Bally Sadharan Granthagar

Ruddha Abeg

Gupta, Sri Satyendrakumar · 2009/08/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রুদ্ধ' আবেগ
শ্ৰীসত্যেন্দ্রকুমার গুপ্ত প্রণীত
দ্বিতীয় মুদ্রণ
শ্যামা পূজা ১৩৩৪
প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
[ এক টাকা।

পুস্তক সংখা
সংস্থা
৩৬২
শ্ৰীসত্যেন্দ্রকুমার শীল।
পরিগ্রহণ সংখ্যা :
শ্রীকৃষ্ণ লাইব্রেরী
৯৮১, অপার চিৎপুর, নােভ, কলিকাতা।
শৈলজার—নূতন পুস্তক
“ঠাকুর-পাে”
বৌদির নিকট ঠাকুরপাে সম্ভাষণ
কি মিষ্ট, কি মধুর, কি পরিতৃপ্তিকর
যিনি এ আহ্বাদে বঞ্চিত, তিনি হতভাগ্য সন্দেহ নাই,
আশাকরি ইহাতে তিনি কতক আস্বাদ পাইবেন।
প্রিন্টার—শ্রীপঞ্চানন দাস,
সত্যনারায়ণ প্রেস,
২৫, দুর্গাচরণ মিত্রের স্ট্রীট, কলিকাতা।

চক আবেগ এক টিফিনের পর স্কুল বসিয়া গেল,-শ্রান্ত ক্লান্ত দেহ লইয়া, ভাল- ছেলেটার মত আবার সব ক্লাসে গিয়া বসিলাম ; পাঁচ মিনিট কাটিয়া গেল, শিক্ষকের অভাবে কোলাহল বিন্দুমাত্র কমে নাই, সহসা প্রধান-শিক্ষয়িত্রী মিস সেন একখণ্ড শ্লিপ লইয়া, চটি জুতার ফটাফট শব্দ করিতে করিতে আমাদের ক্লাসে ঢুকিলেন। তাঁহার এই সহসা আগমনে কোলাহলপূর্ণ গৃহখানি নিঝুম রাতের তার একেবারে শান্ত স্তব্ধ হইয়া গেল ; কেবলমাত্র চুড়ির মৃদু আওয়াজ এবং দৃষ্টিবিনিময় চলিতে লাগিল। মিস, সেন গম্ভীর এবং ততধিক কঠোর-কণ্ঠে বলিলেন,-মিনতি রায়,বইখাতা নিয়ে অফিস ঘরে এসাে! তরুণ কক্ষখানি আমার আমার সহসা কাপিয়া উঠিল। 'সবলের কৌতুহলী এবং উদ্বেগভরা দৃষ্টিগুলি আমার মুখের উপর আসিয়া এ আহ্বানের ফল যে বড় সুবিধার হইবে না, তাহা সকলেই জানিত এবং আমিও জানিতাম যে স্কুলে কিম্বা বাের্ডিংএ পড়িল।

রুদ্ধ আবেগ এমন একটা মহা দুষ্কৰ্ম্ম করিয়াছি যাহার ফলভােগ করিবার জন্য আমাকে এখনই প্রস্তুত হইতে হইবে। ক্লাসের বাহিরে আসিতেই মিস, সেন গম্ভীরভাবে বলিলেন,- তােমার কোন ভাই-টাই আছেন ? পিতার একমাত্র কন্যা হইয়াই, তাহার স্নেহ ও প্রীতির সমস্ত দাবী আমি একাই বহন করতেছি, বলিলাম,-না, নেই ! -মাসতুতত, কি পিসতুত ? , তা আছেন। অফিস-ঘরের সুমুখে আসিয়াই, তিনি একটী যুবকের দিকে তাকাইয়া বলিলেন,-আপনি একেই চান কি ? তিনি রিমলেশ চশমার স্বচ্ছ কাচ দুটীর ভিতর দিয়া আমাকে একবার দেখিয়া লইয়া বলিলেন,-হাঁ, একেই চাই। এই নিন চিঠিখানা—ধীরেশ বাবু আপনাকে দিয়েছেন। কম্পিতহস্তে তাহার নিকট হইতে পত্রখানি লইয়া খুলিয়া ফেলিলাম। তাহাতে লেখা ছিল :- মা, মিনু। এই যে ছেলেটী তােমার বেডিংয়ে চিঠি নিয়ে গিয়েছে, একেবােধ হয় তুমি চিনবে না; এ আমার প্রিয় ছাত্র ও বন্ধু শ্রীরণেনকুমার লাহিড়ী। চিঠি পাঠাচ্ছি এই কারণে—যে দুই এক- দিনের মধ্যেই তােমায় বাের্ডিং থেকে চলে আসতে হবে। আসবে বলল, তােমাকে নিয়ে আসবে। এ গিয়ে ৪

রুদ্ধ আবেগ
লজ্জা করবার কোন দরকার নেই। এ আমার ছেলের মতন,
আমার শরীর মােটেই ভাল নয়, কেমন আছ লিখাে , আমার
আশীৰ্বাদ নিও। ইতি
তােমার বুড়ে-ছেলে-
শ্রীধীরেশ্চন্দ্র রায়
পিতা আর কেহ নয়, পিতা পাঠাইয়াছেন! এত অল্পকালের
মধ্যেই যে প্রিয় বন্ধুগুলির স্নেহ ও প্রীতি হইতে আপনাকে বিচ্ছিন্ন
করিতে হইবে, তাহা স্বপ্নেও ভাবি নাই। পত্রখানি মিস সেনের
হাতে দিয়া বলিলাম,-বাবা লিখেছেন।
তাহার পর
বেঞ্চের উপরে রণেন বাবুর পাশ্বেই বসিয়া
পড়িলাম,—সমস্ত মুখখানি তঁাহার লাল হইয়া উঠিয়াছিল।
চিঠিখানি শেষ করিয়া, মিস্ সেন রণেন বাবুর দিকে তাকাইয়া
বলিলেন,-তা হলে ওকে আজই নিয়ে যাচ্ছেন তাে? ·
মৃদুকণ্ঠে তিনি বলিলেন,—ওঁর যা
বলেন ত
একদিন এসেও নিয়ে যেতে পারি।
যাইতে আমার মােটেই ইচ্ছা করিতেছিল না,
তাঁহার দিকে তাকাইয়া কম্পিতস্বরে বলিলাম,-পরশু ' গেলেই
মত।
এত শীঘ্র
যেন
মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া, মৃদু হাস্যের সহিত তিনি বলি-
লেন,—তা বেশ ত! পরশুই যাবেন ! আমি তবে আসি।

অবেগ
. হাত দুইটা তুলিয়া তাহাকে একটী নমস্কার করিলাম, তিনিও
• একটী প্রতিনমস্কার দিয়া মৃদুস্বরে বলিলেন,-তা হলে পরশু সব
ঠিক করে রাখবেন, মােটর এনে নিয়ে যাব’খন।
তিনি চলিয়া গেলেন, বিমূঢ় ভাবে কতক্ষণ
কতক্ষণ আমি সেখানে
দাড়াইয়াছিলাম, মনে নাই'; হঠাৎ পেছন হইতে কে বলিলেন,-
কি মিনু,-বাের্ডিঙ ছাড়তে খুব কষ্ট হচ্ছে, নয় ?
পিছন ফিরিয়া দেখিলাম,-বাের্ডিং-টিচার চারুদি।
তিনি বলিতে ছিলেন,তা হবেই ত! এতদিন থাকলে একটা
মায়া পড়ে যায় বৈকি! তা,উনি কে এসেছিলেন, মিনু ?
বাবার এক ছাত্র, আমাদের বাড়ীতেই থাকেন।
ওঃ!
বইখাতা লইয়া যখন বেডিংয়ে ফিরিলাম, ছুটীর পর তখন
সকলেই ফিরিয়া আসিয়াছে। আমাকে
দেখিয়া কুন্তলা দুই
হাতে জড়াইয়া ধরিল,—আমাদের সত্যিই ছেড়ে যাবি, ভাই?
লতিকা বােস একটু দূরে দাঁড়াইয়া মশারি ছাড়িতেছিল।
হাসিয়া বলিল,-ত? আর ছাড়বে না কেন!—আজকে
এসেছিলজিজ্ঞেস কর তত?
চকু দুইটা—একটু রাগত করিয়া, তাহার দিকে তাকাইয়া
বলিলাম,লতি,—ফের !
কুন্তলা আমাকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া বলিল,-কে রে?
লভার বুঝি, না তার বন্ধু টঙ্কু কেউ ?

রুদ্ধ আবেগ
প্রতিমা একটু গম্ভীরপ্রকৃতির মেয়ে, মুখ ঘুরাইয়া বলিয়া
উঠিল,—মরণ আর কি। কি কথাই বললেন ? বন্ধু-টন্ধু হলে
কি আর মিস্ সেনের কাছে আমল পেতেন? ছাতুখােরেরাই
তাকে
সহসা মাধুরী বলিয়া উঠিল,—এই, "চুপ
সকলে শীরব হইয়া গেল । দেখা গেল, বােডিংয়ের
সুপারিন্টেডেন্ট মণিকা-দি একখানি বই হাতে করিরা •এদিকে
আসিতেছেন। আমার কাছে আসিয়া স্নিগ্ধকণ্ঠে তিনি বলি-
লেন,-মিনতি,-তুমি নাকি বাের্ডিং ছেড়ে যাচ্ছ, শুনলুম,
মাটীর দিকে তাকাইয়া অস্ফুটকণ্ঠে বলিলাম্,-হু !
—কিন্তু বাের্ডিং তােমায় যদি না ছাড়ে ?-হাসিতে হাসিতে
তিনি নিজের রুমের দিকে চলিয়া গেলেন।
দুইটা দিন অক্লেশে—কোথা দিয়া কেমন করিয়া কাটিয়া গেল,
কিছুই টের পাইলাম না। বিদায়ের দিন আসিল ; বাের্ডিংয়ের মেয়েরা
আজ সকলেই ব্যস্ত। কি করিয়া ফেয়ার-ওয়েল’ দিলে আমার
প্রতি স্নেহ ও
ভালবাসা অধিক
দেখান হইবে, তাহা স্থির
করিতেই ব্যস্ত।
বেলা দুইটার সময় কমনরুমে মেয়েদের মিটিং বসল,
শ্ৰীমতী কুন্তলা চাটার্জি হইলেন সে সভার সভাপতি। প্রায়
ত্রিশ চল্লিশটী মেয়ের সম্মুখে “বিদায়-অভিনন্দন” নামে একটী
কবিতা পড়া হইল,-কুন্তলা একটী ফুলের মালা লইয়া ধীরে ধীরে
৭

