Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Chand Sadagar

Dutta,chandrakant · 2010/02/7

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

চাঁদ সদাগর
শ্রীকান্ত ও
মু ॥o

শিশির কুমার মিত্র, বি, ও
শিশির পাবলিশিং হাউস
৫ং ৰিজনট, কলিকাতা।
১৩৩৬, ১লা আশ্বিন
প্রিন্টার-শিশিরকুমার বসু
শিশির প্রেস,
৯নং বিডন স্ট্রীট, কলিকাতা।

চাদ সদাগর চম্পক নগরের সদাগর চন্দ্রধর। লােকে তাঁহাকে উঁদ সদাগর বলিয়াই ডাকে; চন্দ্রধর বলিলে বড় কেহ তাহাকে চিনে না। তাহার টাকা পয়সার অভাব নাই, দেশ জুড়িয়া তাহার বাণিজ্য। সপ্তডিঙ্গা মধুকর সাজাইয়া তিনি দেশ বিদেশে বাণিজ্য করিতে যান। মহাদেবের বরে তাহার ঘরে লক্ষ্মী বাধা। চাঁদ সদাগরের স্ত্রী সনকা রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। সদাগরের ছয়পুত্র, ঘর আলাে করা তাদের রূপ। সদাগরের সুখের সংসার। ছেলেরা বড় হইল। সদাগর তাহাদিগকে লইয়া বাণিজ্যে গেলেন। বাণিজ্যে সেবার যথেষ্ট লাভ হইল। চাঁদ সদাগর বড় খুসী হইয়া ছয় ছেলের বিবাহ দিয়া ছেলে ও বউ লইয়া দেশে যাত্রা করিলেন। সপ্ত ডিঙ্গা মধুকর আসিয়া চম্পক নগরের ঘাটে লাগিল। বউ বরণ করিয়া লইবার জন্য সদাগর বাড়ীতে সনকার নিকট সংবাদ পাঠাইলেন। সনকা তখন স্নান করিয়া ঘরে বসিয়া ঘট সাজাইয়া চাদ সদাগর। এক মনে মনসা দেবীর পূজা করিতেছিলেন। ছেলেরা বিবাহ করিয়া দেশে ফিরিয়াছে শুনিয়া তাহার প্রাণ আনন্দে নাচিয়া উঠিল, কিন্তু পূজা তাহার তখনাে শেষ হয় নাই, কাজেই তখন উঠিতে পারেন না,—কি জান যদি সংসারের অমঙ্গল হয়। সনকা দাসীকে লিয়া বলিয়া পাঠাইলেন, মনসা দেবীর পূজা শেষ করিয়াই আমি ঘাটে যাইয়া'বউ বরণ করিয়া আনিব । চাঁদ সদাগর শিবভক্ত, তিনি মনসা দেবীর নামও শুনতে পারেন । যখন তিনি শুনিলেন সনকা আঁহার স্ত্রী হইয়া তাহারই ঘরে মনসা দেবীর পূজা করিতেছেন তখন ক্রোধে ঘৃণায় *হার সমস্ত শরীর রি রি করিয়া উঠিল। তিনি আর সেখানে এক মুহুর্ত স্থির থাকিতে পারিলেন না, তখনই এক প্রকাণ্ড হেঁলের লাঠী লইয়া বাড়ীর দিকে ছুটিয়া চলিলেন ! পূজার মন্দিরে ধূপ দীপ নৈবেদ্য সাজাইয়া দেবীর ঘট সম্মুখে লইয়া সনকা একমনে মায়ের পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দিতেছেন, এমন সময় চাঁদ সদাগর অগ্নিমূৰ্ত্তি হইয়া গিয়া সেই ঘরে ঢুকিয়াই লাঠির ঘায়ে ঘট চূর্ণ করিয়া ফেলিলেন ; ধূপ দীপ নৈবেদ্য সারা ঘরময় ছড়াইয়া পড়িল। এত করিয়া তাহার রাগ গেল না, তিন সনকার চুলে ধরিয়া কিল চড় মারিতে মারতে বলিতে লাগিলেন, শিবদুর্গা পূজা করিয়াও কি তাের সাধ মিটে না সৰ্ব্বনাশী ? আবার এ রাক্ষসী কালীর পূজা আরম্ভ করিয়াছি। আমার সোনার সংসারে অলক্ষ্মীর পূজা। ২

*
se.
চাঁদ সদাগর অগ্নিমূৰ্ত্তি হইয়া লাঠিরঘায়ে ঘট চূর্ণ করিয়া ফেলিলেন।
পৃঃ-২

No text on this page.

চঁদ সদাগর সনকা চোখের জলে বুক ভাসাইয়া সদাগরের পা ধরিয়া কত মিনতি করিলেন, ওগাে অমন কথা বলিতে নাই, মা মনসা অলক্ষ্মী নয় গাে,-তার দয়ায় মানুষ ধনে পুত্রে লক্ষ্মীবান হয়। সনকা যতই মিনতি করেন চাদের ক্রোধ ততই দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠে। মনসা দেবী শূন্যে থাকিয়া সমস্তই দেখিলেন। তিনিও চঁাদকে বড় ভয় করিতেন, সব চেয়ে ভয় করিতেন চঁাদের ঐ হেঁতালের লাঠিটাকে। চাদের এই ব্যবহার দেখিয়া দেবীর তাহার উপর এমনই রাগ হইল যে তখনই এই অপমানের প্রতিশােধ লওয়ার পরামর্শ করিবার জন্য সখী নেতাকে ডাকিলেন। নেতা জাতিতে ধােপনী, তবু সে মনসা দেবীর সখী। নেতা আসিয়া সখার মুখে সমস্ত কথা শুনিল। শুনিয়া বলিল, সত্যই ত চঁাদ এত অপমান করিল তােমাকে। তাহাকে ইহার প্রতিফল দিতেই হইবে। চল, তােমার উনকোটী নাগ সাজাইয়া লইয়া মর্ত্যে যাই। চাঁদ সদাগরের বড় সাধের একটী শুপারি বাগান আছে, নানা দূর দেশ হইতে নানারকম শুপারি গাছ আনিয়া কত অর্থব্যয় করিয়া সে সেই বাগান সাজাইয়াছে, যদি আমরা সেই বাগান নষ্ট করিতে পারি তবেই তাহার উপযুক্ত শিক্ষা হইবে ? নেতার কথায় মনসাদেবী ভারী খুশী হইয়া তখনই উনকোটী সাপ সঙ্গে লইয়া নেতার সঙ্গে চাদের শুপারি বাগান নষ্ট করিতে চলিলেন।

চঁদ সদাগর অতগুলি সাপের নিঃশ্বাসে ও গর্জনে বাগানের মালীরা ভয়ে অস্থির হইয়া যে যেদিকে পারিল পলাইল। সাপেরা সমস্ত গাছে গাছে বিষ ঢালিতে আরম্ভ করিল, আর গাছগুলি ভস্ম হইয়া যাইতে লাগিল। এইরূপে সমস্ত বাগান ভস্ম করিয়া মনসা দেবী মনের আনন্দে স্বর্গে ফিরিলেন । ভাের হইতে না হইতেই মালীরা যাইয়া সদাগরকে তাঁহার এই সর্বনাশের খবর দিল। সদাগর কোনও রকমে মুখে চোখে একটু জল ছিটাইয়া দিয়া তাড়াতাড়ি বাগানে গিয়া দেখেন, হায়, তাহার অত সাধের কত কষ্টের শুপারি বাগান একেবারে জলিয়া পুড়িয়া ছাই হইয়া গিয়াছে। চাদের মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল! তিনি বুঝিলেন, ইহা সেই মনসার কাজ। ধন্বন্তরি একজন বড় চিকিৎসক। চাদ তাহাকেই ডাকিয়া আনিয়া তাহার বাগান বাড়ী জীয়াইয়া দিতে বলিলেন। ধন্বন্তরি জল পড়িয়া সেই জল যেমনি ছিটাইয়া দিল অমনি আবার আগেকার সেই সুন্দর বাগান বাঁচিয়া উঠিল। দেখিয়া চাদের আনন্দ আর ধরেন। ওদিকে মনসা দেবী দেখিলেন, তাঁহার সব জারিজুরি নষ্ট হইয়া গেল। ধন্বন্তরি ব্যাটাই যত অনর্থের মূল। মনসা দেবীর মুখখানি দুঃখে এতটুকু হইয়া গেল ! নেতা বলিল, আর ভাবিলে কি হইবে ৪

চাঁদ সদাগর
সখী? একটা উপায় কর। ধম্বারকে প্রাণে না মারিতে পারিলে
আর চাঁদ সদাগরকে শিক্ষা দিতে পারা যাইবে না! এখন আগে
ধন্বন্তরিকে মারার ব্যবস্থা কর। তখন মনসা দেবী গয়লানী সাজিয়া
দধির ভাঁড় কাখে লইয়া ধন্বন্তরির বাড়ীতে যাইয়া হাকিলেন, “ওগাে
তােমরা দৈ নেবে গাে? বড় ভাল দৈ,—চিনিপাতা।”
ধন্বন্তরি তখন বাড়ী ছিলেন না। তাহার স্ত্রী কমলা বড় দই
ভাল বাসিত, সে দই কিনিয়া তাহার দাসী অলীকে একটুখানি
দিয়া বাকীটা ঘরে লইয়া সিকায় তুলিয়া রাখিল। দই খাইয়াই
অলীর সর্বশরীর বিষে আচ্ছন্ন হইয়া গেল, সে যন্ত্রণায় ছটফট,
করিতে করিতে ঢলিয়া পড়িল। কমলা অলীর মৃত্যু দেখিয়া
কাদিয়া আকুল হইল। ধন্বন্তরি বাড়ী আসিয়া কমলাকে শান্ত
করিয়া অলঙ্গীর বিষ ঝাড়িয়া ফেলিলেন, অলঙ্গী জীবন পাইয়া
উঠিয়া বসিল।
মনসা দেবী দেখিলেন, এবারও তাহার অত চেষ্টা বিফল হইল।
তিনি নেতাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বলত সখী এখন কি
করি? চাঁদ সদাগর যদি আমার পূজা না করে তবে পৃথিবীতে
আমার পূজা আর কেহ করিবে না। কিন্তু সে যে আমার নামও
শুনিতে পারে না।”
নেতা বলিল, “চাদকে শিক্ষা দিতে না পারিলে সে তােমার
পূজাও করিবে না। কিন্তু তাহাকে শিক্ষা দিতে হইলে আগে

চাঁদ সদাগর ধন্বন্তরিকে প্রাণে মারিতে হইবে। তুমি সই সেই আয়ােজন কর।” মনসা দেবী তখন অনেক ভাবিয়া চিস্তিয়া একটা আশীবছরের খুখুনে বুড়ী সাজিয়া লাঠীভর দিয়া ধীরে ধীরে যাইয়া ধন্বন্তরির বাড়ীতে উঠিলেন। ধন্বন্তরির স্ত্রী কমলা ঘরের বারান্দায় বসিয়া দাসী অলঙ্গীর সহিত কথাবার্তা কহিতেছিলেন এমন সময় মা কমলা কোথা গা? বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে বুড়ী যাইয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন! কমলা ত বুড়ীকে দেখিয়া অবাক! এদেশে এমন কেহই নাই যে কমলাকে অমন নাম ধরিয়া ডাকিবে । কমলা কিছুক্ষণ বুড়ীর মুখের দিকে তাকাইয়া থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে গা?” বুড়ী ধীরে ধীরে বারান্দায় উঠিয়া কমলার পাশে একখানা পিড়ি টানিয়া লইয়া বসিয়া বলিলেন, “তা’ আমায় আর এখন চিনিবে কেন মা? এখন বুড়া হইয়াছি। আমি যে তােমার মায়ের বােন মাসী। ছােট বেলায় তােমায় কত কোলে কাখে করিয়া মানুষ করিয়াছি, কত খাওয়াইয়াছি। আমার হাতে নাওয়া খাওয়া না হইলে যে তােমার মন উঠিত না। তা বাছা, তােমার দোষ কি? অনেক দিন হইতে আসা যাওয়া নাই, চিনিবে কেমন করিয়া ?” কমলা তাহার অমন আদরের মাসীকে চিনিতে পারিলেন বলিয়া ভারী লজ্জা পাইল। সে ক্ষমা চাহিয়া মাসীকে প্রণাম করিয়া, পায়ের ধূলি লইয়া মাথায় দিল চাদ সদাগর মাসী বােনঝীয়ে কথাবার্তায় সারা দিন কাটিল। সন্ধ্যার সময় যখন ধন্বন্তরির বাড়ী ফিরিবার সময় হইল তখন বুড়ী কমলাকে বলিলেন, “এখন মা, জামাইএর আসিবার সময় হইয়াছে, আমি যে বেশে আসিয়াছি এবেশে কি আর জামাইর সম্মুখে যাওয়া যায় ? তুমি হলে বােনঝী, ছােট বেলা হইতে মানুষ করিয়াছি, তােমার কাছে আর আমার লজ্জা কি? ভাই এ বেশ লইয়া আমি আর জামাইর কাছে যাইতে পারিব না, আমি যাইয়া ধানের গােলার ভিতর লুকাইয়া থাকি । তুমিও যেন বাছা জামাইকে আমার আসার কথা বলিও না, তাহাহ’লে জামাই আমাকে প্রণাম করিতে চাহিলে আরও আমার লজ্জার সীমা থাকিবে না।” এই বলিয়া বুড়ী যাইয়া ধানের গােলার ভিতর লুকাইয়া রহিলেন। পর দিন প্রভাতে উঠিয়া ধন্বন্তরি আবার তাহার কাজে চলিয়া গেলেন। তখন বুড়ী ধানের গােল হইতে বাহির হইয়া আসিয়া ছল ছল চোখে বলিতে লাগিলেন, “আজ ভােরের বেলায় মা কমলা, বড় একটা দুঃখপ্ন দেখিয়াছি। স্বপ্নটা দেখিয়া এখনাে আমার গা কাপিতেছে, বড় খারাপ স্বপ্ন! দেখিলাম, জামাইর খেলার সাপ তাহাকে দংশন করিয়াছে, তাহাতে সে মারা গিয়াছে, তুমি মা অকাল বিধবা হইয়াছ!”••••••এই বলিয়া বুড়ী হাউ হাউ করিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। ৭

চাদ সদাগর
কমলা তাঁহাকে শান্ত করিয়া বলিতে লাগিল, “স্বপ্ন কি কখনাে
সত্য হয় মাসী? ওসব মিথ্যা। আমি শুনিয়াছি, তােমার জামাইর
মরণ নাই, তিনি অমর। তুমি দিওনা মাসী, কোনও চিন্তা নাই।”
বুড়ী বলিলেন, “তুমি কি পাগল বাছা ?
সংসারে জন্মিলেই
মরিতে হইবে। এখানে কেহই অমর নহে। জামাইরও নিশ্চই
কোনওনা কোনও উপায়ে মরণ আছে। কিরূপে তাহার মরণ
হা তুমি জানিয়া রাখিও তাহা হইলে নিশ্চিন্ত হইতে পারিবে।
আমিও মনে শান্তি পাইব।”
মাসীর কথায় কমলা স্বীকার করিল, আজ রাত্রিতে স্বামী বাড়ী
আসিলে সে তাহার মৃত্যুর কথা জানিয়া লইবে।
রাত্রি হইল। বুড়ী যাইয়া ঘরের ভিতর একটা ঝাপির মধ্যে
লুকাইয়া রহিলেন।
রাত্রিতে ধন্বন্তরি শয়ন করিলে কমলা তাঁহার পায়ের কাছে
বসিয়া ধীরে ধীরে তাহার পায়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে জিজ্ঞাসা
করিল, “আচ্ছা তােমার নাকি মরণ নাই, কিন্তু লােকে যে বলে
জন্মিলেই মরিতে হয়। তাহলে তােমারও মরণ আছে, আমায়
বলনা তোমার মরণ কিসে?
বীর মুখে একথা শুনিয়া ধন্বন্তরি অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন, “আজ একথা কেন কমলা? তুমি ত জানই আমি অমর,

চঁদ সদাগর আমার মরণ নাই। তবু আজ ওকথা জিজ্ঞাসা করিতেছ কেন? কালীদহে যে কালকুটী নাগ আছে, সেও যদি আমাকে দংশন করে তবু আমার মৃত্যু নাই।” কমলা বলিল, “হ্যা, লােকের আবার মরণ নাই? তুমি আমাকে ফাকি দিতেছ। তােমার পায়ে পড়ি, বলনা কিসে তােমার মরণ ?” ধন্বন্তরী একটু বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “কথা শোেন কমলা, আমার মৃত্যুর কথা শুনিতে চাহিও না, সে কথা বলিতে নিষেধ আছে।” কমলা আঁচলে চক্ষু মুছিতে মুছিতে বলিতে লাগিল, “বুঝিলাম, আমাকে তুমি বিশ্বাস কর না। আমি বুঝি তােমার মরণ কথা শুনিয়া অন্যকে বলিয়া দিব ? হা অদৃষ্ট! স্বামী যাহাকে বিশ্বাস করে না, তাহার সংসারে বাঁচিয়া লাভ কি ? সংসারে স্বামীর সুখ- দুঃখে স্ত্রীর সুখ দুঃখ, স্বামী ব্যতীত স্ত্রীলােকের জীবনই বৃথা, ইহাতে স্বামীর এমন কি গােপন কথা থাকিতে পারে যে স্ত্রীর কাছে বলিলে দোষ হয় ? সেদিন ধন্বন্তরি বলিলেন, “তুমি চিন্তা করিও না কমলা, আমার মরণ আছে বটে, কিন্তু সে বড় শক্ত কথা, পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর আমার মরণের কথা কেহ জানে না। যে উপায়ে আমার মরণ তাহা কেহ করিতে পারিবে না, আমিও মরিব না। তুমি শান্ত হও কমলা, তােমার কোনাে চিন্তা নাই।”

চঁদ সদাগর
*
“চুপি চুপি আমায় বল না, কে আর এত রাত্রিতে শুনিতে
আসিতেছে? আমি না শুনিলে প্রাণে মােটেই শান্তি পাইব না ;
তােমার পায়ে পড়ি, বল। তুমি কি মনে কর যে, তােমার মরণ
কথা আমি অন্যকে বলিয়া দিয়া আমার সর্বনাশ আমি করিব ?
আমার বড় শুনিতে ইচ্ছা হইয়াছে বল
কমলার অনুরােধ এড়াইতে না পারিয়া ধন্বন্ততি বলিতে
লাগিলেন, “তবে শােন, কিন্তু বড় গােপন কথা, যদি কেহ শুনিয়া
ফেলে তবেই মুস্কিল।আমি যে মন্ত্র জানি তাহাতে যে কোনও
সাপই হউক না কেন আমার কিছুই করিতে পারিবে না। কিন্তু
যদি আমার মরণ হয় তবে এই সাপের হাতেই হইবে। সে বড়
অদ্ভুত কথা। শােন, একদিন মহাদেব স্বয়ং আমাকে ডাকিয়া মন্ত্র
দিতে চাহিলেন। মন্ত্র লইবার জন্য আমি সাগরে স্নান করিতে
গেলাম, আসিয়া দেখি মহাদেব রায়া করিতেছেন। রায় শেষ
হইলে তিনি আমাকে একথালা ভাত বাড়িয়া দিয়া বলিলেন, “তুমি
এই ভাত একটা অবধি খাইয়া ফেল, যদি একটা ভাতও অবশিষ্ট
থাকে তবে তােমার বড়ই বিপদ ঘটিবে। আমি খাইতে বসিলাম,
ধীরে ধীরে বসিয়া বসিয়া আমি সেই ভাত সব কয়টা শেষ করিলাম,
থালায় আর একটা ভাতও রহিল না। থা তুলিয়া দেখিলাম,
একটা ভাত পড়িয়া রহিয়াছে। যেমনি সেই ভাতটা ধরিয়া মুখে
দিতে যাইব অমনি সেটা সাপ হইয়া গেল। ইহা দেখিয়া মহাদেক

চঁদ সদাগর বলিলেন, এই সাপ ব্যতীত আর তােমার মৃত্যুর অন্য কারণ নাই। ইহার নাম উদয় নাগ। তুমি এই সাপ সাবধানে তােমার ঝাঁপির মধ্যে রাখিয়া দাও। ইহার পর একদিন আমি ইন্দ্রের পুরীতে সাপের খেলা দেখাইতে গেলাম। খেলিতে খেলিতে সেই সাপটা যাইয়া ইন্দ্রের পালঙ্কের নীচে লুকাইল। আমি সাপের ল্যাজ ধরিয়া টান দিতেই ইন্দ্রের পালঙ্ক কাপিয়া উঠিল। তখন ইন্দ্র অভিশাপ দিলেন ‘বিনা দোষে তুমি ধন্বন্তরি ইহাকে কষ্ট দিলে, একদিন ইহার দ্বারাই তােমার জীবনান্ত ঘটিবে। তারপর সেই সাপ লইয়া মহাদেব তাহার গলায় মালা করিয়া রাখিলেন। যদি কেহ শনিবার মঙ্গলবার অমাবস্যায় ভগ্ন নক্ষত্রে সেই সাপ আনিয়া আমার মাথার জটার নীচে যে রামতিল আছে ঠিক সেই তিলের উপর দংশন করাইতে পারে এবং সেই বিষ আমার শার্থনাড়ী ভেদ করিয়া যায় তবেই আমার মরণ হইবে। কিন্তু কমলা, ইহা কাহারও ধারায় হইবেও না, সুতরাং আমারও মরণ নাই।” কমলা স্বামীর মরণের অদ্ভুত কথা শুনিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া ঘুমাইয়া পড়িল। মনসা দেবী ঝাপির মধ্যে বসিয়া সমস্ত কথা শুনিয়া লইলেন। - প্রভাতে উঠিয়া ধন্বন্তরি রােগী দেখিবার জন্য চলিয়া গেলেন : ১১ চাদ সদাগর মনসা দেবীও ঝাঁপি হইতে বাহির হইয়া কমলাকে আশীর্বাদ করিয়া ধন্বন্তরিকে মারিবার ফন্দি করিবার জন্য স্বর্গে প্রস্থান করিলেন। মহাদেব কৈলাসে বসিয়া আছেন। এমন সময় পদ্মাবতী সেখানে যাইয়া শিবের পায়ের ধুলি লইয়া প্রণাম করিয়া তাহার নিকট উদয় নাগ চাহিলেন। শিবের আর কোনও কথা বুঝিতে বাকি রহিল না। ধন্বন্তরি তাহার বড় আদরের শিষ, সেই শিষ্যের প্রাণ যাইবে ভাবিয়া মহাদেব প্রাণে বড় আঘাত পাইলেন। কিন্তু কি করিবেন, পদ্মা যে তাহার বড় আদরের বড় সােহগের মেয়ে। শিব বড় দুঃখে কেবল মেয়ের মন রক্ষার জন্য উদয় নাগ তাহাকে দিলেন। মনসার আদেশে উদয় নাগ ধন্বন্তরিকে দংশন করিবার জন্য চলিল। কিন্তু ধন্বন্তরির বাড়ীর নিকটে যাইয়া সাপ আর ঔষধের গন্ধে বাড়ীর মধ্যে যাইতে পারিল না। তখন নেতা গরুড় পক্ষীর রূপ ধরিয়া সমস্ত ঔষধের গাছ খাইয়া ফেলিল। তখন একে রাত্রি দুপুর, তায় আবার অমাবস্যার অন্ধকার, কাজেই কেহই একটু সাড়া শব্দও পাইল না। উদয় নাগ ধীরে ধীরে যাইয়া ধন্বন্তরির শয়ন ঘরে ঢুকিয়া বিছানার উপর উঠিল। কিন্তু বিনা অপরাধে তাঁহাকে দংশন করিতে তাহার বড়ই দুঃখ হইতে লাগিল। কিন্তু দুঃখ করিয়া ত আর লাভ নাই, ধন্বন্তরিকে মারিবার জন্যই যে তাহার জন্ম, বিশেষত মনসা স্বয়ং তাহাকে পাঠাইয়াছেন। ভাবিয়া

চাঁদ সদাগর
নদীর ধারে
চিন্তিয়া শেষে সে ধন্বন্তরির মাথায় জটার নীচে রামতিলের উপর
দংশন করিল। অমনি ধন্বন্তরির সারা দেহ বিষে জ্বলিয়া উঠিল।
তিনি বুঝিলেন যে তাঁহাকে উদয় নাগ দংশন করিয়াছে। তখনই
তিনি কমলাকে বাড়ীর চাকর ধনামনাকে ঔষধ আনিবার জন্য
গন্ধমাদন পৰ্বতে পাঠাইয়া দিতে বলিলেন।
ধনামনা ঔষধ লইয়া বাড়ী ফিরিবার সময় পথে দেখিল,
কমলা কাদিতে কাদিতে ধন্বন্তরিকে সংকার
কারতেছে। ধনামনা আশ্চৰ্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “একি
করিতেছ মা?”
কমলা কপালে ঘা দিতে দিতে বলিল, “আর কি করিব বাবা,
ঔষধ আনিতে তােমাদের দেরী হইয়া গেল, তিনি তাই আর
বাঁচিলেন না। আর কতক্ষণ মড়া কোলে করিয়া বসিয়া থাকিব
বাবা? তাই সৎকার করিতে আসিয়াছি। আর ঔষধ দিয়া কি
হইবে ? এই আগুনে ফেলিয়া দাও।”
ধনামনা কঁদিতে কাদিতে সমস্ত ঔষধ আগুনে ফেলিয়া দিয়া
ধন্বন্তরির বাড়ী গেল।
বাড়ী ফিরিয়া দেখে ধন্বন্তরি তখনাে মরে নাই। ধনামনা ত
অবাক! ধন্বন্তরি জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঔষধ আনিয়াছ ?”
ধনামনা যাহা পথে দেখিয়াছিল, সমস্ত বলিল। ধন্বন্তরি
বলিলেন, “বুঝিয়াছি, আর বাঁচিবার আশা নাই, তবে যদি যে

