Bally Sadharan Granthagar
Russiar Durgesnandini
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
( পুস্কি )
অনুবাদক
শ্ৰক্ষিতীশচন্দ্র বাগচী, এম, এ
মডার্ণ বুক এজেন্সি
পুস্তকবিক্রেতা ও প্রকাশক
১০নং কলেজ স্কেবি, কলিকাতা
প্রকাশক- এ উথন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য ১নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা। মূল্য দেড় টাকা শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস প্রিন্টার-প্রভাতচন্দ্র রায় ।১।১ মির্জাপুর স্ট্রীট, কলিকা
উৎসর্গ
' মাতৃদেবী
স্মরণে
পরিচয়
এণ্ডি পেট্রোভিচ গ্রীন—সিনবিস্কের জমিদার
আডডাটিয়া ভাসিলেভ না—তাঁর স্ত্রী
পিটর এণ্ডিচ, গ্রীনফ-তাদের ছেলে
সাভেলিচ—তাদের বিশ্বস্ত চাকর
ইভান কুমিচ মিরনফবেলগৰঙ্কির দুর্গনায়ক
ভাসিলিসা ইগরফনা—তার স্ত্রী
মেরিয়া ইভানভ (মাসা)-তঁাদের মেয়ে
ইভান ইগ্নেটিচ—দুৰ্গনায়কের লেকটনান্ট,
পালাে-মিরনফের বিশ্বাসী পরিচারিকা
জেসিম-বেলগস্কির পাদ্রী
আকুলিনা পাভিনা-পাত্রীবী
সাব্রিন-বেলগরস্কি দুর্গে নির্বাসিত এনজাইন
ইভান জুরিন—রুশ ফৌজের কর্ণেল
এমিলিয়ান পুগাচফ-বিদ্রোহী কােক নেতা
মাসিমিচ-পলাতক কশাক সার্জেন্ট
নিবেদন . । রাশিয়ার শ্রেষ্ঠ কবি পুস্কিনের জন্ম ১৭৯৯ খৃষ্টাব্দে। ১৮৩ খৃঃ অব্দে এ৩৮ বৎসর বয়সে তিনি দ্বন্দ্ব যুদ্ধে মারা যান। পুস্কিনের মা নাদে সম্রাট প্রথম পিটরের একজন প্রসিদ্ধ নিগ্রো কর্মচারীর সুন্দরী পিতা সম্রান্ত রুশ জমিদার-অলস, উচ্ছ ঙ্খল, অথচ সুৰসিক ও হত্যামােদী। ঠাকুরমা ও ধাত্রীর মুখে রূপকথা শুনে পুস্কিনের শিক্ষা রম্ভ হয়। রুশ ভাষায় অদ্ভুত অধিকার তিনি এদের কাছেই পান। বান 'ফf৭রি, উন্মেষ হয় খুবই অল্প বয়সে-স্কুল ছাড়বার আগেই তিনি কবি বলে খ্যাত হন। তখন অত্যাচারী রুশরাজ সাহিত্যে কোনও স্বাধীন ভাব প্রকাশ হতে দিত না : তরুণ 'বি পুস্কিনের ‘মুক্তিগীতি’ এবং অন্যান্য জ্বালাময়ী রচনা ছাপা হতে পারে নি। কিন্তু হাতে লেখা হয়ে সেগুলি রাশিয়ার ঘরে ঘরে পৌছেছিল। এই লেখার ফলে পুস্কিনকে নিজের গ্রামে আটক থাকতে হয় এবং পরে দিনকতক সম্রাট নিকোলাসের নজরবন্দী হয়ে রাজধানীতে থাকতে হয়। পুস্কিনের গীতিকবিতা ও উপন্যাসের মূল বিষয়, মানুষের মনের যা শ্রেষ্ঠ সম্পদ তাই। প্রেম’ বস্তুটি কবি কত বর্ণে কত ছন্দেই যে মূর্ত করেছেন তার সীমা নেই। প্রেমের আদর্শকে তিনি কোথাও খাটো করেন নাই। পুস্কিনের নির্দিষ্ট প্রেমের আদর্শের কাছে পরবর্তী সকল রুশ লেখককে মাথা নােয়াতে হয়েছে। আরও যে কারণে পুস্কিন সমস্ত রুশ লেখকের নমষ্ঠ হয়ে আছেন, তা হচ্ছে তার ভাষার অবাধভঙ্গী, রচনার সৌষ্ঠব, প্রকাশের স্বচ্ছন্দ, ছন্দ যােজনায় অদ্ভুত নৈপুণ্য।
এই উপন্যাসখানি কবির জীবদ্দশায় সেন্সরের ছুরির ঘায়ে নিতান্ত
অপনি হয়ে বের হয়। কারণ, পুগাচফের বিদ্রোহের বর্ণনা এতে আছে।
পূর্ণাঙ্গ মূল পুস্তকখানি বের হয় কবির মৃত্যুর ৪৩ বৎসর পরে! কবির
সমসাময়িক প্রসিদ্ধ গল্পলেখক গােগল এই বই সম্বন্ধে নিম্নলিখিত
মন্তব্য করেছেন, “গােটা গল্পটি এমন সহজ ভাষায়, এমন সরল, অবলীল
ভঙ্গীতে লেখা যে বাস্তবকেই এর তুলনায় কৃত্রিম ব্যঙ্গচিত্র বা হীন
অনুকরণ বলে মনে হয়। বাংলা অনুবাদে পসি-
কতটা প্রতিফলিত হেনেছে পাঠক সে বিচার করবেন। তবে গল্পটি
না একথা বলা অতিরঞ্জন নয় ।
*লা
বিনীত -অনুবাদক
৮ই শ্রাবণ, ১৩৩৯
২৫, গড়িয়াহাট বাইলেন,
বালিগঞ্জ।
প্রথম পরিচ্ছেদ রক্ষীলের সার্জে যৌবনেই আত্মসম্মানের ওপর দৃষ্টি রাখবে। “কাল হ'ত সে রক্ষীদলের নেতা !” “বাহনা কেন ? হােক্ না পাতিক। “বলছ বটে, তার যে বাজবে ব্যথা, কে তবে তার পিতা ? নিয়ঝিনি আমার বাবা এণ্ডি, পেট্রোভিচ গ্রীনফ, যৌবনে কাউন্ট মিনিকের অধীনে ফৌজের কাজ করতেন | ১৭—সালে প্রথম মেজরের পদে থাকতে কাজ ছেড়ে দেন। সেই থেকে তিনি সিমবিস্ক প্রদেশে নিজ জমিরীতে, বাস করতেন। সেখানে এসে এক গরীব জমিদারের মেয়েকে বিয়ে করেন, তার নাম আভড়ােটিয়া ভাসিলেনা। মায়ের আর সব ছেলে। মেয়ে আঁতুড়েই মারা যায়। আমাদের নিকট আত্মীয় প্রিন্স বি – ক্ষীদলের মেজর ছিলেন। তার মুরুব্বিয়ানায় আমার নাম সেমিনফস্কি পদাতিকদলে লেখা হয়ে থাকে। কথা হল, যতদিন লেখাপড়া শেষ হয়, ততদিন আমার ছুটি। সেকালের শিক্ষা আর একালের শিক্ষায় অনেক তফাৎ। সাভেলিচ, ছিল আমাদের খানসামা, নিরীহ ভাল মানুষ। সাধুতার জন্যই সে পেল আমার তদ্বিরের ভার। তার গুরুগিরির ফলে বানাে বছর বয়সে আমি-রুশ ভাষা পড়তে ও লিখতে শিখলাম ; আর শিকারী কুকুর চিনতে ওস্তাদ হলাম। এই সময়ে বাবা আমার জন্য একটা রাশিয়ার দুর্গেশনন্দি ফরাসী মাষ্টার নিযুক্ত করেন। বছরকার খরচের মদ ও জলপায়ের তো সাথে তিনিও এক দিন মস্কো থেকে এসে পৌছিলেন। তার নাম বেপরে। তার আসায় সাভেলিচ, ভিতরে ভিতরে জ্বলতে লাগল। সে শুধু বক্ বক্ করে বস্ত, “ভগবানের দয়ায় ছেলেটার মুখ ঘােয়াবার, চুল বুরুস করবার, খাবার দেওয়ার লােকের অভাব নেই। আবার পয়সা খরচ করে একজন ফরাসী লােক আনা কেন ? যেন জমিদারীতে চাকরের বড়ই টানাটানি পড়েছে ।” বেপুরে জাতে ছিলেন নাপিত। সিয়ায় গিয়ে তিনি হয়েছিলেন জঙ্গী ; সে পথ ছেড়ে রাশিয়ায় এসেছিলেন গুরুগিরি কতে—যদিও গুরুগিরি কথাটার মানে তার পরিষ্কার জানা ছিল না। তার মনটি ছিল ভালই, কিন্তু প্রকৃতি বড় লঘু, বড্ড চনমনে। তার সব চেয়ে বড় দোষ ছিল কোমলাঙ্গীদের প্রতি অনুরাগের বাড়াবাড়ি। এই গল থাকায় লাথিটা, ঘুসাটা প্রায়ই তার কপালে জুটত, আর কেঁদে ককিয়েও কাট, অনেক সময় । তা ছাড়া, বােতল দেবীর প্রতিও তার যে কিছুমাত্র অভক্তি নেই তা তিনি অকপটে স্বীকার করতেন—অর্থাৎ দ্রবময়ীর মাত্রা বিষয়ে তাঁর আদৌ কৃপণতা ছিল না। কিন্তু মদটা আমাদের বাড়ীতে চত্ত শুধু বড় হাঙ্কুরির সময়ে—তাও মাথাপিছু এক গেলাস করে। গুরুমশাই আবার প্রায়ই বাদ যেতেন। অগত্যা বন্ধু বেয়ে রুশের গৃহজাত ব্রাণ্ডি অভ্যাস করে নিলেন। এমন কি, হজমে ওষুদ বলে তাঁর দেশী মদের চেয়ে এইটারই প্রতি তিনি বেশী পক্ষপাতি দেখতে লাগলেন। প্রথম দর্শনেই আমরা দুজন দুজনকে ভালবেসে ফেলাম। কথা ছিল, তিনি আমায় ফরাসী ও জাৰ্মাণ ভাষা এবং অন্যান্য বিষয় শেখাবেন। কিন্তু, আমার কাছে একটু চলনসই রুশভাষা শিখে নেওয়াই তিনি বেশী বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন। তারপয়ে আমরা জীদলের সার্জেন্ট পথে চলতে গেলাম। যাই হােক, দুজনায় বেশ নৃত। আমার অষ্ঠ গুরুর আকাঙ্ক্ষা ছিল না। কিন্তু ভাগ্য চক্রে শেষে আমাদের বিচ্ছেদ বল। কি করে তা এইবারে বচি। পালাস্কা আমাদের ধােবানী-বেজায় মােটা, মুখে বসন্তের দাগ গলানী আকুলকাতার এক চোখ কাণ। দুজনে একসাথে আমার মায়ের পায়ের ওপর মাথা রেখে তাদের গােপন পাপের কথা স্বীকার করল। এবং কাদতে কাদতে বল্ল, “মসু” ই তাদের পতনের কারণ। এই সব বিষয় হেলা করা মায়ের অভ্যাস ছিল না-মা গিয়ে বাবাকে বলেন। বাবাও সময় নষ্ট করা পছন্দ করতেন না। তিনি তখখুৰি ফরাসী বদমায়েসটাকে ডেকে পাঠালেন। বাদিনীরা তাকে বল্ল, “ম” আমাকে পড়াতে ব্যস্ত আছেন। বাবা সােজা আমার ঘরে এসে পড়তেন। বেপরে তখন আরামে পুণ্যবানদের সুখনিদ্রা ভােগ করছিলেন। আমি খুব গুরুতর কাজেই ব্যস্ত ছিলাম। মকো থেকে আমার জন্য একখানা পৃথিবীর না। আনা হয়েছিল, এটা আমার শলা উচিত। নবসােনা দেয়ালে ঝুত, কোনই কাজে লাগত না। অমন চওড়া, পুরু কাগজ- থানার ওপর আমার অনেক দিনের লােভ ছিল। ঠিক করলাম, ঘুড়ী তৈরী করব। বেপরে ঘুমুচ্ছে, এই সুযােগে আমি কাজ সুরু করলাম। উত্তমাশা অন্তরীপের ঠিক নীচে দড়ির লেজ জুড়ে দিচ্ছি এমন সময়ে বাবা "বরে ঢুকলেন। ভূগােলে আমার এই রকম মনোেযােগ দেখে বাবা কান ধরে টালেন ; তার পরে দৌড়ে গেলেন বেপরের কাছে। তার ঘুমটি যে ভাবে ভাঙলেন সেটাকে খুব মােলায়েম বলা চলে না। তাকে গাল দিয়ে একেবারে ভূতছাড়া করে দিলেন। বেপরে উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারুল না। ভালমানুষ বেচারা মদে একেবারে চুর হয়েছিল। সেও জবাব দিতে কসুর করল না। বাবা তার কামিজের গলা ধরে
৪.
রাশিয়ার দুর্গেশননি।
ছিল।
টেনে তুলে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিলেন। সেই
তাকে দূর করে দেওয়া হ’ল—সাভেলিচের আনন্দ আর ধরে না?
সেই আমার শিক্ষা শেষ হ'ল।
বিনা শিক্ষায় বাড়তে লাগলাম। আমার গায়ের ছেলেদের সাথে
পায়রা তাড়িয়ে, ব্যাঙঝাপ খেলে বেশ সময় কাতে লাগল। ইতিমধ্যে
যােল বছরে পা দিলাম। জীবনে একটা ওলটপালট সুরু হল।
শরৎ
কাল। একদিন মা বাহিরের ঘরে মধু দিয়ে রস তৈরী করছেন।
টগবগ করে ফুটচে,দেখে আমি জিভ, চাটুচি।
ধরে বসে কোর্ট ক্যালেণ্ডার (সরকারী পাজী) পড়চেন। সেখান
বছর বছর আত। বাবার ওপর এই কেতাবখানার বড় প্রভাব
পড়বার সময় উত্তেজিত না হয়ে থাকতে পারতেন না। পড়লেই
তার মাথা গরম হয়ে উঠত। বাবার সব রকম খেয়াল মায়ের তন্ন তন্ন
করে জানা ছিল। মা এই অলক্ষুণে বইখানা যথাসম্ভব সরিয়ে রাখতে
চেষ্টা করতেন। কখনও কখনও দুচার মাসের মধ্যে সেখানা বাবার চোখে
পড়ত না। কিন্তু একবার হাতে পড়লে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার ঐ নিয়েই
কাত। বাবা এই বই পড়ছেন, মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়চেন আর নিজে
নিজে বলচেন :
“লেফটনান্ট জাদরেল।••••"আমার অধীনে সে যে সার্জেন্ট ছিল।
রুশ সরকারের দুটি বড় বড় খেতাবধারী!••••••এই ত সে দিন সে আর
আমি'
শেষে বাবা বইখানি সােফার ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে গভীর চিন্তায়
ডুবে গেলেন। বুঝলাম ব্যাপার সুবিধে নয়।
হঠাৎ তিনি মায়ের দিকে চেয়ে বললেন—“আভড়ােটিয়া ভাসিলেনা,
পেট সার বয়স কত হল ?
ক্ষীদলে, সার্জেন্ট
-মা। “শিগগিরই সতর পুরবে। সেই যে নাটাসিয়া খুড়ীর চোখটা :
গেল, পেট সাও হ’ল ;
অ, যখন
বাধা দিয়ে বাবা বললেন “বেশ। তার এখন কাজে যাওয়া উচিত।
পায়রার বাসা ভাঙ্গা ত ঢের দিন হয়েছে।”
আমায় ছেড়ে থাকতে হবে এই দুঃখে মা এত অধীর হলেন যে তার :
হাতের চামচেখানা কড়ার ভিতর পড়ে গেল, গাল বেয়ে টস টস্ ক'রে
চোখের জল পড়তে লাগল। আমার আনন্দ আর ধরে না। ফৌজের
চাকরী মানেই বুঝতাম অবাধ স্বাধীনতা আর পিটার্সবুর্গে মজা লুটবার
সুযােগ্ন। কল্পনা করলাম, রক্ষীদলের কর্মচারী হয়েছি। তখন সেইটাই
মানবজীবনের চরম সুখ বলে ভাবতাম ।
বাবার মৎলব নড়চড়, হত না। মৎলব ঠিক্ করে চুপ করে বসেও
তিনি থাকতেন না। আমার যাত্রার দিন ঠিক হয়ে গেল। বাবা
বললেন যাওয়ার আগে আমার ভাবী ওপরওয়ালার কাছে একখানা চিঠি
দেবেন। কাগজ কলম চেয়ে নিলেন।
মা বললেন, “এণ্ডি, পেট্রভি, প্রিন্স বি-কে আমার নমস্কার দি এশ,
ভুলাে না। লিখে দাও তিনি যেন পেট সাকে মেহের চুঙ্গে দেখে নকার
এটা আমার বিশেষ অনুরােধ।
করে
বাবা কুঞ্চিত করে বলেন, “কি ব! প্রিন্স বি-কে লিলিয়ার্ড
গেলাম কেন ?
স্বম
“কেন ? তুমি যে বললে পেট সার ওপরওয়ালাকে লিখ চ ?”
“লিথ,চি, তাই কি ?
“পেট সার ওপরওয়ালা ত’ প্রিন্স বি— বাছার নাম ত সেমিন
পদাতিক দলে লেখা হয়েছে।”
“হ’লই বা লেখা ! আমি কেয়ার করি না। পেট সা পিটার্সবুর্গে
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী যাচ্ছে না। সেখানে চাকরী করলে শিখবে কি? পয়সা উড়াবে, উচ্ছন্ন যাবে। তার চেয়ে সেনাদলে ঢুকে নিয়মনিষ্ট' শিখুক, লড়াই করে সত্যিকার বীর হাে-রক্ষীদলের বিলাসী বাবু হয়ে লাভ? ওর ছাড়পত্রখানা কোথায় ? সেখানা আমায় দাও।” ছাড়পত্রখানা আমার অন্নপ্রাশনের পােষাকের সাথে সিন্দুকে তােলা ছিল। মা কম্পিত হাতে সেখান। বাবাকে দিলেন। বাবা বেশ মন দিয়ে পড়ে, সামনের টেবিলে সেখান রেখে, চিঠি লিখতে লাগলেন। কৌতুহলে আমার দম ফেটে যায় যায় ! পিটার্সবুর্গে নয় ত’ যাচ্চি কোথায় ? বাবার কলম ছেড়ে আমার দুচোখ আর নড়ে না। কলম ধীরে ধীরে নড়চে। শেষে চিঠি লেখা হয়ে গেল। পাসপাের্টসুদ্ধ চিঠি খামে পুরে সিল করে দিলেন। তারপরে চসমা খুলে আমায় ডেকে বললেন :- “এই যে এণ্ডি, কালোভিচকে চিঠি লিখলাম—তিনি আমার বন্ধু, । তুমি ওরেনবুর্গে তার অধীনে কাজ করতে যাচ্চ।” পড়, আমার এত রঙীন আশার অট্টালিকা একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে গেল । কাট" পিটার্সবুর্গে যাব মজা লুটতে, আর কোথায় দূর জংলা দৈশে নিজে ম পচে মরতে। খানিক আগে যে ফৌজের কাজ এত সুখের মনে “, এখন তা একটা ভয়ানক পাপের শান্তি বলে বােধ হ’ল। কিন্তু রুশ্ৰতিবাদ করে লাভ নেই। পরদিন ভােরে বাড়ীর দুয়ারে গাড়ী এসে দাড়াল; আমার ব্যাগ, চায়ের জিনিসের বাক্স, এবং পারিবারিক মেহের শেষ চিহ্ন—পিঠে ও রুটির পুটুলি গাড়ীতে বােঝাই হ’ল। বাবা, আমায় আশীৰ্বাদ করলেন। বাবা বললেন - “পিট, এইবারে বিদায়। রাজভক্তির শপথ অক্ষরে অক্ষরে মানবে । ওপরওয়ালার কথা শুবে ; তাঁর অনুগ্ৰহ কখনও চেয়াে না'; মােড়লগিরি বেহকর্মী { রক্ষীদলের সার্জেন্ট করতে যেয়াে না, আবার নিজের কাজেও ফাঁকি দিও না। প্রবাদ আছে ‘কাপড় যতদিন নতুন থাকে সাবধানে রাখবে, বয়স যতদিন কঁাচা আছে, আত্মসম্মানের ওপর নজর রাখবে। কথাটা মনে রেখাে।” মা চোখের জল ফেলে বলেন, “খুব সাবধানে থাকিস্।” সাভেলিচকে বলেন, “খােকার ওপর নজর রেখাে।” আমায় খরগােসের চামড়ার কামিজের ওপর খেকশেয়ালের চামড়ার কোট পরিয়ে দেওয়া হল। সাভেলিচের সাথে গাড়ীতে উঠে বল্লাম এবং চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিদায় হলাম। সন্ধ্যাবেলা সিবিস্কে পৌঁছলাম। দরকারী জিনিসপত্র খরিদ করতে পরদিনও সেখানে থাকতে হবে। সাভেলিচের ওপর খরিদের ভার দিলাম। একটা সরাইএ ওঠা গেল। পরদিন খুব ভােরে সাভেলিচ, সওদা করতে বেরুল। জানালা দিয়ে ধূলিময় রাস্তা দেখে দেখে বিরক্ত হয়ে শেষে আমি উঠে গিয়ে সরাইএর ভিতরটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। বিলিয়ার্ড..ঘরে এসে একটি ঢ্যাঙা লােককে দেখতে পেলাম ; তার বয়স বছর পয়ত্রিশ, দিব্যি লম্বা গোঁফ, হাতে বিলিয়ার্ডের ছড়ি, মুথে পাইপ। ফেলনকার খিদমৎগারের সাথে খেলছিল। ছােকরা জিলে একগ্লাস করে ভােডকা (মদ) বকশিস পাচ্চিল। আর হারলে তাকে গুড়ি মেরে বিলিয়ার্ড টেবিলের নীচে থাকতে হচ্ছিল। শেষে একবার সে টেবিলের নীচেই কায়েম হয়ে রইল। ভদ্রলােক তার মুণ্ডপাত করে আমায় বনে এক বাজী খেলতে। আমি রাজী হলাম না-বললাম, খেলা জানি না। শুনে ভদ্রলােক যেন অবাক হলেন। নিতান্ত করুণার চক্ষে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। যাই হােক, কথাবার্তা শুরু হ’ল ! শুনলাম তার নাম ইভান্ ইভানােভিচ, জুরি। তিনি হুসার পদাতিক দলের কাপ্তেন, সিবিরূঙ্কে এসেছেন রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী রংরূট সংগ্রহ করতে, এবং ঐ সরায়েই উঠেছেন। জুরি আমায় বড় হাজরির নেমন্তন্ন করলেন—সহকর্মী হিসাবে। আমি নেমন্তন্ন নিলাম। একসাথে খেতে বসা গেল। জুরি প্রচুর পরিমাণে পান করলেন এবং আমাকেও করালেন। বললেন ফৌজের হালচাল অভ্যাস করা দরকার। লডাইএর এমন সব চুটকি গল্প বলতে লাগলেন যে তা শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরল। যখন টেবিল ছেড়ে উঠলাম তখন দুজনায় বেশ ভাব হংস গিয়েছে। তারপরে তিনি আমায় বিলিয়ার্ড শেখাতে রাজী হলেন। জুরি বলেন, “থোটা জানা বড়ই দরকার। ধর, লড়াই করতে পশ্চিম সীমান্তের কোন ছােট জায়গায় গিয়ে পড়লাম। তখন কি করা যায় ? জান ত’ সব সময়ে ইহুদী ঠ্যাঙান ভাল লাগে । অতএব সরাইএ ঢুকে বিলিয়ার্ড খেলতে হয়। আর খেতে হলেই তা জানা দরকার।” বুঝলায় খেলাটা জানা নিতান্তই দরকার। খুব রুখে খেলতে সুরু করলাম। রিন্ চেঁচিয়ে উৎসাহ দিতে লাগলে...আমার উন্নতির বেগ #ে "হার তাক্ লেগে গেল, এবং কয়েকটি কায়দা শিখিয়েই তিনি বলেন, “বাজী রেখে খেলা যাক। তিন ফার্দিং করে ধরা.. হবে। লাভের জন্য বলছি না, বাজী না রেখে খেলা ভারি বদ অভ্যাস, এই জত।” আমি তাতেই রাজী হলাম। জুরি কিছু “পাঞ্চ” (মদ) এর ফুমাে দিলেন, আমাকে ও ইচ্ছা করতে বলেন, কারণ সৈন্য জীবনের সব অভ্যাস আয়ত্ব করা দরকার; ‘পাঞ্চ না থাকলে ফৌজের গতি হত কি? আমি তার উপদেশ সাবধানে মন্তি লাগলাম। খেলা চক্ষ। গেলাস যতই বেশী ব্যবহার করছি, বুকের পাটা ততই বেড়ে যাচ্চে । মিনিটে মিনিটে আমার বল সীমানা পার
রক্ষীদলের সার্জেন্ট
হয়ে ছুটতে লাগল। ভয়ানক জি বেড়ে গেল ; স্কোর’ রাখতে
জানে না বলে চাকরটাকে গাল দিলাম ; ক্রমে বাজীও চড়াতে
লাগলাম—মােটকথা, বােকা ছেলে প্রথম ছাড়া পেলে যা করে
ঠিক তাই করতে লাগলাম । সময় কোথা দিয়ে যাচ্ছিল টের পাই
নি! জুরিন ঘড়ীর দিকে চাইলেন, তারপরে ছড়ি রেখে দিয়ে
আমায় বলেন, আমি একশ’ রুবল হেরেছি। আমি ত আকাশ
থেকে পড়লাম ! পয়সাকড়ি ছিল সাভেলিচের কাছে বল্লাম, ‘মাপ
করুন। জুরিন বাধা দিয়ে বলেন, “ব্যস্ত হবার কিছু নেই ।
তােমার কাছে নাই বা থাল, কিছু আসে যায় না। আমি সবুর
করতে পাব। এইবারে চল, আরিস্কার সাথে দেখা করে আসি।”
“কি আর বলব? দিনটি যে ভাবে শুরু হয়েছিল সেই ভাবেই
শেষ হল। আরিস্কার ওখানে ছােট হাজরি সারা গেল। জুরিন
বারবার গ্লাস ভরে দিয়ে বলতে লাগলেন ফৌজের আদবকায়দা
শেখা দরকার। যখন টেবিল ছেড়ে উঠলাম, তখন আর পাড়াতে
পারি নে। রাতু. দুপুরে জুরিন আমায় গাড়ী করে সাঁইএ ফিরিয়ে
আলেন ।
পৈঠার ওপর সাভেলিচের সাথে দেখা ! ফৌজের কাজে আন্তরিকতার
অভ্রান্ত লক্ষণ দেখে সে চেঁচিয়ে উঠল, “কি হয়েছে তােমার ? এমন
অবস্থা কোথায় হ’ল ? হে ভগবান্ ! এমন হাল ত’ তােমার কখনও
হয় নি।”
আমি জড়ান গলায় বললাম, “বচনবাগীশ, আর ফর
হবে না।”
“তুমি মাতাল হয়েচ, যাও শুয়ে পড়গে।” এই বলে সে আমাকে
বিছানায় শুইয়ে দিল।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
পরদিন জেগে ভয়ানক মাথাব্যথা বােধ করলাম। আগের দিনের
সব ঘটনা অস্পষ্ট মনে হতে লাগল। সাভেলিচ, এসে আমার চিন্তা
স্রোতে বাধা দিল। তার হাতে ছিল এক পেয়ালা চা।
মাথা নেড়ে নেড়ে সে বলতে লাগল “পিটর এচি, তুমি বড়ই
অল্প বয়সে মদ ধরলে! বড় ছেলেবেলায় ! এ শিখলে কোত্থেকে ?
তােমার বাপ ঠাকুরদাদা ত মাতাল ছিলেন না। তােমার মা
কজির চেয়ে কঁঝাল কিছু কোনও দিন ছেন না। এই অভ্যাসের
গােড়ায় রয়েচে কে ? সেই ফরাসী বদমায়েসটা, সেই পাজি কুকুরটা
তােমায় একটি বিদ্যে দিয়েছে, যা হােক।”
আমি লজ্জিত হলাম। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকে বল্লাম “যাও
সাভেলিচ, আমি চা খাব না।” কিন্তু সাভেলিচ, একবার যে উপদেশ
দিতে সুরু করল আর থামে না—“এখন ত বুঝতে পারছ বাড়াবাড়ি
করার কি ফল ? মাথা ধরেচে, খিদে নেই। যে মাতাল সে ত
অপদার্থ। ধু দিয়ে খানিকটা শসার রস খাও। ঘরে তৈরী ব্রাপ্তি
আধ গ্লাস খেতে পারলে আরও ভাল। খানিকটা আফি:-
এমন সময়ে একটি ছােকরা জুরিনের চিঠি নিয়ে আমার ঘরে এল।
প্রিয় পিটর এচি,
কাল বিলিয়ার্ডে যে একশ রুবল হেরেচ তা এই ছােরার সাথে
পাঠিয়ে দিও। আমার বড় দরকার ।
তােমার শুভার্থী
ইভান জুরি।
উপায় নেই। নিতান্ত ঔদাস্তের ভাব দেখিয়ে আমি সাভেলিচের
দিকে পাশ ফিরলাম। তার জিম্মায় আমার টাকাকড়ি কাপড়চোপড়
রক্ষীদলের সার্জেন্ট
১১
যা কিছু সব.. থাকত। তাকে বল্লাম, “ছােরাকে একশ’ রুবল দিয়ে
দাও।”
“কি ? ওকে এত টাকা দিতে গেলাম কেন?”
আমি বেশ ধীর ভাবে উত্তর দিলাম “আমি তার কাছে ধারি।”
সাভেলিচের বিস্ময় ক্রমেই বাড়ছে। সে বল্ল, “ধারে ? তােমার
ধার করবার সময় হ’ল কখন ? নিশ্চয়ই কোনও গােলমাল আছে।
তুমি যাই বল, আমি টাকা দেবাে না।”
ভাবলাম, এই বিপদের মূহুর্তে যদি এই একগুয়ে বুড়ােটাকে
হারাতে পারি, ভবিষ্যতে এর গুরুগিরির জ্বালায় অস্থির হতে
হবে। আমি কটুমটিয়ে চেয়ে বাম :
“আমি তােমার মনিব, তুমি চাকর। টাকা আমার, আমি ইচ্ছা
করে বিলিয়ার্ড খেলে হেরেছি। আমার সঙ্গে তর্ক ক'রাে না বলুচি।
যা বলি তাই কর।”
আমার কথায় সাভেলিচ, এত আঘাত পেল যে দুই হাত জুড়ে
সে খানিকটা চুপ করে বসে রইল। তারপরে কাপা' গলায় বল,
“পিটর এচি, আমায় আর দগ্ধে মেরাে না। 'মাণি , বুড়াে, যা
বলি তাই করাে। সেই জুয়াচোরকে লিখে দাও, ও খেলাটেল সব
তামাস। আমাদের অতাে টাকা নেই। একশ রুবল ! হে ভগবান্ !
বলে পাঠাও কাঠবাদাম ছাড়া আর কিছু বাজী রেখে খেতে তােমার
পিতামাতা নিষেধ করেছেন।”
একটু কড়াভাবে বাধা দিয়ে বললাম, “ঢের হয়েছে। টাকাটা
আমায় দাও, নইলে তােমায় দূর করে দেবাে।”
নিতান্ত কাতরভাবে সাভেলিচ, আমার দিকে চাইল, এবং টাকা
আনতে গেল
তার ভাব দেখে আমার দুঃখ হ’ল। কিন্তু আমার
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী স্বাধীনতাও ত রক্ষা করা দরকার বুঝিয়ে দেওয়া দরকার আমি আর ছেলে মানুষ নই। জুরিনকে টাকা পাঠান হ’ল। অপয়া সব্বাই থেকে আমায় নিয়ে পালাতে সাভেলিচ, ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এসে বল, গাড়ী তৈরী। নীরব অনুশােচনা এবং বিবেকের জ্বলা নিয়ে সিমবিরস্ক ছাড়লাম । আমার নতুন ওস্তাদের কাছে বিদায় নেওয়া হল না। তার সাথে আর দেখা হবে এমন আশাও রইল না। .
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
পথ প্রদর্শক
হে বিদেশ, নাহি জানি কি রহস্য অন্তস্তলে তব ।
আসি নাই তব বুকে শান্তি লাগি’ আপন ইচ্ছায়
পথভ্রান্ত অশ্ব, মম আনে নাই তােমার আশ্রয়ে ।
উচ্ছ,ঙ্খল জীবনের খরস্রোতে ভাসিতে ভাসিতে
মদদৃপ্ত যৌবনের কূলপ্লাবী বন্যার গতিতে
চকিতে এসেছি ভেসে ভয়াবহ আবর্তে তােমার । (পুরাণ গাথ: )
পথে যে সব চিন্তা আমার মনকে তােলপাড় করছিল তা নিছক
সুখের নয়। যে টাকাটা হেরেছিলাম সেটা, তখনকার হিসাবে বেশ
মােটা টাকাই বলতে হবে। সিমবিরূঙ্কের সরাই এ আমার আচরণ
যে গোঁয়াস্ত্রের মত হয়েছে নিজের কাছে তা অস্বীকার করতে
পারলাম না। সাভেলিচকে খুব অন্যায় কথা বলেছি এও বুঝতে
পারলাম। বড়ই অশান্তি বােধ হ’ল। বুড়াে বেচারা মুখভার করে
ঘাড় ফিরিয়ে, কোচবাক্সে বসে ছিল। মাঝে মাঝে গলা হচ্ছিল,
কিন্তু কোনই কথা বলছিল না। তার সাথে একটা রফা করব
ঠিক করলাম। কিন্তু ভেবে পেলাম না কি ভাবে শুরু করা যায় ।
শেষে বাম :-
• “আরে, আরে, যাভেলিচ, এস অপােষ করে ফেলি। আমারই
দোষ তা স্বীকার কচি। কাল কি ভূত যে ঘাড়ে চেপেছিল,
১৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী জন্য , শুধু শুধু তােমায় অপমানটা করলাম। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, এখন থেকে সাবধান হব, আর তুমি যা বলবে তাই করব।” গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাভেলিচ, বল, “ভাই পিট, আমার নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে বেশী। আমারই ত’ দোষ। তােমায় একা ফেলে আমি কি করে গেলুম। আমি লােভ সামলাতে পারি নি, পাদ্রীর বৌএর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলুম—পাদ্রী আমার পুরান বন্ধু। প্রবাদ আছে ‘বন্ধুদের দেখতে গেলে, দেখা ঘটুল গিয়ে জেলে। কি দুর্ঘটনা ! কৰ্ত্তা গিন্নিতে মুখ দেখাব কি করে? তারা যখন শুনবেন, থােকা মদ খায়, জুয়া খেলে, তখন বলবেন কি?” সাভেলিচকে শান্ত করবার কথা দিলাম তার অমতে আর আমি এক পয়সাও খরচ করব না। তাকে ঠাণ্ডা করতে অনেকটা সময় লাগল। তবুও সে মাঝে মাঝে ঘাড় নেড়ে বলতে লাগল, “একশ’ রুবল, তামাসা নয় !” যেখানে আমাদের যাওয়ার কথা কাছাকাছি এসে পড়লাম। চারিদিকে খাল-পাহাড়ময়, জনহীন প্রান্তর। সব বরফে ঢাকা। • সূর্য ডুবছে। একটা সরু রাস্তা ধরে গাড়ী চলেছে। চাষাদের চাকাহীন শ্লেজ চলে চলে একটা নি’ পড়ে গিয়েছিল। হঠাৎ কোচম্যান সভয় দৃষ্টিতে দিগন্তের দিকে চাইল। শেষে টুপিটা খুলে আমার দিকে ফিরে বল ? “মশাই, ফিরে গেলে ভাল হত না? “কেন?” “আকাশের অবস্থা সুবিধে নয় ; সুবিধে নয় ; হাওয়া উঠচে বরফ কেমন উড় চে দেখুন।” ; “হ’লই বা ?”
পথ প্রদর্শক দেখতে পাচ্ছেন কি ?” চাবুক তুলে সে পূৰ্বদিকে ইঙ্গিত করল। “দেখতে পাচ্ছি বই কি? ধবধবে মাঠ আর পরিষ্কার আকাশ।” “কেন, ঐ যে ছােট্ট মেঘখানা?” আকাশের কোণে সাদা একখানা মেঘ দেখতে পেলাম বটে প্রথমে সেটাকে দূরের পাহাড় বলৈ আমার বােধ হয়েছিল। কোচম্যান আমাকে বুঝিয়ে দিল যে ঐ মেঘখানি বরফঝড়ের অগ্রদূত। এদিককার বরফঝড়ের কথা শুনেছিলাম ; জানাতে সময়ে সময়ে গাড়ী ঘােড়া সব ডুবে যায়। • কোচমানের মত নাভেলিচেরও ইচ্ছা হল আমরা ফিরে যাই। কিন্তু তেমন জোর ছাওয়া ছিল না ; ভাবলাম ঠিক সময়ে পরের স্টেশনে পৌছে যাব। কোচম্যানকে বাম জোরে হাঁকাতে। কোচম্যান ঘােড়া ধাপে ছুটিয়ে পল। তার দৃষ্টি রইল পূৰ্ব্বদিকে। ঘােড়া বেশ ছুটল। এদিকে হাওয়া ক্রমেই বাড়তে লাগল। মেঘ টুকু ক্ৰমে বড়, ভারি হয়ে আস্তে আস্তে আকাশ ছেয়ে ফেল। গুড়ো গুড়ো বরফ পড়তে লাগল ; তারপরে হঠাৎ বড় বড় ডালা পড়তে শুরু হল । বাতাস হু হু করে ছুটেছে ; আমরা একেবারে বরফঝড়ের মুখে পড়ে গেলাম ! এক মুহূর্তে কালো আকাশ যেন গলে বরফের সাগর হয়ে গেল। দৃষ্টি আর চলে না। কোচম্যান বল, “মশাই, গতিক সুবিধে নয়।” গাড়ী থেকে মুখ বের করে বললাম, “বরফঝড় বুঝি ?” আশ- পাশে অন্ধকার আর ঘুর্ণীবায়ু। হাওয়া এমন ভয়ানক হু হু শব্দ করচে যে মনে হল তা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমি আর দাভেলিচ, বরফে ঢাকা পড়ে গেলাম। ঘােড়া ক’টি ধীরে ধীরে চলতে সাগল, তারপরে একেবারে থেমে গেল।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
আমি ব্যস্ত হয়ে বাম, “থামলে কেন ? হাঁকাও ,
কোচবাক্স থেকে লাফিয়ে পড়ে সে ল, “কি লাভ?
বুঝতে পারচিনে কোথায় এলাম। একে রাস্তা নেই, তার ওপর
অন্ধকার।
আমি তাকে বকতে লাগলাম। সাভেলিচ, তার পক্ষ নিল। সে
রেগে বল্ল “তুমি ওর পরামর্শ কেন নিলে না? এতক্ষণ সরাইএ
ফিরে গিয়ে, চা খেয়ে সকাল পর্যন্ত বেশ আরামে ঘুমতে পাতে ।
তারপরে ঝড় থামলে বেরিয়ে পড়া যেত। এত তাড়াতাড়ি কি ?
আমরা ত বিয়েয় যাচ্চিনে!”
সাভেলিচের কথা ঠিক। কিন্তু উপায় ছিল না। বরফ খুবই
পড়ছিল। গাড়ীর চারপাশে বরফের ঢিবি গড়ে উঠছিল। ঘােড়া
কটি মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে খুইল ; আর মাঝে মাঝে থর থরূ
করে কেঁপে উঠতে লাগল। কোচম্যান তাদের চারদিকে ঘুরতে
লাগল। আর, কিছু করা দরকার তাই তাদের সাজগুলি একটু
-নেড়ে চেড়ে বসিয়ে দিতে লাগল। সাভেলিচ, গজ, গজ, করছিল,
আমি একটা রাস্তা বা বাড়ী দেখতে পাব এই আশায় চারদিকে
চেয়ে দেখছিলাম, কিন্তু সেই অস্বচ্ছ বরফের ঘুর্ণীপাকে কিছুই দেখতে
পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ কালাে একটা কি আমার চোখে পড়ল।
চেঁচিয়ে বল্লাম, “ওহে কোচম্যান, ওদিকে ঐ কালো জিনিষটা
কি?”
কোচম্যান বেশ পরখ করে দেখতে লাগল।
বাক্সে উঠে বল, “ভগবান জানেন ! ওটা গাড়ীও নয়, গাছও
নয়; মনে হয় নড়চে। হয় নেড়ে, নয় মানুষ।”
সেই অজানা জিনিসটার দিকে গাড়ী চালাতে বললাম। সেটাও
পথ প্রদর্শক
১৭
}
মামাদের দিকে আসতে লাগল। মিনিট দুই পরে একটি লােকের
ঙ্গে দেখা!
কোচ ম্যান চেঁচিয়ে বলল, “ওগাে ভাল মানুষটি ! রাস্তাটা কোন্
দকে, জান ?”
পথিক বল্ল, “এই রাস্তা। আমি শক্ত মাটিরই ওপর দাঁড়িয়ে
মাছি। কিন্তু তাতে লাভ কি ?
জিজ্ঞাসা করলাম, “ওহে ভাল মানুষ,
“ওহে ভাল মানুষ, এদিকটা তােমায় জানা
জানা
আছে কি? এই রাতটার জন্য কোনও আশ্রয়ে আমাদের নিয়ে
যেতে পার ?”
পথিক উত্তর দিল, “আমি এ দেশ ভালই চিনি, এর
প্রত্যেকটা ধূলি-কণা আমার পরিচিত। কিন্তু আকাশের অবস্থা
দেখুচ ত ? আমরা নির্ঘাত পথ হারিয়ে ফেলব। তার চেয়ে এখানেই
অপেক্ষা কর। বরফঝড় থামতেও পারে। আকাশ পরিষ্কার হলে
তার আলোয় দিক ঠিক করে নেওয়া যাবে।”
তার নিশ্চিন্ত ভার দেখে আমার ভরসা হ’ল। ভগবানের ওপর
নর্ভর করে রাতটা মাঠেই কাটাব ঠিক করলাম। পথিক হঠাৎ
লাফিয়ে কোচবাক্সে উঠে বসল এবং কোচম্যানকে বল্ল “ভগবানকে
ধন্যবাদ, কাছেই একটা গাঁ রয়েচে, ডানদিকে ঘুরিয়ে সােজা চালাও।”
কোচ ম্যান বিরক্ত হয়ে বলল, “ডানদিক যাব কেন ? রাস্তা
কোথা দেখচ হে ? অপরের ঘােড়ায় চাপ বড় সহজ!
কোচম্যানের কথাই ঠিক মনে হ’ল। জিজ্ঞাসা করলাম, “কি
করে জানলে কাছে গাঁ আছে ?”
সে জবাব দিল “হাওয়ায় ঐ দিক থেকে ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে
আসছে। সুতরাং ও দিকে গাঁ নিশ্চয়ই আছে।”
১৮ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী লােকটার উপস্থিত বুদ্ধি আর তীক্ষ শক্তি দেখে অবাক হলাম। কোচ ম্যানকে বললাম “চালাও।* ঘােড়া ক’টি পুরু বরফের ভিতর দিয়ে কষ্টে চলতে লাগল। গাড়ী ধীরে ধীরে চলেছে, কখনও বরফের ঢিবির ভিতরে ডুবে যাচ্ছে, কখনও শুকনাে খালে পড়ছে। একবার এ পাশে একবার ও পাশে দুচে। ঠিক্ তুফানে জাহাজের মত। সাভেলিচ আমার সাথে ঠোকাঠুকি খেয়ে মাঝে মাঝে কেঁকাচ্চে । আমি সামনের পর্দাটা ফেলে দিলাম ; পশমের কোটটা মুড়ি দিয়ে তুলতে লাগলাম। ঝড়ের গান আর গাড়ীর দুলকি আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিল। একটি স্বপ্ন দেখলাম, তা কখনাে ভুলতে পারব না। আমার জীবনের ওঠাপড়ার কথা ভাবলে সেটা ভবিষ্যতের আভাস বলেই মনে হয়। কুসংস্কার কতদূর মানুষের মজ্জাগত পাঠক তা জানেন । সুতরাং এই সব অলীক স্বপ্নের ওপর যতই ঘৃণা থাক্ না, আশা করি আমায় ক্ষমা করবেন। তখন আমার মনের সেই অবস্থা, যখন বাস্তব জগৎ মুছে গিয়ে স্বপ্নজগৎ সত্য হয়ে ওঠে। গভীর ঘুমের গভীর ঘুমের আগে মন ছায়ালােকে বিচরণ করে। আমার মনে হ’ল ঝড় তখনও বইছে, আমরা সেই বরফে ঢাকা প্রান্তরেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম সামনে একটা ফটক। সেই ফটক দিয়ে ঢুকে সােজা আমাদের বাড়ীর উঠানে এসে পৌঁছলাম। প্রথমটা ভয় হ’ল, আমার হঠাৎ ফিরে আসায় বাবা রাগ করবেন। ভাববেন আমি ইচ্ছা করে অবাধ্য হয়েছি। চিন্তিত ভাবে আমি গাড়ী থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লাম নেমেই মাকে দেখতে পেলাম। মা পৈঠার ওপর এলেন আমায় এগিয়ে নিতে। তার মুখে গভীর দুঃখের ছায়া।
পথ প্রদর্শক ; মা বললেন, “দ 'করাে না, তােমার বাবার বড্ড অসুখ। বাঁচবার আশা নেই ; তােমাকে দেখতে বড় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এস্ত ভাবে আমি মায়ের পিছনে পিছনে শােবার ঘরে ঢুকলাম। ঘরটায় অস্পষ্ট আলাে ছিল ; দেখলাম কতকগুলি লােক বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের মুখ বিষাদমাখা। আমি নিঃশব্দে বিছানার পাশে গেলাম, মা মশারী তুলে বললেন, “এণ্ডি পেট্রোভিচ, পেটুস, এসেচে ; তােমার অসুখের খবর পেয়েই সে ফিরেচে। তাকে আশীর্বাদ করাে।” আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম ; বসে রােগীর দিকে চাইলাম। দেখলাম কি ? বাবার জায়গায় দাড়িমুখখা একটা চাষা শুয়ে আছে, আর হাসিমুখে আমার দিকে চেয়ে দেখছে। আমি অবাক হয়ে মায়ের দিকে ফিরে বলাম, “এর মানে কি? এতাে বাবা নন্ ! এই চাষাটার আশীর্বাদ আমি নিতে গেলাম কেন?” মা বললেন, “তা হােনা পেটু সা, বিয়ের সময় বলে লােকটি তােমার বাবার জায়গায় বসেচে। ওর হাতে চুমাে খাও, ও তােমায় আশীর্বাদ করবে। আমি তা কিছুতেই করব না। চাষা বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠল ; পিছন থেকে একখানা কুড়ল তুলে নিয়ে ঘুরাতে লাগল। আমি পালাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। যেদিকে চাই শুধু মড়া। আমি তার ওপর হোঁচট খেয়ে পা হড়কে রক্তের ভিতর পড়ে গেলাম। সেই ভূতের মত চাষাটা করুণ স্বরে আমায় বলল “ভয় পেয় না, এস আমার আশীর্বাদ নাও।* ভয়ে, বিস্ময়ে আমি অভিভূত হয়ে পড়লাম। ঠিক এই সময়ে আমার ঘুম ভেঙে গেল। জেগে দেখি ঘােড়া ক’টি বাড়িয়ে আছে। সাভেলিচ আমার হাত ধরে বলচে “বেরিয়ে এল, আমরা পৌঁছে গিয়েছি।”
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
.
চোখ রগড়ে জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় ?
