Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Niharika
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
নীহাৰিকা
শ্ৰীযতীন্দ্রমােহন বাগচী
একটাকা
প্রকাশক
ক্রমণীমােহন বাগচী
১•১ আপুলি লেন,
কলিকাতা।
বহরমপুর সত্যরত্ন প্রেস হইতে
ললিতমােহন চৌধুরী তার মুদ্রিত।
উৎসর্গ
কবিবন্ধু শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
প্রিয়বরেষু
No text on this page.
সূচী বিষয় পৃষ্ঠা নীহারিকা ০ ০ এ এ ge ••• ১ ০৮০ ৭ ০ ০ ০ ••• ••• বাণীবন্দনা দেয়া তপস্বিনী ভারত হিমালয় পাহাড়ীয়া বাণী / পাহাড়ীয়া প্রেম : পাহাড়ী ফুল ঝরণাঝার ঋণাতলার ... যৌবন-চাঞ্চল্য " ১ Er ••• ••• . ••• ••• ৩৪ sr ••• ০৩ বিসর্জন ••• s • ' অন্ধকার •• Pr ••• . যুগ অ—অনামিকা + ০ + ••• ০৮ গগন ৫১ s এ এ এ ০ ০ ০ যুগাবতার চিত্তরঞ্জন ... কবি চিত্তরঞ্জন... বীরপ্রয়াণ ••• be . ০ ০ ৪ . ০ ০ ••• pre ৭০ ••• জগদি-তর্পণ... কাশীতে চন্দ্রগ্রহণ আগমনী-বিদায় জন্মাষ্টমী নীলকণ্ঠ খেলা ... প্রান্তর-পথে ৭২ ০ ০ ০ ৭৩ .. ৭৪ . . . ••• ৭৫ ০ ০ ০ + E = s ৭৭ = ০ ০ ০ ০ . • • + + ৭৮ ০ ০ ০ • • • • ০ ০ • • ••• ••• ৮০ . . করবী ভূইচাপা নেবুফুল নব-বর্ষা শ্রবণে + + + ••• ৮১ ••• ০ ০ . ৮২ ••• P . . .. ৮৪ E . . . ৩ ৮৫ see E ••• ৮৯ . ৫০০ ৯১ ০ ০ ০ ০ ০ ১৪ . . . # p ০৩। ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০r r মাধবিকা বাসন্তিকা দল দোলযাত্রা একি দোল বিপরীত অভদ্র কাব্য বন্যা-সঙ্কট ভিক্ষা (গান) উদাসী ••• ••• ১০১ ০ ০ ০ ••• . . . ০ ০ ০ E PE ০. . ১১১ s ৮৮ এ ৮ ৪০ ••• ১১৪ ০ ০ ০ the . ১১৮ ০ ০ ০ ০ ০ ০ te জয়যাত্রা (গান) ভুলের মালা (গান) সন্ধ্যায় (গজল গান) ফিঙে শুভ-দৃষ্টি নারী বৌদিদি দ্বিপ্রহরে একটী উপমা ... ডাক নিবেদন देख्यौ see . . . ••• s ১২৫ ০ ০ ০ ••• . ০ ০ ০ ৮ ও ০ ১২৮ ••• ফাগুণে (গজল গান ) ৩. . ০৩ ১৩১ শরৎচন্দ্র ০ ০ ০ ০ ০ ০ ১৩২ ১৩: ৪ ০ ০ ••• • ব্যথার পূজা দুঃখবিবাদী উচ্ছল আমিহারা ০ ৫০০ ••• ••• বিদায়ে .. ১৪১ n০০ ০০
লেখকের লেখা
পুস্তক
মূল্য
পল্লীকথা
(ঐতিহাসিক যৎকিঞ্চিৎ )
(কবিতা)
ঐ
ঐ
ঐ
অপরাজিতা
নাগকেশর
আগরণী
ব্যর পান
(গাথা )
পথের সাথী
(উপন্যাস)
নীহারিকা ,
(কবিতা)
কলিকাতার প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে প্রাপ্তব্য
নীহারিকা
জানি সে কোন্ সৃজন-উষায়
রাঙা আলাে উৎসুক
অন্ধকারের অচিন মুকুরে
গােপনে হেরিল মুখ।
কি জানি কি ভেবে বুক হতে তার
দীর্ঘশ্বাস উঠে
আবাের ব্যথায় কালাে দর্পণে
নীহারবিন্দু ফুটে।
অই নিশীথের গগনে গগনে
অবাষ্পে লিখা,
সৃজন-উষার প্রথম বেদম--
নীহারিকা, নীহারিকা।
তাই আজও হায়, ঊষায় উষায়
আলাে-আঁধারের কূলে
হেসে-ফুটে-ওঠা ফুলের নয়নে
নীহার-অশ্রু দুলে।
সন্ধ্যায় পুন উদাস আকাশে
আশার আভাস সে,
অকূল ঘুমের নিঝুম অতলে
সােণার স্বপন হাসে।
দূরে দূরে জ্বলে আঁধারের তলে
তুষার-শীতল শিখা,
গগন-মরুর মরীচিকামালা-
নীহারিকা, নীহারিকা।
অরূপ তিমিরে পুলকাঞ্চিত
প্রথম রূপের পরী।
আলাে-ছায়া-আঁকা আধ-ঘুমে-মাখা
নবজাগা অপ্সরী-
ধূপধুম-ছায়ে রূপের শিখাটি
ঝাঁপি’ রাখি’ অঞ্চলে
কোন্ অপরূপ রূপের আশায়
জাগিছ আকাশ-তলে ?
প্রলয়ক্লান্ত শঙ্করভালে
পহিল চঁাদের টীকা,
অরূপ সায়রে রূপছায়াছবি
নীহারিকা, নীহারিকা।
ভ্রমণভ্রান্ত জগতের পথে
তুমি আজও গতিহীন,
যত টানাটানি তত ঠেলাঠেলি—
স্থির তুমি অমলিন।
গবের প্রভাতে অরুণের রথ
তােমারি ছায়ায় থামে,
তােমারে পরশি আলাের প্রদোষ
আঁধারবত্মে নামে;
মরণকৃষ্ণ জীবনসাগরে
অয়ি দিগবর্তিকা!
রজনীর উষা, দিনের সন্ধ্যা
নীহারিকা, নীহারিকা।
নীহারিকা
বাণীবন্দনা
তব নামাঙ্কিত এই পুণ্যসিঞ্চি পঞ্চমীর দিনে,
তােমারি চরণচিহ্ন চিনে
এসেছি তােমারি দ্বারে, অর্চিবারে হে বাত্ময়ী বাণি,
ধ্বনির নূপুর-পরা ওই তব চরণ দুখানি
বহু ভাগ্য মানি’;
শিবরূপা সরস্বতী সহ আজি ভক্তের আরতি
জননী ভারতি।
১
নীহারিকা বিশ্বারাধ্যা শক্তি আদ্যা তুমি বাণী প্রণব ওঙ্কার- সৃজনের প্রথম ঝঙ্কার! তব সুরে সুর বাঁধি ভ্রাম্যমান সূর্য চন্দ্র তারা ; নন্দিব তরঙ্গিত; সিন্ধুবক্ষে তব ছন্দ-ধারা নাচে আত্মহারা ; সপ্তস্বরা তব বীণে সপ্তলােক উঠে শিহরিয়া আনন্দে ভরিয়া । কুলে-তুষারশঙ্খ-শুচিশুভ্র সৌন্দর্য্যের রাণী, মূৰ্ত্তিমাঝে উর বীণাপাণি সিতবাসা স্মিত-হাসা শ্বেত শতদল শশাতে পায়ে, হাসে পঞ্চমীর শশী নন্দনের চন্দন ছিটায়ে ধরিত্রীর গায়ে ; গুঞ্জরে নিখিল বিদ্যা ভূসম ঘেরি দলে দলে পাদপদ্মতলে। শ সঙ্গীতের মধুচ্ছা, জ্ঞানের অমৃতনিঃন্দিনী প্রণমামি চরণে জননী কি দিয়ে করিব পূজা, খেতভূজা, কোন্ ছন্দভাের কোন্ শব্দপুষ্পে গাঁথি’ কোন্ মাল্য পরাইব ততরে- শিখায়ে দে মােরে ; ২
নীহারিকা
আজন্ম কাঙাল আমি, প্রসীদ মা পূজারী সন্তানে-
তব জয়গানে।
;
কঁদিছে তােমারে বেড়ি’ ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিনী,-
হতে চায় চরণে কিঙ্কিণী
জ্যোতির্ময় নীহারিকা বরকণ্ঠে বরমাল্যদানে
যুগ যুগ ঘুরে মরে শূন্যপরে সুযােগ সন্ধানে,
:
* চাহি’ মুখপানে ;
বিচ্ছুরিত সূৰ্য্যকর সেতারের তার রচিবারে
ফিরে বারে বারে !
ছন্দের ইঙ্গিতে তব পঞ্চমেতে গাহিল কোকিল,
কুহুস্বরে ভরিয়া অখিল ;
মধুগন্ধে মধুমাস মাতি’ উঠে মন্দ সমীরণে,
প্রমত্ত মঞ্জরী-মেলা মেলে আঁখি মুগ্ধ আম্রবনে
ধরণীপ্রাঙ্গনে ;
পলাশের কুঞ্জে কুঞ্জে পুঞ্জে পুঞ্জে অলক্তকরেখা
তব জয়লেখা ।
বছর ঘুরিয়া গেছে—দেখা তব পাই নাই দেবি,
বড় সাধ চরণ সেবি ;
নীহারিকা
আজি এই গঙ্গাতীরে শিবপুরে বহু ভাগ্যফলে
যদি বা মিলিল দেখা, মহানন্দে বন্দি পদতলে
ময়নের জলে;
জীবনের যত ভুল ফুল হয়ে ফুটুক্ চরণে
বরণে বরণে।
এস দেবি এস মাতা এস বিদ্যা এস মা কল্পনা,
এস বুদ্ধি বিবেকবসনা ;
এস মা করুণাময়ি, আবাহন করে ভক্তল,
ফুটাও এ চিত্তসরে সাধনার শ্বেত শতদল
পবিত্ৰ নিৰ্ম্মল।
হে রাণি, তােমার বাণী অন্তরের মন্ত্র হাে আজি
কণ্ঠে কণ্ঠে বাজি”।
ফুকারি প্রাণের শঙ্খ সাধনার যুগ্মকরে ধরি’
বন্দি তােমা ত্রিভুবনেশ্বরি।
পঞ্চমুখে পঞ্চমুখ মন্ত্র যার নিত্য জপ করে,
ব্রহ্মা যার বেদ বহে, বিষ্ণু যারে পূজিছে অন্তরে
কোটিকল্প ধরে,
প্রণমি তাহারি পদে, সাষ্টাঙ্গের পূর্ণ সেই নতি
লহ ভগবতি।
৪
নীহারিকা
দেয়ালা
জননীর কোলে শুয়ে শিশু করে স্বপন-দেয়াল
শূন্য’পরে চেয়ে কার পানে;
কি করে ভরিয়া উঠে কোথা তার রসের পেয়ালা,
কে পিয়ায়—তাই বা কে জানে!
==
কভু হাসে কভু কাঁদে কভু ভয়ে আকুঞ্চিত ভুরু
অভিমানে ঠোট দুটি ফুলে ;
ঐটুকু কচি বুক কোন্ ভয়ে করে দুরুদুরু,
কি বেদনা ঐ মর্মমূলে !
সদ্যবিকশিত পুষ্প-তারাে আছে সুখদুখভয়
তারাে মাঝে ফুটে অভিমান,
রহস্য খুঁজিতে গিয়ে বাড়ে শুধু অপার বিস্ময়
কে বুঝিবে তাহার সন্ধান!
মােরাও শিশুরই মত’ হাসি কাদি করি মুখ ভার
যতক্ষণ নাহি কাটে বেলা,
কোথা কোন্ অলক্ষিতে সেই জানে অর্থ শুধু তার
যে জন খেলায় এই খেলা ।
৫.
নীহারিকা
তপস্বিনী ভারত
সেদিন ধ্যানের নেত্রে চাহি’ এই ভারতের পানে,
মনে হ’ল, এর চেয়ে পুণ্যমূৰ্ত্তি ধরণী না জানে!
বহু কষ্ট বহু চিন্তা, বহু ধৈৰ্য্য বহু ধারণায়
বিধাতা করিলা সৃষ্টি তপস্বিনী ভারতমাতায়।
শুষ্ক রুক্ষ জটাজাল মেঘসম উৰ্দ্ধ নীলাকাশে,
যােগমগ্ন শিবনেত্র উত্তমাঙ্গ সমুচ্চ কৈলাসে ;
গিরিগাত্ৰ গৈরিকের কর্কশ কৌষিকবাস-পরা ;
মৃগমদচন্দনাক্ত রুদ্রাক্ষ ও পদ্মবীজ ধরা
বনানি বিপুল হস্তে ; অতীতের ঐশ্বৰ্য বিভূতি
অবশেপ সৰ্ব্ব অঙ্গে, ভস্মশেষ বাসনা আহুতি।
জাহ্নবীশীতল বক্ষে অগণিত তীর্থহার পরি’
দাঁড়াইয়া মৌনবাচা মূর্তিমতী সাধনা-সুন্দরী ;
তপােবন-নামাবলী বরঅঙ্গে শােতে সুবিশাল,
সমুদ্র দেয়ায় মার পাদপদ্ম কোটিকল্পকাল।
৬
নীহারিকা
হিমালয়
বারেক আমারে তুমি দেখা দিয়ে আজ
ভাঙিলে সকল গৰ্ব্ব হে রাজাধিরাজ,
সৃষ্টিপিতামহ ভীষ্ম ওগাে হিমাচল!
দিনে দিনে তিলে তিলে আপনা-বিহ্বল
রচেছিনু মনে মনে যে দম্ভনিলয়,
কঠিন কটাক্ষে তব লভি’ তা বিলয়
মুহূর্তে মিশেছে ওই চরণের তলে,
চরণ-ধুলার মত’ আজি পুণ্যফলে ।
কি আনন্দ! ক্ষুদ্র আমি, লঘু আমি আজ,
মুক্ত আমি তব স্পর্শে হে নগাধিরাজ।
একি হর্ষ ! আজি মাের ভারমুক্ত প্রাণ
সুদূরের যাত্রাপথে বিহঙ্গসমান'
লভিল অপূৰ্ব গতি! তুচ্ছতা তাহার
সত্যরূপে আজি তার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
হিমালয় সম্বন্ধে এই কয়েকটি কবিতা-রচনার সহিত আমার শ্রদ্ধেয় বন্ধু ব্যারিষ্টার
যুক্ত শরৎচন্দ্র বসু মহাশয়ের সাহচর্য-স্মৃতি অতি মধুর ভাবে সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে
একত্র হিমালয়শনের যে সৌভাগ্য ঘটিয়াছিল, সে সৌভাগ্য অর্জনের তিনিই ছিলে
ধান সহায়ক।
৭,
নীহারিকা
আমারে করিয়া ক্ষুদ্র ওগাে হিমরাজ !
সত্যকার বড় তুমি করিয়াছ আজ,
হে দেব হে হিমালয়। অহঙ্কারে গড়া
অসত্যের আবরণ, কলঙ্ক-পসরা
নিজ হাতে কাড়ি’ লয়ে করিয়াছ দান
সুযােগ্য শিষ্যের মূৰ্ত্তি মঙ্গল মহান্।
প্রেম দিয়া অগৌরবে করিয়াছ জয়,
মাভৈঃ অভয় মন্ত্রে হরিয়াছ ভয়
দুর্বলের চিত্ত হতে ; লভি’ সঙ্গ তব
সকল রিক্ততা মাের স্বর্ণ অভিনব
স্পর্শমণি স্পর্শে যথা; লঘু বাষ্পরাশি
তােমার শীতল স্পর্শে দ্রব হয়ে আসি
দুই বিন্দু আঁখিজলে পরিণত আজ,
হে মাের কঠিনকান্ত হে অচলরাজ ।
,
মৌন তুমি, তাই এরা এত মিথ্যা কহে !
জানে তব রুদ্রপাণি বজ নাহি বহে
দণ্ড দিতে দপিতেরে! তুমি সংজ্ঞাহার
পাষাণ প্রস্তরশিলা-অন্ধকার কারা ?
জীবের জীবন ধারা-নিঝরিণী নদী
যে বক্ষে লভিয়া জন্ম নিত্য নিরবধি
করুণা-অমৃতস্তন্তে বসুধা বাঁচায়,
তাহারে ব্যাধিতে চায় জড়ত্ব খাঁচায় ।
নীহারিকা
অনন্ত রত্নের খনি নিত্য যার দান,
সে হ’ল নির্জীব নিঃস্ব-অহল্যা পাষাণ ।
যােগী তুমি মৌনবাক্-এরা চাহে কথা,
সমাধি যে ভিত্তিহীন বর্বর বারতা।
দেবাত্মা কহেনা কথা, মগ্ন সৃষ্টিকাজে
বাড়িছে মিথ্যার ধূলা তাই বিশ্ব মাঝে ।
শঙ্কর করেন বাস সমুচ্চ কৈলাসে,
জগন্মাতা—জন্ম তার শৈলরাজবাসে,
মেনকা মায়ের কোলে ! স্পর্ধা ত অল্প না !
কৰ্ম্মক্লীব কবিদের অলীক কল্পনা !
সেই সত্য, এরা যারে সত্য বলি’ মানে
আপন সঙ্কীর্ণ দুটি দৃষ্টিমাঝখানে ;
দুদিনের বিজ্ঞানের তথ্যে রাখে বাঁধা
বিশ্বের বিধান বার্তা, না মানিয়া বাধা
অন্তরের দিক হতে; আত্মার প্রলাপ
দুর্বলের সৃষ্টি বলি’ দেয় অভিশাপ ;
অর্থ ছাড়া নিরর্থক সকলি বিশ্বের,
নিখিল গৌরব বাঁধা যাহাতে নিঃস্বের ।
সেই শিক্ষা শ্রেষ্ঠ, যার যত আস্ফালন,
বাকী সব মিথ্যা মাত্র, ভীরুর স্বপন।
তব অপরূপ রূপ যে জেনেছে মনে,
সে তােমারে আত্মদান করেছে গােপনে .
৯
নীহারিকা
নিশ্চয় নিশ্চিত ইহা। বাহিরের চোখে
কতটুকু দেখা যায় আঁধার আলােকে!
কতটুকু যায় চেনা? তাই ত সকলে
তােমারে হে প্রিয়তম, হিমাচল বলে।
সৃষ্টির মঙ্গল মুৰ্ত্তি দধিপাত্র শিরে
শিবেরে করিয়া কোলে পালিছ পৃঙ্খীরে ;
বহাইয়া সুরধুনী পুণ্য বক্ষসুধা
পিয়ায়ে নিখিল জীবে পুষিছ বসুধা ;
রুক্ষ কাঠিন্যের বর্ম দেখি যা নরনে
সে তােমার বাহরূপ সমাধি শয়নে
সৰ্বকালজয়ী দেহ ! শৃঙ্গবাহু তুলি’
ডাকিছ সস্তানে তব স্বর্গদ্বার খুলি।
কমঠ কঠিন অঙ্গ প্রস্তর আকার,
তবু তার প্রাণ আছে—করে তা স্বীকার
শিশুছাড়া সৰ্ব্বজনে, যে বা চক্ষুষ্মন ;
যদিও আপাত দৃশ্যে সে শুধু পাষাণ ।
আরাে বড় হবে যবে মানবশৈশব
দৃষ্টি অন্তরালে যবে শিখি’ অনুভব
হেরিবে নূতন চক্ষে অন্তদৃষ্টি খুলি’
সে দিন তব এ বাহ আবরণ ভুলি
স্বরূপ' দেখিবে তব ভবিষ্য মানব ;
ধ্যানমুক্তি হেরি’ তব হইবে নীরব
নীহারিকা আজিকার অবিশ্বাসী ; বন্দিবে বিস্ময়ে তােমার ও পাদদেশ ভক্তিভরা ভয়ে। হে তাপস, হে সুন্দর, হে চিরমঙ্গল সেদিনের কথা ভাবি’ চোখে আসে জল । == তােমার নিঝর নদী অরণ্য কান্তার উপত্যকা অধিত্যকা সমতল পাড় গুহা গুম্ফাসবি শুধু দেয় পরিচয় তােমারে দিয়েছে ধরা সর্ব সমন্বয়। তােমারি শিখরে হেরি অখণ্ড আকাশ, তােমারে ঘেরিয়া আছে পবিত্র বাতাস- জীবের জীবনরূপী-ধাতু শিলা প্রাণী একত্ৰ আহরি’ বক্ষে মহারাজধানী গাঁথিয়াছ বক্ষে তব ওগাে হিমরাজ- যা কিছু নিখিল বিশ্বে হেরি তব সাজ। প্রথম প্রভাত রবি উঠে তব ভালে ; প্রথম চন্দ্রের টিপ তােমারি কপালে ; কোটি তারাহার কণ্ঠে ; মেঘের বসন বিচিত্র বর্ণের মেলা অঙ্গের ভূষণ। প্রত্যহ প্রত্যুষে রবি পরায়ে তিলক তােমার তুষার-ভালে, প্রসাদ আলােক বিতরে বিপুল বিশ্বে, বন্দনার শেষে চন্দ্রের চন্দনরেখা ও ললাট দেশে
নীহারিকা
প্রথম পরশ লভি’ ঝরি’ পড়ে ধীরে
সুষ্মিত কিরণ রূপে তিমিরের তীরে।
তব আজ্ঞাবাহী মেঘ বহি’ বৃষ্টিধার
সৃষ্টিরে পালিছে নিত্য ভরিয়া ভাণ্ডার,
ফল শস্য বারি দানে, আর্তজীব তরে।
পবন চুলায় নিত্য ঝাউএর চামরে
তুহিনশীতল বায়ু; অনন্ত আকাশ
তারার ঝালর ঘেরা ধরে বাবােমাস।
ধরণীর একচ্ছত্র অজেয় সম্রাট,
এই ত রাজার রূপ শাশ্বত বিরাট।
সিঞ্চলের সূর্যোদয়—বিশ্বমানবের
সৌন্দর্য্যের শেষ বাণী সৌর জগতের !
স্রষ্টার চরম সৃষ্টি---অপূর্ব সুন্দর
অপূৰ্ব বিরাটসঙ্গী—গৌরী-মহেশ্বর।
কল্পনার শেষ কথা-বিস্ময় বারতা
সারা বিশ্বভুবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা।
সে দৃশ্যের দ্রষ্টা আর কি করিবে ভয়
রুদ্রের মৃত্যুরে আজি! লভিয়া বিজয়
মানবেরই দৃষ্টি দিয়া সে যে দেখিয়াছে
শিবের সুন্দর মূৰ্ত্তি ভীষণের কাছে !
