Bally Sadharan Granthagar

Sekhhatir Nilkuthi

Mukhopadhya, Saileshnath · 2009/10/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সেখহাটির নীলকুঠি
শ্রীশৈলেশনাথ মুখােপাধ্যায় বি,এ,
প্রাপ্তিস্থান :-
নিউ ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরী।
সকল প্রকার পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক।
২৫২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
[ মূল্য দেড় টাকা মাত্র।
[

প্রকাশক :
মামলাল পিপলাই।
নিউ ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরী।
২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা ।
বি, রায় প্রেস।
৪৪, মসজিদবাড়ী স্ট্রীট, কলিকাতা।
বি, রায় কর্তৃক মুদ্রিত।

স্বর্গীয় পিতৃদেব
প্রসন্নকুমার মুখােপাধ্যায়
মহাশয়ের উদ্দেশে
তর্পণাঞ্জলি।
বাবা,
আপনার শুভ ইচ্ছায় ও স্নেহে যাহার উন্মেষ, আপনার
কাছে শােনা ঘটনার উপর যাহার ভিত্তি, সেই “সেখহাটির
নীলকুঠি” প্রকাশিত হইল।
আমার এই উপন্যাসখানি আপনার চরণ-পদ্মে ভক্তির সহিত
অৰ্পণ করিলাম।
ভাষায় যাহা প্রকাশ করা যায় না, অশ্রুজলেও যাহার
উপলব্ধি হয় না ভাবের সেই গঙ্গাধারা ভাবগ্ৰাহী আপনি
গ্রহণ করুন।
আপনার
শৈলেশ।

No text on this page.

সেখহাটির নীলকুতি -*: লাটপ্রাসাদে। ( ১ ) বঙ্গাব্দ ১২৬৬। ইংরাজি ১৮৬০ সাল। ইংরাজি ১৮৬০ সাল। চৈত্র মাস। নীহারের মুক্তাহার পাতাবাহারের কিংখাবের উপরে দুলিতে দুলিতে তরুণ উষার অরুণরাগে সবে মাত্র রাঙ্গা হইয়া উঠিতেছে। এমন সময় উর্দিপরা কৃপাণ আঁটা উষ্ণীষ ধরা শিখ সিপাহী সশব্যস্তে বড়লাট সাহেবের সদর দরজা খুলিয়া দিল। একখানি জীর্ণ ছ্যাড়া গাড়ী শব্দে দিক্‌ বিদীর্ণ করিতে করিতে উদ্ধশ্বাসে ফটকে প্রবেশ করিল। লুঙ্গী পরা কোচম্যানের হাতের বেত সাঁই সাঁই শকে শীর্ণ অখিনী নন্দনের সফেনপুঞ্জ পৃষ্ঠ দুটি জীর্ণ করিয়া তুলিল। তাহারা এক নিঃশ্বাসে গাড়ীবারান্দার সােপানের তলে আসিয়া থামিল ও ঘােতর ভাবে হাঁপাইতে লাগিল। সে দিকে দৃকপাত মাত্র না করিয়া চোগা চাপকান আঁটা পাগড়ী পরা চশমাধারী শবহুল ক্ষীণকায় আরােহী একতাড়া কাগজ হতে ক্ষিপ্র পদে গাড়ী হইতে নামিয়াই কোন নির্দিষ্ট নিয়মের অনুবর্তিতা না মানিয়া সরাসরি খাস কামরার ভিতরে প্রবেশ করিলেন। সৌম্য মূর্তি লর্ড ক্যানিং চেয়ারে ফাইলের স্তুপের মধ্যে উদ্বিগ্ন-চিত্তে বসিয়াছিলেন। সুরভিত গােলাপ- ২ সেখহাটির নীলকুঠি । গন্ধ চায়ের পরিপূর্ণ পেয়ালা অনাস্বাদিত ; ললাটে বিন্দু বিন্দু স্বেদ জমিয়াছিল। আগন্তুক প্রবেশ করিতেই জিজ্ঞাসা করিলেন :- “হ্যালাে হরিশ ! এই আইন সম্বন্ধে তুমি কি বিবেচনা কর। এই বলিয়া তিনি তঁাহার সুবলিত দক্ষিণ বাহুর করপল্লব নবাগতের দিকে সাগ্রহে বাড়াইয়া দিলেন। আগন্তুক হিন্দু প্যাটিয়েট পত্রিকার স্বনামধন্য সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখােপাধ্যায়-বড়লাট বাহাদুরের প্রসারিত কর-পল্লব সসম্মানে মর্দন করিয়া নম্র কোমল তথাপি দৃঢ়গম্ভীর সুরে বলিলেন-“মি লর্ড । এ সম্বন্ধে আমার ধারণা বড়ই খারাপ।” সৌম্য মুখ গম্ভীর হইল। লড ক্যানিং বলিলেন—“অঙ্গীকার পালন কর্তে মানুষ ন্যায় ও ধৰ্ম্মত বাধ্য যদি কুলোকের পরামর্শে মানুষ সেই অঙ্গীকার পালন কর্কে না চায়, তবে গভর্ণমেন্টের কি উচিত নয়—স্যায় ও ধর্মমতের সমর্থনের জন্য আইন প্রণয়ন করা । হরিশ। নিশ্চয়ই উচিত। লড। তবে তুমি এই আইনকে দোষ দিচ্চ কেন ? নীল বুনিবার জন্য কৃষকেরা অঙ্গীকার সূত্রে আবদ্ধ হইয়াছিল, এখন কুলোকের উত্তেজনায় তাহারা নীল বুনিতে অস্বীকার করিতেছে তাই আইনের সাহায্যে তাহাদিগকে তাহাদের চুক্তির সর্ত বজায় রাখিতে বাধ্য করা হইতেছে মাত্র। ইহাতে দোষ কি? হরিশ। মি লড়! ক্ষমা কৰ্বেন । আমেরিকায় দাসপ্রথা প্রচলনের সময় এইরূপ আইন ছিল। সে প্রথা উঠিয়া যাওয়ার পর কোন সভ্য দেশে আর এরূপ আইন হয় নাই। লড। সে কি! হরিশ। প্রথমতঃ-দেখুন, চুক্তি হয় দুইপক্ষে, স্বাধীনভাবে ও স্বেচ্ছায় ; তবেই সেই চুক্তি ও সেই অঙ্গীকার ন্যায়ঃ ও ধৰ্ম্মতঃ চুক্তি এবং অঙ্গীকার লাট প্রাসাদে। •• বলিয়া গণ্য হয় ; তাহা পালন করিতে চুক্তি ও অঙ্গীকারকারিগণ বাধ্য। কিন্তু যে চুক্তির মূলে জবরদস্তি সে চুক্তি পালন কর্তে কি প্রজা বাধ্য? লড়। না সেততা স্বেচ্ছামূলক চুক্তি নয় ? হরিশ। তবেই দেখুন ব্যাপারটা কি ? একপক্ষে নীলকর প্রবল প্রতাপশালী কুটনীতিজ্ঞ, ভীষণ জবরদস্ত অপরপক্ষে ভীরু দুর্বল নিঃসহায় নিঃসম্বল নিরক্ষর প্রজা নীলকরের ইঙ্গিতের ক্রীড়াপুত্তলি। কেহই নীলকরের সঙ্গে নীল বুনিতে চুক্তি করে নাই। গভর্ণমেন্টের নাম লইয়া মাত্র যৎকিঞ্চিৎ পারিশ্রমিক দিয়া তাহাদের নীল বুনিবার জন্য নীলকরেরা হুকুম দিতেছিল ভয়চকিত প্রন্স অনন্যোপায় হইয়া তাহাই মানিয়া আসিতেছিল। বাস্তবিক সেরূপ দরে নীল বােনা অসম্ভব। আজ নীলকর বেগতিক দেখিয়া নিজেদের বে-আইনী হুকুম চুক্তি মূলক সৰ্ত্ত বলিয়া দাবী করিতেছে এবং পুরুষানুক্রমিক একটি কাল্পনিক ঋণের বােঝা প্ৰজার ঘাড়ে চাপাইয়া তাহাকে নীলকরের নিকট আত্মবিক্রিত এই দেখাইতে চাহিতেছে—সত্য ও অপক্ষপাতিতার তুলাদণ্ডে তূলিত হইলে মি লড়! দেখিবেন এই দাবী সম্পূর্ণ মিথ্যা বলিয়া অগ্রাহ্য হবে। যদি আইন করিয়া প্রজাকে এই নামতঃ পারিশ্রমিক কিন্তু কাৰ্যতঃ জুলুম করা বেগার দিতে ও নীলকরের দাবীকৃত ঋণ শােধ দিতে বাধ্য করা যায়—তবে হয় প্রজা সগােষ্ঠী অনশনে মারা যাবে নয়—মরিয়া হইয়া বিদ্রোহের ধ্বজা তুলিবে। লড। বিদ্রোহ ! বাঙ্গালী প্রজা বিদ্রোহ কৰ্বে ? তুমি কি স্বপ্ন দেখচো হরিশ ? হরিশ। মিঃ লড়! সত্য অনেক সময় স্বপ্নের কল্পনার চেয়েও অভিনব হয়। বাংলার কৃষীবল একতার বন্ধনহীন, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন, খণ্ড বিখণ্ড অবস্থায় বহনশীল স্রোতে ভাসমান টোপাপানার মত ছিল। স্থানীয় ৪ সেখহাটির নীলকুঠি। ; শক্তিমানেরা যে দিকে চালাইত সেই দিকে চলিত—আজ নীলকরের অত্যাচারের প্রবল উত্তেজনা তাহাদের নিকট বিষম সঙ্কটময় সমস্যা আনিয়াছে ; হয় ভূপৃষ্ঠ হইতে অনাহারে সবংশে নির্বংশ হইয়া তিয়ােধান-নয় সংঘশক্তিতে শক্তিমান্ হইয়া সমুখান। মিঃ লর্ড! বঙ্গের কৃষীবল ধীরে ধীরে এই দ্বিতীয় পথ অবলম্বন করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইতেছে জানিবেন। তাই এই বিচ্ছিন্ন টোপাপানার দল এমন ঘন সন্নিবিষ্ট দূর প্রসারী জাল প্রস্তুত করিতেছে, যাহাতে সাম্রাজ্যের তরীখানি অচিরে অচল হবে। লড। ব্যাপার কি এতই গুরুতর ? হরিশ। মিঃ লর্ড। প্রজার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে জোর করে নীল বােনা যাবে না। এক কথায় আমি বল্লাম। যদি জোর করা যায় বিদ্রোহ হবে। সিপাহিরা বিদ্রোহী হয়েছিল সাময়িক উত্তেজনা বশতঃ। কিন্তু বাংলায় যদি বিদ্রোহ হয় তবে তার কারণ প্রতি বাঙ্গালী কৃষকের অন্নবস্তু সংস্থানের মূলে নিহিত থাকবে। কুলােকের উত্তেজনা তাহাতে স্ফুলিঙ্গ যােগাতে পারে সত্য কিন্তু তাহাতে নিত্য ইন্ধন যােগাকে নীলকরের দুব্যবহার ও নীল চাষের বিসদৃশ ব্যবস্থা ও প্রণালী। লড়। তবে কোন্ পথ অবলম্বন করা যায় ? হরিশ। অপক্ষপাতিতা ও ন্যায়পরতার পথ। লড়। কি রকম! হরিশ। মিলর্ড! দিল্লির মিউটিনির পর এত বড় উদ্বেগ-পূর্ণ সমস্যা সমাধানের জন্য আপনার নিকট আর উপস্থিত হয় নাই। লড। হরিশ! সে সময় তােমারি লেখনীর ঐন্দ্রজালিক শক্তি উহেজিত বঙ্গদেশকে সংযত রেখেছিল, তাকে রাজদ্রোহিতার কলঙ্কে লিপ্ত হতে দেয় নি।

লাট প্রাসাদে। * হরিশ। যদি আমার এ ক্ষুদ্র লেখনীতে ইন্দ্রজাল বলে কিছু থাকে তবে নিশ্চয় জানবেন, মিলড়! তাহা আর কিছুই নয় কেবলমাত্র আপনার ন্যায়-নিষ্ঠা, ন্যায়-নিষ্ঠা, অপক্ষপাতিতা, সাদায়-কালায় সমণি ও সর্বোপরি সমবেদনার দৃঢ়তার উপর সরল, সত্য, অটুট বিশ্বাস। আজ সারা বাংলা দেশের অবস্থা হয়েছে ঠিক যেন শুকো খড়ের গাদা, বারুদের স্তুপের উপর সাজান। একটি মাত্র স্ফুলিঙ্গের প্রয়ােজন আর সারা দেশে আগুন জ্বলে উঠবে। প্রস্তুত থাকুন মি লভ! প্রজা-দ্রোহের দীপ্ত বহ্নিশিখা সহ করবার জন্য। লড়। প্রজা-দ্রোহ হতে দিব না। হরিশ। কি করবেন ? লড়। বাধ্যতামূলক আইন বন্ধ করবে। হরিশ। মি লড! মি লর্ড ! ঐ একটি কথা, আপনার মুখের ঐ একটি কথা—আজ ব্রিটিশ রাজের জয়স্তম্ভ হিমাদ্রির উত্ততম শৃঙ্গ হ’তে বঙ্গোপসাগরের নিম্নতম তল পৰ্যন্ত অচল প্রতিষ্ঠ করিল। লক্ষ প্রজার আকুল অনুভূতি আজ এই দরিদ্র ব্রাহ্মণের দেহে প্রত্যক্ষ হয়ে আপনাকে সানন্দে অভিবাদন কচ্চে। ব্রিটিশ রাজের জয় জয়কার হৌক। প্রায় প্রায় সমদৃষ্টি, সাদায় কালায় অভেদ ভাব, সে রাজ্যের ভিত্তি অক্ষয় করুক। নীলকর আপনার প্রজা, বাঙ্গালীও আপনার প্রজা। প্রায় প্রায় বিসদৃশ ভাব রাখবেন না, রাখবেন না। লড়। তাই হবে হরিশ ! সারা ভারতবর্ষের মধ্যে আমার যদি কেহ অকৃত্রিম বন্ধু থাকে তবে সে তুমি, আর তােমার জন্য তােমার বাঙ্গালি জাতিকে আমি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের চক্ষে দেখি। কিন্তু আমার একটি অনুরােধ আছে। হরিশ। মি লড়! যতক্ষণ হরিশের দেহে বিন্দুমাত্র রক্ত থাকবে, লন ৬ সেখহাটির নীলকুঠি। যতক্ষণ তার কণ্ঠশ্বাস নাভিশ্বাসে পরিণত না হবে, ততক্ষণ বাঙ্গালীর কল্যাণকামী হে সৰ্বশ্রেষ্ঠ রাজপ্রতিনিধি, আপনার অনুরােধ দেবাজ্ঞার ন্যায় বর্ণে বর্ণে পালিত হবে, নিশ্চিন্ত থাকুন। লড। আমার অন্তরের অন্তরতম প্রদেশের ধন্যবাদ। আমার অনুরােধ এই যে, প্রজাকে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের ন্যায়পরতা ও অপক্ষ- পাতিতার প্রতি বিশ্বাস কৰ্ত্তে বল। আজ নীল চাষের যে কমিশন বলে। স্বয়ং ছােট লাট সাহেব সে সম্বন্ধে সরজমীন তদারক করিবেন, এই তদন্তের সময় পর্যন্ত প্রজাকে সংযত ও শান্ত রাখ—রা যেন নিজের হাতে নিজে আইন না নেয়, নিয়ম ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে রক্ত গঙ্গায় দেশ ভাসাইয়া—আমার হাত দুৰ্বল করে না দেয়। যদি তদন্তের সময় প্রজাপক্ষ নিজেদের অভিযােগের সত্যতা সপ্রমাণিত কর্তে পারে তবে ঠিক জেনো আশ্বিন মাসেই এই আইন রদ হয়ে যাবে আর বাহাল হবে না। হরিশ। নিশ্চিন্ত থাকুন মি লড! ছােটলাট বাহাদুরের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রজাপক্ষ সংযত থাকবে, সে জন্য হরিশ দায়ী থাকলে কিন্তু তার পরের তাল আপনাকে সামলাইতে হবে। এই বলিয়া প্রসারিত করপল্লব মর্দন করিয়া হরিশ দ্রুতপদে চলিয়া গেলেন। লাফাইতে লাফাইতে মিস্ ক্যানিং গৃহে প্রবেশ করিলেন। ভ্যাডি ড্যাডি তুমি বড় দুষ্ট হয়েছ, এই দেখ তােমার মর্ণিং টি এখনও পেয়ালায় সমান ভাবে রয়েছে, তুমি একটুও খাও নি। লড। তুমি তাে জান আমি কোল্ড টি ভালবাসি মিস্। আমাকে ভােলাচ্চ ! তুমি হরিশ বাবুর সঙ্গে গল্প কন্তে কণ্ঠে চা খাওয়ার কথা ভুলে গেছ। আচ্ছা বাবা! তুমি হরিশবাবুকে বারণ কৰ্তে পার না ? কাল তার বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম তার লাট প্রাসাদে। ৭ মেয়ে মলিনা কি সুন্দর মেয়ে, বাবা দেখলে তাকে আদর না করে থাকতে পার না—সে বড় কাতে লাগলো। হরিশবাবু বড় মদ খান, রাতে বাড়ী থাকেন না। এমন কলিক বেদনা হয়েছে যে, বেশীদিন বাঁচবেন না—হ্যা বাবা তুমি বারণ করে দাও না কেন ? লড়। মা, মদে যাকে খায় সেকি বারণ মানে ? যদি ঐ দোষটি থাকতাে তবে আজ হরিশ বাংলা দেশের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ লােক হতে পার্তো। “চল বাবা মা ডাক্‌চেন” বলিয়া মিস্ ক্যানিং বাবাকে ধরিয়া টানিতে নিতে ভিতরে লইয়া গেলেন :

বরাহ দংষ্ট্রায় নেলী। ( ২ ) “নেলি” আয়লাণ্ডের নীলনয়না সুন্দরীগৌরাঙ্গী; উচ্ছল যৌবন- ভরে সরসা; স্বাস্থ্যের সাচ্ছল্যে পূর্ণাঙ্গী। পীনবাহু, পীনােয়ত স্তনে পীবর বক্ষ, পেলব অঙ্গ। সুশ্রোণী স্বচ্ছন্দগমনা। নেলির পিঙ্গল কেশদাম স্বর্ণাভ, ভুজঙ্গফণার মত কুঞ্চিত, এলায়িত হইলে চঞ্চল প্রবাহে সুৰ্য্যরশ্মির তরঙ্গের পর তরঙ্গের স্যায়—রাজহংসীর মত তাহার দীর্ঘগ্রীব। বাহিয়া পীন পৃষ্ঠদেশ আবরিয়া, নিতম্ববিষ ঘিরিয়া ঘিরিয়া, ছড়াইয়া পড়ে। রূপগৰ্বিতা বিলাসিনী নেলি স্থূলাধরা; যৌবনমদমত্ত বাসনার লক্ষ ধারা-লালসামুগ্ধ নেলির হৃদয়ে আবর্তে আবর্তে ঘােরে—ক্ষুব্ধ কামনার রুদ্ধ গতি মাঝে মাঝে তাহাতে যে ঝানিল তােলে তাহার প্রবল বাত্যার তাড়িত তপ্ত উচ্ছ্বাসে তাহার সুন্দর ললাট ও মসৃণ গণ্ডের লালিমায় কালিমার তামস রেখা ঢালিয়া দেয়, কিন্তু মহা ক্ষণিকের জন্য —আত্মগােপনে অভ্যস্ত শ্বেতাঙ্গ যুবতী তৎক্ষণাৎ তাহা সরাইয়া ফেলে। পুনরায় তাহার মুখখানি অস্তগামী সূর্যের আবিররাঙ্গা কিরণে উচ্ছলিত সুপ্তমীন হ্রদের প্রসন্ন সলিলরাশির ন্যায় নির্মল ও উজ্জ্বল হইয়া ওঠে। নেলি নীলকর মরিসের সহধর্মিণী, সেখহাটি কুঠির অধীশ্বরী। সেখহাটি কুঠিকে কেন্দ্র করিয়া ইচ্ছামতীর দুই তীর ঘিরিয়া ৫৪টা নীলকুঠি বরাহ দংষ্ট্রীয় নেলী । এই কনসার্ণের অন্তর্ভুক্ত। মরিস ও নেলি ভারতে তাহাদের সময় কর্তা। । বেলা অপরাহ্ন প্রায় ১টা। দীর্ঘকালব্যাপী ভূরিভােজন হাস্যের কলরােলে সাদ হােলো। বহুমূল্য সবাই সুরা কাচের পানপাত্রে সূর্যালােকে ঝম করিয়া উঠিল। রঙ্গীন নেশার তরল উচ্ছাস পান করিয়া নেলি ও মরিস প্রফুল্ল হইয়া উঠিল। অমনি মরিস তাহার পরিঘসঙ্কাশ বাহুদ্বয়ে প্রমত্ত যুবতীকে জড়াইয়া ধরিল। কবাট বক্ষে তাহাকে নিবিড় নিষ্পেষিত করিয়া তাহার আরক্ত গণ্ডে অজস্র চুম্বন মুদ্রিত করিয়া দিয়া নিজের কাজে চলিয়া গেল। মরিসের বাহুপাশ হইতে মুক্ত হইলে, নেলির তুষার শুভ্র বক্ষে ঘন ঘন স্পন্দন উঠিল ; সতৃষ্ণ উষ্ণশ্বাস দ্রুত পড়িতে লাগিল। পুরুষের সকাম স্পর্শ তাহাকে লালসাক্ষুব্ধ করিয়া তুলিয়াছিল—সে তাহার অসংন্যস্ত কেশপাশ সংস্ত করিতে করিতে আপনাকে সামলাইয়া লইল, কিন্তু অনুরাগের রক্তরেখায় তাহার সারা দেহ রঞ্জিত হইয়া উঠিল। তাহার হৃদয়কারার অন্ধতম গুহায় অবরুদ্ধ, অন্তরের শুদ্ধান্তঃপুরে লােকচক্ষুর মর্মভেদী দৃষ্টও যেখানে প্রবেশ না পাইয়া মর্মাহত, সেই নিতান্ত নিবিড় নিরালার সঙ্গোপনে ফুৰ্ত্তি পাইল অনিন্দ্যসুন্দর তরুণের লােভনীয় মূর্তি। অমনি দ্রুত পরিচ্ছন্ন পরিবর্তন করিয়া অতি সতর্কতার সহিত প্রসাধন সাধিত করিয়া নেলি একটি হ্যাণ্ডব্যাগে অনেক রকম সেলাইয়ের ও শুশ্রুষার উপায়ন লইয়া চীন দেশীয় রঙীন কাগজের ছাতিটি মাথায় দিয়া ক্ষিপ্রপদে ভ্রমণে বাহির হইল। ছাতিটি নাড়িতে নাড়িতে ব্যাগটি দুলাইতে দুলাইতে আয়াল্যাণ্ডের সাতের কবি মূরের রচিত প্রেম- সঙ্গীতের করুণ সুরলহরী শিস দিয়া গাহিতে গাহিতে নেলি চলিল। সেখহাটি কর্ণের কুঠি হইতে কুঠি অন্তরে যাইবার পথ বহু যোজন } সেখহাটির নীলকুঠি। ব্যাপিয়া প্রকাণ্ড উচু করিয়া বাঁধা ছিল। তাহার দুইদিকে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বাতরু দুরপ্রসারী শাখা প্রশাখায় পাতার মন্দির মাথায় গাথিয়া তরু-বীথিকার বনধারা রচিত করিয়াছিল। মধ্যাহ্নের সূৰ্যকিরণ ও সেখানে প্রবেশ করতে সাহস করিত না। চৈত্রমাসে দারুণ রৌদ্রে ছায়াশীতল সুউচ্চ সেই বাঁধান পথে ভ্রমণ বা অশ্বারােহণ শ্বেতাঙ্গ যুবক যুবতীরা চিত্তবিনােদনে বিলাসলীলার প্রকৃষ্ট প্রসাধন বলিয়া মনে করত। কিন্তু ছায়ায়ঢাকা পাখিডাকা স্নিগ্ধশীতল স্বজাতিপ্রিয় রাজপথে আজ নেলির রুচি হইল না । সে য়ৌদ্র-স্নিগ্ধ নদীতীর বাহী, নদীর কয় সর্পগতি উভয় পার্শ্ববর্তী দীর্ঘ কাড় বনে প্রায় অবলুপ্ত, উচ্চাবচ সরণি বাহিয়া চলিল। সারা কসাড় বনে সাড়া পড়িয়াছিল ; মধ্যাহ্ন ও অপরাহ্নের সন্ধিক্ষণে রৌদ্রতাপের রুদ্রতার অন্তরালে সমগ্র প্রকৃতিব্যাপী যে সৌম্য সঙ্গীতধ্বনি তুলিয়া চিত্ৰবিচিত্র দেই ফুটফুটে ছোট ছােট মনুয়াগুলি লাল লাল ঠোট লইয়া ইতস্ততঃ আহারের সন্ধানে ছুটতে ছুটিতে যে সুরলহরীর অবাধ ফোয়ারা ছুটাইয়াছিল, ফেনিল সে তরঙ্গে, তরঙ্গায়িত হৃদয়ের উদ্দাম কল্পনা নিজের মধ্য দিয়া অবাধে ফুটাইয়া তুলিতে তুলিতে নেলি স্বপন রাজ্যের মধ্য দিয়া চলতেছিল। সহসা সে থমকাইয়া দাঁড়াইল। অজানিত ভীতিপ্রদ শব্দ ও তীব্র গন্ধে সে ভয়বিহ্বল হইল। সম্মুখে দেখিল ফেনশুত্র সূক্ষ্মা গ্র, দুটি দৃঢ় দন্ত প্রসারিত করিয়া একটি বিশালকায় বন্য বরাহ তাহার দিকে ছুটিয়া আসিতেছে। তার গর্জনের ঘেৎ ঘোৎ শব্দে মনুয়াগুলির মঞ্জু মধু বুলি কোথায় লুকাইয়া গিয়াছে ; দূরে টিটিভের হট্টিটির দুন্দুভি নামে ওয়াল জন্তুর সন্নিধি জানাইয়া দিতেছে আর ফিয়ে উড়িতে উড়িতে চেঁচাইতেছে ও বরাহকে ঠোকরাইবার চেষ্টা করিতেছে। মুড়ি পথ, বরাহ দংষ্ট্রীয় নেলী। ১১ দুই পার্শ্বে কসাড়াস্তীর্ণ কণ্টকাকীর্ণ নদীতটলগ্ন উচ্চ ভূমি। আত্মত্রাণের জন্য তরুণী যেমন এই ভূমি বাহিয়া উপরে উঠিতে চেষ্টা করিল, অমনি জুতার উচ্চ হিল অসমভূমিতে পড়ায় তাহার পা পিছলাইয়া, রংয়ের ফোয়ারা ভােলা গাউনখানি কণ্টকগুল্মে ছিন্ন বিছিন্ন হইল, শুত্র ত্ব ছিন্ন করিয়া রক্তধারা ছুটিল, দুধের তরঙ্গে আস্তার ধারা মিলিল, নেলি পড়িয়া গেল। বন্ত বরাহের খদংষ্ট্রার ভীষণ স্পর্শানুভূতি ভাবিতে ভাবিতে নেলি শিহরিয়া উঠিল, ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া আত্মরক্ষা করিবার উদ্দমের ক্ষমতা পর্যন্ত তাহার লুপ্ত হইল। সহসা সাষ্টাঙ্গে ভূপতিত চার্বাঙ্গী তন্বীর দেহষ্ট উল্লম্বন করিয়া ক্ষিপ্রগতি গেরুয়াধারী গৌরবর্ণ, দৃঢ়কায় সন্ন্যাসী জনৈক বঙ্গযুবাদণ্ড হস্তে আসিয়া দাঁড়াইল ; ভুপতিত যুবতীকে পশ্চাতে রাখিয়া বসিল। বৃষস্কন্ধ দৃঢ় করিয়া, সিংহগ্রীবা হেলাইয়া, প্রস্তরের মত মেরুদণ্ড কঠিন করিয়া সুবলিত পেশল উরু, দৃঢ় জানু জোরালাে জঘ সুসংশু রাখিয়া স্ফীত বক্ষে প্রসারিত দণ্ডে বরাহ আক্রমণের বেগ সহ্য করিবার জন্য প্রস্তুত হইতে হইতেই সেই তীক্ষ্ণ অনমনীয়, ধূসর রােমসটার স্ফীত প্রবাহ, দৃঢ় মাংসপেশীর তড়িত্তরঙ্গ, তারুংষ্ট্রা, অতিকায় বরাহ যুবকের উপর আসিয়া পড়িল, সে ভৗষণ সংঘাতে যুবকের সর্বাঙ্গ কঁপিয়া উঠিল কিন্তু তাহার দৃঢ়মুষ্টধৃত দণ্ড স্থলিত না হইয়া বরাহের গতিবেগ নিবারণ করিল। পলক ফেলিতে না ফেলিতে শূকর ফিরিল এবং দ্রুততর বেগে আবার আসিল, আবার প্রহত হইল। পুনরায় আক্রমণ, কিন্তু যুবকের দণ্ড সমান অটুট-বরাহ দেখিল বেগতিক, শীকারতে ফস্কাইয় গেলই এখন নিজেই বুঝি বা শকার হয়-এবার ঋজু দেহে পলায়নের উদ্যোগ চলিল ;-বিদ্যুতের ন্যায় যুবক লাফাইয়া উঠিল, হাতের দণ্ড বজ্রের ন্যায় পিছনের পা দুটির উপর পড়িল, ভগ্নপদে বরাহ ১২ সেখহাটির নীলকুঠি। ভূপতিত হইয়া আর্তনাদ করিতে লাগিল। বস্তাভ্যন্তর হইতে ক্ষুদ্র বাঁশিটা বাহির করিয়া যুবা, তিনটা ফু দিন—সঙ্গে সঙ্গে মাথায় বাবরি চুল, গলায় কী, হাতে তাগা, কানে দুল, গেরুয়া পরা বল্লমধারী তিনজন বাগদী যুবক আসিল ও বরাহকে ফলাগ্নে বিদ্ধ করিয়া নাচিতে নাচিতে লইয়া চলিল।

শ্বেতাঙ্গিনী ও সন্ন্যাসী। ( ৩ ) ইতি মধ্যে নেলি উঠিয়া দাড়াইয়াছে। তাহার তয়বিহ্বলতা কাটিয়া গিয়াছিল কিন্তু চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মত ঘটনাবলি তাহাকে এত বিস্ময়মুগ্ধ করিয়াছিল যে তখনও তাহার বাক্য ফুর্তি হয় নাই। কথঞ্চিৎ প্রকৃতিস্থ হইলে নেলি দেখিল সন্ন্যাসী নিকটে দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিতেছে-“আপনার লাগেনি তাে?” ধন্যবাদ দিয়া সাগ্রহে তরুণী বলিল—“পবিত্র। তােমার সৌম্য মধুর মুর্তি দেখে আমি কখনও মনের কোনেও স্থান দিতে পারিনি যে তােমাদ্বারা অতবড় দুর্দান্ত ভয়ানক পশু এমন ভাবে দমিত বিধ্বস্ত হতে পারে।” এতে বাহাদুরি কিছু নাই মেমসাহেব। সুযােগ ও সুবিধা সংঘটন হলে সবাই এরকম পেরে থাকে। নেলি। এতে সুযােগ সুবিধা সংঘটন নয়, এযে মাসলের (muscle) সঙ্গে মাসলের (muscle) সংঘর্ষণ, চাই শক্তি, চাই সাহস, চাই অসীম তৎপরত। শােন আমার জীবনদাতা। আমি অনেক নীলকর শীকারী দেখেছি কিন্তু তােমার মত এমন প্রত্যুৎপন্নমতি সহসা সমাসঃ বিপত্তির মূখে এমন অবিচলিত ধীর অসমসাহসী লঘুহস্ত অতিসম্পন্ন মানুষ আমি দেখিনি। প। আপনার মেহদৃষ্টির অনুগ্রহ আমার বর্বরতাকেও সুন্দর পবিত্র।

১৪ সেখহাটির নীলকুঠি। করে তুলেছে মেমসাহেব! মহীয়সী, বিদুষী নারী, আপনার নিদেশ- কটাকে আমার ন্যায় নগন্য লক্ষ ভৃত্য আপনার জন্য প্রাণ দিতে আসবে, কিন্তু আপনার মত মান মর্যাদা বাড়াইয়া গুণের আদর করিতে জানেন এমন কত জন কী আছেন ? নেলি। এ এ মেহদৃষ্টি নয়—এ মান মৰ্যাদা দেওয়া নয়—এ গুণমুগ্ধ লুব্ধ হৃদয়ের অকৃত্রিম ভালবাসা। পবিত্র আমি তােমায় ভালবাসি :- নেরি চক্ষে অস্বাভাবিক দীপ্তি, গণ্ড দুটি রক্তরাঙা, অধর রিত। মাথার উপরে দোয়েলের সুধাকণ্ঠ রৌদ রঞ্জিত নীল আকাশ ছাপিয়া উঠিতেছিল। কড় বনের মধ্য হইতে পাপিয়া ঝঙ্কার তুলিতেছিল। দূরে ইচ্ছামতীর উদ্দাম প্রবাহের কল কল ধ্বনি অনিল সঞ্চালনে আসিয়া শ্রুতি সুখকর হইতেছিল। সন্ন্যাসীর পদ্মপলাশ নেত্রের ভ্রমরকৃষ্ণ তারা দুটি বিস্ফারিত হইল অস্ফুট কণ্ঠে কহিলেন—ভালবাসা! মেমসাহেব! আপনি কি পরিহাস কচ্ছেন? নেলি। পরিহাস! সংসারে যদি কথন সত্য কথা বলে থাকি তবে আজ এই নির্জন স্থানে নীল আকাশের তলে দাড়িয়ে বলচি অনিন্দ্যসুন্দর যুবক! যুবতী নেলির তুমি মনের মানুষ, তুমিতো সন্ন্যাসী নও তুমি যে কামিনীর কাম সাধনায় চির সার্থকতা। ঝখানিল তাড়িত ক্ষুব্ধ সিন্ধুর উত্ত, তরঙ্গ : মালা—রসস্যপূর্ণ দুর্বোধ হৃদয়ের দুরধিগম্য তীব্র ভাবোচ্ছাস—তাহার তামসচ্ছায়া নেলির মুখমণ্ডল গাঢ় করিল। সন্ন্যাসী ধীর কণ্ঠে বলিলেন “মেমসাহে ! অপানি কি পাগল।”

শ্বেতাঙ্গিনী ও সন্ন্যাসী।
১৫
তরঙ্গরেখাহীন সুপ্তমীন
হদের মত সৌম্য
প্রফুল্ল তাহার
মুখ পদ্মে বাসনার কালাে রেখার ক্ষীণতম চিহ্নও দেখা গেল না—
স্নিগ্ধ গম্ভীর কণ্ঠস্বর আবেগ উদ্বেগ শূন্য—ইহাকি আত্ম গােপনের
অস্বাভাবিক শক্তি কিম্বা স্বভাব সিদ্ধ সংযম ?
আত্মহারা নেলি বলিল—“পাগল! পবিত্র! তুমি কি জাননা
বিল’তের কবির অক্ষয় উক্তি—প্রেমিক পাগল ও কবির মনস্তত্ত্ব একই
ক্ষেত্রে একই সূত্রে আবদ্ধ—তবে কেন আমায় পাগল বচো।
পবিত্র। দুর্দান্ত নীলকরের লীলাসঙ্গিনী ভীষণ প্রকৃতি মরিসের
লালসার নিধি—ভেবে দেখুন দেখি আপনার এই উদ্যমের পরিণতি
কোন দিকে?
নেলি। ভাবা ?
ভাবা? দেখা ? তুমি কি জাননা পশ্চিমের অন
দেবতা অন্ধ? তার উপাসিকার পক্ষে ভেবে দেখাতো সম্ভবপর নয় ?
তবে আজ মর্মে মর্মে জানলাম নীলকর যতই দুর্দান্ত হোক তার
ভিতরের দুর্বলতা অপরিমেয় , আর তুমি সন্ন্যাসী যতই কোমল
প্রকৃতি বঙ্গ সন্তান বলিয়া নিজেকে পরিচয় দাওনা কেন তােমাদের
মধ্যে এমন একটা কঠোর তেজ নিহিত আছে যার চণ্ড আঘাতে
নীলকরের উদ্যত ফনী নত হয়ে যাবে।
পরিত্র। চেপে যান মেমসাহেব! আত্মসংস্থ হােন। আকাশের
কান আছে, বাতাসের মুখ আছে ; অচল তরু সচল
গােপন কথা ব্যক্ত করে। সত্য প্রেমের সরল ধারা কখন কি মৃদু
প্রবাহী নিস্তরঙ্গ থাকতে পারে?
প্রেমের তরী যে চড়বে ঝঙ্কাতরঙ্গের
বিপুল বিবর্ত তাকেই তাে সহ্য করতে হবে। সুন্দরী! প্রেমের দীপ
জাতে যদি চান্ ধৈর্য্যের নীপাধার সংগ্রহ করুণ।
শক্তিমান্ পুরুষের উক্তির প্রতি শব্দে শক্তি সঞ্চার করে। নেলি

১৬ সেখহাটির নীলকুঠি। আত্ম সংবরণ করিল। ভাবমধুর তাহার মুখখানি সঃ শিশির স্নাত গােলাপ ফুলের ন্যায় স্নিগোজ্জল দেখাইল-পবিত্র বলিল—গাউন ছিড়ে গেছে, সারাগা কাটায় কেটে গেছে, রক্ত ধারা ছুটেছে। সেবাশ্রম দেখতে এসে আজ কি উপদ্রবের মধ্যেই আপনি পড়েছেন। আমে চলুন, বিশ্রাম কৰ্বেন : নেলি। না পবিত্র, আজ আর আমি আশ্রমে যাব না; আজ এখান হতেই ফিরি। পবিত্র। সেকি হয়! চলুন। এই বলিয়া নেলির রক্তকরপল্লব ধীরে ধীরে গ্রহণ করিয়া আকর্ষণ করিল। একি প্রেমানুভূতির অভিব্যক্তি না দেবতার আহ্বান ? নেলির কর্ণে সুধাসঙ্গীত বাজিয়া উঠিল, মানসরাজে সুষমার স্বপ্নে আকাশফুলের সৌরভে অঙ্গে অঙ্গে সঞ্জীবনী-ধারা অনুভব করিতে করিতে নেলি সন্ন্যাসীর সঙ্গে সেবাশ্রমে আসিয়া পৌছিল। নদীতীরে বিপুল প্রান্তরের মধ্যস্থলে সন্ন্যাসীর সেবাশ্রম ; রুগ্নাগার পাশ্ববাস, শিল্পালয়, বালকালিক ও শ্রমজীবি বিদ্যালয়গুলি কল্পলতার মত স্থানীয় অভাব দূর করিবার জন্য প্রতিষ্ঠিত। ব্যায়ামভূমি, ক্রীড়াভূমি অতিক্রম করিয়া দূরে বহু পপসমাকীর্ণ, স্নিগ্ধ তরুচ্ছায় সমন্বিত নানা বিহণকাকলি নাদিত মহাকালী মন্দিরের উচ্চ চূড়া নীলাকাশ ভেদিয়া উঠিয়াছে। কোন প্রাগঐতিহাসিক যুগে লােকচক্ষুর অন্তরালে কোন মহাপুরুষ স্থাপিত করিয়াছিলেন এই মন্দির, প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন দেবতা, জাগ্রত হার শক্তির অলৌকিক বিভূতি, আকৃষ্ট করিত জনসমারােহ, পর্ব দিনে, শনি-মঙ্গলবারে। নীলকরের প্রচণ্ড দৌদও মহাকালীর প্রভাবকে সম্মান করিয়া চলিত এবং এই মন্দিরে নীলকর প্রদত্ত নিত্য ও নৈমিত্তিক পার ব্যবস্থা ছিল।

; শ্বেতাঙ্গিনী ও সন্ন্যাসী। ১৭ সন্ন্যাসী পবিত্ৰানন্দ স্বামী কোথা হইতে আসিয়া এই স্থানে আশ্রম করিলেন; অনাগত শুনিল যেন অতীতের আহ্বান, নবীন আসিল তাই পুরাতনের অভিনন্দনে, মিলন-সৌধ স্থাপনে । সেবাশ্রমে বিশ্রাম করিয়া নেলি সুস্থ হইলেন। রুগ্নাগার ও বিদ্যালয়- গুলি দেখিতে দেখিতে, প্রীতিহাস্যের বিমল উচ্ছাসে মূর্তিমতী সেবা ও আশার আশ্বাসের ন্যায়, নিজের আনীত উপহারগুলি বিতরণ করিতে লাগিলেন। হাতের শােভা দানে, মানুষের শােভা সদ্ভাবের অনুষ্ঠানে। সুন্দরী নেলিকে তাই বড়ই সুন্দর দেখাইতে লাগিল। পবিত্র আসিয়া একটি দুরবীক্ষণ যন্ত্র নেলির হাতে দিয়া বলিল—“দেখুন দেখি পরীক্ষা করিয়া যন্ত্রটি কেমন। সেবার কুঠিতে বিলাতের সেই যে বড় সওদাগর সাহেব এসেছিলেন তিনি সেবাশ্রমকে এই যন্ত্রটি উপহার পাঠিয়েছেন।” উভয়ে তখন ছাতের উপর উঠিয়া চারিদিক দেখিতে লাগিল। সহসা নেলি বলিল, “দেখতাে পবিত্র এরা কারা।” যন্ত্রটি হাতে লইয়া সন্ন্যাসী নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, “তিনটি সাহেব ঝড়ের মত ঘােড়ায় চড়ে বেগে আসছে। যখন কাছিকাটার কনসার্ণের পথের দিক হইতে আসছে তখন সম্ভবতঃ ইহারা নীলকর হিল ও তাহার বন্ধু নীলকরগণ। এখনও প্রায় ১০/১২ মাইল দূরে আছে।” নেলি। দেখ পবিত্র ! আকাশে মেঘ, ঝড় উঠবে। নীলকুঠির আকাশেও মেঘ লেগেছে, ঝড়ের সংবাদ নিয়ে তাই বাজপক্ষীরা ছুটে আছে। আমি কুঠিতে ফিরি। নেলি ও পবিত্র ছাত হইতে নামিয়া আসিল। সেবাশ্রমের মালি সদ্যস্ফুট ও অস্ফুট নানা জাতীয় বৃহদায়তন গােলাপ ফুল, গাছপাকা বড় বড় পেঁপে, কঁচা সােণার রংয়ের মত মােট। মােটা বড় বড় মর্তমান কলার ১৮ সেখহাটির নীলকুঠি। একটি প্রকাণ্ড কঁাদি সম্মুখে রাখিল। এই কয়টি দ্রব্যই নেলির নিতান্ত রুচিকর ও অত্যন্ত প্রিয়, সে সুপ্রসন্ন হইয়া পবিত্রানন্দের দিকে যে বিলােল- কটাক্ষ নিক্ষেপ করিল তাহার অগ্নিবাণ সহ্য করা সাধারণ পুরুষের শক্তি নয়। নেলি কুঠিতে ফিরিল।