চাদ সদাগর আগুনে ঔষধ ফেলিয়াছ সেই স্থানের একটু ভস্মও আনিতে পার, তবেও হয়ত বাঁচিতে পারি। ধামনা তখনই ভস্ম আনিতে চলিল। কিন্তু গিয়া দেখিল, সেখানে কিছুই নাই, কেবল জলে জলময়। তাহারা ফিরিয়া আসিয়া ধন্বন্তরিকে সে কথা জানাইল। ধন্বন্তরি বলিলেন, “বুঝিলাম, আর আমার বাঁচিবার আশা নাই। আমি মরিলে আমার হাত পায়ের চারিটী নখ কাটিয়া তাহা মাটিতে পুতিয়া রাখিয়া জল দিও। আর আমার শরীরটা চারি খণ্ড করিয়া মাটিতে পুতিয়া রাখিও।” বলিতে বলিতে ধন্বন্তরি বিছানার উপর ঢলিয়া পড়িলেন। ধন্বন্তরির মৃত্যুর পর মনসা দেবী নেতাকে ডাকিয়া বলিলেন, “ধন্বন্তরি পথের কাঁটা ছিল, তাহাকে ত দূর করিয়াছি। এখন সহজেই চাদ সদাগরের অহঙ্কার চূর্ণ করিতে পারি। আমি এখন চাদের ছয় পুত্র বধ করিব।” নেতা বলিল,-“তুমি কি পাগল হইয়াছ? তুমি চাঁদের ছয়পুত্র মারিয়া কিছুই করিতে পারিবে না। সে মহাজ্ঞান মন্ত্র জানে, স্বয়ং মহাদেব তাহাকে সেই মন্ত্র শিক্ষা দিয়াছেন। তুমি এখন চাদের ছয়পুত্র মারিলে এখনই সে সেই মন্ত্রের বলে তাহাদিগকে বাঁচাইয়া তুলিবে। তুমি চাঁদের উপবন ভস্ম করিয়া দেখ, এখনই সে আবার তাহা বাচাইবে।” ১৪ চাদ সদাগর তখনই পদ্মাবতী তঁাহার ঊনকোটী সাপকে ডাকিলেন। যে যেখানে ছিল আসিয়া হাজির হইল। পদ্ম মাথায়, গলায়, নাকে, কাণে, কোমরে, পায়ে, হাতে সাপের অলঙ্কার পরিয়া সেই উনকোটী সাপ সাথে লইয়া রথে চড়িয়া চাদের বাগান বাড়ী নষ্ট করিতে চলিলেন, সখী নেতাও তাহার সঙ্গী হইল। চম্পক নগরে উপস্থিত হইয়া মনসা দেবী যেমন চঁাদের উপবনের দিকে চাহিলেন অমনি বাগান পুড়িয়া ছাই হইয়া গেল। আম, জাম, কাঠাল, পেয়ারা, কত নানাবিধ ফলের গাছে সাজান বাগান, তাহার চিহ্ন মাত্রও রহিল না, রহিল মাত্র কতকগুলি ছাই। রাখালেরা সেই বনের ধারে গরু চরাইতেছিল, তাহারা বাগান পুড়িতে দেখিয়া ছুটিয়া যাইয়া চাঁদ সদাগরকে সংবাদ দিল। চাদ পাত্র মিত্র লইয়া আসিয়া দেখেন তাহার অত সাধের বাগান পুড়িয়া ছাই হইয়া গিয়াছে। তঁাহার বুঝিতে বাকি রইল না যে, এ কাজ মনসা ছাড়া আর কাহারও নহে। চাদের মহাজ্ঞান মন্ত্র জানা ছিল, সেই মন্ত্রের বলে তিনি মরা বাঁচাইতে পারিতেন। চার মন্ত্র পড়িয়া যেই জল ছিটাইয়া দিলেন অমনি তাহার সেই ফল-ফুলে ভরা দিব্বি বাগানটী আবার বাঁচিয়া উঠিল। ইহা দেখিয়া পদ্মার বড়ই দুঃখ হইল, তিনি এত পরিশ্রম করিয়া চাদের বাগান ভস্ম করিয়া ফেলিলেন। কিন্তু চাদ তাহার মহাজ্ঞান- চাঁদ সদাগর মন্ত্রের বলে তাহা আবার বাঁচাইয়া তুলিলেন। পদ্মা রাগে দুঃখে জলিয়া সখী নেতার কাছে যাইয়া বলিলেন, “সখী এখন কি করি বল ? চাদের সাথে ত আর পারিলাম না।” নেতা বলিল, “তাহার মহাজ্ঞান যদি হরণ করিতে না পার তবে আর তাহাকে জব্দ করিতে পারিবে না। স্বয়ং মহাদেব তাহাকে এই মন্ত্র দিয়াছেন, সেই মন্ত্রের বলেই সে তােমাকে ঘৃণা করিতে সাহস করে! যতদিন চাদের মনে এই মহাজ্ঞান মন্ত্র থাকিবে ততদিন আর তুমি তাহার কোনও অনিষ্ট করিতে পারিবে না। যদি তাহার অহঙ্কার চুর্ণ করিতে চাও তবে আগে তাহার মহাজ্ঞান হরণ কর।* মনসা দেবী তখন সুন্দরী নর্তকীর বেশ ধারণ করিয়া যাইয়া চাঁদ সদাগরের ফুল-বনে উপস্থিত হইলেন। সদাগর তাহার রূপে মুগ্ধ হইয়া তাঁহাকে বিবাহ করিতে চাহিলে পদ্মা বলিলেন, আমি বিবাহ করিতে পারি। কিন্তু আমার এক অভিসম্পাত আছে, যে আমাকে বিবাহ করিবে তখনই তাহার মৃত্যু হইবে। শুনিয়াছি তুমি নাকি মহাজ্ঞান মন্ত্র জান, যদি বিবাহের পূর্বে আমাকে সেই মন্ত্র শিক্ষা দেও তবে তােমাকে বিবাহ করায় আমার কোনও আপত্তি নাই। কারণ তুমি মরিলে আমি তােমাকে আবার সেই মন্ত্রের বলে বাঁচাইতে পারিব। তারপর আর তােমার মরণ ভয় থাকিবে না, আমরা সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করিতে পারিব।”

৬
মনসাদেবী তখন নর্তকীর বেশ ধারণ করিয়া চাঁদসদাগরের ফল বনে
উপস্থিত হইলেন।
পৃঃ • ১৬

No text on this page.

চাঁদ সদাগর সদাগর সেই সুন্দরীকে বিবাহ করিবার লােভ সংরণ করিতে পারিয়া তাহাকে মহাজ্ঞান মন্ত্র শিখাইয়া দিলেন। মন্ত্র শিখিয়া দেবী সেই মন্ত্র পরীক্ষা করিবার জন্য একটা মাছি ধরিয়া সেটাকে মারিয়া ফেলিয়া আবার বাঁচাইয়া দেখিলেন, সদাগর সত্যসত্যই তাহাকে মহাজ্ঞান মন্ত্র দিয়াছেন কিনা। যখন দেখিলেন তাহার কাৰ্যোদ্ধার হইয়াছে, তখন তিনি নর্তকীর বেশ ছাড়িয়া পূৰ্বরূপ ধরিয়া আকাশের গায়ে মিলাইয়া যাইতে লাগিলেন। সদাগর বুঝিতে পারিলেন, এ সেই মনসা, তাহাকে জব্দ করিবার জন্যই দেবী এত কৌশল করিয়া মহাজ্ঞাণ হরণ করিয়া লইয়া গেলেন। আগে জানিলে মহাজ্ঞান দেওয়াত দূরে থাকুক, হেতালের লাঠীর ঘায়ে তাহার কোমর ভাঙ্গিয়া দিতেন। দেবী অদৃশ্য হইয়া যাইতে ছিলেন সদাগর রাগে দিশেহারা হইয়া তাহাকে ধরিবার জন্য সেই দিকে যেমন হাত বাড়াইলেন দেবী অমনি এক লাথি মারিয়া সদাগরের দুয়ী দাত ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। রক্তের স্রোতে চাঁদের বুক ভাসিয়া গেল। মনসার লাথিতে দাত ভাঙ্গিয়া চাঁদের বড়ই লজ্জা হইল, তিনি কি করিয়া লােক সমাজে মুখ দেখাইবেন? যে মনসা দেবীকে তিনি দুই চক্ষে দেখিতে পারে না, তাহারই লাথিতে তাহার দাত ভাঙ্গিয়া গেল। ছি, ছি, এ লজ্জার চেয়ে যে মরণও ছিল ভাল। সদাগরের দুর্দশা দেখিয়া শুয়ে থাকিয়া মনসা দেবী হাসিতে চাঁদ সদাগর লাগিলেন। তাঁহার হাসি দেখিয়া সদাগরের কাটা ঘায়ে যেন মুনের ছিটা পড়িল। তিনি দেবীকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে লাগিলেন, “আমার মহাজ্ঞান হরণ করিয়া লইয়া মনে করিয়াছিস্ কাণী, যে আমাকে আচ্ছা সাজা দিয়াছি-এখন বিপদে পড়িয়া আমি তাের পূজা করিব, কিন্তু সে কথা মনেও স্থান দিস্ না। যত দিন এ জীবন থাকিবে তত দিন আমার প্রতিজ্ঞা অটল।” মহাজ্ঞান হারাইয়া চন্দ্রধর পাগলের মত হইয়া গেলেন। মনসার উপর তাহার ক্রোধ পূৰ্ব্বাপেক্ষা আরও বৃদ্ধি পাইল। তিনি এখন যেখানে সাপ দেখেন সেই খানেই ছুটিয়া গিয়া লাঠির ঘায়ে তাহাকে মারিয়া ফেলেন। যেখানে মনসার পূজা হইতে দেখে সেখানেই যাইয়া পূজার ঘট, নৈবেদ্য, ফুল ইত্যাদি লাথি মারিয়া ফেলিয়া দিয়া আসেন। শেষে এমন হইয়া পড়িল যে, চধরের ভয়ে চম্পক নগরে কেহই আর মনসা পূজা করিরে সাহস করিতেন না। মহাজ্ঞান হারাইয়া চাঁদ সদাগর আরও দুর্দান্ত হইয়া উঠিলেন দেখিয়া পদ্মা নেতাকে বলিলেন, “দেখ, সই, আর ত চাঁদ সদাগরের অত্যাচার সহ্য করা যায় না। সে মানুষ হইয়া আমাকে এমন ঘৃণা করিবে। আর আমি দেবতা হইয়া নীরবে ভয়ে ভয়ে সে অত্যাচার সহ করিব? ভাবিয়াছিলাম, মহাজ্ঞান হারাইয়া সে কিছু শান্ত

চঁদ সদাগর
হইবে, কিন্তু এখন দেখিতেছি তাহার বিপরীত। এবার আমি
তাহাকে চরম শাস্তি দিতে আরম্ভ করিব, দেখি তাঁহার প্রতিজ্ঞা
সে কতদিনে রক্ষা করিতে পারে। পুত্ৰ-শােক সকল শশাকের
শ্রেষ্ঠ, এবার আমি যে কোনও মতে তাহার বংশ নষ্ট করিতে
আরম্ভ করিব। তুমি আমায় উপায় বলিয়া দাও সই।”
নেতা বলিল, “চঁদ সদাগরের ছয় পুত্র, তাহাদের এক একজন
একজন করিয়া মরিতে গেলে অনেক বিলম্ব হইয়া যাইবে। হাতে
ছয় জনকেই এক সঙ্গে মারিতে পার, তাহার একটা উপায়
করিতে হইবে। তাহাদের খাবার জিনিষের সঙ্গে যদি বিষ
মিশাইয়া দিতে পার তবেই অতি সহজে কাৰ্য সিদ্ধি হইবে।”
চাঁদ সদাগরের ছয়পুত্র পাঠশালায় পড়িতে যায়।
এক দিন
তাহারা তাহাদের সমপাঠীদিগকে জিজ্ঞাসা করিল, “তােমরা কি
খাইয়া পাঠশালে আস ভাই ?”
ছাত্রেরা বলিল, “আমরা ভাই পান্থা ভাত খাইয়া আসিয়াছি।”
সদাগরের ছেলেরা পান্থা ভাতের নাম শুনিয়া অবাক হইয়া
গেল। পান্থা ভাত আবার কি ? বড় লােকের ছেলে কি না? তাই
ভাের বেলা লুচী, মণ্ডা, সন্দেশ, ক্ষীর, সর খাইয়াই পাঠশালায়
যায়। পাস্থা ভাত খাওয়া ত দূরের কথা, নাম পৰ্যন্ত শশানে নাই।
তাহারা সহপাঠীদিগকে জিজ্ঞাসা করিল, “হ্যা ভাই, পান্তা ভাত
কাকে বলে ?”
১৯

চাঁদ সদাগর
ছেলেরা তাহাদিগকে পাস্থা ভাত কাহাকে বলে তাহা ভাল
করিয়া বুঝাইয়া দিল। সদাগর পুরাে বাড়ী যাইয়া তাহাদের মা
সনকাকে বলিল,-“মা, আমরা কাল সকালে পাস্থা ভাত
খাইব।”
সনকা ছেলেদের মুখে আজ এই কথা শুনিয়া পরম আহলাদিত
হইয়া পুত্রবধুদিগকে ডাকিয়া কহিলেন, “কাল ছেলেদের পান্তা ভাত
খাওয়ার ইচ্ছা হইয়াছে, আজ তােমরা যত্ন করিয়া রাঁধিয়া ভাতে
জল ঢালিয়া রাখিয়া দাও।”
বৌএরা পঞ্চাশ ব্যঞ্জন রাঁধিয়া ভাত রাঁধিল। তারপর
রাত্রিতে আহারাদি শেষ করিয়া ভাতে জল দিয়া ঢাকিয়া রাখিয়া
দিল।
নিঝুম নিস্তব্ধ গভীর রাত্রি। সকলেই নিদ্রায় অচেতন। চারি-
দিকে অন্ধকার ছম ছম করিতেছে। তখন মনসা দেবী তাহার
সাপদিগকে ডাকিয়া বলিলেন, “তােমরা সকলেই চাদ সদাগরের
নাম শুনিয়াছ। সে আমাকে যথেষ্ট লাঞ্ছনা দিতেছে।
সে সাপ
দেখিলেই তাহাকে মারিয়া ফেলে, কতশত সাপ যে সে এই ভাবে
মারিয়াছে তাহার সংখ্যা নাই। তাহার ভয়ে আমার কোনও সাপ
আর উত্তর রাজ্যে যাইতে পারে না। চাদকে ইহার প্রতিশােধ
দিতে
আমি চাঁদের ছয় পুত্রকে বধ করিবার ইচ্ছা
করিয়াছি। কাল সকালে তাহারা পাখা ভাত খাইবে। তােমরা
হইবে।

চাঁদ সদাগর আজই রাত্রিতে যাইয়া তাহাদের ভাতের হাঁড়িতে বিষ ঢালিয়া রাখিয়া আইস।” মনসা দেবীর আদেশ পাইয়া ভীষণ বিষধর সর্পেরা তখনই চন্দ্ৰধরের বাড়ীর দিকে ছুটিয়া চলিল। তাহারা এঘর ওঘর খুঁজিয়া রান্না ঘরে গিয়া পাখা ভাতের হাঁড়ি দেখিতে পাইল। পাছে কেহ শব্দ শুনিতে পায় এই ভয়ে তাহারা ধীরে ধীরে নিঃশকে হাঁড়ির সরা উঠাইয়া ভাতে বিষ ঢালিয়া দিয়া মনসার নিকট চলিয়া গেল। ভােরে ছয় ছেলের ছয় বৌ দুঃস্বপ্ন দেখিয়া জাগিয়া উঠিয়া সনকার কাছে যাইয়া কাদিয়া কাঁদিয়া সমস্ত কথা বলিল। সনকা তাহাদিগকে শান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, “স্বপ্ন কি কখনাে সত্য হয় বৌমা দুঃস্বপ্ন নিজের দেখিলে শত্রুর ফলে। এজন্য চিন্তা করিয়া মন খারাপ করিও না।” সদাগর পুত্রেরা ঘুম হইতে উঠিয়া হাত মুখ ধুইয়া মায়ের কাছে যাইয়া পাস্থা ভাত খাইতে চাহিল। সনকা বধূদিগকে ডাকিয়া ভাত বাড়িয়া দিতে বলিলেন। বৌএরা আসন পাতিয়া ভাত বাড়িয়া পরিবেশন করিতে লাগিল। ছয় ভাই মনের আনন্দে ভাত খাইতে বসিল। মনসার মায়ায় পাস্থাভাত তাহাদের কাছে এত ভাল লাগিল যে, জীবনে বুঝি তাহারা এমন খাদ্য আর কখন খায় নাই। তাহারা যেমন পেট ভরিয়া খাইয়া উঠিল অমনি তাহাদের সমস্ত শরীর বিষে অবসন্ন হইয়া আসিল। বেশীক্ষণ চাদ সদাগর আর তাহারা বসিতে পারিল না, দেখিতে দেখিতে অচেতন হইয়া ঢলিয়া পড়িল। মৃতপুত্র কোলে লইয়া সনকা মাথা কপাল কুটিয়া কাদিতে লাগিলেন। তাহার ও বধূদিগের হাহাকারে চম্পক নগর ভরিয়া উঠিল। চন্দ্ৰধর নীরবে বসিয়া চোখের জলে বুক ভাসাইতে লাগিলেন। গ্রামবাসীরা তাহাদের বাড়ীতে আসিয়া চন্দ্রধর, সনকা ও বধূদিগকে নানা ভাবে প্রবােধ দিতে লাগিল। চন্দ্ৰধরের বুঝিতে বাকি রহিল না যে, মনসা দেবীই তাহার এই সর্বনাশ করিয়াছেন। মড়া ছেলে কোলে লইয়া শােক করিয়া লাভ নাই। সাগর তাহার আত্মীয়দিগকে ডাকিয়া বলিলেন, “সাপের বিষে আমার ছেলেরা মারা গিয়াছে। ইহাদিগকে না পােড়াইয়া নদীর জলে ভাসাইয়া দাও।” আত্মীয়েরা সদাগরের কথা মত ছয় জনের মৃত দেহ নদীর জলে ফেলিয়া দিল। মনসা দেবী সেই মৃত দেহ গুলি নদী হইতে তুলিয়া লইয়া গিয়া নিজের কাছে রাখিয়া দিলেন । চন্দ্রধরকে দৈববাণী শুনাইলেন যে, যদি সদাগর তাহার পূজা করেন তবে ছয় পুত্র আবার বাঁচিয়া উঠিবে। সনকাও চক্রধরকে মনসার পূজা করিতে অনুরােধ করিলেন। চধর দৈববাণী শুনিয়া দাত কড়মড় করিতে করিতে বলিলেন, “কখখনাে না সনকা, যদি আমার যথা সৰ্বস্ব যায় তবু আমি কাণীর পূজা করিতে পারিব না। এই হাতে আমি শিব দুর্গার পদে এবং চঁদ সদাগর পুস্পাঞ্জলি দেই, কোনও মতেই আর এই হাতে এই পরাণে অন্য কাহারও পূজা করিতে পারিব না। শিবদুর্গা আমাদের মঙ্গল করিবেন।” মনসা দেবীকে পূজা করিবার জন্য সনকার মন বড়ই অস্থির হইয়া উঠিল। কিন্তু স্বামীর ভয়ে বাড়ীতে পূজা করিতে সাহস করিলেন না। বাড়ীতে পূজা করিতে বসিলে স্বামী নিশ্চয় পূজা নষ্ট করিয়া দিবেন, এই জন্য তিনি পূজার সমস্ত সামগ্রী লইয়া চন্দ্রধরের অজ্ঞাতসারে এক বনে প্রবেশ করিয়া পূজা করিতে লাগিলেন। পূজা করিতে করিতে তাহার মনে পড়িল, রক্ত ব্যতীত মনসা দেবীর পূজা ত হয় না। কিন্তু এই বনে এখন তিনি ছাগ বা মহিষ কোথায় পাইবেন ? তখন তিনি একখানা ধারাল অস্ত্র দিয়া নিজের ডানহাত কাটিয়া সেই রক্তে দেবীর পূজা শেষ করিলেন। মন দেবী তাহার ভক্তিতে পরম সন্তুষ্ট হইয়া স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হইয়া তাহাকে আশীর্বাদ করিলেন। সনকা বনে পূজা করিতেছেন এমন সময় চাঁদ সদাগর বাড়ী আসিয়া সনকাকে দেখিতে না পাইয়া দাসীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন। দাসীরা প্রথমে কিছু বলিতে চাহিল না, কিন্তু শেষে যখন সদাগর তাহার সেই হেঁতালের লাঠী দিয়া তাহাদের মাথা ভাঙ্গিতে চাহিলেন চাঁদ সদাগর সাজাইয়া পূজা তখন তাহারা ভয়ে ভয়ে সত্য কথা বলিয়া ফেলিল। তিনি সেই কথা শুনিয়াই তৎক্ষণাৎ লাঠী হাতে করিয়া বনে ছুটিয়া গিয়া দেখেন, সত্য সত্যই সনকা ঘট বসাইয়া দীপ ধূপ আলিয়া ফুল নৈবেদ্য করিতেছেন । সদাগর প্রথমেই ঘটের উপর হেতালের লাঠী দিয়া এক ঘা মারিলেন, তারপর ঘট, দীপ, ধূপ, ফুলও নৈবেদ্য সমস্তই লাথি মারিয়া সাগরের জলে ফেলিয়া দিয়া সুনকার চুলের গােছ ধরিয়া টানিতে টানিতে বাড়ীতে লইয়া আসিলেন। পদ্মাবতী চন্দ্ৰধরের হাতের লাঠীর ঘা খাইয়া বড়ই অপমানিত হইয়া নেতার কাছে গিয়া কহিলেন, “দেখিলি সই, চাদের অহঙ্কার ত এখনাে কমিল না। তাহার মহাজ্ঞান হরণ করিলাম, অমন ছয় ছয়টী সােণার চাদ ছেলে মারিলাম, তবু ত তাহার বড়াই কমিল না এখন কি করি বল দেখি ?” নেতা বলিল, “যদি তুমি মর্ত্তে তােমার পূজার প্রচার করিতে চাও তবে আজ রাত্রিতে চম্পক নগরে যাইয়া ঝালু মালু নামে যে দুই জেলে আছে তাহাদের মাকে স্বপ্ন দেখাও।” রাত্রিতে মনসা দেবী রথ সাজাইয়া চম্পক নগরে চলিলেন। ঝালু মালুর মা ঘুমাইয়া আছে। দেবী তাহার শিয়রে গিয়া স্বপ্ন দেখাইলেন,—“ঝালুর মা, ওঠ, চক্ষু মেলিয়া চাও, এই দেখ, আমি মনসা দেবী তােমাকে বর দিতে আসিয়াছি। চাঁদ সদাগরের স্ত্রী সনকা আমার পূজা করিয়াছিল, সেই পূজার ঘট চাঁদ সদাগর ২৪ • চাদ সদাগর সমুদ্রের জলে ফেলিয়া দিয়াছে! তােমার ছেলেরা যেন কাল সমুদ্রে জাল ফেলিতে যায় ; জালে সেই ঘট উঠিলে তাহা আনিয়া তােমাদের ঘরে স্থাপন করিয়া ভক্তি ভরে পূজা করিও। তােমার ছেলেরা ধনে পুত্রে লক্ষ্মীবন্ত হইবে।” স্বপ্ন দেখিয়াই ঝালু মালুর মা তাড়াতাড়ি শয্যা ছাড়িয়া উঠিয়া ছেলেদিগকে ডাকিয়া তুলিয়া বলিল, “আজ তােমরা জাল লইয়া সমুদ্রে যাও। আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি, তােমরা আজ যথেষ্ট বড় বড় মাছ পাইবে।” মায়ের কথায় দুই ভাই পান্তা খাইয়া নৌকা সাজাইয়া জাল লইয়া সমুদ্রে গেল। সারাদিন গেল, সন্ধ্যা হয় হয়, কিন্তু তবু তাহারা কিছু মাছই পাইল না দেখিয়া মায়ের উপর তাহাদের খুবই রাগ হইল। এমন সময় মনসা দেবী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশ ধরিয়া সমুদ্রের তীরে আসিয়া তাহাকে পার করিয়া দিবার জন্য ঝালু মালুকে ডাকিতে লাগিলেন। প্রথমে তাহারা দেবীর কথায় কর্ণপাতও করে নাই। তাহার পর দেবীর অনেক কাকুতি মিনতিতে তাহার যেমন সঁহাকে নৌকায় তুলিয়া লইল অমনি নৌকাখানি সােনার হইয়া গেল এবং জালের সাথে সেই ঘট উঠিল। ঝালু মালু আশ্চৰ্য্য হইয়া দেবীর পায়ে ধরিয়া কাদিতে লাগিল, দেবী তাহ- দিগকে ঘট লইয়া বাড়ী যাইয়া তাহা পূজা করিতে বলিয়া অদৃশ্য হইয়া গেলেন। ২৫

চাদ সদাগর
এদিকে সন্ধ্যা হয় দেখিয়া ঝালু-মালুর মা সাগরের কূলে আসিয়া
ছেলেদের অপেক্ষায় দাড়াইয়া রহিয়াছে। তাহাদের নৌকা তীরে
আসা মাত্র সে ছেলেদিগকে জিজ্ঞাসা করিল, “দেখি বাবা আজ কি
পাইলে ?”
ঝালু রাগের মাথায় সেই মনসার ঘটটী মায়ের সম্মুখে ধরিয়া
বলিল, “সারা দিনে পাইয়াছি এই তােমার বাপের মাথা।”
ঘট দেখিয়া পরম
আহলাদিত হইয়া বুড়ী কহিল, “রাগ
করিও না বাবা, চল বাড়ী যাই। এই ঘট পূজা করিয়াই তােমরা
ধনে পুত্রে লক্ষ্মীবন্ত হইবে।”
ঝালু মালু ঘট লইয়া বাড়ী যাইয়া মহা সমারােহে দেবীর পুজার
আয়ােজন করিল। শুভদিনে শুভ লগ্নে নূতন মন্দিরে লক্ষ টাকা
ব্যয় করিয়া তাহারা মনসা দেবীর পূজা করিল। তাহাদের পূজায়
সন্তুষ্ট হইয়া দেবী কহিলেন, “চাদ সদাগরের মত তােমাদেরও ধন
সম্পদ বৃদ্ধি পাইবে। আর তােমরা কি বর চাও বল।”
ঝালু মালু বলিল, “আমরা আর কোনাে বর চাই না মা,
জন্মে জন্মে যেন আমরা তােমার পূজা করিতে পারি এই মাত্র
চাই।”
দেবী বলিলেন,—তাহাই হইবে।”

চাঁদ সদাগর ঝাল মালু সমূদ্রে জাল ফেলিয়া মনসা দেবীর ঘট পাইয়াছে, এবং যে যেই মানস করিয়া সেই ঘটের কাছে যাইয়া বর চায় সে-ই সে বর পায়, একথা সারা রাজ্যময় রাষ্ট্র হইল। দেশ দেশান্তর হইতে কত লােক আসিয়া ঘটে পূজা করিয়া যাইতে লাগিল। ক্রমে চাঁদ সদাগরের কাণেও এই কথা গেল। তখনই তিনি হেতালের লাঠী লইয়া ঝালু মালুর বাড়ীতে মনসার মন্দিরে গিয়া উপস্থিত হইলেন। মনসা দেবী চাদকে দেখিয়াই প্রমাদ গণিয়া তাহার ঘট লুকাইয়া রাখিলেন। চাদ ঘট না দেখিতে পাইয়া মনের ক্রোধে মনসাকে গালি দিতে দিতে বাড়ী চলিয়া আসিলেন। মনসা দেবী নেতাকে বলিলেন, “দেখিলি নেতা, চাদের অহঙ্কার ? এত করিয়াও তাহার গৰ্ব চূর্ণ করিতে পারিলাম না। সনকা চির- কালই আমার ভক্ত, আমি চধরের অপরাধে সনকার ছয়পুত্র মারিয়া তাহার কোল শূন্য করিয়াছি। এবার আমি সনকাকে পুত্রবর দিব।” মনসার কথায় নেতা হাসিয়া বলিল, “বেশ ত! তুমি সনকার মাসীর রূপ ধরিয়া তাহার কাছে যাইয়া তাহাকে ঝাল মালুর বাড়ী গিয়া বর আনিতে বলিও।” মনসা দেবী বুড়ী সাজিয়া সনকার কাছে যাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাকে চিনিতে পারিলে কি সনকা ? আমি যে তােমার মাসী হই। অনেক দিন দেখাশুনা নাই তাই চিনিতে পারিতেছ না।"

চাঁদ সদাগর সনকা মাসীকে প্রণাম করিয়া বসিতে দিয়া পান আনিয়া দিল। মনসা দেবী পান খাইতে খাইতে কহিলেন, “তুমি ত ছয় ছেলের মা ছিলে। কপাল দোষে আজ তােমার কোল শূন্য। পথে আসিতে আসিতে শুনিলাম, ঝালু মালু মনসার ঘট পাইয়াছে, যে সেই ঘট পূজা করে মনসা দেবী তাঁহার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। তুমি বাছা একবার সেখানে গিয়া মনসা দেবীর পূজা করিয়া পুত্ৰবর চাহিয়া আস, দেবী নিশ্চয়ই তােমায় দয়া করিবেন।” মাসীর কথায় সনকার একবার ঝালু মালুর বাড়ী যাইয়া মনসা দেবীর পূজা করিয়া আসিবার খুবই ইচ্ছা হইল। তিনি সমুদ্র স্নানের নাম করিয়া কাপড় গামছার মধ্যে ফুল ও নৈবেদ্য লুকাইয়া লইয়া দেবীর পূজার জন্য চলিলেন। স্নান করিয়া দেবীর সেই ঘটের সম্মুখে দীপ ধূপ ফুল চন্দন ও নৈবেদ্য সাজাইয়া একমনে ভক্তিভরে পূজা করিয়া বর চাহিলেন, “মা আমার যেন একটা ছেলে হয়, আমায় এই বর দাও মা।” মনসা দেবী সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, “তােমায় পুত্রবর দিলাম, ছেলে হইলে তাহার নাম লক্ষীন্দর রাখিও, কিন্তু ছেলে হওয়া মাত্ৰই তাহার মৃত্যু হইবে।” সনকা হাত জোড় করিয়া বলিল, “তাহলে আমার অমন বরে দরকার নাই মা, তুমি ও বর ফিরাইয়া লও।” দেবী কহিলেন,“আচ্ছা ছেলের কর্ণভেদের সময় তাহার মৃত্যু হইবে। ২৮

