ত জুড়ে ফুটছিল। মেঘলা আকাশের ফাক দিয়ে সময় সময়
সন্ধ্যার একটু লাল আলাে যখন সমুদ্রের অশান্ত ঢেউয়ের ওপর
ছড়িয়ে পড়ত, তখন মনে হত রক্তের সাগর ফেণিয়ে ফেণিয়ে
ফেঁফাচ্ছে। মেঘগুলি এক একটি মাতাল দৈত্যের মতাে আকাশের

ডেরিয়ে যােজকে—কলাম্বাস
৮৭
এপার হ'তে ওপারে ছুটে বেড়াচ্ছে,—বিজলীর ঝিলিক, বজ্রের গর্জন
আর ঝড়ের মাতামাতিতে আকাশ তােলপাড় হচ্ছিল। এক
একবার কলম্বাসের মনে হত ঝড়ের এক ধাক্কাতে জাহাজগুলাে
চুরমার হয়ে যেন ধূলাের মত দিগদিগন্তে উড়ে যাবে। তার ওপর
ছিল মুষলধারে বৃষ্টি,—দিনরাত তার বিরাম নেই,যেন সারা
পৃথিবী প্রলয়ের জলে ডুবে যাবে।
এই বিপদে কলম্বাসের দু'খানি জাহাজ একেবারে নষ্ট হয়ে
যায়। লােক-লস্কর, জিনিষপত্তর অপর দু'খানিতে বােঝাই করে
কয়েক মাস পরে ১৫০৩ খ্ৰীষ্টাব্দের জুন মাসে তিনি জ্যামেকা দ্বীপে
পৌছেন।
এ দু'খানি জাহাজেও খুব জল ঢুকত। মাঝিমাল্লা সবাই
মিলে রােজ জল সিচে সিচে এতদিন জাহাজ দু’টি চালিয়েছে।
জ্যামেকাতে পৌছে জাহাজ দু'খানি বালির চড়ার ওপর ঠেলাঠেলি
করে তুলে রাখা হ'ল।
ওদেশের লােকেরা প্রথমে খুব শত্রুতা করতে লাগল।
কলাম্বাস অতি কষ্টে তাদের বশ করে তাদের কাছ থেকে কিছু রসদ
আর অন্যান্য জিনিষ যােগাড় করে নিলেন। তাদের কাছ হতে
১০ খানি ডিঙ্গী কিনে নেওয়া হয়। যাতে তার লােকেরা ওদের
উপর কোন উৎপাত করতে না পারে, সে দিকে তিনি কড়া নজর
রাখলেন। ওখানে ভাল কাঠ বা ছুতােরের যন্ত্রপাতি কিছুই ছিল না,
কাজেই ও দু’টি জাহাজ সেখানে সারিয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে
উঠল।

bobo কলাম্বাস সা ডােমিঙ্গো সহর ওখানে হ’তে ১২০ মাইল দূরে। ওখানে লােক পাঠিয়ে ওভাণ্ডোর কাছে তিনি আবার সাহায্য চাইবেন ঠিক করে ভাবছিলেন,—কা’কে পাঠানাে যায়। সাহসী মেণ্ডেজ, যেতে রাজি হ’ল। কলম্বাস একখানি লম্বা চিঠি স্পেন রাজের কাছে লিখে মেণ্ডেজের সঙ্গে দিলেন। সে স ডােমিঙ্গোতে পৌছে ওচিঠি স্পেনে পাঠিয়ে দেবে। সেই চিঠিতে কলাম্বাস তার নিজের দুর্দশার কথা, তার ছেলে দু’টির ভবিষ্যতের কথা লিখেছিলেন। প্রথমবার মেণ্ডেজ, চললেন, কয়েকজন মাত্র সঙ্গী নিয়ে কিছুদূর যেতে না যেতেই ইণ্ডিয়ানরা তার নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে তাকে খুব মার দিলে। বার্থলােমিউ সেবার নিজে গিয়ে তাকে রক্ষা মেণ্ডেজ আবার চলল ; এবার বেশী কয়েকজন লােক সঙ্গে গেল, আর পঁাড় টানবার জন্য কয়েকটি ইণ্ডিয়ানও সঙ্গে থাকল। তিনদিন পরে দারুণ রােদে আধ পােড়া হ'য়ে, তারা হিস্পানিওলার পশ্চিম উপকূলে গিয়ে পৌঁছল। সেখানে দু’দিন বিশ্রাম করে ওভাণ্ডার কাছে তারা চলে যায়। ওভাণ্ডার, মহাে নর-পিশাচ খুবই কম দেখা যায়। সে কত রকমে ওদেশে অত্যাচার করত আমরা তা কল্পনাও করতে পারিনে। একটি নমুনা দেওয়া যাচ্ছে। সে একদিন ওদেশের এক সর্দারের বাড়ীতে অতিথি হয়ে এক ভােজের আয়ােজন করে ; সেই ভােজে ওদেশের অনেক সর্দারকে নিমন্ত্রণ করা হল। সবাই যখন

