Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Shankhasur Badh Vol. 1

Goswami,fakirchand · 2009/11/30

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শৃঙ্খসুর বধ।
[ কাব্য।]
প্রথম খণ্ড
ফকিরচাদ গােস্বামী কর্তৃক
বিরচিত ও প্রকাশিত।
১নং ভগবান বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলি, আহরীটোলা স্ক্রট,
কলিকাতা।
গান ১৩১১ সাল
মুল। এ বার অনা।

PRINTED BY B. H. PAUL at the
HINDU DHARMA PRESS.
70 Aheereetola Street, Calcutta.

ভুমিকা।
মদীয় পূৰ্বপুরুষ শ্ৰীশ্ৰীনিত্যানন্দ প্রভুর পিতামহ মহাকবি কৃত্তিবাস
রামায়ণ রচনা করিয়া বঙ্গভাষার গৌরব বৃদ্ধি করত অদ্যাবধি
জীবিত আছেন, সেই ভাবিয়া আমার যশােলিা এতদূর বলবতী যে
আমিও সেই দুরূহ পথের পথিক হইতে বাঞ্ছা করিয়াছি। জানি
না, আমার ভাগ্যে কি ঘটে
কতিপয় কারণ বশতঃ এই কাব্যের কেবল পঞ্চম সর্গ পর্যন্ত
জন-সমাজে প্রচার করিতে বাধ্য হইয়াছি। এই কাব্যে আমি সম্পূর্ণ
রূপ পৌরাণিকী ঘটনা অবলম্বন করি নাই। আর ইচ্ছাপূৰ্ব্বক
স্তুতি প্রভৃতি কতকগুলি ক্রিয়া ব্যবহার করিয়াছি। এই কাব্য যে
কত সর্গ সমাপ্ত হইবে, তাহা বলিতে পারিলাম না।
পরিশেষে নিবেদন এই যে, মুদ্রাঙ্কণজনিত স্থানে স্থানে প্রমাদ
ঘটিয়াছে। এস্থলে তাহার একটী উল্লেখ করিতেছি।
২৭ পৃষ্ঠায়
১২ পংক্তিতে ‘করিল পঙ্কিল স্থানে তাহারে পঙ্কিল’ এইরূপ বর্ণ
বিপর্যয় ঘটিয়াছে। সহৃদয় পাঠকবর্গ স্থলে স্থলে এইরূপ :
আগে করিয়া পাঠ করিলেই বাধিত হইব ।
আহরীটোলা,
১নং ভগবান বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেন,
কলিকাতা।
২রা ভাদ্র, ১৩১১ সাল।
ফকিরচাদ গােস্বামী

No text on this page.

শঙ্খশুর-বধ কাব্য।
প্রথম সপ্ন।
প্রণমি, কবীন্দ্র-মুনি, তােমার চরণে,
দ্বৈপায়ন, জগতের কবি-কুলমশি,
অসীম কবিত্বকীর্তি,-সাগর সমান
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড ব্যাপি রহিয়াছে তথ;
কল্পনা-তরঙ্গ যাহে উঠে অনির,
বিশ্বসম ভাসে হে আমার রচনা।
হীন কবি, কিন্তু সদা যশে অভিলাষ,
বামন হইয়া চাদ ধরিবারে আশ।
ভেলায় ভরসা করি হায়, মুড়মতি,
অপার সাগর পার হইতে বাসনা ।
তবে কি গাে, অন্ধ যেই সুন্দর মুরতি
হেরিতে বাসনা আর হয় না কখন ?

[ ২ ]
যবে দেবা-রণে দানবেন্দ্র বলি,
চির-কোলাহলময় সাগরের তীরে,
করিল নারাচাঘাত সহলােচনে,
সহিতে না পারি সেই প্রচণ্ড প্রহার
কোপেতে কুপিয়া; যেন মাতঙ্গ অঙ্কুশে,
জ্বলিল সহ অক্ষি, রিলা দম্ভোলি,
যথা যবে ঘাের রণে ত্রিপুর-সংহারে
ধরিলা কৈলাসপতি ভীম শূল করে।
হুঙ্কারি বাসব, ভীম অস্ত্র ঘােরনাদে
দিলেক ছাড়িয়া রােষে বধিতে দানবে,
চন্দ্র সূর্য গ্রহকুল কাপিতে লাগিলা ;
মন্দ্রিল জীমূতবৃন্দ্র ভৈরব আরবে।
বহিল পবন বেগে, কাপিতে লাগিল
বলির হৃদয় ঘন বেগে ; সে ব্যাপারে
কঁপিল কৈলাসগিরি, সতীর সহিত
চমকি উঠিল বিশ্বনাথ ক্ষণে ক্ষণে।
উজলি অম্বরপথ ভীষণ অশনি
পড়িলা দানববক্ষে, অমনি তখন
বিশাল নগেন্দ্র তুল্য দৈত্যকুলপতি-
স্থা গুরা, হা শুক্রাচার্য্য বলিয়া তুয়ায়
মুদিলা নম্বনদ্বয়, প্রচণ্ড প্রহারে ।
ব্যোমপথে ধ্বনিল দুন্দুভি মুহুর্মুহু
ব্রিদশ-অলিয়ে মৃত্যু অমর-অঙ্গনা
বৃষিলা পুষ্পাসার জুররাজ-শিরে।

বিলাপী বিলাপধ্বনি, জয়ী জয়নারে,
উভয় জারবে স্তব্ধ বিশ্ব চরাচর।
এখানে পুরীর মাঝে মহেশ-মন্দিরে
জালিয়া ধৃতের বাতি রাণী বিন্ধ্যাবলী,
সুগন্ধি ধূলেতে কৰি মঠ আমােদিত,
সিত চন্দনেতে সিক্ত করি খেতফুল,
সুজতের বিল দিয়ে বারবার,
স্বামীর মঙ্গল হেতু নববরণী
ঘজত ভৈরব-লিঙ্গ করে আরাধনা।
কনক লঙ্কায় যবে নিকষানন্দন
জানকীবল্লভ সহ রণে প্রবেশিলে,
স্বামীর কল্যাণ হেতু রাণী মন্দোদরী
পূজিবারে ছিল যথা দেব দিগম্বরে।
পূজা সাঙ্গ করি তবে দানব-ঘরণী
কহিছে যুড়িয়া কর শঙ্করের পদে ;-
নমস্তে ঈশান, হর, কৈলাস-নিবাসী,
বামদেব, বিলােচন, ত্রিপুর-সংহারী,
পার্বতী-বল্লভ, শঙু, পশুপতি, শালী,
মদন-অস্তক, বিষ্ণু মৃড়, চন্দ্রচূড়
পন্নগ-ভূষণ, নাথ, খলাতকারক।
মাহি জানি স্তুতি ভক্তি না জানি পূজ
কৃপা করি এ দাসীরে হইয়ে সদয়,
রাখিও সতত মাের স্বামীরে সময়ে
তোমার চরণে দাসী করে গাে মিনতি।

[ ৪ ]
দুরন্ত স্ব গত নিশিতে হেয়েছি,
তাই, নাথ, কঁাদ প্রাণ সতত আমার,
হে শিব, মলময়, ভকৎসা,
করহ দাঙ্গীরে কাজি ও বিপদ ত্রাণ।
সহসা কাপিল সেই একটি মন্দির,
কঁপিল ধুতুরা ফুল ধূর্জটির শিরে,
শ্বেত চন্দননতে সিক্ত করি কিবল
পূজিয়া ছিলেন যাহেদেব দিগরে
কপিল বলির সেই বিচিত্র প্রসাদ
কাপিতে লগি জ র র পরে,
নাদিল পয়ােধিনাথ গম্ভীর নির্ঘোষে ;
মাংসাশী শকুন্তল অনর পথ
প্রভাকর কররাশি করিলা মনি
ঘাের রবে শিবাদল উঠিল ডাকিয়া
কতক্ষণে সুলােচনা করবরী,
সখীরে সহ্মোধি ৰাম কহিতে লাগিল
দক্ষিণ নয়ন মাের কল লো নাচিছে?
হেরিতেছি দশদিক শূন্যময় কেন ?
কেন লো নিভিল বাড়ি মহলের
পদে পদে দুর্নিমিত্ত হেরিতেছি কেন?
কে যেন কহিছে সেরে শুণকুহরে,
“হারাইলি প্রাণপতি তুই, অগিনি।
হায়! বুঝি এত দিন শিবদাত শি
ৰামদেব হল, সই, আমার কপালে ?

[ ৫ ]
হায় রে, ভাসিল বুক নয়ন-আসার
প্রফুল্ল কমল-ভাতি বদন-মণ্ডল
শশাকের সাগরে মগ্ন হেরি সহনী,
অঞ্চলে নয়ন-নীর মুছতে মুছতে
প্রবােধিতে লাগে তারে সুমধুর যা
অশােক-কাননে যথা সরম সীতাকে -
“জগজনে বলে তােমা নারী-শিরােমণি,
তবে কেন মুখশশী শােক-রাহু গ্রাসে?
ভাবনা ত্যজিয়ে ভাৰ নিত্য নিরজনে,
হবে অমঙ্গল দূর যে পদ স্মরিলে।”
হেন কালে তথা এক ভগ্নদূত আসি
যুড়িয়া যুগল পাণি রাণীর সম্মুখে
হেটমুণ্ড করি—তাহে বিরস বদনে
চিত্রিত পুত্তলি প্রায় রহে দাণ্ডাইয়া।
দূতে দেখি, বিষাদিনী কহিলা তখন ;-
“কহ, দূত, রথিকুল যার বাহুবলে
সতত শঙ্কিত, হেন জনে বুঝি কোন
ঘটেছে ব্যাঘাত ? নহে কেন আজ তব
হেথা আগমন ? এবে বুঝিলাম আমি ;
ত্বরায় বার বলি স্থির কর মােরে।
সহে বিলম্ব আর শুনিতে বারতা।
রাণীর বদনে শুনি এতেক বচন,
কহিতে লাগিল। দূত সকরুণ সুরে।
ভীষণ অশনি ছাড়ি দেব শচীনাথ

[ ৬ ]
করেছে দৰে মাৰি তােমা অনাথিনী
দূতমুখে শুনি রাণ এতে বচন
মুচ্ছিত হইয়ে ভূমে যায় গড়াগড়ি।
কতক্ষণে সুলােচনা পাইয়া চেতন
উচ্চরবে কাঙ্কি রাণী লাগে বিলাপিতে ;-
এই কি শােভে তােমায়, দৈত্যপতি তুমি,
হায় নাথ, উঠ, যাও দেবরাজ যথা
কালদণ্ড সম বজ্র আক্ষালি ভীষণ
দলিছে দানবদল ঘাের রণস্থলে।
নাশহ সমরে তারে শুল-দও ধরি
নাশ, দৈত্যপতি, তারে, ভুলি এ যাতনা ।
বৈধব্য-যাতনা, দেব, ভুলিগো সত্বরে।
কি কাজ বিলাপে, তুমি বীরধর্ম পালি
গেলে বীরলোক। এবে অনাথিনী আমি !
হায় রে দুঃখের কথা আর কব কারে ?
হতজ্ঞান আমি আজি পতির বিহনে।
পূজি পঞ্চাননে আমি পরম যতনে ;
তার প্রতিফলে বুঝি ফলিল এ ফল।
হায় নাথ, কে না জানে এ ভবমাঝায়
পতি বিনা অবলার কি গতি জীবনে ?
উঠ, না, কর কণ শচীনাথ সনে ।
কাল সম দেবরফ হের তব পুয়ে
প্রবেশি লুটিছে ব রতন-ভাণ্ডার। .
ধর অস্তু আজি পুন বীরমদে মাতি,

অমরের রক্তে রাঙ্গা কর রণস্থলী
ভেদি অমর বীর প্রচণ্ড ত্রিশুলে
রণভূমে অনায়াসে করেই শয়ন ।
কোথায় রহিল তৰ তৃণ খড়গ অসি!
হায় রে, কেমনে না, মরিলে অকালে
হায়, নাথ, কহ কি কহিব তবে, যবে
ত্রিলোকেতে এ বার ঘােষিবে সকলে?
শুনেছিনু গুরুমুখে মধুর ভারতী
অমর গাে তুমি, নাথ, এ মর-ভূমিতে।”
কেন বৃথা গিয়ে দ্বন্দে অমরের সনে
মারিলে দানব-বালা মরিলে আপনি।
কেমনে এ অপমান সব এ পরাণে,
শৃগালের পদরজ মৃগেরে ভালে?
জানি আমি তােমা কহে রথিকুলপতি,
কিন্তু, নাথ, ইহা যদি হত সত্য বাণী,
তা হলে কেমনে দেবে করিল নিধন ?
পুরী ক্রন্দনের রােলে।
পুত্রহীনা আমি, নাথ, জানে জগজনে।
কে রাখিবে এবে মােরে কহ প্রাণপতি।
হায় রে, এ লােকাকীর্ণ ধরাধাম আঞ্জ
শ্মশান আমার পক্ষে। এ পােড়া কপালে
লিখিলা বিধাতা কি গাে এ দারুণ বিধি-
দহিতে এ অভাগীরে বৈধব্য-অনলে ?
হায় রে, কি দোষে, নাথ, ত্যজিলে পরাণ
আজ কি পুরিত

f ৮ } ঐ কাল-শয়নে ? স্মরিলে বিদরে হি। কোথা একে মান তব ? মহাভীরু তুমি ! নহে কেন হেন গতি হবে গাে আমার ? কেন বা ভাসিবে মহী মাের নেত্রজলে। যাও চলি, মহাবীর, যাও বীরপুরে, তব পিতৃ-পিতামহ শূলপাণি বীর- হিরণ্যকশিপু বিহারিছে বীর সনে। আর কি কহিবে দাসী ও পঙ্কজপদে, পুরুক দানবপুরী হাহাকার রবে, করুক অম্বর রোধ লােদনের রােলে।” এতেক বিলাপি রূণী কহে কর যুড়ি পার্বতী-বল্ল বল্লভ প্রতি গদ গদ ভাষ্ণে; *জয় মৃত্যুঞ্জয়, হর, ভুজঙ্গ-ভূষণ, সকলি সম্ভব তব হয় কৃপাময়। কৃপা বিতরিমে, নাথ, বাঁচাও পতিরে, বাঁচাও পার্বতীপতি পতিহীন জনে।* হেনকালে দৈববাণী ধ্বনিল গগনে,- পাইবি লো পতি, ধনি, ফিরি পুনরায় ৮ সঞ্জীবনী বিদ্যাৰলে পতিরে তোমার শুক্রগুরু দিলা প্রাণ সমরে মরিলে। হেন বাক্য শুনি তবে দানব-নন্দিনী প্রণমি শঙ্করে চিত্ত করিলেন স্থির। এখানে সাগর-তীরে দানবের পতি সংগ্রামে হারিয়ে ফিরি আসি নিকেতন

[ ১ ]
ভাবে দিবারাত্র বসি আপার কারন
বিমর্ষ হইয়া রাজ রহ নিরন্ত,
সকাল কি মন-কেমনে শালিক
বধারী মহাবীর অদিতিনন্দন।
পরিষদে পরামর্শ দিয়ে কত মতে
পারেনি করিতে অর তুষ্টির সাধন;
অনন্তর একদিন তুদ্ধিনাথ
রাজ-সিংহাসনে বসি আচ্ছন সভায় ;
হেনকালে তথা ভ্রজটা, মহাতেজা,
কৌষেয়-বসনধারী, বৈষ্ণব-প্রধান,
ঋষিকুল-ধ্যেয় ঋষি ব্ৰক্ষার নন্দন,
হ’ল উপস্থিত যােগী জগৎনিবাস।
ব্ৰহ্মার কুমারে হেরি সভাস্থ সকল
করিলেন অভ্যর্থনা তাজিয়ে আসন
হীরকখচিত হৈম-সিংহাসন ত্যজি
গললগ্নীকৃতবাসে দানবের নাথ
পাদ্য অর্থ দিয়াে তারে করিল সম্ভা।
রাজকত্ত পূজা ঋষি করিয়া গ্রহণ
অরি নারায়ণ, ধীর বসিল। আসুন
নমি ঋষি-পদে দৈত্য কহে কর বুড়ি
সর-বারতা যত দেবরাজ সনে -
শুন, দেব, নিবেদি আমি ও রাঙ্গণে
পেয়েছি সংগ্রামে লাজ দেবের সমাজে।
কতমতে পরামর্শ দেয় মন্ত্রিগণ,

[ ১ ]
মানেনা অবােধ মন প্রবােধ তাহাতে।
অপমান রূপ অহি বিস্তারিয়ে ফণা
দংশিতেছে সদাকাল অন্তরে আমার,
সহেনা শরীরে আর সে বিষের জ্বালা,
করহ বিধান তার বিধির নন্দন।
এতেক বচন যদি উত্তরিলা বলি,
কহিতে লাগিল। তবে ব্রহ্মার নন্দন -
ইতিমধ্যে একদিন অমর-আলয়ে
শুধৰ্ম্ম। সভায় আমি হয়ে উপস্থিত
দেখিলাম, তথা ইন্দ্র সুরগুরু-সনে
গাইতেছে তব নিন্দা দিবস রজনী।
সহিতে না পারি আমি তব পরিবাদ,
ত্বরায় এসেছি তাই দিতে এ বারতা।
পরমার্থ-বন্ধু তুমি ধরায় আমার,
তক নিন্দা শুনিতে না পারি এ শ্রবণ।
আসিতে আসিতে আমি তােমার আগারে,
চিন্তিনু অন্তরে, রাজা, ইহার বিধান।
দেখিলাম তুমি এবে সুতের সহায়-
ব্যতীত, জিনিতে কভু নারিবে বাসবে।”
শুনিয়া ঋষির বাণী, রাজার তখন
আকাশ ভাঙ্গিয়া যেন পড়ি মস্তকে।
কহিতে লাগিল। তবে দানবের নাথ ;-
নাহি মাের পুত্র, প্রভু, ভাগ্যহীন আমি,
করিক কেমনে তবে শত্রু-পরাজয় ?