সেখহাটির কুঠি। ( ৪ ) সেখহাটি কুঠিবাড়ীর প্রকাণ্ড হাতার একপার্শ্বে একটি ফজলি আমের গাছ। গাছটি এত বড় যে একটি গাছেই একটি কানন সৃষ্টি করিয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। অপরাহ্নে এই গাছের ছায়ায় বসিয়া চা সেবন কর ও সমথিত দুগ্ধ ও দধি হইতে সমুদ্ভূত উৎকৃষ্ট মাখন সহযােগে গরম গরম রুটির টোষ্ট প্রভৃতি ভােজন করা মরিস দম্পতীর প্রথা ছিল। সেই প্রথার সম্মান রক্ষা করিবার জন্যই নেলি অপরাহ্ন ৩টার মধ্যেই সেবাশ্রম হইতে কুঠিতে ফিরিয়াছে। বেয়ারার চায়ের টেবিল সজ্জিত করিতেছে। মরিস আসিল ব্রিচেস্ পরিয়া হাতে বেত লইয়া ঘােড়ায় চড়িবার সাজে। নানাবিধ ফুলকাটা আসমানি রংয়ের পরিচ্ছদ পরিয়া রুজ, পাউডার ও পমেটমে সাজিয়া নেলি আসিল ফুটন্ত ফুলের তােড়ার মত, কোমল কণ্ঠ অনুরাগের মধুতে কোমলতর করিয়া, লােল-কটাক্ষে ভালবাসার উদ্দীপনা জানাইয়া, বিস্বাধরের লালিমায় চলহাস্যের তড়িৎশিখা জাগাইয়া নেলি জিজ্ঞাসিল, “একি প্রিয়! এত পরে দেখা দিয়ে আবার অশ্বারােহণে চলে? মরিস বলিল, “প্রাণের প্রতিমা ভােমার সঙ্গমুখ ছেড়ে কি আমি কোথাও এখন যেতে পারি? তবে একটা নূতন ঘােড় এসেছে একবার মাত্র পরীক্ষা করে দেখবাে। বেয়ারা চা আনতে আনতেই আমার চড়া শেষ হবে।”

সেখহাটির নীলকুঠি। ৫ সহিস কালো রংয়ের তেজস্বী অশ্ব আনিয়া হাজির করিল। দেওয়ান লক্ষ্মীকান্ত ও একতাড়। কাগজ লইয়া আসিল সাহেবের সহির জন্য । দেওয়ানজী ! কাগজগুলি প্রস্তুত হয়েছে তাে একটু সবুর করুন ঘােড়াটা পরীক্ষা করেই আপনার কাজ সেরে দিব।” এই বলিয়া মরিস ঘােড়ার নিকট গিয়া যেমন চড়িতে যাবে অমনি ঘােড় তড়িদ্বেগে লাফাইয়া উঠিল আর নন কুর্দন করিতে করিতে লম্ফ ঝম্ফ দিয়া অতি দ্রুত ঘুরিতে লাগিল। উদ্দাম, উচ্ছঙ্খল, দুর্দান্ত জন্তুকে মরিস ও তাহার সহিস শত চেষ্টা করিয়াও সংযত করিতে পারিল না। সে ঘােড়া কিছুতেই মরিসকে সওয়ার হতে দিল না। ঘৰ্ম্মসিক্ত দেহে অপারক হইয়া মরিস শান্তি দিল ও চায়ের পেয়ালা লইয়া নেলির পাশে বসিল। নেল। কি ভয়ানক অসভ্য পশু। এই দুর্দান্ত জানোয়ারের উপর আবার সােয়ার হ’তে চেয়েছিলে ? প্রিয় ! তুমি তোমার নিজের জীবনের দিকে একটুও চাও না ! এই বলিয়া নেলি মরিসের প্রতি বিলােল কটাক্ষ করিল। লক্ষ্মীকান্ত দেওয়ান সেলাম করিয়া বলিল সাহেব! তা মেম- সাহেবের সাম্নে ' যদি সােয়ার হতেই ইচ্ছা হয়েছিল তা পাচীরের উপর চড়লেই হতো; গাথা পাচীর নড়তে না।” আজকালকার দিনে, নিম্নকর্মচারী বাঙ্গালীর মুখে বাঙ্গালীর মুখে এরূপ কথা শুনিলে উপরওয়ালা সাহেবের মানের ঢেকি কচকচিয়ে ওঠে, কত তেল পড়া, জল পড়া দিলে তবে সে কচকচানির তাল ঠাণ্ডা হয়, কিন্তু তখনকার দিনে স্বাস্থ্যের স্বাচ্ছলে বজ্র দেহ সাহেবেরও যেমন ছিল বাঙ্গালীরও সেই রকম ছিল আর তখনও সাহেবের নবাগত ; সাম্রাজ্যবাদের উগ্ৰসুরা তাহাদের মস্তিষ্ক তখনও বিকৃত করে নাই।

সেখহাটির
কুঠি।
২১
সাহেব ও বাঙ্গালীতে মানুষে মানুষে সমত্বের একটা ভাব ছিল।
তাই দেওয়ানের প্রগতা
নীলকর দম্পতীকে বিরক্ত করিলনা
তাহারা হাসিয়া উঠিল, বলিল “তুমি পার দেওয়ানজী ?
দেওয়ান। হুজুরের হুকুম হলে বান্দা পারেনা এমন কি কাজ
আছে সাহেব? হুকুম দেন হুজুর !
মরিস। আচ্ছা হুকুম দিলাম। যদি ঘােড়ায় সওয়ার হতে পার
তবে এই পঞ্চাশ টাকা তােমার পুরস্কার।
পকেট হইতে নােট বাহির করিয়া মরিস টেবিলের উপর রাখিল।
লক্ষ্মী! (যােড়হাতে) দেহাই মেমসাহেব ! আপনি এই টাকা
জমা রাখুন; সাহেব বড় কঞ্জুষ টাকা বের করেছেন বটে, দেবার
বেলায় পেরে উঠবেন না কিন্তু।
মরিস। Oh! Fie! Fie ! ধিক্ ধিক্ লােভী ব্যক্তি।
অপ্রতিভ কর তুমি তােমার মুনিবকে লেডির সামে।
লক্ষ্মী। গােস্তাকী মাপ করুন হুজুর! গলাকাটার খাল ঘোড়া
লাফিয়ে পার হবার বাজি আমি জিতলাম; হুজুর বাহাদুর কি সে
টাকা আমাকে দিয়াছেন ?
মরিস।
ও সেকথা আমি ভুলে গেছি। তুমি ভারি সেয়ানা।
আমাকে ঠকালে। আচ্ছা প্রিয়তমে (নেলিকে লক্ষ্য করিয়া) রাখতে।
তুমি এই টাকা তোমার জিম্মায়, কিন্তু দেওয়ান! তুমি যদি বাজি
হঠ ?
পকেট হইতে ১০০ টাকার নােট বাহির করিয়া নেলির হাতে
দিয়া দেওয়ান বলিল—মেমসাহেব! গচ্ছিত রাখুন এই টাকা যদি
বাজি হারি আমি তবে বাজেয়াপ্ত করে নেবেন হুজুর সরকারে।
এই বলিয়া সাহেব দম্পতিকে পুনরায় সেলাম করিয়া লক্ষ্মীকান্ত
;

২২ সেখহাটির নীলকুঠি। ঘােড়ার দিকে অগ্রসর হইল। প্রশংসার দৃষ্টিদিয়ে সেই পুরা পাঁচহাত লম্বা জোয়ান দেওয়ানের দিকে চাহিতে চাহিতে মরিস বলিল—“দেখ প্রাণেশ্বরি! আমার দেওয়ান কেমন জবরদস্ত !” নেলি। হ প্রিয়তম! জবরদস্তিতে সে তার প্রভুর উপযুক্ত ভৃত্য ইহাতে আর সন্দেহ নাই। কিন্তু তাহাদের মুখের কথা মুখেই রহিল। বিস্ময়-স্ফারিত নেত্রে তাহারা দেওয়ান লক্ষ্মীকান্তের উদ্যম দেখিতে লাগিল। ঝড়ের মত ঘােড়া ঘুরিতেছিল, বাত্যাক্ষুব্ধ তরঙ্গের ন্যায় বাতাক্ষুব্ধ তরঙ্গের ন্যায় কখন সম্মুখে কথন পশ্চাতে নত উন্নত হইতেছিল, নাসারন্ধ, স্ফীত হইয়া লােহিত। ভ্যন্তর দৃষ্ট হইতেছিল, ব্যদিস্তে দংষ্ট্রার ও জ্যোতি ও দংশনের বিপুল উদ্যম তাহাকে ভয়াল করিয়া তুলিতেছিল। বিদ্যুৎগতি অশ্বের পৃষ্ঠদেশ অভিমুখে লক্ষ্মীকান্ত এক প্রচণ্ড লম্ফ দিল এবং সকলে যখন তাহাকে অশ্বক্ষুর ক্ষত দেহে খণ্ড বিখণ্ড হইতে দেখিবে বলিয়া প্রায় প্রত্যাশা করিতেছিল ঠিক সেই সময়ে সে “মনে যাহা গণনা করা যায় না সংসারে তাহাই ঘটিয়া থাকে” এই প্রবাদ বাক্যের সার্থকতা দেখাইয়া অশ্বপৃষ্ঠে স্থিরাসনে ঋজুদেহে দৃঢ় হইয়া বসিল। লাগাম বা রেকাবের বিন্দুমাত্র সাহায্য সে লয় নাই, অশ্বগতির বেগ বা পৃথিবীর মাধ্যা- কর্ষণের শক্তি তাহার ক্ষিপ্ৰকারিতায় তিন মাত্র বাধা প্রদান করিতে পারে নাই। ক্ষিপ্রহস্তে দক্ষ সহিস লক্ষ্মীকান্তের হস্তে লাগাম ও চাবুক তুলিয়া দিল অমনি শঙ্কর মাছের লেজের চাবুকের ঘায়ে অশ্ব- দেহে ধূম নির্গত করিয়া দিয়া লক্ষ্মীকান্ত দৃষ্টির বহির্ভূত হইয়া গেল। মরিস বলিল -“ব্রেভাে”, নেলি করতালি দিল।

ঝড় উঠিল। মরিস দম্পতীর চা পান ও লঘু ভােজন শেষ হইতে না হইতেই জন- কোলাহল শােনা গেল। “আচ”, “আচে” শব্দ আকাশে লয় পাইতে না পাইতেই লক্ষ্মীকান্তের অশ্ব ঝড়ের মত সাহেব দম্পতীর প্রায় গায়ের উপর আসিয়া অকস্মাৎ পাথরের প্রাচীরের মত স্থির হইয়া দাড়াইল। তােক্ করিয়া লাফাইয়া দেওয়ানজি নামিল, ঘােড়ার লাগাম ছাড়িয়া দিল, সেকালের গুরুমহাশয়ের কাছে শিষ্ট শান্ত সুবােধ পড়ুয়ার মত সেই দুর্দমনীয় উচ্ছঙ্খল পশু স্থির হইয়া দাঁড়াইল ও মুখ বাড়াইয়া দিয়া জিহ্বা দ্বারা দেওয়ানজীর অঙ্গ লেহন করিতে লাগিল। ভােজ-বাজিকরের ন্যায় দীর্ঘ সেলাম ঠুকিয়া লক্ষ্মীকান্ত অশ্বকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “আশীষ করো, আশীষ করাে সাহেবকো, মেম সাহেবকো” সম্মুখের দক্ষিণ পাখানি তুলিয়া উচু করিয়া ধরিল ও ধীরে ধীরে চামরান্দোলনের ন্যায় নাড়িতে লাগিল। পরক্ষণে পা ছাড়িয়া দিয়া বলিল, “আও হামারা সাৎ, পিছু পিছু কুত্তাকা মাফিক্‌।” এই বলিয়া নিজে আগে আগে চলিতে লাগিল আর শক্তের ভক্ত উদ্দাম পশু ধীরে ধীরে পিছু পিছু চলিল। “হুরে হুররে” বলিয়া মরিস চীৎকার করিয়া লাফাইয়া উঠিল, লক্ষ্মীকান্তের পিঠ চাপড়াইয়া বলিল, “দেওয়ানজী বাজী জিতিয়াছ, টাকা লও, খবরদার কিন্তু আর যেন বদনাম করো না যে মরিস সাহেব বাজি ২৪ সেখহাটির নীলকুঠি। হেরে টাকা দেয় না।” এই বলিয়া বাজির টাকা। পঞ্চাশটি দিয়া দিল আর নেলি দেওয়ানের রাখা ১০০ টাকা ফিরাইয়া দিয়া তাহাতে আরাে ৫০ টাকা যােগ করিয়া দিল। আমি নত হয়ে সেলাম ঠুকিয়া দেওয়ানজি বলিল—জয় জয়কার হৌক মেমসাহেবের, জয় জয়কার হোক সাহেবের। সাহেবের চেয়ে মেম সাহেব বড়। সাহেব বাজি হেরে বকৃশিস দেন, আর মেমসাহেব গুণ দেখে পুরষ্কার দেন—জয় জয়কার হোক মেমসাহেবের; জয় জয়কার হৌক মরিস সাহেবের গরীব বামুনের ছেলের বাপ মা তােমরা দুজন, তােমরা দীর্ঘজীবী হ'য়ে চিরসুখী হও আর তােমানের এই অপুষ্টি ছেলেকে প্রতিপালন কৰ্তে থাকে বাবা।” তারপর সুর নামাইয়া সাহেবকে বলিল, সাহেব হুইস্কির ব্যবস্থা করুন। কাছিকাটার বড় সাহেবের ছেলে জুনিয়ার হিল আর দুইজন নীলকর সাহেব আসছেন। এই বলিয়া লক্ষ্মীকান্ত চলিয়া গেল। দেখিতে দেখিতে ফটক পার হইয়া ঝড়গতি তিন জন শ্বেতাঙ্গ অশ্বারােহী আসিয়া পৌছিল। দক্ষ আরােহী, শিক্ষিত অশ্ব। বহু পথ বেগে অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে, তথাপি শান্তির বিশেষ লক্ষণ তাহাদের দেখিলে বুঝা যায় না। অশ্ববিদ্যা ও স্বাস্থ্যবিদ্যা সাধনের পদ্ধতি জানা ও মানিয়া চলার জন্য নীলকর শ্বেতাঙ্গগণের বিশেষ সুপ্রসিদ্ধি ছিল। ইহারই বলে বিশেষ বিদ্যাবুদ্ধি না থাকিলেও সাধারণ প্রজার নিকট ইহার। প্রভুত্ব করিত। তিন জন আগন্তুক সাহেবই ঘােড় হইতে নামিতে নামিতে সমস্বরে বলিল, “মরিস ! ওন্ড বয় ! সুসংবাদ ! আইন পাশ হয়েছে।” মরিস। ( লাফাইয়া উঠিয়া ) ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! ভারতবর্ষ রক্ষা পেলাে। হিল। (নেলিকে লক্ষ্য করিয়া সকলে হাট খুলিয়া এই মহীয়সী ঝড় উঠিল। २० নীলকর ললনাকে সম্মান প্রদর্শন কর—নীল চাষ অক্ষম হবে। প্রভুত্ব করবার জন্যই ভগবান্ শ্বেতাঙ্গগণকে সৃষ্টি করেছেন, সেই শ্বেতাঙ্গের প্রভুত্ব বাংলা দেশ হতে কখনই নষ্ট হতে দেব না। নীলকর রমণী, রমণীর মণি, রূপের খনি, নীলকর এই রমণীর উপযুক্ত হবার জন্য অদ্ভুত সাহস ও তেজ ধারণ করে। এস আমরা নীলকর নারীর নামে তিনবার জয়ধ্বনি দিয়া এই মহীয়সী নারীর আর এই মহাপ্রাণ দম্পতীর স্বাস্থ্য পান করি। সকলে তিনবার জয়ধ্বনি দিল, লঘু ভােজন সমাধা করিয়া সুরাপান আরম্ভ করিবার অব্যবহিত পূর্বে তাহাদের প্রতি ভদ্রতার অভিবাদন জানাইয়া ধীরে ধীরে রাজরাণীর ন্যায় মদমন্থর গমনে নেলি কুঠির মধ্যে প্রবেশ করিল। পিছু পিছু জুনিয়ার হিল আসিল। ড্রইং রুমের মধ্যে প্রবেশ করিয়া পর্দার আড়ালে কার্পেট মােড়া সুন্দর হলটিতে যখন দুইজনে পাশে পাশে দাড়াইল তখন দেওয়ালে লম্বিত প্রকাণ্ড দর্পণে উভয়ের প্রতিচ্ছায়া উভয়ে সম্মুখে পরস্পরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গের ভাব প্রতিফলিত করিয়া উজ্জল হইয়া উঠিল। হিল পকেট হইতে একটি ক্ষুদ্র বাক্স বাহির করিয়া নেলিকে খুলিতে দিল ; নেলি খুলিবামাত্র আসল হীরকের জ্যোতিতে চক্ষু ঝাইয়া গেল ; আনন্দে আত্মহারা শ্বেতাঙ্গ যুবতী হিরকের হারছড়াটি হাতে করিয়া তুলিতেই হিল ধীরে ধীরে সইয়া তাহার গলে পরাইয়া দিল। দর্পণে নিজেকে প্রতিবিম্বিত দেখিয়া নেলি উচ্ছাস ভরে বলিল, “আজ আমার বহুদিনের সাধ পূর্ণ হলো, কি বলে তােমায় ধন্যবাদ দিব বন্ধু?” হিল বলিল, “তবে আমারাে বহুদিনের সাধ পূর্ণ কর ; বাহুবন্ধনে বাঁধিয়া স্বেচ্ছায় সাগ্রহ চুম্বন দাও।” এই বলিয়। সে সুখভােগে প্রিয়দর্শন নিজের মূর্তিখানি কামনার উগ্র রায় রঞ্জিত করিয়া রমণীর ২৬ সেখহাটির নীলকুঠি। হৃদিরাজ্য-জয়কারী বিজয়ী বীরের মত ভঙ্গী করিয়া সটান সােজা হইয়া দাড়াইল ; চক্ষে তার লালসার দীপ্তি; অধরে তার মনভুলান হাসি। দীর্ঘাকার যুবার শিরােনেশ দীর্ঘাঙ্গী নেলির মৌলি অতিক্রম করিয়া অনেক উন্ধে উঠিয়াছে। ভয়চকিত ব্যাকুলতা নেলির চক্ষে ফুটয়া উঠিল, ভ্রিমদৃষ্টির তরলতা তাহাতে মিলিয়া শৃঙ্গার ভাবের প্রবল তরঙ্গ তুলিল। আশে পাশে চারিদিকে একবার চাহিয়াই সে হিলের বুকের উপর ঝাপাইয়া পড়িল। বাহুলতায় তাহার গ্রীবা বেষ্টন করিয়া স্কন্ধে ভর দিয়া মুখখানি উঁচু করিয়া তুলিল আর হিলের নিম্নধরে নিজের ওষ্ঠাধর আবদ্ধ করিয়া, নিতান্ত পীবর স্তনদ্বয়ে হিলের বক্ষস্থল নিস্পীড়িত করিয়া দিল। পাগলের মত হিল তাহাকে জড়াইয়া ধরিল। মূহুৰ্ত্ত মধ্যেই নিজেকে বাহুপাশ হইতে মুক্ত করিয়া তরুণী দাড়াইল। হিল তখন বলিল, “বিদায় প্রিয়ে। বাবা শীঘ্রই কলিকাতায় যাবেন ও সেখানে কিছুদিন থাকিবেন। সেই সময় আমাদের কুঠিতে যেতে হবে?” বাধা দিয়া নেলি বলিল, “আমি তােমার কেনা রইলাম প্রিয়তম! এখন শীঘ্র যাও, নইলে কেহ সনেহ কৰ্বে।” হিল চলিয়া গেল। নেলি নিজের কক্ষে প্রবেশ করিয়া বিমুগ্ধচিত্তে হারছড়াটি দেখিতে দেখিতে বলিল, কি সুন্দর! দাম পঞ্চাশ হাজার টাকার কম নয় ! মরিস। প্রত্যাবৃত্ত হিলকে দেখিয়া মরিস বলিল—তাহলে গ্রাস্টেব (G. P. Grant) ছােটলাট সাহেব) মতি ফিরেছে, আইন যে সুপারিষ কল্লে ! হিল। আরে গ্র্যান্ট তো সুপারিষ কৰ্বেই। আমার পিতা যে তার দক্ষিণ হত। মারে। শােন শোন মরিস! এক গ্লাসের ইয়ার। হিল। * ঠিক তাই এক গ্লাসের ইয়ার।

ঝড় উঠিল २१ মরিস। তবে ক্লেমেনিসকে বগালে কি করে। তিনি যে ড্যাম নিগারদের দিকে ঢলে পড়েন; নিজের জাতের, নিজের দেশের মান ইজ্জত থােয়ান—সস্তায় নাম কেনার ওয়াস্তা-বর্বর নেটিভদের কাছে দয়ার অবতার—একটি আস্ত দিদিমা। হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিয়া হিল বলিল—বাবা! সেইতাে কথা ! কিন্তু আমার বাবাকে তো জান কায নেবার বেলায় ছিনে কে কোন কিছুতে লেগে গেলে ছাড়াবার জো নাই। সাত ঘাটের কাণা কড়ি। বড় বড় ম্যাজিষ্ট্রেট, রাজা রাজড়া, দেশীয় ব্যসসাদারগণ সব তার হাতে। তাদের মত করিয়ে অনেক কাঠ খড়ি যােগাড় করে তবে কাষ হাসিল কৰ্তে হয়েছে । ফিলিপস। গভর্ণমেন্টের কিন্তু কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত তােমার বাপের কাছে। আজ senior হিল ইংরেজ জাতির মান রক্ষা করেছেন। মারে। রাজ্যই যখন শ্বেতাঙ্গের বাহুবলে শ্বেতাঙ্গের রক্তপাতে জয় করা হয়েছে তখন বিলাতের প্রতিপত্তি ভারতে বজায় রাখতেই হবে। তা রাখতে হলে চাই শ্বেতাঙ্গ অধিবাসী, শ্বেতাঙ্গ জমিদার, শ্বেতাঙ্গ নীলকর, শ্বেতা কর্মচারী , নেটিব থাকবে শুধু শ্বেতাঙ্গদের আয় এবং উপায় চির বর্ধনশীল করিবার জনেটিব কে? তারা কাঠ কাটবে জল তুলবে, ফরমাস খাটবে—তাদের উপর আবার দয়া? • ভারতীয়গণের প্রতি ন্যায়ানুকুল ভাব দেখানর জন্য শ্বেতাঙ্গগণ Lord Canninger Tasty #fant Clemency Canning spets ন্যায়পর Canning বলিত।

২৮ সেখহাটির নীলকুঠি। শ্বেতাঙ্গের সুখ দুঃখের অনুভূতির সঙ্গে সেই বর্বরের সুখ-দুঃখে অনুভূতির তুলনা কর্তে যাওয়া একটি বিরাট পরিহাস, বিপুল বিড়ম্বনা। মরিস। এই তো কথা! ভারতে শ্বেতাঙ্গগণই ভারত গভর্ণমেন্টের পাকা বুনিয়াদ। ইহাদের ঠিক রাখে গভর্ণমেন্ট ঠিক থাকবে আর উহাদের কাচা করে উত্যক্ত করে গভর্ণমেন্ট কাচা হবে, ত্যক্ত বিরক্ত হবে, রাজলক্ষ্মী চঞ্চলা হবে, হাত হ'তে শাসনদণ্ড আপনা আপনি খসে পড়বে। মারে। ব্রেভাে মরিস! পালামেন্টে বক্তৃতা করবার জন্য আমরা তােমাকেই আমাদের প্রতিনিধি করে পাঠাবাে। মরিস। কখনই নয়। আর্চিবাল্ড হিল থাকূতে আর কেহই আমাদের প্রতিনিধি হতে পারে না—Hats of to Senior Hill সিনিয়ার হিলকে সম্মান দেখাইতে নিজের নিজের হাট খােল- গভর্ণমেন্টকে বাধ্য করাে, এবারকার সম্মান তালিকায় আমরা দেখতে চাই যে (Senior Hill) সিনিয়ার হিল নাইট উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। Three cheers for Sir Archibald Hill-স্যার আর্চিব হিলের নামে তিনবার জয়ধ্বনি দাও। মদ্যপায়ী ক্ষমতাপ্রিয় স্বল্পবিদ্যাভয়ঙ্কর প্রগন্ত যুবকগণের আনন্দ সমারোহে সম্পন্ন হইতে না হইতেই যামিনীর অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ ঝঞ্চা আসিয়া নামিল। জুনিয়র হিল পকেট হইতে একখণ্ড কাগজ বাহির করিয়া বলিল—এই লও উপদেশ পত্র ইহাতে কর্তব্য গুলি সমস্তই লেখা আছে। তদন্ত বৈঠক বসিবে কি ভাবে—সাক্ষ্য প্রমাণ যােগাড় করিতে হইবে সব বলা আছে। মরিস। নীলকরের সম্মান রেখো। তোমার অধীনে ৫৪টা কুঠর এলাকাভুক্ত এক প্রজা

ঝড় উঠিল ।
২৯
যেন নীলকরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দেয় তার কড়া বন্দোবস্ত কর।
আমরা আজ রাতেই সকল কুঠিয়ালদের সংবাদ দিতে চাই। ব
হুসিয়ার।
এই বলিয়া ঝঙ্কা ও অন্ধকারের মধ্যে ঝঙ্কা ও অন্ধকারের অসুরের
মত ঘােড় দাবড়াইয়া সাহেব তিনটি তিমিরান্তরালে
অদৃশ্য
হইল।

কাণা বুড়িঘােড়র পায়ের তলে পড়িল। কাণা বুড়ি ভিক্ষা করিয়া বেড়ায়। একদিন যৌবন অনাচারের প্রবাহে তার প্রকৃতির সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে দিইছিল। তাই ব্যাধি ও দারিদ্র্যের কশাঘাত তাকে আজ দারুণ শাসন কচ্চে। সকৰ্ম্মের গুরুভারে দেহ তার বেঁকে পড়েছে। অকাল বার্ধক্যে সে আজ বুড়ী, সে আজ কুঁজি ; সে লােল নয়ন যুগের তীক্ষ্ণ কটাক্ষ কোথায় ! যৌবনের সমােহন শক্তিগীনা, সে আজ দীনা। নিয়তির পরিহাস, জীবনের পরিণতি বুড়ী আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছে। সে তাই আজ যেন মাটির মানুষ। যেখানেই আচারের বা অনাচারের অত্যাচার বুড়ী সেইখানেই নিয়তির পরিহাসের পরপারের করুণার ন্যায় উপস্থিত হয়। রুগ্ন শয্যায় সুলােচনার পিতামাতা—সংসার তাদের অচল, সুলােচনা কাথা বােনে, কাবুড়ী সেগুলি বিক্রয় করিয়া বিক্রয়লব্ধ পয়সা আনিয়া তাহাদের দেয়, কখন কখন নিজের ভিক্ষালব্ধ অর্থ কঁাথা বিক্রয়ের পয়সা বলিয়াও তাহাদের দিয়া তাহাদের সংসার সে চালায়। আজ সারাদিন কিছু জোটেনি। শরীরের যন্ত্রণায় বুড়ী ভিক্ষায় বাহির হতে পারেনি। কথা বিক্রয়ের পয়সাও সে আনিতে পারে নাই। তখন তার সুলােচনার শুরো মুখ- খানির কথা মনে পড়িল, আলােচনার বাপ, মা একটু সাগুর প্রত্যাশায় রহিয়াছে তার মনে হলাে, বুড়ী আর সহ্য করিতে পারিল না। নিজের কানাবুড়ি ঘোড়ার পায়ের তলায় পড়িল যন্ত্রণা ভ্রুক্ষেপ করিল না, সে ভিক্ষায় বাহির হলো। সুলােচনার পিতা দ্বারিক বড়য্যে একদিন জেলার উদীয়মান প্রতিপত্তিশালী মােকার ছিলেন কিন্তু অতিরিক্ত পানকােষে যথেচ্ছাচারিতা ও অমিতব্যয়িতায় আজ তিনি পথের ভিখারী—রুগ্নশয্যায় মরণােম্মুখ আর সুলােচনার মা অনীল বাতে পঙ্গু ! একদিন যারা মনে মুক্তহস্ত ছিল আজ তাদের দেবার এক চোখের জল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। একদিন যাদের পরিপূর্ণ ভাণ্ডার আতিথেয়তায় সকলের জন্যই অবারিত থাকিত, আজ তাদেরি অন্য ঘরে ঘরে দুয়ার বন্ধ—ইহাই নিয়তির পরিহাস। গ্রামের বিজ্ঞনামধারী ধৰ্ম্মাভিমানীদের মতে যাহারা পাপ পুণ্যের বিধি নিষেধের গণ্ডী না মেনে নিজেদের কর্ম দোষে অবস্থা বিপর্যয়ে কষ্ট পায় সে কষ্টের জন্য তাহারাই দায়ী, মানুষের দয়া বা সাহায্য পাওয়ার অধিকারী তার নয়, তাই গ্রামের ভদ্র ভায়ারা তাদের সাহায্য করে না, দেখাদেখি অপরাপর লােকের সাহায্যও তারা পায় না, কিন্তু বুড়ীর মনস্তত্ত্ব পণ্ডিতদের বিধি নিষেধের গণ্ডীর মধ্যে নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি। স্ফুটনােম্মুখ জীবনের নবােন্মেষের দিনে প্রথম সুখের জোয়ার যখন তার জীবন যৌবনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তখন মরীচিকার মরীচিমালা তাকে আবক্ষ তৃষ্ণার্ত করে তার সারা জীবন আলায় জালিয়ে দিয়ে তাকে তার আশার কঙ্কালসার করে রেখে গিয়েছিল। তাই যেখানে জালা, জ্বলে উঠে বুড়ীর বুকে তাৰি প্ৰতিজালা, যেখানে ক্ষত, বেজে ওঠে তার হৃদয়ে সমবেদনার তন্ত্রী সেইখানে। তাই লাঠিটি ভর দিয়ে বুড়ী ভিক্ষায় বেরুলাে ; এং কিছু সংগ্রহ করে সে যখন সুলােচনার হাতে দিয়া তার শুকে। মুখে হাসি ফুটাইল, তখন যেন তার সকল জালার উপশম হলো। বাড়ী ফিরিবার পথে সে দারুণ ঝড় জল ও অন্ধকারের মধ্যে পড়িল। অতি কষ্টে মাঠের পথ ছাড়াইয়া সে যেমন বড়, রাস্তার উপরে উঠিয়া ২ সেখহাটির নীলকুঠি। একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল, অমনি জল ঝড় ও অন্ধকারের মধ্যে ঝড়ের মত বেগে বজ্রের মত কঠোর কি আসিয়া তাহাকে পদদলিত করিয়া বেগে চলিয়া গেল। পূৰ্বাধ্যায়ে লিখিত সাহেবদের ঘােড়াগুলি দৌড়ের মুখে বুড়ীকে মাড়াইয়া গেল। দারুণ আর্তনাদ করিয়া বুড়ী দলা পাকাইয়া পড়িয়া রহিল ; রাস্তার জল রক্তে রাঙ্গা হয়ে গেল , সেদিকে দৃপাত মাত্র না করে শ্বেতাঙ্গগুলি যেমন ঘােড়া দুটাইতেছিল তেমনি বেগে চালাইয়া চলিল। অন্ধকার সজীব হ'য়ে উঠলো। পুঞ্জীভুত মােরাশি ভেদ করিয়া কোথা হতে ধারাবর্ষে অসম্মুঢ় তিনটি ব্যক্তি আসিয়া দাড়াইল। কোমরে তাদের গামছা বাঁধা, মাথায় তাদের ফেটা, দক্ষতাদের দক্ষিণ হাতে তল্লা বাঁশের পাকা লাঠি, নগ্ন গাত্রে মাংস- পেশীগুলি পূর্ণ সুগঠিত লৌহ কঠিন। তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দীর্ঘাকার পুরুষ নতজানু হয়ে বসে বুড়ীর নিঃশ্বাস পরীক্ষা করিল—সর্বাপেক্ষা খর্বকায় বলিল—কি অত্যাচার! আর কত দিন এ রকম সহ্য করবে দা ঠাকুর। দীর্ঘাকার ব্যক্তিই দা ঠাকুর-নিঃশ্বাস পরীক্ষা করিয়া ধীরকণ্ঠে বলিল, যত দিন সহ কওে দিয়েছেন ভগবান সহ্য কর ততদিন। এই বলিয়া মায়ের মত স্নেহে দুই হাতে বুড়ীর রক্তমাখা দেহ বুকের মধ্যে করিয়া তুলিয়া লইল এবং থাকার ব্যক্তিকে বলিল- “গদ খাঁ। নিয়ে যাও বুড়াে মেয়েকে দ্বারিক মােক্তারের বাড়ী তার মেয়ে সুলােচনার কাছে-এখনও জীবন আছে, বাঁচতে পারে।” অপর ব্যক্তিকে সম্বোধন করিয়া বলিল - সাধুমাল ! ভােলা নাপিত অার নন্দ কবিরাজকে ডেকে নিয়ে যাও যেন বুড়াে মেয়ের শুশ্রষা ও চিকিৎসার ত্রুটি না হয়। আমি এখুনি ফিরিব।

কাণা বুড়ি ঘােড়র পায়ের তলে পড়িল। এই বলিয়া চাদ খায়ের হাতে কাবুড়ায় রক্তমাখা দেহ দিয়া দা’ ঠাকুর সেই উচ্চ পথের ধার বাহিয়া নিম্নভূমিতে অবতরণ করিতে করিতে অন্ধকারে মিলাইয়া গেল। চাদ বলিলদা’ ঠাকুর আবার সাহেবদের পিছু নিল কেন? সাধু—একটা মতলব নিশ্চয়ই আছে। আমরা হুকুমের চাকর হুকুম मानि চল। এই বলিয়া দা ঠাকুরের নির্দিষ্ট পথে চাঁদ ও সাধু বুড়ীকে লইয়া চলিয়া গেল। এদিকে দী’ ঠাকুর নিম্নভূমিতে নামিয়া একেবারে তীরের গতির মত সােজা পথ বাহিয়া লাঠি ভর দিয়া রণপায়ে নক্ষত্র বেগে ছুটিল। এইখানে বাঁধনে পথ বহুদুর বাঁকিয়া গিয়াছে—দাঠাকুর রণপায়ে ঋজুপথে যখন বাঁকের মূখে আসিয়া উপস্থিত হইল, তখনও সাহেবের আসিয়া পৌছে নাই। রাস্তার দু'ধারে বিস্তৃত বর্ষা বৃক্ষের মড়কা ডাল- গুলি ঝড়ে ভাঙ্গিয়া পড়ায় সাহেবদের ধীরে ধীরে রাস্তা চলিতে হইতেছিল। সেই সুযােগে দা’ ঠাকুর নিজের কোমর হইতে একগাছি দীর্ঘ, সরু কিন্তু দৃঢ় রঙ্গু বাহির করিল। সেই স্থানে রাস্তার দু'ধারে ঝােপ। ক্যাওড়া ও ঝাড়ের ঝােপ প্রস্তুত করিয়াছে। দুই ধারের দু’টি সরু সরল গাছের সঙ্গে দড়ীর দুই ধার বাঁধিয়া দিয়া ঝােপের অন্তরালে দা’ ঠাকুর অপেক্ষা করিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে সাহেব আসিয়া পড়িল—সেই স্থানের নিকটবর্তী কিয়রের ভগ্ন শাখা প্রশাখায় রাস্তা অবরুদ্ধ না থাকায় সাহেবেরা দ্রুত বেগেই ঘােড় চালাইতেছিল। দড়িতে বাধিয়া ঘােড়া ও মােয়র ভূমিশায়ী হইল, হিলের অত্যন্ত লাগিল; ফিলিপ ও মারে যেমন তাহাকে সাহায্য করিতে যাইবে অমনি ফিলিপ কৰ্ণমূলে ও মারে কটিদেশে ভীষণ আঘাত পাইয়া

৩৪
সেখহাটির নীলকুঠি।
ভূপতিত হইল। আর ঘোড়াগুলি মার খাইয়া এগে দিকে দিকে
পলাইয়া গেল—এই গােলযােগের মধ্যে দড়িগাছটি নিঃশব্দে সংগ্রহ
করিয়া অবিচলিত চিত্তে দা’ ঠাকুর ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে দ্বারিক
মােতারের বাড়ীর দিকে চলিল।

