Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Krishak-bala

2009/11/1

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কৃষক-বান্ধা।
অভিনব গীতি কাব্য।
ইংলণ্ড-গমন-প্ৰয়াসি-ভিক্ষা িকিরছি।
আশুতােষ ঘােষ কর্তৃক
প্রকাশিত।
কলিকাতা।
জি, সি, বদু এণ্ড কোং কর্তৃক বেচু চাটুৰ্য্যের, স্ট্রীট
৩৩ নং ভবনে বহু প্রেসে মুদ্রিত।
১৮৪।

No text on this page.

এই গ্রন্থ
প্রীতিভাজন
শ্ৰীযুক্ত বাবু যাদবানন্দ চক্রবর্তী মহাশয়ের
ক র ক ম লে
সাদরে
উৎসর্গীকৃত হইল।

No text on this page.

পূর্বভাষ। খৃষ্টীয় ১৪৯৯ অব্দে পর্তুগিজ সেনাপতি কেব্রেল (General Cabraf) এয়ােদশসংখ্যক রণ-পােত ও দ্বাদশ শত সৈন্য সহ ভারতবর্ষ অভিমুখে প্রেরিত হন। ভারতে খৃষ্টধর্ম প্রচারার্থ তাহার সহিত আট জন ধৰ্ম্ম- যাজক প্রেরণ করিয়া পর্ট গাল-অধীশ্বর এই আদেশ প্রচার করেন যে কোনও প্রদেশের অধিবাসিগণ খৃষ্টধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃত হইলে, অগ্নি ও তরবারির আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইবে। পথিমধ্যে প্রসিদ্ধ নাবিক ডাইয়াস (Admiral Dias) সহ চারি খানা রণ-পােত ঝটিকাবেগে জল মগ্ন হয়। অনন্তর অবশিষ্ট পােত লইয়া ১৫০০ খৃষ্টাব্দে সেনাপতি মালাবার উপকূলস্থ কলিকট নগরে উপনীত হয়েন। এই ঐতিহাসিক ঘটনার ছায়ামাত্র অবলম্বন করিয়া ‘কৃষকবাল রচিত হইল। ০

No text on this page.

কৃষক-বালা।
সূচনা ও আবাহন।
অতি দূরতম,
মালাবার দেশ,
ভারত-সাগরকূলে।
অমর জিনিয়া, সুষমা যাহার,
নেহালি নয়ন ভুলে।
পূরবে অচল,
ঘাটগিরি নাম,
অগণিত শৈলশাখা।
শত বনরাজি, বিরাজিত তায়,
হরিত মাধুরীমাখা।
२
পরিছে উরসো,
চারু গাঁথা পােতমালা।
ভেটিবারে তায় শৈল কোল ছাড়ি
ধাইছে গিরিজাবালা ।।
নাচিয়া সাগর,
৫ বক্ষঃস্থলে।
। নদী।

।
( ২ )
ঋতু কালাকাল, না বিচারি সেখা,
মেদিনী মধুরে হাসে।
নিদাঘ, বরষা, শরত সরসি,
কমল কুমুদ ভাসে ৷
‘অমরা অমরা, কে দেখেছে কবে ?
অথচ সবাই বলে।
বুঝি বা অমর, হবে কোন দেশ,
অতুলন ধরাতলে ।
ভূধর, সাগর,
শােভমান যথা,
যে দেশে বিরাজে নদী।
কে জানে অমরা • কোথায় আবার
সে দেশে না হবে যদি ?
৪
সেই শতাধিক, যােজনের পথ,
মালাধার সুখধাম।
ছিল কোন দিন, জনপদ তথা,
কৃব র নাম ।
মুনি ম , রুচির* সে ঠাই,
ি » রিম-খনি।
ফুটিত ;a, নব নব ঘেন,

।
৫
ঝলিত কুসুম, লতিকার দেহে,
বিটপে সুরস ফল।
ঝর ঝর ঝর,
ঝরি ঝরণা,
ছড়ায়ে ফটিক জল ।
ডালে ডালে শামা, দয়েল, পাপিয়া,
সুরবে গাহিত গীতি।
পালে পালে গাভী, কচি কচি পাতা,
খুজিয়া চরিত নিতি ।
৬
সারি সারি ক্ষেত, পরিসর মাঠে,
লাঙল চলিত কত।
কোথা বা মারুতে, খেলিত লহরী,
সফল ওষধি শত ।।
ছিল সুশােভন,
কৃষক কুটীর,
সারি সারি ডানি বামে ।
জনপদ সেই, অভিহিত তেঁই,
কৃষক নগর নামে।
।
৭
কোথা বীণাপাণি ! উর মা ভারতি,
অবােধ তনয় আজি।

। ৪)
সেই চারি শত,
বরষের কঙ্কা
গাহিতে বসিল সাজি।
বিরচিব মালা,
নবীন গাঁথনি,
নীরস কানন ফুলে।
মনের হরষে,
ভেটিব মায়ের,
রাতুল চরণমূলে ৷
মূকের বাসনা, তুলিতে লহরী,
সংগীত সাগরে পশি,
বামনের আশা, গগন পরশি,
ধরিতে বিমল শশী।
রচিতে কবিতা, বাসনা আমার,
দেহ দেবি। পদছায়া,
দেখিব কেমন, অবােধ ছাওয়ালে,
মায়ের অধিক মায়া ।
হাসিবে কি হেরি, চপল পাঠক।
কু-কবির যশ-আশ ?
তুমি, আমি, তিনি, বিপুল সংসারে
কে নহে অাশার দাস ?
গুরু কবি যেবা,
রচুক ভাষায়
আকাশ পাতাল সেই।

লঘু জন আমি, লঘু মাের রুচি,
লঘুতে আমােদ তেই
লঘু পদাবলী,
জানিনা আঁকিতে, রাজা, বাদশাহ,
মিলাতে চঁাদের মেলা।
গাব লঘু গান,
কৃষকের লীলা খেলা য
গুণহীন মালী,
শােভাহীন ফুল,
মােটা সূত, ভাঙা সূচি।
বিচারি গাঁথনি,দোষােরােমাে,তোষাে
যাঁহার যেমন রুচি।
পিতা ও তনয়া।
অচলে যেমন হিম গিরিবর,
অহিকুলচূড়া বাসুকী যেমন ;
কৃষক নগরে আছিল তেমনি,
দেবিদাস নামে কৃষক সুজন।
সরল, সদয়, সুধীর, সুরূপ,
দেবিদাস সম ছিল না তথায় ;
ছিল না তথায় কৃষক তেমতি,
কৃষি-বিষয়িণী ভাবি গণনায় ।

গাড়ি, ঘােড়, হাতী ছিল না দেবীর,
ছিল না তাহার হীরা মতিহার ;
তবুও সে ধনী, আছিল যেহেতু
জীবিকা সাধন সকলি তাহার।
কৃষক জীবনে যে কিছু বিভব,
মহিষ, গবয়, জোয়াল, লাঙল ;
মই, কাচি, ছুরী, কুঠার, কোদালী,
ক্ষেত, খােলা, ভূই আছিল সকল।
দেউল, দালান, দেউড়ী, দেয়াল,
আসবাব ছটা ছিল না দেবীর ;
আছিল তাহার বাগান, গােয়াল,
শয়ন-আগার, রসুই-কুটীর।
সারি সারি গােলা; পূরিত তাহাতে,
যব, ছােলা, গম, মসুর, মটর;
খানে খানে সার, পােয়াল, বিচালি,
চাষার কি ধন চাহি এর পর?
পুথি, পাঠশালা, গুরুমহাশয়,
জনমেও চখে হয়নি পতিত ;

( ৭ )
রসনার আগে তথাপি তাহার,
তেরিজ, বিয়োগ, মানস গণিত।
অবসর কালে সাজের বেলায়,
বসিলে ঘেরিয়া কৃষক সকলে,
সুখে রামায়ণ, ভারতের কথা,
আড়াইত দেবী কাহিনীর ছলে।
কি আর গাহিব দেবীর সুযশ,
কি আর করিব গুণের বাখান ;
ছিল না সে মনে ছলনা, চাতুরী,
গুমান, গরিমা, কণা পরিমাণ।
অবনীর সার যত সাধু গুণ,
দয়া, মায়া, আর শীলতা, বিনয় ;
এ সবায় যেন করিয়া একুন,
গঠিলা দেবীরে বিধি দয়াময় ।
গেহে চারুশীলা তনয়া তাহার,
সুর-বালা কোনাে মরতে যেমন
অথবা নিহিত সাগর-গরভে,
অলক্ষিতে এক মুকুতা রতন।
নয়নের তারা, যতনের নিধি ;
কুটীরের আলাে একই পিতার ;

দেশের গরব একই সে ধালা,
একই নায়িকা ‘কৃষক-বালার।
৭
ষার্টি শিশিরের তুষার পতনে,
দেবীর সুকেশ তুষারধবল ;
একাদশ মধু মলয়-মারুতে,
কুমারীর মুখ বিকচ কমল।
সুবিশাল বপু, বাহু সুবলিত,
ললাট, উরস আয়ত পিতার ;
হরিণ নয়নে সরলতা মাখা,
মেঘ-চাপ জিনি ভুরু তনয়ার।
কনক পুতলী-অথচ কোমল,
বিজুলী–অথচ চপলতা-হীন ;
কি দিব তুলনা? সে চারু মুরতি,
আধ বিহসিত শারদ নলিন।
তারকা-খচিত নীলিম গগনে,
শশিকলা যথা কমদরশন ;
কৃষি-কুল-বালা-কুসুম-কাননে,
চারুশীল-ফুল সুচারু তেমন।
জনমিলা চারু ভূলােকে যে দিন,
অশিব নক্ষণ ঘটিল বহুল ;