( ১৯ ]
হায় রে কপাল ! ঋষি কি হবে উপায় ?
মিটিল না মন-আশা পূরিল না পণ,
অতল জলধিতলে গেনু তলাইয়া ।
বিপদ-সাগরে, দেব, তুমি কর্ণধার,
দয়া করি, দয়াময়, করহ উপায়।
তােমার হইলে কৃপা করে নাহি ডর,
কি ছার, সামান্য গণি দেবরাজ অরি।”
দানবেন্দ্র-মুখে শুনি জগৎনিবাস
জলদ-প্রতিমস্বনে কহিতে লাগিলা ;
*গুরুর আশ্রমে রাজা করহ গমন,
পাইবে তনয় তুমি তঁাহার কৃপায়।”
এইরূপে প্রবােধিয়া যােগীন্দ্র-প্রধান,
ত্রিতন্ত্রী বীণাতে তার মূচ্ছনা করিয়া
হরি গুণ গান করি বিমান মার্গেতে
ব্লানবের পুরী হতে করিলা পয়ান ।
প্রভাতিলে বিভাবরী বীরেন্দ্র-কেশরী,
অর্পিয়ে সচিৰ-করে মহারাজ্য-ভার,
পুত্র-কামনায় রাজা পরম প্রীতিতে,
ভক্তি-সমন্বিত চিত্তে চিন্তি বিধাতায়,
সুবর্ণ-প্রতিমা সমা রাণী সঙ্গে করি
আচার্য্য-আশ্রমে যেতে হইল উৎসুক।
গম্ভীর নিনাদী এক মেঘতুল্য রথে
রাজ্ঞীর দক্ষিণ করে নিজ বামকর
করিয়ে অর্পণ, বীরু দানবের পতি

[ ১২ ]
জলদ-দামিনী সহ তাহে আরোহিলা।
সুন্দর স্তনে উঠি বসিলা রাজন;
বসিলা তঁাহার বামে রাণী বিন্ধাবলী,
কি অপূৰ্ব শােভা তথা হইল তখন,
ঘনবর-পাশে যেন সুস্থির বিজলী।
চালাইয়া দিল রথ সারথি তখন
দণ্ডারণ্য-মুখে, যথা গুরুর আশ্রম।
চলিল বিচিত্র রথ পবন-গমনে,
ধাইল আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা দেখিতে।
রাজদেহ রক্ষা হেতু, নিষ্কোষিত অসি
করে ধরি অশ্বেপরি করি আরোহণ,
কেহ বা রথের বামে কেহ বা দক্ষিণে,
সম্মুখে পশ্চাতে থাকি করিছে গমন।
রাজমাৰ্ম্ম পার্শ্ববর্ত্তী অট্টালিকা’পরি
সম্পূর্ণ গবাক্ষদ্বার করি উন্মােচন
নিমেষ, লোচনেতে পুরাঙ্গনগণে
লাগিল দেখিতে তারা রাজপথ পানে।
ঈষৎ কম্পিত করি মহীরুহ দল,
অগুরু চন্দন গন্ধ করিয়া বহন,
প্রস্ফুটিত প্রসূনের পরাগে মিশিয়া,
বহিতে লাগিল বায়ু হয়ে অনুকুল।
তদীয় রথের ওনি ঘর্ঘর নির্ঘোষ
সতত হিংসায় রত শাৰ্দলের দল
গভীর গর্জন করি রথবষ্ম হতে,

[ ১৩ ]
চমকি পায়ে দ্রুত নিবিড় কাননে।
আবার রথের শুনি গম্ভীর নিনাদ,
ময়ুর ময়ুরিগণ মেঘ অনুমানে,
আনন্দিত মনে পাখা প্রসারিয় সবে
লাগিল নাচিতে তারা করি কেকারব।
হরিণ হরিণিগণ হইয়া তৎপর,
কিঞ্চিৎ অদূরে থাকি বিমানবত্মের,
পবন অধিক গতি রাজ-রথপানে
চাহিয়া রহিল তারা নিশ্চল নয়নে।
কোথাও কানন মাঝে অরবিন্দ দল,
বিকসিত হয়ে সব সরসী-মাঝারে,
ঈষৎ কম্পিত তায় পবন হিল্লোলে,
বনস্থলী আমােদিত করিছে সৌরভে।
যাইতে যাইতে পথে দম্পতী তখন,
প্রস্ফুটিত পথােকহ-পল্লবে নিরখি,
নিজ নিজ নােচনের তুলনা করিয়া,
আনন্দ বিহবল চিত্তে করিল গমন।
বাম করতল দিয়ে রাণীর আনন
উত্তোলন করি রাজা পূর্ব-দেব পতি,
বিমান-বিহারী যত বিহঙ্গম দলে
দেখাইতে লাগিলেন আনন্দিত মনে।
কোথাও ব্রাহ্মণগণ অর্থ করে করি,
স্বস্তি বচনাদি সবে মুখে উচ্চারিয়া,
ছুক্ষনবত্মে আর দক্ষিণেতে থাকি

[
১৪
L
অপেক্ষা করিতেছিল রাজ-আগমন।
থামাইয়া রথ তথা অনুরাধিপতি,
ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ করিয়া গ্রহণ,
বিতরিয়া বহু রত্ন শুভাকাঙ্ক্ষী জনে,
চলিছে দানব পুনঃ আশ্ৰমাভিমুখে।
কত শত নদ নদী, কত জনপদ,
গভীর কানন, কত গিরি, প্রস্রবণ,
এড়ায়ে বহুল পথ পরিশ্রান্ত হয়ে,
উত্তরিলা দণ্ডারণ্যে দম্পতী তখন।
দেখিলেন দোহে তথা শ্রীগুরু-আশ্রমে ;
কানন হইতে যত তপস্বী ব্রাহ্মণ
সমিৎ কুশাদি তারা করি আহরণ,
আসিছে আশ্রমে ফিরি প্রফুল্ল বদনে।
সদ্যোজাত ধৃত দিয়া ঋষিগণ যাহা
প্রজ্বলিত হববাহে দিয়েছে আহুতি,
উগারিয়া মনোেহর গন্ধ সেই ধূম,
করিতেছে সুরভিত শুক্রের আশ্রম।
পশ্চিম আকাশ-কোণে গেল দিননাথ,
কমল মুদিল আঁখি সরসী মাঝারে,
পতির সতী যেন স্বামীর মরণে
নিভাতে মনের জ্বালা হ’ল সহগামী।
এহেন সময়ে তারা পবিত্র অন্তরে
অদূরে রাখিয়া রথ চরণে চলিয়া,
যুগলে যতনে স্মরি শ্রীমধুসূদন,

1
[ ১৫
চির শান্তিময় ধামে করিলা প্রবেশ।
সায়ন্তন হােম ক্রিয়া করি সমাধান
সস্ত্রীক বসিয়া গুরু আছেন যথায়,
উপস্থিত হয়ে তখ, দম্পতী তখন
শ্রীগুরু-শীতল-পদে শির নােয়াইল
নতশির দেখি গুরু রাজা ও রাণীরে,
আশীযি পরমানন্দে অকপট মনে,
মস্তকে অভয় পদ অর্পিয়া অচিরে,
আতিথ্য ক্রিয়ায় শ্রম করিলেন দুর।
কতক্ষণে শ্রম-শান্তি হইলে দোহার,
সুধিলা সমােধি গুরু দানবের নাথে ;
“অকস্মাৎ কেন বল, বীরেন্দ্র-কেশরী,
আসি উপস্থিত হলে আশ্রমে আমার?
মন্ত্ররূপ ব্যুহ আমি করিয়া রচনা,
তব রাজ্য চারি পাশে রেখেছে বিস্তারি
প্রক্ষিতেছি, সদা বাহে দেব যক্ষ ডরে
প্রবেশিতে নাহি পারে রাজ্যেতে তােমার।
অভ্রভেদী অগ্নি আলি আশ্রমে আমার,
ব্ৰহ্মা আদি দেবগণে তুষিবার ছলে,
আপনি সদস্য হয়ে শিষ্যগণে দিয়া
করিতেছি যজ্ঞ, যাহে ধূমরাশি উঠি
তােমার শাসিত রাজ্যে ধরি মমঘরূপ
সময়ে শস্যের হেতু হতেছে বর্ষণ।
ব্ৰহ্মভেজ বলে আমি তােমার কারণ
।
,

[ ৬ ] বিধাতা সৃজিত সৃষ্টি-শঙ্করের সম- পলকে নাশিতে পারি, আছে এ ক্ষমতা ; মম তপবল, রাজা, বিদিত জগতে। আচাৰ্য আনমে ওনি আশ্বাস বচন উত্তরিলা তবে দৈত্য কৃতাঞ্জলিপুটে ;- “তব তপােবলে, দেব, রাজ্যতে আমার অকাল মরণে কভু জীবে নাহি নাশ; তব কৃপাবলে আছি সতত কুশলে। কিন্তু এক পেল মাের হৃদয়ে বিঁধিয়া, দিতেছে বেদনা তাহে থাকি অনুক্ষণ, হারিয়ে পেয়েছি লজ্জা দেবরাজ সনে সকলি আছমে, দেব, তব অবগত। সুস্থ নাহি মানে মন, চিত্তি অহর্নিশি কেমনে এ শেল মাের হবে উৎপাটন। ভাবিতেছিলাম আমি উপায় ইহার, হেনকালে আসি মােরে দেবর্ষি নারদ দিলেন উপায় বলি কর অবধান, ‘মুতের সহায়ে তুমি জিনিবে বাব।” আর তিনি কহিলেন কহিতে তোমারে, হাসিতেছে সুর-গুরু দেবরাজশনে সংগ্রামের কথা স্বর্গে করি আলােচনা, জাহাতে করিছে নিন্দা তব দিবারাতি। অষ্টগ্রহ কষ্ট যদি হয় মহাশয়, তােমার সহায়ে তারা কি করিতে পারে ?

[ ১৭ 1
স্বর্গ মত্ত মুহূর্তেকে ক্রোধেতে তোমার
রসাতল যায়, তাহে নাহিক সন্দেহ।
করহ উপায় গুরু ইহার বিধান ;
এত অপমান আর না সহে অন্তরে।
এতেক বচন শুনি দানবেন্দ্র মুখে
ক্রোধেতে জ্বলিলা গুরু বৈশ্বানর সম ;
শিরস্থিত জটা, যাহা পৰশয়ে পদ,
রােষেতে ঋষির তাহা ভেদিয়ে গগন,
বিষধর সম যেন ফণা বিস্তারিয়া,
দংশিতে অদিতি-সুতে হ’ল উৰ্দ্ধমুখী ;
প্রলয়কালেতে যেন পার্বতীর পতি,
মহারুদ্র রূপে বিশ্ব নাশিতে প্রস্তুত।
শাপিতে বাসবে, বারি লইয়া করেতে
মন্ত্রপূত করি যবে ফেলিবেন ভূমে,
হেনকালে ব্ৰহ্মা আসি অন্তরীক্ষে থাকি
গম্ভীর আরবে তারে কহিলা তখনি ;-
• *সম্বর, সম্বর, প্রভাে, ক্রোধ ক্ষণকাল,
ভয়েতে কম্পিত দেখ বিশ্ব চরাচর।
কোন্ দোষে দোষী আমি তােমার চরণে ?
অকালে নাশিতে সৃষ্টি কেন হে উদ্যত ?
আপনার ক্ষমাগুণে আপনি সম্বর,
নতুব হইবে মিথ্যা দুর্বাসা-বচন।”
অকস্মাৎ শুনি ঋষি আকাশ-ভারত
সমমি সম্বরি ক্রোধ মুদ্রিত নয়নে,
।
। •

kaud
১৮ ।
একাগ্র করিয়া মন পঞ্চানন পদে,
ধ্যানযােগে জানিলেন সব বিবরণ।
অসুরে ডাকিয়া তবে কহিলেন গুরু ;-
“অবধান কর, রাজা দানবের পতি,
পুংসবনব্রত তুমি করাও রাণীরে ;
অচিরে পাইবে পুত্ৰ বচনে আমার ।
সুতের সহায়ে তুমি অদিতিনন্দনে,
নিশ্চয় জিনিবে, ইথে নাহিক সংশয়।
শুনিয়া এতেক বাণী রাণীর সহিত,
যুগলে বন্দিয়া পরে এগুরুচরণ
আরােহণ করি দেহে শীঘ্রগামী রথে
ফিরিলেন পুরে তঁারা হয়ে হৃষ্টমন।
ইতি আশ্ৰম-প্রবেশ নামক প্রথম সর্গ

দ্বিতীয় সর্গ।
ক
বিশাল বারিধি সম চন্দ্রাতপতলে
শায়িত প্রকৃতি দেবী শান্তির শয়ানে ;
পূর্ণিমার শশী শােভি গগন মণ্ডলে
ছড়ায় কৌমুদী-ছটা পৰ্বত কাননে।
গগন-প্রাঙ্গণ যেন নক্ষত্র নয়ন
উন্মীলিয়া অনিমিখে বিশ্ব পানে চায়!
ধীরে ধীরে বহিতেছে নৈশ সমীরণ
পিককুল ক্ষীণকণ্ঠে ঘন ঘন গায়!
কল্লোলিনী কল কলে বহি নিরন্তর
চলিছে মিলিতে নিজ কান্তের ভবনে ;
সুশান্ত গভীর নিশি শুব্ধ চরাচর
লভিছে বিরাম বিশ্ব বিভুর চরণে!
এ হেন যামিনী-যােগে আপন নগর
ত্যজিয়া, তুম্বুরু নামে গন্ধর্বের পতি
হেরিতে বাসনা কৰি পাৰ্ব্বতী-শঙ্কর
সস্ত্রীকে আরােহি রথে গেল শুদ্ধমতি।
রুদ্ররূপী গিরিবর কৈলাস-শিখর
রজত-বরণনি অতি অনুপম,
রঞ্জিত ধাতুর রাগে রহে নিরন্তর,
হেরিলে নয়নে হয় দৃষ্টির বিভ্রম।

[ ২ ]
সুশােভিত শৃঙ্গর মুকুটের সম
শােভিতেছে, সদা যেন সম্রাটের শিরে
রতনে খচিত, আহ, কিবা মনােরম।
পড়েছে যাহার জ্যোতিঃ তটিনীর নীরে
ধবলবরণ চূড়া ভূধর উপর,
হেরিয়ে যাহার রূপ সূৰ্য্য তিস্পতি,
মরমে মরিয়ে যেন লুকায় সত্বর
আপন রজত রূপ, হয়ে ভগ্নমতি।
ওষধি, তপস্যা, মন্ত্র, জন্ম, যােগ যুগে
সিদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে যত অমর নিচয়,
নিজ নিজ নিকেতন ত্যজি অনুরাগে
করিতেছে অবস্থিতি হরের আলয়।
বিবিধ ব্রততী আর দ্রুম ও গুল্মেতে
চির-সমাচ্ছন্ন সেই কৈলাস-শিখর ;
নিয়ত সেবিত ইন্দ্র আদি অমরেতে,
বাসবের ধনু যেন ধরি ঘনবর!
অসংখ্য কন্দর আর সানু প্রস্রবণ,
এ সকল মধুরিমা দেখিয়া তথায় ;
মদনে মাতিয়া মনে মানিনী তখন,
নিজ কান্ত সনে মুগ্ধ প্রেম-মন্ত্রণা।
ময়ূর কুলের, মরি, সুমধুর স্বর,
স্পমধু পানে মত্ত মধুপের রকে,
পূর্ণ করি নিরন্তর বিশাল অম্বর,
দিতেছে আনন্দ উঠি ভবানী ভৈরবে।

[ ২১ ।
কামপ্রদ নানাবিধ তরুজি-শখ
মলয় অনিল বলে হয়ে আন্দোলিত,
ব্যজন করিছে যেন করে ধরি পাখা
সিদ্ধাঙ্গনগণে, যারা হয় মূলস্থিত।
গর্ভবতী যুবতীর পয়ােধর সম,
সতত সঞ্চরমান জলদ পটল,
কামিনী-কঙ্কণ ঘায় থাকিতে অক্ষম
হইয়ে, তথায় তাই বর্ষে অবিরল।
গিরি শিরে ফিরে কত উন্মত্ত মাতঙ্গ,
( সচল ভাবেতে যেন চলিছে অচল)
নিবিড় অরণ্যে কভু করে কত রঙ্গ;
কোথাও রয়েছে তীব্র অজগর দল।
কৈলাস উপরে যত সুন্দর নিঝর
ঝর ঝর শব্দ তথা করে অনুক্ষণ,
সে রব শুনিয়ে জ্ঞান উপজে সত্বর,
যেন কোন আলাপনে নগেন্দ্র মগন!
ধবল বরণ বৃষ, ভবের বাহন,
নির্ভয় হৃদয়ে তথা এণ-রিপু সনে
করিয়া রহেছে পেঁাহে একত্র শয়ন,
পরম পবিত্র সেই স্মরারি-সদনে।
চৈত্ররথ বলি কিৰা উদ্যান অদূরে
শােভিছে, নবীন দূর্বাদল বস্ত্র পরি।
অলকা নামেতে তথা কুবেরের পুরে
বহিছে অলকানন্দা বীচুি রব করি ;-