“সরাইএ। প্রভুর দয়ায় আমরা একেবারে বেড়ার ওপরে এসে
পড়েছিলাম। তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে গরম হবে, এস।”
গাড়ী থেকে নাম। বরফঝড় তখনও হচ্চে, যদিও বেগ
অনেকটা কম। গাঢ় অন্ধকার। হােটেলওয়ালা ফটকে এসে আমাদের
আপ্যায়িত করল। লণ্ঠনটি ছিল তার জামার আড়ালে। পথ
দৈখিয়ে 'সে - আমাদের একটা ছােট পরিষ্কার ঘরে নিয়ে গেল। আলানি
কাঠের আগুনে ঘরটা আলাে হয়েছিল। দেয়ালে একটা কশাক টুপি
আর একটা
রাইফেল ঝুলছিল। হােটেল ওয়ালা ইয়েক প্রদেশের
একজন কশাক। বয়স বছর ষাট, কিন্তু শরীর বেশ মজবুত, কর্মঠ।
সাভেলিচ চায়ের জিনিসের বাক্সটা ভিতরে আল, তার পরে চা তৈরী
করবার জন্য একটু আগুন চাইল। প্রস্তাবটা যে কত আরামদায়ক
লাগল, তা বলে বুঝাতে পারি নে। হােটেলওয়ালা আমার মালপত্তর
হেপাজ করতে গেল।
সাভেলিচকে জিজ্ঞাসা করলাম “আমাদের পথ প্রদর্শক কোথায় ?”
ওপর থেকে শব্দ হল এই যে, রাজা।
ওপর দিকে চেয়ে, ষ্টোভের ধারে তাকের ওপর এক গােছ
কালােদাড়ি আর দুটি অজ্বলে চোখ দেখতে পেলাম।
“ভাই, তুমি নিশ্চয় ঠাণ্ডায় জমে গিয়েচ ?
“বােধ হয় গিয়েছিলাম ; গায়ে শুধু একটা পাতলা জারকিন কিনা।
একটা ভেড়ার চামড়ার জামা ছিল, কিন্তু কাল সেটা গেছে আর
একজনের গায়ে, যার দরকার আমার চেয়ে বেশী। বরফ “নেহাৎ মন্দ
পড়ে নি।
এমন সময়ে হােটেলওয়ালা ফুটন্ত জলের কেটলি নিয়ে এল।
পথ প্রদর্শক পথ প্রদর্শকের জন্য এক পেয়ালা চা এগিয়ে ধরলাম-সে তাক থেকে নেমে এল। তার চেহারাটা বেশ মনে লাগে। বয়স চল্লিশের কাছে, মাঝামাঝি লম্বা, একহারা চেহারা, চওড়া বুক। কালাে দাড়িতে সবে, সাদার রেখাপাত হতে শুরু করেছে। তার বড় বড় উজ্জ্বল চোখ ট বড়ই চঞ্চল। মুখখানি সুন্দর কিন্তু দুষ্টুমিমাখা। চুল চাষাদের মত ছােট করে ছাঁটা; গায়ে একটা ছেড়া জারকিন, পরনে তুর্কি ইজের। চায়ের পেয়ালাটা আমি তার হাতে দিলাম। চায়ে চুমুক দিয়েই সে মুখ বাঁকাল। “রাজা, দয়া করে ওদের বলাে আমায় এক গেলাস ভােডকা দিতে। কশাকেরা চা খায় না।” আমি অমনি ফরমাস করলাম। আলমারি থেকে হােটেলওয়ালা বােতল আর গেলাস বের করল, আগন্তুকের কাছে এসে তার মুখের ওপর চোখ রেখে বলল : “আহা! আবার তুমি আমাদের এদিকে এসেচ? কোথেকে আসচ ? আমার পথপ্রদর্শক এসারা ক'রে হেঁয়ালীর ভাবে বলল । “সবজীবাগানে ঘুরে গােটা কতক শণের বীজ কুড়তে গিয়েছিলাম * ঠাদি একখানা পাথর ছুড়ে মেরেছিল, কিন্তু আমায় লাগে নি। তােমরা কেমন আছ ভাই ?* হােটেলওয়ালা হেঁয়ালীতেই বলল “এদের কথা বলে না। সন্ধ্যা উপাসনার জন্য এরা ঘণ্টা বাজাতে চায়। পাত্রীর বৌ নিষেধ করলে ! পাদ্রী সফরে বেরিয়েছে, তাই সয়তানের দলও মাথা তুলেচে।” পথিক উত্তর দিল, “চেপে যাও খুড়াে, জল পড়লেই ব্যাঙের ছাতা গজাবে। আর ব্যাঙের ছাতা গজালেই তার জন্য বুড়ির অভাব হবে না। এখন আবার অর্থপূর্ণ এসারা, “কুড়ল এক কোণে ২২ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী লুকোও, বনে পাহারা বেরিয়েছে। রাজা, 'এই তােমার স্বাস্থ্যপান করছি।” এই বলে পথিক গ্লাসটি নিল ; ক্রুশচিহ্ন করে এক চুমুকে ম নিঃশেষ করল। তারপরে আমাকে নমস্কার করে উননের পাশে তাকের ওপর ফিরে গেল। এই রকম চোরা কথাবার্তা তখন কিছুই বুঝতে পারিনি। পরে অনুমান করেছিলাম তারা ইয়েক কশাকদের কথা বলচে। ১৭৭২ সালের বিদ্রোহের পর তখন তারা সবে ঠাণ্ডা হয়েছে। সাভেলিচ, এই সব কথা শুনছিল, অত্যন্ত বিরক্ত ভাবে। হােটেলওয়ালা ও পথিক দুজনাকেই সে সন্দেহের চোখে দেখছিল। সবাইটা সেই জনহীন প্রান্তরে একখানি মাত্র ঘর, ডাকাতের আড্ডা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। কিন্তু উপায় নেই। ফের রাস্তায় বের হওয়ার কল্পনাও করতে পারলাম না। সাভেলিচের দুশ্চিন্তা দেখে আমার ভারি আমােদ লাগচিল। ইতিমধ্যে রাত কাটাবার আয়োজন শেষ করে আমি বেঞ্চে শুয়ে পড়লাম। উননের পাশে সাভেলিচ, বিছানা পাতল। হােটেলওয়ালা মেঝেয় শুয়ে পড়ল। নাক ডাকার শব্দে ঘর- খানি তখনই মুখর হয়ে উঠল। আমিও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হ’লাম । পরদিন উঠতে দেরী হল। উঠে দেখি ঝড় কমেচে। সূর্য উঠেছে। সেই সীমাহীন প্রান্তর ঝকে বরফের পরদায় টাকা ! ঘােড়া জোতা হ’ল। গেটেলওয়ালার পাওনা বুঝে দিলাম। সে এত কম চাইল যে সাভেলিচও দর কসাকসি করল না, যেটা তার মজ্জাগত অভ্যাস। আগের রাত্রের সব সন্দেহ তার দূর হয়ে গেল। আমাদের পথপ্রদর্শককে ডাকলাম, তার সাহায্যের জন্য তাকে ধন্যবাদ দিলাম ; সাভেলিচকে বললাম, “ভােড় কা খেতে একে আধ রুবল বকশিশ দাও।”
পথ প্রদর্শক
২৩
সাভেলিচ, কটাক্ষ কল। বল “আধ-রুবল। কেন? একে গাড়ী
করে সরাই পৌছে দিয়েচ, এই জন্য ? তুমি যাই বণ, আর আধ
রুবল খরচ করবার যাে নেই। যদি সবাইকে বকশিশ দিই তার
তু
অনাহারে মরতে হবে।”
সাভেলিচের সাথে তর্ক চলে না। আমি কথা দিয়েছিলাম টাকা
তার জেম্মায় থাকবে। ঐ রকম অসুবিধা-বিপদ বললেও অত্যুক্তি হয়
—তা থেকে যে লোকটা বাঁচাল তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে না
পেরে বড়ই বিরক্ত হলাম।
শান্তভাবে বললাম, “আচ্ছা বেশ ; যদি আধ-রুবল না দিতে চাও,
আমার কাপড়চোপড় থেকে কিছু দাও। ওর গায়ে বড় পাহলা জামা।
আনা খরগােসের চামড়ার জ্যাকেটটা ওকে দাও।”
সাভেলিচ চেঁচিয়ে উঠল, “বাপরে! তুমি ক্ষেপেচ ? খরগাে
চামড়ার জ্যাকেটে ওর কি হবে ? সামনে সরাপখানা পেলেই ত সেটা
বাধা দেবে! বেটা কুকুর!
পথিক বল, “বুড়াে, আমি সেটা মদের জন্যই বেচি আর যাই করি
তাতে তােমার কাজ নেই। রাজা আমাকে নিজের পশমের জামাটা
দিচ্ছেন, তার যা খুসি তাই করচেন। তুমি চাকর, তােমার কাজ তার
হুকুম তামিল করা-তর্ক করা নয়।”
সাভেলিচ রেগে বল্ট, “তুমি ডাকাত। তােমার ভগবানের ভয়
নেই ? দেখচ ছেলে মানুষ, এখনও কাণ্ডজ্ঞান হয় নি, সরল ছেলেটিকে
ঠকাতে যাচ্চ? ভদ্রলােকের জামা তােমার কি কাজে আসবে ? তােমার
ঐ চোয়াড়ে ঘাড়,কি ওতে ঢুকবে ?”
বুড়ােকে বললাম, “তর্ক করে না; এখখুনি জামাটা নিয়ে এস।”
সাভেলিচ, আর্তনাদ করে বল্ল “হে ভগবান! তাও কি হয় ?
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী জামাটা যে একেবারে নতুন ! এমন জিনিস দেওয়া, তাও আবার একটা মাতালকে-এযে পাগলাম।” যাই হােক জামাটা এল। চাষা ত তথ খুনি সেটা পরতে গেল। সেটা আমার ছােটবেলার ; তার গায়ে একটু আঁট হবেই। কিন্তু সে সেটা প’রলপ’রতে গিয়ে সেলাই ছিড়ে গেল। পট পটু শব্দ শুনে সাভেলিচ হায় হায় করতে লাগল। ‘আমার বকশিশ পেয়ে পথিক খুব খুসি হ’ল। গাড়ী পর্যন্ত সঙ্গে গিয়ে নত হয়ে নমস্কার করে বল্*রাজা, তােমায় অনেক ধন্যবাদ দিচ্চি। ভগবান তােমাকে দয়াশীলতার পুরস্কার দিন। যতদিন বাঁচব, তােমার দয়ার কথা ভুলব না।” সে তার পথ ধরল। আমি গাড়ীতে চালাম। সাভেলিচের দিকে আর চাইলাম না। খানিকপরেই আগের দিনের বরফঝড়, পথপ্রদর্শক ও জামার কথা একদম ভুলে গেলাম ওরেনবুর্গে পৌছেই সোজা সােনাপতির সনে হাজির হলাম । গাঙা লােকটি, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। লম্বা চুল গুলাে একেবারে সাদা হয়ে গিয়েছে। পুরান পােষাকটার রং জ্বলে গিয়েছে—দেখে রাণী জ্ঞানের যুগের বলে মনে হয়। কথায় জৰ্ম্মাণ উচ্চারণের প্রাবল্য। বাবার চিঠিখানা তাকে দিলাম। আমার নান করতেই তিনি আমায় একপলক দেখে নিয়ে বললো, “দয়ালু ভগবান! এfণ্ড পেট্রভিচ ত’ সে দিন তােমার বয়েসী ছিলেন। এই কদিনে কত বড় ছেলে হয়েছে তার! সময় কেমন উড়ে যায়।” চিঠিখানা খুলে তিনি নীচু গলায় পড়তে লাগলেন, আর মাঝে মাঝে টিপ্পনী করতে লাগলেন, “প্রিয় সার এণ্ডি, কালোভিচ, আশা করি আপনি” এত ফাঁকা ফাঁকা কেন ? ছি! তার লজ্জিত হওয়া পথ প্রদর্শক উচিত ছিল। আদব দরকার বটে, কিন্তু পুরান বন্ধুকে লেখবার কি এই রীতি? ‘আপনি বােধ হয় ভােলেন নি,••••••••“এবং যখন ভূতপূৰ্ব ফিল্ড মার্শাল মিনি..••••সেই অভিযান এবং কারােলিন ওহে ভায়া, ছেলেবেলার সেই দুষ্টুমিগুলাে মনে আছে দেখচি! এইবারে কাজের কথা পাড়ি.•••••আমার ছােট্ট সয়তানটিকে তােমার কাছে পাঠাচ্চি।••••••• ‘তাকে বেশ কাটা দস্তানা দিয়ে ধরে রাখবে। কাটা দস্তানা কি ? রুশ বুলি বােধ হয় ? ওটার মানে কি ?” আমায় জিজ্ঞাসা করলেন। যতদূর পারি নিরীহ ভাল মানুষের মত মুখ করে বাম “ওটাব মানে উদারভাবে ব্যবহার করা, বেশী কড়া না হওয়া, যথেষ্ট স্বাধীনতা দেওয়া।” ‘হু, বুঝলাম.•••••‘তাকে বেশী আস্কারা দেবে না। উহু, বােঝ যাচ্চে কঁাটা দস্তানা মানে অন্যরকম কিছু•••••এই যে তার ছাড়পত্র কই কোথায় ? ওঃ, এই যে......‘সেমিনফস্কি সেনাদলে ভর্তি করে বেশ, বেশ, তা করবাে••••••‘তােমার উচুপদের কথা ভুলে গিয়ে, পুরাণ বন্ধু ও সহকৰ্মী হিসাবে তােমায় আলিঙ্গন করচি, মাপ কোরাে। এহে, শেষকালে কথাটা মনে পড়েছে..••• ইত্যাদি, ইত্যাদি। চিঠি শেষ করে, পাশপাের্টখানা সরিয়ে রেখে তিনি বললেন, “ভাল, বাছা ! তােমার বাবা যা চেয়েছেন ঠিক তাই করা হবে। তােমাকে ‘অফিসর’ করে ন-রেজিমেন্টে বদলি করলাম। দেরী না করে কালই তুমি বেলগরস্কি দুর্গে কাপ্তান মিরনফের অধীনে কাজ করতে যাবে। তিনি খুব ভাল, সম্মানী লােক। সেখানে সত্যিকার কাজ করতে হবে, নিয়মনিষ্ঠাও শিখবে। ওরেনবুর্গে তােমার যােগ্য কাজ নেই। কুড়েমি ছােরাদের পক্ষে খারাপ। আজ রাত্রে তুমি আমার ওখানে খাবে।”
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী ভাবলাম “অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্চে। জন্মাবার আগেই রক্ষীদলের সার্জেন্ট হয়ে থেকে লাভ ত’ হ’ল খুব! শেষকালে চল্লাম কোথায় ? কিরঘি প্রান্তরের সীমানায় এক জনহীন দুর্গে—ন-রেজিমেন্টে। এণ্ডি কালোভিচ এবং তার শরীররক্ষীর সাথে রাত্রে ভােজন করা গেল। আহার বিষয়ে কড়া জৰ্ম্মান মিতব্যয়িতার পরিচয় পেলাম। দুচারজন অতিথি আসবার ভয়েই বােধ হয় আইবুড়াে সেনাপতি আমায় তাড়াতাড়ি বিয়ে দিলেন। পরদিন সেনাপতির কাছে বিদায় নিয়ে আমি গন্তব্য স্থানের দিকে রওনা হলাম ।
তীয় পরিচ্ছেদ
দুর্গ।
“ধূ ধূ করে মাঠ, নাহিক জন মানব,
দুর্গের মাঝে আছি বেশ মোরা সব।
ভােজনের নাই কোন আয়ােতন ঘটা
সুখে কেটে যায় জীবনের দিম ক’টা।
শক্ত অতিথি আসিলে মোদের ঘরে
ফিরিয়া কখনো নাহি যাবে অনাহারে ;
কামানের মুখে কত না খাবার পূরি
পরম আদরে অতিথির সেবা করি " সৈনিকের গান ।
“সেকেলে মানুয আমরা, মশাই।” ফন্ তিনি।
বেলগরস্কি দুর্গ ওরেনবুর্গ থেকে ২৫ মাইল দূরে, রাস্তা গিয়েছে বার
ইয়ে নদীর পাড় তীর বেয়ে। নদীর জল তখনও জমে নি; বরফে
ঢাকা, একঘেয়ে দুটিতীরের মাঝখানে সীসের মত কালাে ঢেউগুলি,
যেন শশাকে মলিন। ওপারে কিরঘি প্রান্তর দিগন্তে গিয়ে মিশেছে।
আমি চিন্তায় ডুবে আছি—তার পর আর দুঃখের চিন্তা। দুর্গে যেতে
আমার আদৌ মন সছিল না। ভাবী উপরওয়ালা, কাপ্তান মিরনফকে
মনে মনে আঁকলাম—কড়া, বদমেজাজী বুড়াে, নিয়মশৃঙ্খলা ছাড়া কিছুরই
তােয়াক্কা রাখে না—কথায় কথায় আমাকে গ্রেপ্তার করে, শুধু রুটজল
খাইয়ে রাখতে হাত বাড়িয়ে আছে। এরই মধ্যে গােধূলির আঁধার নেমে
এল। আমাদের গাড়ী খুব তাড়াতাড়ি ছুটছিল।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী কোচম্যানকে জিজ্ঞাসা করলাম, “দুৰ্গটা অনেক দূর নাকি হে ?” উত্তর—“না, দূর নয়, ঐ সেখানে। এখান থেকে দেখা যায়। আমি এধার ওধার চেয়ে দেখছি—বুঝি বা মস্ত উচু প্রাচীর, রক্ষীদের ধর, পরিখা ইত্যাদি দেখতে পাব। কিছু নয়, একখানি পল্লী, কাঠের খুঁটির বেড়া দিয়ে ঘেরা। তার একধারে গুটি তিনচার খড়ের গাদা, অপর ধারে একটি ভাঙা হাওয়াকল, তার পাখাগুলি অচল হয়ে আছে। আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “কই, তােমার দুর্গ কই?” কোচম্যান সেই পল্লীখানি দেখিয়ে বল, “কেন, এই যে !” বলতে বলতে আমরা সেই পল্লীর ভিতরে এসে পড়লাম। ফটকে দেখলাম, ঢালা লােহার একটা কামান, রাস্তাগুলাে সরু আঁকা বাঁকা, ঘরগুলি ছােট, খড়ে ছাওয়া। কোচম্যানকে বললাম কাপ্তানের বাড়ী নিয়ে যেতে। মিনিট খানেক পরে গাড়ী একটা উঁচু ঢিবির ওপর তৈরী একটা কাঠের বাড়ীর সামনে এসে থাল, তার পাশে একটা গির্জা, সটাও কাঠের তৈরী। আমাকে এগিয়ে নিতে কেউ এল না। ফটক দিয়ে ঢুকে, দোর খুলে সানের ঘরে ঢুকলাম। একটি বুড়ো টেবিলের ওপর বসে একটা সবুজ উর্দির আস্তিনে নীল পট লাগাচ্চিল। পট লাগাচ্চিল। তাকে বললাম আমার আসার খবর দিতে। সে বলল, “এস বাবা, আমাদের সবাই বাড়ীতে আছে।” ছােট্ট একটি পরিষ্কার কামরায় ঢুকলাম-সেকেলে ধরণে সাজান। এক কোণে আলমারিতে বাসন পত্র গুছান রয়েছে। ফ্রেমে আঁটা একখানা অফিসরের ডিপ্লোমা দেয়ালে ঝুলান। তার দুধারে, “চাকফ, ও কুঞ্জীন অধিকার”, “কনে বাছাই”, “বিড়ালের অন্ত্যেষ্টি ইত্যাদি
দুর্গ।
;
রঙীন ছবি ঝক ঝক', করছিল। দেশী জ্যাকেট পরা একটি বৃদ্ধা
জানলার ধারে বসেছিলেন, আর মাথা রুমালে ঢাকা। অফিসরের
উর্দি পরা একটি কাণা বুড়াে হাত বাড়িয়ে সুতাে ধরে ছিল; বৃদ্ধা তাই
গুটাচ্ছিলেন।
হাতের কাজ করতে করতে বৃদ্ধা আমায় জিজ্ঞাসা করলেন কি
চাই মশাই আপনার ?
উত্তর দিলাম, “ফৌজে চাকরী করতে এসেছি। কাপ্তানকে
নমস্কার জানান আমার কর্তব্য।” এই বলে আমি সেই এক চোখে
বুড়াের দিকে চাইলাম। ভাবলাম, সেই বা কাপ্তান হবে। বাড়ীর
কত্রী আমার বক্তৃতায় বাধা দিয়ে বলেন :
“ইভান কুজমিচ বাড়ী নেই। পাদ্রী জেরাসিমের সাথে দেখা
করতে গিয়েছে। তা হােক, আমি তার স্ত্রী। আপনি আসায়
আনন্দিত হচ্চি। বসুন।*
ঝিকে ডেকে বললেন সার্জেন্টকে ডাকতে। বুড়ো তার সঙ্গীহীন
উৎসুক চোখটি দিয়ে বার বার আমায় দেখতে লাগল। আয়
জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কোন্ রেজিমেন্টে কাজ করেছেন জিজ্ঞাসা
করতে পারি কি ?
আমি যথারীতি উত্তর দিলাম।
সে বলল, “রক্ষীদল থেকে গড়ের ফৌজে বদলি হলেন কেন,
জানতে পারি কি ?
উত্তর দিলাম, “আমার গুরুজনের এই ইচ্ছ।”
সেই নাছােড়, বুড়াে বল “বােধ হয় রক্ষীদলের কর্মচারীর পক্ষে
অন্যায় কোন আচরণের জন্য ?
কাপ্তানগৃহিণী বাধা দিয়ে বললেন, “নাও, ঢের বাজে বকেচ।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
দেখতে পাচ্চ ছেলেমানুষ পথ চলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ওসব কথা
ওর কেন ভাল লাগবে? হাতটা টান্ কর দেখি ?”
আমার দিকে চেয়ে বৃদ্ধা বলেন, “বাছা, তুমি এই বনবাসে এসে
পড়ে বলে কষ্ট করে না। এখানে তুমিই প্রথম আসনি; তােমার
পরেও অনেকে আসবে। সাব্রিন আলেকসি ইনিচ পাঁচ বছর আগে
এখানে বদলি হয়ে এসেছে। সে একটি লােককে খুন করেছিল।
ভগবান জানেন কি ভূত তার ঘাড়ে চেপেছিল।
ভূত তার ঘাড়ে চেপেছিল। একজন লেফটুনান্টের
সাথে সে সহর থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর দুজনে কিরিচ নিয়ে
খোঁচাখুঁচি করতে করতে লেফটুনান্টের দফা শেষ হ’ল। তাও
আবার দুজন সাক্ষীর সাননে ! এই ত ব্যাপার! কার যে কখন
কুমতি হয়, তাকি বলা যায় ?
ইতিমধ্যে সেই সার্জেন্ট—একটি বলবান কশাক যুবক—ঘরে ঢুকল।
কাপ্তান গিন্নি বলেন, “ম্যাসিমিচ, এই ভদ্রলােকের থাবার
ঘর দেখ। দেখাে যেন সেটা বেশ পরিষ্কার হয়।”
কশাক উত্তর দিল “যে আজ্ঞে । এর থাবার ঘর ইভান
পােলেজায়েফের ওখানে দেখব কি ?”
মহিলা বললেন “কথখনন না! তার বাড়া ভতি; সে বন্ধু
লােক, তার সব সময়ে মনে থাকে আমরা তার মুরুব্বি। ভদ্রলােককে
নিয়ে যাও••••"আপনার নামটি কি?”
“পিটর এণ্ডিচ।”
“পিটর এণ্ডিচকে নিয়ে যাও কুজফের বাড়ী। সেই সয়তান
তার ঘােড়া ছেড়ে দিয়েছিল আমার সবজী বাগানে। ভাল, ম্যাসিমিচ,
সব খবর ভাল ত ?”
কশাক উত্তর দিল, “ভগবানের দয়ায় সব খবর ভাল। কে
দুর্গ
করপােরাল প্রহরফ উসটিনিয়ার সাথে এক বালতি গরম জল নিয়ে
গােসলখানায় ঝগড়া করেছিল।
কাপ্তান গিন্নি সেই একচোখাে বুড়ােকে বললেন “ইভান ইগ্নিটিচ
তুমি ব্যাপারটার তদন্ত কর। দেখ কার দোষ। আর দুজনকেই শাস্তি
দাও। পিটর এচি, ম্যাসিমিচ তােমায় তােমার বাড়ী নিয়ে যাচ্ছে।”
আমি বিদায় হ’লাম। কশাকটি আমাকে গায়ের ঠিক সীমানায়, .
নদীর উচু তীরে একথানা কুঁড়ে ঘরে নিয়ে এল। ঘরের অর্ধেকটায়
কুঁজফের পরিবার থাকত, আর অর্ধেকটা আমি পেলাম। আমার
অংশে ছিল একটি পরিষ্কার কামরা, বেড়া দিয়ে
বেড়া দিয়ে দুভাগ করা।
সাভেলিচ মাল খুলতে সুরু করল। আমি ছােট জানলা দিয়ে
বাহিরের দিকে চেয়ে রইলাম।
সম্মুখে বিস্তৃত প্রান্তরের বিষাদমাখা ছবি। এক ধারে ক’খানা
কুঁড়ে ঘর দেখা যাচ্ছিল। কয়েকটি মুরগী বুক ফুলিয়ে
রাস্তায় ছুটাছুটি করছিল। এক বুড়ী চুবড়ী হাতে ঘরের পৈঠের ওপর
দাড়িয়ে শূয়ােরের বাচ্চাগুলােকে ডাকছিল। তারা আহলাদে ঘঁৎ বৎ
করে সাড়া দিচ্ছিল। এমন জায়গায় যৌবনটা কাটাতে হবে।
অদৃষ্টের পরিহাস! হঠাৎ বড়ই দুঃখ হতে লাগল। জানলা ছেড়ে
বিছানায় গিয়ে শুয়ে
পড়লাম। সাভেলিচের অনেক পীড়াপীড়িতেও
কিছু পেলাম না। সে বেচারা নিতান্ত বিব্রত হয়ে বলতে লাগল :-
“হে দয়ালু ভগবান, বাছা খাবে না-বাছার যদি অসুখ করে
তবে কী আমায় কি বলবেন?”
পরদিন সকালে সবে পােষাক পরুচি এমন সময়ে দরজা খুলে
গেল ; একটি অল্পবয়সী কর্মচারী ঘরে ঢুকল। লােকটি বেঁটে, রং
ময়লা, মুখখানা সাদাসিদে কিন্তু প্রফুল্প।
সম্মুখের
রাশিয়ায় দুর্গেশনন্দিনী সে ফরাসী ভাষায় বল, “কোনও শিষ্টাচার না দেখিয়েই যে আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম সেজন্য মাপ করবেন। আপনার আসার খবর কাল পেয়েছি, মানুষের মুখ দেখবার লােভটা সামলাতে পারলাম না। কিছুদিন এখানে থাকলেই অবস্থাটা বুঝতে পাবেন।” অনুমানে বুঝলাম, দ্বন্দ যুদ্ধের জন্য যে লােকটি বরখাস্ত হয়েছে এ সেই। তথখুনি আমাদের ভাব হয়ে গেল। সাব্রিন খুব চালাক, কথাবার্তা ভারি মিষ্টি, রসিকতায় ভরা। কাপ্তান পরিবার, দুর্গটি এবং স্থানীয় বন্ধুবান্ধবের চমৎকার একটি বর্ণনা তার কাছে পাওয়া গেল। আমার হাসির রােলে চারদিক মুখর হয়ে উঠল। এমন সময় যে লােকটিকে কাপ্তানের বাড়ীতে উর্দি মেরামত করতে দেখেছিলাম সে এসে জানাল, ভাসিলিসা ইগরফ না আমায় নেমন্তন্ন করেছেন। সাব্রিন বল সেও আমার সঙ্গে যাবে। কাপ্তেনের বাড়ী যেতে স্কোয়ারে জন কুড়ি দুর্গরক্ষী সৈন্য দেখতে পেলাম, তাদের মাথায় তিনকোণা হাট, পিছনে লম্বা বেণী। তারা “অ্যাটেনসনের” কায়দায় দাড়িয়ে ছিল। কাপ্তান-ঢ্যাঙা, বলিষ্ঠ, বুড়ােমানুষটি-নাইট ক্যাপ আর ড্রেসিং গাউন পরে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন, গুটিকত মিষ্টি কথা বলে, ফিরে গিয়ে আবার কুচকাওয়াজ করাতে লাগলেন। আমরা দাড়িয়ে দেখছিলাম। তিনি বললেন, “এখানে দেখবার মত কিছু নেই, আমার ওখানে যাও, আমিও আচি। ভাসিলিসা ইগরফনা আমাদের খুব সমাদর করলেন। তার মিষ্টি ব্যবহারে মনে হ’ল তিনি আমায় জন্ম থেকেই জানেন! বুড়াে সেপাই, আর ঝি পালাসা খাবার সাজাচ্চিল।
দুর্গ। কত্রী বললেন, “ইভান কুজমিচ আজ ড্রিলে দেরী করনে। ক’রনে । পালাসা, কাকে খেতে ডাক্। আর, মাসা কোথায় ?? অমনি বছর আঠারাের একটি মেয়ে এসে দাড়াল--তার মুখখানি গােল, গােলাপী আভা মাখান। সুন্দর চুলগুলি সমান ভাবে কানের পিছন দিকে পাট করে আঁচড়ান—তখন কান দুটি লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। প্রথম দৃষ্টিতে তাকে আমার পছন্দ হ’ল না। আগেই আমার মন বিরুদ্ধভাবে ভাবিত হয়ে ছিল। কাপ্তানকন্যা মাসাকে সাব্রিন নিতান্ত হাবা বলে বর্ণনা করেছিল। মাস। এক কোণে বসে সেলাইএর কাজ কাজ শুরু করল। ইতিমধ্যে বাঁধাকপির ‘সুপ” পাতে পড়ল। স্বামীকে না দেখে কত্রী আবার ডেকে পাঠালেন। বলেন, “পালাসা, কাকে গিয়ে বলে, অতিথিরা বসে আছেন, ‘সুপ’ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে । ভগবানের ইচ্ছা! ইচ্ছার ড্রিল করবার সময় ঢের পাওয়া যাবে। ফিরে গিয়ে খুব চেঁচাতে পারবেন।” একটু পরেই কাপ্তেন সেই এক চোখে বুড়াের সাথে এসে পৌছলেন। তার স্ত্রী বললেন, “তােমার হয়েছে কি, প্রিয়তম ? দেওয়া হয়েছে কোন্ কালে, অথচ তোমার দেখা নেই।” “আমি সৈন্যদের ড্রিল করাচ্চিলাম, জানলে ভাসিলিসা ইগরফ না!” কত্ৰী উত্তর দিলেন, “নাও, রাখাে, তােমার “নাও, রাখাে, তােমার ওসব ড্রিল ফ্রিল ভণ্ডামি, তােমার সৈন্যেরা কিছ ছু শেখে না তুমিও তেম্নি ওস্তাদ। বরঞ্চ বাড়ী বসে ভগবানের নাম করে। বাছারা, টেবিলে এসে বসো।” খেতে বসা গেল। কী এক মিনিটও চুপ করে রইলেন না। চোটে আয় জর জর করে ফেললেন। আমার বাপ, মা কে, বেঁচে আছেন কিনা, কোথায় থাকেন, কত বড় বিষয় ।
৩৪':
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
হত-দি। আমার বাবার তিনশ’ চাষী চাকর আছে শুনেই বললেন
“ভাবব ব্যাপার খান। কত বড় বড় লােকই না আছে! দেখ
বাছা, আমাদের ঐ এক ঝি পালাস্কা। কিন্তু কি দয়া ভগবানের
আমরা আছি বেশ সুখে। একই কষ্ট মাসার কে হয় নি; কিন্তু
তার যৌতুকের মধ্যে আছে একখানা চিরুণী, একগাছা খ্যাংরা আর
পিতলের একটি ফারদিং। যদি তার যােগ্য কেউ আসে, বেশ
কথা। নইলে হতভাগী আইবুড়ােই মরবে।”
আমি মেরিয়া ইভাননার দিকে চাইলাম । সে লজ্জায় লাল
হয়ে উঠল ; চোখের জল তার থালায় পড়তে লাগল। তার জন্য
আমার দুঃখ হ’লআমি তাড়াতাড়ি অন্য কথা পাড়লাম ।
নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক ভাবে বলাম, “শুনেছি বকিরা আপনাদের
দুর্গ আক্রমণ করছে ?”
ইভান কুজমিচ জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় এ খবর পেলে ?”
উত্তর—“ওরেন বুর্গে শুনেছি।”
কাপ্তান বললেন, “ওসব বিশ্বাস করাে না। ক’ বছর ।
'আমরা তেমন কোনও খবর পাই নি। বকিরা ভয় পেয়েছে
কিরঘিসদেরকেও বেশ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ভয় নেই, এরা
আর আসবে না। যদি আসে, এমন শিক্ষা দেবে যে দশ বছর
আর মাথা তুলতে পারবে না।”
কীকে বললাম, “দুর্গে এত উদ্বেগের মধ্যে থাকতে আপনি ভয়
পান না ?
তিনি বললেন “অভ্যাস হয়ে গিয়েছে বাছা! বিশ বছর আগে
যখন সেনাদল থেকে দুর্গে বদলি হলাম, তখন ঐ অসভ্য ডাকাত
দের কি যে ডরাতাম তা বলে বুঝাতে পারি না। বলে বিশ্বাস
দুর্গ করবে না, তাদের চামড়ার টুপী দেখলেই, কিম্বা হাঁক্ লেই আমার বুকের ধুকধুকি থেমে যেত। এখন যদি নি বদমাগুলাে দুর্গের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমিত’ নড়িও না।” সাব্রিন খুব ঘটা করে উত্তর দিল, “ভাসিলিসা ইগরফনা খুব সাহসী। ইভান কুজমিচ তার সাক্ষী।” ইভান কুজমিচ বললেন, “হাঁ, গিন্নি তীরু নন্, এবিষয়ে তােমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পার।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আর মেরিয়া ,ইভানভ না? ইনিও কি আপনারই মত সাহসী ?” কর্তী উত্তর দিলেন, “মাসা? না, মাসা বড্ড ভীরু, এখনও রাইফেলের আওয়াজ শুনে ভয় পায়, ওর সারা শরীর কাঁপতে থাকে। দু'বছর আগে ইভান কুজমিচের খেয়াল হ’ল আমার জন্মদিনে আমাদের তােপটা দাগা হবে। বেচারা মাসাত ভয়ে মরে! সেই- দিন থেকে অপয়া কামনটা আর ছোঁড়া হয় নাই।” খাওয়া শেষ করে উঠলাম। কাপ্তান আর তার স্ত্রী শুতে গেলেন। আমি সাব্রিনের ওখানে গেলাম। সারাদিন সেখানেই কাটল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ দ্বন্দ্ব যুদ্ধ “বেশ কথা । তবে পঁাড়াও সাহসি, সম্মুখে, নিমেষে বসা শাণিত কৃপাণ ঐ বুকে।” নিয়ঝ নিন কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। এর মধ্যে বেলগরস্কি দুর্গ আমার শুধু ধাত সওয়া হয়ে গেল বললে ভুল হবে, আমার কাছে সুখের হয়ে । কাপ্তান পরিবারের মধ্যে আমিও একজন হয়ে পড়লাম । স্বামী স্ত্রী দুজনেই অতি যােগ্য লােক। ইভান কুজমিচ • সামান্য সিপাইএর পদে থেকে ক্রমে কাপ্তান হয়েছিলেন। তিনি সরল, অশিক্ষিত, কিন্তু অতি উদার, সম্মানী লােক। স্ত্রী যে তার ওপরে প্রভুত্ব করতেন, তার সহজ সরল মন তাতে খুশিই হ'ত। ভাসিলিসা ইগরন তার স্বামীর ফৌজের কাজও তার ঘরােয়া ব্যাপার বলে মনে করতেন, এবং ঘরকন্নার মত দুর্গও তিনিই চালাতেন। আমায় দেখে মেরিয়া ইভানভনার যা লজ্জা তা দুদিনেই দূর হ’ল ; আমাদের বেশ ভাব হল। দেখলাম মেয়েটির বুদ্ধি আছে ; প্রাণও আছে । অজ্ঞাতসারে সেই পরিবারের মেহে বাঁধা পড়ে গেলাম। এক চোখে লেফটনান্টকেও আমার আপনার বলে মনে হ’ল! সাব্রিন বত যে কত্রীর সাথে তার একটা অসঙ্গত সম্বন্ধ আছে—যদিও একথায় সত্যের লেশমাত্র ছিল না। কিন্তু সাব্রিন সত্যাসত্যের ধার ধারত না। আমি অফিসার । অামার সামরিক কাজ কিছু শক্ত ছিল না। আমাদের সুখের দুর্গে দুর্গে প্যারেড় ছিল না, ছিল না, ছিল ছিল না। ;
দ্বন্দ্ব যুদ্ধ
৩৭
দু'এক দিন কাপ্তান স্বেচ্ছায় সৈন্যদের শিক্ষা
শিক্ষা দিতেন, কিন্তু ডান
আর বাঁ হাতে কি তফাৎ তা সবাইকে শিখিয়ে উঠতে পারেন
নাই। সাব্রিনের কখানা ফরাসী বই ছিল আমি পড়তে শুরু
করলাম—সাহিত্যে আমার বেশ রুচি হল সকাল বেলা পড়তাম,
তরজমা করতাম আর কবিতা লিখতাম। প্রায় রােজই কাপ্তানের
বাড়ীতে খেতাম এবং সারাদিন সেখানেই কটুত। সন্ধ্যাবেলা পাদ্রী
জেরাসিম এবং তার স্ত্রী আকুলিনা পাস্ফিলভন কখনও আসতেন। এই
মহিলাটি ছিলেন সে তল্লাটের গেজেট। সাব্রিনের সাথেও আমার রােজই
দেখা হত। কিন্তু তার কথাবার্তা ক্রমেই আমার বেশী অরুচিকর
হয়ে উঠল। কাপ্তান পরিবারকে লক্ষ্য করে তার হাসি মস্কারা,
বিশেষতঃ মেরিয়া ইভানার প্রতি বিপের
কটাক্ষ, আমার অসহ
হয়ে উঠল। দুর্গে আর কোনও লােক ছিল না যার সাথে আলাপ
করতে পারি—আর কারও সাথে মিশতে ইচ্ছাও হত না।
প্রবল আশঙ্কা সত্বেও বসকিররা বিদ্রোহী হ’ল না। দুর্গের
চারদিকে শান্তি অক্ষুন্ন রয়ে গেল। কিন্তু ভিতরের গােলমালে হঠাৎ
সেই শান্তি নষ্ট হল।
আগেই বলেছি আমি সাহিত্যচর্চা করতাম। তখনকার
মাপকাঠি দিয়ে বিচার করলে আমার লেখা খারাপ বােধ হবে না।
কবছর পরে কবি সুমনােকফ, সেগুলির প্রশংসাই করেছিলেন।
একদিন একটি গান লিখতে পেরে বেশ তৃপ্তি বােধ করলাম।
সবাই জানেন পামর্শ চাইবার ভাণ করে লেখকেরা অনেক সময়
সমঝদারের কাছে একটু প্রশংসা চান। সুতরাং গানটি পরিষ্কার
করে লিখে সাব্রিনের কাছে নিয়ে গেলাম। দুর্গে সেই একমাত্র
লোক ছিল যে কাব্যের গুণাগুণ বিচার করতে পারে। একটু
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিন
{
ভূমিকা করে নিয়ে পকেট থেকে নােটবুকখানা নিলাম এবং নীচে
লাইন ক’টি পড়লাম :-
ভুলিব কেমনে ভালবাসা।
রূপ যে সড়ত জাগে, নয়ন দরশ মাগে
ছাড়িত পারি না তব আশা।
( মনে শান্তি কেমনে পাই, জুড়াইতে ছুটে যাই,
কিব আসি দরশন লাগি ;
মাসী যাতনা দিও না মােরে, বন্দী আমি তব করে,
কি যাদু করেছে দুটি আঁখি।
সাব্রিনকে জিজ্ঞাসা করলাম “তােমার কেমন লাগছে ?” ভেবেছিলা
প্রশংসা ত পাবই। সাকিকে দরদী সমালােচক বলেই জানতাম
কিন্তু সে বল কিনা আমার গানটি বিশ্রী হয়েছে ! কি যে বির
লাম !
বিরক্তি গােপন করে বললাম, “কেন?”
“তােমার গান আমার ওস্তাদ ট্রেটিয়াকফস্কির * মতো—শুনে তার
প্রেমের কবিতার কথা মনে পড়ে।
আমার নােটবইখানা নিয়ে সাব্রিন প্রতি লাইনে প্রত্যেকটি কথা
নির্দয়, বিদ্রুপাত্মক সমালােচনা শুরু করল। আমি আর সইতে
পালাম না, নােটবইখানা তার হাত থেকে কেড়ে নিলাম। বললাম
“তােমায় আর কখখনাে আমার কবিতা দেখাব না। একই
শুনেও সে হাসতে লাগল। বলল, “আচ্ছা দেখব, কেমন তােমা
কথা ঠিক থাকে। ইভান কুজমিচের যেমন ঋওয়ার আগে মদ ন
* পুরান রুশ কবি-কষ্টে পদ্য লিখতেন, কিন্তু প্রতিভা ছিল না।
বন্দু যুদ্ধ
৩৯
'লে চলে না, কবিরও: তেম্নি শ্রোতা না হলে চলে না। আর
য মসার পায়ে মনের এই আবেগ ঢেলেচ, সেটি কে? মেরিয়া
ভানভ না নয় নিশ্চয়ই ?”
আমি ভ্রুকুটি করে বললাম “যেই হােক তা দিয়ে তােমার
'রকার ? তােমার অনুমানে আমার কাজ নেই, মতেরও দরকার নেই ?
“ওহহ, কি রগচটা কবি! কি একনিষ্ঠ প্রেমিক! আমার
ক্তি শােন; যদি সফলতা চাও, গান লেখা ছেড়ে অন্য চেষ্টা দেখ।”
শুনে আমার রাগ গেল আরও বেড়ে । বললাম, “তোমার
এই নীচ ইঙ্গিতের মানেটা বুঝিয়ে বল দেখি?”
“স্বচ্ছন্দে। বচি কি, সন্ধ্যাবেলা যদি মাস মিরনফের দেখা
পতে চাও, তবে কোমল কবিতা উপহার না দিয়ে একজোড়া
যার রিং উপহার দাও গে ।
আমার রক্ত ফুটতে লাগল।
অনেক কষ্টে রাগ সামলে জিজ্ঞাসা করলাম;--“তার সম্বন্ধে
তামার এ রকম ধারণাকেন, বল দেখি?
সয়তানী হাসি হেসে সে বলল, “কারণ, তার স্বভাব সম্বন্ধে
মামার বেশ অভিজ্ঞতা আছে।”
আমি ভয়ানক চেঁচিয়ে বললাম “সয়তা, তুমি মিছে কথা
{’লচ! একেবারে ডাহা মিছে কথা !”
সাব্রিনের মুখ লাল হয়ে উঠল। আমার হাত শক্ত করে ধরে
স ব’ এর ফল তােমায় ভােগ করতে হবে। এই অপমানের
প্রতিশােধ চাই।” ।
আমি একটু শোয়াস্তি বােধ করলাম। বললাম, “অবশ্য! যখন
তামার ইচ্ছা।” মনে হ’ল লােক্টাকে তখুনি টেনে ছিড়ে ফেলি।
৪০
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
তখনি ইভান ইগ্নেটিচের কাছে গেলাম। ভাসিলিসা ইগরফ নার
অনুরােধে সে চুচ, সুতাে নিয়ে ব্যাঙের ছাতা গাঁথছিল। শীতকালের
জন্য সেগুলি শুকিয়ে রাখা হবে।
আমায় দেখে সে বলল, “আঃ পিটর এণ্ডিচ, তোমায় দেখে ভারি
খুসী হলাম। কি সৌভাগ্য যে তুমি এলে। কি দরকার বলে দেখি ?
বাম “আলেকসি ইনিচের সাথে ঝগড়া করেছি। তােমায়
অনার সাক্ষী হতে হবে।”
সে আমার কথা বেশ মন দিয়ে শুল। সেই সঙ্গিহীন চোখটি
দিয়ে সে একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে রইল। তারপরে ব,
“অর্থাৎ তুমি আলোস ইভানিচকে মাবে, আর আমি তার সাক্ষী হব,
কেমন ?”
“ঠিক তাই।”
“হে ভগবান্ ! পিট এচি, তােমার এ মতি কেন? তােমরা
ঝগড়া কমচ,তাতে হয়েছে কি ? কথার লড়াইএ কোনই লােকসান
নেই। সে
তােমায় গাল দিয়ে থাকে, তুমি সেই গাল ফিরিয়ে
দাও। সে তােমার মুখে ঘুসি মেরে থাকে, তুমি তার কাণে মার,
দুবার, তিনবায়—তারপরে যে যার দেথ। আমরা দেখব
পরে যাতে মিটমাট হয়। কিন্তু একটি মানুষকে মেরে ফেলা ঠিক
কি ? যা করেই হােক, তুমি যদি আলেকসি ইভানিচকে মেরে
ফেল, এসে যাবে না কিছু কারণ তার ওপর আমার বড় একটা
টান নেই! - কিন্তু সে যদি তােমায় গেঁথে ফেলে? বােকা বনে
যাবে কে, বল দেখি?”
এই বৃদ্ধের সদযুক্তি আমার ভাল লাগল না, আমার সংকল্প অটল
রইল।
দ্বন্দ্ব যুদ্ধ ৪১ সে বলল, “যেমন তােমার খেয়াল। “যেমন তােমার খেয়াল। যা ভাল ােৈঝ কর, কিন্তু আমি তােমার সাক্ষী হতে গেলাম কেন ? দুজনে লড়াই করবে, তা দেখবার মতাে কি আছে? আমি সুইডিস্ যুদ্ধে গিয়েছি, তুর্কিদের সাথেও লড়েচি—আমার টের লড়াই দেখা আছে।” সাক্ষীর কর্তব্য তাকে বুঝিয়ে দিতে চাইলাম—সে কিছু শুনল না। : বলল “তােমার যা ইচ্ছা বল্তে পার। এ বিষয়ে আমার একই কৰ্তব্য ইভান কুজমিচকে বলা যে দুর্গের মধ্যে সরকারের স্বার্থবিরােধী ষড়যন্ত্র হচ্ছে—আর তাকে জিজ্ঞাসা করা এই পাপ নিবারণের কি চেষ্টা তিনি ক’রচেন।” আমি ভয় পেলাম । ইভান ইগ্নেটিচকে অনুরােধ করলাম, কাপ্তানকে যেন সে কিছু না বলে। অনেক চেষ্টর ফলে সে রাজী হল। আমি বিদায় •• নিলাম। অন্যদিনের মত সেদিনও সন্ধ্যাবেলাটা কাপ্তানের ওখানে 'কাটান গেল। যতদূর পারি, একটা প্রাণখােলা বেপরোয়া দেখাচেষ্টা করলাম, যাতে কারও কোনাে সন্দেহ না হয়। কিন্তু মনে আমার একেবারেই সােয়ান্তি ছিল না—যার বড়াই অনেকে করে থাকে। সেদিন সন্ধ্যাবেলা ভাবের জোয়ারে মনটা যেন বড়ই উতলা হয়ে উঠল। মেরিয়া ইভানভনার ওপর টান দশগুণ বেড়ে গেল। বুঝি বা এই তার সাথে শেষ দেখা—এই আশঙ্কাই আমার চোখে তাকে বেশী সুন্দর করে তুলল। সাব্রিনও সেখানে ছিল। তাকে গােপনে ডেকে ইভান ইগ্নেটিচের সাথে যে কথা হয়েছিল তা বললাম। সে শুষ্কভাতে উত্তর দিল, “সাক্ষীতে কি দরকার? বিনা সাক্ষীতেই চলবে।” ঠিক করলাম দুর্গের পাশে খড়গদার পিছনে লড়াই হবে। পরদিন
82
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
ভােরে ছ’টা থেকে সাতটার মধ্যে দুজনার সাক্ষাৎ হবে। আমরা এমন
বন্ধুভাবে কথা বলছিলাম যে ইভান ইগ্নেটিচ আনন্দের বাড়াবাড়িতে
আমাদের সব কথা ফাঁক করে দিল। সে হাসিমুখে বল, “এই ত’
চাই ! পাকা শত্রুতার চেয়ে কঁচা মিতালিও ভাল—গারে আঘাত লাগার
চেয়ে সম্মানে আঘাত ঢের ভাল।”
কী জিজ্ঞাসা করলেন, “কি হয়েছে, ইভান ইগ্নেটিচ ?" তিনি এক
কোণে বসে তাস দিয়ে ভাগ্য গণনা করছিলেন, তাই সব কথা শুনতে
পান নি।
ইভান ইগ্নেটিচ আমার বিরক্ত ভাব দেখে, নিজের প্রতিজ্ঞা মনে
করে ঘাবড়ে গেল ; কি বলবে ঠিক করতে পারুল না । সাব্রিন তাকে
বাঁচাতে চেষ্টা করে বল্ল, “ইভান ইগ্নেটিচ আমাদের সন্ধির পক্ষপাতী।”
“কিন্তু, তুমি ঝগড়া কলে কার শাথে, বাছা ?”
