Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Mahajuddhe Soviet
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
UDAYNA RAINPUR (28) Estd. 144 HOWRAH GH, নিবেদন যুদ্ধ রাজনীতিকে বাদ দিয়ে নয়। সমরনীতি ও রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে বিজড়িত। অতএব সােভিয়েট যুক্ত বুঝতে হলে সােভিয়েট রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সম্বন্ধে ষাের্থ জ্ঞান থাকা আবশ্যক। সেজন্যই সােভিয়েট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে এই পুস্তক প্রণয়নের প্রাস পেয়েছি। সােভিয়ে রাষ্ট্রের মূলে রয়েছে মার্ক্সবাদ। মার্ক্সবাদের তাত্ত্বিক দিক আলােচনা করে তার বাস্তব রূপই দেখাবার চেষ্টা করেছি। মােভিয়েট রাষ্ট্রের বাস্তব রূপ সম্বন্ধে কেবল আমাদের দেশেই নয়, রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার আগ পর্যন্ত জগতের অধিকাংশ দেশেই জনসাধারণের মধ্যে অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক অজ্ঞতা ছিল। তদুপরি কায়েমী স্বার্থের ধ্বজাধারী বুদ্ধিজীবীরা জগদ্বাসীর চক্ষে সােভিয়েট শক্তিকে হেয় প্রতিপন্নের জন্য এমন নিরঙ্কুশ প্রচারকার্য চালান যার ফলে সাধারণ লােকের মনে সব অদ্ভুত ধারণার সৃষ্টি হয় এবং প্রগতিবিরােধী ব্যক্তিরা তার সম্বন্ধে নানারূপ উদ্ভট কথা বলে বেড়াবার সুযােগ পান। একথা সত্য সােভিয়েট ভূমি একেবারে স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠেনি বা পথ চলতে গিয়ে সেখানকার লােক যে কোন ভুলভ্রান্তি করেনি এমন কথাও হলফ করে বলা চলে না। কিন্তু সেটাই বড় কথা নয়; সমস্ত ভুলভ্রান্তি অতিক্রম করে তারা যে বিরাট শক্তি অর্জন করেছে—জগৎকে গণমুক্তি ও মানবকল্যাণের যে প্রশস্ত ও ঋজু পন্থা তারা দেখিয়েছে—সেটাই আজ সব চেয়ে বড় সত্য। অখণ্ড হিন্দুস্থান, পাকিস্থান প্রভৃতি নিয়ে আমাদের দেশের এক দল তােক বড় বেশী মাতামাতি করেন এবং জনসাধারণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ান। কোন সম্প্রদায় বা জাতি আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চাইলে কোনক্রমেই তা অগ্রাহ্য করা চলে ; কিন্তু স্বার্থান্বেষী ও প্রভুত্বপ্রয়াসী প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃবর্গের মধ্যে চুক্তি হলেই কোন সম্প্রদায় বা জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের যথার্থ অধিকার লাভ হয় না। সােজিয়েট যুরাষ্ট্রে জনসাধারণের অধিকার স্বীকার করে কিভাবে প্রত্যেক নাতি ওপেন 9ংশিঙ্গাওয়া হয়েছে, তাই আজ আমাদের দেশের ৮ The BRAAI ii করে ভেবে দেখা উচিত। কোন দেশ বা জাতিকেই সেখানে জোর করে যুক্তরাষ্ট্রের অন্ততৃত করে রাখা হয় নি ; যে কোন যুনিয়ন রিপাব্লিক ইচ্ছে করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে পারে । কিন্তু সম্পর্ক কেউ ছেদ করে না। তারা জানে সমগ্র সােভিরেট যুক্তরাষ্ট্রের মঙ্গলেই তাদের মঙ্গল। সােভিয়েটবাসীদের মধ্যে এই ঐক্যবােধ একান্ত সহজ এবং অত্যন্ত তীব্র বলেই বিরাট এলাকা দখল করেও হিটলার সােভিয়েট ভূমিতে ‘কুইসলিং’ শ্রেণীর কোন বিশ্বাসঘাতক খুঁজে পান নি। সােভিয়েট শক্তি আজ জগতের বিস্ময়। তার সম্বন্ধে লােকের কৌতূহলেরও অবধি নেই। সকল কৌতূহলের নিবৃত্তি করতে গেলে বিরাট গ্রন্থের প্রয়ােজন । এই ক্ষুদ্র পরিসরে তা সম্ভব নয়। তবে সােভিয়েট যুদ্ধকে যথার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে হলে যেটুকু পটভূমি জানা একান্ত আবশ্যক এই ক্ষুক গ্রন্থে তা দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। সাফল্যের বিচারক পাঠকবর্গ । অবশেষে একটি কথা বলেই আমার নিবেদন শেষ করব। এই পুস্তকরচনায় হাত দেবার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে কাগজ একেবারে দুমূল্য ও দুস্পাপ্য হয়ে ওঠে। তদুপরি কলিকাতায় জাপানী বিমানের হামলা শুরু হয়। তার ফলে নানা বাধাবিঘ্নের মধ্য দিয়ে আমাকে এই পুস্তক শেষ করতে হয়েছে। সুতরাং কোন ত্রুটি থাকা অসম্ভব নয় এবং তা থাকলে পাঠকবর্গ নিশ্চয়ই সেজন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। বােমাসঙ্কটের মধ্যেও প্রেসের পরিচালক এবং কর্মচারীবৃন্দ এই পুস্তক প্রকাশে যেভাবে সহযােগিতা করেছেন তজ্জন্য তাদেরকে আমার অশেষ ধন্যবাদ। ইতি কলিকাতা, ১লা ফেব্রম্মানী, ১৯৪৩। গ্রন্থকার # To every Union Republic is reserved the right freely do gecede from the U. S. S. R. (Article XVII of the Constitution of the W. S. S. R. of 1936].
সংযুদ্ধ তেলাওয়াট
সূচিপত্র
বিষয়
পৃষ্ঠা
সােভিয়েট শক্তির উৎস
•••
১-১৪
০
২। সােভিয়েটতন্ত্র
শাসনব্যবস্থা, নির্বাচনপ্রথা, শিশুকল্যাণ, শিক্ষাপ্রণালী,
পারিবারিক জীবন, কারখানায় জীবিকার্জন, যৌথ
জনস্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতা, পরিকল্পিত
অর্থনীতি।
চাষ,
৩। সমপ্রস্তুতি
• • •
সমসামর্থ, অস্ত্রবিদ্যা, রণনীতি, মনােবল।
}
০৮
১১০-১৩
৪। রুশ-জার্মান যুদ্ধ
সেনাপতিগণ, ত্রিধারা আক্রমণ, সপ্তাহের
খতিয়ান, ওডেসায় চাপ, জনযুদ্ধ, লেনিনগ্রাড-অবরােধ,
কিয়েফের পতন, সােভিয়েট পাল্টা আক্রমণ, দ্বিতীয়
বর্ষের অভিযান, রণাঙ্গনে লাল ফৌজ।
৫। গ্রন্থপঞ্জী
১৮৪,
গন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যা
No text on this page.
UDAYNARAN
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট
৫৭৪১
৮
। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কর্ণধার মঃ ষ্ট্যালিন ছা ক স ম UDAYNA RAINPUR Eatd. 1944 HOWRAH. GHAI ও সং হিত্য বিগ মহাযুদ্ধে যে নারায়ণপুর, ই সােভিয়েট শক্তির উৎস ; প্রায় পঁচিশ বছরের চেষ্টায় সােভিযেট যুক্তরাষ্ট্র মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে, ফাসিস্ত শক্তি আজ তার বিলােপসাধনে কৃতসংকল্প। পৃথিবীতে এত বড় যুদ্ধ ইতিপূর্বে হয় নি ; অপরিমেয় বিনাশ ও অননুমেয় হিংস্রতার দিক দিয়ে এ সকল যুদ্ধকে অতিক্রম করেছে। সার্বিক যুদ্ধের বিষম আবর্তনে রাষ্ট্রের সর্বশক্তি যুদ্ধমুখীন হয়ে উঠেছে। উভয় পক্ষই চরম অবস্থার জন্য প্রস্তুত। বিবদমান দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে যেমন মাঝপথে অপােষ হওয়া সম্ভব, এক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। এ সংঘাত দুই পরস্পর বিরােধী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে। একের অস্তিত্ব অন্যের ধ্বংসের কারণ। এ যুদ্ধে ফাসিস্ত পক্ষের পরাজয় ঘটলে রণক্লান্ত জনসাধারণ স্বভাবতই ফাসিস্ত পন্থার প্রতি বিরূপ হয়ে উঠবে এবং যুদ্ধের অপরিহার্য পরিণতি আর্থিক দুর্গতি ও বেকার সমস্যার দরুণ য়ুরােপে সাম্যবাদের অনুকূল আবহাওয়া দেখা দিবে। গত মহাযুদ্ধের পরও জার্মানীতে লােক ঠিক এ অবস্থায় পড়ে সাম্যবাদকামী হয়ে উঠেছিল। পশ্চিম য়ুরােপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধনপতিরা সেদিন জার্মানীতে মূলধন পাঠিযে তথাকার ক্ষয়িষ্ণু পুজিপতিদের বাঁচাবার চেষ্টা না করলে ইতিহাস হয়ত আজ অন্যরূপ হয়ে দাঁড়াত। অর্থনৈতিক স্থূল বিচারে ২ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট অবশ্য মনে হয়, যুদ্ধের আদায়ের উদ্দেশ্যেই গত মহাযুদ্ধের বিজয়ী পক্ষ ভাসাই সন্ধির পর জার্মানীতে অর্থ ঢেলে তথাকার শিল্পপতিদের জিইয়ে রাখবার চেষ্টা করে। অর্থাৎ এক হাতে সাহায্য করে তারা আর এক হাতে তা কেড়ে নেওয়ার প্রয়াস পায়। কিন্তু কূটনৈতিক সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখৰ্গে একথা বলা ছাড়া উপায় থাকে না যে, আর্থিক দুর্গতির দরুণ জার্মানীতে পাছে পুঁজিবাদের অবসান ঘটে সােভি- য়েট তন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়, এ আশঙ্কায়ই বিজয়া পক্ষের পুঁজিবাদীরা সেদিন জার্মান শিল্পপতিদের অর্থসাহায্য করার জন্য বেশী ব্যগ্র হয়ে- ছিলেন। জার্মানীতে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার দুশ্চিন্তায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের শাসকগণ পুঁজিবাদীদের অঙ্গুলি- সংকেতে সেদিন যা করেছিলেন, আজ এ মহাযুদ্ধ তারই পরিণতি। জার্মানীতে তখন ক্ষীয়মান পুজিবাদ পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠবার সুযােগ না পেলে হিটলারের অভ্যুত্থান সম্ভব হত কিনা সন্দেহ এবং এ মহাযুদ্ধও হয়ত আজ বাধত না। মানবজাতির ইতিহাসে এ এক বিষম কলঙ্ক। জার্মানীর পরাজয় ঘটলে যেমন সােভিয়েটতন্ত্রের প্রতি লােকের শ্রদ্ধা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি তার বিজয়ের দ্বারা ফল বিপরীত হয়েও দাড়াতে পারে। নাৎসী জার্মানী যদি বিজয়ী হয় তবে বর্তমান সােভিয়েট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। মানুষের মনে সােভিয়েট আদর্শ বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু তার বাস্তবরূপ লোকচক্ষুর অগােচর হবে। আদর্শ, যত বড়ই হােক , সামরিক বলের কাছে কোন রাষ্ট্রের পরাজয় এবং বিজয়ীর ইচ্ছানুযায়ী বিজিত দেশে চিরস্থায়ী না হলেও সাময়িক ভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন ইতিহাসে কিছু নতুন নয়। সােভিয়েট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় থাকার লােকের মনে সােভিয়েট শক্তির উৎস যে ' সামাজিক বােধ জেগেছে এবং যে শ্রেণীবৈষম্যের মনােভাব লােপ পেতে চলেছে, সােভিয়েট শক্তির পরাজয় ঘটলে বাইরের ইন্ধন ও প্ররােচনায় সেখানে এই সামাজিক বােধ বিস্মৃত হয়ে লােকের মনে আবার গণস্বার্থের পরিবর্তে শ্রেণীস্বার্থের চেতনা আসা কিছু অসম্ভব নয়। সেদিন সােভিয়েট রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে তার সমাজব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়বে। তেমন দুর্দিনের হাত হতে অব্যাহতি পাওয়ার জন্যই আজ সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের আপামর জনসাধারণের এই মরণপণে সংগ্রাম। যে মুক্তির আস্বাদ তারা পেয়েছে তা থেকে বঞ্চিত হলে তাদের অদৃষ্টে যে অশেষ দুর্গতি রয়েছে, এ সম্বন্ধে তারা সম্পূর্ণ সচেতন। সোভিয়েট জনসাধারণ জানে, তাদের এ যুদ্ধ পুজিবাদীর স্বার্থরক্ষা বা শাসকবর্গের খেয়াল চরিতার্থের জন্য নয় ; প্রত্যেক সােভিয়েট পরিবার রক্ষার প্রশ্ন এর সঙ্গে বিজড়িত। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কোন জমিদার নেই, সমগ্র জমি জনসাধারণের। কাজেই প্রত্যেক সােভিয়েট প্ৰজাই মনে করে শত্রুর আক্রমণ হতে সে তার নিজেরই জমি রক্ষা করছে। সেখানে কারখানাসমূহের কোন ব্যক্তিগত মালিক নেই; কারখানাগুলি জনসাধারণের সম্পত্তি। সুতরাং প্রত্যেকেই মনে করে শত্রুর আক্রমণ হতে সে তার নিজেরই কারখানা রক্ষা করছে। সর্বোপরি সেখানকার জনসাধারণ জানে যে সােভিয়েট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে অল্পদিনের মধ্যে কি বৈপ্লবিক উন্নতি হয়েছে এবং এ সম্বন্ধে তারা সচেতন বলেই আজ সর্বস্ব পণ করে আত্মরক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। সােভিয়েট শক্তির উৎসের সন্ধান করতে হলে জনসাধারণের অর্থনৈতিক উন্নতিকল্পে তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে শিল্পায়নের কথা সর্বাগ্রে বলতে হয় । জারের আমলের ন্যায় সােভিয়েট আমলেও ;
০ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট যদি রুশিয়ার শিল্প কেবল য়ুরােপীয় রুশিয়ায়ই কেন্দ্রীভূত থাকত তবে জার্মান বাহিনীর প্রবল আঘাতে সসাভিয়েট শক্তি হয়ত অল্পদিনেই ভেঙ্গে পড়ত। কিন্তু যােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পোৎপাদনের ব্যবস্থা কেবল লেনিনগ্রাড, মস্কো, কিয়েফ বা খারকফেই সীমাবদ্ধ নয় ; উত্তরে তুষারাবৃত সুমেরু অঞ্চল হতে দক্ষিণে গর্ণো বাদাকশান এবং পূর্ব দিকে সাইবেরিয়ার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এখন সােভিয়েট শিল্প বিস্তৃত। জারের আমলে যে-সকল এলাকা উপনিবেশ হিসাবে কেবল কঁচা মালই যােগাত, আজকাল সেই সব এলাকায় বড় বড় সব শিল্পকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। কৃষিপ্রধান এলাকায়ও শিল্পের প্রবর্তন হয়েছে ; অনাবাদি তৃণভূমিতে আজ সােণা ফলছে । মরু অঞ্চলে সুরম্য অট্টালিকাপূর্ণ সহর দেখা দিয়েছে ; অজ্ঞাত ও অনাদৃত প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহারে লােকের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন হয়েছে। অর্থনৈতিক, শৈল্পিক ও সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টাকে কেন্দ্রীভূত না করে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সুদূর প্রান্ত পর্যন্ত যে তাকে সম্প্রসারিত করে দেওয়া হয়েছে তারই মধ্যে সােভিয়েট রুশিয়ার মূল শক্তি নিহিত। সােভিয়েট কতৃপক্ষ যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীন উন্নতি বিধানের জন্য তিন তিনবার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তার একটা প্রধান উদ্দেশ্যই হল শিল্প প্রচেষ্টাকে দেশের সর্বত্র সম্প্রসারণ এবং সমবেত চেষ্টায় ঐকত্রিক সমৃদ্ধি সাধন করা। এই প্রচেষ্টার ফলে কেবল যে প্রাচীন শিল্পকেন্দ্রগুলিই পুনর্গঠিত হয়েছে এমন নয়, পরন্তু নানাস্থানে প্রাকৃতিক সম্পদকে অবলম্বন করে নতুন নতুন শিল্পকেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। ১৯২৮ খৃষ্টাব্দে যখন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনানুযায়ী কাজ আরম্ভ হয় তখন শিল্প-সম্পদের দিক দিয়ে জগতে সােভিয়েট
সােভিয়েট শক্তির উৎস
যুক্তরাষ্ট্রের স্থান ছিল পঞ্চম। তারপর পাচ বছর অন্তেই সে জগতে
তৃতীয় স্থান অধিকার করে এবং দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনানুযায়ী
কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তার স্থান হয় দ্বিতীয়। লেনিন এক সময়
বলেছিলেন, “রুশিয়ার অবস্থা ইংলণ্ডের তুলনায় চারগুণ, জার্মানীর
তুলনায় পাঁচগুণ এবং আমেরিকার তুলনায় দশগুণ খারাপ।” আর
বিপ্লবের পর পুনর্গঠনের ফলে সেই রুশিয়া অর্থনৈতিক ভিত্তিতে
আমেরিকার পরই স্থান লাভ করে।
য়ুরােপে তার সমকক্ষ
কেউ নেই।
১৯৩০ খৃষ্টাব্দে মঃ ষ্ট্যালিন কম্যুনিষ্ট পাটির ষােড়শ অধিবেশনে
অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনায় বিজ্ঞানসম্মত ভৌগােলিক
ভিত্তিতে শিল্পোৎপাদনের সুব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেন। শিল্পোৎপাদনের
প্রণালী পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প ব্যবস্থা বণ্টনের পরিবর্তনও
আপনা হতেই হয়ে যায়।
হয়ে যায়। লেনিন যে সমস্যার কথা বলেছিলেন তা
এ ভাবে সমাধানের ব্যবস্থা হয় :-
“কাচা মাল হতে শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদনে যে-সকল
প্রণালীর মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাতে সর্বদাই লক্ষ্য রাখতে
হবে যে, কাচা মাল উৎপাদনক্ষেত্রের যত নিকটে সম্ভব
কারখানা স্থাপন করত যাতে শ্রমশক্তির অপচয় না হয়
সেভাবে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে রুশিয়ার শিল্পব্যবস্থাকে বণ্টন
করতে হবে।”
এই নীতি অবলম্বনের ফলে যেখানে কাচা মাল পাওয়া যায়,
যথাসম্ভব তারই নিকটে নতুন নতুন কারখানা সব গড়ে উঠল।
তাতে উৎপাদনের পথ সহজ হয়ে এল এবং শ্রমশক্তিরও অপচয়
কমল। শিল্পোৎপাদনের জন্য যাতে কাঁচা মাল নিয়ে অধিক দূরে
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট টানাটানি করতে হয় তদুদ্দেশ্যে সােভিয়েট কতৃপক্ষ প্রাকৃতিক সম্পদ আবিষ্কারের নিমিত্ত বৈজ্ঞানিকদের নিয়ােজিত করলেন এবং তারা নিত্য নতুন আবিষ্কারে নতুন নতুন এলাকায় শিল্প-সম্ভাবনার সন্ধান দিলেন। এর ফলে নবাবিষ্কৃত অনুকূল সম্পদরাশির সমাবেশে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ বক্ষে এমন সব বিরাট শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে পূর্বে যা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি। এভাবে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অনগ্রসর এলাকায় সােভিয়েট শিল্প প্রবেশ করেছে। কোথাও সেই সব সম্পদের সন্ধান ইতিপূর্বে কেউ পায় নি । আবার কোথাও পেয়ে থাকলেও তা অনাদৃত অবস্থায়ই পড়ে ছিল। জারের আমলের শাসকবর্গ তা আহরণের চেষ্টা করেন নি এবং সেজন্যই ওই সব অঞ্চলের অধিবাসীদের আর্থিক দুর্গতিরও অবধি ছিল না। জারের আমলে যে-সকল অঞ্চল কুশিয়ার উপনিবেশে পরিগণিত ছিল এবং যেখানে শােষণ ছাড়া এক বিন্দু সরকারী অনুগ্রহও বৃষ্টি হত না, সেই সব অঞ্চলের অধিবাসীদের সাংস্কৃতিক অপকর্ষ আজ তাদের অর্থ নৈতিক দৈন্য ঘুচবার সঙ্গে সঙ্গেই বিদূরিত হয়েছে। ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে কমুনিষ্ট পার্টির দ্বাদশ অধিবেশনে মঃ ষ্ট্যালিন বলেন, “সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনগ্রসর রিপাব্লিকগুলির সুদূর প্রান্ত- স্থিত জেলাসমূহে বিদ্যালয় স্থাপন ও শিক্ষা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে রুশ সর্বহারাদের এও দেখতে হবে যে, ওই সব অঞ্চলে শিল্পকেন্দ্রও যেন ব্যাপকভাবে স্থাপিত হয়। কেন না, তাদের অনুন্নত অবস্থার জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয় ; কেবল কাচ মালের যােগানদার হিসাবে তাদের আগে দেখা হত বলেই আজ তাদের এ অবস্থা। • এর অবসান করতেই হবে।”
এই লক্ষ্যে চলে। সােভিয়েট শক্তির উৎস উপনীত হওয়ার জন্যই সোভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি, শিল্প ও যানবাহন চলাচলের নতুন ব্যবস্থা করা হয়। তদনুসারে বিভিন্ন এলাকায় শিল্পোৎপাদন কেন্দ্র ছড়িয়ে পড়ে। কেবল তাই নয় ; উৎপাদনের প্রধান শক্তি জনবলের বন্টনও সেই অনুসারে হয়। এই পুনর্গঠনের ফলে সেখানে জনসংখ্যা অতিশয় দ্রুতগতিতে বেড়ে ১৯৩৪ খৃষ্টাব্দের হিসাবেই দেখা যায়, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ত্রিশ লক্ষ অর্থাৎ দৈনিক আট হাজার করে লােক বেড়ে যাচ্ছে। এই হার তারপর তারপর আরও বেড়ে গিয়েছে। বলশেভিক বিপ্লবের আগে কুশিয়া বাদে সমগ্র য়ুরােপে যত লােক বাডত, রুশিয়ায় বৃদ্ধি হত তার তিন ভাগের এক ভাগ। আর ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের হিসাবে দেখা যায়, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক লােকবৃদ্ধি সমগ্র য়ুরােপের বার্ষিক লােকবৃদ্ধির প্রায় সমান ; অথচ য়ুরােপের লােকসংখ্যা সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের লােকসংখ্যার প্রায় সওয়া দুই গুণ। এত দ্রুত জনবল বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে নি তার কারণ জনবল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেখানে সম্পদ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনবল বেড়ে চলেছে। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ভৌগােলিক ভিত্তিতে শ্রম বণ্টন করায় অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সব চেয়ে আশ্চর্য রূপান্তর ঘটেছে প্রান্তিক অনগ্রসর এলাকাগুলির। পশুপালক এবং অজ্ঞ কৃষককূল সংস্কারমুক্ত হয়ে জীবিকার্জনের নতুন পন্থা গ্রহণ করেছে। কল- কারখানা এবং যন্ত্রপাতির প্রতি তার আর এখন বিমুখ নয়। নতুন জীবন লাভ করে তারা সুদক্ষ যান্ত্রিক সেজেছে। বিজ্ঞানের আবেদন তাদের কাছে গিয়েও পৌচেছে এবং সেই আবেদনে তারা সাড়া দিয়েছে বলেই সােভিয়েট যুদ্ধ সত্যিকারের জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট নতুন ভাবে শিল্প বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে লােক- বিস্তারও হয়েছে নতুন ভিত্তিতে। প্রাচীন রুশিয়ায়ও স্থান হতে স্থানান্তরে গিয়ে লােক বসবাস করত; কিন্তু তার মূলে ছিল একটা শােষণ ব্যবস্থা। অগ্রসর সমাজের লােকেরা অনগ্রসর সমাজকে শােষণ করতে গিয়ে এমন উৎপীড়ন আরম্ভ করত যে, অত্যাচার সহ্য করতে পেরে লােক তখন স্থানান্তরে চলে যেতে বাধ্য হত। অনগ্রসর এলাকায় লােকসংখ্যা বৃদ্ধি হত খুবই কম। উত্তর রুশিয়ার ছােট ছােট জাতিগুলি একরকম লােপ পেতেই বসেছিল। জারের আমলের সরকারী নথিপত্রেই স্বীকৃতি রয়েছে যে, কতগুলি উপজাতি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। কিন্তু সােভিয়েট আমলে একটি জাতিরও নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কা নেই। সােভিয়েট নেই। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যেক জাতিরই লােকসংখ্যা বাড়ছে। কাজাক, কিরগীজি, তুর্কী, কালমুক, অয়রট, বুরিয়াট, বুরিয়াট, ইভেঙ্ক প্রভৃতি সবই ছিল এককালে যাযাবর জাতি। দেশের প্রায় তিন চতুর্থাংশ এলাকাই ছিল এদের বিচরণভূমি। প্রায় এক কোটি লোেক তাদের গােমহিষ, ছাগলভেড়া নিয়ে স্থান হতে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়াত। শতচ্ছি তাবুতে ছিল তাদের বাস এবং দারিদ্র্য ও অনাহার ছিল তাদের নিত্য সহচর। এই প্রাগৈতিহাসিক জীবনযাত্রাপ্রণালী তাদের সেদিনও পর্যন্ত চলে আসছিল। জারের আমলের গবর্ণমেন্ট তাদের উন্নতির জন্য কোন চেষ্টাই করে নি। তখন বলা হত, কিগীজের যাযাবরগণ তাদের ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টান হলে বসত পেতে পারে। সেই আমলের রুশদের প্রাধান্য বিস্তারের পন্থাই ছিল এই। কোন যাযাবর প্রাচীন রুশিয়ায় বসত পেলে তার গােমহিষাদি পালন করে স্বাধীন জীবিকার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যেত ;
সােভিয়েট শক্তির উৎস উঠেছে। কারণ রুশ উপনিবেশীগণ তার ভাল গবাদি পশু সব নিয়ে নিত। কিন্তু সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সেই যাযাবর জাতি এখন বসত স্থাপন করে গৃহবাসী হয়েছে। গােপালন ও মেষপালনই এককালে যাদের একমাত্র জীবিকার্জনের উপায় ছিল আজ তারা শিল্প ও উন্নত কৃষি, ধরেছে এবং তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আর্থিক জীবনের অনেকখানি উন্নতি হয়েছে। সরকারী ব্যয়ে তাদের বসতগুলি সুসংবদ্ধভাবে গড়ে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ই লক্ষাধিক যাযাবর পরিবার স্থায়ী বসত স্থাপন করেছে। যে সমস্যার কোনদিন সমাধান হয় নি, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র অকর্ষিত জমিতে যাযাবর জাতির জন্য যৌথ চাষবাসের ব্যবস্থা করে দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করেছে । বসত স্থাপন করেও যাযাবররা তাদের পশুপালন ব্যবসা ছেড়ে দেয় নি ; বরঞ্চ তার আরও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। পশুগুলি আগে পােলা মাঠেই থাকত এবং বরফ পড়লে ঘাসের খুবই অসুবিধা হত; কিন্তু এখন সরকারী খরচে পশুর জন্য সব চালাঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কেবল কাচা ঘাসের ওপরই আজকাল আর নির্ভর করতে হয় না, থলের সময় ঘাস শুকিয়ে গাদা করে রাখা হয়। কেবল, তাই নয়, সমবায় পদ্ধতিতে তারা এখন ঘাসের চাষও করে। যাযাবরদের আগে জীবনে মাত্র দু’বার মানের রীতি ছিল জন্মের পর এবং মৃত্যুর পর ; তারা ছিল একেবারে নিরক্ষর ; মুখ ওঝার ছিল তাদের চিকিৎসক। এখন তাদের বসতগুলিতে স্নানাগার, বিদ্যালয়, চিকিৎসালয় কিছুরই অভাব নেই। নিরক্ষরতা একরূপ বিদায় নিয়েছে বললেই চলে। চিরভ্রাম্যমান গৃহহীন যাযাবর জাতি আজ সােভিয়েট, যুক্তরাষ্ট্রে ইমারতবাসী গৃহস্থ পরিবারে পরিণত হয়েছে। নতুন বসত গুলিতে প্রচুর পরিমাণে শাকশজীর চাষ হচ্ছে এবং ১০ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট সেখানে সব শস্যভাণ্ডার স্থাপিত হয়েছে। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত হতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত আজ কৃষিক্ষেত্র বিস্তৃত। বিজ্ঞানের সাহায্যে মরু ও পার্বত্য অঞ্চলে ফসলােৎপাদনের ব্যবস্থা হয়েছে। ফলে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের লােকবন্টনও নতুন ভিত্তি লাভ করেছে। উত্তর এবং পূর্বদিকে শিল্পের সম্প্রসারণ হওয়ায় তােক সেদিকে বিস্তার লাভ করে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আমলে সমগ্র সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ১২ জন লােকবৃদ্ধি হয় ; সেই তুলনায় পূর্বাঞ্চলের লােক বৃদ্ধি হয় শতকরা ২৪ জন। ১৯৩২ খৃষ্টাব্দ হতে ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর প্রান্তিক এলাকায় লােকসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। জোর করে এক স্থান হতে অন্য স্থানে লােক পাঠিয়ে যে অনগ্রসর এলাকায় লােকসংখ্যা বাড়ান হয়েছে এমন নয় । অনাবাদি ও অনধ্যুষিত অঞ্চলে শিল্প ও কৃষির ব্যবস্থা হওয়ায় লােক স্বেচ্ছায় জীবিকার্জনের জন্য সেখানে গিয়ে বসত স্থাপন করেছে। অবশ্য রাষ্ট্র থেকে তারা এই স্থানান্তরে যথেষ্ট সাহায্য পেয়েছে। তাদের নতুন বসতে বাড়ীঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্র তাদের শিল্পোৎপাদন ও চাষের জন্য যন্ত্রপাতি যুগিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা রাহা খরচও পেয়েছে। রাষ্ট্র এতখানি সাহায্য করেছে বলেই উত্তরে সুমেরু অঞ্চল এবং সুদূর প্রাচ্যের কামচকা অন্তরীপে পর্যন্ত আজ বসত স্থাপিত হয়েছে। ১৯৩০ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার লােক গিয়ে উক্ত অন্তরীপে বসত স্থাপন করে। .: বলশেভিক বিপ্লবের আগেও রুশিয়ায় লােক স্থানান্তরে গিয়ে বসত না করত এমন নয় ; কিন্তু তখন লােক স্থানান্তরে যেত প্রধানত নতুন কৃষিক্ষেত্র পাওয়ার আশায়। অনেক ক্ষেত্রেই অবস্থাপন্ন কৃষকরা গিয়ে দরিদ্র চাষীদের ভাল জমিগুলিকে কেড়ে নিত। দরিদ্র চাষীরা সােভিয়েট শক্তির উৎস উৎখাত হয়ে হয় সেখান থেকে অন্যত্র সরে পড়ত, আর তা না হলে অবস্থাপন্ন জোতদারদের অধীনে তাদের দাসজীবন যাপন করতে হত। কিন্তু সােভিয়েট আমলে লােক স্থানান্তরে গিয়ে বসবাস করছে প্রধানত শিল্পের আকর্ষণে। কাউকে বঞ্চিত করার প্রশ্ন তাতে আসে । খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ যে-সকল এলাকা জারের আমলে অজ্ঞাত ও উপেক্ষিত হয়ে পড়েছিল সেই সকল জনবিরল এলাকায় সােভিয়েট আমলে নতুন শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠায় লােক স্বেচ্ছায় ও সানন্দে জীবিকার্জনের জন্য সেখানে গিয়ে বসত স্থাপন করেছে। এবার স্থানীয় কোন সম্প্রদায় বা জাতি বঞ্চিত হয় নি। বরঞ্চ নতুন শিল্পকেন্দ্র স্থাপিত হওয়ায় স্থানীয় লােক উপকৃতই হয়েছে। জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলেই জাতীয় সম্পদের সমান অধিকারী। ১৯১৭ খৃষ্টাব্দের বিপ্লবের আগে রুশিয়ায় ইহুদীদের ওপর নানা ভাবে নিপীড়ন হত। অথচ তারাই ছিল সমগ্র রুশিয়ার জনসংখ্যার শতকরা প্রায় দুই ভাগ। কৃষিকাজ করার কোন অধিকার তাদের ছিল না এবং সরকারী নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে তারা বসবাস করতে পারত না। সামান্য দু’এক ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হলেও তাতে কড়াকড়ির অন্ত ছিল না। সাধারণ ব্যবসা এবং কুটীরশিল্পই ছিল তাদের জীবিকার্জনের একমাত্র উপায়। শ্বেত রুশিয়া ও পশ্চিম য়ুক্রেনের নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে তাদের বসবাস করতে হত। কিন্তু সােভিয়েট আমলে তাদের সেই দুর্দশা ঘুচেছে। সােভিয়েট যুক্ত- রাষ্ট্রে সমস্ত জাতিই সমান, কাজেই ইহুদীদের জন্য সৃষ্ট সেই. কৃত্রিম গণ্ডীরেখা তুলে দেওয়া হয়েছে। কেবল তাই নয়। ইহুদীরা যাতে কৃষিকাজে সুযােগ পায় তার জন্য গবর্নমেন্ট থেকে নানাভাবে তাদের সাহায্য করা হয়। পশ্চিম রুশিয়ায় যে-সকল ইহুদী একদিন দর্জি, ২ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট উঠেছে। মুচির কাজ করে অতি দরিদ্রজীবন স্থাপন করত, আজ তারা সমবায় : কৃষিক্ষেত্রে এক একজন সুখী কৃষক। ১৯৩৭ খৃষ্ঠাব্দের হিসাবেই দেখা যায়, য়ুক্রেন এবং ক্রিমিয়ায় দুই লক্ষাধিক ইহুদী কৃষিকাজে যােগ দিয়েছে। বৃত্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইহুদীরা তাদের স্থানও পরিবর্তন করেছে। উর্বর অথচ একরূপ অনাবাদি জমি তাদের কৃষিকাজের জন্য দেওয়া হয়েছে। পূর্বদিকে আমুরের শাখানদী বিজান ও বীরার তীরে ইহুদীদের এক নতুন উপনিবেশ গড়ে ১৯২৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সেখানে একজন ইহুদীরও বাস ছিল কিনা সন্দেহ। প্রথম পঞ্চবার্ষিক প্রচেষ্টা শেষ হওয়ার আগেই সেখানে ৭ হাজার ইহুদী গিয়ে বসত স্থাপন করে। তারা সেখানে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে সমবায় পদ্ধতিতে কৃষিকাজে লেগে যায়। তারপর সেই উপনিবেশে ধীরে ধীরে বিদ্যুতের কারখানা, কাপড়ের কল, ইমারতী মালমশলা প্রস্তুতের কারখানা, কাঠের আসবাবপত্রের কারখানা, করাতকল প্রভৃতি স্থাপিত হ্য। ইহুদীদের বিদ্যালয় ও শিল্পশিক্ষালয় খােলা হয়। ক্রমশ সেখানে ইহুদী পত্রিকা বেরয় এবং ইহুদীরা তাদের থিয়েটার খােলে। দ্রুত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির ফলে ১৯৩৪ খৃষ্টাব্দে এই উপনিবেশকে স্বাতন্ত্রপ্রাপ্ত ইহুদী প্রদেশ বলে ঘােষণা করা হয়। জার্মানীতে নাৎসীরা যে ইহুদী সম্প্রদায়ের ওপর বর্বরােচিত আচরণ করেছে এবং যে ইহুদী সমস্যা নিয়ে জগতের বিভিন্ন দেশ বিব্রত, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সেই ইহুদী সমস্যার এভাবে সুষ্ঠু সমাধান করা হয়েছে। ইহুদীদের এরূপ ভৌগােলিক সংগঠন ইতিপূর্বে জগতে আর কোথাও হয় নি। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র সহর ও গ্রামের পার্থক্য ঘুচাতে চায়। তার অর্থ এ নয় যে, সেখানে সহরগুলি.সব তুলে দেওয়া হবে। গ্রাম্য ।
সােভিয়েট শক্তির উৎস অঞ্চলে নতুন নতুন শিল্পকেন্দ্র গড়ে তুললে আপনা থেকেই সেখানে ছােট ঘােট সহরের পতন হবে এবং তার ফলে গ্রাম্য জীবনেও সহরের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার আঁচ লাগবে। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র তার এ চেষ্টায় অনেকখানি সফল হয়েছে। সেখানে বহু কৃষিজীবি শিল্পজীবি হয়ে উঠেছে এবং গ্রামগুলির রূপান্তর ঘটেছে। নতুন নতুন সহরের পত্তন হওয়ায় প্রাচীন সহর ও গ্রামে যে আকাশপাতাল পার্থক্য ছিল তা লােপ পেতে চলেছে। আগের তুলনায় সহরবাসীর সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ই সহরবাসীর সংখ্যা শতকরা ১৮ থেকে বেড়ে ২৪শে গিয়ে দাড়ায়। রুশ বিপ্লবের পর সমগ্র দেশে বাসগৃহের সংখ্যা প্রায় দুই তৃতীয়াংশ বেড়ে যায়। ১৯২৬ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৯৩১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ছ’বছরে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পহীন সহরগুলিতে লােকসংখ্যা শতকরা মাত্র ১২ জন বাড়ে, আর শিল্পপ্রধান সহর গুলিতে বাড়ে শতকরা প্রায় ৪৫ জন। নতুন কারখানা অঞ্চলে লােক বৃদ্ধির অনুপাত আরও বেশী । নব প্রতিষ্ঠিত শিল্পকেন্দ্র- গুলির উন্নতির দিকে অধিক নজর দেওয়া হয় । সেজন্য ১৯৩২ খৃষ্টাব্দ থেকে প্রায় একরূপ নিয়মেই দাড়িয়ে যায় যে, মস্কো এবং লেনিনগ্রাডে আর কোন বড় কারখানা স্থাপিত হবে না। কেবল শিল্প নয়, কৃষি অবলম্বন করেও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সহর গড়ে উঠেছে। বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষের ব্যবস্থা হওয়ায় কৃষির যন্ত্রপাতি নির্মাণের জন্য সুদুর পল্লী-অঞ্চলে কারখানা স্থাপন করতে হয়েছে। কেবল কারখানা নয়, জমির উর্বরতা, বীজ ও ফসল পরীক্ষা করে দেখবার জন্য সেই সব স্থানে কৃষি-গবেষণাগারও স্থাপিত হয়েছে। সেগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে 'ছােট ছােট সহর। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দুর্গতির মূলে যে অর্থনৈতিক, কারণ ১৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট সম্বন্ধে বিদ্যমান—সমাজতন্ত্রবাদী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র স্বভাবতই এ সচেতন এবং সেজন্যই অর্থ নৈতিক দুর্গতি দূরীকরণার্থ তার ব্যাপক শিল্প-অভিযান। এর ফলে মধ্য এশিয়া, সাইবেরিয়া, ট্রান্সককেশাস প্রভৃতি এলাকায় অতিশয় দ্রুতগতিতে ছােট বড় নানা প্রকার শিল্প গডে উঠেছে এবং সমগ্র সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের শিরা উপশিরায় নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয়েছে। অরণ্যচারী শিকারী ও যাযাবর মেষপালকগণ আজ কারখানার সুদক্ষ শ্রমিকে পরিণত। পুঁজিবাদীদের স্বার্থরক্ষার জন্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রীয় বিধানের ফলে শ্রমিকগণ যেমন কেবল উৎপাদনের যন্ত্রস্বরূপ হয়ে পড়ে, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিকগণের সে অবস্থা দাড়ায় নি। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সােভিয়েট জীবনযাত্রার মানও অনেকখানি উন্নত হয়েছে এবং তাদের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল হওয়ায় ক্রয়শক্তি বেড়েছে। এই ক্রয়শক্তির মান নির্ণয় করেই সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করেন। বড় বড় শিল্পগুলি রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এবং পুজিবাদের অবসর না থাকায় সেখানে কেবল মুনাফার জন্য প্রয়ােজনের অতিরিক্ত মাল উৎপাদন করা হয় না এবং কাচা মাল সংগ্রহ বা পাকা মাল বেচিবার জন্য সাম্রাজ্যেরও তার প্রয়ােজন নেই। কঁচা মাল বিক্রয়ের দিক দিয়ে সে যাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে সেদিকেই তার লক্ষ্য। ব্যক্তিগত মুনাফার প্রশ্ন নেই বলেই শ্রমিকদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের কথাও ওঠে না এবং মাঝখানে মুনাফা করার কেউ নেই জেনেই সােভিয়েট শ্রমিকরা উৎপাদন বৃদ্ধিতে অধিকতর উৎসাহী হয়। পুজিবাদী দেশের মত উৎপাদন ও বণ্টনের মধ্যে সেখানে কোন অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব নেই এবং এই দ্বন্দ্বহীনতার মধ্যেই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের অপরিমেয় প্রাণশক্তি নিহিত।
সােভিয়েটতন্ত্র সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র এক বিরাট দেশ। তার ক্ষেত্রফল ৮১ লক্ষ ৪৪ হাজার বর্গ মাইল এবং লােকসংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি (রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার আগের হিসাব)। বৃটিশ সাম্রাজ্য পৃথিবীর এক পঞ্চমাংশ স্থান জুড়ে আছে, আর সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে আছে পৃথিবীর প্রায় এক ষষ্ঠাংশ স্থান। তার মধ্যে আবার সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র এক পঞ্চমাংশ হল য়ুরােপে ; বাকী চার পঞ্চমাংশ এশিয়ায় । মেরু সাগরের দিকে তার মত এত বড় দীর্ঘ উপকূলরেখা আর কোন দেশের নেই। সাইবেরিয়ায় রয়েছে তার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিস্তৃত অকর্ষিত জমি। কাষ্ঠ সম্পদের দিক দিয়ে জগতে তার স্থান সকলের শীর্ষে। দক্ষিণ অঞ্চলে রয়েছে ফল- ফলাতি, চা এবং কার্পাস চাষের প্রচুর জমি। সেখানে এক প্রকার গাছের আবাদ হয় তাতে রবার পাওয়া যায়। ককেসারের তেলের খনি তার এক অমূল্য সম্পদ এবং য়ুক্রেনের উর্বর জমিতে সােণা ফলে। তাকে বলা হয় গমের ভাণ্ডার। এ ছাড়া সুদূর প্রাচ্যে মােঙ্গোলিয়া, চীন এবং মাঞ্চুকুওর নিকটবর্তী এলাকায় সব নতুন নতুন শিল্পকে গড়ে উঠেছে। এমন কি কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী মরু অঞ্চলও তা থেকে বাদ পড়ে নি। এই বিরাট দেশে কেবল রুশ জাতিই বাস করে না, আরও বহু জাতি রয়েছে। শাসনতন্ত্রে চল্লিশটি বিভিন্ন জাতির নামােল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র। কেবল বিশালতাই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নয়; বিপ্লবের ফলে সেখানে যে নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সেটাই আজ সত্যিকারের বিস্ময়।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট সেখানে এখন কোন জমিদার নেই যে খাজনার উপর বেঁচে থাকবে বা কোন কারবারের অংশীদার বা মালিক নেই যে মুনাফার ওপর জীবন ধারণ করবে। দেশের সমস্ত জমিই সর্বসাধারণের সম্পত্তি ; সমস্ত শিল্পই হয় রাষ্ট্র বা কোন গণপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত এবং সমস্ত পরিবারই শ্ৰমার্জিত অর্থে জীবিকানির্বাহ করতে বাধ্য। অনুপার্জিত অর্থে জীবন ধারণ করা সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে আইনত অপরাধ। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প এবং কৃষি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত। পরিকল্পনার প্রধান তিনটি উদ্দেশ্য : (ক) দেশরক্ষার যথােপযুক্ত ব্যবস্থা করা; (খ) উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন শিল্পকেন্দ্র ও কারখানা স্থাপন; এবং (গ) ক্রমশ সর্বসাধারণের জীবনযাত্রার মান যতদূর সম্ভব উন্নত করা। শিল্প যেমন রাষ্ট্র কিংবা মিউনিসিপ্যালিটী কর্তৃক পরিচালিত হয়, তেমনি কৃষকগণ একত্র হয়ে জমি চাষ ও ফসল উৎপাদন করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি সারা বছরে যেমন কাজ করে সেই অনুপাতে তাকে ফসলের অংশ দেওয়া হয়। পরিকল্পিত অর্থনীতি অবলম্বনের ফলে ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে বেকার সমস্যা লােপ পায় এবং সে সমস্যা আর কোনদিন আসবে কিনা সন্দেহ। অথচ অর্থ- নৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জগতে শীর্ষস্থান লাভ করা সত্ত্বেও ১৯৪১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তার প্রায় এক কোটি লােক বেকার ছিল। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তার “নিউ ডিল” পরিকল্পনার দ্বারা সেই সমস্যায় অনেক জোড়াতালি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সমস্যার মূলে যে পুজিত রয়েছে তা দূরীকরণের চেষ্টা না করায় তার সমম্ভ প্রয়াস একরূপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। পরিকল্পনার দ্বারা কেবল শিল্পোৎপাদনই বৃদ্ধি পেয়েছে এমন নয়, ।
সােভিয়েটতন্ত্র সােভিয়েট জনসাধারণের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষারও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ২৩ বছর আগে যে রুশিয়ার শতকরা ৮০ জন ছিল নিরক্ষর, আজ তার শতকরা ৮০ জন শিক্ষিত। মৃত্যুর হারও সেখানে গিয়েছে অনেক কমে। ১৯১৩ খৃষ্টাব্দ হতে ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দের মধ্যে মৃত্যুর হার হাজার করা বত্রিশ থেকে নেমেছে সতেরতে। আমেরিকা বলতে যেমন কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বােঝায় না, তেমনি সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র বলতেও কেবল রুশিয়াকেই বােঝায় না। যে ষােলটি সােভিয়েট রিপাব্লিক নিয়ে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র গঠিত, রুশিয়া তারই একটি রিপাব্লিক। ইংরেজীতে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে সংক্ষেপে বলা হয় ইউ এস এস° আর°—অর্থাৎ ‘যুনিয়ন অব সােভিয়েট সােস্যালিষ্ট রিপাব্লিকস', যার বাংলা করলে দাঁড়ায় সােভিয়েট সমাজতান্ত্রিক রিপাব্লিকগুলির যুক্তরাষ্ট্র। আমরা সংক্ষেপে একে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রই বলব। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র নিম্নের মােলটি রিপাব্লিক নিয়ে গঠিত :- (১) রুশিয়া, (২) য়ুক্রেন, (৩) বাইলে-রুশিয়া (শ্বেত রুশিয়া), (৪) ক্যারেললাফিনিশ, (৫) এস্তোনিয়া, (৬) লাটভিয়া, (৭) লিথুয়ানিয়া, (৮) মলদাভিয়া, (৯) জর্জিয়া, (১০) আর্মেনিয়া, (১১) আজারবাইজান, (১২) উজবেকিস্তান, (১৩) তাজিকিস্তান, (১৪) তুর্কীস্তান, (১৫) কিরগীজ এবং (১৬) কাজাক। এই মােলটি রিপাব্লিকের মধ্যে রুশ রিপাব্লিকের আয়তন সর্বাপেক্ষ। প্রত্যেক রিপাব্লিকেরই নিজস্ব গবর্ণমেণ্ট আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে সকলেরই সমান অধিকার। এই সকল রিপাব্লিকের লােক সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের যেখানেই গিয়ে বাস করুক সকলেই সমান নাগরিক বেশী।
