Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Satyer Pathe

Bhattacharya,digendranath · 2009/09/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সত্যের পরে
শ্রীদিগিন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।
মূল্য দশনা

প্রকাশক -ঐদ্বিজেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য,
কাত্যায়নী লাইব্রেরী, পােঃ নিজবুরুঙ্গা, হট্ট
[ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
প্রাপ্তিস্থানঃ-
দীনময়ী লাইব্রেরী, শ্রীহট্ট।
কাছাড় লাইব্রেরী, শিলচর।
কুলজা সাহিত্য-মন্দির, ৩০নং ওয়েলিংটন স্ট্রিট,
কলিকাতা।
কাত্যায়নী লাইব্রেরী, পােঃ—নিজবুরুঙ্গা
দ্বিজেনাথ ভট্টাচাৰ্য, কালীঘাট হিন্দুহােষ্টেল,
শ্রীহট্ট।

পিতামহী— স্বর্গীয়া কাত্যায়নী দেবীর চরণেদ্দেশে ভক্তি-নৈবেদ্য দাদুমা, বিশ্বের আলােয় চোখ মেলে সেই যে প্রথম তােমায় চিনেছিলুম, সেই হতে ক্ষুদ্র এই জীবনটী তােমার স্নেহের ক্রোড়ে কিই না পুলকে ধীরে ধীরে ফোটে উঠ- ছিলাে! কতই না স্নেহ দিয়ে ঘিরে রেখেছিলে তুমি তা’কে! তারপর স্বর্গ থেকে তােমার আবাহন এসে পৌছলাে,-তুমি ছেড়ে চলে গেলে ! তােমার বাণীটি এযে অনুখন প্রাণে জেগে আছে, “ওরে মরে গেলেও তােদেরে কি আমি ভুলতে পারিরে! আকাশের ঐ তারারই মতো উপর থেকে আমি তােদের পানে চেয়ে দেখবাে ! তােদের মুখের হাসি দেখে স্বর্গ থেকে আমি আনন্দের হাসি হাস্বাে!” জানিনা, কোন তারাটীর হাসি হ’তে আমার দাদুর আশীৰ্বাদ ঝরে পড়ছে। তােমারই আশীর্বাদের ক্ষুদ্র একটী কণিকার সাথে আমার অন্তরের অর্ঘ্য মিশায়ে আজ তােমার পূজার অর্ঘ্য রচেছি, দাদু! আমার প্রাণের উপহার পায়ে নাও দেবি! আমার পূজা গ্রহণ করাে। তােমার মেহের দিগি উপহার

নিবেদন।
আমার স্কাউট-ভ্রাতারা ও অন্যান্য ভাই বন্ধুরা “সত্যের পথে”
এর সকল দোষ-ত্রুটী ক্ষমা করিয়া তাহাকে স্নেহের চক্ষে
দেখিয়াছেন। তাই আমার এ সাহস। ভাইদের কাছে এই
উপহার।কাজেই ক্ষুদ্র হইলেও আদর পাইবে আশা আছে।
‘সত্যের পথে’ এর ভাল-মন্দ, দোষ-গুণ সম্বন্ধে বলিবার আমার
কিছু নাই।—লিখিবার সাধ, তাই লিখিয়াছি।
আসামের এ্যাসিষ্ট্যান্ট প্রভিন্সিয়াল কমিশনার অব্‌ স্কাউটস্,
মাননীয় শ্ৰীযুক্ত সতীশচন্দ্র রায় এম, এ (লগুন), স্কুল সমূহের
ইন্সপেক্টার মহাশয় অনুগ্রহ করতঃ সত্যের পথে’র একটী ভূমিকা
লিখিয়া দিয়াছেন। তাহ পরে উদ্ধত হইল। সত্যের পথে
তাহার বিশেষ স্নেহ ও অনুগ্রহ লাভে সমর্থ হইয়াছে। তাহাকে
আমার বিনীত ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি।
সত্যের পথের মঙ্গলাকাঙক্ষী বন্ধুবর্গ ও অন্যান্য সকলকে
আমার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি।
আষাঢ়, ১৩৩৫
নিজবুরুঙ্গা, শ্রীহট্ট।
বিনীত
শ্রীদিগিন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।

সত্যেরপথে।
=
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ সত্যের সাধনাকে আমাদের দেশবাসীর
চিত্তে মুদ্রিত করিয়া দিবার জন্য তাহার সঙ্গীতের ভাষায়
গাহিয়াছেন,
“মােরা সত্যের পরে মন,
আজি করিব সমর্পণ,
জয় জয় সত্যের জয়।
মােরা বুঝিব সত্য, পূজিব সত্য, খুজিব সত্য ধন,
জয় জয় সত্যের জয় ।
যদি দুঃখে দহিতে হয় তবু মিথ্যা চিন্তা নয়,
यमि
দৈন্য বহিতে হয় তবু মিথ্যা কৰ্ম্ম নয়,
यनि দণ্ড সহিতে হয় তবু মিথ্যা বাক্য নয়,
জয় জয় সত্যের জয় !”
শ্রীহট্ট রাজকীয় উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের স্কাউট-সঙ্ঘের
অন্যতম নেতা শ্রীমান্ দিগিন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য “সত্যের পথের
নাট্য-চিত্রে এই সত্যের সাধনাকে মূৰ্ত্ত করিবার প্রয়াস পাইয়া-
স্কাউট-মন্ত্রের সাধন-পথে যাহারা তীর্থযাত্রী হন,
তাহাদিগকে ‘ব্ৰতীবালক’,সেবক’, ‘শান্তিসেনা” প্রভৃতি বিভিন্ন
নামে পরিচিত হইতে দেখা যায়। কিন্তু নামের পেছনে
আসল বস্তুটী খুঁজিয়া দেখিলে আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা, মহৎ
লক্ষ্যের সম্মুখে আত্মবলিদান, পরহিতে নিজের সুখ-স্বার্থ
এমন কি জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করা ; প্রেমে, মৈত্রীতে, ভ্রাতৃ-
হের আকর্ষণে বিশ্ব-মানবকে আপনার পরিবার বলিয়া গ্রহণ
ও সর্বোপরি সত্য যাহা, ন্যায় যাহা, ধর্ম যাহা, তাহাতে

কায়মনােবাক্যে আত্মসমর্পণ করিয়া বীরােচিত সাহস ও নৈতিক শক্তির বলে সংসারের সকল পরীক্ষা ও প্রলােভনের মধ্যে সত্যকে, ন্যায়কে, ধৰ্ম্মকে নিজের ও অন্য সকলের জীবনে জয়যুক্ত করিয়া ভােলা—এই কয়টি স্বর্গীয় ভাবের সমাবেশই স্কাউট-জীবনের বিশেষত্ব বলিয়া করিতে হয়। লেখক ‘বিজিত’ ও ‘অধীরের জীবনে এই মহত্ত্বের, বীর- ত্বের, কৰ্ত্তব্য-নিষ্ঠার, নির্ভীক-চিত্ততার স্বর্গীয় আদর্শ অতি সুন্দর রূপে চিত্রিত করিয়াছেন। তাহার ভাষা যেমন সরল ও স্বাভাবিক, ভাব ও চিন্তা তেমনই উৰ্দ্ধমুখীন ও প্রাণস্পর্শী। স্থানে স্থানে লেখকের লিপি-কৌশল বঙ্গসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নাট্যকবি দ্বিজেন্দ্রলালের রচনা-চাতুর্য ও কল্পনা সম্পদকে উজ্জ্বল ভাবে আমাদের স্মৃতিপটে টানিয়া আনিয়াছে। বীজের মধ্যে যেমন ভাবী-বৃক্ষের বিকাশ নিহিত থাকে, তেমনি এই তরুণ কথা-শিল্পীর প্রথম-তুলিকা-পাতে ভবিষ্যৎ-কবি-প্রতি- ভাৱ পূৰ্বগামী ছায়া সুস্পষ্ট মুদ্রিত রহিয়াছে। এই নাট্য-কাব্যটির দৃশ্যগুলি পড়িতে পড়িতে আমার মনে স্বতঃই এই শুভাকাঙক্ষ। উদিত হইয়াছে যে, এই নবীন লেখকের যে বীজ-শক্তি এই প্রথম উদ্যমের মূলে প্রচ্ছন্ন ভাবে আত্ম- গােপন করিতেছে, তাহা যেন, উত্তরােত্তর বিকশিত হইয়া সাহিত্যসাধনার ক্ষেত্রে একটি ফলবান্, ছায়াবান্ বৃক্ষে পরিণত হয়। সাধক বিজিতের জীবনকে গ্রন্থকার স্বর্গীয় সঙ্গীতের সহিত তুলনা করিয়াছেন। আমাদের দেশের তরুণ সমাজে এরূপ জীবনের অনুপ্রাণনা স্বর্গের মন্দাকিনীর মতই অমৃত == ধারা প্রবাহিত করুক—ইহা যুবক-ভারতের হিতৈষী মাত্রেই বানীয় মনে করেন, ইহাতে সন্দেহ নাই। জাতীয় ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রেয়ের উপর শ্রেয়কে, আমার ইচ্ছার উপর মঙ্গলময়ের মঙ্গল-ইচ্ছাকে, আমার স্বার্থের উপর বিশ্ব- জাগতিক কল্যাণকে প্রতিষ্ঠিত করিতে হইলে ‘বিজিত ও ‘অধীরের’ মত সাধকদের আদর্শ সম্মুখে রাখিয়া চলিতে হইবে। ধৰ্ম্মের নামে যেখানে কেবল অর্থহীন অনুষ্ঠান, নীতির নামে যে সময়ে কেবল অতীত সংস্কারের অন্ধ-অনুবর্তন, সে দেশে সেই যুগে সত্যের এই আহ্বান বড়ই উপযােগী বলিয়া মনে হয়। ছাত্র-সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ আশাস্থল ; বর্তমান যুগের যুবক-সমাজই পরবর্তীকালে স্বদেশ-সেবা-ব্রতের পুরােহিতের আসন গ্রহণ করিবেন। এই ছাত্রসমাজ ও যুবক- সমাজের নিকট বিনীত অনুরােধ—তাহারা সত্যেরপথে’ এর দুর্গম পথ অনুসরণ করিবার জন্য ব্রতী হউন ও স্কাউটের সত্য-সাধনার মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া বলুন, “আমরা স্কাউটদল, ও ভাই, আমরা স্কাউটদল, সত্য মােদের লক্ষ্য, ও ভাই, সত্য মােদের বল।” == শ্ৰীসতীশ চন্দ্র রায়।

স্কাউট-সঙ্গীত
আমরা স্কাউটদল, ও ভাই, আমরা স্কাউটদল,
সত্য মােদের লক্ষ্য, ও ভাই, সত্য মােদের বল।
(কোরাস্)
কৰ্ম্মে মােদের ধৰ্ম্ম, মােদের কর্ম সাধনা,
পরের পরে স্কাউট কভু চেয়ে থাকেনা,
তােরা, কোথায় কেরে আছিস্ বসে চরে, ওরে চল্
একটী ডােরে বাঁধা সবাই আমরা ক’টি ভাই,
ছােট-বড় উঁচু-নীচু মােদের মাঝে নাই ;
ওরে, দীক্ষা যা’দের বিশ্বপ্রেমে ভয় কি তাদের বল্।
বিপদ দেখে পিছিয়ে যে যায় স্কাউট সেততা নয়,
দুঃখীর ব্যথা স্কাউটেরা বুক পেতেই লয়,
সবার সেবক আমরা আছি লজ্জা কি তা’য় বল্ ।
আপনারে বড় করে স্কাউট দেখেনা,
মানুষ তারা, স্কাউট তারা—একটু ভুলেন,
তােরা, যেথায় দেখি নীচতা, তা’ দরে, পায়ে দল।
-

টালিগঞ্জ
রাজীবলােচন
বৃদ্ধ জমিদার।
৩ . .
যুবক জমিদার ।
•
অরুণ
অধীর [ স্কাউট ]
বিজয়
বিজিত [ স্কাউট ]
মােহিত
হরিশৰ্মা
তারিণীচরণ
কালা
ঐ ভ্রাত।
রাজীবলােচনের বন্ধুপুত্র।
কুটিল বৃদ্ধ।
রাজীবলােচনের নামে।
বিজয়ের বালক-ভৃত্য।
a -
স্কাউট-মাষ্টার, গ্রামবাসীগণ, লাঠিয়াল, ভৃত্য ইত্যাদি।

JEI wilar
প্রথম ভাঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
স্থান—স্কাউট-কক্ষ। কাল-প্রভাত।
স্কাউট মাষ্টার ও বিজিত।
বিজিত। বুঝেছি গুরুদেব, আজ হতে আমার কর্তব্য
কত বৃহৎ—কত কঠিন! বুঝেছি, আজ থেকে আমার
সত্য কোথায়।
স্কাউট মাষ্টার। বিজিত! উপরে ভগবান আর নিয়ে
এই বিশাল বিশ্বের দিকে চেয়ে, এই পবিত্র স্কাউট-ব্যাজকে
সাক্ষী করে প্রতিজ্ঞা করাে—আজ তুমি যে দীক্ষা নিচ্ছে,
এর মৰ্যদা তােমা হতে কখনাে ক্ষুন্ন হবেনা। প্রতি
করাে—সত্য পথ থেকে কখনাে দূরে সরে যাবে না।

সত্যেৱপথে
বিজিত। প্রতিজ্ঞা করছি—এ দীক্ষার মর্যাদা আমাহতে
কখনাে ক্ষুন্ন হবেনা। প্রতিজ্ঞা কচ্ছি—আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্যের
সবটুকু দিয়ে আজীবন সত্যের সেবা করতে চেষ্টা করবাে।
আপনাদের আশীর্বাদ আমার সহায় হৌক।
স্কাউট মাষ্টার। ভগবানের শুভ করুণা-ধারা তােমার
অভিষেক করুক। এই ব্যাজ তােমায় পরিয়ে দিলুম।
আমার এ দান সার্থক হউক। আশীর্বাদ করি-ভদ্র হও,
ধন্যহও, ভারত-মাতার হও উপযুক্ত পুত্র’। আশীর্বাদ করি-
জীবনের পথে চিরদিন এগিয়ে চলােধৰ্ম্মের মতাে মহান
সমুদ্রের মতাে বিরাট, আকাশের মতাে উদার, ঐ সূৰ্য্যের
মতাে চির উজ্জ্বল-চির ভাস্বর ।
বিজিত। এ দান, এই আশীর্বাদ মাথা পেতে নিলুম।
এই মঙ্গল-বাণী যেন আমার জীবন-পথে চির অগ্রদূত
হয়ে থাকে।
স্কাউট মাষ্টার। ভগবান তাই করুন। আজ হাতে
এই বিরাট স্কাউট-সঙ্ঘের তুমি এক নবীন সেবক। তােমার
সেবা কে আমরা মহীয়ান্ করে তুলুক। তােমার গরিমায়
দেশের মুখ উজ্জ্বল হোক
বিজিত। আশীর্বাদ হউক সার্থক। দীক্ষা মাের হউক
সফল ! [ অভিবাদন করিয়া প্রস্থান

দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-বিজয়ের বহিঃকক্ষ। কাল-পূর্বাহু।
অরুণ ও বিজয়।
অরুণ।
ভিত্তিহীন অনুযােগ তৰ।
বিজয়, আমি তােমার বন্ধু,
চিরদিন বন্ধুই রহিব।
শক্র আমি তব ? বিশ্বাসকরিতে পারাে সখা ?
ফে তােমারে শৈশব হইতে
বেছে নিছে আজক্ষের সহচর বলি,
যাহার হৃদয় খানি
অনুখন তৃপ্ত ভালবাসি তোরে,
শত্রু সে তােমার!
বিশ্বাস করিলে বন্ধু?
কিন্তু, তুমি
বিজয়।
ভুলে যাও সব,
আর একর, অস্কের নমের মাঝে
ফিরে এসে কি ?

