Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Gajayubbed-sanhita Part 1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
গজায়র্ধ্বেদ-সংহিতা
ঐথম ভাগ
শ্রীশশিকান্ত আচার্য চৌধুরী-কর্তৃক
সঙ্কলিত
**
মূল্য প্রথম খণ্ড২ টাকা
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
মৈমনসিং প্যালেস হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।
২নং রামবাগান স্ট্রীট, ভারতমিহির যন্ত্রে
মীরিকরণ রক্ষিত যারা মুদ্রিত।
ভূমিকা। মঙ্গলময় পরমেশ্বরের করুণায় গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতার” মৰ্ম্মানুবাদ মাতৃভাষাসেবী মহােদয়গণের করকমলে সমৰ্পণ করিতে সমর্থ হইলাম। এই গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা” শ্বের উৎপত্তি বিবরণ। বঙ্গভাষায় লিখিত অভিনব এন্থ নহে। নানাধিক সার্ধ সহস্র বৎসর পূর্বে দেশাধিপতি (*) নােমপাদ নরপতির প্রার্থনাক্রমে মহর্ষি পালকাপ্য, সংস্কৃত গদ্য ও পদ্যময়ী মধুর ভাষায় ইহা রচনা করিয়া গিয়াছেন। গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা প্রাচীন ভারতীয় সেনার প্রধান অঙ্গ মাতঙ্গ সমূহের সর্বোৎকৃষ্ট চিকিৎসা গ্রন্থ। তখনও এই গ্রন্থকে অদ্বিতীয় বলা চলিত না। কারণ এই গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতাতেই আরও দুইখানি হস্তি চিকিৎসা গ্রন্থের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। তন্মধ্যে একখানি অতি পুরাতন, ভগবান বেদব্যাস বিরচিত এবং অপরখানির গ্রন্থকারের নাম উল্লেখ নাই। দুর্ভাগ্যক্রমে অধুনা উল্লিখিত গ্রন্থদ্বয়ের অস্তি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হইয়াছে। বর্তমান পাশ্চাত্য বিজ্ঞানবিদ পণ্ডিতগণের মতে বিশ্বশিল্পীর সৃষ্টিরাজ্যে, কি জড়, কি চেতন, সকল প্রকার সৃষ্ট পদার্থের সৃষ্টিতত্ত্বেই এক অদ্বিতীয় নীতি বিদ্যমান। এন্থের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। এই মহাসত্য যে কেবল সম্প্রতিই আবিষ্কৃত হইয়াছে এমন নহে নূনাধিক সার্জসহস্রাব্দী পূর্বে লিখিত এই গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতাতেও উল্লিখিত মহাসত্যের জ্ঞান প্রতিভাত হয়। যােগশক্তিসম্পন্ন মহর্ষি পালকাপ্য মাতঙ্গদেহের উপাদান বিশ্লেষণ করিয়া তাহাতে মানব দেহের উপাদানের সৌসাদৃশ্য প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন এবং বারণগণের রােগ প্রতীকারার্থ প্রাচীন মানবীয় চিকিৎসাগ্রন্থ “সুশ্রুত সংহিতা” প্রভৃতিতে অবলম্বিত চিকিৎসা নীতিরই অনুসরণ করিয়াছেন ।। ইহাতেও পৰ্যায়ক্রমে প্রায় ৩১৫টী রােগের নিদান, লক্ষণ ও চিকিৎসা লিখিত হইয়াছে। এক রােগের অবস্থা ও নিদান (কারণ) ভেদে একাধিক ঔষধ লিখিত আছে। এই গ্রন্থেও মহর্ষি পালকাপ্য সুশ্রুত-সংহিতাদির ন্যায় উদ্ভিজ্জ, প্রাণিজ ও খনিজ প্রধানতঃ এই বিবিধ ঔষধ প্রয়ােগ করিতেই উপদেশ করিয়াছেন। গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা যে সময়ে রচিত হইয়াছিল সে সময়ে মুদ্রান্ত্রের প্রচলন ছিল না। সুতরাং তাদৃশ সুবৃহৎ গ্রন্থের প্রতিলিপি অতি অল্পই হইয়াছিল সন্দেহ প্রতিলিপি প্রদ। নাই। যে সকল লেখক উহার প্রতিলিপির ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে কোনও লেখক স্বীয় বিবেকানুমােদিত অংশ মাত্রের প্রতিলিপি গ্রহণ করিয়াছিলেন, কেহ * বর্তমান বেহার প্রদেশের অন্তর্গত গঙ্গার দক্ষিণ তীরবর্তী দেশ প্রাচীন ভারতে “অঙ্গদেশ” নামে পরিচিত । এই গজায়ুর্বেদেও ৰাত পিও, কই, মক্ত প্রভৃতি দৈহিক উপাদানের বিকার প্রতীকার অবলম্বন করিয়া চিকিৎসা লিখিত হইয়াছে।
• বা চিকিৎসা অংশ পরিত্যাগ করিয়া কেবল আখ্যায়িকা ভাগকে চিত্রকাব্যরূপে পরিণত করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। ফলকথা যে তিন চারিখানি হস্তলিখিত পুস্তক প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহার একখানিও সম্পূর্ণ এবং অভ্রান্ত নহে। তদ্ভিন্ন তাহার বহু অংশ কীটদষ্ট ও ছিন্ন হইয়া গিয়াছে। জয়পুর নিবাসী মহানুভব পণ্ডিত শিবদ শৰ্মা, গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতার মুদ্রাক্ষণকালে বিভিন্ন প্রদেশ হইতে তিনখানি হস্তলিখিত পুস্তক সংগ্রহ করিয়াছিলেন। উক্ত গ্রন্থ তিনখানির একখানিতেও প্রথম অংশ অর্থাৎ গজোৎপত্তি বিবরণ এবং ভদ্র, মন্দ, মৃগ ও সঙ্কীর্ণ প্রভৃতি মাতঙ্গের লক্ষণ লিখিত নাই। আমি বায়ু পরিবর্তনের নিমিত্ত দাক্ষিণাত্যে (Ootacamund-ওটাকামণ্ড) প্রবাসকালে তাঞ্জোর (Tanjore) পুস্তকালয় হইতে নেলীচেরী পালঘাট (মান্দ্রাজ ) নিবাসী শ্ৰীমান শিবরাম অয়ারের সাহায্যে যে একখানি হস্তলিখিত গ্রন্থের প্রতিলিপি প্রাপ্ত হই, উহাতে কেবল প্রথম অংশ অর্থাৎ গঙ্গোৎপতির বিচিত্র আখ্যায়িকা এবং ভদ্র, মন্দ, মৃগ ও সঙ্কীর্ণ প্রভৃতি বিবিধ প্রকার মাতঙ্গের লক্ষণ মাত্র লিখিত আছে, চিকিৎসা সম্বন্ধে কোন কথাই তাহাতে নাই। ফলতঃ পণ্ডিত শিবদভ শৰ্মার মুদ্রাঙ্কিত পুস্তক ও তাঞ্জোর পুস্তকালয় হইতে প্রাপ্ত হস্তলিখিত পুস্তক একত্র করিলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে উভয় অংশই এক গ্রন্থকারের লিখিত একই গ্রন্থ এবং উল্লিখিত গ্রন্থদ্বয়ের প্রথম অধ্যায় প্রায় একই ভাষায় লিখিত ইহাও তাহার অন্যতম প্রমাণ। এই নিমিত আমরা উভয় গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের মর্মানুবাদ একত্র করিয়া প্রকাশ করিলাম এবং পরে তাঞ্জোর পুর লয় হইতে আনীত পুস্তকের আট অধ্যায়ের মর্মানুবাদ প্রদান করিয়া তৎপরে পণ্ডিত শিবদত্ত শৰ্ম্মার মুদ্রাঙ্কিত গজায়ুৰ্বেদ সংহিতার” মৰ্ম্মানুবাদ প্রদান করা সমীচীন মনে করিলাম। এক সময়ে যাহাই থাক, বর্তমান সময়ে কিন্তু হস্তিচিকিৎসা সম্বন্ধে কোনও সম্পূর্ণ পুস্তক প্রাপ্ত হওয়া যায় না। পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণের যত্নে গাে, অশ্ব, কুকুর প্রভৃতি গৃহ পালিত পশুর চিকিৎসা সম্বন্ধে অনেক পুস্তক রচিত হইয়াছে বটে কিন্তু প্রয়ােজনভাব বশতঃ তাহারা হস্তীর চিকিৎসা সম্বন্ধে বিশেষ কোন গ্রন্থ রচনা করেন নাই এবং তাদৃশ একথানি গ্রন্থের অভাবে এদেশে যে বহু হস্তী অকালে কাল কবলে নিপতিত হয় এবিষয়ে কোনও সংশয় নাই। আমি এই অভব কিয়ৎপরিমাণে দূর করিবার উদ্দেশ্যে মহর্ষি পালকাপ্য বিরচিত “গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতার” মৰ্ম্মানুবাদ ও তাহার প্রত্যেক নােগের চিকিৎসার পরে পরে অপর তিনখানি পুস্তকে লিখিত সেই সেই রােগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সঙ্কলন করিয়া প্রকাশ করিলাম। বলা বাহুল্য যে, গ্রন্থ স্বত্বাধিকারীদিগের সম্মতিক্রমেই এইরূপ গ্রহণ করা হইল। তদ্ভিন্ন তাহারও নিয়ে যে ঔষধ কাহারও নাম নির্দেশ না করিয়া লিখিত হইল তাহা আমার স্বীয় অতিক্ততার ফল। উল্লিখিত তিনখানি পুস্তকের মধ্যে (ক) প্ৰথমখানি পীরগাছার অন্যতম ভূস্বামী শ্ৰীযুত জ্ঞানেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী মহাশয় কর্তৃক প্রণীত (খ) দ্বিতীয় প্রানি মুক্তাগাছা নিবাসী স্বর্গীয় কেশব চন্দ্ৰ আচাৰ্য মহাশয়ের প্রণীত এবং (গ) তৃতীয় খানি ডাক্তার জি, এইচ, ইভেন (Dr. G. H. Evans) প্রণীত। শেষােক্ত পুস্তকখানি ইংরেজি ভাষায় লিখিত। আমি যথাক্রমে (ক) (খ) (গ) চিহ্ন দ্বারা এই তিন খানি পুস্তকের মত কৃতজ্ঞতার সহিত গ্রহণ করিলাম। !
চিকিৎস্য প্রাণীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও অঙ্গ সন্ধিসমূহ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান না থাকিলে চিকিৎসকের ভ্রম জন্মিবার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে, এই নিমিত্ত প্রথমে একখানি হত্তি কঙ্কাল প্রতিকৃতি জ্ঞান। হকিঙ্কাল প্রতিকৃতি এবং উহার বিভিন্ন অবয়বের নাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ চিকিৎসা সৌকৰ্য্যার্থ প্রদত্ত হইল। যদি ভগবৎকৃপায় উদ্দেশ্য কিয়ৎপরিমাণেও সফল হয় তাহা হইলে পরবর্তী মুদ্রাঙ্কণে মাতঙ্গদেহের তথ্য সমূহের বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রদানের ইচ্ছা রহিল। ভৈষজ্য পরিচয়ের অভাব ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্র চর্চার আর এক প্রধান অন্তরায়। পুরাতন ভারতবাসিগণ যে সকল তরুলতার যে সকল সংজ্ঞা প্রদান করিয়াছিলেন, সার্ধ সহস্র বৎসর পরবর্তী ভারতবাসিগণের নিকটে তাহা অপরিচিত থাকাই স্বাভাবিক। তদ্ভিন্ন জল, বায়ু ও স্থান- ভেদে তরু লতাদির আকৃতির ও অম্লাধিক পরিমাণে পরিবর্তন ঘটিয়াছে সন্দেহ নাই। একই তরু কিংবা লতা, সমতল প্রদেশে জন্মিলে তাহার আকৃতি যেরূপ হয়, পার্বত্য প্রদেশে জন্মিলে ঠিক সেইরূপ হয় না, ইহা প্রত্যক্ষ সিদ্ধ । সুতরাং গজায়ুৰ্ব্বেদে ঔষধের বিস্তৃত তালিকা ও উল্লিখিত ওষধি সমূহের মধ্যে যে সকল ওষধির নামের একাধিক অর্থ বিবিধ ভাষায় নাম আছে অনুবাদে তাহাদিগের প্রকৃত অর্থ গ্রহণে ভ্ৰম প্রমাদ অসম্ভব নহে। তথাপি আমি প্রভূত পরিশ্রম সহকারে “নিঘণ্ট, ও দ্রব্যগুণ বিচার” প্রভৃতি পুস্তকের সাহায্যে, যতদূর সম্ভব সাবধানতার সহিত, বহু অর্থযুক্ত কিংবা বিপরীত অর্থযুক্ত শব্দের প্রকৃত অর্থ গ্রহণে যত্ন করিয়াছি। তদ্ভিন্ন ঔষধ সমূহের বিভিন্ন ভাষায় নাম এবং যে যে ঔষধ যে যে অধিকারে ব্যবহৃত হইয়াছে তাহার বিস্তৃত তালিকা চিকিৎসা সেকৰ্য্যার্থে গ্রন্থের শেষে সংযযাজিত করা হইল। দুরদর্শী ঋষিগণ বা বিজ্ঞানাচার্যগণ কেবল রােগ প্রতীকারার্থ ঔষধ নির্বাচন করিয়াই ক্ষান্ত হয়েন নাই, তাহারা কিরূপ সময়ে কিরূপ স্থান হইতে ওষধি ওষধি সংগ্রহের স্থান ও কাল- সংগ্রহ করা কর্তব্য, তাহারও উপদেশ করিয়া গিয়াছেন; কারণ পূর্ণ বীৰ্য্য ঔষধই চিকিৎসকের সফলতা লাভের অন্যতম উপায়। এই নিমিত্ত আমাদের গজায়ুৰ্বেদ পাঠকের স্মরণে রাখিতে হইবে যে কৃষ্ণবর্ণ, গৌরবর্ণ কিংবা লােহিত বর্ণ সমতল ভূমি, যাহার অনতিদূরে স্বচ্ছ সলিল পূর্ণ জলাশয় বিদ্যমান থাকে এবং যে স্থানের মৃত্তিকা স্নিগ্ধ ও মৃদু, তাদৃশ ভূমি হইতেই ওষধি সমুদয় গ্রহণ করা আবশ্যক। পক্ষান্তরে বল্মীক, অনুপ প্রদেশ (জলাভূমি), শ্মশান, উষর ভূমি (ক্ষার মৃত্তিকা) কিংবা পথপার্শ্বে উৎপন্ন ওষধি সমূহ সৰ্বথা বর্জনীয়। তদ্ভিন্ন কীটদষ্ট অগ্নিসন্তপ্ত এবং হিম ব্যাপ্ত ওষধি সমুদয় কখনও পূর্ণবীৰ্য্য হইতে পারে না। যে সকল ওষধির স্বরস ঔষধে ব্যবহারার্থ প্রয়ােজন তাহা শরৎকালে গ্রহণীয়। সেইরূপ বিরেচন ও বমন কাৰ্যোপযােগী ওষধি সমুদয় বসন্তকালে সংগ্রহ করা কর্তব্য। কোন কোনও বিজ্ঞানাচার্যের মতে শীতকালে মূল জাতীয়, বর্ষা ঋতুতে পত্র জাতীয়, শরৎ কালে ত্বক জাতীয়, হেমন্তকালে ক্ষীর জাতীয়, বসন্তকালে সার জাতীয় এবং গ্রীষ্মকালে ফল জাতীয় নিয়।
• ওষধি সমূহ গ্রহণ করা বিধেয়। এই পুস্তকের পরিশিষ্টে ওষধি-তথ্য যতদূর সম্ভব বিস্তৃতরূপে প্রদান করিবার অভিলাষ থাকিল। মানবগণ, এই কর্মময় বিশ্বের বিবিধ কর্মক্ষেত্রে নিরন্তর কৰ্ম্ম করিয়া জগতের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি এবং স্বীয় জীবনের সফলতা লাভ করিতেছেন সত্য, কিন্তু চিকিৎসকের দায়িত্ব। সকল কার্য্যেরই দায়িত্ব সমান নহে। একটুকু স্থিরভাবে চিন্তা করিলে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয় যে একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব কত মহৎ! চিকিৎসকের প্রতিভা কত তীক্ষ, প্রকৃতি কত গম্ভীর, চরিত্র কত চঞ্চলতা-বিহীন হওয়া আবশ্যক! বােগনির্ণয়কালে কতদূর সাবধানতার সহিত রােগের নিদান ও লক্ষণের প্রতি লক্ষ্য করিতে হয় তাহা বিজ্ঞ ব্যক্তি- মাত্রেই অবগত আছেন। বস্তুতঃ যাহার সামান্য একটুকু ভ্রমের ফল রােগীর মৃত্যু বা মৃত্যুবৎ তীব্র ক্লেশ, তাহার কর্মের দায়িত্ব যে সর্বাপেক্ষা সমধিক তাহার কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। প্রত্যেক চিকিৎসকেরই এ কথা স্মরণে থাকা আবশ্যক। জড় বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানবের রােগ নির্ণায়ক “তাপমান যন্ত্র প্রভৃতি যন্ত্রের আবিষ্কারের ফলে মানব জাতির চিকিৎসা অপেক্ষাকৃত সুগম হইয়াছে মূক প্রাণীর চিকিৎসার বৈশিষ্ট্য সংশয় নাই। এতদ্ভিন্ন প্রকৃষ্টজ্ঞানসম্পন্ন মানব স্বীয় আভ্যন্তরিক বা বিশেষত্ব। যন্ত্রণা ভাষার সাহায্যে চিকিৎসকের নিকটে বিবৃত করিয়া রােগ নির্ণয় বিষয়ে তাহার সবিশেষ সহায়তা করিতে পারেন । কিন্তু মাতঙ্গ প্রভৃতি মুক (বাক্শক্তিহীন) প্রাণীর রােগ নির্ণয় কল্পে তাদৃশ কোনও সাহায্যের সম্ভাবনা নাই। কেবল রােগের বহিলক্ষণ এবং মল মূত্রাদির অবস্থা পরীক্ষা দ্বারা উহাদিগের রােগ নির্ণয় করিয়া চিকিৎসায় প্রবৃত্ত হইতে হইবে। সুতরাং আমাদের এই গজায়ুৰ্বেদ সংহিতার পাঠককে সর্বদা স্মরণে রাখিতে হইবে যেতাহার দায়িত্ব মানবের চিকিৎসকের দায়িত্ব অপেক্ষা নিঃসংশয়ে সমধিক। যদি কেহ, এই গ্রন্থের সাহায্যে এতাদৃশ দায়িত্বপূর্ণ হস্তি চিকিৎসা কার্যে ব্রতী হইতে অভিলাষ করেন, তাহার প্রতি আমাদের এই অনুরােধ যে তিনি যেন এই পুস্তকখানি বিচার বুদ্ধি সহকারে একবার আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া লন,এবং যাহাদিগের অন্তঃকরণে মাতঙ্গগণের প্রতি সদয়ভাব বিদ্যমান আছে, কেবল তাহারাই এই কার্যে ব্রতী হইবেন, ইহা ভগবান পাকাপ্যের এক প্রকার অনুরােধ। কোনও মাতঙ্গ চিকিৎসক, যদি বিবেচনা করেন যে ঈশ্বর প্রদত্ত ধীশক্তি কেবল মানবেরই নিজস্ব, তাহা হইলে তিনি নিতান্তই ভ্ৰম করিবেন। বস্তুতঃ ইতর প্রাণীদিগের বিশেষতঃ বারণ- গণের বুদ্ধি শক্তি নিতান্ত অল্প নহে। বুদ্ধিশক্তিসম্পন্ন মাতজাতি স্বভাবতঃ সন্দিগ্ধচিত্তও বটে। সুতরাং তাহাদিগের রুগ্ন অবস্থায় কেবল চির পরিচিত পরিচর্যাকারী ব্যতীত অন্য কোনও লােকের উহাদিগকে শুশ্রুষা করিতে চেষ্টা করা উচিত নহে; কারণ অপরিচিত লােকের আদেশ বা উপদেশে, উহারা, বিল ঔষধ সেবন কিংবা আপাত ক্লেশকর ঔষধের বহিঃ প্ৰয়ােগ করিতে * বিগ, বিনীতে সেবা গ্রন্থাৰ্থ-প্রতিপত্তিমান; নৃপতুল্য প্রিয়া-ভাষী, মহাভােগ পরিগ্রহঃ বাগ্মী প্রগলঃ ও ধুতিমান ধাম্মিকঃ শুচিঃ, মৌলেহিনুরক্তো মধূর কুলীন প্রশস্থতে। গঞ্জাম ৪৭ ৪৮ শ্লোক।
বিপ্ন। দিবে কেন? বিশেষতঃ নেত্রদােগাক্রান্ত বারণগণের নিকটে অপরিচিত লােকের গমন করা বিপদ- জনক বলিয়া বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগণের মতে একান্ত নিষিদ্ধ। অনুবাদ কাৰ্যটি স্বাভাবতই দুষ্কর এবং সময়সাপেক্ষ ; বিশেষরূপে সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ। সংস্কৃত ভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেই অবগত আছেন যে, গজায়ুর্বেদ সংহিতা অনুষদের সংস্কৃত গ্রন্থে বহু অর্থযুক্ত শব্দের মধ্যে অনেক শব্দ এমন আছে যাহাদের অর্থ পরস্পর সম্পূর্ণ বিপরীত * । এইরূপ বিপরীতার্থ যুক্ত শব্দময়ী ভাষার অনুবাদ কার্য কিরূপ দুরূহ তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। বিশেষতঃ গজায়ুৰ্বেদ সংহিতার ন্যায় অপ্রচলিত প্রাচীন পশু চিকিৎসা গ্রন্থের অনুবাদ সম্বন্ধে একথা সম্পূর্ণ রূপে প্রযােজ্য। এই গ্রন্থের কোনও ভাষ্য বা টীকা প্রভৃতি অনুবাদে সাহায্য প্রাপ্ত হইবার যােগ্য কিছুই নাই। এমন কি মুদ্রাঙ্কিত পুস্তক খানিতেও বহু পৃষ্ঠায় কীট দষ্ট কিংবা লিপি প্রমাদ- যুক্ত স্থান সমূহ অদ্যাবধি শুন্য রহিয়াছে। ঐ সকল শূন্য স্থানের অর্থজ্ঞানের অভাবে তাহার অব্যবহিত পূর্ববর্তী বা পরবর্তী স্থান সকলের অর্থও অনেক পরিমাণে দুর্বোধ হইয়া রহিয়াছে। কারণ শব্দার্থজ্ঞান দেশ ও কাল অনুসারেই হইয়া থাকে । ঈদৃশ অবস্থায় গজায়ুৰ্বেদসংহিতার বঙ্গানুবাদ রূপ দুরহ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার কার্য করা হইয়াছে সন্দেহ নাই; কিন্তু কোনও ব্যক্তি এইরূপ দুঃসাহসিক কার্যে হস্তক্ষেপ না করিলে মাতৃ ভাষার একটা কমনীয় অঙ্গ অসম্পূর্ণ এবং একনিষ্ঠ সাধক আর্য ঋষির এই অমর কীর্তি স্বদেশবাসীর চির অপরিজ্ঞাত থাকিয়া যাইত। যাহা হউক, এই সকল নানাবিধ উদ্দেশ্য লইয়া আমি এই গজায়ুৰ্বেদ সংহিতার মর্মানুবাদ প্রকাশে প্রবৃত্ত হইয়াছি। উদ্দেশ্য সাধনে যে সকল বিঘ্ন বিপত্তি উপস্থিত হইয়াছে, যথাসম্ভব তাহার প্রতীকার করিতে চেষ্টা করিয়াছি। ফলতঃ গ্ৰন্থখানি যতদূর সম্ভব, উদ্দেশ্য সিদ্ধির অনুকূল করিতে যত্নের ত্রুটি করি নাই। কতদুর কৃতকার্য হইতে পারিয়াছি তাহা সুধী সমাজের বিচার সাপেক্ষ। যদি ইহার দ্বারা উল্লিখিত অভাব কিয়ৎ পরিমাণেও . বিদুরিত হয় তাহা হইলে পরিশ্রম ও অর্থব্যয় সার্থক মনে করিব। পরিশেষে বক্তব্য এই যে নেলীচারি পালঘাট (মান্দ্রাজ) নিবাসী শ্ৰীমান শিবরাম আয়ার তাঞ্জোর পুস্তকালয় হইতে হস্তলিখিত গ্রন্থের প্রতিলিপি সংগ্রহ বিষয়ে, ময়মনসিংহ নিবাসী ডাক্তার শ্রীযুক্ত ললিতকিশাের রায় ঔষধের মাত্রা বিষয়ে এবং ফরিদপুরের অন্তর্গত বিষ্ণুপুর গ্রাম নিবাসী শ্ৰীযুক্ত দ্বারকানাথ ভট্টাচাৰ্য কাব্যতীর্থ মহাশয় গজায়ুৰ্বেদ সংহিতার বঙ্গানুবাদ করিয়া দিয়া এই পুস্তক প্রকাশে সবিশেষ সহায়তা করিয়া আমাকে বাধিত করিয়াছেন। তজ্জন্ট আমি তাহাদের নিকট কৃতজ্ঞ রহিলাম। ইতি- ১১ই ফান বিনীত ১৩২৬ বঙ্গাব্দ গ্রন্থকার। মুক্তাগাছা। “আ” শব্দের অর্থ “র” ও “নিকট”। । আহার কালে “সৈব” প্রদান করিতে বলিলে লবন প্রদান করিতে হয়, পক্ষান্তুরে যাত্রা করিয়া "সৈন্ধব আনান করিতে বলিলে অশ্বই প্রদান করিতে হইবে।
No text on this page.
গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। প্রথম ভাগ। বনানুচরিত অধ্যায়। আমি, নাদ-প্রণবধ্বনি) স্তন্ত পরিশােভিত ওঁকারস্বরূপ বিশাল গৃহে, ধ্যানপাশে আবদ্ধ কমিয়া গণপতিকে বন্দনা করিতেছি। সকল শাস্ত্রই বাত্ময় অর্থাৎ বাক্যদ্বারা প্রকাশিত হইয়া থাকে, এই নিমিত্ত গ্রন্থকার, বাপিনী সরস্বতীর স্তব করিতেছেন-যিনি পদ্মাসনে স্থিরভাবে উপবেশন করিয়া স্ফটিক- নির্মিত অক্ষমালা ধারণ করিয়াছেন, ব্ৰহ্ম-বিচার বা বেদ যাঁহার স্বরূপ, আমি, সেই অণিমাদি ঐশ্বৰ্যশালিনী, বিশ্বব্যাপিনী, বীণা-পুস্তকধারিণী, অভয়-প্রদায়িনী অন্ধকার-নাশিনী, বুদ্ধি প্রদায়িনী, শুক্লবর্ণা, পূজনীয়া পরমেশ্বরী, সরস্বতীকে বন্দনা করিতেছি। অনন্তর ভগবান ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, শাম্ব, লক্ষ্মী, ও দেবরাজ ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণকে এবং পালকাপ্যাদি ঋষিবৃন্দকে প্রণিপাতপূৰ্ব্বক গজশাস্ত্র বা গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা লিখিত হইয়াছে। পুৰ্বকালে নােমপদ নামে * এক অমিত-তেজস্বী নরপতি সূর্যের ন্যায় প্রবল পরাক্রমে অঙ্গদেশ + শাসন করিতেন। তিনি অত্যন্ত প্রিয়দর্শন এবং দেবরাজ ইন্দ্রের ন্যায় অপ্রতিম প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি প্রভূত পরাক্রমে শৈলমালা ও কানন-পরিশােভিত চতুঃসাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগ শাসন করিতেন। তিনি বেদ-বেদাত শাস্ত্রের তত্ত্ব ও চক্রের ন্যায় দানশীল ছিলেন। তাঁহার দেহে ইন্দু-সদৃশ স্বর্গীয় দীপ্তি শােভা পাইত। সেই ধীমান পরিশ্রমী মহীপতি, এক দিকে যেমন নানারত্নবিভূষিত কাঞ্চন-নির্মিত দিব্য সিংহাসনে উপবেশন করিয়া অবহিতচিত্তে প্ৰজা-পুঞ্জের শাসন কার্য সম্পাদন করিতেন, অপরদিকে তেমনি তপশ্চৰ্য্যা দ্বারা আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনেও একান্ত যত্নশীল ছিলেন। ভাগরীর দক্ষিণ তীরবর্তিনী চম্পানগরী তাহার রাজধানী ছিল। উক্ত নগরী ব্ৰহ্মর্ষিগণের আবাস ভূমি এবং স্বর্গারােহণসোপান পংক্তির ন্যায় সুদীর্ঘ বিশাল সােপানাবলী দ্বারা পুণ্যসলিলা জগীরথীর সহিত সংযুক্ত ছিল। অগণিত পবিত্র আশ্রম পরিবেষ্টিত, অসংখ্য * এই নরপতির চরণ যুগলে খোকার (রেখাময়) রোম’ নামক পদ্ম অঙ্কিত ছিল, এই জন্য তাহাকে ‘নােম, পাই বলা হইত। Modern South Bihar.
গজৰ্বেদ-সংকেত। শাল তাল তাল প্রভৃতি তরুরাজি বিরাজিত সেই মহানগরী যেমন যোগিগণের সমাধিক্ষেত্র, কমল উৎপল কলার প্রভৃতি জলজ-কুসুমের সৌরভে সর্বদা সুরভিত, শুক কোকিল প্রভৃতি কলকণ্ঠ বিহগণের শ্রুতিমধুর কলনাদে নিরন্তর মুখরিত থাকিয়া উহা তেমনি ভােগিগণেরও বিলাস ভূমি ছিল। সকল রাজ-লক্ষণসম্পন্ন সৰ্ব্ববিদ্যা বিশারদ, ধৰ্মার্থত ইতুল্য নরেশ্বর রােমপাল, স্বীয় রাজধানী ঈদৃশ চম্পানগৰীতে অবস্থান করিয়া কখনও সুকেশী মহিষীগণের সহিত হাস্যকৌতুকে কাল যাপন করিতেন, কখনও বা সুর-গুরু-সদৃশ অমাত্য ও পুরােহিতগণে পরিবেষ্টিত হইয়া রাজকাৰ্য্য পর্যালােচনা কিংবা সুরম্য ইতিহাস কথা ও কাব্য শ্রবণে কালাতিপাত করিতেন। একদা নৃপচক্রবর্তী রােমপাদ, পুরবাসী ও জনপদবাসিগণের সহিত সুখে উপবেশন করিয়া কি উপায়ে প্রভূত বলশালী মহাকায় অরণ্য বারণগণকে বশীভূত করা যায়, তাহা পুনঃ পুনঃ আলােচনা করিতেছিলেন এমন সময়ে মার্তণ্ড-মণ্ডলের ন্যায় জ্যোতিষ্ম ষটত্রিংশৎ ঋষি, অপরিহার্য দৈবপ্রেরিত হইয়াই যেন চম্পানগরে আগমনপূর্বক মহানুভব রোমপাদ নরপতির সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। কৌপীন তাহাদের বসন এবং দয়া তাহাদের অসামান্য ভূষণ ছিল। জটা, মুকুট,দণ্ড ও কমণ্ডলুধারী ব্রহ্মচর্য্যপরায়ণ সেই মুমুক্ষু ঋষিগণের মেখলা, অক্ষমালা এবং যজ্ঞােপবীত-ভূষিত দেহে স্বর্গীয় দীপ্তি প্রতিভাত হইতেছিল। অাধিপতি গােমদ, গোতম, অগ্নিবেশ্য, রাজপুত্র বাস্কলি, কাশ্যপ, মৃগশৰ্মা, ভরা, সৌবল-কঙ্কায়ন, গার্গ, সভ্য, বৃহস্পতি, অরিভেদ, মাণ্ডব্য, সুবিখ্যাত কুমুদ, যাজ্ঞবল্ক, হিরণ্য, ভৃগু, আঙ্গীরস পরাশর, অচূড়, মত, উর্মিমালী, সারস্বত, চ্যবন, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, বিশ্বামিত্র, বশি, যমদগ্নি, ভাগব, অগস্ত্য, শিঙ্কু, মরীচি, অত্রি, সুপর্ণ, কাপ্য, দেবগণেরও মাননীয় দেবর্ষিনারদ এবং অন্যান্য মুনিগণকে চম্পানগরীতে যুগপৎ উপস্থিত হইতে দেখিয়া নিয়তিশয় প্রীত ও বিস্মিত হইলেন। অনন্তর সেই শত্রুতাপন নরেশ্বর, তাহাদিগকে দেখিবামাত্র অতিমাত্র ব্যর্থ হইয়া স্বীয় আসন পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পাদ্য, অর্ঘ্য এবং আসন দানে তাঁহাদিগের অর্চনা করিলেন। তারাও অলপতি বিনয়-নম্র ব্যবহারে একান্ত প্রীত হইয়া ধৰ্ম্মশান্ত্রের শাসনানুসারে অনাময়-প্রশ্নপূর্বক তাঁহার বহুবিধ প্রশংসা করিলেন। অঙ্গেশ্বর রােমপদ ও আত্মকুশল নিবেদন করিয়া আসনে উপবেশন করিলেন। অতঃপর বাগ্বিশ্রেষ্ঠ নরেশ্বর, পুরােহিত ও অমাত্যগণের সহিত সমবেত হইয়া মহানুভব ‘নীতিশাস্ত্রপ্রণেতা ঋষিদিগকে অভিবাদন পূর্বক বলিতে লাগিলেন “হে সর্বশান্ত্রাভিজ্ঞ ঋষিগণ, পূর্বে দেবতারা প্রীত হইয়া-দিগগজ বংশধর বারণগণ তােমার বানে হইবে। আমাকে এইরূপ বরপ্রদান করিয়াছিলেন। আমি, তদনুসারে বন্ত বারণদিগকে খনিতে অভিলাষ করিয়াছি। এ বিষয়ে আপনাদিগের কি অভিমত তাহা জানিতে ইচ্ছা করি। নীতিশাস্ত্রজ্ঞ ঋষিগণও অঙ্গপতির সাধু অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া মধ্যম বয়স্ক মাতৃঙ্গগণের গ্রহণে সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন।
৭ বনচরিতাধ্যায় অনন্তয় এই প্রকারে যিগণের সম্মতিপ্রাপ্ত হইয়া মহারাজ 'গােপাদ, গুজারোহণে সমর্থ, হিতকারী, স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত এবং সাহসী সৈনিকগণকে ঐ দুঃসাধ্য কাৰ্য্যে যথাবিধি নিযুক্ত করিলেন। যাজসৈনিকগণ, সানন্দে গজবুথের বিচরণ-পথ অন্বেষণ করিতে করিতে যে স্থানে পুণ্য-সলিল শোহিত্য, নগরজ হিমাদ্রির পদপ্রান্ত প্রক্ষালন করিয় খরবেশে স্বীয় সখা বঙ্গোপসাগরে আত্মসমর্পণ করিয়াছে, সেই উপতাকা প্রদেশে এক বিশাল অরণ্য দর্শন কলি। উক্ত মহারণ্য, একদিকে যেমন যক্ষ, গন্ধর্ব, সিদ্ধ, চারণ এবং অগস্নেগণের আবাসভূমি, অপরদিকে তেমনি হিংস্র পশু ও বিষধর মহাকায় সর্পসমূহের বিচরণক্ষেত্র। রাজসৈনিকগণ নির্ভয়ে সেই অরণ্য মধ্যে প্রবেশ করিয়া, নানাবিধ তরুলতামণ্ডিত, অগণিত ময়ুর, কোকিল ও মধুকরগণের মধুর ঝঙ্কারে নিরন্তর মুখরিত, বিবিধ বন-কুসুম-সৌরভ সুরভিত এক পুণ্য আশ্রম দর্শন করিতে পাইল। ঋষিগণের যোগশক্তি-প্রভাবে সেই আশ্রমে হরিণগণও স্বভাবশত্রু হিংস্ৰপ্ৰকৃতি ব্যাগণের সহিত মিত্রভাবে একত্র বাস করিতেছিল। রাজসৈনিকগণ বন্ত বারণষুথের পদাঙ্ক অনুসরণ পূর্বক আশ্রম স্বরে উপনীত হইয়া প্রিয়দর্শন, প্রসঙ্গবদন, সকল প্রাণীর কল্যাণে নিঃত এক মহর্ষিকে দর্শন করিল। তিনি কঠোর তপশ্চৰ্য্যা দ্বারা স্বীয় জীবন নিস্পাপ করিয়া দিব্যজ্ঞানে অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন। অতঃপর কাজসৈনিকগণ, যে বারণমুখকে গ্রহণ করিতে অভিলাষী হইয়া এতদুয় অগ্রসর হইয়াছে, তাহাদিগকে অদুরে দেখিতে পাইল। সেই ফ্ষমধ্যে অসংখ্য ভদ্র, মন ও মৃগজাতীয় মাতঙ্গ, অগণিত প্রিয়দর্শন কলভ ও করিণী ছিল। তাহারা আরও দেখিল ;-লুর্যলশ জ্যোতিষ্ম পােনিয়ম নিয়ত কৃষ্ণদেহ ক্রিয়াতি, ধৃতি ক্ষমা ও দমপরায়ণ, সকল প্রাণীর আশ্রয়দাতা, জটাবলধারী, এক ঋষি প্রবর সেই যুথমধ্যে বিদ্যমান রহিয়াছেন। তিনি কখনও মমাতলগণের সহিত নানাবিধ কুসুমশােভিত, ভ্রমরকুল-মুখরিত উদ্যান-সদৃশ অরণ্যমধ্যে ক্রীড়া করিতেছিলেন কখনও বা করিণী ও কলভগণের সহিত মিলিত হইয়া কমলশ্রেণী বিমতি, হংসচক্রবাকপরিশােভিত সুরম্য সরােবরে অবগাহন করিতেছিলেন। তিন মধ্যাহ্ন কালে স্বীয় পর্ণ-কুটারে পিতৃর্থ গমন করিতেন এবং সায়ংকালে পুনরায় বারণ-যুখমধ্যে প্রত্যাগমন করিতেন। রাজসৈনিকগণ ঐ সকল অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া মনে করিল-এই বরগণ নিশ্চয় এই ঋষিবর কর্তৃক পরিক্ষিত, অতএব উহাদিগকে অবরুদ্ধ করিতে চেষ্টা করিলে তেজস্বী ঋষি নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইবেন; চল আমরা রাজসমীপে প্রতিগমন করিয়া যথাযথ অস্থা নিবেদন করি। ইহা স্থির করিয়া তার অঙ্গদেশে প্রতিগমন করিত। অনন্তর রাজসৈনিকগণ, প্রসন্নবদনে মহীপতির নিকটে গমন করিয়া সাষ্টা প্রণিপাক্ত পুর্বক কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিল-হে নরনাথ, অরণ্য প্রদেশে অসংখ্য অষ্টপূর্ব প্রাণী দর্শন করিলাম ; তন্মধ্যে কতকগুলি সুখ, কতকগুলি দীর্ঘাকৃতি এবং কতকগুলি বিশাল আকৃতিবিশিষ্ট, উহাদের আকৃতি যেমন বৃহৎ শব্দও তেমনই মহৎ। অপরিমিত শক্তিসম্পন্ন ও বিবিধ স্বর্ণে রঞ্জিত উল্লিখিত প্রাণিগণ প্রতিদিন সকল প্রকার শস্য বিনাশ করিয়া প্রজালিগের গজায়ুৰ্বেদ সংহিতা সর্বনাশ সাধন করিতেছে; সুতরাং দেশের হিতের নিমিত্ত তাহাদিগকে আবদ্ধ করা একান্ত বিধেয়। অঙ্গেশ্বর রামপাদ, দৈনিকগণের এতাদৃশ বাক্য শৰণ করিয়া বায়ণগণকে স্বয়ং অবরুদ্ধ করিতে সঙ্কল্প করিলেন এবং উহারা যে অবসরের কথা বলিয়াছিল সেই মধ্যাহ্ন কালের কথা মনে মনে স্মরণ করিয়া হন্তিগ্রহণোপযােগী পাশ ও বিশাল বাহিনী সহ নগর হইতে বহির্গত হইলেন। অবিশ্রান্ত গতিতে গমন করিয়া তিনি অল্পকাল মধ্যে গজমূখের বিহারভুমি সেই রম্য আশ্রম- সমীপে উপস্থিত হইলেন এবং ক্ষণমাত্র বিলম্ব না করিয়া অতর্কিতভাবে শাপগ্রস্ত গজবকে আবদ্ধ করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর মহাবীর অঙ্গপতি, নবধৃত বারণগণ সহ শম্পানদীর তীরে গমন করিয়া বহু আশ্রম দর্শন করিলেন। আশ্রমস্থিত মুনিদিগকে যথাবিধি অভিবাদন করিয়া তিনি হৃষ্টচিয়ে বলিতে লাগিলেন-হে ঋষিগণ, আপনারা শাস্ত্রকার, প্রজাগণের অহিতকারী এই বরণযুথকে আমি আবদ্ধ করিয়া আনিয়াছি। উহাদিগকে বশীভূত করিবার কৌশল-বিষয়ে আমাকে শাস্ত্রানুমােদিত উপদেশ প্রদান করুন। নীতিজ্ঞ ঋষিগণ, অঙ্গেশ্বরের বিনয়পূর্ণ বাক্যে সাতিশয় প্রীত হইয়া বলিলেন-মহারাজ, উহা তত আমাদিগের অবশ্য কর্তব্য, আপনি, অনন্তর কর্তব্য সকল চিন্তা করুন। সম্প্রতি আপনাকে পরিশ্রান্ত বােধ করিতেছি, আপনি এই শম্পানদীর স্বচ্ছ সুশীতল জলে অবগাহন করিয়া সুস্থ হউন। ঋষিগণের উক্ত প্রকার বাক্য শ্রবণে মহানুভব বরামপাদ নিয়তিশয় প্রীত হইয়া বিশ্রামার্থ আশ্রমের বহিঃস্থিত পটমণ্ডপে গমন করিলেন। নরপতি বিশ্রামার্থ গমন করিলে পর মুনিগণ, সেই নবধৃত গজথকে শুন্তে বন্ধন করাইলেন। এ দিকে মহর্ষি পালকাপ্য, আশ্রমস্থিত পিতৃদেবের শুশ্রুষান্তে বাণগণের অবস্থিতি-স্থানে আগমন করিলেন এবং সেই স্থানে তাহাদিগকে দর্শন করিতে না পাইয়া ব্যাকুলচিত্তে ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। পূর্বে যে যে স্থানে তাহার বিচরণ করিত, যে যে হ্রদ ও সরোবরে তাহারা অবগাহন করিত, সেই সকল স্থানে পুনঃ পুনঃ অন্বেষণ করিয়া তাহাদিগকে দেখিতে পাইলেন না। তখন সেই সৰ্বত্যাগী পােনিরত সংযমী ঋষি, বারণগণের প্রতি অপরিসীম মেই বশতঃ তাহাদিগকে অনুসন্ধান করিতে করিতে নিতান্ত শােকসন্তপ্ত চিত্তে মাতঙ্গগণের পদচিঃ অনুসরণ করিয়া পদব্রজে শম্পানদীর তীরে গমন করিলেন এবং সেই স্থানে এক বিশাল গজমণ্ডপে (পিলখানায় ) স্তম্ভে নিবন্ধ বারণগণকে যুগপৎ দর্শন করিলেন। স্নেহের মাতঙ্গদিগকে আবদ্ধ দেখিয়া তাহৱ নয়ন অপরিপূর্ণ হইল। ব্ৰহ্ম-শাপভীত অঙ্গপতি, ইতঃপূৰ্বেই মুনিবরের গতি বিধি পর্যবেক্ষণের নিমিত্ত একদল অনুচর নিযুক্ত করিয়া রাখিয়াছিলেন। মুনিবর যুথ- সন্নিধানে উপস্থিত হইবামাত্র, অনুচরগণ, নরপতির উপদেশক্রমে যথাবিধি আসন ও অর্থ্যাদি দানে তঁাহার পরিচর্যা করিল। সকল প্রাণীর কল্যাণে নিরত মহাত্মা গৌতম প্রভৃতি শাস্ত্রকার মিগণও তখন সেই স্থানে উপস্থিত ছিলেন। তাহারা, জটামণ্ডিত, সুজনপ্রিয়, উগ্রতপঃ সম্পন্ন, বেবেদাঙ্গপারগ, কৃষ্ণাজিনগর, অমিততেজা, প্রিয়দর্শন এক মৌনী ব্রাহ্মণকে সহসা বারণ- মণ্ডলী মধ্যে প্রবেশ করিতে দেখিয়া চিন্তিত হইলেন। ৫ বনচরিতাধ্যায়। অতঃপর সেই মহানুভব মুনিবর, বারণগণকে আবদ্ধ ও দীনভাবাপন্ন দেখিয়া উদ্বিগ-নেত্রে তাদিগের নিকট গমন করিলেন এবং তাহাদিগকে ক্ষতবিক্ষতঙ্গ ও দুঃখ-পীড়িত দর্শন করিয়া স্বগণের ন্যায় স্বীয় করতলে তাহাদিগের অঙ্গ স্পর্শ পূর্বক দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। অনন্ত তিনি ক্ষতনাশক বহু বৃক্ষক ও তরুমূল আহরণ পূর্বক তাহা নিষ্পেষণ করিয়া বারণগণের ক্ষত স্থানে লেপন করিয়া দিলেন ; তাহাদিগের পথ্যের নিমিত্ত পদ্মকোরক, নব পল্লব, বৃক্ষ-ত্বক, তরু-মূল ও বিচিত্র ঘাস সকল সংগ্রহ করিয়া তাহাদিগকে অর্পণ করিলেন, এই প্রকারে এক রাত্রি অতীত হইলে গৌতমাদি শাস্ত্রকার মহর্ষিগণ, ঋষিপ্রবর পালাপের ভাদৃশ অবস্থান্তর শ্রবণ করিয়া একান্ত দুঃখিত মনে তাহার নিকটে গমন করিলেন এবং বিনীত ভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন ;-হে ঋষিশ্রেষ্ঠ, আপনার শােকের কারণ কি? আপনি সর্বত্যাগী হইয়াও কি নিমিত্ত বন্য বায়ণগণের জন্য এতাদৃণী কাতরতা প্রকাশ করিতেছেন ? কি কারণেই বা উহাদিগের প্রতি ঈদৃশী অনুকম্পা প্রকাশ করিয়া থাকেন? উহাদিগের দেহে ক্ষত হইলে কিরূপেই বা তাহার প্রতীকার করিয়া থাকেন? শম্পাতীরস্থ আশ্রমবাসী ঋষিগণ এই প্রকার প্রশ্ন করিলেও তিনি তাহার কোনও উত্তর প্রদান করিলেন না। তাঁহারা পালকাপ্য মুনির নিকটে কোনও উত্তর না পাইয়া সাতিশয় বিস্ময়ান্বিত হইলেন এবং অঙ্গেশ্বর রােমপাল নরপতির নিকটে গমন করিয়া সমস্ত অবস্থা জ্ঞাপন করিলেন । মহানুভব অঙ্গপতি, মহর্ষিগণের মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া অবিলম্বে মহর্ষি পাল- কাপ্যের নিকটে উপস্থিত হইলেন এবং প্রণিপাত পুৰ্ব্বক পাদ, অর্ঘ্য ও আসন দানে তাহার সমুচিত অর্চনা করিয়া বিবিধ স্তুতি বাক্যদ্বারা তাহাকে প্রসন্ন করিলেন। অতঃপর তিনি কৃতাঞ্জলিপুটে সবিনয় নিবেদন করিলেন;-ভগবন, আপনার নাম কি? আপনি কোন প্রজা- পতির বংশে উৎপন্ন ? কি প্রয়োজন সাধনের নিমিত্ত বারণগণ সৃষ্ট হইয়াছে। ইহাদিগের প্রকৃত স্বরূপই বা কি? আপনিই বা উহাদিগের প্রতি এতাদৃশ দয়াবান্ কেন? আমি, এই সকল তত্ত্ব আপনার মুখে যথাযথভাবে শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি। মহাত্মা অঙ্গরাজ এই প্রকার জিজ্ঞাসা করিলে মহর্ষি পালকাপ্য প্রথমতঃ গজ-যুথের বন্ধন নিবন্ধন খেদ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। অনন্তর আধ্যাত্মিক বলে কিয়ৎপরিমাণে প্রকৃতিস্থ হইয়া ইন্দ্রাদি লোকপালগণের অংশাবতার মন্ত্রীপতির সম্মানরক্ষাৰ্থ তাঁহাকে সম্বোধন পূৰ্ব্বক বলিতে লাগিলেন,“মহারাজ, শ্রবণ করুন পুৰ্বকালে মাতঙ্গগণ ইচ্ছানুরূপ আকৃতি গ্রহণ করিয়া যদৃচ্ছাক্রমে দেবলােক ও নরলোকে সর্বত্র বিচরণ করিতে পারিত, গন্ধৰ্বদিগের ন্যায় তাহাদিগেরও গতি কুত্রাপি ব্যাহত হইত না। স্বীয় দুফার্যের ফলে ব্ৰহ্মশাপে যে প্রকারে তাহাদের সেই মহীয়সী শক্তি বিলুপ্ত হইয়াছে তাহা বর্ণন করিতেছি, এবণ করুন ;- পুরাকালে নগরাজ হিমালয়ের পার্শ্বদেশে এক বিশাল অশ্বথ তরু বিদ্যমান ছিল। উহার গগনস্পর্শী শাখা সমুদয় নূনাধিক দুইশত যােজন বিস্তৃত হইয়া অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয় প্রদান করিত। দীর্ঘতপা' নামে এক ঋষি, দীর্ঘকাল পর্যন্ত ঐ অশ্বখ পাদপের অধোদেশে কঠোর গজায়ুর্বেদ-সংহিতা তপস্যায় নিযুক্ত ছিলেন। অনন্তর এক দিবস কতিপয় পক্ষযুক্ত হস্তী যদৃচ্ছাক্রমে শূন্য পথে আগমন করিয়া সেই মহাতরুর এক শাখায় উপবেশন করিল। তাহাদের দুর্ভাগ্য বশতই যেন, সেই শাখার নিম্ন প্রদেশে মহষি ‘দীর্ঘতপ যােগন্থ হইয়া বিমল আনন্দ উপভােগ করিতেছিলেন। মাতঙ্গযুথের গুরু ভারে সেই মহতী শাখা তৎক্ষণাৎ ভগ্ন হইয়া বারণগণের সহিত মহাশকে ভূতলে নিপতিত হইল ; শাখার প্রবল আঘাতে প্রস্তরময় ভূ-ভাগ বিদীর্ণ হইয়া গেল। মঙ্গলময় পরমেশ্বরের করুণায় মহর্ষি দীর্ঘতপার জীবন রক্ষা হইল বটে, কিন্তু তাহার ধ্যান ভঙ্গ হইয়া গেল। তাহাতে নিরতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া যােগিপ্রবর হস্তীদিগকে অভিসম্পাত প্রদান করিলেন -'হে মাতঙ্গগণ, তােমরা বল দর্পে অন্ধ হইয়া আমার প্রাণ- নাশে উদ্যত হইয়াছিলা, এই নিম আমি অভিসম্পাত করিতেছি—“তােমাদের অন্তরীক্ষে গমন-শক্তি তিরােহিত হউক এবং তােমাদের বংশধরগণ বাহনরূপে মানবের দাসত্ব করিবে। মহর্ষি দীর্ঘতপা যখন বারণগণকে উল্লিখিত অভিশাপ প্রদান করিতেছিলেন, তখন অন্তরীক্ষ হইতে দৈববাণী হইল, হস্তিগণ, যে পক্ষদ্বয়ের সাহায্যে দানবগণের ধ্বংস সাধন করে, মহর্ষির শাপে উহাদের সেই পক্ষ বিনষ্ট হউক। মহর্ষি দীর্ঘতপও ‘তথাও বলিয়া তৎক্ষণাৎ সেই দৈববাণী অঙ্গীকার করিলেন। অনন্তর ঐরাবত প্রভৃতি দিবারণগণ, স্বীয় অপরাধ জনিত মহর্ষির অভিসম্পাতে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া পিতামহ ব্রহ্মার নিকটে গমন করিল এবং যথাবিধি অভিবাদন পূর্বক তাহার নিকটে আদ্যোপান্ত শাপ-বৃত্তান্ত বৰ্ণন করিল। পিতামহ, তাহাদের মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণে নিরতিশয় ব্যথিত হইয়া বলিলেন-হে বারণগণ তোমরা দুঃখিত হইও না। যােগিপ্রবর দীর্ঘতপা যাহা বলিয়াছেন তাহার অন্যথা হইবে না। তপঃসিদ্ধ ঋষিদিগের বাক্যের অন্যথা আচরণ করা কাহারও শক্তির অয়ভ নহে। দিত্মতগণ, ব্রহ্মার উল্লিখিত বাক্যাবলী শ্রবণ করিয়া বলিতে লাগিল;-হায় ! আমাদের ভবিষ্যদ্বংশধরগণের লােকালয়ে অবস্থানকালে বিষমাশনাদি নিবন্ধন রােগ জন্মিবার সম্ভাবনা, তাহার প্রকারের কি উপায় হইবে? বারণ- গণের ঈদৃশ কাতরতাপূর্ণ বিলাপ বাক্য শ্রবণে দয়াপরবশ হইয়া পিতামহ বলিতে লাগিলেন;- হে মাতঙ্গগণ, তােমাদিগের ভবিষ্যদ্বংশধরগণের ব্যাধির নিমিত্ত বিষাদ নিষ্প্রয়োজন। অবিলম্বেই বারণগণের বান্ধব স্বরূপ এক মহর্ষি ভূতলে জন্মগ্রহণ করিবেন। মং-প্রণীত গজায়ুর্বেদ শাস্ত্রে তাঁহার সবিশেষ দক্ষতা থাকিবে; তাহার ফলে ঔষধ প্রভাবে তিনি বারণগণের দাগ প্রতীকারে সমর্থ হইবেন। এই প্রকারে সান্ত্বনা প্রদান করিয়া পিতামহ ব্রহ্মা, দিত্মাতঙ্গদিগকে নিজ নিজ দিক্ রক্ষাৰ্থ গমন করিতে আদেশ করিলেন। তাহারাও কঞ্চিৎ সান্ত্বনা প্রাপ্ত হইয়া স্ব স্ব দিকে এতিগমন করিল। অতঃপর দিগজদিগের অভিশপ্ত বংশধরগণ, ভূতলে আগমন করিয়া পৰ্বতময় গভীর অরণ্য প্রদেশে বাস করিতে লাগিল। কালক্রমে তাহাদিগের বংশে সহস্র সহস্র হস্তী জন্মগ্রহণ করিয়া দলে দলে পৃথিবীর চতুর্দিকে বিচরণ করিতে লাগিল। অশ্যবহুল পাৰ্ব্ব প্রদেশ উহাদিগের প্রিয় বাসস্থান হইল।
