Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kedar-badarir Pathe

Das,bireshchandra · 2010/03/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কেদার-বদরীর পথে।

প্রাপ্তিস্থান।
২৩৩ পঞ্চাননতলা বােছ, হাড়।
এম, সি, সরকার এণ্ড সন্স,
•এ হারিসান নােড, কলিকাতা।
গুম্বন্দাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
হাওড়া।
১নং পুরুষ্ট রোড, হাওড়া কুট কুটার
দি, টিউটোরিয়ান্স প্রেস হইতে মুঠি

কেৱ-বীর পথে।
শ্ৰীবীরেশচন্দ্র দাস, বি, এল,
প্রণীত।
এম, পি, সরকার এ সপ
৯.২এ হালিশন রোড, কলিকাতা।
মুল। দেড় টাকা যায়

পিতৃদেব স্বর্গীয় উমেশচন্দ্র দাস।

শাহার সেবায় সবগ্ন
যাহার কৃপায় সাক্ষাৎ স্বর্গ
মহার শ্রীচরণ সতী
স্বর্গীয় পিতৃ-দেবের
শ্রীপদে
অর্পিত হইল

No text on this page.

মুখবন্ধ। রেল কোম্পানির কৃপায় বাঙ্গালা দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা কাণীর প্রত্যেক অলিগলির সহিত পরিচিত। কিন্তু কেদারনাথ বা বদরীনাথ এখনও দুর্গম। সুতরাং অনেকেই ইচ্ছা করিলেও সাহস করিয়া এপথে বাহির হন না। ভগবানের ইচ্ছায় কেদারনাথ ও বদরীনাথ দর্শন করিয়া ফিরিয়া আসিলে বন্ধুগণ অনেকেই পথের কথা শুনিতে চাহেন। পূজ্যপাদ বন্ধুবর শ্রীযুক্ত হেরম্বচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বি, এল, ও শ্ৰীযুক্ত অন্নদাপ্রসাদ ঘােষ বি, এল, মহােদয়গণের আগ্রহে তাহাদের নিকট এ বিষয় গল্প করি। তাঁহারা গল্প শুনিয়া সন্তুষ্ট হইয়া এই বৃত্তান্তটি সাধারণের নিকট প্রচার করিতে বলেন। তাহাদের ইচ্ছানুসারেই এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানি প্রকাশিত হইল। ইহাতে এই দুর্গম প্রদেশে আমরা যেমন করিয়া গিয়াছি তাহাই যথাসাধ্য সরলভাবে বর্ণনা করিয়াছি। আমি কবি নহি, সাহিত্যিক নহি সুতরাং পাঠকগণ আমার এই পুস্তকে ভাষার লালিত্য বা পারিপাট্য দেখিতে পাইবেন না। আমি কল্পনার সাহায্যে কোন বিষয় অতিরঞ্জিত করিতে চেষ্টা করি নাই বরং অনেক স্থলে ক্ষমতার অভাবে অনেক কথা ভাল করিয়া বুঝাইতে পারি নাই। এই ক্ষু পুস্তকখানি পড়িয়া যদি কাহারও হৃদয়ে এই পবিত্র তীর্থসকল দর্শনের স্পৃহা বলবতী হয়, অথবা পথের কথা জানিয়া কে কোন উপকার প্রাপ্ত মন আমার সকল পরিশ্রম সার্থক হইয়াছে মনে করি।

পুস্তকখানি লিখিবার সময় Garhwal District Gazetteer হইতে
অনেক সাহায্য পাইয়াছি। মুদ্রাঙ্কণের সময় বন্ধুবর শ্রীযুক্ত হরিধন কুণ্ডু
ও প্রযুক্ত রাজেন্দ্রনাথ সােম বি, এল, অনেক সাহায্য করিয়াছেন। আমি
তজ্জন্য তাহাদের নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞ।
কেদারনাথের পাণ্ডা শ্ৰীযুক্ত তুলসীরাম উমাশঙ্কর ও বদরীনাথের
পাণ্ডা শ্ৰীযুক্ত কৃষ্ণভট্ট কৃপা করিয়া আমাদের ভগবান দর্শনের যে সহায়তা
করিয়াছিলেন ও যেরূপ যত্নের সহিত আমাদিগকে রাখিয়াছিলেন তাহা
জীবনে কখন ভুলিব না।
২৩৩নং পঞ্চাননতলা নােড়,
হাওড়া।
১লা আষাঢ়, ১৩২৮।
বীরেশচন্দ্র দাস।
।

সুদীপত্র। ••• ••• কেদার। হরিবার লছমনবােলা দেবপ্রয়াগ শ্রীনগর রুদ্রপ্রয়াগ . . . এ এ এ ৮ ০ + * * * । • ৪২ ৫০০ । . ও । । s ••• . ৪ ০ । • • ০ ০ ০ ৫০ ১২৫ কেদারনাথ বদরী। লালসাঙ্গা বা চামেলী জোশীমঠ বদরীনাথ ফিরিবার'পথে। কর্ণপ্রয়াগ মেহেলচৌরী •• রামনগর পরিশিষ্ট। যমুনােত্তরী গঙ্গোত্তরী ভটবাড়ী হইতে ত্রিযুগীনারায়ণ টিহরি হইতে নগর কালীকলিওয়ালা ০ ০ ০ ৫ ০ ... • ১৪৩ ০ ০ ০ ••• ১১ ১৪ ১৪৫ . * ১৪

No text on this page.

एकप्तान.

No text on this page.

কেদার বদরীর পথে কেল। == দেবাদিদেব মহাদেবের অনুকম্পার আজ আমার অনেক দিনের আকাঙ্ক্ষা বুঝি ফলবতী হইতে চলিল। যে দেবভুমির কথা লােক মুখে শুনিয়া তাহা দেখিবার জন্য কতদিন কতই না ব্যাকুলতা অনুভব করিয়াছি, কালিদাস প্রভৃতি মহা মহা কবিগণের লেখনী প্রসূত কাব্যসকল যে পূণ্যভূমির কত মনােহর চিত্র কতবার নয়নসম্মুখে ধরিয়া হৃদয়ে কতই আননস ঢালিয়া দিয়াছে—সেই লোকোত্তর দেবভূমির অনন্ত সেনব্য উপভােগ করিবার কত বাসনা মনে জাগাইয়া তুলিয়াছে, আজ পৃথিবীর মানদণ্ডস্বরূপ পূর্বাপর সাগরাবগাহী দেবতাত্ম সেই নগাধিরাজ বুঝি আমাকে সত্যসত্যই দেখা দিবেন।

কেসার বদরীৰ পথে। হৃদয়ে নিত্য যে সকল আশার উদয় হয়, তাহাদেয় অধিকাংশ অচিরে জলবুদের ন্যায় হৃদয়েই বিলীন হইয়া যায়। জীবনে কত আশা, কত কল্পনা করিয়াছি—ত আশা কত কল্পনা গড়িয়াছি, আবার পরক্ষণেই ভাঙ্গিয়াছি, তার সংখ্যা নাই। কি জানি কেন আজ ৬ কেদারনাথ ও ৮ বদরীনাথ এ অধমকে ডাক দিয়াছেন। আজ অনেক দিনের আশা, অনেক দিনের কল্পনা বুঝি বা সফল হইতে চলিল। শরীর রুগ্ন। সম্প্রতি রােগে ভুগিয়া এখনও দেহে যথেষ্ট বল পাই নাই। অখ্রীয় স্বজন সকলেই, এমন কি শ্ৰীমান সুরেশ ভাষাও নিষেধ করিলেন কিন্তু ভগবানের নিয়ােগ। ৮ কেদারনাথ ও ৩ বদরীনাথের ডাক আমায় হৃদরে এমন একটা ব্যাকুলতা জন্মাইয়া দিল, যে আত্মীয় বন্ধু বান্ধবের অনুবােধ অগ্রাহ্য করিয়া ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া যষ্টির উপর ভর দিয়াই গৃহ হইতে বাহির হইয়া পড়িলাম। ১৩২৬ সালের ২০শে বৈশাখ শনিবার শুক্লা চতুর্থী—আমায় জীবনের একটি শুভদিন। যে কয়টা দিন এই দুর্বহ জীবনভার বহন করিব, এই শুভদিনের কথা কখনও ভুলিব না। দিবা ১টার সময় যে একখানি এক্সপ্রেস গাড়ি হাওড়া স্টেশন হইতে ছাড়ে তাহাতেই যাত্রা করিব স্থির করিয়া, অতি প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগের পর হইতে প্রস্তুত হইতে লাগিলাম। কলের মত সমস্ত কাৰ্য শেষ করিয়া ফেলিলাম। মঙ্গল ঘট প্রণাম করিয়া মাতৃদেবীর চরণ বন্দনা পুৰ্ব্বক বাহির হইলাম। পিতৃদেব এক্ষণে স্বর্গে, তাহার চরণ বন্দনা আর ভাগ্যে ঘটিলনা। তাহাকে স্মরণ করিয়া গৃহ হইতে বাহির হইলাম। মাতাঠাকুরাণী,দিদিঠাকুণ, ও ছােট ল্প মান খগেশ চন্দ্র সঙ্গী হইলেন। বাহির হইয়া বন্ধুর শ্রীযুক্ত হরিদ্বার। লীলামন্দ ভায়ার দর্শন পাইলাম। তিনি অধমকে আশীৰ্বাদ করিতে আসিয়াছেন। তঁাহাকে যথারীতি প্রণাম করিয়া ১০টা ২০ মিনিটের সময় ষ্টেশন অভিমুখে যাত্রা করিলাম। যথা সময়ে ষ্টেশনে আসিয়া গেছিলাম। ভায়াকে টিকিট ক্রয় করিবার তার দিয়া সােদর-প্রতিম এযুক্ত জ্ঞানেন্দ্র ভায়ার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইলাম। মাতাঠাকুরাণী যাইতেছেন শুনিয়া জ্ঞানেন্দ্র ভাষা তাড়াতাড়ি বিশ্রামকক্ষে (waiting room) আসিলেন। ভায়া তখনও টিকিটের জন্য টিকিট দরজায় দাঁড়াইয়া, তথনও টিকিট পান নাই। মেম- সাহেব এখন হইবে না বলিয়া জবাব দিয়াছেন। একের পর এক সকলেই টিকিট পাইতেছেন, কিন্তু ভায়ার ভাগ্যে মিলিতেছেনা। অবশেষে বােঝা গেল মেম সাহেব ইষ্ট ইণ্ডিয়ান রেলের ষ্টেশন গুলির জন্য টিকিট দিতে কোন আপত্তি করিতেছেন না। কিন্তু অন্ত রেলের কোন ষ্টেশনের জন্য টিকিট চাহিলেই দাড় করাইয়া রাখিতেছেন। অগত্যা জ্ঞানেন্দ্র ভায়াকে টিকিট দরজায় উপস্থিত হইতে হইল। টিকিট পাইয়া মাতাঠাকুরাণী ও দিদিঠাকুরাণীকে স্ত্রীলোকের জন্য নির্দিষ্ট কামরাতে বসাইয়া দিয়া আমরা অপর একটি কামরা দখল করিলাম। ক্রমে ক্রমে কামরাটি পূর্ণ হইয়া গেল। দুই চারিজনের বেঞ্চে বসিবার স্থান মিলিল না। তঁাহায়া কোনরূপে যাত্রীদের বাক্সের উপর বসিবার বন্দোবস্ত করিয়া লইলেন। নির্দিষ্ট সময় আসিয়া উপস্থিত হইল। গাড়ীর দিকে চাহিয়া দেখিলাম ১টা বাজিতে ৫মিনিট-টং টং করিয়া আরােহীদিগকে সতর্ক করিবার জন্য ঘণ্টাধ্বনি শােনা গেল। পাঁচ মিনিট পরে পুনরায় গাড়ী ছাড়িবার ঘণ্টা হইল। গাড়ী ছাড়িয়া দিল।

কেদার বদরীর পথে। পুত্র মান বাসন্তীকুমার বিদায় দিতে আনিয়াছিল, মাতাঠাকুরাণীর নিকট আশীৰ্বাদ লইয়া প্রত্যাবর্তন করিল। ষ্টেশন হইতে বাহির হইয়া গাড়ি পূর্ণ বেগে চলিতে লাগিল। প্রথমেই লিলুয়া অতিক্রম করিল। গাড়ি এখানে দাঁড়াইল না। এই লিলুয়া কিছুদিন পূর্বে অসংখ্য বৃক্ষরাজির অন্তরালে আত্মগােপন করিয়া সাধারণের অপরিচিত সামান্য একটি গ্রাম ছিল, কিন্তু রেলওয়ে কোম্পানীর প্রসাদে এক্ষণে নয়নানন্দদায়ক সৌধ-রাজি-শােভিত একটি পরিপাটী মনােরম নগরে পরিণত হইয়াছে। এখানে (Bengal Humanitarian Association) বঙ্গীয় জীবদয়া প্রসারিণী সভার গােশালা একটা দেখিবার জিনিস। দুগ্ধ সকলেরই নিত্যপ্রয়ােজনীয় বস্তু। খাদ্যাদির মূল্যা- বিক্য এবং বসতবাটীর মধ্যে গােশালার স্থানাভাব বশত: অধুনা কলিকাতায় কিম্বা সহরতলিতে গরু রাখা মধ্যবিত্ত লােকদিগের পক্ষে অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। গােয়ালার দুধ আদৌ স্বাস্থ্যকর নহে। এই রূপে কলিকাতা অঞ্চলে সম্প্রতি বিশুদ্ধ দুগ্ধের নিতান্ত অভাব হইয়া পড়িয়াছে। বিশুদ্ধ দুগ্ধের অভাব শিশুদিগের অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ, ইহা সকলেই স্বীকার করিবেন। ভাল দুগ্ধ পাইতে হইলে গরুর স্থ্যের দিকে দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। গাভীগণের স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং বাতাসের - শুদ্ধ তার উপর অনেকটা নির্ভর করে। খােলা জায়গায় বেড়াতে না প: লৈ গরুদিগকে সুস্থ রাখা একেবারেই অসম্ভব। এই জন্য বেঁ এক এ.মে গােচারণের ভূমি ছিল। কিন্তু এক্ষণে জীবন|ংগ্রামে সেই সব গােচর লুপ্ত হইয়াছে। গ্রামে গ্রামে পূর্বের ন্যায় গােচারণের • ' র দেখতে পাওয়া যায় না। সামান্ত লাভের প্রত্যাশায় আমরা * '' তে র মপি । “ সকল নর আক্ষে হরিদ্বার। প্রচ্ছন্নভাবে আর বেড়াইতে পায় না। নব নব তৃণ আর তাহাদের ভাগ্যে ঘটে না। শুষ্ক খড়ে তাহাদের উদর পূরণ করিতে হয়। অগত্যা দুগ্ধের পরিমাণ হ্রাস হইয়া যাইতেছে। এই অভাব দুরীকরণ বঙ্গী জীবদয়া প্রসারিণী সভার মুখ্য উদ্দেশ্য। দুগ্ধ বন্ধ হইলে সহরে গরু রাখা বড়ই ক্ষতিকর। বঙ্গীয় জীবদা প্রসারিণী সভা এখানে গােচারণ মাঠের বন্দোবস্ত করিয়াছেন। যে সকল মাভী দুগ্ধ দেওয়া বন্ধ করিয়াছে এই সভা তাহাদিগের ভার লইয়া থাকেন। সামান্য মাত্র খরচ লইয়া সেই সব গাভী ইহাদের গােশালায় রাখিয়া থাকেন। দিবাভাগে গাভীসকল স্বচ্ছলে মাঠে চরিয়া বেড়ায়। রাত্রিতে সভার বড় বড় আটচালাতে আশ্রয় ও প্রচুর স্বাস্থ্যকর খাদ্য পাইয়া থাকে। হৃষ্টপুষ্ট বৃষেরও বন্দোবস্ত আছে। প্ৰসৰ হইবার অব্যবহিত পূর্বে বা পরে মালিকদিগের ইচ্ছা অনুধারে সভ্যগণ তাহাদিগের স্ব স্ব গাভীগুলি ফিরাইয়া দেন। ইহাতে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের যে কত সুবিধা হইয়াছে তাহা বলা যায় না। এইরূপ সভা গ্রামে গ্রামে হওয়া উচিত। আমরা লেলুয়া বেলুড় অতিক্রম করিয়া হাওড়া-বর্ধমান নূতন কর্ড লাইনে পড়িলাম। গাড়ী কোথাও থামতেছে না, দ্রুতবেগে ছুটিতেছে। গ্রামের পর গ্রাম, প্রান্তরের পর প্রান্ত অতিক্রম করিয়া তারকেশ্ব রেলপথের নিম্ন দিয়া আমরা শেষে শক্তিগড় রেলওয়ে ষ্টেশনের নিকট প্রধান রেলপথে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। বর্ধমানে গাড়ী থামিলে কিছু মিহিদানা ও সীতাভােগ সংগ্রহ করি লইলাম। বর্ধমান ছাড়িয়া রাণীগঞ্জ, এসেলে প্রভৃতি কয়লার খনিপ্রধান স্থানের উপর দিয়া দূর হইতে খনিগুলির বাহিরের মূর্তি এবং বড় বড় কেদার বদরীর পথে। চিনি ও কয়লা তুলিবার যন্ত্রগুলির চেহারা দেখিতে দেখিতে সীতারাম’ পশ্চাতে রাখিয়া এ্যাও কর্ডে প্রবেশ করিলাম। সূর্যদেব অস্তাচলে গমন করিয়াছেন। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। কিছু পূৰ্বে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। মাঠ ঘাট সবই অন্ধকারময়। গাড়ীতে তখনও আলাে দেওয়া হয় নাই। গাড়ীর অভ্যন্তর অন্ধকারময়। এইরূপ অবস্থায় ধানবাণ ষ্টেশনে পৌছিলাম। ধানৰাদ একটি বড় ষ্টেশন। রেলওয়ে কোম্পানির অনুগ্রহে ধানবাদ সহরে পরিণত হইয়াছে। এখানে গাড়ীতে আলাে দেওয়া হইল। সকলেই প্রফুল্ল হইলেন। সুবিধামত শয়ন করিবার মত একটু স্থান করিয়া লইলাম। কিঞ্চিৎ জলযােগের পরে নিদ্রাদেবীর কোমল ক্রোড়ে আশ্রয় পাইলাম। গাড়ী ছুটিতেছে। পরেশনাথ পাহাড়ের পাশ দিয়া ছােট নাগপুর মালভূমি পার হইয়া গুজিয়ারি সন্নিকট দুই একটি সুড়ঙ্গ ( টনেল) ভেদ করিয়া রাত্রি অনুমান দুইটার সময় গাড়ি গয়া ষ্টেশনে দাঁড়াইল। আরও দুই একটা ষ্টেশনে দাড়াইয়া গাড়ি যখন কুদ্রা ষ্টেশনে পৌছিল তখন পূর্ব দিক পরিষ্কার হইতে আরম্ভ হইয়াছে। মােগল সরাই ষ্টেশনে পৌছিতে প্রায় সাড়ে সাতটা হইল। গাড়ী হইতে অবতরণ করিলাম। এখানে গাড়ী পরিবর্তন করিতে হইবে। তাড়াতাড়ি সকলে স্নান করিয়া লইলেন। খরমুজ, পেড়া খারা কিঞ্চিৎ জলযােগ করিয়া আউল বােহিলখণ্ড রেলের মেল ট্রেনে আশ্রয় লওয়া গেল। গাড়ীগুলি পরিষ্কার। ভিড় কম। ১৫ মিনিটে গাড়ী ছাড়িয়া দিল। পুন্যতােয় জাহ্নবীর উপরিস্থিত লৌহময় সেতু হইতে ৬ বারাণসী ধামের পবিত্র দৃশ্য দেখিতে দেখিতে ভাগিরথী পার হইলাম। গাড়ী বারাণসী কেন্টমেন্ট ষ্টেশনে পৌছিলে দুই এক জন যাত্রী আমাদের গাড়ীতে আসিলেন। ক্রমে প্রতাপগডু, রায়বেরেলি, হরিদ্বার। লক্ষৌ, সাজাহানপুর মুরাদাবাদ প্রভৃতি যুক্ত প্রদেশের প্রধান প্রধান সহরগুলি অতিক্রম করিয়া রাত্রি অনুমান ২ ঘটিকার সময় লৰ জংসনে গাড়ি হইতে অবতরণ করিলাম। এখানে হরিদ্বারাভিমুখী অঞ্চ একখানি গাড়িতে উঠিতে হইবে। গাড়ী সম্মুখের প্লাটফর্মেই অপেক্ষা করিতেছিল। একটি কামরায় আমরা সকলে উঠিলাম। এখানেও ভিড়। কম। লসর হইতে যাত্রা করিয়া ২২শে বৈশাখ অতি প্রত্যুষে হরিদ্বার ষ্টেশনে উপস্থিত হইলাম। এখানে বেশ শীত অনুভূত হইল। ষ্টেশনটা অন্ধকারময়। আলাের বন্দোবস্ত নাই। গাড়ী হইতে নামিয়া বাহিরে আসিয়া দেখিলাম আমাদের পূর্ব পরিচিত ভার্চদ দাড়াইয়া। তারাচঁাদ * কেদার নাথের একজন পাণ্ডার কর্মচারী। বৎসর খানেক পূর্বে তাহার সহিত আলাপ হইয়াছিল, তাহার মুখে কেদারনাথ ও * বদরীনাথ সম্বন্ধে অনেক কথা শুনিয়াছিলাম। তাহাকে দেখিতে পাইয়া মনে বড় আনন্দ হইল, হৃদয়ে যেন বল পাইলাম, ভাবিলাম ভগবানের দয়া অসীম। এই দুর্গম প্রদেশে কে পথ দেখাইবে সময়ে সময়ে এইরূপ একটা ভাবনা মনের মধ্যে উঠিতেছিল। এতক্ষণ বুঝিতে গারি নাই, ভগবান তাহার বনােবস্ত অনেক আগেই করিয়া রাখিয়াছেন। বাহার কৃপা ব্যতিরেকে মানুষ যে এক পাও অগ্রসর হইতে পারে না ইহা আমরা অনেক সময়েই ভুলিয়া যাই। আমরা ভুলিলেও তিনি তত এদিনের জন্যও ভুলেন না। তারাচঁাদকে দেখিয়া ভগবানের অসীম করুণার কথা স্মরণ করিয়া বলিলাম, প্রভাে কি সম্পদে কি বিপদে যখনই পথ ভুলিয়া যাই তখনই নে আপনার ইঙ্গিতে সুপথ চিনিয়া লইবার সুযােগ পাই। দুইখানি অশ্যন ঠিক করা হইল। নিদ্রিত সহরের মধ্য দিয়া কুনু কুলুনাদিনী পুণ্যতােয়া সুরধুনী তটে উপস্থিত হইলাম। সমস্তই নিস্তব্ধ। ৭ কেদার বদরীর পথে। সকলেই নিদ্রামগ্ন। রাস্তায় লােক জন নাই। পূর্বপরিচিত শ্রীযুক্ত প্রতাপ পাতা সাননে আমাদিগকে একখনি ঘর দেখাইয়া দিলেন। ঘরটি গঙ্গার উপরেই। গঙ্গার সুশীতল সমীরণে আমাদিগের ক্লান্তি যেন একেবারেই দূরীভূত হইয়া গেল। আমরা যেন নূতন জীবন লাভ করিলাম। পূৰ্বদিক ক্রমে ক্রমে পরিষ্কৃত হইয়া আসিল। পক্ষী সকল নিজ নিজ কুলায় ত্যাগ করিয়া আহার অন্বেষণে বাহির হইল। দিনমণি যেন সকলকে ডাকিয়া বলিতে লাগিলেন “উত্তিত জাগ্রত প্রাপ্য রান্নিবােধত”। সে ডাক আমরা সকলে বুঝি না, সে ডাক আমরা সকলে শুনিতে পাই না। আমরা জ্যোতির্ময়ের অনন্ত বিকীর্ণ জ্যোতিরাশিতে নিমজ্জিত থাকিয়াও মােহনিদ্রাভিভূত হইয়া তাহার সন্ধান পাই না। জ্যোতিঃপুঞ্জ মধ্যে ওতঃপ্লত হইয়াও ঘাের অন্ধকারের বিভীষিকা দেখিয়া থাকি। আমরা জড়ের ন্যায় নিশ্চেষ্ট। পঙ্কিল হ্রদে পড়িয়া হাবু ডুবু খাইতেছি। আমাদিগের সে উদ্যম নাই, সে সাহস নাই যে ক্ষণেকের নিমিত্ত গা ঝাড়া দিয়া উঠিবার চেষ্টা করি। স্নান করিবার জন্য সকলে বাহির হইলাম। গঙ্গার স্বচ্ছ নীল জল দেখিতে দেখিতে স্নানঘাটে আসিয়া পৌছিলাম। অল অত্যন্ত ঠাণ্ডা বুঝি বরফ অপেক্ষাও ঠাণ্ডা। হাত যেন কাটিয়া লইতেছে। শরীরে অসুস্থতা নিবন্ধন অবগাহন স্নান ভাগ্যে ঘটিল না। সােপানের উপর বসিয়া গাত্র, মস্তক পবিত্র জলে ধৌত করিয়া লইলাম। শরীর জিয় হইল। নিৰ্ম্মল জলে অসংখ্য বড় বড় মৎস্যের স্বচ্ছল বিহার দেখিত বড়ই সুন্দর। সােপান শ্রেণীর উপরিস্থিত দেব দেবী সকলকে প্রায় করিয়া বাসায় ফিরলাম। মধ্যাহ্ন আহারের বন্দোবস্ত হইতে লাগি। হরির একটি ছােট খাট সহর। এখানে কিছুরই অভাব নাই।

হরিদ্ধার। তারাদ আসিয়া উপস্থিত। কিরূপে যাইতে হইবে তাহার কথাবার্তা হইতে লাগিল। ৮ কেদার নাথ ও বদরীনাথ যাইতে হইলে আমাদের দেশের মত পাল্কী, ডুলি, গােশকট বা অশযান প্রভৃতি কোন প্রকার যান পাওয়া যায় না। তৎপরিবর্তে কাণ্ডি, ঝাপান, ও দাণ্ডি প্রভৃতি যানের প্রচলন আছে। অশ্বারােহনেও যাওয়া যায়। ঐ সকল যানাদি এখানে কিম্বা হৃষিকেশে পাওয়া যায়। সঙ্গের জিনিষ পত্র বহন করিবার জন্য কুলিও এই সব স্থানে সকল সময়ে উপস্থিত থাকে। কাণ্ডী এক প্রকার ঝুড়ি। ইহা একজন কাণ্ডীওয়ালা পৃষ্ঠে বহন করে। আরােহীকে সেই ঝুড়িতে বসতে হয়। ঝপান বসিবার উপযােগ একটি খাটুলি মাত্র। বাঁশ ও দড়িতে নির্মিত, চারি জনে বহন করে। দাণ্ডি বসিবার চেয়ারের মত, ইহাও চারিজনে বহন করিয়া থাকে। ইহাদের পারিশ্রমিকের কোন বাধাবাঁধি হার নাই। সময় সময় হারের হ্রাস বৃদ্ধি হয়। কাণ্ডি- ওয়ালারা ৪০ হইতে ৬০ টাকা পৰ্য্যন্ত চাহিয়া থাকে। ঝাঁপানিওয়ালারা চারি জনে ১২০ হইতে ২০০ টাকা পর্যন্ত চাহিতে কুণ্ঠিত হয় না। দাণ্ডি- ওয়ালাদের দাবী ঝাপানওয়ালাদিগের মত। তবে দাণ্ডিটি ক্রয় করিতে হয়। ইহার মূল্য ২৫ টাকা হইতে ৫০ টাকা। ভার বহনকারীদিগের পারিশ্রমিক এক্ষণে মণ করা ৪৫। ইহারা হরিদ্বার হইতে রওনা হইয়া কেদারনাথ ও বদরীনাথ দর্শন করাইয়া গাড়ােয়াল জেলার প্রান্তসীমায় মেহেলচৌরি নামক স্থানে পৌছাইয়া দেয়। গাড়ােয়ালী কুলিরা গাড়ােয়াল জেলা ছাড়িয়া অন্য জেলায় যাইতে চায় না। অন্য জেলার জল হাওয়া তাহাদের সহ হয় না। মেহেলচৌরি হইতে:৭০ মাইল দূরস্থিত রামনগর রেলওয়ে ষ্টেশনে যাইবার নিমিত্ত স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত করিতে হয়। য়ুাত্রীরা হরিধারে আর ফিরিয়া আসে না। অন্য রাস্তা ধরিয়া রামনগর কেদার বদরীর পথে। ষ্টেশনে রেল ধরে। উল্লিখিত পারিশ্রমিক ব্যতীত ঝাপানিরা চারি জনে দৈনিক এক আনা হিসাবে জল খাওয়া ও খিচুড়ি বাবদে ১২ সের চাউলের দাম লইয়া থাকে, ত্রিযুগী নারায়ণে ১ম বদরী নারায়ণে ১ টাকা ও কেদারনাথে ২ টাকা মােট চারি টাকা করিয়া ইনাম লইয়া থাকে। তদ্ভিন্ন কোন স্থানে এক রাত্রির বেশী থাকিতে হইলে প্রত্যেকে একসের করিয়া চাউল লইয়া থাকে। ভারবহন কুণীরাও ঐরূপ পাইয়া থাকে। তারাঠাদের কৃপায় আমাদিগের যাইবার সম্বন্ধে সমুদায় বনােবস্ত ঠিক হইয়া গেল। শঙ্কর আমাদিগের পথ প্রদর্শক হইলেন। শঙ্কর একজন কর্মঠ বিশ্বাসী গাড়ােয়ালী। এই অপরিচিত দুর্গম স্থানে তাহার নিকট আমরা অশেষরূপে উপকার পাইয়াছি। নিজের কষ্টকে তুচ্ছ করিয়া তিনি আমাদিগের সেবায় সর্বদা যত্নবান থাকিতেন। যখন যাহা করিতে বলা হইয়াছে শঙ্কর সহাস্য বদনে তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিয়াছেন তাহার হাসিমুখ কখন ভুলিবার নয়। কল্য প্রাতে আমাদিগের হরির হইতে যাত্রা করা স্থির হইল। মধ্যাহ্ন আহার সম্পন্ন করিয়া কিঞ্চিৎ বিশ্রামের পর সহর দেখিতে বাহির হইলাম। হরিদ্বার সাহারানপুর জেলার একটি প্রসিদ্ধ নগর। গঙ্গার দক্ষিণ তটে এবং শিবালিক নামক গিরিশ্রেণীর পাদদেশে অতি মনােরম স্থানে অবস্থিত। এই স্থানে পৰ্বত ভেদ করিয়া পতিতােৰ্ধারিণী ভাগিরথী পাপিজনের উদ্ধারের জন্য সমতল ভূমিতে অবতরণ করিয়াছেন। হরিদ্বারের অনেকগুলি নাম আছে। মহর্ষি কপিলের আশ্রম বলিয়া ইহার একটি নাম কপিল । মহর্ষির আশ্রম স্থান এক্ষণে “কপিলস্থান” বলিয়া অভিহিত। কেহ কেহ তৈমুরের “কুটিল” ও “কপিল” একই বলিয়া মনে করেন। মুসলমান ঐতিহাসিকেরা ইহাকে “গঙ্গা-ঘার” বলিয়া জানেন। অনুমান হরিদ্বার। সপ্তম শতাব্দী হইতে এই নাম প্রচলিত আছে। প্রসিদ্ধ চীন পরিব্রাজক হিউন সাঙ্গের ভ্রমণ বৃত্তান্তে “মায়াপুরের উল্লেখ আছে। ইহা বর্তমান সহরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। বর্তমান নামেও মতভেদ দৃষ্ট হয় । শৈবেরা ইহাকে “হৰদ্বার” ও বৈষ্ণবেরা “হারার” বলিয়া থাকেন। মােগল সম্রাট আকবরের সময় এখানে তাম্রমুদ্রা প্রস্তুত করিবার একটি কারখানা ছিল; এবং অনেকে বলেন যে তিনি হরিদ্বারের জল ব্যবহার করিতেন। যে গিরিসঙ্কটের ভিতর দিরা গঙ্গা সমতলক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়াছেন তাহার সর্বাপেক্ষা সঙ্কীর্ণ স্থান ও প্রায় ১ মাইল। গঙ্গা বহু শাখায় বিভক্ত। প্রধান শ্রোত নীলধারা নামে অভিহিত। একটী বড় শাখা সহরের প্রায় ২ মাইল উত্তরে বাহির হইয়া হরিদ্বারের নিম্ন দিয়া কখলে পুনরায় প্রধান স্রোতের সহিত মিশিয়াছে। হরিদ্বারের শ্রেণীবদ্ধ ঘাট ও মন্দির গুলির দৃশ্য অতীব মনােহর। উত্তর হইতে আরম্ভ করিয়া তীর্থের মধ্যে প্রথম “ভীমগােড়া” কুও। ইহা একটি খাড়া পাহাড়ের ঠিক পাদদেশে অবস্থিত। গঙ্গার একটি ক্ষুদ্র শাখার জলে কুণ্ডটি পূর্ণ হইয়া থাকে। গঙ্গা যখন সমতল ভূমিতে অবতরণ করেন তখন তাঁহাকে পথ দেখাইবার জন্য মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেন আদিষ্ট হইয়াছিলেন। তাঁহার ঘােড়ার পদাঘাতে পাহাড়ের উপর একটি গর্ত উৎপন্ন হয়। এই গর্তই কালে ভীমগােড়া” নামে অভিহিত হইয়াছে—এইরূপ প্রবাদ, কিন্তু প্রবাদটা নিতান্তই অসঙ্গত। ইহার দক্ষিণে, নগরের মধ্যে একটি ছােট মন্দিরে ব্রহ্মকুণ্ড। ব্ৰহ্মকুণ্ডের লাগাও দক্ষিণে “হর-কি-পাইরি” নামক বিখ্যাত স্নানঘাট। পাণ্ডারা এই ঘাটের দেওয়ালে একখণ্ড প্রস্তরে বিষ্ণুর পদ চিহ্ন দেখাইয়া থাকেন।

কেন্দার বক্সীর পথে। হরিবারে যতগুলি পবিত্র স্থান আছে তাহাদের মধ্যে এই ঘাটই পবিত্রতম। পূর্বে ইহা ৩৪ ফিট প্রশস্ত ছিল, এবং ইহাতে ৩৯টি ধাপ ছিল। পবিত্র মুহূর্তে সকলেই স্নান করিবার জন্য লালায়িত অথচ বাট সঙ্কীর্ণ, বিপুল জনসম্বের স্থান সঙ্কুলান হইত না। সরকারী রিপাের্টে প্রকাশ ১৮২ খৃষ্টাব্দে স্নানের সময় ৪৩০ জন লােক পেশা- পেশীতে মারা যায়। বস্তুত সময়ে সময়ে জলনিমজ্জনে যাত্রীরা মারা যাইত। এই সকল কারণে সরকার কর্তৃক ঘাটটি ১০০ ফিট চওড়া করা হইয়াছে, এবং ধাপের সংখ্যাও ৬০টি হইয়াছে। কুণ্ডের তলদেশ ইষ্টক দিয়া বাধান। স্রোতের জল যাহাতে কুণ্ড মধ্যে প্রবেশ করিয়া পুনরায় বাহির হইয়া যাইতে পারে তাহারও ব্যবস্থা করা হইয়াছে। যাহাতে যাত্রীরা স্রোতের বেগে ভাসিয়া না যায় তজ্জন্য একটি লােহার বেড়া দেওয়া হইয়াছে। কুণ্ড হইতে প্রায় অর্ধ মাইল দূর পর্যন্ত গঙ্গার তীর ইষ্টক দিয়া বাধান। কুণ্ডের পার্শ্বে একটি চড়া। তাহাও তদ্রুপ বাধান। একটি পুল দিয়াএই চড়ায় যাইতে হয়। এখান হইতে চতুর্দিকের দৃশ্য অতি মনােহর। গঙ্গার কুলু কুলু ধ্বনি ও সুশীতল সমীরণে শরীর পুলকিত হয়। কুণ্ডের পার্শ্বে “গঙ্গাঘর” মন্দির। অসংখ্য যাত্রী ইহা দর্শন করিবার জন্য নানা দেশ হইতে সমাগত হন। পুরাকালে সমবেত গোঁসাই ও বেরাগীদিগের মারামারির কথা শুনিতে পাওয়া বায়। ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে কাহার অগ্রে স্নান করিবে এই লইয়া একটি ছোেট খাট লড়াই হইয়াছিল। শােনা যায় এই বিবাদে ১৮•• লােক নিহত হয়। ১৭৯৫ খৃষ্টাব্দে শিখ যাত্রীরা ৫০০ গোঁসাইকে নিহত করে। ১৮৯৮ সালেও একটি দাঙ্গা হইয়াছিল। ১৩৯৮ খৃষ্টাব্দে তৈমুর কর্তৃক এখানে একটি ভীষণ হত্যাকাণ্ড সাধিত হইয়াছিল। “গঙ্গাদ্বারের দক্ষিণে “স্মরনাথের হরিদ্বার। মন্দির পর্যন্ত ক্রমাগ মনির ও মঠের একটি শ্রেণী আছে। স্মরনাথের শনির “লাল তারা উ” ও “গঙ্গার সঙ্গম স্থলে অবস্থিত। ইহার দক্ষিণে মায়াপুর। মায়াপুরে পুলিশ ষ্টেশন, ডিস্পেন্সারি ও উক বাঙ্গালা আছে। গণেশ ঘাটের নিম্নে খাঙ্গের মুখ। খালের উপরে আফিস ও পরিদর্শন বাঙ্গালা। এই স্থান ইতে সহর, গঙ্গা ও পৰ্ব্বত মালার দৃশ্য বড়ই সুন্দর। কানিংহাম সাহেবের মতে মায়াপুর একটি প্রাচীন স্থান। খালের পরে ঠিক বিপরীতদিকে পাথরের ও ইটের একটি স্তুপ দেখিতে পাওয়া যায়। উত্তরে ভৈরব ও মায়াদেবীর মনির। ইহার দক্ষিণ পশ্চিমে নারায়ণ বাটি। নিকটেই বান রাজার দুর্গের ভগ্নাবশেষ। মায়াপুর খালের মুখ হইতে প্রায় ১ মাইল দক্ষিণে কখল সহর। সহরটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, চারিদিকে সুন্দর সুন্দর মন্দির, মধ্যে মধ্যে সুন্দর সুন্দর তােরণ শশাভিত উদ্যান। সহরের মধ্যে একটি পাথর বাধান পরিপাটী রাজপথ। ঐ রাজপথের দুই পার্শ্বে সারি সারি দোকান ও বড় বড় অট্টালিকা। কখলে যতগুলি মন্দির আছে তন্মধ্যে দক্ষেশ্বর মহাদেবের মন্দির সর্বপ্রধান। প্রবাদ এই স্থানে মহাদেব দক্ষরাজার যজ্ঞ ভঙ্গ করিয়াছিলেন। এই স্থানেই সতী পতিনিন্দা শুনিয়া দেহত্যাগ করেন। মন্দিরটি একটি চতুষ্কোণ প্রাঙ্গণ মধ্যে অবস্থিত। আধুনিক অালিকাগুলির মধ্যে লন্ধেরার রাজার দেবালয় ও সত্ৰধটি উল্লেখ যােগ্য। হরিদ্বারের ঠিক অপর পারে নীল ধারা ও গঙ্গার প্রধান প্রবাহে পরিবেষ্টিত একটি দ্বীপ আছে। এই দ্বীপ হইতে নীলধারা পার হইলে “চীপাহাড়”। চণ্ডীপাহাড়ের একটী চূড়ার উপর v চণ্ডী দেবীর ফেঙ্গার শরীর পথে। মন্দির। অপর একটি চূড়ায় অঞ্জনা দেবীর মন্দির। চণ্ডী পাহাড়ের চূড়ান্সে হইতে চতুর্দিকস্থ জনপদের দৃশ্য অতীব মনােরম। নিম্নে গঙ্গার ভিন্ন ভিন্ন স্রোত নল ফিতার মত পৰ্ব্বতের পাদদেশ বেষ্টন করিয়া দূরে কোথায় গিয়া মিশিয়াছে। ওদিকে পৗঁতের উপরি পর্বত উঠিয়া তরঙ্গতঙ্গে অশেয় গায়ে গিয়া ঠেকিয়াছে। ১৪, ২। লছমন ঝোল। হরিদ্বার হইতে সত্যনারায়ণ৭ মাইল। হৃষিকেশ-১৪ মাইল। লছমন ঝোলা-১৭ মাইল। ঘন ২৩ বৈশাখ মঙ্গলবার। অতি প্রত্যুষে উঠিয়া গঙ্গাজল স্পর্শ করিয়া যাত্ৰা করিলাম। তারাচঁাদ দুইখানি গাড়ী ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন। গঙ্গার ধারে ধারে পৰ্ব্বতের নিম্নদেশ দিয়া আমাদিগের রাস্তা। ক্রমে ভীমগােড়ায় পৌঁছিলাম। কুণ্ডটি অসংখ্য নরনারীতে পূর্ণ। সকলেই অবগাহনে নিরত। ব্যোম ব্যোম হর হর শব্দে চারিদিক মুখরিত। ক্রমে গঙ্গা স্রোত আমাদিগকে ছাড়িয়া যাইতে লাগিল। রাস্তাটি গঙ্গার কিনারা হইতে সরিয়া পাহাড়ের পাদদেশ দিয়া যাইতে লাগিল। নিবিষ্ট বৃক্ষরাজির মধ্য দিয়া কখন দেরাদুন রেলপথের ধার দিয়া কখন তাহার উপর দিয়া আমরা যাইতে লাগিলাম। সারিবদ্ধ বৃক্ষ। যেন সেগুলিকে সাজাইয়া রােপণ করিয়া রাখিয়াছে। প্রাতঃ সমীরণে দেহ প্রাণ পুলকিত হইতে লাগিল। মধ্যে মধ্যে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গিরি-নদী অতিক্রম করিলাম। এখন এগুলি পার হইতে কোন কষ্ট নাই। সকলগুলিরই উপর পুল হইয়াছে। তন্মধ্যে রায় বাহাদুর সুরজমলের ব্যয়ে নির্মিত সোম নদীর উপর পুলটা উল্লেখযােগ্য। রাস্তাও পরিষ্কার। ক্রমে ৮ সত্যনারায়ণ দেবের মন্দিরে উপস্থিত হইলাম। এখানে ধশালা কেদার বদরীর পথে। আছে—সাধু সন্ন্যাসীরা সিধা পাইয়া থাকেন। সত্যনারায়ণ ও ৮ পক্ষ্মী দেবীকে দর্শন করিয়া প্রায় ১০টা ১১টার সময় ৬ হৃষিকেশে পৌছিলাম। হৃষিকেশ গঙ্গার তীরের ঠিক উপরেই অবস্থিত। এখানে অনেকগুলি ধৰ্ম্মশালা আছে। স্থানটি সাধু সন্ন্যাসীতে পরিপূর্ণ, পরম রমণীয় তপােভূমি। ত্রিবেণীঘাট এখানকার একটি পবিত্র তীর্থ। ঘাটের উপরেই অনেক সাধু অবস্থান করিতেছেন। এঁরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খড়ের কুঁড়ে ঘরে বাস করেন। এই সকল কুঁড়ের উপর গােল গােল চূড়া। জগাধারি ধর্মশালায় আমরা আশ্রয় পাইলাম। বাজারে সব জিনিষই পাওয়া যায়। আটা। সের ও ঘি ২০ টাকা সেক্স। সকলে ত্রিবেণীঘাটে স্নান করিতে নাশিলাম। স্রোবেগ অত্যন্ত প্রবল। অদ্য অবগাহন স্নানের লােভ সম্বরণ করিতে পারিলাম না। পুণ্য- তােয়া জাহ্নবী নারে মনের আনন্দে বসিয়া পড়িলাম। জলস্রোত বেগে আসিয়া শরীরে লাগিতেছে। কি আরামদায়ক। শরীরের সমুদায় গ্লানিই বিদুরিত হইল। যদিও জল বরফ অপেক্ষা শীতল তথাপি উঠিয়া আসিতে ইচ্ছা হইল না, অনেকক্ষণ জলে রহিলাম, মনের আনন্দে স্নাৰ সমাপন করিয়া উঠিলাম। সে স্থান হইতে চলিয়া আসিতে যেন মন সরিতেছিল । ইচ্ছা হয় সমস্ত দিন রাত্রি এইখানে বসিয়া এই অপূর্ব দৃশ্য দেখি। জলে মাছের খেলা দেখিবার জিনিস। স্রোত এত প্রখর যে আমরা স্থির হইয়া ছাইতে পারি না, সৰ্ব্বদাই ভয় হয় বে হেতে বুঝি ভাসাইয়া লইয়া যাইবে, অথচ মাছ গুলি সেই খরস্রোতে অঙ্গ ভাসাইয়া দিয়া মনের আনলে এদিক ওদিক খেলাইয়া বেড়াইতেছে, ভাসিয়া যাইতেছে । এখানে হিংসা নাই, দেব নাই, মংস্য গুলিকেও হিংসা করিবার কেহ নাই। তাহারা মানুষ দেখিয়া ভয় পায় না। মানুষের নিকট নির্ভীক সহমন ঝোলা। চিত্তে খেলা করিয়া বেড়ায়, এমন কি হাত হইতে খাবার জিনিষ লইতেও ভয় পায় না। যাত্রীরা খেলা দেখিবার জন্য নানাবিধ খাদ্য দ্রব্য জলে, ছড়াইয়া দিয়া কৌতুক দেখেন। ঘাট হইতে উঠিয়া হনুমানজীর মূর্তি দর্শন করিয়া বাসায় ফিরিলাম। হনুমানজীর মন্দিরের সম্মুখে একটী কুণ্ড আছে ভাতে মান, করিয়া পরে গঙ্গা স্নান করিতে হয়। আমাদের বাসাটি ঠিক ঘাটের উপরেই। মধ্যাহ্ন ভােজন সমাপন করিয়া কিঞ্চিৎ বিশ্রামের পর দেখি যে আমাদিগের রওনা হইবার জন্য সমস্তই প্রস্তুত। অপরাহ্ন দুই ঘটিকার সময় যাত্রা করিলাম। এবার আমরা একটি প্রশস্ত পথ ধরিয়া যাইতে লাগিলাম। রাস্তার দুই পার্শ্বে সারিবদ্ধ দোকান। কিছু দূর যাইয়া ভরতজীর মন্দির। জনপ্রবাদ এখানে ভরত তপস্যা করিয়াছিলেন। ভরতজীর মন্দির ব্যতীত রাম সীতা প্রভৃতিরও অনেক গুলি মন্দির আছে। কেহ কেহ বলেন এই স্থানে মহর্ষি দ্বৈপায়ন বেদকে চারি- ভাগে বিভক্ত করিয়া বেদব্যাস উপাধি লাভ করিয়াছিলেন। ক্রমে ক্রমে যতই অগ্রসর হইতে লাগিলাম হিমালয়ের সৌন্দৰ্য্য ততই অধিকতর ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। সম্মুখে একটি বারিশূন্য পাৰ্বতীয় নদীতে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। নদীর গর্ভ প্রস্তর খণ্ডে পূর্ণ। নদীর উপর দিকে চাহিয়া দেখি কেবল প্রস্তর খণ্ড। নিম্নের দিকে ফিরিয়া দেখি কেবল প্রস্তর, দূরে দূরে--সুদূরে পাহাড়ের গায়ে যাইয়া মিশিয়াছে। ঐ নদীর গর্ত অতিক্রম করিয়া আমরা গঙ্গার গর্ভ দিয়া যাইতে লাগিলাম। রাস্তা উপর দিয়া গিয়াছে। গঙ্গা মনের আনন্দে চারিদিক মুখরিত করিয়া চলিতেছেন। আমরা একটি প্রস্তর হইতে অপর একটি প্রস্তরে পদ বিক্ষেপ করিয়া ধীরে ধীরে চলিতে লাগিলা। গঙ্গাতীয়ে অনেকগুলি মন্দির আছে।

কেদার বদরীর পথে পুনরায় রাস্তায় আসিয়া পড়িলাম। অদূরে রেজেষ্ট্রী অফিস। এখানে কুলি ও ঝপানিওয়ালাদের নাম রেজেষ্ট্রী হয়। তাদের নাম ধাম ও পারিশ্রমিক লেখা এক ফর্দ কাগজ যাত্রীদিগকে ও আর এক ফর্দ ঝাঁপানিওয়ালাদিগকে দেওয়া হয়। মাল ওজন করিয়া কুলির পারিশ্রমিক স্থির করা হয়। এক ফর্দ যাত্রীর নিকট থাকে আর এক ফর্দ কুলীর নিকট থাকে। আমাদের ঝ পানওয়ালাদের রেজেষ্ট্রী হইল। আমাদের বিছানা ও পরিধেয় বস্ত্রাদি ঝাম্পানে ৰিছাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। গলা বটি ইত্যাদি যাহা কিছু অবশিষ্ট রাহল সেগুলি আমাদের পথ প্রদর্শক পূর্ণকথিত শঙ্কর শহর যাইতে স্বীকৃত হইলেন। তিনি ওজন মত টাকা পাইবেন ঠিক হইল। ইহা তাহার বেশী লাভ। এই স্থান হইতে রওনা হইবার পর স্পষ্টই বােঝা গেল আমরা এখন উঠিতেছি। এইখানে চড়াই আরম্ভ হইল। চড়াই কাহাকে বলে এখানে কতক উপলব্ধি হয়। পাহাড়ে উঠতে হইলে স্থানে স্থানে পাহাড়ের গা দিয়া খানিকটা উপরে উঠিতে হয়। কোথাও বা খানিকটা সমতল রাস্তাও পাওয়া যায়। ৮ কেদার নাথের রাস্তা পর্বতগাত্রে ক্রমােচ্চ করিয়া কার্টিয়া প্রস্তুত করা হইয়াছে। কোন নদীর পুলে উঠিতে হইলে যেমন খানিকটা উঠিতে হয় ইহাও তদ্রুপ। তবে উচ্চতার তারতম আছে। কোথাও ঠিক খাড়া, কোথাও বা গড়ন। প্রথম প্রথম অভ্যাসের অভাব হেতু চড়াইয়ে উঠিতে বড়ই কষ্ট হয়। বুকে বড় লাগে। ক্রমে ক্রমে অভ্যাস হইলে তত কষ্ট হয় না। যাহারা পদব্রজে যাইতে চাহেন তাহাদের হাতে একগাছি শক্ত লাঠি রাখা আবশ্যক। হরিদ্বারের বাজারে এক প্রকার ঠি পাওয়া যায় তাহার অগ্রভাগ সুচালু লৌহ- লছমন ঝোলা। শলাকা গ্রথিত। অধিকাংশ যাত্রীরা সেইরূপ লাঠি সংগ্রহ করিয়া রাখেন। বস্তুতঃ যে কোন লাঠিতেই চলে। লাঠিতে ভর দিয়া উঠিতে চেষ্টা করিলে অনেকটা কষ্টের লাঘব হয়। চড়াই হইতে নামিবার সময় আবার ঐরূপ লাঠিতে ভর দিতে হয়। তখন মনে হয় যেন উপর হইতে কেহ ধাক্কা মারিয়া ফেলিয়া দিতেছে। গড়গড় করিয়া নামিতে হয়। একটু অসাবধান হইলে মুখ থুবড়াইয়া পড়িবার সম্ভাবনা। কি স্ত্রী কি পুরুষ সকলেরই জুতা পরা আবশ্যক। খালি পায়ে চলিলে পাথরের উপর চলিয়া চলিয়া পায়ের তলা ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়া কে। অধিকন্তু পাথরে চোট লাগিয়া ক্ষত হইবারও সম্ভাবনা। যদি স্ত্রীলােকেরা চামড়ার জুতা পরিতে একান্ত অসম্মত হন, তাহা হইলে হরিদ্বারে কি শ্রীনগরে দড়ির তলাবিশিষ্ট ক্যাম্বিসের এক প্রকার জুতা পাওয়া যায়, তাহাই ব্যবহার করিতে পারেন। শীতােপযােগী গরম ব স রাখা উচিত। এই সময়ে অপরাহ্নকালে প্রায়ই বৃষ্টি হইয়া থাকে । Water proof coat ও oil cloth সঙ্গে থাকিলে ভাল হয়। এই অঞ্চলে এক প্রকার পােকার কামড়ে সময়ে সময়ে বড়ই কষ্ট পাইতে হয়। চুলকাইয়া চুলকাইয়া গা সমস্ত দগড়া দগড়া হইয়া যায়। ইহুদিগে ২াত হইতে পরিত্রাণ পাইবার উপায়, গায়ের উপরি একটি মণ : পরিধান করা। তাহা হইলে পােকাগুলি কামড়াইয়া বসিয়া থাকতে পারে না। জামাটি প্রত্যহ গরম জলে ধৌত করিতে হয়। আহাৰ্য্য দ্র। ঢাকি রাখিবার জন্য একটি ঢাকার সঙ্গে দেওয়া ভাল। এ ল গাছির উপদ্রব অত্যন্ত বেশী। স্থানে স্থানে এত অধিক যে খাইব। লি একেবারে ঢাকিয়া ফেলে। {ই দেখিতে পাওয়া যায় না । দেখিতে দেখিতে আর লণীর মধে আমি। মি। .