ডেরিয়ে যােজকে—কলাম্পাস
ভােজে ব্যস্ত, সে সময় সে তার লােকজন দিয়ে সব সর্দারদের
ধরে বাড়ীর কাঠের খুঁটির সঙ্গে তাদের বেঁধে ফেললে; তারপর সেই
ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে সর্দারদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারল।
সে সেদেশের এক রাজকুমারীকে ধরে এনে তার ওপর নানা
অত্যাচার করে তাকেও ফাসি দিয়ে মেরে ফেলেছিল।
ওভাণ্ডোর এসব অত্যাচারের কথা তখনাে কলম্বাসের কানে
পৌছায় নি। ওভাণ্ডো কলম্বাসের বিপদের কথা সব জানত।
তার ইচ্ছা ছিল কলম্বাস অভাবে, কষ্টে পড়ে ওদেশেই মারা যা।
তাহলে সে নিজের ইচ্ছামত খুব অত্যাচার চালাতে পারবে।
এদিকে কলাম্বাস বড় বিপদে পড়ে গেলেন। যে দু’ভাই
পােরাসকে কলম্বাস কাপ্তান করে সঙ্গে এনেছিলেন তারা
বিদ্রোহী হয়ে কলম্বাসের বিরুদ্ধে এক বড় দল পাকিয়ে তুলল।
তারা জ্যামেকার নানা জায়গায় গিয়ে লােকদের বাড়ী লুঠ করতে
লাগল। তাদের দল বল নিয়ে তারা জ্যামেকার অন্য উপকূলে গিয়ে
আড্ডা করল।
ইণ্ডিয়া পােরাসূদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে
সাহেবদের তাড়াবার জন্য উঠেপড়ে লাগল। কলম্বাস খুব ফাপরে
পড়ে এক উপায় বের করলেন। তিনি গুণে দেখলেন ১৫০৪
খ্রষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের এক দিনে চঁাদের গ্রহণ হবে।
তাই তিনি সর্দারদের ব’লে পাঠালেন,—“তােমরা যদি সাহেবদের
অনিষ্ট করতে থাক,—দেখতে পাবে, অমুক দিনে চঁাদের মুখ
কালাে হয়ে যাবে—তারপর তােমাদের দেশ আগুনে পুড়ে

কলান্যাস
রইল।
ছাই হয়ে যাবে।” তা শুনে সবাই ওই দিনের দিকে তাকিয়ে
গ্রহণের দিনে যখন চাঁদের ওপর পৃথিবীর ছায়া পড়তে
লাগল,ক্রমে ক্রমে যখন চাঁদের আলাে প্রায় নিভে গেল,
তখন সবাই ভয়ে আড়ষ্ট। ছায়া যখন চলে গেল সর্দাররা
অনেক উপহার নিয়ে কলম্বাসের কাছে এসে বলে গেল, তারা
সাহেবদের আর শত্রুতা করবে না।
এরূপে প্রায় আটমাস কাটল ; মেণ্ডেজ, কোন খবর নিয়ে
এল না। তাতে কলম্বাস মনে করলেন হয়ত মেণ্ডেজ হিস্পানি-
ওলাতে পৌঁছতে পারেন নি, কিম্বা পথে মারা গেছেন।
একদিন হঠাৎ ওভাণ্ডোর একখানি ছােট জাহাজ এসে
কলম্বাসকে খানিকটা শূয়ােরের মাংস আর একপিপ মদ দিয়ে
জানিয়ে দিয়ে গেল,—ওভাণ্ডোর এমন কোন জাহাজ নেই যাতে
কলাম্বাসের অতগুলো লােককে স্পেনে পাঠানাে যায় ! জাহাজখানি
এই বলেই চলে গেল।
ও জাহাজটি এসেছিল গােয়েন্দার কাজ করতে,—কিরূপ
দুর্দশাতে কলম্বাস পড়েছেন তা জেনে নিতে। তাতে কলাম্বাসের
লােকেরা খুব নিরাশ হয়ে উঠল। কিন্তু কলম্বাস ওভাণ্ডার
এই ঘৃণিত ব্যবহারে মনে খুবই ব্যথা পেলেন, কিন্তু বাহিরে
আনন্দের ভাব দেখিয়ে সবাইকে বলতে লাগলেন,-“তােমাদের
কোন ভাবনা নেই। শীঘ্রই জাহাজ আসবে—যাতে আমরা স্পেনে
চলে যেতে পারবাে।”
ওদিকে পােরা দু’ভাই যখন শুনতে পেলে ওভাণ্ডে