রুদ্ধ আবেগ
আমার গলায় পরাইয়া দিল।
চারিদিক হইতে আনন্দধ্বনি
উঠিল ।
বেলা চারিটার সময় বিছানাপত্র বাঁধিবার উদ্যোগ করিতেছি,
এমন সময়ে বাের্ডিংয়ের বাহিরে মােটরের শিঙা বাজিয়া উঠিল ।
কুন্তলা ছুটিয়া আসিয়া বলিল,-ঐরে মিনু,শােন! বাঁশী বাজল
বুঝি ! বিদায় লইয়া সকলের কাছে-গাড়ীতে গিয়া যখন
উঠিলাম, কুন্তলা তখন কাণের কাছে মুখ আনিয়া বলিল,-চিঠি লিখতে
ভুলিস নি যেন ভাই,বুঝলি ?
উপরে বারান্দার দিকে তাকাইয়া দেখিলাম, সকলের কাতর মলিন
দৃষ্টি গুলি আমার দিকেই রহিয়াছে। ড্রাইভারের দিকে তাকাইয়া
বলিয়া ফেলিলাম,—চালাও-জদি !
কি জানি, চোখ ভরাইয়া একটা অশ্রু উৎস যেন বুক ঠেলিয়া
বাহির হইতে চেষ্টা করিতেছিল, দীর্ঘ তিন বৎসরের পরিচিত
বাের্ডিংয়ের প্রত্যেক দ্রব্যটী যেন আমায় মায়ার শৃঙ্খলে বাঁধিয়া
ফেলিয়াছিস!•••
দুই
দু
সকালবেলা যখন ঘুম ভাঙ্গিল, খড়খড়ির ফাক দিয়া খানিকটা
আলাে ছিটুকাইয়া আসিয়া আমার বিছানার উপর পড়িয়াছিল ;
একেল পর্যন্ত ঘুমাইয়াছি? মনে একটা লজ্জা আসিত।
•

রুদ্ধ আবেগ আর ঘুমাইব না কেন? এখানে ত ঘুম ভাঙ্গাইবার জন্য কুন্তলা নাই।—বিছানায় বসিয়া বসিয়া চোখ রগড়াইতেছি, ঝি আসিয়া ডাকিল,—চা দোব, দিদিমণি ! চা? হাঁ তা দিয়ে যাও, আর মুখ ধােবার জলও একটু নিয়ে এসে ত ঝি ! এখানকার .. প্রত্যেক জিনিষই আমার কেমন নূতন নূতন ঠেকিতেছিল, অথচ মনে পড়ে—একদিন এই ঘরে মৃত্যুশয্যায় শুইয়াই অভাগিনী জননী আমার সংসারের প্রত্যেক দ্রব্যের সঙ্গে সকল সম্পর্ক কাটাইয়া গিয়াছেন। একদিন এই ঘরের প্রতি ধূলিকণা প্রতিমুহুর্তের চলা-ফেরা আমার কাছে কত প্রিয় ছিল, আজ আর তাহা নাই! কে-জানে আর কোনদিন সে অনাবিল সুখ-আস্বাদন পাইব কি-না। -ওকি দিদিমণি, কঁদছ কেননা গাে ! ফিরিয়া দেখিলাম—চা হাতে করিয়া ঝি দাড়াইয়া ! ঠোঁটের উপর জোর করিয়া খানিকটা হাসি টানিয়া আনিয়া বলিলাম,কৈ না, কাদিনি ত! চোখে কি একটা পড়েছিল, তাইতেই জল পড়ছে বােধ হয়। ঝি, তােমার নাম কি গা ! চা’টা সম্মুখের টেবিলের উপর রাখিয়া ঝি বলিল,-আমাকে মণির মা বলেই বাছা সকলে ডাকে।—অষ্টে দিদিমণি, অৰ্দেষ্ট। নইলে অতবড় মেয়েটা না-জ্বর, না-ব্যানাে এমনি মরে যায় !-চা যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল দিদিমণি !

রুদ্ধ আবেগ চা-টা শেষ করিয়া ঘরের রুদ্ধ জানালাগুলি সব খুলিয়া দিতেছি, এমন সময়ে একটা ছয় সাত বছরের খুকী আসিয়া দুয়ারের পাশেই চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। ডাকিলাম,-এস না খুকী, লজ্জা কি ?-এস, পুতুল নেবে ? মেয়েটা এতক্ষণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়াছিল, পুতুলের নাম শুনিয়া ধীরে ধীরে আমার কাছে আসিয়া দাড়াইল, বলিলাম,-তােমার নাম কি খুকী ? • নিতান্ত অপরাধীর মত আমার মুখের দিকে করুণদৃষ্টিতে তাকাইয়া অস্ফুট কণ্ঠে বলিল,-মীলা। -কোন্ বাড়ীতে থাক তােমরা? চুপ করিয়া সে আমার দিকে তাকাইয়া রহিল, এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তাহার বুদ্ধি ও জ্ঞানের এলাকায় নহে, তাহা বুঝিলাম ; বলিলাম,—তােমার সঙ্গে আর কে কে এসেছেন ? মেয়েটী এবার উত্তর করিল, দিদি ! সহসা বাহিরে দুয়ারের নিকট একটা চাপা-হাসির শব্দ শােনা গেল, মুখ বাড়াইয়া দেখিলাম—আমারই সমবয়স্ক একটী মেয়ে । বলিলাম,-ঘরে এসাে না ভাই, ওখানে দাড়িয়ে কেন ? মেয়েটী ধীরে ধীরে মুখে কাপড় দিয়া ঘরে ঢুকিল, ‘মীলা’ বেচারী আমার নিকট থাকিতে বােধ হয় অত্যন্ত অস্বস্তি বােধ করিতেছিল, দিদিকে ঘরে আসিতে দেখিয়া দিদির কোলের কাছে গিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিল।

রুদ্ধ আবেগ
অল্পক্ষণ পরিচয়ের পর বুঝিলাম, মনীষারা আমাদের পাশের
বাড়ীতেই থাকে, এমন কি এ বাড়ীতে যাওয়া-আসাও তাদের
আছে। তবে আজ তাহারা আসিয়াছে—আমাকে দেখিতে ।
মনীষা মেয়েটী মন্দ নয়, তবে-যা একটু বেশী রকমের লাজুক।
মিশিবার ইচ্ছা আছে অথচ প্রাণ খুলিয়া মিশতে সাহ করিতেছে
; যাইবার সমম.তাহার হাত দুইটা ধরিয়া বলিলাম,আবার আসবে
? এসাে-কেমন ?
মনীষা বলিল,-এ কদিন আপনি কি
‘আপনি কি, ‘তুমি’ বলতে হবে, বুঝলে ?—আচ্ছা এস, দুপুরবেলা
থাকব।
মনীষা মীরার হাত ধরিয়া চলিয়া যাইতেছিল, মীরা ঘাড় ফিরাইয়া
ত ভাই
বলিল,-পুতু!
ওঃ! ঠিক বটে! আনার উপর হইতে একটী পুতুল পাড়িয়া
তাহার হাতে দিলুম, কচি মুখখানি তাহার আনন্দে ভরিয়া
উঠিল ।
;
স্নান করিয়া উঠিবার পর আয়নার সুমুখে দাঁড়াইয়া চুল
বাঁধিবার উদ্যোগ করিতেছি, একখানি মােটা বই হাতে লইয়া
বাবা ঘরে ঢুকিলেন ; গম্ভীর
অথচ কোমলকণ্ঠে তিনি বলি
লেন,-ঘর বেশ পছন্দ হয়েছে ত মা? ওই একটা ঘড়ি
রেখেছি—আলমারীতে বইগুলাে দেখাে যেন পরিষ্কার থাকে,
পাশের ঘরে ঝি রইল, অসুবিধা হলে তাকে জানিও-ইত্যাদি

রুদ্ধ আবেগ বিবিধ প্রকার উপদেশ দিয়া তিনি শেষে বলিলেন,-বাের্ডিং থেকে চলে আসার দরুণ কষ্ট কিছু হয় নি ত ? কষ্ট ? হা হইয়াছিল বৈ কি! দীর্ঘ তিন বৎসর ধরিয়া মাতৃহীন জীবনে-স্নেহ, প্রীতি ও ভালবাসার যে স্বাদ পাইয়াছি, তাহাকে ভুলিব কি করিয়া? ভুলিলেও যে তাহাতে অকৃতজ্ঞতার ভাগী হইতে হইবে, আমতা আমতা করিয়া বলিলাম,-না কষ্ট আর কি বাবা? তবে পড়া শুনাের- আমাকে একটু কাছে টানিয়া লইয়া স্নেহ-গদগদ কণ্ঠে তিনি বলিলেন,-তার জন্যে আর কি বল, মা? রণেনকে বলেছি, সেই কাল থেকে তােকে পড়াবে । কেমন তা হলে হবে ত—কি বলিস্? কি জানি কেন সমস্ত মুখখানা আমার ঘামিয়া উঠিল, অস্ফুটস্বরে বলিয়া ফেলিলাম,-হবে। ঝি আহারের জন্য ডাকিতে আসিল, বাবা বলিলেন,-বাঁধুনীকে বলগে-যাও ঝি, ও আমার সঙ্গে খাবে, বুঝলে? আমারও ভাত দিতে বলগে। ঝি চলিয়া গেল। বাবা বলিলেন,-আয় মা, খাবি আয় ! ধীরে ধীরে সঙ্কুচিতপদে তঁাহার আদেশ পালন করিলাম।

ত
শুধু শুধু বসিয়া থাকিতে ভাল লাগিল না। অনেক অনুনয়
বিনয়ের পর বাবার অনুমতি লইয়া আবার স্কুলে ভর্তি হইলাম; তবে
বেডিংয়ে নয়—এবার শুধু স্কুলে। কুন্তলা, বলিল,-বাঁচালি ভাই,
বাপ! এ কটা দিন যা করে কাটিয়েছি।
তাহার পরে আমাকে দুই হাতে জড়াইয়া ধরিয়া সুর করিয়া
গাহিয়া উঠিল,-“মিনী, তাের তরে পথের পানে—আমি চেয়ে
থাকি-
প্রতিমা ঈষৎ হাসিয়া বলিল,-সং আর কি!
পড়া-শুনায় আবার মন বসাইলাম, প্রত্যহ সকালবেলা রণেন
বাবু আমাকে পড়াইতে আসিতে লাগিলেন। শুধু তাহাই নহে-
.ইংরাজী বিদ্যায় তাঁহার মেধা ও অভিজ্ঞতা দেখিয়া মাঝে মাঝে
• অবক হইয়া তাঁহার মুখের দিকে তাকাইয়া থাকিতাম। এত-ও
মানুষে জানে !
‘বাস’টা আসিয়া সেদিন এত চেঁচামেচি লাগাইয়াছিল যে
কাণ দুইটা ঝালাপালা হইবার যােগাড়। বইগুলিকে কোনরূপ
বগলদাবায় পুরিয়া তাড়াতাড়ি দুপ দাপ করিয়া বাসে উঠিতে
যাইতেছি, হঠাৎ চোখ পড়িল—রণেন বাবুর
বাবুর উপর। নােয়কের
উপর দাড়াইয়া কি একখানা বই তিনি নিবিষ্টমনে পড়িতেছিলেন,

