Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kabitakusum Vol. 1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কবিতাকুসুম।
{ ঐতিহাসিক ও অন্যান্য বিষয় সম্বন্ধীয় কবিতাবলী।)
প্রথম খণ্ড।
“স্বর্ণ-অলঙ্কার যারা পরে শিয়ােদেশে,
কণ্ঠে,হস্তে, পরে না কি ব্রত
:
প্রকাশক
শ্রীরামজয় বাগহী
কলিকাতা।
২১•১ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, ভিক্টোরিয়া প্রেমে
ভুবনমােহন ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত।
১২
No text on this page.
উৎসর্গপত্র।
সােদরপ্রতিম
শ্ৰীমান্ প্রমােদকৃষ্ণ সিংহ , A, B, L.
ভাত!
আমি আশৈশব তােমার পিতা ও পিতৃব্যগণের য়েহ ও
অনুকম্পার ছায়ায় পালিত এবং পরিবর্ধিত হইয়াছি। কৃতজ্ঞ
তার অযােগ্য উপহার--এই ক্ষুদ্র কবিতাকুসুম তােমার
করকমলে সয়েহে অৰ্পণ করিলাম।
রাজসাহী।
১ লা অগ্রহায়ণ,
১২৮ বা
গ্রন্থকার।
No text on this page.
বিজ্ঞাপন।
পাঠকমহােদয়গণ পুস্তকখানি আদ্যন্ত পাঠ করিয়া
ফথঞ্চিৎ সন্তোষ লাভ করিলেও শ্রম সফল জ্ঞান করিব।
কৃতজ্ঞইদয়ে স্বীকার করিতেছি যে পণ্ডিতবর যুক্ত
আগুতােষ কাব্যবিশারদ M. A. মহােদয় অনুগ্ৰহ করিয়া
পুস্তক খানির প্র সংশোধনে আমাকে চিরঋণে আবদ্ধ
করিয়াছেন।
কলিকাতা।
ই মাঘ, ১২৮৯।
গ্রন্থকার।
দ্রষ্টব্য। নিম্নলিখিত ভ্রমগুলি অগ্রে সংশােধন করিয়া না লইলে, অর্থবােধের ব্যাঘাত ঘটিবে। পৃষ্ঠা পংক্তি করিত করিতে কার ১ ১০ { হত, ৩৪ ৭ এক, प ৪১ ১২ জানিয়া, চিনল বিদারিবে খ্যাত গুণী জানিয়া চিত-অনল বিদায়িবে খ্যাতি ১৪ ১৪ ৪ ১৫ ৫ গুণ- জনক জনকে ১১৫ ১ হয়ে ১১০ পৃষ্ঠায় ফুটুনােটে শরৎ বাবুকে সাহিত্যসােপানের রচয়িতা বলা হইয়াছে। আমরা পরে জানিলাম সাহিত্য- সােপান-রচয়িতা শরৎ বাবু কবিতায় উক্ত শরৎ বাবু নহেন। প্রকাশক।
সূচীপত্র।
'
১৭
২৭
৫৪
বিষয়
পৃষ্ঠা।
১। নিশীথকাল।
২। চিরদিন সমভাবে থাকে কবে কার ?
৩। বাদিয়া-কর-ধৃত-রজ্জবদ্ধ বানর। ১২
৪। নবপিঞ্জর-বদ্ধ বিহঙ্গ।
৫। নিশীথে “চোকগেল।” পাখী।
৬। মহারাণা প্রতাপসিংহ।
৭। আফ্রিকা প্রান্তরে গভপ্রাণ প্রিন্স,
নেপােলিয়ান
৮। নির্জন কারাবাসীর বিলাপ।
৯। পাপীর অনুতাপ।
১০। দিল্লীতে ভারতেশ্বরী।
১১। বঙ্গে যুবরাজ।
১২। নাটোর দরবারে সর রিচার্ড টেম্পল।
১৩। বােয়ালিয়ায় সর আসলী ইডেন'।
১৪। স্নেহাস্পদ ভগ্নাশ যুবকের প্রতি।
১৫। মৃত মহাত্মা কুমার কেদারনারায়ণ রায়। ১১৩
১৬। কালকবলিত হায় যুগল রতন! ১১৮
১৭। আবার হইল কি রে অশনিপতন!
১৮। হরিল কি কাল অই মােজার-রতন।
৭৩
৭৭
১০৩
১১০
১৩৪
১১। কল্পনা না সত্য?
২০। শরৎকালে বিদেশস্থ বাঙ্গালীর বঙ্গভূমির
প্রতি।
১৩৮
২১। মুমুর্ষ যুবার স্বপ্নে মাতৃদর্শনে থেদ।
২২। মাতঃ জন্মভূমি! যাচিনু বিদায়।
১০
কবিতাকুসুম।
প্রথম খণ্ড
নিশীথ-কাল।
গত অৰ্দ্ধকাল, নহেরে পতিরে,
বিভাবরী বিষাদিনী।
তমসা অম্বরে,
আবরিয়া দেই,
কাদিছে যেন দুঃখিনী ।
তার দুঃখ হেরে,
নীরব প্রকৃতি,
নির্জীব প্রায় অবনী।
ভগ্ননিদ্র, নীড়ে
করিছে কুজন ধ্বনি।
কচিৎ বিহঙ্গ,
কবিতাকুসুম।
মাতৃকোলে শিশু, জাগিছে, কাদিছে,
আরাম লভিছে কেহ।
কত দীননেত্রে,
ঝরিতেছে অশ্রু,
আদ্রিয়া অম্বর দেহ।
৪
কত নিরাশ্রয়,
সুপ্ত তরুমূলে,
কাদে কত বিরহিনী।
শ্রীহীন সম্রাট, কত চিন্তাকুল,
আসন্ন বিপদ গণি।
দারা-পুত্র ত্যজি,
দেশান্তরে কেহ,
রয়েছে অর্থের তরে।
স্মরি প্রাণােপম, বনিতা তনয়,
ভাসিছে শােক-সাগরে ॥
হায় এ সময়। কেন উল্লসিত,
নৃশংস মানব মন ?
চুরি, ব্যভিচার, নরহত্যা পাপে,
রত যারা অনুক্ষণ ।
কবিতাকুসুম।
৭
ছার রাজ্য হেতু,
রাজপ্রাণনাশে
রত যে পাপী অধম।
রিপুদাস যারা,
সতীত্ব হরণে,
সভয়ে করে উদ্যম দ
৮
কে তুমি নিশীথে,
কামম হয়ে,
পশিছ গৃহের মাঝে ?
ভীমহস্তে তব,
শমনসদনে,,
যাইতে হবে অব্যাজে ॥
পরনারী-রূপে, কেনরে মুজিলি ?
রে পাপি! রিপুর দাস !
আশ্রিত সৈরিন্ধী-প্রতি অত্যাচার ?
এ পাপে হইবি নাশ ।
পুত্র স্নেহে ভুলি,
পাপের ছলনে,
করিলে কি পাপাচার !
পিতৃহীন পঞ্চ
র তনয়
( আশ্রিত যারা তােমার।
नाव
কবিতাকুসুম। ১১ যতু-গৃহে নাশি, নিশীথে পাণ্ডবে, পুত্রে দিবে রাজ্যধন, এ মন্ত্রণা কেন, করিলে হে অন্ধ- নৃপতি, কৌরবাধম। ১২ পদে দণ্ডিয়া, পিতার সম্মান রক্ষিল যে বীরবর। ভাল কৃতজ্ঞতা, দেখাইলে তুমি কৃতঘ্ন দ্বিজপামর। ত্যজি পাণ্ড কেন, কুরুপক্ষে রণ? যুদ্ধ কি দ্বিজের ধৰ্ম্ম ? নিশীথে মারিলে, সুপ্ত পাণ্ড সুতে, এই কি বীরের কৰ্ম্ম ? '১৪ যার তুষ্টি হেতু, এ হেন ভীষণ, পাপেতে হলে মগন। হায় কি বলিব, তুমি গুরুপুত্র ঘটালে তার নিধন!
কবিতাকুসুম।
কি কর কি কর,
হা ধিক, তােমারে
সেনানী কি কাজে রত ?
যে জন তােমারে,
পালে পুত্রসম
বধিতে তারে উদ্যত।
শত্রুও যদ্যপি আশ্রিত, নিদ্রিত
হয়, তবু বধ্য নয়।
আনি নিমন্ত্রিয়া, রাজ অতিথিরে
যতনে নিজ আলয়,
১৭
কোন প্রাণে হয়, নির্দয় পামর
বধিলে নিদ্রিত প্রাণী ?
ধিক! নরহন্তা পাপী “ম্যাকবেথ
মানবকুলের গ্লানি!
}}
সরলা প্রতিমা
শয়িতা নিশীথে,
নাহি কোন চিন্তালেশ।
পতিগত প্রাণ,
পতিসেবা রত,
না জানে যাতনা ক্লেশ।
৩
কবিতাকুসুম।
বিবেকবিমূঢ়
হয়ে হে “ওথেলাে”।
কি নিষ্ঠ র কাজে রত।
স্বকরে কৃপাণ ধরি, অভাগীরে
নির্দোযে করিলে হত।
4
মানিলাম পাপী,
ছিল যদি হায়
দুরাত্মা নিকযাত্মজ ।
ছিল নাকি বীর ধৰ্ম্ম মেঘনাদে,
অজেয় রাবণঙ্গজ।
তবে কেন হায়,
ত্যাজি ক্ষত্ৰ ধৰ্ম্ম,
পশিয়া যজ্ঞ আগার ।
ইষ্টচিন্তাপর, যবে ইন্দ্রজিত,
করিলে তারে সংহার ।
গঢ়ি অন্ধকার,
নিশিথ সময়ে,
রে দুরাত্মা কাপালিক।
সরলা সতীরে,
ডুবাইলি জলে ?
দুরাচার ! তােরে ধিক!
কবিতাকুসুম।
হায় যা বসুধে! কেন তব হেতু,
দুর্দান্ত মানবগণ।
স্বজাতিশােণিতে, আদ্রিয়া তােমায়,
পাপে রত অনুক্ষণ?
২৪
কত জনপদ,
ভস্ম হয় হায়,
দগ্ধ কত রাজধানী।
কত নুরপাল, সমুকুট ছিন্ন,
শীর্ষ হয়ে, ত্যজে প্রাণী।
२०
করি রণ জয়,
কত ক্ষত্র বীর,
নিশীথে সুপ্ত শিবিরে।
অকস্মাৎ পশি,
পামর যবন,
নাশে সুপ্ত ক্ষত্রবীরে !!
করিত যবন,
ন্যায় যুদ্ধ যদি,
হতনা ভারতাধীন।
কত ষড়যন্ত্র
বিশ্বাসঘ্নতায়,
হায় বঙ্গ পরাধীন।
২ কুসুম।
নহে দিন "
প্রতাপ আদিত্য,
ধীনতা-অশ।
কাপিত অরাতি,
গণিত ত্রাস।
যার বা : ",
২৮
যবন ......।
পশি রায়গড়ে,
: "থে করিয়া রণ।
বধি র;"': না, (সুপ্ত ছিল যবে)
[পে করে বন্ধন ॥
কি বলি 'য় !
বলিব কেমনে,
। দিনের অত্যাচার ।
যার পাপাচারে, দগ্ধ বঙ্গবাসী,
করেছিল হাহাকার।
ক্ষুদ্র গৃহে হায়,
সিরাজ !
শতাধিক জনে,
রাখিয়া নিশীথ কালে।
অসীম যাতনা,
দিয়ে প্রাণীকুলে,
বধিলে পাপী! অকালে ।
কবিতাকুসুম।
৩
ব্রিটীশ পীড়ন,
করিত যদি,
ক্লাইব হতােনা পর।
ঘৃণিত হতনা “নিগার বাঙ্গালী”
তাের তরে রে পামর !
চিরদিন সমভাবে থাকে কবে কার ?
বরষা বিভাতে, শরতে রঙ্গে,
যাই দেখিবারে বান্ধব সঙ্গে। ১
নবাবের গঞ্জে, পদ্মার তীরে,
হেরে ভাসিলাম নয়ন নীরে। ২
কত সৌধাবলী গৃহ বিতান,
রসাল কাঠাল বাঁশ বাগান। ৩
সহিন্ত ভূখণ্ড, নদী কবলে
পশেছে দেখিয়া, নয়ন জলে। ৪
ভাসে অধিবাসী—বিকল প্রাণ ।
পতিত বিপদে না হেরি ত্রাণ। ৫
যে গৃহে জনম, শৈশব খেলা,
যৌবনে যাহায় করেছে লীলা। ৬
১৯
কবিতাকুসুম।
বার্ধক্যের যাহা বিশ্রামাগার।
হেরে জলমগ্ন, না হয় কার। ৭
ব্যথিত হৃদয় ? বিষম শােকে,
ভ্রমে নিরাশ্রয় গ্রামিক লােক। ৮
নেহারি এ দৃশ্য নদীর প্রতি।
কহিলাম দুঃখে করি মিনতি। ৯
“কোথা সে তরঙ্গ নর আতঙ্ক।
শব্দে যার প্রাণী হত,সশঙ্ক। ১০
কোথা সে বিপুল সলিল রাশি,
তীরবৎ যাহা যাইত ভাসি। ১১
আরােহীর সহ তরী সকল।
হেরে পােতারােহী হত বিকল। ১২
কোথা সে লহরী ভীষণাকার।
করিত যা তার হৃদি বিদার। ১৩
কোথায় সে ভীম জলের পাক
জীব ত্রাস যাহার ডাক। ১৪
কোথা এবে সেই দ্রুতগামী নীর।
গরাসিল গ্রাম আক্রমি তীর। ১৫
যৌবনােন্মত্ত অধীর হয়ে,
কত নর হৃদে যাতনা দিয়ে। ১৬
.
কুল
কবিতাকুসুম।
১১
গ্রাসিয়া কাহার তনয় মুখ,
বিনাশিলা হায় ! এ বিশ্ব সুখ। ১৭
পতিহীনা পত্নী ভূমে লােটায়।
কান্তাহীন কেহ কাদিছে হায়। ১৮
মাতৃহীন শিশু করে রােদন।
পুত্র শােকে মাতা হত চেতন! ১৯
অগ্রজ ভাসিছে তােমার নীরে
নেহারি অনুজ আকুল তীরে। ২০
দুদিনের জন্য বল কে আর।
তবসম নাশে সুখ সংসার ২১
যৌবনে পীড়িলে পরের মন।
তেঁই শূন্যনীরা তুমি এখন। ২২
এবে রুদ্ধ স্রোতসিকতাময়।
মরি হেরি নদি! তব হৃদয়। ২৩
সম্পদে করিলে গৰ্ব্বিতাচরণ,
তেঁই তব হৃদে করে গোচরণ,
কিম্বা নীল বুনে ওয়াটসন।” ২৪
সম্পদ, গরিমা,প্রতাপ সব।
স্থায়ী নহে ভবে বুঝি মানব। ২৫
বৃথা ধনমদগৰ্বে অতঃপর।
১২ কবিতাকুসুম। দুঃখিরে পীড়িতে হওনা তৎপর। ২৬ ঘরে ফিরে সুখ দুঃখ বিধি বিধাতার। চিরদিন সমভাবে থাকে কবে কার ? ২৭ বাদিয়া-কর-ধৃত-ব্লজ্জ-বদ্বী-বানর। বৎসরান্তে কপি! আইলা আবার দেখাইতে দুঃখ-দশা কি তােমার ? দুঃসহ জ্বলনে দহে অনিবার তব দুঃখে হিয়া, পাষাণ গলে, কি নিষ্ঠ র হায় ! পালক তােমার অল্পাহারে তব অস্থিমাত্ৰসার তথাপি যথেচ্ছ করিছে প্রহার- লৌহের শৃঙ্খল পরায়ে গলে অজ্জন আশায় ভ্ৰমিছে কেবল, প্রান্তরে, বাজারে, গৃহে, সৰ্ব্ব স্থল, ক্ষুধায় হইলে শরীর বিকল তথাপিও পাপী ফিরে না চায়।
কবিতাকুসুম।
১৩
৪
ধনাশায় হায় এমনি বিহ্বল
পিপাসা পাইলে নাহি দেয় জল,
গলবদ্ধ রজ্জ ধরি করতলে
প্রহারে পীড়িয়া তবু নাচায়।
আহা ওই তব উপার্জিত ধনে,
বঞ্চিয় তােমায় লয় সে অপিনে,
কিছুই কি দয়া উপজেনা মনে,
হায়রে এমনি নির্দয় প্রাণ ।
মরি! কি সুন্দর স্বাধীন জীবনে
বিহরে বানর কাশী বৃন্দাবনে,
কৰ্ম্ম ফলে তুমি বাদিয়ার সনে
বদ্ধ,—এ জীবনে নাহিক ত্রাণ।
হে মানব! তুচ্ছ আমােদর তরে
কি কৌতুক দেখ নাচায়ে বানরে ?
জীবদুঃখে কিহে নয়নে না ঝরে
বারি-বিন্দুতব ? হাস কি সুখে ?
?
১৪ কবিতাকুসুম। ৮ স্মর আপনার দশা অতঃপর কপি অপেক্ষায় হবে না অন্তর। করিওনা ঘৃণা ভাবিয়া “ বানর চিন্ত চিতে, মৰ্ম্ম দহিবে দুখে। শুধাও কপিরে পাবে উপদেশ বলিবে তােমায় পেতেছে যে ক্লেশ ; বল মনােদুঃখ করিয়া বিশেষ (সমদুঃখীদুঃখ না রহে যায়)। কপি মৰ্ম্ম স্থানে প্রবেশ যতনে মর্মভেদী বাক্য পশিবে শ্রবণে বিষাদে বহিবে ধারা দুনয়নে শুন শাখামৃগ কি বলে হায় ! “পূরব বংশেতে কেহবা আমার উপাড়ে স্ববলে শৈলেন্দ্ৰ দুৰ্বার- 'রামচন্দ্র সনে মিত্ৰতা কাহার-- কেহ বা নিমেষে তরে সাগর।
কবিতাকুসুম।
১৫
কেহ রাজমন্ত্রী দিত সুমন্ত্রনা!
হায়রে কিকব বিধিবিড়ম্বনা
বাদিয়ার রজ্জ, ধরিয়া অধুনা
নাচায়, নাচি। সেই বংশধর।”
4
কি বলিব হায়! ওহে কপিবর!
যে দুঃখে তােমার দহিছে অন্তর
আমরাও সেই দুঃখে নিরন্তর
দহিতেছি, দুঃখী হায় নিশিদিন।
১৪
যে ভারতে আৰ্য মহীপালগণ
শাসিয়াছে কত রাজ্য অগণন,
সেই আৰ্যকুলে মােদের জনম।
ভাগ্য দোষে মাের আজ পরাধীন।
স্মৃতি, মহাকাব্য, বেদান্ত, দর্শন,
প্রসবিল পূর্বে যেই আৰ্যমন,
সেই আৰ্য্যবংশে মােদের এখন
সেই মন, অনুকরণে রত।
কবিতাকুসুম।
যে ভারত ছিল রতনের খনি
যে ভারত ছিল সুশস্যশালিনী,
সে ভারত আহা আজ কাঙ্গালিনী
কি ছিল! কি হল ! হায় ভারত!
ওহে রামচন্দ্র পূত গুণাকর !
যে জাতি সহয়ে তরিলে সাগর,
এস যদি আজ পাপ মৰ্ত্ত’পর
সে জাতির দশা দেখিতে হয় !