বনচরিতাধ্যায়। + বিকালজ্ঞ মহর্ষি পালকাপ্য এই প্রকারে দিগণগণের উল্লিখিত অবস্থান্তর প্রাপ্তির বিষয় বর্ণন করিয়া পুনরায় বহুনাম্প নরেশ্বরকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন ;-হে মহানুভব অঙ্গপতি, আমার জন্ম-বৃত্তান্ত শ্রবণ করুন; তাহাতেই বুঝিতে পারিবেন যদিও আমি সৰ্ব্বত্যাগী তথাপি কি নিমিত্ত হীদিগের প্রতি আমার এতাদৃশ অকপট মেই সঞ্চারিত হইয়াছে ? এৰং কি নিমিতই বা আমি তাহাদিগের নােগ প্ৰতীকারের উপায় বিধান করিয়াছি। হে নরনাথ, শৈলরাজ হিমাদ্রির বিশাল উপত্যকার যে অংশ নিরন্তর লৌহিত্যের পূত শীকরে সিক্ত হইতেছে সেই স্থানে সামগয়ন' নামে এক মহর্ষি অতি কঠোর তপশ্চৰ্য্যায় নিযুক্ত ছিলেন। তঁাহার পবিত্র আশ্রম সন্নিধানে একদল বন্ধ বারণ বাস করিত। একদা রাত্রিযােগে, নিয়মপরায়ণ মহর্ষি সামগয়ন, স্বপ্নে এক অপূৰ্ব্ব রূপলাবণ্যবতী যক্ষ্মিণীকে দর্শন করিয়া কামার্ত হইলেন। তিনি অবিলম্বে পরমেশ্বরের পবিত্র নাম স্মরণ করিয়া স্বীয় আসন পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক আশ্রমের বহির্ভাগে আসিয়া মূত্র ত্যাগ করিলেন। দৈব-কারণযুক্ত সেই শুক্র মূত্র এক হস্তিনী তৎক্ষণাৎ পান করিয়া গর্ভবতী হইল। মহারাজ নােমপান, মহর্ষি পালকাপ্যের এই অত্যঙুত বাক্য শ্রবণে একান্ত বিস্ময়াভিভূত হইয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন-হে মুনি শ্রেষ্ঠ, আপনার বিচিত্র বাক্য আমাকে কৌতুহল পরবশ করিয়াছে। আপনি অনুকম্পা পূৰ্ব্বক হস্তিনী কেমন করিয়া মানব শুক্রপানে গর্ভবতী হইল, তাহা সবিস্তর বর্ণনা করিয়া আমার কৌতুহল চরিতার্থ করুন। অঙ্গপতির ঈদৃশ প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি পালকাপ্য বলিতে লাগিলেন মহারাজ, শ্রবণ করুন ;-আদিকালে ভগবান্ বিশ্ব-অষ্টা, ধারাবাহিক প্রজা সৃষ্টির উপায় চিন্তা করিয়া দেবতা, মানব, গন্ধৰ্ব্ব এবং রাক্ষসদিগের তেজঃ সংগ্রহ পূর্বক স্বহস্তে রুচির নামে এক দেবীমুর্তি সৃষ্টি করিলেন। সেই অপূৰ্ব্ব রূপ- লাবণ্যবতী রমণীকে দর্শন করিয়া সর্বজ্ঞ দেবগণ, এবং তপোধন ঋষিগণ পরম বিস্ময় সহকারে বলিয়াছিলেন ;-এই রমণী ত্রিভুবনবাসীর ‘রুচিতা' অর্থাৎ বাঞ্ছনীয় এই নিমিত্ত রুচিরা ; নামে বিখ্যাত হইবে।' হে নরনাথ, সেই রুচিরা দেবী, যৌবনগৰ্বেই হউক বা বিলাস-বিভ্রম বশতঃই হউক, দক্ষ প্রজাপতি প্রভৃতি দেবগণের প্রতি অনাদর প্রদর্শন পূর্বক ঋষিগণ কর্তৃক প্রশংসিত হইয়া তাহাদিগের নিকটে গমন করিলেন। তদ্দর্শনে ভগবান্ ব্রহ্মা, নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাকে অভিসম্পাত প্রদান করিলেন-তুমি, করিণী হইয়া ভূতলে জন্মগ্রহণ করিবে। ‘হৈ নাথ, বলুন শাপ প্রভাবে আমাকে কখন ক্ষিতিলে গমন করিতে হইবে? রুচিরা, বিজড়িত কণ্ঠে এই বয়টা মাত্র কথা উচ্চারণ করিয়া ব্ৰহ্মার চরণতলে নিপতিত হইল। বিশ্ব- স্রষ্টা, সেই যৌবন-গর্বি সুন্দরীকে অপূর্ণাক্ষী এবং হৃতগর্ব। বুঝিয়া বলিতে লাগিলেন- ‘ভত্রে, তুমি ভার্গব’ নামে খ্যাত বসু বংশে সুন্দরী কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করিয়া পুনরায় শাপ প্রভাবে ভুতলে মত মুনির আশ্রম সন্নিধানে হস্তিনী রূপে অবস্থান করিবে। অনন্তর সর্বজনবাঞ্ছিত শাপগ্রস্ত রুচিয়া যখন ‘ব কুলে জন্মগ্রহণের উপায় চিন্তা করিতে করিতে পশ্চিম দিকে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইতেছিলেন, তখন শাপলাব বশতঃ সহসা ভূতলে গজায়ৰ্বেদ-সংহিতা ভাগবাশ্রমে অবতীর্ণ হইলেন। মহর্ষি ভার্গবের সেই বিচিত্র আশ্ৰম শৈলরাজ হিমাদ্রির উপত্যকায় প্রতিষ্ঠিত, ব্ৰহ্মলােক সদৃশ, সিদ্ধগন্ধর্ব ও বেদ-পাঠানরত মহর্ষিগণে পরিপূর্ণ ও বিবিধ রত্ন-জি-বিরাজিত। উহা একদিকে যেমন কুরঙ্গ ও শ্বাপদ-কুলের আবাসভূমি, অপরদিকে তেমনি অপ্সরা ও কিন্নরগণের বিলাস-ভূমি ; নিরন্তর হেমানলের ধূমশিখা এবং মধুর বেদ- ধ্বনিতে আকুল; নীল-জল-ধরপটল-সদৃশ অগণিত তরুশ্রেণী এবং অনলতুল্য-স্তবক-ন অশােক বৃক্ষসমূহ সেই আশ্রমের অপূৰ্ব্ব শােভা বর্ধিত করিতেছিল। আশ্রমের বহির্ভাগে কমল ও উৎপলমণ্ডিত অসংখ্য সােবর তাহার শ্রীবৃদ্ধি করিতেছিল। এতাদৃশ ভার্গবাশ্রমে প্রবেশ করিয়া রুচিরা, অসংখ্য মুনিসমূহে পরিবৃত, প্রশান্ত দর্শন, ধীমান্, জ্বলন্ত অনল-সদৃশ তেজস্বী, সুবর্ণস্তম্ভ-সদৃশ-সমুন্নত-দেহ, জটা-মুকুটমণ্ডিত এক ঋষিবরকে দর্শন করিলেন। তাহার সুমেরু-শৃঙ্গের ন্যায় সমুন্নত গৌরবর্ণ দেহ হইতে এক দিব্যজ্যোতি বিকীর্ণ হইতেছিল। তাহা দেখিয়া রুচিরার মনে হইতে লাগিল- যেন সেই নিস্পাপ হৃদয়ের পবিত্র বৃত্তিমিয় নির্গত হইয়া তাহার শাপদগ্ধ মনপ্রাণ শীতল করিতেছে। তিনি কৃতাঞ্জলিপুটে প্রণিপাতপূৰ্ব্বক সেই ৰাশ্মিশ্রেষ্ঠ ঋষিপ্রবরকে জিজ্ঞাসা করিলেন;-'হে মুনিশ্রেষ্ঠ ভার্গব, কিরূপে আমার শাপান্ত হইবে ? এই কথা বলিতে বলিতে তিনি স্বীয় সুকোমল দেহ সেই ব্রাহ্মণের চরণতলে বিন্যস্ত করিলেন। দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন, মহাপ্রাজ্ঞ ভার্গব, শোকসন্তপ্তা রুচিরার বিশাল নয়ন দুইটা অপূর্ণ দেখিয়া যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, ধ্যানযোগে তৎসমুদয় অবগত হইয়া বলিতে লাগিলেন ;-জয়ি শুভাননে, তুমি কি নিমিত্ত ভয়স্তা বা শােকবিহ্বল হইতেছ ? অবশ্যম্ভাবী ফলাফলে ভয় অথবা শােক নিষ্ফল; বসুদিগের উত্তম বংশে তােমার জন্ম হইবে এবং সেই বকুলে কিয়ৎকাল অবস্থান করিয়া তুমি পুনরায় শাপগ্রস্ত হইবে। হে নরনাথ, রুচিরা কিরূপে পুনরায় শাপগ্রস্ত হইয়া হস্তিনীর আকৃতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তৎসমুদয় বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন ;-হে নরেশ্বর, ব্ৰহ্ম-শাপ-প্রভাবে সেই রুচিরা দেবী, বসু কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া ‘গুণবতী’ এই অর্থ অখ্যা প্রাপ্ত হইলেন। অপূর্ব রূপলাবণ্যবতী গুণবতী স্বীয় সখী দেবকন্যা ও গন্ধৰ্ব্ব কাগণের সহিত মিলিত হইয়া জনক জননীর সম্মতিক্রমে স্বেচ্ছায় বিশ্বের সর্বত্র বিচরণ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা কখনও রম্য বন, উপবন, শৈলমালা, কখনও নিৰ্ব্বর, সরিৎ বা প্রস্ফুটিত কমল, উৎপলমণ্ডিত মনোহর সরোবর এই সকল বিচিত্র দৃশ্যাবলী দর্শন করিয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ করিতে করিতে একদা গুণবতী দৈবের অলঙ্ঘ্য শাসনক্রমে স্বীয় সহচরীদিগকে বিস্মৃত হইয়া ক্রীড়া করিতে করিতে মহর্ষি মতঙ্গের সুরম্য আশ্রমে প্রবেশ করিল। ঐ উয়েত ঋষি দীর্ঘকাল যাবৎ মানবের অনধিগম্য নিবিড় অরণ্য মধ্যে মাশ্রম স্থাপন করিয়া অতি কঠোর তপস্যা করিতেছিলেন। সহসা ধ্যানভঙ্গ হইলে মহর্ষি মতঙ্গ তাহাকে দর্শন করিবা মাত্র ‘সমাধিভীত দেবরাজ ইন্দ্র কর্তৃক প্রেরিতা পােবঘ্নকারিণী অপর জমে অভিসম্পাত করিলেন - হে লালনে, কি নিমিত তুমি মানবের অনধিগম্য এই নিবিড় অরণ্য মধ্যে একাকিনী বিচরণ বনানুচরিতাধ্যায় } করিতে আসিয়াছ? কি নিমিতই বা তুমি আমার অজ্ঞাতসারে পবিত্র আশ্রমে প্রবেশ করিয়াছ? অয়ি যৌবন-গৰ্বিতে, যেহেতু তুমি একাকিনী নির্জন অরণ্য মধ্যে বিচরণ করিতে অভিলাষ করিয়াছ, সেই অপরাধে আমি তােমাকে অভিসম্পাত করিতেছি—তুমি হস্তিনী হইয়া অরণ্য মধ্যে বিচরণ করিবে, কিন্তু তােমার পূর্বস্মৃতি বিলুপ্ত হইবে না। বসুকন্যা গুণবতী, এই আকস্মিক বিপৎপাতে একান্ত অভিভূত হইলেন এবং মহষির পদতলে স্বীয় সুকোমল দেহ বিন্যস্ত করিয়া বিবিধ প্রকারে বিলাপ করিতে লাগিলেন। তিনি বলিতে লাগিলেন-হে তপােধন, অামি জ্ঞানহীনা অবল, কেবল কৌতুহল বশতই আপনার রম্য আশ্রমে প্রবেশ করিয়াছিলাম মাত্র। তদ্ভিন্ন ইহাতে আমার অন্য কোনও অসদভিপ্রায় ছিল না ; অতএব আমি নিষ্পাপ, আপনি প্রসন্ন হইয়া আমার শাপ বিমোচন করুন। গুণবতীর এই প্রকার কাতর প্রার্থনায় মহর্ষির স্বভাব-কোমল হৃদয়, করুণায় আর্দ্র হইল। তিনি গুণবতীর বাক্যের সত্যতা উপলব্ধি করিবার নিমিত্ত আচমন পূর্বক সমাধিস্থ হইলেন। ধ্যানযােগে গুণবতীকে নিরপরাধ জানিয়া মহর্ষি মতঙ্গ, বলিতে লাগিলেন-ভদ্রে, তুমি যথার্থই বলিয়াছ, তােমার কোন অপরাধ নাই, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা পিতামহ পূর্বেই যেরূপ ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন তাহা শ্রবণ কর তুমি কিয়ৎকাল হস্তিনীরূপে ভূতলে বিচরণ করিবে। তোমার গর্ভে এবং সামগায়ন ঋষির ঔরসে সুলক্ষণ সম্পন্ন এক মুনিকুমার জন্মগ্রহণ করিবেন। ‘পালকাপ্য তাহার নাম হইবে। সেই ব্রহ্মচর্য্যপরায়ণ ঋষিকুমার, দীর্ঘকাল পর্যন্ত অতি কঠোর তপস্য করিবেন। তিনি বহুকাল শীর্ণ পত্ৰ ভোজন ও জলপান করিয়া গজ-ব্থের সহিত বনে বনে পরিভ্রমণ করিবেন এবং স্বয়ম্ভু ব্ৰহ্মার প্রসাদে গজায়ুৰ্বেদশাস্ত্রে অপরিসীম অভিজ্ঞতা লাভ করিবেন। বারণগণের প্রতি তাঁহার নিরতিশয় মেহ থাকিৰে। তুমি প্রসবানন্তর তাহাকে কিঞ্চিৎ বর্ধিত করিয়া মহর্ষি সামগায়নের হস্তে সমৰ্পণ করিবে। এই প্রকার করিলে তুমি শপ-বিমুক্ত হইবে এবং কদৰ্য্য হস্তিনীরূপ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক পুনরায় স্বীয় আকৃতি প্রাপ্ত হইয়া স্বর্গে গমন করিতে পারিবে। আমার প্রসাদে তখন তােমার দুঃখময়ী পূৰ্বস্মৃতি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হইবে। মহর্ষি মতঙ্গ তাহাকে এই প্রকার ভবিষ্যদুপদেশ প্রদান করিয়া প্রস্থান করিতে অনুমতি নিলেন। গুণবতীও আশ্রমের বহির্ভাগে অাগমন করিবামাত্র স্বীয় কৰ্ম্মফলে দেখিতে দেখিতে এক দিব্য হস্তিনী হইল এবং সামগায়ন ঋষির আশ্রম-সন্নিধানে যুথে প্রবেশ করিয়া একান্ত দুঃখে দিন যাপন করিতে লাগিল। এ দিকে মহৰ্ষি সামগয়ন, ধ্যানযােগে হস্তিনীরূপ বসুকন্যার গর্ভে বিচিত্র উপায়ে স্বীয় শুক্রের প্রবেশ অবগত হইয়া দুঃখিত হইলেন এবং মনে মনে গর্ভস্থ সন্তানের কল্যাণ কামনা করিতে লাগিলেন। সেই অধ্যাত্মবলসম্পন্ন ঋষির মনঃশক্তি-প্রভাবে হস্তিনী-গর্ভে মানব-সন্তান বৰ্ধিত হইতে লাগিল। অনন্তর যথাকালে অতি উজ্জ্বলরূপসম্পন্ন এক কুমার হস্তিনীর মুখ বিবর হইতে নির্গত হইল। সেই যুথস্থিত অন্যান্য হস্তিগণ হস্তিনী-গর্ভে মনুষ্য-সন্তানের জন্ম দর্শনে নিরতিশয় ভীত হইয়া ভয়ঙ্কর শব্দ করিতে করিতে ইতস্ততঃ ধাবিত হইল। কিন্তু ঐ গজায়ুর্বেদ-সংহিতা হস্তিনী গর্ভের মূল কারণ অবগত ছিল সুতরাং সে কিঞ্চিত্রও ভীত না হইয়া সেই সন্তান মহর্ষি শমগায়নের হস্তে সমৰ্পণ করিল। তিনি স্বীয় সন্তান চিনিতে পারিয়া সানন্দে তাহাকে গ্রহণ করিলেন এবং যথাকালে জাতকৰ্ম্মাদি বেদোক্ত সংস্কার সকল সম্পাদন করিলেন। এই সময়ে মহর্ষি সামগয়ন, এক দিন দৈববাণী শ্রবণ করিলেন এই অসামান্য বালক, যুগে যুগে নােগাৰ্ত্ত হস্তীদিগকে পালন করিয়া যশস্বী হইবেন। এই দৈববাণী শ্রবণ করিয়া মহৰি সামগায়ন কাপ্য বংশগত সেই শিশুর নাম ‘পালকাপ্য * রাখিলেন। পিতা সামগায়ন, নামকরণ-কালে আশ্রমস্থ ঋষি ও সজ্জনদিগকে ফল-মূলাদি উত্তম খাদ্য দ্বারা পরিতৃপ্ত করিয়া ছিলেন। আশ্রমের বহির্ভাগে ঐ হস্তিনী বাস করিত। সেই বালক কিঞ্চিৎ বর্ধিত হইয়া যখন ছুটিতে শিখিল তখন সে জননী হস্তিনীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিত। মহারাজ, আমাকেই সেই মহর্ষি সামগায়ন-পুত্র পালকাপ্য বলিয়া জানুন। আমি জন্মাবধি সুদীর্ঘ কাল গজ-যুথমধ্যে বাস করিয়া তাহাদিগের সহিত কখনও নগ নিঝরে, কখনও গিরিপ্রন্থে, কখনও বা কমলােৎপল- শােভিত রম্য জলাশয়ে ক্রীড়া করিতে করিতে বৰ্ধিত হইয়াছি। এই নিমিত্তই আমি বারণগণের অভ্যাস, খাদ্য, অখাদ্য, সুখ, দুঃখ, ঈঙ্গিত ও বিবিধ মনোভাব ব্যঞ্জক বৃহিতের তথ্য অবগত আছি। সেই সুযােগেই আমি, উহাদিগের আহার, বিহার এবং রােগ-প্রতীকার-তথ্য সকল জানিতে পারিয়াছি। পক্ষান্তরে মাতঙ্গগণও আমার প্রিয় কিংবা অপ্রিয় খাদ্য বা ব্যবহার অবগত আছে ; উহারা তদনুসারে আমাকে সেই সকল দ্রব্য প্রদান করিয়া থাকে। মহারাজ, আমি যখন আশ্রমে গমন করিয়াছিলাম সেই অবসরে আপনি, আমার আশ্রিত এই বারণমূথকে আবদ্ধ করিয়া এই স্থানে অনিয়া রাখিয়াছেন। আমি উহাদিগকে অন্বেষণ করিতে করিতে উহাদিগের পদ-চিহ্ন অনুসরণ করিয়া এই স্থানে আসিয়াছি। ইহাতেই বুঝিতে পারিতেছেন উহাদের প্রতি আমার কতদূর স্নেহ বিদ্যমান আছে। এই পর্যন্ত বলিয়া মুনিশ্রেষ্ঠ পােলকাপ্য নীরব হইলেন। তাহার নয়ন-যুগল অপূর্ণ ও কণ্ঠস্বর বাপে বিজড়িত হইল। মহর্ষি পালকাপ্যের উল্লিখিত বাক্যাবলী শ্রবণ করিয়া একান্ত বিস্ময়াভিভূত অঙ্গেশ্বর, কৃতাঞ্জলিপুটে বলিতে লাগিলেন ;-হে তপােধন, আপনার বিচিত্র জন্মবৃত্তান্ত এবং অশ্রত পূৰ্ব জীবনবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া আমার একান্ত কৌতুহল হইতেছে যে আপনি কিরূপে বন্য- বারণগণের সহিত কখনও নদ-নদীসঙ্কুল সমতল প্রদেশে, কখনও বা পর্বতেপত্যকায়, কখনও নির্জন অরণ্যপ্রদেশে বিচরণ করিতে সমর্থ হইয়াছেন ? এইরূপে মদমত্ত বারণগণের সহিত কতকালই বা বিচরণ করিয়াছেন ? কঠোর তপশ্চৰ্য্যায়ই বা আপনার কতকাল অতীত হইয়াছে ? হে ভগব, আমি, এই সকল তথ্য সবিশেষরূপে শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি। অনুকম্পা- পূৰ্ব্বক বর্ণন করিয়া আমার কৌতুহল চরিতার্থ করুণ। মহানুভব অঙ্গপতির ঈদৃশ প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি পালকাপ্য বলিতে লাগিলেন ;-মহারাজ, আমি, যেরূপে স্বধৰ্ম্ম-প্রতিপালনের নিমিত্ত, এই বিশাল বারণ-যুথের সহিত বিচরণ করিয়াছি পালন।দগযুথ কাপ্য গোত্র সমুদ্ভব। পলিকাপ্য ইতি মান্নাম ধেয়ং চকার সঃ। - - - - - বনানুচরিতাধ্যায় । এবং যতকাল তপশ্চৰ্য্যা দ্বারা স্বীয় মানবজীবনের কর্তব্য পালন করিয়াছি তাহা বলিতেছি শ্রবণ করুন;-হে নরেশ্বর, আমি, শৈশবে কতিপয় বৎসর মাত্র প্রসূতির সহিত বারণ-যূথ মধ্যে অবস্থান করিয়াছিলাম। অনন্তর আমার স্নেহময়ী প্রতি স্বলোকে গমন করিলে আমি, বিদ্যাভ্যাস ও তপশ্চৰ্য্যা দ্বারা দীর্ঘকাল অতিবাহিত করিয়া পরে এই বারণ যুথের সহিত কখনও ভ্রমর-কুল-মুখরিত, কুমাবলী-ভূষিত তরুশ্রেণীর মধ্যে, কখনও বা সহকার, তিলক, পুন্নাগ, অর্জুন, কেসর, অশােক, চম্পক, শাল, তাল, তমাল প্রভৃতি তরুরাজি-পরিশােভিত, মাধবীলতাকুঞ্জ-ভুষিত, নিবিড় অন্য মধ্যে বিচরণ করিয়াছি। আমি দিবা ভাগে যখন ক্লান্তি বােধ করিতাম, তখন স্বচ্ছ শীতল সলিল পূর্ণ, পদ্ম-গন্ধ-সুরভিত সরােবরে কলভগণের সহিত ক্রীড়া করিতে করিতে পরমানন্দে জল পান করিয়া তৃপ্তি লাভ করিয়াছি; পুনরায় মরকত-মণি সদৃশ নবতৃণাচ্ছাদিত, নদী-পুলিনে কিংবা উপত্যকা প্রদেশে বিচরণ করিয়া বিমল আনন্দ উপভােগ করিয়াছি। কখনও নিৰ্বাত প্রায় নিবিড় অরণ্য মধ্যে, কখনও বা প্রকৃষ্ট বায়ুপূর্ণ মুক্ত প্রদেশে, কখনও বনে, কখনও ফুল্ল-কুসুমশােভিত মদগন্ধযুক্ত তরুতলে কখনও কদম বিহীন বন প্রদেশে, বর্ষাকালে বিরল পাদপ স্থল প্রায় ভূ-ভাগে,আমি এই মাতঙ্গগণের সহিত সুখে বিচরণ করিয়াছি। হে নরনাথ, আমি পঞ্চদশাধিক একাদশ সহস্রবর্ষ বারণগণের সহিত হৃষ্টচিতে যাপন করিয়াছি; তমিতই আমি কিসে উহাদিগের মঙ্গলসাধন হয় তাহা বলিতে সমর্থ । অনন্তর গুণগ্রাহী অঙ্গেশ্বর, প্রসন্নচিত্রে মহর্ষি পালকীপ্যকে যথাবিধি অর্চনা করিয়া কৃতাঞ্জলি- পুটে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন;-হে মুনিবর, আমি জানিতে ইচ্ছা করি অরণ্যে অবস্থান কালে বারণগণের কি কি লােগ জন্মে? লােকালয়ে আনীত হইলেই বা উহারা কি কি রােগে আক্রান্ত হইবার সম্ভাবনা ? মহানুভব অঙ্গপতি কর্তৃক এই প্রকারে জিজ্ঞাসিত হইয়া মহর্ষি পালকাপ্য, কারণ নির্দেশ পূর্বক গভীর অর্থযুক্ত বাক্য বলিতে লাগিলেন-হে অঙ্গনাথ, স্বাধী- নতাপ্রিয় মাতঙ্গগণ, করিণীগণের সহিত মিলিত হইয়া মধুগন্ধযুক্ত অরণ্য মধ্যে যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ করিতে করিতে, কটু, কযায়, তিক্ত, লবণ, অম্ল ও মধুর রসযুক্ত বিবিধ নবতৃণ, তরু-ধক, লতা, ফল ও পল্লব যথাসুখে আহার করিতে সমর্থ হয়। তখন স্বভাবসুলভ নিপুণতা বশতই উহারা যে ঋতুতে যে সকল আহার গ্রহণ বা বর্জন করা আবশ্যক তাহা করিয়া থাকে। মরনাথ, বারণগণ বর্ষাগমে বৃক্ষ-ভঙ্গ বর্জন করে। উহারা হেমন্তে ও নিদাঘে শল্লকী, কর্ণিকার, কোবিদার ও উদম্বর (যজ্ঞডুমুর) শাখা ভােজন করিয়া থাকে। বর্ষাকালে বন্য বায়ণগণ, স্থলজাত ঘাস ও বট অশ্বত্থ তরুশাখামাত্র ভোজন এবং জল পান করিয়া জীবনধারণ করে। উহারা হেমন্ত ঋতুতেও সেইরূপ স্থলজ তৃণাদি ভােজন করিয়াই সুস্থ দেহে জীবনযাপন করে। আরণ্য অবস্থায় বারণগণ, এইরূপে স্বীয় অভিলাষনুসারে তৃণাদি ভােজনে পুষ্টিলাভ করিয়া যদৃচ্ছক্ৰমে করিণী ও শাবকগণের সহিত স্বভাব রম্য ভূ-ভাগে ক্রীড়া করিতে করিতে ইচ্ছানুরূপ শীতাতপ সেবন করিতে সুযােগ প্রাপ্ত হয়। ঈদৃশ বিহারের ফলেই করিণীগণ যথাকালে গর্ভ ধারণ করিয়া থাকে। এই প্রকারে স্বীয় অভিলাষানুসারে আহার, বিহার, গান, পান, ভোজন, শয়ন, ১২ । গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা । এক - ৭ - শ ম , এ- বিশ্রাম, নিদ্রা ও জাগরণে সমর্থ হয় বলিয়', অরণ্যে অবস্থান কালে উহার প্রায় কোনও রােগেই আক্রান্ত হয় না। হে নরেশ্বর, পক্ষান্তরে, উহার যখন স্বাধীনতার বিলাসক্ষেত্র অরণ্য হইতে লােকালয়ে আনীত হয়, তখন উহাদিগের অন্তঃকরণ, ভয় ও শোকে অভিভূত, বন্ধন ও বধ ভয়ে উদ্বিগ্ন হয় এবং করিণী বিরহে একান্ত কাতর হয়। ঐ সময়ে উহারা কর্কশবাক্যে ভৎসিত হইয়া ভােজন, গমন, কদৰ্য্যস্থানে অবস্থান, শয়ন ও কঠোর পরিশ্রমে একান্ত পীড়িত হয় এবং স্ব-জাতি বিরহে নিতান্ত কাতর হইয়া থাকে। হে নরনাথ, আমি এই সকল সত্য সম্যকরূপে অবগত আছি ; এই নিমিতই আমি শঙ্কিত হৃদয়ে মাতঙ্গগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া কর্তব্যের কঠোর প্রণোদনায় আপনার দৃষ্টিপথের পথিক হইয়াছি। মহর্ষি পালকাপ্যের উল্লিখিত বাক্যাবলী শ্রবণে মহানুভব অঙ্গপতি, তাঁহাকে গজ-শাস্ত্রে সবিশেষ অভিজ্ঞ জানিয়া বিবিধ প্রকারে সান্ত্বনা প্রদান করিলেন এবং বারণগণের সম্বন্ধে যে সকল বিষয়ে স্বীয় অভিজ্ঞতার অভাব আছে, তদৃবিষয়ে উপদেশপ্রার্থী হইয়া বলিতে লাগিলেন ;-হে মহাত্ম, আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়া ইচ্ছাপূৰ্ব্বক কিয়ৎকাল এইস্থানে বাস করুন। মষি পালকাপ্য, সমবেত ঋষিগণ ও স্বয়ং নরপতি কর্তৃক প্রার্থিত হইয়া মাতঙ্গগণের প্রতি জ্ঞাতিয়েহবশতঃ কিয়ৎকাল সেই স্থানে বাস করিতে অভিলাষ করিলেন। অঙ্গপতি রােমপা, মহর্ষির মনোগত অভিলাষ অবগত হইয়া চম্পানগরীর উপকণ্ঠে এক সুরম্য আশ্রম নির্মাণ করাইলেন, সেই আশ্রমের অনতিদুরে এক বিশাল গজমণ্ডপে নবধৃত মাতঙ্গগণ শিক্ষা ও রক্ষাৰ্থ স্থাপিত হইল। অনন্তর মহর্ষি পালকাপ্য, বারণগণের হিতকামনায় সেই আশ্রমে বাস করিতে সঙ্কল্প করিয়া অঙ্গেশ্বরকে বলিতে লাগিলেন-হে নরনাথ, মাতঙ্গগণ, ধূলি কর্দম ও জল প্রভৃতি দ্রব্যম্বার। সর্বদা ক্রীড়া করিতে ভালবাসে; যথেচ্ছভাবে ক্রীড়া ও অঙ্গ সঞ্চালন করিতে দিলে উহাদিগের দেহের উপাদান-স্বরূপ রক্তমাংসাদি সপ্তধাতু প্রসন্ন (অবিকৃত) থাকে। তাহাতেই উহারা সুস্থ দেহে দীর্ঘকাল জীবনধারণ করে। দৈহিক স্বাস্থ্যই বললাভের অসাধারণ উপায় এবং দেহ সবল থাকিলে সহসা তাহাতে কোন রােগও প্রবেশ করিতে পারে না। কারণগণ অত্যন্ত সলিল-প্রিয়; কারণ জলই উহাদের জীবনধারণের প্রধান সহায় ও মহৌষধি স্বরূপ। তন্নিমিত্ত কখনও ইচ্ছাপূর্বক উহাদিগের সলিল-বিহারে বিঙ্গ উপস্থিত করা উচিত নহে। কেবল পৰ্যাপ্ত জল প্রাপ্ত হইলেই বারণগণ, সুদীর্ঘ শত যোজন পথ ভ্ৰমণ করিতেও ক্লান্তি বােধ করে না। পক্ষান্তরে কুঞ্জরগণ, যখন কর্দম ও জল-কণদ্বারা স্বীয় দেহ সিক্ত করিতে অসমর্থ হয়; তখনই উহারা কুষ্ঠরােগগ্রস্ত কিংবা অন্ধ হইয়া থাকে। অতএব যাহাতে মতগণের দেহজল ও বৰ্দম দ্বারা সর্বদা সিক্ত থাকে, কখনও শুষ্ক না হয় এবং যাহাতে উহারা অস্বচ্ছলতা বােধ না * ১স্তিনামূলক প্রণাদগতিক পরায়ণাম : স্মাৎ গলিপমেতেষাং কামতো ন নিবর্তয়েৎ। জাযুঙ্গে সংহিকা ১ম অধ্যায় ২১৫ কে।
বনানুচরিতাধ্যায়। ১৩ করে, সেইরূপ বিধান করা একান্ত কর্তব্য। সরলমতি মাতঙ্গগণ, যে সময় হইতে স্বজন বধ ও বন্ধন জনিত ক্লেশ অনুভব করিতে থাকে, তখন হইতেই তাহাদের দেহের আর উপচয় (বৃদ্ধি ) থাকে না, বরং উহাদের শরীর শীর্ণ হইতে থাকে। সষত্নে প্রতিপালিত হইলে উহারা মেমন শনাশে সহায়তা করে, অযত্নে রক্ষিত হইলে তেমনই স্বীয় প্রভুর অনিষ্ট কামনা করে। তন্নিমিত্ত বায়ণগণের প্রতিপালন বিষয়ে সতত যত্নবান থাকা উচিত। যে সবল নরপতি স্বীয় ঐশ্বর্য বা মঙ্গল কামনা করেন তাহারা কখনও বারণগণকে খাদ্য ও পানীয় প্রদান না করাইয়া স্বয়ং পান ভােজন করেন না। মাতঙ্গগণ, ক্ষীণ বৃদ্ধ বা রুগ্ন হইলে তাহাদিগকে সযত্নে প্রতি পালন করা কর্তব্য। ঐ অবস্থায় প্রভু স্বয়ং তাহাদিগকে পর্যবেক্ষণ করিবেন। নবধৃত মাতঙ্গ সম্বন্ধেও এই রীতি অবলম্বন করা একান্ত বিধেয় । মুণিগণ মধ্যগত মহর্ষি পালকাপ্য, পুরুষ প্রবর অঙ্গেশ্বরের নিকটে স্বীয় উৎপত্তি বৃত্তান্ত এই প্রকার বিস্তারিত রূপে বর্ণনা করিলেন। আৰ্য ঋষিগণ, স্বীয় জন্ম, শিক্ষা ও সংসর্গ সম্বন্ধে যথার্থ কথা বলিতে ভীত বা লজ্জিত হয়েন না। ইতি শ্রীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত হত্যায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবনে মহাযােগস্থানে বনানুচরিত নামক প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত।
গজোৎপত্তি-বিবরণ। অমর মহানুভব অঙ্গেশ্বর রােমপদ নরপতি, মহর্ষি পালকাপকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন;-ভগব, বারণগণের উৎপত্তি সম্বন্ধে শাস্ত্রে যেরূপ নির্দেশ আছে আমি তাহ আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি। আপনি আমার এই কৌতুহল পরিতৃপ্ত করুন। অঙ্গপতির এই প্রকার প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি পালকাপ্য বলিতে লাগিলেন-হে নরেশ্বর, শ্রবণ করুন ;-প্রজাপতি ব্রহ্মা, প্রথমে জল সৃষ্টি করিয়া, তাহাতে স্বীয় তেজ নিক্ষেপ করেন, উহা সুবর্ণময় অণ্ডরূপে পরিণত হয় এবং পরিশেষে উহাই ব্রহ্মাণ্ড বলিয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছে। তাহাতেই প্রাণিগণ উৎপন্ন হইয়া বাস করিতেছে। অতঃপর অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন ব্রহ্মা, উজ্জল তেজঃসম্পন্ন মৃৎপিণ্ড লইয়া তাহা অদিতির করে সমৰ্পণ করিয়া বলিলেন-“তুমি অপ্রতিম- তেজঃসম্পন্ন পুত্র লাভ করিবে, এই পুত্রের নাম মার্তণ্ড (সূৰ্য্য) হইবে।” অনন্তর বিশ্ব-মঙ্গল- কারিণী অদিতি দেবী * সুদীর্ঘকাল গর্ভধারণ করিয়া এক অত্যুজ্জ্বল প্রভাবিশিষ্ট অণ্ড প্রসব করিলেন। ঐ অণ্ডের উজ্জ্বল দীপ্তিতে দশদিক আলােকিত হইয়া উঠিল। কিয়ৎকাল পরে সেই অণ্ড বিদীর্ণ হইয়া তাহার অভ্যন্তর হইতে উৎপন্ন মহাতেজা ভাস্করদেব (সূৰ্য) অনন্ত শুন্থে গমন করিলেন। অতঃপর অনল ও আদিত্যের ন্যায় দীপ্তিবিশিষ্ট নিস্পাপ মহর্ষিগণ, সেই বিচিত্র ঘটনাদর্শনে নিরতিশয় বিস্মিত হইয়া অদিতি দেবীর নিকট হইতে সেই দুই অণ্ডাৰ্দ্ধ গ্রহণপূৰ্ব্বক বেদধ্বনি- মুখরিত পবিত্ৰ ব্ৰহ্মলােকে গমন করিলেন। সেই স্থানে গমন করিয়া ব্ৰহ্মলােকের নিত্য অভ্যাগত মহর্ষিগণ জ্বলন্ত পাবকের ন্যায় প্রদীপ্ত পিতামহ ব্রহ্মাকে আসনে উপবিষ্ট দেখিতে পাইলেন। তাহারা, নিখিল বিশ্বের উৎপত্তিস্থান সেই ত্রিভুবনপতির নিকটে গমন করিয়া যথাবিধি অভিবাদন করিলেন এবং অর্ধ-যুগল তঁাহাকে দেখাইয়া বলিতে লাগিলেন;-*হে ভগব বিশ্বস্রষ্টা, এই হস্তাকৃতি অণ্ডাৰ্দ্ধ আপনার তেজঃসংযুক্ত হইলে প্রাণিগণের উৎপাদনে সমর্থ হইবে।” অনন্তর ভগবান্ ব্ৰহ্মা উভয় হস্তে করাকৃতিবিশিষ্ট অর্ধযুগল গ্রহণ করিয়া ঋষিদিগের সেই জগন্মঙ্গলকর শুভ ইচ্ছা পূর্ণ করিলেন। অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন বিশ্বস্রষ্টা সপ্তসুরে সামগান করিতে করিতে দক্ষিণ হস্তস্থিত অণ্ডাৰ্ধ হইতে রজত-পর্বত-সদৃশ অমিত বলশালী বেগবান্ সাহসী এক পণ্ড সৃষ্টি করিলেন। ঐ পশু সৰ্ব্বপ্রকার শুভলক্ষণসম্পন্ন উজ্জল বৰ্ণবিশিষ্ট। উহার বদনমণ্ডল, বৃত্তাকার সুদীর্ঘ স্থিতিস্থাপক শুৎ দ্বারা পরিশােভিত হইল। ঐ গুণ্ড দ্বারা সে গন্ধ গ্রহণ ও আহার গ্রহণ কাৰ্য্য সম্পাদন করিতে লাগিল। তাহার মুখবিবর হইতে তীক্ষ্ণাগ্র, উজ্জ্বল পাটলবর্ণ বিশিষ্ট, দীর্ঘ দন্ত চতুষ্টয় বহির্গত হইয়া শুণ্ডের উভয় পার্শ্বের সৌন্দৰ্য্য বৰ্ধন করিল। উহার কর্ণযুগল বৃহৎ, চরণ চতুষ্টয় স্কুল ও দীর্ঘ এবং লাঙ্গুল ভূতল পর্যন্ত * অদিতি শব্দের অর্থ মতান্তরে “পথিক।
গজোৎপত্তি-বিবরণ। লক্ষমান ; ঐ গজাজ ইরাবতীর পুত্র বলিয়া উহাকে ‘ঐরাবত এই আখ্যা প্রদান করা হইল। এই ঐরাবতই স্রষ্টার প্রথম সৃষ্টগঞ্জ এবং মাতঙ্গগণের অধিপতি হইল। মতান্তরে প্রণব হইতে ঐরাবতের উৎপত্তি বর্ণিত হইয়াছে ;-আদি মুনিগণ, অদিতির নিকট হইতে সেই উজ্জ্বল প্রভাবিশিষ্ট ডিম্বাৰ্দ্ধদ্বয় গ্রহণ করিয়া তাহা বিশ্বশ্রষ্টা কমলযোনিকে প্রদর্শন করিলেন। তিনি উভয় হন্তে উহা গ্রহণ করিয়া সপ্তসুরে প্রণবযুক্ত সাম গান করিতে করিতে বাম হস্তস্থিত ডিম্বদ্ধ হইতে সপ্ত মমাতঙ্গ সৃষ্টি করিলেন এবং প্রণব হইতে অপর আর একটি মহাকায় মাতঙ্গকে সৃষ্টি করিলেন। এই শেষােক্ত মাতঙ্গীই “ঐরাবত”। ঐরাবতের স্ত্রী অমুর উৎপত্তি বিবরণ এইরূপে বর্ণিত হইয়াছে ;-মলৌকিক শক্তিসম্পন্ন পদ্মযােনি, বাম হস্তস্থিত ডিম্বাদ্ধ হইতে ঐরাবতের ন্যায় সকল লক্ষণ বিশিষ্টা, কিন্তু দচতুষ্টয়- বিহীনা এক হস্তিনীকে সৃষ্টি করিলেন। ঐ হস্তিনী ঐরাবতের ভাৰ্য্যা হইল এবং উহার বিশাল দেহ অভ্র (মেঘ ) স্পর্শী বলিয়া তাহার নাম হইল “অমু”। বিশ্বস্রষ্টা ব্ৰহ্মা ঐরাবত ও অমুকে সৃষ্টি করিয়া বলিলেন-তােমরা ত্রিভুবনে বিচরণ করিতে পারিবে, এবং আত্মানুরূপ বেগ ও বল সম্পন্ন তেজস্বী বহুসন্তান লাভ করিবে।' সর্বশক্তি সম্পন্ন স্বয়ম্ভু ব্ৰহ্মার নিকট হইতে এই প্রকার বর প্রাপ্ত হইয়া ঐরাবত, স্বীয় ভাৰ্যা অমুর সহিত বিবিধ রমণীয় অরণ্যে যথেচ্ছ ক্রীড়া করিয়া বিচরণ করিতে লাগিল। দ্বিতীয় দিগগজ পুণ্ডরীকের উৎপত্তি বৃত্তান্ত এইরূপে বর্ণিত হইয়াছে ;-অনন্তর মহর্ষিগণ বিশ্ব-স্রষ্টাকে বলিলেন-হে দেব, আপনি এই প্রিয়দর্শন মহাকায় প্রাণীটীকে যেরূপে সৃষ্টি করিলেন সেইরূপ আরও অন্য প্রাণী সৃষ্টি করিয়া আপনার সৃষ্ট জগতের পূর্ণতা প্রদান করুন। পদ্মাযােনি আদি মুনিদিগের বাক্য শ্রবণ করিয়া ভবিষ্যৎ প্রয়োজন সাধনের নিমিত্ত অন্যান্য পশু- দিগকে সৃষ্টি করিলেন। অনন্তর তিনি সাম ও রথীন্তর গান করিতে করিতে পুণ্ডরীক-বনের (শ্বেত পদ্মসমূহের) ন্যায় শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট “পুণ্ডরীক” নামক দিগগজ ও তাহার পত্নী কপিলাকে সৃষ্টি করিলেন। পুণ্ডরীক-বনের ন্যায় শ্বেতবর্ণবিশিষ্ট বলিয়া ‘পুণ্ডরীক’ তাহার নাম হইল। পুষ্পদন্ত নামক তৃতীয় দিগগজের উৎপত্তি এইরূপ ভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে ; অতঃপর বিশ্ব-শিল্পী, “বৃহৎসাম” গান করিতে করিতে পুষ্পদন্ত” নামক মহাদিগগজ ও তদীয় ভাৰ্য্যা “তাকর্ণীকে” সৃষ্টি করিলেন। উহার দন্তের বর্ণ, চম্পক, রক্ত-পদ্ম, মল্লিকা, কেতকী, শ্বেতপদ্ম এবং বন্ধুক এই ছয়টা পুষ্পের বর্ণের ন্যায় বলিয়া উহার নাম হইল “পুষ্পদন্ত” । চতুর্থ দিগগজ বামনের উৎপত্তি এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে,-অনন্তর স্বয়ম্ভু ব্ৰহ্মা বেদ গান করিতে করিতে নব জলধরের ন্যায় শ্যামবর্ণ বামন' নামক দিগগজ ও তাহার আত্মানুরূপ পত্নী ‘বশাকে সৃষ্টি করিলেন। এই দিগগজের দশন চতুষ্টয় অত্যন্ত বামন অর্থাৎ খ বলিয়া বামন” উহার নাম হইল। ‘সুপ্রতীক’ নামক পঞ্চম দিগজের উৎপত্তি এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে;-অতঃপর অমিত শক্তি গজায়ুর্বেদ-সংহিতা সম্পন্ন স্বয়ম্ভু, সামবেদ গান করিতে করিতে মহাবীৰ্য্যসম্পন্ন সুপ্রতীক ও তাহার ভাৰ্যা অনুপমা’কে সৃষ্টি করিলেন। উহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিরতিশয় সুন্দর বলিয়া উহার নাম হইল “প্রতীক।” অঞ্জন’ নামক ষষ্ঠ দিগজের উৎপত্তি এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে যে,-অনন্তর বিশ্বস্রষ্টা, পবিত্র সামবেদ গান করিতে করিতে অঞ্জন (কজ্জল) পৰ্বত-সদৃশ কৃষ্ণবর্ণ ‘অঞ্জন’ নামক দিগগজ ও তদীয় অনুরূপা ভাৰ্য্যা ‘অঞ্জনাবতী’কে সৃষ্টি করিলেন। অঞ্জন পর্বতের ন্যায় বর্ণ বিশিষ্ট বলিয়া উহার নাম ‘অঞ্জন’ রাখা হইল। সার্বভৌম’ নামক সপ্তম দিগগজের উৎপত্তি এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে,অতঃপর পদ্মযােনি পদ্যের ন্যায় মনােহর বর্ণবিশিষ্ট সার্বভৌম' নামক দিগগজ ও তাহার পত্নী শ্বেতবর্ণ দন্তবিশিষ্টা শুভ্রদন্তীকে সৃষ্টি করিলেন। ঐ দিগগজের দেই সর্বাপেক্ষা ‘ভূমা অর্থাৎ বিশাল বলিয়া তাহাকে ‘সার্বভৌম এই অর্থ আখ্যা প্রদান করা হইল। অষ্টম দিগগজ কুমুদের উৎপত্তি এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে যে;-অনন্তর ধাতা, মনােহর সাম গান করিতে করিতে কুমুদ কুসুমের (নীল ফুলের ন্যায় শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট কুমুদ’ নামক দিগগজ ও তাহার ভাৰ্যা পিঙ্গলাকে সৃষ্টি করিলেন। ‘কু' শব্দের অর্থ পৃথিবী; পৃথিবীবাসীদিগের ‘মুদ’ অর্থাৎ হর্ষ বিধান করে বলিয়া উহার নাম ‘কুমুদ হইল। অথবা উহার শরীরের বর্ণ ‘কুমুদ কুসুমের ন্যায় শ্বেত বলিয়া উহাকে ‘কুমুদ' এই আখ্যা প্রদান করা হইল। ঐরাবত’ পূৰ্বদিক রক্ষার ভার প্রাপ্ত হইয়া স্বীয় পত্নী অভ্ৰমুর সহিত সেই দিকে গমন করিল। পুণ্ডরীক অগ্নিকোণ রক্ষার নিমিত নিযুক্ত হইয়া তদীয় ভাৰ্য্যা কপিলার সহিত সেইদিকে প্রস্থান করিল। 'পুষ্পদন্ত দক্ষিণ দিকের ভার লইয়া নিজ পত্নী তাম্রকণীর সহিত সেই দিক রক্ষাৰ্থ গমন করিল। ‘বামন নৈঋত কোণ রক্ষার্গ আদিষ্ট হইয়া অঙ্গনা’ নামক আত্ম ভাষার সহিত মিলিত হইয়া তদভিমুখে প্রস্থান করিল। সুপ্রতীক’ নামক দিগজ, পশ্চিম দিকের রক্ষার ভার লইয়া স্বীয় পত্নী অনুপমার সহিত উক্ত দিকে গমন করিল। অঞ্জন’ বায়ু কোণ রক্ষাৰ্থ আদেশ প্রাপ্ত হইয়া নিজ ভার্যা ‘অঞ্জনাবতী’র সহিত তদভিমুখে প্রস্থান করিল। সাৰ্বভৌম’ উত্তর দিক রক্ষার্থ আজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়া নিজ ভাৰ্য্যা শুভ্রদন্তীর সহিত তদভিমুখে অগ্রসর হইল। কুমুদ’ ঈশান কোণ রক্ষার ভার লইয়া স্বীয় ধেনুকা (হস্তিনী) পিঙ্গলার সহিত তাভিমুখে গমন করতঃ বিশ্বস্রষ্টার আজ্ঞা পালন করিল। এই প্রকারে দিগগজগণের উৎপত্তি বৃত্তান্ত বৰ্ণন করিয়া মহর্ষি পালকপ্য বলিতে লাগিলেন। মহারাজ, শ্রবণ করুন ;-দিগগজগণের বংশবিস্তার বিষয়ে স্বয়ং বিশ্বেশ্বর মহাদেব পার্বতীর নিকটে যেরূপ বলিয়াছিলেন তা যথাযথ ভাবে বর্ণন করিতেছিমুনিশাপে যেরূপে উহাদের পক্ষ বিনষ্ট হইয়াছে তাহা পূৰ্বেই উল্লেখ করিয়াছি এইক্ষণে উহাদের সন্তানােৎপত্তির বৃত্তান্ত শ্রবণ করুন ;-এইরূপে অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন পদ্মযােনর আজ্ঞা ক্রমে পক্ষযুক্ত দিম্মাতঙ্গগণ, স্বীয় অভিলাষানুরূপ দেহ ধারণ করিয়া পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করিতে লাগিল। কালক্রমে ঐরাবত ও অমুর মেঘ, পদ্মোদ, অরিষ্ট, চপল, রুচি, অঙ্গদ, অরুজ ও পদ্মগুল্ম নামক মহাবল গজোৎপত্তি বিবরণ পরাক্রমশালী, বিশাল দেহ বিশিষ্ট আট পুত্র জন্মগ্রহণ করে। ‘পুণ্ডরীক এবং কপিলার অহন্নিরিখ, সুপ্রদিষ্ট, প্রমর্দন ও জীমূত নামক পিতৃতুল্য পরাক্রমশালী মহাকায় পুত্র চতুষ্টয় উৎপন্ন হইল। পুণ্ডরীক বংশধর বাণগণের দেহ বলােমে আবৃত কুম্ভ বা শিরোদেশ বিশাল, গুণ্ড দীর্থ, নেত্রদ্বয় সারস পক্ষীর ন্যায় সুরম্য এবং স্বভাব নিতান্ত কোপন হইল । পুষ্পদন্ত ও অকর্ণীয় বিষহ, সাহস, রিফফ, বিচিত্র ও বিচারী নামে পাঁচ মহাবল পরাক্রমশালী পুত্র জন্মিয়াছিল। পুষ্পদন্তের বংশে যে সকল হস্তী জন্মগ্রহণ করে তাহাদের গুণ্ড ও মস্তক স্কুল বিন্দু দ্বারা পরিশােভিত, পৃষ্ঠদেশ ধনুর ন্যায় ঈষৎ বক্র, দেহ কৃষ্ণবর্ণ রােমে আবৃত, উদর কৃশ এবং শুণ্ড ও স্কন্ধদেশ একান্ত স্কুল হইল। বামন ও অঞ্জনার নবজলধর বর্ণ ‘নীলাদ’ নামে একমাত্র পুত্র উৎপন্ন হইল। ঐ পুত্র যেমন বেগশালী তেমনি সলিলবিহারে সতত অভিলাষী। তাহার অক্ষিযুগল অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল বর্ণবিশিষ্ট এবং দেহ দীর্ঘ ও বিস্তৃত। 'হে মহারাজ, ‘সুপ্রতীক’ ও ‘অনুপমা’র পৃথু, সম্প্রহারী ও সম্পাতী নামে তিনটী মহাবীর পুত্র উৎপন্ন হইল। তাহাদের অক্ষিযুগল কপােতের ন্যায় ক্ষুদ্র, শুণ্ড সুদীর্ঘ উন্নতদেহ শ্বেত- পদ্মের ন্যায় শ্বেতাভ ও সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম রােমে আবৃত ছিল। অঞ্জন ও অঞ্জনাবতীর অঞ্জনপর্বত সদৃশ কৃষ্ণবর্ণ দিব্য অশ্রয়ের ও অবরজ নামক তিন পুত্র উৎপন্ন হইল। উহাদের শুণ্ডের অগ্রভাগ সুগঠিত ও সুরম্য, দন্ত ওষ্ঠ লাঙ্গুল শ্বেতবর্ণ রোমে আবৃত ও প্রিয়দর্শন এবং তাহাদের জঘা উন্নত ছিল । এইরূপ : সার্বভৌম ও শুভদন্তীর মেঘ, পুষ্পধর, অসহ, মহা- পদ্মা ও মহার্ণব নামে পাঁচ পুত্ৰ উৎপন্ন হইল। উহাদের গণ্ডদেশ স্থূল, কর্ণযুগল খৰ্ব্ব, নেত্রদ্বয় ক্ষুদ্র, শিরােদেশ চূড়ার ন্যায় ঈষৎ উন্নত এবং গ্রীবাদেশ নিতান্ত হ্রস্ব হইল। কুমুদ ও পিঙ্গলার মহাপদ্ম’ এবং উৰ্ম্মিমালী’ নামে আত্মতুল্য-পরাক্রমশালী দুই পুত্র উৎপন্ন হইল। তাহাদের অক্ষিযুগল তাম্রবর্ণ, দন্ত স্কুল, শুণ্ডের অগ্রভাগ ঈষৎ বিস্তীর্ণ ও কৃষ্ণাভ হইল। উহাদের বর্ণ কুমুদ কুসুমের ন্যায় (নীলফুলের ন্যায় শ্বেত, কুম্ভ অর্থাৎ শিবরাদেশ বিশাল হইল। ইতি গজোৎপত্তি। বারণগণের প্রতি অঙ্গস্থিত প্রত্যেক দেবতার নাম শাস্ত্রে কথিত আছে ;-উহাদের মন্তকে ব্রহ্মা বাস করেন, গলদেশে দেবরাজ ইন্দ্র, স্কন্ধে বিষ্ণু, নাভিতে অগ্নি, নেত্রদ্বয়ে সূৰ্য্য এবং স্বয়ং মৃত্যুদেব উহাদিগের চবণ চতুষ্টয়ে সতত অবস্থান করেন। উহাদিগের বক্ষঃস্থলে ধরণীদেবী বাস করেন, উহাদের জননেন্দ্রিয়ে স্বয়ং প্রজাপতি, বিশাল শুণ্ডে নিখিল বিশ্বের ভার বহনক্ষম নাগগণ অবস্থান করেন। উহাদের সর্বাঙ্গে অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মনে চন্দ্রদেব বাস করিয়া থাকেন। উহাদের বুদ্ধিতে শম্ভু, হৃদয়ে পর্জন্তদেব (মেঘের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা), এবং সমস্ত অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গে অন্যান্য দেবগণ বাস করিয়া সতত উহাদিগের কল্যাণ সাধন করিয়া থাকেন । ইতি শ্রীপলকাপ্য রচিত হত্যায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহারোগ স্থানে গজোৎপত্তি বিবরণ ও দিগগজ-বংশ-কথন নামক দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত ।