রুদ্ধ আবেগ
আমি যাইতেই তিনি স্নিগ্ধকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন,—স্কুল থেকে
সৈই অঙ্কগুলাে আজ জেনে এসােত মিনু ! সবগুলাে আজ
কষে দেব।
অতগুলা মেয়ের সম্মুখে উত্তর দিতে আমার লজ্জা হইতেছিল
যথেষ্ট। অস্ফুটকণ্ঠে বলিলাম, আচ্ছা।
নিভা আমার পাশে একটু ঘেষিয়া বলিল,-উনি কে ভাই ?
কোনরূপে আত্মদমন করিয়া বলিলাম,—কে—উনি ? আমার
সম্পর্কে দাদা হন।
-আচ্ছা, কি দরকার ছিল বাপু,
ততগুলি মেয়ের সম্মুখে
অমন প্রশ্নটা করিবার ? তাহার প্রতি মনটা আমার এত বিরক্ত
হইল, কিন্তু কি করিব অতগুলি মেয়ের সম্মুখে !
স্কুল হইতে বাড়ী ফিরিয়া দেখিলাম,-মনীষ তাহার ঘােট
বােনটীকে লইয়া সিড়ির মুখে দাড়াইয়া আছে। পেছন হইতে
মীরাকে বলের মতন তুলিয়া লইয়া ঘরে ঢুকিলাম। মনীষাও সঙ্গে সঙ্গে
ঘরে ঢুকিল।
আহা বেচারীদের দেখিলে, সত্যসত্যই বড় দুঃখ হয়, ভগবান
মানুষকে কেন যে এত গরীব করিয়া সৃষ্টি করেন, বুঝিলাম
, এ শান্তি দিবার সময়ে মুহুর্তের জন্যও কি তাহার দয়া হইল না ?
গরীবের হাতি রোেগ” যেমন সৰ্ব্বনাশের প্রথম সােপান
সৃষ্টি করে, মনীষাদেরও ঠিক তেমনি করিয়াছে ; শুধু দরিদ্র নন,
মদ্যপ বলিয়াও মনীষার পিতার একটা দুনম রটিয়াছে। আহা,

রুদ্ধ আবেগ বেচারী মনীষার মায়ের হয়ত দুর্গতির সীমা নাই। নাই। স্বামী মাতাল—দারিদ্র্যের চেয়েও যে ইহা তীব্র অভিশাপ। মনীষা একদিন কথায় কথায় বলিয়াছিল,মদ খেয়ে বাবা যখন • মা-কে মারেন, তখন শুধু কেঁদে কেঁদেই ঘুমিয়ে পড়েন। কুে-জানে বিশ্বে তাহার চেয়ে হতভাগিনী আর কেহ আছেন কিনা। জুতা জামা, খুলিয়া ফেলিতেই ঝি অসিয়া বলিল,-জলখাবার নিয়ে আসবেক দিদিমণি ! বলিলাম,—হ নিয়ে এস, আর দু’থালা বেশী নিয়ে এসসা বুঝলে। ঈষৎ কাষ্টমনে কি চলিয়া গেল ; কে-জানে ইহাদিগকে খাও- যাইয়াও আমার যেন কত সুখ হইত। সন্ধ্যার সময় রণেন বাবু আবার ঘরে আসিয়া হাজির,-এনেছ মিনু, অঙ্কগুলাে ? কই দেখি।-বলিয়া তিনি সম্মুখের চেয়ারখানিতে করিয়া বসিয়া পড়িলেন। আমাকে নিরুত্তর দেখিয়া বলিলেন,- আন নি বুঝি সেগুলাে ?—কই দেখি, হিষ্ট্ৰীখানা। এ অযাচিত সাহাৰ্য্য আমার মােটেই ভাল লাগিতেছিল না, ঈষৎ বিরক্ত হইয়া সেলফ হইতে ইতিহাস খানা বাহির করিয়া দিলাম। কিন্তু তবুও তাহার স্নিগ্ধকণ্ঠস্বরের উপদেশপূর্ণ শিক্ষাগুলি অমৃতের মতই আমার অন্তরে প্রবেশ করিতেছিল। প্রায় আধঘণ্টা পড়াইবার পর হঠাৎ তিনি বলিলেন,-কাল বায়ােস্কোপে যাবে মিনু ? চল, খুব ভাল বই আছে। বায়ােস্কোপ দেখিবার সখ আমার খুবই ছিল। ইচ্ছা হইতে আবেগ ছিল বলিকি বই হইবে। তাহা আর জিজ্ঞাসা করিতে হইল না, নিজমনেই তিনি বলিয়া যাইতেছিলেনঅনেকদিন পরে আবার ‘মাতৃ স্নেহ দিয়েছে। বাংলা বই,যাবে মিনু ? সত্যি, এই পুরুষগুলার কথা শুনিয়া ভারী হাসি পায়। কেন, কে-জানে! বায়ােস্কোপে লইয়া যাইবার জন্য জন্য কোথায় আমাকে খােসামােদ করিতে হইবে—না তিনি নিজেই করিতে- ছেন! বলিলাম,-আর কে, কে, যাবেন ? —তুমি আর আমি।—আর কে যাবে বল ? , না, তাহা কি হইতে পারে !..পরদিন দুপুরবেলা বাবাকে জানাইলাম। ত যাও না মা রন্তুর সঙ্গে। গাড়ীটা বার করে দিতে বলি ? বাবার আদেশ লইয়া কাপড় ছাড়িবার জন্য উপরে উঠিতেছি, সিড়িতে দাঁড়াইয়া রণেন বাবু ! আমাকে দেখিয়া মৃদু হাসিয়া বলিলেন,—কি, আর্জি পেশ হােল ? চল, শিগগীর করে না-ও, বুঝলে। বায়ােস্কোপ আরম্ভ হইতে তখনও দেরী ছিল, সিড়িটার কাছে দাড়াইয়া আছি, হঠাৎ পিছনে কঁাধের উপর কাহার এক- খানি হাত পড়িল ! —এ কি কুন্তলা? কুন্তলাও আমাকে দেখিয়া, একটু আশ্চৰ্য্য হইয়া গিয়াছিল ! বলিল,-কার সঙ্গে রে ? কথাটা চাপা দিয়া বলিলাম,-তুই কার সঙ্গে, বল তত ?

রুদ্ধ আবেগ
ত দাদা দাড়িয়ে রয়েছে। দাড়া, আলাল
করিয়ে দি।
কুন্তলা চলিয়া গেল, আমি স্তম্ভিতের ন্যায় রেলিং ধরিয়া সেই
খানেই দাঁড়াইয়া রহিলাম। কুন্তলার উপর মনে মনে এত রাগ
হইতেছিল যে--
-এই যে “দাদা, ইনি হচ্ছেন শ্রীমতী মিনতি রায়, যার কথা
তুমি বােধ হয় খুব কম করেও সাড়ে পঁচাশীবার শুনেছ।
তারপর আমার দিকে তাকাইয়া দুষ্টুমীপূর্ণ হাশ্যে মুখ ভরাইয়া
বলিল,-এই দেখ, মিনী, ইনি আমার দাদা শ্ৰীযুক্ত অরুণকুমার
চট্টোপাধ্যায় বি এ-বুঝলি ?
কুন্তীর উপর ভয়ানক রাগ হইতেছিল সত্য, তবু সভ্যতার
খাতিরে হাত দুইটী কপালে তুলিয়া অস্ফুটকণ্ঠে বলিলাম,-নমস্কার।
অরুণ বাবুও হাত দুইটা তুলিয়া প্রতিনমস্কার করিলেন।
বেশ সরল, সুদীর্ঘ ও সুপুষ্ট চেহারা। বাংলার প্রতি সন্তান-ই
যদি এরূপ স্বাস্থ্য পাইত
কুন্তলা হাসিয়া বলিল;-গল্প যে তােদের মার ফুরােয় না-রে
মিনী! ঘণ্টা পড়ে গেছে শুনেছিস্?
সত্য-ই ত, আলাপ পরিচয়ে আমরা দুজনেই এত নিবিষ্টচিত্ত
ছিলাম যে ওয়াশিং বেলের শব্দ মােটেই শুনিতে পাই নাই, বিদায়-
নমস্কার লইয়া উপরে উঠিতেছি, হঠাৎ চোখ পড়িল নীচেরণেন
বাবুর উপর, মুখখানি তাহার ভারী গম্ভীর-নীরস ।

-মলিন কালাে ধুইয়ে ফেলে
-ঢাললে তরুণ আলাে,
অসীম পারের বন্ধু ওগাে
বাবাে তােমায় ভালাে।”
যেন
সমস্ত অন্তরটা সকালে ঘুম ভাঙ্গিতেই কেমন মুষরিয়া গেল।
কোন সুদূর অতীতের একটা অস্পষ্ট ব্যথা-পূর্ণ
অস্পষ্ট ব্যথা-পূর্ণ স্মৃতি আবার
বুকের মধ্যে জমিয়া উঠিয়াছে।
অরুণ বাবু—বেশ সুন্দর কমনীয় তঁাহার আকৃতি, কে-জানে
তাঁহার অন্তরতর অন্তরতম প্রকৃতিটীও বাহিরের মত ঠিক এমনি
স্বচ্ছ নির্মল কি-না। বেশ নম্র ব্যবহার, যতবারই কাল কথা
কহিতেছিলেন, লজ্জায় মাথাটী তাঁহার মুইয়া পড়িয়াছিল, বিদায়ের
সময় একবার স্পষ্ট ও দীপ্তভাবে আমার মুখের দিকে তিনি
চাহিয়াছিলেন, সে দৃষ্টিতে যেন একটা কমনীয়তা, একটা ভাষা
লুকাইয়াছিল। আমায় শেষে সত্যসত্যই বলিয়া ফেলিলেন,- যদি
কিছু না মনে করেন ত আমাদের বাড়ীতে একবার
অনুরােধ করি! কী মিষ্ট অনুবােধ। কথাবার্তায় দু’জনে এত নিবিষ্টচিত্ত
ছিলাম যে ওয়াণিং বে আমাদের কাণে মােটেই পৌছায় নাই।
১৮

রুহ্ন আবেগ
কুন্তলাকে একবার দেখিয়া লইতে হইবে, সে-ই না আমায় এমন
অপ্রস্তুত করিল ?
বায়ােস্কোপ দেখিয়া মনটা এত খারাপ হইয়াছিল যে, কাল রাতে
বাবার একান্ত অনুরােধেও কিছু মুখে দিতে পারি নাই।
পুরুষদের মন কি এতই স্বার্থপর? এত হীন ? ছি ! অভিমানী
বিবাহিতা পত্নীর ‘অজ্ঞাতসারে আর একটী অভাগিনীকে জমিদার-পুত্র
যদি বিবাহই করিল, তাহার পরিচয় দিতে পত্নীর নিকট এত আশঙ্কা!
আপনার পূত্র বলিয়া অভাগিনীর পূত্রকে পরিচিত করিতেও লজ্জা
করিল ? হায় রে ভালবাসা !
যা ছাই, কি হইবে ওসব ভাবিয়া ! মনটী যেন আরও তিক্ত
হইয়া উঠিতেছিল।
–কিরে মীনু, এখনও ঘুম থেকে উঠিস্ নি ? অসুখ-বিসুখ করেছে
কি, দেখি ?—বাবা ঘরে ঢুকিলেন ; মাথাটা তাহার কোলের
কাছে আরও টানিয়া লইলেন ।
কৈ না, আমার অসুখ ত আদৌ করেনি বাবা, আমি এমনি
শুয়েছিলুম।
বায়ােস্কোপ কেমন দেখলি মা! ভাল লাগেনি বুঝি ?
অন্য অন্য দিন ‘বাসের’ হতভাগা কোচমানের স্বর নয়টার আগেই
বাড়ী কঁপাইয়া দিত, আজ যে এখনও কেন আসিতেছে না, বুঝিলাম
। ঘড়িটার দিকে তাকাইয়া দেখিলাম, নয়টা বাজিতে তখনও
আধ ঘণ্টা দেরী। পােড় কাঁটা কি চলিতে চাহে না? বাবা চলিয়া