তাই আজি মনে হয়—ত্রিকালজ্ঞ যারা
মুনিঋষি তপােধন, কি হেতু তাহারা
১২
নীহারিকা
তােমাতে করেন বাস—ওগাে হিমাচল।
স্বর্গের সােপান তুমি, প্রমূৰ্ত্ত মঙ্গল।
সিঞ্চলের সূর্যোদয়-সৌন্দর্য্যের শেষ ।
যেথায় ধরণী করে নয়ন উন্মেষ
ধরণীনাথের পানে, প্রথম পুলকে
ছাড়িয়া সূতিকাগৃহ, লজ্জারঙা চোখে।
অসংখ্য সন্তানে আজি ভরা তার কোল,
খসিয়া পড়িছে ধীরে বক্ষের নিচোল
কুয়াসার স্বপ্নসম ; লঘু মেঘবাস
বাঞ্ছিতের স্পর্শে অনিবদ্ধ পাশ ।
ভােলনা সন্তানে তবু, সবাকার লাগি
স্বামীর সদয় দৃষ্টি সইতেছে মাগি।
পতা যার মৃত্যুঞ্জয়, কিবা তার ভর,
মা জননী অন্নপূর্ণা, অব্যয় অক্ষয়
নিয়ত ভাণ্ডার যার-কিবা দুঃখ তার ।
হে শিব সুন্দর মূর্তি, লহ নমস্কার।
হে গিরি, কোথায় আজি তব গিরিরাজ,
মায়ের ব্যথার মুক্তি--মা-মেনকা আজ
কোথা গেল—কোথা গৌরী শিবসীমন্তিণী-
অচলনন্দিনী উমা-কৈলাসবাসিনী ?
সত্যই কি মিথ্যা সব, কবির কল্পনা,
ঋষির মানসী মুর্তি-ধ্যানের ধারণা?
নীহারিকা
মিথ্যা যদি—সত্য চেয়ে সেই মিথ্যা মাের
জন্ম জন্ম হােক্ কাম্য-তারি মায়াভাের
বঁধুক জীবনে মাের চির তন্দ্রাজালে
মাগিবনা অন্য সত্য কভু কোনকালে ।
মিথ্যা যদি - নিত্য শিব বাবা তার সাথে?
সুচির সুন্দর সেকি মিলিত তাহাতে !
শিবসুন্দরের সঙ্গে যে বা সুসঙ্গত,
সেই মাের মহাসত্য-বাকী মিথ্যা যত।
{
হিমালয়, মনে হয়, সবসুদ্ধ তােরে
পারিতাম বক্ষে যদি টানিতে আদরে
আজি এ মাহেন্দ্রক্ষণে! এত বড় বুক
বেড়েছে আমার, লভি’ তব সঙ্গসুখ ।
মনে হয়, আজ আমি—তােরও চেয়ে বড়
এত সৰ্ব্বগ্রাসী স্নেহ হইয়াছে জড়’
আমার এ বক্ষেমাঝে, মিথ্যা ইহা নয়।
এই মুহূর্তের শক্তি, লভিয়া সঞ্চয়
তিলে তিলে দিনে দিনে, সাধনার বলে-
হইত অক্ষয় যদি স্থায়ী পুণ্যফলে,
সম্ভব হইত বুঝি সাধ আজিকার ;
কিন্তু সে কি সাধ্য কভু ? হে প্রিয় আমার ।
এই ত নামিয়া গেনু, হৃত সর্ববল
ফিরিয়া আনিছে চক্ষে সেই অশ্রুজল !
;
১৪
নীহারিকা
পাহাড়ীয়া বাঁশী
-~-
পাহাড়িয়া বারী বাজায় ;
পাষাণের বুক চিরে’
ধ্বনি কি জন্মিল ফিরে,
ব্যথায় বাতাসে চিড় খায় !
শৈলে শৈলে ধ্বনি লাগে,
রন্ধে রন্ধে, ফণী জাগে,
বনে বনে প্রমত্ত ময়ুর
গগনে লাগায় মেঘ
পবনে জাগায় বেগ,
নেচে উঠে নিঝর নূপুর !
বিরহ-ব্যাকুল বেদনায়
পাহাড়িয়া বাঁশুরী বাজায় !
নীহারিকা
বনের বর্বর হিয়াহীন ;
কঠিন কঠোর কায়,
নাহি যার দুঃখদায়--
শিপ্রায় সরল স্বাধীন।
তারে কে শেখালে সুর
সুধা হ’তে সুমধুর -
সুবিধুর বিরহের ব্যথা।
মুরলীর বন্ধু ভরি’
বাহিরায় মূর্তি ধরি’
পাষাণে সঞ্চারি’ সজীবতা !
ফুকারিয়া জীবনপ্রিয়ায়
পাহাড়িয়া বারী বাজায়
গরিপারে খাসিয়াবস্তিতে,
তারি সে পরাণ-প্রিয়া
করুণ তরুণী হিয়া
ধূলায় লুটায় সে ধ্বনিতে।
ঘরে ঘরে বন্ধ দ্বার
চারি ধারে অন্ধকার
সুদূর
বাঁশরী
দীর্ঘ পথ,
নীহারিকা
তাই সে সুরের স্পর্শে
চোখে শুধু ধারা বর্ষে
পরবাসী প্রিয় মুখ স্মরি’
তবু সে নিঠুর শুধু, হায় ।
জেনে-শুনে বাঁশরী বাজায়।
দুইপারে দুইটি হৃদয়,
সুরের বিদ্যুৎ-রথে
অজানা উজান পথে
এমনি করিয়া পরিচয়।
দেহ দুরে পড়ে আছে-
মনে মনে তবু কাছে,
মাঝে বহে বিরহের নদী
অপার সে পারাবার
দুয়ে করে পারাপার
সুরের সেতুতে নিরবধি।
পরে শুধু চমকিয়া চায়,
পাহাড়ীয়া বারী বাজায় ।
১৭
নীহারিকা
পাহাড়ীয়া প্রেম
পর্বত অরণ্যচারী
বর্বর গারাের নারী-
তাহারি একটা প্রেমকথা,
আজি বহুদিন পরে থেকে থেকে মনে পড়ে
হৃদয়ে জাগায় ব্যাকুলতা ।
১৮
নীহারিকা
তখন বর্ষার শেষ
মেঘমুক্ত সাদেশ
কুয়াশায় দিক্চক্র ঢাকা,
রৌপ্য-আভা রবিকরে বুনিতেছে তারি পরে
বর্ণজাল বহুচিত্রে আঁকা ;
বিচিত্র ফুলের রাশি
হাসিছে বিচিত্র হাসি
শৈবালআচ্ছন্ন গিরিগায়ে,
নন্দননৰ্তকী জিনি’
নেচে চলে নিঝরিণী ,
শিলার নূপুর পরি’ পায়ে ;
সারি সারি অমেষ
পরিপূর্ণ নভােদেশ
শৃঙ্গ তুলি’ দাঁড়ায়ে পৰ্বত,
তারি তলে মেষপালে
চরাইয়া সন্ধ্যাকালে
গিরিনারী ফিরে গৃহ পথ।
অদূরে চড়াই পরে
সহসা বিস্ময়ভরে
হেরে পূর্ব প্রণয়ী তাহার,
সৈনিক উষ্ণীষ শিরে অশ্ব পরে ধীরে ধীরে
তারি দিকে হয় আগুসার।
প্রথম যৌবনপারে
সৰ্বত্ব সপিয়া যারে
মেনেছিল মনের মানুষ ;
দীর্ঘ সাত বর্ষ শেষ
একেবারে নিরুদ্দেশ
পলাতকা ভীরু কাপুরুষ!
ক
নীহারিকা
জীবন যৌবন তার
ব্যর্থ করি’ চতুধার
অমূল্য প্রণয়রত্ন লুটি
রমণীহৃদয় কাড়ি’
পালায় যে গৃহ ছাড়ি
তাররা এই বীরত্ব জকুটি!
যাহারে ফিরিয়া খুজি দুরাশার সঙ্গে যুঝি”
কাটিয়াছে দীর্ঘ বর্ষ সাত,
দেশে দেশে মৃতপ্রায়
অনাহারে অনিদ্রা
অরণ্যে পৰ্বতে দিবারাত ;
যার মুখসঙ্গতৃষা
মৰ্ম্মরক্তে আজো মিশা--
আজি সেই সন্ধ্যা-অন্ধকারে,
গা ঢাকিয়া কোন মতে ফিরে ওই বনপথে
জানি সে কার অভিসারে।
কিন্তু তবু সেই মুখ
পরিপূর্ণ সেই বুক,
সেই আঁখি মনমােহনিয়া,
স্মরিতে পুরাণাে কথা
যুবক নামিল তথা
গিরি-কাটা খাড়া পথ দিয়া।
চিনিতে কি না চিনিতে বা ধরি’ আচম্বিতে
সম্মুখে দাড়াল নারী আসি,
রাগ মিশে অনুরাগে
পরশে বেদনা জাগে
নয়নে ঘনায় বাষ্পরাশি
নীহারিকা রশি ছাড়, দাও পাশ, কহিলা কর্কশ ভাষ- অশ্বারােহী রশ্মি তার টানি, সুদীর্ঘ বরষ পরে প্রাণ কাঁপে কণ্ঠস্বরে, এই কি প্রথম প্রেমবাণী। জানিনা কোথায় লাগি মুহূর্তে উঠিল জাগি প্রণয়ের সুপ্ত অভিমান, বক্ষের কুকরীখানি চকিতে লইয়া টানি’ দাড়াইল বাঘিনী সমান! ক্ষুব্ধ নারী বজ্রস্বরে গর্জিলা অবজ্ঞাভরে- শেষ কথা কহি সে তােমারে, জগতে দোহার স্থান দেন যদি ভগবান এ জীবনে কিম্বা পরপারে, রহিবে তা একসাথে ঝড়ঝঞ্চাবজ্রাঘাতে, আজি এই করিনু শপথ, যে বা বাছি লহ মনে জীবনে কি বা মরণে এছাড়া ভিন্ন নহে পথ। হিংসাবৃত্তি পশুবুকে যে আকৃতি ধরে মুখে বদনে তেমনি বিকটতা, শ্বাসে যেন সর্প ফোসে রাঙা চক্ষু ঋক্ষ রােষে, বক্ষে বহে আগ্নেয় বারতা।
নীহারিকা
নিমেষে সরি’ নিজে যুবক ভাবিলা কি যে?
লাগাম টানিয়া বেগভরে,
চালাইতে অশ্ব তার
অসি সম তীক্ষ্ণধার
ছুরিকা সে বিঁধিল পঞ্জরে।
পৰ্বতে উদিল উযা
শারদীয়া নিষ্কলুষা
অরুণের রক্তরাগরেখা
গিরিমূলে শিলাতলে হেরিলা সে কৌতুহলে
গাঢ়তর নব রক্তলেখা!
ধীরে ধীরে বেলা হলে পাহাড়ীরা দলে দলে
হেরে ভীতিবিম্মিত নয়নে,
নিরুদ্ধ নিশ্বাস ছাড়ি-
দুটী মৃত নরনারী
দৃঢ়বদ্ধ গাঢ় আলিঙ্গনে।
পাহাড়ের কর্ণদুল
ফুটি’ নানা বর্ণ ফুল,
তেমনি ছড়ায় সুধাহাসি,
প্রণয়ের দীপ্ত রােষে দুটী প্রাণ-উল্কা খসে
কে জানে কোথায় গেল ভাসি’!
নীয়রিকা পাহাড়ী ফুল পাহাড়ের ফুল পাহাড়ের ফুল- পাহাড়ে মাটীর ফুল। গন্ধের নাই সন্দেহ কোনাে বর্ণেই মগুল! কি করিয়া তুই আহরিস রস কঠিন পাষাণতলে ছােট্ট প্রাণের কত না শক্তি- ভাবি তাই এ বিরলে।
নীহারিকা
ক্ষুদ্র বলিয়া তুচ্ছ করিতে
আর নাই বুকে বল,
কার কাছে কেবা বৃহৎ ক্ষুদ্র
কে বা সে বলিবে ব!
এক ফোটা জল, মূল্য তাহার
লক্ষ রাজার ধন,
এক ফোটা ফুল, তাের পশ্চাতে
কতই না আয়ােজন।
নির্জন গিরি, জনমানবের
নাহি কোন আনাগােনা,
হয়ত বন্ধু, মােরই সাথে তাের
প্রথম এ জানালােনা ;
রঙিন্ চক্ষে দেখি নি আর
দ্বিতীয় মানবমুখ ।
পরশে আদরে কি যে তাের করে-
সুখ সে অথবা দুখ!
আসিলে আমি, হয়ত জীবনে
দেখাই হতনা আর ;
ঐ শিলাতলে পড়িত ঝরিয়া—
হেন রূপ সুষমার!
নীহারিকা
তবু ধ্রুব জানি, তােরও আছে ফুল,
নিজ কাজ এ জীবনে,
শেষ না করি , তােরও শেষ নাই
জানি এ বিজন বনে।
কি যে সেই কাজ, জানে একজন,
আমরা পাইনা দিশা,
যত ভাবি তত ভাবনাই বাড়ে
তৃপ্তিবিহীন তৃষা!
তােরে দেখি ফুল, কি জানি কেন যে
চোখে আসে মোের জল,
কি কাজের মাের আদেশ ছিল যে,
কিবা করে গেনু বল!
তােরও বলিহারি, ওরে ও পাষাণ,
এত রস তােরও বুকে ।
বুঝিনাক কি যে শুন্য পিয়া
কোটি সন্তান মুখে
নীহারিকা
নীরস পাষাণ, তােরও এত দান
সৃজনের লাগি” ঝরে,
ওগাে রাজরাজ, কত লেহ জানি,
তোমার ও বুকে ধরে ।
হে বন্ধু, তব নিগ্ধ পরশে
খুলিলে আজি এ চোখ,
তােমার এ দান জীবনে আমার
সার্থক আজি হােক।
যে অশ্রু আজি বহালে নয়নে,
বাকী ক'টা দিন ধরি,
বহুক, না আসে যতদিন সেই
বিদায়ের বিভাবরী।
নীহারিকা
ঝরণাঝারা
জ্বলজ্বল উজ্জ্বল
তুষারের উদ্ভব,
ঝরঝর ঝরণা
গিরিঘরকরণা-
যেন কালাে কুল,
কভু সাদা ধবুধব,
উচু হ’তে নীচুতে টলিয়া কিছুতে,
তুহিনের নিঝর
দিন রাত ঝঝর
ঝ ঝ ঝরছে
ধারা নাহি ধরছে।
হরূদম্ হর্দম্
লতাপাতা কুটকাট চলে করে’ লুটপাট,
ফুরশুৎ নাই তার,
বিদ্যুৎ ভাই তার,
হিম জল-অঞ্চল
অবিরল চঞ্চল,
ধূলা বালি কর্দম
२१
নীহারিকা চমরীর পুচ্ছে, কিঙ্কিণী কঙ্কন রামধনু রং কোন্ ! বালা আর চুড়ীতে বাজে শিলা মুড়িতে, খেলিতেছে ঝম্পাই আমান কম্পাই । শিখরীর উচ্চে আষাঢ়ের ঘটাতে সিংহের জুটাতে, নামে মহা ঝাম্পে হরিণের লক্ষে, ধ ধ ধর ধর কই ঘর, স স- আর নাই, আর নাই ঘর বা’র তার নাই, আঁকা-বাঁকা ভঙ্গী শেয়ালের সঙ্গী, ফিরে ফিরে চায় মাঝে মাঝে ধম্কায়, গাছে-গাছে দোল খায় শিলাতলে টোল খায়, পাকে-পাকে লুটছে তবু ফিরে’ ছুটছে। সাপ সাপ, ঐ সাপ— সরু সরু-বাপ বাপ । সাপ নয়, সাপ নয়, বরফের ধাপ নয় ; ও যে সেই ঝরণা গিরিঘরকরণ— ও যে মাের ঝরণা আপনার পর না! চিকমিক্ ঝিকৃমি রবিকরে ধিক্ দিক, ঝিকৃমি চিকৃমি কিছু ওর নাই ঠিক, ঝম্ ঝম্ ঝম্ ঝম্ এযে দেখি কম্ কম, কই কই, কোথা গেলা, ইচা বাচা চাদা চেলা- ঐ গেল সরিয়া গিরিমাঝে মরিয়া ! ঐ ফের আলােতে সাদাতে ও কালােতে ফুসিয়া ও ফঁাপিয়া কাপাইয়া কাপিয়া, ২৮ নীহারিকা ফেনাময় মণ্ডল ক বেল যুঁই কাশফুল কি ভীষণ তর্জন মাঝে মাঝে গর্জন, ফ্যা ফ্যাস্ ভন্ ভক্ শাকচুণ হাঁস বক, ফিস্ ফি ফ ফস্ বেটী কারাে নয় বশ ; দুর্মদ গতিতে পতিতের মতিতে, খেয়ালে আনন্দে পাগলামি ছন্দে, তড়বড়, দড়বড়, পার বুঝি হয় গড়, উৎরায় উৎরাই কোথা কোন’ খুঁৎ নাই, ইদম্ ইরূদ ছুটে চলে দুর্দম, কম কম, থম্ থম্ ঐ বুঝি লয় দম এইবার পাহাড়ে ঠেকে বুঝি ডাহা রে! তারপর তারপর বা’র ক বার কর চলিবার ফন্দি ক্ষণিকের সন্ধি- পাশ কেটে এইবার হয় দেখি দুই ধার ; সরু সর দুধ দই ক্ষীর সর— গ গ গ গন্ চলে ফের তদৎ, বুদ বুদ বুদ বুদ কল কল তল তল আঁখি দেখি ছল ছল, চোখে বুঝি আসে জল ব ব ঠিক বল; থাম থাম্ আর না থামা তাের কান্না ঐ দেখ গঙ্গা তরলতরঙ্গা; বিলিয়ে দে আপনায় থাকবেনা ভাবনাই। কই কই, কেটে চলে বুদ,
নীহারিকা
ঝরণাতলায়
পাহাড়ে ঝরণা-তলে
পাহাড়ে’ তরুণীদলে
আজিকে পড়েছে কাণাকাণি ;
স্নানে আসিবার কালে
কনিনের আড়ালে
কে জানি গিয়াছে দৃষ্টি হানি।
নীহারিকা
।
পরদেশী পরবাসী
মিঠা সে মুখের হাসি-
বড় মিঠা আঁখির চাহনি
তরুণ সে গােরা দেহ
দুবার দেখেনি কেহ,
তবু সবে বেঁধেছে বাধনি ।
তরলরজতস্বরে
অঝােরে নিঝর ঝরে,
তারি তলে সারি-সারি শিলা
একে-একে দলে-দলে
যুবতীরা কুতুহলে
তারি পরে করে আনলীলা।
মুখে হাসি চোখে হাসি
লাবণ্য উঠিছে ভাসি’
পরিপূর্ণ তনুদেহতটে,
বিচিত্র ধারার ভঙ্গী
সহ খেলার সঙ্গী
যােগ্যের সুযােগ্য রূপ বটে
নীহারিকা
।
কাঁচুলী খসয়ে কেহ
মাজিছে সুন্দর দেহ,
সখী তার কহে পরিহাসে-
বুঝেছি মনের আশ
পূরাইতে অভিলাষ
ঐ দেখ, পরদেশী আসে।
সসঙ্কোচে তাড়াতাড়ি
পরের বসন কাড়ি
ঢাকিতে অঙ্গখানি তার,
অমনি সকলে মেলি’
তারে লয়ে ঠেলাঠেলি—
হাসির তরঙ্গ চারিধার।
ছাড়িতে কটির বাস
কেহ লভে উপহাস,
ছি ছি, ওকি! দেখিছে বিদেশী।
বুঝেছি মনের ভাব
এখনি হইবে লাভ,
তরি পরে টান্ দেখি বেশী ।
৩২
নীহারিকা
নিমেষে হাসির রােলে
বালিকা ঠেকিয়া গােলে-
হাসিবারে গিয়া ফেলে কেঁদে,
মুখরা যুবতী যত
আরাে জোরে হাসে তত
চারিদিকে বেড়ি’ দল বেঁধে।
(৫)
যার যাহা মনে লয়,
তেমনি সে কথা কয়
কথা কিন্তু সেই বিদেশীর ;
যৌবনের অভিশাপ
সুন্দর মুখের ছাপ
হৃদয়ে যতেক যুবতীর !
চঞ্চল সরসী জলে
চঞ্চল মরাল চলে
প্রত্যেক তরঙ্গে চিত্র তার ;
লুকায়ে কাননকোলে
পথিকের চিত্ত দোলে
ভাঙে বাঁধ বুঝি বা লজ্জার।
নীহারিকা যৌবন চাঞ্চল্য ভুটিয়া যুবতী চলে পথ ; আকাশ কালিমামাখা কুয়াশায় দি ঢাকা, চারিধারে কেবলি পর্বত ; যুবতী একেলা চলে পথ। এদিক ওদিক চায় গুণগুণি’ গান গায়, কভু বা চমকি’ চায় ফিরে গতিতে ঝরে আনন্দ উথলে নৃত্যের ছন্দ আঁকা-বাঁকা গিরিপথ ঘিরে। সহজ স্বচ্ছল মনােরথ- ভুটিয়া যুবতী চলে পথ ! ;
নীহারিকা টস্টসে রসে ভরপুর- আপেলের মত মুখ আপেলের মত বুক পরিপূর্ণ প্রবল প্রচুর ; যৌবনের রসে ভরপুর। মেঘ ডাকে কছু কড়, বুঝি বা আসিবে ঝড়, একটু নাহিক ডর তাতে ; উঘারি’ বুকের বাস, উরস পরশ করি’ হাতে! অজানা ব্যথায় সুমধুর সেথা বুঝি করে গুরুগুর ! পূরায় মনের আশ যুবতী একেলা পথ চলে ; পাশের পলাশ বনে কেন চায় অকারণে? আবেশে চরণ দুটি টলে-- পায়ে-পায়ে বাধিয়া উপলে । আপনার মনে যায় আপনার মনে গায়, তবু কেন আনপানে টান ? করিতে রসের সৃষ্টি চাই কি দশের দৃষ্টি স্বরূপ জানেন ভগবান! সহজে নাচিয়া যে বা চলে একাকিনী ঘন বনতলে জানিনাক তারে কি ব্যথায় আঁখিজলে কাজল ভিজায় !
নীহারিকা
দেখার জন্য যেটুক্ চাওয়া, চাহনি তার তার চেয়ে বেশী ।
চেনা মানুষ, তবু দিদি, এ চাহনি বলােত কোন্ দেশী ?
বুঝতে নারি তায়,
কেমন যেন কাঙালপনা চাওয়ার বেশী আর যেন কি চায় ।
ঝাঁ ঝাঁ দুপুর, সদিন দেখি, কূয়াের ধারে চাইতে এল জল,
রুখু মাথা শুনাে মুখে চোখ দুটো তার তবু কি উজ্জ্বল।
একলা আমি ঘরে,
কি করব আর, জল দিতে তায়, তেমনি করে’ চাইল মুখের পরে !
৫
নীহারিকা
ক্ষেতের পাশে চরায় ধেনু, তা ছাড়া কি মাঠ মিলেনা তার?
ঘরের ধারে বাজায় বেণু যখন তখন দিনে হাজার বার,
এমনি সুরেভরে’
যে সুরটি মাের মিষ্টি লাগে, কি আশ্চর্য ! জান্স কেমন করে ?
-
মােরই নামের বনা বাছুর, কাল দেখি যে, আদর করছে তাকে,
কি করে যে জাল সে নাম, ‘পাের মুখাে’ এতও খবর রাখে!
স্পর্ধা দেখাে তার,
আমার মুখেই এক রকম তত চুমাে দিলি, তফাৎ কোথায় আর!
আজ সকালে দেছি আবার, বাঁশীটি তার দুয়ােরে মাের পড়ে।
এই ঘরে যে আমি থাকি, হতভাগা জালি তা কি করে ?
এ তত বিষম জ্বালা,
দিনে রাতে এম্নি করে প্রাণটা আমার করবি ঝালাফালা !