সত্যেৱপথে মনে করাে অতীত ছবিটা শুধু যবে দুইটি বালক, খেলিতে খেলিতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাইত- বক্ষে বক্ষে, প্রাণে প্রাণ মিশি, প্রভাতী পাখীর গানে ঘুম ভেঙ্গে ছুটে যেতে দুইটি হৃদয় পরস্পর পানে। কোথা কেটে যেতে দিন- সান্ধ্য-বায়ু আসিত নামিয়া যবে আঁধারের বুকে- আঁধার ফেলিত ছেয়ে দুইটী হৃদয়। দুইটী কিশাের, বিদ্যালয়ে একসাথে অপরের ঈৰ্ষা-দৃষ্টি মাঝে একসাথে একমনে চলে যেতাে ভেসে। প্রথম যৌবনে কত হাসি, কত স্বপ্ন মাঝে, কত ভাঙ্গা, কত গড়া দিয়ে কিইনা সুখের ছবি আঁকিতে তাহারা। তারপরে ঝাবাত দুজনারে নিল দুই পথে, তবু তারা চলিতে চলিতে

সত্যেন্দ্রপথে
ফিরে যেতে অতীতের স্বপনের মাঝে ।
শুধু এই—শুধু এই
ভুলে যাও আর যত কথা,
সেই তুমি সেই আমি,
অতীতের আমরা দুজন।
আমি শত্রু তব ?
বিশ্বাস করিতে পারাে সখা ?
বিজয়। আমারে করিও ক্ষমা।
এই যেন সত্যবলে মেনে নিতে পারি।
আমার অন্তরখানি ভেঙ্গে চূরে যায়
শত্রু বলি ভাবিতে তােমারে।
অরুণ! অরুণ! এই যেন সত্য হয় ভাই!
পিতারে বলিও তব, আমারে স্নেহভিক্ষা দিতে,
তুচ্ছ স্বার্থ লাগি
আমার হৃদয়-খানি
যেন নাহি ভেঙ্গে দেন ভাই।
[ বিজিতের প্রবেশ ]
বিজিত। দাদা, আসিয়াছি তােমাদের নিতে আশীর্বাদ।
আমার দীক্ষার মান
আমি যেন অক্ষুন্ন রাখিতে পারি।

বিজয়।
সত্য করিয়াছি,দাও আশীর্বাদ।
তােমাদের আশীর্বাদে
সত্যধৰ্ম্ম মাের রহিৰে অটুট।
এসাে ভাই, [পরম স্নেহে আলিঙ্গন করিলেন ]
আমাদের স্নেহের বৰ্ম্ম
তােমারে থাকুক ঘিরি চিরদিন তরে।
ঈশ্বরের করুণা লইয়া-
ধৰ্ম্মপথে চলাে সদা চির-গরীয়ান্।
তাের গর্কে ধন্য হাে দাদা তাের
প্রিয়তম ভাইটা আমার।
সফল-জীবন-গর্বে মহীয়া ও ভাই ।
[ আলিঙ্গন ]
[ স্কাউট-বেশে অধীরের প্রবেশ ]
[ স্মিত হাস্যে ] ছােটা বড়ই স্বার্থপর।
আমি খুঁজে খুঁজে সারা, আর তুমি
এরই মাঝে এসে, একা লুটেনিলে--
আশীৰ্বাদ, আলিঙ্গন সব !
আমি ও খাবনা ফিরে
শুধুহাতে, অমনি, একাকী।
অরুণ।
অধীর।

সত্যেৱপখ
বিজিত।
কেন যাবি?—এসঞ্চয়—এতে তােরই লাগি।
এই তাের সব, আর এই সাথে নে
তাের ছােড়দা’র বুকভরা স্নেহের কণিকা !
[ অধীরকে বক্ষে ধারণ ]
তৃতীয় দৃশ্য।
স্থান-কুটীর প্রাঙ্গন। কাল-অপরাঃ
গৃহমধ্যে উত্তেজিত হরিশৰ্ম্মা।
হরিশৰ্ম্মা।
কাল-সাপের মাথায় কুক্ষণে পা দিয়েছে,
অরুণ। এর কাল-বিষ তােমার সর্বনাশ না করে ছাড়বে
বুঝবে এর জ্বালা কত ভয়ঙ্কর। পাম তাে এমনি
করে পিষে ফেলতাম। হরিশৰ্ম্মা—দ্বিতীয় চাণক্য !
কখনাে অপমান ভুলে না। এতদিন সমাজের উপর অবিচারে
তার অবাধবাণিজ্য চালিয়ে এসেছে সে—আর আজ সে ঘৃণিত,
উপেক্ষিত হয়ে থাকবে ! কখনাে নয় ! এমনি করে চূর্ণ
করে তবে ছাড়বাে। জ্বালিয়ে মারবাে। হরিশৰ্ম্মার কাজের
উপর টু কবে-কারাে বাপের সাধ্য হয়নি। আর তমা-
দের এতদূর সাহস ! ছােট-লােকের কাছে আমাকে অপমান !

সত্যেরপথে
আমাকে প্রতারক বলে ডাকা । আমাকে লম্পট বলা ।
আমাকে মােড়ক বলা ! জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারবাে না
তােমাকে ? হরিশৰ্ম্মা—এ দ্বিতীয় চাণক্য। পিষে ফেলতে
পারিনা ? [ ক্রুদ্ধ-আক্রোশে পাচারণ করিতে লাগিলেন।
হরিশৰ্ম্মাকে অপমান? সর্বনাশ করবে। [পরিক্রমণ] সবে
মাত্র ঘূণ ধরিয়েছি বই তাে নয় ! তিলে তিলে মারূবাে।
বন্ধুত্ব ভাঙুবাে। এই বন্ধুকে দিয়ে তােমার সর্বনাশ করবাে-
দূরে বসে মজা দেখবাে। হরিশৰ্ম্মা—এ দ্বিতীয় চাণক্য,
অপমান ভুলে না।
দৃশ্যান্তর।
স্থান-বিজিতের কক্ষ, কাল—অপরাহু।
পাঠ-নিরত বিজিত।
হঠাৎ ভীতভাবে দৌড়িয়া আসিয়া কালা
গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল।
বিজিত। ত্রিস্তভাবে কি রে কালা, কি হয়েছে?
কালা। ভীতস্বরে] ওরে বাবারে! বুবু-বুবু-বুবু।
বিজিত। সে কি।
কালা। [বিজিতের কাছে সরিয়া আসিয়া দ্বারের দিকে
অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কহিল ] বু-বুবু-বুবু••••••

সত্যেপথে
[হরিশৰ্ম্মার প্রবেশ
বিজিত।
কে, চাটুয্যে মশায়? আসুন।
(কালা ভীতভাবে বিজিতের কাছে সরিয়া দাড়াইয়া
হরিশৰ্ম্মার দিকে সভয়-দৃষ্টিতে চাহিতে লাগিল ]
বিজিত। ও কিরে কালা
কালা। [নিম্নস্বরে] বুবু-বুবু•••••
হরি।
বাবা বিজিত, তােমার দাদা কোথায় বাবা ?
বিজিত।
দেখতে কালা, দাদা কোথায়। চাটুয্যে
মশায়কে তার কাছে নিয়ে যাতে।
কালা মিনতির দৃষ্টিতে চাহিয়া মাথা নাড়িয়া
অস্বীকার করিল ]
বিজিত। কেন রে ?
কালা। বুবু•••••
বিজিত।
কালা
বু।
বিজিত। [ হাসিয়া ] পাগল ! [ হরিশৰ্ম্মাকে ] আসুন,
আমিই নিয়ে যাচ্ছি।
[সকলের প্রস্থান)
বু-কিরে ?
৯

সত্যেৱপথে দৃশ্যান্তর। স্থান—প্রাসাদ-প্রকোষ্ঠ। কাল—অপরাহু। বিজয় ও হরিশৰ্ম্মা। হরি। তবুও কি বাবা, আমরা গরীব মানুষ। ও সব বড়লােক- দের বাদ-বিসম্বাদে আমাদের থাকতে নেই। করবে বাবা, তােমাদেরে কোলে-পিঠে করে এত বড় হতে দেখেছি, কেউ তােমাদের কিছু বললে প্রাণটায় বড় লাগে, তাই মাঝে মাঝে দু-একটা কথা না বলে থাকতে পারিনা। এই জন্যই তাে সবাই আমার শত্রু। তা’ হােক ক্ষতি নাই। তােমাদের বাপ-পিতামহের আশীর্বাদে কোনাে-রকমে তােমরা সুভালয় থাকলে আমার দিনগুলাে কেটে যাবে। গরীব বলে আমরা কি মানুষ নই, যে যা’’ বলে লােভ দেখিয়ে এভাবে অপমান করা। যা’র খাই, তার বিপক্ষে মিথ্যাসাক্ষ্য দোবাে-একি ধৰ্ম্মে সইবে বাবা! আর এত ভয় দেখানােই বা কেন ? বলি, তুমি না হয় বড় আছ-না হয় তােমার রাজসম্পদ আছে, তা বলে, আমার বিজয়-বিজিত তারাও কিছু তােমার চাইতে ছােট নয়। বিজয়। এযে আমি বিশ্বাস করতে পাচ্ছিনা, চাটুয্যেমশাই ! অরুণ কখনাে এমন হতে পারে না। সে যে আমায় সত্যেন্দ্রপথে হরি। তা বাবা, একি আমিই ভাবতে পারতুম, না আর কেহ পারুলতা। বিজয় আমার, অরুণ বন্দুতে অজ্ঞান। অরুণও তাে আগে এমন ছিল না। তা তােমার কষ্ট হবে বৈকি বাবা, সকলেই তাে জানে তাকে তুমি কত স্নেহ কর। হরি হে দয়াময় । এইতাে সংসার! স্বার্থ বাবা, স্বার্থ মানুষকে সব কর্তে পারে ! বিজয়। অরুণ এমন হতে পারে। আপনি হয়তাে ভুল বুঝেছেন চাটুয্যে মশাই ! এযে অসম্ভব । হরি। তার বুড়াে বাপইতাে তাকে এমন করেছে বাবা, নইলে গােড়ায় তাে সে এত খারাপ ছিলাে না। বিজয়। আচ্ছা, আমি নিজে তাকে জিজ্ঞেস্ করবাে। [ কপট ভয়ে ] সাবধান বাবা, ও কাজটী করােনা। আমার কথা ঘুণাক্ষরেও টের পেলে তারা বাপ- বেটাতে আমাকে আস্ত রাখবে না। আমার দিকে চেয়ে এমন কাজটী কখনন করােনা বাবা। দু’দিন যাকু। সত্য-মিথ্যে অমনিই বুঝতে পারবে । বিজয়। আপনি তাহলে আসুন এখন । আমি ভেবে দেখি। হরি। ভয় কি, বাবা। যাই করুক, হরিশৰ্ম্মার কাছে কোনাে বুজরুকিই লুকানাে থাকবে না। আসি তবে বাবা। হরি।

সত্যেৱপথে
বিজয়।
[ প্রস্থান ]
[ কমধ্যে পদচারণা করিতে করিতে ]
এও কি সম্ভব!
অরুণ এমন হতে পারে ?—সে আমারে
কত ভালবাসে।
বিশ্বাস হয় না। [পরিক্রমণ)
অরুণ আমারে ভালবাসে,
ভ্রাতৃসম স্নেহ করে মােরে।
[পরিক্রমণ]
কিন্তু অবিশ্বাস কেমনে করিব ?
আমি সাথে লয়ে মাের
উম্মুখ আগ্রহ
ফিরি তার পানে,
বিজিতের মতাে
আমি তারে ভাই বলে জানি।
এই হিংসা, এই ঈর্ষা, এই কুটিলতা
প্রতিদান এই ক্ষুদ্র স্বার্থ লাগি
এত ভালবাসা সব ফেলিলে মুছিয়া !
বিশ্ব কি কেবলই স্বার্থের বিষে ভরা ?
স্নেহ, প্রেম—আর কিছু নাই?
১২

সত্যেৱপথে ক [দীর্ঘ নিশ্বাস] অরুণ ! করিবে পাগল তুমি মােরে। ধীরে ধীরে গিয়া চেয়ারে বসিয়া পড়িলেন- যেন মুর্তিমন্ত বিষণ্ণতা ] দৃশ্যান্তর। বারান্দায় কালা বসিয়াছিল। হরিশৰ্ম্মা ভিতর হইতে আসিয়া তাহার দিকে তীব্ৰদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। পরে তীব্র কণ্ঠে বলিলেন-“হতভাগা, আমাকে দেখে বুকু করা, আমাকে ভূতবলা।-আস্ত রাখবাে না।” [এই বলিয়া চলিয়া গেলেন। ] কালা ভীতভাবে “ওরে বাবারে, বুবু- বুবু-” করিতে করিতে ছুটিয়া পলাইল। চতুর্থ দৃশ্য। স্থান—পথাের্শ্ব। কাল-সন্ধ্যা। পথপার্শ্বে শয়ান রুগ্ন-কাতর মােহিত। মােহিত। [ আর্তস্বরে ] এ সংসারে যার কেহ নাই, মরণ ! তুমিই তার ভাই।

সত্যেৱপথে
==
এসাে মৃত্যু !
আমি তব প্রতীক্ষায়,
তুমিও থেকোনা দূরে সরে।
শেষ সাথী। শেষ বন্ধু মাের !
আমারে সদয় হও।
সেই আমি একটী সােণার স্বপ্ন-স্মৃতি।
আর আজি ?—আজি আমি হীনতম
পথের কাঙাল।--তারাে চেয়ে হীন!
আজি আমি সব হারা,
সঙ্গীহীন, একা, নিঃসহায়,
জগতের উপেক্ষিত, অবজ্ঞাত,
মরণের শেষ প্রতীক্ষায়।
আয় মৃত্যু!
ক্ষুদ্র জীবনের মাের সব জ্বালা
তাের স্পর্শে হাে অবসান।
শান্তি দে আমারে-
আমারে নিষ্কৃতি দেরে ভাই।
[ অধীর এতক্ষণ পেছনে দাড়াইয়া শুনিতেছিলেন।
শুনিয়া তাহার চক্ষু আর্দ্র হইয়া উঠিল। ব্যথিতস্বরে
কিলেন ]-দাদা!
১৪

সত্যের মােহিত। [ অধীরের দিকে চাহিয়া ] দাদা বলে সম্বােধন করিলে আমারে- আশীর্বাদ লহ। পথের কাঙালে, দিলে তব দাদার আসন ! কে তুমি, স্নেহের ছােট-ভাইটী আমার ? অধীর। অধীর আজ হতে তােমার ছােট ভাই। বড় কি পেয়েছে ব্যথা দাদা ? মােহিত। বহুদিন ধরে একটি স্নেহের কথা আমারে কহেনাই কেহ। তােমার এ স্নেহের বাণী আমারে আকুল করিয়াছে। মরণের ছিনু প্রতীক্ষায়- বাঁচিবার সাধ পুনঃ তুমি জাগাইয়া দিলে। অধীর। বড় কি পেয়েছে ব্যথা দাদা? মােহিত। ব্যথা?—বুঝিবেনা ভাই- কত ব্যথা আমার কিশাের হৃদয় খানি দিবানিশি জালার দহনে দিতেছে জালিয়ে ! বুঝিবেনা—কি আগুণ জলিছে হৃদয়ে ! বুঝিবেনা-বুঝিবেনা প্রাণের দহন ! পিতৃহারা, মাতৃহারা, ভাইবন্ধু সব গেছে ছাড়ি। ১৫ সত্যেৱপথে বংশের একক নন্দন-- স্বপ্নে গানে আত্মহারা কেটে যেতে দিন। সহসা মরণ-ঝঞা সব স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া দিয়াছে, গান থেমে গেছে, আমারে রাখিয়া গেছে আমার অদৃষ্ট মাঝে। এই সে অদৃষ্ট মাের- এই শীর্ণদেহ, এই ক্ষীণপ্রাণ, এই ধুলিশয্যা, এই উপেক্ষা, অবজ্ঞা, এ মাের নিয়তি। অধীর ! অধীর। দয়াল বিধির লিখা এ মাের অদৃষ্ট-লিপি ভাই! দাদা, এ হতে পারেনা তব অদৃষ্ট কখন। আজিহতে অধীরের পূজনীয় জ্যেষ্ঠভ্রাতা তুমি- চেনােনা দাদারে মাের ? অরুণ তাহার নাম তােমারে পাইলে দাদা কত খুসী হবে। আজি হতে দুই দাদা মাের, আজি হতে তিন পুত্র আমার পিতার। চলাে সাথে মাের। ( প্রবল আগ্রহে মােহিতের হাত ধরিলেন ]