১৮
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট
অধিকার পাবে। এছাড়া এসব রিপাব্লিকের মধ্যে আবার ছােট ছােট
জাতি নিয়ে গঠিত সব স্বায়ত্তশাসনপ্রাপ্ত রিপাব্লিক রয়েছে। সেগুলিকে
বলা হয় অটোমাস ন্যাশনাল রিপাব্লিক'। কেবল তাই নয়, স্থান
বিশেষে সামান্য লােক নিয়ে একটি গ্রামকে পর্যন্ত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া
হয়েছে। এমন কি সম্রাজ্ঞী ক্যাথারিণের আমলে যে-সকল জার্মান
গিয়ে কশিয়ায় বসত স্থাপন করেছিল, ভঙ্গা নদীর তীরে তাদেব জন্য
একটি স্বতন্ত্র জার্মান অটোনমাস
বিপারিক পর্যন্ত করে দেওয়া
হয়েছে।
সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের চরম
ক্ষমতা রয়েছে সুপ্রিম সােতি-
য়েট’-এ, অর্থাৎ যাকে বলা যায়
সােভিয়েট পার্লামেন্ট। সুপ্রিম
সােভিয়েটের প্রত্যেক সদস্য
সার্বজনিক ভিত্তিতে প্রাপ্ত
বয়স্কদের ভােটে নির্বাচিত
হন। সুপ্রিম সােভিয়েটের
সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দুটি পরিষদ রয়েছে। উভয়
ম: কালিনিন
পরিষদেব সমান অধিকার।
একটির নাম ‘সােভিয়েট অব দি য়ুনিয়ন এবং অপরটির নাম ‘সােভিয়েট
অব ন্যাশনালিটিজ।
‘সােভিয়েট অব দি য়ুনিয়ন’-এ ছ’শ’রও বেশী সদস্য রয়েছেন।
প্রতি তিন লক্ষ লােকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
‘শােভিয়েট অব ন্যাশনালিটিজও প্রায় সমান সংখ্যক সদস্য নিয়েই
সােভিয়েটতন্ত্র গঠিত। তাতে প্রতিনিধি নির্বাচন হয় এভাবে :—মূল রিপাব্লিকের প্রত্যেকটি হতে পঁচিশ জন করে সদস্য ; প্রত্যেক অটোনমাস রিপাব্লিক থেকে এগার জন করে সদস্য এবং ছােট ছােট স্বাতন্ত্র প্রাপ্ত এলাকাগুলি থেকে একজন কি দুজন করে প্রতিনিধি। এভাবে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সমগ্র অধিবাসী যেমন সুপ্রিম সােভিয়েটে প্রতিনিধিত্বের সুযােগ পায়, তেমনি বিভিন্ন জাতির সেখানে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রয়েছে। সুপ্রিম সােভিয়েটের যখন অধিবেশন বন্ধ থাকে তখন কাজ চালাবার জন্য একটি প্রিজাইডিং কমিটী’ গঠিত হয়। তাকে বলে ‘প্রেসিডিয়াম। এছাড়া সুপ্রিম সােভিয়েট কতৃক একটি মন্ত্রিসভাও নিযুক্ত হয়। সােভিয়েট মন্ত্রিসভার নাম কাউন্সিল অব পিপলস কমিসাস”। রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান দপ্তরগুলি এক একজন কমিসার বা মন্ত্রীর হাতে থাকে। কাউন্সিল অব পিপলস কমিসাস’এর চেয়ার- ম্যানই হলেন প্রধান মন্ত্রী। বর্তমানে মঃ ষ্ট্যালিন এই পদে অধিষ্ঠিত আছেন। রুশ-জার্মান যুদ্ধের ফলে যেমন জরুরী অবস্থার সৃষ্টি হয় তেমনি প্রেসিডিয়ামও জরুরী ব্যবস্থা অবলম্বন করে। দেশরক্ষার যাবতীয় কার্য- নির্বাহের জন্য নিম্নের পাঁচ জন নিয়ে এক কাউন্সিল বা পরিষদ গঠিত হয় ? মঃ ষ্টালিন ( প্রধান মন্ত্রী), মঃ মলােটফ ( পররাষ্ট্র সচিব ), মঃ ভরােশিলফ (উত্তর রণাঙ্গণের প্রধান সেনাপতি), মঃ বেরিয়া ( স্বরাষ্ট্র সচিব) এবং ম: ম্যালেঙ্কফ (সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের ক্যুনিষ্ট পার্টির একজন সেক্রেটারী)। কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের মত অপরাপর প্রধান রিপাব্লিকগুলির মহাযুদ্ধে সােভিয়েট প্রত্যেকটিতে একটি করে সুপ্রিম সােভিয়েট রয়েছে। সেখানেও সার্বজনিক ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভােটে সদস্য নির্বাচন হয়। তবে সেই সব সুপ্রিম সােভিয়েটে মাত্র একটি করে পরিষদ। এছাড়া ক্ষুদ্র জাতিগত স্বাতন্ত্রপ্রাপ্ত এলাকা এবং প্রত্যেক সহর ও গ্রামের জন্যও সব ছােট ছােট সােভিয়েট কতৃপক্ষ রয়েছে। সেই সব স্থানেও স্থানীয় জনসাধারণ কর্তৃক সার্বজনিক ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন হয়। সােভিয়েটকে বাংলায় আমরা পঞ্চায়েৎ বলতে পারি। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় সােভিয়েটগুলির ক্ষমতা যথেষ্ট। স্ব স্ব এলাকায় শিক্ষাবিস্তার এবং স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্ব তাে সেগুলির ওপর ন্যস্ত রয়েছেই, তাছাড়া বহু ক্ষেত্রে সমবায় ভাণ্ডার চালান, কারখানা স্থাপন এবং আমােদপ্রমােদের ব্যবস্থাও সেগুলির করতে হয়। উর্ধতন সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের নির্দেশ তাদের মেনে চলতে হয় এবং সর্বদা লক্ষ্য রাখতে হয় যে, তাদের স্থানীয় কাজ যেন কোন ভাবে রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরি- কল্পনাবিরুদ্ধ না হয়। একজন সাধারণ সােভিয়েট নাগরিকের এতগুলি ভােটাধিকার রয়েছে কেন্দ্রীয় সুপ্রিম সােভিয়েটের দুই পরিষদে প্রতিনিধি নির্বাচন ; তার নিজস্ব রিপাব্লিকের সুপ্রিম সােভিয়েটে প্রতিনিধি নির্বাচন এবং তার স্থানীয় সোভিয়েটে প্রতিনিধি নির্বাচন। নিজের নির্বাচকমণ্ডলীতে এক বা একাধিক শ্রমিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মনােনীত হলেই যে কেউ নির্বাচনে দাঁড়াতে পারে। জনসাধারণেরই নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ কর্তৃক গঠিত সুপ্রিম সােভিয়েটু ‘কাউন্সিল অব পিপলস কমিসাস' বা মন্ত্রিসভা নিযুক্ত করে থাকে। সেই মন্ত্রিসভা কর্তৃক দেশরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বৃহৎ শিল্প, সমর শিল্প, কাষ্ঠ ব্যবসায়, কৃষি এবং দেশের সমস্ত অর্থ নৈতিক জীবন পরিচালিত হয়।
সােভিয়েটতন্ত্র প্রথমেই বলেছি, প্রত্যেক সক্ষম নাগরিকই জীবিকার্জনের জন্য শ্রম করতে বাধ্য। রাষ্ট্র পরিচালিত কোন কারখানায় কাজ নিলে তার নিয়ােগকর্তা হয় ষ্টেট ট্রাষ্ট । উক্ত কারখানা যে শিল্পের অন্তর্গত সেই শিল্প বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দপ্তর কর্তৃক ওই ষ্টেট ট্রাষ্ট নিয়ন্ত্রিত হয়। তারপর মিউনিসিপ্যালিটি পরিচালিত কোন কারখানা, রেস্তোরা বা দোকানে কেউ কাজ নিলে তার নিয়ােগকর্তা হয় স্থানীয় সােভিয়েট। কোন সমবায় খামারে কেউ কাজ করলে তাকে অন্যান্য গ্রামবাসীর সঙ্গে একত্রে চাষবাস করতে হয় এবং আর সবার মত সেও উক্ত খামারের একজন অংশীদাররূপে ফসলের ভাগ পায় । কারখানায় নিযুক্ত শ্রমিকগণ সােভিয়েটগুলিতে তাে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেই, তা ছাড়া ট্রেড য়ুনিয়নে অর্থাৎ শ্রমিক সঙ্ঘে যােগ দিয়ে তারা ট্রেড য়ুনিয়ন কমিটীতে তাদের প্রতিনিধিও নির্বাচন করতে পারে। সমবায় খামারে কৃষকরা তাদের পরিচালনা- কমিটীর সদস্য নির্বাচনে যােগ দেওয়ার অধিকারী। এ ছাড়া সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কনিষ্ট পার্টির প্রায় ২৫ লক্ষ সভ্য রয়েছে। তারা বিভিন্ন শাখা কমুনিষ্ট পার্টির সদস্য নির্বাচনে যােগ দিয়ে থাকে। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে কমুনিষ্ট পার্টির প্রাধান্য বিদ্যমান। সেখানে আর কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নেই। ১৯১৭ খৃষ্টাব্দের বিপ্লবের পর সেখানে যে-সব দল মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল তারা ছিল কায়েমী স্বার্থের প্রতিভূ। যে-সব দল সােভিয়েট তন্ত্রের অবসান ঘটাবার জন্য অস্ত্রধারণ করেছিল বা বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হয়। কনিষ্ট পাটি, তার নীতি এবং কমুনিষ্ট নেতৃবৃন্দ যে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কতখানি জনপ্রিয়, মহাযুদ্ধে সােভিয়েট রণাঙ্গনে লালফৌজের নৈতিক দৃঢ়তাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কমুনিষ্ট পাটি জনপ্রিয় না হলে সােভিয়েট যুদ্ধ সত্যিকারের জনযুদ্ধ হয়ে উঠত এবং জার্মান-অধিকৃত সােভিয়েট এলাকায়ও জনসাধারণ সমস্ত বিপদ তুচ্ছ করে গেরিলা যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করত না। নির্বাচনপ্রথা আঠার বছর বয়স হলেই যে কেউ নির্বাচনে ভােট দিতে পারে। স্ত্রী পুরুষে' কোন প্রভেদ নেই। সাধারণ নাগরিকদের মত সাধারণ সৈন্যরাও তােট দেবার অধিকারী। কম্যুনিষ্ট পার্টির ন্যায় ট্রেড মুনিয়ন, কো-অপারেটিভ সােসাইটি, বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান এবং যুব প্রতিষ্ঠানগুলিও নির্বাচনে প্রার্থী মনােনীত করতে পারে। এছাড়া শ্রমিকগণ এবং কৃষকরা সাধারণ সভা করেও তাতে প্রার্থী মনােনীত করার অধিকারী। নির্বাচন প্রার্থীকে যে কমুনিষ্ট পার্টির সভ্য হতেই হবে এমন কোন কথা নেই। ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে যে নতুন শাসনতন্ত্র প্রবর্তিত হয় তদনুসারে এপর্যন্ত মাত্র একবারই সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনে প্রত্যেক নির্বাচকমণ্ডলীতে একটি করে সম্মেলন হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রার্থী মনােনীত করা হয় সেই সব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উক্ত সম্মেলনে যােগ দেয়। সেই সব সম্মেলনে স্থির হয় যে, সকলে একমত হয়ে কোনও একজন বিশিষ্ট প্রাথীকে সমর্থন করবে। তার ফলে প্রত্যেক নির্বাচকমণ্ডলীতেই এক একজন প্রার্থীকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হয় এবং তাঁরা তাঁদের স্ব স্ব নির্বাচকমণ্ডলীতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সমর্থন লাভ করেন। প্রার্থীর সামাজিক, ব্যক্তিগত এবং কর্মজীবন আদর্শস্থানীয় কিমা, মনােনয়নকালে সে সম্বন্ধে সােভিয়েটতন্ত্র বিশেষ ভাবে বিবেচনা করা হয়। আইন সভায় যাকে পাঠিয়ে নির্বাচকগণ বিশ্বাস করতে পারে যে, তাকে দিয়ে তাদের স্বার্থ যথাযথ রক্ষিত হবে কেবল তাকেই তারা মনোনীত ও নির্বাচিত করে। পুজিবাদী তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলির সঙ্গে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে পার্থক্য রয়েছে। পুঁজিবাদী দেশগুলিতে অর্থ দিয়ে ও নানারূপ প্রলােভন দেখিয়ে বিত্তশালী লােকেরা যেভাবে ভোট- দাতাদের হাত কবে, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রার্থীদের সেভাবে টাকা ছড়াবার উপায় নেই। সেখানে প্রার্থীদের নৈতিক বলে জনসাধারণের আস্থা অর্জন করতে হয় এবং সেজন্যই তারা হন সত্যিকারের গণ-প্রতিনিধি। পক্ষান্তরে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক দেশ- গুলিতে জনসাধারণের অধিকার স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও দেখা যায়, নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে যারা নির্বাচনে জয়লাভ করেন তাদের অধিকাংশই কায়েমী স্বার্থের সংরক্ষক। বিত্তশালীরা হয় নিজেরাই নির্বাচনে অবতীর্ণ হন, আর তা না হলে অর্থানুকূল্যে এমন সব লােক নির্বাচনে দাঁড় করান যারা আইন সভায় গিয়ে তাদের ধনী মুরুব্বীদেবই স্বার্থরক্ষার জন্য এই গলদ রয়েছে বলেই তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে নানারূপ বিসদৃশ অবস্থার সৃষ্টি হয়। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনে কে কাকে ভােট দিল জানবার উপায় নেই। কেবল ভােট গণনার সময় জানা যায় কোন্ প্রার্থী কত ভােট পেলেন। স্ত্রীপুরুষ নির্বিশেষে ভােটদাতারা নিজে এসে ভােটগ্রহণ কেন্দ্রে একখানি সীলমােহর করা খামে ভোট দিয়ে যাবে। সুপ্রিম সােভিয়েট কিংবা স্থানীয় সােভিয়েটসমূহের নির্বাচিত সকল সদস্থকেই মাঝে মাঝে তাদের নির্বাচকমণ্ডলীতে এসে কাজের বিবরণ দিয়ে যেতে হয়। কারা কাজ সন্তোষজনক না হলে নির্বাচকরা লড়বেন।
२४ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট তাকে সরিয়ে অবিলম্বে আর একজনকে সেই পদে নির্বাচিত করে, পরবর্তী নির্বাচনের অপেক্ষায় তাদের বসে থাকতে হয় না। আমাদের দেশের ম্যাজিষ্ট্রেট-কোর্টের মত সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে যে সব কোর্ট আছে সেগুলিকে সেখানে বলা হয় ‘পিপল্স কোর্ট। পিপলস কোর্টের জজরাও সর্বসাধারণের ভােটে নির্বাচিত হন। শিশুকল্যাণ কথায় বলে, কোন গবর্ণমেন্টের রাজনৈতিক কাঠামাে দিয়ে তার বিচার করা করা চলে না। বাস্তবিক পক্ষে বিচার্য বিষয় হল কোন্ গবর্নমেন্ট গণকল্যাণের জন্য কতটুকু কি করে। শিশুই জাতির ভবিষ্যৎ। অতএব সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের গণকল্যাণ প্রচেষ্টা সম্বন্ধে কিছু বলতে হলে সর্বাগ্রে বলা দরকার সেখানে শিশুদের জন্য কি করা হয়। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ আগাগােড়াই শিশুকল্যাণের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে এসেছেন। এমন কি গত মহাযুদ্ধের পর রুশিয়ায় যখন ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখনও সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ শিশুমঙ্গলকেই রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। সােভিয়েট শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রথম যে-সকল আইন পাশ হয় তার মধ্যে সর্বসাধারণ্যে শিক্ষা বিস্তারের একটি আইন থাকে। আইন পাশ হয়ে কেবল সরকারী দপ্তরখানার খাতাপত্রেই তা সীমাবদ্ধ রয় নি; তা কাজে লাগাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে। তারই ফলে ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে যেখানে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ছিল ৮০ লক্ষ ; সেখানে ১৯৪১ খৃষ্টাব্দে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এসে দাড়ায় ৩ কোটি ২০ লক্ষে। আমাদের দেশে যেমন সাধারণত বালক বালিকাদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়েই খালাস, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক তেমন নয়। বিদ্যালয়ে সােভিয়েটতন্ত্র পাঠাবার আগেও শিশুদের জন্য যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হয়। কার্যত প্রত্যেক শিশুর জন্মের আগে থেকেই তার মঙ্গলের জন্য নানাবিধ সরকারী ব্যবস্থা রয়েছে। সন্তানসম্ভবা হলেই প্রত্যেক নারী বিনা পয়সায় ডাক্তারী সাহায্য পেয়ে থাকে। প্রত্যেক সহরে এবং এখন বহু গ্রামেও প্রসূতিভবন স্থাপিত হয়েছে। সেখানে বিনা খরচায় সন্তান প্রসব হয়। এছাড়া যে-সব নায়ী জীবিকার্জনের জন্য কাজ করে, সন্তান প্রসবের পর তাদের পূর্ণ বেতনে দু’মাসের ছুটি দেওয়া হয়। তারপরও কয়েক মাস তাদের খুব বেশী পরিশ্রমের কাজে দেওয়া হয় བ། | ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী যার জন্য যতদিন যেমন হালকা কাজের দরকার ততদিন তাকে তেমন হালকা কাজেই রাখা হয় এবং সেই সময়টায়ও তারা পুরা বেতনই পায়। তদুপরি শিশুর জন্মের পর তার জন্য কিছুদিন ভাতা বাবদ কিছু অর্থ দেওয়া হয়। এছাড়া কারো সাতটির বেশী সন্তান হলেই সে মােটা রকমের একটা ভাতা পেয়ে থাকে। সােভিয়েট যুক্তবাষ্ট্রে মাতৃত্ব অবজ্ঞাত না হয়ে এভাবে পুরস্কৃত হয়। রাষ্ট্রের লক্ষ্য শিশুদের যাতে উপযুক্ত যত্ন হয় অথচ সন্তান লালন- পালন নিয়ে মাপ খুব বেশী ব্যাপৃত না হয়ে পড়ে। সেজন্য যে-সব নারী শ্রমজীবী, তাদের শিশুদের জন্য রয়েছে শিশুমঙ্গলালয় এবং কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়। সেখানে সব শিক্ষিত নাস তাদের তত্ত্বাবধান করে এবং সেই শিশুসমাজে হয় শিশুমনের সহজ বিকাশ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যরক্ষার প্রাথমিক নিয়ম পালনে তারা সেখানে আপনা থেকেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। শিশুমঙ্গলালয় এবং কিণ্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলি অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয় এবং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানই তার, নারী TBRARY সন্তানসন্ততির জন্য এ ব্যবস্থা করতে বাধ্য একথা সত্য ; কিন্তু তা বলে সন্তান মহাযুদ্ধে সােভিয়েট পরিবার থেকে শিশুদের একেবাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখাই সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য নয়। ববঞ্চ এটাই তাদের কাম্য যাতে দিনে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত বার ঘণ্টাকাল শিশুবা বাড়ীতে তাদের মাবাপ ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই থাকে। শৈশব পার হলেই ছেলেমেযেদের জন্য সব সাধাৰণ বিদ্যালয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা বযেছে। কেবল স্কুলকলেজে শিক্ষাই সেখানে যথেষ্ট কিণ্ডারগার্টেনে সােভিয়েট শিশু বলে বিবেচিত হয় না, বাইরেও তাদের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে ছেলেমেয়েরা যে যার রুচি অনুযায়ী শিক্ষার সুযােগ পায়। বড় বড় সহরের উদ্যানগুলিতে লাইব্রেরী, খেলাধুলা এবং অন্যান্য সব শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ছেলেমেয়েদের যার যেদিকে সােভিয়েটতন্ত্র বেশী ঝোঁক সেখানে সে তা শিখবার সুযােগ পায় । সেখানে সরকারী বেতনে শিক্ষক নিযুক্ত রয়েছেন। এছাড়া সােভিয়েট যুক্ত- রাষ্ট্রের প্রায় প্রতি নগরে এবং বহু গ্রামেও শিশুশিক্ষার জন্য সব “পায়ােনিয়ার প্যালেস” বা শিশু-দুঘর স্থাপিত হয়েছে। এঞ্জি- নিয়ারিং, প্রাকৃত বিজ্ঞান, বিমান ও রেলওয়ের খেলনা, নৃত্য, গীত, চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য, ফটোচিত্র, খেলাধূলা প্রভৃতির নিদর্শন এবং তৎসম্পর্কে এমন সব যন্ত্রপাতি রয়েছে যেগুলি দেখে শিশুমন সহজেই আকৃষ্ট হয়। সেই সব দেখে যে শিশু যেমন শিখতে চায় তাকে তেমন যন্ত্রপাতি দিয়ে শিক্ষকরা সাহায্য করে থাকেন। সব শিশুই সেখানে ভর্তি হতে পারে না। বিদ্যালয়ে যারা খুব ভাল ফল দেখায় তাই সাধারণত সেখানে প্রবেশের অধিকার পায়। তাছাড়া কোন শিশুর মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য অদম্য স্পৃহা দেখা গেলে তাকে পায়ােনিয়ার প্যালেসে পাঠান হয়। বিস্ময়ের কথা এই যে, এই সব শিক্ষালয়ে ছেলেমেয়েরা এঞ্জিনিয়ারিং, বিমানবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, কৃষিবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে এমন সব নতুন জিনিসের সন্ধান দিয়েছে যেগুলি দেশের অর্থনৈতিক জীবনে গ্রহণযােগ্য। শিশু মনে নতুন আবিষ্কারের যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থাকে, এই সব বিদ্যালয়ে এসে তাদের সেই প্রবৃত্তির সহজ বিকাশ হয়। কতগুলি সহরের ময়দানে ছেলেদের জন্য রেলওয়ের মডেল পাতা হয়েছে। কি করে রেলওয়ে চালাতে হয় এবং কোন্ যন্ত্রপাতি কি কাজে লাগে, ছেলেরা তা সব সেখানে শিখে। তারাই সেগুলি চালায় এবং কিছু ভেঙ্গে গেলে তারাই তা মেরামত করে। এছাড়া লেনিনগ্রাড ও ওডেসায় ছেলেদের জন্য নকল বন্দর তৈরী করা হয়েছিল। তাতে সব ছোট ছােট, জাহাজ থাকত এবং সেই সব ২৮ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট মডেল জাহাজের সাহায্যে ছেলের জাহাজচালনা, জাহাজপ্রস্তুত ও মেরামতী কাজ শিখত। এগুলি তারা নিজেরাই চালাত এবং তা নিয়ে ছেলেরা দস্তুরমত মাথা খাটাত। তারপর সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের নিজস্ব থিয়েটার রয়েছে। শিশু থিয়েটারের সংখ্যা শত খানেকের কম হবে না। শিশুদের বােধ্য করে সব নাটক লেখা হয় এবং শিশুরাই তার অভিনয় করে। তাছাড়া সেখানে কেবল শিশুদেরই জন্য বহু সিনেমা রয়েছে এবং সেই সব সিনেমায় শিশুশিক্ষার উপযােগী সব ছবি দেখান হয়। এতদ্ব্যতীত শিশুরা যাতে গ্রীষ্মবকাশ বেশ আমােদ প্রমােদের ভিতর দিয়ে কাটাতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রপরিচালিত কারখানা, স্কুল ও ট্রেড য়ুনিয়নসমূহের কর্তৃপক্ষগণ সব ‘সামার ক্যাম্প বা গরমের ছুটি কাটাবার শিবির স্থাপন করেছেন। সেই সব শিবিরে নাস, ডাক্তার ও শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ছেলেমেয়েরা পরম আনন্দে গরমের ছুটিটা কাটিয়ে দেয়। এভাবে প্রায় বিশ লক্ষ ছেলেমেয়ের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বলা বাহুল্য, যুদ্ধের সময় এই সামার ক্যাম্পগুলি সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের খুবই উপকারে এসেছে। সহর ছেড়ে শিশুরা এই সব ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় পেয়েছে এবং আগে থেকে ব্যবস্থা থাকায় তাদের শিক্ষারও কোন ব্যাঘাত হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রণালী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাব্যবস্থা শিশুবিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এক সূত্রে গাথা। যে-সকল নারী জীবিকার্জনের জন্য কাজ করে তাদের শিশুদের জন্য রয়েছে শিশুমঙ্গলালয় এবং কিণ্ডারগার্টেন। তাছাড়া সর্বসাধারণের শিক্ষার জন্য সব প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ছেলেমেয়েরা যাবে মাধ্যমিক সােভিয়েটতন্ত্র বিদ্যালয়সমূহে এবং সেখান থেকে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার বয়স আট হতে আঠার। এই দশ বছরে তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করতে হয় এবং তের চৌদ্দ বছর বয়স হলেই আর এক বিদ্যালয় ছেড়ে অন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া চলে না। ছেলেমেয়েরা একই বিদ্যালয়ে পড়ে এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষকতার কাজে লােক নিয়ােগ করা হয়। যােগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি, স্ত্রী-পুরুষে কোন বৈষম্য করা হয় না। ছেলেমেয়েরা যে কেবল বিদ্যালয়ে এক সঙ্গে পড়েই এমন নয়, তারা এক হােষ্টেলেও থাকে। ইংরেজ অধ্যাপক প্যাট স্লোয়ান অনেকদিন সােভিয়েট রুশিয়ায় থেকে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি তার “Russia without Illusions” পুস্তকের এক স্থানে লিখেছেন, “সােভিয়েট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকশিক্ষয়িত্রীদের মধ্যে সত্যিকারের সমভাব দেখে আমি অভিভূত হই।•••••••••শিক্ষালয়ে নারী ও পুরুষকে আলাদা করে রাখা হয় নি। এক হােষ্টেলে, একই এক হােষ্টেলে, একই তলায় ছাত্রছাত্রী ভিন্ন ঘরে বাস করে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোন অশােভন মেলা- মেশা বা অন্তরঙ্গতা আমার চক্ষে কখনও পড়ে নি ; এমন কি কোন নীতিবাগীশও বােধ হয় তাদের সম্বন্ধে কোন খারাপ ধারণা করতে পারবেন না।” কেবল স্ত্রী ও পুরুষ সম্বন্ধেই যে সমভাব বিদ্যমান এমন নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিভিন্ন জাতিও সমান ব্যবহার পেয়ে থাকে। অথচ জারের আমলে কি জাতিবৈষম্যই না রুশিয়ায় ছিল। অধ্যাপক প্যাট স্লোয়ান তার পূর্বোক্ত বইএ এ সম্বন্ধে একটি যে উদাহরণ দিয়েছেন তা মর্মান্তিক। তিনি বলেছেন :- *একটি ইহুদী শিক্ষয়িত্রীর সহিত আমার জানাশুনা হয়। আমরা মহাযুদ্ধে সােভিয়েট উভয়ে উভয়ের কাছে পাঠ নিতাম। বলশেভিক বিপ্লবের আগে তিনি সেন্ট পিটার্সবুর্গে (বর্তমান লেলিনগ্রাড) কি কষ্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী লাভ করেন তা তিনি আমাকে বলেন। ইহুদী বলে তিনি ছাত্রী রূপে প্রথমে রাজধানীতে থাকার অনুমতি পেলেন না। তখন তাকে ভিন্ন পথ বেছে নিতে হল। পুলিশের কাছে বারবনিতা বলে নাম লিখিয়ে তিনি রাজধানীতে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের অনুমতি পেলেন। আর আজ সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে জাতি হিসাবে কাউকে ঘৃণা বা অপমান করা আইনত দণ্ডনীয়।” মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলে এবং সন্তোষজনক এই সাটিফিকেট পেলে সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। ভালাে এবং উত্তম’ এই সার্টিফিকেট পেলে ছাত্রেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পড়ার সুযােগ পায় এবং প্রয়োজন হলে তাদের অন্যান্য খরচ চালাবার জন্য জলপানিও দেওয়া হয়। সাধারণ বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও শিক্ষার জন্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে স্বতন্ত্রভাবে বহু শিল্পশিক্ষালয় ও কৃষিবিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। সেখানে লক্ষ লক্ষ বালক বালিকা শিক্ষা লাভ করে। সেই সব বিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষা তাে আছেই, তা ছাড়া বৃত্তিশিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। বৃত্তিশিক্ষার উদ্দেশ্য হল এই যে, আঠার বছর বয়সেই যেন তারা এক একজন সুদক্ষ শ্রমিক হয়ে বেরুতে পারে। এ গেল সাধারণভাবে ছাত্রজীবনে শিক্ষার কথা। এ ছাড়া সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে বয়স্কদের শিক্ষার জন্য নানারূপ ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের দেশে যেমন সাধারণত বিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষা সমাপ্ত হয় এবং কর্মজীবনে প্রবেশ করে আর অন্য কিছু শিখবার বিশেষ ৫ সােভিয়েটতন্ত্র ঠিক তা নয়। প্রয়ােজন আছে বলে কেউ মনে করে না, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু সেখানে কর্মজীবনে প্রবেশ করেও অধিকাংশ লােকই অবসর সময়ে অন্য কিছু শিখে। অবশ্য এসব শিখতে তাদের কোন খরচ লাগে না, সরকারী অথবা ট্রেড য়ুনিয়নের খরচে শিখাবার ব্যবস্থা করা হয়। কারখানার শ্রমিকগণ যাতে অধিকতর সুদক্ষ কারিগর হতে পারে তার জন্য অবৈতনিক ট্রেনিং ক্লাস রয়েছে। ইচ্ছা করলেই সেখানে সােভিয়েট বালক মডেল দেখে বিমান নির্মাণ শিখছে গিয়ে অবসর সময়ে যে কোন শ্রমিক নিজের উন্নতির জন্য শিক্ষা লাভ করতে পারে। এছাড়া সুদূর পল্লীতে যে-সব শিক্ষক ও চিকিৎসক থাকেন তারা মাঝে মাঝে সহরে এসে বিনা বেতনে নতুন নতুন বিষয়ে শিক্ষালাভ করে যান। তা ছাড়া নিজের বৃত্তি বাদে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে শিখবার ব্যবস্থাও রয়েছে। অধ্যাপক প্যাট স্লোয়ান তাঁর “Russias মহাযুদ্ধে সােভিয়েট in Peace and in War" নামক পুস্তকের এক স্থানে লিখেছেন :- “সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে একবার ট্রেনে দীর্ঘপথ ভ্রমণের সময় একজন রেলওয়ের খানসামা এসে আপশােষ কবে আমাকে বলল যে, এত দূরপথে ভ্রমণের ফলে সে আৰ সন্ধ্যাবেলা অভিনয় শিখবার জন্য তাব ক্লাসে যােগ দিতে পারছে না। তার নিশ্চয় বিশ্বাস, খানসামাগিবি ছেড়ে একদিন সে ভাল অভিনেতা হতে পারবে।” কেবল বেশী বেজগারের আশাযই যে সেখানে লোক অবসব সময়ে শিক্ষা লাভ করে এমন নয় ;—সাধারণ জ্ঞান লাভের জন্যও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রবাসীরা রাজনীতি, অর্থনীতি এবং দর্শনের ক্লাসগুলিতে যোগ দেয়। সােভিয়েট শিক্ষা ধারার একটা মস্ত বড় বৈশিষ্ট্য এই যে, কোন সম্প্রদায় বা জাতি শ্রেষ্ঠ—এ ভাবটা মোেটই শিখান হয় না। ছোটবেলা থেকেই তারা শিখে সকল জাতি, সকল সম্প্রদাষই সমান। তা ছাড়া শিক্ষার মধ্য দিয়ে তাদের এ ৰােধ জন্যে যে, দেশব জমি ও শিল্পসম্পদ কারাে ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তাতে সকলে বই অধিকার আছে। পরস্পবের প্রতি সৌহাদ্যভাব এবং কর্মস্পৃহা জাগাবার জন্যও সর্বতােভাবে চেষ্টা করা হয়। একজনের শ্রমে আর একজনের মুনাফা করা যে অন্যায়, শিক্ষার মধ্য দিয়ে এটাও তাদের বােঝান হয়। এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ধর্মের কোনই সংস্রব নেই। পারিবারিক জীবন সােভিয়েট পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে কুচক্রীদের কুৎসিত প্রচার- কার্যের ফলে অদ্যাবধি অনেকের মনে ভ্রান্ত ধারণা না রয়েছে এমন নয়। সােভিয়েটবিবেমীরা লােকের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে নিরঙ্কুশ ভাবে दमक । विवादित, १६:, बन करत हिमा भानिक मारे जय नारा र दा सिरिर र दा५ । 5: काय ? و زیر له ما نرما نے نا تو نے ....2, 22 - 12 : 2:22 1 7.. 12 2... ... ... !: 4 ... ... ...... -, :...1... 2 .2", ... ... . 7 . या कार प्रातः २,? ... ... ... ... ............ . 23, Li: 2:4152,.. -- : 'दन : 5 तक : क न.र. 22.10:22.2 ६.2 - 22,22, ३... १ . وه و رهن مان : د قام ، ما منه 7 - tilai 5 152 22.2 नि निन.... मग तथा शामिल ما بره مالي مر ا ب . : زئی روک دیا تم ه م میر ۔ 2. 2. in 25 22222) २६.24T12:222ati 17 میم نے नागदक 157 नगं माया । Pati ৩৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট চায় যুক্তরাষ্ট্রে জীবিকার্জনের জন্য উৎসাহিত করা হয়। পুরুষের সমান পারিশ্রমিক নারী পায় এবং যােগ্যতা অনুসাবে পদোন্নতি হয়। আগেই বলা হয়েছে, পদোন্নতি ব্যাপারে পুরুষ ও নারীতে কোন বৈষম্য নেই। এর ফলে সােভিযেট যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য নাবী এখন স্বাধীন ভাবে জীবিকার্জন করে। সন্তান লালনপালন এবং সংসাবিক কাজকর্ম যাতে জীবিকার্জনের পথে অন্তরায় হয়ে না দাড়ায় তদুদ্দেশ্যে শিশুদেব বক্ষণ- বেক্ষণ ও শিক্ষার জন্য রয়েছে সরকাবী শিশুমঙ্গলালয় এবং কিণ্ডাৰ- গার্টেন বিদ্যালয়সমূহ। এছাড়া প্রত্যেক অফিস বা কাবানা সংলগ্ন ভােজনালয থাকায় রান্নাবান্নার জন্যও মেযেদেব বাড়তে বসে থাকতে হয় না ; অবশ্য স্বামীর উপার্জনের ওপর নির্ভর কবেই কেউ যদি সংসারযাত্রা নির্বাহ করতে তাতেও কোন আপত্তি নেই। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য কোন নারী আগ্রহান্বিত হলে তাব জন্য সেই পপ সর্বদাই উন্মুক্ত। পারিবারিক জীবনের স্বাস্থ্য বক্ষার পক্ষে এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যে কত দরকার, সমাজ সম্বন্ধে চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই তা উপলব্ধি করবেন। বহুক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক পরাধীনতার দরুণ নাবীজকে পুরুষসমাজের কাছে নিগৃহীত হতে হয় এবং অর্থনৈতিক কারণে সম্পত্য জীবন বিকৃত হয়ে ওঠে। আর্থিক প্রয়ােজনে সােভিয়েট যুক্তবাষ্ট্রে নাবীব আৰ এখন স্বামী খুজতে হয় । বা সেই ভয়ে স্বামীর আশ্রয়ে থাকা বাধ্যবাধকতা নেই। নরনাবীব পারস্পরিক ভালবাসার ওপই এখন সেখানে দাম্পত্য জীবন প্রতিষ্ঠিত। বলা বাহুল্য, এই অর্থ নৈতিক মুক্তির ফলে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে পতিতা- বৃত্তির অবসান :টেছে। সন্তানসন্ততির কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রেখেই প্রধানত সােভিযেট বিবাহবিধি প্রবর্তিত হযেছে। বিবাহবিচ্ছেদের পদ্ধতি সেখানে অপেক্ষাকৃত সহজ ; এক পক্ষের উপস্থিতিতে অপর পক্ষ
সােভিয়েটতন্ত্র
দরখাস্ত করলেই বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর করা হয়।
পথ সহজ বলেই
==PM treী এক মেল
1.
র
"
=====
গত মে ৭ (ভি’ট সৎ ও গৃহি।
যে সেখানে কথায় কথায় বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে থাকে এ নয়। জীবন
৩৬ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট བ། | তবে ধারা সহজ হওয়ায় মানুষের দাম্পত্য জীবনের সমস্যাও অনেক কমে গিয়েছে এবং তা ছাড়া কতকগুলি আর্থিক ও নৈতিক দায়িত্ব থাকায় পারতপক্ষে কেউ বিবাহবিচ্ছেদ করতে যায় বিবাহবিচ্ছেদ কমাবার জন্য প্রত্যেকবার বিবাহবিচ্ছেদের ওপর ক্রমবৃদ্ধিহারে সরকারী ফী ধার্য আছে : প্রথম বারের বিচ্ছেদে ৫০ রুবল ( রুশ মুদ্রা। এ রুল আমাদের দেশের প্রায় সকল টাকার সমান ), দ্বিতীয় বাবে ১৫০ রুবল এবং তৃতীয় বারে ৩০০ রুবল—এই হারে ফী আদায় করা হয়। এছাড়া বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানের ভরণপােষণের খরচ বহন করতে পিতা বাধ্য। এই সব কারণে স্বভাবতই বিবাহবিচ্ছেদ কম হয়। স্বামী-স্ত্রীতে নিতান্ত মনের অমিল হলে জোর কবে তাদের বিবাহ- বন্ধনে আবদ্ধ রাখার ব্যবস্থাও সেখানে নেই। শিশুকল্যাণই সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের সর্বপ্রধান লক্ষ্য। কাজেই প্রত্যেক শিশুই যাতে জীবনের প্রারম্ভে সমান সুযােগ লাভ করতে পারে তজ্জন্য সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ বিশেষ নজর দিয়ে থাকেন। এজন্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কোন সন্তানকেই অবৈধ বলে বিবেচনা করা হয় না। বিয়ের আগে সন্তান জন্মালেও পিতাকে জনকত্ব স্বীকার করতেই হবে এবং সেই সন্তানের ভরণপােষণের জন্য তার আয়ের এক চতুর্থাংশ দিতে সে বাধ্য। কেবল আইনের ভয়েই নয়, নৈতিক বােধ হতেও সােভিমেট পুরুষরা আজকাল এ দায়িত্ব এড়াবার চেষ্টা করে না। বিবাহবিচ্ছেদের পর বিশেষ কোন কারণ না থাকলে সন্তান লালন- পালনের ভার সাধারণত মায়েরাই পেয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে পিতাকে এক সন্তানের জন্য তার আয়ের এক চতুর্থাংশ, দুই সন্তানের জন্য এক তৃতীয়াংশ এবং তিন বা ততােধিক সন্তান থাকলে তাদের জন্য সােভিয়েট তন্ত্র আয়ের অর্ধাংশ দিতে হয়। সন্তানেব জননী তা পেয়ে থাকেন। অবিবাহিত জীবনে সন্তান জন্মালেও এ দায়িত্ব পালন করতে হয়। সােভিয়েট পারিবারিক জীবনে ধর্মের প্রভাব সম্পর্কে এখানে দু'চার কথা বলা দরকার। সােভিয়েট রাষ্ট্র ধর্মকে বাদ দিয়ে চললেও ব্যক্তিগত জীবনে ধর্ম সেখানে নিষিদ্ধ হয় নি। ধর্মব্যাপারে রাষ্ট্রের কোন উৎসাহ নেই এবং কোন ধর্ম প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের সমর্থন বা অর্থ- সাহায্য পায় না। কিন্তু কোন ধর্মমতের প্রতি রাষ্ট্রের বিদ্বেষ ও নেই। খৃষ্টায়, ইসলাম, বৌদ্ধ—সকল ধর্মই রাষ্ট্রের নিকট সমান ব্যবহার পায়। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে সকলেই স্ব স্ব ধর্মমত মেনে চলতে পরে ; কিন্তু ধর্মের ধ্বজা ধরে কেউ রাষ্ট্রবিরােধী কাজ করলে তা বরদাস্ত করা হয় না। কারখানায় জীবিকার্জন বশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার ফলে সােভিয়েট কারখানায় শ্রমজীবীদের দৈনিক কাজের ঘণ্টা আগের মত ঠিক রাখা সম্ভব হয় নি। যুদ্ধের প্রয়ােজনে কাজের ঘণ্টা বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু ১৯১৭ খৃষ্টাব্দ থেকে এ যুদ্ধের প্রাক্কাল পর্যন্ত সেখানে কখনও শ্রমিকদের দৈনিক খাটুনি আট ঘণ্টার বেশি হয় নি। বরঞ্চ বহু বছর শ্রমিকদের দৈনিক খাটুনি ছিল মাত্র সাত ঘণ্টা করে। বছরে তারা পনর দিন হতে এক মাস পর্যন্ত পুরা বেতনে ছুটি পেত। যুদ্ধের জরুরী প্রয়ােজনে এই ছুটিটাও তাদের বন্ধ হয়ে যায় ; তবে এক মাসের বেতন তাদের বেশী দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। আগেই বলেছি, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানই হয় ষ্টেট কিংবা কোন গণপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত এবং প্রত্যেক মহাযুদ্ধে সােভিয়েট শিল্প প্রতিষ্ঠানেই ট্রেড যুনিয়নের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত। কলকারখানায় কিরূপ উৎপাদন হচ্ছে সেই সম্বন্ধে ট্রেড য়ুনিয়ন বমিটী প্রশ্নাদি করার অধিকারী। এছাড়া কলকারখানার পরিচালনা কি ভাবে বেশী উন্নত করা যায় তা আলােচনার জন্য মাঝে মাঝে শ্রমিকদের সভা আহ্বান করা হয় । সেই আলােচনা সভায় কাউকেই ছেড়ে কথা বলা হয় না। কারখানার পদস্থ কর্ম- চারীরা যেমন সাধাৰণ শ্রমিকদের কাজের সমালােচনা করতে পাবেন, তেমনি সাধারণ শ্রমিকরাও আবার দরকার হলে তাদের উর্ধতন কর্ম চারীদের কাজের সমালােচনা করে থাকে। সাধারণ একজন স্ত্রীলােক রেলওর-সিগন্যালারের কাজ শিখছে শ্রমিকদের মধ্যে যারা যােগ্যতার পরিচয় দেয় তাদের পদোন্নতি হতে বেশী দিন লাগে না। উচ্চপদে নিয়ােগের আগে অনেক সময় তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান হয়। সেখানে বিনা খরচে তারা কারখানা পরিচালনাদি সম্বন্ধে শিক্ষালাভ করে আসে। নিয়ােগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ট্রেড মুনিয়ন এক সঙ্গে পরামর্শ করে শ্রমিকদের বেতনের হার নিরুপণ করে থাকে। সর্বনিয় বেতনের হার জাইনেই নির্ধরিত রয়েছে। সর্বোচ্চ বেতন কত হবে তার কোন নির্দিষ্ট সােভিয়েটতন্ত্র • সীমা নেই। তবে যারা বেশ ভাল বেতন পায়, রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার পর তাদের ওপর মােটা রকম আয়কর বসান হয়। যে যে-পরিমাণ কাজ করবে সেই হারে তার বেতন নির্ধারিত হবে। এক বছর অন্তেই প্রত্যেক শ্রমিকের বেতনবৃদ্ধি সম্বন্ধে বিবেচনা করা হয়। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আরম্ভের পর এযাবৎ সােতিয়েট শ্রমিকদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ছিল গড়ে তাদের বেতনের দশ হতে পনর ভাগ করে। কারখানা পরিদর্শন এবং সমাজকল্যাণ বীমার টাকা বণ্টন ব্যাপারে সােভিয়েট ট্রেড য়ুনিয়নগুলির পূর্ণ কতৃত্ব বিদ্যমান। সমাজ- কল্যাণ বীমার টাকা প্রধানত এ ভাবে শ্রমিকদের কল্যাণে নিয়ােজিত হয় সন্তানসম্ভবা নারী শ্রমিককে প্রসবের আগে দুমাস পুরা বেতনে ছুটি দান ; তা ছাড়া অন্তসত্ত্বা অবস্থায় পুরা বেতনে হালকা কাজের ব্যবস্থা করা এবং ছ'বছর চাকরি হয়েছে এমন কোন শ্রমিক পীড়িত হলে অসুস্থ অবস্থায় তাকে পুরা বেতন দেওয়া। দু’বছরের কম কারো চাকরি হলে অসুস্থ অবস্থায় সে বেতনের চেয়ে কিছু কম হারে ভাতা পায়। যারা ট্রেড য়ুনিয়নের সভ্য নয় তারা সমাজকল্যাণ বীমা তহবিল থেকে অন্যান্যের তুলনায় অর্ধেক সুবিধা পায়। অবশ্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেড য়ুনিয়নের বাইরে শ্রমিকের সংখ্যা শত করা পনর জনের বেশী হবে কিনা সন্দেহ। পুরুষকে ষাট বছরে এবং স্ত্রীলােককে পঞ্চাশ বছরে কাজ থেকে অবসর দেওয়া হয়। পুরুষ পচিশ বছর এবং স্ত্রীলােক কুড়ি বছর চাকরি করলেই পেন্দন পাবার অধিকারী। অবসর গ্রহণ করে তারা তাদের বেতনের অর্ধেক কি তার কিছু বেশী পেন্সন বাবদ পেয়ে থাকে। স্বামী মারা গেলেও বিধবা স্ত্রীকে পেন্সনের টাকা দেওয়া হয়। সােতিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেড জুনিয়নের শ্রমিকল্যাণ প্রচেষ্টা কেবল মহাযুদ্ধে সােতিয়েট যাবে। কারখানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পারিবারিক জীবন পর্যন্তও তা সম্প্রসারিত। শ্রমিকদের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির দিকেও ট্রেড য়ুনিয়নগুলি যথেষ্ট নজর দিয়ে থাকে। অনেক সময় পারিবারিক বিবাদের নিষ্পত্তি এবং অপরাধীর বিচাব ট্রেড য়ুনিয়নসমূহই করে। ট্রেড য়ুনিয়নের প্রভাব সেখানে কতখানি একটা উদাহরণ দিলে বােঝ মস্কোতে একবার একটি স্ত্রীলােক স্বামীর চরিত্রে সন্দিহান হয়ে স্বামীকে খুন করে। স্বামীর চরিত্রে সন্দেহ করার অবশ্য যথেষ্ট কারণ থাকায়ই ব্যাপারটা ঘটে। স্ত্রীলােকটির একটি শিশুসন্তান ছিল। মস্কোর আদালতে তার বিচার উঠল। আদালতে রায় দেওয়া হল, স্ত্রীলােকটির কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ইতিহাস ভাল । খুব বেশী উত্তেজনার কারণ থাকায়ই সে এমন একটা মারাত্মক কাণ্ড করে বসেছে। তাকে এখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলে সে হয়ত আর কোন ভাবেই নিজকে শােধরাবার সুযােগ পাবে না। কাজেই স্থির হল সে তার পূর্ব কাজেই বহাল থাকবে এবং ট্রেড য়ুনিয়ন তার প্রতি বিশেষ নজর রাখবে যে সে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে কিনা। বলা বাহুল্য, স্ত্রীলােকটি অল্পদিনের মধ্যেই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এল। একজন গুনী আসামীকে যেখানে ট্রেড য়ুনিয়নের হাতে এ ভাবে সপে দেওয়া হয় সেখানে যে ট্রেড মুনিয়নের শক্তি ও দায়িত্ব কতখানি সহজেই অনুমান করা যায়। খুব গুরুতর রকমের কোন অপরাধ করলে শাস্তি স্বরূপ ট্রেড য়ুনিয়ন থেকে তার নাম কেটে তাকে ‘লেবার ক্যাম্পে নিয়ে আটক রাখা হয়। আর অপরাধ মারাত্মক না হলে সাধারণত অপরাধীর জন্য ‘ফোস ড লেবার’ এর ব্যবস্থা হয়। ফৈাস লেবার’ এর অর্থ অপরাধীকে সােভিয়েটতন্ত্র চাকরি থেকে না সরিয়ে স্বাধীনভাবেই জীবন যাপনের সুযোেগ দেওয়া ; তবে তার মাইনে থেকে জরিমানা বাবদ কিস্তি হিসাবে টাকা কাটা যাবে। অবশ্য ট্রেড য়ুনিয়ন কেবল এ করেই খালাস নয়; অপরাধীর জীবনযাত্রা প্রণালীর প্রতি সে প্রখর দৃষ্টি রাখে এবং চেষ্টা করে যাতে সমাজৰিকদ্ধ কাজের প্রবৃত্তি তার জীবনের বাবা থেকে লোপ পায়। এক এক অবস্থায় পড়ে এক এক জনের মনে দুষ্কর্যের প্রবৃত্তি জাগে। সেই অবস্থা থেকে তাকে মুক্ত করার জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করা হয়। সোভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেড মুনিয়ন এমন প্রসার লাভ কবেছে যে, বাড়ীর সাধারণ পরিচারক-পরিচাবিকাদেরও ট্রেড যুনিয়ন রয়েছে। অনেকেব মনে প্রশ্ন উঠতে পাবে যে, বাড়ীতে চাকরবাকই যদি খাটান চলে তবে আর সেখানে শ্রেণীবৈষম্য দূর হল কৈ ? বিষয়টা একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। বাজনৈতিক শ্রেণী বলতে আমরা যা বুঝি সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে তা নেই এবং সেভাবে এক শ্রেণীব অন্য শ্রেণীকে শােষণ করা চলে না ; কিন্তু তা বলে সেখানে সকলের আয় সমান এমন মনে করাও ভুল। মুড়ি মিছরী এক দরে বিকায় না, যােগ্যত' অনুযায়ী বেতনের তারতম্য রয়েছে। তবে সােভিযেট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ব্যক্তির আত্মােন্নতির পথ যথেষ্ট প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিকূল অবস্থার জন্য মানুষ সাধারণত আত্মবিকাশের সুযােগ পায় না, সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ তা থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছে এবং উন্নতির পথ খােলা আছে বলেই সেখানে ছােট কাজ গ্রহণে কেউ কুষ্টিত হয় না। যার যেমন যােগ্যতা তেমন কাজেই সে ঢোকে, তবে জানে যে সেখানেই তার জীবনের শেষ চেষ্টা করলে সেও ক্রমশ উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারবে। নয়;