[ ২২ 1
অঙ্গনার অঙ্গচ্যুত কুঙ্কুমের রাগে
শােভিছে তটিনী-বক্ষ স্বর্ণরেখা সম,
দিয়ে সন্তরণ যাহে গেছে দিবাভাগে
কামিনী কুলেতে যারা অতি মনােরম।
কোথাও মাধবীলতা উঠি সহকারে
রয়েছে যতনে তারে করি পরশন,
শিখাতে নারীরে যেন, শান্ত ব্যবহারে
কেমনে করিবে তারা পতি আলিঙ্গন।
তরুরাজ-শির করি স্বর্ণ সিংহাসন
গাইতেছে তথা বসি বসন্ত-বান্ধব ;
শ্রৰণে শুনিয়া তাহা যক্ষ-বালাগণ
মধুপানে মত্ত হয়ে করিছে উৎসব ;
স্নিগ্ধ তটিনীর জল করি পরশন
শীতল মলয়ানিল যত লাগে গায়,
প্রফুল্লিত প্রাণে সব যক্ষ-বালাগণ
ততই বলিছে “নম মকরধ্বজায়।”
উদ্ধা হাত করি যত রুদ্র-দূতগণ
নর-মুণ্ডমালা গলে করি পরিধান,
তাণ্ডব-বিধানে নাচে, বিকট দর্শন
বিভূতি ভূষিত অঙ্গ, উন্মত্ত সমান ।
গম্ভীর গর্জনে গজ্জি ঘন অনুক্ষণ
প্রমথ কুলের
সেই তাণ্ডবের কালে,
পটহ বাজনা কাৰ্য করে সম্পাদন ;
শ্রবণে আননেদ ভূত নাচে তত ভালে।

السا
২৩ ]
যদিও নাচিছে প্রেত প্রচণ্ড-প্রতাপে,
তথাপি পর্বতবর কৈলাস-শিখর
ভৈরবের ভরে তাহা কভু নাহি কঁপে।
ব্ৰহ্ম-পিশাচেতে শব্দ করে নিরন্তর ;
তালিছে কবন্ধ ঘন করতালি গাছে ;
উগ্রচণ্ডা ভীমা নর-কপালকুণ্ডলা
চরণ-চুম্বিত-বেণী এলাইয়া পাছে
নাচিতেছে, হেরি ভয়ে চমকে চপলা।
হেন গিরি’পরে এক বটবৃক্ষমূলে,
ত্রিপুরারি ত্রিলােচন ত্রিনয়নী সনে,
বিভু-গুণ-গানে মগ্ন বাহ বস্তু ভুলে
ছিলেন করিতে বসি মুদিত নয়নে।
নদী সুরধুনী তথা চির-প্রবাহিনী,
সতিনীর প্রতি যেন ঈৰ্য্যা প্রকাশিয়া,
ফেনরাশি রূপ হাসি হাসি বিনােদিনী,
অম্বিকা-কুটী তাহে অবজ্ঞা করিয়া,
উৰ্ম্মিরূপ কর যেন করি প্রসারণ,
পিনাক-পাণির কেশ রহিছে ধরিয়া।
ফুল কোকনদ ভ্রমে পাৰ্ব্বতী-চরণ
মত্ত ষট্‌পদকুল বসিছে উড়িয়া।
শিমুখ প্রস্রবণ হইতে ত্বরায়
ব্ৰহ্ম-গুণ-গান-নদী যেন ধীরে ধীরে,
তারিতে ত্রিলােক-জীবে বহিয়া তথায়,
মিলিছে সতীর কর্ণসাগরের নীরে।

[ ২৪
]
হেনকালে তথা এক রথ রইময়ে
চাপিয়া গন্ধর্ব আসি ব্যোমপথ দিয়া,
উপস্থিত হয়ে ধীর হেন অসময়ে
তথাকার নভস্থল ফেলিল ঢাকিয়া।
দেখিল তুরু তথা পৰ্বতীর সনে
শ্রুতি-আলাপনে মগ্ন দেব দিগরে;
এতেক হেরিয়া সেই বিচারিল মনে,
উচিত নহেক নাম। কৈলাস-চত্বরে ;
যদিও তুঘুরু-রথ কৌমুদিনী রাশি
বিদূরিত করি পুরী আঁধারে পূরিলা ;
হর-নেত্ৰ-চন্দ্র আর অম্বিকার হাসি
ধরিয়া অপূর্ব শােভা তাহারে নাশিলা।
হেনকালে উপস্থিত ব্রহ্মার নন্দন,
সুচক্রী নারদ ঋষি, পরম তাপস,
দূরে থাকি করি পঞ্চাননের বন্দন,
স্বাগত বলয়ে ;-ধন্য আমার দিবস
*প্রথমে শুনিল কর্ণ বিভু-গুণ-গান
যােগী প্রধান প্রভু পঞ্চানন-মুখে
দ্বিতীয় পেয়েছি পূর্ণ করিবারে স্থান
দুর্বাসার অভিশাপ যামিনীতে সুখে ;
কিন্তু আমি কি করিয়া দেখাব শঙ্করে
আছয়ে গন্ধর্ব বসি সুবর্ণ বিমানে ?
কেমনে কহিব কথা কঁাপিছে অন্তরে ?”
এত চিন্তি স্তুতি কৈলা-পার্বতী-চরণে
৪

[
২৫. 1
অকস্মাৎ দেব-ঋষি তিল যখন
উন্মীলি নয়ন পদ্ম হেরি দাঙ্গায়ণী,
অমৃত-বচনে মাতা করি সম্ভাষণ,
মেহবাক্যে শ্রম দুর করিলা তখনি।
অতঃপর কহিলেন নগেন্দ্র-নন্দিনী ;-
“কহ জগতের, ঋষি, কুশল বারতা।
বাঞ্ছে মন শুনিবারে মঙ্গল-কাহিনী ;
ত্বরায় বলিয়া নাশ চিত্তের ব্যর্থতা।
শুনিয়া সতীর মুখে এতেক ভারতী
জগৎ-জননী-পদে নত করি শির,
আরম্ভিলা কহিবারে ঋষি শান্তমতি
অন্তরে ভাবিয়া বহু হয়ে অতি ধীর ;-
“মুহূর্তে ভ্রমণ করি বিশ্ব চরাচর,
দেখিলাম আমি মাগাে তোমার কৃপায়
সত্যব্রতে ব্ৰতী সবে আছে নিরন্তর ;
অণুমাত্র কেহ মনে ব্যথা নাহি পায় ।
অকাল মরণ কভু জীবে না পরলে ;
সুরামত্ত কামাসক্ত নহে কোন জন,
আছয়ে সকল জীব স্বধর্মের বশে ;
পাপাচার বিনিময়ে হরি সঙ্কীৰ্ত্তন ও
কুরঙ্গ শাবক সিংহে নাহি করে ভয়,
সদাই অহিংসাপূর্ণ এ ভব মণ্ডল ;
কহিলাম শুন মাগাে তুমি অতঃপর,
উঠেছে’অমৃতে এবে দেখগাে গরল।

[ ২৬
২৬ ]
*প্রভাকীর্ণ সমুজ্জ্বল রথে করি ভর,
তুম্বুরু নামেতে ওই গন্ধর্বের পতি,
আছে বহুক্ষণ তব মস্তক উপর,
কর গো উপায় তার শীঘ্র দয়াবতী।
দুষ্টের দমন যদি না কর জননী
তা হলে সংসার শীঘ্র যাবে ছারখার,
বাড়িবে পাপীর ভাগ শুন মা এখনি,
পুণ্যের রাজ্যেতে হবে পাপের সঞ্চার।
শুনিয়া ঋষির মুখে অম্বিকা তখন
অমনি সত্বরে চাহি গগনের পানে,
দেখিলেন দুরাচার হয়ে হর্ষ মন,
তুম্বুরু বসিয়ে এক বৃহৎ বিমানে।
অধীর হইল ক্রোধে দেবী দাক্ষরণী,
(জ্বলে বৈশ্বানর যেন পবনের যােগে।)
কটুবাক্যে তাহে দেবী কহিলা এমনি ;-
শুন রে গন্ধৰ্ব্ব, তুই নানা উপভােগে
কাটাইলি বহুকাল অমর আলয়ে,
কিন্তু এবে মদগর্বে হইয়ে গর্বিত
হরের মস্তক্ষে বসি আছ অসময়ে,
সেই পাপে স্বর্গ সুখে হইলি বঞ্চিত।
আছি বসিয়ে তুই যেমন উপরে,
পাপে হইবে জন্ম অসুর ঔরসে।
হেন বাণী শুনি তবে গন্ধৰ্ব্ব সত্মরে
সতীর চরণে নমি কহিছে বিশে;

( ২৭ 1
“কেন মা, দাসের প্রতি এমন নির্ণয়
সহসা বচন তব হ’ল উচ্চারণ ?
কোন দোষে দোষী, মাতা, গন্ধর্ব তনয় ?
কঁপিছে তােমার বাক্যে আমার জীবন।
কুপুত্র যদ্যপি কেহ হয় কদাচন,
তথাপি জননী তারে যতনে আদরে ;
ভুজঙ্গ জননী সম তব আচরণ
হইল আমার প্রতি কহিনু তােমারে।
গাইত মঙ্গল গীত তােমার রসনা
আজি কিনা অসম্ভব তাহে উপজিল।
ভাসাইত দিগন্তর দয়ার ঝরণা
ঋষির কুটি চক্রে তাহারে পঙ্কিল ।
কতদিন বব মাগাে হেন কারাগারে ?
পাপে মুক্ত কর, দুর্গা, আমারে অচিরে ;
এ যাতনা প্রাণ মাের সহিতে না পারে
কার গো বাসনা বাস করিতে তিমিরে ?”
এতেও হলো না যদি দয়া অধিকার
।
শিবের চরণে গিয়ে পড়িল। তখন,
কাতরে করুণস্বরে কান্দিয়া অপার
বলিলা -“পার্বতী শাপে করহ মােচন
দয়ার সাগর তুমি অগতির গতি,
আশুতােষ নাম তব বিদিত জগতে,
সহে না যাতনা আর শুন, পশুপতি।
তারহ রায়, তাত, মােরে কোন মতে।

( ২৮ ]
-
*ধ্যানেতে বিরত আমি করিয়ে তােমায়
স্মরণে মদন-ভশ্ন ভয়ে কাপে প্রাণ।
বিপদে পড়িয়ে তােমা ভাকি উভরায়,
এ চির আশ্রিত দাসে কর পরিত্রাণ।
তুম্বুরু চরণে হেরি দেব ত্রিলােচন
কহিলেন ধীরে ধীরে মধুর বচনে ;-
“কি হেতু, তুম্বুরু, তুই ধরিয়ে চরণ?
কেন না তুষিছ মােরে হরি-গুণ-গানে ?*
দাঙ্গায়ণী দিল শাপ নিয়া শ্রবণে
অধীর হইয়া বলে দেব পঞ্চানন ;-
বারে বারে কেন সতী সেবকে এমনে
অভিশপ্ত কর তুমি ? কি জানি কেমন ?
কি দোষ করিয়াছিল গন্ধৰ্ব্ব প্রধান,
যাহাতে তাহারে তুমি এক্সপে শাপিলে?
কেমনে করিব তোমা কত সাবধান ?
সেবকে শাপিয়ে সতী আমারে ভাপিলে !”
হেরিয়া পতির ক্রোধ পঙ্কজ-নয়নী
নারদে ডাকিয়া দিল করিতে উত্তর :
কৃতাঞ্জলিপুটে তবে ঋষি চূড়ামণি
আদ্যোপান্ত বিবরণ কহে অতঃপর ;-
“সশিয্যে দুর্বাসা ঋষি পারণ কারণ
দ্বাদশী তিথিতে গেল। ইন্দ্রের আলয় ;
যাইয়া তথায় তার না পেয়ে দর্শন
মনি জ্বলিল ক্রোধে বৃদ্ধ মহাশয়।

( ২৯
২৯ ।
ধ্যান যােগে জানিলেন সব বিবরণ,
বলিরে জিনিয়ে ইন্দ্র হয়ে হৃষ্টমতি,
উর্বশীর সনে গেছে নন্দনকানন
করিতে কৌতুক ক্রীড়া অমরের পতি।
নন্দন-কাননে পুনঃ গেল। ঋষিবর,
ক্ষুধায় কাতর ইন্দ্রে কতই ডাকিলা ;
কিন্তু হায়! কি বিধায় হেন অবসর
হ’ল না শক্রর হে বসিতে বলিলা।
তবে মহাতেজা ঋষি দুর্বাসা তখন
শাপিলা দেবেরে বলি “বলি-পুত্র হ'তে
নিশ্চিত জানিহ, ইন্দ্র, হইবে বন্ধন,
স্বর্গের সুষমা তাের যাবে সৰ্বমতে।
দুর্বাসার শাপ দেবে হইল যখন,
শ্রবণে শুনিতে তাহা পাইনি বাসব ;
যেহেতু বাজিতেছিল অস্কার-কঙ্কণ,
নৃত্যকালে নর্তকীর অতি অসম্ভব ?
এরূপে শাপিয়ে ঋষি, স্মরিয়ে শঙ্কর
আসিতেছিলেন পথে, এমন সময়
আমার সহিত দেখা হইল অতঃপর ;
কহিলা সকল কথা ঋষি মহাশয়।
সাধিতে ঋষির বাক্য ছিদ্র অন্বেষণ
করিয়ে ভ্রমিতেছিনু দিবস রজনী,
হেনকালে হেথা আসি তুম্বুরু স্যন্দন
রয়েছে তােমার শিরে হেরি, দেবমণি !

1
"সেই হেতু শাপিয়াছি পার্বতীরে দিয়া
সাধিতে ব্রাহ্মণ-বাক্য হইয়া তৎপর ;
কহিলাম আমি, দেব, সব বিস্তারিয়া ;
নাহিক দুর্গার দোষ ইহাতে, শঙ্কর।
বিধির বিধাতা তুমি যা হয় তা কর,
তুম্বুর গন্ধর্বে দেব এবে কর পার,
প্রণমি তােমার পদে যাই নিজ ঘর ;
এত বলি চিন্তে ঋষি হরি সারোদ্ধার !
ঋষি মুখে শুনি দেব সব সমাচার
জলদ গম্ভীর স্বরে কহিলা তখন ;-
“শােন্ রে গন্ধৰ্ব্ব তুই সেবক আমার,
কেমনে হইবে তব শাপ বিমােচন,
পরম বৈষ্ণব বলি প্রহলাদের নাতি,
বিন্ধ্যাবলী নামে পত্নী সৰ্ব্ব গুণাধার
করিতেছে পুংসবন ব্ৰত দিবারাতি
সুতের লাগিয়া রাণী করি শুদ্ধাচার ;
হইবে তােমার জন্ম তাহার উদরে
বাসবে করিবে তুমি সমরে বন্ধন,
মহা-পরাক্রম তব হবে ধরা”পরে,
ভাতিবে গৌরব-রবি বিস্তারি কিরণ।
অবশেষে যৰে বিষ্ণু বামনাবতার
হইয়ে, ছলিবে বলি দানব ঈশ্বরে,
সেই কালে যুদ্ধস্থলে মস্তক ভােমার
ছেদিবেন চক্রধর ধরি চক্রবরে।”

( ৩১ ]
হেন বাক্য হইল যদি গন্ধৰ্ব্ব উপরে,
অমনি তুরু তথা ত্যজিয়া বিমান
লভিলা জনম বিল্ক্যাবলীর উদরে ;
আনন্দে মারদ ঋষি করিলা প্রস্থান।
ইতি তুম্বুরু পতন নামক দ্বিতীয় সর্গ।

তৃতীয় সর্গ।
এখানে দানবপুরে রাণী বিন্ধ্যাবলী
সত্যব্রত পতি যার দানবেন্দ্র বলি।
পবিত্র অন্তরে তিনি সুতের লাগিয়া।
পুংবসন-ব্ৰতত বুতা বৎসর ধরিয়া ।
নারায়ণে পূজা রাণী করি সমাধান।
বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণে পরে করে স্বর্ণদান।
পবিত্র মানসে রাণী চিন্তিয়া পাতায়।
পরম আনন্দে পরে পতি পাশে যায়।
হেথায় সতীর শাপে তুঙ্গুরু পতিত।
প্রবেশিল রাণী-গর্ভে পবিত্র চরিত।
সূমেরু গঘিরে যথা সিংহ প্রবেশিল।
তেমতি গন্ধ গর্ভে আশ্রয় লইল ।
অনন্তর ক্রমে ক্রমে দানব কুলের।
নিদান স্বরূপ অভিমত মঙ্গলের ।
গর্ভের লক্ষণ যুত হইল প্রকাশ।
উদর অম্বরে সুত শশী পরকাশ ॥
পরম সুন্দর ক্ষীণ তনু সে তখন।
লাের্ধ তুল্য পাণ্ডুবর্ণ করিল ধারণা
পাণ্ডুবর্ণ শেভে যথা গগনে চন্দ্রমা।
কিম্বা তারাময়ী শেষ শর্বরীর সমা।