সভ্যেৱপথে
মােহিত।
[ আনন্দে, প্রেমে, প্রশংসায় অধীরকে বক্ষে
চাপিয়া ধরিলেন ]
ভাষা মাের মূক হয়ে গেছে,
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে উচ্ছ্বাস,
রুদ্ধ হয়ে গেছে সব বাণী।
শৈশবেই মাতৃ-পিতৃহারা-
সাথী শুধু দুঃখের নিঃশ্বাস,
সহচর-জগতের উপেক্ষা-অবজ্ঞ।
এমন স্নেহের বাণী বহুদিন কেহ কহে নাই।
পিতা মাের আমারে সঁপিয়া দিয়া বাল্যবন্ধু করে
চলি’ গেলা কোন দূর দেশে-
আমার অদৃষ্ট-মাঝে আমারে ছাড়িয়া।
সেই মাের পিতৃ-ৰন্ধু—আমি যারে
পরম নির্ভয়ে আপনার বলি’ চিনেছিনু-
সেই মাের পিতৃসম পূজনীয় গুরু,
অভাগারে অবােধ, একাকী, বসাইয়া পথে
বন্ধু-ঋণ শােধিলা সুন্দর।
সেই হতে ভাগ্য মাের
আমারে ঘিরিয়া আছে।
বুজে গেছে ফুটন্ত হৃদয় মাের, না হতে বিকাশ।

সত্যেৱপথে
আমি আজ মৃত্যু-প্রতীক্ষায় পথের কাঙাল
অধীর !
আমি পথের কাঙাল !
অধীর। অধীরের দাদা নহে পথের কাঙাল।
মােহিত। কি বলিয়া আশীর্বাদ করিবে তােমারে !
তুমি যে অতীত তার !
তুমি নহ এ মর্ত্যের কেহ,
দীনে তব এত দয়া ।
হীন কাঙালে তব এতই করুণা ।
দগ্ধ-শুষ্ক এই জীবন সম্মুখে
সজীব, সুন্দর এক প্রেমময় ছবি
উঠিছে জাগিয়া।
একি অজানিত সুখ !
একি হৃদে আনন্দ-স্পন্দন।
[ অধীরকে আলিঙ্গন ]
১৮

দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য।
স্থানপ্রাসাদ প্রকোষ্ঠ
কাল—অপরাহু।
রাজীবলােচন, তারিণীচরণ ও হরিশৰ্ম্মা।
রাজীব। ঘোড়াটার স্পর্ধা তাে দেখছি কম নয়।
বাপতাে এমন ছিলাে না। কিন্তু
হরিশৰ্ম্মা। আজ্ঞে, ছেলে ওটা পূরণ করে নিয়েছেন।
একেবারে পুরােপুরি গোয়ার-গােবিন্দ। মাথার ওপর
আপনারা যে এখনাে আছেন, ওটা তত গায়েই মাখেন না,
বরং উটে যে সব কথা বলেন, আপনি দেশের রাজা, কি
বলবাে, আপনাকেও
রাজীব। ‘পিপীলিকা পাখা ধরে মরিবার তরে।
আমারাে নাম রাজীবলােচন। দু’দিনেই পাখা ভেঙ্গে দিতে
তবে কিনা, তােমাদের তাে আর অজানা নেই,
কথাটা হচ্ছে, ওর বাপ শেষ সময়ে বলতে গেলে আমারই
পারি।

সত্যেৱথে
হাতে তার সব দিয়ে গেছে। এর জন্য লােকত-ধৰ্ম্মতঃ
আমি ওদের হিত দেখতে বাধ্য।
কি বল হে তারিণী ?
তারিণী। আজ্ঞে, দেশের সবাই বলাবলি করে যে
আমাদের কামশায়ের মতাে লােক আর দুটী নেই।
হরিশৰ্ম্মা। তাকি আর বলতে ! সেদিনও বিজয়
ছোঁড়াটার সাথে এ নিয়ে মস্তবড় ঝগড়া। আমি এই
কথাটা বলেছিলুম বলে আমায় কি না তেড়ে মারতে আসে।
তা আমিও পিছুবার পাত্রটী নই। বলি, কৰ্ত্তামশায় জীবিত
থাতে তােমার মতাে কেঁচো-চিংড়িকে আমরা থুড়াই কেয়ার’
করি।
রাজীব।
হু।
বিষদাত ভাঙতে আর কিছু বেশীদিন
লাগবেনা।
তবে কিনা আমি, তােমরা সবই জানাে, বড়
এক কথার মানুষ। তুমি ভালাে, তােত আমিও ভাল। আর
তুমি যদি এক কড়ার না হয়ে তিন কড়ার ফোস ফোসানি
দেখাও, আমিও বাবা, মাথায় কঁঠাল ভেঙ্গে তবে না ছাড়বে।
এতে যে যাই বলুক। কি বলহে চাটুয্যে।
হরিশৰ্ম্মা। এ ও কি কথা ! আপনারা শাসন না
করবেন তাে কে করবে। বলে, ভালো যে, মন্দও সে?
তা আবাগীর ব্যাটারা এটা-ওটা পাঁচ কথা বলে বলুক।

সত্যেৱথে
রাজীব। তুমি ঠিক আমার মনের কথাটাই বলেছে।
সকলের কথায় কাণ দিলে চলে না।
তারিণী। কৰ্ত্তামশায় বলে তবু যা সয়ে যান। আর
কেউ হলে ওসব খেকীদের ফেউ একদিনেই ঠাণ্ডা করে
দিতাে।
হরিশৰ্ম্মা। মাটির মানুষ হে, মাটির মানুষ । কৰ্ত্তা
একেবারে মাটির মানুষ।
রাজীব। কথাটা হচ্ছে কি, একজন এক কথা বলে,
আচ্ছা, বলুক না। এতে তাে আর আমার গায়ের মাংস
দু’টুকরাে খসে পড়ছে না, বা রক্ত কিছু জল হয়ে যাচ্ছে না।
আর, একটা দাঙ্গা হাঙ্গামা বাঁধানাে আমার একেবারেই ইচ্ছা
নেই।
হরি হে অধম-তারণ! [ ক্ষণেক মৌন থাকিয়া ]
বিজয় ছোঁড়াটা তবে বড়ই বেড়ে উঠেছে, কেমন
চাটুয্যে ?
হরিশৰ্ম্মা। আজ্ঞে, ব্যাটা হাড়ে হাড়ে অসৎ।
আপনার বড় বাবাজীর সঙ্গে বাহিরে একেবারে একপেট,
কিন্তু ব্যাটার ভিতরের মতলব যদি বাবাজী বুঝতেন, তবে
আর ওদিক হতেন না। আপনি আর কদিনই বা, তারপর,
বুঝলেন কিনা, বাবাজীকে হাতে রাখতে পারলে তাে আর
কথাই নাই। সাধে কি আর বলি, ব্যাটা হাড়ে হাড়ে অসৎ।
ঐ যে
এro.

সত্যপথে
হু।
বলি,
রাজীব।
বলাে কিহে, সেদিনের ছোড়া, আমাকেও
দেখছি
হরিশৰ্ম্মা। আজ্ঞে, ওসব বড় ঘরের কথা, আমাদের
চুপ থাকাই ভালাে। বাবাজীকে এবিষয়ে একটু সাবধান
করে দিলে বােধহয় ভাল হয়।
রাজীব।
আছিসরে, বড়বাবুকে
একবার ডেকে দেতাে।
হরিশৰ্ম্মা। আমি তবে এখন আসি। একটু কাজে
এক জায়গায় যেতে হচ্ছে।
[ উঠিলেন ]
রাজীব।
এসাে, এসাে। অবসর সময় মাঝে মাঝে
আমাদের মনে করাে হে। আর দেখাে, বিজয় ছোঁড়ার
সাথে যদি কিছু এদিক-ওদিক হয় তাহলে খবর দেবাে।
হরিশৰ্ম্মা। আজ্ঞে, এর জন্য ভাববেন না।
নমস্কার।
রাজীব। নমস্কার। [ হরিশৰ্ম্মার প্রস্থান ]
রাজীব। চাটুয্যে ব্যাটাকে হাতে পেয়ে আমাদের খুবই
একটা ভালাে হয়ে গেল হে তারিণ। বাড়ীটা যে ভাবেই
হউক, আমাদের চাই-ই।
তারিণী। আজ্ঞে, সহজে ছাড়বে বলে মনে হয়না।
তবে বড়বাবু যদি বলেন, তবে, ছোড়াটা যাই হউক বড়
বাবুকে সত্যিই ভালবাসে, হয়তাে ছেড়ে দিতে পারে।
২২

সত্যেৱপথে
রাজীব। অরুণের কথা আর বলাে না। ওর দ্বারা
আর কিছু হবে না।
ভারী তাে বন্ধু!
আমাদের আর বন্ধু
ছিলাে না !
[ অরুণের প্রবেশ ]
অরুণ। বাবা আমায় ডেকেছেন ?
রাজীব। হাঁ, বসাে। দেখাে আমি আজ সােজাসুজি
জানতে চাই যে, তােমার পিতা বড়, না বন্ধু বড় ?
অরুণ। একথা কেন বাবা?
রাজীব। যে জন্যই হউক, আমি জানতে চাই।
অরুণ। বুঝেছি পিতা!—চাটুয্যে এসেছিলাে না,
নায়েব মশাই ?
রিণী। আজ্ঞে, এসেছিলেন।
অরুণ। আমি পূর্বেই বুঝেছিলাম, পিতা।
রাজীব। কি বুঝেছিলে ?
অরুণ। আমায় ক্ষমা করবেন পিতা। চাটুয্যে যেখানে
মন্ত্রণা দিতে আসে, আমার সেখানে বলবার কিছুই নেই।
লক্ষী সেখান থেকে ছুটে পালায়, মঙ্গল সেখান থেকে কেঁদে
দূরে সরে যায়।

সত্যেৱপথে
রাজীব।
অরুণ, তুমি কি আমায়
ভৎসনা করতে
চাও?
অরুণ। মাজ্জনা করবেন পিতা। তার আগে যেন
অরুণের বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।
রাজীব।
উত্তম।
আমার অনুরােধ
অরুণ। আপনার অনুবােধ ?- পিতা। [ ক্ষণেক
নীরব] পিতা পুত্রকে ডেকে অনুরােধ করেন, আর পুত্র
তাই কাণ পেতে শশানে !
রাজীব। উত্তর দাও। নীরব রইলে কেন?
অরুণ। আদেশ করুন পিতা !
রাজীব। যােগ্য পুত্র তুমি। তােমাকে আদেশ
করতে পারিনা। কলির পিতাদের সে সৌভাগ্য আর নাই।
তবে বিশেষ মিনতি জানাচ্ছি, যে কয়টা দিন আছি-
অরুণ। মিনতি। [ ক্ষণেক নীরব ] পিতা, আপনি
আমায় মিনতি কচ্ছেন, আমি স্থির পদে দাঁড়িয়ে আপনার
প্রার্থনা শােন্‌ছি ।
সত্যই অরুণ কি এতই পশু হয়ে গেছে।
অরুণ এত অমানুষ হয়ে গেছে! জাতেন যদি পিতা, এ কি
আঘাত করেছেন আপনি বলুন পিতা, আমায় কি করতে
আপনার পা ছুঁয়ে এই শপথ করছি—অরুণের ধৰ্ম্মা-
ধৰ্ম্ম, ন্যায়-অন্যায় সব আজ হতে মরে গেছে। আজ হতে
২৪
:

সভ্যৱপথে
ধৰ্ম্ম সাক্ষ্য করে প্রতিজ্ঞা করছি—আজ হতে যদি কোনাে
দিন পিতৃ-আদেশের একটী অক্ষরও পালনে বিমুখ হই, তবে
যেন অরুণ নরকের অতলে চিরদিন জ্বলে পুড়ে মরে।
আদেশ করুন পিতা।
রাজীব। তােমাকে এত শপথ করূতে তাে আমি
বলিনি।
অরুণ। পিতা। বলুন, আদেশ করুন, কি জন্য
আমায় ডেকেছেন ?
রাজীব। বিজয়ের সঙ্গে তােমার—আচ্ছা, থাক, তুমি
ক্রুদ্ধ হয়েছে। এখন যাও। [ অরুণের প্রস্থানােপক্রম ]
আর দেখাে, তােমাদের ভালাের জন্যই
অরুণ। এই মুহুর্ত থেকে আমার ভালাে-মন্দ সব মরে
গেছে পিতা।
[ প্রস্থান ]
দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-উদ্যান। কাল-সন্ধ্যা।
মেঘাবৃত আকাশ। মধ্যে মধ্যে বজ্র গজ্জিতেছিল।
মােহিত অনেকক্ষণ একদৃষ্টে আকাশের ঘন-কৃষ্ণ

সত্যেপথে
মেঘের দিকে চাহিয়া দেখিতেছিলেন। পরে একটা কাতর
নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “যাক, অন্ধকার ছেয়ে
ফেলে।”
ক্ষণেক একদৃষ্টে চাহিয়া রহিয়া আবার ধীরে
ধীরে কহিলেন, “ঠিক আমারই অন্তরের মতাে।”
[ সহসা বিদ্যুত চমকিল। মেঘ ডাকিল ]
মােহিত।
আমারি হৃদয়-ছবি।
ঐ কৃষ্ণ মেঘ, ঐ অন্ধকার রাশি,
ঐ তীব্রা বিক্ষুব্ধ প্রকৃতি,
বিধাতার-রােষ-দগ্ধ এই অভিশাপ বাণী।
এ নহে নূতন।
তবু বিদ্যুতের হাসি
মাঝে মাঝে দিয়ে যায় সুখের বারতা !
[ এমন সময় অধীর প্রবেশ করিয়া কহিলেন, “দাদা!
তুমি এইখানে । আর, আমি তােমারে খুজিয়া সারা!
মােহিত। আমার অন্তরছবি
দেখিতে ছিলাম ভাই, আঁধারের বুকে।
এই ভীষণ ঝটিকা মাঝে-
এই মেঘের গনে।
এই বিদ্যুৎ-ক্রীড়ায়।

সত্যেপথে
অধীর।
মােহিত।
একি দাদা? তবু তব বিষন্ন বদন ।
এতাে কহিলাম তবু কঁদিতেছে।
আমি কি তােমার কেহ নহি ?
ভিখারীর যদি কিছু থাকে, তবে তুমিই সৰ্ব্বস্ব।
মরণ যাত্রীরে-
এ জীবন তুমি যে দিয়েছে।
[ পরম স্নেহে অধীরের দুই হাত নিজ হাতে
ধারণ করিয়া বুকে রাখিলেন ]
যবে গান থেমে গেলাে, সহসা অজ্ঞাতে,
যবে স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলাে,
বুঝিলাম নিয়তি আমার!
তাড়িত কুকুর প্রায় ছুটিলাম দেশ দেশান্তরে
ভাগ্য মাের ছুটিল পশ্চাৎ।
জীর্ণ-রুগ্নদেহ—অক্ষম বহিতে ভার,
অন্নহীন, নিদ্রাহীন--কেহ না চাহিল ফিরে।
কত সাধিলাম, কত কঁদিলাম,
একটি স্নেহের কথা কেহ কহিল না ।
[ভগ্নস্বরে] সর্পাঘাতে তিনদিন
রহিলাম মৃতপ্রায় তবু মৃত্যু
নিলাে না আমারে।
২৭