১৮
বিক্রমে যাহারা ছিল অতুলন,
অক্লেশে করিল অরাতি দলন,
দুরদৃষ্ট কিবা ! দৈব বিড়ম্বন !
তার বংশধরে বাপে বাদিয়ায়।
যে জাতি করেছে ব্যবস্থা রচনা
যে জাতি করেছে জ্যোতিষ গণনা,
এখন সে জাতি ভুলিয়ে আপনা
ভ্রমে হীন কাজে, হয়ে কাতর ।
কবিতাকুসুম।
, ১৭
পূজ্য দেবভাষা ভুলেছে সবাই
সমাদর তার এবে অন্য ঠাই।
ভারত বাসির যত্ন তাহে নাই
শিক্ষা তরে তাই যায় দেশান্তর।
২১
বৃথায় সে সব স্মরিয়া কি ফল
আশাই দুঃখীর জীবনসম্বল,
জীর্ণ হলে ছিন্ন হইবে শৃঙ্খল
বিচরিবে পুনঃ স্বাধীন মনে,
বন্দী হেতু দুঃখ না ভাব অন্তরে
ধরাধিপও বন্দী ছিল দ্বীপান্তরে
বিমুক্ত বন্ধন কিছু দিনান্তরে
হইবে, এ আশা পােষ যতনে।
নব পিঞ্জয়বদ্ধ বিহঙ্গ।
১
নূতন পিঞ্জরে পশি ময়না বিহঙ্গ,
বহিছে কি তব মনে সন্তোষ তরঙ্গ ?
কেন হবে সুখ ? দুঃখ হলনাত ভঙ্গ,
দৃঢ়তর বন্দী আর (৩) হায় ! যথা বঙ্গ।
১৮
কবিতাকুসুম।
প্রাচীন পিঞ্জর হতে যদি কোন দিন
পারিতে করিলে চেষ্টা হইতে স্বাধীন।
বিহরিতে স্বজাতির সহিত, বিহঙ্গ!
খাইতে মনের সুখে আরণ্য পতঙ্গ।
পালক তােমায় বড় ভাল বাসে বলে
অবরােধ করিয়াছে অতি কুতূহলে,
খেতে দেয় ঘৃত, দুগ্ধ, তােষে সুবচনে
পড়ায় পবিত্র নাম পরম যতনে।
৪
তথাপি অসুখে পাখি, চঞ্চল চরণে
ভ্রমিতেছ পিঞ্জরের মাঝে প্রতিক্ষণে,
পক্ষপুট নিশ্চল হতেছে দিন দিন
তবু তব আছে চেষ্টা হইতে স্বাধীন।
বিহরে সম্মুখে মুক্ত বিহঙ্গ নিচয়,
তা দেখি হয় কি তব দুঃখের উদয় ?
হয় যদি, শুন তবে মম এ সম্বাদ
আমাদের দশা দেখ, না রবে বিষাদ।
কবিতাকুসুম।
১৯
তব দুঃখ হেতু নহে স্বজাতি তােমার।
আমাদের স্বজাতীর শুন ব্যবহার।
করিণী যেমন করি বন্দীর নিদান
হায়রে! স্মরিতে দুঃখে দগ্ধ পাপ প্রাণ।
৭
.
বাঙ্গালীই বাঙ্গালীর এদুঃখের হেতু
ভেঙ্গেছে বঙ্গের হায় ! স্বাধীনতা সেতু
দেখ পাখি আমাদের অদৃষ্টের ফের
না সম্ভাষে মিষ্টভাষে রক্ষক মােদের।
প্রচণ্ড প্রতাপে সদা শঙ্কিত পরাণ,
বিষাদে বিদরে হিয়া, বিশুদ্ধ বয়ান,
প্রদানে সন্তানে শস্য বঙ্গ নিরন্তর
মজাত খাদ্য হায়! যায় দেশান্তর।
অভাগা বাঙ্গালী আহা তবু নিরুদ্যম
ইচ্ছা নাই এশা করিতে অতিক্রম।
স্মরিতে নয়নে বহে সলিল তরঙ্গ
দুর্ভিক্ষেও করে করে সাঙ্গ এবে বঙ্গ।
২•
কবিতাকুসুম
উন্নতি পতন যদি প্রকৃতি নিয়ম
হবেন। কি আমাদের দশা ব্যতিক্রম
নিশীথে “চোক গেল” পাখী।
গাঢ় তমােময় নিস্তব্ধ নিশীথে
কভু বা করিছে কুকুর চীৎকার ;
লম্পট, তস্কর, অভীষ্ট সাধিতে
সভয়ে করিছে চরণ সঞ্চার ।
বিগত নিশীথে জনমের তরে
হারায়েছে যেই তনয় রতন
নীরবে কাদিছে, ভাবিছে বা কত
“কাল বাছা জিয়ে ছিল এতক্ষণ”।
ওই স্থানে বসি শিয়রে বাছার
ফেলিয়াছি আহা পাপ আঁখিনীর
ওই স্থানে হায় হারায়েছি আমি
জীবনসম্বল এই দুখিনীর।
কবিতাকুসুম।
২১
১
সমস্ত দিনের সে কঠোর শ্রমে
বিশীর্ণশরীর বদন মলিন
কারাগৃহে বন্দী চিন্তিছে বসিয়া
মুক্তির আর বাকী কত দিন।
অনাদিষ্টদণ্ড হত্যাঅভিযুক্ত ।
কি হইবে কালি দশা আপনার
চিন্তিছে বিষাদে (হায়! বিনা দোষে)
হবে বুঝি প্রাণ দণ্ডাজ্ঞা প্রচার।
ভাবসংরক্ষণ, শব্দসংযােজনে
চিন্তাপর কবি বসিয়া বিজনে
উপমার তরে মরি শূন্য মনে
দেখে বিশ্বশােভা কল্পনানয়নে।
৭
দিবা যুদ্ধে হায়! দেখি সেনাক্ষয়
শিবিরে সেনানী নিমগ্ন চিন্তায়
নিশি অবসানে শত্রুসনে রণে
হইবে কেমনে উদ্ধার উপায়।
কবিতাকুসুম।
এজগতীতলে এ নিশীথকালে
কত ভাগ্যহীন প্রাণী চিন্তাকুল
নীরবে কাঁদিছে, হাসিছে বা কেহ
আশার কুহকে আনন্দে অতুল।
সূৈরিণী কামিনী নায়কের তরে
গৃহের কবাট করি অনর্গল
পদশব্দ আশে বসি একাকিনী-
চিন্তিছে স্বকরে স্থাপি গণ্ডস্থল।
তরুপত্ৰ কভু নড়িছে, পড়িছে
প্রিয় পদশব্দ। ভ্রমে ভাবি তায়
বাহিরি প্রাঙ্গণে, নাহেরি স্বজনে
পুন শূন্য মনে গৃহমাঝে ধায়।
হেন কালে পাখী “চোক গেল !” বলি
কি হেতু সঘনে করিছে চীৎকার,
সত্য কি বিহঙ্গ! হইয়াছে ব্যথা
এই পাপ দৃশ্যে নয়নে তােমার ?
কবিতাকুসুম।
তাই “চোক গেল !” বলি এ নিশীথে
কুজিছ আকুলি মানবের মন।
কিম্বা শ্লেষ কর বঙ্গবাসীজনে
বাঙ্গালীর কাৰ্য্য করি বিলােকন
কিম্বা বাঙ্গালীর দারুণ দুর্দশা
দেখিতে অশক্ত নয়ন তােমার
পর দুঃখে দ্রবহৃদয় হইয়া
“চোক গেল !” বলি করিছ চীৎকার ।
১৪
চক্ষু সত্বে করি অন্ধ প্রায় কাজ
তাই দেখি বুঝি দিতেছ ধিক্কার
“চোক গেল !” বলি ? উপদেশচ্ছলে
এনিশীথ কালে বাঙ্গালী সবার
১৫
“চোক গেল।” কেন ? থাকিলে ত যাবে ?
বহুদিন হতে গিয়াছে নয়ন
পলাই যে দিন ছাড়ি সিংহাসন
সপ্তদশ জনে দিয়ে রাজ্যধন।
২৪
কবিতাকুসুম।
অথবা সে দিন যেই দিনে হয়
(ভবিষ্যত অন্ধ) আমরা সবে
ষড়যন্ত্রে লই নবাব আসন
ভঙ্গ দিয়ে জয় প্রায় অহবে
-----
সেই দিন হ’তে নাহিরে নয়ন
সব দেখিতাম থাকিলে লােচন--
স্নেহের আম্পদ স্বদেশ সম্পদ
ত্যজিতাম কিহে করি পলায়ন ?
১৮
আৰ্যবীর্য্যবল গেছে রসাতল
রােদন সম্বল ছিল এতদিন
কাব্য বা নাটকে হায় কাদিতাম
তাও হ’ল নব বিধানে বিলীন !! *
সেই দিন হতে ভারত তপন
প্রতীচী গগনে হইল উদিত ;
পুরবে উদিল। পুনঃ “অর্ধনিশি,”
হইল তপন তাপ অস্তমিত !!
* অধূন মহাত্মা পড় রিপনের আদেশে উক্ত
১৮৮২ সালের জানুয়ারি a); রহিত হইয়াছে।
কবিতাকুসুম।
বিপরীত দেখি বিধির বিধান,
অশক্ত দর্শনে তাই বার বার
কৃজিছে বিহঙ্গ “চোক গেল !” বলি
ভারতে সে রবি উদিবে আবার ?
অহহ ! পুরাকালে দেখেছ অনেকে
সৰ্বস্ব করিতে দীনে সম্প্রদান,
অক্ষোভে ছেদিলা তনয়ের শির
দ্বিজতৃপ্তি তরে কর্ণ মতিমান।
२२
দেবহিত হেতু ত্যজিলা দধীচি
দেহ আপনার ; তরে অতুলন,
নাশি ক্ষত্ৰ বীর বিজিত পৃথিবী
দিল দ্বিজবরে, ভৃগুর নন্দন।
খ্যাত চরাচর মহানৃপবর
হরিশ্চন্দ্র নিজ দান বলি মুখে,
বিফলবাসনা হইল ভূপাল
নারিলা যাইতে সে ত্রিদিব লোকে।
কবিতাকুসুম।
28
যেই দেশে হায়! দানের বিষয়
না বলি স্বমুখে, রাখিত ছাপা ;
এখন কজনে দান করে দীনে
অনুরােধ বিনে কাগজে ছাপা !
কত রাজদ্বারে মুষ্টিভিক্ষা তরে
বৃথাশ্রমে ভিক্ষু দরিদ্রশেয,
দিনান্তে যাদের জোটেন আহার,
পরা ছিন্নবাস, মলিন বেশ।
হেন জনে দান নাহিক বিধান
( কেন না,এদান হয় “বে-দলিলী”)
একুদৃশ্য দেখি কৃজিছে কিপাখী
এ নিশীথ কালে “চোকগেল !”বলি ?
কবিতাকুসুম।
২৭
মহারাণা প্রতাপসিংহ।
হদি ঘাটের সেই ভীষণ সংগ্রামে *
প্রকাশিয়া বীরবীৰ্য অতুল সংসারে
নারিলা লভিতে জয় হায় দৈববামে।
বিনাশি বিপুলসংখ্য বিপক্ষ সেনারে !
অস্ত্রাহত অশ্ববর ‘চৈতকে রাজন
আরােহিয়া রণক্লান্ত, শ্রান্ত কলেবরে
পরাজয়, সেনাক্ষয় করিয়া চিন্তন
চলেছে একাকী আহা বিষন্ন অন্তরে।
হায়! যথা বাসন্তীয় সনবপল্লব
শােভমান শাখাসহ মহীরুহচয়
প্রচণ্ড নিদাঘ বাতে (কে হেন মানব ? )
ভগ্নশাখ (দেখে যার না দ্রবে হৃদয় !)
৪
প্রমর বা অগ্নিকুল কিংবা ঝালাকুল
সংগ্রাম সাহায্যকারী যাহারা রাণীর
স্বাধীনতা তরে আহা! যুঝিয়া অতুল
অসংখ্য তুরকীসৈন্যে করিয়া সংহার,
১৫৭৬ সালে এই যুদ্ধ ঘটে।
২৮
কবিতাকুসুম।
নিবারিয়া শত্ৰুগতি ভুজবীৰ্য্য বলে
স্বদেশের তরে প্রাণ দিলা আপনার।
দেশ হিতে প্রাণ দিতে তৎপর সকলে।
রাজস্থান রাজপুত দৃষ্টান্ত ধরার।
অসংখ্য মােগল সৈন্য তেজোদুর্নিবার
দ্বাবিংশ সহস্র সেনা রোধিলা সে গতি
থাৰ্ম্মপলী রণভূমে হেলাসকুমার
জরকসিস্ সেনাদলে দলিলা যেমতি।
৭
চতুর্দশসহস্র সে রাজপুত সেনা
পড়িয়া সমর ক্ষেত্রে ভীষণ প্রহারে।
রক্ত বহে ক্ষতদেহে, তথাপি বেদনা
বােধ নাই, শত্রুসেনা সহর্ষে সংহারে।
ভারতভুগতিমূল কুরুক্ষেত্র রণে
একগ্নী আবাতে যবে হিড়িম্বাতনয়
পড়িয়া, অন্তিমে চাপি কুরুসেনাগণে
বিনাশি সহর্ষে, যথা গেলা যমালয়।
কবিতাকুসুম । সমগ্র-ভারত-বল যার ভুজবলে। কাতর, সে বীরহিয়া তাপিত বিষাদে। “অম্বরাধিপের মাত্ৰ অপূৰ্ব্ব কৌশলে সাহসী তৈমুরসেনা সম্মুখ বিবাদে। “বিক, রাজা মানসিংহে ক্ষত্রিয়কলঙ্ক স্বভগ্নী যবনে দিয়া হলি পরাধীন কলুষিত করিলি হা! জননীর অঙ্ক অনন্ত নরকে দেহ হইবে বিলীন। দেবালয়, স্বাধীনতা, স্বদেশ, গােন, রক্ষা হেতু প্রাণদান বুঝি অবিহিত ? দেশবৈরী দেবদ্বেষী বিধম্মী যবন- দাস হয়ে, পানে মত্ত স্বজাতিশােণিত, ১২ রক্ষাহেতু কুল, মান, স্বাধীনতা ধনে স্বজাতি, গৌরব, জন্মভূমির লাগিয়া, সে পামর, কাতর যে প্রাণ বিসর্জনে, বরঞ্চ নিধন শ্রেয়ঃ স্বধৰ্ম্মে থাকিয়া।
কবিতাকুসুম।
“ছিলনা অসিতে ধার ? বাহুযুগে বল ?
ক্ষত্র অস্ত্র বিরত কি বৈরীবিনাশিতে ?
রাজপুত কুলাঙ্গার ! ধিক-চিতানল
ছিলনা কি সােদরার সতীত্ব রক্ষিতে।”
১৪
রোষে ক্ষোভে মানসিংহে মানসে গঞ্জিয়া
অতিক্রম করে ক্রমে প্রকাণ্ড প্রান্তর
“মহারাণ ক্ষম দাসে” সহসা শুনিয়া
দাড়াইল মহাবীর স্তম্ভিত অন্তর।
অদূরে অনুজে হেরি চিনিলা রাজ
“শক্ত-অনুরক্ত যেই ছিল তুরকীর ;
আনন্দে আশীষি চুম্বি করে আলিঙ্গন
সাদরে প্রণত শক্তে তুলি মহাবীর।
নাধিপ”। কহে শক্ত সজললােচনে
“ জন্মভূমি, ভ্রাতৃস্নেহে জলাঞ্জলি দিয়া,
পাপী আমি, তেঁই সেই পামর যবনে
পূজিলাম, এতকাল দাসত্ব করিয়া ।
কবিতাকুসুম। ১৭ “ক্ষমদাসে নরনাথ ! দেহ পদেস্থান, করিনু প্রতিজ্ঞা এই স্পশি ও চরণ- এই মুক্ত অসিবরে তুর্কিরক্তে স্নান করাইব, দেশ হিতে দিব এজীবন।” ১৮ “স্বাধীনতা ক্রীড়াভূমি হায় রাজস্থান- কিরীট স্বরূপ যার চিতাের নগরী তুলিলা তুরকী তাহে বিজয় নিশান দগ্ধিয়া অনলে যবে ভস্মময় করি। “সেই হতে রাজ্যসুখ ত্যজিয়া রাজন, ভ্ৰমিছ সংসারত্যাগী তপস্বীর প্রায় উপাধান বাহুমূল, শিলায় শয়ন ভক্ষ্য তরুফল, পান নিঝর ধারায়। ২০ “ধন্য তুমি দৃঢ়ত, পবিত্রজীবন, সূৰ্য্যকুলঅলঙ্কার, বীরত্বআধার । প্রতিজ্ঞা-না দলি বৈরী রাজসিংহাসন লইবেনা, চিতােরের না করি উদ্ধার ।
৩২
কবিতাকুসুম।
“দেখিনু নয়নে আজ বীরত্ব অদ্ভুত
অসংখ্য যবনসৈন্য মাঝে প্রবেশিয়া
তাড়াইলে জাহাঙ্গীরে, যথা বায়ু সুত
কুরুরাজে কুরুক্ষেত্রে, বাহিনী দলিয়া
२२
“বীরত্বের যশােগানে, মত্ত বীরমদে,
কার না নাচেরে হিয়া ক্ষত্রিয় তনয়
দেশ বৈরী বিনাশনে ? তেঁই তবপদে
বধিতে বিধর্মী পুন’, লইনু অাশ্রয়।
“কারনা কাদেরে প্রাণ, তােরে জন্ম ভূমি
চিতাের! দলিত হেরি রিপুপদতলে !
পামর কৃতঘ্ন তাই কাদি নাই আমি,
কাদে নাই গৌড়েশ্বর সে গৌড়মণ্ডলে।”
২৪
অসংশয়ে প্রতাপ অনুজে সঙ্গে করি
চলিলা কমমিরে—নব বাসস্থান,
“ভ্রাতৃধনে বলীয়ান্ আর কারে ডরি,
উদ্ধারিব চিতাের যাবত দেহে প্রাণ।
কবিতাকুসুম।
(মহিষী সম্বাদ)।
একে বহুজনাধীন তায় ভগ্নমন,
যেজন সুদীর্ঘকাল পীড়িতশয়নে,
বিমুখ কল্পনা তাহে যারে অনুক্ষণ,
বাম বীণাপাণি যারে বিদ্যা বিতরণে,
কবিতা দেবীর হায়! প্রসাদ লভিতে
সেজন কেমনে শক্ত হইবে না জানি।
বিকল পদের যথা অচল লজ্জিতে
বাসনা বৃথায় হায়! অসম্ভব মানি।
কৃপা করি এ কিঙ্করে, কোবিদজননি!
কহ মা চিতাের ত্যজি, ত্যজি উদিপুরে,
কমমির রাজধানী, কার এরমণী
কি হেতু রাজিছে হায় এ ভীল কুটিরে !