[ ৩৩
1
এ হেন সুন্দর মূৰ্ত্তি রাণীর তখন।
করিল ধারণ, যাহা অপূর্ব দর্শন।
ভূমিতে শয়ন করে পাতি পরা বাস।
মৃত্তিকা ভােজনে তার দিবানিশি আশ ।
অমরাবতীতে ইন্দ্র কশ্যপনন্দন।
অশেষ সম্পদ ভােগ করয়ে যেমন ।
তেমতি তাহার পুত্র ভাবিয়া অন্তরে।
করিবেক সুখভােগ ধরণী উপরে।
অার ও চিস্তি মনে রাণী সুতের স্পন্দন ।
দিগন্ত পর্যন্ত তাহা করিবে ভ্রমণ ॥
সুস্বাদ যতেক রস করিয়া বর্জন।
তেকারণে মাটি রাণী করেন ভক্ষণ ৯
প্রেয়সীর গর্ভ রাজা দেখিয়া তখন।
পঞ্চগব্য দিয়া কৈল গর্ভের সােধন।
মৃত্তিকাতে সুগন্ধিত রাণীর আনন।
করেন আঘ্রাণ কৰি নিৰ্জ্জুনে গমন ।
ফুল্ল কোকনদে যেন সরসী মাকারে।
চুম্বিল যাইয়া যথা শিলীমুখ তারে ॥
আষাঢ়ের ধারা সিক্ত যতেক পল।
আঘ্রাণে মাতয়ে যথা মতঙ্গের দল।
তেমতি উন্মত্ত তাহে হইলা তখন।
সুবুদ্ধি চতুর বিবােচনের নন্দন।
কুবের হইতে তার বৈভব অতুল।
ঐ গুরু কৃপায় কিছু নাহি অপ্রতুল ॥

Land
1
যখন যা চান বাণী তখনি ত দেয়।
বিবিধ প্রকারে রাজা রাজ্ঞীরে তেষয় ।
দিনে দিনে গর্ভ তার যতই বর্ধিল।
তার সঙ্গে আহারেতে রুচিও জন্মিল ॥
অদ্ভুত লাবণ্য তাহে অতি চমৎকার।
হৃষ্টপুষ্ট কলেবর হইল তাহার ।
নয়নের কোণে কালি গর্ভের জনিত।
নবীন নীরদ যেন গগনে উদিত ।
পীনপয়ােধর যুগলের অগ্রভাগ ।
ঈষৎ হইল তাহে কিবা নীল রাগ ।
হৃদি সরােবরে কুচ কমলের কলি।
নীলরাগ-বৃন্ত যেন শেভে তাহে অলি।
বসন্তের সমাগমে যথা বৃক্ষ সব।
শীর্ণপত্র ত্যজি ধরে নবীন পল্লব।
তেমতি হইল রাণী দেখিতে সুন্দর।
করিয়া ধারণ শুতে গর্ভের ভিতর।
অন্তুরাগ্নি শমী কিম্বা রত্নগর্ভা ধরা।
দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী আদি পাপহরা।
করিতে লাগিলা জ্ঞান র্তাহারে এমন।
সুবর্তী দেখি রাজা রাণীরে তখন
আপন ঔদার্য্যে রাজা প্রেয়সীর মন।
লাগিলা তুষিতে তিনি করিয়া যতন।
এইরূপে গর্ভ তার যত বেড়ে যায়।
পড়য়ে হেলিয়ে রাণী মৃদুমন্দ বায় ।

-
]
অন্তঃপুরে রাজা যদি করয়ে গমন।
অভ্যর্থনা জন্য তার ত্যজিয়ে আসন ।
নারেন করিতে রাণী নিজ গর্ভভারে।
নয়ন ঠারিয়া তাহা করেন তাহারে।
কত শত স্বর্ণমুদ্রা আরও কত মণি।
বিতরিল ব্রাহ্মণেরে দানব তখনি ।
ধাত্রিগণে ডাকাইয়া অতি শীঘ্রগতি।
রাখিলেন রাণী পাশে পূৰ্ব দেবপতি।
যখন করিল গর্ভ দশমে প্রবেশ।
শ্রীহরি চরণে করি চিত্তের নিবেশ।
প্রসব সময় দৈত্য প্রতীক্ষা করিয়া।
রহিলেন গুরু আজ্ঞা অন্তরে স্মরিয়া ।
বিচিত্র সুতিকাগার রাখিলা ঘেরিয়া।
থাকিবেন রাণী যাহে পুত্র প্রসবিয়া।
কে জানে নারদ মুনি কিভাবে বেড়ায়
একুল ওকুল ঋষি দুকুল মজায়।
করিতে বাসবে তুষ্ট ব্রহ্মার নন্দন।
করিলেন মাত্রা যথা ইন্দ্রের ভবন।
সুধৰ্ম্মা সভাতে হেথা বসি স্বরীশ্বর।
শােভিতেছে শিরে তার কিরীট সুন্দর
শীখণ্ড সম রেখা ললাট ভূষণ।
বিশদ উত্তরী ইন্দ্র জাঙ্গে সুশােভন ।
সর্বাঙ্গে মর্দিত তাহে অগুরু চন্দন।
শোভিছে দেবের গায় অপূর্ব দর্শন।

[
borand
পরিধান বাস ও অলঙ্কার।
সুবর্ণ কঙ্কণ শােভে ভুজেতে তাহার ॥
শুনিতেছে সুনাসীর বাজনা সেতার।
নৃত্যকালে অপ্সরার কঙ্কণ ঝঙ্কার ।
কিন্নরে গাইছে গীত নাচিছে অপ্সরা।
কেহবা রাগিণী দিয়া ধরিছে অন্তরা ॥
বুতির সহিত গায় আপনি অনঙ্গ।
কেহবা বাজায় বাঁশী কেহবা মৃদঙ্গ ।
ভাল ভাল বলে যত ত্রিদিব ঈশ্বর।
ভাণ্ডব বিধানে তত নাচে বিদ্যাধর
পারিজাতে গাথি মালা আসিয়ে উৰ্বশী ।
পায়ে দেবের গলে হাসিয়ে রূপসী
স্বকীয় ঐশ্বৰ্য্য অার অতুল বৈভব।
পেয়ে আনন্দেতে মত্ত দেবতা বাসব ।
এরূপে আপনপুরে অমরের রাজ।
শুনিছে নারীর গীত ত্যজি নিজ কাজ।
বাজিল ত্ৰিতন্ত্রী বীণা গম্ভীর গগনে।
সভায় থাকিয়া দেব শুনিল শ্রবণে ৪
জানিলা আসিছে বুঝি আমার আবাস।
করিতে পবিত্র ঋষি জগৎ নিবাস ॥
হইয়ে তৎপর তথা দেবেন্দ্র তখন।
করিতে গেলেন দ্বারদেশে সম্ভাষণ ।
মপেক্ষা করিয়ে তথা ঋষি আগমন।
রছিলেন দাণ্ডাইয়া সহস্রলোচন

f
L
হেনকালে এল ঋযি বাসবের ধাম ।
সর্বাঙ্গে অঙ্কিত তার শ্রীহরির নাম ।
প্রেমানলে দেখি তঁারে বিভাের হইয়া ।
প্রণমিলা সুররাজ শির নােয়াইয়া
আসিয়া নারদ বলে অমরের নাথ।
চলহ নির্জনে কথা আছে তব সাথ ।
শুনিরা খযির মুখে এরূপ ভারতী।
শশব্যস্ত হয়ে তবে দেব শচীপতি ।
পদ্যঅর্ঘ্য দিয়ে তার শ্রম করি দূর।
যন্ত্রণা অাগারে পরে লয়ে গেল। শূর ।
অপূৰ্ব্ব মন্ত্রণাপুরী কি কব বাখান।
ভরেতে যাহার কাছে কেহ নাহি যান ।
সপ্তস্তর প্রকায়ে সে সুন্দর আগার।
রয়েছে বেষ্টিত যাহা নির্মিত সােণার ।
চৌদিগে পরিখা তার আছয়ে বেড়িয়া।
বিশ্বকৰ্ম্মা আসি যাহা গেছে নিৰ্মাইয়া ।
অপূর্ব সে ঘর গজদন্ত বিনির্মিত।
হীরা মুক্তা আদি কত রতনে খচিত।
দেলিছে মন্দার মালা দ্বারের চৌকাটে ।
দৌবারিক গণেতে আছয়ে মালসাটে ।
লইয়া উলঙ্গ অসি দেব দ্বারপাল।
রক্ষিতেছে সবে তাহা সদাসর্বকাল
মহুতে অঙ্কুশ হাতে মাতঙ্গ উপরি ।
চাপিয়া হুঁকিছে সবে ভীমনা করি।

( ৩
brand
বিংশ প্রকোষ্ঠের পরে মন্ত্রণা আগার।
মহামূল্য রত্ন শোভে ভীতেতে যাহার।
নিস্তব্ধ মন্ত্রণপুরী সদাসর্বক্ষণ।
শব্দের ভয়েতে তথা না বহে পবন ।
এ হেন নির্জন পুরী মাঝেতে বসিয়া।
কহিছে নারদমুনি দেবে সম্বােধিয়া।
“কহি শুন শচীনাথ অমর ঈশ্বর।
তােমার লাগিয়ে মাের কঁপিছে অন্তুর।
ত্রিদিব নিবাসী শ্রেষ্ঠ বিধি বিষ্ণু শিব ।
আছয়ে ধরায় যত মানবাদি জীব।
সৰ্ব্বাপেক্ষা ভালবাসি না যায় কথন।
সদাই তোমার চিন্তা করে মম মন ।
পাই না সময় দেব তােমার কারণ।
পূজিতে যুগলমূৰ্ত্তি লক্ষ্মী নারায়ণ।
তুমি হে অমর হও সম্পর্কেতে নাতি।
তেকারণে ভাবি আমি শুন দিবারাতি ।
মহাজ্ঞানী হও তুমি বুদ্ধি অতি ধীর।
সদা শান্তমতি তাহে বজ্রধারী বীর ।
কিন্তু তব এক দোষে খেয়েছে তোমায়।
কহিব কি দেব তাহা কহ নাহি যায় ।
গোমুত্রের সহযােগে যথা গৰ্য রস।
তেমতি তােমার তাহে নাশি মাছে যশঃ।
সদাই মদনে মাতি কর শীধু পান।
দিবারাতি শুন বসি কিনুরীর গান ।

[ ৩৯
কি করিলে কি হয় তা ভাবনা অন্তরে
আপনা হইতে বড় দেখ না অপরে ॥
পড়িবে এবার তুমি বিষম সঙ্কটে।
কহিলাম সার কথা আমি অকপটে।
সুধৰ্ম্মা সভায় বসি কে আর তখন।
খি মেলি হেরিবেক অপ্সরা নৰ্ত্তন।
নন্দন কাননে তবে কে আর যাইয়া।
করিবে কৌতুক তথা উৰ্বশী লইয়া।
শুন শুন দেবরাজ কহি আরবার।
স্বর্গের ঐশ্বর্য্য তব হবে ছারখার।
এত যদি কহিলেন ব্রহ্মার নন্দন।
শ্রবণে চমকি উঠি সহস্রলােচন ॥
কহিলা নারদে তবে অদিতি নন্দন।
“পড়িব সঙ্কটে ঋষি কিসের কারণ।
তুমি যাহা কহ তাহা মিথ্যা কভু নয়।
তেকারণে মম মনে এত ভয় হয় ।
শুনিয়া তোমার বাণী কঁপিছে অন্তর।
কহনা স্বরূপে তাহা আমারে সত্বর।”
একদিন তব পুরে দ্বাদশী তিথিতে।
দুর্বাসা আসিয়াছিল পারণ করিতে ।
না দেখি তােমারে ঋষি দ্বারীরে জিজ্ঞাসি।
নন্দন কাননে আছে শুনি তথা আসি ।
দেখিলেন তথা মুনি সুন্দর কাননে।
মদন্নে উন্মত্ত আছ উর্বশীর সনে।।

( ৪০
ক্ষুধায় কাতর ঋষি হইয়া তােমায়।
ডাকিলা কতই তোমা কহা নাহি যায়।
মধুপানে মত্ত হয়ে স্বৈরিণী সহিত।
হয়ে জ্ঞানহারা দেব তুমি হিতাহিত ৷
পারণ উদিকে থাক অভ্যর্থনা করা।
হয় নাই মত্ত ছিল লইয়া অঙ্গরা।
দেখিয়ে তােমার রীতি দুর্বাসা তখন।
অভিশাপ দিয়ে তােমা গেছেন এমন
হবে তব পরাজয় বলিপুত্র হতে।
কহিয়া গেছেন মুনি তােমা এইমতে ॥
শুনিয়া ঋষির বাণী কহিলা বাসব।
©ষে কথা কহিলা তুমি সব অসম্ভব ।
নাহিক বলির সুত জানি আমি ভালে।
হইবে পরাভব মাের কোন কালে।
পূরিবে না কভু ঋষি দুর্বাসা কামনা।
ভাবনা ত্যজিয়ে ভাব হরির ভাবনা ।
হইবে মুনির বাক্য এবারে লঘন।
দিয়েছে যে শাপ তিনি না ভাবি কারণ।
দেবমুখে শুনি ঋষি তাচ্ছীল্য ৰচন।
কহিলা তঁাহারে তবে ব্রহ্মার নন্দন ।
হারিয়া তােমার যুদ্ধে দানবের পতি।
অন্তরে দুঃখিত হয়ে আছিলেন অতি ?
অবশেষে আচার্যের আদেশানুসারে।
সুতের লালসে তিনি অতি শুদ্ধাচারে কি

[ ৪১
1
করাণ রাণীরে নামে ব্রত পুংসবন।
যাহাতে হইবে তার অবশ্য নন্দন।
দশমাস গর্ভ এবে হয়েছে রাণীর।
আজি কালি মধ্যে সুত হবে যেন স্থির ।
তপােবলে জানিয়াছি সব সমাচার।
জগতে হবেনা কেহ সমকক্ষ তার ।
তাহা হইতে পরাজয় হইবে তােমার।
নিশ্চয় জানিহ রাজা বচন আমার ।
একমাত্র বন্ধু তুমি জগতে আমার।
কহিলাম চিন্ত যাহে পার সারিবার।”
এরূপপ কহিয়া ঋষি দেবেরে তখন।
যথা ইচ্ছা তথা তিনি করিল গমন।
নারদের মুথে শুনি এরূপ ভারতী ।
আপন আলয়ে আসি দেব শচীপতি।
ভাবেন বসিয়া বলে কি হবে উপায়।
এতদিনে বুঝি মাের স্বর্গসুখ যায়।
দুরন্ত দুৰ্বাস। ঋষি দিয়াছেন শাপ।
দোষ নাহি তার আমি করিয়াছি পাপ ॥
দুর্জনে শপিতে লভে মহতে জনম।
অন্যায় দেখিয়ে ঋষি খেপেছে এমন ॥
অমর সমাজে আর দেখাব না মুখ।
অন্তরে লাগেনা ভাল সদাই অসুখ ।
কি করিব কি হইবে কেমনে সারিব।
অলঙ্ঘ্য ঋষির বাক্য কেমনে লবি।

--
82
]
“উর্বশী হয়েছে কাল অমর আলয়ে।
দিবারাত্রি থাকি মেতে হয় তারে লয়ে ।
খেয়েছি বিষয় মদ মজেছি সম্পদে।
পড়েছি এবার আমি বিষম বিপদে ।
নন্দন কাননে আর কভু যাইবনা।
ভুলিয়া উৰ্ব্বশীপানে আর দেখিব না।
অহঙ্কারে মত্ত আর কভু হইবনা।
সহেন হৃদয়ে আর এতে ক যাতনা |}
ব্ৰহ্মশাপ শুনি মাের কাপছে অন্তর।
কে আছে এমন বন্ধু জগত ভিতর।
বিপদ সাগরে মােরে করিবে উদ্ধার।”
একথা শুনিয়ে কঁাদে অদিতি কুমার।
হেন কালে দেবগুরু বৃহস্পতি আসি।
উপস্থিত হইলেন যেন তেজরাশি।
বুদ্ধির সাগর গুরু জগতে বিদিত।
সদাই চিনে মনে বাসবের হিত ।।
ভাবনা সাগরে ডুৰি অদিতি নন্দন।
করিল না তাকালেতে তারে সম্ভাষণ।
দেখি সুরগুরু সুরজ ব্যবহার।
ধ্যানযােগে জানিলেন কারণ ইহার ।
কতক্ষণে কহিলেন ডাকিয়া বাসবে।
জলদনিনাদ সম গম্ভীর আরবে।
“কেন ইন্দ্র ভাব তার বসিয়ে এখন।
(চয়ে কি দেখনা আমি তােমার সন।