চাদ সাগর
সনকা বলিলেন, “অমন বরে আমার দরকার নাই।”
দেবী বলিলেন, “তুমি বর নাও সনকা, অন্নপ্রাসনের সময় ছেলের
মৃত্যু হবে।”
সনকা তবু বর লইতে স্বীকার করিলেন না দেখিয়া মনসা দেবী
কহিলেন, “আচ্ছা তবে বিবাহের সময়েই
মৃত্যু
হইবে।”
সনকা বলিলেন, “ছেলে হইল যদি আবার পুত্রশােক সহ
করিতে হয় তবে আর অমন বর দিয়া আমার কি কাজ মা, আমার
বরে প্রয়ােজন নাই, তুমি বর ফিরাইয়া লও মা।”
নেতা দেখিল মহা বিপদ। হয়ত দেবী শেষে সনকাকে ছেলের
দীর্ঘ জীবনের বর দিয়াই বসিবে, তখন সে সনকাকে কহিল, “তুমি
কা, বর নিতে অত আপত্তি করিতেছ কেন? না হয় ছেলের
বিবাহ দিও না, তাহা হইলে ত আর ছেলে মরিবে না। দেবী
তােমাকে যেই বর দিতেছেন তুমি হাত পাতিয়া সেই বরই লও।”
নেতার কথায় সনকা আর আপত্তি না করিয়া আঁচল পাতিয়া
ভক্তিভরে দেবীর দেওয়া বর লইলেন। বর দিয়া পদ্মাবতী কহিলেন,
“তােমার পুত্র হইতেই আমার সহিত চলধরের বিবাদের শেষ
হইবে। কিন্তু একটা কথা আমি তােমাকে বলিয়া দেই—বিবাহ
রাত্রিতে সর্প দংশনে তােমার পুত্রের মৃত্যু ঘটিবে, ইহার অন্যথা হইবে
সনকা বলিলেন, “মা, এ ত বর নয়, এ যে অভিশাপ। এমন
২১

চঁদ সদাগর
সর্বনাশের বর দিয়া আমার কি হইবে? তুমি বর ফিরাইয়া লও
মা, পুত্রশােক আর আমি সহিতে পারিব না।”
মনসা দেবী আর কোনও কথা না বলিয়া অন্তর্হিত হইয়া
গেলেন। সনকা ভাবিতে ভাবিতে বাড়ী ফিরিলেন।
একদিন অনিরুদ্ধ ও উষা, স্বামী স্ত্রী দুইজনে পাহাড়ের উপর
বেড়াইতেছিলেন। এমন সময় তাহারা সনকার কান্না শুনিতে
পাইলেন। উষা অনিরুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আচ্ছা এমন কি
কোনাে উপায় নাই যাহাতে সনকা পুত্ৰশােক ভুলিয়া যাইতে পারে ?”
অনিরুদ্ধ বলিলেন, “আছে বই কি? যদি সনকার একটা ছেলে
হয় তবেই সে অনেকটা শান্তি পাইবে। শােন উষা, আমার ইচ্ছা
হয়, আমি যাইয়া সনকার ছেলে হইয়া জন্মগ্রহণ করি, আর তুমি
যাইয়া সাহু বেণিয়ার গৃহে মেয়ে হইয়া জন্মগ্রহণ কর। তারপর
আমাদের দুজনের বিবাহ হয়, এবং কিছুদিন আমরা পৃথিবীতে ঘর
সংসার করিয়া আবার স্বর্গে ফিরিয়া আসি।”
ঊষা বলিলেন, “তাহলে বেশ হয় কিন্তু। পৃথিবীটাও বেশ
ভাল করিয়া দেখা হয় আর সনকাও শােকে শান্তি পায়।”
অনিরুদ্ধ বলিলেন, “তােমার বুঝি আর স্বর্গ ভাল লাগে না
উষা ?”

চঁদ সদাগর উষা হাসিয়া উত্তর করিলেন, “কেন লাগিবে না? তুমি আগে কথাটা তুলিলে তাই আমিও বলিলাম।” ১০ সনকাকে বড় দিয়া মনসার চিন্তা হইল, কার কোল শূন্য করিয়া আনিয়া আবার সমকার কোলে ছেলে দিবেন? নেতার নিকট পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিলেন। নেতা বলিল, “সেজন্য ভাবিও না। সে দিন আমি উষা ও অনিরুদ্ধের কথা বার্তা শুনিয়াছি। অনিরুদ্ধ সনকার ছেলে হইয়া জন্ম লইতে চায়। আজ শিবের সভায় উষা ও অনিরুদ্ধ নৃত্য করিবে। তুমি এখনই সেখানে যাও, যাইয়া উষা ও অনিরুদ্ধকে পৃথিবীতে জন্ম লইবার ব্যবস্থা কর।” দেবী তখনই সারা অঙ্গে সাপের গহনা পরিয়া সাপের রথে চড়িয়া মহাদেবের সভার উদ্দেশ্যে যত্ৰা করিলেন। শিবের সভা। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, ই,, চন্দ্র, বরুণ ইত্যাদি দেবগণ সভা আলাে করিয়া বসিয়া আছেন। সভায় অনিরুদ্ধ গান গাহিতেছেন, আর উষা নৃত্য করিতেছেন। দেবগণ তন্ময় লইয়া নৃত্য গীত দেখিতেছেন, এমন সময় মনসা দেবী সেখানে যাইয়া উপস্থিত হইলেন। দেবগণ তাঁহাকে অমন বেশ ভূষা করিয়া সহসা সভায় আসিয়া উপস্থিত হইতে দেখিয়া অবাক হইয়া গেলেন।

চঁদ সদাগর তাহাদের খুব ভয় হইল, আজ না জানি মনসা কাহার কোন অনিষ্ট করিয়া বসেন। উষা তালে তালে পা ফেলিয়া নৃত্য করিতেছেন, দেবতারা নৃত্য দেখিতে দেখিতে তন্ময় হইয়া গিয়াছেন। এমন সময় মনসার চোখের বিষ-দৃষ্টি যাইয়া উষা এবং অনিরুদ্ধের উপর পড়িল । তাহারা বিষের জ্বালায় অস্থির হইয়া উঠিলেন, নৃত্যের তাল কাটিয়া গেল। দেবতারা সকলেই ইহাতে বিরক্ত হইয়া উঠিলেন। অমন নাচ গান হঠাৎ থামিয়া গেলে কাহার না বিরক্তি হয়। মহাদেব ক্রোধে জ্ঞান হারা হইয়া উষা ও অনিরুদ্ধকে অভিসম্পাত দিলেন, আমি ভস্ম মাখিয়া শ্মশানে মশানে থাকি, ভিক্ষা করিয়া খাই, এই জন্য বুঝি আমার সম্মুখে নৃত্য করিতে তােমাদের ঘৃণা হয় ? আমি অভিশাপ দিতেছি তােমাদের এই অহঙ্কারের জন্য তােমরা যাইয়া পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ কর। কাল পূর্ণ হইলে আবার স্বর্গে ফিরিয়া আসিবে।” মহাদেবের অভিশাপ শুনিয়া উষা এবং অনিজের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হইল। এমন সুখের স্থান স্বর্গ ছাড়িয়া তাহাদিগকে দুঃখ কষ্ট সহ্য করিবার জন্য পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিতে হইবে। তাঁহারা উভয়ে শিবের চরণ ধরিয়া কাঁদিয়া বলিলেন, “আমাদিগকে আপনি এমন অভিসম্পাত দিলেন মহেশ্বর ? আমাদের ত কোনই অপরাধ নাই, আমরা ইচ্ছা করিয়া নৃত্য পরিত্যাগ করি নাই, মনসা চাঁদ সদাগর দেবী আজ নিশ্চয় কোনও অভিসন্ধি লইয়া সভায় আসিয়াছেন। তাহারই দৃষ্টিতে আমাদের সর্বশরীর আচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছিল, সেই জন্য আমরা নৃত্য করিতে পারি নাই। আমাদিগকে ক্ষমা তাহাদের কথায় শিবের প্রাণে দয়া হইল। তিনি তখন সমস্ত ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া মনসা দেবীকে জিজ্ঞাসা করিলেন। মনসা দেবী বলিলেন, “চম্পক নগরের সদাগর চন্দ্ৰধর আমার পূজা-ত করেই না বরং আমাকে যারপর নাই অপমান করে। যেখানে আমার পূজার কথা শােনে সেই খানেই যাইয়া সে হেতালের লাঠীর ঘায়ে আমার পূজার ঘট ভাঙ্গিয়া ফেলে। অধরের ভয়ে এখন আর কেহ আমার পূজা করিতে চায় না। সাপ দেখিলেই সে তাহা মারিয়া ফেলে। মানুষের হাতে দেবতার এমন অপমান আর কি সহ হয় বাবা? তাই আমি সেই অপমানের প্রতিশােধ হওয়ার জন্য প্রথমে তাহার মহাজ্ঞান হরণ করিয়াছি, কিন্তু তাহাতেও তাহার দর্প চূর্ণ না হওয়ায় শেষে তাহার ছয় পুত্রকে মারিয়াছি। চাঁদসদাগরের স্ত্রী সনকা আমার পরম ভক্ত, বাল্যকাল হইতে সে আমার পূজা করে। ছয় পুত্র হারা হইয়া সে এখন পাগলের মত হইয়াছে, কিন্তু তবু আমার পূজা পরিত্যাগ করে নাই। স্বামীর ভয়ে সে লুকাইয়া লুকাইয়া আমার পূজা করিতেছে। আমি তাহার পুত্র শােক সহ করিতে না পারিয়া তাহাকে পুত্র বর দিয়াছি। ৩ চঁদ সদাগর অনিরুদ্ধকে সনকার পুত্র-রূপে জন্ম গ্রহণ করাইবার জয় আজ আমি আপনার এখানে আসিয়াছি। অনিরুদ্ধ চাঁদ সদাগরের এবং উষা সাহ বেণিয়ার ঘরে জন্ম লইবে। আমার কাৰ্য্য উদ্ধার হইলে আমি আবার তাহাদিগকে স্বর্গে ফিরাইয়া আনিব। তুমি আমায় এই জন্য ক্ষমা কর বাবা। মেয়ের অপমান দেখিয়া কি তােমার একটুও দুঃখ হয় না?” শিব আর কি করেন ? মেয়ের আকার, রক্ষা না করিয়া উপায় নাই। তিনি মনসা দেবীকে বলিলেন, “অনিরুদ্ধ ও উষাকে আমি বড় ভালবাসি। হঠাৎ, আমি তাহাদিগকে একটি অভিসম্পাত দিয়া ফেলিয়াছি। তােমার অনুরােধ রক্ষা না করিয়া পারিলাম না। কিন্তু তাহাদের অভাবে আমার বড় কষ্ট হইবে। যাহা হউক, তাহাদিগকে আমি তােমার হাতে সঁপিয়া দিলাম। দেখিও, পৃথিবীতে যাইয়া যেন তাহারা কোনও প্রকার কষ্ট না পায়। যদি আমার কথা শুনিয়া তাহাদিগকে কষ্ট দেও তবে তােমার সঙ্গে আর আমার কোনই সম্পর্ক থাকিবে না, ইহা মনে রাখিও পদ্মাবতি। পদ্মাবতী বলিলেন, “সে জন্য তােমার কোনও চিন্তা নাই বাবা। আমি সর্বদা তাহাদের প্রতি দৃষ্টি রাখিব।” মহাদেব উষা ও অনিরুদ্ধকে বলিলেন, “ভাবিয়া চিন্তিয়া আর কি করিবে? তােমাদের অদৃষ্ট মন্দ, নতুবা এতকাল তােমরা আমার সভায় নৃত্য কর আজ সহসা এমন হইবে কেন ? অভিসাপ যখন ৩৪ চঁদ সদাগর দিয়া ফেলিয়াছি তখন আর ফিরাইয়া লইবার সাধ্য নাই। মর্ত্যে যাইয়া তােমাদের কোনও দুঃখ হইবে না, আমি পদ্মাবতীর হাতে তােমাদিগকে সপিয়া দিলাম । আশীর্বাদ করি, তােমরা সুখী উষা মনসা দেবীকে বলিলেন, “তােমার কথায় কোনও বিশ্বাস নাই, তুমি যখন বিনা অপরাধে আমাদের এমন সর্বনাশ করিতে পারিলে, তখন এমন কাজ নাই যাহা তুমি পার না। যদি তুমি এই দেবগণের সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করিতে পার যে, যখন আমরা বিপদে পড়িয়া তােমাকে ডাকিব তখনই তুমি আমাদের নিকট উপস্থিত হইয়া আমাদিগকে রক্ষা করিবে, আর আমি মর্ত্যে যাইয়া সময় মত তােমার কাছে দুইটি বর চাহিব, তখন তুমি অকপটে আমাকে সেই বর দিবে, তাহা হইলে আমরা তােমার সাথে যাইয়া পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করিতে পারি।” পদ্মাবতী দেবগণের সম্মুখে তিন সত্য করিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন। উষা ও অনিরুদ্ধ দেবগণকে প্রণাম করিয়া মনসার রথে চড়িয়া তাহার সহিত চলিলেন। পদ্মাবতী তাহাদিগকে লইয়া আসিয়া নেতাকে বলিলেন “এই নাও নেতা, আমি শিবের অনুমতি লইয়া উষা ও অনিরুদ্ধকে আনিয়াছি। এখন ইহাদের দ্বারা আমার আশা পূর্ণ করিব। তুমি ৩৫ চাঁদ সদাগর নাগদিগকে লইয়া গিয়া মন্দাকিনী তীরে অগ্নকুণ্ড সাজাও। ইহারা সেই অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করিয়া দেব-শরীর পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সংসারে জন্মগ্রহণ করিবে।” মনসার কথায় নেতা নাগদিগকে লইয়া মন্দাকিনী তীরে যাইয়া শাল, পীয়াল, চন্দন প্রভৃতি শুষ্ক কাষ্ঠ দ্বারা প্রকাণ্ড অগ্নকুণ্ড সাজাইল। তারপর তাহাতে ভড়ে ভাঁড়ে ঘৃত ঢালিয়া আগুন ধরাইয়া দিল। হু হু করিয়া আগুন জ্বলিয়া উঠিল। উষা ও অনিরুদ্ধ স্নান করিয়া নূতন কাপড় পরিয়া ফুলের মালা গলায় দোলাইয়া গায়ে চন্দন অগুরু মাখিয়া আসিয়া অগ্নিকুণ্ডের সম্মুখে দাড়াইলেন। প্রথমে উষা অগ্নির স্তব পাঠ করিয়া সাতবার অগ্নি, প্রদক্ষিণ করিয়া তাহার শরীরের এক এক স্থান হইতে মাংস কাটিয়া আগুনে ফেলতে লাগলেন। ঊষার ফুলের মত কোমল শরীর বাহিয়া রক্তের ধার দর দর করিয়া বহিতে লাগিল। দেবতারা স্বর্গ হইতে ইহা দেখিয়া অবাক হইয়া গেলেন। সন্তুষ্ট হইয়া সেই অগ্নি কুণ্ড হইতে এক দিব্য পুরুষ বাহির হইয়া আসিলেন। ইনিই অগ্নিদেব। তিনি উষাকে বলিলেন, “মা উষা, আমি অগ্নিদেব। আমি তােমার ভক্তিতে সন্তুষ্ট হইয়া বর দিতে আসিয়াছি। যে বর ইচ্ছা চাহিয়া লও।” উষা অগ্নিদেবকে প্রণাম করিয়া কহিলেন, “দেব, আমরা মহাদেবের সাপে সংসারে জন্ম লইতে যাইতেছি। আপনি আমাকে উষার শুবে

চাদ সদাগর
;
বর দিন যেন আমি পৃথিবীতে জন্মিয়াও এ জন্মের কথা স্মরণ করিতে
পারি, আর আমরা স্বামী স্ত্রী যেন পৃথক না হই।”
অগ্নিদেব বলিলেন, “তাহাই হইবে মা। আমার বরে তুমি
পৃথিবীতে একজন প্রধান সতী বলিয়া সম্মান লাভ করিবে; মরা
বাচাইতে পারিবে এবং হারাধন ফিরিয়া পাইবে। তুমি সােণা,
রূপা, তামা, লােহা যে কোনও ধাতুই কেন আগুণে জাল না দাও
আমার বরে তাহা অতি শীঘ্র গলিয়া যাইবে। এসব কথা কখনও
পৃথিবীতে যাইয়া কাহারও নিকট প্রকাশ করিও না।”-এই বলিয়া
অগ্নিদেব আবার সেই আগুণের কুণ্ডে বিলীন হইয়া গেলেন।
উষা ও অনিরুদ্ধ দেবতাগণের উদ্দেশ্যে প্রণাম করিয়া এক
সাথে আগুণের কুণ্ডে প্রবেশ করিলেন। আগুন আরও ধূ ধূ
করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। নাগগণ কলসে কলসে ধৃত আনিয়া আগুনে
ঢালিয়া দিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে উষা ও অনিরুদ্ধের শরীর
পুড়িয়া ভস্ম হইয়া গেল।
অনেক দিন যাবৎ চাঁদ সদাগর বাণিজ্যে যান নাই। তাই
তাহার ইচ্ছা হইল, একবার বাণিজ্যে যাইবেন। তিনি তাহার
চাকর ধনাকে সূতার মিস্ত্রী জাকিয়া আনিতে বলিলেন। সূতার ও
মিন্ত্রী আসিলে তিনি তাহাদিগকে সমুদ্রে বাণিজ্যে যাওয়ার উপযুক্ত
নৌকা প্রস্তুত করিতে বলিয়া দিলেন।
৩৭

চাঁদ সদাগর
সনকা যখন শুনিলেন সদাগর আবার বাণিজ্যে যাইবেন, তখন
তাহার মনটা যেন একটা ভয়ে ভরিয়া উঠিল। তিনি সাগরকে
বলিলেন, “সংসারে ত আমাদের আর কেহ নাই, আমরাই মাত্র
দুইটী প্রাণী। ভগবানের কৃপায় আমাদের যে টাকা পয়সা আছে
তাহাতেই বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে চলিয়া যাইবে। আবার বাণিজ্যে
যাইয়া দরকার কি? আমাদের আর ধন রত্নের আবশ্যক নাই।
নদীতে সাগরে ঝড়ে বৃষ্টিতে কষ্ট না করিয়া ঘরে বসিয়া ভগবানের
নাম করাই ভাল।”
সদাগর বলিলেন, “অনেক দিন যাবৎ বাণিজ্যে যাই না, তাই
একবার যাইতে ইচ্ছা হইয়াছে। কতকাল আর ঘরে বসিয়া খাইব ?
ঘরে বসিয়া খাইলে রাজার ভাণ্ডারও ফুরাইয়া যায়। তুমি ত
বােঝ না সনকা, টাকা পয়সা, ধন দৌলত কাহারও কোনও দিন
বেশী হয় না।”
সনকা বলিলেন, “সমুদ্রে বাণিজ্য করিতে যাওয়া, সে যে বড়
বিপদের কথা। পথে চোর দস্যু, ঝড় বৃষ্টির ভয়। আমি এবার
বড় দুঃস্বপ্ন দেখিয়াছি, তুমি বানিজ্যে যাইও না। তােমার কোষ্ঠীতে
এ সময়টা ভাল বলিয়া লেখা নাই। যদি যাইতেই হয়, তবে
কিছুদিন পরে যাইও।”
সনকার কথায় সদাগর হাসিয়া বলিলেন, “স্বয়ং শিবদুর্গা
আমার সহায় সমকা, কার সাধ্য আমার অনিষ্ট করে ? তুমি মনে

চঁদ সদাগর কোনও ভয় করিও না। আমাকে এবার বাণিজ্যে যাইতেই হইবে।” সনকা আর কোনও উত্তর দিলেন না। সাগর কহিলেন, “সনা, এ গর্ভে যদি তােমার ছেলে হয় তবে তাহার নাম লক্ষ্মীন্দর আর মেয়ে হইলে তাহার নাম শশিকল রাখিও। বাণিজ্য হইতে ফিরিয়া আসিতে আমার সাত আট বৎসর লাগিতে পারে। ছেলে হইলে তাহাকে ভালরূপ লেখাপড়া শিক্ষা দিও। সদাগরের বাণিজ্যে যাত্রার চৌদ্দ ডিঙ্গা নির্মিত হইল। তিনি ব্রাহ্মণ ডাকিয়া যাত্রার জন্য শুভদিন ধার্য করিলেন। বাণিজ্যের যত দ্রব্য সাত ডিজায় ভরা হইল। তারপর শুভদিনে শুভ লগ্নে সদাগর শিবদুর্গা নাম জপ করিতে করিতে যাইয়া নৌকায় উঠিলেন। মাঝীরা বদর বদর বলিয়া নৌকা ছাড়িয়া দিল। চৌদ্দ ডিজা মধুকর লইয়া চঁদ সদাগর দক্ষিণ পাটনে বাণিজ্যে চলিলেন। সদাগরের চৌদ্দ ডিঙ্গা মধুকর পাল তুলিয়া সারি দিয়া নদী বাহিয়া চলিয়াছে। সেই নদীর ধারে ঝালু মালুর মনসার মন্দির। ঝালু মালু মহা ধুমধাম করিয়া মনসার পূজা করিতেছিল। এমন সময় চাঁদ সদাগরের নৌকার বহর যাইয়া সেখানে পৌছিল।

চঁদ সদাগর সদাগর ঝালুকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখানে কিসের মন্দির ? তােমরা কোন্ দেবতার পূজা করিতেছ?” ঝালু বলিল, “এটা মনসা দেবীর মন্দির। আমরা তাহারই পূজা করিতেছি। যে এই দেবীকে ভক্তিভরে পূজা করে তাহার সমস্ত বাসনা পূর্ণ হয়। আপনি বাণিজ্যে চলিয়াছেন, দেবীকে ভক্তিভাবে পূজা করিয়া যান, দেখিবেন আপনার চতুগুণ লাভ হইবে।” মনসার নাম শুনিয়া চাঁদ সদাগর তখনই হেতালের লাঠী হাতে লইয়া তীরে লাফাইয়া উঠিলেন। মন্দিরে ঢুকিয়া তিনি ফুলে বেলপাতায় ঢাকা সিন্দুর মাখা মনসার ঘট দেখিতে পাইয়া লাঠীর ঘায়ে তাহা চুর্ণ করিয়া ফেলিলেন। ঝালু মালু এই ব্যাপার দেখিয়া ভয়ে পলাইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না, সাগর তাহাদের দুই ভাইকে বন্দী করিয়া নৌকার উপর আসিয়া বুকে পাথর চাপা দিয়া ফেলিয়া রাখিলেন। তাহাদের মুখে ঝলকে ঝলকে রক্ত উঠিতে লাগিল। কিছু দূর যাইয়া সদাগর তাহাদিগকে ছাড়িয়া দিলেন। সেখান হইতে সদাগরের ডিঙ্গার বহর নানা দেশের মধ্য দিয়া নানা নদনদী বাহিয়া গিয়া শঙ্খনদীর বাকে উপস্থিত হইল। সেখানে কেবল শখের বাস। সমস্ত শব্দেরা নৌকার শব্দ পাইয়া জলের উপর নৌকার চারিধারে ভাসিয়া উঠিল। নৌকা চলা বন্ধ হইয়া ৪০

চঁদ সদাগর
গেল। সদাগর দেখিলেন মহা বিপদ। তখন তিনি মাঝী-
দিগকে নদীতে কলসী কলসী তেল ঢালিয়া দিতে আদেশ করিলেন।
তেল ঢালিবা মাত্রই শখেরা পলাইয়া গেল। নৌকা আবার
চলিতে আরম্ভ করিল। সেখান হইতে নৌকা যাইয়া হিজুলায়
উপস্থিত হইল। এখানে জোঁকের রাজ্য।
জলে জোঁক থৈ থৈ
করিতেছে। সেই জোঁক ঠেলিয়া নৌকার বহর আর চলিতে
পারিল না। তখন মাঝী মাল্লারা জলে মণে মণে চুণ
ঢালিতে লাগিল।
চুণের গন্ধে
জোকেরা পলাইয়া প্রাণ
বাচাইল।
জোকের হাত হইতে নিস্তার পাইয়া চৌদ্দডিজা
মধুকর
যাইয়া
কুন্তনদীতে পড়িল। কুমীর মানুষের গন্ধে তাহাদের প্রকাণ্ড
প্রকাণ্ড শরীর লইয়া ভাসিয়া উঠিল। মনে হইতে লাগিল যেন
সমস্ত নদীতে চড়া পড়িয়া গিয়াছে। মাঝীমাল্লারা ভয়ে অস্থির
হইয়া উঠিল । তাহারা আর নৌকা বাহিতে পারিল না। ভয়ে
জড়সড় হইয়া আসিয়া নৌকার ছৈ-এর ভিতর বসিল। চাদ
সদাগরেরও ভয়ে সারা বুকটা শুকাইয়া উঠিল। তিনি মাঝীদিগকে
জিজ্ঞাসা করিলেন, এখন কি করা যায় ? মাঝীরা সকলেই
এ ওর মুখের দিকে চাহিতে লাগিল। একজন বুড়া মাঝী
ছিল, সে অনেক বার এই পথে আসা যাওয়া করিয়াছে। বুড়া
তাড়াতাড়ি উঠিয়া কয়েক বস্তা হলুদের গুড়া জলের উপর ছড়াইয়া
৪১

চাঁদ সদাগর দিল। কুমীরেরা হলুদের গন্ধ পাওয়া মাত্রই জলের তলে ডুবিয়া গেল। চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর আবার চলিতে লাগিল। নানা দেশ বিদেশের মধ্য দিয়া নদী সাগর পার হইয়া আরও ছয়মাসের পর সদাগর যাইয়া দক্ষিণ পাটলে উপস্থিত হইলেন। এদেশের সবাই বড় লােক, গরীব কেহ নাই। সদাগর দেখিলেন, রাখালেরা সােণার পাচনী হাতে গরুর পাল লইয়া মাঠে যায় ; কৃষকেরা সােণার লাঙ্গল দিয়া জমী চাষ করে; স্ত্রীলােকেরা সােণার কলসী কাখে ঘাটে জল নিতে আসে ; ধনী দরিদ্র সকলেই সােণার থালায় ভাত খায় ; দেশটাই সােণায় ভরা। চন্দ্ৰধর মাঝীকে এখানেই নৌকা বাঁধিতে বলিলেন। মাঝীরা নৌকা ঘাটে বাঁধিয়া সদাগরের আসার সংবাদ প্রচার করিবার জন্য দামামা বাজাইতে আরম্ভ করিল। সে দেশের রাজার নাম চন্দ্রকেতু। দামামার শব্দ শুনিয়া চন্দ্রকেতু মনে ভাবিলেন, হয়ত কোনও দেশের রাজা সৈন্য সামন্ত লইয়া তাঁহার রাজ্য জয় করিতে আসিয়াছে। তাই তিনি ভয়ে রাজসভা ছাড়িয়া একেবারে বাড়ীর মধ্যে যাইয়া লুকাইয়া রহিলেন। ১৪ মনসা দেবী আবার চাঁদ সদাগরকে শান্তি দিবার ইচ্ছা করিয়া গণক ব্রাহ্মণ বেশে যাইয়া চন্দ্রকেতুর রাজ সভায় উপস্থিত হইলেন। ৪২