২৮
কে এ সৌদামিনী সম কান্তিমতী নারী,
চারু যুগল, স্থির, বিশ্রান্ত, উজ্বল,
বিষাদব্যঞ্জক নেত্র, তবু শূন্য বারি,
মহিমা জড়িত, মরি, বদন মণ্ডল,
A
কবিতাকুসুম।
পূর্ণেন্দুবদনা বন্ধু বিধুমুখী বালা।
বালারুণ সম দীপ্তি কুমার সুমতি
ভূষিত রাজ ভূষণে, গলে মতিমালা,
কিন্তু ক্ষৎপিপাসাক্লান্ত হেরে খিন্না সতী।
রাজপুত-কুল-কবি, রাজপুত কুল
মহিমা কীৰ্ত্তনগানে নিরত যাহারা,
তাদের রমণী এক বিষাদ শঙ্কুল
জানিয়া, ত্যজিলা যিনি এসংসারকারা,
শৈলেশ্বর শিবের সেবায় অনুক্ষণ
নিরত ‘চরণী দেবী লভি দিব্যজ্ঞান,
রাজস্থান রণবার্তা করি আকৰ্ণন,
আইলা লইতে রাজ মহিষীসন্ধান।
৩২
শিরে শুভ্র জটাভার, দীর্ঘ কলেবর,
চিন্তারেখা অঙ্কিত সে প্রশস্ত ললাটে,
উপনীতা ভীলাবাস। বিষন্ন অন্তর,
উপবিষ্টা যথা রাণী ছিলা শিলাপাটে,
কবিতাকুসুম।
সসম্ভ মে মহিষী সম্ভাষি চরণীরে
সুধাইলা নিরাময় অমিয় বচনে,
মহিষীর দশা হেরি ভাসি অশ্রনীরে
জিজ্ঞাসে চরণী দেবী সজললােচনে,
৩ঃ
“কোথায় মা মহারাণা, কোথা সেনাগণ,
প্রাসাদ ত্যজিয়া কেন ভীলের কুটিরে,
করিলা কি আবার যবনে আক্রমণ,
আমরি, সুন্দরপুরী সে কমলমীরে,”
হায়রে, এ রাজস্থান অগণ্য তনয়
প্ৰদানিল, প্ৰদানিল সংখ্যাতীত ধন,
হয়ে অন্তঃসার হীন, অরাতি নিচয়
সমর তরঙ্গে সব হ’ল নিগমন।
রসালের তরু যথা কল্লোলিনী কুলে
ক্ষতৃমূল প্রবাহিনী-প্রবাহ পীড়নে,
তথাপি শরীরশােভা চারু ফল ফুলে,
প্রদানে অজস্র, আহা! অনন্ত জীবনে
কবিকুম।
“কি বলিব দেবি’! কহিলা মহিষী,
“বলিতে হৃদয় ফাটে,
এত দুঃখ হায়! বিরলে বিধাতা
লিখিলা রণাললাটে।
৩৮
“দুরন্ত আহবে, রাজ্য,ধন, জন
সকলি হইল লয়,
শত্রু কবলিত,
পূত রাজস্থান,
কোথায় নাহি আশ্রয়।
মহাধীর রাণ,
অসম সাহসে
যুঝিলা যবন সনে,
রাজপুত সেনা, হইল নিঃশেষ
হলদিঘাটের রণে।
৪০
“স্বল্প সংখ্য যারা, সে ভীম আহবে
পেয়েছিল পরিত্রাণ,
দশবর্ষ জুড়ি,
বিষম সমরে
ক্রমে সবে গত প্রাণ।
কবিতাকুম।
৩৭
৪১
“বিধৰ্ম্মিবিজিত প্রতি দুর্গ’ পরে
উড়িছে শনিশান,
দ্বিষৎলাঞ্ছিত, হায় রাজস্থানে,
নাহি দাড়া’বার স্থান।
৪২
“সমরসম্বল,
নাহি অর্থবল,
নাহি সে শিক্ষিত সেনা।
শত্রু সনে আর,
কি লয়ে যুঝিবে রাণ!
সম্মুখ সমরে
প্রতিজ্ঞা তথাপি যাবত জীবন,
ঘুঝিবে যবন সনে।
উদ্ধারি চিতাের, মারিবে যবনে,
অথবা মরিবে রণে।
53
“নিত্য সঙ্গে করি, স্বল্পসংখ্য সেনা
পর্বত, প্রান্তরে ভ্রমে,
নাশে শত্রুসেনা,
বিষম প্রহারে
সে ভীষণ পরাক্রমে।
3
কবিতাকুসুম।
৪৫
“এইরূপে স্বামী, শত্রুসেনা-নাশে
নিরত নিশি বাসর,
আমি ভীমগড়ে, জানিয়া, যবন
নিশিতে ঘেরিলা গড়।
৪৬
“মুক্ত অসি করে,
অযুত যবন
যুদ্ধার্থ দণ্ডায়মান,
দুর্গজয় করি আমায় লইয়া
করিবে সম্রাটে দান।
৪৭
“তা হইলে রাণা আমা উদ্ধারিতে,
লইবে যবনাশ্রয়,
এই দুরাশায়
ঘেরিলা সে গড়
শতপুরে দুরাশয়।
৪৮
সে গড়রক্ষক
রাঠোরের সেনা
ছিল পঞ্চশত প্রায়,
দুর্গ রক্ষা তেঁই সংশয় মানিয়া
রক্ষিলা মোরে হেথায়।
কবিতাকুসুম।
৪৯
গড় রক্ষার চন্দন সিংহেরে
দিয়া তেজসিংহ বীর,
সে ঘাের নিশিতে এ ভীল-কুটিরে
আনিলা আমায় ধীর।
“সে কাল রাত্রিতে কত ভাবিলাম
রাঠোর-রমণী তরে,
কি দুর্গতি হায় হইৰে, নাজানি,
পাপিষ্ঠ যবনকরে।
“পােহাইলে নিশি,
উদিলে দিনেশ,
শুনিলাম রণকথা।
এখন(৩)বলিতে চরণি ! আমার
উপজে মরমে ব্যথা।
૯૨
“দুর্জয় রাঠোর
পঞ্চশত সেনা
নির্ভীক হৃদয় বীর,
করি প্রাণপণ
কার্টিলা অসিতে
অসংখ্য অরাতিশির।
৪
কবিতাকুম।
“প্রতি অসিঘাতে পড়িল নিশিতে
হায় রে রাঠোর দল।
গড়ের মাঝারে, ফিরে সশরীরে
বিংশতি জন কেবল।
৫৪
‘চন্দনের মাতা
শুধিলা চন্দনে
‘কহ বৎস! কি করিলা,
সমস্ত শর্বরী, যুঝিয়া তােমরা
কত শত্রু বিনাশিলা ?”
“বিষাদে বালক মায়ের চরণে
বলিল রণবারতা,
‘প্রভাত পর্যন্ত
এই দুর্গ জয়ে
অক্ষম শত্ৰুৰীরতা ।
‘সহস্র অধিক জীবিত অ্যাপি
মােরা মাত্র বিংশ জন,
গড় রক্ষাহেতু শত্রু সনে আর
কিরূপে সম্ভবে রণ।
কবিতাকুসুম।
৫৭
‘তবু প্রাণ দিব
সম্মুখ সমরে
ডরি মরিতে রণে,
কিন্তু তােমাদের কি গতি জানিতে
এসেছি ও শ্রীচরণে।
‘যাও বৎস রণে’ কহিলা জননী,
‘ভেব না মােদের তরে
বীরের জননী, রাঠোররমণী,
দেখিবে কেমনে মরে।
“এই কথা বলি যত বালা বধূ
একত্রে মিলি সকল
স্নান পূজা করি, ইষ্টদেব স্মরি
জ্বালিলা চিতানল।
জ্বলিল দ্বিগুণ
“পশিল চিতায়।
সে চিতা আগুন হায় !
রাঠোর বীরের জীবনের আশা
ভরসা মিশিল তায়।
8२
কবিতাকুসুম।
“মাতা, ভগ্নি, দারা, দুহিতা, অনলে
দাইন দেখি সবার
আশাশূন্য হিয়া লয়ে এ সংসারে
বচিতে বাসনা কার ?
“নিৰ্মম জীবন, সংসার-বন্ধন
ছিন্ন হয়ে বীরগণ,
নমি পরস্পরে,
জনমের তরে
পশিল সমরাঙ্গণ।
“মারি শত্রুসেনা মরিল সবাই
প্রিয় জন্মভুমি তরে
কি বলিব আর
চরণি ! তােমায়
রাঠোর আদশ নরে।”
৬৪
এই কি সে রাজপুত ? চেনা নাহি যায়,
হতভাগ্য দাস্যে রত যাহারা এখন!
কেঁদেছে কি এই জাতি অবলার প্রায় ?
যবে মহারাষ্ট্রপতি করিলা দলন ?
কবিতাকুসুম।
১৩
প্রভূত্ব, প্রতাপ, হায়! চিরস্থায়ী কার ?
পুনঃ পুনঃ গ্রীস, রােম, পারস্য, মিশর,
তুরস্ক, আরব, পড়ে উঠে চক্রাকার,
ভারতের সমদশা সহস্র বৎসর !!
যে দেশে মানব সংখ্যাধিকদেবকুলে
নির্ভর করিত সদা আসন্ন বিপদে।
হা দেব ! তাদের প্রতি হয়ে প্রতিকূল
কি দোষে আশ্রিত জনে দিলা অবসাদে।
স্বাধীনতা, জন্মভূমি, সম্মান, গোধন,
হে দেব! আলয় তবরক্ষিবার তরে,
প্রাণপণে বিধৰ্ম্ম সহিত করি রণ,
বিসজ্জি’লা যাহারা জীবন অকাতরে—
তাদের দুহিতা মাতা, বনিতা সকলে
নেহারি জনক সুত স্বামীর নিধন,
সােণার পুতলী আহা! রাশি চিতানলে
গতপ্রাণা-ছিন্ন করি সংসার-বন্ধন!
৪৪
কবিতাকুসুম।
হে বিধি! পাষাণ গলে এ দৃশ্য নেহারি,
দেবহৃদে না হ’ল কি দয়ার উদয় ?
শত্রুও না পারে নিবারিতে নেত্রবারি,
কেমনে যবনে হায়! হইলে সদয়।
৭০
কি সাধনে যবনে হইলা অনুকুল ?
কি দোষে শরণাগতে এত বিড়ম্বনা?
কুলাঙ্গনা সহ সবে করিয়া নিৰ্ম্ম ল
সহিছ কি সুখে এত বিধর্মিলাঞ্ছনা ?
(নৈরাশ্যের শেষ উদ্যম)।
৭১
বীরবীর্যে যেইজন, দশবর্ষ করিরণ,
দুৰ্বার যবনসেনা করিল নির্মল।
বসিয়া পৰ্বতােপরে, বিষাদ-ব্যাকুলান্তরে,
আজি সেই মহারাণ কেন চিন্তাকুল ?
৭২
শূন্য রাজসিংহাসন, শূন্য রাজনিকেতন,
রাজছত্র রাজবেশ কোথায় এখন ?
হীঘাটের রণে, যুঝিলা যবন সনে,
কোথায় সে সুরবীর-কুলেশ্বরগণ।
কবিতাকুসুম।
n
৭৩
কোথা সে শিক্ষিত সেনা, শত্রু প্রতিদিতে হানা,
নির্ভীক অন্তর যারা সমর প্রাঙ্গনে,
শূন্য করি রাজস্থান, ক্রমে সব গতপ্রাণ,
দৈব প্রতিকূলে হায়! এই মহা রণে।
৭৪
মেওয়ারেতে স্থান নাই, প্রতি দুর্গ, গড়খাই,
শক্রকবলিত—সবে বিধৰ্ম্মি-নিশান
উড়িছে নেহারি হায়, কার না কাদে ব্যথায়,
জন্মভূমি জন্য যার ব্যাকুল পরাণ?
৭৫
অর্থ নাই, নাই সেনা, কি লয়ে যুঝিবে রাণী,
নাহি অগ্নি ঝালাকুল সমরসহায়।
মানবের সাধ্যাতীত, সাধিয়া স্বদেশহিত,
ভ্ৰমিছে পৰ্বতে রাণা তাপিত হৃদয়।
৭
অনাবৃত রাজ-শির, রাজত, মহিষীর,
বৃষ্টিধারা পাতে কভু সিক্ত কলেবর।
শীতে সর্ব গাত্র কাঁপে, দগ্ধ দেহ গ্রীষ্মতাপে,
সহিলা এতেক ক্লেশ অম্লান অন্তরে।
১৬
কবিতাকুসুম।
৭৭
হলে ক্ষুৎপিপাসাকুল,
দিয়া দুৰ্ব্বাদল-মূল,
স্বহস্তে মহিষী রুটি বানায় যতনে।
ভােজনে বসিলে রাণা, শত্রু আসি দেয় হানা,
খাদ্য ত্যজি স্থানান্তর চলে অনশনে।
৭৮
এত কষ্টে যায় দিন, তথাপি তুর্কিঅধীন,
হইবে রাণা—রবে যাবত জীবন।
হেরি পুত্র কন্যা গণে,
কিন্তু আজ বাষ্পকুল বীরের নয়ন।
শীর্ণকায় অনশনে,
সম্বােধিয়া মহিষীরে, বিষাদে বলিছে ধীরে,
“হায় সতি! সব কষ্ট সহিবারে পারি।
কিন্তু পুত্র কন্যা গণ, ক্ষুধায় করে রােদন,
এ দৃশ্য মহিষি! আর নেহারিতে নারি।
“কুটিরে কৃষক গণ,
শ্রম করি প্রাণপন,
উপার্জিত অর্থ দ্বারা পালে পরিজন,
মধ্যাহ্নে শাকান্ন খায়, নিশিতে সুনিদ্রা যায়,
হায়রে নিশ্চিন্ত কিবা কৃষকজীবন।
কবিতাকুসুম।
৪৭
৮১
“দারা পুত্র লয়ে আমি, পৰ্বত প্রান্তরে ভ্ৰমি,
মিবারে নাহিক স্থান প্রতিকল বিধি।
ত্যজি পূজ্য রাজস্থান, সিন্ধুতীরে লই স্থান,
কি কাজ এ রাজনাম এ যাতনা যদি।”
মধুর বিনীত বাণী,
বলিছে রাণায় রাণী,
“বিপদ সম্পদ বল থাকে কবে কার ?
ক্ষত্রিয়ের বীৰ্য বল,
বীরত্ব কীর্তি কেবল
অনশ্বর, তদিতরে সকলি অসার।
৮৩
“ভ্রমে দময়ন্তী যথা, কিম্বা সীতা পতিরতা,
ত্যজি রাজ্য সুখভােগ রাজনিকেতন।
প্রান্তরে, অচলে, বনে, ভ্ৰমিব তােমার সনে,
কিছুমাত্র মনােদুঃখ না ভাবি রাজন।
৮৪
“পালিব, অপত্য গণে,—তুমি মার প্রাণপণে
দেশবৈরী দেবদ্বেষী বিধর্মী যবন।
দশ বর্ষ যুদ্ধকরি,
নাশিলে অসংখ্য অরি,
উচিত কি এবে শূর ক্ষান্ত দিতে রণ ?”
কবিতাকুম।
৮
হেন কালে অকস্মাৎ রাজবালা অশ্রুপাত
করি ভুমে পড়ে, হায়! করিয়া চীৎকার
ক্ষুধায় জ্বলিছে কায়, লয়েছে তাহার হায়,
অৰ্দ্ধকবলিত খাদ্য আরণ্য মাজ্জার।
কে আছে এমন বীর,
এ দৃশ্যে নয়নে নীর
নাহি বহে যাঁর ?--তার হৃদয় পাষাণ।
শত্রুঅস্ত্ৰক্ষত দেহ,
রাণার নয়নে কেই
দেখে নাই বারিবিন্দু, আজ কাদে প্রাণ।
৮৭
“ত্যজিব এ রাজস্থান, কিম্বা যুদ্ধে দিব প্রাণ,
অথবা সম্রাট সহ সন্ধি সংস্থাপিব ।
যাব সিন্ধুনদী তীরে,
কিম্বা হায় তুরকীরে-
পাপ মুখে পাপ কথা কেমনে আনিব।
৮৮।
“কিম্বা স্বাধীনতা ধন, আকবরে বিতরণ,
করিব কেমনে, হয়ে, মিবারের স্বামী।
দশবর্ষ যুঝিলাম, তার এই পরিণাম,
হা বিধাতঃ ! কোন প্রাণে নেহারি আমি।
কবিতাকুসুম।
৪৯
“হা ধিক, একি বাসনা। না ভরে মরিতে রাণা,
মরিব সম্মুখ রণে মারি শত্রুকুল।
প্রবল তৈমুরবংশ, না পারি করিতে ধ্বংশ,
হইবে বাম্পার বংশ হউক নিৰ্ম্মল।
A
“তথাপি যবনাধীন, হইব কোন দিন,
হয় মিবার ত্যজি যাব সিন্ধুতীরে।
অহে কুলপতিগণ, কর যুক্তি নির্ধারণ,
বিহীন সম্বল সবে যুঝিবে কি করে ?”
বিষাদে বিজলীপতি বলিছে প্রতাপ প্রতি,
“অকারণে প্রাণ দানে কি ফল ফলিবে,
চিরপূজ্য রাজস্থান, হইবে মহাশ্মশান,
রাজপুত-নারী চিতা-অনলে পশিবে ।
“যে বংশ জগতমান্য, যাহার উন্নতি জন্য,
যােগেন্দ্র সমরসিংহ যুঝিলা অতুল।
আচন্দ্র ভাস্কর যার, শেষ নাহি মহিমার,
জগতে হইবে শূন্য সেই মহাকুল !
কবিতাকুসুম।
“যাই সবে সিন্ধুতীরে, সেনা সংগৃহীত করে,
ফিরিব স্বদেশে পুনঃ, রহিব স্বাধীন”।
সজল নয়নে হায়,
সবাই দিলেন সায়,
বিষাদে নিশ্বাস ত্যজি যাইতে সেদিন।
অনন্তর মহারাণা বিষাদিত মনে,
চাহিলা চিতাের পানে বিষম নয়নে।
“যেদিন তােমায় তাত ত্যজিলা নিশিতে,
পরাক্রান্ত আকবর পশিল পুরীতে ।
আদেশিয়া মাতা মােরে তােমা উদ্ধারিতে,
সতী বসুমতী প্রাণ দিলা চিতাগ্নিতে!
“জননী-আদেশে পরি তপস্বীর বেশ,
যুঝিলাম প্রাণপণে সহি নানা ক্লেশ।
নারিলাম উদ্ধারিতে রাজলক্ষী তাের,
চলিলাম জন্মশােধ জননি চিতাের।
“পবিত্র উদয়পুর ! পিতৃনিকেতন!
তােমার উদ্ধার হেতু করি প্রাণপণ,
কবিতাকুসুম।
১
রাজপুতকুল-ক্ষয় করিয়া বৃথায়,
করিলাম বৃথা রণ হলদীঘাটায় ।
“উন্নত পর্বতমালা অহে আরাবলি।
জনমের তরে তােরে ছাড়ি যাই চলি,
শৈশবে কিশােরে কত প্রীতির নয়নে
হেরিয়াছি তােরে আজ, ত্যজিব কেমনে!
৯৮
‘রাজস্থান মাঝে পূজ্য স্বদেশ মিবার !
বৃথা রাজপুতরক্তে কলুষি তোমার
পূত কলেবর, নাশি অসংখ্য কুমার,
যাই, তব ক্রোড়ে স্থান নহিল আমার ।
“হে আদি পুরুষবর দেব দিবাকর ।
কেন দাস প্রতি রাগরক্ত-কলেবর
হয়ে প্রবেশিছ প্রভু প্রতীচি অম্বরে ?