কেদার বদরীর পথে। মন্দিরটি একটি উচ্চ চত্বরের উপর নির্মিত। রাবণ বধের পাপক্ষয় মানসে রামচন্দ্র হৃষিকেশে এবং লক্ষ্মণ এই স্থানে উৎকট তপস্যা করিয়াছিলেন। লক্ষণজীর মন্দির হইতে নামিয়া কিছু নিম্নে কতকগুলি ঘােট ঘােট মন্দির দেখিতে পাওয়া যায়। পার্শ্বেই গঙ্গার দুরন্ত স্রোত হু হু করিয়া ছুটি- তেছে। এখানে ধ্রুব বা দ্ৰোণ ঘাট, ও ঘাটের নিম্নে একটি কুও দেখিবার জিনিষ। নিকটেই প্রসিদ্ধ লছমন বােলা। দুই দিকে উচ্চ পাহাড় ও মধ্যে খরস্রোতা জাহ্নবী। লছমন ঝােলা গঙ্গা পার হইবার সেতুমাত। কথিত আছে ত্রেতাযুগে লক্ষ্মণদেব এই স্থানে গঙ্গা পার হইবার জন্য দুই গাছি লৌহের শিকল পৰ্বত মধ্যদেশে ঝুলাইয়া দিয়াছিলেন। বর্তমান লৌহ সেতু নির্মিত হইবার পূর্বে সেতুটি দড়ি নির্মিত ছিল। এপার হইতে ওপার পর্যন্ত দুই গাছি দড়ি দুই পার্শ্বে দুইটি করিয়া চারিটি খোঁটাতে আবদ্ধ ছিল। এই দুইটি দড়ি হইতে বিলম্বিত হােট ঘােট বহুসংখ্যক দড়িতে আবদ্ধ এপার হইতে ওপার পর্যন্ত সরাসর বিস্তৃত একটি কাঠের মই সেতুর কাৰ্য করিত। এরূপ সেতু এখনও যাত্রীপথে অনেক জায়গায় দেখিতে পাওয়া যায়। লক্ষণ ঝােল এক্ষণে সুতার দড়ির পরিবর্তে তারের দড়িতে তৈয়ার হইয়াছে। এই সেতুটি বণিকবর সূরষমলের অন্যতম কীৰ্ত্তি। ধৰ্ম্মাত্মা সুষম মাতৃসমভিব্যাহারে বদরিকাশ্রমে যাইতেছিলেন। মাতৃআজ্ঞায় যাত্রীদিগের সুবিধার জন্য বহু অর্থব্যয়ে এই সেতু নির্মাণ করেন। এই সেতু হইতে ভাগিরথীর প্রচণ্ড স্রোত দেখিলে অন্তরাত্মা একেবারে শুকাইয়া যায়। গঙ্গার উভয় পার্শ্বে সাধু ও যাত্রীদের জন্য অনেক ধৰ্ম্মশালা আছে। থাকিবার কোন কষ্ট নাই। সচরাচর প্রয়ােজনীয় সকল রকম আহাৰীয় সামগ্রী বিক্রয়ের জন্য অনেকগুলি দোকান আছে। {

দেবপ্রয়াগ।
}
।
।
১।
নছমন বােলা হইতে ফুলবাড়ী-৩ মাইল। লছমন ঝােলা হইতে মহাদেব—২১ মাইল
গুলার-৬
थापन-२०
মােহন
কাণ্ডি-২৮
হােট বিজলী-১
ব্যাসঘট—৩২
বড় বিজলী-১১৭ ,
ছালৌড়ি-৩৫
উমরা—৩৭• •
সৌর-৩৯
লছমন ঝোলা হইতে দেবপ্রয়াগ-৪১ মাইল।
লছমন বােলা পার হইয়া আমরা অগ্রসর হইতে লাগিলাম। দক্ষিণ পার্শ্বে
কে যেন পাথর দিয়া আকাশস্পর্শী একটি প্রাচীর নির্মাণ করিয়া রাখিয়াছেন।
বাম পার্শ্বে অতি নিয়ে ঠিক যেন পাতাল দিয়া গঙ্গার খরস্রোত কল নাদে
সেই নির্জন গিরি সঙ্কট প্রতিধ্বনিত করিয়া তীরবেগে কি জানি কি
উদ্দেশ্যে ছুটিয়াছে। গঙ্গার জল যেমন স্বচ্ছ, সােত তেমনি প্রবল, মধ্যে মধ্যে
উপলখণ্ডে প্রতিহত হইয়া এক বিচিত্র সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি করিতেছে, উৎক্ষিপ্ত
বারিকণা রাশি রাশি ফেণপুঞ্জ উদগীরণ করিয়া চারি দিকে ছড়াইয়া
দিতেছে। নিরবচ্ছিন্ন মৃদু কুলু কুলু ধ্বনি বজ্র নির্ঘোষে পরিণত হইয়া পৰ্বতে
পৰ্বতে প্রতিধ্বনিত হইতেছে। কোমলে কঠোরে, মধুরে ভীষণে, এমন
মেশামিশী,এমন কোলাকুলী, বুঝি আর কখন দেখি নাই। উপরে নীলাকাশ,
নিয়ে নীজন, পার্শ্বে পৰ্বত গাত্রে হরিৎ তরু রাজি। মরি মরি কি

কোর বদরীর পথে। রঙের খেলা। এই রঙের খেলায় বিভাের হইয়া এই অনন্ত সৌন্দর্য্যে প্রাণমন ভাসাইয়া চলিতেছি। যতই অগ্রসর হইতেছি ততই সেই প্রাণমন মাতােয়ারা ছবির রচয়িতাকে মনে পড়িতেছে। প্রভু, আমাকে কি দেখাইলে-ভাবিতে ভাবিতে জানি না কখন আনতে নয়ন ভাসিয়া উঠিল-বলিয়া উঠিলাম হর হর ব্যোম ব্যাম। জয় কেদারনাথ জি কি জয়। সূৰ্য্যদেব ধীরে ধীরে অস্তাচলে যাইতেছেন, কিরণজাল গুটাইয়া লইতেছেন, পৰ্বত গাত্র হইতে সরাইয়া লইয়া পৰ্বত শৃঙ্গ উদ্ভাসিত করিতে- ছেন। হঠাৎ পৰ্বতের ওপার হইতে উকি ঝুকি মারিয়া মেঘখণ্ডগুলি আসিয়া নীলাকাশ আবৃত করিয়া ফেলিল। এ এক নূতন দৃশ্য। প্রভু তােমার লীলা বােঝা ভার। এই যে চতুর্দিক হাসিতেছিল সে হাসি কোথায় লুকাল। পবন দেবও কাহার কি জানি এক অশ্রুত ডাকে দৌড়িয়া আসিলেন, আনন্দে ছুটাছুটি করিতে লাগিলেন, বিশাল বৃক্ষরাজির সহিত তাণ্ডব নৃত্যে প্রবৃত্ত হইলেন। বৃক্ষ সকল এদিক ওদিক হেলিতে দুলিতে লাগিল। এ এক আনন্দের খেলা। মেঘগুলি ক্রমে ক্রমে উপর হইতে নামিয়া আসিল। বৃষ্টিপাত হইতে লাগিল। আমরা গুটি গুটি যাইতেছি। নিমে—নিম্নে—অতিনিম্নে খরস্রোতা ভাগিরথী, পার্শ্বে পার্থে পাহাড়ের আকাশস্পশী প্রাচীর, রাস্তা সঙ্কীর্ণ, প্রচণ্ড ঝড়। পবন দেবের বেগ বুকি বা আর সহ করিতে পারি না। বুঝি বা ভাগীরথীনীরে চুবাইয়া দেয়। এইরূপে ভীষণ বাত্যায় উৎপীড়িত হইয়া, বৃষ্টির জলে অভিসিঞ্চিত হইয়া, প্রকৃতির পবশ্বসংহারক তাণ্ডব দৃশ্য দেখিতে দেখিতে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। কিছুক্ষণ এইরূপে চলিয়া প্রায় চারি মাইল দূরবর্তী ফুলবাড়ী চটিতে পৌছিলাম। খুব বড় বড় পাঁচ সাত খানা ঘর, ঠিক গঙ্গার উপরে ; দেবপ্রয়াগ। অবস্থিত। নিকটে অনেক বড় বড় গাছ আছে। চটিওয়ালারা বেশ সজ্জন। এই অঞ্চলে প্রত্যেক চটিতে আহারােপযােগ আটা, ঘি, ডাল প্রভৃতি পাওয়া যায়। ঠিক সন্ধ্যার সময় চটিতে আশ্রয় লইলাম। তখনও ‘আকাশ পরিষ্কার হয় নাই। চটিতে আসিয়া দেখি একটি যুবক বিষঃ চিত্তে গালে হাত দিয়া বসিয়া আছেন। তিনি মাতার সঙ্গে আসিতেছিলেন ; মাতা আগে আগে আসিতেছিলেন, তিনি পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতেছিলেন। ঝড়ের সময় পরস্পর ছাড়াছাড়ি হইয়াছেন। ভাবিয়াছিলেন যে সন্মুখবর্তী ফুলবাড়ী চটিতে মাতাকে দেখিতে পাইবেন। কিন্তু এখানে আসিয়া তাঁহাকে না দেখিতে পাইয়া বড়ই ব্যাকুল হইয়া পড়িয়াছেন। রাত্রি আসিয়া পড়িল। কোথায় খুঁজিবেন ঠিক করিতে পারিতেছেন না। অগ্রসর হইবার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সকলে নিষেধ করিতেছেন। অজানিত স্থান, তাহার উপর পথ দুৰ্গম, সময় সময় রাত্রিতে হিংস্র জন্তুও বাহির হয়। তিনি কাহারও কথায় কর্ণপাত না করিয়া যাইতে উদ্যত অতিকষ্টে তাহাকে নিবৃত্ত করা গেল। কেহ কেহ বলিল একটি স্ত্রীলােক ঝড়ের সময় ফুলবাড়ী চটিতে না মিয়া চলিয়া গিয়াছে। সকলেই অনুমান করিলেন তাহার মা নিশ্চয়ই পরবর্তী চটিতে আশ্রয় লইয়াছেন। চটির ঘরগুলি লম্বা লম্বা। 'তিন দিক পাথরের দেওয়াল দিয়া ঘেরা। সম্মুখ দিক একেবারে খােলা, কেবল কতকগুলি খুঁটি আছে। খুঁটির উপর ‘চাল। কতকগুলি বড় বড় শ্লেটের মত পাথর চাপান। ঘরের এক পার্শ্বে চটিওয়ালার ফর্ণ ; তাহাতে যাত্রিদিগের দরকারী জিনিষপত্র থাকে। চটিতে থাকিতে হইলে চটিওয়ালার নিকট হইতে জিনিষপত্র কিনিতে হয়। ঘর ভাড়ার জন্য কিছুই দিতে হয় না। চটিওয়ালারা যাত্রিদিগকে ঘড়া হুঁড়ি, বাসন প্রভৃতি মােগাইয়া থাকেন, তাহার জন্য তারা কিছু কেদার বসরীর পথে। দাবী করে না। আমরা চটিতে পৌঁছিয়াই আমাদের ভিজা কাপড় পরিত্যাগ করিয়া চটির মধ্যে শুকাইবার জন্য ছড়াইয়া দিলাম। আমরা ভিজা কাপড়ের জন্য ব্যস্ত কিন্তু ভায়া আটা, ঘি, ও কাঠের জন্য ব্যস্ত। চটিওয়ালার সহিত বেশ আলাপ করিয়া তাহাকে নিজের লােক করিয়া লইয়াছেন। তাহার নিকট হইতে আটা, ঘি ও শুষ্ক কাঠ সংগ্রহ করিয়া লুচি করিবার জন্য প্রস্তুত, সঙ্গে আলু ও মসলা আছে। আটা জাত পেসা। এ অঞ্চলের অধিবাসীরা স্রোতের বেগে জাতা চালাইয়া গম পিষিরা আটা করেন। সে 'আটা খুব সুস্বাদু। ঘি খুব উৎকৃষ্ট, কোন ভেজাল নাই। শঙ্কর চটিওয়ালার নিকট হইতে একটি ঘড়া কইয়া গঙ্গাজল আনিলেন। জল বেশ নিৰ্ম্মল। মা ও দিদি পাককাৰ্যে প্রবৃত্ত হইলেন, ভায়া তাহাদিগকে সাহায্য করিতে লাগিলেন—আমার কোন কাজ নাই। তখন আকাশ পরিষ্কার হইয়াছে, সপ্তমীর চন্দ্র দেখা দিয়াছেন, বাহিরে বসিয়া হিমালয়ের নিভৃত করে গঙ্গার কুলু কুলু ধ্বনি শুনিতে লাগিলাম। कि যেন অমৃত ধারা সিঞ্চিত হইতে লাগিল। ভগবানের অনন্ত রূপ, অনন্ত সৌন্দৰ্য্য দেখিয়া যেন আত্মহারা হইয়া গেলাম। এদিকে সুচি ও আলুর দম প্রস্তুত, ভায়ার ডাকাডাকিতে উঠিয়া পড়িলাম। বড়ই ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছে। লুচি আলুর দমে উদর পূর্ণ করিয়া শয়ন করিলাম। কাপড় চোপড়গুলি চারিদিকে ছড়ান রহিয়াছে ঘুমাইয়া পড়িলে পাছে কেহ লইয়া যায়, সেই কথা ভাবিতে ভাবিতে কখন নিদ্রাদেবীর কোমল ক্রোড়ে আশ্রয় পাইলাম বলিতে পারি না। চক্ষু খুলিয়া দেখি আলােকে চারিদিক আলােকিত হইয়াছে, বিহঙ্গকুল প্রভাতি আরম্ভ করিয়াছে। শয্যায় আর থাকা উচিত নয় মনে করিয়া উঠিয়া পড়িলাম। দেখিলাম কাপড় চোপড়গুলি যেখানে ছিল সেইখানেই মধুর। কর্ণে ঙ্গের প্রয়াগ। আছে। কেহই সায় নাই। কল্য সন্ধ্যার সময় এক দৃশ্য দেখিয়াছিলাম আজ আর এক দৃশ্য। বিহঙ্গকুলের মধুর কাকলী, সুরধুনির সুমধুর গীত ধ্বনি, পৰ্বতগাত্রে সূৰ্য্যরশ্মির অনুপম বর্ণ বৈচিত্র, স্তরে স্তরে সজ্জিত তরুরাজির সুকুমার সৌন্দৰ্য্য, মনের ভিতর কি একটা ভাবের তরঙ্গ তুলিয়া দিতেছে। অদ্য ২৪শে বৈশাখ। প্রাতঃকৃত্যাদি শেষ করিয়া যাত্রা করিলাম । গঙ্গা কিছুদূরে সরিয়া পড়িলেন। যাইতে যাইতে পথিপার্থে স্থানে স্থানে পাইপ হইতে অনবরত জল পড়িতেছে দেখিলাম। অনুসন্ধানে জানিলাম পৰ্বতের উপরিস্থিত ঝরণার জল যাহাতে পথশ্রান্ত যাত্রীরা অনায়াসে পাইতে পারেন তজ্জন্ত এইরূপ ব্যবস্থা করা হইয়াছে। জল সুমিষ্ট। কিছুক্ষণ চলিবার পর একটি প্রস্তর নির্মিত সেতু পার হইয়া একটি চটি পাইলাম। গত সন্ধ্যার পরিচিত সেই ভদ্রলােকের মাতাকে দেখিতে পাইয়া তাহাকে তাহার পুত্রের মঙ্গল সংবাদ দিয়া আমরা অগ্রসর হইলাম। তাহার পরই হিউলি নদীর লৌহ নিৰ্মিত ঝােলান ( Suspension bridge ) সেতু পার হইলাম। নদীর অপর পার্শ্বে পৰ্ব্বত গাত্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৌটার ন্যায় ঘরগুলি বড় সুন্দর দেখাইতেছিল। নদীর গর্ভে স্থানে স্থানে আবাদ হইয়াছে। উপর হইতে বিস্তৃত সতরঞ্জির মত দেখাইতেছিল। ক্রমে ক্রমে মােহন ও ছােট বিজলী চটি অতিক্রম করিয়া বড় বিজলীতে উপনীত হইলাম। এই কয়েকটী চটিতেই সুন্দর সুন্দর ঘর ও ধৰ্ম্মশালা আছে। মোহন চটির ঠিক নিম্নে হিউলি নদী। এখানে সদানন্দ ব্রহ্মচারীর একটি ধর্মশালা আছে, ও জলের পাইপ আছে। অধিকন্তু হিউলি নদীর জলও পানয়ােগ্য। একটি চড়াইয়ের পর ছােট বিজলী, পরে বড় বিজলী। এখানে সরকারী বাঙ্গালা আছে। চটি ২৫ কেদার বদরীর পথে। গুলির ব্যবধান দেড় মাইল হইতে তিন মাইল। বড় বিজলীতে বিশ্রাম করিতে সঙ্কল্প করিলাম। ফুলবাড়ী হইতে আট মাইল আসা হইয়াছে। একটি পরিষ্কার ঘর বাছিয়া লইয়া তাহাতেই আশ্রয় লওয়া গেল ; ঘরগুলি সব নিকান। সম্মুখেই জলের পাইপ। জলের কোন কষ্ট-নাই। ভায়া আমার চটিওয়ালার সন্ধানে যাইলেন, উত্তম চাউল, উত্তম ঘি পাওয়া গেল। চাউল ॥• আনা সের ঘি ২০ টাকা সের আলু • সের দুধ। সের। পাইপের জলে উত্তম করিয়া স্নান করিলাম। জল বড়ই ঠাণ্ডা। নান্তে দুই ভাইয়ে মধ্যাহ্ন আহারে বসিয়া পড়িলাম, বড়ই ক্ষুধা, এত ক্ষুধা বুঝি পূৰ্বে কখনও অনুভব করি নাই। অল্প একবার দুইবার তিনবার পাতে আসিয়া পড়িল, ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হইয়া গেল। বুঝিবা মাতাঠাকুরাণী ও দিদির জন্য কিছুই থাকে না। তৃপ্তির সহিত আহার করিতেছি দেখিয়া মাতাঠাকুরাণীর রড়ই আনন। চাউল সুগন্ধ, অন্নও সুন্দর হইয়াছে, অথচ আমাদের চটিওয়ালার মতে অন্নপাক ঠিক হয় নাই। সে অনবরত আমাদিগকে স্মরণ করাইতে লাগিল যে আমরা ভালরূপে বন্ধন করিতে পারি নাই। ভােজুনান্তে শয়ন করিলাম। দিবসে নিদ্রা হয় না। ইয়া কত কি চিন্তা করিতেছি। কোথায় ছিলাম কি করিতে ছিলাম, আর আজ কোথায়। ভাবিতেছি, এমন সময় দেখি কম্বলের পাজামা ও চাপকান পরিহিত দুইটা সুন্দর যুবক আমার শয়্যার নিকট আসিয়া বসিলেন। যেন কতদিনের পরিচিত। সহাস্য বদনে আমাদের মঙ্গল জিজ্ঞাসা করিয়া আমরা কোথায় কোথায় যাইব জানিতে চাহিলেন। গন্তব্য স্থান জানিতে পারিয়া গঙ্গোত্তরী ও যমুনােত্তরী যাইবার জন্য অনুরােধ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা এই তীর্থধুয়ের পাণ্ডা। বুঝিলাম এখান ইত ঐসকল তীর্থস্থানে যাইতে হইলে দেবপ্রয়াগ হইয়া যাইতে হয়।

দেবপ্রয়াগ। রাস্তা তত ভাল নয়, মাতাঠাকুরাণী তত কষ্ট সহ করিতে পারিবেন না ভাবিয়া সে মতলব ত্যাগ করিলাম। সচরাচর লােকে দেরাদুন্ দিয়া গঙ্গোত্তরী যাইয়া থাকেন। যদি কখনও তাহা ভাগ্যে ঘটে ভাবিয়া তাহাদের নাম ধাম লিখিয়া লইলাম। কথােপকথন করিতে করিতে তিনটা বাজিয়া গেল। ঝপানিওয়ালারা যাইবার জন্য প্রস্তুত। একটি কথা লিখিতে ভুলিয়াছি। চটিগুলির উভয় পার্শ্বে এক এক মাইল দূরে এক একটি লাল নিশানা দেখিতে পাওয়া যায়। সেগুলি মেথর দিগের নিশানা। সরকার হইতে প্রত্যেক চটিতে মেথরের বন্দোবস্ত আছে। কিন্তু চটি ও সেই নিশানগুলির মধ্যবর্তী জমিতে মলত্যাগ নিষেধ। তৰে মেথর দিগকে কিছু বকশিস দিলে তাহারা সুবিধামত স্থান দেখাইয়া দেয়। দুই একটি পয়সা পাইলেই তাহারা সন্তুষ্ট। শীতের আধিক্য বশতঃ তাহাদের পরিধান কম্বলের পাজামা ও চাপকান্। দেখিলে মেথর বলিয়া বােঝা যায় না। মেথর রমণীদিগেরও বেশের পরিপাট্য আছে। পরিধানে নানা রঙের ঘাঘরা ও কোর্তা। ভােজনাবশিষ্ট পাইবার জন্য তাহারা বড়ই লালায়িত। কথাটী বন্ধনের সময় যাত্রীদিগের মনে রাখা উচিত। ঝাঁপানিওয়ালা আসিয়া উপস্থিত। কালক্ষেপ না করিয়া বাহির হইলাম। রাস্তা পূৰ্বেরই মত। দুই পার্শ্বে পৰ্ব্বতের শ্রেণী, মধ্যে নদী। হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া পড়িল। টিপ টিপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতে লাগিল। পথে একটি অশ্বারোহী বৃদ্ধের সহিত দেখা হইল। তিনি সপরিবারে ' কেদারনাথ দর্শনে বহির্গত হইয়াছেন। স্ত্রীলােকেরা পদব্রজে যাইতেছেন স্বয়ং অশ্বারােহণে। বৃষ্টির ভয়ে:৩ মাইল দূরবর্তী কুণ্ড চটিতে আশ্রয় হইলাম। তখন সাড়ে চারিটা। মুষল ধারায় বৃষ্টি পড়িতে লাগি ২৭.

ফেঙ্গার বকরীর পথে। ক্রমে ক্রমে অনেক যাত্রী সেখানে আসিয়া জুটিল। সেই বৃদ্ধের বিষয় ভাবিতে লাগিলাম। এই বৃষ্টিতে সেই বৃদ্ধ কিরূপে এই পার্বত্য পথে অশ্বারােহণে আসিতেছেন। যাহা ভাবিলাম তাহাই ঘটিয়াছে, অশ্ব পিচ্ছিল পথে পা রাখিতে না পারিয়া আবােহ সহিত পড়িয়া গিয়াছে, বৃদ্ধ আঘাত পাইয়াছেন। কয়েকজন ধরাধরি করিয়া এই কুণ্ড চটিতে লইয়া আসিলেন। জিজ্ঞাসায় জানিতে পারিলাম আঘাত সামান্য মাত্র, দুই এক দিন বিশ্রাম করিলেই আরােগ্য হইয়া যাইবে। কিন্তু তিনি ৬ কেদারনাথ দর্শনে এত অধীর হইয়াছেন যে অনবরত বলিতেছেন তাহার কিছুই হয় নাই, অথচ দাড়াইতে পারিতেছেন না। দেখিতে দেখিতে বৃষ্টি থামিয়া গেল। আকাশ পরিষ্কার হইল, বৃদ্ধকে এই চটিতে অন্ততঃ একদিন বিশ্রাম করিতে অনুরােধ করিয়া আমরা বাহির হইলাম। তখন বেলা সাড়েপাঁচটা। খানিকটা সমতল রাস্তা দিয়া যাইবার পর উতরাই আরম্ভ হইল। নামিয়া আসিয়া একেবারে সুরধুনী তীরে পৌছিলাম। বেলা সাড়েছয়টা। সন্ধ্যা আগত প্রায়, স্থানটির নাম বান্দর চটি (বন্দর ভেল)। হরিদ্বার হইতে ৩৫ মাইল। রাস্তার উভয় পার্শ্বে ঘর। রাস্তার বাম পার্শ্বে অশ্বথ গাছের তলায় সুরধুনী তীরে একটি ঘর লইলাম। মায়ের মধুমাখা অভয় বাণী শুনিতে লাগিলাম। মা সন্মুখ হইতে আসিয়া পার্শ্ব দিয়া চলিয়া গিয়াছেন। নদীর অপর পার্শ্বে একেবারে খাড়া পাহাড় আবার দক্ষিণ পার্শ্বেও খাড়া পাহাড়। আমরা সেই পৰ্বত মাঝে সুরধুনী তীরে যেন কোন মুনির আশ্রমে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। স্থাটা নির্জন, গঙ্গার কল কল শব্দ ভিন্ন আর কিছুই শােনা যাইতেছে না। রাত্রি হইয়া পড়িল। অদ্য অষ্টমী। সেদিন সুনীল আকাশে যে একবার চন্দ্রদেবের মােহনমূর্তি দেখিয়াছে সে তাহা ২৮ দেবপ্রয়াগ। কখন ভুলিবে না। জলযােগের বন্দোবস্ত হইল। জলযােগ বলাতে কেহ যেন মনে না করেন যে সামান্য মাত্র জলযােগ করিয়া আমরা ক্ষান্ত হইলাম। এই পার্বত্য প্রদেশে ক্ষুধার উদ্রেক খুব বেশী হয়। ঝরণার জল ও পর্বতের বাতাস এত স্বাস্থ্যকর এবং পরিপাক শক্তি এতই বাড়াইয়া দেয়, যে আকণ্ঠপূর্ণ আহার করিলেও জলবাতাসের গুণে অতি শীঘ্রই সব হজম হইয়া যায়। আবার যাহারা পদব্রজে যান তাহাদের পথশ্রম, হজমের শক্তিকে আরও বাড়াইয়া দেয়। ব্যপান কিম্বা দাণ্ডি করিয়া যাইলেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যথেষ্ট পরিচালনা হইয়া থাকে তাহাতেও হজমের সহায়তা করে, আবার আহারের জন্য যে জিনিষগুলি পাওয়া যায় তাহার সবগুলিই খাটি। কোনটাতেই ভেজাল নাই। প্রাতে চলিবার পূর্বে সকলেরই কিছু কিছু জলযােগ করিয়া বাহির হওয়া উচিত। খালি পেটে চলিলে আমাশয় হইবার আশঙ্কা থাকে। রাত্রিতে আকণ্ঠপূর্ণ খাইয়া শয়ন করিলেও প্রাতে শয্যাত্যাগের পরই যথেষ্ট ক্ষুধার উদ্রেক হইয়া থাকে। ক্ষুধা লইয়া চলা উচিত নহে। কেহ কেহ দুধ পান করিয়া বহির্গত হন। দুধ প্রায় সকল চটিতেই পাওয়া যায়। যদি নিজের পক্ষে তৈয়ার করা সম্ভব না হয়, চটিওয়ালার সঙ্গে বন্দোবস্ত করিলে সকাল বেলা গরম লুচি, পেঁড়া ইত্যাদি পাওয়া যায়। চলিতে চলিতে মধ্যে মধ্যে তৃষ্ণা পায়, কেবল জলপান করা উচিত নয়। সঙ্গে কিছু মিছরি রাখা বিধেয়, এক টুকরা মুখে ফেলিয়া দিয়া জলপান করা উচিত। অভ্যাশ বসতঃ প্রাতঃকালে কিছু না খাইয়াই বাহিৰ হইতাম; কিন্তু পরে সে অভ্যাস রাখিতে পারি নাই। দুই একদিন সকলবেলা খাইতে হইয়াছিল। আহারের পর শয়ন করিলাম। সুরধুনী তাহার কল কল ধ্বনিতে কর্ণে অমৃত ধারা ঢালিতে লাগিলেন ও সুশীতল কেদার বদরীর পথে। সমীরণে দেহ প্রাণ সুশীতল হইতে লাগিল। আমরা সকলে ঘুমাইয়া পড়িলাম। এখানে চোর ডাকাতের কোন ভয় নাই। যেখানকার জিনিষ সেইখানেই পড়িয়া থাকিবে, কেহই ‘ইবে না। তবে যাত্রিদের মধ্যে সভ্য সমতলবাসী যদি কেহ অনুগ্রহ করেন তাহা স্বতন্ত্র। অসভ্য পৰ্বতবাসী কিন্তু চুরি কাহাকে বলে জানে না। সরকারি রিপাের্টে cpty "Crime is practically non-existent"-District Gazetteer, Garhwal p. 105. “Theft is practically unknown" Ibid p. 69. অদ্য ২৫ শে বৈশাখ। অতি প্রত্যুষে উঠিয়া মুখ হাত ধুইয়া পাঁচটা পােনের মিনিটের সময় রওনা হইলাম। ভয়ানক চড়াই। পাহাড় কাটিয়া রাস্তা হইয়াছে। খাড়া পাহাড়ের ঠিক নিম্ন দিয়া গঙ্গা যাইতেছেন, পাহাড়ের গায়ে গাছের লেশমাত্র নাই ; একবার পদস্খলন হইলেই সর্বনাশ। মনে হয় হাড়গােড় চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া একটি মাংসপিণ্ডে পরিণত হইব। এইরূপ প্রায় তিন মাইল পথ অতিক্রম করিয়া একটু খােলা জায়গায় আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এইখানে মহাদেব চটি। পাহাড় একটু সরিয়া গিয়া গঙ্গাতীরে একটু চটি নির্মাণ করিবার জায়গা দিয়াছেন। গঙ্গা গর্ভে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ড ইতস্ততঃ পড়িয়া রহিয়াছে। জল আসিয়া তাহাতে ধাক্কা লাগিতেছে। জলের সঙ্গে অগণিত কাঠের তক্তা ভাসিয়া আসিতে দেখিলাম। শুনলাম আরও উপরে গাছ কাটিয়া তক্তা করিয়া নদীর স্রোতে ভাসাইয়া দেওয়া হয়। তক্তাগুলি ভাসিতে ভাসিতে আলিয়া হরিবারের আরও নিগ্নে আসিলে তাহাদিগকে ডাঙ্গায় ভােলা হয়। **ড়ের উপর হইতে মতলে কাঠ আনিবার ই সহজ উপায় । এই স্থানে মহাদেবের মন্দিৰ, গৰ্মশালা ও কয়েকখান ঘর ও দোকান দেবপ্রয়াস। পাট আছে। একটি ডাকের বাক্সও দেখা গেল। প্রায় অর্ধ ঘন্টা বিশ্রাম করিয়া পুনরায় অগ্রসর হইলাম। এক মাইল সাধারণ চড়াইয়ের পর একটী বাংলা। এতক্ষণে হরিদ্বার হইতে ৪০ মাইল আসা হইল। নিকটে আশ্চর্য দৃশ্য দেখিলাম। পূর্বের রাস্তা খারাপ হইয়া যাওয়ায় পৰ্ব্বত কাটিয়া একটা রাস্তা করা হইয়াছে। রাস্তাটি ঠিক খাড়া পাহাড়ের উপর। রাস্তাটির উপরে পাহাড় ছাতার ন্যায় ঝুকিয়া রহিয়াছে। পাছে মাথা ঘুরিয়া কেহ পড়িয়া যায় এই জন্য রাস্তার ধারে পাথর দিয়া একটু আড়াল করিয়া দেওয়া হইয়াছে। এখান দিয়া চলত বই ভয় হয়, এদিক ওদিক চাহলে শরীরের রক্ত শুকাইয়া যায়। নিম্নে বেগবতী নদী লাফাইতে লাফাইতে ডু.তেছে, সম্মুখে উচ্চ পাহাড়, মাথার উপর পাহাড়, মনে হইতেছে যেন ঘাড়ে পড়িয়া যাইবে। মহাদেব চটি হইতে চারি মাইল দুরবর্তী শ্যামল চটি পার হইয়া নয়টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে কাঙি চটিতে উপ- নীত হইলাম। ইহা শ্যামল চটি হইতে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। পথি মধ্যে পৰ্বতখখাদিত কুলঙ্গীতে বসিয়া ব্রাহ্মণ কুমারগণের সুমধুর তান- লয়যুক্ত সংস্কৃত শ্লোকাবৃত্তি বড়ই শ্রুতিমধুর। কাণ্ডি চটিতে মধ্যাহ্ন ভােজনের ব্যবস্থা করা গেল। এই স্থানটির উপরে ও নীচে গ্রামগুলি বেশ সুন্দর। রাস্তার দুই পার্শ্বে আম্র বৃক্ষের সারি, মাঝে মাঝে বসিবার জন্য বেঞ্চ। এখানকার গােপাল জীউর মন্দির ও ধৰ্মশালা উল্লেখ যােগ্য। নিকটেই ঝরণার জল নিরবচ্ছিন্নবেগে বহিয়া যাইতেছে। স্নান করা গেল। দলে দলে গাতীসকল পাহাড় হইতে নামিয়া ঝরণার দিকে আসিতে লাগিল, তখন রৌদ্রের তাপ অধিক হইয়াছে ; তাহারা রৌদ্রের তাপ সহ্য করিতে না পারিয়া বাসার দিকে চলিতেছে। রাস্তার ধারে ঝরণার জল পান করিয়া তৃষ্ণা দুর করিতে লাগিল। এক এক দলে কেদার বদীর পথে। এইরূপ ৩০/৪০টি গাভী আছে। এক একটি বালকের ইঙ্গিতে তাহারা চলিতেছে ও ফিরিতেছে। বালকেরা সব হৃষ্টপুষ্ট গৌর বর্ণ। পরিধানে পায়জামা ও চাপকান্। আমাদের অন্ন প্রস্তুত হইল। ভােজন সমাপন করিয়া যথাপূৰ্ব শয়ন করিলাম। কতকগুলি গাভী আসিয়া উপস্থিত। তাহাদিগকে যৎকিঞ্চিৎ দিয়া অতিথি সৎকার করা হইল। প্রায় আড়াইটার সময় পুনরায় যাত্রা করিলাম। অল্পদূর যাইলে ভীষণ উতরাই আরম্ভ হইল। সকলকে পশ্চাতে ফেলিয়া গড় গড় নামিতে লাগিলাম। প্রতি পদক্ষেপেই মনে হইতে লাগিল এইবার বুঝি মুখ থুবড়াইয়া পড়িলাম। খুব সতর্ক হইয়া নামিতে লাগিলাম শেষে একটি ভাঙ্গা পুলের নিকটে আসিয়া পোঁছান গেল। নদীটি নায়ার বা ব্যাসগঙ্গানদী। প্রচণ্ড স্রোতে প্রধান সেতুটা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। পারাপারের জন্য অপর একটি সামান্য সেতু প্রতিনিধিত্ব করিতেছে। অতিকষ্টে তাহা পার হইয়া নদীর অপর পারে পৌছিলাম। সঙ্গীরা তখন কেহই আসিয়া পোঁছান নাই। সেখান হইতে অত্যুচ্চ পর্বত দেখিয়া মনে হইতে লাগিল তাহারা কিরূপে আসিবেন। পর্বতের দিকে নির্নিমেষ নেত্র চাহিয়া রহিম। ক্রমে ক্রমে অতি উচ্চ পর্বত গাত্রে ঝাপান গুলি নয়ন পথে পড়তে লাগিল। ভায়া আমার ঝাপান হইতে নামিয়া গড় গড় আসিতেছেন। ভায়া ও ঝাপান গুলির অবস্থা দেখিয়া মনে অত্যন্ত ভয় হইতে লাগিল। প্রতি মুহুর্তে হাদের পতনের আশঙ্কা হইতে লাগিল। যাহউক সকলে নিরাপদে ব্যাস নদীর তীরে আসিয়া পৌছিলেন এবং অতি সন্তর্পনে সেতু পার হইয়া অদূরে ব্যাস চটিতে উপনীত হইলেন তখন বেলা ; সাড়ে চারিটা। ব্যাস ঘাট গঙ্গা ও ব্যাসগঙ্গার সঙ্গমস্থলে অবস্থিত দক্ষ হইতে ১৪১৪ দেবপ্রয়াগ। ফিট উচ্চ। হরিদ্বার হইতে ৪৯ মাইল। এখান হইতে দুইটি রাস্তা বাহির হইয়াছে, একটি ল্যান্সডাউন অভিমুখে গিয়াছে অন্তটা আদোয়ানির দিকে গিয়াছে। প্রবাদ বেদব্যাস এইস্থানেসিয়া তপস্যা করিয়াছিলেন, এই জন্য ইহার নাম ব্যাঘাট। বেদব্যাসের নামে একটি মন্দির আছে। নিকটে ডাকঘর ও একটি ধর্মশালা আছে। গঙ্গার জল বেশ পরিষ্কার, ব্যবহারের যোগ্য। আকাশে মেষ দেখা দিতেছে, আর অগ্রসর হওয়া বুদ্ধিমানের কাৰ্য্য নহে বিবেচনা করিয়। এখানে রাত্তিতে বিশ্রাম করিবার আমােৰ করা গেল। অনেকগুলি দোকান আছে। আয্য সামগ্রী সবই পাওয়া যায়। থাকিবার সুন্দর সুন্দর ঘরও অনেকগুলি আছে, ভায়া একটি ঘর পছন্দ করিয়া লইলেন। এই প্রদেশে প্রায় কেহই একতালা ঘরে থাকিতে চায় না। আমরা দুই এক স্থান ব্যতীত প্রায় সর্বত্রই দ্বিতল ঘরে বাসা লইয়াছিলাম। ভায়া আহারের যােগাড়ে রহিলেন। আমি জানালাতে বসিয়া গঙ্গা দর্শন করিতে লাগিলাম। গঙ্গার অপর পারে পর্বত। তাহার পশ্চাতে পৰ্বত, আবার তাহার পশ্চাতে পৰ্বত, ক্রমান্বয়ে চলিয়া ; গিয়াছে, যেন প্রত্যেক পৰ্বতটী গঙ্গা দর্শনেচ্ছু হইয়া একটি আর একটি। মাথার উপর দিয়া উকি মারিতেছে। একটু বাম দিকে গঙ্গা ও ব্যাস- গঙ্গার সঙ্গম স্থল। নদীপার্শ্বে পৰ্বতশ্রেণ বরাবর চলিয়া গিয়া কোথায় মিশিয়াছে। যতদূর দেখা যায় পৰ্ব্বতশ্রেণী ব্যতীত আর কিছুই নয়নগােচর হয় না। এখানে গঙ্গা একটা বাক লইয়াছেন এই বাকের বাম দিক হইতে ব্যাসগঙ্গা আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। পৰ্বত যেন নদী তীর হইতে একটু সরিয়া গিয়া নিয়ে সমতল ক্ষেত্রে ব্যাস চটি নির্মিত হইবার সুবিধা করিয়া দিয়াছেন। আমাদের চটির ঠিক পশ্চাতে গঙ্গার পর্যন্ত কেদার বগরীর পথে। সামান্য একটু সমতল ক্ষেত্র আছে। তাহাতে গমের চাষ হইয়াছে। কি পরম রমণীয় শােভা, না দেখিলে সম্যক্ হৃদয়ঙ্গম হয় না। অল্প অল্প মেঘ পর্বতের ওপার হইতে উকি মারিতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হইয়া সমস্ত আকাশ ঢাকিয়া ফেলিল। সঙ্গে সঙ্গে মুষল ধারায় বৃষ্টি পড়িতে লাগিল। বৃষ্টির মধ্য দিয়া আর কিছুই দেখা যায় । যেন সমস্ত কুজঝটিকাতে আবৃত হইয়া গেল। প্রকৃতিদেবী আমার প্রতি যেন বিরক্ত হইয়া মেঘান্তরালে সরিয়া দাড়াইলেন। আমি হাঁ করিয়া প্রকৃতির এই খেলা দেখিতে লাগিলাম। উপরে মেঘের কড় কড় নিনাদ, নিচে নদীর কল কল ধ্বনি ও বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দ, একত্রে মিশিয়া কি একটা অশ্রুত পূৰ্ব সঙ্গীতে পরিণত হইল। এইরূপে প্রায় অর্ধ ঘণ্টা কাটিয়া গেল, আকাশ পরিষ্কার হইল, মেঘ সরিয়া পড়িল, প্রকৃতিদেবী পুনরায় হাসিতে লাগিল। বাতায়নতল ত্যাগ করিয়া বাহিরে আসিলাম। রাস্তায় কোথাও একবিন্দু জল দাড়াইয়া নাই, সমস্তই খটখটে। রাস্তায় খানিকটা বেড়াইতে লাগিলাম। ক্রমে নিশার ছায়া আসিয়া পড়িল। চন্দ্রদেব আকাশের এক কোণে দর্শন দিলেন। চন্দ্র কিরণে পৰ্বত নদী প্লাবিত হইয়া গেল। নিকটে ব্যাসদেবের মন্দিরে পূজার ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। হিমালয়ের এই নিভৃত করে কত সহস্র বৎসর ধরিয়া এই ঘণ্টা নিনাদিত হইতেছে তাহা কে বলিবে! কত শত শােক তাপ জড়িত হৃদয়ে এই ধ্বনি ক্ষণেকের জন্য শান্তি, আনিয়াছে তাহার হিসাব কে দিবে! এই নির্জন প্রদেশে এই শান্তি আলয়ে এই ঘণ্টাধ্বনি কি মধুর ! কে যেন গতি ফিরাইয়া দিল। কে যেন মন্দির অভিমুখে পথ দেখাইয়া দিল। ধীরে ধীরে মন্দিরসম্মুখে আসিয়া পড়িলাম, দেখিলাম আমার আগেই মা ও দিদি এখানে উপস্থিত হইয়াছেন।