( ৯ )
একে অমানিশি, উদিল তাহাতে,
ধুমকেতু এক বৃহৎ-লাল।
কহিল সকলে—দেবীর এ মেয়ে,
হবে না সুখিনী জনমে কখন ;
বছরটী গত না হতে জননী,
জনমের মত মুদিলা নয়ন।
১০
দুধের শিশুটী রাখিয়া বালারে,
করিলেন মাতা, যাই পরিহার;
একই সে ভেলা সংসার-পাথারে
দেবের অধিক জনক তাহার।
ভালবাসা রূপ তপােবন ধামে,
আছিল চারুর তিনটী সাধন ;
একটী সে গাভী ধবলিকা নামে,
অপর সে পিতা, আরাে এক জন
যুবক ও বালিকা।
বসুধা বদনে সিদূর মাখিয়া
আকাশে দিনেশ পড়িল হেলিয়া

( ১০)
নােঙি তৃণশির,
বৈকালী সমীর,
ধহিল কুসুম-সুরভি লইয়া।
২
এহেন সময়ে কে ওই কুমারী ?
কে ওই যুবক পারশে উহারি ?
কুসুম-বাগানে,
অতি সাবধানে,
অলিবাল পরে সেচিতেছে বারি।
অহহ কি বালার রূপ-মধুরিমা।
মুখ ঢল ঢল, শারদ চদিমা
যুবক-বদন,
সুষমা সদন,
সু-ঈষৎ তায় গোঁফের কালিমা।
৪
৫
নয়ন, ললাট আয়ত যুবার।
বীরতার খনি, শীলতা আধার
উরস বিশাল,
গুরু ভুজ নাল,
দেহে যৌবনের নব অধিকার।
বৃক্ষের আইল।

কহিলা কুমারী দেখাে যােগ দাদা,
কোনাে ফুল, কালাে, কোনো ফুল সাদা;
কেহ বা পাটল,
কপিশ, ধূমল;
কারু লাল রঙে চোখে লাগে ধাদা।
মালতী, গােলাপ, যুঁই, জবা ফুল,
কারু বা বিকাশ কারু বা মুকুল ;
কারে, সাধ করি,
মালা গেঁথে পরি,
কারে বা ছিড়িয়া কানে পরি দুল।
৭
নানাবিধ ফুল, ফুটিয়া হেথায়।
খেলিছে লহরী সুশীতল বায়।
ফুলকুলমণি,
কহ কারে গণি,
কার সম ফুল নাকি ধরায় ?”
শুনিয়া যুবক কহিলা মৃদুল,
“সব চেয়ে ভালো গােলাপের ফুল,

( ১২ }
রূপে দিক আলো,
গুণেতেও ভালাে ;
কি আছে কুসুম, এর সমতুল?
গােলাপের গুণ, সুলােকের যশ,
জীবনে মরণে, উভয়ে সরস।
শুখায় গােলাপ,
নাহি পরিতাপ,
মুসৌরভে তার পূরে দিক দশ।”
“ছােট বােন তবে এই ভিক্ষা চায়,
দেখিবাে গােলাপ কত শোভা পায়,
বিভা করি যবে,
বধূগেহে লবে,
দুটি ফুল তার পরায়ে খােপায়।”
বলিয়া সরলা হাসিলা যেমনি,
হেঁটমুখ যুবা লজেতে তখনি।
নিরখি সে হাব,
অহো কত ভাব,
ভাবুকের মনে উথলে অমনি।

( ১৩ ২ চেন কি উহারে, পাঠক ঠিকা। সুরবালা-নিভা কে অই বালিকা : এ যে সে অতুল, চারুশীলা-ফুল, “কৃষক বালার” একই নায়িকা। আছিল চারুর তিনুট সাধন- “পিতা আর গাভী আরাে এক জন শুনিয়াছ যেই এই যুব সেই নামটা উহার যােগীশমােহন। দান ও আদান । গােধূলি গগনে ডুবিল তপন ; ঝলিল তারকা সােণালী বরণ ; সরসে ফুটিল কুমুদিনীগণ ; অভাগী রােজী মুদিল আঁখি হাসিল পূরবে চারু শশধর ঝলিল মেদিনী অচলশিখর ;

( ১৪ )
সােহগে ফাটিয়া হাসিল-সাগর
সুনীল হৃদয়ে হলুদ মাখি।
এহেন সময়ে আলােকি কুটীর
বসি দেবিদাস কৃষক সুধীর।
পাশে চারুশীলা তনয়া দেবীর,
পুরাণ কাহিনী শুনিছে বসি।
মৈথিলী যেমন জনক সকাশে,
অথবা সে উমা হিমাচল পাশে,
উপকথা ছলে শুনিছে আসে
বেদের সুবিধি আমােদে রসি।
দুয়ারে কাহার (সহসা তখন)
চরণের রব বাজিল সঘন ;
পড়সী বাসব, কৃষক সুজন
পশিল কুটীর হসিত মুখে।
শৈশবের সাথী, যুব-সহচর,
পলিতণ বয়সে সুহৃৎ নােসর,
ধরি চিরসখা বাসবের কর
বইলা দেবী ভাসিয়া সুখে।
* সীতা।

(১৫ )
৪
দাঁড়াইয়া চারু সহসা অমনি
সুধাইলা বাণী অমৃত নিছনী
“কহ তাত কেন একেলা আপনি
কেন যােগ দাদা আসেনি আজি।”
বলিয়া কুমারী হাসিলা বিশদ,
বিকাশি অধর কম কোকনদ ;
ধীরি ধরি ধরি বাড়াইলা পদ
সিলিম তামাক আনিতে সাজি।
হাসিয়া বাসব কহিলা দেবীরে
“মরি কি মমতা মায়ের শরীরে।
এক দিন যদি না দেখে যােগীরে
কতই অসুখ সয়ে চারু।
‘যে যার সে তার বেদের কথন,
চারুর যে ভাব যােগীর তেমন;
সােদর সােদরা উহারা যেমন,
নাহি পরভাব মনেতে কারু।
হা ভাই বাসব, চারু মা আমার
ননীর পুতলী, মুরতি মায়ার,

জীবন অধিক যােগ দাদা তার,
যােগীশও তােমার তেমনি ছেলে।
পেলে ভাল কোনাে খাওয়ার জিনিশ,
খাবে না মা চারু না খেলে যােগীশ,
যােগীশ না হলে অমিয়ও বিষ,
বিষও অমিয় যোগীশে পেলে।”
৭
“তবে দেবিদাস, আর কেন ভাই,
বর বর সুধু খুজিছ সদাই ?”
“আমিও বাসব ভাবিতেছি তাই
যােগশ চারুতে হউক বিভা।
চপলা যেমন নব জলধরে,
বিকচ নলিনী যেন মধুকরে,
অথবা তটিনী মিশিয়া সাগরে,
নব শােভা দেহে ছড়াবে কিবা।”
:
“সাক্ষী অমরার দেব দেবীগণ!
সাক্ষী আকাশের সুধাংশু তপন!
আজি দেহে যেই করিতেছি পণ,
কোন মতে তার হবে না আন।
চারুশীলা নামে তনয়া আমার,
যুবক যােগীশ বাসককুমার,

( ১৭ )
শুভ পরিণয় হইবে দোহার
শুভ যােগে হবে আদান দান ॥”
“এ আশীষ যদি করেন দেবতা,
সে সুখের আর রবে না সমতা,
সহকার তরু মাধবীর লতা,
কোমল বাধনে মিলিবে দেহে।
যােগীশের সুখ, আশা অভিলাষ,
হরিষ, বিষাদ, বাসনা, বিলাস,
চারুর হৃদয়ে পাইবে বিকাশ;
মােহিবে উভয়ে একই মােহে।”
১০,
হেথায় কুমারী মরালগমনা,
রাখি ডাবা নল, সলাজনয়না,
ভাবিয়া মরমে কি জানি ভাবনা,
ছুটিয়া পলালাে আনত মুখে।
হাসিয়া বাসব, দেবিদাস আর,
কাহিনী অপর তুলিলা আবরি,
আবাদ, ফসল, শত সমাচার,
একে একে একে পাড়িলা সুখে ||
সহসায় দেবী চকিত, নীরব,
ক্ষণ পরে-“ওই কি শুনি বাসব,

গভীর নিশীথে বায়সের রব,
সুচারু লক্ষণ-নহেত তেহ।”
“গভীর নিশীথে বায়সের রব,
সুচারু লক্ষণ নহে এ সব,
কহি মৃদু মৃদু চলিলা বাসব,
ভাবিতে ভাবিতে আপন গেহ ॥
লাজ ও সংশয়।
১
আরূঢ় শিরসি পরে দেব দিনমণি,
শিথিল গমন এবে ধাঁধিতে অবনী ;
উতরি আধেক পথ,
যেন সংযমিয়া রথ,
নিজ অধিকার-সীমা হেরেন আপনি।
২
উ গারে অনলকণা নিদাঘের বায়,
ঝুপি ঝােড়ে পশুপাখী বাঁচাইছে কায় ;
রাখাল না ফুকে বেণু,
না চরে গােঠের ধেনু
লাঙল ছাড়িয়া গােরু তরুতলে ধায়।

( ১৯
) {
মাণিক, গােবন, বিশু কৃষকের নাম
মুচিছে কেঁচড় খুলি কপালের ঘাম;
কারু মুখে নাই হাসি ;
ছুটা ছুটী ধেয়ে আসি,
ছায়ার শীতল কোলে লভিছে বিরাম।
৪
অলস অবশ কেউ ক্ষুধায় কাতর,
ছটফট তৃষায় তাপিত কলেবর ;
গাছের গুড়িীতে কেহ,
হেলায়ে বিশাল দেহ,
সাধের ভাসান গীতে তুলিছে লহর।
উদর পূরিয়া কেহ করিছে ফলার,
ছােলা, ছাতু, নােনা, ফুটি নানা উপচার ।
সিলিম সাগরে কেউ,
তুলিয়া ধোঁয়ার ঢেউ,
পিয়িছে তামাক সুধা অমৃতের সার।
সহসা এমন কালে হাতে লয়ে থালা,
জনপদ ছাড়ি এক কৃষকের বালা,