“ এণ্ডুিচের সাথে আমার বড্ড ঝগড়া হয়েছে।”
*#*
অতি সামান্য বিষয় নিয়ে, ভাসিলিসা ইগরফ না! একটি গান নিয়ে।”
“গান নিয়ে ঝগড়া? এ বড় অদ্ভুত কথা ! কি করে হ’ল ?”
“বচি কি করে। এই সে দিন পিট এণ্ডিচ একটা গান তৈরী
করেছে। আজ সেটা আমার কাছে গাইছিল। আমিও আমার পছন্দ
মতো গানটি গাইতে শুরু করলাম :-
শোন দুর্গেশবালা সাবধান,
রাত্রি নিশীথে দুর্গম পথে করােনা করােনা অভিযান।
সুরে গরমিল হ’ল। পিটর এণ্ডিচ ত’ রেগেই গিয়েছিল। কিন্তু
তারপরে ভেবে চিন্তে ঠিক করল, যার যা খুসি গাইবােব ঐ খানেই
শেষ।
দ্বন্দ্ব যুদ্ধ সাহিনের নিলতা দেখে আমি জ্বলে উঠেছিলাম আর কি। কিন্তু আমি ছাড়া তার নীচ ইঙ্গিত আর কেউ বুঝতে পারুল না। অন্ততঃ কেউ তা লক্ষ্য ক’রূল না। গান থেকে শুরু করে কবিদের কথা উঠল। কাপ্তান বললেন, “কবিরা সব বদমায়েস, মাতাল ।” আমায় বললেন, “তুমি পদ্যলেখা ছেড়ে দাও, কারণ সৈন্যের কাজের সাথে কবিতা, লেখাটা খাপ খায় না; আর ওতে কারাে কোনাে লাভ নেই।” সাব্রিনের উপস্থিতি আমার অসহ্য বােধ হ’তে লাগল। আমি তখনই। কাপ্তান ও তার স্ত্রী-কন্যাকে নমস্কার করে বিদায় হলাম। বাড়ী এসে তলােয়ার খানার ধার ভাল করে দেখে নিয়ে শুয়ে পড়লাম । সাভেলিচকে বললাম “ভাের ছটায় জাগিয়ে দেবে।” পরদিন যথাসময়ে শত্রুর অপেক্ষায় খড়গদার পিছনে দাড়িয়ে রইলাম। একটু পরেই সে এসে পৌছল। বলল, “কাজে বাধা পড়তে পারে । এস চট্পট্ সেরে নিই।” উর্দি খুলে ফেললাম। শুধু জ্যাকেট গায়ে সাব-পু: নিমেটি, ঠিক তখনই ইভান, ইগ্নেটিচ দুর্গের পাঁচজন সৈন্য নিয়ে গড়গাদার পিছন থেকে এসে পড়ল। বল “তােমরা কাপ্তানের কাছে চল ।* বিরক্ত হলেও, তাই করতে হল। সৈন্যেরা আমাদের ঘিরে নিল, আমরা ইভান ইগ্নেটিচের পিছনে চাম । সে দিগ্বিজয়ী বীরের মত সদর্পে আমাদের নিয়ে চল। কাপ্তানের বাড়ী আসা গেল। ইভান ইগ্নেটিচ দোর খুলে ঘােষণা করল, “তাদের নিয়ে এসেছি।” ভাসিলিসা গরফ না এলেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন, “ভগবা! এর পর না জানি আরও কি আছে! কি করে সাহস পেলে ? আমাদের দুর্গে খুনের ফন্দী! ইভান কুজমিচ, এদের এখুনি গ্রেপ্তার কর। -- ৪৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী পিট এচি, আলেকসি ইভানিচ, তােমাদের তলােয়ার আমায় দাও। ফ্যালাে, শীগগির ফ্যালো! পালাস্কা, তলােয়ার দুখানা তাড়ারে নিয়ে রাখ। এতে আমি ভাবতেও পারি নি। পিট এচি, তােমার লজ্জা হচ্চে না ? আলেক্সি ইভানিচকে অবিশ্যি একাজ সাজে। খুন করে সে কাজ থেকে বরখাস্ত হয়েছিল। তার ভগবানে বিশ্বাস নেই। কিন্তু তুমি ! তােমার এ প্রবৃত্তি হল কেন ? তুমিও কি ওরই মতাে হতে চাও?” ইভান কুজমিচ স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে বললেন, “ভাসিলিসা ইগরফ নার কথা ঠি। মনে রাখবে ফৌজের ভিতরে ডুয়েল একদম্ নিষিদ্ধ।” পালাস্কা আমাদের তলােয়ার নিয়ে ভাড়ারে রেখে দিল। আমি হাসি চাপতে পারুলেম না। সাব্রিন গম্ভীর হয়ে রইল। # কত্রীকে বলল, “আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করি ; তবুও বলতে হচ্ছে, আপনি আমাদের বিচার করতে অযথা ব্যস্ত হচ্ছেন। এ সব ব্যাপার ইভানকুঞ্জমতে হাতে ছেড়ে দিন—এটা তারই কাজ।” কাপ্তানগিন্নি উত্তর দিলেন “কিন্তু মশাই, স্বামী আর স্ত্রী এক দেহ, এক আত্মা, সে খেয়াল আছে কি আপনার? ইভান কুজ মিচ, कि ভাবচ? দুজনকে গ্রেপ্তার করে ঘরের দুই কোণে বসিয়ে রাখাে। যতক্ষণ এদের চৈতন্য না হয় শুধু রুটি আর জল বরাদ্দ করে। পাত্রী জেসিমকে বলল, এদের প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা দিক্-দুজনাকেই ভগবানের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে হবে, আর সবার সামনে পাপের কথাৱঁকপটে খুলে বলতে হবে।” ইভান কুজ মিচ, কি করূবেন ভেবে পেলেন না। মােয়া ইভাননার মুখ একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে বড় শান্ত হল। কী নরম হয়ে বললেন, “তােমরা দুজন দুজনকে চুমাে খাও।” আমরা দ্বন্দ্ব যুদ্ধ ৪৫ তাই করলাম। পালাস্কা আমাদের তলােয়ার ফেরৎ দিল। আমরা কাপ্তানের বাড়ী থেকে তখনকার মত সন্ধি করেই বের হলাম। ইভান ইগ্নেটিচ আমাদের সাথে চল। তাকে ধমক দিয়ে বললাম, “তােমার লজ্জা হ’ল না? কথা দিয়েছিলে কাপ্তানের কাছে। বলবে না ; বিশ্বাসঘাতকতা করতে সে বল “ঈশ্বর সাক্ষী, আমি ইভান কুজমিচকে কিছু বলি নি। ভাসিলিসা ইগরফনা আমার পেট থেকে সর বের করে নিয়েছেন। আর, ইভান কুজ মিচকে কিছু না বলে তিনিই সব ব্যবস্থা করেছেন। যাক, ভগবানকে ধন্যবাদ, ব্যাপারটা ভালােয় ভালােয় মিটুল। এই বলে সে বাড়ী ফিরে গেল। রইলাম শুধু আমরা দুজনা। বললাম, “ব্যাপার এভাবে মিটতেই পায় না।” সাব্রি উত্তর দিল, “নিশ্চয়ই না। তােমায় রক্ত দিয়ে এ মানের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। কিন্তু দিনকত ওরা খুব নাম রাখবে। সুতরাং দেখাতে হবে যেন আমাদের খুব ভাব হয়েছে। এখন বিদায়।” যেন কিছু হয় নি, এই ভাবে যে যার পথ ধলাম । কাপ্তানের বাড়ী ফিরে আমি আগের মত মেরিয়া ইভানভনার পাশে গিয়ে বাম। ইভান কুজ মিচ, বাড়ী ছিলেন না। ভাসিলিসা ইগর না ঘরকন্নায় ব্যস্ত ছিলেন। মেরিয়া ইভাননা আমায় একটু মিষ্টি গাল দিয়ে বলল “সাব্রিনের সাথে ঝগড়া করে তুমি সবাইকে ব্যস্ত করে তুলেচ। যখন শুনলাম তােমরা লড়াই ক’তে যাচ্ছ, আমি ত একেবারে অবশ হয়ে প'লাম। মানুষ কি অদ্ভুত! যে কথাটা সাতদিন না যেতে ভুলে যাবে, তার জন্য নিজেরা মারামারি করবে, প্রাণ দেবে, বিবেক জলাঞ্জলি দেবে, এবং এমন লােককে দুঃখ দেবে যে•••••
৪৬
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
কিন্তু আমার বিশ্বাস গােড়ায় তুমি ঝগড়া কর নি বােধ হয়, আলেক্সি
ইনিচেরই দোষ।”
“তােমার এ রকম ভাববার কারণ কি, মেরিয়া ইভানভ না?”
“ওঃ, তা বলতে পারি নে•••••লােকটা সবাইকে ঠাট্টা করে ।
আমি ওকে পছন্দ করি না। ওকে দেখে আমার বিরক্তি হয়
আশ্চর্য এই যে ও আমাকে অপছন্দ করবে এটা আমার সহ্য হয় না।
তা হলে আমার বড়ই উদ্বেগ হবে।”
“তােমার কি মনে হয়, মেরিয়া ইভানভ না? ও তােমায় পছন্দ
করে ?”
মেরিয়া ইভানভ না একটু অপ্রতিভ হ’ল। তার মুখ লাল হয়ে
উঠল। সে বলল, “আমার মনে হয়...আমার বিশ্বাস, পছন্দ করে।”
মাত্র বিশ্বাস কে ?”
“কারণ ও আমার কাছে বিয়ের কথা পেড়েছিল।”
“তােমার বিয়ে করতে চেয়েছিল? কখন ?”
“গেল বছর। তুমি আবার মাস দুই আগে।” .
“তুমি রাজী হও নি?”
“বুঝতেই পাচ। অবিশ্যি আলেক্সি ইনিচ চালাক, ধনী, সম্ভ্রান্ত
বংশের ছেলে। কিন্তু যখন ভাবি, গির্জায় সবার সামনে তাকে চুমম।
দিতে হবে.•••••কিছুতেই না, কিছুতেই রাজী হতে পারলাম না।”
মেরিয়া ইভানভনার কথায় আমার চোখ খুলে গেল। আমি অনেক
কিছু বুঝতে পারলাম। বুঝলাম, কেন সে সর্বদা মেয়েটির নিন্দা করে।
যা থেকে আমাদের ঝগড়ার সৃষ্টি তা এখন আরও জঘন্য মনে হতে
লাগল। কারণ, বুঝলাম তা ঠাট্টা করে বলা হয় নি, একজনের নামে
কুৎসা রটাবার জন্য ভেবে চিন্তে বলা হয়েছিল। এই নিলর্জ নিন্দককে
দ্বন্দ্ব যুদ্ধ ৪৭ শাস্তি দেবার ইচ্ছা ভয়ানক বেড়ে গেল। আমি সুযােগের অপেক্ষায় রইলাম। বেশী দিন অপেক্ষা করতে হল না। পরদিন সকাল বেলা একটা শােক সঙ্গীত রচনা করছি, একটি পদ্য না মিলাতে পেরে কলম কামড়াচ্চি, আর ভাবছি, এমন সময়ে সাব্রিন এসে আমার দোরে ঘা দিল। কলম ছেড়ে তলােয়ার নিয়ে বাইরে তার কাছে গেলাম। সাব্রিন বলল, “আর দেরী কি ? এই সময়ে কেউ দেখচে না। চল, নদীর ধারে যাই; কেউ আমাদের বিরক্ত কবে না।” নীরবে দুজন এগিয়ে চললাম। একটা খাড়া রাস্তা দিয়ে নেমে নদীর ধারে এসে পড়া গেল। দুজনে তলােয়ার খুলে নিলাম। সাব্রিন আনার চেয়ে ভাল তলােয়ার চালাতে পারত, কিন্তু আমার সাহস বেশী, বলও বেশী। সে বেপরে আমায় গাে৮তুক প্যাচ বিখিয়েছি, আমি সেক’টি খাটালাম। সাব্রিন ভাবেনি আমি অতবড় দুর্জ। কিছুক্ষণ কেউ কাউকে মাতে পারি নি। শেষে দেখলাৎ সাব্রন কাহিল হয়ে পড়ছে। ঠেলতে ঠেলতে তাকে প্রায় নদীর ভিতরে নিয়ে ফেলেছি, এমন সময়ে শুনলাম্ কে আমার নাম ধরে ডাকছে। মুখ ফিরিয়ে দেখি সাভেলিচ। সে সেই খাড়া পথে দৌড়ে নেমে আচে। ঠিক তখনি ডানদিকে, বুকের ওপর তলােয়ারের খোঁচা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
প্রেম
“ওগো তরুণি, ওগাে সুন্দরী,
এ কঁচা বয়সে প'ড়ো না ফাপরে প্রেম করি।
ঘরে আছে যত গুরু জন, সবে বিরূপ হবে যে তােমারে,
পরিণয় কালে নতজানু হয়ে নাহি যদি তােষ সবারে -
কর সঞ্চয় জ্ঞান ও বুদ্ধি, আনাে সম্পদ আনে। গোঋদ্ধি,
চিরবাঞ্ছিত নন্দিত হবে, অতি সমাদরে লবে বরি'। চাষার গান।
–
“যদি দ্যাখাে আমার চেয়ে ভাল, ভূলবে আমারে,
মনে আমায় তবে চিরদিন, খারাপ দেখলে তারে
চাষার গান
যখন জ্ঞান হল কয়েক মিনিট বুঝতে পারলাম না কোথায় আছি,
আমার কি হয়েছে। একটি অপরিচিত ঘরে, বিছানায় শুয়ে ছিলাম,
বড়ই দুর্বল বােধ করছিলাম। সাভেলিচ একটা বাতি হাতে
দাঁড়িয়েছিল। কে যেন অতি সাবধানে আমার বুক আর কঁাধে জড়ানাে
ব্যাণ্ডেজ খুলে দিচিচল। ধীরে ধীরে আমার স্মৃতি ফিরে এল। যুদ্ধের
কথা মনে হ’লবুঝলাম আহত হয়েছি। ঠিক তখনই দরজা খােলার
শব্দ হল।
অতি ধীরে কে জিজ্ঞাসা করল “কেমন আছ?” স্বর শুনে আমার
শরীরটা কেঁপে উঠল।
সাভেলিচ দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, “সেই একই রকম ; এখনও
অজ্ঞান রয়েছে। আজ পাচ দিন।
প্রেম
৪৯
আমি মুখ ফিরাতে চেষ্টা করলাম, পারলাম না।
অনেক চেষ্টা করে বললাম “আমি কোথায় ? ওখানে কে ?”
মেরিয়া ইভানভ না আমার বিছানার কাছে এসে মুখ নােয়াল।
জিজ্ঞাসা করল “কেমন আছাে?”
অতি ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিলাম, “ভগবানকে ধন্যবাদ। তুমি মেরিয়া
ইভানভ না? আমায় বল দেখি...”
আর কিছু বলতে পারলাম না, চুপ করলাম। সাভেলিচ আনন্দে
চেঁচিয়ে উঠল, “জ্ঞান হয়েছে ! ভগবানকে ধন্যবাদ! বাছা পিট
এচি, , আঃ, আমি কি ভয়টাই পেয়েছিলাম ! আজ পাঁচ দিন,
তামাসা নয়।”
মরিয়া ইভানভ না তাকে বাধা দিল “বেশী বকিও না সাভেলিচ, উনি
এখনও খুব দুর্বল।” এই বলে বাইরে গিয়ে সেখদার বন্ধ করে দিল
আমার মনে ঝড় বইতে লাগল। তা হলে আমি স্কাধানের
বাড়ীতে আছি! মেরিয়া ইভানভ না আমার কাছে এসেছিল।
নাভেলিচকে গােটাকত কথা জিজ্ঞাসা করব ভাবলাম। হতভাগা
কানে আঙুল দিয়ে মাথা নাড়তে লাগল। বিরক্ত হয়ে চোখ বুজলাম ;
শীগগিরই ঘুমিয়ে পড়া গেল।
জেগে সাভেলিচকে ডাকলাম । সাভেলিচের বদলে মেরিয়া ইভানভ না
কাছে এল। তার সেই দেবতার মত কণ্ঠে আমার অভিবাদন করল ।
ক আনন্দে যে-শরীর মন ভরপুর হয়ে গেল, তা কথায় বুঝান যায় না।
তার হাতখানা নিয়ে বার বার চুমাে খেতে লাগলাম। আনন্দের অশ্রুতে
স হাত ভিজে গেল। মাসা হাত টেনে নিল না।...হঠাৎ তার ঠোঁট
খােনি আমার গণ্ডদেশ স্পর্শ করল। আমি তার সদ্য, ব্যগ্র চুম্বন
মনুভব করলাম। বুকে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল ।
১
৪
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী ; আমি তাকে বললাম “মেরিয়া ইভানভল, তুমি, শুধু তুমিই আমায় সুখী করতে পার। ক’রবে কি ?” সে আত্মসংবরণ করল। বল, “ভগবানের দোহাই, শান্ত হও।” হাতখানা টেনে নিয়ে বল, “তােমার বিপদ এখনও কাটে নাই। ঘায়ের মুখ খুলে যেতে পারে। অন্তত আমার দিকে চেয়ে একটু সাবধান থাকো।” এই কটি কথা বলে, আমার প্রাণ আনন্দে ভরে দিয়ে সে বাহিরে গেল। সে আমার হবে! সে আমার হবে । এই সুথে আমাকে সজীব করে তুলল। আমার সারা দেহমন এই ভাবময় হয়ে গেল। সেই থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভাল হয়ে উঠতে লাগলাম। দুর্গে কোনও ডাক্তার ছিল না ; রেজিমেন্টের নাপিত আমার চিকিৎসা আমার, তাগ্য ভাল, তাই সে বেশী ওস্তাদী ফলাতে চেষ্টা কুরেনি। রক্তের তেজ আর প্রকৃতির আনুকূল্যে আমি শীগগির সেরে উঠলাম। কাপ্তান পরিবারের সবাই আমার শুশ্রুষা করেছিল। মেরিয়া ইভানভ না সর্বদা কাছে কাছে থাকৃত। প্রথম সুযােগেই আমার মনের কথাটা আবার পড়লাম। মেরিয়া ইভানভ না আমার সব কথা শুল। কোনও ছল না করে সে সরল ভাবে স্বীকার করল, আমায় ভালবাসে। বলল, “আমার বাবা মা আমার সুখে নিশ্চয়ই সুখী হবেন। কিন্তু ভেবে দেখ, তােমার বাপ মা আপত্তি করবেন না ত’ ?” আমি চিন্তিত হলাম। মায়ের ভালবাসা সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ ছিল । কিন্তু বাবার মত ও খেয়াল আমার জানা ছিল। বুঝলাম আমার ভালবাসার কথা তার মনে দাগ বসাতে পাবে না। একথা মেরিয়া ইভানভনাকে আমি সরলভাবে বলাম। কিন্তু ঠিক করলাম, বেশ ভাল করে গুছিয়ে একখানা চিঠি বাবাকে লিখে তার আশীর্বাদ চেয়ে পাঠাব। চিঠি লিখে মেরিয়া ইভানভ নাকে দেখালাম। তার কাছে সেখান এত মন্মস্পর্শী, এত যুক্তিপূর্ণ বােধ হ’ল যে সফলতা বিষয়ে তার তিলমাত্র সন্দেহ রইল না। যৌবন ও প্রেমের সহজ অনাবিলতায় স আপন ভাবের স্রোতে গা ঢেলে দিল। একটু সুস্থ হয়েই সাব্রিনের সাথে মিটমাট করে ফেলাম। ইভান জমিচ এই ডুয়েলের জন্য গা দিয়ে বললেন, “আঃ, পিট এচি, মামার উচিত তােমায় গ্রেফতার করা। কিন্তু তােমার দের শাস্তি হয়েছে। আলেকসি, ইভানিচকে ভাঁড়ার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। গাসিলিসা ইগরফনা তার তলােয়ার কুলুপ দিয়ে বন্ধ করে রেখেছেন। ছারা বিষয়টা একটু তলিয়ে বুঝে অনুতাপ করুক।” এত সুখের মধ্যে আমার মনে আর শত্রুতার লেশও রইল না। মামি সাব্রিনের হয়ে ক্ষমা চাইলাম। সহৃদয় *পান ঠিক *সলে চার স্ত্রীর সম্মতি নিয়ে তাকে ছেড়ে দেবেন। সাব্রিন আমার সাথে দেখা ফরল; যা হয়েছে তার জন্য খুব অনুতাপ করল। সে স্বীকার করল ষাল আনা দোষ তারই। আমাকে বলল, “অতীতের কথা ভুলে যাও গাই।” শত্রুতা পুষে রাখা আমার স্বভাব নয় ; আমি ঝগড়ার কথা, মাঘাতের কথা ভুলে গিয়ে অকপটে তাকে ক্ষমা করলাম। বুঝেছিলাম মাহত অভিমান ও নিরাশ প্রেমের প্রতিহিংসা নিতেই সে কুৎসা করছিল। চাই এই দুর্ভাগা প্রতিদ্বন্দ্বীকে উদার ভাবে মাপ করলাম। অল্পদিনেই চাল হয়ে উঠে নিজের ঘরে ফিরলাম। ব্যাকুলভাবে শেষ চিঠিখানার ত্তরের অপেক্ষায় রইলাম। বাবার সম্মতির আশা করি নাই ; তবুও কানও ভয় মনে ঠাঁই পাচ্ছিল না। কাপ্তান ও তার স্ত্রীকে মনােভাব টানাই নি। কিন্তু আমার প্রস্তাবে তারা আশ্চর্য হন নাই। মেরিয়া রাশিয়ায় দুর্গেশনন্দিনী ইভানভ না বা আমি তাদের কাছে ভাব • লুকাবার চেষ্টা করি নাই, এবং তাদের সম্মতি পাব এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলাম। শেষে, একদিন সকালে সাভেলিচ চিঠি হাতে চিঠি হাতে করে এল। সেখানা নেবার সময় হাত কাঁপতে লাগল। ঠিকানা বাবার হাতে লেখা। বুঝলাম ব্যাপার গুরুতর। কারণ, বরাবর মাই আমাকে চিঠি লিখতেন, চিঠির শেষে বাবা দু’ এক লাইন জুড়ে দিতেন মাত্র। খাম খুলবার আগে, শিরােনামা পড়তেই কয়েক মিনিট কেটে গেল ! “প্রিয় পুত্র পিট এণ্ডে ভিচ গ্রীনফ, বেলগরস্কি দুর্গ, ওরেনবুর্গ প্রদেশ।” হাতের লেখা দেখে অনুমান করতে চেষ্টা করলাম, কি মেজাজে লিখেচেন। শেষে সাহস করে সেখানা খুললাম। গােড়ার কয়েক লাইন দেখেই বুঝলাম, সব মাটি। চিঠির অনুলিপি এই :- প্রিয় পাপটর, এই মাসের ১৫ই তারিখে তােমার চিঠি পেয়েছি। তাতে তুমি মিরনফের কন্যা মেরিয়া ইভানভনাকে বিয়ে করবার অনুমতি এবং আমার আশীৰ্বাদ চেয়েছ। আমি অনুমতিও দিচ্ছি না, আশীৰ্বাদও করছি না। শুধু ইচ্ছে হচ্চে দুষ্ট ছেলেদের উপযুক্ত সাজা তােমাকে দিই। তােমার কর্মচারীর পদের কথা আর মনে আসছে না। কারণ দেশরক্ষার জন্য যে তলােয়ার তােমাকে দেওয়া হয়েছে, তার অযােগ্য, সে পরিচয় পেয়েচি। ঐ তলােয়ার তােমারই মত লক্ষ্মীছাড়াদের সাথে লড়াই করতে দেওয়া হয় নাই। এণ্ডি, কল- ভিচকে লিখচি তিনি তােমাকে বেলগরঙ্কিদুর্গ থেকে আরাে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেবেন, যাতে তােমার বাঁদরাম যায়। তোমার ডুয়েল লড়া ও জখম হওয়ার কথা শুনে তােমার মা কাতর হয়ে পড়েছেন, তিনি এখন শয্যাগত। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি তােমায় তুমি প্রেম সুমতি দিন; যদিও এত দয়া তার হবে এ আশা করতে সাহস হয় না। তােমার বাবা। চিঠি পড়ে মনে একসাথে অনেক চাব জেগে উঠল। বাবা- যে এতগুলি নিষ্ঠুর কথা অসঙ্কোচে ব্যবহার করেছেন, ভেবে আমার বড়ই দুঃখ হল। মেরিয়া ইভানভনাকে যে রকম তাচ্ছিল্যের ভাবে উল্লেখ করেছেন, তা আমার কাছে অন্যায়, অসঙ্গত বলে মনে হল। বেলগরস্কি দুর্গ থেকে বদলি হওয়ার কথা ভাবতেও আমার ভয় হল। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখ হল বেশী মায়ের অসুখের কথা শুনে। সাভেলিচের ওপর রাগ হল, সেই যে আমার বাবা ও মাকে সবকথা লিখেচে তার আর সন্দেহ রইল না। ছােট্ট কামরাটির ভিতর পায়চারি করতে করতে তার সানে থেমে রাগ করে বললাম, “তােমার দোষে যে আমি জখ হলাম, একমাস যমের দুয়ারে পড়ে রইলাম, তাতেও তুমি খু হও নি । শেষে আমার মাকেও মেরে ফেলতে বসেচ ? সাভেলিচ বজ্রাহতের মত স্তম্ভিত হয়ে রইল। কঁাদ কঁাদ হয়ে বলল, “হা ভগবান্ ! তুমি কি বল ? তুমি আমার দোষে জখম হয়েচ? ভগবান জানেন, আলেকসি ইনিচের তলােয়ারের সানে বুক পেতে তােমায় বাঁচাতে ছুটে যাচ্ছিলাম। বুড়ো হয়েছি, তাই ছুটতে পালাম না। কিন্তু তােমার মাকে আমি কি করেছি ?” দাম, “কি করে? কে তােমায় বিশ্বাসঘাতকতা করতে বলেছে? তুমি কি এখানে গােয়েন্দাগিরি করতে এসেচ ?” সাভেলিচ সজল চোখে উত্তর দিল, “আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি? হে পরমেশ্বর, হে স্বর্গের রাজা! ভাল, তা হলে কর্তা আমায় কি লিখেছেন, একবার দেখ। বুঝতে পাবে আমি কেমন বিশ্বাসহন্তা।”
৫৪
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
।
সে একখানা চিঠি বের করে পড়তে লাগল
“বুড়েকের
কুকুর, তােমার লজ্জা হওয়া উচিত। আমার কড়া হুকুম
সত্ত্বেও তুমি আমার ছেলের বিষয়ে কিছু লেখ না। তার কুকীর্তির
কথা আমায় অপর লােকর কাছে শুনতে হয়। এই বুঝি প্রভুর
আদেশ মাৰ্চ? নিজের কর্তব্য করছ, কেমন? ছোঁড়ার সঙ্গে সায়ে
কাজ করছ আর সত্য গােপন করছ, এই অপরাধে আমি তােমাকে
শূয়রের রাখাল করব। আমার হুকুম, এই চিঠি পেয়েই লিখবে সে
কৈমন আছে—খবর পেয়েচি, একটু ভাল—ঠিক কোন জায়গায় জখম
হয়েছে, আর ঘা ঠিক শুকিয়েছে কি না?”
বেশ বােঝা গেল, সাভেলিচ নির্দোষ। বৃথা সন্দেহে, গালাগালি
দিয়ে তাকে অপমান করলাম। আমি মাপ চাইলাম, কিন্তু বুড়ো আর
কিছুতেই শান্ত হয় না।
সে শুধু বার বার বলতে লাগল “আমার শেষে এই দশা! এই
আমার কাজের পুরস্কার! আমি বুড়কুকুর, শূয়রের রাখাল, আর
আমিই তােমার জখম হওয়ার কারণ! না, পিট এচি, আমি নই—
সব অনিষ্টের মূল হচ্ছে সেই ফরাসী সয়তান! সেই ত তােমাকে তালে
তালে পা ফেলে ছুঁচল লােহা দিয়ে খোঁচাখুচি করতে শিখেয়েচে। যেন
ঐ রকম পা ফেলেই দুষ্টলােকের হাত থেকে বাঁচা যায় ! সেই ফরাসীটাকে
রেখে পয়সা খরচ না করলে আর চছিল না।”
তা হলে কে কষ্ট করে এই খবর আমার বাবাকে দিতে পেল?
সেনাপতি ? কিন্তু সে আমায় এতটা মনে রেখেছে তা বােধ হল না!
ইভান কুজমিচ তাকে ডুয়েলের খবর নিশ্চয়ই জানান নি। ভেবে কূল
পাচ্ছিলাম না। শেষে সব সন্দেহ গিয়ে সাব্রিনের ওপর পড়ল। আমার
বিরুদ্ধে খবর দিয়ে লাভের আশা শুধু তারই। দুর্গ থেকে আমায় বদলি
প্রেম . । করলে কাপ্তানপরিবারের সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হবে। আমি মেরিয়া ইভানভনাকে সব বলতে বের হলাম। ঘরের পৈঠের ওপবে এসে সে আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেল। আমার দিকে চেয়ে সে বলল “কি হয়েছে জেমার? মুখখানা। কালাে হয়ে গিয়েছে যে।” “সব মাটি হয়েছে।” এই বলে বাবার চিঠিখানা তার হাতে দিলাম । তারও মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চিঠিখানা পড়ে যখন সে ফিরিয়ে দিল, তখন তার হাত কাঁপচে। কাঁপা গলায় বলল, “বুঝতে পারছি, তা হবার নয়। তােমার পিতা মাতার ইচ্ছ। নয় আমি তােমাদের পরিবার- ভূক্ত হই। ভগবানের যা ইচ্ছা তাই হােক। আমাদের পক্ষে কি ভালাে ভগবান তা আমাদের চেয়ে বেশী জানেন। এর কোনও প্রতিকার নেই। পিট এচি, অন্ততঃ তুমি সুখী হও এটা আমার ইচ্ছা।” তার হাত ধরে বাম “তা হতেই পারে না। তুমি ত আমায় ভালবাস; আমি সব বিপদ মাথা পেতে নেব। চল, দুজনে তােমার বাবা ও মায়ের পায়ের ওপর পড়ি গে। তারা সরল, অমায়িক—নিষ্ঠুর বা দাম্ভিক নন্ ; তারা আমাদের আশীর্বাদ করবেন। আমাদের বিয়ে হয়ে গেলে, পরে বাবার মনও নরম হবে। মা আমাদের হয়ে বলবেন। তিনি আমাদের ক্ষমা ক’রূবেন। মাসা বলল, “না, পিটর এণ্ডিচ, তােমার বাপ মায়ের আশীর্বাদ না নিয়ে আমি বিয়ে করতে পাব না। তাঁদের আশীৰ্বাদ ছাড়া তুমি সুখী হবে না। ভগবানের ইচ্ছা মেনে নেওয়াই উচিত। তুমি যদি বিয়ে করাে, যদি অন্য কোনও মেয়েকে ভালবাস, ভগবান যেন তােমার ওপর প্রসন্ন থাকেন। আমি তােমাদের দুজনারই জন্য প্রার্থনা করব।” মাসা কেঁদে ফেলল। তারপরে আস্তে আস্তে চলে গেল। আমি তার রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী পিছনে পিছনে ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ঘুঝলাম, নিজেকে সামলাতে পাব না-বাড়ী ফিরে গেলাম। ব'সে ব'সে গভীরভাবে চিন্তা করছি, এমন সময়ে সাভেলিচ এসে আমার চিন্তাস্রোত বাধা দিল। আমার হাতে একখানা লেখা কাগজ দিয়ে সে ব, “এই দেখ বাছা, আমি গােয়েন্দা কি আর কিছু। বাপ আর ছেলের ভিতরে ঝগড়া বাধাবার কোনও মৎলব আমার আছে কিনা।” কাগজ নিয়ে দেখলাম সেখানা সাভেলিচের লেখা বাবার চিঠির উত্তর। লেখার ধরণ এই :- দয়ালু পিতা এণ্ডি পেট্রোভিচ, তােমার স্নেহপূর্ণ পত্র পেলাম। তুমি আমার ওপর রেগেচ। লিখেচ, প্রভুর আদেশ পালন করতে না পারায় আমার লজ্জিত হওয়া উচিত। বুড়াে কুকুর নি আমি তােমার বিশ্বাসী চাকর। তােমাকে শ্রদ্ধা করে থাকি, যথাশক্তি তােমার কাজ করতে করতে আমি বুড়াে হয়েচি। পিট এণ্ডিচের আঘাতের কথা লিখে তােমাদের অযথা ব্যস্ত করা সঙ্গত মনে করি নি। শুলাম কত্ৰীমা সেকথা শুনে ভেবে কাতর হয়েচেন। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি তিনি ভাল হয়ে উঠুন। পিট এণ্ডিচ, ডানদিকে বুকের ওপর, গলার হাড়ের নীচে আঘাত পেয়েছিল—ঘা তিন গভীর হয়েছিল। তাকে আমরা নদীর ধার থেকে কাপ্তানের বাড়ীতে এনে রাখি। এখানকার নাপিত তার চিকিৎসা করে। ভগবানকে ধন্যবাদ, সে এখন ভাল হয়েচে-কোনই চিন্তার কারণ নেই। কাপ্তান তার ওপর খুব খুসি, ভাসিলিসা ইগরফনা তাকে নিজের ছেলের মত ভালবাসেন। সে যে গােলে পড়েছিল, সেটা লজ্জার কিছু নয়। ঘােড়ার । চার পা, তবুও সে হোঁচট খায়। আর তুমি আমায় লিখেচ, আমায় প্রেম শুয়রের রাখাল করে পাঠাবে। তুমি আমার প্রভু, যা খুসি তাই করাে। তােমাকে বিনীতভাবে নমস্কার করি। তােমার বিশ্বাসী ভৃত্য, আরিফ সাভেলেফ। এই ভালমানুষটির চিঠি পড়তে পড়তে না হেসে পারি নাই। আমার পক্ষে বাবাকে চিঠি লেখা অসম্ভব হ’ল ; মনে হল, সাভেলিচের চিঠিতেই মায়ের ভাবনা যাবে। সেই থেকে আমার মন খারাপ হ’ল। মেরিয়া ইভানভ না খুব কমই আমার সাথে কথা কইত ; আমাকে ছেড়ে দূরে দূরে থাকত। কাপ্তানের বাড়ী যেতে আর মন উঠত না। ক্রমে একা ঘরে বসে থাকা অভ্যাস হয়ে গেল। ভাসিলিসা ইগরফ না প্রথমটা আমায় গাল দিতেন—কিন্তু আমার গোঁ দেখে তিনিও আর শেষে ত্যক্ত করতেন না। কাজের খাতিরে ইভান কুজমিচের সাথে দেখা করতাম । সাব্রিনের সাথে কদাচিৎ দেখা হত, সেটাও আমার ভাল লাগত না। দেখতাম মনে মনে সে আমাকে হিংসা করে—তাতে আমার পূর্ব সন্দেহ বেড়ে গেল। ক্রমে বেঁচে থাকাই দায় বােধ হতে লাগল। কেবল দুঃখের ভাবনা ভাবতাম ; অলসতা আর নির্জনতায় সে ভাবনা বেড়ে গেল। নির্জনতায় আমার, প্রেমও গভীরতর হয়ে আমাকে পীড়া দিতে লাগল। লেখাপড়ার অভ্যাস নষ্ট হয়ে গেল। আমােদ আজাদ সব গেল, ভয় হ’ল পাছে পাগল হয়ে যাই, কিম্বা নেশা ধরে বসি। এই সময়ে এমন একটা অপ্রত্যাশিত ব্যাপার হল যে আমি যেন একটা শক্ত ঘা মেয়ে জেগে উঠলাম। তাতে আমার সারা জীবনের স্রোত ফিরে গেল।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ গাফের বিদ্রোহ “যুবকের নল শােন মনদিয়া, বৃদ্ধ আমরা কি বলি।” চাষারগান . আমি যে সব অদ্ভুত ঘটনা প্রত্যক্ষ করি, তা বর্ণনা করবার আগে ১৭৭৩ খৃষ্টাব্দে ওরেনবুর্গের অবস্থা সম্বন্ধে কিছু বলব। এই প্রদেশটি বেশ বড়, প্রকৃতির দেওয়া সম্পদে ভরা। আধা সভ্য জাতিদের বাস এখানে; তারা তখন সবে রুশ সম্রাটের অধীনতা স্বীকার করেছে। দুর্দান্ত, বর্বর জাতি-সভ্যতা বা আইনের ধার ধারে । তাই তারা বার বার বিদ্রোহী হয়ে উঠছিল। সরকারকে তাদের ওপর কড়া নজর রাখতে হত। সুবিধা মতাে জায়গা দেখে দেখে দুর্গ তৈরী করা হয়েছিল—ইয়েক কশাক নামক দুর্ধর্ষ জাতি ছিল এইসব দুর্গের প্রজা। ইয়েক নদীর দু’ধার তারা আবহমান কাল ভােগ দখল করে এসেচে। যে কশাকের এই প্রদেশের শান্তি রক্ষায় নিযুক্ত ছিল, তারাই কিছুদিন হ’ল সরকারের উদ্বেগের কারণ হয়েছিল। ১৭৭২ খৃঃ অব্দে এখানকার প্রধান নগরে বিদ্রোহ উপস্থিত হল। সেনাপতি ট্রাওয়েনবুর্গ কশাকদের বাধন কিছু শক্ত করতে চেষ্টা পান, আর কিছু কড়া আইন করেন। ফলে, ট্রাওয়েনবুর্গ অতি নিষ্ঠুর ভাবে হত হন্। কশাক সৈন্যদল বিদ্রোহী হয়। শেষে কামান বন্দুক দিয়ে অতি নৃশংস ভাবে বিদ্রোহ দমন করা হয়। বেলগরস্কি দুর্গে আমার আসার আগে এই ঘটনা ঘটে। আমি যখন পুগাচফের বিদ্রোহ এখানে এলাম তখন. সব চুপ করে ছিল। বিদ্রোহীদের ভাণ করা অনুতাপ সরকার আন্তরিক বলে বিশ্বাস করেছিল। বিদ্রোহীরা মনের আগুন মনে চেপে নতুন বিপ্লব সৃষ্টির চেষ্টায় ছিল। এইবারে আমার গল্পের শুরু। একদিন সন্ধ্যাবেলা (১৭৭৪ খৃঃ অব্দের অক্টোবরের আড়া) একা ঘরে বসে আছি। শরতের শরতের সন্ধ্যাবায়ুর শোঁ শোঁ শব্দ কানতে শুচি, আর সাদা সাদা মেঘগুলি কেমন দৌড়ে চাদকে ছাড়িয়ে : যাচ্চে, তাই দেখছি, এমন সময়ে কে যেন আমায় বল কাপ্তান ডাকচেন। তখনি বেরিয়ে গেলাম। সেখানে সাব্রিন, ইভান ইয়েটিচ এবং কশাক সার্জেন্ট ম্যাসিমিচকে দেখতে গেলাম। কত্রী বা মাসা যেখানে ছিল না। কাপ্তান যখন আমায় অভিবাদন করলেন, তখন তাকে একটু চিন্তিত দেখলাম। দোর বন্ধ করে তিনি সবাইকে বসতে বললেন-শুধু সার্জেন্ট দাড়িয়ে রইল +, পকেট থেকে একখানা চিঠি বের করে তিনি বললেন “জরুরী খবর আছে ; সেনাপতি কি লিখচেন, তােমরা মন দিয়ে শােন।” চশমা পরে তিনি চিঠিখানা আমাদের শুনালেন - “বেলগস্কি দুর্গের অধিনায়ক, কাপ্তান মিরনফ বরাবরেষু (গগাপনীয়) আপনাকে জানাইতেছি, একজন পলাতক ডন কশা, এমেলিয়ান পুগাচফ, মৃত সম্রাট তৃতীয় পিট বলিয়া নিজের পরিচয় দিতেছে। এই অপরাধ অমার্জনীয়। উপরন্তু সে একদল বদমায়েস জুটাইয়া ইয়েক. প্রজাদের মধ্যে বিদ্রোহ সৃষ্টি করিয়াছে ; কয়েকটি দুর্গ দখল ও লুঠ করিয়াছে—সবস্থানে ডাকাতি, খুন জখমও অনেক করিয়াছে। অতএব মহাশয়, আপনি সেই দুবৃত্তকে শান্তি দিবার জন্য প্রস্তুত থাকিবেন রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী এবং যদি সে আপনার অধীনস্থ দুর্গ আক্রমণ করে, তাহাকে সমূলে ধ্বংস করিবেন। কাপ্তান তাঁর চসমা খুলে কাগজখানা ভাঁজ করতে করতে বললেন, “ধ্বংস করিবেন” বলা খুব সােজা, বুন্সে? বদমায়েসটার পিছনে নিই ৮ লােক আছে, আর আমরা রয়েচি এখানে মােট ..এক ত্রিশ নবিশ্যি কশাকদের বাদ দিয়ে, কারণ তাদের ওপর আদৌ নির্ভর করা চলে না—ম্যাকসিমিচ, তােমায় দোষ দিচ্চিনে। {শাক সার্জেন্ট হাল। যাই হােক, উপায় নেই। তােমরা সাবধানে যার যার কাজ কর; দিন রাত পাহারার ব্যবস্থা কর; যদি আক্রমণ হয়, ফটক বন্ধ করে সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে দাঁড়াবে। আর, ম্যাসিমিচ, তুমি তােমার কশাকদর ওপর কড়া নজর রাখা। কামনটার কলকবজা পরীক্ষা করে, বেশ পরিষ্কার রাখা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যাপারটা গােপন রাখবে, দুর্গের কেউ ঘুণাক্ষরেও না জানতে পারে। উপদেশ দিয়ে ইভান কুজমিচ আমাদের বিদায় দিলেন। সাব্রিন আর আমি একসঙ্গে বের হয়ে গেলাম—যা শুনেছিলাম দুজনে তারই -আলােচনা করতে লাগলাম। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম “ব্যাপার কতদুর গড়াবে মনে হয় ? সে উত্তর দিল, “ভগবান জানেন। দেখতেই পাব। এখনও বেশী কিছু বােঝা যাচ্ছে না। কিন্তু যদি সে চিন্তা করতে লাগল, আর অন্যমনস্ক ভাবে শীস্ দিয়ে একটা ফরাসী সুর ভাঁজতে লাগল। আমাদের সাবধানতা সত্ত্বেও পুগাচফের খবরটা দুর্গময় ছড়িয়ে পড়ল। ইভান কুজমিচ তার স্ত্রীকে শ্রদ্ধা করতেন খুবই, কিন্তু সারা যেন পুগাচফের বিদ্রোহ পৃথিবীর বিনিময়েও কোনও সামরিক গুপ্ত খবর তিনি তাকে জানাতে রাজী ছিলেন না। সেনাপতির চিঠি পেয়ে তিনি স্ত্রীকে কৌশলে সরিয়ে দিয়েছিলেন ; বলেছিলেন “পাদ্রী জেরাসিম ওরেনবুর্গ থেকে ভয়ানক সংবাদ পেয়েছে; আবার সেটা গােপন করে রেখেচে ; যাও দেখি, জেনে এস।” ভাসিলিস ইগরফনা তখনই পাত্রী সীর কাছে গেলেন। ইভন কুজমিচের পরামর্শে মাসাকেও তিনি সঙ্গে নিলেন, পদ একা থাকতে তার কষ্ট হয় । এইভাবে বাড়ীর একমাত্র কর্তা হয়ে কাপ্তান আমাদের ডেকে পাঠালেন এবং পালসাকে ভাঁড়ার ঘরে কুলুপ দিয়ে বন্ধ করে রাখলেন, যাতে সে আড়ি পেতে কিছু না শােনে। কী পুরুতের বৌএর কাছে কোনই খবর বের করতে পারেন নি; বাড়ী এসেই শুনতে পেলেন যে তার অনুপস্থিতিতে ইভান কুজমিচ একটি সভা করেচেন ; পালাসা ত আটক ছিল। তার বুঝতে বাকি রইল না যে স্বামী তঁাকে ঠকিয়েছেন। তিনি। স্বামীকে জেরা করতে লাগলেন। ইভান কুজমিচ এই আক্রমণের জন্য তৈরী ছিলেন। এতটুকুও অপ্রতিভ না হয়ে তিনি উত্তর দিলেন, “প্রিয়তমে, আমাদের মেয়েরা খড়ের আগুনে ষ্টোভ ধরাতে শুরু করেছে, এতে চালাঘরে আগুন লাগবার ভয়। তাই আমি কড়া হুকুম দিয়েছি, তারা যেন খড় না পুড়িয়ে কাঠ পােড়ায়।” কী জিজ্ঞাসা করলেন, “তাহলে পালাসাকে আটকে রেখেছিলে কেন? কি অপরাধে তাকে আমাদের আসা পর্যন্ত বন্ধ থাকতে হ’ল ?” ইভান কুজমিচ এই রকম জেরার জন্য তৈরী হন্ নি ; তিনি ঘাবড়ে * গিয়ে কতকগুলাে এলােমেলো কথা বললেন। ভাসিলিসা ইগরফনা স্বামীর ধাপ পাবাজী ধরে ফেললেন, কিন্তু বুঝলেন তার পেট থেকে 0 রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী কোনও কথা বের করা যাবে না। তাই জেরা ছেড়ে দিয়ে, পাদ্রীবো মুণ দিয়ে কেমন সুন্দর শসা মাখতে জানে তাই বলতে লাগলেন। সারা রাত তার ঘুম হল না। কেবলই ভাবতে লাগলেন, তার স্বামীর মনে এমন কি কথা থাকতে পারে যা তার জানা বারণ ? পরনি-গর্জা থেকে ফিরবার পথে তিনি দেখতে পেলেন, ইভান নেটিচ কামানটার মুখ থেকে ছেড়া ন্যাক্রা, কাঠ, পাথর ইত্যাদি যত রবিস টেনে টেনে বেঁ করছে—ছেলেরা সেগুলাে কামানের মুখে গুজে দিয়েছিল। কাপ্তানগিন্নি অবাক হয়ে ভাবলেন, “এ সব লড়াইএর আয়ােজন কেন? আবার কিরঘি। এল নাকি ? ইভান কুজমিচ এই তুচ্ছ খবর আমার কাছে নিশ্চয়ই গােপন করতেন না। তার মেয়েস্বভাবসুলভ জাদার প্রবৃত্তির পক্ষে পীড়াদায়ক এই গুপ্তসংবাদ বের করবার জন্য কোমর বেঁধে তিনি ইভানয়েটিচকে ডেকে পাঠালেন। হাকিম যেমন দোষীকে অতর্কিত আক্রমণ কবার জন্য জেরার আগে অনেক বাজে কথা জিজ্ঞাসা করে, ভাসিলিসা ইগরফ না তেমনি গােড়ায় ঘরকন্নার গােটাকত কথা পাড়লেন। তারপরে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মাথা নেড়ে বললেন “পােড়া কপাল! কি দুঃসংবাদ একবার ভাব দেখিনি।” ইভান ইগ্নেটি উত্তর দিল “ব্যস্ত হবেন না, মা! ভগবানের ইচ্ছায় মঙ্গলই হবে। আমাদের সৈন্য অনেক, গােলা বারুদ যথেষ্ট। তা ছাড়া, কামানটা এই সাফ, ক'রে এলাম। পুগাচর্কে আমরা রুখতে পাবই। ভগবান যার সহায়, তার অনিষ্ট কেউ করতে পারে না। কর্তী জিজ্ঞাসা করলেন, “কি রকম লােক এই পুগাচফ ?” ইভান ইগ্নেটিচ দেখল মস্ত গাফিলী হয়ে গিয়েছে। সে চেপে যেতে পুগাচফের বিদ্রোহ চেষ্টা করল। কিন্তু তা আর চল না। ভাসিলিসা ইগরফ না তার পেট থেকে সব কথা টেনে বের করে নিলেন, অবিশ্যি আর কাউকে বলবেন না, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে । কী কথা রেখেছিলেন—খবরটা আর কাউকে বলেন নি। তবে, পাদ্রীবৌএর ওখানে গিয়ে দেখলেন, তার গরুটা তখনও বাহিরের মাঠে চ’রছে। সেটা যে বিপদজনক এই প্রসঙ্গে বিদ্রোহীদের কথা : পাদ্রী বৌএর কানে গেল। সুতরাং পুগাচফের কথা নিয়ে দুর্গ তােলপাড় হতে লাগল। গুজব এক এক জনের মুখে এক এক রকম শােনা যেতে লাগল। কাপ্তান কশাক সার্জেন্ট ম্যাকসিমিচকে পাঠালেন, পাশের গ্রামে ও দুর্গে খবর নিতে। সে ফিরে এসে খবর দিল, মাইল ৪ দূরে সে অনেক আলাে দেখতে পেয়েছে ; বকিরদের কাছে শুনেছে যে অসংখ্য সৈন্য এদিকে আসছে। সত্যি খবর কিছুই সে দিতে পারুল না—কারণ আর এগিয়ে যেতে তার সাহস হয় নাই। দুর্গের কশাকেরা চঞ্চল হয়ে উঠেছে, তা বেশ বােঝা যাচ্ছিল। রাস্তায় রাস্তায় দল পাকিয়ে তারা ফিস্ ফিস করে কি বলছিল, আর সৈন্য কিম্বা দুর্গের পাহারাদের দেখলেই গা ঢাকা দিচ্ছিল। তাদের ভিতরে গােয়েন্দা পাঠানাে হল। একজন খৃষ্টান কালমুক—নাম যুলাই-কাপ্তানকে অনেক দরকারী খবর * এনে দিত। সে বল্ল, ম্যাসিমিচ, মিথ্যা খবর দিয়েছে। ফিরে এসে সেই চতুর কশাক তার বন্ধুদের বলেছে যে সে বিদ্রোহীদের কাছে গিয়েছিল এবং তাদের নেতার সাথে সাক্ষাৎ করেছিল। নেতা তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল চুমাে খেতে, তার সাথে কথাও বলেছিল অনেকক্ষণ। এই কথা শুনেই কাপ্তান ম্যাকসিমিচকে গ্রেপ্তার করে যুলাইকে তার ৬৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী জায়গায় নিযুক্ত করলেন। কশাকেরা এতে ভয়ানক চটে গেল। তারা প্রকাশ্যে অসন্তোষ দেখাতে লাগল। ইভান ইগ্নেটিচ শুনতে পেল, তারা বলাবলি করছে, “দুর্গের মুষি, তােমার দিন ঘনিয়ে এসেচে।” কথা ছিল সেইদিনই কাপ্তান বন্দীকে জেরা করবেন। কিন্তু ম্যাসিমিচ, পালিয়ে যায়—খুব সম্ভব তার বন্ধুদের সাহায্যে। . আর একটা কারণে কাপ্তানের দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। একজন বকির রাজদ্রোহজনক কাগজপত্র সুব্ধ ধরা পড়ে। এবারও কাপ্তান কোনও অছিলায় কত্রীকে অন্যত্র পাঠিয়ে, একটি সভা করতে চাইলেন। তিনি সােজা সরল লােক, তাই আগেকার কৌশলটাই খাটাতে গেলেন। গলা পরিষ্কার করে বললেন, “ভাসিলিসা ইগরফনা, শুলাম পাদ্রী জেসিম সহর থেকে ভয়ানক একটা কাপ্তান গিন্নি বললেন, “আমার কাছে বাজে গল্প করো না, প্রিয়তম! বােধ হচ্ছে, এমেলিয়ন পুগাচফের সম্বন্ধে কিছু বলতে তুমি আবার সভা করবে। তাই বলে আমাকে ঠকিও না। ইভান কুজমিচ ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। শেষে বললেন, “ভাল, প্রিয়ে, তুমি যখন সব জেনেই ফেলেছ, তুমি থাকতে পার। আমরা তােমার সানেই কথা কইব।” গিন্নি বললেন, “সেই বরং ভাল। ধা বাজী তােমার আসে না ; কর্মচারীদের ডেকে পাঠাও * আবার একত্র হওয়া গেল। ইভানকুজমিচ তার স্ত্রীর সামনেই পুগাচফের ঘােষণাপত্র পড়লেন। সেখানা কোনও প্রায়-নিরক্ষ কশাকের লেখা। সয়তান জানিয়েছে, দুর্গে সে এসে পড়ল বলে। দুর্গবাসী কশাক ও সৈন্যদের ডেকেছে তার সাথে যােগ দিতে, এবং দুর্গনায়কদের উপদেশ দিয়েছে, তারা যেন বাধা না দেয়-বাধা দিলে মৃত্যু নিশ্চিত।
পুগাচফের বিদ্রোহ ৬৫ ঘােষণা-পত্ৰখানা চাষাড়ে ভাষায় লেখা, কিন্তু মনে খুব ধরে। সাধারণের মনে নিশ্চয়ই সেখানা খুব লেগেছিল। ভাসিলিসা ইগরফনা চেঁচিয়ে বললেন “বদমায়ে ব্যাটা। ব্যাটার : এত বড় আস্পর্ধা, আমাদের কাছে ঐ রকম প্রস্তাব করে। আমরা গিয়ে দেখা করে নিশান তার পায়ের নীচে রাখব। বেটা কুকুর, বেটা জানে না যে আমরা চল্লিশ বছর, ফৌজে আছি- —অমন ঘটনাও দু'চারটে দেখেছি! গুণ্ডা বেটার কথা নিশ্চয়ই কোন দুর্গনায়ক শােনে নি?” ইভান কুজমিচ উত্তর দিলেন, “আমার ত’ তা মনে হয় না। বােধ হচ্ছে গুণ্ডা বেটা এরই মধ্যে অনেক দুর্গ দখল করে ফেলেছে। সাব্রিন্ বলল, “তা হলে লােকটা শক্তিমান্ ব’লতে হবে’ কাপ্তান বললেন, “শক্তিটা তার কত তাই একবার দেখতে ইচ্ছা আছে। ভাসিলিস। ইগরফনা, ভাঁড়ারের বিটা দাও। ইভান ইগ্নেটিচ, সেই বসকিরটাকে বের করে নিয়ে এস। যুলাইকে বল, চাবুকখানা আনতে।” কাপ্তানগিন্নি উঠে বললেন “একটু সবুর কর, ইভান কুজমিচ। আমি মাসকে বাড়ী থেকে বাহিরে নিয়ে যাই। চীৎকার শুনলে বেচারী ভয় পাবে। আর সত্যি কথা বলতে কি, ও সব আমারও ভাল লাগে না। তােমাদের উদ্দেশ্য সফল হাে” সেকালে অপরাধীকে যন্ত্রণা দেওয়া বিচারের এমন একটি বড় অঙ্গ ছিল যে, যে উদার আইনের দ্বারা এই প্রথা রহিত হয় তা অনেক দিন পর্যন্ত অচল হয়ে থাকে। তখনকার ধারণা ছিল দোষীকে সাজা দিতে হলে তার স্বীকারােক্তি নিতান্ত দরকার। এই ধারণা একেবারে ভিত্তিহীন ও বিচারবুদ্ধির বিরােধী। কারণ আসামীর অস্বীকারােক্তি রাশিয়ার তুর্গেশনন্দিনী মদি তার নির্দোষিতার প্রমাণ ব’লে না মনে হয়, তবে তার স্বীকারােক্তিটা অপরাধের প্রমাণ বলে বিবেচিত হওয়া আরও ভয়ানক অবিচার। এখনও অনেক বুড়াে বিচারককে এই বর্বর নিয়ম উঠে যাওয়ায় দুঃখ করতে শুনি। আসামীকে যন্ত্রণা দেওয়া যে উচিত এবিষয়ে তখন আর দুই মত ছিল না-হাকিমেরও না, আসামীরও না। সুতরাং কাপ্তানের হুকুম শুনে আমরা আশ্চর্য হই নাই। ইভান ইগ্নেটিচ বকিরটাকে আনতে গেল—কাপ্তানগিন্নির ভাঁড়ারে সে বন্দী ছিল। কয়েক মিনিট পরে তাকে দরজার কাছে আনা হ’ল। কাপ্তান হুকুম দিলেন তাকে ঘরের ভিতরে আনতে। লােকটি অনেক কষ্টে দুয়ার পার হয়ে ঘরে ঢুকল। তার পায়ে বেড়ী ছিল। লম্বা টুপিটি খুলে সে দরজার পাশে দাড়াল। আমি তার দিকে চেয়ে দেখলাম। দেখে ভয়ে বুক দুরদুর করূতে লাগল। তার চেহারা কখনাে ভুলব না। বয়স তার সত্তরের ওপর হবে। নাক, কান কিছু নেই, মাথা মুড়ানােকয়েকগাছি মাত্ৰ দাড়ি মুখে ছিল। লােকটি খাটো, পাতলা, কুঁজো—কিন্তু তার ঘােট ঘােট চোখ দুটির ঔজ্জ্বল্য তখনও নষ্ট হয় নি। কাপ্তান তার শরীরে ভয়ানক চিহ্নগুলি দেখে বুঝতে পারলেন, সে ১৭৪১ খৃঃ অব্দের বিদ্রোহীদের একজন। বলেন “ওহহ, দেখছি তুমি বুড়াে নেকড়ে, আমাদের জালে এসে পড়েছ। তােমার চেহারাতেই মালুম হচ্চে যে এটা তােমার পুরান’ থেলা। কাছে এস ; বল কে তােমায় পাঠিয়েছে ?” বুড়াে নীরবে কাপ্তানের দিকে একটা ভাবহীন দৃষ্টিতে চেয়ে বই। ইভান কুজমিচ বললেন, “কথা কইচ না যে ! রুশভাষা বােঝ না ?