ভাবছি মনে পালাই কোথাও, না-হয় চলে’ তুই-ই কোথাও যা!
এমন করে পায়ে পায়ে দিনে দিনে আমায় বিধিস্ না।
বুঝবে এবার লােকে,
খেতে শুতে চলতে চাইতে পাের মুখ আর পড়বেনাক চোখে।
কদিন থেকে দেখছি না আর, সত্যি কোথাও চলেই গেল নাকি?
যেমন মানুষ—যেতেও পারে—বুদ্ধিটি তার বুঝতে নাই ত বাকী।
ভালােই হ’ল এবার
সাধ্যি কারাে থাকবে না আর মন্দ লােকের আমায় খোঁটা দেবার !
৩৭
নীহারিকা
দিব্যি সুখে কাটছে সময়, লােকের কাছে লজ্জা না আর পাই,
ঘুরে ফিরে বেড়াই পথে, যখন তখন এ যেমন চাই ;
হাল্কা ফাকা মন,
মনের মধ্যে রাত্রি-দিবা ‘ঐ রে’ বলে’ নাইক উচাটন।
কুয়াের ধারে তেনি একা বসে থাকি, চায়না কেহ জল,
তেম্নি করে সকাল-সাঁঝে তাকায় না আর আঁখিটি বিল ;
বাঁশী লুটায় ঘরে,
বাছুরটা মাের তেনি চরে, বাহুপাশে কেউ না এসে ধরে ।
দিদি, তােরা খোঁজ নে তাে ভাই, আবার ফিরে আসবে না ত আর ;
সজল চোখে আমার পানে চাইবে না তাে আবার বারম্বার।
থাকব একা সুখে,
যাশীটা আর দিচ্ছি নাক, কেমন শাস্তি ! লুকিয়ে রাখব বুকে।
এদিক ওদিক কোথাও সে নাই, মাসে মাসে বছর গেল কেটে
শ্রাবণ-ধারায় ভিজে ভিজে, চোৎ-বােশেখে শুননা মাটী ফেটে ।
যদিই থাকে বেঁচে,
দিদি তােরা দেখিস্ শুধু পাগলটা মাের আসেনা ফের যেচে !
নীহারিকা
বিসর্জন
দুইখানি যাত্রী-গাড়ী দুই দিক হতে
জনশূন্য ষ্টেশনের প্রদীপ্ত আলােতে
বিপরীত পথগামী—ড়াইল আসি’
কলিকাতামুখী এক, অপরটি কাশী।
তখন গভীর রাত্রি, বারােটাই বাজে ।
ভাটা পড়ে আসিয়াছে চলাফেরা কাজে।
জানালায় বসে আছি, ঘুম নাই চোখে,
সহসা পড়িল দৃষ্টি উজ্জ্বল আলােকে
একখানি কচিমুখে—যেন পরিচিত।
সমস্ত বুকের রক্ত করিয়া স্পন্দিত।
একেবারে পাশাপাশি দুইখানি গাড়ী,
হাত দুই ব্যবধান মাঝে শুধু তারি।
তরুণী বসিয়া এক বাতায়নে তার,
ডাগর নয়ন দুটি মেলিয়া এধার।
সহসা চকিত মাের দৃষ্টি-বিনিময়ে
আঁখি দুটি তারাে যেন ভরিল বিস্ময়ে ।
আর রহিল না বাকী, বুঝিনু নিমেষে।
পাঁচটি বৎসর পূর্বে নিতান্ত বিদেশে
তারি সাথে হয়েছিল বিবাহের কথা;
কি জানি কি বিয়ে হ’ল প্রতিবন্ধকতা ।
নীহারিকা
তখন লক্ষ্ণৌয় মােরা থাকি পাশাপাশি,
কর্মক্ষেত্রে পরিচিত ; উভয়ে প্রবাসী
প্রতিবেশী পরিবার বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ
ঘনিষ্ঠতা এত বেশী—জিনি’ আত্মজন!
}
কিন্তু একি! এ যে দেখি বৈধব্যের বেশ!
কুঞ্চিত নিতম্বচুম্বি তরঙ্গিত কেশ
এ যে দেখি, স্কন্ধে পড়ে ভুজঙ্গের মত ;
সদাহাস্যভরা দৃষ্টি ব্যথা অবনত !
জগতে অনেক সত্য কল্পনা-অধিক
ঘটিবার পূর্বে কেহ বুঝেনাক ঠিক?
বিস্ময়ে বিস্মিত করি’ স্তব্ধ করি’ মােরে,
শুধাইল সহসা সে নমস্কার করে—
ক
হে বন্ধু, আছ ত ভাললা ? বহু বহুদিন
তােমার পাইনি দেখা; বড় ভাগ্যহীন,
মাের কথা শুধায়ােনা-একা আমি আজ ;
এবারের মত মাের ফুরায়েছে কাজ!
একি কথা! সেই শৈল! কি কহিব আর,
কি না সে পারিত হ’তে জীবনে আমার।
সব চেয়ে অন্তরঙ্গ, সব চেয়ে বেশী,
সকল সম্বন্ধবাড়া সেই পরদেশী ।
৪০
নীহারিকা
=
এই শৈল! এ যে মাের জীবন-অধিক
যৌবন-বসন্তে মাের কলকণ্ঠ-পিক,
এ নিঃসঙ্গ জীবনের পথের দোসর ;
সেই প্রিয়া আজি মাের পর হতে পর!
নিষিদ্ধ তাহার সঙ্গে মুখের আলাপ ;
করস্পর্শ তার--সে ত অতি-বড় পাপ!
চাহিবারও অধিকার নাহি বুঝি ফিরে,
যে ছিল প্রাণের রাণী—সে আজি বাহিরে।
এই এত কাছে মাের, হাতটি বাড়ালে,
হৃদয় থাকেনা আর হৃদয় আড়ালে ;
ওই ত সম্মুখে মাের পিপাসার বারি,
মুহূর্তে তৃষ্ণার জ্বালা নিবাইতে পারি ।
চমক ভাঙিয়া গেল ফিরে’ তারি ডাকে।
প্রাণপণে রুদ্ধ করি’ বিদ্রোহী আত্মাকে,
ত্বরিতে নামিয়া দ্রুত গেনু তার পাশে ;
শুধানু দুচারি প্রশ্ন অবরুদ্ধ ভাষে।
কি বেদনা, কি আঘাত ঐটুকু প্রাণে,
সমাজ জানেনা তাহ, ধৰ্ম্ম শুধু জানে!
নিরুপায় প্রাণ যায়, তবু উপবাসী-
তাই
সেসৰ্বস্ব ছাড়ি’ চলিয়াছে কাশী ।
৪১
নীহারিকা
তাই যাক্-তাই হােক, শান্তি যদি পায়
বিশ্বনাথ পদে আজি অর্পি’ অপনায়!
তাই হােনা ঘটুক্ কোন পরিবাদ ;
ছিন্ন ধুতুরায় হাে শিবেরই প্রসাদ।
অশ্রুত চারিচক্ষু মৌন বেদনায়,
গাড়ী ছাড়িবার সাড়া পড়িল ঘণ্টায় ।
মনে নাই শেষ কথা—কি বলিয়া হায়,
কেমনে বিদায় দিনু প্রাণপ্রতিমায় !
পড়িল শেষের ঘণ্টা ; আসিলাম ফিরে
কাশীর যাত্রীর গাড়ী ছাড়ি’ গেল ধীরে
দেবভােগ্য ভােগ বহি ত্যাগের শ্মশানে।
বিধাতার অভিপ্রায় বিধাতাই জানে।
তাই যা—এ জগতে কে না বল’ যায় !
সার্থক ত সেই যাত্রা, সভে যা বিদায়
আপনারে বিসর্জিয়া বিশ্বের বিধানে--
পড়িল দ্বিতীয় ঘণ্টা; আবােহিনু যানে।
•
তখন শেষের রাত্রি—ভােরের বাতাসে
সর্ব অঙ্গ দেহ মন হিম হয়ে আসে।
দৃষ্টি নাহি চলে চোখে ; হায়-হায়-হাওয়া
হাহাকারে হারাইয়া শেষ ফিরে পাওয়া ।
ও
৪২
নীহারিকা
অন্ধকার
অন্ধকার, ওগাে অন্ধকার ।
অসীমের রাজপাটে একেশ্বরী অয়ি বন্ধদ্বার,
নিবিড় নিকষ তব ঘনকৃষ্ণ চিকুরের তলে,
নিখিল উদাস-করা কালাে চোখে যে মাণিক জ্বলে-
নিশীথ বিরলে,
কোনােদিন কারাে কাছে মিলিল না সন্ধান তাহার
ব্যর্থ বসুধার,
অয়ি অন্ধকার !
বিদেশিকা হে অন্তঃপুরিকা,
চিরদিন উপেক্ষিছ অলােকের অন্ধ অহমিকা ;
দর্শন হইল অন্ধ, বিজ্ঞানের হ’ল জ্ঞান হারা,
ধ্যানের স্তিমিতনেত্রে অঝােরে ঝরিল বারিধারা,
খুজিয়া কিনার ;
ভাষার আভাষপাতে আঁকিবারে তব রূপচ্ছবি
চাহে মুগ্ধ কবি ।
৪৩
নীহারিকা
বিশ্বজয়ী অয়ি একেশ্বরী,
তােমার তিমিরদুর্গে জাগে ভয়—সতর্ক প্রহরী।
দ্বারে দ্বারে অজানার আতঙ্কেতে ত্রস্ত যাত্রী সব,
পথে পথে অচেনার আশঙ্কার আর্ত কলরব
ভীষণ-ভৈরব ;
কুহুনিশীথিনী তার কাকপক্ষ অন্ধ পাখা দিয়া
রাখে আগলিয়া।
;
হে অজানা-ওগাে অন্ধকার,
যা-কিছু জানি বা চিনি, তারাে মর্মে তব অধিকার ?
খনিগর্ভে গিরিগর্তে বনমধ্যে সমুদ্রের জলে
তােমার বিজয়-চিহ্ন প্রতি ছত্রে আঁকা ধরাতলে
সর্ব জলস্থলে ;
সীমা নাই শেষ নাই বাধা নাই-বসুন্ধরা কাপে
তােমার প্রতাপে!
হে অচেনা, হে চিরঅজানা!
মানবের মনােমাঝে কে খুজিবে তােমার ঠিকানা ?
কোথা ফুটে প্রেমপুষ্প কোন্ সে নিভৃত অন্তরালে,
কোথা ছুটে গন্ধ তার কোন্ রস-রহস্য-পাতালে,
কোন সন্ধ্যাকালে ;
চিকুহরের ফঁাকে পাকে-পাকে কত হিংসাবিষ
ফুসে অহর্নিশ !
৪৪
নীহারিকা
মােময় তােমার আলয়ে
সূৰ্য্য চন্দ্র কোনাে দিন দৃষ্টি তার হানেনাক ভয়ে ;
প্রগভের অন্তরালে রচিয়াছ তব রাজধানী,
ত্রিলােক যোগায় নিত্য নিদ্রারূপে পরাভব মানি’
রাজকর খানি;
মরণ-তােরণ-দ্বারে ডাক যারে, সেই শুধু যায়
তব পদচ্ছায় !
রঙ্গময়ি হে অবগুষ্ঠিতা !
তুমি কিন্তু ত্রিভুবনে হের নিত্য চিরঅকুণ্ঠিতা ;
বন্ধবাতায়ন পথে অপরূপ কালাে ভুরু হানি’
বাসনার হাত হতে খসাও উদ্ধত অসি খানি,
ওগাে মরাণি ;
লালসার বক্রদৃষ্টি নিবে তব সংক্ষুব্ধ নিঃশ্বাসে,
মৌন অট্টহাসে !
হে নিঃসঙ্গ, তবু ভাবি মনে
তােমারও ঈপ্সিত বুঝি আছে কেহ সুদূর ভূবনে !
বিরহ-বেদনা যার ধুমাঙ্কিত বাসনার ধূপে
ছাপিয়া হৃদয় তব চিররাত্রি জলে কালােরূপে
তমিস্রার শুপে ;
একবেণীধরা তুমি জাগ’ নিত্য নিশীথশয়নে
বিনিদ্র নয়নে।
৪৫
নীহারিকা
হে ব্যথিতা, হে অপরিচিতা,
তব রুক্ষ কটাক্ষেতে নিবে’ যায় দিবসের চিতা
সখী রাত্রি একা যাত্রী তােমার গহন কুঞ্জবনে
অপরাজিতায় ঘেরা, কোকিলের মৌন আলাপনে
জাগে তব সনে ;
তােমার বাঞ্ছিত সঙ্গী মৃত্যুঞ্জয় সৰ্ব্বভয়হারা
যােগে আত্মহারা ।
হে শরি, হে প্রলয়ঙ্করি,
তবু বর দেহ দেবী, এ জীবনে তােমারেই বরি।
জীবনের পূর্বপারে তুমি ছাড়া কে ছিল মা আর ?
মাঝে দুদিনের সেতু, আছ তুমি ঘেরি’ পরপার,
হে চির-আঁধার ;
তােমার অনন্ত রূপ চিনিবারে এ মর জীবনে
দীপ্তি এ নয়নে !
;
ওগাে মাতা, ওগাে অন্ধকার।
আলােকের অন্ধ শিশু-অক্ষমের লহ নমস্কার
কি ভাবে তােমারে ডাকি, শ্যাম শ্যামা তাই গড়ি মনে
তােমার অরূপ রূপ বাঁধিবারে সীমার বন্ধনে
চাহি প্রাণপণে !
অতুল সে কালেরূপে, ছায়াচ্ছবি তব প্রতিমার,
নমি বারম্বার,
অয়ি অন্ধকার !
SU
নীহারিকা
যুগ্ম অশ্রু *
(১)
অনামিকা
প্রত্যহ প্রত্যুষে উঠি’ কার নাম জপি মনে মনে,
কোন্ মূর্তি ধ্যান করি নিশি নিশি নিশীথ শয়নে।
বিশ্রামে কর্মের মাঝে কোন্ চিন্তা চিত্তখানি ভরি’
উতলা করিয়া তুলে জীবনের দিবস শর্বরী ?
দেবতা কি ? গুরু সে কি ? ইষ্টমন্ত্র সে কি গাে আমার ?
রত্ন কি সে? ধন কি সে? আরাধনা সে কি বিধাতার ?
রমণীর রূপ কি সে? যশের নিভৃত চিন্তা তা কি ?
নহে নহে, এ সবের মত নহে অত বড় ফঁাকি।
হেন কাম্য কি সে তবে--বাঞ্ছনীয় সবাকার চেয়ে ?
সে আমার—সে আমার—সে আমার ছিল ছােট মেয়ে !
বিধাতারও চেয়ে সত্য সে আমার ঐটুকু ইলা-
আত্মার আত্মীয়তম-অন্তরের গূঢ় অন্তঃশিলা।
কে বলে নাস্তিক আমি, কার সাধ্য বলে যে নাস্তিক
তবু বলি তার চিন্তা—সে আমার ঈশ্বর-অধিক।
সৰ্বপুণ্য চেয়ে বড়, স্বর্গ চেয়ে প্রিয় সে বিশ্বাস,
নয়নের সত্যদৃষ্টি, মরমের পরম নিঃশ্বাস !
* কবিয়ােগে
৪৭
নীহারিকা
দুদিনের সে আমার শাশ্বত ব্রহ্মাণ্ড চেয়ে বড় !
যাহা-কিছু শ্রেয় প্রেয়, সমস্ত হইতে গুরুতর ;
গুরু ইষ্ট সে আমার ; ষড়ৈশ্বৰ্য্য, অখিল জগৎ
তার কাছে তুচ্ছ, হেয়, অবজ্ঞেয় ভস্মমুষ্টিবৎ !
ঐটুকু ছােট পায়ে কতদূর গেল সে যে চলি’!
সেখানে যায়না যাওয়া ? সে পথ কি দিতে পার বলি?
যতই দুর্গম হােক-থাকো যদি কোথাও দেবতা,
ইঙ্গিতে অস্পষ্ট করে একবার বলো সেই কথা।
ভেবেছিনু বলিবনা, আমার যা, আমারি তা থাক্,
বজ্রে বাঁধি বক্ষতল রুদ্ধশ্বাসে ছিলাম নির্বাক।
কেন ফেলিলাম বলি’, কেন বলিলাম,-নাহি জানি,
মর্মন্তুদ শােক বুঝি মানেনাক সংযমের বাণী ।
বুক-ফাটা ব্যথা তার অর্থহীন শব্দরূপ ধরি
বাহিরায় অকারণে সরমে সঙ্কোচে নাহি ডরি’!
তেমনি প্রকাশ বুঝি হবে এর, অথবা প্রলাপ ;
কিম্বা হবে আর কিছু, নহে কিন্তু ছন্দের বিলাপ।
হাসিও না কাব্যামােদী, মহাকাব্য হ’তে যাহা বেশী,
তাহার কি ভাষা আছে ? ভাষা সে ত শব্দ বহির্দেশী।
অন্তর্গট যে বেদনা, তার কাছে সৰ্ব্ব ভাষা মিছে!
অ — বুঝি ভাষা তার, চক্ষে যাহা নিঃশব্দে ঝরিছে।
৪৮
নীহারিকা
(২)
কালাে
কথাটি তাের না ফুটতে আজ তাের কথাটি শেষ হ’ল যে কালাে,
শরতে তাই না শাঙন প্রদোষে ঐ ঢাকল উষার আলাে !
ধরেছিলাম সােণার হরিণ গলাটি তার জড়িয়ে মায়ার ফঁসে,
কোন্ বনে সে পালিয়ে গেল, ডাক এল তার কোথায় কোন্ আকাশে।
মনের মাঝে প্রাণের মাঝে চোখের কালাে, নিলি কি তুই বাসা,
একটি ফুয়ে নিবিয়ে দিয়ে হিয়ার বাতি, জীবন-রাতের আশা?
তুইত গেলি সমুখ থেকে, কালােত তাের পড়লনাক টাকা,
তােরি কালাে ছড়িয়ে আজি ভুবন যে মাের হ’ল কালীমাখা
যে আঁখিতে দেখায় আলাে, কালােবরণ তারি যেমন তারা,
সেই তারাটি হারা হলে বিশ্ব যেমন হয় সে আঁধিয়া ;
দেহ মনের সেই তারাটি কোথায় গেলি আমার আকাশ ছাড়ি’
কোথায় গেলি কালাে আমার কালাে করে মনের ঠাকুরবাড়ী ?
.
সেবায় বুঝি ত্রুটি ছিল, পূজায় বুঝি পড়ল কোথাও বাদ,
উপচারে অভাব কি সে, অর্ঘ্যে বুঝি ঘটল অপরাধ ।
তাই বুঝি আজ ছেড়ে গেলি, এঘর কি মা লাগল না তাই ভালাে,
দেবতা আমার ঠাকুর আমার লক্ষ্মী আমার, ওরে আমার কালাে।
৪৯
নাহারিকা
প্রত্যহ প্রত্যুষে দেখি, শয্যাখানি ছাড়ি’
অস্থির হইয়া উঠে যেতে তাড়াতাড়ি
নদীর কিনারটিতে; শুনিবেনা কানে—
বাড়ীতে নাওয়ার কথা—কেন সেই জানে।
বুঝিতে পারিনা আর, সেদিন গােপনে
লুকায়ে ব্যাপার তার হেরিং নয়নে।
ছয়মাস আগে তারি ছােট বােনটিরে
যেখানে করেছি দাহ জাহ্নবীর তীরে,
ঠিক তারি পাশটিতে চুপ করে চেয়ে
হেরিলাম এক দৃষ্টে বসে আছে মেয়ে!
মৌন কঠে নাহি বাণী, চক্ষে নাহি জল,
বিসিত ব্যথিত দৃষ্টি বুঝি সে কেবল
খুজিয়া দেখিতে চায়, কি করিয়া ধূলি
কোথায় রাখিল তারে লুকাইয়া তুলি।
ভপাশে ফুলমালামূর্তিমতী শােক,
বুঝিলাম গঙ্গাত্মানে তাই এত ঝোক !
বহুদিন পরে চোখে ফিরে এল জল,
জাহ্নবীর ভরা আঁখি করে ছল ছল ।
নীহারিকা দেশবন্ধু হায় অভিশপ্ত দেশ, তােমারে কি দিব আর দোষ। সমগ্র জাতির পরে বিধাতার পুঞ্জীভূত নােয- সহ বর্ষের পাপ—এক জন্মে লুপ্ত কভু হয় ? দেবের অসাধ্য যাহা, মানবের সাধ্য তাহা নয়। তাের যে তেত্রিশ কোটি, লক্ষ রূপ, লক্ষাতীত মত, এ নহে সগরবংশ—কি করিবে একা ভগীরথ ? শঙ্খ মুখে ফুকারিয়া প্রাণ সে ত করিলা অর্পণ, তবু জাগিল না ভস্ম, কলঙ্কের হ’ল না তর্পণ। হায় দুর্ভাগিনী মা, কি পুত্ৰই ধরেছিলি বুকে, ধৰ্ম্ম একা জানে তারে মর্মে তার বাক্যহীন মুখে। কেহ চিত্তে কেহ বিত্তে কেহ দানে কেহ বা কল্যাণে কেহ ভােগে কেহ ত্যাগে কেহ বীর্যে কেহ বা সম্মানে, নানারূপে নানাভাবে আপন সঙ্কীর্ণ দৃষ্টি ভরি’ দেখেছে তাহারে লােকে আপনার মনোেমত করি’ কিন্তু কোথা উৎস তার, উৎসব যাহার দিকে দিকে, অন্তর্যামী জানে শুধু অন্তরের গুপ্ত ধনটিকে। কোন্ গৃঢ় প্রকৃতির বহিমুক্ত বিচিত্র বিকাশ, শতধারে আপনারে শক্তিরূপে করে প্রকাশ।
নীহারিকা
বিচিত্র এ চিত্ত-কাব্য! কল্পনা আপনি মানে হারি,
একাধারে ভীমকান্ত-সহজে বুঝিতে নাহি পারি।
শাবকের ওষ্ঠপুটে বিগলিত করুণার ধারা
স্তন্যরূপে পিয়াইয়া যে সিংহী আনন্দে আত্মহারা,
সেই মূৰ্ত করুণাই মুহূর্তে প্রচণ্ড রূপ ধরি’
শত্রুর উদ্ধত শিরে উদ্যত হিংসার বজ্রে পড়ি
মিটায় শােনিততৃষ্ণা—দুধে রক্তে তীব্র মাখামাখি,
মমতার মর্মনীড়ে পালিত উদগ্র বাজ পাখী।
ভীষণ এ ভালবাসা—চক্ষে বহে অশ্রুর নির
তারি কণ্ঠে বজ্র বাজে, তারি হন্তে উগ্র ধনুঃশর?
তাই আজি মনে হয়, কেমনে পারিলে প্রাণ দিতে
নিতান্ত সহজে তুমি অনায়াসমধুর ভঙ্গীতে !
হে বীর হে দেশবন্ধু সৌম্যকান্তি হে চিত্তরঞ্জন,
তৃষার্ত দেশের চিত্ত—ভারতের নয়ন অঞ্জন!
ঐ ক্ষুদ্র মরদেহে এত প্রাণশক্তি ছিল কোথা,
লতিঘ’ দেশ দেশান্তর জাগাল যা জীবন-বারতা
মুমুষু মানব মর্মে ! জ্বলন্ত পাবন বহ্নি শিখা
আঁধারে আলিলে দীপ জীবনেরে করিয়া বর্তিকা !