( ২০ )
মাঠ কোণে দিলা দেখা,
অহহ কি রূপের রেখা,
বিকসিল শশী যেন ভেদি মেঘমালা।
৭
ঠা হরিলা দেবিদাস চলনি .দেখিয়া,
ফুকারিল ধবলিক সােহাগে ফুলিয়া ;
‘ওই বুঝি চারু’ বলি,
যােগীশ আমােদে গলি,
ছুটিল কঁাধের হল ভূতলে ফেলিয়া।
র
একি অভিনব আজি ? ভাসিয়া উৎসৰে
‘এস বাে’ বলি যুব সংভাষিলা যবে,
শুনিয়া সে সংভাষণা
চমকিলা সুলোচনা,
চমকিত মৃগী যেন বাঁশরীর রবে।
ভাসিল লাজের আভা বিলােল নয়নে ;
কুসুমকোরক মরি মুদিল তপনে ;
যোগীশ আদর করি,
সাধিলা করেতে ধরি ;
তবু না ফুটিল কথা সে বিধুবদনে

( ২১)
সেদির অধিক ছিল যােগীশ তাহার,
আগেকার যােগদাদা নহে সে কি আর ?
যুবক
ভাবিয়া
চুর,
সংশয় করিতে দূর,
জনক বাসব পানে ফিরিল আবার।
"
১১
০
সুধাইলা “একি বাবা! দেখিলাম আজ,
আমায় নিরখি চারু বাসিলক লাজ;
হেসে না কহিল বাণী ;
নােমিয়া বদন খানি,
মাটীর পুতুল হেন করিল বিরাজ।
আপন ভগিনী বই জানি না উহায়,
চারুও সােদর হেন বাসিত সদায় ;
চারুরে পাইলে সাথে,
চঁদ যেন পাই হাতে ;
চারুও ভাসিত সুখে হেরিলে আমায়।
ভালবাসি আগুলিতে যাইনু তাহাকে,
সেও চারু ভাৰ ভাবিল আমাকে।

( ২২ )
‘যােগ দাদা’ ডাকি সুখে
চাহিল হাসি মুখে ;
কহ পিতঃ যদি এর হেতু কিছু থাকে।
১৪
বলি নীরবিলা যােগী বিকলহৃদয়,
যঈৎ হাসিল পিতা বুঝিয়া অশয় ;
দেখিয়া সে কূট হাসি,
সংশয় সাগরে ভাসি,
আকাশ পাতাল কত ভাবিলা নয়।
সভা ও দূত।
পােহাইল নিশি, উদিল তপন;
একি অভিনব কৃষক নগরে,
নাহি মাঠে বাটে একটীও চাষী,
মহাসভা আজ বাসবের ঘরে।
নিধু, সীধু, ফেলা, মাণিক, মতিয়া,
চেটাই পাতিয়া বসিয়াছে সব ;
সাধের ডাবাটী মুখ হতে মুখে,
‘হাবােল তাবোল’ করিতেছে রব

( ২৩ ) ,
কহিলা বাসব চাহি চারি ভিতে,
“মন দিয়া তবে শুনহ সবায়,
সমবেত আজি যে দুটী কারণে
অ সময়ে এই কৃষক সভায় ।
একটি কারণ আমোদ তামাসা
-চারু সনে কালি বিবাহ যােগার
অপর সে বড় বিষম কাহিনী,
ভাবি থর থর কঁপিছে শরীর।
পটুগাল* দেশী বণিক সকলে
করিল ছাউনীসাগরের পার।
সেনাপতি নাকি কেবারেলণ নাম,
দিল দূতমুখে ঘােষণা তাঁহার
তােমাদের যত দেবদেবীগণ
অলীক সে সব করি পরিহার
হও সুদীক্ষিত মােদের ধরমে ;.
নহিলে বিপদ জানিও সবার।
৪.
ওই দূতবর দাঁড়ায়ে ওখানে ;
অতএব যেবা উচিত বিধান,
* পর্ব গাল।
৭ ফেব্রল।

{ ২৪ }
বিচারি ঝটিতি শুনাও উহারে ;
পরিণাম যাহা জানে ভগবান।
কৃষকের জাতি আমরা সকলে,
অপকার কারু না করি কখন ;
ইথে যদি হন বিমুখ বিধাতা,
কপালের দুখ কে করে মোচন!”
বলি নীরবিলা বাসব যেমতি
রাগে, ভয়ে মুখ না ফুটিল কার ;
চাহিলা সকলে দেবিদাস পানে,
অভিমত যেন অপেক্ষি তাহার ।
গরজিল দেবী জলদ আরাবে,
“যায় রসাতলে যা বসুমতী ;
পিতা, পিতামহ পূজিলা যে দেবে,
তেয়াগিব তায়? ধিক্ এ যুকতি।”
‘ধিক এ যুকতি’ সহসা অনি,
শত মুখ হতে উঠিল এ ব ;
হেথায় অতীব শীলতার সহ,
চাহি দূতপনে কহিলা বাসব
‘সেনাপতি যিনি কহিও তঁাহারে,
ইথে দোষ কিছু না ভাবেন মনে,

( ২৫ ) পিতা, পিতামহ পূজিলা যে দেবে, তেয়াগিতে তায় নারিব জীবনে।” হাসি দূত তবে কহিলা বাসবে, “বুঝি হেলায় ডুবালে দুকূল ; বুঝিলাম বিধি-যীশু দয়াময়, তােমাদের পরে নহে অনুকূল। আমাদের দেশে মহারাজা যিনি, সেনাপতিবরে করিলা আদেশ- কথায় না হলে বশীভূত কেহ, অনল কৃপাণে ঢলাও সে দেশ। bu ‘অনল কৃপাণে চলাও সে দেশ। বাসব-হৃদয়ে বাজিল বিষম ; শিহরিল তনু; ভাসিল ললাটে, ভাবনার রেখা অতি গাঢ়তম। ঘুচি সে ভাবনা সহসা আবার, নব ভাব হৃদে হইল উদয়- ‘পিতা, পিতামহ পূজিলা যে দেবে, তেয়াগিতে তায় পরাণে কি সয় ? হাসিয়া কহিলা “পূত বেদলিপি, অধম, অলীক তাও যদি হয়।

কহ দূতবর, জানিব কেমনে,
তােমাদের মত অলীক সে নয় ।
আমরা কৃষক করষি লাঙল,
দোষ গুণ কিছু না বুঝি কখন ;
পিতা, পিতামহ যুগ যুগ হতে,
চলিলা যে ভাৰে চলিব তেমন।
“ইহাতেও যদি সেনাপতি তব,
অবিচার কোনাে করেন হেথায়,
কাঙালশরণ ভগবান যিনি,
অনাথ ভাবিয়া হবেন সহায়।
যাও দূতবর, কহিও সে শূরে,
করিবেন তিনি যে হয় বিহিত ;
সনাতন মত করি পরিহার,
যাবনিক মতে হব না দীক্ষিত।”
“হব না দীক্ষিত” কহিল যােগীশ,
“সেনাপতি যিনি কহগে তঁাহারে,
তেজিব না দেবে, রহে যত দিন,
একটু শােণিত ধমনী মাঝারে।
পড়ে রবি শশী, পড়ক খসিয়া ;
ডুবুক ভারত ভারত-মাগরে ;

( ২৭ }
জীবন থাকিতে যাবনিক মত,
লইব না কেহ কৃষক নগরে।”
শুনি রাজদূত কহিলা সরােষে,
“খল সয়তান কঁাধে চাপে যার,
হিতবাণীকভু না শােনে অবােধ,
তােমরাও তাই বুঝিলাম সার।
এসেছি সাধিতে দেবতার কাজ,
কথায় না হয় সাধিব সমরে ;
বংশীনাদে যদি না পশে আনায়,
বধিব সে মৃগ বিষমাখা শরে।
“কোথা রবে তাের পূত বেদলিপি;
কি করিবে তাের ভূত ভগবান ;
শমন সােসর পটুগীজ সেনা
যবে সে সমরে ধরিবে কৃপাণ ?
পােড়াবে অনলে দেবালয় যত,
আছাড়ি ভাঙিবে মাটীর পুতুলে ;
যা বনিক মত বুঝিবি তখনি
যবে সে যবন চড়াইবে শূলে।”
১৪
এত কহি চলি গেলা দূতবর।
হেথায় কৃষক আমােদে অধীর ;

( ২৮ )
বাজে ঢাক, ঢােল, কঁাসর ঝাজর
চারু সহ কালি বিবাহ যােগীর।
কেহবা গাইছে, নাচিছে কেহবা
নাহি কার মনে বিষাদের লেশ;
বিরস বাসবভাবিছে সুধু সে
“অনল কৃপাণে ঢলাও সে দেশ।”
অনল ও কৃপাণ।
১
বিহায়স কোণে ডুবিল তপন,
কনকের থালা সাগরে যেমন ;
মেদিনী উরসে,
জোনাকী বালসে,
তারার মেখলাণ পরিল গগন।
২
কৃষক নগরে উৎসব অপার,
ঘরে ঘরে আলাে কুটীরে সবার;
কারু মুখে হাসি,
কেহ ফুকে বশী,
কেহ বা সংগীতে খেলিছে তার।
অাকাশ।
৫ চন্দ্রহার।

( ২৯ ) ,
এ সময় চারু কতই ভাবিছে ;
কতই হৃদয়ে ভাঙিছে গড়িছে ।
কভু গড়ে আশা,
কভু ভালবাসা,
নিরাশা সলিলে কভু বা ডুবিছে।
কালি হতে চারু কুমারী সে নয়,
কালি জীবনের নব অভিনয় ;
কালি নব ভূষা,
পরিবেন উষা,
নব দিনমণি হইবে উদয়।
৫
সােদর অধিক যােগীশ তাহার,
তারি সনে কালি বিবাহ বালার ;
আগেকার ভাব,
হবে তিরােভাব,
নব ভাব হৃদে খেলিছে দোহার।
যােগ দাদা বই জানিত না যায়,
কেমনে বরণ কুরিবে তাহায় ?