ર মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ব্যক্তির জীবনের আশাআকাভা সফল করে তােলার জন্যই সােভিয়েট রাষ্ট্র সর্বতােভাবে সাহায্য করে এবং এটাই সােভিয়েট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। ট্রেড য়ুনিয়নের নির্দিষ্ট হারে বেতন দিলে গৃহস্থালী কাজে সাহায্যের ন্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে তােক পাওয়া অসম্ভব নয়। আমাদের দেশের ঝি চাকরের মত ব্যবহার তারা পায় না বা এক বেতনে এক অবস্থায় তাদের সারাজীবন কাটিয়ে যেতে হয় না। নিজেদের উন্নতির জন্য তারা স্ব স্ব য়ুনিয়ন থেকে যথেষ্ট সাহায্য পায়। সাধারণত কোন গ্রাম্য মেয়ে যখন সহরে কাজের সন্ধানে আসে তখন অন্য কাজের যােগ্যতা থাকায় সে প্রথমে কোন পরিবারে পরিচারিকা রূপে প্রবেশ করে। সেখানে সে থাকাধাওয়া পায় এবং কাজে কাজে যােগ দেওয়ার পবই যুনিয়নের সভ্য হওয়ার জন্য তার ডাক পড়ে। য়ুনিয়নের সভ্য হলেই সপ্তাহে দুদিন সন্ধ্যাবেলা সে অবৈতনিক ক্লাসে যােগ দিতে পারে এবং সেখানে কিছু শিখে অনায়াসেই আর একটা ভাল কাজ সে পেয়ে যায়। সাধারণ স্তর থেকে একটি মেয়ে এভাবে কতখানি ওপরে উঠতে পারে অধ্যাপক প্যাট স্লোয়ান তার একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “১৯৩২ খৃষ্টাব্দে একটি গ্রাম্য মেয়ে মস্কোতে এসে প্রথমে এক পরিবারে পরিচারিকার কাজ নিয়েছিল। পরে ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সফরের সময় তার সঙ্গে আমার দেখা হল। শহরে যখন সে প্রথম এসেছিল তখন সাধারণ বর্ণজ্ঞানও তার ছিল না। আমাদের দেশের কোন ইংরেজ মালিক হলে তিনি মেয়েটিকে বলতেন বােকা মেয়ে। এদেশে (ইংলণ্ডে) তার এবাড়ী ওবাড়ীতে ঝিনা করেই সারাজীবন কাটাতে হত, কোন উন্নতির আশাই হয়ত তার থাকত না। কিন্তু যে ফ্ল্যাট বাড়ীতে সে সােভিয়েটতন্ত্র ৪৩ প্রথম কাজ নিয়েছিল সেখানে ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দে যখন আমার সঙ্গে তার ফিরে দেখা হল তখন সে আমাকে বলল, আমি এখন একাজ ছেড়ে দিয়েছি। এঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য আমি বর্তমানে একটা ল্যাবরেটরীতে কাজ শিখছি।” এই রূপান্তর কেবল অন কয়েকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমগ্র সােভিয়েট সমাজই একটা বিরাট রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এভাবে তার চরম লক্ষ্য পূর্ণ সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। যৌথ চাষ বিপ্লবের আগে আমাদের দেশের জমির মতই রুশিয়ায় খণ্ড খণ্ড ভাবে জমির চাষ হত। জমির উর্বরতা বাড়াবার জন্য বিশেষ কোনই চেষ্টা হত না। তার ফলে চাষীদের দারিদ্র্য লেগেই থাকত। আমাদের দেশে যেমন দুর্ভিক্ষ একটা সাধারণ নিয়মের মধ্যে দাড়িয়ে গেছে, প্রাকৃবিপ্লব কুশিয়ায়ও ঠিক এমনি অবস্থা চলেছিল। অনশন, অধাশন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ডেলী টেলিগ্রাফ পত্রিকার সংবাদদাতা ই° জে ডিলন ই জে ডিলন একবার লিখেছিলেন, “তুষারপাত, সাইবেরিয়ার প্লেগ প্রভৃতির ন্যায় দুর্ভিক্ষও কুশিয়ায় প্রতি বছর ঘুরে ঘুরেই আসে।” চাষীদের এই অবর্ণনীয় দুঃখদারিদ্র্য দূর করার জন্যই সােভিয়েট আমলে যৌথ চাষ প্রবর্তন করা একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়ে। চাষীরা যাতে একত্র হয়ে সব বড় বড় খামারে চাষ করতে পারে তার জন্য গবর্ণমেন্ট থেকে চাষের নানাবিধ যন্ত্রপাতি দিয়ে সাহায্য করা হয়। কেবল যন্ত্রপাতিই নয়, আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে যাতে চাষ হতে পারে তার জন্য গবর্ণমেন্ট বিভিন্ন এলাকায় কৃষিবিদ্যালয় ও ঘােট ঘােট মহাযুদ্ধে সােভিয়েট গবেষণাগার স্থাপন করে দেয়। তা ছাড়া কৃষকরা যাতে ফসলের উত্তম দাম পায় গবর্ণমেন্ট তারও ব্যবস্থা করে। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দের মধ্যে যৌথ চাষপ্রণালী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক ভাবে প্রবর্তিত হয়। অবশ্য অবস্থাপন্ন কৃষকরা প্রথম দিকে এ ব্যবস্থার ঘাের বিরােধিতা করে। প্রতিবেশী দরিদ্র চাষীদের সঙ্গে একত্রে একটি যৌথ কৃষি গবেষণাগারে গ্রাম্য চাষীরা শস্যের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করছে । খামারে কাজ করা অপেক্ষা তারা বরঞ্চ হাগরু নষ্ট করে ফেলাই শ্রেয় মনে করত। ফলে কোন কোন এলাকায় হালের গােমহিষ পাওয়া মুস্কিল হয়ে পড়ে এবং তাতে ফসলােৎপাদনের দিক দিয়ে সেই সব এলাকা অনেকদিন পিছনে পড়ে থাকে। অবশ্য ধীরে ধীরে সােভিয়েটতন্ত্র তাবা যখন বুঝতে পারে যে, যৌথ চাষে যােগ না দিলেই ক্ষতি তখন তারা একে একে এসে যৌথ চাষে যােগ দেয়। যৌথ চাষের সাধারণ নিয়ম এই :—একটি গ্রামের সকল চাষী তাদের জমি গুলি একত্র করে নেবে। গােমহিষাদি এবং চমের যন্ত্রপাতিগুলিও তাদের একত্র থাকবে। তারা নিজেদের মধ্য হতে লােক নির্বাচন করে খামার পরিচালনার জন্য একটি কমিটী গঠন করবে। গবর্ণমেন্ট তাদের ট্যাক্টর (কলের লাঙ্গল) এবং অন্যান্য কৃষি- যন্ত্রপাতি যােগাবে। অনেক সময়ই যৌথ খামারের তরফ তরফ হতে ট্রাক্টর ভাড়া নেওয়া হয়। রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার আগে সােভিযেট যুক্তরাষ্ট্রে ২ লক্ষ ৪০ হাজার যৌথ খামার ছিল। সেই সব খামার যাতে সহজে ট্রাক্টর ভাড়া পেতে পারে তার জন্য গবর্ণমেন্ট বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাত হাজার মেশিন ট্রাক্টর ষ্টেশন স্থাপন করে। সেইগুলির কাজ যৌথ খামারকে ট্র্যাক্টর ভাড়া দেওয়া। যৌথ খামারে সকলেই সমান মালিক। দৈনিক আট ঘণ্টা হিসাবে সাধারণ চাষীদের রােজ রা হয়। সেইভাবে যাব যত রােজ কাজ হয় তদনুপাতে সে ফসলের ভাগ পায় । অবশ্য সুদক্ষ চাষীরা রােজ হিসাবে কিছু বেশী পেয়ে থাকে। ফসলের একটা অংশ নির্দিষ্ট দরে গবর্ণমেন্টের কাছে বেচতে হবে এবং আর একটা অংশ যন্ত্রপাতির ভাড়া বাবদ মেশিন ট্রাক্টর ষ্টেসনগুলি পাবে। তারপর কিছু ফসল পরবর্তী বছরের বীজের জন্য আলাদা করে রাখতে হবে। অবশিষ্ট ফসল যৌথ খামারের চাষীরা ইচ্ছা করলে অর্থের বিনিময়ে বেচে দিতে পারে অথবা বছরে যার যত রােজ কাজ হয়েছে তদনুসারে ফসল বণ্টন করেও দেওয়া চলে । এছাড়া সমাজহিতের জন্য যৌথ খামারের পরিচালকগণ সম্ভব হলে ফসলের একটা অংশ বঁচিয়ে সর্বসাধারণের তহবিল পুলতে পারে ।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট অনেক ক্ষেত্রে এভাবে চাষীরা নিজেদের লাইব্রেরী, ক্লাবঘর, বিশ্রামাগার প্রভৃতি স্থাপন করেছে। যৌথ খামারের কোন অংশীদার বৃদ্ধ হলে তার জন্য অবশ্যই পেন্সনের ব্যবস্থা করতে হয়। যৌথ চাষীরা বিনা খাজনায় বাড়ী ও বাগানের জন্য জমি পেয়ে থাকে। তা ছাড়া গােচারণাদির জন্যও তাদের যথেষ্ট জমি দেওয়া হয়। এক এক এলাকায় প্রয়ােজন অনুসারে এক এক রূপ নিজস্ব গৃহপালিত পশু রাখার অনুমতি তারা পায়। যৌথ খামারে যে চাষীদের যােগ দিতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যৌথ খামারে যােগ না দিলে চাষীদের কিছু বেশ হারে ট্যাক্স দিতে হয় এবং এটা খুবই স্বাভাবিক যে, একটি গ্রামের দশজন চাষীর মধ্যে যখন নয়জনই যৌথ খামারে যােগ দেয় যােগ দেয় তখন তাদের ভাগেই ভাল জমিগুলি পড়ে এবং যে বাইরে থাকে তার ভাগে ভাল জমি পড়তে পারে না। কারা কত বেশী ফসল উৎপাদন করতে পারে তা নিয়ে বিভিন্ন যৌথ খামারের চাষীদের মধ্যে দস্তুরমত প্রতিযােগিতা চলে এবং গবর্ণমেন্টের কাছ থেকে তারা নানা ভাবে উৎসাহ পায়। যৌথ চাষের ফলে সােভিয়েট ধুক্তরাষ্ট্রে ফসলােৎপাদন কি পরিমাণে বৃদ্ধ পেয়েছে নিম্নের কয়েকটি হিসাব হতেই তা বােঝা যাবে :- ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে জারশাসিত কুশিয়ায় যে পবিমাণ বীজশস্য উৎপন্ন হয়েছিল ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে উৎপন্ন হয় তাব দেড় গুণ। ১৯১৩ খৃষ্টাব্দের তুলনায় ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে আলুর চাষ বেডে প্রায় তিনগুণে গিয়ে দাড়ায়। চিনির উৎপাদনও তেমনি বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়। হা এবং লেবু জাতীয় ফলের চাষ এত বেশী হয় যে দেশের চাহিদা মিটাবার এই সেগুলি বাইরে থেকে আমদানী না করলেও চলে।
সােভিয়েটত ৪৭ ইচ্ছা করলে আরাে দীর্ঘ ফিরিস্তি দেওয়া যায় । কিন্তু তা দিয়ে আর এ প্রসঙ্গ বাড়াব না। জনস্বাস্থ্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে এপর্যন্ত বিজ্ঞানকে মানবকল্যাণে নিয়ােজিত করার চেষ্টা হয়েছে সব চেয়ে বেশী এবং সেজন্যই সেখানে কতৃপক্ষের সর্বদা দৃষ্টি রয়েছে জনসাধারণের স্বাস্থ্যরক্ষার ওপর। সেখানে কেবল রােগ হলে আরােগ্যের ব্যবস্থাই করা হয় নি, রােগ যাতে না হতে পারে তারও চেষ্টা করা হয়েছে। রােগের মূলােৎপাটনের জন্য বিজ্ঞানীরা নানা ভাবে গবেষণা করেছেন এবং তাদের গবেষণার ফল সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ কাজে লাগিয়েছেন। এখানেও অন্যান্ত দেশের সঙ্গে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের পার্থক্য রয়েছে। পুজিতন্ত্রী দেশ- গুলিতে অনেক ক্ষেত্রে পুজিপতিরা বিজ্ঞানীদের গবেষণাজাত ফল অর্থ দিয়ে কিনে নেন এবং তা পেটেন্ট করে বাজারে বেঁচে প্রচুর লাভ করেন। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে তা হবার উপায় নেই। ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য কেউ বিজ্ঞানী নিয়ােগ করতে পারে না বা কোন বিজ্ঞানী নিজেও ব্যাবসা করতে পারেন না। বিজ্ঞানীর কাজ গবেষণার দ্বারা রাষ্ট্রকে সাহায্য করা এবং রাষ্ট্রের কাজ বিজ্ঞানীর গবেষণালব্ধ ফলকে গণকল্যাণে নিয়ােজিত করা। বিজ্ঞানীর গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা এবং গবেষণার কাজে তাকে নানাভাবে সাহায্য করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সকলেরই বিনা পয়সায় চিকিৎসা করাবার অধিকার আছে। কারাে অসুখ করলেই সে তার স্থানীয় ক্লিনিকে চলে যাবে। প্রত্যেক ক্লিনিকেই বিভিন্ন রােগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অব
মহাযুদ্ধে সােভিযেট
রয়েছেন , কাবে হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা কৰাবাৰ দৰকাব হলে
+- ১৮
f
সক পা
। ৮
A bd
৭
E
74
*
।
ন
A
Tr
• • • •
।।
---
1. Is,
।
(সাছিয়ট সরকারী দুশ ল।
বিনা খরচেই সে হাসপাতালে ভর্তি হতে পাৰে। হাসপাতালে
সােভিয়েত ভর্তি হওয়ার জন্য উৎকোচ স্বরূপ কোন ডাক্তারকে প্রাইভেট কলের নাম করে টাকা দিতে হবে না। গবর্ণমেন্ট কিংবা কোন গণপ্রতিষ্ঠান কতৃক প্রত্যেক ডাক্তার ও নার্স নিযুক্ত হন। ইচ্ছা করলে তারা প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করতে পারেন এবং কোন রােগী নিজের খরচায় চিকিৎসা করাতে চাইলে অনায়াসেই সে তা করাতে পারে। পাব্লিক ক্লিনিকগুলিতে বােজ হিসাবে ডাক্তারদের সাধারণত দু' ঘণ্টা এবং নার্সদের আট ঘণ্টা করে খাটতে হয়। প্রথমেই বলেছি, রােগ আরোগ্যের ব্যবস্থার সঙ্গে রােগের মূলােৎপাটনের জন্যও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে নানাভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। মধ্য এশিয়ায় কৃষির জন্য যে নতুন সেচের ব্যবস্থা হয় তাতে মশা জন্মে না ম্যালেরিয়ার সৃষ্টি হতে পারে তার জন্য আগে থেকেই কর্তৃপক্ষ সব বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা করেন। ম্যালেরিয়া নিবারণের জন্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের মত আর কোন দেশ এত ব্যাপক আয়ােজন করেছে কিনা সন্দেহ। জলা জায়গায় যাতে মশার সৃষ্টি না হতে পারে তার জন্য সব খাল কেটে জলের স্রোত বইয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে জল না রাখলে চলে না সেখানে বিমান থেকে মশকনাশক তেল ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া মশার ডিম খেয়ে ফেলবার জন্য কতৃপক্ষ সেই সব জলাশয়ে মশকভুক মাছও ছেড়ে দেন। যক্ষ্মারােগ নিবারণের জন্যও নানা ভাবে ব্যবস্থা করা হয়েছে। যক্ষ্মারোগ প্রতিষেধের নিমিত্ত ব্যাপকভাবে চেষ্টা করা তাে হয়ই, তাছাড়া নানাস্থানে যক্ষ্মারােগীর চিকিৎসার জন্য অসংখ্য ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যনিবাস ছড়িয়ে রয়েছে। সেখানে রােগী রেখে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করা হয়। কারখানাদিতে সাধারণত যেসব অদ্ভুত ধরণের রােগ দেখা দেয় ৪ মহাযুদ্ধে সোভিয়েট তার চিকিৎসা ও রােগের মূল কারণ দুরীকরণের জন্য বিশেষ ভাবে চেষ্টা করা হয়। এই শ্রেণীর রােগ নিবারণের জন্য একটি স্বতন্ত্র চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানই স্থাপিত হয়েছে। সেখানে রােগের মূল কারণ নির্ণয়ের দিকে কিভাবে নজর দেওয়া হয় একটি উদাহরণ হতেই তার খানিকটা আভাস মিলবে। কয়েক বছর আগে মস্কোতে একজন শ্রমিকের আঙ্গুলের মাথায় একটা ঘা হয়। সাধারণ চিকিৎসায় তার কিছুই হল না দেখে ট্রেড য়ুনিয়ন তাকে ‘ইনষ্টিটুট অব ইণ্ডাষ্ট্রিয়াল ডিজিজ’ অর্থাৎ যেখানে কারখানাজাত রােগের চিকিৎসা হয় সেখানে পাঠাল। নানাভাবে পরীক্ষার পর দেখা গেল যে, উক্ত শ্রমিক যে ধরণের কাজ করে তা থেকেই এই বিষাক্ত ঘায়ের সৃষ্টি। রােগের মূল নির্ণয়ের পর তাকে আরােগ্য করা হল। কিন্তু সেখানেই শেষ হল না; সেই ইষ্টিদ্যুট হতে প্রত্যেক কারখানায় চিঠি গেল যে, এই ধরণের কাজে যেসব শ্রমিক নিযুক্ত আছে তাদের সম্বন্ধে যেন চিঠিতে বর্ণিত নির্দেশগুলি মেনে চলা হয়; কেন না তা না হলে তারাও এ রােগে আক্রান্ত হতে পারে। কেবল কারখানার শ্রমিক, নয়, সর্বসাধারণের স্বাস্থ্যরক্ষার দিকে সােভিয়েট কতৃপক্ষের প্রখর দৃষ্টি রয়েছে বলেই সেখানে মৃত্যুর হার আগের তুলনায় অনেক কমে গিয়েছে এবং সমগ্র জাতি এভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। কারণ স্বাস্থ্যই জাতির প্রধান সম্পদ। সংস্কৃতি ও সভ্যতা সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের জীবনকে কেবল কর্মব্যস্তই করে ভােলা হয় নি। খেলাধূলা, আমোদপ্রমােদ ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিয়ে সােভিয়েট সর্বসাধারণের জীবনকে আনন্দময় করে তােলা হয়েছে।
সােভিয়েটতন্ত্র তা না হলে তাদের জীবন তিক্ত হয়ে উঠত। পুঁজিতন্ত্রী দেশগুলিতে প্রধানত অভিজাত ও মধ্যবিত্তদের চিত্তবিনােদনের জন্যই নানা আমােদ- প্রমােদ ও বিলাসব্যসনের আয়ােজন থাকে ; কিন্তু সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সেই শ্ৰেণীবৈষম্য দূর করে শিল্পকলা, আমােদপ্রমােদ ও খেলাধূলাকে সর্বসাধারণের অভিগম্য করে তােলা হয়েছে : সাধারণ শ্রমিক এবং কৃষকও আজ সংস্কৃতির আনন্দরসে বঞ্চিত নয়। ক্ষেত্র প্রসারের ফলে সােভিয়েট সংস্কৃতির অপকর্ষ না ঘটে কি ভাবে তার উন্নতি হয়েছে এখানে সংক্ষেপে তাই আলােচনা করব । প্রথমেই বলা দরকার যে রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধবার আগে সােভিয়েট শ্রমিকরা বছরে যত ছুটি ও বিশ্রাম উপভােগ করেছে, জগতে আর কোন দেশেই শ্রমিকরা তা পায় নি; অথচ তা সত্বেও শিল্পোৎপাদনের দিক দিয়ে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র কতখানি এগিয়েছে রুশ-জার্মান যুদ্ধেই তা ভাল ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সােতিয়েট শ্রমিক ও কৃষকদের অবসর সময় ও ছুটির দিনগুলি কাটাবার জন্য যেসব ব্যবস্থা হয়েছে প্রথমে তৎসম্পর্কেই বলি। প্রত্যেক বড় কারখানা ও যৌথ খামারের সংশ্লিষ্ট একটি করে ক্লাব রয়েছে। বড় ক্লাবগুলিতে একটি করে নাট্যশালা ও সিনেমাঘর, খেলাধূলার সাজসরঞ্জাম এবং গানবাজনার নানারূপ বাদ্যযন্ত্রাদি থাকে। সেই সব ক্লাবে গিয়ে অধিকাংশ শ্রমিক ও কৃষক তাদের অবসর সময় আমােদআল্লদে কাটায়। তাছাড়া সহরের পার্কগুলিতেও অবসর সময় কাটাবার মত নানারূপ ব্যবস্থা রয়েছে। মস্কোর ‘পার্ক অব কালচার এণ্ড রেষ্ট দেখে বহু বিদেশী পর্যটকই তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। সেখানে কেবল বেড়াবার জন্য রাস্তা ও বসার জন্য কয়েকটা । আসনের ব্যবস্থা করেই কর্তৃপক্ষ কর্তব্য সারেন নি; থিয়েটার, সিনেমা, মহাযুজে সােভিয়েট লাইব্রেরী, পাঠাগার, খোলা নাচমঞ্চ এবং উন্মুক্ত স্থানে থিয়েটার করার এ এক বিরাট নাটমঞ্চ রয়েছে। এত বড় খোলা, নাটমঞ্চ জগতে আর কোথাও নেই। কেবল তাই নয়। শিশুদের খেলাধূলা ও আমােদ- এমােদের জন্য সেখানে স্বতন্ত্র ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় সেই উদ্যান আনকোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে, আর শীতকালে টো আইস-স্কেটিং ও ঋী-ইংএর জন্য ব্যবহৃত হয়। তারপর শহরের অদুরে বনের ধারে কি কোন নদীর তীরে সব বিশ্রামভবন রয়েছে। শ্রমিকরা বেড়াবার জন্য সেখানে গিয়ে একদিন করে থেকে আসতে পারে। বিশ্রামভবনগুলি ট্রেড য়ুনিয়ন কর্তৃক পরিচালিত হয়। তাছাড়া কারখানার পরিচালকগণ শ্রমিকদের মাঝে মাকে সব ভাল থিয়েটার, যাদুঘর, চিত্রশালা প্রভৃতি দেখতে পাঠান। অনেক সময় তাদের দেশভ্রমণেও পাঠান হয়। এক কথায় বলতে গেলে সােভিয়েট শ্রমিকদের কেবল কারখানার যন্ত্রপাতির সঙ্গেই সম্পর্ক থাকে না। তারা নাচে, নাটক করে, সাহিত্য চর্চা করে, ধূৰি আঁকে, ফটোগ্রাফি শিখে, গান গায়, বিদেশী ভাষা আয়ত্ত করে এবং বিদেশলাহিত্য পড়ে। ক্লাবগুলিতে এসব ব্যাপারে তারা রীতিমত উৎসাহ ও সাহায্য পায়। বাইরের জীবনে এই আনরসের ধারা আছে বলেই কারখানায় জীবন তাদের মরুভূমি হয়ে ওঠে না। যন্ত্র তাদের কাছে দানব না হয়ে বন্ধু রূপে ধরা দিয়েছে। খেলাধূলা সভ্যতার একটা অঙ্গ। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সেই খেলাধুলা প্রসারের কতখানি চেষ্টা হয়েছে এবার সেই সম্বন্ধেই কিছু বল। শারীরচর্চা ও খেলাধুলা পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কশিটা সয়েছে। সেই কমিটীর অধীনে পাচটী সরকারী কলেজ সােভিয়েটত পরিচালিত হয়। সেই সব কলেজে ব্যায়াম ও খেলাধূলার শিক্ষক তৈরীর জন্য ছাত্র গৃহীত হয়। তারা পাশ করে বেরুল্পে-বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের সমান মর্যাদাই পায়। পাঁচটি কলেজে প্রায় তিন হাজার ছাত্রের পড়ার ব্যবস্থা আছে। প্রত্যেক ক্লাবে এই সৰ কলেজের পাশ করা এক একজন গ্র্যাজুয়েট ব্যায়ামশিক্ষক থাকেন। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে খেলাধূলা কতখানি সম্প্র- সারিত হয়েছে নিম্নের হিসাব থেকেই তার কতকটা অনুমান হবে : —সেখানে যুদ্ধ বাধার আগে ৬৫ টি ষ্টেডিয়াম ( আসবাব বসার, অাসনযুক্ত খেলার মাঠ) ছিল ; এক একটি ষ্টেডি- য়ামে কয়েক হাজার তােক ধরে। মস্কোর ডায়নামাে বাষিক যুব-দিবসে মস্কোর রেড স্কোয়ারে ষ্টেডিয়ামে প্রায় সােতিয়েট তরুণ-তরুণ হাজার লােক বসতে পারে। মস্কোতে ইসমাইলোভা নামে আর একটি নতুন স্টেডিয়াম তৈরী হচ্ছিল যাতে এক লক্ষ পর্যন্ত লােক ধরার কথা। যুদ্ধের দরুণ তার নির্মাণকার্য •আর শেষ হতে পারে নি।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট এছাড়া প্রায় আট হাজার খেলার মাঠ ও সাড়ে তিনশ’ সাতারের মঞ্চ সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। প্রত্যেকেই এক একটি খেলায় বিশেষজ্ঞ হতে পারে ; তবে সাধারণত চেষ্টা করা হয় যাতে খেলােয়াড়রা ‘অলরাউণ্ড স্পােটর্স ব্যাজ’ লাভ করতে পারে। উক্ত ব্যাজের গায়ে লেখা থাকে, “শ্রম ও দেশরক্ষার জন্য প্রস্তুত।” সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫০ লক্ষ লােক এই ব্যাজ পেয়েছে। খেলাধুলায় যারা আরাে বেশী নৈপুণ্য দেখায় তাদের এর চেয়ে উচ্চাঙ্গের ব্যাজ দেওয়া হয়। তেমন ব্যাজধারীর সংখ্যা ৭০ হাজারের কম হবে না। প্রথমােক্ত শ্রেণীর ব্যাজ লাভ করতে হলে দৌড, হাঁটা, লাফ, সঁতার, ঋী-ইং, স্কেটিং, গ্রেনেড নিক্ষেপ, রাইফেল ছোড়া, সাইকেলে চড়া প্রভৃতি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। এগুলি ছাড়া ভারােত্তলন, প্যারাশুটে অবতরণ, গ্লাইডার চালনা, স্কীর সাহায্যে লাফ, দীর্ঘ পথ দৌড়ান প্রভৃতি কঠিন বিষয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবে শেষােক্ত শ্রেণীর কাজ পাওয়া যায়। বিপ্লবের পর সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কতকগুলি নতুন খেলাও প্রবর্তিত হয়েছে। ফুটবল ও টেনিস খেলার প্রচলন সেখানে ছিল না; কি সােভিয়েট আমলে এই দুটি খেলা বিশেষ প্রসার লাভ করেছে। খৃষ্টাব্দের হিসাবে দেখা যায় সেখানে প্রায় ৪ হাজার ফুটবল টীম ও লাখ দশেক ফুটবল খেলােয়াড় রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযােগিতায়ও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেকে রেকর্ড স্থাপন করেছেন। তাঁদের সংখ্যা জন পঞ্চাশেকের কম হবে না। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে খেলাধূলার ব্যাপক আয়ােজন থাকায় যুদ্ধের সময় সৈন্স সংগ্রহে খুবই সুবিধা হয়েছে । কেননা খেলাধুলার ১৯৪১ সােভিয়েটতন্ত্র মধ্য দিয়েই সেখানকার যুবসমাজ প্রায় অর্ধেক সামরিক শিক্ষা পেয়েছে। সভ্যতার আর একটি প্রধান অঙ্গ আমােদপ্রমােদ। বলা বাহুল্য, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে জনসাধারণের মধ্যে এই আমােদপ্রমোদ বিতরণের জন্যও বৈপ্লবিক পন্থা অনুসৃত হয়েছে। নিছক আনন্দদানের জন্যই সেখানে থিয়েটার ও সিনেমাগুলি পরিচালিত হয় না; সেগুলিকে লােকশিক্ষার বাহনও করে ভােলা হয়েছে। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, আমােদপ্রমােদের ভিতর দিয়েই গণজীবনে শিক্ষা বিস্তার করা সব চেয়ে সুবিধাজনক ; কেননা নিরক্ষর বয়স্ক ব্যক্তি বর্ণবােধের প্রাথমিক নীরস স্তর উত্তীর্ণ হওয়ার উদ্যম হারিয়ে সাধারণতই যেমন শিক্ষার প্রতি বিমুখ হয়, শিক্ষাপ্রদ আমােদপ্রমােদ তাদের তেমন ভাবে বিমুখ করে তােলে না। বরঞ্চ অনেক সময় কোন কোন চিত্র তাদের মনে এমন গভীর রেখাপাত করে যা সারা জীবনেও তারা বিস্মৃত হয় না। শিক্ষাপ্রদ আমােদমােদ গণজীবনে জ্ঞানস্পৃহা জাগায় এবং নিজ জীবন সম্বন্ধে তাদের সচেতন করে তােলে। এই আত্মচেতনার উদ্রেকই লােকশিক্ষার মূল লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার অন্যতম প্রধান বাহন নাট্যশালা ও রূপালী পর্দা। তারপর আর্টের যে কোন নির্দিষ্ট গণ্ডী বা সংজ্ঞা নেই সােভিয়েট- তম্ব তা প্রমাণ করেছে। মানুষের সামাজিক চেতনা ও পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আর্টের রূপও বদলে যায়। জারের আমলে যে আর্ট কেবল অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ সীমাবদ্ধ ছিল সােভিয়েট জনসাধারণের কাছে তার কোন আবেদন ছিল না। সােভিয়েত প্রতিষ্ঠার ফলে সেখানে যেমন গণজীবনের পরিবর্তন ঘটেছে তেমনি মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ; সতীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আটকে আবদ্ধ রাখতে চান নি। যে আর্ট দেশ, কাল, পাত্রের অতীত তার যথার্থ সমাদর সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র- বাসীরা করতে জানে এবং বসবােধ তাদের আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তারই জন্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কেবল বিপ্লবােত্তর সাহিত্যই একাধিপত্য পায় নি, প্রাকবিপ্লব কুশসাহিত্যও যথেষ্ট সমাদর এবং প্রসার লাভ করেছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ায় সাহিত্যের আদর বেড়েছে। ববী সাহিত্যের বােগ্য সমাদর আমাদের দেশে যে আজও হয় নি তার মূল কারণ এদেশের ব্যাপক দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা। এদেশে মুষ্টিমেয় শিক্ষিতের মধ্যেই রবীন্দ্রসাহিত্য অদ্যাবধি সীমাবদ্ধ বয়েছে। জাতির অস্তবতম প্রদেশে তার ডাক পৌছাতে পারে নি; কাজেই আজও পর্যন্ত তিনি জাতীয় কবি হয়ে ওঠেন নি। দেশের এই দারুণ দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা দূর হয়ে যদি কোনদিন সংস্কৃতির ক্ষেত্র মুষ্টিমেয়ের গণ্ডী পেরিয়ে বৃহত্তর গীবনে পরিব্যাপ্ত হতে পারে তবে সেদিনই একমাত্র রবীন্দ্র- সাহিত্যের যথার্থ সমাদর হওয়া সম্ভব। শুধু তাই নয় ; রবীন্দ্র- সাহিত্য সত্যই লোকো কিল-মানব কাছে তার কোন চিরকুন অাবেদন আছে কিনা-এর যথার্থ যাচাই হবে সেই জাগ্রত গণচিত্তের কষ্টিপাথরে। সেদিন হয়ত সত্যই তিনি জাতীয় কবি রূপে পূজা পাবেন। তার কাব্য ও সাহিত্য জন কয়েকের বিলাসবন্ত হয়ে আর থাকবে না। • থিয়েটারের ন্যায় সিনেমাও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে অদ্ভুত উন্নতি লাভ করেছে। কেবল নরনারীর প্রেমকাহিনীই সােভিয়েট ছবিগুলিতে প্রাধান্য লাভ করে না; কান, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাহন হিসাবে সেইগুলি ঈর্শকদের চিত্তে অপূর্ব প্রভাব বিস্তার করে। ছবির সাহায্যে সােভিয়েটতন্ত্র নতুন সমাজব্যবস্থার প্রতি সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জাগাবার চেষ্টা করা হয়। সর্বাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য বিষয় এই যে, আমােদপ্রমােদের মধ্যেও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত জাতির বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয় এবং তার বিশেষ প্রমাণ মিলে ‘মে দিবস’ ও ‘নবেম্বর দিবস’-এর উৎসবে। সহর হতে সুদূর পল্লী পর্যন্ত সেই উৎসবে যে আনন্দের বন্যা প্রবাহিত হয় তাতে থিয়েটার সিনেমা থেকে আরম্ভ করে লােকনৃত্য ও পল্লীসঙ্গীত পর্যন্ত কিছুই বাদ পড়ে না। বিভিন্ন জাতির লােক তাদের জাতীয় পােক পরে নাচগান, খেলাধূলা, আমােদমােদ প্রভৃতি করে থাকে। নানা বৈচিত্র্যে সমগ্র সােভিয়েট জীবন ঐক্যের মধ্যেও সেই আনন্দোৎসবের দিনে এক বিচিত্র রূপ পরিগ্রহ করে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রত্যেক জাতিকে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কিরূপ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে অধ্যাপক প্যাট স্লোয়ান তাঁর “Russia without Illusions” পুস্তকে এ সম্বন্ধে একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন- “জজিয়ান সােভিয়েট রিপাব্লিকে এক এক জায়গায় এক এক রকম ভাষা রয়েছে। যেসব স্থানে জর্জিয়ান ভাষা প্রচলিত নয় সেখানে বিদ্যালয়সমূহে স্থানীয় অধিবাসীদের মাতৃভাষাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় ; জর্জিয়ান ভাষা ছেলেমেয়েরা সেখানে অতিরিক্ত ভাষা হিসাবে শিখে। একদিন এক গ্রাম্য চাষীর সঙ্গে কথােপকথনের সময় আমি এক নতুন সত্যের সন্ধান পাই। সে একজন ঝানু বিপ্লবী। বিদেশীরা সােভিয়েট গবর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে যখন ‘ইন্টারভেন্সনের মুখােস পরে অভিযান চালিয়েছিল তখন এই চাষী তাদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। এখন সে একটি গ্রাম্য সােভিয়েটের সদস্য। তার মুখে এক অপূর্ব মহাযুদ্ধে সােভিয়েট অভিযােগ শােনা গেল। অভিমােগ আর কিছুই নয়—তার গ্রামের ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয়ে রুশ ভাষা শিখতে পারছে না। ছেলেমেয়েরা তাদের মাতৃভাষা শিখছে, নিজেদের রিপাব্লিকের ভাষা জর্জিয়ানও শিখছে, কিন্তু রুশ ভাষা শিখাবার জন্তু সেখানে কোন শিক্ষক নেই। অথচ বিপ্লবের আগে ককেসাসবাসীদের একটা বড় অভিযােগ ছিল এই যে, রুশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় গবর্ণমেন্ট রুশ প্রভাব বিস্তারের জন্য তাদের ওপর জোর করে রুশ ভাষা চাপিয়ে দিয়ে তাদের মাতৃভাষার সর্বনাশ করছিল। সােভিয়েট গবর্ণমেন্ট সেই নীতি একেবাবে পবিবর্তিত করে প্রত্যেক জাতিকে এমন কি ছােট ছােট উপজাতিগুলিকে পর্যন্ত তাদের মাতৃভাষায় বলতে, লিখতে ও ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদানে স্বাধীনতা দিয়েছে। প্রত্যেক জাতি এভাবে তার মাতৃভাষা শিক্ষা লাভের স্বাধীনতা পেয়েছে বলেই ককেসাসে একটা ক্ষুদ্র জাতির একজন কৃষকের মুখে আমি সত্যিকারের দাবী শুনতে পেলাম যে তার ছেলের রুশ ভাষা শেখা দরকার। সে বলল, 'রুশ ভাষা না শিখলে কেবল আমাদের নিজেদের রিপাক্লিকেইরাে চলে। কিন্তু সমগ্র সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরতে হলে রুশ গল্প জানা একান্ত আবশ্যক। সেজন্যই আমরা আমাদের বিদ্যালয়ে একজন রুশ শিক্ষক পাঠাবার জন্য অবােধ করছি।” এর পরই অধ্যাপক প্যাট জায়ান বলছেন- উভন্ন ওয়েললে আমি প্রায়ই দেখতাম সেখানে ইংরেজী ভাষায় পড়তে ও পরীক্ষা দিতে অনেক ছাত্রেরই খুৰ অসুবিধা হয়, কেননা ইংরেজী ভাষাটা কি ","ঙ্গাদের মাতৃভাষা নয়। ওয়েলশ জাতীয় আন্দোলনের লে-এটা একটা মন্তু বড় কারণ। সােজিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কয়ৰ পুলিশ জাতির প্রতি এ বিষয়ে আমার সহানুভূতি সােভিয়েটতন্ত্র জন্মে; কিন্তু ওয়েলসে যখন ছিলাম তখন আমার এ সহানুভূতি ছিল না। এখন আমি দেখছি, ইংরেজীর পরিবর্তে মাতৃভাষায় তাদের ছেলেপিলেদের শিক্ষার দাবী অসঙ্গত নয়।” অথচ রাষ্ট্রভাষার নামে হিন্দুস্থানী চাপাবার চেষ্টা করতে গিয়ে আমাদের দেশে কিছুদিন আগে মাদ্রাজের কংগ্রেসী প্রধান মন্ত্রী যুক্তরাজগােপালাচারী কি কাণ্ডই না করেছেন। তিনি সেখানে বিদ্যালয়গুলিতে তাের করে হিন্দুস্থানী ভাষা চালাতে গেলেন এবং তার প্রতিবাদ করায় দুজনের জেল পর্যন্ত হল। হিন্দুস্থানী ভাষার প্রচলন হয়ত অবাঞ্ছনীয় নয়; কিন্তু কোন প্রদেশের গবর্নমেন্ট কর্তৃক রাষ্ট্রভাষার নামে জোর করে তা চালাতে যাওয়া স্বৈরাচারেরই পরিচায়ক। রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবী যদি হিন্দুস্থানীয় সত্যই থেকে থাকে তােক নিজের প্রয়ােজনে স্বেচ্ছায়ই তা শিখবে; জোর করে তা চাপাবার প্রয়ােজন হবে না। অবশেষে একথা বলেই এই প্রসঙ্গ শেষ করব যে, সােতিয়েট শাসনে সেখানকার জনসাধারণ কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই মুক্তি পায় নি; জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্পকলা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তারা মুক্তি পেয়েছে। পরিকল্পিত অর্থনীতি আগেই বলেছি সমগ্র দেশ সংগঠনের জন্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে পরিকল্পিত অর্থনীতি অবলম্বিত হয়। ১৯২৮ থেকে ১৯৪২ খৃষ্টাব্দের মধ্যে সােভিয়েট কতৃপক্ষ এতদুদ্দেশ্যে তিন বার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই পরিকল্পনানুযায়ী কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সমাজগঠন এবং প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের সন্ধানে দেশের অভ্যন্তরে মহাযুদ্ধে সােভিয়েট নানা দিকে অভিযান চলে। যে মধ্য এশিয়ায় একদিন একটা বিরাট সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, জারের আমলে ক্রমশ সেটা মরুভূমিতে পরিণত হয়। সােভিয়েট বিজ্ঞানীরা আবার সেখানে জমি উর্বর করার জন্য সেচের ব্যবস্থা করেন এবং ধীরে ধীরে সেই মরু অঞ্চলে লােকালয় গড়ে ওঠে। তারপর চির তুষারাবৃত উত্তর মেরু অঞ্চল আবিষ্কার সেখানে সভ্যতার বিস্তার সােতিয়েট কর্তৃপক্ষের এক অক্ষয় কীর্তি। উত্তর মেরু অঞ্চল আবিষ্কারের ফলেই য়ুরােপের উত্তর দিক দিয়ে পশ্চিম য়ুরােপের সঙ্গে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের একটা স্থায়ী সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। এপথ যে রুশ-জার্মান যুদ্ধে কতটা কাজে এসেছে তা বােধ হয় কারাে অবিদিত নেই। বৃটেন ও মার্কিন যুক্ত- রাষ্ট্রের সমবােপকরণ নিয়ে বহু জাহাজ এই উত্তরপথেই সােভিয়েট বন্দর আর্কএঞ্জেলে গিয়ে উপনীত হয়। চেস্কিন অভিযানের নেতা অধ্যাপক অটো মিডিট এবং তুষারাবৃত সুমেরু অঞ্চলে অভিযানের নায়ক ইভান পাপানিনের নাম জগদ্বিখ্যাত। এছাড়া যে বৈমানিক দল প্রথৰ সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুমেরু অঞ্চল হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যায় তাদের দানও কম নয়। বরফাচ্ছন্ন দেশের ওপর দিয়ে বিমান চালনায় যেসকল বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক অভিজ্ঞতা তাদের লাভ হয় উত্তরকালে রুশ-জার্মান যুদ্ধে সেগুলি বিশেষ ভাবেই কাজে লাগে। সােভিয়েট পরিকল্পিত অর্থনীতি সম্বন্ধে বিস্তারিত আলােচনা কর। এ পুস্তকে সম্ভব নয় ; তবে তিনটি পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় সােভিয়েট ভূমিতে যে কি আশ্চর্য উন্নতি হয়েছে সংক্ষেপে তার কিছু হিসাব না দিলে চলে না। এখানে বলা দরকার যে, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আরম্ভ হয় ১৯২৮ খৃষ্টাব্দে এবং ১৯৪২ খৃষ্টাব্দে তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরি- কল্পনা শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের সােভিয়েটতন্ত্র জুন মাসে নাৎসী জার্মানী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করে বসে। কাজেই তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আর শেষ করার সুযােগ সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ পান নি। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা কাজ যে প্রায় শেষ করে এনেছিলেন সােভিয়েট প্রতিরােধশক্তিতেই তার প্রমাণ মিলে। এই যুদ্ধের মধ্যেও সেদিন উরাল অঞ্চলে ম্যাগনি- টোগরস্ক লৌহ ও ইস্পাতের কারখানায় এক বিরাট চুল্লী স্থাপিত swas ইফ' মা * * * * . • • • ** + + + + + + v । । । । Pr W *, ---- * * * * * : ক + ৮। । , **« * * * A ন AwH টি * ৩ = *--*** * 1 - * * - - y pe 1 * * * গ . * * পঞ্চ । = ***** অধ্যাপক অটো স্মিডিট বরফের দেশে তাঁর শ্বেত ভল্লুক নিয়ে খেলছেন হয়েছে। এত বড় চুল্লী এত বড় চুল্লী য়ুরােপের আর কোন দেশে আছে কিনা সন্দেহ। ১৯৪০ খৃষ্টাব্দের হিসাবে দেখা যায়, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কারখানায় শ্রমজীবীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। আর ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে সেখানে শ্রমজীবীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লক্ষের সামান্য কিছু বেশী । তারপর কয়লা, বিদ্যুৎ ও খনিজ তেলের হিসাবে দেখা যায়, যেখানে মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে জারশাসিত ৰুশিয়ায় ২ কোটি ৯০ লক্ষ টন কয়লা বছরে আহণ করা হত, সেখানে ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে খনি হতে বছরে কলা আহরিত হচ্ছে ১৬ কোটি ৪০ লক্ষ টন। বিদ্যুৎ উৎপাদনও ১৯১৩ খৃষ্টাব্দের তুলনায় ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে প্রায় একুশ গুণ •বেড়ে যায় । ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে তেলােৎপাদন হত ৯০ লক্ষ টন, আর ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দের হিসাবে দেখা যায় সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ৩ কোটি ১০ লক্ষ টন তেল উৎপাদিত হয়েছে। শিল্পসারণের ফলে তাদের নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়ােজনের জিনিস কি পরিমাণ বেড়ে যায় দু’একটি হিসাব হতেই তা বােঝা আরশাসিত কুশিয়ায় ১৫ কোটি অধিবাসীর জন্য বছরে ২ কোটি জোড়ার কে জুতা প্রস্তুত হত না। সেখানে ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট যুক্তৰাষ্ট্রে ছুরে প্রায় ১৬ কোটি ৪০ লক্ষ জোড়া জুতা এত হয়। তারপর ১৯১৩ খৃষ্টাব্দের তুলনায় ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দে সেখানে কাল রােশানও যিশ পরিমাশে এসে দাঁড়ায়। কেল কলি ও শিল্পক্ষেত্রেই এই উতি সীমাবদ্ধ রয় নি; সােভিয়েট রায়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি, যা এবং সমাজকল্যাণ প্রচেষ্টায়ও এক অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। আগেই বলেছি, ১৯১৩ খৃষ্টাব্দের তুলনায় ১৯৪৯ খৃষ্টাফে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এসে দাড়ায় ৮০ লঞ্চ থেকে ৩ কোটি ২০ লক্ষে; বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসংখ্যা ১ লক্ষ ১২ হাজার হতে বেড়ে ৬ লক্ষ ২০ হাজার হয় ; হাসপাতালগুলিতে রোগীর শ্যার সংখ্যা ১ লক্ষ ৭৫ হাজার থেকে বেড়ে ৮ লক্ষ ৪• হাজারে এসে দাড়ায় এবং ডাক্তারের সংখ্যা ২ হাজার হতে বেড়ে ১ লক্ষ ২০ হাজারে গিয়ে পৌছায়। নাট্যশালা ও সিনেমার সংখ্যা, কত বেড়ে বার পুর্বেই তা বলেছি, সােভিয়েটতন্ত্র এবার সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বাসগৃহ সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু বলে এ অধ্যায় শেষ করব। বিপ্লবের পর সােভিয়েট কর্তৃপক্ষকে প্রধানত যেসকল সঙ্কটের সম্মুখীন হতে হয়, বাসগৃহসমস্যাকে তা থেকে বাদ দেওয়া চলে না। বিশেষত প্রথম পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ আরম্ভ হওয়ার পর যখন সেখানকার গণজীবনে আর্থিক উন্নতি দেখা দেয় এবং শ্রমজীবী হওয়ার আশায় গ্রাম ছেড়ে লােকের সহরে আশার দিকে ঝোক পড়ে তখন বাসগৃহসমস্যা নিয়ে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষকে কিছুকাল ভালভাবেই বিব্রত হতে হয়। সমস্যা পূরণের জন্য অতিশয় তাড়াহুড়ার মধ্যে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ তখন যেসব বাড়ী নির্মাণ করান সেগুলি দেখেই অনেক বিদেশী সাংবাদিক অপপ্রচারের উদ্দেশ্যে ব্যাপারটাকে বেশী ফেনিয়ে তােলেন। গ্রাম থেকে যারা তখন সহরে এসেছিল তারা সেই সব বাড়ী পেয়েই যথেষ্ট খুসী হয়েছিল । কারণ অনেককেই পল্লীজীবনে যে দুর্দশার মধ্যে কাটাতে হত তার তুলনায় এ ছিল তাদের কাছে স্বর্গরাজ্য কিন্তু অসন্তোষটা বেশী প্রকাশ করত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লােক। সােভিয়েট ভূমিতে শ্রেণীবৈষম্য তখনও একেবারে লােপ পায় নি। ব্যবহারিক জীবনে সুযোগ না পেলেও মধ্যবিত্ত ঘরের মনােভাব তখনও পর্যন্ত অনেকের মধ্যেই বেশ প্রবল ছিল এবং সেই মনােভাবাপন্ন লােকই . সুযােগ পেলে বিদেশীদের কাছে গােপনে সােভিয়েট ব্যবস্থার শ্রাদ্ধ করে জারের আমলের মহিমা কীর্তন করত। প্রথম পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার ব্যর্থতা প্রমাণের জন্য বিদেশে যত প্রচারকার্য হয়েছে তাতে খানিকটা ইন্ধন যুগিয়েছে জারের আমলের এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী। আগে দেশবাসীর একটা বিরাট অংশকে অনশনে, অর্থাশনে রেখে তারা যে সুখ ভােগ করত, সােভিয়েট আমলে সেই গৃহহীন নিরন্নদের • মহাযুদ্ধে সােভিয়েট জন্য গ্রাসাচ্ছাদন ও বাসস্থলের ব্যবস্থা হওয়ায় তাদের ভাগ্যে কিছু কম পড়ে যায় এবং তাতে তারা মনে মনে বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। এই অসন্তুষ্ট মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনযাত্রার মান নিরিখেই পুজিতন্ত্রী দেশের বহু সাংবাদিক সােভিয়েট প্রথম পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার ব্যর্থতা প্রমাণে লেখনী চালিয়েছেন। কিন্তু সত্যদ্রষ্টারা দেখেছেন ভিন্ন দিক। তারা দেখেছেন এক বিশাল অনগ্রসর দেশে ব্যাপক সম্পদ বৃদ্ধি এবং অগণিত দুঃস্থের জীবনে আর্থিক ও মানসিক উন্নতি। নতুন সমাজ গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য এই মনােব সেখানে ক্রমশ লােপ পায় এবং যে বাড়ীসঙ্কট দেখা দিয়েছিল তারও অনেকখানি সমাধান হয়। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের ঐকান্তিক চেষ্টায় কেবল স্থান সঙ্কুলানেরই ব্যবস্থা হয় না, পরন্তু নতুন পরিকল্পনায় ইমারতনির্মাণও বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক বাড়ীগুলি স্বাস্থ্য, আরাম এবং সৌন্দর্যের দিক দিয়ে জগতের কোন দেশের তুলনায়ই নিকৃষ্ট নয়; বরঞ্চ স্থাপত্যে কোন কোন বিষয়ে সে অনেক দেশকে ছাড়িয়েই গিয়েছে। মস্কোর ভূগর্ভস্থ রেল-ষ্টেসনগুলি স্থাপত্যে, ভাস্কর্যে এবং চিত্রে অতুলনীয়। মর্মরে গাঁথা সেই হাজি দেখে প্রশংসা না করেছেন এমন লােক কম। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সহরগুলিতে কোন বাড়ীর ব্যক্তিগত মালিক নেই। সমম্ভ 'বাড়ীই মিউনিসিপ্যালিটির কিংবা কোন কারখানার। কোন পরিবারের নিকট হতেই তাদের আয়ের শতকরা দশ ভাগের বেশী বাড়ীভাড়া বাবদ আদায় করা হয় না। ভাড়া আদায় করে তা বাড়ীর মেরামতাদি এবং ভাড়াটেদের নানাবিধ সুখবিধার জন্যই ব্যয় করা হয়। বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ীগুলিতে একটি করে কমিটী থাকে। সেই-কমিটী স্থির করেন ভাড়ার টাকা কিভাবে খরচ করা হবে। এই