কে বলে জ্বরের দাহ? দীপ্ত প্রাণ অগ্নিগর্ভ তেজে
পেয়ে ইন্ধন তার আপনারে ভস্ম করেছে যে!
৫৪
নীহারিকা
কে বলিবে মৃত তুমি—অমৃত কাহারে হবে বলে ?
যে পাথেয় সঙ্গে লয়ে মর্তের মানবযাত্রী চলে,
তাহারি সন্ধান বহি’ যুগে যুগে আসিয়াছ তুমি-
কালে কালে পদস্পর্শে পুণ্যময়ী করি’ মর্ত্যভূমি।
আবার আসিবে তুমি, তাও জানি নিশ্চয় নিশ্চিত,
ব্যর্থ হইবার নহে তােমার ও অঙ্গুলি ইঙ্গিত।
কে তুমি বলিবনাক—কে তুমি যে দেশ নাহি জানে,
তার কাছে সত্য মিথ্যা, চিত্তশক্তি লুষ্ঠিত সেখানে ;
সুন্দর সেখানে স্নান-আত্মা তার নহে মৃত্যুঞ্জয়
তােমার মাভৈঃ মন্ত্র কভু তারে দিবে না অভয়।
নীহারিকা
যুগাবতার চিত্তরঞ্জন
সেদিন দুৰ্যোগ রাত্রি, তুমি গেলে চলে,
যাবার সময় কারে কিছু নাহি বলে’!
-এ কেমন রীতি বন্ধু, সারা দেশ যারে
ধ্রুব নক্ষত্রের মত মানি’ পারাবারে
যাত্রা করেছিল সুরু অন্ধকার রাতে,
তাদের অর্পিয়া গেলে আজি কার হাতে ?
দেশ যার অস্থি মজ্জা, দেশ যার প্রাণ,
সৰ্ব্ব ধৰ্ম্ম চেয়ে বড় দেশের সম্মান
যার কাছে—সেই দেশ তেমনি ধিক্কত
রহিল পড়িয়া পিছে, তেমনি নিজ্জিত
নীহারিকা তুমি ছেড়ে চলে গেলে বন্ধু হয়ে তার, বিশ্বাস না হয় এই বিস্ময়-ব্যাভার। -তাই নাকি? স্বর্গ হ’তে অমৃত সন্ধানে তােমার এ মহাযাত্রা তাহারি কল্যাণে ? তাই হাে–দারুণ এ বিয়ােগের ব্যথা সার্থক তােমার পুণ্যে হউক সৰ্বথা। মােরা রব পথ চাহি’ শােক মনে, সাধিয়া সংযম নিত্য সৰ্ব আচরণে আচারে বিচারে কাৰ্য্যে, পূর্ণ মমতায় সৰ্ব্বজনে বক্ষে টানি’ আত্মীয় ব্যথায় ; তব প্রিয় কাৰ্য হােক আমাদের প্রিয়, তােমার নির্ভয় শান্তি সমাচরণীয় হউক সবার প্রাণে ; অরি’ তব মুখ বাঁধুক বিপুল বীর্যে বারাে কোটি বুক যতদিন দেশবন্ধু নাহি আসে ফিরে যুগান্তের নববার্তা বহি’ নব শিরে। সেদিন আসিবে কবে ? এই দেখ বীর- আমরা ফেলিমু মুছি নয়নের নীর।
নীহারিকা
কবি চিত্তরঞ্জন
‘মালঞ্চ শুকায়ে গেছে
ফুটিবেনা আর বসন্তের ফুল ;
আগাছা আকন্দ শুধু
উঠিছে নিঃশ্বাসি’--অতীতের ভুল!
কাটার বেড়াটি আজি
ভাবে রুক্ষ মনে—একি হ’ল হায়,
কুটিল কটাক্ষ মাের
এতদিনে বুঝি ব্যর্থ হয়ে যায় !
নীহারিকা কে ছিড়িল ‘মালা’গাছি- ভ্রষ্ট ফুলদল পড়ে ঝরি ঝরি’ প্রিয় কণ্ঠে কি পরাবে- ভাবে তাই বসি’ ‘কিশাের-কিশােরী। ‘অন্তর্যামী জানে শুধু মুগ্ধ সে হিয়ার গােপন বেদনা, অতল পাতাল তলে কোথা ছিল তার নিভৃত সাধনা। সাগরের ডাক শুধু ভেসে আসে আজ ‘সাগর সঙ্গীতে, নাই নাই কবি নাই- হায় হায়-হাওয়া কাঁদে ধরণীতে। চিত্ত নাই, মন নাই-- প্রাণ নাই আর সংসারের কাজে ; অজানা বাঁশীর সুরে কথাটা তাহার ব্যথা হয়ে বাজে।
নীহারিকা বীর প্রয়াণ মৃত্যু করিয়া পণ মুক্তিসমর মহা সঙ্কটে, বাঙ্গলার সেই ভাগীরথী তটে আবার বাধিল রণ ! অদ্ভুত রীতি-নূতন প্রথায় চিরজয়ীদের কে ঐ হটায় ধাটি পরে ঘাটি জিনে; দুর্দম কে রে বিক্ষতাঙ্গ- ভঙ্গে ভাঙ্গি’ অরিতরঙ্গ জয়মালা লয় ছিনে’! সে দিনের মত রণ অবসান, কাল প্রাতে পুন বাজিবে বিষাণ সৈন্য শিবিরে ফিরে। বিজয়বাদ্য বাজে ঝম্ ঝম্ স্তম্ভিত অরি হেরি’ বিক্রম সেই ভাগীরথী তীরে। সহসা কে যেন সাথীরে শুধায়, সর্দারে কেন দেখিনা হেথায়— সর্দার কোথা ভাই ?
নীহারিকা
কোথা সর্দার! জয়বিল
বাহিনী পলকে ভয় নিশ্চল ;
—সর্দার ফিরে নাই।
অধীর,সমীর থমকিলা থির,
শান্ত তটিনী তরঙ্গ নীর,
আকাশের শ্বাস বন্ধ,
সহসা সমুখে তাশন মুখে
হেরিলা সকলে স্পন্দিত
বুকে,
আঁখিতারা নিস্পন্দ!
সর্দারে বহি’ উড়ে ধুমরথ,
লঘি’ কানন নদী পৰ্বত--
উৰ্দ্ধ আকাশ পানে ;
পবনে পবনে অট বােল,
গগন ভরিয়া উঠে হরিবােল,
কাপে নভঃ জয়গানে।
সন্ধ্যা-রবির অন্ত আবির
রঞ্জিত করি’ গঙ্গার তীর
আঁধারে আবরে বিশ্ব ;
সৈকাতার যেন কায়াহীন
ছায়াসম ধীরে তিমির বিলীন,
জড় নির্জীব দৃশ্য !
নীহারিকা
নাহি কোন গতি, নাহি যেন প্রাণ,
কর হতে খসে পড়েছে কৃপাণ,
যেন ছবিসম আঁকা,
শুধু হায় হায়, শুধু হাহাকার
উঠে শবাকার মুখে সবাকার,
ভীতি ও নিরাশা মাখা
হেন কালে সেথা সন্যাসী ধীর
মহাত্মা কোনও কহে গম্ভীর--
ভয় নাই শােক নাই ;
সেনাপতি তব যে কাৰ্য আজি
সাধিলা হেথায় বীর বেশে সাজি’
নাহি তার তুলনাই !
মর দেহ ধরি’ সে আজি অমর,
তাই নিল তারে বিধাতার বর
অমরের অমরাতে;
ত্যজ ক্ষণিকের এই দেহ-শােক,
অনুসর তার কীর্তি-আলােক
তারি মত নিঠাতে।
হের সে প্রাণের গভীর মর্ম
ভুলাইল চিরাচরিত ধৰ্ম্ম
এ মাের জীবন সাঝে
নীহারিকা
শুনি তার নব কৰ্ম্মের গীতা
বাণী মাের আজি সমুল্লসিতা
নবীন দীপকে বাজে!
দেশাত্মবােধ যজ্ঞের লাগি
শক্তির পথ লহ আজি মাগি
মুক্তিমন্ত্রে তার,
ঐক্যসূত্রে বাধ জনে জনে
৫
এক-এক-এক জপ মনে মনে
একান্ত অনিবার।
শুনি সেই বাণী সত্য মহান্
বিদ্যুতে যেন ফিরে এল প্রাণ
অচল সৈন্যদলে ;
বিদ্যুতে যেন ঝলি’ উঠে মুখ,
বিদ্যুতে যেন ভরি’ উঠে বুক,
বিদ্যুৎ চোখে জলে!
গৃহ বিশ্রাম ভুলি’ গিয়া সবে
আবার মাতিলা বিজয়ােৎসবে
স্মরি’ সর্দার নাম ;
অসাধ্য বুঝি হইবে সাধ্য,
সিদ্ধ হইবে চিরআরাধ্য
শক্তির অভিযান।
নীহারিকা
জগদিন্দ্র তর্পণ
ইন্দ্রপাতসত্য সে কি-মহারাজ জগদিন্দ্ৰ নাই ?
বীণাপাণি হে বাঙ্গেবি, সত্যবাণী তােমারে শুধাই ;
কাল ছিল, আজ নাই, এ রাজা ত হেন রাজা নয়-
সে যে মানুষের রাজা, সে ত নহে রাজ-অভিনয়।
এরি মাঝে কি বলিয়া সে কথা বুঝাতে যাব কারে?
জানি, ভেসে যাবে বাণী বেদনাবিল অশ্রুধারে
আজি এ তর্পণ-দিনে; কিন্তু তবু সত্য কভু নয়—
মহারাজ চলে গেছে। এ কথা কে করিবে প্রত্যয়
সত্যের শাশ্বত চোখে ! যারা বলে মহারাজ নাই,
কভু কোন দিন তারা মহারাজে চক্ষে চেনে নাই।
রাজার পােক ছেড়ে নিত্য রাজা এল এতদিনে,
অমর সিংহাসনে অজরার রাজ্য তার জিনে।
রাজসজ্জা চলে গেছে, কি হয়েছে ? যায় যদি যাক,
মানবের মহারাজা নিত্য-চিত্তে সঞ্জীবিত থাক।
দেহসজ্জা রাজা নয়, নহে রাজা রাজ-আড়ম্বর,
ঐশ্বৰ্য্য বিভব বিত্ত রাজা নয় রাজ-কলেবর ;
সত্যকার রাজচিহ্ন মানুষের মৰ্ম্মরক্তে আঁকা,
কালের দুর্গম দুর্গে উড়ে যার বিজয় পতাকা।
ভিখারীর ছেলে রাজা জগৎ দেখেছে বারবার,
আত্মার সে রাজটীকা বাহিরের ধারেনাক ধার
৬৪
নীহারিকা
কভু কোনাে দিন তরে, যুগে যুগে সাক্ষী তার আছে ;
তাই বিশ্ব নরমাঝে নররাজে নিত্য পূজিয়াছে।
জগতের জগদিন্দ্র মরিতে পারে না কভু আজ,
চিরন্তন রাজসূয়ে চিরন্তন সে যে মহারাজ।
দু’দণ্ডের রাজা হলে প্রাণের কাঙাল সে কি হয়!
লক্ষ্মীর দুলাল হয়ে চক্ষু তার চির-অশ্রুময়
কভু কি সম্ভব হ’ত? ভিখারীরে বাড়াইয়া কোল
ধরে কি সে রাজবাহ! চিত্তে তার নিত্য দেয় দোল
কাব্যের ঝুলনগীতি! বুভুক্ষিত ব্যথাতুর প্রীতি
উৎসারিয়া অকপটে জলাঞ্জলি দিত রাজনীতি !
দরিদ্র বান্ধবদলে করে সে কি আত্ম-পরিবার
আত্মার আত্মীয় বলি, বিসর্জিয়া আভিজাত্য তার !
ভবানী কি কথা-শেষ ? রামকৃষ্ণ সে কি ভস্মসার, ?
সমগ্র জাতির চিত্তে তাহারও যে উত্তরাধিকার ।
সে ছিল প্রেমের রাজা, বিধির অপূৰ্ব্ব পরােয়ানা
যে প্রেমের উচ্চতুচ্ছ আত্মপর থাকে না ঠিকানা
যে প্রেম ক্ষুদ্রের কাছে আপনারে ক্ষুদ্রতর করি
বিছায় প্রাণের রাজ্য সঙ্গোপনে সৰ্বদেশ ভরি।
সে যে এনেছিল বহি স্পর্শমণি শক্তি সুমহান্,
বিদ্যা বুদ্ধি জ্ঞানে গুণে সর্বত্র সমান মহীয়ান্।
সাহিত্যের দ্রোণাচাৰ্য, সঙ্গীত-শিল্পের গুণিরাজ,
দেশাত্মবােধের স্তম্ভ-তীব্র-জ্বালা অগ্নিগর্ভ বাজ ।
নীহারিকা
ঋষি-কবি রবীন্দ্রের “পঞ্চভূত” যার নামে গাথা---
সে কি শুধু রাজা বলি’, সে যজ্ঞের সেও যে উদগাতা ।
মমাঝে মরূদ্যান প্রকৃতির রম্য সে সৃজন,
রাজার প্রাসাদ-মাঝে ভাবের অপূর্ব বৃন্দাবন
আপন অমৃতস্পর্শে গড়েছিলে তুমি ব্রজনাথ,
রাজরাজেরে জিনি’ সখ্য-প্রেমে মিলাইয়া হাত
নিত্য সবাকার সনে—কোথা আছে তাহার তুলন?
সব চেয়ে সখা মােরে ভাসােবাসে, করিত কল্পনা
যে কেহ পেয়েছে সঙ্গ দিনেক বা দু’দণ্ডের তরে-
এর চেয়ে বড় কথা জানিনা ধরণী কোথা ধরে!
নরনাথে ভুলে যদি, ব্ৰজনাথে কে পারে ভুলিতে ?
অক্ষয় সে সিংহাসন জগতের চিরক্ত চিতে।
অস্ত গেছে ‘সন্ধ্যাতারা প্রভাতের শুকতারা মাঝে ;
অতিন্দ্রীয় বিশ্ববীণে নিত্য তার দীপ্ত সুর বাজে
অনন্ত অম্বর ভরি’; কেহ শােনে কেহ বা শােনে না ;
কেহ বােঝে অর্থ তার, সামান্য সঙ্কেতে মাত্র চেনা
অন্তরঙ্গ বন্ধু সম; মূকের
ইঙ্গিত-বাণী দিয়া
আত্মীয়-অন্তরতন্ত্রী মূচ্ছনায় বাঙ্গে যা করিয়া ;
তেমনি তােমার মাঝে পেয়েছি যে সূক্ষ্ম পরিচয়,
হে বন্ধু, জীবনে মাের কভু তাহা ভুলিবার নয়!
যােগে শােকে দুঃখে সুখে চিরদিন রহিবে তা গাঁথা
নয়নের সঙ্গে যথা অভিন্ন এ নয়নের পাতা।
t
নীহারিকা তবু তুমি চলে গেছ, ছেড়ে গেছ আমাদের আজ- সে কথা ভুলিতে নারি, হে অন্তরতম মহারাজ! অন্তরের মন্ত্রে বন্ধু, ভরে না এ বুকের জঠর, দেহের বিয়ােগ তাই মর্মন্তুদ লাগিছে কঠোর ধূলির এ মর-মর্মে ; ফিরে ফিরে শুধু পড়ে মনে সেই অনুগ্রহহীন আগ্রহ-উদ্যত আলিঙ্গনে ; ভাবে-ভরা চক্ষুপক্ষ্ম, প্রাণস্পর্শী সে সমবেদনা, সাহিত্যসঙ্গমতীর্থযাত্রাপথে সে সহচারণা সুদীর্ঘ দিবস লাগি; সুনিবিড় সেই ভালােলাগা, সুন্দরের আরত্রিকে কাব্যকুঞ্জে সেই রাত্রি জাগা । হে রাজেন্দ্র, হে সুহৃদ, হে কাঙাল, হে বন্ধুবৎসল, কি দিব তর্পণে আজি—দুই বিন্দু অন্তরশ্রুজল অর্পি উদ্দেশে তব, উর্দ্ধ হতে তাই লহ আজ, হে মাের হৃদয়বন্ধু, হে অন্তুরতম মহারাজ ! আজ তুমি কাছে নাই, এক সাথে কে কাঁদিবে আর শুনি’ এই কাব্যকথা—তাই মনে পড়ে বারেবার।
নীহারিকা
কাশীতে চন্দ্রগ্রহণ
৮ই ফান, ১৩৩০
মানবের স্রোত মিলিল আসিয়া গঙ্গার স্রোত সাথে,
তেরশ-তিরিশ মাঘীপূর্ণিমা রাতে
এ নব মিলন কর দরশন ওরে মন যােড়-হাতে !
গঙ্গা-যমুনা অসি ও বরুণা কত-না যুক্তধার--
গলিতকরুণা যেন বা সে বিধাতার,
কত-না তীর্থরূপে ভারতের রচিলা কণ্ঠহার !
নীহারিকা
হেন অপরূপ সঙ্গম তবু কভু ত ভাবিনি মনে,
বারাণসীপুরে আজি এ শুভক্ষণে
হেরিলাম যাহা পরম পুণ্যে তৃষার্ত দু’নয়নে।
জনধারা আর জলধারা আসি’ মিলিল যে মহিমায়
যােগীশ্বরের জটিল জটাচ্ছায়,
নূতন রসের সে পূত পাথারে ভুবন ভাসিয়া যায়।
তল-তল-তল ছল-ছল-ছল কল-কল জলধারা
গােমুখীর মুখে গঙ্গোত্রীর ঝারা
ভক্তের লাগি’ পতিতপাবনী নামে টুটি গিরিকারা।
দেশ-দেশান্ত আগত পান্থ করি প্রাণান্ত পণ
তারি সাথে আজ সঙ্গত দেহ মন,
তপ্ত শীতল, রক্ত ও জল, অলক্তচন্দন !
কে কারে আজিকে করে পবিত্র, ভক্ত কি ভগবান,
কার লাগি’ কার আজিকার অভিযান ?
ওরে মন এই যুগ্মধারায় করে নে পুণ্যস্নান।
রাহুগ্রস্ত পূর্ণচন্দ্র আবার উদিল ধীরে
বারাণসীপুরে নরগঙ্গার তীরে,
ভারতের শশী কবে সে আবার হাসিবে এমনি ফিরে’?
নীহারিকা
আগমনী-বিদায়
মাথার কিরে—বনা তােরা, শুছি যাহা, সত্যি তা কি ?
ভােরের মুখে খবর পেলাম—মা ফের ফিরে আসছে নাকি!
একটু আগেই অরুণ-আলােয় শিউলি ফুলের গন্ধ দিয়ে
বলে’ গেল—চা তােরা আবি মাকে সঙ্গে নিয়ে।
সময় ছিল এমন কথায় উড়ে যেতাম উধাও হয়ে,
মনােরথে কৈলাশ হ’তে আন্তে মাকে বঙ্গালয়ে
দেবদারুর ছায়াপথে ছড়িয়ে বনফুলের রেণু,
ওষধিতে জ্বালিয়ে বাতি, কীচকবনে বাজিয়ে বেণু,
কাশের চামর দুলিয়ে পথে শরৎ আসার সাথে সাথে
মাকে ফিরে আনতে ঘরে জাগত পুলক প্রাণের পাতে।
;
৭০
নীহারিকা
আজ সে কথা ভাতে মনে সুখের চেয়ে ব্যথাই বেশী,
কার ঘরে আজ ডাব কারে, বুঝবি নাকি মুক্তকেশী ?
হিমগিরি—নিঃস্ব সে আজ, মা মেনকা শূন্য ঘরে
কি দিয়ে আজ তিনদিনই বা মেয়েরে তার আদর করে ?
যে পিতা তার ভুবন-রাজা, যে মাতা তার ভুবন-রাণী,
তারা যে আজ শক্তিহারা ভিক্ষুকেরও অধম জানি।
বড় ঘরের কন্যা ছিল, আজ কি সে ঘর তেম্নি আছে-
পূর্ব দশা ভেবে তারা মরণ হলে হয়ত বাঁচে!
তুই বা কেন আসবি মাতা, দেখবি কি আর বাপের ঘরে?
দেখবি এসে সবাই যে তাের শ্বশুর বাড়ীর ধারা ধরে ;
দেখবি সেথায় শূন্য শ্মশান ভিক্ষা ছাড়া বৃত্তি নাহি,
ঘরে ঘরে দিগম্বরের শিশুরা সব দেখবি চাহি;
দুর্দশা আর দুর্গতিতে দুর্গে আজি দুঃখীদলে,
ভূতের মতন পাগল হয়ে বেড়ায় তােরি ভবনতলে ।
আসিনে মা, আসিনে মা, আসি যদি এবার তারা,
দেখবি পথে আল্পনা নাই, নয়নধারার বােধনঝারা,
হাহাকারের হাওয়ায় ঘেরা রাজ্য এ যে প্রেতের বাসা,
নাই সে হরষ, নাই সে প্রীতি, নাইকো আশা নাই সে ভাষা;
আনতে যদি পারিস আবার আগের মতন হরষ হাসি,
তবেই আসিস, নইলে তােরে চাইনা মােরা সর্বনাশি !
৭১
নীহারিকা
জন্মাষ্টমী
1
এমনি বাদর রাত্রে ঘন ঘাের ভাদর দুর্দিনে
সমুদিত কৃষ্ণচন্দ্র অন্ধকারে পথ চিনে চিনে
ধরণীর অন্ধ ভালে, মুক্তালােকে দিগন্তর ভরি’
বন্ধন-বিক্ষুব্ধ রুদ্ধ ক্রন্দনের ধ্বনি অনুসৰি।
এমনি দুৰ্যোগ রাত্রে দপিতের সর্ব দর্প নাশি’
নির্যাতিত বন্দীবাসে ফুটাইয়া আনন্দের হাসি
খামচ দিলা দেখা হরিবারে অন্ধ শিলাভার
হাসিল নিখিল পৃথী দাম্ভিকের হেরি’ সে ধিক্কার
--সেদিন কি কথা-শেষ ? হাসিবেনা আর কিরে ফিরে
মুক্তির বিমল দীপ্তি তমসার ক্ষুব্ধ বক্ষ চিরে ?
আসিবেনা চক্ৰহাতে আর কি সে নর-নারায়ণ
শাসিতে কংসের বংশে-নাশিতে এ ব্যথার বন্ধন।
দিকে দিকে শসে বসু, দেশে দেশে দৈবকী যে কাঁদে
কোথা তুমি আসখা বিলখিছ কোন অপরাধে ?
•
৭২
নীহারিকা
নীলকণ্ঠ
মহাসমুদ্র মন্থনে আজি উঠেছে কেবলি বিষ,
ওরে বুভুক্ষু ওরে ও পিয়াসি, আয় যেথা যে আছিস্ ;
দ্বন্দ ভুলিয়া আয় তােরা—তাই নেরে অঞ্জলি ভরি’,
বক্ষের আলা ঘুচিবে তােদর দুঃখের শর্বরী।
আজি মন্থদণ্ড দণ্ডই
শুধু,
মন্দার আর নাই,
শেষের বদলে অশেষ দুঃখ বরণ করিয়া তাই,
দেবতা দানব অভাবে মানব মিলেছি পরস্পরে
লক্ষ্মী উঠেনি তাই ত এবার লক্ষ্মীছাড়ার করে ;
নাই সুধাশশী নাই কৌস্তুভ, নাহি সে হস্তি হয়,
এবারে কেবলি বিষের ভাণ্ড—সর্বনাশের জয় !