কাশীশ্বর জননেতা হইল ও ক্ষেত্রমণি অভিসারে চলিল। ( ৭ ) গ্রাম পুণ্যপুর। অপরাহ্নে ক্ষেত্রমণি নিজের রূপপানি পরিমার্জিত করিয়া তুলিল। তার টানাটোনা ভাসা ভাসা চোখ দুটার উপর ঢেউ খেলান সৰু বাকা ভুরু দুটা কাচপােকার টিপের উপর আসিয়া মিলিল। নিবিড় ঘন, মিশমিশে কালাে, থকা থকা তার দীর্ঘ চুলের বােঝা, চিরুণী জব্দ করিয়া প্রসাধনকারিণীর হাতের বল ও কৌশল পরীক্ষা করিয়া আপনার অসংন্তত অজস্রতা বহু আয়াসে বশ মানিয়া চিকণ বিননীর দক্ষতার মধ্যে সুসংগত হইল। অভ্যস্ত হস্তে ক্ষেত্রণি তখন লক্ষ টাকা মূল্যের খোঁপা বাঁধিয়া ফেলিল, সিথি ও ঝাপটায় মুখখানির স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য্য সুন্দরতর করিয়া তুলিল। ভাবকে শিল্প স্বাভাবিক ভাবে সুন্দরতর করিতে পারে । কেএমণি সে কৌশল জানিত। তাই পঞ্চবিংশতি বর্ষীয়া হইলেও ক্ষেত্ৰমণি যােড়শীর ন্যায় লাবণ্যময়ী, হাবভাবে পরিলক্ষিতা। সুতা, সুবাসিতা, প্রসাধনা কৌশলে চাকচিক্যময়ী ক্ষেত্ৰমণি যখন তারার ফুলকাটা নীল সাড়ী পরিয়া নীল সমােবরে কমলিনীর ন্যায় ফুটিয়া উঠিল তখন সে সন্ধ্যায় প্রাক্কালে তাম্বুল রঞ্জিত রক্তাধরে প্রফুল নয়নে চারিদিকে দৃষ্টিপাত সেখহাটির নীলকুঠি। এত করিতে করিতে দেখিল, তাহার অঙ্গনের সম্মুখের রাস্তা দিয়া তরুণ যুব। পরেশনাথ যাইতেছিল। সুকুমার, সােবময় পরেশের ব্যায়াম শশাধিত নির্দোষ দেহ ; বিদ্যা ও প্রতিভার প্রভায় উদ্ভাসিত তাহার প্রশস্ত গৌর ললাট ; দুরভিগম্য তার দৃষ্টি ; দুরবগাহ তার হৃদয়। মেধা বিচ্ছুরিত উজ্জ্বল তার নয়ন দু’টি, অন্তরের অন্তরতম গুহায় নিহিত কোন্ উচ্চাকাঙ্ক্ষা উদ্দাম প্রেরণায় কোন অজানা রাজ্যে, কোন অনাগতের কষে, কোন আকাশকুমের কালতায় আকৃষ্ট বলিবে। তাই বুঝি সে সুন্দর, এত রহস্যময়, এত শক্তিশালী। ক্ষেত্ৰমণি অধরে মৃদু হাসির হিল্লোল উঠাইল, সুরে মধু ঢালিল, কটাক্ষে বিদ্যুৎ খেলাইয়া জিজ্ঞাসিল “দাদা- বাবু! এদিকে কোথায় গেছিলেন?” পরেশের উদাস দৃষ্টি ক্ষণিকের জন্য ক্ষেত্ৰমণির মুখের পরে স্থাপিত করিল, পরক্ষণেই তাহার চক্ষু দীপ্ত হইয়া উঠিল ভ্রু ও ললাট কুঞ্চিত হইল, সে কোন কথা না বলিয়া সমান চলিয়া গেল। বিকৃতজঘনা ক্ষেত্রমণির যৌবন-রসে জ্ঞতদাদ হইবার কল্পনাকেও মনে স্থান না দিয়া, তাহার রূপের ডালি আম্রাণ করিবার বিন্দুমাত্র আগ্রহও না দেখাইয়া তাহার কৌশল- জাল অনাড়ম্বরে উপেক্ষিয়া পরেশ চলিয়া গেল। ক্ষেত্রমণি অন্তরে বেদনা পাইল। এ যাবৎ কোন পুরুষের কাছে সে কোন দিন উপেক্ষিত হয় নাই বরং সেই সৌখীন পুরুষদের সাগ্রহ আহ্বান কতদিন উপেক্ষা করিয়াছে। কিন্তু এ অবহেলায় ক্ষেত্রমণি চটিলনা তাহার নয়নে নয়নে অধর কোণে কৌতুক হাস্য ফুটিয়া উঠিল। সে মনে মনে বলি “আচ্ছা জালা পাখী, আজ চলে গেলে যাও, মেণি তােমাকে খাচায় পুরবেই পুরবে, তবে তার নাম ক্ষেত্ৰমণি।” দেখিতে দেখিতে পূৰ্বাধ্যায় কথিত ঝড় উঠিল। কেমণি সন্ত্রাসে কাশীশ্বর জননেতা হইল ও কেএমণি অভিসারে চলিল। ৩৭ ঘরের মধ্যে গিয়া খিল দিল। বহু বৃক্ষ ধরাশায়ী করিয়া, বহু গৃহ পালিত করিয়া ঝড় ও জলের বেগ কমিতেছে এমন সময়ে কেএমণির শয়ন ঘরের দরজায় কে মৃদু করাঘাত করিল। কেএমণির অন্তর পুলকে নৃত্য করিয়া উঠিল, তাহার বক্ষোজ দু'টি ঘন ঘন স্পন্দিত হইতে লাগিল, সে ভাবিল, তার জঙ্গলা পাখী পরেশ বুঝি ফিরিয়া আসিল। সে নিঃশব্দে আর খুলিয়া : দিল। কোথায় পরেশ ? সট, করিয়া কাশীশ্বর বাঁড়ুয্যে আসিয়া ঢুকিল। কাশীশ্বর প্রৌg, বিরলকেশ, কীণদেহ, খর্বকায়, ধূর্ত, শঠ, উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন চটপটে ও কর্মঠ। কোট-গত তার চটুল চক্ষু। অধরােষ্ঠে তার আসলিন্স; অপেক্ষাকৃত এশত চিবুকে উচ্ছলতা। কাশীশ্বর আসিয়াই চোরের মত ঘর ঢুকিল আর এদিক ওদিক চাহিয়াই দরজা বন্ধ কৰিয়া দিল। কাশীশ্বরকে দেখিয়াই জেএমণির সৰ্বাঙ্গ আলিয়া গেল সে ব্যঙ্গভরে উচ্চকণ্ঠে বলিল—“কিগাে বাৰা ঠাকুর। মামাশ্বশুর হয়ে ভাগনে বৌএর সঙ্গে পিরীত কর্তে এসেছে। বুড়াে বয়সে মুখে মুড়ো জোটে না।” কাশীশ্বর কাচুমাচু হয়ে নিতান্ত নিয়ে বলিল—“ছি কেতু। তােমার সব তাতেই র, তুমি মামাশ্বশুর বলে টাচো কেন, তােমার মা যে আমাকে খুড়াে বলত তুমি যে আমার নাতবৌ আনি কি বেসম্পর্কে কাজ করি।” মেনি। ওরে আমার সম্পর্ক মেনে চলা রসিক নাগর নাদি মেগােহ'তে এসেছো, দাড়াও তােমার মুখে মুড়ো আচি।” এই বলিয়া সেই মুখরা কুলটা ধাকা দিয়া কাশীশ্বরকে ঘরের ভিতর ফেলিয়া দিল; তীরবেগে ঘরের বাহিরে গেল ও বাহির হইতে শিকল বন্ধ করিয়া উচ্চকণ্ঠে লােক ডাকিতে লাগিল। দু একটি করিয়া লােৰু জমিতে লাগিল। তাহাদের মধ্যে আসিল মধু পাত। মধু জাতিতে গন্ধ বণিক ; সেইগ্রামে অনেকের নাম মধু থাকায় আর মধুর তগুলি সেখহাটির নীলকুঠি। একটু উচু থাকায় মধুর নাম হইয়াছিল, মধুদাত। মধুদাত বলবান, নিশাচর, পরস্থাপহারী—কিন্তু খেয়াল হইলে প্রতিবেশীর দায়, দৈবে, বিপদ-আপদে মাথা দিয়া পড়িত। ক্ষেত্ৰমণি তখন নানাভাবে, নানাঘরে নিজের দুঃখের গান গাহিতে গাহিতে বলিল—সে অবীরা, অনাথা, নিতান্ত দুঃখিনী--অবলা, ত্রিজগতে তার আপনার বলতে কেউ নাই- সে গ্রামের একপ্রান্তে সকলের ছােট হ'য়ে, সকলের কাছে ভিক্ষা করে নিজের পেট চালায়, তাই বলে কেউ তাকে নষ্ট দুষ্ট কুচরিত্রা কুলটা বলতে পাৰ্বে না—কিন্তু কুলােকে তার পাছে পাছে ঘােরে; তার জাত মার্তে চায়, দশের কাছে তার মাথা হেঁট কর্তে চায়। সে আজ তাই লােক আটক করেছে দশে ধর্মে জানাবার জন্যে : ক্ষেত্ৰমণির গেখের জল যেন হুকুম মানিয়াই অঝােরে ঝরিতে লাগিল। কান্নার সুরে গগনের সিক্ত বাতাসে রিক্ততার আমেজ আনিয়া দিল। তাহার মাথার কাপড় অকস্মাৎ খুলিয়া পড়িল বিশাল কবরী লােকচক্ষুর গোচরে আসিল, বঙ্গোরুহ লগ্ন, নীল সাড়ী এলাইয়া পড়িল একে সুদর্শন যুবতী—তাতে রােমানা, অসংন্যস্তা বসনা, ক্ষেত্ৰমণি সহজেই সমবেত পুরুষগণের সহানুভূতি আকর্ষণ করিল। দু একজন ৰষীয়সী স্ত্রীলােক যারা এসেছিল, তারাই কেবল অর্ধস্ফুট স্বরে বলিল “কারণ আর কি! ঢং দেখনা।” মধুদাত শিকল খুলিয়া ঘরের ভিতর চুকিল ; ঘরের মধ্যে আবদ্ধ পুরুষ মানুষটিকে উত্তম মধ্যম দিতে দিতে টানিয়া বাহিরে আনিয়া আলােকে ভাল করিয়া দেখিল ও সকলকে দেখাইয়া বলিল-“এ কি! বাঁড়ুয্যে মশায়। আপনার এই কাজ।” নেড়া বাগি চোইয়া বলিল-“ছিঃ মােশায় তােমরা আপনারা ভর নােক, বড়নােক, তােমরা আপনারা যদি এই রকম কর তবে আমাদের গরীব লােকের আর জাত মান নিয়ে ঘর করা যায় না। ছি।” ।

কাশীশ্বর জননেতা হইল ও ক্ষেত্ৰমণি অভিসারে চলিল। ৩৯ দেখিতে দেখিতে স্থানটি স্ত্রীপুরুষে ভরিয়া গেল। কাশীশ্বর তখন একবার মধুদাতের একবার সমবেত স্ত্রী পুরুষদের কখন হাতে কখন পায়ে পড়িতে লাগিল, কঁদিয়া ভাসাইয়া দিল, দন্তে তৃণ করিয়া জোড় হাতে সকলের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগিল। এই লাঞ্ছনার প্রহসন যখন পূর্ণমাত্রায় চলিতেছিল, ঠিক সেই সময়ে হিল, মারে ও ফিলিপ খোড়াইতে থোড়াইতে সেখানে আসিয়া পৌছিল। দারুণ ঝড়ে সহসা ভগ্ন বৃক্ষশাখায় তাহারা আহত হইয়াছে, তাহাদের ঘােড় জখম হওয়ায় তাহারা ঘােড়াগুলি ছাড়িয়া আসিয়াছে, তাহারা লােক ও আনে। চায় যাহাতে তাহারা সন্নিহিত কোন নীলকুঠির নায়েব গােমস্তার বা পাইকের বাড়ী যাইতে পারে ও যাহাতে তাহাদের ঘােড়াগুলি আনাইবার ব্যবস্থা হয়, সাহেবী বাঙ্গালায় এই কথাগুলি তাহারা বুঝাইতে চেষ্টা করিল। বাঘ বা ভালুক দেখিলে লােকে যেমন ভীত হয়, নীলকরগণ বঙ্গ- দেশের সাধারণ নরনারীর নিকট সেইরূপই ভয়ের বস্তু ছিল। সমবেত জনতা সাহেবদের দেখিবামাত্র অন্ধকারে মিলাইয়া যাইবার উদ্যোগে ব্যস্ত রহিল , এহেন মধুদাত ও নেড়া বাগী তাহারাও দমিয়া গেল। চতুর কাশীশ্বর কিন্তু সুবর্ণ সুযােগ পাইল। যেন কোন ঐন্দ্রজালিক স্পর্শে তাহার নাকে কাদা, কাকুতি মিনতি করা, হাতে পায়ে ধরা, হীন অনুগ্রহ চাওয়া নগন্য যাচকের সঙ্কোচ শরীর, আকুঞ্চিত বিকুঞ্চিত ভুলঙ্গের বেপণুমান গমনশীল দেহ সহসা পরিবর্তিত হইল। চকের নিমেষের মধ্যে সে একটা মত কেও কেডা গ্রাম্যনেতা সমাজপতির ভাব ধারণ করিল ও সটান সােজা হইয়া মাথা তুলিয়া সাহেবদের সম্মুখে সকলকে দেখাইয়া সাহঙ্কারে দাড়াইল ও পরক্ষণেই আভূমি নত হইয়া এক প্রকাণ্ড সেলাম করিল ও একগাল হাসিয়া প্ৰতিপ্রফুল্লকণ্ঠ বলিল, “কোন চিন্তা নাই, হুজুর বাহাদুর ! বালা এখনই সব বন্দোবস্ত করে দেবে।” এই বলিয়া ৪০ ; সেখহাটির নীলকুঠি। নেড়া বাগীকে উদ্দেশ করিয়া সে গম্ভীর কণ্ঠে বলিল, “এই নেড়া! তােক সেই থেকে বলচি আলােটা নিয়ে হুজুর বাহাদুরদের এগিয়ে দিতে, তা কথাটা যে কাণেই তুলচিস না; শিগগির আলাে নিয়ে চল্ ৰচি ; যাদের রাজ্যে বাস করি, যাদের প্রতাপে বাঘে হরিণে এক ঘাটে জল খায় সেই নীলকর বাহাদুরেরা এয়েছেন আর তুই কিনা এখনও ইতস্ততঃ কচি। শিগগির চল বলছি।” নেড়া জনান্তিকে বলিল, “উঃ গুতাে দেখ না?” প্রকাশ্যে বলিল, “এই যে দা’ ঠাকুর যাচ্চি; কোথায় যেতে হবে বলুন;” এই বলিয়া নিজের আলােটি লইয়া নিরীহ ভক্তের মত আগে আগে চলিল। কাশীশ্বর তখন সাহেবদের সঙ্গে লইয়া সগৰ্ব পদবিক্ষেপে পরেশ গাঙ্গুলীর বাড়ীর দিকে চলিল। নিয়তির পরিহাস বিদ্যুবিকাশের ন্যায় অপমান ও ঘৃণার জীবকে ক্ষণিকদীপ্তিতে ভাসমান করিল, জনসাধারণের চকিত দৃষ্টির সম্মুখে এনাগ্রের আসনে আনিল। জনতা চলিয়া গেলে কেমণি দেখিল, তাহার ঘরের দাওয়ায় এক ব্যক্তি হাঁটুর মধ্যে মাথা দিয়া বসিয়া বসিয়া নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে ; তাহার পাশে একটি লণ্ঠন, ফিতা নামাইয়া দেওয়ায় খুব মিটি মিটি এলিতেছে, হাঁটুর তলায় লাঠিগাছটি রহিয়াছে। ক্ষেত্ৰমণি মৃদুস্বরে বলিল, “গৌর দা নাকি।” গৌরহরি দাসের চটকা ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল, নাকডাকা থামিল। সে বলল, “ ভাই, চল।” ক্ষেত্ৰমণি বলিল, “এখুনি?” গৌরহরি। জরুরি তলপ দেরী করাে না। কেএমণি। আমি ভাবলাম এই ঝড় জলে কর্তা বুঝি ভুলে গেলেন। গৌরহরি। ভােলা! কর্তা কি ভােলা লােক ; তবে আমি ভাবছিলাম আগে খবর নেই তােমার ঘরে যদি লােক থাকে। • কাশীশ্বর জননেতা হইল ও ক্ষেত্ৰমণি অভিসারে চলিল। ৪১ কেএমণি। গৌর দা কি ফেলে ! থাকুলাে ৰা লােক, কর্তার তলপের পর কি আর কারো কথা আছে। গৌরহরি। সেই ভরসায় তাে আশা; অমন গরীবের মা বাপ মুনিব আর হয় না। আমি বল্লাম ক্ষেত্ৰ দিদি তেমন মেয়েই নয়, কার খবর জানলেই উঠে চলে আসবে। এখন চল। “চল” বলিয়া ক্ষেত্ৰমণি ত্বরিত পদে গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া গহনা গুলি বাহির করিয়া সন্তর্পণে পরিল; দর্পণ সম্মুখে অসন্ত প্রসাধনা সংন্যস্ত করিয়া লইল। পানের ডাবরের কাছে বসিয়া, হাঁচি পানগুলি ৰাছিয়া লইয়া অতি মিহি করিয়া কাটা গুবাকুতে ছােট এলাচ ও পানের মশলা প্রভৃতি দিয়া সুগন্ধি খদিরে উৎকৃষ্ট এক ডিবা পান সাজিয়া ও পানগুলিতে আতর লাগাইয়া রেশমী রুমালে বাঁধিয়া তাহাতে জলের ছিটা দিয়া গৌরহরির সঙ্গে নিশাঅভিসারে উলসীর কাছারিতে নায়েব মহাশয়ের কাভিমুখে চলিল।

পরেশ গাঙ্গুলির সাংসারিক জ্ঞান জন্মে নাই। ( ৮ ) পুণ্যপুরের তরুণ জমিদার পরেশ গাঙ্গুলির সাংসারিক জ্ঞান জন্মে নাই। অন্ততঃ বিষয়ী লােক বিষয় কৰ্ম্ম রক্ষার জন্য যে সমস্ত কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে তদনুযায়ী জ্ঞান পরেশ গাঙ্গুলি উপার্জন করিয়া উঠিতে পারে নাই। বাল্যে পিতা যথেষ্ট বিষয় সম্পত্তি রাখিয়া লােকান্তরে যান। মাতা সেই সমস্ত সম্পত্তি অপেক্ষাও পুত্রকে বহুতর মূল্যবান জ্ঞান করিয়া উদারচেত সর্বশাস্ত্রজ্ঞ অধ্যাপক স্বামীর উপযুক্ত আদর্শে গঠিত করিবার জন্য সর্বস্ব পণ করিতে উদ্যত হইলেন। মাতামহ নরেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায় তখনও বর্তমান রতনপুর পরগণার একমাত্র ভূস্বামী তিনি। পরেশের মাতাই তাহার একমাত্র কন্যা, মাতামহের অবর্তমানে সমস্ত সম্পত্তিই পরেশনাথের। তাই নরেন্দ্রনাথ ও কন্যার সহিত একমতা- বলখী হইয়া পরেশনাথ যাহাতে সর্বতাে বিসারিণী বিদ্যলাভ করিতে পারেন, সেই বিষয়ে উদ্যোগী হইলেন। পিতা ও কন্যা উভয়েই পরেশনাথকে কলেজে ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত করিবেন এ বিষয়ে মােটের উপর একমত হইলেও কতকগুলি বিষয়ে কন্যা রুদ্রাণী পিতার সহিত একমত হইতে পারেন নাই। রুদ্রাণীর পিতা নরেন্দ্রনাথ তখনকার দিনে ইংরাজি শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত, ঘােরর স্বাধীনবাদী, সকল ধর্ম- M পরেশ গাঙ্গুলির সাংসারিক জ্ঞান জন্মে নাই। ৪৩ মতের বিরােধী। সমাজে, সকলের মাঝে নির্ভয়ে নিজেকে নাস্তিক বলিয়া প্রচার করিতে তাহার বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা ছিল না এবং কাহাকেও গ্রাহ্য করা বা কাহারও মৰ্যাদা রাখিতে গিয়া সত্যের অপলাপ করা এ অভ্যাস তাঁহার কখনও ছিল না। তিনি নিজে হিন্দু, ব্রাহ্ম বা খৃষ্টান কোন ধর্মমতাবলম্বীই ছিলেন না তথাপি ব্রাহ্ম ও খৃষ্টধর্মে তিনি বরং পক্ষপাতী ছিলেন কিন্তু হিন্দুধর্মে তঁাহার ঘােতর অনাস্থা ছিল। কি জীবনে সকল কাৰ্যে সকল অবস্থায় সত্য ও সরলতার সমর্থন তিনি করিতেন। তিনি প্রতিদিন নিয়মিত মদ্য পান করিতেন এবং প্রকা তাহা বলিতে কুণ্ঠা বোধ করিতেন না। তাই বলিয়া তিনি মাতাল নন এবং বহুদিন হইতে বিপত্নীক হইলেও চরিত্রহীন নন। অত্যাচ পুরাদস্তুর সাহেবী মত ও সাহেবী মেজাজ হার ছিল। রুদ্রাণীর কিন্তু ছিল হিন্দু ধৰ্ম্মে অটুট বিশ্বাস ; তাই পিতৃগৃহে যাইয়া পুত্রের লালন পালনে তিনি অনাস্থা প্রকাশ করিলেন এবং স্বামী গৃহে থাকিয়াই পুত্রের সুশিক্ষার ব্যবস্থা করিতে লাগিলেন। তাঁহার স্বামী ছিলেন হিন্দুশাস্ত্রে সকল কলা পারদর্শী অগাধ পণ্ডিত। তিনি শাস্ত্রের ভাসা ভাসা কথার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেন নাই। সত্যের প্রকৃত তথ্য প্রতি শাস্ত্রমতের মূলে যখন দেখিতে পাইতেন তখনই সেই মতের মর্মানুযায়ী কাৰ্য্য করিতেন অন্যথায় নয়। তাই নিয়ম নিষ্ঠায় দৃঢ়াচারী হইলেও কুসংস্কার তাহাকে কখনও আচ্ছন্ন করিতে পারে নাই। সঙ্কীর্ণতা তাঁহার মনের কোণেও স্থান পাইত না, গোঁড়ামির যন্ত্রণা তাহাকে কখন ভােগ করিতে হয় নাই। মৃত্যুর কয়েক বৎসর পূর্বে ইংরাজি অনুশীলন করিয়া তিনি ইংরাজি মতের সহিত হিন্দুশাস্ত্র মতের ঐক্য ও অনৈক্য, শ্রেষ্ঠতা ও অপকৃষ্টতা বিশেষ ভাবে আলােচনা করিতেন। রুদ্রাণী এ বিষয়ে তাহার শিষ্য ছিলেন। রুদ্রাণীকে সংস্কৃত, বাঙ্গালা ও ইংরাজিতে নিজে শিক্ষিত করিয়া তাহার ৪৪ সেখহাটির নীলকুঠি। মনের স্বাভাবিক হিন্দুধর্মের প্রতি অনুরাগের ভাৰ যুক্তি দ্বারা ও অন্যান্য ধর্মের তুলনায় শ্রেষ্ঠতা উপলব্ধি দ্বারা সুদৃঢ় করিয়া তুলিয়াছিলেন। পিতার সত্যপ্রিয়তা, সর্বপ্রকার মিথ্যা, ভণ্ডামি ও কপটতার বিরুদ্ধে নিজেকে বিপন্ন করিয়াও দাড়াইবার শক্তি ও তত্ত্বদশী স্বামীর দেবতা দুর্লভ চরিত্র, মহাপ্রাণতা ও গভীর জ্ঞান এই উভয়ের সংমিশ্রণে গড়িয়া উঠিয়াছিল, আমাদের রুদ্রাণীর মনােরাজ্য স্বাভাবিক যাহার সম্পদ সুষমা কাজণীয় হইত স্বর্গের রাজরাণী ইন্দ্রাণীনরা। এই কোলের বাছা কোলে পাওয়ার পর সাত বৎসর হইতে না হইতেই মুছিয়া গেল যখন তাহার সিথী হইতে সীমান্তের সিন্দুর, খসিয়া গেল হাত হইতে আয়তির কঙ্কণ, স্ত্রীলােকের সেই সর্বাপেক্ষা দুর্দিনে তাহার মনের তরী কর্ণধারহীন তরুণীর ন্যায় সংসার আবর্তে দিকহারা হইয়া দে তরঙ্গে ঘুরিয়া বেড়াইল । প্রতিভার আকাশে সৎ সঙ্কল্পের ধ্রুবতারা চালিত করিল তাঁর জীবনের তরীখানি সত্যের পথে বিবেক বুদ্ধির আকর্ষণে। পতির রুণধিবংসী দেহ বিগত হইলেও সেই কল্যাণশীল আত্মার চিরজ্যোতি রুদ্রাণীর মানসাকাশে পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় নিত্য কুরিত হইতে থাকিল। তিনি পুত্র দেহে বিগত স্বামীকে বিরাজিত দেখিলেন। প্রাণের আরাধ্য প্রিয়ের সুখের জন্য সেবানিষ্ঠার আত্মবিসর্জনে সঞ্জাত পুত্রকে পিতৃহীন নিরাশ্রয় দেখিয়া বিশ্বজয়ী মাতৃত্বের মহামহিমা পরিস্ফুরিত হইল রুদ্রাণীর হৃদয়ে। তিনি বুঝিলেন এতদিনের ধর্মানুমােদিত সংসারের সুখতােগের পরিণতির সময় আসিয়াছে ত্যাগের প্রতিষ্ঠায়। আত পতির প্রতি প্রেমনিষ্ঠা পরিপূর্ণ করিবার প্রকৃত দিন। ত্যাগ ও সংযমের যুপকাষ্ঠে আত্মজীবনের ভােগলালসার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞার তীক্ষ্ণ থঙ্গে বলিদান দিতে হইবে। তবেই ব্রহ্মচারিণী মায়ের মহামাতৃত্বের জলন্ত জীবন্ত আদর্শ সম্মুখে দেখিয়া বিকশিত হইবে সন্তানের জীবনতরু প্রতিষ্ঠার পরেশ গাঙ্গুলির সাংসারিক জ্ঞান জন্মে নাই। ৪৫ ; ক্ষেত্রে, ধর্মের আহাওয়ায়, অমৃতের সিঞ্চনে, শান্তির আবেষ্টনে। রুদ্রাণী সেইদিন হইতে আর বন্ধু রহিলেন না, তিনি হইলেন সন্তানের মা, সংসারের না। এমন মায়ের ছেলে পরেশনাথ কি করিয়া ক্ষুদ্র ব্যর্থ বােধ সম্পন্ন কুট বিষয়বুদ্ধিতে পারদর্শী হইবেন। তার মা যে ব্রহ্মাণ্ডের মা, অনাথ আতুর ক্লিষ্টের মা ; সে তো কখনাে তাদের পর ভাবিতে শেখে নাই, সকলেই যে তার মায়ের ছেলে ; রমণী যে তার কাছে মহামহিমান্বিত মায়ের জাতি ; রমণীর ছেলে যে তার ভাই সেই শিক্ষায় সে গঠিত। তাই ইংরাজি, বাঙ্গালা, সংস্কৃত, ল্যাটিন প উর্দুতে পারদর্শী, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন ও ধর্মশাস্ত্রে অভিজ্ঞ ও বি, এ, পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করিলেও পরেশের সাংসারিক অভিজ্ঞতা জন্মায় নাই। কিন্তু রুদ্রাণী জানিতেন, এই বালকের মত ভাব, সরল যুবা যদি কখন সংসারের প্রবল আঘাতে নিপীড়িত হয়, তখনি তাহার ভিতর হইতে এমন অভাবনীয় মনীষার বিকাশ হইবে অভূতপূর্ব যার জ্যোতিমণ্ডল উদ্ভাসিত করিবে সমগ্র সমাজ, অচিন্ত্যনীয় যার শক্তির দুর্মদ ইমনে বজ্রাহত হবে সংসারভিজ্ঞের সমস্ত কূটবুদ্ধি। চিরশুচি ননী শান্ত মনে সেইদিনের অপেক্ষায় ছিলেন কিন্তু তিনিও বুঝিতে পারেন নাই যে সেই আঘাতের দিন এত নিকটে এত ভয়ানক ভাবে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। যখন কাশীশ্বর টিকি সঞ্চালিত করিয়া অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে সাহেবদের লইয়া পরেশনাথের বাড়ী উপস্থিত হইল, পরেশনাথ তখন মহা ব্যস্ত। প্রবল ঝড়ে ও জলে যাহাদের ঘর পড়িয়া গিয়াছে কি চাল উড়িয়া গিয়াছে এইরূপ বহু দরিদ্র প্রতিবাসী তাহার প্রকাণ্ড প্রাঙ্গণ পূর্ণ করিয়া বসিয়াছিল। পরেশনাথ মাতাকে বলিয়া গােন রামজয় মিত্রের সাহায্যে কোন না কোন প্রতীকারের ব্যবস্থা করিতেছে।

৪৬ সেখহাটির নীলকুঠি। পরেশনাথের প্রকাণ্ড চণ্ডীমণ্ডপট তাহার খামারের কৃষিজাত দ্রব্যে পরিপূর্ণ। বস্তা বস্তা ধান, গম, মুগকলাই ও বাণ্ডিল বাণ্ডিল পাট তাহার বৈঠকখানা পরিপূর্ণ করিয়া রহিয়াছে। ইউরােপীয় ভাব ধারায় গঠিত হইলেও তাহার বাহিরের ঘরখানি নিতান্ত গ্রাম্য কৃষকের গৃহের ন্যায় মাত্র কৃষিজাত দ্রব্যে পরিপূর্ণ ছিল এবং তাহার প্রাঙ্গণে ‘পবাদির খাদ্য আউড়, বিচালী, পােয়াল পর্বতাকারে দক্ষতার সহিত জান ছিল। সহসা তদানীন্তন সে অঞ্চলের লক্ষ্মীর বরপুত্র নীলকর সাহেবদের অপ্রত্যাশিত অতিথি দেখিয়া তাহাদের সহিত ভদ্রতাসুচক কিঞ্চিৎ কথাবার্তা বলার পর পরেশ অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বাহিরের ঘরখানি ইন্দ্রজালের মত পরিবর্তিত করিয়া ফেলিল। বাড়ীর ভিতর হইতে এক খানি ক্যাম্প টেবল আনিয়া অয়েলথের উপর ফেণগু লতাপাতা কাটা টেবল ক্লথ পাতিয়া দিল। তাহার উপর উৎকৃষ্ট শামনে বাতি আলিয়া দিয়া-ঘরের মটকায় লাগান লােহার হকের সঙ্গে কারুকার্য চিত, সুদীর্ঘ, বিশাল বহু শাখান্বিত কাচের দীপপাদপের ঝড় টাঙ্গাইয়া তাহাতে আলােক প্রদান করিল। প্রকাণ্ড ঘরখানি সহসা আলােকদাম দীপ্ত দীপাবলীর তেজে উজ্জলিত হইয়া উঠিল, টেবিলের চারিধারে কতকগুলি উৎকৃষ্ট চেয়ার ও কয়েকখানি আরাম কেদারা দেওয়া হইল ও বন্ত্রের যবনিকায় মণ্ডপের একাংশ ঘিরিয়া টিনের টবে জল পুরিয়া তাহা গােসলখানায় পরিণত হইল ও সাবান তােয়ালে vaseline আয়না চিরুণী, ব্রাস প্রভৃতি সেখানে দেওয়া হইল—বস্ত্র পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি ঢিলা পাজামা ও গেঞ্জি ও ফতুয়া আসিল। ক্ষতস্থান ধৌত করিয়া আয়ােডিন লাগাইয়া হাত, মুখ প্রভৃতি প্রক্ষালনান্তে সাহেবের অনেকটা সুস্থ হইল। তখন টেবিলের উপর গরম গরম চা, লুচি, ঘরে প্রস্তুত বহুবিধ মিষ্টা, পেপে, কলা প্রভৃতি ফলে কাচের বড় বড় ডিসগুলি পরেশ গাঙ্গুলির সাংসারিক জ্ঞান জন্মে নাই। ৪৭ পরিপূর্ণ হইয়া গেল। বড় বড় গলদা চিংড়ির কাটলেটে ও মাছের চপের সুগন্ধে ঘরটি আমােদিত করিয়া তুলিল। সাহেবরা এই অপ্রত্যাশিত আতিথেয়তায় অত্যন্ত প্রীত হইল আর বাঙ্গালী ভদ্রলােক কুঠিতে গেলে যেরূপ অসৌজ দেখায় তাহা মনে করিয়া কিঞ্চিৎ কুষ্ঠিত ও লজ্জিত হইল। তখন কাশীশ্বর মুখ হাত নাড়িয়া অনেক করিয়া পরেশনাথের বংশমর্যাদার সুখ্যাতি করিতে লাগিল ও পরেশনাথের গুণাবলি সহস্রগুণে অতিরঞ্জিত করিয়া উচ্চকণ্ঠে কীৰ্তিত করিল। বাড়ীর মধ্য হইতে রুদ্রাণী কাশীশ্বরের এই চাটুবচন শুনিয়া তাহাকে জলযােগের মহাসমারােহে আপ্যায়িত করিলেন। সাহেরা দেখিলেন পরেশনাথ আতিথেয়তায় মুক্তহস্ত হইলেও কথােপকথনে মিতভাষী ; নিজের মর্যাদা রাখিয়া কথা কহিতে স্বভাবজাত ক্ষমতাশীল ; যেখানে নীলকর ও প্রজাদের প্রতি পরস্পরের আচরণের কথা আসিয়া পড়িতেছে সাহেবদের সহিত সামাজিক ভাবে কথােপকথনের পদ্ধতিতে পটু হইবার সুযােগ না পাইলেও পরেশনাথ সময়ােপযােগী বাক্য-কৌশল প্রমােগে আলাপের ধারা প্রসঙ্গান্তরে পরিবর্তিত করিয়া উভয় পক্ষের হৃঙ্গাহের কারণ তিরােহিত করিয়া দিতেছিলেন। আদব কায়দা সহকারে এইরূপ ভাবে ভদ্র ব্যবহার অক্ষুন্ন ভাবে রক্ষা করিয়া পরেশনাথ সুসজ্জিত তিনটি অখ আনিয়া দিলেন। নিজের গােমস্তা ও পায়েককে সঙ্গে দিয়া সাহেবদের দুই ক্রোশ দূরবর্তী উলসীর কাছারীতে পাঠাইয়া দিলেন । কাশীশ্বরও সঙ্গ লইল। • ক্ষেত্রমণিকে হরণ করিয়া নিল। (৯) বঙ্কিম। নায়েব কিশােরীমােহন সরকার উলসীর কাছারীতে নিজের শয়নকক্ষে ল্ডিংয়ের খাটে পালকের গদির উপর দুগ্ধ ফেণনিভ শয্যায় বসিয়া এস্রাজ আলাপ করিতেছিলেন। বহুমূল্য চিত্র আস্তরণে আবৃত তার কক্ষ কুট্টিমে শয্যার নিকট রৌপ্য নির্মিত পিকদানী, নিকটে রৌপ্য নির্মিত বিশাল ফয়সীতে বহু কারুকার্য খচিত রৌপ্য কলিকার উপরে ধূমপানের সুবিধার জ ঝালর মণ্ডিত তাপ নিয়ামক তাওয়া, ফরসীর মুখে বহু গজ বিস্তৃত চিত্রবিচিত্র সটকার দীর্ঘ নল, তাহাতে সােনার মুখুটি ঈষৎ অম্বুরি তামাকের সুগন্ধে ঘর ভরপুর। কিশােরীমােন দীর্ঘাকার, গৌরণ, সুন্দর, সৌখীন বিলাসী যুবা; যুগ্মভুরু, পদ্মপলাশ নেত্ৰ বিশাল ললাট। এম্রাজে সুরের নেশা যেন ভাল করিয়া জামিল । অন্যমনস্ক কিশােরীমােহনের শ্রবণ দুটি বুঝি এম্রাজের সুরের চেয়েও মিষ্ট কোন শব্দের প্রতীক্ষায় ছিল কিন্তু অাশা বহুক্ষণ সাফল্যে বঞ্চিত হলে বুঝি হৃদয় অবসন্ন হইয়া পড়ে তাই কিশােরীমােহন বাদ্যযন্ত্র ফেলিয়া শয্যায় এলাইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণ এইরূপে গেল। রজনীর নিস্তব্ধতা শরীরিণী হইয়া যেন কিশােরীমােহনকে আঘাত করিতে লাগিল। কাদের সন্তর্পণে পদসঞ্চারের অস্ফুট শব্দ, ফিস ফিস করিয়া কথা, ক্ষেত্ৰমণিকে হরণ করিয়া নিল। ৪৯ চুড়ি ও মলের অতি মিহি সুরের ঝঙ্কার। কিশােরীর বক্ষ স্পন্দন দ্রুততর হইল সমস্ত শরীরে দুরন্ত গরমের বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলিল। চুপি চুপি প্রবেশ করিয়া গৌরহরি বলিল—“কামশাই! এসেছে।” কিশােরী। নিয়ে এস। অবগুণ্ঠনবতী কেএমণি প্রবেশ করিল—দরজা বন্ধ করিয়া গৌরহরি বাহিরে গেল। পাপােষে পা ঝড়িয়া, সঙ্গে আনিত গামছায় অলক্ত রঞ্জিত পা দুখানির সদ্য পথহাঁটার মলিনতা মুছিয়া লইয়া ক্ষেত্ৰমণি কর্তাকে প্রণাম করিল ; কর্তা তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া তাহার অবগুণ্ঠন লুণ্ঠন করিলেন, ক্ষেত্ৰমণি গােলাবী খিলিগুলি কর্তাকে উপহার দিল। কোথায় গৃহ? কোথায় গৃহিণী। দারিদ্র্যপীড়িত সংসারে বিব্রত, ব্যতিব্যস্তা বহু পরিবার ভার বহনে ম্রিয়মান—আর কর্তা—বিলাসিনী বিহ্বল! নব নব ফুলমধু লুব্ধ, উচ্ছল! কিছুক্ষণ রসালাপের পর ক্ষেত্ৰমণি কর্তাকে বলিল, “আজ আপনার বাজনা শুনিব।” কর্তার এস্রাজ বাজানাে সে অঞ্চলে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। কর্তা তখন তার ভাসা ভাসা চোখে চুমা দিয়া গাল টিপিয়া বলিলেন, “তুমি গাও সখি, আমি বাজাই।” ক্ষেত্ৰমণি সুকণ্ঠা ; তার গানের সুরে, চোখের হাব ভাবে, পুরুষের মন মেতে ওঠে, মজে ওঠে, গলে যায়, আপনার সর্বস্ব হারায়। ক্ষেত্ৰমণি গান ধরিল :- গীত। “কওনা কথা মুগ্ধ কলি লুব্ধ অলি গুঞ্জরে। “ভুবন ভরা গানের মাঝে স্থান লবি গাে কবে। ৪

৫০
সেখহাটির নীলকুঠি।
অই শুন প্রেমের পাখী
গুঞ্জে প্রাণ-পিঞ্জরে।
কেন আপন মাঝে মগন হয়ে
হৃদি-কুঞ্জে রবে ।
মলয় বহিছে মৃদু গন্ধ
তটিনী তুলিছে নব ছন্দ
নন বন ছেয়ে
যৌবন গান গেয়ে
আদরে কে তােরে
ডাকে মধু রবে।”
গান বাজনায় তরুণ তরুণী যখন আত্মহারা, বাস্তব জগতের সীমা
ছাড়াইয়া, সুরের সাগরে, সুখের হিল্লোলে ভাসিতেছিল, ঠিক সেই সময়ে
গৌরহরি রুদ্ধ কৰাটে উদ্বেগের কয়েকটি মৃদু কিন্তু দ্রুত আঘাত করিল।
কর্তা দ্বার খুলিয়া জিজ্ঞাসিলেন, “ব্যাপার কি?” ভয়চকিত কণ্ঠে
গৌরহরি বলিল, “বড় সাহেবের প্রায় এলে পড়েছেন, শীঘ্র আসুন।”
কেএমণিকে আত্মগােপন করিয়া সাবধানে অপেক্ষা করিতে বলিয়া
কৰ্ত্তা বাহির হইয়া শশব্যন্তে কাছারি ঘরের দিকে গেলেন। সম্মুখে
কাশীশ্বর। অপদেবতা দেখিলে লােকে যেমন চমকাইয়া ওঠে, সেই গভীর
নিশীথে কাশীশ্বরকে দেখিয়াও কিশােরীমােহন চমকাইয়া উঠিলেন ও মনে
মনে তিনবার শ্রীদুর্গা স্মরণ করিয়া লইলেন।
নায়েব মহাশয়কে দেখিয়া কাশীশ্বর এক নিঃশ্বাসে উচ্চকণ্ঠে বলিয়া
ফেলিল, “এই যে দাদার আমার এতক্ষণে ঘুম ভাঙ্গলাে। এই রকম
করেই মরিস সাহেবের নায়েবিগিরি করেছ দেখচি। তুমি কর্বে নায়েবী
আর শীশ্বর আবাগের প্রাণ যাবে তােমাদের সাহেবদের ঘােড়া খোজ,

ক্ষেত্ৰমণিকে হরণ করিয়া নিল। খাবার জোটাও, আলাে দাও, সঙ্গে করে কাছারী নিয়ে চল। সব কাজেই কেবল কাশী বাবু, কাশী বাবু। কেন বাবু এত কেন! তােমার তাে নায়েব গােমা সব রয়েছে। কাশীশ্বর গরীব বামুনের ছেলে তার উপর এত জুম কেন বাবু?” এই বলিয়া কাছারীটা যেন তারই এই ভাব করিয়া—“এই গৌর! এই জমাদার, এই চৌকিদার! কে কোথায় আছিস শীঘ্র আয়! বেটারা কেবল বসে বসে খাবে, কাজের বেলায় পেটের ভেতর একদম হাত পা সি ধিয়ে যায়।” এই অনর্গল বাক্যম্রোতে সহসা বাধা দিয়া বিরক্তির সুরে কিশােরী মােহন বলিলেন, “আঃ থাম না, এখানে এখন ফোপল দাদালি নাই কল্পে; যা করবার আমিই কৰ্বো এখন তােমার আর মাথা ঘামিয়ে কাজ নাই।” কিশােরীমােহনের সেই সুরসিক সৌখীন ঢলঢলে ভাব মূহুর্তে পরিবর্তিত হইয়া গেল, এখন তাহাকে দেখা খেল—কর্তৃত্বে চির অভ্যন্ত রাশভারী গভীর প্রকৃতি, সুন্দর তেজৰী কৰ্ম্মঠ যুবা, অঙ্গে অঙ্গে যার কর্মশীলতা। তিনি পলকের মধ্যেই ঘটনা সতি ধারণা করিয়া লইলেন এবং বুঝিলেন সেই অবস্থা সঙ্কট হন্তের মুষ্টির মধ্যে আনিবার শক্তি ও পরিকল্পনা আঁহার আছে। তিনি ডাকিলেন, “দেবী বক্স।” অমনি মাথায় পাগড়ী বাঁধা কপালে ত্ৰিপুরেখা, মালকোচা দিয়ে ধুতি পরা, গায়ে অঙ্গরাখা আটা, হাসি মুখ—পরিপুষ্ট মাংসপেশী, পুরা ছয় হাত জোয়ান দীর্ঘাকার দৃঢ় এবং স্কুল :অস্থি সম্পন্ন জমাদার দেবী বন্ধ সিং পাকা বাঁশের তেল চুকচুকে লাঠি হাতে আসিয়া দাঁড়াইল। লাঠি ধরার দিকটি রূপা দিয়া ও মাথার দিকটি লােহা দিয়া বাধান। সঙ্গে সঙ্গে ৭৮ জন বরকন্দাজ আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের বেশভূষা প্রায় জমাদারের মত তবে তাহাদের লাঠিগুলি কোন ধাতু দিয়া বাধান নয়। জমাদার আসিয় । সেখহাটির নীলকুঠি “হুজুর বলিয়া আমি নত হইয়া সেলাম করিল ও সঙ্গে সঙ্গে বরকন্দাজগণ ঐরূপ সেলাম দিল। তাহাদের দেখিয়া ও নায়েব মহাশয়ের প্রতি তাহাদের অচলা শ্রদ্ধা বুঝিয়া কাশীশ্বর চুপ করিয়া গেল, সে বুঝিল যে, এখানে আর বেশী নিজেকে জাহির করিতে গেলে যেটুকু সম্মানের পান সে অধিকার করিয়াছে তাহার সেটুকুও নষ্ট হইবার সম্ভাবনা এমন কি তাহার প্রকৃত স্বরূপ সাহেবদের কাছে প্রকাশ হইয়া পড়িতে পারে, তাই গুঢ় ফণা সর্পের মত সে তার বিষদ তার মস্তিষ্কের কুচক্রের মধ্যে লুকায়িত রাখিল সময়ান্তরে পূর্ণবেগে প্রকাশের জন্য। এক্ষণে মূহুর্তের মধ্যে ভাব পরিবর্তন করিয়া বলিল—“দাদা নইলে কি কেও তাল ঠাণ্ডা কর্তে পারে ; তুমি কিছুতে হঠবেনা দাদা।” সে কথায় কর্ণপাত করিয়া কিশােরীমােহন জমাদার বরকন্দাজগণের অগ্রে অগ্রে দ্রুত সাহেবদের সম্মুখে গেলেন ও সসম্মানে তাহাদের কাছারিতে লইয়া গিয়া তাহাদের সুবিধার জয় বন্দোবস্ত করিলেন। কিশােরীমােহনকে লােকে “কর্তা” বলিয়া কিত। এখন দেখা গেল তাহার সে খেতাব সার্থক। অল্প কথায়, স্পষ্ট, কোমল কিন্তু দৃঢ়সুরে ও সহজবােধগম্য তাঁহার আদেশ- গুলি জমাদার ও বরকন্দাজগণ এত দ্রুত এত সম্মানের সহিত এমন সর্বাঙ্গসুন্দরভাবে পালন করিতে লাগিল যাহাতে বােঝা যায় তিনি যেন কৰ্ত্তা হইয়াই জন্মিয়াছেন। তাঁহার ব্যবহার ও বন্দোবন্তে সন্তুষ্ট হইয়া আগন্তুক সাহেবদিগকেও দেখা গেল যে নায়েব মহাশয়ের সম্বন্ধে কথা হইলে তাঁহারাও তাঁহাকে কৰ্ত্তা বলিয়া উল্লেখ করিতেছেন। যদিও উলসীর কাছারী মরিস সাহেবের সেখহাটির কসানের অন্তর্গত এবং সাক্ষাৎ সম্বন্ধে আগন্তুক সাহেবগণ তাঁহার মুনিব নন তথাপি চাকুরীজীবী কিশােমীমােহন এটুকু জানিতেন যে যখন গৌরাঙ্গ তাঁহার মুনিব তখন যে কেহ গৌরাঙ্গ হইবে সেই তাহার মুনিবজাতি, অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত, ক্ষেত্ৰমণিকে হরণ করিয়া নিল ইষ্টদেবতার দলের অন্তরঙ্গ। ব্রাহ্মণ সন্তান কিশােরীমােহন সাহেবের চাকুরী করিয়া সাহেব না হোন, সাহেবী ভাবের আচ্ছন্নতা হইতে নিজেকে দুরে রাখিতে পারেন নাই। ব্রাহ্মণগাচিত ক্রিয়া কর্মে অনাস্থা আসিয়াছিল বংশগত ইষ্টদেবতার পরিবর্তে তিনি তাহার শ্বেতাঙ্গ প্রভু ও তাহার জাতীয়দের-ইষ্টদেবতা ও ইষ্টদেবতার অন্তরঙ্গ বলিয়া মনে করিতেন। সেই ইষ্টদেবতার অন্তরঙ্গগণের পূজায় কিশােরীমােহন কায়মনােবাক্য প্রদান করিলেন ও অল্পক্ষণেই সাহেবদের সম্বন্ধে প্রয়ােজনীয় সমস্ত সংবাদই সংগ্রহ করিয়া ফেলিলেন ও বুঝিলেন যে সাহেৰেরাত্রির মধ্যেই বহু কুঠিতে কতকগুলি জরুরী সংবাদ পাঠাইতে চাহিয়াছিলেন এবং নিজেরাই সেই সকল সংবাদবাহকের কাৰ্য করিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু দৈবদুর্ঘটনায় পারেন নাই। কর্মপটু কিলােৱীমােহনের বন্দোবন্তে ও তৎপরতায় •প্রীত হইয়া সাহেবরা রাত্রির জ বিশ্রামের আয়ােজন করিতেছেন এমন সময় কিশােরীমােহন বলিলেন-“হুজু বাহাদুরের যদি কোন সংবাদ রাত্রির মধ্যেই কুঠিতে পাঠাইতে হয় বান্দা তাহার বন্দোবস্ত কর্তে পারে!”