L
]
“আসিয়াছি আমি দুঃখ করিতে মােচন।
শুন অকপটে এবে আমার বচন
কিছার মিছার অসুরেরে আমি গণি।
আমার ভয়েতে কাপে গ্রহরাজ শনি ॥
ধর বর্জ নাশ ভুমি গর্ভস্থ বালকে।
করেছ বিনাশ যাহে দুৰ্ব্বার বৃএকে।
এমন সুযােগ আর কভু পাইবে না।
বধিতে দুরন্ত রিপু দেরি করিওনা ৷
দিলাম বলিয়া আমি উপায় এমন।
অতএব কর ইহা কাশ্যপনন্দন।”
গুরুমুখে হেন আজ্ঞা শুনিয়া তখন।
কহিতে লাগিল। দেব সহস্রলােচন |
এমন ধৰ্ম্ম আমি কি রূপে করিব।
নারী হত্যা –ণহত্যা পাপেতে মজিব।
এক ব্রহ্মশাপ মাের ঢুকেছে শরীরে।
আবার শিখাও তাহে নাশিতে নারীরে।
হেন বাক্য শুনি কাপে শরীর আমার।
বুঝিতে পারি না দেব তব ব্যবহার।
হায় মহা পাপে লিপ্ত করিতে আমায়।
হয়েছ উদ্যত গুরু তুমিও তাহায়।
কাজ নাই স্বর্গসুখ যাই গো অরণ্যে।
এই নিবেদন মাের তোমার চরণে।
থাকুক দুর্বাসা শাপ আমার উপর।
করিতে এমন কর্ম কঁপিছে অন্তর ।”

1
[ ৪৪
এত কথা বলি ইন্দ্র নিস্তব্ধ হইল।
অমনি অমরগুরু কহিতে লাগিল।
“কি হেতু এ মহা মােহে ঘেরিল তোমায়
দেবের বুদ্ধিতে যাহা কভু না যুয়ায়।
হেন বুদ্ধি উপজিলে হয় ধৰ্ম্মমাশ।
কীর্তিনাশ হয় আর অষশ প্রকাশ ।
ক্ষুন্ন নাহি হও মনে অদিতি নন্দন।
দেবের বুদ্ধিতে ইহা না আসে কখন।
ত্যাগ কর কাতরতা ওহে দেবরাজ।
গৰ্ভস্থ বালকে নাশ ধরি অস্ত্র রাজ ।
যেরূপ ভাবনা তুমি করিছ অন্তরে।
এরূপ ভাবনা জ্ঞানী জনে নাহি করে ।
কে কারে নাশিতে পারে কেবা কার অরি।
আত্মারে নাশিতে তুমি নার বর্জ ধরি।
তুমি আমি আর এই বিশ্ব চরাচর।
ব্ৰহ্ম বিনা কিছু পূৰ্বে ছিল না অপর।
লয় পেলে বিশ্ব আর হবে কি হবে না।
ইহার বিষয় কেহ নিশ্চয় জানেনা।
পরমাত্মা ভূমা যিনি হন সনাতন।
উৎপত্তি বিনাশ তঁার না হয় কখন ।
শরীরের মাঝে হয় জন্ম মৃত্যু জরা।
অতএব এর জন্যে বৃথা খেদ করা ৷
জন্মিলে মরিতে হবে নিশ্চয় এমন।
বৃথা তুমি শোক কর তাহার কারণ।

[.
৪৫
لا
*পূর্ণ হবে কাল যবে জীর্ণ হৰে বাসা।
পাইবে প্রাণপাখী থাকিবে না আশা।
ইন্দ্রিয়ের জ্ঞান বাহে অছয়ে যাদের।
ত্রিতাপ জ্বালাতে তাপ দেয় তাহাদের।
ইহারা যাদের দুঃখ না দেয় রাজন।
তাহারই হয় বিশ্বে মুক্তির ভাজন।
ভৌতিক দৈবিক আর মানসিক তাপ।
এ ব্যতীত আর যত আছে মহাপাপ ।
তাহারা ছুইতে নাহি পারে যাহাদের।
তাহারাই শ্রেষ্ঠ জীব মতে জ্ঞানীদের।
আত্মার অভাব দেব কখন না হয়।
মনীষী গণেতে এর করেছে নির্ণয় ।
সমস্ত জগৎ ব্যাপি রয়েছেন যিনি।
যেন দেবরাজ চিরকাল নিত্য তিনি।
উপাধি রহিত আত্মা হয়েন অনন্ত।
শরীরীমাত্রের জেন আছয়ে পর্যন্ত ।
আত্মারে যে বধ্য মনে করে দেবরাজ।
গণ্য নাহি করে তাহে পণ্ডিত সমাজ ।
নাহিক আত্মার কভু জানিহ বিনাশ।
অতএব অস্ত্র ধরি কর শত্রুনাশ।
জন্ম-মৃত্যু স্থিতি আর হ্রাস বৃদ্ধি শূন্য।
এ ছয় বিকারে আত্মা কভু নয় ক্ষুন্ন ।
যে হেতু তাহারে কেহ পরশিতে নারে।
সত্যময় নিত্য সবে জানিয়া আত্মারে ॥

{
৪৬ ]
বিতরি শরৎশ শীতল কিরণ।
করিতে আত্মার তৃপ্তি পারেনা কখন।
প্রচণ্ড মাৰ্ত্তও কভূ নিদাঘে উঠিয়া ।
পারেনা তাপিতে তারে রশ্মি বিতরিয়া ।
পােড়াতে পারেনা কভু দেব বৈশ্বানর।
ডুবাতে পারেন। তঁারে অতল সাগর ।
এমন কি তব বজ্রে হয়না নিধন।
অতএব বধ কর গর্ভস্থ নন্দন।
বাক্য ও মনের তিনি হয়েন বাহির।
ইন্দ্রিয়াদি গ্রাহ্য নয় আছে সদা স্থির।
শুন দেব কহি আমি তােমারে এখন।
নাশিতে বালকে তুমি করহ মনন ।
গড়েছ সঙ্কটে এবে ধৰ্ম্মের বিচার।
নাহিক সময় আর তাহা করিবার।
নাশিলে থাকিবে সুখে, নতুবা বন্ধন।
করিয়া লইয়া যাবে বলির নন্দন।
শুক্রের রােযাগ্নি জ্বলে ব্যাপি ব্যোমদেশ।
ফণা ধরি বিষ যেন উগারিছে শেষ ।
হাসিবেক কবি গুরু সাবেনা শরীরে।
অত এব রাখ বাক্য আমার অচিরে।।”
এমতে বুঝালে গুরু অমনি তখন।
ধরিলা কুলিশে তবে কশ্যপ নন্দন।।
করিয়া আচার্য্যপদে শত নমস্কার।
লক্ষ্য করি বালকেরে ছাড়িয়ে হুঙ্কার ।

[ ৪৭
1
নাশিভে গর্ভস্থ সুতে ছাড়ি বক্স দিল।
ভয়ঙ্কর শব্দে হিশ্ব কাপিতে লাগিল।।।
হেথায় আশ্রমে বসি অসুর কুলের।
আচার্য্য চিন্তেন হিত গর্ভস্থ সুতের ।
অকস্মাৎ শুনি ঋষি অশনি নিন।
বুবিতে পারিল ইন্দ্র পেড়েছে প্রমাদ !
তৎক্ষণাং ব্ৰহ্মতেজ দিয়া দ্বিজ বর।
শূন্যপথে করিলেন বজ্রের অন্তর ।
অতঃপর সেই অস্ত্র ইন্দ্রের তোরণে।
পড়িয়া ভাঙ্গিল দেব দেখিলা নয়নে।
অমোঘ ইন্দ্রের অস্ত্র ব্যর্থ নাহি হয়।
সেই হেতু ভাঙ্গে গিয়া বাসব তালিয় ।
ব্যর্থ তার অস্ত্র দেখি নমুচীসূদন।
অত্যন্ত হইল। তিনি বিষাদিত মন ।
কি করিব কি হইবে চিন্তয়ে রাজন।
সুরগুরু সনে বসি সদা সর্বক্ষণ ।
এখানে বলির ঘরে রাণী র উদরে।
উপজিল প্রসব বেদনা তার পরে।
সূতিকা গৃহেতে রাজ্ঞী করিল গমন।
পূর্ণকুম্ভে শােভে তার দ্বার অনুক্ষণ।
যখৰ গগনে বেলা দ্বিতীয় প্রহর।
প্রচণ্ড মার্তণ্ড তাপে তপ্ত চরাচর।
এ হেন সময়ে রাণী চিন্তি নারায়ণ।
প্রসবিল পুত্র এক অপূর্ব দর্শন।

৪৮
1
বালকের তেজে তেজহীন দীনকরে ।
আচ্ছাদিল পাংশু যেন দেব বৈশ্বানরে ।
টলিল সুধৰ্ম্মা সভা দেবের সহিতে।
খসিল কিরীট ইন্দ্র শিরে আচম্বিতে ।
প্রস্ফুটিত পারিজাত নন্দন কাননে।
শুকাইয়া গেল তাহা অসুর জনমে ।
কড় কড় নাদেতে নাদিল কাদম্বিনী।
দিবা দ্বিপ্রহরে বােধ হইল যামিনী।
মহাঝড় তৎকালেতে বহিয়া পবন।
হইল কম্পিত যেন ভয়ের কারণ ।
চলে প্রবাহিনী উচ্চ বিচী রবে কাদি।
কহিতে বারীশে যত অমঙ্গল আদি ।
দিতে ত্বরা করি যেন মনে হয়ে ভীত।
যথায় আছেন পাশী পবিত্র চরিত ।
অনন্তর অন্তঃপুর হইতে এক দাসী।
উপস্থিত হইল বলির পাশে আসি।
দিলেক সংবাদ তঁারে হয়েছে নন্দন।
দ্বিভুজ সুনীল কান্তি আয়ত লােচন ॥”
শুনিয়া দাসীর মুখে দানবের পতি।
হলেন অন্তরে তিনি আনন্দিত অতি।।
দরিদ্র পাইলে যথা ধনের কলস।
ততােধিক আনন্দিত বলির মানস ।
আঁখিহাৱা জনে যথা আঁখি লাভ হয়।
তেমতি শুনিয়া তিনি হয়েছে তনয় ।

( ৪৯
1
দাসীরে বিতরি রাজা স্বর্ণময় হার ।
দেখিতে তনয়ে গেল। সহিত তাহার
স্বল্প-পরিসরা-স্বচ্ছ-তটিনী যেমন।
নব দূর্বাদলপরি হয় সুশােভন।
তেমতি শোভয়ে রাণী কোলেতে হয়।
হেরি আনন্দিত হৈল। রাজা মহাশয়
ভবে দানবের নাথ করিয়া কৌতুক ।
মাণিক্য অঙ্গুরী মুতে দিলেন যৌতুক ।
বামগণ কুতূহলে দিল। হুলহুলি ।
রাজসঙ্গে দেয় কেহ হরিদ্রার গুলি।
অনন্তর দিতিসুত আশ্রম হইতে ।
অনায়ে গুরুরে ডাকি অলিয়ে ত্বরিতে।
অতঃপর শুক্রাচাৰ্য জাত কৰ্ম্ম করি।
আশীর্বাদ কৈলা বহু চন্দ্র মোলি স্মরি।
দানবেরে ডাকি তবে কছিলেন তিনি।
সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন কবিকুলে যিনি ।
“তপােবলে জানিলাম সব বিবরণ।
তব পুত্র কৈল যবে জনম ধারণ ।
ক্রন্দন করিয়াছিল কম্বুনাদ করি ।
শঙ্খমুর নাম তাই রাখিনু ইহারি।
জানিই অমােঘ বাক্য আমার রাজ।
হবে পরাক্রমশালী তোমার নন্দন।
ইহার সহায়ে, দৈত্য, সে মেঘবাহনে।
জিনিবে নিশ্চয় তুমি কহিনু এক্ষণে ॥

king
এই বলি দৈত্যগুরু করিল গমন।
দণ্ডারণ মাঝে যথা শান্তিনিকেতন ।
জাতক আদি সব কৈলা সম্পাদন।
"পরম আনন্দে বিরেচনের নন্দন।
কারাগার মধ্যে যত কারাবাসী ছিল।
তোদের সকলে রাজা মুক্ত করি দিল ।
কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রা বিপ্র বিতরিল।।
মহামহােসবে রাজপ্রাসাদ পূরিলা।
এমত কহি শঙ্খমুরের জনম
রচিত রচনা আমি বড়ই অক্ষম।
মাতৃপাপ শিরে করিয়ে বন্দন ।
'থি নবীন দাম পর গৌড়জন {}
ইতি শঙ্খশুৱ-জন্ম-নামক তৃতীয় সর্গ

চতুর্থ সর্গ।
দেবতা বাঞ্ছিত পুরী ধলির ভবন।
অতি অনুপম যাহা না যায় বর্ণন।
এ হেন পুরীর মাঝে বলির নন্দন।
সিতপক্ষ শণী সম হতেছে বর্ধন ।
অতঃপর যবে পঞ্চ বর্ষে প্রবেশি।
আচাৰ্য্য আলয়ে পাঠ পড়িবারে দিল।
চৌষট্টি কলায় সুত হয়ে সুশিক্ষিত ।
মাগয়ে গুরুর কাছে বিদায় ত্বরিত ।
উপযুক্ত ক্ষেত্রে বীজ হয়েছে রােপণ
হেরি আনন্দিত হৈল আচার্যের মন ।।
অবশেযে আশীর্বাদ করি বহুতর।
বিদায় দিলেন তারে হইয়া সত্বর।
শিক্ষিত কুমার আসি পিতার চরণে।
ভক্তির সহিত নমে প্রফুল্ল বদনে ।
তবে দৈত্যপতি তার চুম্বিলা আনন।
মহানন্দে পূর্ণ এবে দানব ভবন।
বাল্যকাল অসুরের হইলে অতীত।
যৌবন যখন আসি হ’ল উপনীত ।
তবে যথাকালে রাজা পুত্রে বিভা দিল।
শাস্ত্রমত শুভকৰ্ম্ম সকলি করিলা ।।

( ৫২ ]
অতঃপর এক দিন গিয়া সঙ্গোপনে।
যুদ্ধের বার যত জানাল নন্দনে।
যেরূপে পালিয়া ব্ৰত লভিল তাহায়।
সমরে পাইয়া লজ্জা দেবের সভায়।
তার (ও) বলে ওন, পুল, তােমার সহষ্ণ।
দেবর্ষি নারদ হেন বলিলা আমায় ।
পুরুহুত পরন্তপে জিনিব সমরে।
কহিনু এ গুপ্ত কথা তোমার গোচরে ।।
অতএব কর, পুল, ইহার উপায়।
অন্তর এ অপমান সহ নাহি যায় ।
দমুজেন্দ্র মুখে শুনি এতেক বচন।
পদতলে পড়ি পুত্র কহিছে তখন।
“কোন্ ভয় কর পিতঃ, দেবতা বাসকে।
করিব বন্ধন জেন তাহারে আহবে ।
যে গলে শোভয়ে তার মায়ের দাম।
মাণিক-মুকুতা-মালা রহে অবিশ্রাম ।
সে গলা হইবে বদ্ধ দাসত্ব শৃঙ্খলে।
করিনু প্রতিজ্ঞ। আমি ইহা তৰ স্থলে।
জর্জিতে সাগর তীরে যাইব ধাতায়।
এই সে মিনতি মাের কহিনু তোমায়।”
পুত্রের মুখেতে শুনি এতেক ভারতী।
মনাে দুখে কহে তবে দানবের পতি
*বহুকষ্ট করি পুত্র ব্রত পুংসবন।
পেয়েছি অঙ্কেতে আমি তোম। হেন ।

t
৫৩ }
“কাজ নাই সুখ আশে বৈরী নির্যাতনে
কাটাইব কাল আমি চির ক্ষুগ্ন মনে।
হাসুক অমর-গ্রাম ভায়ক সুখেতে ।
এ জীবন ভুঞ্জি আমি আজন্ম দুঃখেতে।
হুমুক বাসব বসি অমর সভায়।
পড়েছি না পড়িয়াছি, দুঃখের আনায়।
তথাপি তােমারে তাত তপস্যা কারণ।
পাঠাইতে কোন দেশে বাঞ্ছে নাহি মন ।
কে কবে জলধি হতে মুকুতা তুলিয়া ।
পুনঃ সে তাহার মাঝে দেয় ডুবাইয়া ।
তােমারে ছাড়িতে প্রাণ না চাহে আমার।
বাঁচিব না মুহূর্তৃেক কি কহিব আর।”
এত শুনি কহে তবে বীর শঙ্খমুর।
“শুন গাে জনক, চিন্তা কর এবে দূর।
সরল অন্তরে আজ্ঞা দেহ মোরে দান।
করিব তােমায় দুঃখ হতে পরিত্রাণ ।
যাত্রা কালে নিবারিলে হয় অমঙ্গল।
স্থির কর মন ভাত, না হও চঞ্চল।
দৈব বলবান্ পিতঃ, দৈব বলবান্ ।
পরমেষ্ঠি-পদ সেবি পাব দুঃখে ব্রণ।”
পুত্রের মুখেতে শুনি এতেক বচন।
দিলেন বিদায় স্মরি শুক্রের চরণ।
একাকী বিদায় দিয়া দানবের পতি।
কাতর হৃদয়ে চিন্তে অগ্নতির গতি।