জন্ধ আবেগ যাইবার পর আয়নার সুমুখে দাঁড়াইয়া, চুলগুলি গুছাইয়া লইয়া, বইগুলি সাজাইতেছি, রণেন বাবু ঘরে ঢুকিলেন ! কি মীনু, বই সাজাচ্ছ যে! খাবে না? তাহার কথাগুলি আমি যেন আদৌ শুনিতে পাই নাই, এমনি ভাণ করিয়া বই গুছাইতেই লাগিলাম। ঝি আসিয়া ডাকিল-খাবে না দিদিমণি, বেলা হয়ে গেল যে যে । একটু গম্ভীর হইয়া বলিলাম-না, বগে যা, আজ খাব না, শরীর খারাপ। ঝি চলিয়া গেল। দেরাজের উপর হইতে বায়ােস্কোপের হাও- বিলটা নাড়িতে বাড়িতে রণেনবাবু বলিলেন—কি করে শরীর খারাপ হলাে মীনু ?—তা হােক, তুমি দুটী খেয়ে নাও, বুঝলে? নীচে সহি হাঁকিয়া উঠিল। বইগুলি লইয়া তাড়াতাড়ি বাহির হইতেছি, রণেনবাবু দুয়ার আটকাইয়া দাঁড়াইলেন। -লক্ষ্মীটী মীনু, যা হােক দুটী খেয়ে নাও, শুবে না ? একটু বিরক্ত হইয়া বলিলাম—গাড়ী দাড়িয়ে রয়েছে- তা, ও-বরং চলে যাক, মােটরে যেও—বলিয়া জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন—দিদি-বাবু মােটরমে যায়েগা, তােম যানে শেকৃতা! তাহার উপর শুধু যে রাগ হইল, তাহা নহে; মনে মনে হাসিও পাইল। আমাকে এরূপ অযাচিত যত্ন ও স্নেহ সহকারে খাওয়াইবার এই অদম্য আগ্রহের কারণ কিছু বুঝিলাম না। কোনরূপে দুই চারি, - ২০ রুদ্ধ আবেগ খানা লুচি খাইয়া হাত ধুইতেছি, এমন সময়ে ঝি আসিয়া বলিল- তােমাদের মটর-কারের বাবুর অসুখ লেগেছে, বলে, গাড়ী বেরুবে ! উপায় ! এত রাগ ধরিতেছিল রণেনবাবুর উপর, কি করিব হার জন্যই তাে আমার এই অবস্থা! রাগ করিয়া উপােষ থাকাও হইল না, আবার স্কুল যাওয়াও হইল না। বিছানার উপর গিয়া শুইয়া পড়িলাম, চোখ ফাটিয়া আমার জল আসিতেছিল। মীনু ! চমকিয়া উঠিয়া ফিরিয়া দেখিলাম—রণেনবাবু ! চল স্কুলে।আবার শুয়ে পড়লে কেন? অসুখ কছে বুঝি ? আচ্ছা থাক, তাহলে গাড়ী আবার রেখে আসি। ইচ্ছা হইতেছিল চেঁচাইয়া বলি—না গাে না, অসুখ আমার মােটই করে নাই -সেজন্যে তােমার অত মাথাব্যথার প্রয়ােজন নাই। বলিলাম—না, অসুখ ত করে নিতবে ডাইভারের অসুখ করেছে। বাধা দিয়া তিনি বলিলেন—তার আর কি হয়েছে, চলল না, আমি-ই নিয়ে যাচ্ছি। ভয়ানক লজ্জা করিতেছিল আমার। একদল মেয়ের সম্মুখে তার চেয়ে না যাওয়াও বােধ হয় ভাল ছিল, কি ভাবিয়া আবার যাইতে ইচ্ছা হইল, বলিলাম, আচ্ছা, চলুন।

রুদ্ধ আবেগ নীচে নামিয়াই বিস্মিত হইলাম। এ টু-সীটার মােটর কাহার? রণেনবাবু ষ্টার্ট লাগাইয়া ব্যস্তভাবে বলিলেন, উঠে পড়! তাঁহার পাশে নিতান্ত জড়সড়ভাবে বসিয়া পড়িলাম। স্কুলে পৌছিতেই দেখিলাম, স্কুলে আসিতে আধঘণ্টা দেরী হইয়াছে এবং সহসা স্কুলে ইস্পেক্ট্রেস আসার দরুণ সেদিনকার মত ছুটী হইয়া গিয়াছে। কুন্তলা বলিল—কি বরাত ভাই, পােইট্রীটা আজ মােটেই মুখস্থ হয়নি—আর আজকেই কি-না ইনপেক্টার এসে হাজির! হাঁ রে, আমাদের বাড়ী কবে যাবি ? নেমন্তন্ন নিয়েছিস, রাখতে যাবি না? —তুই এখন বাের্ডিঙে, না বাড়ীতে রে ? কুন্তলা একটু হাসিয়া বলিল—এখন ভাই এক মাস ছুটী নিয়ে বাড়ীতেই আছি। দীপ্তি ঠোট চাপিয়া একটু হাসিয়া লইয়া বলিল-জানি না বুঝি, এবার ওর কি হবে ! আগ্রহভরে কুন্তলাকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া বলিলাম—কি হবে রে কুন্তী ? কুন্তলা মুখ ফিরাইয়া বিরক্তভাবে বলিল—শ্রাদ্ধ হবে। স্কুল হইতে ফিরিয়া ভাবিলাম, এবার ও-বেলাকার শােধটা তুলিয়া লইতে হইবে। বড় যে আগ্রহভরে খাওয়াইয়া স্কুলে পাঠান হইয়াছিল। এবার? দরজায় খিল লাগাইয়া শুইয়া পড়িলাম। কিন্তু তাহাতেও কি ছাই নিষ্কৃতি আছে! ঝি-ঠাকুরাণী আসিয়া জল- ২২

রুদ্ধ আবেগ
খাবারের জন্য দোরের কাছে দাঁড়াইয়া এমন চেঁচামেচি শুরু করিল
যে, না উঠিয়া উপায় নাই। জলখাবারের থালাটা তাহার হাত
হইতে লইয়া আবার খিল দিয়া শুইয়া পড়িলাম।
কুন্তলার কথা সত্য কি ? অরুণবাবুর নিকট হইতে যে নিমন্ত্রণ
মৌনভাবে অবনত মস্তকে গ্রহণ করিয়াছি, তাহা রক্ষা করিতে হইবে
বই কি! কৈ, মুখ ফুটিয়া সে সময় তাে কোন ওজর দেখাইতে পারিলাম
। সে সময় এ অযাচিত সাদর আমন্ত্রণের বিরুদ্ধে কোন ভাব ফুটাইতে
পারিলাম না ত,-হাসিমুখে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছি।
নানা কথা ভাবিতে ভাবিতে যখন ঘুম আসিল, রাত্রি তখন প্রায়
দশটা। বাবা বাহিরে সকলকে সাবধান করিয়া দিতেছিলেন
খবরদার, আজ তােরা কেউ দিদিমণিকে বিরক্ত করিসনি শরীর
খারাপ-বুঝলি ?
পাঁচ
“শােনাব গান একলা তােমার কানে,
ঢেউএর মতন ভাষা বাঁধন-হারা—
আমার সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে।”
সন্ধ্যার কাল-ছায়া তখনও ধরণীর বুকে ঠিক জুড়িয়া বসে নাই।
শুইবার ঘরে একখানা ইজি-চেয়ারে বসিয়া ‘মানসী’র পাতা উল্টাইতে
ছিলাম। বাড়ীতে আর কেহই নাই। বাবা ছাদের ঘরটীতে

রুদ্ধ অাবেগ নিজের বিছানায় শুইয়া কাগজ পড়িতেছিলেন। সমস্ত দিনটা অর্গান্ বাজাইয়া আর হিষ্ট্রীর বংশাবলী ধ্বংস করিয়া রণেনবাবু সবেমাত্র সান্ধ্য- ভ্রমণটা সারিয়া লইতে গিয়াছেন। অবশ্য আমাকে সঙ্গে লইবার চেষ্টা করিতে কসুর করেন নাই, তবে শরীরের অবস্থা নিতান্ত খারাপ বলিয়া সে অনুরােধ হইতে রেহাই পাইয়াছি, এই যা। পুরুষ-মানুষ জাতটাকে চিনিয়া লওয়ার চেয়ে শক্ত কাজ বােধ হয় আর দুনিয়ায় নাই। অন্তরের আকাঙ্খ প্রীতি তাহাদের মুক্ত প্রাণের মধ্যে কখন আধিপত্য ছড়াইয়া বসে, আবার কখন সেই প্রীতি মেহের উপর একটী মলিন দাগ বসাইয়া চলিয়া যায়,বােঝা অত্যন্ত দুরূহ। তাহাদের অন্তর-তাহাদের ভালবাসাও- মীনু ! কে, কুন্তলা ?-তাড়াতাড়ি দুয়ার খুলিয়া দেখিলাম, কুন্তলা আসিয়া হাজির! অন্ধকারে ব’সে কি ভাবছিলি রে ? তাের কথা। আমার, না-আর একজনের ? কুন্তলার গাল দুইটী টিপিয়া দিয়া বলিলাম—হাঁ, এই লােকটীর । কুন্তলা বলিল, নে নে, কাপড় ছাড় ; না, এই কাপড়েই যাবি ? স্তম্ভিত হইয়া বলিলাম—কোথা রে? আহা, তা যেন জানেন না। আমাদের বাড়ী,-নে, চল ভাই শিগগীর, দাদা গাড়ী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ২৪ রুদ্ধ আবেগ চমকিয়া উঠিলাম।—কে এসেছেন বলি ? কুন্তলা ব্যস্তভাবে বলিল—দাদা রে, দাদা,-একটু শীগগীর করে নে ভাই। বাবাকে বলিলাম । একটু মৃদু হাসিয়া বলিলেন—তা যা তরে, একটু শীগগীর ফিরিস্ বুঝলি ?—আর হাঁ, রণেন এসেছে কি ? না, আসেন নি এখােননা। কাপড় জামা পরিয়া, নীচে নামিতেই অরুণবাবু হাত দুইটি তুলিয়া স্নিগ্ধস্বরে বলিলেন-“নমস্কার । লজ্জায় সমস্ত মুখখানা আমার ঘামিয়া উঠিয়াছিল। হাত দুইটা তুলিয়া আমিও একটি প্রতি-নমস্কার দিলাম। গাড়ীতে ষ্টাৰ্ট লাগাইয়া অরুণ বাবু নিজেই ষ্টিয়ারিং ধরিলেন। কুন্তলার মা আসিয়া কত আদর-যত্ন করিতে লাগিলেন। একটা সঙ্কোচ ও কুণ্ঠা আসিয়া আমার সমস্ত শরীরকে এমনভাবে বাঁধিয়া ফেলিয়াছিল যে, কথাগুলি সব আমার জিহ্বার নিকটে আসিয়াই আটকাইয়া যাইতেছিল। কুন্তলার বড় বৌ-দি পইসা আমার হাতটা ধরিয়া বলিলেন—এস ত ভাই আমার সঙ্গে। ঘরটীতে ঢুকিয়া দেখি, একদল মেয়ে বসিয়া। কাহারও হাতে এজাজ, কাহারও হাতে বীণা ইত্যাদি এক এক রকম যন্ত্র। কুন্তলার বৌদিদির সহিত ঘরটীতে ঢুকিতেই—ঘরখানি যেন একেবারে নিঝুম হইয়া গেল, সঙ্গে সঙ্গে বিশ জোড়া চক্ষু আমার মুখের উপর আসিয়া