গজশাপ-প্রতীকার তৃতীয়-প্রকরণ। অনন্তর একদা মহর্ষি পালকীপ্য যদৃচ্ছাক্রমে শম্পাতীরে আগমন করিলে, মহানুভৰ অঙ্গপতি নােমপাদ, প্রত্যুৰ্গমন পূৰ্ব্বক পদ্যি অর্থ ও. আসনদানে তাহার অর্চনা করিলেন। অতঃপর মহর্ষি আসন গ্রহণ করিলে অঙ্গেশ্বর তাহাকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন,হে তাপস-প্রবর, কিরূপে বায়ণগণের দুইটা দন্ত বিলুপ্ত হইল ? কিরূপেই বা উহারা অল্পায়ুবিশিষ্ট হইল ? কেমন করিয়া তাহাদের জিহ্বা পরিবৃত্তি হইল ? কেমন করিয়াই তাহাদের স্বেদ বা ঘৰ্ম্ম বাহিরে প্রকাশ না হইয়া দেহের অভ্যন্তরেই ক্রিয় করিয়া থাকে ? কেন উহারা মনুষ্যের বাহন হইয়াছে ? কি নিমিত্তই বা উহাদের দেহের অভ্যন্তরে তাপ অৰ্দাহ উৎপাদন করে ? কেনই বা উহাদের স্বীয় শক্তি জ্ঞানের অভাব হইয়াছে ? কি নিমিত্ত উহারা ধূলি জল ও কর্দম দ্বারা শরীর মলিন রাখিতে ভালবাসে ? কেনই বা উহাদের মুফ দেখা যায় না। কিজন্য উহাদের ইচ্ছানুরূপ দেহধারণ-শক্তির অভাব হইয়াছে ? কেমন করিয়াই বা দেবতার বংশধর হইয়াও উহাদের দেবত্ব বিনষ্ট হইয়াছে ? কেনই বা উহারা স্বীয় মলমূত্রে এতাদৃশ প্রীতিযুক্ত লক্ষিত হয়। এই সকলের গৃঢ় কারণ বর্ণন করিয়া আপনি আমার কৌতুহল চরিতার্থ করুন। মহানুভব য়ােমপাদেয় ঈদৃশ প্রশ্ন শ্রবণ করিয়া মহর্ষি পালকাপ্য পরম প্রীতিলাভ করিলেন এবং বলিতে লাগিলেন-মহারাজ, শ্রবণ করুন, এক দিবস দিগগজগণ মিলিত হইয়া হিমাদ্রির উপত্যকায় মহর্ষি দীর্ঘতপার আশ্রমে গমন করিল। আশ্রমে উপস্থিত হইয়া তাহার যদৃচ্ছাক্রমে আশ্রমবাসিদিগকে উৎপীড়ন করিতে লাগিল। ইহাতে মহর্ষি দীর্ঘতপা নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাদিগকে অভিসম্পাত প্রদান করিলেন;-হে দিগগজগণ, আমি অভিসম্পাত করিতেছি আমার শাপে তোমাদের বংশধরগণের চতুর্দন্ত বিনষ্ট হইয়া দ্ধিদত হইবে, তাহারা অল্পায়ু হইবে, তাহাদের বেগ ও পরাক্রম অল্পতাপ্রাপ্ত হইবে এবং তোমাদের যে দেব-প্রভাব আছে ইহা আর তাহাদের থাকিবে না সুতরাং অভিলাষানুরূপ দেহধারণের ক্ষমতাও বিলুপ্ত হইবে, হে বারণগণ, বিশ্বশ্রষ্টার প্রদত্ত শক্তির অপব্যবহার করিয়াছ বলিয়া তোমরা মানবের বাহনরূপে মনুষ্য-প্রদত্ত আহার গ্রহণ করিয়া জীবনধারণ বরিবে। অসীম প্রভাব সম্পন্ন মহর্ষি দীর্ঘতপা ক্রোধ ভরে এইরূপ অভিসম্পাত করিয়া নিরস্ত হইলে দিগগজগণ নিতান্ত দুঃখিত হইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল। তদবধি তাহাদের সস্তানগণ তদবস্থা প্রাপ্ত হইয়া মনুষ্যবাহনরূপে জীবনধারণ করিতে লাগিল। মহর্ষি পালকাপ্য পুনরায় বলিতে লাগিলেন ;-মহারাজ শ্রবণ করুন ; কোন সময়ে দেবগণ অগ্নিদেবের হব্য নিবারণ করিলেন, ইহার ফলে অগ্নিদেব বিরক্ত হইয়া দেবগণের ক্লেশ বিধানের নিমিত্ত, লুক্কায়িত হইলেন। তাহাতে পিতামহ ব্রহ্মা অনন্যোপায় হইয়া গজশাপ-প্রতীকর অধ্যায়। ১৯ দিগৰায়ণগণকে আহ্বানপুৰ্ব্বক বলিলেন ;-বৎসগণ, তোমরা অগ্নিকে অন্বেষণ করিতে গমন দিষ্মতগণও অবিচারিতভাবে আমরা তাই করিব’ বলিয়া অঙ্গীকার করিল। অতঃপর তাহারা জগতস্রষ্টার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণপূর্বক অনুজ ও আত্মজ-গণের সহিত মিলিত হইয়া অনলদেবের অন্বেষণে গমন করিল। তাহারা অগ্নির অনুসন্ধান করিতে করিতে বহুদেশ পর্যটনের পরে অবশেষে ‘দীর্ঘারণ্য ঋষির আশ্রমে উপস্থিত হইল। ঐ আশ্রমে বস্তুতই অনলদেব, দেবপ্রভাবে আত্মগােপন করিয়া অবস্থান করিতে ছিলেন। দিগৰারণগণ তাহাকে দর্শন করিতে না পাইয়া তদীয় পত্নী ‘স্বাহা দেবীর অবমাননা করিতে লাগিল। ইহাতে স্বাহাদেবী উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণে অগ্নিদেব নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাদিগকে দগ্ধ করিতে আসিলেন। কিন্তু তাহাদের দেব-প্রভাববশতঃ দগ্ধ করিতে অসমর্থ হইয়া তাহাদিগকে অভিসম্পাত প্রদান করিলেন-হে মাতঙ্গগণ, যেহেতু তােমরা নির্ভীকভাবে আমরা তাহাই করিব’ বলিয়া সগর্বে ব্রহ্মার বাক্যের উত্তর প্রদান করিয়াছি, সেই হেতু আমার শাপে অদ্য হইতে তোমাদের জিহবা পরিবর্তিত হইবে এবং তোমরা অন্তর্দাহ যুক্ত হইবে। এই অভিসম্পাতে তাহারা অচিরে অন্তর্দাহযুক্ত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিতে লাগিল এবং অবিলম্বে স্বীয়রূপ পরিত্যাগপূর্বক দেব-দেহ ধারণ করিল। তখন হস্তিদেহ পরিত্যাগ করায় তাহাদের আর অন্তৰ্দাহ থাকিল না। অতঃপর তাহারা পদ্মযােনির নিকটে গমন করিয়া তাহাকে ভক্তিভরে প্রণাম করিল। তিনি তাহাদিগকে দেবরূপে উপস্থিত হইতে দেখিয়া উভয় হস্তে সস্নেহে তাহাদের দেহ মার্জনা করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন;-বৎসগণ, তােমরা কোন ব্যক্তি হইতে ঈদৃশ ভয় প্রাপ্ত হইয়াছ? এবং কি নিমিত্তই বা স্বীয় গজরূপ পরিত্যাগ করিয়া দেব-দেহ ধারণ করিয়াছ? পিতার ঈদৃশ সস্নেহ প্রশ্নের উত্তরে তাহারা অগ্নির অভিসম্পাত-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত, বর্ণন করিল; কিন্তু উহাতে স্বাহা দেবীর অবমাননা করা রূপ যে স্বীয় অপরাধ ছিল তাহা গােপন করিল। ইহাতে পদ্মযােনি নিরতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন ; হে মাতঙ্গগণ, তােমরা আমাকেও প্রতারণা করিয়াছ ; স্বাহা দেবীর অবমাননার কথা আমাকে জ্ঞাপন কর নাই; তনিমিত্ত আমি অভিসম্পাত করিতেছি ;-‘তােমরা সর্বদা জল, কর্দম ও ধূলিদ্বারা লুষ্ঠিত হইবে, ইহাতে অবশ্যই তোমাদের অন্তর্দাহ নিবৃত্ত হইবে। হে মহারাজ, ব্রহ্মার এই অভিসম্পাত বশতঃই জল, কর্দম ও ধুলিবিলুণ্ঠিত হইয়া মাতঙ্গগণ নীরােগ থাকে এবং তাহাদের অন্তর্দাহ বিনষ্ট হয়। এই পর্যন্ত বলিয়া মহর্ষি পালকাপ্য নিরস্ত হইলেন। অনন্তর মহর্ষি পালকাপ্য পুনরায় অঙ্গেশ্বরকে সম্বােধন করিয়া বলিতে লাগিলেন,-মহারাজ, শ্রবণ করুন, বারণগণের স্বেদ বাহিরে প্রকাশিত না হইয়া কি নিমিঙ দেহাভ্যন্তরেই ক্রিয়া করিতে থাকে, তাহার কারণ বলিতেছি ;-হে অঙ্গনাথ, পুৰ্ব্বকালে দেবতা ও অসুরগণের মধ্যে এক মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ঐ যুদ্ধ দেবগণ, বিবিধ অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হইয়া অসুরদিগের ২০, গর্জায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। সহিত যুদ্ধার্থ গমন করেন। দীর্ঘকাল যুদ্ধের পরে স্বীয় বাহন বায়ণগণের দেহ হইতে এত অধিক পরিমাণে স্বেদ-জল নির্গত হইতে লাগিল যে তাহাদের পরিচ্ছদ উহাতে আর্দ্র হইয়া গেল। ইহার ফলে তাহারা সকলেই স্ব স্ব আসন হইতে খলিত হইয়া ভগ্নোৎসাহ হইতে লাগিলেন। ইহাতে বরুণদেব তাহাদিগকে বলিয়াছিলেন ;-হে বারণগণ, অদ্যাবধি তােমাদের ঘৰ্ম বিন্দু সকল বহির্ভাগে নিঃসৃত না হইয়া শরীরের অভ্যন্তরেই থাকিবে। হে মহারাজ, বারণগণ কি নিমিত্ত স্বীয় মলমূত্রের গন্ধ গ্রহণ করিয়া থাকে, তাহা বর্ণন করিতেছি শ্রবণ করুন ;-নরেশ্বর, আপনি অবগত আছেন যে সপ্তচ্ছদ ( ছাতিয়া) বৃক্ষের নির্যাসের গন্ধ মত্ত বারণগণের মদ গন্ধের সুসদৃশ, এই নিমিত্ত উহারা সপ্তচ্ছদ বৃক্ষে নিতান্ত প্রীতিযুক্ত দৃষ্ট হইয়া থাকে। একদা একদল মত্ত মাতঙ্গ সপ্তচ্ছদ গন্ধে অন্য গজ-মদ গন্ধ ভ্রমে একান্ত উন্মত্ত হইয়া সপ্তচ্ছদ তরুশ্রেণী পরিশােভিত ‘ভৃগু মুনির আশ্রমে প্রবেশ করিল। আশ্রমে প্রবেশ করিয়া উহারা স্বীয় মদ গন্ধেরায় সপ্তচ্ছদ-নিৰ্যাস-গন্ধে নিরতিশয় অসহিষ্ণু হইয়া আশ্রমস্থিত তরুলতা সকল ছিন্ন ভিন্ন করিয়া আশ্রম বিদ্ধস্ত করিল। এইরূপে উন্মত্ত মাতঙ্গগণ মহর্ষি ভৃগুর যজ্ঞকুণ্ড মধ্যে মলমূত্র ত্যাগ করিয়া যজ্ঞাগ্নি নির্বাপিত করিল। ইহাতে মহাতেজাঃ ভৃগু একান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া মাতঙ্গদিগকে অভিসম্পাত করিলেন ,-“হে মাতজগণ, তোমরা মত। প্রযুক্ত যেরূপ অপকৰ্ম্ম করিয়াছ তাহার ফলে আমার অভিসম্পাতে তােমরা এবং তােমাদের ভাবী বংশধরগণ, মলমূত্র ত্যাগ করিয়া তাহার গন্ধ গ্রহণ করিবে। হে মহানুভব, মহর্ষি ভৃগুর অভিশাপেই মাতঙ্গগণ স্বকীয় মলমূত্রের গন্ধ গ্রহণে এতাদৃশ প্রতীমা দৃষ্ট হইয়া থাকে। অনন্তর মহর্ষি পালকপ্য পুনরায় অঙ্গেশ্বরকে সম্বােধন করিয়া বলিতে লাগিলেন; ‘মহারাজ, বারণগণ, কি নিমিত্ত নিজদেহের বল অবগত নহে এবং উহাদের মুঞ্চ অদর্শনেরই বু। কারণ কি তাহার পুরাতন ইতিহাস বর্ণন করিতেছি শ্রবণ করুন ;-ব্ৰহ্মার মানস পুত্র আদি ঋষিগণ, অমিত বলশালী তেজস্বী ও গতিশীল পর্বতের ন্যায় বিশাল দেহবিশিষ্ট গণকে পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করিতে দেখিয়া নিতান্ত বিস্মিত হইলেন এবং বিশ্বস্রষ্টাকে সম্বােধন করিয়া বলিতে লাগিলেন ;-হে শােক-পিতামহ, এই অমিত বলশালী, সাহসী পগুগণ ক্রুদ্ধ হইলে কেন অপর প্রাণীদিগকে বিনষ্ট করিবে না? তাহা হইলে আপনার সৃষ্টি বিনষ্ট হইবে। আপনি অনুকম্পাপূর্বক তাহার প্রতিবিধান করুন। ঋষিগণের ন্যায়- সঙ্গতবাক্য শ্রবণ করিয়া বিশ্বস্রষ্টা তাহাদিগকে বলিলেন-হে ঋষিগণ, আমার ইচ্ছাক্রমে উহাদিগের আত্মশক্তি-জ্ঞান থাকিবে না। অনন্তুর একদিবস দেবগণ, পিতামহ ব্রহ্মার নিকটে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, হে এতো, ধারণগণ, যেরূপ বিশাল পুংচিহ্নবিশিষ্ট তাহাতে উহারা নিতান্ত কামুক এবং অস্ত্রশস্ত্র প্রভৃতি যুদ্ধোপযােগী সামগ্রী বহনের ভাষােগ্য হইবে। দেবগণের এইরূপ বৈধবাক্য শ্রবণে বিশ্বস্রষ্টা তাঁহাদের ইচ্ছাপুর্ণ করিলেন এবং তদবধি উহাদের বর্তমান অবস্থাপ্রাপ্তি ঘটিয়াছে।
গজশা-প্রতীকার অধ্যায়। মহারাজ, দীর্ঘতপা ঋষির শাপে যেরূপে মাতঙ্গগণের পক্ষচ্যুতি ঘটিয়াছে তাহা পূর্বেই বর্ণন করিয়াছি, অনন্তর যাহা ঘটিয়াছিল বলিতেছি শ্রবণ করুন,-বারণগণ স্বীয় অপরাধ- জনিত শাপবৃত্তান্ত অবগত হইতে পারিয়া একান্ত দুঃখিত হইল এবং বিশ্বস্রষ্টা ব্রহ্মার নিকটে গমন করিয়া বলিতে লাগিল,-“হে পিতঃ মুনি শাপানলে আমাদের অন্তর্দাহ হইতে থাকিলে অমদের বা আমাদিগের ভাবী বংশধরগণের কি উপায় হইবে? এবং মানবগণের ইচ্ছানুসারে প্রদত্ত অসদৃশ বা অনভ্যস্ত আহার গ্রহণ করিয়া লােকালয়ে তাহাদের যে বােগ উৎপন্ন হইবে তাহারই বা কি ভয়ঙ্কর পরিণাম? ঐ সকল রােগ হইতে তাহাদিগের মুক্তি লাভের কি উপায় হইবে? দিগগজগণের উল্লিখিত প্রশ্ন শ্রবণ করিয়া পদ্ম-ভু ব্ৰহ্মা, বলিতে লাগিলেন ;- বৎসগণ, পৃথিবী ক্ষত্রিয়গণ, ব্রাহ্মণ ও গেঃ-জাতির রক্ষার নিমিত্ত মহাসংগ্রামে লিপ্ত হইবেন, ঐ ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামে দেহত্যাগ করিয়া তােমরা পুনরায় স্বর্গে আগমন করিতে পারিবে। আর তােমাদের বংশধরগণ যাহারা লােকালয়ে বাস করিবে, তাহাদের রােগ প্রতীকরার্থ মতপ্রণীত ‘গজায়ুৰ্বেদ’-শাস্ত্রে অভিজ্ঞ এক ঋষি অচিরকাল মধ্যে ভূতলে জন্মগ্রহণ করিবেন।” ঐরাবত প্রভৃতি দিগবারণগণ, বিশ্বস্রষ্টার এই প্রকার আশ্বাসপূর্ণ বাক্যে কথঞ্চিৎ সান্ত্বনা লাভ করিয়া স্ব স্ব স্থানে প্রতিগমন করিল। হে মহারাজ, তদবধি সহস্র সহস্র দিগগজ বংশধরগণ, দলে দলে কানন ও শৈলমালা-পরিশােভিত পৃথিবীর সকল প্রদেশে বিচরণ করিতেছে। ইতি পালকাপ্য ঋষি বিরচিত হস্তায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাযোগ স্থানে গজশাপ-প্রতীকার নামক তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত হইল।
অথ গজবন নিরূপণ অধ্যায়। হে মহানুভব, ভারতবর্ষে আটটা সুবিখ্যাত গজাকর অরণ্য আছে। প্রথমটার নাম প্রাচ্য, দ্বিতীয়টা চেদিকরুষক’, তৃতীয়টী ‘দশাণক’ চতুর্থটী ‘অঙ্গারেয়ক’, পঞ্চমটা কালিক, ষষ্ঠটী ‘অপরাজিত’ সপ্তমী সৌরাষ্ট্রক’ এবং অষ্টমটীর নাম ‘পঞ্চনদ'। তন্মধ্যে প্রাচ্য' নামে যে বন আছে উহার একদিকে হিমালয় শৈলমালা, অপরদিকে প্রয়াগ এবং অন্যদিকে খর- প্রবাহ লোহিত্যনদ বিদ্যমান *। এই প্রাচ্য অরণ্যজাত বারণগণের কর্ণ, মস্তক, মুখবিবর ও ওষ্ঠ বৃহৎ হইয়া থাকে। উহাদের দন্তদ্বয় সাতিশয় স্কুল, উদর বিশাল, শুণ্ড ও সম্মুখের পদদ্বয় অপেক্ষাকৃত স্থূল হইয়া থাকে। উহাদের কণ্ঠস্বর মধুর ও দেহ কপিল বর্ণবিশিষ্ট দৃষ্ট হয়। অনন্তর চেদিকরুষক অরণ্য ও সেই অরণ্য-জাত বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-হে নরেশ্বর, চেদিকরুষক অরণ্যের একদিকে চেদিরাজ্য + অপরদিকে দশর্ণদেশ বা বিন্ধ্য পর্বতের পূৰ্বদক্ষিণ প্রান্ত, অন্যদিকে ‘উন্মগঙ্গ’ প্রদেশ + এবং অপর আর একদিকে নদীর উৎপত্তি স্থান। এই অরণ্যজাত হস্তিগণের পার্শ্বদেশ উন্নত, দশনদ্বয় মধুর বর্ণের ন্যায় রক্তাভ, এবং উহারা বিক্রমশালী ও শীঘ্রগামী হইয়া থাকে। ইহাদের কপিল বা তাম্রভি দেহ সুগঠিত চরণ চতুষ্টয় সুরম্য এবং ইহারা সহজেই প্রতিপালকের বশীভূত হয়। অতঃপর তৃতীয় অরণ্য ‘দশীর্ণক’ এবং সেই অরণ্যে উৎপন্ন বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে,-শার্ণক’ অরণ্য বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরদিকে অবস্থিত। উহার পূর্বদিকে দশাদেশ, পশ্চিমদিকে বেত্রবতী নদী, দক্ষিণদিকে বিন্ধ্যপর্বতমালা এবং উত্তর-পশ্চিমদিকে বর্তমান বােম্বাই প্রেসিডেন্সীর ধারবার জেলাস্থিত শ্ৰপৰ্বত অবস্থিত। এই দশাক অরণ্যজাত হস্তিগণ পিঙ্গলবণ বিশালদেহবিশিষ্ট অতি উৎকৃষ্ট হইয়া থাকে। অনন্তর অঙ্গারেক বনও তত্ৰত মাতঙ্গগণের লক্ষণ বর্ণিত হইয়াছে। এই অরণ্যের দক্ষিণ- দিকে, রেবা বা নর্মদা নদী, উত্তরদিকে রাজপুতনার অন্তর্গত বিদিশা বা ভিশা নগর-দুর্গ এবং বর্তমান জয়পুর রাজ্যের নিকটবর্তী ‘পাথর’ গিরিমালা, একদিকে ব্রহ্মপুরি শ প্রদেশ ও অপরদিকে বিন্ধ্য গিরিমালা বিদ্যমান। এই অরণ্যজাত হস্তিগণ অপরিমিত বলশালী হইয়া থাকে। উহাদের নেত্রদ্বয় সুরম্য এবং দেহের চর্ম প্রায়শঃ কোমল হইয়া থাকে। লৌহিত্যোদর কাননানি যমুনা-ভাগীরথী সঙ্গম শঙ্কোকৌলি ভুজঙ্গ মস্তক-মণিচ্ছায়া-রুণা জাবী ; মন্দামােপবনােপবিষ্ট রমণোৎসঙ্গস্থ বিদ্যাধরী পীতাপূরিত করঃ স হিমবান্ প্রাচ্যং বনং দন্তিনা। + বৰ্তমান জব্বলপুর জিলার নিকট হইতে নর্মদানদী পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগ চেদিনাজ নামে অভিহিত হইত। ptolemy সাহেবের মতে যে স্থানে বর্তমান পলা’ নদী বিদ্যমান উহাই শার্ণ দেশ। Lower, part of the Ganga. * এহ্মবতী শুলগয়ে দেখা যায়, কিন্তু প্রদেশ বাচক ‘ব্রশীত শব্দ না পাওয়ায় এমাপুরিই প্রাদেশিক নাম বর্তী এইরূপ স্থির করা গেল--B. ". Dutta, l, c. S, * গজবন নিরূপণ অধ্যায় অতঃপর কালিঙ্গক বন ও সেই বনজাত মাতঙ্গগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে এই অরণ্যের একদিকে উৎকল বা বর্তমান উড়িষ্য প্রদেশ, অপরদিকে সহ পৰ্বত ৰা নীলগিরি, দক্ষিণদিকে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরদিকে বিন্ধ্যপর্বতমালা এই বিশাল অরণ্য উড়িষ্যা হইতে আরম্ভ করিয়া নিজাম রাজ্যের কিয়দংশ ও পশ্চিমঘাট শৈলমালার পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই মহারণ্যজাত হস্তিগণের শরীরের লোম সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম, নেযুগল মধুর ন্যায় আভাযুক্ত এবং ইহায়া প্রায়শঃ মদস্রাবী ও মন্দগতি হইয়া থাকে। অনন্তর অপরাজিত বা অপরাস্ত বন ও সেই অরণ্যজাত বারণগণের লক্ষণ বর্ণিত হইতেছে, এই অরণ্যের পশ্চিমদিকে অশুগিরি বা পশ্চিমঘাট শৈলমালা, উত্তরদিকে রেবা বা নর্মদা নদী, পূৰ্ব্ব ও দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগর এবং ভারতমহাসাগর, বর্তমান মহীশূর রাজ্যসহ এই অরণ্য বিদ্যমান ছিল। এই অপরান্ত অরণ্যবাসী মাতঙ্গগণ প্রিয়দর্শন, প্রভূত বলশালী ও মৃদুচৰ্ম্মবিশিষ্ট হইয়া থাকে। অতঃপর সৌরাষ্ট্র বন ও সেই অরণ্যজাত মাতঙ্গগণের লক্ষণ কথিত হইয়াছে।রেবা বা নর্মদা নদীর উত্তর, অবন্তী বা উজ্জয়িনীর দক্ষিণ, দ্বারকার পূর্ব ও প্রমদপুরের পশ্চিম এই সমগ্র সৌরাষ্ট্র বা বর্তমান সুরাটপ্রদেশ লইয়া এই বন বিস্তৃত ছিল। সম্ভবতঃ এই নিমিত্তই উহা ‘সৌরাষ্ট্র বন’ এই আখ্যা প্রাপ্ত হইয়া থাকিবে। এই অরণ্যজাত মাতঙ্গগণ অল্পায়ু ও নির্বোধ হয় ; উহাদের নখ ও দন্ত অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র হইয়া থাকে। অতঃপর পঞ্চনদ বন ও সেই অরণ্যজাত বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে, এই মহুণ্যের একদিকে হিমালয় শৈলমালা, অপরদিকে সিন্ধুনদ, অন্যদিকে সুবিখ্যাত কুরুক্ষেত্র এবং অপর আর এক দিকে কালেয় অরণ্য। এই বিশাল অরণ্য প্রায় সমগ্র পঞ্চনদ বা পাঞ্জাব প্রদেশ লইয়া বিস্তৃত ছিল ; এই নিমিত্ত ইহাকে পাঞ্চনদ বন’ এই অন্য নাম প্রদান করা হইয়াছে। এই অরন্থ-জাত মাতঙ্গগণ প্রায়শঃ অমিত-বলশালী উগ্ৰপ্রকৃতি ও বিশাল আকৃতিবিশিষ্ট হইয়া থাকে। এই প্রকার অরণ্য-লক্ষণ ও সেই সেই অরণ্যজাত গজলক্ষণ বর্ণন করিয়া মহর্ষি পালকাপ্য পুনরায় বলিতে লাগিলেন;-মহারাজ, ভারতবর্ষীয় আটটা প্রসিদ্ধ গজাকর অরণ্য ও তদুৎপন্ন বায়ণগণের লক্ষণ শ্রবণ করিলেন, তন্মধ্যে প্রাচ্যবন, কালিঙ্গক বন এবং অপরাজিত বা অপরাস্ত বন সর্বোত্তম অরণ্য ; এই তিন অরণ্যজাত মাতঙ্গগণ ও উত্তম লক্ষণযুক্ত এবং উৎকৃষ্ট হইয়া থাকে। চেদিকরুষক, দশর্ণক ও অঙ্গারেয়ক অরণ্য মধ্যম ; এই সকল অরণ্যে উৎপন্ন বারণগণও মধ্যম গুণসম্পন্ন হইয়া থাকে; কিন্তু সৌরাষ্ট্র ও পাঞ্চনদ এই দুইটী অরণ্য অতি জঘন্য ; ইহাতে উৎপন্ন মাতজগণ ও নানাবিধ দোষযুক্ত হইয়া থাকে। ইহাদের আকৃতি প্রকৃতি ও লক্ষণ শ্রবণ করিলেন এইক্ষণে ভারতবর্ষে যে আইটী গজাকর উপবন বা স্থান আছে তাহাও বর্ণন করিতেছি শ্রবণ করুন ;-অঙ্গেশ্বর, হিমালয় শৈলমালার পূর্ব প্রান্তে কিরাতদেশ। ঐ কিতদেশে একটী গজাকির উপবন বা অনতি বিস্তৃত অরণ্য আছে। উহা পূৰ্ব্বোপন নামে পরিচিত। ঐ অরণ্যে উৎপন্ন মাতৃঙ্গগণ প্রায়শঃ বিকৃতকার হইয়া থাকে। উহাদের গতিবিধি ও প্রকৃতি সকলই দুর্বোধ।
২৪ , গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। == = = অনন্তর আগ্নেয় উপবন এবং সেই অরণ্য-জাত মাতঙ্গগণের লক্ষণ কখিত হইতেছে,এই উপবন বর্তমান চট্টগ্রাম ও আরাকান প্রদেশে অবস্থিত ছিল। উহার পুৰ্ব্ব-দক্ষিণদিকে লীলা- পর্বতমালা বিদ্যমান। ঐ অরণ্যে উৎপন্ন বায়ণগণের মুখের আকৃতি খর্ব এবং তাহাদের গতিবিধি প্রকৃতি ও দুক্তেয় হইয়া থাকে। অতঃপর দক্ষিণােপবন ও সেই বনে উৎপন্ন বারণগণের লক্ষণ বর্ণিত হইতেছে;-এই অনতি প্রশস্ত বন বিশালদ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। এই অরণ্য-জাত মাতঙ্গগণ খর্বাকৃতি, বিকৃতকার বিশষ্ট হইয়া থাকে। উহারা প্রভূত পরিমাণ আহার গ্রহণ করে, এই নিমিত্ত উহাদিগকে ‘রাক্ষস গজ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। অতঃপর খৈতাপবন ও সেই অরণ্য-জাত বায়ণগণের লক্ষণ বর্ণিত হইতেছে ;-এই অরণ্য ভারতবর্ষের নৈঋত কোণে বর্তমান পশ্চিমঘাট শৈলমালার দক্ষিণ । সীমান্তে বিদ্যমান ছিল। পুরাতনকালে এই প্রদেশকে ‘বৰ্ব্বরদেশ’ বলিত। এই অরণ্যে উৎপন্ন মাতজগণ খর্বাকৃতি বিশিষ্ট এবং তাহাদিগের দশনযুগলের আকৃতি অপেক্ষাকৃত খৰ্ব্ব হইয়া থাকে। অনন্তর পশ্চিমােপবন ও সেই অরণ্যজাত বারণগণের লক্ষণ নির্ণীত হইতেছে,—বিন্ধ্যশৈল- মালার পশ্চিমাংশে ‘বিহবল নামে এক গিরি বিদ্যমান আছে। ঐ গিরির উপরিভাগে পশ্চিমােপবন অবস্থিত। এই অরণ্য চরণ চতুষ্টয় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ জাত মাতঙ্গগণের গুণ্ড প্রায়শঃ খৰ্ব্ব এবং হইয়া থাকে। অতঃপর বায়ব্য উপবন ও সেই অরণ্যোঙব মাতঙ্গগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে,ভারতবর্ষের পশ্চিম-উত্তর কোণে এই অরণ্য বিদ্যমান ছিল। এই অরণ্য ‘বাতিক’ নামক গিরির উপরিভাগে অবস্থিত এবং এই অরণ্যে উৎপন্ন বারণগণ কৃষ্ণাভ ও কৃশাঙ্গ হইয়া থাকে। অনন্তর উরােপন ও সেই অরণ্যজাত মাতঙ্গগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে,-হিমালয় শৈলমালার উত্তরদিকে যে বন আছে, উহাকে ‘উরােপবন বলে। ঐ অরণ্য-সদ্ভূত মাতঙ্গগণ, পার্বত্য মাতঙ্গ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। উহারা অপেক্ষাকৃত নির্বোধ এবং ম্লেচ্ছদিগের ন্যায় মদ্যাদি পান করে বলিয়া অল্পায়ু হয়। অনন্তর ঈশানােপন ও সেই অরণ্যজাত মাতঙ্গগণের লক্ষণ বর্ণিত হইতেছে,-এই অরণ্য ভারতবর্ষের পূৰ্বোত্তর কোণে ভূধররাজ হিমালয়ের উপত্যকায় বর্তমান ‘ডিব্ৰুগড়’ প্রদেশের উত্তর পূৰ্ব্বাংশে অবস্থিত ছিল। ঐ অরণ্যে উৎপন্ন মাতঙ্গগণ ভস্মবর্ণ ও সকল কাৰ্য্যে অবাধ্য হইয়া নিকৃষ্টতা প্রকাশ করে, অতএব এই আটটা উপবন বা অনতি প্রশস্ত অরণ্য-জাত হস্তী গ্রহণের অযােগ্য। ইতি শ্রীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত হস্তায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহরােগ স্থানে গজবন নিরূপণ নামক চতুর্থ অধ্যায় সমাপ্ত। * বর্তমান গোহাটী প্রভৃতি স্থানের পূর্বাংশে। + সম্ভবতঃ এই দক্ষিণপন যন্ত্রমান কমারিকা অন্তরীপের নিকটবর্তী কোন স্থানে অবস্থিত ছিল।
পঞ্চম অধ্যায়। অনন্তর বাণগণের অপরিমিত বলের বিষয় এবং মৈত্রী ও দ্বেষের ফলাফল বর্ণন করিতেছি। মহারাজ, শ্রবণ করুন -হে অঙ্গেশ্বর, মাতঙ্গগণের দেহে অপরিমিত শক্তি আছে। এই প্রভূত সামর্থ্য প্রভাবে উহারা মহাবল পরাক্রমশালী পশুরাজ সিংহকেও পরাভূত করিয়া থাকে, মনুষ্য বানর প্রভৃতি দুর্বল প্রাণীদিগের ত কথাই নাই। মাতঙ্গগণের স্মৃতিশক্তি এমন প্রখর যে প্রতিপালক বা অন্য কোনও ব্যক্তি যদি কখনও উহাদিগের প্রতি অন্যায় আচরণ করে উহারা তাহা বিস্মৃত হয় না, সুযােগ পাইলেই প্রতিহিংসা লইয়া থাকে। পক্ষান্তরে বারণগণ, সন্তুষ্ট থাকিলে উহাদিগের দ্বারা নৌচালন, শকট-বহন গুরুভার স্থানান্তরীকরণ প্রভৃতি কার্য সম্পাদন করান যাইতে পারে। তদ্ভিন্ন যত্নপূর্বক শিক্ষা প্রদান করিলে উহারা নানা প্রকার কৌশল অভ্যাস করিতে সমর্থ হয়। হে অঙ্গেশ্বর, মাতঙ্গগণের কৃতজ্ঞতার বিষয় চিন্তা করিলে বিস্মিত হইতে হয়। কখনও কোনও ব্যক্তি উহাদের কিঞ্চিত্র উপকার করিলে উহারা তাহা কদাপি বিস্কৃত হয় না বরং তাহা স্মরণ করিয়া দীর্ঘকাল পরেও ঐ উপকারী ব্যক্তিকে দেখিলে চিনিতে পারে। এইরূপ মাতঙ্গগণের প্রতি কেহ সস্নেহ বা সদয় ব্যবহার করিলে উহারা তাহা চিরকাল স্মরণ করিয়া রাখে এবং সুদীর্ঘ কাল পরেও সেই ব্যক্তিকে দেখিতে পাইলে চিনিতে পারিয়া নানারূপ অঙ্গ- ভঙ্গী: দ্বারা মনােভাব ব্যক্ত করিয়া থাকে। করুণাময় পরমেশ্বর মাতঙ্গগণের অন্তঃকরণও মানবান্তঃকরণের ন্যায় দয়াগুণে অলঙ্কৃত করিয়া রাখিয়াছেন। কোনও দুঃখময় ঘটনা-দর্শনে মানব অন্তঃকরণে যেমন দয়ার উদ্রেক হয় মাতঙ্গগণের হৃদয়ও তেমনি স্বভাবসুলভ দয়ায় আর্দ্র হইয়া থাকে। স্বীয় ক্রোধ-প্রবৃত্তি. চরিতার্থের ফলে কোনও শােকাবহ ঘটনা ঘটিলে তাহারা উহা দর্শন করিয়া অনুতাপানলে একান্ত দগ্ধ হয় এবং নানাপ্রকারে সেই অন্তর্নিহিত অনুতাপ প্রকাশ করিতে থাকে। অপত্য বাৎসল্য প্রভৃতি মানবীয় মনােবৃত্তি নিচয় উহাদের অন্তঃকরণের অসামান্য ভূষণ। ইতি শ্রীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত হস্তায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাবােগ স্থানে মৈত্রীদ্বেষ ফলাফলনিরূপণ নামক পঞ্চম অধ্যায় । ৪ বয়ােনিরূপণ-অধ্যায়। অনন্তর মাতঙ্গগণের আকৃতি দেখিয়া বয়ঃক্রম কিরূপে জানা যায় তাহা বলিতেছি, মহারাজ, শ্রবণ করুন ;-হে মহানুভব, শৈশবে বারণগণ অতিশয় চঞ্চল থাকে, এমন কি এক মাস বাস্ক মাতঙ্গ-শিশু চঞ্চলতা বশতঃ স্তন্যপান করিতেও অসমর্থ হয় ; ঐ একমাসমাত্র বয়স্ক মাতঙ্গ- শিশুকে ‘শিশু’ এই অখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। গ্রহান্তরে এইরূপ কথিত আছে যে একমাস বয়স্ক গজ-শিশুদিগকে ‘বি’ বলে ; উহাৱা শুন্য পান করিতে ব্যাকুলতা প্রকাশ করে বটে, কিন্তু চপলতাবশতঃ সম্যকরূপে সমর্থ হয় না। দুই মাস বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশু ঈষৎ রক্তাভ হয়। তখন উহারা সর্বদা কর্দমে থাকিতে ভালবাসে। এই বয়সে উহাদিগকে ‘হংস’ এই বিশেষ আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। শাস্ত্রান্তরে এইরূপ কথিত আছে যে, দ্বিমাস বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশু স্তন্য পানে অভ্যস্ত হয়, উহার পঙ্কপ্রিয় ও কোমল দেহ বিশিষ্ট হইয়া থাকে। তখন উহাদিগকে ‘মণ্ডক’ বলে । মাতঙ্গ-শিশু তিন মাস বয়স্ক হইলে অত্যন্ত জল ও দুগ্ধ প্রিয় হইয়া থাকে, তখন উহারা যুথ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক স্বতন্ত্রভাবে বিচরণ করিতে ভালবাসে, এই নিমিত তাহাদিগকে ‘যুথ-নিচ্ছ্বামী’ বলে। অন্যগ্রন্থেও তিন মাস বয়স্ক গজ-শিশু, দুগ্ধ ও সলিল প্রিয় হইয়া থাকে এবং দল পরিত্যাগ করিয়া স্বাধীনভাবে বিচরণ করিতে ভালবাসে সেই জন্য তাহাদিগকে ‘ঘূথ নিষ্ক্রামী’ বলে এইরূপ লিখিত আছে। চতুর্থ মাসে মাতঙ্গ-শিশুগণ সর্বদা অবিশ্রান্তভাবে ইতস্ততঃ ধাবিত হইয়া থাকে, এই নিমিত্ত উহাদিগকে ‘চপলাঙ্গ’ বলে। শাস্ত্রান্তরেও চারি মাস বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশু সগর্বে দ্রুত গমন করে বলিয়া উহাদিগকে ‘চপলাঙ্গ’ই বলা হইয়াছে। পঞ্চম মাসে মাতঙ্গ-শিশুগণ, স্বীয় যুথ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক স্বতন্ত্রভাবে যুথের পার্শ্বে পার্শ্বে গমন করিতে থাকে এবং চঞ্চল দৃষ্টিতে ইতস্ততঃ অবলোকন করে, এই নিমিত্ত উহাদিগকে ‘বিবাক্ষ এই আখ্যা প্রদত্ত হইয়াছে। গ্রন্থান্তরে পঞ্চম মাসীয় মাতঙ্গ-শিশুর সম্বন্ধে এইরূপ কখিত হইয়াছে যে,—উহারা এই বয়সে শল্লকী, কর্ণিকার ও খদির বা খয়ের বৃক্ষের কোমল পল্লব আহার করিয়া থাকে। যাস বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশুর অঙ্গ-সংস্থান বা অঙ্গ-সন্ধি সকল সুপরিস্ফুট হইয়া উঠে। তখন উহাদের কুম্ভ বা মস্তকের উপরিভাগ এবং বদনমণ্ডল অপেক্ষাকৃত বৃকার ধারণ করিয়া থাকে। গ্রহান্তরে কথিত হইয়াছে যে-ষষ্ঠ মাসে মাতঙ্গ-শিশুর দশনযুগল মুখ-বিবর হইতে ঈষৎ নির্গত হয় এবং তাহারা সলিল দর্শন মাত্র তদভিমুখে ধাবিত হয়। এই বয়সে উহাদিগকে ‘লক্ষ্যোপদংশ’ আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে।
বয়ােনিরূপণ-অধ্যায়। সপ্তম মাসে মাতঙ্গ-শিশু তৃণ ও লণ্ড ( তালপাকান খাদ্য আহার করিতে অভ্যস্ত হয় এবং ঐ বয়সে উহাদের গমন সময়ে আর চরণে চরণে পরস্পর আঘাত প্রাপ্ত হয় না। অন্য গ্রন্থে লিখিত আছে,-বারণ-শিশুগণ সপ্তম মাস বয়স্ক হইলে উহারা তৃণ ও লণ্ড ভােজনে বিশেষরূপে অভ্যস্ত হয়, এই নিমিত্ত ঐ সময়ে উহাদিগকে ‘তৃণ-খাদী’ বলা হয় । অষ্ট মাস বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশু সতত সঞ্চরণশীল ও চঞ্চল হইয়া থাকে, এইজন্য উহাদিগকে ‘চপল’ এই অখ্যা প্রদত্ত হইয়াছে। অন্য গ্রন্থেও বর্ণিত আছে যে, - অষ্ট মাস বয়স্ক বারণ-শিশু সতত সঞ্চরণশীল ও চপল হইয়া থাকে। এই সময়ে উহাদিগকে আবদ্ধ করা প্রয়ােজন হয়। নবম মাসে বারণ-শিশুগণ, তরুপল্লব-ভােজন প্রিয় এবং কোপন-স্বভাব হয়। শাস্ত্রান্তরে কথিত আছে,-নবম মাস বয়সে মাতঙ্গ-শিশুগণ সাতিশয় নিদ্রালু হইয়া থাকে, সুতরাং ঐ বয়সের মাতঙ্গ- শিশুকে অধিক পরিমাণে নিদ্রার সেবা করিতে দেখিলে তাহার রােগ কল্পনা করা একান্ত ভ্রান্তি মূলক। দশম মাসে মাতঙ্গ-শিশু, মাতৃস্নেহাভিলাষী এবং সর্বদা ভােজনপ্রিয় হইয়া থাকে। শাস্ত্রান্তরেও কথিত আছে যে, মাতঙ্গ-শিশুগণ দশম মাস বয়সেও অজস্র স্তন্যপান করিয়া থাকে এবং মাতৃবাৎসল্য প্রাপ্ত হয়। একাদশ মাস বয়স্ক বারণ-শিশুগণের তালুদেশ অপেক্ষাকৃত উন্নত এবং সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, সুতরাং এই বয়সে উহাদিগকে ‘ব্যক্ত-তালু’ বলিয়া থাকে। অন্য গ্রন্থেও এইরূপই বর্ণিত হইয়াছে। দ্বাদশ মাস বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশু, আত্মরক্ষায় সতত সাবধান থাকে, ইহাতে উহাদের নিদ্রার হ্রাস হয়। এই নিমিত্ত উহাদিগকে ‘বিনিদ্র এই অম্বৰ্থ অখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। এই বয়সে উহাদের জিহ্বা, ওষ্ঠ, দন্ত ও কর্ণযুগল তাম্রবর্ণ ধারণ করে এবং পদতলের পশ্চাদ্ভাগ (পায়ের গোড়ালী) স্নিগ্ধ বা উজ্জলতর হইয়া থাকে। সংবৎসর পূর্ণ হইলে বারণ-শিশুদিগের মুখ-বিবরের হর্ভাগ, তালুদেশ ও পদনখের পশ্চাৎভাগ কৃষ্ণবর্ণ হয় এবং কর্ণযুগল কোমল লােমে আবৃত হইয়া থাকে। গ্রন্থরে লিখিত আছে ;- দ্বাদশ মাস বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশুর নিদ্রার হ্রাস লক্ষিত হয় এবং এই নিমিত্ত উহাদিগকে ‘বিনিদ্র বলিয়া থাকে । সংবৎসর পূর্ণ হইলে উহারা ‘বর্ষী নামে অভিহিত হয় এবং উহাদিগকে প্রায়শঃ কুশাঙ্কুর প্রভৃতি কোমল তৃণ ভােজন করিতে দেখা যায়। মতান্তরে পূর্ণ সংবৎসর বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশুদিগকে ‘বালগজ’ বা ‘বর্ষীয়গজ’ নামে অভিহিত করা হইয়াছে। দ্বিবর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গ শিশুগণের জিহ্বা ও ওষ্ঠদ্বয় রক্তবর্ণ হইয়া থাকে, অঙ্গসন্ধি সকল ঘন চর্মে আবৃত হয়, নখ-সন্ধি সকল সৰ্ব্বদা স্বেদা থাকে এবং সৰ্বাবয়ব রক্তাভ হইয়া থাকে। এই বয়সে উহাদের মস্তকে কেশ ও কর্ণের অগ্রভাগে মনােরম বিন্দু সমূহ উৎপন্ন হইয়া থাকে। তখন বারণ-শিশুগণ অল্প অল্প যবস কচরা) ভক্ষণ করিতে আরম্ভ করে। শাস্ত্রান্তরে কথিত আছে; -দ্বিবর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশুগণের নখ অপেক্ষাকৃত বৃহৎ হয় বলিয়া ঘন সন্নিবিষ্ট মনে হয়, গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। জিহবা, ওষ্ঠ ও অঙ্গসন্ধি সকল রক্তবর্ণ হয়। এই সময়ে উহারা অতি অল্প মাত্রায় স্তন্যপান করিয়া থাকে এবং কিয়ৎপরিমাণে তৃণ-লতাদি ভক্ষণ করিতে চেষ্টা করে। এই বয়সে বারণ-শিশুগণ প্রায়শঃ আঘাত ভয়ে নেয় নিমীলিত করিয়া বিনা কারণে হৃষ্টচিত্তে দ্রুতবেগে ধাবিত হয়, ঐ অবস্থায় কখনও কখনও নয়ন উন্মীলন করিয়া থাকে, কিন্তু তখনও উহারা নেত্রে আঘাত লাগিবার ভয়ে নিম্নদিকে দৃষ্টি স্থাপন করিয়া ধাবিত হয়। স্থান্তরে কথিত আছে ;-দুই বৎসর বয়স্ক বারণ- শিশুগণ এতাদৃশ ভীরু-স্বভাব হইয়া থাকে যে, উহারা মানব শিশুর কণ্ঠস্বর শুনিলেও ভীত হয়। বয়সে উহাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সকল অপেক্ষাকৃত কোমল থাকে, মুখবিবরের অভ্যন্তরবর্তী দশনাবলী শ্বেতবর্ণ দৃষ্ট হয়। এই বয়সে উহাদের অন্তঃকরণ স্বভাবতঃই নিয়ন্ত দুঃখভারাক্রান্ত থাকে, তখন প্যুষিত জল পান ও নবতৃণ ভােজনে উহাদের প্রীতি দেখা যায়। সকল মাতঙ্গ-শাস্ত্রেই দ্বিবর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গ-শিশুকে ‘চুচুক এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। ত্রিবর্ষবয়স্ক মাতঙ্গ-শিশুগণের কর্ণদ্বয়ের অগ্রভাগ মনােরম বিন্দুসমুহে অলঙ্কৃত হয়, মস্তকের উপরিভাগে কেশ উৎপন্ন হয় এবং দন্তপংক্তি দুগ্ধাভ হইয়া থাকে। এই বয়সে উহারা শুন্য ত্যাগ করিয়া আহাৰ্য্য ঘাসাদি গ্রহণ করিয়া থাকে। গ্রহান্তরে লিখিত আছে,—তৃতীয় বর্ষে বারণশিশু- গণের পদ-নখ সকল পূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়া অর্ধচন্দ্রাকৃতি ধারণ করে এবং নখ-সন্ধি সমুহ সুপরিস্ফুট হইয়া থাকে, শ্রবণ-যুগলে, দস্তপার্শ্বে এবং বক্ষঃস্থলে সুরম্য বিন্দুসকল উৎপন্ন হয়। ঐ উহাদের মস্তকে কেশ উৎপন্ন হয়, কর্ণে ও কর্ণ- পিষে (কর্ণদ্বয়ের নিকটবর্তী স্থানে। দীর্ঘলােম জন্মে। তখন উহাদের শিরঃ সৰ্ব্বদা নম্র থাকে, দশনাবলী অপেক্ষাকৃত দৃঢ় হয়, সুতরাং তৃণ ভিন্ন অন্য কিছুই আহার করিতে চায় না। এই বয়সে উহাদিগকে ‘উপসর্প’ বলে। চতুৰ্ব্ব বয়স্ক মাতঙ্গশিশুগণ প্রায় সর্বদা হৃষ্ট থাকে। এই সময় হইতেই উহাদের যৌবনের পুৰ্ব্ব লক্ষণ পরিস্ফুট হইয়া উঠে ;-এই বয়সে উহাদের মস্তক স্থির এবং গতিবিধি সভঙ্গী হইয়া থাকে। এই সময়ে উহাদিগকে ‘পৰ্য্যন্ত এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। গ্রন্থাত্তরে চতুর্বর্ষ বয়স্ক বারণ-শিশুকে ‘বৰ্ব্বর’ বলে। এই গ্রন্থকারের মতে এই বয়সে বারণশিশুগণের দশনাবলী দৃঢ়, চিত্ত চঞ্চল, জ্যা স্কুল এবং উহারা নিদ্রালু হয় ; তখন উহাদের দেহের স্থানে স্থানে মধুকর সমূহের ন্যায় বিন্দুসকল উৎপন্ন হয় ; মস্তক, কর্ণ ও কর্ণের নিকটবর্তী স্থানে লােম উদগত হইয়া বয়সে অতঃপর মাতঙ্গশিশুগণের শিক্ষা প্রদান কাল আরম্ভ হয়। পূর্ণ চারি বৎসর বয়স হইলে যা ( মাহুত), বারণ-শিশুর পৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া উহাদিগকে গমনাগমন, অবস্থান ও উপবেশন প্রভৃতির সাঙ্কেতিক শব্দ অভ্যাস করাইতে পারে। এই সময়ে উহাদের বৃহৎ দন্তদ্বয় নির্গত হয় এবং নিদ্রা অপেক্ষাকৃত অল্প হয়। তখন উহাদিগকে ‘বস’ বলে। পঞ্চবর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গ- শিগুকে ‘কলভ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। তখন উহারা তৃণ ও তরুত্ব