চঁদ সদাগর
চন্দ্রকেতু পাত্র মিত্র লইয়া রাজ সভায় বসিয়া আছেন, এমন সময়
গণক ব্রাহ্মণকে দেখিয়া তিনি বড়ই আনন্দিত হইয়া তাহাকে প্রণাম
করিলেন, বসিবার জন্য আসন দিলেন।
মনসা দেবী বলিলেন, “মহারাজ, আমি আপনাকে বৎসরের
ফলাফল শুনাইবার জন্য আসিয়াছি।
অনুগ্রহ করিয়া প্রবণ
করুন।”
রাজা বলিলেন, “গণনা করিয়া বলুন দেখি আমার রাজ্যে এখন
মঙ্গল বা অমঙ্গলের কিছু আছে কিনা ?”
মনসা দেবী মাটীতে খড়ি পাতিয়া গণিয়া বলিলেন, “সমস্তই
মঙ্গল মহারাজ, অমঙ্গলের কিছুই দেখিলাম না। তবে সামান্য
একটু ভয় আপনার আছে।” আগামী কাল সকালে একজন লােক
আপনার প্রাণ নষ্ট করিবার চেষ্টায় রাজ সভায় আসিবে।
বিষফল লইয়া আসিবে, তাহার উপরে ছােবড়া, তারপর মালা,
তার পর শাস, তার পর জল, এক অদ্ভুত ফল মহারাজ, দেখিতে
প্রায় মানুষের মাথার মত, অমন ফল আপনি কখন দেখেন নাই।
ফলের নাম জিজ্ঞাসা করিলে সেই লােকটা উহার নাম বলিবে
নারিকেল। লােকটার নাম চন্দ্রধর। আপনি যদি তাহাকে বিশ্বাস,
করিয়া সে ফল খান, তবে তখনই আপনার জীবন শেষ হইবে।
দুষ্ট লােককে কখনও বিশ্বাস করিবেন না, মহারাজ।”
এই বলিয়া মনসা দেবী প্রস্থান করিলেন ।
৪৩

চঁদ সদাগর
সারা রাত্রি দুশ্চিন্তায় কাটাইয়া রাজা চন্দ্রকেতু পর দিন প্রভাতে
আসিয়া রাজ সভায় বসিয়া আছেন। পাত্র, মিত্র, মন্ত্রী, উজীর, নাজীর
যে যার যার স্থানে বসিয়া আছে। সে সময় চাঁদ সদাগর একটা
নারিকেল ফল লইয়া আসিয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন। তাহাকে
দেখিয়া সকলের প্রাণ দুরু দুরু করিয়া কাপিয়া উঠিল।
সদাগর রাজার সম্মুখে নারিকেল ফলটা রাখিয়া তাহাকে প্রণাম
করিয়া কহিলেন, “মহারাজ, ইহা আমাদের দেশের একটা উৎকৃষ্ট
ফল, আপনার রাজ্যে এ ফল নাই, এই জন্য আপনাকে ইহা উপহার
দিলাম।”
রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ ফলের নাম কি?”
সাগর কহিলেন, “ইহার নাম নারিকেল ফল মহারাজ!”
রাজা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার নাম কি?”
সদাগর কহিলেন, “আমার নাম চধর।”
তখনই রাজার আদেশে কোটাল যাইয়া সদাগরকে লােহার
শিকল দিয়া বাধিয়া ফেলিল। চাঁদ সদাগর যেন আকাশ হইতে
পড়িলেন। তিনি বলিতে লাগিলেন, “একি মহারাজ! আমি
একটা চমৎকার ফল আপনাকে উপহার দিলাম, আর আপনি
আমাকে বন্দী করিলেন। আপনি দয়া করিয়া খাইয়া দেখুন
মহারাজ, সত্যসত্যই ইহা উৎকৃষ্ট ফল কিনা। ইহার মধ্যে অতি
পরিষ্কার সুমিষ্ট শীতল জল আছে।”
৪৪

চাঁদ সদাগর
রাজা প্রাণের ভয়ে নিজে না খাইয়া তাহা কোটালকে খাইতে
দিলেন। কোটাল ভয়ে ভয়ে একটু জল খাইয়া মনে মনে ভাবিল,
সৰ্ব্বনাশ হইল, এখনই আমার প্রাণ যাইবে। ইহা মনে করিতে
করিতেই সে ভয়ে অজ্ঞান হইয়া মাটীতে পড়িয়া গেল। তাহা
দেখিয়া সকলেই মনে ভাবিল, সত্যসত্যই রাজার প্রাণ নাশ করিবার
জন্য বিষফল লইয়া আসিয়াছে। প্রহরীরা আসিয়া তখনই সাগরকে
কারাগারে লইয়া গিয়া বন্ধ করিয়া রাখিয়া দিল।
এদিকে মাঝীদের কাছে যাইয়া এই খবর পৌঁছিল। প্রধান
মাঝীর নাম দুলাই, সে তখনই রাজসভায় উপস্থিত হইয়া রাজাকে
বলিল, “মহারাজ আমাদের সদাগর সেই প্রাতঃকালে আপনার
রাজসভায় আসিয়াছেন, সন্ধ্যা প্রায় হয় হয়, কিন্তু তিনি এখনো
ফিরিতেছেন না। তিনি কোথায় আছেন বলুন মহারাজ।”
রাজার রাগ তথন পড়ে নাই। তিনি রাগিয়া বলিল, “ব্যাটা
জুচ্চোর, তােমরা মানুষ মারিতে এদেশে বিষফল লইয়া আসিয়াছ
চন্দ্রধরকে কারাগারে রাখিয়াছি, তােমাকেও সেখানে যাইতে হইবে।
সিপাহী, ইহাকে বঁধিয়া কারাগারে লইয়া যাও।”
দুলাই কিছুমাত্র ভীত না হইয়া বলিল, “মহারাজ, আপনারা
বুঝিয়া অনর্থক আমাদিগকে সাজা দিতেছেন। নারিকেল ফল
খাইয়া কি কখনাে মানুষ মরে ? আপনার কোটাল মরে নাই,
দেখুন আমি এখনই উহাকে বাঁচাইয়া দিতেছি।” এই বলিয়া
৪৫

চাদ সদাগর
দুলাই একটা আগুনের মসাল লইয়া যেই কোটালের মুখের কাছে
ধরিল, কোটাল অমনি বাবারে মারে করিয়া চীৎকার করিয়া
লাফাইয়া উঠিল।
রাজা তখন সদাগরকে কারাগার হইতে আনাইয়া পরম যতে
নাহার করাইয়া বলিলেন “আমাদের দুই জনের একই নাম,
কাজেই আজ হইতে আমরা মিতা হইলাম।”
সদাগর বলিলেন, “মিতা, আমি বেশ দিব্বি মিহি কাপড় লইয়া
আসিয়াছি; আমাদের দেশে বড় বড় রাজা মহারাজ সেই সব
কাপড় পরিয়া থাকেন।”
রাজা বলিলেন, “আমিও সেই কাপড় কিনিব।”
সদাগর দুলাইকে কাপড় আনিতে আদেশ করিলেন। দুলাই
নৌকা হইতে একথান কাপড় লইয়া আসিল। তােমরা বােধ হয়
কাপড়ের কথা শুনিয়া অবাক হইবে। সে কাপড় আর কিছুই নয়,
পাতলা চট। কিন্তু সদাগর যখন বলিয়াছেন, এই কাপড় তাহাদের
দেশের রাজা মহারাজারা পরিয়া থাকেন, তখন চন্দ্রকেতুও তাহা
পরিবার লােভ সামলাইতে পারিলেন না। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন,
“দাম কত?”
সদাগর বলিলেন, “তুমি আমার মিতা, তােমার কাছে কি আর
বেশী দাম চাহিব ? এই এক একখানা কাপড়ের দাম মাত্র
৫০ খানা মােহর।”

চাদ সদাগর
রাজা সেই চট কিনিয়া পরিয়া বাড়ীর মধ্যে গেলেন। রাণীরা
তাহা দেখিয়া রাজাকে ধরিয়া বসিলেন, তাহাদিগকেও ঐ কাপড়
এক একখানা কিনিয়া দিতে হইবে। রাজা রাণীদের অনুরােধ
এড়াইতে না পারিয়া সাতরাণীকে সাতখানা চট কিনিয়া দিলেন।
রাণীরা চট পরিয়া মহা খুশী হইলেন।
রাজ বাড়ীর পূজারী ব্ৰাক্ষণের স্ত্রী একদিন রাণীদের সঙ্গে দেখা
করিতে আসিয়া ঐ চটের কাপড় দেখিয়া গেলেন। তাঁহারও সাধ
হইল তিনি সে কাপড় একখানা পরেন। ব্রাহ্মণকে সে কথা বলায়
ব্রাহ্মণ মাথায় হাত দিয়া বলিলেন, “সর্বনাশ, অত দামী আর অত
ভাল কাপড় কি আমাদের মত গরীবে পরিতে পারে ? ওসব রাজ
মহারাজাদেরই যােগ্য। কিন্তু ব্রাহ্মণী জো ধরিয়া বসিলেন,
তাহার একখানা চাই-ই। ব্রাহ্মণ আর কি করেন? অগত্যা
ব্রাহ্মণীকেও একখানা কিনিয়া দিলেন।
রাজা রাণীকে চট পরিতে দেখিয়া রাজ্যের যত বড় বড় লােক
সকলেই সদাগরের নিকট হইতে এক একখানা চট কিনিয়া
পরিলেন। সদাগরের যথেষ্ট লাভ হইল।
আর একদিন রাজা সদাগরকে রাজ সভায় ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন,“মিতা, তুমি আর কি কি জিনিষ লইয়া বাণিজ্যে আসিয়াছ ?
আমি সমস্ত দ্রব্যেরই কিছু কিছু কিনিয়া রাখিব।”
সদাগর বলিলেন,-“বেশ ত, আমার কাছে নানারকম
৪৭

চঁদ সদাগর উৎকৃষ্ট উৎকৃষ্ট জিনিষ আছে, দামও বেশী নয়। বিশেষত তুমি যখন আমার মিতা, তখন তােমাকে বিনা লাভেই দিতে হইবে। আমার কাছে কাশার থালা, নারিকেল, কমলানেবু, গােড় নেবু, মূলা, হরিদ্রা ও তামাক পাতা আছে। দাম খুব সন্তা, একখানা কঁাসার থালার দাম দশ খানা সােণার থালা, এক কুড়ি নারিকেলের দাম চৌদ্দ কুড়ি শঙ্খ, একটী কমলা নেবুর দাম পাঁচটী মুক্তা, একটা গােড়া নেবার দাম একটী চন্দ্রকান্ত মণি, একটা মূলার দাম দুইটা হাতীর দাত, একটা হরিদ্রার দাম দুইখানা হীরা, একটা তামাক পাতার দাম মােল খান সােণার পাতা। তুমি আমার মিতা, কাজেই এত সস্তায় দিলাম, ইহাতে আমার কিছুই লাভ নাই। রাজা চন্দ্রকেতু সদাগরের নিকট হইতে ঐ সমস্ত জিনিষ গুলি কিনিয়া লইলেন। সদাগর মণি মুক্তা হীরা জহরত ও সােণা রূপা দিয়া তাহার চৌদ্দ ডিঙ্গা মধুকর ভরিয়া ফেলিলেন। এত লাভ তিনি জীবনে কোনাে দিন করে নাই। আনন্দে তিনি আত্মহারা হইয়া গেলেন। বাণিজ্যে যথেষ্ট লাভ করিয়া সদাগর মনের আনন্দে খুব ধূমধাম করিয়া শিবদুর্গার পূজা আরম্ভ করিলেন। পূজার সময় মনসা দেবী ৪৮ চাঁদ সদাগর পূজার মন্দিরে আসিয়া কহিলেন, “চত্রধর, আমার পূজা কর। আমার আশীর্বাদে তুমি আরও বেশী লাভ করিতে পারিবে।” মনসা দেবীকে দেখিয়া চাঁদসদাগর তেলে বেগুনে জ্বলিয়া উঠিয়া তখনই হেঁতালের লাঠী লইয়া তাহাকে তাড়া করিলেন। মনসা দেবী পূজা লইতে আসিয়াছিলেন, পূজাত দূরের কথা অপমান হইয়াই তিনি রাগে দুঃখে নেতার কাছে গিয়া বলিলেন, “দেখিলি সই, চাদের অহঙ্কার এখনাে গেল না, আমি পূজা লইতে গেলাম, আর সে কিনা লাঠী লইয়া আমাকে তাড়াইয়া আসিল। সমস্ত দেবতাদের কাছে আমার মুখ হেট হইয়া গেল। এবার আমি চাদকে আচ্ছ। শান্তি দিব।” সদাগরের দক্ষিণ পাটলে বাণিজ্য শেষ হইল। তিনি এখন দেশে ফিরিবেন। মাঝী মাল্লারা শুনিয়া আহলাদে আটখানা। কতদিন হয় তাহারা দেশ ছাড়িয়া আসিয়াছে, বাড়ীর জন্য মন কেমন করিতেছে, কিন্তু সদাগরের কাছে মুখ ফুটিয়া কেহই কিছু বলিতে সাহস করে নাই; কিন্তু আজ যখন সদাগর নিজেই বাড়ী ফিরিবার কথা বলিলেন, তখন তাহাদের মধ্যে একটা মন্ত আনন্দের সাড়া পড়িয়া গেল। শুভদিন দেখিয়া সদাগর জয়দুর্গা বলিয়া দেশের দিকে নৌকা ভাসাইলেন। মাঝী মাল্লারা মনের আনন্দে সারি গাহিয়া নৌকা বাহিতে লাগিল। কল কল ছল ছল করিয়া চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর চঁদ সদাগর হেলিয়া দুলিয়া নাচিয়া নাচিয়া বাতাসের বেগে সাগরের নীল জলের উপর দিয়া চলিতে লাগিল। যখন চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর যাইয়া কালীদহ সাগরে উপস্থিত হইল তখন মনসা দেবী নেতাকে কহিলেন, “এবার আমি চঁাদের চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর ডুবাইয়া অপমানের প্রতিশোেধ লইব।” নেতা বলিল, “তুমি ইচ্ছা করিলেই চন্দ্ৰধরের নৌকা ডুবাইতে পারিবে না। সে শিবদুর্গার পরম ভক্ত, তাহারা সব সময় তাহাকে রক্ষা করিবেন। তুমি আগে গঙ্গাদেবীর কাছে যাও, তিনি যদি দয়া করেন তবে তােনার মনস্কামনা সিদ্ধ হইবে।” পদ্মাবতী তখনই রথ সাজাইয়া গঙ্গার কাছে বাইয়া উপস্থিত হইয়া তাহাকে বলিলেন, “ম। আমি তােমার মেয়ে হইয়াও চাদ সদাগরের হাতে যার পর নাই লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ করিতেছি। যেখানে আমার পূজা হয় সে সেখানেই গিয়া লাখ মারিয়া পূজার ঘট ভাঙ্গিয়া দেয়, গালাগালি করে। এ অপমান আর আমার সহ হয় না। তাহাকে আমি এজন্য আচ্ছা সাজা দিব মনে করিয়া তােমার কাছে আসিয়াছি। চঁদ সদাগর দক্ষিণ পাটন হইতে বাণিজ্য করিয়া বিস্তর ধন রত্ন লইয়া দেশে ফিরিতেছে, এখন তাহার চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর কালীদহ সাগরে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। তুমি মা, আমার সহায় হও। আমি চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর ডুবাইয়া দিব।” গঙ্গাদেবী বলিলেন, “আমি তাহা পারিব না বাছা, তুমি যেমন চঁদ সদাগর আমার মেয়ে সেও তেমনি ছেলে। তােমার জন্য তাহার অনিষ্ট আমি কিছুতেই করিতে পারিব না। ভগবতী স্বয়ং তাঁহার নৌকা রক্ষা করিতেছেন। কাহারও সাধ্য নাই, সে ডিঙ্গা ডুবাইতেপারে।” গঙ্গার কথায় মনসা রাগিয়া বলিলেন, “তুমি মা হইয়া এমন কথা বলিলে? আচ্ছা তুমি তােমার ছেলে লইয়াই থাক। আমি এখনই গিয়া তােমার জলে বিষ ঢালিয়া দিব যেন কেহ আর সে জল স্পর্শ করে। আমাকে বিদায় দাও মা!” -এই বলিয়া মনসা দেবী রাগ করিয়া চলিলেন। গঙ্গা দেখিলেন, বিপদ বড় ভয়ানক। যদি সত্যসত্যই মনসা গঙ্গাজলে বিষ ঢালিয়া দেন, তবে কেহ আর সে জল ছুইবে না। তিনি মনসাকে ডাকিয়া বলিলেন, “শােন পদ্মা, না বুঝিয়া রাগ করিলে কি চলে? যাহার সহায় স্বয়ং শিব দুর্গা, আমার কি ক্ষমতা আছে যে, তাহার অনিষ্ট করিতে পারি?” তুমি এক কাজ কর, তাহাদের কাছে গিয়া সমস্ত কথা বল, যদি তাহারা তােমার উপর দয়া করেন তবে চৌদ্দডিঙ্গা ডুবাইতে পারিবে। তুমি তাহাদের নিকট হইতে উনপঞ্চাশ বায়ু ও বার মেঘ চাহিয়া লইও, তবেই আমি সদাগরের ডিঙ্গা ডুবাইয়া দিতে পারি।” মনসা দেবী তখনই রথে চড়িয়া কৈলাসে মহাদেব ও পার্বতীর কাছে যাইয়া উপস্থিত হইলেন । মহাদেব তাহাকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি জন্য আসিয়াছ পদ্মা ?”

চাদ সদাগর
মনসা দেবী শিবকে সমস্ত কথা বলিলেন। শিব তাঁহার কথা
শুনিয়া রাগে আঁত কড়মড় করিতে করিতে বলিলেন, “আর আমি
তােমাদের যন্ত্রণা সহ্য করিতে পারি না, দিনরাত তােমাদের ঝগড়া
বিবাদ ! তােমাদের একজন না মরিলে আর আমার শান্তি নাই।
আমি ত চাদের কোন দোষ দেখি না, যত দোষ তােমার। তুমি
কেবল অনর্থক ঝগড়া করিতে যাও।”
পদ্মাবতী কাদিতে দিতে বলিলেন, “আমার কোন দোষ নাই,
যত দোষ ধরের। সে মানুষ হইয়া আমাকে গাল দেয়, লাঠী
দিয়া মারিতে আসে, আমার পূজার ঘট লাথি মারিয়া ভাঙ্গিয়া দেয়।
তুমি যদি বাবা চাঁদকে শান্তি না দেও তবে আমি সমুদ্রে ডুবিয়া
মরিব, এ প্রাণ আর রাখিব না।”
তাহার কান্না দেখিয়া শিবের বড়ই দুঃখ হইল, তিনি পদ্মার
হাত ধরিয়া উঠাইয়া চোখের জল মুছাইয়া বলিলেন, “চঁদ সদাগর
আমার পরম ভক্ত, কেমন করিয়া আমি তাহার এ সর্বনাশের
আদেশ দিব পদ্মা?—সে যে আমার ছেলের চেয়েও বেশী। আচ্ছা
যাও, তােমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক, কিন্তু কাহারও যেন প্রাণ
নষ্ট না হয়। যদি চন্দ্রধরকে সমুদ্রে ফেলিয়া বেশী কিছু কষ্ট দেও
তবে নিশ্চয় জানিও পদ্মাবতী, তােমার সার্থে আর আমার কোনও
সম্পর্ক থাকিবে না।”
মনসা বলিলেন, “তাহাই হইবে, আমি চধরের জীবনের উপর

চঁদ সদাগর কোনও কষ্ট দিব না। আমার সাথে বার মেঘ আর উনপঞ্চাশ বায়ু দেও, তাহাদের সাহায্যে আমি চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর ডুবাইব।” মহাদেব তাহাকে তাহাই দিলেন। পদ্মা সন্তুষ্ট হইয়া প্রস্থান করিলেন। সেখান হইতে আসিয়া মনসা দেবী নেতাকে দেশে দেশে সমস্ত নদ নদীর নিকট পাঠাইয়া দিয়া বলিয়া দিলেন, “সমস্ত নদ নদীকে বলিও, কাল আমি কালীদহে চাঁদ সদাগরের নৌকা ডুবাইব। তাহারা সকলেই যেন কাল যাইয়া সেখানে উপস্থিত হয়।” নেতা মনের আনন্দে সমস্ত নদ নদীকে নিমন্ত্রণ করিতে চলিল। পরদিন প্রভাত হইতেই মন্দাকিনী, সরস্বতী, ভােগবতী, ভাগীরথী, সিন্ধু, যমুনা, ইচ্ছামতী, ভৈরব, নর্মদা, মহানন্দা, তাপ্তী, গােদাবরী প্রভৃতি নদীরা যাইয়া কালীদহে উপস্থিত হইল। আকাশে দৈত্যের মত কাল মেঘগুলি থম্ খস্ করিতে লাগিল, উত্তর দিক হইতে উনপঞ্চাশ বায়ু ভীষণ ঝড় তুলিয়া বহিতে আরম্ভ করিল, কালীদহের জলে পাহাড়ের মত ঢেউ উঠিয়া চৌদ্দডিঙ্গা মধুকরকে তােলপাড় করিয়া তুলিল। দেখিতে দেখিতে ঝম ঝম্ করিয়া মুষল ধারায় বৃষ্টি নামিল। সদাগর ও মাঝীমাল্লারা ঝড় দেখিয়া দড়াদড়ি শক্ত করিয়া বধিতে লাগিল, ভয়ে তাহাদের প্রাণ শুকাইয়া উঠিল। সদাগর চাদ সদাগর একমনে শিবদুর্গার নাম জপ করিতে লাগিলেন। ঝড় ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল ; মাঝী মাল্লার প্রাণের আশা ছাড়িয়া দিয়া চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে নৌকা বাঁচাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। এমন সময় মনসা দেবী আকাশে থাকিয়া বলিলেন, “এখনও অহঙ্কার পরিত্যাগ কর চন্দ্রধর, যদি তুমি আমাকে পূজা কর তাহা হইলে এই ঝড়ে তােমাকে রক্ষা করিব। তাহা না হইলে আজ এই সমুদ্রে তােমাকে প্রাণে মরিতে হইবে। কেহ রক্ষা করিতে পারিবে না।” মনসার কথা শুনিয়া চাঁদ সদাগর কহিলেন, “তাের লজ্জা নাই কাণী, এত অপমান করিলাম, তবু আবার আমার পূজা খাইতে আসিয়াছি! শিবদুর্গা আমার সহায়, কার সাধ্য আমাকে প্রাণে মারে ?” “তবে দেখ চন্দ্রধর, তাের অহঙ্কার আমি চুর্ণ করিতে পারি কিনা?”—এই বলিয়া মনসা দেবী নদনদী, বায়ু এবং মেঘ দিগকে চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর ডুবাইবার জন্য আদেশ করিলেন। করিয়া বাজ পড়িতে লাগিল, শিলা বৃষ্টি আরম্ভ হইল, বাতাস আরও উতলা হইয়া উঠিল, নদ নদীরা শো শাে শব্দ করিয়া গর্জিতে লাগিল, চারিদিক অন্ধকার হইয়া আসিল। একে একে সদাগরের তের খানি নৌকা ডুবিল। সদাগর মনসা দেবীকে পূজা করিলেন না। তখন মনসা দেবী নদ-নদী দিগকে সদাগরের মধুকর নৌকা ডুবাইতে আদেশ করিলেন। অমনি কড় ৫৪

চাদ সদাগর
নদ-নদীরা বহু চেষ্টা করিল, কিন্তু মধুকর নৌকা ডুবাইতে পারি না।
মনসা দেবী দেখিলেন, স্বয়ং ভগবতী মধুকর ডিঙ্গার উপর অদৃশ্য
ভাবে বসিয়া আছেন ; সেই জন্যই মধুকর ডুবিতেছে না। তখন
তিনি তাহাকে বলিলেন, “দেখ মা, যদি তুমি সদাগরের ডিজা
পরিত্যাগ না কর তবে আমি তােমার কার্তিক গণেশকে বিষে
জর্জরিত করিয়া মারিয়া ফেলিব।” ভগবতী আর কি করেন, ভয়ে
ভয়ে নৌকা ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন।
নদ নদীরা আবার নৌকা ডুবাইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল
। মনসাদেবী তখন হনুমানকে স্মরণ করিলেন, হনুমানও অনেক
চেষ্টা করিয়া নৌকা ডুবাইতে পারিল না। তখন তাহার মনে
পড়িল, চাদ সদাগরের পিতা মহাদেবের নিকট হইতে বর
পাইয়াছিলেন। যতক্ষণ চাঁদ সদাগর নৌকার উপর থাকিবেন ততক্ষণ
কেহই সে নৌকা ডুবাইতে পারিবে না। হনুমান অমনি সদাগরকে
ঠেলিয়া জলে ফেলিয়া দিল। দেখিতে দেখিতে মধুকর নৌকা
সাগরের জলে ডুবিয়া গেল।
১৭
চাঁদ সদাগর নদীতে পড়িয়া হাবু ডুবু খাইতে খাইতে শিব দুর্গার
নাম জপ করিতে লাগিলেন। দেবতারা তাঁহার দুর্দশা ও দুঃখ
দেখিয়া তাঁহাকে মনসাদেবীর স্মরণ করিতে বলিলেন, কিন্তু

চাঁদ সদাগর - সদাগরের প্রতিজ্ঞা অচল অটল, তিনি ডুবিয়া মরিবেন, তবু মনসা- দেবীকে পূজা করিবেন না। তিনি ঢেউএর সাথে সাথে হাবু ডুবু খাইতে লাগিলেন, তাহার প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়া আসিল। ক্রমে তাহার শরীর অবসন্ন হইল, তিনি মড়ার মত চিৎ হইয়া ভাসিতে লাগিলেন। কাক চিল ও শকুনীরা তাঁহাকে মড়া মনে করিয়া ঠোকর মারিতে লাগিল, তিনি ব্যথায় আহা উহু করিতে করিতে শিব দুর্গাকে ডাকিতে লাগিলেন। তাহার কষ্ট দেখিয়া মনসাদেবী একটা কলা গাছে লিখিলেন,-“চাদ, তুমি যদি আমার পূজা কর তবে এখনই আমি তােমাকে সমুদ্র হইতে উদ্ধার করিব।” লিখিয়া সেই কলাগাছ সদাগরের সম্মুখে ফেলিয়া দিলেন। সদাগর কলাগাছ পাইয়া মনে করিলেন, শিবদুর্গা দয়া করিয়া তাহার জন্য এই কলাগাছ সমুদ্রে ফেলিয়া দিয়াছেন। তিনি মনে মনে শিবদুর্গাকে কোটা কোটী প্রণাম করিয়া কলাগাছের উপর উঠিয়া বসিলেন। কিছু দূর ভাসিয়া যাইয়া হঠাৎ সেই লেখার উপর তাহার নজর পড়িল। তখন তিনি বুঝিতে পারিলেন, ইহা সেই মনসার কাজ, অমনি কলাগাছ ছাড়িয়া আবার সাগরের জলে ঝাপাইয়া পড়িলেন। নেতা মনসা দেবীকে কহিলেন, “আর যদি তুমি বেশীক্ষণ চাঁদ সদাগরকে এই ভাবে সমুদ্রে ফেলিয়া কষ্ট দাও তবে সে নিশ্চয়ই প্রাণে মরিবে, তাহা হইলে আর পৃথিবীতে তােমার পূজার প্রচার

চে
*
তিনি মড়ার মতন চিৎ হইয়া ভাসিতে লাগিলেন।
পৃ:৫৬

No text on this page.