পূৰ্বানুবৃত্তি। ( ১০ ) ছােট হিল সােপ্পাসে বলিল “পাৰ্বে তুমি ‘কা।” কি। “হুজুর বাহাদুরের পিতার কাছে আমার প্রথম চাকুরী আর আমি পারবােনা আপনাদের কার্য কর্তে ?” ছােঃ হি। ও কর্তা তুমি আমাদের কনসার্ণে কাষ করেছিলে তবে তুমি নিশ্চয়ই পাকা লােক। আমার এই পাঁচঠা কুঠিতে এই চিঠিগুলি আজ রাতের মধ্যে পাঠান চাই। কুঠিগুলির তালিকা ও চিঠিগুলি লইয়া নায়েব মহাশয় বরকন্দাজদের যথাবিধি উপদেশ দিয়া পাঠাইয়া দিলেন ও সাহেবদের জানাইলেন যে আদেশানুযায়ী পত্রগুলি তিনি বরকন্দাজ মারফত পাঠাইয়া দিয়াছেন। দন্তচি কৌমুদী ছটায় নায়েবের শঙ্কার অাঁধার সরাইয়া দিয়া গালভরা প্রসাদ হাসি হাসিয়াঘােট হিল বলিল ‘বাহবা। কত্তামশায়। আপনিই আমার পিতার উপযুক্ত কর্মকারক।” কিশােরীমােহন যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। চাকুরী চাওয়া করার খুরী জীবন আজ যেন তার ধন্য হলাে। এদিকে কাশীশ্বর দেখলে যে হাওয়ায় থাকলে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পার্তো, নায়েব মহাশয়ের কৌশলে সে হাওয়া বদলে গেল।

ও পূৰ্বানুবৃত্তি। ইহাতে সে নায়েব মশায়ের উপর অত্যন্ত চটিয়া গেল, আর নিজেকে নিতান্ত খাপছাড়া মনে করে জল হইতে সদ্য ভােলা মৎস্যের গায় ফাইতে লাগিল। সে তখন সাহেবদের সেলাম করিয়া বিদায় হইতে চাহিল। বুদ্ধিমান নায়েব মহাশয় সাহেবদের খাস কামরায় আর তাহাকে ঢুকিতে দিয়া নিজে ভিতরে গিয়া ধন্যবাদ সহ হুকুম আনাইয়া দিলেন ও পুণ্যপুরের কাছারীর গােমস্তা বরকন্দাদের সদে কাশীশ্বরকে বিদায় দিলেন। তারপর একটি খানসামা দিয়া সাহেবদের সােড়া ও হুইস্কি প্রভৃতি পাঠাইয়া দিলেন। সাহেবদের মন একেবারে ভিজিয়া গেল, তারা নায়েব মশায়ের হাতের মুঠির মধ্যে আসিয়া পড়িল। প্রতি খেয়ালের তপ্ততরঙ্গে নিজের মাথা বেতন্সী লতার মত নত কবে পেতে দেয়, তাদের স্বার্থপরতার উদ্দাম অসংযত বহ্নিশিখা অপরের সর্বনাশ সাধন করে জ্বলে উঠছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য না করে সেই স্বার্থপরতার অগ্নিতে চাটুতার সহজদাহ্য সুরভি ইন্ধন জুটিয়ে দেয়, চাকুরী চাওয়ার এমন চাকরকে বিবেক-বুদ্ধি বর্জিত কোন উচ্ছল মনিৱে পছন্দ না করে থাকতে পারে। সাহেবেরা মদ খাইতে আরম্ভ করিল ও মেঝেয় গড়াগড়ি দিতে লাগিল, অনুমানে বােঝা গেল বেলা দশটার পূর্বে আর তাদের ঘুম ভাঙ্গবে । নায়েব তখন হৃষ্টচিত্তে নিজ কুঞ্জে কেএমণির নিকট ফিরিয়া গেলেন। বহুক্ষণ পরে জেএমণি বিদায় হইল। নৈশ নিস্তব্দতা ভেদ করিয়া পােচকের তীব্ৰধ্বনি শােনা একবার, দুইবার, তিনবার। ভােগান্ত নায়েবের চকে তার জড়িমা জাকিয়া বসিয়াছিল। তিনি সে শক গ্রাহও করিলেন না। হিল ও মারে মদ্য পানে অচেতন হইয়া পড়িয়াছিল তাহারাও শুনিতে পাইল না। কিন্তু ফিলিপস মাতাল হয় নাই সে শব্দ শুনিয়া বাহিরে আসিল ও শব্দ ৫৬, সেখহাটির নীলকুঠি। লক্ষ্যে কিছুদূর অগ্রসর হইয়া দেখিল ঝােপের আড়ালে বরকন্দাজ বেশী জনৈক বঙ্গ ফুৰা। দুজনে চুপি চুপি অনেকক্ষণ ধরিয়া পরামর্শের পর ফিলিপস বলিল-রাঘব সর্দার, ঘােড় কোথায়? না। ঐ পুকুরের পাড় ছাড়িয়া বটগাছের তলায়। দুজনে তখন পথ বাহিয়া চলিতে লাগিল। পুকুরের পাড় ছাড়াইতেই সম্মুখে দেখিল-একটি অবগুণ্ঠনৰতী রমণী একটি পুরুষের সঙ্গে চলিয়াছে। ফিলিপস বলিল-“সর্দার। শিকার। তুমি ঘােড়া তৈয়ারী কর আমি দেখচি।” রাষৰ ঘােড়র দিকে চলিয়া গেল। সাহেব অগ্রসর হইয়া বলিল-“এত রাত্রে কি যায় ?” মেণি গৌরহরিকে সাথে করিয়া অভিসার হইতে গৃহাভিমুখে ফিরিতেছিল। সহসা সাহেবকে দেখিয়া দুইজনেই চমকাইল। গৌরহরি লম্বা এক সেলাম ঠুকিয়া বলিল—“হুজুর। আমার খুড়ি কুটুমবাড়ী এসেছিলেন, তাঁকে বাড়ী রেখে আসতে চলেছি। ফিলিপস বলিল—“তােমার খুড়ী, দেখি।” এই বলিয়া সে ক্ষেত্ৰমণির হাত ধরিয়া তার মুখের পরে নিল কামুক দৃষ্টি স্থাপিত করিয়া গৌরহরিকে বলিল—“মিথ্যাবাদী, বজ্জাত। এ তােমার খুড়ী কেন হৰে; এ যে স্বর্গের সুন্দরী, এ আমার পছন্দের মেয়েমানুষ ; তােমার সঙ্গে কেন যাবে, তুমি শালা বজ্জাত, তুমি যাও জাহান্নামে” এই বলিয়া সবুঢ় পদাঘাতে গৌরহরিকে সটান লম্বা ভাবে পগারে ফেলিয়া দিয়া বিকট হাতে ক্ষেত্ৰমণিকে বলিল-“চল সুন্দরি। আমার সঙ্গে মেম সাহেব হৰে। কেএমণি হয়ে পাংশু হইয়া ঠক্ ঠক্ করিয়া কঁপিতে ছিল, তাহার কথা কহিবার সামর্থ্য ছিল না। সাতে তাহার উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই কামােত দুর্দান পশুর মত তাকে জড়াইয়া ধরিল ও ৰকে নিলেৰিত করিতে করিতে তাহার মুখে ঠোটে গালে সবলে • ৫৭ পূর্বানুবৃত্তি। চুম্বন দিতে লাগিল। “মাগাে” বলিয়া মেণি সাহেবের বাহুর বন্ধনের মধ্যে মূৰ্জিত হইয়া সাহেবের বুকে ঢলিয়া পড়িল। ভয়ে তখন তাহার মনের সকল সরস প্রবৃত্তি লুপ্ত হইয়াছে ; শৃঙ্গারভাবের উদ্দীপনা কোথায় উড়িয়া গিয়াছে। কেমণি চিরদিনই যথেচ্ছাচারিণী কাহারও শাসনের মধ্যে কোন দিনই সে নিজেকে নিয়ন্ত্রিতা রাখিতে পারে নাই। তাই অনিচ্ছায় বলাৎকারের বিভীষিকা তাহার একয়ে মনােবৃত্তির পক্ষে অতি ভীষণ হইল সে আপনাকে মুক্ত করিবার জন্য প্রথমে একবার সৰ্বায়বের সকল শক্তি নিযুক্ত করিল, কিন্তু সাহেবের বাহু লৌহবন্ধনে তাহাকে এমন করিয়া ধরিয়াছিল যাহাতে তাহার সন্ধায়বের সর্বাতিশয়ী উদ্যম এই বন্ধনের উপর বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই। বরং ধ্বস্তাধ্বস্তিতে সেই বন্ধন আরও দৃঢ় আরােও ভীষণ হইল, কেএমণির জীবনীশক্তির স্বচ্ছধারা নিষ্প্রভ ও ক্ষীণ হইতে হইতে একেবারে সুপ্ত হওয়ার মত হইল তাহার সকল ইন্দ্রিয় এলাইয়া পড়িল, সে জ্ঞান হারাইল। ক্ষেত্ৰমণির দোহারা গড়ন; তাহার দেহের ভারও নিতান্ত লঘু নয়। কিন্তু অদ্ভুত বলশালী অতি দীর্ঘাকার ফিলিপসের পক্ষে তাহার দেহ পক্ষিশাবকের অপেক্ষাও লঘুতর বােধ হইল। অবলীলায় সে তরুণীর দেহবল্পী উন্ধে তুলিয়া লইল চক্ষের নিমেষে অশ্বপৃষ্ঠে আমােহণ করিয়া দক্ষিণ ৰাহর আবেষ্টনে তাহাকে দৃঢ়ভাবে ধরিয়া ঘােড় ছুটাইয়া দিল। নির্মেঘ নৈশকাশে কক্ষচ্যুত দুষ্ট গ্রহের মত সেই তেজস্বী অশ্ব নিশীথ অন্ধকার ভেদ করিয়া ধৰা-বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া ছুটল। পাছু পাছু রাঘব সর্দারের ঘােড় ঝড়ের মত চলিল। ৩০ কুমন্ত্রণা। (১১) ফিলিপ্স, গুপ্তপথে রামনগরের কুঠতে প্রবেশ করিল। ক্ষেত্ৰমণির অচৈতন্য দেহ ভিতরের গুপ্তকক্ষে পালঙ্কের উপর শােয়াইল। পাহারার জন্য রহিল নাটার মত চোখ, বাটার মত মুখ, লম্বা দেহ, লম্বা, গ্রীবা, চেলা কাঠের মত হাত পা, শশানের মুড়ির মত অবিরল, ঘন কুঞ্চিত অর্ধপঙ্ক কেশরাজী রামীর মা বুনানী। তাহার পর সে প্রমণ-মলিন পরিচ্ছদ খুলিয়া গােসল ঘরে প্রবেশ করিল। শীতল জলভরা বিশাল টবে ঝাপাইয়া পড়িল। পরক্ষণে সুগন্ধ-সঞ্চারি ফেনকে সর্বাঙ্গ ফেনিল করিয়া সযত্নে ধৌত করিল। সারাদিবসের ক্লেদ চলিয়া গেল। সে তখন গ্লানিহীন অমানকান্তি প্রাথমুখ, সুস্থ তারুণ্যের লাবণ্যে প্রিয়দর্শন হইল। ফিলিঙ্গ, জানিত যে তাহার সেই জমকালাে দেহের সমারােহ, সমুন্নত সুঠাম মনােজ্ঞ মানবদেহের একখানি গৌরববাজ্জ্বল নমুনা এই আত্মপ্রত্যয় ও এই আত্মাহুতি তাহাকে প্রেতযােনির ন্যায় সর্বদা আবিষ্ট করিয়া রাখিত, তাই যাহাতে তাহার দেহের আড়ম্বর সর্বদা সৰ্বথা অক্ষুন্ন থাকে সে বিষয়ে তাহার বিনিদ্র চেষ্টা জাগরুক থাকিয়া নিত্য আত্মপ্রকাশ করিত। এক্ষণে সম্মুখে কূট রাজনৈতিক মন্ত্রণা, জীবন মরণের জরুরি কুমন্ত্রণা। জল্পনা, ইহা সম্পূর্ণ জানিয়াও ফিলিগ, রুজ, পাউডার ক্রিম প্রভৃতি ব্যবহারে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করিল না। অভিনিবেশ সহকারে বেশ- ভূযায় পারিপাট্য করিয়া দহন্তে এমন কৌশলে সেগুলি সংত্যন্ত করিল, তাহাতে যাহাদের চক্ষু পুরুষের প্রসাধন কৌশলের গুপমন্ত্রে দীক্ষিত নয় তাহারা প্রথম দর্শনেই মনে করিবে লােকটি বেশ সাদা সিধে বসন-ভূষণ ও প্রসাধনে তাহার তত লক্ষ্য নাই। সাজগোজা মনের মত হইলে ফিলিপ, নিজের মুখের ভাব মনের বলে পরিবর্তন করিয়া লইল। তামসী চিন্তাবলিতে তাহার মুখমণ্ডল সহজেই ঘাের দর্শন দেখাইত, অধুনা ঘােরদর্শন মুখমণ্ডল প্রিয়দর্শন হইল, গাল ভরা অহেতুকী হাসি, চোখে বন্ধুভাবের স্নিগ্ধ জ্যোতি, মােলায়েম কষ্ট কাপট্যের ভিত্তিভূমিতে সরল উদার ভাবে মুখমণ্ডল চিত্রিত করিয়া সৌজন্যের ঋজুতা লইয়া ফিলিপ, নিজের হলঘরে প্রবেশ করিল। একখানি গ্রামের মত প্রকাণ্ড সে হল মৃগয়াহত গতজীব দুর্দমনীয় হিংস্র পশুগণের খণ্ডিত ছিন্ন ভিন্ন অবয়ব সংস্থানে ও নানাবিধ বন্দুক রিভলভার, লাঠি, সােটা, সড়কি, টাঙ্গি, তরবারি, তীর, ধনুক প্রভৃতি প্রহরণে ভীমদর্শন ও ভয়াল ; উদ্দাম বন্য প্রকৃতির মত অনিয়ন্ত্রিত উচ্ছলতার মধ্যে, অপারিপাট্যের অনির্বচনীয় পারিপাট্যে ভৌতিক ব্যাপারের মত অলৌকিক, অস্বাভাবিক দেখাইতেছিল। সেখানে সাহেবী পােষাক পরা দুটি লােক আরাম কেদারায় শুইয়া ছিল। ফিলিলকে প্রবেশ করিতে দেখিয়া উভয়েই উঠিয়া দাড়াইল। একজন সমুন্নত ভীমদেহ। তাঁহার যুগ্ম গুফ ওষ্ঠ ব্যাপিয়া উভয় কর্ণ জড়াইয়া স্কন্ধমূল স্পশ করিতেছে। ফিলিপস ইহার প্রসারিত করশাখা সাগ্রহে বিমর্দন করিয়া বলিল - “সুগত” মসিউর (monsieur) কি! ;

৬০ সেখহাটির নীলকুঠি। মহান রুষ ভল্লুকের গুপ্ত মন্ত্রণার দক্ষ হও, উদীয়মান খার প্রতিভার রক্তগচ্ছটা মন্ত্রণা ও আয়ােজনের কুহেলীজাল ভেদ করিয়া রাজনীতির বিশাল, গগনের দিকচক্রবাল শত ভাস্করের তেজে উদ্ভাসিত করিবার জন্য সমাসঃ ; অদূর ভবিষ্যতে যার মনীষা ইউরােপ ও এসিয়ার মানচিত্রে পরিবর্তনের ধারা আনিতে বাধ্য ; স্বাগত হে মহীয়ান, সুস্বাগত এই দীনের কুটীরে। এতভিনন্দন করিয়া কি মিষ্টকণ্ঠে বলিল- আপনার এই অযােগ্য দাসের ক্ষমতা অতিরঞ্জিত করিলেও, ভবদীয় ভবিষাণী মহাশয়ের এই অধম ভৃত্যের ও তাহার প্রাণপ্রিয় সম্রাটের প্রতি যে সদিচ্ছা জ্ঞাপন করিতেছে তাহার অন্য আমরা চিরঋণী রহিলাম। সংশয় ও আশা লইয়া আমরা প্রথমে আপনার সহিত কথাবার্তা চালাইতে থাকি। কারণ আপনি ব্রিটন ও নীলকর। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মর্মরময় হর্মের পাকা বুনিয়াদ ব্রিটন ও নীলকর। তাই আমরা বড়ই ভয়ে ভয়ে অগ্রসর হইয়াছিলাম। ফি। যেখানে ভয় নেইখানেই জয় । গু। সত্যই অহা। এখন আমরা যতই অগ্রসর হইতেছি, কর্ম- ক্ষেত্রে পদে পদে আত্মপরীক্ষার যত পরিচয়ের অভিজ্ঞতা পাইতেছি তাতে বুঝিয়াছি, ভবিষ্যৎ-ভাগ্যে জয়পরাজয়ের ফলাফল যাহাই হউক আপনি আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু, পূজ্যপাদ মহনীয়কীর্তি রুষসম্রাটের সাম্রাজ্য বিস্তারের কল্পনার স্বপ্নকে লন্ত সত্যে পরিণত করিবার মহামনীষী আপনি, অখণ্ড যাহার আধিপত্যের পতাকা তলে সমাকৃষ্ট চুম্বকের আকর্ষণে, নিতীক যুবজনের লৌহকঠিন দৌলও। ফি। লক্ষ্য লক্ষ্য বঙ্গবাদ। আমার তরবারি, আমার মস্তক রুষ সটের চরণ তলে। অগপ যার মনীষার ভাতি, যার অদ্ভুত কুমন্ত্রণা। ৬১ মন্ত্রগুপ্তিময় কূট বুদ্ধির শাণিত খড় ব্রিটিশ কুচক্রের তন্তুজাল ছিন্ন ভিন্ন করিয়া স্বীয় প্রাধান্ত স্থাপন করিতেছে কষিয়ার সেই জনপ্রিয় পররাষ্ট্র সচিবের জয় জয়কার। মহাশয়ের অভ্রান্ত বুদ্ধি পাত্র নির্বাচনে উদভ্রান্ত হয় নাই। চন্দনের গন্ধ যেমন ঘর্ষণে ঘর্ষণে বৃদ্ধি পায়—এ অধীনে বিশ্বস্ততা ও কর্মপটুতা সঙ্কট হইতে সঙ্কটতর ঘটনা সংঘটনের কাল যতই প্রত্যাসন্ন হইবে ততই বুঝিতে পারিবেন। আমি ব্রিটন হইলেও ব্রিটন, নহি, নীলকর হইলেও নীলকর নহি। মনুষ্যের জন্মজাত অধিকারী আপনার দৌণ্ডে আস্থাবা, ভাগ্যলক্ষ্মীর অনিসন্ধিৎসু যুদ্ধজীবী আমি। তাই ঝাপাইয়া পড়ি, তমসাচ্ছন্ন অদৃষ্ট-সিন্ধুর ঘূর্ণাবর্তময় ফেনিল জলে, অক্লান্ত কর্মের পূর্ণানন্দের উৎসাহে, আপনার ভাগ্য আপনি গড়িব বলিয়া নিশ্চিন্ত হােন্ মন্ত্রিবর! অর্থ ও আয়ুধ সংগ্রহে সাচ্ছল্য দেখান, আপনার বদান্যের প্রাচুর্য থাকিলে বিশ্বস্ততা ও বল সংগ্রহের অপ্ৰাচুৰ্য্য এ পক্ষ হইতে হইবে না—ইহা নিশ্চয় জানিবেন। । শত সহস্র ধবাদ। এই প্রত্যয়জনন নিশ্চিতবাক্যের জন্য উত্তর পশ্চিম প্রান্তের গিরিসঙ্কট ভেদ করিয়া, পুলিশের চক্ষুতে ধূলি দিয়া বঙ্গসিন্ধুর উদ্বেলিত বেলায় লক্ষ তটিনীর বেণীপরা, শস্যভরা-বঙ্গবসুন্ধরায় আসিয়াছি। আর সঙ্গে আনিয়াছি মহাবা কুলতিলক রঘুনাথ রাওকে ন্যায়ানুমােদিত ধর্মানুমােদিত ভারতের সম্রাট, দিল্লীর সম্রাট মহারাষ্ট্র- কেশরী নানাসাহেবের প্রতিনিধি ও ভাতুপুত্র। ফিলিপ্স সাগ্রহে রঘুনাথের সহিত করমর্দন করিয়া বলিল - আজ জীবন ধন্য হলাে। কিন্তু দুক্তেতার কুহেলি আমার মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করেছে, তাই বুঝি বাস্তবতার সত্যের আলােক আমার বুদ্ধিকে স্পর্শ কর্তে পাচ্ছে না; সর্বত্র রাষ্ট্র বিশ্রুতকীর্তি নানাসাহেব, ইংরেজ সেনার কীর্তিহারী নানসাহেব, ইহজগতে আর নাই।

সেখহাটির নীলকুঠি। র। ঐরূপ ভাবে জনমত বিস্তারের চেষ্টা আমাদের পক্ষ ও ইংরাজ পক্ষ উভয় পক্ষ হইতেই হইয়াছিল আমরা চাহিয়াছিলাম ইংরাজের গুপ্তচরের অবহিতত্ব পরিহার করিতে আর ইংরাজ চাহিয়াছিল বিদ্রোহাগ্নির পুনরুন্দীপন নিবারণ করিতে। ফি। বর্তমানের প্রকৃত অবস্থা কি ? র। নানাসাহেব মহারাজ সুস্থ ও নিরাময়। রুষ সম্রাট তাহার পৃষ্ঠপােষক, নেপাল রাজ তাহার সহায় অসংখ্য মারাঠা যুবক তাহাকে সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুত, মহারাষ্ট্রের লুপ্ত গৌরব উদ্ধার করিবার জন্ত সৰ্ব্বস্বদানে কৃতসঙ্কল্প। আমাদের সঙ্গে যােগ দিন, কি পুরস্কার চান বলুন। ফি। আপনাদের অনুগ্রহই আমার পুরস্কার। তবে পুরস্কারের কথাই যখন উঠলাে, তখন দাৰীৰ কথাটা খােলগা করে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত। কথায় বলে, আগের ঝগড়াই ঝগড়া, শেষের ঝগড়া পেজেমি। শিকারী বাজ যেমন নভােনীলিমায় খরদৃষ্টিতে অবাধগতিতে শিকার অন্বেষণে ছােটে—আর শিকার দেখিলে শিকারের উপর বজ্রবেগে আপতিত হয়—তেমনি আমার চালিত নদীয়া, যশােহর, পাবনা, ফরিদপুর, রাঢ় ও বরেন্দ্রভূমির গােয়ালা, কৈবর্ত, চণ্ডাল, হাড়ি, ডােম, মুচি ও মুসলমান দোয়ানে গঠিত যুবজনােচিত বিক্ৰম প্রকাশের উল্লাসে উৎফুল্ল, পৰবলঘাতী, চণ্ডগে, লঘুগতি বরকন্দাজ সৈন্য বাঙ্গালা মায়ের শ্যামল বক্ষে অদম্য বীর্যে তাণ্ডব নৃত্য, কচ্চে। শত্রু-শােণিত পিপাসু রণদক্ষ তারা; ছত্রপতি মহারাজ শিবাজীর মাউলা সৈন্ত যেমন মােগল বাদসার নিদ্রাহীন চোখে সর্ষের ফুল ফুটিয়ে দিইছিল, সময়কালে দেখবেন আমার এই বাঙ্গালী বরকন্দাজ সৈন্যের খেলায় বিপক্ষপক্ষের নাভিশ্বাস উঠছে। যখনি প্রয়ােজন হবে আমার এই বরকন্দাজ সৈন্যের কুমন্ত্রণা। সংখ্যা বৃদ্ধি করে যুদ্ধক্ষেত্রে দক্ষতায় ঈপ্সিত ফল প্রদান করবার শক্তি রাখে এরূপ লক্ষ লােক সংগ্রহে আমার বিলম্ব হবে না। ফোর্ট উই- লিয়মেও আমার লােক আছে, আসল গােরা। বিদ্রোহের রক্তপতাকা উড্ডীয়মান হলেই দুর্গ আমাদের পদতলে ও সমগ্র বঙ্গদেশ আমাদের শাসনাধীনে অনায়াসে আসবে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। কেবল অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করুন। আর সব ভার আমার উপর। পুরস্কার যদি দিতে চান তবে বলি আমার অন্তর্নিহিত দুর্নিবার যুদ্ধোৎসাহ চরিতার্থ করিবার উপযুক্ত সুযােগ পাওয়াই আমার পুরস্কার, কীর্তির অম্লান মালা কণ্ঠে পরাই আমার পুরস্কার বিস্মিত ধরাবাসীর অপলক নয়নের অকৃত্রিম প্রশংসার দৃষ্টিই আমার পুরস্কার, ইহার উপর যদি আপনারা আপনাদের বদান্তের পরিচয় দিতে চান, প্রাণঢালা সেবাগুণের ঋণ শােধ করিতে চান তবে বঙ্গের সিংহাসনই আমার কাম্য। মহারাষ্ট্রকেশরী ভারতেশ্বরের বশ্যতা স্বীকার করিয়া মহামান্য রুষসম্রাটের সন্ধির সর্ত অক্ষুন্ন রাখিয়া বঙ্গের সিংহাসন আমি প্রার্থনা করি। যদি আমার দাবী ন্যায় সঙ্গত মনে করেন তবে বর্তমানে আপনাদের কাৰ্য্য সিদ্ধি করিবার জন্য উপযুক্ত অর্থ সাহায্য করুন। গু। আপনার দাবী অযৌক্তিক নয় কিংবা তাহার সম্মান রক্ষা করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব নয়। এই নিন পঞ্চাশ সহস্র মুদ্রা কাষ হাসিল করুন, টাকা, অস্ত্র বা প্রয়ােজন হইলে সৈন্যের অভাব হবে না। কিন্তু সাবধান যদি প্রবঞ্চনা করিবার ইচ্ছা থাকে তবে যতই বীরপুরুষ হােন, আপনার জীবনের জণ্ঠ এক কপর্দক মূল্যও কেহ দেবে না। রুষ ভল্লুকের উদ্যত নােষের বিদ্যুতে সদ্যমৃত্যুর হাত হতে পরিত্রাণ কাহারও নাই। এই বলিয়া গুর্কি পকেট বহি হইতে নােটের তাড়া বাহির করিয়া ৬৪ সেখহাটির নীলকুঠি। ফিলিপসের হাতে দিল। লােলুপ দৃষ্টিতে সেগুলি দেখিয়া লইয়া উভয়কে সসম্মানে অভিবাদন করিয়া ফিলিপস বলিল ;- মসিওর গুর্কি। শ্ৰীমন্ত মহারাজ রঘুনাথ রাও। আপনাদের বদান্ত মানুষের লৌহহৃদয়কে চুম্বকের আকর্ষণে টানিয়া আনে। রুশিয়ার জার পৃথিবীব্যাপী অধিকার বিস্তার করুন, শসুদন নানাসাহেব অমর- জীবন লইয়া চিরকালের জঙ্গ ভারতলক্ষ্মী অঙ্কশায়িনী করুন আর আমার মত শত শত ভাগ্যান্বেষী সৈনিকের তরবারি তাঁহাদের শত্রুর রক্তে রঞ্জিত হয়ে তাহাদের পদতলে স্থাপিত হোক। ইহার পর তাহারা গভীর আলােচনায় নিযুক্ত হইল।

আমতলার মাঠ। ( ১২) অয়নান্ত বৃত্তের নিদাঘ-সূৰ্য্য চণ্ডকিরণে যাকে দগ্ধ করে রেখেছিল, তৃষাতুর সেই ধরা বক্ষ বর্ষাগ্রবারির অজস্র ধারা সাগ্রহে ধারণ করিল। ফলপ্রসূ হইবার রসভাণ্ডার পূর্ণ করিয়া লইয়া শীতল হইল। কবীব বহুল বঙ্গের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে প্রান্তরে প্রান্তরে জীবনী শক্তির সাড়া পড়িয়া গেল। লাগলের জো হয়েছে, লাঙ্গলীর নিশ্চেষ্টতা অসম্ভব। বৎসরের থােক, ছেলে মেয়ে পরিবারের ভরণ-পােষণ, মহানের শােধ, নিত্য নৈমিত্তিক ব্যয় ও সঞ্চয় সকলি নিৰ্ভর কছে আমি আত্মনিয়ােগে এই দেবদত্ত সুযােগ সদ্ব্যবহারের পুরুষকারে। নীলকরও নিশ্চেষ্ট নয়—অমির জে হইলেও প্রথম মােড়ায় মন বােনা না হইলে নালের অতবড় কনসার্ণগুলি সব বেকার বসিয়া থাকিবে। বেলা প্রায় দশটা বাজে। লতিফ সে প্রাণপণে লাল চত। পাতের থালা মাথায় করে চুলের গােছা নাচাতে নাচাতে ফুলবিবি এসে বললে—“সে কি নানা। তুমি একা চটে বে?

সেখহাটির নীলকুঠি। ফুল বিবি কালো, কিন্তু দেখতে ভালাে, বাল্য ও যৌবনের সন্ধিস্থলে নবসজাত তার কৈলাের কখন পুষ্পধনুর অধিকারে আসিল সে তাহা বােঝে নাই কিন্তু কণ্ঠে তার অভিনব মধু, নয়নে তার লজ্জা, চরণে তার লীলা গতি, সাধু মালের ছেলে বাঁশী মালের চোক এড়াইতে পারে নাই। বাঁশী বলেছিল যে সে সকালে বৃদ্ধ লতিফের সাহায্যে নিজের লাঙ্গল গরু নিয়ে আসবে, কিন্তু কোনখানে তাকে দেখতে না পেয়ে ফুলবিবি অবাক হয়ে গিয়েছিল। এই আজ প্রথম তার কাছে কথা দিয়ে বাঁশী মাল কথা রাখে নি। লতিফ ব–“একা ছাড়া আর দো কোথা থেকে হবে দিদি। আর কি আমার বারি আর গণি বেঁচে আছে। দুই হাতির মত জোড়া বেটা যমের মুখে তুলে দিয়ে যমের অরুচি বুড়াে একা পড়ে আছে একা, বড় একা, কে তার সাহায্য কৰ্বে দিদি।” অঝােরে চখের জল ঝরতে লাগল, লাঙ্গল ছেড়ে বুড়ো বসে পড়ল। বর্ষীয়সী গৃহিণী যেমন ঘােট ছেলেটিকে কোলে তুলে নিয়ে ভােলায় সেই রকম করে সেই ছােট মেয়েটি তার বুড়াে পিতামহকে ভােলাতে লাগল। হিড় হিড় ক'রে গরু তাড়াতে তাড়াতে জল জোয়াল নিয়ে বাঁশী মাল ও তার সখা মাখম ঘােষ এসে পড়লাে, সঙ্গে পাঁচন হাতে দু'জন রাখাল। ফুলবিবি বল্ল-এত দেরী কল্পে বাঁশী দাদা! নানার যে ভারি * হয়েছে। তােমার সঙ্গে আর আমি কথা কইব না। মাখম। ফুল দিদি ওকে বকিস না ও বড় মার খেয়েছে। দেখ না পিঠ কেটে কোড়ার দাগ বসে গিয়েছে। সজল চোখে ফুলৰিবি দেখলাে বাঁশীর পিঠময় দাগড় গড়া মারে দাগ, রক্ত ফুটে বেরুচ্চে। সে দিকে লক্ষ্য না করে বাঁশী দিব্য লাঙ্গল

আমতলার মাঠ।
৬৭
চষতে লাগিয়ে দিল। মাখমও সেই সঙ্গে যােগ দিল। ফুলৰিবি
অতিকাইয়া উঠল, চেঁচাইয়া বলিল, ওমা অমন করে কে মাগ্লো গাে।
বাঁশী। যার মারে; লাঙ্গলের জো হয়েছে।
লাগলের জো হয়েছে। আগে সাহেবদের
নীলের জমি চষতে হবে পরে নিজেদের ক্ষেত চাে। আর নীল বােনা
হবে নিজেদের জমার সেরা ভু ই গুলিতে। দলে দলে লােক ধরে নিয়ে
গিয়ে বেগার নিচ্চে। আমিও কয়দিন বেগার দিয়েছি।
বলে বেগার দিতে। আমি বলি—বিশ্বাস দাদার জমিতে আজ যাৰ,
আজ মাপ কর তাই গােমস্তা মশায় সােহাগ করে পিঠে কোড়া বুলিয়ে
দিলেন। শেষে মাখম শুদ্ধ প'ড়ে একজনের কায দুজনে তুলে দিয়ে
তাড়াতাড়ি ছুটে আসচ তোদের কাছে। জো চলে গেলে তাদের
এবারকার চাষ একদম মা ও হবে যে।
এই বলিয়া তাহারা সােৎসাহে জমি চুষিতে লাগিল।
সহসা পরুষ কণ্ঠে কে বলিল—“লতিফ বিশ্বাস ! বড় গােস্তাকি;
তোমার এই আমতলার জমি এবার তোমাকে চাষ কর্তে বারণ করা
হইছিল না? সরকার থেকে নীল বােনা হবে বলে ! কি! কণা
কষ্ট না যে ?
সকলে সভয়ে দেখিল তেজস্বী অশ্ব পৃষ্ঠে স্বয়ং দেওয়ান বাহাদুর
লক্ষ্মীকান্ত, পশ্চাতে তার বরকন্দাজ সেনা।
লতিফ। কি কথা বলবাে হুজু—জোড়া বেটা পেটে পুলিচি তবু
তাে পােড় পে পােরেনি—এ জমিটুকুতে নীল বুনলে খাবাে কি ?
লী। গাছের পাতা খাও কি আকার ছাই খাও আমার মা
দেখ বার দরকার নাই। আমি সরকারি চাকর—সরকারি ॥
হাসিল কর্পো, ইথে মেরা থাকো কি যাও আমার তাতে কি
৫
অ'সে যায় না।

সেখহাটির নীলকুঠি। লক্ষ্মী। লতিফ। তবে সরকারি কার্য সরকারি লােক দিয়ে সরকারি খাস জমায় হাসিল হুর,—অামাদের বেগার খাটানই বা কেন আর আমাদের নিজেদের জোতের জমায় নীলই বা বােনেন কেন? লক্ষ্মী। কেন? হারামজাদা বাদীর বাচ্চা তােমার মত কুকুরে কাছে কৈফিয়াত দেব আমি। শােন বেইমান বজ্জাত এখুনি এই জমিতে নীল বােন পাইকের কাছে কাঠা পােয়া নীলের বীজ আছে। শিগগির নিয়ে নীল বােন। লতিফ। গালাগালি কৰ্ব্বেন না হুজুর-নীল আর বুনবে না আমরা। এত আস্পর্ধা!—এই বলিয়া হাতের সেই ভারি চাবুক দিয়ে লতিফ বিশ্বাসকে সজোরে প্রহার করিলেন। বিদ্যুতের বেগে ফুলৰিবি বুড়াকে জড়াইয়া ধরিল চাবুকের বাড়ি সজোরে পড়িল ফুল- বিবির কোমল অঙ্গে। ছিঃ বল্লরীর মত কিশােরী অচেতন হইয়া ভূপতিত হইল। বাঘের মত গর্জিয়া বাঁশী মাল লক্ষ্মীকান্তকে আক্রমণ করিল। রকিব সেখ চালিত বরকন্দাজ সেনা হার কম্বিয়া সমুখে বেড় দিল। খেলিতে লাগিল লাঠি বাঁশী মালের হাতে, লােয়ার দিল মাখম যােব। বয়সে তারা নবীন কিশাের, অত্য তাদের যৌবন কিন্তু কাজের বেলায় দেখা গেল প্রবীণের তারা দীক্ষা- শুরু। তাদের লাঠির চোটে এক এক করে বরকন্দাজ সেনা আহত হয়ে পিছু হটতে লাগলাে। রকিব সেখ চিন্তিত হলাে। যাশী শরি গুরু মন্তু শিষ, তার প্রাণহানি বা অবনি কার উমে নিয়ে অন্তরাত্মা অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে বসে ধিকার দিনে উঠছে। কিন্তু চিন্তার আর সময় নাই। বালকেরা যে খেলা দূড়েছে, জীবন মরণ তার পণ। আজ কার খেলার মান বাঁচাতে হলে হয়

আমতলার মাঠ।
নিজেকে লাস হ'য়ে আমতলার ক্ষেতে পড়ে থাকতে হবে, সাত
দুটাকে সাবাড় দিয়ে যেতে হবে।
বহুক্ষণ পরে সর্বাঙ্গে আহত হয়ে রক্তাক্ত কলেবরে বাঁশী ও মাখন
ধরাশায়ী হইল।
লতিফের জমিতে নীল বুনিয়া দিয়া-বরকন্দাজ সেন লতিফকে
বাঁধিয়া লইয়া চলিল। তাহাদের মধ্যে একজনও অক্ষত দেহ ছিল না।
আহত ফুলবিবি সংজ্ঞা ফিরিয়া পাইয়া কুররীর মত ক্রন্দন করিতে করিতে
ভূমিতে লুটাইতে লাগিল।

দ্বারিকানাথের ভাগ্য ফিরিল। ( ১৩ ) কথায় আছে অমঙ্গল হইতে মঙ্গলের বিকাশ হয়। রাণী নগরের আরিক মােক্তারেরও তাহাই হইল। যখন কাবুড়ীর রক্তমাখা হতচেতন দেহ লইয়া তাহাদের আঙ্গিনায় রাখিল, সুলােচনা অকূল পাথার দেখিল পিতামাতার রুগ্ন শয্যা হ’তে ওঠা কষ্টসাধ্য। আর যে বুড়ী তার শ্রম- জাত দ্রব্য বিক্রয় করে দিয়ে তাদের সংসার চালাত সেও আজ মুমূর্য। কিন্তু দৈনন্দিন অভাব ও প্রতিকূল দৈবের সঙ্গে যুদ্ধ করা একরকম তার স্বভাবের মধ্যে হয়ে দাড়িয়েছে, দৈববিড়ম্বনার আকস্মিক দুর্ঘটনা হাকে সহসা মুহমান করে না। অনিলা জিজ্ঞাসা করিল—কি হবে মা? কন্যা জননীর ন্যায় উত্তর দিল-ভয় কি মা। এতদিন যিনি চালিয়ে যেন তিনিই সবদিক ৰক্ষা কৰ্বেন। বিপদের নিবিড় মেঘে সুলোচনা চিরদিনই আশা-সৌদামিনীর রজত- রেখা দেখতে পেয়েছে, তাই অভরষার দিনেও তার ভরষা। দ্বারিকনাথ বায্যে শয্যা হইতে অর্ধউখিত হইয়া চীৎকার করিয়া বলিলেন—“ঠিক বলেছ মা ; কোন ভয় নাই। এ অত্যাচার বন্ধ কতে হবে। এ রক্তস্রোত মােধ কৰ্তে হৰে। ভগবান্ নিশ্চয়ই আমাকে দ্বারিকানাথের ভাগ্য ফিরিল। ৭১ অামাৰ হারান স্বাস্থ্য ফিরে দেবেন। বিপদে পড়ে বুঝতে পেয়েছ মা, বিপদের বন্ধুর দাম কত। আমাদের সেই বিপদের বন্ধু আজ মৃত্যু শিয়রে করে আমাদের দরজায় এসে পৌছেছে। সুসময়ের কোকিলদের মত দ্বারিক বাড়ুয্যে অকৃতজ্ঞ নয় দেখিয়ে দে মা দেখিয়ে দে। মাথায় মুকুটের মত আদর করে নে, চখের মণির মত করে যত্ন কর, বুকের রক্ত দিলে যদি বড় মেয়ে যচে আমি তাই দেবাে” অত্যধিক উত্তেজনায় ব্যাধি-দুৰ্বল দেহ অবসন্ন হইয়া পড়িল দ্বারিকা নাথ মুচ্ছিতের গায় নিজ শয়নীয়ে শুইয়া পড়িলেন। সুলােচনা ও অনিলার শুশ্রুষায় সে ধাকার বেগ সামলাইয়া সুস্থ হইলেন; তখন তিন জনে মিলিয়া আহতের শুশ্রুষায় রত হইলেন। ভােলা নাপিত আসিয়া ক্ষত ধুইয়া দিল। নন কবিরাজ আসিয়া রােগিনীকে পরীক্ষা কমিয়া ঔষধের ব্যবস্থা করিলেন ও নিজে লােক দিয়া সেগুলি পাঠাইয়া দিতে চাহিলেন। ভােলা নাপিত বলিল -কবিরাজ মশায় এত রাতে লােক পা আর অসুবিধা হতে পারে—আমিই আপনার সঙ্গে গিয়ে তাড়াতাড়ি বধ নিয়ে আসি। কবিরাজ। ভােলানাথ, আঘাত সাংঘাতিক। রােগীর জীবন সংশয়পর, প্রতি পদে প্রাণ বহির্গত হইবার আশঙ্কা—এ সময় তােমার এ স্থান মুহূর্তমাত্র ত্যাগ করা উচিত নয়। আমিই ঔষধ পাঠাইব। সেই লােক মাফেত অবস্থা জানিয়ে দেবে। প্রয়োজন হলেই আমাকে ডেকে পাঠ বে। তোমার ও আমার বিদ্যাবুদ্ধির শেষ দৌড় পর্যন্ত বেয়ে দেখতে হবে। দা ঠাকুরের হুকুম পালন কর্নে হবে। এই বলিয়া কবিরাজ চলিয়া গেলেন ও কিছুক্ষণ পরে তার লােক এসে ধ ও প্রলেপ দিয়ে গেল।