ভােজন করিতে ভালবাসে ; ধূলি, জল ও কর্দম দ্বারা স্বীয় দেহ সিক্ত করিয়া তৃপ্তি লাভ করে। পরিচালকের বশীভূত থাকিয়া উত্থান, উপবেশন ও গমনাগমন প্রভৃতির সাঙ্কেতিক শব্দ অভ্যাস করিতে পারে। এই বয়ােনরূপ-অধ্যায়। বয়সে করি-শাবকগণের দশাবলী ও ললাটদেশ অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ও সুখ দুঃখের সম্যক অনুভূতি হইয়া থাকে এবং তখন উহাদিগকে অধিককাল ক্রুদ্ধ ও অতি অল্পকাল হৃষ্টচিত্ত থাকিতে দেখা যায়। বড়বর্য-বয়স্ক মাতঙ্গশিশুর কণীদ্বয়ে ( অধর প্রান্তভাগে) কর্ণদ্বয়ে, গণ্ডজ্বয়ে এবং দদ্বয়ের অন্তরাল প্রদেশে বিন্দুসকল উৎপন্ন হইয়া থাকে। মহর্ষি পালকাপের মতে এই ষষ্ঠবর্ষ বয়সেই উহাদিগের সুখ দুঃখের সম্যক্ অনুভূতি হইয়া থাকে । অন্য গ্রন্থের মতে ষড় বর্ষ-বয়স্ক মাতঙ্গ- শিশুকে বৈকারিক’ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে, তখন উহাদের কর্ণমুল, কর্ণ, গও, স্ক প্রদেশ, নেত্র ও দশনযুগলের অন্তরাল প্রদেশ মনােরম ঘনসন্নিবিষ্ট বিন্দুসমূহ দ্বারা ভূষিত হয় এবং শরীরে বলি বা তরঙ্গ আর দৃষ্ট হয় না। সপ্তবর্ষীয় মাতঙ্গ-শিশুগণের, কণ্ঠদেশে বলি বা ত্ব-তরঙ্গোৎপতি, নখাবলীর ঘনসন্নিবেশ এবং শরীরস্থ পৰ্যাপ্ত রােমাবলীর চাকচিক্য বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়া থাকে। এই বয়সে উহাৱা সংস্কার বশতঃ সম্পন্ন কাৰ্য্যেও আঘাত করিয়া আনন্দ অনুভব করে। গ্রন্থান্তরে সপ্তবর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গকে ‘শিশু এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। উহাতে লিখিত আছে ;-সপ্তবর্ষীয় মাতঙ্গের নখসন্ধি সমূহ সান্দ্র, নেত্ৰদ্বয়ের মধ্যভাগ উজ্জ্বল, শুণ্ডে বলি বা দ্ব তরঙ্গের উৎপত্তি, শীর্ষদেশের অপেক্ষাকৃত বিস্তৃতি, আহার কালে দশনাবলীর সম্যক ব্যবহার, গতি শক্তির বৃদ্ধি এবং বাহুদ্বয়ের ও গুণ্ডাগ্রের স্নিগ্ধতা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। এই বয়সে উহাদিগকে ‘শিশু এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। অষ্ট বর্ষীয় মাতঙ্গশিশুর ক্রোধ ও হর্ষের অল্পতা, চলন্ততা, পুংচিহ্নের সৰ্ব্বদা সহর্ষভাব, দেহে অসংখ্য বিন্দু সমুহের উৎপত্তি হয়। এই বয়সে উহাদের ধোকার প্রতি আসক্তি লক্ষিত হয় এবং হৃষ্টচিত্তে বারণগণের সহিত উহারা ক্রীড়া করিতে অভিলাষী হইয়া থাকে। এই বয়সে উহাদের দেহে কোন ব্রণ হইলে অল্পায়াসে তাহার প্রতীকার করা যাইতে পারে। গ্রন্থাত্তরে অষ্টবর্ষ-বয়স্ক মাতঙ্গগণ ‘অঞ্জন’ এই আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। ঐ গ্রন্থেই কথিত আছে—অষ্টমবর্ষবয়সে মাতঙ্গগণের নখ-সন্ধি সকল ঘনসন্নিবিষ্ট হয় এবং পদক্ষেপে ব্রণ উৎপন্ন হয়। এই সময়ে উহারা অপেক্ষাকৃত মৃদু ঘাস আহার করিতে অভিলাষী হয়, উহাদের দন্তপংক্তি বিচলিত এবং গতি চপল হয়। এই সময়ে উহাদের দেহ হইতে অজস্র দান বা মদজল ক্ষরিত হইয়া থাকে। নববর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গশিশুর দেহ-চৰ্ম্ম দৃঢ়তর হয়, মস্তকের সুচিক্কণ কেশ দুরীভুত হইয়া সেই স্থানে স্কুল লােম উদগত হয়। এই সময়ে উহাদিগকে সতত উৎসাহযুক্ত দেখা যায়। অন্যগ্রন্থে নববর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গশিশুর ‘প্রভব’ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। সেই গ্রন্থেই কথিত আছে নববর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গশিশুর দেহ-কান্তি স্নিগ্ধ, নেত্রদ্বয় শুরু, দন্তমূল দৃঢ়, বক্ষঃস্থল প্রশস্ত ও অঙ্গসন্ধি সকল কঠিন হইয়া থাকে। এই বয়সে উহারা যে আঘাত করে তাহা দৃঢ়তর হয় এবং সময়ে সময়ে হস্তিনীর অনুসরণ করিয়া থাকে। -- ৩০ গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা দশবর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গশিশুর দেহ-কান্তি মেঘের ন্যায় কৃষ্ণাভ এবং উজ্জ্বল, গুণ্ড ও অঙ্গসন্ধি সকল দৃঢ়, দেহ অপেক্ষাকৃত সবল, নেত্র ও পুংচিহ্ন শুক্লবর্ণ এবং অঙ্গসন্ধি সুপরিস্ফুট হইয়া থাকে। গ্রন্থান্তরে দশবর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গশিশুর ‘বি’ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। এই গ্রন্থে কথিত আছে যে—দশবর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গশিশুর দেহকান্তি, নবজলধরের ন্যায় কৃষ্ণাভ, অক্ষিযুগল প্রসন্ন, গণ্ড, স্কন্ধ ও চরণাপ্ত স্নিগ্ধ, দন্তমূল দৃঢ়, অঙ্গসন্ধি সকল কঠিন এবং উহারা অধিকতর তেজস্বী ও বলশালী হইয়া থাকে। এই দশম বর্ষ বয়সে উহাদের শুক্র সঞ্চার হয় এবং ধাবন কালে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আর পূর্বের ন্যায় চঞ্চল থাকে না। এই দশবর্ষ বয়স পর্যন্তই মাতঙ্গশিশুর ‘প্রথম দশা’ বলে। অতঃপর একাদশ বর্ষ হইতে উহাদের দ্বিতীয় দশা আরম্ভ হয়। দ্বিতীয় দশায় অর্থাৎ একাদশ বর্ষে বারণ-যুবকের মুখমণ্ডলে শ্মশ্রর ন্যায় মে উৎপন্ন হয়। যৌবন-প্রারম্ভে উহাদের মাংসপেশীসকল অপেক্ষাকৃত দৃঢ় হয়, গতি বেগযুক্ত হয়, সমবয়স্ক মাতঙ্গগণের সহিত বিরােধে দর্প প্রদর্শন করে। এই বয়সে উহাদের অস্থি, মাংস, রক্ত প্রভৃতি শরীর উপকরণ সমূহ দোষমুক্ত বা বায়ু, পিত্ত ও কফ-বিকার-মুক্ত থাকে। গ্রন্থন্তরে দশম বর্ষের পরে মাতঙ্গশিশুকে ‘কলভ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে -এই দ্বিতীয় দশায় উপনীত হইয়া মাতঙ্গ, বলশালী, তেজস্বী ও স্থৈর্যযুক্ত হইয়া থাকে। এই বয়সে মাতঙ্গ- যুবক, তুল্য বয়স্ক বারণগণের সহিত সতত যুদ্ধে গৰ্ব প্রকাশ করে এবং বারণ জাতির স্বভাব- সুলভ গুণ সমুদয়ে অলঙ্কত হইয়া থাকে। এই সময়ে উহাদের দর্শন-যুগল পীতাভ হয়। তৃতীয় দশায় উপনীত মাতঙ্গযুবক অত্যন্ত কোপন-স্বভাব ও জিঘাংসু হয়। এই বয়সে উহাদিগের দেহ ত্রিবলী-ভূষিত বা তিনটা ত্বত্তরঙ্গে শোভিত হইয়া থাকে। কখনও কখনও ঐ বলী বিছিন্ন কখনও বা উহা সংযুক্ত দৃষ্ট হয়। তখন শুণ্ড অপেক্ষাকৃত দৃঢ়, অঙ্গ-সন্ধি সকল সবল এবং উহাদিগকে সতত উৎসাহসম্পন্ন দেখা যায়। গ্রন্থান্তরে কথিত আছে; তৃতীয় দশায় উপনীত মাতঙ্গ-যুবককে ‘জবন’ ( বেগশালী) বলে। ঐ বয়সে উহারা, দৈহিক শক্তিসম্পন্ন, কাম-প্রবণ, যুদ্ধপটু, প্রিয়দর্শন, কোপন-স্বভাব ও সুবােধ বলিয়া অনুমিত হইয়া থাকে। তখন উহাদিগের কটে (গণ্ডে) ও ললাট প্রদেশে মদ-গন্ধ পাওয়া যায় এবং উহারা নর হত্যায় ও গিরি-সামু বা নদীকূল ভাঙ্গিতে প্রবৃত্ত হয়। এই বয়সে উহাদের দেহের ললাম, অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বলতর, নয়ন-যুগল অনেক সময়েই দীনতা-ব্যঞ্জক এবং মাতঙ্গ-স্বভাবসুলভ গুণসমূহ প্রকাশ পায়। চতুর্থ দশায় মাতঙ্গযুবকের উভয় পার্শ্ব, গণ্ডদয়, ও কর্ণ যুগল হইতে মদস্রাব হইতে থাকে। এই বয়সে উহারা কেবল বিহারযােগ্য প্রদেশে তরুণী হস্তিনীর প্রতি আসক্তি প্রদর্শন করে। শাস্ত্রান্তরে চতুর্থ দশায় উপনীত মাতঙ্গ যুবককে কল্যাণ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। এই বয়সে উহারা পূর্ণবলসম্পন্ন পূর্ণাবয়ব বলিশােভিতদেহ ও দর্পিত হইয়া থাকে এবং অন্য মাতঙ্গের সহিত বৈরভাবাপন্ন হইলে তাহাদিগকে দুরীভূত করিতে চেষ্টা করে। তখন উহারা সরলবৃক্ষ উন্মলন বষােনিরূপণ-অধ্যায়। - করিয়া তাহা ভােজন করিতে ভালবাসে। চতুর্থ দশা বা চত্বারিংশ বর্ষ বয়সে উপনীত মাতঙ্গ যুবকের শারীরিক চাঞ্চল্য অপগত হয়, তখন উহাদের পৃষ্ঠদেশে উপবেশন করিয়া লক্ষ্য স্থির করা যায়; প্রতিদ্বন্দ্বী মাতঙ্গগণের স্মৃতিতে দেহ হইতে মদ ক্ষরণ হয়। শুও আন্দোলন করিয়া তখন উহারা আনন্দ অনুভব করে। এই সময়ে উহাদের শিরঃস্থিত কেশ সকল স্কুল ও উৰ্দ্ধমুখ হইয়া থাকে এবং উহারা যুথে বিচরণ করিতে ভালবাসে। পঞ্চম দশাতে মাতঙ্গযুবক, তেজস্বী, নিরতিশয় উদ্যমশীল, সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিকতম বীৰ্য্যবান্ হইয়া থাকে। এই বয়সে উহারা ক্ষুৎপিপাসা-সহিষ্ণু, স্বকৃত বা পরকৃত কষ্ট-সহন-সমর্থ হয় এবং স্বীয় ত্বক হইতে যে মদস্রাব হয় তাহার গন্ধে আকৃষ্ট হইয়া থাকে। এই সময় হইতে উহাদের ওষ্ঠাধরের স্থূলতা অনেক পরিমাণে অপগত হয় এবং কর্ণ, গণ্ড, মস্তক ও পিঞ্চ (কর্ণমূল হইতে মদস্রাব হয়। উহারা এই সময়ে সাধারণ শব্দ শ্রবণ করিয়াও ভীত হইয়া থাকে। গ্রন্থাত্তরে পঞ্চম দশায় উপনীত মাতৃঙ্গশিশুকে ‘যুথ’ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। এই বয়সে বারণগণ সৰ্ব্বাপেক্ষা সমধিক সাহসী, বলশালী, পরিচালকের বশীভূত, পূর্ণাবয়ব, ক্ষুধাসহিষ্ণু ও হস্তিনীর প্রতি আসক্ত দৃষ্ট হয়। তখন উহাদের কর্ণ, গণ্ড, এবং অন্যান্য মদ-ক্ষরণ-যােগ্য স্থান হইতে সৰ্ব্বদা মদক্ষরণ হইয়া থাকে। এই সময়ে উহারা বিনা কারণে দীর্ঘকাল নিদ্রা যায়, সাহসী হইয়াও সহিষ্ণু হয় । তখন উহাদের গণ্ডস্থল সর্বদা মদসিক্ত থাকে। ষষ্ঠদশায় উপনীত মাতঙ্গগণের শরীরের লোম ও কেশ স্পষ্টভাবে পৃথরুপে লক্ষিত হয়। এই ষষ্টি বর্ষ বয়সে আর উহাদের দেহের তাদৃশ উপচয় থাকে না, শরীরস্থ বলি সমূহ স্থানে স্থানে ছিন্ন দৃষ্ট হয়, ইন্দ্রিয়গণের শক্তি হ্রাস প্রাপ্ত হইতে থাকে, শরীরের উপাদান স্বরূপ ধাতু সমুদয় ক্ষীণতর হইতে থাকে। গ্রন্থান্তরে, ষষ্ঠ দশায় বা ৫০-৬০ বৎসর বয়সে বারন গণের দর্শন-মূল কিঞ্চিৎ নির্গত হইয়া থাকে। এই নিমিত্ত উহাদিগকে ‘বিস্থতদন্ত’ বলা হইয়াছে। এই বয়সে দেহের উৰ্দ্ধভাগের স্ব-স্তরঙ্গ সকল বিচ্ছিন্ন দৃষ্ট হয়, তখন উহাদের শরীরের উপাদানীভূত রক্ত মাংসাদি ধাতু সমুদয় ও ইন্দ্রিয়গণ অপেক্ষাকৃত নিস্তেজ হয় এবং উহাদের ওষ্ঠ ও কর্ণ প্রভৃতি স্থানে লােম উৎপন্ন হইয়া থাকে। সপ্তম দশাতে উপনীত বারণগণের বিশেষ লক্ষণ এই যে ঐ বয়সে উহাদের সর্বাঙ্গ দীর্ঘ লােমে আবৃত হয়। শাস্ত্রান্তরে কথিত আছে—যষ্টি বর্ষ বয়স্ক বারণের পিল ও অগ্নিবল হ্রাস প্রাপ্ত হয়, বায়ুর প্রকোপ জন্মে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সকল শিথিল হয় এবং দেহকান্তি বিবর্ণ ও কর্কশ হইয়া থাকে। তখন উহাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ক্রিয়া ক্ৰমে অল্পতা প্রাপ্ত হইতে দেখা অষ্টম দশাপ্রাপ্ত মাতঙ্গ, বার্ধক্য প্রযুক্ত যুদ্ধাদি পরিশ্রমকর কাৰ্যে ক্লান্ত হইয়া পড়ে। তখন উহাদের দেহ চিররুগ্ন ও স-ব্রণ হয়, আক্ষি-যুগল কোটর-প্রবিষ্ট ও সৰ্বাঙ্গ দীর্ঘ লােমে আবৃত হইয়া থাকে এবং তখন উহারা পৰ্বত-গহ্বরে অবস্থান করিতে ভালবাসে। শাস্ত্রান্তরে কষিত আছে-৭০ - ৮০ বৎসর বয়স্ক বা সপ্তম দশাপ্রাপ্ত মাতঙ্গকে ‘বিবরী’ বলে এই বয়সে উহাদের গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা । দেহ দীর্ঘ ললামে আবৃত ও অতি বিবর্ণ এবং নেত্ৰদ্বয় অকারণ অপূর্ণ হইয়া থাকে। এই বয়সে উহাদের দেহে যে ব্রণ হয়, অতি কষ্টে তাহার প্রতীকার হইয়া থাকে, ইন্দ্রিয়গণ শিথিলতা প্রাপ্ত হয়; তখন আর দন্তদ্বয় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় না। নবম দশায় উপনীত মাতঙ্গের দেহের লুলিত চর্ম সকল ত্ব-তরঙ্গ উৎপাদন করে। ঐ বয়সে উহারা দন্তরােগাক্রান্ত হয় এবং মৃদু খাদ্য গ্রহণ করিতে ভালবাসে। তখন ক্রোধ ও ভয়াদি হেতু পৃষ্ঠ, গ্রীবা ও স্কন্ধ দেশে তাড়িত হইয়াও উহারা সবেগে গমন করিতে বা আঘাতকারীকে আক্রমণ করিতে চেষ্টা করে না। গ্রন্থান্তরে নবম দশায় উপনীত বা ৮০-৯০ বৎসর বয়স্ক মাতঙ্গকে ‘পুরাণ’ এই অর্থ আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে এবং কথিত আছে ;-ঐ বয়সে উহাদের মস্তকের কেশ ও মুখের লােম দীর্ঘ হইয়া বদনমণ্ডল আবৃত করে, নেত্রদ্বয় শিথিল হয় ; তখন উহারা পৰ্বত-গহ্বরে শয়ন-প্রিয় হয়। এই বয়সে উহাদিগকে যুথে-বিচরণ করিতে কিংবা দুর্গম স্থানে গমনাগমন করিতে অনভিলাষী দেখা যায়। তখন উহাদের অঙ্গসন্ধি সকল শিথিল হইয়া থাকে। অন্য শাস্ত্রে কথিত আছে-নবম দশায় উপনীত মাতঙ্গের গ্রীবাদেশ দুল, দন্তমূল শিথিল, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শ্লথ, দেহকান্তি কর্কশ, শরীর ত্বক তরঙ্গে ব্যাপ্ত, কণ্ঠস্বর ক্ষীণতর ও কোমল খাদ্যে প্রীতি হইতে দেখা যায়। ঐ বয়সে উহাদের দন্ত হইতে লালাস্রাব হইতে থাকে এবং উহারা যুথ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক দুর্গম স্থান হইতে দূরে অবস্থান করিতে ভালবাসে। দশম দশায় উপনীত বা ৯০-১০০ বর্ষ বয়স্ক মাতঙ্গের বিশেষ লক্ষণ এই যে-উহাদের গুফের বা পায়ের গোড়ালীর মাংস ও চর্ম লুলিত, সৰ্বাঙ্গ শিথিল, দেহ কেশ ও দীর্ঘ লােমে আবৃত হইয়া থাকে; অক্ষি প্রান্তশ্লথ ও দীর্ঘ লােমে আবৃত এবং ইন্দ্রিয়গণ শিথিল হয়। ঐ বয়সে উহারা কোন গুরুভার স্কন্ধে বহন করিতে বা উৎক্ষেপন করিতে পারে না; সৰ্ব্বদা উদর পীড়া ও মূত্র বােগে আক্রান্ত হয়। গ্রন্থান্তরে দশম দশায় উপনীত মাতঙ্গকে স্থবির এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। এই বয়সে মাতঙ্গগণের শরীরের লােমাবলী বিশীর্ণ, দেহ ক্লান্ত ও ঘর্মাক্ত, গুমন মন্থর, ও ক্লেশপূর্ণ এবং বাতের প্রকোপে সৰ্বাঙ্গ কম্পিত হইতে দেখা যায়। অন্য শাস্ত্রে কথিত আছে--দশম দশায় উপনীত মাতঙ্গের দেহ ক্ষয়শীল, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কম্পিত, শরীরের নােম বিশীর্ণ (পতিত ), দন্তমূল শিথিল, শরীরের উপাদান স্বরূপ মাংস মেদ প্রভৃতি ধাতু ক্ষয়প্রাপ্ত, শিরা সকল স্পষ্টদৃষ্ট হইয়া থাকে। তখন উহাদের দন্ত সকল পতিত হইতে থাকে, উহারা মলমূত্র ত্যাগেও কষ্ট বােধ করে, অতি অল্প খাদ্য গ্রহণ করিয়া থাকে। এই দশম দশায় উহাদের সর্বাঙ্গ এমন কি মস্তকে পৰ্য্যন্ত ত্ব-তরঙ্গ ও কর্ণযুগল বিশাল দৃষ্ট হয়। পালকাপ্য ঋষির মতে একটী হস্তী দশম দশার বা একশত বৎসরের অধিক কাল জীবিত থাকে না; কিন্তু শাস্ত্রান্তরে কথিত আছে -বারণগণ দ্বাদশ দশা পৰ্যন্ত জীবিত খাকে এবং সেই শাস্ত্রেই একাদশ দশায় উপনীত বা একশত দশ বৎসর পর্যন্ত উহাদিগকে ‘পূর্বক এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। ঐ বয়সে উহাদের দেহ সৰ্ব্বদা ক্ষতযুক্ত ও কর্কশ দৃষ্ট হয়। তখন উহাদের বক্তে, গুণ্ডাগ্রে ও অস্থিসন্ধিতে ক্ষত হইয়া থাকে। অতঃপর দ্বাদশ দশায় উপনীত হইলে মাতঙ্গগণের অঙ্কঃকরণ, স্থির অর্থাৎ বিষয় গ্রহণ শক্তির বয়ােনিরূপণ-অধ্যায়। অাব বশতঃ স্বভাবতঃই নিষ্ক্রিয় হয়। তখন উহাদের কর-চরণের অঙ্গুলি সফল ও শুণ্ডাগ্রভাগ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হইয়া থাকে। এই বয়সে মাতঙ্গগণ, নরপতিদিগের ব্যবহারের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়। এই বয়সে কি প্রকারে পালন করিলে তাহাদিগকে সুস্থ ও জীবিত রাখা যায়, তাহা বুঝিতে পারা যায় না। এই প্রকারে হস্তী দেখিয়া স্থূলভাবে তাহার বয়ােনিরূপণের উপায় সংক্ষেপে বর্ণিত হইল; বস্তুতঃ শাস্ত্রকার স্পষ্টই বলিয়াছেন যে মাতঙ্গগণের আয়ুজ্ঞান বয়ােজ্ঞান এবং গর্ভিণী-জ্ঞান সম্বন্ধে মুনিগণেরও ভ্রম হইয়া থাকে, স্থূলদশী মানবগণের তাে কথাই নাই। এই বয়ঃক্রম ভেদে মতঙ্গগণের উত্তম মধ্যম ও অধম এই তিন প্রকার আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে ;—দশ বৎসর হইতে চতুর্দশ বৎসর বয়স পর্যন্ত মাতঙ্গদিগকে ‘উত্তম’, পঞ্চদশ হইতে ত্রিংশৎবষ বয়স পর্যন্ত হস্তীদিগকে মধ্যম এবং ত্রিংশৎবর্ষ হইতে সপ্ততিবর্ষ বয়স পর্যন্ত উহাদিগকে ‘অধম’ বলা হইয়াছে। অতঃপর উহারা বৃদ্ধ ও দুর্বল হইয়া থাকে। মাতঙ্গগণের উত্তম মধ্যম ও অধম বয়ােবিভাগের ফল ও নির্ণীত হইয়াছে—প্রথম বয়সে হস্তীদিগকে সকল প্রকার শিক্ষা প্রদান করা যায়। এই নিমিত্ত উক্ত বয়ঃক্রমকালকে ‘উত্তম’ কাল বলা হইয়াছে, মধ্যম বয়ঃক্রম কালে উপনীত মাতঙ্গগণ যুদ্ধ কাৰ্য্যেই প্রশস্ত হইয়া থাকে এবং হে নরনাথ, অতঃপর অধম বয়সে উহাদিগকে অন্যপ্রকার নানাবিধ কার্যে নিয়ােগ করা উচিত। ইতি শ্রীপলিকাপ্য ঋষি বিরচিত গজায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাজােগ স্থানে বয়ােনিরূপণ-নামক ষষ্ঠ অধ্যায়।
সপ্তম প্রকরণ। অনন্তর বৈশম্পায়ন ঋষির মতে হস্তীর বয়ােজ্ঞান কথিত হইয়াছে ;-তিনি লিখিয়াছেন ভদ্র জাতীয় বারণগণ দীর্ঘজীবী হয়। পক্ষান্তরে ‘ম’ জাতীয় হস্তীসমূহ, দেহ ক্ষীণ হইবার পূর্বেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে; কিন্তু মৃগ জাতীয় মাতঙ্গগণ ‘ম’ বার অপেক্ষা অধিকতর বৎসর জীবিত থাকে। তদ্ভিন্ন সঙ্কর মাতঙ্গগণের বয়ােজ্ঞান হস্তিতত্ববিৎ পণ্ডিতগণ, ক্ৰমে অবগত হইতে পারেন। বস্তুতঃ বৃষ্টির কাল, হস্তীর আয়ু, বয়স, গর্ভ ও হিতকর প্রতিপালন পদ্ধতি এবং গ্রহ নক্ষত্রে যে সতত ধ্বনি হইয়া থাকে তাহা, মুনিগণেরও অজ্ঞেয় সাধারণ মানবগণ কি প্রকারে জানিবে ? ভদ্র মন্দ মৃগ ও সঙ্কীর্ণ, এই সকল প্রকার মাতঙ্গেরই আয়ুজ্ঞান সাধারণ শক্তির বহিভূত তথাপি বিশেষ বিশেষ লক্ষণ এবং চিহ্লাদি দ্বারা যােগিগণ কোন প্রকারে উহা নির্ণয় করিতে সমর্থ হইয়া থাকেন। দেশ-ভেদ, বলি, বর্ণ দন্ত, স্বভাব, বল, বেগ, লােম এবং কর্ণদ্বয় প্রভৃতি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দর্শন করিয়া বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগণ মাতঙ্গের বয়ঃক্রম অবধারণ করিয়া থাকেন। বেদবিগণ অতি কষ্টে মাতঙ্গগণের জন্ম-বৃত্তান্ত এবং বয়ঃক্রম অবধারণ করিতে সমর্থ হন, অপরাপর অল্পবুদ্ধি মানবগণ তাহা অবধারণ করিতে সমর্থ হয় না। গজশাবকগণ পূর্ণ এক বৎসর বয়স পর্যন্ত কেবল মাতৃস্তন্যই পান করিয়া জীবন ধারণ করে এবং অষ্টাদশ বর্ষ বয়ঃক্রমের পরে উহাদের শরীরের লােম সকল চতুরঙ্গুলী পরিমিত দীর্ঘ হইয়া থাকে। বিংশদ বয়ঃক্রম পর্যন্ত উহাদের শরীরস্থ রােমাবলীর বৃদ্ধি হইতে দেখা যায় । চল্লিশ বৎসর বয়ঃক্রম পর্যন্ত উহাদের দেহের উপচয় এবং দস্তযুগল বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও স্থূল হইয়া থাকে। উক্ত লক্ষণ সমূহ দ্বারাই মাতঙ্গগণের উত্তম মধ্যম ও অধম বয়ঃক্রম এবং কাৰ্যাকাৰ্য্য বলাবল অবগত হইতে পারা যায়। বিংশতি বৎসরের পরে চত্বারিংশৎ বৎসর পর্যন্ত বারণগণের উত্তম বয়ঃ- কাল, চল্লিশ হইতে সপ্ততি বৎসর বয়ঃক্রম পর্যন্ত মাতঙ্গগণের মধ্যম বয়স, অতঃপর জীবনকালকে ‘অধম এই অর্থ আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। উহাদের জীবনের এই অংশ নিতান্তই নিস্ফল। প্রম বিংশতি বৎসর বারণগণের বাল্যকাল । বাল্যকালের শেষ অবস্থায় কিঞ্চিৎ মদক্ষরণ হয়। ঐ বয়সে যুদ্ধ ব্যতীত অন্য সকল প্রকার কাৰ্যই উহাদিগ দ্বারা করান যাইতে পারে। বয়ঃক্রমের উত্তম, মধ্যম ও অধম দ্বারাই শারীরিক বলের তারতম্য করা হইয়াছে। দশম দশার পরে উহাদিগের গতিবিধি শয়ন প্রভৃতি সকলই মন্দ হইয়া থাকে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সকল শিথিল হয়। এই সময়ে উহারা সম্পূর্ণ অকর্মণ্য হইয়া যায় । ইতি শ্রীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত হত্যায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাবােগ স্থানে বয়ােন নামক সপ্তম প্রকরণ। . এক জাতীয় জনক ও অপর জাতীয় জননী হইতে উৎপন্ন মাতঙ্গগণকে সঞ্চর বা সঙ্কীর্ণ আখ্যা প্রদান কৰা হইয়াছে।
অষ্টম প্রকরণ অনন্তর দেশভেদে মাতঙ্গগণের উত্তম মধ্যম ও অধমাদি ভেদ কথিত হইতেছে ;-পুলিন্দ অরণ্য (১) বঙ্গদেশ হুন নেপাল অবন্তী ও বিদর্ভ দেশজাত মাতঙ্গগণ উত্তম আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। উহাদের বদনমণ্ডলে, নেত্ৰযুগলে এবং সর্বাঙ্গে রক্তবর্ণ চিহ্ন লক্ষিত হয়, উহাদের চিন্ত শান্ত এবং দেহ শ্লেষ্ম প্রধান এই নিমিত্ত উহাদিগকে ‘শূদ্র জাতীয় মাতঙ্গ বলা হইয়াছে। কাম্বােজ (২) লাটবর সিন্ধু ও অঙ্গদেশ জাত বারণগণ ‘মধ্যম’ নামে অভিহিত হইয়াছে। উহাদের শুণ্ড অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ, মুঞ্চ লম্বমান, দেহস্থিত লােমাবলী খৰ্ব্ব ও অপেক্ষাকৃত কোমল হইয়া থাকে। উহাদের নীলবর্ণ দেহে শ্বেত আভা লক্ষিত হয়, কুম্ভ, নখ ও দন্ত অপেক্ষাকৃত শ্বেতাভ হইয়া থাকে। রজোগুণের প্রাধান্যবশতঃ উহাদিগকে মধ্যম বলা হইয়াছে। সৌরাষ্ট্র, (৩) ঘূর্ণিক, কলিঙ্গ যবন, বৎস এবং কাশ্মীর দেশজাতমাতঙ্গগণ সঙ্কর ( মিশ্র ) এই আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। উহাদের বদন মণ্ডল, গণ্ডদেশ, কেশ ও শরীরস্থ লােম শ্বেতবর্ণ হইয়া থাকে। উহারা নাসিকা ও মুখ দ্বারা অন্য জাতীয় মাতঙ্গ অপেক্ষা অধিকতর বায়ু গ্রহণ করে এবং অন্য আহার না পাইলেও কিয়ৎকাল জীবন ধারণ করিতে সমর্থ হয়। উহাদের আর এক স্বভাব এই যে হস্তিনী দর্শন করিলেই দেহ, নখমুল প্রভৃতি স্থান হইতে মদ ক্ষরণ হইয়া থাকে। মৎস্য (৪) বব্বর (৫) ত্রিগর্ভ, (৬) মালব এবং অন্ত প্রদেশ জাত বারণগণ তামস প্রকৃতি অর্থাৎ আলস্য, নিদ্রা প্রভৃতি তামস-বৃত্তিদ্বারা অভিভূত। উহারাও ‘সঙ্কর’ জাতীয় মাতঙ্গ। উহাদের নেত্রয়, নখসন্ধি ও শুণ্ডা ভাগ হরিদ্রাভ এবং দন্তদ্বয় খৰ্ব্ব ও তাহার প্রান্তভাগ এবং ললাট শ্বেতাত হয়। সেবীর (৭) দশর্ন (৮) ও বাল্লীক (৯) প্রদেশে উৎপন্ন বারণগণও ‘উম’ শ্রেণীভুক্ত, কারণ উহারা যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচলিত ধৈৰ্য্য সহকারে যুদ্ধ করিয়া থাকে। উহাদের দেহের গন্ধ অগুরু চন্দনের (১) পুলিল-বৰ্ত্তমান তাপ্তি নদীর তীরে অবস্থিত অরণ্য। -মরু প্রদেশের পশ্চিম উত্তর কোনে শত নদীর তীরে অবস্থিত। কাম্বোজ-শ্যামরাজ্যের অন্তর্গত বর্তমান চীন দেশের সীমান্তে অবস্থিত। (৩) সৌরাষ্ট্র-বৰ্ত্তমান গুজরাট বা সুরাট প্রদেশ। (৪) মৎস্য-আগ্রা এবং সম্বর হ্রদের মধবর্তী ভূঙ্গ। (৩) বর্বর—সিন্ধুদেশের পূর্বাংশ। (৬) ত্ৰিগৰ্ত্ত-বর্তমান পাতিল্লাল। রাজ্যের অন্তবর্তী প্রদেশ। (৭) শোৰীৰবৰ্ত্তমান গুজরাটের পূৰ্বোত্তরাংশে অবস্থিত। (৮) দান---মান ভূপাল রাজ্যের নিকট অবস্থিত। (৯) বাণী-বর্তমান বলকান প্রদেশ।
গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা । গন্ধের ন্যায়। উহাদের মুখমণ্ডল, দেহস্থিত লােমাবলী ও দশনমুল তাম্রাভ এবং দেহ শ্লেষ্ম প্রধান হইয়া থাকে। গীৰ্ব্বাণ, বাহুক প্রভৃতি দেশজাত মাতঙ্গগণ মধ্যম শ্রেণীভুক্ত। উহাদের নানাবর্ণে চিত্রিত দেহ পীতাভ, নখালী নীলবর্ণ এবং মুষ্ক ও গুণ্ডা রক্তবর্ণ হইয়া থাকে। উহাদের দেহ কোমল এবং রজোগুণ প্রধান। মৎস্য রাজ্য, করহাটক (১) এবং ভােজ (২) প্রদেশজাত বারণগণের দেহ খৰ্ব্ব, নীলাভ ও ঈষৎ ব, গুণ্ডা ও দযুগল অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ। উহাদের গতি অতিশয় বেগশালী এবং সর্বাঙ্গে তিলের গন্ধ পাওয়া যায়। ইহারা অধম শ্রেণীভুক্ত। কর্ণাট, অন্ধ, (৩) মলয়, অলবিকুন্ত, পাণ্ড্য, পাশ্চাত্য, তৌলবকণ্টক এবং গৌড় দেশজাত হস্তিগণ সঙ্কর’ শ্রেণীভুক্ত। উহাদের দেহের বর্ণ নীল, দন্ত ও নখাবলী অতিশয় শুভ্র। উহার অত্যন্ত বলশালী এবং গজতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিগণের মতে বহু প্রকারে বিভক্ত। শৈলায়, হিরল ও সহ প্রভৃতি প্রদেশজাত মাতঙ্গগণ দেখিতে অত্যন্ত প্রিয় দর্শন হইয়া থাকে। উহাদের দেহবর্ণ পজন্ধু ফলের ন্যায়, দন্তদ্বয়ের মধ্যভাগ শ্বেতবর্ণ লােমে আবৃত ও দন্ত শুভ লক্ষণযুক্ত। উহারা সদ্যোজাত দ্বত পান করিতে ভালবাসে। উহাদের প্রকৃতি নিরতিশয় সাত্বিক হইয়া থাকে । মহারাষ্ট্র দেশজাত বারণগণের শরীরস্থ লােম নীলাভ হইয়া থাকে; কিন্তু গুজরাট প্রদেশ জাত মাতঙ্গগণ শ্বেতবর্ণ হয় এবং চুধুমল-দেশজাত বারণগণের কেবল দন্ত ও নখই শ্বেতবর্ণ হইয়া থাকে। কর্ণখৌম প্রদেশজাত মাতঙ্গগণের কেশ দীর্ঘ হয়। উহারা দেখিতে কৃশ এবং যে স্থানে দণ্ডায়মান হইয়া যুদ্ধ করে প্রায় সেই স্থান হইতে অন্যত্র গমন করিতে চায় না। ইহারা সর্বদা সকল কাৰ্যে কাতরতা প্রকাশ করে এবং অধিকাংশ সময়েই মত্ত থাকে। সুতরাং কুরু (৪) শূরসেন (৫) ও কুকুর (৬) দেশজাত বারণগণ সাধারণতঃ যুদ্ধভীরু ও নীরস দ্রব্যপ্রিয়। এই নিমিত্ত উহারাও অধম শ্রেণীভুক্ত। জাঙ্গল দেশ-জাত মাতঙ্গগণ অত্যন্ত বলশালী সাহসী ও কোপন স্বভাব হইয়া থাকে। উহাদের মস্তকে শ্বেতবর্ণ দীর্ঘকেশ জন্মে। উহারা ‘উত্তম’ আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। অনুপ দেশজাত বারণগণ খর্বাকৃতি হইয়া থাকে। উহাদের শরীর পিত্ত প্রধান এবং পুংচিহ্ন অপেক্ষাকৃত দীর্ঘাকৃতি হয়। উহারা মধ্যম’ এই আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। (১) করহাট-বৰ্তমান বােষে প্রদেশের অন্তর্গত করা প্রদেশ। (২) ছো—বিগিরি শ্রেণীর অব্যবহিত নিকটবর্ত্তী বর্জন চল নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। (৩) অন্ধ-কৃষ্ণা এবং গােদাবরী নদীর মধ্যবর্তী ভূগ। (৬) কুরু-বৰ্তমান দিল্লী দেশ। (৩) শূরসেন-বৰ্তমান মথুরা এবং দিল্লীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগ। (৬) কুকুর-ধমান যৈাধপুরের দক্ষিণাংশে অবস্থিত ছিল।
অষ্টম প্রকরণ। গ্রন্থকার যে সকল প্রদেশে উত্তম, মধ্যম, অধম ও সঙ্কর (মিশ্র) মাতঙ্গ সকল উৎপন্ন হয় তাহা বিস্তৃতরূপে উল্লেখ করিয়া পুনরায় সংক্ষেপে সঙ্কলন করিয়াছেন। উত্তম গজাকর প্রদেশ যথা,-তরন্নাল, সরবাহ প্রজ্ঞাপয়াের, যবন, সুসুল্লাস, সুতখণ্ড, শাল শৌলুক, অহিরল, সুসহক, চিল, বাহব, গুর্জর, কেরল দশাণ, বালীক, সেবীর বিদর্ভ, অবস্তি, নেপাল যুণ, সুন্দ, বঙ্গ, পুলিন্দ, প্রাগজ্যোতিষ (আসাম) পৌ, সিন্ধু, যুগন্ধর কোমল, পাঞ্চাল ও জাঙ্গল প্রদেশ। এই সকল প্রদেশজাত মাতঙ্গগণ “উত্তম’ এই আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। মধ্যম গজাকর প্রদেশ-তহার, বাহক, গীৰ্বাণ, মরাল, অঙ্গ বনাযুজ, সিন্ধু, লাটবর, কাম্বােজ এবং অনুপ; এই সকল প্রদেশে উৎপন্ন বায়ণগণ মধ্যম’ নামে আখ্যাত হয়। অধম গজাকর প্রদেশ; যথা-গান্ধার, ভােজ, করহাট, মৎস্য রাষ্ট্র, নীলবাল, মহারাষ্ট্র ও সিন্ধু । এই সকল প্রদেশে উৎপন্ন মাতঙ্গগণ ‘অধম’ নামে অভিহিত হয়। সঙ্কর গজাকর প্রদেশ,যথা অন্ত, মালব, বিগ, বৰ্ব্বর, মৎস্য, কাশ্মীর, যবন্ত বৎস, কলিঙ্গ, ঘূর্ণিক, সৌরাষ্ট্র, আরট্ট, সুসুম, শূরসেন, চৌর্য, বঙ্গ, বিদেহ, সুদেষ্ণ, কোঙ্কন, সামুদ্র, সৌর জীব, গৌরব, জাপূক, কেকয়, খার, যবকল, বিকুন্ত, পাণ্ড্য, পাশ্চাত্য, অন্ধ কর্ণাটক, ময়ল, তৌলব বণ্টক, সগর, মগধ ও চেকিতান এই সকল প্রদেশে উদ্ভূত বারণগণ ‘সঙ্কর’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। কেরল প্রদেশের প্রান্তভাগে যে সকল মাতঙ্গ জন্মে তাহারা উম। উহাদের মুখমণ্ডল ও কর্ণযুগল সুক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিন্দু দ্বারা অলঙ্কত হইয়া থাকে; নেত্রদ্বয় তাম্রাভ অথচ স্নিগ্ধ, দশাবলী ক্ষীণ ( সরু ও শ্বেতবর্ণ উহাদের আকৃতি একান্ত প্রিয় দর্শন হইয়া থাকে। অনন্তর হস্তী ধারণের প্রকার কথিত হইতেছে; ভগবান্ ব্যাসদেব মাতঙ্গগণেব গতিবিধি ও অবস্থিতি সম্বন্ধে এইরূপ উপদেশ প্রদান করিয়াছেন যে,-অরণ্যবাসী বা আরণ্য পথ. সম্বন্ধে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ, হস্তীর মল ও মুত্র শরীরে মাখিয়া অরুষ্কর বা ভল্লাতকী (ভেলা) বৃক্ষের শাখা দ্বারা স্বীয় শরীর আবৃত করিয়া পদ চিহ্ন দ্বারা, ভগ্ন-তরু শাখা দ্বারা বা বৃংহণ (শব্দ) শ্ৰবণ দ্বারা মাতঙ্গগণের গমন পথ বা অবস্থিতি স্থান জানিতে পারে। এইরূপে হস্তিগণের অবস্থান অবগত হইয়া মাতঙ্গ-লক্ষণাভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ, নরপতির বা স্বীয় প্রভুর আদেশক্রমে করিণী পৃষ্ঠে বা অন্থে আরােহণ করিয়া ‘পাদপাশ’ সহকারে বহুসংখ্যক মাহুত সঙ্গে লইয়া যত্ন পূৰ্ব্বক হস্তীধারণের নিমিত্ত গমন করিবে। নরপতি গ্রীষ্ম ঋতুতেই গজবন্ধনে অভিজ্ঞ মাহুতগণ দ্বারা যত্ন-পূৰ্ব্বক শুভ লক্ষণযুক্ত হস্তীসকল পুত করিবেন। বারিবন্ধ ‘বশাবন্ধ এবং অনুগত বন্ধ এই তিন প্রকার বন্ধই মাতঙ্গগণকে ধৃত করিবার পক্ষে উত্তম কথিত হইয়াছে। তদ্ভিন্ন “আপাত” ও “অপাত” এই দুই প্রকার বন্ধ নিতান্ত নিন্দনীয় অতএব সৰ্ব্বা বর্জনীয়; কারণ উল্লিখিত বন্ধদ্বয়ে মাতঙ্গগণ প্রায়শঃ বিনষ্ট হইয়া থাকে। .
৩৮ গজায়ুর্বেদ সংহিতা। বারি বন্ধের প্রকার এইরূপ কথিত হইয়াছে ;-বারি বেষ্টিত স্থান দেখিয়া তন্মধ্যে উৎকৃষ্ট ঘাস বপন করিতে হয় এবং উহার মধ্যে মধ্যে শল্লকী, ইক্ষুদণ্ড কদলী তরু, পদ্মকল, পিয়াল বৃক্ষ হরিৎদল শশাভিত বেণু কুঞ্জ প্রভৃতি গজপ্রিয় তরু ও তৃণ সকল রােপণ করিতে হয়। তাহা দর্শন করিয়া গজয়ুথ আহার লােভে ঐ স্থানে আগমন করে। এইরূপে প্রত্যহ চরিতে আসিলে তাহাদের সাহস বৃদ্ধি পায় এবং নিশ্চিন্ত মনে বিচরণ করিতে থাকে। তখন একদিন সহসা তাহাদের প্রতিগমন পথ অবরুদ্ধ করিতে হয়। অপর আর এক প্রকার বারিবন্ধ কথিত হইয়াছে যথা;-অনুন এক ক্রোশ দীর্ঘ ও এক ক্রোশ বিস্তৃত বারি বেষ্টিত ভূভাগ, বৃক্ষ বা বৃহৎ খোঁটা দ্বারা অতি দৃঢ়ভাবে চতুর্দিকে আবেষ্টন করিতে হয়। অনন্তর কুঞ্জরগণের প্রবেশের নিমিত্ত বাৰিবন্ধন বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ গমনাগমন পরিমিত একটা দৃঢ় দ্বার প্রস্তুত করেন। তৎপরে উহার অভ্যন্তরে গজমূখ প্রবেশ করিয়াছে বুঝিয়া বৃহৎ বৃক্ষের অওরাল হইতে উক্ত দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিতে হয়। অতঃপর অভ্যন্তরস্থিত শুভ লক্ষণযুক্ত হস্তিগণকে কৌশলে বন্ধন করিবে। বারিবন্ধ বিচক্ষণ ভগবান্ ব্যাসদেব এইরূপ বন্ধুকে বাৰিবন্ধ’ আখ্যা প্রদান করিয়াছেন। ইতি বারি-বন্ধ। সুশিক্ষিত হস্তিপালকগণ পাশহন্তে বিশাল দেহ বিশিষ্ট বেগবান্ ও করিণীর বাধ্য সাত আটটা মাতঙ্গে আরােহণ করিয়া ভল্লাতকী বা অলাভে অন্য প্রকার তরু শাখা দ্বারা স্বীয় দেহ আবরণ করিবে। অতঃপর আরণ্য গজ বন্ধনের নিমিত্ত রঞ্জু-পাশ করিণীগণের শুণ্ডে প্রদান করিয়া উহাদের দ্বারা আরণ্য মাতঙ্গ বন্ধন করাইবে এবং নরপতি, মাতঙ্গী উত্তমরূপে আবদ্ধ হইয়াছে জানিয়া তাহার পৃষ্ঠে মাহুত উঠিতে দিবেন। ইহাকেই বশাবন্ধ বলে। ইতি বশ-বন্ধ। অনুগত-বন্ধ। কখন কখনও আরণ্য মাতঙ্গ, মােহবশতঃ গৃহ পালিত হস্তিনীর অনুগমন করিয়া লােকালয়ে আগমন করে এবং কৌশলে আবদ্ধ হইয়া থাকে। গজবন্ধ-বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ এই প্রকার বন্ধুকে ‘অনুগত বন্ধ বলিয়া থাকেন। ইতি অনুগত বন্ধ । অর্পিত ও অবপাত বন্ধ। কদলী শল্পকী প্রভৃতি গজপ্রিয় তরু লতায় প্রচ্ছন্ন নাতি বৃহৎ গর্তে ফেলিয়া হস্তী ধৃত করাকে গজ-বন্ধ বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ আপাত, (অাৎ ঈষৎ পতন) বন্ধ বলিয়া জানেন। ঐ প্রকার প্রচ্ছন্ন ।
অষ্টম প্রকরণ। বৃহৎ গর্তে ফেলিয়া আরণ্য মাতঙ্গ গ্রহণের নাম ‘অবপাত-বন্ধ’ এই উভয় প্রকার বন্ধেই অনেক সময়ে মাতঙ্গের মৃত্যু ঘটে বলিয়া নিন্দিত ; সুতরাং উহা সম্যকরূপে বর্জনীয়। ইতি আপাত এবং অবপাত বন্ধ। আলান-বন্ধন মন্ত্র। অনন্তর নবস্তৃত মাতঙ্গকে আনিয়া নিম্নলিখিত মন্ত্র পাঠ পূৰ্ব্বক প্রথম স্তম্ভে বন্ধন করিতে যথা;-“হে অবাধগতিশীল মাতঙ্গ, তুমি এই অপূৰ্ব স্বীয় আবাস গৃহে প্রবেশ করিয়া এই স্তম্ভে শত বৎসর বাস কর। তােমার সাহস, পরাক্রম ও যশঃ দিন দিন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হউক। তুমি নীরােগ ও প্রভূত বলশালী হইয়া স্বীয় প্রভুর বিজয় লাভের কারণ হও।” ইতি শ্ৰীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত গজায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাবােগ স্থানে দেশান্তরভেদে গজভেদ কথন নামক অষ্টম প্রকরণ ।
++ । - নবম প্রকরণ। অনন্তর ক্রমে ভদ্র, মন্দ, মৃগ ও সঙ্কীর্ণ জাতীয় গজের লক্ষণ কথিত হইতেছে;সত্যযুগে সফল নাতই যথেচ্ছ আকুতি গ্রহণ করিয়া যদৃচ্ছাক্রমে বিশ্বের সর্বত্র বিচরণ করিতে পারিত এবং সকলেই ভদ্র গুণযুক্ত ছিল ; তাহাদের বংশজাত বলিয়া একদল মাতঙ্গ ‘ভদ্র’ নাম প্রাপ্ত হয় ত্রেতাদি যুগে উহারা মানবের বাহনরূপে পরিণত হইয়াছে, ত্রেতাযুগ হইতেই দাসত্ব প্রযুক্ত উহাদের কুলক্রমাগত গুণাবলী ক্রমে মন্দীভূত হইয়া আসিতে থাকিলে উহারা মন্দ’ এই আখ্যা প্রাপ্ত হয়। দ্বাপরে উহাদের মধ্যে একদল মুগভাবাপন্ন হওয়ায় তাহাদের বংশধরগণ মৃগ’ এই খ্যাতি লাভ করে এবং কলিযুগে ঐ সকল গুণের মিশ্রণ দর্শন করিয়া উহাদিগকে ‘সঙ্কীর্ণ’ (মিশ্রিত) এই নামে অভিহিত করা হইয়াছে। ধৈৰ্য্য, বীরত্ব, সকল কার্যে নিপুণতা, নম ব্যবহার, সৎকার্যে উৎসাহ, অনায়াসে পরিচালকের আজ্ঞা জ্ঞান, ভয়ের যথেষ্ট কারণ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কিংকৰ্তব্য- বিমূঢ় না হওয়া, শারীরিক সৌন্দৰ্য্য, বীরত্ব প্রভৃতি ‘ভদ্র’ জাতীয় মাতঙ্গের প্রধান লক্ষণ। তেজের আধিক্য থাকায় ‘ভদ্র’ জাতীয় বারণগণের দেহ-কান্তি অনতি-পক পূগ বা গুবাক ফলের ন্যায় উজ্জল হইয়া থাকে। পূর্ণবয়স্ক ভদ্র’ মাতঙ্গের দেহের দৈর্ঘ্য নবহস্তের নূন এবং উচ্চতা সপ্ত হস্তের নৃন হয় না। মন্দ’ জাতীয় বারণগণের শরীরের দৈর্ঘ্য অষ্ট হস্ত এবং ঔন্নত্য ষট হস্ত পরিমিত হইয়া থাকে। মৃগ জাতীয় গজের দেহ প্রায়শঃ সপ্তহস্ত দীর্ঘ ও পঞ্চহস্ত মাত্র উন্নত হইতে দেখা যায়। উহাদের শুণ্ডের দৈর্ঘ্যও যথাক্রমে দশ, নয়, ও অষ্ট হস্ত পরিমিত হইয়া থাকে। ভদ্র জাতীয় বারণগণের শারীরিক লক্ষণ এইরূপ কথিত আছে যে,--উহাদের কুম্ভ বা মস্তকের উপরিভাগ অত্যন্ত উন্নত, স্কুল ও বৃত্তাকার বিশিষ্ট, কর্ণযুগল বিস্তীর্ণ, কলবি ( মাছ রাঙ্গা) বিহঙ্গের ন্যায়, উহাদের নয়ন যুগল বিস্তীর্ণ ও বিপর্যস্ত পদ্মদলসদৃশ ঈষৎ উন্নত, দেহ-কান্তি স্নিগ্ধ, বনমণ্ডল ও শুণ্ড উজ্জ্বল, দন্তদ্বয় বিশাল, শুণ্ডের অগ্রভাগ রক্তোৎপল সদৃশ, পৃষ্ঠদেশ মুক্ত গুণ ধনুর মধ্যভাগের ন্যায় ঈষৎ নিম, কেশ সমূহ দীর্ঘ, দেহ সুবিভক্ত, জঘা বা উরুদেশ বরাহের জঘার ন্যায়, শুণ্ডাগ্রভাগ ভূতল পৰ্য্যন্ত লম্বমান, তালু ঈষৎ তাম্রবর্ণ মস্তক কর্কশ, দেহ উন্নত, অঙ্গসন্ধি সকল পূর্ণতা প্রাপ্ত, কণ্ঠদেশ বৃহৎ, স্থূল ও মেঘের ন্যায় উজ্জ্বল বর্ণ বিশিষ্ট, বদনমণ্ডল বিন্দু সমুহ দ্বারা অলঙ্কত হইয়া থাকে। উহারা সকল কার্যে নিপুণ, অমিত বলশালী, সাহসী ও বেগবান্ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী মাতঙ্গের দর্শনে উহাদের মদাব হয়। ‘অনুভদ্র’ জাতীয় মাতঙ্গ নামে আর এক প্রকার মাতঙ্গ দেখা যায়, উহারা দেখিতে প্রায় ‘ভদ্র জাতীয় মাতঙ্গের অনুরূপ। উহাদের লক্ষণ এইরূপ কথিত আছে যে—উহারা নাভিশ এবং নাতিল, উহাদের দর্শনাবলী ও নয়নযুগল মধুর বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল রক্তাভ, পৃষ্ঠদেশ ধনুর পৃষ্ঠদেশের ন্যায় ঈষদ্ ব; দেহ সুগােল ও মনােরম হইয়া থাকে। .