•
আজি ভারত-সাগর মন্থনে তাই মিলিয়াছে শুধু বিষ—
আয় উপবাসি আয়রে পিপাসি পীড়িত অহর্নিশ
কে আছে কোথায় শিবের মতন অশেষ দুঃখভাগ,
আয় ছুটে আয় বিষের নেশায় আয়রে সর্বত্যাগী ।
শ্মশানে করিবি আসন আয়রে শবেরে করিবি সাথী
কে কোথা আছিস অস্থির মালা নেরে নে কণ্ঠ পাতি
নীলকণ্ঠের মত হলাহল নিঃশেষে করি’ পান
অপাওয়া অমৃতে নিখিলের হিতে করে’ যারে আজ দান ;
ভয় নাই ওরে নিঃস্ব, তােদেরি পিতা মৃত্যুঞ্জয়
মৃত্যুরে দলি’ চরণে বিশ্ব করিয়া গিয়াছে জয়।
।
নীহারিকা খেলা ফানের অপরাহ্ন। সঙ্গীহীন। মুক্ত বাতায়নে বসে আছি আঁখি মেলি’ সম্মুখের কুটীর-প্রাঙ্গনে নিষগাছটির দিকে। দক্ষিণের সুমন্দ বাতাসে কচি কিশলয়গুলি দুলিতেছে পরম উল্লাসে হিন্দোল-দোদুল ছন্দে। ভিন্ন রীতি দুটি সঙ্গী মাঝে প্রকৃতির বক্ষ ভরি’ অপরূপ মৌন বীণা বাজে। সহসা পড়িল নেত্ৰ তারি মাঝে বৃক্ষতলদেশে প্রতিবেশী জেলেদের দুরন্ত ছেলেটি নগ্নবেশে তারি মত হৃষ্টপুষ্ট কৃষ্ণ এক ছাগ শিশুসাথে খেলিতেছে মহানন্দে গ্রীবাটি বেড়িয়া দুটি হাতে ; কি আগ্রহে কি আনন্দে দেয় চুমা এ উহার মুখে, সেও ফিরাইয়া দেয় সে সােহাগ অপূৰ্ব্ব কৌতুকে! জননী নিকটে নাই, কাজে ব্যস্ত বুঝি গৃহকোণে, দ্বিধাহীন শিশু দুটি খেলে তাই আপনার মনে! অন্ধকার নেমে আসে। একা বসে ভাবিতেছি তাই- সত্যই কি প্রকৃতির আনন্দের কোন বাধা নাই । মানুষের অহঙ্কার সত্যই কি সীমারেখা টানি’ পরস্পরে দূরে রাখে রচি’ তার ভেদগণ্ডী খানি। ৭৪
নিহারীকা
প্রান্তর পথে
চলেছি প্রান্তরপারে সরু এক আলিপথ দিয়া,
হেমন্তের হিম বায় বহিতেছে কাপিয়া কাপিয়া
সরণি সঙ্কীর্ণ অতি--একজন কোনাে মতে ধরে,
দুটি পাশে পাকা ধান ধীরে ধীরে করস্পর্শ করে
পঞ্জরে ও বাহু পাশে স্বর্ণ-আভা শস্যশীর্ষভাগে—
শিরশির করে অঙ্গ প্রগর্ভ সে পরশসসাহাগে !
অপরাহ্ন মুদে আসে সায়াহ্নের আলিঙ্গনপাশে,
চেলাঞ্চল শস্যক্ষেত্রে গােধূলির লগ্ন নেমে আসে।
ফিরিতে পথের মােড়, সহসা সম্মুখে দেখি চেয়ে,
বিপরীত দিক হতে আসে এক কৃষাণের মেয়ে---
শিরে আটি, কাস্তে-হাতে, দ্রুতগতি, মুখে মৃদু গান,
নিটোল ডাগর কান্তি, বর্ণ ওই ধানেরই সমান।
একেবারে মুখামুখিচকিতে গুঞ্জন গেল থামি,
চারু দন্তে জিহ্বা কাটি ধীরে ধীরে পথ হ’তে নামি’
সম্বরিলা বরতনু বক্ষস্পশী শস্যমাঝখানে ;
ঈষৎ লজ্জার রাঙা হাসিতে চাহিয়া মাের পানে।
পলকের কাণ্ড মাত্র। মুহূর্ত কাপিয়া দেহমনে
বাধাহীন পন্থা বাহি’ আবার চলিনু অন্যমনে।
৭৫
নীহারিকা
ঘােড়ষী না সপ্তদশী, ঘরে তার কে আছে না জানি !
একা ফিরে ধান কাটি,
-কতদূরে হবে গৃহখানি !
কি গান গাহিতেছিল, বিরহের অথবা প্রীতির,
কিম্বা কোনাে গ্রাম্য ছড়া, ছিন্ন অংশ স্বদেশ গীতির
কতদূর গেল চলি’—এ পথে ফিরিবে না ত আর ?
চিরাভ্যস্ত মুক্তচারী, তবু কেন হাসিটি লজ্জার।
;
সন্ধ্যার অস্পষ্টীলােকে প্রান্তরের পর দেখা যায়,
সমুজ্জ্বল শুকতারা জ্বলে উঠে মাঠের মাথায়।
পথ হয়ে আসে শেষ, ধান্থক্ষেত্র পড়িয়া পশ্চাতে,
হেমন্তের সিক্ত বায়ু লাগে রিক্ত দেহের সীমাতে ;
একটানা দীর্ঘ যাত্রা, ভাবিবার নাহি আজ কেহ,
ঐ টুকু হাসি এই প্রান্তরের পথের পাথেয় !
নীহারিকা
১
তুমি ধরা কোনােদিন দিবেনাক, সে ত জানি,
তবু ধরিতে তােমারে ধরে রাখি এ জীবন ;
তাই বাতাসে বাড়ায়ে বাসনার বাহুখানি
আমি মেলে বসে থাকি মরমের দুনয়ন।
ওগাে চির-চাওয়া ওগাে অপাওয়া আমার প্রিয়া ---
জানি তোমার আমার মিলন বন্ধু, মরণের পথ দিয়া।
ঐ সন্ধ্যার হাতে হাতটি লুকাবে বলে
হের প্রভাতের সাধ ফুটিছে দিনের দাহে,
তার মুগ্ধ আঁখিটি মুদিতে আঁধার কোলে
সে যে পলে পলে পলে মরিয়া বাঁচিতে চাহে ;
জাগে সন্ধ্যার আঁখি রাত্রির বাতায়নে
যবে সকালের চাওয়া মিলায় আঁধার মৃত্যুর আবরণে !
ওরে তবু চাই তােরে তবু তােরে চাই প্রিয়া--
জানি পাব একদিন চির-চাওয়া আর না পাওয়ারই পথ দিয়া।
৭৭
নীহারিকা
করবী
প্রভাতের মন্দ বায়ে মুখটি তুলে
করবি, বলতে কি চাস্ ঘােমটা খুলে
ওলাে ও রঙ্গভরা,
ছি ছি আজ পড়লি ধরা
অরুণের রূপের হাটে লজ্জা ভুলে’!
৭৮
নীহারিকা
আরাে ত পাড়ায় তাের ঐ গুঝে গাছে-
চেয়ে দেখ একবয়সী অনেক আছে ;
কেহ বা পল্লব আড়ে
লুকিয়ে ঘাড়টি নাড়ে,
বড় জোর স্বপ্ন দেখে হাওয়ার কাছে।
চাঁপা, যে উচ্চকুলের স্বর্ণরাণী,
তাররা কি অম্নি খােলা আননখানি ?
সেও দেখ, শাখায় পাতায়
লুকিয়ে গন্ধে মাতায়--
তারাে ত তাের মত নয় মনজানানি
গরবি, তােমায় তবু ভালােই বাসি,
হেরি তাের মনমাতানাে মুখের হাসি ;
জানি যে আপনা-ভােলা,
সে যে হয় ঢাকনা-খােলা,
জানি সে সকল ভুলে’ হয় উদাসী
করবি, তাই তােমারে ভালই বাসি।
*
৭৯
নীহারিকা
ভুইচাপা
ভুইচাপা, তুই ভুয়েই ফুটে’ লুটিয়ে থাকি ভুয়ে-
তােরে হেরে চিত্ত আমার পড়ছে নুয়ে নুয়ে !
নীল আকাশের আলাের পরশ
নীলচোখে তাের বুলাক হরষ
মাটীর কোলের মায়া তবু থাকুক্ তােরে ছুয়ে।
স্বর্ণচাপা বাড়া বাহু ঊর্ধ আকাশপানে,
ধরার ধরা এড়িয়ে চলুক মন যদি তাই মানে !
করুণ চোখে অরুণ সাথে
দৃষ্টি মিলাক, দিনে রাতে,
গভীর রাতে জানা প্রতি চাদের কাণে কাণে।
তুই হেথা থাক্ তৃপ্ত হয়ে মৃত্তিকা মার বুকে,
মায়ের মধু রসের ধারা লেগেই থাকুক, মুখে ;
তারি মতন পায়ের নীচে
তারি মতন সবার পিছে
থাকুকুরে তাের আসনখানি সর্বহার সুখে।
নীহারিকা
নেবু-ফুল
ছােট্ট নেবুর ফুলটি আমার, ছােট্ট নেবুর ফুল
স্বর্ণ উষার কর্ণভূষার বর্ণ তুষার দুল।
চত্রধবল সরস কান্তি
চন্দনজল পরশ শান্তি,
মন্দমারুত বন্দনারত গন্ধ তব অতুল !
ছােট নেবুর ফুল
সন্ধ্যামুখের সৌরভী ভাষা,
বন্ধ্যা বুকের গৌরবী আশা,
গুপ্ত প্রেমের সুপ্ত পিয়াসা, বিরহের বুলবুল।
ছােট্ট নেবুর ফুল
প্রথম প্রীতির সুমধুর স্মৃতি—ব্যথাভরা দুটি ভুল।
গন্ধপুরীর রাজকন্যার হীরার কর্ণদুল।
ছােট
নেবুর ফুল,
মুগ্ধ হিয়ার মন্দির তােরি মন্তরে মণ্ডল।
নীহারিকা
নববর্ষ
শ্যামগম্ভীর নব মেঘে আজি উঠে বাজি’ মৃদু মৃদুঙ্গে
ডিমি ডিমি ডিমি ডিমি,
ধারামঞ্জীরে নভ-অঙ্গনা সঙ্গত করে সে সঙ্গে
রিমি রিমিঝিমি ঝিমি ;
উতলা পবন বিদ্যুতে সাজি’ তারি তলে নাচে তর্জিয়া
গুরু গুরু গর গর,
রুদ্র বেতাল তারি ফাকে হাঁকে বজ্ৰ নাকাড়া গর্জিয়া
কড় কড় হর হর!
সিন্ধু সরিৎ সাথে মাতে সেই আনন্দে,
দিগদিগন্ত পাছে পাছে নাচে সে ছন্দে,
মত্ত কানন বৃষ্টিসঘন সুগন্ধে
উঠে উদ্দাম হয়ে ;
নাচে শাল তাল নারিকেল নাচে সে রঙ্গে,
গিরিনির ভরে সুর তার সারঙ্গে,
মত্ত ময়ূর নাচে জলদের জভঙ্গে
ভুজঙ্গে সাথে লয়ে।
লােক ভূলােক পুলকে মাতিয়া তারি তাল তুলে উচ্ছাসি
জল-তরঙ্গে আজি,
মেঘমল্লার নটনারায়ণ তারি সুর তুলে উদ্ভাসি’
কোমলে কণ্ঠ মাজি’ ;
৮২
নীহারিকা
ছন্দে ছন্দে হিন্দোল উঠে কদম্ব ফুটে ইঙ্গিতে,
দুলে উঠে রস-দোলা,
মানবচিত্তে জাগে সে নৃত্য ঝর ঝর স্বরসঙ্গীতে
সকল বাধন খােল ;
নরনারীহিয়া কেঁপে উঠে বাহুবন্ধনে,
বাদলের ছায়া ঘনায় মিলননন্দনে,
পুলকের ব্যথা বাহিরায় ফাটি ক্রন্দনে
বরষার ধারা সাথে;
আষাঢ়ের এই ঘন ছায়া ঘেরা মন্দিরে
তারি সুর বাজে উতলা মনের মঞ্জীরে,
অন্তরতলে লুটায় এ কোন্ বন্দী রে
বাণীহীন বেদনাতে !
সুর-ভগীরথ কে সে সন্যাসী মেঘের শঙ্খ ফুৎকারি’
ধারা-গঙ্গায় আনিল ধরায় ধরিয়া ।
মরা নিখিলের বিপুল ভন্মে মাভৈঃ মন্ত্র উচ্চারি’
সঞ্জীবনীর অমৃত কে দিল ভরিয়া ?
মৃত্যুঞ্জয় সে নটনাথের তাণ্ডব-নাচা অভয় চরণ তলে
কদকেয়াকূটজ-অর্ঘ্য বিরচিল কবি বরষার ধারাজলে।
নীহারিকা
শ্রাবণে
শাওন মেঘের ছােপ লেগেছে শালের বনের শিরে,
শ্যামলতার ঢেউ উঠেছে সারা কানন ঘিরে’!
শাখায় শাখায় আকুলতা
তাই চাহে আজ কইতে কথা-
বরষভরা নীরবতার নিবিড় ব্যথা চিরে।
কালাে কাজল পরশমাখা সজল হাওয়া লেগে
পাতায় পাতায় ঝলকভরা পুলক উঠে জেগে !
গুরু গুরু মধুর বাণী
কাঁপায় তাহার পরাণ খানি,
রোয়ায় রোয়ায় শিউরে’ তুলে ব্যাকুল বনানীরে !
ভাবছে মনে ঝরঝরিয়ে ঝরবে কখন ধারা,
সফল করে’ সকল বেদন সাধন হবে সারা !
যে মিলনের মধুর প্রেমে
উচু আসে আপনি নেমে
সেই মিলনে বাজবে দুয়ে বিচিত্র একতারা।
৮৪
নীহারিকা
শরতে
আজি জলে-ভরা ভাদ্রের চোখে
শরতের দিঠি জ্বলে,
মিগ্ধ করুণ আর্দ্র আলােকে
আঁকিয়া জলে স্থলে ;
হাসি হাসি আর কান্না কান্না
হয় হীরা নয় জানি তা পান্না,
এ যে অসহন মর্মবেদনে
চাপিবার শুধু ছল ;
এ হাসির চেয়ে শতবাঞ্ছন
বাদলের আঁখিজল !
হাকারে-ঘেরা শােকের আগারে
রাজার অ্যুদয়
করায় যাহারে, পারে বা না পারে, ,
উৎসব অভিনয় ;
সেই বুঝে এর গভীর অর্থ,
আত্তি-কানাে প্রাণের তত্ত্ব
বিধবার মুখে বিলাস-লজ্জা,
প্রণয়ের সম্ভাষ,-
কুসুমের হারে সমাধি-সজ্জা
লুকানাে সর্বনাশ!
৮৫
নীহারিকা চির সুধাময় এই কি শরৎ- দিগ্বিজয়ের দিন । আজি না মুক্ত মিলনের পথ, ত্রিজগৎ দ্বিধাহীন ? যােগায় ধরণী ক্ষুধার খাদ্য, ঘরে ঘরে বাজে বিজয় বাদ্য, বরষার বারি সাথে নাকি শেষ নিরাশা-অন্ধকার ? এই কি শরৎ সুশুভ্র বেশ মূৰ্ত্তি সে ভরসার। এ যে দেখি, হায়, বােধনের মাঝে বাজে রােদনের ধ্বনি, বিসর্জনের বেদনা ভরা যে আনন্দ-আগমনী। বিকচ কুন কাশের আস্তে হাসে পরিহাস বিকট হাস্যে হাঁসের পাখায় বিধূনিত আজ আকাশের অন্তর ; আলাের আড়ালে আঁধারের বাজ গরজে নিরন্তর।
নীহারিকা
আর্ত-পীড়িত পর-পদানত
দুর্বল দীনহীন,
নিত্য-চকিত মৃত্যু-আহত
দিনে-দিনে ক্ষয়-ক্ষীণ,-
তার চোখে এ কি প্রাণের দীপ্তি,
তার মুখে এ কি হরষ তৃপ্তি,
অন্ধ আগার ভেদ করি’ তার
এ কি আলােকের শিখা,
উঠে বসে রােগী করি’ পরিহার
নিরাশার যবনিকা।
কোন্ উত্তরে হিমগিরিপারে
পড়িল গেহের সাড়া,
জাগিল লক্ষ বক্ষমাঝারে
মমতার মধুধারা।
মৃত্যুর বুকে অমৃত স্পর্শ
ফুটায় যেমন প্রাণের হর্ষ
টুটাইয়া দিয়া নিমেষের মাঝে
পুঞ্জিত অবসাদ ;
উথলিয়া উঠে অসাগরে
আলাের আশীর্বাদ।
নীহারিকা তাই আয় মাতা, আয় শারদীয়া শ্মশান-সাহারা মাঝে, দীর্ণ দলিত বক্ষে ঘ দিয়া বাজা না যে সুর বাজে ; আশায় রিক্ত ব্যথায় তিক্ত শত সংগ্রামে শােণিতসিক্ত- তবু তারি মাঝে দিব তাের পূজা জীবনরক্ত দানে, দশ হাতে তাই নে মা দশভূজা ভক্তের আহ্বানে। -
নীহারিকা
মাধবিকা
;
দখিন হাওয়া রঙিন হাওয়া নূতন রঙের ভাণ্ডারী,
জীবন-রসের রসিক বঁধু, যৌবনেরি কাণ্ডারী!
সিন্ধু থেকে সদ্য বুঝি আছ আজি স্নান করি’--
গাংচিলেদের পক্ষধ্বনির সন্নানির গান করি;
মৌমাছিদের মনভুলানি গুণগুণানির সুর ধরে’
চল্লে কোথায় মুগ্ধ পথিক পথটি বেয়ে উত্তরে।
লক্ষ ফুলের গন্ধ মাখি’ বক্ষ আঁকি’ চন্দনে,
যাচ্ছ ছুটে’ কোন্ প্রিয়ারে বাঁধতে ভুজবন্ধনে।
-
অনেক দিনের পরে দেখা, বছর-পারের সঙ্গী গাে,
হােক্ না হাজার ছাড়াছাড়ি, রেখেছ সেই ভঙ্গী তাে।
তেমনি সরস ঠাণ্ডা পরশ, তেমনি গলার হাঁটি সেই,
দেখতে পেলেই চিন্তে পারি, কোনােখানেই ফাকটি নেই।
কোথায় ছিলে বন্ধু আমার, কোন মলয়ের বন ঘিরে
নারিকেলের কুঞ্জে-বেড়া কোন্ সাগরের কোন তীরে।
ললকে সেই বেতসবীথির বলল ত ভাই কোন্ গলি,
এলালতার কেয়াপাতার খবর তসব মঙ্গলই ?
ভালাে কথা, দেখলে পথে, সবাই তােমায় বলে তাে,
বন্ধু বলে চিনতে কানাে হয়নি তাে সে সন্দেহ ?
৮৯
নীগরিকা
নরনারী তোমার মােহে তেমনি তাে সব ভুল করে
তেমনিতর পরস্পরের মনের বনে ফুল ধরে।
;
আসতে যেতে দীঘির পথে তেমনি নারীর ছল করা
পথিকবধুর চোখের কোনে তেনিতাে সেই জলভরা ?
যুবতীরা ডাগর আঁখির কাজল-লেখা মন্তর
আজো তাে সেই আগের মতন প্রিয়জনের মন হরে ?
পলাশ ফুলে হঠাৎ দেখে’ নখক্ষতের চিহ্ন কার
ঈষৎ হেসে কণ্ঠে বাঁধে পূৰ্বরাতের ছিন্ন হার!
রঙ্গনে সেই রং তাে আছে, অশােকে তাই ফুটছে তাে,
শাখায় তারি দুলতে দোলায় তরুণীদল যুটুছে তাে?
তােমায় দেখে তেমনি ডেকে উঠছে তাে সব বিহঙ্গ,
সবুজ ঘাসের শীষটি বেয়ে রয় তত চেয়ে পতঙ্গ ?
তেমনি-সবি তেনি আছে !-হ’লা শুনে’ খুসখুসী
প্রাণটা উঠে চৰ্চনিয়ে, মনটা উঠে উসখুসী!
নূতন রসে র হৃদয়, রক্ত চলে চঞ্চলি’,
বন্ধু তােমায় অর্ঘ্য দিলাম উচ্ছসিত অঞ্জলি।
গ্রহণ করাে গ্রহণ করাে বন্ধু আমার দণ্ডেকের
জানিনাক আবার কবে দেখা তােমার সঙ্গে ফের!
নীহারিকা
বাসন্তিকা
ওগাে ফাল্গুনি হাওয়া,
দিনেক দুয়ের অতিথি আমার, ওগাে এসে-চলে’-যাওয়া !
ক্ষণিকের তরে ভুলায়ে আমারে একি এ রঙ্গ সখি,
মাটীর কারায় বন্দীজনায় পরিহাস করিছ কি ?
ও তােমার পরশন
মর্মে মর্মে হানিছে আমার কদম্ব-হরষণ!
করি’ প্রাণপণ বাহু মেলে মন আকুল আলিঙ্গনে,-
ওগাে দেহহীন, দিবে নাকি ধরা প্রণয়ের বন্ধনে ?
হে পথিক পথবাসী,
খাঁচার পাখীরে কেন ডাকে তব নীল আকাশের বাঁশী ?
দেহের বাহিরে গতি নাহি যার, গৃহের বাহির করি
মরণের পরে কেন ডাকো তারে ওগাে চির-পথচারী।
D
১১
নীহারিকা
তব উপহাস সহি
ফুটিছে মুকুল টুটিছে বকুল ব্যাকুল বেদনা বহি’;
লুটি ফুলরেণু ফুকারিছ বেণু বনবীথিকার ফঁাকে,
মানুষের মন সে কি গাে তেমন, কেমনে বাঁচিয়া থাকে ?
কোন্ সে অচল মলয়ের বুকে কোন্ সে কুলারে বাসা,
সেথা কি জাগেনা জ্যোৎস্নাযামিনী চির-বিরহীর আশা।
ফুল পাখী অলি তারা
সবি কি সেথায় বিরাজে বৃথায় উদাসীন দিশাহারা ?
মৃত্তিকামর ব্যথাভরা বুকে বাসনার জাল বােনা,
দেওয়া-নেওয়া আর পাওয়া-থােওয়া দিয়ে জানাশােনা আনাগােনা
সবি যে কান্না-হাসি-
তুমি তার মাঝে চলিবে কি একা বীতরাগ সন্ন্যাসী ?
তাই যদি হয়, ওগাে নির্দয়, এ কেমন তব ধারা,
পরে কেন চাহ পরাতে বাঁধন নিজে বন্ধনহারা ?
পরশ-বেদনা দিয়া
পরখ করিতে চাহ, বেদনায় কেমনে বিদরে হিয়া।
দ্বারে বাতায়নে চাহি’ জনে জনে কেন কর’ ডাকাডাকি,
মৃদু সনসনে মাতাও সঘনে ব্যাকুল বনের পাখী !