রুদ্ধ আবেগ
পড়িল। বৌদিদি বলিলেন—আজ ইনি তােমাদের সঙ্গীত-সভার
সভাপতি হবেন; বুঝলে সব?
চারিদিক হইতে আনন্দ-কলরােল উঠিল । আর আমার অবস্থা?
কুন্তলার উপর যে ক্রোধ হইতেছিল, তাহাকে সন্মুখে পাইলে তৎক্ষণাৎ
বােধ হয় তাহার একটা পরিচয় হইয়া যাইত।
বৌদিদির হাত দুইটা ধরিয়া মিনতিপূর্ণকণ্ঠে বলিলাম-দোহাই
বৌদি এসব বিষয়ে আমি একেবারে অনভিজ্ঞ ।
বৌদিদি হাসিয়া বলিলেন—হাঁ, তা বটে, প্রাইজের সময় গানে
আর বাজনায় ফাষ্ট-প্রাইজটা ও-পাড়ার বুচি খেদী পেয়েছিল নয় ?
দুষ্টু, গাও বলছি এখনি ?
কিন্তু শরীরটে আজকে
—ওসব লেম্ এককিউজ আজকে চলবে না ত মিস্ রায় ?
মুখ ফিরাইয়া দেখিলাম—অরুণবাবু একটি এজাজ লইয়া আমার
পাশে দাঁড়াইয়া ।
আমার মুখের দিকে তাকাইয়া আবার সেইরূপ বিনয়নম্রবচনে—
স্নিগ্ধস্বরে তিনি বলিলেন-না না, ওসব কথা রাখুন, আজকে
অন্ততঃপক্ষে একটা গান আপনাকে গাইতেই হবে। দেখছেন ত এত
গুলি শ্রোতা আপনার অপেক্ষায় কি রকম বসে রয়েছে।
জীবনে এরূপ বিপদে কখন পড়ি নাই; একি মহা ধাঁধায় আজ
পড়িলাম! একধারে অন্তরের সমস্ত লজ্জা কুণ্ঠা ও সঙ্কোচ আসিয়া
নিবিড়ভাবে জমাট বাঁধিয়াছে, আর এক দিকে অরুণবাবুর মিনতিপূর্ণ
২৬

রুক আবেগ অনুবােধ—সশ্রাতাবন্ধুদিগের একটা প্রবল আগ্রহ—প্রতীক্ষা! অরুণ বাবুর অনুরােধ, —কৈ গাে, তােরা খেতে এলি নি সব? আয় আয়, ওলাে কুন্তী, তাের বন্ধুটীকে নিয়ে আয় না লাে ? বাপ, বাঁচা গেল। কুন্তলার ঠাকুরমা আসিয়া আমাকে এক মহা বিপদ হইতে রক্ষা করিলেন। নহিলে ইহাদের সম্মুখে গান ধরিলে অরুণবাবু সহসা বলিয়া উঠিলেন—আমি, কুন্তী আর ইনি এর পরে খাব ঠাকুরমা, এখন ওদের খাওয়াওগে যাও। অরুণ বাবু আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন—আপনি ভাবলেন যে, খুব নিষ্কৃতি পেয়েছি, নয় ? কিন্তু আমার মত লােকের হাতে পড়ে আজ আপনাকে একট, বেগ পেতে হচ্ছে। নিন, এইবার একটা ধরুন, সব চলে গেছে। অস্ফুটস্বরে বলিলাম, কি ধরুবাে বলুন? গলা আমার আজ মােটেই ভাল নেই কিন্তু। প্রকাণ্ড হণ্টার মধ্যে আমরা তখন তিনজন। বিজলী-বাতির খানিকটে আলাে ঠিক্রাইয়া আসিয়া অরুণবাবুর মুখের উপর পড়িয়াছিল। সে আলােতে হার দেবতার মত প্রশান্ত সুন্দরমুখখানি আরও সুন্দর হইয়া উঠিয়াছিল। ধীরে ধীরে একখানি গান আরম্ভ করিলাম ; অরুণবাবু অর্গানটার উপর বসিয়া বাজাইতে সুরু করিলেন- রাত্রি এসে যেথায় মিশে দিনের পারাবারে। তােমায় আমায় দেখা হ’ল—সেই মােহানার ধারে। - । ; ২৭ রুদ্ধ আবেগ অর্গানের সুর ঘর হইতে বাহিরে ছুটিল, শেষে বায়ু হইতে অসীমের চারিধারে ছড়াইয়া কানের মধ্যে ঝঙ্কার তুলিল। বায়ােস্কোপের ছবির মত, চাঁপাফুলের মত শ্বেতশুভ্র তাহার অঙ্গুলীগুলি রীডের উপর নাচিয়া বেড়াইতে লাগিল, আর সে সুরের ঝঙ্কার কানের মধ্যে ঢুকিয়া সমস্ত অন্তরকে আকুল করিয়া তুলিল। আমার ঘর্মসিক্ত মুখের পানে তাকাইয়া তিনি বাজাইয়া চলিলেন- মুখের পানে তাকাতে যাই, দেখি দেখি দেখতে না পাই। স্বপন সাথে জড়িয়ে জাগা, কঁদি আকুল ধারে। ওগাে, একি আকুলতা, একি মৰ্ম্ম-কাপান সুর ! থামাও থামাও তােমার ও-সুর, ওগাে মত্ত পথিক! অন্তরের নিভৃত ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে একি বিশৃঙ্খলতা, একি বিদ্রোহ-তরঙ্গ খেলিয়া গেল! এখনও সেই সুর, সেই কঙ্কার আমার গােপন-চিত্তের প্রতি-বিন্দুটীকে নাচাইয়া তুলিতেছে! ওগাে গােপন পথিক! একি আকুলতা আমার শান্ত স্থির প্রাণে তুমি জাগাইয়া দিলে ? -ও কি, কঁদছেন না কি ? সত্যই তাে, এ আমি কি করিতেছি ! পােড় রুদ্ধ-অশ্রু যে আর বেগ মানিতে চাহে না । কুন্তলা হাসিয়া বলিয়া উঠিল, কঁদবে না ! যে ভাবে বাজিয়ে তুমি ওর গানের রসটুকু নষ্ট করে দিচ্ছিলে দাদা, আমি হলে ত চেঁচাতুন। আমার দিকে তাকাইয়া অরুণবাবু বলিলেন, সত্যি, বাজান খুব ৮ রুদ্ধ আবেগ ; খারাপ হয়েছে নয় ? সত্যি কথা বলতে কি, আমার মন ছিল আপনার গানের দিকে, আঙ্গুলগুলাে কেবল বাজিয়ে গেছে। বাধা দিয়া বলিলাম, কৈ না, বেশ ত’ বাজানাে হয়েছে! চোখে কি একটা আচ্ছা উঠুন, এবার খাওয়াটা সেরে নেওয়া যাক। যখন বাড়ী • ফিরিলাম, তখন রাত্রি প্রায় বারােটা ; নিজের টু-সীটার কারের পার্শ্বে সযত্নে বসাইয়া, তিনি আমায় বাড়ীতে পৌছাইয়া দিয়া গেলেন। উদ্দাম চঞ্চল-প্রাণের মধ্য হইতে কাহার সুন্দর মূর্তিখানি মাঝে মাঝে আমার দীপ্তিহারা চক্ষের সুমুখে ভাসিয়া উঠিতেছিল। অনেক রাত্রি অবধি বিনিদ্র-অবস্থায় শত সহস্র চিন্তার জালে আবদ্ধ থাকিয়া, কখন যে ঘুমাইয়া পড়িলাম, মনে নাই। ছয় একটা দুঃস্বপ্নের মতই কালকের রাত্রের কথাটা মনে পড়িয়া গেল। অতগুলি মেয়ে, যাহারা আমার গান শুনিবার জন্য অত রাত্রি পৰ্য্যন্ত বসিয়াছিল, না জানি তাহারা কি ভাবিল! হয় ত আমার বিষয় গল্প করাই—আমার শিক্ষা-দীক্ষার—দূর ছাই, এ সব কি চিন্তা মনের মধ্যে আসিতেছে! অরুণবাবু! হাঁ, একজন নম্র বিনয়ী যুবক বটে। বড় হইতে ছােটটীকে পৰ্য্যন্ত কেমন আপনি বলিয়া কথা কহা।

রুদ্ধ আবেগ
কিন্তু তাঁহার কাছেও কাল কত অপরাধ করিয়াছি! কুন্তলার
বৌদিদির উপর কাল প্রথমে এত রাগ হইতেছিল—কি বলিব! কেন
বাপু! সঙ্গীতচর্চায় ফাষ্ট হইয়া প্রাইজ পাই বলিয়াই কি যেখানে
সঙ্গীত-সভা বসে, সেখানে আমাকে সভাপতি হইতে হইবে ? কেন,
কুন্তলাকে সভাপতি করিলে ত পারিতেন। সে-ও ত বৎসরের পর
বৎসর সম্মানের সহিত সঙ্গীত-শিক্ষায় দ্বিতীয় পুরস্কার পাই
আসিতেছে!
রণেনবাবুর মন আজকাল এত বিমর্ষ কেন, কে জানে? কুন্তলার
দাদার সহিত আলাপ করার দরুণই কি তাহার মন এত তিক্ত—এত
বিরস ? জীবনের অন্তরাত্মার বিকাশ যেস্থানে পরিস্ফুট
.
মিনতি ?
চমকিয়া উঠিয়া পেছন ফিরিয়া দেখি, রণেনবাবু।
আসুন, ঘরে আসুন।
আজ স্কুলে যাবে না মিনু ?
এই ত আবার সেই স্নেহের ডাক! তবে এ গাম্ভীৰ্যপূর্ণ ‘মিনতি
বলিয়া ডাকা কি পরিহাস, না বিদ্রুপ ?
বলিলাম—না, শরীরটে আজ মোটেই ভাল নেই। বােধ হয়
যাব না।
রণেনবাবু আপন মনে বলিতে লাগিলেন-সময় কাল যা খারাপ
পড়েছে, বললেও ত তােমরা শােন না, কাল অত রাত পর্যন্ত বাইরে
কাটিয়ে আসাটা কি ভাল হয়েছে ?