সপ্তম অধ্যায়। ভগবান্ বেদব্যাস বিরচিত গজশাস্ত্রে ভদ্র গজের লক্ষণ এইরূপ কথিত হইয়াছে যে, উহাদের দেই, শুণ্ড এবং পুচ্ছ নতি স্কুল ও নাতি কৃশ, বক্ষঃ বিশাল ও উন্নত, পৃষ্ঠদেশ ধনুরাকার, কুম্ভ বা মস্তকের উপরিভাগ সাতিশয় উন্নত ও স্থূল, গণ্ডদ্বয় নিরতিশয় নিম্ন, দন্ত স্থূল, পদতল বিপুল, নিতম্ব- দেশ বরাহের জন সদৃশ, কুক্ষিদ্বয় ছাগ কুক্ষির ন্যায় মনােহর, নখ ও দন্ত সমদীর্ঘ ও উজ্জল হইয়া থাকে। উহাদের নেযুগল মধুর ন্যায় পিঙ্গল বর্ণ, ললাটদেশ উন্নত, ঈষৎ গৌরাভ এবং বিন্দুসমূহে পরিশােভিত ; তালু জিহ্বা এবং ওষ্ঠ ঈষৎ তাম্রবর্ণ। উহারা আহার ও বিহারকালে আরণ্য-বারণ- যুথের অর্থে অর্থে গমন করিতে অভ্যস্ত এবং মেঘ-গর্জন কিংবা ভেরীধ্বনি শ্রবণে ভীত না হইয়া অব্যাকুলভাবে গমন করিয়া থাকে। বন হইতে ধৃত হইয়া লােকালয়ে আসিলে উহারা কৰ্ম্মকালে অভিজ্ঞ ও পরিচালকের আদেশ বা উপদেশ অবিলম্বে গ্রহণ করিতে সমর্থ হয়, এবং উহাদিগকে যাহা শিক্ষা প্রদান করা যায় তাহা কখনও বিস্মৃত হয় না। উহারা যেমন সাহসী তেমনই কর্মবীর হয়। উহাদের গতিবিধি নরপতির ন্যায় প্রভুত্বব্যঞ্জক। এই প্রকার ‘ভদ্র মাতঙ্গ প্রভুর বিজয়াবহ হইয়া থাকে। অনন্তর মন্দ জাতীয় মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-মন্দ জাতীয় মাতঙ্গের শুণ্ড, কর্ণ ও উদর অপেক্ষাকৃত বৃহৎ, পুংচিহ্ন ও লাঙ্গল-মূল স্কুল, মাংসাবলী বা ত্বর অধিকতর লম্বমান, অক্ষিযুগল সিংহের ন্যায় হইয়া থাকে। গ্রহান্তরে কথিত আছে—মন্দ জাতীয় মাতঙ্গগণের দেহ সাতিশয় স্থূল, শুণ্ড, দন্ত, নখ ও উদর বিশাল, মাংসাবলী লম্বমান, দৃষ্টিক্ষেপ বক্র, চিত্ত দুঃখভারা- ক্রান্ত, আলস্য, নিদ্রালুভাব, মূঢ়তা, গম্ভীর-বেদিতা এবং অনিষ্টকারিণী বুদ্ধি এই সকলই তমোগুণ- সম্ভুত ; মন্দ জাতীয় মাতঙ্গগণের উক্ত সকল দোষই বিদ্যমান থাকে। মন্দ জাতীয় মাতঙ্গের উল্লিখিত দোষসমূহ বিদ্যমান থাকিলেও উহাদিগের গুণও অল্লাধিক পরিমাণে লিখিত আছে; সকল প্রখর শুভ কর্মেই মন্দ জাতীয় মাতঙ্গে আরােহণ প্রশংসনীয়। তদ্ভিন্ন মন্দ জাতীয় মাতঙ্গপৃষ্ঠে আরােহণ অপেক্ষাকৃত সুখকর। মন্দজাতীয় মাতঙ্গের বর্ণ নবজলধরের ন্যায় গাঢ় কৃষ্ণ, উহাদের, সৰ্বাঙ্গ কৃষ্ণবর্ণ রুক্ষাতি কেশে আবৃত, প্রকৃতি শ্লেষ্ম ও পিত্ত এই উভয় গুণসম্পন্ন হইয়া থাকে। ভগবান্ ব্যাস বিরচিত গজ শাস্ত্রে মন্দ মাতঙ্গগণের লক্ষণ এইরূপ কথিত হইয়াছে যে,-মন্দ জাতীয় মাতঙ্গগণের বক্ষঃস্থল, মুখমণ্ডল, কর্ণযুগল, শুণ্ড লাঙ্গুল এবং পৃষ্ঠদেশ বিশাল ও দীর্ঘ হইয়া থাকে। উহাদের উদর ভেকের উদরের ন্যায়, অক্ষিযুগল কপিল বর্ণ এবং দেহ নব-জলধর বর্ণবিশিষ্ট ও স্থূল হয়। উহারা অলস প্রকৃতি, প্রভূত বলশালী, অরণ্যে বাসকালে শশক প্রভৃতি ক্ষুদ্র জন্তু দেখিয়াও ভীত হয়। উহারা কখনও হৃষ্টচিত্তে অবস্থান করে না, সতত নিদ্রালু হইয়া থাকে। শিক্ষাদান সময়ে মন্দজাতীয় বারণগণ অনেক বিলম্বে শিক্ষা গ্রহণ করিতে সমর্থ হয় এবং অবিলম্বেই শিক্ষিত বিষয় বিস্তৃত হয়; কিন্তু মন্ত অবস্থায় শিক্ষিত বিষয় স্মরণ করিতে সমর্থ হয়। উহাদের দেহকান্তি স্নিগ্ধ, দৃষ্টিব, মস্তকের বর্ণ নবজলধরের বর্ণের ন্যায় শ্যাম সুন্দর দর্শন যুগল অধোমুখ উদর লম্বমান ও ললাটদেশ দীর্ঘ হইয়া থাকে।
গজায়ুৰ্বেদসংহিতা। অনন্তর ‘মৃগ জাতীয় মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইয়াছে;-মৃগ জাতীয় মাতঙ্গগণের শুণ্ড, চরণ-চতুষ্টয় ও গ্রীবাদেশ কৃশ ও খৰ্ব্ব, নেত্রদ্বয় স্থূল, কেশ, পুংচিহ্ন ও ওষ্ঠাধর খর্বাকৃতি এবং মুখ ও দন্ত কৃশ হইয়া থাকে। উহাদের সর্বাঙ্গ কৃশ, ধুসরবর্ণ সুন্দর ও ঈষৎ বক্র, অনুভব শক্তি তীব্র, মতি ও গতি চঞ্চল, স্বভাব অত্যন্ত কোপন, দেহ পিত্তপ্রধান এবং দন্তদ্বয় দীর্ঘ হইয়া গ্রান্তরে কথিত আছে-“মৃগ’ জাতীয় মাতঙ্গগণ তেজস্বী, উগ্ৰস্বভাব, চঞ্চল, ক্ষিপ্রকারী এবং দুর্বল হইয়া থাকে। উহাদের অনুভব শক্তি তীব্র, দেহ মলিন-বন্ত্রের ন্যায় ধুসরবৰ্ণবিশিষ্ট, শরীরে লােমাবলী রুক্ষ ও তাম্রবর্ণ, এবং প্রকৃতি পিত্তপ্রধান হইয়া থাকে। পালকাপ্য ঋষির মতে,-মৃগ জাতীয় মাতঙ্গগণের অঙ্গুলী, লাঙ্গল, বদনমণ্ডল ও পুংচিহ্ন কৃশ । উদর লঘু, গণ্ডদ্বয় ও কণ্ঠদেশ ক্ষীণ, কর্ণদ্বয় বিস্তীর্ণ, দন্তদ্বয় কৃশ ও দীর্ঘ এবং অক্ষিযুগল স্কুল হইয়া থাকে। ব্যাসবিরচিত মাতঙ্গশাস্ত্রে লিখিত আছে-‘মৃগ’ জাতীয় মাতঙ্গগণের শরীর, চরণ, নখ, গন্ত দেহের মধ্যভাগ, শুণ্ড ও কণ্ঠদেশ ক্ষীণ ও দীর্ঘ হইয়া থাকে। মস্তক, স্কন্ধ, লাঙ্গল ও গণ্ডদ্বয় খর্ব হইয়া থাকে। উহাদের গণ্ডদ্বয় প্রায় সর্বদা মদসিক্ত খাকে; কুক্ষি ও কর্ণদ্ব অত্যন্ত ক্ষীণ হয়, অঙ্গুলি, চিবুক, কেশ ও বক্ষঃ ঈষৎকুজ পরিলক্ষিত হয়। মৃগ’ জাতীয় বারণগণের আরণ্য অবস্থায় শরীরের বর্ণ গাঢ় কৃষ্ণ, নয়ন স্বচ্ছ ও স্থূল থাকে। উহারা একাকী চরিতে ভালবাসে এবং অন্যান্য পশুর বিচরণক্ষেত্রে গমন করে। উহারা ভীরু ও চঞ্চলচিত্ত হইয়া থাকে। ধৃত হইয়া লােকালয়ে আসিলে কৰ্ম্মকালে উহাদের উনবেদিতা (অনুভব শক্তির তীব্রতা) দুঃশীলতা ও চপলতা লক্ষিত হয়। অনন্তর ‘সঙ্কীর্ণ জাতীয় মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে । বিভিন্ন জাতীয় জনক জননী হইতে উৎপন্ন বারণগণকে ‘মিশ্র’ বা ‘সঙ্কীর্ণ এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। সঙ্কীর্ণ জাতীয় মাতঙ্গে ভদ্র, মন্দ ও মৃগ এই তিন প্রকার মাতঙ্গের গুণই লক্ষিত হয়। এই সঙ্কীর্ণ জাতীয় বারণগণ ধৃত অইলে অতিশয় দ্রুতগতিতে ধাবিত হয়, কিন্তু উহাদিগকে গমন করিতে সঙ্কেত করিলে উহার গমন করে না। উহারা একান্ত ধূর্ধ; এই নিমিত্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মাতঙ্গ নিকটবর্তী হইলে তাহা সহজেই বুঝিতে পারে। উল্লিখিত সঙ্কীর্ণ বা মিশজাতীয় মাতঙ্গ নানা প্রকার ;-‘ভদ্র মন্দ ভদ্র মৃগ, মন্দ ভদ্র’ ‘মন্দ মৃগ’ ‘মৃগম’ ‘মৃগভদ্র’ ‘ভদ্রমন্দ মৃগ’ ‘মন্দ মৃগ-ভদ্র’ ও ‘মৃগ-ভদ্র- মন্দ। তদ্ভিন্ন দেহের উৰ্দ্ধাংশ ও অধ অংশ ভেদেও উহার দ্বিবিধ । সৰ্বসমেত এই অষ্টাদশ প্রকার ‘সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গ কথিত হইয়াছে। হে নরনাথ, কলিযুগে সকল মাতঙ্গই ‘সঙ্কীর্ণ’ বা মিশ্র শ্রেণীভুক্ত। গুণ ও দোষের আধিক্য বিচার দ্বারা সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গগণের নাম ও লক্ষণ নির্ণীত হইতেছে।-হে নরেশ্বর, মাতঙ্গদিগের মধ্যে ভদ্র জাতীয় মাতঙ্গই বিশালদেহ বিশিষ্ট হইয়া থাকে এবং মন্দ জাতীয় মাতঙ্গও অন্যান্য জাতীয় বারণ অপেক্ষা বৃহৎ হয়। সুতরাং এই উভয় জাতীয় জনক-জননী হইতে উৎপন্ন বারূণগণের মধ্যে যাহাদের সম্মুখ ভাগ ‘ভদ্র’ ও পশ্চাৎ ভাগ মন্দ অহারাই অপরূপ সপ্তম অধ্যায়। সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গ অপেক্ষা উত্তম। সম্ভবতঃ বর্তমান সময়ে এই শ্রেণীর মাতঙ্গকে কুমিরিয়া বাঁধের হস্তী বলা হইয়া থাকে। অনন্তর ‘ভদ্রমৃগ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-মৃগের আকৃতির সহিত কিঞ্চিৎ সাম্য থাকিলেও ‘ভদ্র’ জাতীয় মাতঙ্গগণ কখনও হীন হইতে পারে না, বরং উহারা বহুল পরিমাণে উত্তম গুণসম্পন্নই হইয়া থাকে। যে সকল মাতঙ্গের দেহের সম্মুখভাগ ‘ভদ্র কিংবা মন্দ জাতীয় মাতঙ্গের সম্মুখভাগের সুসদৃশ এবং পশ্চাদ্ভাগ ‘মৃগ’ জাতীয় বারণগুণের অনুরূপ উহাদিগকে ‘দ্র-মৃগ’ বলে। উহারা অত্যন্ত বেগবান্ বা দ্রুতগামী হইয়া থাকে। যেহেতু সকল শাস্ত্রেই নয়ন যুগলকে অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলা হইয়াছে, সেই নিমিত্ত যদিও ‘ভদ্র’ জাতীয় মাতঙ্গের অক্ষিদ্বয় মৃগের নয়নের অনুরূপ, তথাপি উল্লিখিত ভদ্র-মৃগ জাতীয় বারণগণ কোন ক্রমেই প্রশংসনীয়তম নহে। সম্ভবতঃ উহারাই বর্তমান ‘মিড়কা বাঁধের হাতী। অনন্তর মদ-ভদ্র জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-এই প্রকার যে সকল বারণের দেহের সম্মুখ ভাগ ‘ম’ জাতীয় মাতঙ্গের অনুরূপ এবং পশ্চাদ্ভাগ “ভদ্র জাতীয় রায়ণগণের পশ্চাদ্ভাগের সুসদৃশ, উহার ‘ম-ভদ্র’ এই আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে ;-এই জাতীয় মাতঙ্গগণও উত্তম গুণবিশিষ্টই হইয়া থাকে। অনন্তর ‘ম-মৃগ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের অঙ্গ- প্রত্যঙ্গে ‘ম’ জাতীয় বারণগণের সৌসাদৃশ্য বহুল পরিমাণে বিদ্যমান থাকে এবং অতি অল্প পরিমাণে ‘মৃগ’ জাতীয় বারণের লক্ষণ প্রতিভাত হয় ; পক্ষান্তরে ভদ্ৰজাতীয় মাতঙ্গের কোন চিহ্নই লক্ষিত হয় না, তাহাকে ‘ম-মৃগ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গ বলা হইয়াছে। উহারা মধ্যম গুণযুক্ত হইয়া থাকে। অনন্তর ‘মৃগ-মন্দ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে-যে সকল মাতঙ্গের আকৃতি ও শক্তি মৃগ জাতীয় বারণগণের অনুরূপ উহারা একান্ত অধম ; কারণ উহারা শারীরিক ও মানসিক এই উভয়বিধ শক্তিহীন হইয়া থাকে। সম্ভবতঃ ইহাদিগকে বর্তমান সময়ে একহারা বাঁধের হাভী’ বলে । সঙ্কীর্ণ’ জাতীয় বারণগণের মধ্যে ‘ভদ্র-মন্দ’ মাতঙ্গগণই সর্বোৎকৃষ্ট এবং মৃগ-মন্দ মাতঙ্গগণ সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট হইয়া থাকে। অনন্তর ‘মৃগ-ভদ্র জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;যে সকল মাতঙ্গের শুণ্ড, দস্তদ্বয়, অক্ষিযুগল ও কুম্ভ বা মস্তকের উপরিভাগ ‘মৃগ জাতীয় বারণগণের অনুরূপ এবং অবশিষ্ট অবয়ব ভদ্র জাতীয় মাতঙ্গগণের সুসদৃশ, উহাদিগকে ‘মৃগ-ভদ্র এই আখ্যা প্রদান করা হইয়া থাকে; মৃগ-মন’ জাতীয় বারণগণ যেমন নিকৃষ্ট বলিয়া গণ্য হইয়াছে ‘মৃগ-ভদ্র’ জাতীয় মাতঙ্গগণও তেমনি একান্ত অধম বলিয়া কথিত হইয়াছে। অনন্তর ‘ভদ্রমন্দ-মৃগ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে;ৰ সকস বারণের দেহের সম্মুখ ভাগ ‘ভদ্র’ জাতীয় বারণগণের অনুরূপ, মধ্য ভাগ মদ' জাতীয় মাতঙ্গগণের সুসদৃশ ৫ এবং পশ্চাদভাগ ‘গ’ জাতীয়, হস্তিগণের তুল্য, তাহাদিগকে ‘ভদ্র-মন্দ-মৃগ জাতীয় সঙ্কীর্ণ ৪৪ গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা মাতঙ্গ বলে। উহারা সত্বর গমনে সমর্থ হয় এবং মধ্যম গুণযুক্ত মাতঙ্গ বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। ইহারাই বর্তমান ‘শোলা বাঁধের হাতী'। অনন্তর মন-মৃগ-ভদ্র জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে;যে সকল মাতঙ্গের দেহে ‘ম’ জাতীয় বারণগণের সৌসাদৃশ্য বহুল পরিমাণে বিদ্যমান থাকে এবং অপরাপর অবয়বে মৃগ’ ও ‘ভদ্র’ জাতীয় বারণের অবয়ব-সাদৃশ্য লক্ষিত হয়, তাহাদিগকে ‘ম-মৃগ-ভদ্র জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গ বলে। উহারা মধ্যম গুণযুক্ত বলিয়া মধ্যম শ্রেণীভুক্ত হইয়া থাকে । অনন্তর ‘মৃগ-ভদ্র-মন জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে, যে সকল মাতঙ্গের আকৃতি ও শক্তি মৃগ জাতীয় মাতঙ্গের অনুরূপ তাহারা শারীরিক ও মানসিক উভয়বিধ শক্তি বিহীন বলিয়া অধম শ্রেণীভুক্ত হইয়া থাকে। সুতরাং যে সকল মাতঙ্গের শুণ্ড, দন্ত, চক্ষু ও কুম্ভ প্রভৃতি মুখ্য অবয়বে মৃগ জাতীয় বারণগণের সৌসাদৃশ্য বিদ্যমান থাকে এবং অপরাপর অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ‘ভদ্র’ ও ‘ম’ জাতীয় মাতঙ্গের লক্ষণ প্রতিভাত হয়, তাহারাও নিকৃষ্ট মাতঙ্গ মধ্যে গণ্য এবং ‘মৃগ-ভদ্র-মন্দ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গ নামে অভিহিত হয়। অনন্তর ‘উদ্ধা-ভদ্র-অধাে-মন্দ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-হে নরনাথ, বারণগণের মধ্যে ‘ভদ্র’ জাতীয় বারণগণই বৃহত্তম হইয়া থাকে, ‘ম’ জাতীয় মাতঙ্গগণও বিশালদেহ বিশিষ্ট, অতএব যে সকল মাতঙ্গের দেহের উদ্ধৃভাগ ‘ভদ্র জাতীয় মাতঙ্গের অনুরূপ এবং অধােভাগ ‘ম’ জাতীয় বারণগণের সুসদৃশ তাহারাও ‘ভদ্র-মন্দ নামে অভিহিত হয় এবং উম মাতঙ্গ মধ্যে গণ্য হইয়া থাকে। বর্তমান সময়ের ‘দোহরা বঁধের হাতী’ এইরূপ । অনন্তর ‘উদ্ধা-ভদ্র অথধামৃগ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের প্রধান অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ‘ভদ্র’ জাতীয় বারণের লক্ষণ সুপরিস্ফুট থাকে এবং অপরাপর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মৃগ জাতীয় বারণগণের অবয়বের কিঞ্চিৎ সাম্য থাকে, উহারাও উত্তম শ্রেণীভুক্তকারণ • ‘ভদ্র’ জাতীয় মতিঙ্গ কখনও নিকৃষ্ট হয় না। অনন্তর ‘উদ্ধা মন্দ অধাে ভদ্র জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল তঙ্গের মুখ্য অবয়ব-সমূহে মন্দ জাতীয় মাতঙ্গের সৌসাদৃশ্য স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় এবং অপরাপর অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ভদ্র জাতীয় বারণের লক্ষণ বিদ্যমান থাকে তাহাদিগকে মন্দ-ভদ্র’ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গ বলে। উহারাও উৎকৃষ্ট মাতঙ্গ মধ্যে গণনীয়। সম্ভবতঃ অধুনা উহাদিগকে ‘গঠিয়া বাঁধের হাতী’ বলা হয়। অনন্তর ‘উদ্ধা-মন্দ-অপাে-মৃগ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;যে সকল মাতঙ্গের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মন্দ’ জাতীয় বারণের সৌসাদৃশ্য বহুল পরিমাণে বিদ্যমান থাকে এবং মৃগ’ জাতীয় মাতঙ্গের লক্ষণ অতি অল্পই প্রতীয়মান হয়, তাহারা মধ্যম শ্রেণীর অন্তর্গত। অনন্তর ‘উদ্ধা মৃগ-অধাে-মন্দ’ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ‘মৃগ’জাতীয় বারণগণের সৌসাদৃশ্য বহুল পরিমাণে বিদ্যমান থাকে এবং ‘মন জাৰ্তীয় মাতঙ্গের লক্ষণ অতি অল্পই প্রতিভাত হয়, তাহারা শারীরিক ও মানসিক সপ্তম অধ্যায়। ৪৫ উভয়বিধ শক্তি বিহীন ও অধম শ্রেণীভুক্ত বলিয়া জানিবে। সম্ভবতঃ ইহারাই বৰ্তমান ‘পাতলা খালের হাতী। অনন্তর ‘উদ্ধা মৃগ-অধাে ভদ্র জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের শুণ্ড, দশন যুগল, নেত্ৰদ্বয় ও কুম্ভ প্রভৃতি মুখ্য অবয়বসমূহে মৃগ জাতীয় মাতঙ্গের সৌসাদৃশ্য বিদ্যমান থাকে এবং অপরাপর অবয়বে ‘ভদ্র’ জাতীয় মাতঙ্গের লক্ষণ বিদ্যমান থাকিলেও উহারা নিকৃষ্ট মাতঙ্গ মধ্যে গণনীয়। অনন্তর ‘উদ্ধভদ্র -অধাে-মন্দ-মৃগ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে; যে সকল মাতঙ্গের দেহের উৰ্দ্ধভাগে ‘ভদ্র’ ও ‘মন’ জাতীয় মাতঙ্গের লক্ষণ বিদ্যমান থাকে এবং অধােভাগে মৃগ জাতীয় বারণের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়, সেই সকল ভদ্র-মন্দ-মৃগসাদৃশ্য যুক্ত বারণগণ মধ্যম শ্রেণীর মাতঙ্গ মধ্যে গণনীয় এবং দ্রুত গমনশীল হইয়া থাকে। অনন্তর ‘উদ্ধামন্দ-অধধ-মৃগ-ভদ্র’ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;- সকল মাতঙ্গের দেহের উৰ্দ্ধ ভাগে মন্দ জাতীয় বারণগণের সৌসাদৃশ্য বহুল পরিমাণে বিদ্যমান থাকে এবং অন্যান্য অবয়বে ‘মৃগ’ ও ‘ভদ্র’ জাতীয়—মাতঙ্গের লক্ষণ দৃষ্ট হয়, তাহারা মধ্যম শ্রেণীর মাতঙ্গ মধ্যে গণ্য। অনন্তর ‘উৰ্দ্ধ-মৃগ অধে-ভদ্র মন্দ’ জাতীয় সঙ্কীর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে,-যে সকল মাতঙ্গের শুণ্ড, দন্ত, চক্ষু ও কুম্ভ ‘মৃগ জাতীয় মাতঙ্গের ন্যায় এবং অপরাপর অবয়ব ‘ভদ্র ও ‘ম’ জাতীয় বারণগণের সুসদৃশ, উহারা নিতান্ত নিকৃষ্ট মাতঙ্গ মধ্যে গণ্য; কারণ যে সকল মাতঙ্গের আকৃতি, প্রকৃতি ও শক্তি মৃগের অনুরূপ সেই সকল শক্তি ও সদ্গুণবিহীন মাতঙ্গকে অধম বলিয়া জানিবে । ইতি শ্ৰীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত গজায়ুৰ্ব্বেদে মহাপ্রবচনে মহারােগস্থানে গজলক্ষণ নির্ণয় নামক সপ্তম অধ্যায় সম্পূর্ণ।
; অষ্টম অধ্যায়। অনন্তর ব্রহ্মাদির অংশে উৎপন্ন মতিঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের গৌর- বর্ণ রম্যদেহ, সংযুক্ত বিন্দুসমূহ দ্বারা ভূষিত, নেত্র প্রান্তদ্বয় লােহিতবর্ণ, দন্তদ্বয় স্নিগ্ধ ও দৃঢ়, সেই সকল মাতঙ্গ ব্ৰহ্মাংশ সমুৎপন্ন। উহারা স্বীয় প্রভু নরপতিদিগের বিজয় ও আনােগ্যবর্ধনকারী এই নিমিত্ত সমধিক যত্ন পাইবার যােগ্য। ভগবান্ ব্যাসদেব, ব্ৰহ্মাংশ সম্ভুত মাতঙ্গের এই প্রকার লক্ষণ বলিয়াছেন। অনন্তর প্রজাপতির অংশে উৎপন্ন বারণগুণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ; যে সকল মাতঙ্গের কক্ষাভাগ এবং কণ্ঠদেশ সমান, ভুজমুল স্কুল, মুখমণ্ডলে রক্ত পদ্মের কান্তি এবং দেহ, যুগ্ম রােমে শােভিত, উহারা প্রাজাপত্যাংশ-সস্তৃত এবং প্রজা বৃদ্ধিকর মাতঙ্গ। বৎসরের মধ্যে বহুকালই উহাদের দেহ হইতে মদস্রাব হইয়া থাকে এবং উহারা মেঘের ডাকে হর্ষ অনুভব করে। অনন্তর ইন্দ্রাংশ জাত বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের শরীরে বহু বিন্দু বা রেখময় স্বস্তিক, পদ্ম ও নদ্যাবর্ত চিহ্ন দৃষ্ট হয় এবং যাহাদের নেত্রপ্রাপ্ত রক্তোৎপল-সদৃশ, উহ' ইন্দ্রাংশ সস্তৃত মাতঙ্গ। অনন্তর ধনদাংশ-সত বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;- যে সকল মাতলের দেহের বর্ণ অমলকী ফলের ন্যায় হরিদ্রাভ, নেত্রদ্বয় ও দশনদ্বয় কুঙ্কুমকান্তি এবং ওষ্ঠ ও জিহ্বা তামাভ, তাহারা ধনদ বা 'কুবেরের অংশে উৎপন্ন মাতঙ্গ। উহারা প্রতিদ্বন্দ্বী নরপতির বিজয় ও সম্পদ আনয়ন করিয়া স্বীয় প্রভুকে প্রদান করে। উহারা সকল প্রকার মাতঙ্গ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, স্বীয় প্রভু নরপতির ধনসম্পদ বৃদ্ধিকারী, এই নিমিত্ত একান্ত আদৃত হইয়া থাকে। অনন্তর বরুণাংশে উৎপন্ন বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;- যে সকল মাতঙ্গের কৃষ্ণবর্ণ দেহ হইতে তরল ঘৃত সদৃশ মদস্রাব হয়, তাহাদিগের মস্তকে উপবেশন অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক। উহাদের গর্জন মেঘ গর্জনের ন্যায় গম্ভীর। বরুণাংশে উৎপন্ন বারণগণ প্রভূত মদাবী ও স্বীয় প্রভুর বিজয়প্রদ হইয়া থাকে। অনন্তর চন্দ্রাংশ-সস্তুত বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের কণ্ঠ ত্রিবলী- মণ্ডিত, ময়নদ্বয় মধুর ন্যায় পিঙ্গলাভ, দন্তদ্বয়ে কেতকী-কুসুম-কান্তি, পাণ্ডুবর্ণ দেহ, তরুণ রক্ত পল্লব সদৃশ স্থূল বিন্দু-পরিশােভিত ; উহারা শশাঙ্কাংশে উৎপন্ন মাতঙ্গ। উহারা যুদ্ধক্ষেত্রে স্বীয় প্রভু নরপতির বিজয়প্রদ হইয়া থাকে। অনন্তর অগ্ন্যংশে উৎপন্ন বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের দেহের লােমাবলী অগ্নি-শিখা সদৃশ উজ্জ্বল রক্তাভ এবং অক্ষিযুগল, তালু ও পুষ্কর পিঙ্গলবর্ণ, তাহারা অগ্ন্যংশে উদ্ভূত মাতঙ্গ। উহারা যুদ্ধক্ষেত্রে সাক্ষাৎ বহ্নির ন্যায় শত্রু সেনগণকে সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত করিয়া থাকে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়ঙ্করপ্রকৃতিসম্পন্ন বলিয়া শত্রু সৈন্যের ভয়প্রদ হয়। v অষ্টম অধ্যায়। • • ৩. অনন্তর বিষ্ণু অংশে উৎপন্ন বারণগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে;যে সকল মাতঙ্গের শুণ্ড, দস্তয়ের মধ্য ভাগ হইতে আরম্ভ করিয়া তাম্রবর্ণপুর বা অগ্রভাগ পর্যন্ত ক্ৰমে ক্ষীণতর হইয়া আসে এবং অঙ্গুলি সকল সুপ্রমাণ ও আয়ত, নিঃশ্বাস সমূহ দীর্ঘ ও সৰ্গন্ধ যুক্ত অম্বুকণবাহী ; বলি বা ত্বক তরঙ্গবিহীন দেহ, একান্ত দৃঢ়-সংবদ্ধ, মৃদু ও সূক্ষ্ম কৃষ্ণবর্ণ লােমে আবৃত ; দেহকান্তি রক্ত পদ্মের বিমল কান্তির ন্যায় অতি মনােহর; সুদৃঢ় দন্তদ্বয়, স্বর্ণকেতককুসুমের ন্যায় সুন্দর কান্তিযুক্ত ও বল, প্রান্তদেশ হইতে আরম্ভ করিয়া আয়ত; বর্তুল, কুদ্বয় সাতিশয় প্রিয়দর্শন; সুন্দর ও দীর্ঘ ও লােমযুক্ত এবং উহা হইতে সতত মদস্রাব হয় ; মুখমণ্ডল সাতিশয় প্রিয়দর্শন; সুগঠিত নেত্ৰদ্বয়, কুসুম সদৃশ, পাটলবর্ণ ও প্রান্ত লােহিত , বলিশােভিত, কোমল, বিস্তীর্ণ শিরা ও ছেদবিহীন কর্ণদ্বয়ের আঘাতে দুন্দুভির ন্যায় ধ্বনি হইয়া থাকে। বিপুল পৃষ্ঠদেশ সমতল, গলদেশ ঋজু ও খৰ্ব, সুগঠিত মাংসল বাহুদ্বয়, দীর্ঘ, ঋজু ও মক্ষীণ ; চরণ নখ সকল অর্ধচন্দ্রাকৃতি; বক্ষঃস্থল বিশাল ও সুগঠিত ; উদর অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ, পুংচিহ্ন এবং কুচয় খর্ব ও প্রশান্ত, জননদেশ বরাহের জঘনদেশের ন্যায় রম্য ; পৃষ্ঠবংশ সজা ধনুর ন্যায় বক্ত; লাঙ্গুল দীর্থ ও রম্য ; রমণীয় দেহ, শঙ্খ, চক্র, গদাকৃতি বিন্দু সমূহে বা বলিদ্বারা শোভিত সেই সকল মাতঙ্গ বিষ্ণু অংশে উৎপন্ন। উহারা নরপতিগণের একান্ত আদরণীয় এবং সকল কার্যে সফলতা প্রদ হইয়া থাকে। অনন্তর যজ্ঞাহঁ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে; হে নরনাথ, যে সকল মাতঙ্গের অঙ্গুলী সমূহ দীর্ঘ, কর্ণ ঘন সন্নিবিষ্ট ; মুখমণ্ডল আয়ত, বর্ণ কৃষ্ণ মেঘের ন্যায় সুনীল, সেই সকল নিঃশক্তি মাতঙ্গ যজ্ঞা এবং কেবল নরপতিগণেরই যােগ্য। অনন্তর সংগ্রামিক মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ; যে সকল মাতঙ্গের ধমনীতে অধিকতর রক্ত প্রবাহিত হয় এবং যাহারা শতবর্ষকাল জীবিত থাকে, তাহারা সাংগ্রামিক বারণ নামে কথিত হইয়া থাকে। উহারা স্বীয় প্রভুর ধনসম্পদ বৃদ্ধি করে। অনন্তর বর্ণগজ লক্ষণ কথিত হইতেছে,-হে নরেশ্বর, তিন প্রকার মাতঙ্গ শুদ্ধবর্ণ বিশিষ্ট, তিন প্রকার মিশ্ৰবৰ্ণ বিশিষ্ট এবং অপর তিন প্রকার মাতঙ্গ অন্তর্বর্ণ’ নামে আখ্যাত হইয়া থাকে। তন্মধ্যে শ্বেতবর্ণ, রক্তবর্ণ এবং কৃষ্ণবর্ণ এই তিন প্রকার মাতঙ্গই শুদ্ধ বা অমিশ্র বর্ণ বিশিষ্ট বলিয়া গজশাস্ত্রবিদগণ বলিয়া থাকেন। অনন্তর শ্বেতরূপ শুদ্ধবর্ণবিশিষ্ট মাতঙ্গগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-কফপ্রধান দেহ বিশিষ্ট বারণগণ শ্বেতবর্ণ এবং উহাদের কর্ণ, লােম ও নখ অন্তর্বর্ণবিশিষ্ট হইয়া থাকে। ইহাই শ্বেতরূপ শুদ্ধবর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ। অনন্তর রক্তরূপ শুদ্ধবর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-পিপ্রধান দেহবিশিষ্ট বারণগণের শরীরের বর্ণ রক্তাভ হইয়া থাকে। অনন্তর কৃষ্ণরূপ শুদ্ধবর্ণ মাতঙ্গগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-বায়ুপ্রধান শরীর বিশিষ্ট বারণগণ কৃষ্ণবর্ণ হইয়া থাকে, ইহাই মাতৃঙ্গশাস্ত্রবিৎ পণ্ডিতগণের মত। গ্রন্থান্তরে কথিত হইয়াছে, ৪৮, গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। বারণগণ, রক্ত, পীত, কৃষ্ণ ও ধবল এই চারি প্রকার হইয়া থাকে । তন্মধ্যে বায়ুপ্রধান দেহ বিশিষ্ট বারণগণ কৃষ্ণবর্ণ, কফপ্রধান দেহ বিশিষ্ট মাতঙ্গগণ শ্বেতবর্ণ এবং পিত্তপ্রাধান্থ বশতঃ মাতঙ্গগণ রক্তবর্ণও পীতবর্ণ হইয়া থাকে । অনন্তর মিশ্রণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-হে নরেশ্বর, শ্বেতকৃষ্ণ, শ্বেতরক্ত এবং কৃষ্ণরক্ত এই তিন প্রকার মিশ্রবর্ণ মাতঙ্গই প্রধানতঃ দৃষ্ট হয়। উহারা কফ, বাত ও পিত্ত প্রভৃতি শারীরিক উপাদানের বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্মিলন বা মিশ্রণবশতঃ জন্মাবধি এই প্রকার বিভিন্ন বর্ণ বিশিষ্ট হইয়া থাকে। অনন্তর গজনে-বর্ণ লক্ষণ কথিত হইতেছে ;- যে সকল মাতঙ্গের চক্ষুর অভ্যন্তরের বর্ণ মধুর বর্ণের ন্যায়, ঘৃত বিন্দুর বর্ণের ন্যায়, গাে-দন্ত মণি বা হরিতাল বিশেষের বর্ণের তুল্য, প্রাতঃ সূর্যের বর্ণের সদৃশ, কিংবা জ্বলন্ত অগ্নির বর্ণের অনুরূপ, উহারাই বারণগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং স্বীয় প্রভুর বিজয়-প্রদ হইয়া থাকে। অতঃপর অন্তর্বর্ণ-গজ-লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-হে নরনাথ, অন্তর্বর্ণ মাতঙ্গগণ প্রায়শঃ তিন প্রকার দৃষ্ট হয়, অন্তঃশ্বেত বহির্লোহিত, অন্তঃপাণ্ডর বহিঃকৃষ্ণ এবং অন্তর্লোহিত বহিঃকৃষ্ণ। স্বীয় নাম দ্বারাই উহাদের আকৃতি সুব্যক্ত হইতেছে। গ্রহান্তরে আরও দুই প্রকার অন্তর্বর্ণ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত আছে ;-উহাদের মধ্যে এক প্রকার শ্বেত-পীত’ এবং অন্য প্রকার ‘রক্ত- পীত। গ্রন্থান্তরে কথিত আছে ;-মিশ্রবর্ণ মাতঙ্গগণ শ্বেত বর্ণ, কুঙ্কুম-বর্ণ, পদ্মবর্ণ, রক্ত-বর্ণ এবং কজ্জলের ন্যায় উজ্জ্বল কৃষ্ণবর্ণ এই পাঁচ প্রকার হইয়া থাকে। সুতরাং কুঙ্কুম-বর্ণ মাতঙ্গগণ মিশ্ৰবৰ্ণ মাতঙ্গ মধ্যে গণনীয়। পলকাপ্য ঋষির মতে শঙ্খ-বৈদু-মণি বা প্রবল, বিদ্যুৎ-মেঘ-ইন্দ্রনীল মণি, হরিতাল অতি উজ্জ্বল রক্ত এবং কুশপুঞ্জ সদৃশ বর্ণযুক্ত মাতঙ্গগণ ভূতলে কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না, কেবল লােকস্থিত মাতঙ্গগণই ঐ সকল বর্ণ বিশিষ্ট হইয়া থাকে। অনন্তর মাতঙ্গগণের বিভিন্ন প্রকার দেহ-কান্তি দ্বারা শুভাশুভ লক্ষণ কথিত হইতেছে;—হে নরনাথ, ইতস্ততঃ দৃশ্যমান মাতঙ্গগণের দেহকান্তি পার্থিী ঔদকী, আগ্নেয়ী, বায়ব্যা এবং নাভসী এই পাঁচ প্রধান ভাগে বিভক্ত করা যায়, তন্মধ্যে পার্থিবী ঔদকী এবং আগ্নেয়ী এই ত্রিবিধ দেহকান্তি মাতঙ্গগণের শুভ লক্ষণ এবং বায়ব্যা ও নাভসী এই দুই প্রকার দেহকান্তি নিন্দিতা । যে সকল মাতঙ্গ-দেহ-কান্তি বিবিধ বর্ণে মিশ্রিত হইয়াও গম্ভীর অথচ স্নিগ্ধ তাহা পার্থিবী আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। ঐরূপ দেহকান্তিযুক্ত বারণগণ স্বীয় প্রভুর রাজ্যলাভের কারণ হইয়া থাকে। যে মাতঙ্গ-দেহকান্তি স্নিগ্ধ নীলামুদ সদৃশী, তাহাকে “ঔদকী এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। ঐরূপ দেহকান্তিযুক্ত বারণগণ স্বীয় প্রভুর যশঃপ্রদ হইয়া থাকে । যে সকল মাতঙ্গ-দেহ-কান্তি, ইন্দ্রগােপকীট, প্রাতঃসূৰ্য্য কিংবা পদ্মকিঞ্জল্ক সদৃশ, তাহাদিগকে ‘আগ্নেয়ী’ কান্তি বলা যায়। ঐরূপ দেহকান্তিযুক্ত বারণগণ স্বীয় প্রভুর ধনবৃদ্ধিকারী হইয়া থাকে।
অষ্টম অধ্যায়। ৪ যে মাতঙ্গদেহকান্তি, ভস্মের ন্যায় কর্কশ ও প্রভাবিহীন তাহাকে বায়ব্যকান্তি বলে। ঐ প্রকার কান্তিযুক্ত বারণগণ স্বীয় প্রভুর দুঃখ বৃদ্ধি করিয়া থাকে। যে মাতঙ্গ-দেহ-কান্তি ক্ষীণ এবং রুক্ষ্ম তাহাকে নাভসী এই আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। ঐ প্রকার দেহকান্তিযুক্ত মাতজগণ স্বীয় প্রভুর দুঃখপ্রদ হইয়া থাকে । হে নরনাথ, অনন্তর মাতঙ্গগণের শুভাশুভ গন্ধ কথিত হইতেছে, যে সকল মাতঙ্গের স্বেদে মুদে, মূত্রে এবং বমনে, শ্বেতবীরণ, ঘৃত, লাজ ( খৈ) পদ্ম, জাতি ও পাটল কুসুমের গন্ধের ন্যায় সুগন্ধ পাওয়া যায়, তাহারা স্বীয় প্রভুর শুভপ্রদ হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে যে সকল মাতঙ্গের স্বেদাদিতে নানাপ্রকার কদৰ্য্য গন্ধ থাকে তাহারা স্বীয় প্রভুর অমঙ্গলকারী হয়। হে নরেশ্বর, মাতঙ্গগণ, বিভিন্ন প্রকার গন্ধ দ্বারা গন্ধৰ্ব্ব, যক্ষ, দানব ও দৈব এই চারি প্রধান ভাগে বিভক্ত হইয়া থাকে ; তন্মধ্যে যে সকল মাতঙ্গের স্বেদাদির গন্ধ মৎস্যের বা সুয়ার গন্ধের তুল্য, তাহারা ‘গন্ধৰ্ব্ব জাতীয় মাতঙ্গ বলিয়া জানিবে । যে সকল মাতঙ্গের স্বেদাদির গন্ধ অশােক কিংবা মালতী কুসুমের গন্ধের অনুরূপ, তাহারা যক্ষ জাতীয় মাতঙ্গ। যে সকল মাতঙ্গের স্বেদাদির গন্ধ সিন্ধুবার কিংবা অগুরু-বৃক্ষের গন্ধের সুসদৃশ, তাহারা ‘দানব’ জাতীয় মাতঙ্গ। যে সকল মাতঙ্গের ঘৰ্ম্মাদির গন্ধ, পদ্ম, পীতঝিণ্টী শুধিনাল কিংবা সপ্তচ্ছদ (ছাতিয়া) কুসুমের গন্ধের ন্যায়, তাহাদিগকে দেব জাতীয় মাতঙ্গ বলিয়া জানিবে । অনন্তর মাতঙ্গগণের সত্ব পরীক্ষার প্রকার কথিত হইতেছে ; -সৌন্দৰ্য্য অপেক্ষা বৃহৎ আকৃতি অধিকতর প্রশংসনীয়, বৃহৎ আকৃতি অপেক্ষা বল অধিকতর প্রশংসনীয় এবং বল অপেক্ষাও সন্তু সমধিক আদরণীয়; তন্নিমিত্ত সকল মাতঙ্গেরই সত্ত্ব পরীক্ষিত হওয়া উচিত। বিমল স্ফটিক সদৃশ উজ্জল ‘সত্ত্ব প্রাণিগণের হৃদয় প্রদেশে বিদ্যমান থাকে। তন্নিমিত্ত সত্ত্ব-জ্ঞান একান্ত দুঃসাধ্য, সুতরাং কৌশলে তাহা পরীক্ষা করিতে হয়। যে মাতঙ্গ, অষ্টাদশ-সহস্র পল পরিমিত সুবর্ণ, রজত ও তাম পৃষ্ঠে লইয়া অক্লান্তভাবে দশযাজন পথ অপরাপর বারণগণের সহি সবেগে গমন করিতে পারে, সে উত্তম সত্ত্বশালী মাতঙ্গ মধ্যে গণনীয় হইয়া থাকে। যে মাত, চতুর্দশপল-পরিমিত সুবর্ণাদি দ্রব্য লইয়া অন্যান্য মাতঙ্গগণের সহিত অক্লান্ত ভাবে সপ্ত যোজন পথ গমন করিতে পারে তাহাকে মধ্যম সত্ব সম্পন্ন মাতঙ্গ বলা যায়। পক্ষান্তরে যে, দশ সহ- পল-পরিমিত সুবর্ণ রজত ও অস্ত্র পৃষ্ঠে লইয়া অপরাপর মাতঙ্গগণের সহিত কোন প্রকারে গমন করিতে সমর্থ হয়, তাহাকে ‘হীনবল সম্পন্ন মাতঙ্গ বলে। প্রকারান্তরেও মাতঙ্গগণের সত্নপরীক্ষা প্রচলিত ছিল ;-একটা প্রশস্ত ক্ষেত্রে প্রস্তর কিংবা ইষ্টক দ্বারা বাণ-পাত দ্বয় পরিমিত দীর্ঘ এবং তদনুরূপ প্রস্থ ভূ-ভাগ দৃঢ়রূপে সংবদ্ধ করাইয়া তন্মধ্যস্থলে, চতুর্দশ হস্ত দীর্ঘ, অষ্টহস্ত প্রস্থ এবং ত্রিহস্ত উচ্চ একটি বেদী নিৰ্মাণ করাইতে হইবে। পরে শুভদিনে পরস্পর স্পর্ধাযুক্ত এবং কম্বল মণ্ডিত দুইটী মাতঙ্গকে সেই বেদীর ৭ গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। উপয় পার্শ্বে উপস্থাপিত করিয়া -হে ভূতেশ, হে বিঘ্ননাথ, হে গণাধিপ, এই মাতঙ্গ দ্বয়ের সত্ব সন্দেহের নিরাকরণ হউক এই মন্ত্রপূত জলদ্বারা উল্লিখিত মাতজদ্বয়কে প্রেক্ষণ করিতে হইত। অনন্তর ঘন্টাধ্বনি দ্বারা দিণ্ডল প্রতিধ্বনিত হইলে বংশদণ্ড বা দারুময়দণ্ড দ্বারা, পরস্পর সম্মুখীন মাতদ্বয়ের দন্তে সবলে আঘাত করিতে এবং দুই একটা হস্তিনী দ্বারা তথন আঘাত করাইয়া এইরূপ উত্তেজিতে করিতে হইত যে উহারা সেই সকল আঘাতজনিত বেদনা আগ্রহ করিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী মাতঙ্গের দিকে অগ্রসর হইতে থাকে এবং তাহাকে প্রতিঘাত করে। যে মাতঙ্গ পলায়ন না করিয়া এইরূপ করিতে পারিত তাহাকে ‘সত্ত্ববান্ মাতঙ্গ বলিয়া স্থির করা হইত। হে নরনাথ, মানবগণ যেমন গুণভেদে সাত্বিক, রাজসিক ও তামসিক হয়, মাতঙ্গগণও তেমনই প্রকৃতিভেদে সাত্ত্বিক, রাজসিক, এবং তামসিক হইয়া থাকে। যে মাতঙ্গ, সতত প্রফুল্ল, তেজস্বী, কোপন-স্বভাব, সাহসী, প্রতাপশালী এবং ক্রীড়াকালে হর্ষপ্রদর্শন করে, তাহাকে ‘সাত্বিক’ মাতঙ্গ বলে। মাতঙ্গগণের মধ্যে উহারাই সর্বোৎকৃষ্ট। উহাদের আর একটা স্বভাব এই যে উহারা উপকারীর কৃত উপকার কখনও বিস্মৃত হয় না। যে সকল মাতঙ্গ সতত হস্তিনী লাভের নিমিত্ত ব্যাকুল এবং তাহার অপ্রাপ্তিতে নিতান্ত দুঃখিত, আশাবান্, দুৰ্বল, কুর এবং উন-বেদী, তাহারা রাজসিক’ মাতঙ্গ নামে আখ্যাত হয়। উহাদের গতি নিতান্ত কদৰ্য্য এবং স্মৃতিশক্তি একান্ত দুর্বল। যে সকল মাতঙ্গ, নিদ্রালু অর্থাৎ উদ্যম উৎসাহ বিহীন, সংজ্ঞাহীন প্রাণীর ন্যায় জড়ায়,কখনও ক্রীড়াদি করিতে স্বেচ্ছায় অগ্রসর হয় না এবং যাহাদিগকে অতি কষ্টে কোনও বিষয় শিক্ষাপ্রদান করা যায়, তাহাদিগকে ‘তামস’ মতঙ্গ বলে। হে নরনাথ, পূর্বকালে যখন সৌম্যমূৰ্ত্তি দিম্মাতঙ্গগণ বিশ্বের সর্বত্র বিচরণ করিতেছিল, তখন রমণীয় কান্তি দেবকন্যা, যক্ষ-কন্যা, গন্ধৰ্ব্ব-কন্যা, নাগকন্যা, রাক্ষসকন্যা ও পিশাচ-কন্যাগণ তাহা- দিগের সহিত সংগত হইয়াছিল। সেই মিলনের ফলে যে সকল সন্তান উৎপন্ন হইয়াছে, তাহারা প্রসূতির প্রভেদবশতঃ ‘দেবসত্ব যক্ষ-সত্ত্ব’ ‘গন্ধৰ্ব্বসত্ব নাগসত্ব রাক্ষসসত্ব’ ও ‘পিশাচসত্ত্ব’ এই ছয় প্রকার দৃষ্ট হয়। তন্মধ্যে যে সকল মাতঙ্গ অত্যন্ত প্রিয়দর্শন এবং যাহাদের বদনমণ্ডল সতত প্রফুল, দেহে কুমুদ, চনন, সপ্তপর্ণ ( ছাতিয়াণ) মৃগ, পদ্ম এবং আরগবধ বৃক্ষের গন্ধের ন্যায় গন্ধ বিদ্যমান থাকে, যাহারা আত্মসম্মানজ্ঞামবিশিষ্ট, যাহাদের ও সুন্দর এবং যাহারা সরলমতি করগণের সহিত সতত ক্রীড়া করিতে ভালবাসে, তাহাদিগকে ‘দেবস’ মাতঙ্গ বলে। ভগবান বেদব্যাসের মতে যে সকল মাতঙ্গ নীরােগ, অচঞ্চল ও পরাক্রমশালী এবং যাহাদের হে, বলি বা তরঙ্গবিহীন,সেই সকল সতত প্রফুল্ল মাতকেই ‘দেবস’ মাতঙ্গ বলা হইয়াছে। উহারা স্বীয় প্রভুর অভিষেক ও পূজার যােগ্য এবং সকল কাৰ্য্যে সফলতা প্রদানকারী হইয়া থাকে। অনন্তর গন্ধৰ্বসত্ব মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের দেহের গন্ধ । ৪ * মূল গ্রন্থে ‘যক্ষ সত্ব মাতঙ্গের কোনও লক্ষণ সৃষ্ট হইল না। সম্ভবতঃ প্রতিলিপি প্রমাদৰশত এইরূপ বৃদিয়া থাকিবে।