( ৩০ ০ )
বরমালা গলে,
দিবে যে কি বলে,
হানি বাজ অহাের লাজের মাথায় ?
৭
ভাবিয়া কুমারী মুদিল যেমন,
শতদলনিভ যুগল নয়ন,
ঘুমের আবেশে,
এলায়িত কেশে,
নারীরূপ এক করিলা লােকন।
এয়তি লক্ষণ শরীরে উহার,
সিদূরের ফোঁটা, শাখা শাড়ী আর ;
আসি যেন পাশে,
মৃদু মধু ভাষে,
কহিলা ভারতী অমৃতের ধার।
৯
“মা বলিয়া কোলে আয় যাদুমণি,
আমি অভাগিনী তােররে জননী ;
হেরিয়া তোরে,
সদা আঁখি বােরে,
নয়নের তারা তুইরে বাছনি।

( ৩১ )
“দুধের শিশুটী আছিলি যখন,
পাষাণীর মত তেজিনু তখন ;
হেরি আজ তােরে,
বিপদের ঘােরে,
আসিয়াছে এই কহিতে বচন।
১১
“কি ভাবিস, মনে বাছারে আমার,
এ ছার ভাবনা কর পরিহার।
জেনাে এই মনে,
সংসার কাননে,
শমন সোসর যোগীশ তােমার।
“সাবধান বাছা! জীবনের দায়,
ভুলে কাল সাপে ছুওনা উহায়;
করি হেয় বােধ,
মাতৃ-উপরােধ,
দেবতার কোপ লওন মাথায়।
বলিয়া যেমন বিলীন ললনা,
জাগিলা কুমারী চকিত-নয়না;

( ৩২ )
শুনিলা অমনি,
অসি ঝনঝনি,
সৈনিকের নাদ, সমর বাজনা।
১৪
শিয়রে জনক ডাকেন সৃঘন,
উঠো মা আমার কাঙালের ধন,
বিষম অরাতি,
পটুগীজ জাতি
মজাইল দেশ, কর পলায়ন।
১৫
উঠো চারুশীলা, যায় কুল মান,
জনমের মত করহ পয়ান ;
হা ধিক বণিক।
পিশাচ অধিক।
হা ধিক যবন। নিরেট পাষাণ ।
১৬
“উঠো মা আমার পরাণ পুতলি,
থাকুক জীবন যাউক সকলি।”
বলিতে বলিতে,
যুগল আঁখিতে,
সলিলের ধারা পড়িল উছলি।

১৭
শিহরিল চারু; যেন সহসায়,
আকাশ ভাঙিয়া পড়িল মাথায় ;
সুধিলা বালিকা,
“কোথা ধবলিকা,
কহ পিতঃ, এবে যােগীশ কোথায় ?
গরজিলা পিতা“কি চাহিস, আর ;
বাচো যদি দেখাে পথ আপনার ;
জানিনা যােগীশ,
গেছে কোন দিশ,
ধেনু ধবলিকা গােহালী মাঝার।
১৯
“কি চাহিস, বাছা! যায় জাতি মান।
ওই সেনাকুল ! ভীষণ-কৃপাণ!
হা ধিক্ বণিক।
পিশাচ অধিক ।
হা ধিক্‌ যবন নিরেট পাষাণ।”
২০
হেথায় সমরে সাজিল বহুল,
কৃষক যুবক যমদূত তুল;

( ৩৪ ) :
যবন নিপাত,
কিংবা দেহপাত,
ভাবি এই সার যুঝিল তুমুল।
২১
পটুগীজ সেনা সমরে করাল,
সাজোয়া শরীরে, করে অসি ঢাল ;
কৃষক সবার,
ভীম হাতিয়ার,
কুঠার, কোদালী, লাঙল, জোয়াল ।
২২
গরজিয়া দোহা যুঝিলা ভীষণ,
ভীম কোলাহলে পূরিল গর্গন;
খর করবলে,
লাঙলের ফালে,
উঠিল শবদ ঝন ঝনন।
রাধিল আহব* দেবের অতীত,
নদী কলকলে বহিল শােণিত ;
জয় পরাজয়,
চির কারু নয় ;
ক্ষণে কেহ জয়ী, ক্ষণেকে বিজিত।

২৪
আকাশের শশী গড়ায়ে পড়িল,
শত শত তারা ভাতিল নিরিল ;
শত শত বীর,
তেজিল শরীর ;
কৃষক-গরিমা অটল রহিল।
২৫
অবশেষে সেনা হতাশ হৃদয়,
তেয়াগিল অসি মানি পরাজয়।
তা দেখি কৃষক,
লভিলা পুলক
ঘােষিলা সঘনে ভারতের জয়।
২৬
জয় ভারতের, ধরমের জয়,
জয় কৃষকের, দেবতার জয় !
সে নিনাদ শুনি,
মনে শুভ গুণি,
দিল হুলহুলি কুলবতীয়।
২৭
তবে কেবারােল চাহি চারি দিক্‌,
গরজিলা ঘােরে “হা ধিক সৈনিক।
পটুগিজ সেনাপতি।

ধিক বীরপণা,
কৃপণ চালনা।
ধিক ও জীবন পশুর অধিক।
২৮
“পটুগীজ নামে কালী মাখাইলি,
লাওলের ভয়ে অসি তেয়াগিলি,
কেশরী হইয়া,
আপনা ভুলিয়া,
শৃগাল-সমরে পিঠ দেখাইলি।
২৯
“হাসিল ভারত, জগৎ হাসিল।
হাসি ওই শশী ঢলিয়া পড়িল!
যুনানী গৌরব,
হলো পরাভব,
গিরিচূড়া যেন কুলিশে ভাঙিল ।
‘চারি রণপোত ঝটিকার ভরে,
ডাইয়াস সহ ডুবিল সাগরে ;
তােরা কেন ছিলি,
কেন না ডুবিলি,
কেন না মরিলি জননী জঠরে ?
* পর্ট, গিজ পােধ্যক্ষ।

কি ছার জীবন অরাতি বিজিত,
দেবতা, দানব, পশুর স্মৃণিত।
রণে তেজি অসি,
মাখালি যে মসী,
নিজ ললাহে পুনঃ করহ ক্ষালিত।
৩২
“কি চাহিস্ ভীরু, কি ভাবি আর,
লহ পুনঃ ঢাল, খােল তরবার !
অনল শিখায়,
কররে সহায়,
কৃষক নগর হােক ছার খার।
০
শিশু কি রমণী না করে বিচার,
করিহ ভেদ পশুপাখী আর ;
কুটীর বা গােলা,
গােধূম কি ছােলা,
হুতাশনে দেও আহুতি সবার।”
৩৪
একে সেনাকুল হৃদয় কঠোর,
তাহে সেনানীর অনুমতি ছাের ;

স-অনল অসি,
ঘরে ঘরে পশি,
পৈশাচ আমােদে হইলা বিভাের।
ছেদনীর মুখে ওষধি যেমন,
বড় মুখে যথা কদলি-কানন ;
পড়িল তেমনি,
কত যে রমণী,
কতই বা শিশু কে করে গণন ?
কৃষকের বল টুটিল:এবার,
যেথায় সেথায় ঘাের হাহাকার ;
গােহাল বাগান,
ভীষণ-মশান।
কুটীর হইল কসাই আগার।
আকাশ পাতাল করিয়া গরাস,
লক লক শিখা ছুটিল হুতাশ;
নাদে সেনাদল,
ক্ষিতি টল মল ;
দিবি নাগ লােকে লাগিল তরাসি।
*
অগ্নি।
সর্গ।

( ০৯ )
৩৮.
গগাহাল, বাগান, ক্ষেত, বাড়ী ঘর,
সকলি আগুন চিতার সােসর ;
দেখিতে দেখিতে,
অনল অসিতে;
সাহারার মরু কৃষক নগর।
কালগতি ও কৃষক নগর।
১
কাল নিশি হল অবসান;
পূরবে উদিল ভানুমান ;
কেহ যায় কেহ আসে, কেহ কঁদে কেহ হাসে,
সংসারের এই তত বিধান।
বাদসাহ, ওমরা, আমির,
ধনী, মানী, কাঙাল ফকির ;
কালের কুটিল ঢেউ, নিবারিতে নারে কেউ,
আপনি বসুধা নতশির।
কোথা সে আদিম বেবিলন,
কারথেজ, মিসর, ইরাণ?
* ইরাণ-পারস্য দেশের নামান্তর।

( ৪ ) কোথা শুর হানিবাল, ডেরায়ুস মহীপাল, ফেরে নিকো, সিথ মহান্ ? কোথা ঝােম, কোথা সে গিরিস, যে নামে কঁপিত দশ দিশ ? কোথা নৃপ রমুলাস, মহাবীর হরেসাস ? সিজ, সােলন, উলিসিস ? ৫ অহাে ভারতের একি সাজ! কোথা সেই নৃমণি-সমাজ ? অবনীর অবতংস, কোথা ভানু-বিধু-বংশা কোথা সব মুনি ঋষি আজ? ৬ সুশাণিত কালের কুঠার, ভাঙিছে গড়িছে অনিবার ; সময়ে গিরির চূড়া, ভাঙি হয় শত গুড়া, মরুভূমে খেলে পারাবার। * হানিবাল কারখে দেশীয় সেনাপতি। ফেরে নিকো ও সিসমিসরীয় নৃপতিদ্বয়। ৫ নমুলাস-রোমের প্রতিষ্ঠাতা। হরেসাস-রোমীয় বীর, ইনি দুই জন মাত্র সঙ্গী লইয়া কুজিয়ামাজ পরসেনার সমূত্রবৎ সেনার বিরুদ্ধে টাইবর নদীর উপরিস্থ সেতু রক্ষা করিয়াছিলেন। জুলিয়স সিজর—রােমান সম্রাট। সোলন- গ্রীসীয় প্রসিদ্ধ ব্যবস্থাপক। উলিসিস-টুয়যুদ্ধকালীন গ্রীসীয় সেনাপতি।