কুপুত্র বলিয়া বুঝি আর এ পামরে
দিবে না দর্শন অহে দেব দিনপতি।
তাই চাই—তবে যাই করিনু মিনতি।
১০০
‘প্রতিকুল দেবকুল ভারতের প্রতি
হত যবে কুট যুদ্ধে পৃথ্বী পৃথ্বীপতি।
কবিতাকুসুম।
ভগবান একলিঙ্গ ! আশাপূর্ণা । দেবি ।
চাহ তাদের পানে যারা চিরসেবী!
পাইতাম যদি পুনঃ সেনা অর্থবল,
তাড়াতাম দেশ হতে অরাতি মণ্ডল।”
রােষে, ক্ষোভে ব্যাকুলিত বীরেন্দ্র হৃদয়।
রাণাকুল মন্ত্রিবর বলে সবিনয়,
“দিব অর্থ সংখ্যাৰ্তীত শুন বীরবর,
তাই লয়ে কর শত্রু সহিত সমর।”
“পিতৃগণ দত্ত ধন লইব কেমনে”
বলি চিন্তাকুল রাণা আপনার মনে।
মন্ত্রি বলে “মহারাণা,কিঙ্কর এ জন!
দেশহিত হেতু ধন করিছে অর্পণ,
আমিও এদেশবাসী, এদেশ (ও) আমার,
বিশেষ ও ধনে তব আছে অধিকার।”
যবনের বিশ্বাস,
অর্ধশশী-সুপ্রকাশ,
কেতন উড়িছে দুর্গচুড়ে।
বাপ্পারাও-প্রতিষ্ঠিত পাষাণ-নির্মিত শিবলিঙ্গ।
+ সমরসিংহ-অর্চিত-শক্তিমূর্তি।
কবিতাকুসুম।
যাহার বাহুবিক্রমে, ভারত বিজিত ক্রমে,
বীরত্ব বাখান বিশ্ব জুড়ে।
১৪
হায় কার দিন ভবে, চিরদিন সমভাবে,
নাহি থাকে, বিধি বিধাতার।
‘নাদের’ রাহু আসিবে, অর্ধশশী গরাসিবে,
দেখি ভাবি ছায়া স্লানতার।
১০৫
চিন্তাযুক্ত নিশাকর, পাণ্ডুবর্ণ কলেবর,
পশ্চিম অচলে চলে ধীরে।
প্রতাপ প্রফুল্ল মনে,
প্রভাতে হেরে নয়নে,
সিন্দুরাভ প্রসন্ন মিহিরে ।
১০৬
সাহসে উল্লাস মনে, লয়ে মন্ত্রিদত্ত ধনে,
পুনঃ সেনা করি সংগৃহীত,
করিয়া দারুণ রণ, উড়ায় জয়-কেতন,
প্রতি দুর্গে শত্রু কবলিত।
চিতাের ব্যতীত আর দুর্গ করি অধিকার,
পুত্রে দিয়ে রাজ্যভার স্ত।
৫৪
কবিতাকুসুম।
অধীন হইতে রাণ, বারম্বার করি মানা,
অবলম্ব করে বানপ্রস্থ। *
১০৮
হেথা সম্রাট সকাশে, দূত গিয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে,
প্রতাপ-বিজয় বার্তাবলে।
দশবর্ষ রণ-শ্রম
পণ্ড বীরপরাক্রম,
প্রতাপসিংহের বীর্য্যবলে।”
আফ্রিকা-প্রান্তরে গত প্রাণ । প্রিন্স্ নেপােলিয়ন।
সসাগরা ধরা রাজত্ব যাহার
(বিধির নির্বন্ধ কে খণ্ডিবে হায় !)
তার বংশধর হয়ে অসহায়
আফ্রিকা-প্রান্তরে জীবন হারায়।
যে বােনাপার্টির ভুজবীৰ্য্যবলে
কম্পিত “য়ুরােপ” ছিল একদিন,
:
১৫৭৯ সালে মহারাণা প্রতাপসিংহ বাণপ্রস্থ ধৰ্ম্ম অব
লম্বন করেন।
+ খ্ৰীষ্টীয় ১৮৭৯ শকের আগষ্ট মাসে।
কবিতাকুসুম।
যার বীরদাপে শত্রু সশঙ্কিত,
নৃপতিমণ্ডল ছিল আজ্ঞাধীন।
সে নেপােলিনের শেষ দশা স্মরি
কাহার হৃদয় না হয় ব্যথিত।
হেলন দ্বীপে মরে বন্দীবেশে
“ওটালুর” রণে হয়ে পরাজিত ।
৪
ভাতপুত্র তার ভুবনে বিখ্যাত
ধন্য বীরপুত্র লুই নেপােলিন।
সিয়াসমর-সলিলে যাহার
রাজ্য, রাজাসন, গৌরব বিলীন।
ত্রিংশত বৎসর প্রচণ্ড প্রতাপে
শাসিয়া সম্রাজ্য অসীম প্রভায়,
সিনসমরে সেনা সহ বন্দী!
প্রাক্তনের গতি কে রােধিবে হায় !
অহ! কি কুক্ষণে বাধাইলে রণ
সিয়ার সনে—এ অনর্থ হেতু ?
করাইলা নর-নাশ অকারণ,
উদাইলা ভাগ্যব্যোমে ধূমকেতু!
কবিতাকুসুম।
হারাইলা প্রিয়জন্মভূমি হায় !
গৌরব, বিভব, রাজ্য, সিংহাসন,
বিপদ-সাগরে মহিষী ‘ইজিনে,
প্রাণের কুমারে দিল বিসজ্জন!
৮
যাহার চরণে আশ্রয় লইয়া
ছিল সুখে কত নৃপতি মণ্ডল,
প্রাণ ভিক্ষা তরে হায়! সেই জন
লুটাইল প্রসিয়ার পদতল !
শােকে, দুঃখে, ক্ষোভে, বিপদে, সন্তাপে
যাপি জীবনের ক্লেশময় কাল
শােক সিন্ধুনীরে ভাসায়ে কুমারে
গেলা পরলােকে ফাস্ মহীপাল।
১০
জনক সম্রাট,বিপুল সাম্রাজ্য,
প্রিয় জন্মভূমি, পিতৃ সিংহাসন,
অতুল ঐশ্বৰ্য, প্রভূত গৌরব,
হারাইয়ে কার না হয় বেদন?
কবিতাকুসুম।
জনকের শােকে ব্যথিত কুমার
জননী সহিত বিষাদে মগন,
বীরপুত্র তাই,বীর হিয়া বলি
সহিলা সন্তাপ বীরের মতন।
.
১২
সপ্তদশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে
হয়ে পিতৃহীন ইংলণ্ডে থাকিয়া,
শিখি শস্ত্রবিদ্যা তরুণ যৌবনে
স্বদেশ উদ্ধারে নাচিত সে হিয়া।
১৩
আফ্রিকা-প্রান্তরে ইংলণ্ডের সহ
ইলা ক্ষেত্রে জুলুরাজ রণে
(করি পরাজয়দুর্ধর্ষ ইংরাজে)
বিজয়ী,কুমার শুনিয়া শ্রবণে
১৪
স্বল্পসংখ্য সেনা সহচর রূপে
লয়ে সাথে হায়! কুক্ষণে কুমার
আসি আফ্রিকায়, জুলু-অস্ত্রাঘাতে
গতপ্রাণ, ফান্স করিয়া আঁধার।
৮
কবিতাকুম।
ভীষণ প্রান্তরে ভীম রণভূমে
কৌতুকে কুমার করিতে দর্শন
চলিলা, সহসা আক্রমি কুমারে
আঘাতিলা অস্ত্র জুলু সৈন্যগণ।
অনুচর যারা কাপুরুষ প্রায়
ভয়ে পলাইল ফেলিয়া কুমারে।
নির্দয়হৃদয় জুলু সেনাচয়
একেশ্বর বীরে অন্যায় সংহারে।
১৭
যথা যজ্ঞাগারে জগদেকবীর
ইন্দ্রজিত যবে ধ্যান পরায়ণ,
সহসা আমি অস্ত্রশূন্য বীরে
অন্যায় সমরে বধিলা লক্ষণ ;
১৮
কিম্বা অভিমন্যু কুরুক্ষেত্র রণে
একাকী যুবক যুঝি অতুলন,
নিরস্ত্র সে যবে বধিলা তাহারে
অন্যায় সমরে রথী সপ্তজন।
কবিতাকুসুম।
পিতার সম্পদ, মাতা ইউজিন,
জন্মভূমি ফান্স, পিতৃসিংহাসন,
স্মরিয়া অন্তিমে বিষাদে কুমার
অবান্ধব দেশে ত্যজিলা জীবন।
কালের এ গতি কে বুঝিবে হায়!
মােহান্ধ মানব ! ভাব কি কখন
আজ যিনি এই অবনীর পতি
কালি ভিক্ষা হেতু করিবে ভ্রমণ ?
২১
তুচ্ছ ধন, মান, সম্পদ, গরিমা,
প্রভুত্ব, সামর্থ্য সকলি বৃথায় !
আছে, নাই, এর বৃথা অহঙ্কার
ক্ষণস্থায়ী সব, জলবিম্ব প্রায়।
२२
কোথা হায়! এবে হিন্দুরাজগণ।
কোথা মণিময় শিখি সিংহাসন।
কোথা সে দুর্দান্ত যবন এখন?
কালে হয়, পুনঃ কালে বিনাশন
কবিতাকুসুম।
কোথা ফান্স দেশ, কোথা রাজধানী,
জগৎ মােহিত যাহার প্রভায় ;
কোথা সে সম্রাট, কোথা রাজরাণী,
নেপােলিন্ বংশ বিলুপ্ত ধরায় !!
২৪
এই কুমারের জনম দিবসে
মহানন্দে মগ্ন পারিস নগর,
সম্রাট আদেশে, রাজদ্রোহী বন্দী
হয় কারামুক্ত সহস্র উপর।
২৫
সপ্তম বৎসরে ভাষা চতুষ্টয়
শিখিলা কুমার সুতীক্ষ্ণধীমান।
খুল্লপিতামহ সম যুদ্ধবীর
য়ােবিংশ বর্ষে হারাইল প্রাণ।
জুলুগণ ! অহহ! কি কাৰ্য্য সাধিলে
বধিয়া নিরস্ত্র নির্দোষী যুবায়
জগদেকবীর ? শ্রেষ্ঠ রাজকুল
বিলােপিলা হায় আ ধারি ধরায় !
?
কবিতাকুসুম।
৬১
স্বামী, সিংহাসন, সম্পদ সকল
হারাইয়া অহা ! রাণী ইউজিন,
তনয়রতন-বদন হেরিয়া
যাপিত জীবন হয়ে পরাধীন।
২৮
আশায় পালিত অধীন জীবন,
আশা ছিল—কালে পাবে সিংহাসন,
আশায় সহিয়া এত বিড়ম্বন
সুতে হেরি শােক হত বিস্মরণ ।
হায়রে ! রাণীর নির্মল সে আশা
জুলু-অস্ত্রাঘাতে আফ্রিকা-প্রান্তরে।
বাঁচিবেন রাণী—যথা অন্ধমুনি
হেরি মৃত সুতে দশরথ-শরে।
মন্দ ভাগ্যবতী রাণী ইউজিন।
ভব সুখসীমা শেষ এধরায়।
প্রাণ কাঁদে আহা! তব ভাগ্যস্মরি
এ শােক পাশর, স্মরি ঈশ পায়।
७२
কবিতাকুসুম।
নির্জন কারাবাসীর বিলাপ।
১
এই কি হইল হায় !
জীবনের পরিণাম
অবস্থিতি অন্ধতম বিজন কারায় !
আজন্ম হেরিনু যাহা,
নর-নেত্র বিনােদন,
রবি,শশি, দিবা, নিশি, দেখা নাহি যায় !
এ ভীষণ কারাগারে ,
সাত দিন কি প্রকারে
রহিব ? মুহুর্তে যার অসহ্য যাতনা।
হে বিধাত! কোন পাপে
ফেলিলা বিষম তাপে ?
প্রাণ যায়—উদ্ধারের উপায় বলনা।
দোষীই জানিলা সবে ;
কিন্তু মনে জানি আমি
{ দোষী নই) বিনা দোষে এ দণ্ড বিধান !
কবিতাকুসুম।
পুলিসের কোপানলে,
ভূস্বামী আহুতি দিলে,
তেঁই সে হইল সৃষ্ট, অনৃতপ্রমাণ।
৪
বিচারক ধন্য তুমি !
প্রমাণের অনুগামী
হইলে, বুঝিলেনা যে বল অত্যাচারে,
অর্থহীন অসহায়ে
দণ্ডিতে বিচারালয়ে
অবাধে ওরূপ সাক্ষী সৃষ্ট হতে পারে।
গ্রামবাসী জনগণ
ভূস্বামীর করতল,
অত্যাচার ভয়ে সবে বিপক্ষ হইল।
নির্দোষিতা প্রমাণিতে
যারে সাক্ষী মানিলাম,
তারাও বিপক্ষবশে বিরুদ্ধ বলিল।
বিচার-সাহায্যকারী
উকীল মােক্তারগণ
৬৪
কবিতাকুসুম।
কে বলে ? কেবল সবে অর্থ পরায়ণ।
স্বীয় পক্ষ সমর্থিতে
যাহাদের বরিলাম,
অর্থ-বশে কাৰ্যকালে হ’ল অদর্শন।
এদেশীয় ভাব, ভাষা-
অনভিজ্ঞ বিচারক
সক্ষম এ ষড়যন্ত্র ভেদিতে কজন?
এরূপ প্রমাণমূলে
নির্দোষীরা আসে জেলে
(কেলয় সন্ধান তার ?) অভাগা মতন!
৪
ঘােরান্ধকার কারায়
পারি তিষ্ঠিতে হায়!
ফাফর হইল যেন প্রাণ যায় যায় !
লােকচক্ষু রবি শশি
কোথা সে নক্ষত্ররাশী
আর কি দেখিতে পাব প্রকৃতি তােমায় ?
অবনি! এ দীনে স্থান
দেহ মা তব উদরে,
কবিতাকুসুম।
এ যাতনা হতে ত্রাণ কর মা আমায়।
এ তনু ত্যজিতে কত
বৃথা চেষ্টা করিলাম,
নাহি দেখি কোনরূপ উদ্ধার উপায়।
এ সজন বিশ্বমাঝে
সদা জনকোলাহল,
আঁধার বিজনে বন্দী অভাগা কেবল ! ;
প্রাণ কাঁদে অভাগার
হেরিতে সে প্রাণীকুল,
দিবালােক, নিশিশশী নক্ষত্রমণ্ডল।
১১
অন্ধকার কারালয়ে
জনপ্ৰাণীহীন স্থানে,
বাক্যালাপ বিনা বাস করা কি কঠিন।
কে বুঝিবে এ সন্তাপ,
এ কারার ভীষণতা ?
হায়রে চিন্তায় হয় মস্তিষ্ক বিলীন।
বন্দিশালে বসি হায়!
কতযে কি ভাবি সদা
কবিতাকুসুম।
পােড়া স্মৃতি তায় পুনঃ যাতনা বাড়ায় ।
সুখদ শৈশব কাল
নিস্পাপ সারল্যময়
কেন স্মৃতি কারাগারে দেখলে আমায় ?
আছিলেন অপুত্রক
পূজ্যপাদ পিতামাতা ;
জীবনের শেষভাগে আমি কুলাঙ্গার
জন্মিলাম ধরাতলে,
পিতা মাতা কুতূহলে
বিতরিলা ধন দীনে আনন্দে অপার।
১৪
স্মরিতে বিদরে হিয়া-
অকস্মাৎ জননীর
উপস্থিত হ’ল হায় আসন্নসময়,
মােরে পিতৃকরে দিয়ে,
অতৃপ্ত বাসনা লয়ে
ত্যজিলেন মাতা মম এমর্ত্য আলয়।
আকুল বিষম শােকে
স্থবির জনক হায় !
কবিতাকুসুম।
বিলাপিলা সবিষাদে দুঃখ সে দিনের,
দিন দিন ক্রমে কালে
অলক্ষ্যে হ্রাসিলা শশাকে,
হ্রাসয়ে শুভ্রতা যথা শুরু বসনের।
শােক দুঃখ এজগতে
সমভাবে চিরদিন
থাকে কার ? থাকিলেও ধাতার সৃজন
থাকিত না এত দিন ।
অন্ধ দশরথ প্রায়
সবে শােকানলে দেহ দিত বিসজ্জন।
১৭
হত শত পুত্রশােকে
বাচিত কি অন্ধরাজ ?
পঞ্চ মহা পুত্রশােকে দ্রুপদনন্দিনী?
হেরে বিশ্ব অন্ধকার
ধরিত জীবন আর
ময়-সুতা মন্দোদরী, কুন্তী অনাথিনী ?
১৮
প্রকৃতি-নিয়মাধীন
ক্রমশঃ শিথিলশােক
৬৮
কবিতাকুসুম।
হইয়া জনক মােরে লাগিলা পালিতে ;
নিষ্ঠুর কৃতান্ত হায় !
করি মােরে অসহায়
হরিলা পিতায়, দুঃখে আমায় দহিতে!
১৯
সাধের তনয় ফেলি
পিতা মাতা গেলচলি ;
এ বিশ্বে আমার বলি করিতে পালন
ছিল না কি কেহ হায় !
ছিল, কিন্তু অভাগায়
কে আদরে-বিধি যারে বাম অনুক্ষণ !!
এবিশ্বে বিপন্ন জনে
কজন আশ্রয় দানে
পালন করয়ে দীনে দয়ার আম্পদ ?
দরিদ্র স্বজনে দেখি
ত্বরায় ফিরায় অাখি,
চাহেনারে ফিরে কেহ বিহীনে সম্পদ।
২১
পিতার ভবন আহা!
সম্পদে স্বজন যাহে
কবিতাকুসুম।
নিবসিত নিরন্তর, কোলাহল ময় ;
পিতৃপরলােক পরে
কেহ না রহিল আর,
শূন্য করি চলি গেলা সে সুখ-আলয় !
૨૨
সেই দিন সবিষাদে
জন্মভূমি ত্যজিলাম,
ত্যজিলাম শশাকে সেই পিতৃনিকেতন ;
ভ্ৰমিলাম কতদ্বার
পােড়া উদরের তরে,
না চাহিল তবু ফিরে জ্ঞাতি বন্ধুগণ।
তথাপি স্বাধীনগতি
যথা ইচ্ছা ভ্ৰমিতাম,
না ছিল রােধিতে কেহ পথ সুখময়।
স্বেচ্ছায় নিগড় আমি
দিলাম আপন পদে
বন্দী হেতু, ভ্রান্ত নরে বলে পরিণয়”।
২৪
আর যে এ পাপ আ খি
প্রিয় দারাপুল দেখি
কবিতাকুসুম।
তৃপ্ত হবে কোন দিন, সে আশা বৃথায় !
অভাগায় বন্দী করি
নির্দয় ভূম্যধিকারী
রেখেছে কি দারা সুতে ভিটায় বজায় ?
ভাঙ্গিয়াছে ঘর বাড়ী,
পথের ভিখারি করে
তাড়ায়েছে নিরাশ্রয় করে তা সবায় !
উদরান্ন তরে হয়!
মিছে বা কত দ্বারে
কে দিবে আশ্রয় আহা! দেখে অসহায় ?
মলিন বসন পরি
শিশু সুতে কোলে করি
ভ্রমিতেছে অভাগিনী কাঙ্গালিনী প্রায় !