৭২ সেখহাটির নীলকুঠি। যে নন কবিরাজকে লােকে সাধ্য সাধনা করিয়া পাই না, জ্ঞান অপেক্ষা হাতযশ যার বেশী, হাতযশ হইতে নিজের উপর বিশ্বাস ও তজ্জনিত গর্ব যার অধিকতর সেই নন কৰিাজ আর যেন সহৃদয়তার প্রতিমূর্তি। দা ঠাকুরের নামের কবচ অসাধ্য সাধন করে। ইষ্ট দেবতাকে নন্দ কবিরাজ চাইতে পারে ও চটায়—কিন্তু দা ঠাকুরকে নয়। গদি কি তােষক ছিল না; তাই সুলােচনা মানুষের উপর ছিন্ন কথাগুলি পাতিয়া তার উপর নিজের হাতের কারুকার্য করা একখানি নূতন কঁাথা দিয়া তার উপর পরিষ্কার চাদর পাতিয়া দিল। পুরাতন কাপড়ের শুভ্র ঝালর দেওয়া বালিস দিয়া কাণা বুড়িকে শােয়াইল। শেষ রাত্রে যখন কাণা বুড়ির জ্ঞান হইল, হাতে পাখা সুলােচনাকে শুশ্রষা করিতে দেখিয়া সে আরামের নিঃশ্বাস ফেলিয়া নিদ্রা গেল। ভিখারিণীকে রাজরাণীর সম্মান দিতে, ভুক্তভােগী দুঃস্থ পরিবার ইতঃস্তত করিল না। দাঠাকুর ওরফে রামধন ভট্টাচাৰ্য সকালে আসিলেন। ছিলেন লাঠিয়াল গণের মুরুব্বি, নিজে একজন অসীম শক্তিশালী এসি লাঠিয়াল, তদ্ব্যতীত লাঠিয়ালের সংগঠনে তাহার শক্তি ছিল অসাধারণ। এল কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় দুরন্ত, উদ্ধত লাঠিধামী যুবকগণের হৃদয় স্পর্শ করে আকর্ষণ কার শক্তি তার ছিল। সে সময় লাঠিয়ালের চাহিদা ছিল দেশব্যাপী। আইন আদালতের বহুল প্রচলন না হওয়ায়—লােকে কলহের মীমাংসার অঙ্গ যাইত লাঠির আদালতে। আর সে আদালতে প্রসিদ্ধ উকিল, মােক্তার বা ব্যারিষ্টার ছিলেন রামধন দাঠাকুর। যে পরে যখন লাঠিয়াল প্রয়ােজন হইত, দাঠাকুরকে সংবাদ দিত, দাঠাকুর নিপাড়ায় বাহার যেরূপ প্রয়ােজন সেইরূপ লাঠিয়াল পাঠাইয়া দিতেন। আবার কাহারও যখন কাহাকেও বিশেষজ্ঞবে জ করিতে হই দ্বারিকানাথের ভাগ্য ফিরিল। ৭) কোন দুৰ্ধৰ কর্মের প্রয়ােজন হইত উপযুক্ত মূল্য পাইলে রামধন তাহ অনাড়ম্বরে অতি দক্ষতার সহিত সম্পন্ন করিয়া দিতেন নিঃশব্দে, কাকে বকে টের পাইত না। দাঠাকুরকে তাই লােকে যমের মত ভয় করি দাঠাকুরের অবস্থাও বেশ ভাল ছিল। দ্বারিক বাড়ুয্যে, ভাল অমস্থার সময় দু’জনে ভাব ছিল না। অসুবিধায় সময়ও রামধন খোজ লন নাই। এখন দেখিলেন উষার আলােক চ্ছটার মত শুভদৰ্শনা সুলােচনা যাহাই স্পর্শ করে তাহাই শুচি। সমুজ্জল হইয়া ওঠে। ওঠে। জ্যোৎস্নার মত লাবণ্যময়ী সুলোচনা, যেন করুণার মূর্তিমতী ব্যথা, প্রাণময় তাহার স্পর্শে নােগশয্যা আশে হয়ে উঠেছে, দরিদ্রের কুটির ঝলমল কচ্ছে। এমে তার শাস্তি নাই, অনিদ্রায় তার কান্তি নাই, অনাহারে বা অর্ধাহারে সে লাবণ্যের গ্লানি নাই। গ্লানিহীন সে সুষমা যেন শেফালির ফুল, শরতে ব্রাহ্মমূহুর্তে ফুটিয়া উঠিয়া ধরণীকে পবিত্র ও অলঙ্কত করিতে করিতে ধূলায় লুটাইতেছে। কে তাহাকে পূণর থালায় উঠাইয়া লইয়া সিংহবাহিনীর পাদপদ্মে স্থাপিত করিবে ? রামধন বহুক্ষণ থাকিলেন। সুলােচনার সখী ও সমবয়স্কা বহুদিন গতায়ু নিজের একমাত্র কন্যার স্মৃতি আজ তাকে পাগল করে তুলেছে। রামধনের পাথরের মত শক্ত মন ভেদ নিঝর ধারা বইল সুলােচনার উপর। সেইদিন হতে আলােচনার শংসারে আর কোন কষ্ট রহিল না। রামধন যেন সত্য সত্যই সুলােচনার জ্যেষ্ঠতাত। রিকালামে সহিত তাহার সম্ভাব স্থাপিত হইয়া ঘনীভূত হইল। এর মধ্যে রাষ্ট্র হইল নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রাপকের কলা করিবার ও এরিকানাথ মাের এত হইয়াছেন। নীলকরদের ৭৪ সেখহাটির নীলকুঠি। বিরুদ্ধে মকদ্দমা লওয়া তখনকার উকীল বা মােক্তাদের সাহসে কুলইতনা। তাই মক্কেলে বাড়ী ভরিয়া গেল। ঔষধ, পথ্য ও অর্থ বন্যার স্রোতের ন্যায় আসিতে আৰম্ভ করিল। দ্বারিকানাথের ও তঁাহার স্ত্রী অনিলার স্বাস্থ্য ফিরিয়া আসিল। আবার বার বেহারায় বাহিত পাকাতে চড়িয়া থারিকানাথ প্রতিদিন অগ্রাম হইতে মোরী করিবার জন্য সহরসগােরবে যাতায়াত করিতে লাগিলেন। পুনরায় বাড়ীতে বারমাসে তের পার্বণ আরম্ভ হইল।

অগ্নি জ্বলিল। (১৪) লতিফ বিশ্বাস ছাড়া পেয়েছে। সহজে ছাড়া পায় নাই। সে হাত দিয়া নাল বুনিতে রাজি হয় নাই। তাই লক্ষ্মীকান্ত সহায় মাথা মাইয়া মাথায় আঁটুলি মাট দিয়া তাহার উপর নীলের বী বুনিয়া দিয়াছিল। আর যতদিন নীলের চারা বাহির না হয় ততদিন পৰ্য্যন্ত বুড়াকে সেখহাটির কুঠির ফটকে আটক থাকিতে হইয়াছিল। দ্বারকানাথ ফুলবিবির তরফ হইতে মকদ্দমা জুড়িয়া দিলেন। ফুলবিবি আদালতে গিয়া সব কথা নিয়ে প্রকাশ করিয়া দিল। নীলকর পক্ষের উকীলের হুমকিতে সে ভড়কাইল না। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের পক্ষ হইতে মরিস সাহেবের উপর চাপ আসিল। লতিফ বিশ্বাস আটকের হাত হইতে নিস্তার পাইল। মাথায় নীল বুনিয়া দিয়াছে, কিন্তু হাত দিয়া তাহাকে নীল বুনাইতে পারা যায় নাই। বুড়া কাঠ কবুল হাত থাকিতে হাত দিয়া সে আর নীল বুনিবে না। বাঙ্গালার কৃষিজীবী তরুণ জোতদারের দল বলিল,-সাবাস লতিফ বিশ্বাস, সাবাস বাশ মাল, বাহবা ফুলবিৰি, বাহবা মাখন যে বুড়ায় আর ঘোড়ায় যা পারে, একটা ছােট মেয়ের কলিজায় যতটুকু বল ও সাহস আছে লোয়ানের কি তাহা থাকবে না? আলমুখ অগ্নি মাত্র ৭ সেখহাটির নীলকুঠি। ফুৎকারের অপেক্ষা করিতেছিল এখন তাহা পাইয়া আলিয়া উঠিল। নীলের বেগার দেওয়া বন্ধ হতে লাগলো। এদিকে নূতন আইন অনুসারে নীলের বেগার দিতে প্রজারা বাধ্য। সেই আইনকে কার্যকরী করিবার জন্য লক্ষ্মীকান্ত তাহার অধীনস্থ ৫৪ কুঠৰ এলেকায় আদ জল খেয়ে লেগে গেল। আদালতের শাসনের সঙ্গে নীলকরের শক্তি ও জুলুম এক হলাে। আইন অমান্ত হতে লাগলাে। আর এক এক করে প্রজার জেলে যাওয়াও আরম্ভ হলাে। মরিস সাহেব পাকা নীলকর; শক্তি তাঁর সমবদ্ধ। দেওয়ান লক্ষ্মীকান্ত প্রভুভক্ত অতি জাহাজ লােক; যেমন দাঙ্গাবাজ তেমনি মামলাবাজ, যে সকল এ গেলে যেতে লাগল, তারা জেলে যেতে না যেতে তাদের গৰু ৰাহু, ঘর বাড়ী, জোত অমা, আসবাব পত্র সব যেন সিপি খােল শিশি হ'তে কপূরের মত উড়ে যেতে লাগলো। লক্ষ্মীকান্ত গজন করিতে করিতে প্রকাশ করিত, এজাপক্ষ প্রমাদ গণিল কিন্তু দমিল না। পার্বত্যনদী গিরিদরী হইতে উঠিয়া আসিতে আসিতে গিরিসঙ্কটে বাধা পাইলে উৎস স্থানে ফিরিয়া যায় না, বুঝিয়া যুঝিয়া পথ করিয়া লয়। যুঝিয়া পথ করিয়া লয়। বাপ পিতামহের যায্য অধিকার বল করিয়া কাড়ি লইতেছে, যদি প্রতীকার চেষ্টার মূলে এই বােধ বদ্ধমূল থাকে তবে সে চেষ্টা সূত্রপাতে পরাভুত হইলেও চরমে অপরাজেয় ; আর সেইপ বােধসম্পন্ন লােক প্রথমে অল্প হইলেও কালগতির সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য হইয়া ওঠে। মরিস সাহেবের একটি কর্মচারী সঙ্গে করিয়া কাশীশ্বর আসিল রিকানাথের বাড়ী। বলিল-

অগ্নি জ্বলিল
৭৭
“ডায়াহে। বরাত ফিরেছে। সাহেব বাহাদুর মকদ্দমা দিয়েছি।
নগদ ও এক হাজার। এই কাগজপত্র দেশ। এই টাকার থলে
লও।” বলিয়া ঝনাৎ করে টাকার খলে সম্মুখে রাখিল ও মকদ্দমার
নথি তাঁকে দিল। টাকার দিকে না চা হয়া কাগজে একবার বৃষ্টি
দিয়াই দ্বারিকানাথ বলিলেন -
কি ছাই বিড়ালে খেলে দাদা, এ মকদ্দমায় যে আগে হতেই
আমায় অপর পক্ষে নিযুক্ত করেছে। আমি যে মােক্তারনামায় সই
করেছি। আমার যে আর সাহেব বাহাদুরের মকদ্দমা নেবার উপায় নাই।
কাশী। তাই ত ভায়া! মুস্কিল কল্পে। সাহেব বাহাদুরকে নই
জানিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে মকদ্দমা নিলে কাটা কি ভাল হলো? না
যে জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বাদ।
বারি। সে কি দাদা, সাহেব বাহাদুরের সঙ্গে বিবাদের কথা কই
কেন? আমরা করি কথা বেচে খ:ওয়া পেশা , বেতার যেই
আমরা। যে যখন আমাদের বায়না করে আমরা তখনই তার এ
পোঁদ নাচিয়ে গান গাই, আমরা কি কারও সঙ্গে বিবাদ করি না
সেটা করা সম্ভব।
কা। তা যাই হোক কাষটা তাে ভাল হচ্ছে না। যত সৰ
ডেপুনরুপের মকদ্দমা কচ্চ, আর বুনিয়াদি ঘর ছেড়ে দিচ্চ কাটা
তত ভাল নয়, তা দেখ আমি না হয় বুঝিয়ে বলিগে বে এ
মকদ্দমায় প্রকার দিকে থাকলেও তুম তত মন দিয়ে কাষ ফর্বে
, আর ভবিষ্যতে সাহেব বাহাদুরকে না জানি আর পঁয়
বিরুদ্ধে মকদ্দমা নেবে না। টাকাগুলাে বয়ং থাক।
। সে কি কাদা, মরেলের টাকা খাবে আর তার মা।
কৰ্বোনা ! তার বিরুদ্ধ পনের টাকা খাৰ, আমাদের ইংরেজী শেখা মতে

৭৮
সেখহাটির নীলকুঠি।
এরকম কায আমাদের যারা হবে না। তবে আপনাদের টোলে
পণ্ডিতদের কি মত তা আপনারাই জানেন।
কাশ। আরে ঠাট্টা কর কেন ভায়া, না হয় একটা আধটা
টোল আছে ; দু দশটা ছাত্ৰও আছে, দোল দুর্গোৎসবটাও হয় সেটা
কি এতই নিন্দের! তবে কি জান তােমাকে ছােট ভায়ের মত দেখি
যাতে তােমার হিত হবে এমন একটা পরামর্শ দিতে এলাম।
যদি তােমার পছন্দ না হয় আমি কি কৰ্বে। , কথায় বলে-
“যার বিয়ে তার মন নেই
পাড়া পড়শীর ঘুম নেই।”
আগ্রা কিন্তু সংস্কৃত বাগানবাশ লােক সাহেব সুবাে চটাতে চাই
না। তোমাদের কিনা একেলে মত তোম। কাকেও গ্রাহি কর না।
এই বলিয়া একটু বক্ৰহাসি হাসিয়া কাশীশ্বর সাহেবের লােক ও
টাকা লইয়া চলিয়া গেল। সে বাঁকা হাসির অর্থ দ্বারিকানাথ
বুঝিলেন। বিশেষ একটু চিন্তিতও হইলেন। দা ঠাকুরকে ব্যাপারটা
বলিলেন। উভয়ে বুঝিলেন এবার মরিস সাহেবের আক্রোশের প্রবল
বেগ দ্বারিকানাথের উপর দিয়াও এক চোট বইবে। প্রজারা আসিল।
সকলেই বুঝিল বিশেষ সাবধানতার সহিত না চলিলে রক্ষা পাওয়৷
তার হবে : সকলে একবাক্যে বলিল,-“দা ঠাকুর! উপায় কি?
এস উপায় দেখাইয়া দিতেছি। বলিয়া সকলকে সঙ্গে লইয়া দা
কুর পরামর্শ করিতে লাগিল।

কাশীশ্বরের মুখােব (১৫) কোরোন করে দেবে, কোরোন করে দেবে। ঘরের বউ কি সব বেরিয়ে যাবে, বিধবার বিয়ে হবে, সন্ধ্যে আহ্নিক উঠে যাবে, ঘরে ঘরে মুগি রায় হবে, জাত যাবে, জন্ম যাবে, ধর্ম যাবে কর্ম যাবে, সাবধান, 'বধান।” কাশশ্বর নিজের চণ্ডীমণ্ডপের দাওয়ায় এক নাবৃিহৎ জনতায় জটলার মধ্যে উপরুক্ত মন্তব্য গম্ভীর ভাবে প্রচার করে ভবিষ্যৎ যে দেখতে পায় এমন একটা গুণী জ্ঞানীর মত চিক্ষণ ভাবে বল। মধুৰ্দাত বলে,-তাইত বিদ্যারত্ন দা ঠাকুর, আমরা ভেবেছিলাম ককেতা থেকে পণ্ডিত এসেছেন আর যে সে পণ্ডিত নয়, একে বারে বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগর, ..ছলেদের ফুল হবে মেয়েদের স্কুল হবে, দেশের উন্নতি হবে, না এর মধ্যে এত ব্যাপার। জাত জন্ম আমার কল। তা এ ফ্যাসাদে পয়সা দিয়ে লােকে কেন পা দেবে? আমরা মুখ্য সুখ মানুষ অতশত বুঝ না, ভ্যাগ্যিস আপনারা ছিলেন তাইতে হাদিস বাতলে দিলেন। বাবা প্রধান জায়গা, এখানে ধা।

সেখহাটির নীলকুঠি। - চলবে না। এখানে হেলে নেই গিরগিটি নেই আছে সব আসল মরিস এ মেগের কাছে পেগের বড়ায় নয়, বাঘের ঘরে ঘােগের বাসা , কৈলাস গুয়ালঙ্কার বলিল, -আরে মধু ভায়া এই বিয়ের দাদা থাকলে, আর শৰ্মা ন্যায়লস্কার না থাকলে ইয়ে তাে গিইছিলই। সীতাপতি খুড়োর কি আর সে দিন আছে। বার্ধক্যে ভীমরতি হয়েছে কথায় বলে—মুনীণাঞ্চ মভ্রি। তিনি তো বিদ্যাসাগরের ভয়েই ফুলের দিকে মত দিইছিলেন, তা বিদ্যের দাদার কাছে আর কয়েই পেলেন না। কাশ। ছিঃ কৈলাস! সীতাপতি খুড়ো বুড়াে মানুষ তাঁর অক্ষমতা আর বাহিরে প্রকাশ করার প্রয়ােজন কি? বুনাে রাম- নাথের শিষ্য ছিলেন বটে উপাধিও আছে বাচস্পতি সরস্বতী কিন্তু এখন সে সব হয়েছে যেমন কাণাছেলের নাম পদ্মলােচন। সৰ ভুলে গেছেন। ছাত্র দিয়েই দেখতে পার তােমার আমার টোল ভর্তি, আর তাঁর টোল কাকস্য পরিবেদনা, শিবরাত্রির শতের মত একটি চাপ, টিপ কচ্চে। কৈলাস। আচ্ছা, ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাসাগর উপাধি কে দিল? বিধবা বিয়ে যে দিতে চায় এমন আহাম্মক হলেন বিদ্যাসাগর। কাণী। আরে রেখে দাও তােমার সাগর। তোমার আমার পাল্লায় পলে সাগর শুকিয়ে গর্ত হয়ে যাবে। আমাদের তর্কের সৰে গ'লে বুঝে নিতাম কেমন সে আহাম্মক গুরু যার এত বড় আৰু শিষ্য। সা গভীর সুরে, দিপমণ্ডল ঝঙ্কত করে সংস্কৃত ভাষায় কাশীশ্বরের মুখহােব ১ সংযত কর রসনা পণ্ডিতন্য বিসু। ঈশ্বরচন্দ্রকে পদাঘাত করিলেও সে নত মস্তকে সহ করিবে কিন্তু তাহার গুরুর অপমান করিয়া তােমরা অল পাবকে হস্ত প্রদান করিয়াছ। আমায় তর্ক যুদ্ধে আহ্বান করেছ ; আমি সে আহ্বান গ্ৰহণ কমি। অবতীর্ণ হও তর্ক যুদ্ধে বাগাড়ম্বর প্রিয় বিগণ। সময়ক্ষেপে অলং। সকলে বিস্ময়ে দেখিল তালতলার চটিপায়ে রেলির উনপঞ্চাশী ধূতি পরা বিছানার চাদর গায়ে দেওয়া, কপালে চন্দনের ফোটা, শিখায় পূজার ফুল বাঁধা প্রসারিত ললাট অর্ধ মুণ্ডিত মস্তক কশ-দেহ বিদ্যাসাগর আননে তাঁর প্রতিভার ভাতি, নয়নে তার আলাময়ী দ্যুতি। নিঝরের জল যেমন ঝঝরে ঝরিয়া চলে তেমনি তাহার কণ্ঠ হইতে নির্গত হইতে লাগিল অবিরল ধারে, তিসুখকর প্রাঞ্জল সংস্কৃত পদাবলির স্বচ্ছধারা, উচ্চারণ ও ব্যাকরণ শুদ্ধ অনুস্বার ও বিসর্গের সুচিন্তিত বিন্যাসে ঝঙ্কারকারী, দিগন্ত মুখরিত। পার্শ্বে দাড়াইয়া পরেশনা মৃদুমৃদু হাসিতেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র যেন দীপ্ত বহি শিখা, বির। ন্যায়ালঙ্কার ও তাঁহাদের সাঙ্গোপাঙ্গকে শুষ্কতৃণস্তুপের মত পাইয়া দ করিতে লাগিলেন। কাশীশ্বর বিনা বিন্যায় বিদ্যারত্ব ; কৈলাস গায়ালারের অলঙ্কারের মর্গে নধর সুডৌল কাল কুচকুচে মণ দেহ খানি—তাঁদের টোলে পড়া শিদে বিদ্যার দৌড় সহজেই অনুমেয়। কাশীশ্বর হঠিতে হঠিতে কোণঠাসা হই গায়ালার গলদঘর্ম, শিয়গণ হৃতবাক, ভয় বিষ সর্পের ন্যায় নি। নতশী। মধুপাত টিটিকারী দিল, আর সকলে বলিতে লাগিল “আরে ছি ছি! এই বিদ্যের এত বড়াই! আজ যে লেল্যায় খাড় বেরিয়ে পল, মা দিয়ে চিত্তির করে এতদিন ঢাকা ছিল। বাবাঠাকুররা এরি বলে এতদিন পায়ের উপর পা দিয়ে চাহিলেন আর আমাদের উপর প্রভুত্ব নিলেন ২ সেখহাটির নীলকুঠি সকল কণ্ঠস্বর মগ্ন করিয়া বিদ্যাসাগরের কম্বুক পুনরায় ধ্বনিত হইল। অবিদ্যার রত্নকে, কে বিদ্যারত্ব কল্লে। অন্যায়ের অলঙ্কারকে কোন্ অযােগ্য গুরুর খােমােদ প্রিয় চিত্ত ন্যামালঙ্কার ভূষণে ভূষিত করে শব্দ ও অর্থের বিপর্যয় সাধিত করেছে ? অযােগ্যতার বিলাস ভূমির জন্য কি টোলের অধ্যাপনা ? সংস্কৃতের পর্যালােচনা কি বাণীর বিড়ম্বনা ? সরকার বাহাদুরের সাহায্য নিয়ে অচিরে এমনই আইন প্রস্তুত কৰ্ত্তে হবে যাহাতে তােমাদের মত অপদার্থ লােকের বিদ্যারত্ব ন্যায়ালার প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ বা বিতরণ করা চিরদিনের জন্য অসম্ভব হবে। বন্ধ করে দিতে হবে তােমাদের টোল, স্তব্ধ করে দিতে হবে তােমাদের দম্ভবাণী, তােমাদের মূখ হতে। সভামণ্ডপ অপ্রতিভ করা সাধারণ বিশৃঙ্খলার আবেষ্টনের মধ্যে কোন সময়ে আসিয়া বসিয়াছিলেন গৌর সুন্দর অশীতিপর এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, সঙ্গে তরুণ উষার অরুণের ন্যায় মুখচ্ছটা এক নবীন যুবা কেহ তাহা লক্ষ্য করে নাই। এতক্ষণ পরে বৃদ্ধ কথা কহিলেন। বয়সে বৃদ্ধ কিন্তু কণ্ঠ তাঁর তরুণের নবীনময় বীণাবেণু নিন্দিত। নখ নখ কপাে সন্নিপাত্যোহয়নি মৃদুনি মৃগশরীরে, তুলশা বিয়ে কত হরিণকানাং জীবিতঞ্চাতিলােলং কচ নিশিত নিপাতাবসারা শরান্তে। এই গােক উচ্চারণ করিয়া সুনির্বাচিত পদ বিন্যাসে সুষ্ঠু, সুন্দর সুললিত সংস্কৃতে বলিতে লাগিলেন। হে ধীম অপার শক্তি পারাবার ব্রিটিশ সরকারের সুমনােনীত উচ্চপদস্থ সুযােগ্য পণ্ডিত! হে বাগ্মি! আননে যাহার ষড়ৈশ্বর্যশালিনী, ভগবতী কাশীশ্বরের মুখছােব বীণাপাণীর নরীনৃত্য দেখিয়া গুণমুগ্ন মহালক্ষ্মী স্বপত্নীর দ্বেষ ভুলিয়া একত্র বাসের অনুগ্রহের অনুমতি প্রার্থিনী। সম্বরন করুন এ ক্রোধ, ভবদীর মাহাত্ম ও পদগৌরবের উপযুক্ত এ নয়! আশ্রম মৃগবপে উদ্যত শস্ত্রপাণি মহারাজ দুষ্মন্তকে অভিনন্দন করিয়া তাপসকুমার যেমন সনির্বন্ধ অনুরােধ করিয়াছিলেন আমিও তেমনি আপনাকে মিনতি করিতেছি—ভীতিপ্রদর্শন বাক্য কার্যে পরিণত করিবার শক্তিশালী মহাত্ম আপনার বিরাগরূপ বাণ আম মৃগের মত ক্ষীণ প্রাণ এই দরিদ্র ব্রাহ্মণগণের উপর নিক্ষেপ করিবেন না ইহাদের বৃত্তি লােপ করিবেন না। হতে পারে ইহারা অল্পধী, হতে পারে স্থল বিশেষে কাহারও গােপন চরিত্র নিন্দার ঘােগ্য, হতে পারে এদের প্রগলভতা নিজেদের সারবত্তার সীমা বহুদুর অতিক্রম করিয়া ফেলে, তথাপি এদের দৈনন্দিন আনুষ্ঠানিক ব্যবহার সমাজের ক্ষতি অপেক্ষা উপকার অনেক বেশী করে। এদের মধ্যে অনেকেই বৃত্তির জন্য, জীবিকার জন্য বানরীর গায় বাগেবীকে যেথা সেথা নৃত্য করাই বেড়ায় বটে কিন্তু এদের বৃত্তি ললাপ করিলে সমাজের স্থায় অপকার করা হবে, উপকার করা হবে না, এদের সংযত কর্তে পারেন, নষ্ট কৰ্বেন না। আর যদি এ ধারণা আপনার বন্ধমূল হয়ে থাকে যে এ অঞ্চলের প্রত্যেক টোলই অসার অধ্যাপকের অসারতর ছাত্রজুই তবে সে দুষ্ট ধারণা দূর করিবার জন্য মচ্ছিয় মা বাণীক ভবৎসমীপে সমাগত হে বিদ্যাসাগর ! করুন এই তরুণের বিপরীক্ষা- সভামণ্ডপে দর্শক বৃন্দের মধ্যে স্বস্তির নিঃশাস বহিল। গ্রামের অগ্রণীগণ বিদেশী পণ্ডিতের নিকট এত সহজে হারিয়া গেল; এই অপমান ও লজ্জা তীর ছুরিকার গায় তাহাদিগকে বিদ্ধ করিতেছিল, সহসা . সীতাপতি ভট্টাচার্যের অভাবিত সুক্তে অবস্থার বিপৰ্যয় . ৮৪ সেখহাটির নীলকুঠি টিল দেখি সকলে হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিল। কাশীশ্বর তাড়াতাড়ি উঠিয়া সীতাপতির পদধুলি গ্ৰহণ করিল, কোথা হইতে একখানি পাখা সংগ্রহ করিয়া কৈলাসচন্দ্র তাঁহাকে হাওয়া করিতে লাগিল। পরেশনাথ পরিচয় করিয়া দিলেন। পরিচয় পাইয়া একরকম ছুটিয়া আসিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় সীতাপতি বাচপতি সরস্বতীর পদপ্রান্তে মস্তক লুটাইয়া দিয়া বলিলেন “আজ আমার কি সৌভাগ্য। আজ আমি স্বয়ং সরস্বতীর সাক্ষাৎ পাইলাম। বুনন রামনাথের শেষ শিয়। বুনন রামনাথের মতই তেজস্বী ! এই হীনতেজ শিখামুশিষের কোটি কোটি প্রণাম গ্রহণ করুন।” সীতাপতি ঈশ্বরচন্দ্রকে আলিঙ্গন করিয়া আশীর্বাদ করিলে ঈশ্বরচন্দ্র বলিলেন- আমার ধারণা ছিল, আপনি কাশীবাস করিতেছেন, তাই আমি আপনার পায়ের ধূলি লইয়া নিজে ধন্য হইবার জন্য সর্বাগ্রে আপনার আমেৰাই নাই; সে কুটী মার্জনা করিবেন। কথায় বলে গেছােযুগী ভিখ পায় না। তাই সীতাপতির গুণের আদর ও সম্মান করিতে পুণ্যপুরের সাধারণ লােকে জানিত না। উপেক্ষার অবহেলার মধ্যে আত্মসন্মান বাঁচাইবার জন্য সীতাপতি বড় একটা কোথাও যাইতেন না, কারণ তাহার উপস্থিতির প্রয়ােজনীতা বড় একটা কেহ অনুভব করিত না। আজ তাই ঈশ্বরচন্দ্রের মুখে সম্মানের ভাষা শুনিয়া বৃদ্ধের চক্ষু সজল হইল, কঠ গাঢ় হইল। তিনি ঈশ্বরচন্দ্রকে আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন—যে নিজে দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত হয়ে অপরের পাণ্ডিত্যের গৌরব রাখে ভগবান কে চিরজীবী করুন, বলের আতী তাঁহাকে অক্ষয় কীর্তির অমর মালা দান কাশীশ্বরের মুখছােব ৮৫ বিদ্যাসাগর পুনরায় পদধূলি লইয়া বলিলেন “আশীর্বাদ ভিক্ষা চাই গুরুদেব! যেন আপনার তেজও, ত্যাগীকারের আদর্শ অনুমাত্রও দেখাতে পারি। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ অবলীলা ক্রমে ত্যাগ করেছেন অসেব্য সেবা করেন না শূদ্রের দান না আপনার দারিদ্র ব্রতে আপনার গুরুদেবের নাম অক্ষুন্ন হয়েছে, পাণ্ডিত্যে ও কবিত্বে নাট্য রচনায় আপনার যশ প্রভায় সংস্কৃত সাহিত্য উজ্জ্বল হয়ে আপনাকে ও আপনার গুরুদেবকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।” জনতার অয়ধ্বনির মধ্যে—সভা ভঙ্গ হইল।

বিজয়িন কি বন্দিনী।
( ১৬ )
“নিষ্ঠুর ! তােমার অই সুন্দর দেহ কি অস্থিমজ্জার সমষ্টি মাত্র,
হৃদয় বলে কোন জিনিষ কি তাতে নাই ?
সেখহাটির কুঠীর সংলগ্ন শিকারের জন্য সংরক্ষিত বিস্তীর্ণ বনানীর
মধ্যদেশে দাড়াইয়া নেলি পবিত্ৰানন্দকে এই কথাগুলি বলিল।
অবিকশিত কণ্ঠে সহজ সুরে পবিত্র বলিল—মেমসাহেব !
অগ্নি সংযােগে বারুদের মত নেলি আলিয়া উঠিল, তীব্র কঠে
বলিল:-
আবার মেমসাহেব! নেলি বলতে পাচ্ছনা? আপনার জন
বলে ডাকতে পাচ্চনা, নীরস শুকণ্ঠে অপরিচিতের মত সম্বােধন
আমার সর্বাঙ্গে আগুন বেলে দিচ্ছে, তােমার ঐ উপেক্ষার বিষে
আমি জলে মলাম; ইচ্ছে করে এই নখ দিয়ে তােমার মুখখানি আমি
চিরে ফালা ফালা করে দিই।
পবিত্রান চট করিয়া একটা শেয়ালের ডাল ভাঙ্গিয়া তার
তী কাটাগুলি নিজের মাংসল দক্ষিণ গণ্ডে গভীর বিদ্ধ করিয়া, কাটা
সহ ডালটি উঠাইয়া ফেলিয়া দিলেন; ফোটা ফোটা রক্তবিন্দু বর্তুল
চার মিয়া উঠিয়া গও বাহিয়া গড়াইয়া পড়িল।

বিজয়িনী কি বন্দিনী ৮৭ •ন চীৎকার করিয়া নেলি পকেট হইতে মদের একটি ক্ষুদ্র শিশি বাহির করিয়া রুমালখানি তাহাতে ভিজাইয়া পবিত্রানন্দের ক্ষত স্থানে লাগাইয়া দিবার জন্য ছুটিয়া আসিল। ধীরে, মৃদুতার সহিত, কিন্তু দৃঢ় ভাবে সন্ন্যাসী নেলির সাহায্য প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন- মেমসাহেব! পশ্চিমের সভ্যতার ধারায় জগৎ বিধ্বংসিনী আস্থা- শক্তির সম্মােহিনী রূপ আপনার প্রাণে জেগে উঠেছে। তাই নূতন নূতন পুরুষের নূতন নূতন মনােরাজ্য জয় করিবার অদম্য প্রবৃত্তি বর্ষার স্রোতে পার্বত্য তটিনীর মত আপনার প্রাণে খরবেগা। কেন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীকে অনর্থক প্রলুব্ধ কচ্চেন! নেলি—প্রলুব্ধ নয় পবিত্র ! পুরুষকে বাঁদরের মত নাচাইতে সত্যিই এতদিন নেলি সিদ্ধহস্ত ছিল; সত্যি সত্যিই বােধ হয় পুরুষকে হাতের মুঠোর মধ্যে আনবার মত আমােদ নেলি আর কিছুতেই পাইতনা ; আজ কিন্তু তুমি আমার সব বদলাইয়া দিয়াছ। বল পবিত্র বা আমাকে ভালবাস। পবিত্ৰ নিশ্চল হইয়া স্থির কটাক্ষে যুবতীর দিকে চাহিল। নেলি আগ্রহ ভরে বলিতে লাগিল “ভালবাস, নিশ্চয়ই ভালবাম আমার মন জানে পবিত্র তুমি আমাকে নিশ্চয়ই ভালবাস।” এই বলিয়া সে জাদু গাড়িয়া পবিত্রের পদতলে বসিয়া যুক্তকর বলিল—দেখ পবিত্র, বিজয়িনী আজ বন্দিনী ; রাজরাণী আজ ভিখারি তােমার কৃপা কণার। পবিত্র অকম্পিত কণ্ঠে বলিল উঠুন সুন্দরী, কেহ দেখিলে অনর্থক অপবাদের যন্ত্রণায় আপনি অস্থির হয়ে পড়বেন। আপনি স্থির হােন মনের খেয়াল দমন করুন; যখন হারা সন্ন্যাসীকে ;

সেহখাটির নীলকুঠি বাঁধবার নূতন খেয়াল হয়েছে, যেই বাধা হয়ে যাবে, পায়ের তলায় যেই তাকে এনে ফেলবেন অমনি এ খেয়াল এ দারুণ অনুরাগ দূর হয়ে যাবে। নেলি। কখনই নয় পবিত্র ; আমি তােমা ব্যতীত আর কোন পুরুষকে কখনই ভাল বাসিতে পারিব না, আর আমি কাহাকেও ভাল বাসি না পবিত্র। তবে, মর্মবাণীর মত কার অই হার ব্লাউজের তলায় গােপনে বুকের উপর দুলচে, রেখা মাত্র যার দেখা যাচ্চে অরাল অই গ্রীবার ভঙ্গিমায়, শুধু প্রেমের গূঢ় চুম্বনের কি দুর্মূল্যউপহার উহ! তবে এ ব্যর্থ অভিনয়ের সার্থকতা কি মেমসাহেব। যান ঘােট হিলের কাছে যান। নেলি শিহরিয়া উঠিল; মুখমণ্ডল একেবারে রক্তশূন্য পাংশু হইয়া গেল। সে অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া বলিল- উঃ কি কঠোর তােমার হৃদয়! কি বিষদিগ্ধ তােমার রসনার বাক্যবান কিন্তু কি সুন্দর তােমার মূর্তি। তুমি নরপিশাচ, তুমি গুপ্তচর, নেলি তােমাকে সকল অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে, ভিখারী বর্বর নেলি তােমার মুখে নিষ্ঠীবন ত্যাগ করে। এই বলিয়া পবিত্রের মুখে নিষ্ঠীবন নিক্ষেপ করিয়া নিজের গ্রীব হইতে হার খুলিয়া তাহাকে ছিড়িয়া পৰিত্রের গায়ে ফেলিয়া দিয়া বন্দুক হইতে গুলি যেমন ছুটিয়া বাহির হইয়া পড়ে সেই রকম নেলি কত চোখের আড়ালে চলিয়া গেল। কিছুক্ষণ উদ্ধশ্বসে ছুটিয়া সে থামিল। শরীরের সকল রক্ত তার মাথায় উঠিয়া তাহাকে পাগল করিয়া তুলিয়াছিল, অ অত্যরে অতি অত সঞ্চালন, শীতল হাওয়া মোমের আলাে এখন তাহাকে প্রকৃতিস্থ করিয়া যেন মূতন করিয়া বিজয়িনী কি বন্দিনী ; গড়িয়া তুলিল। পাতার মর্মরে মরে সে নূতন সংগীত নিতে পাইল; 'পাখীর কাকলি তার প্রাণে আনিল এক অজানা নবীন সৌন্দৰ্য্য জগতের, জাগ্রত জীবন্ত প্রত্যক্ষ প্রত্যয়াস। সে ফিরিল অভিমান আসিয়া বাধা দিল ; সে আবার থামিল। নারীত্বের অভিমান, জেতার জাতির জাতিত্বের অভিমান, পদমর্যাদার অভিমান, মুহূর্ত পূৰ্বে দয়িত যে অন্যায় সন্দেহে নিষ্ঠুর অপমান করিয়াছে তজ্জনিত ক্ষত বিক্ষত আহত চিত্তের গভীর অভিমান, গুরুভার লৌহ শৃঙ্খলের ন্যায় তাহার পা দুটি জড়াইয়া ধরিল সে মনে করিল “আর কেন, যাক যথেষ্ট হয়েছে। আত্মমর্যাদা এমন করে আর নষ্ট করা যায় না”। সহসা তার কাণে যেন বেজে উঠলাে তার নিজের কণ্ঠস্বর “সকল অন্তর দিয়ে তােমায় আমি ঘৃণা করি। আর জেগে উঠলে তার অন্তরের অন্তস্তলে দুটি করুণ আঁখি সহান্য সজল, দয়িতাকৃত অপমানে অচঞ্চল, গেয়ে উঠলাে তার অন্তরের অন্তরাত্মা “আমি সকল অপমান সইতে পারি, প্রেমের অপমান সইতে নারি কেঁদে উঠলাে তার প্রাণ বলবার জন্য ওগাে আমি তােমায় অপমান করিনি অপমান করিনি, অমনি খসে পড়ল তার অভিমানের হল মানলােনা কোন বাধা তার মন ধেয়ে চল্প তার চরণ দরিতের উদ্দেশে।