সত্যেৱপথে
[ অধীর সহসা কঁদিয়া ফেলিলেন ]
মােহিত।
এতই কোমল তুমি? [ধীরে ধীরে অধীরকে
বুকের কাছে টানিয়া আনিলেন ] কঁদিও না ভাই।
[জনৈক ভৃত্যের প্রবেশ]
ভৃত্য।
ছােটবাবু, কৰ্ত্তা আপনাকে ডাকছেন।
মােহিত।
এসাে ভাই।
অধীর। আর, তুমি এই বাহিরে একা বসে বসে
ভাববে ?
মােহিত। ভাই! আমি আর ভাববাে না। এসাে
তবে ভাই।
[অধীরের প্রস্থান। মােহিত অনেকক্ষণ তাহার দিকে
চাহিয়া রহিলেন। পরে কহিলেন,]
“একটা স্বর্গের কাহিনী। একটা স্নেহের উৎস।
একটা মূৰ্ত্ত সরলতা !
সবাই যদি তােমার মতাে হতাে
ভগবান । একি নূতন পরীক্ষায় ফেলেছে
আমারে। আমার রাজৈশ্বৰ্য কেড়ে নিয়ে যে আমাকে পথের
ভিখারী করেছে, আমার যে সর্বনাশ করেছে, মরণের দোরে
যে আমাকে ঠেলে দিয়েছে, আজ তারই গৃহে তা’রই পুত্র
পথ থেকে তুলে এনে আমার জীবন দিয়েছে, আমাকে ভায়ের
২৮

সভ্যেৱপথে
স্নেহ দিয়েছে—যা কেউ আমায় এতদিন দেয়নি, আমাকে
প্রেমে করুণায় জড়িয়ে ধরেছে। এ ঋণ শােধ ৰার নয়,
আমার হৃদয় যদি
দেখতে পারতে অধীর !
যদি বুঝতে !
[ বিজিতের প্রবেশ ]
বিজিত। আমি দেখতে পেরেছি ভাই !
বুঝেছি ! কাদছাে ?-কঁদো ভাই ! তােমার ব্যথায় ব্যথা
মিলিয়ে আমি ও কাদছি। এই অশ্রুতে সকল ব্যথার
অবসান হউক।
[ বিজিত আসিয়া মােহিতের হস্ত ধারণ করিলেন ]
তৃতীয় দৃশ্য।
স্থান—প্রাসাদ-প্রকোষ্ঠ। কাল-অন্ধকার রাত্রি।
রাজীবলােচন রায় শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় ধূমপান
নিরত। তারিণী, অরুণ ও অধীর দণ্ডায়মান।
রাজীব।
আমার বক্তব্য অরুণ ও অধীরকে বলেছিলে
তারিণী ?
রিণী। আজ্ঞে বলেছিলুম।
রাজীব। তাহলে আমার অভিপ্রায় শােনেছাে অরুণ?
অরুণ। কোন অভিপ্রায় পিতা ?
* ।

সত্যেৱপথে রাজীব। মােহিত সম্বন্ধে।--যে, ও’র আমার বাড়ীতে থাকা চলবে না। অরুণ। শােননছি পিতা। আর, আমাকে জানানাের তাে কোনাে প্রয়ােজন ছিলো না। আপনার অভিপ্রায়ের উপর আমার কোনাে বিবেচনা নাই। রাজীব। তবু তােমাদেরে জানানাে- অরুণ। কোনাে প্রয়ােজন নাই পিতা ! অরুণের নিজের মতামত সব মরে গেছে। কিছু করতে হয়, আদেশ করুন। রাজীব। উত্তম। অধীরও শােনেছছা বােধ হয় ? অধীর। শােনেছি বাবা। বিশ্বাস কতে পারিনি। রাজীব। কি বিশ্বাস করতে পারেনি ? অধীর। যে, আপনি এ আদেশ দিয়েছেন। রাজীব। কেন ? অধীর। কারণ, আমি বিশ্বাস করতে করতে পারিনি যে আমার পিতা এরকম আদেশ দিতে পারেন। রাজীব। কি রকম আদেশ ? অধীর। এই নিৰ্ম্মম আদেশ। আমার পিতা এত নিষ্ঠ র নহেন যে এই বিপন্ন, পীড়িত, পীড়িত, কপর্দকহীন, সত্যেৱপথে বিশেষতঃ আমি যাকে দাদা বলে ডেকেছি, তাকে বিদায় করে দেবার কথা বলতে পারেন। রাজীব। হাঁ, এ আমার আদেশ। অধীর। কেন বাবা ? রাজীব। [ গম্ভীর স্বরে ] আমার ইচ্ছা । অধীর। বাবা ! [ এই বলিয়া পিতার গম্ভীর মুখের দিকে চাহিয়াই চুপ করিলেন ] রাজীব। আমার বাড়ী--এ অনাথ আশ্রম নহে। অধীর। বাবা ! [ মিনতির দৃষ্টিতে চাহিয়া কহিলেন ] বাবা ! তঁার দুঃখের কাহিনী শশালে আপনি এমন আদেশ- রাজীব। তুমি অবাধ্য। এই কি তোেমাদের শিক্ষা ? [অধীরের চক্ষু জলে ভরিয়া আসিল। তিনি অরুণের দিকে চাহিয়া ডাকিলেন, “দাদা!” ] অরুণ। দাদা তাের নাই অধীর। অধীর। বাবাকে বলাে দাদা! অরুণ। [অধধামুখে পিতার আদেশ। পালন করে। অধীর। পিতা না ভেবে আদেশ করছেন। রাজীব। [সক্রোধে] উদ্ধত বালক !-হবে বৈ কি! এখান থেকে সরে যাও।

সত্যেশস্বে
স্বর্গীয় !
অধীর কঁদিতে কাদিতে চলিয়া গেলেন। মুহুৰ্তকাল
সকলে নীরব। তৎপর অরুণ কহিলেন, “পিতা, মার্জনা
করবেন। একটা কথা বলবাে। অধীরকে ভৎসনা করবেন না
সে যেন এই জগতের কেউ নয়।—এত কোমল।
করুণ । এত পবিত্র ! একটা স্বর্গের সঙ্গীত। তাকে
ভৎসনা করবেন না পিতা?”
রাজীব।
দেখেছাে কতদূর বেড়ে উঠেছে।
অরুণ।
ভুল বুঝেছেন পিতা। সে এত সরল ।
তাকে ক্ষমা করবেন। তা’কে রূঢ় ববেন না ।
[ অধীরের হাত ধরিয়া মােহিতের প্রবেশ ]
মােহিত। দুঃখ কিসের ভাই ?-স্রোতের ছিন্ন ফুল,
তােমাদের দোরে ভেসে এসেছিলাম, আবার ভেসে যাবে।
দুঃখ করােনা। অভাগাকে তুলে এনে জীবন দিয়েছিলে,
স্নেহ দিয়েছিলে—এই-ই যে তা’র মহা-সৌভাগ্য ।
অধীর।
দাদা, এ হতে পারেনা। বাবা তােমাকে
রাখতে না চান, আমি ও সঙ্গে যাবে। বিশেষতঃ, তুমি
অসুস্থ। তােমাকে একা যেতে দিতে পারি না।
মােহিত। অবুঝ হয়াে না ভাই। পিতার আদেশ,
অন্যথা করতে নেই।

সত্যেৱপথে
অধীর।
পিতার আদেশ ন্যথা করবাে না। বাবা !
আমার শিক্ষা আমাকে কর্তব্য শিখিয়েছে, এবং আপনারাই
আশীর্বাদ করেছিলেন, ‘কৰ্ত্তব্য ভুলােনা। আমি আমার
কৰ্ত্তব্য বেছে নিয়েছি। আপনার আদেশ অমান্য করূবাে না।
ছােড়দা’ এ বাড়ীতে আর থাকবে না। আপনি স্থান না
দেন, আমি তাকে নিয়ে যতদিন না তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ও
সবল হয়েছেন, লােকের বাড়ী কাজ করে তাকে শুশ্রুষা
করবাে কোথাও স্থান না পাই, গাছতলায় থাকবে।
[ বিজিতের প্রবেশ
বিজিত। কোথাও স্থান না হয়, বিজিত তার বুক চিরে
স্থান করে দেবে। এসাে ভাই! অধীর তােমাকে দাদার
আসন দিয়েছিলাে, আজ থেকে তুমি বিজিতেরও দাদা।
আজীবন তােমায় আমরা বুকে করে রাখবে। এসাে দাদা।
অধীর! সর্ব প্রশংসার অতীত তুই! সার্থক তাের শিক্ষা !
[ স্নেহে অধীরকে কাছে টানিয়া লইলেন ]
অরুণ। ধন্য আমি। আমি তাের ভাই।

সত্যেৱপথে
চতুর্থ দৃশ্য।
স্থান-বিজয়ের বাড়ীর প্রবেশদ্বার সংলগ্ন পথ।
কাল–মধ্যাহ্ন।
[হরিশৰ্মার প্রবেশ। ]
হরিশৰ্ম্মা। হরিশৰ্ম্মা—এ দ্বিতীয় চাণক্য ; অপমান
অল না।অরুণ!
তৈরী থেকো। হরিশৰ্মার প্রতি
হিংসা !চোখের জলে-নাকের জলে করে তবে ছাড়বাে !
তােমার পিতা এখন আমার এই হাতে !—তােমার প্রিয়বন্ধু
এখন আমার এই মুঠোয় ! যা চাইবাে, তাই করাবাে।
তােমার দুঃখে শেয়াল-কুকুর কাদবে। হরিশৰ্ম্মার অপমান!
জালিয়ে পুড়িয়ে মারবাে না ?•••সাবাস্ হরিশৰ্ম্মা ! চাণক্যকে
কৃট বলেছিলাে কে ?—তখন যদি তুমি জন্মাতে ! যদি
থাকতে তােমার একটা সাম্রাজ্য ! চাণক্যের নাম তাহলে
ডুবে যেতাে-জগৎ বিস্ময়ে অবাক হয়ে থাকতাে ।
বিলিতে বলিতে বাড়ীর ভিতর প্রস্থান করিলেন।
এমন সময় অন্যদিক হইতে এক বালক-ভৃত্যের সহিত কাল
কথা কহিতে কহিতে প্রবেশ করিল ]
৩ঃ

সত্যপথে
বালক। নতুন বাবু সদাই বড় দুঃখের গান গায়।
আমার যেন কাঁদতে ইচ্ছে করে।
কালা। আমার ভারী ভালাে লাগে। আমাকে একটা
শিখিয়েছে। গাইবাে ?
বালক। গা।
[ কালা গাহিতে লাগিল ]
গান
মরণ-নদীর পারে তােরা
কে যাবিরে আয়।
খেলবাে খেলা নদী-শেষের শান্তি-মােহনায়।
• অদূরেতে ডাবে জলধি
আয় ! আয় ! আয় !
আমি, দোদুল দোদুল দুলবাে নদীর তরঙ্গ-দোলায়।
বীচি-মালা আমায় নিয়ে
ছুটবে হেলে নেচে গেয়ে,
হােথা, নীল সায়রের অতল-বুকে মহা-মিলন-আশায়।
সহসা বাড়ীর ভিতর হইতে হরিশৰ্ম্মা বাহির হইয়া,
কহিলেন “আরে রাখ, ছোড়া। ভারী যে বৈরাগ্য দেখছি।
‘মরণ মরণ করে চেঁচাতে সুরু করেছে।”

সত্যেৱপথে
কালা হঠাৎ
যেন বােকা
হইয়া গেল।
তৎপরই
হরিশৰ্ম্মার দিকে চাহিয়া দেখিয়াই ‘ওরে-বু-বুবু•••••
করিতে করিতে দৌড়িয়া পলাইল।
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান—অরুণের বাটীকা সংলগ্ন উদ্যান।
কাল-সন্ধ্যা।
একটী কুসুমিত পুষ্প-বৃক্ষের
শাখা ধরিয়া অরুণ
অনেকক্ষণ অন্যমনে দাড়াইয়া ছিলেন। দূরে সান্ধ্য-রবির
শেষ রক্ত-রশ্মি ধীরে ধীরে মুছিয়া যাইতেছিল। অরুণের
দৃষ্টি সেইদিকে একান্ত নিবদ্ধ।
কিছুক্ষণ পরে একটী ভৃত্য আসিয়া সসম্রমে ডাকিল,
“বাবু!”—অরুণ তেমনই একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলেন।
আবার ডাকিল। অরুণ চমকিয়া ফিরিয়া চাহিয়া ব্যন্তে
কহিলেন, “বিজয় এসেছে ?”
, তিনি
অরুণ।
বিজয় আসূবে না !
এলােনা
[ একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন ]
!
–

সভ্যেরপথে এই পত্র দিলেন। বললেন--তােমার বাবুকে বলাে, সব দেনা-পাওনা শেষ হয়ে গেছে । আর কোনা আবশ্যক নাই, অবসরও নাই। এই পত্র। অরুণ। [ অর্ধস্বগতঃ ] দেনা পাওনা শেষ হয়ে গেছে! অবসরও নাই, আবশ্যকও নাই ! [পত্র গ্রহণ] ভৃত্য। চাটুয্যে মহাশয়কে সেখানে দেখে এলুম। তাই নাকি এখন অবসর নাই। অরুণ। আচ্ছা যাও। [ ভৃত্যের প্রস্থান ] চাটুয্যে শঠ বৃদ্ধ, হীন-কপট—যাক, অন্ধকার সরে যাচ্ছে, এতদিনের সব ধাঁধা দূর হলাে। [ পত্র খুলিতে খুলিতে] এ আমি আগেই সন্দেহ করেছিলুম। চাটুয্যে-মানুষের আবরণে নরকের আবর্জনা তুমি। পত্রপাঠ সমাপ্ত হইলে একটা করুণ দীর্ঘশ্বাস বাহির হইয়া আসিল। তিনি পূর্বের ন্যায় আবার কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। পরে পত্রখানি আবার পড়িয়া নাড়াচাড়া করিতে করিতে কহিলেন- বিজয়। বাঁধন ছিড়িতে পারাে তুমি, কিন্তু, হতভাগ্য অরুণের এ যে অসম্ভব। এতখানি সে তােমারে ধীরে ধীরে সমর্পিয়া দেছে । মুিহূর্ত নীরব] ৭ সত্যেনাখে হায় ! আসিলে না তুমি । আমি পাঠিয়েছি মাের আকুল আহ্বান, অনুনয়- তবু তব অবসর নাহি। [নীরব হইলেন] বিজয়। বিজয়! এতদিনে চিনিলে না মােরে ! বন্ধু মাের তুমি—শুধু এই ? শুদ্ধ এতটুকু ?—আর কিছু নহ! আমি যে হারায়েছি শক্তি তাের পরে ক্রোধ করিবার ! হে ঈশ্বর। ক্ষুদ্র এ বুকের মাঝে তােমার সকল-শ্রেষ্ঠ দান- এযে বড় বেশী হয়ে গেছে । মানবের বক্ষ মাের-- কেন তুমি দেছ ভরি স্বর্গের হৃদয়ে ! ফিরে লও—ফিরে লও—ধীরে ধীরে নিক্রান্ত ষষ্ঠ দৃশ্য। স্থান-বিজয়ের বহিঃকক্ষ। কালরাত্রি। বিজয় ও হরিশৰ্ম্মা বসিয়া কথােপকথন করিতেছেন। বিজয়। আপনি সত্যই বলেছিলেন চাটুয্যে মশাই, যে, মানুষ চেনা বড় কঠিন। বুঝলেন চাটুয্যে মশাই, এ আমি ত সত্যেৱপথে আগে বিশ্বাস করতুম না। কিন্তু আজ এই সত্যটাই সব চাইতে বড় হয়ে আমায় ধরা দিয়েছে। এত অন্ধ মানুষ! [বলিয়া নীরব হইলেন। মুহূর্ত উভয়েই নীরব। পরে হরিশৰ্ম্মা বলিলেন, ] “কথাটা বলে কি তােমায় কষ্ট দিলুম বাবাজী ? বিজয়। কষ্ট !—হয়তাে তাই হবে। কিন্তু আপনি আমার চোখ খুলে দিলেন চাটুয্যে মশাই। এত অন্ধ মানুষ !আপনার ঋণ- হরি। ওকথা বলে আর লজ্জা দিচ্ছাে কেন বাবা । তােমাদেরে বলতে গেলে কোলে-পিঠে করে মানুষ হতে দেখলাম। এইটুকুও তােমাদের জন্য করুবাে না তাে বুড়ো এখনাে বেঁচে আছি কেন ?—কিন্তু অরুণটার জন্যও কষ্ট হয়। চোখের উপর একেবারে বয়ে গেলাে। পাপ-পুণ্যের ভয়টাও রাখলে না। সামান্য স্বার্থ-এর জন্য, আর যাই করুক ক্ষতি নাই, তােমাকে পৰ্যন্ত অপমানের চূড়ান্ত করে তবে ছাড়লে! বনামটাই কি কম রটানাে রটিয়েছে বাবা! দেখলে তাে সেদিন, ঐ বাড়ীটা নিয়ে কি কাণ্ডটাই না করলে। তা’র বুড়াে বাপ কি আর সহজে রাজি হয়েছিলাে । ওসব জাল কাগজ-পত্র ভােবতে ভয় হয় বাবা, কোথা দিয়ে কে হয়তাে শুনে লাগিয়ে দেবে, আর সত্যেপথে গরীবের প্রাণটাই মাঝ পথে বেঘােরে মারা যাবে কিন্তু সাবাস্ হাতটাই তৈরী করেছে অরুণ,—কি নিছক্ জালটাই করলে । কত আর ববব বাবা ! সে দিনের অরুণ- কিন্তু দেখে শুনে আমরা পৰ্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছি। কিন্তু তুমি হলে বাবা সত্যি যুগের লােক ! বিজয় নীরব। দৃষ্টি বহুদূরে নিবদ্ধ। তঁাহার দিকে চাহিয়া হরিশৰ্ম্মার আননে কুটিল হাস্য ফুটিয়া উঠিল। স্বগত কহিলেন, “ঔষধ বেশ ধরেছে। কিন্তু আরাে চাই। আরাে বিষ ঢেলে দিতে হবে।” তৎপর বিজয়ের নিকটে সরিয়া আসিয়া কহিলেন, “আর একটা কথা শােলুম বাবা, অতি ভীষণ কথা, অরুণ নাকি••••••” বিজয়ের কাণের কাছে মুখ লইয়া গিয়া কি কহিলেন। বিজয় হঠাৎ ভয়ানক ভাবে চমকাইয়া উঠিলেন। কহিলেন, “এ অসম্ভব অসম্ভব। অরুণ এত নীচ-এতপশু- সহসা পশ্চাৎ হইতে অরুণ ডাকিলেন, “বিজয়।” বিজয় সক্রোধে চীৎকার করিয়া কহিলেন, “দূর হও তুমি। তুমি নীচ, তুমি পশু, তুমি-” [উত্তেজনায় তাহার কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া গেল ] অরুণ বিজয়ের হাত ধরিয়া ডাকিলেন, “বিজয় !” বিজয় তাহার হাত বেগে সরাইয়া লইয়া উত্তেজিত স্বরে ৪০