রুদ্ধ আবেগ অনাবৃত পৃষ্ঠের উপর কে যেন একগাছা ললকে চাবুক মারিল। সমস্ত শরীরটা সেই একটা কথায় শির শির করিয়া শিহরিয়া উঠিল । ধীরে গম্ভীরভাবে বলিলাম—নিমন্ত্রণে গেলে সকলেই কাটিয়ে আসে- ' কিন্তু সে জন্যে দোষ কাকেও দেওয়া যায় না। মােটা বইখানার পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে তিনি বলিলেন- দোষ দেওয়া যায় না বলে স্বেচ্ছায় একটা কষ্টকে বরণ করে নেওয়াও ত ঠিক নয়! আর লােকের চোখেও সেটা ভাল দেখায় না। যা আজ তাহলে তুমি পড়বে না? অস্ফুটকণ্ঠে বলিলামনা। বুঝিলাম না, কিসের জন্য ধীরে ধীরে এ বিদ্রোহের সৃষ্টি তিনি নির্ভীক অম্লান চিত্তে করিয়া যাইতেছেন। এক কাপ চা দে ত মিনু !-বাবা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকিলেন। কি রনু যে! পাগলীকে পড়াচ্ছিলে বুঝি ? আমার দিকে একটী কঠোর দৃঢ়দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া রণেনবাবু উত্তর দিলেন—না, আজকে মিনতি বলছে, পড়বে না, শরীর খারাপ! ষ্টোভের উপর জল বসাইয়া কনডেনসের মুখ খুলিতেছি, বাবা বলিলেন—শরীরটে কি বড়ই খারাপ লাগছে মিনু ? বাবা, তেমন কিছুই নয়। দেখিস্ মা, সাবধানে থাকি। হাঁ, কাল রাতে কখন ফিলি মা? উত্তরের প্রতীক্ষা না করিয়াই রণেনবাবু বলিলেন—তা রাত প্রায় একটা হবে। ৩১

জ্ব আবেগ
তুমিও গিছলে না কি হে?
বাবার মুখের দিকে তাকাইয়া তিনি বলিলেন—আজ্ঞে না, তখন
নীচে ঘরে আমি পড় ছিলুম্ ।
ইস্! কি প্রবঞ্চনাময় কুটীল হৃদয় এই পুরুষ-জাতিটার! শুধু একটা
জেদ এবং আত্মম্ভরিতার বশবর্তী হইয়া তিনি আমার প্রতি কি
ব্যবহারই না করিতেছেন! কিন্তু ‘অরুণবাবু ? কৈ, তাহার শরীরে
এই নীচ কুসংস্কারের চিহ্নও ত পাইলাম না ! দেবতার মত নির্মল
তাঁহার চরিত্র, পুষ্পের মত শুভ্র তাঁহার আকাঙ্খ, আবার সিংহের মত
নির্ভীক তাঁহার ব্যবহার !
মিনু! মা-আমার !
পেছনে ফিরিয়া দেখিলাম, রণেনবাবু নাই, বাবা একা।
জানিস্ত মিনু, আমার একটা বাসনা আছে, যার জন্যে তােকে
বাের্ডিং থেকে বাড়ীতে এনেছি!
বিস্মিত স্তম্ভিতনেত্রে তাহার দিকে তাকাইয়া বলিলাম, কি বাবা!
অন্তরের সমস্ত শিরা-উপশিরাগুলি আমার যেন শিথিল হইয়া
গেল, না-জানি এবার কি কথাই না শুনিতে হইবে! বাবা
বলিতেছিলেন—আর তাের মারও ইচ্ছে ছিল মীনু, যে একটা বেশ
সচ্চরিত্রশিক্ষিত ছেলের হাতে তােকে সপে দি! অমত করিনি মা!
রণেন বলেছে
বাধা দিয়া একটু শক্ত হইয়া হঠাৎ বলিয়া ফেলিলাম—কি বলেছে
বাবা ?
৩২

রুদ্ধ আবেগ == তাের মনকে সে জয় করেছে! আর তুইও তাকে মিথ্যা কথা! জীবনের মধ্যে যদি কাহাকেও আমি অন্তরের সহিত ঘৃণার চক্ষে দেখিতাম—যদি কাহাকেও জগতের মধ্যে হয় নীচ পদার্থ বলিয়া জানিতাম, তবে সে এই হীন মিথ্যাবাদী জাতিটাকে। লুণ্ঠনকারী দস্যকে ভালবাসি—অত্যাচারীকে প্রাণ ভরিয়া ভাল বাসিতে পারি, কারণ তাহারা বুঝিতে পারে না, কি সৰ্ব্বনাশ তাহারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অপ্রতিহতভাবে জগতের বুকে করিয়া চলিয়াছে! কিন্তু এই মিথ্যাবাদী ? জানিয়া শুনিয়াও শুধু মুহূর্তের একটা সাফল্য-ভরা আলােকের রশ্মিতে নিজেদের-বিবেক- চক্ষু ধাঁধাইয়া লয়। পৃথিবীর অভিশপ্ত জীব- মীনু। চোখ ফাটিয়া আমার জল আসিতে চাহিতেছিল, বাবার কোলের ' উপর মাথা রাখিয়া সেইখানেই হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িলাম। বাহিরে তখন উত্তপ্ত সূর্যের উজ্বল রশ্মি ধক্ ধক্ করিয়া জ্বলিতেছিল—আর অন্তরে আমার সমস্ত জমাট বাঁধা অভিমানটুকু জল হইয়া চক্ষু দিয়া ফাটিয়া বাহির হইতেছিল ! মেহনিষিক্তকণ্ঠে বাবা আবার ডাকিলেন—মী, মা আমার ! কোলের উপর মাথা রাখিয়াই বলিলাম কি বাবা ! তাের মাকে মনে পড়ে রে ? মা’কে ! জীবনের সুখ-দুঃখমিশ্রিত সমস্ত স্মৃতিগুলা নিৰ্ম্মমভাবে কেউ হৃদয়পট হইতে মুছাইয়া দিলেও অভাগিনী মায়ের স্মৃতিটুকু রুদ্ধ আবেগ • উজল দেউটীর মতই জ্বল জ্বল্ করিতে থাকিবে ! সেই সুন্দর মুখ- খানি—সেই সুন্দর কোমল দৃষ্টি ; সেই আহ্বান—এ জীবনে তাহা চির-উজ্জ্বল হইয়া—চির পরিস্ফুট হইয়া আমার চোখের সুমুখে জ্বলিতে থাকিবে ! হউক না সে অতীতের কথা, হউক না সে পুরাতন—ওগাে, তবু সে আমার এ ব্যথিত 'জীবনে চির নূতন, চির-বৰ্তমান ! কঁদিস্ নি মা, আজ তারই একটা বাসনা তােকে পূরণ করতে হবে ! তুই বিয়ে করবি, সুখী হবি, এ যে তার বড় ইচ্ছে ছিল মা? বল, রণেনকে তা হলে মত দি ? হে আম্রার কাম্য-দেবতা, ওগগা জগদীশ্বর, এ কি মহা-পরীক্ষায় আজ আমায় ফেলিলে ! নিষ্কলঙ্ক শুভ্র-দেবতা আমার- মীনু! কি, আমার দিকে অমন করে চাইছিস যে ?-আচ্ছা, ভেবে দেখ, মা ! তবে জানি, এ বুড়াে ছেলের আশীৰ্বাদ তােদের চিরকাল অমর করে রাখতে চাইবে ! চল মা, স্নান করে জাসি ওগাে নিভূত অন্তরের পূজ্য দেবতা আমার! দেখাও, দেখাও আজ তােমার পুণ্য-আলােক, এ অন্ধকারে আর যে থাকতে ইচ্ছে করছে না আমার। = ৩৪ সাত আঁধার-ভরা উদ্বেগ-বিহীন পথের মাঝে সঙ্গীহারা জীবনখানি লইয়া দাঁড়াইয়া—এ কাহার আলােকোজ্জ্বল সবিতার ন্যায় দীপ্তমৃত্তি দেখিলাম ! নির্জীব জীবনে, শান্তিহারা ভাবে, অনাদৃত-লাঞ্ছিত এ দগ্ধ-পরাণ লইয়া পড়িয়াছিলাম, কিন্তু ওগাে, কে তুমি, তােমার সরস বলপূর্ণ স্নিগ্ধ-কোমলস্বরে আমায় আশ্বাস দিয়া গেলে ? একি বারি- বিহীন ধূ ধূ মরুভূর বুকে অতৃপ্ত পিপাসা জাগাইয়া, সুর তুমি শীতল বারি লইয়া দূরে দাড়াইয়া ! আঃ, আজ বােধ হয় আমার নিষ্কৃতির দিন—চিরবিদায়ের দিন। উদ্বেলপূর্ণ, শত বাধা-বিপত্তিপূর্ণ উর্বর ভূমিখণ্ড হইতে আজ চলিয়াছি সৰল কোমল সত্যের পথে পবিত্রতার পথে ! “মীনু !” “কে, অরুণবাবু ?-না না, রণেনবাবু ? আঃ!” “কেমন আছ মিনতি ?” একি! এখনও আমার রােগ-কাতর মুখখানি আপনার ক্রোডে লইয়া রণেনবাবু বসিয়া আছেন ? এ কি ভালবাসা ?-প্রেম ?-- , বলিতেও যাহা ঘৃণা হয়, ভাবিতেও যাহা শরীর শিহরিয়া উঠে, সেই চঞ্চল আকাঙক্ষার উত্তেজনা ? “কেমন আছি, কে জানে! সেই যে সন্ধ্যার সময় শুইয়া পড়িয়াছি .