( ৪১ )
৭
জীবন যৌবন যেন হায়,
জলধনু নভাে-নীলিমায় ;
অলকা সােপান সম, এই অতি চারুতম,
পুনঃ কোথা ক্ষণেকে মিশায়।
সুখ দুঃখ সুধু মায়াজাল,
ক্ষণে ভাটা ক্ষণেকে কটাল।
সময়ে শৃগালছানা, সিংহপুরে দেয় হানা,
ভিক্ষুবেশে ফেরে মহীপাল ।
কালি ছিল কৃষক নগর,
সুষমায় অমরা সােসর
আজিতে মশান তেহ, শববাপরি শব-দেহ,
রাশীকৃত শব তদুপর।
শকুনি, গৃধিনী করে নাট,
কেহ বা মারিছে পাখশাট;
কা, কা রবে যেন কাক, বাজাইছে জয়ঢাক,
শৃগাল কুকুরে মেলে হাট।
* কটাল-অমাবস্যা ও পূর্ণিমার প্রবল জলোচ্ছাস।

( ৪২ )
মণিজালে যীশুনাম আঁকা ;
পটুগীজ বিজয়-পতাকা ;
নাচিছে মৃদুল বায়; যেন আকাশের গায়,
মালাকারে উড়িছে এলাকা।
একবার পাঠক সুজন,
হেথা আসি কর দরশন;
করহ এ দশা দেখে, নয়ন নীরদ থেকে
এক ফোঁটা বারি বরিষণ।
এই রূপে কৃষক নগর,
হইল বিজন ঘােরতর ;
বাসব, যােগীশ, চারু, খোঁজ না মিলিল কারু,
একে একে চারিটি বছর।
নিষাদ ও গাভী।
ওই শুকতারা ডুবিল গগনে,
হাসিল পূরবে বালক ভানু ;

( ৪৩ )
মরি কি সুচারু নীল গিরি এবে,
ঝলিল গহন, শিখর, সানু।
কুলু কুলু রবে ঝরিছে ঝরণা,
খেলিছে দামিনী মেঘের কোলে ;
চায় মৃগশিশু বিলােল নয়নে,
গায় পিকবধু ললিত বােলে।
২
খেলে তরুশির মৃদুল মারুতে,
ছড়ায় সুরভি কুসুজালে,
বিলপিছে কে ও? উছলিল কার
দুখের সাগর এ সুখকালে ?
কে গাইছে ওই বিষাদের গাথা,
মেঘনাদ সহ মিশায়ে তান,
মেঘনাদ সহ গরজি গরজি,
অচলে অচলে ছুটিছে গান।
“হা ধিক, নিদয় বণিকের জাতি।
নাহিক হৃদয়ে করুণালেশ!
কি দোষে পামর ! সাধিলি এ বাদ,
অনল কৃপাণে ঢলালি দেশ ?
পতেঙ্গ উপরিস্থ সমতলভূমি।

( ৪৪ )
এই কি তােদের, জ্বালিলেন যীশু,
ধরমের আলো হৃদয় মাঝ !
এই কি তােদের লেখে বাইবেলে,
অনাথের শিরে হানিতে বাজ।
৪
ছিল না মোদের অসি ঢাল যদি,
আছিল তাে কঁচি কুঠারী, হল!
সমরকৌশল ছিল না যদিও,
আছিল তাে এই বাহুর বল!
ছিল না কি হয় কৃষক নগরে,
হাজারের মাঝে জনেক বীর ;
কোথায় আছিল যােগীশ পামর,
ছিল যদিও ধনুক, তীর।”
বলিতে বলিতে মনের আবেগে,
তুণ হতে এক বাছিয়া শর,
‘আরােপিলা যুব ধনুকছিলায়,
গরজিল তীর আকাশ পর।
অনিমেষ চখে চাহিলা যোগীশ,
দর-বিগলিত বহিল ধারা;
আবার সে গীত গাহিতে গাহিতে,
ছুটিল যুবক পাগল পারা।

( ৪৫
উতরিলা আসি, আসীনা যথায়,
তরুমূলে এক অতুল ধেনু ;
ফুকরিল গাভী, অমনি সে যুবা
ঝুলি হতে তুলি লইল বেণু।
বাজিল মুরলী যুগল অধরে,
বনবাসী সবে মােহিল তানে ;
মৃদুল মধুরে যেন সে বাঁশরী,
এই কটী কথা কহিল গানে।
৭
“ভালবাসা যদি শিখালে হে বিধি,
কেন ভালবাসা না কৈলে নিট ?
যদি বা কুসুমে গঠিলে হে বিধি,
কেন পুনঃ তায় সৃজিলে কীট ?
কেন নিরমিয়া চারু-আশা-লতা,
বিষ মেখে দিলে উহার ফলে.?
হাতে হাতে যদি তুলে দিলে চঁাদ,
কেন পুনঃ তায় হরিলে ছলে ?
“কোথায় সে চারু, ললিত-মূরতি,
যােগীশহৃদয়ে সুচির আঁকা ?

( ৪৬ )
কোথা সে নয়ন, তরল চাহনি,
কেশ-জলধর, বদন রাকা* ?
কোথা সে জনক, কোথা বা সে দেশ,
কোথা আমি জটা বাঁধিয়া কেশে,
ফিরি বনে বনে অচল, গুহায়,
ধনুঃ শর হাতে নিষাদবেশে।”
যােগিনী ও তাপস।
গভীর যামিনীযােগে ঘাটগিরিমূলে,
বিচরিছে মৃদু পদে রমণীমূরতি ;
গৈরিকবসনা বামা জটাভার চুলে,
নবীন যােগিনী কোন ষােড়শী যুবতী।
নীরব শিখর সানু, নীরব অচল,
নড়ে না একটী পাতা তরুবর-শিরে;
রজনীর গভীরতা ভাঙিছে কেবল,
যামে যামে যামঘােষ ফুকারি গভীরে
২
নীরবে চলিলা বা চাহি চারি ভিতে,
মানবের সায় সাড়া কোথা না মিলিল ;
* পূর্ণ চন্দ্র।
+ শৃগল।

( ৪৭ )
সহসা একটী আলো পাইলা দেখিতে,
সহসা নিদয় বিধি সদয় হইল।
নীরবে আলােক-শিখা চাহিয়া চাহিয়া,
পশিলা ললনা এক তাপস-শালায় ;
ভাষিলা তাপসবর বচন অমিয়া,
“আজি ভিখারিণী,দেব,অতিথি হেথায়।
সুধাইলা তপােনিধি উদাস নয়নে,
“দেবী বা দানব-বালা কে তুমি রূপসি ?
কমলা, শিবানী, শচী, তাই কি শােভনে,
ছলিতে এ অভাগারে নবীনা তাপসী ?
‘ক্ষম এ দাসীরে দেব, এ নহে দানব,
শিবানী, কমলা, শচী, নহে তাে পাপিনী,
মরত-বাসিনী আমি অধম মানবী,
অথবা পিশাচী এক মানবরূপিণী।”
৪
পুনঃ সুধাইলা ঋষি, “কহ সুলােচনে.
গভীর নিশীথকালে কে তুমি কামিনি!
নিবেদিল ভিখারিণী মৃদুল বচনে,
“যােগীশের যােগে আমি যৌবনে যােগিনী।”
যােগীশের নামে যোগী চাহিলা চকিতে,
কহিলা “মা চারুশীলা। তুইকি সে তবে?

( ৪৮ )
আয় মা”-বলিতে ধারা বহিল আখিতে,
সে মুখ নেহালি চারু চিনিলা বাসবে।
“আয় বাছা। করি কোলে তােরে একবার,
বারেক তাপিত হিয়া হউক শীতল ;
নিবুক, ও চাঁদ মুখ নিরখি বাছার,
তনয়-বিরহরূপ ভীষণ অনল।
এই কি মা,সাজে তােরে ? ফিরিছ যােগিনী,
গৈরিক বসনে ঢাকি কম কলেবর ?
কোথায় জনুক তব ? কহ সুহাসিনি,
কোথায় আছিলি এই চারিটী বছর ?”
“কোথায় জনক ? দেব, কি আর কহিব,
আকাশের কোলে জনক আমার ।
কোথায় ছিলাম ? পিতঃ, কত সে বলিব ?
গুহায় গহনে ছিল তনয়া তােমার।
যে দিন বণিক হায়, নিরেট পাষাণ ।
মজাইল নিরদয় কৃষকনগর,
আনিলা তরণী পিতা ; বাহিনু উজান,
সজোরে তটিনী বুকে তুলিয়া লহর।
৭
নিশি দিন তর তর বহিল তরণী,
সহসা ডাকিয়া বাণ ভার্সিল সে ঠাই,