অষ্টম অধ্যায়। যুথিকা, পদ্ম, পুন্নাগ কুসুম কিংবা চন্দন-গন্ধ-তুল্য, যে সকল মাতঙ্গ শ্রুতিমধুর ধ্বনি শ্রবণ করিতে ভালবাসে, যাহাদের গতি মুননাহর এবং যাহাদের দর্শন-যুগল, নেত্ৰ-দ্বয়, কুম্ভ, মস্তক, গুণ্ডাগ্রভাগ ও বাহুসন্ধি-সুন্দর, তাহারা ‘গন্ধ-সত্ত্ব’ মাতঙ্গ নামে অভিহিত হইয়াছে। ভগবান্ বেদব্যাসের মতে, গন্ধৰ্ব্বসত্ত্ব’ মাতঙ্গগণ মেধাবী, নিপুণ, ক্রিয়দক্ষ, কামুক, চঞ্চল এবং স্বীয় স্তম্ভাবলােকনকারী হইয়া থাকে, উহারা সকল কাৰ্য্যেই প্রশস্ত। দেবস’ এবং গন্ধৰ্ব্বসত্ব’ এই দ্বিবিধ মাতঙ্গই নরপতিগণের আরােহণে শুভ। অনন্তর ‘নাগসত্ত্ব মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতজের দেহের গন্ধ, ভস্ম, শৈবাল, কর্দম, সুরা কিংবা অন্নের গন্ধের তুল্য এবং যাহারা সুপরিচিত মেঘ-ধ্বনি শ্রবণ করিয়াও সন্ত্রস্ত হয় ; যাহারা নিরন্তর ক্রুদ্ধ থাকে এবং ধূলি ও সলিল দ্বারা ক্রীড়া করিতে ভালবাসে, তাহাদিগকে ‘নাগসত্ব’ মাতঙ্গ বলে। ব্যাসােক্ত গ্রন্থে, জ্বর, বিশ্বাসঘাতক, কুটিলগতিবিশিষ্ট মাতঙ্গকেই নাগ-সত্ত্ব’ মাতঙ্গ বলে। উহারা মদমত্ত অবস্থায় পৰ্যাপ্ত আহার গ্রহণ করে না। অনন্তর ‘পিশাচসন্ধ’ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মতঙ্গের দেহের গন্ধ রক্ত কিংবা পযুষিত শবগন্ধের তুল্য, যাহারা নির্জন স্থানে অবস্থান এবং গভীর রাত্রিতে ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে ভালবাসে, যাহাদের শব্দ, মেঘধ্বনির অনুরূপ, যাহারা সতত ক্রুদ্ধ থাকে এবং অনেক সময়ে ক্লান্তি অনুভব করে ; সেই মূঢ়স্বভাব মতিঙ্গগণকে ‘পিশাচত্ব’ মাতঙ্গ বলে। ভগবান্ বেদব্যাসের মতে, রজোগুণবহুল পিপ্রধান স্থূল দেহবিশিষ্ট, সৰ্ব্বদা উন্মার্গগামী, একান্ত সদসবিচারবুদ্ধি বিহীন, এবং কাৰ্যকালে উন্মত্তবৎ মাতঙ্গকে ‘পিশাচসত্ত্ব মাতঙ্গ বলে। অনন্তর রাক্ষসসত্ত্ব’ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে;যে সকল মাতঙ্গের দেহের স্বাভাবিক পুতিগন্ধ, কাক, বানর, গর্দভ, উষ্ট্র কিংবা বিড়ালের মল ও মুত্রের গন্ধের ন্যায়, যাহারা নিরন্তর নিষ্ঠুর কাৰ্যে রত, মাংস ও রুধিরপ্রিয়, কৃত, প্রতিকূলাচরণকারী এবং সময়ে সময়ে নম্রতা অবলম্বন করিয়া থাকে তাহাদিগকে ‘রাক্ষসস’ মাতঙ্গ বলে। ভগবান্ বেদব্যাসােক্ত গ্রন্থে-যে ' সকল মাতঙ্গ, রাত্রিকালে যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ করে এবং যাহারা মনুষ্যবধে অভ্যস্ত, তাহাদিগকে রাক্ষসসত্ব সাত বলে। উহারা যেমন বলবান তেমনই বেগবান্ হইয়া থাকে। তিনি আরও লিখিয়াছেন যে নাগ-সত্ব’ ও ‘রাক্ষস-সত্ব’ এই দ্বিবিধ মাতঙ্গই তামস বা তমােগুণবহুল হইয়া থাকে। যাহাদের দেহ, তমােগুণবহুল, তাহারা নিতান্ত নির্বোধ ; সুতরাং রাক্ষস-সত্ত্ব’ মাতঙ্গগণ নিদ্রালু, চঞ্চল ও বাতপ্রধান দেহ হইয়া থাকে। পিশাচ-সত্ত্ব’ ও ‘রাক্ষস-সত্ব’ এই উভয়বিধ মাতঙ্গ, নরহত্যা কার্যে নিযুক্ত হইবার যােগ্য। এতদ্ভিন্ন ব্রাহ্মণ-সত্ব’ (*) ক্ষত্রিয়স’ ‘বৈশ্যসত্ব’ ও ‘শূদ্রস’, এই চতুর্বিধ মাতঙ্গও দৃষ্ট হয় । তন্মধ্যে যে সকল মাতঙ্গ, সতত পবিত্র অবস্থায় থাকিতে ভালবাসে, যাহাদের দেহে, মধু, দুগ্ধ, পরমাণ, ঘৃত কিংবা সুগন্ধি আম্রমুকুলের গন্ধের ন্যায় সুরম্য গন্ধ বিদ্যমান থাকে; যাহারা শান্ত শান্তিপ্রিয়, বিপ্রঃ শুচি-মধুপঃ পরমা-সর্পিত-প্রসূনসামগন্ধি-গজিতাঙ্গ। সাম-প্রি সকল নাগহিতঃ সুশান্ত প্রানপ্রিয় সুতগতির্গদিতে মুনীঃৈ।
গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। আননিরত অপরাপর সকল হস্তীর হিতকারী এবং উত্তম গতিসম্পন্ন ; তাহারা মুনীগণ কর্তৃক ‘ব্রাহ্মণসত্ব’ মাতঙ্গ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। ভগবান্ বেদব্যাসের মতে, যে সকল মাতঙ্গ নিরন্তর জলাবগাহনপ্রিয়, কোপন-স্বভাব, একান্ত কাতর এবং ভেজনাসক্ত, তাহাদিগকে ‘ব্রাহ্মণসত্ব মাতঙ্গ বলা হইয়াছে। অনন্তর ক্ষত্রিয় সত্ব’ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মতিঙ্গের দেহে, শ্বেত চন্দন পদ্ম, হরিতাল, মনঃশিলা বা মন্ছাল কিংবা গুগুলের গন্ধের ন্যায় গন্ধ বিদ্যমান থাকে, যাহারা যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ভয় এবং বিবিধ অস্ত্র শস্ত্রাঘাত প্রাপ্ত হইয়াও চঞ্চলতা প্রকাশ না করিয়া স্বীয় কর্তব্য সাধন করিতে থাকে, যাহাদের পৃষ্ঠদেশে আসন বন্ধন অক্লেশকর, তাহাদিগকে ক্ষত্রিয়াত্ব মাত বলে। ভগবান্ বেদব্যাসের মতে যে সকল মাতঙ্গ শান্ত, পরাক্রমশালী, সদা উৎসাহী, বলবান্ সাহসী, যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচলিত এবং যুদ্ধকার্যে নিপুণ, তাহারাই ক্ষত্রিয়-সত্ত্ব’ মাতঙ্গ। অনন্তর বৈশ্য সত্ত্ব’ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;—ষে সকল মাতঙ্গের দেহের গন্ধ, বন্ধু কুসুম, শালিধান্য, তিল, কেতকী পুষ্প কিংবা মালতী কুসুমের গন্ধের সুসদৃশ, যাহাদের তালু ও জিহ্বা বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত, যাহারা পিশিত ভােজী, সান্ত্বনা প্রিয় ও ক্লেশ সহিষ্ণু এবং যাহারা ক্রুদ্ধ হইলেও অচিরে পুনরায় প্রতিস্থ হইয়া থাকে, তাহাদিগকে ‘বৈশ্য সত্ত্ব’ মাতঙ্গ বলে। গ্রন্থান্তরে, কপটাচারী দুষ্টচেষ্ট, কাৰ্যপটু, বিকলস্বরবিশিষ্ট এবং যুদ্ধকালে ভীরু মাতঙ্গকে ‘বৈশ্য সত্ত্ব’ মাতঙ্গ বলে। অনন্তর শূদ্র সত্ব’ মাতঙ্গের লক্ষণ কথিত হইতেছে ; -যে সকল মাতঙ্গ অপরাপর মাতঙ্গের ভুক্তাবশিষ্ট আহার কিংবা শুষ্কান্ন গ্রহণ করিয়া নিরতিশয় প্রীতিলাভ করে, যাহারা অকস্মাৎ ভয় প্রাপ্ত হয় ; যাহাদের দেহের গন্ধ, কঙ্কট বা কাকড়ার দেহের গন্ধের সদৃশ, যাহারা কখনও কোপন-স্বভাব এবং সময়ে দীনভাবাপন্ন হয়, সেই সকল কৃতঃ মাতঙ্গকে ‘শূদ্রসত্ব’ মাতঙ্গ বলে। গ্ৰস্থান্তরে শুদ্র স’ মাতঙ্গের লক্ষণ এইরূপ কথিত আছে যে ;-যে সকল মাতঙ্গ কেবল দণ্ডদ্বারা বশীভূত হয়, যাহারা নীচ-স্বভাব, নির্বোধ ও কদৰ্য্য আহরগ্রহণে অভ্যস্ত; যাহারা বলশালী হইয়াও যুদ্ধপরাঙ্খ, সেই সকল মাতঙ্গকে ‘শূদ্র স’ মাতঙ্গ বলে। ‘ক্ষত্রিয় সত্ব’ মাতঙ্গগণ, যুদ্ধকার্যে ব্যবহৃত হইবার যােগ্য, ‘বৈসত্ব বারণগণ চিকিৎসা ব্যাপারে বাহনরূপে ব্যবহার্য এবং ‘শূদ্র সত্ত্ব’ মাতঙ্গগণ ভাণ্ডাদি বহনরূপ সেবা-বৃত্তিতে ক্লেশসহ বলিয়া কথিত হইয়াছে। অনন্তর মাতঙ্গগণের শুভাশুভ স্বরের লক্ষণ কথিত হইতেছে; যে সকল মাতঙ্গের স্বর, শঙ্খ, মেঘ, রাজহংস, দুন্দুভি, ব্যাঘ, সিংহ কিংবা বৃষের কণ্ঠস্বরের অনুরূপ, তাহারা সমধিক আদৃত হইয়া থাকে। মাতঙ্গগণের ধ্বনি সাধারণতঃ বৃংহিত’ ‘গজ্জিত’ ও ফেণায়িত' এই ত্রিবিধ, অখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে ; তন্মধ্যে তালু হইতে উৎপন্ন স্বরকে ‘বৃংহিত’ কণ্ঠ হইতে উদ্ভূত স্বরকে ‘গজ্জিত এবং জিঘামুল হইতে জাত স্বরকৈ ‘ফেণয়িত’ বলে।
অষ্টম অধ্যায়। গ্রন্থান্তরে, গ, শির, কণ্ঠ, জি, গুণ্ড, বক্ষঃস্থল, শ্রবণযুগল বিশেষতঃ তালু হইতে উৎপন্ন শব্দকে ‘বৃংহিত' আখ্যা প্রদান করা হয়াছে। বারণগণের কণ্ঠদেশজাত শঙ্খধ্বনি সদৃশ শব্দকে কিংবা হৃৎপিণ্ড হইতে উদ্ভূত মেঘধ্বনি সদৃশ রবকে অথবা জিহবা ও কর্ণ সমুৎপন্ন হংসরব সদৃশ ধ্বনিকে ‘গর্জিত বলে। উহাদের গণ্ডদেশ হইতে উৎপন্ন ব্যায়-সদৃশ ‘রব’কে ‘উৎক্রোশ’ এই অম্বৰ্থ নাম প্রদান করা হইয়াছে। মস্তক ও গুণ্ড হইতে উৎপন্ন সিংহ অথবা বৃষের অনুরূপ শব্দ ‘নিনদ’ নামে অভিহিত হয়। যে সকল মাতঙ্গের কণ্ঠস্বর, কুকুর, কাক, শৃগাল, বরাহ কিংবা বানরগণের সুসদৃশ, তাহারা কখনও স্বীয় প্রভুর শুভফলপ্রদ হয় না। স্থান্তরে; যে সকল মাতঙ্গের শুও হইতে মৃদঙ্গের রব, কর্ণযুগল হইতে দুন্দুভিধ্বনি এবং মুখ বিবর হইতে ভেক-ধ্বনি নির্গত হয়, সেই সকল মাতঙ্গ শুভম্বরবিশিষ্ট মাতঙ্গ বলিয় আখ্যাত হইয়াছে। অনন্তর মাতঙ্গগণের শুভাশুভ গতির লক্ষণ কথিত হইতেছে ;- যে সকল মাতঙ্গের গতি, মল্ল, শুক, শাল কিংবা বৃষের তুল্য অবিষম, তুল্য পাদ বিক্ষেপ বা তুল্য অঙ্গ সঞ্চালন নিম্পন্ন তাহারা শুতগতিসম্পন্ন মাতঙ্গ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। শুভ লক্ষণসম্পন্ন অশ্ব কিংবা বারণগণের গতি কথনও মন্থর কখনও বা দ্রুত হয় না অথচ সত্বর পদক্ষেপে সম্পন্ন হইয়া থাকে। ইহার ফলে আরােহীর বিন্দুমাত্রও ক্লান্তি বােধ হয় না। ফলতঃ যে সকল বারণের গতি, মত্ত কিংবা নিরতিশয় আনন্দিত অবস্থাতে ও একরূপ থাকে, তাহারাই স্বীয় প্রভুর শুভফলপ্রদ হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে যে সকল মাতব্দের গতি, বৃক, কাকলাস, গর্দভ কিংবা নকুলগণের অনুরূপ, তাহারা দুষ্টগতি সম্পন্ন মাতঙ্গ বলিয়া পণ্ডিতগণ কর্তৃক কথিত হইয়া থাকে। যে সকল মাতঙ্গের পৃষ্ঠে দীর্ঘ কেশ থাকা নিবন্ধন আসন সঞ্চালিত ও বিকৃত হইয়া থাকে, তাহাদিগকে ‘বিষমাসন’ বা ‘বিকটাসন’ মাতঙ্গ বলে অথবা সাদি পুনঃ পুনঃ আঘাত করা সত্ত্বেও যে সকল মাতঙ্গের গতি মন্থর থাকে, অথবা যাহাদের গমন সময়ে পৃষ্ঠদেশস্থিত আসন আন্দোলিত হয়, সেই সকল মাতঙ্গগণ গজশাস্ত্রপ্রণেতাদিগের মতে বিগর্হিত-গতি মাতঙ্গ বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। যে সকল মাতল, গমনকালে পথি পার্শ্বস্থিত বল্মীকাদি উচ্চতর ভূমিতে উৎপন্ন তরু, লতা, গুল্ম প্রভৃতি দান করিতে স্বেচ্ছায় উৎফুল্ল-নয়নে মস্তক উন্নত করিয়া তদভিমুখে ধাবিত হয়, কিংবা যে সকল মাতঙ্গ কক্ষা বন্ধনকালে স্বীয় শরীর পুনঃ পুনঃ কম্পিত করিতে বা উচ্চৈস্বরে চীৎকার করিতে থাকে অথবা স্বীয় গুণ্ড দ্বারা বাম দন্ত বা দক্ষিণ দত্ত বেষ্টন করিতে থাকে, তাহাদিগকে অণ্ডত লক্ষণযুক্ত মাতঙ্গ বলে। অনন্তর সর্বদা ফলপ্রদ এবং শুভাশুভ ফলপ্রদ আবর্ত বা বিন্দুময় চিহ্নের স্থান ও লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-কর্ণমূল, গুণ্ডা, বক্ষঃস্থল, উভয় পার্শ্ব, উভয় ভুজমুল, বন্ধু ও উপরন্ধ, উভয় বাহু, লাঙ্গল, লাঙ্গল-মূল, গলদেশ এবং বজ-প্রান্ত, এই সকল শুভাবৰ্ত্ত স্থান। যে সকল মাতজের উল্লিখিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ‘আবৰ্ত্ত থাকে, তাহারা স্বীয় প্রভুর মঙ্গল, আনােগ্য এবং বিজয়প্রদ হয়।
গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা শঙ্খ, পদ্ম, কলস, মৎস্য, সরাব, প্রাচীর, আদর্শ, বৃষভ, প্রদীপ, রাজপ্রাসাদ, দ্বার, বেদি, ধূপ, শক্তি, পটিশ, ধনু, চামর, অঙ্কুশ এবং ছত্রাকৃতি চিতুই শুভ চিহু; সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিন্দু কিংবা স্ব- তরঙ্গের সংযােগে মাতঙ্গদেহে উক্ত আবৰ্ত্ত সকল উৎপন্ন হইয়া থাকে। যে সকল মাতঙ্গের দক্ষিণভাগে দক্ষিণাবর্ত এবং বামভাগে বামাবর্ত দৃষ্ট হয়, তাহা সবিশেষ শুভফলপ্রদ এবং বিপরীত চিতুযুক্ত মাতঙ্গগণ অপেক্ষাকৃত অল্পফলপ্রদ হইয়া থাকে। হে নরনাথ, যে সকল মাতঙ্গের শুভাবৰ্ত-স্থান ব্যতীত অপরাপর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে গণ্ডে, গলে, হৃদয়ে, চিবুকে, জননেন্দ্রিয়ে, কুক্ষিতে, ওষ্ঠের উপরিভাগে, নখে, মুচ্চে, জায়, অঙ্গুলিতে, মস্তকে, মসন্ধিতে এবং উদরে আবৰ্ত্ত চিঃ দৃষ্ট হয়, তাহারা অপ্রশস্ত মাতঙ্গ এবং স্বীয় প্রভুর কুল ও ধনক্ষয়কারী হইয়া থাকে। অনন্তর হে নরেশ্বর, বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগত বিশেষ বিশেষ চিনু দ্বারা যে অভ আবর্ত দোষ প্রশমিত হইয়া থাকে, তাহা বর্ণন করিতেছি শ্রবণ করুন যে সকল মাতঙ্গের অঙ্গুলীসমূহ প্রশস্ত, তাহাদের শুণ্ডে, অশুভ আবৰ্ত্ত দোষ থাকিলেও তাহা শুভফলপ্রদ হইয়া থাকে। এইরূপ প্রশস্ত শুণ্ড, দন্তদোষ নিবারণ করিয়া থাকে ; প্রশস্ত দন্ত, মুখমণ্ডলস্থিত আবৰ্ত্ত দোষ বিদুরিত করে; প্রশস্ত মুখ, নেত্রগত দোষ অপসারিত করে ; প্রশস্ত নেত্র, নখজাত দোষ নিবারক ; প্রশস্ত নখ, চিবুকস্থিত আবৰ্ত্তদোষ প্রশমনকারী, প্রশস্ত চিবুক, বক্ষঃস্থলের সম্মুখভাগস্থিত দোষ অপসারিত করে, প্রশস্ত উরু, দেহগত আবর্ত দোষ নিবারণ করে ; দেহের পশ্চাদ্ভাগ প্রশস্ত হইলে লাঙ্গলের অশুভ আবর্ত নিষ্ফল হইয়া থাকে ; প্রশস্ত লাল, মুফস্থিত আবৰ্ত্তদোষ নিবারক। প্রশস্ত মুফ, সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গস্থিত দোষ নিবারণকারী হইয়া থাকে। ফলকথা যে মাতঙ্গের অঙ্গুলি সকল প্রশস্ত, সে সকল প্রকার অশুভ লক্ষণযুক্ত হইয়াও অন্তঃস্থ কিংবা বহিঃস্থ দোষ প্রমুক্ত থাকে ; পক্ষান্তরে দন্তদোষ থাকিলে মুখ-জাত শুভাব লক্ষণ ও নিষ্ফল হইয়া থাকে। অনন্তর গজ-মহাদোষ কথিত হইতেছে যে মাতঙ্গের তিনটী দত্ত থাকে কিংবা অধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে, তাহারা স্বীয় প্রভুর অশুভ ফলপ্রদ হয়। এইরূপ মুফ কিংবা চরণ চতুষ্টয়ের স্থূলতা, খাদ্য দ্রব্য নিস্পৃহা কিংবা গর্ভিণীয় ন্যায় সর্বদা পরিস্রাব, হিংস্র স্বভাব, কপটাচার, পূৰ্ব্ববৈর স্মরণ, দেহের পূৰ্বভাগের, পশ্চাৎভাগের কিংবা গণ্ডদ্বয়ের অস্বাভাবিক ক্ষীণতা, থলতা, লাঙ্গলের অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য কিংবা একান্ত খৰ্ব্বতা, কোশের স্থূলতা অথবা অত্যন্ত অল্পতা, শুণ্ডের অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য কিংবা অস্বাভাবিক খর্বতা, অঙ্গুলির আধিক্য কিংবা অল্পতা কর্ণ-যুগলের অস্বাভাবিক বিস্তার অথবা অস্বাভাবিক সঙ্কীর্ণতা, নাভির অস্বাভাবিক বৃহভাব কিংবা অস্বাভাবিক ক্ষুদ্রতা, নাসিকার সমধিক বিশালতা অথবা অস্বাভাবিক খৰ্ব্বতা, মুকতা, বধিরতা, কান্তিহীনতা, কুভার, পিশাচ-ভাব, রোমকূপের অস্বাভাবিক গভীরতা, দীর্ঘ দীর্ঘ লােমাবলী দ্বারা সর্বাঙ্গের ব্যাপ্তি, শরীরস্থিত লােমাবলীর অসমতা, চরণ চতুষ্টয়ের অস্বাভাবিক স্থূলতা, নেত্র- দ্বয়ের একান্ত কৃষ্ণবর্ণ কিংবা জননেন্দ্রিয়াদির অস্বাভাবিক বিকৃতি, এই সকল অশুভ লক্ষণ বারণ- অষ্টম অধ্যায়। গণের ‘মহাদোষ’ বলিয়া কথিত হইয়াছে। এই সকল দোষযুক্ত বারণগণ স্বীয় প্রভুর প্রভূত অনিষ্টের কারণ হইয়া থাকে। বৈশম্পায়নের মতে এই সকল গজ মহাদোষ। অনন্তর মাতঙ্গগণের পরিমাণ কথিত হইতেছে ;-হে নরনাথ, ‘ভদ্র জাতীয় মাতঙ্গগণের দৈর্ঘ্য নয় হন্ত, উচ্চতা সপ্ত হস্ত এবং বক্ষঃস্থলের ব্যাপ্তি দশ হস্ত পরিমিত হইয়া থাকে। এইরূপ ‘ম’ জাতীয় বারণগণের দৈর্ঘ্য অষ্ট হস্ত, ঔন্নত্য ষট হস্ত, হৃৎপিণ্ডের ব্যাপ্তি নয় হস্ত পরিমিত হইয়া থাকে এবং মৃগ’ জাতীয় বারণগণের দৈর্ঘ্য সপ্ত হস্ত, উচ্চতা পঞ্চ হস্ত এবং বক্ষঃস্থলের ব্যাপ্তি অষ্ট হস্ত পরিমিত হইয়া থাকে। অনন্তর অরাল মতিঙ্গগণের লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-যে সকল মাতঙ্গের দৈর্ঘ্য দশ অরঙ্গি উচ্চতা অষ্ট অররি এবং বক্ষস্থলের ব্যাপ্তি একাদশ অররি তাহাদিগকে ‘অরাল গজ’ বলে। উহারা সকল কাৰ্যেই গর্হিত। গ্রন্থান্তরে ;-যে মাতলের দৈর্ঘ্য দশ হও, উচ্চতা অষ্ট হস্ত এবং বক্ষস্থলের ব্যাপ্তি একাদশ হন্ত, তাহাকে ‘অরাল’ গজ বলে। সাধারণ-অরাল’ গজ প্রায়শঃ দৈর্ঘ্যে নয় অরঙ্গি, উচ্চতায় অষ্ট অরঙ্গি এবং বক্ষঃস্থলের ব্যাপ্তিতে একাদশ অরঙ্গি পরিমিত হইয়া থাকে। যাহাদের দৈর্ঘ্য সপ্ত হস্ত, ঔন্নত্য পঞ্চ হস্ত এবং বক্ষস্থলের ব্যাপ্তি অষ্ট হন্ত মাত্র, তাহারা সঙ্কীর্ণ ‘গ’ জাতীয় মাতঙ্গ। এইরূপ যাহাদের দৈর্ঘ্য অষ্ট হস্ত, উচ্চতা ঘটন্ত এবং বক্ষঃস্থলের ব্যাপ্তি নবহস্ত পরিমিত, তাহারা সঙ্কীর্ণ মন্দ’ জাতীয় মাতঙ্গ এবং যাহাদের দৈর্ঘ্য, ঔন্নত্য ও ব্যাপ্তি প্রত্যেকে ইহাদিগের দৈর্ঘ্যাদি অপেক্ষা এক হস্ত মাত্র অধিক তাহারা সঙ্কীর্ণ ভদ্র জাতীয় মাতঙ্গ মধ্যে গণনীয়। যাহাদের দৈর্ঘ্যাদি ইহাদের দৈর্ঘ্যাদি অপেক্ষা এক অরড়ি মাত্র অধিক, তাহারা ‘অরাল গজ’ আখ্যা প্রাপ্ত হয় এবং যাহাদের দৈর্ঘ্যাদি, এই অরাল গজের দৈর্ঘ্যাদি হইতে আরও এক অরঙ্গি অধিক, তাহারা ‘অত্যরাল গজ’ নামে উল্লিখিত হইয়া থাকে। অরাল ও অন্তরাল মাতজদিগকে কখনও গ্রহণ করিবে না। অনন্তর উত্তম মাতঙ্গের পরিমাণ কথিত হইতেছে যে সকল মাতদের উচ্চতা সপ্ত অরছি মাত্র, দৈর্ঘ্য নব অত্নি এবং দেহের ব্যাপ্তি দশ অরছি মাত্র, তাহারা উৎকৃষ্টতম মাতঙ্গ এবং স্বীয় প্রভুর শুভপ্রদ হইয়া থাকে। যাহাদের উচ্চতা, দৈর্ঘ্য এবং ব্যাপ্তি প্রত্যেকে উত্তম মাতঙ্গের উচ্চতাদি অপেক্ষা এক অত্নি মাত্র নন, তাহারা পরিমাণে মধ্যম শ্রেণীর মাতঙ্গ মধ্যে গণ্য। এবং যাহাদের উচ্চতাদি প্রথমােল্লিখিত পরিমাণোত্তম মাতঙ্গের উচ্চতা প্রভৃতি অপেক্ষা দুই অরক্সি মাত্র নন, তাহারা পরিমাণে একান্ত নিকৃষ্ট মাতঙ্গ বলিয়া কথিত হইয়াছে। এই প্রকার যে সকল মাতঙ্গের উচ্চতা প্রভৃতি পূর্বোক্ত নিকৃষ্ট মাতঙ্গ অপেক্ষাও নুন তাহারা বামন’ (খৰ্ব) মাতঙ্গ নামে প্রখিত হইয়া থাকে এবং বামন’ অপেক্ষাও ক্ষুদ্রাকৃতি মাতঙ্গকে ‘কুজ’ এই অর্থ আখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। বামন’ এবং কুজ’ এই উভয় জাতীয় মাতঙ্গই একান্ত নিন্দনীয়। অনন্তর পরিমাণ প্রকরণের অন্তর্গত অবড়ি প্রভৃতির প্রমাণ লিখিত হইতেছে ;-জগতে কনিষ্ঠাঙ্গুলীর অগ্রভাগ হইতে কিনুই পর্যন্ত পরিমাণকে এক ‘জরঙ্গি বলে।
গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা ‘পরমাণু’ বলিয়া অতি সূক্ষ্ম এক প্রকার পদার্থ আছে, তাহা স্থূল দৃষ্টির অনধিগম্য। সেই পরমাণুর আটা মিলিত হইলে ত্রসরেণু' হয় ; আট এসরেণুতে এক ‘রথরেণু এবং অষ্ট রখরেণুতে এক ‘কেশাগ্র হইয়া থাকে। অষ্ট কেশর্থে এক ‘শিক্ষা অষ্ট লিগায় এক ‘যুকা’ অষ্ট যুকায় এক ‘যব’ অষ্ট যবে এক ‘অঙ্গুলি’ হইয়া থাকে এই অঙ্গুলি পরিমাণের ছয় অঙ্গুলিতে অরঙ্গির অংশ হয় (দ্বাদশাঙ্গুলে এক বিতস্তি) দুই বিতস্তিতে এক ‘অর’ি চার বিভক্তি বা দুই অরঙ্গিতে এক ‘কিছু’ দুই কিছুতে এক ধং সহস্র ধতে এক ‘গােল’ (২) এবং দুই গোলে এক দুই ক্রোশে এক ‘গব্যুতি’ এবং দুই ‘গতি’ বা অষ্ট সহস্র ধনুতে এক যােজন কথিত হইয়াছে। অনন্তর দিগগজ পরিমাণ লিখিত হইতেছে ;-ঐরাবত প্রভৃতি অষ্ট দিগজের দৈর্ঘ্য নয় শত যােজন, উচ্চ সপ্তশত যােজন এবং দেহের ব্যাপ্তি দশ শত যোজন ছিল বা আছে। মুখ হইতে লাঙ্গল-মূল পৰ্যন্ত দৈর্ঘ্য, পৃষ্ঠ, উদর ও উভয় পার্শ্বের ব্যাপ্তিই ‘পরিনাহ’ শব্দের অর্থ এবং পদ হইতে আসন পর্যন্ত উচ্চতা পরিমাণে গৃহীত হইয়া থাকে। রঞ্জু কিংবা মুত্ৰাদি দ্বারা পরিমাণ গ্রহণ করিতে হয়। ইতিশ্রীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত গজায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাবােগ স্থানে অষ্টম অধ্যয় সমাপ্ত। এক কিফ, প্রায় এক গজের সমান। (২) এক গোল প্রায় এক মাইল এর সমান।
নবম অধ্যায়। অনন্তর অসন-লক্ষণ কথিত হইতেছে ;-উৎকৃষ্ট’ ‘মধ্যম’ ও ‘অপকৃষ্ট এই তিন প্রকার গজাসন গজশাস্ত্রাভিজ্ঞগণ কর্তৃক কথিত হইয়াছে। মন্দ’ ভদ্র জাতীয় মাতঙ্গ পৃষ্ঠে, যুদ্ধাদি কাৰ্য্যে উৎকৃষ্ট আসন বন্ধন করা আবশ্যক। যে আসনের উপরিভাগ সমতল, তলদেশে সম্পূর্ণরূপে পৃষ্ঠদেশ সংলগ্ন এবং জানুসন্ধিতে সম্বন্ধ তাহাই উৎকৃষ্ট আসন নামে আখ্যাত হয়। ত্রিবিধ আসনই দেখিতে সুন্দর হওয়া আবশ্যক। হস্তীচালকের নিমিত্ত দেশেও আসন থাকা প্রয়ােজনীয়। * ইতি শ্রীপলকাপ্য ঋষি বিরচিত গজায়ুৰ্বের মহাপ্রবচনে মহারােগস্থানে নবম অধ্যায় সমাপ্ত। সম্ভবতঃ প্রতিলিপি প্রদাবশতঃ এই প্রকরণ চিরবিলুপ্ত হইয়াছে।
? অন্ন সমাচারাধ্যায়। একদা অঙ্গেশ্বর রােমপদ, স্বীয় চম্পানগরস্থিত সুরম্য প্রাসাদে উপবেশন করিয়া মহর্ষি পাল- কাপ্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন ;-হে মুনিবর, মাতঙ্গগণ অরণ্যে অবস্থান কালে তৃণ, লতা, ফল, মূল, ওষধি । এবং কড়ঙ্গর! (Herbs) ইচ্ছানুরূপ ভক্ষণ করিয়া জীবন ধারণ করে। তখন উহারা স্বীয় অভিলাষানুসারে করিণীগণের সহিত মিলিত হই য়া কখনও ধূলি, কথন কর্দম, কখনও বা সলিল দ্বারা সর্বাঙ্গসিক্ত করিয়া থাকে। উহারা কখনও পদ্মনাল, কখনও বা তরুশ্রেণী ভগ্ন করিয়া যথা সুখ ভ্রমণ ধাবন প্রভৃতি বিবিধ ক্রীড়ায় সানন্দে জীবন ধারণ করে; কিন্তু যখন উহারা লােকালয়ে আনীত হয় তখন উহাদিগকে কি প্রকারে প্রতিপালন করা উচিত মানবের ইচ্ছানুরূপ খাদ্য ভােজন ও জলপান দ্বারা লােকালয়ে মাতঙ্গগণ কেন রােগাক্রান্ত হইবে । আমি এই সকল তত্ত্বজিজ্ঞাসু হইয়াছি। আপনি মাতঙ্গগণের সকল বিষয়েই অভিজ্ঞ ; ( অনুকম্পাপূর্বক) আমার সংশয় অপনােদন করুন। অঙ্গেশ্বরের ঈদৃশ প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি পালকাপ্য বলিতে লাগিলেন ;-হে রাজেন্দ্র, অরণ্যে স্বাধীনভাবে বিচরণ সুখে অভ্যস্ত মাতঙ্গগণ, যখন আবদ্ধ হইয়া লােকালয়ে আনীত হয় । তখন উহারা শারীরিক ও মানসিক দুঃখে এতাদৃশ অভিভূত হইয়া থাকে যে—উহারা দীর্ঘায়ু হইলেও সকলে জীবন ধারণ করিতে সমর্থ হয় না। হে নরনাথ, অরণ্যে উহাদের যে শান্তি, তাহা উহাদের জাতিগত নহে, কুল ক্রমাগত নহে অথবা স্বাধীন বিচরণ ক্ষেত্র সম্ভুত নহে; সে শান্তি বা তৃপ্তি মাতঙ্গগণের আজন্ম সিদ্ধ ; সুতরাং গজ পালনে অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণই মহৎ, অল্প, শুদ্ধ বা সঙ্কীর্ণ লক্ষণ দর্শন করিয়া আঘাত, বধ কিংবা বন্ধন হইত উহাদিগকে জীবিত রাখিতে সমর্থ হয়েন। তদ্ভিন্ন বারণগণের অভিনব গ্রহণে কিংবা অন্য কোনও প্রকার সংশয় উপস্থিত হইলে নরপতি স্বয়ং অনুগ্রহ প্রদর্শন পূৰ্ব্বক সদয় ব্যবহারে উহাদিগকে রক্ষা করিবেন। বনবাস কালে বারণগণ যে সকল দ্রব্য আহারে বা পানে অভ্যস্ত লােকালয়ে তাহা দুর্লভ হয়, পক্ষান্তরে যাহা আজন্ম অনভ্যস্ত, বাধ্য হইয়া তাহাই উহাদিগকে আহার করিতে হয়। এই নিমিত্ত উহাদিগের শরীরের উপাদান স্বরূপ বায়ু পিত্ত ও কফ বিকৃত হইয়া মােগ উৎপাদন করে। এতদ্ভিন্ন লােকালয়ে অবস্থান কালে উহার প্রতিপালকের ইচ্ছানুসারে কখনও প্রচুর খাদ্য প্রাপ্ত হয় কখনও বা উপবাস করিয়া থাকিতে বাধ্য হয়। এইরূপে অনাহার ও প্রভূত আহার গ্রহণ, কদর্য স্থানে শয়ন, যখন আহারের ইচ্ছা না থাকে তখন আহার এবং যখন পানের ইচ্ছা না * পণ্ডিত শিবদ পণ্ডিত মহাশয়ের প্রকাশিত হস্তায়ুর্বেদের ২য় অধ্যায় এই পুস্তকের দশম অধ্যায় রূপে গৃহীত হইল। । ওষধি ফুল পাকা বৃক্ষ ৰা তৃণ গোতিলতা। + কম জাগড়া গাছ বাধাশ্যাদি শস্যের খােষ।
দশম অধ্যায়। থাকে, তখন পানীয় পান, অবরােধ, স্বগণের মৃত্যু দর্শন, অত্যন্ত লবণ আহার কিংবা লবণের একান্ত পরিহার ;- এই সকল কারণ দ্বারা বাত, পিত, কফ কুপিত হইয়া কখনও বায়ু বিকৃতি জনিত রােগ, কখনও পিত্ত বিকৃতি জনিত রােগ, কখনও কফ বিকৃতি জনিত রােগ কখনও বা সান্নিপাতিক অর্থাৎ বায়ু-পিত্ত-কফ এই তিনেরই এককালীন বিকৃতি জনিত রেগদ্বারা উহারা আক্রান্ত হয়। এই নিমিত্ত উহাদিগকে লােকালয়ে আনিয়া সবিশেষ সতর্কতা সহকারে প্রতিপালন করা উচিত। নরপতি, গর্দভ, উষ্ট্র, ভৃত্য, চক্ৰযুক্ত দ্রোণী দ্বারা কিংবা অন্য উপায়ে শীতল জল আনয়ন করাইয়া নব গৃহীত মাতঙ্গগণকে পান এবং উহাদের সর্বাঙ্গ সিক্ত করাইবেন। অতঃপর কিঞ্চিৎ বশীভূত হইলে যা প্রতিদিন প্রাতঃ- কালে মাতঙ্গগণকে জলে প্রবেশ করাইয়া আকৰ্ণমূল নিমগ্ন রাখিবে; কারণ আজন্ম শীত- প্রধান স্থানে বাস করিয়া অভ্যস্ত বারণগণ, জলনিমগ্ন থাকিতে পাইলে অরণ্যবাস-মুখ স্মরণ করে না। তদ্ভিন্ন উহাদিগের দেহের গ্লানিও প্রশমিত হয়। দিবসের শেষ অষ্টম ভাগে সূর্যের উত্তাপ মন্দীভূত হইলে মাতঙ্গগণকে জল হইতে স্থলে আনয়ন করিয়া স্তম্ভে বন্ধন করা- ইবে। অতঃপর শত ধৌত ঘৃত দ্বারা বারণগণের সর্বাঙ্গ সিক্ত করা উচিত। সন্ধ্যাকালে উহা- দিগকে ধৃত মিশ্র যবান্ন প্রদান করিতে হয়। শর ও গ্রীষ্ম ঋতু ব্যতীত অন্য সকল ঋতুতেই উহা- দিগকে শত ধৌত ঘৃতের জি-কালীন সেক প্রদান করা কর্তব্য। এইরূপে কিছুদিন সেক প্রদান করিয়া পরে প্রতিপক্ষে একবার করিয়া গজ শাস্ত্র বিধানানুসারে লৈ সেক প্রদান করা উচিত। এইরূপে যতই কাল অতীত হইবে মাতঙ্গের নিমিত্ত ক্রমে অল্প পরিমিত জল আহরণ করিবে। অতঃপর মাতঙ্গগণ কিঞ্চিৎ প্রকৃতিস্থ হইলে তাহাদিগকে স্থলে বন্ধন করিয়া গজ বৈদ্যগণ তাহাদিগের আহারাদির ব্যবস্থা করিবেন। হে নরেশ্বর, যে সকল আহার দ্বারা মাতঙ্গগণের পাকস্থলীর পরিপাকশক্তি প্রদীপ্ত হয় এবং বাত, পিত্ত ও কফ কুপিত না হয় তাহা সবিশেষ বলিতেছি শ্রবণ করুন সুষ (ছােলা প্রভৃতি শস্যের খােসা মৃদু বাস, তরুপল্লব, ঘাস, পদ্মমৃণাল, ইক্ষু এবং অন্যান্য মধুর-রসযুক্ত খাদ্য এই সময়ে উহাদিগকে আহার করিতে দিলে বায়ু কুপিত হইয়া উহাদিগের পাকস্থলীর বিকৃতি উৎপাদন করে না; কারণ উহারা অরণ্যে এই সকল দ্রব্য আহার করিতে অভ্যস্ত থাকে। চিকিৎসক, গৃহীত মাতঙ্গের দেহের পরিমাণের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া আহাৰ্য্য বস্তুর পরিমাণ স্থির করিতে বিস্তৃত হইবেন না। যখন মাতঙ্গগণ শয্যাতে সুখে নিদ্রা যাইতে থাকে তখন উহাদিগের সম্মুখে গুড় মিশ্রিত ভণ্ডুল রাখিয়া দিতে হয়। রাখিয়া দিতে হয়। ঐ গুড়মিশ্রিত তণ্ডুল এক এক পল । করিয়া বৃদ্ধি করিতে করিতে এক কুড়ব * পৰ্য্যন্ত বর্ধিত করিতে হইবে। অতঃপর বারণগণ, যখন এক কুড় গুড় মিশ্রিত ততুল তােজন করিয়া সম্যকরূপে পরিপাক করিতে অভ্যস্ত হয় তখন উহা দ্বিগুণ বর্ধিত করিতে হয়। এইরূপে ক্রমে ত্রিগুণ চতুগুণ বর্ধিত করিতে হইবে; কিন্তু স্মরণে থাকা আবশ্যক * এক পল ৮ জেলা এক কুড়ব ৩২ তােলা।
গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা । যে-গুড়-তল, লবণ-তণ্ডুল কিংবা অজ-মূত্র মিশ্রিত তণ্ডুল কিঞ্চিৎ পেষণ করিয়া ভােজন করাইতে হইবে ইহাতে উহাদের জঠরানল উদ্দীপিত হইয়া বল ও তেজঃ বর্ধিত হইয়া থাকে। এই প্রকারে তণ্ডুল ও বিটলবণ প্রদান করিলেও উহাদের বল এবং তেজঃ বর্ধিত হইয়া থাকে। অজ-মুত্র প্রেক্ষিত তর্ভুল ভােজনে বারণগুণের পাকস্থলীতে বায়ুর প্রকোপ জন্মে না। গুড়মিশ্রিত কাঞ্জিকা ভােজন করাইলে উহাদিগের তেজঃ ও বল বর্ধিত হয়। ইহাতে উহাদের পাকস্থলীর শক্তি বৰ্দ্ধিত হইয়া থাকে, পক্ষান্তরে বায়ুর প্রকোপ হ্রাস প্রাপ্ত হয়। গজায়ুৰ্ব্বেদে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ, গুড় তণ্ডুলের পরিমাণের ন্যায় ক্রমে এক পাদ, অর্ধাংশ, ত্রিপাদ এবং পূর্ণমাত্রায় অন্যান্য খাদ্য দ্রব্যও প্রদান করিবেন। বারণগণ, প্রাতঃকালে ঘৃত-স্নিগ্ধ কিংবা গুড়মিশ্রিত দ্রব্য ভােজন করিবে এবং অপরাহে তৈল ও লবণযুক্ত দ্রব্য আহার করিবে। ঋতু বা কালবিচারপূর্বক জলপান করিবার পরে তৈল-লবণযুক্ত দ্রব্য আহার করিতে দিতে হইবে, অন্যথা উহাদিগের শরীরে দাহ উপস্থিত হইতে পারে। হে নরেশ্বর, এইরূপ গােমূত্র, ক্ষীর, মদ্য, দধি কিংবা সৌবীর * প্রভৃতি দীপনীয় দ্রব্য মাতঙ্গ- গণকে জল পান করাইবার পূর্বেই আহারার্থ প্রদান করিতে হইবে, নচেৎ উহাদের শ্লেষ্ম কুপিত হইতে পারে। গ্রীষ্ম ঋতুতে মধ্যাহ্নকালে এক দ্ৰোণ পরিমিত গুড়মিশ্রিত জল প্রেক্ষিত সক্ত ( ছাতু) ভােজন করাইয়া এক রাত্রি পযুষিত + জল পান করাইবে এবং গ্রীষ্ম শীতাদি ঋতুবিচার পূৰ্ব্বক বারণগণকে জলে অবগাহন করাইতে হইবে। এইরূপ পরিচর্যা করিতে করিতে নবধৃত মাতঙ্গগণের জঠরানল যখন প্রকৃতিস্থ, শরীর নীরােগ ও মুখ বিশুদ্ধ হইবে এবং উহারা পান ও ভােজনের অনিচ্ছা জ্ঞাপন করিতে সমর্থ হইবে, তখন উহাদিগের প্রকৃতি সবিশেষরূপে অবগত হইয়া শীত গ্রীষ্ম প্রভৃতি ঋতুবিচার পূর্বক স্নেহােপচার করা উচিত। হে নরেশ্বর, স্নেহদানের বিধান বিশেষরূপে কথিত হইতেছে শ্রবণ করুন ;- ‘পরমাণু এতাদৃশ সূক্ষ্ম যে তাহা স্কুল চক্ষু দ্বারা দর্শন করিতে পারা যায় না, কেবল অনুভব দ্বারা স্থির করা হইয়া থাকে। বিশ্বমণ্ডলের প্রত্যেক স্থূল দ্রব্যকে বিভক্ত করিতে করিতে যে সূক্ষ্ম অংশ অবশিষ্ট থাকে, যাহাকে আর বিভাগ করা যায় না, সেই অবিভাজ্যতম অংশকে ‘পরমাণু' বলে। অথবা সৌ গবাক্ষজাল দ্বারা গৃহে প্রবেশ করিলে তন্মধ্যে যে ক্ষুদ্রতম ধূলিকণা দৃষ্ট হয়, তাহার ত্রিশ ভাগের এক ভাগ পরমাণু’ নামে উল্লিখিত হইয়া থাকে। অষ্ট পরমাণুতে এক সরেণু অষ্ট বস রেণুতে এক ‘রথরেণু অষ্ট রখরেণুতে এক ‘কেশাগ্র’ অষ্ট কেশাগ্রে এক ‘লিক্ষা অষ্ট লিক্ষায় এক ‘যুকা’ অষ্ট যুকায় এক যুব’ এবং অষ্ট যবে এক ‘অঙ্গুলি হইয়া থাকে। দ্বাদশাঙ্গুলিতে এক ‘বিতস্তি’ দুই বিতস্তিতে এক অতি’ দুই অভ্রিতে এক কিন্তু, দুই কিছুতে এক ‘ধনু সহস্র ধনুতে এক ‘ক্রাশ’ এবং ইহারই দ্বিগুণ এক ‘গব্যতি’ এই প্রকার গব্যুতি চতুষ্টয়ে এক ‘যােজন’ এই যােজন দ্বারা লােকিক পরিমাণ কার্য। সমাহিত হইয়া থাকে। বৈদ্যপ্রবর, এই পরিমাণ দ্বারা যান্ন দ্বারা প্রস্তুত কাজি । প্রচলিত ‘বালি জগ’!