নেলি বিপদে। ( ১৭ ) পূৰ্ব্বস্থানে ফিরিয়া আসিয়া নেলি আর পবিত্রকে কোথাও দেখিতে পাইল না। কিন্তু দেখিল তার ফেলে দেওয়া হার ছড়া ধূলায় লুটিতে লুটিতে শুষ্ক পাতার আড়াল দিয়া উকি মারিতেছে। তার জিনিষ তার প্রিয়তম অবহেলা ভরে ফেলে চলে গেছে! অমনি উদগত হলাে অশ্রুধারা তার বক্ষস্থলের অতল হতে, লুপ্ত হয়ে গেল তার দুটি নয়নের দৃষ্টি সজল বাপের অন্ধকারে, রােধ হ'য়ে এল তার কণ্ঠ, স্ফীত হলে তার নাসারন্ধু, শুদ্ধ হলাে তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন, রক্তজবার ন্যায় লাল হয়ে উঠল তার কান দুটি। হৃদয়ের দৈন্য হাহাকার দিয়ে আত্ম প্রকাশ ক েদুনিয়া তার কাছে বােধ হলাে সব শূন্য জীবন হলাে যেন সঙ্গীহীনের জলাভূমি সে মনে কল্লে। তার আজ কেহ নাই সে বড় একা। মাবিষ্টের ন্যায় নেলি তার হার ছড়া চুপি চুপি তুলিয়া লইয়া নিজের পকেটে রাখিল যেন সে চুরি করিতেছে, যেন সে অতি অপরাধী, সহসা সে চমকিয়া উঠিল নিষ্পেষিত পত্রের মর্মর তুলিয়া, পদত্যাসে ধরাব কম্পিত করিয়া বন্যপথের অদূরবর্তী মােছ ফিরিয়া কাহার ঐ দীর্ঘ দেহের বিপুল পরিসর নেলির দৃষ্টিপথ বাহিয়া তাঁহার আখি তারকাকে রূঢ়ভাবে আঘাত দিল? নেলি নেলি বিপদে দেখিল রামনগরের কুঠিপতি ফিলিপস। নেলিকে দেখিয়া দীর্ঘ দীর্ঘ পদবিক্ষেপে ফিলিপস নিকটে আসিয়া বলিল :- বনানীর অধিনায়িকা বনদেবীগণের সাম্রাজ্ঞী ! নয়নে যার হৃদয় হরণ জ্যোতিঃ, আননে যার ত্রিদিবের সুষমা ভাতি, কঠে যার বীণার ঝঙ্কার গ্রহণ করুন মুগ্ধ মর্ত্যজনের নমস্কারের শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই বলিয়া সে হাট খুলিয়া অভিবাদন করিল ও বিশাল ভুজের পঞ্চশাখা বিস্তার করিয়া ধরিল নেলির করম্পর্শের জন্য। নেলি শুষ্ক কণ্ঠে অভিবাদন ফিরাইয়া দিল কিন্তু নিজের করপল্লব বাড়াইয়া দিল না ফিলিপসের বিস্তৃত পাণি দেখিয়াও দেখিল না। উপেক্ষায় ফিলিপস দমিল না সে বলিতে লাগিল :- অয়ি রুচির তনু, অয়ি মনােজ্ঞে, প্রগলভতা আমার মার্জনা কর প্রভাতসূৰ্য্যের স্বর্ণ রশ্মির ন্যায় অই মসৃণ পিঙ্গল কুঞ্চিত পদ্মগন্ধ কেশদামে বদ্ধ হয়েছে আমার মনমাতঙ্গ, সামাজিকতার অঙ্কুশদ্বায় আর কি তাকে ফিরান যায়? অই অধরের তারাগে অই নয়নের হিল্লোলে দগ্ধ কচ্চে পঞ্চবাণ আমার হৃদয়কে, বাছা বাছা তীক্ষ্ণ শরসন্ধানে। সুন্দরি ! তােমার অই করপল্লব আমি অধরে স্পর্শ করি :- বলিতে বলিতে ক্ষিপ্র হন্তে নেলির করগ্রন্থি হস্তে ধরিয়া তাহার রক্ত করতলে কামােন্মত্তের তপ্ত চুম্বন অঙ্কিত করিয়া দিল বিচ্ছু যেন দংশন করিল, জলন্ত অঙ্গারে সে যেন স্পৃষ্ট হইল যাের শব্দ করিয়া নেলি হাত ছিনাইয়া লইল শ্রুতিকটু, পাশ কণ্ঠে কহিল- চমৎকার! আতিথেয়তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার। অতিথিপ্রিয় মরিসের বদান্তের পুরস্কার! নির্জন পাইয়া আতিথ্যকারিণীর উপর দুজনের অত্যাচার! বাধা দিয়া ফিলিপস মুগ্ধকণ্ঠে কহিল :- ১২ সেখহাটির নীলকুঠি অত্যাচার নয়! অত্যাচার নয়! হে সৌন্দর্যের সাম্রাজ্ঞী, হে জীবনের যৌবন লতা, বঙ্গী বিলাস কলায় কুতুহলীগণের নয়ন পুত্তলী তুমি এ যে তােমার প্রাপ্য, যৌবনের কাছ হতে এযে তােমার ব্যায্য অধিকার বলিতে বলিতে ফিলিপস কামােন্মত্ত চক্ষু দুটি দিয়া নেলির সর্বাঙ্গের সৌন্দৰ্য পান করিতে লাগিল। নেলি। নত কর নত কর তােমার নির্লজ্জ দৃষ্টি কামুক পশু ! রমণীর সন্তান! সন্ত্ৰম কৰ্ত্তে সেখ রমণীকে। ফিলিপস। সুন্দরী! অই দেখ তােমার নব সঞ্জাত রােষে তােমার শরীরের রক্তধারা নেচে উঠল, ধেয়ে চল্প উৰ্দ্ধমুখে ধমণী বেয়ে গাল দুটি তাই লাল হয়ে উঠল, কি সুন্দর দেখাচ্চে তােমাকে। রূপের আভরণ হীণা, হৃত যৌবনাই শুধু চায় যৌবন জলে উচ্ছল অঙ্গ ভাব তরঙ্গে সন্তরণশীল তরুণের নিকট হইতে মাতৃ সমােধন ; কিন্তু প্রস্ফুটিত ফুল চায় ভ্রমরের আলিঙ্গন, নবােদ্ভিন্ন যৌবনা চায় যুবকের আশ্লেষণ। রূপ সুধার সুধাকর তুমি সুন্দরী! আমার নয়ন চকোর বিভাের হয়ে পান কচ্চে সেই সুধা ও বরাজের অঙ্গে অঙ্গে ; কেন বারণ কর তারে? অই বুকের বর্তুল—গাউন ভেদ করে উঠেছে উহার ৰ্যৈ আমার ধৈৰ্য্য পরীক্ষা করছে, দাও সখী দাও আমার বক্ষে বিধাইয়া। প্রাণের দারুণ ক্ষুধার সুধা ভাঙার । আমি চরিতার্থতা সকল কামনার বাহুর বন্ধনে ধরা দাও, অঙ্গে অঙ্গে আলিঙ্গন ওবাঁচাও বাঁচাও। নাভিক কামুক! অসার জলনাভাষী তােমার ঐ রসনা ছিন্ন করে কুকুরকে দিতে হয় আহার্যের জন্য। মরিস কাণ্ডজ্ঞান হীন মেতে উঠে সে নীল করের নাম শুলে খুলে দেয় সে তার নেলি।

নেলি বিপদে আতিথেয়তার দুয়ার নির্বিচারে সরল মনে সেই সুবিধার সুযােগ নিয়ে লম্পট! আমার সঙ্গে তুমি কথা কইবার সাহস পেয়েছিলে তাই কাপুরুষ। যেই দেখলে নির্জন বনে একাকিণী আমি অসহায় অমনি খুলে ফেল্লে তােমার মূখ হতে আত্মগােপন করা কাপটে ভরা যতে পরা ভদ্রতার মুখস—প্রকাশ পেলাে নিছক বর্বরতা, বন্য পশুর ঘৃণ্য অসভ্যতা—আত্মমর্যাদাময়ী রমণীর দৃষ্টি পথের পথিকের যােগ্য তুমি নও। ছিন্ন কর বা বিনিময়ের সম্বন্ধ আজ হ’তে অরে দুর হয়ে যাও ভদ্র বেশী বর্বর আমার নয়ন পথ হতে। “কলি ছােড়ড়গা নেহি” বলিয়া ফিলিপস নেলিকে জড়াইয়া ধরিল, তাহার মুখে মুষ্টিপ্রহার করিতে করিতে নেলি শরীরের সমস্ত শক্তি কণ্ঠে প্রয়ােগ করিয়া কণ্ঠস্বর সর্বোচ্চ মাত্রায় তুলিয়া চীৎকার করিল “সাহায্য কর সাহায্য কর ওগাে কে কোথায় আছ সাহায্য কর।”

মুষ্টিযুদ্ধ। ( ১৮ হত চেতন। এঞ্জিনের শিটির শব্দের মত বিপদাপন্ন নারীর হৃদয়ভেদী আৰ্তনাদের মর্মস্পশী শ্রুতিকটু কর্কশ শিহরণ শূন্যে মিলাইতে না মিলাইতে কোথাও, নার মত দুজ্ঞেয় প্রদেশ হইতে প্রাদুভুত হইলেন পবিত্ৰানন্দস্বামী দক্ষিণ হন্তের বদ্ধমুষ্টি প্রহার করিলেন অম্লান বদনে ফিলিপসের কর্ণমূলে বিনা দ্বিধায়। ধরাশায়ী হইল প্রকাণ্ড লাস গত জীবের মত মুহূৰ্ত্ত মধ্যে সংজ্ঞা ফিরিয়া পাইয়া সে দৈত্যের মত লাফাইয়া পড়িল পবিত্ৰানন্দের উপর, চতুরতার সহিত সেই নররূপী পর্বতের উল্লম্ফন বেগ এড়াইয়া পবিত্ৰানন্দ তাহার গর্দানে দারুণ রদা মারিলেন বাধিয়া গেল তুমুল যুদ্ধ। উভয়ে দক্ষ উভয়ে বলবান। মুষ্টিতে মুষ্টিতে প্রহারে প্রহারে উভয়ে উভয়কে জর্জরিত করিতে লাগিল। উভয়ে খুঁজিতে লাগিল উভয়ের ছল, প্রত্যেকে সচেষ্ট হইল দুর্নিবার এহারে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিশ্চেষ্ট করিতে, তাহার অসতর্কতার সন্ধিক্ষণে। একজন অজানা গৈরিকধারী বঙ্গবাসী এতক্ষণ ধরিয়া ইউরোেপ বিখ্যাত মুষ্টিযােদ্ধা ফিলিপসের বিজয় চেষ্টা ব্যর্থ করিতেছে, তাহার সকল এম পণ্ড করিতেছে ইহা ফিলিপসের পক্ষে দুঃসহ ইহল, সে তখন পাগলের মত ভীষণ ভাবে মুষ্টি কষ্টি করিতে লাগিল, যে মুষ্টিযুদ্ধ মুষ্টির একই আঘাতে মদমত্ত বলিষ্ঠ বৃষ ভূপতিত হয় এরূপ মুষ্টির বৃষ্টি ধারা—পবিত্ৰানন্দ শুধু সহ করিতেছে তাহা নহে তাহার পরিবর্তে সুদ সহ যে উদগ্র সংঘাত গুলি ফিরাইয়া দিতেছে তাহার প্রবল ঝথায় ফিলিপস দিক্‌হারা হইতে লাগিল। সে দেখিল পবিত্রান মুষ্টি যুদ্ধে তাহার সমকক্ষ তত বটেই শ্রেষ্ঠ হইলেও হইতে পারে তখন সে তাহার রণ-কৌশল বদলাইল। সে ভাবিল পবিত্ৰানন্দ বলবান ও কৌশলী হইলে কি হয় ফিলিপসের দেহের ভার ও বল পবিত্ৰানন্দ অপেক্ষা অনেক বেশী, যদি এই গুরুভার দেহ লইয়া সে পবিত্রানন্দের উপরে আপতিত হয় সে বেগ পবিত্ৰানন্দ সহিতে পারিবেনা। তখন সে তাহাকে পিষিয়া মারিয়া ফেলিবে। এই সঙ্কল্প করিয়া উন্মত্তের মত কুর্দন করিতে করিতে প্রচণ্ড ধাবনে ধাবমান হইল ফিলিপস, আপতিত হইল পবিত্রানন্দের দেহপরে ; সে ভীষণ আঘাতের দুর্দমনীয় সংঘাতে, পৰিত্ৰানন্দের জানু দুটি বক্র হইল ভুমি স্পর্শ করিল তখন ফিলিপস দারুণ অট্টহাস্য করিয়া বজের মত দুটি বাহুর পেষণে পিষিতে লাগিল পবিত্রানন্দের দেহ পিণ্ড। বাধিয়া গেল ভীষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি। পবিত্রের দেহের মাংসপেশীগুলি স্বাভাবিক অবস্থায় সাধারণ ভদ্রলােকের মত বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু এখন কসরতের ক্ষেত্রে অঙ্গচালনার আধিক্যে তারা অসাধারণ গবে স্ফীত হইল, বন্ধিত হইল, শক্ত হইল লৌহ খণ্ডের মত। স্বাভাবিক অবস্থায় বােধ হইত ফিলিপস পবিত্র অপেক্ষা দ্বিগুণাধিক সুলতর। কিন্তু এক্ষণে পবিত্রের মাংস পেশীগুলি প্রচণ্ডভাবে বন্ধিত ও শীত হইয়া ভীষণাকার ধারণ করায় তাহাকে এত স্কুল দেখাইতে লাগিল যে স্থূলতার ফিলিপের দেহের সহিত তাহার দেহের কোন পার্থক্য রহিল না। ফিলিপস এক হাতে পবিত্রকে আবেষ্টন করিয়া অপর • সেখহাটির নীলকুঠি হাত দিয়া তার পৃষ্ঠে বজ মুষ্টি মারিতেছিল, ভাবিয়াছিল যে তাহার চাপনে পড়িয়া পবিত্ৰানদের দম বন্ধ হইবে তাই প্রথমে তাহার নিশ্চেষ্টতা দেখিয়া ফিলিপস ভাবিয়াছিল সেটা স্বাভাবিক-পবিত্রের যুদ্ধ করিবার শক্তি ফুরাইয়া গিয়াছে এই ভাবিয়া সে দ্বিগুণ বেগে পবিত্রের পৃষ্ঠে মুষ্ট্যাঘাত করিতে লাগিল। কিন্তু পবিত্র নিশ্চেষ্ট নয় তাহার নিশ্চেষ্টত। ভাণ মাত্র ফিলিপ্সের শক্তি ও মনোযােগ অন্য দিকে আকৃষ্ট করিয়া সেই সুযােগে সে নিজের দেহ ঋজু ও দৃঢ় করিয়া তাহার সকল বল প্রয়ােগ করিবার শেষ কৌশল অবলম্বন করিল। ধীরে ধীরে ফিলিপ্সের সেই প্রকাণ্ড পর্বতাকার দেহ উদ্ধে উঠিতে লাগিল, ফিলিপস শত চেষ্টা করিয়াও সে উৰ্দ্ধগতি রুদ্ধ করিতে পারিল না তাই সে পবিত্রের গ্রীবা ধরিয়া তাহার কণ্ঠ রােধ করিতে চেষ্টা করিতে লাগিল। পরক্ষণেই পৰিত্ৰানন্দ তাহাকে মাথার উপর দিয়া গলাইয়া তাহার দুটী পা ধরিয়া সাপটাইয়া লইয়া সতরঞ্চি কাচার মত সটান আছাড় মারিলেন। হতচেতন ফিলিপস মাংস পিণ্ডের মত দালা পাকাইয়া পড়িয়া রহিল। বনভূমি মুখরিত করিয়া জয়ধ্বনি উঠিল। মরিসের কুঠিতে বহু নীলকর ইউরােপীয় পুরুষ ও স্ত্রী আসিয়াছিল অতিথিরূপে, তাহারা ইতস্ততঃ ভ্রমণে ও শীকারে বাহির হইয়াছিল। নেলির চীৎকার ধ্বনি তাহাদের মধ্যে অনেকেরি কর্ণে পেীছিল। যে যেখানে ছিল দৌড়িয়া আসিল। দূর হ’তে অনেকেই দেখিতে পাইয়াছিল, ফিলিপস কর্তৃক আক্রান্ত নেলি উন্মত্তের মত উচ্চ চেষ্টা করিতেছে তাহার আলিঙ্গন পাশ ছিন্ন করিবার জন্য। তাহারা আরও দেখিয়াছিল অতি প্রয়ােজনীয় সময়ে চপলাবৎ চকিত গতিতে পবিত্রানন্দের আবির্ভাব ও প্রচেষ্টা। মরিস আসিয়া নেলিকে আশ্বস্ত করিল, হিল মুক্তিযুদ্ধ মারে, জেলার জজ এলিস সাহেব তাহাকে প্রবােধ দিল, জল সাহেবের মেয়ে মিস এলিস ও তাহার সঙ্গিণীগণ আন্তরিক সমবেদনা জানাইয়া সখীর ন্যায় তাহার মনস্তুষ্টি করিতে লাগিল। কিন্তু সকলেরই দৃষ্টি আবদ্ধ হইল যুধ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বীদ্বয়ের প্রতি। রুদ্ধশ্বাসে তাহারা যুদ্ধ দেখিতে লাগিল। পুরুষের প্রস্তুত হইল পবিত্র পরান্ত হইলে তাহার স্থানাভিষিক্ত হইয়া ফিলিপসকে শান্তি দিবে। কেহই প্রত্যাশা করে নাই—ধর্ম ব্যবসায়ী সন্ন্যাসীর যুদ্ধ ব্যবসায়ে পারদর্শিতা। এক্ষণে তাহাকে জয়যুক্ত দেখিয়া সকলে উল্লাসের জয়মালা বরমালার মত তার গলায় পরাইয়া দিয়া তাহাকে অভিনন্দন করিল।

পুণ্যপুরে পুণ্যাহ। ( ১৯ ) পুণ্যাহ। পরেশনাথ বিস্তীর্ণ জমিদারীর অধিকারী। আজ তাঁর অধিকারভুক্ত প্রতি কাছারিতে পুণ্যাহের মহােৎসব। বসন্তের সাড়া পেলে তারাগের রক্ত পল্লবের নূতন ভূষায় তরুলতা যেমন সাজে, আর তাদের ফুলের নবীন মঞ্জরী বেরিয়া ঘেরিয়া ভ্রমর কুল উড়িতে উড়িতে যেমন গুঞ্জনের জয়ধ্বনি করে পুণ্যপুর গ্রামখানি তেমনি উৎসবের জাকজমকে ঝলমলিয়ে উঠল, দেশ বিদেশ হতে সমাগত জনগণের আনন্দ কোলাহলের কল্লোল বয়ে গেল। বহুদিন হতে এ জমিদারীতে এই রীতি প্রচলিত আছে পুণ্যাহ দিনে পুণ্যপুরে মেলা বসে প্রজারা মফস্বল হ’তে আসে যা পারে কিছু নজর ভেট বলে হাতে করে আনে, জমিদারকে তাই দিয়ে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে নূতন খাতায় নাম লেখায় আর জমিদার বাড়ী আকণ্ঠ ভােজন করে যাত্রা দেখে, মেলা দেখে গান বাজনায় যােগদেয়, লাঠিখেলে কুতি করে শিরােপা পায় না আমােদে কাল কাটাইয়া ফুর্তি করে বাড়ী এবার উৎসবের ঘটা বড় বেশী। প্রজাপক্ষের উৎসাহ উচ্ছলিত বেগে ছুটে চলেচে। নূতন নূতন লাঠিয়াল, সড়কীয়াল, ঢালী, মল্লগীর পুণ্যপুরে পুণ্যাহ দলে দলে আসিতেছে। তরুণের দল বল, দেখাবার জন্য বিল হয়ে মেতে উঠেছে। জান দেবে তার, মান নেবে তার। তুচ্ছ তাদের কাছে প্রাণ, কিন্তু বড় প্রিয় বড় উচ্চ শুভ্র যশের সমান। যৌবনবান জোতদারের যুবা জমিদার পরেশনাথ ! তােমার কাছে চায় তারা সুমীমাংসার নিরপেক্ষ বিচার। নিজে নিজের অভিভাবক রূপে সাধারণ্যের অনুষ্ঠানে বরেণ্যের আসনে আত্মপ্রকাশ করা পরেশনাথের এই প্রথম—তাই পরেশনাথ প্রথমে চাহিয়াছিলেন যেমন প্রতিবারে মায়ের আড়াল হ’তে কাজ করেন এবারও তাই কৰ্বেন; কিন্তু রুদ্রাণী চাহিলেন তাঁর অঞ্চলের নিধি, ওড়নার আড়াল হতে বাহির হয়ে কর্তৃত্বের গদির উপর বসুক, দাবীত্বের বেদীতে প্রতিষ্ঠিত হােক। পরেশনাথ দেখিলেন জননী তাঁর পরীক্ষা লইতেছেন মায়ের পদধুলি মাথায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা যেমন সসম্মানে উত্তীর্ণ হইয়াছেন তেমনি সংসারের এই প্রথম পরীক্ষায় কৃতিত্বের গৌরব লাভ কর্তে সচেষ্ট হইলেন। পরেশনাথ শতধারে বহিতে লাগিলেন যেমন বিপুল লােক সমাগম ব্যবস্থা ও আয়োজন তদনুযায়ীই হইল। মেলা সুরক্ষিত রাখা আমাের প্রমােণর উপভোগের সুব্যবস্থা, জলস্রোতের মত আগন্তক জনস্রোত অনিয়ন্ত্রিত করিয়া তাহাদের আদর আপ্যায়ন—তাহাদের দত্ত উপঢৌকন গুলি হিসাব ভুক্ত করিয়া সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রত্যেক বিষয়ে পরেশনারে তী দৃষ্টি সুচিন্তিত কিন্তু সহজে বােঝা যায় এমন ভাষায় বলা পরিষ্কার আদেশ ও অভিমতগুলি সকলকেই মুগ্ধ করিল। পূর্বাশার দুয়ার খুলিয়া উষার আলােক দুটা বাহির হইতে মা হইতেই ছুটিয়া আসিয়াছে পাড়া পাড়ার হ’তে তরুণীর দল অ রাঙা কাপড় পরে, শিশির ভেজা ফুলের মত হাসি মাখা মুখে আজার কে অই ১০০ সেখহাটির নীলকুঠি দিনে কাজ কৰ্বে বলে রুদ্রাণীর যজ্ঞশালায়। গ্রামে আজ হাঁড়ি চড়বে না; সকল হাঁড়ি কাড়া আজ জমিদারের বাড়ী। তাই সকল গৃহের গৃহলক্ষ্মী সমাগত আজ বাস্তলক্ষ্মী রুদ্রাণীর অন্নপূর্ণার ভাণ্ডারে। তরুণী নব তপনের বর্ণের দীপ্তি নিয়ে, স্নিগ্ধ উষার মুগ্ধ হাসি মুখে, নিয়ন্ত্রিত করিতেছে তরুণীর দল কৰ্ম্ম হতে কৰ্ম্মান্তরে ? তর্ক করা চলেনা তার সঙ্গে, অমান্য করা যায় না তার নিদেশ কিন্তু বিদ্রোহ করেনা হৃদয় তার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সে যেন স্বভাবের সুন্দরী, তাই স্বাভাবিক তার প্রত্যেক আচরণ, যা করে তাই মানান সই সুন্দর যা বলে তাই যুক্তি যুক্ত। রুদ্রাণী ডাকিলেন “মা সুলােচনা ! এত বেলা হলাে, সকলেই জল খেললা তুমি একটু বাসি মুখে জল দিলে না।” পাড়ার একটি মেয়ে বলিল “আমাদের খাওয়াতেই ব্যস্ত ও খাবে কখন খুড়িমা? সুলােচনাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল “যালাে যা খুড়িমার হুকুম মানতে মুলােচনা। আমার তত তেষ্টা পায়নি জেঠাইমা আপনার পূজা হয় নি, আপনি জল খাননি, আমি এখন খাবােনা। “ও সৰ কথা আমি শুতে চাইনে” এই বলিয়া রুদ্রাণী দুটি রসগােল্লা তার মুখে গুজিয়া দিয়া তাহাকে এক গ্লাস জল খাওয়াইলেন; নিজের করতল দিয়া কপােল দুটী মার্জিত করিয়া আদর করিতে লাগিলেন। মুলােচনা পুণ্যপুরে আসিয়াছিল তার মাসীর বাড়ীতে। মাসীমা তাকে সঙ্গে করিয়া আনিলেন জমিদার বাড়ী রুদ্রাণীর সঙ্গে দেখা করিতে। রুদ্রাণীর সুনজরে পড়িল মুলােচনা; পুণ্যাহের উৎসবের পুণ্যপুরে পুণ্যাহ ১০১ জণ্ঠ তিনি তাহাকে তাহার মাসীমাকে বলিয়া আটক করিলেন। রুদ্রাণীর মেহনীড়ে বন্দিনী হইতে সুলােচনা আপত্তি করে নাই। পরেশনাথ ত্বরিত গতিতে আসিতেছিলেন কি প্রয়ােজনে, এক জন অপরিচিতা কুমারীকে মা আদর করিতেছেন দেখিয়া সে সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিল “কাকে অমন করে আদর কচ্চ মা পাড়ার সেই মেয়েটি বলল “দাদার বুঝি হিংসে হচ্চে খুড়িমা ?” সুলােচনার মুখখানি দুই হাতে উচু করিয়া ধরিয়া রুদ্রাণী বলিলেন “দেখ, দেখি কেমন সুন্দর!” তরুণীর প্রতি তরুণের সহজাত আকর্ষণ প্রেম ও প্রণরে পরিণত করিবার জন্য যে দেবতা পুষ্পবাণ সন্ধান করেন, এতদিন তিনি পরেশনাথকে উপেক্ষা করিয়া আসিয়াছিলেন তাই লােলুপতা তাঁর নয়নে ছিল না, দেখিবার বিশেষ আকাক্ষা বা আগ্রহও তঁাহার ছিলনা অমনােযােগের অননুসন্ধিৎসু অপরিচিত দৃষ্টি দিয়ে তিনি দেখিলেন -সপ্রতিভ সলজ্জ দুটি নয়নের কালো তারায় আনন্দের অভিনন্দন তখন সেই অসাবধানতার ভাসা ভাসা দৃষ্টির এক চমকেই উদ্ভাসিত হয়ে গেল ক্ষণপ্রভার তম বিধ্বংসি আলাে—অন্তরের অন্তরতম হলে অনলের অক্ষরে লিখিত হলাে অপ্রতিম এ নারী প্রতিমা আলােকসানা প্রভাবে অনন্ত সাধারণ শক্তিময়ী।

নীল চাষের সর্বনাশ। বেলা বেড়ে গেল। লােক বহু জমে গেল। আহাৰ্যও প্রস্তুত। কিন্তু “নজর ও বড় কেহ দেয় না, খাইতেও কেহ বসে না। ভাবের আকাশে উৎকণ্ঠার উম্ম জমাট বেঁধে জায়গা গরম হয়ে উঠল। অপ্রত্যাশিত অবস্থা সংস্থানে কর্মচারিরা বিব্রত হয়ে পরেশনাথকে জানাল। পরেশনাথ জোতদারগণের বক্তব্য শুনিতে চাহিলেন। বিস্তৃত বহিরঙ্গন নরসংঘে ভরিয়া গেল। তিল ধারণে স্থান রহিল না- সঙ্কুক্ষিত তারা উত্তেজিত, চঞ্চল, প্রকুপিত। কিন্তু উচ্ছল হলাে তারা—দা ঠাকুরের গম্ভীর নির্ঘোষ আর চাঁদখায়ের কর্কশ নিনাদ সুনিয়ন্ত্রিত করিল অশিক্ষিত পল্লীগাঁয়ের বলদৃপ্ত কৃষিবল ; ক্ষুব্ধ সিন্ধুর তরঙ্গ তাড়িত হৃদয়ে স্তব্ধ হয়ে শ্রেণীবদ্ধ হলে তারা তাদের জননায়কের শুনিয়র। দা ঠাকুর বলিল -বাবু! আপনি পরগণার জমিদার ; ঐ দেখুন পরগণার জোতদারেরা সব হাজির সঙ্গে তাদের আপনার প্রাপ্য আজিকার পুণ্যাহের নজর, অভুক্ত তারা বড় আশা তাদের আরামের ভূরি ভজন আপনার হেসেল হতে। কিন্তু কাতর তারা, দুর্ত হয়েছে তাদের জীবনের ভার অবিচারের গুরুভারে তাই বুক • নীল চাষের সর্বনাশ ১০৩ পােরা প্রত্যাশার তৃষা নিয়ে তারা আজ এয়েছে আপনার দুয়ারে আলম নিতে। যদি আশ্বাসের অভয় বাণী দেওয়ার সামর্থ্য আপনার থাকে গ্রহণ করুণ তাদের নজর, খাওয়ান তাদের পেটপুরে—আর যদি সে সামর্থ্য আপনার না থাকে তবে চোখের জলে বিদায় লবে আপনার ছেলের দল এই প্রজারা পেটের ক্ষুধা পেটে নিয়ে, বুকের তৃষা বুকে রেখে ছিন্ন কৰ্বে তারা আজ হতে সকল বন্ধন আপনার সঙ্গে দেবে না তারা নজর, দেবে না তারা খাজনা ছেড়ে দেবে তারা আপনার জমি আপনাকে বেড়াবে তারা পথে পথে-আসমান হবে তাদের ছাত, ধরা পৃষ্ঠ তাদের শয্যা বায়ু দের ভক্ষ্য অশ্রুজল হবে তাদের সম্বল। আর এই সব হতভাগাদের তপ্ত নিঃশ্বাসের নরকাগ্নি ঝন্ সে দেবে আপনার সকল সম্মান সকল সম্পদ। পেশকর, চাঁদখা হুজুরের দরবারে তােমার আরজ।” চাঁদ খ—হুজুর! ওপরে খােদা আর নীচে আপনি! আমরা যেমন আপনার প্রজা মরিস সাহেবও তেমনি আপনার প্রজা। তার ৫৪ খানি কুঠি আপনারি জমিদারিতে। আমাদেরও যেমন অমাই এ তাহারও প্রায় সকল স্থানেই তাই তবে কিসের জোরে সে প্রজাদের উপর জমিদারেরও বড় এই রকম ব্যবহার করে। জোর করে নীল বােনে, জোর করে বেগার নেয়, বাধা দিলে মাথা ফাটিয়া দেয়-হাতে নীল না বুলে মাথায় বুনিয়ে ছাড়ে। আমরা আপনার প্রজা আম চাই আপনার। পরেশনাথ। মরিস সাহেব বাজার জাতি। রাজার দরবারে তার কথার দাম আছে। তাই তার বুক বেড়ে গেছে। খুটোর জোরে ম্যাড়া লড়ে। স্থানস্থিত কাপুরুষও সিংহের মত কাজ করে। মরিস সাহেব জানে ইংরাজ জাতি ঐক্য বন্ধনের শক্তির মর্ম সম্পূর্ণ ভাবে হৃয়ম করেছে। যা মরিস নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য কর্নে, তাহা ১০৪ সেখহাটির নীলকুঠি গদখা। রাখবার জন্য প্রত্যেক নীলকর সাহেব প্রাণান্ত পরিচ্ছেদ চেষ্টা কৰে। যদি গভর্ণমেন্ট তাদের সমর্থন না করেন তবে তারা বিলাতের স্বজাতির নিকট নিজেদের কঁদুনি বিচিত্র বিননে এমন করিয়া বিনাইবে, অতি তুচ্ছ ব্যাপার ঘনাইয়া ফেনাইয়া এমন গুরুতর করিয়া তুলিবে যাহাতে তাদের প্রাণ কেঁদে উঠবে, ক্ষেপে উঠে তারা আস্ফালন কৰ্বে বাধ্য কৰ্বে বাংলার সরকারকে নীলকরদের দাবী সম্পূর্ণ ভাবে গ্রাহ কর্তে। এই শক্তির বিরুদ্ধে লড়বার সামথ্য আমার কি আছে ? তবে বিলিয়ে দিন হুজুর আপনার জমিদারী মরিস সাহেবকে বেরিয়ে পড়ুন পথে পথে আমাদের সাথে। চুচ হয়ে সিধিয়েছে সে ফাল হয়ে বেরুবে এই মরিস সাহেব। উচু নীচু রাখবে না সে করে দেবে সব ধূলা গুড়ার মত নীচু সমান, চলে যাবে সকল দেশী লােকের মাথার উপর দিয়ে তার বুটের গোড়ালি মানবে না সে রাজা কি প্রজা রাখতে পারবেন না জমিদারী হুজুর জমিদার হবে মরিস সাহেব মদোমাতাল কোন ভিল সাঁওতাল হবে তার প্রজা মরে যাবে হিন্দু মুসলমান সকল প্রজা অনাহারে, চলে যাবে তাদের জোত। জোত থাকবে কাদের ? ইত ছাড়বে যারাট্যাড়া মাথা যারা কৰ্বে নসিব তাদের ফুটো হবে, কপাল তাদের ভাঙ্গবে, বলতে পার্কে যারা জল উচু বলে জল উচু নীচু বল্লেই জল নীচু তারাই পার্কে থাকতে ভাত ভিক্ষে করে—অপমানের জীবন বয়ে বেইজ্জত হয়ে সমগ্র জনতার দিকে চেয়ে স্বরগ্রাম সপ্তমে তুলে র চক্ষে দ খ হাকিল- কেমন পাৰ্বি তােরা এমন জীবন বইতে, গৰু জৰু বিলিয়ে দিতে লােত জমা ছাড়তে, গামাদও রামাদের বাড়ি পিঠ পেতে নিতে? নীলাকাশ ভিন্ন করিয়া সহ সহস্র কণ্ঠের মিলিত বজ-নিনাদ উঠিল “না, নীল চাষের সর্বনাশ পুণ্যাহ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলাে। নজরের টাকা গাদা হয়ে জমে উঠলাে। পরেশ নাথ প্রজার স্বার্থ ও নিজের স্বার্থ রক্ষা কর্তে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হলেন। ভাতের কঁাড়ি পাহাড়ের মত জতে জমতে পাত হতে ফুয়ে উড়ে যেতে লাগলাে। বুভুক্ষু জোয়ানদের ভােজনের আনন্দোৎসবে। মিটলাে তাদের পেট পােরা ক্ষুধা, মিটলাে তাদের বুক পােরা তৃষা। বল্লো তারা জেলে যাব আমরা, দাঙ্গা করবে। আমরা চাঁদা দেব আমরা, মওড়া লও বাবু পিছনে থাক বাবু। আমাদের মেয়েছেলে আমাদের মান ইজ্জত তােমার হাতে।” রুদ্রাণীর নিদেশে সুলােচনা দিলেন তারুণ্যের পুরস্কার বাঁশী মালের করপুটে সােণার তাগা। বাঁশী মালকে ফন্ধে করিয়া সমগ্র জনতা পাগলের মত চেঁচাইতে লাগিল, “জয় রাণী নগরের রাণী দিদির জয়।” “জয় পুণ্য পুরের রাণী মায়ের জয়”। “জয় পুণ্য পুরের রাজা বাবুর জয়।” “নীল চাষের সর্বনাশ নীল বুনানি বন্ধ।” যথাসময়ে কাশীশ্বর এ সংবাদ মরিস সাহেবকে দিল। মরিস গর্জাইয়া উঠিল। লক্ষ্মীকান্ত বলিললুঠবাে পরেশ বাবুর কাছারী ; চড়াও কৰ্বো তার বাড়ী দেখি কে ঠেকায়।

লক্ষ্মী কান্তের হুকুম। ( ২২ ) চুপ, চুপ, চুপ,। মরিস সাহেবের অধিকারের কুঠিগুলির এলেকার হাওয়ায় হাওয়ায় গুরিয়া উঠিতে ছিল চুপ, চুপ, চুপ। তখনও রেলবােডগুলি বাংলার বুকের উপর লৌহ পাশ লইয়া জাতিয়া বসে নাই। দক্ষিণ বঙ্গের সাগর বাহিনী নদীগুলি তখনও লৌহ সেতুর ভীষণ ভুজপাশে রুদ্ধশ্বাসে ফোপাইতে ফোপাইতে ছিন্ন ভিন্ন গুফতােয়া কুকুর লঘিনী হইয়া ম্যালেরিয়া জননী হয় নাই। শৈবাল দলে তাহাদের জল রেখা তখনও লুপ্ত হয় নাই। নিবিড় নীলের নীলিমায় তাহাদের স্বচ্ছ, স্বাস্থ্যকর জলধারা তখনও আবিল হইয়া উঠে নাই বােগের রাহু তখনও দুঃস্বপ্নের ঘােড়াভূতের মত লােকের বুকে চারি পা দিয়া চাপিয়া বসে নাই। তাই বাঙ্গালির তখন স্বাস্থ্যের সচ্ছলতা সৰ্ব্ব কাৰ্য্যে উছলিয়া উঠিত। বাঙ্গালি তখন কথা কহিত উচ্চকণ্ঠে হাসিত উচ্চ হাস্যের কলরােলে ফুসফুসের বায়ুকোষ ব্যধি বীজানুর বিষাক্ত দোষে দুষ্ট ছিল না। তাই চড়া গলায় ছিল ধ্বনির শক্তি ; হৃদপিণ্ডের রক্তাশয়ে রক্তধারা ম্যালেরিয়া রাক্ষসী চুষিয়া শুষিয়া লয় নাই ; মর্ম ছিল তাই পরিহাসপ্রিয় নঠ, কর্মঠ দেহে। উষ্মা বর্জিত ব্যঙ্গ পীযুষে রঙ্গরস উচছুসিয়া পড়িত। গানে ও ছড়ায় পাড়ায় পাড়ায় লড়াই বাধিত ; লাঠিতে ফাটাফাটি হইত • ;

লক্ষ্মী কান্তের হুকুম ১০৭ মাথা। আবার পরক্ষণেই ফেটা বাঁধা ক্ষত মাথায় হইত কোলাকুলি ; চিরদিনের বন্ধুত্ব উঠিত জাগিয়া নিবিড়তর হয়ে ক্ষনিকের শত্রুতা যেতে ডুবে বিস্মৃতির অতল তলে। গোপন শব্দ থাকিত গােপনে। মন প্রাণ ছিল খােলসা, ব্যবহার ছিল সাদা সিদে, উন্মুক্ত উদার। খােলাখুলি ভাবের তরঙ্গে বঙ্গ একটানা স্রোতে ভাসিয়া চলিয়াছিল। এই সময় জারি হলাে অলেখার আজ্ঞলেখা চুপ, চুপ, চুপ। কাশীশ্বর আসিয়া কিশােরীমােহনকে বলিল “দেখ দাদা এতটা মেশা- মেশি এতটা খােলাখুলি এসব কিন্তু মােটেই ভাল নয়। তুমি কর সাহেব বাহাদুরের চাকুরী -আর যে সে সাহেব নয় মরিস সাহেব। ৫৪ খানি যার কুঠি, লাখ লাখ টাকা যার আয়, স্বয়ং বাংলা বাহাদুর-আর চাকুরীও তোমার ছােট নয় একেবারে নায়েবী-তােমার এলেকায় তুমিই তাে মরিস সাহেব। তােমার একটা পজিসন [ position ] রেখে চলা উচিত। অত সহজ প্রাপ্য হলে সাহেবের মান ইজ্জত বজায় রেখে চলতেতাে পাৰ্বে না। কিশােরী। তা কি রকম করে চলতে হবে ? কাশীশ্বর। । চাকুরী করেন দাওয়ান মহাশয় লক্ষ্মীকান্ত দাদা বলিহারি যাই। কপ্তি পোঁদা চাষা বেটা যেই কথা বলার জন্য সামনে দাঁড়িয়েছে, অমনি হুকুম লে আও শ্যামাদ—আর তখনি পিঠের পরে তুড়ং ঠুকে দিলে—এস বাবা কথা কইতে! আর speak টি not টু শব্দটি কেও করে না। কড়া শাসন। আর দাদা তােমার দরজা সকলের কাছেই খােলা। অতকরে আস্কারা। যে যখন যা আব্দার করে সময় নেই অসময় নেই কিশােরী দা অমনি উঠেন মেতে। অত খাতির বিশেষ যারা মনিবের বিরুদ্ধে দল পাকায় তাদের কিসের ?