দেবপ্রয়াগ। মহর্ষির চরণে প্রণাম করিয়া তাহার পূজা দেখিতে লাগিলাম। যে পুণ্যক্ষেত্রে মহর্ষি বেদব্যাস একদা একাগ্রচিত্তে শ্রীভগবানের আরাধনা করিয়া অখিল বেদঃশাস্ত্রের নিগুঢ় রহস্য হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলেন, আজ কোন্ পুণ্যফলে মাদৃশ অধম সেই পবিত্র আশ্রমের বজরাশি স্পর্শ করিয়া জন্ম সার্থক করিল বুঝিতে পারিলাম না। পূজা সমাপনান্তে মহর্ষিকে প্রণাম করিয়া বাসায় ফিরিলাম, বাসায় আসিয়া ক্ষণেক বিশ্রামের পর তৃপ্তির সহিত ভােজন করিলাম। সমস্ত দ্রব্যই সুস্বাদু বলিয়া বােধ হইল। আহারান্তে শুইয়া নানারূপ কথােপকথন করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িলাম। অন্ত ২৬শে বৈশাখ। অতি প্রত্যুষে সকলে শয্যা ত্যাগ করিলাম। ভায়া অতি শীঘ্রই বিছানা বাঁধিয়া ফেলিলেন। এসব কাজে তিনি খুব দক্ষ তাহাকে কিছুই বলিতে হয় না, যেখানে যেটি আবশ্যক বলিবার পূর্বেই তিনি সেটি করিয়া রাখেন। সাড়ে পাঁচটার সময় বাহির হইলাম। গঙ্গার ধার দিয়া সােজা পথে হরিদ্বার হইতে ৫২ মাইল দূরবর্তী ছলৌড়ি চটি অতিক্রম করিয়া আরও দুই মাইল পরে উমরা চটিতে উপনীত হইলাম। উমরা চটিটি বেশ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। অনেকগুলি সুন্দর সুন্দর ঘর আছে। একটি গায়ক ও গায়িকা নাচিতে নাচিতে সুললিত কষ্ঠে ভগবানের স্তুতি গান করিতেছিল আর একটি গায়িকা তাহাদের সহিত যােগদান করিলেন। প্রাতঃসমীরণে সেই পবিত্র সঙ্গীত কণে অমৃত ধারা ঢালিয়া দিতে লাগিল। গান শুনিবার জন্য তথায় ক্ষণে অপেক্ষা করিয়া অগ্রসর হইলাম। পথে সৌর চটি অতিক্রম করিলাম। এই চটির নিকটে অনেকগুলি আম্র বৃক্ষ দেখিতে পাওয়া গেল। রাস্তার দুই ধারে আম্র বৃক্ষের সারি। বেলা নয়টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের সময় দেবপ্রয়াগে আসিয়া উপস্থিত হইলাম।

কেদার বরীর পথে। দেবপ্রয়াগ হরিদ্বার হইতে ৫৮ মাইল। দূর হইতে দেবপ্রয়াগের দৃশ্য বড়ই মনােহর, ধাপে ধাপে মনােহর, ধাপে ধাপে পর্বতের গায়ে যেন গুলি লাল রঙের কৌটা সাজান রহিয়াছে। দেবপ্রয়াগ টিহরীর অন্তর্গত একটি সহর, অলকনন্দা ও ভাগিরথীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। সমুদ্র বক্ষ হইতে ১৫৫• ফিট উচ্চ। এখানে অলকনন? প্রায় ১৪২ ফিট চওড়া, ভাগিরথী প্রায় ১১২ ফিট চওড়া, সঙ্গমের পর গঙ্গ প্রায় ২৪ ফিট চওড়া। ভাগিরী উচ্চ পাহাড়ের মধ্য হইতে প্রচণ্ড বেগে ভীষণ গর্জন করিতে করিতে বক্ষ কেনপুঞ্জে আবৃত করিয়া অলকননা সহিত মিশিতেছেন। যাত্রীদিগকে বৃটিশ গাভােয়ালস্থিত “বা” নগরী হইতে অলকননার উপরিস্থিত ২৮ ফিট দীর্ঘ একটি লৌহের ঝুলান সেতু পার হইয়া পরে দেবপ্রয়াগ যাইতে হয়। এখানে পূৰ্ব্বে একটি দড়ীর পুল ছিল, ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে উহা লৌহ নির্মিত হয়, পরে গােহনা বন্যায় তাহা অব্যবহাৰ্য্য হইয়া যাইলে গত ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে নৈনিতালনিবাসী জনৈক মহাত্মা ৫০০ টাকা ব্যয়ে পুনরায় নির্মাণ করাইয়া দেন। এই পুলের উপর হইতে নদীর ভীষণ জলপ্রবাহ ভয়ানক বলিয়া বােধ হয়। এখানে কুমারী নিবেদিতার মন্তব্যটুকু পাঠকগণকে উপহার দিবার লােভ সংবরণ করিতে পারিলাম না I have missed many chances of seeing Niagra, but I cannot imagine that it is any grander than the sight of the gorge as one stands on the bridge of Devaprayag. Nor can I conceive of anything more terrible than the swirl and roar of the rivers here, where the steps lead down over the living rock to the meeting of the Alakaranda and Bhagirathi. Wind and whirlpool দেবপ্রাগ। and torrent overwhelmed us with their fierceness of voice and movement. The waters roar and a perpetual tempest wails and rages. And as long as a thing is too much for one's mind to grasp, does it matter whether it is once or fifty times too much ? Infinite is the terror of the waters at Devaprayag. Victory to the Infinite! Glory to the terrible ! অলকননা গাড়ােয়ল জেলার একটি প্রধান নদী। বদরিনাথের কিছু উত্তরে উঠিয়াছেন। মানা গ্রামের কিছু নিম্নে সরস্বতী ইহাতে আসিয়া মিশিয়াছেন। ধনাধিপতি কুবেরের রাজধানী অলকাপুরীর নিকট আসিয়া মৰ্ত্তভূমির দিকে ধাবিত হইয়াছেন বলিয়া তাহার নাম অলকনন্দ। বিষ্ণুপ্ৰয়াগে ধবলি গঙ্গা আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। বদরিনাথ হইতে বিষ্ণুপ্ৰয়াগ ১৬ মাইল, অলকনন্দা ৫০০০ ফিট নামিয়া আসিয়াছেন। সঙ্গমস্থলে ধবলি গঙ্গা ৩৫ হইতে ৪০ গজ প্রশস্ত, অলকনন্দা ২৫ হইতে ৩০ গজ। উভয়েরই স্রোত প্রচণ্ড। সঙ্গমস্থল সমুদ্র বক্ষ হইতে ৪৭৪৩ ফিট উচ্চ। ক্রমে রুদ্র, গরুড়, পাতাল, ও বিরহী গঙ্গাকে সঙ্গে লইয়া দক্ষিণ পশ্চিম মুখে চামােলি পর্যন্ত আসিয়াছেন। পরে দক্ষিণাভি- মুখে আসিয়া নন্দপ্রয়াগে নাকিনীকে সঙ্গে লইয়াছেন। নন্দাকিনী ও অলকননার সঙ্গমস্থল সমুদ্রবক্ষ হইতে ২৪৬৪ ফিট উচ্চ এখান হইতে দক্ষিণ পশ্চিমাভিমুখী হইয়া কর্ণ প্রয়াগে উপনীত হইয়াছেন। কর্ণ প্রয়াগে পিণ্ডার বা কর্ণ নদীর সহিত মিলিত হইয়াছে। সঙ্গমস্থল সমুদ্র বক্ষ হইতে ২৩০০ ফিট উচ্চ। তথা হইতে ঠিক পশ্চিম ১৯ মাইল দূরে রুদ্র প্রয়াগ। রুদ্রপ্রয়াগ মন্দাকিনী ও অলকনন্দার সঙ্গমস্থল, সমুদ্র বৃক্ষ হইতে ১৯১২ ফিট উচ্চ। তাহার পর ৪৪ মাইল দূরে দেবপ্রয়াগ। ৩৭ কেদার বঙ্গরীর পথে। দেবপ্রয়াগ সহরটী নদীবক্ষ হইতে পৰ্বত গাত্রে ১•• ফিট উচ্চে নির্মিত। নগরের পশ্চাতে পাহাড়টী প্রায় ৮০০ ফিট উঠিয়াছে। সহরের মধ্যে রামচন্দ্রের একটি প্রকাণ্ড মন্দির আছে। মন্দিরটি বােধ হয় পাথর সাজাইয়া নির্মাণ করা হইয়াছে, কোনরূপ মসলা দেওয়া হয় নাই। একটি চত্বরের উপর প্রতিষ্ঠিত। ভাগিরথী ও অলকনন্দার সঙ্গমস্থল হইতে যাইতে হইলে প্রস্তর নির্মিত সােপান অবলম্বন করিয়া যাইতে হয়, তাহা অতীব আয়াস সাধ্য। পাণ্ডারা বলেন মন্দিরে অনেক ধন দৌলত আছে। টিহরি রাজগণ মৃত্যুকালে তাঁহাদের নিজ ব্যবহারের অলঙ্কার ও পরিচ্ছদাদি এই মন্দিরে অৰ্পণ করিয়া থাকেন। মন্দিরের মস্তকে একটি শুভ্র গম্বুজ, একটি স্বর্ণময় গােলক ও চূড়া শােভা পাইতেছে। ব্রাহ্মণের ইহার বয়স ১০০০০ বৎসর অনুমান করেন। এখানে অনেকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মন্দির আছে। মন্দির গুলিতে গণেশ দুর্গা ও শিবলিঙ্গ বর্তমান আছেন। অলকনন্দা গর্ভে বশিষ্ট কুণ্ডে ও ভাগিরথী গর্ভে ব্ৰহ্মকুণ্ডে স্নান করিতে হয়। সঙ্গমস্থলে একটি মজবুত ঘাট আছে তথায় যাত্রীগণ লােহার শিকল ধরিয়া স্নান করিয়া থাকেন। জলের বেগে ভাসিয়া যাইবার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশী। এখানে মস্তক মুণ্ডন, পিতৃগণের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান, ভােজ্যদান, করা বিধেয়। অধিকন্তু যাত্রীর গােদান করিয়া অশেষ পুণ্য সঞ্চয় করিয়া থাকেন। দেবপ্রয়াগে বদরীনাথের পাণ্ডারা বাস করেন। যাত্রীদিগকে সঙ্গমস্থলে স্নান করাইয়া রামচন্দ্র ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি দর্শন করাইয়া তাহাদিগের নিজ নিজ খাতায় নাম ধাম লিখিয়া লন। ৩ বদরীনাথে তাহারা আর খাতা রাখেন না। যাত্রীদের থাকিবার জন্য অনেকগুলি বাসাঘর আছে। কিন্তু পাণ্ডারা প্রায় নিজ বাটীতেই আশ্রয় দিয়া থাকেন। পাণ্ডারা অধিকাংশই সজ্জন, যাত্রীদিগকে অত্যন্ত যত্ন করিয়া ৩ দেবপ্রয়াগ। • থাকেন। এরূপ দুর্গম অজানিত প্রদেশে তাহারা না থাকিলে যাত্রীদের কষ্টের সীমা থাকিত না। দোকান আছে, দরকারী প্রায় সকল রকম জিনিষ পত্রই এখানে পাওয়া যায়। ছাতা জুতা প্রভৃতিও বিক্রয় হইতেছে। ভাল ভাল মিষ্টান্নেরও কয়েকখানা দোকান রহিয়াছে। দেব প্রকাগ টিহরি রাজ্যের একটি সৰডিসিন। এখানে টিহরি রাজ্যের একজন ম্যাজিষ্ট্রেট থাকেন। অলকননার অপর পারে ‘বা। ইহা ব্রিটিশ গাভােয়ালের অধীন। এই স্থানে টেলিগ্রাফ আফিস ও পােষ্ট আফিস আছে। ‘ব সহরের ভিতর দিয়া অলকনার ধারে ধারে যাত্রীপথ চলিয়া গিয়াছে। অপর একটি রাস্তা দেবপ্রয়াগ হইতে জঙ্গলের মধ্য দিয়া টিহরির দিকে গিয়াছে। এই রাস্তা দিয়া গঙ্গোত্তরী ও যমুনােত্তরী যাওয়া যায়। অলকননা সেতু পার হইয়া শঙ্কর আমাদিগকে পাণ্ডা ঠাকুরের বাটা লইয়া গেলেন। বাটীটি দ্বিতল। রাস্তার দক্ষিণ পার্শ্বে ঠিক পৰ্বত গাত্রে নির্মিত। রাস্তা হইতে সােপান। পাণ্ডা ঠাকুর স্ত্রীর উপর অতিথি সুকারের ভার দিয়া ৩ বদরীনাথ ধাম চলিয়া গিয়াছেন। তাঁহার স্ত্রী আমাদিগকে সমাদর করিয়া থাকিবার জন্য দ্বিতলে একটি সুন্দর ঘর দেখাইয়া দিলেন। ঘরের পশ্চাৎ দিকের জানালা খুলিলেই দুই হাত দূরে গগণম্পশী পাহাড। নগরজ যেন বাটীখানিকে ক্রোড়ে লইয়া বসিয়া আছেন। আমরা আমাদের গাঁটরিগুলি রাখিয়া শঙ্করের সহিত ভাগিরথী ও অলকনন্দার সঙ্গমস্থলে চলিলাম। সঙ্গে পাণ্ডা ঠাকুরের ভাগিনেয় চলি- লেন। তাহার উপদেশানুসারে কর্তব্য কাৰ্যগুলি সম্পন্ন করা হইল।

কেদার বদরীর পথে। নদীর জল অত্যন্ত ঠাণ্ডা ; অবগাহন স্নান করিতে সাহস হইল না। দুই তিনটি ধাপ নামিয়া বসিয়া পড়িলাম। এবং সেইখানে বসিয়া বসিয়া গাত্র মস্তকাদি ধৌত করিয়া লইলাম। মা ও দিদি আরও কতকটা নামিয়া স্বচ্ছনে প্রীতির সহিত অবগাহন করিয়া স্নান করিলেন। পুরােহিত মহাশয় মন্ত্র পড়াইতে লাগিলেন। স্নানান্তে রামচন্দ্রের মন্দির ও অন্যান্য কয়েকটি দেবমনিরাদি দর্শন করিয়া বাসায় ফিরিলাম। আমাদিগকে প্ৰসাদ দিবার জন্য পাণ্ডাপত্নীর বড়ই আগ্রহ। কিন্তু তাহার ক্রোড়ে দুই মাসের এক নবকুমার, সুতরাং প্রসাদের লােভ সম্বরণ করিয়া তাহাকে আমাদের জন্য বন্ধন করিবার প্রয়াস হইতে বহুকষ্টে নিবৃত্ত করিলাম। আজকাল প্রত্যহ বৈকালে বৃষ্টি হইতেছে ভাবিয়া আমরা শীঘ্র বাহির হইয়া পড়িব মনে করিলাম। তাড়াতাড়ি আহার করিয়া দেবপ্রয়াগ ত্যাগ করিলাম। সেতুর উপর হইতে অলকনন্দা ও গঙ্গার সঙ্কমের মহান দৃশ্য দেখিয়া বিস্ময়রসে আপ্লুত হইয়া পড়িলাম। শ্রীভগবান ভক্ত অর্জুনকে যে বিশ্বরূপ দেখাইয়াছিলেন এ বুঝি তাহারই প্রতিচ্ছবি-এ বুঝি সেই বিরাট পুরুষেরই তাণ্ডব লীলা। এক দিক হইতে গঙ্গার শুভ্রধারা, অপর দিক হইতে অলকনন্দার নীল জলরাশি স্বর্গের কোন্ নিভৃত প্রদেশ হইতে যেন আর্যাবর্তের মঙ্গল সাধনের মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হইয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে দৌড়াইয়া আসিতেছিল। এই মহা পুণ্যক্ষেত্রে পরস্পরে মিশিয়া একপ্রাণ একদেহ হইয়া আবার সেই পূর্বের মত প্রচণ্ডবেগে দৌড়াইয়াছে। অভ্রংলিহ গিরিশ্রেণীর মধ্য দিয়া এই দুইটি স্রোতস্বিনী যেখানে পরস্পরকে আলিঙ্গন করিয়াছে, সেখানকার সেই ভীষণ দৃশ্য দেখিলে সেই উদ্বেলিত বিক্ষিপ্ত জলরাশির তরঙ্গভঙ্গিমা, অনন্ত বিকীর্ণ বারিকণার অনুপম সৌন্দয়- ৱাশি প্রত্যক্ষ করিলে এবং ভীম ভৈরব তরঙ্গাভিঘাতধ্বনি করে করে ৪০

দেবপ্রয়াগ।
প্রতিধ্বনিত হইতে শুনিলে অতিবড় নাস্তিকেরও মস্তক ভগবানের চরণে
লুটাইয়া পড়ে, ভক্তিগদ্গদচিত্তে বলিয়া উঠে
আখ্যাহিমে কো ভবানুগ্ররূপে
নমােহস্তু তে দেববর! প্রসীদ।
বিজ্ঞাভূমিচ্ছামি ভবন্তমাং
নহি প্ৰজামি তব প্রবৃত্তিম ?

( 3 )
শ্রীনগর।
I
দেবপ্রয়াগ হইতে রাণীবাগ-৭ মাইল।
রামপুর-১১ মাইল।
ভিন্ন কেদার-১৫ মাইল।
শ্রীনগর-১৮ মাইল।
অলকনন্দা পার হইয়া “বা” নগরীতে পৌছিলাম। বামতীর
হইতে দেৰয়াগের অপূৰ্ব শােভা আর একবার দেখিয়া লইলাম।
সৌন্দৰ্য্য উপভােগ করিবার আর কোন অবসর পাইব কি না জানি না।
যতই দেখি পরিতৃপ্তি হয় না।
ভাগিরথীর নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া আমরা অলকনন্দার বামতীর
ধরিয়া যাইতে লাগিলাম। রাস্তা একই রকমের। উভয় পার্শ্বে আকাশ
ভেদী পৰ্বতশ্রেণী, মধ্যে অলকনন্দা। ক্রমে সন্ধার ছায়া আসিয়া পড়িল।
সূৰ্য্যদেব পৰ্বতের ওদিকে নামিয়া পড়িলেন। আমরাও সম্মুখবর্তী
রাণীবাগ চটীতে আশ্রয় লইলাম। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইতে লাগিল।
চন্দ্রদেব বেগতিক দেখিয়া সরিয়া পড়িলেন। সুযােগ পাইয়া অন্ধকার
চারিদিক দখল করিয়া বসিলেন। ধরিত্রীর এ এক ভীষণ মূর্তি। ভাড়া-
তাড়ি আহার করিয়া শয়ন করিলাম। শুইয়া মেঘের গর্জন ও বৃষ্টি
পতনের শব্দ শুনিতে লাগিলাম।
৪২

শ্রীনগর। অদ্য ২৭শে বৈশাখ শনিবার। প্রত্যুষে উঠিয়া মুখ ধুইবার জন্য পাইপের নিকট যাইলাম। সর্বনাশ! পাইপে জল পড়িতেছে না, বৈধ হয় বৃষ্টি ও ঝড়ের বেগে পাথর গড়াইয়া আসিয়া উপরের পাইপের মুখ বন্ধ করিয়া ফেলিয়াছে। কোথায় জল পাইৰ ভাবিতেছি এমন সময়ে শঙ্কর হাসিতে হাসিতে জল লইয়া আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আমাদের উঠিবার আগে তিনি এই ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া তলদেশবাহিনী নদী হইতে জল আনিতে গিয়াছিলেন। তাহার নিকট হইতে জল লইয়া মুখ হাত প্রক্ষালণ করিয়া লইলাম। ৫টা ৪৫ মিনিটের সময় রাণীবাগ ত্যাগ করিলাম। দেড় মাইলের পর একটি বাংলা দেখা গেল। ক্রমে রামপুরে আসিয়া পৌছিলাম। রামপুরের সন্নিকটে একটি ক্ষুদ্র পার্বত্য স্রোত বহিয়া গিয়াছে। আমরা সেই স্রোত বামে রাখিয়া কতকটা অগ্রসর হইয়া একটি পাকা সেতু দ্বারা তাহা পার হইলাম। পার্বত্য রমণীগণ লৌহ নির্মিত কলসে নদীগর্ভ হইতে জল লইয়া আসিতেছে দেখিয়া বােধ হইল যেন দেবকন্যাগণ পৰ্বত গাত্রে খেলা করিয়া বেড়াইতেছেন। ক্ষণেক বিশ্রাম করিয়া পুনরায় চলিতে লাগিলাম। অল্পক্ষণের মধ্যে একটি বিস্তৃত উপত্যকায় আসিয়া পৌঁছিলাম। চতুর্দিকে পৰ্বতের প্রাচীর। মধ্যে একমাইল ব্যাসের একটি গােলাকার সমতলক্ষেত্রে চাষবাস হইতেছে। রাস্তাটি আমাদের বাঙ্গালাদেশের গ্রাম্য রাস্তার ন্যায়, পথের ধারে কাটার বেড়া। বেড়ার মধ্যে গম তামাক ইত্যাদির চাষ হইয়াছে। ৩ মাইল পরে জলাশ গ্রাম। এখানে নদীগর্ভে খানিকটা সমতল জমি পাওয়ায় আবাদ হইয়াছে। নদীর স্রোতের পার্শ্বে খানিকটা সমতলভূমি, তাহার পার্থে পাহাড়। রাস্তা পাহাড়ের গা দিয়া চলিয়া গিয়াছে। রাস্তা হইতে শস্য ক্ষেত্রগুলি সতরঞ্চির মত দেখাইতে লাগিল। দেখিতে বড়ই সুন্দর।

কেদার বদরীর পথে। ক্রমে ক্রমে বিশ্বকেদার বা ভিল্লকেদারে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। টুংটম বা খাণ্ডৰ নদী এখানে আসিয়া অলকনন্দার সহিত মিশিয়াছেন একটি লৌহ সেতু দিয়া তাহা পার হইতে হয়। সঙ্গমস্থলের উপরে একটি উচ্চ পাহাড়ে ভিল্লকেদারের মন্দির প্রতিষ্ঠিত। নিকটেই অনেকগুলি মূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। পাণ্ডারা তাহা নারায়ণ ও কালীমূর্তি বলিয়া নির্দেশ করেন। তন্মধ্যে একটি মুর্তি বুদ্ধ মূর্তি বলিয়া বােধ হইল। দ্রষ্টব্য বিষয় গুলির মধ্যে বহুপুরাতন একটি শিবলিঙ্গ, মেঝের উপর খােদিত চরণ চিহ্ন ও পদ্ম উল্লেখ যােগ্য। গত গহনা বন্যায় স্থানটির বিশেষ ক্ষতি হইয়াছে। এই স্থানের অপর একটি নাম ঢুণ্ড প্রয়াগ। এই স্থানে অৰ্জন মহাদেবকে তপস্যায় সন্তুষ্ট করিয়া পাশুপত অস্ত্র লাভ করিয়াছিলেন। সে উপাখ্যান অনেকেই মহাভারতে পড়িয়াছেন। যাহারা পড়েন নাই তাহারা বনপর্বের কেরাত পর্বাধ্যায় পড়িয়া দেখিতে পারেন। যখন পাণ্ডবগণ কাম্যবনে বাস করিতেছিলেন সেই সময়ে দেবগণের নিকট হইতে দিব্যাস্ত্র সকল লাভ করিবার জন্য অজুন সশস্ত্র হিমালয় প্রদেশে গমন করিলেন, এবং তথায় একটি অতি রমণীয় স্থান নির্বাচন কবিয়া উগ্রতপস্যায় প্রবৃত্ত হইলেন। কিছুকাল পরে পশুপতি কিরাত বেশে এবং ভগবতী ও অন্ত কতিপয় রমণী কিরাত রমণীর বেশে যেখানে অক্ষুন তপস্যা করিতেছিলেন তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ঠিক সেই সময়ে মূক নামক এক দানব বাহরূপ ধরিয়া অর্জুনকে আক্রমণ করিল। অর্জুন তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বাণক্ষেপ করিলেন, কিরাও বরহকে লক্ষ্য করিয়া বাণক্ষেপ করিলেন। দুইটা তীরই এককালে রাহরূপী দানবকে বিদ্ধ করিল। দানব প্রাণত্যাগ করিল। ৪৪ নমগর। তখন কিরাত ও অর্জুনের মধ্যে খৈার বিবাদ উপস্থিত হইল। অজুন কহিলেন আমি অগ্রে বাণ ত্যাগ করিয়াছি তুমি কেন তাহার প্রতি বাণ ত্যাগ করিলে ? এরূপ আচরণ মৃগয়াধর্ম বিরুদ্ধ। কিরাত কহিলেন আমি প্রথমেই বরাহের প্রতি লক্ষ্য করিয়াছিলাম এবং আমারই শরে সে নিহত হইয়াছে। তুমি আমার লক্ষ্যের প্রতি শরক্ষেপ করিয়া গর্হিত কাৰ্য কবিরছ। তােমাকে তজ্জন্ত শাস্তি দিব। । বিবাদ ক্রমে ঘনীভূত হইয়া উঠিল উভয়ের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বধিরা গেল। শরজাতে আহত হইয়াও কিরাত বিশেষ বিচলিত হইল না। অর্জুনের অস্ত্রশস্ত্র ফুরাইয়া গেল, তখন উভয়ে মল্লযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। কিরাত কর্তৃক ভূতলে নিক্ষিপ্ত হইয়া অজুন কিছুক্ষণ হচেতন হইয়া পড়িয়া থাকিয়া সংজ্ঞা লাভ করিলেন এবং মৃন্ম শিবমুর্তি নির্মাণ করিয়া মহাদেবের অর্চনায় প্রবৃত্ত হইলেন। মৃণয় মূর্তির মস্তকে মাল দিয়া বিস্ময়ের সহিত দেখিলেন সেই মাল্য কিরাতের শিরােদেশে দুলিতেছে। অর্জুন তখন বুঝিলেন পশুপতিই কিরাতবেশে তাহাকে দর্শন দিয়া- ছেন। ভক্তির উচ্ছাসে বিল হইয়া গেলেন—কিরাতের পদপ্রান্তে লুঠাইয়া পড়িলেন। না জানিয়া যে অপরাধ করিয়াছেন, তাহার জন্য বার বার ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। পশুপতি ক্ষমা করিয়া হাসিতে হাসিতে তাহাকে আলিঙ্গন করিলেন এবং প্রসন্নচিত্তে সমন্ত্রক পাশুপত অস্ত্র দান করিলেন। দেবাদিদেব এই খানে কিরাতবেশ ধারণ করিয়াছিলেন বলিয়া এই স্থানের নাম ভিল্লকেদার হইয়াছে ইহাই প্রবাদ। ৪৫ কেদার বঙ্গরীর পথে। ওপারে মার্কণ্ডেয় গঙ্গা নামে একটি জলস্রোত অলকনন্দায় আসিয়া পড়িয়াছে। প্রবাদ সঙ্গমস্থলে মার্কণ্ডেয় ঋষি তপস্যা করিয়াছিলেন। সােমবারে অমাবস্যা পড়িলে এখানে খুব ধুম ধাম হয়। ভিল্লকেদারে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম করিলাম। বিশ্রামান্তে কতকগুলি দ্রষ্টব্য বিষয় দেখিয়া রওনা হইলাম। কিছুদূর অগ্রসর হইয়া অপর একটি রাস্তার সন্ধিস্থলে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এখানে টিহরি হইতে একটি রাস্তা আসি। আমাদিগের রাস্তায় মিশিয়াছে। রাস্তাটি অলকননার উপর দিয়া আসিয়াছে । একটি বােলা সেতু দ্বারা অলকনন্দা পার হইতে হয়। ওপারে পাহাড়ের গায়ে রাস্তাটি দেখিয়া বােধ হইতে লাগিল যেন কে একটি মালা পাহাড়ের গায়ে রাখিয়া দিয়াছে। রাস্তাটি বাম দিকে রাখিয়া আমরা যাইতে লাগিলাম। ক্রমে ক্রমে ক্রযন্ত্রঘাটে আসিয়া পৌছিলাম। ইহা হরিদ্বার হইতে ৭৫ মাইল। এখানে অলকনন্দা একটু প্রশস্ত। নদীর বামপার্শ্বে প্রায় অর্ধ মাইল একটি চড়া। রাশীকৃত বালুকা। নদীগর্ভে স্থানে স্থানে সােতবিক্ষিপ্ত ছােট বড় নানা রকমের প্রস্তরখণ্ড। তাহাদের মাঝে মাঝে অনেকগুলি তা আসিয়া লাগিয়া রহিয়াছে। নদীতে জল কম থাকায় তক্তাগুলি পাথরে লাগিয়া আটকাইয়া আছে, ভাসিয়া যাইতে পারে নাই। ঘাটের নিকটেই রাস্তার দক্ষিণ পার্শ্বে একটি প্রকাণ্ড অশ্বথ বৃক্ষ। তলাটি পাথর দিয়া বাধান। তাহার উপর বসিয়া অনেকগুলি লােক বিশ্রাম করিতে পারেন। আমরা আসিবার পূর্বে সেই বাঁধান চত্বরের উপরে কয়েকজন লােক বসিয়াছিল। খাটটিও লােকে পরিপূর্ণ। ইহাদের অধিকাংশই স্থানীয় লোক। এত জনতার কারণ জানিবার জন্য বড়ই কৌতুহল হইল। অনুসন্ধানে জানিলাম যে একটি যাত্রী এই স্থানে ভগবৎক্রোড়ে নগর। স্থান পাইয়াছেন। এই দেশের রীতি অনুসারে তাহার দেহ নীলে ভাসাইয়া দেওয়া হইতেছে। যাত্রীটি একাকী খাইতেছিলেন, তাহার বাড়ি কোথায় কেহই জানে না। তাহার আত্মীয় স্বজন কেহই সংবাদ পাইবেন না। তাহারা কতদিন উৎকণ্ঠিত চিত্তে তাহার প্রত্যাগমন প্রতীক্ষা করিবেন। সােৎসুক নয়নে পথপানে চাহিয়া থাকিবেন। কত আশায় বুক বাঁধিয়া দিনের পর দিন গণনা করিবেন। মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর, চলিয়া যাইবে পরে হতাশ প্রাণে তাহার প্রত্যাগমনের সকল আশায় জলাঞ্জলি দিয়া তাহার কথা ভুলিবার চেষ্টা করিবেন। একপ্রাণে একমনে ভগবানের নাম স্মরণ করিয়া এই ভাগ্যবান ভগবদর্শন করিতে যাইতেছিলেন। ভগবান তাহাকে ক্রোড়ে আশ্রয় দান করিয়াছেন। সুতরাং তাহার জন্য আমাদের মন ততটা বিচলিত হইল না, কিন্তু তাহার আত্মীয় পরিজনের কথা ভাবিতেও আমাদের হৃদয় কঁপিয়া উঠিল। এই ঘটনার কথা ভাবিতে ভাবিতে আমরা এক মাইল পথ অতিক্রম করিয়া শ্রীনগর সহরে উপনীত হইলাম। শ্রীনগরসহরটী নূতন, গাড়ােয়ল জেলার বর্তমান হেড কোয়াটার পৌড়ি হইতে ৮ মাইল দুরে সমুদ্র বক্ষ হইতে ১৭০৬ ফিট উচ্চে অলক নন্দার বাম উপকূলে অবস্থিত। পুরাতন শ্রীনগর গাড়োয়াল রাজ্যের রাজধানী ছিল। ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দের ভীষণ বন্যায় তাহা একেবারে ভাসিয়া গিয়াছে। রাজভবনের কোন চিছু নাই। যেখানে রাজধানী প্রতিষ্ঠিত ছিল সেখানে এখন কৃষিক্ষেত্র হইয়াছে। তথা হইতে ৫ ফালঙ উত্তর পূর্বে পাহাড়ের উপর একটি উচ্চ স্থানে এই নুতন সইর নির্মিত হইয়াছে। রাস্তাগুলি পরিস্কার, দুইপার্শ্বে গাছের সারি। রাস্তার পার্শ্বের বাটীগুলি দ্বিতল। নিম্নতলে দোকান, সেই সকল দোকানে নানা প্রকার দ্রব্য ৪৭ কেদার বদরীর পথে। বিক্রিত হইতেছে। জুতা, ছাতা, কম্বল, অইল কথoil cloth) প্রভৃতি 'অনেক দ্রব্য এখানে পাওয়া যায়। বাটীগুলি প্রস্তর নিম্মিত, ছাদ শ্লেটের। এখনকার সহরের ন্যায় এখানে হাসপাতাল, পুলিশ, পােষ্ট ও টেলিগ্রাফ আফিস, উচ্চশ্রেনীর ইংরাজি বিদ্যালয় ধৰ্ম্মশালা ও একটি ডাক বাংলা আছে। সহরে প্রবেশ করিলেই হাসপাতাল। হাসপাতালটি সদা বুত ও হইতে ১৫০০০ টাকা ব্যয়ে নিশ্মিত। প্রাচীনকালে গাড়ােয়া রাজ কতকগুলি গ্রামের রাজস্ব সাধারণের উপকারের জন্য দান করেন। ঐ টাকা কতক দেবতার সেবার ও মনিরাদির সংস্কারে এবং কতক দরিদ্র যাত্রীদের সেবায় ব্যয়িত হয়। যে টাকা দরিদ্র যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট আছে তাহাতে একটি কণ্ড বা ভাণ্ডার হইয়াছে তাহাই সদাব্রত ফণ্ড। বর্তমান সহরের অর্ধমাইল মিশ্নে ঐকমলেশ্বর শিবের মন্দির। মন্দিরটি একটি বৃহৎ প্রাঙ্গনের মধ্যে অবস্থিত। মন্দিরের সম্মুখে একটি বৃহৎ পিলের নিৰ্ম্মিত ষণ্ড। প্রাঙ্গনের চতুর্দিকে অট্টালিকা। একটি তিল কামরায় পাণ্ডারা শঙ্করাচার্যের বেদি দেখাইয়া থাকেন। তাহার তুলেন এখানে শঙ্করাচার্য্যের একটি মঠ ছিল। এ দেশীয় বন্ধ্যারমণীরা সন্তান কামনা করিয়া বৈকুণ্ঠ চতুর্দশীর রাত্রিতে ঘৃতের প্রদীপ লইয়া এই কমলেশ্বর দেবের মন্দিরের চতুর্দিকে দাড়াইয়া থাকেন। তাহাদের বিশ্বাস যিনি সমস্ত রাত্রি জাগিয়া থাকিতে পারেন ও যাহার প্রদীপ সমস্ত রাত্রি প্রজ্জ্বলিত থাকে, তাহারই কামনা সিদ্ধ হয়। ইহা ব্যতীত এখানে পঞ্চ পাণ্ডবের মন্দির আছে। তথায় নারদেরও একটি মুক্তি দেখিতে পাওয়া যায়। কিঞ্চিৎ দূরে অন্য দিকে লক্ষ্মী নারায়ণের মন্দির। যদি কেহ বদরি নারায়ণ পৰ্য্যন্ত যাইতে না পারেন এই ৪৮ নগর। 'ছনে লক্ষ্মী নারায়ণকে দর্শন ও তঁাহাদের পূজা কৰিলে বদরীনারায়ণ দর্শন ও তাহার পূজার ফললাভ হয়, পাণ্ডারা এইরূপ বুঝাইয়া থাকেন। লক্ষ্মী নারায়ণের দুইটি মন্দির আছে একটি পুরাতন, ভীষণ জঙ্গল মধ্যে, যাওয়া নিতান্ত দুরূহ। দ্বিতীয়টি অপেক্ষাকৃত নূতন। মন্দিরের সম্মুখে গরুড় দেবে একটি মূর্তি আছে। পাণ্ডারা বলেন এই মূর্তিটি নূতন। পূৰ্বে এখানে অপর একটি মূর্তি ছিল—তাহা একদিন হঠাৎ আকাশে উড়িয়া গেলে এই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। বর্তমান শহর হইতে কিঞ্চিৎ দূরে নদীর অপর পারে একটি প্রকাণ্ড কৃক্ষের নিকট ফালিকাদেবীর যজ্ঞবেদী। পূৰ্বে এখানে নরবলি হইত। জন প্রবাদ, শঙ্করাচাৰ্য পাথরটি নদীগর্ভে ফেলিয়া দিয়া নরহত্যা নিবারণ করিয়াছেন। গাড়ােয়াল একটি প্রাচীন রাজ্য। যিষ্ণুপুরাণ, মহাভারত, ও স্কন্দপুরাণে ইহা নাগ হুল কিরাতাদি দ্বারা অধ্যুসিত কেদারখণ্ড নামে অভিহিত। বর্তমান রাজবংশ শালিবাহনের বংশ বলিয়া পরিচয় দেন। নাগরাজগণের প্রাধান্য পাকেশ্বরে নাগপূজায় কতকটা অনুমিত হয়। পৌড়ির নিকটে নাগদেব নামক স্থানে নাগ এখনও পূজা পাইয়া থাকেন। পূর্বে গাড়োয়াল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। হুয়েনসাঙের বিবরণীতে ব্রহ্মপুরের নাম দেখিতে পাওয়া যায়। গােপেশ্বর মন্দিরে একটি প্রকাণ্ড ত্রিশূল একটি প্রাচীন রাজ্যের সাক্ষ্য দিতেছে। একটি রাজ্যের রাজধানী জোতিবামে ছিল বলিয়া বােধ হয়। পাণ্ডুকেশ্বর ও নিকটবর্তী স্থানে প্রাপ্ত গিলালিপি হইতে অনেকে অনুমান করেন যে এই রাজ্য তুষারধবল হিমাদ্রি শিখর হইতে হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। অজয় পাল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য জয় করিয়া প্রথমে এ সুত্র রাজা হন। পালবংশে ফেঙ্গার বদরীর পখে। অনেকগুলি রাজা ক্রমান্বয়ে দেওলগড়ে রাজত্ব করেন। বাহাদুর সা লােদী গাড়োয়াল রাজ্য পরিদর্শন করিতে আসেন। গাড়োয়াল রাজের অতিথি-সৎকারে সন্তুষ্ট হইয়া যাইবার সময় তদানীন্তন রাজা বলভদ্র সাকে সা উপাধিতে ভূষিত করেন। নিহরি রাজগণ অদ্যাবধি এই উপাধি ধারণ করিতেছেন। বলভদ্র সার পর মান সা, শম সা, দুলারাম সার নাম পাওয়া যায়। শেষােক্ত রাজার রাজত্ব কালে নিকটবর্তী কুমায়নরাজ রুদ্রাদের সহিত সঘর্ষ উপস্থিত হয়। রুদ্রাদের মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র লক্ষ্মীচাদ সাত বার গাড়েয়াল রাজ্য আক্রমণ করেন। কিন্তু গাড়োয়ালরাজ মহীপতি সার নিকট পরাজিত হইয়া গাড়োয়ালজয়ের আশা পরিত্যাগ করেন। মহীপতি সা রাজধানী দেওলগড় হইতে শ্রীনগরে লইয়া আসেন। মােগলদের রাজত্বকালে গাড়োয়াল রাজ, মােগল সরকারে কোন রাজস্ব দিতেন না। জনপ্রবাদ, মােগল সম্রাট আকর রাজস্ব নির্ধারণ করিবার জন্য রাজ্যের আয় ও একটি মানচিত্র চাষি। পাঠান। তদানীন্তন গাড়ােয়ালরাজ সম্রাটসমীপে একটি, শীর্ণ উষ্ট্র পাঠাইয়া দিয়া বলিয়া পাঠান ইহাই গাড়োয়াল রাজ্যের প্রতিকৃতি। সম্রাট সন্তুষ্ট হইয়া গাড়োয়ালরাজকে রাজস্ব হইতে অব্যাহতি দেন। গাড়োয়ালরাজকে অনবরত কুমায়ুন ও নেপাল রাজার সহিত যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকিতে হইত। অবশেষে ১৮৩ অব্দে অমর সিংহ থাপা প্রমুখ সেনানীগণের নেতৃত্বে গুখ সৈন্ত গাড়োয়াল আক্রমণ করেন। রাজা প্রধামন সা ভূমিকম্প প্রভৃতি কতিপয় অশুভ চিহ্ন দেখিয়া ও রাজপুরােহিতগণের ভবিষ্যদ্বাণী শ্রবণ করিয়া কিংকর্তব্যবিমুঢ় হইয়া পড়েন। শত্রুসৈন্তকে বাধা দিবার কোন বন্দোবস্ত হইল না। তাহারা নির্বিবাদে রাজধানী দখল করিল, রাজা সপরিবারে দেহরাদুনে পলাইয়া শ্রীনগর। আত্মরক্ষা করিলেন। তথা হইতেও তাড়িত হইয়া লাঙ্কোরার রাজার আনুকুল্যে ১২০০০ সৈন্য সমভিব্যাহারে দুন পুনরুদ্ধারের জন্য একবার চেষ্টা; করেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হইলে পুত্র সুদর্শন স ইংরাজ রাজত্বে, পলাইয়া আশ্রয় গ্রহণ করেন। অমরসিংহ শ্রীনগরে রাজধানী রাখিয়া গাড়োয়াল রাজ্য কঠোর ভাবে শাসন করিতে লাগিলেন। গুর্যাসে গাড়োয়াল রাজ্য অধিকার করিয়া ক্ষান্ত হইল না। ব্রিটিশ অধিকারে, হস্তক্ষেপ করিল। লর্ড হেষ্টিংস গুদিগকে সমুচিত শাস্তি দিবার জন্য আয়ােজন করিতে বাধ্য হইলেন। গুর্খারা গাড়োয়াল রাজ্য হইতে বিতাড়িত হইল। ১৮১৫ অব্দে নেপালযুদ্ধ শেষ হইলে, সুদর্শন সা ইংরাজের নিকট হইতে বর্তমান টিহরি রাজ্য প্রাপ্ত হইলেন। অলকননা ও মন্দাকিনীর পুর্ব দিকস্থিত জনপদ ইংরাজ অধিকায়ে রহিল, সুতরাং শ্রীনগর ইংরাজেরই হইল। গাড়ােয়ালরাজ টিহরিতে রাজধানী স্থাপন করিলেন। গত সিপাহি বিদ্রোহের সময় সুদর্শন সা ইংরাজদিগকে সমুচিত সাহায্য, করেন। ১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে অপুত্রক অবস্থায় পরলােক গমন করিলে ইংরাজরাজ ভবানী সার উপর রাজ্যভার অর্পণ করেন। তিনি ১৮৭২ খৃাব্দে এবং তঁাহার পুত্র প্রতাপ সা ১৮৮৭ খৃষ্টাব্দে দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী রাজা সার কীৰ্ত্তি সা K. c. S. i, ১৮৯২ সালে রাজগদি প্রাপ্ত হন। বর্তমান রাজা নরেন্দ্র সা বাহাদুর মেও কলেজে অধ্যয়ন সমাপন করিয়া গত ১৯১৯ খৃষ্টাব্দের ৪ঠা অক্টোবর তারিখে সিংহাসন প্রাপ্ত হইয়াছেন এবং ক্যাপ্টেন উপাধি লাভ করিয়াছেন। আমরা ধর্মশালায় আশ্রয় লইলাম। পাশাপাশি দুইটি বাড়ী। মধ্যে: একটি দরজা। বাড়ী দুইটিরই মধ্যে প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণের চতুর্দিকে কামরা, কেদার বদরীর পথে। কামরাগুলি দ্বিতল। প্রাঙ্গণের মধ্যস্থলে জলের পাইপ। পর্বতের উপর হইতে ঝরণার জল আসিতেছে। পাইপ হইতে সর্বদা জল পড়িতেছে। ধর্মশালাটি যাত্রীতে পরিপূর্ণ। বাঙ্গালী, হিন্দুস্থানী, রাজপুত, পাঞ্জাবী আরহাটী, মাদ্রাজী সকল জাতির একত্র সমাবেশ। বাঙ্গালী যাত্রীদের মধ্যে স্ত্রীলােকের সংখ্যা বেশী। অন্যায় প্রদেশের যাত্রীদের মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই সংখ্যা প্রায় সমান, বরং পুরুষের সংখ্যাই কিছু বেশী প্ৰলিয়া বােধ হইল। এখানেই আমরা গান আহার সমাপন করিয়া লই লাম। সহরে প্রবেশ করিবার সময় যা কিছু দেখিবার সব দেখিয়া, আসিয়াছি।