[ ৫৪
৫৪ 1
পাইয়া পিতার আজ্ঞা কুমার তখন।
যাদঃপতিতীরে তবে করিল গমন।
সুনীল গগন তলে বিশাল জলধি।
বিস্তারি নীলাম্বুরাশি আছে নিরবধি।
ব্ৰহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া যেন প্রকাণ্ড প্রকার।
স্পর্শিয়াছে ব্যোম পথ করি অন্ধকার
উত্তাল উল্লোল স্বতঃ ভীষণ দর্শন।
উঠিছে সর্বদা তথা ভেদিয়া গগন ।
উৰ্ম্মিরূপ কিরীট করিয়া পরিধান।
বসি বারিনিধি যেন সম্রাট সমান।
সংখ্যাতীত স্রোতস্বতী বেগে বহি যায়।
সহস্র করেতে কর প্রদানিতে আয় ।
কোথাও তােয়বৃন্দ বাঞ্ছি বারি পান।
জবৰ্ত্ত বেগেতে সবে হয়ে ঘূর্ণমান ।
হতেছে প্রবৃত্ত দেখি হয় অনুমান।
মথিছে সাগর পুনঃ দানৰ গীর্বাণ।
ভয়ঙ্কর কাকোদর মেলিয়া বদন।
করে পান বৈকালিক বেলা সমীরণ।
হেন সাগরের রােধে বলির নন্দন।
বসিয়ে চিন্তয়ে চিতে চতুর-আনন।
সে দিন যামিনীযােগে করি উপবাস।
শান্ত মনে রহিলেন পরি শুদ্ধবাস।
অস্ত গেলে নিশামণি বীরেন্দ্র নন্দন।
ইন্দ্রিয় হইতে মন করি, আকর্ষণ।

[ ৫৫
hood
উপেক্ষিয়া শরীরেরে তবে বীরবর।
তপ করি করে জীর্ণ শীর্ণ কলেবর ॥
ইতিমধ্যে একদিন আসি আসি ।
কহিলা অমরনাথে সম্বােধিয়ে হাসি।
“তপ করে দৈত্যৰীর সাগরের তীরে।
করহ উপায় তুমি তাহার অচিরে।”
শুনিয়া গুরুর মুখে এতেক ভারতী।
ত্বরা করি গেল যথা মেনকা যুবতী।
অাদি অন্ত সব তারে করিলা বর্ণন।
সত্বরে রামারে বীর কপনন্দন ।
তপোভঙ্গ হেতু তারে কহিলা বাসব।
এ কৰ্ম্ম করিতে মা তােমার ই সম্ভব।
পাইয়া ইন্দ্রের আজ্ঞা অঙ্গরা তখন।
হইলা তৎপর তথা করিতে গমন।।
বিনাইয়ে বিনােদিনী বিনােদ কবরী।
চলিছে যথায় ভাবী বাসবের অরি।
রাকা-শশী হ্রাসে হেরি বদন মধুরী।
তৃষিত চকোর তথা সদা ফিরে ঘুরি।
অাখিতে অঞ্জন মরি কিবা দেখা যায় ।
শােভিছে কেমন তাহা মুদির রেখায় ।
হেরি সে রেখার কান্তি মাতি ভ্রান্তি মদে ।
ময়ূর ময়ুরী নাচে আনন্দের হ্রদে।
ভুরূ-ধনু কুসুমেষু ধরে নিজ করে।
উচ কুচ হেরি বৃথা গিরি গর্ব করে ।

৫৬ ]
ক্ষীণ মাজা পরাজ। দেখিয়া লজ্জায়।
বিজন বিপিনে গিয়ে গহ্বরে লুকায়।
চঞ্চল যুগল ভুজে নিলে তরঙ্গিণী।
সুন্দর চিকণদন্তে হারে শিখরিণী ।।
অতি অনুপম তার রামরম্ভা উরু।
অঙ্গেতে মেখেছে ধনী চন্দন অগুরু।
উড়িছে উত্তরী গায় পবনের বলে।
হেরি যােগী যােগ ভুলে মুনি মন টলে।
কত ভাবে যায় রামা সুম গমনে।
বা দেখি মরিয়া আছে মরাল বারণে ॥
হেন অপরূপ রূপে সাজিয়ে তখন।
উপস্থিত হৈল.যথা বলির নন্দন ।
অতিপে তাপিত যেন ভুজঙ্গিনী যায় ।
জুড়াতে নিদাঘলা চন্দন-তলায় ।
মৃদু মৃদু রবে ধনী কহিছে তাহায়।
“এসেছি নয়নে হের ভজিতে তােমায় ।
কোন্ ব্রতে ব্ৰতী, নাথ, হয়েছ এখন।
কহ ত্বরা করে মােরে করি সম্পাদন ।
কত ভাবভঙ্গী রাম করিল তথায়।
তথাপি রহিল ধীর মহেশের প্রায়।
এত দেখি ভগ্নব্রতে ফিরিল অঙ্গরা।
বাসব ভবনে হয়ে দুঃখে মনােভরা।
আদি অন্ত নিবেদিল দেবেন্দ্র চরণে।
শ্রবণে অদিতিত বলে ক্ষুন্ন মনে।

[ ৫ ]
বজের ভরসা আমি না করি যথায়।
অবশেষে তােমা, ধনি, পাঠাই তথায়।।
এতদিনে ওন, ভীরু, জানিলাম ভাল ।
তুমিও এসেছ ফিরে ভেঙ্গেছে কপাল।
নিশ্চয় জানিহ আমি ডুবিনু আঁধারে।
স্বর্গের সুষমা সব যাবে ছারখারে।”
এইরূপে বিলাপিতে লাগে দেবরায়।
হেথায় বলির গৃহে শুক্র চলি যায়।
আচার্য্যে হেরিয়ে দৈত্য উঠিয়া তখন।
পাদ্য অর্থ দিয়ে কৈল শ্রান্তি নিবারণ ।
রাজদত্ত পূজা পরে করিয়া গ্রহণ।
আশীযি পরমানন্দে বসিলা তখন।
কাতরে দানবপতি কহে গুরু পায়।
“সুতের বিরহ আর সহ। নাহি যায় ।
স্বার্থপরবশ হয়ে কুমারে আমার ।
আজ্ঞা দিমু তপ হেতু কি কহিব আর।
অনন্ত সিকতা পূর্ণ পয়ােনিধি কূলে।
করিতেছে তপ পুত্র বহিজ্ঞান ভুলে।
দৈভ্যবংশ অবতংস সুত শঙ্খমুর ।
না পাই দেখিতে তারে অাছে বহুদূর ।
হায় রে তথায় কত ক্ষুধায় কাতর।
তপঃকৃচ্ছ- সাধনেতে জীর্ণ কলেবর।
নিরাশ্রয় সুতরাং সৈকতে শয়ন।
করিয়া রয়েছে মাের হৃদয়ের ধন ।

( ৫৮
অহো ছিছি! একি গুরো, পিতার আচার
হিতাহিত কোন জ্ঞান নাহিক আমার।
সহস্রেক সমা প্রায় অতীত হইল।
আছে কিবা নাই কেহ সংবাদ না দিল ।
কোন সমাচার নাই মনে ভাবি তাই।
সর্বদা হ’তেছে শুতে হারাই হারাই।
ধিক্ ধিক্‌ শত ধিক্‌, ধিক্ এ জীবনে।
এমন করিয়া প্রাণ ধরি গাে কেমনে ।
হায় গো বিদায় দিয়ে সেই বীরবরে।
নিদ্রা যাই নিশাযোগে পালঙ্ক উপরে।।
ভেবে বুক ফেটে যায় কহ নাহি যায় ।
আর কি পাইব দেখা কুমারে হেগায় ।
হা পুত্র! হা প্রাণাধিক ! বলিয়া যখন।
রমণী রােদন রেলে ভেদিবে গগন।
করুণানিধান, বল কেমনে তখন।
আমার উভয় কর্ণ করিবে শ্রবণ ।”
দানবেন্দ্র মুখে শুনি এতেক বচন।
করিলা উত্তর তবে শুক্র তপােধন।
ব্ৰহ্মতেজ বলে দৈত্য তনয়ে তোমার।
রক্ষিতেছি আমি তাহে জে অনিবার।
বিভাবসু সম তেজ ধরে তব সুত।
শুদ্ধ করিয়াছি তাহে করি মন্ত্রপূত।
যাহার বীরত্বরূপ বিশাল কীর্তিতে।
সমকক্ষ নাহি হবে কেই এ উব্বীতে ।।

{
السا
যে কৰ্ম্ম করিতে নারে হরের কুমার।
তাহাই করিবে জেন তনয় তােমার ।”
দানবে প্রবােধি ভবে কবিকুলমণি।
গঙ্গাধর পদ চিন্তি চলিল। তখনি ।
ভাৰ্গবের বাক্য গুনি পূর্বদেব-পতি।
অতঃপর বহুকষ্টে স্থির কৈলা মতি।
হেথায় সাগর তীরে বলির নন্দন।
করিছে কঠোর তপ ইন্দ্রের কারণ ।
শঙ্খমুর করে তপ বড়ই দুষ্কর।
হেটমাথে উদ্ধাপদে রহে নিরন্তর।।
কপাল উরস্ ভুঙ্গে লেখা ইষ্টনাম।
নির্ভয় মনে সে তপ করে অবিশ্রাম
নিদাঘে দারুণ অগ্নি তপ হেতু
জ্বলে
উত্তরী বিহীন রহে শিশিরের কালে ।
তপ করে দুই পদে স্পর্শিয়া আকাশ।
দানবের তপ দেখি দেবে লাগে ত্রাস।
মধ্যে মধ্যে মেধ্যফল করয়ে আহার ।
মহাকষ্ট করে দৈত্যসুত অনিবার।
অবশেষে নিরাহারে বায়ু করি পান।
তপস্যায় রত হৈল বলির সন্তান।
এতেও হ’ল না যদি দয়া বিধাভার।
অপর উপায় দৈত্য করে পুনৰ্ব্বার।
লবণ জলধিজলে অভিষিক্ত শির।
ছেদিয়া আহুতি দিতে
মনে
কৈল স্থির !

f
• 1
কাটিতে মস্তক যবে উদ্যত দানব।
হেনকালে উপস্থিত হৈল অজোদ্ভব ।
পশ্চাতে থাকিয়া হস্ত ধরিয়া তখন।
সে ভীষণ কৰ্ম্ম হৈতে করিলা বারণ।
(মহাকালকূট করে করি উত্তোলন।
আত্মঘাতী যায় যবে করিতে ভক্ষণ।
পশ্চাতে থাকিয়া তার নিজ বন্ধুজন।
করে যথা আত্মহারে সে কৰ্ম্মে বারণ)
হেন কৰ্ম্ম কৈলা যদি কমল-আসন।
অমনি চমকি দৈত্য কহিল তখন।
“কে তুমি পশ্চাতে থাকি এমন সময় ।
বাধা দিলে হেন কৰ্ম্মে ভাল নাহি হয়।”
শুনিয়ে দানবমুখে এতেক বচন।
বলিল। বিরিঞ্চি দেব জগৎ-বন্দন।
শব্দাদি বিষয় আর ইন্দ্রিয়গণের।
বিশ্রামের স্থান ভূত তােমার চিত্তের।
স্থির করি দিবানিশি চিন্তিছ যাহারে।
সেইজন হই, নেত্রে 'হেরহ তাহারে ।
অর্জিত দেবতা নিজ সম্মুখে দেখিয়া ।
নমস্কার করি কহে চরণে ধরিয়া।
“কান্ত সময়ে, দেব, তােমার সৃজিত
জগৎ সংসার প্রভু হইলে অন্তর্হিত।
বিশ্বের কারণ অধেক্ষজ নারায়ণ।
প্রলয়-পয়ােধি-জলে আছিল শয়ন ।

3
তৎকালে তুমিও তাহে হইলা বিলীন।
সংসারের(ও) কিছুমাত্র না রহিল চিন্।
শাশ্বত-পুরুষ বিখপাত-জনার্দন।
পুনৰ্ব্বার মায়া শক্তি করি সঞ্চারণ
নাভি-সরসিজ তোমা, করিলা সুজন।
করিতে নূতন সৃষ্টি জগৎ কারণ।
অতএব পিতামহ সৰ্বমূলাধার ।
প্ৰপন্ন-কামনা, প্রভাে, পূরাও এবার।
কৃপা করি কৃপাময়, দেহ এই বর।
এ ভব মাঝারে যেন হই গাে অমর ॥”
দানবের বর শুনি বিরিঞ্চির হাসি।
আকাশে অমরগণ পাইলেক ত্রাস।
*বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডেতে কেহ না হয় অমর।
কহিলাম অকপটে শুন দৈত্যবর ॥
অনাদি-অনন্ত সেই পুরুষ ব্যতীত।
অমরতা-সুধা পানে সকলে বঞ্চিত।
ভবিষ্যৎ-অন্ধ-জীব ভ্ৰম-বশতায়।
অভিহিত করে সুরে “অমর” আখ্যায় ।
দ্বিপরার্ফ বর্ষ যবে হইবে অতীত।
তৎকালে জানিহ আমি হব অন্তর্হিত ।
হেন বর ভিন্ন তুমি যে বর যাচিবে।
করিলাম সত্য তাহা অবশ্য পাইবে।
যেহেতু স্বয়ং আমি নহিক অমর।
কি করিয়া বল তবে দিব হেন বর।”

[ ২ ]
হেন বাক্য হইল যদি বিরিঞ্চির তুণ্ডে।
বজ্রাঘাত হইল যেন দানবের মুণ্ডে।
অতঃপর কতক্ষণ করিয়ে বিচার।
বিধাতার পদে ধরি কহে পুনৰ্ব্বার ।
“কি বর মাগিব, দেব, আমি মূঢ়মতি।
তােমার চরিত্র বুঝে কাহার শকতি।
আছিল আমার কুলে দানব-ঈশ্বর।
হিরণ্যকশিপু বীর বড় ভয়ঙ্কর।
মাগিল অমর বর তোমার নিকট।
প্রবন্ধে ভুলালে তারে করিয়া কপট।
অতএব যেই বাঞ্ছা হয় তব মনে।
সেই বর দেহ, বিধি, নিবেদি চরণে।
কহিব কি সব তব আছয়ে গোচর।
পিতৃ-দুঃখ-কালব্যাল দংশে নিরন্তর।”
দ্রবিল দৈত্যেন্দ্র-সুত-করুণ-বচনে।
পিতামহ-পদ্মসন-চিত্ত এতক্ষণে।
উদ্যত করিতে দান বর পদ্মযােনি।
হেনকালে অকস্মাৎ হৈল দৈববাণী।
“বিধাত বিচারি বর, বিতর দানবে ।
দুর্জয় হইবে দুষ্ট জেন এই ভবে।”
সে শব্দ কেবল গেল ব্রহ্মার শ্রবণে।
দৈবতগণের বাণী কে শুনে কেমনে।
ক্ষণকাল মৌনব্রতে থাকি দেবরায়।
দানবে তথায় বর দিলেন ত্বরায়।

[ ৩ ]
“যােড়শােপচারে পূজা করিয়ে শঙ্করে।
প্রবেশে সমরে এই বিশ্ব চরাচরে।
ব্রিলােক নিবাসী কেহ জিনিতে নারিবে।
আমার বচন, দৈত্য, নিশ্চয় জানিবে ।
আর এই পাশ অস্ত্র দিলাম তােমায়।
করিবে বন্ধন ইন্দ্রে নিশ্চয় যাহায়।
সৌরকররাশি হতে সূর্যকান্ত-মণি।
কাষ্ঠ দহির শক্তি পায় সে যেমনি।
বিধির প্রদত্ত পাশে তেমতি দানবে।
সৌভাগ্য-আকাশ-ভ্রষ্ট করিবে বাসবে।
বিধাতা বিতরি বর মরাল-বাহনে।
চাপিয়া চলিয়া গেল। নিজ নিকেতনে।
ইতি শঙ্খপুর বরপ্রাপ্তি নামক চতুর্থ সর্গ।

পঞ্চম সর্গ।
বর পেয়ে বিধাতার দানব-কুমার,
যথা স্বর্ণ-সিংহাসনে,
পাত্রমিত্রগণ সনে,
বিরাজিত দৈত্যেশ্বর জনক তাহার,
আসি তথা তাঁর পদে নােয়াইয়া শির,
আদ্যোপান্ত বিবরণ
করি সব নিবেদন,
হিলেন দাণ্ডাইয়া হয়ে অতি ধীর।
বহু দিবসের পরে সুতেরে হেরিয়া
আনন্দ বাড়িল মনে,
দরিদ্র যেমন ধনে,
সিন্ধু যথা উচ্ছলিত ইন্দু নিরখিয়া ।
করিলা চুম্বন সু-শীর্ষ বারবার,
করি হস্ত প্রসারণ,
দিয়া তারে আলিঙ্গন,
বসাইলা বলি শূরে অঙ্কে আপনার।
বিতরিলা বহুরঙ্গ দ্বিজেরে রাজন;
আনন্দিত হয়ে অতি
“জয় দানবের পতি।”
বলিয়া ব্রাহ্মণগণ করিল গমন।