Sob সেখহাটির নীলকুঠি কিশােরী। কই আমার এলেকায় নীল না বােনার বিরুদ্ধে বা সাহেবের বিরুদ্ধে এমন বিশেষ কোন দলের খবরতাে শােনা যায় না। কাশীশ্বর। দাদা! এখনও মাতৃগর্ভে আছ; খােজ কিছুই রাখ না ; নিজে খােলস সবাইকেই ভাব তাই। প্রজারা যারা তােমার কাছে আসে সব শালারা গুপ্তচর-তমার গুপ্ত খবর জানবার জন্য আসে- খুব সাবধান, খুব সাবধান-কাকেও বিশ্বাস করে না। কাকেও কোন কথা বলল না সব চুপ সব চুপ দাদা এই শৰ্মারাম তােমাকে প্রাণের চেয়ে ভালবাসে মাঝে মাঝে আমার পষ্ট কথায় তােমার কষ্ট হতে পারে কিন্তু যদি তােমার ও ফেলবার দরকার হয় কাশীশ্বর হাসিমুখে তা কর্কে জেনাে; সকলের হাঁড়ির খবব কাশীশ্বরের পেটে ঝুলির মধ্যে গজ গজ কচে আর ঝুলি ঝেড়ে সব খবর বের করে দেবে সে তােমাকে তােমার ভালর জন্য। ঝড়ের মত দড়বড়িয়ে ঘােড়ায় চড়িয়া লক্ষ্মীকান্ত আসিল। ঘােড়া থামিবার পূর্বেই ঘােড়র পিঠ হইতে লাফাইয়া পড়িল আর কিশােরী মােহনের হাত খানা shake-hand করিতে গিয়া সজোরে নাড়া দিল। লক্ষ্মীকান্ত। কিশোের! কাজ কেমন চলছে ! কাশী এসে জুটেচ যে। তােমাকেই আমি খুজছিলাম। কাণী। আমি দাদা তাে হুকুমের তাঁবেদার ; একবার কাক মুখে বার্তা পেলেই হলাে ছুটে গিয়ে হাজির হতাম। লমী। কাশী, শিষ বাড়ী বেড়াতে যাও। কাশ। কোথা দাদা। লী। খােলালােগ। কাশ। তা অনায়াসেই যেতে পারি। সেখানে রামরূপ যােক আমার মত্ত শিয়।

লক্ষ্মী কান্তের হুকুম
লক্ষ্মী।
লক্ষ্মী। গতিদার রামরূপ।
কাশী। আজ্ঞা হা।
তবে তত ভালই হবে। খােলাপােতায় পরেশবাবুর বড়
কাছারী বাড়ী আছে না ?
কাশ। আজ্ঞা হাঁ প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার তহশীল।
লক্ষ্মী। এই কাগজ খানি লও। পড়িয়া দেখ—এই সমস্ত সংবাদ
আমি চাই। সেইগুলি সংগ্রহ করে ইহাতে লিখিও আর সেই
লেখা কাগজ কিশােরীকে আনিয়া দিবে খুব গােপনে। আর জেনে
আসবে রামরূপ আমাদের বাধ্য হতে পারে কিনা আর যদি হয়
কতখানি সাহায্য সে আমাদের কর্তে পারে।
কাশী। আমি ২১ দিনের মধ্যেই সমস্ত সংবাদ এনে দিচ্ছি।
আর এটাও বলতে পারি যে রামরূপকে কাশীশ্বর উঠতে বল্লে উঠবে,
বসতে বল্লে বসবে। দাদা আপনি যদি হুকুম দেন তবে রামরূপকে
আপনার পায়ের তলায় আবাে হুকুমের তাঁবেদার করে দেব।
লক্ষ্মী। আচ্ছা কেমন বাহাদুর দেখা যাবে ; এখন রওনা হয়ে যাও
এক্ষণি, বিলম্বে কাৰ্য্য হানি হবে।
উভয়কে প্রণাম করিয়া কাশীশ্বর চলিয়া গেল।
লক্ষ্মী। কিশাের! মামলা লাগিয়ে দাও সকল শালা মাতব্বর প্রজার
নামে-
কিশোর। কি রকম করে ?
লক্ষ্মী। রকমের ধার আমি ধারি না যে রকম করেই হৌক লাগাতে
হবে মােকদ্দমা। এই লও ফর্দ, এই সকল ইদের বিরুদ্ধে মােক কর্তে
হবে। সত্য মিথ্যার ধার ধেয়ােনা। নিজে বাদী হবে না। মামলা
করাবে অপর নােক দিয়ে। একের শত্রুকে হস্তগত করে অপরকে জব্দ

১১০ সেখহাটির নীলকুঠি কৰে, এই হবে কৌশল—গরু বাছুর ধরে ধরে আটক কর্নে, ফসল খেয়েছে বলে। যতক্ষণ সমস্ত জমী সাহেবের খাস না কর্তে পার্কে, নীলের জন্য নির্দিষ্ট কৰ্ত্তে না পারবে ততক্ষণ চালাও জোরসে জুলুম, জীবন করে তােল দুর্বহ ; মাথা যারা উচু কৰ্বে বা করেছে, করে দিতে হবে তাদের মাথা নত ধূলির সঙ্গে। চাকুরীর মায়া যদি চাও মিষ্ট কথা ভুলে যাও জোরসে জুলুম চালাও। তড়াক করে ঘােড়ায় চড়ে লক্ষ্মীকান্ত হাওয়ার মত ফুড়ে বেরিয়ে গেল। ধড়াস করে ফরাসের উপর বসে পড়ে তাকিয়া হেলান দিয়ে কিশােরী মােহন ফরসীর নল মুখে দিয়ে ধীরে ধীরে টানতে টানতে গভীর ভাবে চিন্তা কর্তে লাগলেন। এতদিন চাকুরী করে এসেছেন কিন্তু বিবেক বুদ্ধিকে একেবারে বিসর্জন দিতে হয় নাই। যে বুদ্ধিতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে কাৰ্য্য প্রণালীর সে ক্রিয়া কৌশল তিনি জানতেন তাই এতদিন মুনিব সন্তুষ্ট ও প্রজা সন্তুষ্ট করিয়া উভয় কুল বজায় রাখিতে পারি। ছিলেন। কিন্তু এখন হলো অবস্থা সঙ্কট। হ’তে হবে গুপ্ত চর ; খেতে হবে লােকের পৃষ্ঠ মাংস ; গােপনে মারতে হবে ছুরি ; ভাইকে লাগাতে হবে ভায়ের বিরুদ্ধে—কিশােরী ভাবতে লাগলেন এতে তাঁর ধাতে সইবে না। দুদুমি এসে সেলাম করে বলল “সেবা দিই কৰ্ত্তামশাই। তারপর কর্তামশাইকে চিন্তাকুল বিমর্ষ দেখে বলল “আজ মুখখানি শুক্ননা কেন বাবা ঠাকুর।” দুদু মিঞা অশীতিপর বৃদ্ধ—মাথার চুলগুলি সাদা, প্রচুর সাদা দাড়ি বুকের উপর লুটাইতেছিল। কৰ্ত্ত। বললেন “চাকুরী ছেড়ে দেব ভাবছি।” দুদু। ছাড়তে হবেনা কর্তা।

ললী কাস্তের হুকুম
১১১
;
কিশােরী! কেন ?
দুদু। আপনি ছাড়বেন কেন ?
কিশােরী। বলে গেল জোরসে জুলুম চালাতে ; পাৰ্বোনা তা ; কাজে
কাজেই ছাড়তে হবে চাকুরী।
দুদু। শােন কর্তাবাবা চাষার সলা। হঠাৎ কোন কাজ করােনা
বাবা এ জুলুমের বেগ জোয়ারের জল, বেশী দিন রইবে না বাবা, ভাটা
এল বলে, পড়ে থাক মাটি কেড়ে। ছাড়বাে না আমরা তােমাকে
কর্তা, ক্ষতিও তােমার হতে দেব না। গায়ে তােমার আঁচ লাগবে না
বাবা; মাথার চুল গাছটা পৰ্যন্ত তােমার খােয়া যাবে না কৰ্ত্তা। কিন্তু
বিশ্বাস করােনা ঐ কাশী ঠাকুরকে।
কিশােরী। কেন ?
দুদু। ওর ঐ এক শালীর ছেলে আছে নানাম অনঙ্গমােহন তাকে
দিতে চায় তােমার এই নায়েবী। সেই ফিকিরে ঘুরচে ওটা, খােদ সাহেবের
কাছে পৰ্যন্ত দরবার করেছে; তােমার বিরুদ্ধে কাণ ভারি কচ্চে।
কিশােরী। অনঙ্গমােহনের যে পেটে বােমা মাকে বেরােবে না।
দুদু। তা না বেরুক হয় কে নয়তাে কর্তে পর্বে র নয়কেও হয়
কর্তে পর্বে।

মহাকালীর মন্দিরে। আজ অষ্টাহকাল মহাকালীর মন্দিরে পবিত্রান স্বামী ধ্যানে মগ্ন-- দিবারাত্রির মধ্যে জলস্পর্শ নাই। আসন ত্যাগ নাই, কথাবার্তা নাই। দূর দূরান্তর হতে লােক সব মায়ের পূজা দিতে আসছে, মায়ের মূর্তি প্রাণ ভরে দেখচে আর ধ্যান গম্ভীর, মৌন সুন্দর সন্ন্যাসীর মূর্তি দেখে ভক্তি নত চিত্তে প্রণাম করে যাচ্ছে। কিন্তু নেলি সে সংবাদ রাখে না। তাহার চিত্ত সন্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ভাল আর তার কিছুতে লাগছে না। মন আর তার সংসারে বসছে না। মিস, এলিস এলাে নমনীয় সঙ্কোচপ্রসারশীল কমনীয় চলন ভঙ্গিমার লঘু গমনে—সদ্য ফোটা গােলাপ ফুলের হাসি ও সৌরভ নিয়ে, ভাবের আবিরে গাল দুটি তার লাল, অরুণ রাঙ্গা অধরে তৃপ্তির হাসি। সে বলিল “প্রিয় সখি শুভেচ্ছার আশীৰ্বাদ দাও। আর্চি আমার সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব করেছে’আর্চি-হইতেছে ঘােট হিল, নেলি। আর তুমি ? এলিস। অনুকুলে অভিমত দিতে হলাে করি কি অভাগার জীবন একেবারে অকুলে ভেসে যাবে।

মহাকালীর মন্দিরে
বলিবার ভঙ্গী দেখিয়া নেলি হাসিয়া উঠিল, তাহাকে আলিঙ্গন
করিয়া তাহার কপােল চুম্বন অঙ্কিত করিয়া দিল, বলিল “চিরসুখী
হও ভগ্নী। তারপর সে তার জামার পকেট হইতে বাহির করিল
হিলের দেওয়া সেই হায় ছড়া; পবিত্রানন্দের বিজপের পর হইতে
সেই হার যেন তাহাকে বিছুতে দংশন করিতেছিল, সে আর তাহ
পরে নাই। এখন মিস এলিসের গলায় পরাইয়া দিয়া স্বস্তির নিঃশাস সে
ফেলিল, বুকের বােঝা তার নেমে গেল। মিস এলিসকে বলিল “ভগ্নী এই
লও তােমার সখির মেহােপহার—তােমার মনােনীত তােমার দয়িতকে গিয়ে
অভিনন্দন করে এসাে*; নাচিতে নাচিতে কুমারী এলিস চলিয়া গেল।
চোরের মত জুনিয়ার হিল এলাে। অপরাধীর মত মাথানত করে
বল্লো “অামাকে কি ক্ষমা কৰ্বে ! আমার সকল সুখ, ভবিষ্যৎ জীবনের
সকল আশা তােমার একই ফুৎকারে নিবে যেতে পারে।”
নেলি। আমার একটি প্রশ্নের অকপট স্পষ্ট জবাব দিতে পাৰ্বে ?
মানুষের মত বল
হিল। ভগবানের নামে শপথ করে বচি ঠিক উত্তর দিব।
নেলি। কুমারী এলিসকে তুমি কি সত্য সত্যই ভালবাস?
হিল। এমন সরল যথার্থ সত্য জীবনে আমার আর কিছুই নাই।
নেলি। তাকে প্রবঞ্চনা কৰ্বে না ? অন্য রমণীর রূপে উন্ম
হয়ে তার বিশ্বাস ঘাতক হবে না ?
হিল। আমার সম্মানের নামে শপথ কচি যতক্ষণ জীবন থাকিবে
কুমারী এলিসের অকপট বিশ্বাস আমি কখনই ভঙ্গ করিব না।
নেলি। তবে যাও বন্ধু! জীবন সঙ্গিনীর কাছে, ভবিষ্যতের
পরিষ্কৃত জীবনচ্ছদ নিয়ে, মুছে ফেল, মুছে ফেলি অতীতের মসী লিপ্ত
চিত্র, চিত্ত হতে। আরম্ভ কর জীবনের জয়যাত্রা নবীনতার মাসে

১১৪ সেখহাটির নীলকুঠি অতীত পতির জীর্ণ ছিন্ন পাতা এই দেখ আজ দগ্ধ হয়ে গেল নেলির অন্তরে, চিতুও তার রহিল না। নির্ভয়ে চলে যাও। হিল চলিয়া গেল—যাইবার সময় বলিল “তুমি দেবী। নেলি ভাবিতে লাগিল। স্বার্থ ছিল বসুন্ধরা তার কাছে। নিজের স্বার্থ বা স্বার্থের ছায়া চরিতার্থ করিবার জন্য যদি অপরের জীবন ব্যর্থ করিতে হইত তাহাতে দ্বিধা বােধ তার তাে ছিলই না বরং তাহাতে সে আনন্দ বােধ করিত। পবিত্ৰানন্দকে প্রথমে সে যখন দেখে কৌতুকে তার চিত্ত ভরিয়া উঠে, সে ভেবেছিল ইহার সন্ন্যাস ভঙ্গ করে ইহার চিত্তখানি পায়ের তলায় এনে তারপর ফুটবলের মত kick করে লাথি মেরে ফেলে দিতে কত আমােদ কিন্তু ভাগ্যদেবতার চক্রান্তে বিজয়িনী আজ নিজের কারাগারে নিজে বন্দিনী। চিত্ত তাই তার তিক্ত হয়ে উঠেছিল সংসারের উপর। হিলের সঙ্গে প্রণয়ের সম্বন্ধ ছিন্ন কর্তে তাই তার বিন্দুমাত্র দ্বিধা লাগলাে না। তার মনে হলাে পাপের রাহু যেন তাকে ছাড়লাে : অপেক্ষাকৃত লঘুচিত্তে তরুণী বেড়াইতে লাগিল। মহাকালীর মন্দিরের দিকে বেড়াইতে বেড়াইতে নদীর ধারে আসিল সেথায় সান বাঁধান ঘাট, উপরে বিশাল বনস্পতি বটবৃক্ষের শত শত লম্বমান বােয়া গুলি সহস্র সহস্র আবেষ্টনে ঘিরিয়া ঘিরিয়া মাধবীর বিপুল বল্লরী ফুলে ফুলে ফুলময় করিয়া নিকুঞ্জ কানন রচিয়াছে, সেখানে প্রবেশ করিয়া নেলি দেখিল দুটি সন্ত্রান্ত মহিলা, বাঙ্গালী ঘরের। একজন বর্ষীয়সী দিবস ও রাত্রির সন্ধিক্ষণের সন্ধ্যা দেবীর ন্যায়, শান্ত শীতল, মি উল ; অপরটি তরুণী, কুমারী—যেন উষার বাতাসে প্রভাতের প্রথম আলোেক পর্শ। প্রথমা রুদ্রাণী। দ্বিতীয়া সুলােচনা। ইহারা আসিয়াছিলেন অমাবস্যার পূজা দিতে, মহাকালীর মন্দিরে।

মহাকালীর মন্দিরে ১১৫ ; অল্পক্ষণেই পরিচয় লইয়া নেলি আলাপ জমকাইয়া বলিল—আচ্ছা মা? ভগবানের মূর্তি গড়েই যদি পূজা কর্তে হলো তবে অমন ন্যাংটা বীভৎস ভয়ঙ্করী মূর্তির পূজা করেন কেন—একি অনার্য্যের আদিম কালের চিহ্ন নয় ? রুদ্রাণী। মা গাে। অরূপ ভগবানের রূপ কল্পনা ভক্তের কল্যাণের জন্য। মা আমার তাই ন্যংটা ; কোন আসক্তির বাঁধন তাকে বাঁধতে পারেনা। অই ভয়ঙ্করী অাবার সৌম্য, সৌম্যতরা তাহা অপেক্ষাও অতি সুন্দরী। যদি সমগ্ৰ ধারণা কর্তে চান তবে ঐ সন্ন্যাসীর মত বাহ্যজ্ঞান শূন্য হয়ে ধ্যান মগ্ন হোন্। নেলি চমকাইয়া উঠিয়া বলিল, কোন্ সন্ন্যাসী। রুদ্রাণী। কেন, মহাকালীর মন্দিরের মধ্যে যিনি আজ অষ্টাহ ধ্যান মগ্ন হয়ে আছেন। লােকে যাকে পবিত্ৰানন্দ স্বামী বলে ! পবিত্রান যে মন্দিরের মধ্যেই অবস্থান করিতেছেন নেলি সে সংবাদ রাখে নাই। এখন আগ্রহান্বিত হইয়া রুদ্রাণী ও সুলােচনার সঙ্গে মন্দিরে গেল। ভিতর প্রাঙ্গনে জুতা পায়ে প্রবেশের অধিকার ছিলনা সে জুতা মােজা খুলিয়া ঢুকিল। দেখিল মহাকালীর মূর্তির সম্মুখে ধ্যান মগ্ন পবিত্রান স্বামী। শুনিল আজ অষ্টাহ এইরূপ ভাবেই তিনি ধ্যানমগ্ন । রুদ্রাণী ও সুলােচনা ভক্তিভরে প্রণাম করিলেন। সবিস্ময়ে তারা দেখিলেন আভূমি নত হয়ে প্রণাম কল্পে নেলি ; চক্ষে তার অশ্রু মুক্তা। পরেশনাথ এসে মাকে জানালেন—বেলা যায়, পাকী প্রস্তুত, রওনা ৩ হতে হবে। নেলির নিকট বিদায় নিয়ে তারা রওনা হলেন।

বিপদের মাঝে। প্রত্যাবর্তনের পথ রুদ্রাণী, সুলােচনা ও পরেশনাথ কাহারও পক্ষে নিৰ্ব্বিগ্ন হইল না। পরেশনাথ অশ্বারােহণে আগে আগে যাইতেছিলেন। বেহারারা পাকী দুইখানি বাহিয়া পিছু পিছু আসিতেছিল। সান্ধ্যবাতাসে অশ্ব উৎফুল্ল হইয়া উঠিল, পরেশনাথ তাহার ইচ্ছায় বাধা না দিয়া তাহাকে দুটাইয়া দিলেন। পান্ধী দুটি পিছু পড়িয়া থাকিল। একজন মাথায় পাগড়ী বাঁধা জমাদার গােছের লােক প্রকাণ্ড সেলাম করিয়া সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল হুজুর আপনার গােমস্তা খুব জরুরী খবর নিয়ে আসতে আসতে পথে শূল বেদনা ধরে এই নিকটে এক ঘরে ছটফট কচ্ছে আপনাকে দেখতে চাচ্ছে। নিঃসন্দিগ্ধ পরেশনাথ তাহার কথা বিশ্বাস করিয়া অশ্ব হইতে নামিলেন, একজন আসিয়া ঘােড়ার লাগাম ধরিল আর পূৰ্বকথিত লােকটি আগে আগে পথ দেখাইয়া চলিল—একটি ঝােপের মধ্যে লােকটি অদৃশ্য হইল, সঙ্গে সঙ্গে ভীমকায় কতকগুলি লােক একত্র পরেশনাথকে আক্রমণ করিয়া তাঁর মুখ হাত পা বাঁধিয়া ফেলিল। পরেশনাখের চীৎকার করিবার পর্যন্ত শক্তি রহিলনা। তাঁহাকে তখন হাতে হাতে তুলিয়া লইয়া নদীর ধারে আনিল। সেখানে একখানি ছিপ অপেক্ষা করিতেছিল! তাহার মধ্যে পরেশনাথকে ফেলিল, সঙ্গে রহিল সশস্ত্র পাহারা। পক্ষিশীর মত ছিপ উড়িয়া চলিল।

বিপদের মাঝে ১১ ; রুদ্রাণীও সুলােচনার পাকী আসিতেছিল। সঙ্গে বাহকদের মধ্যে এলেম আর লালমােহন ছিল। চাদ খায়ের ডাকাতের দল ভুক্ত তাহারা। তাহাদের অভ্যন্ত চক্ষু সন্ধ্যার অন্ধকারে ঝােপের মধ্যের যায়গাটা একটু সন্দেহের চক্ষে দেখিল ; পাল্কী পিছু রাখিয়া তাহারা আগু হয়ে দেখতে এলাে। গুপ্ত যায়গা ব্যক্ত হলাে দেখে পিল পিলিয়ে লাঠিয়ালের দল বেরিয়ে এল, ঘেরাও কর্তে চাইল পাকী। বেহারারাও লেঠেল মন্দন। বাংলাে বেজায় ঠোকাঠুকি। এলেম দিল সিটি ঠোট দুটি ধরে তার উপর আঙ্গুল রেখে এক দুই তিন কিটু কর্কশ, গতি যার বহুদূর। নদীর বাঁকে বাঁকে, জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে, প্রান্তরের বাতাসে বাতাসে সন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্যে প্রতিধ্বনি নিয়ে চ’ল্প সেই সিটির শব্দ বিপদবার্তার অগ্রদূতের মত প্রান্তরের প্রান্তে প্রান্তে, নিকট ও দূরের বন্ধুজনের কর্ণে কর্ণে। রুদ্রাণী, রুদ্রাণীর মত নির্ভয় কষ্টে নিজের দলের উৎসাহ বাড়াইয়া কহিলেন “সােণাদিয়ে বাঁধিয়ে দেব তােদের হাত, যদি আজ এই ডাকাতদের হঠিয়ে দিতে পারিস।” নামিলেন তিনি পান্ধী হইতে; নামালেন সুলােচনাকে। নিলেন তিনি হাতে লাঠি নিলেন তিনি হাতে লাঠি তুলে দিলেন লাঠি সুলােচনার হাতে। সুলােচনা চাইলেন রুদ্রাণীর মুখের দিকে । রুদ্রাণী লাঠি বিদ্যায় পারদর্শিনী, সুলােচনা নন। রুদ্রাণী বুঝিয়া বলিলেন “ভয়নাই মা ; বাঘিনীর বাচ্চা বাঘিনী ; হাতে লাঠি নিয়ে আমার পিছনে পিছনে থাক; চালিও লাঠি দরকার হলে ; দমােনা ; কৌশল আপনি আসবে।” রুদ্রাণী তখন বাহিনী ব্যুহবদ্ধ করিয়া চালনা করিতে লাগিলেন। শত্রুরা সংখ্যায় বহু ; লাঠি বিভায় অসাধারণ। কিন্তু সুচালিত রুদ্রাণীর জোয়ানদের সহলা কায়দা করিতে পারিনা, কোন হতে কোনান্তরে সম্মুখে পতি ;

•• ১১৮ সেখহাটির নীলকুঠি সুশিক্ষার অভ্যন্ত কৌশলে সঞ্চরন করিতে লাগিলেন রাণী নিজ সৈন্য মধ্যে, পরবশ মন্থন করিয়া ; ভৈরব তাঁর নির্ঘোষ, আলামী তার উৎসাহ বাণী, অভ্রান্ত তাঁর দৃষ্টি শত্রুর ছিদ্র অন্বেষণে, অব্যর্থ র লক্ষ্য শক্ত ঘাতনে। এলেম আর লালমােহন যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মরিয়া হয়ে লড়তে লাগলো, মরিয়া করে তুললো তারা নিজের দলের সকল লােককে। লড়তে লড়তে তারা এগুতে লাগল বাহবন্ধ হয়ে। ক্রমে তারা শক্ত হয়ে পড়তে লাগল। আক্রমণকারীরা বিষম চাপে তাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। জয়ের আশা হতে লাগল দূর হতে সুদূর পরাহত ; তখন সেই হিন্দু মুসলমানের ক্ষুদ্র বাহিনী জোট হয়ে দাড়াল লাঠি হাতে কঁাধে কঁাধে। জান কবুল করে মান রাখবার জন্য। এক এক করে শুতে লাগল ধরাপৃষ্ঠে, পিঠ দেখালেনা কেউ স্থান ছাড়িল কেউ এলােচনা আহত, রুদ্রাণী আহত, এলেমের দৃষ্টি লুপ্তপ্রায় লালমােনর সর্বাঙ্গ আঘাতে কাপচে দু এক মুহূর্ত আর সব শেষ হয়ে যাবে। এমন সময় দিগ দিগন্ত বিদীর্ণ করিয়া কাহার ঐ সিংহধ্বনি শ্রবণ বধির করিয়া ধ্বনিত হইল ? শত হলাে ক্রোশেক পথ দূর হতে। মৃতপ্রায়, এলেম চেঁচাইয়া উঠিল “দখা, চাদ খা— লালমােহন পাগলের মত লাফাইয়া উঠিয়া জয়ধ্বনি করিল ‘6াখা গদখা— লাগাও শালাদের। আততায়ীর হইল যেন বিজলীহত। হাতে, মাথায় মুখে, পৃষ্ঠে পায়ে তাদের পড়িতে লাগিল গদখায়ের লাঠির বাড়ি বধির হয়ে গেল তাদের প্রবণ চাঁদ খানের মুহমূহঃ সিংহধ্বনিতে, খসে পড়তে লাগল লাঠি অপেক্ষাকৃত অনভ্যন্তদের হাত হতে অতি চণ্ড সেই নিনাদে। হ্রস্থ দেহ গদখা ওড়ে নে ঝড়ের আগে, পড়ে যেন ঝরিৰেগে, হানে যেন বিদ্যুৎ বিপদের মাঝে ১১৯ চমকায়। নিমেষের মধ্যে হঠে গেল শত্রুর দল, মিশে গেল তারা তমসায়, নিশান্তের দুঃস্বপ্নের মত। চাঁদখা এসে রুদ্রাণীকে সেলাম করে বল্লে চড়ুন মা পাল্কীতে আর ভয় নেই। যেখানে ছিল আপনার ছেলে জুটেচে সব এলেমের সিটি শুনে দিল্লীর বাদসাও এদের হঠাতে পারবেনা। মাঠ তখন চাঁদখায়ের লেঠেলে ভরে গেছে। শিবিকায় উঠিতে উঠিতে রুদ্রাণী বলিলেন চাদ খা! আমার ছেলে, পরেশ- চাদ খাঁ। তিনি নিশ্চয়ই এতক্ষণ বাড়ী পেীছিয়েছেন।

জমীদার বাড়ী চড়াও। ( ২৪ ) পরেশ নাথের পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। জলস্থল মরিস সাহেবের কুঠি, তার অধীনস্থ অপরাপর কুঠি বাড়ী তন্ন তন্ন অনুসন্ধান করা হলাে, অতি গােপনে, সন্ধান কিন্তু মিল না পরেশ নাথের! চাঁদ খ রক্ত চক্ষু করে ঘুরে বেড়াতে লাগল বৃথাই, দ্বারিক বড়য্যে ম্যাজিষ্ট্রেট, জজ, পুলিশ সাহেব প্রভৃতিকে এতেলা দিতে লাগলেন নিলেদা ঠাকুর সেই যে সাধুমালকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেছেন সন্ধানের কি এক সূত্র ধরে সংবাদ আর নেই তাঁর। কড়া হুকুম রেখে গেছেন পুণ্যপুরের জমীদার বাড়ীতে খাড়া পাহারা থাকবে। এদিকে খােলাপােতার কাছারী সুট করে মরিস সাহেব দখল করে ফেলেছে, সেথায় সঞ্চিত খাজনা হস্তগত করেছে; প্রজারা পরেশ নাথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করে মরিস সাহেবকে জমীদার বলে স্বীকার করেছে। সারারাত পাহারা দিয়ে চাঁদ খাঁ নিজের বাড়ীতে আসিয়া শুইয়া পড়িয়াছে। কয়দিন অবিরত পরিশ্রম ও রাত্রি জাগরণের পর সে মড়ার মত ঘুমাইতেছে। তাহার স্ত্রী সজোরে ঠেলিয়া ;

জমীদার বাড়ী চড়াও তাহাকে তুলিয়া দিতে দিতে বলিল “ওঠ, মিসে যদি মড়ার মতই ঘুমুবি তবে লাঠি হাতে কর্তে শিখিছিলি কেন? জমীদার বাড়ী মরিস সাহেব লুঠ কচ্চে, মেয়ে ছেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্চে, গুলি চালাচ্ছে। আর তুই ঘুমুচ্চিস! চল্লাম আমি ঢালির মেয়ে সেখানে, দেখাব মরদে যা পারে না মাগী তা করে।” ঢাল তলােয়ার হাতে করে দখার স্ত্রী গােলাবী চলিল। সশব্যতে চাদ খা উঠিয়া অস্ত্র লইয়া ছুটিল। একজন লেঠেল ছুটে এসে বল্ল-মরিস সাহেব আর ঘােট পুলিশ সাহেব হাতির পিঠে চড়ে এসেছে সদর দরজায় হানা দিয়েছে সঙ্গে তাদের বন্দুকধারী পদাতিক ন্যাংটা গােরা ফৌজ প্রায় শতাবধি। পুলিশ সাহেব বলচে কে একজন দাগী ডাকাত পালিয়ে এসেছে পরেশ বাবুর বাড়ী পরেশ বাবু তাকে লুকিয়ে রেখেছে তাই চায় খানা তল্লাসী কর্তে বাড়ী। মা দেউড়ী বন্ধ করে তাদের হঠিয়ে দিতে হুকুম দিলে, লাঠির ঘায়ে সৈন্যেরা যখন হঠতে আরম্ভ কল্প, চালাল তারা তখন গুলি জখম হচ্চে লেঠেলরা তবুও ঘাল কচ্চে গােরার মাথা। বিষম মুখ খিস্তি করে গাল দিয়ে চাঁদ খ বললে-সরিয়ে আন্ আনাড়ির দলকে গুলির সামনে গেল লাঠি নিয়ে এগিয়ে সড়কি ফেলে এল বাড়ীতে বৌকে খেলা দেখাবে বলে। ঝড়ের গতিতে লেঠেল চলে গেল হুকুম পালতে। স্বামী-স্ত্রীতে ছুটে গেল তখন বনের পথ দিয়ে জমীদারের খিড়কি দরজায়। বাঁশী মাল সেখানে পাহারা দিচ্চে বাছা বাছা জোয়ান নিয়ে। চাঁদ খা ও গােলাবী ঢুকে গেল বাড়ীর ভিতর। পাড়ার যত বৌ ঝি হয়েছে জমা সেখানে ভয়ে অস্থির হয়ে। আহত জোয়ানরা আনীত হচ্চে সেথায় এক এক করে রুদ্রাণী ও সুলােচনা কচ্চেন তাদের সেবা। গােলাৰী এসে বলল আপনারা চলুন উপরে।

১২২ সেখহাটির নীলকুঠি সুলােচনা ও রুদ্রাণী উপরে গেলেন। গােলাবী তখন হাত নেড়ে মুখ খিচিয়ে বল-ননীর পুতুলের মত ভয়ে গলে যাওয়ার সময় এ নয় মা ঠাকরুনরা থামাও তােমাদের ভয়ের গণ্ডগােল—শক্তি ও সাহস যারা ধর, সামর্থ্য যাদের আছে সমও বয়সের বৌ ঝি সব চল আমার সঙ্গে কোমর বেঁধে, বুড়াে মায়েরা সব থাক নীচে আহতের কর সেবা। বাছা বাছা মেয়েদের নিয়ে উঠল গিয়ে তেতলার ছাতে গােলাবী। রাখিল সেথা ইট ও ঝামা ঘােট ঘােট ঠেঙ্গা, স্তুপাকার করিয়া, স্থানে স্থানে। রুদ্রাণী অস্ত্রের ঘর খুলিয়া দিলেন, স্তুপে স্তুপে সড়কি লইয়া শদ খা প্রস্থান করিল। মরিস সাহেব মাহুতকে ইঙ্গিত করিল হাতী টোয়াইয়া দাও দেউড়ী ভাঙ্গিতে। অঙ্কুশ ঘায় ঘন ঘাের বৃহিত ধ্বনি করিয়া শুণ্ড শূন্তে তুলিয়া অগ্রসর হইল মহন্তী—অমনি বামা হস্ত হইতে হইতে লাগিল ঝামা বৃষ্টি পিছাইল হাতী। পুরী মধ্যে জলের অনটন হইল উঠতি বয়সের আহত লাঠিয়ালেরা জল জল করিয়া চীৎকার করিতেছে তৃষ্ণায় তাহাদের ছাতি কাটিতেছে জল নাই। রুদ্রাণী ঠাকুর খুলিয়া দিলেন। সেখানে পূজার জন্য ঘড়া ঘড়া গঙ্গাজল সঞ্চিত ছিল—নিজে হাতে করিয়া সেই জল খাওয়াইয়া সুস্থ করিলেন আহতদের। এদিকে বাহিরে পড়ে গেল বিষম গণ্ডগােল। বন্দুকধারী হাইল্যাণ্ডার গােরা ফৌজ দেখতে পাচ্ছে না কোন লােক, আছে তারা কোন আড়ালে কি কাণে শুনচে সামলাও তােমার চোখ সালাও তােমার কাণ সামলাও তােমার হাঁটু সামলাও তােমার উরু আর সেই সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আহত হচ্চে সেই সেই স্থান সড়কির আঘাতে। বহু গােরা সৈ • জমীদার বাড়ী চড়াও ১২৩ আহত হলে কিন্তু প্রতি আঘাত করিবার লােক খুঁজিয়া গেলাে না। সুশিক্ষিত সড়কি ওয়ালারা দখার আদেশে গুপ্ত স্থানে নিজেদের সুরক্ষিত করে রেখে চালাচ্চে সড়কী অব্যর্থ সন্ধানে, নিচে প্রতিশােধ লাঠির উপর গুলি চালান কাপুরুষতার। এরূপ অসম সমর ক্ষেত্রে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করা মূঢ়তা। মরিস তাই ছােট পুলিশ সাহেবকে একবার শেষ চেষ্টা করিতে অনুরােধ করিলেন। দেউড়ীর নিকটে হাতী পুনরায় টোয়াইয়া দিয়া টোটা পােরা বন্দুক উচু করিয়া ঘােট পুলিশ সাহেব বলিলেন এবার উপর হইতে যে ঝামা মারিবে তাহাকে তৎক্ষণাৎ গুলি করিব। অমনি আলিসা হইতে গলা বাড়াইয়া ঠিক বন্দুকের লক্ষ্যের সম্মুখে প্রকাশ পেলে একখানি সুন্দর মুখ তরুণীর, নিখুত ললাটে তার সিন্দুর বিন্দু সূর্যের আলােকে ঝকমকিয়ে উঠেছে বিপদে অবিচল দুর্দমনীয় তার হৃদয়ের অসীম সাহসিকতা আঁকা রয়েছে তার বাঁকা নয়নের কালাে তারার অসামান্য ঔজ্জ্বল্যে, অমলিন সুন্দর স্মেরাননে লােহিত লঘু অধরে -ব্যাকরণ সুন্দর উচ্চারণে ইংরাজী ভাষায় সে বলিল-রমণীর সন হয়ে যে পুরুষ, কাপুরুষ হয়, নিরস্ত্র নিঃসহায় রমণীর সঙ্গে আসে লড়াই কর্তে অগ্নি অস্ত্র নিয়ে সেই ভীরুর মুখ রমণী আমি এই রকম করেই বন্ধ করে দিয়ে থাকি। বলিতে বলিতে ফুটন্ত জলপূর্ণ বালতি ফেলিয়া দিল সাহেবদের মুখের “গেছি গেছি” বলিয়া তাহার মুখ কিল-মাহুত বেগে হাতী সরাইল কিন্তু দেউড়ীর সীমা পার হইবার আগেই ছাতের আর এক প্রান্ত হইতে ফেলিয়া দিল । সেই তরুণী-গােবর জলে পূর্ণ ছড়া হাঁড়ি বলিল—কাপুরুষ মরিস তােমার বাঁদরামীর এই পুরস্কার। তরুণী সুলােচনা। রুদ্রাণী নিজের বহু মূল্য হার গলায় পরাইয়া উপর।

১২৪
সেখহাটির নীলকুঠি
দিয়া বলিলেন-মা! রাণী নগরের সত্যিই রাণী তুমি, পরেশ আমার
সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক পুণ্যপুরের জমিদারীর রাণী কৰ্বো তােমা
আমি মা।
বলিতে বলিতে জয়ধ্বনি উঠিল ঘােড় ছুটাইয়া পরেশ বাবু দা
ঠাকুর ও সাধুমালের সঙ্গে দেউড়ীতে ঢুকিলেন।

অন্ধকূপে পরেশনাথ। ( ২৫ ) বিশ্বনাথ বাবু ওরফে বিশে ডাকাত বসে আছেন তাঁর ময়ুরপঙ্খী ছিপ নৌকায় কিংখাপে মােড়া খাস কামরায় চুণি নদীর উপর ঘােপের মধ্যে। সম্মুখে এসে দাঁড়াল একখানি বিশাল, মরদের দেহ, চন্দন চচিত তার উন্নত ললাট, বদ্ধশিখায় রক্তফুল, গরদের ধুতি পরা, গরদের নামাবলি গায়ে, রুদ্রাক্ষের মালা তার গলায় রুদ্রাক্ষের তাগা তার হাতে। “দা-ঠাকুর রামধন ভট্টাচাৰ্য আজ প্রকৃত ভট্টাচার্য্যের বেশে বিশ্বনাথ বাবুকে দর্শন দিলেন। বিশ্বনাথ বাবু ভক্তিভরে প্রণাম করিয়া বসিতে আসন দিলেন। আশীর্বাদ করিয়া দা-ঠাকুর বলিলেন “ তিক ব্রাহ্মণ এসেছি ভিক্ষা কর্তে বাবু মহারাজের দরজায় যদি ভিক্ষা পূর্ণ করেন আসন গ্রহণ করি। যােড় করে বিশ্বনাথ বলিল “ভূদেবতা ব্রাহ্মণ যখন দেবতার আশীর্বাদের মত, পায়ের ধূলি দিয়েছেন ডাকাত বিশের ঘরে, প্রাতি তঁার দেওয়া তাে হয়েছে তখনি,ঐ শ্রীমুখ থেকে আদেশের বাণী বাহির হ’তে যতক্ষণ বিলৰ মাজ ততক্ষণ বিলম্ব কৰ্বে এ দাস সেই আদেশ প্রতি পালনে। রামধন। বাবু মহারাজ ! একি সত্য?

১২৬ সেখহাটির নীলকুঠি ; বিশ্বনাথ। পরীক্ষা করে দেখুন দেবতা। এ অপবাদ যেন মূতন করে বিশ্বনাথের না হয় যে ব্রাহ্মণ যাজ্ঞা কর্তে এসে তার নিকট হতে বিফল মনােরথে ফিরে গেছেন। জীবন তুচ্ছ কথা ; অর্থ—আরও তুচ্ছ; অদেয় কি আছে সংসারে দেবতা ? রামধন। আর ব্রাহ্মণ যদি ভ্ৰষ্টাচার হয় ? বিশ্বনাথ। সে বিবেচনার ভার বিশ্বনাথ তার বিশ্বনাথের উপর ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত আছে নিজের জন্য রাখেনি। আপনি ভ্রষ্টাচার হােন আর শুদ্ধাচার হোন্ ; আপনি ব্রাহ্মণ আপনি আমার দেবতা। “সাধু। সাধু!” বলিয়া রামধন আসন গ্রহণ করিয়া বলিলেন- বাবু মহারাজ একদল লোেক আপনার নিকট কোন লােককে বন্দী করে দিয়ে গেছে—নিক্রয় মূল্য আদায় করার জন্য ? বিশ্বনাথ। একজন টাকাওয়ালা লােক জমীদার গােছের তাকে কয়দিন হলাে আমাদের চেনা কোন দল, কয়েদ করে আমার হেল্লায় রেখেছে আমার উপর ভার তার ছাড়ার মূল্য আদায় করার—লােকটিকে আমি এখনও দেখি নাই। রামধন। তিনি পুণ্যপুরের জমিদার। বিশ্বনাথ। পুণ্যপুরের জমিদার ? পরেশবাবু? সত্য দেবতা। সত্য ? রামধন। নির্ঘাত সত্য। বিশ্বনাথ লাফাইয়া উঠিল অতি ব্যাকুলতার সহিত রামধনের দুটি পা ধরিয়া বলি- দেবতা দোহাই আপনার পায়ের বিনামা দিয়ে বিশের মুখে মারুন, বিশের মাথায় মারুন। ওরে বিশে ডাকাত ? এই পাপেই ততাকে ঝুলতে হবে ইংরাজের ফাসী কাঠে- অন্ধকূপে পরেশনাথ রামধন সশন্তে বলিলেন “ব্যাপার কি বাবু মহারাজ ?” বিশ্ব। দেবতা—অনেক দিনের কথা ! পরেশ বাবু তখন ছােট, কৰ্ত্তা বাবু সবে মারা গেছেন। আমার পিছু লাগে কোম্পানির লােক ; আমি তখন জখম ; প্রায় ধরে ফেলেছিল, তখন আর উপায় দেখে সােটান সিধিয়ে পড়ি খিড়কি দরজা দিয়ে পুণ্যপুরের জমিদারের অন্দর মহলে ; মায়ের পা জড়িয়ে ধরে নিজের পরিচয় দিয়ে জীবন ভিক্ষা চাই-মা ঘেন্না কল্লে না অধম বলে পায়ে ঠেল্লে না ; আশ্রয় দিলে জীবন দিলে তার পরিবর্তে আমি কিনা মায়ের অন্ধের নড়ি একমাত্র পুত্রকে রাখলাম অন্ধকূপে বন্ধ করে । রাম। এ কাজ কি আপনার দলের লােকে করেছে ? বিশ্ব। কখনই নয়—আচ্ছা দেখে নেব আমি সেই আপ্তসারা ফিলিপস সাহেবকে এতখানি চাতুরী খেলে আমার সঙ্গে। তারপর দুজনে অপেক্ষাকৃত ছােট ছিপ নৌকায় উঠিলেন। কুড়ি জন ডাকাতে দুই সারে বসিয়া বৈঠা বাহিয়া চলিল। নদী ছাড়িয়া বিলের মধ্যে পড়িল-প্ৰকাণ্ড বিল নাম ডাকাতের গাড়ী—বিলের মধ্যভাগে একটি প্রকাণ্ড শিব মন্দির। নৌকা লাগিল সেখানে, উঠিল বিশ্বনাথ নৌকা হইতে—রামধনকে সঙ্গে লইয়া গেল মন্দিরাভ্যন্তরে। বিগ্রহ মূর্তিকে গলবন্ত্রে প্রণাম করিয়া বিশ্বনাথ ধীরে ধীরে মূর্তিটি ঠেলিতে লাগিল, বিষম গহ্বর বাহির হলাে। উভয়ে গহ্বর বাহিয়া নীচে নামিয়া গেল। বহু নিয়ে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিদ্রামগ্ন একটি যুষা। বিশ্বনাথ আলাে আলিল-রামধন দেখিলেন পরেশনাথ অঘােরে ঘুমাইতেছেন— অনিশ্চিতের অন্ধকারে মৃত্যু শিয়রে করিয়া অদৃষ্টের ভঙ্গীকে এমনি নিশ্চিন্ত মনে উপেক্ষা করার অকুতােভয় দেখিয়া দুঃসাহসী দাঠাকুরেরও আশ্চৰ্য্য লাগিল। পরেশ নাখের নিদ্রা ভাঙ্গাইয়া বিশ্বনাথ বারবার

১২৮
সেখহাটির নীলকুঠি
ক্ষমা চাহিয়া তাঁহাকে মুক্ত করিয়া দিল। দাঠাকুর পরেশ বাবুকে
সঙ্গে করিয়া পুণ্যপুরে যখন পৌছিলেন তখন সুলােচনার হাতের গােবর
জল পােরা ছড়া হাঁড়ি মাথায় করিয়া মরিস সাহেব পগার পার
হইয়াছে।

লাট সাহেবের সফর-পরেশনাথ বাদশাহ। ( ২৬ ) “ইউনিয়ান জ্যাক উড়িতেছে। জলযান “নােটাস চলিতেছে। বঙ্গের শাসন কর্তা গ্রান্ট সাহেব সফরে বাহির হইয়াছেন। পরেশনাথকে হইতে হইয়াছে অক্লিষ্টকৰ্ম্মা। ইংরাজি সংবাদ পত্রে বলা হইয়াছে, জন কয়েক শিক্ষিত লােক কর্তৃক উত্তেজিত হইতেছে বঙ্গের নীল বুনিবার কৃষকগণ, বিদ্রোহের উত্তেজনায়, অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হইয়া দেশময় রক্ত বিপ্লব আনিবার জন্য। তাহারা উচ্চ কণ্ঠে বলিতেছে “শাসন কর শিক্ষিতদের, কয়েদ কর তাদের, হাঙ্গামা চুকিয়া যাবে। দেশে অশান্তি নাই, নীলকরের জুলুম নাই ; হতভাগা, ইংরাজি শিক্ষিত ছােকরা এই সােণার শান্তিপূর্ণ দেশে অশান্তি এনে দিচ্ছে। যদি দেশ শাসন কর্তে চাও বদ্ধ লৌহ মুষ্টি দেখাও।” হিন্দুপ্যাট্রিমাটে পরেশনাথ দেওয়াচ্চেন তার জবাব বলাচ্চেন তিনি-বিবাদ নীলকরে আর প্রজায় ; নীলকরও গভর্ণমেন্টের প্রজা, বাঙ্গালীও গভর্ণমেন্টের প্রজা। প্রায় প্রায় বিরােধ মীমাংসা করবেন গভর্ণমেন্ট অপক্ষপাতিতার তুলাদণ্ডে ; এতে যারা বিদ্রোহের গন্ধ দেখে বিদ্রোহী তারাই। দেখাচ্ছেন তিনি নীলকরদের অত্যাচার, সেখহাটির নীলকুঠি কস্টেন কথা, প্রজার যেখানে অত্যাচারী চেপে যাচ্চেন সে সব ব্যাপার। আর, যমুনা, ইছামতী, ভৈরব, নবগঙ্গা, কুমার, মাথাভাঙ্গা, মধুমতী ও পদ্মার কতকাংশ—এই সমস্ত নদীগুলির উভয় তীরস্থ যত প্রজা, যত জমীদার, যত লেখক ও ক্ষমতাশালী লােক—এদের সকলকে সংঘ বদ্ধ করেছেন পরেশনাথ, লাট সাহেবের কাছে সব কথা খুলে বলবার জন্য। দরখাস্তের পর দরখাস্ত করাচ্ছেন তিনি লাট সেরেস্তায়, সংগ্রহ কচ্চেন তিনি সেখানে সকল সংবাদ—পয়সা ব্যয় কচ্চেন জলের মত, লােকেও মাচে তঁাকে গুরুর মত ; দাঠাকুর শুনচেন তার কথা বালকের মত, স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলেন নিজের কর্তৃত্বের পদ যােগ্যতর এই তরুণকে—এই অপরিণতের পরিণত যুক্তির প্রামাণ্য শির নত করে মাতে লাগলেন তার আদেশ দ্বারিকানাথ। হরিশচন্দ্রের দক্ষিণ হস্ত হইয়াছেন পরেশনাথ। অক্লান্ত পরিশ্রমে পরেশনাথের কিন্তু ক্লান্তি নাই, কেন ? ক্লান্তিহরণ কান্তি নিয়ে শান্তিময়ী সুলােচনা আজ তার ধর্মপত্নী। রুদ্রাণী পরেশনাথের সঙ্গে সুলােচনার মহাসমারােহে বিবাহ দিয়েছেন। সিংহের সঙ্গে সিংহিনী মিলিয়াছে। লাট সাহেব দেখছেন অবাক হয়ে। দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি, রৌদ্র বৃষ্টি সহ্য করে দলে দলে কাতারে কাতারে পিপীলিকার সারের মত চলেছে জনস্রোত, দুই তীর ঘেরিয়া লাট সাহেবের জয় শব্দে দিক কাপাইয়া, চাইছে তারা ন্যায় বিচার, চাইছে তারা অপক্ষপাতিতা। এত লােক, পুলিশ নাই তাদের পাহারা, তবু ছত্রভঙ্গ হয়নি তারা, শাস্তি ভঙ্গ করেনি তারা। স্তম্ভিত, বিস্মিত গভর্ণর দেখচেন ক্ষণিক উত্তেজনার পােন এত নয়, আঁতে ঘা আছে এর তলায়, চায় তারা তাই জানাতে।