ব্যথায় রাঙায়ে তুলি’
গন্ধ লুটিয়া পালাও ছুটিয়া পরিয়া ফুলের ধূলি ?
৫
নীহারিকা মিলনের বুকে বিরহ জাগাও, বিরহের বুকে ব্যথা মানবচিত্তে আণব নৃত্যে আনহ চঞ্চলতা ; সুধীরে সঁপিয়া দোল বিশখাতায় পাতায় পাতায় কেন তব হিন্দোল ? ওগাে দেহহীঅতিথি আমার, ওগাে ও পথিক হাওয়া! চির-নির্দয় কপট হৃদয়, ওগাে পেয়েও-না-পাওয়া ! বড় দুখে দিনু শাপ- চির-হায়-হায়-এ ফুরাবেনা কভু তব ও মনস্তাপ। నం
নীহারিকা
দোল
কে তােদর দোল দিল, তাই বল
ও তাল-খেজুর ও বেণুবন, নারিকেল্পের দল,
কে তােদর দোল দিল তাই বল
শাখায় শাখায় পাতায় পাতায়
অমন্ করে’ কে আজ মাতায়,
অচঞ্চলে করলে কে আজ উচ্ছল চঞ্চল ।
ওপার হতে আষাঢ় এল চিকণ কালাে বেশে
ইসারাতে সেই কি তােদর ডাক দিয়েছে হেসে ?
তারি হাওয়ার হাতছানিতে
জাগুল কি আজ আচম্বিতে
মর্মরিত শাখায় তােদের হরষ-কোলাহল।
আমার মনেও তােদের মতন অনি আকুলতা-
বুকের 'পরে আছড়ে মরে হিয়ার যত ব্যথা।
তােদের পাগল শাখার ঘেরে
আজকে আমায় জড়িয়ে নেরে--
অমনি করে’ দুলুক রে মাের পরাণ বিল।
৯
নীহারিকা
দোল যাত্রা
আজ
রংমহলের পরূদা কোথায় পড়ল যে খুলে’
রঙের ধারা লাগল রে তাই ধরার দুকূলে।
শুকননা শিমুল কাঁটায় ভরা
রং মেখে সেও পড়ল ধরা,
অশােক পলাশ হাস্ছে দেখে মনের বেভুলে!
কোন্ গহনে কোন্ সে কিশাের বাজায় বাঁশরী!
দুলছে সুরে বিশ্ব-জগৎ আনা পাসরি’ ;
দুলছে সাথে চক্রতারা
কালিন্দী-জল তন্দ্রা-হারা,
চিত্তমূলে উঠছে দুলে’ নিত্যকিশােরী!
দোলের মাদল উঠল বাজি’ তাই কি ফাগুনে।
ভুবন ভরি’ তাই এ মাতন রঙের আগুনে !
বনের মনে ফুলের মেলা
মনের বনে ভুলের খেলা
আজ সহসা জাল সে কার মন্ত্রণাগুণে !
কার সাথে আজ খেলব হােরী, কার সাথে বা নয়,
পিচকারীতে ছড়িয়ে প্রাণের রঙীন পরিচয়।
রং মেখে এই চাদনি রাতে
দুব খুসীর হিন্দোলতে
মরণ এলেও করব হেসে জীবন বিনিময় ।
নীহারিকা
একি দোল!
এ কি দোল, এ কি দোলা
অসীমের মহাকল্পবৃক্ষে সৃজনের হিন্দোল।
ল’ি অপার আঁধার সিন্ধু
দোলে আনন্দে আলাের বিন্দু,
দুলে’ ফিরে দোলা বিপুল ছন্দে, বন্ধন মাগে খােলা
এ কি দোল, এ কি দোলা।
দোলে দোলা নিশিদিন—
সম্মুখে পিছে দুলিছে কভুবা বাম হ'তে দক্ষিণ ।
সুৰ্য চন্দ্র গ্রহ তারা কি রে
উদয়ে অন্তে দুলে দুলে’ ফিরে,
জীবনছন্দ ফুটি’ আনন্দে টুটে ক্রন্দনলীন।
অনন্ত অনিবার,
দোলে মহাদোলা, করে দিক হতে দিগন্ত পারাপার ;
বিন্দু হইতে উঠে বামপারে,
ঝঙ্কার হতে ফিরে ওঙ্কারে
নিমেষ পরশি মিশে অনিমেষে, হাসি হতে হাহাকার !
৯৬
নীহারিকা
ঘরে ঘরে,
উড়ে দিস নীল কেশপাশ, ত্রাসে খাস সম্বরে ;
অসীম দোলায় মরণপন্থী
কসিয়া বাধিছে জীবন-গ্রহী
আয় আয় আয়, যায় যায় যায় শিঙারবে ব্যোম ভরে।
এ কি দোল এ কি দোলা,
সৃজনের মহাকাবৃক্ষে প্রলয়ের হিনলালা !
চলে দোল চলে দোলা;
প্রলয়ের মহাকক্ষে সৃজনের হিন্দোল।
গন্ধের দোলা ছনের দোল,
সিন্ধু সরিতে জাগে হিন্দোল,
ধমনীর স্রোতে ছুটে কল্লোল রাঙা আনন্দ পােলা-
সেলে সৃজনের দোলা।
কে তুমি দিতেছ দোল?
কাহারে বেঁধেছ বাহবন্ধনে, কে ভরেছে তব কোল!
নূতন করিয়া বাধিবারে কানে
দালাছলে দুর কর বারেবারে,
নিমেষের তরে হারায়ে কাহারে বাঁশী কা েউতরােল।
។
নীহারিকা ফাগুন সন্ধ্যাকাশে কার সাথে ফাগ খেল মেঘে মেঘে উচ্ছাসে উল্লাসে, অপােকে পলাশে কার অনুরাগ ফুটাইয়া তােলে সােহগের দাগ, রহনে ভরা রঙ্গটি কার সরমের রঙে হাসে? রসের রঙীন ঝরি চির অফুরাণ ভরিছে এ কোন্ আনন্দ- পিকারী? পরশের সুখে বাহু বিহ্বল, মনে মনে ব্যথা, চোখে চোখে জল, পরাণের মাঝে দোলে চঞ্চল কোন্ সে মিলনচারী। তাই হাে তাই হাে- মাতুক চিত্ত বিভল নৃত্যে বিস্মৃত ব্যথাশােক । প্রেম হিন্দোলে হৃদয় দোলাও জীবনের রসে মরণে ভােলা, মিথ্যার রঙে সত্য রাঙায়ে রচগাে স্বপ্নলােক ; তাই হাে তাই হােক- শাশ্বত দুখে ক্ষণিকের সুখে করে তােল সার্থক। ,
নীহারিক
বিপরীত
দখিনা হাওয়ার বিরহযাত্রা উত্তরা অভিযানে,
কোন্ সুদূরের উত্তর সন্ধানে ;-
মােরই প্রাণে তার বিপরীত গতি, হেরি সে পূরবকামী
যাত্রা তাহার যৌবনপথগামী।
ফুলের গন্ধ তাহারি পাখায় হয় বাতাের,
মন্দময়মন্থরগতি তার ;
মােরই প্রাণে তার ত্বরিত যাত্রা, পলকে ভরিয়া মনে
তড়িৎ-গতিতে ফিরে যায় যৌবনে ।
১৯
নীহারিকা
বউ-কথা-কও পাখীর কণ্ঠ মিলনেরই গান গায়
মৌন বধুরে মুখর করিতে চায় ।
মােরই কাছে তার বিপরীত রীতি, কণ্ঠ চাপিয়া ধরে-
বাণীহীন মুখে চোখে শুধু জল ঝরে !
চন্দনবাহী চন্দ্র-কিরণ আঁধারে দেখায় আলাে,
উজ্জল করি অন্ধ পথের কালাে ;
মােরি চোখে তাহা নিয়ে দৃষ্টি সৃষ্টির পথ ঢাকে,
ভিতরে বাহিরে অন্ধ করিয়া রাখে!
ফুল পাখী হাওয়া চন্দ্র-কিরণ-জানি দেবতার দাস,
তাদেরও হৃদয়ে কৌতুক অভিলাষ।
নতুবা কেমনে আমারি এ মনে বিপরীত রীতি তার,
নিত্যনিয়ত বাড়ায় বেদনা ভার।
নীহারিকা
ভঐ-কাব্য
==
প্রভাত হইতে ভদ্রপাড়ায় ঘুরে ঘুরে’ সারা বেলা,
হজম করিয়া হরেক রকম ভদ্র-আনার ঠেলা--
মুখখাস-পরাণ মােলাম মিথ্যা, বিনীত অহঙ্কার,
গরীবের পরে সহৃদয় ঘৃণা, ভণ্ডামি করুণার,
সন্ধ্যাবেলায় শূন্য
জঠরে এলাম রে তাের দ্বারে,
ওরে চাষা, তাের আগড়টা খােল, ঠাই দে পাওয়ার ধারে।
তরি ঘরে আজ রাতটা কাটাব কয়ে দুটো সােজা কথা,
ঠিক জানি, তুই চিরদুখী বুকে বুঝিবি আমার ব্যথা ;
যদি বুঝি, তাও তত বুঝিব, রহিবে না কোন গােল,
নহে সে মিথ্যা মাথা-নাড়া শুধু ভদ্র-আনার ভােল?
১০১
নীহারিকা
থাক থাক ভাই, ব্যস্ত হােন, কথাতেই হবে বেশ,
খড়ের বুদীটা ওই ত রয়েছে, ঘুম পেলে দেব ঠে।
এই শীতে আর পা-ধােবার জলে কোন দরকার নাই;
থাক রে পাগলা, হয়েছে প্রণাম, বােস্ দেখি কাছে ভাই।
•••খাবার যােগাড়—এখনি কি তার ? হাে না খানিক রাত,
হা হা তাই হবে, তাের ঘরে খেলে যাবেনাকো আর জাত।
•••দাড়িয়ে কেরে ও? তােরি ছেলে নাকি ? মন না ওর নাম
তােরি মত দেখি যােয়ন হয়েছে। করে তাে রে কাজকাম ?
ক্ষেতের কৰ্ম্মে ভারি দড় নাকি! আহা! ভারি খুসী শুনে’-
কি বল্লি ?—এই কুড়িতে পড়িবে সামনের ফানে!
সারাদিন ভাই, কিছু খাই নাই—সত্যি কথাই বলি,
বড়লােক যারা—খেতে বলে কেউ ? মিছে এত বড় হলি!
চা ও খানই বিস্কুট নামে সঙ্গে তাহারি চাট
তাই দিয়ে বটে রাখে কেউ-কেউ ভদ্র-আনার ঠাট;
বাজে কথা যাক’বিঘা চোতেলি করেছি এই সন্?
পাটে কত পেলি, নয়ালির ধান ঘরে এল ক’ কাহন?
মহাজন-দেনা রাজার খাজনা-হয়েছে তাে সব শােধ ?
বেশ বেশ ভাই, বড় খুসী তাের দেখে’ বিবেচনা বােধ।
ওরে ও মা, একটা কলকে তামাক পারি দিতে?
•••দিয়েছি নাকি! এ যে দেখি তুই বাপেরেও গেলি জিতে
১০২
আখ, মানুষের কষ্ট থাকেনা, হয় যদি লােক খাটি,
সােণার ফসল ফলায় যখন পায়ের তলার মাটি।
মাটিরই যদি না এ হেন মূল্য, মানুষের দাম নাই।
এই সংসারে এই সােজা কথা সব আগে বােঝা চাই।
বিশ্বপিতার মহকারবার এই দিন-দুনিয়াটা,
মানুষই তার মহামূলধন, কৰ্ম তাহার খাটা;
তারি নাম নিয়ে খাটিবে যে জন, অন্ন তত তার মুখে,
বিধাতার সেই সাচ্চা বাচ্চা কখনাে পড়েনা দুখে ;
তবে যে হেথায় দেখিবারে পাই গরীবের দুর্গতি,
অর্থ-তাহার, চেনে না সে তার শক্তির সংহতি।
সেই শক্তির মূল কথাটাকে ভালাে করে বেশ বুঝে,
আপনার মাঝে আপনার বল লইতে হইবে খুজে’!
নিজ ঘরে থেকে পর-ঘরে’ যত শিক্ষা সভ্যতার
সেই শক্তির গােড়ায় হেনেছে কুঠার তীক্ষ্ণধার।
নিজেরে যে মুঢ় আপনি মেরেছে, কে তারে বাঁচাবে বল,
তাই তারে নিয়ে জুয়াে খেলে যত জাত-জুয়াড়ীর দল!
ধনী মহাজন, মনিব কৃপণ রাজা প্রভু সরকার
নানা নামে তারে খো সাজিয়ে সাধে নিজ দরকার।
পােষণের নামে শােষণ তাই তাে শাসন করিছে বিশ্ব,
নিত্য নিয়ত নিঃশক্তিরে নিঃশেষে করি নিঃস্ব।
নীহারিকা পায়ের তলার ধূলা, সেও, যদি কেউ পদাঘাত করে, নিমেষে তাহার প্রতিশােধ লয় চড়ি তার শিরােপরে ; মানুষ কি সেই ধূলি চেয়ে হীন, সহিবে যে অপমান, আত্মার সেই মহাদুর্গতি নহে দেবতার দান! নাই ভগবান নাইক ধর্ম যাদের শিক্ষামূলে, ছিন্নমস্তা শিক্ষা সে শুধু শয়তানি ইস্কুলে। দূর করি’ সেই ঝুটো সভ্যতা যত ফুকো শিক্ষার, করি’ সেই ভেক্ নেওয়া যত অপমান ভিক্ষার, আপনার মত আপন শিক্ষা নিজে নিতে হবে জিনে, মুক্তির পথ মিলিবে তবে তাে দেশযােড় দুর্দিনে। r- কি হােল মােড়ল, কথা যে কওনা—ভয় হয় মনে নাকি? নিজ ছায়া দেখি উঠিছ চমকি’ নিজেরই আবাসে থাকি। নিজের বলিয়া বিশ্বাসটুকু হারায়েছ যেইদিন, সেইদিন থেকে জেনাে ভাই সবে হয়েছ শক্তিহীন ; সেই বিশ্বাস ফিরে পেতে হবে আপন মৰ্ম্মমাঝে দেখিবে সকলি সােজা হয়ে যাবে কথায় এবং কাজে ; মাথার মধ্যে ভগবান আর বুকের মধ্যে বল, আজ থেকে তাই করে নে সবাই যার সম্বল ; করি শপথ, সােজা হবে পথ, লক্ষ্মী আপনি সেধে তােদেরি আবাসে করিবেন বাস-খলি-পাট্টা বেঁধে। ১০৪
নীশরিকা
ডাকিছে শেয়াল, রাত্রি দুপুর হ’ল বুঝি এইবার,
খাটুনির দেহ, এইবার ভাই বিশ্রাম দরকার।
সৌরভ যেন পাই কিসের, চিড়ে কোটা বুঝি হয়।
টেকির শব্দ—তাই ত রে ঠিক; সমস্ত বাড়ীময়
নূতন ধানের মধুর গন্ধ মাতাতে তুলিছে মন
আর কি চাইরে, কোনও আয়ােজনে নাই কিছু প্রয়ােজন।
অতখানি দুধ—কি হবেরে ভাই, খানিকটা রাখ তুলে,
হজমই হয় না খাটি দুধ, সে যে বহুদিন গেছি ভুলে।
এখাে-গুড় নাকি! বাড়ীতে হয়েছে? তিন মন দশ সের?
সবি ত বাড়ীর! হায় এ কি দান গরীব গৃহস্থের !
৩’তে যাও ভাই, রাত্রি অনেক, নিদ্রাও পায় ভারি,
হেন মনে হয়, আজ বুঝি প্রাণ শান্তির অধিকারী।
বড়লােক আর ভদ্রলােকের অভদ্র ব্যবহারে
যে জ্বালা পেয়েছি, মনে হয় বুঝি জুড়াইল এইবারে।
সহজ উদার সরল পরাণ, ঘেঁদো সভ্যতাহীন,
শুষ্ক রুক্ষ্ম শিক্ষাশূন্য চির নিরুপায় দীন,
তােরি ঘরে যেন মনে হয় আজি সারা ভারতের পথ
অশ্রুসজল রয়েছে চাহিয়া অদূর ভবিষ্যৎ।
দেহ মন দিয়া প্রণতি আমার করি আজ তােরে চাষা,
তরি বারে আজ দিয়ে গেনু বাধা হৃদয়ের ভালবাসা
১০৫
নীখরিকা
বন্যাসঙ্কট
নয়ক এ বান্—আজ ভগবান্ বাংলা জুড়ে দেশটাকে
ভাসিয়ে দিয়ে দেখছে তাদের আত্মবােধের চেষ্টাকে।
লক্ষ কয়েক যা না মারা—লক্ষ্য খােদার নয় সেদিক
জ্যান্তগুলাের বাঁচার উপায় বাংলা তারে বুঝিয়ে দিক।
লক্ষ কয়েক যাচ্ছে মারা যাচ্ছে তত ফি বচ্ছরই,
অত্যাচারে হত্যা হয়ে, অর্ধাহারের পথ চরি;
কিচ্ছ, সেটা নয়ক নূতন, না হয় গেল বন্যায় এ,
বাঁছে যারা পশুর মতন—বাচছে তারা কোন্ ন্যায়ে।
পরের হাতে প্রাণের খেলা বায়ােঙ্কোপেই দৃষ্টি হয়-
নপুংসকের বংশধারা ভগবানের সৃষ্টি নয়।
নীহারিকা
দেশযােটা গল এই হাহাকার কাগজ-ভরা ক্রন্দনে,
সত্যিকাত যদি, থাকত তাদের বন্ধন এ?
কান্না চোখের জল কি শুধু, কান্না মাঝে নাই কি প্রাণ?
প্রাণের কঁাদন শুবে বসে’-ভগবানের নাই কি কাণ?
দেশের যদি আত্মা কাঁদে, খােদা কাদেন সঙ্গে তার,
প্রলয় জলে বিশ্ব ভাসে বজ্রে জগৎ ভস্ম-সার।
পুরাণ খােলাপাতায় পাতায় মিলবে তাহার নিদর্শন,
নরের মাঝে সিংহ সাজে, পদ্মে রাজে সুদর্শন।
‘সম্ভবামি যুগে যুগে’–ইতিহাসের সত্য এ
প্রতিদেশেই পাই দেখা তার প্রত্যক্ষে প্রত্যয়ে।
লক্ষ মানুষ বানে ভাসে—কোন্ দেশে হয় সত্য তা ?
যে দেশ, শুনি, রাজার অধীন, ধর্ম যাহার সভ্যতা!
লক্ষ মানুষ জলে ডােবে—মিথ্যা কথা নিশ্চিত এ--
পশু হলেও এমন বলি আজো তাের দিস্ দিতে?
তােরা, যারা দাড়িয়ে দেখিনুইয়ে মাথা যােকরে,
করকে তােদের যােড়ে বাধা কে রেখেছে জোর করে ?
মার খেয়ে সে খােদয় মারে সাচ্চা মানুষ-বাচ্চা যে,
মরেও তোরা ভিক্ষে মাগি, কাণ্ড তােদর আচ্ছ। এ
আত-ভিখিরীর কপট কান্নাতােদের দেখে ঘেন্না হয়-
হাত থেকে যে ভিক্ষে করেদান ত তাদের অপব্যয়।
১০৭
নীহারিকা
চারধারে তার মাথার পরে আছে সাগর তজিয়া,
বাস, খাড় রও—হাঁকছে হল্যাণ্ড তাবােপরে গজিয়া।
শক্ত হাতে বাঁধ বেঁধে সে সিন্ধু-শক্তি জয় করে
চাচ্ছে না ত ভিক্ষা তারা মরছে না ত ভয় করে ;
গ্রীণল্যাণ্ডের ফিল্যাণ্ডের ল্যাপল্যাণ্ডের দেশবাসী,
তুষার-রাজ্য পরকে দিয়ে পালায় না সে ব্যাসকালী ;
রাজপুতানার অগ্নি-মরুর হলকা-খাওয়া রাজপুতে
পাথর দিয়ে কেল্লা আরাে গাথলে জোরে মজবুতে।
প্রাণ থাকে যার বুকের মাঝে মান থাকে মন্-মন্দিরে
জানে না সে বাঁচার উপায় ভিক্ষা করার ফন্দী রে।
আজকে এল অন্নকষ্ট লক্ষ দশেক খ তায়,
কালকে এল মহাপ্লাবন আধখানা দেশ ধল হায় !
পরশু এল মহামারী-শীর্ণ হাতে ভিক্ষা চাই,
বচাও রাজা, বাঁচাও ধনী নইলে মােদের রক্ষা নাই।
পায়ে ধরাই উপায় যাদের, উপায় তাদের ভীষণ শাপ,
তাদের বেঁচে থাকার চেয়ে কোথায় আছে এন পাপ!
বাঁচতে যদি ইচ্ছা থাকে, বাঁচতে যদি সত্যি চা,
দু’হাত দিয়ে দে চুকিয়ে অধীন হওয়ার মিথ্যা ফাস।
বাচিস যদি, মানুষ হয়ে বাঁচার উপায় কর আজই,
নইলে দে আজ লুপ্ত করে বৰ্তে থাকার কারসাজি।
১০৮
নীহারিকা
(গান)
দেখি-পারি কিনা আজ পারি-
তােদের ঐ ঘরে ঘরে পরাব আজ
আপন হাতের ধুতি শাড়ী।
কাপাসে ঘরের পাশে
তুলে দেয় বার মাসে,
যখনি মন করি তা আপনা থেকে পয়সা বিনা আসে,
ওরে সময় পেলেই চরকাতে তাই ঘুরিয়ে সুতাে কাটি-
সে সুতােয় যখন খুসি ঘরের তাতে কাপড় বুনি
যা দরকারী।
নীহারিকা
মায়ের দুয়ার খােললা
দেখ ঐ প্রভাত হ’ল
তােমারি ছেলেরা সব দলে দলে দাঁড়িয়ে তােমার দ্বারে ;
তাদের আজ ভিক্ষা শুধু মা জননী, রাখতে হবে কথা
আজ হতে দিব্যি করে বলতে হবে পরের বসন
দিলাম ছাড়ি।
আজি সব জাগাে জাগাে,
এ বড় লজ্জা মাগাে
বিদেশী চিকণ সুতােয় গরব করে’ অঙ্গশােভা ঢাকো ;
এদিকে আপন ঘরে না খেয়ে যে মরছে আপন ছেলে,
মা হয়ে মুখ হতে তার মুখের অন্ন কোন প্রাণে মা
নিচ্ছ কাড়ি!
কালাে হােক নিজের ছেলে-
মা তবু দেয় কি ফেলে’!
অপরের ফরসা ছেলেয় আপন বলার লােভ সে কেমন ধারা।
বিদেশী কাপড় ত তাই—মনে বুঝে’ লাগ’ আপন কাজে,
দেখবে সব ধনে-পুতে লক্ষ্মী আবার আসবে ফিরে
বাড়ী বাড়ী।
नौशेविका
উদাসী
মাের মন জানেনা মনের মানুষ,
রূপ চেনেনা আঁখি,
আমি তাই চারিদিক দেখে শুনে’
উদাস হয়ে থাকি।
আজ যাহারে ভালাে লাগে
কালুকে দেখে বিরাগ জাগে,
পরশু তারেই দেখে ভাবি
দেখার আছে বাকী।
আমি তাই করিনা সঙ্গে কারাে
প্রাণের মাখামাখি
লােকে ভাবে পাগল বুঝি,
সদাই উদাস আঁখি।
.