ডেরিয়ে যােজকে—কলাম্বাস
;
;
কলম্বাসকে সাহায্য করতে নারাজ হয়েছে, কলাম্বাসও রােগে,
দুর্ভাবনায় কাতর হয়ে পড়েছেন, তখন তারা দল বেঁধে এসে
কলাম্বাসের লােকদের আক্রমণ করলে।
বার্থলােমিউ ছিলেন খুব সাহসী ;
ছিলেন খুব সাহসী; আর কলম্বাসের সঙ্গে
যারা ছিল সবাই ছিল তার খুব অনুরক্ত। দু’দলে খুব লড়াই
হ'ল ; ফ্রান্সিস্ পােরা বন্দী হ’ল ; দলের অন্যান্য লােকেরা
কলাম্বাসের কাছে ক্ষমা চাইলে। কলম্বাসের মন ছিল খুব বড়।
তিনি সবাইকে ক্ষমা করে দলে নিলেন।
ওদিকে মেণ্ডে আট মাস বসে বসে ওভাণ্ডোর কাছ থেকে
কোন সাহায্যই পেতে পারলে না। একদিন যখন ওভাণ্ডে কোন
কাজে সঁ ডােমিঙ্গো হতে দূরে এক জায়গায় চলে গেছেন, ঠিক
সেই সময় সে বন্দরের একখানি জাহাজে মদ, রুটি, মাংস, শূয়াের,
ভেড়া, আর ফল একরাশি বােঝাই করে জাহাজখানি নিয়ে
একেবারে জ্যামেকাতে কলম্বাসের কাছে চলে গেলেন।
এই নতুন জাহাজ আর রসদ পত্র দেখে কলম্বাসের লােকদের
আনন্দ দেখে কে! তারা সবাই ১৫০৪ খ্রীষ্টাব্দের ২৮শে জুন
জ্যামেক হ’তে স্পেনের দিকে রওয়ানা হলাে।
যাবার পথে কলাম্বাস হিস্পানিওলাতে পৌছে ওভাণ্ডার
অত্যাচারের সব কথা শুনতে পান! তাতে তার মন, প্রাণ একে-
বারে দমে যায়। স্পানিয়ার্ড রা নিরীহ লােকদের ওপর যে ভয়ানক
অত্যাচার করেছে তার কথা মনে করে তিনি নীরবে অশ্রু বিসর্জন
করতেন। তিনি ভগ্ন-মনে, জীর্ণ, শীর্ণ শরীর নিয়ে স্পেনে ফিরে

৯২
কলাম্বাস
•
গেলেন। রােগে, দুশ্চিন্তায়, অভাবে তাঁর শরীর মন একেবারে
ভেঙ্গে পড়েছিল।
স্পেনে এসেই শুনলেন সহৃদয়া
রাণী ইসাবেলা মৃত্যু-
শয্যায়। এই রাণীর অপার দয়া, উৎসাহ ও অভয় কলাম্বাসকে
সকল দুঃখ, নৈরাশ্য ও বিপদের মধ্যে রক্ষা করে এসেছিল। কিছু
দিনের মধ্যেই রাণী মারা যান। তাতে কলম্বাস নিতান্ত অসহায়
হয়ে পড়লেন। তখন বাজা নানা লােকের পরামর্শ শুনে চলতেন
তার ওপর নির্ভর করা যেত না।
কলম্বাসের টাকাকড়ি, জিনিষ পত্তর—যা বােবাডিলা লুঠে
নিয়েছিল তা পাবার জন্য, আর গভর্ণর ও রাজপ্রতিনিধির উপাধি
তাঁকে আবার দেবার জন্য তিনি রাজার কাছে অনেক প্রার্থনা
করেন,—রাজা তার কোন জবাব দিলেন না।
অবশেষে ১৫০৫ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসে কলম্বাস একটু সুস্থ হয়ে
রাজা ফার্দিনান্দের দরবারে উপস্থিত হলেন। রাজা এবার তাঁকে
তেমন আদর অভ্যর্থনা কিছুই করলেন না। এখন কলম্বাসের
মৃত্যু হলেই তিনি যেন সুখী হন এমন ভাব দেখালেন!
এত উপেক্ষা, নিরাশা ও অবিচারের ভারে তার শরীর ও মন
দিন দিন ভেঙে যেতে লাগল। ১৫০৬ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসে তিনি
পরলােক গমন করেন।
তার মৃত্যুর পরে রাজা ফার্দিনান্দ, কলাম্বাসের কবরের ওপর
একটি লাইন লিখিয়ে দিয়েছিলেন তার অর্থ এই ঃ-
“কলাম্বাস স্পেনকে এক নতুন জগৎ দিয়ে গেছেন।”