সােভিয়েটতন্ত্র
ব্যবস্থা থাকায় সেখানে বাসগৃহগুলি কতটা আরামপ্রদ হতে পারে তা
সহজেই অনুমান করা যায়।
সােভিয়েট শাসনব্যবস্থার ফলে সেখানকার নাগরিক জীবনে
কতখানি উন্নতি হয়েছে এপর্যন্ত তারই একটি চিত্র দেবার চেষ্টা করেছি।
এবার রণাঙ্গনে লাল ফৌজ ও সােতিয়েট জনসাধারণ যে বিপুল
শক্তির পরিচয় দিয়েছে তার পশ্চাতে কি বিরাট সংগঠনশক্তি ও
সমপ্রস্তুতি ছিল সেকথাই বলব।
সমর প্রস্তুতি * সােভিয়েট সরপ্রস্তুতি সম্পর্কে কিছু বলতে হলেই সর্বাগ্রে তার পররাষ্ট্রনীতি সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার । কেননা অনেকের মনে এ প্রশ্ন থাকা কিছু অসম্ভব নয় যে, বিশ্বের শান্তিকামী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র পররাজ্যলােভী নাৎসী শক্তির মত বিপুল সমরায়ােজন করল কেন? বিশেষত পােলাণ্ডের পতনের পর সােভিয়েট সৈন্যগণ কর্তৃক তার অর্ধেক দখল; লাটভিয়া, এস্তোনিয়া এবং লিথুয়ানিয়ায় সােভিয়েট শাসনতন্ত্র প্রবর্তন, ফিনল্যাণ্ডের সহিত সােভিয়েট শক্তির যুদ্ধ এবং রুমানিয়ার বেসারাবিয়া প্রদেশে লাল ফৌজের অভিযান প্রভৃতিকে সূত্র করে পুজিতন্ত্রীরা এক সময় এমন ভাবে প্রচারকার্য চালিয়েছেন এবং সমস্ত ব্যাপারটাকে এমন বিকৃত করে বুঝাবার চেষ্টা করেছেন যাতে লােকের মনে ধারণা জন্মে, নাৎসী শক্তির ন্যায় সাম্রাজ্যবিস্তারই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য। কিন্তু সাম্রাজ্যবিস্তার যে সমাজতন্ত্র- বাদের মূলনীতিবিরুদ্ধ, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিসন্ধিমূলক প্রচারকার্য চালাবার সময় তারা সেই কথাটা একেবারেই বিস্মৃত হন ৰা চেপে যান, এবং লােকের অজ্ঞতার সুযােগ নিয়ে এক নিঃশাসে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে তারা নাৎসী জার্মানীর স্তরে টেনে নামান। লােভিয়েটবিরােধীরা তাে তাতে উল্লসিত হয়ে ওঠেনই, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের মধ্যেও তখন অনেকের ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের ২২শে জুন জার্মান যুদ্ধ বাধার অব্যবহিত পরই এই অধ্যায়ের কোন কোন অংশ প্রবন্ধকারে ‘দেশ’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় ধারাবাহিক গবে লিখেছিলাম।
সমপ্রতি মনে একটা খটকা লাগে। এমন কি আমাদের দেশে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু পর্যন্ত লাল ফৌজের ফিনল্যাণ্ড অভিযানের নিন্দা করে এক বিবৃতি দেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাবলীর দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ তখন ফিনল্যাণ্ডের দিকে এগিয়ে ঘাঁটি স্থাপন না করলে এবং পশ্চিমে সীমান্ত না সরালে নাৎসী বাহিনীর প্রথম আক্রমণেই তার শ্রেষ্ঠ নগরীগুলি বিপন্ন হয়ে পড়ত। রুশ রণাঙ্গনে যুদ্ধ বিলম্বিত হওয়ায় বৃটেন ও তার মিত্রশক্তিবর্গের সমরায়ােজনে যে কতখানি সুবিধা হয় তা বিশেষ করে না বললেও চলে। গত মহাযুদ্ধের ক্রোড়ে সােভিয়েট রুশিয়া জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু এই নতুনের আবির্ভাবকে সেদিন তথাকথিত “গণতন্ত্রীরা কেউ সুনজরে দেখতে পারে নি। আজও যে পারে এমন নয়; কনিষ্টবিদ্বেষ গণতন্ত্রী শাসকগণ হামেশাই অকপট চিত্তে প্রকাশ করে থাকেন। তবে বিপাকে পড়ে আজ তারা এই অন্ত্যজের মিত্র। এই নবজাত শিশুকে হত্যার জন্য সেদিন চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কেন? কিসের জন্য তার ওপর এত ক্রোধ ? সেই একই কথা। সাম্রাজ্যবাদী ভিত্তিতে যে অর্থনৈতিক বনিয়াদ গড়ে উঠেছে সােভিয়েট রুশিয়ার আবির্ভাবে তা ভেঙ্গে পড়বার উপক্রম হল। রুশ বিপ্লবেব ফলে গণজীবনে অর্থনৈতিক চেতনা দেখা দিল এবং তাতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের শাসকবর্গ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তারা ভাবলেন সাম্রাজ্য- বাদ বুঝি আর টেকে না। আত্মরক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর হলেন এবং নানা কৌশলে সােভিয়েটঘেঁষা প্রজাতন্ত্রী জার্মানীকে ধনতন্ত্রী রাষ্ট্রে পরিণত করলেন। ফলে হিটলারের অভ্যুত্থান ও বর্তমান মহাযুদ্ধ। এইটেই হল এই বিশ্বগ্রাসী সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক পটভূমি।
৭e মহাযুকে সােভিয়েট ১৯২৯ খৃষ্টাব্দে জগদ্ধাপী অর্থনৈতিক সঙ্কটের ফলে বিভিন্ন দেশকে নানারূপ কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সেই অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়ে নানা দেশের সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয় ; দেশে দেশে কলকারখানা বন্ধ হতে আরম্ভ করে এবং তাতে জগতের বিভিন্ন দেশে পাঁচ কোটিরও বেশী লােক বেকার হয়ে পড়ে। ফসলের মূল্য কমে যাওয়ায় ভারতবর্ষে এবং কাঁচা মাল সরবরাহকারী উপনিবেশগুলিতে কৃষকদের অবস্থা অত্যন্ত শশাচনীয় হয়ে দাড়ায়। চারদিকে যখন এরূপ সঙ্কট তথন সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা সাফল্যের দিকে এগিয়ে চলে এবং তার ফলে সেখানকার অর্থনৈতিক জীবনে যথেষ্ট উন্নতি দেখা দেয়। জগতের আর্থিক সঙ্কট তাদের স্পর্শ করতে পারে না এবং সােভিয়েট ভূমিতে বেকার সমস্যা লােপ পায় । ১৯২৮ খৃষ্টাৰে পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনানুযায়ী কাজ আরম্ভ হবার পর দেখতে দেখতে সােভিয়েট গণজীবনে এতখানি অর্থনৈতিক পরিবর্তন আলে যে, তা অন্যান্য দেশের অধিবাসীদের ঈর্ষার বস্তু হয়ে দাড়ায় এবং এই দুঃসহ অবস্থায় পড়ে তারা ক্রমশ বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদের দিকে বুকে পড়ে। এতে সাম্রাবণী শাসকগণ প্রমাদ গণেন এবং তাদের প্রাণে শােছিয়েট-আতঙ্ক উপস্থিত হয়। দলবদ্ধ হয়ে তারা সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সব জঘন্য প্রচারকার্য চালাতে থাকেন এবং সােভিয়েট পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা যে উদ্ভট এবং তা যে ব্যর্থ হতে বাধ্য একথা প্রয়াণের জন্তু তাঁরা উঠে-পড়ে লেগে যান । য়ুয়ােপকে সােভিয়েট প্রভাব হতে মুক্ত করবার জন্য একটি ফুরােপীয় সঙ্ঘ গঠনের সলাপরামর্শ চলে এবং তা নিয়ে জেনেভা ও অন্যান্য স্থানে বিস্তর আলােচনা হয়। ফ্রান্সের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব আরিষ্টাইড ব্রিয়। তাতে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বলশেভিকৰিছে কতখানি প্রবল ছিল এইচ জি ওয়েলসের সমপ্রতি ৭১ একটি মন্তব্য হতেই তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি তার পৃথিবীর ইতিহাসে বলেছেন: “সােভিয়েট রুশিয়ার বিরুদ্ধে জগতের সংবাদপত্রগুলিতে নিরঙ্কুশ ভাবে হীন প্রচারকার্য চলে এবং প্রচারকরা নানা ভাবে উর্বর মস্তিষ্কের পরিচয় দেন। তাদের চিত্রে বলশেভিক নেতারা লুণ্ঠনকারী ও রক্তপিপাসু দ্য এবং তার কামুকতার এক একটি জীবন্ত মূর্তি”। এর ওপর মন্তব্য বৃথা। কেবল প্রচারকার্য করেই পুজিবাদী রাষ্ট্র- সমুহের শাসকগণ ক্ষান্ত হন নি, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ইন্টার- তেনের নামে তারা একাধিকবার সামরিক অভিযান চালিয়েছেন। গত পচিশ বছরের ইতিহাসে সােভিয়েট শক্তির তিক্ত অতি- জ্ঞতা যথেষ্টই সঞ্চিত রয়েছে। ১৯১৪-১৮ খৃষ্টাব্দে মহাযুদ্ধের সময় কুশিয়ায় জার- অবসানে সোভিয়েট পররাষ্ট্র সচিব ম মলােটফ সােভিয়েটশক্তি যখন নিরুপায় হয়ে আত্মরক্ষার জন্য ব্রেষ্ট-লিটভকে জার্মানীর সঙ্গে স্বতন্ত্র ভাবে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয় তখন চারদিক হতে তাকে বেড়াজালে ফেলে মারবার জন্য কম চেষ্টা করা হয় নি। ব্রেষ্ট-লিটভঙ্ক চুক্তিকে ৭২ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট } তখন তথাকথিত গণতন্ত্রী মিত্রশক্তিবর্গ বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করে। তাদের অভিযােগ ছিল এই যে, জাবশাসিত রুশিয়া মিত্রপক্ষের অর্থাৎ বৃটেন, ফ্রান্স প্রভৃতির পক্ষ হয়ে যুদ্ধে নেমেছিল ; সােভিয়েট গবর্ণমেন্টও সেই যুদ্ধ না চালিয়ে কেন জার্মানীর সঙ্গে সন্ধি করতে গেল? অথচ সােভিয়েট গবর্ণমেন্টকে যে তখন বাস্তবের দিকে লক্ষ রেখে জার্মানীর সঙ্গে বাধ্য হয়ে সন্ধি করতে হয়েছিল—অর্থাৎ গৃহযুদ্ধের ফলে তার আর জার্মানীব বিরুদ্ধে লড়বার মত সামর্থ্য ছিল না—এ কথাটা মিত্রশক্তিবর্গ যেন বুঝেও বুঝছিল না। ব্রেষ্ট-লিটভঙ্ক চুক্তি যে একটা অজুহাত মাত্র বৃটিশ পার্লামেন্টের সদস্য মি: ডি° এন প্রিট তার “Must the War Spread” নামক পুস্তকের এক স্থানে তা স্পষ্টভাবেই বলেছেন। তিনি লিখেছেন :- *মিত্রশক্তিবর্গ বিশেষ জোর দিয়েই বলে যে, জারশাসিত রুশিয়ার সহিত তাদের যে সম্পর্ক ছিল, ব্রেষ্ট-লিটভঙ্ক চুক্তি দ্বারা তা ছিন্ন করা হয়েছে । সুতরাং তাদের দূত মারফৎ তারা এতে তীব্র আপত্তি এর অব্যবহিত পরই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সহিত যে শত্রুতা আরম্ভ হয় এবং স্বীকাল চলে, গত মহাযুদ্ধে মিত্রপক্ষের হয়ে সােভিয়েট রুশিয়ার না ভাই যে তার প্রধান কারণ এ মনে কল্প গুলা. সভিয়েট রুশিয়ার প্রতি বিরূপ হওয়ার এটাই যদি কারণ হয়ে থাকে তবে রুমানিয়ার প্রতিও মিত্রশক্তিবর্গের সেরূপ মনােৰ অবলম্বনই উচিত ছিল। কারণ সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের মত রুমানিয়াও তখন মধ্য য়ুরােপীয় সাম্রাজ্য-শক্তিবর্গের সঙ্গে স্বতন্ত্র ভাবে এক শাস্তির চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল।” অতএব সােতিকেট শক্তির ওপর খহস্ত হবার মূল কারণ ব্রেই ১ লিটগুৰু চুক্তি নয়, কনিষ্টবিদেষ্ণু। ঘটনাচক্রে আজ ধরা নিতান্ত ;
সমপ্রস্তুতি সামরিক প্রয়ােজনে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র তাদের মুখ দিয়ে সেদিনও সাম্যবাদের নিন্দা অকুণ্ঠে বেরিয়েছে। মিঃ চার্চিল, মি: ইডেন ও প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট স্পষ্টতই বলেছেন তারা জঘন্য সাম্যবাদের ঘাের বিরােধী। সে দিক দিয়ে বােধ হয় হিটলারের সঙ্গে তাদের কোন মতবিরােধ নেই। হিটলারের সঙ্গে তাদের একমাত্র পার্থক্য এই যে, হিটলার ‘পররাজ্যলােভী-তারা বলতে চান তাদের সেই ‘লােভ’ নেই। আজ ফাসিস্ত শক্তির বিরুদ্ধে অনেক কথাই শুনতে পাওয়া যায় ; কিন্তু গােড়ার দিকে একমাত্র সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রই বুঝতে পেরেছিল যে ফাসিস্ত শক্তির অভ্যুত্থানে কতখানি বিপদ আসতে পারে । তথাকথিত গণতন্ত্রী রাষ্ট্রসমূহের পুজিবাদী শাসকগণ তখন সােভিয়েট অভ্যুত্থানের আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ফাসিস্ত অভ্যুত্থানকে গ্রাহই করেন নি; বরঞ্চ অনেক ক্ষেত্রে তারা ফাসিস্ত নায়কদের প্রশ্রয়ই দিয়েছেন। ‘ইন্টারভেন্সন' নীতিতে ব্যর্থ হয়ে তারা প্রকাশ্যে সােভিয়েট শক্তির বিরুদ্ধাচরণ ছেড়ে দিলেন সত্য, কিন্তু মনে প্রাণে তাকে গ্রহণ করতে পারলেন না। যখন দেখা গেল যে, নব বলে বলীয়ান বিপ্লবী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যুদস্ত করা সহজ নয় তখন তারা একে একে তার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধ্য হলেন। বাইরে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য হলেও পুঁজিতন্ত্রীরা সাম্যবাদী সােভিয়েট শক্তির প্রতি মনে মনে বিদ্বেষের ভাবই পােষণ করতে লাগলেন এবং তার ফলেই য়ুরােপে তথা সমগ্র জগতে একটা শশাচনীয় অবস্থার সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তারা ফাসি শক্তির বিরােধিতায় সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছুতেই হাত মিলাতে পারলেন না। এই সােভিয়েটবিদ্বেষ যে কতখানি প্রবল ছিল, মিঃ ডি এন প্লিটের Light on Moscow” ন গত মহাযুদ্ধে সােভিয়েট বই থেকে একটি উদাহরণ দিলেই তা বেশ বােঝা যাবে। তিনি লিখেছেন :- *১৯২২ খৃষ্টাব্দে জেনােয়া নগরীতে এক সম্মেলন হয়। মহাযুদ্ধের ধ্বংসের পর কি ভাবে বিভিন্ন দেশকে পুনর্গঠিত করা যায় তা নিরূপণ করাই ছিল সম্মেলনের উদ্দেশ্য। য়ুরােপের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিগণ তাতে উপস্থিত ছিলেন। তৎকালীন বৃটিশ প্রধান মন্ত্রী মিঃ লয়েড জর্জ তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। সম্মেলনের তরফ থেকে সােভিয়েট প্রতিনিধিদের বলা হল যে, তাঁরা যদি তাদের সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে পুনরায় পুজিতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হন তবে মহাযুদ্ধে ও গৃহযুদ্ধে তাঁদের দেশের যে ধ্বংস হয়েছে তা পুনর্গঠনের জন্য তারা সাহায্য পেতে পারেন। বলা বাহুল্য, সােভিয়েট প্রতিনিধিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।” আগাগােড়া গণতন্ত্রী দেশসমূহের শাসকবর্গের এই মনােভাব প্রবল ছিল বলেই রাষ্ট্রসঙ্গে সােভিয়েট প্রতিনিধি মঃ লিটভিনফ ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত শত চেষ্টা করেও একটা ফাসিস্তবিরােধী সম্মিলিত দল সৃষ্টি করতে পারেন নি। ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রপক্ষের বাইরেই ছিল। ১৯৩১-৩২ খৃষ্টাব্দে জাপান মাঞ্চুরিয়া দখলের পর সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব সীমান্তে একটা যুদ্ধোদ্যম করে এবং ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দের বসন্ত কালে সে রাষ্ট্রস ছেড়ে দেয়। তারপর সেই বছরই শরৎকালে ফাসি জার্মানী রাষ্ট্রসঙ্ঘ পরিত্যাগ করে। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের তখন দুই দিকে দুই শক্ত প্রবল হয়ে দাড়ায়- পূবে জাপান এবং পশ্চিমে জার্মানী। জার্মানীর অভ্যুত্থানে ফ্রান্সও খানিকটা চিকিত হয়ে পড়ে এবং সে তখন পারস্পরিক সাহায্যের সরপ্রস্তুতি ৭৫ করে। } জন্য সােভিয়েট মুক্তরাষ্ট্রকে রাষ্ট্রসঙ্গে যােগদানের নিমিত্ত আহ্বান বলা বাহুল্য, বৃটেন ও ফ্রান্সই ছিল রাষ্ট্রসঙ্রে কর্ণধার । ফ্রান্স তখন বৃটেনের মিত্র ; কাজেই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের সেই আহ্বানকে বৃটেনেরও আহ্বান বলে ধরে নিল এবং রাষ্ট্রসজ্ঞের সাহায্যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটা শান্তি স্থাপিত হতে পারে এই আশায় সে রাষ্ট্রসঙ্গে যােগ দিল। কিন্তু রাষ্ট্রসজ্যে এসে তাকে শেষ পর্যন্ত নিরাশ হতে হল। রাষ্ট্রসঙ্রে প্রহসন তার কাছে প্রথম স্পষ্টভাবে ধরা পড়ল মুসােলিনীর আবিসিনিয়া অভিযানের সময়। ইতালীর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক শাস্তিবিধানের প্রস্তাব গৃহীত হল । কিন্তু বৃটেন ও ফ্রান্স কার্যক্ষেত্রে তা প্রয়ােগের সময় কোন সততার পরিচয় দিল না। তারপর স্পেনের গৃহযুদ্ধে বৃটেন ও ফ্রান্স “ইন্টারভেন্সনের” নামে হাত গুটিয়ে থেকে কার্যত ফাসি চক্রের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করল। হিটলার একদিকে ভার্সাই সন্ধির নিন্দা করে জার্মানদের মধ্যে বৃটেন ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার করেছেন, অপরদিকে কম্যুনিজম ধ্বংসের সুর তুলে পুজিতন্ত্রীদের চক্ষে ধূলি দিয়েছেন। পুঁজিতন্ত্রীরা হিটলারের এই ধাপ্পায় ভুলেই “তােষণনীতির” আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সেজন্যই চরম সঙ্কটকালেও সােভিয়েট শক্তির সঙ্গে তার মস্কোতে, সামরিক চুক্তির আলােচনায় নানারূপ গাফিলতি দেখিয়েছিলেন। হিটলার চতুর লােক ; কাজেই সেই সুযােগ না ছেড়ে তিনি তাড়াতাড়ি সােভিটে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা অনাক্রমণ চুক্তি করে সাময়িক ভাবে পূর্ব দিক সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হলেন এবং তারপরই পােলাণ্ডে অভিযান চালালেম। তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলির পুঁজিবাদী শাসকগণ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আকাল পর্যন্ত সােভিয়েট মহাযুদ্ধে সােজিয়েট কর্তৃপক্ষকে কিছুতেই বুঝতে দেন নি যে, তাদের আসল উদ্দেশ্য কি? সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ তা স্পষ্টভাবে জানবার জন্য বহু চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বারংবার তারা নিরাশ হয়েছেন। কোন সােভিয়েট প্রতিনিধিকে ডেকে যেভাবে গােপনে মিউনিক চুক্তি করা হল তাতে তাঁরা গণতন্ত্রীদের সততা ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আরও সন্দিহান হয়ে উঠলেন। হিটলার সােভিয়েট ভূমি আক্রমণ করলে গণতন্ত্রীরা যে তার সঙ্গে যােগ দেবেন না এমন কোন নিশ্চয়তা সােভয়েট কর্তৃপক্ষ পেলেন । মিউনিক চুক্তির পরও তারা ফ্রান্স ফ্রান্স এবং বৃটেনের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে চেয়েছিলেন এবং সেজন্য মস্কোতে আলােচনাও চালিয়েছিলেন; কিন্তু বৃটেন ও ফ্রান্সের তৎকালীন কর্ণধারগণ নানা চাল চেলে সেই আলােচনা ব্যর্থ করে দিলেন। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে হিটলার যখন তার পররাষ্ট্র সচিব ফন রিবেনট্রপকে এক অনাক্রমণ চুক্তির প্রস্তাব দিয়ে মস্কো পাঠালেন তখন সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তারা জানতেন সে চুক্তি বেশিদিন স্থায়ী হবে না; বৃটেন ও ফ্রান্সের দুর্বলতার সুযােগ নিয়ে হিটলার কিছু শক্তি সঞ্চয় করেই সােভিয়েট ভূমি আক্রমণ করবেন । কৈননা সােভিয়েট শক্তি বেচে থাকতে ফাসিন্ত শক্তি নিশ্চিন্ত হতে পারে না। গণতন্ত্রী পুজিবাদীদের সঙ্গে বরঞ্চ ফাসিরা একটা রফা করে চলতে পারে; কিন্তু সমাজতন্ত্র ও ফাসিস্ততন্ত্রের মধ্যে মূলত এতই বিনােথ যে, তাদের পাশাপাশি এক সঙ্গে বেশী দূর চলা অসম্ভব। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ এ সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন বলেই হিটলারের সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি হওয়া সত্বেও তারা আত্মরক্ষার আয়ােজন বাড়িয়ে চলেছিলেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, নানাভাবে খেয়ে যে সায়াজ্যবাদীর সােভিয়েট কর্তৃপক্ষকে হিটলারের সঙ্গে অনাক্রমণ সমরপ্রস্তুতি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেছিলেন তারাই চুক্তির পর সােভিয়েট শক্তি ফাসিস্ত সাম্রাজ্যের অংশীদার হয়েছে বলে তার নামে দুর্নাম রটাতে লাগলেন। অথচ ফাসিস্ত শক্তির অভ্যুত্থানকে তারা আগাগােড়া কিরূপ অম্লানবদনে সহ করে আসছিলেন নিম্নের ঘটনাবলীই তার সাক্ষ্য দেবে। হিটলারের অভ্যুত্থানের গােড়ার দিকে তাকাতেই দেখা যায়, প্রথম হতেই তিনি কখনাে পুঁজিবাদী কখনাে সমাজতন্ত্রীদের সমর্থক হয়ে নিজের সুবিধা করে নেন এবং এভাবে ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে জার্মানীর কর্তৃত্ব হস্তগত করে তিনি বৃহত্তর ক্ষেত্রে সেই নীতি প্রয়ােগ করতে আরম্ভ করেন। পরের বছরই পূর্ব পার্শ্ব হতে আক্রমণ সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হবার জন্য তিনি পােলাণ্ডের সঙ্গে দশ বছরের মেয়াদে এক শান্তিচুক্তি করলেন। ভাসাই সন্ধিতে জার্মানীর অস্ত্রবল সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল । ১৯৩৫ খৃষ্টাব্দে হিটলার তা অগ্রাহ্য করে অস্ত্রবল বাড়ালেন। ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে সামরিক বলে তিনি রাইনল্যাণ্ড দখল করলেন। সেই বছরই তিনি স্পেনের গৃহযুদ্ধে জেনারেল ফ্রাঙ্কোকে সাহায্য করতে অগ্রসর হলেন। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল স্পেনীয় প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিম য়ুরােপে বৃটেন ও ফ্রান্সের একটি শত্রু সৃষ্টি করা। ফ্রাঙ্কোর জয়ের দ্বারা তার সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধি হবে বলে তিনি যখন নিশ্চিন্ত হলেন তখন আবার তিনি পূর্ব দিকে মুখ ফেরালেন। ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে তিনি অষ্ট্রিয়ায় অভিযান চালালেন। ফলে চেকো- শ্লোভাকিয়ার পার্শ্বদেশ বিপন্ন হল। গত মহাযুদ্ধের পর স্বপ্রভাবিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ সৃষ্টি করে ফ্রান্স জার্মানীর চারদিকে যে প্রাচীর খাড়া করেছিল, হিটলার কূটনৈতিক চালে তা ভেঙ্গে দিলেন। ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মিউনিক চুক্তির দ্বারা তিনি যে কেবল সুদেতেনল্যাণ্ডই ফিরে পেলেন এমন নয়, চেকোশ্লোভাকিয়ার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিলেন ।
৭ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট তারপ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসে তিনি হৃতবল চেকোশ্লোভাকিয়াকে গ্রাস করে পােলাণ্ডের দক্ষিণ পার্শ্বদেশে বাই বিস্তার করলেন। একরূপ বিনা রক্তপাতেই তিনি এতগুলি দেশে তার তথাকথিত “শান্তি-অভিযান চালিয়ে মধ্য য়ুরােপে ফরাসী আধিপত্য খর্ব করলেন। কেবল তাই নয় ; চারদিকের প্রতিকূল বেষ্টনীকে তিনি কৌশলে অকূল করে নিলেন। একেই বলা যায় রণাঙ্গনে শত্রুকে ঘা দেবার আগে সুবিধাজনক স্থান অধিকার করে নেওয়া। এর দ্বারা প্রত্যক্ষ ভাবে জার্মানীর অস্ত্রবৃদ্ধির সুবিধা হয় এবং পরােক্ষভাবে তার শত্রুবর্গের শক্তি হ্রাস পায়; কেননা বৃটেন ও ফ্রান্স একে একে তাদের ক্ষুদ্র মিত্র শক্তিগুলিকে হারাতে থাকে। এভাবে হিটলার ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দের বসন্তকালের মধ্যে এমন অবস্থায় এসে পৌছলেন যে বার হতে সরাসরি আক্রান্ত হবার ভয় আর তার রইল না। সেই সময় বৃটেন আর এক চাল দিতে গিয়ে ভুল করে বসল। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোন বুঝাপড়া না করেই সে অকস্মাৎ পােলা ও রুমানিয়াকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিল ; অথচ উক্ত দুই দেশেই বৃটেন হতে সামরিক সাহায্য পাঠান কঠিন। একমাত্র সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বুঝাপড়া করলে সেখান হতেই পােলাণ্ড এবং রুমানিয়ায় সাহায্য প্রেরণ সম্ভব হত। কিন্তু তা না করে পােলাও ও রুমানিয়াকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় অবস্থা আরাে খারাপের দিকে গেল। এই প্রতিশ্রুতির দ্বারা স্পষ্টত প্রকাশ পেল যে, বৃটেনের “তােষণনীতি অনুসরণের অর অভিপ্রায় নেই। হিটলার তখন তাড়াতাড়ি সামরিক বলে পােলা দখল করে পূর্ব দিকে সীমান্ত সম্প্রসারিত করলেন এবং তারপর পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধের অন্য সম্পূর্ণ রূপে প্রস্তুত হলেন। হিটলারের এই স্ট্র্যাটেজিক সম্প্রসারণের আসল উদ্দেশ্য ম ষ্ট্যালিন
সমরপ্রস্তুতি
৭১
এ4,
.., ২৭
বুঝতে পেরেছিলেন। মধ্য য়ুরােপেই হিটলারের সম্প্রসারণচেষ্টা
সীমাবদ্ধ থাকবে না এবং তা যে এক ভাবী মহাসমরের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা
মাত্র—একথা পূর্বাহে বুঝতে পেরেই মঃ ষ্ট্যালিন সেই ভাবী যুদ্ধের জন্য
প্রস্তুত হতে লাগলেন এবং তদুদ্দেশ্যেই তিনিও পশ্চিম দিকে সীমান্ত
রেখা সরিয়ে দিলেন ।
হিটলার তার চক্ষে ধূলি
দিতে পারেন নি। মঃ
ষ্ট্যালিন তখন পশ্চিম
দিকে সােভিয়েট এলাকা
না বাড়ালে হিটলারের
বাহিনী আক্রমণের প্রথম
চোটেই গিয়ে যে
লেনিনগ্রাড ও মস্কোর
দ্বারে উপনীত হত একথা
পরে ম: ষ্ট্যালিনের পরম
শত্রুও স্বীকার করেছেন।
সােভিয়েট স্বরাষ্ট্র সচিব মঃ এল বেরিয়া
সােভিয়েট ভূমিতে
আক্রমণ চালাবার আগে হিটলার বৃটেনের মৈত্রী লাভের আশায়
তার অন্তরঙ্গ হের হেসকে বৃটেনে পাঠিয়ে আর এক চাল চেলেছিলেন।
তিনি ভেবেছিলেন, হের হেস অত্যন্ত সােভিয়েটবিদ্বেষী একথা
বৃটেনের শাসকগণ জানেন ; কাজেই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
মিলিত অভিযান চালাবার জন্য হেস হয়ত বৃটিশ শাসকগণের মৈত্রী
লাভে সমর্থ হবেন। হের হেসকে নিয়ে বৃটেনে তখন নানারূপ
তালাকনাও চলে। এমন কি কোন কোন সংবাদপত্রে তার ব্যক্তিগত
মহাধুকে সােতিয়েট প্রশংসাও করা হয়। অধ্যাপক প্যাট লােয়ান তার “Russia Resists” নামক পুস্তকের এক স্থানে লিখেছেন- “হেস-সমর্থক প্রচারকার্যের বিরুদ্ধে জনসাধারণ তীব্র অসন্তোষ জানিয়ে সুর পরিবর্তনে বাধ্য না করলে মনে হয় সরকারী মহলে হেস হয়ত প্রকাশ্যেই সংবর্ধনা পেতেন।” যে কারণেই হােক, হিটলারের সেই চাল ব্যর্থ হয়। মিঃ চার্চিল রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার পর বেতারে ঘােষণা করেন :- “যে কোন ব্যক্তি বা রাষ্ট্র নাৎসীশাসনের বিরুদ্ধে লড়বে সেই আমাদের সাহায্য পাবে।•• •••আমরা যতদূর পারি রুশিয়াকে সাহায্য ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দে সামরিক চুক্তির আলােচনায় সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নানারূপ টালবাহনা কৰুে কাটন যে ভুল করেছিল, হিটলারের এই চালে আর লে সেই ভুল কনা। হিটলারকে অগত্যা পশ্চাতে শক্ত লেখেই ফোলিয়েট মুe অন্তিম করতে হল। এই অভিযানে ৰাধা দেবার জন্য সােজিয়েট: কর্তৃপক্ষ পূর্বাহে কতখানি প্রস্তুত হয়ে ছিলেন এবার সংক্ষেপে তাই বল। সরলামর্থ্য বলজিয়েট সমপ্রস্তুতি বুঝতে হলে বিভিন্ন দেশের সমরায়াে- জমের গােড়ার কথা কিন্তু জানা দরকার। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বাধার পূর্বে বুঝােপের রাজনৈতিক গগনে যে প্রবল ঝড় ওঠে তার মূলে ছিল নতুন সামরিক শক্তির আবির্ভাব। নাৎসী জার্মানী এবং সাম্যবাদী লােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ নতুন ধরণে সমরসজ্জা করে ।
সমরপ্রস্তুতি ৮১ সমবায়ােজনে প্রাচীনপন্থী গ্রেট বৃটেন ও ফ্রান্স হতে তা একেবারেই পৃথক। প্রয়ােজনকালে অনতিবিলম্বে যাতে দেশের সমস্ত শক্তিসামর্থ্য ও সম্পদরাশি সামরিক প্রয়ােজনে নিয়ােজিত করা চলে, জার্মানী ও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র পূর্বাহেই তেমন ব্যবস্থা করে রাখে এবং উভয় দেশই রণকৌশলকে আক্রমণাত্মক করে তােলে। পক্ষান্তরে গ্রেট বৃটেন ও ফ্রান্স সেই প্রাচীন আত্মরক্ষাত্মক রণকৌশলকেই আঁকড়ে ধরে বসে থাকে। ফলে ভাসাই সন্ধিতে গ্রেট বৃটেন ও ফ্রান্স সামরিক বলে যে প্রাধান্য লাভ করেছিল, ১৯৩০ হতে ১৯০৫ খৃষ্টাব্দের মধ্যে তা লােপ পায় এবং পশ্চিম য়ুরােপের সামরিক প্রাধান্য মধ্য ও পূর্ব য়ুরােপে এসে আশ্রয় নেয়। নাৎসী জার্মানী ও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র এই দুই নতুন সামরিক শক্তির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পৃথক ; কাজেই তাদের সমরায়ােজনের লক্ষ্যও স্বতন্ত্র ! অস্ত্র বাড়ালেই পররাজ্য গ্রাস করতে হবে এমন কোন কথা নেই। আক্রমণাত্মক সমরপ্রস্তুতি আব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে পররাজ্য আক্রমণ এক কথা নয়। সামরিক ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক নীতি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সহজেই আত্মরক্ষাত্মক অস্ত্ররূপে ব্যবহৃত হতে পারে। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রবৃদ্ধির উদ্দেশ্য তার রাজনৈতিক লক্ষ্যকে বাঁচিয়ে রাখা; নাৎসী জার্মানীর মত পররাজ্যমুখী নয়। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় দৃষ্টিপাত করলেই তার প্রমাণ মেলে। চারদিক থেকেই আক্রান্ত হবার একটা আশঙ্কা যে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের ছিল সােভিয়েট পররাষ্ট্র প্রসঙ্গে তা আলােচনা করেছি। নাৎসী জার্মানী ও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সমরপ্রস্তুতিতে তিনটি বিষয় বিশেষ ভাবে বিবেচ্য। প্রথমত, তাদের প্রাকৃতিক ও সামগ্রিক সম্পদ বেশ ; য়ুরােপে সব ২ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট চেয়ে বেশী লােকের বাস ওই দুই দেশে এবং তাদের প্রত্যেকেই শৈল্পিক সামর্থ্য যথেষ্ট। দ্বিতীয়ত, সমরসম্ভার নির্মাণে তারা ঋথেষ্ট সময় থাকতে মন দেয় এবং তাদের অস্ত্রগুলি অতি আধুনিক ও উৎকৃষ্ট সেনাদল গঠনে যান্ত্রিক উৎকর্ষের কোনটিকেই তারা বাদ দেয় না। তৃতীয়ত, জার্মানী ও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে আদর্শ পৃথক হলেও রাষ্ট্র কর্তৃক শিল্পোৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বৈপ্লবিক পন্থায় সেনাগঠনে সুবিধা হয়েছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পসম্পদকে তারা যেমন পূর্বাহেই সমর্থক করে তুলতে পেরেছে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী গ্রেট বৃটেন ও ফ্রান্স তেমন পারে নি। শিল্পকে সমরার্থক করার জন্য যুদ্ধ বাধার পর সমস্ত কলকারখানা বৃটিশ সরকারকে নিজ নিয়ন্ত্রণে নিতে হয় । কিন্তু জার্মানী ও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র এব্যবস্থা পূর্ব হতেই করে রেখেছিল। কাজেই প্রয়ােজন হওয়ামাত্রই তারা দেশের সমস্ত শক্তি ও সম্পদ যুদ্ধে নিয়ােজিত করতে পেরেছে। এই কারণেই তাদের সমসামর্থ্য অধিক। সামরিক শক্তিপুঞ্জের মধ্যে নাৎসী জার্মানী ও সাম্যবাদী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের স্থান যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বাধার প্রাক্কাল পর্যন্ত শীর্ষে ছিল তা. অবিসংৱাদিত সত্য; কারণ অর্থনৈতিক শক্তিযুম্পন্ন দেশগুলির মধ্যে কেবল এই দুই দেশই সমরসামর্থ্য বাড়াবার অঙ্গ আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। হিটলার কতৃক অন্যান্য দেশ দখলের আগে আবার এই দুই দেশের মধ্যে বােধ হয় সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের স্থান আরও উচ্চে ছিল, কেননা জার্মানীর তুলনায় তার কঁচা মাল ও জনবল ছিল বেশী। এই গেল প্রথম শ্রেণীর সামরিক শক্তির কথা। দ্বিতীয় শ্রেণীর পর্যায়ে, গছে গ্রেট বৃটেন ও ফ্রান্স। এই দুই দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি খুবই * ৮৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট পােলাও, রুমানিয়া ও যুগােশ্লাভিযাকে। শিল্পক্ষেত্রে তা নিতান্তই অনগ্রসর, সৈন্যবল মাঝারি, অস্ত্রশস্ত্র খুবই কম। কাজেই দলে ভিড়াবার জন্য তাদের নিয়ে প্রবল রাষ্ট্রসমূহ যথেষ্টই টানা হেঁচড়া করে। তাদের মধ্যে পােলাও ও যুগোশ্লাভিয়ার সামরিক বল জার্মানীর সঙ্গে যুদ্ধে বিনষ্ট হয় এবং রুমানিয়া জার্মানীৰ দলে ভিড়ে পড়ে। এই মানদণ্ডের সাহায্যে বিচার কবলে সহজেই অনুমান করা যায় সামরিক জগতে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের স্থান কোথায়। রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার পর সােভিয়েট সামরিক শক্তির পবিচয় পেয়ে অনেকেই বিস্মিত হন; কিন্তু সামরিক জগতের যথার্থ খবব যারা রাখতেন তারা তাতে মোটেই বিস্মিত হন নি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বাধার আগেই সােভিয়েট সম প্রস্তুতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ব্যক্তিরা যেসব কথা বলেছিলেন এবার সেইগুলি নিয়েই আলােচনা করব । প্রথমেই বলা দরকার, যুদ্ধে যথেষ্ট জনবল ও প্রচুর কঁাচা মালের প্রয়ােজন। সোভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে তার অভাব নেই। কাজেই জনবল ও কাচামাল যথেষ্ট থাকায় সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক ভিত্তি দৃঢ় এবং দীর্ঘকাল যুদ্ধ চালাতে সে সক্ষম। সােভিয়েট প্রথম পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার ফলেই তার সামরিক জীবনে এমন অমূল পবিবর্তন আসে যার ফলে সমগ্র য়ুরোপের পারস্পরিক সামরিক সম্পর্ক বদলে যায় । অবশ্য অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় হলেই যে কোন দেশ সামরিক বলে শ্রেষ্ঠ হবে এমন ধারণা করা ভুল ; কাবণ বৃটেন ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় থাকা সত্বেও সময়ােজনের দিক দিয়ে তারা জামানীর পশ্চাতে পড়ে ছিল। কাজেই যুদ্ধের জন্য চাই প্রস্তুতি। যুদ্ধে সমস্ত শক্তি ও সম্পদ নিয়ােগের জন্য পূর্বাহ্বে প্রস্তুত হয়ে না থাকলে শত আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং প্রচুর জনবল নিয়েও পরে সহজে কিছু করে ওঠা
সমর প্রস্তুতি
যায় না। আধুনিক যুদ্ধে প্রথম দিকেই প্রযােজন হয যথেষ্ট সুশিক্ষিত
TA
+
লাল ফৌজের একজন নারী এঞ্জিনিয়ার তার সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ
করতে করতে সিড়ি দিয়ে নামছেন।
সৈনিক এবং প্রচুর সমরেপকরণ। যুদ্ধের প্রারম্ভেই যথাসাধ্য শক্তি
-৬ মহাযুদ্ধে সভিয়েট নিয়ােজিত করতে না পারলে যুদ্ধের সময় শক্তিসঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান যুদ্ধের মুখে সামরিক বলে দুর্বল থেকেও বৃটেন যে পরে কিছুটা শক্তিসঞ্চয় করার অবসর পেয়েছে তা তার সুবিধাজনক ভৌগােলিক অবস্থানের জন্যই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বৃটেনের পক্ষে যা সম্ভব হয়েছে ফ্রান্সের পক্ষে তা হয় নি। অতি অল্পকালের মধ্যেই ফ্রান্সের পতন ঘটেছে। গত মহাযুদ্ধেও কিন্তু সমরসম্ভার বৃদ্ধির প্রচুর যোেগ এবং অবসর যুধ্যমান রাষ্ট্রগুলি পেয়েছিল ; কারণ ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে যুদ্ধ বাধলেও যথার্থ শক্তিশালী কামান, গােলা ও এরােপ্লেনের ব্যাপক ব্যবহার আরম্ভ হয়েছিল ১৯১৭-১৮ খৃষ্টাব্দে। ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে একশত ডিভিসন জার্মান সেনার ২৫ শতের বেশী মেশিনগান ছিল না -আজ- কাল পাঁচ ডিভিসন জার্মান সেনারই প্রায় তত সংখ্যক মেশিনগান পাকে। কাজেই তখনকার তুলনায় আজকাল অবস্থার অনেকখানি বির্তন হয়েছে। বর্তমানকালে জরুরী অবস্থার জন্য দেশের সমস্ত শক্তি ও সম্পদকে সমার্থক করে না রাখলে যুদ্ধকালে শক্তিসঞ্চয়ের অবসর তেমন ঘটে না। অতএব সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সমরপ্রস্তুতির কথা বিচার করলে দেখতে হবে গত কয় বছরে তার লমরায়ােজন কি ভিত্তিতে হয়েছে। পােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট সমরবিশেষজ্ঞ দিয়েৎশিনের অভিমত এখানে সর্বাগ্রে গ্রাহ। তিনি বলেছেন- “আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রগুলিকে অবিলম্বে যুদ্ধে প্রেরণ করতে হয় এবং সেগুলি সংখ্যায় প্রচুর হওয়া দরকার। অস্ত্র গুলি এমন শক্তির আধার মা হােট ঘােট কিস্তিতে খরচ করলে চলবে না। অতএব যুদ্ধে ব্যয়সঙ্কোচ বা পরীক্ষা করে দেখার অবসর নেই।” বলা বাহুল্য, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক সামরিক শক্তি এই ফিরেই গড়ে উঠেছে। জার্মানীর ন্যায় সেও যুদ্ধের সমপ্রস্তুতি সময় যাতে অনতিবিলম্বে সমস্ত শক্তি নিয়ােজিত করতে পারে পূর্বাহেই তেমন ব্যবস্থা সে করে রাখে। সময়ােজনও সে জার্মানীর পূর্বেই আরম্ভ করে । তার মত রিজার্ভ সৈ য়ুরােপের আর কোন রাষ্ট্রেরই ছিল না। কেউ কেউ বলেছিলেন যে তার সুশিক্ষিত রিজার্ভ সৈন্তের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি এবং তাদের অধিকাংশই অতি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র চালনায় সুনিপুণ। যুবােপে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের মত সামরিক সম্পদরাশিও আব কারাে নেই। তার উন্নত প্রণালীর শিল্পব্যবস্থা, উৎকৃষ্ট সমবশিল্প এবং সুপরিচালিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সবই যুদ্ধে অনুকূল। এই সমস্তে মিলে যে সে যুদ্ধশক্তিতে একটা বিশিষ্ট স্থান লাভ কবে –শমিত্র অনেকের মুখেই তা প্রকাশ পায়। ফ্রান্সের রক্ষণশীল দলের অন্যতম মুখপত্র “Revue des Deux Mondes”তে এক সময় লেখা হয় :- “য়ুরােপের শক্তিবর্গের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক নিরূপণ করতে হলে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বল অবশ্য ধর্তব্য।” উপরােক্ত পত্রিকাখানিতে মার্শাল পো, জেনারেল ওয়েগা, জেনারেল সেকেলী প্রভৃতি ফ্রান্সেব বিশিষ্ট সমরবিশারদগণ লিখতেন। কাজেই সে পত্রিকার মতামত হেসে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। ১৯৩২ খৃষ্টাব্দে জপ নৌদপ্তরের মুখপত্র “ইয়েতে জাপ নৌবিভাগীয় প্রতিনিধি মিঃ মেহদী লিখেন- “সাভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের কেবল যথেষ্ট সংখ্যক ট্যাঙ্ক আছে”খলেই হয় না—তার বৈশিষ্ট্য এই যে, সেইগুলির অধিকাংশই আধুনি ধরনের স্ট্যাঙ্ক। সামরিক কুচকাওয়াজে যেসকল প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন লালদের যন্ত্রসজ্জা তাঁদের দেয়। .