জুবিলা তরণী সহ জনক আপনি,
দুখ দিতে অভাগীরে বাচাল গোসাই।
জানিবা আরাে কত আছে তার মনে,
জনম দুখিনী, বিধি, 'আমায় জিলা?”
বলিয়া চাহিলা চারু উদাস নয়নে,
কিবা যেন সুধাইতে আর না সুধিল ।
কাতরে কহিলা ঋষি বুঝিয়া আশয়,
“কি আর বলিব, বাছা, যােগাশের কথা;
চারিটী বছর আজি নিখোঁজ নয়,
চারিট বছর আমি মৃত জীব যথা।
যে দিন বণিক হয়, ভীষণ দহনে,
পীড়িল অনাথ সেই কৃষক-সমাজে,
একাকী যােবিলা বাছা শত যোধ সনে,
একাকী কেশরী যেন ফেরুপাল মাঝে।
৯
“অবশেষে পটুগীজ পিশাচ পামর,
অনলে সােণার ভূমি কৈলা ছার খার।
বাছার টুটিল বল, হইলা ফাপর,
খসিল সে কর হতে লাঙল কুঠার।
হায় তবে নিরুপায় নিঃসহায় ভাবি,
ক্ষত দেহে গেহে গেহে পাশল বাছনি,

বাঁচাইলা ক্ষীণজীব কত মেষ, গাভী,
কে গণিবে কত শিশু কত যে রমণী ?
‘অতঃপর পশি তর জনকের ধামে,
ভীষণ রাবণচিত হেরিলা সেখানে,
ছিল এক গাভী তব, ধবলিক নামে,
তাসহ ছুটিলা বাছা ঘাটগিরি পানে।
শুনিয়াছি এবে নাকি ঘাট পরিহরি,
বিচরিছে নীলাচলে নিষাদ-আকার।”
বলিতে বলিতে তনু উঠিল শিহরি,
ঝরিল মুষল ধারে নয়ন আসার ।
মণিহারা ফণিনী বা মেঘ-আশে
চাতকিনী।
তাপস কুটীর, পরিহরি আজ,
ওই বুঝি যায়, যােগিনী।
কে রােধিবে পথ ? মিলিতে সাগরে,
ধাইছে ছুটিয়া, তটিনী।
হেরিতে কেশবে, আলুথালু কেশ,
ধায় গােপকুল-কুমারী।

( ৫১ )
পাতকের ভাগী, কে হইবে বল,
কে রােধিবে পথ, উহারি
ধায় চারুশীলা, অচলের কোলে,
নীরদের কোলে, বিজুলি।
অয়স* পাথরে, টানিতেছে লােহা,
কে রাখিবে, পথ আগুলি ।
ধায় পাগলিনী, নীলাচল পানে,
নাহি বােধ দিবা-যামিনী ।
রােধ না উহার, বনচরগণ,
এ যে মণিহারা ফণিনী ।
ঝরে ঝর ঝর, দুনয়নে ধারা,
সুধাইলা বামা, সঘনে।
“কহ বনচর, দেখেছ কি তােরা,
হেথা এক যুবরতনে
দেখেছ কি তােরা—কি দিব তুলনা!
নাহি সে রূপের সমতা।
হাতে ধনুঃশর, তুণীর সে পিঠে,
নিষাদের বেশে দেবতা।
কহ বনচর, দেখেছ কি কেহ,
ফুল-ধনু জিনি মুরতি।
* চুম্বক পাথর।

( ৫২
>
*
ফুল-ধনু-ধনু , সে ভূরু যুগল,
আজানু সে ভুজ-আয়তি।
দেখেছ কি যুবা, আয়ত লােচন;
বিশাল উর পরিধি।
বলিতে বলিতে, শিহরিলা বামা,
উথলিল শােক-বারিধি ॥
“দেখেছ কি গভী, দেবধেনুনিভ,
তুহিন + সদৃশী, ধবলী।
সে দোহার তরে, তেজেছি সংসার,
আশা, অভিলাষ, সকলি ॥”
এই রূপে বামা, কঁাদিলা অচলে,
বনে বনে বনে, যােগিনী।
কাদিল শুনিয়", বিহগ বিহগী,
বনের হরিণ হরিণী ।।
এই রূপে চারু, কতই বছর,
ফিরিল গুহায়, গহনে।
হারা নিধি তার, না মিলিল তবু,
না হেরিল চাদ-বদনে
# কামদেবের ধনু।
* বক।

হতাশ ও আশা ।
১
ভুলিনু কি সেই দিন—সেই কালরজনী।
ঘুমের আবেশে যবে আদেশিলা জননী,
“ভুলিও সে কাল সাপে,”
আজিও হৃদয় কাপে,
এবেও শিহরে তনু ভাবিতে সে কাহিনী;
উপেক্ষিনু মাতৃ-বাণী আমি হতভাগিনী।
২
আপন পাসরি যারে ভাবি দিবা নিশিতে,
কেমনে ভুলিব পুনঃ, পারিব কি ভুলিতে ?
বিকাইনু যেই পায়,
জীবন সঁপিনু যায়,
কেমনে ভুলিব তায় তাই ভাবি মনেতে,
কেমনে মুছিব ছবি আঁকা হৃদি পটেতে?
কে মুছিবে ছায়াপথ আকাশের গায়েতে,
নিয়ত তুহিন ক্ষরে,
অযুত ঝরণা ঝরে,
কে মােছে কুলিশ-ক্ষত ধরাধর দেহেতে ?
কে মুছিবে মৃগরেখা সুধাংশুর কোলেতে?

( ৫৪ )
৪.
কেমনে ভুলিব হায়। পারিব কি ভুলিতে,
ভুলি নাই ক্ষণ যারে শৈশবের কেলীতে,
এ ঘাের বিপদ জালে,
ভুলিনি যৌবনকালে,
ভুলিব না সেই দিন—ধেয়াইব হৃদিতে,
মাটীর শরীর যবে মিশাইবে মাটীতে।
সে যদি ভুলিলাে মােরে, কেন নাহি ভুলিবাে ?
সে যদি তেজিলল, কেন তারে নাহি তেজিব ?
ভুলিবাে সে কাল সাপে,
আর না মজিববা পাপে;
মায়ের আদেশ যাহা আর নাহি হেলিবো,
ভুলিবাে সে কাল ফণী; ভুলিতে কি পারিব ?
৬
জীবম যােগীশ যদি অভাগীরে তেজিলে,
কি সুখ জীবনে আর, কি হইবে বাঁচিলে ?
বিফল যােগিনী বেশে,
ফিরিতেছি দেশে দেশে ;
কি ফল গৈরিক বাস, জটাভার বহিলে,
তেজিব পরাণী ওই উনুইর সলিলে।

( ৫৫ )
এতেক বিলাপ করি নীরবিল রমণী,
ডুবিয়া উনুই মাঝে তেয়াগিতে জীবনী,
যেমন নামিবে জলে,
শুনিলা আকাশ-তলে,
মৃদুল ভারতী এক অমৃতের নিছনী।
নিরাশ হৃদয়ে আশা উছলিল অমনি।
সহসা অচল যেন ঘােষিল এ কাহিনী,
“মরিবি কি চারুশীলা। মরিবি কি পাপিনি,
তেজিবি কি ভালবাসা,
জীবন যৌবন আশা;
ডুবিবি কি চির তরে, মরিবি কি পাষাণি !
একবার না হেরিয়া ও চরণ দুখানি।” .
৯
নিরাশ হৃদয়ে আশা উথলিল অমনি,
মরিতে বাসনা বামা পাশরিলা তখনি ;
তেগিব না ভালবাসা,
জীবন যৌবন আশা,
ডুবিব চির তরে, না তেজিব পৰাণী,
এক বার না হেরিয়া ও চরণ দুখানি।

* ( ৫৬ )
ঈশানী না পাষাণী ।
একে ঘাের অমানিশি গহন মাঝার,
ঘনীভূত তাহে পুনঃ কুহেলি আঁধার
ঘুমে অচেতন গিরি বিবশ শরীরে ;
বিবশ মা বসুমতী বাসুকীর শিরে।
এ হেন সময়ে চারু, হায়রে অভাগী,
খুজে ঠাই নিশীথিনী যাপিবার লাগি।
জুড়াইতে অভাগীর-বলিতে আপন,
নিখিল সংসারে ঠাই নাহিক এমন।
হতাশ নয়নে ধনী চাহি চারি ভিত,
হেরিলা দেউল এক পাষাণ-রচিত।
দীপিছে আলােক তায় দেউটী আকার,
ঝটিত চরণে চারু হৈলা আগুসার।
দেখিলা সে দীপ নহে, কিরীট উজালা,
রবি শশী জিনি তায় ঝলে মণিমালা।
বিরাজেন মহামায়া নীরদবরণ;
লােলিছে বিজুলী-নিভ ললিত রসনা।
সমরে সাজিয়া ভীমা নাচেন ঈশানী;
লুটায় চরণতলে দেব শূলপাণি।
নাহি জনসমাগম নিরজন পুরী ;
হেরিলা নীরবে বামা ও রূপ মাধুরী।

!
( ৫৭
৫৭}
সভয় ভকতি-যােগে কহিলা যােগিনী,
‘পূরও চারুর আশা ভবেশ-ভামিনী।
এতেক কহিয়া বামা নমিতে চরণে,
গরজিলা পাষাণী মা পাষাণ বদমে।
বিদারি আকাশতল কাপায়ে মহীরে,
ঘােষিল সে দৈববাণী জলদ-গভীরে
“দূর হরে পাপীয়সি! চলি যা ঝটিত,
কি কাজ পরশে পুরী করে কলুষিত।
ভাবি দেখ কালামুখি। সেই নিশি ঘােরে
ধরিয়া জননীরূপ আদেশিনু তােরে,
ভুলিতে সে কাল সাপে, না শুনিলি কাণে
মাতৃবাণী দৈববাণী হেলিলি গুমানে।
শােন্ তবে দৈব-বল থাকিলে মহীতে,
সে মহাপাপের ভােগ হইবে ভােগিতে।
এ ভাবে জনম তাের যাবে দুঃখ তাপে ;
যােগীশে না পাবি দেখা দেবতার শাপে।
এতেক কঠোর যদি কহিলা কালিকা,
চলিল কৃষক-বালা কনক লতিকা।
কাঁদিয়া কহিছে বাম “বুঝিলাম সার,
পাষাণ হইতে হিয়া পাষাণ তােমার।
যদিও কলুষ মাখা চারুর জীবন,
ক্ষম তারে ; কিংবা দেব ক্ষমায় কৃপণ ?”