( ৫১ রুদ্রপ্রয়াগ। নগর হইতে নরকোটা-১৪ মাইল। নগর হইতে সুকরতা-৪ মাইল। ভটিসেব-৭|• • খাকরা-১২ গুলাব রায়-১ প্রয়াগ-২ শ্রীনগর ছাড়িয়া পুনরায় পাহাড় ও নদীর মধ্যে অসিয়া পড়িলাম । একদিকে আকাশস্পশী পৰ্ব্বতের শ্রেণী, অন্য দিকে পাতাবাহিনী নদীর স্রোত। সূৰ্য্যদেব পশ্চিম গগনে ঢলিয়া পড়িতেছেন। রৌদ্রের তাপ ক্রমেই কমিয়া আসিতেছে। সেই অপ্রখর তাপে বেশ আরাম বােধ করিতে করিতে আমরা ধীরে ধীরে চার মাইল দূরবর্তী সুকর চটি অতিক্রম করিলাম। চটিটা যাত্রীতে পরিপূর্ণ। চটি ছাড়িয়া প্রায় এক মাইল আসিয়াছি এমন সময় হঠাৎ একখণ্ড মেঘ কোথা হইতে আসিয়া দেখা দিল। সঙ্গে সঙ্গে মুষল ধারে বৃষ্টি পড়িতে লাগিল। এখন অনেকটা সতর্ক হইতে শিখি- ছি। Water proof coat বরাবর সঙ্গে রাখিতেছি। মা ও দিদির বাগান oil clothএ ঢাকিয়া দেওয়া হইল। বৃষ্টিতে ভিজিবার ভয় রহিল না। রাস্তায় একটি বরষাত্রীদলের সহিত দেখা হইল। তাহার বিবাহের পর কতা বইয়া ফিরিতেছিল। বয় কন্যা খােল দাণ্ডিতে কেদার বদরীর পথে। বরযাত্রীরা পদব্রজে। বৃষ্টিতে সকলেই ভিজিয়া গিয়াছেন। বরকন্যার পরিহিত লাল রঙের বস্ত্র ভিজিয়া একেবারে বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে। বরের ছােট ভাই, শ্রীনগর ইংরাজি বিদ্যালয় হইতে মেট্রিকিউলেসন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া এলাহাবাদে কলেজে অধ্যয়ন করিতেছেন। তাহার সহিত কথােপকথনে আনন্দলাভ করিলাম। এই আধ ঘণ্টার আলাপে এতই ঘনিষ্ঠ হইয়া পড়িলাম যে, তিনি আমাদিগকে তাহার বাড়ীতে লইয়া যাইবার জন্য বারম্বার অনুরােধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু ভায়ার অবকাশ অল্প। তাঁহার আতিথ্য গ্রহণ আমাদের ভাগ্যে ঘটিল না। তিনি আমাদের সহিত অনেক দূর আসিলেন। অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া উচ্চ পর্বতগাত্রে তাহাদের গ্রাম দেখাইলেন। ফলতঃ আমরা তাহার অনুগমন করিলাম না বলিয়া তিনি অবশেষে দুঃখিত অন্তঃকরণে আমাদের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া একটি সঙ্কীর্ণ পথ ধরিয়া পাহাড়ে উঠিতে লাগিলেন। আমরাও অগ্রসর হইয়া ভটিসেরা চটিতে পৌছিলাম। ঘরগুলি সব যাত্রীতে পরিপূর্ণ। ভাল ভাল ঘরগুলি সব আগেই অধিকৃত হইয়া গিয়াছে। শেষ প্রান্তে একটি স্রোতের পার্শ্বে একটি ঘর আমাদের ভাগ্যে মিলিল। ঘরটি বড় নীচু। এইখানেই অদ্য আমাদিগকে রাত্রিযাপন করিতে গাঁটরি নামাইয়া সতরঞ্চি বিছাইলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিতেছি এমন সময় একদল গায়ক ও গায়িকা আমাদের ঘরের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহারা নিকটবর্তী গ্রামে বিবাহের আসরে গান বাজনা করিয়া ফিরিতেছিল। পথে বৃষ্টিতে বড় কষ্ট পাইয়া ভিজিয়া গিয়াছে। কোথাও আশ্রয় না পাইয়া আমাদের বাসার সম্মুখে আসিয়া ‘াড়াইল। আমাদের ঘরটি একটু বড়। এক অংশে তাহাদের স্থান করিয়া দেওয়া গেল। তাহারা যেন হাতে স্বর্ণ পাইল। আহারাদি করিয়া হইবে।

রুদ্রপ্রয়াগ। তাছারা নাচ গান আরম্ভ করিয়া দিল। সমস্ত রাত্রি ধরিয়া নৃত্যগীত "চলিল। এ অঞ্চলের নাচ গান দেখিবার সাধ ছিল—তাহা ভগবানের ইচ্ছায় অদ্য মিটিল। গান বুঝিতে পারিলাম না অথচ বড়ই মধুর লাগিল। গান শুনিতে শুনতে ঘুমাইয়া পড়িলাম। ২৮শে বৈশাখ রবিবার। প্রাতে ভটিসেরা ত্যাগ করিলাম। একটি চড়াই আৰম্ভ হইল। ক্রমে হরিদ্বার হইতে ৮৬ মাইল অতিক্রম করিলাম। দূর হইতে পৰ্বতশিখরে তুষাররাশি দেখা যাইতে লাগিল। দৃশ্য অতীব মনােহর। দুই মাইল উতরাইএর পর খাঁকড়া চটি। এখানে ভারবাহী ছাগ প্রথম দেখিতে পাইলাম। পার্বত্য অঞ্চলে ছাগ দ্বারা ভার বহন করা হয়, ভূগােলে পড়িয়াছিলাম—অদ্য তাহা প্রত্যক্ষ করিলাম। ছাগগুলি "বঙ্গদেশের ছাগ অপেক্ষা আকারে বড় ও বলিষ্ঠ, সমস্ত অঙ্গ লম্বা লম্বা লােমে আবৃত। কতকগুলির রঙ ধবধবে সাদা, কতকগুলির রঙ কালাে। পৃষ্ঠের দুইদিকে শস্যাদিপুর্ণ দুইটি চামড়ার বা চটের থলে ঝুলাইয়া দেওয়া হইয়াছে। সেই ভার পিটে করিয়া তাহারা অবলীলাক্রমে পৰ্ব্বতের পর পর্বত অতিক্রম করিতেছে। প্রত্যেককে দশ পােনের সেরের অধিক ভার দেওয়া হয় না। এক এক দলে ৩০৪টি ছাগ থাকে । যাইতে যাইতে রাত্রি হইলে তাহারা খােলা জায়গায় শুইয়া থাকে ; প্রত্যুষে উঠিয়া আবার চলিতে আরম্ভ করে। সূর্যের উত্তাপ বেশী হইলে তাহাদের পৃষ্ঠ হইতে তার নামাইয়া লইয়া ছাড়িয়া দেওয়া হয়, তাহার স্বচ্ছল চিত্তে পৰ্বত গাত্রে বিচরণ করিয়া বেড়ায় এবং পর্বতজাত তৃণ ও বৃক্ষ-পত্রে উদর পূর্ণ করে। তাহাদের আহারের জন্য কাহাকেও কোন কষ্ট পাইতে হয় না। আবশ্যকমত চালকের ইঙ্গিতে সকলে একস্থানে আসিয়া # হয়। শলে গুলি আবার পৃষ্ঠে চাপান হয়। তাহারা লাফাইতে '১৫ কেদার বীর পথে। লাফাইতে গন্তব্যস্থানে যাইতে থাকে। পৰ্বতগাত্রে সারিবদ্ধ হাগের দক দূর হইতে সুন্দর দেখায়। খাকরা চটীতে যথেষ্ট পরিমাণ দুধ পাওয়া যায়। এ অঞ্চলে গরুর দুধ প্রায় মিলে না। মহিষের দুধই বেশী পাওয়া যায়। খাকরা চটি অতিক্রম করিয়া একটি সেতু পার হইতে হয়। পরেই একটি চড়াই। প্রায় এক মাইল চড়াইয়ের পর দুই মাইল উতরাই করিয়া নরকোটা চটি এখানে শ্ৰীশ্ৰীকালীদেবীকে প্রণাম করিয়া একটি চড়াইয়ে উঠিতে আরম্ভ করিলাম। দেবীর মন্দিরটি বন্যার স্রোতে গুসিয়া গিয়াছে। হরিদ্বার হইতে ৯১|• মাইল পরে গরুড় দেবের মন্দির। পরেই উতরাই। পর্বতশৃঙ্গে বিমলধবল তুষাররাশি সূর্যকিরণে এক অপূর্ব ঐ ধারণ করিয়া নয়নপথের পথিক হইল। প্রায় তিন মাইল পরে গুলাবরায় চটি নিকটেই জলের ঝরণা। দোকানে জল খাবার ও নিত্যপ্রয়ােজনীয় আটা, ঘি, চাউল, ডাল সবই পাওয়া যায়। হরিদ্বার হইতে ৯৬ মাইল দূরস্থিত রুদ্রপ্রয়াগে উপনীত হইলাম। রুদ্র প্রয়াগের নিকট অলকনন্দার উপর একটি লৌহসেতু পার হইতে হয়। রুদ্র প্রয়াগ অলকনন্দা ও মন্দাকিনীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। স্থানটি সমুদ্রবক্ষ হইতে ১৯১২ ফিট উচ্চে। অলকনন্দা বদরীনাথ হইতে, মন্দাকিনী কেদারনাথ হইতে আসিয়া এখানে মিশিয়াছেন; একটি সােপান- শ্রেণী অবলম্বন করিয়া যাত্রীপথ হইতে সঙ্গমস্থলে নামিতে হয়। সােপান, শ্রেণী পাহাড় কাটিয়া নির্মিত হইয়াছে। সােপানশ্রেণীর ঠিক উপরেই রুদ্রদেবের মন্দির। জনপ্রবাদ, মহর্ষি নারদ এখানে তপস্যা করিয়াছিলেন। রুদ্র প্রয়াগ কেদারখণ্ডস্থিত পঞ্চ প্রয়াগেমধ্যে অগতম। অন্যান্য প্রয়াগ গুলির নাম—দেবপ্রয়াগ, বিষ্ণুপ্ৰয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, ও,কর্ণপ্রাগ। এখানে ;

প্রয়াগ ধর্মশালা, ডাকঘর ও সরকারি বাঙ্গালা আছে। ছােট খাট একটি বাজার দেখিতে পাওয়া গেল। অনেকগুলি দোকান। এখান ইতে একটি রাস্তা মন্দাকিনীর ধার দিয়া কেদারের দিকে গিয়াছে। আর একটি রাস্তা অলকনন্দার ধার দিয়া বদরীর দিকে গিয়াছে। দুই মাইল দূরে অলকনন্দা তীরে কোটেশ্বর মহাদেব দ্রষ্টব্য। পাণ্ডবগণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কলিয়া প্রকাশ। অলকনন্দার ঠিক উপরেই একটি দ্বিতল কক্ষে আমরা বাসা লইলাম। অতি নিম্নে অলকননা উৎকণ্ঠিতচিত্তে মন্দাকিনীর সহিত সাক্ষাৎ করিবার অন্য ছুটিতেছেন। নিকটেই পরস্পরের সাক্ষাৎ ও প্ৰেমালিঙ্গন-কি মধুর! পরক্ষণেই দুই জনে মিশিয়া আনন্দ কোলাহলে চারিদিক মুখরিত করিয়া আনন্দে ফুলিয়া ফুলিয়া সমুদ্রের মত তরঙ্গ তুলিয়া আবার কেমন ছুটিয়াছেন। দোকান হইতে চাউল ও ঘৃত সংগ্রহ করা হইল। দ্রব্যগুলি উপাদেয়। এখানেও যাত্রীসংখ্যা বিস্তর। ঘরগুলি সব যাত্রীতে পরিপূর্ণ। ইহারা আমাদের বহুপূৰ্ব্বে, হরিদ্বার হইতে রওনা হইয়াছেন।

গুপ্তকাশী।
৮
"রুদ্রপ্রয়াগ হইতে ছাতোলী-৫ মাইল। রুদ্রপ্রয়াগ হইতে চাপুরি—১৫ || • মাইল।
টিয়ানা -৬|| •
ভোরী-১৮
, অগস্ত্যমুনি-১•|• ..
সৌড়ী-১৩ • ,
গুপ্তকাশী-২৪
রুদ্রপ্রয়াগে মধ্যাহ্নভোজন সমাপন করিয়া কিঞ্চিৎ বিশ্রামের
পর প্রায় সাড়ে তিনটার সময় যাত্রা করিলাম। শাস্ত্রীয় বিধানানুসারে
অগ্রে কেদারনাথ দর্শন কর্তব্য। *
আমরা প্রথমেই কেদারনাথ দর্শন মানসে কেদারনাথেরই পথ
ধরিলাম। আমাদিগের রাস্তা মন্দাকিনীর বাম ধার দিয়া। ভয়ঙ্কর চড়াই
ও উৎরাই পার হইয়া পাঁচ মাইল দূরবর্তী ছাতোলী চটিতে আসিয়া
পৌছিলাম। এখানে আটা পাচ আনা সের ও ঘি ১০ টাকা সের
বিক্রীত হইতেছে।
অপরাহ্ন ছয়টা। সূৰ্য্যদেব অস্তাচলগমননান্মুখ হইয়াছেন। পৰ্ব্বত
চূড়া সূর্যকিরণে অভিরঞ্জিত হইয়া অপূর্ব শােভা ধারণ করিয়াছে, মধ্যে
৯ ততঃ কেদারভবনং গছে পাপাপুনয়ে।
কেদারনাথং সংপূজ্য—গৃহীতাজ্ঞং ততঃ সুধীঃ ॥
কৰ্য্যং বদরীকেশস্য দর্শণং শুভদায়ক।
অকৃত্বা দর্শনং বৈশ্য কেদারস্যাঘনাশিন।
যে গচ্ছেদ্বদরীং তস্য যাত্রা নিতং ব্রজে।
কেদারখণ্ড।

গুপ্তকাশী। মধ্যে মেঘ আবরণে মুখ লুকাইতেছে। বৃক্ষরাজি স্বর্ণ আভরণে মণ্ডিত হইয়া নিস্তব্ধ ভাবে দেবাদিদেবের চরণ বন্দনা করিতেছে। পক্ষী সকল দিবাবসান বুঝিয়া নিজ নিজ কুলায় অভিমুখে দৌড়তেছে। ক্রমে ক্রমে সূৰ্য্যদেব পাহাড়ের ওপারে নামিয়া পড়িলেন। পক্ষীগণ বৃক্ষশাখায় বসিয়া বন্দনাগীতি আরম্ভ করিল। পৰ্বতবাসীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটীর হইতে পুঞ্জ পুঞ্জ ধূমরাশি কুণ্ডলী পাকাইয়া পৰ্বতগাত্রে ঘূরিতে ফিরতে লাগিল। গােও মহিষের গলায় লম্বিত কাঠের ঘণ্টার শব্দ কর্ণগােচর হইতে লাগিল। ফ্রমে ক্রমে অন্ধকারের ছায়া আসিয়া পড়িল। অচিরে চন্দ্রদেব ওদিক হইতে হাসিতে হাসিতে চারিদিক প্রফুল্লিত করিয়া দেখা দিলেন। তাহার হাসিতে চতুর্দিক পুলকিত হইল। এখানে একদল নেপালী যাত্রীর সহিত দেখা হইল। দলটিতে কেবল একজন মাত্র পুরুষ, অবশিষ্ট সকলেই রমণী। নানা রঙের বস্ত্র পরিহিত নেপালরমণীগণ চন্দ্রকিরণে প্রস্ফুটিত গােলাপের ন্যায় প্রতীয়মান হইতে লাগিল। তাহারা বদরীনাথ দর্শন করিবার জন্য নেপাল হইতে আসিতেছেন। এই চটিতে আর একটি নেপালী পুরুষের সহিত তাহাদের দেখা হইল। তিনি সমস্ত ভারতবর্ষ পৰ্যটন করিয়া বারীনাথ যাইতেছেন। তাহাদের সহিত কথােপকথনে রাত্রি অনেক হইল। ভােজনান্তে শয়ন করিলাম। শয্যা হইতে চন্দ্রদেবের মধুর হাসি দেখিতে লাগিলাম। আকাশ নির্মল, নক্ষত্রখচিত। নিম্নে চতুর্দিকে বৃক্ষরাজিপূর্ণ পর্বতশ্রেণী। প্রকৃতি দেবী যেন কালাপাড় ধবধবে সাদা একখানি সাড়ী পরিয়া মাথায় মূল্যবান সাচ্চার কাজকর ওড়না জড়াইয়া নির্জনে শ্রীভগবানের ধ্যানে নিমগ্ন। পাছে সে কেদার বীর পথে। ধ্যানের কোনরূপ বিঘ্ন হয় শই বুঝি সারা জগৎ আজ এত নীরব-বাতাসও বুঝি নিশ্চল। অদূরে নিরিণী কেবল কুলু কুলু নিনাদে প্রকৃতির সেই সাত্বিকী পূজার মন্ত্রপাঠ করিতেছে। নির্নিমেষ নেত্রে চাহিয়া রহিলাম- বুঝি সহস্রলােচন হইলেও এ দৃশ্য দেখিয়া পরিতৃপ্তি হয় না। সৌন্দর্যের আকর হিমালয়—তােমার ক্রোড়ে বসিয়া দিন দিন ভগবানের কতই বিচিত্র রূপ দেখিলাম । ২১শে বৈশাখ সােমবার। প্রাতে ছাতোলি ছাড়িলাম। দেড় মাইল দূরবর্তী মঠিয়ানা চটি অতিক্রম করিয়া পুনশ্চ দেড় মাইল পরে রাস্তার কিঞ্চিৎ উপরে পর্বত মধ্যে বালকেদার দেবের মন্দির দেখিতে পাইলাম। মন্দিরটি বহু পুরাতন। ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। মেরামত না হইলে একেবারে নষ্ট হইবার সম্ভাবনা। তথা হইতে বাহির হইয়া আড়াই মাইল দূরস্থিত অগস্ত্যমুনি চটীতে আসিয়া পৌছিলাম। চটিটি মন্দাকিনীর বাম উপকূলে অবস্থিত। স্থানটি দেখিয়া বােধ হইল যেন পুরাকালে এখানে একটি হ্রদ ছিল। জল শুকাইয়া গিয়াছে। প্রবাদ, এখানে অগস্ত্য মুনি তপস্যা করিয়াছিলেন। একসময়ে তিনি নাকি সমুদায়, জল গণ্ডুষ করিয়া পান করিয়া ফেলিয়াছিলেন। তার একটি মন্দির আছে। মন্দিরটির চারিদিকে প্রাঙ্গণ ও প্রাঙ্গণের চারিদিকে ঘর। এখানে অনেকগুলি মুক্তি আছে- তন্মধ্যে নৃসিংহদেবের ও মহাভারত আদিপর্বে কথিত শৃঙ্গী ঋষির মূর্তি উল্লেখযােগ্য। প্রাঙ্গণের মধ্যে একটা ছােট স্তম্ভ। ইহা অটিপলে, মস্তক ও তলদেশ চৌকা ধরণের। মস্তকের চারিদিকে চারিটি চক্র আছে, তাহা- দিগকে লােকে ব্রহ্মচক্র বলে। শুন্তের নিকটেই কতকগুলি সুর সুর পাথরের চক্র ও পয় রহিয়াছে দেখিলাম। বােধ হইল এগুলি মন্দিরের কোৰ অংশ হইতে স্থানচ্যুত হইয়াছে। পাণ্ডার একটি চৌকা পাথর ও তাহাতে লাগান ঠেসান দিবার মতন আর একটি পাথর দেখাইয়া বলেন যে ইহা রামচন্দ্রের আসন। নিকটেই নবগ্রহ, নারদ ও গণেশের মূর্তি। মনির হইতে প্রায় অর্ধমাইল দূরে লক্ষ্মী নারায়ণের মুর্তি। অদূরে আরও অনেকগুলি সুন্দর প্রস্তরযুক্তি দেখিতে পাওয়া যায়। তন্মধ্যে কতকগুলি ধৌদ্ধমূর্তি বলিয়া মনে হয়। আড়াই বা তিন মাইল দূরে সৌড়ী চটি। নিকটেই মন্দাকিনী তীরে একটি সুন্দর পরিপাটী বাগান। কদলী ও পিয়ারা গাছে পূর্ণ। দেখিয়া আমাদের বাঙ্গালা দেশের কথা মনে পড়িল। বাগানের মধ্যে শিব মন্দির। মন্দাকিনীর ঠিক ধার দিয়া যাইতে লাগিলাম। সম্মুখে চন্দ্র নদী। একটি ভাঙ্গা সেতু দিয়া পার হইলাম। খানকতক তক্তা ফেলিয়া দেওয়া হইয়াছে—তাহাই পুলের কাৰ্য্য করিতেছে। পুলের মাশুল লােক প্রতি এক পয়সা ও ঝাপান প্রতি • দিতে হয় বদরী নারায়ণের পথে আর কোথাও পুল পার হইবার জন্য মাশুল দিতে হয় না। এখানে কেন যে সে প্রথার ব্যতিক্রম হইয়াছে বলিতে পারি -কেহ কেহ বলিল, একটি শক্ত পুল করিবার জন্য এই মাশুল লওয়া হইতেছে। রুদ্রপ্রয়াগ হইতে ১৫ মাইল আসিয়া পড়িলাম। নিকটেই চাপুরি চটি, চন্দ্রা ও মন্দাকিনীর সঙ্গমস্থল। চটিতে অনেকগুলি ঘর আছে। নিকটেই একটি স্রোতের সাহায্যে জাতা চালাইয়া গম পেশা হইতেছে, দেখিবার জিনিষ। এইরূপ যন্ত্র হৃষিকেশ হইতে রাস্তায় অনেক স্থানে দেখিতে পাওয়া যায়। স্রোতের সম্মুখেই একটি পরিষ্কার ঘর দেখিয়া আমরা আশ্রয় লইলাম। সিমলা জেলাবাসী একটি যাত্রী স্থবির হইতে আমাদের সঙ্গী হইয়াছেন। তিনি বরাবর আমাদের সঙ্গে কেদার বঙ্গরীর পথে। আসিতেছেন। স্ত্রী ও পুত্র মারা যাওয়াতে শশাকে অভিভূত হইয়া তীর্থ ভ্রমণে বাহির হইয়াছেন—যদি শান্তি পান। এখানে আসিয়া তাহার কয়েকবার দাস্ত হইল। সঙ্গে আত্মীয় স্বজন কেহই নাই, তিনি একাকী। মনে বড় ভয় হইল। ভায়ার সঙ্গে কবিরাজি মতে হজমি গুলি ছিল। তাহাকে খাইতে দেওয়া হইল। খাইয়া তিনি কতকটা সুস্থ বােধ করি। লেন এবং ঘুমাইয়া পড়িলেন। আমরা স্রোতের জলে স্নান করিয়া লইলাম। এদিকে খিচুড়ী প্রস্তুত। খুব ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছে। খিচুড়িও বেশ উপাদেয় হইয়াছে—সুতরাং ভােজন যেন বড়ই গুরুতর হইয়া পড়িল। প্রায় দুই ঘটিকার সময় পীড়িত যাত্রীটি শ্যা হইতে উঠিলেন। তাহার শরীর খােলসা হইয়াছে বুঝিতে পারিয়া বালি পথ্য বন্দোবস্ত করা গেল। বার্লি আমাদের সঙ্গে ছিল। বালি খাইয়া একটু আরাম পাইলেন। প্রায় তিনটার সময় আমরা চন্দ্রপুরি ছাড়িলাম। পথে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজিতে নারায়ণ চটীতে পৌছিলাম। চটি নূতন হইয়াছে। একটি মাত্র ঘর। এখানে একদল বাঙ্গালী যাত্রীর সহিত দেখা হইল। তাহারা কিছু পূৰ্বে আশ্রয় লইয়াছেন। দলের মধ্যে সকলেই রমণী। একটি মাত্র পুরুষ। স্থান কম থাকায় বৃষ্টি থামিমাত্র আমরা আবার চলিতে আরম্ভ করিলাম। মন্দাকিনীর লৌহ সেতু পার হইয়া রুদ্র প্রয়াগ হইতে কিঞ্চিদধিক ১৮ মাইল দূরে ভোরী চটি পাইলাম। ব্যাপানিওয়ালা- দিগের মধ্যে একজনের শরীর অসুস্থ হইয়াছে দেখিয়া এই স্থানেই রাত্রিবাস করা বিধেয় মনে করিলাম। নদীর উপরেই একটি দ্বিতল ঘরে বাসা লইলাম। ঝপানীওয়ালার বার্লি ও হজমিগুলির উপকারিতা বুঝিতে পারিয়াছে। দুই চারিটা গুলির জন্য ভয়ার নিকট উমের। ভায়াও গুপ্তকাশী হাস্য বদনে ইজমি গুলি বিতরণ করিয়া প্রয়োজনমত বালি প্রস্তুত করিয়া দিবেন বলিয়া তাহাদের আশ্বাস দিলেন। তাহাদের মুখে হাসি ধরে না। একটুতেই তাহারা সন্তুষ্ট। অন্য দ্বাদশী। চন্দ্রদেবের মধুর মূর্তি আকাশ- প্রান্তে ফুটিয়া উঠিল—সঙ্গে সঙ্গে তারকারাজি হকে বেষ্টন করিয়া, আসর জমকাইয়া বসিলেন। সকলেই এক ভাবে অনুপ্রাপিত। সমস্ত জগৎ নিস্তব্ধ হইয়া আসিল। সকলে ঘুমাইয়া পড়িল। ৩০শে বৈশাখ মঙ্গলবার। সূর্যোদয়ের পূর্বেই ভোরী চটি হইতে যাত্রা করিয়া চারি মাইল দূরন্থিত কুণ্ড চটি অতিক্রম করিলাম। পরেই একটি চড়াই আরম্ভ। দুই মাইল চড়াই রাস্তা অতিক্রম করিয়া গুপ্তকাশীতে উপস্থিত হইলাম। গুপ্তকাশী মন্দাকিনীর দক্ষিণ তীয়ে নদীবক্ষ হইতে ৮০০ ফিট উঙ্গে অবস্থিত। এখানে পােষ্ট অফিস, ধৰ্ম্মশালা ও যাত্রী থাকিবার জন্য অনেকগুলি ঘর আছে। যাত্রীপথের পার্শ্বে অনেকগু ল দোকান, নানাবিধ দ্রব্য পরিপূর্ণ। শীততাপযােগী বস্ত্রাদি সাজান রহিয়াছে দেখা গেল। এখান হইতে শীত অনুভব হইয়া থাকে। গুপ্তকাশী উত্তরাখণ্ডে একটি প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান। মহাদেবকে সন্তুষ্ট করবার জন্য দেবতারা এখানে গুপ্তভাবে তপস্যা করিয়াছিলেন বলিয়া এই স্থানটি গুপ্তকাশী নামে অভিহিত। বিশ্বনাথ এখানকার প্রধান দেবতা। তাঁহার মন্দিরটি একটি প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত। প্রাঙ্গণটির এক দিকে পর্বত ও অন্য তিন দিকে যাত্রীদের থাকিবার ধর। ঘর গুলি সব পাথরের। প্রাঙ্গণটিও পাথর বসান। বিশ্বনাথের মন্দিরের মধ্যে বিশ্বনাথ ও-পাৰ্বতী। বিশ্বনাথ লিঙ্গমূর্তি। পার্থেই অর্ধনারীশ্বরের মন্দির। মন্দির মধ্যে বদরীনাথ ও অর্ধনারীশ্বর। পার্শ্বে অন্যান্য কুঠারীতে ভৈরব ও পঞ্চ পাণ্ডবের মূর্তি আছে। বিশ্বনাথের মন্দিরে সম্মুখে প্রাণমধ্যে একটি কুণ্ড আছে। ইহাকে মণিকর্ণিকা কুও বলে। কুণ্ড মধ্যে অনবরত দুইটি ধারা পড়িতেছে। একটি ধারা পিতলের হন্তী মুখ বিশিষ্ট ও অপরটি গােমুখ বিশিষ্ট। হস্তীমুখী ধারার নাম যমুনা ও গােমুখী ধারার নাম গঙ্গা। এই কুণ্ডে সকলকে স্নান করিতে হয়। কুণ্ডের উদ্বৃত্ত জল একটি প্রণালী দিয়া মন্দাকিনীতে পড়িতেছে। এখানে গুপ্তদান” নামক এক প্রকার দানের বিধি প্রচলিত আছে। যাত্রীরা কুণ্ডে স্নান করিয়া গুপ্তভাবে নারিকেলের মধ্যে নিজ ইচ্ছামত স্বর্ণ ও রৌপ্য পুরিয়া উৎসর্গ করেন। ইহা অবশ্য পাণ্ডারা পাইয়া থাকেন। পাণ্ডার বলেন, এখানে এইরূপ ভাবে দান করিলে মহাপুণ্য লাভ হয়। গুপ্তকাশী হইতে ১৮ মাইল উত্তর পুৰ্ব্বে চৌখাম্বা পৰ্বতশৃঙ্গের পাদ দেশে মধ্যমহেশ্বর দেশের মন্দির আছে। ইহা পঞ্চ কেদারের মধ্যে শীতকালে মনির বন্ধ থাকে। রৌপ্যনিশ্মিত শিবমূর্তি মন্দাকিনীর অপর পারে উথীমঠে আনীত হয়, এবং তথায় তাহার যথাবিধি পূজা হয়। শিবলিঙ্গ বরাবরই মন্দির মধ্যে থাকেন। বিশ্বনাথের পবিত্র পুরী গুপ্তকাশীতে অদ্য মধ্যাহ্ন ভােজন সমাপন করা গেল। পরে যথাপূৰ্ব বিশ্রাম। মণিকর্ণিকায় অবিশ্রান্তভাবে বাত্রি গণের সমাগম দেখিতে দেখিতে দেড়টা বাজিয়া গেল। সূৰ্য্যের উত্তাপ তত বেশী নহে। যাত্রা করাই বিধেয়। কেদার দর্শনে সকলেই ব্যাকুল হইয়া পড়িয়াছেন। ক্ষণমাত্ৰ সময় নষ্ট করিতে চাহিতেছেন না। ঝাপানিরাও প্রস্তুত। সকলে বাহির হইয়া পড়িলাম।

( ৭ )
৬ কেদারনাথ
গুপ্ত কাশী হইতে নাল-১ মাইল। গুপ্তকাশী হইতে রামপুর-১২ মাইল।
» ভেত বা নারায়ণ-২
ত্রিযুগীনারায়ণ—১৬
বুড-৪
শােণ প্রাগ-১৪
মৈখণ্ডা-৬
গৌরীকুণ্ড-১৭
ফাটা—
রামবাড়া-২১
2
৪
}
বাদল-৯
কেদারনাথ-২৫
গুপ্তকাশী হইতে এক মাইল দুরে নাল চটি, দুইটি রাস্তার সঙ্গমস্থল।
একটি রাস্তা কেদারনাথের দিকে, অপরটি উখীমঠ হইয়া বদরী-
নাথের দিকে গিয়াছে। যাত্রিগণ কেদারনাথ দর্শন করিয়া ফিরিবার
সময় এই পথ দিয়া উখীমঠ হইয়া বদরীনাথ অভিমুখে গমন করেন।
উথীমঠ মন্দাকিনীর অপর পারে অবস্থিত। নদী পার হইবার জন্য মন্দাকিনীর
উপর ২৪৯ ফিট লম্বা একটি ঝােলান পুল ( Suspension bridge)
আছে। নালা গ্রামে কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মন্দির দেখা গেল। প্রায় সকল
গুলিই ভাঙ্গা। নালা গ্রামের এক মাইল দূরে ভেত বা নারায়ণ চটি।
নারায়ণ এক সময় বহুমন্দিরশােভিত একটি সমৃদ্ধিশালী গ্রাম ছিল।
পাণ্ডারা বলেন, মহাত্মা শঙ্করাচাৰ্য এই স্থানে বদরীশ্বর মহাদবের উদ্দেশ্যে
৩৬০টি মন্দির নির্মাণ করিয়াছিলেন। কতকগুলি ভাঙ্গা মন্দির এখনও
তাহার পূর্বপরিচয় দিতেছে। যাত্রিপথের পার্শ্বেই বীরভদ্র ও সত্যনারায়ণ
দেবের মন্দির-মন্দিরের সম্মুখেই একটি জয়স্তম্ভ ; পশ্চাতে নদীর দিকে

কেদার-বদরীর পথে। কতকগুলি ছোট ছােট মন্দির। রাস্তার অপর পার্শ্বে লক্ষ্মীনারায়ণের মন্দির এবং তৎপার্শ্বে কতকগুলি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ। যেগুলি এখনও দাড়াইয়া আছে—তাহাদের সংস্কার নিতান্ত আবশ্যক। নারায়ণ-চটি পার হইয়া প্রায় দেড় মাইল উৎরাইয়ের পর ব্যুঙ চটি। ব্যঙ চটির কিছু অগ্রে একটী রাস্তা মন্দাকিনী পার হইয়া কালীমঠে গিয়াছে। কালীমঠে অনেকগুলি দুর্গামন্দির আছে। এখানে ছাগ ও মহিষ বলি হইয়া থাকে। কালীমঠের নিম্নে কালী নদী প্রবাহিত গুনিলাম এখানকার রাজপুত অধিবাসীরা তাহাদের প্রথমা কন্যাকে দেবতার সেবায় উৎসর্গ করেন। বঙচটি পার হইয়া সামান্য চড়াইয়ের পর ঐ নামে আর একটি ছােট চটি দেখা গেল। ক্রমে দুই মাইল দূরবর্তী মৈখণ্ডা চটিতে উপনীত হই- লাম। এখন কেবল চড়াই। চটিটি একটি অপেক্ষাকৃত উচ্চ স্থানে নির্মিত। রুদ্র প্রয়াগ হইতে ৩০ মাইল। এখানে মহিষমর্দিনীর একটি মন্দির আছে। দেবীর মন্দিরের ভিতর আলােক প্রবেশের কোন পথ নাই। একটি দর্পণে বাছিরের আলােক প্রতিবিম্বিত হইয়া দেবীমূর্তি আলােকিত করে—তাহাতে দেবীর দর্শনলাভ হয়। যাত্রীদের ঘর চারি পাঁচটির অধিক হইবে না। মন্দিরের সম্মুখের প্রাঙ্গণটি একটু প্রশস্ত। এক বারে ঠিক খাড়া পাহার উপর একটি লৌহ শিকলের দোলনা। যাত্রীরা এই দোলনায় দোল খাইয়া থাকেন। ক্রমে অগ্রসর হইয়া এক মাইল দূরে ফাটা চটিতে উপনীত হইলাম। পথিমধ্যে দুইটি পরিবার জলের ধারা ও একটি শিবালয় দেখিতে পাওয়া বার। চাটা চটিটি একটি বড় চটি। অনেকগুলি ঘর আছে। সৰ্ব্ব একার ঋব্যের এমন কি মিষ্টান্ন প্রভৃতিরও অনেকগুলি দোকান রহিয়াছে।

ও কেদারনাথ। একটি জলপ্রবাহ চটির মধ্য দিয়া বহিয়া যাইতেছে। আমরা একটি পরিষ্কার দ্বিতল ঘর মনােনীত করিয়া লইলাম। সম্মুখেই জলের পাইপ। জল সুস্বাদু। কেদারনাথ হইতে ফেরত অনেকগুলি যাত্রীর সহিত এখানে দেখা হইল। তাহারা সকলেই একবাক্যে বলিল এখান হইতে কেদারনাথ পৰ্যন্ত রাস্তাটী বড়ই দুর্গম এবং এই দুর্গমতার নানারূপ ভয়াবহ বিবরণ দিয়া আমাদের মনে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করিল, আমরা এই চটিতে রাত্রিযাপন করিতে মনস্থ করিলাম। পাহাড়ের ঠিক গায়েই আমাদের ঘর। রাত্রিতে যখন রন্ধন হইতেছে তখন উনুনের নিকট একটি গর্ত হইতে সাপের শকের ন্যায় চিড়ি চিড়ি শব্দ শােনা যাইতে লাগিল। এই শব্দ কিসের হইতে পারে তাই লইয়া আমরা নানা কল্পনা জল্পনা করিতেছি এমন সময় শঙ্কর আসিয়া আমাদের নিষেধ সত্বেও গর্তের মধ্যে হাত প্রবেশ করাইয়া দিল এবং একটি পতঙ্গ বাহির করিয়া আমাদের অমূলক আশঙ্কার নিরাস করিয়া দিল। ৩১ বৈশাখ বুধবার। এতে যাত্রা করিয়া বরা, বাদলপুর অতি- ক্রম করিয়া ৫ মাইল দূরস্থিত রামপুর চটিতে পৌঁছিলাম। ইহা একটি নড় চটি। প্রায় এক মাইল পরে একটি পুল পার হইতে হইল। পুলের ঠিক নিয়ে স্রোতের সাহায্যে নানারূপ কাঠের জিনিষ প্রস্তুত হইতেছে । জিনিষগুলি বড়ই সুন্দর। তন্মধ্যে ঘটি ও কমণ্ডলু উল্লেখযােগ্য। যাত্রীরা প্রায় সকলেই নিজের ইচ্ছামত এক একটি সংগ্রহ করিয়া লইলেন। পুল হইতে প্রায় সিকি মাইনা চড়াইয়ের পর বাম দিকে একটি রাস্তা ত্রিমুগী- নারায়ণের দিকে গিয়াছে। অমিরা কেদারনাথের রাস্তা ছাড়িয়া ত্রিযুগীনারায়ণের দিকে সাইতে লাগিলাম। ত্রিমুগীনারায়ণের রাস্তাটি তাল নয়—ভয়ানক চড়াই। অতি কষ্টে দুই মাইল রাস্তা চলিয়া শাক- কেদার-বদরীর পথে। স্বরী দেবীর মন্দিরে উপস্থিত হইলাম। এখান হইতে দেড় মাইল দূরে ত্রিযুগীনারায়ণ। ত্রিযুগীনারায়ণ একটি বড় গ্রাম। এখানে থাকিবার কোন কষ্ট নাই। যাত্রীদের থাকিবার জন্য বড় বড় ঘর অনেকগুলি আছে; নিকটেই একটি পরিষ্কার ধর্মশালা। মিষ্টান্নের দোকানে পুরি পৰ্য্যন্ত পাওয়া যায়। এখান হইতে একটি রাস্তা জঙ্গলের ভিতর দিয়া টিহিরির দিকে গিয়াছে। রাস্তাটি ভাল নয়, দুর্গম। এখান হইতে গঙ্গোত্তরী যাইতে হইলে এই রাস্তা ধরিতে হয়। এই রাস্তা এখান হইতে ৬৮ মাইল দূরে দেহরাগঙ্গোত্তরী রাস্তায় ভটবাড়া নামক স্থানে মিলি- য়াছে । গ্রামের শেষ দিকে ত্রিযুগীনারায়ণ-দেবের মন্দির। মন্দির মধ্যে অষ্টধাতু-নির্মিত ঐশীনারায়ণ-দেব, পার্শ্বে লক্ষ্মীদেবী ও সম্মুখে একটি অগ্নিকুণ্ড। পাণ্ডারা বলেন, এই কুণ্ডে তিন যুগ ধরিয়া অগ্নি প্রজ্বলিত রহিয়াছে। দুই তিনটি ব্রাহ্মণ তাহার চতুর্দিকে সমস্ত দিবারাত্রি উপস্থিত থাকিয়া কঠ দিয়া থাকেন। যাত্রীরা সাগ্রহে কুণ্ডের ছাই কপালে লেপন করিয়া আপনাদিগকে ধন্য মনে করিয়া থাকেন। প্রবাদ সত্যযুগে এখানে শিব ও পার্বতীর বিবাহ হইয়াছিল এবং বিবাহ কাণে হে ৭ জন যে অগ্নি জালা হইয়াছিল তাহা আর নিবা হয নাই। মন্দিরে বাহিরেও কতকগুলি দেবদেবীর মূর্তি আছে। মন্দিরের সম্মুখে ও গার্ণে চরিকুণ্ড আছে। তন্মধ্যে বিষ্ণুকুণ্ড, রুদ্রকুণ্ড ও ব্রহ্মকু উল্লেখযােগ্য। এই কুণ্ডগুলিতে স্নান করিতে হয়। শুনিলাম কুণ্ডগুলি অনেক সাপ আছে। কিন্তু তাহাদের বিষ নাই। পাণ্ডারা বলে স্নান কবার ‘ময় যদি তাহার গাত্ৰস্পর্শ করে তাহা হইলে প্রভু ক্ষল হয়। কুণ্ডের পৰ নেক : ছােট ছােট মন্দির আছে।

কদারনাথ। ত্রিযুগীনারায়ণে মধ্যাহ্নভােজন সমাপন করিয়া কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর অপরাহ্ন দুই ঘটিকার সময় বাহির হইয়া পড়িলাম। এক মাইল না যাইতে যাইতে মুষল ধারে বৃষ্টি, সঙ্গে শিলপাত। বড় বড় শিলায় চারিদিক একেবারে সাদা হইয়া গেল। তাড়াতাড়ি যাইয়া শাকম্বরী দেবীর মন্দিরে আশ্রয় লইলাম। অনেক যাত্রী বৃষ্টিতে ভিজিয়া এখানে আশ্রয় লইলেন। অন্যূন এক ঘণ্টাকাল অপেক্ষা করিতে হইল। বৃষ্টি থামিলে আবার রাস্তা ধরিলাম। ভীষণ উৎরাই। পথ বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হইয়া গিয়াছে, অতি সন্তর্পণে নামিতে লাগিলাম। অনেকে পা ঠিক রাখিতে না পারিয়া পড়িয়া যাইতে লাগিলেন। কেহ কেহ গুরুতর আঘাতও পাইলেন, অতিকষ্টে নামিয়া মন্দাকিনী ও শােণ নদীর সঙ্গমস্থলে রুদ্রপ্রয়াগ-কেদার- নাথ রাস্তায় আসিয়া পৌছিলাম। শােণ নদীকে বাসুকীগঙ্গাও বলে। একটি লৌহনিৰ্ম্মিত ঝুলান সেতুর সাহায্যে শােণ নদী পার হইয়া আবার চড়াইয়ে উঠিতে আরম্ভ করিলাম। সেতুটি ১৯১৩ সালে নির্মিত। কয়েক বৎসর পূর্বে যাত্ৰিভারে পুরাতন সেতুটি ভাঙ্গিয়া যায়। তাহাতে অনেকে মৃত্যুমুখে পতিত হন এবং অনেকে আহত হন। অর্ধ মাইল অতিক্রম করিয়া “মুণ্ডকাটা গণেশের” * সাক্ষাৎ পাইলাম। *বৈনায়ক তথা দ্বারং সংস্থিত্য সংস্থিতঃ শিবে। গণেশস্তাবক পুত্র অঙ্গরাগেণ যঃ কৃতঃ। স্থাপিতে দ্বারি দেবেশি ত্বয়া চ প্যমানয়া। মযস্থ শিরচ্ছিন্ন পতিতং শিবক্ষেত্রকে। প্রসমেন ময়া দেবি পুনঃ করিষরং শিরঃ। সংযােজিতং তদঙ্গে তু ততো গমুখােহভবৎ । সংপূজ্য তং গণেশ বৈ নানানৈবেদ্যদ্রব্যকৈ। গমে মহাস্থানে যত্র গত্বা শিববা ভবেৎ : স্কন্দপুরাণ।

কেদার-বদরীর পথে। এখান হইতে তিন মাইল দূরে গৌরীকুণ্ডচটি। গৌরীকুণ্ডচটিও একটি বড় চটি। রাস্তার দুই পার্শ্বেই অনেকগুলি ঘর। ঘরগুলি সবই প্রায় দ্বিতল। নিম্নে দোকান। উপরে যাত্রীদের থাকিবার স্থান। এখানে হরপার্বতীর একটি মন্দির আছে। নিকটেই দুইটি কুণ্ড। একটি শীতল জলের, অপরটি গরম জলের। কুণ্ডগুলি পাথর দিয়া বাধান। এ দারুণ শীতের দেশে গরম জল যে কত আদরের এবং কত মূল্যবান তাহা বােধ হয় কাহাকেও বুঝাইয়া দিতে হইবে না। এখানে কুণ্ডের গরম জলে স্নান করা কি আরামের তাহা সকলেই বুঝিতে পারিতেছেন। এ যেন ভগবানের দান। মাটির ভিতর দিয়া গরম জলের স্রোত অনবরত কোথা হইতে আসিয়া কুণ্ডটি পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছে। গােমুখাকৃতি পিতলের একটা মুখ দিয়া কুণ্ডের মধ্যে অনবরত জল পড়িতেছে ; উদ্ধৃত্ত জল অন্য দিক দিয়া বাহির হইয়া মন্দাকিনীতে যাইয়া পড়িতেছে। ঠাণ্ডা জলের কুণ্ডটির জল হরিদ্রাবর্ণ। প্রবাদ, পার্বতী এই কুণ্ডে খতু-স্নান করিয়াছিলেন, তাই ইহার নাম গৌরীকুণ্ড*। *ত্রিগুঝাতো মম স্থামাদ্দক্ষিণে শৃণ, তীর্থক। গৌরীতীর্থমিদং খ্যাতং সর্বসিদ্ধিপ্রদায়কম । যত্র ত্বয়া মহেশানি মন্দাকিস্তাস্তটে পুরা। ঋতুস্নানং কৃতং তদ্বৈ গাের্মীতীর্থমিতি স্মৃতং । মহাসেমস্য উৎপত্ত্যৈ বিস্মৃতং কিং ত্বয়ানছে। তস্মাচ্চিং প্রবক্ষামি যেন তজ্জায়তে শুভং ' কটুষ্টং তু জলং তত্র সিন্দুরা তু মৃত্তিকা। তৎস্থানং দেবদেবেশি ন ত্যজামি কদাচন। কেদারখণ্ড!