চাঁদ সদাগর হইবে না, মহাদেবও আর তােমাকে দুইচক্ষে দেখিতে পারিবেন না, এখনও সদাগরকে বাঁচাইবার ব্যবস্থা কর।” মনসাদেবী তখন সদাগরকে চক্ষুর নিমেষে কূপের নিকট লইয়া গিয়া তাহার সম্মুখে একটা সােণার কলসী ভাসাইয়া দিলেন। সদাগর ধীরে ধীরে সেই কলসী ধরিয়া তীরে উঠিলেন। তীরে উঠিয়া চাদ সদাগর শীতে ঠক ঠক্ করিয়া কাপিতে লাগিলেন। ক্ষুধায় তঁাহার পেট জ্বলিয়া যাইতে লাগিল। মনসাদেবী তাহার সম্মুখে এক টুকরা শুকনা কাপড় ফেলিয়া দিলেন, সদাগর কোনও রকমে তাহা পরিলেন। এখন উদরের জালা নিভাইতে সদাগরের ভিক্ষা ছাড়া আর অন্য উপায় নাই। তিনি নগরে ঢুকিয়া ‘ভিক্ষাদাও, ওগাে এক মুষ্টি ভিক্ষা দাও’ বলিয়া দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। কিন্তু কেহ তাহার দিকে ফিরিয়াও চাহিল না। হাটিতে হাটিতে তিনি কতক- গুলি পাকা কলার খােসা দেখিতে পাইয়া পরম যত্নে সেগুলি তুলিয়া লইয়া সমুদ্রের দিকে চলিলেন। মনে আশা, স্নান করিয়া শিবদুর্গার পূজা করিয়া তবে তিনি কলার খােসাগুলি খাইবেন। কলার খােসাগুলি সমুদ্রের কিনারে রাখিয়া তিনি স্নান করিতে নামিলেন, অমনি মনসা দেবী গাভীরূপ ধরিয়া আসিয়া সেগুলি খাইয়া ফেলি- লেন। সদাগর উপরে উঠিয়া দেখিলেন একটী কলার খােসাও সেখানে নাই। তিনি বুঝিলেন, সমস্তই মনসার ছলনা। তিনি

চঁদ সদাগর
সেখান হইতে যাইয়া এক বণিকের বাড়ীতে ভিক্ষার জন্য উঠিলেন।
বণিকের স্ত্রী দয়া করিয়া তাহাকে এক মুষ্টি চাউল ভিক্ষা দিল ।
চাউল পাইয়া সদাগরের খুব আনন্দ হইল, তিনি মনে করিলেন, এই
চাউল ও একটু জল খাইলেই তাহার গায়ে একটু বল হইবে, তাহা
হইলে ধীরে ধীরে তিনি চম্পক নগরে যাইতে পারিবেন। সদাগর
বন হইতে কচুপাতা ছিড়িয়া তাহাতে চাউল রাখিয়া পূজা করিতে
বসিলেন, এই অবসরে নেতা মনসা দেবীর আদেশে দাড় কাকের
রূপ ধরিয়া আসিয়া সমস্ত চাউল খাইয়া ফেলিল। সদাগর তাড়াতাড়ি
জল হইতে উঠিয়া কাকের পিছু পিছু ছুটিলেন, কাক শূন্যে উড়িয়া
গেল। চন্দ্ৰধর পেটের জ্বালায় সেখানে বসয়া পড়িলেন। দুই চক্ষু
বহিয়া জলধারা পড়িতে লাগিল।
এমন সময় একদল কাঠুরিয়া সেই পথে বনে কাঠ কাটিতে
যাইতেছিল। সদাগর তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমরা
কে ভাই, কোথায় যাইতেছ ?”
কাঠুরিয়ারা বলিল, “আমরা ভাই কাঠুরিয়া। বনে কাঠ কাটতে
যাইতেছি। কাঠ কাটিয়া আনিয়া নগরে বিক্রয় করিব।”
সদাগরেরও ইচ্ছা হইল, তিনিও তাহাদের সাথে বন হইতে কাঠ
কাটিয়া আনিয়া নগরে বিক্রয় করিবেন, তাহা হইলে আর তাহাকে
এত কষ্ট সহিতে হইবে না। কাঠুরিয়াদিগকে বলিলেন,
“আমিও তােমাদের সাথে মাইব ভাই।”
1তনি
৫৮

চাঁদ সদাগর কাঠুরিয়ারা বলিল, “বেশত, চলনা।” সদাগর তাহাদের সাথে চলিলেন। বনে যাইয়া সাগর কাঠ কাটিতেছেন এমন সময় মনসা দেবী নাগদিগকে কহিলেন, “তােমরা যাইয়া চাঁদ সদাগরের সম্মুখে ভীমরুলের বাসা তৈয়ার করিয়া রাখ।” সদাগর যে গাছে কাঠ কাটিতেছিলেন তাহারই নিকটে একটা কাঠাল গাছে যাইয়া নাগের ভীমরুলের বাসা বাধল। সদাগর কাঠ কাটিতে কাটিতে সেই কাঠাল গাছের নীচে আসিয়া উপরে চাহিয়া ভৗমরুলের বাসা দেখিয়া মনে করিলেন, একটা বড় কাঠাল পাকিয়া রহিয়াছে, অন্যান্য কাঠুরিয়ারা একটু আড়ালে গেলে তিনি একাকী কাঠাল খাইয়া পেটের জ্বালা জুড়াইবেন। কাঠুরিয়ারা দেখিলে হয়ত ভাগ চাহিবে, অতগুলি লােকের মধ্যে একটা কাঠালে কাহারও পেট ভরিবে না।—এই ভাবিয়া সদাগর সেই গাছের নীচে বসিলেন। কাঠুরিয়ারা যাইবার সময় তাঁহাকে ডাকিল, তিনি তাহাদিগকে ফাকি দিয়া বলিলেন, “তােমরা যাও ভাই, আ!ম একটু বিশ্রাম করিয়া যাইব।” কাঠুরিয়ারা চলিয়া গেলে সদাগর ধীরে ধীরে গাছে উঠিয়া কাঠাল ভাবিয়া ভীমরুলের বাসাটাকে যেই ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন অমনি ভীমরুলের দল তাহাকে ঘিরিয়া ধরিয়া কামড়াইতে লাগিল। সদাগর ভীমরুলের কামড়ে অস্থির হইয়া গাছ হইতে অজ্ঞান হইয়া নীচে পড়িয়া গেলেন।

চঁদ সদাগর কিছুক্ষণ পরে মনসা দেবীর কৃপায় সদাগর জ্ঞান লাভ করিয়া উঠিয়া বসিলেন, তাহার গায়ের ব্যথা বেদনা সব চলিয়া গেল। তিনি ধীরে ধীরে উঠিয়া কাঠের বােঝ বাঁধিয়া লইয়া নগরের দিকে চলিলেন। কিছুদূর গিয়া এক কুম্ভকারের বাড়ীর সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। কুম্ভকারের স্ত্রী বড় দয়াবতী, সে কাঠগুলি লইয়া চন্দ্রধরকে চারিপণ কড়ি দিল। কড়ি পাইয়া সদাগর খুব আনন্দিত হইলেন। তিনি এক গাছ তলায় বসিয়া কড়িগুলি চারি ভাগ করিয়া ভাবিলেন, একপণ দিয়া চুল দাড়ি কামাইবেন, একপণ দিয়া পেট ভরিয়া দখি চিড়া ও কলা কিনিয়া খাইবেন, একপণ দিয়া একখানা কাপড় কিনিবেন, অবশিষ্ট আর একপণ খরচ করিয়া বাড়ী যাইবেন। ১৮ সাগর সেখান হইতে নাপিতের সন্ধানে চলিলেন। এমন সময় নেতা নাপিতের বেশে আসিয়া তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। যখন অর্ধেক কামান হইয়াছে তখন হঠাৎ পায়ের ঠেলা লাগিয়া বাটির জল সমস্ত পড়িয়া গেল। নেতা সাগরকে বসাইয়া রাখিয়া জল আনিতে গেল। কিন্তু আর ফিরিল না। সদাগর অর্ধেক চুল ও অর্ধেক দাড়ি লইয়া অনেকক্ষণ নাপিতের আশায় বসিয়া রহিলেন। কিন্তু যখন নাপিত আর ফিরিল না, তখন তিনি দেখিলেন মহা বিপদ! এমন অবস্থায় আর চাঁদ সদাগর কোথায় যাইবেন? রাস্তায় যাহাকে দেখেন তাহাকেই নাপিত বলিয়া ডাকিয়া অপদস্থ হইতে লাগিলেন। অনেকের হাতের দু’ চার ঘাও তাঁহার পিঠে পড়িল। চারিপণ কড়ি যাহা তাঁহার সাথে ছিল, তাহা যে পারিল কাড়িয়া লইয়া গেল। সদাগর অনেক কষ্টে সেখান হইতে অব্যাহতি পাইয়া আবার পথ চলিতে লাগিলেন। পথে এক নাপিত তাহার দুঃখের কথা শুনিয়া দয়া করিয়া বিনা পয়সায় তাহাকে কামাইয়া দিল। সেখান হইতে যাইয়া সদাগর এক গ্রামে উপস্থিত হইলেন। সেই গ্রামের মােড়লের নাম গজদন্ত ভল্লুক। ভল্লুক মহাশয় খুব একজন বড় ধনী। ক্ষেত খামার, জোত জমা, টাকা পয়সার তাহার অভাব নাই। কিন্তু সে বড় কৃপণ। একটা ভাতের কণা পৰ্যন্তও তাহার বাড়ীতে নষ্ট হইবার উপায় নাই। ভিখারীরা তাহাকে বিশেষ রকম চিনে, তাই কেহ তাহার বাড়ীর ত্রিসীমানা মাড়ায় । চন্দ্ৰধর তাহার বাড়ীতে উপস্থিত হইয়া সমস্ত দুঃখের কথা বলিয়া কিছু খাবার চাহিলেন। ভজুক মহাশয় ভিখারী দেখিয়া তেলে বেগুনে জ্বলিয়া উঠিল। সে বলিল, “না বাপু, এখানে ভিখারীদের জন্যে অসত্ৰ খােলা হয় নাই, ভাত অত সস্তা নহে যে আসিয়া চাহিলেই পাওয়া যায়। আমার যথেষ্ট ক্ষেত খামার আছে, যদি সারাদিন তাহাতে কাজ কর তবে সন্ধ্যার সময় দু’টা খাইতে পাইবে।” সদাগর আর কি করেন, পেটের দায়ে তাহাই স্বীকার চঁদ সদাগর করিলেন। গজদন্ত তাহাকে একখানা কান্তে আনিয়া দিয়া ধানের ক্ষেত দেখাইয়া দিল, সেই ক্ষেত নিড়াইতে হইবে। সদাগর আর কি করেন, অগত্যা কান্তে হাতে করিয়া ধানের ক্ষেতে গিয়া নিড়াইতে বসিলেন! সদাগর ক্ষেত নিড়াইতেছেন এমন সময় মনসা দেবী আবার মায়া করিলেন, তাহার মায়ায় সদাগরের ধান গাছগুলি ঘাস বলিয়া মনে হইল, তিনি তাই ঘাস রাখিয়া ধানগাছ গুলিই তুলিয়া ফেলিতে লাগিলেন। সন্ধ্যার কিছু আগে ভল্লুক ক্ষেতে কৃষাণদিগের কাজ দেখিতে আসিল। ক্ষেতে ঘুরিয়া সে বেশ সন্তুষ্ট হইয়া যখন সদাগর যে ক্ষেতে কাজ করিতেছিলেন সেই ক্ষেতে আসিল, তখন তাহার পা হইতে মাথা পৰ্যন্ত রাগে জ্বলিয়া উঠিল। সে দেখিল, সদাগর সমস্ত ধানের গাছ গুলিই তুলিয়া ফেলিয়াছে, ক্ষেতে কেবল ঘাস রহিয়াছে, তখন সে তাহার হাতের লাঠী দিয়া সদাগরের পিঠে কয়েক ঘা বসাইয়া দিল। তাহাকে মারিতে দেখিয়া অন্যান্য চাষারাও ছুটিয়া আসিয়া সদাগরকে কিল চড় ঘুষি মারতে লাগিল। সারাদিন খাটিয়া সন্ধ্যার সময় ভাত পাওয়া দূরে থাকুক, চাঁদ সদাগর মার খাইয়া কোনও রকমে প্রাণ লইয়া পলাইয়া বঁচিল। চলিতে চলিতে সদাগর আসিয়া আর এক রাজ্যে উপস্থিত হইলেন। এ দেশের রাজার নাম চধর। চাঁদ সদাগরের বহু দিনের মিতা। কিন্তু সদাগর বুঝিতে পারেন নাই যে তিনি তাঁহার

চাঁদ সদাগর
মিতার রাজ্যে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। তিনি রাজবাড়ীর
সম্মুখের বড় রাস্তা দিয়া ধীরে ধীরে চলিয়াছেন, এমন সময় রাজা
চন্দ্ৰধর আসিয়া মিতা মিতা বলয়া তাহার গলা জড়াইয়া ধরিলেন।
সদাগর বহু দিনের পর মিতাকে দেখিয়া যেন হাতে স্বর্গ
পাইলেন। তিনি মিতার গলা ধরিয়া চোখের জল ফেলিতে
ফেলিতে তাহার সমস্ত দুঃখ কষ্টের কথা বলিয়া শেষে কহিলেন,
“ক্ষুধায় আমার প্রাণ যায় মিতা, আগে আমাকে কিছু খাইতে দাও।”
রাজা সদাগরকে সাথে লইয়া রাজবাড়ীর মধ্যে গিয়া বড়
রাণীকে বলিলেন, “বহুদিন পরে আমার মিতা আসিয়াছে, শী শীঘ্র
তাহার আহারের ব্যবস্থা করিয়া দাও।”
তখনই দাস দাসীরা আয়ােজন করিয়া দিল, সাত রাণী সাত
উনান আলিয়া রধিতে বসিলেন। শাক হইতে আরম্ভ করিয়া
পিঠা পায়েস ইত্যাদি নানা সামগ্রী রাঁধিয়া সদাগরকে খাইতে ডাক
দিলেন। সদাগর খাইতে বসিয়াছেন, বড়রাণী পরিবেশন
করিতেছেন। এমন সময় মনসা দেবী মায়া করিয়া সদাগরের থালার
সমন্ত অব্যঞ্জন হরণ করিয়া লইলেন। রাণী আবার পরিবেশন
করিলেন, সদাগর কয়েক গ্রাস খাইতে না খাইতেই মনসা দেবী
আবার থালার সমস্ত জিনিষ হরণ করিয়া লইলেন। রাণী আবার
পারবেশন করিলেন, মনসা দেবী হরণ করিলেন। রাণী দেখিলেন
মহা বিপদ, তাহারা যাহা রাঁধিয়াছিলেন তাহা প্রায় শেষ হইয়া

চাঁদ সদাগর
আসিল, তবু সদাগরের পেট ভরে না। তিনি রাজাকে গিয়া
বলিলেন, “তােমার মিতা কি রাক্ষস ? প্রায় পাঁচ সাত জনের
খাবার একেলা খাইয়া ফেলিল তবু তাহার পেট ভরে নাই।”
রাজা শুনিয়া হাসিয়া বলিলেন, “মিতা অনেকদিন ভাতের মুখ
দেখে নাই, তাই তার পেটে অত ক্ষুধা। সে যত খাইতে পারে দাও,
পেট না ভরিয়া উঠিতে দিও না।”
রাণী আবার পরিবেশন করিতে লাগিলেন। মনসা দেবীও
তাহা হরণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে ১০/১২ জন লােকের
খাওয়া শেষ করিয়া সদাগর কোনও প্রকারে ক্ষুধা মিটাইয়া উঠিয়া
পড়িলেন।
আহারাদি করিয়া সদাগর শয়ন করিতে গেলেন। প্রাতে
উঠিয়া বাড়ীর জন্য তাহার মন বড়ই উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল। তিনি
রাজাকে বলিলেন, “মিতা, অনেক দিন হয় বাড়ী ছাড়িয়া আসিয়াছি,
বিদেশে আসিয়া বহু কষ্টই পাইলাম, এমন কষ্ট জীবনে কখনাে
পাই নাই। এখন বাড়ীর জন্য মন বড়ই খারাপ হইয়া উঠিয়াছে।
দোল। আনিয়া দাও, আমি আজই চম্পকনগর যাত্রা করিব।”
রাজা কহিলেন, “অনেক দিন পরে তােমার সাথে দেখা, আবার
কবে দেখা হইবে কে জানে? কিছু দিন আমার এখানে থাকিয়া
যাও। দুইজন কিছু দিন পরম সুখে কাটাইব।”
সদাগর বলিলেন, “না মিতা, আর একবার আসিয়া কিছু দিন
৬৪

চাদ সদাগর
থাকিব। এবার আমায় ক্ষমা কর। বাড়ীর জন্য মন আমার
বড়ই খারাপ, আজই আমি বাড়ী রওনা হই।”
রাজা আর আপত্তি করিলেন না। পাল্কী আনাইয়া দিলেন।
সদাগর মিতার নিকট বিদায় লইয়া বাড়ী রওনা হইলেন।
চম্পক নগরের নিকটে আসিয়া সদাগর মনে করিলেন, এই সমস্ত
লােকজন, পাকী বেহারা বিদায় দিয়া তিনি একাকী চম্পক নগরে
যাইবেন।
এমন সময় মনসাদেবী আবার চাঁদ সদাগরকে কষ্ট দিবার সঙ্কল্প
করিয়া পাল্কী বেহারা সহ নেতাকে পাঠাইয়া দিলেন। নেতা চাদ
সদাগরের চাকর ধনার রূপ ধরিয়া আসিয়া সেখানে উপস্থিত হইল
ধনাকে দেখিয়া সদাগরের আনন্দ আর ধরে না।
তিনি তাহাকে
জিজ্ঞাসা করিলেন, “ধনা, তুই কেমন করিয়া দেশে ফিরিলি?”
ধনা বলিল, “শিবদুর্গার কৃপায় আসিয়াছি।
আপনি দেশে
আসিতেছেন শুনিয়া আমি আপনাকে লইয়া যাইবার জন্য পাত্তী
বেহারা লইয়া আসিয়াছি, আপনি আপনার মিতার পাল্কী বেহারা
লােজন বিদায় দিয়া এই পাল্কীতে উঠুন।”
সদাগর মনের আনন্দে রাজার লোেক জন সমস্ত বিদায় দিয়া
ধনার পাকীতে উঠিলেন। পাক্কী কিছু দূর গেলে পর ধনা সদাগরের

চঁদ সদাগর চুল ধরিয়া টানিয়া পাক্কা হইতে নামাইয়া কিল চড় মারিতে লাগিল। সদাগর আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিরে ধনা, আমাকে তুই মারিতেছি কেন?” ধনা কোনও উত্তর না দিয়া কেবলই মারিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে পাল্কী বেহারারাও আসিয়া সদাগরকে কিল ঘুষি লাথি মারিতে আরম্ভ করিল। সদাগর সেখান হইতে দৌড়িয়া পলাইয়া প্রাণ বাঁচাইলেন। হাটিতে হাঁটিতে রাত প্রায় দুপুরের সময় চাঁদ সদাগর গিয়া চম্পক নগরে পঁহুছিলেন। কিন্তু তাহার মনে কি এক দুর্বুদ্ধি জাগিল, তিনি লজ্জায় বাড়ীতে না উঠিয়া ফুলবনে লুকাইয়া রহিলেন। রাত্রিতে মনসা দেবী সনকাকে স্বপ্ন দেখাইলেন,-“সনকা, তােমার স্বামী সমুদ্রে ধনজন সমস্ত হারাইয়া অনেক কষ্ট পাইয়াছে। সে এখন ভিক্ষা করিয়া খাইতে খাইতে দেশে আসিতেছে। তুমি সদাগরের মঙ্গলের জন্য ভােরে উঠিয়া আমার পূজা কারও।” সবেমাত্র তখন ভাের হইয়াছে। গাছে গাছে পাখী ডাকিতেছে। অন্ধকার তখনাে সম্পূর্ণ দূর হয় নাই। সনকা স্বপ্ন দেখিয়া জাগিয়া উঠিয়াই দাসীকে ফুল তুলিবার জন্য ফুলের বাগানে পাঠাইয়া দিল। সে ফুল তুলিতে তুলিতে যেখানে চাঁদসদাগর লুকাইয়াছিলেন তাহার একটু দূরে গিয়া উপস্থিত হইল। সদাগর লােকের সাড়া চাদ সদাগর পাইয়া একটা ফুলগাছের ঝােপের নীচে চুপটী করিয়া শুইয়া পড়িলেন। সনকার দাসী সনকাৰ দাসী দূর হইতে তাহা দেখিল, কিন্তু চিনিতে পারিল না। তাহার মনে সন্দেহ হইল, হয়ত কোনও চোর হইবে, লােকের সাড়া পাইয়া আসিয়া ফুলবনে লুকাইয়াছে। সে হাকিল, “কে তুমি, কে ওখানে?” সদাগর ইহা শুনিয়া সেখান হইতে বাহির হইয়া ছুটিয়া পলাইবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু পারিলেন না, ইতিমধ্যে দাসী আসিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিয়া লাথি মারিতে লাগিল। সদাগর লজ্জা ও অপমানে বলিতে লাগিলেন, “আমি চোর নহি দাসী, আমি সনকার স্বামী চাদসদাগর, সমুদ্রে ধন রত্ন হারাইয়া দেশে আসিয়াছি।” দাসী সদাগরের মুখের দিকে ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিল, কিন্তু চিনিতে পারিল না। সে ভাবিল, চোর পলাইবার জন্য মিথ্যা কথা বলিতেছে। যদি সে সত্য সত্যই সদাগর হইবে তবে বাড়ী না গিয়া ফুলের বাগানে লুকাইয়া আছে কেন? সে আরও রাগিয়া চাঁদ- সদাগরের নাকে মুখে বুকে পিঠে লাথি মারিতে লাগিল। সদাগর বলিতে লাগিলেন, “দাসী আমাকে আর মারিও না, সত্যই আমি চাঁদসদাগর, দক্ষিণ পাটনে বাণিজ্য করিতে গিয়াছিলাম, সমুদ্রে চৌদ্দ- ডিঙ্গা মধুকর মাঝীমাল্লা, ধনজন সব হারাইয়া কতকষ্ট পাইয়া দেশে ফিরিয়াছি। লজ্জায় বাড়ীতে না উঠিয়া ফুলবনে লুকাইয়া ছিলাম। শেষে কিনা দাসীর পায়ের লাথি খাইতে হইল, এর চেয়ে আমার ৬৭

চাদ সদাগর
মরণও ভাল ছিল। আর মারিওনা, আর মারিলে প্রাণে
বাঁচিবনা।”
দাসী সদাগরকে আচ্ছা করিয়া পিঠমােড়া বাধিয়া ফেলিয়া রাখিয়া
সনকার কাছে যাইয়া সংবাদ দিল, “আমি ফুলবনে একটা চোরকে
বাঁধিয়া রাখিয়া আসিয়াছি। সে বলে যে আমার নাম চাঁদসদাগর।”
সনকা বলিলেন, “চোরকে আমার নিকট লইয়া আস।”
দাসী যাইয়া সদাগরকে সনকার কাছে লইয়া আসিল।
সনকাও তাহাকে চিনিতে পারিল না। সে দাসীকে বলিল, “একখানা
ধারাল ছুরী লইয়া আয় ত, আমি নিজ হাতে চোরের নাক কাণ
কাটিয়া ছাড়িয়া দিব, দেখি ব্যাটা কেমন সদাগর সাজিয়া
আসিয়াছে।”
দাসী—ছুরী আনিতে চলিয়া গেল। তখন সদাগর তাহাকে
ধীরে ধীরে বলিতে লাগিলেন, “সনকা, তুমিও কি আমাকে চিনিতে
পারিলে না? সত্য সত্যই আমি তােমার স্বামী চন্দ্রধর। তােমার
কথায় অবহেলা করিয়া বাণিজ্যে গিয়াছিলাম, হাতে হাতে তাহার
ফল পাইয়াছি।
মনসা সমুদ্রে আমার চৌদ্দ ডিঙ্গা ডুবাইয়া
দিয়াছে। তােমার অদৃষ্টগুণে আমি প্রাণে বাঁচিয়াছি। পথে যে
আরও কত কষ্ট পাইয়াছি তাহা আর কি বলিব ? ভিক্ষা করিয়া
খাইতে খাইতে দেশে আসিয়াছি। কিন্তু লজ্জায় তােমাকে মুখ
দেখাইতে পারি নাই, সেই জন্য ফুলবনে লুকাইয়া ছিলাম।