[ ৬ ]
সেনাপতিপদে বলি ৰবিলা কুমারে ;
সভাস্থ সকল জন
হল হরষিত মন,
ধন্যবাদ দিল। তারা সকলে উহারে।
কহিলা অনুরনাথ সুত শঙ্খমুরে ;
“সাজি যুদ্ধ সাজে সবে
শাসিতে বাসবে তবে
করি ভীমনাদ চল অমরের পুরে।
তােমার সহায়ে পুত্র জিনিব তাহারে,
পূজি শীঘ্র মহেশ্বরে,
এস তুমি ত্বরা করে,
যাব মহারণে আজ লইয়া তােমারে।”
পাইয়া পিতার আজ্ঞা কুমার তখন,
পূর্ণ রূপে পূজি হরে,
গালবাথ করি পরে,
সাজিতে সমর সাজে করিল গমন।
সাজাইছে বেশকারী সমর সজ্জায়
দিয়া নানা আভরণ
শীঘ্রগতি সে তখন
বিচিত্র মুকুট দিল বাঁধিয়া মাথায়।
সুনীল বরণ-অঙ্গে উত্তরীয় দিল
চৰ্ম্ম, বৰ্ম আদি সাজে,
সাজাইল যুবরাজে,
কর্ণেতে কুণ্ডল দিল করে ঝিলমিল।

K
।
মধ্যাহ-মার্তণ্ডনিভ সূৰ্য্যকান্ত মণি
ভালে পরাইয়া দিল
ভাণ্ডারেতে যাহা ছিল,
উদয় সে নীলাকাশে যেন দিনমণি
সারথি আনিল রথ অপূর্ব দর্শন,
মুকুতা ঝালর ঝােলে,
ফুলহার তাহে দোলে,
কৌষেয় কেতন উড়ে ভেদিয়া গগন।
চাপিয়া শতঙ্গে, দৈত্য পিতার চরণে
আসি উপস্থিত হল,
কহিল জনকে,-“চল,
শাসিতে সুরের শ্রেষ্ঠ অদিতি-নন্দন।”
সজ্জিত কুমার বুখী পিতার সম্মুখে
করিতেছে আস্ফালন,
সাজে যত শূরগণ ;
“মার! মার ! এই শব্দ সকলের মুখে।
শুনিয়া সুতের মুখে এতেক বচন--
আপনি সাজিল বলি ;
যথা দশানন বলী
নাশিতে কামনা করি জানকী-জীবন ।
আজ্ঞা দিল বলি বাদ্য বাজাতে তখনি,
উৰ্ব্বীশ-আদেশ পেয়ে,
ঢক্কা ঢোল লয়ে ধেয়ে,
দানবেরা রণবাদ্য বাজাল অমনি ।

[ ৭
]
ভেরী জগঝম্ফ বাজে শত শত ভক্ষ,
দামামা বাজিছে কত,
আর বাদ্য ছিল যত,
যাহার নিনাদে হ’ল ত্রিভুবনে কম্প।
বাজায় মৃদঙ্গ কেহ মন্দিরা মােচঙ্গ।
রণশিঙ্গা বাজে মাের,
সকলে শুনিয়া তাের,
ঝাঝরি খমক বাজে গভীর ভোরঙ্গ।
লক্ষ শঙ্খ একবারে বাজিয়া উঠিল ;
স্বর্গ, মর্ত্ত, রসাতল,
শব্দে করে টলম,
বিমান-বিবর সেই আরাবে পূরিল।
নাচে তালে তালে অশ্ব করি হ্রষা রব,
উলঙ্গ কৃপাণ করে,
সাদীব্রজ বাজি’পরে ;
ভীষণ নিনাদে নাদে করিদলে সব
যামিনী তৃতীয় আম নীরব অবনী,
ভীমনাদে ঘোরতর,
কাপাইয়া চরাচর,
উঠিল সে ধ্বনি, তায় হ’ল প্রতিধ্বনি।
ভয়েতে কাননে যত হিংস্র জীবগণ,
রণবাদ্যে মিশাইয়া,
ত্রিভুবন কঁাপাইয়া,
করিতে লাগিল, তার গম্ভীর গর্জন

band
বিস্তারি দানবীমায় শূন্যমাৰ্গ দিয়া
অষ্ট অক্ষৌহিণ ঠাট,
যুড়িয়া আকাশ-বাট,
চলিল সকলে বীর মদেতে মতিয়া
রণঙ্গে সাজি সব চলিছে দানব ;
কম্পমা ত্রিভুবন,
চলে করিবারে রণ,
দিশ-আলয়ে যথা আছয়ে বাসব।
বাজে জয়ঘণ্টা রথে ঠঠন্ ঠঠনে ;
শঙ্খনুর চলে আগে,
তাহার পশ্চাৎ ভাগে
চাপিয়া চলিল বলি বৃহৎ শুনে।
অমরায় বিধবা মানসমােহিনী,
প্রতি দেব ঘরে ঘরে,
আনন্দেতে নৃত্য করে,
আমােদ-প্লাবনে ভাসে যামিনী কামিনী।
বিচিত্র পুরীর মাঝে সুন্দর ভবনে,
অপূৰ্ব পৰ্য্যৰু’পরে
পৌলমীরে কোলে করে
আছিল বাসব শুয়ে ঘুমে অচেতনে।
হেন নিশিযােগে আসি ইন্দ্রের ভবন,
বিহারি অম্বর তল,
অসংখ্য দানব বল
শেরিল তাহার পুরী সকলে তখন।

{
৯ ।
টলমল করে পুরী দৈত্য-পদভরে ;
কাঁপিছে নন্দন বন,
হাঁকিছে দনুজগণ,
বাজিল বাদি তথা দ্বিগুণে তৎপরে।
অকস্মাৎ রণবাদ্য ওনিয়া শ্রবণে
চমকি উঠিল বীর,
ঝড়ে যথা সিন্ধুনীর,
বসিলা শয্যার’পরে সশঙ্কিত মনে।
জানিলা দেবেন্দ্র—বলি দানব-ঈশ্বর,
সুতেরে সহায় করি,
এসেছে দুরন্ত অরি
করিতে আমার সাথে সংগ্রাম দুস্তর।
এতেক চিন্তিয়া মনে পৌলমীরঞ্জন
উঠিল। করিতে রণ,
অঙ্গে পৰি আভরণ,
হেনকালে শচী তার ধরিয়া চরণ
কহিছে বিনয় করি কাতরে তখন ;-
“যেও না সমরে, নাথ।
দুরত্ত দানব সাখ,
মনে কি জাগে না দেব দুর্বাসা-বচন?
বিশেষ কোবিদ তুমি বুদ্ধে বিচক্ষণ,
আপন পাশরি কেন,
লিপ্ত হও কাৰ্যে হেন ?
কি বলে বুঝাব যুদ্ধে হইবে বন ?
-

[ • 1
নিশ্চয় দনুজ জেন পাইয়াছে বল,
হারি একবার রণে,
এল পুনঃ কি কারণে?
বুঝিতে পার না তাহা নিজে সে দুর্বল ?
চিন্তিলে তােমার কৰ্ম্ম, ভয়ে প্রাণ কাঁপে!
ওন ওন, গুণমণি!
সদা অমঙ্গল গণি
কাদে স্বর্গ দিবানিশি, দুর্বাসার শাপে!
আৰ্যপুত্ৰ ! আজিকার যেও না সমরে ;
যা হবার তাই হবে,
থাক অবরােধে, তবে
ভগ্নোদ্যম দৈত্যচ হয়ে যাবে ঘরে।”
বিপদে পড়িলে যদি বুঝায় রমণী,
সে বুদ্ধি সুবুদ্ধি হলে,
শুনয়ে পুরুষ দলে,
আর কি বলিব, ওহে সুর-শিরোমণি।”
প্রবেশে পতঙ্গ যথা পাবক শিখায় ;
শুনিয়া সে বচন,
করিতে ভীষণ রণ,
পুরীর বাহির হয়ে পুরন্দর যায়।
ভাবিতে লাগিল মনে পুলােম-নন্দিনী।
মনে মনে বলে, হায়!
স্বর্গসুখ বুঝি যায়।
কত অমঙ্গল গণে বসি ৰিষাহিনী।

[ ১ ] পুরীর বাহিরে ডাকে সহলোচন- “কোথা এবে, দেবগণ! ব্ৰহ্মা শিব, নারায়ণ। রক্ষ এ বিপত্তিকালে আমারে এখন। বিপদে সহায় মাত্র তােমরা সকলে পড়েছি বিষম দায়, স্বর্গ-লক্ষ্মী ছাড়ি যায়, করিতে বরণ বুঝি বলি মহাবলে! অসময়ে দেখ আসি ঘেরেছে আমায়। তােমা সব বিনা আর বিপদে করিতে পার নাহি দেখি সবে এবে হও হে,সহায়। এখানে বৈকুণ্ঠে হরি দেব নারায়ণ ; অম্ভোজা কমলাসনে, ছিল। প্রেম আলাপনে হেনকালে টলি তাঁর উঠিল আসন। জানিলা অন্তরযামী স্মরিছে বাসব, কি করি উপায় এবে? বলি মােরে সদা সেবে ? হইতে সহায় এবে কার তবে যাব? ভেবে চিন্তে দৈতাহারী গরুড়-আসনে, করিতে দেবের হিত, হইলেন উপনীত, অর বেষ্টিত যথা জিষ্ণুর ভবন।

hood
মরাল বাহনে এল চতুর-আনন।
লইয়া ত্রিলােক ত্রাসী
পাশ হতে এল পশী ;
মহাঝড় বহি তথা আইলা পবন ;
ভয়ঙ্কর কালদণ্ড করিয়া ধারণ
নিজ দূত সঙ্গে করি,
সমরের সজ্জা পৱি,
আইলা মহিষারূঢ় কৃতান্ত শমন।
অবশিষ্ট দেবতারে করিয়ে সংহতি,
করে ধরি শাসন,
সুধী ময়ূরাসন,
হল সমবেত রণে, যথা শচীপতি।
পরম ভকত ধীর বলির নন্দন,
জানি তাহা ত্রিলােচন,
আসিয়া সে কারণ,
পাঠাইলা নিজ দূত করিবারে রণ।
ভূত, প্রেত, যক্ষ, দানা সবে দিল হানা,
না ভৈঃ! মা ভৈঃ! রবে।”
রুদ্রদূত
হ’ল উপনীত যথা মুনাসীর থানা।
ঘাের-বেশে মুক্ত-কেশে করাল বদনী,
ডাকিনী যােগিনী সঙ্গে,
অসি করে রণরঙ্গে,
আইলেন মহাকালী জলদ বরণী।
ডাকি সবে,

[ ৭৩ ]
সুরগণে সমবেত সহলােচন,
দেখিয়া নয়নে তবে,
আজ্ঞা দিল দেব সবে
চল শীঘ্রগতি যাই করিবারে রণ।
বাসদের রণবাদ্য বাজিল অমনি
কাপে মন্দাকিনী জল,
কঁপে স্বর্গ টম,
স্কাপিল শােণিত-শিরা দেবে তখনি।
নিজ নিজ প্রহরণ ধরি সুরগণ,
করি সবে, আস্ফালন,
চলিছে করিতে রণ,
দেবরাজ আজ্ঞা পেয়ে উৎসাহে তখন।
সর্ব অগ্রে শরজন্ম দেব-সেনাপতি,
কোদণ্ড টঙ্কার করি,
মারিতে দুরন্ত অয়ি,
প্রবেশিল রণাঙ্গণে বীর মহামতি।
মধ্যভাগে শচীনাথ মাতলি সারথি,
আগে পাশে দেবগণ
থাকি সবে সেইক্ষণ
উপস্থিত হইলেন সকলেতে তথি।
“পাড়া রে দুরন্ত দুষ্ট দনুজের দল।”
বলি হঁাকে দেবগণ,
করে অস্ত্র বরিষণ,
শরে শরে হ’ল যেন,শ্রাবণ-বাদল।

[ ৭৪
I
“সমরে অদূরদর্শী দুষ্ট দৈত্য দল।
নিশাকালে কি কারণ
করিবারে এলি বল ?”
বলিয়া নিদিলা যবে তারকসুদন;
কৃষিয়া দানবগণ অমনি তখন,
শূল, শেল, ধনুর্বাণ,
কেহ খঙ্গ খরশান,
লইয়া লাগিল তার করিবারে রণ।
অসিতে অসিতে যুদ্ধ, মুষলে মুষল,
গজ ধায় গজবরে,
অষে অশ্ব যুদ্ধ করে,
তুমুল সংগ্রামে ক্ষুব্ধ হ’ল রণস্থল।
বাণে বাণে আচ্ছাদিল গগন মণ্ডল ;
সুরাসুরে হয় রণ,
বিশ্ব কাপে ঘন ঘন !
রুধিরে হইল রাঙ্গা মন্দাকিনী-জল।
অগণ্য দানবীসেনা হ’ল তিরােধান ;
কেহ অর্ধমৃত প্রায়
হয়ে গড়াগড়ি যায়,
কেহ বা রয়েছে করি বদন ব্যাদান।
তবে ত দানব আজ্ঞা দিল সারথিরে ;
“লহ রথ ত্বরা করি
যথায় তারক, অরি,
সমরে পরা তারে করিব অচিরে।

liet
আনিল শতাঙ্গ সূত সম্মুখে তাহার,
রথ-অশ্ব গর্জে তথা,
হরের কুমার যথা,
লাগিছে দেখাতে বীরপনা আপনার।
একবারে বার বাণ যুড়িয়া কাকে
দৈত্য করে সিংহনাদ,
দেবে গণে পরমাদ।
বিন্ধিলা তাহাতে বীর কুমারের বুকে।
শরাঘাতে ষড়ানন লাগিলা হাসিতে ;
দেখি দৈত্য কটু বলে,
বহ্নি যথা ঘৃতে এলে,
ততোধিক বলিলেক না পায়ি সহিতে।
দম্ভ কৰি দৈত্যসুত কহিছে তখন ;-
“আমার সমর আগে
কে আছে অমর ভাগে,
দাণ্ডাইয়া ক্ষণ কাল করিবেক রণ?
কেমনে জানিলি তুই জিনিবি দানবে?
নহে এ তারকাসুর,
শােন দুষ্ট, ওরে ক্র!
এখনি ধাঁধিব দেখ দেবতা বাসবে!
থাকিতে হবে না আর বৈজয়ন্ত থামে,
ছিল না জগতে বীর ;
তাই সবে আছ স্থির ;
কি এবে পান নাকি শখ নামে?

[
1
“সম্মুখ সমরে আজ যুঝে, সেই বী,
দেখিব ত্রিদশ দল
কত ধরে গবে ;
অবিরল ঝরাইব নয়নেতে নীর।
পারিজাত মালা ই পরছে যে গলে,
হীরক খচিত হার
শােভয়ে যে কণ্ঠে তার,
হইবে আবদ্ধ তাহা দাসত্ব-শৃঙ্খলে।
বৈজয়ন্ত ধামে যথা রাজসিংহাসনে
বসয়ে বাসব তোর,
এই রে প্রতৃিজ্ঞা মাের,
বসাব জুনকে আমি সে রাজ-আসনে
ঘুচাব অমর নাম রাখিব গৌরব ;
দেবগণে কাদাইব,
দানবেরে হাসাইৰ,
লইৰ কাড়িয়া ত্বরা বাসব বিভক?
বীর অংশে জন্ম মাের, বীর অবতাৰু
কুমার নিশ্চয় জেন,
কহিলাম তোরে হেন,
স্বর্গের সুষমা হবে শীঘ্র ছারখার।
দেখাব দানব-বীর্য্য দেখিবি কেমন ?
ছাড়িব না একজনে,
হারাব অমরগণে,
সবার সম্মুখে আম্নি কহি এমন।

{
1
বলির কুমার মুখে এতেক বচন
গুনিয়া শ্রবণে তবে,
পর্জন্ত-নিনাদ-রবে
গর্জিয়া বলিল বীর দেব ষড়ানন ;-
শুন হে দানবমুত! বহুকাল পরে
পুনরায় মহরঙ্গে,
হবে রণ দৈত্য সঙ্গে,
আসিয়াছি তাই আমি সাজিয়া সমরে।
কিন্তু এই ভয়ানক সমর-সাগরে
বালক সেনানী তুমি,
মহার্ণবে যথা ভূমি,
দেখিয়া অবজ্ঞা মাের হ’তেছে অন্তরে।
করিবারে বাঞ্ছি রণ দানবেন্দ্র সনে ;
তোমা নাহি চাই আমি,
কোথায় দানব স্বামী ?
দেহ দেখাইয়া, তারে, সমর প্রাঙ্গণে।
একে এ নবীন কান্তি বালক তাহাতে,
কেমনে তােমার সনে,
ধরি অস্ত্র ঘের রণে
তুলিব কলঙ্ক লোকে গাইবে যাহাতে?
কহে শঙ্খমুর,-“অগ্রে জিনহ আমারে ;
কথায় কি প্রয়ােজন ?
শীঘ্র আসি দেহ রণ,
প্রাণ যদি পাও তবে দেখিবে তাহারে,

السعة
৬৮
সুররক্তে রণক্ষেত্র হবে প্রক্ষালিত,
অমর মস্তক পরে
অমুরের দর্প ভরে
দলিবে নিয়ত, স্কল, জানিহ নিশ্চিত।”
বলির কুমার মুখে এতেক বচন
দেব সেনাপতি তবে
গর্জিয়া ভীষণ রবে,
ভয়ঙ্কর অস্ত্রগণ করিলা বর্ষণ,
অমনি সন্ধান পূরি বলির নন্দন,
এড়ি অস্ত্র খরশান,
শূন্য পথে খান খান
করিয়া ফেলিলা কাটি সেই শরগণ।
ব্যর্থ গেল অস্ত্র যদি কুষিয় কুমার,
তূণ হ’তে বাছি বাণ,
ধনুকেতে দিয়া টান,
ছাড়িলা তাহাতে যুড়ি দিয়া হুহুঙ্কার।
শূন্য পথে আসে বাণ অগ্নি হেন জ্বলে
নাশিতে দানব দল ;
বনে যথা দাবানল
দহিতে প্রস্তুত হয় মহীরুহ দলে।
গলায় অসুর দেখি ভয় পেয়ে মনে,
শঙ্খানুর কহে তবে
“দাড়াও দানব সবে
এখনি ছেদিব অস্তু দেখহ নয়নে।”