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট শুধু তাই নয়। ১৯৩৪ খৃষ্টাব্দে বিশিষ্ট সমরবিশেষজ্ঞ জেনারে ব্যারেট্রিয়ার “টেম্পস” পত্রিকায় লিখেন “যুদ্ধের জন্য ডাক পড়লে লাল ফৌজ যুদ্ধজয়ের পক্ষে একটি শক্তিশালী অরূপে আত্মপরিচয় দিবে। লাল ফৌজের মত এমন যন্ত্রসজ্জা য়ুরােপের আর কোন শ্রেষ্ঠ সেনাদলেই নেই।” ১৯২৯ খৃষ্টাব্দে লাল ফৌজের যে যন্ত্রসজ্জা আরম্ভ হয়, সােভিয়েট সমরনায়ক মার্শাল ভবােশিলফ ১৯৪১ খৃষ্টাব্দে তা কোথায় এনে ঠেকান, সামরিক ব্যয়বৃদ্ধির হিসাব দেখেই তা অনেকটা অনুমান করা যায়। ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে যেখানে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়বরাদ্দ ছিল ১৫ মিলিয়ার্ড রুবল, ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে সেখানে তার সামরিক ব্যয়বরাদ্দ এসে দাঁড়ায় ৩৪ মিলিয়ার্ড বলে অর্থাৎ ৬ বছরে তার সামরিক ব্যয় :২ গুণ বেড়ে যায়। ১৯৩১-৩৪ খৃষ্টাব্দে নে সামরিক প্রয়ােজনে মােট খরচ করে ৯ মিলিয়ার্ড রুবল—আর ১৯৩২ হতে ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দ এই চার বছরে সে একই প্রয়ােজনে মােট খরচ করে ৭৯ মিলিয়ার্ড রুবল। এ হতেই বােঝা যায়, গত কয় বছরে তার সামরিক বল কিরূপ দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। জার্মানীও পূর্ণোদ্যমে “পময়ােজনে মন দেয় ১৯৩৫ খৃষ্টাব্দে। কাজেই দেখা যায়, জার্মানীর সঙ্গে পাল্লা দিয়েই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র তার সময়োপকরণ বৃদ্ধি করেছে। বৃটেন ও ফ্রান্সের মত গড়িমসি চালে চলে সে পশ্চাতে পড়ে থাকে নি। ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসে মার্শাল বােশিলফ ১৯৩৪ খৃষ্টাব্দের তুলনায় লাল ফৌজের সৈন্য ও অন্ত্রবল বৃদ্ধির যে অনুপাত দেন তা এইরূপ :- যৈ শতকরা ১০৩; ট্যা শতকরা ১৯১; সাঁজোয়া গাড়ী সমরপ্রস্তুতি ১২। ‘শতকরা ৬৫*; গােলালী শতকরা ৪০০; বড় কামান শতকরা ৮ এবং বিমানধ্বংসী কানশতকরা ১৬৯। কেবল তাই নয়। সঙ্গে সঙ্গে সামরিক অফিসারের সংখ্যাও বাড়ান হয়। অফিসার বৃদ্ধির অনুপাত এই :- পদাতিক বাহিনীর সেনানী শতকরা ১১৮; অশ্বারােহী দলের সেনানী শতকরা ৬৬; সঁজোয়া বাহিনীর সেনানী শতকরা ১৫৪ এবং গােলন্দাজ বাহিনীর সেনানী শতকরা কমিশনবিহীন অফিসারের সংখ্যা দ্বিগুণ, ক্ষেত্র বিশেষে তিন গুণও করা হয়। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন সুশিক্ষিত সৈন্য ও সেনানীর সংখ্যা বাড়িয়েছে, অপরদিকে তেমনি প্রচুর পরিমাণে মারণাস্ত্র নির্মাণ করেছে। কারণ অস্ত্র না থাকলে সৈন্ত বাড়িয়ে কোন লাভ নেই। ato atata tts "The Military Strength of the Powers" নামক পুস্তকে লিখেন :- “আমরা ধরে নিতে পারি যে, ১৯৩৫-৩৮ খৃষ্টাব্দে লাল ফৌজ তার আধুনিক মারণাস্ত্রের সংখ্যা দ্বিগুণ করেছে। ১৯৩৭ - ৩৮ খৃষ্টাব্দে তার বিমানসংখ্যা ১০ হাজার এবং ট্যাঙ্কের সংখ্যা ১৫ হাজার হতে ২০ হাজারের মধ্যে এসে দাড়ায়। ১৯৩৫-৩৬ খৃষ্টাব্দেই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক উদ্দেশ্যে দেড় লক্ষ বৈমানিক ও ৯ লক্ষ মােটরচালক শিক্ষিত করে তােলা হয়। এছাড়া সােভিয়েট কৃষকদের অধিকাংশই চাষের জন্য ট্রাক্টর চালনায় অভ্যন্ত। কাজেই তাদের পক্ষে ট্যাঙ্কচালনা শিখতে বেশীদিন লাগার ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দের হিসাবেই দেখা যায়, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে বিমান নির্মাণের বড় কারখানা বার তেরটি রয়েছে। তন্মধ্যে দু মহাযুদ্ধে সােভিয়েট কারখানায়ই বছরে বিভিন্ন শ্রেণীর প্রায় পাঁচ হাজার বিমান নির্মিত হতে পারে। কারখানাগুলিতে তখনই আড়াই লক্ষ লােক কাজ করছিল। ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দের পর সেই সব কারখানা সম্প্রসারিত এবং আরো অনেকগুলি নতুন কারখানা স্থাপিত হয়। তারপর জার্মানী কখনাে আক্রমণ করলে তা প্রতিরােধের এবং পাল্টা আক্রমণের ব্যবস্থাও সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ তাদের পশ্চিম সীমান্তে ভালভাবেই করে রাখেন। ম্যাক্স বার্নার তার ম্যাক্স বার্নার তার পূর্বোক্ত পুস্তকে লিখেন *১৯৩৫-৩৮ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক প্রচেষ্টা লাফল্য লাভ করে তার ফলে তার পশ্চিম সীমান্তে দ্রুত পাল্টা ঘা দেওয়ার উপযােগী একটি শক্তিশালী ও ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন সেনাদল গড়ে কি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়, কি শৈল্পিক প্রচেষ্টায়, সর্বক্ষেত্রেই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র সমরশিল্পকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে আসে। আত্মরক্ষার প্রচেষ্টায় সে কখনাে গাফিলতি করে নি। ১৯২৮ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের একখানি শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক পত্রিকায় লেখা হয় :- আমাদের পঞ্চ বার্ষিক পরিকনায় অর্থনৈতিক পদ্ধতির এমন সব শাখা, বিশেষত আমাদের সমরশিল্পের দ্রুত উন্নতির দিকে এমন ভাবে মন দিতে হবে যার ফলে আমাদের দেশরক্ষার ব্যবস্থা অধিকতর সুদৃঢ় হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধের সময় আমাদের আর্থিক ব্যবস্থা অবিচলিত থাকে। শিল্পসম্পদ বৃদ্ধির অর্থ হল সমরশিল্পের উন্নতি।” তারপর ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দে জার্মান সমরদপ্তরের মুখপত্র “Borseneitung” পত্রিকায় লেখা হয়, *যেয়েট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পরিচালনায় সামরিক প্রয়ােজন সমপ্রতি অপ্রয়ােজনের কথাই বিশেষভাবে বিবেচিত হয়।••••••শান্তির সময় সামরিক প্রযােজন সাধন এবং যুদ্ধকালে বর্ধিত সামরিক চাহিদা পূরণের জন্য সমগ্রভাবে শিল্পকে প্রস্তুতকৰণই হল সােভিয়েট অর্থনৈতিক পঞ্চবর্ষ পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য। অতএব দেখা যায়, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র বিপদের সম্মুখীন হওয়ার জন্য বহুদিন হতেই প্রস্তুত হয়ে আসছিল। শিল্পোন্নয়ন করতে গিয়ে সে কেবল বিলাসের সামগ্রীই প্রস্তুত করে নি-সঙ্গে সঙ্গে আত্মরক্ষার জন্য প্রচুর পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্রও নির্মাণ করেছে এবং তার অস্ত্রের উৎকর্ষ ও কার্যকারিতার সাক্ষাৎ পবিচয যারা পেয়েছেন তারা অকুণ্ঠভাবে তার প্রশংসা না করে থাকতে পারেন নি। সমরবিজ্ঞানে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র যে কোন কোন ব্যাপারে নাৎসী জার্মানীর পথপ্রদর্শক তারও প্রমাণ পাওয়া যায়। অবি সাম্যবাদী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের একথা গােড়া হতেই ভাল ভাবে জানা ছিল যে, কেবল জার্মানী কেন, একদিন জগতের সাম্রাজ্যবাদী ও পূজিপন্থী সমস্ত রাষ্ট্র মিলেই তার বিরুদ্ধে দাড়াতে পারে। কাজেই সেই সম্মিলিত বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে লড়বার উপযাের্থ কয়েই সে যতদূর সম্ভব আত্মরক্ষার আয়ােজন করে এবং সেভাবেই সামরিক সামর্থ্য লাভে সে প্রয়াস পায়। তবে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র জার্মানী আধুনিক রণসজ্জা ও রণকৌশলে যে সমগ্র জগৎকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টিত তা সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র প্রথম হতেই লক্ষ্য করেছে এবং সেই সে গত কয় বছরে নিজের সামরিক ব্যবস্থাতেও বিপ্লব আশনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। ।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট কোন দেশের রণনৈপুণ্যের কথা বলতে গেলেই প্রথমে বলতে হয় সেই দেশের সৈন্যরা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র চালনায় অভ্যস্ত কিনা । অতএব লাল ফৌজ এদিক দিয়ে কতদূর কি শিক্ষা পায় তা আমাদের দেখা দরকার। আধুনিক ফৌজকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করে দেখলে মন্দ হয় না সাবেক ও নতুন। পদাতিক ও অশ্বারােহীকে সাবেক ধরণের এবং ট্যাঙ্ক ও বিমান বাহিনীকে নতুন ধরণের ফৌজ বলা যেতে পারে। গোলন্দাজ বাহিনীকে এই দুই শ্রেণীর মাঝামাঝি পর্যায়ভুক্ত করা চলে। অবশ্য এই সীমারেখাকে সর্বত্র রক্ষা করা চলে ; কারণ তথাকথিত সাবেক শ্রেণীর ফৌজকে আজকাল নানাভাবে এতখানি আধুনিক করা হয়েছে যে, তাকে পুরাতন বললে ভুল হয়। রূপান্তর সাধনে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের কৃতিত্বের যথেষ্ট পরিচয় ওয়া যায়। সে কয়েক বছর পূর্বেই তার পদাতিক বাহিনীকে এমন ভালেপুনর্গঠিত করে যাতে তারা সকল প্রকার আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রেরই সাহায্য পেতে পারে। ১৯৮ খৃষ্টাব্দেই তার পদাতিক বাহিনীর এক তৃতীয়াংশকে সে মােটরসজ্জিত করে এবং তা সমগ্র বাহিনীর যসজ্জার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়। এতদ্ব্যতীত ট্যাবহরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যােগাযােগ রক্ষা করে যাতে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়, এই এক তৃতীয়াংশ, পদাতিক বাহিনীকে তেমন ভাবে গড়ে তুলতেও লাল ফৌজের কর্তারা কিছুমাত্র ক্রটি করেন নি। এতদ্ব্যতীত দুই তৃতীয়াংশ পদাতিক বাহিনীর নিজৰ ট্যাঙ্কের ব্যবস্থা করা হয়। লাল ফৌজের পদাতিক বাহিনী সম্বন্ধে এক সময় ফরাঙ্গী সেনাপতিমণ্ডলীর অধ্যক্ষ জেনারেল জাইগণ বলেন - আমা সাহী সােভিয়েট পদাতিক সৈদের অতি দ্রুত গতিতে গিয়ে দুর্গম অঞ্চলে আক্রমণ চালাতে এবং অত্যন্ত অল্প সমপ্রতি সময়ের মধ্যে পরিখা খনন করে তাতে তাদের আশ্রয় নিতে দেখেছি।” ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে লাল ফৌজের পদাতিক বাহিনীর মহড়া দেখে চেক সামরিক মিশনের নায়ক জেনারেল লুজাও বলেন : “মহড়ায় দেখলাম সােভিয়েট পদাতিক সৈঙ্গ বেশ তৎপরতার সঙ্গে ঘােরাফেরা করল এবং অস্ত্রচালনায় চমৎকার নৈপুণ্যের পরিচয় দিল।* এই গেল সেনাসংগঠনের কথা। অস্ত্র চালনায়ও যে সােভিয়েট সেনা সুনিপুণ তারও পরিচয় আগেই পাওয়া যায়। ম্যাক্স বার্নার ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে তাঁর “The Military Strength of the Powers” নামক বিখ্যাত পুস্তকে লিখেন :- *১৯৩৭ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে লণ্ডনে যে আন্তর্জাতিক অল- ক্যালিবার’ গুলীবর্ষণ প্রতিযােগিতা হয় তাতে ২৮টি দেশ হতে ২১২টি প্রতিমােগী দল যােগ দেয় ; তন্মধ্যে সােভিয়েট দল শীর্ষস্থান অধিকার করে এবং ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দের গ্রীষ্মকালে সেই একই প্রতি- যােগিতায় তারা প্রথম হতে ষষ্ঠ স্থান পর্যন্ত লাভ করে। থেকেই বােঝা যায় গুলীবর্ষণে তারা কিরূপ নিপুণ। দীর্ঘ পথ ‘মার্চ করে যেতেও তারা অত্যন্ত। তাদের কষ্টসহিষ্ণুতা সম্বন্ধেও শক্রমিত্র অনেকেই প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, লাল ফৌজে এমন সব বৈমানিক আছেন যারা সাত হাজারেরও অধিকৰার আকাশে উড়ে ছয় লক্ষাধিক মাইল পথ অতিক্রম করেছে এমন সব টাচালক আছেন যাদের আড়াই হাজার ঘণ্টা ট্যাঙ্ক চালাবার অভিজ্ঞতা আছে। এমন সব টঙ্কি আছে যেগুক্তি চার হাজার মাইল পথ অষণ করেছে এবং একাধিক্রমে ৬০০ মাইল অতিক্রম করতে ফোন মহাযুদ্ধে সােভিয়েট , যান্ত্রিক গােলমাল হয় নি। এতদ্ব্যতীত এমন আরও বহু ট্যাঙ্ক আছে। যেগুলি জলকাদা ভেঙ্গে ৩০০ মাইল পথ অতিক্রমে সক্ষম হয়েছে এবং সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের উভচর ট্যাঙ্ক জলে স্রোত ঠেলে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত পথ চলেছে।” ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে মার্শাল ভরােশিলফ এক বক্তৃতায় বলেন :- “উদ্ভাবনী শক্তিকে ধন্যবাদ। আরাে ধন্যবাদ যেসকল যান্ত্রিক ও সেনানী এই সকল যন্ত্রের সাহায্যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। আমাদের ট্যাঙ্কচালকগণ অনায়াসে তাঁদের ট্যাঙ্কগুলিকে জলাভূমি দিয়ে সাফল্যের সহিত চালিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, অথচ সেগুলি অলাভূমিতে চালাবার জন্য মােটেই তৈরী হয়েছিল না। তারা উভচর ট্যাঙ্ক নিয়ে নদী, হ্রদ, এমন কি ছােটখাট উপসাগর পর্যন্ত পার হয়েছেন। এমন সুদক্ষ ট্যাঙ্কচালক আমাদের বহু রয়েছেন।” 'মার্শাল ভরােশিলফ যা বলেন, চেক সমরবিশারদ জেনারেল লুজা, ফরাসী সেনানীমণ্ডলীর অধ্যক্ষ জেনারেল ভাইসগথ এবং বৃটিশ সেনানায়ক কর্ণেল মার্কেলের উক্তিতেও তারই সমর্থন পাওয়া যায়। তারা সকলেই একবাক্যে সােভিয়েট ট্যাঙ্কবাহিনীর উচ্ছসিত Rলা করেন। তারপর সােভিয়েট বিমানসেনাও নানাভাবে সুশিক্ষিত হয়ে ওঠে। সাহসে, সহিষ্ণুতায়, যান্ত্রিক নৈপুণ্যে এবং পর্যটনকৌশলে তাদের খ্যাতি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। সুমেরু অঞ্চল অভিযানে সােভিয়েট বৈমানিকগণ যে অসম সাহস ও নৈপুণ্যের পরিচয় দেয় সেকথা কে না। জগতের বিভিন্ন বিমান প্রতিযােগিতায়ও সােভিয়েট । বৈমানিকগণের যখেতিবের পরিচয় পাওয়া যায়। সুমেরু অঞ্চল জয়ের সঙ্গে সােছিয়ের দশক্ষার যােগযােগ যথেষ্টই রয়েছে। মেরু
সরপ্রস্তুতি
অঞ্চল গত কয়েক বছর রুশ বৈমানিকদের একটি প্রধান শিক্ষাস্থল
হয়ে ওঠে। সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে হাজার হাজার মাইল অতিক্রম
করা এবং উত্তর মহাসাগরের ঝড়বায়ুব মধ্য দিয়ে বিমানচালনা
যাদের পক্ষে সহজসাধ্য হয়ে ওঠে, বলা বাহুল্য, য়ুরােপের যে কোন
আবহাওয়ায়ই তারা বিমানচালনায় সক্ষম। ১৯৩৫ খৃষ্টাবে এই
সােভিয়েট উভচর ট্যাঙ্ক।আর ও খালে এই ট্যাঙ্ক সমভাবেই চলতে পারে।
মেরু-অভিযান সম্পর্কে গেল দেশরক্ষা বিভাগের একখান্দি মুখপত্রে
বা আমাদের দেশরক্ষাব্যবস্থা মুমূঢ়
“সুমেরু অঞ্চল জয়
করছি।”
বিমানবিদ্যার প্রতি জন
কর্তৃপক্ষ আপ্রাণ চেষ্টা করে
অনুরাগী কার জন্য সােতিরেট,
লেখাৰে সংখ্য নারী বৈমানিক
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট " রয়েছে। এমন কি শিশুদের খেলনাগুলি পৰ্যন্ত নানা মডেলের বিমানাকারে প্রস্তুত হয়। কাজেই শৈশব হতেই সেখানে বিমান সম্বন্ধে লােকের মনে আগ্রহ জাগে। নানা প্রকার বিমান ক্লাব স্থাপন, গ্লাইডার চালনা, প্যারাশুটে অবতরণ শিক্ষাদান প্রভৃতি নানাভাবেই সেখানে বিমানবিদ্যা সম্প্রসারিত করা হয়। ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে সােভিয়েট সরকার তাদের সঙ্কল্প ঘােষণা করেন যে, অন্তত দেড় লক্ষ সমরক্ষম বৈমানিক শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাতেই বােঝা যায়, সেখানে বিমানবল সৃষ্টির জন্য কিরূপ চেষ্টা করা হয়। জার্মান বিমানদপ্তরের মুখপত্রে কর্ণেল ফন বুলাও ১৯৩৫ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে লিখেন :- “সম্প্রতি কয়েক বছরে সােভিয়েট রুশিয়ার বিমানবল এত বাড়ান হয়েছে যে জগতে তার সমকক্ষ কেউ নেই। বিমানবলই সােভিয়েট রুশিয়ার সামরিক শক্তির প্রাণকেন্দ্র।” ১৯৩৫ খৃষ্টাব্দের পরও যে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ পূর্ণোদ্যমেই সম- রায়ােজন করেছেন সেকথা আগেই বলেছি। কাজেই বিমানবলে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র জার্মানীর তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী না হলেও যে রুশ-জার্মান যুদ্ধের আগেই তার সমকক্ষ হয় তা একরূপ নিঃসন্দেহেই বলা চলে। রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার অব্যবহিত পর বৃটিশ বিমানবিশেষজ্ঞ মেজর অলিভার স্টুয়ার্ট এক বেতার বক্তৃতায় বলেন :- “জার্মানরা যান্ত্রিক নৈপুণ্যের দিকে অত্যধিক জোর দেয় একথা সত্য; কিন্তু রুশগণ যে অন্যান্য জাতির তুলনায় উদ্ভাবনী শক্তিতে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ তাও অস্বীকার করা যায় না। প্যারাশুট বাহিনী গঠনের বুদ্ধি রুশগণের মাথায়ই প্রথম খেলে। সৈন্য ও ট্যাঙ্কবাহী বিমানচালনাও তারাই প্রথম পরীক্ষা করে দেখে। অতিকায় বিমান নির্মাণেও তারাই অগ্রণী । কেবল সংখ্যা দ্বারা এই উভয় দেশের = সরপ্রস্তুতি নিবলের তুলনামূলক বিচার করা যায় না। উরাল পর্বতে রুশগণ গগাপনে তাদের বিমানশক্তি গড়ে তুলেছে। কাজেই যান্ত্রিক নৈপুণ্যের দিক দিয়েও তাদের তাক লাগাবার মত কোন বৈশিষ্ট্য থাকা কিছু অসম্ভব নয়।” তাক লাগাবার মত নতুন কিছু না থাকলেও বিপক্ষকে প্রতিহত করার মত বিমানশক্তি যে সােভিয়েট রুশিয়ার ছিল, রুশ রণাঙ্গনে তার যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে। রণনীতি জারের আমলের সেই প্রাচীন রুশ রণনীতির অবসান ঘটে সােভিয়েট আমলে ফুশিয়ার স্ট্র্যাটেজী কিভাবে বদলে যায় এবার তাই বলব। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক স্ট্র্যাটেজীর উন্নতি বিধানে দুটি বিষয় বিশেষ সাহায্য করে। তার গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক রণবিদ্যাশিক্ষার অনুকূল আবহাওয়া। রুশিয়ার গৃহযুদ্ধে লাল ফৌজের নায়কগণ নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভের বিশেষ সুযোেগ পান। তার ফলে তাদের পক্ষে বাইরের কতকগুলি মরচে ধরা রণপ্রথার প্রভাবমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরণে সৈন্যদল গঠন করা সম্ভব হয়। কোন বাঁধাধরা পথে নয়, সম্পূর্ণ বৈপ্লবিক পন্থায় প্রয়ােজনের তাগিদে লাল ফৌজ গড়ে ওঠে। প্রথম অবস্থায় লাল ফৌজের রণকৌশল যে খুব উচ্চাঙ্গের ছিল তা নয়, কিন্তু স্ট্র্যাটেজী বা রণনীতিজ্ঞান যে তাদের আগাগােড়াই ভাল ছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। তারপর ১৯২৯ খৃষ্টাব্দ হতে যন্ত্রসজ্জার দিকে মন দিয়ে সােতিয়েট সেনাপতিগণ লাল ফৌজকে আধুনিক রণবিদ্যম এমন ভাবে সুশিক্ষিত করে তােলেন যার ফলে তাঁদের স্ট্র্যাটেজী বিপ্লব ঘটে। অনেকের অনুমান ১৮ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট লাল ফৌজকে দেখেই জার্মানরা আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার প্রেরণা পায়। কেবল অনুমান নয়, একথা সত্য যে লাল ফৌজের শক্তিশালী বিমান- বাহিনী, মােটর ও যন্ত্রসজ্জা এবং আধুনিক যুদ্ধের বহু উপকরণ দেখে কয়েক বছর পরে বিভিন্ন দেশ তাদের সেনাদলে সেইগুলির প্রবর্তন করে। এমন কি হিটলারও লর্ড লণ্ডনডেরীকে সময় বলেছিলেন :- “সােভিয়েট রুশিয়া কেবল সামরিক বলে শ্রেষ্ঠত্বই অর্জন করে নি ; তার সঙ্গে রয়েছে এক নতুন সামরিক ভাবধারা।” দেশের জলবায়ু, ভৌগােলিক অবস্থান, জনবল, অস্ত্রবল, পথঘাট, যানবাহন প্রভৃতি অবলম্বনে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের যে নিজস্ব স্ট্র্যাটেজী গড়ে ওঠে তা একটা নির্দিষ্ট রূপ নেয় ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দে। রাজনৈতিক লক্ষ্য আত্মরক্ষাত্মক হলেও সােভিয়েট রণনীতি আক্রমণাত্মক। রণনীতি আক্রমণাত্মক হলেই যে পররাজ্য আক্রমণ করতে হবে এমন কোন কথা নেই। এখানেই ফাসিস্ত রাষ্ট্র ও সাম্যবাদী সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে পার্থক্য। জার্মানীর রণনীতিও আক্রমণাত্মক , কিন্তু সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের মত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার নীতি আত্মরক্ষাত্মক নয়। কাজেই জার্মানী তার আক্রমণাত্মক রণনীতিকে রাজনৈতিক অভীষ্টলাভের জন্য পররাজ্যগ্রাসের অস্ত্ররূপে ব্যবহার করে এবং তার সমপ্রতিই সেই উদ্দেশ্যপ্রণােদিত। পক্ষান্তরে দেখা যায়, প্রথম হতেই সােভিয়েট শক্তিকে গলা টিপে মারবার জন্য বার হতে নানারূপ চক্রান্ত চলে এবং পূবে জাপান ও পশ্চিমে জার্মানী অহরহ তাকে আক্রমণের ভয় দেখায়। এই আক্রমণের ভয় ছিল বলেই পাণ্টা ঘা দিবার জন্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল সমরায়ােজন করতে হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরক্ষার জন্যই সামরিক ব্যাপারে সমরপ্রস্তুতি আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ না করলে কি শােচনীয় ফল দাঁড়ায় ফ্রান্সের পরাজয় তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। অতএব লাল ফৌজ সােজামুজি যুদ্ধে প্রচণ্ড পাল্টা ঘা দিয়ে শনিধনের স্ট্র্যাটেজী অবলম্বন করে। তার সামরিক বিধানেই বলা হয় - “লাল ফৌজের সামরিক তৎপরতা হবে শত্রুকে ধ্বংস করা। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে যদি কখনাে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয় তবে তখন তার মূল লক্ষ্য হবে চূড়ান্ত জয়লাভ এবং শত্রুকে একেবারে পর্যুদস্ত করা।••••• প্রতি- পক্ষের ব্যুহের গভীর প্রদেশে চলে। তাদের পরিবেষ্টিত ও গিয়ে ধ্বংস করতে হবে।” এ হতে বােঝা যায়, সােভিয়েট রণনীতি যুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য হাত পা গুটিয়ে কুর্মাবতার সাজ- বার পক্ষপাতী নয়। সােভিয়েট দেশরক্ষা পরিষদের সদস্য ম: ম্যালেঙ্কফ শত্রু আক্রমণ করতে এলে তাকে প্রচণ্ড বেগে গিয়ে পাল্টা ঘা দিতে হবে। এজন্যই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র তার সমস্ত বাহিনীকে দ্রুত গতিশীল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। লাল ফৌজের নায়করা আত্মরক্ষার বাহিনী ও আক্রমণের বাহিনীর প্রাচীন সংজ্ঞা ছেড়ে দেন এবং রণকৌশলেও আক্রমণ এং আত্মরক্ষার পুরাতন পার্থক্যটাকে মহাযুদ্ধে সােভিয়েট বিদায় করেন। তারা মনে করেন, সাফল্যের সহিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হওয়াই আত্মরক্ষার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। আধুনিক বাহিনী- গুলি প্রধানতই আক্রমণের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত ; অতএব আত্মরক্ষার জন্য সেই আক্রমণের বাহিনীগুলিরই সাহায্য নিতে হবে। তবে কোন বাহিনীর ওপরই বেশী জোর দিলে চলবে না। সমবেতভাবে সকল বাহিনী একসঙ্গে প্রয়ােগ করে প্রতিপক্ষকে প্রচণ্ড ঘা দিতে হবে । অনেকদিন আগেই তাদের আক্রমণনীতি বর্ণনায় বলা হয় - “প্রত্যেক বাহিনীর বৈশিষ্ট্য ও রণশক্তির কথা বিশেষ ভাবে বিবেচনা করে রণাঙ্গনে তা নিয়ােজিত করতে হবে এবং প্রত্যেক বাহিনীকেই অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে যথাসম্ভব ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ রক্ষা করে লড়তে হবে। তাছাড়া রণাঙ্গনে এমন সুযােগ দেখে প্রত্যেক বাহিনীকে নিয়ােজিত করতে হবে যাতে সে যুদ্ধে পূর্ণ রণশক্তি প্রয়ােগের সুবিধা পায়। অতএব দেখা যায়, লাল ফৌজের অধিনায়ক আধুনিক যুদ্ধের একটা বাস্তব রূপ বহু পূর্বেই সম্যক ধারণা করতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে কেউ কেউ বা ঠকে শিখে, সােভিয়েট নায়কগণ পূর্বাহেই তা বুঝতে পারায় লাল ফৌজকে ঠিক তেমনি ভাবে তারা আধুনিক যুদ্ধের উপযােগী করে গড়ে তােলেন। লাল ফৌজে বিভিন্ন বাহিনীর কার্যভার এভাবে বন্টিত হয় - স্বতন্ত্র ট্যাঙ্কবাহিনীতে থাকবে বিস্তৃত অঞ্চলে আক্রমণ চালাবার জন্য বহু ট্যাঙ্ক ইউনিট এবং মােট সঁজোয়া ইউনিট। সেই সমন্তের পশ্চাতে যাবে মােটরবাহিত পদাতিক ও মােটরবাহিত গােলন্দাজ- বাহিনী। প্রথমােক্ত ট্যাবহরের কাজ হবে প্রতিপক্ষের প্রধান যােগাযােগ পথে হানা দেওয়া, বিপক্ষের রিজার্ভ বাহিনী ও সেনা- সমরপ্রস্তুতি নায়কদের উপর বিধ্বংসী আঘাত করা, প্রধান গােলন্দাজ বাহিনীকে বিনাশ করা এবং মূলবাহিনীর পশ্চাদপসরণের পথ বন্ধ করা। মােটর- সঁজোয়া ইউনিটগুলির কাজ হবে হবে বিপক্ষের পশ্চাদপসরণকারী সেনাদের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করা এবং পশ্চাৎ দিক হতে আক্রমণ করে তাদের আঁটি হতে বিচ্ছিন্ন করা। বিমান বাহিনী অগ্রবর্তী ট্যাঙ্কগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যােগাযােগ রক্ষা করে যুদ্ধ করবে। এগিয়ে গিয়ে বিপক্ষের ব্যুহাভ্যন্তরেও সেগুলি আক্রমণ চালাবে। বােমা ফেলে বিপক্ষের যােগসূত্র ছেদ, কূহের পশ্চাৎদিকস্থ ঘটি হতে শত্রুকে বিচ্ছিন্নকরণ এবং তার সরবরাহ বন্ধের চেষ্টা করাও হবে বিমান বাহিনীর কাজ। গােলন্দাজ বাহিনী কামান দেগে যে কেবল বিপক্ষের অগ্রগতিই রােধ করবে এমন নয়, লাল ফৌজের গােলন্দাজ বাহিনীতে দূরপাল্লার সব কামান থাকবে যেগুলির সাহায্যে বিপক্ষের ব্যুহের অভ্যন্তরস্থিত রিজার্ভ বাহিনী, সেনানায়কদের হেড কোয়ার্টার, পশ্চাৎ- দিক যানবাহন এমন কি কামানশ্রেণীর ওপর পর্যন্ত প্রচণ্ড ভাবে গােলাবর্ষণ করা চলবে। আর কামানগুলিকে একস্থানে বসিয়ে গােলা দাগ হবে না; সেগুলিকে যত্রতত্র নিয়ে যাবার জন্য মােটরযানে স্থাপিত করা হবে। কাজেই অগ্রগামী সৈন্যদের সেইগুলি বিশেষ সহায়তা করতে পারবে। এভাবে সকল বাহিনী নিয়ে একযােগে শত্রুর ওপর চূড়ান্ত আক্রমণের বর্ণনা দিতে গিয়ে লাল ফৌজের একখানি মুখপত্রে বলা হয় :- “শত্রু পরাজিত হয়ে তার, সেনা, অস্ত্রশস্ত্র এবং রসদাদি বাঁচাবার জন্য পশ্চাদপসরণের চেষ্টা করছে। তার আগেই তার আগেই আমাদের অগ্রবর্তী এমন মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ট্যাঙ্ক ও বিমান বাহিনী প্রতিপক্ষের সম্মুখসেনার পশ্চাতে বহু দুরে চলে যাবে এবং সেখানে গিয়ে তাদের পশ্চাদপসরণের পথ বিচ্ছিন্ন করবে। বিপক্ষের বাহিনী তখন দেখবে চারদিক থেকেই তাদের ওপর আক্রমণ চলছে ; কেন না আমাদের সৈন্যরা তার আগেই তাদের পশ্চাদ্দেশে চলে গেছে এবং তাদের পার্শ্বদেশ ভেদ করে ঢুকে পড়েছে। সেই অবস্থায় বিপক্ষ মনােবল হারিয়ে ফেলবে। আমাদের সৈন্যরা তাদের ৯ রাইফেল-চালনায় সােভিয়েট জনসেনা বেড়াজালে ফেলে চারদিক থেকে এমন ভাবে চাপ দেবে যার ফলে তারা অত্যাগে বাধ্য হবে।” অতএব দেখা যায়, পশ্চাদ্দিকে যােগসূত্র ছিন্ন করে অকস্মাৎ পার্শ্বদেশ হতে আক্রমণ করত শত্রুকে ঘিরে ফেলে অস্ত্রত্যাগে বাধ্য করার যে কৌশল হিটলারের বাহিনী দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে দেখায়, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের লাল ফৌজ সেই কৌশলে বহু আগেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
সমরপ্রস্তুতি ১০৩ সসাভিয়েট স্ট্র্যাটেজীর আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, জার্মানদের মত অকস্মাৎ আক্রমণ এবং তড়িৎগতিতে যুদ্ধে ফললাভের স্বপ্ন লাল ফৌজ কখনাে দেখে না। অর্থাৎ যুদ্ধে চটক দেখাবার প্রবৃত্তি তাদের কম। তাদের মতে আকস্মিক আক্রমণ ও “স্ট্র্যাটেজিক” আক্রমণের মধ্যে পার্থক্য আছে। যুদ্ধকে তারা একটা তাড়াতাড়ির ব্যাপার বলে মনে করে না। অনেকগুলি অবস্থার ওপর ট্র্যাটেজী নির্ভর করে। তাড়াহুড়াে করে অপ্রত্যাশিত ফললাভের আকাঙ্ক্ষা করে তারা বরঞ্চ এটাই ধরে নেয় যে, যুদ্ধ দীর্ঘকাল চলবে এবং শত্রু যথাশক্তিতে পড়বে। এসম্বন্ধে একজন সােভিয়েট সমরবিশেষজ্ঞের অভিমত এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। তিনি বলেন- “আধুনিক যুদ্ধ মুষ্টিযুদ্ধের প্রতিযােগিতা নয় যে অপেক্ষাকৃত ওস্তাদ ব্যক্তি তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে অকস্মাৎ এক ঘায়ে ধরাশায়ী করবে। যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে তাকে নতজানু করতে হলে অবিরাম শক্তি ও সামর্থ্য ঢেলে যেতে হবে।” পক্ষান্তরে দেখা যায়, জার্মান স্ট্রাটেজীর মূলেই রয়েছে শত্রুকে অকস্মাৎ আক্রমণ করে অত্যল্পকালের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করা। এই নীতিকে ভিত্তি করেই জার্মান ‘ব্লিটজীগের’ উদ্ভব। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজী ঠিক এর বিপরীতধর্মী। যুদ্ধ দীর্ঘকাল চলতে পারে এ মনে করেই সে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং সেই ভাবেই তার সমর প্রস্তুতি। তার সমর্থক অর্থনীতি এবং শিল্পব্যবস্থাও সেই নীতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত। মনােবল লাল ফৌজের কষ্টসহিষ্ণুতা, ও মনােবল সম্বন্ধে এবার সংক্ষেপে কিছু বলা যেতে পারে। বেশী আগের দিকে গিয়ে লাভ নেই।
১০৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ফিনল্যাণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধ হওয়ার পর রুশ-জার্মান যুদ্ধের প্রাক্কাল পর্যন্ত সােভিয়েট সামরিক কর্তৃপক্ষ লাল ফৌজকে কষ্টসহিষ্ণু করে তােলবার জন্য যেভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন, দু’চার কথায় না বললেই চলবে। সামরিক কর্তৃপক্ষ স্থির করেন, কার্যত যেভাবে আধুনিক যুদ্ধ হয় ঠিক সেই অবস্থার মধ্যে রেখে সৈন্যদের ট্রেনিং দিতে হবে। প্রায় এক বছর এভাবে তাদের ট্রেনিং চলে। রণাঙ্গনে যেমন অবস্থা হয় তেমন অবস্থায় থেকে নবাগত সৈন্যরা সামরিক শিক্ষা লাভ করে। রাত্রে ঘুমিয়ে আছে, হঠাৎ তাদের মার্চ করার ডাক পড়ল ; শীতকালীন অভিযানে যাতে তারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে সেজন্য তুষারাবৃত মাঠে তাদের সারারাত কাটাবার আদেশ হল; সারাদিন হয়ত তারা শিবিরের বাইরেই রইল ; শীতে কাতর না হয় সেজন্য সকাল বেলা প্রত্যেকের জন্য ঠাণ্ডা জলে স্নানের ব্যবস্থা হল। এভাবে নানারূপ কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সােভিয়েট সৈন্যরা সকল অবস্থায়ই যুদ্ধ করার মত যােগ্যতা লাভ করল। কেবল তাই নয়। মার্চ করে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে যেখানে যেমন মালমসলা জুটবে তা দিয়েই অফিসার ও সৈন্যদের একযােগে কিভাবে সৈন্যাবাস নির্মাণ করতে হবে, তাও তারা শিখল। তাছাড়া রণক্ষেত্রে নিজেদের রান্না যাতে নিজেরা করতে পারে তার জন্য তারা প্রত্যেকেই রাধতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠল। লাল ফৌজ বরফের ওপর দিয়ে স্কী-চালনায় কিরূপ নৈপুণ্য অর্জন করে উত্তরকালে রুশ রণাঙ্গনে তার পরিচয় ভালভাবেই মিলেছে। এ গেল তাদের কষ্টসহিষ্ণুতার কথা। তাদের মনােবল সম্বন্ধে কিছু বলতে হলেই প্রথমে বলা দরকার যে, সৈন্যদের মনােবল প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত, অফিসার তথা কর্তৃপক্ষ সমপ্রস্তুতি তথা গবর্ণমেন্টের প্রতি সাধারণ সৈন্যদের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। দ্বিতীয়ত, যে কারণে যুদ্ধ হচ্ছে সেই কারণের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবনের যােগাযােগ ও সমস্যার সমাধানে তার নিজের দায়িত্ববােধ। সেজন্য চাই যথেষ্ট রাজনৈতিক চেতনা। সােভিয়েট লাল ফৌজ যে জগতে মস্কোতে বিংশ বিপ্লব বার্ষিক উৎসবে উজবেকীস্তানের তরুণীদল। এদের মায়েরাই একসময় বােরখা পরে বেরুত। রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধলে এইসব তরুণীর দল লাল ফৌজকে নানাভাবে সাহায্য করে। সর্বাপেক্ষা রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন বাহিনী তা বােধ হয় না বললেও চলে। সাধারণত যেসব কারণে অফিসারদের প্রতি সাধারণ সৈন্তগণের শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস থাকে না, লাল ফৌজ তা থেকে এক রকম ষােল আনা মহাযুদ্ধে সােভিয়েট মুক্ত বললেই চলে। পুঁজিতন্ত্রী দেশগুলিতে প্রধানত অভিজাত ও ধনীর দুলালরাই সৈন্যদলে বড বড পদগুলি দখল করে থাকেন । সাধারণ সৈন্যরা যােগ্যতা দেখিয়ে পদোন্নতির সুযােগ খুব কমই পায়। তারপর সাধারণ সৈন্য ও অফিসারদের জীবনযাত্রার মান এত বেশী পৃথক থাকে যে, সাধারণ সৈন্যদের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই তা ঈর্ষার কারণ হয়ে দাড়ায়। লাল ফৌজে এর প্রশ্রয় খুবই কম। যােগ্যতা অনুসারেই সেখানে পদোন্নতি হয় এবং সাধারণ সৈন্য ও অফিসারের বেতন এক না হলেও এমন কোন আকাশপাতাল পার্থক্য তাতে নেই যা ঈর্ষার কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। কিভাবে পদোন্নতি ব্যাপারে যােগ্যতার সমাদর করা হয় নিমের ব্যাপার থেকেই তা বােঝা যাবে। অনেক সময়ই কোনখানে একটা যুদ্ধ হয়ে যাবার পর যখন তাতে একটু ঢিলা পড়ে এবং সৈন্যরা বিশ্রামের জন্য শিবিরে ফিরে যায় তখন বিশ্রামশিবিরে সেই যুদ্ধ নিয়ে আলােচনা হয়। তাতে প্রত্যেক সৈন্তই যােগ দিতে পারে। তার স্বপক্ষের দোষগুণ নিয়ে আলােচনা করে এবং কোন কোন ব্যাপারে তীব্র সমালােচনাও হয়। সেই আলােচনায় যারা সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি ও সামরিক জ্ঞানের পরিচয় দেয় তারাই পদোন্নতি লাভ করে। একজন সাধারণ সৈনিকও এরূপে নায়কের পদ পেয়ে যেতে পারে। যােগ্যতার এভাবে সমাদর করা হয় বলেই লাল ফৌজের নায়কগণ ও সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে সৌহার্দ্যের ভাব খুব বেশী এবং তাদের সকলের মধ্যেই সৈনিকসুলভ মনােভাব প্রবল। বলা বাহুল্য, এই সৈনিকসুলভ মনােভাবের ওপরই সৈন্যদলের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা এবং সর্বোপরি তাদের রণনৈপুণ্য বহুলাংশে নির্ভর করে। এর পর দ্বিতীয় প্রশ্ন হল সৈন্যরা কিসের জন্য লড়বে ?
সমরপ্রস্তুতি ১৭ সঙ্গে এ প্রশ্নটাও বিজড়িত থাকে যে, একজন সৈন্য যখন তার রাষ্ট্রের জন্য লড়বে তখন রাষ্ট্র সেই সৈন্যের ও তার পরিবারের জন্য কি করবে ? বেতন, পদোন্নতি এবং পােষ্যবর্গের ভরণপােষণ রক্ষণাবেক্ষণের প্রশ্ন তাতে ওঠে। কোন সৈন্য যদি নিশ্চিন্ত হতে পারে যে, অক্ষম হয়ে পড়লে সে পেন্সন পাবে বা মারা গেলে তার পােষবর্গের ভরণপােষণের ব্যবস্থা রাষ্ট্র করবে তবে স্বভাবতই রণক্ষেত্রে তার মনােৰল বেশী হবে। সােভিয়েট সৈন্য যে এ সম্বন্ধে একরূপ নিশ্চিন্ত বলাই বৃথা। রণাঙ্গনে গিয়ে কেউ একেবারে অক্ষম হয়ে পডলে পূর্ণ বেতনে তাকে পেন্সন দেওয়া হয়। কেউ আংশিক ভাবে অকর্মণ্য হয়ে পড়লে সে আংশিক বেতন ভাতা হিসাবে পায়। আর যুদ্ধে কেউ মারা গেলে তার পােয়বর্গকে পেন্সন-হিসাবে পুরা বেতন দেওয়া হয়। অবশ্য যুদ্ধে যাওয়ার আগে যার যেমন রােজগার তেমন হারেই কর্তৃপক্ষ পেন্সন ও ভাতার ব্যবস্থা করেন। সৈন্যের পােয়বর্গের মধ্যে ধরা হয় তার নাবালক ছেলেপিলে ও ভাইবােন, স্ত্রী, ষাট বছরের বেশী বয়স হলে বাপ এবং পঞ্চান্ন বছরের উধ্বে হলে মা। রাষ্ট্র থেকে সরাসরি তাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা তত করা হয়ই। তাছাড়া ট্রেড য়ুনিয়ন এবং যৌথ খামার হতেও তাদের অনেক সময় সাহায্য করা হয়। এমন কি রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার পর বিদ্যালয়ের ছাত্ররা পর্যন্ত সৈন্যদের স্ত্রীপুত্ৰপরিজনকে সাহায্যের জন্য সমিতি গঠন করে। অতএব সােভিয়েট সৈন্য জানে যে, দেশের জন্য লড়তে গিয়ে যদি তার জীবন যায় তবে দেশও তার পরিবারকে রক্ষার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। আহত সৈন্যের পেন্সন এবং নিহত সৈন্তের পরিবারবর্গের ভরণ- পােষণের ব্যবস্থা পুজিতন্ত্রী দেশগুলিতেও করা হয়। সুতরাং এ সম্বন্ধে ১০৮ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট নিশ্চয়তাই লালফৌজের পক্ষে একটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল এই—সে জানে যে কিসের জন্য সে লড়ছে, তার শত্রু কারা এবং রাজ- নৈতিক সমস্যাই বা কি ? এই রাজনৈতিক চেতনাই লাল ফৌজের এক প্রধান অস্ত্র ও বৈশিষ্ট্য। সাধারণ অধিবাসীদের ন্যায় সােভিয়েট সৈন্যরাও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমান অধিকার ভােগ করে থাকে। কিন্তু অধিকাংশ দেশেই সৈন্যদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক এর বিপরীত। সৈন্যদের কেবল রাজনৈতিক জ্ঞানলাভ ও রাজনীতি সম্পর্কে আলােচনায় উৎসাহিতই করা হয় না, পরন্তু লাল ফৌজের কর্তৃপক্ষ তা একান্ত আবশ্যক বলে মনে করেন। সেজন্যই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোন দেশের সঙ্গে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের কখন কিরূপ সম্পর্ক দাড়ায়, সেই সম্বন্ধে বক্তৃতা ও আলােচনার দ্বারা সােভিয়েট সৈন্যদের সর্বদা ওয়াকিফহাল রাখা হয়। তাতে তার বুঝতে পারে কে যথার্থ শত্রু এবং কে যথার্থ মিত্র। তাছাড়া কিসে বিপদ আসতে পারে সে সম্বন্ধেও তারা সম্পূর্ণ সচেতন থাকে। সৈন্যদের মধ্যে এই রাজনৈতিক চেতনাবৃদ্ধির জন্যই লাল ফৌজে 'পলিটিক্যাল কমিসার’ প্রথা প্রবর্তিত হয়েছিল। সামরিক শিক্ষার ভার ছিল সেনাপতিদের হাতে এবং রাজনৈতিক শিক্ষার ভার ছিল ‘পলিটিক্যাল কমিসারদের হাতে। ১৯৪২ খৃষ্টাব্দের মাঝামাঝি পলিটিক্যাল কমিসার’ প্রথা এই বলে তুলে দেওয়া হয়েছে যে, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রবাসীরা এখন এতখানি রাজনৈতিক চেতনা লাভ করেছে যাতে সৈন্যদলে ভর্তি হলে তাদের জন্য আর পৃথক ভাবে রাজনৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা না করলেও চলে। এতব্যতীত জারের আমলের যেসকল সেনাপতি লাল ফৌজে যােগ দিয়েছিলেন তাঁর প্রথম দিকে সৈন্যদলে রাজনৈতিক শিক্ষার আবশ্যকতা তেমন উপলব্ধি করেন নি এবং তাতে তাদের বিশেষ সমপ্রস্তুতি আস্থাও ছিল না। কিন্তু এখন তারা সৈন্যদের রাজনৈতিক চেতনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং তাদের মনে যেসকল সন্দেহ ছিল এতদিনে তার নিরসন হয়েছে। কাজেই সেনাপতিরাই বর্তমানে সামরিক ও রাজনৈতিক শিক্ষাদানের দায়িত্ব গ্রহণে সম্পূর্ণ সক্ষম। লাল ফৌজ গঠনের মূলে রয়েছে এই ধারণা, যে চিন্তা করতে পারবে সেই ভাল যােদ্ধা হবে। সৈন্যদের প্রশ্ন করার কিছু নেই, নির্বিচারে যুদ্ধ করা ও মরাই তাদের কাজ-লাল ফৌজের মধ্যে এ ধারণা মােটেই নেই। সােভিয়েট কতৃপক্ষ মনে করেন, সৈন্যরা অন্ধ আজ্ঞাবহ না হয়ে যদি যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারে কিসের জন্য ও কেন তারা লড়ছে—তবেই তারা যুদ্ধে বেশী বল পায়। উদ্যম, বিচারশক্তি ও আত্মপ্রত্যয়ই লাল ফৌজের প্রধান গুণ। এই গুণাবলীর বিকাশের জন্যই চিন্তা করতে, রাজনৈতিক প্রশ্ন বুঝতে, দেশের রাজনৈতিক জীবনে অংশ গ্রহণ করতে এবং যুদ্ধ সম্বন্ধে আলােচনা ও স্বাধীন মতামত প্রকাশে তাদের উৎসাহিত করা হয়। এই বাস্তববােধই রণক্ষেত্রে তাদের মনােবল রক্ষার প্রধান সহায়।