রুদ্ধ আবেগ তার পর আর উঠিবার শক্তি পাই নাই, একটা দুর্বলতা আসিয়া, তাহার সমস্ত শক্তি প্রয়ােগ করিয়া, আমায় বাঁধিয়া ফেলিয়াছে ;-শক্তি- হীন হইয়া পড়িয়াছি।” বাবা আসিলেন !–‘মীনু, কেমন আছিস্ মা ?” একি দুর্বলতা আসিয়া আমায় ছাইয়া ফেলিল,-কথা কহিবার শক্তিটীও ত কৈ খুঁজিয়া পাইতেছি না ! “একটু ‘হ’ কর ত মীনু।” “কে, রণেনবাবু! হাঁ, দিন্। আঃ!” জীবনের মধ্যে যাহাকে সর্বাপেক্ষা ঘৃণার চক্ষে দেখিতে সুরু করিয়াছিলাম, আজ সে-ই ত সমস্ত রাত্রি অনাহারে-অনিদ্রায় আমারই শুশ্রুষায় কাটাইয়া দিল ! তবে? একি শুধু মুহূর্তের ভূল-ক্ষণিকের উত্তেজনা। “রণেনবাবু!” আমার মাথাটীকে বুকের মধ্যে চাপিয়া মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া রণেনবাবু বলিলেন—“কেন মীনু ? এই ত আমি এখানে আছি ! বল, কোন কষ্ট হচ্ছে কি ?” ইস! কি কোমল, কি স্নিগ্ধ সুরেই না কথা কয়টা আমার কাণে আসিয়া বাজিল ! যে মলিনতা দেখিয়া ঘৃণায় আমার সর্বশরীর শিহ- রিয়া উঠিয়াছিল, আজ তাহা কি সুন্দরভাবেই না রাঙাইয়া উঠিল! “দোয়াত আর একটুকরাে কাগজ, রণেনবাবু!” কিন্তু কি লিখিব ? আসিতে ? যদি না আইসে ?-না না, A রুদ্ধ আবেগ আসিবে বই কি! কুন্তলা, কুন্তলা—তাহাকে যে আমি জীবন ভরিয়া ভালবাসি! আমার অমুখ শুনিলে সে কি না আসি থাকিতে পারিবে ? দূর ছাই, কলম সরিতে চাহে না কেন? যত জোর করিয়া কলম ধরিতে যাই, কে যেন তাহার সমস্ত শক্তি দিয়া সে-চলা ব্যর্থ করিয়া দেয়। অনেক কষ্টে লিখিলাম— ভাই কুন্তী !! . কোন্ অদৃশ্য সত্য-সুন্দরের মেহসিক্ত আহ্বানের জন্য আজ বিশ্ব ছাড়িয়া-জগতের প্রত্যেক রেণু পরমাণুটী ছাড়িয়া, মরণের পথে ছুটিয়া চলিয়াছি, জানি না! এ আহ্বান শুধু আজনয়—কত যুগ যুগান্তর হইতে আমারই মত কত অভাগিনীকে বরণ করিয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। আজ আমিও চলিলাম, আমারও ডাক আসিয়াছে! ব্যর্থতার মধ্য দিয়া, বিচ্ছেদের মধ্য দিয়া যে গােপন- সুখ নীরবে আপনি ফুটিয়া উঠে, সে সুখ আজ আমিও পাইয়াছি। বিদায় কালের শেষ দেখা দিতে আজ তােকে তাই আহ্বান করিতেছি। তােরই আশায়—তােরই অপেক্ষায় এখনও এ মহা-নিদ্রার হাত এড়াইয়া জাগিয়া আছি! বিদায়, বিদায় বন্ধু! ইতি তােরই মিনতি ! সত্যই কি আমার মাথা খারাপ হইয়াছে ? এ সব ছাই ভস্ম যা-তা কি লিখিলাম ! বেহারা! অরুণবাবু কি কুন্তলার সহিত আসিবেন ? ছিঃ, তাহার চিন্তা,

রুদ্ধ আবেগ
তাহার ধ্যান, তাহার কল্পনা করাও যে আজ আমার পক্ষে মহাপাপ।
দেবতার পূজা করা কাঙালিনীর পক্ষে কতখানি পাপ, তাহা সে নিজেই
কি জানে ?
“বেহারা এসে যে দাড়িয়ে রয়েছে মীনু।”
“হাঁ, এইখানা নিয়ে যাও তত বেহারী—সেই বাড়ীতে।
“বাবা !”
“কি মীনু! লক্ষ্মীটী মা-আমার!”
“উঃ! বড় কষ্ট বাবা!”
সন্ধ্যার সময় জ্বরটা একটু কম ছিল, মাথাটার দপদপানি অনেকটা
কমিয়া গিয়াছে! ভাবিলাম, কৈ বিদায় লইয়াও ত লওয়া হইল না,
এত সব শান্ত স্থির হইয়া আসিল! হঠাৎ দ্বার হইতে কে ডাকিল,
“মিনী, ভাই!”
“কে, কুন্তী আসিয়াছিস্? আয় ভাই, বােস্!”
আমার কপালটার উপর হাতখানি রাখিয়া কুন্তলা বলিল, “গা যে
পুড়ে যাচ্ছে রে! খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি? ইস্, যা করে চিঠি লিখেছিস্?
আমি ত ভয়েই মরে যাই।—নে ভাই, একটা বিছানা আমার এই
ধারটা পাতিয়ে দে! আজকে থেকেই যাব।”
“সত্যি! রণেনবাবু?”
“কি মী! কি বলছে? বিছানা? আচ্ছা, আমি পাতিয়ে
দিচ্ছি।”
Oborn

আট
—নিভেছে মাের হাতের বাতি
জানিনে পথ-কোথায় সাথী
কারার কোণে কাটছে রাতি
চরণ বাঁধ রে !
অন্ধকারময় উদ্দেশ্যবিহীন ব্যর্থ জীবনভার লইয়া আবার
বাঁচিয়া উঠিলাম। পােড়া দেহ যেন দিন দিনই আবার ফুটিয়া উঠিতে
লাগিল। কিন্তু কোথায়, কাহার জন্য ? নিঃসঙ্গ জীবনের আঁধার-ভরা
দিনগুলি যে একাকী-ই কাটাইতে হইবে! বাবা সেদিন বলিয়াছিলেন,
রণেন বাবুকেই বিবাহ করিতে হইবে ! কিন্তু তা কি সম্ভব ? শক্তি,
শক্তি দাও ভগবান! এ আদেশ পালন করিবার শক্তি যে আমার
আদৌ নাই ! তার চেয়ে বরং আবার বাের্ডিংএ গিয়া বাকী দিনগুলা
কাটাইয়া দি-ই! কিন্তু বাবা কি তাহাতে, মত দিবেন ? আর
রণেনবাবু ? তিনিই বা কি ভাবিবেন ?
“মনু ?”
শেলাই হইতে মুখ
উঠাইয়া বলিলাম—“কি বাবা?”
“চল্ মা, কোথাও একটু ঘুরে আসি ! তাের শরীরের অবস্থা
হয়েছে।”
৩৯

রুদ্ধ আবেগ
“কোথায় যাবে বাবা ?”
“পুরীতে যাবি ? মাসখানেকের জন্যে ?”
বাবার বুকে মাথা রাখিয়া বলিলাম—“যা ভাল বােঝ কর বাবা !
“তা-ই চল্ মা ! আর ভাল লাগে না এখানে!”
“তার পর ?”
“তারপর কি মা? 'রণেনের কথা বলছিস্? সেও যাবে
আমাদের সঙ্গে।”
“জানি না আবার কোথায় কি উদ্দেশ্যে ব্যর্থ জীবনভারখানি টানিয়া
লইয়া চলিলাম।”
এ যে চারিদিকেই কান্না! কেবলই শত বেদনার বুকে লইয়া
তরঙ্গসমূহের ফুলিয়া ফুলিয়া উঠা ! শত বিচ্ছেদভরা, অশ্রুসিক্ত মৌন
চঞ্চল বক্ষখানি লইয়া যাহার প্রত্যাশায় পাগলের মত তীরের দিকে
ছুটিয়া চলিয়াছে—সে চলা কি ব্যর্থ নহে? বুক ফাটাইয়া আছড়িয়া
পড়াই তাহার সার !
স্বর্গদ্বারের পার্শ্বেই যেস্থানে বাটীটা আমরা পাইয়াছিলাম, চারিদিক
তাহার খােলা! সমুদ্রের প্রচণ্ড হুঙ্কার একটা করুণ আর্তনাদের মতই
কানে আসিয়া বুকে গিয়া ঘা দিত ! কিন্তু মাঝে মাঝে এ সমস্ত
আৰ্তনাদ, বিদ্রোহী কোলাহল ছাড়িয়া ছােট্ট মনখানিকে যে সুদূর
বাংলার একটী ঘরের উদ্দেপে আবার ছুটিয়া যাইত, তাহাকে বশে
আনার সাধ্য তাে আমার ছিল না।
৪০

রুস্ক অাবেগ বাের্ডিং ছাড়িয়া চলিয়া আসিয়াছি বটে, কিন্তু তাহার স্মৃতি, প্রত্যেক দ্রব্যটীর মায়া নাগপাশের ন্যায় আমাকে যে সুদৃঢ়ভাবে বাঁধিয়া ফেলিয়াছে, তাহার হাত হইতে কি মুক্তি নাই ? কুন্তীর বিবাহ! নূতন জীবনের প্রথম সােপান! ভাবিতেও আনন্দে সমস্ত বুকখানি ভরিয়া উঠে! কুন্তলা, কুন্তলা! আমার কুন্তলা ! তাহারই বিবাহ! আচ্ছা, এ বিবাহে তাহার কি সম্মতি নাই ?—প্রাণে সে উন্মাদনা নাই ?—চক্ষে সে দীপ্তি নাই ? তবে—তবে এ তাহার বিবাহ, -আত্মবলিদান ? কুন্তলার বৌদিদি বলিয়াছিলেন, ছেলেটী নেহাৎ মন্দ নয় এম-এ পাশ করেছে, স্বভাব-চরিত্তির ভাল, দেখতেও মন্দ নয়। তবে !–এ বিবাহে কুন্তলার মত নাই কেন? এ আনন্দের তরঙ্গ ত সকলের প্রাণে গিয়াই ঘা দিয়াছে—তবে কুন্তী তাহাতে এত বিমর্ষ কেন ? তৃতীয় দিনে একখানি চিঠি আসিয়া হাজির। কুন্তী পত্রে লিখিয়াছে— ভাই মীনু। “কত কষ্টে, কত চেষ্টায় আজ যে তােকে এই চিঠি লিখছি, তা ভগবানই জানেন। হাত আমার অবশ হয়ে আসছে—চক্ষের আলো নিভে আতে চাইছে, তবু-তবু জোর করে তাদের কাজ চালিয়ে নিচ্ছি! শুনেছিস বােধ হয়, দুদিন পরেই আমার বিয়ে! কিন্তু এ কি আমার বিয়ে ? নিরীহ মৌন ছাগল যেমন ব্যাধ্য হয়ে হাড়ী- ৪১ রুদ্ধ আবেগ কাঠে গিয়ে মাথা ঢােকায়, আমারও যে এ তাই ভাই! সে মরণের পথে চলা-ছাগলের বুকে তখন যে কি কষ্ট, নির্বোধ কশাই কি তা বুঝতে পারে ? “যার সঙ্গে আজ আমার এ মহা বলিদানের অভিনয় আরম্ভ, শুনেছি, তিনি না কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বরপুত্র, তিনটে বিষয়ে এম-এ দিয়েছেন। কিন্তু ভাই মীনু, জীবনে কাউকে যদি আমি বন্ধু বলে, দিদি বলে উপদেষ্টা বলে ভালবাসি, ভক্তি করি, তবে সে একমাত্র তুই ! তাই আজ তােকে সব কথা বছি ! তুই এসে হয়ত দেখবি, তাের কুন্তীকে আর একজন নিয়ে গেছে। তার স্বাধীনতা, তার হাসি, তার কান্না সমস্তই আর একজন তার হাতে তুলে নিয়েছে। কিন্তু ভাই এ বিয়ের চাইতে যদি আমার মৃত্যুর পরওনা এসে হাজির হত, তাহলে হয় ত আমি হাতে হাতে চলে যেতুম ! “যার সঙ্গে আমার বিয়ে, তার চেয়েও আর একজনকে যে আমি কত ভালবাসি,আমার নিভৃত অন্তরের সুখ-দুঃখ সমস্ত যে তার পায়ে রেখেছি ভাই! আজ যদি তাকে ছেড়ে যাই, তাহলে শুধু আজ নয়, কাল নয়, চিরদিনের জন্যে যে পাপের ভাগিনী হয়ে অকৃতজ্ঞতার বােঝা নিয়ে আমার জ্বলে মরুতে হবে। নারীত্বের সুখ-আত্ম-বিসর্জনের মধ্যে,-নারীত্বের গৰ্ব—আত্মত্যাগের মধ্যে। আজ যদি সেই ত্যাগ-সেই সুখ আমার দরিদ্র শ্রীহীন কুটীরবাসী প্রিয়তমের জন্যে ত্যাগ না করতে পারি, তবে কোথায় আমার এ নারীত্বের সুখ, গৰ্ব ? ৪২