চাদ সদাগর "দাসীর পায়ের লাথি খাওয়াও অদৃষ্টে ছিল ! সনকা, ভাল করিয়া চাহিয়া দেখ, আমি তােমার স্বামী চন্দ্রধর, জীবসাধুর পুত্র, ধনপতির নাতি। আমি চোর নহি।” মনসার কৃপায় এবার সনকা সদাগরকে চিনিতে পারিল। অমনি সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া সদাগরকে প্রণাম করিয়া পায়ের ধুলা লইয়া তাহার হাতের বাঁধন খুলিয়া দিল। সদাগরের দুঃখে তাহারও চক্ষু জলে ভরিয়া আসিল। সে সদাগরকে বাণিজ্যের কথা জিজ্ঞাসা করিল, সদাগর এক এক করিয়া সনকাকে সমস্ত কথা বলিয়া শুনাইলেন। দাসী আসিয়া তাহার পায়ে ধরিয়া ক্ষমা চাহিল। তারপর সদাগর আনাহার করিয়া বিশ্রাম করিতে গেলেন। চাঁদসদাগরের বাণিজ্য যাওয়ার চারি পাঁচমাস পরেই সনকার একটা ছেলে হইয়াছিল। সনকা আদর করিয়া ছেলের নাম রাখিয়াছিল লক্ষ্মীন্দ্র। লক্ষ্মীন্দ্র এখন বেশ বড় হইয়াছে। সদাগর ছেলেকে দেখিয়া খুব সন্তুষ্ট হইয়া তাহার বিবাহ দিয়া বৌ ঘরে আনিবার ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু ছেলের বিবাহের কথা শুনিয়াই সনকার প্রাণ কাপিয়া উঠিল। তাহার মনে পড়িল সেই দিনের কথা, যেদিন মনসা দেবী তাহার পূজায় সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে পুত্র-বর দিয়া বলিয়াছিলেন,—“কিন্তু বিবাহের রাত্রিতেই ছেলে তােমার চাঁদ সদাগর সর্পদংশনে মারা যাইবে।” সনকা স্বামীকে মনসার বরের কথা বলিল না। কেবল বলিল, “ওগাে আমি ছেলেকে বিবাহ করাইবনা, লখাই আমার বাঁচিয়া থাকুক।” সদাগর কিন্তু তাহার কথা শুনিলেন না। তিনি দৈবজ্ঞ আনাইয়া লক্ষ্মীন্দরের কোষ্ঠী দেখাইয়া শীঘ্রই তাহার বিবাহ দিতে মনস্থ করিলেন। দৈবজ্ঞ লক্ষ্মীন্দরের কোষ্ঠী দেখিয়া গণিয়া বলিলেন, “উজানী নগরে সা সদাগরের একটা অতি রূপবতী ও গুণবতী কন্যা আছে। মেয়েটীর নাম বেহুলা, তার গুণের সীমা নাই, সে ছয়মাসের মড়া বাঁচাইতে জানে । তুমি তােমার ছেলের জন্য এই মেয়ে লইয়া আস। এর চাইতে ভাল মেয়ে আর আমি দেখি না।” সদাগর দৈবজ্ঞের কথা শুনিয়া পরম সন্তুষ্ট হইয়া সেইদিনই বেহুলাকে দেখিবার জন্য দৈবজ্ঞকে সাথে লইয়া উজানী নগরে, চলিলেন। তাহার নৌকা আসিয়া মুক্তা সরােবরের ঘাটে লাগিল। . উজানী নগরে রাত্রিতে সােণার খাটে শুইয়া বেহুলানিদ্রা যাইতেছে। এমন সময় মনসা দেবী আসিয়া তাহার শিয়রে বসিয়া স্বপ্ন দেখাইলেন,—“বেহুলা, তুমি জান, পূর্ব জন্মে তুমি অনিরুদ্ধের চাদ সদাগর তী উষা ছিলে। মহাদেবের অভিসম্পাতে তােমরা স্বামী স্ত্রী আসিয়া পৃথিবীতে জন্ম লইয়াছ। অনিরুদ্ধ লক্ষ্মীন্দর রূপে চম্পক নগরে ধনপতি সদাগরের ঘরে জন্মগ্রহণ করিয়াছে। তুমি যদি কাল সকালে উঠিয়া মুক্তা সরােবরের ঘাটে স্নান করিতে যাও তবে লক্ষ্মীন্দরের সহিত তােমার বিবাহ হইবে, তােমার স্বামী আবার তুমি ফিরিয়া পাইবে, আর যদি স্নান করিতে না যাও তবে আর বার বৎসরে তােমার বিবাহ হইবে না। আমি স্বয়ং পদ্মাবতী তােমাকে স্বপ্ন দেখাইলাম, আমার কথা অন্ত থা করিও না।” বেহুলা স্বপ্ন দেখিয়া ঘুম ভাঙ্গিয়া উঠিয়া দেখিলেন ভাের হইয়া গিয়াছে, গাছে গাছে পাখীরা মধুর কণ্ঠে গান গাহিতেছে। ফুলের গন্ধে ভােরের বাতাস ভরিয়া গিয়াছে। বেহুলার মনে আজ আনন্দ ধরে না, কতকাল পরে আবার সে তাহার স্বামীকে ফিরিয়া পাইবে। তিনি তাহার মা সুমিত্রাকে কহিলেন, “মা আজ আমি সখীদিগকে লইয়া মুক্তা সরােবরে স্নান করিতে যাইব।” সুমিত্রা কহিলেন, ”সেকি মা, আমাদের কি দাস দাসীর অভাব যে তুমি পুকুরে স্নান করিতে যাইবে ? পুকুরে খাইয়া কাজ নাই, তােমার যত জলের প্রয়ােজন হয় দাসদাসীরাই বাড়ীতে আনিয়া দিবে।” বেহুলা কহিলেন, “না মা, আমি মুক্তা সরােবরেই স্নান করিতে যাইব,আজ আমি স্বপ্ন দেখিয়াছি।” ৭১ চঁদ সদাগর বেহুলার পিতা সাহ সদাগর মেয়ের কথা শুনিয়া বলিলেন, “বেশত মা, মুক্তা সরােবরে স্নানে যাইবার ইচ্ছা হইয়াছে, ভাল কাপড় চোপড় পরিয়া সখীদিগকে সাথে লইয়া স্নানে যাও।” বেহুলা আনন্দে সখীদিগের সাথে দোলায় চড়িয়া গান গাহিতে গাহিতে স্নানে চলিলেন। এই অবসরে মনসা দেবী বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর বেশ ধরিয়া যাইয়া মুক্তা সরােবরের ঘাটে বসিলেন। বেহুলা ঘাটের কাছে যাইয়া সন্ন্যাসীকে দেখিয়া কহিলেন, “সন্ন্যাসী ঠাকুর, এটা স্ত্রীলােকের স্নানের ঘাট, আমরা স্নান করিতে আসিয়াছি, তুমি অন্য ঘাটে যাও।” সন্ন্যাসী বলিলেন, “আমি কাল একাদশী করিয়াছি, আজ আর চলিবার শক্তি নাই, তােমরা অন্য ঘাটে যাইয়া স্নান কর।” বেহুলা সন্ন্যাসীর কথা না শুনিয়া ঘাটে নামিয়া জলে ঝাপাইয়া পড়িলেন। সে সময় তাহার পায়ের জলের ছিটা সন্ন্যাসীর গায় গিয়া পড়িল। সন্ন্যাসী রাগে অগ্নিশর্মা হইয়া অভিশাপ দিলেন, “বেহুলা তুই অহঙ্কারে আমার গায়ে তাের পায়ের জল দিলি. আমি অভিসম্পাত করিতেছি বিবাহের রাত্রিতে বাসর ঘরে তাের স্বামী সর্পাঘাতে প্রাণ হারাইবে।” সন্ন্যাসীর কথা শুনিয়া বেহুলার মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। তিনি সন্ন্যাসীর পায়ে ধরিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া ক্ষমা চাহিতে লাগিলেন। १२

চাঁদ সদাগর
কিন্তু সন্ন্যাসী বলিলেন, “আমার কথা মিথ্যা হইবে না বেহুলা,
বাসর ঘরেই তুই বিধবা হইবি।”
অত কঁদিয়া কাটিয়া কাকুতি মিনতি করিয়া হাতে পায়ে ধরিয়া
ক্ষমা চাহিয়াও যখন বেহুলা ক্ষমা পাইলেন না তখন সন্ন্যাসীর উপর
তাহার বড়ই রাগ হইল, তিনি বলিলেন,-
“যুতী তাের শাপে মাের হবে ঝি গাে।
আমারওত সহায় আছে মহাদেবের জি গাে
আমি জীয়াইতে পারি মরা গাে।
ওগাে সাগরে ডুবিলে পাই ভরা গাে।
যদি হই সতী নারী, তােমার শাপের কি ধারধারি।
সত্যধৰ্ম্ম যদি থাকে তাের শাপে আর হবে কি?”
“আমাদের দুই জনের আজ ধর্ম পরীক্ষা হউক, তুমি দেখ
আমি প্রকৃত সতী কিনা, আর আমি দেখিব তুমি প্রকৃত যতী
সন্ন্যাসী কিনা। আমি যদি সতী হই তবে এক ডুব দিয়া মনসাদেবীর
ঘট, সরা, শঙ্খ, সিন্দুর তুলিতে পারি, আর তুমি যদি প্রকৃত সন্ন্যাসী
হও তবে তুমিও তাহা তুলিতে পারিবে।”—এই বলিয়া বেহুলা দেবী
ডুব দিয়া মনসার ঘট সরা শঙ্খ সিন্দুর তুলিলেন। এবার সন্ন্যাসী
ঠাকুর ডুব দিলেন, কিন্তু একটা শোল মাছ লইয়া তিনি ভাসিয়া
উঠিলেন! ইহা দেখিয়া বেহুলা বলিলেন, “তুমি যে কেমন সন্ন্যাসী
তাহা বুঝিতে পারিলাম, সন্ন্যাসী হইয়া মাছ লইয়া উঠিলে ?”
৭৩

চঁদ সদাগর বেহুলা আবার ডুব দিলেন, এবার তাহার হাতে আয়ত্তের শাখা সিন্দুর উঠিল। সন্ন্যাসী এবার রাগ করিয়া তুবি দিলেন, কিন্তু দিলে কি হয়, এবারও অদৃষ্টে সেই শৌল মাছ! সদাগর ও দৈবজ্ঞ ঠাকুর সরােবরের তীরে একটা গাছের নীচে গােপনে বসিয়া বেহুলার এই অদ্ভুত ক্ষমতা দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেলেন। সদাগর দৈবজ্ঞকে বলিলেন, ‘শুনিয়াছি, বেহুলা মড়া বাঁচাইতে পারে, একবার স্বচক্ষে তাহা দেখিতে চাই।” দৈবজ্ঞ তখন একটা মড়া পক্ষী লইয়া বেহুলার নিকট বাইয়া বলিলেন, “মা, শুনিয়াছি তুমি মড়া বাঁচাইতে পার, আমার এই মড়া পাখীটা বাঁচাইয়া দাও।” বেহুলা ব্রাহ্মণের পায় প্রণাম করিয়া মন্ত্র পড়িয়া পাখীর গায় জল ছিটাইয়া দিলেন, অমনি পাখীটা উড়িয়া আকাশে চলিয়া গেল। চাঁদ সদাগর দূরে থাকিয়া সমস্ত দেখিয়া মনস্থ করিলেন, তিনি এই মেয়ের সাথেই তাহার পুত্র লক্ষ্মীন্দ্রের বিবাহ দিবেন। চন্দ্ৰধর সেখান হইতে দৈবজ্ঞকে সাথে লইয়া বেহুলার পিতা সা সদাগরের বাড়ী যাইয়া উপস্থিত হইলেন। সা সদাগর তাঁহাদের পরিচয় এবং আগমনের কারণ শুনিয়া পরম আহলাদিত হইয়া বলিলেন, “আমার পরম সৌভাগ্য যে, আপনার ব্যায় কুলে শীলে ৭৪ উঁদ সদাগর ধনে মানে শ্রেষ্ঠ বণিকের পুত্রের সাথে আমার কন্যা বেহুলার বিবাহ দিতে পারিব। আপনারা আগে স্নান পূজা ভােজনাদি শেষ করুন, পরে কথাবার্তা হইবে।” চাঁদসদাগর বলিলেন, “সেজন্য আপনাকে অনুরােধ করিতে হইবে না, আমরা অবশ্যই এখানে আহারাদি করিব। আমার একটা নিয়ম আছে যে, আমি মধ্যাহ্ন আহারের পূর্বে লােহার কলাই সিদ্ধ খাইয়া তারপর ভাত খাই। লােহার কলাই আমার কাছেই আছে, এই নিন, এই কলাই সিদ্ধ করিয়া দিবার ব্যবস্থা করুন।” এই বলিয়া চন্দ্ৰধর সা সদাগরকে লােহার কলাই দিলেন। সা সদাগর স্ত্রী সুমিত্রাকে ডাকিয়া বলিলেন, “আজ বেহাই এখানে আহার করিবেন, আগে তাহাকে এই লােহার কলাই সিদ্ধ করিয়া দাও। রান্নাবান্না যেন ভাল হয়, নিজে দেখিয়া শুনিয়া করিও।” লােহার কলাই সিদ্ধের কথা শুনিয়া সুমিত্রা অবাক হইয়া গেলেন। এত বয়স হইয়াছে কিন্তু কোথাওত তিনি লােহার কলাই সিদ্ধের কথা শােনেন নাই। যাহা হউক, বেহাই যখন খাইতে চাহিয়াছেন তখন করিয়া দিতেই হইবে। তিনি তাঁহার পুত্রবধূদিগকে ডাকিয়া লােহার কলাই সিদ্ধ করিয়া দিতে বলিলেন। তাহারা শাশুড়ীর মুখে আজ এই অদ্ভুত কথা শুনিয়া বলিল, “ছােট বেলা আমাদের বিবাহ হইয়াছে, কিন্তু লােহার কলাইত কোনও দিনও সিদ্ধ করিবার কথা শুনি নাই।” ৭৫ চঁদ সদাগর সুমিত্রা তখন উপায়ান্তর না দেখিয়া নিজেই রাঁধিবার আয়ােজন করিতে লাগিলেন । লােহার কলাই সিদ্ধ করিতে হইবে, কাজেই আয়ােজনও আবার সেইরূপ হওয়া চাই। দাসদাসীরা কেহ উনন খুড়িতে আরম্ভ করিল, কেহ ঘড়া ঘড়া জল আনিতে লাগিল, কেহ ভারে ভারে কাঠ লইয়া আসিল। সুমিত্রা প্রকাণ্ড একটা হাঁড়িতে জল দিয়া লােহার কলাই সিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। জ্বাল দিতে দিতে হাঁড়ির জল শুকাইয়া আসিল, কিন্তু তবু কলাই সিদ্ধ হইল না, সুমিত্রা মহা বিপদে পড়িলেন। এমন সময় স্নান করিয়া বেহুলা বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া তাহার মাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি রাধিতেছ মা?” সুমিত্রা হাসিয়া বলিলেন, “তাের শ্বশুর লােহার কলাই খাইবেন, তাহা সিদ্ধ করিতেছি।” মা তাহাকে উপহাস করিতেছেন ভাবিয়া বেহুলা লজ্জিত হইয়া চলিয়া গেলেন। এদিকে সুমিত্রার আর লােহার কলাই সিদ্ধ হয় না, মহা বিপদ! কলাই সিদ্ধ না করিতে পারিলে অতিথির খাওয়া হইবে না। সুমিত্রা লজ্জায় দুঃখে ও অপমানে কাদিয়া ফেলিলেন। সাহ সদাগরও মনে মনে বড়ই দুঃখিত হইলেন। মায়ের কান্না দেখিয়া বেহুলা উনানের কাছে আসিয়া দেখিলেন, সত্য সত্যই সুমিত্রা লােহার কলাই সিদ্ধ করিতেছেন, তখন তাহার মনে পড়িল সেই পূৰ্ব জন্মের কথা, অগ্নিদেব তাহাকে সােণা রূপা লােহা যে কোনও চঁদ সদাগর ধাতু জলে সিদ্ধ করিবার বর দিয়া ছিলেন। বেহুলা সুমিত্রাকে বলিলেন, “তুমি দুঃখ করিও না মা, আমি লােহার কলাই সিদ্ধ করিয়া দিতেছি।”—এই বলিয়া বেহুলা ভক্তিভরে অগ্নিদেবকে প্রণাম করিয়া নূতন উনানে নূতন হাঁড়িতে গঙ্গাজল দিয়া লােহার কলাই সিদ্ধ করিতে লাগিলেন, মাত্র আড়াইটা আখের পাতায় লােহার কলাই সিদ্ধ হইয়া গলিয়া গেল। চন্দ্রধর লােহার কলাই খাইয়া বেহুলার গুণে পরম পরিতুষ্ট হইলেন। তারপর আহারাদি শেষ করিয়া বিবাহের কথাবার্তা হইল। সা সদাগর লক্ষ্মীরে হাতে বেহুলাকে সমর্পণ করিতে বিন্দুমাত্র আপত্তি করিলেন না এবং সানন্দে সম্মতি দিলেন। গণক ডাকাইয়া বিবাহের দিন দেখা হইল, পরের দিনই উত্তম দিন পাওয়া গেল। চাঁদসদাগর কহিলেন, “আমি কালই পুত্রের বিবাহ দিব, শুভকাৰ্য্য শীঘ্র হওয়াই সঙ্গত।” সাহ সদাগরও আপত্তি করিলেন না। বিবাহের দিন ধার্য করিয়া চাদসদাগর চম্পক নগরে ফিরিয়া আসিলেন। সনকা বেহুলার গুণের কথা শুনিয়া সন্তুষ্ট হইলেন বটে কিন্তু পুত্রের বিবাহ দেওয়ার হার মােটেই ইচ্ছা নাই। মনসাদেবী যখন তাহাকে পুত্রবর দেন তখনই তিনি বলিয়াছিলেন যে, যে পুত্র হইবে সে তাহার বিবাহ রাত্রেই সর্পদংশনে মারা যাইবে। আজ ११ চাঁদ সদাগর পুত্রের বিবাহের কথা শুনিয়া সনকার সেই কথা মনে পড়িল। পুত্রের বিবাহে তাহার আনন্দ হওয়া দূরে থাকুক, বরং পুত্রের অমঙ্গল ভয়ে তাহার হৃদয় কম্পিত হইয়া উঠিল। তারপর যখন শুনিলেন, সদাগর আগামী কল্যই লক্ষ্মীরে বিবাহের দিন ঠিক করিয়া আসিয়াছেন তখন আর তিনি চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না, বুক ফাটিয়া কান্না আসিতে লাগিল। তিনি কঁাদিতে কাদিতে সদাগরের পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিতে লাগিলেন, “ওগো আমার লক্ষ্মীন্দ্রের বিবাহের কাজ নাই, বিবাহ হইলেই আর আমি তাহাকে দেখিতে পাইব না। মনসাদেবীর অভিশাপে তাহাকে বিবাহ রাত্রিতেই বাসর ঘরে সাপে কামড়াইয়া মারিবে।” সদাগর সনকাকে সান্ত্বনা দিয়া কহিলেন, “কোনও চিন্তা নাই সনকা, আমি লােহার বাসর ঘর নির্মাণ করিয়া দিব, সে ঘরে সাপ কেন একটু বাতাস পৰ্যন্ত প্রবেশ করিবার পথ থাকিবে না! বিবাহ রাত্রি অতীত হইলেই সমস্ত ভয় দূর হইবে। স্বয়ং মহাদেব আমার সহায় থাকিতে মনসার সাধ্য কি যে সে আমার পুত্রের অনিষ্ট করিতে পারে।” স্বামীর কথায় সনকা কিঞ্চিৎ সুস্থির হইয়া পুত্রের বিবাহে সম্মতি দিলেন। কিন্তু মনে তাহার একটা ভয় রহিয়া গেল । চাদসদাগর সনকার সম্মতি পাইয়া লােহার বাসর ঘর নির্মাণের জন্য তখনই লােক পাঠাইয়া চৌদ্দশত কৰ্ম্মকার আনাইলেন। সেই ৭৮ চাঁদ সদাগর কৰ্ম্মকারদিগের যে সর্দার তাহার নাম কালু। সদাগর কালুকে বলিলেন, “দেখ সর্দার, আজ দিন রাত্রির মধ্যে একটা লােহার বাসর ঘর তৈরী করিয়া দিতে হইবে। সেই বাসর ঘরে যেন কোথাও বাতাস প্রবেশের পর্যন্তু একটু পথ না থাকে।” কালু চৌদ্দশত কৰ্ম্মকার লইয়া বাসর ঘর নির্মাণ আরম্ভ করিল। চৌদ্দশত কৰ্ম্মকারের দিনরাত অনবরত পরিশ্রমে একদিনের মধ্যেই বাসর ঘর তৈরী হইয়া গেল। উঁদসদাগর বন্ধুবান্ধবদিগকে সাথে লইয়া আসিয়া ঘর পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন। সকলেই লােহার বাসর ঘর দেখিয়া খুব সন্তুষ্ট হইল, সদাগর যেমনটা চাহিয়াছিলেন ঠিক তেমনটাই হইয়াছে। চন্দ্ৰধর পরম আহ্নাদিত হইয়া কৰ্ম্মকার দিগকে বিস্তর ধনরত্ন পুরস্কার দিয়া বিদায় করিলেন। কামারেরা যখন বাড়ী চলিয়া যায় তখন মনসা দেবী নেতাকে কহিলেন, “এখন কি করি নেতা? চাঁদ সদাগর তাহার ছেলের জন্য লােহার বাসর ঘর নির্মাণ করাইয়াছে, তাহাতে বাতাস প্রবেশের পথটুকু পৰ্যন্ত নাই। অথচ লক্ষ্মীন্দ্রকে আমি বাসর ঘরে সর্পদংশনের অভিসম্পাত দিয়াছি।” নেতা বলিল, “তুমি এখনই যাইয়া আমাদের সর্দার কালুর সহিত দেখা কর, পথেই তাহার সহিত দেখা হইবে । তাহাকে ভয় দেখাইয়া বলিও, যদি সে পুনরায় যাইয়া বাসর ঘরে একটা ছিদ্র দিয়া না আসে তবে সে সবংশে নির্বংশ হইবে।” ৭৯ চঁদ সদাগর মনসা দেবী তখনই নাগ-রথে চড়িয়া যাত্রা করিলেন। পথেই কালুর সহিত দেখা হইল। তিনি তাহাকে বলিলেন, “আমাকে কি চিনিতে পারিতেছ কালু? আমি মনসা দেবী। তুমি এখন যে লােহার বাসর ঘর নির্মাণ করিয়া আসিলে এখনই যাইয়া তাহাতে একটি ছিদ্র করিয়া দিয়া আইস, নতুবা তুমি সবংশে নির্বংশ হইবে।” মনসা দেবীর কথা শুনিয়া এবং তাহার মুক্তি দেখিয়া কালু ভয়ে ও আশ্চর্যে নির্বাক হইয়া দাড়াইয়া রহিল। মনসা দেবী “আমার ক্ষমতা একবার দেখ কালু”-এই বলিয়া একটা জীবন্ত বটগাছের দিকে বিষ নয়নে চাহিলেন, অমনি সেই বট গাছটা আগুনে পােড় গাছের মত হইয়া গেল। মনসা দেবী আবার ভাল চোখে চাহিলেন, গাছটা আবার আগের মত সুন্দর হইয়া বাঁচিয়া উঠিল। কালু দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া এই সব দেখিয়া ভয়ে অস্থির হইয়া বলিল, “আমায় ক্ষমা কর মা, আমি এখনই যাইয়া বাসর ঘরে ছিদ্র করিয়া দিয়া আসিতেছি।” কালু ভাবিতে ভাবিতে যাইয়া চাঁদ সদাগরের বাড়ীতে উঠিল। সদাগর তাহাকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি সর্দার, আবার কেন?” কালু বলিল, “আজ্ঞে ভুলে চালের উপর একখানা খারাপ লােহার পাত দিয়া ফেলিয়াছি। সেখানা বদলাইয়া দিতে আসিয়াছি।” সদাগর খুসী হইয়া কহিলেন, “বেশত, বদলাইয়া দিয়া যাও।” ৮০ চাদ সদাগর কালু চালে উঠিয়া বাটালের এক ঘায়ে ছােট একটি ছিদ্র করিয়া দিয়া চলিয়া গেল। কালু চলিয়া গেলে সদাগরের সন্দেহ হইল। তিনি পরীক্ষা করিবার জন্য চালের উপর জল ঢালিয়া দেখিলেন। যখন সদাগর জল ঢালেন তখন মনসাদেবী একটি মাছির আকার ধরিয়া সেই ছিদ্রের উপর পড়িয়া ছিলেন কাজেই এক ফোটা জলও ঘরের ভিতর পড়িতে পারিল না। সদাগরের মনের সন্দেহ দূর হইল, তিনি নিশ্চিন্ত হইয়া সনকাকে গিয়া বলিলেন, “আর কোনও ভয় নাই সনকা, যে লােহার বাসর ঘর নির্মাণ করাইয়াছি-তাহাতে সাপ কেন একটু বাতাস ঢুকিবার জো নাই। তারপর বাসরের চারিদিকে পাইক প্রহরী ময়ূর, বেজী এবং নানা প্রকার ঔষধ রাখিয়া দিব, সাপের সাধ্য কি সে ঘরের কাছে যায়।” শুভ দিনে শুভলগ্নে মঙ্গল স্নান করিয়া লক্ষ্মীন্দ্র মুকুট মাথায় সােণার দোলায় চড়িয়া বন্ধুবান্ধব সঙ্গে বিবাহ করিবার জন্য উজানী নগর যাত্রা করিলেন। লােক লস্কর, পাইক বরকন্দাজ,হাতী ঘােড়া, বাদ্যবাজন ও বরযাত্রীর দলে চম্পক নগর হইতে উজানীর সমস্ত পথ ভরিয়া গেল। ছেলে বিবাহ করিতে চলিয়াছে, কিন্তু র মনে একটুও আনন্দ নাই, তাহার কেবলই মনসাদেবীর সেই চাঁদ সদাগর অভিসম্পাতের কথাই থাকিয়া থাকিয়া মনে হইতে লাগিল। তিনি চোখের জল মুছিতে মুছিতে লক্ষ্মীকে আশীর্বাদ করিলেন । যাত্রার সময় লক্ষ্মীন্দ্র নানা অমঙ্গল দেখিল। কিন্তু কেহ তাহা বড় গ্রাহ্য করিল না। গগাধূলি লগ্নে লক্ষ্মীন্দ্র যাইয়া বিবাহ সভায় বসিলেন। তাহাকে দেখিয়া সকলেই খুব সন্তুষ্ট হইল। চৌদিকে নানাসুরে মঙ্গল বাদ্য বাজিতে লাগিল এয়ােগণ উলুধ্বনি দিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে নানাবিধ বসন ভূষণে সজ্জিত হইয়া এয়ােগণের সাথে বেহুলা সুন্দরী ধীরে ধীরে আসিয়া লক্ষ্মীরে সম্মুখের আসনে বসিলেন। শুভ মুহূর্ত দেখিয়া শুভদৃষ্টি হইয়া গেল। উভয়ে উভয়কে দেখিয়া খুব সুখী হইলেন। এমন সময় হঠাৎ এক বিপদ উপস্থিত হইল। লক্ষ্মীরে মাথার উপরের সােণার ছত্র ভাঙ্গিয়া পড়িয়া গেল। শুভ কাৰ্যে ছত্রভঙ্গ একটা বড় অমঙ্গল চিহ্ন ভাবিয়া সকলে কাণাকাণি করিতে লাগিল। সুমিত্রা চোখের জল কেলিতে লাগিলেন। মহা আনন্দের মধ্যে একটা বিষাদের ছায়া পড়িল। সকলেরই মুখ শুকাইয়া গেল। সেই সভায় অন্যান্য দেবগণের সহিত মনসাদেবীও গােপনে উপস্থিত ছিলেন। ছত্ৰব্যতীত বিবাহ অসম্পূর্ণ থাকে বলিয়া তিনি তাড়াতাড়ি আড়াইরাজ সৰ্পকে লক্ষ্মীন্দ্রের মাথার উপর ছত্র ধরিতে বলিলেন। আড়াইরাজ সর্প লক্ষ্মীন্দ্রের মাথার উপর ফণা বিস্তার করিয়া ধরিল। বিবাহ সভার কেহ চঁদ সদাগর আর তাহা দেখিল না, কেবল লক্ষ্মীরে চোখে পড়িল। তিনি মাথার উপর অমন ভীষণ সর্প ফণা বিস্তার করিয়া থাকিতে দেখিয়া ভয়ে অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া গেলেন। সকলে হায় হায় করিতে করিতে যাইয়া চক্ষ্মীন্দ্রকে জড়াইয়া ধরিল। বিবাহের বাদ্যবাজন উলুধ্বনি সমস্তই একসাথে মিয়া গেল। বাড়ীময় কান্নার রােল উঠিল। চাঁদ সদাগর কপালে আঘাত করিতে করিতে কাদিতে লাগিলেন, হায় তিনি বাড়ী গিয়া সনকাকে কি বলিবেন? সনকাত পুত্রের বিবাহে মােটেই রাজী হইয়াছিলেন না, কেবল তিনিই জেদ করিয়া বিবাহ করাইতে আনিয়াছিলেন। এখন কোন্ মুখে যাইয়া তিনি বাড়ীতে উঠিবেন? বিবাহ সভায় উপস্থিত অনেকে বেহুলাকে অলক্ষ্মী, রাক্ষসগণী, খণ্ডকপালী ইত্যাদি বলিয়া নিন্দা করিতে লাগিল । বেহুলার মা সুমিত্রা মাটীতে লুটাইয়া লুটাইয়া কাঁদিতে লাগিলেন, তাহার কান্নায় যেন আকাশ ফাটিয়া যাইতে লাগিল। বেহুলা নীরবে বসিয়া চোখের জলে বুক ভাসাইতে লাগিলেন। মনসা তখন বিবাহ সভা হইতে ধীরে ধীরে উঠিয়া নিজের মন্দিরে চলিয়া গেলেন। মন্দিরে যাইয়া নাগদিগকে বলিলেন, “আজ সাবধানে তােমরা দুয়ারে পাহারা দাও, কেহ যেন মন্দিরে ঢুকিতে না পারে, আমার শরীর বড় খারাপ, ভাল করিয়া একটু ঘুমাইতে না পারিলে শরীর ভাল হইবে না।” নাগের মন্দিরের ৮৩