পুগাচফের বিদ্রোহ ৬৭ যুলাই, তােমর ভাষায় জিজ্ঞাসা করে, কে ওকে আমাদের দুর্গে পাঠিয়েছে ? কাপ্তানের প্রশ্নটি যুলাই তাতার ভাষায় জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু, বন্দী একই ভাবে তার দিকে চেয়ে রইল। কোনও জবাব দিল না। কাপ্তান বলেন, “আচ্ছা দাড়াও, তােমাকে কথা বলাচ্চি। তােমরা ওর ঐ ডােরা গাউনটা খুলে ফেল ; পিঠে যেন বেশ দাগ বসে। যুলাই, কাজটি বেশ ওস্তাদীর সাথে করা চাই।” দু’জন বুড়াে সিপাই বসকিরটির পােষাক খুলতে লাগল। হতভাগার মুখে আশঙ্কার চিহ্ন ফুটে উঠল। কোন জংলা পশু ছেলেদের হাতে পড়লে যে ভাবে তাকায় লােটি তেমনি চেয়ে রইল। তখন সিপাইরা তাকে চ্যাং দোলা করে শূন্যে তু, যুলাই চাবুক দোতে লাগল। লােকটি ক্ষীণ, করুণ স্বরে আর্তনাদ করে উঠল। এবং মাথা নাড়তে নাড়তে মুখ খুল। দেখা গেল তার মুখে জিভ, নেই—শুধু জিভের কাটা গােড়াটা আছে। লােকটার এই অবস্থা দেখে আমার প্রাণে বড় বাজল। কাপ্তান বললেন, “ভাল, দেখতে পাচ্ছি এর কাছে আমরা বেশ কিছু জাতে পারব না। যুলাই, বকিরটাকে ফের ভাড়ারে নিয়ে রাখাে। তােমাদের সাথে আমার আরও কিছু পরামর্শ আছে।” তখনকার অবস্থার আলােচনা করছি এমন সময়ে ভাসিলিসা ইগরা স্তভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকলেন। কাপ্তান অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তােমার আবার কি হল ?” ভাসিলিসা ইগরফুনা উত্তর দিলেন “অতি ভয়ানক দুংসংবাদ, প্রিয়তম আজ সকালে ওরা নিওজানী ‘দুর্গ দখল করেছে। পাত্রী জেসীমের ;
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী চাকর এই সেখান থেকে আসছে। যখন দখল হয়, সে নিজে দেখেছে। দুর্গের নায়ক এবং আর সব কর্মচারীর ফাঁসি হয়েছে। সব সৈন্য বন্দী। বদমায়েসগুলাে যে কোনও মুহূর্তে এখানে এসে পড়বে।” এই অপ্রত্যাশিত সংবাদে আমার মন একেবারে দমে গেল। নিওজারুনী দুর্গের কাপ্তানকে আমি জান্তাম। অতি বিনয়ী, ধীর যুবক সে। দুমাস আগে ওরেনবুর্গ থেকে তার কর্মস্থলে যাওয়ার পথে সে কুজমিচের বাড়ীতে উঠেছিল। সঙ্গে তার কিশােরী পত্নী ছিল। তার দুর্গ আমাদের এখান থেকে পনর মাইল। পুগচিফ এইবারে যখন ইচ্ছা আমাদের দুর্গ আক্রমণ ক’রূবে। কল্পনাচক্ষে মেরিয়া ইভানভনার ভাবী দুর্দশা দেখে অধীর হয়ে পড়লাম। কাপ্তানকে বল্লাম, “ইভান কুজমিচ, শুনুন্। বলাবাহুল্য শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দুর্গ আমাদের রক্ষা করতে হবে। কিন্তু মেয়েদের রক্ষার উপায় ভাবা দরকার। রাস্তা যদি খােলা থাকে তবে ওরেনবুর্গ কিম্বা আরও দূরের কোনও দুর্গে তাদের এখনি পাঠিয়ে দিন যাতে গুণ্ডারা নাগাল না পায়। কাপ্তান তার স্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, “প্রিয়ে, বলছি কি, যতদিন বিদ্রোহদমন না হয়, ততদিন তোমাকে আর মাসাকে অন্যত্র পাঠালে ভাল হয় নাকি?” তিনি উত্তর দিলেন “অতি বাজে কথা! গুলির কাছে কোন দুর্গই নিরাপদ নয়। বেলগরস্কি কি দোষ করেছে ? ভগবানের আশীর্বাদে আমরা এখানে ২২ বছর কাটালেম। বকিরদের দেখেছি, কিরঘিসদেরও দেখেছি। ভগবানের দয়া থাকলে পুগাচফও আমাদের কোন অনিষ্ট করতে পারবে না।” ইভান কুজমিচ বললেন “তবে তাই হোক, প্রিয়ে ; আমাদের দুর্গের পুগাচফের বিদ্রোহ ৫ । । । । । উপর যখন তােমার এত ভরসা, তখন তােমার ইচ্ছা হয়, থাকো। কিন্তু মাসার কি ব্যবস্থা করা যায় ? যদি ওদের তাড়িয়ে দিতে পারি বা . নতুন সৈন্য পৌছা পর্যন্ত টিকে যাই, ক্ষতি নেই কিছু। কিন্তু যদি গুণ্ডারা দুর্গ দখল করে ?” “যদি তা হয় ভাসিলিসা ইগরফনা নিতান্ত অধীর হয়ে পড়লেন, আর কথা বলতে পারলেন না। কাপ্তান দেখলেন জীবনে এই প্রথম তার কথা তার স্ত্রীর মনে লেগেছে। তিনি বললেন, “মামার এখানে থাকা ঠিক হবে না। ওরেনবুর্গে তার ধৰ্ম্মমায়ের কাছে তাকে পাঠিয়ে দিই! সেখানে অনেক সৈন্য, বন্দুক কামানও যথেষ্ট, দুর্গ পাথরের দেওয়ালে ঘেরা। তােমাকেও পরামর্শ দিচ্চি, তুমি মাসার সঙ্গে সেখানে যাও। তুমি বুড়া, কিন্তু দুর্গ যদি ওদের হাতে পড়ে, তােমার কি দশা হয় দেখতেই পাবে।” গিন্নি বললেন, “বেশ কথা, তা হলে মাসাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া যাক। কিন্তু আমাকে পাঠাবার স্বপ্ন দেখাে না। আমি যাবনা, বুড়াে বয়সে, তােমায় ছেড়ে থাকবার কথা ভাবতেও পারিনে। দূরে একা আলাদা কবরে যাবো ? তা হবে না, এক সঙ্গে আছি, যাবও এক সঙ্গে। কাপ্তান বলেন, “কথা ঠিক। যাক্, আর সময় নষ্ট করা উচিত নয়। মাসার যাওয়ার ব্যবস্থা করগে। কাল ভােরে তাকে একজন পাহারার জেম্মায় পাঠিয়ে দেবাে, যদিও অতিরিক্ত লােক আমাদের একেবারেই নেই। কিন্তু মাস কোথায় ? কাপ্তানগিন্নি বললেন “পাদ্রীবৌএর ওখানে। নিওজারনী দুর্গ বিদ্রোহীদের হাতে পড়েছে শুনে বেচারী মূৰ্জিত হয়ে পড়েছিল। ভয় হচ্ছে, ওর একটা অসুখ বিসুখ বা হয়ে পড়ে।” ভাসিলিসা ইগরফ না মেয়ের যাত্রার ব্যবস্থা করতে গেলেন। আমাদের ৭০ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী কথাবার্তা চলতে লাগল। কিন্তু তার কিছুই আমার ঢুকল না। রাত্রে খাওয়ার সময় মাস এল—মুখ ফ্যাকাসে, চোখ দুটি জলভরা। নীরবে খাওয়া শেষ করা গেল ; অন্য দিনের চেয়ে অনেক আগে টেবিল ছেড়ে উঠলাম। কাপ্তান পরিবারের কাছে বিদায় নিয়ে নিজের বাসার দিকে চললাম। কিন্তু আমি ইচ্ছা করেই তলােয়ারখানা ফেলে রেখে গিয়েছিলাম। সেখানা নিতে আবার ফিলাম। আমার আশা ছিল মেরিয়া ইভানভনাকে একা দেখতে পাব। সত্যিই সে দোরে এসে তলােমারখানা আমার হাতে দিল। চোখের জল ফেলে সে বল, “পিটর এণ্ডিচ, এইবার তবে বিদায়। আমাকে ত’’ওরেনবুর্গে পাঠাচ্চে। তুমি বেঁচে থাকো, সুখে থাকো, হয়ত ভগবানের ইচ্ছায় আবার দেখা হবে। যদি না হয় “বলতে ব’লতে মাসা ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আমি তাকে বুকে চেপে ধরলাম ; বলাম, “আমার হৃদয়ের দেবি, প্রিয়তমে, বিদায় দাও। ভাগ্যে যাই ঘটুক, মনে রেখাে, আমার শেষ চিন্তা, শেষ প্রার্থনা হবে তােমারই মঙ্গলের জন্য।” মাসা আমার কাধে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। আমি আদর করে তাকে একটি চুমাে দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
।
আক্রমণ
শির দিয়ে কত করিয়াছি সেবা সম্রাটের,
তিরিশ বছর প্রাণপণ করি খেটেছি ঢের।
হ’ল না অর্থ, সুখ এ কপালে হ'ল না হয়,
খ্যাতি যশােমান না হইতে লাভ আয়ু ফুরায় ।
এত খেটেখুটে অপঘাত, ছিল কপালে মাের,
উপরি পাই গলেতে চিকণ ফাঁসীর ভাের। চীষার গান
সে রাত্রে পােষাক ছাড়লাম না, ঘুমও হল না। ঠিক করলাম
ভােরে দুর্গের ফটকে যাব। মেরিয়া ইভানভুনা রওনা হওয়ার আগে
তার কাছে শেষ বিদায় নেব। আমার মনের ভাব তখন একদম
বদলে গিয়েছে। আগেকার অবসাদের চেয়ে এখনকার এই উত্তেজনা
খারাপ লাগছিল না। বিদায়ের দুঃখের সাথে, একটা প্রাণভরা আশা,
বিপদের আশঙ্কা, উচ্চ ভাবের প্রেরণা মিশে ছিল। রাতটি কি করে
কাটল জাতেও পালাম না। আমি বের হয়ে যাব এমন সময়ে আমার
দোর ঠেলে একজন করপােরাল ভিতরে ঢুকল। সে খবর দিল, আমাদের
কশাক সৈন্যদল রাত্রে দুর্গ ছেড়ে পালিয়েছে। যুলাইফে ধরে নিয়ে
গিয়েছে। দুর্গের বাহিরে জনকতক অপরিচিত লোেক ঘােড়ার পিঠে
ঘুরছে।
মেরিয়া ইভানভ না হয়ত’ পালাবার সময় পাবে না, এই ভেবে আমি
রাশিয়ার হুর্গেশনন্দিনী • । বড্ড ভয় ভয় পেলাম। তাড়াতাড়ি করপােরালকে কয়েকটি উপদেশ দিয়ে আমি দুর্গনায়কের বাড়ীর দিকে ছুটলাম। তখন ভােরবেলা। রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছি এমন সময় শুলাম, কে যেন ডাকছে। আমি ফিরে দাড়ালাম। কাণা ইভান ইগ্নেটিচ আমার নাগাল ধরে জিজ্ঞাসা করল, “কোথায় যাচ্ছ? ইভান কুজমিচ প্রাচীরের ওপর। সে তােমায় ডেকে পাঠিয়েছে। পুগাচফ এসেছে।* ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “মেরিয়া ইভানভ রওনা হয়েছে কি ?” উত্তর—“তার আর সময় হয় নি। ওরেনবুর্গের রাস্তা শত্রুর হাতে। তারা দুর্গ ঘিরে ফেলেছে। গতিক বড় সুবিধে নয়, পিটর এণ্ডিচ। আমরা দুর্গ প্রাচীরের ওপরে গেলাম। মাটিটা সেখানে স্বভাবত প্রাচীরের আকারে উচু। তার গায়ে কাঠের বেড়া দিয়ে শক্ত করা হয়েছে। দুর্গের সবলােক সেইখানে ভিড় করছিল। . সৈন্যেরা রাইফেল কাঁধে দাড়িয়ে ছিল। কামানটা আগের দিন সেখানে বসান হয়েছিল। কাপ্তান তার.ছােট সৈন্যদলের সামনে পায়চারি করছিলেন। বিপদের সম্মুখে সেই বর্ষীয়ান যােদ্ধার অদ্ভুত তেজ প্রকাশ পেতে লাগল। দুর্গ থেকে অল্প দূরে, প্রান্তরে জনকুড়ি লােক ঘােড়ার পিঠে ছুটাছুটি করছিল। দেখে মনে হচ্ছিল তারা কশাক। কয়েকজন বকিরও ছিল। মাথায় বনবেড়ালের চামড়ার টুপি, পিঠে তৃণ দেখে তাদের চেনা যাচ্ছিল। কাপ্তান সিপাইদের সারের মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে বললেন, “দেখ বাছা, আমরা মহারাণীর চাকর, এস আমরা পৃথিবীর সবাইকে দেখাই যে আমাদের সাহস ও রাজভক্তি দুইই আছে।” সৈন্যের মহা উল্লাসে এই আক্রমণ ৭ কথায় সাড়া দিল। সাব্রিন আমার পাশেই দাড়িয়ে শত্রুদের দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিল। দুর্গে এই সাড়া দেখে প্রান্তরের সােয়ারের এক হয়ে কি বলাবলি করতে লাগল। কাপ্তান ইভান ইগ্নেটিচকে কামানটা তা করে বসতে বললেন ; তারপরে নিজহাতে সেটা দাগলেন। কামানের গােলা শশা শো শব্দ করে শত্রুর মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল ; কিন্তু তাদের কোনই ক্ষতি হল না। সােয়ার কটি বিচ্ছিন্ন হয়ে, তখনই অদৃশ্য হয়ে গেল; প্রান্তর জনশূন্য হ’ল। সেই সময়ে ভাসিলিসা ইগরফ না মাসাকে নিয়ে দুর্গপ্রাচীরের ওপর দেখা দিলেন। মাস কিছুতেই তাকে ছেড়ে থাকছিল না। কাপ্তানগিন্নি জিজ্ঞাসা করলেন, “কি গাে, কি হচ্ছে ? লড়াই কেমন চলেছে ? শত্রু কোথায় ? ইভান কুজমিচ বলেন, “শত্রু বেশী দূর নয় । ভগবানের ইচ্ছায় সব ভালই হবে। মাসা, তােমার ভয় হচ্ছে না ?” মাসা উত্তর দিল, “না, বাবা! বাড়ীতে এল। থাকার চেয়ে এখানে ঢের ভাল। আমার দিকে চেয়ে সে একটু হাসতে চেষ্টা করল। আমি তলােয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরলাম। মনে হ’ল আগের দিন সেখান মাসার হাত থেকে পেয়েছি তাকে রক্ষা করবার জন্যই। আমার রক্ত গরম হয়ে উঠল। মনে হতে লাগল তাকে রক্ষা ক’বার ভার আমার ওপর। তাকে যে ভালবাসি তার পরিচয় দিতে অধীর হয়ে উঠলাম। যুদ্ধের সেই শুভ মুহূর্তের জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলাম। সেই সময়ে দুর্গের আধ মাইল দূরে একটি পাহাড়ের আড়াল থেকে নতুন একদল সােয়র দেখা দিল। দেখতে দেখতে অনেক লােক প্রান্তর ছেয়ে ফেল। তাদের হাতে বর্শা ও তীরধনুক। লাল কোট ।
৭৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী গায়ে একটি লােক সাদা ঘােড়া চড়ে, খােলা, তলােয়ার হাতে সেই জনতার ভিতরে ঘুছিল। সেই পুগাচফ,। সে ঘােড় থামালে সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়াল। চারজন লােক ধাপে ঘােড়া ছুটিয়ে একেবারে দুর্গপ্রাচীরের নীচে এসে দাঁড়াল। বােঝা গেল' তারা পুগাচফের হুকুম নিয়ে আছে। তারা আমাদেরই বিশ্বাসঘাতক কশাকদের চারজন। একজন টুপিতে করে একখানা কাগজ এনেছিল ; আর একজন এনেছিল বর্শার ফলকে যুলাইএর মাথা। সেটা সে কাঠের বেড়ার ওপর দিয়ে আমাদের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সেই কালমুক বেচারার মাথাটা গড়িয়ে এসে কাপ্তানের পায়ের কাছে পড়ল। সেই নিমক- হারামগুলো চেঁচিয়ে উঠল, “গুলি করে না, আমাদের রাজাকে সেলাম করবে এস। ঐ যে রাজা এসেচে।** ইভান কুজমিচ চেঁচিয়ে বললেন, “এই যে সেলাম জানাচ্ছি। বাছারা, চালাও গুলি।” সৈন্যেরা একবার গুলি ছুড়ল। যে কশাকটি চিঠিখানা ধরেছিল সে ঘােড় থেকে পড়ে গেল। বাকি ক’জন ঘােড়া ছুটিয়ে পালাল। মেরিয়া ইভানভনার দিকে চাইলাম। বুলাইএর সেই রক্তাক্ত মাথাটা দেখে, আর একসাথে অতগুলি বন্দুকের আওয়াজ শুনে তার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। কাপ্তান করপোরালকে ডেকে সেই মৃত কশাকের হাতের চিঠিখানা আনতে বলেন। কপােল বের হয়ে গিয়ে মৃত কশাকের ঘোড়াটা লাগাম ধরে ভিতরে নিয়ে এল। চিঠিখানা কাপ্তানকে দিল। ইভান কুজমিচ সেখান মনে মনে পড়ে নিয়ে টুকরাে টুকরাে করে ছিড়ে ফেললেন। ইতিমধ্যে বিদ্রোহীরা যুদ্ধের জন্য তৈরী হ’ল। দু চার মিনিট না হতেই আমাদের কানের পাশ দিয়ে সোঁ সোঁ করে গুলি ছুটতে লাগল। কয়েকটি তীর এসে আক্রমণ ৭৫ মাটিতে পুঁতে গেল; আর গােটা কত আমাদের সামনে বেড়ায় এসে ঠে। কাপ্তান বললেন, “ভাসিলিসা ইগরফনা, এটা স্ত্রীলোকের উপযুক্ত জায়গা নয়। মাসাকে নিয়ে বাড়ী ফিরে যাও; মেয়েটা যে ভয়ে একেবারে আধমরা হয়ে পড়েছে।” গুলি ছোেটার সাথে সাথে কাপ্তান গিন্নি চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি প্রান্তরের দিকে চাইলেন—দেখলেন সেখানে মহা হুলুস্থুল ! তারপরে স্বামীর দিকে চেয়ে বললেন “ইভান্ কুজমিচ, বাঁচামরা সব ভগবানের হাত। মাসাকে আশীর্বাদ করে। যাও মা, তােমার বাবার কাছে যাও।” মাস শুনাে মুখে কঁপতে কাপতে বাবার কাছে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে, মাটিতে লুটিয়ে তাকে নমস্কার করল। বুড়াে কাপ্তান তার গায়ে তিনবার ক্রুশের চিহ্ন আঁকলেন, তারপরে ধ’রে তুলে, মাথায় চুমাে খেয়ে বলেন, “মাস, ভগবাস তােমায় সুখী করুন। তাকে ডেকো, তিনি তােমায় ছাড়বেন না। যদি ভাল বরের হাতে পড়, ভগবান যেন তােমাদের শান্তি ও প্রতি দান করেন। আমরা যেমন ঘর করেছি তােমরাও তেম্নি করে। এইবারে এস। ভাসিলিসা ইগরনা, তুমি মাসাকে নিয়ে ফিরে যাও।” মাস দুই বাহু দিয়ে বাবার গলা ধরে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। কাপ্তান-গিন্নি ছলছল চোখে বললেন, “এ প্রিয়, আমরাও দুজনা দুজনকে চুম্বন করি। বিদায়, ইভান কুজমিচ। যদি কখনও তােমায় বিরক্ত করে থাকি, আমায় ক্ষমা করাে।” বুড়ীকে গাঢ় আলিঙ্গন দিয়ে কাপ্তান বলেন, “বিদায়, প্রিয়ে, বিদায়! বেশ হয়েছে। তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে যাও। যদি আয় পাও, মাসাকে একটা গরম জামা পরিয়ে দিও।”
৭৬ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী কাপ্তানের স্ত্রীকন্যা ফিরে চলেন। আমার দৃষ্টি বুইল মাসার দিকে। মাস আমার দিকে চেয়ে মাথা নােয়াল। এইবারে ইভান কুজমিচ আমাদের দিকে ফিরলেন। এখন সারা মন দিয়ে তিনি শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলেন। বিদ্রোহীরা তাদের নেতার চারদিকে ঘােড়া থেকে নামতে লাগল। কাপ্তান বলেন, “এইবার শক্ত হয়ে দাড়াও ; ওরা আক্রমণ করবে।* হঠাৎ ভয়ানক চীৎকার ও জয় জয় শব্দে আমাদের কানে তালা লাগল। বিদ্রোহীরা তীরের মত দুর্গের দিকে ছুটে এল। কামানটাতে গােলা ভরা ছিল। কাপ্তান তাদের খুব কাছে আসা পৰ্যন্ত চুপ করে রইলেন। তারপরে কামান দাগা হল। গােল গিয়ে ঠিক জনতার মাঝখানে পড়ল। বিদ্রোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছিয়ে গেল। শুধু তাদের নেতা দাড়িয়ে তলােয়ার ঘুরাতে লাগল। মনে হ’ল সে সঙ্গীদের উৎসাহ দিচ্ছে। যে চীৎকার গর্জন থেমেছিল, তা আবার শুরু হল। কাপ্তান বললেন, “বাছারা, এইবারে ফটকটা খােল; ঢাক বাজাতে বাজাতে গিয়ে চলল, আমার পিছনে।” কাপ্তান, ইভান ইগ্নেটিচ ও আমি তখনি দুর্গ প্রাচীরের বাহিরে গিয়ে পড়লাম। কিন্তু আমাদের সৈন্যরা ঘাবড়ে গিয়েছিল। তারা নড়লও না। ইভান কুজমিচ চেঁচিয়ে বললেন, “বাছারা, চুপ করে দাড়িয়ে রইলে কেন ? মরুতেই যদি হয়, ম’ব। সেটা ত’ রােজকার ঘটনা, এমন নতুন কিছু নয়।” এই সময়ে বিদ্রোহীরা দৌড়ে আমাদের দিকে এল। ভিড় করে তারা দুর্গের ভিতরে ঢুকে পড়ল। ঢাকের বাজনা থেমে গেল ।
আক্রমণ ৭৭ আমাদের সৈন্যরা রাইফেল ফেলে দিল। আমি ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম ; উঠে বিদ্রোহীদের সাথে দুর্গের ভিতরে ঢুকলাম। কাপ্তান মাথায় জখম হয়েছিলেন; বয়েসগুলাে তাকে ঘিরে ধরে চাবির : তাগিদ দিতে লাগল। আমি তাকে সাহায্য করতে ছুটিলাম। কয়েকটি যােয়ান কশাক আমাকে ধরে তাদের বেল্ট দিয়ে বেঁধে ফেলল। বলল “সম্রাটের শত্ৰু, তােমাদের পুরস্কার দিচ্ছি।” তারা রাস্তা দিয়ে আমাদের টেনে নিয়ে চল। সহরের লােক বিদ্রোহীদের নেতার জন্য মুন রুটি উপহার নিনে বাহিরে এসে দাঁড়াল। গির্জার ঘণ্টা ঢং ঢং করে বাজতে লাগল। হঠাৎ জনতার মধ্যে রব উঠল। “সম্রাট বাজারের মধ্যে বন্দীদের বিচার করবার জন্য অপেক্ষা করছেন, আর রাজভক্তির শপথ গ্রহণ করাচ্ছেন।” সহরের লােক সেইদিকে ছুটল ; আমাদেরও সেইদিকে নিয়ে চলল। পুগাচফ, কাপ্তানের বাড়ীর সম্মুখে পৈঠার ওপর চেয়ারে বসেছিল। তার গায়ে ছিল জরীর কাজ করা একটি কশাকদের লাল কোট। সােনার ঝুঁটিওয়ালা লম্বা কালাে. একটি টুপি তার উজ্জ্বল চোখ দুটিকে আড়াল করে ছিল। তার মুখখানা চেনা চেনা ঠেকল। বুড়াে কশাকেরা তাকে ঘিরে ছিল। পাদ্রী জেরাসিম বিবর্ণ মুখে পাশে দাঁড়িয়ে কঁপছিলেন তার হাতে একটি কুশন্ত্র। মনে হ’ল ভাবী দণ্ডিতদের জন্য তিনি ভগবানের দয়া ভিক্ষা করছিলেন। বাজারে চটপট, ফাঁসিকাঠ খাটান হচ্ছিল। বসকিরেরা ভিড় সরিয়ে দিয়ে আমাদের পুগাচফের সামনে নিয়ে এল। ঘন্টার ঢং ঢং শব্দ থামূল। চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। | জাল সম্রাট বলল, “কাপ্তান কোনটি ? কশাক সার্জেন্ট ম্যাসিমিচ ভিড় ঠেলে এসে ইভান কুজমিচকে ৮০ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী ওরা আমাকে তুলে ছেড়ে দিল। আমি সেই নিষ্ঠুর প্রহসন দেখতে লাগলাম। সহরের সব লােক রাজভক্তির শপথ নিচ্ছিল। লােকের পরে লোক এসে শকাঠে চুমাে খেয়ে জালরাজাকে নমস্কার *’রতে লাগল। দুর্গের সৈন্যেরাও সেখানে ছিল। ফৌজের দর্জি তার ভোঁতা কঁচি দিয়ে তাদের বেণী কৈটে দিল। তারা গা ঝাড়া দিয়ে এসে দিব্যি পুগাচফের হাতে চুমাে খেল। পুগাচফ, তাদের ক্ষমা করে নিজের দলে ভৰ্ত্তি করে নিল। ঘণ্টা তিনেক ধরে এই ব্যাপার চল। অবশেষে পুগাচফ, পৈঠা বেয়ে নীচে নেমে এল। তার মন্ত্রীর সাথে চল। তখনি দামী সাজপরা একটা সাদা ঘােড়া আনা হ’ল। দুজন কশাক তার হাত ধরে নিয়ে ঘোড়ায় চাপিয়ে দিল। পুগাচফ, পাদ্রী জেরাসিমকে ব, “আজ তােমার ওখানে আমার বড় হাজরির যোগাড় কর গে।” ঠিক তখনই মেয়ে গলার কান্না শােনা গেল। কয়েকটা ডাকাত ভাসিলিসা ইগরফনাকে টাতে টাতে নিয়ে এল। তার আচ্ছাদন ছিল না বললেই চলে ; চুলগুলাে আলু থলু। তার জামাটি একজন ডাকাত ছিনিয়ে নিয়ে পরেছিল। আর জনকত তার ঘরের পালকের গদি, বা, বাসন কোসন, কাপড় জামা প্রভৃতি লুটে নিয়ে আসছিল। বৃদ্ধা কেঁদে বলেন, “বাছারা, আমাকে ছেড়ে দাও। দয়া করে আমাকে ইভান কুজমিচের কাছে যেতে দাও।” হঠাৎ ফাঁসিকাঠের ওপর তঁার নজর পড়ল। স্বামীকে তিনি চিনতে পারুলেন। রাগে, দুঃখে পাগল হয়ে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “সয়তানের দল, ও কি করেছিস। ইভান কুজমিচ, আমার চোখের মণি, সাহসী : বীর, নির্ভীক যােদ্ধা! প্রসিয়ার তলোয়ার, তুর্কের কামান তােমার ;
আক্রমণ
৮১
গায়ে আঁচড় দিতে পারে নাই। ন্যায়যুদ্ধে মরবার সুযােগ মাের
হ’ল না ! শেষে কিনা একটা পলাতক চোরের হাতে তােমার মৃত্যু
লেখা ছিল!”
পুগাচফ, বল, “চুপ রয়ে, সয়তান বুড়ি !”
একটি বােয়ান কােক তার মাথায় তলােয়ারের চোপ, বসিয়ে
দিল। সেই পৈঠার ওপরে তার মৃতদেহ ঢলে পড়ল।
পুগাচফ, ঘােড়া ছুটিয়ে দিল ; জনতা তার পিছনে ছুটুল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ অনাহূত “অতিথি অচেনা যে, তুকির বাড়া সে।” প্রদ •• বাজারে প্রাঙ্গন তখন জনশূন্য ! আমি তবুও সেখানে দাড়িয়ে ছিলাম, এলো মেলো চিন্তাগুলি গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না। সেই দিনের বীভৎস ঘটনাগুলি আমার মনে কি ঝড় তুলেছিল। গেরিয়া ইভানভনার দশা কি হল, এই ভাবনাই আমার সব চিন্তা ছাপিয়ে উঠল। কোথায় সে ? কি অবস্থায় আছে ? লুকোবার সময় পেয়েছে কি না ? যেখানে আছে সেটা নিরাপদ কিনা—এইসব ভাবতে ভাবতে কাপ্তানের বাড়ীতে ঢুকলাম। বাড়ী একে বারে জনশূন্য ; চেয়ার, টেবিল, বাক্স সব গুড়াে গুড়াে হয়ে গিয়েছে ; বাসন পত্র সব ঐ একই অবস্থায়, আর সব জিনিষ লুঠেদের হাতে পড়েছে। দোতলছােট সিড়িটা বেয়ে ওপরে উঠলাম। জীবনে এই প্রথম মেরিয়া ইভানভনার কাায় ঢুকলাম। দেখলাম ডাকাতরা তার বিছানা ছিড়ে সুত করে ফেলেছে। কাপড়ের আলমায়রা ভেঙ্গে লুট করেছে ; দেবতার শূন্য কুলঙ্গীর সামনে তখনও প্রদীপ জ্বলছে। দুটি জানালার মাঝখানে, দেয়ালে আসিখানা তখনও ঝুলছে। কিন্তু এই অনাড়ম্বর শয়নঘরের অধিষ্ঠাত্রী কই ? হঠাৎ একটা ভয়ানক আশঙ্কা আমার মনে জেগে উঠল। কল্পনার চোখে যেন দেখতে পেলাম মা ডাকাতদের হাতে পড়েছে। আমার বুক অবসন্ন হয়ে গেল। ব্যাকুলভাবে প্রিয়তমার অনাহু { নাম ধরে ডাকতে লাগলাম। এই সময়ে একটা শব্দ হ’ল ; পালাসা কাপড়ের আলমারার “পছন থেকে বের হল, তার মুখ ফ্যাকাশে, সারা শরীর কাঁপছে। দুই হাত জুড়ে মেটচিয়ে বল্ল, “আঃ পিট এণ্ডিচ, কি ভীষণ দিন ! কি দুর্ঘটনা। আমি ব্যস্তভাবে জিজ্ঞাসা করলাম “আর মেরিয়া ইভানভ না? তার কি হয়েছে?” পালাসা উত্তর দিল, “সে বেঁচে আছে। আকুলিনা পামফিলভ নার বাড়াতে লুকিয়ে আছে।” আমি ভয়ে আকুল হয়ে বললাম, “পাদ্রির বাড়ীতে ! হা ভগবান, পুগচফ যে সেখানে ।” ঝড়ের মত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সােজা দৌড়ে পুরুতের বাড়ী পোঁছলাম—কোথায় কি হচ্ছে ক্ষেপ নেই। সেখানে গানের আওয়াজ আর উচ্চ হাসির রােল শুনতে পেলাম। পুগাচফ বন্ধুদের নিয়ে ভােজে ব্যস্ত ছিল। পালাসা আমার সঙ্গে এল। তাকে দিয়ে গােপনে পাদ্রীর বৌকে ডেকে পাঠালাম। পাদ্রীবৌ ফটকে এসে দাড়ালেন। ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করলাম “ভগবানের দোহাই ! ঠিক্ বলুন, মেরিয়া ইভানভ না কোথায় ? পাদ্রির বৌ বলেন “আহা বেচারা! এই বেড়ার ওপিঠে আমার বিছানায় শুয়ে আছে। কি বলব, পিট এচি, আমরা ধরা পড়েছিলাম আর কি! কিন্তু ভগবানের দয়ায় বিপদ কেটে গিয়েছে। বদমায়েসটা খেতে বসেছে এমন সময়ে জ্ঞান হয়ে বেচারা গোঁ গোঁ করতে লাগল। আমার ত ভয়ে প্রাণ যায়। বদমায়েস তা শুনতে পেয়েছে।
৮৪ রাশিয়ার দুর্গেশন্দিনী । আমাকে জিজ্ঞাসা করল “ও বুড়ি, ওদিকে কেঁাকায় কে? আমি লম্বা সেলাম দিয়ে বল্লাম, “হুজুর, আমার ভাইঝি পীড়িতা—আজ দিন পর হল বিছানায় পড়ে আছে।” “তােমার ভাইঝির বয়স অল্প নাকি?” বাম, “হাঁ হুজুর।” “বুড়ি, তােমার ভাইঝিকে একবার দেখাও।” আমার ত বুক দুরু দুর করতে লাগল। কিন্তু উপায় নেই। বাম, “যে আজ্ঞা, হুজুর ; কিন্তু ছুড়ী ত’ উঠে তােমার সামনে আসতে পারবে না।” “আরে তাতে কি বুড়ি, আমি নিজেই গিয়ে দেখে আসছি।” তখনই উঠে হতভাগাটা বেড়ার পিছনে গেল। পরদা সরিয়ে একবার বাজপাখীর দৃষ্টিতে ছুড়ীর দিকে চাইল, আর কিছু বল্ল না। ভগবান বাচালেন। কিন্তু বললে বিশ্বাস করবে না, আমার স্বামী ও আমি মাসার জন্য মরতেও প্রস্তুত ছিলাম। ভাগ্যিস ছুড়ী টের পায় নাই লােকটা কে! হা ভগবান, এত দেখতে হবে তা স্বপ্নেও ভাবি নি। আহা, ইভান কুজমিচ বেচারা। কেউ ভেবেচে এমন হবে ? আর ভাসিলিস। ইগরফনা, ইভান ইগ্নেটিচ। কি অপরাধে তাদের এই সাজা? তােমাকে ছেড়ে দিয়েচে দেখছি। সাব্রিনের কথা তােমার কি মনে হয়? সে ত কশাকদের মত ছােট করে চুল ছেটেছে আর এখানে ওদের সাথে ভােজ খাচ্চে। লােকটা ভয়ানক ধড়ীবাজ এ স্বীকার করতে হবে। যখন বল্লাম আমার ভাইঝি পীড়িত, বলে প্রত্যয় যাবে না, ওর দৃষ্টি তখন ছুরির মত আমাকে বিধতে লাগল। তবুও, কথাটা ভেঙ্গে বলে নাই, এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ।” অতিথিদের নেশা জড়ানাে গলার আওয়াজ শােনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে পাদ্রি জেরাসীমের গলাও শুনতে পেলাম। অতিথিরা আরও মদ চাইছিল । পাদ্রি তার বৌকে ডাছিলেন। পাদ্রিগিন্নি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পাদ্রি বৌ বিদায় হলে আমি একটু নিশ্চিন্ত ভাবে বাড়ীর দিকে অনাহত ৮৫ রওনা ই’লাম।\বাজারের ভিতর দিয়ে যেতে দেখলাম কয়েকজন বসকির হাসি কাঠের কাছে ভিড় করে মৃত বীরদের পা থেকে বুট টেনে খুলছে । {রাগ সামলানাে দায় হ’ল। কিন্তু বেশ বুঝলাম বাধা দেওয়ার চেষ্টা বৃথাN. লুঠেরা দুর্গের ভিতরে ছুটাছুটি করে কর্মচারীদের ঘরবাড়ী সব লুটছিল। মদমত্ত বিদ্রোহীদের বিকট চীৎকারে চারদিক মুখর হয়ে উঠেছিল। বাড়ী পৌছলাম। ফটকে সাভেলিচের সাথে দেখা হল। আমায় দেখে সে ব, “ভগবানকে ধন্যবাদ! ভাবলাম বদমায়েস বেটারা বুঝি আবার তােমায় ধ’রুল। ভাল কথা, এচি, তুমি বিশ্বাস করবে না বেটারা আমাদের সর্বস্ব নিয়ে গিয়েছে। যা হােক তােমায় যে ছেড়েছে, সেই সব চেয়ে বড় কথা। ওদের নেতাকে চিনতে পেরেছ ?” “না, পারিনি ত’ । কেন ? লােকটা কে? “বাঃ! সেই মাতালটার কথা মনে নেই ? সেই যে সরাইখানায় তােমার খরগােস চামড়ার জামাটা হাত পেতে নিল ! একেবারে নতুন জামাটা ! বেটা জানােয়ার সেটার ভিতরে ঢুকতে গিয়ে সব সেলাই ফাঁসিয়ে দিল!” আমি অবাক হলাম। সত্যিই পুগাচফের সঙ্গে...আমার সেই পথ প্রদর্শকের মুখের বেশ সাদৃশ্য ছিল। বিশ্বাস হ’ল পুগাচফ আর সে একই লােক। বুঝতে পারলাম কেন সে আমায় ছেড়ে দিয়েছে। ঘটনার অদ্ভুত যােগাযােগের কথা ভেবে আশ্চর্য হলাম। ছেলেবেলার একটা জামা একজন ভবঘুরেকে দিয়েছিলাম, তাই ফাঁসি থেকে রেহাই পেলাম ! আর একটা বেকার ফেরারী আসামী, যে এক সরাই থেকে আর একটাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল সেই কিনা কতকগুলি দুর্গ দখল করে রুশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিযুদ্ধ নড়িয়ে তুলেছে।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী সাভেলিচ অভ্যাস মত আমাকে জিজ্ঞাসা করৎ “কিছু গবে না? ঘরে ত’ কিছু নেই ; দেখি যদি কিছু তৈরী করে দিতে পারি। একা বসে তন্ময় হয়ে ভাবতে লাগলাম, এখন কি করা যায় । বিদ্রোহী যে দুর্গ নিয়েছে সেখানে থাকা বা তার পছনে ঘােরা রাজ কর্মচারীর পক্ষে ঠিক নয়। উপস্থিত বিপদের সময়ে আমার কাজ সেইখানে যাওয়া যেখানে আমাকে দিয়ে দেশের কাজ হবে। কিন্তু মেরিয়া ইভানভ না আমাকে টাছিল অন্যদিকে। ইচ্ছা হল তাকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচাব। বুঝলাম এ অবস্থা বেশী দিন থাকবে না, কিন্তু তার সেই বিপদের কথা ভাবতেও প্রাণ শিউরে উঠছিল। হঠাৎ একজন কশাক এসে আমার চিন্তাস্রোতে বাধা দিল। সে ব, “সম্রাট আপনাকে তলব করেছেন। ব্যস্তভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, “তিনি কোথায়?” কশাকটি উত্তর দিল, “কাপ্তানের বাড়ীতে। ভােজের পর গােসলখানা থেকে বেরিয়ে এখন বিশ্রাম করছেন। মশাই, তার হাল চাল দেখেই বােঝা যায় তিনি একজন মহাপুরুষ। দুই দুটো ভাজা শূয়রের বাচ্চা খেয়ে ফেললেন। এত গরম জলে স্নান করেন যে তা গায়ে লাগলে অন্য লােক মরে যাবে। তিনি বুক খুলে দেখিয়েছেন—রাজচিহ্ন আঁকা!” এই মতামত নিয়ে তর্ক করাটা সুবিধে মনে হল না। তার সাথে কাপ্তানের বাড়ীর দিকে চললাম। পুগাচফের সাথে প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্যটা ভাবতে লাগলাম। ব্যাপার কতদুর গড়াবে বুঝে উঠতে পালাম না। যখন কাপ্তানের বাড়ী পৌছলাম তখন গােধূলির আঁধারে চার দিক ঢাকা। দোলায়মান মৃত দেহ সুদ্ধ ফাঁসি কাঠটা অন্ধকারে অতি বীভৎস দেখাচ্ছিল। অভাগিনী ভাসিলিসা ইগরফলার দেহ পৈঠার নীচে পড়ে ছিল। সেখানে দুজন কশাক পাহারা দিচ্ছিল যে কশাকটি আমাকে অনাহূত ৮৭ ডেকে এনেছিল, সে আমার আসার খবর দিতে গেল। ফিরে এসে সে আমাকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল। সেই ঘরে আগের রাত্রে মেরিয়া ইভানভনার কাছে কত কষ্টে বিদায় নিয়েছিলাম । দেখলাম পুগীয় আরও জন দশ বারো কশা নেতার সাথে একটি টেবিলের চারদিকে বসে আছে। টেবিলটা কাপড়ে ঢাকা। তাদের পরনে রঙীন সার্ট, মাথায় টুপি। টেবিলের ওপর মেলা বােতল ও গ্লাস । সবারই মুখ যেন নেশার লাল, চোখ গুলি অচে। বিশ্বাসঘাতক সাবিন কিম্বা ম্যাসিমিচ, কেউ সেখানে ছিল না। আমাকে দেখে পুগাচফ বল্ল, “এই যে কুমার, এস ; তুমি আমার অতিথি। তােমার আসন এই আমার পাশে।” দলের লােকে আমায় জায়গা ছেড়ে দিল। আমি নীরবে একপাশে . ব’সলাম। আমার পাশে একটি পাতলা সুশ্ৰী কশাক যুবক বসে ছিল । সে এক গেলাস ভােডকা ঢেলে দিল। আমি তা ছুলাম না, কেবল উৎসুক ভাবে সঙ্গীদের দেখতে লাগলাম। পুগাচফ টেবিলে ভর দিয়ে সব চেয়ে ভাল আসনে বসে ছিল । তার কালাে দড়ীর গােছা হাতের মােটা কবজীর ওপরে ন্যস্ত ছিল। তার মুখখানি বেশ সুগঠিত, সুশ্রী ; তাতে কোনও উগ্রভাব ছিল না। মাঝে মাঝে বছর পঞ্চশ বয়স্ক ' একটি লােকের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে কি বলাবলি করছিল। বােধ হয়, সকাল বেলার আক্রমণ, বিদ্রোহের সাফল্য ও ভবিষ্যৎ কাৰ্যপদ্ধতি সম্বন্ধেই আলােচনা হচ্ছিল। সবাই অবাধে পুগাচফের সাথে তর্ক করে মতামত দিচ্ছিল। এই পরামর্শ বৈঠকে ঠিক হল তারা ওরেনবুর্গ আক্রমণ করবে- পরদিনই তারা সেইদিকে রওনা হবে। পুগাচফ, বল “এস, শােনার আগে আমার প্রিয় গানটি গাও যাক। চুমিকফ, সুরটা ধর দেখি।” ।
৮৮
রাশিয়ার দুর্গেশকৃন্দিনী
আমার পাশের লােকটি ভগ্নানদীর নাবিকদের এই বিষায় গানটি
খুব চেঁচিয়ে গাইতে সুরু করল :-
বনদেবি, তুমি চুপ করে থাকো,
সবুজ পাতার পাখা নেড়’ নাকো
বেপরােয়া প্রাণ বাধাহীন ছুটেছে।
কাল যেতে হবে বিচার ভবনে,
দাড়াইতে হবে আনত বদনে
রাজার সদনে—কত না নিঠুর সে।
সম্রাট প্রভু পুছিবে আমারে,
‘ভাল, মাের বাছা, বল সবিস্তারে,
রাহাজানি, লুটে তােমার সহায় কে ?