( ৫৮ )
গভীরে আকাশ বাণী নিনাদে আবার,
“আহুতিস দেব-রােষে কেন বারংবার।
দেবের হইল ক্ষমা ; হেরিবি যােগাশে,
দংশিবে সে কালফণী মরিবি সে বিয়ে।”
নীরবিল দৈববাণী ; অহহ সে ভারতী,
বাজিল যােগিনী-বক্ষে কুলিশ যেমতি।
আকুলে কাদিল ধনী; জগৎ কাদিল,
কাদিয়া যামিনী সতী নীহার ঢালিল।
আপনি তিতিল। গিরি সেতত শিলাময়,
টলিল ঈশানীর পাষাণ-হৃদয়!
রোদন।
১
হায় মা পাষাণি। আজ একি বাদ সাধিলি,
ক্ষত দেহে কেন পুনঃ ক্ষারধারা ঢালিলি !
যে জন বিষাদে জরা,
আপনি মরমে মরা,
তাহারে বধিয়া আর কি পৌরুষ লভিলি ?
ক্ষীণজীবী চটকীর শিরে বাজ হানিলি।

( ৫৯ )
২
সংহার-কারণ শিব, তুমি তার ঘরণী
শিলাময় পিতা তব ; শিলা তুমি আপনি ;
ধরি করে খর অসি,
সমর-স্নগরে পশি,
পিয়িছ রুধির-ধারা কিবা দিবা রজনী ;
তাের ও হৃদয়ে দয়া থাকিবে কি কখনি ?
নিরেট পাষাণে যদি কোমলতা থাকিতে,
হিমানী তুষারে যদি শতদল ফুটিততা,
নীরস মরুতে যদি,
বহিত তরল নদী ;
অমার নিশীথে কভু শশধর ঝলিতাে ;
না জানি কতই ধরা সুখময়ী হইতাে।
৪
ফণীর থাকিতাে যদি হলাহল ধারণা,
কসাই বুঝিতে যদি বধের কি যাতনা ;
ফণী না ধরিয়া ফণা,
উগারিতে সুধা-কণা ;
কসাই তেজিততা ছুরী, জীব-বধ-বাসনা ;
অপাপ বসুধা হতো অমরার তুলনা।

তুই কি বুঝিবি ভীমা, বিরহীর যাতনা ;
দুখী বই কে বুঝিবে দুখীর যে বেদনা।
হুতাশন সােহাগায়,
কনক গলিয়া যায় ;
শিলা যে শিলাই রহে, সেতাে কভু গলে না ;
তােরও যে পাষাণ হিয়া গলিতে সে পারে না।
নিয়ত হৃদয় মন দহিছে যে দহনে,
কে বুঝিবে সে অনল দুখী তাপী বিহনে ?
চারুর দুখের সীমা,
তুই কি বুঝিবি ভীমা ;
বিরহ বিষম তাপ জানিবে সে কেমনে,
নিরবধি পতি যার লুটাইছে চরণে ?
৭
সংস্থার কারণ শিব ; তুমি তার গেহিনী ;
সৈনিক পিশাচ, দানা, সহচরী শকিনী ;
কৃপাণ ভূষণ যার,
উরসি নৃশির হার ;
অমার আঁধার জিনি বরণের নিছনি ;
তাের, ও হৃদয়ে দয়া থাকিবে কি কখনি ?

হরিষ ও বিষাদ।
এই রূপে চারু কতই কাঁদিলাে ;
এ ভাবে তাহার নিশি পােহাইললা ;
অগণন তারা,
হয়ে বিভা-হারা,
একে একে নভােনীলিমে মিশিলে।
২
ভাসায়ে মহীরে হৈম-কর-জালে,
হাসিলেন ভানু সুখ ঊষাকালে ;
উজলি গগন,
শোভে সে রতন,
সিদুরের ফোটা এয়ােতীর ভালে।
এই ছিল ধরা ঘুমে জড়সড়,
সহসা ভাঙিল সে মােহ নিগড় ;
জাগয়ে আকাশ ;
দিক পরকাশ;
জাগয়ে জগৎ জড় কি অজড়।
ডাকে ফিঙা শুক সুললিত অতি,
জাগেন ঈশানী শুনি সে আরতি ;

পাষাণ নয়নে,
চাহেন সঘনে,
চারু-পানে ভীমা পাষাণ-মূরতি।
নমি অসিতার রাজীব চরণে,
চলিলা যােগিনী সজল নয়নে ;
নিরখিয়া ধনী,
চকিলা অমনি,
ধেনুরূপ এক পূরব তােরণে।
দেখিলা গাভীর নয়ন ঝুরিছে ;
রসনাতে কার চরণ লেহিছে ;
শিলাশয়ী তেই,
ধূসরিত দেহ ;
ভূমে খসি শশী যেন বা লুটিছে।
৭
ধিকি ধিকি ধিকি জীবন যুবার,
নিবু নিবু দীপ চাহে নিৰিবার ;
কঁপে ঘন হিয়া ;
শলাকা ভাঙিয়া,
পিঁজরার পাখী চাহে উড়িবার।
* কালী দেবীর।

( ৩ )
তেজোহীন দুটী নয়নের মণি,
অনিমিক্‌ তায় চরম চাইনি।
বরফ-শীতল
শরীর বিকল :
ডুবু ডুবু যেন তুফানে উরণী।
ঘন গোফরাজি কপােলে যুবার ।
করে নখ পতি আয়ুধ আকার ;
উপাধানে কুণ,
শর, ধনু গুণ ;
কটিতে কৌপীন, শিরে জটাভার।
পারশে যুবার, ধুলায় ধূসর,
বেণু, ডাব, নল, অতসী পাথর ;
পারাবারে, যেহ,
ভাসায়েছে দেহ,
সে বিনা ভেলার কে করে আদর ?
বনবাসী যুবা; ইহা বই আর,
সহায় দোসর কি ছিল তাহার ।

( ৬৪ }
ছিল এক বটে,
ওই যে নিকটে,
দাঁড়াইয়া ধেনু সুরভি-আকার।
১২
আরও এ শরীরে ছিল ভুজবল;
বীরতা, ধীরতা ছিল এ সকল ;
নিয়াছে তা হরি,
পীড়া বিষধরী,
ভাবনা রাক্ষসী, বিধুহ অনল।
১৩
চিনিলেক চারু ধেনুরে তখন,
সেতাে ধবলিকা, যতনের ধন;
কাদিল যুবতী,
চিনি সে মূরতি,
সে যে যােগিনীর যােগীশমােহন।
১৪
নাহি সে যুবার ললিত মূরতি,
নাহি সে বিশাল উরস-আয়তি;
নাহি সেই শুচি,
কম মুখ রুচি;
তবে বা কেমনে চিনিলা যুবতী ?

অথবা যােগিনী কিসে পাসরিবে ?
যােগীশের রূপ কেমনে ভুলিবে ?
হােক দেহ শেষ,
এক গাছি কেশ,
বাকি যদি রহে, তবু সে চিনিবে।
*যােগীশ। যােগীশ ৷ যােগিনী ডাকিলাে।
“যােগীশ ! যােগীশ।” গিরি নিনাদিলাে !
বিকাশি নয়ন,
যােগীশ তখন,
সহসা সজোরে উঠিয়া বসিলাে।
নিরখি যােগিনী পুলকে পূরিলাে ;
নিরাশ হৃদয়ে আশা উছলিলাে;
বহুদিন পরে,
ক্ষণেকের তরে,
চারিটী নয়ন মিশিয়া হাসিলো।
১৮
একি, একি ?
পুনঃ সে অমৃতে বিষ উগারিলাে ।
পুনঃ সে হরিষে বিষাদ উদিলাে ।

( ৬৬ )
পুনঃ তেজোহীন,
নয়ন নলিন ;
পুনরপি যুবা ঢলিয়া পড়িলাে।
“চারু ! চারু ৷ চারু !!!” বলিতে যুবার,
শিলা সম ‘শীলা’ না সরিল আর ;
“শী-শী-শীল” বোলে,
চারুশীলা কোলে,
জনমের মত শুইলা এবার।
২০
নিবিতে দেউটী যেনরে ভাতিলো ;
জাতিয়া সে দীপ অমনি নিবিলাে;
ফুরাইলে লীলা ;
ঢলে চারুশীলা,
আশা বাসা তার আশু ফুরাইলে।
আকাশ ভেদিয়া কঁদিলা যােগিনী ;
দিল সে গাভী চির-অভাগিনী।
ঝরাইয়া ফুল,
কাদে তরুকুল ;
কঁদে বনদেবী, বন-বিহগিনী।

আক্ষেপ ও চিতা রচনা।
যােগশি তেজিল। তনু জনমের তরে;
চক্ষে বহে নীর-ধারা, ফণী যেন মণিহারা,
ভাসে চারু শােকের সাগরে।
মুখে সুধু হা হুতাশ, আলুথালু কেশ বাস,
দীনা বেশে লুটায় ধরণী ;
কাদে বামা বিনাইয়া, “হা নাথ,পাষাণ-হিয়া !
বিনা মেঘে হানিলে অশনি।
নাহি জানি তােমা বিনা; মাতৃহীন পিতৃহীনা,
আমি দাসী জনম দুখিনী ;
এ ঘাের বিপিনে হায়, তুমিও ঠেলিলে পায়;
কোথা দাঁড়াইবে কাঙালিনী ?
পতির ধরম এই, অভয় চরণ দেই,
অবলারে রক্ষিবে সদায় ;
নৃশংস! তুমি আজ, নিবিড় গহন মাঝ,
রিপু-মুখে তেজিলে জায়ায়! :
কোথায় যাইবে দাসী; বল কেবা কাছে আসি,
সদয়ে চাহিবে মুখ পানে ?
আপন বলিতে আর, কে আছে সংসারে তার,
বিধাতার কুটিল বিধানে।
রে বিধাতঃ নিদারুণ । হায় কি করিলে।