চাঁদ সদাগর
চারিদিকে পাহারা দিতে লাগিল। মনসাদেবী মন্দিরে ঢুকিয়া
চুপটী করিয়া শুইয়া রহিলেন।
বেহুলা অনেকক্ষণ বিবাহ সভায় বসিয়া থাকিয়া শেষে ধীরে
ধীরে যাইয়া মনসাদেবীর মন্দিরের দুয়ারে দাঁড়াইলেন ! নাগেরা
তাহাকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে গাে, কি জন্য এখানে
আসিয়াছ ?”
বেহুলা কহিলেন, “আমি সাহে বণিকের কথা বেহুলা, বড়ই
বিপদে পড়িয়া দেবীর কাছে আসিয়াছি।”
নাগেরা বলিল, “এখন দেবীর সাথে দেখা লইবার কোনও
উপায় নাই, কাল সকালে আসিও এখন দেবী ঘুমাইয়া
আছেন।”
বেহুলা হাত জোড় করিয়া অনুনয় করিয়া বলিলেন, “তােমরা
যাইয়া একবার দেবীকে আমার কথা বল, তাহা হইলে তিনি আমার
দুঃখ বুঝিতে পারিয়া নিশ্চয়ই তাহার সাথে দেখা করিবার অনুমতি
দিবেন।”
ধামু নামক নাগ যাইয়া মনসাদেবীকে বেহুলার কথা বলিল।
তখন সেখানে নেতা উপস্থিত ছিল। সে দেবীকে বলিল, “তুমি
বড় নিষ্ঠুর পয়া, বেহুলা মনের দুঃখে তােমার কাছে ছুটিয়া
আসিয়াছে আর তুমি তাহার সাথে দেখাটী পৰ্যন্ত করিতে
চাহিতেছ না।

চঁদ সদাগর মনসাদেবী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শেষে বেহুলাকে ঘরে পাঠাইয়া দিবার অনুমতি দিলেন। বেহুলা ঘরে ঢুকিয়া পদ্মাবতীকে প্রণাম করিয়া সমস্ত কথা কহিলেন। কিন্তু পদ্মাবতী উত্তর দেওয়া দূরে থাকুক তাহার দিকে একবার ফিরিয়াও চাহিলেন না। তখন বেহুলা বলিলেন, “মা, এত কাদিলাম, এত অনুরােধ করিলাম, তবু যখন তােমার দয় হইল না তখন আর এ জীবন রাখিব না, বিবাহ সভায় যাহার স্বামী মরেন, জীবন রাখিয়া তাহার সুখ কি? আমি এইখানেই আত্মহত্যা করিয়া সকল যন্ত্রণা জুড়াইব।” এই বলিয়া বেহুলা তাহার নিজের বুকে ছুরী বসাইয়া দিতে উদ্যত হইলেন। মনসাদেবী তখন তাড়া- তাড়ি বেহুলার হাত ধরিয়া কহিলেন, “শােন বেহুলা, তােমার স্বামী মরে নাই অনর্থক দুঃখ করিতেছ কেন ? বিবাহ সভায় যখন ছত্র ভাঙ্গিয়া পড়িল—তখন আমিই লক্ষ্মীরে মাথায় নাগছত্র ধরাইয়া- ছিলাম, লক্ষ্মীন্দ্র তাহা দেখিয়া ভয়ে মূচ্ছ। গিয়াছে। আমার ঘটের জল লইয়া গিয়া তাহার গায়ে ছিটাইয়া দাও তাহা হইলেই সে জ্ঞান পাইয়া উঠিয়া বসিবে।” বেহুলা দেবীকে প্রণাম করিয়া ঘটের জল লইয়া মনের আনন্দে বিবাহ সভায় চলিয়া আসিলেন। তখনো সকলে লক্ষ্মীকে ঘেরিয়া ধরিয়া তঁাদিতেছিল। বেলা ধীরে ধীরে সকলকে বলিলেন, “আপনারা দুঃখ করিতেছেন কেন ? পরমায়ু শেষ হইলে তাহাকে ৮৫ চঁদ সদাগর কেহ বাচাইতে পারে না। যে মরিয়া গিয়াছে তাহার জন্য শােক করিয়া লাভ নাই। আপনারা একটু সরিয়া যান, আমি স্বামীকে একবার ভাল করিয়া দেখিব।” বেহুলার কথায় সকলেই সরিয়া গেল। এক নির্জন ঘরে লক্ষ্মীরে মাথা কোলের উপর রাখিয়া বেহুলা বসিল। লক্ষ্মীরে মুখ দিয়া তখনাে ফেণা পড়িতেছিল। বেহুলা অনেকক্ষণ স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। তাহার পূর্বজন্মের সব কথা একে একে মনে পড়িতে লাগিল। তিনি চোখের জল মুছিয়া মনসার ঘটের জল লক্ষ্মীরে গায়ে ছিটাইয়া দিয়া বিয়নীর বাতাস দিতে লাগিলেন। একটু পরেই লক্ষ্মীন্দ্র উঠিয়া বসিলেন। বেহুলা হাসিমুখে স্বামীকে প্রণাম করিয়া তাহার পায়ের ধূলা লইলেন। এদিকে বিলম্ব দেখিয়া চাঁদ সদাগরের মনে হইল, রাক্ষসী বেহুলা বুঝি নির্জন ঘরে বসিয়া স্বামীর মাংস খাইতেছে। তাই তিনি তাড়াতাড়ি ঘরের দুয়ারে গিয়া লাঠির ঘায়ে কপাট ভাঙ্গিয়া ঘরে ঢুকিয়া পড়িলেন। ঢুকিয়াই দেখেন, বেহুলা ও লক্ষ্মী বসিয়া রহিয়াছেন। শ্বশুরকে দেখিয়াই বেহুলা ঘরের “ন্য দুয়ার দিয়া তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেলেন। চাঁদ সদাগৰ পুত্ৰকে লইয়া আবার বিবাহ সভায় আসিয়া বসিলেন। সকলে লক্ষ্মীকে সুস্থ শরীরে দেখিয়া পরম আদিত

চঁদ সদাগর
হইল। আবার বাডীময় আনন্দের নােল উঠিল। বিবাহের
যেটুকু বাকী ছিল এবার তাহা নির্বিঘ্নে শেষ হইয়া গেল।
আহারাদি শেষ হইলে চাঁদ সদাগর সাহু বণিককে বলিলেন,
“মনসার সহিত আমার চিরদিনের বিবাদ, এই জন্য আমি বাড়ীতে
লােহার বাসর ঘর নির্মাণ করাইয়াছি। আজ রাত্রিতে সেই বাসর
ঘরে লক্ষ্মীন্দ্র ও বৌমাকে রাখিব, নতুবা বড় বিপদের আশঙ্কা আছে।
আমি এখনই বৌমাকে লইয়া বাড়ী রওনা হইব, আপনি আপত্তি
করিবেন না।”
সমস্ত কথা শুনিয়া সাহ বাণিয়া আপত্তি করিলেন না। কিন্ত
বেহুলার মা শুনিয়া কাদিতে লাগিলেন। যাহা হউক, তাহাকে
অনেক প্রকারে বুঝাইয়া সুঝাইয়া চন্দ্ৰধর পুত্র ও পুত্রবধূ লইয়া সেই
রাত্রেই বাড়ী রওনা হইলেন।
চম্পক নগরের সকলেই অমন চাদপানা টুকটুকে বউ দেখিয়া
খুব সুখ্যাতি করিতে লাগিল। সনকা সােণার প্রদীপে দ্বতের বাতি
জালিয়া বধূবরণ করিয়া লইলেন। অমন সুন্দর বউ দেখিয়া
তাহার প্রাণেও আনন্দ ধরে না। তিনি সকলের কাছে শতমুখে
বউএর রূপের প্রশংসা করিতে লাগিলেন।

চাঁদ সদাগর বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দ্র লােহার বাসর ঘরে গেলেন। সােণার খাটে সুগন্ধি ফুলের বিছানা, বড় বড় ঝাড় লণ্ঠনের আলােকে ঘর আলােময়। হঠাৎ লক্ষ্মীরে খুব ক্ষুধা পাইল। তিনি বেহুলাকে বলিলেন, “আমার খুব ক্ষুধা পাইয়াছে বেহুলা, তুমি শীঘ্র উঠিয়া আমাকে শুধু কিছু ভাত রাঁধিয়া দাও,-ক্ষুধা আর সহ্য হয় না।” স্বামীর কথা শুনিয়া বেহুলা উঠিয়া বসিলেন। কিন্তু এখন তিনি কি করিয়া ভাত রাঁধিবেন, কোথায় চাউল, কোথায় হাড়ি, কোথায় উনান, কোথাই বা কাঠ? কিন্তু স্বামী খাইতে চাহিয়াছেন, দিলে যে পাপ হইবে। তাই তিনি অনেক চিন্তা করিয়া উঠিয়া গিয়া বরণ ডালার উপর যে ধান ছিল তাহা একটা একটা করিয়া নখ দিয়া খুঁটিয়া চাল তৈরী করিলেন, তার পর তিনটা নারিকেলের মালা তিনদিকে বসাইয়া উনান প্রস্তুত করিয়া বিবাহের একটা ঘটে চাউল জল দিয়া কাপড়ের আঁচলে আগুন ধরাইয়া জাল দিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে ভাত রান্না হইয়া গেল। পেট পুরিয়া আহার করিয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন। বেহুলা স্বামীর পায়ের কাছে বসিয়া রহিলেন। মনসাদেবী অনাগকে স্মরণ করা মাত্রই তাহারা আসিয়া দেবীর নিকট উপস্থিত হইল। তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, “তােমরা ৮৮ চাঁদ সদাগর যাইয়া লােহার বাসর ঘরে লক্ষ্মীকে দংশন করিয়া আস, আজ রাত্রিতে যদি লক্ষ্মীন্দ্রের মরণ না হয় তবে আর তাহার মৃত্যু হইবে না।” দেবীর কথায় অষ্টনাগ ধীরে ধরে চম্পক নগরের দিকে চলিল। দেবীর বরে লােহার বাসরের চারিদিকে যে প্রহরীরা ছিল কেহই তাহাদিগকে দেখিতে পাইল না। তাহারা লােহার বাসরের দরজার নিকট যাইয়া উপস্থিত হইল। বেহুলা পূর্বেই জানিলে যে বাসর ঘরে মনসাদেবীর অভিসম্পাতে তাহার স্বামীর মৃত্যু হইবে। অষ্টনাগ বাসর ঘরের দুয়ারে আসিয়াছে বুঝিতে পারিয়া তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, “তােমরা যে-ই হও, আমি দুয়ার খুলিয়া দিতেছি, ঘরের ভিতর আস, দেবী মনসার মাথা খাও, পলাইয়া যাইও না।” বেহুলা বাটীতে বাটীতে দুধ কলা সাজাইয়া দরজা খুলিয়া দিলেন। অষ্টনাগ ধীরে ঘরে প্রবেশ করিল। বেহুলা তাহাদিগকে বলিলেন, “তােমরা আজ আমার গৃহে অতিথি, অতিথির পূজা করা গৃহস্থের অবশ্য কর্তব্য, তােমর এই দুধ কলাটুকু খাও।” সাপেরা দুধ কলা পাইয়া মনের আনন্দে যে যত পারিল পেট ভরিয়া খাইল। বেহুলা যখন দেখিলেন, তাহারা আর পেটের ভারে নড়িতে চড়িতে পারিতেছে না তখন তিনি তাহাদিগকে একে একে ধরিয়া লােহার সিন্ধুকের মধ্যে পুরিয়া তালা বন্ধ করিয়া ফেলিলেন। অষ্টনাগেরা সিন্ধুকের মধ্যে বন্দী হইয়া রহিল। ৮৯ চঁদ সদাগর মনসাদেবী ধ্যানযােগে অষ্টনাগের বন্দীর কথা জানিতে পারিয়া বড়ই দুঃখিত হইলেন। যে ভাবে হউক আজ রাত্তিতে বাসর ঘরে লক্ষ্মীকে দংশন করা চাই। কালনাগ না হইলে আর কাহারও দ্বারা এ কাজ হইবে না, তিনি তখনই ধামু নাগকে কালীনাগকে ডাকিয়া আনিবার জন্য পাঠাইয়া দিলেন। কালীগ আসিয়া উপস্থিত হইলে মনসাদেবী তাহাকে লক্ষ্মীকে দংশন করিতে যাওয়ার জন্য বলিলেন। কালীনাগ বলিল, “মা কোন অপরাধে আমি তাহাকে দংশন করিতে যাইব? সনকা দিন রাত তােমার পূজা করে, কোন্ পাপে তুমি তাহাকে এই পুত্র শােক দিতে চাহিতেছ ? বিনা অপরাধে কাহাকেও এমন শাস্তি দেওয়া উচিত নহে। মনসাদেবী কহিলেন, “আমি সনকাকে পুত্র বর দেওয়ার সময়ই বলিয়াছি যে, তাহার পুত্র বিবাহের রাত্রিতে সর্প দংশনে মারা যাইবে। সুতরাং আমার সে অভিশাপ পূর্ণ করিতে হইবে। ইহাতে তােমার কোনও অপরাধ হইবে না। আজ যদি লক্ষ্মীন্দ্র সর্প দংশনে মারা না যায় তবে চাঁদ সদাগরের অহঙ্কার আরও বৃদ্ধি পাইবে।” কালীগ আর কোনও উত্তর না দিয়া লক্ষ্মীকে দংশন করিতে চলিল। রাত্রি তখন প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে। বেহুলা বিভাের হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। কালীনাগ সূতার মত আকার ধরিয়া চাদ সদাগর লােহার বাসরের সেই ছিদ্র দিয়া ঘরে ঢুকিল। ঘরে প্রদীপ জ্বলিতে ছিল, সেই প্রদীপের আলােকে বেহুলা ও লক্ষ্মীকে দেখিয়া কালী নাগের প্রাণে বড়ই দয়া হইল। সে ভাবিতে লাগিল, “হায় মনসা কি পাষাণী, বিনা অপরাধে এমন সুন্দর লক্ষীন্দ্রকে দংশন করিবার জন্য আমাকে পাঠাইল। এই বাসর ঘরে বেহুলা বিধবা হইবে, কাল সকালে উঠিয়া সনকা আর লক্ষ্মীন্দ্রকে কোলে লইয়া বুক জুড়াইতে পারিবে না। যাহা হউক, যখন মনসা আমাকে পাঠাইয়াছেন তখন আমাকে তাঁহার আদেশ পালন করিতেই হইবে।” —এই ভাবিয়া কালনাগ ফণা তুলিয়া ভীষণরূপে গিয়া লক্ষ্মীন্দ্রের কাছে দাড়াইল। কিন্তু কামড় দিতে বড়ই দুঃখ হইল। এমন সময় লক্ষ্মী পাশ ফিরিয়া শুইবার কালে তাহার পা গিয়া কালীনাগের উপর পড়িল। কালীগ দেবতাদিগকে সাক্ষী করিয়া বলিল, আপনারা আমার সাক্ষী থাকুন, লক্ষ্মীন্দ্র আমাকে লাথি মারিল,-- এবার আমি তাহাকে ক্ষমা করিলাম কিন্তু আর একবার হইলে ক্ষমা করিব না।” আবার লক্ষ্মীরে পা কালীনাগের গায়ে পলি। এবারও কালীগ তাহাকে ক্ষমা করিল। তৃতীয় বার যখন লক্ষ্মীরে পা তাহার গায়ে পড়িল তখন আর সে, ক্ষমা করিল না, দেবতাদিগকে সাক্ষী করিয়া লক্ষ্মীরে কনে আঙ্গুলে দংশন করিল। দংশনের ব্যথায় অস্থির হইয়া লক্ষ্মীন্দ্র উঠিয়া বসিলেন। কালনাগ তখন তাড়াতাড়ি পলাইবার চেষ্টা করিতেছিল, লক্ষ্মী তাহাকে চাদ সদাগর দেখিয়া খপ, করিয়া তাহার লেজ ধরিয়া ফেলিলেন, কিন্তু তখন কালনাগ সেই ছিদ্র পথে প্রায় অর্ধেক বাহির হইয়া গিয়াছে, লক্ষ্মী কাটারি দিয়া তাহার লেজটুকু কাটিয়া রাখিয়া দিলেন। কালনাগ চলিয়া গেল। বেহুলা তখনাে ঘুমে অচেতন। লমী বিষের জ্বালায় অস্থির হইয়া ছট ফট করিতে করিতে তাহাকে কত ডাকিলেন, কিন্তু বেহুলা জাগিলেন না। লক্ষ্মী আর বেশীক্ষণ বসিয়া থাকিতে পারিলেন না, অজ্ঞান হইয়া ঢলিয়া পড়িলেন। মনসাদেবী বেহুলাকে স্বপ্ন দেখাইলেন, “বেহুলা, ওঠ, আর কত ঘুমাও? চাহিয়া দেখ তােমার স্বামী সাপের কামড়ে ঢলিয়া পড়িয়াছে।” বেহুলা স্বপ্ন দেখিয়া উঠিয়া বসিয়া লক্ষ্মীস্ত্রের দিকে চাহিয়াই কাদিয়া ফেলিলেন। হায়, হায়, জন্মের মত তাহার সমস্ত সুখ শেষ হইয়া গেল, স্বামীকে একবার ভাল করিয়া তিনি দেখিতে পাইলেন । স্বামীর শােকে বেহুলার সারা বুকটা যেন জ্বলিয়া পুড়িয়া যাইতে লাগিল। সমস্ত পৃথিবী যেন তাহার চোখে অন্ধকার হইয়া আসিল। তিনি দেখিতে পাইলেন, স্বামীর পার্শ্বেই সাপের কতকটা লেজ পড়িয়া আছে, লেজটা তিনি কাপড়ের আঁচলে বাধিয়া স্বামীর মাথা কোলের উপর তুলিয়া বসিয়া বসিয়া কাদিতে লাগিলেন।

বেহুলা স্বামীর মাথা কোলে তুলিয়া কঁদিতে লাগিল পৃঃ৯২

No text on this page.

চাঁদ সদাগর সনকা প্রভাতে উঠিয়া মনের আনন্দে এয়ােদিগকে ডাকিয়া বাসী বিবাহের যােগাড় করিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় এক এয়াে বাসর ঘরে কান্নার শব্দ শুনিতে পাইয়া সনকাকে তাহা বলিল। এয়াের কথা শুনিয়া সনকার মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল, তিনি ছুটিয়া গিয়া বাসরের দুয়ার খুলিয়া দেখিতে পাইলেন, মড়া লক্ষ্মীকে কোলে করিয়া বেহুলা বসিয়া কঁদিতেছেন। অমনি তাহার বুকফাটা আকুল ক্রন্দনে বাড়ী ভরিয়া উঠিল। আত্মীয় স্বজন সকলেই কাদিতে লাগিল। যাহার মুখে যাহা আসিল সে তাহা বলিয়াই বেহুলাকে গালি দিতে লাগিল। কান্না শুনিয়া চাঁদ সদাগর ছুটিয়া আসিলেন। তিনিও হাহাকার কারতে করিতে বেহুলাকেই গালি দিতে লাগিলেন। হতভাগিনী বেহুলা কোনও উত্তর দিলেন , কেবল চোখের জলে বুক ভাসাইতে লাগিলেন। চাঁদ সদাগর সনকাকে সান্ত্বনা দিবার জন্য বলিতে লাগিলেন, “আর কাদিয়া কি হইবে? জন্ম হইলে মরণ অবশ্যই আছে। শিবদুর্গাকে স্মরণ কর তিনিই আমাদের শােক দূর করিবেন --- এখন তিদিগকে ডাকিয়া লইয়া আস, গাঙ্গুড়ের কূলে লইয়া গিয়া লক্ষ্মীকে সৎকার করুক। বাস! মড়া ঘরে রাখিয়া বাড়ীর অমঙ্গল করিয়া লাভ কি ? লক্ষ্মীকে পােড়াইবার কথা শুনিয়া বেহুলা বলিলেন, “লােকের চঁাদ সদাগর মুখে শুনিয়াছি, সাপের কামড়ে মড়া পােড়াইতে নাই, তাহাকে জলে ভাসাইয়া দিতে হয়। আপনারা একটা কলার ভেলা তৈরী করুন, আমি স্বামীকে লইয়া সেই ভেলায় চড়িয়া নদীতে নদীতে ভাসিয়া বেড়াইব। মা ভগবতী কৃপা করিলে আমি স্বামীকে বাঁচাইয়া লইয়া আসিতেও পারি। আপনারা আমাকে ভেলায় চড়িয়া ভাসিবার ব্যবস্থা করিয়া দিন।” বেহুলার কথা শুনিয়া চাঁদ সদাগর রাগে জ্বলিয়া উঠিয়া বেলাকে কুৎসিৎ ভাষায় গালি দিতে লাগিলেন। সােমাই পণ্ডিত চাদ সদাগরকে কহিলেন, “তুমি বউমাকে গালি দিতেছ কেন? তাহার কি দোষ? তুমি মনসার সাথে বিবাহ করিয়াছ, সেই পাপে তােমার এই সর্বনাশ হইয়াছে। এখন বউমা যাহা বলিতেছেন তাহাই কর, লক্ষ্মীকে কলার ভেলায় করিয়া ভাসাইয়া দাও, বৌমা যদি সাথে ভাসিতে চায় তাহাতে আপত্তি করিও না, মা আমার সতী লক্ষ্মী, নিশ্চয়ই সে স্বামীকে বাঁচাইয়া আনিতে পারিবে। সাপে মড়াকে পােড়াইবার ব্যবস্থা নাই, তাহাকে জলে ভাসাইয়া দেওয়াই নিয়ম। পণ্ডিতের কথা শুনিয়া চাঁদ সদাগর আপত্তি করিলেন না। তখনই মালী ডাকিয়া ভেলা প্রস্তুতের আদেশ করিলেন । ভেলা প্রস্তুত হইয়া গেলে আত্মীয় স্বজনেরা লক্ষ্মীকে ধরাধরি করিয়া গাজরের কুলে লইয়া আসিয়া গঙ্গাজলে স্নান করাইয়া চন্দন ১৪ চাদ সদাগর কুঙ্কুম গায়ে মাখিয়া নৃতন কাপড় পরাইয়া ভেলার উপর শােয়াইয়া দিল। বেহুলাও স্নান করিয়া নূতন কাপড় পরিয়া একে একে গুরুজন দিগকে প্রণাম করিয়া সৰ্বশেষে সনকার নিকট আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া কহিলেন, “মা আপনি আশীৰ্বাদ করুন আমি যেন স্বামী বাঁচাইয়া দেশে ফিরিতে পারি। যদি সত্য সত্যই আমি সতী সাধ্বী হই তবে মা নিশ্চয়ই আমার ছয় ভাসুর ও স্বামীকে লইয়া আবার দেশে ফিরিয়া আসিব। আপনি আমাকে সন্তুষ্ট হইয়া স্বামীর সঙ্গে ভেলায় ভাসিতে অনুমতি দিন। আমি আপনাকে চারিটা জিনিস দিয়া যাইতেছি, এই চারিটী জিনিস হইতে আপনি আমার ভবিষ্যতের সমস্ত কাজ কর্ম জানিতে পারিবেন। এই যে সিদ্ধ ধান দিয়া গেলাম, যখন দেখিবেন এই সিদ্ধ ধানে গাছ হইতেছে তখন বুঝিবেন আমি স্বামী লইয়া দেবপুরীতে গিয়া পঁহুছিয়াছি। এই যে সিদ্ধ হরিদ্রা, যখন ইহাতে গাছ হইবে তখন জানিবেন আমি স্বামী বাঁচাইয়াছি। এই যে ভাজা কলাই, যখন দেখিবেন ইহাতে গাছ হইয়াছে তখন বুঝিবেন আমার ছয় ভাসুর প্রাণ পাইয়াছেন। আমি বাসর ঘরে কিছু চাউল রাখিয়া আসিয়াছি, সেই চাউল হাঁড়িতে করিয়া জল দিয়া রাখিয়া দিন, যখন দেখবেন বিনা জালে সেই চাউল ফুটিয়া ভাত হইয়াছে, তখন মনে করিবেন, আমি স্বামী ও ভাসুর দিগকে লইয়া দেশে ফিরিতেছি।” তারপর বেহুলা যাইয়া মৃত চঁদ সদাগর স্বামীকে কোলে করিয়া ভেলার উপর বসিল। ধীর বাতাসে ভেলা ভাসিয়া চলিল। দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করিলেন। চন্দ্রধর, সনকা ও আত্মীয় স্বজন কাদিতে দিতে বাড়ী ফিরিলেন। ২৭ প্রকাণ্ড নদী, কুল কিনারা দেখা যায় না, চারিদিক শুধু ধূ ধূ করিতেছে, তাহাতে পাহাড়ের কত উচু ঢেউ। সেই ঢেউর মধ্য দিয়া বেহুলার ভেলা হেলিয়া দুলিয়া ভাসিয়া চলিয়াছে। কুল কিনারা শূন্য নদীর মধ্যে ভেলার উপর বসিয়া বেহুলার ভয় হইতে লাগিল। তিনি এক মনে দেবতাদিগকে ডাকিতে ডাকিতে ভাসিয়া চলিলেন। মনসা দেবী বেহুলার ভয় দেখিয়া আসিয়া তাহার । ভেলায় বসিয়া দৈববাণী করিলেন, “কোনও ভয় নাই বেহুলা, আমি মনসা তোমার সাথে আছি।” দৈববাণী শুনিয়া বেহুলার অতি দুঃখের ভিতরও হাসি পাইল। তিনি কহিলেন, “শিশুকাল হইতে তােমার পূজা করিয়া শেষে এই ফল পাইলাম। বিবাহ রাতে বিধবা হইতে কোথাও কাহাকেও শুনি নাই, কিন্তু তােমার পূজা করিয়া আমার অদৃষ্টে তাহাই ঘটিল। কাল রাত্রিতে বাদ্য বাজন আমােদ প্রমােদের মধ্যে চম্পক নগরে আসিয়াছিলাম, আর আজ মৃত স্বামী কোলে করিয়া নদীতে ভাসিয়া বেড়াইতেছি। তুমি আমাকে খুব পুরস্কার দিয়াছ ।

কে ১
.
বেহুলার ভেলা হেলিয়া দুলিয়া ভাসিয়া চলিয়াছে
পৃঃ ৯৬

No text on this page.