দশম অধ্যায়। মাতঙ্গগণকে মাপিয়া হস্তীর বাসস্থান, বিহারস্থান ও মাতঙ্গগণের শিক্ষাবিধানের নিমিত্ত যাহা যাহা কৰ্তব্য সে সমস্তই সম্পাদন করিবেন। অতঃপর তেল পরিমাণ কথিত হইতেছে ;-অষ্টচুলিকা’ ফলে এক ‘সর্ষপ, অষ্ট-সৰ্ষপে এক ‘যব’ চারি যবে এক কাকিনী, চারি কাকিনীতে এক ‘মা’, চারি মাষে এক, শানক, চারি শানকে এক ‘সুবর্ণ’ চারি সুবর্ণে এক পল’, চারি পলে এক ‘কুড়ব’ চারি কুড়বে এক ‘প্র’ চারি প্রস্থে এক ‘অক’ চারি আটুকে এক দ্রোণ’ এবং চারি দ্রোণে এক ‘খারী। হে নরনাথ, রসের পরিমাণ গ্রহণ বিষয়ে পঞ্চ কুড়বে’ এক প্রস্থ গণনা করিতে হয় এবং অন্তরীক্ষ হইতে যে জল পরিশ্রুত হয় অথবা শৈল গাত্র হইতে যে জল নিঃসৃত হয়, সার্জ বয়ােদশ পলে তাহার এক প্রস্থ গণনা করিতে হইবে। গজ পালনে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ, এই পরিমাণের অনুসরণ করিয়া বারণগণকে মেইদান ও তণ্ডুল দানাদির ব্যবস্থা করিয়া থাকেন। তদ্ভিন্ন অন্যান্য পরিমাণ গ্রহণেও এই পরিমাণই কথিত হইয়াছে। হে নরেশ্বর, যে সকল মাতঙ্গের উচ্চতা নয় অরজি, দৈর্ঘ্য একাদশ অরক্সি এবং বক্ষস্থলের ব্যাপ্তি দ্বাদশ অরঙ্গি তাহাকে ‘অত্যরাল’ মাতঙ্গ বলে এবং যে সকল মাতঙ্গের উচ্চতা অষ্ট অরঙ্গি, দৈর্ঘ্য দশ অরক্সি ও বক্ষঃস্থলের ব্যাপ্তি একাদশ অরঙ্গি, তাহাদিগকে ‘অরাল’ মাতঙ্গ বলে। উল্লিখিত দুই শ্রেণীর মাতঙ্গই সাতিশয় উচ্চ বলিয়া গজ শাস্ত্রাভিজ্ঞদিগের মতে গ্রহণের অযােগ্য। যে সকল মাতঙ্গের উচ্চতা সপ্ত অরঙ্গি, দৈর্ঘ্য নব অররি এবং দেহের ব্যপ্তি দশ অরত্নিমাত্র, সেই সকল নবধৃত মাতঙ্গের দৈনিক আহারের পরিমাণ সাধারণতঃ সপ্তদ্রোণমাত্র। যে সকল মাতঙ্গের উচ্চতা ছয় অরক্সি, দৈর্ঘ্য অষ্ট অরজি এবং দেহের ব্যাপ্তি নব অরঙ্গি, তাহাদের দৈনিক আহারের পরিমাণ ছয় দ্রোণমাত্র। যাহাদের উচ্চতা পঞ্চ অরঙ্গি দৈর্ঘ্য সপ্ত অরজি এবং দেহের ব্যাপ্তি অষ্ট অরক্সি, তাহাদিগের আহারের পরিমাণ ও পঞ্চদ্রোণমাত্র। যাহাদের উচ্চতা চারি অরজি, দৈর্ঘ্য ছয় অরঙ্গি এবং দেহের ব্যাপ্তি সপ্ত অরঙ্গি, তাহাদিগের আহারের পরিমাণ চারি দ্রোণ মাত্র • বিধেয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ, উল্লিখিত মাতঙ্গগণের অগ্নিবল সবিশেষরূপে পরীক্ষা করিয়া এই পরিমাণের হ্রাস বৃদ্ধি করিতে পারেন। এইরূপ তিন অরঙ্গি বা দুই অরঙ্গি মাত্র যাহাদের দেহের উচ্চতা, তাহাদিগকে চিকিৎসক, মুক্তিদ্বারা যথাক্রমে তিন দ্রোণ ও দুই দ্রোণ আহার প্রদান করাইবেন। ফলতঃ যে মাতঙ্গের উচ্চতা যত অরজি, তাহার আহার তত দ্ৰোণ পরিমাণে হইবে। মধুর, লবণ, অম্ল ও কষায় রসযুক্ত আহার বা পথ্য নবধৃত মাতঙ্গকে (উচ্চতার) প্রতি অরঙ্গিতে দুইপল হিসাবে প্রদান করা উচিত। এইরূপ কটু রসযুক্ত দ্রব্য, প্রতি অরঙ্গিতে এক কর্ষ । হিসাবে এবং তিক্তরসযুক্ত দ্রব্য দুই কর্ষ হিসাবে প্রথমতঃ প্রদান করিতে আরম্ভ করিয়া * আফ্রিয়তে রসঃ অস্মাৎ ইতি অাহার -যাহা হইতে রস অ'হৃত হয় তাহাকে আহার অর্থাৎ অহাৰ্য্য ৬২ গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা লােকালয়ে অবস্থান সম্যকরূপে অভ্যস্ত হওয়া পর্যন্ত বিচার পূর্বক অগ্নিবলের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া ক্রমশঃ বৃদ্ধি করিতে হইবে। অতঃপর মাতঙ্গগণ, যখন সম্যক্রূপে অভ্যস্ত হয় এবং উহাদের মুখ যখন একান্ত বিশুদ্ধ হয়, তখন উহাদিগকে যষ্ঠি-পল-পরিমিত মধুর-রসমুক্ত আহার প্রদান করা যাইতে পারে। এইরূপ তিক্তরসযুক্ত দ্রব্য, তাহার অর্ধ অর্থাৎ ত্রিংশত পল এবং কটুরসযুক্ত দ্রব্য তদন্ধ অর্থাৎ পঞ্চদশ পল পরিমিত উহাদিগকে প্রদান করা যায়। এইরূপ কয়, লবণ ও অম্নরসযুক্ত দ্রব্য ও ঐ অবস্থায় যষ্টি-পল পরিমিত প্রদান করা বিধেয়। যে সকল মাতঙ্গ সপ্ত অরঙ্গি উচ্চ তাহাদিগকে পূর্ণ মাত্রার মােগ্য ধরিয়া ব্যবস্থা করা হইল। মাত্রাহীন দ্রব্য বিকার প্রতীকারে সমর্থ হয় না, পক্ষান্তরে মাত্রা সমধিক হইলে নানা প্রকার নূতন ব্যাধি অথবা যন্ত্রণা উপস্থিত হইতে পারে। সবল মাতঙ্গকে ঔষধ-চুৰ্ণ কিংবা নিষ্পেষিত করিয়া ভােজন করাইতে পারা যায়- কিন্তু রােগক্লিষ্ট দুর্বল মাতঙ্গকে, ঔষধের কাথ পান করান আবশ্যক। হে নরেশ্বর, ঔষধের কিংবা পথ্যের যে মাত্রার উল্লেখ করা হইয়াছে তাহা আ ঔষধ সম্বন্ধেই ব্যবহাৰ্য, শুষ্ক ঔষধের কিংবা ঘাসেরও পথ্যের মাত্রা উহার দ্বিগুণ হইবে। করিণীদিগের ও মতিগণের অনুরূপ শুশ্রুষা ও চিকিৎসা করিতে হইবে। কিন্তু পুর্ণবয়স্ক হস্তিনীর পথ্য এবং ঔষধাদির পরিমাণ, মধ্যম বয়স্ক মাতঙ্গের সমান রাখা একান্ত বিধেয় । অরণ্যে অবস্থান কালে বারণগণ সর্বদা আহার করিয়া সুস্থ থাকে ; এই নিমিত্ত পূৰ্বঘ্নে ও অপরাহ্নে দিবসে দুইবার করিয়া ঔষধ ও পথ্য প্রদান করা উচিত। ঔষধ দ্রব্যের পরিমাণ বিষয়ে বিশেষ বিধান এই যে—পেষ্য বা পেষণ করিয়া ব্যবহার করিবার বােগ্য দ্রব্য সমুদয়ের সাধারণতঃ সমষ্টির পূর্ণ পরিমাণ ২০ পল বা ১৬০ ভােলা এবং কাথ ব্যের পরিমাণ এক দ্রোণ বা ৬২ সের হওয়া আবশ্যক। পারিপার্শ্বিক অবস্থার সহিত সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া উহার পরিমাণ উল্লিখিত মাত্রার চতুগুণ পর্যন্ত বর্ধিত করা যাইতে পারে অর্থাৎ এক আচক বা ৮ সের বর্ধিত করিয়া এক দ্রোণ বা ৬২ সের পর্যন্ত করা যাইতে পারে। প্রতিরূপ বা প্রক্ষেপ দ্রব্য পেষ্য দ্রব্যের ও অষ্টম ভাগের এক ভাগ হইতে হইবে এবং স্নেহ-দ্রব্যের পরিমাণ সাধারণতঃ এক দ্রোণ বা ২ সের হইবে। এইরূপ ষড়ঙ্গের পরিমাণ অর্থাঢ়ক বা /8 সের মাত্র হওয়া উচিত। পানীয় ঘনতর সুরার পরিমাণ ও তপ অৰ্ধাঢ়ক বা / সেরই গ্রহণ করিতে হইবে। মাতঙ্গগণের অনুবাসনে । উক্ত পরিমাণই গ্রহণীয়। নিহ-দ্রব্যের মাত্রায় দ্রোণ শব্দ থাকিলে দ্রোণ শব্দের অর্থ দ্বিকুড়ব বা ৬৪ তােলা বুঝিতে হইবে । চুর্ণ ব্যর পরিমাণ প্রত্যেক দ্রোণে অর্ধকুড়ব বা ১৬ তোলা গ্রহি। অনুবাসনে যে মাত্রার উল্লেখ হইয়াছে সৰ্ব্ব সেকেও সেই মাত্রাই গ্রহণ করিতে হইবে। গৈরিকানুষেচনে । মাতঙ্গের উচ্চতর e * * বক্তি বিবিধঃ অনুসনাখ্যো নিরূহশ্চেতি সংক্তিতঃ, যঃ স্নেহৈীয়তে, স স্যানুসননাশক। কষায় ক্ষীর তৈলৈৰ্যো নিরূহ, স নিগদ্যতে। স্নেহ পদার্থ দ্বারা যে পিচকারী প্রদান করা যায় তাহাকে অনুশাসন এবং কন্যদি তারা যে পিচ কারী দেওয়া হয় তাহাকে ‘নিক্স’ বলে ইতি আয়ুর্বেদে। । মধ্য প্রাণের চোহনি অৰেও রোগস্থানে ২ অ৭৫ গো।
Fম অধ্যায়। প্রত্যেক অরজিতে ১০ পল বা ৮০ ভােলা পরিমাণ গ্রহণ করা কর্তব্য। নবধৃত কিংবা রুন্ম মাতঙ্গকে উচ্চতার প্রত্যেক অরঙ্গিতে ১২০ পল বা ৯৬০ ভােলা পরিমাণে আহাৰ্য্য কিংবা পথ্য প্রদান করিতে হইবে। সেইরূপ উচ্চতার প্রত্যেক অরজিতে এক দ্রোণ বা ২ সের পরিমাণে ঘাস ভােজন করিতে দিবে। উল্লিখিত পরিমাণ কেবল আর্জ ঘাসের সম্বন্ধেই নির্ধারিত হইল। কিন্তু হে নরনাথ, শুষ্ক ও লঘু তৃণ এবং তরুর পরিমাণ উল্লিখিত পরিমাণের দ্বিগুণ হওয়া আবশ্যক। গর্ভিত অর্থাৎ যে সকল তৃণ ফলােখ তাহার পরিমাণ উল্লিখিত, পরিমাণের অংশ মাত্র এবং ফুলযুক্ত তৃণ সমুদয়ের পরিমাণ, প্রথমােক্ত পরিমাণ অপেক্ষা অর্ধ পরিমিত হইবে। গাত্রসেকে তৈলের পরিমাণে এক দ্রোণ দিকুড়ব বা ৬৪ ভােলা এই পারিভাষিক অর্থ ই বুঝিতে হইবে। সেইরূপ উত্তর পানে যেস্থলে এক দ্রোণের উল্লেখ আছে সেইস্থলে দ্রোণ শব্দের, এক প্রস্থ ১২৮ তােলা এই পারিভাষিক অর্থ ই গ্রাহ। মাতঙ্গগণের উত্তর বস্তিতেও উচ্চতার প্রত্যেক অরম্নিতে এক কুড়ব করিয়া প্রব্য গ্রহণ করা বিধেয়। নাসিকার-দয়ে অথবা গণ্ডদয়ের রােগ প্রতীকারার্থ যে ঔষধ প্রদান করিতে হইবে তাহার সমষ্টির পরিমাণ, প্রত্যেক নাসিকা বা গণ্ডের নিমিত্ত এক এক কুড়ব বা ৩২ তােলা হওয়া আবক। এইরূপ তৈলানুষেকে দুই দ্রোণে এক কুড়ব বুঝিতে হইবে। মস্তকে মঙ্গলের নিমিত্ত মেধী চুর্ণের পরিমাণ অর্ধ কুড়ব এবং ঘৃতের পরিমাণ এক কুড়ব হওয়া আবশ্যক। তদ্ভিন্ন উৎকর্ষণ বা ঘর্ঘণ দ্বারা যে সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ক্ষত হয় তাহার ঔষধের পরিমাণ অর্থ কুড়ব বা ১৬ তােল মাত্র বিহিত আছে। হে নরেশ্বর, ঔযধার্থ গৃহীত দীপ-তৈলের পরিমাণ, এক কুড়ব বা ৩২ তােলা জানিবেন। অণ্ডকোষে অথবা মস্তকে রােগ-প্রতীকারার্থ মর্দনের নিমিত্ত যে তৈল গ্রহণ করিতে হইবে তাহার পরিমাণ এক কুড়ব বা ৩২ ভােলা মাত্র। যে স্থলে দুগ্ধ ও ধৃত এক যােগে ব্যবহার করিবার কথা আছে যেই স্থলে ঘৃত ও দুগ্ধের পরিমাণ সাধারণতঃ প্রতি অরঙ্গিতে উল্লিখিত পরি- মাণের দ্বিগুণ গ্রহণ করিতে হইবে। অন্যান্য ঔষধের সমষ্টির প্রত্যেক দ্রোণে দশ পল বা ৮০ ভােলা গ্রহণ করিতে হইবে। স্নেহ পানবিধানে পানাৰ্থ স্নেহের যে পরিমাণের উল্লেখ আছে, তাহাই মুত্র এবং সৌবীরকের সমষ্টির পরিমাণ বলিয়া জানিতে হইবে; কিন্তু মূত্রের পরিমাণ সৌবীরকের অর্ধ মাত্র। দধি, মেদক (ঘনতর সুরা ) দুগ্ধ এবং মদ্য এই সকলের পরিমাণ এক দ্রোণ বা ২২ সের মাত্র। মহিষাদি পশুর মাংসের পরিমাণ সাধারণতঃ ৫০ পল বা ৪০০ ভােলা হওয়া আবশ্যক। জঙ্গল এবং জলচর বিহঙ্গের মাংসের পরিমাণ এক দ্রোণ বা ২ সের পর্যন্ত হইতে পারে। কৃত- সংস্কার বস বা কজ্জলীর পরিমাণ এক পল বা ৮ ভােলার অধিক হইবে না। দধি কিংবা মাংস যােগে দ্বতের পরিমাণ, গুড়পিণ্ডের পরিমাণের অনুরূপ অর্থৎ ৪০ তােলা মাত্র। বিজ্ঞ চিকিৎসক, সাবধানে দিবসের পূর্বাদ্ধে মাতঙ্গগণকে পানীয় পান করাইয়া পরে ভােজন করাইবেন। নুর স্থানে সবিস্তার লিখিত আছে।
গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। পান ভােজনের পোর্বাপৰ্য্যের ব্যবস্থা, মাতঙ্গগণের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করিয়া করিতে হইবে। অপরাহ্নে মাংস-স্নেহ-রসযুক্ত খাদ্য ভােজন করিতে দিবেন। বারণগণের কঙ্কাজন ও তীক্ষাঙ্গনের পরিমাণ ২ রতি মাত্র হইবে। পরিমাণে মধ্যম মাতঙ্গের কল্কাঞ্জনের পরিমাণ ইহার অর্থ হইবে; কিন্তু উক্ত কাঞ্জন যদি মৃদুবীৰ্য্য হয়, তাহা হইলে উহার দ্বিগুণ গ্রহণ করা আবশ্যক। হে নরনাথ, চুর্ণাজনের পরিমাণ কাঞ্জনের পরিমাণ অপেক্ষা অংশ বা পাদ হীন হইবে। এতদ্ভিন্ন সাধারণ ঔষধের পরিমাণ দশ পল বা ৮০ ভােলা হইতে এক দ্রোণ বা ২ সের পর্যন্ত হইতে পারে এবং যে সকল ঔষধের চূর্ণ ব্যবহার করিতে হইবে তাহার পরিমাণ ২৪ পল বা ১৯২ তােল হইতে এক দ্রেণ পৰ্যন্ত হইতে পারে। বিজ্ঞ চিকিৎসক, অন্নের সহিত যে মাংস রস পান করিতে দিবেন তাহার পরিমাণ এক, প্রস্থ বা /২ সের হইবে। নবধৃত বা রুগ্ন মাতঙ্গগণের ভােজনার্থ মাষ কলাইয়ের পরিমাণ উত্তমরূপে ওজন করিয়া দ্বাদশ দ্ৰোণ করা যাইতে পারে। এবং ঘাসের পরিমাণও উক্ত স্বাদশ দ্রোণই পর্যাপ্ত। অতঃপর বারণগণের বলের অনুরূপ গতি কথিত হইতেছে;আতঙ্গগণ, সাধারণত শ্রেষ্ঠ মধ্যম ওজন্য এই তিন প্রধান ভাগে বিভক্ত হইয়া থাকে। তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠ বা উত্তম ধীর মাতঙ্গের গতি প্রতিদিন অন্ততঃ দশ যোজন পরিমিত হইবে, মধ্যম শ্রেণীর মাতঙ্গের গতি সপ্ত যােজনের অধিক হওয়া উচিত নহে এবং জঘন্য বা নিকৃষ্ট শ্রেণীর বারণগণের গতির পরিমাণ পঞ্চ যােজনই পৰ্যাপ্ত। সুশিক্ষিত মধ্যম ও জঘন্যা করিণীগণের দৈনিক গতির পরিমাণ যথাক্রমে সপ্ত, এবং চারি যােজনের অধিক হওয়া উচিত নহে। হে নরনাথ, ইহাই বারণগণের আহারের প্রমাণ ও পরিমাণ। অতঃপর ক্রমঃ যােগ, ক্রিয়া যােগ এবং গ্রীষ্মদি ঋতুষােগে কিংবা বল, প্রকৃতি এবং সুচির অভ্যাস প্রভেদে মাতঙ্গগণের আহার সম্বন্ধে আরও যে সকল বিশেষ বিশেষ জ্ঞাতব্য থাকিল, তাহা ভবিষ্যতে সবিশেষরূপে বলিব। 'যে ব্যক্তি, মাতঙ্গগণের বয়স, স্বভাব, অভ্যাস, শরীর, ঘাস গেহাদি দান, অভঙ্গ, অঞ্জন ও আহারাদি সম্বন্ধে প্রমাণ এবং পরিমাণ সম্যকরূপে অবগত নহে, সে কাৰ্যকালে অবশ্যই ভ্রান্তপথে গমন করিবে; এই নিমিত্ত যে ব্যক্তি প্রমাণ ও পরিমণে সম্যকরূপে অভিজ্ঞ, তাহাকেই চিকিৎসক বলা হইয়াছে। হে অঙ্গেশ্বর, আপনি আমাকে যাহা যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তৎ সমুদায়ই আপনাকে বলিলাম। ইতি শ্রীপালকাপ্য ঋষিবিরচিত-হত্যায়ুৰ্বেদ মহা প্ৰচনে মহারােগ স্থানে অন্ন সমাচার নামক দশম অধ্যায়। + নিরূহ ক্রিয়ার পরে যে ব্যক্তি বা পিচ কারী প্রদান করা হয়। গরম একাদশ অধ্যায়। • একদা মহর্ষি পলকাপ্য চম্পা নগরীতে উপস্থিত হইলে, বাগ্মি-শ্রেষ্ঠ অঙ্গের কৃতাঞ্জলিপুটে তঁাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন;-ভগবন, আপনার গুণ-মাহাত্ম্য সমুদয় তপঃ প্রভাসত। আপনার জননী দিব্যাঙ্গনা এবং আপনার জনক অশেষ গুণের আকর। আপনি সকলই সম্যকরূপে বর্ণন করিয়া আমাদিগের কৌতূহল চরিতার্থ করিয়াছেন। কখনও বায়ু-সেবন, কখনও শীর্ণ পর্ণ ভােজন, কখনও অন্ধুমাত্র পান করিয়া, আপনি স্বয়ং যেরূপে মত্ত মাতঙ্গগণের সহিত বনে বনে বিচরণ করিয়াছেন, মহানুভব অগ্নিবেশ, গৌতম প্রভৃতি মহর্ষিগণ তাহা বর্ণন করিতে করিতে বিস্ময় প্রকাশ করিয়াছেন। আপনি নিশ্চয়ই সুদীর্ঘকাল তাহাদিগের সহিত একত্র বাস করিয়া উহাদিগের গতিবিধি বিশেষরূপে অবগত আছেন। এই নিমিত্ত আমি সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করিতেছি পৃথিবীতে আপনিই কি আরণ্য বারণগণের একমাত্র চিকিৎসক ? অথবা অরণ্য মধ্যে আপনার ন্যায় আর কেহ বন্য মাতঙ্গগণের চিকিৎসক আছেন? মহানুভব অঙ্গপতির ঈদৃশ প্রশ্নের উত্তরে ভগবান পালকাপ্য বলিতে লাগিলেন ;-হে নরেশ্বর, ত্রিদোষ জনিত রােগসমুদয় আরণ্য বারণগণকে, কখনও আক্রমণ করিতে পারে না; কিন্তু যখন তাহারা প্রকৃতি দত্ত স্বাধীন বিচরণ ক্ষেত্র অরণ্য হইতে আবদ্ধ হইয়া লােকালয়ে আনীত হয়, তখন তাহাদের প্রাণ একদিকে যেমন বধ ও বন্ধন জনিত আতঙ্কে ব্যাকুল হইতে থাকে, অপর দিকে তেমনি দেহ ও মন, প্রাজন ও অঙ্কুশের আঘাতে ক্লিষ্ট হইতে থাকে। এতাদৃশ অবস্থায় দুঃখিতচিত্তে নিরন্তর স্বাধীনতার লীলাভূমি অরণ্যের বিষয় চিন্তা করাই উহাদিগের পক্ষে স্বাভাবিক। কিয়ৎকাল এইরূপে অতিবাহিত হইতে থাকিলে, নদী সমূহ যেমন সাগরকে আশ্রয় করে, তেমনই নানাবিধ রোগ বারণগণকে আশ্রয় করিয়া থাকে। তদ্ভিন্ন বনে বিচরণকালে তাহাদিগকে প্রায়শঃ রোগাক্রান্ত হইতে দেখা যায় না। হে নরেশ্বর, আমি, সুদীর্ঘকাল মাতঙ্গগণের সহিত একত্র অবস্থান করিয়া বহুবার প্রত্যক্ষ, করিয়াছি যে অরণ্যে মাতঙ্গগণের পঞ্চদশটী মাত্র মৃত্যু-হেতু উপস্থিত হইয়া থাকে। তদ্ভিন্ন স্বাধীন ভাবে স্বেচ্ছায় বিচরণ ও পান ভােজন করিতে পারায় কিংবা বিবিধ আরণ্য দ্রব্যের গুণে উহাদিগের দেহে সংক্রামক ব্ৰণাদি ও উৎপন্ন হইতে দেখা যায় না। মহারাজ, আরণ্য বারণগণের মৃত্যু কারণ শ্রবণ করুন ;-পৰ্বত হইতে পতন পঙ্কে নিমজ্জন, বিষ-লতা ভােজন, বার্ধক্য, দাবানল, তৃণাচ্ছন্ন কৃপ, বলাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী মাতঙ্গ, জলজন্তু, বিদ্যুৎ, ব্যাধ, সর্প, অলম সিংহাদি হিংস্র জন্তু, এবং শৈশবে মাতৃহীনতা প্রভৃতি পঞ্চ দশটা কারণে অণ্যে মাতঙ্গগণের মৃত্যু ঘটয়া থাকে। তদ্ভিন্ন ত্রিদোষ জনিত রোগ অরণ্যে, সতত প্রফুল্ল বারণগণকে আক্রমণ করিতে পারে না। মহর্ষি পালকাপ্যের উল্লিখিত বাক্যাবলী শ্রবণ করিয়া একান্ত বিস্ময়াভিভূত শিষ্যভাবাপন্ন অঙ্গেশ্বর, নিঃশঙ্কভাবে পুনরায় মহর্ষিকে জিজ্ঞাসা করিলেন;-ভগব, অরণ্যে অবস্থান কালে বারণগণের দেহে কি পাঞ্চভৌতিক দেহের সাধারণ উপকরণ বায়ু, পিত্ত, কফ, এবং রক্ত মাংসদি * অলম এক প্রকার বিষবৃক্ষ।
গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা সপ্তধাতুর স্বাভাবিক প্রভাব বিলুপ্ত হয় ? অঙ্গপতির ঈদৃশ প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞ ভগবান পাল- কাপ্য, বলিতে লাগিলেন; হে নরনাথ, আমি মাতঙ্গগণের সহিত বাসকালে দেখিয়াছি সাত্ম * বা চিরন্তন অভ্যাস’ই উহাদের স্বভাব হইয়া থাকে, সুতরাং আমি, সাত্মা ও তাহার গুণাবলী কীর্তণ করিতেছি শ্রবণ করুন ;-অরণ্যে অবস্থান কালে বারণগণ, স্বাধীনভাবে জন্মাবধি অত্যন্ত আহার বিহারাদি করিয়া মন ও ইন্দ্রিয়গণকে সতত প্রফুল্ল রাখিতে সমর্থ হয়। ঐ নিরন্তর অভ্যাস প্রভাবে উহাদিগের দেহের উপাদানস্বরূপ বাত পিদি কখনও দূষিত হয় না এবং তাহারই ফলে বন্ধ বারণগণকে রােগ কখনও আক্রমণ করিতে পারে না। হে নরেশ্বর, প্রাণীআত্রের আচার কিংবা আহার যখন’একান্ত অভ্যস্ত হয়, তখনই তাহার সুফল প্রাপ্তি সম্ভবপর। আরণ্য বারণগণ স্বীয় অভিলাষানুসারে কখনও তরুশাখা ভগ্ন করিয়া আহার করে, কখনও বা তৃণ, কখনও বৃক্ষ ত্বক কখনও বা তরুমূল ভেজন করে, এবং জল ও বাল্যকালে প্রতিস্তন্য পান করিয়া বর্ধিত হয়, সুতরাং ইহা বারণগণের আহার সম্বন্ধীয় সাত্ম বা চিরন্তন অভ্যাস বলিতে হইবে। আচার সম্বন্ধীয় সাত্ম্য এই যে বারণগণ অরণ্যে অবস্থান কালে স্বাধীনভাবে স্বীয় অভিলাষানুসারে শয়ন, বিশ্রাম, কৰ্ম্ম, আহার, বিহার এবং চেষ্টা করিতে অভ্যস্ত হয় ; কখনও তাহাতে কোন বিষ্ণু উপস্থিত হয় না। ঙ্গেশ্বর, মহর্ষি পালাপ্যের এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া পুনরায় বলিতে লাগিলেন ;-ভগব, যদি ৰ'রণগণ তৃণমাত্র ভােজন করিয়াই সুখে থাকে, তাহা হইলে লােকালয়ে আনীত হইয়াও কেবল তৃণদ্বারাই পুষ্টিলাভ করিতে পারে; কারণ উহাই তাহাদের প্রীতিকর আহর। অঙ্গপতির এবং বিধ প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি পালকাপ্য, অঙ্গেশ্বরের সংশয় অপনয়নের নিমিত্ত স্পষ্টহেতু নির্দেশ, পূর্বক বলিতে লাগিলেন;-হে নরেশ্বর, বনচর তৃণভােজী প্রাণীমাত্রই বিশেষরূপে মাতঙ্গগণ আশৈশব তৃণভােজনে অভ্যস্ত, তৃণপ্রিয় ; সুতরাং তৃণই উহাদিগের প্রাণ, ইহাতে কোনও সংশয় নাই, তথাপি পােকালয়ে আনীত হইলে যে কারণে কেবল তৃণ কিংবা কেবল বন-জাত খাদ্যমাত্রই উহাদিগের তসাধন করিতে পারে না, তাহা বলিতেছি শ্রবণ করুন-হে নরনাথ, স্বাধীনচেতা প্রকৃষ্টজ্ঞানসম্পন্ন বারণগণের নিরবগ্রহ বা যথেচ্ছভাবে আহারাদির অধিকারই পরম সুখ, স্বাধীন ভাবে আহার বিহারদির যে সকল গুণ আছে, তাহা শ্রবণ করুণ। বারণগণের, স্বাধীনভাবে স্বীয় অভিলাষানুসারে আহার বিহারাদি সম্পাদনকে, নিরবগ্রহ ৰা অবাধগতি বলে। এই অবাধগতির ফলেই বারণগণের অন্তঃকরণ সতত প্রফুল্ল থাকে। নিরন্তর প্রফুল্লতার ফলে উহাদের বল বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং বলবৃদ্ধির ফলে অগ্নিবলও বর্ধিত হয়। ইহাতে বারণগণের শারীর ধাতুর সমতা রক্ষিত হয় এবং ধাতু সাম্যের ফলেই রােগ, স্য তিগণকে আক্রমণ করিতে সমর্থ হয় না। হে নরেশ্বর, মনীষিগণ, স্বচ্ছ সলিলকেই মাতঙ্গগণের প্রাণস্বরূপ বলিয়া থাকেন, বিশেষত জলই বারণগণের অধিকাংশ রোগের মহৌষধ। এই নিমিত্ত আরণ্য বারণগণ, পৰ্যাপ্ত তৃণ ও জল * সাত্ম্যং নাম মহারা, অথৈবাত্মা তথা স্মৃতম্ । } ।
একাদশ অধ্যায়। মাত্র লাভ করিয়াই নীবােগ জীবন যাপন করিতে সমর্থ হয়। পক্ষান্তরে ঐ সকল আরণ্য বারণগণ, যখন ধৃত হইয়া লােকালয়ে আনীত হয়, তখন উহাদিগের আহার বিহার প্রভৃতি সকলই বিপর্যস্ত হইয়া যায়। তখন সেই স্বাধীনতা-প্রিয় বাবণগণের যথেচ্ছ আহার বিহারদি ব্যাহত হওয়ায় উহাদের অন্তঃকরণ, নিরন্তর অনুতাপানলে দগ্ধ হইতে থাকে এবং তাহার ফলে উহাদের শারীর শক্তি ও জঠরনল উভয়ই ক্রমে বিলীন হইতে থাকে। পক্ষান্তরে সেই অবস্থায় অভ্যস্ত আহারের বর্জনে ও অনভ্যস্ত আহার গ্রহণের ফলে সহজেই শারীর ধাতুর বৈষম্য এবং তজ্জনিত ত্রিদোষ, বিকার উহাদিগকে আক্রমণ করিয়া থাকে। উহাদিগের মধ্যেও যে সকল মাতঙ্গের, স্বজন-বধ কিংরা, বন্ধন জনিত ক্লেশের তাদৃশ তীব্র অনুভূতি থাকে না, অভ্যস্ত আহারের বর্জনে কিংবা অনভ্যস্ত আহারের গ্রহণে, অথবা স্বভাবসুলভ শুষ্ক তৃণ পত্রাদি শয্যার অভাবে কিংবা স্বীয় মল- মূত্ৰ-দুষিত শয্যায় শয়নে, ধেনুকার বর্জনে, নিরন্তর জাগরণে, অবস্থানে কিংবা স্বেচ্ছাচারের ব্যাঘাতে তাহাদিগের তাদৃশ দুঃখ বােধ হয় না; তাহারা লােকালয়ে আনীত হইয়াও অনুবিগ্ন এবং নীরােগ থাকিতে সমর্থ হয়। হে নরনাথ, ইহাই আরণ্য বারণগণের আরােগ্যে, আনন্দে কিংবা কেবল তৃণমাত্র ভােজন করিয়া বলার্জনের অসাধারণ কারণ। তদ্ভিন্ন বারণগণের প্রথম সৃষ্টি-সময়ে স্বয়ং স্রষ্টা বলিয়াছিলেন ;--- “হে অমিত বলশালী মাতঙ্গগণ, তােমরা দেবগণের বাহন হইয়া গমন কর, ভগ্ন তরু শাখা ও তৃণ মত্র ভোজন করিয়া নীরোগ সবল দেহে রমণীয় অরণ্য মধ্যে বিচরণ করিতে পারিবে।” হে অঙ্গনাথ, দেবগণের প্রীতির নিমিত্ত অসীম প্রভাবশালী বিশ্বস্রষ্টার সেই বরের প্রভাবে অরণ্য বারণগণের রােগ হয় না বা ভবিষ্যতেও হইবে না। উক্ত বিষয়ে শ্লোক কথিত আছে ;-বনচর ক্ষুদ্র করি-শিশু কিংবা ক্রীড়ন সমর্থ কলভ অথবা পরিশ্রম পরায়ণ ধেনুকাগণ অরণ্যে বাস করিয়া কখনও কৃশ বা দুৰ্বল হইবে না। হে নরনাথ, বন্য বারণগণ, কমল কুমুদ কুবলয় প্রভৃতি জলজ কুসুমাবলী-পরিশােভিত, • তরুকুঞ্জ ও লতাগুল্মে আচ্ছন্ন তীর, স্বচ্ছ সলিল পরিপূর্ণ (পাৰ্বত্য) সরােবরে নিরস্তর অবগাহন করিয়া দৃঢ়কায় হইয়া থাকে। হে নরেশ্বর, বন্য বারণ-শ্রেষ্ঠগণ, হিংস্র পশুর ভীষণ আরবের মধ্যে বাস করিয়াও কেবল অরণ্যের গুণে ও ফল পুষ্পের গুণেই হৃষ্টপুষ্ট হইয়া থাকে ; রস, ঘৃত, গুড়, লবণ কিংবা উত্তম খাদ্যের গুণে নহে। পক্ষান্তরে উহারা যখন উহাদের প্রকৃতি দত্ত প্রিয় বাসস্থান হইতে আনীত হইয়া নানা প্রকার রােগে আক্রান্ত হয় তখন বিজ্ঞ গজায়ুৰ্বেদজ্ঞ ব্যক্তিগণের উপদেশানুসারে উহা- দিগকে নীরােগ করিতে পারা যায়। ইতি শ্রীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত হত্যায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাবােগ স্থানে একাদশ অধ্যায়।
বলুন দ্বাদশ অধ্যায়। একদা অঙ্গেশ্বর হস্তিশালায় একাগ্রচিত্তে উপবিষ্ট, অমিততেজাঃ মহর্ষি পালকাপ্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন;- ভগব আপনি পূৰ্ব্ব অধ্যায়ে সমগ্র ‘সাত্ম’ নির্ণয় বর্ণন করিয়াছেন এবং সাত্ম্য- বর্জন ও অসাত্ম গ্রহণ নিবন্ধন যে নবধৃত মাতঙ্গগণ বিবিধ রােগগ্রস্ত হয় তাহাও বলিয়াছেন, হে ধৰ্ম্ম-সত্ত্ব, আমি, সেই সকল ব্যাধির সংখ্যা ও পরিমাণ সবিশেষরূপে জানিতে ইচ্ছা করি। হে অপােধন, সেই সকল রােগ কত ভাগে বিভক্ত হইতে পারে ? তাহাদের পরিমাণই বা কি ? আগন্তুক রােগ এবং মানসিক রােগই বা কি প্রকার ? সেই সকল রােগের সবিশেষ তথ্য আমাকে 1. অঙ্গপতির উল্লিখিত বাক্যাবলী শ্রবণ করিয়া মহর্ষি পালকাপ্য বলিতে লাগিলেন;- হে অঙ্গেশ্বর, এই গজায়ুৰ্বেদ শাস্ত্রের সংগ্রহ অধ্যায়ে মাতঙ্গগণের সকল প্রকার রােগ, হার শ্রেণীবিভাগ, পরিমাণ, সংখ্যা, স্থান, প্রভৃতি সকলই, বারণগণের চিকিৎসার্থ, আনুপূর্বিক সংক্ষেপে যথাযথ ভাবে বর্ণন করিতেছি শ্রবণ করুন ;-এই শাস্ত্রের প্রথমেই বনানুচরিত অধ্যায়, দ্বিতীয় অন্ন সমাচার তৃতীয় সাত্ম-নিশ্চয় চতুর্থ সংগ্রহ অধ্যায়, পঞ্চম গজ রক্ষণ বিন্যাস ষষ্ঠ শিষ্যোপনয়ন সপ্তম রােগ-বিভাগ অষ্টম রােৎপত্তি নবম জ্বর চিকিৎসা ও দশম সকল অধ্যায় কথিত হইয়াছে। অনন্তর প্রসঙ্গ ক্রমাগত দশবিধ পাকলের দশ প্রকার বিভিন্ন নাম কথিত হইতেছে;—শুদ্ধ, বাল, পল, মৃদুগ্রহ, কুকুট, একাগ্রহ, প্রমুপ্ত, কুট, পুণ্ডরীক এবং মহাপাকল। এই প্রকার স্কল ও ত্রিবিধ-অন্তরাম স্কন্দ, বহিরায়াম স্কন্দ এবং ব্যাবিদ্ধস্কন্দ। পুরাণকৃশ নামক পাণ্ডু- রােগ, বাতিক, পৈত্তিক ও শ্লৈষিক এই ত্রিবিধ হইয়া থাকে। আনাহ পাঁচ প্রকার; অত্যাশিত প্রথমতঃ এক প্রকার, পরে বায়ু বিক্রিয়া ভেদে উহাই বাতােন্মথিত, বাতােপরুদ্ধ এবং সংসক্ত এই তিন প্রকার কখিত হইয়াছে। এইরূপ অসংসক্ত রােগ ও বিবিধ-লক্ষণ যুক্ত তিন প্রকারই হইয়া থাকে। ধান্য প্ৰদুষ্ট বােগও প্ৰদুষ্ট এবং অপ্ৰদুষ্ট ভেদে দুই প্রকার। অনন্তর সান্নিপাতিক অর্থাৎ বায়ু পিত্ত কফ বিকার জনিত মৃত্তিকাজগ্ধ রােগ ও তাহার চিকিৎসা কথিত হইয়াছে। এই পর্যন্তই আনাহ রােগের বিষয় কথিত হইয়াছে। অতঃপর মুচ্ছা-মুচ্ছালােগ, সাধারণতঃ প্রভূত আহার গ্রহণ, কিংবা দগ্ধদ্রব্য-ভােজন অথবা ধান্য ভক্ষণজনিত হইয়া থাকে। অভিন্ন স্নেহ মূৰ্ছা, বাত, পিত্ত, কফ, সান্নিপাতিক, জল, মদ্য, ঘাস, প্রভৃতি হইতেও মুচ্ছারোগ উৎপন্ন হয়। হে নুপশ্রেষ্ঠ, এই দ্বাদশ প্রকার মুচ্ছ কথিত হইয়াছে। অতঃপর সপ্তবিধ শিরােনােগের বিষয় কথিত হইয়াছে ;-ঐ রােগ বায়ু, কফ, পি, এবং সমবেত জ্বয়ের কিংবা রক্তের বা উদরস্থ কৃমিগণের বিকৃতি বশতঃ জন্মিয়া থাকে। ঐ রােগ অনেক সময়ে মস্তকের মর্মস্থানে আঘাত নিবন্ধনও জন্মিয়া থাকে। 'অতঃপর ব্রিংশত প্রকার পাদ রােগ কথিত হইয়াছে। ঐ পাদবােগ বিভিন্ন লক্ষণবশতঃ-উৎকারকী কারকী, নাড়ীজাত, সংরাষ্ট্র, নখভভদ, পূয়কেশ, বিপ্লাবক, কেশগ্রন্থি বিপ্নত, সমকেশ, কচকেশ, কদম্বকেশ, সফুল্ল, কুঠারক, ফুপাদ, ভিন্ননখ, শরম্নদ্ধ, দক্ৰকেশ, প্রগুল্মকেশ, গম্ভীর, চর্মতল, ক্ষত, নিৰ্ম্মলিত, কেশ, দ্বাদশ অধ্যায়। লােহিত, স্থাথাহত, ক্ষীণতল, ক্ষরীকৃত, নিষ্পিষ্ট মাংসকেশ, এবং স্থানরত, এই ত্রিংশত নামে অভিহিত হইয়া থাকে। অতঃপর অষ্টবিধ ব্যাপদের বিষয় কথিত হইয়াছে -এই ব্যাপ লােগ তৈল, ঘৃত, বসা, দুগ্ধ, ধান্য, মদ্য, জল ও উপধান্য প্রভৃতি অষ্টবিধ নিদান হইতে উৎপন্ন হয় বলিয়া অষ্ট প্রকার কথিত হইয়া থাকে। শােফ লােগ সাত প্রকার মন্যাশশাফ, সগদা শোফ, দ্ৰোণীক শশাফ, ব্যবচ্ছিন্ন শশাফ, শাল্মলী স্কন্ধ, কদলী স্কন্ধ, এবং শুদ্ধ শােফ। অতঃপর বিংশতি প্রকার অক্ষিরােগ কথিত হইয়াছে ; প্রাবারকী, ঔদকী, অণ্ডা, কাচা, নায়ংপ্রেক্ষী, প্রতিমুন্ন, নিষ্পেশ হত, বিন্নিপাতদগ্ধ, বিদ্যুদ- বারিহত, উষ্মপরিগত, চৰ্ম্মক্লিষ্ট, শ্রোতােন্ধ, বুদবুদী, অক্ষিপাক, পাটল, দণ্ড, মুঞ্জ, মুঞ্জজাল, লােহিতাক্ষ এবং বিকটাক্ষ, অক্ষিরােগ এই বিংশতি প্রকার কথিত হইয়া থাকে। হে নরনাথ, পিতামহ প্রণীত গজায়ুৰ্বেদ শাস্ত্রের প্রথম স্থানের বা পাদের ইহাই বর্ণনীয় বিষয়। এই প্রথম স্থানকে ‘মহারাগস্থান’ বলে। এই মহারোগ স্থান অষ্টাদশ অধ্যায়ে বিভক্ত এবং তাহাতে একশত আটটী রােগের নিদান, লক্ষণ ও চিকিৎসা পৰ্য্যায়ক্রমে যথাযথ ভাবে কথিত হইয়াছে। অনন্তর ক্ষুদ্র রােগ স্থান বা দ্বিতীয় পাদ কথিত হইয়াছে;-ক্ষুদ্র রােগ স্থানের প্রথমেই বান রােগের লক্ষণ ও চিকিৎসা কথিত হইয়াছে। এই বমন রােগ আগন্তুক ও দোষজ এই দুই প্রকার। দোষজ বমন লােগ আবার বাত, পিত্ত কফ ও সন্নিপাত জনিত। অতঃপর অতীসার রােগের বিষয় কথিত হইয়াছে। এই অতীসার রােগ পঞ্চাশয় ও আমাশয় সমুৎপন্ন বলিয়া প্রথমতঃ দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত হইয়া থাকে এবং ঐ দ্বিবিধ অতীসারই বায়ু পি, কফ ও সান্নিপাতিক বিকার জনিত বলিয়া, প্রত্যেকে চতুৰ্ব্বিধ। তদ্ভিন্ন দুষ্ট ধাত্যাদি ভােজন প্রভৃতি বিভিন্ন, সাত প্রকার নিদান হইতে উৎপন্ন হওয়ায় ঐ রােগ সপ্তবিধ। এইরূপে সর্বসমেত একাদশ প্রকার অতীসার রােগের লক্ষণ ও তাহার চিকিৎসা কথিত হইয়াছে। মদন’ বৃক্ষ বা (ময়না গাছ) ভােজন করিয়া কিংবা সামর্থ অতিক্রম পূর্বক কার্য-নিয়ােগ দ্বারা মাতগণের ‘শোষ’ রােগ জন্মে। বিষাক্ত তরুলতা আহারে উহাদের ‘দুষ’ রােগ এবং সর্পদংশনে ‘স্কোটিক’ রােগ জন্মে। তদ্ভিন্ন দিগ্ধ বিদ্ধ, অপবাদ বদ্ধ, পূৰ্বাবদ্ধ, বিসর্প, হৃদয়স্ফালী, বলক্ষাণী, ছয় প্রকার মেহনক্ষণী এবং গলগ্রহ লােগ বারণগণের প্রভূত ক্লেশের কারণ হয়। এতথ্যতিরেকে হস্তান্মখিত রােগও ছয় প্রকার হইয়া থাকে। উল্লিখিত রােগের প্রথমটা দ্বারা আক্রান্ত হইলে মাতঙ্গগণ সপ্তরাত্রি মধ্যেই দেহত্যাগ করে, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থটী দ্বারা আক্রান্ত হইলে যথাক্রমে অষ্ট, নব ও দশরাত্রি মধ্যে প্রাণত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রকার দ্বারা অভিভূত হইলে যথাক্রমে একাদশাহ ও দ্বাদশাহ পর্যন্ত জীবনধারণ করিতে দেখা যায় । কিন্তু ঐ অবস্থায় উহাদিগের কষ্টের আর অবধি থাকে না; ইহাই ষড়বিধ হস্তোন্মখিত রােগের ফল । এতদ্ভিন্ন উৎকর্ণক, বায়ুবিকার, মন্যাস্তম্ভ, মদক্ষয় নিবন্ধন কৃশ, বলক্ষয়, শ্লেষ্ম, সাত্মানুললামিক, পরে বালক্ষাণী আছে।
৭০ গঙ্গায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। তলকাশী, গলগ্রহ, সিদ্ধার্থক, ভূতগ্রহ, বাতকুণ্ডলী, উন্মাদ, অপর, লুপ্ত চিকিৎসিত, উদাবৰ্ত্ত, পত্ৰকৃমি, প্রগুস্মিক, উরঃক্ষত, শােনিতী, বৃদ্ধ চিকিৎসা, অবসন্ন, বাল চিকিৎসা, ত্রিক্ষিপ্ত, যবগণ্ড শিরা, চৰ্ম্মকীল, জঠরক, বাল-বক্ষণ, অবসন্ন এবং মূত্রসঙ্গ রােগের বিষয় কথিত আছে। সঙ্গ রােগেও যথাক্রমে ভিন্ন বস্তি, গাঢ়-মূত্ৰী, পরিমুত্রী, পিষ্ট-মেহী, শােণিত-মেহী, এবং জাত শর্কর এই ছয় প্রকার কথিত হইয়াছে। অতঃপর সূতিকা-রােগ এবং সাত প্রকার দন্ত-রােগের বিষয় কথিত আছে। ঐ দন্তরােগ প্রথমতঃ দ্বিবিধ-দৈব ও আগন্তুক। বিধি-বিহিত জরাজনিত দশন রেগই দৈৰ। তদ্ভিন্ন আগন্তুক। বাত, পিত্ত, কফ ও সান্নিপাতিক বিকার-সস্তৃত। অনন্তর চেতভ্রংশ এবং দ্বিবিধ শূল রােগের বিষয় কথিত হইয়াছে। তৎপর চারি প্রকার শারদ’ রােগ এবং ‘জরগণ্ড রােগের বিষয় সবিশেষ বর্ণিত হইয়াছে। অতঃপর ‘শীতন্ন মক্ষিকা-দষ্ট প্রভৃতি রােগের বিস্তারিত বর্ণনা আছে । অনন্তর একাদশ প্রকার ছবী দোষ এবং তৎপরে মৃত্তিকা অধ্যায়। ইহার পরে কৃমি-কোষ্ঠ এবং অতি দুজ্ঞেয় দশবিধ ক্ষয় রােগের বিষয় কথিত হইয়াছে। অনন্তর চতুর্বিধ দৌর্বলের বিষয় কথিত হইয়াছে—ঐ চতুর্বিধ দুৰ্বলতা যথাক্রমে প্রকৃতিবশতঃ, রােগ দ্বারা, অত্যন্ত ঔষধ সেবনে এবং চতুর্থ বয়সেই উৎপন্ন হয় ; তদ্ভিন্ন উহাদের আর একপ্রকার দুর্বলতা ধাতুদোষ-ক্ষয়-নিবন্ধন জন্মিয়া থাকে। তদনন্তর সংগ্রহ বা মস্তাইও মদ মত্ত বারণগণের বাত পিত্ত রক্ত ও সন্নিপাতজনিত বিভিন্ন প্রকার সংগ্রহের বিষয় কথিত হইয়াছে। তৎপরে কৃমিরােগ। কর্ণাভ্যন্তরে উৎপন্ন কে শ- সমুহজাত কর্ণ-নােগ প্রভৃতি সমুদয় কথিত হইয়াছে। অতঃপর অতিবাত এবং বাত পিত্ত কফ রক্ত জনিত ও সান্নিপাতিক ও পঞ্চবিধ গুল্ম-রোগের চিকিৎসা বিহিত হইয়াছে। অনন্তর বাত পিত্ত কফ জনিত হৃদরােগের বিষয় বর্ণিত হইয়াছে। তৎপরে বাত পি কফ ও সন্নিপাত সমুদ্ভব চতুর্বিধ গাত্র রােগের বিষয় কথিত হইয়াছে। তৎপর আগন্তুক গাত্ররোগ ও ষড়বিধ নির্ণীত হইয়াছে। ইহাই ক্ষুদ্র রােগ স্থান’ অধ্যায়ের বর্ণনীয় বিষয়। উল্লিখিত স্থান বা প্রধান অধ্যায়টা সপ্ততি অধ্যায়ে বিভক্ত। তন্মধ্যে চতুঃষষ্ঠি অধ্যায়ে উল্লিখিত রােগসমূহের নির্ণায়ক লক্ষণ সমুদয় । এবং বিশেষ লক্ষণ দ্বারা তাহাদের সাধ্যত্ব, অসাধ্য, যাপ্যত্ব এবং উৎপত্তি অর্থাৎ নিদান কথিত হইয়াছে। তদ্ভিন্ন প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থানে মানস ও আগন্তুক রোগ সমুহ এবং তাহাদের সম্যক বিভাগ যথাযথ ভাবে কথিত হইয়াছে। অনন্তর শল্যস্থান’ নামক তৃতীয় সর্গ কথিত হইয়াছে। হে নরেশ্বর, আমি, ক্রমে ক্রমে এই অধ্যায়ের সংগ্রহ বা সংক্ষেপ বলিতেছি শ্রবণ করুণ -এই সর্গের প্রথমে দ্বিব্ৰণীয় অধ্যায়, তদনন্তয় সদ্যঃক্ষত, ষড়ত্যয়োপচার, ব্ৰণোপক্ৰম-লক্ষণ, দ্বাদশোপম, গর্ভামনাধ্যায়, গর্ভাবক্রান্তি, শরীর বিচয়, শস্ত্রাগিনিধি, যন্ত্রবিধি, শস্যোদ্ধরণ, বিধি, ব্ৰণনাড়ী, শিয়া-বহ বাধ, দন্তজ নড়িী, অধিদ, শিরাচ্ছেদ, মৰ্ম্ম, এর, অৰ্বদ, মৰ্ম্মবিদ্ধ, দোষগতি, দন্ত, নূতা, কীট, ব্যাল, প্রদেশ, শস্ত্র, ক্ষাঁর, ভগ্নচিকিৎসিত, মূঢ় গর্ভপনয়ন এবং দন্তোদ্ধরণ নামক ত্রয়স্ত্রিংশত অধ্যায় উল্লিখিত শাল্য স্থানে বর্ণিত হইয়াছে। শান্য স্থান’ ই এই গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়। এই অধ্যায়ে বর্ণিত বিষয় দ্বাদশ অধ্যায়। শ্রবণ করুণ;—ইহাতে ভগ, ধৃষ্ট, ক্ষত, বিদ্যুৎ ক্ষার ও তুষার দ্বারা দগ্ধ, অর্ক ও অগ্নি হইতে সন্তাপ এই ছয় প্রকার উপদ্রব। বাত পিষ্ট কফ ও সন্তাপ হইতে উৎপন্ন চতুৰ্বিধ বিধি, মূঢ়গর্ভ, শল্য, ব্যাল, এণ্ড অৰ্বদ, লুতা কীট, চুর্ণ-বিচূর্ণিত এই অষ্টাবিংশতি রােগ ও তাহার চিকিৎসা বর্ণিত হইয়াছে। হে নরেশ্বর, এই স্থান বা প্রধান অধ্যায় তৃতীয় স্থান রূপে গণিত হইয়াছে। অনন্তর চতুর্থ উত্তর স্থান’ কথিত হইতেছে ;-এই উত্তর স্থান বা চতুর্থ সর্গ পূৰ্বোল্লিখিত স্থানত্রয়ের উপসংহার স্বরূপ। এই অধ্যায়ে প্রথমতঃ স্নেহ-পান তৎপরে অন্ন-পানবিধি, স্নেহ বিকল্প, বস্তিসিদ্ধি, স্থানাধ্যায়, নস্যদান, অঞ্জনদান, যবসাধ্যায়, রসবীৰ্য্য বিপাক, শােভা, আয়ু জ্ঞান, বয়ােজ্ঞান, নক্ষত্রারিষ্ট, অরিষ্ট, গুগগুলুকল্প, পিণ্ড, গুগগুলু, লাক্ষা দান, লাক্ষা, সুরা প্রয়োগ, অশিত-পীত-গুণ, সেবীরক বিধি, লবণাধ্যায় প্রভৃতি সবিশেষরূপে বর্ণিত হইয়াছে। অতঃপর প্রতিপান, মদাবস্থা, ক্ষীরদানব্যাপতি, দুষ্ট-দোষপরীক্ষা, করীষাধ্যায়, ক্রোধাদি বিভিন্ন প্রকার মানসিক অবস্থাজ্ঞান, দন্ত কল্প, ইক্ষুদান, লজঘন, আরােগ্য লবণ, পাংশুদান, কার্য কার্যবিধি, ঋতুচৰ্য্যা, চুর্ণারিষ্ট অধ্যায়, গ্রাহ-অধ্যায়, জলহস্তী অধ্যায়, জলৌকা অধ্যায়, বিচিত্র বিধি সম্ভাগ, গন্ধ জ্ঞান, কটবস্তি অধ্যায় এবং বনাধ্যায়-এই শাস্ত্রে অতি বিশদরূপে বর্ণিত হইয়াছে। এই অধ্যায়ের অন্তে উপসর্গ বিধি কথিত হইয়াছে। এই উত্তর স্থানে উনপঞ্চাশ অধ্যায় এবং তাহাতে পঞ্চদশটী রােগের বিষয় লিখিত আছে। তদ্ভিন্ন অষ্টবিধ বস্তি ব্যাপ, কবল ব্যাপদ, একপ্রকার লণ্ডন ব্যাপদ, কটুরসযুক্ত খাদ্য ভােজনের দ্বিবিধ দোষ, জল হস্তী এবং গাত্ৰাতঙ্কবােগ ও তাহার চিকিৎসা অতি বিশদরূপে কথিত হইয়াছে। এই মিমি এই উত্তর স্থানকে ‘পরিবার এই অখ্যা প্রদান করা হইয়াছে। এই গ্রন্থে সৰ্বসমেত একশত এক সপ্ততি অধ্যায় বর্ণিত আছে এবং তাহাতে তিনশত পঞ্চদশটী রোগের নিদান লক্ষণ ও চিকিৎসা বিশদরূপে কথিত হইয়াছে। ইহাতে দ্বাদশ সহ শ্লোক লিখিত হইয়াছে। হে নরনাথ, ইহাই গজায়ুৰ্বেদ শাস্ত্রের সংগ্রহ বা সংক্ষেপে আপনাকে বলিলাম। হে নরেশ্বর, এই গজায়ুৰ্বেদ শাস্ত্রের যথাযথ বিস্তার বলিতে হইলে বলিতে হইবে যে চিকিৎসার মূল সফলতা কর্মেরই অধীন। এই গ্রন্থে প্রমাণ, প্রয়ােগ ও কাল বিধান সম্বন্ধেও বহুজ্ঞাতব্য বিষয় বর্ণিত হইয়াছে। তন্নিমিত্ত শাস্ত্ৰতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিগণ, এই সঙ্গে গজায়ুৰ্বেদ শাস্ত্র অধ্যয়নকেই চিকিৎসার মূল বলিয়া থাকেন। যাহারা ‘পরিগ্রহ’ অধ্যায় বর্জন করিয়া এই শাস্ত্র অধ্যয়ন করে, সেই অল্পজ্ঞব্যক্তিগণ রােগ নির্ণয় করিতে সমর্থ হয় না। তদ্ভিন্ন সাংগ্রাধিক অধ্যায়, ‘কবল অধ্যায়,-বাতানুলােমক অধ্যায়, ভুক্ত-পাক অধ্যায়, অধোভাগ সম্বন্ধীয় অধ্যায় অনুবাস, নিরূহ, উত্তর বাস্তিক গৈহিক বিরেচন, শীর্ষ-বিরেচণ প্রমাণ ও উপচার অধ্যায় যাহারা না জানে, তাহারা যুদ্ধভীরু সৈনিকের ন্যায় কি চিকিৎসা করিবে ? হে নরেশ্বর, এই গ্রন্থ সকল শ্রেণীর লােকই পাঠ করিতে পারেন, কিন্তু এই সকল রােগ বা জনিত, ঐ সকল রোগ রক্তদোষজনিত, এই সকল রােগ সান্নিপাতিক এবং ঐ সকল রােগ সংক্রামক, ইহা সম্যকরূপে অবগত না হইয়া যাহারা চিকিৎসা করেন তাহারা কখনও সফলতা লাভ ৭২ গজায়ুৰ্বেদংহিতা করিতে পারেন না। বিজ্ঞ প্রভু, কখনও উত্তর স্থানে অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের হস্তে স্বীয় মাতঙ্গগণের চিকিৎসার ভার প্রদান করিবেন না, পক্ষান্তরে যে চিকিৎসক আদ্যোপান্ত গজায়ুর্বেদ শাস্ত্র-অধ্যয়ন করিয়াছেন এবং কর্মক্ষেত্রে ও আত্মশক্তির পরিচয় প্রদান করিয়াছেন, তাদৃশ চিকিৎসককেই চিকিৎসায় নিযুক্ত করিবেন। যে চিকিৎসক রােগের তথ্য সম্যকরূপে নির্ণয় করিতে চেষ্টা না করিয়া চিকিৎসা করিতে থাকেন, তাহার ভ্রান্ত চিকিৎসায় মাতঙ্গগণের রােগ বৰ্দ্ধিতই হইয়া থাকে। যে চিকিৎসক চিকিৎসাকার্যে অভিজ্ঞতা লাভ করিতে পারেন নাই কেবল শামাত্র অধ্যয়ন করিয়াছেন অথবা যে বৈদ্য, শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ কেবল চিকিৎসা কাৰ্য্যেই কিঞ্চিৎ নিপুণ, এই উভয় প্রকার চিকিৎসকই অর্ধবেদধর অর্থাৎ অৰ্দ্ধাভিজ্ঞ, ইহারা উভয়েই নিন্দনীয়। এই দুয়ের মিলিত বােগ বিহিত ঔষধ অমৃতের ন্যায় কাৰ্য্য করিয়া থাকে, পক্ষান্তরে অরেগ বিহিত ঔষধ তীব্র বিষের ক্রিয়া করে। যে চিকিৎসক পরিবার অধ্যায় বা উত্তর স্থানে কুশল, চিকিৎসা- কাৰ্য্যে নিপুণ, সকল কার্ষ্যে অভিজ্ঞ এবং উচ্চবংশজাত, তিনিই সর্বোত্তম চিকিৎসক। তদ্ভিন্ন যে শাস্ত্র-জ্ঞান ও নিপুণতা এই উভয়ের যােগে ঔষধে কুশল, শাস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ স্মৃতি শক্তি সম্পন্ন এবং বহু চিকিৎস প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, তাদৃশ চিকিৎসককে ও উত্তম চিকিসক বলে। এই প্রকারে উল্লিখিত গুণ সম্পন্ন যে চিকিৎসক অম্বয়া-বিহীন হইয়া অপরাপর চিকিৎসাশাস্ত্র হইতে তথ্য সমুদয় সংগ্রহ করিতে সমর্থ হয়েন এবং প্রকৃত শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিয়া স্বীয় সংশয় অপনােদন করিতে লজ্জা বােধ করেন না। তদ্ভিন্ন কোন ক্ষেত্রে কতটুকু উহ করিতে হইবে এবং কোন স্থলে বা কতটুকু পরিত্যাগ করিতে হইবে তাহা সম্পূর্ণরূপে অবগত আছেন, তিনি, দেবগণের মধ্যে দেবরাজ ইন্দ্রের তুল্য, সৰ্বশ্রেষ্ঠ ও পূজনীয় হইয়া থাকেন। এ বিষয়ে দুইটা শ্লোক কথিত আছে, যে চিকিৎসক শাস্ত্রানুমােদিত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া স্বীয় বিবেকানুসারে চিকিৎসা করেন, তিনি সফলতা লাভ করিয়া থাকেন, তাহার চিকিৎসায় কখনও বিপরীত কাৰ্য্য হইতে দেখা যায় না তজ্জন্য যে বৈদ্য গুরুকুলবাস জনিত ক্লেশ স্বীকার পূর্বক গজুয়েৰ্বেদ শাস্ত্র আদ্যন্ত পাঠ করিয়া তাহাতে বিচক্ষণতা লাভ করিয়াছেন, তিনিই বারণগুণের চিকিৎসা করিবার যােগ্য এবং সেই প্রতিভা সম্পন্ন চিকিৎসক নরপতির নিকটে সর্বদা উত্তম সম্মান প্রাপ্ত হইবার যােগ্য। ইতি পালকাপ্য ঋষি বিরচিত হস্তায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাযোগ স্থানে শাস্ত্র-সংগ্ৰহ নামক দ্বাদশ অধ্যায়।