৮ কেদারনাথ , এই চটিতে আমরা রাত্রিযাপন করিলাম। শীতের জন্য রাত্রিতে কম্বল গায়ে দিতে হইয়াছিল। ৬ কেদারনাথ হইতে ফেরত অনেকগুলি যাত্রীর সহিত এখানে সাক্ষাৎ হইল। সকলেরই মুখে সেই এক, কণা রাস্তা বড় দুর্গম। ১লা জ্যৈষ্ঠ বৃহস্পতিবার। প্রাতে গৌরীকুণ্ড ছাড়িয়া চড়াইয়ে উঠিতে আরম্ভ করিলাম। রাস্তা ক্রমেই সঙ্কীর্ণ হইয়া আসিতে লাগিল। অতি সন্তর্পণে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইয়া চীরসা ভৈরবের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এখানে ভৈরবজীকে ছিন্ন বস্ত্র দ্বারা পূজা করিতে হয়, না করিলে তিনি যাত্রীর:সমস্ত ফল হরণ করেন। এইবার সারণ চটি। রাস্তা ক্রমে দুর্গম হইয়া আসিতে লাগিল, স্থানে স্থানে ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, তাহা হইলেও কাণ্ডী, ঝাপান, দাঙী সকলই যাতায়াত কম্নিতেছে। এইবার বরফ আরম্ভ, স্থানে স্থানে রাস্তা বরফে আবৃত। নীচে জলস্রোত বহিয়া যাইতেছে, উগরে তুষাররাশি। তাহার উপর দিয়া যাইবার পথ ; পৰ্বতগাত্রে সংলগ্ন এইরূপ রাস্তা দিয়া যাতায়াত বড়ই বিপজ্জনক, পা ঠিক রাখিতে পারা যায় না, পড়িয়া যাইবার আশঙ্কা হয়। আবার মাঝে মাঝে ফাপা বরফের আচ্ছাদনটি ভাঙ্গিয়া নিম্নস্থিত জলের মধ্যে পড়িয়া যাইবার সম্ভাবনা। যাইতে যাইতে ভীমের এক বিশাল প্রস্তর মূৰ্ত্তি দেখিতে পাইলাম। পাণ্ডারা বলেন, মহাপ্রস্থানকালে ' #গৌরীতীর্থাদূভাগে পৰ্বতে সৌম্যদিকন্থিতে। চীরবাস। ভৈরবস্তু ক্ষেত্র রক্ষতি মমিকম। তস্মৈ চীনাদিকং দস্তা সৰ্ব্বং পুণ্যং লভেম্নরঃ। অন্যথা তৎফলং সৰ্ব্বং হরতে, ভৈর শিবঃ । কেদাখ। ৭১ কেদার-বদরীর পথে। ভীম এইখানে দেহত্যাগ করিয়াছিলেন। এখান হইতে এক মাইল দূরে রামবাড়া। রাস্তা হইতে নদীর অপর পারের পর্বতগাত্রে প্রস্রবণগুলির দৃশ্য এতই মনােহর যে সেদিক হইতে চক্ষু ফিরাইয়া লইতে ইচ্ছা করে না। পৰ্বতশৃঙ্গ হইতে অসংখ্য জলধারা পর্বতগাত্র বহিয়া পড়িতে পড়িতে জমিয়া গিয়াছে। পৰ্বতগুলি এইরূপ তুষারাভরণে সজ্জিত হইয়া এক অসামান্য সুষমার সৃষ্টি করিয়াছে। স্থানে স্থানে ভীষণ জলপ্রপাত, কোথাও বা নানাবণের পত্রশােভিত বৃক্ষরাজী, কোথাও বা নানাবর্ণের প্রস্ফুটিত কুসুমদামশােভিত পুষ্পবৃক্ষের শ্রেণী। যাত্রিগণের পথক্লেশ অপনােদনের জন্য প্রকৃতিদেবী যেন সাজাইয়া রাখিয়াছেন। আবার এদিকে উত্তঙ্গ পৰ্বতমালা ও আকাশভেদী মহীরুহচয় পথিকগণের ভীতি উদ্রেক করিতেছে, সৌন্দর্য্য ও ভীষণতার সংমিশ্রণে যে এক অপূর্ব শ্ৰী পথিকগণের নয়নরঞ্জন করিয়া থাকে তাহা কেবল উপভােগ করা যায়, বর্ণনা করা যায় না। * রামবাড়া আর একটি বড় চটি। পােষ্টঅফিস, আহারীয় দ্রব্যের দোকান ও যাত্রীদের থাকিবার উপযােগী অনেকগুলি বড় বড় পরিষ্কার ঘর আছে। যাইবার ও ফিরিবার সময় যাত্রীরা প্রায় এইস্থানে বিশ্রাম করেন। সকল সময়েই চটিটি যাত্রীতে পরিপূর্ণ। কুলীর ভারি ভারি জিনিষ এইখানে রাথিয়া যায়। ক্ষণেক বিশ্রাম করিয়া চড়াই উঠিতে আরম্ভ করিলাম, রাস্তা নিতান্ত সঙ্কীর্ণ, স্থানে স্থানে ভাঙ্গা। মেরামতের বন্দোবস্ত আছে সত্য কিন্তু একস্থানের মেরামত শেষ হইতে না হইতে, অন্য স্থানে ভাঙ্গিয়া যাইতেছে। রাস্তা ঠিক রাখা বড়ই কঠিন। প্রকৃতিদেবী যেন সৰ্ব্বদাই রাস্তাগুলির চিঃ মুছিয়া দিতেই প্রয়াসবতী, তার উপর অধিকাংশ বৃস্তা বরফে আচ্ছন্ন। পৰ্ব্বত, নদী, চারিদিকে শাদা ধব ধৰ, করিতেছে, ৭২ কেদারনাথ তি কষ্টে ও সাবধানে মাঝে মাঝে বিস্তৃত তুষার-ক্ষেত্র অতিক্রম ফরিয়া বেলা একটার সময় মন্দাকিনী-তীরে কেদারনাথধামে আসিয়া পৌছিলাম। অপূর্ব দৃশ্য। চতুর্দিকে তুষারধবল পৰ্বতের শ্ৰেণী: মধ্য কেদারনাথের মন্দির। কেদারনাথের মন্দির সমুদ্র-বক্ষ হইতে ১১৭৫৩ ফিট উচ্চে। মহাপথ নামক পৰ্বত-শিখরের ঠিক নিয়ে একটি চিরতুষারমণ্ডিত পৰ্ব্বতশ্রেণী আছে, তাহা হইতে একটি জাঙ্গাল বাহির হইয়াছে। এই জাঙ্গালে মন্দাকিনীর তীরে উপত্যকার উপর দিকে একটি সমতল ভূমির উপর মন্দিরটী নির্মিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে স্থানটী বড়ই মনােরম। মনির প্রস্তর নিৰ্ম্মিত। সুন্দর স্বর্ণ-চুড়াশােভিত। মন্দিরের দ্বার দক্ষিণ দিকে। দরজার দুই পার্শ্বে সম্মুখের দেওয়ালে কোলঙ্গা এবং নানা দেবদেবীর প্রতিমূৰ্ত্তি। সম্মুখে এক প্রস্তরনিৰ্ম্মিত বৃষ। মন্দিরটী তিন ভাগে বিভক্ত। ভিতরের অংশে শ্ৰীশ্ৰীকেদারনাথের লিঙ্গমূৰ্ত্তি। আমরা সচরাচর যেরূপ লিঙ্গমূর্তি দেখি ইহা সেরূপ নহে। ইহা একটি, কৃষ্ণবর্ণ পাথরের চাঙ্গড়। তলদেশ, প্রশস্ত এবং উপরিভাগ ক্রমশঃ সূক্ষ্ম । যাত্রিগণ চতুষ্কোণবিশিষ্ট গৌরীপিঠের উপর এই বিশাল লিঙ্গমূৰ্ত্তিতে ঘৃত, মাখাইয়া থাকেন এবং উৎকটু পাপ ও মহাব্যাধি হইতে পরিত্রাণ, পাইবার মানসে এই লিঙ্গমুৰ্ত্তিকে আলিঙ্গন করেন। মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করিয়া সকলেই এই লিঙ্গমূর্তি স্পর্শ করিতে পারেন। তাহাতে, কোন বাধা নাই। পাণ্ডারা বলেন, এই কৃষ্ণবর্ণ পাথরের চাঙ্গড় সদা- শিবের পশ্চাদ্ভাগ। তুঙ্গনাথে তঁাহার বাহু, রুদ্রনাথে মুখ, মধ্য মহেশ্বরে নাভি, এবং কল্লেখরে জটা পুজিত হইয়া থাকেন। এই পঞ্চ কেদার দর্শন ও পুজন মহা সৌভাগ্যসাপেক্ষ, সকলের ভাশ্যে ঘটে না! মন্দিরে কোন :

কেদারবরীর পথে। জানালা নাই। সম্মুখস্থ বৃহৎ দরজা হইতে যে আলােক প্রবেশ করে তাহাই যথেষ্ট। মন্দির মধ্যে সর্বদাই টুপটাপ জল পড়িতেছে। মধ্যভাগে শ্ৰীশ্ৰীপাৰ্বতী দেবী ও শ্রীশ্রীলক্ষ্মী দেবী এবং সম্মুখ ভাগে পঞ্চ পাণ্ডব, দ্রৌপদী, কুন্তী, নন্দী, ও প্রমথগণের মূর্তি আছে। মন্দিরের নিকটে অনেকগুলি পবিত্র কুণ্ড আছে। অমৃতকুণ্ড, সুফল- কুণ্ড, হংসকুণ্ড, রেতঃকুণ্ড ও উদককুণ্ড। এই উদককুণ্ড ব্যতীত আর কোন কুণ্ড দর্শন আমাদের ভাগ্যে ঘটিয়া উঠে নাই। অপরগুলি বরফে ঢাক। কতকগুলি প্রান্তবাহিনী নদীরও নাম শুনিলাম, ক্ষীর* মহােদধি, সরস্বতী, স্বর্ণদ্বারী। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কোনটারই দর্শন পাইলাম না। সকলগুলিই তুহিনাবরণের ভিতর দিয়া প্রবাহিতা। মন্দাকিনীও তুষারের মধ্য দিয়া প্রবাহিতা। স্নানঘাটের কোন চিহ্ন নাই। মন্দিরের সম্মুখে একটি রাস্তা আছে। তাহার দুই পার্শ্বে কেবল সারিবদ্ধ পাথরের ঘর। প্রায় সবগুলিই দ্বিতল। প্রথম তালাটি এখনও বরফের মধ্যে। দ্বিতীয় তলের ছাদে এখনও বরফের স্তুপ। বরফ কাটিয়া ঘর বাড়ী বাহির করা হইতেছে। মন্দির হইতে চারি মাইল দূরে মহাপথ-শেখরের রাস্তায় ভৈরবঝম্প নামক একটি খাড়া পাহাড় আছে। মােপ্রাপ্তির আশায় সন্ন্যাসীরা এখান হইতে ঝাঁপ দিতেন, ঝাপ দিবার পূৰ্বে সন্নিহিত মন্দির-গাত্রে নিজ নিজ নাম লিখিয়া যাইতেন ইহা এক্ষণে ‘ক্ষীরগঙ্গাতু যা ধারা মন্দাকিন্তু সঙ্গমে, শিবপ্রদং মহাতীর্থং ক্রৌঞ্চ হৰ্ত্ত: প্রকীৰ্তিতং 'যত্র আকা বরারােহে কৈলাস নিয়ে বসেৎ।" কেদারখণ্ড। ৭৪ ৮ কেদারনাথ। গভর্ণমেন্ট কর্তৃক নিষিদ্ধ। আরও কিয়দ্র অগ্রসর হইলে বরফের নদী দেখিতে পাওয়া যায়। এই বরফের নদী হইতেই মন্দাকিনীর উৎপত্তি। মহাপথের অপর পার্শ্বে শ্ৰীশ্ৰীবদরিকাশ্রম। পূৰ্ব্বে পূৰ্বে এক পুজারিই শ্রীশ্রীকেদারনাথ ও শ্ৰীশ্ৰীবদরীনারায়ণ দেবের পূজা করিতেন, কিন্তু এক্ষণে শ্রীশ্রীকেদারনাথ হইতে শ্রী শ্রীবদরিনাথ যাইতে সাত আট দিন লাগে। পাণ্ডারা বলেন, কিছুদিন পূর্বে কেদারনাথ হইতে বদরিকাশ্রম যাইতে যে একটি সােজা রাস্তা ছিল, তাহতে দুই তিন দিন মাত্র লাগিত; কিন্তু এক্ষণে পৰ্বত ভাঙ্গিয়া সে পথও লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। কেদারনাথের মহান্ত রাওল নামে অভিহিত। তিনি উখীমঠে অবস্থান করেন ; বেতনভােগী পূজারী দ্বারা পূজাদি সমাহিত হয়। পূজার ব্যয়ের জন্য গাড়োয়াল জেলায় ৬০ টি আলমােরা ও নৈনিতাল জেলায় ৪৫টী এবং টিহরী রাজ্যের কতিপয় গ্রামের রাজস্ব নির্দিষ্ট আছে। কেদারনাথের মহান্ত গুপ্তকাশী, উখীমঠ ও মধ্য মহেশ্বরেরও পূজার বলােবস্ত করিয়া থাকেন। তুষার ক্ষেত্র, তুষার কণায় পরিপূর্ণ। কণাগুলি বালির মতন। তুষার ক্ষেত্রগুলি শাদা ধব ধবে বালুকা-রাশি পরিপূর্ণ প্রান্তর বলিয়া বােধ হয়। কেদারনাথপুরীর ঠিক অব্যবহিত পূৰ্বেই প্রায় এক মাইল ব্যাপী একটি তুষার ক্ষেত্র অতিক্রম করিতে হইয়াছিল। ইহা বড়ই গড়ানে। মনির সন্নিকট ভাবিয়া প্রায় সকলেই এই তুষার ক্ষেত্রের উপর পদ ব্ৰজে যান। তবে খালি পায়ে ইহার.উপর দিয়া যাওয়া বিপজ্জনক। শরীর এবােরে অবশ হইয়া পড়ে। ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে ধনুফোটী তীর্থের উত্তপ্ত বালুকাৱাশিপরিপূর্ণ প্রান্তরটা মনে পড়িল। একদিন দিগন্তব্যাপী উত্তপ্ত ৫৫ কেদারবদরীর পথে। বালুরাশির মধ্যে পড়িয়া মৃত্যুর বিভীষিকাময় ছায়া দেখিয়াছিলাম। আর আজ এখানে চিরতুষারাচ্ছন্ন পৰ্ব্বতের উপর অনন্তবিস্তৃত তুহিনরাশির মধ্যে দাড়াইয়া সেই একই বিভীষিকার ভিন্ন মুর্তি নয়নগােচর করিয়া প্রতি মুহূর্তে ভাবিতে লাগিলাম, ভগবান বুঝিবা এবার তাহার শান্তিময় শীতল ক্রোড়ে স্থান দিবেন, কিন্তু এখনও-যে পাপের ভােগ ফুরায় নাই, এখনও যে অদৃষ্টে অনেক দুঃখ আছে, এখনও যে অনেক শােকতাপ সহিতে হইবে। তাই তিনি আশ্রয় দিলেন না। কাষ্ঠ নির্মিত সেতুর সাহায্যে মন্দাকিনী পার হইয়া কেদারনাথে উপস্থিত হইলাম ; সম্মুখেই পাণ্ডা মহারাজ আমাদের জন্য অপেক্ষা করিতে- ছিলেন। আমাদিগকে সাদর সম্ভাষণে আপ্যায়িত করিয়া একটি দ্বিতল গৃহে লইয়া গেলেন। শীঘ্রই অগ্নি জ্বলাইবার বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। অগ্নি-উত্তাপে কতকটা প্রকৃতিস্থ হইলাম। পাণ্ডা-মহারাজ যাত্রীদিগের সুবিধার জন্য বহু কম্বল সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছেন। আসিয়া পড়িল। পাণ্ডা-মহারাজের কৃপায় গরম জলও পাইলাম। স্নান করিবার লােভ সম্বরণ করিতে পারিলাম না। ঘরের মধ্যেই বসিয়া অন-ক্রিয়া সমাধা করিয়া ললাম। Sweater, Waist-coat, coat যাহা কিছু শীতবস্ত্র ছিল সব পরিধান করিলাম, তথাপি শীত যায় না, পরিশেষে কম্বল মুড়ি দিয়া শুইয়া পড়িলাম। ক্ষণেক বিশ্রামের পর কেদারনাথ দর্শনের বাসনায় পাণ্ডা-মহারাজকে অনুরােধ করিলাম। কিন্তু মন্দিরের দরজা বন্ধ হইয়া গিগছে, সুতরাং তখন সে আশা ত্যাগ করিতে হইল । আহ’র প্রস্তুত। পাণ্ডা-মহারাজের কৃপায় ও ব্যবস্থায় নানাবিধ ব্যঞ্জন ও পোলাও দ্বারা উদরপূৰ্ত্তি হইল। আহারান্তে জানালায় বসিয়া প্রাকৃতিক শােভা নিরীক্ষণ করিতে লাগিলাম, চতুর্দিকে, শ্বেত বর্ণ, অন্য ৭৮টি কম্বল '৮ কেদারনাথ, কোন বর্ণ নাই। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া আসিল। চড় চড় করিয়া কেবল শিলাপাত হইতে লাগিল, বৃষ্টি নাই। সন্ধ্যার সময়ই পাণ্ডা-মহারাজ কেদারনাথদেবের আরতি দেখিতে যাইবার জন্য লইতে আসিলেন। গরম কাপড়ের পায়জামা, মােজা, সােএটার, ওয়েষ্ট-কোট, কোট ও অলষ্টার, পরিশেষে তদুপরি একটি কম্বল মুড়ি দিয়া গৃহ হইতে বহির্গত হইলাম। তবুও বুকের ভিতর শীতে গুন্ গুন্ করিতেছিল। অদ্য পূর্ণিমা, চন্দ্রদেব আকাশ প্রান্তে দর্শন দিয়াছেন। প্রকৃতির বিমল ধবল তুষাররাশির উপর পূর্ণচন্দ্রের বিমল কিরণজাল প্রতিফলিত হইয়া চারি দিকে এককালে সহস্র সুধাকরের সৃষ্টি করিল, স্ফটিক রঙ্গালয়ে যেন সহস্র পূর্ণচন্দ্রের উদয় হইল, সে দৃশ্য দেখিয়া ভাবিলাম এই তাে ভগবান আমার সম্মুখে, আবার কোথায় যাইতেছ ? এই তাে প্রভু আমার সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছেন, এই তো আমার রজতগিরিনিভ মহেশ, এই তাে আমার চারুচন্দ্রাবতংস মহেশ, এই তাে আমার রত্নাকল্লোঙ্খলাঙ্গ দেবাদিদেব। অমনি ভক্তিভরে মস্তক আপনা হইতে আনত হইয়া পড়িল--মনে মনে বলিয়া উঠিলাম ধ্যায়েন্নিতাং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং রত্নাকল্লোলাঙ্গং পরশুমৃগবরাভীতিহস্তং প্রশ্নং। পদ্মাসীনং সমত্তাৎ স্ততমনরগণোত্ৰকৃত্তিঃ বসান বিশ্বদ্যং বিশ্ববীজং নিপিলভয়হরং পঞ্চবক্তং ত্রিনেত্রং। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শোেনা যাইতে লাগল। নির্জন প্রদেশে এই ঘণ্টাধ্বনি কি মধুর ! মন্দিরে প্রবেশ করিতে হইলে ভারে ছয় পয়সা জমা দিতে হয়, তাহা মনির-ফুণ্ডে জমা হয়। মন্দিরে প্রবেশ করিয়া দেবাদিদেবকে দর্শন করিয়া ৭.

কোরবদরীর পথে। আজ যেন জীবনকে কৃতার্থ জ্ঞান করিলাম। আজ যেন সকল পথপ্রম সার্থক হইল। মন্দিরের আরত্রিক আরম্ভ হইল। যথারীতি আরত্রিক শেষ হইলে ভগবান ও পূজারিকে প্রণাম করিয়া ও পূজারির নিকট আশীৰ্বাদ গ্রহণ করিয়া গৃহে ফিরিলাম। পূজারি সকলকে জানাইয়া দিলেন, আগামী কল্য প্রাতে আটটার সময় দরজা খোেলা হইবে। বাসায় আসিয়া লুচি আলুর দমে উত্তমরূপে ভােজন ক্রিয়া সমাধা করিয়া শয়ন করিবার বন্দোবস্ত করিলাম। প্রচণ্ড শাত, শতের উপযােগী কম্বলাদির অভাব নাই। তত্রাপি ঘরে আগুন জ্বালাইয়া রাখিতে হইল। আমাদের ঘরে দুইটি জানালা ছিল, জানালা খুলিয়া স্বভাবের শােভা দেখিবার বড়ই কৌতূহল হইল ; কিন্তু পাণ্ডা- মহারাজ পুনঃ পুনঃ নিষেধ করিতে লাগিলেন। যাহা হউক, তিনি চলিয়া খাইলে একবার জানালা খুলিবার লোভ সম্বরণ করিতে পারিলাম না। আহা মরি মরি কি সুন্দর দৃশ্য দেখিলাম। ; কতক্ষণ যে এইরূপ ভাবে বসিয়াছিলাম জানি না। পরে ভগবানকে স্মরণ করিতে করিতে কম্বল মুড়ি দিয়া শুইয়া পড়িলাম। কোন সময় যে নিদ্রাদেবী অলক্ষিতে তাহার আধিপত্য বিস্তার করিলেন বলিতে পারি না। পরদিন ২রা জ্যৈষ্ঠ প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গের পর শয্যা হইতে উঠিয়া যথারীতি প্রাতঃকৃত্য সমাধা করিলাম এবং স্নান সমাপনান্তে ভগবৎ দর্শনে বহির্গত হইলাম। বরফের উপর দিয়া রাস্তা। রাস্তার উভয় পার্শ্বে পাকা বাড়ী, প্রথম তােলা এখনও বরফের মধ্যে, দ্বিতলটি কেবল বাহির হইয়াছে। মন্দিরের দ্বার খােল হইল, সকলে প্রবেশ করিলাম। দেবাদিদেবের চতুষ্পর্শে দণ্ডায়মান রহিলাম। তাঁহার পূজা দেখিতে এ8 সে কেদারনায় । লাগিলাম। পূজা শেষ হইল, সকলে দেবাদিদেবের আলিঙ্গন লাভে জীবন চরিতার্থ করিলেন। বাহিরে আসিয়া দেখিলাম, কতকগুলি লােক একখানি খাতা লইয়া আমাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। কেদারনাথপুরীতে আসিয়া আমরা কিরূপ ভাবে আছি, আমাদের কোন কষ্ট হইতেছে কিনা, ভগবান দর্শন কিরূপ হইল, কোন অসুবিধা হইল কিনা, মন্দির রক্ষয়িতৃগণ আমাদের সহিত কিরূপ ব্যবহার করলেন ইত্যাদি বিষয় ঐ খাতায় লিখিতে হয় ;. পুরীতে আদিবার সময় রাস্তার অবস্থাও তাহাতে লিখিবার জন্য অনুরুদ্ধ হইলাম। ইহা ব্যতীত যা।এদের সুবিধার জন্য যদি কেহ কোন মন্তব্য লিপিবদ্ধ করিতে ইচ্ছা করেন তাহাও লিখিতে পারেন। আমরা আমাদের মন্তব্য উহাতে লিখিয়া আর একবার ভগবানকে দর্শন করিয়া মন্দিরের চত্বর হইতে অবতরণ করিলাম। মন কিছুতেই অগ্রসর হইতে চায় না। মনে হয় যেন এই স্থানেই বসিয়া জীবনের যে কয়েকটা দিন আছে ভগবচ্চিন্তায় কাটাইয়া দি। কিন্তু ভগবানের সে কৃপা নাই, ধীরে ধীরে বাসার দিকে ফিরিতে হইল। এক একবার মুখ ফিরাইয়া সেই শান্তিনিকেতন দেখিতে লাগিলাম। 'উদককুণ্ড হইতে একটু জল লইয়া পান করিলাম। পূজারি মহাশয় এই স্থানে আসিয়া একটি প্রসংশাপত্র (certificate) চাহিলেন। তাঁহাকে একখানি প্রসংশাপত্র লিখিয়া দিলাম। ইহার মূল্য যে কি তাহা কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। যাহা হউক বাসায় ফিরিয়া তখনই তথ। হইতে পুনর্যাত্ৰা করিতে হইবে। দুরন্ত শীতে মাতাঠাকুরাণীকে অধিক দিন এখানে রাখিতে ইচ্ছা করিতেছে না। যৎকিঞ্চিত জলযােগের আয়ােজন হইল। পাণ্ডা-মহারাজ বড়ই সজ্জন। তাহার সহিত পাওনার নিমিত্ত কোনও বাদানুবাদ হইল না। যথারীতি তাহার নিকট হইতে

কেদার-বদরীর পথে।
বিদায় গ্রহণ করিয়া কেদারনাথকে স্মরণ করিয়া যাত্রা করিলাম। পাণ্ডা-
মহারাজ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আসিতে লাগিলেন। মন্দাকিনীর সেতুর
উপর দাড়াইয়া তাহার নিকট বিদায় গ্রহণ করিলাম।
tre

बची।

No text on this page.

দলী। ( ১ ) লালসা বা চামেলী স মণ্ডল-২| | 7/ of নালা হইতে উখীমঠ-৩ মাইল। লালা হইতে ভুলকণা:৭ মাইল। ব্রহ্ম চটি -৬ ভীমগােড়া ১৯ দুর্গা- জঙ্গল বা পাঙ্গরবাস ২২ ) দরিয়া-৯ পেখিবাসা ১১ বৈরাগণ। ২৭ বণিয়া কুণ্ড ১৪ অ রাম-২৭• চোপ-১ঃ • , সেটুনা বা বীরেশ ২• .. তুঙ্গনা ১৮ গােপেশ্বর ৩০ নালা হয় লাল বা চামেলী-৩৩ মাইল। কেদারনাথ ছাড়িয়া যইয়ে, মন সরিতেছে না। পা যেন উঠিতেছে । অতি অনিহা, অপু! দেয়ে মন্দাকিনী পার হইলাম। পুনরায় পূৰ্ববর্পিত তুফg " হা ক্রম গৌরীকুণ্ড চটিতে পৌছিলে বৃষ্টি আরম্ভ হইল, অএইখানেই বিপ!ং কলাম। পূর্বেই বলা হইয়াছে গৌরীকুণ্ড একটি বড় চটি, স্মাহ ম সমুদায় পাওয়া যায়। রাত্রিতে ভােজনাদি সমাপন করি। এর “ন করিলাম। ।

কেদারবদরীর পথে। ৩রা জ্যৈষ্ঠ অতি প্রত্যুষে উঠিয়া প্রাতঃকৃত্যাদি সমাধা করিলাম। তখনও জ্যোৎস্নায় চারিদিক আলােকিত, সুতরাং কোন অসুবিধা হইল না। গৌরীকুণ্ডে স্নান করিয়া বাহির হইয়া পড়িলাম। ক্রমে গলাকাটা গণেশ, শােনপ্রয়াগ সেতু, রামপুর, বাদলপুর, বরাচটি অতিক্রম করিয়া ফাটা চটিতে উপনীত হইলাম। প্রায় ২শটা বাজিয়া গেল। মধ্যাহ্ন আহারের বন্দোবস্ত হইল। রাস্তায় দলে দলে যাত্রী যাইতেছে ও আসিতেছে, জর কেদারনাথ কি জয় শব্দে দিক দিগন্তু মূখরিত হইতেছে। সকলেই এক উদ্দেশ্যে চলিয়াছে, ভগবানের চিন্তা ব্যতীত কাহারও মনে অন্য কোন চিন্তা নাই। রাগ, হিংসা, দ্বেষ বুঝি বা ক্ষণকালের নিমিত্ত মানবহৃদয় হইতে অপমৃত হইয়া গিয়াছে। অপরাহ্নে প্রত্যহই বৃষ্টি হইতেছে দেখিয়া বেলা দুইটার সময় বাহির হইয়া পড়িলাম। কিছুদূর অগ্রসর হইলেই মেঘগর্জনের শব্দ শােনা গেল। দুই একটা বড় বড় টোও পড়িতে লাগিল। আমরা যথাসম্ভব দ্রুতবেগে চলিয়া প্রায় চারিটা পেনের মিনিটের সময় নালাচটিতে আসিয়া পেছিলাম এখানে অর্ধ ঘণ্টা অপেক্ষা করিতে হইয়াছিল। বদরী নাশের রাস্তা এইস্থানে কেদার নাথের রাস্তায় আসিয়া মিলিয়াছে। আমরা এখন ৬ বদরী নাথের দর্শনে যাইতেছি সুতরাং এখান হইতে বদরী নাথের রাস্তা ধরিলাম। প্রথমে মন্দাকিনী পার হইতে হইবে। নালা চটি হইতে অনেক কষ্টে দুই মাইল অবরােহণের পর আমরা মন্দা- কিনার সেতু পাইলাম। রাস্তা বড়ই সঙ্কীর্ণ, দুই তিন জন লোক পাশা- পাশি যাইবার উপযুক্ত প্রচুর স্থান নাই। আবার এই রাস্তা দিয়াই গাে মহিষাদিও যাতায়াত করে। রাস্তার একদিকে পর্বতশ্রেণী আকাশ স্পর্শ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে ও অপর দিকে গভীর খাদ যেন পাতালের অন্বেষণ লালসাঙ্গা ল মৌলী। করিতেছে। একটু অসাবধান হইলে, একবার পদস্খলিত হইলে, বােধ হয় একবারে মাংসপিণ্ড হইয়া যাইতে হইবে। এই দুর্গম পথ অতিক্রম করিয়া পবিত্ৰসলিলা মন্দাকিনীর তীরে উপণীত হইলাম। এখানে নদী পার হইবার সেতুটী অপেক্ষাকৃত নূতন, ১৯১৩ সালে নিৰ্ম্মিত। পার হইয়া চড়াই পাইলাম। প্রায় এক মাইল চড়াইয়ের পর উথীমঠ। সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছে। প্রকৃতি দেবী অন্ধকারে মুখ লুকাইতেছেন। পশু পক্ষী সকলেই নিজ নিজ আবাসের সন্ধানে চলিতেছে। আমরাও একটি ঘর বাছিয়া লইয়া আমাদের পুটলী সকল ফেলিলাম। রাস্তার উভয় পার্শ্বে দ্বিতল সারিবদ্ধ গৃহ। নিম্নতলায় দোকান, নানাবিধ দ্রব্য সম্ভারে পরিপূর্ণ। চা পানকারীরা শুনিয়া আনন্দিত হইবেন যে এখানে বেশ ভাল চা পাওয়া যায়। দ্বিতলের গৃহগুলি যাত্রীদিগের জন্য। আমরা একটি অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত ঘর মনােনীত করিয়া লইলাম। বিশ্রামের পরে দেবদর্শনে বাহির হইলাম। এখানে একটি বৃহৎ মঠবাটী আছে। তথায় কেদারনাথের মােহন্ত বাস মঠবাড়ীর সম্মুখেই একটি জমকাল ফটক। ফটকের উপর লাল ও কাল রঙের হাতীওয়ালা কার্ণিশ। কার্ণিশটি কাষ্ঠনির্মিত। কাষ্ঠনির্মিত। তােরণ পার হইয়া একটি প্রাঙ্গণে পড়িতে হয়। প্রাঙ্গণের চতুর্দিকে যাত্রীদের থাকিবার ঘর। মধ্যস্থলে একটি মন্দির। মনির মধ্যে মান্ধাতার, ওঙ্কারেশ্বরের এবং আরও অনেকগুলি দেবতার মুর্তি রহিয়াছে। প্রাঙ্গণের এক পার্শ্বে ক্ষুদ্র একটি কুটরীতে অনিরুদ্ধ ও উষার মূর্তি। প্রাঙ্গণের অপরদিকে একটি ঘরের ভিতর দিয়া একটী সঙ্কীর্ণ পথে মহান্ত মহারাজের গদি দেখিতে যাইতে হয়। তথায় পঞ্চমুখ কেদারেশ্বর দেবের প্রতিমূর্তি। এই মূর্তির দুইটি মৰ স্বর্ণ নির্মিত ও তিনটি রৌপ্যনির্মিত। ইহা ব্যতীত ভিন্ন ভিন্ন কুটরীতে ৪৫ কেদার-বঙ্গরীর পথে। . গঙ্গা, কুন্তী, দ্রৌপদী চারি যুগের কালী ও পঞ্চ পাণ্ডবের মূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। মােহন্ত মহারাজের কর্মচারী আমাদিগকে অত্যন্ত যত্নে সহিত যাবতীয় দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখাইলেন। বাসায় ফিরিতে রাত্রি একটু বেশী হইয়া গেল। আকাশ একটু মেঘাচ্ছন্ন ছিল, শরীরে শীত বােধ হইতে লাগিল। কম্বল মুড়ি দিয়া শয়ন করিতে হইল ; সুনিদ্রার কোন ব্যাঘাত হইল না। এখানে ডিস্পেন্সারী, পুলিশ থানা ও পােষ্ট অফিস আছে। এখান হইতে ছয় মাইল উত্তরপূৰ্বে দিউড়ীতাল নামক একটা হ্রদ আছে। ইহা বদরীনাথ হইতে উথীমঠের নিম্নবাহিনী মন্দাকিনী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি জাঙ্গালের উপর সমুদ্র পৃষ্ঠ হইতে ৮০০ ফিট উচ্চে অবস্থিত। পরিধি প্রায় ৮০০ গজ হইবে। ইহার কোন অংশ অগভীর নহে; তবে উত্তরভাগের গভীরতা সর্বাপেক্ষা অধিক। তীর হইতে এই হ্রদের দৃশ্য বড়ই মনােম। ১৫ মাইল দূরস্থিত বদরিনাথ পর্বতের আপাদমস্তক প্রায় সমস্তটাই দেখিতে পাওয়া যায়। প্রত্যুষে তুষারমণ্ডিত বদরিনাথ ও কেদারনাথ হ্রদের জলে প্রতিবিম্বিত হইয়া দর্শকের হৃদয় আনন্দরসে আপ্লুত করিয়া দেয়। ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ। প্রাতে উখীমঠ ত্যাগ করিলাম। তখন সূৰ্য্যদেব উঠেন নাই। খানিকদূর অগ্রসর হইলে অত্যুচ্চ পর্বতশৃঙ্গে প্রাতঃসূর্যের কিরণচ্ছটা নয়ন পথে পতিত হইল। সূর্যরশ্মি ক্ৰমে পৰ্বত গাত্রে নামিয়া আসিয়া সমস্তই স্বর্ণময় করিয়া তুলিল। দূরে মহাভারতবর্ণিত বাণ রাজার রাজধানী শশাণিতপুরের ভগ্নাবশেষ পরিলক্ষিত হইল। তাহার পর সত্যনারায়ণ। এখানে রাস্তা একেবারেই ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। পর্বত গাত্রে রাস্তার কোন চিহ্নই নাই। সবটুকু ধসিয়া একেবারে নিয়ে খাদের ভিতর চলিয়া গিয়াছে। পৰ্বত গাত্র ধরিয়া হামাগুড়ি দিয়া অতি কষ্টে "লালসাঙ্গা বা চামেলী। -নিকটা উপরে উঠিতে হইল ; তথায় এক একটি পাদবিক্ষেপ করিবার মত স্থান পাইয়া তাহার উপর দিয়া কতদূর আসিয়া আবার অতি কষ্টে নিম্নে নামিয়া সাবেক রাস্তায় আসিয়া পড়িলাম। এই স্থানটুকু অতিক্রম করিতে আমাদের বড়ই কষ্ট হইল, তদ্ভিন্ন প্রতি মুহূর্তেই বিপদের আশঙ্কা হতেছিল, ফলতঃ শরীরে যথেষ্ট সামর্থ এবং হৃদয়ে সাহস ও দৃঢ়তা না থাকিলে এরূপ দুর্গম প্রদেশ দিয়া গমন করা নিতান্ত অসম্ভব। পৰ্বত প্রদেশবাসী.ঝপানিওয়ালারা পথের এ সকল দুর্গমতাকে গ্রাহ করে না। তাহার উপর তাহারা সকলেই বলিষ্ঠ সুতরাং আমাদের এক একজনকে পৃষ্ঠে লইয়া অবলীলাক্রমে এই সকল পথ অতিক্রম করিয়া থাকে। উখীমঠ হইতে চাই রাস্তায় দুই তিন মাইল চলিয়া আমরা ব্রহ্মচটিতে উপনীত হইলাম, ব্রমচ টি হইতে দুই মাইল উতরাই নামিয়া আকাশগঙ্গা নদীর গর্ভে আসিয়া পড়িলাম। দুর্গা চটি। আকাশগঙ্গা লাফাইতে লাফাইতে চলিতেছেন, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড উপলখও তাহার গতি কোনরূপে প্রতিহত করিতে পারিতেছে না। নদীর সেতুটি ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। যাত্রীদের সুবিধার জন্য কাঠ ফেলিয়া একটি সাময়িক সেতু করা হইয়াছে। ভয়ে ভয়ে তাহার উপর দিয়া পার হওয়া গেল; পুনরায় ভীষণ চড়াই। এক দল বাঙ্গালী যাত্রীর সহিত সাক্ষাৎ হইল, দলে দুইটি পুরুষ ও আট দশজন মহিলা। সকলেই পদব্রজে যাইতেছেন। মহিলাগণ পথশ্রমে একেবারেই অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছেন। এখানের ভীষণ চড়াইতে আর উঠিতে পারিতেছেন না, এক পা অতি ক্লেশে উঠিয়া আবার বসিয়া পড়িতেছেন ; বাঁহারা কখনও বাড়ীর বাহির হন নাই, পদব্রজে রাস্তা হাটা যে কি ধাহারা কখনও জানেন নাই, তাহারা কি জানি কি এক অজ্ঞাত দুর্দমনীয় এ্যাকুলতার প্রেরণায় এই ভীষণ বিপদসঙ্কুল রাস্তায় আসিয়া পড়িয়াছেন, ; ৮৭ কেদারবরীর পখে। কি এক স্বর্গীয় আকর্ষণে জীবনের মায়া তুচ্ছ করিয়া অশেষ কষ্ট লাঞ্ছনার প্রতি দৃকপাত না করিয়া রাস্তার শত বাধা সহ বিঘ্ন অগ্রাহ্ন করিয়া অভীষ্ট পথে অগ্রসর হইতেছেন। এত শরীরের কষ্ট, কিন্তু মনের জোর কিছুতেই কমিতেছে না। সকলেই আনন্দে উৎফুল্ল, সকলের মুখ হাসিতে পূর্ণ ; পরস্পর পরস্পরকে আশ্বাস দিতেছেন—আর একটু পরেই বাঞ্ছিত স্থান মিলিবে। ভগবানের নিকট প্রাণ অৰ্পণ করিয়া সমস্ত ক্লেশ ভুলিব। তাঁহাদিগের সহিত কিছুক্ষণ কথােপকথন করিয়া আমরা অগ্রসর হইলাম। এক মাইল অগ্রসর হইয়া দরিয়াচটি (দৈড়া)। দরিয়াচটি অতিক্রম করিয়া একটি নর্তকীর সহিত সাক্ষাৎ হইল। সুললিত নৃত্য গীতের দ্বারা যাত্রীদিগের পথক্লেশ অপনােদন করিতেছেন। সুর সুললিত কিন্তু ভাষা অবােধ্য, দুএকটি কথার বুঝিতে পারা গেল যে ভগবানের গুণ কীৰ্ত্তন করিতেছেন। এইবার ভীষণ অরণ্য ; ঘননিবিষ্ট মহীরুহচর স্ব স্ব আকাশ ভেদী মস্তক সকল উন্নত করিয়া সদর্পে দাড়াইয়া আছে। শাখা প্রশাখা সকল পরস্পর পরস্পরের সহিত বিজড়িত হইয়া রহিয়াছে। সেই অবিরলক্রম বনপ্রদেশে সূর্যের রশ্মি প্রবেশ লাভ করিতে না পারায় স্থানটী বাস্তবিকই ভয়ানক। তদ্ভিন্ন এখানে লােকজনের সমাগম নাই, পশু পক্ষীর সংখ্যাও বড় বেশী নয়, চারিদিক নীরব, কেবল কচিত দূরাগত বৌ-কথা-কও পাখীর শব্দে সেই নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে ভাঙ্গিয়া যাইতেছে, স্থানে স্থানে রাস্তার চিহ্নমাত্র নাই, আবার এক এক স্থানে এক একটী প্রকাণ্ড বৃক্ষ ঝটিকার বেগ সহ্য করতে না পারিয়া ধরাশায়ী হইয়া যাত্রীদিগের পথ অবরােধ করিয়া পড়িয়া রহিয়াছে। এখানে রাস্তা মেরামত বা পরিষ্কার করিবার ভাল বন্দোবস্ত নাই বলিয়াই বােধ হইল। স্থানে স্থানে ৮০ লালসাঙ্গা বা চামেলী ; ভূপতিত প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বৃক্ষসকলের শিকড়ের উপর দিয়াই রাস্তা হইয়া গিয়াছে। কত কাল যে এইরূপ অবস্থায় আছে তাহা অনুমান করা দুঃসাধ্য। এইরূপ প্রায় দুই মাইল অতিক্রম করিয়া “পােথি বাসায়” উপনীত হইলাম। স্থানটী চতুর্দিকে পৰ্বতবেষ্টিত একটু সামান্য সমতল ক্ষেত্র। সচরাচর চটি গুলি যেমন হয় ইহাও তেমনি ; রাস্তার দুই পার্শ্বে যাত্রীদের থাকিবার ঘরের সারী; চাউল, ডাল, ঘি, আলু সমস্তই পাওয়া যায়। দ্বিপ্রহরের পূর্বে পৌছিতে পারিলে দুগ্ধও পাওয়া যায় । তবে এ প্রদেশে মহিষ দুগ্ধই সচরাচর পাওয়া যায়, গোদুগ্ধ বড়ই দুর্লভ। নিকটেই সুশীতল ও সুস্বাদু জলের ঝরণা ; রৌদ্রুে বসিয়া আরামে সর্বাঙ্গে তৈল মর্দন করা গেল। ব্যথা নিবারণে তৈলের সমতুল ঔষধ বিরল। নিকটবর্তী ঝরণায় স্নান করিলাম; এদিকে খাদ্য প্রস্তুত ; আহার করিয়া পদ্মনাভের স্মরণ করা গেল। সংসারের কোলাহল এখানে পৌছিতেছে না। লােকক্ষয়কারী ভীষণ ইউরােপের যুদ্ধের কথা একেবারে ভুলিয়া গিয়াছি। জগৎ হইতে যেন আমরা সম্পূর্ণ রূপে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছি। পুটলি পাটলি বাধিয়া বেলা দুইটার সময় রওনা হইলা, পুনরায় ভীষণ বনের ভিতর দিয়া দেড় মাইল অতিক্রম করিলে একটি ভগ্ন চটি পাইলাম, তথা হইতে আবার এক মাইল পরে বণিয়া কুণ্ড। ইহা একটি অধিত্যকার উপর অবস্থিত। অনেকগুলি মহিষ চরিতেছে। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আবার চলিতে লাগিলাম, বরাবর চড়াই চলিতেছে, তবে তত কষ্টকর নহে। তরঙ্গায়িত বনভূমি দেখিয়া কলিকাতার ইডেন গার্ডেন ও হাওড়ার বােটানিকেল গার্ডেন মনে পড়িল। উদ্যান নির্মাতৃগণ উদ্যান মধ্যে স্থানে স্থানে এই সকল তরঙ্গায়িত বনভূমির অনুকরণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন বলিয়াই বােধ হইল।

কেদার-বদনীর পথে। ক্রমে ক্রমে এক মাইল দূরবর্তী “চোপ” পৌছিলাম। একস্থানে কতকগুলি প্রকাণ্ড কায় সাদা হনুমান দেখিতে পাওয়া গেল। তাহার এক বৃক্ষ হইতে অন্য বক্ষে লম্ফ দিয়া যেন আমাদিগকে জানাইতে লাগিল যে তাহারাই এ প্রদেশের অপ্রতিদ্বন্দ্ব অধীশ্বর। যতগুলি চটি দেখিয়া আসিয়াছি তন্মধ্যে চোপতা সৰ্ব্বাপেক্ষা উচ্চস্থানে অবস্থিত ; পশ্চাদ্দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করিলে তরঙ্গের অনুকারী পৰ্বত শৃঙ্গ ব্যতীত আর কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলগুলি যেন অধঃপ্রদেশে। একটির পর একটি মাথা উচু কৃবিয়া উঠিয়াছে, আবার নামিয়াছে, আবার উঠিয়াছে। এইরূপে বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের লহরীলীলার অনুকরণ করিয়া কোথায় গিয়া মিশিয়াছে। সকলেই যেন অপরকে নিয়ে রাখিয়া নিজে উঠিবার চেষ্টা করিতেছে। সম্মুখে তুষার কিরিটি চশীলা শৃঙ্গ ১২০৭১ ফিট উচ্চ ; ইহার উপর তুঙ্গনাথ-দূরে কেদার নাথ ও চোখাম্বা পৰ্বত! চৌখাম্বা পৰ্ব্বতশেখরের গহ্বর গুলি নির্বাপিত আগ্নেয় গিরির গহ্বর বলিয়াই বােধ হয়। এখনও গহ্বর গুলি সম্পূর্ণ ভরাট হইয়া যায় নাই। গহ্বরের ধারগুলি এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে।চটিটী অপেক্ষাকৃত বড়। সিন্ধিয়া, গােয়ালিয়র প্রভৃতি রাজন্যবর্গের ধৰ্ম্মশালা, সদাব্রতণ্ডের ডিসপেনসারী ও যাত্রী থাকিবার অনেকগুলি ঘর আছে। এখানে বিলক্ষণ শীত অনুভূত হইল। ইহার বাম পা দিয়া তুঙ্গনাথে যাইবার রাস্তা ; ভীষণ চড়াই। মধ্যে মধ্যে রাস্তা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে ; আরােহণ নিতান্তই কষ্টকর। তিন মাইল চড়াইয়ের পর তুঙ্গনাথ দেবের মন্দির, মন্দিরের নিকটে একটি কুণ্ড। তুঙ্গনাথ ব্যতীত পাৰ্বতী, গণেশ, ভৈরব, ব্যাসদেব ও শঙ্করাচার্যের মূর্তি আছে। তুঙ্গনাথের মন্দিরের নিকটেই আকাশগঙ্গার উৎপত্তি। কেদার নাথের ন্যায় তুঙ্গনাথের ছয় মাস পূজা হয়। শীতের ।