চাঁদ সদাগর
বাপ মার সাথে একবার দেখা করিয়া আসিতে পারিলাম না,
তাহা আমার খবর পাইলেন না, এই বড় দুঃখ রহিয়া গেল।”
মনসাদেবী তখন নেতাকে ডাকিলেন। নেতা খেত কাকের
রূপ ধরিয়া আসিয়া ভেলার উপর পড়িল। পদ্মাবতী কহিলেন
“বেহুলা, তােমার খবর লইয়া এই শ্বেত কাক উজানী নগরে যাইবে,
তুমি এক খানা পত্র লিখিয়া দাও *
বেহুলা কলার পাতে চোখের কাজল দিয়া একখানা চিঠি লিখিয়া
দিলেন। শেত কাক তাহা লইয়া উজানী নগরে গিয়া সুমিত্রার
সমুখে ফেলিয়া দিল। পত্র পড়িয়া সুমিত্রা চারিদিক শূন্য দেখিতে
লাগিলেন, তঁাহার কান্না শুনিয়া সকল ছুটিয়া আসিয়া যখন এই
সর্বনাশের সংবাদ শুনিল তখন তাহাদের মাথায়ও যেন আকাশ
ভাঙ্গিয়া পড়িল। বেহুলার বড় ভাই হরি সাধু তখনই বেহুলাকে
ফিরাইয়া আনিবার জন্য ঘােড়ায় চড়িয়া রওনা হইল। নদীর একটা
বাকের নিকট বেহুলার সহিত তাহার দেখা হইল হরি সাধু তাহাকে
বলিল, “বেহুলা কোথায় যাইতেছ ? মড়া কি কখনাে কেহ
বাচাইতে পারে ? নদীর ধারে লক্ষ্মীকে পােড়াইয়া চল বাড়ী
ফিরিয়া যাই বাবা মা তােমার জন্য কত কঁদিতেছেন। পথে কত
বিপদ আছে, কে তােমাকে তখন রক্ষা করিবে? আমার কথা শােন,
বাড়ী ফিরিয়া চল।”
বেহুলা বলিলেন, “দাদা, আমাকে অমন কথা বলিও না। যাহার
৭

চাদ সদাগর স্বামী মরয়া যায় সংসারে আর তাহার সুখ কোথায়। আমি স্বামী লইয়া দেবপুরে চলিয়াছি, সেখান হইতে স্বামীকে বাঁচাইয়া তবে ঘরে ফিরিব। বাবা মাকে তােমরা সান্ত্বনা দিও। যদি স্বামীকে বাঁচাইতে না পারি তবে আর ফিৰিব না। তুমি দেশে ফিরিয়া যাও দাদা, আমি যে কাজের জন্য চলিয়াছি তাহাতে বাধা দিও না।” হরি সাধু আর বেহুলাকে কোনও কথা না বলিয়া চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে বাড়ী ফিরিয়া গেল। রাত নাই দিন নাই, বেহুলা ভাসিয়া চলিয়াছেন। লক্ষ্মীরে গায়ের মাংস পচিয়া থক থকে হইয়া গিয়াছে, জলের একটু ঢেউ লাগিলেই তাহা খসিয়া জলের সাথে ভাসিয়া যায়। বেহুলা আর উপায় না দেখিয়া লক্ষ্মীরে পচামাংস ধুইয়া ফেলিয়া মাত্র হাড় কয়খানি যত্নে রাখিয়া দিলেন। পথে বেহুলাকে অমন ভাবে ভাসিয়া যাইতে দেখিয়া কত লােকে কত কথা বলিতে লাগিল, কত ভয় ও প্রলােভন দেখাইল, কিন্তু সতী সাধ্বী বেহুলা কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ না করিয়া দেবতার নাম জপিতে জপিতে ভাসিয়া চলিলেন। যাইতে যাইতে বেহুলা যাইয়া নেতা ধােপানীর ঘাটে পঁহুছিলেন। এই নেতা। মনসা দেবীর সখী সে এই ঘাটে দেবতাদের কাপড় কাচে । বেহুলাকে দেখিয়াই নেতা চিনিতে পারিয়া বলিল, “বেহুলা, তােমার দুঃখের শেষ হইয়াছে, আর তােমাকে মরা স্বামী লইয়া ভাসিয়া বেড়াইতে হইবে না। তুমি দুই এক দিন আমার ১

চঁদ সদাগর
এখানেই থাক, আমি তােমার স্বামী বাচাইবার সমস্ত ব্যবস্থা
করিয়া দিব।”
বেহুলা নেতার কথায় রাজী হইয়া সেখানে কয়েক দিন রহিলেন।
একদিন তিনি নেতাকে কহিলেন, “মাসীমা, আজ তুমি ঘরে থাক,
আমি দেবতাদের কাপড় কাচিয়া দেই।”
নেতা বলিল, “বেশত, মনসাদেবীর কাপড় খানা তুমি কাচিয়া
দাও।”
বেহুলা মনসাদেবীর কাপড় খানা বেশ পরিপাটী করিয়া ধুইয়া
তাহাতে সুন্দর ফুটন্ত পদ্মফুল অকিয়া দিলেন। নেতা সেই কাপড়
লইয়া মনসা দেবীর কাছে গেলে তিনি কাপড় দেখিয়া বড়ই সন্তুষ্ট
হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “সত্য করিয়া বলত নেতা, আমার কাপড়ে
এমন সুন্দর পদ্মফুল কে আঁকিয়া দিয়াছে ?”
নেতা বলিল, “আমার এক বােনঝি আসিয়াছে, সে অতি সুন্দর
শিল্পকাৰ্য জানে, এই ফুল তাহারই হাতের আঁকা।”
নেতার কথায় পদ্মাবতী বিষম রাগ করিয়া বলিলেন, “নেতা,
তুমি আমাকেও ঠকাইতে চাইতেছ? আমি কি কিছু জানি না ?
এ ফুল বেহুলার হাতের আঁকা। তুমি এখনই এখান হইতে দুর
হও, অন্য কেহ হইলে তাহাকে আমি আচ্ছা সাজা দিতাম।”
নেতা বলিল, “ছােট বেলা হইতে বেহুলা তােমায় সেবা করিয়া
আসিতেছে তাহার ফল তুমি তাহাকে হাতে হাতে দিয়াছ। সে

চঁদ সদাগর
মরা স্বামী লইয়া ভাসিতে ভাসিতে তােমার কাছে আসিয়াছে,
আমিই তাহাকে আমার বাড়ীতে স্থান দিয়াছি। তােমার কাপড়ে
সে-ই পদ্মফুল আঁকিয়া দিয়াছে, তাহাতে তােমার রাগের সীমা নাই।
এমন হইলে তােমাকে কেহ পূজা করিবে না। বেহুলাকে এত
কষ্ট দিয়াও কি তােমার সাধ মিটে নাই ?”
মনসাদেবী একটু লজ্জিত হইয়া বলিলেন, “নেতা, বেহুলার
স্বামীকে আমি বাঁচাইব নিশ্চই, কিন্তু এখন তাহাকে আরও একটু
কষ্ট পাইতে হইবে।
নেতা সেখান হইতে রাগ করিয়া আসিয়া বেহুলাকে ক হলেন,
“লাে, মনসাদেবীর দ্বারায় তােমার কোনও উপকারের আশা নাই,
তুমি তাহার পুরীতে না গিয়া মহাদেবের পুরীতে গিয়া নৃত্য করিয়া
ইচ্ছামত বর চাহিয়া নিও। আমার ছেলে ধনপতির দুইটা মৃদঙ্গ
আছে, আমি গােপনে তােমাকে তাহার একটা মৃদঙ্গ দিয়া দিব, তুমি
সেই মৃদঙ্গ বাজাইয়া মহাদেবের সভায় নাচিও।
রাত্রি প্রভাত হইতেই বেহুলা মৃদঙ্গ লইয়া মহাদেবের পুরীর
উদ্দেশ্যে ভেলা ভাসাইলেন।
শিবপুরীতে দেবতাদিগকে সাথে লইয়া রহময় সিংহাসনে শিব
পার্বতী বসিয়া আছেন। বেহুলা পুরীর সম্মুখে গিয়া শিব দুর্গাকে
১০০

No text on this page.

~
ফি
* * *
শেখ কত --
বেহুলা সভায় প্রবেশ করিয়া নৃত্য-গীত আরম্ভ করিল।
পৃঃ-১০১

চঁদ সদাগর শুনি নাই। লক্ষ্য করিয়া প্রণাম করিয়া বাহিরে গড়াইয়া মৃদঙ্গ বাজাইয়া গান আরম্ভ করিলেন। শশাকে তাপে অনাহারে অনিদ্রায় বেহুলার শরীর নিতান্ত দুর্বল হইয়া গেলেও তাহার সেই কোকিলের মত সুন্দর মিষ্টি সুর তেমনি রহিয়াছে। পুরীর মধ্যে বসিয়া বেহুলার গান শুনিয়া মহাদেব নন্দীকে বলিলেন, “যে দিন উষা ও অনিরুদ্ধ স্বর্গ ছাড়িয়া গিয়াছে সেই দিন হইতে এমন মধুর গান আর আমি যে গান গাহিতেছে তুমি এখনই গিয়া তাহাকে সভায় লইয়া আস।” নন্দীর সাথে বেহুলা সভায় প্রবেশ করিয়া নৃত্য ও গীত আরম্ভ করিলেন। তাঁহার সুরে তালে সভাসুদ্ধ দেবতারা মুগ্ধ হইয়া গেলেন। সব চেয়ে বেশী মুগ্ধ হইলেন মহাদেব। তিনি আনন্দে আত্মহারা হইয়া নদীকে বলিলেন, “নন্দী, বহুদিন পরে আজ আমি গানের মত গান শুনিলাম,তুমি উহাকে জিজ্ঞাসা কর সে কি বর চায়।” বেহুলা করঘােড়ে কহিতে লাগিলেন, চম্পক নগরের চাদসাগর আপনার পরম ভক্ত। আমি তার কনিষ্ঠ পুত্রবধূ বেহুলা। মশার অভিসম্পাতে বিবাহ রাত্রিতে বাসর ঘরে আমার স্বামী সর্পদংশনে মারা গিয়াছেন। মরা স্বামী লইয়া ভেলায় ভাসিতে ভাসিতে অনা- হারে অনিদ্রায় ছয়মাস কটাইয়া আজ আপনার পুরীতে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি। আপনি দয়া করিয়া আমার মীর জীবন দান করুন-এই আমি চাই।

চঁদ সদাগর ভগবতী শিবকে বলিলেন, “এই বেহুলাই পূর্বজন্মে উষা ছিল, মনসার চক্রান্তে আপনার অভিশাপে ইহাৱা স্বামী স্ত্রী পৃথিবীতে যাইয়া লক্ষ্মীন্দ্র ও বেহুলারূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছে। মনসার অভি শাপে বেহুলা আজ বিধবা। আপনি মনসাকে ডাকাইয়া লমীকে বাঁচাইয়া দিন।” মহাদেব তখনই নন্দীকে মনসার নিকট পাঠাইয়া দিলেন। নন্দীর মুখে সমস্ত কথা শুনিয়া মনসাদেবী চতুরতা করিয়া কহিলেন, “আমার শরীর ভাল নহে, আমি এখন যাইতে পারিব না।” নন্দী ৰাইয়া মহাদেবকে সে কথা জানাইলে তিনি গণেশকে পাঠাইয়া দিলেন। মনসাদেবী তখনও আসিলেন না। মহাদেব রাগে অগ্নি অবতার হইয়া কার্তিককে পাঠাইয়া দিলেন। কার্তিক যাইয়া মনসাকে বলিলেন “দিদি বাবা তােমাকে যাওয়ার জন্য দুইবার লােক পাঠাইলেন, কিন্তু তুমি মিথ্যা বলিয়া যাও নাই। বাবা তােমার চাতুরী সমস্তই বুঝিয়াছেন, এবার যদি আমার সাথে না যাও তবে কিন্তু তােমার আর রক্ষা নাই। বেহুলাকে বাবা স্বামীদান দিবার জন্য প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, তুমি এখনই আমার সাথে চল।” কার্তিকের কথায় মনসার মনে বড় ভয় হইল; শিব রাগ হইলে বর্গ মর্ত্য পাতালে আর কাহারও নিস্তার নাই, তিনি ইহা বেশ ১২ চাদ সদাগর জানিনে। কাজেই এবার আর আপত্তি করিলেন না। সাপের অলঙ্কার পরিয়া সাপের রথে চড়িয়া তিনি শিবের সভায় মাত্রা করিলেন। তখনাে বেহুলা নৃত্য করিতেছিলেন। মনসা ধীরে ধীরে যাইয়া মুখটা নীচু করিয়া সভার এক ধারে বসিলেন। তাঁহার বুক ভয়ে দুর দুর করিয়া কাপিতে লাগিল, এতগুলি দেবতার মধ্যে আজ তাহাকে জানি কতই অপমান হইতে হয়। মহাদেব পদ্মাবতীকে কহিলেন, “পদ্মা, কোন অপরাধে তুমি বিবাহ রাত্রিতে বাসর ঘরে লসীজের প্রাণ নাশ করিয়াছ? প্রাণে কি তােমার একটুও দয়ামায়া নাই ? ত্রিভুবনে তােমার এ কলঙ্ক •াকিবে। এখন যদি মঙ্গল চাও তবে লক্ষ্মীকে বাঁচাইয়া দাও।” পদ্মাবতী মহাদেবের ক্রোধ দেখিয়া ভীত হইয়া হাত ঘােড় করিয়া কহিলেন, “বাবা, আপনি অনর্থক আমাকে দোষ দিতেছেন। বেহু- লার কর্মদোষে তাহার স্বামী মরিয়াছে, ইহাতে আমার অপরাধ কি? আমি দেবতাদিগকে সাক্ষী করিয়া বলিতেছি, আমি এ বিষয় কিছুই জানি না, যদি আমি বেহুলার স্বামীকে মারিয়া থাকি তবে নিশ্চয় তাহাকে আবার বাঁচাইয়া দিব। যাহার আয়ুক্ষয় হইয়াছে সে মরিয়াছে ইহাতে আমার কোন দোষ নাই।” বেহুলা বলিলেন, “তুমি মা দেবতা হইয়া এই দেবতার সভায় গড়াইয়া এত বড় মিথ্যা কথাটা বলিলে যে, আমার স্বামীর মরণের চঁদ সদাগর কথা তুমি কিছুই জান না? আমি শিশুকাল হইতে তােমায় পূজা করিয়া শেষে কি এই ফল পাইলাম ? তোমার অষ্টনাগকে ডাকিয়া আন আমি প্রমাণ করিয়া দিতেছি যে তুমি তুমি কিছু জান কিনা।” দেবতারা সকলেই বলিতে লাগিলেন, “বেহুলা কখনাে মিথ্যা কথা বলিতেছে না। মনসাই লক্ষ্মীরে মৃত্যুর কারণ।” ভগবতী এতক্ষণ চুপ করিয়া ছিলেন। মনসার মিথ্যা কথায় তিনি রাগিয়া শিবকে বলিতে লাগিলেন, “মনসা চিরকালের রাক্ষসী, যে নিজের স্বামীকে খাইতে পারে সে আর অন্যের স্বামীকে খাইতে পারিবে না কেন? সে সত্য বলুক মিথ্যা বলুক তাহাতে আমাদের প্রয়ােজন নাই, আপনি বেহুলার স্বামী বাঁচাইয়া দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন এখন সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করুন। আপনি ইচ্ছা করিলেই সব হইবে, পত্মাবতীর ইহাতে কোনও দরকার নাই।” বেহুলা তাহার আঁচলে বাধা কালীনাগের লেজ খুলিয়া সভার মধ্যে রাখিয়া কহিলেন, “আপনারা সকলে দেখুন, এই সাপ আমার স্বামীকে বাসর ঘরে কামড়াইয়াছিল। স্বামী সেই সাপের লেজ কাটিয়া রাখিয়া দিয়াছেন। আপনারা সেই কালী নাগকে সভায় ভাকিয়া আনিয়া দেখুন আমার কথা সত্য কিনা।” পদ্মাবতী কহিলেন, “কালীনাগ লক্ষ্মীকে কামড়াইয়াছে তাহাতে আমার অপরাধ কি? আমাকে কি জন্য আপনারা সকলে

চাঁদ সদাগর
দোষ দিতেছেন। সে কালীদহ সাগরে থাকে, আমার সাথে তাহার
সম্পর্ক কি?”
বেহলা কহিলেন, “তােমার যুক্তি না হইলে কালীগ কামড়াইতে
যায় নাই। তুমি প্রথমে অষ্টােগকে পাঠাইয়াছিলে, আমি কৌশলে
তাহাদিগকে বন্দী করিয়া ফেলিয়াছিলাম।
তারপর যখন হঠাৎ
আমি ঘুমাইয়া পড়িয়াছি তখন তুমি কালনাগকে পাঠাইয়া আমার
স্বামীকে দংশন করাইয়াছ।”
মহাদেব কহিলেন, “পদ্ম অনর্থক আর মিথ্যা কথা বলিয়া লাভ
কি? আমরা সকলেই বুঝিয়াছি যে তােমার চক্রান্তেই ইহা
ঘটিয়াছে। এখন লক্ষ্মীকে বাঁচাইয়া দাও, জগৎ ভরিয়া সকলেই
তােমার প্রশংসা করিবে।”
মনসাদেবী আর আপত্তি করিতে পারিলেন না। বেহুলাকে
লক্ষ্মীরে হাড়গুলি আনতে বলিলেন। বেহুলা ঝাঁপি খুলিয়া
হাড়গুলি বাহির করিয়া দিলেন। মনসাদেবী হাড়গুলি ভাল
করিয়া সাজাইয়া তাহার উপর অমৃতকুণ্ডের জল ছিটাইয়া
দিয়া মন্ত্র পড়িতে লাগিলেন। মন্ত্র পড়িতে পড়িতে বীজের
সমস্ত অস্থিগুলি একে একে জোড়া লাগিল, তারপর ধীরে ধীরে
মাংস রক্ত, চর্ম, চোক, কাণ, নাক, হাত, পা, চুল সমস্তই হইল।
মনসাদেবী অমৃতকুণ্ডের জল ছিটাইয়া মন্ত্র পড়িতে লাগিলেন।
দেখিতে দেখিতে লক্ষ্মী ধীরে ধীরে নিখাল ফেলিলেন। তারপর

চঁদ সদাগর
যেই মনসাদেবী তাহার কানে মহামন্ত্র দিলেন অমনি লক্ষ্মী
উঠিয়া বসিলেন। সভা দেবতারা সকলে জয়ধ্বনি করিয়া
মনসাদেবীকে ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন। লক্ষ্মীরে মনে
হইতে লাগিল, তিনি যেন কতকাল পরে ঘুম হইতে উঠিলেন।
স্বামীকে জীবিত দেখিয়া বেহুলার প্রাণে আর আনন্দ ধরে না, তিনি
বামীকে প্রণাম করিয়া একে একে সমস্ত দেবতাদিগকে প্রণাম
করিলেন। দেবতারা তাহাকে আশীর্বাদ করিলেন, “তুমি সতী-
শিরােমণি নামে কীৰ্ত্তি লাভ কর।”
লক্ষ্মীন্দ্র এদিক ওদিক চারিদিক চাহিয়া অবাক হইয়া বেহুলাকে
জিজ্ঞাসা করিলেন, “বেহুলা, আমরা ত বাসর ঘরে ওইয়াছিলাম,
হঠাৎ এই কোথায় আসিলাম?”
বেহুলা লক্ষ্মীকে সমস্ত কথা বলিলেন। লক্ষ্মীন্দ্র কহিলেন,
জন্মজন্মান্তরে না জানি কত পুণ্য করিয়াছিলাম তাই তােমার মত
এমন স্ত্রী পাইয়াছি।”
বেহুল। আবার নাচিতে লাগিলেন। মহাদেব কহিলেন, “তােমার
আর কি চাই বেহুলা? স্বামীর জীবন দান চাহিয়াছিলে তাহা
পাইয়াছ, আবার নাচিতেছ কেন?”
মনসাদেবী কহিলেন, বল বেহুলা, তােমার আর কি চাই?”
বেহুলা হাত ঘােড় করিয়া কহিলেন, “বাড়ীতে আমার ছয়
বিধবা মা রহিয়াছেন, খতরের দেবে তােমার কোপে পড়িয়া তাঁহারা

চাঁদ সদাগর
বিধবা হইয়াছেন। আমি স্বামী লইয়া দেশে ফিরিব আর তাহারা
চোখের জল ফেলিবেন, তাহা আমি সহিতে পারি না। তুমি মা,
তাঁহাদিগকে বাঁচাইয়া দাও, আমি তাহাদিগকে সাথে লইয়া বাড়ী
ফিরিব।”
মনসাদেবী তথা’ বলিয়া তখনই রথে চড়িয়া গঙ্গাদেবীর নিকট
হইতে লমীরে ছয় ভাইকে লইয়া আসিলেন। তাঁহাদিগকে দেখিয়া
বেহুলা ও লমীন্দ্রের আনন্দ আর ধরে না। লক্ষ্মীন্দ্র তাহাদিগকে
প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলি মাথায় তুলিয়া লইলেন।
এখন চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর পাইলে বেহুলা দেশে ফিরিতে পারেন।
তাই তিনি আবার নাচিতে লাগিলেন। মনসাদেবী জিজ্ঞাসা করিলেন,
“আবার কি বেহুলা? তুমি আর কি চাও?”
বেহুলা বলিলেন, “মা, আসবার সময় আমরা মাত্র দুইজন
ভেলায় চড়িয়া আসিয়াছিলাম। কিন্তু এখন আটজন হইয়াছি, তুমি
দয়া করিয়া আমার শ্বশুরের চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর ফিরাইয়া দাও।
আমরা তাহাতে চড়িয়া দেশে ফিরিব।”
মনসাদেবী পবন-নন্দন হনুমানকে সমুদ্র হইতে চাদ সাগরের
চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর তুলিয়া দিতে আদেশ করিলেন। আদেশ মাত্রই
হনুমান সমুদ্র হইতে চৌদ্দভিজা
মধুকর তুলিয়া আনিয়া নদীর তীরে
বাধিল।
বেহুলা, লক্ষ্মী ও ভঁহার ছয় ভাই দেবতাদিগকে প্রণাম করিয়া
১০৭

চাঁদ সদাগর মনসার ঘট লইয়া নৌকায় উঠিলেন। দেবতারা জয়ধ্বনি করিয়া পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। যেই দিন লক্ষ্মীরে চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর আসিয়া চম্পক নগরের ঘাটে লাগিবে সেইদিন সনকা স্বপ্ন দেখিলেন যে, বেহুলা তাহার সাত পুত্রকে বাঁচাইয়া চৌদ্দডিঙ্গা মধুর সহ দেশে ফিরিতেছেন। রাত্রি প্রভাত হইতে না হইইে সনকা তাড়াতাড়ি উঠিয়া বাসরঘরের দুয়ার খুলিয়া দেখেন, বেহুলা দেবপুরী যাত্রার সময় তাহাকে যে সিদ্ধ ধান, সিদ্ধ হলুদ এবং ভাজা কলাই দিয়া গিয়াছিলেন তাহাতে সত্যসত্যই গাছ হইয়াছে। বেহুলা বাসর ঘরে মাটীর হাড়িতে জল ও চাউল রাখিয়া গিয়াছিলেন, সনকা সেই হাঁড়ির কাছে গিয়া দেখেন বিনা আগুনে সেই চাউল টগবগ করিয়া ফুটিতেছে। তখন তাহার মনে হইল, সত্যসত্যই বুঝি বেহুলা তাঁহার সাত পুত্রকে বাঁচাইয়া চৌদ্দ ডিজা মধুকর উদ্ধার করিয়া দেশে ফিরিতেছেন। চাদ সাগর পাত্র মিত্র লইয়া বসিয়া আছেন, এমন সময় ধনা ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে বলিল, “মহারাজ, আজ বড় শুভসংবাদ। আপনার ছােট পুত্রবধু বেহুলা আপনার সাত পুত্রকে বাঁচাইয়া তাঁহাদিগকে লইয়া চৌদ্দডিজা মধুকরে চড়িয়া আসিয়া হীরাঘাটে পৌছিয়াছেন। শীঘ্র আসিয়া দেখিয়া যান। Sot চাঁদ সদাগর চাঁদ সদাগর অমনি পাত্রমিত্র লইয়া উদ্ধশ্বাসে হীরাঘাটের দিকে দুটিয়া চলিলেন। পুরােহিত সােমাই পণ্ডিত যাইয়া অাপুরে সনকাকে এ সংবাদ দিলেন। সনকা অমনি দাসী ও পুত্রবধূদিগকে লইয়া সাত ছেলের মুখ দেখিবার আশায় নদীর ধারে ছুটিলেন। বেহুলা মরা স্বামী ও মরা ভাসুরদিগকে বাঁচাইয়া ডুবিয়া যাওয়া চৌদ্দডিঙ্গা মধুকর লইয়া দেশে ফিরিয়াছেন একথা সারা চম্পকনগর ময় রাষ্ট্র হইয়া গেল। ছেলে বুড়াে বৌ ঝী গ্রামশুদ্ধ সকলেই নদী তীরে আসিয়া দাড়াইল । পিতামাতাকে দেখিয়া সাত ভাই নৌকা হইতে উপরে উঠিয়া আসিয়া তাহাদিগকে প্রণাম করিলেন। চতধর ও সনকা তাঁহাদিগকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া আনন্দে কাদিয়া ফেলিলেন। সনকা বলিতে লাগিলেন,“কৈ, আমার সতীসাধ্বী লক্ষ্মী বৌমা বেহুলা কৈ ?” তখন বেহুলা ধীরে ধীরে নৌকা হইতে উঠিয়া আসিয়া শ্বশুর শ্বশুড়ীকে প্রণাম করিলেন। সনকা তাঁহাকে কোলে তুলিয়া লইলেন। সকলে বেহুলাকে ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। বেহুলা সনকাকে বলিলেন, “মা, আমরা ফিরিয়া আসিয়াছি সত্য, কিন্তু শশুর মহাশয় যদি ভক্তি করিয়া মনসাদেবীর পূজা না করেন তবে এই ধনক্ষন এখনই আবার হারাইতে হইবে।” চাঁদ সদাগর বেহুলার কথা শুনিয়া রাগে আগুন হইয়া বলিলেন, “চাই না আমি ধনজন, সব যাউক। যে হাতে শিব-দুর্গাকে পূজা চাঁদ সদাগর করি সেই হাতে কানী মনসাকে আমি কখনই পূজা করিতে পারিব ।—চাইনা আমি সাত পুত্র,চাইনা আমি চৌদ্দভিজা মধুকর, সব যাউক।” চাঁদ সদাগরের কথা শুনিয়া সনকা কাদিতে লাগিলেন। তখন আকাশে দৈববাণী হইল,-“চন্দ্রধর, আর অহঙ্কার করিও না। আমি ভগবতী তােমাকে মনসাদেবীর পূজা করিতে বলিতেছি। আকাশে চাহিয়া দেখ, আমি ও মনসাদেবী এক ছাড়া দুই নই, ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি মাত্র।”—চন্দ্ৰধর আকাশের দিকে চাহিয়া দেখিলেন, সােণার রথে ভগবতী ও মনসা এক হইয়া বসিয়া আছেন। তিনি হাত তুলিয়া প্রণাম করিয়া কহিলেন, “মা, এতদিনে আমার ভুল ভাঙ্গিয়া গেল। আমি মনসাদেবীর পূজা করিব।” তারপর শুভদিন করিয়া সােণার প্রতিমা গড়াইয়া চাদ সদাগর মনসা পূজা করিলেন। মনসাদেবী চাদকে বর দিতে চাহিলে চাদ বলিলেন, “আমায় এই বর দাও মা, আমি যেন পুত্র পুত্রবধূ ও স্ত্রীকে লইয়া সুখে যাইয়া স্বর্গবাস করিতে পারি।” মনসাদেবী তথাস্তু বলিয়া অন্তর্হিত হইয়া গেলেন। চাঁদ সদাগরের নাতিরা মনসা পূজা দেখিতে আসিয়াছিলেন। তাঁহারা নিমন্ত্রণ খাইতে আপত্তি করিয়া বলিলেন, “বেহুলা একাকিনী ভেলায় ভাসিয়া দেবপুরে গিয়াছিল, সে সতীসাধ্বী কিনা সে বিষয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। সে যদি নিটী পরীক্ষা দিয়া আমাদিগকে চাঁদ সদাগর সন্তুষ্ট করিতে পারে আমরা তাহা হইলে তােমার বাড়ীতে নিমন্ত্রণ খাইতে পারি।” চাঁদ সদাগর বেহুলাকে বলিলেন, “মা লক্ষ্মী, তুমি একবার পরীক্ষা দিয়া জ্ঞাতিদের সন্দেহ দূর কর।” বেহুলা বলিলেন, “আমরা স্বামী-স্ত্রী পূর্বজন্মে উষা ও অনিরুদ্ধ ছিলাম, মহাদেবের সাপে পৃথিবীতে আসিয়া জন্ম লইয়াছি এখন আমাদের অভিশাপের কালপূর্ণ হইয়াছে। এখনই আমরা স্বর্গে চলিয়া যাইব। ঐ দেখুন আমাদের জন্য স্বর্গ হইতে রথ আসিতেছে। আর আমি পরীক্ষা দিতে চাহি না।” দেখিতে দেখিতে স্বর্গ হইতে রথ আসিয়া নামিল। বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দ্র পিতামাতা ও গুরুজনদিগকে প্রণাম করিয়া যাইয়া রথে উঠিলেন। চোখের নিমেষে বুথ উপরে উঠিয়া আকাশের গায়ে মিলাইয়া গেল। চাদ সদাগর ও সনকা পুত্র ও বধুর শােকে হাহাকার করিয়া কাদিতে লাগিলেন। সমাপ্ত ১১১

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Chand Sadagar

Author
Dutta,chandrakant
Title
Chand Sadagar
File name
Chand Sadagar
Text
OCR done
Citation
1914
Published
2010/02/7
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
134
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Epic
Keywords
Lakkhindar
DLI number
512533
Barcode
4990010019599.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
tR5yuioNE0f
Download PDF

Chand Sadagar