হে দয়া ! কেমনে তুমি
মানবহৃদয় ত্যজি
এমন নিষ্ঠ র কায করাও ধরায় ?
অহাে প্রিয়ে ! সেই দিন
কতমত বুঝাইলে
কবিতাকুসুম।
৭১
অবিবাদে ভুস্বামীর বৃদ্ধ কর দিতে।
শুনিনু তব বাণী-
সেই দিন হতে হায় !
আরম্ভিলা দুরাচার আমায় দমিতে!
২৮
এতই নিষ্ঠুর কাষ
করিবে ছিলনা মনে,
কর বৃদ্ধি হেতুকি সাধিবে সর্বনাশ !
পড়িবে মৃদুল বায়
মহা মহীরুহচয়,
ফু লিঙ্গে দহিবে বিশ্ব, ছিলনা বিশ্বাস।
কেমনে সে শত্রু মাঝে
জীবে শিশু সুত সহ ?
তব দুঃখ সুরি সদা ব্যাকুল হৃদয় !
বিপদে সম্বরি শােক,
স্মরি পরমেশ পায়,
রক্ষিও সতীত্ব ধন, সে শিশু তনয়
লৌহের শৃঙ্খল করে
পরাইয়া যেই দিন,
१२
কবিতাকুসুম।
রাজদূত, নদী-তীরে তরণী উপর
উঠাইলা বজম্বরে ;
চমকি চাহিলা ফিরে,
দেখি মােরে “একি!” বলি হইলা কাতর
নদীবক্ষ ভেদ করি
ভেদিয়া দম্পতি হৃদি
ছুটিলা সবেগে তরি অভাগা সহিত,
যতদূর চলে দৃষ্টি
চাহিলা তরীর পানে,
অদর্শনে ভূমিতলে হইল মুচ্ছিত।
७२
সেই বুঝি শেষ দেখা
আর না যাইব ফিরে
এই কষ্টে পাপ প্রাণ যাইবে কারায় ;
অতি শ্রমে তনু ক্ষীণ,
দিন দিন আয়ুহীন,
বুঝিতেছি এল কাল লইতে আমায়।
দুর্লভ মানবকুলে,
জনমি কুকাযে কাল
কবিতাকুসুম।
৩
কাটালাম মন্দমতি আমি দুরাচার,
অনিদ্রায় অনাহারে
অর্থ উপার্জন করে
করেছি অসাধু কাযে অপব্যবহার !
৩৪
দয়া করি পরমেশ!
ঘুচাও দীনের ক্লেশ,
অন্তিমে, ও পদে এই মম নিবেদন
বিপদে বনিতা সুতে
রক্ষ হে মধুসূদন !
প্রান্তে পাপীরে, প্রভাে! দিও চরণ।
“অলঙ্ঘ্য বিধির বিধিমত্ত পাপাচারে
যে জন, তাহার প্রাণ অবশ্য দহিবে
অনুতাপানলে শেষে-” (হেলেনা)
১
ভদ্র আবরণে শরীর ঢাকিয়া
থাকিতাম সদা, কে জানিত হিয়া
পাপপূর্ণ, বাহ্য সাধুতা প্রকাশ,
চিন্তা চিরন্তন পর-সর্বনাশ।
৭৪
কবিতাকুসুম।
२
অতিক্রম করি সুকিশাের কালে
যৌবন সীমায় হায় পদাপিলে!
ভুলিলাম ধৰ্ম্মে, পড়িনু জঞ্জালে
উপাজ্জিতে অর্থ অপূৰ্ব্ব কৌশলে।
করেতে শৃঙ্খল করিনু ধারণ
মূহুর্মুহু তায় প্রহরি-পীড়ন
যন্ত্রণায় হল হৃদি বিদারণ
মৃত্যুই পাপীর প্রার্থিত এখন।
৪
কি হেতু বৃথায় অর্থের কারণে
দিনু বিসজ্জন ধৰ্ম্ম হেন ধনে ?
বিসজ্জি জনক জননী ভবনে
পালিত হয়েছি যাহতে যেখানে ।
ছিল নাত কিছু অর্থে প্রয়ােজন
মূঢ় আমি হায়! তবে কি কারণ
করিলাম হেন উপায় ভীষণ
উপাজ্জিতে অর্থরাশি অকারণ ?
কবিতাকুসুম।
৭৫
অন্যবিধ পাপ করিলে সঞ্চয়
দিতেন আশ্রয় বান্ধব নিচয়
এবে বন্ধুচয় দেখিলে আমায়
ফিরিয়া না চায় ঘৃণায় লজ্জায়।
৭
যত দিন বাঁচি এ ভব ভবনে
দেখাব না কাকে এ পাপ বদনে,
দেখিব না কাকে এ পাপ নয়নে,
রাজায় রব এ কারা নির্জনে ।
৮
এই যে জগৎ জনপূর্ণ হয়।
হেরিতেছি আমি জনশূন্য প্রায় ;
পৃথিবীও যেন ধরিতে আমায়
চায় হায়রে আমি নিরাশ্রয়।
আর কেন স্মৃতি বাড়াও যন্ত্রণা?
কেন বা সে চিত্র দেখাও কল্পনা ?
পারে দেখিতে নয়ন আপনা,
সে দৃশ্য এ পাপ হৃদয়ে সহে না।
কবিতাকুসুম।
পামরের এই পাপ বার্তা শুনি,
স্নেহের আধার দুঃখিনী জননী
কাদিছেন অহা লুটায়ে ধরণী
অচেতন প্রায় দিবস যামিনী।
১১
পূজ্যপাদ পিতা সুত-স্নেহ বশে
আসিয়াছে আমা উদ্ধারের আশে
বৃথা আশা, তাত! যাও ফিরি দেশে
পুছি অশ্রুজল স্মর পরমেশে।
পাপ পুত্র তরে না কাদিও আর
তব দুঃখ হেতু আমি কুলাঙ্গার ;
করিও শান্তুনা মায়েরে আমার
নারিনু শােধিতে তােমাদের ধার।
যদিও এখন করিনু বিদায়
হৃদয় কেমনে বিদারিবে হায়!
পু-দুঃখদগ্ধ সে পিতা মাতায়
যত দিন পাপ জীবন না যায়।
কবিতাকুসুম।
৭।
১৪
মাতঃ বঙ্গভূমি! দুঃখিনী ভারত।
দিবে কি বিদায় জীবনের মত।
যাব আণ্ডামানে—হায় রে বিধাত!
এই কি আমার অদৃষ্টে লিখিত।
দিল্লীতে ভারতেশ্বরী
ধন্য ভিক্টোরিয়া ! নারীকুলােমা,
বিশ্ব-মাননীয়া, সাধ্বী নিরুপমা,
জলধি-সম্ভবা পদ্মালয়া সমা,
ভরিল ভুবন তােমার যশে।
শুভক্ষণে তব জন্ম মহীতলে ;
অখণ্ড প্রতাপে ভারত শাসিলে,
সিন্ধিয়াদি যত ভারত নৃপালে
রেখেছ আপন আজ্ঞার বশে।
* ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ ই জানুয়ারী।
কবিতাকুসুম।
শুভদৃষ্ট তাের হস্তিনানগরি ।
আজি তোর চারু সিংহাসনোপরি
উপবিষ্ট হবে “ভারত-ঈশ্বরী”
উপাধি ধরিয়া, রাণী বৃটন।
৪
গ্রহিতে আসন অনন্ত জলধি-
পারে থাকি পাঠাইল প্রতিনিধি
মহাত্মা সুকবি ধীর গুণনিধি
করুণা-নিধান লড লিটন। *
যে আসনে দুৰ্য্যোধন কুরুপতি
বিরাজিত,যুধিষ্ঠির মহামতি
যে আসনে হায়! পৃথী নরপতি
বসিত, রচিত দানব ময়।
আত্মভেদ হ’ল ভারতের কাল
কুরুযুদ্ধে এর ঘটিল জঞ্জাল,
বিনষ্ট বলিষ্ঠ ক্ষত্রিয় ভূপাল
তেই সে আসন যবনে লয়।
* তৎকালে সাধারণ মত এই রূপ ছিল
কবিতাকুসুম।
৭৯
অন্যায়ে, যবন পুণ্য সিংহাসন
লভিল, নারিল করিতে রক্ষণ
যবনের পাপে সে ময়ূরাসন
কাল-কবলিত যবন সনে।
৮
কত শূর বীর ক্ষত্রিয় সন্তান
যে আসন হেতু হারাইল প্রাণ,
যে আসন তরে মােগল, পাঠান
অকালে অসংখ্য মরিল রণে।
নব বর্ষে করি মঙ্গলাচরণ,
লভিলে মা ! আজ সে পুণ্য আসন,
ভারত-ইশ্বরী বলি বিঘােষণ
হইতেছে তেঁই পূরি জগত।
শুন ভারতের ভূতবিবরণ
শ্রুতি, মহাকাব্য, বেদান্ত দর্শন,
প্রসবিল ভারতীয় আর্য্য মন
ধরাতলে পুণ্যভূমি ভারত ।
৮০
কবিতাকুম।
ত্রিকালজ্ঞ ঋষি মনু মতিমান
রছিলেন রাজব্যবস্থা বিধান,
(নহে পদ্মপত্র সলিল সমান)
আছে চিরস্থির—বে অটল।
স্মৃতি, ধৰ্ম্মশাস্ত্র, চরক নিদান,
বিরচিলা কত ঋষি জ্ঞানবান ;
আছে কোন্ দেশে ভারত সমান
নীতিশাস্ত্র এত পূত, নিৰ্ম্মল ?
ভারতের আৰ্য মহীপালগণ
শাসিয়াছে কত রাজ্য অগণন,
জগতে ভারত ছিল অতুলন
সমকক্ষ কেবা ছিল ধরায়।
১৪
এ ভারতে ছিল রতনের খনি,
এ ভারতে ছিল কহিনুর মণি,
এ ভারত ছিল ধরা মাঝে ধনী,
এবে কাঙ্গালিনী বিপাকে হায়!
কবিতাকুসুম।
(প্রার্থনা।)
শুভদিনে দিল্লী-সিংহাসন মাতঃ !
শুভক্ষণে আজ করিলে গ্রহণ
বহুশত বর্ষ কলুষিল যাহা
রাজধৰ্ম্ম ভুলি দুর্দান্ত যবন।
তব সুশাসনে হে ভারতেশ্বরি।
আছি শান্তিসুখে, জ্ঞানের নয়ন
ফুটেছে মােদের তােমার কৃপায়,
করিতেছ রাজকৰ্তব্য পালন।
১৭
সেই জ্ঞান নেত্রে করি বিলােকন
ভারতের ভুত, বর্তমান কাল,
ব্যথিত হৃদয়ে করি নিবেদন
নাশ ভারতের অসুখ জাল !
১৮
প্রজা-পুঞ্জ-সুখ-সাধন স্বধৰ্ম্ম
দুঃখ-বিমােন কর্তব্য ভূপাল
দুঃখী মােরা—তাই দয়া করি সুতে
বিনাশ ভারত-অসুখ জাল।
৮২
কবিতাকুসুম।
তুমি মা! ভারত-ঈশ্বরী এখন
সম শ্বৈতপুত্র ভারত সন্তান
আর যেন মাতঃ ! বর্ণগত ভেদে
কলুষ না হয় সে রাজবিধান।
উদারস্বভাব শ্বেতদ্বীপ-সুত
পূৰ্ব্বকালে এই ভারত ভবনে
করি আগমন নিবসিত যারা,
স্থাপিত সদ্ভাব এদেশীয় সনে।
সুশিক্ষিত এবে ভারতবাসীরা,
দাও উচ্চপদ করি নির্বাচন,
কর কৃপা দৃষ্টি বাণিজ্যের প্রতি,
ভারতে রহিবে ভারতের ধন।
ভারতের শিল্পে আদরে না কেহ
তাই শিল্পজাত বস্তু লুপ্ত প্রায়,
ভারতের শস্য যায় দেশান্তর
কর মা অচিরে ইহার উপায়।
কবিতাকুসুম ১৩ २७ বড়ই কঠিন সিবিল সার ভিস, পরীক্ষার দ্বার দয়া করি চিতে কর সুকোমল, যাহে অল্পায়াসে ভারত সন্তান পায় প্রবেশিতে। ২৪ নিরস্ত্র আমরা (নহি চিরদিন) বাচাতে বিপদে ধন, মান, প্রাণ অসমর্থ এবে, তাই দয়াময়ি! কর মাতঃ ! অস্ত্র-শিক্ষার বিধানে। যে দিন হইতে সূৰ্য্য শশধর- বংশ রাজ্য লুপ্ত দেব বিড়ম্বনে, সেদিন হইতে দেখেনি ভারত- নিবাসী ভারত-রাজ-সিংহাসনে। তাই বড় সাধ উপজে মা মনে পূরাও বাসনা হে প্ৰজা-রঞ্জিনি! ভারতের দুঃখ জানিতে, নাশিতে, তােষিতে ভারতে হও নিবাসিনী ৮৫ কবিতাকুসুম। । প্রজা সুখ দুঃখ দেখ স্বনয়নে প্রজাপুঞ্জ তব যুড়াক নয়ন- (বহুদিন ভাগ্যে ঘটে নাই যাহা) রাজ-শ্রীচরণ করি দরশন। ২৮ বিপদ ঘটিলে না পারি জানাতে তুমি আছ মাতঃ সমুদ্রের পার ; কেমন কৃতজ্ঞ ভারতের প্রজা, আসিলে জানিতে হৃদয় সবার ভারতে বাসিলে ভারতের তরে করিতে আরও যত্ন প্রাণোপম, এর উন্নতিতে তব রাজোমতি হইত, কতই সুখ মনােরম! ভারত শাসিতে পাঠাও যাদের যদিও তাহারা উদারহৃদয় দীন প্রজা দুঃখে দুঃখী কেহ বটে, কিন্তু নহে সবে সম দয়াময়।
কবিতাকুসুম।
৮৫
৩১
মহামতি নর্থক দয়াময়,
টেম্পলের আহা অসীম যতনে
বঙ্গের বিগত দুর্ভিক্ষ-অনল
নিভিল, বাচিল বঙ্গ প্রজাগণে।
৩২
উড়িষ্যা দুর্ভিক্ষে স্মর একবার
বিডনের হায় নির্দয়াচরণ ;
স্মরি একবার করেছ, শুনেছি,
প্রজানাশ হেতু অশ্রুর পতন।
যদি মা ! আপনি থাকিতে ভারতে,
অনশনে প্রাণী মরিতে দেখিতে
পারিতে না কভু-স্নেহের নয়নে,
উপজিত ব্যথা সুকোমল চিতে
৩৪
ক্ষুধা তষ্ণা সহি বাঁচাতে প্রায় ;
পালে যথা মাতা আপন বালকে,
ভক্ষি ভক্ষণ যথা বিহঙ্গিনী
তক্ষ্যদানে আহা! বাঁচায় শাবকে।
৮৬
কবিতাকুসুম।
স্থাপি মহাসভা ভারত মাঝারে
দাও মন্ত্রিপদ ভারতীয়গণে,
সৈনিকতা পদ বিতর বঙ্গেরে,
তব হেতু প্রাণ দিবে সবে রণে
রাজ্যেশ্বরী যার হায়! দৃষ্টাতীত
সম সুখ দুঃখ হয় কি বিশেষ ?
এ আক্ষেপ মতিঃ ঘুচাও সত্বরে,
দেখিব তােমায় রামনিৰ্বিশেষ।
তাই বলি মাগাে! বড় সাধ মনে
পূরাও কামনা হে প্রজারঞ্জিনি!
ভারত শাসিতে ভারতের হিতে
হও মা ত্বরিতে ভারতবাসিনী।
( আশীৰ্বাদ।)
পাল সুত সম ভারত সন্তানে,
দম দুরাশয় ভারতের অরি,
হউক অটল তব সিংহাসন
বিধির ইচ্ছায় ভারত ঈশ্বরি।
বঙ্গে যুবরাজ।
কি বিচিত্র গতি অদৃষ্ট চক্রের !
শুভদিন আজ দুঃখিনী বঙ্গের !
শুভ আগমনে মহিষী-পুত্রের,
মহানন্দে বঙ্গ হয়ে মগন
তিতি নেত্রনীরে, আশীষি কুমারে,
পূৰ্ব্ব সুখ দুঃখ স্মরিয়া অন্তরে,
হরষে বিষাদে (১) কুমার গােচরে,
গতদিন-দশা করে নিবেদন।
হৃত পুত্র হেতু জননী যেমন,
শোকে দুঃখে সদা করয়ে রােদন,
বহু দিন পরে পুত্র-দরশন
পাইলে আনন্দ সাগরে ভাসি—
১৮৭৫ ডিসেম্বর।
(১) যুবরাজের আগমনে হর্ষ ও পূর্ব সুখ স্মৃতিতে
বিষাদ।
কবিতাকুসুম। ৪ লয় কোলে করি, চুম্বে সুতশির, অবিরল বহে নয়নের নীর, বলে সুতে, শোকে, যত দুঃখিনীর- যাতনা হয়েছে দিবস নিশি। (গত গৌরব স্মৃতি। কি দেখিতে বঙ্গে এলে যুবরাজ ! আছে কি বঙ্গের পূৰ্বরূপ সাজ ? হরেছে সকল যবনের রাজ! বঙ্গের গৌরব-উজলদীপ । নাই পালকুলে ভূপাল সকল, ধৰ্ম্মপাল, দেবপাল, মহাবল, সে লক্ষণ সেন, বঙ্গশিরােজ্জ্বল, আঁধার আজি গৌড় নবদ্বীপ। এই নবদ্বীপ বঙ্গমাঝে ধন্য, এই নবদ্বীপে মহাত্মা চৈতন্য, এই নবদ্বীপে বঙ্গেশ লাক্ষণ, ছিল রঘুনাথ রঘুনন্দন।
কবিতা কুসুম।
এই বঙ্গে আগে কবিকুলপতি
ছিল জয়দেব, শ্ৰীহর্ষ সুমতি।
জ্ঞানদাস, চণ্ডিদাস, বিদ্যাপতি,
সাহিত্য, দর্শনে, বঙ্গ অতুলন!
ছিল বঙ্গাধীন প্রয়াগ সিংহল,
শস্য বঙ্গভূমি সমতল
অনায়াসজাত সুশস্য সকল
জমীদার (ও) ছিল রণতৎপর ;
সেনা, যুদ্ধ সাজ, রাখিত সবাই,
আছিল সবার দুর্গ গড়খাই,
এবে অস্ত্র হেতু পাশ লওয়া চাই
পূর্বের তুলনে কত অন্তর !
প্রার্থনা)
4
১১
বহুশত বর্ষ যবনের করে, .