সত্যেৱপথে
কহিলেন, “তুমি অস্পৃশ্য—দূর হও এখান থেকে।”
অরুণ মুহুৰ্ত্ত মাত্র বিজয়ের মুখের দিকে মুখ তুলিয়া
চাহিলেন। তারপর কহিলেন, “দূর হয়ে যেতেই এসেছি
বিজয় ! কিন্তু যাবার আগে তোমার একটা উপকার করে
যেতে চাই।
বিজয়। তােমার উপকার গ্রহণ করতে আমি ঘৃণা
বােধ করি।
অরুণ। আর এই ধূর্ত,
ধূৰ্ত্ত, কপট, হীন বৃদ্ধ-এর
মন্ত্রণাকে গুরুবাক্য বলে মেনে নিতে গর্বে তােমার শির
উচু হয়ে উঠে ?-সত্যি বিজয় ?
বিজয়। সাবধানে কথা কও বছি। নইলে—তুমি
আমার অতিথির অপমান করেছে।
অরুণ। এ কি অপমান বিজয় ! একে গালি দেবার
উপযুক্ত ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা আমি, নইলে এমন গালি
দিতুম, যা মূর্ত হয়ে উঠে নরকের দুর্গন্ধের মতাে ওকে ছেয়ে
ফেলতো ! পারতুম তাে, ওর ঐ মানুষের খােলসটা এমন
করে ছিড়ে ফেতুম, যা’তে ভিতরের শয়তানটা চোখের
সামনে বেরিয়ে পড়তাে। [ হরিশৰ্মার প্রতি ] ধিক
তােমাকে শয়তান।
৪১

সত্যেপথ হরিশৰ্ম্মার চক্ষু হইতে যেন আগুন ঠিকরিয়া পড়িতে লাগিল। কিন্তু সামলাইয়া লইয়া কহিলেন, “বিজয়, তােমার বাড়ীতে এসে—কিন্তু আমিও এর প্রতিশােধ” অরুণ । বেশ করে যত পারাে নিয়াে। কিন্তু কখনাে আর এ পথে এসাে না- সেক্রোধে হরিশৰ্ম্মার প্রস্থান) অরুণ। বিজয় ! বিজয়। তুমি ভুলে গেছাে অরুণ, যে এ আমার বাড়ী। অরুণ। ভুলিনি বন্ধু । আর এও ভুলিনি, যে, এ বাড়ীর সাথে এই-ই শেষ হিসাব মিটিয়ে যেতে এসেছি। কিন্তু আরাে একটু খানি সময় প্রার্থনা করছি বিজয়। শােননা বিজয়, আমি একদিন তােমার বন্ধু ছিলুম- বিজয়। সে অতীতের একটা ভুল মাত্র। বিজয় আর এখন অন্ধ নয়। তুমি নীচ-- অরুণ। ভুল! তাই বটে। তবু একদিন আমাকে বন্ধু বলে ডেকেছে বিজয়। তা’রই শেষ দাবীটুকু দিয়ে আজ তােমায় একটা কথা বলে যেতে চাই। এই হরি চাটুয্যে—এ মানুষের দেহে পিশাচ। এর সংশ্রব ত্যাগ করাে। বিজয়। নইলে তােমার ভণ্ডামি সব প্রকাশ হয়ে পড়বেএই তাে কারণ? এর জন্য আমি কারাে উপদেশ চাইছি না। ৪২

সত্যেপথে
অরুণ। আমার ভণ্ডামি ?—বিজয় !
বিজয়। নয় তো কি ?—তুমি অধম
অরুণ। এতটা আমি ভাবতে পারিনি বিজয় !
মুিহুর্ত নীরব রহিয়া বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কহিলেন] বিজয় ! শেষ
বিসর্জনের পূর্বে আমার বহুদিনের বন্ধুকে, আমার সখাকে,
আমার স্নেহের ভাইকে একবার ভিক্ষা চাইছি। একবার
তাকে ফিরিয়ে দিবে ভাই? [বিজয় নীরব]
অরুণ। তােমার আমার সম্বন্ধ—এ মুছে ফেলতে
হবে বলে কখনাে যে ভাবিনি! [অর্ধস্বগত] একই দিনের
আলােয় দু’জনে আমরা চোখ মেলেছিলুম, ঈশ্বরের কোন্
অজ্ঞাত বিধানে জানিনা, একই দিনে গুরুমহাশয়ের দুয়ারে
দু’জনে বাণীর প্রথম পূজার অর্ঘ্য নিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলুম।
গুরুমহাশয় উভয়ের হাত ধরে আদর করে বলেছিলেন, “ঠিক
যেন দুটী ভাই।”
শুনে দু’জনে দু’জনার পানে চেয়ে
দেখেছিলুম।সেই থেকে এই দীর্ঘদিন কতই না স্বপ্নে
কেটে গেছে !
মনে পড়ে বিজয়, একবার আমি পরীক্ষা
দিতে পারলুম না। তুমি পাশ হয়ে উপরে চলে গেলে।
আমি কঁদছিলুম-“তুমি এসে চোখ মুছিয়ে দিলে, পাশ
হয়েও এক বছর আমার প্রতীক্ষায় বসে রইলে । খেলার
মাঠে তারা তােমায় একা আক্রমণ করলে, দেখতে পেয়ে
৪৩

সভ্যৱপথে ছুটে গিয়ে আমি তােমার পাশে দাড়ালুম। তােমায় বাঁচিয়ে তাদের অত্যাচার মাথা পেতে নিলুম। এখনাে তার চিহ্নটুকু, এই দেখাে বিজয়, আমার অঙ্গে এখনাে নিদর্শন হয়ে আছে। এ আমার কত সুখের স্মৃতি !••• •কত কথাই না মনে পড়ে বিজয় !—আমি দোষ করেছি—তুমি হেসে তার শাস্তি নিয়েছে ; তুমি অন্যায় করেছে—আমি অপরাধ স্বীকার করেছি ; গুরুজনের। তিরস্কার খেয়ে দু’জনে বসে কেঁদেছি। কত বলবাে সখা ! তাে খুব অতীতের কথা নয় বিজয় নৌকা ডুবে’ নদীর প্রবল বন্যায় ভেসে গিয়েছিলুম,—তুমি জীবনের মমতা ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে ঝাপিয়ে পড়লে। তারপর দুজনেই তলিয়ে গেলুম। পরে কাগত প্রাণ আমি তীরে উঠলুম, কিন্তু তুমি পারুলেনা ; আবার আমি ভালুম--দু’জনে, একসাথে মনে পড়ে বিজয় ? বিজয় ৰ্বিাক, নিস্তব্ধ -অরুণের মুখের দিকে এক- দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। অরুণ উহার হাত ধরিয়া পূর্ণ-আবেগে কহিলেন, “সেই হারানাে স্নেহ-ভালবাসার শেষ একটী আলিঙ্গন তােমার কাছে ভিক্ষা চাইছি বিজয়। দাও দাও সখা। এর পর আর কিছুই চাইবে না।” এই বলিয়া আলিঙ্গন দিবার নিমিত্ত অগ্রসর হইয়াই সহসা ভাই! ৪৪

সত্যেৱপথে
সরিয়া দাঁড়াইয়া তাহার হাত ছাড়িয়া দিয়া কহিলেন, “না-
যদি কোনােদিন তেমন ভাবে দিতে পারাে, দিয়াে। নইলে
এই-ই শেষ।—বিদায় বন্ধু !”—এই বলিয়া ধীরে ধীরে
বাহির হইয়া গেলেন। বিজয় কিছুক্ষণ তেমনই নিস্তব্ধ
ভাবে বসিয়া রহিলেন।
তৎপর হঠাৎ
বেগে উথিত
হইয়া ক্ষীণকণ্ঠে কাতরে ডাকিলেন, “অরুণ ! অরুণ !
অরুণ !”,
==
দৃশ্যান্তর।
একখানি চেয়ারে বিজয় উপবিষ্ট—তাহার বাম করতল
কপােল-সংলগ্ন। চেয়ারে হাত রাখিয়া নিকটে মােহিত
দাড়াইয়া।
মােহিত।
আমি
শুনেছি বড়দা ! তাকে
ফিরেয়ে নিয়ে আসি দাদা ?
বিজয়। আর আসবে না সে ?—দেখাে, যদি পারাে
ভাই, পায়ে ধরে
[মােহিত সানন্দে চলিয়া গেলেন। কিছু পরে হরিশৰ্মা
প্রবেশ করিলেন]
=
৪৫

=
সভ্যেৱপথে
হরি।
এর প্রতিশােধ আমি নেবােই নেবে। নইলে
আমার নাম হরিশৰ্মাই নয় !—দেখলে বিজয়, ব্যাটার
অহঙ্কার ? আমাকে তাে যা’
বল্লেই।
তােমাকে
পৰ্যন্ত কি না বলে গেলাে ।
বিজয়। চাটুয্যে মশায়, আমি হয়তাে উন্মাদ হয়ে
যাবে। এই-ই হয়তাে আমার পরিণাম !—অরুণ -
হরি। সে হতভাগাটাকে আমি একবার বেশ করে না
দেখে ছাড়ছি না। ব্যাটা ভণ্ড, পিশাচ
[ মােহিতের প্রবেশ ]
মােহিত। মিথ্যা কথা। অরুণ ভণ্ড নয়, অরুণ
পিশাচ নয়। ভণ্ড তারা, যারা এথা বলতে লজ্জা
পায়না। পিশাচ তারা যাদের জিভ, তঁা’কে পিশাচ বলতে
খসে পড়েনা। চাটুয্যে মশাই, ভেবে দেখেছেন কি-
কদিন আর আপনার বাকী। এর পরের উপায় ভেবেছেন
সত্যই এমন ভাষা নাই, যাতে আপনার উপযুক্ত
বিশেষণ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।-বড়দা ?
বিজয়। মােহিত ।
মােহিত। দূর করে দিউন এই ভণ্ড তপস্বীকে।
আমি ওকে খুবই চিনে নিয়েছি। সত্যই তুমি কৃপার
পাত্র বৃদ্ধ !
৪৬

সত্যপথ হরি। দেখাে ছোঁড়া, ছােটমুখে বড়কথা শােভা পায়না। অরুণের ওকালতি করতে এসেছে, এসেছে, কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, সেদিন সে-ই তােমায় কুকুরের মতাে দূর করে দিয়েছিলাে না ? মােহিত। মিথ্যা কথা। বড়দা, আদেশ করুন-দূর করে দিই ওকে। হরি। কি। দূর করে দিবে আমাকে ? উত্তম। বিজয়, তােমার বাড়ীতে আমার এই অপমান। কিন্তু আমিও দেখবাে। প্রতিহিংসা-হরিশৰ্ম্মার প্রতিহিংসা! এ দ্বিতীয় চাণক্য,অপমান ভুলে না। সাবধান অরুণ ! সাবধান মােহিত। এ হরিশৰ্ম্মা। এমনি করে পিষে ফেলবাে ! জ্বালিয়ে মারুবাে তিল তিল করে পুড়ে মারূবাে ! হরিশৰ্ম্মা—দ্বিতীয় চাণক্য ; অপমান ভুলে না ! [ সক্রোধে প্রস্থান ] বিজয়। মােহিত। মােহিত। ভালােই হয়েছে বড়দা ! নইলে এ দুষ্ট- শনি রাহুর মতাে একদিন অলক্ষিতে সকলকে গ্রাস করতাে। বিজয়। আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না মােহিত! সব ভালাে-মন্দ যে এক হয়ে যাচ্ছে ! ৪৭

সত্যেরখে
মােহিত। মেঘ কেটে গেছে দাদা ভালাে আলাে
হয়ে ফুটে উঠবে।
বিজয়।
আমায় পথ দেখিয়ে ঈশ্বর।
[ উভয়ে নিষ্ক্রান্ত ]
সপ্তম দৃশ্য।
স্থান-বিজয়ের বাটীকা-সংলগ্ন উদ্যান। কাল—অপরাহু।
একটী পুষ্পবৃক্ষে হেলান দিয়া বসিয়া অধীর আপনমনে
গান গাহিতেছিলেন।
গান
তােদেরি পূজার অর্ঘ্য দিতেরে হৃদয় লইয়া এসেছি
আয়রে তাপিত, পরাণ পেঁচিয়া ভিখারীর অশ্রু এনেছি।
তােদের অশ্রুতে তা মিশায়ে আমি যে কঁদিতে শিখেছি,
আয়রে ব্যথিত, ব্যথার গীতি গাহিতে আমি যে গেঁথেছি।
তপ্ত-তােদের বুকে লুকায়ে মুখ দিবাে তােদেরি দুঃখে,
ভিখারী কাদিলে কঁদিবে জগৎ, বিধাতা বেদনা পাবে ;
৪৮