কত তা ছিল সাথী তব সাথে,
রাজবােষ কারা তুলে নিল মাথে
মরণ কাদের ঘনাইয়ে এসেছে ?”
ফুলাইয়ে বুক, মাথা করি উচু,
কহিব সকলি, লুকাব না কিছু
‘সহকারী মাের ঢাবিজন খেটেছে।
ঘুট ঘুটে রাত সঙ্গী পহেলা,
দ্বিতীয় ধারাল ছুরিকার ফল,
ঘােড়াটি তৃতীয় হওয়ার দোসর সে
চৌথ সঙ্গী শাসন মম,
দূত চোখাতীর, যমদূত সন,
নিল যাহারে, ধূলায় ধূসর সে।
সম্রাট হাসি’ কহিবে, ‘বাই রে,
অনাহূত
৮৯
সাবাস, বাহবা। আমার বিচারে
যােগ্য ভবন নিরমিত হয়েছে।
ঐ দেখ, দূরে ধূ ধূ করে মাঠ,
মােট। দুটি থাম, শিরে শােভে কাঠ,
ঐ গৃহখানি তােমা তরে রয়েছে।
চাষাদের এই ফাঁসিকাঠের গান শুনে মনে কি ভাব হ’ল তা ভাষায়
বলা কঠিন। যারা গাইছিল তাদের জীবন-নাটকের যবনিকা পতন যে
ফাঁসিকাঠে হবে এটা ধ্রুব নিশ্চিত ছিল। তাদের ভীতিজনক মুখের
ভাব, গানের সরল ভাষাটাকে ভঙ্গী দ্বারা আরও শক্তিময় করবার চেষ্টা,
তাদের তাবলয়যুক্ত সুর—সবগুলি মিশে আমাকে কি একটা
অনির্বচনীয় ভয়ে অভিভূত করে ফেল।
সঙ্গীরা আর এক গেলাস করে মদ খেয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে পুগাচফের
কাছে বিদায় নিল। আমিও তাদের পিছনে যাচ্ছি, এমন সময়ে পুগাচফ
আমায় বলল, “চুপ করে বসাে, তােমার সাথে কথা আছে।”
রইলাম শুধু আমরা দুজন। কয়েক মিনিট দুজনাই চুপ করে বসে
রইলাম। পুগাচফ একদৃষ্টে আমায় দেখতে লাগল—মাঝে মাঝে বা চোখটা
কপালে তুলে বিদ্রুপের কটাক্ষ করতে লাগল। অবশেষে সে এমন একটা
সরল আনন্দময় হাসি হাসল যে আমিও, কেন জানি নে, না হেসে
থাকতে পারলাম না।
পুগাচফ বলল, “ভাল, কুমার সাহেব, ছেড়াগুলাে যখন দড়িটা গলায়
পরাল, তখন ভয় পেয়েছিলে নিশ্চয়ই, স্বীকার করে। তখন আকাশ
“নিশ্চয়ই এত টুকু হয়ে গিয়েছিল!
তােমার চাকরটি না থাকলে
তুমি ঝুম পড়েছিলে আর কি! আমি বুড়াে বেচারাকে দেখেই
৯০ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী চিনেছি। ভাল, তুমি কি স্বপ্নেও ভেবেছিলে, যে তােমাকে পঞ্চ দেখিয়ে সরাইএ নিয়ে গিয়েছিল সেই রাশিয়ার ভাবী রাজা? তাের অপরাধ গুরুতর। কিন্তু আমি তােমাকে বাঁচিয়েছি তােমার দয়ালতার জন্য । তুমি এমন সময়ে আমার উপকার করেছ যখন সুমি শত্রুদের হাত থেকে পালিয়ে ফিরছিলাম। কিন্তু তুমি যা উপকার পাবে, তার তুলনায় সেটা কিছুই নয়। যখন দেশ আমার হবে, তখন তােমার খুব বড় উপকার আমি করব। বল, প্রাণপণে আমার কাজ করবে ?” সয়তানের এই নিলজ্জ প্রশ্ন আমার এত অদ্ভুত ঠেকল যে আমি হেসে ফেল্লাম। কুটি করে পুগাচফ বল, “হাস কেন? তােমার কি বিশ্বাস হয় না যে সারা রাশিয়ার রাজা হব আমি ? সােজা উত্তর দাও।” আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম । এই ভিক্ষুকটাকে রাজা বলি কি করে ? তা বলা ক্ষমার অযােগ্য ' কাপুরুষতা বলে মনে হল। কিন্তু মুখের ওপর ধাপ্পাবাজ বলে মৃত্যু নিশ্চিত। ফাঁসিকাঠের নীচে দাড়িয়ে প্রথম রাগের মুখে যা বলেছিলাম ফের তা বলা বাজে বই হবে, এটা বুঝলাম। কি বলব তাই ভাবছি ; পুগাচক উত্তরের অপেক্ষায় আছে। শেষে, মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক দুর্বলতার চেয়ে আমার কর্তব্যবুদ্ধিই প্রবল হ’ল। বললাম, “শােন, সব খুলে বলি। ভেবে দেখ, আমি কি করে তােমায় রাজা বলে স্বীকার করি ? তুমি বুদ্ধিমান লােক, বুঝতেই ত’ পাবে আমি ভাণ করছি।” “তা হলে, আমাকে তােমার কি বলে মনে হয় ?” “ভগবান জানেন। কিন্তু যাই হও, তুমি আগুন নিয়ে খেলা করছ।” পুচফ আমার দিকে তীব্র কটাক্ষ করল । বলল, “তা হলে আমাকে রাজা তৃতীয় পিটর বলে তােমার বিশ্বাস অন হয় নি । বেশ কথা। কিন্তু লক্ষ্মী চিরকাল সাহসের কশ। সেকালে গ্রিকা ওট্রেপিয়েফ, রাজত্ব করে নাই কি ? তােমার ক্ষতিটা কি ? অপরে মনিহ'লে যা, আমি হলেও তাই। সরল মনে, বিশ্বাসের সাথে আমার কাজ করে যাও, তােমায় সেনাপতি করব, মিত্ররাজ করব। কি বল ?” দৃঢ়স্বরে বললাম, “না। আমি ভদ্রসন্তান, রাণীর কাছে রাজ ভক্তির শপথ নিয়েছি, তােমার কাজ করতে পারব না। যদি আমার ভাল করাই তােমার ইচ্ছা হয়, আমায় ওরেনবুর্গে যেতে দাও।” পুগাচফ, ভাবতে লাগল। বলল, “আচ্ছা যদি তােমায় ছেড়ে দিই, আমার বিরুদ্ধে লড়বে না, প্রতিজ্ঞা করাে।” উত্তর দিলাম, “সে প্রতিজ্ঞা কি করে করি ? তুমি ত বুঝচ যা ইচ্ছা করবার স্বাধীনতা আমার নেই। যদি তারা আমাকে তােমার বিরুদ্ধে পাঠায়, না এসে উপায় নেই। তুমি নিজেই ত’ একজন নেতা। তােমার অধীনে যারা কাজ করে তারা তমার বাধ্য থাকে এটা নিশ্চয়ই তুমি চাও। যখন দরকার তারা যদি লড়াই করতে না চায়, তুমি কি ভাববে? আমার প্রাণ তােমার হাতে। যদি ছেড়ে দাও ধন্যবাদ দেব, যদি ফাঁসি দাও, ভগবান তােমার বিচার করবেন। যা সত্যি তাই তােমাকে বাম।” আমার সরলতায় পুগাচফের মন গল। আমার কাধ চাপড়ে সে বলল, “তাই থােক। আমি কোনও কাজ আধখানা করে ফেলে রাখি নে। তােমার যেখানে খুসি যাও, যা ভাৰ লাগে করাে। কাল সকালে, যাবার আগে দেখা করাে। আজ শােগে। আমরাও ঘুন পেয়েছে।” দায় নিয়ে রাস্তায় এসে পড়লাম। রাত নিস্তব্ধ, কুয়াসাচ্ছন্ন।
৯২
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
আকাশে চাঁদ ও তারা ছিল । চাদের আলাে বাজারের ওপর, ফাঁসিকাঠের
ওপর ছড়িয়ে পড়েছিল। দুর্গের ভিতর অন্ধকার, নিস্তব্ধ, শুধু মদের
দোকানের জানালায় আলাে ছিল। সেখান থেকে রাত্ত্বিরদের গলার
আওয়াজ শােনা যাচ্ছিল। পাদ্রীর বাড়ীর দিকে চাইলাম। সেখানে
ফটক, দরজা বদ্ধ-সব নীরব।
বাড়ী ফিলাম। সাভেলিচ, আমার দেরী দেখে আপন মনেই
দুঃখ করছিল। আমার মুক্তির খবর পেয়ে তার যে কি আনন্দ হ’ল
তা বর্ণনা করা যায় না।
দুই হাত তুলে ভগবানকে ধন্যবাদ দিয়ে সে বলল, “ভাের হ’তে না
হ’তে আমরা দুর্গ ছেড়ে সােজা রওনা হব। কিছু খাবার তৈরী করেছি।
, বাছা, খেয়ে সকাল পর্যন্ত নিশ্চিন্ত ঘুমােও গে।”
তাই করা গেল। খাবারটা বেশ তৃপ্তি করে খেয়ে, খালি মেঝের
ওপর শুয়ে পড়লাম। দেহ মন বড়ই অবসন্ন ছিল।
।
নবম পরিচ্ছেদ বিষয় মিলনের দিন কত না মধুর ছিল, বিদায়ের কাল শতগুণ দুখ দিল। হেরাফ, ভােরবেলা ঢাকের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বাজারের মাঠে গেলাম। পুগাচফের দলবল ফাঁসিকাঠের পাশে সার দিয়ে দাড়িয়ে ছিল। সেখানে আগের দিনের নিহত দুটি প্রাণী তখনও ঝুলচে। কশাকেরা ছিল ঘােড়ার পিঠে ; রাইফেল কঁাধে সৈন্যদল ছিল দাড়িয়ে। কয়েকটা নিশান উড়ছিল। গুটিকত কামান গাড়ীতে চাপানাে হচ্ছিল—তার ভিতরে আমাদেরটাও দেখলাম। দুর্গবাসী সবাই সেখানে বিদ্রোহী নেতার অপেক্ষায় ছিল। একজন কােক একটি সুন্দর, সাদা কিরঘি ঘােড়ার লাগাম ধরে কাপ্তানের বাড়ীর পৈঠার ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল। ভাসিলিসা ইগরফনার দেহটি কোথায়, তাই খুঁজতে লাগলাম। সেটি একপাশে সরিয়ে তেরপল ঢাকা দিয়ে রাখা হয়েছিল। অবশেষে পুগাচফ, দরজায় দেখা দিল। উপস্থিত সকলে টুপি খুলে নমস্কার করল। পুগাচফ পৈঠার ওপর দাঁড়িয়ে সবাইকে অভিবাদন করল। বুড়াে মন্ত্রীদের একজন তামার মুদ্রাভরা একটি থলে তার হাতে দিল। পুগাচফ, মুঠে মুঠে সেগুলি ছড়াতে লাগল। জনতা হৈ চৈ করে তাই কুড়াতে ছুটল। হুটোপাটিতে অনেকে জখম হ’ল। প্রধান সর্দাররা পুগাচফকে ঘিরে দাড়াল; তাদের মধ্যে সাব্রিন ছিল। আমাদের দুজনের চোখােচাখি হতেই আমার বিদ্রুপ দৃষ্টি সে বুঝতে পারল।
৯৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী সেও আন্তরিক বিদ্বেষে, অথচ ভাণ করা বিদ্রুপের ভঙ্গীতে মুখটা ফিরিয়ে নিল। ভিড়ের মধ্যে আমায় দেখে পুগাচফ, মাথা নেড়ে আমায় এসারা করল। পুগাচফ, ব, “শােন; এখুনি ওরেনবুর্গ রওনা হও। সেখানকার শাসক ও সেনাপতিদের গিয়ে বল, আমি এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের সাথে দেখা করব। শিশুর মত সরলতা ও ভালবাসা নিয়ে তারা যেন আমার সাথে দেখা করে। নইলে নিৰ্মম মৃত্যুর হাত থেকে তাদের রক্ষা নেই। কুমার, তােমার যাত্রা শুভ হােক।” তারপরে সাব্রিনকে দেখিয়ে সে বল, “বছর ইনি তােমাদের দুর্গের নতুন নায়ক। সব বিষয়ে একে মান্ব। ইনি দুর্গের ও দুর্গবাসীদের মঙ্গলের জন্য আমার কাছে দায়ী থাকবেন।” এই কথা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল। সাব্রিনকে দুর্গের কর্তা করা হ’ল ! মেরিয়া ইভানভ না তার হাতে পড়বে যে ! ভগবান্, হতভাগীর কি হবে? পুগাচফ, পৈঠা বেয়ে নীচে এল। ঘােড়াটি তার কাছে আনা হল। কশাকদের সাহায্যের অপেক্ষা না করে সে একলাফে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল। এমন সময়ে সাভেলিচ ভিড় ঠেলে এসে পুগাচফের হাতে একখানা কাগজ দিল। কি যে ব্যাপার, আমি ধারণাই করতে পারলাম না। গম্ভীর ভাবে পুগাচ, জিজ্ঞাসা করল, “কি এ ?” সাভেলিচ বলল, “পড়ন, তা হলেই বুঝবেন।” পুগাচফ, কাগজখানা নিয়ে একদৃষ্টে দেখতে লাগল। শেষ বর্ণ, “এত অস্পষ্ট করে লেখ কেন? আমাদের এমন কাচা চোখেও পড়তে পারছি নে। কই হে, সেক্রেটারী কোথায় ? সার্জেন্টের উর্দিপরা একটি ছােরা তার কাছে দৌড়ে এল।
বিদায় বিদ্রোহী নেতা তার হাতে কাগজখানা দিয়ে বল, “চেঁচিয়ে পড়।*. পুগাচফের কাছে সাভেলিচ কি লিখেছে জাতে আমার ভারি আগ্রহ ল। সেক্রেটারী প্রত্যেকটি কথা স্পষ্ট করে চেঁচিয়ে পড়তে লাগল। “দুটি ড্রেসিংগাউন--একটা সুতাের, একটা ভােরা কাটা রেশমের, দাম । পুগাচফ, জকুটি করে বলল, “তার মানে ?” সাভেলিচ শান্তভাবে উত্তর দিল, “ওকে পড়ে যেতে বলুন সেক্রেটারী পড়তে লাগল, “মিহি সবুজ কাপড়ের একটা সামরিক পােষাক-–দাম ৭ রুবল। সাদা সুতাের ইজের একজোড়া–দাম ৫ রুবল। ঝালর লাগান এক ডজন সুতি সার্ট—দাম ১০ রুবল। একটি চায়ের সেট—দাম আড়াই রুবল।” পুগাচফ, বাধা দিয়ে বলল, “কি মাথামুণ্ডু লিখেছ হে ? তােমার চা সেট, ঝালর, ইজের দিয়ে আমার দরকার ?” সাভেলিচ, গলাটা পরিস্কার করে বুঝিয়ে বল, “মশাই, এটি আমার মনিবের জিনিসের ফর্দ। এগুলি গুণ্ডা বেটারা লুটে নিয়েচে !” পুগাচফ, ধমক দিয়ে বলল, “কোন গুণ্ডারা হে ?” সাভেলিচ বল, “মাপ করুন, হুজুর, হঠাৎ বলে ফেলেছি। গুণ্ডা নয়, গুণ্ডা নয়, আপনার লােক। তারা আমাদের বাড়ী তালাস করে এই সব জিনিস নিয়ে গিয়েছে। রাগ করবেন না হুজুর, ঘােড়র চারখানা পা তবুও সে হোঁচট খায়। ওকে শেষ অবধি পড়তে বলুন।” পুগাচফ, বলল, “পড়ে যাও।” সেক্রেটারী পড়তে লাগল, “সুতি বিছানার চাদর, রেশমের বালিসের অড়—দাম ৪ রুবল। খাকশেয়ালের চামড়ার কোট-লাল আন্তর ৯ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী *ওয়া-দাম ৪০ রুবল। আরও একটা খরগােস চামড়ার জ্যাকেট যা হুজুরকে সরাইয়ে দেওয়া হয়েছিল—দাম পনর রুবল।••••.. পুগাচফ চেঁচিয়ে বলল, “তার পর ?” তার চোখ দিয়ে তখন আগুন ঠিকরে পড়ছে। বলা বাহুল্য, সাভেলিচের জন্য আমার ভয় হ’ল । সে আরও কৈফিয়ৎ দিতে যাচ্ছিল, পুগাচফ, ধমক দিয়ে বল্ল, “বাপু, তুমি কোন্ সাহসে ঐ সব তুচ্ছ জিনিসের জন্য আমায় বিরক্ত করছ ?” সেক্রেটারীর হাত থেকে কাগজখানা নিয়ে পুগাচফ সাভেলিচের মুখে ছুড়ে মারল। বল, “বুড়ো বাচাল, তুমি আর তােমার মনিব যে একসাথে ফাঁসিকাঠে ঝােল’নি সেটা তােমাদের বড় ভাগ্যি—সে জন্য বাকি জীবনটুকু আমাদের মঙ্গল চিন্তায় কাটানাে উচিত। খরগােস চামড়ার জ্যাকেট ! সত্যি নাকি ? দাঁড়াও দিচ্চি তােমাকে খরগােস চামড়ার জ্যাকেট। জীয়ন্তে তােমার ছাল ছাড়িয়ে জ্যাকেট করে দিচ্চি।” সাভেলিচ উত্তর দিল, “হুজুরের যেমন অভিরুচি ! আমি ক্রীতদাস -- মনিবের সম্পত্তি রক্ষার ষােলআনা দায়িত্ব আমার।” পুগাচফ, খুবই খােস মেজাজে ছিল নিশ্চয়। আর কোনও কথা না বলে সে ঘােড়া ফিরিয়ে ছুটল। সাব্রিন ও কশাকবৃদ্ধেরা তার পিছনে ছুটল। তার দলবল দিব্যি সুশৃঙ্খলভাবে দুর্গ থেকে বের হয়ে গেল। দুর্গবাসীরা কতকদূর তার অনুগমন করল। বাজারের মানে রইলাম শুধু সাভেলিচ আর আমি। সাভেলিচ নিতান্ত বিরসমুখে কাগজখানা নাড়াচাড়া করতে লাগল। শুগাচফের সাথে আমার সদ্ভাব দেখে সে কিছু সুবিধা করে নেবার চেষ্টায় ছিল। কিন্তু তার এই সদিচ্ছা ফলবতী হ’ল না। তার এই বিদায় রকম ভস্মে ঘি ঢালা দেখে আমি গাল দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বড় হাসি পেল। সাভেলিচ বল, “বাপু, হাসা খুব সােজা। কিন্তু জিনিসগুলি নতুন কিতে গেলে এত আহলাদ থাকবে না।” মেরিয়া ইভানভনাকে দেখতে পাদ্রীর বাড়ী গেলাম। পাদ্রীবৌ বড় দুঃসংবাদ দিলেন। রাত্রে মাদার জ্বর হয়েছিল। বিকারের ঘােরে সে তখনও অজ্ঞান রয়েছে। পাদ্রীবৌ তার কামরায় আমাকে নিয়ে গেলেন। আমি নিঃশব্দে বিছানার কাছে গেলাম। চেহারার পরিবর্তন দেখে অবাক হলাম। সে আমায় চিনতে পারল না। কিছুক্ষণ বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। পাদ্রী আবু তার বৌ কি বলছিলেন শুনতে পাই নি-বােধহয় আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। দুর্ভাবনায় আমার মন অস্থির হয়ে উঠল। জিঘাংসু বিদ্রোহীদলের মধ্যে একা, অসহায়, আশ্রয়হীনা এই মেয়েটি, আর অসহায় আমি, একথা ভাবতে আমার ভয় সাব্রিনের চিন্তাই আমার মনে সবচেয়ে বেশী পীড়া দিতে লাগল। বিদ্রোহী নেতা তার হাতে দুর্গ, শাসন ক্ষমতা সবই দিয়ে গেল। সেখানেই তার হিংসার পাত্রী এই নিরপরাধ, দুখিনী মেয়েটি রয়েছে। সে ত’ যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। আমার কি কৰ্তব্য? কি করে তার সাহায্য করি? কি করে গুণ্ডার হাত থেকে তাকে বাঁচাই ? আমার হাতে একটি মাত্র উপায় ছিল। ঠিক করলাম তথনই ওরেন- বুর্গে গিয়ে যত শীঘ্র পারি বেলগ রস্কি উদ্ধারের উপায় করব। পাদ্রী- দম্পতির কাছে বিদায় নিলাম। তাদের বিশেষ করে বাম মেরিয়া ইভানভনার শুশ্রুষা করতে। তাকে আমার মনােনীতা স্ত্রী বলেই মনে করলাম। বেচারীর হাতখানা তুলে নিয়ে চুমাে খেলাম,—সেখানা চোখের জলে ভিজিয়ে দিলাম। } । ।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী । পাদ্রীবৌ বলল, “পিটর এচি, এখন বিদায়। আশা করি আবার সুসময়ে আমাদের দেখা হবে। আমাদের ভুলাে না, ঘন ঘন চিঠি লিখাে। তুমি ছাড়া এখন মেরিয়া ইভানভনা বেচারীর সান্ত্বনা বা আশ্রয় কিছুই রইল না।” বাজারের মাঠে এসে ফাঁসিকাঠের কাছে একটু দাঁড়ালাম। সেখানে মাথা নত করে নিঃশব্দে দুর্গ ছেড়ে ওরেনবুর্গের রাস্তা ধরলাম। সাভেলিচ আমার সাথে চল। নিজের ভাবে তন্ময় হয়ে চলেছি, এমন সময় পিছনে হঠাৎ ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনলাম। একজন কােক ঘােড়া ছুটিয়ে আসছিল। তার হাতে আর একটি বসকির ঘােড়া, লাগাম ধরা। দূর থেকে সে আমায় এসারা করল। আমি দাড়ালাম—একটু পরেই চিলাম আমাদের সেই সার্জেন্ট ম্যাসিমিচ। কাছে এসে ঘােড়া থেকে নেমে দ্বিতীয় ঘােড়াটার লাগাম সে আমার হাতে দিল। বল, “কুমার, আমাদের প্রভু এই ঘােড়াটা আর তার নিজের একটা পশমের জামা তােমাকে উপহার দিয়েছেন।” (জিনের সাথে একটা ভেড়ার চামড়ার কোট বাঁধা ছিল।) “তিনি আরও কিছু দিয়েছিলেন,” বলে ম্যাসিমিচ, ইতস্ততঃ করতে লাগল, “পঞ্চাশ কোপেক মুদ্রা কিন্তু তা রাস্তায় হারিয়ে ফেলেছি। আমায় ক্ষমা করুন।” সাভেলিচ তার দিকে কটমটিয়ে চেয়ে বলল, “রাস্তায় হারিয়ে ফেলেছ ! তােমার বুকপকেটে ঝন্ ঝন্ করছে কি ও? তােমার ধৰ্ম্মবুদ্ধি নই ?” সার্জেন্ট অসঙ্কোচে বল্ল, “আমার বুক পকেটে ঝন্ ঝন্ করছে! বাঃ, বুড়াে তুমি ত’ বেশ ! ওকি কোপে নাকি? ও আমার লাগাম।” তর্কে বাধা দিয়ে বাম, “তা হােল্ক গে ! যিনি এসব পাঠিয়েছেন বিদায় ৯৯ । F তাকে আমার ধন্যবাদ জানাবে। ফিরে যেতে হারানাে মুদ্রাকটি খুঁজে দেখাে। পেলে তা দিয়ে ভোড়কা খাবে। ঘােড়া ফিরিয়ে সে বলল, “কুমার, তােমাকে বহু ধন্যবাদ। যতদিন বাঁচবে, তােমার মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করব ” এই বলে কোটের বুকটা এটে ধরে ঘােড়া ধাপে ছুটিয়ে এক মিনিটে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি কোটটা পরে ঘােড়ায় চেপে বসলাম। সাভেলিচকে পিছনে বসিয়ে নিলাম । বুড়ো বলল, “দেখলে বাছা, আমি যে ডাকাত বেটার কাছে আরজি করেছিলাম তা বৃথা হয় নি। চোরের বিবেকে সেটা ঘা দিয়েছে। এই ঢ্যাঙা বসকির ঘােড়া আর ভেড়ার চামড়াটার দাম যা চুরি গেছে তার অর্ধেকও হবে না। তবুও ত’ এ কাজে লাগবে। জংলা কুকুরের এক গােছ লােম ছিড়ে নিতে পারলেও লাভ আছে। এ যেন উকোর গায়ে জোঁক লাগা।”
দশম পরিচ্ছেদ অবরােধ পাহাড়ে, প্রান্তরে বেঁধেছে শিবির সে, নগরে নগরে আগুনের শিখা জ্বেলেছে । উল্কার মত ক্ষিপ্র ত্বরিত গতিতে গ্রাম জনপদ দহন করিয়া চলেছে । ওরেনবুর্গের কাছে এসে একদল কয়েদীর সাথে দেখা হল। তাদের মাথা নেড়া, মুখে লােহাপপাড়া দাগ, চেহারা দেখে ভয় হয়। দুর্গের ফৌজের তত্ত্বাবধানে তারা দুর্গ প্রাচীরে কাজ করছিল। পরিখা আবর্জনায় ভরাট হয়ে ছিল ; কতক লােক সেইগুলি তুলে পিপেয় ভরে গড়িয়ে নিয়ে, যাচ্ছিল, জনকতক খুঁড়ছিল। মিস্ত্রীরা ইট বয়ে নিয়ে দুর্গ প্রাচীর মেরামত করছিল। ফটকে পাহারা আমাদের গতিরােধ করল, তারা ছাড়পত্র দেখতে চায়। তাদের সার্জেন্ট যখন শুনল আমি বেলগস্কি দুর্গ থেকে আচি তখন সে আমায় সােজা সেনাপতির বাড়ীতে নিয়ে গেল। সেনাপতিকে তার বাগানের ভিতরে পেলাম। শরতের দীর্ঘশ্বাসে নিস্পত্ৰ আপেল গাছগুলি তিনি বেশ মন দিয়ে দেখছিলেন। একজন মালি যত্ন করে গাছগুলাের গায়ে শুকনাে খড় জড়িয়ে দিচ্চিল। সেনাপতির মুখে দিব্যি স্বাস্থ্য, সরলতা ও নিশ্চিন্তার ছাপ। আমাকে দেখে তিনি খুসি হলেন। যে সব ভীষণ ঘটনা আমি দেখেছি, তাই জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। আমি সব বললাম, বুড়া গাছ ছাঁটতে টতে আমার কথা শুনতে লাগলেন। ৭ অবরােধ ১০। আমার দুঃখের কথা শেষ হলে সেনাপতি বললেন, “আহ মিরনফ , বেচারা! তার জন্য সত্যিই আমার দুঃখ হচ্চে ; সে বীর ছিল বটে। আর মিরনফের স্ত্রী অতি ভাল মেয়ে ; কেমন সুন্দর ব্যাঙের ছাতার মােরব্বা করত। ভাল, মাসার খবর কি, সেই যে কাপ্তানের মেয়েটি ? বললাম, “সে দুর্গে ই রইল, পাদ্রীবৌএর তত্ত্বাবধানে।” সেনাপতি, “তাইত, “তাইত, তাইত তাইত। সেটা ঠিক হল না। বদমায়েসগুলাের ত সংযম বলে কিছু নেই। হতভাগী মেয়েটার কি হবে ?* উত্তর দিলাম, “বেলগরস্কি দুর্গ তবেশী দূর নয় ; আপনি সকালেই নিশ্চয় সৈন্য পাঠিয়ে অসহায় দুর্গবাসীদের বাঁচাবেন।” সেনাপতি অনিশ্চয়ের ভাবে মাথা নেড়ে বলেন, “দেখা যাক্, দেখা যা। সে বিষয়ে কথা বলবার অনেক সময় পাওয়া যাবে। চল, একটু চা খাবে। লড়াইএর কথা আলােচনা করবার জন্য আজ সবাইকে ডাকাচ্চি। তুমি সয়তান পুগাচফ ও তার সৈন্যদের বিষয়ে খাঁটি খবর দিতে পারবে। আপাততঃ যাও, বিশ্রাম করগে।” আমার জন্য নির্দিষ্ট বাসায় ফিরলাম। সাভেলিচ আগেই গিয়ে তৈজসপত্র গুছিয়ে রাখছিল। উদ্বিগ্নভাবে সমর সভার অপেক্ষায় রইলাম। পাঠক বুঝতেই পারছেন যে আমি ঐ সভায় না গিয়ে পারি নাই। সভার নির্দেশের ওপর আমার ভাগ্য নির্ভর করছিল। যথা সময়ে সেনাপতির বাড়ী গেলাম। একজন কর্মচারীর সাথে দেখা হ’লসে শুল্ক বিভাগের কর্তা হবে। যতদূর মনে পড়ে, বেশ মােটা বুড়া লােকটি, গালদুটি গােলাপের মত লালচে, পরনে কিংখাবের কোট। ইভান কুজমিচের মৃত্যুর কথা সে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করতে ১০২ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী ; • লাগল। দুজনায় কি সম্বন্ধে ছিল। মাঝে মাঝে জেরা করে সে আমার গল্পে বাধা দিচ্ছিল। এমন মত দিচ্চিল যাতে তার যুদ্ধে অভিজ্ঞতা না থা, উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া গেল। ইতিমধ্যে অন্যান্য নিমন্ত্রিতেরা এসে পড়লেন। সবাই বসলে এবং চায়ের পেয়ালা হাতে হাতে দেওয়া হলে সেনাপতি সভার উদ্দেশ্যটা সবাইকে সরলভাবে বুঝিয়ে বললেন । “ভদ্রগণ, বিদ্রোহীদের সাথে আমাদের কি ভাবে লড়তে হবে সেইটাই এখন বিবেচ্য। আমরা আক্রমণ করব, না আত্মরক্ষা করব ? সুবিধা অসুবিধা উভয় পথেই আছে। আক্রমণে অল্প সময়ে শত্রু নিপাতের আশা থাকে বেশী। কিন্তু আরক্ষাই নিরাপদ পন্থা, তাতে বিপদের ভয় কম।•••সুতরাং আসুন ভােট নেওয়া যাক। যারা ফৌজের কাজে সবে ঢুকেচে তাদের মত নিয়েই শুরু করা যাক্।* আমাকে সম্বােধন করে বললেন, “এনসাইন, তােমার মত দাও।” আমি উঠে পুগাচফ ও তার অনুচরদের সম্বন্ধে গুটিকয়েক কথা বলে মত দিলাম যে শিক্ষিত সৈন্যদের সম্মুখে দাড়াবার মত বল পুগাচফের নেই। বুঝলাম আমার মত কর্মচারীদের পছন্দ হ’ল না। তারা এতে যৌবনের স্পর্ধা ও অবিবেচনার পরিচয় পেলেন। গুণ,গুণ, শব্দ হতে লাগল, কে একজন চাপা গলায় বল্ল “অনাড়ী। সেনাপতি আমার দিকে চেয়ে বলেন, “এনসাইন, সমর সভার প্রথম ভােট প্রায়ই আক্রমণের পক্ষে হয়। হওয়াই উচিত। এইবারে আরও ভােট নেওয়া যাক। শিক্ষাপরিষদের সভাের কি মত?” কিংখাবের কোটপরা ছােট্ট বুড়ােটি তার তৃতীয় পেয়ালা চা এক চুমুকে খালি করে, এবং “ম” নামক সুরার মাহাত্মে সরস হয়ে
অবরােধ
১০৩।
সেনাপতিকে বললেন, “সেনাপতি, আমার মনে হয় আক্রমণ কিম্বা
আত্মরক্ষা কিছুরই আমাদের দরকার নেই।”
বিস্ময়ে সেনাপতি জিজ্ঞাসা করলেন, “সে কি রকম, মশাই ? কোনও
তৃতীয় কৌশল ত’ সম্ভব নয়। হয় আক্রমণ, নয় আত্মরক্ষা করতে হবে।”
“সেনাপতি, আপনি ঘুসের পন্থা অবলম্বন করুন।”
“হাঃ হাঃ হাঃ, আপনার পরামর্শই কাজে খাটাব। গুটি সত্তর কি
একশ রুবল খরচ করা যেতে পারে-বদমায়েসের মাথার দাম। টাকাটা
গুপ্ত ভাণ্ডার থেকে দেওয়া যাবে।”
শুল্ক বিভাগের কর্তা বললেন, “এই নীতি খাটালে চোরের দল যদি
তাদের সর্দারকে হাত পা বেঁধে আমাদের হাতে না দিয়ে যায় তবে
আমাকে সভ্য শিক্ষিত, না বলে কিরঘিস্ ভেড়া বলবেন!”
সেনাপতি। “আচ্ছা, এটা আর একবার ভেবে দেখা যাবে এখন।
কিন্তু তা ছাড়াও সামরিক কৌশল খাটাতে হবে। ভদ্রগণ, আপনারা
রীতিমত ভােট দিন।”
সবার মত হ’ল আমার উল্টা। কর্মচারীরা বলল, সৈন্যদলকে
বিশ্বাস করা চলে না, ভাগ্যলক্ষ্মী চঞ্চলা, সাবধান থাকাই ভাল ইত্যাদি।
সুতরাং শক্ত দুর্গপ্রাচীরের আড়ালে কামান নিয়ে বসে থাকা,
বাহিরে বেরিয়ে লড়াই করার চেয়ে ভালো।
সব শেষে সেনাপতি পাইপের ছাই ঝেড়ে ফেলে বললেন :-
“ভদ্রগণ, স্বীকার করতেই হবে যে আমার মত এই এনসাইনের
সাথে একেবারে মিলে যায়। কারণ সেইটি শ্রেষ্ঠ সমরনীতি সঙ্গত।
সেনাপতি আবার পাইপ ভরতে সুরু করলেন। আমার বুক ফুলে
উঠল। কর্মচারীদের দিকে সগর্বে চাইলাম। তাদের মুখে বিরক্তি
ও দুশ্চিন্তার ছায়া পড়ল।
১০৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী তাপরে, দম ফেলে, হু করে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে সেনাপতি আবার বললেন, “কিন্তু ভদ্রগণ, এতবড় গুরু দায়িত্ব আমি নিজের কাধে নিতে নারাজ। বিশেষতঃ, মহারাণী যে আমাকে এই প্রদেশের শান্তিরক্ষার ভার দিয়েছেন, তাই করা দায় হয়ে পড়েছে। সুতরাং আমি বেশী সভ্যের মতই মেনে নিচ্চি—যারা দুর্গের ভিতর থেকে লড়াইএর পক্ষপাতী। আমরা কামান দেগে, কখনও বা হঠাৎ আক্রমণ করে শত্রুদের বিধ্বস্ত করবাে।” এইবার কৰ্ম্মচারীরা আমার দিকে বিদ্রুপের কটাক্ষ করল। সভা শেষ হল। বুড়ো সেনাপতির এই দুর্বলতা দেখে দুঃখিত হলাম। লােকটি জেনে শুনে কতকগুলি অজ্ঞ, তুভিজ্ঞ লােকের মতে সায় দিলেন। এই স্মরণীয় সভার কয়েকদিন পরে আমরা খবর পেলাম পুগাচফ তার কথামত ওরেনবুর্গের দিকে আচে। সহরের প্রাচীরে চড়ে আমি বিদ্রোহী সৈন্য দেখতে লাগলাম। মনে হল তারা আগের চেয়ে দশগুণ বেড়েছে। যে সব ছােট দুর্গ হাতে পড়েছিল সেখানকার কামানগুলিও এইবার সঙ্গে এনেছে। সভার নির্দেশ মনে পড়ল। বােধ হল, দীর্ঘকাল অবরােধ ভােগ করতে হবে। বিরক্তিতে কান্না পেতে লাগল। ওরেনবুর্গ অবরােধের বর্ণনা আর করব না। সেটা ইতিহাসের বিষয়, পারিবারিক বিবরণ নয়। শুধু এইটুকু বলা দরকার যে স্থানীয় কর্মচারীদের শৈথিল্যে অবরােধটা নগরবাসীদের পক্ষে দুঃসহ হয়ে উঠল। তারা দুর্ভিক্ষ, রােগ ইত্যাদি ভােগ করতে লাগল। উঠানে কামানের গােলা পড়া অভ্যাস হয়ে গেল। শেষে পুগাচফের আক্রমণে লােকে আর তেমন চঞ্চল হত না। আমি বসে বসে বিরক্ত হয়ে উঠলাম। দিন যায় ; বেলগরস্কি ;
অবরােধ দুর্গ থেকে কোনই চিঠি পাই না। সব রাস্তা বন্ধ। মেরিয়া ইভানভনার বিরহ আমার পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠল। তার ভাগ্য সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা আমার দুশ্চিন্তার কারণ হল। মাঝে মাঝে দুর্গ থেকে বের হয়ে শত্রুদের আক্রমণ করাই ছিল আমার একমাত্র আমােদ। পুগাচফকে ধন্যবাদ, আমার ঘােড়াটা ভালই হয়েছিল। খাবার যতটুকু পেতাম দুজনে ভাগ করে খেতাম। তারই পিঠে চড়ে পুগাচফের সৈন্যদের সাথে গুলিবদল করতাম। এইসব আক্রমণে সুবিধা হত শত্রুদের, কারণ তারা খাবার ও ও পানীয় যথেষ্টই পেত। তাদের ঘােড়াগুলিও ছিল খুব ভাল। দুর্গের দুর্ভিক্ষপীড়িত সােয়ারেরা তাদের সাথে পেরে উঠত না। আমাকে নিরন্ন পদাতিকরাও মাঝে মাঝে যুদ্ধে না, কিন্তু প্রান্তরে পুরু বরফের মধ্যে সােয়ারদের বিরুদ্ধে এটে উঠতে পারত না। দুর্গপ্রাচীরে কামানের, গর্জন হত, কিন্তু মাঠে বরফের ভিতরে সেগুলি অচল হয়ে পড়ত—অনাহারে শীর্ণ ঘােড়া তা টেনে নড়াতে পারত না। এই ছিল আমাদের সমরকৌশল, আর এই ছিল ওরেনবুর্গের কর্মচারীদের সতর্কতা। একদিন বড় একদল শত্রুকে হারিয়ে দেওয়া গেল। তারা ছড়িয়ে পড়ল। একজন কশাক পিছনে পড়ে ছিল, আমি তাকে ধরলাম। তারা মাথা কেটে ফেলব বলে তুর্কি তলােয়ারখানা তুলেছি, অমি সে টুপিটা খুলে চেঁচিয়ে বলল, “নমস্কার পিটর এচি, কেমন আছে?” তার দিকে চেয়েই চিলাম, সে আমাদের কশাক সার্জেন্ট খুব আনন্দ হ’ল ; বললাম, “কেমন আছ, ম্যক্সিমিচ ? দু'এক দিনের মধ্যে বোগরস্কি গিয়েছিলে কি ?” “হাঁ, কাল গিয়েছিলাম ; তােমার একখানা চিঠি আছে।” বলাম, “কই, দাও।” আমার মুখচোখ দিয়ে আগুন ছুটুল । = ১০.৬ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী - কোটের বুক পকেট থেকে একখানা কাগজ নিয়ে ম্যাসিমিচ বলল, “এই যে এখানে। আমি পালাসাকে কথা দিয়েছিলাম, যা করে হােক এখানা তােমায় পৌছে দেব।” ভাজকরা কাগজখানা আমার হাতে দিয়ে সে ঘােড়া ছুটিয়ে চলে গেল। চিঠিখানা খুলে পড়লাম। আমার বুক কাঁপতে লাগল। চিঠির মর্ম এই :- ভগবানের ইচ্ছায় আমি বাপ, মা দুইই এক সাথে হারিয়েছি পৃথিবীতে আপনার বলতে কেউ নেই। জানি, তুমি আমার শুভার্থী এবং সর্বদাই লােকের সাহায্য করতে উন্মুখ। আমার ইচ্ছা, চিঠিখানা তুমি পাও। ম্যাসিমিচ কথা দিয়েছে, এটা তােমাকে পৌঁছে দেবে। পালাসা ম্যাসিমিচের কাছে শুনেছে, সে তােমাদের আক্রমণের সময়ে প্রায় তােমাকে দেখে।, তখন তুমি নাকি নিজের কথা মােটেই ভাবব না, আর যারা চোখের জল ফেলে তােমার মঙ্গল কামনা করে তাদের কথাও ভাবব না। আমি অনেক দিন অসুস্থ ছিলাম। যখন ভাল হ’লাম, সাব্রিন-আমার বাবার বদলে যে এখন দুর্গের কর্তা হয়েছে—জোর করে পাদ্রী জেরাসিমের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিল, পুগাচফকে বলে দেবে এই ভয় দেখিয়ে। বলছে, আমায় জোর করে বিয়ে করবে। বলে, সেই আমায় বাঁচিয়েছে, কারণ পাদ্রীবৌ যখন বলেছিল, মেয়েটি আমার ভাইঝি, তখন সে সত্য কথাটা খুলে বলে নি। আমি নিজের বাড়ীতে বন্দিনী। সাব্রিনকে বিয়ে করার চেয়ে আমার মরাই ভাল। সে বড়ই নির্দয় ব্যবহার করে। ভয় দেখায়, তাকে বিয়ে না করলে আমায় পাচফের হাতে ধরিয়ে দেবে। আমি সময় চেয়েছি, তাই সে তিন দিন সময় দিয়েছে। তারপরে যদি তাকে বিয়ে না করি, সে আমায় কোনই
অবরােধ
১০৭
অনুগ্রহ দেখাবে না। পিটর এণ্ডিচ, তুমিই আমার একমাত্র রক্ষক ;
আমার এই দুর্দিনে সাহায্য কর। সেনাপতি ও অন্যান্য নায়কদের
বুঝিয়ে বল, তারা যেন অবিলম্বে আমাদের উদ্ধারের জন্য একদল
সৈন্য পাঠান। সম্ভব হলে তুমিও এস।
একান্ত বিনীতা,
অনাথ মেরিয়া মিরনফ।
চিঠি পড়ে পাগলের মত হয়ে গেলাম। ঘােড়াটাকে তাড়িয়ে যত
শীগগির পারি দুর্গে ফিরলাম। কি করে মেয়েটিকে বাঁচান যায়,
সেই চিন্তা করতে লাগলাম। ভেবে কূল পেলাম না। দুর্গে
পৌছেই সেনাপতির বাড়ীর দিকে ছুটলাম—এবং সিধা তার বাড়ীর
ভিতরে
দুকে গেলাম।
সেনাপতি পাইপমুখে
ঘরের ভিতরে পায়চারি করছিলেন ।
আমাকে ঢুকতে দেখে থামলেন। আমার চেহারা দেখে তিনি উদ্বিগ্ন
হয়েছিলেন নিশ্চয়ই। ব্যস্তভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “ব্যাপার কি ?