মৃত্যুর পনে
কলাম্বাস কত বড় মহাদেশ আবিষ্কার করে গেলেন, তিনি
তার মৃত্যুদিন পর্যন্তও তা জানতে পারেন নি। তার প্রায়
একশাে বছর পরেও ইউরােপের লােকেরা উত্তর আমেরিকার পশ্চিম
উপকূল আবিষ্কার করতে সক্ষম হয় নি। তাই অত বৎসর আগে
সামান্য জাহাজ, লােকজন, যন্ত্রপাতি নিয়ে, লােকের মূখত,
কুসংস্কারের বাঁধন কেটে মহাসাগরের পরপারে এক মহাদেশ
আবিষ্কার করতে যাওয়া কত বড় সাহসের কাজ তা আমাদের
ধারণারও বাহিরে। তিনি অনেক প্রতিকূল অবস্থার ধাক্কা
সয়েছেন, অসংখ্য বিপদ, লাঞ্ছনা বুক পেতে নিয়ে যে আবিষ্কার
করে গেলেন, তার ফলে তার জন্মভূমি জেনােয়া, আর কৰ্ম্মভূমি
স্পেনরাজ্য যে গৌরবান্বিত হ’ল এমন নয়, এই আবিষ্কারের
ফলে ইউরােপ আজ এত বড় হয়ে উঠেছে।
কলম্বাসের পর হ’তে ইউরােপের দৃষ্টি সমুদ্রের দিকে ফিরেছে ;
দলে দলে তােক সমুদ্র পথে বের হয়ে নানা দেশ আবিষ্কার করেছে,
নানা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছে। আজকাল উত্তর ও দক্ষিণ
আমেরিকাতে ছােট বড় যে সব রাজ্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছে,
তার মূলেই কলম্বাসের সাধনা,কলাম্বাসের আমেরিকা
আবিষ্কার।

৯৪
কলাঘাস
ওভাঙোর অত্যাচারের কথা যখন স্পেনের লােকেরা জানতে
পারল, তাকে পদচ্যুত করে তার স্থানে কলম্বাসের ছেলে জেমসকে
এডমিরাল উপাধি দিয়ে ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপগুলির গভর্ণর করা হয়।
তার পরে তিনি “ডিউক অব, ভিরাগুয়া” উপাধি পান;এই উপাধি
এখনাে কলম্বাস পরিবারের রয়েছে। কলম্বাসের ছােট ছেলে
ফার্দিনান্দ, বিয়ে করেন নি,—তিনি কলম্বাসের জীবনের বিবরণ
সংগ্রহ করে আজীবন ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর লেখা
কলাম্বাসের এক জীবনী রয়েছে। কলম্বাস যে সব বহি, মানচিত্র,
যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতেন, তার অনেকগুলাে সেভিল দেশের
কলান্থাস লাইব্রেরীতে, আর জেনােয়ার মিউনিসিপাল প্রাসাদে
এখন দেখা যায়।
কলাম্বাস দেহত্যাগ করেন স্পেনের ভ্যালাদোলিদ স্থানে ;
তাকে কবর দেওয়া হয় সেভিল নগরীর এক গির্জাতে। তাঁর
মৃত্যুর বিশ বৎসর পরে তার ছেলে জেমসের মৃত্যু হয় ; তাকেও
কলম্বাসের কবরের কাছে গাের দেওয়া হয়েছিল। বিশ বছর
পরে দুজনের মৃতদেহ সঁ ডােমিঙ্গোতে নিয়ে কবর দেওয়া হয়।
১৭৯৫ খ্ৰীষ্টাব্দে ফরাসীরা হিস্পানিওলা অধিকার করে ; তখন
দু’জনের মৃতদেহ কিউবা দ্বীপের রাজধানী হাভানা নগরে নেওয়া
সেখানেও তাদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয় নি।
০ বৎসর আগে আবার মৃতদেহ দু’টি সেভিল নগরীতে ফিরে
আনা হয়েছে।
কলাম্বাস যখন বেঁচেছিলেন, ছােট
বড় অনেক নাবিক

No text on this page.