সভ্যৱপথে
এনেছি অর্ঘ্য রচিয়া, এনেছি পরাণ মথিয়া-
যা কিছু আমার তােদেরি লাগিয়া অশ্রু বহিয়া এনেছি।
এই প্রাণটুকু দেবােরে তােদেরে, তােরা যে আমার সাধনা,
আমার দেবতা তােদেরি মাঝারে, আমি যে হারে চিনেছি ।
বিজয় ও বিজিত প্রবেশ করিয়া এতক্ষণ একপাশে
দাড়াইয়া নীরবে গান শুনিতেছিলেন। এক্ষণে বিজয়
কহিলেন, “কি সুন্দর গাহিতে শিখেছিস অধীর !
মধুর !”
একি !
অধীর। [ মুখ তুলিয়া লজ্জিত-হাস্যে কহিলেন ]
তােমরা কোথায় ছিলে বড়দা’ ? এত খুজলুম তােমাদের
ছােটা কাছে যে ?
বিজিত।
গানের মতো সত্যই যদি পারতুম ভাই
বিলিয়ে দিতে এই হৃদয়টা ! সত্য যদি হতাে এই সঙ্গীত।
-দাদা !
বিজয়। কিন্তু উপায় তাে নেই ভাই। তারা মরুতেই
যে জন্মেছে । অনাহারে মৃত্যু-এই যে তাদের অদৃষ্টের
লেখা ! দেশ জুড়ে আৰ্ত্তের হাহাকার, শত শত লােক
মরছে—মরবে ও, যদি ভগবান মুখ তুলে না চান।
বিজিত। আর আমরা শুদ্ধ দাড়িয়ে দেখতেই কি
বেঁচে থাকবাে দাদা !-ওঃ ! বুভুক্ষুর মরণ আর্তনাদ-কি
৪৯

সভ্যেৱপথে ভয়ঙ্কর! নিষ্ঠুর, ভগবান—তুমি কি নিষ্ঠুর!••••••দাদা ! এত লােক-কারাে প্রাণ কি কঁদছে না ? বিজয়। কঁদছে বই কি ভাই । কিন্তু যে জন কঁাদলে কাজ হবে, সে যদি না কঁাদের প্রাণ কাঁদছে কি না সে-ই জানে। বিজিত। দাদা ! আমাদের বিজয়। বুঝেছি ভাই !–সরল সুন্দর প্রাণ! এত কোমল ! এত মধুর ! স্বর্গীয় !—এ ও একখানি সঙ্গীত। —বিজু ! বিজিত। দাদা! বিজয়। আমাদের পূর্ব-পুরুষের উপাজ্জিত যত নগদ টাকা আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে আছে, আমি সে সমস্ত আমার স্নেহময় ভাইকে দিলুম। এই অর্থ ’র আর্ত- নারায়ণের সেবায় সার্থক হউক, সহস্র সহস্র বুভুক্ষুর উদর একদিনের জন্যও তৃপ্ত হউক। [ বিতি বিস্মিজত সহসা কম্পিত হস্তে বিজয়ের পাদস্পর্শ করিয়া আবেগ-রুদ্ধ কণ্ঠে কহিলেন, “দাদা । দাদা ! এত স্নেহ তােমার ?” ] বিজয়। [ বিজিতের হাত ধরিয়া ] তাের ঐ অন্তর খানিকে সুখী রাখবার জন্য দাদা যে তাের প্রাণ দিতে পারে

সত্যেৱপথে
বিজিত । ঐ হৃদয়ের স্বর্গ খানির সন্ধান যে পেয়েছে,
এ দান—এ যে তা’র অতি তুচ্ছ ভাই !
বিজিত। বতে যে আমি কথা খুঁজে পাচ্ছিনা দাদা।
ঐ চরণ-ধূলার অধিকারী আমায় জন্মে জন্মে রাখবে কি
ভগবান ?
অধীর এতক্ষণ বিস্ময়ে উভয়ের মুখের দিকে চাহিয়া
ছিলেন। এক্ষণে আনন্দের আতিশয্যে
আতিশয্যে সহসা চীকার
করিয়া বলিলেন, “একি আমার গান জীবন্ত হয়ে উঠলে !
মেজদা ! দাদা!
দৌড়ে দেখে যাও—স্বর্গ যে নেমে
এসেছে।”
-
অষ্টম দৃশ্য।
স্থান-রাজীবলােচনের কক্ষ। কাল–অপরাহু
রাজীব, তারিণী ও হরিশৰ্ম্মা।
রাজীব। মােহিত ছােরাটা যে সত্যই আমায় চিনতে
পেরেছে ও মােকদ্দমা পাতাবার যােগাড়যন্ত্র করেছে, এ কথা
কি তুমি ঠিক জানতে পেরেছাে চাটুয্যে ?
৫১

সত্যেরপথে
চাটুয্যে। আজ্ঞে, নইলে আপনাদের ওসব ঘরােয়া
গুপ্তকথা আমি জান্নাে কেমন করে ?
রাজীব। হু—ছােকরাটাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলুম।
কিন্তু এখন দেখছি তার অদৃষ্ট নেহাৎই মন্দ।
চাটুয্যে। ঐযে আপনি তাড়িয়ে দিলেন, আর তারা
অমনি মহা-আদরে লুফে নিলে, এর ভেতরের মল্লবটা
ভেবেছেন কি ? হাওয়া যে কোন দিক থেকে বইছে,
তা তাে বুঝতেই পারূছেন।
রাজীব।
হু-আচ্ছা, তােমরা তবে এখন এসাে।
হরিশৰ্ম্মা ও তারিণী বাহির হইয়া গেলে রাজীববাবু
ডাকিলেন,-“বলি ওহে তারিণী, আর একটা কথা শুনে
যাওতাে।”—-তারিণী ফিরিয়া আসিলেন।
রাজীব।
বসাে।দেখাে, এই মােহিতের ইতিহাস
ততা আগাগােড়াই তােমার জানা। হতভাগাটা যে এতদিন
বেঁচে আছে, এই-ই আগে আমার ধারণা ছিল না। নইলে
আগেই এর বন্দোবস্ত করতুম।
তারিণী।
আমারও পূর্বে এই ধারণাই ছিল।
রাজীব। কিন্তু এখন তাে আর বসে থাকতে পারিনা।
আজই- [ সহসা নীরব হইলেন। পরে আবার বলিলেন ]
হা, আজই !—বিলম্বে প্রমাদ ঘটতে পারে। এভিন্ন আর

সত্যপথে
উপায় নেই। মােহিত! তােমার আর এসংসারে থাকা
চলবে না—কারণ তুমি থাকলে হয়তাে আমাকে লাঞ্ছিত
হতে হবে।-বুঝলে তারিণী, যত টাকা লাগে—আজই।
তারিণী। এ না হলেই কি নয় ?
রাজীব। অন্য উপায় নাই।
তারিণী ধীরে ধীরে প্রস্থানােছত হইলেন। রাজীবলােচন
পুনর্বার কহিলেন, “দেখাে তারিণী, আমি তােমাকে স্নেহ
করি।••••••আর দেখাে, খুব সাবধানে।
উভয়ে দুইদিকে নিক্রান্ত হইলেন। কিছুক্ষণ পরে
জনৈক লাঠিয়াল গুণ্ডার সহিত তারিণী চরণকে দূরবর্তী এক
প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিতে দেখা গেল। আরও কিছুক্ষণ
পরে ঐ দিক হইতে স্তম্ভিত অধীর শশব্যস্তে আসিয়া প্রবেশ
করিয়া কহিলেন, “কি ভয়ানক! একি সম্ভব! ওঃ !
কি ভীষণ-হত্যা! [বলিতে বলিতে ব্যস্তভাবে নিক্রান্ত
হইলেন।
===

সত্যেৱপথে
নবম দৃশ্য।
স্থান—উদ্যান-পথ। কাল-সন্ধ্যা।
[ শশব্যন্তে বিজিতের প্রবেশ ]
বিজিত।
মেজদা ! মেজদা
ওঃ ।
কি ভীষণ ! হত্যার চক্রান্ত।
হে ভগবান!
বিজিতের প্রাণ বিনিময়ে
রক্ষাকরাে হতভাগ্য মেজদারে মাের।
মেজদা। মেজদা !
কোথাতুমি ?—মােহিত ।
মােহিত !
[ ডাকিতে ডাকিতে ব্যস্তভাবে নিক্রান্ত হইলেন।
কিছুক্ষণ পরে পুনর্বার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ভাবে প্রবেশ করিয়া
অর্ধস্বগত-কহিলেন ]
কোথাও নেই—শুধু অন্ধকার।
হতভাগ্য !বুঝি সব শেষ হয়ে গেছে !
হঠাৎ উন্মুক্ত ছুরিকাহস্তে পূর্বোক্ত লাঠিয়াল গুণ্ডা
তাঁহাকে আক্রমণ করিল। “একি ! কে তুমি?” বলিয়া
৫৪
তে

সত্যেৱপথে
মুহুৰ্ত্ত মধ্যে দুইহাত উদ্ধে তুলিয়া বিজিত বসিয়া পড়িলেন।
তঁাহার বাহুতে ছুরিকা বিদ্ধ হইল। এমন সময় বিদ্যুত
চমকিল। “একি!—এ যে-কি ভুল !” এই বলিয়া
আক্রমণ কারী হঠাৎ দৌড়িয়া পলাইল।
“তবু ভাল ! মােহিত মরেনি।
হে ঈশ্বর। এ তােমার দয়া।” এই বলিয়া
বিজিত বাহু হইতে ছুরিকা ধীরে ধীরে টানিয়া তুলিলেন এবং
অন্যহাতে ক্ষতের উপর চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন,
“কাতর আহ্বান মাের করিলে গ্রহণ,
হে ঈশ্বর। ধন্যবাদ লহ।”

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য।
স্থান-বিজয়ের বহিঃকক্ষ। কাল-পূর্বাহ্।
বিজিত উপবিষ্ট। তাহার পদতলে পূর্বোক্ত
লাঠিয়াল। বিজিতের হস্তের ক্ষতস্থান বাঁধা।
লাঠিয়াল। বলল বাবু আমায় মাপ করেছেনইলে
এই পায়ে মাথা খুড়ে মরবাে।
বিজিত। আমার কাছে মাপ চেয়ে তাে কোনাে লাভ
নেই। ঐ খানে মাপ চাও। তাকে ডাকো।
[ উপরে
নির্দেশ ]
লাঠিয়াল।
দোহাই বাবু, আর আমায় মেরাে না।
তােমার শাপে আমার জোয়ান ছেলে পড়ে মরেছে। বলাে
আমাকে মাপ করলে। [ পদ ধারণ ]
বিজিত। ওঠো, আমি মাপ করেছি। ভগবান তােমায়
ক্ষমা করুন। [ হাত ধরিয়া তুলিলেন ]
[ বিজয়ের প্রবেশ ]
বিজয়।
কি হয়েছে, বিজিত ?

সত্যেপথে
লাঠিয়াল। আমায় ক্ষমা করাে বাবু। আমার পাপের
ফল হাতে হাতে পেয়েছি।
বিজয়। কি হয়েছে ?
লাঠিয়াল। ঐ অঙ্গে আমি অস্তর তুলেছিলুম।
পাপে আমার ছেলে হারিয়েছি।—আমায় মাপ করাে।
বিজয়। [ চমকিত হইয়া ] কি, বিজিতকে ছুরি মেরে
ছিলে, তুমি ?
লাঠিয়াল। আমি-আমি মেরেছিলুম।
[ বিজয়ের সর্বাঙ্গে হঠাৎ যেন আগুন ছুটিল। তিনি
দৃঢ় ভাবে লাঠিয়ালের হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন, “সত্য?”
বিজিত। দাদা ।
এ অনুতপ্ত,—আর এ ব্যক্তির শাস্তি
হয়ে গেছে।
বিজয়।
বলো, কার কথায় এ কাজ করেছে ?
বলাে
কেন এমন করলে।
লাঠিয়াল।
বাবু, নায়েব আমায় টাকার লােভ দেখিয়ে-
ছিলাে। কিন্তু আমি না দেখে ভুল--
বিজয়। নায়েব ?-তারিণীচরণ ? সত্য বলছাে ?
[ আরাে দৃঢ়ভাবে তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া জোরে ঝাকি
দিয়া তীব্র স্বরে কহিলেন ] নায়েব বলেছিলাে?
লাঠিয়াল। দোহাই ধৰ্ম্মের, আমি মিছে বলিনি।
৫৭

নভেৱপথে
[ মুহুর্ত মধ্যে বিজয় তাহার হাত ছাড়িয়া দিলেন।
তৎপর উন্মত্তবৎ “শয়তান প্রস্তুত হও—আজ তােমার শেষ।”
বলিতে বলিতে বেগে নিক্রান্ত হইলেন। বিজিত “দাদা ।
দাদা!” বলিয়া তাঁহার অনুসরণ করিলেন
দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-পথ-পার্শ্ব। কাল-পূৰ্বাদু।
রক্তাক্তদেহে ভূপতিত তারিণী । বিজয়ের পিস্তলের
গুলি ভঁহার বাহুমূল ভেদ করিয়াছিল। ক্ষত হইতে রক্ত
পড়িতেছিল। একপাশে পিস্তল হস্তে বিহ্বল ভাবে চাহিয়া
বিজয় দাড়াইয়া ছিলেন। তাহার সর্বাঙ্গ ভয়ে কঁপিতেছিল।
একজন দুইজন করিয়া লােক দৌড়িয়া আসিতেছিল। বিজিত
নিজের বসন-প্রান্ত ছিড়িয়া রক্তবদ্ধ করিবার প্রয়াস করিতে-
ছিলেন।
ধীরে ধীরে অতিকষ্টে তারিণী কহিলেন, “আমার এ
শাস্তি উপযুক্ত হয়েছে ! কিন্তু আমি ইচ্ছাকরে পাপ করিনি।
আমায় মাপ করাে--মােহিত আমাকে ক্ষমা করাে—”
৫৮

সত্যেরপথে
বিজিত। তারিণীবাবু, দাদা আপনার কাছে মার্জনা
চাইছেন।
তারিণী। [ অতিকষ্টে অপর হস্ত উত্তোলন করিবার
প্ৰয়াস করিয়া কহিলেন ]-কলুম।
বিজয় ধীরে ধীরে অবনত মস্তকে তারিণীচরণের কাছে
সরিয়া আসিলেন। এমন সময় অতি ব্যন্তে অরুণ আসিয়া
উপস্থিত হইলেন। তাহাকে দেখিয়াই বিজয় ভঁহার বক্ষে
ঝাপাইয়া পড়িয়া কঁদিয়া উঠিলেন
তৃতীয় দৃশ্য।
স্থান—রাজীবলােচন বাবুর অন্তঃপুরস্থ কক্ষ।
কালমেঘান্ধকার রাত্রি। মধ্যে মধ্যে বজ গজ্জিতেছিল।
প্রবল বাত্যা বহিতেছিল। কক্ষমধ্যে একাকী রাজীবনােচন।
উঃ !
রাজীব।
কি দুৰ্যোগ ! কি কালাে ! বাহিরে
ঐ ঝঞা, ঐ গর্জন, ঐ অন্ধ-প্রকৃতি !আর ভিতরে [ বুকে
হাত ] —ঠিক তাই!-ঐ ঝা, ঐ অন্ধকার ! হে ঈশ্বর।
তােমাকে ভাবার সাহসও হারিয়েছি। ক্ষমা চাহিবার

অধিকারও রাখিনি। [ ক্ষণেক পরে ] অন্তরে-বাহিরে একি ঝটিকা ! একি বিপ্লব। এক সাথে তারা আজ বিদ্রোহ ঘােষণা করেছে। কিন্তু অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে । বড় বেশী তলিয়ে গেছি !--হে ঈশ্বর ! ক্ষমা চাহিবারও অধিকার রাখিনি! | একপার্শ্বস্থিত একটি বাস টানিয়া খুলিয়া উহার ভিতর হইতে অনেক গুলি বাঁধা কাগজ-পত্র খুলিয়া আনিলেন ] এই স্তুপীকৃত পাপ-আমার আজন্মের সঞ্চয়। আমার জীবনের বিনিময় । আমার অধঃপাতের নিয়ামক। অনেক নামিয়ে নিয়েছে,-এবার এই বিষ- আলিঙ্গন থেকে আমায় মুক্তি দাও। [সমস্ত কাগজে আগুণ ধরাইলেন ] ভিতরেও ঠিক অমনি জ্বলছে—কিন্তু হায় ! সঞ্চয় যদি এরই মধ্যে পুড়ে মুছে ফেলতে পারতাে !হে হে পিতা ! ক্ষমা চাহিবারও অধিকার রাখিনি। নিজের কণ্ঠ নিজেই যে আগে থেকে চেপে রেখেছি! চক্ষু আগে যদি খুলে দিতে দয়াময় ! [কিছুক্ষণ একভাবে দাড়াইয়া রহিলেন। তৎপর ধীরে ধীরে নিক্রান্ত হইলেন।] ঈশ্বর !