ক
আমি রূপের দিশা পাইনা খুঁজে’--
কোথায় যে তার বাসা,
এক মুখে ল এক-এক সময়
বলে এক-এক ভাবা।
১১১
নীহারিকা
কালাে কেশের ঝর্ণাপাশে
কভু বা সে লুকিয়ে হাসে,
আঁখির কোণে কভু দেখি
ঝলক সর্বনাশা ।
অঙ্গ ভরি যখন-তখন
গােপন যাওয়া আসা;
ঠিক-ঠিকানা পাইনা ত তাই
কোথায় যে তার বাসা।
সারা
।
আমি তাইতে সবার সঙ্গে থেকে
সকল সঙ্গহারা,
মাের স্বভাব যে তাই বলে সবাই
পাগল সৃষ্টিছাড়া!
সকল রূপের স্বরূপ খুঁজে
বরং থাকি চোখটি বুজে’--
আপন মনের গােপন তলে
পাই যদি তার ধারা;
সেই অতলে মিলে যদি
সত্যিকারের সাড়া ;
বলুক লােকে যেমন খুশী
উদাস লক্ষ্মীছাড়া!
১১২
নীহারিক
জয়যাত্রা
(গান)
( মান্ দিলীপকুমার রায়ের যুবােপ যাত্রা উপলকে)
গুণি, তােমার অশেষ গুণে চড়াও নূতন শর
জিতে হবে জগৎসভায় সুরের স্বয়ম্বর।
পঞ্চদেশের পাঞ্চালীরে
আনতে হবে এবার ফিরে
জয়ের যশে ভরতে মায়ের তৃষার্ত অর
পূর্বযুগের দিলীপসম দিগ্বিজয়ী দানে
পূর্ণ কর আকাশ বাতাস তােমার গানে গানে।
ব্যথায় ভরা বিরস দেশে
হরষ আবার উঠুক হেসে
উৎসারিত রসস্রোতের উচ্ছসিত বানে।
প্রিয় আমার, যাত্রা তােমার উঠুক জয়ে ভরি’-
সকল ধনে পূর্ণ ভরা শ্ৰীমন্তেরি তরী।
যেখানে যা মাণিক আছে
কুড়িয়ে আন’ পায়ের কাছে।
সেই আশাতে সইবে মায়ের বিদেশী।
১১৩
নীহারিকা
ভুলের মালা
(গান)
আমার
ওগাে
ভুলের ফুলের মালার হেথায় হয়না বুঝি ঠাঁই,
প্রিয়, তােমার কণ্ঠ ছাড়া কোথায় তা পরাই ?
এই নিখিলের আঁখিজলে
যেথায় হীরার ঝলক ঝলে
সেই খানে মাের ভুলের মালার শরণ যদি পাই ।
বঁধু
গােপন আলার কালাে মাণিক যে বুক যুড়ে দোলে,
গভীর ব্যথার রক্তমণি লুটায় যারি কোলে,
সেই উরসের সাতনরী হার
তুলবে গেঁথে ভুলটি আমার
ও সেই উদার বুকের পরশ-সুধার প্রসাদ পেতে চাই।
১১৪
নীহারিকা
সন্ধ্যায়
[ গজল গান]
রজনীগন্ধা বাস বিলালাে-
সজনি, সন্ধ্যা-আবি না লাে?
বিদায়-মায়া বিছায় ছায়া,
ধরণীকায়া করুণ কালাে!
ত্বরিতে ফিরে বন-বিহঙ্গ
বরিতে নীড়ে প্রণয়াস ;
তরণী তারে
ভিড়িছে ধীরে
তিমির নীরে কাপিছে আলাে ।
নীহারিকা
নিভৃত রাতি কি করি’ যাপে
নিশীথ-বাতি শিহরি’ কাপে;
বিরহিনীরা চির-অধিরা
ভাবে অধীরা—মরণ ভালাে!
কোকিল ডাকে, আয় বসন্ত,
সখি লাে, হাঁকে বায় দুরন্ত ;
আজি এ রাতে পরাণ মাতে
বাহুর সাথে বাহু মিলালাে।
বঁধুর চিত্তে দোলারে ছন্দ,
মধুর নৃত্যে ভোলারে বন্ধ ;
টুটায়ে দ্বন্দে ছুটায়ে গন্ধে
মিলনাননে অমিয়া ঢালাে।
১১৬
নীহারিকা
ফিঙে
ফিঙে তুই ফিচ্ দুলিয়ে চুলবুলিয়ে চল্লি কোথায় ?
কাননের কাজলা মেয়ে, লাজ লাগে কি বসতে হেথায় ?
সহসা শিষটি দিয়ে নিসৃপিসিয়ে শিরিস শাখায়
উড়ে যাস্ এক নিমেষে মিমিসে ঐ চিকণ পাখায় ?
পাখী তাের আচানানির চঞ্চলতার চম্কানিতে
কবেকার চোখ দুটি কার ডাক দিয়ে যায় হাতছানিতে।
সে ছিল তাের মতনই মন্মােহিনী কৃষ্ণকলি ;
দেখিনি চোখভুলান’ রূপটি তেমন, স্পষ্ট বলি;
ছিল তার বিজলী চোখের চাউনি চোখা এমনিতর,
পলকে ঝলকে জ্বালায় ছকে পালায় যেনি ধরে ;
ছিল তাের পাখার মতন কষ্টি-কালাে কেশের রাশি,
ছিল তার চোখ-ধাঁধানাে মন-মাতানাে মিষ্টি হাসি।
ক
গিয়েছে কোন্ গহনের কোন্ বনে সে বাঁধতে বাসা,
সেথা সেই অন্ধকারের পথ চিনে কি যায় না আসা
যে ছিল হাল্কা তরল চটুল চপল, একেবারে
তারে কি গুন্ করে দেয় ঘুম-গারদের বদ দ্বারে !
পাখী তুই চুলবুলিয়ে চোখ ভুলিয়ে যানে চলে’-
তবু যে তাের মাঝে চাই চিহ্নটি তার দেখব বলে।
১১৭
নীহারিকা
শুভদৃষ্টি
বাড়ীভরা লােজন ; ঘরে-ঘরে গল্প আর হাসি-
স্বতঃস্ফুর্ত শুভকৰ্ম্ম কণ্ঠে-কণ্ঠে উঠিছে উদ্ভাসি’;
চারিদিকে ডাক-হাক, একটু নিরালা কোথা নাই ;-
আজি বুঝি বৌ-ভাত! সাহানায় বাজিছে সানাই
কলকোলাহলপূর্ণ বিচিত্র ধ্বনির বক্ষ চিরে,
বাড়ীতে না পেয়ে শ্রোতা সুর ভেসে বাহিরায় ধীরে।
চলেছে মেয়ের দল, ঝ-ঝম্ ঝুম্ঝুম্ ধ্বনি,
সেই সে সকাল থেকে কেবলি বাজিছে আগমনী।
বেতর স্বরের মেলা-পান দে না, ওরে জল আন্-
উচ্ছ্বসিত শিশুকণ্ঠে আনন্দের উন্মত্ত তুফান!
নীহারিকা
আরে আরে বর কই? বন্ধুরা শুধায় পরম্পরে;
বরের নাহিক দেখা, নাই সে নীচের কোনও ঘরে!
ততক্ষণ কোন্ ফঁাকে খুজে খুজে তেতলার কোণে
দেখে বর, নববধূ একা বসে কঁদিছে গােপনে।
ঘােমটার অন্তরালে অশ্রুবিন্দু ঝরি-ঝরি পড়ে
স্বর্ণ আভরণে ভরা অঙ্কশায়ী দুটি হস্ত পরে।
এদিক ওদিক চাহি ধীরে বর শুধাইলা তারে
কি হয়েছে কাদ’ কেন ? একবার বলনা আমারে।
বলিবেনা, বলিবেনা ?—তত জোরে ঝরে আঁখিজল,
আনন্দ-প্রতিমা চক্ষে ভাষাহীন বেদনা তরল।
কি হয়েছে বলনা গাে-বল’ বল’ লক্ষ্মীটি আমার।
এবারে কহিলা বধু অতি কষ্টে রুধি’ অশ্রুধাঃ
অস্ফুট মুদিত কণ্ঠে বাহিরিল ধ্বনি অতি ক্ষীণ
ছােট ভাইটির মাের জ্বর দেখে এসেছি সেদিন ;
আমারি সে অনুগতকঁদে শুধু দিদি দিদি বলি,
মার কোলে ফেলে তারে লুকায়ে যে এসেছিঃ চলি”,
ওগগা, দুটি পায়ে পড়ি
—চুপ চুপ, কেঁদোনাকো আর,
এখনি খবর আমি এনে দিব ভায়ের তােমার।
সমবেদনায় পূর্ণ শুনি’ সেই আশ্বাসের স্বর
বধূর ব্যথিত বক্ষে বহে নব শান্তির নিঝর।
যােমটার আবরণ চকিতে উঠিয়া গেল ধীরে,
ডাগর নয়ন দুটি জলে-ভরা অমনি সে ফিরে
১১৯
নীয়রিকা
=
মুহূর্তে উঠিল ফুটি’ স্বামীর সতৃষ্ণ নেপানে—
সত্যকার গুভ-দৃষ্টি নিমেষে মিলায়ে সেই খানে।
উৎসবের বক্ষোবাসী আনন্দের চক্ষু দুটি ভরি
অপরূপ হাসি কান্না এক সঙ্গে পড়ে যেন ঝরি’!
আজি এই শুভ দিনে কাঁদিতেছ তুমি নববধু ?-
কবি কহে অ নহে—অপূর্ব ও অন্তরের মধু
প্রথম রিল আজি ভােগবতী অমৃতের মত
সমবেদনার বাণে সৰ্ব্ব বাধা করিয়া হত।
আরক্তিম ঋক্তিমাঝে ওই অমুকুতাতরল--
ওরি মূল্যে মহনীয় গৃহস্থের রিক্ত গৃহস্থল।
১২০
নীহারিকা
নারী
রমণী বিচিত্র প্রহেলিকা।
অমুতে গরলে মেশা
অপূর্ব অদ্ভুত নেশা
আঁধার-বাড়ানাে অগ্নিশিখা।
রমণী এমনি প্রহেলিকা-
একাধারে ক্লান্তি তৃপ্তি
শীতল উজ্জ্বল দীপ্তি
তৃষাহরা গৃহ-মরীচিকা!
একই সাথে টানে ও ফিরায় ।
অধরে বিদায়-বাণী
নয়নে ফিরায় টানি’
কঠিনে-কোমল করুণায় !
নারী যে নিতান্ত নিরুপায়
এক চোখে হাসি তারি
অন্য চোখে ঝরে বারি
সহজে ফিরানাে সে কি যায়,
তাইত ঠেকিছু তারি দায়।
১২১
নীহারিকা
বৌদিদি
দাদা আমার দৈবাগত, বৌদি তুমি নূতন পাওয়া
হাহানার কুঞ্জবনে ফুলফোটান’ দখিন হাওয়া।
তেনি উদার তেমনি মধু, তেমনি স্নেহপরশখানি
এক নিমেষে ভুলিয়ে দিলে দেহ-মনের সকল গ্লানি।
পড়ল মনে কোন্ অতীতে ছিলাম যেন ভাইটি হয়ে,
কোলের কাছে ঘুম পাড়াতে গল্প করে বায়না সয়ে ;
নিত্যি নূতন সোহাগ দিয়ে জাতে আমার মনের কথা,
মিষ্টি মুখের আদর দিয়ে ভুলিয়ে দিতে প্রাণের ব্যথা!
সেই দিদি আজ বৌদি-রূপে মি আজি দূর প্রবাসে,
তেমনি স্নেত বক্ষপাশে তেনি স্নেহ চক্ষে হাসে;
ভাই এল তাই দেওর হয়ে নূতন সুধার নূতন টানে-
স্নেহের সাথে রঙ্গ মিশে নূতন প্রয়াগ তাই এখানে।
দাদার বুকের ফল্গুধারা তােমার হাতের পরশ পেয়ে
উচ্ছসিয়া উঠল আজি আকুল হয়ে দুকূল বেয়ে ;
ফুলের বুকে সুবাস ছিল সুপ্ত তােমার মুখটি চেয়ে,
যেমনি এলাে দখিন হাওয়া অনি গেল ভুবন ছেয়ে।
জীবন-খেয়ার সন্ধ্যাবেলায় মিল যদি মলয় হাওয়া
শেষ মিনতি রাখতে হবে—এই যেন হয় পরম পাওয়া।
এলাহাবাদের বিখ্যাত য়াড়ভােকেট কবি-বন্ধু সুরেনাথ সেন মহাশয়ের
উদেশে।
১২২
নীহারিকা
দ্বিপ্রহরে
বইয়ের পাতায় মন বসেনা, খােলা পাতা খােলাই পড়ে থাকে,
চোখের পাতায় ঘুম আসেনা-দেহের ক্লান্তি বুঝাই বলল কাকে?
কাজের মাঝে হাত লাগাব, কোথাও কোন’ উৎসাহ নাই তার,
চেয়ে আছি চেয়েই আছি, চাওয়ার তবু নাইক কিছু আর ।
বেলা বাড়ে, নােদ চড়ে যায়, প্রখর রবি দহে আকাশতল,
বাঝা করে ভিতর-বাহির, চোখের পথে শুকায় চোখের জল ;
মােহাচ্ছন্ন মৌন জগৎ, কোথাও যেন জীবনচেষ্টা নাহি,
ক্লিষ্ট আকাশ নিৰ্ণিমেষে দিনের দাহ দেখছে শুধু চাহি’!
নীহারিকা
ঘরে-ঘরে আগল আঁটা, আমার ঘরেই মুক্ত শুধু দ্বার,
সেই যে খুলে চলে গেছে তেমনি আছে, কে দেয় উঠে আর ।
পথের ধারে নিমের গাছে একটি কেবল তিক্ত-মধুর খাস
ক্ষণে-ক্ষণে জানায় শুধু গােপন বুকের উদাসী উচ্ছ্বাস !
হাহা করে তপ্ত হাওয়া শস্যহারা বসন্ত-শেষ মাঠে,
চোতের ফসল বিকিয়ে গেছে কবে কোথায় অজানা কোন্ হাটে।
উদার মলয় নিঃস্ব আজি, সামনে শুধু ধূসর বালুচর
পঞ্চতপা দিক্-বিধবার বসনখানি লুটছে নিরন্তর।
কোন্ পথে সে গেছে চলি’মরুবেলায় চিহ্নটি নাই তার,
লুপ্ত সকল শ্যামলিমা লয়ে তাহার মুগ্ধ উপচার ;
জাগছে শুধু প্রখর দাহ তৃষ্ণাভরা বিশুদ্ধ জিহ্বায়—
দিনান্ত—সে আবে কখন? দম্কা বাতাস ধমক দিয়ে যায় ।
১২।
নীহারিকা
একটি উপমা
ভক্ত আর ভগবানে ভেদরেখা এমনি সে ক্ষীণ -
পদ্মকোষে পদ্মপর্ণে যেমন সম্বন্ধ চিরদিন
মধুভরা মৰ্ম্মকোষ মধ্যে রাজে সুগন্ধ ভরা
পরাগ-কেশ-বেড়া, রেণুর কুঙ্কুম-রজ-পয়া,
তারি গায়ে গাঁথা থাকে মধুবাসপূর্ণ পদল
বেড়িয়া মণ্ডলাকারে, রূপেরসেগন্ধে ঢলঢল!
ভক্ত ছাড়া ভক্তি মিথ্যা; ভক্তি ছাড়া কোথা ভগবান!
ভক্তিরস মধ্যভাগে দোহারে করিছে সপ্রমাণ
আঁকড়িয়া পরস্পরে অপরূপ বন্ধনের টানে-
অতি সূক্ষ্ম সে বন্ধন রসময়-রসিকই তা জানে।
কোষে আর দলে দুই কাছাকাছি একই গুণ ধরে,
রূপ রস গন্ধ স্পর্শ কম-বেশী দোহারই অন্তরে ;
ভক্তে আর ভগবানে অভিন্ন সম্বন্ধ নিরমল
কোষে আর পর্ণে দুয়ে মিলে যথা পূর্ণ শতদল !
১২৫
নীহারিকা
বসেছিলাম নীচের তলায় শুতে তারি ডাক,
ভেবেছিলাম আদেশ এলে যাব—এখন থা!
এটা-ওটা-সেটা নিয়ে খুটিনাটির কাজে
জড়িয়ে কখন্ পােষের বেলা গড়িয়ে গেল সাঝে ;
শীতার্ত এই অঙ্গ পরে মােটা কাপড় টানি’
ছড়িয়ে দিলাম ক্লান্ত দেহ শান্তি-আলস মানি।
সন্ধ্যা-আঁধার নাম্ল ক্রমে পূর্ব কোণের ফঁাকে,
ভাবছি মনে এর মাঝে কি জ্বালব প্রদীপটাকে
এমন সময় হঠাৎ শুনে সন্ধ্যারতির শাক
পড়ল মনে, আজ কি তবে আসবেনা আর ডাক।
নীহারিকা
কেমন হল? হয়ত বা সেই উপরতলা থেকে
বড় প্রয়ােজনের সময় পাননি আমায় ডেকে ।
ব্যস্ত ছিলাম নীচের ঘরে আপন বাজে কাজে
ফিরে ফিরে গেছে সে ডাক, শুনতে পাইনি তা যে !
ন
ধড়ফড়িয়ে বেরিয়ে প’লাম উৰ্দ্ধপানে চেয়ে
খাসমহলের ছাতের উপর উঠতে সিঁড়ি বেয়ে
তাকিয়ে দেখি, প্রভুর ঘরে জ্বলছে দুটি তারা,
আসনখানি শূন্যে শুধু চেয়ে উদাসপারা
চারিধারে দিগ্বধূরা পঁড়িয়ে আঁখি নত,
কোলের কাছে কাপছে সাগর অপরাধীর মত ;
শ্যাম বনানী ধারটিতে তার স্তব্ধ সঙ্গীন হাতে
কোন্ সুদূরে জলতরঙ্গ বাজছে মৃদু বাতে;
রাজার দেখা নাইক তবু অচেনা কোন্ স্বরে
শান্তিমন্ত্র উঠছে কোথায় প্রশান্ত অম্বরে !
মনে হ’ল, হায়রে পাগল, কি ডাক চাহি আর,
আপন মনের ডাকই যে তার সেবার অধিকার।
সত্যিকারের সে ডাক আসে মনের গােপন কোণে
সেবার মত প্রাণ আছে যার সেই সে বাণী শােনে।
১২৭
নীহারিকা নিবেদন ৫ ‘তুমি আমার এমন কথা বলব কেমন করে, ‘আমি তােমার’ বলতে শুধু পারি । সেই অধিকার—তাও তুমি আজ ভিক্ষা দেহ মােরে সাক্ষী করে এই নয়নের বারি। হাতদুটি মাের সেবায় তােমার মুক্ত করে রাখি’ সেবার শেষে যুক্ত করে দিও, ভােলানাথের মূর্তিতে মাের দোষটি ভুলে থাকি আতােষের তুষ্টি শুধু নিও। হর’ আমার সকল দুঃখ সকল অপরাধ- হে শিব আমার অশিব কর জয় ; দেহের দাহে নেত্ৰ তােমার পাঠাক আশীৰ্বাদ, মনের মৃত্যু ঘুচাও মৃত্যুঞ্জয়। ১২ নীহারিকা হৈমন্তী # পল্লীর বধূ চলিয়াছে পথে, পল্লীতে তবু চেনেনা কেহ, সারা পল্লীর ঘরেরই বধূ সে, প্রতি ঘর যার আপন গেহ; কুহেলি-কুণ্ঠ অবগুণ্ঠনে মুখচন্দ্রমা অত্রে ঢাকা, আত্মজনের পরিচয়টুকু দিয়া যায় সবে আভাষে আঁকা ; সবাই ভাবিছে চিনিলাম বুঝি—তবু ঠিক যেন যায় না চেনা, সহসা কিসের আড়াল পড়ে যে, তাই ত, নয় ত, হয় ত সে না! ঝিমি ঝিমি ঝিমি ঝুমুর ঝুমুর ঝিঝি সুরে দূরে নূপুর বাজে, খর্জুরে-ঘেরা দীর্ঘিকাতীরে বল্লরীবেড়া বনের মাঝে ; প্রতি গৃহপাশে প্রাঙ্গণে ঘাসে পায়ে পায়ে হাসে শিশির স্নেহ- পল্লীরই বধূ চলিয়াছে পথে পল্লীতে তারে চেনে না কেহ, ১২৯
নীহারিকা
৩
দোপাটি কুসুমে খোপাটি সাজানাে, দলমল করে কণ্ঠে গাঁদা,
চরণ পরশি’ ভূইচাপা ভাবে সার্থক মাের ভূয়ের বাধা ;
পুলকাঞ্চিত শালীমঞ্জরী পীতপাণ্ডুর কর্ণভূষা
কালাে কেশতলে মুখমণ্ডলে ফুটাইয়া তােলে স্বর্ণ উষা
হরিদ্রা ভাবে দরিদ্রা আমি, কোথা পাব ঐ কান্তিসার,
ও যে লাবণ্য ভুবনন্য ক্ষমা করে দেবি ভ্রান্তি তার ;
অমল সরসী নয়নের তটে তারকাসফরী শিখিছে খেলা,
বক্ষ ভরিয়া চক্ৰবাকের বক্ৰপাটল মিথুন মেলা ;
অখিল শােভার লাবণ্যসার কোন্ বধু চলে পল্লী-বাটে,
উথলিয়া উঠে রূপতরঙ্গ আলাে-ঝলমল উদার মাঠে।
#
•
এ নহে গৌরী উগ্র তাপসী রুদ্ররূপসী বৈশাখী,
শ্যামঘন শােভা আষাঢ়-কান্তি এ নহে শ্যামা মাভৈঃ ডাকি।
তুষারশুভ্রা হংসবাহিনী এ ত নহে বাণী বসন্তের,
কমলবাসিনী নহে এ কমলা চরণশায়িনী অনন্তের
কল্যাণময়ী মূৰ্ত্তি যে ওই জগদ্ধাত্রী অনুদার
ধরারে সাজায় বসুন্ধরা যে বহি নিজ করে অন্নভার
বক্ষ-কলসে খর্জুর-বস পুণ্য পানীয় তুলনাহারা,
অন্নপূর্ণা জননীর মতাে কার হেন রূপ হিমানী ছাড়া?
পল্লীরই বধু পল্লীদুহিতা পল্লীরই পুলক্ষ্মী মা
কবি একান্তে পেয়েছে জানতে হেরি’ সে মূৰ্ত্তি দক্ষিণা।
নীহারিকা
ফাগুনে
(গজল গান)
ফুলবাগানে ভুলজাগানে’ বইল মিঠা বায়,
বাতাবীর ফুকলিদল বেদনাবিল ঘােটা খুলি’ চায়।
অলিদের গুঞ্জরণে কুঞ্জবনে ফুল না যার মুখ,
তারা আজ আপনা ভুলে’ ঢাকনা খুলে চাইল কি ব্যথায়
আকাশে অজুত তারা পলকহারা রঙ্গ হেরি আর
আঁধারে কৌতুহলে চমূকে জ্বলে রাতের আঙিনায়।
বিটপীর ঘুলঘুলিতে বুলবুলিতে উচ্চে তুলি’ তান
সে কথা লােকের ঘরে জাহির করে মুখর মহিমায় !