বাম, “সেনাপতি, আমি পিতার মত আপনাকে শ্রদ্ধা করি ;
ভগবানের দোহাই, আমার আবেদন অগ্রাহ্য করবেন না। আমার
সমস্ত জীবনের সুখ এরই ওপর নির্ভর করছে।”
অবাক হয়ে বুড়ো জিজ্ঞাসা করলেন “কি হয়েছে, বাছা ? তােমার
জন্য আমি কি করতে পারি, বল।”
“সেনাপতি, আমায় একদল সৈন্য আর পঞ্চাশটি কশাক দিন ;
আর আদেশ দিন বেলগরস্কি দুর্গ ফের দখল করি।”
বৃদ্ধ একটু নিবিষ্টভাবে আমার দিকে চাইলেন, বােধ হয়
ভেবেছিলেন, আমার মাথা খারাপ হয়েছে—তার ধারণা
ভুল নয়।
jobi
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
“সত্যি ?
অবশেষে তিনি বললেন—“তুমি কেমন করে বেলগরস্কি দখল করতে
চাও?
সাগ্রহে বল্লাম “আমি কথা দিচ্ছি, দখল করব, আপনি শুধু
অনুমতি দিন।”
তিনি মাথা নেড়ে বললেন “না
বললেন “না হে ছােরা, অতদূরে শত্রু
তমার ফিরবার পথ বন্ধ করে তােমায় পিষে ফেলবে। একবার যদি পথ
বন্ধ করে:•••••••
আমার ভয় হ’ল যুদ্ধনীতি সম্বন্ধে তিনি দীর্ঘ বক্তৃতা শুরু করবেন।
সুতরাং তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বল্লাম “কাপ্তান মিরনফের মেয়ে
আমাকে একখানা চিঠি পাঠিয়েছেন, সাহায্য ভিক্ষা করে। সাব্রিন
তাকে জোর করে বিয়ে করতে চায়।”
সাব্রিন ভয়ানক সয়তান ; আমার হাতে পড়লে
তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোর্ট মার্শাল করে দুর্গের প্রাচীরের ওপরে
গুলি করে মারব। কিন্তু ততদিন ধৈৰ্য রাখতে হবে।”
ভাবলাম “ধৈৰ্য্য রাখতে হবে।” বাম “এর মধ্যে সে যে
মাসাকে বিয়ে করে ফেলবে!”
সেনাপতি। “সেটা তত খারাপ হবে না। কিছুদিন বরঞ্চ তার
সাব্রিনের স্ত্রী হয়ে থাকাই ভাল। আপাততঃ সেই মাসার তত্ত্ব নেবে।
পরে তাকে গুলি করে মারূল, ভগবানের ইচ্ছায় অনেক বর জুটবে।
সুন্দরী বিধবারা বুড়ো বয়স পর্যন্ত অবিবাহিত থাকে না—তাদের
বর কুমারীদের চেয়ে তাড়াতাড়ি জোটে।”
রেগে বললাম “সাব্রিনের হাতে তাকে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে বরং প্রাণ
দেবাে।”
বুড়াে বললেন “ওহহ, এইবারে বুঝলাম। বােঝ যাচ্চে তুমি
অবরােধ
১০৯
মাসার প্রেমে পড়ে। সে আলাদা কথা। তাইত হে হতভাগা
ছােরা ! কিন্তু যাই হােক, আমি তােমায় সৈন্য দিতে পারি নে।
এ রকম অভিযান যুক্তিসঙ্গত হবে না। এর দায়িত্ব নিতে আমি নারাজ।
আমার মাথা হেট হ’ল। বুঝলাম কোনই আশা নেই। হঠাৎ
একটা চিন্তা আমার মাথায় খেল । সেকেলে ঔপন্যাসিকদের কথার
বছি—পরের পরিচ্ছেদে পাঠক জানতে পারবেন, সেটা কি।
---
পরিচ্ছেদ
একাদশ
বিদ্রোহী শিবিরে
‘সিংহ তখন আহার শেষ করেছে ;
জিঘাংসু হ'লেও সে জিজ্ঞাসা করল,
‘আমার বিবরে তুমি কেন এসেছ ?” সুমারোকফ।
সেনাপতির কাছে বিদায় নিয়ে তখনই বাড়ী ফিলাম। সাভেলিচ
মামুলি উপদেশের ঝুড়ি খুলে বসল।
“তুমি ঐ নেশাখাের লুঠেদের সাথে মেষা কেন পড়তে যাও বাপু?
ও ত’ ভদ্র লােকের কাজ নয়। কোন দিন বা অকারণে প্রাণটা যাবে।
তুর্কি বা সুইড, হলেও বা হত—ও বেটাদের নাম করতে নেই।”
বল্লাম, “থামাে। দেখ আমাদের কত টাকা আছে।
সে হাসিমুখে বল, “ঢের আছে। বেটারা সব জায়গা খুজেছিল।
আমি টাকাটা লুকিয়ে রেখেছিলাম, তাই বেঁচেছে।” এই বলে সে পকেট
থেকে টাকা ভরা একটা বােনা থলে বের করল।
বল্লাম, “বেশ, ওর অর্ধেক আমায় দাও, বাকি তুমি নিজে নাও।
আমি বেলগরস্কি দুর্গে যাচ্ছি।”
দরদী বুড়াে কঁপা গলায় ব, “ভাই পেটু সা, তুমি বল কি ?
বদমায়েসগুলো চারদিক ছেয়ে রয়েছে। কি করে যাবে তুমি? নিজের
প্রাণের মায়া নাই থাকুক, অন্ততঃ বাপমায়ের কথা ভাবা উচিত। কেন
যাবে ? সবুর কর না, ফৌজ এসে ডাকাতদের ধরে ফেলুক, তখন
যেখানে ইচ্ছা যেয়াে।*
আমার প্রতিজ্ঞা অটল রইল।
বিদ্রোহী শিবিরে ১১১ বললাম, “তর্ক বৃথা। আমাকে যেতেই হবে। দুঃখ করাে না, সাভেলিচ। ভগবানের দয়া থাকলে আবার দেখা হবে। বেশী কৃপণতা করাে না। তােমার যা দরকার কিনবে—তিনগুণ দাম দিয়েও। ঐ টাকাটা আমি তােমায় বকশিস্ দিচ্চি। যদি তিন দিনে না ফিরি.•••••• সাভেলিচ বলল, “কি তাই, তুমি ভাবচ একা যাবে ? তা স্বপ্নেও ভেবাে না। তুমি যেখানে যাবে ঠিক করেছ, আমিও সেখানে যাব। হেঁটে যেতে হলেও যাব। তােমায় ছেড়ে নিরাপদে ঘরের কোণে রইব ? এখনও আমার মতিভ্রম হয় নি।” সাভেলিচের সাথে তর্ক করা বৃথা। সুতরাং তাকে যাত্রার জন্য তৈরী হ’তে বল্লাম। আধঘণ্টা পরে আমি ভাল ঘােড়াটায় চাপলাম, সাভেলিচ চড়ল একটা দুর্ভিক্ষ পীড়িত, খোঁড়া টাটুর পিঠে। সেটা একজন প্রতিবেশী না খাওয়াতে পেরে অকে দিয়েছিল। আমরা দুর্গের ফটক পর্যন্ত গেলাম। পাহারা আমাদের কোনও বাধা দিল না, ওরেনবুর্গ ছাড়া গেল। তখন গােধূলি। রাস্তা গিয়েছে বান্দার ভিতর দিয়ে—সেটা তখন পুগাচফের দখলে। বড় রাস্তাটি বরফে ঢাকা পড়েছিল; কিন্তু সারা মাঠে ঘােড়ার খুরের দাগ ছিল। সেগুলি রােজ নতুন করে পড়ত। আমি কদমে যাচ্ছিলাম, সাভেলিচ আমার সঙ্গে সঙ্গে চলতে না পেরে কেবল চেঁচাচ্ছিল “অত তাড়াতাড়ি নয় ভাই। ভগবানের দোহাই, অত তাড়াতাড়ি চলাে না। তােমার ঐ ঢ্যাঙা ঘােড়াটার সাথে আমার এই খোঁড়া টাটু চলতে পারবে কেন ? এত তাড়াতাড়ি কি ভাই? চলেছি ত’ নিশ্চিত মরণের দিকে—তা এত তাড়াতাড়ি কেন ভাই? হায় পিট এচি, তােমার বরাতে অনেক কষ্ট আছে।” ;
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী শীগগিরই বান্দার আলাে চোখে পড়ল। যে সব ছােট পাহাড়ে নদীর শুনন খাত এই সব গায়ের স্বাভাবিক পরিখার মত, সেই পৰ্য্যন্ত এলাম। সাভেলিচ আমরা পিছনে বক্তে বকুতে চলেছে। গ্রামটা ঘুরে যাব ভেবেছিলাম। হঠাৎ গােধূলির ক্ষীণ আলােয় দেখতে পেলাম, পাঁচজন চাষা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ৬ এরা পুগাচফের বাহিনীর অগ্রদূত। তার সামরিক সঙ্কেত করল উত্তর জানি না, তাই পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। তারা ঘিরে ফেল্ল। একজন আমার ঘােড়ার রাস চেপে ধরল। আমি তলােয়ার খুলে তার মাথায় চোপ মালাম। টুপি থাকায় মাথা বাঁচল, কিন্তু লােকটা চোট খেয়ে পড়ে গেল। আর সবাই ভয় পেয়ে কেঁচা দৌড়ে পালাল। সেই সুযােগে ঘােড়র পেটে ঘা মেরে আমি ধাপে ছুটলাম। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে আমি বাঁচতে পারতাম, কিন্তু ফিরে দেখতে পেলাম, সাভেলিচ পিছনে নেই। সেই খোঁড়া টাটুর পিঠে ডাকাতদের হাত এড়িয়ে বুড়ো আসতে পারে নি। কি করি? কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে যখন বুঝলাম বুড়াে সত্যিই আটকা পড়েছে, তখন আবার ফিলাম। সেই নদীর শুকনাে খাতের কাছে পৌছে গােলমাল শুনতে পেলাম। সাভেলিচের গলাও শােনা যাচ্ছিল। ঘোড়া তাড়াতাড়ি চুটিয়ে ফের সেই চাষার দলের মধ্যে এসে পড়লাম। তারা বুড়ােকে ঘােড়া থেকে টেনে নামিয়ে বাঁধবার যােগাড় করছিল। আমি ফিরে আসায় তারা খুসি হয়ে, চীৎকার করে আমার দিকে ছুটুল। আমার ঘােড়া থেকে টেনে নামিয়ে তাদের মােড়ল বলল, “চল আমাদের রাজার কাছে। রাজা বিচার করবেন তােমার এখনই ফাসি হবে, কি কাল সকালে। সাতেলিচ বা আমি আর কোনও বাধা দিলাম না। তারা আমাদের নিয়ে চল।
বিদ্রোহী শিবিরে
১১৩
খাত পার হয়ে গাঁয়ে ঢােকা গেল। সধ জানালাতেই আলাে
অছিল, রাস্তায় অনেক লােকের সাথে দেখা হল। কিন্তু অন্ধকারে
কেউ আমাদের লক্ষ্য করল না, বা ওরেনবুর্গের কর্মচারী বলে চিনতে
পারল না। রাস্তার চৌমাথায় একখানা কুটিরের সম্মুখে আমাদের নিয়ে
গেল। ফটকে দুটি কামান বান ছিল। একজন বল, “রাজা এখানে
আছেন, আমি খবর দিচ্ছি।”
লােকটা ভিতরে গেল। সাভেলিচের দিকে চাইলাম-সে ভগবানের
নাম করছিল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করবার পর চাষা ফিরে এসে বলল,
“ভিতরে এস, প্রভু বলেন তিনি তােমাকে দেখবেন।”
ঘরের ভিতরে ঢুকলাম। দুটি মােমবাতি জ্বলছিল। ঘরের দেয়াল
সােণালি কাগজে ঢাকা ; অন্যান্য আবাব সাধারণ কুঁড়ে ঘরে যেমন হয়।
পুগাচফ একটি লাল কোট ও লম্বা টুপি পরে যীশুমূর্তির নীচে কোমরে
হাত দিয়ে বসে ছিল। তার কয়েকটি সহচর বিনীতভাবে পাশে দাড়িয়ে
ছিল। ওরেনবুর্গ থেকে কর্মচারী আসার সংবাদে তারা ব্যস্ত হয়ে অভ্যর্থনার
যােগাড় করেছিল। পুগাচফ, আমায় দেখেই চিনতে পাল। সে শান্তভাবে
বলল, “আ! এই যে তুমি! কেমন আছে? এখানে কেন এসেচ ?”
বলাম, “নিজের কাজে যাচ্ছিলাম, তােমার লােকে আমায় ধরে
রেখেছে।”
“কি তােমার কাজ ?”
কি বলব ভেবে পেলাম না। পুগাচফ ভাবল আমি অত লােকের
সামনে কিছু বলতে নারাজ। বন্ধুদের ঘরের বাহিরে যেতে বল। সবাই
গেল, দুজন নড়ল না।
পুগাচফ বলল, “এদের সামনে সব বলতে পার । এদের কাছে
আমার কিছুই গােপন নেই।”
৮
১১৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী বিদ্রোহী নেতার বন্ধুটিকে একবার দেখে নিলাম। একজন বেঁটে, কূজো, বুড়াে ; গায়ে মেটে রঙের কোট, ঘাড়ের ওপর একটি নীল ফিতে। আর কোন বিশেষত্ব ছিল না। দ্বিতীয় লােকটিকে কখনাে ভুলব না। সে যেমন ঢ্যাঙা, তেম্নি মােটা, তেমি চওড়া তার ঘাড়। বয়স বছর ৪৫ হবে। ঘন লাল দার, ঝকঝকে চোখ দুটি, মােটা নিরেট নাক, কপালে ও গালে লাল দাগ ; মুখখান। ভয়ানক। তার পরণে ছিল লাল সার্ট, কিরঘিস্ গাউন, কশাক হাজর। পরে শুনেছিলাম, প্রথম লােকটি পলাতক কর্পোরাল বরডফ : দ্বিতীয়টির নাম লেপুসা, সাইবেরিয়ার খনি থেকে তিনবার পলাতক দাগী । আমি নিতান্ত অন্যমনস্ক ছিলাম—পুগাচফের কথায় জ্ঞান হ’ল :- “এইবারে বল, কি উদ্দেশ্যে ওরেনবুর্গ ছেড়ে এসেচ ।" মাথায় একটা অদ্ভুত খেয়াল চাপূল। মনে হল, ভগবান আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যই আবার পুণাচফের কাছে নিয়ে এসেছেন। কোনও ইতস্ততঃ না করে সােজা উত্তর দিলাম, “বেলগরস্কি দুর্গে একটি অনাথা বালিকাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছিলাম। সেখানে তার ওপর ভয়ানক অত্যাচার হচ্ছে।” পুগাচফের সেই বড় বড় চোখদুটি জ্বলে উঠল। সে চেঁচিয়ে বলল, “আমার লোকের মধ্যে এমন দুঃসাহস কার যে আনাথার উপর অত্যাচার করে ? যতই সেয়ানাহােক্ না, আমার হাতে তার রক্ষা নেই। কে এই অপরাধী?” উত্তর দিলাম, “সাব্রিন। যে মেয়েটিকে তুমি পাদ্রীর বাড়ীতে পীড়িত দেখেছিলে সাব্রিন তাকে ঘরে কুলুপ দিয়ে আটকে রেখেছে, আর তাকে জোর করে বিয়ে করতে চাইছে।” পুচফ, কুটি করে বলল, “বটে! সাব্রিনকে সাব্রিনকে আমি শিক্ষা বিদ্রোহী শিবিরে দিচ্ছি। আইন হাতে নিয়ে লােককে জ্বালাতন করাব ফল আমি তাকে বুঝিয়ে দিচ্চি। তাকে আমি ফাঁসি দেব।” লােপুসা ডাঙা গলায় বলল, “আমি একটি কথা বলতে চাই। তুমি সাব্রিনকে দুর্গের নায়ক করে দিলে, আবার হঠাৎ তাকে ফাঁসি দিতে চাও। ভদ্র লােককে কলাকদের নায়ক করে তাদের ক্ষেপিয়ে রেখেছ ; আবার সামান্য অপরাধে তাকে ফাঁসি দিয়ে ভদ্র সম্প্রদায়কে উত্যক্ত করো না।” নীলফিতেওয়ালা বুড়াে বলল, ওদের দরদ দেখান বা উপকার করা দুইই ভুল। সাব্রিনকে ফাঁসি দাও, কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু এই কর্মচারীটিকে বেশ করে জেরা করা দরকার। যদি এ তােমাকে নেতা বলে না মানে তােমার কাছে তার বিচার প্রার্থনা করা উচিত নয়। যদি মেনেই থাকে, এতদিন ওরেনবুর্গে তােমার শত্রুদের সাথে কেন ছিল ? অনুমতি দাও, একে একটা সম্মানের আসনে বসিয়ে, নীচে আগুন জ্বেলে জেরা করে দেখি।” এই বুড়াে সয়তানের যুক্তি আমার খুব সঙ্গত মনে হ’ল। কার হাতে পড়েছি মনে করতে আমার গা শিউরে উঠল। পুগাচফ, বুঝল আমি ভয় পেয়েছি। চোখ টিপে আমায় বল্ল, “কেমন হুজুর ? “কেমন হুজুর? আমার সেনাপতি খুব সঙ্গত কথা বলেছে। তােমার কি মনে হয় ?” পুগাচরে তামাসায় আমার সাহস ফিরে এল। আমি বললাম, “আমি সম্পূর্ণ তােমার হাতে। তুমি যা ইচ্ছে করতে পার।” পুগাচফ বল “বেশ। এখন বলো, দুর্গে তােমাদের দিন কেমন যাচ্ছে।" উত্তর দিলাম, “ভগবানকে ধন্যবাদ, দিন ভালই যাচ্ছে।” পুগাচফ। “বেশ যাচ্ছে, আর লােকে না খেয়ে বেশ মরছে, নয় ?
১১৬ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী পুগাচফ, ঠিক ধরেছিল। কিন্তু আমার কর্তব্য বলে আমি “ও সব ফাঁকা গুজব। ওরেনবুর্গে প্রচুর খাবার আছে।” বুড়াে বল, “দেখছ, এ তােমার চোখের উপর তােক ঠকাচ্চে। সব পলাতক সমস্বরে বল্ছে, ওরেনবুর্গে দুর্ভিক্ষ, মড়ক লেগেই আছে। লােকে মরা জন্তুগুলাে অতি উপাদেয় খাবার মনে করে খাচ্ছে। আর হুজুর বলছেন, তাদের প্রচুর খাবার আছে। যদি সাব্রিনকে ফাঁসি । সেই কাঠে একেও ঝুলিয়ে দিলে তবে দুজনার প্রতি ন্যায়বিচার করা হবে।” হতভাগা বুড়াের কথায় যেন পুগাচফের টনক নড়ল। সৌভাগ্যক্রমে লােপুসা তার প্রতিবাদ ক’বল। সে বলল, “এস নাউমিচ, তুমি যে সব সময়ে মারমুখাে হয়ে আছ। এদিকে নিজের ত মানুষের হাল নেই, কোনও রকমে ধড়ে প্রাণটা ধুক ধুক্ কছে। তােমার এক পা রথে, তবুও পরকে মারবার সাধ যােল আনাই রয়েছে । হাত যা লাল হয়েছে তাতেও প্রাণ খুসি হয় নি !” বডফ উত্তর দিল, “তুমি যে মস্ত বড় সাধু বনে গেলে ! এত দয়া তােমার কবে থেকে হ’ল ?” লােপুসা বল, “আমার হাত কম লাল এ কথা বলছি নে।” আস্তিন গুটিয়ে লােমে ঢাকা লােহার মত হাতখানি বের করে বল, “এই হাতে অনেক রক্তপাত হয়েছে। তবে আমি শত্রু মেরেছি, অতিথি নয় ; যুদ্ধক্ষেত্রে বা সদর রাস্তায়, ঘরের কোণে বা উননের ধারে নয়— পুগাচফ, গম্ভীর ভাবে বলল, “ভাই, ঢের হয়েছে আর নয়। ওরেন- বুর্গের দলকে দল যদি ফাঁসি কাঠে ঝােলে তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু আমাদের ললাকে বিবাদ করলে সমূহ ক্ষতি। থামে, আর বিবাদ নয়।”
বিদ্রোহী শিবিরে ১১৭ লােপুসা ও বরডফ, চুপ করল, কিন্তু কটমট করে একে অপরের দিকেচাইতে লাগল। দেখলাম আলােচনার বিষয়টা বদলান দরকার। এর ফলে আমার যা দশা হবে সেটা সুবিধে নয়। তাই পুগাচফের দিকে ফিরে হেসে ক্লাম, “ওহহ, তােমার ঘােড়া আর পশমের কোটটার জন্য ধন্যবাদ দিতে ভুলে গিয়েছি। তােমার সাহায্য না পেলে আমি পথ হারিয়ে হিমে জমে যেতাম।” আমার- এই চালে ফল হল। পুগাচফ খুসি হয়ে উঠল। সে চোখ ঠেরে বলল “উপকার পেলেই উপকার করতে হয়। এখন বল দেখি, সাব্রিন যে মেয়েটির সাথে দুর্ব্যবহার করছে, তার সাথে তােমার সম্বন্ধটা কি? তােমার পিয়ারী নয়ত ?” হাওয়া বদলেছে দেখে ভাবলাম সব কথা খুলে বলাই ভাল। বললাম “সে আমার মনােনীতা। পুগাচফ হেসে বলল, “তােমার মনােনীতা! আগে বলনি কেন? বাঃ, আমরা তােমার বিয়ে দিয়ে খুব ধুমধাম করতাম।” বরডফের দিকে চেয়ে পুগাচফ বল, “শােন সেনাপতি, ইনি আমার পুরানাে বন্ধু, সুতরাং আমরা একসাথে খেতে বসব। রাত্রের চেয়ে সকাল বেলা বুদ্ধি খােলে ভাল। তখন দেখা যাবে একে নিয়ে কি করা যায়।” ইচ্ছা হল ভােজের সম্মানটা প্রত্যাখান করি, কিন্তু সাহস হল না। ঘরখানা যে কশাকের, তার ছােট দুটি মেয়ে টেবিলে কাপড় পেতে রুটি, মাছের ঝােল ও মদ এনে রাখল। আবার পুগাচফ ও তার সঙ্গীদের সাথে খেতে হল। অনেক রাত পর্যন্ত পানভােজন ও কথাবার্তা চলল। শেষে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। পুগাচফের সঙ্গীরা উঠে আমাকে তাদের সঙ্গে যেতে বল। আমি তাদের সাথে বের হয়ে এলাম। লােপসার হুকুমে পাহারা আমায়
১১৮
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
একখানি কুঁড়ে ঘরে আটকে রাখল। সেটা তাদের আফিস। সাড়ে
আগেই সেখানে ছিল । বুড়াে পর পর এই সব ঘটনায় এত অবাক
হয়েছিল যে সে আর কিছু বল্ল না। অন্ধকারে শুয়ে সে তাৰ্তনাদ আর
দীর্ঘশ্বাসে মনের বােঝ। হালকা করতে লাগল। খানিক পরেই তার
নাসিকা গর্জন শুরু হল। আমার মনে এমন চিন্তাস্রোত ছুটল যে এক
পলকও ঘুমুতে পারলাম না।
সকাল বেলা পুগাচফ ডেকে পাঠাল। দেখা করতে গেলাম। তিনটি
তুকি ঘােড় জোতা একখানা গাড়ী দোরে দাড়িয়ে ছিল। রাস্তায়
ভয়ানক ভিড়। ফটকে পুগাচফের সাথে দেখা হল ।
পশমের কোট
ও কিরঘিস টুপি পরে সে সফরে বের হবার জন্য প্রস্তুত ছিল।
সঙ্গীরা সবাই অতি বিনীত ভাবে তাকে ঘিরে দাড়িয়ে ছিল। হাসিমুখে
আমাকে অভিবাদন করেই পুগাচফ গাড়ীতে উঠে বসল।
আমিও
উঠে বসলাম।
যে বিশালবক্ষ তুর্কিটি ঘােড়ার রাস ধরে কোচবাসে বসেছিল,
পুগাচফ তাকে বলল, “বেলগরস্কি দুর্গের দিকে !”
আমার বুক দু দুর করে উঠল। ঘােড়া ছুটুল, গাড়ীর ঘণ্টা টং টং
করে বাজতে লাগল।
গাড়ী উড়ে চল।
পিছনে চেনা গলার আওয়াজ শােনা গেল, “থামাে, থামাে।”
দেখি সাভেলিচ পিছনে দৌড়াচ্চে। পুগাচফ গাড়ী থামাতে বলল।
সাভেলিচ বল্ল “ভাই পিটর এণ্ডিচ, এই বুড়ােবয়সে আমায় গুণ্ডাদের
মাঝে ফেলে পালিয়াে না।”
গাচফ, ব, “আরে, এই যে বুড়ো তুমি! আবার আমাদের
দেখা ! বসস, কোচবাসে উঠে বসে।”
বিদ্রোহী শিবিরে ১১৯ গাড়ীতে উঠে সাভেলিচ বল, “ধন্যবাদ, হুজুর, ধন্যবাদ। বুড়াের ওপর এই দয়ার জন্য ভগবান তােমায় একশ বছর পরমাই দিন। যতদিন বাঁচব, তােমার জন্য প্রার্থনা করবাে। সেই খরগােস চামড়ার জ্যাকেটটার কথ• কখনও বলব না।” শেষটুকু পুগাচফ শুনতে পায় নি, শুলে হয়ত রেগে উঠত। ঘােড়া ধাপে ছুটুল, রাস্তার লােকে থেমে সেলাম দিতে লাগল। পুগাচফ দুধারে মাথা নােয়াতে লাগল। মিনিট কয়েক পরে গ্রাম ছেড়ে আমরা সমতল মাঠের রাস্তায় ছুটলাম। তখনকার মনােভাব হজেই বােঝা যেতে পারে। যাকে আর পাবাে বলে ভাবি নি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার তার সাথে দেখা হবে। সেই মিলনের মুহূর্তটি কল্পনা করতে চেষ্টা পেলাম। কার হাতে পড়েচি তাও মনে হ’ল। আমার ভাবী স্ত্রীর অভিভাবকের ভয়ানক নিষ্ঠুরতা, পশুর মত রক্তপিপাসা মনে পড়ল। পুগাচফ, জানত না সে কাপ্তান মিরনফের মেয়ে। সাব্রিন হিংসা করে তা বলে ফেলতে পারে, কিম্বা পুগাচফ অন্যভাবেও জানতে পারে.........তা হলে মেরিয়া ইভাভার কি হবে? আমার চুলের ডগা পর্যন্ত শিউরে উঠল। হঠাৎ পুগাচফ, জিজ্ঞাসা করল “এত গভীরভাবে কি ভাবচ, কুমার?” উত্তর দিলাম, “না ভেবে উপায় কি ? আমি রাণীর কর্মচারী, ভদ্রসন্তান ; কাল তােমার সাথে লড়াই করেছি ; আজ তােমার পাশে, গাড়ীতে যাচ্ছি। আমার সমস্ত জীবনের সুখ আজ তােমার ওপরে নির্ভর করছে।” পুগাচফ জিজ্ঞাসা করল, “ভাল, তােমার ভয় হচ্ছে নাকি ? উত্তর দিলাম, “একবার যখন বাঁচিয়েছ, এবারও বাঁচাবে আশা করি তােমার প্রাণ যে বড়।”
১২০।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
!
পুগাচফ, বল, “তােমার ধারণা ঠিক। আমার সঙ্গীরা তােমায় সন্দেহ
করছিল ; সেই বুড়াে আজও সকালে বলছিল, তুমি গােয়েন্দা, তােমায়
ভয়ানক যন্ত্রণা দিয়ে শেষে ফাঁসি দিতে। কিন্তু অমি রাজী হই নি।”
পুগাচফ খানিকটা চুপ করে থেকে বলল, “ওরেগে ওরা আমার
কথা কি বলে ?
“ওরা বলে, সহজে তােমার সাথে পেরে ওঠা যাবে না। তােমার
যে শক্তি আছে তা এইবার স্বীকার করছে।”
পুগাচফের মুখে তৃপ্তির চিহ্ন দেখা গেল। সে আবার বলল “ওরা
‘ঘুজিবা’র লড়াইএর কথা জানে কি ? ৪জন সেনাপতি মারা পড়ে।
চার দল ফৌজ বন্দী হয়। যখন মস্কো আক্রমণ করবে, তখন আমার
শক্তি আরও বুঝতে পারবে।”
“তুমি সে আশাও রাখ নাকি?”
পুগাচফ চিন্তিত ভাবে বলল, “ভগবান জানেন। আমার চলাফেরা
অবাধ নয়, যা ইচ্ছা তাই করতে পারি না। আমার সঙ্গীরা বড় বেশী
সব চোর ; আমায় চারদিকে নজর রাখতে হয়। একবার
হার হলে ওরা আমার মাথা বেচে নিজেদের গলা বাঁচাবে।”
আমি বললাম, “ঠিক কথা। সময় থাকতে ওদের ছেড়ে রাণীর
কাছে ক্ষমাভিক্ষা কর না কেন?
পুগাচফ, বিদ্রুপের হাসি হাসল। বল্ল, “আর ফিরছি না। যাত্রা
যে ভাবে শুরু করেছি সেই ভাবেই শেষ করব।
আমি দেশের
মুক্তি চাই ; তাতে যার স্বার্থহানির ভয় সে বলবে আমি ডাকাত, আমি
খুনে। কিন্তু ভগবানের চোখে আমি ন্যায় ও ধর্মের রক্ষক। আমার
চেষ্টা সফল হতেও ত’ পারে। জানত গ্রিকা ওটিপিয়েভ, মস্কোয়
রাজত্ব করেছিল ?
বিদ্রোহী শিবিরে ১২১ “তার দশা কি হয়েছিল তাও ত’ জান ? তাকে জানালা গলিয়ে ফেলে দিয়েছিল ; তারপরে মেরে, পুড়িয়ে তার ছাই কামানে পুরে ছুড়েছিল।” পুগাচফ যে কোন দৈব প্রেরণায় বলতে লাগল, “তােমায় একটা রূপকথা বলি; এটা ছেলেবেলায় একটি কালমুক বুড়ি আমায় বলেছিল। ঈগলপাখী একদিন দাঁড়কাককে জিজ্ঞাসা করল—ভাই- দাঁড়কাক,বল দেখি তুমি কেন তিনশ’ বছর বাঁচ, আর আমি বা কেন তেত্রিশ বছরের বেশী বাঁচি নে? দাঁড়কাক বলল, বাপধন ঈগল, তার কারণ এই যে তুমিও তাজা রক্ত, আর অমি মড়া খেয়ে প্রাণ বাঁচাই। ঈগল বল, আমিও তা হলে তােমার খাদ্যই খাব। দুটিতে একসঙ্গে উড়ে গেল ; যেতে যেতে একটা মরা ঘােড় দেখতে পেয়ে নেমে এসে তার ওপর বল। দাড়কাক বেশ মাংস ছিড়ে খেতে লাগল, আর সেই খাদ্যের ভারি তারিফ করতে লাগল। ঈগলপাখী সেই মাংস দুই একবার করে, পালকে ঠোঁট মুছে, পাখানাড়া দিয়ে বলল, ভাই কাক, তিন শ বছর ধরে মড়ার মাংস খাওয়ার চেয়ে এক চুমুক তাজরক্ত খেয়ে বাকি সব ভগবানের পায়ে সঁপে দেব। কালমুকদের এই গল্প তােমার কেমন লাগে ? বাম, “গল্পের কায়দাটি বেশ। কিন্তু খুন আর লুট করে প্রাণ বাঁচানই আমার মতে মড়ার মাংস ঠোকরান।” পুগাচফ, হেসে বলল, “সে অপরাধ ত সরকারেরই বেশী। তােমার মনিব খুন জখম, লুটতরাজ করে আমাদের দেশ কেড়ে নিয়েছে । আমরা সেই দেশ ফিরে পাবার জন্য লড়াই করছি। তুমি কি বােঝ না স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করাই তাজা রক্ত খাওয়া ?” এরপরে আমরা গভীর নীরবতায় ডুবে গেলাম। যে যার আপনার রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী চিন্তায় বিনা হলাম। তাতার কোচম্যানটি একটি দুঃখের গান গাইতে লাগল। সাভেলিচ কোচবাক্সে বসে একবার সামনে একবার পিছনে দুলতে লাগল। গাড়ীখানা শীতের পিছল রাস্তা দিয়ে উড়ে চল।•••••• হঠাৎ ইয়েক নদীর ধারে একটি গ্রাম চোখে পড়ল—তার চারদিকে কাঠের বেড়া, গির্জার চূড়াটি আকাশে ঠেকেচে। মিনিট পনর পরে আমরা বেলগরস্কী দুর্গে পৌছে গেলাম।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ, অনাথ এই শীর্ণ নবীন শাখী, আশ্রয় হীন, দুৰ্বল দীন, কেমনে ইহারে রাখি ? বালিকা অবলা, বান্ধবহীন, ভাপীড়নে নত, অতি দীনা, নাহি পিতামাতা, ভগিনী বা ভাতা কে মুছাবে দুটি আখি ? আজি শুভদিনে আশীস্ কে দিবে, আদরে তুলিয়া বাঞ্ছিতে সপিবে, হতাশ হৃদয়, চারিদিকে ভয়, হিয়া কাপে থাকি থাকি। বিয়ের গান। গাড়ী দুর্গনায়কের বাড়ীর সামনে এসে থাল। পুগাচফের গাড়ীর ঘণ্টা শুনে দলে দলে লােক আমাদের পিছনে ছুটল। সাব্রিন পৈঠার ওপর এসে তার ‘রাজা’কে অভ্যর্থনা করল। তার সেই কশাকদের মত পােষাক, মুখে আবার দাড়ী হয়েছিল। এই নিমকহারাম গাড়ী থেকে পুগাচফকে নামিয়ে নিল, আর অতি নীচভাবে রাজভক্তি জানাল। আমাকে দেখে সে একটু হতবুদ্ধি হয়েছিল, কিন্তু তখনই সামলে নিয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল- “তা হলে, তুমিও আমাদের একজন! সময়ে কি না হয় !” আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম, কোনও কথা কইলাম না।
১২৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী যখন সেই পরিচিত ঘরে ঢুকলাম, আমার বুক ব্যথায় ভরে উঠল। মৃত দুর্গনায়কের ডিপ্লোমা খানা অতীতের স্মৃতি নিয়ে তখনও দেয়ালে ঝুলছিল। যে সােফায় বসে ইভান কুজমিচ বউএর বকুনি শুতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তেন, সেইখানায় পুগাচফ বসল।.. সাব্রিন তাকে কিছু ভােড়কা এনে দিল। পুগাচফ এক গ্লাস খেয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল, “কুমারকে কিছু দাও।” সাব্রিন বারকোস নিয়ে আমার কাছে এল ; কিন্তু আমি আবার মুখ ফিরিয়ে নিলাম। লােকটা সােয়াস্তি পাচ্চে না, তা বুঝতে পারলাম। তার স্বাভাবিক তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতেই সে বুঝতে পেরেছিল যে পুগাচফ, তার ওপর বিরক্ত হয়েছে। ভয় পেয়ে সে আমায় সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। দুর্গের অবস্থা, শত্রু সৈন্যের সংবাদ এবং ঐ রকম অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করতে করতে পুগাচফ, হঠাৎ বলল- “বল দেখি ভাই, যে মেয়েটিকে তুমি ঘরে বন্দী করে রেখেচ, সে কে? তাকে নিয়ে এস, আমি দেখব।” সাব্রিন মড়ার মত ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কাপতে কাপতে বলল, “হুজুর সে বন্দিনী নয়, রােগিণী। উপরে বিছানায় শুয়ে আছে।” পুগাচফ-“আমায় তার কাছে নিয়ে চল।” রাজার হুকুম ফেলা চলে না। সাব্রিন তাকে মেৰিয়া ইভানভ নার ধরে নিয়ে চলল। আমি পিছু নিলাম । সিড়ির ওপরে সাব্রিন থাল। বলল, “হুজুর, আপনি আমার সবই দাবী করতে পারেন; কিন্তু একটি অজানা লােককে আমার স্ত্রীর শশাবার ঘরে ঢুকতে দেবেন না ।” আমি ভয়ে শিউরে উঠলাম।
অনাথা বললাম, “ত হলে বিয়ে হয়ে গিয়েছে ?” ইচ্ছে হ’ল লােকটাকে ছিড়ে টুকরো করে ফেলি। পুগাচফ, ধম্কে বল্ল, “চুপ কর। সে সব আমি দেখব।” সাব্রিনকে ফল, “বাপু, বেশী চালাকি করাে না, স্ত্রীই হােক আর যাই হােক আমি যাকে ইচ্ছে নিয়ে যাব। কুমার, আমার সঙ্গে চলল।” মাসার ঘরের কাছে গিয়ে সাব্রিন আবার থাল, ভাঙা গলায় বলল, “হুজুর, সাবধ'। সাবধ"। ওর জ্বরবিকার হয়েছে, আজ তিন দিন হ’ল ভুল বচে।” . পুগাচফ-“দুয়ার খােল “ সাব্রিন পকেট খুজতে লাগল, বলল, “চাবিটা ত’ আনি নি?” পুগাচফ লাথি মেরে দোর ভেঙে ফেল্ল। তালাটা খসে পড়ল, দোর খুলে গেল। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। যা দেখলাম, তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। মেরিয়া ইভানভ না রােগা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, তার চুল আলু থালু, পােষাক চাষাদের মত ; সে মেঝেয় বসে আছে, তার সামনে একটি জলের ঘড়, তার ওপরে আস্ত একখানা রুটি। আমাকে দেখেই চমকে উঠে সে কঁদতে লাগল। কি যে মনে হল তা বলে বুঝাতে পারি না। পুগাচফ সাব্রিনের দিকে চেয়ে হেসে বল্ল- “তােমার এ হাসপাতালটি ত’ বড় চমৎকার।” তারপরে মেরিয়া ইভানভনার কাছে গিয়ে বল্ল “লম্মিটি, বল দেখি তােমার স্বামী তােমাকে সাজা দিচ্ছেন কেন? তুমি কি অন্যায় করেছ ?” সে বল, “আমার স্বামী ! ও ত আমার স্বামী নয়। আমি ওকে বিয়ে করতে গেলাম কেন? তার চেয়ে আমার মরণ ভাল। ওর - হাত থেকে আমায় না বাঁচালে আমি নিশ্চয় মরব।”
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী পুগাচফ সাব্রিনের দিকে চেয়ে ভ্রুকুটি করল। বল্ল “আমার সাথে চালাকি করতে তােমার সাহস হ’ল। হতভাগা, তােমার কি শাস্তি হওয়া উচিত জানাে ?” সাব্রিন, পুগাচফের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ঘৃণা আমি সেদিকে চাইলাম না। একটি ভদ্রসন্তান একজন পলাতক বিদ্রোহীর পায়ের কাছে গড়াগড়ি যাচ্ছে, এটা আমার বড়ই বিসদৃশ লাগল। পুগাচফ, নরম হল। সে বল, “আমি তােমাকে এবার ক্ষমা করলাম; ফের যদি কোনও দোষ কর এ অপরাং, তাও আমার মনে পড়বে।” তারপরে মেরিয়া ইভানভনার দিকে ফিরে মেহসিক্ত কণ্ঠে বল্ল, “লক্ষ্মি, চলে এস ; আমি তােমাকে মুক্তি দিচ্চি। মেরিয়া ইভানভ না তার দিকে চাইল, বুঝল যে তার পিতৃহন্তা সম্মুখে। হাতে মুখ ঢেকে সে মূচ্ছিত হয়ে পড়ল। আমি ছুটলাম তাকে ধরতে, কিন্তু প্রভুপরায়ণা পালাসা নির্ভয়ে ঘরে ঢুকে তার প্রভু- কন্যার সেবা করতে লাগল। পুগাচফ, বেরিয়ে এল, আমরা তিনজনে নীচে এলাম। পুগচিফ, হেসে বলল, “ভাল, দেখলে কুমার, আমরা লক্ষ্মীটিকে উদ্ধা করলাম। কি বল, এইবার পাদ্রিকে ডেকে তার ভাইঝির সাথে তােমার বিয়ের কথাটা পাড়ি। আমি কন্যাদান করব—যদি তােমার মত হয়, সাব্রিন হবে বরের বন্ধু। আমরা ক'টা দিন বেশ উৎসব করব।” যা ভেবেছিলাম তাই হল। পুগাচফের কথা শুনে সাব্রিন রাগে অধৈৰ্য্য হয়ে চেঁচিয়ে বলল, “হুজুর আমার কসুর মাপ করবেন। আমি আপনার কাছে মিছে কথা বলেছি। গ্রীনফও আপনাকে ছলনা করছে।
অনাথা ১২৭ মেয়েটি পাদ্রীর ভাইঝি নয়, কাপ্তান মিরনফের মেয়ে। দুর্গ দখল করবার সময়ে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল জ্বলন্ত আগুনের মত চোখ দুটি আমার চোখের ওপর রেখে পুগাচফ বল, “এ কি ?” আমি দৃঢ়ভাবে অথচ ধীরে উত্তর দিলাম, “সাব্রিন ঠিক বলেছে।” পুগাচফ। “তুমি ত আমার বল নি ?” তার মুখখানা অন্ধকার হয়ে গেল। আমি উত্তর দিলাম, “একবার ভেবে দেখ, তােমার সাথীদের সানে আমি কি ক৫ে, বলি যে মিরনফের মেয়ে বেঁচে আছে ? তারা ত’ ওকে ছিড়ে টুকরাে-টুকরা করে ফেলত। কিছুতেই বেচারাকে বাচান যেত না।” পুগাচফ, আবার সরলভাবে হেসে বল, “ঠিক বলেছ। আমার সঙ্গী মাতালগুলো বেচারাকে অপমান করত। পাদ্রীবৌ তাদের ছলনা করে ভালই করেছে। আহা, লক্ষ্মী মেয়েটি। তার মেজাজ খুসি দেখে বল্লাম, “দেখ, তােমায় কি বলে ডাক্ব জানি না, জানতেও চাই না! কিন্তু ভগবান সাক্ষী, তুমি আমার যে উপকার করেছ, আমি হাসিমুখে প্রাণ দিয়ে তার প্রতিদান করব। আনার ধর্ম বা সম্মানের হানিকর কোনও অনুরােধ করে না। এই অনাথা মেয়েটিকে নিয়ে, ভগবান আমাদের যে পথ দেখান সেই পথে যেতে দাও। তুমি যে ভাবে, যেখানেই থাক আমার জীবনের প্রত্যেকটি দিন তােমার আত্মার কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করব।” পুগাচফ, হেসে বল্ল, “তাই হােক। প্রতিহিংসাতেই হােক আর ক্ষমাতেই হােক আমি আধাআধি রফা করি না। তুমি তােমার মনােনীতাকে নাও; তাকে সঙ্গে করে যেখানে ইচ্ছা যাও; ভগবান তােমাদের দুজনকে ভালবাসা ও মনের মিল দিন।
১২৮
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
তারপরে সে সাব্রিনের দিকে ফিরে বল, “আমার অধীনে যত দুর্গ,
যত গ্রাম আছে তার ভিতর দিয়ে অবাধে যাওয়ার একখানা ছাড়পত্র
একে দাও।”
সাব্রিন বজ্রাহতের মত দাড়িয়ে ছিল। পুগাচফু-দুর্গ পরিদর্শন করতে
গেল। সাব্রিন তার সঙ্গে গেল, আমি রইলাম যাত্রার জন্য তৈরী হবার
অছিলায়।
দৌড়ে ওপরে গেলাম। দরজা বন্ধ ছিল, ঘা লিম। পালাসা
জিজ্ঞাসা করল “কে ?*
আমার কথা শুনে ভিতর থেকে মাস
মধুর কণ্ঠে
এচি, একটু. আ কর। আমি কাপড় ছাড় চি। পাদ্রী বৌএর
ওখানে যাও, আমি শগগিরই আচি।”
পাদ্রীর বাড়ী গেলাম। পাদ্রী আর তার বৌ দৌড়ে এলেন আমাকে
এগিয়ে নিতে। সাভেলিচ আগেই তাদের খবর দিয়েছিল।
পাদ্রীবৌ জিজ্ঞাসা করলেন, “কেমন আছ, পিটর এণ্ডিচ? ভগবানের
ইচ্ছায় আবার আমাদের দেখা হল । আমরা রােজ তােমার কথা
বলি। তােমায় ছেড়ে আসার দিন বড়ই কষ্টে যাছিল। আহা বেচারী।
কিন্তু পুগাচফকে পটালে কি করে বল দেখি? তােমাকে যে সে
জীয়ন্ত রেখেছে, এ বড় আশ্চর্য্য। এইখানে সয়তানের কিছু মহত্ত্ব
ব, “পিটর
আছে।”
পাদ্রী জেরাসিম বললেন “ঢের হয়েছে, আর বেশী বকো না। বেশী
কথা যারা বলে তাদের মুক্তি নেই। ভিতরে এস, পিটর এচি!