সত্যেলখে
চতুর্থ দৃশ্য।
স্থান-বিজয়ের বহিঃ কক্ষ। কাল--প্রভাত
বিজয় একাকী।
বিজয়। সুর না জাগিতে বীণা মূক হয়ে গেছে,
সাধের কুসুম মাের না ফুটিতে ঝরে গেছে
একটী মৰ্ম্মর-স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গিয়াছে !
যাও সুখ!
যাও শান্তি। আমারে বিদায় দাও--
আমারে আমার দুঃখে ছেড়ে চলে যাও !
রেবিজয়! হতভাগ্য! এঁকেছিলে কত সুখ ছবি,
গেঁথেছিলে কত গান গাহিবে বলিয়া,
হায় !
ব্যর্থ হয়ে গেছে সব
অলক্ষিতে কার অভিশাপে ।
আজি আমি নরহন্তা !
দস্ত চেয়ে হীন ।
পশুরও অধম !—আমি আজ অমানুষ!
এই হস্তে হত্যা করিয়াছি।
[ অধীরের প্রবেশ ]
বিজয়।
অধীর।
আমি এই হস্তে হত্যা করিয়াছি।

সত্যেৱপথে
[ অধীর মুখ তুলিয়া বিজয়ের দিকে চাহিলেন। তাঁহার
চক্ষু বাষ্পকুল হইল। তিনি মুখ নত করিলেন ]
বিজয়। কঁদছাে ?—আমারে লেগেছে ভয় ?
কেঁদোনা অধীর !–আমি তাের--
অধীর। বড়দা !
বিজয়। আমি কি এখনও তাই আছি অধীর ?
অধীর।
কেন থাকবে না, দাদা ?
বিজয়। আমি কি পাগল হয়ে ছিলুম অধীর ?-নইলে
অধীর।
বড়দা !
বিজয়। এই সংসার থাকবে, এই আমার সাধেরপুরী
থাকবে,—বিজিত থাকবে, তুই থাকবি-সবই থাকবে, আমি
তখন কোথায় খাবাে অধীর ? আমি যে নরহন্তা। আমার
শাস্তি হয় আজীবন কারাবাস, না হয়--না হয়—অধীর।
অধীর।
বড়দা; তুমি অস্থির হয়েছে।
বিজয়। [ ধীরে ধীরে ] আমি যে নরহন্তা—এই
সুন্দর আকাশ, এই সুন্দর পৃথিবী, এই সুন্দর প্রভাত,
আমার আর ওতে কোনােই অধিকার নেই। আমার স্পর্শে
হয়তাে সবই শুকিয়ে যাবে ! [ ক্ষণেক পরে ] অধীর, একটা
গা’মাআরতাে শুবাে না তাের গান—একটা গান গা”

সভ্যৱপথে
অধীর।
তােমার তাে কোনাে দোষ ছিলো না দাদা।
এ সব ভাবছাে কেন ? চলাে অন্যত্র যাই।
বিজয়। আগে তুই গা-
[ অধীর গাহিলেন ]
গান
নিখিল বিশ্ব সুন্দর সব তােমারি পুণ্য পরশে,
হে মােহন, সুন্দর তব দরশে।
আকাশে-বাতাসে তব আবাহন,
সাগর-সঙ্গীত গাহে তােমার কীৰ্ত্তন
আমার হৃদয়ে তােমার আসন,
হে সুন্দর, তুমি এসাে।
তুমি পুণ্য, তুমি নিৰ্ম্মল,
তুমি শিব, তুমি সুন্দর,
হে পিযুষ, এসে
আমার কলুষ নাশাে।
অধীর !
বিজয়।
অধীর।
বড়দা !

সত্যেরপথে
বিজয়।
তাের গানে সত্যই সুন্দর এসেছিলে
আমায় শান্তি দিয়ে গেছে। আয়, যাই'।
অধীর। এসাে দাদা।
পঞ্চম দৃশ্য
স্থান—পথ।
কাল--মধ্যাহ্ন।
মােহিত ও হরিশৰ্ম্মা।
মােহিত। বুঝেছো ঠাকুর, কি করেছে তুমি ?
হরি।
আমায় ক্ষমা করাে মােহিত। আমি সর্বনাশ
করেছি।
মােহিত। তুমি সর্বনাশ করেছে। কিন্তু সে যে কত
বড় সর্বনাশ—আগে যদি বুঝতে ! শুভ্র-জ্যোস্না-পুলকিত
বাসন্তী রাত্রি দেখেছে বৃদ্ধ ?কাল ঝার মতো সেই
জ্যোৎস্নাকে তুমি বিষের নিশ্বাসে পুড়িয়ে দিয়েছে।
ধরার বুকে কখনাে নন্দনের ক্রীড়া দেখেছো ?—নিষ্ঠুর
৬

সভ্যেৱপথে
•
বাতব্যাধির মতাে সেই উচ্ছ্বসিত ক্রীড়াকে তুমি স্তব্ধ পঙ্গু
করে দিয়েছে । একটা ঢল ঢল তরুণ হাসি ফুটতে না
ফুটতে তুমি তার মুখে নরকের দুঃস্বপ্ন ছিটিয়ে দিয়েছে !
তুমি এখনাে বুঝতে পারছে না—প্রতিহিংসায় অন্ধ ব্রাহ্মণ,
কি তুমি করেছছা !
হরি। মােহিত!
মােহিত। একটা আনন্দ-উৎসবকে তুমি মৃত্যু-যজ্ঞে
পরিণত করেছে ? -বৃদ্ধ জমিদার এ যজ্ঞের কৰ্ম্ম-কৰ্ত্তা, তুমি
এর পুরােহিত, আর আমি-আমি এ যজ্ঞের ইন্ধন রচিয়েছি ।
[ ক্ষণেক পরে ] কিন্তু আমি অজ্ঞাতে করেছি
আমার হত-অদৃষ্ট আমার অজ্ঞাতে আমায় অপরাধী করেছে।
নইলে তােমাকে আমি কেন বিশ্বাস করেছিলুম বৃদ্ধ!—ক্ষুদ্র
এই জীবনের জন্য কত অভিশাপের ভার তুমি জমিয়ে
রেখেছিলে ঈশ্বর। আকুল আশায় ছুটে গেছি,—বিশাল
সাগর-বক্ষ আমার স্পর্শে শুষ্ক হয়ে গেছে । একটা স্বস্তির
নিশ্বাস ফেতে চেয়েছি,-ফেলতে না ফেতে শত বেদনার
নিশ্বাস বক্ষের পঞ্জর ভেদ করে বাহিরে ছুটে এসেছে।
উম্মুখ আগ্রহ নিয়ে একটীবার মাত্র তােমায় করুণাময় বলে
ডাকতে মুখ তুলেছি,কণ্ঠ চিরে সহস্র অভিযােগ আমার
উদ্যতবাণীকে মুক করে দিয়েছে ! এমনি দগ্ধ-জীবনের

সত্যেৱপথে
ঝা-প্রহারে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন আমি তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে কুল
পেলুম। স্নেহ-কোমল কয়খানি হস্ত কতই না করুণায়
আমায় কোলে টেনে নিলে। কিন্তু দু’দিন না যেতেই সেই
স্নেহের বন্ধন থেকে ছিনিয়ে নিতে শুশান তা’র কঙ্কাল-বাহু
দু’খানি প্রসারিত করে দিলে। সে আক্রমণ থেকে স্নেহের
বাহু কয়খানি প্রবল করুণায় আমায় বুকে আঁকড়ে রাখলে।
তারপর ?—শােনাে বৃদ্ধ !—তারপর, বৃদ্ধ তুমি, পরম
আপন জেনে জীবনের সমস্ত গুপ্ত-ইতিহাস—যা কেউ
জান্তাে না-তােমার কাছে ব্যক্ত করলুম। আমি তােমাকে
বিশ্বাস করলুম।
কিন্তু সেই বিশ্বাসের বিনিময়ে, অপমানের
প্রতিহিংসায় অন্ধ তুমি এই মহা সর্বনাশকে ডেকে আনলে !
এই সর্বনাশ-যজ্ঞের পুরােহিত তুমি ! আর আমি তার
ইন্ধন রচিয়েছি ! হতভাগ্যকে কেন বুকে টেনে নিয়েছিলে
বন্ধুগণ !আর কত জ্বালাবে ভগবান ! অভিশাপের বােঝ
ক্ষুদ্র এই জীবন থেকে সরিয়ে নাও প্রভু, না হয়, যেখানে
নিতে হয় নিয়ে যাও—নিয়ে যাও।
হরি। মােহিত! মােহিত! আমাকে ক্ষমা করাে।
মােহিত। এখানে-
ঐখানে—ঐ তার
কাছে চা, তাকে
ডাকুন চাটুয্যে মশায়, সে যদি দয়া করে ।
কাছে—[ উপরে নির্দেশ ]

সত্যেপৰে
ষষ্ঠ দৃশ্য।
স্থান-বিজয়ের কক্ষ।
কাল—অপরাহ্ন।
বিজয় ও অরুণ।
অরুণের স্কন্ধোপরি মস্তক রক্ষা
করিয়া বিজয় কঁদিতেছিলেন। অরুণ তাহাকে বাহুপাশে
আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন।
রুদ্ধকণ্ঠে বিজয় কহিলেন, “অরুণ ! ভাই আমার ।
তােমার কাছে মার্জনা চাহিবার মুখ-ও যে আমার নেই !”
অরুণ। মার্জনা চাইবে কার কাছে বিজয়। সকল
মার্জনার দান যে একদিনেই বহু আগে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
হৃদয় নুইয়ে ভেঙ্গে পড়তে চেয়েছে বেদনায়, তবু ঐ বেদনা-
খানিকেই বুকে আঁকড়ে ধরেছে সে ;-তা’র সুখের সমাধি
যে ঐ বেদনার তলে । তা’র সকল-সুখের স্মৃতি দিয়ে গড়া
যে এই দুঃখ ! তােমার উপর রাগ করবার ক্ষমতাটুকুও
যে আমি হারিয়ে বসেছি ভাই ! সেদিন আমার উদ্যত
আলিঙ্গন ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলুম-বড় দুঃখেই গিয়ে-
ছিলুম! কিন্তু সেই ফিরিয়ে নেওয়ার দাহন টুকু কত বড়
দুঃখ হয়েই যে জেগে রয়েছে এখানে। নিজেই নিজেকে

সত্যেৱপথে
মার্জনা করতে পারিনি বিজয় ! নিজের অভিশাপে নিজেই
পুড়ে মরছিলুম ; বেদনার নিশ্বাসকে চেপে রাখতে সকল
অভিমান আমার ক্ষত-বিক্ষত হয়ে উঠেছিলাে যে ভাই ।
বিজয়। অরুণ ! অরুণ! কোথায় তুমি স্বর্গের পুণ্য
সিংহাসনে, আর কোথায় আমি-নরকের অন্ধ-গুহা-তলে!
[ রাজীব লােচনের প্রবেশ ]
রাজীব।
বিজয় !
বিজয়। একি !
আপনি ! এখানে।
অরুণ। একি, বাবা ।
রাজীব।
বিজয় ! বৃদ্ধ রাজীবলােচন আজ তােমার
কাছে ভিক্ষা চাইতে এসেছে !
[ অরুণ ও বিজয় নির্বাক-বিস্ময়ে তাঁহার মুখের দিকে
চাহিয়া রহিলেন ]
রাজীব। বিশ্বাস হচ্ছে না ?—সত্যই আমি আজ
ভিখারী বিজয় ! ভিক্ষা দাও।
বিজয়। এ কি বল্‌ছেন আপনি ? এ কি ? আপনি
কি-
রাজীব।
-এখনাে হইনি।
কিন্তু হয়তাে
তাই হতে হবে। বলল বিজয় আমায় ভিক্ষা দেবে—আমায়
ক্ষমা করবাে ? [ বিজয় পূর্ববৎ নির্বাক। রাজীব লােচন
উন্মাদ ?-

সত্যেৱপথে
দুইহস্তে বিজয়ের দক্ষিণ হস্ত ধারণ করিয়া কহিলেন ] বলল
বিজয়, আমায় ক্ষমা-ভিক্ষা দেবে ?
বিজয়। আপনি—এ কার কাছে ক্ষমা চাইছেন।
গর্বোন্নত তুঙ্গ আসন ছেড়ে একি সেই অভিমানী আপনি
নেমে এসেছেন এ ভাবে—এখানে ? আপনি ?—অরুণ !
অরুণ।
বিজয় !
বিজয়। এ কি রহস্য !
রাজীব। রহস্য নহে। এ সাক্ষাৎ সত্য। আমি-
অভিমানী গৰ্বী রাজীবলােচন আজ তােমার কাছে ভিক্ষা
চাইতে এসেছি বিজয় !
বিজয়। আপনি ভিক্ষা চাইছেন আমার কাছে !আর,
আপনি অরুণের পিতা। স্থির হউন পিতা ! সমস্ত তপ্ত
অতীত এই শুভ বর্তমানের মাঝে লুপ্ত হয়ে যাক। সকল
গত-স্মৃতি এই সুন্দর বর্তমানের গর্ভে বিস্মৃত হয়ে যাক।
স্থির হউন পিতা !
রাজীব। বাঁচালে পুত্র ! অনেক
পেলুম!
মােহিতকে ডেকে এনাে অরুণ ! -সেও যদি ক্ষমা করে ।
[ মােহিতের প্রবেশ ]
মােহিত। মােহিতের কাছে ক্ষমা চাইবার কোনাে
প্রয়ােজন নেই। যেদিন জেনেছি আপনি অধীরের পিতা,

সত্যেপথে অরুণদা’র পিতা, সেদিন থেকেই সকল অতীত আমার কৰ্ম্মফল বলে মেনে নিয়েছি। আপনি আমার অতি বড় শত্রু হলেও আজ আমি আপনাকে পিতা বলে সম্বােধন করছি। জানেন পিতা, আপনার দ্বারা শৈশবে তাড়িত কাঙাল মােহিতের পুনজ্জীবন যে—আপনারই পুত্রের দান। অধীর একটা স্বর্গের সঙ্গীত পিতা !আর তার জন্মদাতা আপনি। আমি সকল অতীত বিস্মৃত হয়েছি পিতা ! রাজীব চরম শান্তি পেলুম। আমায় ক্ষমা করে বলে ডেকেছে। এসাে,—পিতার আলিঙ্গন নাও! [ আলিঙ্গন ] কিন্তু জানাে কি মােহিত, আমি তােমার কি করেছিলুম ? জানাে কি আমি পিতৃমাতৃহীন তােমার সব কেড়ে নিয়ে তােমাকে পথে তাড়িয়ে ছিলুম ; তােমার জীবনের উপর চক্রান্ত করেছিলুম ? জানাে কি, যে ছুরিকা সেদিন বিজিতের হাতে বিঁধেছিলাে, আমি তাকে তােমারই বক্ষ বিদ্ধ করবার জন্য নিযুক্ত করেছিলুম ? জানাে কি মােহিত মােহিত। জানি। তবু আপনাকে আজ পিতা বলে সম্বােধন করছি। রাজীব ! তুমি কি এখন ক্ষমা করবে না ঈশ্বর ! মােহিত, তবে তােমার এই বােঝ তুমি নাও। এ পাপ-