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের গ্রীষ্মকাল আসতেই চারদিকে খবর রটতে লাগল যে, ফিনল্যাণ্ড, পােলণ্ড ও রুমানিয়ায় বিপুল জার্মান সৈন্য সন্নিবেশ করা হয়েছে এবং অপর দিকে সােভিয়েট কতৃপক্ষও উত্তরে বণ্টিক সাগর থেকে দক্ষিণে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত সুদীর্ঘ সীমান্তে ব্যাপক ভাবে সৈন্য আমদানী করেছেন। উভয় দেশের মধ্যে মনােমালিন্য চলেছে বলে অনেক খবর প্রকাশ পেল ; কিন্তু ২০শে জুনও সােভিয়েট সরকারী সংবাদসরবরাহ প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে বলা হল যে, উভয় দেশের মধ্যে মৈত্রী কোন ভাবে ক্ষুন্ন হয় নি বা হওয়ার কিছু আশঙ্কাও নেই। কিন্তু ২২শে জুন সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে কোনরূপ চরমপত্র না দিয়েই প্রায় দু’শ ডিভিসন জার্মান সৈন্য অকস্মাৎ তাকে আক্রমণ করে বসল এবং তার পরশ' মাইল ব্যাপী দীর্ঘ সীমান্তে এক বিরাট অভিযান চালাল। জার্মান বিমান বাহিনী সীমান্তস্থিত বিমানঘাটি- সমূহ এবং কিয়েফ ও অন্যান্য সহরে হানা দিয়ে সােভিয়েট পক্ষকে এই আক্রমণের বার্তা প্রথম জানাল। সেদিনই সন্ধ্যাবেলা বৃটিশ প্রধান মন্ত্রী মিঃ চার্চিল এক বেতার-বক্তৃতায় ঘােষণা করলেন যে, বৃটেন এযুদ্ধে যথাসাধ্য রুশিয়াকে সাহায্য করবে। অব্যবহিত পরেই বৃটিশ সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদল মস্কো রওনা হলেন। প্রতিপক্ষকে কোনরূপ চরমপত্র না দিয়ে করলে আক্রমণকারীরা প্রথম দিকে কিছু সুবিধা পাবেই। কাজেই বুল্টিক থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত সুদীর্ঘ রণাঙ্গনের সর্বত্রই জার্মান যান্ত্রিক অতর্কিতে আক্রমণ রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাহিনীর সেই সুবিধা হতে লাগল। অবশ্য আক্রমণের প্রথম ধাক্কা গেল সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভূত নতুন এলাকায়। আগেই বলেছি, ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানরা পােলাণ্ড আক্রমণ করার পর সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্র আত্মরক্ষার জন্য তার সীমান্ত কিছু সম্প্রসারিত করে। ফিনল্যাণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধ হয়ে গেলে লেনিনগ্রাডের " সামরিক পরিচ্ছদে একদল সােভিয়েট নারী উত্তরে লাডােগা হ্রদের চতুর্দিকস্থ এলাকা সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভূত করা হয়। ১৯৪০ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে তিনটি বণ্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়া সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে যােগ দেয়। পােলাণ্ডের পশ্চিম অধাংশ যখন জার্মানদের হাতে যায় তখন মহাযুদ্ধে সােভিয়েট তার পূর্বাংশ সােভিয়েট সৈন্যরা দখল করে। এছাড়া ১৯৪০ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে রুমানিয়ার বেসারাবিয়া প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভূত হয়। জার্মান বাহিনীর প্রথম চাপ পড়ে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন এলাকায়। আক্রমণের প্রথম দিকে ফিনল্যাণ্ড মৌখিক নিরপেক্ষতা প্রকাশ করে; কিন্তু জার্মানরা ফিনল্যাণ্ড দিয়ে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবার অনুমতি পায়। কাজেই ফিনল্যাণ্ডের নিরপেক্ষতার মুখােস দেখতে দেখতেই খসে পড়ে এবং অচিরেই সে এই অভিযানে জার্মানদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যােগ দেয়। দক্ষিণে হাঙ্গারী এবং রুমানিয়ার সৈন্যরাও জার্মানদের পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। রুশ রণাঙ্গনে যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার এগার দিন পরই জার্মান ইস্তাহারে ঘােষণা করা হয়, “সাভিয়েট বাহিনীর প্রতিবােধশক্তি বিচূর্ণ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু একদিন বাদেই আবার বলা হয় যে, জার্মান সৈন্যদের প্রবল প্রতিরােধের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর পরে জার্মান ইস্তাহারগুলিতে এমন স্ববিরােধী ঘােষণা আরাে অনেকবারই করতে দেখা গেছে। কিন্তু সােভিয়েট বাহিনীর প্রতিবােধশক্তিকে বিচুর্ণ করা যে কি কঠিন ব্যাপার, পরে জার্মানরা ভালভাবেই তা টের পেয়েছে। রুশ-জার্মান যুদ্ধের মত এত অস্ত্রশস্ত্র ও জনবল নিয়ে এমন বিরাট যুদ্ধ পৃথিবীতে এ পর্যন্ত হয় নি। পনর শ’ মাইল দীর্ঘ রণাঙ্গনে লক্ষ লক্ষ লােক মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করে। অতি আধুনিক ও ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র- সমূহের এমন ব্যাপক ও সমবেত প্রয়ােগ ইতিপূর্বে আর কোথাও হয়েছে বলে শােনা যায় নি। আক্রমণের প্রথম দু’সপ্তাহের মধ্যেই সােভিয়েট পক্ষ ধাক্কা খানিকটা সামলে নেয় এবং ইত্যবসরে দেশের অভ্যন্তর হতে অজ। সৈন্য ও রুশ-জার্মান যুদ্ধ প্রচুর সমবােপকরণ বিভিন্ন রণাঙ্গনে আনিয়ে প্রতিপক্ষকে প্রবল বাধা ও পাল্টা ঘা দিতে সক্ষম হয়। ফলে জার্মানদের গতি অপেক্ষাকৃত মন্থর হয়ে আসে। এমন কি কয়েকদিন যুদ্ধ একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে গণ্ডীবদ্ধ ভাবে চলে বললেও অত্যুক্তি হয় না। জার্মান বাহিনী অবশ্য প্রাণপণে বিভিন্ন দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে, কিন্তু অগ্রসর হতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সােভিয়েট সেনার নিকট তাদের বাধা পেতে হয়। প্রথম ধাক্কায় কিছু এগিয়েই জার্মানরা প্রধানত তিনটি লক্ষ্য স্থির করে অভিযান চালায়। উত্তরে তাদের লক্ষ্য থাকে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধ নগর লেনিনগ্রাড দখল করা। এই নগর সােভিয়েট যুক্ত- রাষ্ট্রের একটি প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র। এ দখল করতে পারলে রুশদের বন্টিকে বেরুবার পথ বন্ধ হয়। এছাড়া বণ্টিক সাগরে যে সােভিয়েট নৌবহর আছে তাও অকেজো হয়ে পড়ে। জার্মানীর পক্ষে তা কম লাভের কথা নয়। এতদ্ভিন্ন আরাে উত্তরে গেলে রয়েছে প্রসিদ্ধ সােভিয়েট বন্দর মুরমান। উত্তর দিকে সেই তুষারমুক্ত সােভিয়েট বন্দর দখলের জন্যও জার্মানরা ফিনল্যাণ্ডের মধ্য দিয়ে কিনদের সাহায্যে এক অভিযান চালায়। লেলিনগ্রাডের দক্ষিণে জার্মান বাহিনী মিল্ক হতে যােলেনস্ক হয়ে মস্কো পৌছার চেষ্টা করে। স্নােলেনস্ক হতে মস্কোর দূরত্ব ২৫০ মাইল। ঘােলেনঙ্কের দিকে অগ্রসর হবার জন্য জার্মানরা দু’ বাহু প্রসার করে। তারপর আরও দক্ষিণে জার্মানদের লক্ষ্য হয় য়ুক্রেনের রাজধানী কিয়েফ। অবশ্য দক্ষিণে কৃষ্ণসাগরতীরবর্তী ডেসা বন্দরও তাদের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে ওঠে। প্রথম দিকে জার্মানরা চেষ্টা করেছিল প্যারাশুল নামিয়ে ক্রীট দ্বীপের মত ওডেসা বন্দরও দখল করা যায় ১১৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট কিনা; কিন্তু তাতে সাফল্যের সম্ভাবনা না দেখে তারা স্থলপথেই ওডেসা পৌছার চেষ্টা করে। উত্তরে লেনিনগ্রাডমুখী অভিযানে জার্মানরা ভিন-লেনিনগ্রাড রেলপথ ধরে এগিয়ে গিয়ে প্রথম ঘা খায় অষ্ট্ৰোফ ষ্টেসনের কাছে। সেখানে সােভিয়েট বাহিনীর সঙ্গে এক ভীষণ যুদ্ধে জার্মানদের প্রভূত ক্ষতি হয় এবং কিছুদিনের মত তাদের অগ্রগতি সেখানে থেমে যায়। সেদিকে যুদ্ধ তখনাে লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়ার বুকে। আরাে উত্তরে ফিনল্যাণ্ড হতেও সেই সময় লেনিনগ্রাড দখলের জন্য প্রবল চেষ্টা চলে। মধ্য রণাঙ্গনে অর্থাৎ মস্কোর দিকে অভিযানে জার্মানরা উত্তরে লেপেলের দিকে এক বাহু এবং তার দক্ষিণে বােক্রইস্কের দিকে আর এক বাহু বিস্তার করে। লেপেল অঞ্চলে উভয় পক্ষে এক বিরাট ট্যাঙ্কযুদ্ধ হয় এবং তাতে সােভিয়েট সেনা বিশেষ কৃতিত্ব দেখায়। জার্মানদের দক্ষিণ বাহু বেরেজিনা পার হয়ে নীপার নদীর তীরে গিয়ে পৌছে। নীপার নদী বােব্ৰুইস্ক হতে ৩০ মাইল পূবে। সেখানে নীপার পার হবার চেষ্টা করলে লাল ফৌজ জার্মানদের প্রবল বাধা দেয় এবং তাতে উভয় পক্ষের বিস্তর ক্ষতি হয়। প্রথম চেষ্টায় জার্মানরা নীপার নদী অতিক্রমে অসমর্থ হয়। তারপর পশ্চিম য়ুক্রেন অর্থাৎ সােভিয়েট অধিকৃত পােলাণ্ডের দক্ষিণাংশে প্রিপেট জলাভূমির দক্ষিণেও জার্মান পানৎসার’ বাহিনী* নির্মমভাবে আক্রমণ চালায়। তবে বিনা বাধায় তারা বেশীদূর অগ্রসর হতে পারে না। তারও দক্ষিণে বেসারাবিয়ায় প্রবল বাধা * জার্মান সারোয়া বাহিনী।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ বৃহ। সত্বেও জার্মান এবং রুমানীয় বাহিনী এগিয়ে চলে। বুকোভিনার অন্তর্গত সারনউটি দখল করার পর তারা গিয়ে নীষ্টার নদীর তীরে উপনীত হয়। এই এলাকায় যুদ্ধ চালাবার প্রধান দায়িত্ব পড়ে রুমানীয় বাহিনীর ওপর। ৮ই জুলাই জার্মানরা সর্বপ্রথম দাবী করে যে, নাৎসী বাহিনী ষ্ট্যালিন লাইনের কয়েক স্থান ভেদ করেছে এবং তাদের বিমানবাহিনী সােভিয়েট সৈন্যদের রসদ বন্ধ ও যােগাযােগ ছিন্ন করার জন্য পশ্চাৎ দিকে জোর বােমা ফেলছে। হাঙ্গারীয় বাহিনী উজানের দিকে নীষ্টার নদী অতিক্রম করেছে বলেও জার্মান তরফ থেকে দাবী করা হয়। এই ষ্ট্যালিন লাইনেই রচিত হয়েছিল সােভিয়েট পক্ষের প্রধান ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দের আগে মূল সসাভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম দিকে যেখানে সীমান্ত ছিল সেখানেই এই ব্যুহ রচিত হয়। এই ব্যুহ ভেদ করতে গিয়েই জার্মানরা সােভিয়েট প্রতিবােধশক্তির যথার্থ পরিচয় পায় এবং রুশ রণাঙ্গনে যুদ্ধ প্রচণ্ড হয়ে ওঠে। ৮ই জুলাই ষ্ট্যালিন লাইন ভেদ করতে গিয়ে মাত্র একটি যুদ্ধেই জার্মানীর ৭ হাজার সৈন্য মারা যায় এবং ১৫ হাজার সৈন্য বন্দী হয়। লাল ফৌজ জার্মান ট্যাঙ্ক বহরকে ৭ মাইল অগ্রসর হতে দেয় এবং সেগুলিকে মূল বাহিনী হতে বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করে। লেপেল রণাঙ্গনেও জার্মান যান্ত্রিক বাহিনী তখন এক যুদ্ধে মার খায়। তারা শত শত নিহত সৈন্যকে রণক্ষেত্রে ফেলে রেখে পশ্চিম দিকে অপসরণ করে এবং দুটি জার্মান সঁজোয়া রেজিমেন্ট নিশ্চিহ্ন হয়। পােলটস্কের এক যুদ্ধেও জার্মানরা বিস্তর সৈন্য হারায়। ১১ই জুলাই এক খবর পাওয়া যায় যে, প্রায় ৮০ লক্ষ সােভিয়েট সৈন্য দেশের অভ্যন্তর হতে রণাঙ্গনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট সােভিয়েট তরফ থেকে মঃ লজোভস্কি এক সাংবাদিক সম্মেলনে তখন বলেন যে, প্রথম ১৯ দিনের যুদ্ধে জার্মান পক্ষের ১০ লক্ষাধিক সৈন্য হতাহত ও বন্দী হয়েছে। অপর দিকে জার্মান হাই কমাণ্ডের এক ইস্তাহারে দাবী করা হয় যে, লাল ফৌজের কয়েকজন জেনারেল ও ডিভিসন-কমাণ্ডার সমেত ৩ লক্ষ ২৩ হাজার সৈন্য বন্দী হয়েছে। এছাড়া সােভিয়েট পক্ষের ৩৩৩২টি ট্যাঙ্ক, ১৮৯টি কামান এবং আরো বিস্তর রণসম্ভার জার্মানরা হস্তগত করেছে। যুদ্ধের সময় দুই পক্ষের প্রদত্ত বিবরণেই কিছু অতিরঞ্জন থাকা সম্ভব । কিন্তু তা হলেও এই বিবরণ থেকে অনুমান করতে কোনই কষ্ট হয় না যে, তিন সপ্তাহের মধ্যেই রুশ-জার্মান যুদ্ধ কিরূপ রুদ্র মূর্তি পরিগ্রহ করে। । সেনাপতিগণ রুশ-জার্মান যুদ্ধে প্রথম দিকে যেসকল সেনাপতির ওপর প্রধানত সমরচালনার ভার অর্পিত হয় এবার তাদের কিছু সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। অাগে সােভিয়েট সেনাপতিগণের কথাই বলা যাক। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ সমস্ত রণাঙ্গনকে প্রধানত তিনটি এলাকায় বিভক্ত করে উত্তরে লেলিনগ্রাড এলাকায় মার্শাল ভরােশিলফ, মধ্যে দােলেনস্ক এলাকায় মার্শাল টিমােশেঙ্কো এবং দক্ষিণে য়ুক্রেন এলাকায় মার্শাল বুদেনীর ওপর সমর পরিচালনার ভার দেন। মার্শাল ক্লিমেন্ট ইয়েমোেভিটশ ভয়ােশিলফ ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে কুশিয়ায় এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা এক পরিবারে পরিচারিকার কাজ করতেন এবং তার পিতা ছিলেন একজন সাধারণ শ্রমিক। ভবােশিলফকে বাল্যে ক্লিম বলে ডাকা হত। সাত বছর রুশ-জার্মান যুদ্ধ বয়সে তিনি দৈনিক দু’আনা মজুরীতে এক খনিতে কাজে নিযুক্ত হন। তের বছর বয়স পর্যন্ত নানা কষ্টে কাটবার পর একজন শিক্ষকের সুনজরে পড়ায় তার অদৃষ্টে কিছু লেখাপড়া শিক্ষা ঘটে। দু’বছর বিদ্যালয়ে পড়ার পর তিনি উক্ত শিক্ষকেরই সহায়তায় একটি লােহার কারখানায় চাকুরী পান। যােল বছর বয়সে তিনি বিপ্লবীদলে যােগ দেন এবং ক্রমে ষ্ট্যালিনের দক্ষিণ হস্তস্বরূপ হয়ে ওঠেন। তাকে কয়েকবার সাইবেরিয়ায় নির্বা- সিত করা হয়। খৃষ্টাব্দে রুশ গৃহযুদ্ধে তিনি বিপ্লবী দলের স্থলসেনার অধি- ১৯১৮-২০ নায়ক রূপে যােগ দেন এবং য়ুক্রেন হতে নানা বিঘ্ন অতি- ক্রম করে সদলবলে পশ্চাদপ- সরণে সক্ষম হওয়ায় তার মার্শাল ভরােশিলফ সামরিক খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। লাল ফৌজের যন্ত্রসজ্জায় তিনিই প্রথম ও প্রধান উদ্যোগী । ১৯২৫ খৃষ্টাব্দ হতে রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধা পর্যন্ত তিনি সােভিয়েট সমর সচিবপদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ১৯২১ খৃষ্টাব্দ হতে তিনি কনিষ্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সমিতির সদস্য। মার্শাল ভরােশিলফ কেবল একজন যােদ্ধাই নন, তিনি বিদ্যানুরাগীও বটে। সমগ্র সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ৭১টি ক্লাব ও বিদ্যালয় এবং ৯৫৪৬টি পাঠাগার স্থাপন করেন। তারই একান্ত চেষ্টায় লাল ফৌজেয় মধ্যে ব্যাপকভাবে শিক্ষাবিস্তার হয়।
১১৮ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট কাজ করছেন। লাল ফৌজে মধ্য রণাঙ্গনের ভারপ্রাপ্ত রুশ সেনাপতি মার্শাল টিমােশেঙ্কোর নাম ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দের আগে তেমন খ্যাত ছিল না। গত মহাসমরে তিনি জারের সৈন্যদলে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন। অবশ্য ভরােশিলফের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে এবং তখন হতেই তিনি লাল ফৌজে ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দে যে ছাটাই হয় তার পরই মার্শাল টিমােশেঙ্কোর প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। পােলাণ্ড অভিযানে তিনি এবং জেনারেল কায়ালফ সােভিয়েট বাহিনীর দুটি শাখাকে পূর্ব পােলাণ্ডে পরিচালিত করেন। তারপর রুশ-ফিন যুদ্ধে তিনি ভরােশিলফের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সােভিয়েট বাহিনী পরিচালনার ভার পান। ফিনল্যাণ্ডের যুদ্ধে তাঁর খ্যাতি যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। য়ুক্রেন রণাঙ্গনের প্রধান সােভিয়েট সেনাপতি মার্শাল বুদেনীর সঙ্গে মার্শাল ভরােশিলফের পরিচয় হয় জারিৎসিন (বর্তমান ষ্ট্যালিন- গ্রাড) যুদ্ধের সময়। জারিৎসিনে ১৯১৮ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে মঃ ষ্ট্যালিনের নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী সমর পরিষদ গঠিত হয় এবং সেখান থেকেই মঃ ষ্ট্যালিন বিপ্লববিরােধীদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে তার অপূর্ব সামরিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। তৎকালীন সােভিয়েট প্রধান সেনাপতি লিয় ট্রীর পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে মঃ ষ্ট্যলিন তখন তার নিজস্ব পরিকল্পনায় যুদ্ধ চালিয়ে গৃহযুদ্ধের যে মােড় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাতে তিনি মার্শাল বুদেনীর কাছ থেকে অনেকখানি সাহায্য পেয়েছিলেন। তারপর ১৯১৯ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে মার্শাল ভৰােশিলফ যখন সময় পরিষদের সভাপতি হন তখন তিনি বুদেনীকে একটি অশ্বারােহী দলের নায়ক করবেন বলে স্থির করেন। তদনুসারে তিনি প্রথম অশ্বারােহী কোর গঠন করে তার অধিনায়কত্ব বুদেনীকে দেন।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ
যুদেনী প্রথমে ছিলেন একজন অশিক্ষিত ও অয়াজিত চাষী।
কম্যুনিষ্টদের তিনি আগে বাস্তবিকই ঘৃণা করতেন। কিন্তু ক্রমশ তিনি
বিপ্লবপন্থী হয়ে ওঠেন এবং অবশেষে লাল ফৌজে যােগ দেন। তিনি
একজন সুদক্ষ অশ্বারােহী এবং রুশ-জাপান যুদ্ধে তিনি জারের পক্ষে
লড়াই করেছিলেন। ভবােশিলফের প্রতি তার একটা শিশুসুলভ
প্রীতি আছে। বন্ধু ভবােশিলফ বললে তিনি না করতে পারেন
এমন কাজ নেই। চেহারা, তার রুক্ষ, বিশাল গুম্ফরাশি তার
বৈশিষ্ট্য। সংকল্পে দৃঢ়তাই তার
চরিত্রের প্রধান গুণ।
এবার জার্মান সেনাপতি-
দের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেব ।
উত্তর রণাঙ্গনে মার্শাল, ভরাে-
শিলফের প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে যিনি
জার্মান বাহিনীর সেনাপতিত্ব
লাভ করেন তার নাম রিটার
ফন লীব। তিনি ব্যাভেরিয়ার
লােক। গত মহাযুদ্ধে রণাঙ্গনে
মার্শাল টিমমাশেঙ্কো
থেকে তিনি বিশেষ খ্যাতি
অর্জন করেন।
১৯১৮ খৃষ্টাব্দে তিনি জার্মান সেনানীমণ্ডলীতে একজন
মেজর ছিলেন। দীর্ঘকাল সমর বিভাগে পদস্থ কর্মচারীর পদে কাজ
করার পর ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে হিটলারের কোপদৃষ্টিতে
পড়ে তিনি অবসর গ্রহণে বাধ্য হন। কিন্তু ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দে যুদ্ধ বাধলে
পর আবার তাকে জার্মান সেনানীমণ্ডলীতে ফিরিয়ে আনা হয়।
খৃষ্টাব্দের মে মাসে তার অধিনায়কত্বে প্রায় ৩• ডিভিসন
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট জার্মান সৈন্য হল্যাণ্ড: ও বেলজিয়ম আক্রমণ করে। জেনারেল ফন কুয়েচলার এবং ফিল্ড মার্শাল ফন রাইখনাউ তখন তার অধীনে সেনাপতিত্ব করেছিলেন। মধ্য রণাঙ্গনে মার্শাল টিমমাশেঙ্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে জার্মান বাহিনী পরিচালিত করার ভার পান ফিল্ড মার্শাল ফন বক। তিনি একজন মেজর জেনারেলের পুত্র ; বয়স ষাটের উর্ধে। ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে অষ্ট্রিয়া অভিযানকারী একটি জার্মান বাহি- নীর তিনি অধিনায়ক ছিলেন। সেই বছরই শরৎকালে চেকো- শ্লোভাকিয়ার সীমান্ত- অঞ্চল দখলে তিনি জার্মান বাহিনীর অধিনায়কত্ব করেন। ফ্রান্সে তা র ই অ ধীনে জা মা ন বাহিনী সােম-আইন অঞ্চলে ফরাসীদের পাল্টা আক্রমণ প্রতিহত মার্শাল বুদেনী করে। ফিল্ড মার্শাল ফন রুগ এবং ফিল্ড মার্শাল কাসারলিং ফন বকের অধীনে রুশ-জার্মান যুদ্ধে সেনাপতিত্ব লাভ করেন। কারলিং মধ্য রণাঙ্গনে ‘লুফৎভাফের’ অর্থাৎ জার্মান বিমান বাহিনীর অধিনায়কত্ব রুশ-জার্মান যুদ্ধ 'পান। ফন রুগ ফ্রান্সে ফ্ল্যাণ্ডাসের যুদ্ধে জেনারেলপদে থেকে একটি জার্মান বাহিনী পরিচালিত করেছিলেন। যুক্রেনের দিকে অর্থাৎ দক্ষিণ রণাঙ্গনে মার্শাল বুদেনীর প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে জার্মান বাহিনী পরিচালিত করেন ফিল্ড মার্শাল ফন কষ্টেড। তার বয়স ষাটের বেশী এবং তিনিও ফন লীবের ন্যায় বর্তমান মহাযুদ্ধ বাধলে অবসর-জীবন থেকে পুনরায় সেনানীমণ্ডলীতে ফিরে আসেন। অবশ্য ফন লীবের মত তাকে হিটলারের বিরাগভাজন হয়ে অবসর নিতে হয়েছিল না, স্বাস্থ্যভঙ্গের দরুণ তিনি নিজেই অবসর নিয়েছিলেন। জন্ম তার প্রশিয়ায়। পােলদের বিরুদ্ধে তিনি একটি জার্মান বাহিনীর অধিনায়কত্ব করেন এবং তারপর ফ্রান্সে ৫০ ডিভিসন জার্মান সৈন্যের সাহায্যে বিরাট অভিযান চালাবার ভার তিনি পান। তারই পরি- চালিত বাহিনী আর্দেনেস ও মিউজে ফরাসী ব্যুহ ভেদ করে। য়ুক্রেন রণাঙ্গনে ফিল্ড মার্শাল ফন রাইখনাউ ফন রুগুষ্টেডটের অধীনে সেনাপতিত্ব পান। তিনি কূটনৈতিক সেনাপতি’ নামে সমধিক পরিচিত। ১৯২৭ খৃষ্টাব্দ হতে তিনি একজন পাক্কা নাৎসী হন। খেলাধূলার মধ্য দিয়ে সামরিক শিক্ষাদানের তিনি বিশেষ পক্ষপাতী। তিনি বহু ভাষাবিদ এবং জার্মানীতে বিশেষ ভাবেই পরিচিত। ১৯৩২ খৃষ্টাব্দে তিনি মিউনিক সামরিক জেলার অধিনায়ক হন। পােলা এবং হল্যাণ্ড-বেলজিয়মে তিনি একাধিক জার্মান বাহিনী পরিচালিত করেন। ভাল যােদ্ধা হিসাবে জার্মানীতে তার যথেষ্ট খ্যাতি আছে। ত্রিধারা আক্রমণ আগেই বলেছি রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার পরই মিঃ চার্চিল সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্যের আশ্বাস দেন এবং তদনুসারে একদল প্রতিনিধিও ১২২ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট মস্কোতে প্রেরিত হন। তাদের সঙ্গে আলােচনান্তে ১২ই জুলাই মস্কোতে বৃটেন ও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্যের চুক্তি হয়। চুক্তিতে মাত্র দু’টি ধারা থাকে। প্রথমটিতে বলা হয় যে, জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধচালনায় উভয় দেশ উভয় দেশকে সর্বতােভাবে সাহায্য করবে এবং দ্বিতীয়ত, একের সম্মতি ব্যতীত অন্য কোনরূপ সন্ধি বা যুদ্ধবিরতি করতে পারবে না। এমন কি তজ্জন্য আলােচনাও চালান যাবে না। এদিকে প্রথম চোটে কিছু এগিয়েই জার্মানবা আবার দাড়িয়ে খানিকটা দম নেয়। প্রায় ৪৮ ঘণ্টাকাল একরূপ নিস্তব্ধ থাকার পর ১২ই জুলাই রাতে জার্মান বাহিনী পুনরায় ‘ব্লিৎসক্রীগ’ বা ঝটিতি যুদ্ধ আরম্ভ করে। এবারের আক্রমণে তারা দক্ষিণ রণাঙ্গনে বেশী জোর না দিয়ে উত্তরে লেনিনগ্রাড এবং মধ্যাঞ্চলে মস্কোর দিকে অগ্রসর হবার জন্যই বেশী চেষ্টা করে। কিন্তু লেনিনগ্রাডের দিকে তারা তেমন বেশী সুবিধা করে উঠতে পারে না ; একমাত্র মস্কোর দিকেই তারা খানিকটা এগিয়ে যায় এবং ১৬ই জুলাই জার্মানরা স্মােলেনস্ক সহর দখলের দাবী করে। জার্মানরা স্মেলেনস্ক পর্যন্ত গিয়ে হাজির হওয়ায় মধ্য রণাঙ্গনের অবস্থা সঙ্গীণ হয়ে ওঠে এবং মঃ ষ্ট্যালিন ২০শে জুলাই স্বহস্তে দেশরক্ষা সচিবের দপ্তরও গ্রহণ করেন। প্রথম আক্রমণে জার্মানরা যত দ্রুত গতিতে অগ্রসর হয়েছিল দ্বিতীয় আক্রমণে তত দ্রুত অগ্রসর হতে না পারলেও লেনিনগ্রাডের দিকে প্রায় ৪• মাইল এবং মস্কোর দিকে ১২০ মাইল তারা এগিয়ে যায়। ১৬ই জুলাই মােলেনস্ক সহর জার্মানদের হস্তগত না হলেও তাদের অগ্রগামী সাজোয়া বাহিনী সেপর্যন্ত গিয়ে হাজির হয়। ।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ
তারপর কিয়েফের দিকেও জার্মানরা আবার এগুবার চেষ্টা করে।
তাদের একটি সঁজোয়া বাহিনী কিয়েফের উপকণ্ঠে গিয়ে উপনীত
হয়; কিন্তু লাল ফৌজ আবার তাদের পশ্চাতে হটিয়ে দেয়।
কিয়েফের ৮৫ মাইল পশ্চিমে জিততামীরকে কেন্দ্র করে উভয়
পক্ষে তুমুল যুদ্ধ চলে।
দশ বার দিনের চেষ্টায় সেই অঞ্চলে
-
• ',
রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার পর য়ুক্রেনের কৃষাণীর মাঠ থেকে তাড়াতাড়ি
খড় সংগ্রহ করছে।
জার্মানরা মাইল পঞ্চাশেক অগ্রসর হয়।
পঞ্চাশেক অগ্রসর হয়। তার দক্ষিণে হাঙ্গারীয় এবং
রুমানীয় সৈন্যরা প্রায় শতখানেক মাইল এগিয়ে গিয়ে বুগ নদীর তীরে
হাজির হয় ।
অবশ্য তারা বিনা বাধায় অগ্রসর হতে পারে নি।
১২৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ; তাদেরই ইস্তাহারে দেখা যায় যে, সােভিয়েট বাহিনী বিনাযুদ্ধে সূচ্যগ্র ভূমিও ছেড়ে দেয় না। আলেঙ্কের দিকে এগিয়েই জার্মানরা মস্কোর ওপর বিমান আক্রমণ চালাতে থাকে। ২১শে জুলাই রাত্রে প্রথম মস্কোতে বিমানহানা হয়। জার্মানীর প্রায় দু’শ বিমান সাড়ে পাঁচ ঘণ্টাকাল মস্কোতে হানা দেয়। জার্মানরা বলে যে, তাদের বিমান বাহিনী মস্কোতে কয়েকটি সামরিক লক্ষ্যের ওপর হানা দিতে সক্ষম হয়; কিন্তু সােভিয়েট পক্ষ তা অস্বীকার করে বলে যে, সেদিনের আক্রমণে কেবল অসামরিক অধিবাসীদেরই ক্ষতি হয়। তার পরদিনও রাত্রে আবার শ'দেড়েক জার্মান বিমান মস্কোতে হানা দেয় এবং কয়েক দিন এভাবে ক্রমাগত বিমান-আক্রমণ চলে। সােভিয়েট পক্ষ হতে বলা হয় যে, মস্কোর বাইরেই জার্মান বিমানবহর সােভিয়েট বিমান বাহিনীর আক্রমণে প্রতিবার ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং মাত্র দু’চারখানি করে জার্মান বিমানের অতি কষ্টে সহরের ওপর পৌছা সম্ভব হয়। ঘােলেন এলাকায় জার্মানরা সাড়াশীর ন্যায় দু’বাহু বিস্তার করে একটা বড় সােভিয়েট বাহিনীকে পরিবেষ্টনের মধ্যে ফেলে। সােভিয়েট সৈন্যরা তা ভেদ করে বেরুবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং তাতে উভয় পক্ষে সেখানে ঘােরতর যুদ্ধ বাধে। অবরুদ্ধ সৈন্যদের উদ্ধারের জন্য বার হতেও সােভিয়েট বাহিনী জার্মানদের ওপর চাপ দেয় এবং তাতে রণাঙ্গন ক্রমশ বিস্তার লাভ করে। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই বিষম ক্ষতি হয় ; তবে যুদ্ধে জয়লাভ করে জার্মান বাহিনী। সােভিয়েট সৈন্যরা কিছু দুর সরে গিয়ে নতুন বহরচনায় বাধ্য হয়। এভাবে ছয় সপ্তাহ গিয়ে সাত সপ্তাহ চলে এবং ইতিমধ্যে যুদ্ধের আবার মােড় ঘুরে যায়। খোলেনঙ্ক এলাকায় যুদ্ধে সুবিধা করার পর রুশ-জার্মান যুদ্ধ জার্মানরা উত্তরে লেনিনগ্রাড় এবং দক্ষিণে কিয়েফের অভিযানে বেশী জোর দেয়। বেসারাবিয়ার দিক হতে জার্মান ও রুমানীয় বাহিনী সােভিয়েট সেনার প্রবল বাধা অতিক্রম করে আর বেশী অগ্রসর হতে না পারায় কিয়েফ অঞ্চল হতে জার্মানদের একটি বাহু কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী ওডেসা বন্দরে পৌছার চেষ্টা করে। তারা সােজাখুজি ওডেসার দিকে না গিয়ে পূর্বদিকে পৌছে ওডেসায় সােভিয়েট বাহিনীকে পশ্চাদ্দিক হতে আক্রমণের প্রয়াস পায়। ওদিকে নীষ্টার নদী পেরিয়ে জার্মান ও রুমানীয় সৈন্যরা সােজা ওডেসায় পৌছার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। জার্মানদের এই নতুন চালে দক্ষিণ যুক্রেনের যুদ্ধ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উত্তরে লেনিনগ্রাডের দিকে অভিযানে এস্তোনিয়া হতে জার্মানরা অগ্রসর হবার জন্য প্রবল ভাবে যুদ্ধ চালায়। অপর দিকে লাভােগা এবং ওনেগা হ্রদের মধ্যবর্তী এলাকায় ফিনরা অগ্রসর হয়ে সােভিয়েট ব্যুহ ভেদ ও ষ্ট্যালিন খাল দখলের চেষ্টা করে। অনেকেই তখন অনুমান করছিল যে, সেই খাল দিয়ে বণ্টিক সাগর হতে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ তাদের বহু সাবমেরিণ উত্তরে সুমেরু এলাকায় পাঠাচ্ছিলেন। কাজেই ষ্ট্যালিন খালের গুরুত্ব তখন খুবই বেশী ছিল। সুমেরু অঞ্চলে সেই সময় সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ সৈন্ঠ পাঠিয়ে শক্তিবৃদ্ধি করেন এবং বৃটিশ নৌবলও তখন সেখানে কিছু উপস্থিত হয়। ফিনল্যাণ্ডের পােয় পেটসামাের ওপর বৃটিশ বিমান হানা দেয়। মুরমানকে কেন্দ্র করে উক্ত এলাকায় ভালভাবেই হানাহানি চলে। য়ুক্রেনে জার্মানরা কিয়েফের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অনেকখানি অগ্রসর হয়ে বিলয়া টসারকফ পর্যন্ত গিয়ে পৌছে। কিয়েফ হতে "তার দুরত্ব মাত্র ৫০ মাইল। সেখানে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। সেই ১২৬ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ধুদ্ধে প্রচণ্ড ঘা খেয়ে জার্মানরা কিছুদিনের মত কিয়েফের দিকে অগ্রসর হওয়া বন্ধ রাখে এবং ওডেসার দিকে নজর দেয়। কিয়েফ ও ওডেসার যােগসূত্র ছিন্ন করার জন্য তারা বিশেষ ভাবে চেষ্টা করে এবং তাদের লক্ষ্য থাকে ওডেসার সােভিয়েট সৈনাকে কিভাবে য়ুক্রেনের মূল শক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়। কিয়েফের ১২৫ মাইল দক্ষিণে এবং ওডেসার ১৫০ মাইল উত্তরে উমানকে কেন্দ্র করে তখন এক প্রবল যুদ্ধ হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই অগ্রগামী জার্মান বাহিনী ওডেসার ৭৫ মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত নিকোলায়েফে গিয়ে পৌছে। তার ফলে ওডেসার সমূহ বিপদ দেখা দেয়। জার্মানদের এই নতুন অভিযান প্রতিরােধের জন্য মার্শাল বুদেনী আরাে সৈন্য আনিয়ে শক্তিবৃদ্ধি করেন। সেই সময় বার্লিনের ওপর সােভিয়েট বিমান হানা দেয়। প্রথম দিন সােভিয়েট বিমান- যােদ্ধারা বার্লিনবাসীদের আগ্নেয় বােমা দিয়ে অভিবাদন জানায়। তারপর ক্রমাগত তিন চারদিন বার্লিনে বিমানহানা চলে এবং তাতে তারা উগ্র বিস্ফোরক বােমাও ফেলে। প্রথম দিকে সােভিয়েট বিমানহানায় বার্লিনরক্ষীরা রীতিমত বিব্রত হয়ে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল, বার্লিনে কখনাে বিমানহানা হলে পশ্চিম দিক থেকেই হবে এবং বৃটিশ বিমান গিয়েই তাদের উৎপাত করবে। অতদূর হতে সােভিয়েট বিমান যে তাদের ওপর গিয়ে হানা দিতে পারে সেটা তারা প্রথমে বুঝতেই পারে নি। পরে অবশ্য এসম্বন্ধে তারা হুশিয়ার হয়। ছয় সপ্তাহের খতিয়ান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে কি অপরিসীম ক্ষতি হয় এবার তার খানিকটা আভাষ দেওয়া যেতে পারে। ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে রুশ রণাঙ্গনে যে রুশ-জার্মান যুদ্ধ বিপুল লোেকক্ষয় ও সমবােপকরণ বিনষ্ট হয়, তার আগে প্রায় দুই বর্ষব্যাপী যুদ্ধে সমগ্র য়ুরােপে তা হয় নি। এই ক্ষতির সঙ্গে অন্য কোন যুদ্ধের ক্ষতির তুলনাই হয় না। দুই প্রবল পরাক্রান্ত শক্তির সংঘর্ষ জগদ্বাসীকে বিস্মিত ও স্তম্ভিত করে তােলে। আগেই বলেছি, যুদ্ধের ক্ষতি সম্বন্ধে উভয় পক্ষের বিবরণেই কতকটা অতিরঞ্জন থাকা সম্ভব। তাছাড়া যুদ্ধের সময় নির্ভুল হিসাব দেওয়া কারাে পক্ষে সহজ নয়। কাজেই দু’পক্ষের বিবরণে যথেষ্ট অসঙ্গতি বিদ্যমান। কোন পক্ষের বিবরণই নির্বিচারে বিশ্বাস করা কঠিন ; তবে উভয় পক্ষের বিবরণদৃষ্টে অদ্ভুত একথা নিঃসন্দেহেই বলা চলে, যে, উভয়দিকেই ক্ষতি প্রচণ্ড রকমের হয়। অবশ্য উভয় পক্ষের বিবরণে কিছু পার্থক্যও না আছে এমন নয়। জার্মান বিবরণে প্রধানত তাদের প্রতিপক্ষের ক্ষতিরই হিসাব দেওয়া হয় ; পক্ষান্তরে সােভিয়েট বিবরণে প্রতিপক্ষ ও স্বপক্ষ উভয় দিকেরই ক্ষতির হিসাব থাকে এবং তাদের সেই বিবরণে উভয় পক্ষের ক্ষতির হিসাবে আকাশ- পাতাল পার্থক্য দৃষ্ট হয় না। সাধারণ বিচারবুদ্ধিতে তা অপেক্ষাকৃত সংযত ও সঙ্গতিপূর্ণ বলা যেতে পারে। সে যাই হােক, সত্যাসত্য, নিরূপণের চেষ্টা না করে উভয় দিকের বিবরণ উদ্ধত করাই এখানে সমীচীন। ৬ই আগষ্ট জার্মান হাই কমাণ্ডের এক ইস্তাহারে বলা হয় :- “এপর্যন্ত জার্মানরা ৮ লক্ষ ৯৫ হাজার রুশ সেনাকে বন্দী করেছে। এতদ্ব্যতীত সােভিয়েট পক্ষের ১৩১৪৫টি সাজোয়া গাড়ী, ১০৩৮৮টি কামান এবং ৯০৮২টি বিমান থােয়া গিয়েছে।” আর একটু বিস্তারিত বিবরণে বলা হয় যে, এস্তোনিয়ার দিকে যুদ্ধে ৩৫ হাজার রুশ সেনা বন্দী হয় এবং সােভিয়েটের ৩৫৫টি ট্যাঙ্ক, ৬৫৫টি কামান এবং ৭৭১টি বিমান খোয়া যায়। দক্ষিণে বেসারাবিয়া - মহাযুদ্ধে সােভিয়েট A পার হয়ে কিয়েফের দিকে যে অভিযান চলে তাতে দেড় লক্ষ রুশ সেনা বন্দী হয় এবং সােভিয়েটকে ১৯৭০টি সাজোয়া গাড়ী, ২১৯টি কামান এবং ৯৮০টি বিমান হারাতে হয়। তারপর শ্মেলেনস্কের যুদ্ধে রুশ সেনা বন্দীই হয় প্রায় ৩ লক্ষ ১০ হাজার ; তাদের কামান খােয়া যায় ৩২টি এবং ওই একই রণক্ষেত্রে সােভিয়েট বিমান বিধবস্ত হয় ১৩৯৮টি। এর পাল্টা জবাবে সােভিয়েট পক্ষ হতে ৮ই আগষ্ট এক বিবৃতি দিয়ে বলা হয় যে, জার্মান হাই কমাণ্ডের দাবী উদ্ভট। সােভিয়েট বিবৃতিত্বে উভয় পক্ষের ক্ষতির হিসাব নিম্নরূপ দেওয়া হয় :- ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে নিহত, আহত ও বন্দী ধরে জার্মানীকে পূনর লক্ষাধিক যােদ্ধা হারাতে হয়। সােভিয়েটের খােয় আয় প্রায় ৬ লক্ষ লােক। লাল ফৌজ জার্মানদের ৬ হাজারেরও অধিক ট্যাঙ্ক বিধ্বম্ভ ও হস্তগত করে। সােভিয়েটের খােয়া যায় প্রায় ৫ হাজার ট্যাঙ্ক লালফৌজ কর্তৃক বিধৰ as হস্তগত জার্মান কামানের সংখ্যা সংখ্যা ৮ হাজারে বেশী ; সােভিজেটের খােয়া যায় প্রায় ৭ হাজার কামান। জাানীর ৬ হাজার বিমান থােয়া স্নায়, আর সােভিয়েট হারায় প্রায় ৪ হাজার বিমান। এতদ্ব্যতীত সােভিয়েট বিবৃতিতে আরাে বলা হয় যে, ষ্ট্যালিন লাইন জার্মানদের আবিষ্কার বিশেষ। জার্মানরা যেরূপ প্রচার করে প্রকৃত প্রস্তাবে সেরূপ কোন বিশেষ ‘লাইন বা দুর্গমালার অস্তিত্ব সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে নেই। তবে প্রয়ােজন বােধে স্থান বিশেষকে সুরক্ষিত করা হয়েছে একথা সত্য, কিন্তু তাকে ফ্রান্সের মাজিনাে লাইন, জার্মানীর সিগফ্রিড লাইন বা ফিনল্যাণ্ডের ম্যানার- হাইম লাইনের পায়ে ফেলা বাতুলতা মাত্র। জার্মানরা এই সাফাই রুশ-জার্মা বুদ্ধ গায় কেবল নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার জন্য। রণাঙ্গনে সােভিয়েট বাহিনীর দৃঢ়তাই হল যথার্থ ষ্ট্যালিন লাইন। প্রসঙ্গান্তরে না গিয়ে এবার রুশ-জার্মান যুদ্ধে জার্মানীর ক্ষতি সম্বন্ধে মার্কিন সূত্রে প্রাপ্ত একটি হিসাব দিয়ে বক্তব্য শেষ করা যাক। লাল ফৌজের একদল বিমান ননা জার্মান বিমান বাহিনীর সঙ্গে সারাদিন লড়াইয়ের পর তাদের নায়ককে যুদ্ধের ফলাফল জানাচ্ছে। জার্মানীর গুপ্ত সরকারী দলিলপত্র হতেই নাকি কোন ভাবে এই হিসাব পাওয়া যায়। ১১ই জুলাই পর্যন্ত হিসাবে দেখা যায়, প্রথম সপ্তাহে নিহত, আহত ও বন্দী ধরে জার্মানী প্রতিদিন ৪০ হাজার করে লােক হারায়। এতদ্ব্যতীত সেই সপ্তাহে তাদের মােট ৪৫০টি ট্যাঙ্ক ও ৫৫টি বিমান খােয়া যায়।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে আরাে বেশী ক্ষতি হয়। মােট ৩ লক্ষ ৬০ হাজার লোক, সাত আট শত ট্যাঙ্ক, ৭৫০টি বিমান জার্মানীর হারাতে হয়। তৃতীয় সপ্তাহে তার খােয়া যায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার লােক, ৭০০ ট্যাঙ্ক ও ৮০০ বিমান। অতএব এই তিন সপ্তাহের যুদ্ধে জার্মানীকে মােট প্রায় ১০ লক্ষ লােক, ১৯০০ ট্যাঙ্ক এবং ২০•• বিমান হারাতে হয়। ওডেসায় চাপ দক্ষিণ দিকে কয়দিনে জার্মানরা আরাে এগিয়ে যায়। ওডেসা বন্দর ও বুগ নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে তারা কৃষ্ণসাগরের তীর পর্যন্ত গিয়ে পৌছে। জার্মান ইস্তাহারে বলা হয় যে, রুমানীয় বাহিনী ওডেসা ঘিরেছে এবং জার্মান ও হাঙ্গারীয় বাহিনী নিকোলায়েফ পরিবেষ্টিত করেছে। খারসনের উত্তর-পশ্চিমে প্রসিদ্ধ লৌহখনির অঞ্চল ক্ৰিভয়-রগ দখল করেছে বলেও জার্মানরা দাবী জানায়। এছাড়া সােভিয়েট পক্ষ হতে স্বীকার করা হয় যে, নিকোলায়েফের উত্তর-পশ্চিমে বুগ নদীর তীরে অবস্থিত কিয়ােভগ্রাড ও পারতমেস্ক সহর হতে রুশ সৈন্য সরান হয়েছে। সােভিয়েট পক্ষ সেই সময় নীপার নদীর বাঁকে নতুন ব্যুহ রচনা করে। উত্তরে লেনিনগ্রাডমুখী অভিযানে জার্মানরা ষ্টার-রাশায় গিয়ে পৌছে। তার উত্তরেই ইলমেন হ্রদ এবং সেই হ্রদের উত্তরে লেনিন- গ্রাড। ইলমেন হ্রদ থাকায় এবং ইলমেন হ্রদ ও লেনিনগ্রাডের মধ্যবর্তী অঞ্চল জলা হওয়ায় জার্মানরা সেই পথে লেনিনগ্রাড দখলে আর অগ্রসর না হয়ে ষ্টারয়া-রাশা হতে প্রায় ৬০ মাইল পূবে লেলিনগ্রাড- মস্কো রেলপথ বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত হয়।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ মােলেনস্ক দখলের পর জার্মানরা কিছুকাল সেখানে আক্রমণ না চালিয়ে আত্মরক্ষার নীতি অবলম্বন করে এবং লেনিনগ্রাড ও যুক্রেনের দিকে ক্রমাগত চাপ বাড়ায়। আগষ্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে খবর পাওয়া যায় যে, য়ুক্রেন রণাঙ্গনে জার্মানী প্রায় পনর লক্ষ সৈন্য নিয়ােজিত করেছে। ৪০ হতে ৫০টি জার্মান পদাতিক ডিভিসন, ৪৫টি পানৎসার ডিভিসন এবং জার্মানীর পক্ষাবলম্বী রাষ্ট্রসমূহের ৪৫ থেকে ৫০ ডিভিসনে সেই পনর লক্ষ সৈন্য বিভক্ত। আগেই বলেছি, ওডেসা বন্দর পরিবেষ্টিত করে জার্মানরা উক্ত অঞ্চলে বেশ খানিকটা সুবিধা করে নেয়। ১৮ই আগষ্ট পাকা খবর পাওয়া যায় যে, ওডেসার উত্তর-পূর্বদিকস্থ প্রসিদ্ধ বন্দর নিকোলায়েফ এবং তার একশ’ মাইল উত্তর-পূর্বে ক্ৰিভয়-বগের পতন হয়েছে। সােভিয়েট পক্ষ হতে বলা হয় যে, নিকোলায়েফ বন্দর ও ক্রিয়-রগ ত্যাগের প্রাক্কালে লাল ফৌজ প্রতিপক্ষের প্রায় বিশ হাজার সৈন্য হতাহত করে যায়। এছাড়া নিকোলায়েফের পােতাশ্রয়ও উড়িয়ে দেওয়া হয়। জার্মানরা দাবী করে যে, নিকোলায়েফ বন্দরে তারা সােভিয়েট পক্ষের ৩৫ হাজার টনের একখানি ব্যাটলশিপ, দশ হাজার টনের একখানি ক্রুজার, চারখানি ডেস্ট্রয়ার এবং দুটি সাবমেরিণ হস্তগত করেছে। এর উত্তরে সােভিয়েট পক্ষ হতে বলা হয় যে, নিকোলায়েফ জাহাজখানায় একখানি নতুন ব্যাটলশিপ ও ক্রুজার ছিল বটে, তৰে নির্মাণকার্য শেষ না হওয়ায় কোনটিতেই এঞ্জিন বসান হয়েছিল না। সােভিয়েট সেনা ডক উড়িয়ে দেবার কালে জাহাজ দু’খানিও উড়িয়ে দিয়ে যায়। লেনিনগ্রাডের দিকে জার্মান ও ফিন বাহিনীর অভিযানের বেগ- মহাযুদ্ধে সােভিয়েট বৃদ্ধি লাল ফৌজের পক্ষে কিছু আশঙ্কার কারণ হয়ে দাড়ায়। এস্তোনিয়া হতে পিপাস হ্রদের দুধার দিয়ে জার্মান বাহিনী অগ্রসর হয়ে উত্তরদিকস্থ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়। পিপস হ্রদ ও বণ্টিক সাগরের মধ্যবর্তী ত্রিশ মাইল প্রশস্ত ভূভাগে জার্মান বাহিনী আধিপত্য লাভ করায় এস্তোনিয়ায় সােভিয়েট সৈন্যরা তাদের মূল বাহিনী হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উত্তর দিকেও ফিন বাহিনী লাডােগা হ্রদ এবং ওনেগা হ্রদের মধ্যবর্তী অঞ্চলে কয়েক স্থানে মূল সােভিয়েট সীমান্ত অতিক্রম করে। কাজেই লেনিনগ্রাডের দিকে যুদ্ধটা বেশ জটিল হয়ে ওঠে। মার্শাল ভরােশিলফ প্রায় দশ লক্ষ সৈন্য নিয়ে লেনিনগ্রাড রক্ষার জন্য প্রস্তুত হন। লেনিনগ্রাডের পঞ্চাশ মাইল দূরে সােভিয়েট বহিহ রচিত হয়। কেবল তাই নয়। স্মােলেন এবং কিয়েকের মাঝামাঝি স্থানে নীপার নদীর পূর্বতীরে প্রসিদ্ধ রেলওয়ে ষ্টেসন গােমেলকে কেন্দ্র করেও বুদ্ধ বেশ প্রবল হয়ে ওঠে। তুমুল যুদ্ধের পর সােভিয়েট সৈন্যরা গােমেলত্যাগে বাধ্য হয়। জার্মানরা আরাে এগিয়ে গােমেলের উত্তর-পূর্ব দিকে দেড়শ’ মাইল দূরে ব্রিয়ানস্ক পর্যন্ত যায়। ব্রিয়ানস্ক হতৈ মস্কোর দুরত্ব খুব বেশী নয়। কাজেই তারা সেখান থেকে মস্কোর দিকে যাবে কি কিয়েকের দিকে ধাওয়া করবে, তা নিয়ে সােভিয়েট পক্ষকে কিছু দুর্ভাবনার মধ্যে পড়তে হয়। দক্ষিণে নীপার নদীর মুখে খারসন বন্দরও জার্মানরা দখল করে নেয়। ফলে স্থলপথে ওডেসা একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একমাত্র জলপথে কৃষ্ণসাগরীয় সােভিয়েট নৌবাহিনী ওডেসারক্ষীদের রসদ যােগাতে থাকে। অপর দিকে কৃষ্ণসাগরের তীর হতে দু’শ মাইল উজানে নীপার নদীর পশ্চিম পারে অবস্থিত প্রসিদ্ধ লৌহ ও ইস্পাতের কারখানা নিপ্রােপেট্রোভঙ্ক রুশ-জার্মান যুদ্ধ দখলের জন্য জার্মানরা মরিয়া হয়ে লাগে। তুমুল যুদ্ধের পর সেই সােভিয়েট ইস্পাতনগরী নিপ্রােপেট্রোভস্কও তারা দখল করতে সমর্থ হয়। তার দক্ষিণে নীপারের ওপর যে বিরাট বাঁধছিল তা সােভিয়েট রণাঙ্গনের পশ্চাতে সােভিয়েট কৃষকরা সরকারী ভাণ্ডারে সাহায্যের জন্য তাদের ঘর থেকে খাদ্য গাড়ী বােঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে। সৈন্যরা ভেঙ্গে দেয়। ফলে নিপ্রোপেট্রোভস্কের লৌহ ও ইস্পাতের কারখানাধ জন্য যে হাইড্রো-ইলেকটিকের ব্যবস্থা ছিল তা অচল হয়ে যায়।. আঁটির দিকে নীপার তীরবর্তী অঞ্চল একেবারে চাষের ১৩৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট অযােগ্য হয়ে পড়ে। সােভিয়েট বাহিনী কর্তৃক এই ‘পােড়ামাটি নীতি অবলম্বনের ফলে এত সমস্ত দখল করেও জার্মানরা তেমন লাভবান হতে পারে না। রুশ-জার্মান যুদ্ধের দশ সপ্তাহের ফলাফল বিচার করলে দেখা যায়, স্থলবিশেষে জার্মানদের প্রচণ্ড আক্রমণ সহ প্রচণ্ড আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে সােভিয়েট বাহিনী পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয় সত্য; কিন্তু কোনক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ না করে তারা স্থানত্যাগ করে না এবং বিনা শক্তিক্ষয়ে কোনস্থলেই প্রতিপক্ষকে তারা অগ্রসর হতে দেয় না। প্রয়ােজন হলে তারা পশ্চাদপসরণ করে, তবে যাওয়ার আগে যদ্দর সম্ভব তারা শত্রুর ক্ষতি করে যায়। এছাড়া কোন স্থানত্যাগের পূর্বে তাদের পােড়ামাটি নীতি অবলম্বনের ফলে পরিত্যক্ত স্থান এমন অবস্থায় পরিণত হয় যার ফলে বিপক্ষের সৈন্যরা এসে সেখানে কোনই সুবিধা করতে পারে না। ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে জামান বাহিনী কর্তৃক য়ুরােপের পশ্চিম রণাঙ্গনে অর্থাৎ ফ্রান্স, বেলজিয়ম ও হল্যাণ্ড দখলের কালে কিন্তু ঠিক এর বিপরীত অবস্থা হয়েছিল। সেখানে জার্মান বাহিনী একরূপ অবিরাম ও অব্যাহত গতিতে অগ্রসর হয়ে যেসকল স্থান অধিকার করে সেই সকল স্থানের কৃষিজাত ও খনিজ সম্পদ এবং কলকারখানাগুলি হাতে পাওয়ায় জার্মানীর যথেষ্ট সুবিধা হয়ে যায়। সেখানকার যােদ্ধারা যে সর্বত্র ইচ্ছা করেই সেই সব সম্পদ শত্রুর জন্য পশ্চাতে ফেলে রেখে যায় এমন নয় ; প্রবল পরাক্রান্ত প্রতিপক্ষের আক্রমণে তিষ্ঠিতে না পেরেই অতীব অপ্রস্তুত অবস্থায় সব ফেলে রেখে তাদের পশ্চাদপসরণ করতে হয়। সেই অবস্থায় পশ্চাদপসরণ পলায়নেরই নামান্তর মাত্র। পলায়নপর বাহিনীর পক্ষে খেয়াল রাখা সম্ভব নয় যে, শক্রর হাতে কি পড়বে না পড়বে। কিন্তু রুশ রণাঙ্গনের অবস্থা রুশ-জার্মান যুদ্ধ সম্পূর্ণ অন্যরূপ। সেখানে উভয়পক্ষই প্রবল ; কেউ কারাে ভয়ে পালাবার নয়। আধুনিক যুদ্ধের কৌশল উভয় পক্ষেরই সমান আয়ত্ত এবং ঘাত-প্রতিঘাতে উভয়ই সমকক্ষ। সুতরাং প্রতিপাদ ভূমির জন্য সােভিয়েট বাহিনী বিপক্ষের সঙ্গে লড়তে সমর্থ হয় এবং কোন স্থান- ত্যাগের কালে তারা সেখানকার সমস্ত নষ্ট করে দিয়ে যেতে পারে। আত্মরক্ষার যথেষ্ট শক্তি না থাকলে হয়ত য়ুরােপের পশ্চিম রণাঙ্গনের মত রুশ রণাঙ্গনেও জার্মান ‘ব্লিৎজক্ৰীগের’ মুখে পড়ে সােভিয়েট বাহিনীকে পশ্চাদপসরণের সময় সম্পদরাশি ফেলে রেখে যেতে হত এবং সেগুলি লাভ করে জার্মানীর সমরসামর্থ্য আরাে বেড়ে যেত। কিন্তু সােভিয়েট সৈন্যরা তাদের প্রতিপক্ষের সেই আশা নিষ্ফল করে দেয়। কেবল লাল ফৌজই নয় ; সােভিয়েট জনসেনা গেরিলাযুদ্ধের কৌশলে একাজে কতখানি সহায়তা করে, এবার সেই সম্বন্ধেই কিছু বলব। জনযুদ্ধ আধুনিক ‘টোটাল ওয়ার’ বা সার্বিক যুদ্ধ যে কেবল বেতনভুক সৈন্য- দেরই ব্যাপার নয় তা ভালভাবে প্রমাণ করেছে সােভিয়েট জনসেনা। সেখানে চাষীমজুর পর্যন্ত স্বেচ্ছায় অস্ত্রধারণ করেছে এবং বিজিত অঞ্চলে সেই জনসেনা গেরিলা কৌশলে খণ্ডযুদ্ধ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে নানাভাবে বিব্রত করে তুলেছে। তারই ফলে সােভিয়েট যুদ্ধ যথার্থ জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। রণাঙ্গনের পশ্চাতে সােভিয়েট গেরিলাদের ভয়ে জার্মানরা সদা সন্ত্রস্ত। কিছুদিন আগে ‘নিউজ ক্রনিক পত্রিকার সমর-সংবাদদাতা মিঃ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ফিলিপ জর্ডন তার রুশ রণাঙ্গনে লব্ধ সাত মাসের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে এক বক্তৃতায় বলেন :- “মিত্রশক্তিবর্গের মধ্যে অন্তত এক দেশের সেনাপতিমণ্ডলী জনযুদ্ধের প্রয়ােজনীয়তা যথার্থ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তা পেরেছিলেন বলেই চিন্তাধারাকে বাস্তবে পরিণত করে তারা যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছেন; তা না হলে এতটা সাফল্য লাভ করা হয়ত তাদের পক্ষে সম্ভব হত না। এই সেনাপতিমণ্ডলী হলেন রুশ সেনাপতিমণ্ডলী। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, যুদ্ধ আমার, আপনার এবং সকলের। কাজেই তারা গেরিলাদল গঠনে জনসাধারণকে নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন এবং সাহায্য এবং সাহায্য যুগিয়েছেন। কুশিয়ায় এই জনযােদ্ধারা ‘পাটিজান' নামে পরিচিত।” রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধবার আগেই সােভিয়েট সামরিক কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিলেন যে, জার্মানরা কখনাে আক্রমণ করলে লাল ফৌজকে প্রথমে খানিকটা পশ্চাতে হটে আসতেই হবে এবং তারপর তারা পাল্টা আক্রমণ চালাবার সুবিধা পাবে। একথা তাদের জানা ছিল বলেই লাল ফৌজের সেনানীরা গ্রাম হতে গ্রামান্তরে এবং সহর হতে সহরান্তরে গিয়ে গেরিলা-বাহিনী গড়ে তােলেন। প্রত্যেক স্থানেই গেরিলাদের নেতৃত্ব দেওয়া হয় প্রধানত গ্রামের মােড়ল অথবা স্থানীয় কোন গণপ্রতিষ্ঠানের কর্তার ওপর। সােভিয়েট সেনানীরা কেবল গেরিলাদল সংগঠন করেই ছেড়ে দিলেন না; তারা বনেজঙ্গলে এবং গুপ্তস্থানে খাদ্য ও অস্ত্রশস্ত্র মাটির নীচে পুঁতে রেখে গ্রামবাসী ও ছােট ছােট সহরের অধিবাসীদের বললেন, “তােমাদের জন্য এই রসদ ও অস্ত্র মাটির নীচে সঞ্চিত রইল। শত্রু এলে যেভাবে পার তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলল। তাছাড়া আমাদের সঙ্গে যােগাযােগ রেখাে।”
রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৩ রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধলে সােভিয়েট গেরিলারা সত্যই জার্মানদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলল। অধিকৃত এলাকায় গেরিলা-যােদ্ধারা কোথাও জঙ্গলে কোথাও পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিল। জার্মানদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হবার মত শক্তি গেরিলাদের নেই। কাজেই রাত্রির অন্ধকারে আত্মগােপন করে তারা জার্মানদের ট্যাঙ্কাশয়, রেজিমেন্টের প্রধান শিবির প্রভৃতিতে আচমকা হানা দিয়ে বিস্তর ক্ষতি করতে লাগল। কেবল তাই নয়, জার্মানদের যােগাযােগপথে সােভিয়েট নারী গেরিলা যােদ্ধা। কাস্তে ফেলে এই সব কৃষকরমণী রাইফেল ধরেছে। আক্রমণ চালিয়ে তারা তাদের বিষম বিবৃত করে তুলল ; এমন কি রসদ ও অস্ত্র বােঝাই জার্মান ট্রেনগুলিকে পর্যন্ত তারা লাইনচ্যুত করে ফেলতে লাগল। সােভিয়েট গেরিলারা কেবল যে রাত্রেই আক্রমণ করে এমন নয়, দিনের বেলা ঝােপঝাড় হতে অকস্মাৎ বেরিয়েও তারা সুযােগ পেলে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে। সব সময় সকলের রাইফেলও জোটে না, ১৩৮ মহাযুদ্ধে সােতিয়েট দা কাস্তে, খন্তা কুড়ুল, যার যেমন অস্ত্র জোটে তেমন অস্ত্র নিয়েই। তারা প্রতিপক্ষকে ঘা দিতে অগ্রসর হয়। হাতের কাছে মানুষ মারার যে কোন একটা অস্ত্র তাদের পেলেই হল। সােভিয়েট গেরিলাদের এরূপ আক্রমণের ফলে জার্মানরা আর যে-সে পথে সরবরাহ পাঠাতে পারে না; একমাত্র বড় বড় রাজপথ দিয়েই ‘কনভয় করে তারা সরবরাহ পাঠাতে বাধ্য হয়। তাতে সােভিয়েট বিমান বাহিনী জার্মান সরবরাহের ওপর আক্রমণ চালাতে যথেষ্ট সুবিধা পায়; কিন্তু জার্মানরা সােভিয়েট সরবরাহের বিমানহানা দিতে ততখানি সুবিধা পায় না। উপরন্তু সােভিয়েট গেরিলাদের আক্রমণে জার্মানরা এতটা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে যে, অধিকৃত এলাকায় প্রত্যেক সরবরাহকেন্দ্রে তারা রক্ষীর সংখ্যা বিস্তর বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়। এটাও জার্মানীর পক্ষে একটা কম অসুবিধার কথা নয়। রণাঙ্গনের পশ্চাতে এভাবে পাহারার জন্য রক্ষীর সংখ্যা অস্বাভাবিক ভাবে বাড়াতে না হলে জার্মানী অনায়াসেই যুদ্ধক্ষেত্রে আরাে বেশী সৈন্য নিয়ােজিত করতে পারত; কিন্তু সােভিয়েট গেরিলাদের অতর্কিত আক্রমণ হতে নিজ রসদ ও সরবরাহরক্ষার জন্য জার্মানীকে তার সুশিক্ষিত সৈন্যদলের একটা বড় অংশ কেবল পাহারার কাজে নিযুক্ত রাখতে হয়। এভাবে সােভিয়েট গেরিলারা রণক্ষেত্রে সপক্ষের বাহিনীর ওপর প্রতিপক্ষের বাহিনীর চাপ খানিকটা হ্রাস করে। তারপর অধিকৃত সােভিয়েট এলাকায় গেরিলাদের ভয়ে জার্মান সৈন্যদের মনােবল কতখানি ক্ষুন্ন হয় তাও ভাববার বিষয়। তাদের সদাই ভয়-এই বুঝি এল। যে কোন মুহূর্তে গুপ্ত আক্রমণে তাদের প্রাণ যেতে পারে। গুপ্ত ঘাতকের ছােরা যে কখন বক্ষে বিদ্ধ হবে তার কিছু ঠিক নেই। অধিকৃত সােভিয়েট এলাকায় জার্মানদের ঠিক রুশ-জার্মান যুদ্ধ এই অবস্থায়ই কাটাতে হয়। ঘুমােতে গিয়েও তারা নিশ্চিন্ত মনে ঘুমােতে পারে না। অন্ধকারে কখন অন্ধকারে কখন সােভিয়েট নরনারী- সােভিয়েট নরনারী-এমন কি বালকবালিকা পর্যন্ত এসে অকস্মাৎ তাদের বিশ্রামাগারে হানা দেবে এবং পালাবার চেষ্টা করলে বুকে ছুরি বসিয়ে দেবে অথবা গুলী করবে—ঠিক কি ? এ অবস্থায় কারো মনােবল ঠিক থাকতে পারে । মিঃ ফিলিপ জর্ডন বলেন –“রুশিয়ায় আমি জার্মান বন্দীদের মধ্যে অনেককে বলতে শুনেছি যে, ক্রমাগত গেরিলাদের ভয়ে থাকার চাইতে তারা বরঞ্চ পালিয়ে এসে বন্দী হয়ে ভালই আছে।” এ থেকেই বােঝা যায়, রণক্ষেত্রের পশ্চাতে সােভিয়েট গেরিলারা প্রতিপক্ষের মধ্যে কতখানি বিভীষিকা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এর চেয়ে আরাে বড় কাজ গেরিলাদের রয়েছে। সােভিয়েট গেরিলারা নিয়মিতভাবে শত্রুর খবরাদি সংগ্রহ করে সপক্ষের সৈন্যদলকে সেগুলি যােগায়। শত্রু যে-এলাকায় অবস্থান করে গেরিলারাও সেই এলাকায়ই থাকে। পথঘাট তাদের সবই জানা। কাজেই শত্রুর খবরাদি সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সহজ। অনেক সময় গা ঢাকা দিয়ে তার বিপক্ষের সলাপরামর্শ পর্যন্ত শুনে নেয় এবং শুনে নিয়ে তারা তা সপক্ষে পৌছায়। অনেক সময় তারা, বিপক্ষের রেজিমেন্ট ও ডিভিসনের প্রধান শিবিরে হানা দিয়ে মানচিত্র ও গুপ্ত দলিলপত্রাদি হাত করে এবং অবিলম্বে সেগুলি লাল ফৌজের প্রধান শিবিরে পাঠায়। কোন কোন গেরিলার সঙ্গে ছােট বেতার- প্রেরকযন্ত্র থাকে এবং তার সাহায্যে তারা স্বপক্ষে খবর দেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা হাতে হাতে চিঠিপত্র পাঠায়। এই খবর পৌছাবার কাজেই বালক বালিকারা সাহায্য করে বেশী। অন্ধকারে তারা শত্রুপক্ষের ব্যুহ পেরিয়ে গিয়ে স্বপক্ষের শিবিরে খবর পৌছিয়ে এমন কি ১৪০ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট আসে এবং তাদের মারফৎই আবার লাল ফৌজের কর্তারা গেরিলাদের নতুন নির্দেশ পাঠান। এই সব সংবাদবাহকরা অনেক সময় পকেট ভরতি করে রাইফেলের গুলীও নিয়ে আসে। এই কাজটা যত কঠিন বলে মনে হচ্ছে তত কঠিন নয়। সুদীর্ঘ রুশ রণাঙ্গনে সর্বত্রই যে কাতারে কাতারে সৈন্য মােতায়েন রয়েছে এমন মনে করা ভুল। ঘাঁটিগুলির মাঝে মাঝে খানিকটা করে ফঁাক থাকেই। সেই সব ফাক দিয়েই অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে সংবাদবাহকরা যাতায়াত অবশ্য কোন জরুরী প্রয়ােজন উপস্থিত হলে সােভিয়েট গেরিলারা জার্মান ঘাটির কাছ দিয়েও যেতে ইতস্তত করে না ; সেক্ষেত্রে সমস্ত বিপদকেই তারা বরণ করে নেয় । বরণ করে নেয়। সােভিয়েট গেরিলাদের প্রধান নীতিই হল এই যে, যেখানে তাদের বাস সেখানে থেকেই তার শেষ পর্যন্ত লড়বে ; বেতনভুক সরকারী সৈন্যদের মত তার স্থান হতে স্থানান্তরে যাবে না। অধিকাংশই তাদের কৃষক এবং আজীবন তারা সেখানে বাস করে আসছে। কাজেই প্রতিটি পথঘাট, নদীনালা, গাছপালা এবং ঝােপঝাড় তাদের একেবারে নখদর্পণে ভাসে। জার্মানদের পক্ষে তা জানা অসম্ভব। কাজেই সােভিয়েট গেরিলারা শত্রুর চক্ষে সহজেই ধূলি দিতে পারে। কোন সােভিয়েট সৈন্ত যখন তার দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন গেরিলারা তাকে আবার দলে ফিরে যেতে সাহায্য করে। তা না হলে কখনাে কখনাে তারা তাকে নায়করূপে নিজেদের মধ্যে রেখে দেয়। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের এই জনসেনার কৃতিত্বের কথা বলতে গিয়ে মিঃ ফিলিপ জর্ডন বলেছেন- “প্রেরণা পেলে ভারতীয়দের পরিচালনায় এবং ভারতীয়দের শিক্ষায় রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৪১ এক শক্তিশালী ভারতীয় গেরিলা-বাহিনী রাতারাতি গড়ে না ওঠবার কোন কারণ নেই।” ভারতে গেরিলা-বাহিনী অর্থাৎ জনসেনা গড়ে তােলবার প্রয়াে- জনীয়তা সম্বন্ধে দ্বিমত করার কিছুই থাকতে পারে না। গেরিলা- বাহিনী গঠনের পক্ষে ভারতবর্ষ যে প্রশস্ত ক্ষেত্র ইতিহাসেও তার নজির রয়েছে। শিবাজী গেরিলা বাহিনীর সাহায্যেই এক সময় বিরাট মােগল বাহিনীকে অস্থির করে তুলেছিলেন। কিন্তু গেরিলা-বাহিনী অর্থাৎ জনসেনা গঠন করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়ােজন জনসাধারণের গবর্ণমেন্ট প্রতিষ্ঠা এবং জনসাধারণের প্রতি গবর্ণমেন্টের আস্থা স্থাপন। সেই আস্থা স্থাপন করে বিদেশী শাসকগণ কি ভারতের জনসাধারণের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে পারবেন? সােভিয়েট গেরিলারা কিভাবে পােড়ামাটি নীতি সার্থক করে তােলে, এবার তৎসম্পর্কে কিছু বলা যাক। একটি গ্রামের দৃষ্টান্ত দিলেই তার খানিকটা বােঝা যাবে। য়ুক্রেনে জার্মান অভিযানের সময় কোন একটি গ্রামের লােক যখন জানতে পারল যে, নাৎসীরা তাদের গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে তখন গ্রামের অল্পবয়স্করা দল বেধে শস্যভাণ্ডার খালি করে নিকটবর্তী রেলষ্টেসনে সমস্ত শস্য নিয়ে গিয়ে মালগাড়ীতে তা চাপিয়ে দিল। ট্রেণ সেগুলি রণাঙ্গনের পিছনে নিয়ে গেল। পঞ্চাশ ষাট মণ শস্য আর স্থানান্তরে পাঠান সম্ভব হল না। গ্রামবাসীরা আগুন লাগিয়ে তা পুড়িয়ে ফেলল। যৌথ খামারের কৃষাণীরা তাদের গরুবাছুর ফলন্ত ক্ষেতে ছেড়ে দিয়ে সমস্ত খাইয়ে দিল। যে ফসল কাটবার মত হয়েছিল সেগুলিকে কেটে মাড়াই করে স্থানান্তরে পাঠাবার মত সময় ছিল না। কাজেই কৃষাণীরা কান্তে দিয়ে সেগুলি কেটে তার ওপর দিয়ে ট্রাক্টর চালিয়ে সেগুলিকে এমন ভাবে মাটির সঙ্গে ১৪২ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট মিশিয়ে দিল যে, কারাে আর তা কুড়িয়ে পাবার উপায় রইল না। আলু, গাজর প্রভৃতির ক্ষেতগুলি চষে তারা একেবারে নষ্ট করে দিল। শূকরগুলি কেটে ধারেকাছে যেসব লাল ফৌজ ছিল তাদের দিয়ে দেওয়া হল। শূকর ও ঘােড়ার আস্তাবল এবং গােয়ালগুলি ভেঙ্গে ফেলা হল। ভাল ঘােড়াগুলিকে গেরিলা-যােদ্ধাদের ব্যবহারের জন্য জঙ্গলের দিকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। কেবল তাই নয়, চাষের সমস্ত একটি যৌথ খামারে জার্মানদের আসবার আগে সােভিয়েট কৃষকরা ট্র্যাক্টর গলিয়ে মাটির সঙ্গে ফসল মিশিয়ে দিচ্ছে। যন্ত্রপাতি গ্রামবাসীরা ভেঙ্গে ফেলল, তাদের স্থানীয় চিনির কলটিকে তারা ধূলিসাৎ করে দিল। এমন কি কোন পুকুরে পর্যন্ত তারা একটি মাছ রাখল না। দোকানের জিনিসপত্র যা পারল তারা পিছনে সরিয়ে বাকীটা নষ্ট করে দিল। কুয়ােগুলি তারা ভরাট করে ফেলল এবং গ্রাম থেকে শিশু ও বালকবালিকাদের সরিয়ে দিয়ে গ্রামবাসীরা রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৪৩ প্রতিপক্ষের সঙ্গে গেরিলা কৌশলে যুদ্ধ করবার জন্য নিকটবর্তী বনে- জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নিল। কেবল গ্রাম নয়, সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে সহরগুলিকেও শক্রর হাতে পড়ার আগে এভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। গেরিলাযুদ্ধ চালাতে গিয়ে সােভিয়েট জনসাধারণকে নাৎসীদের হাতে নির্যাতিতও কম হতে হয় নি। অনেকক্ষেত্রে নাৎসীরা তাদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করে। সামােখিন নামে একজন গেরিলা যােদ্ধা ধরা পড়লে নাৎসীরা তাকে এই বলে ভয় দেখায় যে, সে যদি দলের সকলের কথা বলে না দেয় তাকে ট্যাঙ্কের চাকার নীচে ফেলে পিষে মারা হবে। কোন খবর দিতেই সে অস্বীকার করে। নাৎসীরা তখন তাকে ও অন্যান্য বন্দীকে একটা ট্যাঙ্কের সঙ্গে বেঁধে কাঁটাবনের মধ্য দিয়ে অতি দ্রুতগতিতে ট্যাঙ্ক চালিয়ে দেয়। নাৎসী-অধিকৃত এলাকা থেকে এক যৌথ খামারের দুজন স্ত্রীলােক অতি কষ্টে সােভিয়েট ব্যুহে চলে আসে এবং নাৎসীরা কিভাবে তাদের গ্রামে প্রবেশ করে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে তারা বলে—নাৎসীরা যৌথ খামারের চেয়ার- ম্যানকে ধরে দুটি ট্যাঙ্কের সঙ্গে একদিকে তার পা এবং একদিকে তার হাত দুটি বাধে এবং সমস্ত গ্রামবাসীর চোখের সামনে তারা তার দেহটাকে টুকরা টুকরা করে ছিড়ে ফেলে । টুকরা করে ছিড়ে ফেলে। তারপর তারা সমস্ত গ্রামবাসীকে শাস্তি দেবার ভয় দেখায় এবং বলে যে স্থানীয় সােভিয়েট কর্তাদের সকলকে ধরিয়ে দেওয়া হােক। কৃষকরা এই ঘৃণ্য কাজ করতে অসম্মত হয়। তখন গ্রামের সাতজন বৃদ্ধকে দড়ি দিয়ে বেঁধে গ্রামের একটি ময়দানে নিয়ে তাদের ওপর দিয়ে একটি ভারি ট্যাঙ্ক চালিয়ে দেওয়া হয়। তারপর চলে গ্রামবাসীদের ওপর তাদের অকথ্য অত্যাচার। বিশেষ করে স্ত্রীলােকের ওপর অত্যাচারটাই মাত্রা ছাড়িয়ে যায়।
১৪৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে হৃত এলাকা পুনরুদ্ধারের পর আরাে বহু গ্রাম থেকে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ এরূপ নৃশংস অত্যাচারের কাহিনী শুনতে পান; কিন্তু এত নির্যাতন ও নিপীড়ন সহ্য করেও গ্রামবাসীরা তাদের সংকল্পে অটুট থাকে এবং স্বাধীনতার জন্য তারা সকল বিপদ ও ক্ষতিকে তুচ্ছজ্ঞান করে। সােভিয়েট গেরিলাদের কাহিনী দিয়ে একখানি বিরাট গ্রন্থ রচিত হতে পারে। কাজেই এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে তাদের যথার্থ পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। সােভিয়েট গেরিলাবাহিনীর যে এক বীরাঙ্গনা তার অপূর্ব ত্যাগ ও শৌর্যের জন্য অমরত্ব লাভ করেছে, তার কথা দিয়েই এ প্রসঙ্গ শেষ করব। এই সােভিয়েট বীরাঙ্গনার নাম জয়া কসমােডেমিয়ানস্কায়া, কিন্তু তানায়া নামেই সে সমধিক পরিচিত। মস্কোর ওপর জার্মানরা যখন ভীষণ ভাবে চাপ দেয় জয়া তখন স্বদেশরক্ষার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গেরিলাদলে যােগদান করে এবং জার্মান বাহিনীর পশ্চাতে থেকে কাজ চালায়। শিক্ষিতা তরুণী, বয়স মাত্র আঠার, রুশ ও বিদেশী সাহিত্য অধ্যয়নে সে রত ছিল। কিন্তু দেশের দুর্দিনে অধ্যয়ন নিয়ে সে স্থির থাকতে পারল না-ছুটে গেল সে জার্মানদের পশ্চাতে তাদের বিব্রত করে তােলার জন্য। মস্কোর অদুরে পেটিশচেভাের পাদ্দিকে গিয়ে সে গেরিলাদের সঙ্গে যােগ দিল। সেখানে বহু জার্মান সৈন্য আস্তানা গেড়েছিল। জার্মান শিবিরে এবং বারুদ ও তেলের গুদামগুলিতে সে আগুন লাগাতে লাগল। প্রতিপক্ষের চক্ষে ধূলি দিয়ে এমনভাবে সে তাদের অস্থির করে তুলল যে, তারা দস্তুরমত তার ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। দিনের বেলা সে জঙ্গলে আত্মগােপন করে থাকত এবং, রাত্রি- বেলা আক্রমণ চালাত। এভাবে কিছুদিন চলল। তারপর খাদ্যের অভাবে তার দলের লােকেরা পুনরায় অনধিকৃত সােভিয়েট এলাকায়
রুশ-জার্মাম যুদ্ধ
১৪৫
ফিরে যেতে বাধ্য হল। কিন্তু জয়া কিছুতেই গেল না। সে জার্মানদের
পিছনে থেকেই কাজ চালাতে লাগল। অবশেষে একদিন রাত্রে একটি
রসদবােঝাই জার্মান গাড়ীতে আগুন লাগাতে গিয়ে সে ধরা পড়ল।
খবর বের করার জন্য
জা মা ন রা তাকে
নানাভাবে নিগৃহীত
করল, কিন্তু কিছুতেই
তারা কোন কথা
তার
কাছ
থেকে
আদায় করতে পারল
; এমন কি সে
তার নিজের নামটিও
পর্যন্ত প্রকাশ করল
না।
শীতের রাত্রে
নগ্নপদে এবং একরূপ
খালি গায়ে তাকে
বরফের ওপর দিয়ে
হটিয়ে নেওয়া হল।
তৃষ্ণার্ত হয়ে জল
চাইলে প্রহরীরা এনে
সােভিয়েট বীরাঙ্গনা জয় কসমােডেমিয়ানস্কায়
তাকে বিদ্রুপ করে কেরােসিন তেল পান করতে দিল। তারপর একটা
জলন্ত ল্যাম্প এনে তার মুখের ওপর রাখা হল। অবশেষে গ্রামের একটি
ময়দানে নিয়ে জার্মানরা তাকে ফঁাসীকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিল। তার ফঁাসী
দেখবার জন্য গ্রাম থেকে সকলকে জোর করে ধরে আনা হল।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ফাসীমঞ্চে গিয়ে জয়া গ্রামবাসীদের দেখে বলল, “বন্ধুগণ, নিরাশ হয়াে না, সাহসে বুক বাধাে। সংগ্রাম চালিয়ে যাও, নাৎসীদের ধ্বংস কর, তাদের পুড়িয়ে মার, কখনাে তাদের ছেড় না। মৃত্যুকে আমি ভয় করিনে। দশের জন্য মরা তাে সৌভাগ্যের কথা।” জার্মান অফিসাররা যখন তাদের এই নৃশংসতার ছবি তুলে নিচ্ছিল তখন তাদের উদ্দেশ করে জয়া একবার বলে উঠল, “তােমরা আমাকে ফাসী দিতে পার, কিন্তু আমি একা নই। আমার মত লক্ষ লক্ষ লােক রয়েছে। তাদের সকলকে তােমরা ফাসী দিতে পারবে না। আমাকে তােমরা হত্যা করবে, কিন্তু এর প্রতিশােধ তারা নেবে। জার্মান সৈন্যগণ, সময় থাকতে তােমরা আত্মসমর্পণ কর। লাল ফৌজের জয় অনিবার্য।” তারপর তার গলায় ফাসীর রজ্জ পরিয়ে দিয়ে একজন জার্মান সৈন্য যখন লাথি মেরে তার পায়ের তলা থেকে বাক্সটা সরিয়ে দেবে তখন জয়। এই ক’টি কথা বলে পৃথিবী থেকে শেষ বিদায় নিল, “বিদায়, বন্ধুগণ, বিদায়। সংগ্রাম চালিয়ে যাও, ভয় নেই। ষ্ট্যালিন আমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি তােমাদের মুক্তি দিতে আসবেন।” জয়ার সেই আবেদন ব্যর্থ হয় নি। প্রতিটি সােভিয়েট নরনারীর অন্তরকে তা স্পর্শ করেছে। তার নামে “স্বর্ণ তারকা” পদক ঘােষণা করে তার স্মৃতির প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ সােভিয়েট সামরিক সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। সে আজ “সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের বীরাঙ্গনা” আখ্যা লাভ করেছে। কেন? কিসের জন্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে আপামর জনসাধারণের এই মৃত্যুপণ ? রণাঙ্গনের উন্মাদনায় নয়, কর্তৃপক্ষের কুটিতে নয়- লােকচক্ষুর অগােচরে, নীরবে, নিঃশব্দে এবং স্বেচ্ছায় এই যে তারা রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৪৭ তিলে তিলে আত্মদান করে যাচ্ছে-এর মূলে রয়েছে কোন্ প্রেরণা। এই প্রশ্নই আজ জগদ্বাসীর কাছে সব চেয়ে বড় প্রশ্ন এবং জগতের নিপীড়িত মানবসমাজের মুক্তির মধ্যেই রয়েছে এই প্রশ্নের যথার্থ লেনিনগ্রাভ-অবরােধ আবার মূল রণাঙ্গনের কথায় আসা যাক। আগষ্ট মাসের শেষ দিকে রুশ রণাঙ্গনে বর্ষা আরম্ভ হয় এবং নীপার নদীর বক্ষ স্ফীত হয়ে ওঠে। উত্তরে ফন লীবের বাহিনী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে লেনিনগ্রাডের কাছাকাছি হাজির হয়। আগষ্ট মাস শেষ না হতেই তারা ফিনল্যাণ্ড উপসাগরের দক্ষিণ তীরে কিংইশশপের নিকট গিয়ে পৌছে এবং দক্ষিণ দিক দিয়ে একটু ঘুরে গিয়ে নভগােরড দখল করে। পরে এই নভগােরড হতেই তারা ভলখফ নদীর তীর ধরে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয় এবং লেনিনগ্রাড-মস্কো রেলপথ বিচ্ছিন্ন করে। তারপর আরাে এগিয়ে গিয়ে তারা লেনিনগ্রাড-ভলােগ রেলপথ অতিক্রম ওদিকে লাডােগা হ্রদের পশ্চিম ও পূর্ব তীর ধরে ফিন বাহিনীও এসে চাপ দেয়। ফলে স্থলপথে লেনিনগ্রাড একরূপ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একমাত্র লাডােগা হ্রদ দিয়ে জলপথে মূল সসাভিয়েট ভূমির সঙ্গে কিছু যােগাযােগ থাকে। জার্মানরা যখন লেনিনগ্রাডের দিকে এগিয়ে যেতে আরম্ভ করে, বর্ষার জলে তখন সেখানকার পথঘাট ক্রমশ দুর্গম হয়ে ওঠে। জার্মানদের তরফ থেকে এক বেসরকারী খবরে দাবী করা হয় যে, তারা লেনিনগ্রাডের পনর মাইলের মধ্যে গিয়ে পৌছেছে। কিন্তু কার্যত জার্মান বাহিনী তখন লেনিনগ্রাডের বুহিবহে গিয়েই ঠেকে; আর তারা এগুতে পারে না। সহরের প্রায় ১৪৮ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট পঞ্চাশ মাইল বাইরে সােভিয়েট বহির্বহ রচিত হয়। সেই পর্যন্ত গিয়েই জার্মানরা দাড়িয়ে যায়। লেনিনগ্রাডরক্ষার জন্য সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই নানারূপ ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। লেনিনগ্রাড সােভিয়েটবাসীদের তীর্থস্থান বললেও অত্যুক্তি হয় না। ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে বলশেভিক বিপ্লবের সূত্রপাত হয়েছিল সেখানে। প্রথম দিকে লেনিনগ্রাডের নাম ছিল পেট্রোগ্রাড এবং পরে নাম হয়েছিল সেন্ট পিটার্সবুর্গ । বিপ্লবােত্তরকালে মহামতি লেনিনের নামানুসারে এই নগরের নাম হয় লেনিনগ্রাড। এই নগরকে কেন্দ্র করে চতুষ্পর্শে সব বড় বড় কল- কারখানা গড়ে ওঠে কারখানার যন্ত্রপাতি, জাহাজ, কাগজ, এমিনিয়ম, সেলােজ প্রভৃতি শিল্পের দিক দিয়ে লেনিনগ্রাড সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষস্থানীয় বললেও চলে। কাজেই এই নগর- রক্ষার আয়ােজন সােভিয়েট কতৃপক্ষ ভালভাবেই করেন। নগরের চারদিকে ত্রিশ বর্গমাইল ব্যাপে কংক্রীটের নানারূপ প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হয়। উত্তরে ও পশ্চিমে লাডােগা হ্রদ এবং ফিনল্যাণ্ড উপসাগর, দক্ষিণে ভলডাই পাহাড় ও দক্ষিণ-পশ্চিমে নার্ভা এবং পিপাস হ্রদ পর্যন্ত দুর্গমালা, ট্যাঙ্ক ফেলবার কঁাদ ও স্থলমাইনে আকীর্ণ করে রাখা হয়। ফিনল্যাণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কায় লাল ফৌজের কর্তৃপক্ষ ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দ হতেই লেনিনগ্রাডরক্ষার ব্যবস্থা সম্প্রসারিত ও দৃঢ়তর করে আসেন। রুশ-ফিন যুদ্ধের পর ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে তঁারা সেই ব্যবস্থাকে আরাে পাকাপােক্ত করে তােলেন। এছাড়া আগেই বলেছি, মার্শাল ভরােশিলফ প্রায় দশ লক্ষ সুশিক্ষিত সৈন্য নিয়ে নগররক্ষার জন্য প্রস্তুত হন। কেবল তাই নয়, প্রয়ােজন হলে লেনিনগ্রাডের ত্রিশ লক্ষ অধিবাসীই যাতে রাস্তায় রাস্তায় প্রতিপক্ষের রুশ-জার্মান যুদ্ধ সঙ্গে লড়তে পারে, তিনি তেমনভাবেও তাদের শিক্ষিত করে তােলেন। এই বিরাট আয়ােজনের ফলে জার্মান ও ফিন বাহিনী চারদিক থেকে আক্রমণ চালিয়েও শেষ পর্যন্ত তেমন সুবিধা করতে পারে নি। বারংবার নগরের কাছে গিয়েও সােভিয়েট বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে আবার তাদের ফিরে আসতে হয়। ভলড়াই পাহাড় এলাকা থেকে লাল ফৌজ পাল্টা আক্রমণ চালিয়েও লেনিনগ্রাডরক্ষীদের ওপর হতে খানিকটা চাপ কমায়। এদিকে সেপ্টেম্বর মাসে মার্শাল টিমমাশেঙ্কোর বাহিনী সমালেনস্ক ও ভিয়াজমার মধ্যবর্তী এলাকায় পাল্টা আক্রমণ করে এবং তাতে মস্কোর দিকে জার্মান বাহিনীর অগ্রগতি কিছুদিনের মত বন্ধ থাকে। কিন্তু অক্টোবর মাসে জার্মানরা মধ্য রণাঙ্গনে পুনরায় উদ্দাম গতিতে আক্রমণ চালায় এবং মস্কোর উত্তর-পশ্চিম, পশ্চিম এবং দক্ষিণ দিক দিয়ে ত্রিধারা অভিযান করে। উত্তর দিকে লেনিনগ্রাড রেলওয়ের ওপর অবস্থিত কালিনিন সহর তারা দখল করে। রেজেভ থেকে জার্মানরা ভলােকোলামস্ক অভিমুখে অগ্রসর হয়। সমালেনস্ক-রেলপথ ধরে তারা ভিয়াজমা এবং বরােডিনাের মধ্য দিয়ে মােজাই পর্যন্ত এগিয়ে যায়। মােজাই হতে মস্কোর দূরত্ব প্রায় ৬০ মাইল। আরাে দক্ষিণে গিয়ে ব্রিয়ানস্ক হতে তারা কালুগা এবং তারপর কালুগা হতে মালাে- রােস্লাভেৎস পর্যন্ত অগ্রসর হয়। আরাে দক্ষিণে ওরেল থেকে জার্মান টুলার দিকে ধাওয়া করে। মােজাইঙ্কের উত্তরে ও দক্ষিণে দুই বালজ সৃষ্টি করে জার্মানরা সােভিয়েট সৈন্যদের পরিবেষ্টনের প্রয়াস পায় এবং সেইজন্যই উক্ত দুই এলাকায় যুদ্ধ অতিশয় প্রচণ্ড হয়ে ওঠে। কিন্তু সােভিয়েট বাহিনীর প্রবল প্রতিরােধে জার্মানদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ইতিমধ্যে বৃটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে এক ত্রিশক্তি সম্মেলনের উদ্দেশ্যে লর্ড বীভারব্রুক এবং মিঃ আভেরেল হরিম্যানের নেতৃত্বে একদল বৃটিশ ও মার্কিন প্রতিনিধি ২৮শে সেপ্টেম্বর মস্কোতে গিয়ে পৌছেন। সেখানে মঃ ষ্ট্যালিন এবং অন্যান্য সােভিয়েট নেতাদের সঙ্গে তিনদিনব্যাপী আলােচনার পর সম্মেলনের তরফ থেকে ঘােষণা করা হয় যে, সােভিয়েট সামবিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষগণ যেমন প্রয়ােজন বােধ করবেন তেমনভাবে তাদের রসদ ও সমবােপকরণাদি সরবরাহ করা হবে বলে এক চুক্তি হয়েছে। আরাে বলা হয় যে, কোন পথে কিভাবে বেশী মাল প্রেরণ করা সম্ভব সেসব বিষয়েও বিবেচনা করে সমস্ত ঠিক করা হয়েছে। এই চুক্তির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঋণ ও ইজারা দান’ আইন অনুসারে মাল প্রেরণের ব্যবস্থা হয়। ওদিকে দক্ষিণ য়ুক্রেনে ওডেসারক্ষীরা শক্ত কর্তৃক পরিবেষ্টিত হয়েও দীর্ঘকাল আত্মরক্ষা করে। মঃ লজোভস্কি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এক বিবৃতিতে বলেন, “ওডেসা তকও নয়, ডানকার্কও নয়, ওডেসা ওডেসা।” তার সেই উক্তিতে বাড়াবাড়ি কিছুই ছিল না; কেননা ওডেসা পবি- বেষ্টিত হওয়ার অনেকদিন পর সােভিয়েট সরকারী মুখপত্র ‘ইজতেস্তিয়ার সহিত’সংশ্লিষ্ট মেজর ভিলেনস্কি ওডেসা হতে মস্কোতে গিয়ে যে বিবরণ দেন তাতে তিনি বলেন যে, তখনাে পর্যন্ত ওডেসার স্বাভাবিক নাগরিক জীবনযাত্রার তেমন কোন ব্যত্যয় হয় নি। ট্রাম, বাস, দোকানপাট এবং ডাকের চিঠি বিলি তখনাে রিতিমতই চলেছে, একমাত্র টেলিগ্রাম পেতে সময়ের কিছু এদিক সেদিক হয়। অবরুদ্ধ হলেও ওডেসায় খাদ্যসঙ্কট দেখা দেয় নি ; গম, চিনি ও তরিতরকারী প্রচুর পরিমাণে গুদামজাত রুশ-জার্মান যুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় সিগারেটের কারখানাগুলিও দস্তুরমত চলেছে। এক মাংসের কিছু অভাব হয়, তার কারণ আশপাশের যেসব লােক মাংস সরবরাহ করত তারা বিপক্ষের আগমনবার্তা পেয়েই শত্রুর ট্যাঙ্ক, ঘায়েল করবার জন্য একজন্ (সাভিয়েট পদাতিক বসে গ্রেনেড অর্থাৎ হাতবােমা ঠিক করে নিচ্ছে। সময় থাকতে তাদের গরুবাছুর ও অন্যান্য গৃহপালিত পশু অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। সহরের প্রান্ত হতে প্রায় ১০ মাইল দূরে বৃত্তাকারে রণাঙ্গন মহাযুদ্ধে সােভিয়েট বিস্তৃত। সেই রণাঙ্গন ও সহরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে রয়েছে প্রচুর শস্য- সম্পদ। তা থেকেই সহরে ফলমূল, তরিতরকারী প্রভৃতি সরবরাহ হয়। তখনো পর্যন্ত ওভেসার কৃষ্ণসাগরের পথে জাহাজে করে খাদ্য আনাতে হয় নি। যা কিছু আসে অস্ত্রশস্ত্র ও নানাবিধ সমােপকরণ। তাছাড়া ওডেসায় সেই অবস্থায়ও অস্ত্রনির্মাণের কতকগুলি নতুন কারখানা স্থাপিত হয়। এ থেকে বুঝতে কোন কষ্ট হয় না যে, সােভিয়েট সৈন্যরা ওডেসা রক্ষার জন্য কিরূপ আয়ােজন করে এবং তারা সেখানে কতখানি দৃঢ়তা দেখায়। ওডেসার কাছে এসে প্রতিপক্ষ ভেবেছিল দু’তিন দিনের মধ্যেই তারা বন্দর দখল করে নেবে এবং বিজিত অঞ্চলের খাদ্যাদিতেই তাদের চলবে; কিন্তু তাদের সেই দুই আশাই ব্যর্থ হয়। ক্ষিপ্র- গতিসম্পন্ন যান্ত্রিক যুদ্ধের যুগেও একরূপ অবরুদ্ধ অবস্থায় দীর্ঘকাল ওডেসার আত্মরক্ষা সত্যই বিস্ময়কর। কিয়েফের পতন এদিকে বিয়েফ রণাঙ্গনে যুদ্ধের মােড় জার্মানদের অনুকূলে ঘুরে যায়। ১৭ই সেপ্টেম্বর তারা কিয়েফ সহর দখল করে। তার আগে আগষ্ট মাসের প্রথম ভাগেই জার্মানরা একবার কিয়েফের উপকণ্ঠে গিয়ে হাজির হয়েছিল সে কথা পূর্বে বলেছি। তখন লাল ফৌজের তাড়া খেয়ে তাদের পশ্চাতে হটে আসতে হয়। তারপর কিছুদিন কিয়েফের দিকে জার্মান-অভিযানে শিথিলতা আসে। উত্তরে লেনিনগ্রাড এবং দক্ষিণে ওডেসা নিয়েই তারা বিষম ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস আসতেই জার্মানরা আবার কিয়েফ রণাঙ্গনে জোর দেয়। তারা নীপার নদী পার হয়ে নিপ্রোপেট্রোভঙ্কের কুশ-জার্মান যুদ্ধ উত্তরে ক্রেমেনচুগ দখল করে নেয়। তখনই বােৰা যায়, জার্মান বাহিনীর দক্ষিণ বাহু সেপথে গিয়ে কিয়েফ পরিবেষ্টন করতে চায়। অপর বাহু যায় কিয়েফ হতে ৮০ মাইল উত্তর-পূর্বে চার্নিজোজের পথে । এই দুই সহর যুগপৎ জার্মানদের দখলে যাওয়ায় কিয়েফের বিপদ ঘনিয়ে আসে। কিয়েফ দখলের জন্য জার্মান বাহিনী সহরের প্রান্তে পৌছেই প্রথমে বহিবুহ ভেদ করে এবং তারপরই কয়েকদিনের জন্য তারা থেমে যায় এবং কেবল লাল ফৌজের পাল্টা আক্রমণ হতে আত্মরক্ষা করতে থাকে। ইতিমধ্যে জেনারেল ফন বক ও জেনারেল ফন রুগুষ্টেডটের বাহিনী পার্শ্বদেশ দিয়ে ঘুরে গিয়ে সহরের প্রায় ষাট মাইল পূবে মিলিত হয়। এদিকে সহরের বহির্দেশে যেসকল জার্মান সৈন্য কেবল আত্মরক্ষায় ব্যাপৃত থেকে সময় অতিবাহিত করছিল তারা সুযােগ বুঝে এবার সহরে প্রবেশের চেষ্টা করল। সেই সময় সহরের উত্তর দিক দিয়ে নীপারের পূর্ব তীর হতে কয়েক ডিভিসন জার্মান সৈন্য পার হয়ে আসল এবং দক্ষিণ দিক হতে নীপারের পশ্চিম তীর ধরে আরাে কয়েক ডিভিসন জার্মান সৈন্য এগিয়ে এসে কুশদের সুরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করল। এই এলাকাকে আশ্চর্যভাবে নানা কৌশলে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। তা ভেদ করতে জার্মান বাহিনীকে কম বেগ পেতে হয় নি। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের আক্রমণে কিয়েফের আত্মরক্ষা- ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ল এলং লাল ফৌজ কিয়েফত্যাগে বাধ্য হল। রুশ-জার্মান যুদ্ধ বাধার পর জার্মানরা যে তিনটি প্রধান লক্ষ্যস্থলের দিকে অভিযান চালায় তন্মধ্যে কিয়েফ একটি। আর দু’টি হল মস্কো • ও লেনিনগ্রাড়। কাজেই সামরিক গুরুত্বের দিক দিয়ে কিয়েফ দখলদ্বারা জার্মানদের লাভ-লােকসান যাই হােক, দক্ষিণ রণাঙ্গনে এই ১৫৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট সাফল্য জার্মানদের মধ্যে নতুন উদ্যম ও উৎসাহের সঞ্চার করে এবং এই বিজয়স্তম্ভকে সামনে বেখে নাৎসী নায়কগণ সমর-পরিচালনায় অধিকতর সুবিধা পান। কিয়েফ দখলের পর জার্মানরা দাবী করে যে, তাদের পরিবেষ্টনের ফলে সেই এলাকায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার সােভিয়েট সৈন্য বন্দী হয়। কিন্তু কিয়ে দখলের জন্য জার্মানী অনুমান আড়াই লক্ষ সৈন্য নিযুক্ত করে। আড়াই লক্ষ সৈন্যের পক্ষে প্রায় ৪ লক্ষ সৈন্য বন্দী করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বিশেষত লাল ফৌজের মত যােদ্ধারা অত সহজে আত্মসমর্পণ করে না। কিয়েফের পূর্বদিকে জার্মানরা লাল ফৌজকে পরিবেষ্টনের চেষ্টা করেছিল একথা সত্য; কিন্তু মার্শাল বুদেনী তার আগেই সেখান থেকে তার সৈন্য সরিয়ে নিয়ে যান এবং কিছু পূবে গিয়ে নতুন ব্যহ রচনা করেন। কিয়েফে সাফল্য লাভের সঙ্গে সঙ্গেই নীপারের ভাটির দিকে জার্মানরা নদী পেরিয়ে ক্রিমিয়ার দিকে অভিযান চালায়। দিনের মধ্যেই তারা পেরেকোপ বােজকে উপনীত হয় । তাতে ক্রিমিয়া স্থলপথে মূল সােভিয়েট ভূমি হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে জার্মানরা প্রথমে ৭৫ হাজার সৈন্য নিয়ােজিত করে। কয়েক দিন বাদেই তারা আরো সেখানে শক্তি বাড়ায়। পেরেকোপ যােজকে উভয় পক্ষে ঘাের যুদ্ধ বাধে এবং লাল ফৌজ প্রতিপক্ষকে সেখানে বেশ কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখে। পেরেকোপ বােজকে বাধা পেয়ে জার্মানরা চেষ্টা করে ক্রিমিয়ায় প্যারাশুট নামাতে। সােভিয়েট পক্ষ তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। ক্রিমিয়ায় প্যারাশুটী নামান যে সহজ নয় জার্মানরা সামান্য চেষ্টা করেই তা বুঝতে পারে।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৫৫ ক্রিমিয়ার পশ্চিম প্রান্তেই ছিল প্রসিদ্ধ । সােভিয়েট নৌদুর্গ সিবালােপােল। তাছাড়া কৃষ্ণসাগর হতে সােভিয়েট নৌবিভাগীয় বিমান ক্রিমিয়ার যুদ্ধে লাল ফৌজকে বিশেষভাবেই সাহায্য করে। ওদিকে কিয়েফ দখলের পর জার্মানরা সেখান হতে প্রায় দু’শ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে এবং ক্রেমেনচুগ হতে অনুমান ৬৫ মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পােলটাভা সহরও দখল করে। পােলটা হতে একটি রেলপথ কিয়েফে এবং আর একটি রেলপথ পুবে খারকফে গিয়েছে। কাজেই জার্মানরা পােলটাভায় গিয়ে খারকফে পৌছবার মতলব আঁটে। পােলটাভা হতে খারকফ উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ৮৫ মাইল দূরে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ শিল্পপ্রধান নগর। সেখানে সােভিয়েট পক্ষের বিস্তর ট্যাঙ্ক নির্মিত হত। তাছাড়া সেখানে অন্যান্য কারখানার সংখ্যাও যথেষ্ট। কাজেই কিয়েফের পতনের পর জার্মানরা খারকফ দখলের জন্য বিশেষ ভাবে চেষ্টিত হয় । সেই সময় খবর পাওয়া যায়, সাইবেরিয়া মার্শাল ব্লচার শীতকালে যুদ্ধ চালাবার জন্য পাঁচ লক্ষ সােভিয়েট সৈন্যকে বিশেষ ভাবে শিক্ষিত করে তুলছেন ; ডিসেম্বর মাসেই সেই সৈন্যদল যুদ্ধে নামতে পারবে। সােভিয়েট সামরিকক্ষেত্রে মার্শাল ব্লচারের একটা বিশিষ্ট স্থান আছে। ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দে ‘ভন্নর নিকটে ইয়ারােস্লাভ জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার নামের উচ্চারণ অনেকটা জার্মান ধরণের ; কিন্তু তিনি খাটি রুশ। তার জন্মস্থানের অনেকেরই নাম জার্মানদের নামের অনুরূপ। মার্শাল ব্লচারের কর্মজীবন আরম্ভ হয় একজন শ্রমিকরূপে এবং পরে তিনি একজন মেকানিক, হন। ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে বয়স তখন তার খুবই কম-সেই সময়ই তিনি বিপ্লবী দলে যােগ দেন। তারপর গত মহাযুদ্ধে সােভিয়েট মহাযুদ্ধে সৈন্যদলে ডাক পড়ায় বাধ্য হয়ে তিনি জারের পক্ষে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে তিনি আহত হন এবং বীরত্বের জন্য পুরস্কার পান। অতঃপর ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে তিনি লেনিনগ্রাডে সােভিয়েট সৈন্যদল গঠনে সহায়তা করেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সামরিক ব্যাপারে বিচক্ষণ- তার পরিচয় দেন এবং রুশিয়ার গৃহযুদ্ধে কয়েক স্থলে বলশেভিক সৈন্য পরিচালনা করেন। সাইবেরিয়ার দিকে তিনি তখন যুদ্ধ চালান এবং কার্যত সােভিয়েটের সুদূর প্রাচ্য তিনিই রক্ষা করেন। কোলচাক, সেমেনফ প্রভৃতি বিপ্লববিরােধী নায়কগণ তাঁরই সৈন্যদল কর্তৃক পরাভূত হন এবং জাপানীরা মার খেয়ে ব্লাডিকােষ্টকে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তারপর কিছুকালের জন্য তিনি মস্কোতে ফিরে আসেন এবং লাল ফৌজের পুনর্গঠনে মঃ লিয়াঁ ট্রটস্কিকে সাহায্য করেন। কিন্তু আকর্ষণটা তার থাকে সুদূর প্রাচ্যের দিকেই। কাজেই সুযােগ আসামাত্রই তিনি মােঙ্গোলিয়ায় চলে যান। তার কিছুকাল পর ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথে একদিন ভ্রমণকালে হঠাৎ রেলের কামরায় চিয়াং কাইশেকের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। চিয়াং তখন চীনের একজন তরুণ সামরিক অফিসার। আলাপের ফলে উভয়ের মধ্যে বিশেষ সৌহার্দ্য জন্মে। চিয়াং বুচারকে ক্যান্টনে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করলেন। রুচার সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তিনি লাল ফৌজ হতে বিদায় নিয়ে ক্যান্টনে গেলেন এবং সেখানে গিয়ে চিয়াংএর সামরিক বিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষকের পদ গ্রহণ করলেন। চীনারা তাকে ‘গা-লিন’ বলে ডাকত। ফলে তার পরিচয় নিয়ে এক রহস্যের সৃষ্টি হল। চীনে বিদেশীরা তাকে জেনারেল ‘গ্যালেন’ বা ‘গ্যালান্ট” বলে অভিহিত করত এবং কয়েক বছর তিনি সুচারের পরিবর্তে এই নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। চিয়াং কাইশেক রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৫৭ } প্রথম দিকে যেসকল অভিযানে জয়লাভ করেন তার গৌরব রুচারেরই অধিকাংশ প্রাপ্য। তারপর কনিষ্টদের সঙ্গে চিয়াংএর যখন বিরােধ উপস্থিত হল, রুচার তখন চীন হতে পালিয়ে মস্কোতে ফিরে গেলেন। সেখান হতে আবার তাকে সাইবেরিয়ায় পাঠান হল । ১৯২৯ খৃষ্টাব্দে তিনি সােভিয়েট সুদূর প্রাচ্যবাহিনীর প্রধান সেনাপতিত্ব লাভ করেন। বলতে গেলে সাইবেরিয়ার সােভিয়েট বাহিনী একরূপ তারই সৃষ্টি। ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে মার্শাল ব্লচারের পদচ্যুতি, গ্রেপ্তার, হত্যা, আত্মহত্যা প্রভৃতি নানারূপ আজগুবি খবর রটে ; কিন্তু তিনি আগাগােড়া মঃ ষ্ট্যালিনের বিশেষ অন্তরঙ্গই থাকেন এবং সােভিয়েট সুদূর প্রাচ্য নানাভাবে সুরক্ষিত করে জাপানের সাইবেরিয়া অভিযানের আকাঙ্ক্ষা অনেকখানি দমিয়ে দেন। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে রুশ-রণাঙ্গনে যুদ্ধের অবস্থা মােটামুটি এরূপ দাড়ায় : উত্তরে জার্মানরা সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে লেনিনগ্রাড দখলের চেষ্টা করে। মধ্য রণাঙ্গনে স্মেলেনঙ্ক এলাকায় মার্শাল টিমােশেঙ্কোর বাহিনী বার বার প্রতিপক্ষের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। দক্ষিণে ২৯শে সেপ্টেম্বর কিয়েফের পতন হয়। কিয়েফের পূর্বদিকে পশ্চাদ- পসরণের সময় মার্শাল বুদেনীর বাহিনীকে পরিবেষ্টনের জন্য জার্মানরা যে চেষ্টা করে তা ফেঁসে যায়। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে উত্তরে নভগােরড হতে গেঁলেনস্কের পূর্ব দিয়ে নীচের দিকে এসে নিপ্রােপেট্রোভঙ্ক হয়ে দক্ষিণে ক্রিমিয়া পর্যন্ত জার্মানরা প্রায় এক সােজা লাইন করে দাঁড়ায়। বার্লিনে তখন হিটলার ঘােষণা করেন যে, রুশ রণাঙ্গনে জার্মান অভিযান আগাগােড়া পরিকল্পনা অনুযায়ীই চলেছে এবং ইতিমধ্যে লাল ফৌজের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গিয়েছে।