লাট সাহেবের সফর—পরেশনাথ বাদশাহ নােটাস এসে ঘাটে লেগেছে—বিপুল প্রান্তরে বসে গেছে জন সভা লাট সাহেব স্বকর্ণে শুনছেন তাদের কথা। সামিয়ানা খাটান হয়েছে র জন্য। এসেছেন সব নীলকর সাহেবেরা, এসেছেন তাদের উকীল মাের। প্রজা পঞ্চাশ হাজারের উপর এসে জমেছে ; আরাে জচে। হরিশচন্দ্রও এসেছেন লাট সাহেবের আমন্ত্রণে। বড়হিল সাহেব বললেন—শুধু একটা sentiment এর উপর নির্ভর করে এত বড় কাণ্ডটা করে ফেলচে। চায়ের পেয়ালায় তুলেছে তুমুল ঝড়, তিলকে করেছে তাল। নীলকরেরা অমনি নীল বােনায় না, রীতিমত মজুরি দেওয়া হয়। পরেশনাথ স্থির কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন-- কত করে মজুরি আপনারা দেন অনুগ্রহ করে বলবেন কি ? হিল সাহেব গর্জন করে বললেন তােমার প্রশ্ন করার অধিকার নাই, তুমিই সব লােক খেপাচ্ছ, আমাদের কুঠি সব উঠে গেলে লাভ তাে হবে তােমারি, কোন জবাব আমি দেবনা তােমার কথার। বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে পরেশনাথ বিশুদ্ধ ইংরাজিতে লাট সাহেবকে সম্বােধন করে বলতে লাগলেন- “হে মহান্, হে সম্মান আম্পদ ! সমগ্র বঙ্গদেশ যার অঙ্গুলি হেলনে চালিত হচ্ছে, যার তেজের ঔজ্জ্বল্যে নীলকরের জোনাকির আলাে ডুবে যেতে বাধ্য, শরি চোখের সামনে, তাঁরি আশ্রয়ের গণ্ডীর মধ্যে যার রক্ত চক্ষুর অগ্নি আমার মত একজন পদস্থ জমীদারকেও দগ্ধ কর্তে ইতস্ততঃ কচ্চেনা—নিজের গণ্ডীর অবাধ যথেচ্ছাচারিতার মধ্যে পেলে দুৰ্বল, সহায় হীন, নিরক্ষর কৃষকের প্রতি তার ব্যবহার যে কি রকম হয়, আর কি রকম মজুরি যে তিনি তাকে দেন, সহানুভূতি পূর্ণ বাংলার শাসন কর্তার পক্ষে তাহা বুঝিবার বিন্দুমাত্রও বিলম্ব হবে না। হে ১৩২ সেখহাটির নীলকুঠি মাননীয় সন আম্পদ, বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে “শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। যে পাচকব্রাহ্মণ গৃহস্থের অংশের মৎস্য নিজের উদর পুর্ণ করিবার জন্য চুরি করে, লুকাইয়া রাখে সে তাহা নিজের ভাতের থালায় শাকের আড়ালে। লােকে দেখচে পাচক মহাশয় খুব নির্লোভ, গৃহস্থকে সব খাওয়াইয়া নিজে শুধু শাক দিয়া ভাত খাইতেছেন। নীলকর সাহেবের এই যে ক্রোধ, ইহাও শাক দিয়ে মাছ ঢাকা ; প্রকৃত ক্রোধ এ নয়, ক্রোধের আড়ালে সত্য গােপনের ঐকান্তিক চেষ্টা। সনাতন কাল হতে চলে আসচে অপ্রিয় প্রসঙ্গ বর্জন করার অদূরদশীর সার্বভৌম নীতি—যুক্তি তর্ক ছেড়ে দিয়ে রােষানল প্রােজ্জ্বল করা পরচিত্ত দহন করবার জন্য। দরিদ্রের মা বাপ! খুলে দেখুন নিজের সেরেস্তার কাগজ, দেখতে পাবেন তাতে এই হিল সাহেবই আপনাদের জানিয়েছেন জন পিছু চারি পয়সা হইতে ছয় পয়সা পৰ্যন্ত মজুরি দিয়ে থাকেন নীল বুনানর জন্য—যদিও প্রজারা তাহা স্বীকার করে না তথাপি সে কথাও যদি স্বীকার করে নেওয়া যায় তবে দেখা যাবে যে ঐ মজুরি বর্তমান পারিপার্শ্বিক অবস্থার তুলনায় অতি অকিঞ্চিৎকর—ঐ উঠচে কুষ্টিয়ায় লৌহ সেতু, নির্মাণ হচ্চে সেথা লৌহবত্ম- চচে সেখানে গভর্ণমেন্ট হ’তে মাটি কাটার কাজ—এই দেখুন হুজুর সেখানকার অধ্যক্ষের পত্র, দিচ্ছেন তাঁরা মজুরি । হইতে • আনা পর্যন্ত দৈনিক। রাজা যে মজুরী স্বেচ্ছায় দিচ্ছেন অধীনস্থ প্ৰজা হয়ে তার ব্যতিক্রম কর্তে সাহস করা কি রকম শিষ্টাচার-বহু সম্মানের আম্পদ, দরিদ্রের মা বাপ, আপনিই বিচার করে দেখুন। অধৈৰ্য্য হইয়া মরিস, গর্জিয়া বলিল :- পরেশবাবু যে বাদশার মত কথা বলতে লাগলেন।

লাট সাহেবের সফর—পরেশনাথ বাদশাহ
তখন এগিয়ে এল হ্রস্ব দেহ কৃষ্ণকায় রক্ত চক্ষু চাঁদ খা। লাট
সাহেবকে আভূমি সেলাম করে বল্লে—তা হলেন হুজুর
লাট সাহেব বললেন—কি হলেন?
চাদ খাঁ। এই পরেশবাবু বাদশা হলেন—মরিস সাহেব তাকে বাদশা
করে দিলেন।
পঞ্চাশ সহস্র লােকের জনতা আকাশ বিদীর্ণ করিয়া গাহিল
“পরেশ বাদশার জয়।
মৃদু মন্দ হাস্য করিতে করিতে লাট সাহেব সভা ভঙ্গ করিলেন।
হরিশচন্দ্র পরেশনাথকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন “নিশ্চিন্ত থাক
পরেশ, এ আইন নিশ্চয় রদ হয়ে যাবে।”

পরেশনাথ কারাগারে। ( ২৭ ) কাশীশ্বর রুদ্রাণীকে বললেন- “সব মিটে যাবে খুড়িমা ; একবার পরেশনাথ খােলাপােতায় গেলেই -প্রজারা সব খাজনা দিয়ে দেবে-মরিস সাহেবের বিদ্যে আর খাটবে না।” রুদ্রাণী। আমার, পরেশকে পাঠাতে মন সরে না, যদি তার অনিষ্ট হয়। কাশীশ্বর। আমার মাথায় বজ্রাঘাত হবে যদি পরেশের কোন অনিষ্ট হয়—মাথায় করে নিয়ে যাব মাথায় করে পৌছে দেব কি বল রামরূপ ? রামরূপ। পা ছুঁয়ে দিব্বি কচ্চি মা, বাবুর কোন বিপদ হবে রুদ্রাণী ভুলে গেলেন ; বিশ্বাস কল্লেন। মায়ের পায়ের ধূলি নিয়ে, সুলােচনার নিকট হতে বিদায় নিয়ে পরেশ গেলেন পা করে থােলালােতায়। যেমন পৌছান, রামরূপের পরেশনাথ কারাগারে ছােট ভাই নটবর ঘােষ এসে সেটান চিৎ হয়ে শুয়ে চেঁচাইতে লাগিল, উঃ সড়কি দিয়ে জখম করেছে আমায় পরেশবাবু-সত্য সত্যই তার উরু এ ফোড় ও ফোড় হয়ে গিয়েছে সড়কীর আঘাতে। তবে সে আঘাত পরেশবাবুর দেওয়া নয়—পরেশবাবুকে বাঁধাইবার জন্য মরিস সাহেবের সড়কিওয়ালা করিয়াছে। মার্চ করিতে করিতে বন্দুকধারী পুলিশ সৈন্ত আসিয়া পরেশবাবুকে ঘেরিয়া ফেলিল, দারােগা আসিয়া হা বিরুদ্ধে পরােয়ানা দেখাইয়া হাকে গ্রেপ্তার করিল। পরেশনাথ ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের নিকট জামিন পেলেন না, জেলে বাস কৰ্তে হল ; তবে অনুমতি পেলেন প্রতিদিন প্রত্যুষে তিনি অশ্বারােহণে গঙ্গাস্নান করিয়া আবার জেলে ফিরিয়া আসিবেন। জেলখানা হইতে গঙ্গা প্রায় ৪৫ ক্রোশ দূরে। জেলার সাহেব খুব বন্ধুর ভাব দেখাইতেছেন জেলার সাহেবের পত্নী খুব মিশিতেছেন। পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়া হলাে। জেলপুরী ইন্দ্রপুরীতে পরিণত হলো। পরেশনাথের মনে জাগচে জিঘাংসা, বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিহিংসা ; পরেশনাথের এখন গতি অবাধ। দা’ ঠাকুরের লােকের সঙ্গে রীতিমত পরামর্শ করবার সুযােগ হলাে। রাত্রিকালে জেলারের সঙ্গে ব্রিজ খেলিতেছেন পরেশনাথ। জেলারের অলক্ষ্যে ঘড়িটি দুইঘণ্টা ফাষ্ট করিয়া রাখেন! পরেশনাথ ইচ্ছা করিয়া হারিতে লাগিলেন-জেলার অনেকগুলি টাকা লাভ করিলেন, খেলা ভাঙ্গিল। পরেশনাথ বলিলেন রাত কত-জেলার ঘড়ি দেখিল, বলিল রাত ১২টা। জেলার শুইতে চলিয়া গেল। পরেশনাথ ঘড়ির কাটা পুনরায় ঘুরাইয়া ঠিক সময় করিয়া দিলেন। পরেশনাথ জেল ১৩৬ সেখহাটির নীলকুঠি ছাড়িয়া তখনি সেই রাত্রিতে বাহির হইলেন জমাদার বাধা দিলনা। জেলারের আদেশ ছিল পরেশ বাবুকে বাহির হতে বাধা দিবেনা। আর জমাদারও অনেক টাকা ঘুস খাইয়াছিল। অশ্ব সজ্জিত ; উঠিয়া তীর বেগে ছাড়িয়া দিলেন। নদী তীরে নৌকা প্রস্তুত ছিল। নৌকায় পার হইয়া ওপারে গেলেন। অপর পারে ঘােড়ার ডাক বসান ছিল। পরেশনাথ ঘােড়ায় নক্ষত্র বেগে চলিলেন। ঘাটিতে ঘাটিতে ঘােড়া বদলাইয়া পৌছিলেন খােলাপােতায়। চঁাদ খা, সাধুমাল আর আর সব লেঠেলরা ছিল মােখ মুখে দিয়ে, কেবল পরেশনাথ রহিলেন নিজের বেশে, পরিলেন না কোন ছদ্ম পরিচ্ছদ। পরেশনাথ দাঁড়িয়ে থেকে লুঠ করালেন রামরূপের বাড়ী, খােল- পাের কাছারী পুড়িয়ে দিলেন। পুড়িয়ে দিলেন রামরূপ আর নটবরের ঘর আর সেই গ্রামের প্রত্যেকের ঘর, পথের ফকীর করে দিলেন বিশ্বাস- ঘাতকদের এক ঘণ্টার অগ্নি উৎসবে, বেদম মার খেলাে, গােমস্তা নায়েব। রামরূপ আর নটবর সে সব লেঠেলদের কাছে এগুতে পাল্লনা কেউ লক্ষ্মীকান্তের দল কুকুরের মত লেজ গুটাইয়া আঁধারের মধ্যে মিশিয়া গেল-কাছারী হয়ে গেল দখল সেখানকার একজন মাত্র লােক ছিল ৰাধ্য—সেই হলাে গােমস্তা বাহাল—তার পর ফিরে গেলেন সেই রকম ঘােড়ার ডাক বসিয়ে। ভাের বেলা রােজ যেমন গঙ্গা স্নান করে জেলখানায় ফিরতেন, ফিরলেন তিনিও সেই দিন ঠিক সেই পরদিন হাইকোর্ট থেকে জামীনের হুকুম মঞ্জুর হয়ে এল। পরেশনাথ জেলখানা হতে বাহির হলেন। ঢাক, ঢোল নিয়ে প্রজার সব মহাসমারােহ করে পরেশনাথকে বাড়ী নিয়ে গেল। খােলালােতার রামরূপ নালিশ কল্লে পরেশনাথ রাত্রি ১২টার পরেশনাথ কারাগারে ১৩৭ সময় নিজে উপস্থিত হয়ে ললাকেদের দিয়ে তাহার ও প্রজাদের বাড়ী লুট করে পুড়িয়ে দিয়েছে ও কাছারী পুড়িয়ে দিয়েছে। জেলার সাহেব সাক্ষী দিলেন ঐ রাত্রি ১২টা পর্যন্ত তিনি পরেশের ঘরে জেলখানায় পরেশের সঙ্গে তাস খেলেছেন। জেলখানা হ’তে খােলাপােত ৪০ মাইল। মকদ্দমা ফেঁসে গেল।

লক্ষীকান্ত জখম। ( ২৮ ) লক্ষ্মীকান্ত সুসজ্জিত হয়ে ঘােড়র উপর উঠতে যাবেন এমন সময়ে পকেটে দেখেন একখান পত্র। বাহির করিয়া দেখেন এ পত্র তত তিনি পূৰ্বে পান নি আর তাহা তিনি পকেটেও রাখেন নি। খুলিয়া পড়িলেন-লেখা আছে - কাপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত! দেশের লােক হয়ে কচ্চ সর্বনাশ দেশবাসীর কাপুরুষের মত লুঠলে পরেশবাবুর কাছারী; লুঠতে গেলে তাঁর বাড়ী-কাপুরুষের মত খাবে এমন মার যাতে জন্মে আর তােমাকে কখন ঘােড়ায় চড়তে হবেনা। ব্রাহ্মণকুলের কুলাঙ্গার। ফিরে যাও নিজের ঘরে নহিলে মরিস সাহেবের খাপদ। প্রজার আপদ হয়ে আর তােমার বেঁচে থাকা হবে না। টুকরাে টুকরাে করে ছিড়ে ফেল্পে সেই পত্র, ফেল্লে তাতে থুথু ; হাসলে উপেক্ষার হাসি গোঁফে দিল চাড়; খাড়া হয়ে বসলাে ঘােড়ার উপর, ছাড়তকে ছাড়ল ঘােড়া চিতিয়ে চল্প বুক ফুলিয়ে বিদ্যুতের বেগে লক্ষ্মীকান্ত, হাতে চাবুক শঙ্কর মাছের লেজের। দেখতে ; লক্ষ্মীকান্ত জখম দেখতে এলে উলসীর কাছারী-জোর গলায় ডাকলাে-কিশাের, কিশাের, চল ক্ষেত্রপালের মাঠে। কিশােরীমােহন প্রস্তুত হলেন যাবার জন্য ; সাজালেন নিজের ঘােড়া ; দুদুমি ডেকে নিয়ে গেল গােপনে-বল্লে কৰ্ত্তা ক্ষেত্ৰপালের মাঠে যাচ্চ সঙ্গে সিপাই ক’জন ? কিশােরী। ৫৬ জন। দুদুমিঞা। যামােনা কর্তা ওমাঠে; যেতে দিয়ােনা তােমার ঐ দেওয়ান দাদাকে ; হাড় চূর্ণ হয়ে যাবে, দশ হাজার লেঠেল সেখানে মজুত। অন্ততঃ ১০০ জন বরকন্দাজ সঙ্গে করে যেতে হবে। যেখােন আজ। গােপনে এসেছিল, গােপনে স’রে পলাে দুদুমিঞা। কিশােরী মােহন বল্লেন “দাদা আজ আর ক্ষেত্রপালের মাঠে গিয়ে কাজ নেই অনেক দুষ্ট লােক সেখানে জচে ; আমার কুঠিতে মাত্র ৫ জন সেপাই আছে— এদের নিয়ে তাদের মহড়া নেওয়া যাবেনা—সদরে লিখচি এখুনি ফৌজ চলে আসবে তারপরে দুইভায়ে যাব। লীকান্ত চোখ পাকল করিয়া বলিল “মেয়ে মানুষ হয়ে মরিস সাহেবের চাকুরী করা চলে না। কুঠেল সাহেবের একজন বরকন্দাজ এক হাজার ন্যংটা পোদা লেঠেলের সঙ্গে সমান—থাক তুমি কাছারীতে বাবু মশায়, দেখ তােমার দাদা হাসিল করে কেমন করে কাজ। চলে গেল ঘােড়া হাঁকাইয়া। জমাদার দেবী বকস ও ৪ জন সিপাহী পাঠাইয়া দিলেন সঙ্গে কিশােরীমােহন, অপর সােয়ার পাঠালেন মরিস সাহেবের কাছে বরকন্দাজ ফৌজের জন্য, অপেক্ষা কর্তে লাগলেন তাদের আশায়।

১৪০ সেখহাটির নীলকুঠি ভীম বিক্রমে চলেছেন লক্ষ্মীকান্ত ক্ষেত্রপালের মাঠে ; বিস্তীর্ণ সে ময়দান। ক্ষেত্রপাল দেবতার পূজা হয় সেখানে একটি বটবৃক্ষতলে বাঁধান বেদীর উপর—হিন্দু মুসলমানে নির্বিচারে দেয় পূজা ক্ষেত্র রক্ষার জন্য ফসল বৃদ্ধির জন্য—উৎকৃষ্ট -উৎকৃষ্ট চাষের জমি যেখানে, নীল বােনা হয় সেখানে। চারিদিকে নরমুণ্ড, অথচ নিকটে কেহ নাই, আকাশের নীলিমা, ঘাসের সবুজের সঙ্গে দূর দিক চক্ররেখায় যেখানে মিশেছে, সেই সীমান্তের বৃত্তের পরিধির রেখায় রেখায় দেখা যায় শুধু কালাে কালাে মাথা—আকাশের নীল আর ঘাসের সবুজ, মাথার কালাে চুলে কাল হয়ে গেল ; উত্তর দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিম ফঁাক নাই কোথাও। কে দেখাবে জমী ; কাকে দেবেন হুকুম-সাহেবের তরফের দু-এক জন লােক যারা ছিল-প্রমাদ গণিল তারা, মানুষের ঘেরের বৃত্ত রেখা ক্রমশঃ অপরিসর হতে লাগল অস্পষ্ট কোলাহল শােনা গেল। “মরিস সাহেবের শ্বাপদ দীর্ঘজীবী হও—নীল বানরের বানর দেখাও দেখি নাচ-নিজের মুখ পােড়ালে মুখ পােড়া, বংশের নাম ভােবালে মুখপােড়া–নিপাত যাও, নিপাত যাও -বসুন্ধরার বুক জোড়া হও।” জন মণ্ডলের ঘের এগিয়ে এসে চেপে পড়বার মত হলো আর পড়তে লাগলাে বাঁশের ঘােট ঘােট ঠেদ্দি প্রথমে একটি দু’টি তারপর রীতিমত বৃষ্টির ধারার মত-লক্ষ্মীকান্ত একবার এক দিকে ঘােড় নিয়ে আক্রমণ কর্তে যান সে দিকের লােকেরা তাঁর আক্রমণের সীমার বহুদূরে সরিয়া যায় আর অপর তিন দিক হতে পড়তে থাকে কঠোর ঠেৰ্দির বৃষ্টি, ক্রমাগত নিস্ফল প্রয়াসে লক্ষ্মীকান্ত ক্লান্ত হয়ে পলাে, ঘোড়া অথম হয়ে ধরাশায়ী হলাে তখন মাটিতে পড়ে লড়তে লাগলাে লক্ষ্মীকান্ত, বীরের মত লাঠি হাতে করে ঠেকাতে লাগলাে ঠেরি বৃষ্টি ; কিন্তু লক্ষ্মীকান্ত জখম ১৪১ অসাধ্য সাধন করা সব সময়ে সম্ভব হয় না; ঠেৰ্দির আঘাতে মাথায় জখম হয়ে পড়ে গেলেন লক্ষীকান্ত ; দানবের মত হুঙ্কার করে, রক্তস্বাদে মত্ত দুর্দান্ত বন্য পশুর মত এগিয়ে এল চিরদিনের লাঞ্ছিত বৰ্বর নামে উপেক্ষিত মানুষ পশুর দল পড়তে লাগল তাদের লাঠির বাড়ি ভূশায়ী নিরস্ত্র নিরুপায় দেওয়ানের উপর এতদিন সবল কাপুরুষের অত্যাচার দুৰ্বল কাপুরুষ সহ করেছিল মাথা পেতে অাজ নিয়তির বিধানে দুর্বল কাপুরুষ সবল হয়ে কাপুরুষের মতই প্রতিবিধানের বিচার কল্লো সবল কাপুরুষের উপর, তাকে নিরুপায় দুর্বল করে। হায় সাম্য! কোথায় তুমি থাক এই বৈষম্যের জগতে। “মানুষ কেন যে মানুষের প্রতি যমের মূর্তি ধারণ করে ব্যবহার করে, কে দিবে তার উত্তর ? পালিয়ে গেল সব সিপাহিরা লক্ষ্মীকান্তকে ছেড়ে। থাকলে শুধু একা জমাদার দেবী বক। এগিয়ে এল সে, আক্রমণকারীদের ভিড় ঠেলে—লাঠি রাখলে। নিজের বগলে—সেই হাজার হাজার লাঠিয়ালের মধ্যে একার লাঠি চালনা, বিড়ম্বনা। তখন নিষ্ঠাবান সেই ছত্রির ছেলে, বর্ষীয়ান অস্ত্রবিদ দারওয়ান অস্ত্র চালনা বন্ধ রেখে বেছে নিল সেই পথ—যুগ যুগ ধরে সকল দেশের সকল কালের বীরেরা যে পথ ধরে চলেছে, তর্ক যেখানে মৌন, যুক্তি যেখানে পৌছেনা হৃদয় যেখানে বিজয় ডঙ্কা বাজিয়ে এগিয়ে চলে, বুদ্ধিমানের বুদ্ধির দৌড় যার নাগাল না পেয়ে হতভম্ব হয়ে থাকে—সেই আত্মােৎসর্গের পথ। বাঘের মত থাবা গেড়ে পড়ল সে ভূশায়ী, মৃতপ্রায় দাওয়ানের উপর নিজের বুকের নীচে রাখল তার মাথা, আর পেতে দিল নিজের মাথা নিজের দেহ লাঠি বৃষ্টির জন্য।

১৪২
সেখহাটির নীলকুঠি
দুড়দাড় করে পড়ছিল লাঠির বাড়ি দুড়মুড়িয়ে নির্বিচারে—সহসা
যাদুকর যেন মন্ত্র পড়ে দিল—আর রুদ্ধ হয়ে রইল বদ্ধমুষ্টিতে উখিত
যষ্টি-
“সাবধান! জমাদারের গায়ে যেন বাড়ি না পড়ে বেজে উঠল
জনেকের কণ্ঠে মানবিকতার বাণী--অমনি ঘুমিয়ে পড়া মনুষ্যত্ব উঠলাে
জেগে—থেমে গেল তাদের লাঠি।
আধমরা দেওয়ানকে কাঁধে করে কুঠিতে ফিরিল জমাদার দেবী
বকস সিং।

হলুদ গাঁ লুটের কথা। দুর্দমনীয়তা-মানবের শিরায় শিরায়, অস্থিতে অস্থিতে মজ্জায় মজ্জায় শশাণিতে শশাণিতে আঁকা। “আমি বড় হব” এই প্রবৃত্তির মৃত্যুহীন বৃত্তি ধ্বনিত হচ্ছে এই সংসারের জন্ম মৃত্যু প্রবাহের লহরে লহরে। এই প্রবৃত্তিই চালিত করেছিল মরিস ও তাহার সমব্যবসায়ী নীলকর দলকে। বিদেশী তারা চেয়ে ছিল দেশজের উর্দ্ধে উঠতে । তুলেছিল তারা নীলের কুঠিগুলি দৃঢ় ভিত্তি করে, নদীর বাঁকে বাঁকে এমনি সুদৃঢ় স্থানে অনায়াসে যেখান হ’তে শত্রুসৈন্যের গতিরােধ করা যেতে পারে, মুহূৰ্ত্ত মাত্ৰ সংবাদে যাহাকে দুর্গে পরিণত করে রক্ষা কর্তে পারা যায় সেই সেই অঞ্চলের সকল লােকের আক্রমণের বিরুদ্ধে, যেথায় আশ্রয় নিয়ে কুঠিবাসীরা স্থানীয় অঞ্চলগুলি অবশে রাখতে পার্কে। সেই প্রবৃত্তির প্রতিক্রিয়ার প্রতিধ্বনি বেজে উঠেছে সকল দেশজের অন্তরে অন্তরে-আজ তারা চায় বিদেশী কুঠীওয়ালাকে বহিষ্কৃত করে দিয়ে নিজেরা বড় হতে। গভীর প্রশস্ত খাতে আসিয়া যেমন জমা ১৪৪ সেখহাটির নীলকুঠি হয় শত শত সঙ্কীর্ণ, অগভীর জলধারা, তেমনি মিলিতে লাগিল সহ সহস্র লােক পরেশনাথের নেতৃত্বের তলে চায় তারা তাকে বড় কর্তে, বিদেশীদের ছােট করে, নিজেরা বড় হওয়ার জন্য। খােলাপােতায় বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তি দেওয়া দেখে পরেশনাথের খাতির জমে গেল প্রজাদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকদের দল ছিল মুষ্টিমেয় পরেশনাথ কারাগার হতে বাহির হইয়া আসার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও রহিল আর—এক কাশীশ্বর ছাড়া পরেশনাথের বিরুদ্ধবাদী। তখন পরেশনাথ যাদের ঘর পোড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল তাদের ঘর তুলিয়া দিতে লাগিলেন আবার জমি জমা দিলেন। হলুদ গাঁয়ের মাতব্বরেরা এল, বল হুজুর ! মরিস সাহেব লুঠ করেছিলেন আপনার খােলাপােতার কাছারী আপনি লুঠুন হলুদ গায়ের মরিস সাহেবের কাছারী-দেখিয়ে দিন দেশে মরদ আছে, একা মরিস সাহেবই পুরুষ বাচ্চা নয়। পরেশ। হলুদগ। সেখহাটি কনসার্ণের অন্তর্গত, বরাবর মরিস সাহেবের দখল, খাজনা আদায় করেছে মরিস সাহেব দাখিলা দিয়েছে তার গােমস্তা কি করে আমার দখল সাব্যস্ত হবে ? মাতব্বর-কাগজ বদলান হুজুর ! গােমস্তার নামে নালিশ করুন—বিদ্রোহী হয়ে সে যােগ দিয়েছে মরিস সাহেবের সঙ্গে সমস্ত প্রজা আমরা দেব সাক্ষী—আমরা দিই খাজনা আপনার সেরেস্তায়—দিন হুজুর আমাদের দাখিলা বারাে বছরের লুঠ করুন কাছারী। পরখ করে নিন হলুদ গাঁয়ের লােক কাজে কথায় এক কিনা। গৌরবর্ণ ছিপ ছিপে হােকরা রামজয় মিত্র—পরেশ বাবুর সদর নায়েব। কুঞ্চিত তার কেশ পাশ, লম্বিত বঙ্কিম নাসিকা, বড় বড় ১৪৫ হলুদগাঁ লুটের কথা চোখের তারা ঈষৎ নীলাভ-ঘােড়ায় চড়ে এসে দাড়াল সে হলুদ- গায়ের কাছারী-সন্ধ্যার প্রাক্কালে-ঢুকে প’ল সেটান কাছারী ঘরের মধ্যে-মরিস সাহেবের গােমস্তা তুলসী বিশ্বাস বসে বসে কাজ কচ্চিল সেখানে। চিন্তত সে রামজয়কে। খাতির করে কাছে বসাল, ভৃত্যকে দিয়ে তামাক সাজিয়ে এনে দিল। শিষ্টাচারের কুশল প্রশ্ন কর্তে লাগল। গম্ভীর ভাবে তামাক টাতে টাতে তাকিয়া হেলান দিয়ে বসে বল্লে রামজয়- বিশ্বাস ! শিষ্টাচার রাখ, অনেক দিনের হিসাব বাকি ; হিসাব নিকাশ দাও, নয় চাকুরী হতে বরখাস্ত হও। তুলসী বিশ্বাস যেন আকাশ হতে প’ল, সে অবাক হয়ে বল্ল, কিসের হিসেব নিকেশ মিত্তিরমশায়—এ কাছারী যে মরিস সাহেবের, আপনার বাবুর কোনও হিসেব তত এ সেরেস্তায় নেই— গর্জন করে বল্পে-রামজয় বিশ্বাসঘাতক! এতদিনের নেমক ভুলে গিয়ে একেবারে যােগ দিলে মরিস সাহেবের সঙ্গে—যাও, বরখাস্ত কল্লাম আজ হ’তে, চুনি মিত্র হলাে নূতন গােমস্তা, দাও সিন্দুকের চাবি তাকে যদি জান্ রাখতে চাও তাে মুখ বুজে হুকুম পালন কর— তুলসী বিশ্বাস চেয়ে দেখল ঘর ভরে গেছে রামজয়ের লেঠেলে খােলাপােতা কাছারীর মারের খবর অতিরঞ্জিত হয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে—তুলসী ভয়ে আধমরা হয়ে গেল, কোমর হতে চাবির গােছ ফেলে দিয়ে সটান দৌড় মাল্লে সে। হলুদ গায়ের কাছারী পরেশ বাবুর দখলে এলবার বৎসরের খাতা প্রস্তুত হয়ে গেল—পরেশ বাবুর জয় শব্দে আকাশ পূর্ণ করে সম্বৎসরের খাজনা একদিনে দিয়ে দিল প্রজারার বদলে নিল তারা বার বৎসরের দাখিলা । ১০ ১৪৬ সেখহাটির নীলকুঠি মরিস সাহেব নালিশ করল পরেশবাবুর নামে, প্রজাদের নামে- দাখিলা দাখিল করে প্রজারা বলতে লাগল তুলসী পরেশবাবুর গােমস্তা, পরেশবাবুর হয়ে খাজনা আদায় কৰ্ত্ত—এখন মরিস সাহেবের বাধ্য হয়ে মিছে কথা বলছে। আদালতে দাখিল দাখিলা দেখতে দেখতে তুলসী বিশ্বাস চমকাইয়া উঠিল—১১ই কার্তিক ১২৬০ সাল রয়েছে লেখা একখানা দাখিলাতে সহি শীতুলসী বিশ্বাস—তুলসী দেখিল স্বাক্ষর করেছে জাল, হুবহু তারি স্বাক্ষরের মত, কিন্তু ১১ই কার্তিক ১২৬০ সালে সে ছিল পুরীধামে ওঙ্কার পাণ্ডার কাছ থেকে ধার করেছিল সে ১৫ টাকা—শােধ করেনি সে টাকা এখনাে আছে সেই পাণ্ডার খাতায় তার স্বাক্ষর সমেত সেই টাকা ধার দেওয়া লেখা। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব গােপন জরুরী পত্র লিখে দিলেন পুরী ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে—হস্তগত করে সেই খাতা পাঠিয়ে দিতে তার কাছে। গুপ্তচর নিয়ে এল সংবাদ ; রামজয় পরেশনাথকে বল্ল “চিন্তা নাই হুজুর! গভর্ণমেন্টের আঠার মাসে বৎসর। সরকারি লােক পৌছাবার আগে, উদ্ধার করে অবিবা খাতা আমি। পায়ের ধুলি দিন।” থলে ভরে দিলেন টাকা পরেশনাথ, দিলেন হুকুম তাকে, রেহাই দেবেনা নিজেকে, রেহাই দেবেনা ঘােড়াকে, অতিরিক্ত মেহনতে যদি ঘােড় মরে যায়, নৃতন ঘােড় কিনে নিয়ে ঝড়ের মত চলে যাবে। ওঙ্কার পাতা গান করে গীত গােবিন্দ পাঠ কচ্ছিলেন-রামজয় মিত্র আসিয়া সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলি লইয়া জিহ্বাগ্রে দিল। তাহার ভক্তিতে পাণ্ডা ঠাকুর গলিয়া গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই রামজয়, তুলসী বিশ্বাস বলে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আলাপ জমিয়ে তুললেন। পাণ্ডাজী খাতা খুলে তুলসীর নিকট নিজের প্রাপ্য জানাইয়া দিলেন। দিলেন। পাণ্ডার হলুদগাঁ লুটের কথা ১৪) প্রাপ্য টাকা শােধ করিয়া দিয়া প্রণামী স্বরূপ আরও পাঁচ টাকা দিয়া খাতা খানি হস্তগত করিলেন ও পাণ্ডার সামনেই পােড়াইয়া ফেলিলেন। তিলার্ধ সময় ব্যয় না করিয়া পুনরায় অশ্বপৃষ্ঠে রামজয় দেশে ফিরিলেন। তিন দিন পরে পুরী কলেক্টারের লােক যখন সেখানে পৌছিল, দেখিল বামাল উধাও বেমালুম-রামজয়ের শিক্ষায় পাঠাকুর ধারের কথাটা একেবারে অস্বীকার করিল। মরিস সাহেব মকদ্দমা হারিল-হলুদ গাঁয়ের কাছারী পরেশের দখলে আসিল।

কারাগারে নেলি ( ৩১ ) গভীর রাত্রি ; নেলি লােহার স্প্রিংয়ের খাটে সুখসুপ্ত। মরিস কুঠিতে নাই মকদ্দমার তদ্বিরে জেলায় গিয়াছে। অতি সতর্কতার সহিত ফিলিপস কয়েকজন দস্যুর সহিত ঘরে প্রবেশ করিল। ক্লোরোেফমে ভেজান রুমাল নেলির নাসিকায় ধরিল। ঘুমাইতে ঘুমাইতে নেলি অজ্ঞান হইয়া পড়িল। বিছানার তলা হইতে চাবি লইয়া লােহার সিন্দুক খুলিয়া ফিলিপস মরিসের যথাসর্বস্ব চুরি করিল। সকলে মিলিয়া নেলির অচৈতন্য দেহ উদ্ধে তুলিয়া লইয়া প্রস্থান করিল। মহাকালী মন্দিরের সংলগ্ন মহাশ্মশান। গভীর নিশীথে ধ্যানমগ্ন ছিলেন সেখানে পবিত্ৰানন্দ স্বামী-নেলির অচৈতন্য দেহ নৌকায় লইয়া ফিলিপস ও দস্যগণ সেই শ্মশানঘাট বাহিয়া চলিয়া গেল। পবিত্ৰানন্দের ধ্যান ভাঙ্গিয়া গেল তিনি নৌকা অনুসরণ করিলেন। অন্ধকার পাতাল ঘরে নেলি কারারুদ্ধ। ফিলিপস তাহাকে রামনগর কুঠিতে রাখে নাই। তিন দিকে কল্লোলময়ী যমুনা, অপর দিকে খাল, এই চতুর্দিক জলবেষ্টিত যাদবপুরের দুর্গম দ্বীপের দুর্গে সে আবদ্ধ। এই দুর্গে কারাগারে নেলি ১৪১ বিদ্রোহ-ধ্বজা উড়াইবে বলিয়া ফিলিপস তাহার অস্ত্রশস্ত্র রসদ অর্থ প্রভৃতি সঞ্চয় করিতেছে—সৈনিক পুরুষে দুর্গ পরিপূর্ণ করিতেছে ; যুদ্ধ- ছিপের বহরে নদী পুরিয়া উঠিয়াছে- নেলি আজ তিন দিন আবদ্ধ। রামীর মা ছিল পাহারায় ; আজ আসিয়াছে ক্ষেত্ৰমণিক্ষেত্ৰমণি ফিলিপসের সর্বনাশ করিবে বলিয়া দৃঢ়- সঙ্কল্প হইয়াছিল তাই তার মন যােগাইয়া ফিলিপসের বিশ্বাসপাত্রী হইল-- নেলিকে সে আশ্বস্ত করিয়া গিয়াছে, বলিয়া গিয়াছে যেমন করেই হোক সে তার অবরােধের স্থান তাহার স্বামী ও বন্ধুদের জানাইবে। গুপ্ত পথ দিয়া ক্ষেত্ৰমণি বাহির হইয়া গেল—অশ্বথ তলে নদী তীরে পবিত্ৰানন্দ বসিয়া, সঙ্গে মরিসের কর্মচারী, সেখানে ক্ষেত্ৰমণি গিয়া বলিল সকল ঘটনা -পবিত্র চিঠি লিখিয়া দিল, মরিসের কমচারী অতি ত্ৰন্ত চলিয়া গেল—সহসা উপযুপরি বন্দুকের শব্দ—গুলীতে ক্ষতবিক্ষত দেহ হতে ভূমিপরি হইলেন পবিত্ৰানন্দ স্বামী–হুঙ্কার করিয়া বাহির হইয়া এল ফিলিপস, সঙ্গে ভীমদেহ অনুচর। ক্ষেত্ৰমণির কেশাকৰ্ষণ করিয়া তাহাকে গাছে ঝুলাইয়া দিল ফাসী। তারপর তার নির্জীব দেহ দিল ফেলাইয়া নদীর জলে—পবিত্ৰানন্দের গুলীত অচৈতন্য দেহও দিল ফেলাইয়া নদী জলে। নেলির নিকটে গিয়া বিকট-হাস্যে ফিলিপস বলিল—এখন ইও আমার আজ্ঞাবর্তী, নয় এই বন্দুকের গুলীতে তােমার জীবনের লীলা শেষ করে দেব। নেলি। তােমার কথা শােনা অপেক্ষা বন্দুকের গুলীতে মরা আমার সহস্র গুণে ভাল। ফিলিপস অট্টহাস্যে বলিল—ও ধনি ! অত সহজে তােমাকে কিলিপস ছাড়বে না।

সেখহাটির নীলকুঠি
পার হয়ে গেল নেলির মুখ ; সহসা সে ছুটে গিয়ে সবলে চেপে
ধল্লো নিয়ামক যন্ত্রের কল।
“সয়তানি, প্ৰেতিনি কল্লি কি” বলে ফিলিপস রিভলভারের বাঁট দিয়ে
নেলিকে আঘাত কর্তে গেল।
অন্ধকারকে আরও অন্ধকার করে ধেয়ে এল সগর্জনে যমুনার জল
ভীষণ উল্লাসে ভাসাইয়া নিল ফিলিপস ও নেলিকে। নিয়ামক যন্ত্রের কল
অজ্ঞাতসারে নেলি টিপিয়াছিল।

পরিণাম। ( ৩১ ) ষড়যন্ত্র প্রকাশ হইয়া গিয়াছে। ফিলিপসের সমস্ত সম্পত্তি সরকারে বাজেয়াপ্ত হইয়াছে। ফিলিপস জলে ডুবিয়া মরিয়াছে—নেলি বাঁচিল। লাটসাহেবের তদন্তের ফলে বাধ্যতামূলক আইন প্রত্যাহার করা হইল—প্রজাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নীল বুনিতে হইল না। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নীল প্রস্তুত হইতে লাগিল। তাহার সহিত প্রতিযােগিতায় চাষের নীল পারিয়া উঠিল না। একে প্রজার চাষ করিতে অনিচ্ছা, চাষকরার লােকাভাব, তারপর বাজারে নীলের দর কম হওয়ায় মরিস সাহেবের বহু টাকা লােকসান হইল-নীলের চাষ সে ছাড়িয়া দিল। সেখহাটির কুঠি বিক্রয় করিয়া মরিস ও নেলি বিলাতে চলিয়া গেল- পরেশবাবু সেখহাটির কুঠি কিনিয়া লইলেন। গভর্ণমেন্ট পরেশবাবুকে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট করিয়া দিলেন। কাশীশ্বর কুটুম্ব বাড়ী যাইতেছিল। পথের মধ্যে বিষম জল মধ্যে বাদল নামিল ; তিন দিনের মধ্যে বাদলধারা কমিল না। চতু দিনে দেখা গেল বজাঘাতে কাশীশ্বর মারা গিয়াছেন। তাহার মৃত কাদার মধ্যে পড়িয়া রহিয়াছে। বহুদিন পরে সুলােচনা ও পরেশ এলেন সেখহাটিতে। কিশোরীমোহ সেখহাটির নীলকুঠি এখন পরেশনাথের সেখহাটির কুঠির নায়েব। লক্ষ্মীকান্ত প্রহারের ফলে ক্রমাগত ভুগিয়া রক্তবমি করিতে করিতে বিষম দারিদ্র্যের ভিতর মারা গিয়াছেন! তাহার ইন্দ্রপুরীর মত প্রকাণ্ড প্রাসাদের ইটখানি পর্যন্ত বিক্রয় হইয়া গিয়াছে— হরিশচন্দ্র নীলকুঠিয়ালদের সহিত মকদ্দমা করিতে করিতে সর্বস্বান্ত হইয়া মারা গিয়াছেন। পরেশনাথ তঁাহার অকৃত্রিম বন্ধু হারাইয়াছেন। পরেশনাথ এখন জেলার চার্জে ম্যাজিষ্ট্রেট হইয়াছেন।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sekhhatir Nilkuthi

Author
Mukhopadhya, Saileshnath
Title
Sekhhatir Nilkuthi
File name
Sekhhatir Nilkuthi
Text
OCR done
Citation
1860
Published
2009/10/5
Publisher
Sri Makham Lal Piplai, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
166
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Setangini O Sannyasi
DLI number
513247
Barcode
4990010020243.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
sBFyJjbEOuh
Download PDF

Sekhhatir Nilkuthi