সত্যেপথে
স্তুপ আর আমি বইবাে না। এর জন্য আমি মনুষ্যত্ব
হারিয়েছি ! আমায় রিক্ত হ’তে দাও এখন?-অরুণ!
অরুণ। আদেশ করুন পিতা।
রাজীব।
পিতাকে অভিশাপ দিয়াে না পুত্র !
অরুণ। অভিশাপ দেবাে !—তুচ্ছ সম্পত্তির বিনিময়ে
আজ যে আমার পূর্ণ-স্নেহময় পিতাকে ফিরে পেয়েছি বাবা!
কাঁচ গেছে,—আমি কাঞ্চন পেয়েছি বাবা!
রাজীব। উঃ! কি অন্ধকারে আমায় ঢেকে রেখেছিলে
প্রভু!—কি আমি স্বেচ্ছায় হারিয়েছিলুম !
[ হরিশৰ্ম্মার প্রবেশ ]
হরি। অরুণ ! অরুণ ! অনুতপ্ত বৃদ্ধকে ক্ষমা
করাে। ক্ষমা করাে বিজয়। ক্ষমা করাে বাপ সকল!
-নইলে তার পরপারের পথ যে বন্ধ হয়ে যায়।
বিজয়। এ কি আজি আনন্দের দিন। এ কি সুখ!
-কিন্তু হায় ! নরহন্তা আমি, অভিযুক্ত হত্যা অপরাধে।
৭১

সত্যেৱপথে
সপ্তম দৃশ্য।
স্থান-বিজিতের কক্ষ। কাল—সায়াহ্ন।
[ বিজিত ও অধীরের প্রবেশ ]
বিজিত। [ অর্ধ স্বগত)
কেঁদোনা বিজিত । বহু কাদিয়াছে।
সমস্ত জীবন পাবে কাঁদিবার তরে,
কাদিয়াে তখন।
ক্রন্দন জীবন-সাথী
হবে অতঃপর। এবে স্থির অকম্পিত করে
হানাে বজ্র।
অটল হিমাদ্রি সম রহ স্থির,
কঁপিয়াে না, কাদিয়াে না। ফেলিয়াে না
একটা নিশ্বাস। দিতে হবে আজন্মের
স্নেহ-প্রতিশােধ!
[ অরুণের প্রবেশ ]
অরুণ।
বিজিত!
বিজিত। বলাে দাদা!—আঁখি-নীরে পাষাণ গলে না !
অরুণ। ভেবে দেখ, ভাই! তাের মুখের একটী
কথার পরে নির্ভর করে
৭২

सद
রেপ
আর, যদি
দাদার জীবন তাের। এতে তাের কোনাে পাপ নাই।
বিজয় সম্পূর্ণ নিরপরাধ ।
হয়ে থাকে পাপ কিছু এতে,-এও শুধু
তাের লাগি। অন্য কিছু করতে হবে না তাের;
শুদ্ধ বলিবি দাঁড়িয়ে, “কে করিয়াছে হত্যা
আমি নাহি জানি।” এইমাত্র-- আর কিছু
করিতে হবে না তােরে। এতে যদি পাপ হয়
কিছু—আমরা সে পাপ-ভাগী হবে।
অন্য যাহা করিবার আমরা করেছি।
কোনাে দিকে কোনাে ছিদ্র রাখি নাই বাকী।
এ হত্যার কোনােই প্রমাণ পাইবে না
কেহ। তাের পরে এবে নির্ভর করে
জীবন-মরণ।
বিজিত।
এত অনুনয় কারে করিতেছে দাদা !
তােমাদের বিজিত মরিয়া গেছে।
এ শুদ্ধ কঙ্কাল তার ; কঙ্কালে শােনে না
কথা। যারে দেখিতেছে এই—এ, বংশের
অভিশাপ ! এ এক জল্লাদ !
-অরুণ। বিজিত ! আমাদের অনুরােধ, অনুনয়,
কাতর প্রার্থনা ; সর্বোপরি স্নেহময়

সত্যেৱপথে
তবু আমি
ভেবে দেখ,
দাদা তাের, তাের মুখ চেয়ে।তবু তুই
অটল, কঠিন।
বিজিত । তবু আমি অটল, কঠিন।
নিৰ্ম্মম দানব !
অরুণ।
ভাই ! আমি
বিজয়েরে লইয়া আসি।
[ প্রস্থান ]
বিজিত। অধীর ! অধীর বুক বুঝি ফেটে যায় !
[ দুইহস্তে অধীরকে টানিয়া আনিয়া প্রবল আবেগে বক্ষে
জড়াইয়া ধরিয়া বালকের মতাে কঁদিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ
পরে কহিলেন--]
কেন নিয়েছিনু হায়, এ দীক্ষা ভীষণ !
কেন করেছিনু সত্য-মিথ্যা কহিবাে না !
কেন মরি নাই পূর্বে !
এমন কি কেহ নাই—যে আমারে মুহুর্তের মাঝে
দুর্বাসার অভিশাপে ভস্ম করে দিতে পারে।
অধীর। এ কি করূলে ঈশ্বর।
বিজিত। অধীর। আমারে বলে দে পথ।
একদিকে স্নেহময় আরাধ্য-দেবতা
দাদা মাের মুখ পানে চেয়ে।
অন্য দিকে
সত্য ঐ নির্বাক ভীষণ ।
অধীর !
৭৪

সত্যেৱপথে
আমারে বলে দে পথ।
অধীর।
ছােড় দা !
বিজিত। আমি নিৰ্ম্মম দানব !
দাদা !
বুক চিরে স্নেহ দিয়ে ভাল বেসেছিলে।
লও প্রতিফল ।
স্নেহ-ভালবাসা ! মরে মুছে যাও এই
সৃংসার হইতে। থাক শুধু অভিশাপ ।
[ বিজয় ও অরুণের প্রবেশ ]
বিজয়। বিজু ! ভাই !
বিজিত। [ উচ্চৈস্বরে ] অভিশাপ দাও-অভিশাপ।
[ উম্মত্তের মত বিজিত বিজয়ের বুকে ঝাপাইয়া পড়িলেন।
উভয়ের বক্ষে বক্ষ ও স্কন্ধে স্কন্ধ সংলগ্ন হইল ]
বিজয়। অভিশাপ ?—তােরে অভিশাপ দিবাে-আমি?
করি আশীর্বাদ, সত্য তাের থাকুক অটুট, ধর্ম
তাের থাকুক অক্ষত।
৭৫

সভ্যৱপথে অষ্টম দৃশ্য। স্থান-রাজপথ। কালঅপরাছু। [ পথ দিয়া কয়েকজন লোেক যাইতে যাইতে কথােপ- কথন করিতেছিল। ] ১ম ব্যক্তি। আরে ভাই, দেখতে দেখতে বুড়াে হয়ে গেলুম, তবু মানুষ চিনতে পারলুম না। ২য় ব্যক্তি। ঠিক বলেছাে দাদা এ ভবে মানুষ চেনা বিষম দায়। ৩য় ব্যক্তি। সাহেব পৰ্যন্ত শুনে অবাক হয়ে গেলে। ২য় ব্যক্তি। হবে না ?-কেমন দাঁড়িয়ে বললে, আমি গুলি করতে দেখেছি। ১ম ব্যক্তি। আরে ভাই, ভিতরে কথা আছে হে কথা আছে । ৩য় ব্যক্তি। আরে রেখে দাও তােমার কথা আর উথা। ২য় ব্যক্তি। আহা ! শুনতে দাওনা হে বিষয়টা। তুমি কি কিছু জানাে নাকি দাদা? ৭৬

সত্যেপথ
১ম ব্যক্তি। এ আর জাতে কারই বাকী আছে হে।
তােমরা দেখছি দুনিয়ার কোনাে খবরই রাখাে না।
৩য় ব্যক্তি। ঠিক-ঠি ! আমি বুঝে ফেলেছি।
ও সব বিষয়-আশয় নিয়ে
১ম ব্যক্তি। আঃ! তুমি তাে ভারী চ্যাংড়া হে বাপু!
কথাটা পূরােতেই দাও না।
৪র্থ ব্যক্তি। আমার কিন্তু এ কথা বিশ্বাস হয় না।
ছােট বাবুকে আমি জানি। তার এমন স্বভাবই নয়।
১ম ব্যক্তি। আর বিশ্বাস হয় না । বাপু হে, আরাে
বড় হও—এখনাে অনেক শিখবার বাকী আছে।
[বলিতে বলিতে সকলে প্রস্থান করিল। ২য় ব্যক্তি গান
ধরিল, “এ ভবে মানুষ চেনা বিষম দায়। ]

সত্যেৱপথে
নবম দৃশ্য।
স্থান-স্কাউট মাষ্টারের কক্ষ। কালরাত্রি।
স্কাউট মাষ্টার ও বিজিত।
বিজিত। [ স্কাউট-ব্যাজ হস্তে
লইয়া ] গুরুদেব !
গুরুদেব । এই ফিরিয়ে নিন্ আপনার ব্যাজ। দেখুন,
এর মর্যাদা আমা হতে একটুও ক্ষুন্ন হয় নি। দেখুন, এর
মাঝে এতটুকু কালিমার দাগ পড়েনি। দেখুন, হৃদয়ের
রক্ত দিয়ে আমি কেমন করে একে উজ্জ্বল রেখেছি। এই
নিন্, গুরুদেব ! আপনার দান—আপনি ফিরিয়ে নিন।
স্কাউট মাষ্টার। এসাে কৰ্তব্য-কঠোর বীর ! এসাে
সফলসাধক তাপস! এসাে প্রেমিক তরুণ। আমার
পূর্ণ-হৃদয়ের স্নেহ-অর্ঘ্য দিয়ে তােমায় আজ অভিনন্দন
দিচ্ছি। এসাে শিষ্য আমার ।
বিজত। অভিনন্দন—ফিরিয়ে নিন্ গুরু, ফিরিয়ে
নি। আমার ভ্রাতৃ-অভিশাপে এ.যে বিষাক্ত হয়ে গেছে
আমার ভায়ের তপ্ত নিশ্বাসে এ উষ্ণ হয়ে আছে। ফিরিয়ে
নিন্ এই আপনার দান ! দেখুন, একে আমি এতটুকু মলিন
৭

সত্যেৱপথে
হতে দিইনি। দেখুন, আমি এর অপমান করিনি । দেখুন,
সর্বস্ব দিয়ে কেমন করে আমি একে উজ্জ্বল রেখেছি।
ফিরিয়ে নিন্ ! ফিরিয়ে নিন্ ।
স্কাউট মাষ্টার। স্থির হও বিজিত! এন্ড অধীর হয়াে না।
বিজিত। স্থির আছি গুরুদেব ! নইলে দেখেন নি
আপনি—স্থির পদে দাড়িয়ে এমনি করে নিজের হাতে
হৃদপিণ্ড ছিড়ে দিয়ে এসেছি ! এতটুকু কেঁপে উঠিনি-
এতটুকু টলিনি। স্থির আছি—নইলে এ পারতুম না।
কত মিনতি, কত ক্রন্দন, কত জ্বালা, কত দহন—সব সহ
করেছি। চারিদিকে কত কাতর-চক্ষুর আকুল প্রার্থনা
দেখেছি,—তবু কঁপিনি, তবু একবিন্দু অশ্রু ফেলি নি
তবু কণ্ঠ চেপে ধরিনি ।গুরুদেব । গুরুদেব ! তবু
বুক ফেটে যায় নি।
স্কাউট মাষ্টার। মহৎ শিষ্য । এমনি করেই তাে
সত্যেরপথে চল্‌তে হয়।
এই চলার মাঝেই যে সকল
গৌরব, সকল সাফল্য, সকল পুরস্কার !
বিজিত। এ যে রক্ত দিয়ে উপার্জন করা গৌরব
গুরুদেব!
স্কাউট মাষ্টার। ওখানেই যে সকল সাফল্য বিজিত।
দুঃখ যদি ভােগ করতেই হলাে, তবে একটা অসাধারণ
৭৯

সত্যপথে
রকমেরই করবাে।
ভুলে যেয়ােনা বিজিত, সেই মহাবাণী
যা তােমায় অনেক দিন শিখিয়েছি, “যে দুঃখ এক নিমেষে
আসে, নিমেষে যায়, সে দুঃখ আমার নয়। যে দুঃখ এক
ফোটা অশ্রু সলিলে, একটা দীর্ঘ নিশ্বাসে ফুরিয়ে যায়,
সে দুঃখ আমার নয়। যে দুঃখ মানব-সভ্যতার বুকে ভৃগু-
পদচিহু আঁকিয়া দিল না, সে আবার একটা দুঃখ কি ?
দুঃখ পাইব তেমন, যাহা দু’চার জন্ম বুকের উপরে ক্ষতের
চিঃ রাখিয়া যাইবে। আঘাত পাইব তেমন, যাহা হৃদয়-
শােণিতের রক্তস্রোতে বিশ্ব-সুখের মন্দাকিনী বহাইবে,
সন্ধ্যামন্ত্র পড়িবার কালে যেন বেদনিষ্ঠ সাম-ব্রহ্মচারী জাবী-
যমুনার তীর্থ-সলিলকে আহ্বান না করিয়া আমার এই ব্যথার
মন্দাকিনীকে ডাকিয়া আনে!”
বিজিত।
মানুষের এ যে বড় কঠিন দেব ।
স্কাউট-মাষ্টার। কিছু নয়। পুষ্প ফোটে—অত্যন্ত
‘সহজ সার্থকতায় আদ্যোপান্ত প্রফুল্ল হয়ে উঠে কিন্তু এতে
তার তাে কোনাে গৌরবই নেই ; কারণ এ যে ক্ষণকালীন
সম্পূর্ণতা ; দিনের রবি ডুবতে না ডুবতে সব শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু মানুষ বিরাট, তাই তার দুঃখও বিরাট !
‘এত দুঃখ
‘ক্ষুদ্রের নহে।
মহতেরই গৌরব দুঃখ। বিশ্ব সংসারের
মাঝে মনুষ্যত্বই সেই দুঃখের মহিমায় মহীয়ান্—অশ্রুজলেই

সত্যেপথে
তা’র রাজ্যাভিষেক। মানুষ মহৎ, কারণ মনুষ্যত্ব সুকঠিন,
এবং মানুষের যে পথ, “ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া,
দুর্গমং পথস্তৎ কবয়াে বদন্তি।”
বিজিত। সবই বুঝি গুরুদেব !
কিন্তু সকল বুঝা-
না বুঝা যে এক হয়ে গেছে ।
স্কাউট মাষ্টার। বিজিত । মনুষ্যত্বকে সতেজে
উচ্চে তুলে ধরেছো তুমি। এখন তাে নুয়ে ভেঙে পড়লে
চলবে না ! আর, এখানেই তাে সকল হিসাবের সমাপ্তি
নয়। সকল পুরস্কার—ঐ হােথায় জমা হয়ে থাকে
একজনের চির-সতর্ক দৃষ্টি অহর্নিশি বিশ্ব জুড়ে সদা-জাগ্রত
হয়ে চেয়ে আছে। সে তােমায় ভুলে নি। হৃদয়ের রক্ত
দিয়ে তুমি তার পূজা করেছে, সে ভঁ’র সকল আশীর্বাদ
সকল পুরস্কার-ঐ দেখাে বিজিত ।ঐ চেয়ে দেখােতা।
নিকটবর্তী কক্ষ হইতে বিজয় বাহির হইয়া আসিয়া
কহিলেন,
“বিজিত! প্রিয়তম ! মুক্ত আমি সসম্মানে!”
सर्वविश

প্রিন্টার -প্রীক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্য
ক্ষিতীশ প্রেস
৩০নং ওয়েলিংটন ষ্ট্রীট, কলিকাতা

No text on this page.

No text on this page.

Satyer Pathe

Author
Bhattacharya,digendranath
Title
Satyer Pathe
File name
Satyer Pathe
Text
OCR done
Citation
1928
Published
2009/09/20
Publisher
Kattayan Library, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
99
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Plays
Keywords
Kala
DLI number
513243
Barcode
4990010020240.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
tUWJxEMHhao
Download PDF

Satyer Pathe