নিপীড়িত হয়ে, ছিনু শূন্যোদরে,
রাজ্ঞীর পালন হতে অতঃপরে
আছি সুখে বৎস! বলি তােমায়।
কবিতাকুম। কিন্তুগুটীকত অসুখের শেষ আছে, তাই হয় যাতনা অশেষ, জিত জাতি বলি করয়ে বিদ্বেষ ক্ষুদ্রমনা গৌরবরণ ঘৃণায়। সিবিলসার্বিসে কঠিনতা কত আছে, রাজবিধি ভেদ বর্ণগত, যে দোষে সুরেন্দ্রনাথ পদচ্যুত, গুরুতর দোষী হয়ে ‘লেব- ১৪ হস্কে ত্যজি স্বীয়পদ দূরদেশে, স্বজন সহিত থাকিয়া স্ববাসে, জীবিকার তরে প্রতি মাসে মাসে লইছে উভয়ে মিলি পেন্। মহামতি নর্থব্রুক দয়াময়, ক্যাম্বেল, টেম্পল, অতি মহােদয়, বিগত দুভিক্ষে বঙ্গ প্রজাচয়, রক্ষিলেন যারা অতি সুযতনে।
কবিতাকুসুম।
৯১
ঈদৃশ সুজন বৃটনে থাকিতে,
পূনঃ যেন এই ভারত শাসিতে,
বৃটিশকলঙ্ক না পায় আসিতে
উড়িষ্যা নাশিতে কাল “বীভনে।”
(কৃতজ্ঞতা ও আশীৰ্বাদ)
কি আছে বঙ্গের হেন অলঙ্কার,
ভাবী সম্রাটেরে দিব উপহার,
লও চির কৃতজ্ঞতা ভক্তিহার,
রাজন্যের যাহা বাঞ্ছিত ধন।
১৮
তব আগমনে আলােক মালায়,
উজলিত বঙ্গ তােষিতে তােমায়,
শুনিলে যা সব, বলিও তা মায়,
আশীষি উল্লাসে হয়ে মগন।
নাটোর দরবারাসীন মাননীয় মহামতি সাররিচার্ড
টেম্পল সাহেব বাহাদুরের অভ্যর্থনা ।*
১
२
এস বঙ্গেশ্বর ! রাজসাহী মাঝে,
রাজশাহী বাসী পূজিবে তােমারে,
দীন সবে, তাই পূজিবে কেবল
শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, ভক্তি উপহারে।
প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষে বঙ্গ প্রজাকুল
বাঁচায়েছ, কীৰ্ত্তি রেখেছ অপার,
নিমন্ত্রি বাঙ্গালী সম্মানিলা গেহে
গৌরবিলা কত বঙ্গ গ্রন্থকারে।
কৃত উপকার স্মরিছে বাঙ্গালী,
কৃতজ্ঞতাপূর্ণ বাঙ্গালী জীবন ;
তেয়াগিয়া বঙ্গে যাবে যবে দেশে
তব হেতু বঙ্গ করিবে রােদন।
“বাঙ্গালী” বলিয়া ঘৃণা নাহি তব,
এমহত্ব কেন দেখিনা সবার।
৪
* ১৮৭৬ নবেম্বুর।
কবিতাকুসুম।
তব বিদ্যমানে উদ্ধত ইংরাজ
করে কেন বঙ্গে এত অত্যাচর ?
হ্রাস কর-ভার দম দুষ্টগণে,
নাশ “ সরাসরি ” বিচার বিধান,
দাও পদ গুণ অনুরূপ জনে,
গবে যশ তব বঙ্গের সন্তান।
কি দেখিতে ত্যজি সে মহানগরী
ত্যজি রাজশাহী শ্রেষ্ট বােয়ালিয়া,
হেরি বিচার বিচারকগণ,
আইলা নাটোরে সে সবে ত্যজিয়া ?
কোথা সে সৌভাগ্য নাটোর বাসীর ।
কোথায় আনন্দ হেরি দরবার ।
নিষ্প্রভ নাটোর মহারাজকুল
হায়রে সেদিন পাইবে কি আর ।
৮
যে রাজবংশের রাজোন্নতি হেতু
‘‘রাজসাহী” বলি খ্যাত এই স্থল,
কবিতাকুসুম।
একদিন যার দান শীলতায়
পতিতা ভারত ছিল সমুজ্জ্বল।
“মহারাজ অধিরাজ পৃথ্বীপতি”
বলি যার খ্যাত ছিল একদিন,
তৃণ তুল্য যিনি ত্যজি রাজ্য সুখ
তপস্যা নিরত ছিল নিশি দিন,
সেই রামকৃষ্ণ তনয় যাহার
প্রাতঃস্মরণীয়া, ধন্যা, যশস্বিনী,
পুণ্যবতী তিনি, খ্যাতি মহারাণী-
ভবানী, সতত সুদীন পালিনী।
১১
অতুল সাহসে অসীম প্রতাপে
অর্ধ বঙ্গরাজ্য করিয়া শাসন,
অনশ্বর কীর্তি স্থাপিয়া ভারতে
নশ্বর শরীর দিল বিসজ্জন।
১২
নাহি সে নাটোর সেই রাজধানী,
দেবেন্দ্র বাঞ্ছিত সে সম্পদ হায় !
কবিতাকুসুম। নাহি মহাপাত্র সুরগুরু সম মতিমান ধীর দয়ারাম রায়। এ রাজকুলের ধ্রুবতারা নিভ রাজা চন্দ্রনাথ জ্ঞানচ্যুতিমান রাজোচিত গুণী বিদ্যাবিভূষিত, গাইত ভারতে যার যশােগান, ১৪ স্বাধীন ভূপতি সসভ্রমে যার প্রণত হইত চরণযুগলে, আধারিয়া বঙ্গ বঙ্গসুধাকর- চন্দ্রনাথ গত চির অস্তাচলে। ‘ভারতনক্ষত্র’ জনক তঁাহার প্রসাদিলা যবে এ পদ প্রদানি, সে বংশের হায় এই দরবারে আসন লইয়া আজ টানাটানি । নাটোরের আদি পুঠিয়াধিপতি “ঠাকুর” বলিয়া পূজিত সৰার,
কবিতাকুসুম।
বহু বিভাগেতে ছিন্ন ভিন্ন এবে
নাহি সে বিভব পূৰ্ব্ববৎ আর ।
১৭
এ বংশ রতন মহেশ নারায়ণ
সত্যবতীসুত সম সুপণ্ডিত
সহর্ষে স্বর্গীয় বঙ্গেশ “হেলিড়ে”
স্থাপিলা সৌহার্দ যাহার সহিত।
১৮
পুণ্যবতী সতী বিদ্যাগুণবতী
শরত সুন্দরী রাণী যশস্বিনী
ভীষণ দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানবে
দানিল ওদন সুদীন পালিনী।
দীনদুঃখে যার ঝরে অশ্রুজল,
যশে পূর্ণ বঙ্গ বদান্য যাহার,
রাণী” খ্যাতি নহে কীর্তি অনুরূপ,
“মহারাণী” পদ সমুচিত তঁার।*
রাজশ্রী পরেশ নারায়ণ রায়-
স্থাপিত ঔষধ-বিদ্যানিকেতনে
* ১৮৭৭ সালে মহারাণী উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছেন।
কবিতাকুসুম।
৯৭
অসংখ্য পীড়িত বিদ্যার্থী বালকে
তােষিছে ঔষধ, বিদ্যা, বিতরণে।
আঁধার ‘রে এবে সে তাহেরপুর
রাজা চন্দ্রশেখরেশ্বর বিহীনে।
বােয়ালিয়া মাঝে যার ধর্মশালা
ক্ষুধার্তে দিতেছে অন্ন নিশিদিনে।
ক্ষুধার্ভে দুর্ভিক্ষে দিলা অন্নদান
রাজা হরনাথ দুবলহাটীর,
যতনে করিলা উর্ধেতে উন্নত
বােয়ালিয়া-রাজবিদ্যার মন্দির *
२७
অদূরেতে দিঘাপতিয়াধিপতি
রত সদা দেশদুঃখ-বিনাশনে,
রাজশ্রী প্রমথনাথ সুপণ্ডিত
মিতব্যয়ী, তবু মুক্তহস্ত দানে ।।
* ১৮৭৩ সালে “ বােয়ালিয়া হাইস্কুল ” স্থাপন করেন।
+ ১৮৭৩ সালে সাৰ্দ্ধৈক লক্ষ মুদ্রাদানে রাজশাহী
কলেজ স্থাপন করিয়া রাজশাহীবাসীর চিরকৃতজ্ঞঙ্গভাজন
হইয়াছেন।
১৮
কবিতাকুম।
২৪
যে আত্মকলহে অধীনা ভারত
যে একতা বিনে বঙ্গ পরাধীন,
সে আত্মবিগ্রহে আত্মভেদে হায়!
“ তাড়াশের ” আজ শােচনীয় দিন !!
প্রাচীন তাড়াশ ভূপতি কুলের
পূৰ্ব্ব-কীর্তি-জ্যোতি প্রায় অস্তমিত,
কালে জনশূন্য নিজ অধিকার
তাই নব কীর্তি নহে অনুষ্ঠিত।
নরেন্দ্র কৃষ্ণেন্দ্র বলিহারপতি
সাহিত্যানুরাগী বদান্য ধীমান,
বিতরিয়া বিদ্যা, অর্থ অগণন
তােষিছেন কত সুদীন সন্তান।
২৭
জলমগ্ন যবে “বােলিয়া” নগরী
বিপন্ন-আশ্রয়, আহারবিহীনে
দানি অন্নাশ্রম ‘রায় বাহাদুর’
ভ্রানিলা সুমতি অগণন দীনে।
কাসিমপুরের জমীদার।
কবিতাকুসুম।
২৮
বিবিধ পাদপ সুশােভিত তীর,
ক্ষীরনিভ-নীরপূর্ণ জলাশয়,
রাজবত্ম পাশে যত বিদ্যমান
শ্রান্ত পথিকের বিশ্রামনিলয়-
সুকুলকুলের এ কীর্ভিনিচয়।
সৎপাত্রে ধাতা সমপিলে ধন,
সে ধনের হয় শিব ব্যবহার;
তাই রাজ-বিদ্যা মন্দির স্থাপিয়া
হইলা রসীদ * দৃষ্টান্ত সবার।
দয়াবান ধীর শ্রীরাজকুমার
সত্যবাদী, গুণী, মৃদুল স্বভাব
করচমাড়িয়া বসতি ই হার
নাশিতে নিরত দেশের অভাব।
স্বাধিকারে স্থাপি বঙ্গবিদ্যালয়,
অসংখ্য বালকে বিদ্যা বিতরণ
কবিতাকুম। করিছে! স্থাপিয়া ঔষধনিলয় দিতেছে অসীম মুমূর্ষ জীবন। যতই ভূস্বামী দেখিতেছ আজ প্রায় সবাকার ভুমির নিদান- নাটোরাধিপের রাজ্য একদিন ছিল, শুন ওহে করুণানিধান। ৩৩ যেরূপ তরুর শাখায় কলমে যতনে জনমে বিটপী সকল, মূল তরু ক্রমে ছিন্নশাখ হয়ে কালের পীড়নে হয় সে বিকল । ৩৪ নাহি সে বিভব রাজ্য ধন জন, কালের কবলে করেছে প্রস্থান, আছেরে কেবল স্তিমিত প্রভায় এ রাজকুলের পূর্বের সম্মান। ছিল বটে আগে দেখিবার স্থান এই রাজধানী, সে “ বঙ্গ-উজ্জল,
কবিতাকুসুম।
ছিল যবে মহারাণী সে ভবানী
স্বাধীনাপ্রতাপে অখণ্ড প্রবল।
ছিল যবে রাজ কাযে স্বাধীনতা,
ছিল যবে হস্তে বিচার, বিধান,
ছিল নাকো বধ্যজন-পরিত্রাণ,
ছিল “ ভাটকই” প্রাণদণ্ডস্থান।
৩৭
যদ্যপি সে পাপ সিরাজ-রাহুতে
অন্ধকূপাম্বরে ব্রিটিশ-তপন
গ্রাসিত, না পীড়িত বাঙ্গালীরে,
এই মহত্বের হত কি পতন ?
৩৮
কি কাজ স্মরিয়া সে গত গৌরব,
কি কাজ সে শােক করি উদ্দীপন,
অস্তমিত হেরি সে ভাগ্য-তপন
মহামতি! তব বেদনিবে মন।
বেদনিবে মন ? ব্যথিবে হৃদয়
সে গেরিববি মলিন হেরিয়া,
কবিতাকুসুম।
তাই সম্মানিলা ‘জঙ্গলী শিবিরে
সাদরে কুমারযুগে সম্ভাষিয়া।
মহৎ বেদনে, মহতের তাপে
হয় দ্রবচিত মহৎ যে জন,
নীচ জনে হায় ! মান-অপমান
(শিরচ্ছেদ সম) বুঝে কি কখন ?
৪১
মহা-আত্মা তুমি তেঁই সে দ্রবিলা,
তােষিলা নাটোর সন্তপ্তহৃদয়,
তাপি গ্রীষ্মদিবা পরিতােষে যথা
তাপিতে বিতরি সুশীতল পয়।
8२
রঞ্জ প্রজাপুঞ্জে সুখে থাক সদা,
হও চিরজীবী ঈশ্বর কৃপায়,
রাজশাহীবাসী আশিষে তােমারে-
বঙ্গবাসী যেন তব যশ গায়।
কবিতাকুসুম। ১০৩ মাননীয় মহামতি সর আসলী ইডেন সাহেব * বাহাদুরের বােয়ালিয়া আগ- মনােপলক্ষে। এস বােয়ালিয়া-বন্ধু পুরাতন! এবে বঙ্গেশ্বর অদৃষ্টের ফলে, এস বােয়ালিয়া নগরীর মাঝে, যতনে তােমায় পূজিবে সকলে। এ পূজায় নাহি জবা বিশ্বদল, কিম্বা ধূপ, দীপ, তুলসী, চন্দন । ভক্তি, কৃতজ্ঞতা মানসােপজাত আছে রাজোচিত পূজোপকরণ। ন তাই দিয়া তােমা পূজিব সবাই, রাজার পূজায় আমরা তৎপর,- পূজিয়াছি যথা হায় রে ! যতনে হিন্দুরাজে। সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর । * ইনি বােয়ালিয়ায় প্রথমতঃ আসিষ্টান্ট মাজিষ্ট্রেট ছিলেন। ১৮৭১ ডিসেম্বর।
১০৪
কবিতাকুসুম।
৪
অনন্তর সেন, পল কুল নৃপে,
যবন ভূপালে পূজেছি যতনে,
শতাধিক বর্ষ কৃতজ্ঞ হৃদয়ে
নতশির বঙ্গ ব্রিটিশচরণে।
ধন্য বোয়ালিয়া ! যে নগরী মাঝে
বঙ্গেশের আজ শুভ-আগমন,
করুণাহৃদয়ে নগর বাসীর
শুন বঙ্গাধিপ! কটী নিবেদন।
ভারতসম্রাজ্য-নিদান বাঙ্গালী
স্মরি বঙ্গেশ্বর ! পূরব কথা,
তনয়ের তুল্য পাল বঙ্গ সুতে
নাহি পায় যেন মরমে ব্যথা।
চির পরাধীন বাঙ্গালী জীবন
অধীনতা-ক্লেশ মনে না ভাবে,
প্রচণ্ড প্রতাপে সদা ভয়াকুল,
মৃদু ব্যবহারে তােষ এ সবে।
কবিতাকুসুম।
ছিলে যবে আগে এই বঙ্গ মাঝে,
বঙ্গের এ দশা দেখেছ কি হয় !
দহিত কি এত দুর্ভিক্ষ-দহনে,
গ্রাসিত কি সিন্ধু দুঃখী বাঙ্গালায়?
সুশস্যশালিনী ছিল বঙ্গভূমি,
শস্যপ্রসূ বঙ্গ খ্যাত ধরাতলে,
এবে শস্য নাই! হলে অন্য ঠাই
যায়, তাই বঙ্গে দুর্ভিক্ষ প্রবল !
ছিলনাক আগে বর্ণগত ভেদে
ভিন্ন রাজবিধি এত কলুষিত,
ন্যায় দণ্ডে যাহা হবে সমতুল
বিপরীত দেখি বাঙ্গালী দুঃখিত।
তদুপরি আরও গুরু কর-ভার
সহিবে কেমনে দরিদ্র দেশ।
নিরন্ন প্রজার হাহাকার ধ্বনি,
শুনি ত্বরা নাশ করের ক্লেশ।
কবিতাকুসুম।
দেয়ানী বিচারে গুরু ব্যয়ভার
বহনে অশক্ত কত দীন জনে,
হৃতসত্ব হয়ে দীন হেতু হায়!
পশিতে না পায় ধৰ্ম্মাধিকরণে।
২
জ্ঞানচক্ষ আগে আছিল মুদিত,
সুশিক্ষা প্ৰদানি দিলা
চক্ষু
দান,
তেঁই সে স্মরিয়া পূৰ্ব্ব-সুখদুঃখ
কাঁদিছে বিষাদে বঙ্গের সন্তান।
১৪
কি হেতু বাঙ্গালী কাঁদে কোন দুঃখে-
ক্রন্দনের হেতু না করি বিচার,
রােদন থামাতে, কি অদৃষ্ট হয় ।
করাইলে নব আইন প্রচার।
রুদ্যােন পুঁতে রােদনের হেতু
জিজ্ঞাসিয়া, যুক্ত করিতে সান্ত্বনা;
করিয়া তাহা, ঘুচাতে ক্রন্দন
গলা চাপি ধরা যথা বিড়ম্বনা।
কবিতাকুসুম।
যঙ্গের কলঙ্ক, বঙ্গের রােদন,
নাশ বঙ্গেশ্বর ! রাখ বঙ্গ-মান,
দাও ভিক্ষা মুদ্রাযন্ত্র-স্বাধীনতা,
গাবে যশ তব বঙ্গের সন্তান।
১৭
নিরীহ বাঙ্গালী চির শান্ত জাতি,
শতাধিক বর্ষ দেখিলে যাহায়,
তাদের শাসনে এত কঠোরতা-
কটাক্ষে যাদের হৃদয় শুকায়!
১৮
তুমি মহামতি বঙ্গের বান্ধব,
বাচায়েছ বঙ্গে বিষম বিপদে,
কৃতজ্ঞ হৃদয়ে তাই বঙ্গবাসী
দীর্ঘায়ু তােমার যাচে ঈশ-পদে।
সে মহত্বভাব হৃদয়ে তােমার
আজ(ও) বিরাজিছে, তবে কেন হায়।
শিশুর রােদনে হইলে বিরক্ত?
কর কৃপাদৃষ্টি দুঃখী বাঙ্গালায়।
কবিতাকুসুম।
২০
তবু 'স্থিতি কালে ছিল এ নগরী
দর্শকনিকর-নেতৃপ্তিকর,
ছিল শ্রোতস্বতী তীর সুশােভিয়া,
বিচারআগার সৌধ মনোহর।
অদূরে দক্ষিণে চারু রাজপথ,
শােভিত দু ধারে পাদপনিচয়,
ছিল ছায়া যার আতপতাপিত
ক্লান্ত পথিকের বিশ্রাম নিলয় ।
२२
নগর দক্ষিণে প্রশস্ত বিপণি
ছিল পরিপূর্ণ জন-কোলাহলে,
লাগাইয়া তরি তীরে বৈদেশিক
করিত বাণিজ্য কত কুতুহলে।
२७
কালের মাহাত্মে অরণ্যে প্রাসাদ,
কালে মহারণ্য ভুপেন্দ্র-ভবন,
স্রোতস্বতী হয় গিরিমরুময়,
অনন্তসলিল, মরু, গিরি, বন।
কবিতাকুসুম।
২৪
নাহি সে সুষমাপূর্ণ সৌধাবলী,
রাজবন্ধু শােভি মহীরূহ চয়,
বিপুলসলিলা এই পদ্মানদী-
উদরে সকলি হয়েছে বিলয় ।
যে বিচারালয়ে বসিয়া আপনি
সুবিচার দানি তােষিতে সকলে,
পরিবৰ্তময় প্রকৃতিনিয়মে
গ্রাসিয়াছে তায় অনন্ত সলিলে।
এ নগরে আর, হায় ! দেখিবার
কিবা আছে নর-নেত্র বিনােদন,
আছে ভীমকান্তি ‘কারা’, ‘বড় কুঠী’
নগর-গৌরব শেষ নিদর্শন।
বােয়ালিয়া তব আদি কাৰ্য্য স্থান
কাৰ্য্য সুদক্ষতা, আর সাধুতায়
হলে বঙ্গেশ্বর, আরও উন্নতি
লভিবে এ ভবে ঈশ্বর-কৃপায়।
কবিতাকুম।
২৮
অনশ্বর কীর্তি রাখ ধরতলে,
হও চিরজীবী বিধির ইচ্ছায়,
মৃদুল শাসনে তােষ প্রজাপুঞ্জ
চির দিন বঙ্গ স্মরিবে তােমায়
স্নেহাস্পদ ভগ্নাশ যুবকের প্রতি।
কি শুনি! হে শরচ্চন্দ্র! * মাগিছ বিদায়
দেশ হতে কি বিরাগে কিশাের জীবনে ?