তােমাকে সাদরে অভ্যর্থনা করছি। কত দিন তােমাকে দেখিনি।”
ঘরে খাবার যা ছিল পাদ্রীবৌ আমাকে তা বের করে দিলেন।
সেই সাথে অবিশ্রাম ব’কে যেতে লাগলেন। সাব্রিন কি করে মেরিয়া
অনাথা ১২৯ ইভানভ নাকে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, মাস কত কেঁদেছিল, তাদের ছেড়ে যেতে চায় নি, পালাসার কাছে তারা কেমন মাসার সব খবর পেতেন, পালাসাই কেমন আমার কাছে চিঠি লিখতে মাসাকে পরামর্শ দেয়, ইত্যাদি সব খবর তাঁর কাছে পাওয়া গেল। আমিও সংক্ষেপে আমার সব খবর দিলাম। পুগাচফ তাদের ফাঁকির কথা জেনেচে, শুনে পাদ্রীদম্পতি ভগবানের নাম করতে লাগলেন। পাদ্রীবৌ বললেন, “পবিত্র কুশ আমাদের সহায় হােক্ ! ভগবান ঝড় শান্ত করুন। মুবিন আমাদের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে । কি রকম লােক দেখ দেখি!” ঘরের দোর খুলে গেল। মাস নিষ্প্রভ মুখে হাতে হাতে ভিতরে এল। চাষার পোষাক ছেড়ে, আগের মত সহজ সুন্দর বেশে সে এসে দাড়াল। আমি তার হাত ধরলাম ; খানিকক্ষণ দুজনে কোনই কথা কইতে পারলাম না। হৃদয় তখন এত পূর্ণ যে কথা আর সরে না। বাড়ীর কৰ্ত্তা-গিনি দেখলেন তাদের কথা ভাববার মত স্থান আর আমাদের মনে নেই। তাই তাঁরা আমাদের রেখে বাহিরে গেলেন। এইবারে আমাদের কথার ফোয়ারা ছুটল। দুর্গ দখলের পর তার ভাগ্যে কি কি হয়েছে মাস। সব বল। তার সেই দুর্দশা, নীচমনা অত্যাচারীর হাতে লাঞ্ছনা, সব শুলাম। আগের সেই সুখের দিনের কথা মনে পড়ল . দুজনেই কঁদলাম। •••শেষে আমার উদ্দেশ্যের কথা পাড়লাম। পুগাচফের এলাকায়, সাব্রিনের দুর্গে তার থাকা অসম্ভব। ওরেনবুর্গের কথা ভেবে লাভ নেই, কারণ, অবরােধে সেখানে লােকের বড়ই কষ্ট হচ্ছিল। জগতে তার আপনার বলতে আর কেউ ছিল না। আমি তাকে আমার বাবার কাছে গিয়ে থাকতে অনুরােধ করলাম। প্রথমে সে ইতস্ততঃ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী • করল ; তার ওপর আমার বাবার উপেক্ষার কথা তার জানাই ছিল, তাই সে ভয় পেল। আমি তাকে আশ্বাস দিলাম। জাম যে বৃদ্ধ বীর দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, বাবা কৰ্তব্যবােধে, আনন্দে তার মেয়েকে বরণ করে নেবেন। শেষে তাকে বললাম “মাসা, আমি তােমাকে আমার অর্ধাঙ্গিনী বলেই মনে করি। ভগবানের দয়া আমাদের দুজনকে এক করে দিয়েচে। জগতে আর কোনও শক্তি নেই আমাদের বিচ্ছেদ ঘটায়।” মেরিয়া ইভানভ না লজ্জা বা অনিচ্ছার কোনওগুণ না করে আমার কথা শুল। সে বুঝেছিল তার ও আমার ভাগ্য এক সূতােয় বাঁধা পড়েছে। কিন্তু সে আবার বল্ল, শুধু আমার বাপ মায়ের অনুমতি পেলে আমায় বিয়ে করবে। আমি প্রতিবাদ করলাম না। দুজনা দুজনকে চুম্বন করলাম। আমাদের কর্তব্য ঠিক হয়ে গেল। ঘণ্টাখানেক পরে পুগাচফের অবােধ্য দস্তখৎসুদ্ধ ছাড়পত্র নিয়ে ম্যাসিমিচ এল। এসে বলল, পুগাচফ আমার সাথে দেখা করতে চায়। গিয়ে দেখি সে যাত্রার জন্য তৈরী হয়ে আছে। এই ভীষণ লােকটির কাছে বিদায় নিতে আমার কষ্ট হতে লাগল। পুগাচফ অমঙ্গলের মুৰ্ত্তি, কিন্তু আমার পক্ষে নয়। সত্যকথা বলতে কি, সেই সময়ে তার ওপরে আমার কি দর হ’ল তা বলে বুঝাতে পারি নে ! ইচ্ছা হ’ল সেই ডাকাতের দল থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে, সময় থাকতে তার মাথাটা বাঁচিয়ে দিই। সাব্রিন ও অন্যান্য লােক থাকাতে আমি প্রাণের কথা তাকে খুলে বলতে পারলাম না । সেই নির্মম অথচ সহৃদয় বন্ধুটির কাছে বিদায় নিলাম। জনতার মধ্যে পাদ্রীবৌকে দেখে পুগাচফ, আঙ্গুল নেড়ে কুটি করল; তারপরে গাড়ীতে চেপে কোচম্যানকে হুকুম দিল বারূদার দিকে হাঁতে। ঘােড়া অনাথা ১৩১ সাব্রিনও অদৃশ্য ক’টি যখন ছুটুল তখন পুগাচফ মাথা বের করে আবার চেঁচিয়ে বল্ল, “বিদায়, কুমার, হয়ত আবার দেখা হবে।” আবার দেখা হয়েছিল, কিন্তু সে কী অবস্থায়। পুগাচফ, গাড়ী চড়ে চলে গেল। সেই সীমাহীন প্রান্তরের যেদিকে তার ঘােড়াকটি উদ্দাম নৃত্যের ভঙ্গীতে ছুটে চলেছিল, আমি একদৃষ্টে সেইদিকে চেয়ে রইলাম। ক্রমে জনতা মিলিয়ে গেল ; হ’ল। আমি পাত্রীর বাড়ীতে ফিরে এলাম। বিদায়ের সব বন্দোবস্ত হয়ে গেল। আর দেশী করা সঙ্গত মনে হল না। আমানের জিনিসপত্তর মৃত দুর্গনায়কের গাড়ীতে চাপান হল। চালকেরা নিমেষে ঘােড়া জুতল। মাস তার পিতামাতার সমাধির কাছে বিদায় নিতে গেল- গির্জার পিছনে তাদের সমাহিত করা হয়েছিল। আমি তার সাথে যেতে চাইলাম, কিন্তু সে বল্ল একাই যাবে। খানিক পরে, নীরবে চোখের জল ফেলতে ফেলতে সে ফিরে এল। গাড়ীখানা বাড়ীর সামনে আনা হল। পাত্রী ও তার স্ত্রী পৈঠার ওপরে এলে দাঁড়ালেন। আমরা তিন জন—মেরিয়া ইভানভনা, পালাসা ও আমি-- গাড়ী চাপলাম। সাভেলিচ কোচবাক্সে বসল। হৃদয়া পাদ্রীবৌ বলেন “মামা, লক্ষ্মি, এইবারে বিদায়! পিটর এচি, প্রতিভাবান যুবক, বিদায় ! তােমাদের যাত্রা শুভ হােক । ভগবান তােমাদের সুখী করুন।” আর রওনা হলাম। দেখলাম সাব্রিন দুগনায়কের বাড়ীর জানালায় দাড়িয়ে আছে। তার চোখে মুখে হিংসার আগুন জ্বলছে। দলিতশত্রুকে লক্ষ্য করে বিজয়ের উল্লাস দেখাতে আনার মন চাইল না— আমি অন্যদিকে চোখ ফিরালেম। আমরা দুর্গের ফটক পার হলাম, এইবারে বেলগরস্কি দুর্গ চিরদিনের জন্য ত্যাগ করলাম । ০ এয়ােদশ পরিচ্ছেদ গ্রেপ্তার “ক্ষমা করো, ভাই, আমার কাজ, তােমারে পাঠাব করার মাঝ ।” “পাঠাও তাহাতে দুঃখ নাই, দুটি কথা আগে বলিতে চাই।” নিঝনিন যার মধুর মুখখানি এতদিন হৃদয় ভরে ছিল, আশাতীত ভাবে তার সাথে মিলন হ’ল। সেদিন সকালবেলাও তার চিন্তায় আমি ছিলাম । আমার নিজের ইন্দ্রিয়ের ওপর বিশ্বাস হচ্ছিল না---যা ঘটছে তা স্বপ্নের মত, ছায়াবাজীর মত লাগছিল। মাস চিন্তিত ভাবে একবার আমার দিকে, একবার রাস্তার দিকে চাইছিল। তার সহজ অবস্থা তখনও ফেরে नि । দুজনেই নীরবে বসে ছিলাম—যেন বড়ই ক্লান্ত। বণ্টা দু’য়ের মধ্যে কখন যে পরের দুর্গটার পোঁছলাম তা টের পাই নি। এটাও পুগাচরে হাতে ছিল। এখানে ঘোড়া বক্লান হ’ল ; চট পট, ঘােড়াগুলির সাজ পরানাে হল। দুর্গের কশাক কাপ্তান আমাদের রওনা করবার জন্য ভারি ব্যস্ত হয়ে উঠল। বুঝলাম কোচম্যানের বাচালতার ফলে লোকে আমাকে জারের প্রিয়পাত্র মনে করেছিল। আবার যাত্রা শুরু হল। গােধুলি নাছে এমন সময়ে একটি ছােট সহরে পৌছলাম। কশাক কাপ্তান বলেছিল এটিও পুগাচফের অধীন। নগররক্ষীরা আমাদের পথ আটকাল জিজ্ঞাসা করল “কে যায়?”
১৩৩ কোচম্যান গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, “জারের বন্ধু ও তার স্ত্রী।” হঠাৎ একদল হুসার আমাদের ঘিরে ফেলে যাচ্ছে তাই গাল দিতে লাগল। বড় বড় গোপওয়ালা একটি সার্জেন্ট আমাকে বল, “সয়তানের বন্ধু, বেরিয়ে এস। তােমার অভ্যর্থনার মধুর ব্যবস্থা হচ্ছে—সেই সাথে ঐ ছুড়িটারও।” গাড়ী থেকে নেমে আমি বললাম, “আমায় সেনাপতির কাছে নিয়ে চল।” আমার কর্মচারীর উর্দি দেখে সৈন্যরা গাল দেওয়া বন্ধ করল। সার্জেন্ট আমাকে কর্ণেলের কাছে নিয়ে গেল—সাভেলিচ সঙ্গে চল। সে বছিল, “বাহবা জারের বন্ধু ! চাটু থেকে গড়িয়ে একদম আগুনে ! হে ভগবান, এর শেষ কোথায় ?” গাড়ীখানা আস্তে আস্তে আমাদের পিছনে চলল। সার্জেন্ট আমাকে পাহারাদের জেম্মায় রেখে খবর দিতে গেল। তখনই ফিরে এসে সে বল, কর্ণেলে আমার সাথে দেখা করবার অবসর নেই। সে হুকুম দিয়েছে আমাকে জেলে পাঠিয়ে আমার স্ত্রীকে তার কাছে নিয়ে যেতে। রেগে বলুন, “তার মানে ? লােকটার মাথা খারাপ হয়েছে নাকি?” সার্জেন্ট : “তা ত’ বল্তে পারিনে হুজুর। অংশাদের জুর বললেন হুজুরকে জেলে পাঠিয়ে হুজু রাণীকে তার কাছে নিয়ে যেতে।” আমি গট গট করে পৈঠা বেয়ে উঠে গেলাম। পাহায়াগুলাে বাধা দিল না । সােজা ঘরে ঢুকলাম, সেখানে হুসারদের ক’জন কস্মচারী তাস খেছিল। তাদের মধ্যে যেটি কর্ণেল সে তাস বাটছিল। দেখলাম সে আর কেউ নয়—আমার বিলিয়ার্ডের ওস্তাদ, ইভান জুরিন। চেঁচিয়ে বল্লাম, “একি সত্যি ! সত্যই কি আপনি ইভান জুরিন ?”
১৩৪
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
“কেরে? পিটর এণ্ডিচ ? তুমি আচ কোখেকে ? কি মজা!
এস এস, খেলবে না আমাদের সাথে ?”
“ধন্যবাদ। আগে আমার জন্য বাড়ীর ব্যবস্থা করে।”
“বাড়ী ? তুমি আমার সাথে থাকবে।”
তা ত’ পারব না ভাই, আমি একা নই যে।”
“তােমার বন্ধুকে সঙ্গে করে নিয়ে এস।”
“বন্ধু কোথা ? আমার সাথে স্ত্রীলোেক যে !”
“স্ত্রীলােক
! কোথায় পেলে ? ওহে ভাই!”
এই বলে জুরিন
এমন ভঙ্গী করে শীস্ দিল যে তার সাথীরা হেসে উঠল। আমি বড় লজ্জা
পেলাম।
জুরিন বলল, “ভাল, তাই হােক। তােমায় বাড়া দিচ্চি। কিন্তু
বড় দুঃখ হচ্ছে...আমরা আগের মত আমােদ করতে পারতাম•••কই হে
কে আছ, পুগাচফের পিয়ারীকে নিয়ে আসচ না কেন ? আসতে চায়
বুঝি? বল কোনই ভয় নেই ; ভদ্রলােকটি বড় দয়ালু, তার কোন
অনিষ্ট করবে না—দু এক ঘা লাথি মারে। যাতে চট পট আসে।”
আমি বল্লাম—“তুমি কি বচ? পুগাচফের পিয়ারী ? কাপ্তান
মিরনফের মেয়ে যে । আমি তাকে উদ্ধার করেছি। এখন বাবার কাছে
তাকে রাখতে যাচ্ছি।”
“কি রকম? ওরা কি তা হলে তােমার আসার খবর দিয়ে গেল ?
বেশ মজা ত! আমি যে কিছুই বুঝতে পারচি নে ?"
‘সব তােমায় পরে বলব এখন। তুমি আগে মহিলাটিকে আশ্বাস
দাও। তােমার হুসারে তাকে বড্ড ভয় দেখিয়েছে।”
তখনই জুরিন ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার ভুলের জন্য রাস্তায় এসে
মেরিয়া ইভানভনার কাছে ক্ষমা চাইল। সার্জেন্টকে বলল সহরের
গ্রেপ্তার সেরা বাড়ীখানি তাকে ছেড়ে দিতে। আমায় রাত কাটাতে হবে জুরিনের সাথে । দুজন একসাথে খেলাম। তারপরে, নির্জনে আমার দুঃসাহসের কথা সব জুরিনকে বল্লাম। সব বলা শেষ হলে জুরিন মাথা নেড়ে বল । “যা করেছ বেশ করেছ। ভাই, শুধু একটি কাজ আমার পছন্দ হচ্ছে না। বােকা ছেলে, তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছ কেন? আমি সাদাসিদে লােক, তােমায় ছলনা করব না। বিশ্বাস করো, বিয়ে একটা মস্ত ধোঁকা। একটা বউ ঘাড়ে করে গুচ্ছের ছেলেপিলে মানুষ কর তােমার সাজে কি ? চুলােয় যাক্ সব। যা বলি তাই করো; তােমার দুর্গেশনন্দিনীটিকে বিদেয় কর। সিমবিস্কের পথ এখন নিরাপদ—আমি সাফ করে রেখেচি। তাকে একা তােমার বাবার কাছে কাল পাঠিয়ে দাও; তুমি আমার দলে থেকে যাও। ওরেনবুর্গে যাওয়ার দরকার নেই। ফের বিদ্রোহীর হাতে পড়লে তােমার রক্ষা থাকবে না। আমার সাথে থাকলে তােমার পিরিতি বােগ আপনা হতেই সেরে যাবে, সবদিক্ রক্ষা পাবে।” জুরিন আর যাই বলুক, সৈন্যদলে আমার থাকা দরকার এটা ঠিক বলেছিল। ঠিক করলাম, মাসাকে দেশে পাঠিয়ে তার সাথেই থাক্ । সাভেলিচ আমার কাপড় চোপড় বের করতে লাগল। বললাম, “কাল তােমায় মেরিয়া ইভানভনার সাথে যেতে হবে। প্রথমে সে রাজী হয় না। বল, “কি যে বল, আমি কি করে তােমায় ছেড়ে থাকব ? কে তােমার তত্ত্ব নেবে ? তােমার বাপ মা কি বলবেন?” সাভেলিচের একগুয়েমি আমার জানা ছিল। ভাবলাম দরদ দেখিয়ে মিষ্টিকথায় বুড়ােকে হাত করব। বললাম, “আরিফ সাভেলিচ, ভাই আমার, অমত করো না। আমার বড় উপকার হবে। আমার চাকর লাগবে না, কিন্তু মেরিয়া
১৬
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী,
ইভানভনা একা গেলে আমি সােয়াস্তি পাব না। তার কাজ করলেই
আমার কাজ করা হবে, তাকে যে আমি বিয়ে করব।
সাভেলিচ বিস্ময়ে আমার দিকে চেয়ে রইল। বলল “বিয়ে করবে ?
ছেলে মানুষ বলে কিনা বিয়ে করবে ! তােমার বাপ মা বলবেন কি ?”
আমি। “তারা রাজী হবেন, মেরিয়া ইভানভ নাকে জানার পর
তারা নিশ্চয়ই রাজী হবেন। তােমার ওপরেও ভার থাকচে। বাবা
মা তােমাকে বিশ্বাস করেন, তুমি আমার হয়ে তাদের বলবে, কেমন?”
সাভেলিচ গলে গেল ; বল “আহা, ভাই পিটর এণ্ডিচ, যদিও
বিয়ের কথা ভাববার বয়স তােমার হয়নি,
তবুও বলি মেরিয়া
ইভানভ না এত ভাল মেয়ে যে এ সুযােগ ছাড়লে পাপ হবে। তােমার
যা ইচ্ছে কর। 'আমি তার সাথে যাব—সে যে দেবী ! তােমার বাবাকে
বলব, এমন কনের যৌতুক দরকার নেই।”
সাভেলিচকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি জুরিনের সাথে এক ঘরে শুতে
গেলাম । আমার মনে ভয়ানক ঝড় উঠেছিল, কেবল বকে যেতে
লাগলাম। প্রথমে জুরিনের খুব সাড়া পাচ্ছিলাম ; কিন্তু ক্রমে তার
কথা অল্প এবং অসংবদ্ধ হয়ে এল। অবশেষে আমার একটি প্রশ্নের
উত্তরে তীপু নাসিকাগৰ্জন
শুনতে পেলাম। কাজেই আমি
করলাম এবং কিছুক্ষণ পরেই তার অনুগামী হলাম।
পরদিন ভােরে মামার কাছে গিয়ে মনের কথা খুলে বল্লাম।
আমার কথা যুক্তিসঙ্গত বলে সে মাল। সেই দিনই জুরিনের সৈন্যদলের
সহর ছাড়বার কথা। সময় আদৌ ছিল না। সাভেলিচের ওপরে
মাসার ভার দিয়ে আমি বিদায় নিলেন। তার হাতে বাবা আর মায়ের
নামে একখানা চিঠি দিলাম। নাসা কাদতে লাগল।
সে খাটোগলায় বলল, “পিট এচি, বিদায়। ভগবান জানেন
চুপ
গ্রেপ্তার ১৩৭ ; আর দেখা হবে কিনা। যতদিন বাঁচি তােমায় ভুলব না-তুমিই আমার হৃদয় অধিকার করে থাকবে।” আমি কথা বলতে পারলাম না। অনেক লােক ছিল। যে ভাব উদ্বেল হয়ে উঠেছিল, ললাকের সামনে তাতে ভেসে যাওয়া চলে না। শেষে মাস গাড়ীতে রওনা হল। আমি নিরবে, বিষন্ন মনে জুরিনের কাছে ফিরলাম। আমায় খুসি করতে সে উঠে পড়ে লাগল। আমি সব ভুলতে চেষ্টা করছিলাম ; সারা দিন হৈচৈ করা গেল ; সন্ধ্যাবেলা জুরিনের সাথে রওনা হলাম। তখন ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ। শীতকালে যুদ্ধযাত্রা কষ্টকর ছিল ; শীত শেষ হয়ে এল, এইবারে সব সেনাপতি একযােগে আক্রমণের জন্য তৈরী হলেন। পুগাচফ, তখনও ওরেন বুর্গ অবরােধ করে ছিল। অবরােধ করে ছিল। এদিকে ছােট ছােট সৈন্যদল একত্র হয়ে চারদিক থেকে ডাকাতের বাসা ভাঙবার আয়ােজন করল। সৈন্য আসতেই বিদ্রোহী গ্রামগুলি শান্ত হয়ে গেল। আমাদের দেখে ডাকাতের দল গা ঢাকা দিল ; দেখেশুনে মনে হল যুদ্ধে আমাদের জয় সুনিশ্চিত। অল্পদিনের মধ্যে কুমার গলিটুসিন টাটিসেভ দুর্গে পুগাচফকে হারিয়ে তার দল ছত্রভঙ্গ করে দিলেন এবং ওরেনবুর্গ উদ্ধার করলেন। মনে হ’ল বিদ্রোহের শেষ নিশ্বাসটুকু সত্যিই ফুরিয়ে গেল। জুঙিন একদল বিদ্রোহী বকিরের পিছু নিলেন। তা আমাদের দেখে পালিয়ে যাচ্ছিল। বসন্তকালে আমরা একটি তাতার পল্লীতে এসে পৌছলাম। নদীতে বন্যা—পার হওয়া দায়। বেকার বসে রইলাম ; শুধু এইটুকু সান্ত্বনা ছিল যে বর্বর ডাকাতদের সাথে বিরক্তিকর ছােটখাট যুদ্ধ এতদিনে শেষ হল।
১৮ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী কিন্তু পুগাচফ, ধরা পড়ে নাই। সাইবেরিয়াতে গিয়ে নতুন দল সংগ্রহ করে সে আবার মরণের খেলা শুরু করল। আবার তার সফলতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সাইবেরিয়ায় দুর্গের পর দুর্গ তার হাতে পড়ছিল। যে সব সেনাপতি তুচ্ছ বিদ্রোহীকে হতবল, পঙ্গু ভেবে বেশ নিদ্রা দিচ্চিল তারা হঠাৎ একদিন শুনে ভয় পেল যে পুগাচফ, কাজান দখল করে মস্কোর দিকে যাচ্চে। জুরিনের ওপর আদেশ হ’ল ভঙ্গা নদী পার হয়ে সিবিস্কের দিকে যেতে। সেখানে তখন বিদ্রোহের আগুন ভালই জ্বলে উঠেছে। আশা হ’ল এইবারে বাড়ী গিয়ে বাবা মাকে আলিঙ্গন করতে পাব, মাসার সঙ্গে দেখা হবে। আমার আনন্দ আর ধরে না। ছেলে মানুষের মত লাফাতে লাগলাম। জুরিনকে আলিঙ্গন করে বার বার বলতে লাগলাম, “চল, সিমবিস্কে চল।” জুরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল, “না, তােমার দ্বারা কোনও কাজ হবে না। তুমি বিয়ে করে উচ্ছন্ন যাবে।” আমরা ভলগা নদীর দিকে চাম। আমাদের সৈন্যরা ন-পল্লীতে ঢুকে রাত্রিবাসের আয়ােজন করতে লাগল। পরদিন ননী পার হব। গাঁয়ের মােড়ল বল, ওপারের সবগুলি গা বিদ্রোহী, পুগাচফের লােক চারদিকে ফিছে। খবর শুনে বড় ভয় পেলাম । বড়ই অধীর হ’লাম। বিশ্রাম করা অসম্ভব হল। বাবার এলাকা নদীর ওধারে—মাইল কুড়ি দূরে! আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেউ আমাকে ওপারে নিয়ে যেতে পারে কিনা। সেখানে সবাই জেলে- নৌকোও অনেক ছিল। জুরিনকে আমার ইচ্ছাটা জানালেম । জুরিন বলল, “খবরদার, তােমার পক্ষে একা যাওয়া বড় বিপদজনক। সবুর কর, ভাের হােক। আমরা সবার আগে নদী পার হব ; তেমন দরকার হলে পঞ্চাশ জন হুসার নিয়ে তােমার বাবার ওখানে যাওয়া যাবে।”
গ্রেপ্তার
১৩৯
আমি ভারি ব্যস্ত হলাম। নৌকো তৈরী ছিল ; দুইজন মাঝি
নিয়ে নৌকোয় চাপলাম। তারা সেখান ঠেলে ভাসিয়ে দাঁড় টানতে
লাগল।
আকাশ পরিষ্কার। জোৎস্নায় চারদিক প্লাবিত, বাতাস নিস্তব্ধ।
ভঙ্গ নীরবে, অবাধ শান্তিতে ব’য়ে যাচ্ছে। তালে তালে হেলে দুলে
নৌকো কালাে ঢেউএর ওপর দিয়ে চলেছে। প্রায় আধ ঘণ্টা কেটে
গেল। আমি যেন স্বপ্ন জগতে গিয়ে পড়েছি। গৃহবিবাদের ভয়, প্রেম,
ডাকাতের আক্রমণ, ইত্যাদি কত না বিষয়ের চিন্তা একটির পর একটি
মনে ভেসে উঠচে। নৌকো নদীর মাঝখানে এসেচে এমন সময়ে মাঝিয়া
ফিস্ ফিস্ করে কি বলতে লাগল।
সজাগ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কি হয়েছে ?”
দূরে নির্দেশ করে তারা বল, “ভগবান জানেন, আমরা কি করে
বব ?”
সেই দিকে চাইলাম। দেখলাম কালো কি একটা নদীর স্রোতে
ভেসে আসছে। সেটা আমাদের দিকেই আসছিল। মাঝিদের বললাম
একটু থামতে।
চাদ একখানা মেঘে ঢাকা পড়ল। সেই ভাসা জিনিসটি মিশ, কালাে
হয়ে গেল। খুব কাছে এসে পড়েছে তবুও কি জিনিস ঠিক্ ঠাউরে
উঠতে পারচি নে।
মাঝিরা বলল, “কি ওটা ? দেখা যাচ্চে, পাল ও নয় মাস্তুল ও নয়।"
হঠাৎ মেঘের আড়াল থেকে চাদ বেরিয়ে এসে আমাদের চোখের
ওপরে একটা ভীষণ দৃশ্য ফুটিয়ে তুল—সেটা ভেলার ওপরে একটি
ফাঁসিকাঠ। তার আড়ায় তিনটি মানুষ ঝুলছিল।
মানুষ ঝুলছিল। কেমন একটা
অস্বাভাবিক কৌতূহল আমাকে পেয়ে বল। সেই মানুষ ক’টির মুখ
১৪০ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী দেখতে বড়ই ইচ্ছা হল। মাঝি’দর বল্লাম, “লগার গাথায় বাঁধা হুক দিয়ে মাঝিদের ভেলাটাকে টেনে ধর।” সেই ভাসা ফাঁসিকাঠে আমার নৌকো ধাক্কা খেল। আমি লাফিয়ে একেবারে থাম দুটির মাঝখানে গিয়ে পড়লাম। সেই হতভাগাদের বিকট মুখভঙ্গী পূর্ণিমার আলােকে আরও বীভৎস হয়ে উঠল। তাদের একজন মােঙ্গল জাতীয়, দ্বিতীয়টি বছর কুড়ির একটি চাষার ছেলে ; তৃতীয় মুখখানা দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল। সেটি আমাদের চাকর ভান্কার। হতভাগা বুদ্ধির দোষে পুগাচফের দলে মিশেছিল। ফাঁসিকাঠের গায়ে একখানা কালাে তক্তা আঁটা ছিল, তাতে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল—‘বিদ্রোহী ডাকু। যেন কিছুই হয় নাই এম্নি ভাবে ভেলাটা আটকে রেখে মাঝিরা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি নৌকোয় উঠলাম—ভেলা ভাটিয়ে যেতে লাগল। আমাদের ছাড়িয়ে গিয়েও ফাঁসিকাঠটা সেই অস্পষ্ট জোৎস্নায় অনেকক্ষণ দেখা যেতে লাগল। অবশেষে সেটা আড়াল হ’ল ; আমার নেকে। নদীর উচু, খাড়া পাড়ে এসে ভিড়ল। •ঝিদের খুশি করে বকশিস দিলাম । পারঘাটে .. কাছে যে পন্নীট, আনায় একজন তার মোড়লের কাছে নিয়ে গেল। দুজনে একাথে কুঁড়েঘরে ভিতরে ঢুকলাম। মােল যখন jলাম। মােড়ল যখন শুনল একটি ঘােড় চাং, সে ত চোটেই লা- বড় কড়া কড় কথা বলতে গিল। আমার সঙ্গী তখন স্ িস্ করে তার কানে কি বলল । তার কানে কি বলল। সে অনি একেবারে কেঁচো হয়ে গেল। চোখের নিমেষে তিন বাড়া: গাড়ী তৈরী হল ; কোচম্যানকে বল্লাম আমাদের এলাকার দিকে হাতে । বড়রাস্তা দিয়ে ঘোড়াকটি ধাপে ছুটল-দুধারে ঘুমন্ত পল্লী। ভয় হল, কেইবা রাস্তায় বাধা দেয়। ভগা নদীর সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল বিদ্রোহীরা এদিকে আছে। কিন্তু রুশ সরকার যে কড়া
গ্রেপ্তার
১৪১
;
হাতে বিদ্রোহ দমন করছে তাতে সে প্রমাণও ছিল; ঠেকে
পড়লে কাজে লাগবে ভেবে পুগাচরে পাশ আর জুরিনের হুকুম দুইই
এনেছিলাম। কিন্তু রাস্তায় কোনও বিপদ হল না ; ভােরে একটি
নদীর ধারে এলাম, তারই পারে পাইন ঝােপের আড়ালে আমাদের গাঁ।
কোচম্যান চাবুক মেরে ঘােড়া ছুটাল, মিনিট পনরাের মধ্যে আমরা গ্রামে
ঢুকলাম। অপর ধারে আমাদের বাড়ী। ঘােড়াকটি প্রাণ পণে ছুটেছে,
হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে কোচমান রাস্ টেনে ধরল।
নিতান্ত ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “ব্যাপার কি ?”
কোচম্যান অনেক কষ্টে সেই ধৰ্ম্মাক্ত ঘােড়াক’টি থামিয়ে উত্তর
দিল, “হুজুর, পথ বেড়া দিয়ে আটকানো।”
দেখলাম সত্যিই রাস্তা বন্ধ, সেখানে একজন পাহারা লাঠি হাতে
দাড়িয়ে আছে। লােকটি আমার কাছে এসে, টুপি খুলে, আমার
ছাড়পত্র চাইল।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এর মানে কি ? এখানে বেড়া কেন ?
তুমি কাকে পাহারা দিচ্চ ?"
মাথা চুলকোতে চুলকোতে সে উত্তর দিল, “হুজুর, আমরা যে বিদ্রোহ
করেছি।”
আমি একেবারে দমে গেলাম। বললাম, “তােমার মনিবেরা কোথায় ?”
চাষা বল্ল, “মনিবেরা কোথায় ! মনিব আর তাঁর স্ত্রী গােলাঘরে ।”
“গােলাঘরে?”
“কেন, গাঁয়ের মােড়ল এণ্ডি উহা যে তাদের বন্দী করেছে,
আমাদের রাজার কাছে নিয়ে যাবে।”
“হা ভগবান! বেড়া তুলে ফে, গাধা কোথাকার। হা করে
দেখচিস্ কি?”
১৪২ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী পাহারা নড়ল না। আমি গাড়ী থেকে নেমে তার কানে এক ঘুসি মারলাম (বলতে দুঃখ হচ্ছে ), তারপরে নিজেই বেড়া তুলে ফেল্লাম। চাষাটা মার খেয়ে বােকার মত আমার দিকে চেয়ে রইল। ফের গাড়ীতে উঠে কোচম্যানকে বল্লাম, “যত তাড়াতাড়ি পার, গাড়ী হাঁকো বাড়ীতে ঢুকেই গােলাঘরের কাছে গেলাম ; দেখি দরজা তালাবন্ধ, সেখানে দুজন চাষ লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ী তাদের সামনে থাল। আনি নেমেই তাদের তাড়া করলাম, বললাম “দোর খােল।” তখন আমার চেহারা নিশ্চয়ই ভীষণ হয়েছিল ; কারণ তারা লাঠি ফেলে দৌড়ে পালাল। তালা ভেঙে দোর খুলে ফেলতে চেষ্টা করলাম ; কিন্তু দরজা ও কাঠে, তালাও মস্ত, ভাঙা গেল না। সেই সময়ে যােরান একটি চাষ। চাকরদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উদ্ধতভাবে আমায় জিজ্ঞাসা করল, “এখানে গােলমাল করছ কোন সাহসে?” আমি চেঁচিয়ে বললাম, “তােমাদের মােড়ল এণ্ডি, উহা কোথায়, তাকে ডেকে দাও।” কোমরে হাত দিয়ে, বুক ফুলিয়ে সে উত্তর দিল, “আমি এণ্ডি, আফানচি, এণ্ড উহা নই, কি চাই তোমার ?” কিছু না বলে তাকে ঘাড় ধরে গােলাবরে দোরের কাছে টেনে নিয়ে গেলাম। বললাম, “দোর খাে।” এই ব্যবহারে ফল হল, সে চাবি বের করে গােলাঘর খুলে দিল। চৌকাঠ পার হয়ে, একটা ছােট জানালার 'অস্পষ্ট আলােকে দেখতে পেলাম, বাবা ও মা সেই ঘরে আছেন। তাঁদের হাত বাঁধা, পায়ে কাঠের বেড়ী। আমি দৌড়ে তাদের আলিঙ্গন করতে গেলাম, মুখে কথা ফুটল না। তারা অবাক
গ্রেপ্তার
১৪৩)
হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। সৈন্ত্রজীবনের চার বছরে আমার
চেহারা এমন বদলে গেছিল যে তারা আমায় দিতে পারেন নি
হঠাৎ পরিচিত মিষ্টি গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম, “পিটর এচি,
তুমি নাকি ?”
ফিরে দেখলাম, অপর কোণে মেরিয়া ইভানভ না; তারও হাত পা
বাধা। আমি একেবারে বােকা বনে গেলাম। বাবা চুপ করে চেয়ে
রইলেন, তার নিজের চোখকেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। আনন্দে তার
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
আমাকে বুকে চেপে ধরে বাবা বললেন “এস পেট সা, তােমায় দেখতে
পেলাম, সেজন্য ভগবানকে ধন্যবাদ দিচ্চি।
মা ত কেঁদে ভাসালেন। বলেন, “বাবা পেট সা, ভগবান কি
করে তােকে এখানে আনলেন? ভাল আছিস্ ত ?”
তাড়াতাড়ি তলােয়ার দিয়ে তাদের বাধন কেটে দিলাম, আর সেই
ঘর থেকে বের করে নিতে গেলাম। কিন্তু দরজার কাছে এসে দেখি
আবার বাহির থেকে তালা বন্ধ করা হয়েছে।
ডালান, “এণ্ডুি উস্কা, দোর খােল।”
বাহির থেকে লােকটা উত্তর দিল, “ভয় নেই, তুমিও ঐখানেই
থাকো। হাঙ্গাম করে রাজার কৰ্ম্মচারীর গলাধাক্কা দেওয়ার মজাটা
বুঝবে এখন।”
ঘরটার চাদিক বেশ করে দেখলাম, বের হবার কোনও উপায়
আছে কিনা।
বাবা বললেন, “কষ্ট করে না, চোর ঢুকতে পারবে এমন গােলাঘর
আমি তৈরী করি নি।*
একটু আগেই আমি আসায় মা আনন্দে উতলা হয়ে উঠেছিলেন,
১৪৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী এখন বড় হতাশ হয়ে পড়লেন—ভাবলেন, পরিবারের আর সবার সাথে আমাকেও বুঝি মরতে হল। কিন্তু তাদের ও মাসার কাছে থাকায় আমার তত অসােয়াস্তি হচ্ছিল না। আমার কাছে একখানি তলােয়ার আর দুটি পিস্তল ছিল। অবরােধে আমার ভয় ছিল না। সন্ধ্যাতক জুরিনের পৌছিবার কথা। সে আমাদের মুক্ত করে দেবেই। মা, বাবাকে একথা বললাম, মা আর মাসাকে সান্ত্বনা দিলাম। আমাদের মিলনের আনন্দেই তারা সব ভুলে গেলেন, কথাবার্তায় ও স্নেহের আদান প্রদানে কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল। বাবা বললেন, “ভাল পিটর, তুমি যথেষ্ট গোয়াড়তুমি করেছ । আমি তােমার ওপর সত্যিই রেগে ছিলাম । কিন্তু পুরানাে স্মৃতি উস্কিয়ে লাভ নেই। আশাকরি সব উচ্ছ,জ্বলতা ছেড়ে এখন ভাল হয়েছ। জানি তুমি কর্মচারীর কর্তব্য ঠিক ঠিক করেছ। সে জন্য তােমায় ধন্যবাদ দিচ্ছি। এই বুড়ো বয়সে তুমি ভরসা দিলে। যদি তােমার দ্বারা আমার মুক্তি হয়, আমার জীবন দ্বিগুণ আনন্দময় হবে।” সজল চোখে তার হাতে চুমাে খেলাম । মেরিয়া ইভানভনার দিকে চেয়ে দেখলাম আমার আসার আনন্দে সে সব ভুলে গিয়েছে। মনে হল তার কোনই দুঃখ বা উদ্বেগ নেই। দুপুর বেলা ভয়ানক চীংকার ও গোলমাল শুনতে পেলাম। বাবা বললেন, “এর কারণ কি ? তােমার কর্ণেল এল নাকি হে ?” বললাম, “অসম্ভব। সন্ধ্যার আগে সে আবে না।” গােলমাল বাড়ল; খবরদারী ঘণ্টা বাজান হল। ঘােড়র পায়ের খট খট শব্দ শুনতে পেলাম—উঠান পার হয়ে কারা যেন আছিল। সেই সময়ে দেয়ালের ছােট ফুটো দিয়ে সাভেলিচের দাড়ী দেখা গেল। বুড়াে বাহির থেকে কঁাদকঁাদ হয়ে বলল, “এণ্ডি, পেট্রোভিচ, পিটর এচি, বাছা
গ্রেপ্তার
১৪৫
মেরিয়া ইভানভ না, আর আমাদের রক্ষা নেই। বদমায়েরা গ্রামে
ঢুকেছে। কে তাদের এনেছে জানাে?' সাব্রিন, এলেক্সি, ইভানিচ,।
বেটা জাহান্নমে যাক্।” মাস সেই ঘৃণিত নাম শুনে দুই হাত একত্র করে
স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইল।
সাভেলিচকে বললাম, “শােন, ঘোড়ার পিঠে কাউকে পারঘাটে
পাঠাও; সেখানে হুসার সৈন্যদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কর্ণেলকে
সে আমাদের বিপদের কথা বলবে।”
“কিন্তু পাঠাই
কাকে ? সবগুলাে ছােরা
বিদ্রোহীর দলে।
ঘােড়াগুলাে ওরা নিয়েছে। ভাই, ঐ যে ওরা উঠানে। ঐ গােলাঘরের
দিকে আচে।”
কথা শেষ হতে না হতে কয়েকজনের গলার আওয়াজ শুনতে
পেলাম। মা ও মেরিয়া ইভানভ নাকে আমি এক কোণে সরে যেতে
বল্লাম। তলােয়ার খুলে ঠিক দরজার পাশে দেয়াল ঠেসে দাঁড়ালাম।
বাবা পিস্তল দুটি নিয়ে দুটিরই ঘােড়া তুলে আমার পাশে দাড়ালেন।
তালা খােলর খটখট শব্দ হ’লদোর খুল; এণ্ডিউস্কারের মাথা ভিতরে
ঢুকল। আমি তলােয়ারের চোপ বসিয়ে দিলাম, সে দরজা জুড়ে পড়ে
গেল। বাবা তথ খুনি পিস্তল আওয়াজ করলেন। যারা আমাদের
অবরােধ করেছিল, তারা গাল দিতে দিতে পালিয়ে গেল। আহত
লােকটাকে ভিতরে টেনে নিয়ে আমি দোর বন্ধ করে দিলাম ।
উঠান সশস্ত্র লােকে ভরে গিয়েছিল । তাদের মধ্যে সাব্রিনের গলা
চিলাম। মেয়েদের বলাম, “ভয় পেয়ে না; আশা আছে। বাবা
তুমি আর গুলি কোরাে না। শেষ গুলিটা মজুত রাখাে।”
মা নীরবে ভগবানকে ডাকছিলেন, মেরিয়া ইভানভ না দেবতার মত
অচল ভাবে মায়ের পাশে দাড়িয়ে নিয়তির প্রতীক্ষায় ছিল। দুয়ারের
;
১০
১৪৬ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী 'ওধারে ভয় প্রদর্শন, গালাগালি, শপথ ইত্যাদি অবিশ্রাম চলছিল। আমি ঠিক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, যে আগে মাথা দেবে তাকে চোপ মার জন্য। হঠাৎ বদমায়েগুলাে চুপ করল। শুক্লাম, সাব্রিন আমার নাম ধরে ডাকছে। “এই যে আমি এখানে। কি চাও তুমি?” “গ্রিনফ, আত্মসমর্পণ কর; জোর করা বৃথা। বুড়াে বাপমার ওপর তােমার মমতা থাকা উচিত। একগুয়েমি করে কিছুতেই বাঁচবে না। তােমাকে ধবই।“ “একবার চেষ্টা করে, বিশ্বাসঘাতক।” “আমি মিছে এগিয়ে যাব না, কিম্বা অকারণ লােকক্ষয় করব না। গােলাঘরে আগুন ধরিয়ে দেব। তারপরে দেখব, বেলগ রস্কির ডনকুইন্সট তুমি কি কর। এখন খাওয়ার সময়। ইতিমধ্যে বসে, অবসর মত বেশ করে ভেবে দেখ। মেরিয়া ইভানভ না, বিদায়। তােমার কাছে আমি ক্ষমা চাইব না; প্রণয়ীটিকে পাশে পেয়ে ঐ অন্ধকারে তােমার কষ্ট হচ্চে না নিশ্চয়ই। সাব্রিন দোরে পাহারা রেখে চলে গেল। আমরা সবাই বিমনা হয়ে চুপ করে ছিলাম। একের ভাব অন্যের কাছে বলতে ভরসা হচ্ছিল । সাব্রিন হিংসার জ্বালায় কি কি অনিষ্ট করতে পারে তারই কল্পনা করছিলাম। নিজের ভাবনা আদৌ ভাবি নি। সত্যি কথা বলতে কি, আমার বাপ মায়ের চেয়েও মেরিয়া ইভানভনার পরিণাম ভেবে আমার অসােয়ান্তি হচ্ছিল বেশী। জান্তাম কি চাষারা, কি বাড়ীর চাকররা সবাই মাকে দেবতার মত ভক্তি করে। বাবা কড়া লােক হলেও তাকে সবাই ভালবাসে। কারণ তিনি ন্যায়বান এবং দরদী। তাদের বিদ্রোহ একটা ক্ষণিক ভ্রান্তি বা মত্ততা, তাদের মনােগত বিদ্বেষের প্রকাশ নয়।
গ্রেপ্তার ১৪৭ খুব সম্ভব মা বাবা রক্ষা পাবেন, কিন্তু মেরিয়া ইভানভনার কি হবে? ঐ বিবেকহীন পশুর হাতে তার কি দশা ঘটবে? বেশীদূর এ চিন্তা করতে আমার সাহস হল না। ঠিক করলাম সেই নির্মম শত্রুর হাতে পড়বার আগে মাসাকে আমি নিজ হাতে মেরে ফে। ( ভগবান আমায় ক্ষমা করুন।) ঘণ্টাখানেক কাটুল। দূরে মাতালদের গান শােনা গেল। আমাদের পাহারা ক’টি তাদের হিংসা করতে লাগল এবং বিরক্ত হয়ে আমাদের গাল দিতে লাগল। আমাদের খুব যন্ত্রণা দিয়ে মারূবে এই ভয় দেখাল। আবার উঠানে হৈ চৈ পড়ে গেল ; আবার সাব্রিনের গলা শুনতে পেলাম। “কেমন, তােমার সুবুদ্ধি হয়েছে কি ? স্বেচ্ছায় ধরা দেবে ?” আমরা কেউ জবাব দিলাম না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সাব্রিন তার লােকদের কিছু খড় আতে বল্ল। কয়েক মিনিট পরে আগুনের শিখায় সেই অন্ধকার গােলাঘর আলােকিত হয়ে উঠল। বন্ধ দোরের ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া ঢুকতে লাগল। তখন মা আমার কাছে এসে হাত ধরে চুপি চুপি বল্ল, “পিটর এচি, আমার জন্য তুমি, তােমার বাবা, মা সবাই মৃত্যুপণ কোরাে না। সানি আমার কথা শুনবে, আমাকে বের করে দাও।” রেগে বল্লাম, “তা কি হয় ? জান তােমার দশা কি হবে ?” সে ধীরভাবে বল, “আমি অপমান সহ্য করে বাঁচব না নিশ্চয়ই ! কিন্তু আমার উদ্ধারকর্তাকে, আর যে পরিবার আমার মত হতভাগী অনাথাকে আশ্রয় দিয়েছে তাদের আমি বাঁচাব। এণ্ডি পেট্রোভিচ, আভড়ােটিয়া ভাসিলেনা, বিদায় ; আপনারা শুধু আমার বিদায় ; ;
১৪৮ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী ন তার চেয়ে অনেক বড়। আমায় আশীৰ্বাদ করুন। পিটর এচি, তােমার কাছেও বিদায় নিচ্চি। বিশ্বাস কোবরা .....যে......” হাতে মুখ ঢেকে মাস ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আমি আত্মহারা হলাম। মাও কাঁদতে লাগলেন। বাবা বলেন, “মেরিয়া ইভানভনা, মিছে গােল কোরাে না। তােমায় একা ডাকাতদের ভিতর যেতে দেওয়ার কথা ভাবছে ? এইখানে চুপ করে বসে থাকো। যদি ময়ূতে হয়, সবাই একসাথে মরব। শােন, লােকটা আবার কি বলে।” সাব্রিন চেঁচিয়ে বলছিল, “কেমন তােমরা ধরা দেবে ? আর পাঁচ মিনিটে একেবারে ভাজা হয়ে যাবে, বুঝলে ?” বাবা দৃঢ়স্বরে উত্তর দিলেন, “সয়তা, আমরা ধরা দেবে না।” বাবার সেই দৃপ্ত, গভীর রেখাঙ্কিত মুখমণ্ডল অপূৰ্ব তেজোমণ্ডিত হয়ে উঠল। পাকা ভুরূর আড়ালে চোখ দুটি ঝক ঝক্ করতে লাগল। বাবা আমার দিকে ফিরে বললেন, “এই সুযােগ।” তিনি দোর খুলে ফেলেন। আগুনের লক্লকে শিখা ঘরের ভিতরে ঢুকে কড়িকাঠ পৰ্য্যন্ত উঠল। বাবা পিস্তল ছুড়লেন, জ্বলন্ত চৌকাঠ পার হয়ে আমাদের বললেন, “এস আমার পিছনে।” আমি মা আর মাসার হাত ধরে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম। বাবার সেই দুর্বল হাতের গুলি খেয়ে সাব্রিন চৌকাঠের কাছে পড়ে গিয়েছিল। আমাদের হঠাৎ আক্রমণে ডাকাতের দল ছত্রভঙ্গ হয়েছিল ; এইবার তারা সাহস করে আমাদের ঘিরে ধরল। আমি তলােয়ার চালাতে লাগলাম ; কিন্তু একটা ইট কেউ বেশ লক্ষ্য করে ছুড়ে থাকবে, সেটা ঠিক আমার বুকে এসে লাগল। ঘ• খেয়ে কয়েক মিনিট আর আমার জ্ঞান ছিল না। আমায় ঘিরে ফেলে অস্ত্র কেড়ে নিল। যখন জ্ঞান হল, দেখলাম সাব্রিন গ্রেপ্তার ১৪৯ ঘাসের ওপর বসে আছে ; সেখানটা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে। আমাদের পরিবারসুদ্ধ সবাই তার সামনে দাড়িয়ে। গুণ্ডারা আমাকে ধরে দাড় করাল। একদল চাষা, কশাক ও বসকির আমাদের ঘিরে ছিল। সাব্রিনের মুখ ভয়ানক ফ্যাকাশে, সে পাঁজরের ক্ষত একহাতে চেপে ধরে ছিল, হিংসা আর যন্ত্রণায় তার চেহারা ভীষণ হয়েছিল। সে ধীরে মাথা তুলে আমার দিকে চেয়ে, ক্ষীণস্বরে বল, “ওকে ফাঁসি দাও—ওদের সবাইকে, শুধু ঐ মেয়েটি ছাড়া।” গুণ্ডারা আমাদের চেপে ধরে হিড় হিড় করে টাতে টাতে ফটকের কাছে নিয়ে গেল। কিন্তু জানি না কেন হঠাৎ তারা থমকে দাঁড়ালো ; তারপরে আমাদের ছেড়ে দিয়ে যে যার মত ছুটে পালাতে লাগল। দেখলাম সম্মুখে ঘােড়ার পিঠে জুরিন! তার উন্মুক্ত তলােয়ার রােদে ঝক্ঝক্ করছে। তার সঙ্গে বড় একদল সার খােলাতলােয়ার হাতে উঠানে এসে দাড়ালাে। বিদ্রোহীরা পালাতে পথ পাচ্ছিল না। হুসার দল তাদের পিছনে ছুটল। দুধারে তলােয়ার চালাতে লাগল আর অনেক বন্দী করে ফেল। জুরিন লাফিয়ে ঘােড়া থেকে নেমে আমার মা বাবাকে নমস্কার করল ; সস্নেহে আমার হাত চেপে ধরল, তারপর হঠাৎ মাসাতে দেখতে পেয়ে বল্ল, “আঃ এই যে তােমার মনােনীতা পত্নী ! আমি ঠিক সময়ে এসেছি।” নাসার মুখ লাল হয়ে উঠল। বাবা জুরিনের কাছে গিয়ে অতি ধীরভাবে তাকে ধন্যবাদ দিলেন— যদিও তার হৃদয় ভাবে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। মা তাকে স্নেহভরে আলিঙ্গন দিয়ে বলেন, “বাবা তুমি আমাদের বাঁচালে। তুমি দেবতা। “আজ আমার ওখানে তােমার নিমন্ত্রণ।” এই বলে বাবা জুরিনকে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে চলেন।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী • সাব্রিনের পাশ দিয়ে যেতে জুরিন জিজ্ঞাসা করল “এ কে ?” বৃদ্ধ সৈনিকের পক্ষে স্বাভাবিক গর্বের সঙ্গে বাবা বললেন “এটি হচ্ছে ডাকাতের সর্দার। ভগবান আমার হাত দিয়ে এর শাস্তি বিধান করেছেন। সেই সঙ্গে আমার ছেলের রক্তপাতের প্রতিশােধ নেওয়া হয়েছে।” জুরিন বল, “সাব্রিন! আমি খুব খুসি হলাম। বাছারা, ওকে ধর তাে। ডাক্তারকে বল, ওর ক্ষতস্থান বেঁধে দিয়ে যেন খুব যত্ন করে । ওকে কাজানের গুপ্ত অনুসন্ধান সমিতির কাছে পাঠাতে হবে । একজন বড় আসামী ওর স্বীকারােক্তি খুব কাজে আসবে।...” সাব্রিন ক্লান্ত ভাবে চোখ দুটি খুলল। তার মুখে যন্ত্রণা ছাড়া আর কোন ভাব দেখা গেল না। একটা পােষাক বিছিয়ে হুরেরা তারই ওপর শুইয়ে তাকে নিয়ে গেল। আমরা বাড়ী গেলাম। চারদিকে চাইতে ছেলেবেলার কথা মনে পড়ল। আমার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেতে লাগল। বাড়ীর কিছুই নড়চড় হয় নাই ; যেখানে যা ছিল, সেখানেই আছে। সাব্রিন বাড়ী লুঠ হতে দেয় নাই। অধঃপাতের নিম্নস্তরে ডুবেও সে তুচ্ছ লােভকে আস্কারা দেয় নাই। চাকরগুলাে হলঘরে এল ; তারা বিদ্রোহে যােগ দেয় নি। আমাদের মুক্তিতে তাদের আন্তরিক আনন্দ প্রকাশ পেল। সাভেলিচের স্ফুর্তি দেখে কে? ডাকাতদের আসায় চারদিকে যে হুটোপাটি হয় সেই সুযােগে সাভেলিচ আস্তাবলে গিয়ে ঘােড়া তৈরী করে, চুপিচুপি আড়ালে পারঘাটের দিকে ছুট দেয়। গিয়ে দেখল ভগ্নার এপারে সৈন্যদল বিশ্রাম করছে। জুরিন যাই তার কাছে আমাদের বিপদের কথা শুনেচে অমনি সােয়ারদের ছুটতে হুকুম দিয়েছে। ভগবানের দয়ায় সে ঠিক সময়ে পৌঁছেছিল। ;