লালসাঙ্গা বা জামৌলী। ছয় মাস বন্ধ থাকে। ইহা পৰু কেদারের মধ্যে একটি। আমাদিগের ভাগ্যে তুঙ্গনাথ দর্শন ঘটিল না। তুঙ্গনাথের দুই জন পাণ্ডার মুখে শুনিলাম রাস্তায় অবস্থা বড়ই শােচনীয়। অধিকাংশ স্থলেই ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। পুরুষেরা অতি কষ্টে যাইতে পারেন; কিন্তু স্ত্রীলােকদের পক্ষে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। বিশেষতঃ আমাদের সঙ্গে অশীতিপর বৃদ্ধা। পাণ্ডা দুই জন আমাদিগকে নিরস্ত হইবারই পরামর্শ দিলেন। মনে বড়ই কষ্ট হইল ; এতদূর আসিয়া তুঙ্গনাথের দর্শন মিলিল না। যাহা হউক পাণ্ডা- দিগের নিকট প্রসাদ গ্রহণ করিয়া সে আশা ত্যাগ করিলাম। কিঞ্চিৎ চড়াইয়ের পর উতরাই। যেখানে উতরাই আরম্ভ হইল ঠিক সেইখানে একটি ছােট মন্দিরের মধ্যে তুঙ্গনাথের একটী মূর্তি। যাহার শৃঙ্গদেশে উঠিতে অক্ষম হন তঁাহাৱা এই মন্দিরস্থিত দেবমূর্তিকে প্রণাম করিয়া মনের আক্ষেপ মিটাইয়া থাকেন। আমাদিগের ভাগ্যেও তাহাই ঘটি। ভগবানকে প্রণাম করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম। ভীষণ উতরাই, গড় গড় নামিয়া আসিতে লাগিলাম, যেন এই পড়ি এই পড়ি। দেড় মাইল উতরাইয়ের পর ভূলকণা চটি। প্রায় দুই মাইল পরে ভীমগগাড়া চটি। চোপত হইতে উঠিয়া পর্বত উলঙ্ঘন করিয়া তুঙ্গনাথের রাস্তা আবার এইখানে বদরি নাথের রাস্তায় মিশিয়াছে। সন্ধ্যা আগতপ্রায়, আর অগ্রসর হওয়া সমীচীন নহে; জগৎ নিস্তব্ধ হইয়া আসিতেছে নির্জন বন প্রদেশে বাতাসের শশা শোঁ শব্দ ব্যতীত আর কোন শব্দ শােনা যাইতেছে না; সেই বাতাসও বুঝি থামিয়া আসিতেছে; মহীরুহ সকল নিশ্চলভাবে দাঁড়াইয়া বুঝি বা বিশ্বেশ্বরের ধ্যান করিতেছেন। একটি ঘরে আশ্রয় লইলাম; এখানে বচ্ছ শীত। চটিওয়ালা ঘরে আগুন করিয়া রাখিয়াছে। দুইটী কুও কেদারবদরীর পথে। অলিতেছে। মােটা মােটা বৃক্ষ শাখা অাগুনে দেওয়া হইয়াছে। তথাপি এক একবার বাতাস আসিয়া সমস্ত শরীর কাপাইয়া দিতেছে। ভায়া আমার চটিওয়ালার নিকট হইতে উত্তম ঘি, ময়দা সংগ্রহ করিলেন। আলুও কিছু পাইলেন। নিজেই আগুন ধরাইলেন ; কাহারও সাহায্যের অপেক্ষা করিলেন না। লুচি, আলুর তরকারী প্রস্তুত হইল। পরিতৃপ্তি সহকারে উদরপূর্তি করা গেল। দুরন্ত শীতে বড়ই কষ্ট হইতে লাগিল। আমাদিগের যে সকল শীতবস্ত্র সম্বল ছিল, তাহাতে কোনরূপে শীতের প্রকোপ হইতে রক্ষা পাওয়া বড়ই দুরূহ হইয়া উঠিল। ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া কোনরূপে রাত্রি অতিবাহিত করিলাম। ৫ই জ্যৈষ্ঠ সোমবার। অতি প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করা গেল ; যথা- নীতি প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপন করিয়া যাত্রা করিলাম। পূৰ্বদিনের ন্যায় ভীষণ অরণ্যের ভিতর দিয়া রাস্তা। এক মাইল চড়াইয়ের পর দুই মাইল উতরাই, তাহার পর জঙ্গ-চটি বা পাঙ্গর বাসা। ভীষণ অরণ্যের মধ্যে। কিন্তু সারিবদ্ধ অনেকগুলি ঘর আছে। মেষপালকদিগেরও থাকিবার বিশেষ বন্দোবস্ত আছে। বড় বড় আটচালার মধ্যে দলে দলে মেষ রহিয়াছে। এখানে বােধ হয় দুগ্ধ অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়। কারণ চটিতে প্রবেশ করিবামাত্র “বাবু দুধ চাই, বাবু দুধ চাই” বলিয়া কয়েক জন আমাদিগের নিকট আসিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু এত সকালে দুধের কোন আবশ্যকতা নাই জানিয়া তাহারা ক্ষুব্ধ-চিত্তে চলিয়া গেল। সামান্য মাত্র বিশ্রাম করিয়া পুনরায় বাহির হইলাম। এখন বরাবর উতরাই ; প্রায় চার মাইল উতরাইয়ের পরে রুদ্রগঙ্গা নদী। নদীতীরে মণ্ডল চটি । অনেকটা সমতল ভূমি। চটিটি ও অপেক্ষাকৃত বড় ; খাদ্য দ্রব্যের অনেক খুশি দোকান আছে। এখান হইতে একটি রাস্তা বরাবর রুদ্রনাথের লালসাঙ্গা যা জামৌলী। ; দিকে চলিয়া গিয়াছে। রুদ্রনাথ পঞ্চকেদারের মধ্যে একতম। এখান হইতে রুদ্রনাথের মন্দির প্রায় ১৫ মাইল। মধ্যে অনুসূয়া দেবীর মন্দির আছে। মণ্ডলচটির দুই মাইল দূরে রাস্তা বড় কদৰ্য্য, চড়াই অত্যন্ত বেশী । খুব কম লােক ঐ রাস্তা দিয়া যাতায়াত করে। এই রাস্তাটি রুদ্রনাথ হইয়া চামেলী হইতে চার মাইল দূরে ছিকা চটিতে মিশিয়াছে। মণ্ডলচটি ত্যাগ করিয়া পদব্রজে রুদ্রগঙ্গা পার হইলাম। সেটা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। অপর পারে নদীর ধার দিয়া সুগম রাস্তা পড়িয়া রহিয়াছে। নদীর পাড়ের উপর দিয়া রাস্তাটি নির্মিত। রাস্তাটি পরিষ্কার; কলিকাতার ট্র্যাণ্ড রােতের কথা মনে পড়িল। এইরূপে প্রায় দুই মাইল অতিক্রম করিয়া বৈরগণা চটি ; মধ্যে বালাসুত নদী পার হইতে হয়। কিঞ্চিৎ চড়াইয়ের পর, আরামচটি। পরে উতরাই-এক মাইল হইবে। বীর বা বালখিল নদীর তীরে আসিয়া পৌছিলাম। সেতুটী ভাঙ্গা, অদৃষ্টে কেবল ভাঙ্গা সেতুই মিলিতেছে। নদীর এবং তীরস্থিত দুই পার্শ্বের পাহাড়ের অবস্থা দেখিয়া বড়ই ভয় হইল ; কিরূপে পার হওয়া যাইবে। নীচে মদী বহিয়া যাইতেছে, দুই পার্শ্বে প্রাচীরের ন্যায় পাহাড়। ঝপানী কুলীরাই পর্থের কাণ্ডারী, তাহাদের সাহায্যে অতি কষ্টে একে একে নদী পার হওয়া গেল। নিকটেই সেটুনা চটি। পুটলী পাটলী ফেলিয়া এইখানেই মধ্যাহ্ন ভােজনের বন্দোবস্ত করা গেল। চটি ওয়ালাটি বেশ সজ্জন। তাহার অবস্থাও ভাল। নিজের চাষ আছে। চাষে গম জন্মায় এবং নিচে নদী স্রোতে গম পিসিবার জানা আছে। বাহিরের কোন খবর রাখেন না। স্ত্রী পুত্র লইয়া বেশ সুখে স্বচ্ছনে পর্বত মধ্যে কাল যাপন করিতেছেন। একটি পুত্র আসিয়া সূচ সুতার অভাব জানাইল। এদেশে সুচ সুতা বড় পাওয়া যায় না, তাই কেদারনাথ কোরবারীর পথে। ও বদরীনাথ দর্শনেচ্ছু অনেকেই সঙ্গে করিয়া সুচ, সুতা লইয়া যান। পাহাড়ী লােকেরা প্রায় সুচ সুতা চাহিতে আসে। মধ্যাহ্ন ভােজন সমাপনান্তে কিঞ্চিৎ বিশ্রামের পর আন্দাজ বেলা দুই ঘটিকার সময় পুনরায় যাত্ৰা করিলাম। প্রায় দেড় মাইল অতিক্রম করিয়া “গােপেশ্বর” ; মধ্যে এক স্থানে রাস্তার চিহ্ন বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। পাহাড় ধসিয়া গিয়াছে, রাস্তা কোথায় থাকিবে। গােপেশ্বর একটি সুন্দর গ্রাম। এখানে গােপেশ্বর দেবের একটি পুরাতন মন্দির আছে। মন্দিরটি প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত, প্রাঙ্গণের চতুর্দিকে সারিবদ্ধ ঘর আছে। তাহাতে যাত্রীরা বিশ্রাম করিতে পারেন। প্রাঙ্গণের এক কোণে লৌহ নির্মিত একটি প্রকাণ্ড ত্রিশূল আছে। তাহাতে কত কি লেখা রহিয়াছে। কিন্তু অক্ষরগুলি ক্রমে ক্রমে মুছিয়া যাইতেছে। প্রাঙ্গপের বাহিরে একটি দ্বিতল ঘরে শ্রীশ্রীলক্ষ্মী দেবী। নিকটে পাণ্ডা মহারাজের গদী। গােপেশ্বর দেবের পূজারীও রাওল নামে অভিহিত। পূর্বে ইনি কেদার নাথের রাওলের অধীন ছিলেন। এক্ষণে তাহার অধীনতা ত্যাগ করিয়াছেন। পূজার ব্যয় নির্বাহের জন্য কতিপয় গ্রামের রাজধ বরাদ্দ আছে। গােপেশ্বর চোপতা হইতে ১৩ মাইল দূরে এবং অলকননার একটি শাখা বালাসুত নদীর বামতীরে অবস্থিত। এখানে একটি বালিকা বিদ্যালয় আছে। দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখিয়া ও গোপেশ্বর দেবকে যথারীতি পূজা করিয়া অগ্রসর হওয়া গেল। বাওল সাহেব বেশ সজ্জন, তিনি হাসিমুখে আমাদিগকে নানারূপ কথােপকথনে আপ্যায়িত করিলেন। গােপেশ্বর ত্যাগ করিয়া আমা- দিগকে ক্রমে ক্রমে নামিতে হইল। প্রায় তিন মাইল অবতরণের পর আমরা অলকননা পাইলাম। অলকনন্দাকে আমরা রুদ্রপ্রয়াগে ছাড়িয়া আসিয়াছিলাম। ৯৪ লালসাঙ্গা বা চামেলী। অলকনন্দার অপর পারে, লালসাঙ্গা বা চামেলী। ইহা একটি ক্ষুদ্র সহয়; গাড়ােয়ল জেলার একটি সাবডিভিসন্; এখানে একজন ডেপুটা কলেক্টর থাকেন। তাহার আদালত পাহাড়ের উপর। নিম্নে পূর্ণ। বিভাগের ইস্পেকস বাঙ্গলা। অলকনন্দার দক্ষিণ তীরে একটি বাজার আছে। পূর্বে এই বাজারটী বামতীরে ছিল ; ১৮৯৪ সালে গােহনার। ভীষণ জলস্রোতে সমস্ত ভাসিয়া গিয়াছে। অলকনন্দার পুরাতন পুলটিও এই সময়ে ভাসিয়া যায় এবং তাহার স্থানে ২৩৩ ফিট লম্বা একটি সেতু নির্মিত হইয়াছে। এখানে পােষ্ট অফিস, টেলিগ্রাফ, অফিস, হাসপাতাল, যাত্রীদিগের থাকিবার স্থান, দোকান প্রভৃতি সকলই। আছে। যাহারা এখানে থাকিতে চাহেন তাহাদিগকে উক্ত পুলটী পার। হইয়া যাইতে হয়; এপরে থাকিবার কোন ঘর বাড়ী নাই। কেবল নদীগর্ভ হইতে উথিত প্রাচীরের ন্যায় খাড়া পাহাড় গম্ভীর ভাবে দাড়াইয়া । নদীর প্রচণ্ড বেগ পৰ্যবেক্ষণ করিতেছেন। নদীর কিনারার রাস্তাটী অত্যন্ত । সুন্দর। নদী গর্ভ হইতে পাথর দিয়া বাধান। রাস্তাটীর এক পার্শ্বে নদী এবং অপর পার্শ্বে পৰ্বত। আমাদিগের লালসাঙ্গা যাইবার কোন আবশ্যক ছিল না। কিন্তু হিসাব করিয়া দেখা গে? আমাদের সম্বল বড়ই কমিয়া গিয়াছে। টাকার দরকার সুতরাটেলিগ্রাফ অফিসের সাহায্য লইতে হইল। পুল পার হইয়া টেলিগ্রা, তুফিসে যাইলাম। রণেশ ভায়াকে টাকার জন্য তার করা হইল । ভাই রণেশ, * এখন তুমি অমরধামে, কি প্রপের ভিতর তুমি যে দুর্বিসহ শশাকের অনল জ্বলিয়া দিয়া গিয়াছ সে শুনলে তােমার দাদার রণেশচক্র দাস L.E., A.M.I.C.E., M.R. Sal... M.RS,A, E., &ca এ্যাসিষ্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়র, বিহার এবং উড়িষ্যা। জন্ম ৫ মে : ৭৫, মৃত্যু ১৫ই আ5; ”।

কারখদরীর পথে। হৃদয়খানা পুড়িয়া একেবারে খাক হইয়া যাইতেছে। তােমার স্মৃতি সুপ্তােক জাগাইয়া দিতেছে। তােমার সেই চিরসুন্দর মুখখানির কথা, বালকের মত সেই সরলতার কথা, এখনও মনে পড়িলে হৃদয়ের নিভৃত প্রদেশে লুক্কায়িত শােক সহসা যে সঙ্কুক্ষিত হইয়া উঠে। ভাই যখন যেখানে গিয়াছি তােমারই উৎসাহে, তােমারই পরামর্শে গিয়াছি। তুমি নিজে কোথাও যাও নাই কিন্তু আমাকে ভারতের তীর্থে তীর্থে বেড়াইবার জন্য তুমি কতই উৎসাহ দিয়াছ, কোথায় কি দেখি, কোথায় কি দেখিবার আছে, তাহা তুমি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আমাকে বুঝাইয়া দিয়াছ, বারম্বার কত অনুরোধ করিয়াছ। ভ্রমণে বাহির হইয়া যাহাতে কখন কোনরূপ অর্থকষ্টে না পড়ি তজ্জন্য অনবরত তীক্ষ্ণ-দৃষ্টি রাখিয়াছ, কিন্তু এখন তুমি কোথায় ! তুমি সমস্ত জীবন প্রবাসে থাকিয়া কত কষ্টভােগ করিয়াছ অথচ দাদাকে সর্বদা সুখে রাখা, হৃষ্ট রাখা তােমার জীবনের ব্রত ছিল, আজ তোমার সেই দাদা তােমাকে হারাইয়া শত বৃশ্চিকের দংশনের জ্বালায় অস্থির, তাহাতে কি তােমার কোমল হৃদয়ে ব্যথা লাগিতেছে না? তােমার প্রাণবায়ু বাহির হইবার পূর্ব-মুহূর্তেও যে তুমি তােমার দাদাকে ভুলিতে পার নাই তাহার নিদর্শন তােমার জীবনের শেষােচ্চারিত কয়েকটা কথয় দিয়া গিয়াছ, তাই এখনও ভাবিতে পারি না যে তুমি তােমার সেই শােকার্ত দাদাকে চিরতরে ভুলিতে পারিয়াছ। কিন্তু ভাই, আবার কি কখনও তােমার মুখে অপর কোন জগতে সেই চিরপরিচিত, মধুর “দাদা” সম্বােধন শুনিতে পাইব?

S
.
টি
**
স্বর্গীয় রণেশচন্দ্র দাস।
---

No text on this page.

৫২১ জোশীনই। , পালসা হইতে মঠ-২ মাইল। ছিনকা-৩ সিয়াহার-৬ হাট-৭ পিপলকোটী-১ * গরুড় গঙ্গা-১৩ টাঙ্গলি—১৫ লালসাঙ্গা হইতে দেওয়রা-১৬ মাইল পাতালগঙ্গা- গুলাবকোটা-১৯ কুমার২২ খলনাটি—২৪ সিঙ্গধার-২৭ জোশীমঠ-২৮ , অলকনন্দার ধারে ধারে চলিতে লাগিলাম। দুই মাইল পরে মঠচটি চটিটি বড়। বৃষ্টি আসিতেছে দেখিয়া এই চটিতে আশ্রয় লইতে মন করিলাম। চটিতে অনেকগুলি ঘর থাকিলেও যাত্রীর সংখ্যা এত অধিক যে কোন ঘরে স্থান পাওয়া গেল না। অগত্যা এ চটি ত্যাগ করিতে হইল। এখানে কতিপয় বন্ধুর সহিত দেখা হইল। তাহারা আমাদের আসিবার পূর্বেই এখানে আসিয়া বাসা লইয়াছেন। তাহাদের বাসাতেই আমাদিগের আশ্রয় লইবার জন্য অনুরােধ করিলেও তাহাদিগকে অনর্থক কেন কষ্ট দিব ভাবিয়া এক মাইল দূরস্থিত ছিনকা চটিতে যাইয়া পুটলী-পাঁটলা নামাইলাম। ইহা হরিদ্বার। হইতে ১৩৯ মাইল। একটি দ্বিতল গৃহে আশ্রয় লইলাম। এখানে একটু জলকষ্ট ভােগ করিতে হইয়াছিল। নদী অনেক নিম্নে সেখান হইতে জল আনা একেবারে অসম্ভব। চটি হইতে একটু দূরে একটি ছােট ঝরণা আছে, তাহা হইতে অতি সুক্ষ্ম ধারায় জল পড়িতেছে। এক কলসী কেদার-বদরীর পথে। জল লইতে অনেক সময় অবশ্যক; তাছাড়া সকল সময়েই কেহ না কে:- কলসী হন্তে অপেক্ষা করিতেছে। ভগবানের ইচ্ছায় জলের জন্য আমাদের বিশেষ কোন অসুবিধা ভোগ করিতে হয় নাই। যথাসময়ে আহার প্রস্তুত হইল। পরিপাটিরূপে ভােজন করিয়া শয়ন করিলাম। আমাদের ঘরের পাশেই একটি বােম্বাই প্রদেশবাসী ভদ্র লােক আশ্রয় লইয়াছেন। তিনি সপরিবারে বদরীনাথ দর্শনে চলিয়াছেন, সঙ্গে মাতা, স্ত্রী, ও একটি শিশু। তাহার সঙ্গে অনেক রাত্ৰি পৰ্যন্ত নানারূপ কথা- বার্তায় আনন্দে কাটিয়া গেল। ৬ই জ্যৈষ্ঠ মঙ্গলবার। এখনও প্রভাত হয় নাই, সূৰ্য্য উঠিবার এখনও অনেক বিলম্ব আছে। চন্দ্রদেব এখনও তাহার রজত কিরণে চারিদিক আলােকিত করিতেছেন। রাস্তায় মনুষ্য চলাচলের শব্দে ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। পূর্ববর্তী চটির যাত্রীরা জ্যোৎস্নার আলােকে রাত্রি থাকিতে থাকিতেই পথ চলিতে আরম্ভ করিয়াছেন। আমরাও তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িলাম। যত শীঘ্র সম্ভব প্রাতঃকৃত্যাদি সারিয়া লইলাম। তখনও অরুণালােকের দেখা নাই। চাদের আলােকেই বাহির হইয়া পড়িলাম। রাস্তা একই রকমের, এক পার্শ্বে আকাশস্পশী পাহাড় ও অপর পার্শ্বে অলকনন্দা! এক মাইল পথ অতিক্রম করিলে সম্মুখে বিরহী গঙ্গা*। এই বিরহী গঙ্গার তীৰে সতীবিরহে আকুল হইয়া শিব তপস্যা করিয়া- ছিলেন। ১৮৯৪ সালে ২৫শে আগষ্ট তারিখে ইহারই জলােচ্ছ্বাসে তীরস্থিত পাহাড়, পর্বত, গ্রাম, নগর, সমস্তই ভাসিয়া একেবারে ওলট ১১ তত উত্তর দিগভাগে নদী পরমপাবলী। ব্রীহিকানামা বিখ্যাত সৰ্ব্ব পাপহরা মতা ততে বৈ বিরহবর্তী নবী পাপমােচনী। বিরহেন পুর তত্র স্যাস্তপ্তঃ শিবেন হি।

জোশীম। পালট হইয়া গিয়াছে। ইহার পরাক্রমের চিহ্ন এখনও স্থানে স্থানে বিদ্যমান রহিয়াছে। খ্রষ্টীয় ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাহাড় ধস খাইয়া গােহনা নামক গ্রামের নিকট নদীস্রোত একবারে বন্ধ হইয়া যায়। নদীগর্ভে এপার হইতে ওপার পর্যন্ত একটা বিরাট বাঁধের উৎপত্তি হয়। বাঁধটি তলদেশে ১১০০০ ফিট প্রশস্ত-শীর্ষদেশে ২০০০ ফিট প্রশস্ত এবং উচ্চে ৯০০ ফিট। নদীর জল এইরূপে অবরুদ্ধ হইয়া একটি হ্রদে পরিণত হইল। সকলেই আশঙ্কা করিতে লাগিলেন যে, ক্রমে ক্রমে জল বাড়িয়া বাঁধ উপচাইয়া অলকনন্দা ও গঙ্গার উভয় পার্শ্বস্থ স্থান সমূহের বিশেষ ক্ষতি করিবে। প্রত্যহ কত জল বাড়িতে লাগিল দেখিবার জন্য তথায় একজন এসিষ্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নিযুক্ত হইলেন, এবং ভাবী বন্যার বেগ পরিদর্শন করিবার জন্য গােহনা, চামৌলি, নদপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ, নগর, বা, ব্যাসঘাট, হৃষীকেশ ও হরিদ্বারে এক একজন কর্মচারী নিযুক্ত হইলেন। অলকনন্দার উভয় তীর হইতে বহুদূর পর্যন্ত যে সকল গ্রাম ছিল তাহাদের লােকগুলিকে স্থানান্তরিত করা হইল। কবে সেই ভীষণ বন্যা আসিবে সকলেই তাহার প্রতীক্ষায় রহিলেন। পরিশেষে ২২শে আগষ্ট তারিখে এসিষ্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার কুকাঙ্ক সাহেব সংবাদ দিলেন আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ভীষণ বন্যা আসিবে। ২৫শে আগষ্ট প্রাতে বাঁধ উপচাইল, এবং রাত্রি দ্বিপ্রহরের সময় বাঁধ ভাঙ্গিয়া ভীষণ জলস্রোত ভীষণ গর্জনে পৰ্বত কম্পিত করিয়া ধাবিত হইল। সম্মুখে যাহা পাইল তাহাই ভাসাইয়া লইয়া গেল। সে ভীষণ বেগ কেহই সহ করিতে পারিল না। অলকনন্দার উভয় তীরবর্তী স্থানগুলি বিভিন্ন আকার ধারণ করিল। লােকালয়ের চিহ্ন সম্পূর্ণরূপে মুছিয়া গেল ; গাভােয়ালের প্রাচীন রাজধানী শ্রীনগর একেবারে অদৃশ্য হইল। চামােলর পুরাতন কেদারবদরীর পথে। বাজারটি ধরণীপৃষ্ঠ হইতে বিলুপ্ত হইল। ২৬শে আগষ্ট প্রাতে দেখা গেল যে, বাঁধের মধ্যে ৩৯• ফিট জল নামিয়া গিয়াছে এবং ১০,০০০,০•••••, ঘনফিট জল বাহির হইয়া গিয়াছে। বিরহীগঙ্গার এখন আর সে তেজ নাই। ক্ষীণ কলেবরে ধীরে ধীরে অলকননায় আসিয়া মিশিয়াছেন। বিরহীগঙ্গার সঙ্গমস্থল ছাড়িয়া অগ্রসর হইয়া একটি গিরিসঙ্কটের মধ্যে আসিয়া পড়িলাম। পৰ্বতগাত্রে গাছের লেশ মাত্র নাই। গিরিয়াজের সেই কঠিন পাষাণমূৰ্ত্তি পথিকদের মনে ভীতির উদ্রেক করিতেছে। অতি নিম্নে অলকনন্দা সেই সুকঠিন পাষাণের উপর ভীম পরাক্রমে আঘাত করিয়া প্রতিহত হইতেছেন। গিরিরাজ যেন উপেক্ষার দৃষ্টিতে অলকনন্দার এই নিষ্ফল আস্ফালন দেখিয়া অটল হইয়াই দাড়াইয়া রহিয়াছেন। স্থানটি অতীব ভীষণ। ভগবানকে স্মরণ করিয়া ধীরে ধীরে দুই মাইল পথ অতিক্রম করিয়া সিয়াহার চটিতে পৌছিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাচিলাম। চটিটি বড়। বহুসংখ্যক নরনারীতে পূর্ণ। কি এক মন্ত্রবলে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হইতে সকলে সমাগত হইয়াছেন। সকলের মুখ আনন্দে পুলকিত। পথকষ্টের চিহ্ন মাত্র নাই। বাঙ্গালী, মাদ্রাজী, মারহাট্টী, রাজপুত, হিন্দুস্থানী সকলে এক মায়ের ছেলে—এক মহামন্ত্রে দীক্ষিত। কাহারও কোন সঙ্কোচ নাই, অকপট হৃদয়ে পরস্পর পরস্পরের মনের ভাব ব্যক্ত করিতেছেন। ভাই যেন ভাইকে চিনিয়াছে। কি মধুর সম্মিলন। সকলের মুখে “জয় বদরী বিশাল কি জয়।” এখানে ক্ষণেক বিশ্রাম করিয়া অগ্রসর হইলাম। এক মাইল পরে হটচটি। এ চটিটিও বড়, যাত্রীতে পরিপূর্ণ ; কেদারনাথের রাস্তায় কোন চটিতে এত অধিক সংখ্যক যাত্রী দেখিতে পাই নাই। কেদারনাথ জোশীমই। অপেক্ষা বদরীনাথের যাত্রী অধিকতর বলিয়াই বোধ হইতে লাগিল। হাটচটি পশ্চাতে রাখিয়া চলিতে লাগিলাম, ক্রমে একটি লৌহ সেতুর নিকটে আসিয়া পোঁছিলাম, সেতুটি আশী ফিট লম্বা। সেতু দ্বারা অলক- নন্দা পার হইলাম। সেতুর উপর হইতে নিম্নে চাহিলে মাথা একেবারে ঘূরিয়া যায়। পাতাল দিয় অলকনন্দা বেগে ছুটিতেছেন। পৰ্ব্বতের মধ্যে তিলার্ধের জন্য যেন তিনি থাকিতে চাহিতেছেন না। কোথাও কিছু বাধা পাইলে দ্বিগুণতর বেগে আবার ছুটিতেছেন। সেতু পার হইয়া ক্ষণেক বিশ্রাম করিলাম। নিম্নে অলকনন্দার ভীষণ প্রবাহ। উপরে ভীষণ চড়াই। উপরদিকে চাহিয়া দেখি দলে দলে যাত্রিগণ পিপীলিকা সারির ন্যায় চলিয়াছে—একদল আসিতেছে আর একদল যাইতেছে। মধ্যে মধ্যে সহস্র কণ্ঠে ‘জয় বদরীধিশালা কি জয়’ শব্দে গিরিচূড় প্রতিধ্বনিত হইতেছে। অলকনন্দা বুঝি আনন্দে মাতােয়ারা হইয়া যাত্রিগণের কণ্ঠে কণ্ঠ মিশাইয়া ‘জয় বদরীবিশাল কি জয়’ শব্দে চতুর্দিক মুখরিত করিতেছেন। অথবা দেবাদিদেবের দর্শন পাইয়া প্রেমে বিহ্বল হইয়া পাপীদিগকে শান্তিনিকেতনের পথের সন্ধান বলিয়া দিতেছেন। চড়াইতে উঠিতে আরম্ভ করিলাম। প্রতি পদবিক্ষেপে ‘জয় বদরী বিশালা কি জয়’ শব্দ শূহ হইতে লাগিল। হঠাৎ একি! পথের পার্শ্বে একটি স্ত্রীলােক পড়িয়া রহিয়াছে, নিকটেই একটি কাণ্ডি, অদূরে কাণ্ডি- ওয়ালা। ভীষণ চড়াইতে উঠিতে গিয়া হঠাৎ কাণ্ডিওয়ালার পদস্খলন হইয়াছে। আবােহ সহিত কাণ্ডিটি ফেলিয়া দিয়াছে। কাণ্ডিটি পর্বতের দিকে পড়িয়াছিল তাই রক্ষা-নদীর দিকে পড়িলে যে কি হইত তাহ সকলেই বুঝিতে পারিতেছেন। কোথায় যাইয়া অনন্তে মিশিয়া যাইত। মণী মাথায় বিবম আঘাত পাইয়াছেন। সম্পূর্ণ অজ্ঞান। মাথায় জল দিবাকু কোপারবপরীর পথে। ব্যবস্থা হইল। জলের একটি নাম জীবন। জল দিতে দিতে স্পন্দন শক্তি ফিরিয়া আসিল। ক্রমে চক্ষু চাহিলেন। লজ্জায় জড়সড় হইয়া পড়িলেন। কিঞ্চিৎ সুস্থ হইয়া পদব্রজে অগ্রসর হইবার প্রস্তাব করিলেন, কাণ্ডিতে উঠিতে চাহিলেন না। তাঁহার সঙ্গীদিগকে কিছুকাল বিশ্রাম করিতে বলিয়া আমরা অগ্রসর হইলাম। তিন মাইল চড়াইয়ের পর পীপলকোটি। চটিতে প্রবেশ করিলে রাস্তার দুই পার্শ্বে সারীবদ্ধ দোকান। পীপলকোটী একটি বড় গ্রাম বলিয়া বােধ হইল। কয়েকটি ছােট ছােট মন্দির ও অনেকগুলি দেবদেবীর মুৰ্ত্তি দেখিতে পাইলাম। একটি মন্দিরে একটি শিবলিঙ্গ আছেন। লিঙ্গটা শঙ্করাচার্য্যের পূর্ববর্তী সময়ে প্রতিিষ্ঠত বলিয়া প্রবাদ। দোকানে চামর বিক্রীত হইতেছে। এ অঞ্চলে নােটের প্রচলন নাই। যাহারা নােট লইয়া যান তাহারা এখানে নোট ভাঙ্গাইয়া লইতে পারেন। তানেকগুলি বড় বড় মহাজনি দোকান আছে। অবশ্য বাটা লাগে। এক শত টাকার নােট ভাঙ্গাইতে অন্ততঃ এক টাকা লাগে। পীপলকোটীতে পােষ্ট অফিস, পুলিশ, সরকারী বাঙলা, ও যাত্রীদিগের থাকিবার বিস্তর ঘর আছে। দ্রষ্টব্য বিষয় গুলি কতক কতক দেখিয়া অগ্রসর লইলাম। কতক চড়াই কতক উতরাই করিয়া প্রায় তিন মাইল পরে গরুড়-গঙ্গার * তীরে * তত গরুড়গঙ্গায়াং গজায়া দক্ষিণতটে। স্না দেবং সভ্যচ্চ পক্ষীশং বিষ্ণুরূপিন । পঞ্চকোটিসহস্ৰানাং ব্যাণাং বসতে চিরম্। বিষ্ণুলােকে যােগীগমে ততাে যােগিযু জায়তে। ন তত্র সর্পজ ভয়ং বিদ্যতে ন তথা বিষাৎ। বিষগ্রস্তোহপি যে মর্তো জলে সৃষ্টং পিবেত্তবৈ। নতত্র সর্পবিজ ভয়ং ভবতি কহিঁচিৎ। ১০২ জোশীম। উপনীত হইলাম। হরিদ্বার হইতে সােজা পথে ১৪৯ মাইল। এপারে কেবল সদাব্ৰত ধৰ্মশালা। একটি কাঠের পুল দিয়া নদী পার হইতাম। নদী পার হইলে চটি মিলিল। অনেকগুলি বড় বড় ঘর থাকা সত্ত্বেও সকল যাত্রীর স্থান সঙ্কুলান হইতেছে না। অনেকে গাছতলায়, খোলা জায়গায় আশ্রয় লইয়াছে। ভগবানের কৃপায় এত ভিড়ের মধ্যেও আমরা একটি ঘর পাইলাম। আমরা ঘরে প্রবেশ করিয়া কতকগুলি যাত্রীকে সেই ঘরে আসিতে বলিলাম। পুটুলি পা ফেলিয়া স্বার্থ গঙ্গাগর্ভে অবতরণ করিলাম। একটি সুন্দর পাকাঘাট জল পর্যন্ত গিয়াছে। ঘাটে লােকে লােকারণ্য-ন স্থানং তিলধারণং, একদল উঠিতেছে, একদল নামিতেছে। নদীগর্ভে কেহ মন্ত্র পড়িতেছে, কেহ জলে ডুব দিতেছে, কেহ হামাগুড়ি দিয়া এদিক ওদিক যাইতেছে—নদীতে হাঁটু জল অপেক্ষা বেশী জল নাই। কিন্তু জলের বেগ বড়ই প্রখর, স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া থাকা একটু শক্তিসাপেক্ষ। অনেকেই নদীগর্ভ হইতে উপলখণ্ড কুড়াইতেছেন। গরুড়গঙ্গার উপলখণ্ড সর্পভয়নিবারক। ঘাটের উপরেই গরুড়জীর মন্দির। তাহাকে থালা ও পেঁড়াদির দ্বারা অর্চনা করিতে হয়। এখানে মধ্যাহ্ন ভােজন সমাপন করিয়া কিঞ্চিৎ বিশ্রামাত্তে আন্দাজ দুইটার সময় বাহির হইয়া পড়িলাম। প্রথমেই চড়াই। প্রকাণ্ডকায় অভ্র- ভেদী চিরবৃক্ষের সারির মধ্য দিয়া আমরা যাইতে লাগিলাম। এই চিরবৃক্ষের কাঠ দিয়া এখানকার সেতুগুলি নির্মিত হয়। কিন্তু কাঠগুলি অধিক দিন স্থায়ী নহে। শীঘ্রই পচিয়া যায়। এইজন্য সেতুগুলি পাঁচ ছয় বৎসরের মধ্যে অকর্মণ্য হইয়া পড়ে। ক্রমে টাঙ্গনি ও দিওয়ার চটি অতিক্রম করিলাম। আকাশে মেঘ দেখা দিল। দূর হইতে মেঘগর্জনের অস্ফুট শব্দ শুনিতে পাওয়া গেল। বাতাসের বেগও বাড়িতে লাগিল। ১৫৩নং মাইল ষ্টোনের কোরবদরীর পথে। নিকট পৌছিয়া দেখা গেল যে, রাস্তার চিহ্ন একবারে লুপ্ত হইয়াছে। আকাশম্পশী পৰ্ব্বতের তলদেশ দিয়া খরস্রোতা স্রোতস্বিনী তীরবেগে পাগলের মত ছুটিতেছে। বাতাসের বেগে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড প্রস্তরখণ্ড পৰ্বতের গাত্র হইতে মহাবেগে গড়াইতে গড়াইতে নদীগর্ভে পড়িতেছে। প্রকৃতির এই সংহারমুৰ্ত্তি দেখিয়া হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলাম। আশ্রয়ের স্থান নাই—চটি হইতে অনেক দূরে আসিয়া পড়িয়াছি। ভগবানকে স্মরণ করিয়া রাস্তার উপর বসিয়া পড়িলাম। বদরীনাথ হইতে প্রত্যাগত একদল যাত্রীর সহিত দেখা হইল। তাহারা এই ঝড়ের সময় বড়ই বিপদে পড়িয়াছিলেন। একজন মস্তকে অত্যন্ত আঘাত পাইয়াছেন। তাহারা আমাদিগকে অগ্রসর হইতে নিষেধ করিয়া চলিয়া গেলেন । কিন্তু এতদূর আসিয়া ফিরিতে কোনরূপে মন সরিল না। প্রায় অর্ধ ঘণ্টা কাল এই স্থানে অপেক্ষা করিলাম। প্রকৃতির লীলা বােঝা চ র— কখন মধুর হাস্যে মেহময়ী জননীর ন্যায় সকলের হৃদয়ে শান্তিবারি ঢালির দেন, আবার পরক্ষণে ভীষণ ভ্রুকুটি সহকারে অট্টহাস্যে নির্ভীকের অন্তঃ করলেও ভীষণ ভীতির উদ্রেক করেন। মা যেমন মাঝে মাঝে কুটী দেখাইয়া পরক্ষণেই শিশুকে ক্রোড়ে লইয়া মুখচুম্বন করেন, মাতৃরূপিণী প্রকৃতিও যেইরূপ কখন উগ্র কখন শান্তমূর্তিতে আমাদিগকে কখন ভীত কখন প্রফুল্ল করেন। বায়ুর বেগ কিছু প্রশমিত হইল। রাস্তার সহায় ঝপানিকুলিদে সাহায্যে নিয়ে অতিনিয়ে নদীগর্ভে অবতরণ করিলাম। নদীগর্ভস্থিত প্রস্তরখণ্ডে পদবিক্ষেপ করিয়া খানিকদূর অগ্রসর হইয়া আবার উঠিতে আরম্ভ করিলাম। অতিকষ্টে এইরূপে ফি র যাইলে প্রকৃতরাস্তা লোশীমঠ। মিলিল। পার্বত্য কুলিদের সাহায্য ব্যতীত এরূপ বিপদ হইতে উদ্ধার হইবার সম্ভাবনা নাই। ক্ৰমে পাতাল-গঙ্গায় আসিয়া পোঁছিলাম। নদীর উপরেই এই নামে একটি চটি । পাতাল-গঙ্গাকে গণেশ-গঙ্গাও * বলে। এখনও বেলা আছে, আমরা অগ্রসর হইতে লাগিলাম। হরিদ্বার হইতে সােজাপথে ১৫৫ মাইল দূরে গুলাবকোটী চটি পাইলাম। বেলা ছয়টা দশ মিনিট। অদ্য এইখানে বিশ্রাম। এখানে একটিও যাত্রী নাই। ঝড়ের ভয়ে বােধ হয় যাত্রীরা কেহই পূর্ববর্তী বা পরবর্তী চটি ছাড়ে নাই। ক্রমে অন্ধকার আসিয়া পড়িল। ঘন অন্ধকারে পর্বত, পাহাড় নদী সমস্তই ঢাকিয়া ফেলিল। দুই একটী করিয়া যাত্রী আসিতে লাগিল। সৰ্বশুদ্ধ দশ বারটির অধিক হইল না। তাহারা সকলেই অযােধ্যা ও আগরা প্রদেশবাসী। চটির ঘরগুলি সব খালি পড়িয়া রহিল। রাত্রিতে বিলক্ষণ শীত বােধ হইয়াছিল। কম্বল মুড়ি দিতে হইয়াছিল। কিছু উপরে পর্বতের গায়ে একটী সুন্দর ডাকবাঙ্গালা । সরকারী কৰ্ম্মচারিরা পরিদর্শন করিবার সময় ইহাতে অবস্থান করেন। অন্যান্য পথিকেরাও থাকিতে পারেন তবে পূৰ্বে অনুমতি লইতে হয়। ডাকবাঙ্গালা হইতে চারিদিকের দৃশ্য বড়ই মনােম। এই জ্যৈষ্ঠ বুধবার। অতি প্রত্যুষে ভগবানকে স্মরণ করিয়া যাত্রা করিলাম। তিন মাইলের পর কুমার বা হিলাংচ। যাত্রিদের থাকিবার স্থান যথেষ্ট, একটি পােষ্ট অফিসও আছে। এই চটির প্রায় সিকি মাইল নিম্নে কল্পেশ্বরগঙ্গা-কনাশা অলকনন্দার সঙ্গমস্থল। নিকটেই নিবিড় দেবদারুবনমধ্যে ৫ কঙ্গেশ্বর মহাদেব। ইনি পঞ্চ * তত গণেশনাং বৈ আত্বা পাপক্ষয়ে ভবেৎ..

কেদার-বদরীর পথে। কেদারের মধ্যে একটি। আড়াই মাইল তিন মাইল পরে অর্থাৎ ১৬০ ও ১৬১ মাইল ষ্টোনের মধ্যে খননটি চটি। এখান হইতে একটি রাস্তা ধ্যান-বদ্রীর দিকে গিয়াছে। ধ্যানবদ্রী পঞ্চবদ্রীর মধ্যে একটি। খনােটি চটি হইতে দুই মাইল পরে ঝাকুলা চটি, এক মাইল পরে রাস্তার নীচে অনীমঠ, অনীমঠে বৃদ্ধ বদ্রীর মন্দির। ইনিও পঞ্চ বদ্রীর মধ্যে একটি। অর্ধ মাইল পরে সিঙ্গাধার চটি । একটু যাইয়া রাস্তাটি দুই ভাগে বিভক্ত হইয়াছে। একটি রাস্তা বাম দিকে পাহাড়ের নীচে দিয়া বিষ্ণুপ্ৰয়াগের দিকে গিয়াছে। অন্যটি দক্ষিণ দিকে প্রায় অর্ধ মাইল যাইয়া জোশীমঠে পৌঁছিয়াছে। আমরা আপাততঃ বিষ্ণুপ্ৰয়াতের রাস্তা ছাড়িয়া জোশীমঠের রাস্তা ধরিলাম। যথা সময়ে জেণীমঠে আসিয়া পৌছিলাম। জোশীমঠ * শঙ্করাচার্য্য প্রতিষ্ঠিত চারিটি প্রধান মঠের মধ্যে অন্যতম। মহাত্মা শঙ্করাচাৰ্য সনাতনধর্ম প্রচারার্থ ভারতের চারি প্রান্তে চারিটি মঠ স্থাপন করেন। হিমালয়ে (জ্যাতিষী বা জোশীমঠ, দ্বারকাধামে সারদামঠ, দাক্ষিণাত্যে, মহীশূর অঞ্চলে শৃঙ্গগিরি বা শৃঙ্গেরিমঠ, পুরুষােত্তম ক্ষেত্রে ভােগবদ্ধন বা গােবর্ধনমঠ। তােটক, হামলক, সুরেশ্বরাচাৰ্য ও পদ্মপাদ এই চারজন প্রধান শিষ্যকে যথাক্রমে এই চারিটি মঠের আচাৰ্য রূপে ব্রতী করেন। তােটকের শিষ্যগণ গিরি, পৰ্বত ও সাগর, হামলকের শিষ্যগণ তীর্থ ও আশ্রম, সুরেশ্বরাচার্যের শিষ্যগণ সরস্বতী ভারতী ও পুণী এবং, পদ্মপাদের শিষ্যগণ বন ও আরণ্য উপাধি গ্রহণ *ততঃ কোশসপ্তকেচ জোতিধাম শুভপ্রম। নৃসিংহরূপী ভগবান্ যত্রান্তে মুক্তি দায়ক।

জোশীমঠ। করেন। এই দশটী উপাধিধারী শিষ্যদিগকে লােকে দশনামী সন্ন্যাসী বলিয়া থাকেন। দ্বারকাধামে, মহীশূরে ও পুরুষােত্তমে এখনও মহাত্মা শঙ্করাচার্যের গদী আছে। যাহারা উক্ত গদীতে আরােহণ করেন তাঁহারা শঙ্করাচাৰ্য্য নামে অভিহিত হইয়া থাকেন। জোশীমঠ এখন একটি ক্ষুদ্র সহর। সহরে প্রবেশ করিতেই সরকারি ডাকবাঙ্গালা। একটি প্রকাণ্ড অট্টালিকা। ক্রমে রাস্তার উপরেই পােষ্ট আফিস, তারঘর। রাস্তার দুই ধারে পাথরের অট্টালিকা। কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া ৬ বদরীনাথের মােহন্ত মহারাজ রাওল সাহেবের প্রকাণ্ড বাসভবন। বৎসরের মধ্যে ছয় মাস তিনি এখানে থাকেন। বাকী ছয় ' মাস ৩ বদরীনাথে থাকেন। শীতের ছয়মাস যখন বদরীনাথের মন্দির বন্ধ থাকে তখন বদরীনাথের পূজা জোশীমঠেই হয়। জোশীমঠ অলকনন্দা ও ধবলী গঙ্গার সঙ্গমস্থল হইতে ১৫০০ ফিট ও সমুদ্র বক্ষ হইতে ৬১০৭ ফিট উচ্চে অবস্থিত। ইহা চারিদিকে উচ্চ পৰ্বত দ্বারা বেষ্টিত। বিশেষতঃ উত্তর দিকের পর্বতমালা অপেক্ষাকৃত উচ্চ। উত্তর দিকের শীতল বাতাস হইতে সহরটিকে যেন রক্ষা করিতেছে। এখানে অনেকগুলি দেবমন্দির আছে। তন্মধ্যে নৃসিংহদেবের মন্দির সর্বপ্রধান। রাস্তা হইতে কয়েকটি সােপান পার হইয়া একটি প্রাঙ্গণে নামিতে হয়। প্রাঙ্গণের একপার্শ্বে পিতলের হস্তীমুখাকৃতি পথে দুইটি জলধারা। সেই জলধারায় স্নান করিতে হয়। ব্রাহ্মণগণ সকল সময়ে উপস্থিত থাকেন এবং স্নানের সময় যাত্রিদিগকে মন্ত্র পড় ইয়া থাকেন। স্নান করিয়া যাত্রিগণ অন্য একটি প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। এ প্রাঙ্গণটি চতুর্দিকে ঘেরা। তাহার একদিকে নৃসিংহদেবের মন্দির। ১০৭ কেদারবরীর পথে। নৃসিংহদেবকে দর্শন করিয়া যাত্রিগণ প্রধান রাস্তার আসিয়া পড়েন। সম্মুখেই পিত্তলনিৰ্মিত গরুড়দেবের মূর্তি। নিকটেই বদরীনাথ, কৃষ্ণ, বলরাম, নবদুর্গা ওগণেশের মূর্তি। মন্দিরগুলি অত্যন্ত পুরাতন। প্রায় সবগুলি ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। নৃসিংহদেব সম্বন্ধে এখানে একটি গল্প প্রচলিত আছে। এখানে পুরাকালে এক রাজা ছিলেন। তিনি নৃসিংহদেবের প্রধান ভক্ত ছিলেন। নৃসিংহদেব রাজার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া অতিথি বেশে একদিন রাজবাটীতে উপস্থিত হন। তখন রাজা বাটীতে ছিলেন না। রাণী তাঁহাকে পরিপাটিরূপে ভােজন করাইলেন। ভােজনান্তে তিনি রাজার শয্যায় শয়ন করিয়া নিদ্রিত হইয়া পড়িলেন। রাজা ফিরিয়া আসিয়া তাহার শয্যায় একজন অপরিচিত পুরুষ শুইয়া আছে দেখিয়া ক্রোধে তাঁহার হস্তে তরবারির আঘাত করিলেন। নিদ্রিতপুরুষের ক্ষত স্থান হইতে রক্তের পরিবর্তে দুগ্ধের ধারা বহির্গত হইতে লাগিল। রাজা ও রাণী বড়ই বিস্মিত হইয়া গেলেন। নৃসিংহদেব রাজার তদবস্থা দেখিয়া স্বরূপ প্রকাশ করিলেন। অতঃপর রাজা মন্দির মধ্যে প্রবেশ করিয়া বিস্ময়ের সহিত দেখিলেন যে, মন্দিরস্থ নৃসিংহদেবের হস্তে কে আঘাত করিয়াছে। প্রবাদ, যতদিন এই কাটা হাত এই মূর্তিতে থাকিবে—ততদিন ৩ বদরী- নাথের, বদরীনাথে পূজা হইবে। কাটা হাত পড়িয়া যাইলে বদরীনাথের রাস্তা বন্ধ হইয়া যাইবে, এবং আদিৰদরী কিম্বা ভবিষ্য- বদরীতে যথারীতি তাহার পূজা হইবে। জোশীমঠে একটি পুরাতন মন্দির আছে তথায় একটী দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। জনবাদ তঁাহার সম্মুখে প্রত্যহ নরবলি হইত। মহাত্মা শঙ্করাচাৰ্য্য দেবীকে স্থানচ্যুত করিয় নরবলি বন্ধ করেন। ১০৮ জোশীম জোশীমঠ হইতে একটি রাস্তা তিব্বতের প্রান্তসীমায় নিতি পৰ্য্যন্ত গিয়াছে—নিতি জোশীমঠ হইতে ৪১ মাইল। এই রাস্তার উপর জোশীমঠ হইতে নয় মাইল দূরে তপোবন নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রাম:আছে। এই গ্রামের নিকট কতক গুলি উষ্ণ-কুণ্ড ও কতকগুলি ভাঙ্গা মন্দির আছে। চাৰি মাইল পরে সুচৈ গ্রাম। তথায় পঞ্চবদরীর মধ্যে অন্যতম ভবিষ্য- বদরীর মন্দির দেখিতে পাওয়া যায়।