.
wwe
स
८. रिकार 7-Jऊ. मिलिन ८८.८...
tu.zz."1-21... Tirn.
P:/t.isticfile R... Contra.maa.itter.

't মৃত্যুর পরে কলাম্বাসের পথ ধ'রে পশ্চিমে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে জেনােয়াবাসী জন্ ক্যাবােট ও ব্যালবােয়া প্রধান। ক্যাবােট কলম্বাসের আবিষ্কারের কথা শুনে স্পেনে যান। সেখানে পশ্চিম সমুদ্র-পথের অনেক বিষয় জেনে ইংলণ্ডে চলে আসেন একখানি জাহাজের যােগাড় করতে। তিনি ম্যাথুস নামে একখানি জাহাজে চড়ে ১৪৯৭ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসে ব্রিষ্টল নগরী হ’তে পশ্চিম মুখে যাত্রা করেন। তিনি কানাডার উপকূলে কে’প ব্রিটন দ্বীপ আবিষ্কার করেছিলেন। ব্যালবােয়ার বাড়ী ছিল স্পেনে। তিনি ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দে একবার অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে হেইতী দ্বীপে গিয়ে ফিরে আসেন। পরে ১৫০৯ খ্রীষ্টাব্দে যখন কলম্বাসের ছেলে জেমস্ ওয়েষ্ট ইণ্ডিস্ দ্বীপের গভর্ণর হয়ে যান, তার সঙ্গে ওদেশে গিয়ে তিনি ডেরিয়ে যােজকের গভর্ণর হন। তিনি ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের ২৫শে অক্টোবর ঐ যােজকের মাঝখানে যে একটি পাহাড় আছে তাহার চূড়ায় উঠে প্রশান্ত মহাসাগর প্রথম দেখতে পান। তার পূর্বে ইউরােপের কোন লােক ও মহাসাগরের কথা জানতাে না। ব্যালবােয়ার অদৃষ্ট কলম্বাসের চেয়েও অধিক শােচনীয় হয়েছিল। তাঁর শত্রুরা তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযােগ আনে। প্রশান্ত মহাসাগর আবিষ্কারের চার বৎসর পরে স্পেন রাজার আদেশে তাকে কেটে ফেলা হয়। যে দু’জন মহাপুরুষ যশে ও গৌরবে স্পেন জাতির নাম ইউরােপে অদ্বিতীয় করে তুলেছিলেন, তাঁদের কপালে এত দুর্দশা।

কলাম্বাস কিন্তু কলম্বাসের মাতৃভূমি জেনােয়া—যার কোলে কলাম্বাস মানুষ হয়েছিলেন, যার বুকে থেকে বাল্যে ও যৌবনে তিনি সমুদ্রের উদার ডাকে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, সেই তাঁর জন্মভূমি জেনােয়া—তার স্মৃতি রক্ষা করেছে। তােমরা জেনােয়াতে যখন যাবে, বন্দরের মুখেই তার এক বিরাট প্রস্তর মূর্তি দেখতে পাবে, খুব উচু মর্মর পাথরের বেদীর ওপরে একটি নােঙরে হেলান দিয়ে কলাম্বাস দাড়িয়ে,মুখে তার অসীম গাম্ভীৰ্য-দৃষ্টি তঁার সাগরের পারে—দূর দিগন্তের দিকে—তার পায়ের কাছে এক নবীন নারীমূৰ্ত্তি বসে আছে—সে হচ্ছে— আমেরিকা”

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Colambas

Author
Dasgupta ,gangacharan
Title
Colambas
File name
Colambas
Text
OCR done
Citation
1929
Published
2010/01/29
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
136
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Literature
Keywords
Rani Isabela
DLI number
512568
Barcode
4990010019631.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
rZYNc25abq9
Download PDF

Colambas