[ ৭৯
1
রণে ফিরাইয়া যত দানবের দল,
নিজ বাণ এড়ি পরে
কুমারের অস্ত্রবরে
কাটিয়া হাসিতে বীর লাগে খলখল।
তবে দৈত্য অনাকিনী সকলে তখন
ঘন, ভীষণ শল্য,
চক্র, প্রক্ষে, ড়ন, ভল্ল,
দিলেক ছাড়িয়া ভয়ে কঁাপে দেবগণ!
ভয়ঙ্কর অগ্নিবাণ হইতে তখন
ধূম অগ্নি উদগীরণ,
ব্যোমপথ আচ্ছাদন
করিয়া নাশিতে ছুটে যত দেবগণ।
চঞ্চল পয়ােধি-নাথ হইয়া হতাশ,
ফেলিছে তরঙ্গ শ্বাস,
হয় বুঝি কীর্তিনাশ,
ব্যোমপথে দেখি বাণ ভাবিয়া সন্ত্রাস।
অনন্তর শত শর যুড়িয়া কাম্মুকে,
কাপাইয়া ত্রিভুবন,
হৃদে চিন্তি পঞ্চানন,
বিন্ধিলা বলির পুত্র কুমারের বুকে।
মূচ্ছিত হইল। তাহে ময়ুর-আসন,
ছয় মুখে তৎক্ষণাৎ,
রক্ত উঠি.অকস্মাৎ,
ত্যজিয়া বাহন বীর পড়িলা তখন ।

[ ৮০
لبا
হেরি হাহাকার করে দেবের সমাজ
আনিয়া শীতল বারি
কেহ দেয় মুখে তাৰি,
ব্যজন করেন পাখা নিজে দেবরাজ।
কতক্ষণে চেতন পাইলা বীরবর।
নাহিক শকতি আর
করিতে সমর তার,
পলাইলা ভঙ্গ দিয়া রণে অত:পর।
সেনানী ভয়েতে যদি গেল পলাইয়া ।
কোপেতে কম্পিত কায়,
নিজগণ সঙ্গে ধাম,
আরক্ত নয়নে এল কৃতান্ত ধাইয়া।
শমনে সমরে হেরি দনুজের দল
“মার, ! মা!” করি তবে,
শেল শূল লয়ে সবে,
ঘেরিল নিমিষে তঁারে দৈতাবীর-দল।
অর্ধচন্দ্র শিলীমুখ বাণ ব্রহ্মজাল,
মুষল, মুদশর বরে
ল’য়ে কেহ ত্বরা করে,
নিক্ষেপিছে আর ভয়ঙ্কর ভিদিপাল।
শঙ্খমুর পাছে করি, যত বলি-বল
করে যুদ্ধ যম সনে,
সবে উৎসাহিত মনে
কাণাঘাতে রবিসুতে করিলা বিকল।

[ ৮১ 3 দিতি-তে রথচক্র চুণি মেঘদল ফিরিতেছে নিরন্তর, ভয়ে স্তব্ধ চরাচর, অবিরাম দলিতেছে তাহে সুবল। ঘাের রণ প্রভঞ্জনে দেব দৈত্য-দাপে, শিঞ্জিনী টঙ্কারি ঘন, অাঘাত বিভীষণ, সেনার গর্জনে ঘন মেরুণীর্ষ কাপে। অস্ত্রের উপরে অস্ত্র করে বরিষণ- তীক্ষ্ণ উকা সমশর অনুরের বহুতর একবারে এড়িলেক করিয়া গর্জন। বাণে বাণে নিবারিয়া সূর্যের নন্দন, কহিছে দানবে ডাকি, গভীর নিনাদে হকি "কোথায় বলির পুত্র ? ওরে দৈত্যগণ । দেখাইয়া দেহ তারে আমারে সত্বর। যদি পাই দেখা তার, তা হলে নিস্তার আর, থাকিবে না কহিলাম সবার খােচর। অন্তরে ভেবেছ বুঝি জিনিয়াছি দেবে ? নহে এ তারক-অরি, চরমে চিনুহ হরি, আপনি শমন যুদ্ধে আসিয়াছে এৰে।

[ ২ ]
ঐ দেখ, দুষ্ট দৈত্য! পিতৃগণ তব
ফেলিছে নিশ্বাস ঘন,
হেরিয়ে নশ্বর বণ,
বংশ নাশ হয় পাছে সাসেতে সব,
এই বেলা লও, দৈত্য। করিয়া তৰ্পণ ;
আমার সময়ে সবে
মরিলে কি আর তবে,
বারি দানে তুষিবেক তব পিতৃগণ ?”
নিয়া শমন-মুখে এতেক বচন,
অগ্নি হেন উঠি অলি
কহে সূচীমুখ বলি-
“দাড়া রে, কতান্ত, তােরে দেখব এখন।
মনে কি করেছ তুমি সবার শমন?
যে সে বীর নয় আমি,
শােন সংযমনী স্বামি।
এখনি পাঠাব তােরে তােমারি ভবন।
উদিতে পূর্বাশায় তােমার জনক
দমুজের হবে জয় ;
ইহা মাের মনে লয়,
তবে কেন বৃথা গর্ব মৃত্যুর নায়ক ?
কোন মতে মম হাতে পাও পরিত্রাণ ।
তাতেও নিস্তার নাই,
কহি ওন মম ঠাঁই,
আছে রে কৃতা! তোর বলির সন্তান।

[ ৮৩
]
ছি ছি রে শমন! শত ধিক্ ধিক্ তােরে
মুখে গর্ব পরকাশ,
অন্তরেতে পও ত্রাস,
আপনি আপন বড় দেখ নিজ জোরে!
আমার সংগ্রামে তাের নাহি পরিত্রাণ,
অন্তরে জানিহ স্থির
এখনি কাটিব শির,
ঘুচাৰ অমর নাম ধরিয়া কৃপাণ ।
জগতে পাবি না স্থান করিতে বিশ্রাম
অমর কুলেতে কালি
কেন আসি দিলি চালি?
বল, রে কৃতান্ত! নাহি ভাবি পরিণাম ?
এতেক বলিলা যদি পরুষ বচন ;
কোপেতে কম্পিত যেন
মাতঙ্গ অঙ্কুশে হেন
কৃষিয়া উঠিল দেব রবির নন্দন
বিকট ভীষণ রদ করিয়া বিস্তার
আজ্ঞা দিল সূৰ্য্যসুত,
ভয়ঙ্কর যমদূত
কূট করতালি দিয়া বলি মার মার!
বেশিলা রণক্ষেত্রে যত যােদ্ধা দল।
শেল, শূল, দর্পভরে
উঠাইয়া স্কন্ধপরে
আচ্ছাদিল কেহ শরে গগন মণ্ডল।
গন

f
৪
3
পর্জিছে অমর সৈন্য ভৈরব গর্জনে ;
নিষ্কোষিত অসি ঘায়,
পদাঘাতে কেহ হয়,
নাশিছে দানবীসেনা উৎসাহিত মনে।
অকস্মাৎ একবারে লক্ষ অগ্নি বাণ,
ভীষণ গৰ্জন করি,
ছাড়িলা দুরন্ত অরি,
কত শত দৈত্য-সুত হৈল তিরােধান।
লইয়া উলঙ্গ অসি শব-উরঃপরে,
লেল জিহ্বা অট্টহাসে
করালবদনা হাসে,
বিশ্ব চরাচর কাপে থথর, থথরে ।
উৰ্দ্ধবাহু যত তথা রুদ্র-দূতগণ,
ভৈরব আরব করি,
মৃত দেহ করে ধরি,
মন্দাকিনী জলে সবে করে বিসর্জন।
সমর প্রাঙ্গণ হল শ্মশান সমান
স্থাপিত সম্মুখে শব
বিরত বদনে বুব,
রয়েছে পড়িয়া কেহ ধরিয়া কৃপাণ।
নাচিছে প্রমথগণ, ডাকিনী হাঁকিছে
একে অন্ধকার নিশি
জগৎ তাহাতে মিশি
ত্রাসিত অন্তরে যেন চাহিয়া রহিছে ।

pakun
বিরাট তাণ্ডবে ক্ষুব্ধ হ’ল ত্রিভু,
দেবসেনা নাচে তালে,
ভূতে বম্ বলে গালে,
পূর্ণ হ’ল কোলাহলে সমর প্রাঙ্গণ।
বসেছে পেতিনীপাল শব লয়ে ভূয়ে ;
হী-হী শব্দে ঘোরতর,
পূর্ণ হ’ল চরাচর,
লাগিল উড়িতে দৈত্য ঘন ঘন ফুয়ে।
আনন্দসাগরে ইন্দ্র ভাসিল তখন,
জানিল জিনিনু রণে,
আজিকে অসুরগণে,
মিথ্যা যে হইল এবে দুৰ্ব্বাসবচন।
পলায় আসুরীসেনা ভঙ্গ দিয়া প্রণ,
মুখে বলে হায়! হায় ।
সমরেতে প্রাণ যায় !
কেমনে পাইব ত্রাণ সংশয় জীবন।
গর্জিয়া কহিল তবে বলির নন্দন
*দাড়াও দানবগণ!
কেন ভঙ্গ দাও রণ?
এখনি দেখহ করি বাসবে বন্ধন।
ভেবেছ কি মনে যুদ্ধে অদিতিনন্দন,
রণে তােমা হারাইয়া,
সিংহাসনে পুনঃ গিয়া,
বসিবে শচীরে লয়ে হয়ে হৃষ্টমন

}
.
বলির কুমার আমি হরের কিঙ্কর।
আমার সমর আগে,
কে আছে অমর-ভাগে,
স্থির হয়ে ক্ষণকাল করিবে সমর ?
ওর ধনুর্বাণ সবে বাজাও বাজনা ;
শঙ্খশুর জীয়ে এবে,
তাও কি দেখ না ভেবে ?
ক্ষিত বেলায় সিন্ধু জেনেও জান না ?
কি ছার মিছার প্রাণ করিয়ে ধারণ ?
ব্লখিব বীরত্ব: ধৰ্ম্ম,
সাধিব বীবের কৰ্ম্ম,
অবশ্য বাধিই পিতার কারণ।
শঙ্কর সেবক আমি দেখাব বিক্রম।
দেখিব দেবতা দল
ধরে কত অঙ্গে বল,
ভাশ্চৰ্য্য হইবে দেখি আমার কম।
করয়ে সাগর যদি বেলা অতিক্রম,
মলয়-অনিল-বলে
যদি হিমাচল টলে,
তথাপি জানিহ স্থির আমার বচন।
লাধিতে পিতার কর্ম জনম আমার,
বাসবে না ভরি আমি,
অজে যথা পশু-স্বামী,
জানি তেমতি দৈত্য কহিনু এ সার।

{ ৮৭ } চল রে দানবীসেনা চল আবার ; দেখিব অমরগণ, কি করিয়া করে রণ, বীরের নন্দন আমি বীর অবতার। আমারে জিনিতে রণে আছে সাধ্য কার ? কি ভয় অন্তরে কর ? ধর অস্ত্র যুদ্ধ কর উৎসাহিত হয়ে সবে আজ্ঞায় আমার। বীরমদে মাতি সবে বাজাও বাজনা ; ‘জিনিল দানবপতি, জিনিল দানবপতি’, বলিয়া সকলে পুনঃ দত্ত এ ঘােষণা। ফিরিল দানবীসেনা বাজিল বাজনা ; নড়ে মহীরুহ-মুল, ছুটিল কলম্বকুল যেন ক্ষিপ্ত গ্রহবৎ, কাপে দিগঙ্গনা। সেনা সঙ্গে শসুর সুমুখ সারথি ; কোদণ্ড টঙ্কার করি, দলিতে দুরন্ত অরি, হ’ল উপস্থিত দৈত্য বীরদাপে তথি। * দেবতা দানবে যুদ্ধ বাজে অরিবার- জগৎ সংসার স্তব্ধ, সুরাসুরে যুদ্ধার, কেহ বা গম্ভীর রবে ছাড়িছে হুঙ্কার =

C
1
যােগেতে জানিয়া ঋষি যােগন্দ্র প্রধান
ব্ৰহ্মার নন্দন আসি,
মুখে বল বল হাসি,
শাকিয়া গগনে দেখে বাণের সন্ধান।
কোন্দলের মন্ত্র ঋষি পড়ে বার বার ;-
কেহ বাক্যে যুদ্ধ করে,
কেহ বা কৃপাণ করে,
দানৰে দেবত দল করে ছারখার।
তবে ৰলির মুত ছাড়িয়া সালন,
বায়ুগামী অশ্ববরে
চাপি, ত্বরা করি পরে
ৰিধিদত্ত পাশঅস্ত্রকরিলা ধারণ ।
শোভিল সুন্দর তনু হয়ের উপরে,
শিরে শোভে শিরস্ত্রাণ,
ভূণে পূর্ণ পৃষ্ঠে বাণ,
জ্বলে অক্ষি যেন অর্ক দ্বিতীয় প্রহরে ?
বীরমদে মাতি বীর ভীম অস্ত্র ঝাকে,
দেবরর্থী কম্পমান
দেখি বলে নাহি ত্রাণ,
চিন্তি দেব আখণ্ডল পড়িলেক ফাকে ।
অতঃপর সেই অস্ত্র শূর শসুর,
ছাড়িয়া ভীষণ নাদে,
মুহূর্তেকে অবিৰাদে,
করিল। অমরগণে সেই কালে দূর।

kasal
একাকী সমরক্ষেত্রে অদিতিন
ত্যজি গেল বন্ধুগণ,
কি করিয়া হয় রণ !
ভাবেন *ফলিল বুঝি দুর্বাসাবচন ।
বিপদ-সাগরে বন্ধু দেব নারায়ণ ;
আর কি করিব বল,
সকলি করম ফল,
নতুবা তিনিও কেন করিল গমন ?”
এতেক চিন্তিয়া যবে কশ্যপনন্দন
নাশিতে দুরন্ত অরি,
যান ত্বরা বজ্ৰ ধরি,
হেনকালে পাশ অস্ত্রে দানব তখন
করিয়া বন্ধন দেবে মহানন্দে হাসে ।
তাথৈ তাথৈ তালে,
দৈত্যগণ নাচে ভালে।
আনিল কুমার ইন্দ্রে অসুরেন্দ্র পাশে।
লাজে হেটমুণ্ডে রহে অদিতিনন্দন।
গেল স্বর্গ সিংহাসন,.
গেল শচী প্রাণধন,
অশেষ ভাবনা মনে ভাবে অনুক্ষণ
চিল অমর লক্ষ্মী দানবেন্দ্র ভালে।
শচী উন্মাদিনী এবে,
পতির ভাবনা ভেবে,
নাচেন উশন। কবি বাজাইয়া গালে।

{
--
?
পােহাল যামিনী জয় দানবেন্দ্র বলি
শচীর নয়ন নীর,
করে শােভা দূৰ্বাশির,
ফুটিল সসীমাঝে কমলের কলি
দানবের সুখসূৰ্য্য দিল দরশন।
সবিষাদে সমীরণ
দেবদশা নিরীক্ষণ
করি, ধীরে ধীরে তথা বহিল তখন।
স্বর্গরাজ্য সিংহাসন করি অধিকার।
মনের বাসনা সাধি,
অমর ঈশ্বর বাঁধি,
আনিলা অসুরনাথ আপন আগার।
অমরায় সুরগণ করে হায় হায় ।
আশ্রমে দুর্বাসা মুনি,
নারদের মুখে শুনি,
বিরাট তাণ্ডবে নাচি হরগুণ গায়।
হরিল দেবেন্দ্র আজ দানবেন্দ্র সনে ।
বিষম বরিষা কাল,
হরিণে বাঘের গাল,
চটে যথা অদৃষ্ট-চক্রের আবর্তনে।
কোথা জনলােক কোথা দিশ-আলয়
এতদূর হতে আসি,
স্বর্গের সুষমা রাশি,
নাশিল দানবে মরি স্বদে নাহি সয়।

”
==
কালের কুটিল গতি বহে অবিরাম।
মুহূর্তেক পূর্বে, আহা
কি হবে কে বলে তাহা ?
বিজন কানন এবে বৈজয়ন্ত ধাম।।
ইতি শঙ্খাসুর বধ-কাব্যে ইন্দ্রনিগ্রহ নামক
পঞ্চম সর্গ।
প্রথম খণ্ড সমাপ্ত।
ঔ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Shankhasur Badh Vol. 1

Author
Goswami,fakirchand
Title
Kabya
File name
Shankhasur Badh Vol. 1
Text
OCR done
Citation
1904
Published
2009/11/30
Publisher
Fakirchand Goswami,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
104
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Epic
Keywords
Goswami,Fakirchand
DLI number
513255
Barcode
4990010020251.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
rb7mfMWIhps
Download PDF

Shankhasur Badh Vol. 1