এয়ােদশ অধ্যায় । একদা অঙ্গেশ্বর, চম্পানগরে সমাগত মহর্ষি পালকপ্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন,হে দ্বিজ-শ্রেষ্ঠ, মাতঙ্গগণ সর্বপ্রকার সৈন্যগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং নরপতিগণের বিজয়প্রদ এই নিমিত্ত সেনার উৎকর্ষাভিজ্ঞ জয়লাভেচ্ছু নরপতিগণের পক্ষে তাদৃশ অমিত বা সম্পন্ন বারণগণের প্রতিপালন একান্ত বিধেয়। যে প্রকারে উহাদিগকে প্রতিপালন করিতে পা । যায় তাহা আমাকে সবিশেষরূপে উপদেশ করুন। মহানুভব অঙ্গপতির ঈদৃশ প্রশ্নের উত্তরে মহর্ষি বলিতে লাগিলেন, হে নরেশ্বর, দেবজাতি হইতে উৎপন্ন হইয়াছে বলিয়া বারণগণ ও প্রতক্ষ দেবতা স্বরূপ, এই নিমিত্ত উহারা স্বীয় প্রভুর ভূমি সম্পদ বৃদ্ধির কারণ হইয়া থাকে। মাতঙ্গগণ নরপতি কর্তৃক আরূঢ় হইলে শােভ পাইনা থাকে। পক্ষান্তরে নরপতির শােভাও মাতঙ্গাল্লোহনেই বর্ধিত হয়, শোভা-সম্পদে উভয়েই তুল্য বলিয়া বারণগণ নরপতিদিগের আত্ম-সদৃশ। হে নরনাথ, মাতঙ্গগণ ক্ষুতি কিংবা তৃষ্ণার্ত হইয়াও আপৎকালে স্বীয় প্রভু নরপতিকে পরিত্যাগ করে না বলিয়া উহারা নরপতিগণের বান্ধব স্বরূপ। উহারা শিক্ষাগ্রহণ বিষয়ে শিষ্য স্বরূপ, ইচ্ছানুবর্তনে ভৃত্যস্বরূপ, বিক্রীত কিংবা প্রদত হইলে ভৃত্যবৎ নীরবে গমন করিয়া থাকে। বারণগণ বিনয় বিষয়ে ঋষিগণের তুল্য, ক্রুদ্ধ হইলে রাক্ষস সদৃশ এবং অসি অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট শস্ত্র স্বরূপ। উহারা প্রয়ােজন উপস্থিত হইলে, স্বীয় প্রভুকে রক্ষা করে, প্রভূর নিমিত্ত যুদ্ধ করে, এবং তাহাকে বহন করিয়া রণক্ষেত্রের সম্মুখভাগে উপস্থিত হয়, অতি ক্লেশে প্রাণত্যাগ করে অর্থাৎ, শত্রুগণ উহাদিগকে অক্লেশে নিধন করিতে পারেন না, এই নিমিত্ত কুঞ্জরগণ সেনার শ্রেষ্ঠ অঙ্গ। প্রাচীর দ্বার কিংবা অট্টালিকা দ্বার উদঘাটনে, ভঞ্জনে কিংবা মর্দনে হস্তিগণ বজ সদৃশ ; শ্রেণীবদ্ধ মাতঙ্গগণ দুর্জয় প্রাচীরের ন্যায় স্বসৈন্যদিগকে রক্ষা করিয়া শত্রুসেনা বিতাড়িত করিয়া থাকে। সুসজ্জিত মাতঙ্গগণ, অতর্কিত অবস্থায় উপনীত শত্রু-সৈন্যদিগকে, সাগরে সেতুবন্ধের ন্যায় প্রতিহত করিতে সমর্থ হয়। অকস্মাৎ কোনও কৰ্ত্তব্য উপস্থিত হইলে মহীপতি মাতঙ্গে আরােহণ করিয়া এক অঙ্গ বিজয় করিতে পারেন। কল্পিত এবং শিক্ষিত হইলে অমিতবলশালী একটী মাতঙ্গ যট, সহস্র বেগবান্ অশ্বকেও প জিয় করিতে পারে। যেমন সজল জলদ-জাল, মন্দর পর্বতে প্রতিহত হইয়া প্রত্যাবর্তন করে তেমনই অশ্বগণ কুঞ্জর-ঘটায় প্রতিহত হইয়া প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হয়। যে যুদ্ধক্ষেত্রে স্বীয় বাহন মাতঙ্গকে পরিত্যাগ করে, সেই যােদ্ধা, ব্রহ্মহত্যা কিংবা মাতৃহত্যা- কারীর যে গতি, স্বীয় দুহিতা অথবা গুরুপত্নীগামীর যে গতি, যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়নপর ক্ষত্রিয়ের যে পরিণতি, সেই গতি প্রাপ্ত হইয়া থাকে। অশ্ব কিংবা মানব একটা মাত্র শক্তির আঘাতেই প্রাণত্যাগ করে, কিন্তু মাতঙ্গগণ যুদ্ধক্ষেত্রে শত শত শক্তির আঘাত অবহেলায় সহ্য করিয়া থাকে । এই বিশ্বে মাতঙ্গ ব্যতীত এমন কে আছে যে, শত শত শরে বদনমণ্ডল বিদ্ধ হইলেও প্রাচীর । পদদলিত করিয়া রথ, অশ্ব ও মাতৃঙ্গগণকে হত্যা করিতে সমর্থ হয় ? মাতঙ্গ ভিন্ন কে এমন গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা আছে যে নিশীথের গাঢ় অন্ধকার অবহেলা করিয়া যখন চতুর্দিকে অগ্নিপ্রজ্জ্বলিত হইতে থাকে, তখন শত্রু-সৈন্যদলনে সমর্থ হয়? যেমন মুক্তি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ গতি নাই, বেদ অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর শ্রুতি নাই, কৃষ্ণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ প্রাণী নাই, তেমনই মাতঙ্গ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বাহন নাই। যেমন পৃথিবীর ভূষণ, শশাঙ্ক যেমন শরীর ভূষণ, বিদ্যা যেমন মানবের ভূষণ, মাতঙ্গ তেমনই সেনার অনন্য সামান্য ভূষণ স্বরূপ। যে সুখে, সন্তোষ বা তৃপ্তি আছে তাহাই প্রকৃত সুখ, যে রাজ্যে রাজা আছেন, তাহা যথার্থ রাজ্য, যে বন্ধুর প্রতি অকপট বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারা যায়, তিনিই প্রকৃত মিত্র, যে নােয় কুঞ্জর নাই তাহা যথার্থ সেনাই নহে। সাধু স্বভাবই রূপের শােভা, সৎচরিত্র বংশের শােভা, কুমাবলী উদ্যানের শােভা, তেমনই মাতঙ্গগণ সেনার শােভা। যেমন ঐখ- যের শেভ জ্ঞাতি, কূলের শােভ ধন, রমণীগণের শােভা অলঙ্কার, তেমনই সেনার ভূষণ মাতঙ্গগণ। এ বিষয়ে শ্লোক কথিত আছে, যে ব্যয়ে গুণবান্ ব্যক্তি লাভবান হয় না, তাদৃশ ব্যয়কে ‘বায়’ বলা উচিত নহে, যে বিজ্ঞ তপশ্চৰ্য্যায় পরায়ুখ, সে বিজ্ঞ বিজ্ঞই নহেন, যে পুরুষের পত্নী হিতকায়িণী নহে, সে পুরুষ পুরুষ’ নামের অযােগ্য, যাহার হিতকর মাতঙ্গ নাই তেমন নরপতির নরপতি নাম বিড়ম্বনা মাত্র। যেমন সিংহবিহীন অরণ্য, অরাজক রাজ্য, নিরস্ত্র বীরত্ব, সৌন্দর্যবিহীন, তেমনি গজ-যুথবিহীন সেনা বিড়ম্বনা মাত্র। যে স্থানে সত্য সেইস্থানেই ধর্ম, যেস্থানে ধর্ম সেইস্থানেই ধন, যে স্থানে রূপ, সেইস্থানেই সৎস্বভাব, যেখানে মাতঙ্গযুথ সেইখানেই জয়। যে সকল সৈনিক, মাতঙ্গ-স্কন্ধে অবস্থান করিয়া যুদ্ধ করিতে করিতে শর, তােমার কিংবা চক্ৰদ্বারা নিহত হয়, তাহারা ক্ষণকাল মধ্যে স্বর্গলােকে গমন করে ; তন্নিমিত্ত মাতঙ্গগণ স্বর্গ-সদৃশ। হে নরনাথ, মাতঙ্গগণ যেমন রণক্ষেত্রে নরপতির অসামান্য সহায়, বিলাসক্ষেত্রেও তেমনি অসাধারণ নর্ম সহচর। উহারা প্রাসাদে, অসনে, শয্যায় কিংবা শিবিকায় উপবিষ্টা প্রমদাগণকে উদ্যানে কিংবা বনে বহন করিয়া লইয়া যায়। নরপতিগণের জলক্রীড়াকালে সুশিক্ষিত মাতঙ্গগণ, গুণ্ডাগ্রভাগ দ্বারা প্রস্ফুটিত পদ্ম ধারণ করিয়া তাহাদিগকে স্নান করাইয়া থাকে। ফলতঃ বারণগণই স্বীয় প্রভু নরপতির রাজশ্রীকে মৃয়ীর ন্যায় অচলা করিতে সমর্থ হয়। নরপতিগণের হস্তীর তুল্য উত্তম বন্ধু আর নাই ; হস্তি-সদৃশ সখা নাই হস্তীর ন্যায় যােদ্ধা নাই এবং হস্তীর তুল্য শত্রুও নাই; জগতে কোন প্রাণীরই হস্তীর ন্যায় বিশাল দেহ নাই; কোন প্রাণীরই মাতঙ্গের ন্যায় অপরিমিত সামর্থ্য নাই, উহাদের শক্তি অপরিমিত দৃষ্ট হইয়া থাকে। অশ্ব, রথ ও পদাতি এই ত্রিবিধ সৈন্যের যে যে সদ্গুণ থাকে, একটা নিকৃষ্ট হস্তীরও সেই সমুদয় গুণাবলী দৃষ্ট হইয়া থাকে। শশাঙ্ক-বিহীন নিশা কিংবা শস্যহীনা ভুমি যেমন শােভা পায় না, তেমনি মাতঙ্গয়ূথ বিহীন বিপুলবাহিনী ও সৌন্দৰ্যবিহীন হইয়া থাকে। বারণগণের উল্লিখিত গুণাবলী ও তদ্ভিন্ন আরও বিবিধ গুণ সমুদয় কথিত হইয়াছে, তন্নিমিত্ত উহাদিগকে স্বীয় সন্তানগণের ন্যায় সৰ্বপ্ৰযতে পালন করা নরপতিগণের একান্ত বিধেয়। তদ্ভিন্ন উহাদিগের দেহে অপরিমিত বল কাছে এইজও উহাদিগকে পালন করা উচিত। (গ) অত্যাগ সহননা বন্ধু দেবাগতঃ সুহৃদ।
এয়ােদশ অধ্যায়। অতঃপর যে সকল সদ্গুণ সম্পন্নলােক হস্তীশালার বিবিধ কার্যে নিযুক্ত হইবার যােগ তাহা কখিত হইতেছে ;-যাহারা ধাৰ্মিক, শুচি, গজপালনে অভিজ্ঞ, মাৎসৰ্যবিহীন, সত্ত্বগুণসম্পন্ন, উচ্চবংশজাত, সকল প্রকার পান দোষ বর্জিত, প্রভূর হিতকারী, কালজ্ঞ, প্রিয়ভাষী, উৎসাহ এবং বলশালী, কৃতজ্ঞ, লােভজ্জিত, বিশ্বস্ত, মাতঙ্গগণের আহারের গুণ দোষ জ্ঞানে দক্ষ, জাতিগণের হিতকজ্জিী, স্বীয় প্রভু নরপতির আজ্ঞাকারী, প্রিয়ান্বেষণ তৎপর, প্রশস্ত বাকপটু তাহারা গজরক্ষাধিকারী পদে নিযুক্ত হইবার যােগ্য। তাহাদের নাম মঙ্গল বাচক হওয়া উচিত। যাহারা মাতঙ্গগণের সকল প্রকার কাৰ্য্যে অভিজ্ঞ এবং গজাধ্যক্ষেরও বিশেষরূপে গজ চিকিৎসকের বশীভূত তাহারাই “গজাধিকারীর” পদে নিযুক্ত হইবার যােগ্য। উল্লিখিত গুণসম্পন্ন গজাধিকারিগণ সর্বদা চিকিৎসকদিগের সহিত মিলিত হইয়া মাতঙ্গগণের ভােজন, অবস্থান, শয়ন, মদক্ষরণ ও গমন প্রভৃতি অবস্থায় উহাদিগকে পৰ্যবেক্ষণ করিবেন। গজাধ্যক্ষ ও যে মাতঙ্গীর সম্বন্ধে যখন যেরূপ কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা করেন হে নরনাথ, তাহা স্বীয় প্রভুকে জ্ঞাপন করিয়া চিকিৎসকের উপদেশ ক্রমে সম্পাদন করিবেন। যে ব্যক্তি গজায়ুৰ্ব্বেদে সুশিক্ষিত, মেধাবী, চিকিৎসা শাস্ত্রের যথার্থ তাৎপৰ্য্য গ্রহণে সমর্থ, নরেন্দ্র সদৃশ মধুরালাপী, বাগ্মী, প্রগন্ত, ক্ষমাশীল, ধৈৰ্যশালী, ধাৰ্মিক, শুচি, কুলক্রমাগত ভৃত্য অর্থাৎ বিশ্বস্ত, অনুরক্ত, মধুর-স্বভাব, উচ্চবংশজাত, তিনিই মাতঙ্গগণের উত্তম চিকিৎসক নিযুক্ত হইবার যােগ্য। যে ব্যক্তি, শব্দার্থ-জ্ঞানে এবং নীতিজ্ঞানে কুশল, শুচি, বংশ পরম্পরায় উক্ত কাৰ্যকারী, নীরােগ, গণিত ও ব্যবহার ( আইন) শাস্ত্রে অভিজ্ঞ, তিনিই গজামাত্য পদে নিযুক্ত হইবার যােগ্য। যে ব্যক্তি, তীক্ষ-খী-সম্পন্ন, সকল প্রাণীর আশ্রয় দাত, একান্ত জিতেন্দ্রিয়, সুশিক্ষিত, সত্য প্রতিজ্ঞ, বয়ঃস্থ এবং জ্ঞানবান্ তিনিই, গজাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইবার যােগ্য। যে ব্যক্তি, সৰ্ব্বদা মাতঙ্গগণের হিতে রত, প্রভুভক্ত, শুচি, নিপুণ এবং ধাৰ্মিক, তিনিই ‘গজাজীবী” পদে নিযুক্ত হইবার যােগ্য। যে ব্যক্তি, মাতঙ্গগণের তত্ত্বজ্ঞ এবং তাহাদের প্রিয়, সাহসী ও ধৈৰ্যশালী, সংযমসম্পন্ন, সুগঠিত দেহ, নীলােগ, মাতঙ্গগণের পরিচালনে সমর্গ, অঙ্কশ ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ, শুভাশুভ ফলশংসী অনুকূল ও প্রতিকূল দৈব নিদেশ-জ্ঞানে সমর্থ, চিকিৎসাকার্যে কিঞ্চিৎ দক্ষ, মাতঙ্গগণের প্রিয়, উহাদিগের প্রতিপালনে কুশল, উৎসাহ সম্পন্ন, প্রভুর হিতৈষী, তিনিই মহামাত্র বা মাহতের পদে নিযুক্ত হইবার যােগ্য এবং সুশীল ও পরম যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণই আবােঢ়া পদে বৃত হইবার যােগ্য। ঈদৃশ আনােঢ়ার অপর নাম স্থানভেদে “অত্যাভিষেক্ষী” হইয়া থাকে। উল্লিখিত গুণবিশিষ্ট গজাষ্ট কুলিক অর্থাৎ মাতঙ্গ বিভাগের আট শ্রেণীর কর্মচারিগণ, যশােলি ও পরস্পর পরস্পরের হিতাকাঙ্ক্ষী হইয়া পৰ্যবেক্ষণ করিতে থাকিলে, সহজেই মাতঙ্গগণ নীরােগ ও বলশালী হইয়া বর্ধিত হইতে থাকে এবং উহারা প্রহৃষ্টচিত্তে সুখে জীবন যাপন করে। এইরূপ সুখ স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করিতে পাইলেই যথাকালে উহাদের দেহ হইতে মদ ক্ষরণ হইতে থাকে এবং উহারা শুভ লক্ষণযুক্ত হইয়া ৬ গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা স্বীয় প্রভু নরপতির অভীষ্ট সাধনে সমর্থ হয়। পক্ষান্তরে যে নরপতির মত বিভাগীয় উল্লিখিত অষ্টবিধ কর্মচাী, সর্বদা কোপন স্বভাব, ব্যসনাসক্ত, লুন্ধ, নিবুদ্ধি, গজপালনে অনভিজ্ঞ, পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন, অনবহিত চিত্ত, খণপ্রকৃতি, অসম্বদ্ধ প্রলাপী, সৰ্ব্বদা মদ্য পান করিয়া স্বীয় আবাসস্থানে কিংবা শয্যায় অবস্থান করিতে ভালবাসে, তঁাহার মাতঙ্গগণ সম্যকরূপে প্রতি পালিত না হয়ায় ক্ষুপা, বধ ও বন্ধন পীড়িত হইয়া অবিলম্বে সবংশে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। এই বিষয়ে শ্লোক কথিত আছে, বিশ্বস্রষ্টা জগতের হিতের নিমিত্ত মহাপ্রতাপশালী বারণ- গণকে সৃষ্টি করিয়াছেন। যে নরপতি এতাদৃশ মাতঙ্গগণের হিতসাধনে তৎপর, যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়- শ্ৰ ভঁহার হস্তের অগ্রভাগে বিদ্যমান থাকে। অসুরগণ প্রভূত বলশালী এবং অসংখ্য রণ, অশ্ব ও পদাতি পরিশােভিত সেনা-বলবিশিষ্ট, তথাপি দেবগণ, মাতঙ্গদিগের দ্বারা তাহাদিগকে পরাজিত করিয়া জয়লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। সিংহ যেমন অরণ্যস্থ ক্ষুদ্র প্রাণীদিগকে হত্যা করে, তেমনি যে নরপতির সেনা মাতঙ্গ বহুল, তিনি অসংখ্য অশ্ব পদাতি-সঙ্কুল প্রতিপক্ষ রাজসেনাকে বলপূৰ্ব্বক পরাজয় করিয়া থাকেন। ভূমণ্ডলের সকল অশ্ব মিলিত হইয়াও যুদ্ধক্ষেত্রে একটা মাত্র সুশিক্ষিত মাতঙ্গের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হয় এবং রথ সমূহ বতাহত মেঘমালার ন্যায় ক্ষণকাল মধ্যে বিলয় প্রাপ্ত হয়। সবল দৃঢ় ইন্দ্রিয় একটা মাত্র হস্তী রণক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে বিচরণ করিতে পাইলে, হে নরনাথ, ক্ষণকাল মধ্যে অসংখ্য পদাতিগণকে নিঃসংশয়ে বিনাশ করিতে সমর্থ হয়। এই নিমিত্ত উত্তম উলুম মাতঙ্গশ্রেণী রক্ষা করা নরপতিগণের একান্ত বিধেয়, উহারাই রাজশক্তির জীবন-স্বরূপ। এই বিশ্বে অমিত বলশালী, প্রভাবসম্পন্ন বারণগণ ভিন্ন দিগবিজয়ী নরপতির অপর এতাদৃশ সহায় আর নাই ইতি পালকাপ্য ঋষি বিরচিত হত্যায়ুৰ্বেদ মহাপ্রবচনে মহাবােগ স্থানে গজরক্ষণ বিন্যাস নামক ত্রয়ােদশ অধ্যায়।
চতুর্দশ অধ্যায় হে নরনাথ, অতঃপর যে সকল গুণ থাকিলে গজায়ুৰ্বেদ শাস্ত্র অধ্যয়নে শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে পরা যায় তাহা এবং শিষ্যোপনয়ন বিধি কথিত হইতেছে—যে ব্যক্তি, কাম ক্রোধবিহীন শার্থ ও তদনুরূপ কার্যের তত্ত্বজ্ঞ, উচ্চবংশজাত, সুশীল, সদ্গুণসম্পন্ন, ধােবী, স্মৃতি শক্তিশালী, সকল কার্যে নিপুণ, সাহসী, উদারহৃদয়, মধুরভাষী, উদ্ভাবনী-শক্তি সম্পন্ন, কৰ্ম্মজ্ঞ, সামশালী, শুশ্রুষা পরায়ণ, শঠতাবিহীন, পবিত্র হৃদয়, তিনিই একমাত্র গজায়ুৰ্বেদ শাস্ত্রধ্যয়নে শিষ্যত্ব গ্রহণ করিবার যােগ্য। ঈদৃশ গুণসম্পন্ন শিষ্যকে স্ব-সমীপে উপস্থিত হইতে দেখিয়া প্রথমতঃ সশিষ্য উপবাসী, সংযত ইন্দ্রিয় গুরু, শুভতিথি নক্ষত্রযুক্ত লগ্নে, শুক্ল বসন পরিধান পূৰ্ব্বক পূৰ্বোত্তর দিকে গমন করিয়া জলাশয়ের অনতিদুরে পবিত্র স্থানে চতুর্বিংশতি অরঙ্গি পরিমিত একটী মণ্ডল অঙ্কিত করিবেন। তৎপর তিনি উক্ত মণ্ডলটী, পূর্ণকুম্ভ, কুশ ও পুষ্প দ্বারা সুশােভিত করিবেন। অনন্তর ঐ মণ্ডল মধ্যে সমিধ দ্বারা অগ্নি প্রজালিত করিয়া নানাবিধ শস্যদ্বারা ইন্দ্রাদি দিপালগণের, ঐরাবতাদি দিগগজদিগের, ব্রহ্মা, শঙ্কর, বিষ্ণু, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহগণ, ঋষিগণ, স্কুল, অস্পয়ােগণ, উরগগণ এবং গুহকগণের প্রতিমূৰ্ত্তি অঙ্কিত করিবেন। অতঃপর যথাবিধি ধূপ মাল্য অনুলেপন সকলপ্রকার অন্ন এবং উপহার স্বরূপ বিবিধ প্রাণী দ্বারা তাহাদিগের অর্চনা করিয়া তৎপরে গুরু, সংযতচিত্তে অধােলিখিত মন্ত্রে হােম করিবেন। হােম মন্ত্র যথা :- ও ভবায় স্বাহা, ভূভুবঃ স্বাহা, অগ্নয়ে স্বাহা, সােমায় স্বাহ, রুদ্রায় স্বাহ, সেনাদ্যৈ স্বাহা, বলায় স্বাহা, বলাঙ্গায় স্বাহা, বলাধিপয়ে স্বাহা, শক্তিধরায় স্বাহা শিতিকণ্ঠ প্রিয়ায় স্বাহা, কুকুট ঘণ্টাপ্রিয়ায় স্বাহা ময়ুরধ্বজায় স্বাহাঁ, ব্ৰহ্মণে স্বাহা, নারায়ণায় স্বাহা, ৰুদ্ৰায় স্বাহা, বিশ্বায় স্বাহা, যায় স্বাহা, বরুণায় স্বাহা, ধনদায় স্বাহা, সূৰ্যেভ্য স্বাহা, বসু'ভ্যঃ স্বাহা, শৈলেভ্যঃ স্বাহা, নন্দিভ্যঃ স্বাহা, মহাকালায় স্বাহা, দেবেভ্যঃ স্বাহা, নদীভ্যঃ স্বাহা, অনিলায় স্বাহা, ধৰ্ম্মায় স্বাহা সমুদ্ৰায় স্বাহা দিভ্যঃ স্বাহা, বিদিগভ্যঃ স্বাহা এবং বিশ্বায় স্বাহা। উল্লিখিত মন্ত্রে অনলে আহুতি প্রদান করিয়া গুরু শিষ্যকে হুতাবশিষ্ট অজ্য দ্বারা প্রেক্ষণ করিবেন। অনন্তর শিষ্য দেবগণকে প্রণাম করিলে গুরু তাহাকে শ্রবণ করাইবেন;-বৎস, তুমি, কখনও শঠতা করিবে না, কখনও নৃশংস হইবে না, কখনও প্রলুব্ধ হইবে না, কদাপি অসূয়াপরবশ হইবে না। কিংবা নিষ্ঠুর হইবে না। তুমি, সৰ্ব্বদা সরল, অনলস নিষ্পাপ, আৰ্য্যশীল ও কুটুম্বগণের প্রতি সদয় থাকিবে। তুমি, সৰ্ব্বদা আচার্যের সেবা করিবে। ঈদৃশ গুণসম্পন্ন শিষ্যের প্রতি গুরু, যদি বস্ত্র, অধ্যাপনা কিংবা ভােজন বিষয়ে কোনও প্রকার শঠতা করেন তাহা হইলে তিনি শিষ্যের আজন্ম সঞ্চিত পাপভাগী হইবেন। পক্ষান্তরে শিষ্য ও যদি যথারীতি অন্নবস্তু ও জ্ঞানদান পরায়ণ, আৰ্য-চরিত্র গুরুর সম্বন্ধে বিরুদ্ধ ব্যবহার করেন তাহা হইলে নিয়রগামী হইবেন। এই প্রকারে সকল বিদ্যা সম্যকরূপে আয়ত্ত হইলে, যথাসময়ে গুরুর অনুমতিক্রমে তােমায় গমন করিতে হইবে। অতঃপর কৃতবিদ্য হইয়া তুমি রাজসমীপে উপস্থিত হইলে গজায়ুৰ্বেদ-সংহিতা। তিনি তােনাকে যথাযােগ্য সম্মান সহকারে মাতঙ্গশালায় নিযুক্ত করিবেন। তখন তুমি, বায়ণগণের প্রতি স্বীয় সন্তানের ন্যায় স্নেহ প্রদর্শন করিবে। মাতঙ্গগণ বাগিলিয় বিহীন, সুতরাং প্রয়োজনীয় দ্রব্য প্রার্থনা করিতে অসমর্থ, এই নিমিত্ত তাহাদিগের প্রতি সবিশেষ স্নেহপ্রদর্শন করা তােমার একান্ত কর্তব্য হইবে। বৎস, স্মরণ রাখিবে যেসকল মাতা উত্তম বা কার্যোপযােগী নহে, তাহারাও যেন তােমার মেহে বঞ্চিত না হয়। যে চিকিৎসক, সদাচারৎপর, সতর্ক নরপতির মাতঙ্গগণের চিকিৎসাকার্যে নিযুক্ত হইয়া তাহাতে উপেক্ষা করে, সে মুখ, অবশ্যই পাপভাগী হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে যে নরপতি, যথাবিধি কর্তব্যপরায়ণ সদ্গুণসম্পন্ন চিকিৎসককে দান মানাদি দ্বারা প্রোৎসাহিত না করেন, তিনিও পাপভাগী হইয়া থাকেন। হে বৎস, তুমি কখনও বারণগণের আহার দ্রব্যের অংশ গ্রহণ করিবে না; যে ব্যক্তি উহাদিগের খাদ্যের অংশ অপহরণ করে, উহারা বিদ্বিষ্ট-হৃদয়ে নিরন্তর তাহার অকল্যাণ চিন্তা করিয়া থাকে, এই নিমিত্ত পৰ্যাপ্ত আহার অভাবে মাতঙ্গ যেমন ক্ষীণ হইতে থাকে সেও তেমনি ক্ষীণ হইয়া থাকে এবং উহাদিগের অভিশম্পাতে তাহার গৃহে সঞ্চিত অর্থ বিলয় প্রাপ্ত হয়। তন্নিমিত্ত তুমি সর্বদা বারণগণের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন করিবে। যে ব্যক্তি, বারণগণের হিতৈষী, মাতগণ, ক্ষুধার্ত, কাতর, ভীত অথবা প্রমত্ত হইলে কিংবা রণক্ষেত্রে, পিতামহ ব্রহ্মার সৃষ্ট বারণগণকে রক্ষা করা তাহার একান্ত বিধেয়। গান্ধৰ্ব্ববিদ্যা কিংবা সঙ্গীতবিদ্যা যেমন সামবেদের উপবেদ বলিয়া কথিত হইয়াছে, ধর্ম, অর্থ, ও যশের আশ্রয় স্বরূপ মঙ্গলময়ী পবিত্র স্মৃতি (শাস্ত্র) যেমন্ ঋকবেদের উপবেদ স্বরূপে পঠিত হয়, নাট্য শাস্ত্র যেমন যজুৰ্ব্বেদের উপবেদ ; এই গজায়ুৰ্বেদও তেমনি অথৰ্ব্ববেদের উপবেদ স্বরূপ। ব্রাহ্মণ এই গজায়ুৰ্বেদ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বর্ণকেই অধ্যাপনা করিতে পারেন, ক্ষত্রিয়, ক্ষত্রিয় বৈশ্য দুই বর্ণকে এবং বৈশ্য একমাত্র বৈশ্যকেই অধ্যাপনা করিতে পারেন। হে বৎস, শূদ্র গুণবান্ হইলেও তাহাকে এই বিদ্যা দান করা যায় না, যেহেতু এই অনুপমা বিদ্যা বৈদ-বেদাঙ্গ শাস্ত্রসমুহের তুল্য। যে ব্যক্তি, যথাবিধি শিষ্যত্ব স্বীকার না করে কিংবা ন্যায়পরায়ণ না হয়, তাহাকে এই বিদ্যা কখনও প্রদান করিবে না। যাহারা এই শাস্ত্রে শ্রদ্ধাসম্পন্ন নহে, যাহারা নাস্তিক, অয়াপরবশ অথবা বিদ্যাবমানী তাহাদিগকে এই বিদ্যা প্রদান করিবে না। পক্ষান্তরে যাহারা অপরাপর শাস্ত্র অধ্যাপনা করিয়া থাকেন, কিংবা বিজ্ঞান শাস্ত্রে কুশল তাহাদিগকে যথাবিধি শিষ্যত্ব স্বীকার না করিলে ও এই বিদ্যা প্রদান করিতে পারা যায়। ভিন্ন ভিষ স্বীয়পুত্রকে কিংবা যে বিদ্যার্থী, অশ্ব, গাে রজত অথবা সুবর্ণ দক্ষিণ-প্রদান পূর্বক যথারীতি শিষ্যত্ব গ্রহণ করিবে তাহাকেই এই বিদ্যা প্রদান করিবেন অপরকে নহে।” শিষ্যকে এই প্রকার উপদেশ প্রদান করিয়া আচাৰ্য্য, স্বয়ং পুষ্প, অনুলেপন, ধূপ, পানীয় ও ভােজ্য দ্রব্য দ্বারা সমাগত ব্রাহ্মণমণ্ডলীর তৃপ্তি সাধন করিবেন। এইরূপে ব্রাহ্মণ ভোজনাদি সমাপ্ত হইলে, শিষ্য অগ্রে পূজিত দেবগণের প্রসাদ গ্রহণ করিবেন। ইতি শ্রীপালকাপ্য ঋষি বিরচিত হাস্তায়ুৰ্বেদ মহা প্রবচনে মহারােগ স্থানে শিষ্যোপনয়ন নামক চতুর্দশ অধ্যায়।
1. চতুর্দশ অধ্যায়। একদা তীক্ষ-প্রতিভাশালী অঙ্গপতি সন্ধ্যা-বন্দনাদির অবসানে মহর্ষি পালকাপ্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন;«হে মহর্ষে, আপনি পূৰ্বে সংগ্রহাধ্যায়ে যে রােগ বিভাগের উল্লেখ করিয়াছেন এইক্ষণে আমি তদ্বিষয়ে জিজ্ঞাসু হইয়াছি, অনুকম্পাপূর্বক আমাকে উপদেশ প্রদান করুন। মহানুভব অঙ্গেশ্বর কর্তৃক এই প্রকারে জিজ্ঞাসিত হইয়া মহর্ষি বলিতে লাগিলেন ;-হে নরনাথ, রােগসমূহ প্রথমতঃ “আধ্যাত্মিক ও ‘আগন্তুক এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত। উল্লিখিত আধ্যাত্মিক ব্যাধি সমুদায় পুনরায় ‘দোষজ’ ও ‘মানস’ এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত। এইরূপ আগন্তুক নােগ সমুদয় ও ‘আধিভৌতিক’ এবং আধিদৈবিক’ এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত হইতে পারে। পূৰ্বোল্লিখিত আধ্যাত্মিক রােগ সমুদয় ব্যস্ত ও সমস্ত বাত, পিত্ত, কফ, রক্ত, মংস প্রভৃতি দৈহিক উপকরণ সামগ্রীর বিকাব হইতে উৎপন্ন হয় বলিয়া তৎ নাম ভেদে বিভিন্ন প্রকার কথিত হইয়া থাকে। এইরূপ আগন্তুক রােগ সমুদায় ও জল, বায়ু, অগ্নি, প্রভৃতি বহিঃস্থ ভুত বা বিবিধ কারণ হইতে সৃষ্ট হয় বলিয়া তত্তৎ নাম ভেদে বিভিন্ন প্রকার কথিত হয় এবং গ্রহগণের কিংবা ইন্দ্রাদি দেবতার প্রকোপ বশতঃ উৎপন্ন রােগ সমুদয়ও উল্লিখিত প্রকারে পৃথক পৃথক নাম প্রাপ্ত হইয়া থাকে। উক্ত সকল রােগই সাধ্য, অসাধ্য, যাপ্য ও কৃচ্ছসাধ্য এই চারি প্রধান ভাগে বিভক্ত। উল্লিখিত রােগ সমুদায়ের মধ্যে বায়ু ও কৃমিজনিত ষটসপ্ততি প্রকার রােগের বিষয়ই প্রথমে বলিতেছি শ্রবণ করন ;-বাল-রােগ, পাণ্ডু-রােগ, আমরী-রােগ এবং সকল প্রকার আনাহ-রােগ, অতিশয় আহারাদি নিবন্ধন পঞ্চবিধ মূচ্ছ, সৰ্ব্ববিধ শিরোনােগ, উৎকারকী প্রভূতি দশবিধ পাদরােগ, দ্বিবিধ ব্যাপভি; শেফি রােগ, ঔদকী, অক্ষি, নায়ংপ্ৰেক্ষী প্রভৃতি অক্ষি-রােগ, ছৰ্দী (বমন) অতীসার, তৃণশোষী, বিসর্প, মেচুক্ষাণী, ষড়বিধ হস্তান্মাদ, উদাবৰ্ত্ত, উৎকর্ণক, গ্ৰহণীদোষ, আমৰােগ, বাত গতি, মন্যাস্তম্ভ, মদক্ষ, কৃশতা, বলক্ষয়, উরঃক্ষত, জবগ, গামূত্ৰী, সূতিকারােগ, স্বভাবজ এবং শারদ দ্বিবিধ দন্তরােগ, সপ্তপ্রকার ধাতুক্ষয় জনিত রােগ, স্বভাবতঃ বেগ বশতঃ কিংবা ঔষধ দ্বারা দুৰ্বলতা, প্রভিন্ন, দ্ৰোণীক, গুল্ম, হৃদরােগ, গার্লরােগ, ব্রণ, বিধি, অধিদপ্তক, কটশ্রোতভনিরােধ, গাত্ৰাতঙ্ক প্রভৃতি ষট, সপ্ততিবিধ রােগ বায়ু বিকৃতি বশতঃ জন্মিয়া থাকে। অতঃপর সপ্তবিংশতি প্রকার পৈত্তিক রােগের বিষয় কথিত হইয়াছে ; অম্বু-মুচ্ছ, মদ্য- মুচ্ছ', শিরাে-রােগ, কুঠারক-রােগ, মদ্য ব্যাপ, শােফ, বমন, অতীসার, বিসর্প, মেট্ৰক্ষাণ, সিদ্ধার্থক, পরিমূত্ৰী, দন্তরােগ, শারদরােগ, পিত্তপ্রভিন্ন, দ্ৰোণীক, গুল্ম, হৃদরােগ ও শরীরজ নােগ, ব্রণের উপদ্রব, বিধি, নস্যের অপব্যবহার জনিত রােগ, নাশারন্ধে, প্রভূত ধুম প্রবেশ জনিত রােগ, রশুন জনিত রােগ, কবল ব্যাপদ প্রভৃতি সপ্ত বিংশতি প্রকার রােগ, পিত্ত বিকৃতি হইতে উৎপন্ন হইয়া থাকে। অনন্তর দ্বাত্রিংশত প্রকার শ্লেষ্ম রােগের বিষয় বর্ণিত হইয়াছে ;-শুদ্ধ পাণ্ডুরোগ, কফজ মুচ্ছা, কফ ও কৃমিজনিত দ্বিবিধ শিরােনােগ, ঘৃত-ব্যাপৎ, যবস-ব্যাপং ক্ষীর-ব্যাপ, শােফ, বুদবুদী, পটলক্ষ মুঞ্জনােগ, ছদ্দী, সতীসার, বিসর্প, মেহন-ক্ষাণী শ্লেষ্মবসন্ন রােগ, পিষ্ট-মেহী, দন্তরােগ, সুলশারদ গজায়ুৰ্বেদসংহিতা রোগ, উদ্গম্ কৃমিকোষ্ঠ, প্রভিন্ন রােগ, কর্ণলােম জাত রােগ, দ্রোণীক শেফগুল্ম, হৃদ্গত রােগ শরীর জাত রােগ, ব্রণােপদ্রবজ, রােগ এবং বিধি রােগ এই সকলই কফজ রােগ। অনন্তর রক্ত-দোষ জনিত পঞ্চদশ প্রকার রােগের বিষয় কথিত হইতেছে—শিরােরোগ, রক্তগুল্ম, গম্ভীর রোগ, ক্ষরী-কৃত, নিষ্পিষ্ট, শােফ, রক্তাক্ষ, মেট্র ক্ষাণী, লােহিত শারদ, প্রভিন, দ্ৰোণীক, গুল্ম এবং অগ্নি উপদ্রব, এই সকলই রক্ত জনিত রােগ। অতঃপর সান্নিপাতিক রােগ কথিত হইতেছে ;- এই সন্নিপাত বা সমবেত বাত পিও-কফ- বিকার জনিত রােগ দ্বাবিংশতি প্রকার। উল্লিখিত দ্বাবিংশতি প্রকার সান্নিপাতিক রােগের আদি মৃদুগ্রহ, তৎপরে মূচ্ছা, শিরােনােগ, কচ কেশ, শােফ, প্রাবারকী, মুজাল, বমন, অভীসার, মদনক, বিসর্প, মেছু বিকৃতি, তুলকাশী, অশ্মরীক, দন্তরােগ, অশিত রােগ, প্রভিন্ন, দ্রোণীক, গুল্ম, গাত্ৰাময়, উপদ্রব, এবং বিধি প্রভৃতি দ্বাবিংশতি রােগ সান্নিপাতিক বিকার সস্তৃত। এই প্রকার বাত ও পিত্ত উভয়ের যুগপৎ বিকৃতি জনিত রােগ চতুর্দশ প্রকার কথিত আছে, হে নরনাথ, পক্কল, বহিরায়াম, স্নেহ মূচ্ছা, পূয়কেশ, সমস্ত কেশ, চৰ্ম্মতিল, তৈল ব্যাপৎ, বিন্মালী, বস্ত্র ক্লিষ্ট, পিটিকাক্ষ, শূল, মৃত্তিকা ভক্ষণ, কফ, ক্ষয় এবং অতিপাত এই চতুর্দশটা বােগ যুগপৎ বাতপিত্ত বিকৃতির ফলে উৎপন্ন হইয়া থাকে। অনন্তর বাত ও শ্লেষ্মর যুগপৎ বিকৃতি জনিত ষোড়শ প্রকার রােগের বিষয় যথাযথ বর্ণিত হইতেছে,-“সুপ্ত, মহাখ্য, স্ব, তৃণ জনিত মুচ্ছ', কারকী, জল ব্যাপৎ, গলগ্রহ, জরাজনিত রােগ, শূল, দন্তশূল, তৃণপুষ্পী, ক্ষীণপিত, ঘাস-দুৰ্বল, অভক্ত ছন্দ, এসােপরোধ এবং মেদ উপদ্রব প্রভৃতি যােলটী রােগ বাত-শ্লেষ্ম বিকার হইতে উৎপন্ন। অতঃপর সপ্ত প্রকার বাত রক্ত জনিত রােগের বিষয় বর্ণিত হইতেছে ;-কেশ গ্রন্থি, শােফ, বাত কুণ্ডলিকা, রক্তাণ্ডী, যব গণ্ডী, চৰ্ম্মকীল এবং বিসর্দিনী এই সাতটী রােগ যুগপৎ বাত রক্ত ‘দোষ জনিত বলিয়া জানিতে হইব। অনন্তর শ্লেষ্ম-শোণিত বিকার জণিত ত্রিবিধ রোগের বিষয় বর্ণিত হইতেছে ;-দকী, মহাদ এবং মণ্ডলিকী এই তিন প্রকার রােগ যুগপৎ কফক্ত বিকৃতির ফল স্বরূপ। অন্তঃপর পিত্ত ও কফ বিকৃতি জনিত ত্রিবিধ রােগের বিষয় বর্ণিত হইতেছে,-শ্রোতােহল্ক, পিটকী এবং বাতক্ষয় এই তিন প্রকার রােগ যুগপৎ কফপিত্ত বিকারসস্তৃত। অনন্তর যুগপৎ বাত পিত্ত রক্ত বিকার জনিত ত্রিবিধ রােগের বিষয় কথিত হইতেছে পাকল, পুণ্ডরীক এবং বিপ্লাবক এই ত্রিবিধ রোগ, বায়ু পিত্ত এবং রক্তের বিকার হইতে উৎপন্ন হইয়া থাকে। অতঃপর কফ রক্ত বাত বিকার জনিত বিবিধ রােগের বিষয় কথিত হইতেছে ;- অক্ষি পাক রােগ, যব গণ্ড রােগ এবং কর্ণ বােগ এই ত্রিবিধ রােগ যুগপং কফ রক্ত ও ব:ত বিকার সস্তৃত হইয়া থাকে। এই প্রকার যুগপৎ পিত্ত রক্ত ও কফ বিকার জনিত এক মাত্র বিচর্জিকা বােগই জন্মিয়া থাকে। ।
পঞ্চদশ অধ্যায়। অনন্তর ভূতানিলাত্মক ষড়বিধ রােগের বিষয় বর্ণিত হইতেছে ;-এই ছয় প্রকার রােগের প্রথমটা কুকুট’ রােগ নামে আখ্যাত হইয়া থাকে ; দ্বিতীয় একাঙ্গ গ্রহ, তৃতীয় কূটরােগ, চতুর্থ অন্তরাময়, পঞ্চম হস্তগ্রহ এবং ষষ্ঠ রান্ধ রােগ নামে খ্যাত। অতঃপর পঞ্চবিধ মানস রোগের বিষয় কথিত হইয়াছে ;ভয়াতীসার, পূৰ্বাবদ্ধ, হৃচ্ছালী, চেততাংশ এবং সন্তাপ দগ্ধ এই পাঁচ প্রকার রোগই মানা রোগ নামে খ্যাত। উল্লিখিত দুইশত বত্রিশটী বােগই আধ্যাত্মিক রোগ নামে প্রসিদ্ধ। তৎপরে সর্বসমেত তিরাশি প্রকার আগন্তুক রােগ কথিত হইয়াছে,তন্যধ্যে বিদ্যুৎ-পাতাহত-অক্ষি-রােগ, দন্ত রােগ এবং বিদ্যুৎ দাহ জনিত রােগ এই ত্রিবিধ রােগই ‘দৈবিক’ আখ্যা প্রাপ্ত হইয়া থাকে । তদ্ভিন্ন গ্ৰহাত্মক রােগ দশ প্রকার-প্রগ্রহ, অপবাহুক, মৃগাক্ষ, অরতিক, প্রতার, স্বপিতি, প্রমর্দন, কামাখ্যা, বাণিজ্য ও স্থবির এই নয় প্রকার এবং উথান এই দশ প্রকার রোগ গ্রহাবেশ বশতঃ জন্মিয়া থাকে। মহারাজ, উল্লিখিত ব্যাধি সমূহ ব্যতীত আরও সপ্ততি প্রকার রোগের নাম লক্ষণ ও চিকিৎসা কথিত আছে। অভিঘাত, শিরােনােগ, শরাঘাত ক্ষত, চরণ চতুষ্টয়ে শুষ্ক বৃক্ষ কাণ্ডাদির আঘাত জনিত ক্ষত, চরণ তল ক্ষয় নিবন্ধন ক্ষত, শোফ, কাচ, প্রতিমুন্ন, নিষ্পেষ হত, সন্তাপ, অতীত মুক্ত, উষ্ম-পরিগত, দণ্ডাক্ষ ছৰ্দী, অতীসার বিষাক্ত, দগ্ধ-দুষিত, সর্পাঘাত, স্ফোটক, অপবাদ-বদ্ধরােগ, বিসর্প-রােগ, বলক্ষাণী, মেহনক্ষণী, অবসাদ, বস্তিভেদ, দন্তরােগ লুপ-রোগ, শীতাতি-রােগ, মক্ষিকা দংশন, কৰ্ম্মাতি নীত, স্তব্ধ, নিঃখাত, নিষ্পিষ্ট, বিহত, ব্য'হত, শূন, সঙ্কুচিত, ভগ্ন, স্নান, আবেষ্টিত, নিশ্চেষ্টিত, শােষিত, উন্মথিত, ভ্রষ্ট, ছিন্ন, চুত, সৰ্ব্বশরীরে বেদনা, সদ্যঃক্ষত, দেহ ভঙ্গ, ঘর্ষণ, অগ্নিদাহ, ক্ষারদাহ তুষারদাহ, অৰুতেজোদাহ, মূঢ়গর্ভ, শস্য-বিনিষ্পেষণ, ব্যাল এরক, লুতা কীটাবচূর্ণ, বস্তিজ অষ্টবিধ ব্যাপং, দ্বিবিধ হিংস্র জল জন্তুর আক্রমণ জনিত রােগ এবং জলহস্তীর আঘাত এই সকল আগন্তুক রােগ নামে অভিহিত হয়। এই সৰ্বসমেত তিনশত পঞ্চদশী রােগের বিষয় পৃথক পৃথক রূপে এই গ্রন্থে কথিত হইয়াছে। উল্লিখিত রােগ সমূহের মধ্যে শুদ্ধ পাকল, কূট পাকল, স্কন্দ, সংসক্ত, সন্তাপানাহ, শিরােরােগ, সংরাষ্ট্র, বিপ্লব, গ্রহিবিপ্নত, সমন্ত কুঠারাধ্য, স্থানরত, বিন্নিপাত-দাহ, উম্মপরিগত, সন্নিপাত বিকারজ বিসর্প, ক্ষত জনিত বিসর্প, পূৰ্ব্বাবদ্ধ, অপবাদ-বদ্ধ, হৃদয়-স্ফালী, ষড়বিধ হস্তোন্মথ, অবসাদ, বস্তিভেদ, দৈবিক দন্তরােগ, অচি কিংসা, বিবিধ অরিষ্ট লক্ষণযুক্ত দৈব বিকার এবং জীবনী শক্তির ক্ষয় হইতে থাকিলে যে সকল রোগ জন্মে উহা প্রায়শঃ অসাধ্য অর্থাৎ প্ৰতীকারের অযোগ্য রোগ নামে খ্যাত। অনন্তর যে সকল রোগ যাপ্য তাহা কথিত হইতেছে ; কচ-কেশ, কদম্বক, সুফুল, অফুল, অবগণ্ড শিরা, ওল কাশী, বয়ােজ-দুৰ্বলতা, প্রকৃতি-দুর্বলতা এবং গাত্ৰাতঙ্কী বােগ এই সকল রোগ যাপ্য রোগ মধ্যে গণনীয়। তদ্ভিন্ন যে সকল রােগ উপেক্ষিত, তাহাও যাপ্য রােগ মধ্যে গণ্য। যে সকল রোগ উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত লক্ষণ প্রকাশ পায় কিংবা যে সকল রােগে অত্যন্ত বেদনা (ক্লেশ) থাকে, অথবা যে সমুদয় রােগ মৰ্ম্মস্থানে কিংবা তাদৃশ স্থানে গজায়ুৰ্বেদ-সংহিত। উৎপন্ন হয়, অথবা যে সকল রোগ চিকিৎসার অযােগ্য স্থানে জন্মে এবং যে সকল রােগের প্রারম্ভে অরিষ্ট লক্ষণ বিদ্যমান থাকে, অথবা মহারােগাধ্যায়ে যে সকল রােগ দুরারোগ্য বলিয়া আখ্যাত, তাহারা কৃচ্ছ, সাধ্য রােগ মধ্যে গণনীয়। হে নরেশ্বর, অসাধ্য যাপ্য ও কৃচ্ছসাধ্য রােগের এই সকল লক্ষণ কথিত হইতেছে। তদ্ভিন্ন সাত্মানুললামিক, বাল চিকিৎসিত উপসর্গে যে সকল রোগ জন্মে, তাহারাও যাপ-শ্রেণীভুক্ত। দন্তশল্য দন্তরোগ হইতে অভিন্ন, মৃদজীর্ণ ও মৃদানাহবােগ একই, এই নিমিত্ত উহা ও যাপ্য রােগ মধ্যে গণনীয় এবং রােগ সংগ্রহে উপক্রমে পৃথক্ বলিয়া পৃথরূপে নির্দিষ্ট হইয়াছে। অঙ্গেশ্বরের প্রার্থনায় মহর্ষি কালকাপ্য ইহা বলিয়াছেন। ইতি পালকাপ্য ঋষি বিরচিত হত্যায়ুৰ্বেদ মহা প্রবচনে মহারােগ স্থানে রােগ ভক্তি নামক পঞ্চদশ অধ্যায়।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.