( ৬৮ )
।
কি দোষে সাধিয়া বাদ, পাড়িলি এ পরমদ,
ডুবাইলি অগাধ সলিলে।
দুঃখ লেখাে যার ভালে,সুখ নাহি কোন কালে,
শিলাময়ী লেখনী তােমার ;
এ তাের বিচার ভালাে; যারে না দেখাস আলাে,
তারে দিস্ কেবলি আঁধার।
দুঃখ রাশি আহরিয়া, ইলাহল মিশাইয়া,
পাপ-দেহ করিলি সৃজন;
মা বাপ হরিলি জোরে,যােগিনী করিলি মােরে,
পুনঃ তায় পতির নিধন!
নাহি গৃহ নাহি ঠাঁই, সহায় দোসর নাই,
একে একে করিলি বিলয় ;
ছিল যে বাঁধিতে বুক, আশা-লতা একটুক,
তাহাও ছিড়িলি নিরদয় ।
অথবা কি দোষ তাের, কপালে ঘটায় মাের,
হিতে কৈ বিপরীত বােধ ;
নৈলে কেন ডুবি পাপে, মজিলাম কাল সাপে,
উপেক্ষিনু মাতৃ-উপরােধ।
কি সাধ জীবনে বেচে; বিানুকে সাগর ঘেঁচে,
যদিও বা লভিলাম মণি ;
তুলিয়া পরিতে শিরে, দেবে বাম অভাগীরে,
পুনঃ ছলে হরিল অমনি।

( ৬০ )
আর লাগি দেশ, দিশি, কিবা,দিবা, কিবা নিশি,
সুখ দুঃখ না কৈ বিচার ;
গহন, শিখর, সানু, ঝটিকা, শিশির, ভানু,
সকলি করিনু একাকার।
যাহারে পাবার আশে, ফিরিনু গৈরিক বাসে,
শিরসি বহিয়া জটাজুট ;
হৃদয়ে বাধিয়া শিলা, সেও যদি তেয়াগিলা,
কি ছার জীন কালকূট ।
সপেছি যা যার হাতে,যা তা তাহারি সাতে,
চিতানলে ঢালিব পরাণী ;
'ভালে যদি থাকে লেখা, সুর লােকে হবে দেখা
পূজিব ও চরণ দুখানি।”
এত বলি নত শিরে, নমিয়া মা ঈশানীরে,
চিতা এক করিলা রচনা ;
রাখি শৰ তদুপরি, নিরখিলা চক্ষু ভরি,
হুতাশন দিলা সুলােচনা।
উপজিল ধূম রাশি, চকিল কানন-বাসী,
ধ ধকে ভাতিল হুতাশ ;
আচরিতে সতী-লীলা, সাজিলেক চারুশীল,
ধবলিক পাইল তরাস ।
* বিৰ।

*
বিদায় ওঁ চিতারােহণ।
“হা দেব তপন! মাতঃ বসুমতি।
যাই মা অসিতে, পাষাণ-মুরতি।
সাধিতে এবার পতি-ঋণ-দায়,
মরম-হুতাশ নিবাতে চিতায়,
আজি চারুশীলা,
কৃষক মহিলা,
তেয়াগিছে সুখে এ জীবন-লীলা ;
আশীষি সকলে বিদাও তাহায় :
কি সুখ তাহার বঁচিয়া ধরায় ?
দাও উলু যত বন-বিহগিনি;
সুখে কুলু কুলু, গাওলাে তটিনি।
বরষ বিটপ, কুসুম আসার,
ছড়াও পবন, সুরভির ভার ।
চাওলো হরিণি!
নাচলো শিখিনি,
জলদের কোলে খেললো দামিনি!
সুখ-সরে সবে দাওলাে সাঁতার,
সুখময় হােক নিখিল সংসার।

( ৭ )
;
সুখে দুখে তাের ; তােরা বই অরি,
অভাগিনী আমি, কে আছে আমার ?
বনে বনে বনে কেঁদেছি যখন,
দুখে দুখী হয়ে কাদিলি যেমন,
তেমনি আবার,
সুখেতে আমার,
উছলুক সুখ-জলধি সবার।
শুধামাখা হাসি হাসলাে সকলে,
কপুক অচল সুখ-কোলাহলে।
৪
হাসলো। লতিকা, তুরু-বিলাসিনি ;
পর ফুল-সাজ বিলাসে মেদিনি ;
ঝাপিছে যােগিনী ভীষণ চিতায়,
নয়ন ভরিয়া দেখলাে সবায় ;
আর না চাহিবি,
তোর না হেরিবি ;
চারু : কাণে আর না শুনিবি;
হেরবে চারু আর তাে সবায়,
জনমের মত করলাে বিদায়।
হা দেব তপন! মাতঃ বসুমতি।
যাই মা অসিতে, পাষাণ-মূরতি।

( ৭২ )
এই শেষ দেখা, আশীষে সবাই;
চল্পম সময়ে এই ভিক্ষা চাই,
অতুলিত ধন,
যােগীশ রতন,
জনমে জনমে করি নিরীক্ষা
ওচরণ যেন হিয়ায় ধেয়াই ;
অভাগীর আর অভিলাষ নাই।
ঘটিয়াছে মম মরি কি সুদিন,
জড় দেহ আজি হইবে বিলীন;
অমরতা লাভে পশি সুর-পুরী;
হেরিব পিতার ও মুখ-মাধুরী।
ডাকি, মা, মা, বােলে,
জননীর কোলে,
জুড়াব জীবন হরিষ বিভােলে
সংসার-যাতনা পন ন ..
পূজিব পতির চর
৭
বলিতে বলিতে, হাসিতে খেলিতে;
আকাশের পানে চাহিতে চাহিতে,
জুড়াইতে হিয়া পতি-পদতলে,
মিশাইতে তনু চিতার অনলে,

0
( ৭৩ }
ঝাঁপিলা যােগিনী,
ভুবনমােহিনী,
কৃষকের কুলে সুর-সােহাগিনী ;
নিবারিতে তায় কে আছে ভূতলে ?
কে আছে উহায় বাঁধিতে শিকলে ?
সংসারে উহায় কে আছে রােধিতে,
কে রােধে তটিনী সাগরে মিশিতে ?
পরাতে নিগড় কে আছে ভূতলে,
মদ-মাতােয়ারা করেণুর গলে ?
কে করিবে রােধ ?
জনমের শােধ,
দেখােরে শলভ পশিল অনলে।
কে দেখিবি তােরা দেখ চক্ষু খুলি,
অপরূপ শোভা সুন:
!
শত ? ** : :কাশ ,
ধক ধক ধ? দীপিল হুতাশ ;
হেরিতে কৌতুক বনচরদল,
চকিত নােচনে চাহিল সকল ;
শসায় অনল,
পাখী কল কল,

( ৭৪ )
পশুর নিনাদে কাপিল অচল ;
দেখিতে দেখিতে জনমের মত,
পতি সহ চারু রেণ পরিণত !!
খুলিল কােট সুরাসুর পুরে,
অমর বাজনা বাজিল মধুরে ;
যােগীশের সহ যােগীশ-বাসনা,
পশিবে অমরা তেই এ বাজনা ;
তেঁই সুর-বালা,
গাঁথি ফুলমালা,
বসিয়াছে দিক করিয়া উজালা;
পতি সহ যাই পশিবে ললনা,
পরাইবে গলে রবে না তুলনা !
গাভী ও
।
এইরূপে জীবলীলা করি সমাপনা,
পতি সহ সুরপুরী গেলা সুলােচনা।
আসি দেবগণ পথ লইলা আগুলি ;
মনসুখে দিবধূ দিলা হুলহুলি।

( ৭৫ )
আশীষি, দোহার গলে সুরের রমণী,
দোলাইলা ফুলহার বিনােদ-গাঁথনি।
বাজিল কাসর শাক গভীর ঘটায় ;
ললিত নূপুর বােলি নাটিকার পায়।
মধুরে বাজিল বীণা, মুরজ, বশিরী,
গায়িকা গাইল গীতি অমিয়-লহরী।
নেহারি অলকা ধামে সে সুখ-সমিতি,
পাইলা যােগীশ চারু পরম পীরিতি।
অনুপম শােভা কত দেখিলা সেখানে,
দেখে নাই চক্ষু যাহা, শােনে নাই কাণে।
একই নভসি ঝলে ভানু নিশাকর ;
সরােবরে কমলিনী কুমুদী সােসর।
একই বিপিনে খেলে কুরগ, কেশরী;
অহি-অপাপময়ী, অতুলা নগরী।
হেথা? অচলে ধেনু, শােকেতে আকুল;
বষ-মাখা শূল।
{ ঝরিল ;
• ৩ার পলক পড়িল।
শবে চাহিল গাভী চিতা-ভূমি পানে,
সাধের তরণী দুটী ডুবিল যেখানে।
সময় সময়, পােড়া উদরের দায়,
যদিও চরিতে গাভী যাইত কোথায় ।

. ( ৭৬
ক্ষণেকে সে চিতা-ভূমি ফিরিত আবার,
আবার ঝুরিত আঁখি বরিষার ধার।
হে পাঠক, মৃহীতলে দেখেছ কখন,
অলৌকিক দেব-ভাব পশুতে এমন ?
সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Krishak-bala

Author
Not Available
Title
Abhinaba Geeti Kabya
File name
Krishak-bala
Text
OCR done
Citation
1884
Published
2009/11/1
Publisher
Ashutosh Ghosh,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
92
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Lyrics
Keywords
Krishak-Bala
DLI number
512832
Barcode
4990010019868.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
sx90Jd4EHNn
Download PDF

Krishak-bala