৫
বদীনাথ।
জোশীমঠ হইতে বিষ্ণুপ্ৰয়াগ-২ মাইল জোশীমঠ হইতে পাণ্ডুকেশ্বর-৮ মাইল।
বলদুড়া-৩
লামগড়-১১
ঘাট-৬
হনুমান-১৪
জোশীমঠ হইতে বদরীনাথ-১৯ মাইল।
B
মধ্যাহ্ন ভােজন সমাপন করিয়া জোশীমঠ হইতে বাহির হইলাম।
দুই মাইল ভীষণ উতরাইয়ের পর ধবলী বা বিষ্ণুগঙ্গার তীরে উপনীত
হইলাম, নিকটেই অলকনন্দা ও বিষ্ণুগঙ্গার সঙ্গমস্থল। একটি সেতু দিয়া
বিষ্ণুগঙ্গা পার হইতে হয়। সেতুটি ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। তাহার স্থানে
একটি দড়ির পুল। অতি সন্তর্পণে দড়ির পুল পার হইয়া বিষ্ণুপ্ৰয়াগে ।
যাইলাম। * পুল পার হইলেই বিষ্ণুপ্ৰয়াগ। সঙ্গমস্থলে নামিবার জন্য ।
পাহাড় কাটিয়া সিড়ি করা হইয়াছে। উপরে বিষ্ণুমন্দির। নদী-
দ্বয়ের ভীষণ লহরীলীলা দেখিতে দেখিতে অগ্রসর হইতে লাগিলাম।
গিরিরাজ ভীষণ হইতে ভীষণতর হইতে লাগিলেন। গাছপালা যেন
কম হইয়া আসিতে লাগিল। সম্মুখে, পশ্চাতে, পার্শ্বে কেবল পাথর
পাথরের উপর পাথর আকাশে গিয়া মিশিয়াছে। এক মাইল পরে
বলছুড়া। পুনরায় তিন মাইল পরে ভীষণ গিরিসঙ্কটের ভিতর দিয়া
* বিষ্ণুপ্ৰয়াগকে স্নাত্বা বিষ্ণুলােকে মহীয়তে।
যত্র ব্রহ্মাদছো সেবাঃ পরাঃ সিদ্ধিমবায়ু ।
কেদারখও

বদরীনাখা বাইয়া ঘাট চটি পাইলাম। এই তিন মাইল রাস্তা যে কি ভয়াবহ তাহা বর্ণণা করিবার শক্তি আমার নাই। মধ্যে লৌহ সেতু দ্বারা অলকনন্দা পার হইতে হয়। ঘাট চটির কিছু দূরে কাক ভূষণ্ডী যাইবার রাস্তা। একটি পুরাতন ধরণের কাঠের পুল পার হইয়া যাইতে হয়। আমাদিগের কাক ভূষণ্ডী যাওয়া হইল না। আমরা বরাবর চলিয়া সন্ধ্যার সময় । পাণ্ডুকেশ্বরে আসিয়া পৌঁছিলাম। পাণ্ডুকেশ্বর একটি বড় গ্রাম। রাস্তার দুই পার্শ্বে সারিবদ্ধ অনেকগুলি দোকান। গ্রামে অনেক লােকের বাস। পৰ্বত গাত্রে স্তবকে স্তবকে। তাহাদের ঘর বাড়ী রহিয়াছে। সন্ধ্যার সময় সেই সকল বাড়ীতে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলিলে বড়ই মনােরম দেখাইল। পৰ্বতের গায়ে কে যেন দীপমালা সাজাইয়া রাখিয়াছে। আমরা একটি দ্বিতল ঘরে আশ্রয় সইলাম। সম্মুখের দোকানে সবই মিলিল। মসলার পর্যন্ত অভাব হইল না। পাণ্ডুকেশ্বর একটি ব্যবসায়ের কেন্দ্র। তিব্বত ও ভারত প্রান্তের ভুটিয়ারা এখান হইতে প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি লইয়া যায়। শীতকালে ভারতের সীমান্তবাসীরা শীত সহ্য করিতে না পারিয়া নামিয়া আসে, কেহ কেহ শীতের কয় মাস এইখানেই থাকে। আবার কেহ কেহ জোশীমঠ পর্যন্ত নামিয়া যায়। এখানে দুইটি সুন্দর মন্দির আছে। • মনির দুইটি পাশাপাশি অবস্থিত। একটি বিষ্ণুমন্দির—অপরটি যােগবদরীর মন্দির। যােগবদরী, পঞ্চবদরীর মধ্যে একটি। দুইটি মূৰ্ত্তিই ধাতুনির্মিত। ধাতুনিৰ্ম্মিত। যােগবদরী শঙ্করা- চাৰ্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বলিয়া প্রবাদ। বাস্তবিক মন্দির দুইটি অত্যন্ত প্রাচীন মন্দির মধ্যে কতকগুলি তাম্রফলক রক্ষিত আছে। লেখাগুলি ১১১ কদার-বদরীর খে। পড়া যায় না। সরকারি রিপাের্টে প্রকাশ যে, লেখাগুলি কাঠজুড়ি রাজা- দিগের আমলের লেখা। পাণ্ডারা বলেন যে, পাণ্ডবেরা পরীক্ষিতের উপর রাজ্যভার অর্পণ করিয়া এইস্থানে আসিয়া তপস্যা করিয়াছিলেন। কেহ কেহ অলকনন্দার অপর পারে একখানি শিলাখণ্ড দেখাইয়া বলেন যে পাণ্ডুরাজা এইস্থানে তপস্যা করিয়াছিলেন—এবং এইস্থানেই পঞ্চ পাণ্ডবের জন্ম হয়। তাহাদের মতে তাম্রফলকগুলি পাণ্ডু রাজার। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র নাকি ফলকগুলি পড়িবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, তঁাহার মতে এগুলি জমি দানের দলিল মাত্র। জ্যৈষ্ঠ বৃহস্পতিবার। প্রাতে পাণ্ডুকেশ্বর ছাড়িলাম। ক্রমে শেষধারা, লামবগড়, অতিক্রম করিয়া ঘৃতগঙ্গা ও অলকনন্দার সঙ্গম স্থলে আসিয়া পৌছিলাম। সেতুর সাহায্যে ঘৃতগঙ্গা পার হইয়া হনুমান * চটিতে যাইলাম। চটিটি পাণ্ডুকেশ্বর হইতে ছয় মাইল। এখানে হনুমানের একটি মন্দির আছে। পাহাড়ের উপর বৈখানস মুনির আশ্রম ছিল বলিয়া প্রকাশ। নিকটেই মত্ত রাজার যজ্ঞ স্থান। পাণ্ডারা এখনও চতুর্দিকে হােমের ছাই দেখাইয়া থাকেন। দোকানে সুনরাপুরি ও জিলাপি বিক্রীত হইতেছে। ঘৃতগঙ্গাতে চান করিয়া কিঞ্চিৎ জলযােগ করা গেল। জলযােগ করিয়া আবার চলিতে * ততঃ ক্রোশদ্বয়ে দেবি বৈখানস মুনিস্থলম। যজ্ঞভূমিস্ত তত্র তেষাং মুনিবরাত্মনাম। অদ্যাপি তৎপ্রদেশে বৈ বাদৰ্খাস্তথা কিল। জঙ্গারাশ্চাপি দৃশ্যন্তে হােতৃস্থানে মহাত্মনাম। কেদারখও। . ১১২ বদরীনায়। । 'আরম্ভ করিলাম। রাস্তার অবস্থা বড়ই শােচনীয়। পাহাড় কাটিয়া রাস্তা করা হইয়াছে। বেশ পরিস্কার করা হয় নাই। উচু নীচু পাথরের উপর দিয়া যাইতে হইল। স্থানে স্থানে পাহাড়ের চাঙ্গড় ফাটিয়া রহিয়াছে যেন পড়ে পড়ে। স্থানে স্থানে বড় বড় পাথরের চাঙ্গড় ধসিয়া রাস্তার উপর পড়িয়াছে। সেইগুলিকে উল্লম্বন করিয়া যাইতে হইল। আবার ঠিক পার্শ্বে অলকনন্দার স্রোত। বড় বড় পাথরের স্তপে গতি প্রতিহত হইয়া রাগে ফুলিয়া ফুলিয়া ভীষণ তর্জন গর্জন করিতেছেন। এবার তুষার-ক্ষেত্রে আসিয়া পড়লাম। মধ্যে মধ্যে মাইলব্যাপী ভুদার-ক্ষেত্র পার হইতে হইল। পৰ্বত, নদী সমস্তই বরফে ঢাকা, দশ অতীব মহান্ স্থানে স্থানে নদীর চিহ্ন পৰ্যন্ত দেখা যায় না। বােধ হয় যেন একখানি সাদা ধবধবে চাদর, পৰ্ব্বতের এক পা হইতে অপর পাশ পৰ্যন্ত কে বিছাইয়া রাখিয়াছে। কোথায় নদী, কোথায় পাহাড় কিছুরই চিহ্ন নাই। রাস্তায় কতকগুলি ভুটিয়ার সহিত দেখা হইল। তাহারা ঘােড়ার পিঠে মালপত্র চাপাইয়া স্ত্রী-পুত্রসহ স্বদেশ অভিমুখে যাইতেছে। তাহাদের ভাষা দুর্বোধ্য। অনেক কষ্টে বুঝিলাম তাহাদের বাড়ী ভারতের সীমা দেশে। শীতকালে তথায় কেহই থাকিতে পারে না। শীতে আরম্ভেই ঘর বাড়ী ছাড়িয়া নিয়ে চলিয়া আসে। একটু সমতল ক্ষে খুঁজিয়া লইয়া তঁাবু ফেলিয়া বা পাতার ঘর করিয়া শীতের কয় মাস কোন রূপে কাটাইয়া দেয়। তাহারা যে স্থানে থাকে তাহার নিকটেই চাষ- আবাদ করিয়া প্রয়ােজনীয় দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন করিয়া লয়। তাহার!' বন উপর হইতে নামিয় আসে তখন তাহাদের নিজেদের প্রস্তু কতকগুলি কম্বল সঙ্গে আনিয়া থাকে, সেইগুলি বি , য় করিয়া যাহা পায় কেদাবীর পথে। ভাহা হইতেই তাহারা প্রয়ােজনীয় খরচ ও নির্বাহ করিয়া থাকে। পরিধানে কম্বলের মা ও পায়জামা। শরীরের গঠন বলিষ্ঠ, রঙ কিঞ্চিৎ রক্তাত। ছােট ছােট ছেলেগুলি দেখিতে বড়ই সুন্দর। তাহারা তাহাদিগকে ঝুড়িতে বসাইয়া পিঠে করিয়া লইয়া যাইতেছিল। তাহাদের কোন কোন দলে চামরি গরু দেখিতে পাইলাম। গরুগুলি দেখিতে তত সুত্র নহে। সর্ব অঙ্গ ললামে আবৃত। বাঙ্গালা দেশের গৰু অপেক্ষা আকারে বড়। লেজটি চামর। একটি বাৰু ফিরিলে নারায়ণের মন্দির দৃষ্টিপথে পড়ি, সকলে আনলে চীৎকার করিয়া উঠিল, “জয় বদরী বিশাল। কি জয়।” পুটকি - পাটলি ফেলিয়া সকলেই সাষ্টাব্দে প্রণিপাত করিলাম। চতুর্দিকে আকাশভেদী পর্বতমালা, মধ্যে খরস্রোতা অলকনন্দা। দূরে পাহাড়ের গায়ে মন্দির। অতি রমণীয় দৃশ্য। এই স্থানটি একটু সমতল। এই সমতলের উপর দিয়া চলিতে লাগিলামসম্মুখে সরকারি ডাক-বাঙ্গালা । ডাক-বাঙ্গালার পার্শ্বে একজন একখানি খাতা লইয়া বসিয়া আছেন। তাহার কাছে আমাদের নাম ধাম লেখাইতে হইল। ঋষিপ্রয়াগ পার হইয়া বদরীনাথ ধামে পৌছিলাম। বদরীনাথ একটি বড় গ্রাম-দীর্ঘে তিন মাইল, প্রস্থে এক মাইল একটি অধিত্যকার উপর প্রতিষ্ঠিত। ইহার একদিকে নর ও অপরদিকে নারায়ণ পর্বত। একটি রাস্তা গ্রামটিকে ভেদ করিয়া তিব্বত অভিমুখে গিয়াছে। রাস্তার দুই পার্শ্বে সারিবদ্ধ দোকান, নানারূপ, দ্রব্য সমুহে পরিপূর্ণ। চাউল ডাইল আটা, সি প্রভৃতির অনেক গুলি দোকান ত আছেই, তৎব্যতীত অনেক পুলি ৰয়। দোকানও দেখা গেল। এখানে পুরি জিলাপি গান ;;;a{{ছ। , অক্ষি' বড়, সঙ্গে একটি টেলিগ্র আসি বরীনায় আছে। পাহাড়ের উপর দিকে পাণ্ডাদের বাড়ী ও যাত্রীদের বাকির ধৰ্ম্মশালা। মন্দিরটি গ্রামের সর্বোচ্চ স্থানে নির্মিত। রাস্তা হইতে চল্লিশ কিম্বা পঞ্চাশ ফিন্ট উল্ফে, সমুদ্র-বক্ষ হইতে ১০২৮৪ ফিট উচ্চে অবস্থিত। অনুমান অষ্টম শতাব্দীতে শঙ্কাচাৰ্য্য এই মন্দিরটি পন করেন। কিন্তু তাহার স্থাপিত মন্দির এধল নাই, বস্কের স্রোতে নিয়া গিয়াছে। বর্তমান লিটি পাবে, চূণ কি দিয়া থা! দেওগ্নালে বালি চূণ পরান ও উপরে একটি গম্বুজ। মন্দিরটি একটি প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত। পুৱারী একটি প্রশস্ত সােপান-শ্রেণীর উপরে একটি বড় ফটকের ভিতর দিয়া যাইয়া এই প্রাঙ্গণে পড়িতে হয় প্রবেশ করিয়া বাম দিকে গরুড়জির মূর্তি। সম্মুখে মন্দিরের বার। কপাট লৌহের গরাদে দেওয়া। কপাট প্রায়ই বন্ধ থাকে। মলির তিন ভাগে বিভক্ত। উক্ত কাৰ দিয়া প্রথম ভাগে পড়িতে হয়। প্রথম ভাগে কিছুই নাই। পরে একটি দরজা পার হইয়া দ্বিতীয় ভাগে যাইতে হয়। তৃতীয় ভাগে ভগবান ও অন্যান্য দেব দেবীর মূর্তি আছে। তৃতীয় ভাগে পূজারী ব্যতীত কাহাকেও বাইতে দেওয়া হয় না, দ্বিতীয় ভাগ হইতে ভগবানকে দর্শন করিতে হয় মন্দিরে প্রবেশ করিবার দরজাগুলি ব্যতীত আলােক যাইবার অন্য কোন রাস্তা নাই। দীপালােকের সাহায্যে ভগবানের দর্শন লাভ হয়। মন্দিরের অভ্যন্তরে স্থান অত্যন্ত অপ্রচুর, তজ্জন্য এককালে বহু লােককে প্রবেশ করিতে দেওয়া হয় না। তৃতীয় ভাগের সম্মুখে একটি সিন্ধুক। বাত্রীরা তাদের স্ব স্ব ক্ষমতা ও ইচ্ছানুযায়ী প্রণামী একটি পাত্রে লাজাইয়া লইয়া যান এবং এই সিন্ধুকে ঢলিয়া দেন। ইহা মলিক তহবিলে জমা হয়। স্থলির মধ্যে বিশাল বদরী, বদরীনাথ বা বদমীনারায়ণের মূর্তি পদ্মাসনে ১১৫ কেদার বদরীর পথে। সমাধি মগ্ন। কৃষ্ণবর্ণ প্রস্তরে নির্মিত। দক্ষিণ পার্শ্বে নর ও নারায়ণ, বাম পার্শ্বে কুবের ও নারদ। বীনারায়ণ দেবের মস্তকের উপর একটি স্বর্ণ নির্মিত ক্ষুদ্র চন্দ্রাতপ। মস্তকে স্বর্ণের মুকুট, মুকুটে একখণ্ড ভাস্বর হীরক। দেব অঙ্গ মুল্যবান অলঙ্কারে ভূষিত। শােনা গেল, সমস্ত অলঙ্কার, পােষাক-পরিচ্ছদের মূল্য দশ হাজার টাকার কম হইবে না। যে সিংহাসনে মূর্তিটি স্থাপিত তাহারই মূল্য ৪০০০ টাকা হইবে। মনির প্রাণে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম প্রম ভাগের দরজাটি বন্ধ। কাহাকেও প্রবেশ করিতে দেওয়া হইতেছে না। অনেকগুলি যাত্রী বাহিরে অগে করিতেছেন, সকলেই দেবদর্শনে উৎসুক। শুনিলাম মনির মধ্যে বিস্তর যাত্রী প্রবেশ করিছে তাহারা বাহির হইলে নূতন যাত্রীদিগকে প্রবেশ করিতে দেওয়া হইবে না। ক্ষণকাল অপেক্ষা করিতে হইল। গবান আমাকে কোথায় আনিলে ! আমার কি আছে যাহা আপনার চরণে দিব ! আমি অতি দীন দরিদ্র। তবে আমার হিংসা আছে, আমার অহঙ্কার আছে, আমার লােভ অrছ, এগুবি লইয়া সমস্ত জীবনই তে অতিবাহিত করিলাম, সমস্ত জীবন ধসিয়াই তাে এতগুলি ভূতের বোঝা ঘাড়ে করিয়া বহিলাম। প্রভু এলি কি আজ আপনার চরণতলে রাখিস, 'ইতে পারি না? কিন্তু আমার হৃদয়ে তাে সে বল নাই। আজ শুৰ্বজন্মের বহু সুকৃতির ফলে স্বর্গের এই উপণ্ঠে আসিয়াও যে এগুলিকে ত্যাগ করিতে পারিতেছি না! প্রভু আমি নরকের কীট, নরকেই আমার স্থান, স্বর্গরাজ্যে আমার অধিকার নাই, তাই দিয়া কি আপনার করুণা চাহিব না। প্রভূ হৃদয়ে শক্তি দিন, মনে সাহস দিন, আজ যখন আপনার বন্দরনাথ।. চরণ-তলে আসিয়া দাঁড়াইতে পারিয়াছি, তখন যেন ফিরিবার সময়েও ঐ ভূতের বােঝাগুলিকে কাধে করিয়াই না ফিরি। একজন কর্মচারী, যেন কতদিনের পরিচিত, আমাদের নিকট আসিয়া আমাদিগকে নানাবিধ মিষ্ট কথায় আপ্যায়িত করিয়া প্রথম ভাগের মধ্যে লইয়া গেলেন। তথায় অযযাধ্যা ও আগরা প্রদেশের কয়েকটি যাত্রী সুললিত ছলে ভগবানের স্তব কমিতেছিলেন। ক্ষণকাল অপেক্ষার পর আমরা দ্বিতীয়ভাগে প্রবেশ লাভ করিলাম। তখনও তথায় অনেকগুলি যাত্রী রহিয়াছেন। অন্ধকারময় স্থান, অনেকগুলি প্রদীপের আলােকেও ঘাটী সম্পূর্ণ আলােকিত হয় নাই। জয় বদরী বিশালা কি জয়! সম্মুখে বদরী বিশালা। নির্ণমেষ নেত্রে চাহিয়া রহিলাম। মন্দির হইতে বাহির হইলাম, প্রাঙ্গণের এক পার্শ্বে লক্ষ্মী দেবীর মন্দির। প্রাঙ্গণ পার হইয়া উপরি উক্ত ফটকের মধ্য দিয়া সােপান-শ্রেণী অতিক্রম করিয়া রাস্তায় আসিয়া পড়িলাম। রাস্তা হইতে কয়েকটি ধাপ নামিলেই “তপ্তকুণ্ড * কুণ্ডটি ১৬ ফিট লম্বা এবং প্রায় ১৪ ফিট চওড়া। একটি গরম জলের ও* আর একটি ঠাণ্ডা জলের ধারা ইহার মধ্যে পড়িতেছে। ধারাগুলি গােমুখী। গরম জলেয় ধারা না থাকিলে গান করা বড়ই দুরূহ হইত। কুণ্ডের জলে স্নান বড়ই তৃপ্তিকর। ইহার উপরে উপরে তক্তার একটি আচ্ছাদন আছে। প্রবাদ, বিষ্ণুর অনুমতিক্রমে অগ্নিদেব তপ্তকুণ্ডে বাস করিতেছেন। তপ্তকুণ্ডের কিঞ্চিৎ উপরে “কেদার” নামে শিবলিঙ্গ। তপ্তকুণ্ডের নিম্নে নদীগর্ভে প্তোকময়ী ধারা বহ্নিতীর্থ সমুদ্ভবা। বতে তত্র সুগে দেবানামপি দুলর্ড। কেদারখণ্ড।

কোরবানীর পথে। ** আর একটি কুও দেখিতে পাওয়া যায়। তাহার নাম নারদ কু। পাণ্ডারা বলেন ভগবান শঙ্করাচাৰ্য্য এই কুণ্ডে ঢুৰ দিয়া বদরীনারায়ণ বিগ্রহ উদ্ধার করিয়াছিলেন। এই কুণ্ডে স্নান করিলে পুনৰ্বার জন্ম গ্রহণ করিতে হয় না। গারদীয় হ্রদে গা ভুয় গুনপাে ভবেৎ।” ইহার একটু বামদিকে “সূৰ্য্যকুণ্ড”, ইহা একটি উষ্ণ প্রস্রবণ—এখানে কোন কুণ্ড নাই। যাত্রীরা হাতে, করিয়া প্রস্রবণের জল লইয়া সমস্ত অঙ্গে ছিটাইয়া দেন। নিকটেই গৌরীকুণ্ড, নৃসিংহধারা, কুধারা ও প্রাণধার। কিছু উত্তরে কপাল পাহাড়। যাত্রীরা এখানে তাহাদের মৃত আত্মীদিগের উদ্দেশে পিণ্ডদান করিয়া থাকেন। পাণ্ডারা বলেন এখানে পিণ্ডদান করিলে আর কোন স্থানে বা কখনও পিণ্ডদান করিতে হয় না । বদরিকাশমে আসিয়র্থে আম ও পঞ্চশীলা এবং কেদার লিঙ্গের দর্শন ও পূজা করা অবশ্য কর্তব্য। পঞ্চতীর্থের নাম-(১), এষিগঙ্গা, (২) কূর্মধারা, (৩) প্রহলাদ ধারা (৪) তপ্তকুণ্ড ও (৫) নার কুণ্ড। পঞ্চশীলার নাম-~-(১) সামশীলা, (২) বরাহশীলা (৩) নরসিংদী (৪) গরুড় শীলা এবং (৫) মার্কণ্ডেয়শীলা। ইহা ব্যতীত পবিত্র দেবভূমিতে আগমন করিয়া সকলেরই পঞ্চদরীয় পূজা করা উচিত। পঞ্চবদরী যথা—(১) বদরীনাথে বদরীনারায়ণ (২) পাণ্ডুকেরে যােগকারী (৩) জোশীমঠ হইতে তিব্বতের রাস্তায় ভবিষ্ণু- বদরী (৪) অনিমঠে বৃদ্ধ, বদরী ও (৩) হিলঙে ধ্যানরী। এই পণ ..বদরী অধুষিত সমগ্ৰ ভূভাগ বৈষ্ণব-ক্ষেত্র বলিয়া পরিচিত। বদরীনাথ ধামে ৬ বদরীনাথের মন্দিরে তিনপ্রকার প্রণামির প্রচলন আছে। (১) থালিভেট (২) টকাভােগ ও (৩) গজিভেট। • ৯, বরীনাথ। (১) খালিভেট প্রধান প্রণামী! ইহাই ভগবানের উদ্দেশ্যে দেওয়া । যাত্রীরা স্ব স্ব ইচ্ছামত প্রণামী একটি থালায় সাজাইয়া ভগবানের মন্দিরে লইয়া যান। ভগবানকে তাহা দেখাইয়া সম্মুখস্থ সিন্ধুকে লিয়া । (২) আটকা ভােগ-যদি কেহপ্রসাদ পাইতে ইচ্ছা করেন তাহাকে এই প্রণামী দিতে হয়। যিনি যত টাকা দেন তাহার অর্ধেক মূল্যের প্রসাদ পাইয়া থাকেন। প্রাতঃকালে টাকা দিতে হয় বৈকালে এসাদ 'পাওদা যায়। (৩) গদিতেটই বাওল সাহেবের সম্মানার্থ রাওল সাহেবকে দেওয়া হয়। বদমীনারায়ণ দেবের পূজারিকে রাওল সাহেব বলে। বাওল সাহেবের রীতিমত আফিস আছে। তিন চারিজন কর্মচারী আছেন। এই আফিসে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকার প্রণামী জমা দিতে হয়। রীতিমত রসিদ পাওয়া যায়। বদরীনারায়ণ দেবকে এই প্রাতে রান করান হয়। তখন তাহার 'অঙ্গ হইতে সমস্ত অলঙ্কার ও পরিচ্ছদাদি খুলিয়া লওয়া হয়। বাঙল ব্যতীত কেহই দেব অঙ্গ স্পর্শ করিতে পান না। বেশভূষাবিমুক্ত মূর্তি “নির্ধাণমূৰ্ত্তি” বলিয়া খ্যাত। নির্ধাণমুক্তি দর্শন অতীব সৌভাগ্যসাপেক্ষ। বদরীনারায়ণ দেবের দুইবার ভােগ হয়। প্রাতঃকালে বাল্যভােগ ও বৈকালে অন্নভােগ। বাল্যভােগ মিষ্টান্ন ভােগ। অন্নভােগ—অঙ্গ, * ভাল, আলুর বড়া, লাড্ড, পাঁপড় ভাজা, মালপােয়া, আচার ইত্যাদি। ভােগ মন্দিরের মধ্যে সাজাইয়া প্রায় অর্ধঘণ্টাল রাখা হয়। তখন কোন যাত্রীকে মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করিতে দেওয়া হয় না। বার বন্ধ থাকে। জগন্নাথ-ক্ষেত্রের ন্যায় এখানেও জাতিভেদ নাই। ব্রক্ষণে কোরবঙ্গরীর পথে। শদ্রের স্পষ্ট ভােগ লইতে কুণ্ঠিত হন না।* ভােগের থালাগুলি স্বর্ণ ও রোপ্যনিম্মিত। সন্ধ্যার সময় আরত্রিক। সেই সময় নিশামুখে বহুকণ্ঠে উদগীত বানের সুললিত স্তবগান শ্রবণ করিলে হৃদয় ভক্তির উচ্ছাসে আপ্লুত হইয়া যায়, শােক-তাপ-জরা-ব্যাধিময় পৃথিবীর কথা ভুলিয়া শ্রোতৃগণ ক্ষণকালের জন্য যেন শান্ত স্বর্গের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করে। এই পুণ্যভূমি বদরীক্ষেত্রে যিনি একবার ভগবানের স্তবগান শুনিয়াছেন—তিনি তাই জীবনে কখনও ভুলিবেন না—এখনও সে সঙ্গীতধ্বনি যেন কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হইতেছে :- পবনম সুগন্ধশীতল (হমমরি শোভিতম। নিকট গঙ্গা বহতি নিরমল বদরীনাথ বিশ্বম্ভর শেষ সুমিরণ করত নিশিদিন ধ্যান ধরত মহেশ্বর। ঐবে ব্রহ্মা করত স্থতি বদরীনাথ বিশ্বশুরম্ । ইন্দ চন্দ্র কুবের ধুণীকর ধুপদীপ প্রকাশিত। সিদ্ধ মুনিজন করতঃ জয় জয় শ্রীবদরীনাথ বিশ্বম্ভরম্ ? ইত্যাদি। ৫ কেদারনাথ দেবের ন্যায় বীনারায়ণ দেবেরও বৎসরে ছয়মাস মাত্র এখানে পূজা হয়। শীতকালে যখন চতুর্দিক বরফে আচ্ছন্ন হইয়া যায় তখন তাঁহার পূজা বন্ধ থাকে। অলঙ্কারাদি মূল্যবান দ্রব্যগুলি সমস্তই জোশীমঠে লইয়া যাওয়া হয়। পতের ছয়মাস জোশীমঠে তাহার পূজা হয়। প্রবাদ মনির বন্ধ করিবার সময় দুই মণ দ্বতের একটি প্রদীপ জ্বালাইয়া দরজা বন্ধ করা হয়। এই প্রদীপ শতের ছয় মাস অলিয়া * লক্ষ্মী পচতি নৈবেদ্যং ভুংক্তে নারায়ণ স্বয়ম। চাণ্ডালনাপি সংস্পষ্টং ন দোষায় ভবেৎ কচিৎ। কেদার। ২০ বাসরীনাথ। থাকে, ছয় মাসের পর যখন মন্দির প্রথম খােলা হয় তখন ইহার ক্ষীণ শিখা দেখিতে পাওয়া যায়। এই শিখ দর্শন পরম পুণ্যের ফল। বদরীনারায়ণ দেবের পূজার ব্যয়ের জন্য আলমােড়া জেলার ৪৫টি গ্রামের । সমুদায় ও ২৬টি গ্রামের আংশিক রাজস্ব এবং গাড়ােয়া জেলার ১৬৪টি গ্রামের সমুদায়, ও ১১১টি গ্রামের কতক রাজস্ব নির্দিষ্ট আছে। শুনিলাম দেবােত্তর সম্পত্তি ও যাত্রীদত্ত অর্থে, মন্দিরের বার্ষিক আয় নূনাধিক ৪৮০০০ টাকা। বদরীনারায়ণ হইতে অগ্রসর হইলে অলকনন্দা ও সরস্বতীর সঙ্গমস্থলে মানা গ্রাম। এখানে একটি বিষ্ণু-মন্দির আছে। মহাভারতেক্ত মনিভদ্রের বাসস্থান এই স্থানে ছিল বলিয়া প্রকাশ। অলকনন্দা ও সরস্বতীর সঙ্গম কেশব প্রয়াগ নামে অভিহিত। নিকটেই স্কুল পুরোণোক্ত নানসদ্ভেদ তীর্থ। অলকনন্দার বাম তীরে ব্যাপগুহ।এই গুহায় অবস্থান করিয়া মহামুনি ব্যাসদেব মহাভারত রচনা করিয়াছিলেন বলিয়া প্রকাশ। মানা হইতে একটি রাস্তা সত্যপথের দিকে গিয়াছে। এই রাস্তায় “বসুধারা নামে একটি জলপ্রপাত দেখিতে পাওয়া যায়। জল বহু উচ্চ হইতে পড়িতেছে, বায়ু তাড়িত হওয়ায় সময়ে সময়ে বারিকণা সকলের গায়ে লাগে না। তদুপলক্ষে পাণ্ডারা বলেন এখানে পাপপণ্যের পরীক্ষা হয়। ক্রমে অগ্রসর হইলে সত্যপথ। ইহা একটি ত্রিকোণাকার হদ । এক একটী কোণে এক একটী ঘাট, তাহাদের নাম রহ্মঘট, বিষ্ণুঘাট, ও মহেশ্বরঘাট। বিষ্ণুটে ও মহেশ্বরঘাটে দুইটি ক্ষুদ্র নদী আসিয়া দে 'পড়িয়াছে, হ্রদটির পরিধি প্রায় পৌনে এক মাইল এবং চতুর্দিক বরফে । * বসুধাভিদ শীর্থং সর্বপাপনাশনম। পাপিণাং মুরঞ্জি তত্তোয়বিলবো ন পতত্তি ১২১ কেদারকারীর পথে। . আচ্ছন্ন। ইহা কুদরীনাথ হইতে ১৮ মাইল। এখানে যাওয়া বড়ই কষ্টসাধ্য। রাস্তা অত্যন্ত কদর্য্য। থাকিবার স্থান নাই। খাদ্যদ্রব্য কিছুই পাওয়া যায় না। পর্বত গুহাতে থাকিতে হয় ও খাবার জিনিষ সঙ্গে করিয়া লইয়া বাইতে হয়। এখানে যাওয়া আমাদের ভাগ্যে ঘটে নাই। ৯ই জ্যৈষ্ঠ গুক্রবারপ্রাতে যথাবিধি পুকুণ্ডে ও নিকটবর্তী কুণ্ড গুলিতে স্নান বা জলস্পর্শ করিয়া ভগবানের নির্বাণ-মূর্তি দর্শন লালসায় মনিরাভিমুখে চলিলাম। তখনও মন্দিরের বার ভােলা হয় নাই। কিছুক্ষণ • অপেক্ষার পর দ্বার খােলা হইল। “জয় বদরী বিশালা'কি জয়” সমরে সমবেত জনমণ্ডলী আনন্দধ্বনি করিলেন। বেশবিমুক্ত নারায়ণদেৰ সকলের সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। রাওল সাহেব দেব অঙ্গে চন্দন লেপন করিতেছেন। কাহারও চক্ষে বুঝি পলক পড়িতেছে না। প্রাঙ্গণস্থিত দেব-দেবী সকলকে যথারীতি পূজা ও অর্চনাদি করিয়া বাসায় ফিরিলাম। টেলিগ্রাফিক মনিঅর্ডার কয়েকদিন হইল পােষ্ট অফিসে { পড়িয়া রহিয়াছে শুনিয়া পােষ্ট আফিসে যাইয়া টাকা লইলাম। মধ্যাহ্নে অতি পরিপাটিরূপে ভােজন করা গেল। বড়ই শীত-মধ্যে মধ্যে বাতাস বহিতেছে, তাহাতে সৰ্বাঙ্গ ঠাণ্ডা হইয়া আসিতেছে। যদিও কেদারনাথের ন্যায় চতুর্দিক বরফে আচ্ছাদিত নহে তবুও রাস্তায় স্থানে . স্থানে বরফের স্তুপ দেখিতে পাওয়া যায়। কিঞ্চিৎ বিশ্রামের পর সহরটি দেখিতে বাহির হইলাম, সমস্ত দিন ঘুরিয়া বেড়াইলাম। ঘুরিয়া ঘুরিয়া • সাধ মিটে না। সন্ধ্যাগমে ভগবানেআরত্রিক দেখিয়া বাসায় ফিরিলাম।

ফিৰিবার পরে

No text on this page.

কর্ণপ্রয়াগ শালী হইতে কুয়েড়—১• মাইল। চামেলী হইতে ভর-১৫ মাই ; } 7 1 । } } লাহা-১২ নয়াগ- জৈকী--১৫ সোনলা-৯ , কর্ণপ্রয়াগ-১৭। ১ই জ্যৈষ্ঠ। তাড়াতাড়ি শয্যা ত্যাগ করিয়া পূৰ্ব্বকথিত কুণ্ড গুলিতে স্নান বা জলম্পশ করিয়া বদরিনাথ হইতে চলিয়া যাইবার পূর্কে আর একবার ভগবানকে দর্শন করিবার জন্য ছুটিলাম। ভগবানের নিৰ্বাণ মুভি দর্শন করিয়া কৃতার্থ হইলাম। ভগবৎ সমীপে কত প্রাণের কথা, কত অভিযােগ জানাইয়া বাসায় ফিরিলাম। পাণ্ডা ঠাকুরের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া কিঞ্চিৎ জলযােগের পর, নিরানন্দচিত্তে পুরী ছাড়িল । যতদূর দেখা যায় ফিরিয়া ফিরিয়া দেখিতে লাগিলাম। ক্রমে হনুমান চ লামগড় অতিক্রম করিয়া পাণ্ডুকেশ্বরে আসিয়া পৌছিলাম। এখানে মধ্যাহ্নভোেজন সমাপন কবিতা অপরাহ্নে জোশীমঠে উপস্থিত হইলাম। এখানে অদ্য রাত্রি যাপন করা গেল। ১১ই জ্যৈষ্ঠ। টঙ্গন:ত মধ্যাহ্নভােজন, ছিনকাতে মাত্রিযাপন। ১২ই জ্যৈষ্ঠ। প্রাতে ছিনকা ছাড়িয়া লালসাঙ্গা বা'চামৌলি পাইলাম । কেদারনাথ হইতে আসিযা সময় এখানে আমরা হরিদ্বার বদরীনাথ স্নাস্তা ধরিয়াছিলাম। আমরা এই রাস্তা ধৰিয়াই যাইতে লাগিলাম । কুয়েড়, মৈঠান। চটি পার হইয়া চামৌলি হইতে ছয় মাইল দূরবর্তী ছিল। কোরবদীর পথে। নদ প্রয়াগে* আসিয়া উপনীত হইলাম। পৰ্বতবেতি নাপ্রয়াণ পঞ্চপ্রয়াগের মধ্যে অন্যতম। এখানে নন্দাকিনীর সহিত অনলার মিলন হইয়াছে। অনেকে বলেন মহামুনি কম্ব মুনির আশ্রম এইখানে ১৮৯৪ সালে গােহনা বন্যায় এই গ্রামটি একেবারে ভাসিয়া যায়। যেখানে পুরাতন গ্রাম ছিল হা হইতে প্রায় ছয়শত হাত উপরে গ্রাম নির্মিত হইয়াছে। এখানে একটি সুন্দর বাজার ও একটি পােছ অফিস আছে। নন্দপ্রয়াগে গান আহার সমাপন করিয়া বাত্রা করিলাম।'' একটি লৌহনিৰ্ম্মিত সেতু দিয়া মন্দাকিনী পার হইলাম। সেতুটি ১২• ফিট লম্বা। সেতুর নিকট হইতে একটি রাস্তা গােয়ালধাম অভিমুখে গিয়াছে। সােনলা ও গুৰত চটি পার হইয়া ঠিক সন্ধ্যার সময়ে সাহায় চটিতে উপস্থিত হইলাম। চটিটি চামৌলী হইতে বার মাইল, হরিদ্বার হইতে ১২ মাইল। একটি সমতল ক্ষেত্রের উপর অবস্থিত। নিকটবর্তী গ্রামে বেশ চাষ আবাদ হইয়াছে। চটিতে অনেকগুলি বড় বড় ঘর আছে। একটি স্রোতের নিকট একটি পরিষ্কার ধরে আমরা আশয় শইলাম। * কংসারভ্য যাবসগিরির্ভবেৎ। তাবৎক্ষেত্রং পরংপুণ্যং ভুক্তিমুক্তি প্রদায়ক। করে নাম মহাতেজা মহর্ষি লােকবিশ্রুতঃ। তাপদে গত্বা তগৰং রমাপতি। দুরাত্মনােহপি গচ্ছতি পদং দুঃখবিবর্জিত। মশগুগকে গঙ্গি সংপূজ্য চরমাপতিমণ। কিং কিংবায়তে তপ্ত মুক্তি যুক্ত করে দিত। থাঃ কলিযুগে গােয়ে যে নরাঃ বারীং গতা।

কর্ণপ্রয়াগ। : =- । ১৩ই-জ্যৈষ্ঠ প্রাতে যাত্রা করিয়া পাঁচ আইল চলিয়া কর্ণ ও অলকনন্দার সঙ্গমস্থল কর্ণ প্রয়াগে আসিয়া পৌছিলাম। প্রবাদ এই স্থানে। কর্ণ তপস্যা করিয়াছিলেন। তপস্যায় সন্তুষ্ট হইয়া সূৰ্যদেক তাহাকে সুবৰ্ণ মণিমাণিক্য ও ধনরত্নাদি দান করেন। এখানে দাতাকর্ণের একটি মন্দির আছে। ইহা ব্যতীত পাহাড়ের উপর চণ্ডিকাদেবীর একটি মন্দির আছে। এ অঞ্চলে সমতলক্ষেত্র প্রায় দেখিতে পাওয়া যায় না। নিকটেই একটি সমতল-ক্ষেত্র পাইয়া তাহা গােচাঙ্গণের মাঠে পরিণত করা : হইছে। প্রয়াগ হরিদ্বার হইতে ১১৬ মাইল ও সমুদ্র বক্ষঃ হইতে ২৩০০ ফিট উচ্চে অবস্থিত। কর্ণয়াগ একটি বড় গ্রাম। অনেকগুলি দোকান, হাসপাতাল, ডাকঘর ও ঘর আছে। গােহনা বা প্রতাপ এখানেও • পরিলক্ষিত হয়। ১২৫ • মেহেল চোরী। কর্ণপ্রয়াগ হইতে কালিমাটি-২০ মাইল। গােয়র-২১ } কর্ণপ্রয়াণ হইতে পাটলি-২ মাইল। সিনাল-৪ সিৱোলী-৬ ভটোলী-৭ আদিব—১১৮ নারায়ণ-২ । ধূনারঘাট-২৩ ০ আরাম-২৫ U জুন-১৬ দেওয়ালি১৮ হনুমান-২৫ মেহেল চৌরী-২৯ . ২২১ ২১ ফিট লম্বা একটি সেতুর সাহায্যে কর্ণ বা পিণ্ডার নদী পার হইলাম। নদী পার হইয়া দুইটি রাস্তা পাইলাম। প্রধান রাস্তাটি হরিদ্বর অভিমুখে গিয়াছে। অপর একটি শাখারাস্তা রামনগর রেল (ঔশনের দিকে গিয়াছে। বদরীনাথ হইতে কিরিবার সময় যাত্রীরা এই শেষের রাস্তা দিয়া বামনগরে যাইয়া থাকেন। গতানুগতিকের ন্যায় আমরাও রামনগরের রাস্তা ধরিলাম। দুই মাইল দূরে পাটলি ছাড়াইয়া কারও ওই মাইল চলিবার পর সিমলি চটিতে উপনীত হইলাম। এখন বেশ বুঝতে পারিতেছি পর্বত ছাড়িয়া আমরা সমতল ক্ষেত্রের দিকে যাইতেছি। সিলি চটিটি একটি সমতল ক্ষেত্রের উপর অবস্থিত। নিকটবত্তা নদীতে অবগাহন স্নান করিয়া মধ্যাহ্ন-ভােজন সারিয়া লইলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া অপরাহ্ন তিন ঘটিকার সমষ আবার রাস্তা ধরিলাম। কত চড়াই কতক উতরাইয়ের পর সিয়ােলি চটি। দেড় মাইল পরে ১২৮ মেহেল চোরী। টোলী। উটোণী হইতে দুই মাইল পরে একটি নূতন চটি দেখা গেল নিকটেই একটি রাস্তা পৌড়ীর দিকে, অপর একটি রাস্তা লােভর দিকে গিয়াছে। প্রায় চার মাইল অতিক্রম করিলে আদিবদরী আদিবদরী কর্ণপ্রয়াগ হইতে প্রায় বার মাইল এবং লােভ হইতে প্রায় দশ মাইল। লােতার রাস্তা দেওয়ালি খাল নামক গিসিঙ্কট পার হইয়া দেওয়ালি পর্বতমালা পার হইয়া চলিয়া গিয়াছে। এই গিরিসঙ্কটের নিকটে একটি দুর্গের ভগ্নাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার দেড় মাইল নিম্নে ডিমডিমা নামক স্থানে বনবিভাগের একটি বাংলা আছে। রাস্তার পার্শ্বে কতকগুলি পর্বতশৃঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাদের উচ্চতা ৫০০০ হইতে ৮৫০০ ফিট। আদিবদরীর কিঞ্চিৎ উত্তর পূর্বদিকে একটি হ্রদ আছে। আদিবদরীতে ১৬টি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। মন্দিরগুলি ৮৫ ফিট লম্বা ও ৪২ ফিট চওড়া একটি পাথরের চত্বরের উপর নির্মিত। মন্দিরগুলি উচ্চে ৬ ফিট হইতে ২০ ফিট হইবে। তাহাদের মধ্যে অন্নপূর্ণা, লক্ষ্মীনারায়ণ, বদরীনারায়ণ, সত্যনারায়ণ, গরুড়, জানকী, ব্রহ্মা, কেদারেশ্বর, অঞ্জনা ও গৌরীশঙ্কর দেবের মূৰ্ত্তি আছে। এই মন্দিরগুলি নাকি মহাত্মা শঙ্করাচাৰ্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। স্থানীয় ব্রাহ্মণেরা এই সকল দেবদেবীর পূজা করিয়া থাকেন। ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, বুধবার। প্রাতে আদিবদরী ছাড়িলাম। ধীরে ধীরে জঙ্গল, দেওয়ালি, কালিমাটি, গােয়ার ও নারায়ণ অতিক্রম করিলাম। নারায়ণ চটির নিকটেই একটি সুন্দর ইনস্পেক্সন বাংলা। পরে ধূনার ঘাট--একটি বড় চটি, এখানে পােষ্ট আফিস, বাজার ইত্যাদি আছে। মধ্যাহ্নে বিশ্রাম করিয়া ঠিক সন্ধ্যার সময় মেহেলচৌরিতে আসিয়া কেদার-বদরীর পথে। পেীছিলাম। এই চটিটা গাড়ােয়াল ও আলমােরা জেলার সীমান্তে অবস্থিত। চটিটি বড়ই অপরিষ্কার। খাবার দ্রব্য কিছুই পাওয়া যায় না। আগে মনে করিয়াছিলাম যে দুইটি জেলার সন্ধিস্থলে অবস্থিত এই চটিটি নিশ্চয় আকারে বড় হইবে এবং দোকানপত্রের সংখ্যাও বেশী হইবে। এখানে ঝাপান বদল করিতে হয়—সেজন্য আফিস আছে--না জানি কত বড় সহই হইবে। কিন্তু চটিতে পৌছিয়া ইহার শ্রী দেখিয়াই তাে আশ্চৰ্য্য হইয়া গেলাম। দোকান পসারি কিছুই নাই, খানকতক নীচু চালা ঘর। তাহাতেই যাত্রীরা অতি কষ্টে কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত করেন। ঝাঁপানিরা তাহাদের প্রাপ্য সমুদায় বুঝিয়া লইয়া এই স্থানে আমাদের নিকট বিদায় লইল। তাহারা তাহাদের জেলা ছাড়িয়া অন্য জেলায় যাইতে চাহেনা। এখান হইতে রামনগর রেল ষ্টেশন ৭০ মাইল। যাইবার জন্য আমাদের নূতন বন্দোবস্ত করিতে হইবে। এই তেইশ দিন একত্র থাকিয়া ঝাঁপানি- কুলিরা আমাদের এত আপনার লােক হইয়া গিয়াছিল যে এই বিদায় বড়ই কষ্টকর বােধ হইল। তাহারা আমাদিগকে ছাড়িয়া কতক দূর "!'.. : ', করিয়া আসে, যেন আমাদের ছাড়িয়া যাইতে তাহাদের প্রাণে . : কেবল শঙ্কর আমাদের সঙ্গে রহিল—সে আমাদিগকে -:" ; পৰ্য্যন্ত পৌছাইয়া দিবে। 'এখ} এইত রামনগর পর্যন্ত এক এক খানি বাঁপানের ভাড়া ৩০ ১। হিগ ঘােড়ায় চড়িতে পারেন তাহাদের খুব সুবিধা। এখানে পাওয়া যায়—নয় টাকাতেই রামনগর পৌছাইয়া দেয়। আমরা দুইটি #পা নিমু করিলাম। ভায়া ও আমি অশ্বারোহণে যাইব স্থির করিলাম। মালপত্র লইয়া যাইবার জন্য আর একটি ঘােড় লইতে হইল মা আট টাকা দিতে হইবে।