কায়মনে থাকি সদা সুশিক্ষায় রত
কিবা তাপ হায় তব উপজিল মনে?
বিশ্ববিদ্যালয়-যশ লভিবার পথ
বিমুক্ত তোমার পক্ষে তােমার যতনে,
তবে আর কেন চিন্তা বল গুণাধার!
অগ্রসর হও ত্বরা লভিতে সে ধনে।
* চিতােরের বীরগান, সাহিত্য-সােপান ও আৰ্য্য-সঙ্গীত
প্রভৃতি রচয়িতা।
কবিতাকুসুম।
জীবন-কুসুমে তব কি হেতু পশিল
দারুণ নিরাশা-কীট-জানিব কেমনে?
আঁধার মানব হৃদে পায় কি কখন
দেখিতে জগতে অন্য মানব নয়নে ?
৪
জানি আমি ধরাতলে তুমি নিরাশ্রয়,
স্বজন আত্মীয় হীন দেব বিড়ম্বনে!
কিন্তু তব ভাগ্য-গুরু ফলিবে অচিরে
শরৎসুন্দরী কৃপা-বারি বরিষণে।
যাহার বদান্যে তব জ্ঞানের নয়ন
বিকাশিল এতদিন, পরম যতনে
পুনঃ সেই পুণ্যবতী পালিবে তােমায়
সুতসম, শিক্ষা দিবে ধন বিতরণে।
কোথা বা সে চট্টগ্রাম দেখিনি নয়নে,
এক গ্রামবাসী মত স্নেহ হয় মনে,
তেই সে দেখিতে সাধ,অমিয় বচন
বরষি আর কি হায়! জুড়াবে শ্রবণে ?
কবিতাকুন।
নিরাশা-পীড়নে যদি ছাড়ি অধ্যয়ন
ভ্রমণ করহ তাপে এই ধরাতল,
মানবের হিত কাৰ্য কিছু না সাধিলে,
লইবে না তত্ত্ব, তব মানব মণ্ডল ;-
অযত্নসম্ভূত যথা কাননকুসুম
ফুটিয়া শুকায়, পড়ে, রহে বনস্থলে,
নাহি লাগে দেবার্চনে তােষেনা মানবে,
লয়না সন্ধান তার মানব মণ্ডলে।
পরিহর তাপ, ত্যজ দুষ্ট নিরাশায় ;
নবােদ্যমে করি পূর্ণ হৃদয়-ভাণ্ডার,
ভারতের দুঃখে দ্রবি, হে ভারতী-সুত ।
মধুময় সুসঙ্গীত শুনাও আবার।
হরষে নবীন চন্দ্র পূরব বঙ্গেতে
উদিয়া করিলা কাব্য-সুধা বিতরণ
বঙ্গীয় চকোরগণে; হে শরত চন্দ্র !
উজ্জল বঙ্গের মুখ তুমিও তেমন।
কবিতাকুম।
মৃত মহাত্মা কুমার কেদারনারায়ণ রায়
কি অদৃষ্ট নৃপবর !
ফাটে এ হৃদয় হায়! স্মরিতে তােমায়,
বিখ্যাত বংশ উজলি
রােগের জ্বালায় জ্বলি
ত্যজিলে অকালে দেহ, সম্পদ ধরায়।
পুঠিয়ার পুরাতন পূত রাজ কুলে
জনম লভিয়া,
জানিনা কি দোষে হয়।
( কি বলিৰ বিধাতায়।)
যাপিলে জীবন চির অসুখে জ্বলিয়া।
কুলগ্নে পশিল কাল রােগরূপে হায় !
হৃদয়ে তােমার,
করিলে বহু যতন,
ব্যয়িলে অনেক ধন,
তথাপি আরােগ্য-সুখ পেলেন কুমার !
৪
আশৈশব রােগ-জীর্ণ দেহ ভার হায়।
সহিতে না পারি,
১১০ কবিতাকুসুম। মুহূর্তে ত্যজিলে তাহা মানবে দুর্লভ যাহা- রাজধন, রাজপদকিছু না বিচারি। . : হায়! যথা মহাহবে মহারথিকুল- বিপক্ষ-শমন, জয়াশা ত্যজিলে মনে, বহুসংখ্য সেনা সনে শত্রুকরে করে সবে আত্মসমর্পণ। দিনেকের তরে সুখ ছিলনা তােমার- সদা রােগময়! আরােগ্য নাহিক যার, জগতে কি সুখ তার? বিষ বােধ রাজভােগে, শরীর বৃথায়। ৭ প্রখর রবির তাপে তাপিত হইয়ে রে। কৃষক মণ্ডল, প্রফুল্ল, সুদৃঢ়কায় ভবিষ্যৎ ভরসায় আকর্ষণ করিতেছে আনন্দেতে হল।
কবিতাকুসুম।
সমস্ত দিনের শ্রমে ক্লান্ত হয় সবে
সুখে নিদ্রা যায়,
নাহি শয্যা পরিপাটী,
উপাধান, শয্যা, মাটী-
রােগীর বেদনা বােধ কোমল শয্যায় ।
তরুতলে বসি পান্থ দিবা অবসানে
ক্লান্ত পথশ্রমে,
কি সুন্দর নিরাময়
বলিষ্ঠ সৃদৃঢ় কায়!
রুগ্ন ধনী হ’তে সেও সুখী ধরাধামে।
শরীরী জীবের পক্ষে আরােগ্য রতন
আপার্থিব ধন,
পায় না সকলে তায়।
কি পাপে নাজানি হায় !
নাহি দিলা ধাতা তােম। হেন সুখধন।
১১
মৃদুল স্বভাব, হৃদি মহত্ব আধার
আহা কি সুন্দর!
কবিতাকুসুম।
সদা সত্য প্রিয়ভাষী,
তোষিতে সবে সম্ভাষি
মিষ্টালাপে, ছিল তব পবিত্র অন্তর।
১২
সঙ্গীত, সাহিত্য, কাব্য, ইতিহাসে কত
করিতে যতন,
নাটকের অভিনয়ে
দেখায়ে স্বধন ব্যয়ে
করিলে পুঠিয়াবাসী চিত্ত বিনােদন।
কুতুহলে
স্বকরে সম্পদ ভার নিলে
আহা যেই দিন,
কত উচ্চ আশামনে
করেছিলে সেই দিনে,
দেহ সহ হ’ল তাহা ভস্যুেতে বিলীন।
১৪
রােগরূপ কীট যদি না পশিত হয়।
তব হৃদয়েতে,
হরিত যদি কালে
জীবন তব অকালে,
পারিতে বঙ্গের কত মঙ্গল সাধিতে।
কবিতাকুসুম।
বহুমূল্য বাদ্যযন্ত্র কোথায় এখন
শায়ী ধরাতল।
কে করে যতন আর
( সবে করে হাহাকর!)
যন্ত্রীর বিহনে যন্ত্র হয়েছে বিকল।
কোথা রাজধানী, কোথা উদ্যান সুন্দর
সকলি আঁধার।
রাজরাণী শােকে ক্ষীণ,
রাজধানী শােভ হীনা,
কাদে রাজমাতা হায়! বিহনে তােমার!
১৭
যাও তবে হে কুমার ! চির শান্তিধামে
রােগ তাপ হীন;
লইতে পূত জীবনে
ঈশ্বরের নিকেতনে
নিবস চির আনন্দে সুখে চিরদিন।
১৮
হায়! ভবার্ণবে তব জীবন-তরণী
ভাসি কিছুদিন,
কবিতাকুসুম।
ড বিল অতল জলে
ক'দিল সুহৃদ দলে ;
কাদিল শােকার্ড এক অনুগত দীন।
কালকবলি ' যুগল রতন !
কেন রে নীরব এজ এ নগরী।
কেন অশ্রুময় শাখি সবাকার।
কেন শুনি হানাদন নিনাদ।
নগর মাঝারে ধনি হাহাকার !
বিচারক কেন মলিন বয়ান!
কেন পান্থ তব বিবাদিত মুখ !
* রাজশাহীর স: পপ উশীল সুপ্রসিদ্ধ গােবিন্দনাথ
সেন মহাশয়ের বরফ ও কালীকুমার নামক সুশিক্ষিত
পুত্রদ্বয়ের মৃত্যুপমে। বরদাকান্ত বি. এল পাস করিবার
বৰ্ষত্ৰয় পরে এবং কালীকুমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ
উপাধি প্রাপ্ত হইয়া f৭. এ পাস করিবার অব্যবহিত
পরেই অকস্মাৎ জ্বররোগে অক্লান্ত হইয়া একই সময়ে বৃদ্ধ
পিতার ক্রোড় শুন্য করি। পলায়ন করেন।
কবিতাকুসুম।
কেন ঘরে ঘরে নীরব সকলে
ত্যজি শােকশ্বাস লাঘবে দুঃখ।
কেন অশ্রুবিন্দু না হতে পতন
হয় অশ্রুবিন্দু উদয় আবার
কি সন্তাপ হায় পশিল মরমে
উথলিছে কেন শােক পারাবার !
ও ,
কি বলিলে স্মৃতি ? গােবিন্দ নাথের
প্রাণ সম আহা! তনয় যুগল
(বিনা মেঘে মরি! বজাঘাত প্রায়)
পশিল অকালে কালের কবল !
হায় রতুযুগ হারালে নগরি !
পাইবে কি ফিরি তেমন আর ।
আদি এমে’ হয়ে রাজশাহী মাকে
উজলিল মুখ কালী কুমার।
আর কি দেখিবে সে চারু বদন?
পাইতে দেখিতে, থাকিত রে যদি
কবিতাকুম।
দ্বিজ দ্বৈপায়ন, সে মধুসূদন,
যাহাদের আহা! অপূৰ্ব্ব কৌশলে
মৃত আত্মা সহ হত সম্মিলন।
৭
হায় রে ! যে গৃহে চির সুখ শান্তি
সৌভাগ্য বিরাজ করিত কেবল,
সেই গৃহ এবে শ্মশান সমান।
কাঁদে বৃদ্ধ, শিশু বিধবার দল!
৮
হায়! ফাটে বুক হে কালীকুমার
( ভাগ্যহীন তুমি !) স্মরিতে তােমায় !
চতুর্দশ বর্ষ যাপি নিশি জাগি,
যতনে লভিলে উপাধি বৃথায় ।
বিশ্ববিদ্যালয় হইতে যে দিন
বাহিরিলে লভি উপাধি উত্তম,
আশাবীজ যত রােপিলে হৃদয়ে,
বিনাশিল কাল-নিদাঘ বিষম
নবােদ্যমে পূর্ণ বিপুল বাসনা
কর্মক্ষেত্রে যেই করিবে প্রবেশ,
কবিতাকুসুম।
করিবে জনমভূমি-মুয়ােজ্জল,
অমনি কৃতান্ত পরশিল কেশ
হ’ল মরতে সুখের সম্ভোগ,
হইল পূর্ণ তব অভিলা,
না লাগিলে হায় ! পৃথিবীর কাজে,
বনমাঝে যথা কুসুম সুবাস।
ভ্রাতৃস্নেহে ভুলি তাত, খুল্লতাতে,
ভুলি প্রিয়তমা (চির অভাগিনী! )
অকালে দুঃসহ যাতনা-অনলে
নিক্ষেপিলে সবে দহিবারে প্রাণী।
বরদাগােবিন্দ!
“বঙ্গভ্রাতা” বলি সম্ভাষিতে সদা,
বাসিতাম ভাল, বার্সিতে তেমন;
আদরে পড়িতে “পলাশীর যুদ্ধ,
স্বাধীনতা-প্রিয় ছিল তব মন।
০}
১৪
“হিন্দুরঞ্জিকায় লিখেছ প্রবন্ধ
বঙ্গীয় ভাষায় করিয়া যতন,
১২২
কবিতাকুসুম।
করিতে আদর স্বদেশ-ভাষায়,
বঙ্গগ্রন্থ পাঠে ছিল আকিঞ্চন।
১৫
পরমনে ব্যথা দেও নাই কভু,
মিষ্টভাষে সদা তােষিতে সকলে;
তােমাগত প্রাণ তাত, খুল্লতাতে
হানি শােকশেল কেমনে চলিলে ?
কতই সাধের সন্তান তােমার
শিশু ‘কালীপদ' সােহাগের ধন,
ক্রোড়ে ভিন্ন যার ছিলনা বসতি
এবে সে কাদিছে পড়ি ধরাসন।
কত ভাল হায়! বাসিতে যাহায়,
দেখ একবার কি দশা তাহার
কাদি ক্ষত-শির পতিব্রতা নারী,
বহে অশ্রুসহ শােণিতের ধার।
পূজ্যপাদ তব জনক স্থবির
( তােমাদের সুখ বাড়াবার তরে।
কৰিতাকুসুম।
আরও উন্নতি দেখিবে আশায়
আছে এতদিন আবদ্ধ সংসারে
নিরদয় কাল ভেঙ্গেছে সে আশা !
হরেছে যুগল নয়নের মণি !
এ কুবার্তা যবে পশিবে শ্রবণে, *
মহাশােকে প্রাণ ত্যজিবে তখনি।
কি বিচিত্র-গতি অদৃষ্ট-চক্রের !
চির ভাগ্যবান বলিতাম যায়,
এক দিনে হায় ! ভাগ্যচ্যুত তিনি
হেন ভাগ্যহীন কে আজ ধরায় ?
বড় ভাল তুমি বাসিতে অনুজে,
( ভ্রাতা তব ভালবাসিবার ধন, )
তােমার বিহনে শােক পাবে বলে,
যেতে সঙ্গে নিলে সে শান্তি-ভবন।
२२
উনি হাত যথা ছিন্নমূল হলে
বাম করে করে সে কাৰ্য্য সাধন,
১২
কবিতাকুসুম।
তােমার অভাবে হেরে বাজে
হ’ত শােকশাস্তি জীবনরক্ষণ।
বরদাগােবিন্দ ! এত নিরদয়
ছিল কি হে হায়! হৃদয় তােমার ?
কেন অনুজেরে নিলে সঙ্গে করি।
সােণার সংসার করে ছারখার ?
২৪
ভাবিলে না ভ্রমে সংসারের দশা,
দেখিলে না সুতে,স্থবির পিতায়,
ভাসাইলে আজি অকুল, অপার
শােক-সিন্ধু-জলে বাল বিধবায়।
ভ্রান্ত আমি! বৃথা দোষিনু তোমায়,
কে চাহে মরিতে এ তিন ভুবনে?
নিয়তি নিকটে সবে পরাজয়
ধনী, মানী, আনী,দীন, মুখজনে।
২৬
হে নিষ্ঠর কাল। কাল না বিচারি
হরিলি অকালে যুবক যুগল,
কবিকুম।
যাহারা জীবনে পরম যতনে
পৃথিবীর কত সাধিত মঙ্গল।
२१
কত নিরাশ্রয় বিদ্যার্থী বালকে
দিয়াছে আশ্রয়, করেছে পালিত,
তােষিয়াছে কত দরিদ্র দুর্বলে,
সেধেছে নিরন্ন স্বজনেরও হিত।
২৮
একে নিয়ে দশে কর নিরাশ্রয়,
(এ কু বিধি হায় ! কেন বিধাতার ?)
গতিহীন দীন রুগ্নশয্যাশায়ী
সাধিলে, না যাও নিকটে তাহার ।
জনপূর্ণ ভবে যার কেহ নাই,
বৃক্ষমূল মাত্র আশ্রয় যাহার,
গলিতশরীর গন্ধে খায় কীট,-
সাধিলে না যাও নিকটে তাহার।
কেন কর নর! দেহের গরিমা,
বাসনার বৃক্ষ বাড়াও ভবে,
কবিতাকুসুম। দেখিয়। শিখ না কি আশ্চর্য্য হায়! এই দশা শেষে সবার হবে। হে গােবিন্দনাথ। মৃত পুত্র তরে না কর ক্রন্দন, মজিওনা বৃথা শােকের আবেশে, ভুলি ভূত কথা, ভাবি ভবিষ্যৎ চিত্ত সমাধান কর পরমেশে। যাও ভ্রাতৃযুগ ! চির শান্তিবামে, ভুলিব না তােমা জীব যত দিন; স্মরণার্থ-এই কৃতজ্ঞতা-হার আশীষি অপিলা “বঙ্গভ্রাতা” দীন। আবার হইল কি রে অশনিপতন! পশিতে নগরে যেই করি পদাপর্ণ, কাপিল হৃদয় হয় ! সহসা আমার, শুনিলাম যে সংবাদ হৃদি-বিদারণ- এ নগরী করি আজি। চির অন্ধকার
কবিতাকুসুম।
১২।
প্রাতে অস্তমিত প্রিয় সুহৃদ আমার,
মাতৃ-অঙ্ক-সুশােভন সে “চন্দ্রভূষণ”-
ত্যজিয়াছে মায়াময় নশ্বর সংসার,
কাদাইয়ে বন্ধুগণে বান্ধব-রতন।
প্রশান্ত গম্ভীর মূর্তি, পবিত্র, সুঠাম,
সদা মৃদুহাস্যময়, বিশাল লােচন,
স্মরিতে নয়ন-বারি বহে অবিরাম,
তরুণ যৌবনে তার অকাল মরণ !
৪
অনির্ণীত রােগে আহা! বিনা চিকিৎসায়
রুদ্ধশ্বাস হ'য়ে বন্ধো! ত্যজিলে জীবন।
বৈদ্যগণ প্ৰদানিল ঔষধি বৃথায় ;
এ মহা শােকের শাস্তি হবে না কখন।
অগ্রজ-আজ্ঞানুবর্তী তব সম আর
দেখি নাই কভু আমি এ মর নয়নে,
কেমনে ধরিবে প্রাণ অগ্রজ তােমার
হারাইয়া তােমা হেন অনুজরতনে!
১৮
কবিতাকুসুম।
হায় রে। স্মরিতে শােকে শিহরে হৃদয়-
যার লিপি দেখাইতে যতনে আমায়,
অনন্ত দুঃখের নীরে, হইয়ে নির্দয়,
কেমনে জুবালে পতিপ্রাণ বনিতায় !