তবু সে গন্ধ ছুটায় পরাগ লুটায় মলয় পরশে
পিরীতি প্রণয় পেলে দেয় সে ঠেলে কলঙ্ক-কথায়।
১৩১
নীহারিকা শরৎচন্দ্র জানিনা তারিখ মানিনাক সনবুঝিনা সে ইতিহাস- বিশ্বের যারা শাখত, জানি, মানেনা বরষ মাস । কালের কণ্ঠে পরায় যে গুণী বাণীর কণ্ঠহার, নিত্য-মানব-চিত্তের সুরে বাঁধে বীণাখানি তার, স্বাধীন প্রাণের রুদ্র সাধনে বিলায় সিদ্ধিফল, সত্য প্রেমের সেবায় যে সঁপে জীবনের সম্বল, কে বাঁধিবে তারে জন্মখাতায় তুচ্ছ তারিখ মাসে? সে যে কালাতীত কালের কণ্ঠ কণ্ঠেতে পরেনা সে। ১৩২
নীহারিকা
মহামানবের মনের অন্ন বন্টে যাহার বাণী,
ছন্নছাড়ার বক্ষে বসায় লক্ষ্মীর রাজধানী,
পতিতে তুলিয়া পাংক্তেয় করে আভিজাত্যের সাথে,
কলঙ্কী হাতে অমৃত বিলায় নরদেবতার পাতে,
শরশয্যার তৃষ্ণা মিটাতে বাণে কাটে ভােগবতী,
পঙ্ক মথিয়া উদ্ধার করে পূজার সরস্বতী ;
পল্লী-পুরীতে রচি’ তােলে যে বা রসের বৃন্দাবন
বয়সের আঁকে জানাইব তারে কোন্ অভিনন্দন ?
শরৎচন্দ্র ফুটিল যেদিন নীল আকাশের পটে,
জ্যোৎস্যাজুয়ারে ভুবন ভাসিল, এইটুকু জানি বটে!
রসের কুমুদ হেসে মেলে আঁখি মানসের সন্মােবরে,
জীবনের রঙ ঘনাইয়া উঠে মানবের ঘরে ঘরে ;
বর্ণে গন্ধে রূপে রসে গানে দুকুল ভাসিয়া যায়,
তিথি ও তারিখ কে গণে তখন অপূৰ্ব্ব মহিমায় ?
অঞ্জলি যুড়ি’ বন্দে মানব আনন্দে অবগাহি,
শত শরতের পরমায়ু শুধু মন তার উঠে চাহি।
* শ্রদ্ধেয় বন্ধু অদ্বিতীয় কথাশিল্পী শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের পঞ্চাশৎ
বার্ষিক অভিনন্দন উপলক্ষে।
নীহারিকা
ব্যথার পূজা
বেদনার শক্তিমাঝে আনন্দের মুক্তাফল ফলে,
যে শুক্তির জন্মশয্যা অন্তরের অন্তরজলে।
ব্যথা মাের থাক্ বক্ষে প্রিয়পদে সঁপি’ মুক্তাফল,
যে প্রিয় আমার সেই গােবিনের চরণকমল।
১৩৪
নীহারিকা
দুঃখবিবাদী
দুখী বৈরাগী আখড়া খুলেছে শ্মশান-ঘাটের ধারে,
জঙ্গলে ভরা মরা সুতিটার মােহানার আড়পারে।
কয়দিন হতে দেখি যে আবার তুলি’ মহা হাঁকডাক
দিন রাত নাই কেবলি বাজায় দুঃখের জয়ঢাক !
পল্লীর যত বীণা আর বাঁশী কাণা করি সবগুলি
দুখ-দুখ-দুখ দুদুখ দুদুখ কপচায় নব বুলি ।
শুধু তাই নয়, হেঁকে সবে কয়, মহা উৎসাহে মাতি’
জগতের লােক, চলে আয় হেথা নিবিয়ে সুখের বাতি ;
মিথ্যা প্রকৃতি মিছে আনন্দ কহি সত্যের ভানে,
দুই হাত দিয়ে যাত্রীজনের পোঁটলা ধরিয়া টানে
প্রকৃতি যদি সে মিথ্যাই হত, আনন্দ যদি মিছে,
কার ইঙ্গিত বহিছে প্রমাণ এই প্রচারের পিছে ?
কুহু কুহু করি’ কোকিল যে ডাকে চৈত্র-নিশীথরাতে
হােক কুহু কুহু, তবু মুহু মুহু সুখেরই প্রকাশ তা’তে ।
* কবি-বন্ধু যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের দুঃখবাদী কবিতার বঙ্গোত্তর।
নীহারিকা
ন
ছবি ও ছন্দ, গীতি ও গন্ধ তুলে দে রে কারবার,
আকাশ বাতাস ফুল পিক অলি, সাবধান এইবার
তােরে দফাটি শেষ করিবারে দুঃখের রঙে দাগ
নবরূপে আজি উদিল মর্ত্যে দুখবাদী বৈরাগী
কল্কির হাতে অসি আছে শুনি, ইহাদের হাতে মসী
তাই লেপি’ এরা কালাে করে দেবে ধরণীর রবি-শশী ;
মলয়ভক্ত ওরে মূঢ় দল, পালারে পাতাল ফুড়ে,
নতুবা এখনি মন্ত্রের ঝড়ে উড়িবে তােদের কুঁড়ে।
কে যে মরেছিল বাজ পড়ে কবে শুনিনি তা কি কাণে,
মনুর বংশ তবু ফিরে’ চা নবঘনশ্যাম পানে ?
এখনাে মােদের আখড়াতে আয়, ওরে মুখের দল,
হাতে হাতে ফল পেয়ে যে তােদের চক্ষে ঝরিবে জল ;
সৌন্দর্য্যের পুজারী হইতে চাহিবিনা একেবারে
কেবা সুন্দর কেবা কুৎসিত মােদের অন্ধকারে।
এই বিশ্বের প্রকৃতি হইতে কিছু নাই শিখিবার।
তরুর মতন সহিষ্ণুতা—সে কেবলি কথার মার।
মাটীর মতন ধৈৰ্য্য এবং বিনয় তৃণের মত,
অগ্নিতে তেজ সলিলে শান্তি পাগলের কথা যত!
পক্ষীর মাঝে প্রথমেই হায়, চটক পড়িল চোখে !
উড়াে’ শকুনির খর নজরের বৃথা দোষ দেয় লােকে।
চক্ৰবাকের প্রেমের কাহিনী কবির মিথ্যা বাণী,
খাপদ ভিন্ন নাহিক অন্য অহিংস্র কোনও প্রাণী।
নীহারিকা
কুসুমের দোষ শুধু পড়ে চোখে, ভুলি’ গন্ধের দান,
রাঙা সন্ধ্যার মন্দিরে শুধু বিলাসীরই অভিযান।
উপমাটি ভালাে, তবু সে খাতিরে রহিয়া সত্যাধীন
মক্ষিবৃত্তি হতে নারি হয়ে যপদে উদাসীন।
এ ব্রহ্মাণ্ডে মাকালই দেখিছ, অন্য অমৃত নাই,
কর্মের বলে ভাগ্যের ফলে, যার যাহা জোটে তাই।
হায় কবি হায়! এমনি করিয়া মিথ্যার ঠুলি পরি’
ভরা দুপুরেতে ঘনায়ে তুলিছ তমিস্রা শৰ্বরী।
দিনও যেমন রাত্রিও তাই, সমান আঁধার আলাে,
দুই আছে বলে সুখে ও দুঃখে জগতে বেসেছি ভালাে ;
হাল্কা বলিয়া ফুৎকারে তব উড়াতে চেয়োনা সুখে,
আছে বলে’ জীবে জীবনতৃষ্ণা জাগে তাই বুকে-বুকে।
সুখ আছে বলে’ সার্থক দুখ, সুখ আছে বলে আছি,
মরণপন্থীসেও বলে তাই মরিতে পারিলে ‘বাঁচি।
মােটের উপরে সুখেরই মাত্রা বেশী না রহিত যদি,
কোথা হতে এই কাব্যের স্রোত কল্লোলে নিরবধি ?
অবিচারে মেঘ ঢালিলে বর্ষা কোথায় থাকিত ভূমি
কোথা থাকিত এ সখের দুঃখ কোথা বা থাকিতে তুমি?
বুদ্ধের নাম লইও না আর মিথ্যার ইতিহাসে,
দুঃখ দূরের তথ্যে তাহারি সুখেরই সাক্ষ্য হাসে !
১৩৭
নীহারিকা
অলীক কথায় মনে পড়ে যায় সে কালের সেই গল্প,
অল্প আকার কিন্তু যাহার তত্বটি নয় অল্প !
বিশ্বের এই চির-সুন্দর শ্যাম অরণ্য মাঝে
শুষ্ক কাষ্ঠে দুঃখবাদীর শুষ্ক কণ্ঠ বাজে!
খট-খটখট্ ঠক্ঠক্ঠক্ কহিতেছে কাঠঠোকরা,
সৃষ্টি-তরুতে কোনও রস নাই নিঃসার সে যে ফোপরা ।
মহা অরণ্য তথাপি তাহারই জোগায় খাদ্য জল,
মায়েরই মতন চির-ক্ষমাশীল সুন্দর ধরাতল।
ধরণী কেবলি ধূলাবালিময় শুষ্ক নীরস ওঁচা,
খচূ-খচূ-খ চক্ষু বিধিয়া কাঁদিতেছে কাদাখোঁচা ;
তথাপি ধরণী জননীরই স্নেহে পালিয়া শস্যে-জলে
হাসিয়া উড়ায় সে মুঢ় প্রলাপ মেহেরই করুণাবলে।
বাড়ে তাহাদেরই সন্তানদল-সুখেরই প্রমাণ খাসা।
আহা, বেঁচে থাক্ তবুও বাছারা মােরি বুকে বাঁধি বাসা।
নাহারিকা উচ্ছ, খল আজি শৃঙ্খল ছিড়িয়াছে উচ্ছল রাতে অগ্নিতে পুড়ে গেছে গৃহসম্বল; ঝড়ে মন্দির চৌচির বিগ্রহ দূর- গৃহে রন্ধেতে শনি পঞ্চমে মঙ্গল। ফুল মালঞ্চে আজি শুধু কাটা জঙ্গল, সেথা দিবসে দুপুরে ফিরে শিবাদঙ্গল ; ছিল টলে জল যেথা শ্যাম সরােবর, মজি পঙ্কে ও শৈবালে হ’ল পল। ঘরে কৰ্ত্তা গিয়াছে মরে গিন্নি পাগল, রাতে ভূত্যটি নাই দ্বারে ভেজিবে আগল ; যেথা প্রাঙ্গন ভরা ছিল কল-কোলাহল সেথা শিশু দুটি অনাহারে কাঁদিছে কেবল। আজি শৃঙ্খল ছিড়িয়াছে উচ্ছল- যেথায় যা-কিছু ছিল হয়েছে বিকল যেথা কিঙ্কিনি-ঝঙ্কারে ভরা গৃহতল- সেথা পােড়ো বাড়ি বােড় বারে বাজায় শিকল।
নীহারিকা আমি-হারা ; আর কিছু চাহে নাই; চেয়েছিল শুধু সঙ্গে যেতে, পথের কলঙ্ক যত নিয়েছিল নিজ অঙ্গে পেতে ;- তবু লই নাই সাথে ; প্রমত্ত সে জয়যাত্রাদিনে কে বহে পথের বােঝা, কে চাহে নগণ্য বলহীনে! যশের দুর্গম দুর্গে যাত্রা মাের নিঃসঙ্গ একাকী দুর্জয় লক্ষ্মীরে জিনি’ নিজহস্তে পরাইব রাখী। সরণী হয়েছে শেষ ; মন্দাক্রান্তা জীবনতরণী চলেছে ভাটার মুখে সন্ধ্যা-ঘােরে তিমিরবরণী ; লাগিছে পারের হাওয়া জাগাইয়া শীত-শিহরণ, অজানা সে বৈতরণী সর্বশক্তি করিছে হরণ । যতদূর চক্ষু যায়, কেহ নাই, কোথা নাই কেহ- অবিচ্ছিন্ন অন্ধকার নিজ দেহে ঘটায় সন্দেহ। সহসা পারের বাঁকে কে গাে তুমি দাঁড়ায়ে সুন্দরী! সেই সকরুণ আঁখি, চেয়ে দেখি, অশ্রুবারি ভরি’ সাজায়ে মঙ্গলঘট—অভাগার অমঙ্গল দিনে, নিরাশার খেয়া-ঘাটে দুরাশার পথচিহ্ন চিনে’! যতদিন ছি আমি, ততদিন চাহিনি ও মুখে, আমি-হারা অন্ধকারে আজি তুমি হাসিছ সম্মুখে । ১৪০ নীহারিকা বিদায়ে জীবন-ঘাটের সােপান-সীমা প্রায় ত হলাম পার, যে কটা ধাপ রয়েছে আর বাকী- ভাঙন-ধরা শেওলা-পিছল তাও যে চারিধার- পার হতে আর পারব সে ক’টা কি। দিনের আলাে নিবিয়ে আসে ক্লান্ত আঁখির 'পরে, আছে কাণে কালাে জলের ডাক। তবু আমায় ফিরতে বলি তােদর খেলাঘরে, ওরে পাগল, হাতছানি তাের রাখ। ১৪১
नौम्यत्रिका
প্রথম যেদিন তরুণ প্রাণের যাত্রা হ’ল সুরু,
সঙ্গে সেদিন কেউ ছিলনা আর
নূতন চলার আবেগভরে বক্ষ দুরুদুরু
চক্ষে তরল দৃষ্টি সুষমার;
কাণের কাছে কোকিল ডাকে আকুল কলতানে,
ব্যাকুলতায় এগিয়ে চলে পা ;
দখিণ বায়ু বুনন-ফুলের গন্ধ বয়ে আনে,
কিছুই যেন নিষেধ মানে না !
পথের মাঝে জুটুল সাথী, কেউ-বা খানিক চলে
সঙ্গ ছেড়ে এগিয়ে গেল আগে,
কেউ-বা কোথাও পড়ল বসে কিছুই নাহি বলে,
জানিনা কোন্ গােপন অনুরাগে।
কেউ-বা চলে, কেউ-বা আসে, কেউ-বা ফেলে যায়,
সঙ্গী বলে’ কারেও নাহি পাই;
আপন বেগে চলছে চরণ চলার আকাঙ্ক্ষায়,
ফিরে দেখি—সময় তারকা নাই
প্রথম কুড়ির চাতাল পরে লাগল নূতন নেশা,
পথের চেয়ে পথের সাথী পরে,
ফুলের গন্ধ যেন-বা কার কেশের গন্ধে মেশা-
জড়িয়ে ধরে গভীর আবেশ তরে।
নীহালকা
চলতে গিয়ে বসে পড়ি, রসূতে গিয়ে চলি,
ভুল হয়ে যায় চলায় না-চলায়,
কাণের কাছে বউ-কথা-কও প্রথম কথা বলি
বলাতে চায় কোন্ সে অ-বলায়!
এমনিতর নেশার ঝোকে কাল কত দিন,
হাতের সাথে হাতটি দিয়ে বাঁধা,
দুই কুড়ি ধাপ পেরিয়ে এলাম, দৃষ্টি ক্রমে ক্ষীণ,
পায়েপায়ে পাই যে শেষে বাধা !
পাখীর কণ্ঠ মিলিয়ে আসে ঝোড়াে হাওয়ার হাঁকে,
ফুলের গন্ধ মিলায় সে যে ধীরে ;
সঙ্গীজনের টুটুল নেশা কালাে জলের ডাকে,
চোখের দৃষ্টি মিলায় নদীনীরে।
সম্মুখের ঐ চাতাল ভরি’ নানা লােকের ভিড়,
মন্দিরেতে উঠছে কলরব ;
চলার গতি সবার যেন আসছে হয়ে থির,
আসন নিতে ব্যস্ত দেখি সব
ঠেলাঠেলির কলধ্বনি উঠছে চারিভিতে,
তারি মাঝে নদীর গরজন
নিরুৎসাহ মূর্তিগুলি জাগায় শুধু চিতে
অমৃতের চিত্র সুভীষণ ।
৩
১৪৩
নীহারিকা
ঐ যেখানে ঢেউএর শেষে নদীর পরপারে-
ঝাপসা আঁখির দৃষ্টি-অন্তরালে,
অজানা ঐ আঁধার-ঘেরা অচিন বেড়ার ধারে
সন্ধ্যাবধূ তারার বাতি জ্বলে,
ঐখানে ঐ সুদুর পারের নূতন পথের শেষে
মাের তরে কি বাজছে সাঝের
এপার—সে ত দেখাই গেলযাব যে ঐ পারে—
যেখানে ঐ নীল মােহানার বাঁক
?
নূতন সাথীর
লাগছে গায়ে শীতের হাওয়া, জাগছে শিহরণ,
আছি আজ এ জীবন-সীমানা
নূতন
রূপটি কি মনােহরণ,
কি পরিচয় হবে বা তার সাথে ।
যে কটা ধাপ রইল বাকী, হােক বা না হােক সারা,
পার পাব ত~-যতই বাধা থাক,
তােরা আমায় করিস্ ক্ষমা, ভালােবাসি যারা,
পেছন থেকে দিনে আজ আর
১৪৪
No text on this page.
ভূতপূর্ব মানসী ও যমুনাসম্পাদক কবি শ্রীযতীন্দ্রমােহন বাগচী বি. এ. লিখিত কাব্য সম্বন্ধে কয়েকটি অভিমত । লেখা কবিবর শ্রীদ্বিজেন্দ্রলাল রায়-কাজলা দিদির কবিতাটি সােনার অক্ষরে ছাপান উচিত ছিল। কয়েকটি কবিতা উচ্চ অঙ্গের, বঙ্গসাহিত্যে নূতন। আপনি রবিবাবুর ঝঙ্কার কতক পাইয়াছেন। বিচক্ষণ সাহিত্যিক ও সুবিখ্যাত সমালােচক চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় এম্. এ., বি. এল,—আজকাল বাঙ্গালা কবিতাগ্রন্থ যেরূপ হইয়া থাকে, তাহাতে আমরা এ কথা বলিবার অধিকারী যে, সে সকল দায়ে পড়িয়া কেবল কর্তব্যের অনুরোধেই আমা- দিগকে পড়িতে হয়। ইচ্ছাধীন হইলে সে সকল আমরা কিছুতেই পড়িতাম । হতােম বলিয়া গিয়াছেন যে, বাঙ্গালা ভাষা লাওয়ারিশ। আজ- কালকার কবিতার পুস্তক এবং নবন্যাস পড়িতে বসিয়া হুতােমের কথার সত্যতা প্রতি পদে অনুভব করিতে হয়। সেই জন্য এই প্রণালীর কোন উপাদেয় গ্রন্থ আমাদের হাতে আসিলে আমরা বড়ই আহ্লাদিত হই এবং শতমুখে তাহার প্রশংসা করিতে ইচ্ছা করে। আজ এক জন প্রকৃত সুকবিকে যে আমরা পরিচিত করিতে পারিতেছি, ইহাতে আমাদের বড় আনন্দ। অন্ধকারে একটু আলােক পাইলে, ভন্মস্তুপের মধ্যে রত্ন পাইলে, মরুভূমে একটু জল পাইলে, লােকের যে আনন্দ আজ আমরা সেই আনন্দ অনুভব করিতেছি।
ভূতপূর্ব মানসী ও যমুনাসম্পাদক কবি যতীন্দ্রমােন্ত বাগচী বি. এ. লিখিত কাব্য সম্বন্ধে কয়েকটি অভিমত মহাকবি রবীন্দ্রনাথ—তােমার রেখা নিকষে সােনার রেখা না, তার চেয়ে বেশী নিশান্তের অরুণ-রেখা। কবিবর দেবেন্দ্রনাথ সেন এম. এ., বি. এল—সকল কবিতাগুলিই বড়ই মধুর, বড়ই সুন্দর। আমি মােহিত হইয়া পাঠ করিয়াছি। পাঠান্তে নবজীবন লাভ করিয়াছি। ইহা অত্যুক্তি নহে। আমি আপনার ভক্ত। চিরদিনই ভক্ত থাকিব। লেখা নয় যেন কতকগুলি পারিজাত, সন্তানক, হরিচন্দন! লেখা নয়—যেন কতকগুলি কোহিনুর, পদ্মরাগ, ইন্দ্রনীল, চন্দ্রকান্ত। আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি আপনার সকল কবিতাই অমরত্ব লাভ করিবে। কবিবর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর-তােমার রেখা পড়িয়া মুগ্ধ হইলাম। তােমার কবিতায় চিত্রাঙ্কনী প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। এক-একটি ছােট-খাটো রেখার টানে গ্রাম্য দৃশ্যগুলি কেমন ফুটিয়া উঠিয়াছে! তােমার কবিতায় ‘ফড়িং’ ও ‘প্রজাপতিও আদর পাইয়াছে। তােমার ছন্দবন্ধ সুমধুর ; ভাষাও ভাবের উপযােগী। কোন কোন কবিতায় সুললিত সংস্কৃত শব্দের প্রাচুর্য্য, আবার গ্রাম্যদৃশ্যের বর্ণনায় ভাবব্যঞ্জক চলিত গ্রাম্য শব্দের নিপুণ প্রয়ােগ দেখিতে পাওয়া যায়। তােমার ‘রেখা’ বঙ্গসাহিত্যের মুখ উজ্জল করিবে। ৫ ভূতপূর্ব মানসী ও যমুনাসম্পাদক সুকবি শ্রীযতীন্দ্রমােহন বাগচী বি. এ. প্রণীত নাগকেশর সম্বন্ধে সাহিত্যসম্রাট শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিমত ইতিমধ্যে তােমার নাগকেশর পড়িয়া দেখিলাম। দেখিলাম তােমায় লেখনী তােমার কবিত্বকে পক্ষিরাজ ঘােড়ার মতন এখনাে সমান বেগে বহিয়া লইয়া চলিয়াছে; এখনাে তার ক্লান্তির লক্ষণ নাই, বরঞ্চ নিজের গতিবেগে সে যেন আরাে মাতিয়া উঠিয়াছে। তােমার নিপুণ ছন্দের পায়ে পায়ে অনায়াস নৃত্যলীলার নূপুর বাজিতেছে, আবার, তাহার হাতে ও মাথায়, কানায়-কানায়-ভরা বিচিত্র রসের থালি। বােধ হয় এককালে ইসভার রঙ্গভূমিতে তাহার স্থান ছিল, কোন একটা পদস্খলনের অভি- শাপে মর্তে আসিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু নন্দনের লীলা ভােলে নাই এবং অমরাবতীর প্রতি এখনাে তার দাবী আছে। কিন্তু অমরাবতীর কোন মহলের প্রতি তােমার কবিত্বের পক্ষপাত বােঝা গেল না—মনে দুইল সকল দিকেই তার লােভ কি শিবের কৈলাসে, কি বিষ্ণুর বৈকুম্ভে, কি সেই অলকাপুরীতে যেখানে বিরহিণীর দীর্ঘনিশ্বাসে শিশিরা শরতের করুণ শিউলিগুলি রাত না পােহাতেই ঝরিয়া ঝরিয়া পড়িতেছে। ইতি ১৪ই কার্তিক। শুভাকাক্ষী-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.