। = ?? রামনগর। মহলচোরী হইতে সিমলক্ষেত-২ মাইল। মেহেশচৌরী হইতে পারো--২৫ মাইল। নারায়ণ ভিখিগাসন-২ রাম-- হাট-২৯ + গনাই বা চৌধুটিয়া ? ফোকাট-৩১ ভাটকোট-৯ চিনােণী-১১ ভগবতী-১২ গণেশ-১৩ ১, একটি ছাে টি-৪২ বাণালী- মামী--১৫ টোটামt৩ (১) একটি ছােট চটি--১৭ বৃদ্ধ কেদার-১৯ ৩ ১১ ২'-~৫৭ সােয়া-২• ১০ চ। • ৬ বাসেড়ী-১১ • গরায়- নওলা----২! চিকুলি- জয়নাল-২; ৪৪ । সৌ~-৫২||• ? t I ৭ ০ । । (১) গদি হইলে ষ্টেম ল পথে দুই মাইল। (২) টোটাম হইতে মোরা জঙ্গপথে দুই ইল। ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, বৃহষ্পবাক । অতি প্রত্যুষে উখি অন্ধকার থাকিতে থাকিতেই রওনা হওয়া গেল ! ভায়া ও আমি অশ্বপৃষ্ঠে। ঘোড়ায় চড়া অনেকদিন অভ্যাস না থাকায় একটু বাধ বাধ ঠেকিতে লাগিল। আবার কেদার-বদরীর পথে। পৌছিলাম। এই চটিটা গাড়ােয়াল ও আলমােরা জেলার সীমান্তে অবস্থিত। চটিটি বড়ই অপরিষ্কার। খাবার দ্রব্য কিছুই পাওয়া যায় না। আগে মনে করিয়াছিলাম যে দুইটি জেলার সন্ধিস্থলে অবস্থিত এই চটিটি নিশ্চয় আকারে বড় হইবে এবং দোকানপত্রের সংখ্যাও বেশী হইবে। এখানে ঝাপান বদল করিতে হয়—সেজন্য আফিস আছে-না জানি কত বড় সহরই হইবে। কিন্তু চটিতে পৌঁছিয়া ইহার শ্রী দেখিয়াই তাে আশ্চর্য হইয়া গেলাম। দোকান পসারি কিছুই নাই, খানকতক নীচু চালা ঘর। তাহাতেই যাত্রীরা অতি কষ্টে কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত করেন। ব্যাপানিরা তাহাদের প্রাপ্য সমুদায় বুঝিয়া লইয়া এই স্থানে আমাদের নিকট বিদায় লইল। তাহারা তাহাদের জেলা ছাড়িয়া অন্য জেলায় যাইতে চাহেনা। এখান হইতে রামনগর রেল ষ্টেশন ৭ মাইল। যাইবার জন্য আমাদের নূতন বন্দোবস্ত করিতে হইবে। এই তেইশ দিন একত্ৰ থাকিয়া ঝাঁপানি- কুলিরা আমাদের এত আপনার লােক হইয়া গিয়াছিল যে এই বিদায় বড়ই কষ্টকর বােধ হইল। তাহারা আমাদিগকে ছাড়িয়া কতক দূর "] :: :: হিয়া আসে, যেন আমাদের ছাড়িয়া যাইতে তাহাদের প্রাণে কেবল শঙ্কর তামাদের সঙ্গে রহিল-সে আমাদিগকে "::::: পর্যন্ত পৌছাইয়া দিবে । এ.- +ইত রামনগর পর্যন্ত এক এক খানি বাঁপানের ভাড়া ৩৫ iণ * } খাত ৰােড়ায় চড়তে পারেন তাহাদের খুব সুবিধা। এখানে " ও "ওয়া যায়—নয় টাকাতেই রামনগর পৌছাইয়া দেয়। আমরা দুইটি ঝাপান নিযুক্ত করিলাম। ভায়া ও আমি অশ্বারােহণে যাইব স্থির কহিলাম। মালপত্র লইয়া যাইবার জন্য আর একটি ঘােড়া চাইতে হইল ৩হাকে আট টাকা দিতে হইবে।

১ ২) 1, = রামনগর। মেহলচোরী হইতে সিমলক্ষেত-২ মাইল। মেহেলচৌরী হইতে ধারে-২৫ মাইল। নারায়ণ ভিখিসন-২ • ঐট-২৯ » গনাই বা চৌধুটিয়া- কাট-৩১ ভাটকোট-৯ চিনােণী-১১ ভগবতী-১২ গণেশ-১৩ , একটি ছোট টি-৪২ বাণালী-১৪ মামী- টোটাম-৫ (১) একটি ছােট চটি-১৭ বৃদ্ধ কেদার—১৯ী • ) সােন্না-২•|• ?? বাসেড়ী-২১৷ গরজিয়া নওল-২১ চিকুমি--৬৪ } । - : ।। 1. : 1 ৫৪ }} }} সে –৫২• . } 7 D 7/ । . } - P . জয়নাল-২। ০ (১) গদি হইতে টে। জঙ্গল পণে দুই মাইল। (২) টোটাম হইত ফুমেরিয়া জঙ্গপথে দুই মাইল। ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, বৃহষ্প বা। অতি প্রত্যুষে উঠিয় অন্ধকার থাকিতে থাকিতেই রওনা হও। গেল । ভায়া ও আমি অশ্বপৃষ্ঠে। ঘোড়ায় চড়া অনেকদিন অভ্যাস না থাকায় একটু বাধ বাধ ঠেকিতে লাগিল। আবার ১৩১ কেদার-বদরীর পথে। প্রথমেই একটি ভীষণ চড়াই। বড়ই ভর হইতে লাগিল। ঘােড়া ও ঘােড়সহর একসঙ্গে গড়াইতে গড়াইতে একবারে গভীর গুলশায়ী হইতে হয়। এক একবার ভাবিতে লাগিলাম, ঘােড়া হইতে নামিয়া পড়ি, পরক্ষণে লজ্জা আসিয়া বাধা দিতে লাগিল। এইরূপ অবস্থায় চড়ারের উচ্চতম স্থানে আসিয়া পৌছিলাম। উতরাইতে তত ভয় হইল না। ধীরে ধীরে নামিতে লাগিলাম, বনের মধ্য দিয়া রাস্তা। বড় বড় গাছ সকল আকাশ মাথায় করিয়া দাড়াইয়া আছে। শাখা প্রশাখা ছড়াইয়া পথিকগণের শ্রান্তি দূর করিতেছে। এইরূপ পথে প্রায় তিন মাইল উতরাইয়ের পর সমতল জমি পাইলাম। আর ভয় নাই। মনে আশার সঞ্চার হইল। সিমলক্ষেত, নারায়ণ, রাম প্রভৃতি চটি পার হইয়া গনাই বা চৌখুটিয়াতে আসিয়া পৌছিলাম। রৌদ্রের তাপ ক্রমশঃ বাড়িতেছে, দশটা এগারটার পর আর চলিতে পারা যায় না। এই চটিটি বেশ বড় একটি প্রশস্ত সমতল ক্ষেত্রের উপর অবস্থিত, সম্মুখেই রামগঙ্গা নদী। নিকটেই ডাক- বাংলা, ডাকঘর, পুলিশফাড়ি ও ডাক্তারখানা। এখান হইতে একটি রাস্তা রাণীক্ষেত অভিমুখে গিয়াছে। পূৰ্ব্বে রাণীক্ষেতের রাস্তা দিয়া যাত্রীরা প্রত্যাবর্তন কবিত। এক্ষণে রামনগর রেলষ্টেশন খােলায় যাত্রীরা গুহার ঘটির রাস্তায় যায়। রাণীক্ষেতের রাস্তা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। রাণীক্ষেতে ছাউনি থাকার ঐ রাস্তায় যাত্রিদের বােধ হয় একটু অসুবিধা হইত। গনাইয়ের পূর্ব দিকে একটি উপত্যকা আছে। এই উপত্যকায় গনাই হইতে তিন অাইল দূরে তড়াগ-তাল নামে একটি হ্রদ আছে। গনাই চটিতে বিশ্রাম করিয়া অপরাহ্লাে রামগঙ্গার পুল পার হইয়াগুজার ব্যাটির রাস্তা পালন। পুল পার হইলে একটি রাস্তা পৌড়ীর দিকে গিয়াছে। পোড়ার পথে গনাই হইতে দুই মাইল দূরে এক্ষণে-একটি নগরের রামনগর। ধ্বংশাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। যাএীপথ ধরিয়া ভটকোট, চিনৌনি প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্ৰ চটি পার হইয়া সন্ধ্যার সময় মাসী নামক স্থানে উপস্থিত হইলাম। গ্রামটিতে অনেকগুলি মুসলমানের বাস। এখানে যাত্রিদিগকে চটি-ঘরের ভাড়া দিতে হয়। যাত্ৰিসংখ্যার উপর ঘরের ভাড়ার তারতম্য নির্ভর করে। সম্মুখেই রামগঙ্গা নদী, কিন্তু নদীর জল কেহই ব্যবহার করে না। শঙ্কর প্রায় অর্ধমাইল দূরস্থিত একটি ইদারা হইতে অল আনিলেন। রামগঙ্গা পার হইয়া পৌড়ী যাইবার একটি রাস্তা আছে। এই চটিতে আমরা রাত্রি যাপন করিলাম। ১৬ইজ্যৈষ্ঠ, শুক্রবার। প্রত্যুষেই যাত্ৰা করিয়া ছােট ছােট অনেক গুলি চটি পার হইয়া ১১মাইল দূরে ভিখিয়াসেন নামক চটিতে মধ্যাহ্নভােজনের অামােজন করা গেল। চটিটি গগাস (চন্দ্রভাগা) ও রামগঙ্গা নদীর সঙ্গম স্থলে অবস্থিত। সঙ্গমস্থলে নকুলেশ্বর দেবের একটি মন্দির আছে। ভিখিষাসেন একটি বড় চটি। এখানে অল্পক্ষণ মাত্ৰ থাকিব ভাবিয়া ভাল বাসার অনুসন্ধানে সময়ক্ষেপ না করিয়া নিম্নতলেই একটি ঘর লইয়া তাহা অধিকার করিয়া বসিলাম কিন্তু নিমতলস্থ ঘর লইয়া বড়ই ঠকিলাম দ্বিতলের মেজেটি তক্তা ও মাটী দিয়া নির্মিত। উপরের ঘরের জল মাটি ভেদ করিয়া নিয়ে পড়িতে লাগিল। উপরিস্থ যাত্রিদিগকে কিছু সতর্ক করিয়া তাড়াতাড়ি কাজ সারিয়া লওয়া গেল। যথাপূৰ্ব্ব তিনটার সময় রওনা . হইলাম। নদী পার হইয়া একটি পাহাড়ে উঠিতে হইল। আমি এখনও অশ্বপৃষ্ঠে। বড় ভয় হইতে লাগিল, কিন্তু অশ্বটি বড়ই শান্ত ও শিক্ষিত। সে নিজ গন্তব্য পথে আপন মনে ধীরে ধীরে পদবিক্ষেপ করিয়া চলিতে লাগিল। আমাকে কিছুই করিতে হইল না। এইরূপ প্রায় তিন মাইল চড়াইয়ের পর শ্রীকোট মিলিল। এখান হইতে রাস্তাটি চওড়া হইতে আরম্ভ কোরবদরীর পথে। হইল। অনেকগুলি গরুর গাড়ী দেখা গেল। যাত্রীরা এই স্থান হইতে গরুর গাড়ীতে রামনগর যাইয়া থাকেন। এক এক খানি গরুর গাড়ীতে চারিজন করিয়া আরােহী থাকে। ভাড়া তিন চারি টাকা। আড়াই মাইল অগ্রসর হইলে ব্যালকোট। এইখানে রাত্রিযাপন করিতে মনস্থ করিলাম। এখানকার ঘরগুলি তত ভাল নয়। ঘরের সংখ্যাও অল্প। যাত্রী অনেকগুলি আসিয়া জুটিলেন, সকলের বুঝি স্থান সঙ্কুলান হয় না। কিন্তু যাত্রিদের মধ্যে সকলের মনের ভাব একরূপ। পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করিতে প্রস্তুত। আশ্রয় পাইতে কাহারও বিশেষ কষ্ট হইল না। অতি অল্প জায়গায় সকলেরই থাকিবার স্থান কুলাইয়া গেল। নানাদেশ হইতে নানা ভাষী যাত্রিদের সহিত অনেক রাত্রি পর্যন্ত নানা বিষয় কথােপকথন করিতে করিতে সময় কাটিয়া গেল। আগরা ও অযােধ্য। প্রদেশবাসী একটি স্যানিটারী ইনস্পেক্টারের সহিত আলাপ হইল। চটিগুলি পরিদর্শন করা তাহার কাৰ্য্য। কতকগুলি করিয়া চটি এক এক জন ইস্পেক্টারের তত্ত্বাবধানে আছে। চটিগুলি যথাসাধ্য পরিষ্কার রাখিতে তাহারা সততই যত্নবান। তাহাদের জন্য দোকানে কেহই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যদ্রব্য বিক্রয় করিতে পারেন না। ঝাড়দার ও মেথরগণ নিজ নিজ কাজে অবহেলা করিবার সুযােগ পায় না। এই চটিটি গরুর গাড়ীর একটি প্রধান আড্ডা। ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, শনিবার। সূৰ্য্য উঠিবার অনেক আগেই আমরা মাত্রা করলাম। পথে একটি সুন্দর হাসপাতাল দেখিতে পাইলাম। এক মাইল অন্তর দুই একটি চটি পার হইয়া রামনগর রাণীক্ষেত রাস্তায় গুজার বাটীতে আসিয়া পৌঁছিলাম। গুজারঘাটি হইতে রামনগর ৩৩ মাইল। ৰাস্তাটি খুব চওড়া, সৈন্য যাতায়াতের জন্য প্রস্তুত ; খুব চওড়া বলিয়া রামনগর। ঘােড়সহরে যাইতে আর কোন ভয় হইতেছে না—স্বচ্ছনে যাইতে লাগিলাম। ঘােট ঘােট চটিগুলি পার হইয়া সাত মাইল দূরে গদীচটিতে উপনীত হইলাম। মধ্যবর্তী চটিগুলিতে বড়ই জলকষ্ট। গদীচটিতে একটি সুন্দর প্রস্রবণ আছে, অনবরত জল পড়িতেছে। এজন্য এখানে যাত্রিসংখ্যা বেশী। আনন্দের সহিত জলধারাতে স্নান করিয়া লইলাম। যদিও জল অত্যন্ত ঠাণ্ডা তথাপি বড়ই প্রীতিকর। এখানে একটি যুক্তপ্রদেশবাসী ভদ্রলােকের সহিত আলাপ হইল। তিনি মাতা ও স্ত্রীর সহিত তীর্থ- পৰ্যটনে বাহির হইয়াছেন। কাণ্ডি করিয়া কেদারবদরী পরিক্রম করিতেছেন, রাস্তায় কাঙিওয়ালা কাঙিটি ফেলিয়া দিয়াছিল। মা মস্তকে এরূপ আঘাত পাইয়াছেন যে তাঁহার মস্তিষ্ক একেবারে বিকৃত হইয়া গিয়াছে। তাহাকে যেখানে বসাইয়া রাখা হয় সেইখানেই বসিয়া থাকেন। প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারেন না। এক স্থান হইতে অন্ত স্থানে যাইতে হইলে হাত ধরিয়া লইয়া যাইতে হয়। আহারান্তে ঘরে বসিয়া রাস্তা দেখিতে লাগিলাম। দলে দলে লােক যাতায়াত করিতেছে, কেহ পদব্রজে, কেহ বড় বড় গােযানে, কেহ বা অশ্বপৃষ্ঠে। নানাবিধ দ্রব্যপরিপূর্ণ বড় বড় গােযান সারি দিয়া যাইতেছে। রাস্তার অপর পার্শ্বে পৰ্বতের প্রাচীর আর নাই। রাস্তার ঠিক নিয়ে খাদ—পরেই তরঙ্গায়িতভারে পাহাড় চলিয়া গিয়াছে। তরঙ্গের পর তরঙ্গ উঠিয়া দূরে গিয়া মিশিয়াছে। অপরাহ্নে তিনটার সময় আবার রওনা হইলাম। রাস্তা প্রশস্ত, অশ্বপৃষ্ঠে যাইতে আর ভয় হয় না। কিছুদূর যাইয়া একটা সরু রাস্তা প্রধান রাস্তা হইতে বাহির হইয়া ক্ৰমশঃ নিম্নদিকে গিয়াছে। সঙ্গীদের কথামত আমরা সেই রাস্তা ধরিলাম, প্রশস্ত শকট-পথ ছাড়িয়া দিলাম। } কেদার-বদরী পথে। দুই মাইল নামিয়া টোটাম নামক স্থানে পুনরায় শকট পথ পাইলাম। শকট-পথ দিয়া আসিলে আমাদের ছয় মাইল ঘর হইত। টোটামে একটি সুন্দর বাংলা আছে। দুই মাইল অবতরণের পর অত্যন্ত তৃষা পাইয়াছিল। নিকটবর্তী একটি স্রোতের জলে তৃষ্ণা দূর করিলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া আবার যাইতে লাগিলাম। সগিদিগকে ছাড়িয়া দিয়া সুন্দর প্রশস্ত পথে অশ্বপৃষ্ঠে প্রকৃতির শােভা দেখিতে দেখিতে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। রাস্তার একদিকে বৃক্ষরাজিশশাভিত পৰ্ব্বতশ্রেণী—অপর দিকে খাদ—খাদের ভিতর হইতে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাদপসমুহ মস্তক উত্তোলন করিয়া তাহার অস্তিত্ব লুকাইয়া রাখিবার চেষ্টা করিতেছে। অশ্বটি মহাননে আপন মনে বেগে যাইতে লাগিল। সেও যেন স্বভাবের নিৰ্য্যে বিমুগ্ধ হইয়া গেল। আরােহী বা ছাড়িয়া দিয়া নিস্তব্ধভাবে বয়া রহিল মাত্র। এক একবার পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখিতে লাগিল-সঙ্গিরা করে। কিন্তু সঙ্গিদের কোন চিহ্ন দেখিতে পাওয়া যাইতেছে না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি মনে করিলাম, কিন্তু অশ্ব থামিতে চাহিতেছে না। দুই মাইল দূরে সৌরাল চটি ছাড়িয়া চলিলাম। পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখিলাম সঙ্গতিগকে দেখিতে পাইলাম না। অশ্ব অবিরাম গতিতে চলিতেছে। বস্তা একই প্রকার, এক পাশে পাহাড়, আর অন্য পাশে খাদ। খাদ বৃক্ষ আচ্ছাদিত থাকায় তত ভয়াবহ নহে। যাইতে যাইতে একটি ইউরােপীয় ভদ্রলােকের সহিত সাক্ষাৎ হইল। পৰম্পর নিকটবর্তী হইবামাত্র গিনি ইয়ুরােপীয় প্রথানুসারে সম্ভাষণ করিলেন। যথারীতি প্রতিসম্ভাষণ করিলাম। তিনি একজন রেলওয়ে সারভেয়ার। রেলপথ এখন রামনগর পৰ্য্যন্ত আসিয়াছে এবং আরও খানিকটা পর্বতের মধ্যে আনিবার চেষ্টা হইতেছে। পৰ্বতের অবস্থা দেখিতে তিনি নিযুক্ত হইয়াছেন। নিকটেই নদীতীরে তঁাহার তাম্বু। তিনি আর অগ্রসর হইলেন না। আমার সহিত ফিরলেন। দুইজনে কথােপকথন করিতে করিতে ঠিক সন্ধ্যার সময় কুমেরিয়া চটিতে আসিয়া পোঁছিলাম। ভদ্রলােকটি আমাকে চটিতে পেছাইয়া দিয়া তাম্বুর দিকে যাইলেন। চটিতে প্রবেশ করিয়া দেখি সঙ্গীরা সকলে সেখানে বসিয়া আছেন। বড়ই আশ্চর্য্য হইলাম—তাহারা কি করিয়া এখানে আমার আগে আসিয়া পৌঁছিলেন। শুনিলাম টোটাম ছাড়িয়া তাহারা একটি জঙ্গল পথ ধরিয়াছিলেন। সেপথে এই স্থানটা টোটাম হইতে দুই মাইল মাত্র। আর আমাকে ছয় মাইল ঘুরিয়া আসিতে হইয়াছে। কুমেরিয়া একটি বড় চটি-খানিকটা সমতল জমির উপর অবস্থিত। সম্মুখেই একটি নদী, স্রোত প্রচণ্ড। শুনিলাম দুই এক দিন আগে হঠাৎ বান আসিয়া আবােহিসহ একটি গরুর গাড়ী ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছে। এই চটিতে অাজ বিশ্রাম করিলাম। এখান হইতে রামনগর তের মাইল মাত্র। ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, রবিবার। অতি প্রত্যুষেই সকলে যাত্রা করিলাম। সম্মুখ দিয়া একটি প্রশস্ত শকট-পথ গিয়াছে। আমরা সে পথ ছাড়িয়া একটি সােজা পথ ধরিলাম। এটিও শকট-পথ, তবে প্রথমটির অপেক্ষা কম চওড়া। আমাদিগকে পূর্বোক্ত নদীটি পায় হইতে হইল। নদীর পুলটি ভাঙ্গা, খানকয়েক কাঠ ফেলা আছে মাত্র“তাহার উপর দিয়া অতি সন্তর্পণে পদব্রজে পার হইলাম। এখানে অনেক যাত্রীর সহিত দেখা হইল। যতই অগ্রসর হইতে লাগিলাম ততই সমতল ক্ষেত্রে আসিয়া পড়িতে লাগিলাম। ক্রমাগত নদীর ধার দিয়া যাইতে লাগিলাম। নদীর গর্ভ রাস্তা হইতে অধিক নিয়ে নহে। এক স্থানে নদীগর্ভে শুন্তেই !

কেদারবরীর পথে। ব্যায় একটি খাড়া পাহাড় দেখিতে পাওয়া গেল। তাহার মাথার উপরে একখানি ঘর। এই ঘরখানি ব্যতীত আর একটুও জমি নাই। নদীটি আঁকিয়া বাঁকিয়া চলিতেছে। অবশেষে আমাদের ঠিক সম্মুখে আসিয়া পড়িল। এখানে একটি পুল ছিল, এখন নাই, তাহার নিদর্শন আছে মাত্র। একটি অল্প গভীর স্থান দেখিয়া পদব্রজে নদী পার হইলাম। ক্রমে চকখুলা, গরজিয়া অতিক্রম করিয়া ঢিকুলীতে আসিয়া পৌছিলাম। ঢিকুলী রামনগর রেলওয়ে ষ্টেশন হইতে ছয় মাইল মাত্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে উচ্চে ১৩৮ ফিট। বােধ হয় পূর্বে ইহা একটি সমৃদ্ধিশালী নগর ছিল। মাটির কয়েক ফিট নিমেই পুরাতন অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ পাওয়া গিয়াছে। এক্ষণে ইহা একটি সুন্দর গ্রাম—বেশ চাষ আবাদ হইতেছে। পাহাড় আমাদিগকে ছাড়িয়া যাইতেছে। রাস্তার দুই পার্শ্বে সমতল ক্ষেত্র পাহাড় হইতে ঢলিয়া পড়িতেছে। স্থানে স্থানে রাস্তার পার্শ্বে সারিবদ্ধ বৃক্ষশ্রেণী পথিকগণের শ্রান্তি দূর করিতেছে। ক্রমেই সূৰ্য্যের উত্তাপ অধিক হইতে অধিকতর হইয়া পড়িতেছে, ক্রমে ক্রমে অসহ্য হইয়া উঠিতেছে। অধিকক্ষণ কষ্ট করিতে হইল না। প্রায় ১১টার সময় রামনগরে আসিয়া পৌছিলাম। সম্মুখেই একটি ময়দান। ভায়া আমাদিগকে পশ্চাতে ফেলিয়া চলিয়া আসিয়াছিলেন, একটি সুন্দর পান্থনিবাস খুঁজিয়া বাহির করিয়া নিকটবর্তী অশ্বথ বৃক্ষের তলায় বিশ্রাম করিতেছেন। অশ্বটিও ছুটি পাইয়া স্বচ্ছন্দচিত্তে বেড়াইয়া বেড়াইতেছে। ভায়ার কথা ভাবিতে ভাবিতে আসিতেছিলাম, তাহাকে দেখিয়া আশ্বস্ত হইলাম। অশ্বথ বৃক্ষের ছায়ায় বসিয়া পড়িলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর নদীতে স্নান করিবার জন্য বাহির হইলাম। ভীষণ রৌদ্র, শরীর ঝলসাইয়া দিতেছে। মাটিতে পা দিতে পারা যাইতেছে না। রৌদ্রের তাপে দগ্ধ হইয়া নদীর নিকট উপনীত হইলাম। নদীতে হাঁটু । ১৩ রামনগর। কােতে বসিয়া পড়িলাম। সর্বশরীর স্নিগ্ধ হইল উঠিয়া আসিতে যেন ইচ্ছা হইল না। পুনরায় ভীষণ রৌদ্রে পুড়িতে পুড়িতে বাসায় ফিরিলাম। ষ্টেশন হইতে সংবাদ পাইলাম যে, রাত্রি দেড়টার সময় ট্রেণ পাওয়া যাইবে। সুতরাং তাড়াতাড়ি করিবার কোন প্রয়ােজন থাকায় মধ্যাহ্নভােজন করিয়া বিশ্রাম করা গেল। সন্ধ্যার কিছু পরেই বাসা ছাড়িয়া ষ্টেশনে ওয়েটিংরুম দখল করিলাম। অনেক যাত্রী আসিয়া পৌছিলেন—ষ্টেশনটি যাত্রীতে পূর্ণ হইয়া গেল। দলে দলে স্বেচ্ছাসেবকগণ আসিয়া যাত্রিগণের সেবায় নিযুক্ত হইলেন। যাহার যাহা অভাব সেচ্ছাসেবকগণ সাধ্যমত পূরণ করিতে লাগিলেন। যথাসময়ে টিকিট ক্রয় করিয়া গাড়ীতে উঠলাম। রাত্রি আড়াইটার সময় কাশীপুর ষ্টেশনে আসিয়া পৌছিলাম, আমরা মুরাদাবাদ হইয়া যাইবার মনস্থ করিয়াছি-অতএব এখানে গাড়ী হইতে অবতরণ করিলাম। ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, সােমবার। প্রাতে সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কাশীপুরে অপেক্ষা করিতে হইল। সাড়ে ছয়টার সময় গাড়ীতে উঠিয়া অনুমান বেলা নয়টার সময় মুরাদাবাদ পৌছিলাম। ষ্টেশনের নিকটেই একটি সুন্দর ধর্মশালা আছে। সমস্ত দিন ধৰ্ম্মশালায় থাকিয়া সন্ধ্যার সময় ষ্টেশনে ওয়েটিং রুমে আশ্রয় গ্রহণ করিলাম। রাত্রি নয়টার সময় ধর্মশালার দরজা বন্ধ হয়। রাত্রি সাড়ে তিনটার সময় মেল ট্রেণ ধরিলাম। ২০শে জ্যৈষ্ঠ, মঙ্গলবার। ট্রেণ ছুটিতেছে, সে অলকনন্দা নাই। হিমালয়ের সে অভ্রভেদী প্রাচীর নাই। দুই পার্শ্বে অনন্তবিস্তৃত প্রান্তর ধু ধু করিতেছে। মধ্যে মধ্যে উত্তপ্ত বায়ুপ্রবাহ আসিয়া সৰ্বাঙ্গ ঝলসাইয়া দিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে ধুলিরাশি আসিয়া সৰ্ব্বশরীর আবৃত করিয়া ফেলি- তেছে। ধুলিতে সমস্ত গাড়িটি ধূলিময় হইয়া গেল। এইরূপ ধূলায় কেদারবরীর পথে। আয় একটি খাড়া পাহাড় দেখিতে পাওয়া গেল। তাহার মাথার উপরে একখানি ঘর। এই ঘরখানি ব্যতীত আর একটুও জমি নাই। নদীটি আঁকিয়া বাকিয়া চলিতেছে। অবশেষে আমাদের ঠিক সম্মুখে আসিয়া পড়িল। এখানে একটি পুল ছিল, এখন নাই, তাহার নিদর্শন আছে মাত্র। একটি অল্প গভীর স্থান দেখিয়া পদব্রজে নদী পার হইলাম। ক্রমে চকলা, গরজিয়া অতিক্রম করিয়া ঢিকুলীতে আসিয়া পৌছিলাম। ঢিকুলী রামনগর রেলওয়ে ষ্টেশন হইতে ছয় মাইল মাত্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে উচ্চে ১৩৮ ফিট। বােধ হয় পূর্বে ইহা একটি সমৃদ্ধিশালী নগর ছিল। মাটির কয়েক ফিট নিম্নেই পুরাতন অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ পাওয়া গিয়াছে। এক্ষণে ইহা একটি সুন্দর গ্রাম—বেশ চাষ আবাদ হইতেছে। পাহাড় আমাদিগকে ছাড়িয়া যাইতেছে। রাস্তার দুই পার্শ্বে সমতল ক্ষেত্র পাহাড় হইতে ঢলিয়া পড়িতেছে। স্থানে স্থানে রাস্তার পার্শ্বে সারিবদ্ধ বৃক্ষশ্রেণী পথিকগণের শ্রান্তি দূর করিতেছে। ক্রমেই সূর্যের উত্তাপ অধিক হইতে অধিকতর হইয়া পড়িতেছে, ক্রমে ক্রমে অসহ্য হইয়া উঠিতেছে। অধিকক্ষণ কষ্ট করিতে হইল না। প্রায় ১১টার সময় রামনগরে আসিয়া পৌঁছিলাম। সম্মুখেই একটি ময়দান। ভায়া আমাদিগকে পশ্চাতে ফেলিয়া চলিয়া আসিয়াছিলেন, একটি সুন্দর পান্থনিবাস খুঁজিয়া বাহির করিয়া নিকটবর্তী অশ্বথ বৃক্ষের তলায় বিশ্রাম করিতেছেন। অশ্বটিও ছুটি পাইয়া স্বচ্ছন্দচিত্তে বেড়াইয়া বেড়াইতেছে। ভায়ার কথা ভাবিতে ভাবিতে আসিতেছিলাম, তাহাকে দেখিয়া আশ্বস্ত হইলাম। অশ্বথ বৃক্ষের ছায়ায় বসিয়া পড়িলাম । কিছুক্ষণ বিশ্রমের পর নদীতে স্নান করিবার জন্য বাহির হইলাম। ভীষণ রৌদ্র, শরীর ঝলসাইয়া দিতেছে। মাটিতে পা দিতে পারা যাইতেছে না। রৌদ্রের তাপে দগ্ধ হইয়া নদীর নিকট উপনীত হইলাম। নদীতে হাঁটু ১৩ রামনগর। স্রোতে বসিয়া পড়িলাম। সর্বশরীর স্নিগ্ধ হইল। উঠিয়া আসিতে যেন ইচ্ছা হইল না। পুনরায় ভীষণ রৌদ্রে পুড়িতে পুড়িতে বাসায় ফিরিলাম। ষ্টেশন হইতে সংবাদ পাইলাম যে, রাত্রি দেড়টার সময় ট্রেণ পাওয়া যাইবে। সুতরাং তাড়াতাড়ি করিবার কোন প্রয়ােজন থাকায় মধ্যাহ্নভােজন করিয়া বিশ্রাম করা গেল। সন্ধ্যার কিছু পরেই বাসা ছাড়িয়া ষ্টেশনে ওয়েটিংরুম দখল করিলাম। অনেক যাত্রী আসিয়া পৌছিলেন—ষ্টেশনটি যাত্রীতে পূর্ণ হইয়া গেল। দলে দলে স্বেচ্ছাসেবকগণ আসিয়া যাত্রিগণের সেবায় নিযুক্ত হইলেন। যাহার যাহা অভাব সেচ্ছাসেবকগণ সাধ্যমত পূরণ করিতে লাগিলেন। যথাসময়ে টিকিট ক্রয় করিয়া গাড়ীতে উঠিলাম। রাত্রি আড়াইটার সময় কাশীপুর ষ্টেশনে আসিয়া পৌঁছিলাম, আমরা মুরাদাবাদ হইয়া যাইবার মনস্থ করিয়াছি--অতএব এখানে গাড়ী হইতে অবতরণ করিলাম। ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, সােমবার। প্রাতে সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কাশীপুরে অপেক্ষা করিতে হইল। সাড়ে ছয়টার সময় গাড়ীতে উঠিয়া অনুমান বেলা নয়টার সময় মুরাদাবাদ পৌঁছিলাম। ষ্টেশনের নিকটেই একটি সুন্দর ধর্মশালা আছে। সমস্ত দিন ধৰ্মশালায় থাকিয়া সন্ধ্যার সময় ষ্টেশনে ওয়েটিং রুমে আশ্রয় গ্রহণ করিলাম। রাত্রি নয়টার সময় ধর্মশালার দরজা বন্ধ হয়। রাত্রি সাড়ে তিনটার সময় মেল ট্রেণ ধরিলাম ২•শে জ্যৈষ্ঠ, মঙ্গলবার। ট্রেণ ছুটিতেছে, সে অলকনন্দা নাই। হিমালয়ের সে অভ্রভেদী প্রাচীর নাই। দুই পার্শ্বে অনন্তবিস্তৃত প্রান্তর ধু ধু করিতেছে। মধ্যে মধ্যে উত্তপ্ত বায়ুপ্রবাহ আসিয়া সৰ্বাঙ্গ ঝলসাইয়া দিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে ধূলিরাশি আসিয়া সৰ্বশরীর আবৃত করিয়া ফেলি- তেছে। ধূলিতে সমস্ত গাড়িটি ধূলিময় হইয়া গেল। এইরূপ ধূলায় কেদার-বীর পথে। ধূসরিত হইয়া অনুমান চাবিটার সময় বারাণসীধামে আসিয়া পৌছিলাম। ২৯শে জ্যৈষ্ঠ কাশী হইতে যাত্রা করিয়া ২৩শে জ্যৈষ্ঠ লাহেরিয়া সরাই পৌছিলাম। রণেশ তখন লাহেরিয়া সরায়ে থাকিত। ভায়ার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া ২৪শে জ্যৈষ্ঠ প্রাতে ট্রেণ ধরিলাম । ২৫শে জ্যৈষ্ঠ প্রাতে হাওড়ায় পেীছিলাম। ভগবানের আশীর্বাদে শরীর এখন বেশ সুস্থ এবং সবল। যাত্রা করিবার সময় যাঁহারা নিষেধ করিয়াছিলেন তাহারা শরীরের অবস্থা দেখিয়া বিস্মিত হইয়া গেলেন। সম্পূর্ণ।

সত্ৰিশিষ্ট

No text on this page.

যমুনােত্তরী। হরিদ্বার হইতে রেলপথে দেরাদুন। দেরাদুনে ঘােড় বা দণ্ডি পাওয়া যায়। দেরাদুন ছাড়িয়া প্রথমে রাজপুর পরে মসুরি। ১৫মাইল রাস্তা। বাজপুর হইতে মসুরি (৮মাইল) অত্যন্ত চড়াই। মসুরির নিকটেই লণ্ডার। এখানে একটি পরিস্কার হিন্দু হােটেল ও একটি ধর্মশালা আছে। লণ্ডোর হইতে ঝালকী ৬মাইল। এখানে বড়ই জলকষ্ট। ঝালকী হইতে ধনােল্টি ৯ মাইল। রাজপুর হইতে ধানােণ্টি পৰ্য্যন্ত একটি সােজা রাস্তা নূতন তৈয়ার হইয়াছে ১৮মাইল মাত্র। ঝালকী হইতে ৩ মাইলদূরে একটি রাস্তা টিহিরির দিকে গিয়াছে। ধনােল্টীতে কালী কম্বলীওয়ালার একটি ধৰ্ম্মশালা আছে। ধনােন্টী হইতে কানাতাল ৮ মাইল। মধ্যে সুরকণ্ডা দেবীর মন্দির। কানাতালে কালী কম্বলীওয়ালার আর একটি ধৰ্ম্মশালা আছে। কানাভাল হইতে বলডিয়ান ৯ মাইল। টিহিরির রাস্তা এখানে আসিয়া মিশিয়াছে। ৫ মাইল পরে ছাম। এখানে মহারাজা দেবশমসের জঙ্গ বাহাদুরের একটি সুন্দর ধর্মশালা আছে। ৩ মাইল পরে ধৌলা। ধৌলাে হইতে ৫ মাইল দূরে নৌগাউ। পরে ধরা, এখানে বাবা কালী কম্বলিওয়ালার একটি ধৰ্ম্মশালা আছে। এখান হইতে একটি রাস্তা গঙ্গোত্তরীর দিকে গিয়াছে। যমুনােত্তরীর দিকে যাইতে হইলে প্রথমে রাডীখাল পরে ১৫ মাইল চড়াই উঠিয়া কিছু উতরাই করিয়া যমুনাতীরে গঙ্গনানী। ধৱাসু হইতে ২৪ মাইল। রাস্তাটি ভীষণ জঙ্গলের মধ্য দিয়া, অর্ধপথে একটি ধর্মশালা। গঙ্গনানী হইতে ১৬ মাইল দূরে হনুমানগাড়। মধ্যে ৪, ৯ ও ১৫ মাইলে অবস্থিত গ্রামে যাত্রীরা অবস্থান করে। তন্মধ্যে বজারী গ্রামটি সর্বাপেক্ষা বড়। গঙ্গনানী হইতে ২০ মাইল দূরে খরসালী। এখানে যমুননারীর পাণ্ডারা বাস করেন। ৪ মাইল পরে যমুনােত্তরী। ১৪৩ পরে উত্তর- গঙ্গোত্তরী। ধরা হইতে ডুণ্ডা ৮ মাইল। রাস্তা জঙ্গল মধ্যে। ইতে উত্তরকাশী ৮ মাইল। এখানে টিহিরি রাজার একজন ডেপুটি কালেক্টার থাকেন। এখান হইতে দুইমাইল দূরে বিনসীগাড় পরে ছয় মাইল দূরে নিতালা। এখানে একটি দোকান আছে। কাশী হইতে ৯ মাইল দূরে মনেরি। এখানে টিকিরি রাজার একটি ও কালীকম্বলীওয়ালার দুইটি ধৰ্ম্মশালা আছে। মনেরি হইতে ভাটোয়ারি ৯ মাইল। মধ্যে মনু। এখান হইতে একটি রাস্তা খ্রিযুগী নারায়ণের দিকে গিয়াছে। ভাটোয়ারিতে ( ভটবাড়ী) একটি শিবমন্দির ও কালীকম্বলী- ওয়ালার ধৰ্ম্মশালা আছে। ধৰ্ম্মশালার নিকটেই গঙ্গার ঘাট। ভাটোয়ারি হইতে ৪ মাইল দূরে বুখী, ৯ মাইল দূরে গঙ্গনানী। নিকটেই পরাশর দেবের আশ্রম। একটি তপ্তকুণ্ড। এখানে পীলীভীত নিবাসী রাজা ললিতা প্রসাদ ও হরপ্রসাদের দুইটি ধম্মশালা আছে। একমইল পরে বলেীগাড় ৪ মাইল পরে লুহারীবাগ। হারীবাগ ৫ইতে ৮ মাইল দূরে সুখী। ১ মাইল চড়াইয়ের পর ঝালা। ৫ মাইল পর হশিলা। কানন ভূমি দশ্য অতীব মনােম। নিকটেই একটি মন্দির ও ধৰ্ম্মশাল!। শীলা হইতে ৪ মাইল পরে ধরালী ও ৮ মাইল পরে জাঙ্গলা। এখান হইতে ৮ মাইল দূরে গঙ্গোত্তরী, মধ্যে ভৈরব ও গৌরীকুণ্ড। গােমুখী গঙ্গোতী হইতে ১৮ মাইল। এইস্থানে যাইবার রাস্তা অতি বিপজ্জনক। মহাপুরুষ ব্যতীত এখানে অনেক সাধারণ যাত্রীরা যাইতে সাহস করে না। ধরা কইতে গঙ্গোত্তরী প্রায় ৭৬মাইল। দেরাদুন হইতে যমুনােত্তরী, প্রায় ১০৯ মাইল। ১৪৪ ভটবাড়ী (ভাটোয়ারি) হইতে ত্রিযুগীনারায়ণ। ভাটোয়ারি ভাস্করগঙ্গা ও গঙ্গার সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। একটি সমৃদ্ধি শালী গ্রাম। এখান হইতে ৯মাইল দূরে চোরনা। মধ্যে ৬মাইল পরে একটি ক্ষুদ্ৰ চটি। চোরণা হইতে ৩মাইল পরে বেলক। বেলক হইতে ৫মাইল পরে পাঙ্গরানা। এখান হইতে মাইল পরে খালাচটি–পরে ৬মাইল অতিক্রম করিলে বুড়াকেদায়। এখানে বালগঙ্গা ও ধৰ্ম্মগঙ্গা নামী ৬ইটি নদী আসিয়া মিশিয়াছে। এখানে প্রশ্ৰীড়াকেদারনাথ দেবের একটি মন্দির আছে। এখান হইতে ৩মাইল পরে বেতী ও ৫মাইল পরে হকুঁড়। হতকুঁড়ে ভেবনাথ দেবের একটি মন্দির দেখিতে পাওয়া ৰা ! এখান হইতে মাইল পরে ভৌত, ৮মাইল পরে পনেথী ও মাইল পরে ধুত্ত। এই গ্রামে রঘুনাথদেবের একটি মন্দির আছে। ধুও, হইতে ১মাইল পরে বিলী। মধ্যে ১মাইল, ৪মাইল ও ৭মাইল পরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চটি আছে। পলী হইতে মধু মাইল। মধু হইতে ত্রিযুঞ্জনারায়ণ মাইল। প্রায় সকল চটিগুলিতেই থাকিবার জন্য দোকান ও কালীকম্বলিওয়ালার ধর্মশালা আছে। ভটবাড়ী হইতে ত্ৰিযুগীনারায়ণ ৮ নাইল। টিহরি হইতে শ্রীনগর। টিহরি হইতে পৌ ১১ মাইল। পৌ হইতে ডাঙ্গচোরা ১৪ মাইল। ভাঙ্গচোর হইতে নগর ৮ মাইল। অর্ধপথে কীৰ্ত্তিনগর। এখানে উরি রাজের এজন ডেপুটি কলেঙ্কার থাকেন।

কালীকম্বলিওয়ালা কয়েক বৎসর পূর্বে পুণ্যক্ষেত্র হৃষিকেশধামে বিশুদ্ধানন্দস্বামী অবস্থান করিতেন। তিনি সদাসর্বদা একখানি কাল কম্বল মুড়ি দিয়া থাকিতেন বলিয়া তাঁহাকে লােকে কালীকম্বলিওয়ালা বলিত। এখনও তিনি সকলের নিকট এই নামে পরিচিত। তাঁহাকে সকল সময়ই সাধু সন্ন্যাসী দ্বারা পরিবৃত দেখা যাইত। কলিকাতা বড়বাজারের বণিকবর স্বনাম ধন্য সুরমল মহােদয় একদিন তাহার দর্শন লালসায় তাহার কুটিরে উপস্থিত হন, তখন তিনি সাধন ভজনে রত। তাঁহার সাক্ষাৎ লাভ পাইয়া তিনি আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান করিলেন। এবং তাহার কোন কিছু কাজে আসিতে পারেন কি না জিজ্ঞাসা করিলেন। সাধুজী সন্তুষ্ট হইয়া প্রকাশ করিলেন যে যদি সম্মত হন তাহা হইলে তিনি অনেক কাজ, করিতে পারেন। বুঝি বা ভগবং আদিষ্ট হইয়া তিনি তাহার কাছে আসিয়াছেন। বণিকপ্রবর অকপট হৃদয়ে, সাধুজি যাহা অনুমতি করিবেন তাহা সাধ্যমত পালন করিতে স্বীকৃত হইলেন। সাধুজী তাহাকে সঙ্গে লইয়া সমগ্র উত্তরাখণ্ড পরিভ্রমণ করেন এবং যাত্রিদের সুবিধা অসুবিধা সমস্ত সম্যকরূপে দেখাইয়া দেন। এবং তাহার দ্বারা যাত্রিদের অসুবিধা নিরাকরণ হইবে তাহাও জানাইলেন এবং যে যে স্থানে যে রকম ব্যবস্থা করা উচিত তাহার পত্তন করিয়া আসেন। সাধুজীর প্রবর্তনায় বণিক- খবর সুরমল কেদার, বদরী, গঙ্গোত্তরী ও যমুনােত্তরীর পথে প্রায় সম- তে যাত্রিদের সুবিধার জন্য বাসােপযােগী ধৰ্ম্মশালা নির্মাণ করিয়া ১৪৬,

কালীকম্বলিওয়ালা।
ধৰ্ম্মশালাগুলি কলিওয়ালার ধর্মশালা বলিয়া অভিহিত।
কোন কোন চটিতে সাধু সন্ন্যাসীরা সিধাও পাইয়া থাকেন। ইহারই ব্যয়ে
লছমনপােলা সেতু নিশ্মিত হইয়াছে। ইহা দ্বারা যাত্রিদের যে কত সুবিধা
হইয়াছে তাহা বর্ণনাতীত। লছমঝােলা সুরষমলের মাতৃভক্তির নিদর্শন।
মাতৃ আজ্ঞায় তিনি এই সেতু নির্মাণ করেন।
১৭

No text on this page.

Kedar-badarir Pathe

Author
Das,bireshchandra
Title
Kedar-badarir Pathe
File name
Kedar-badarir Pathe
Text
OCR done
Citation
1921
Published
2010/03/27
Publisher
M.c.sarkar
Language
Sanskrit
Pages
169
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Geography
Keywords
Ramnagar
DLI number
511161
Barcode
4990010018333.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
tBjQeqCaiYg
Download PDF

Kedar-badarir Pathe