গ্রেপ্তার - হুসারেরা কয়েকজন বন্দী নিয়ে ফিরে এল। যে গােলাঘরে আমাদের স্মরণীয় অবরােধটা সহ্য করতে হয়েছিল, সেইখানে তাদের আটকে রাখা হ’ল। আমরা যে যার ঘরে গেলাম—বুড়ােদের বিশ্রাম দরকার, অমিও সারারাত ঘুমােই নি। বিছানায় পড়ে খুব ঘুম দিলাম। জুরিন তার সৈন্যদের ব্যবস্থা করতে গেল। সন্ধ্যাবেলা আমরা সবাই বৈঠকখানায় চায়ের কেটলিটা ঘিরে বসে আমােদ করে গত বিপদের আলােচনা করতে লাগলাম। মাস। চা ঢেলে দিতে লাগল। পাশে বসে আমি প্রাণভরে তাকে দেখতে লাগলাম। মনে হল আমার মা, বাবা এই প্রণয় বেশ স্নেহের চক্ষে দেখচেন। সেই সন্ধ্যাটি এখনও আমার স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমার সুখের পেয়ালা একেবারে ভরপুর হয়েছিল—এতটুকু খালি ছিল । মানুষের জীবনে এমন শুভক্ষণ বেশী আসে, কি ? পরদিন খবর এল চাষারা বাবার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেচে। বাবা তাদের সাথে কথা বলতে বাহিরের পৈঠার ওপর এলেন। তাকে দেখে চাষারা নতজানু হয়ে ক্ষমাভিক্ষা করল। বাবা বললেন, “বােকার দল, ক্ষেপেছিলে কেন?” তারা একবাক্যে বল, “হুজুর, আমাদের বড় অনুতাপ হয়েছে।” “অনুতাপ ? সত্যি নাকি ? সয়তানি করে আবার অনুতাপ ? আমার বাড়ীতে আনন্দোৎসব, তাই তােদর ক্ষমা করছি। ভগবান আমার ছেলে পিটর এণ্ডিচকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আচ্ছা তাই হােক, পাপ স্বীকার করলেই পাপের ক্ষমা হয়।” “আমরা বড়ই অন্যায় করেছি হুজুর, বড়ই অন্যায় করেছি।” “হােক গে! ভগবান সুদিন দিয়েছেন। তিন দিন ধরে কি করেছিস, বোকার দল? এইবারে খড় কাটগে। সর্দার, সবাইকে ১৫২ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী , পাঠিয়ে দাও খড় কাটতে। মনে রেখাে, সাধু জনের জনের উৎসবের আগে সব খড় গাদা হবে। খড় গাদা হবে। বুঝলে, লালচুলাে সয়তান ? এখন পালাও। চাষারা মাথা নুইয়ে কাজ করতে ছুটুল, যেন কিছুই হয় নাই। সাব্রিনের আঘাত মারাত্মক হয় নি। তাকে কড়া পাহারায় কাজান পাঠান হ’ল। গাড়ীতে শুইয়ে যখন তাকে নিয়ে যায়, আমি জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম। আমাদের চার চোখ এক হতেই সে মাথা নােয়াল। আমি জানালা থেকে সরে গেলাম। লাঞ্ছিত, পতিত শত্রুকে দেখে আমার দরদ ছাড়া আনন্দ হয় নি। জুরিনকে আরও দূরে যেতে হবে। কিছুদিন পরিবারের ভিতরে থাকি এই ইচ্ছা সত্ত্বেও আমি তার সাথে যেতে প্রস্তুত হলাম। যাওয়ার আগে মা বাবার কাছে এসে, তখনকার প্রথামত, তাদের সামনে মাটিতে মাথা নুইয়ে মাসাকে বিয়ে করব বলে আশীৰ্বাদ চাইলাম। বুড়ােবুড়ী আমাকে তুলে নিয়ে, আনন্দে চোখের জল ফেলে সম্মতি দিলেন। তখনকার মনােভাব কথায় বলা যায় না। যারা আমার অবস্থায় পড়েছে তারা বুঝবে। যারা পড়ে নাই, তারা দয়ার পাত্র। তাদের পরামর্শ দিচ্চি, কাউকে ভালবেসে বাপ মায়ের আশীৰ্বাদ নেগে নি। পরদিন আমাদের সৈন্যরা তৈরী হল। জুরিন আমাদের পরিবারের কাছে বিদায় নিল। আমাদের বিশ্বাস ছিল লড়াই শীগগির শেষ হয়ে যাবে। আশা হ’লআর এক মাসের মধ্যে বিয়ে হতে পারবে। মাস। সকলের সানে আমায় চুমো খেল। গাড়ীতে উঠে বলাম, সাভেলিচ আবার আমার পিছু নিল। সৈন্যরা যাত্রা করল। যতক্ষণ দেখা যায়, আমি স্নেহের স্মৃতি জড়িত সেই বাড়ীখানি ফিরে ফিরে দেখতে লাগলাম। বাড়ী ছেড়ে যেতে কি একটা অজানা আশঙ্কা মনে উকি গ্রেপ্তার দিচ্ছিল। কে যেন কানে কানে বলছিল আমার বিপদ তখনও কাটে নাই। প্রাণে অনুভব করলাম, ঝড় সম্মুখে। আমাদের অভিযান কিম্বা পুগাচফের যুদ্ধের শেষ অধ্যায় আর বর্ণনা করতে চাই না। পুগাচফ, যে সব গ্রাম লুটেছিল আমরা সেইগুলির ভিতর দিয়ে গেলাম, আর লােকের অবশিষ্ট যা ছিল তাও কেড়ে নিলাম। লােকে বুঝতে পারছিল না কার কথা মবে। আইনকানুনের বালাই ছিল না। জমির মালিকরা জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল। ডাকাতরা দলে দলে গ্রাম লুট করছিল। সৈন্যদলের নায়কের পুগাচফের সন্ধানে ফিরছিল। সে তখন অষ্টাখানের দিকে পালাচ্ছে। সরকারী সৈন্য দোষী নির্দোষী বিচার না করে যেমন খুসি সবাইকে সাজা দিচ্ছিল। যেখানে বিদ্রোহ হয়েছিল সেখানকার অবস্থা ভয়ানক হ’ল। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি রাশিয়ায় সশস্ত্র বিদ্রোহ,আর না দেখতে হয় সেটা নিরর্থক নিষ্ঠুরতার চরম বলেও অত্যুক্তি হয় না। যারা রাশিয়ায় হিংসামূলক বিপ্লবের চেষ্টা করছে তারা হয় অনাড়ী ছেলের দল, আমাদের দেশকে জানে না, নতুবা নিষ্ঠু রপ্ৰকৃতি লােক যারা নিজের ও অন্যের জীবন অতি তুচ্ছ বলে ভাবে। পুগচিফ, পালাচ্ছিল, সেনাপতি মিচে তাকে তাড়া করছিলেন। ক’দিন পরে শুলাম পুগাচফের ভয়ানক হার হয়েছে। শেষে জুরিন শুনতে পেল, সে ধরা পড়েছে। সেই সঙ্গে আমাদের ওপর হুকুম এল আর এগিয়ে যােয়াে না। লড়াই শেষ হ’লএইবার বাপমায়ের কাছে যেতে পাব। তাঁদের আলিঙ্গন করতে পাব এবং মাসাকে দেখতে পাব, ভেবে বড় আনন্দ হল। মসির খবর অনেক দিন পাইনি। আনন্দে ছেলেমানুষের মত নেচে উঠলাম। জুরিন আবার হেসে বলল, “তােমার কপালে দুঃখ আছে, তুমি বিয়ে করে বকে যাবে।”
১৫৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী কিন্তু একটা অজ্ঞাত আশঙ্কায় আমার সকল আনন্দ বিষময় হয়ে উঠল। শত নিরপরাধ বলির রক্তে রাঙা সেই ধূর্ত বিদ্রোহীর চিন্তায় আমার বড়ই অসােয়াস্তি হতে লাগল। সে ত’ এখন শাস্তির প্রতীক্ষা করছিল। ভাবলাম, হতভাগাটা সঙ্গীনের ঘায়ে, কিম্বা কামানের গােলায় মারা গেল না কেন? সেইটাই ত’ ওর পক্ষে ভাল ছিল। তােমরা কি ভাববে জানি না। পুগাচফের কথা ভাবতেই মনে হত সে আমার জীবনের এক সন্ধিক্ষণে আমাকে বাঁচিয়েছে, ঘৃণিত সাব্রিনের হাত থেকে আমার মনােনীতাকে উদ্ধার করেছে। জুরিন আমাকে ছুটি দিল। আর কয়েকদিনের মধ্যে বাড়ী ফিরে গিয়ে মাসাকে দেখতে পাব। হঠাৎ যেন একটা দমকা ঝড়ে আমাকে বিধ্বস্ত করে দিল । আমার বিদায়ের দিন, .ঠিক যখন যাত্রা করব সেই সময়ে জুরিন একখানা চিঠি নিয়ে আমার ঘরে এল। তার মুখ বড়ই বিষন্ন । তাকে দেখেই আমার মন দমে গেল ; কেন জানি না, বড় ভয় হতে লাগল। আমার আরদালিকে বাহিরে পাঠিয়ে সে বলল, গােপন খবর আছে। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কি ব্যাপার ?” চিঠিখানা আমার হাতে দিয়ে সে বলল, “ব্যাপার বড়ই অপ্রীতিকর । এখখুনি কি খবর পেয়েচি পড়ে দেখ।” পড়লাম, সমস্ত সেনাপতির কাছে গােপনে আদেশ পাঠান হয়েছে যেখানে আমাকে পাবে গ্রেপ্তার করে কড়া পাহারায় কাজানে পাঠাবে -পুগাচফের বিদ্রোহসম্পর্কে গঠিত অনুসন্ধান সমিতির কাছে। চিঠিখানা আমার হাত থেকে পড়পড় হল। জুরিন বলল, “উপায় নেই ; হুকুম তামিল করা আমার কাজ। তুমি যে বন্ধুভাবে পুগাচফের সাথে ঘুরেছ, সেই খবর সরকারে পৌঁছেছে।
গ্রেপ্তার
১৫৫
আমার বিশ্বাস, কোনই ভয়ের কারণ নেই ; তুমি কমিটির কাছে তােমার
নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারবে। যাও হতাশ হয়াে না।”
আমার মন ছিল সম্পূর্ণ অসঙ্কোচ ; বিচারের ভয় আদৌ আমাকে
দমাতে পারে নি। কিন্তু পুনর্মিলনের শুভ মুহূর্ত আবার ক'মাস পিছিয়ে
গেল, এই ভাবনাই হ’ল সব চেয়ে বেশী। গাড়ী প্রস্তুত ছিল। জুরিন
একান্ত বন্ধুভাবে আমায় বিদায় দিল। গাড়ীতে উঠে বলাম । দুজন
সার খােলা তলােয়ারের হাতে আমার পাশে এসে বল। গাড়ী
রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ বিসর “জনরব সমুদ্রতরঙ্গের ন্যায়।” প্রবাদ মনে হ’ল, বিনা অনুমতিতে ওরেনবুর্গ ছেড়ে আসাই এই বিপদে মূল কারণ। আমার পক্ষে বার অনেক কথা ছিল। দুর্গের বাহিরে শত্রুকে আক্রমণ করা বারণ ছিল না, বরং তাতে উৎসাহ দেওয়া হত। আমাকে একগুয়ে বলা যেতে পারে, অবাধ্য বলা যায় না। কিন্তু পুগাচফের সাথে আমার বন্ধুতার অনেক প্রমাণ ছিল ; খুব মােলায়েম করে বলেও এই ব্যাপারটি সন্দেহজনক বলতে হয়। পথে অবিশ্রাম শুধু ভাবতে লাগলাম, কি কি প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, উত্তরই বা কি কি দিতে পারব। ঠিক করলাম, বিচারকালে সরল সত্যকথা স্পষ্ট খুলে বম্ব। মনে হল এইটাই আমার পক্ষ-সমর্থনের সবচেয়ে সোজা উপায় । কাজানে পৌছলাম ; সহরটি পুড়ে ধ্বংস হয়েছিল। ঘরবাড়ীর বদলে রাস্তায় গাদা গাদা ছাই পড়েছি, ছাদও চৌকাঠহীন পােড়া দেয়ালের ধ্বংসাবশেষও ছিল। পুগাচফের যাত্রাপথের এই চিহ্ন। সেই পােড়। সহরের মাঝখানে যে দুর্গটি আস্ত ছিল, সেইখানে আমাকে নিয়ে এল। হুসারেরা আমাকে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত কৰ্ম্মচারীর হাতে দিল। সে একজন লােহার ডেকে পাঠাল। লােহার এসে আমার দু পায়ে শিকল পরিয়ে জুড়ে দিল। আমাকে নির্জন বন্দীঘরে নিয়ে রাখল ; সেটা একটা অন্ধকার সংকীর্ণ ঘর, তার দেয়াল আস্তরহীন, জালায় লােহার গরাদ। ;
বিচার
১৫৭
অভ্যর্থনাটি বড় সুবিধে বােধ হল না। যাই হােক্, ভরসা ছাড়ি
নাই। দুঃখে যিনি 'একমাত্র সান্ত্বনা তাকেই আশ্রয় করলাম।
আমার এই নিৰ্ম্মল, অথচ ছিন্নভিন্ন হৃদয়ের অকপট প্রার্থনার মাধুৰ্য্য
ভগবানের পায়ে ঢেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়লাম। কি
হবে তা আর ভাববার অবসর হ’ল না।
পরদিন ভােরে ওয়ার্ডার আমায় ডেকে তুলে বল, কমিটিতে
আমার ডাক পড়েছে। দুটি সৈন্য উঠান পার করে আমাকে দুর্গ
নায়কের বাড়ী নিয়ে গেল। তারা দোরে দাঁড়াল, আমি ভিতরে
ঢুকলাম।
ঘরটি মাঝারি আকারের, সেখানে দুজন লােক কাগজের গাদায়
ঢাকা একখানি টেবিলের পাশে বসেছিল। তাদের একজন একটি
বুড়াে সেনাপতি, ভাবের লেশমাত্রশূন্য, নির্দয় চেহারা ; আর একজন
রক্ষীদলের কাপ্তান, সুশ্রী চেহারা, হাবভাব সরল ও চিত্তাকর্ষক, বয়স
বছর আটাশ ।
কানে কলম গুজে একটি কেরাণী অন্য টেবিলে কাগজের ওপর
ঝুকে বসেছিল-আমার জবানবন্দী লিখবৈ বলে। জেরা সুরু হল
আমায় জিজ্ঞাসা করল, কি নাম, কি কাজ করি ইত্যাদি।
সেনাপতি জিজ্ঞাসা করলেন, আমার বাবার নাম এণ্ডি পেট্রোভিচ
গ্রীন কিনা। বাম হাঁ। সে অতি কড়াভাবে মন্তব্য করল :--
“এমন সন্ত্রান্ত লােকের ছেলেটি এমন লক্ষ্মীছাড়া হয়েছে ।
বড়ই দুঃখের বিষয়।
আমি ধীরভাবে উত্তর দিলাম, আমার বিরুদ্ধে অভিযােগ যাই
থা, সরল সত্যকথা বলে আমি আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারব।
সেনাপতি আমার এই আত্মবিশ্বাস পছন্দ করলেন না। কুটি
১৫৮
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী,
করে বললেন, “বাপু, তুমি বড় চালাক। কিন্তু তোমার চেয়ে চালাক
লােকও আমরা দেখেছি।”
সেই যুবা কর্মচারী জিজ্ঞাসা করলেন, “কখন কি উপলক্ষে তুমি
পুগাচফের কাজে ঢুকেছিলে? তােমাকে দিয়ে সে কি কি কাজ
করিয়েছিল ?”
আমি রেগে উত্তর দিলাম, “রাণীর কর্মচারী ও ভদ্রসন্তান হয়ে
পুগাচফের চাকুরি লওয়া, বা তার কোনও কাজ করা আমার পক্ষে
সম্ভব ছিল না।”
প্রশ্নকারী আবার বললেন “তা হলে এই ভদ্র কর্মচারীটির সঙ্গীর
বিদ্রোহীর হাতে নিষ্ঠুরভাবে হত হলেও তিনি নিজে রক্ষা পেলেন
কি করে ? তিনি বিদ্রোহীর সাথে বন্ধুভাবে ভােজ খেলেন কি
করে, তার কাছে ভেড়ার চামড়ার কোট,
ভেড়ার চামড়ার কোট, একটি ঘােড়া আর
পঞ্চাশ কোপে মুদ্রাই বা বকশিস পেলেন কেন? এই আশ্চৰ্য্য
বন্ধু জন্মাল কি করে ? বিশ্বাসঘাতকতা, বা অতি নীচ, জঘন্য
ভীরুতা ছাড়া এ কি করে সম্ভব হল ?"
কৰ্ম্মচারীর এই কথায় আমি বড়ই অপমান বােধ করলাম
এবং গোড়া থেকে সব বলতে লাগলাম। সেই রকম ঝড়ের মধ্যে
কি করে পুগাচফের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়, পরে বেলগরস্কি
দখলের সময় সে আমার চিনতে পেরে কেমন ছেড়ে দেয়, সব
বান। স্বীকার করলাম যে সেই ঘােড়া বা কোট নিতে আমি
কুন্থিত হই নি, কিন্তু এটাও সত্য যে বেলগরস্কি রক্ষার
রক্ষার জন্য
আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি । অবশেষে , আমার সেনাপতিকে
সাক্ষী মালাম ;
তিনি
অামার কর্তব্যবােধের সাক্ষ্য দিতে
পারবেন।”
. বিচার সেই নিষ্ঠুর ডাে টেবিল থেকে একখানা সিলবিহীন চিঠি নিয়ে, খুলে চেঁচিয়ে পড়লেন, “এনসাইন গ্রীনফ, ঘটিত অনুসন্ধান সম্পর্কে আমার বক্তব্য এই :- উক্ত এনসাইন ১৭৭৪ খৃঃ অব্দের অক্টোবর থেকে ১৭৭৫ খৃঃ অব্দের ২৪শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ওরেনবুর্গে কাজ করে। শেষােক্ত তারিখে সে সহর ছেড়ে যায়, আর ফিরে এসে আমার অধীনে কাজ করে নাই। আমি বিদ্রোহীর শিবির থেকে পলাতকদের মুখে শুনেছি সে পুগাচফের শিবিরে গিয়েছিল ; পুগাচফের সঙ্গে তার পূৰ্ব্ব কৰ্ম্মস্থান বেলগরস্কি দুর্গে গিয়েছিল। তার চরিত্র সম্বন্ধে আমি.........” এই পর্যন্ত পড়ে তিনি রূঢ়স্বরে বলেন, “এইবার তােমার স্বপক্ষে বলবার কি আছে ?” আগেব অনুবৃত্তি করে মেরিয়া ইভানভনার সাথে আমার সম্বন্ধ ইত্যাদি খুলে বলতে ইচ্ছা হল। কিন্তু হঠাৎ মনে একটা ভয়ানক ঘৃণার উদ্রেক হ’ল। ভাবলাম, তার নাম করলে কমিটির সামনে তার ডাক পড়বে। গুণ্ডাদের জঘন্য কাজের সাথে তার নাম যুক্ত হবে, আর সেইগুলি উল্লেখ করে তাকে জেরা করা হবে, এ আমার কাছে বড়ই বিশ্রী ঠেল। আমি বড়ই কুষ্ঠিত হলাম । বিচারকেরা এতক্ষণ আমার কথা বেশ অনুকূল ভাবেই শুনছিলেন। আমার এই সঙ্কোচ দেখে তাদের সন্দেহ বাড়ল। যুবা কর্মচারী জিজ্ঞাসা করলেন, যে লােকটি আমার সব খবর দিয়েছে তার সাথে মােকাবিলা করতে চাই কি না। সেনাপতি হুকুম দিলেন, আগের দিনের বদমায়েসটাকে নিয়ে আসতে। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে দরজার দিকে চাইলাম, কে আমার এই হিতৈষী বন্ধুটি তাই দেখতে। কয়েক মিনিট পরে শিকলের ঝন ঝন্ শব্দ শােনা গেল। দরজা খুলে যেতেই সাব্রিন ১৬০ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী . ৮ ঢুকল। তার চেহারা দেখে আশ্চর্য হলাম ; ভয়ানক রােগা, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এই সে দিন যে চুল মিস্ কালাে ছিল, তা একেবারে সাদা হয়ে গেছে ; দাড়ী বেড়ে বেশ লম্বা হয়েছে। সে তার অভিযােগ অতি ক্ষীণ অথচ অবিচলিত স্বরে আবৃত্তি করে গেল। তার মৰ্ম্ম এই যে পুগাচফ 'আমাকে চর করে ওরেনবুর্গে পাঠিয়েছিল। আক্রমণের অছিলায় বের হয়ে এসে আমি সব সংবাদ লিখে তাকে দিয়ে যেতাম। অবশেষে আমি প্রকাশ্যভাবে তার সাথে যােগ দিই এবং দুর্গে দুর্গে ঘুরি। অপর বিশ্বাসঘাতকদের সৰ্ব্বনাশের যথাসাধ্য চেষ্টা করি, তাদের পদ নিজে পাবার জন্য ; তা ছাড়া বিদ্রোহী নেতার কাছে বকশিসও আমি অনেক নিয়েচি ইত্যাদি। চুপ করে তার সব কথা শুনলাম। একটা কারণে আমার একটু আনন্দ হল-হতভাগা মেরিয়া ইভানভনার নাম করে নি। বােধ হয় সে উপেক্ষা করেছিল বলেই তার নাম উচ্চারণ করতে ওর আত্মসম্মানে ঘা লাগছিল ; অথবা তখনও আশার কোনও ক্ষীণ রেখা ওর মনের কোণে ছিল, তাই পাপিষ্ঠ তার নাম করে নি। যাই হােক, বেলগরস্কির দুর্গেশনন্দিনীর নাম কমিটির সামনে উঠল না। আগের চেয়ে আরও দৃঢ়লংকল্প করলাম, তার নাম করব না। যখন বিচারকরা জিজ্ঞাসা করলেন, সাব্রিনের অভিযােগ মিথ্যা প্রমাণ করব কি করে, আমি উত্তর দিলাম, আগে যা বলেছি তাই শুধু বলতে চাই, তার বেশী আমার স্বপক্ষে বলবার কিছু নেই। সেনাপতি হুকুম দিলেন আমাদের দুজনাকে সরিয়ে নিতে। দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে গেলাম। আমি শান্ত ভাবে সাব্রিনের দিকে চাইলাম, কিছু বললাম না। সে প্রতিহিংসার হাসি হেসে, শিকল নেড়ে আমায় পিছনে ফেলে চলে গেল। আমাকে তারপরে জেলে নিয়ে রাখা হল। আর আমায় জেরা করা হয় নাই।
বিচার ১৬১ পরে এমন সব ঘটনা ঘটেছে যা আমি প্রত্যক্ষ করি নি, কিন্তু যা পাঠককে জানানাে বড় দরকার । সে সব কথা আমি এতবার শুনেছি যে তার খুটিনাটি অবধি আমার মনে গভীর ভাবে বসে গেছে। আমার মনে হয় যেন আমি অদৃশ্য ভাবে তা প্রত্যক্ষই করেছি। সে সব ঘটনা এইবারে বলছি। আমার গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে বাড়ীর সকলেই মর্মাহত হলেন। পুগাচফের সাথে আমার অপ্রত্যাশিত পরিচয়ের বিবরণ মেরিয়া ইভানভ না মা ও বাবাকে এমন সরলভাবে বলেছিল যে তাতে করে তাদের কোনও দুশ্চিন্তা হওয়া দূরে থাক, তারা প্রাণভরে আমােদ পেয়ে কেবল হাতেন। যার উদ্দেশ্য রাজাকে ধ্বংস করা এবং ভদ্রসম্প্রদায়ের উচ্ছেদ করা এমন বিদ্রোহে আমার সংস্রব থাকতে পারে, বাবা তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চান নি। তিনি সাভেলিচকে করে জেরা করেছিলেন। বুড়াে একথা গােপন করে নি যে আমি পুগাচফের সাথে দেখা করেছি এবং সেই বিদ্রোহীনেতা আমার সাথে খুব ভদ্র ব্যবহার করেছে। সে যে রাজদ্রোহজনক কোন কথাই আমার মুখে শোনে নি তা বাবাকে শপথ করে বলেছিল। বাবা, মা আশ্বস্ত হয়ে সুসংবাদের প্রতীক্ষায় ছিলেন। মেরিয়া ইভানভ না বড্ড ভয় পেয়েছিল, কিন্তু কিছুই বলে নি; কারণ তার বুদ্ধি যথেষ্ট থাকলেও অহংকার আদৌ ছিল না। কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।••••••••হঠাৎ আমার বাবা পিটার্সবুর্গ থেকে আমাদের আত্মীয় প্রিন্স বি -র একখানা চিঠি পেলেন। তিনি আমার সম্বন্ধে লিখেছেন। মামুলি ভূমিকার পর তিনি জানিয়েছেন যে দুর্ভাগ্যক্রমে বিদ্রোহীর ষড়যন্ত্রের সাথে আমার সংস্রব সত্যিই ছিল, এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। অপরের শিক্ষার জন্য ১৬২ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী আমাকে ফাঁসি দেওয়াই হত, কেবল আমার বাবার মহৎ চরিত্র আর বৃদ্ধ বয়স বিবেচনা করেই তা করা তা করা হয় নি। শােচনীয় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সাইবেরিয়ার সুদূর প্রান্তে আমার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের আদেশ হয়েছে। এই সংবাদ বাবার পক্ষে বজ্রাঘাতের মত সাংঘাতিক হল । তিনি মারা যেতেই বসেছিলেন। তার স্বাভাবিক ধীরতা নষ্ট মুয়ে গিয়েছিল ; অতি দুঃখে তিনি কেবল কাতরভাবে বিলাপ করতেন। তিনি আত্মহারা হয়ে বলতেন “কি! আমার ছেলে পুগাচফের সাথে ষড়যন্ত্র করেছে ! ভগবান্ এও আমায় বেঁচে থেকে দেখতে হল। রাণী আমার ওপর দয়া করে তার জীবন দিয়েছেন, তাতে কি আমার মান বাড়ল? মৃত্যুদণ্ডই একটা বড় কথা নয়। আমার বড় ঠাকুরদাদা যা বিবেক সঙ্গত বলে ভেবেছিলেন তারই জন্য জল্লাদের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন। আমার বাবা ভলিনস্কি (১) ও হ্রসভের (২) সঙ্গে কত নিৰ্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু ভদ্রলােকের পক্ষে রাজভক্তির শপথ ভঙ্গ করা, ডাকাত, খুনে, পলাতক ক্রীতদাসের দলে যােগ দেওয়া ! এটা আমাদের বংশের বড় লজ্জা, বড়ই কলঙ্ক।” তার এই গভীর নৈরাশ্য দেখে ভয় পেয়ে মা তার সম্মুখে কঁদতেও সাহস পেতেন না। জনরবের নিশ্চয়তা নেই, লােকের কথায় কি বিশ্বাস আছে, ইত্যাদি বলে বাবাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করতেন। বাবার মন কিছুতেই প্রবােধ মানত না। মেরিয়া ইভানভনার কষ্ট হ’ল সবার চেয়ে বেশী। তার দৃঢ় ধারণা হ’ল আমি ইচ্ছা করলেই নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারতেম । ও (১) এর মহারাণী, অ্যানের জাম্মান প্রিয়পাত্রের বিরুদ্ধ-দলের নেতা ছিলেন।
বিচার প্রকৃত ঘটনাটা অনুমানে বুঝে নিয়ে সে নিজেকেই আমার দুরবস্থার কারণ বলে মনে করল। তার দুঃখ, তার চোখের জল সে সবারই কাছে গোপন করত। দিনরাত কেবল ভাত কি উপায়ে আমাকে বাঁচান নায় । একদিন সন্ধ্যাবেলা বাব। সােফায় বসে সরকারী গাজির পাতা উল্টাচ্ছিলেন। কিন্তু তার মন ছিল বহুদূরে ; তার ওপরে বইখানির সহজ প্রভাবের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। তিনি শীস নিয়ে একটা পুরানাে যুদ্ধের গানের সুর ভাজছিলেন। মা চুপ করে বসে একটা পশমের কোট বুনছিলেন ; মাঝে মাঝে তার ওপর দু’এক ফোঁটা চোখের জল পড়ছিল। মেরিয়া ইভানভ না তার পাশে ছুচের কাজ করছিল। সে হঠাৎ বল, “আমার একবার পিটার্সবুর্গ যাওয়া বড়ই দরকার; কি করে যাওয়া যায় ? শুনে মা বড়ই দুঃখিত হলেন। বললেন, “পিটার্সবুর্গে কেন যাবে বাছা? তুমিও কি আমাদের ছেড়ে যেতে চাও ?” মেরিয়া ইভানভ না উত্তর দিল, “আমার ভবিষ্যৎ এই যাত্রার ওপর নির্ভর করছে। আমার বাবা সরকারী কাজে জীবন দিয়েছেন, তার মেয়ে আমি। আমি সেখানকার সম্ভ্রান্ত, প্রভাবশালী লােকদের সাহায্য ভিক্ষা করব।” বাবা মাথা হেট করলেন। ছেলের ঘাড়ে যে দোষ চাপান হয়েছে সে কথা মনে হলেই তিনি কষ্ট পেতেন—সেটা তার ভয়ানক অপমান বলে মনে হত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা বললেন, “যাও বাছা, তােমার সুখের পথে আমরা বাধা হতে চাই নে। ভগবান তােমায় সচ্চরিত্র স্বামী দি-নীচ প্রকৃতি বিশ্বাসহন্তা যেন তােমার স্বামী না হয়।”
১৬৪ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী, বাবা উঠে বাইরে গেলেন। ঘরে রইলেন মা আর মেরিয়া ইভানভ না। মেরিয়া ইভানভনা মায়ের কাছে তার মনের কথা কতকটা ভেঙ্গে বল। মা কাঁদতে কাঁদতে কে আলিঙ্গন করলেন এবং তার উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলেন। তার যাবার সব বন্দোবস্ত ঠিক হয়ে গেল। কয়েক দিন বাদেই বিশ্বাসী সাভেলিচ ও পালাসাকে সঙ্গে নিয়ে সে যাত্রা করল আমার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ায় সাভেলিচ বেচারা বড়ই কষ্ট পাচ্ছিল। অন্ততঃ আমার ভাবী স্ত্রীর সেবা করতে পারবে, এইটুকু হ’ল তার সান্ত্বনা। মেরিয়া ইভানভনা নিরাপদে সােফিয়া পৌছল। জারস্কো সেলােতে রাণী আছেন এই কথা শুনে সে সেখানেই থাকা ঠিক করল। ষ্টেশন ঘরে বেড়ার আড়ালে একটি ছােট কামরায় তার থাকার জায়গা হল। ষ্টেশন মাষ্টারের স্ত্রীর সাথে তার আলাপ হল। কথাবার্তায় সে জানতে পারল রাজবাড়ীতে যে উনুনে আঁচ দেয় সেই মেয়েটি মাষ্টারগিন্নির ভাইঝি। রাজবাড়ীর চালচলনের রহস্য মাষ্টারগিন্নি মাসাকে বুঝিয়ে দিল। সকালে কখন রাণী ওঠেন, কখন কাফি খান, কখন বেড়াতে যান, তখন কোন্ কোন্ পারিষদ সঙ্গে থাকে, আগের দিন ডিনারের সময় রাণী কি বলেছেন, সন্ধ্যাবেলা কার সাথে দেখা করেছেন, ইত্যাদি সব সে বিনিয়ে বিনিয়ে মাসাকে বল। মােটকথা আনা ভাসিয়েভনার কাহিনী, রাজবাড়ীর দৈনন্দিন ইতিহাসের কয়েক পৃষ্ঠা বললেও অত্যুক্তি হয় না। লেখা হলে ভবিষ্য সন্তানদের পক্ষে তা বেশ মুল্যবান জিনিস হত। মেরিয়া ইভানভনা বেশ মন দিয়ে সব শুনল। সেই দিনই তারা সহরের বাগানে বেড়াতে গেল। আনা ভাসিয়েভনা প্রত্যেকটি গাছে ঢাকা পথ, প্রত্যেকটা পুলের ইতিহাস মাসাকে শুনিয়ে দিল। অনেকটা বেড়িয়ে দুজন দুজনের ওপরে খুব খুসি হয়ে ষ্টেশনে ফিরল।
বিচার ১৬৫ ; মেরিয়া ইভানভ না পরদিন খুব ভােরে উঠল ; তারপরে পােষাক পরে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গিয়ে সেই বাগানে ঢুল। বড় সুন্দর প্রভাত সেটি। সবে রােদ এসে উচু লেবুগাছগুলির মাথায় পড়েছে ; শরতের হাল্কা নিশ্বাসে তাদের সব পাতা হলদে হয়ে গেছে। মস্ত সবােবর, এতটুকু ঢেউএর সাড়া নেই ; রােদ পড়ে তার বুক ঝক ঝক করছে । বড় বড় রাজহাঁস—এই সবে জেগেছে-ওপারের ঝােপে ঢাকা পাড় থেকে নেমে সাঁতার কেটে এগিয়ে আচে। মেরিয়া ইভানভনা একটি সুন্দর মাঠের ধারে ধারে বেড়াচ্ছিল। সেখানে কাউণ্ট মিয়ান্টসেভের বিজয়স্তম্ভ সবে তৈরী হয়েছে। হঠাৎ একটা সাদা বিলাতি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে মেরিয়া ইভানভনার দিকে ছুটে এল। সে ভয়ে জড়সড় হয়ে থমকে দাড়াল। তখখুনি একটি মহিলার মধুর স্বর তার কানে পৌছল :- “ভয় নেই, ও কামড়াবে না।” মেরিয়া ইভানভ না দেখল, স্মৃতিস্তম্ভের সম্মুখে একখানা বেঞ্চে একটি মহিলা বসে আছেন। মেরিয়া ইভানভ না গিয়ে বেঞ্চের অপর ধারে বল। মহিলাটি বেশ মনােযােগ দিয়ে তাকে দেখছিলেন। মেরিয়া ইভানভ নাও তার দিকে বার বার চাইছিল এবং তাকে আপাদমস্তক বেশ করে দেখছিল। তার পরনে ভােরের সাদা পােষাক, নাইটক্যাপ ও রুশ জ্যাকেট। বয়স বছর চল্লিশ হবে। গােলগাল টুকটুকে মুখখানি শান্তিভরা অথচ তেজোমণ্ডিত। নীলাভ চোখদুটি সহাস্যমুখে একটা অবর্ণনীয় সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। সেই মহিলাটি প্রথম নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বললেন, “বােধ হয়, তুমি এখানে নতুন এসেচ ?” “হঁ মা, আমি এই কাল পাড়াগাঁ থেকে এসেছি।” “আত্মীয় স্বজন কেউ সঙ্গে আছে ?* “না মা, আমি একাই এসেচি 2
১৬
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী
“একা ? কিন্তু তােমার বয়স এত অল্প !•••••*
“আমার বাপ, মা কেউ নেই।
“অবশ্য কোনাে কাজে এসে থাকবে ?”
“হাঁ মা, আমি মহারাণীর কাছে একটি আবেদন করতে এসেছি।”
“তুমি অনাথ ; বােধ হয় কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নালিশ করতে
এসেচ ?”
“না মা, আমি বিচারের প্রার্থিনী নই, দয়া ভিক্ষা করতে এসেছি।”
“তােমার নাম কি, জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?”
“আমি কাপ্তান মিরনফের মেয়ে।”
“কাপ্তান মিরনফ। যিনি ওরেনবুর্গে একটি দুর্গের নায়ক ছিলেন ?”
“হাঁ, মা।”
মহিলাটির সত্যই দয়া হল।
তিনি আরও আদর করে বলেন, “আমি তােমার বিষয়ে জাতে
এত উৎসুক হয়েচি দেখে মনে কিছু কোরো না। আমি মাঝে মাঝে
রাজবাড়ী গিয়ে থাকি। তােমার আবেদনটা আমায় বলে ; হয়ত
আমি তােমায় কিছু সাহায্য করতে পারব।”
মেরিয়া ইভানভ না উঠে দাড়িয়ে সসম্ভ্রমে তাকে ধন্যবাদ ‘দল। সেই
অপরিচিতা মহিলার ব্যবহারে সে ক্রমেই বেশী আকৃষ্ট হচ্ছি; এবং
অকপটে সব কথা তাকে বলতে সাহস পাচ্ছিল। মেরি ইভানভ না
একখানা ভাজকরা কাগজ পকেট থেকে বের করে সেই মহিলার হাতে
দিল। তিনি মনে মনে সেখান পড়তে লাগলেন।
প্রথমে তিনি সদয়ভাবে বেশ মন দিয়ে পড়ছিল, কিন্তু হঠাৎ তার
মুখের ভাব বদলে গেল। মেরিয়া ইভানভ না তার প্রত্যেকটি মুখভঙ্গী
লক্ষ্য করছিল। যে মুখ খানিক আগে এত শান্ত, এত মধুর ছিল,
বিচার
১৬৭
তাতে হঠাৎ কঠোর ভাব ফুটে উঠতেই মেরি। ইভানভন' ভয়
পেল।
মহিলাটি কড়াভাবে বললেন, “তুমি গ্রীনফের জন্য দয়া চাইতে এসেছ?
মহারাণী তাকে ক্ষমা করতে পারেন না । সে ত’ সরল বিশ্বাসে, না
জেনে বিদ্রোহী নেতার দলে যায় নি, একটা জঘন্য, দুর্নীতিপরায়ণ
পিশাচের মত গিয়েছে।”
মেরিয়া ইভানভনা আর্তনাদ করে বল, “উঃ, একথা সত্য নয়, মা।”
মহিলা তার কথা ক’টিই আবার বলেন, “কি ? একথা সত্য নয় ?”
তার মুখ লাল হয়ে গেল।
“একথা সত্য নয়। ভগবানের দিব্যি বচি, একথা সত্য নয়।
আমি এ ঘটনা সব জানি ; আপনাকে সব বলচি। সে যা যা করেছে,
শুধু আমারই জন্য। বিচারকদের সামনে সে,যে নিজের নির্দোষিত
প্রমাণ করে নি, তাও শুধু আমাকে এ ব্যাপারে জড়াবে না বলে।”
তখন সেই সাময়িক আবেগে সে সরলভাবে আমূল সমস্ত ঘটনা বল ।
পাঠক তা আগেই জানেন।
মহিলাটি মন দিয়ে সব শুনলেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কোথায় উঠেচ ?”
মাসা আনা ভাসিয়েভনার বাড়ীতে আছে শুনে হেসে বললেন “ওহে,
বুঝেচি। এখন বিদায়। আমাদের এই সাক্ষাতের কথা কাউকে
বলল না। আমার বােধ হচ্চে, আবেদনের উত্তরের জন্য তােমার বেশী
দিন অপেক্ষা করতে হবে না।”
এই বলে তিনি উঠে গেলেন, দেখতে দেখতে একটা গাছে ঢাকা
পথে অদৃশ্য হলেন। মেরিয়া ইভানভন আশায় উৎফুল্ল হয়ে আনা
=মিয়ভ নার বাড়ীতে ফিরল।
১৮ রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী, এত সকালে বেড়াতে গিয়েছিল বলে বাড়ীর কত্রী তাকে তিরস্কার করে বলল, “এটা শরৎকাল ; এখন তােমার মত ছেলেমানুষের এত সকালে বেড়ান ভাল নয়।” গরম জলের পাত্র এনে চা খেতে খেতে সে রাজবাড়ীর গল্পের অফুরন্ত ভাণ্ডার খুলে দিল। এমন সময়ে রাজবাড়ীর একখানা গাড়ী দরজায় এসে দাঁড়াল। প্রাসাদের বরকন্দাজ ঘরে ঢুকে বল, “মহারাণী কুমারী মিরনফকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আনা ভাসিয়েভনা প্রথমে বিস্মিত হ’ল, তারপরে মহাব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে চেঁচিয়ে বল্ল, “বাপরে! মহারাণী তােমায় রাজবাড়ী ডেকে পাঠিয়েছেন। তােমার কথা তিনি জানলেন কি করে ? আহা, বাছা আমার, কি ভাবে রাণীর সানে যাবে ? আমার ত’ বিশ্বাস তুমি রাজবাড়ীর আদব কায় কিছুই জান না।...... আমি তােমার সঙ্গে গেলে হত না? অন্ততঃ কতক বিষয়ে আমি তােমায় সাবধান করে দিতে পারতেম । আর এই গন্তের পােষাক পরেই বা যাবে কি করে ? ধাইমার কাছে হলদে গাউনটা চেয়ে পাঠাই না?” বরকন্দাজ জানাল, মহারাণীর ইচ্ছা কুমারী যে ভাবে আছেন সেই ভাবেই একলা আসবেন। সুতরাং উপায় নেই। আনা ভাসিয়েভনার উপদেশ ও আশীর্বাদ সম্বল করে মেরিয়া ইভানভ না গাড়ীতে উঠে রাজবাড়ীর দিকে চল। সে বুঝতে পেরেছিল যে এইবারে আমাদের একটা সুরাহা হবে। তার বুক দুর দুর করতে লাগল। কয়েক মিনিট পরে গাড়ী এসে রাজবাড়ীর দুয়ারে থাম। মেরিয়া ইভানভ না কাঁপতে কাঁপতে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠেগৈল। দরজা একদম্ খুলে গেল। দামী আসবাব দিয়ে সুন্দরভাবে • বিচার সাজান কতকগুলি নির্জন কামরা সে পার হয়ে গেল ; বরকন্দাজ রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে একটা বন্ধ দুয়ারের কাছে এসে লােকটি ব, ‘আগে আমি আপনার আসার খবর দিই। এই বলে মাসাকে একা রেখে সে চলে গেল। একেবারে মুখখামুখি মহারাণীর সামনে দাড়াতে হবে, এই ভেবে ভয়ে তার পা ঠক্ ঠক্ করে কাপতে লাগল। মিনিটখানেক পরে দুয়ার খুলে গেল ; মহারাণীর প্রসাধনের ঘরে তাকে নিয়ে গেল। মহারাণী বেশবিন্যাসের টেবিলের পাশে বসেছিলেন, তাকে ঘিরে কয়েকজন পারিষদ্ দাড়িয়ে ছিল। তারা সসম্মানে মাসাকে পথ ছেড়ে দিল। মহারাণী সস্নেহে তার দিকে চাইলেন-মাসা দেখল ইনি তার সেই পূর্বপরিচিত। মহিলা, যার কাছে এই খানিক আগে সে অসঙ্কোচে সব কথা বলেচে। মহারাণী তাকে পাসে ডেকে নিয়ে হাসিমুখে বলেন :- “তোমায় যে কথা দিয়েছিলাম তা রাখতে পেরেচি ; আর তােমার অনুরােধ রাখাও সম্ভব হয়েছে। এটা আমার পক্ষে আনন্দের বিষয়। তােমার মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে তােমার ভাবী স্বামী নির্দোষ । এই চিঠিখানা দিচ্ছি, এখান তােমার ভাবী শ্বশুরকে নিজ হাতে দিও।” চিঠিখানা নিতে মেরিয়া ইভানভনার হাত কাঁপতে লাগল। সে কঁদতে কাদতে মহারাণীর পায়ের ওপর পড়ে গেল। মারাণী তাকে উঠিয়ে চুমাে খেলেন ; তারপরে তার সাথে আলাপ করতে লাগলেন। বললেন, “আমি জানি তুমি ধনী নও, কিন্তু আমি কাপ্তান মিরনফের মেয়ের কাছে ঋণী। ভবিষ্যতের ভাবনা করাে না, আমি তােমার সব ভার নিচ্ছি।
রাশিয়ার দুর্গেশনন্দিনী এই অসহায় নাথাকে মহারাণী আরও অনেক মিষ্ট কথা বলে . বিদায় দিলেন। মেরিয়। ইভানভ না রাজবাড়ীর গাড়ীতে ফিরে এল। আনা ভাসিয়েভনা অতি উৎসুক ভাবে তার প্রতীক্ষা করছি; ফিরে আসতেই প্রশ্নবাণে তাকে জ জ করে তুলন্স। মাস। কিছু গুছিয়ে স্পষ্ট করে বলতে পারল না। অনা ভুসিভেন। তার স্মরণ শক্তির এই দুর্বলতা দেখে বড়ই হতাশ হ’ল; ভাবল এটা পাড়াগেঁয়ে, লাজুকতার লক্ষণ এবং অতি উদার ভাবে তাকে ক্ষমা করল। মেরিয়া ইভানভ না সেই দিনই দেশে ফিরবার জন্য রওনা হ’ল, পিটসবুর্গের সম্পদ ও শােভার দিকে একর ভ্রুক্ষেপও করল না।...... পিটর এণ্ডিচ গ্রীনফের আত্মকাহিনী এইখানেই শেষ হয়েছে। পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায় যে ১৭৭৫ খৃঃ অকে। শেষে স্বয়ং মহারাণীর আদেশে তার মুক্তি হয়। পুগচিফের প্রাণদণ্ডের সে উপস্থিত ছিল। তাকে দেখেই পুগাচফ হাসিমুখে অভিবাদন করে। মুহূর্ত পরেই সেই নির্ভীক বিদ্রোহীর ছিন্ন মুণ্ড জনতার সম্মুখে তুলে ধরা হয়। এই ঘটনা গ্রীনফের পক্ষে বড়ই মর্মন্তুদ হয়েছিল। দুচার দিন পরেই তার সাথে মেরিয়া ইভাননার বিয়ে হয়। তাদের বংশধরেরা আজও সিমবি সুথে বাস করছে । ত্রিশ মাইল দূরে একটি জমিদারী আছে—দশজন মালেকের এলাক।। সেখানে একখানা বাড়ীতে কঁাচের ভিতরে ফ্রেমে আঁট। দ্বিতীয় ক্যাথেরিনের একখানা চিঠি আছে। চিঠিখানা পিটর এণ্ডিচের বাবাকে লেখা। এতে তার ছেলের নির্দোষিত। এবং দুর্গেশনন্দিনী মেরিয়া মিরনফের হৃদয় ও বুদ্ধির প্রশংসা বর্ণিত আছি। পিটর এণ্ডিচ গ্রীনফের আত্মকাহিনী তার এক নাতি আমাকে দেন। তিনি শুনতে পেয়েছিলেন আমি, তার পিতামহ বা কাল সব