একটী তনয় যদি থাকিত তাহার,
তােমা স্মরি অধীর হইত যবে চিত,
উচ্ছসিত হত যবে শােক-পারাবার,
সুতে হেরি শােক-শান্তি হ’ত কথঞ্চিৎ।
৮
সরে লেখনী হায়! স্মরিতে তােমায়,
স্থবিরা মাতার এবে কি হবে উপায়!
তব সম পুত্র-রত্ন হারায়ে তাহার
জীবন যাইবে শােকে অন্তিম দশায়।
বদান্য,পরােপকারী,বিপন্ন-আশ্রয়,
গুণগ্রামে ছিল তব দেহ বিভূষিত ;
বঙ্গভাষা-অনুরাগী ছিলে অতিশয়,
শ্রদ্ধায় শুনিতে কত বঙ্গ-সুসঙ্গীত।
কবিতাকুসুম।
প্রাচীনের স্নেহাস্পদ, বান্ধব যুবার,
অনুগত-জনগণ-ভরসার স্থল,
বালকের পিতৃকল্প,প্রিয় সবাকার,
তাই রে বিষম শােকে হৃদয় বিকল !
অভিনয়ে রঙ্গাঙ্গনে দর্শকনিকরে
কাদাইলে, কাদে এবে দোকানী বাজারে,
মাতা, ভ্রাতা, বনিতায়, চিরদিন তরে
কাদাইলে, কাঁদাইলে বান্ধব সবারে।
হে বিধাতঃ! বাম কেন বােয়ালিয়া প্রতি,
বরদা, কালীর তরে করিছে ক্রন্দন,
সেই মহা শােক নাহি হইতে বিস্মৃতি,
পুনঃ এক রত্ন হায়! করিলে হরণ!
হায়। যথা অশ্রুবিন্দু না হতে পতন,
আর এক বিন্দু পুনঃ হয়রে উদয়,
তেমতি একটী নাহি হতে বিস্মরণ,
আর এক শােকে পুনঃ দহিলে হৃদয়।
কবিতাকুসুম।
১৪
যাও তবে হে সুহৃদ। শান্তিনিকেতনে,
সততার পুরস্কার থাকে যদি সেথা,
নিবসিয়ে চিরানন্দে পুণ্যাত্মার সনে,
অবশ্য লভিবে শান্তি, না হবে অন্যথা।
হলি কি কাল ওই মােস্কা-রন।
কে তুমি দাড়ায়ে? শমন কিঙ্কর।
যাও চলি হেথা হতে,
পবিত্রজীবন দীননাথ-দেহ
নারিবে কদাপি ছুতে।
মহৎ যে জন
পাপের ছলনে
ভুলে নাই কোন দিন,
ভবে পুণ্যবান, অন্তিম কালে কি
হইবে তব অধীন?
বােয়ালিয়ার সর্ব প্রথম ও সর্ব প্রধান মোক্তার বান্য
দিননাথ সিংহ।
কবিতাকুসুম।
রাজ-কর্ণে দান- বার্তা না দানিয়া,
করি পাত্র বিচার,
অসংখ্য মানবে
নাহি কি রে পুরস্কার ?
অন্নদান হেতু
৪
অজ্জি বহু ধন,
জীবনে যে জন
থাকি সদা ন্যায় পথে,
কত দীন জনে (নহে যশ হেতু
পালিয়াছে বিধিমতে;
বিপন্নের ত্রা,
আশ্রিত-পালক,
দীনে অতি দয়াবান,
এ মর নয়নে
অনন্য না দেখিব
এ দীননাথ সমান।
অর্ধ শতাব্দীর অজ্জিত ত সম্পদ
বিতরিয়া সাধু কাষে
নির্জন যে জন,
তার কি মরণে
যমালয় যাওয়া সাজে।
কবিগাকুন।
যাও চলি ত্বরা তব প্রভুপাশে,
বল তারে দূতবর।
“নারিনু পালিতে তবাদেশ প্রভাে!
সে নহে পাপাত্মা নর।”
৮
পর-উপকারী, সত্য-প্রিয়ভাষী,
বহুদর্শী বিজ্ঞবর,
উদারপ্রকৃতি উপদেশ দিতে
আছিলে অতি তৎপর।
বাকপটুতায় ছিলে সুপণ্ডিত,
বিপক্ষ হত স্তম্ভিত ;
ভী সনে রণে পরপক্ষ যথা
হইত সতত ভীত ।
মৃত্যু-পূৰ্বদিনে
স্বীয় শক্তিবলে
সাধিয়া আপন কাম,
নিশি সুপ্রভাতে
ইচ্ছামৃত্যু সম
লভিলা চির বিশ্রাম।
কবিতাকুসুম।
১
১১
হা-মধুসূদন
বঙ্গকবিবর
হইয়া যেমন ঋণী
গেলা পরলোকে, মােক্তার-রতন।
তােমার সে দশা শুনি।
।
শােক হয় মনে
তব ভাগ্য স্মরি—
করেছ বহু অজ্জন,
না শােধিয়া ঋণ (হউক সৎকায)
ব্যয়িলা সকল ধন।
যাও চলি চির শান্তিনিকেতনে,
নিবস পূণ্যাত্মা সনে ;
সুখে থাক সদা (করি আশীৰ্বাদ)
ভবেশে ভাবিয়া মনে।
১৪
হায় রে ! জগতে মােক্তার বলিতে
বােঝে সবে পাপাচারী;
এ অভাগা জীবে (বিধি কি হে বাম
নিলে নরে না বিচারি।
১৪
কবিঙ্গাকুম।
দেখুক তাহারা
মােক্তারমণ্ডলে
ছিল কি নর-রতন;
ভ্ৰমান্ধ মানব মােক্তার-সমাজে
ঘৃণ্য ভাবে অকারণ।
সব সম্প্রদায়ে
আছে সদসৎ,
দেখি কেন তা সবে,
বৃথা উপহাসে মােক্তারের কুলে।
এরাই কি দোষী ভবে ?
কল্পনা না সত্য?
একদা নিশীথে আমি চিন্তাকুল মনে
ছিলাম শয়নে, আবরিলে নিদ্রা দেবী
নেত্রদ্বয় মম, কহিলেন ক্ষণপরে
কোন্ জন যেন আহা! আশ্চৰ্য্য বারতা-
“ছিল বঙ্গে যে নিন্দিত পরিণয়-প্রথা
পূৰ্বে প্রচলিত, এবে হ’ল তিরােহিত।
স্থবির, বধির, অন্ধ কিম্বা খঞ্জ হতে
পাইলে
প্রচুর ধন, অর্থলোভী পিতা
কবিতাকুসুম।
জুবাতেন, পাত্রপাত্র কিছু না বিচারি,
দুহিতা-রতনে হায়! কুপাত্ৰ-সাগরে !
যে ফল ফলিত তাহে কে না জানে ভবে ?
অরিলে সে কথা চক্ষে বহে বারিধারা।
ধন-ক্রীত স্থবিরের বনিতা দুখিনী
যাপিত যামিনী দিবা বিষাদিত মনে ;
কেহ বা অধীর হয়ে গরল ভক্ষণে
নাশিত জীবন, নিন্দি নৃশংস পিতায় ।
কেহ কুল, মান, ধৰ্ম্মে দিয়া জলাঞ্জলি
কুলের পিঞ্জর ভাঙ্গি বাহিরিত দুখে,
অর্থলােভে অপাত্রেরে তনয়া-দানের
পরিণাম প্রদশি তে যেন স্ব পিতায়।
ঘটিতেছে ব্যভিচার এই পরিণয়ে
শাস্ত্র-বিগহিত, দেখি বঙ্গ বুধগণ
করি মহাসভা আজ নিবারিল তায়।
অই শুন আদেশিছে সবে উচ্চ নাদে,
‘লইবে না পণ কেহ সুতায় বিকায়ে
আর, বৃথা অর্থতরে ধৰ্ম্মে অনাদরি ;
দিবেন বিবাহ যথা শাস্ত্র-অনুমত।
চেয়ে দেখ কি আনন্দ আজ বঙ্গভূমে,
কবিতাকুম।
উজ্জল হইল মরি! সবার বদন।
আভিজাত্য বঙ্গ মাঝে আর কিছু দিন
রবে ক্ষীণ তেজে, যথা প্রভাতপ্রদীপ।”
জাগি এ সুবার্তা শুনি, শুধাই ধীরে
কল্পনা দেবীরে আমি বিনয় বচনে--
“সত্য কি না এ কাহিনী? কহ দয়াময়ি?”
উত্তরিলা দেবী,“আমি মানস-কল্পনা
উদাসীন যত দিন বঙ্গীয় সমাজ
দূরিতে কুরীতি হেন, হবেনা সফল
তােমার এ স্বপ্ন,বৎস! কহিনু তােমায়।”
শরৎকালে বিদেশস্থ ভগ্নাশ বাঙ্গালীর বঙ্গভূমির প্রতি।
+
বৎসরের মধ্যে দেশে
আশ্বিন কার্তিক মাসে
আনন্দে মগন, বঙ্গ, দেব-আবির্ভাবে।
শারদীয়া, দীপান্বিতা,
কার্তিকেয়, উমাসুতা
পুজে বঙ্গবাসী নর মহা ভক্তিভাবে
কবিতাকুসুম।
=
দাসের ছিল মা। সাধ
পূজিতে দেবীর পাদ,
বিফল বাসনা, হায়, দৈব বিড়ম্বনে।
হতপু-শােকানলে
এ পাপ হৃদয় জ্বলে,
দেখিব সে পরব আর এনয়নে
স্থির করি অবশেষে
আইলাম এ সুদেশে, *
দেখিলাম মােক্ষধাম তীর্থ অগণন ;
দেবমূর্তি যত আছে,
নাহি মা! এ তব কাছে,
আকুল হেরিতে তােমা তবু কেন মন?
৪
দারা পুত্র পরিহরি
হইলাম দেশান্তরী,
তাই কি বাসনা বাসে যাইতে আবার ?
• উত্তরপশ্চিম প্রদেশ।
কবিতাকুসুম।
কিম্বা তব স্নেহগুণে
ইচ্ছা যাইতে ভবনে?
মাতৃভূমি! তােমা বিনে জগত আঁধার !
মুম্বযু যুবার স্বপ্নে মাতৃ দর্শনে খেদ।
কেন জন্মিলাম এই ধরাতলে,
নাহি সাধিলাম মানবের হিত ;
কেন ভ্ৰমিলাম বৃথা নানা দেশে,
পাইল শান্তি এই পাপ চিত।
আছে শান্তি যার সুখী সেই জন,
অভাগার মনে কেন শান্তি নাই--
মাসেক হইল পীড়িত-শয্যায়
শুইয়া সতত ভাবিছি তাই।
পীড়িতের নিশি
দীর্ঘ যে কতই
যে পীড়িত সেই জানে,
কত কু স্বপন কত বিভীষিকা
দেখি নিত্য রাত্র দিনে !
কবিতাকুসুম।
জীবনে যাহার
পবিত্র মূরতি
দেখি নাই কোন দিন,
শিয়রে আসিয়া
জননী আমার
হয়েছেন সুআসীন।
প্রসবি আমায়
“কেন স্নেহময়ি।
অসময়ে তেয়াগিলে ?
জানি নাই আমি
মাতৃ-স্নেহ কারে বলে।
জননী কেমন,
স্তন-দুগ্ধ কেন
দিলেনা জননি!
কি পাপ ছিল আমার,
কেন তেয়াগিলে
সােণার সংসার
অভাগা নব কুমার ?
ফুটিতে মাের
জ্ঞানের নয়ন,
মধুর “মা” বুলি মুখে,
কি খেদে জননি! পতি পুত্র ত্যজি
গেল চলি পরলােকে ?
কবিতকুম।
পূণ্যবতী তুমি,
পতি পুত্র রাখি
গেল। চলি পূণ্যলােকে,
গলগ্রহ রূপ
আমায় লইয়া
জনক তাপিত শশাকে।
কষ্ট সহি পিতা
দ্বাদশ বৎসর
পালি এ পাপ সন্তান,
পারি সহিতে পামরের ভার
করিলা স্বর্গে প্রয়াণ।
সেই দিন হ'তে এ পাপ জীবনে
পাইনু দুঃখ অশেষ,
শুইনু কবর
মরণ-শয্যায়
রাচিনু ভুগিতে ক্লেশ।
এত দিন পরে হলাে কি স্মরণ
অভাগা সন্তানে তোর ?
তাই কি জননি! স্বর্ণ পরিহরি
এসেছ শিয়রে মাের ?
কবিগাকুসুম।
১৪১
১২
দশ মাস মাত্র হায় মা। যখন
বয়ক্রম অভাগার,
অবোধ শিশুরে কেন তেয়াগিলে
হইয়ে স্নেহ-আধার ?
জানি নাই—কিন্তু পড়েছি, দেখেছি,
করিয়াছি আকর্ণন,
সন্তানের তরে
করেন জননী
স্বীয় সুখে বিসর্জন।
১৪
হইলে পীড়িত প্রাণের কুমার,
জননী কোলেতে করি,
পুত্রমুখ চেয়ে
থাকেন সতত
নিদ্রাহার পরিহরি।
মাসেক হইল
পীড়িত-শয্যায়
শুইয়া শৰ্বরী দিন,
গাত্ৰ-দাহে সদা জুলি ছটফটি,
যাতনায় তনু ক্ষীণ।
কবিতাকুসুম।
আমারে নিদয় হইয়া জননি!
পাসরি সন্তান-দুখ,
যাতনা নাশিতে
করি যতন
কেমনে হলে বিমুখ ?
প্রাণের সহিত প্রাণ দিয়ে আর
কে দেখে জননী বিনে?
হতভাগ্য আমি !
তেঁই মাতৃহীন
আশৈশব, পূণ্যহীনে।
১৮
মাতা নাই যার, সােণার সংসারে
বৃথা এ সংসার তার,
মনে শান্তি নাই
সংসারে অসুখ
বিনা সে স্নেহ-আধার ।
যত বন্ধুগণ অসে,দেখে নিত্য
সামাজিক রীতি মতে ;
“আছেন কেমন ?” শুধালে কেবল
যায় কি যাতনা তাতে ?
কবিতাকুসুম।
:
হা ঈশ্বর! তুমি অনাথের নাথ,
কেন এ পাপের যাতনা বাড়াও?
নাশ রােগ, কিম্বা সাঙ্গ করি মম
ভবযাত্রা, তব ধামে লয়ে যাও।
२२
রক্ষ হে ঈশ্বর! বিতরিয়ে দয়া
অবােধ বালকে আশ্রয়বিহীন,
রক্ষ বনিতায় হলে অনাথিনী,
এই ভিক্ষা যাচে চিরদাস দীন।
মাতঃ জন্মভূমি! যাচিদু বিদায়।
পূত নদী-কুলে স্থিতি হেতু তব
হয়েছিল মাগাে! “গাঙ্গইল” নাম,
এবে সে আত্রেয়ী শূন্য-নীরা হায় !
ভুমিও এখন বিষাদ ধাম।
૨
তােমার সমৃদ্ধি ছিল মা যখন,
নাচিত আত্রেয়ী লহরী ছলে,
১৪৪ কবিতাকুসুম। সুখের বারতা জানাতে সাগরে অবিরাম গতি যাইত চলে। বিপুল সলিলে সলিল-বিহারী আছিল অগণ্য প্রাণী সকল, বিবিধ প্রকার বাণিজ্য-তরণী আছিল শােভিয়া নদী-বক্ষঃস্থল। ৪ ছিল সুখী তব তনয় সকলে, জনপূর্ণ তুমি ছিলে মা যখন, দারিদ্র্য-বেদন জানিত না কেহ কুশলে সকলে যাপিত জীবন । ধনী, বৈদ্য,নদী, শ্রোত্রিয়,রাজন- বাস হেতু যাহা প্রয়োজন হয়, মুশস্য-শালিনী সমতল ভূমি, তােমার অঙ্কেতে ছিল সমুদয় । হায় মা! সে দুঃখ লিখিব কেমনে? স্মরিতে উপজে যান জুঙ্গি-
কবিতাকুসুম।
১৪৫
১
তব ভাগ্য সনে হয়েছে অন্তর
সে পূতসলিলা আত্রেয়ী নদী।
ছিলে যবে ধনী, পরধনহারী
দস্য হতে যেন রক্ষিতে তােমায়,
পরিখা-রূপিণী ছিল সে তটিনী,
শুষ্ক এবে, কেন রহিবে বৃথায়?
৮
কিম্বা লাে আত্রেয়ি! তব তীরে মাের
পিতৃকুল ক্রমে হইল সংহার,
সহিতে না পারি তাই কি সে শােক
শুকায়ে হৃদয় হয়েছে বিদার?
কাল নিদাঘেতে জলরাশি তব
শােষিয়াছে, আছে খাত মাত্র সার,
সলিল-গলিত মৃন্ময়ীপ্রতিমা
দেহ যথা মরি! সন্তাপ-আধার।
!
১০
নাই জলচর জীবশ্রেণী, নাই
নদী হৃদি শোভি তরণী সকল,
কবিতাকুম।
আছে চিহুমাত্র গাে-দেহ-পঞ্জর,
শবদাহ-স্থান শ্মশান কেবল।
১১
নাই অবিরাম জন কোলাহল,
জনশূন্য প্রায় তব অঙ্ক স্থল,
আছে যে ক জন-আপন কলহে
মজিছে, ভােগিছে দারিদ্র্য-অনল
১২
নিবিড় অরণ্যে ঘেরিয়াছে তােমা,
শুষ্কনীর কূপ, তড়া সকল ;
অল্পমাত্র নীর যদি কোন স্থানে,
ঢাকিয়াছে তাও শৈবালের দল।
শুভক্ষণে মাতঃ ! মম পিতৃগণে
আপন গরভে দিয়ছিলে স্থান,
জনমিয়া তার স:সাধ্য সাধি
তব হিত, এ চরেছে প্রস্থান।
৪
সেই বংনে ন; কুলাঙ্গার !
". ( অভাগায়,
বৃথা )
কবিতাকুসুম।
১৪৭
পিতৃ-কুল-কীর্তি না পারি রাখিতে
পামরের মত ত্যজেছি তােমায়।
হারায়ে জনক জননী অকালে,
দৈব বিড়ম্বনে হয়ে পরাবীন,
ত্যজিলাম তােমা মাতঃ জন্মভূমি !
ভুলিব না কিন্তু জীব যতদিন।
সংসার-সাগরে জনক-তরণী
ছিল যে আশ্রয় শৈশব জীবনে
ড বিল অকালে, ভাসিনু অকুলে-
নিরাশ্রয়ে মাতঃ! রহিবে কেমনে?
একে অসহায়, পিতৃ-শােক তায়
বিন্ধিল মরমে, হইনু আকুল,
দিল আশ্রয় কেহ সে সময় ।
কেন দিবে যারে বিধি প্রতিকুল ?
১৮
ছিল না কি কেহ জ্ঞাতি বন্ধু মাঝে,
স্বজন-সমাজে পালিতে আমায় ?
১৪৮
কবিতাকুসুম।
ছিল-কিন্তু হায়! কে আদরে কবে
পিতৃমাতৃহীন হেন অভাগায় ?
ভাসমান যথা অবান্ধব শব
পবন-হিল্লোলে যায় নদী-তটে,
ঘৃণায় তরঙ্গে ভাষায় তাহারে
অনাদরি আহা! আসিলে নিকট।
তব হিত কিন্তু নারিনু সাধিতে,
এ মর জীবন যাপিনু বৃথায় !
নিকট মরণ,তাই তব কাছে
মাতঃ জন্মভূমি! যাচিনু বিদায়।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.