১৫৮ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট তারপর অক্টোবর মাস পড়তেই জার্মানরা মস্কোর দিকে নবােদ্যমে অভিযান চালায়। তার দক্ষিণে মুক্রেনের দিকে তারা নীপার নদী পেরিয়ে খারকফ দখল করে এবং ডােনেট্রজ, অববাহিকার বড় বড় শিল্পকেন্দ্র ও খনিপ্রধান সহরগুলি হস্তগত করার পর ডােনেটজ নদীর দিকে অগ্রসর হয়। কৃষ্ণসাগর ও আজফ সাগরের সমগ্র উত্তর উপকূল ভাগ দখল করে তারা টাগানরগ পর্যন্ত এগিয়ে যায় এবং সেখান হতে ডন নদীর মােহনায় অবস্থিত প্রসিদ্ধ বন্দর রােষ্টফের অদূরে গিয়ে বহু চেষ্টা করেও সােভিয়েট বাহিনী ওডেসারক্ষায় অসমর্থ হয় এবং ক্রিমিয়া মূল সােভিয়েট ভূমি হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জার্মানরা পেরকোপ যােজকে ভীষণ ভাবে লড়াই আরম্ভ করে। মধ্য রণাঙ্গনে ২০শে অক্টোবর মস্কো নগরী একরূপ অবরুদ্ধ বলে ঘােষিত হয় এবং সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ মস্কো হতে প্রায় পাঁচশ মাইল দূরে ভয়াতীরে অবস্থিত কুইবিশেফ সহরে কোন কোন সরকারী দপ্তর- খানা স্থানান্তরিত করেন। বিদেশী দূতরাও মস্কো হতে সেখানে চলে যান। ২৪শে অক্টোবর সমগ্র রুশ রণাঙ্গনকে দু'ভাগে ভাগ করে দু’জন প্রধান সেনাপতির ওপর দু’রণাঙ্গনের ভার দেওয়া হয়। মস্কো হতে লেনিনগ্রাড পর্যন্ত উত্তর রণাঙ্গনের ভার পান জেনারেল জুকফ এবং সমগ্র দক্ষিণ, রণাঙ্গনে সৈনাপত্য লাভ করেন মার্শাল টিমােশেঙ্কো। মার্শাল ভরােশিলফ এবং মার্শাল বুদেনী রণাঙ্গনের পশ্চাতে গিয়ে নতুন সৈদল গঠন ও তাদের শিক্ষাদানের ভার গ্রহণ করেন। জেনারেল জুকফ একজন চাষীর ছেলে। সেই অবস্থা থেকে তিনি ক্রমে লাল ফৌজের সেনানীমণ্ডলীর অধ্যক্ষ হন। বয়স তাঁর পঞ্চাশেরও কম। তিনি একজন ভাল অশ্বারােহী। এক সময় তিনি সুদূর প্রাচ্যে সােভিয়েট দ্বিতীয় আর্মি কোরের অধিনায়কত্বও করেছিলেন। তারই রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৯৪৩ পরিচালনায় সােভিয়েট সৈন্যরা চ্যাংকুফেং পর্যন্ত যায় এবং ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে মােঙ্গোলীয় সীমান্তে জাপানীদের পরাভূত করে। খৃষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে তিনি মার্শাল পদে উন্নীত হন। জেনারেল জুফের ওপর মস্কোরক্ষার ভার অর্পিত হবার পর মার্শাল শাপোশনিকফ পুনরায় সােভিয়েট সেনানী- ম ও লীর অধ্যক্ষ- পদে নিযুক্ত হন। কিছুকাল আগে স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ায় তিনি অবসর গ্রহণ করে- মার্শাল জুক ছিলেন এবং তাঁর স্থলে জে না রে ল জুকফ অধ্যক্ষ নিযুক্ত হয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, রুশ ষ্ট্যাটেজী মা শা ল শাপােশনিকফের জ্ঞান অসাধারণ এবং মঃ ষ্ট্যালিন তার মতামতের বিশেষ মূল্য দিয়ে থাকেন। যুক্রেনে ডােনেটজ, অববাহিকা ও আজফ সাগরের উত্তর তীর ধরে রােষ্টফের দিকে জার্মানরা এগিয়ে যাওয়ায় সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের তৈল- ভাণ্ডার ককেশাসের সমূহ বিপদ দেখা দেয়। ক্রিমিয়ায় জার্মান সাফল্য আরাে ভয়ের কারণ হয়ে দাড়ায়। সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগে জার্মানরা ক্রিমিয়া আক্রমণ করে। সােভিয়েট বাহিনী প্রায় এক মাস সঙ্কীর্ণ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট যােজক পেরকোপে তাদের ঠেকিয়ে রাখে। ২৯শে অক্টোবর জার্মানরা সােভিয়েট ব্যুহ ভেদ করে ক্রিমিয়ায় ঢুকে পড়ে এবং তিন দিন পরে ক্রিমিয়ার রাজধানী সিম্ফারােপােল তাদের দখলে যায়। সােতিয়েট বাহিনীর একটা অংশ গিয়ে সিদ্যোপােলের আত্মরক্ষাব্যুহে আশ্রয় নেয় এবং অপর অংশ পূর্বদিকে পশ্চাদপসরণ করে। ৪ঠা নবেম্বর জার্মানরা থিওডােসিয়ায় প্রবেশ করে এবং তারপর আরাে পূবে এগিয়ে গিয়ে তুমুল যুদ্ধের পর ১৭ই নবেম্বর তারা কার্চ বন্দর দখলে সমর্থ হয়। • তার ফলে আজফ সাগরের প্রবেশপথে তারা আধিপত্য চেষ্টা না অনেকে তখন অনুমান করেন যে, সঙ্কীর্ণ কার্চ প্রণালী পেরিয়ে জার্মানরা ককেশাসে অভিমান করবে। কিন্তু সে পথে অভিযানের করে জার্মানরা স্থলপথে ককেশাসে পৌছার জন্য রােষ্টফের দিকে চাপ দেয়। কার্চ থেকে ককেশাসে অভিযান চালাতে জার্মানরা দু’টি কারণে ইতস্তত বােধ করে। প্রথমত ক্রিমিয়ার পশ্চিম প্রান্তে প্রসিদ্ধ নৌদুর্গ সিবাতোপােল তখনাে পর্যন্ত লাল ফৌজের হাতে। দ্বিতীয়ত কৃষ্ণসাগরে সােভিয়েট নৌবলের প্রাধান্য। কাজেই তারা স্থলপথে যাওয়াই অধিকতর নিরাপদ বলে মনে করে। আজফ সাগরের তীর ধরে তারা রােষ্টফ বন্দরে গিয়ে উপনীত হয়; কিন্তু সেখানেই শুরু হয় মার্শাল টিমােশেঙ্কোর পাল্টা আক্রমণ। ডন নদী পার , হয়ে মার্শাল টিমােশেঙ্কোর বাহিনী সােজা রােষ্টফ বন্দরে প্রতিপক্ষের উপর আক্রমণ চালায় এবং তার ফলে জার্মানরা রেষ্টত্যাগে বাধ্য হয়। নবেম্বরের শেষ সপ্তাহে এই পাল্টা আক্রমণ চলে। ডােনেজ, এলাকা থেকেও সােভিয়েট বাহিনী প্রতিপক্ষের পার্শ্বদেশে ঘা দেয় এবং তার ফলে জার্মানরা রােষ্টফের পঞ্চাশ মাইল পশ্চিমে টাগানরগে রুশ-জার্মান যুদ্ধ { সরে আসতে বাধ্য হয়। এতে ককেশাসের সমূহ বিপদ তখনকার মত কেটে যায়। বােষ্ট উদ্ধার করে লাল ফৌজ ডােনেজ, শিল্পাঞ্চল শত্রুমুক্ত করার প্রয়াস পায়। ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দে যুদ্ধ বাধার পর স্থলযুদ্ধে জার্মানীর এই প্রথম সর্বাপেক্ষা বড় পরাজয়। ওদিকে ডিসেম্বর মাসে ক্রিমিয়ায়ও আবার যুদ্ধের চাকা ঘুরে যায়। ৩০শে ডিসেম্বর জলপথে সােভিয়েট সৈন্য এসে ক্রিমিয়ায় অবতরণ করে এবং কার্চ বন্দর ও থিওডােসিয়া পুনরায় তাদের হস্তগত হয়। কয়েকদিন পর ক্রিমিয়ার পশ্চিম প্রান্তে ইওপেটোরিয়ায়ও সােভিয়েট সৈন্য অবতরণ করে এবং সিবাস্তোপােলরক্ষীরা তৎপর হয়ে ওঠে। সােভিয়েট পাল্টা আক্রমণ এদিকে প্রচণ্ড শীত আসার আগেই মস্কো দখলের জন্য জার্মানরা মধ্য রণাঙ্গনে বিশেষ জোর দেয়। সমস্ত নবেম্বর মাস ভরে তারা সেখানে ক্রমাগত শক্তি বাড়িয়ে চলে। মস্কোর উত্তর-পশ্চিমে শতখানেক মাইল দূরে অবস্থিত কালিনিন সহর হতে আরম্ভ করে মস্কোর দক্ষিণে টুলা পর্যন্ত বিস্তৃত রণাঙ্গনে জার্মানরা সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। অক্টোবর মাসের মস্কো-অভিযানে মাত্র সতেরটি জার্মান ডিভিসন নিয়ােজিত হয়েছিল ; নবেম্বর মাসে সেখানে নিয়ােজিত হয় চল্লিশ ডিভিসন। দিনের পর দিন অবিরাম ট্যাঙ্কযুদ্ধ চলতে থাকে। কালিনিনের দক্ষিণে জার্মানরা এগিয়ে ক্লিন পর্যন্ত যায় এবং সেখান থেকে মস্কো-ভয়া খালের দিকে তারা অগ্রসর হয়। মােজাই- মালাে য়ারােস্লাভেৎস এলাকায় তারা নারা নদী পার হয়ে নারাফোমিনস্ক অতিক্রম করে এবং মস্কোর উপকণ্ঠ হতে মাত্র ৩৬ মাইলের মধ্যে গিয়ে পৌছে। মস্কোর দক্ষিণ দিকে টুলায় বাধা পেয়ে তাদের দাঁড়াতে মহাযুদ্ধে সােতিয়েট হয়:সত, কিন্তু টুলার পূর্বদিকে এগিয়ে তার স্ট্যালিনােগৰু দখল করে এবং সেখান থেকে তারা উত্তরে ওকা নদীর তীরে পৌঁছবার প্রয়াস পায়। কিন্তু তর আর তারা যেতে পারে না। কিছু দূর গিয়েই তাদের থামতে হয়। ডিসেম্বর মাসের প্রথম ভাগে মস্কো-রণাঙ্গনে জার্মান আক্রমণের তীব্রতা শিথিল হয়ে আসে। প্রচণ্ড শীতে জার্মানদের অবস্থা অত্যন্ত কাহিল হয়ে দাড়ায় ; সুযােগ বুঝে সােভিয়েট বাহিনী তাদের ওপর দুর্বার বেগে পাল্টা আক্রমণ চালায়। আক্রমণােম জার্মানদের হাত হতে সােভিয়েট হাতে চলে যায় এবং জার্মানরা ক্রমশ পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। জার্মান সামরিক কর্তৃপক্ষ অবশ্য সাফাই গাইতে আরম্ভ করেন যে, শীতকালে আত্মরক্ষার জন্য রণাঙ্গন সঙ্কোচনের প্রয়ােজনেই জার্মান বাহিনী পশ্চাতে হটে এসে নতুন ব্যুহে আশ্রয় নিচ্ছে । কিন্তু সােভিয়েট বাহিনীর পাল্টা চাপে যে তারা সরে আসতে বাধ্য হয় সেকথা আর জার্মান সামরিক কর্তৃপক্ষ বেশী দিন চাপা দিয়ে রাখতে পারেন না। দেখতে দেখতে মস্কোর উত্তর-পশ্চিমে ক্লিন ও কালিনিন সহর পুনরায় সােভিয়েট বাহিনীর হস্তগত হয়। মস্কোর পশ্চিমে সােভিয়েট বাহিনী আবার তলােকোলাম এবং রুজাতে বিজয়গর্বে প্রবেশ করে। মালাে য়ারােস্লাভেৎস হতে টুল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় জার্মানরা দ্রুত পশ্চাদপসরণ করে। কেবল মােজাইঙ্কে জার্মানরা দৃঢ়ভাবে দাড়িয়ে থাকে। ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে একমাত্র মােজাইল্কের নিকটবর্তী এলাকা ভিন্ন জার্মানরা সর্বত্র মস্কো হতে একশ মাইলের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়। কেবল মস্কো রণাঙ্গনেই নয়, লেনিনগ্রাডের পূবেও লাল ফৌজ টিভিন পুনরুদ্ধার করে। নবেম্বর মাসে টিভিন জার্মানদের হাতে { কল-কাৰ্মান যুদ্ধ ১ । গিয়েছিল। টিখনি থেকে সােভিয়েট বাহিনী চুড়ােত হয়ে নৃভগােরডের দিকে এগিয়ে যায়। তাদের এই অগ্রগতি ও কালিনিন পুনরধিকারের ফলে লেনিনগ্রাড-মস্কো রেলপথ মুক্ত হয়, এবং উভয় নগরের মধ্যে পুনরায় সরাসরি চলাচলের পথ খুলে যায়। লাল ফৌজ টুলার দক্ষিণে ইয়েলেৎস পুনরুদ্ধার করে মস্কো-রােষ্টফ রেলপথ মুক্ত করে এবং কুরস্ক ও ধারকফের দিকে এগিয়ে চলে। দক্ষিণে তারা সােভিয়েট বােমারু বিমান ডােনেজ, এলাকা থেকে আক্রমণ চালায় এবং আজফ সাগরের উত্তর তীরস্থিত জার্মান বাহিনীর ওপর ভালভাবেই চাপ দেয়। ক্রিমিয়ায় জলপথে এসে লাল ফৌজ অবতরণে সক্ষম হওয়ায় পূর্ব যুক্রেনে জার্মান বাহিনীর পশ্চাদ্দিক হতে আক্রান্ত হবার একটা আশঙ্কা দেখা দেয়। ১৯শে ডিসেম্বর জার্মান প্রধান সেনাপতি ফিল্ড মার্শাল ফন ব্রাউশিকে পদচ্যুত করে হিটলার সমগ্র জার্মান বাহিনীর অধিনায়কত্ব সহস্তে গ্রহণ করেন। সেই সময় বৃটিশ পররাষ্ট্র সচিব মিঃ ইডেন কমন্সসভায় এক বক্তৃতায় বলেন - “রুশ রণাঙ্গনে সোভিয়েট বাহিনীর বর্তমান সাফল্য আকস্মিক ১৬৪ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ৰা অপ্রত্যাশিত নয়। গ্রীষ্মকালীন যুদ্ধে সােভিয়েট বাহিনী পশ্চাদপসরণ করেছে সত্য, কিন্তু প্রতিপক্ষের তারা ক্ষতিও করেছে যথেষ্ট। পােড়ামাটি নীতি অনুসরণ করে তারা কোন উপকরণই প্রতিপক্ষের হস্তগত হতে দেয়নি। তারপর রণাঙ্গনের পশ্চাতে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ বিপুল ভাবে নতুন সৈন্যদল গড়ে তুলেছেন। একদিকে জার্মান বাহিনী যখন রণক্লান্ত ও দুরন্তু শীতে বিপর্যস্ত, তখন অপরদিকে সােভিয়েট পক্ষ রণাঙ্গনে নতুন সৈন্যদল আমদানী করে প্রতিপক্ষের ওপর ভীষণ ভাবে চাপ দেয় এবং তাতেই জার্মান বাহিনী এভাবে কাহিল হয়ে পড়ে। মার্শাল ভরােশিলফ ও মার্শাল বুদেনী নতুন সৈন্যদল গঠনে যে সফলকাম হয়েছেন এদ্বারা তা নিঃসন্দেহেই প্রমাণিত হয়। রুশ রণাঙ্গনে জার্মানদের বর্তমান পরাজয়দ্বারা এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না যে, আর তারা মেরুদণ্ড সােজা করে দাড়াতে পারবে না বা এখানেই তাদের শেষ পরাজয় ; কিন্তু একথা অবিসম্বাদিত সত্য যে, ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে জার্মান বাহিনী যে অবস্থায় ছিল আজ আর তারা সেই অবস্থায় নেই। আগামী বসন্ত কালে নতুন উদ্যমে যুদ্ধ চালালেও জার্মানীর পূর্বশক্তি ফিরে পাওয়া কঠিন।” কয়েক মাস পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সােভিয়েট বাহিনী ভৌগােলিক বিচারে দেশ পুনরুদ্ধারের দিক দিয়ে যে খুব বেশী অগ্রসর হতে পারল এমন নয়; কিন্তু তাদের পাল্টা ঘ খেয়ে প্রতিপক্ষের সৈন্য ও সমবােপকরণে যে ক্ষতি হল, সামরিক হিসাবে তার মূল্য যথেষ্ট। হিটলারও একদা বলেছিলেন যে, সােভিয়েট দেশ দখল তার প্রধান উদ্দেশ্য নয়, তার আসল লক্ষ্য সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সমরসামর্থ্য নষ্ট করা। ঠিক একই কথা সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযােজ্য।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ সেও যদি জার্মানীর সমরসাম্য নষ্ট করতে পারে তবে দেশ পুনরুদ্ধার করতে তারও বেশী কষ্ট হবে না। সমরসাম্য নষ্ট হলে হয়ত জার্মান বাহিনী সােভিয়েট ভূমিতে থাকতেই জার্মানীর পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আসতে পারে। গত মহাযুদ্ধেও ঠিক এমনি অবস্থা হয়েছিল। জার্মানী যখন যুদ্ধবিরতি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করল তখনাে পর্যন্ত জার্মান বাহিনী ফ্রান্সেরই বুকে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রুশ রণাঙ্গনেও তার পুনরাবর্তন হওয়া কিছু অসম্ভব নয়। জার্মানীর সমরসামর্থ্য নষ্ট করা সময় সাপেক্ষ ; কেননা সােভিয়েট সােভিয়েট ফাইটার বিমান যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণের আগেই হিটলার য়ুরােপের অধিকাংশ দেশ জয় করে তার সমসামর্থ্য বাড়াবার ব্যবস্থা করে নেন। কিন্তু .‘টাইম টেবল’ অনুসারে অর্থাৎ প্রচণ্ড শীত পড়ার আগেই মঙ্কো- দখলের জন্য প্রবল ভাবে ঘা দিতে গিয়ে নিজে যে ঘা খান তার জের অনেক দূর পর্যন্ত গড়ায়। অনেকের ধারণা আছে এবং সেই ভাবেই যথেষ্ট প্রচারকার্য করা হয়েছে যে, যুদ্ধে জয়লাভের জন্য হিটলার কোন ক্ষতির প্রতিই হৃক্ষেপ কগ্রেন না—অর্থাৎ তিনি যেন সামরিক বল প্রয়ােগে বেহিসাবী। হিটলারের সমরনীতি সম্বন্ধে এ একটা প্রান্ত মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ধারণা। তাঁর উক্তিতে ঠিক এর বিপরীত কথাই পাওয়া যায়। তিনি বলেন :- “যুদ্ধ আরম্ভ হবার আগে কিভাবে শক্রর মনােবল বিনষ্ট করা যায় সেকথাই আমি বিশেষ ভাবে চিন্তা করি। রণাঙ্গনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যাদের আছে তাদের প্রত্যেকেই অনাবশ্যক রক্তক্ষয় এড়াবার চেষ্টা করবেন।” অতএব দেখা যায়, সামরিক বলের প্রয়ােগ সম্বন্ধে হিটলার মোটেই অসাবধান নন। সম্মুখযুদ্ধে বিস্তর ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে বলেই তার বাহিনী সাধারণত পাশ কাটিয়ে গিয়ে প্রতিপক্ষেয় পশ্চাদ্দিকে দুর্বল স্থানে ঘা দিবার চেষ্টা করে। ফ্রান্স, বেলজিয়ম, হল্যাণ্ড প্রভৃতি রণাঙ্গনে এই নীতিতেই তার যুদ্ধ পরিচালিত হয়। যেখানে এর ব্যত্যয় ঘটেছে সেখানেই তাকে বিপুল ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। রুশ রণাঙ্গনেও হিটলারের বাহিনী এই নীতিতেই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল । কিন্তু মস্কোর দ্বারে গিয়ে দেখল সােভিয়েট বাহিনীর আত্মরক্ষাব্যুহ সেখানে দুর্ভেদ্য। অথচ ‘টাইম টেব’ অনুসারে কড়া শীত পড়ার আগেই মস্কো দখল না করতে পারলে মুস্কিল। কাজেই জার্মান বাহিনীর ওপর নির্দেশ হল, যে কোনভাবে মস্কো দখল করতেই হবে। জার্মানরা দক্ষিণে ওরেল হতে এক বাহু এবং উত্তরে কালিনিন হতে আর এক বাহু সম্প্রসারিত করে তাদের সমরনীতি অনুযায়ী মস্কোকে পরিবেষ্টনের চেষ্টা করল। কিন্তু সেই চেষ্টা তাদের ব্যর্থ হওয়ায় মস্কো, দখলের জন্য অবশেষে তারা বেপরােয়া হয়ে সােজাসুজি সােভিয়েট ব্যুহে আক্রমণ চালাল। জার্মান রণকৌশলেব ব্যত্যয় ঘটল এবং তার ফলে মস্কোর দ্বারে গিয়ে তাদের যে বিপুল ক্ষতি যে বিপুল ক্ষতি হল তাতে যুদ্ধের মােড় ঘুরে গেল। মস্কো রণাঙ্গনের প্রভাব সমগ্র সােভিয়েট • রুশ-জার্মান যুদ্ধ রণাঙ্গনের ওপর পড়ল এবং জার্মানরা যা খেয়ে আক্রমণাত্মক নীতি ছেড়ে যুদ্ধে আত্মরক্ষাত্মক নীতি গ্রহণে বাধ্য হল। দেখতে দেখতে প্রচণ্ড শীত এসে পড়ল এবং সােভিয়েট বাহিনীর তাতে খুবই সুবিধা হয়ে গেল। ক্রমাগত মা খেয়ে লাল ফৌজ যেটুকু দুর্বল হয়ে পড়েছিল সময় পেয়ে তারা তা সেরে নিল। হিটলারও এই পরাজয়ের গ্লানি হতে মুক্তির জন্য তার বসন্তকালীন অভিযানের আয়ােজনে মন দিলেন। দ্বিতীয় বর্ষের অভিযান সােভিয়েট রণাঙ্গনে এই বিষম ক্ষতি হওয়া সত্বেও হিটলার পুনরায় বসন্ত কালে অভিযান চালাবার জন্য নতুন শক্তিসঞ্চয়ে সক্ষম হলেন। সােভিয়েট শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণার আগে তিনি একে একে য়ুরােপের দেশগুলি গ্রাস করেন। ইচ্ছায় হােক, অনিচ্ছায় হােক, সেই সব দেশ তাকে সাহায্য করতে বাধ্য। কতকগুলি দেশ হতে তিনি সরাসরি সেনাসাহায্য পান এবং কতকগুলি দেশ হতে তিনি সম্পদ ও শ্রমিক সংগ্রহ করেন। বিজিত দেশসমূহে সৈন্যদল গঠন এবং তাদের রণক্ষেত্রে প্রেরণে অসুসিধা ও আশঙ্কার কারণ আছে; কিন্তু সাধারণ শ্রমিকের কাজে তাদের নিয়ােগ করতে তেমন কোন ভয় বা আশঙ্কার কারণ নেই। আধুনিক ‘টোটাল ওয়ার’ অর্থাৎ সার্বিক ধুদ্ধে শ্রমিকের প্রয়ােজন কত বেশী একথা কারাে অবিদিত নেই। রণাঙ্গনে একজন সৈন্য প্রেরণ করতে হলে তার পশ্চাতে নিতান্ত কম পক্ষে তিনজন শ্রমিক নিয়ােগ করা দরকার। অর্থাৎ প্রতি যােদ্ধায় তিনজন শ্রমিক প্রয়ােজন। যুদ্ধৈ দশ লক্ষ সৈন্য পাঠাতে হলে তাদের অস্ত্র- নির্মাণ ও রসদ সরবরাহের জন্য অন্তত ত্রিশ লক্ষ শ্রমিক দরকার।
মহাযুদ্ধে সােতিয়েট সুতরাং বিজিত দেশসমূহে শ্রমিক সংগ্রহ করে হিটলার বেশী সংখ্যায় জার্মানদের যুদ্ধে পাঠাতে সক্ষম হন। এই কারণেই হিটলারের যােঙ্কসংখ্যা বহুলাংশে বেড়ে যায় এবং রুশ রণাঙ্গনে অপরিমেয় ক্ষতি সত্বেও তার শক্তির উৎস নিঃশেষ হয়ে আসে না। বিজিত দেশ ও মিত্র রাষ্ট্র হতে হিটলার শ্রমিক সংগ্রহ করে কিভাবে শক্তি বাড়ান একটা হিসাব দিলেই তার কতকটা বােঝা যাবে। ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিজিত ও আশ্রিত দেশগুলি হতে হিটলার যত শ্রমিক লাভ করেন নিম্নে তার হিসাব দেওয়া গেল :- নারী পােলাও ৭,৪৪,৮•• ২,৩২,৭০০ দুদেতেনল্যাণ্ড ১,১১,৮০০ ২৮,২০০ স্লোভাকিয়া ৫৪,০০০ ২৬,০০০ হাজারী ২৫,৪০০ ৯,৬০০ যুগােস্লাভিয়া ৮২,৮০০ ২৬,০০০ বুলগেরিয়া ১৪,৪০০ २०० ইতালী ২,৫০,০০ ২১,৭০০ ফ্রান্স ৩৪,০০০ ১৪,৫০০ বেলজিয়ম ১,০৬,৮০০ ১৪,৭০০ ना७ि ৮,৮০০ ১২,৩০০ ডেনমার্ক ২৫,৩০০ ৩,৬০০ অন্যান্য দেশ ১,৩৭,৩০০ (২,৬০০ ১৬,৬৭,৪০০ ৪,৭২,১০০ এই হিসাব অনুসারে দেখা যায়, ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত হিটলার স্ত্রী ও পুরুষে মােট ২১,৩৯,৫০০ শ্রমিক লাভ করেন।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ । তদুপরি সমরবন্দীর সংখ্যা প্রায় বিশ লক্ষ। সমরবন্দীদের অধিকাংশকেই কৃষিকার্যে নিয়ােজিত করা হয়। হিটলার এই উপায়েই তার রুশ রণাঙ্গনের ক্ষতি পূরণ করেন। সেখানে ক্ষতি যতই বেড়ে চলে, অধিকৃত দেশগুলির ওপর ততই শ্রমিক যােগাবার জন্য বেশী চাপ পড়ে। এছাড়া জার্মানীর তাবেদার ও মিত্র রাষ্ট্রগুলি বেশী সৈন্য যােগাতে বাধ্য হয়। তার ফলেই দ্বিতীয় বর্ষেও রুশ রণাঙ্গনে হিটলার ১৭৯টি জার্মান ডিভিসন, ২২টি রুমানীয় ডিভিসন, ১৪টি ফিন ডিভিসন, ১৩টি হাঙ্গারীয় ডিভিসন, ১০টি ইতালীয় ডিভিসন, ১টি স্লোভাক ডিভিসন এবং ১টি স্পেনীয় ডিভিসন—মােট ২৪টি ডিভিসন নিয়ােজিত করতে সমর্থ হন। এই বিরাট বাহিনী নিয়ে হিটলার ১৯৪২ খৃষ্টাব্দের বসন্তকালে পুনরায় রুশ রণাঙ্গনে অভিযান চালান। কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষের এই অভিযান প্রধানত দক্ষিণ রনাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ থাকে, অন্যান্য রণাঙ্গনে জার্মানরা কেবল আত্মরক্ষা করে চলে। মিঃ ইডেন কমসভায় তাঁর বক্তৃতায় যে অনুমান প্রকাশ করেছিলেন তাই সত্যে পরিণত হয়। প্রথম বর্ষের মত দ্বিতীয় বর্ষে জার্মান আক্রমণ আর তত ব্যাপক হয় নি। কেবল দক্ষিণ রণাঙ্গনেই তা সীমাবদ্ধ হয়। মার্শাল টিমােশেঙ্কো প্রথমে খারক এলাকায় জার্মানদের ঠেকাতে চেষ্টা করেন এবং সেখানে কয়েকদিন উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ চলে। কিন্তু জার্মান চাপ সহ্য করতে না পেরে অবশেষে তিনি পশ্চাদপসরণে বাধ্য হন এবং জার্মানরা ক্রমশ পূবদিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এদিকে ক্রিমিয়ায় নৌদুর্গ সিবান্তো- পােলের পতন হয়। রােষ্টফ বন্দরও জার্মানদের হাতে আসে এবং সেপথে তারা ককেশাসে গিয়ে প্রবেশ করে। তার উজানে জার্মানরা ডন নদী পেরিয়ে ষ্ট্যালিনগ্রাড পর্যন্ত যায়, কিন্তু সেখানে তিন মাসের মহাযুদ্ধে সােভিয়েট চেষ্টায়ও তারা ষ্ট্যালিনগ্রাড় দখলে অসমর্থ হয়। জার্মান সৈন্য সহরে প্রবেশ করে, কিন্তু সেখানে রাস্তায়-রাস্তায়, বাড়ীতে বাড়ীতে উভয় পক্ষে যুদ্ধ চলে।কোন সহরের বুকে এমন যুদ্ধ কখনাে হয়েছে বলে এপর্যন্ত শােনা যায় নি। সােভিয়েট বাহিনী শেষ পর্যন্ত নগররক্ষায় সমর্থ হয় এবং সুযােগ বুঝে পুনরায় পাল্টা আক্রমণ আরম্ভ করে। মধ্য রণাঙ্গনে রেজেভের দিকেও সােভিয়েট বাহিনী আক্রমণ চালায় এবং প্রসিদ্ধ রেলওয়ে জংসন ভেলিকি লুকী তারা পুনরায় দখল করে। লেনিনগ্রাড অবরােধমুক্ত হয় এবং ককেশাস থেকে জার্মানরা পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। দীর্ঘকালের অবরােধ হতে মুক্তির পর লেনিনগ্রাভবাসীদের মধ্যে আবার নতুন উদ্যম ফিরে আসে। অবরুদ্ধ অবস্থায় তাদের অশেষ দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হয়। খাদ্যের অভাব হওয়ায় অতি সামান্য পরিমাণে খেয়েই তারা কোন রকমে জীবনরক্ষা করে। বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ট্রেণ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। লােকে তেলের বাতি জ্বালাতে আরম্ভ করে এবং আলানির অভাবে পুরাণ কাঠের ঘরবাড়ী ভেঙ্গে শীতকালে আগুনের ব্যবস্থা করে। সেই অবস্থায় জার্মানরা দূর পাল্লার কামান দেগে সহরের বুকে অহরহ গােলা ফেলতে থাকে। তার ফলে সহরের দক্ষিণাঞ্চলের অধিবাসীদের সরিয়ে আরাে অভ্যন্তরে আনতে হয়। কামানের গােলা ছাড়া বিমান হতে বােমাবৃষ্টি তাে ছিলই। এই অগ্নিপরীক্ষার মধ্যেও লেনিনগ্রাডবাসীরা অম্লানবদনে সকল কাজ চালিয়ে যায় এবং নগররক্ষায় কোনরূপ ? শৈথিল্য দেখা দেয় না। তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য জার্মানরা যত চেষ্টা করেছিল অবশেষে তা সমস্তই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। দ্বিতীয় বর্ষের যুদ্ধে সােভিয়েট বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের জের কোথায় ।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১১ • গিয়ে ঠেকবে ঠিক নেই; কাজেই তার ইতিহাস লেখার সময় এখন আসেনি। কেবল ১৯৪২ খৃষ্টাব্দের নবেম্বর বিপ্লব-বার্ষিকীতে এই অভিযান সম্পর্কে মঃ ষ্ট্যালিন যে বক্তৃতা দেন তা থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ উদ্ধৃত করেই এই অধ্যায় শেষ করা যেতে পারে। তিনি বলেন : “অনেকে মনে করেন, দক্ষিণে জার্মান ফাসিস্তদের আক্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাকুর তৈলাঞ্চল দখল করা। কিন্তু আসলে তৈলাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হওয়া তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না, ওটা ছিল গৌণ লক্ষ্য। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মস্কোকে পূবদিক থেকে ঘেরাও করা। তারা চেয়েছিল পশ্চাদ্দিকস্থ সরবরাহের উৎস থেকে মস্কোকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে। বাকুর দিকে তাদের এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের প্রধান রিজার্ভ সৈন্যদের দক্ষিণে টেনে নেওয়া, মস্কোতে আমাদের বাহিনীকে দুর্বল করা এবং সহজে মস্কো দখল করা। সম্প্রতি আমাদের সৈন্যদের হাতে কতকগুলি জার্মান দলিল পড়েছে। তার মধ্যে একখানি মানচিত্রে দেখা যায়, জার্মানদের অভিপ্রায় ছিল ২৫শে জুলাইর মধ্যে ষ্ট্যালিনগ্রাডে, ১৫ই আগষ্টের মধ্যে কুইবিশেফে এবং ২৫শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকুতে পৌছা। মস্কো দখলের পরিকল্পনা সম্বন্ধে আমরা যে সংবাদ পেয়েছিলাম, এই দলিলগুলির দ্বারা তা সমর্থিত হয়।” ম: ষ্ট্যালিনের এই অনুমান সত্য হয়ে থাকলে হিটলারের দ্বিতীয়বার মস্কোদখলের চেষ্টাও যে ব্যর্থ হয়েছে তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। রণাঙ্গনে লাল ফৌজ একদিন অনেকেরই ধারণা ছিল দুর্মদ জার্মান বাহিনীকে রণাঙ্গনে ঠেকাতে পারে য়ুরােপে এমন কোন শক্তি নেই। কিন্তু সােভিয়েট রাষ্ট্রের লাল ফৌজ লােকের সে ধারণা বদলে দিয়েছে। তার প্রমাণ ১৭২ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট করেছে যে, জার্মান বাহিনী যতই শক্তিশালী হােক, তারা অজেয় নয়। সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করে জার্মানরা তার ক্ষতি যথেষ্টই করেছে, কিন্তু সােভিয়েট সমরসামর্থ্য বিনষ্ট করার যে আশা তার পােষণ করেছিল সে আশা তাদের পূরণ হয় নি । ক্ষতিগ্রস্ত তাদেরও যথেষ্টই হতে হয়েছে এবং লাল ফৌজের পাল্টা আক্রমণ অনেকক্ষেত্রেই তাদের বিব্রত করে তুলেছে। রুশ রণাঙ্গনে এক বছরের যুদ্ধে উভয় পক্ষের ক্ষতি সম্বন্ধে ১৯৪২ খৃষ্টাব্দের ২৩শে জুন মস্কো-বেতারে নিম্নরূপ হিসাব দেওয়া হয় :- জার্মান সােভিয়েট হত, আহত, নিখোঁজ সৈন্য ১ কোটি ৪৫ লক্ষ কামান। ৩০,৫০০ ২২,০০০ ট্যাঙ্ক ২৪,০০০ বিমান ২২,০০০ ৯,০০০ মস্কো-বেতারে আরাে বলা হয় যে, এক বছরে জার্মানীর অন্তত ৩৫ লক্ষ সৈন্ত নিহত হয়েছে। আহত সােভিয়েট সৈন্যদের শতকরা ৭৫ জন আবার সৈঙ্গদলে যােগ দিতে সক্ষম হয়েছে; কিন্তু আহত জার্মান সৈন্যদের শতকরা ৪৩ জনের বেশী পুনরায় সৈন্যদলে যােগ দিতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। তারপর ২৭শে সেপ্টেম্বর মস্কো থেকে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট প্রেরিত বিশেষ প্রতিনিধি মিঃ উইী এক বিবৃতিতে বলেন :- “নিহত, আহত ও নিখোঁজ রুশ সৈন্যের সংখ্যা ৫০ লক্ষ হবে। এ ছাড়া হিটলারের করতলগত রুশ এলাকায় অন্তত ৬ কোটি রুশ দালYখলে আবদ্ধ। আগামী শীতে খাদ্যের বিষম অনটন হবে। বিতকালে লক্ষ লক্ষ লােক ঘরে আগুন রাখবার জন্য জ্বালানি পাবে না।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ
সৈন্য এবং অত্যাবশ্যক শ্রমিকদের বস্ত্র যুগিয়ে সর্বসাধারণের বক্স
বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে সােতিয়েট গ্রাজুয়েট তরুণী। এরাই আজ
সােভিয়েট রাষ্ট্রের শক্তি।
মিলে না বললেই চলে। বহু দরকারী ওষুধপত্রই নেই। তথাপি
১৭ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট সংকল্পে রুশরা অটুট। তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা-হয় বিজয়, না হয় মৃত্যু। বিজয়ের কথা ছাড়া তাদের মুখে অন্য কথা নেই। এরেই বলে সত্যিকারের জনযুদ্ধ। লক্ষ লক্ষ রুশ নারী ও বালক বালিকা সমরসম্ভার উৎপাদনের কারখানায় অম্লান বদনে কাজ করে যাচ্ছে । তারাই কৃষিকাৰ্য্য চালাচ্ছে। আট দশ বছরের বালকবালিকারা পর্যন্ত কাজে যােগ দিয়েছে। সক্ষম সাবালক ব্যক্তিমাত্রই হয় সৈন্যদলে যােগদান করেছে, আর তা না হলে কারখানায় সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এদের যুদ্ধোদ্যম সম্বন্ধে আমি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। নিজের মনে কেবলই প্রশ্ন জাগছে-আমাদের এই শৌর্যশালী মিত্র শক্তিকে কিভাবে সব চেয়ে বেশী সাহায্য করে আমরা জয়লাভের পথ সুগম করতে পারি। আমার নিজের বিশ্বাস, বৃটেনের সহযােগিতায় যত শীঘ্র সম্ভব য়ুরােপে একটি যথার্থ দ্বিতীয় রণাঙ্গন খুলেই সব চেয়ে বেশী সাহায্য করা সম্ভব।” পুঁজিতন্ত্রী দেশের একজন শিল্পপতির মুখ দিয়েই সােভিয়েট জন- সাধারণের দৃঢ়তা সম্বন্ধে এরূপ অকুণ্ঠ প্রশংসা বেরিয়েছে। তারপর রণাঙ্গনেও লাল ফৌজ অন্তত এটা নিঃসন্দেহেই প্রমাণ করেছে যে, জার্মান বাহিনীর তুলনায় তারা রণবিদ্যার দিক দিয়ে কোন অংশেই নিকৃষ্ট নয়। রণনীতি ও রণকৌশলে স্থানে স্থানে তারা শ্রেষ্ঠত্বেরও পরিচয় দিয়েছ। রণাঙ্গনে তারা যেসব বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছে, এখানে সংক্ষেপে তারই আলােচনার চেষ্টা করব। একটা কথা প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল। সােভিয়েট ‘্যাটেজী’ বা রণনীতিই হল প্রথমে বিপক্ষের আক্রমণ প্রতিরােধ এবং ক্রমশ সমস্ত শক্তি সংহত করে শত্রুর বিলােপসাধন। তারই জন্য 'দীর্ঘকাল যুদ্ধ চালাবার উপযােগী করে তার সমরপ্রস্তুতি। এই রণনীতির ওপর রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৭ নির্ভরশীল বলেই সে জানত যে, জার্মান বাহিনী আক্রমণ করলে প্রাথমিক সুবিধা তাদের কিছু হবেই; কারণ রণাঙ্গনে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ শক্তি নিয়ােজিত করতে কিছু সময় কেটে যাবে। জার্মানী আক্রমণ করবে এই আশঙ্কায় আগে হতেই রণাঙ্গনে সে পূর্ণ শক্তির সমাবেশ করতে পারে না, কারণ সেটা তার রণনীতিবিরুদ্ধ। কাজেই এই শক্তি সমাবেশে তার যে সময় লাগবে, সেই অবসরে প্রতি- পক্ষ নিশ্চয়ই সােভিয়েট এলাকায় খানিকটা প্রবেশে সমর্থ হবে এবং তা যে ঠেকান যাবে না লাল ফৌজের কর্তৃপক্ষ তা জানতেন। জানতেন বলেই তারা পূর্বাহেই সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এলাকায় কিভাবে প্রয়ােজন হলে “পােড়ামাটি” নীতি অবলম্বন করা যাবে তার সব ব্যবস্থা ঠিক করে রেখেছিলেন। সেটা তারা রাতারাতি ঠিক করেন নি; সােভিয়েট সমর প্রস্তুতিতে সেটা একটা সুচিন্তিত পরিকল্পনা। সেই জন্যই ফসল থেকে আরম্ভ করে গােলাবারুদ, কলকারখানা পর্যন্ত এই যুদ্ধের মধ্যে তাদের পক্ষে অন্যত্র সরান সম্ভব হয়েছে। যেগুলি সরান সম্ভব হবে না সেগুলিকে ধ্বংস করার পরিকল্পনাও আগেই করে রাখা হয়েছিল। এই “পােড়ামাটি নীতি অবলম্বনে লাল ফৌজের ‘স্যাপার্স বা এঞ্জিনীয়ার বাহিনী যে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে, নিম্নের উদাহরণ থেকেই তা ভাল বােঝা যাবে। ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানরা যখন ক্রিমিয়া দখলে উদ্যত তখন একটি খবর পাওয়া গেল যে, লাল ফৌজ বেতারসাহায্যে দূর থেকে বারুদখানা উড়িয়ে দেবার এক নতুন কৌশল বের করেছে এবং এইভাবে অনেক স্থলে তারা বারুদখানা উড়িয়ে দিচ্ছে। তার ফলে গুপ্ত বারুদখানার সন্ধান করতে গিয়ে বহু জার্মানের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। এর আগে যখন কিয়েফের পতন হয় তখনাে এক খবর পাওয়া মহাযুদ্ধে সােভিয়েট হল। এই নতুন গােলা গিয়েছিল যে, জার্মানরা কিয়েফে প্রবেশের পর কয়েকদিন ক্রমাগত মাইন ফাটতে আরম্ভ করল এবং তার ফলে সহরের অবস্থা এমনি শশাচনীয় হয়ে দাড়াল যে, জার্মানরা আবার সহর ছেড়ে যেতে বাধ্য তারপর জার্মান স্যাপাররা’ গিয়ে খুঁজে বের করল যে কোথায় কোথায় গুপ্ত মাইন পাতা রয়েছে। তারা মাইন কুড়ায়ে সহর বিপন্মুক্ত করলে তবে জার্মান সৈন্যরা আবার কিয়েফে প্রবেশ করে। তারই কিছুদিন আগে আর একটা খবর আসে যে, সােভিয়েট বাহিনী অরণ্যে আগুন লাগাবার জন্যে এক প্রকার নতুন কামানের গােলা আবিষ্কার করেছে। কোনও স্থান ত্যাগ করতে হলে তারা সেই অঞ্চলের অরণ্যে আগুন লাগাবার উদ্দেশ্যে দূর হতে কামান দেগে এই নতু বর্ষণ করে এবং গােলাগুলি পড়েই জ্বলতে থাকে, ফলে সমগ্র অরণ্যে দাবানল জ্বলে ওঠে। প্রতিপক্ষ যাতে এসে অরণ্যসম্পদ লাভ না করতে পারে এবং তাদের অগ্রগতিতে যাতে বিঘ্ন ঘটে তদুদ্দেশ্যেই এরূপ করা হয়। এ থেকেই বােঝা যায়, “পােড়ামাটি” নীতি অবলম্বনে লাল ফৌজ কতখানি তৎপরতা ও কৃতিত্ব দেখিয়েছে। তারপর রণকৌশলের দিক দিয়েও লালফৌজ নতুনত্ব না দেখিয়েছে এমন নয়। পশ্চিম য়ুরোপের যুদ্ধে লােকের মনে ধারণা জন্মেছিল, জার্মান সঁজোয়া বাহিনীর ‘পানৎসার’ ডিভিসনগুলি বুঝি অজেয় এবং অভেদ্য। কিন্তু রুশ রণাঙ্গনে এই ‘পানৎসার’ ডিভিসনগুলিকে কাবু করার জন্য লাল ফৌজ দুটি চমৎকার কৌশল অবলম্বন করে। তারা অনেকক্ষেত্রেই জার্মান পানৎসার’ যুনিটগুলিকে বিনাবাধায় অগ্রসর হতে দেয়। সেগুলি নিশ্চিন্তে অনেক দূর অগ্রসর হলে পর অকস্মাৎ রুশ সাজোয়া বাহিনী গুপ্ত স্থান হতে বেরিয়ে পশ্চাদ্দিকন্তু অপেক্ষাকৃত রুশ-জার্মান যুদ্ধ মন্থরগতিসম্পন্ন জার্মান পদাতিক বাহিনীকে আক্রমণ করে। সােভিয়েট ট্যাঙ্কবহরের এই আক্রমণমুখে পড়ে জার্মান পদাতিক বাহিনী বিভ্রান্ত ও ছত্রভঙ্গ হয়। সামনের ‘পানৎসার’ য়ুনিটগুলিকে নির্বিবাদে অগ্রসর হতে দেখে তারা ধারণাই করতে পারে না যে, তাদের ওপর এরূপ আকস্মিক আক্রমণ হতে পারে। পশ্চাদিকস্থ মূল পদাতিক বাহিনী হতে বিচ্ছিন্ন হবার ফলে সম্মুখস্থ ‘পানৎসার’ য়ুনিটগুলি স্বভাবতই দুর্বল হয়ে পড়ে। এর চেয়ে আরাে একটি চমৎকার কৌশল লাল ফৌজ সময় সময় অবলম্বন করে থাকে। সাধারণত সন্ধ্যার পরে সােভিয়েট মােটর সজ্জিত বাহিনী অন্ধকারে জার্মান বাহিনীর পশ্চাতে গিয়ে ভিড়ে পড়ে। তারপর সুবিধাজনক স্থানে উপস্থিত হলে সুযােগ বুঝে সােভিয়েট সেনা সম্মুখ ও পশ্চাৎ উভয় দিক হতে প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালায়। অন্ধকারে উভয় দিক হতে অপ্রত্যাশিত আক্রমণের ফলে জার্মান ‘বাহিনীতে বিষম বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হয়। কে শত্ৰু, কে মিত্র, তারা চিনে উঠতে পারে না। কিন্তু লালফৌজের সে অসুবিধা হয় না । কারণ কলকাঠি ও আটঘাট তাদের সব আগে হতেই ঠিক করা থাকে। বলা বাহুল্য, রুশিয়ার অরণ্যপ্রধান অঞ্চলেই এসব কৌশল অবলম্বনে সুবিধা হয় ; উন্মুক্ত প্রান্তরের যুদ্ধে এসব কৌশল খাটে না। এ গেল কৌশলের কথা। লাল ফৌজের নির্ভীকতা এবং দৃঢ়তার কথাও আজ আর কারাে অবিদিত নেই। খারকফের যুদ্ধে সােভিয়েট পদাতিক বাহিনী যে দৃঢ়তার পরিচয় দেয় তা অতুলনীয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রথম পর্বে সাধারণত দেখা যায়, ট্যাঙ্ক ঠেকাবার জন্য ট্যাঙ্কই নিয়ােজিত হয়েছে । ট্যাঙ্কধ্বংসী পদাতিক সেনা সেগুলিকে সাহায্য করেছে মাত্র। কিন্তু খারকফের যুদ্ধে যখন সােভিয়েট পক্ষের বিস্তর ট্যাঙ্ক খােয় যায়, তখন লাল ফৌজ এই নিয়মের ১৭৮ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট ব্যতিক্রম করে জার্মান ট্যাঙ্ক-আক্রমণের প্রথম চোট সামলাবার জন্য ট্যাঙ্কধ্বংসী পদাতিকসেনা নিয়ােজিত করে। তাদের সঙ্গে এক দফা রণাঙ্গনে সােভিয়েট গোলন্দাজ বাহিনী। যুদ্ধক্ষেত্রে সােভিয়েট গােলন্দাজরা বিস্ময় স্থাপন করেছে। যুদ্ধ হয়ে যাবার পর সােভিয়েট ট্যাঙ্কবাহিনী এসে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এতে পদাতিক বাহিনীর যে কতখানি দৃঢ়তা দরকার তা বােধ হয় না বললেও চলে।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ লাল ফৌজের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল তার অশ্বারােহী ও স্কী- বাহিনী। যন্ত্রসজ্জার ফলে অন্যান্য দেশে অশ্বারােহী বাহিনী একরূপ লােপ পেতে বসেছে; কিন্তু রুশ রণাঙ্গনে সেদিনও লাল ফৌজের অশ্বারােহী দল যে কৃতিত্ব দেখিয়েছে, তাতে মনে হয় তার প্রয়ােজন অদ্যাবধি শেষ হয় নি। বিশেষ করে জলাভূমিতে যখন ট্যাঙ্ক ও সঁজোয়া গাড়ী চালাতে অসুবিধা হয় তখন সেখানে একমাত্র অশ্বারােহী দলই দ্রুতগতিতে ছুটে গিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে। তাছাড়া আরণ্য অঞ্চলে গা ঢাকা দিয়ে হঠাৎ শত্রুকে আক্রমণ করতেও অশ্বারােহী দলের সুবিধা। কয়েক ক্ষেত্রে জার্মান সাজোয়া বাহিনীকে রুশ অশ্বারােহী দলের অতর্কিত আক্রমণে যথেষ্ট বিব্রত ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। প্রথম বর্ষের অভিযান চালাবার সময় শীতকালে সােভিয়েট স্কী-বাহিনীর দ্বারা জার্মানরা নাস্তানাবুদ কম হয়নি। রুশ রণাঙ্গনে প্রবল ঊষারপাতে বরফ জমায় জার্মানরা যখন আত্মরক্ষাব্যুহে কোন রকমে টিকে থাকবার চেষ্টা করে, সােভিয়েট স্কী-বাহিনী তখন বরফের ওপর দিয়ে ছুটে এসে তাদের ওপর ভীষণভাবে আক্রমণ চালায়। জার্মানরা নিরুপায়, তাদের ঋী-ৰাহিনী নেই। কাজেই কোথাও বাধ্য হয়ে তারা পশ্চাদপসরণ করে, কোথাও স্কী-বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণে তারা বিষম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্কীর সাহায্যে সােভিয়েট বাহিনী রণাঙ্গনে কেবল কামানবন্দুকই যে চালায় এমন নয়, সৈন্যদের জন্য রসদাদিও আনায়। বরফের ওপর তাদের যুদ্ধ করতে দেখে জার্মানরা অনেকক্ষেত্রেই বিস্মিত হয়। অতঃপর সতিয়েট নৌ ও বিমান বাহিনী সম্বন্ধে দু’চার কথা; বলেই উপসংহারে আসব। সােভিয়েট বিমান বাহিনীর সব চেয়ে কৃতিত্ব হল এই যে, এত বড় একটা রণাঙ্গনের কোন স্থানেই জার্মান বিমান ১৮০ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট বাহিনী প্রাধান্য লাভ করতে পারে নি। অথচ এই বিমানবলই ছিল জার্মানীর গৌরব। সর্বত্র সােভিয়েট বিমান বাহিনী সােভিয়েট স্থল- সেনাকে এমনভাবে সাহায্য করেছে এবং পাহারা দিয়েছে যে, জার্মান বিমান বাহিনীকেও বাধ্য হয়ে স্বপক্ষের স্থলসেনাকে সাহায্য করার জন্য সমস্ত রণাঙ্গনে ছড়িয়ে থাকতে হয়েছে। এ জন্যই বােধ হয় লেনিনগ্রাড ওঁ মস্কোর এত কাছে গিয়েও জার্মান ‘লুফৎভাফে’ তেমন- ভাবে হানা দেবার সুযােগ বা অবসর পায় নি। স্থলযুদ্ধ চালিয়ে স্বতন্ত্রভাবে কোথাও জোর হানা দেবার মত অতিরিক্ত বিমানবল যে জার্মানীর ছিল না, একথা রুশ রণাঙ্গনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই বলেছেন। সােভিয়েট ফাইটার বাহিনী যে দুর্ধর্ষ যােদ্ধা এর প্রমাণও বহু ক্ষেত্রেই পাওয়া গেছে। তারা কিরূপ মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করে একটি দৃষ্টান্ত থেকেই তা বােঝা যাবে। রুশ বিমানযােদ্ধারা যখন দেখে যে, প্রতিপক্ষের বিমানকে গুলীগােলা ছুঁড়ে আর কোনক্রমেই কাবু করার উপায় নেই তখন তারা নিজেদের বিমান নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গিয়ে প্রতিপক্ষের বিমানে সােজা ঘা মারে। নিজেদের ধ্বংস নিশ্চিত জেনেও এভাবে বিপক্ষের ক্ষতিসাধনে তারা পরায়ুখ হয় না। পন্থাটা অত্যন্ত মারাত্মক হলেও প্রয়ােজনক্ষেত্রে তারা এ রণকৌশল অবলম্বন করে থাকে। সাবেককালে নৌযুদ্ধে জাহাজের ওপর জাহাজ চালিয়ে এরূপ ramming করা হত। সােভিয়েট বাহিনী কর্তৃক আধুনিক বিমানযুদ্ধেও বিমান দিয়ে বিমানকে এভাবে ram করা সত্যই বিস্ময়কর। বিমানযুদ্ধে লাল ফৌজের দান অসামান্য। প্যারাশুট বাহিনীর প্রবর্তন তারাই প্রথম করে এবং ট্যাঙ্ক ও সৈন্যবাহী বিমানচালনা রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১১ তারাই আগে পরীক্ষা করে দেখে। সম্প্রতি সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ রেড কসের শুশ্ৰষাকারিণীদের প্যারাশুটের সাহায্যে নামাবার ব্যবস্থা করেছেন। বলা বাহুল্য, এও এক অভিনব পন্থা। সােভিয়েট নৌবাহিনীর গুরুত্ব অন্যান্য প্রথম শ্রেণীর রাষ্ট্রগুলির তুলনায় কম। তবে প্রয়ােজনানুরূপ ব্যবস্থা করতেও যে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ ত্রুটি করেন নি তার প্রমাণ বণ্টিক ও কৃষ্ণসাগরের দিকে তাকালেই মিলে। বহু চেষ্টা করেও বণ্টিকের পথে লেনিনগ্রাড অভি- যানে জার্মান নৌবাহিনী সুবিধা করতে পারেনি এবং কৃষ্ণসাগরে অদ্যাবধি সােভিয়েট নৌবহবের প্রাধান্য বিদ্যমান। সাইবেরিয়ার দিকে তার নৌবল কিরূপ রুশ-জাপান যুদ্ধ না বাধলে তা বােঝা যাবে ; তবে জাপান ও সাইবেরিয়ার মধ্যবর্তী দরিয়ায় যে সােভিয়েট সাবমেরিণ বিস্তর রয়েছে সেকথা আর গােপন নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে লাল ফৌজ জগতে বিস্ময় স্থাপন করেছে। কেবল রণনীতি ও রণকৌশলে নয়, আধুনিক মারণাস্ত্র আবিষ্কার, তার নির্মাণ এবং চালনানৈপুণ্যেও সােভিয়েট শক্তি নতুন দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে। নতুন সােভিয়েট বােমা “মলােটফের ঝুড়ির” কথা অনেকেই শুনে থাকবেন। তারপর সেদিনও এক নতুন সােভিয়েট মারণাস্ত্রের খবর বেরিয়েছে। এমন একটা অস্ত্র তারা উদ্ভাবন করেছে যা থেকে এক সঙ্গে ৪২টি ছােট গােল বেরুয়। জার্মানরা এক স্থানে একটা এই নতুন অস্ত্র হস্তগত করেছে এবং তারা পরীক্ষা করে দেখছে যে, জার্মানীতেও তা তৈরী করা যায় কিনা। যুদ্ধ আরাে দীর্ঘকাল চললে এরূপ আরাে নতুন নতুন অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া কিছু বিচিত্র নয়। তারপর সােভিয়েট সৈন্যদের ব্যক্তিগত বীরত্ব এবং স্বদেশপ্রেমের কাহিনীও এপর্যন্ত অনেকই শােনা গিয়েছে। কেবল পুরুষ নয়, ১৮২ মহাযুদ্ধে সােভিয়েট নারীও সেখানে পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে অমিত বিক্রম ও অতুলনীয় শৌর্যের পরিচয় দিচ্ছে। কিছুদিন আগে মস্কোতে সামরিক কায়দায় সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদর্শন করে সােভিয়েট রাষ্ট্রেব তরফ থেকে প্রসিদ্ধ নারী বৈমানিক মেজর মারিনা রাসকোভার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর মস্কোতে রাষ্ট্রের তরফ হতে কারাে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া রণক্ষেত্রে একজন আহত সৈনিক ক্রোড়ে সােভিয়েট স্বেচ্ছাসেবিকা এই প্রথম। মেজর রাসকোভা এক ডাইভ-বােমারু বিমান বাহিনীর অধিনায়িকা ছিলেন। রণাঙ্গনে তিনি প্রাণ হারান এবং শেষ সম্মান প্রদর্শনের জন্য তাঁর মৃতদেহ মস্কোতে নেওয়া হয়। সেখানে সহস্র সহস্র মস্কোবাসী তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ ১৮৩ ১৯৪২ এবার এক সােভিয়েট যােদ্ধা মৃত্যুকালে স্বদেশপ্রেমের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান তার কথা বলেই বক্তব্য শেষ করব। খৃষ্টাব্দের শেষভাগে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সােভিয়েট বাহিনী পুনরায় যুক্রেনের পূর্ব সীমান্তে এসে উপনীত হয়। খৃষ্টীয় বড়দিনের সকালবেলা লাল ফৌজ যখন সীমান্ত অতিক্রম করে য়ুক্রেনে পুনঃপ্রবেশের জন্য প্রথম আক্রমণ চালায় তখন শত্রুর গুলীতে মুক্রেনের এক তরুণ লেফটেনান্ট আহত হন। আহত হয়েও তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন। দ্বিতীয় বার তিনি আহত হন, কিন্তু থামেন না। পথ, চলেন আর বলতে থাকেন, “আমি য়ুক্রেনে যাচ্ছি।” তারপর সীমান্ত পেরিয়ে মুক্রেনের প্রথম গ্রামে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গেই বিপক্ষের এক কামানের গােলার ভাঙ্গা টুকরা এসে তাকে ধরাশায়ী করে। অতিকষ্টে মাথা তুলে তিনি একবার তাকান এবং দু’হাত বাড়িয়ে মুক্রেনের কালাে মাটি স্পর্শ করে ক্ষীণকণ্ঠে এই বলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, “আমার য়ুক্রেন, আমার প্রিয় জন্মভূমি।” একা নয়, যে ভূমিতে এমন লক্ষ লক্ষ দেশপ্রেমিকের জন্ম, সেখানে যদি শেষ পর্যন্ত তার শত্রুর কণ্ঠেই বিজয়লক্ষ্মী জয়মাল্য অর্পণ করেন তবে তার সেই পক্ষপাতিত্বের জন্য ভবিষ্যতে ইতিহাস-রচয়িতারা নিশ্চয়ই একবার বিস্মিত ও স্তম্ভিত হয়ে ভাববেন—নিয়তির একি নিষ্ঠুর পরিহাস !
গ্রন্থপঞ্জী
এই পুস্তক প্রণয়নে বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িক পত্রিকা বাদে
প্রধানত নিমের গ্রন্থসমূহ হতে সাহায্য গৃহীত হয়েছে :-
Soviet Geography-by N. Mikhaylov, lecturer, Moscow
Stalin Institute of Transport Engineers.
Russia without Illusions—by Pat Sloan.
Russia in Peace & in War-by Pat Sloan.
Russia Resists- by Pat Sloan.
Russia-by Bernard Pares.
Women in Soviet Russia-by Fannina W. Halle.
Women in the Soviet East--by Fannina W. Halle.
Light on Moscow—by D, N. Pritt.
Must the War Spread-by D. N. Pritt.
The Military Strength of the Powers-by Max Werner
Battle for the World--by Max Werner.
From Tobruk to Smolensk-by Strategicus .
The War Moves East-by Strategicus.
Horrabin's Atlas-History of the Second Great War.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.