রুদ্ধ আবেগ
“ভাই মীনু ! জীবনের মহা সমস্যায় আজ আমি পড়েছি ! এ
সমস্যার সমাধান বােধ হয় আমি নিজেই করব, জগদীশ্বরের কাছে
প্রার্থনা করি, তুই সুখে থাক্ ! বিদায়, বিদায় ভাই! যদি কখনও
কোন অপরাধ তাের কাছে করে থাকি ত আজ ছােট বােন মনে
করে সব ভুলে যাস্ ভাই, লক্ষ্মীটী দিদি আমার ! বিদায়, বিদায়
বন্ধু!
ইতি তােরই বুকের স্নেহে—গর্বিত
কুন্তলা !
কুন্তী, কুন্তী, দিদিটী আমার ! কেন ভাই আজ মৃত্যুর—(হাঁ
মৃত্যু বই কি) বােঝাকে ঘাড়ে তুলে নিলি ? • ভালবাসিলিখেছিলি !
বড় ভুল করেছিস দিদি ! ভালবাসা যে এ নয়—এ যে অভিশাপ
জীবন-ভরা ব্যাকুলতার মধ্যে মর্মান্তিক অভিশাপ।
পত্ৰটী পড়িয়া অবধি অন্তরের আত্মাটুকু আমার ফুকরিয়া কাদিয়া
উঠিতেছিল। হে ভগবান, ওগাে বিরাট জগতের একমাত্র অধীশ্বর
যদি নারীকে সৃষ্টি করিয়াছিলে, তবে তাহাকে জগতের প্রচণ্ড ঘা
সহিবার শক্তিগুলি দাও নাই কেন ? নারী কি শুধু চোখের জল
ফেলিবার জন্যই আসিয়াছে ? জগতের সুখ, জগতের শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য
উপভােগ করিবার অধিকার তাহার কি বিন্দুমাত্র নাই ?
“মীনু ?-মিনতি।”
মুখ ফিরাইয়া দেখি, রণেন বাবু।
“কঁদছিলে কেন মিনতি ? ও চিঠি কার ?”
৪ ৩

রুদ্ধ আবেগ ছিঃ! এ কি দুৰ্বলতা, এ কি লজ্জা আসিয়া আমাকে পাইয়া বসিল। “চল, একটু বেড়িয়ে আসি, বুঝলে ?” “আজকে নয়—শরীরটে বড় খারাপ হয়ে রয়েছে।” প্রতারণা, প্রতারণা! এ কি হীনপ্রবৃত্তি। মুহূর্তের জন্য একটা জীবন-ভরা অভিশাপের বােঝ স্বেচ্ছায় তুলিয়া লওয়া! নয় দশটা-দিন আরও , কাটিয়া গিয়াছে। সকাল বেলাটা সমুদ্রের তীরে লবণসিক্ত বালুরাশির উপর বসিয়া বসিয়াই কাটিয়া যায় । অস্তগামী সূর্যের উজ্জল কিরণচ্ছটায় যখন সমস্ত বেলাভূমি আলাে- কিত হইয়া উঠে, ছােট্ট ইজি-চেয়ারখানি লইয়া বারান্দায় বসিয়া সমুদ্রের চঞ্চল লীলা দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যাটাও কাটাইয়া দিই। এ বৈচিত্ৰবিহীন কর্মহীন অলস দিনগুলির মধ্যে পড়িয়া আপনাকে এত শক্তিহারা করিয়া ফেলিয়াছি যে, অসম্বদ্ধ দিনগুলির বিদায়- মিলনের সহিত নিজের সম্বন্ধকে কখনও সুদৃঢ় করিয়া রাখিতে পারি নাই। কুন্তলার আর কোন সংবাদ পাই নাই। কে জানে, এখন হয় ত অভাগিনী তার সংসার-পথ দিয়া স্বেচ্ছায় চলা-ফেরা করিতে পারিতেছে । হিন্দুর গৃহে জন্ম তাহার,-ধর্মের প্রতিবন্ধকে হইয়া চলার উন্দায় ৪৪ রুদ্ধ আবেগ বা শক্তি তাহার নাই! প্রতি পদক্ষেপে এখন তাহার অধীনতার শৃঙ্খল! কুন্তী, দিদি আমার ! পূর্বজন্মের কৰ্ম্মফলের বােঝা ঘাড়ে করিয়া আনিয়াছিলি,-এ বুঝি তাহারই শাস্তি! সত্যই তাে! দুইটা প্রাণের মিলন যেখানে হইল না, কেবল মাত্র বাধ্যবাধকতার ভিতর দিয়া সংযুক্ত করা হইল! সে কি বিবাহ ? অরুণ বাবুর কি এমন শক্তি ছিল না, এ মহা বিপদ হইতে তাহাকে রক্ষা করেন ? যাক, পুরীতে আসিয়া অবধি এত অশান্তির কোলাহল মনের মধ্যে উঠিতেছে তাহার নিবৃত্তির উপায় ত কৈ খুঁজিয়া পাইতেছি না । আহার শেষ করিয়া ইজি-চেয়ারে গা ঢালিয়া দিয়া সেদিন কার ডেলি নিউজখানা লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছি, হঠাৎ রণেনবাবু আসিয়া বলিলেন, অরুণ চট্টোপাধ্যায় বলে তুমি কাউকে চেন মিনু ? বুকের মধ্যে কে যেন একটা নাড়া দিয়া উঠিল। “হাঁ হাঁ, কি হয়েছে তার রণেনবাবু?” “নীচে ড্রয়িংরুমে তিনি বসে আছেন, তােমার সঙ্গে দ্রুতপদে নীচে নামিয়া গেলাম, রুক্ষ কেশ, মলিন বসন, বদন- মণ্ডল বিবর্ণ। এ কি! এ চেহারা কেন আজ তার? আমাকে দেখিয়া একটু মলিন-হাসি হাসিয়া তিনি বলিলেন- “বসুন! আজ একটা ভয়ানক সংবাদ নিয়েই আপনার কাছে ছুটে এসেছি ! কুন্তী এখানে আসে নি ত?” ৪৫ রুদ্ধ আবেগ “কুন্তী। কুন্তলা ! না না, কি হয়েছে তার ?” সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া একটা বজ পড়িলেও আমি বােধ হয় এতটা চঞ্চল হতাম না ! অরুণবাবু বলিতেছিলেন—“আপনি বােধ হয় শুনে থাকবেন, তার বিয়ের সমস্তই ঠিক হয়ে গিয়েছিল, এমন কি, আশীর্বাদও তারা করে গিয়েছিল। তারপর বিয়ের দিন থেকেই তাকে পাওয়া যাচ্চে না, মিস্ রায়।” স্তম্ভিত হইয়া বলিয়া ফেলিলাম-“তার পর ?” “ভারপর আর কি বলুন? যত পরিচিত জায়গা ছিল, সব তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছি, মা-পাগলের মতন।” “আর কোন খোঁজ নিয়েছেন তাঁ’র ?” ম্লান-বিষাদপূর্ণ হাসি হাসিয়া অরুণবাবু বলিলেন-“খোঁজ আর কোথায় নেবাে বলুন ? জায়গা ত আর খুঁজে পাই না। তবে আমার বিশ্বাস, সুধীরের সঙ্গেই সে কোথাও চলে গিয়েছে, মিস্ রায় “সুধীর, সুধীর কে, মিঃ চাটার্জি ?” অরুণবাবু বলিতে লাগিলেন,—“সুধীর সে আমার বাবার এক বন্ধুর ছেলে ! বিএ পাস দিয়ে এম-এ, পড়ছিল, বড় গরীব তারা, কিন্তু হাঁ, স্বভাব তার ছিল ভারী মিষ্টি। সুধীরও কুন্তীকে খুব ভালবাসতাে।” নিমেষের মধ্যে অরুণবাবুর সমস্ত মুখখানি গােধুলির মত লাল হইয়া উঠিল। “উপায়?” ৪৬

রুদ্ধ আবেগ
“উপায়? উপায় আর কি মিস্ রায় ? যাক, তারা যদি
সমাজের রক্তচক্ষু থেকে পরিত্রাণ পেয়ে আপনাদের জীবনের
প্রকৃত সুখ শান্তিকে ডেকে আনতে পারে, তাহলে সেও কি একটা সুখ
নয় মিস্ রায় ?”
ছিঃ! এ কি প্রশ্ন করিলাম, এ প্রশ্নের উত্তরে অন্তরের সমস্ত ধমনী
গুলা যে আপনা হইতেই কঁপিয়া উঠিবে, তাহা কে জানিত। মনুষ্যের
বিবেক, জ্ঞান, আত্মমৰ্য্যদা-
মিস্ রায়
সেই স্বর, সেই ভঙ্গী, সমস্ত দেহটা আমার শিহরিয়া উঠিল,“অস্ফুট
কণ্ঠে বলিলাম-“কিছু বলছেন ?”
“মাতৃহীন হলে মানুষের মন এত চঞ্চল হয় কেন বলতে পারেন ?
“এ কি প্রশ্ন ? সামঞ্জস্য বিহীন, এ কঠিন প্রশ্নের উত্তর নারী আমি,
কি দিব ?”
“বলুন মিস্ রায়! আর সেই জন্যেই বােধ করি, মনটা আমার
এত চঞ্চল, এত উদ্বেগপূর্ণ হয়েছে।”
বাধা দিয়া বলিলাম,-“কেন, আপনার মা,
“না মিনতি ! আমার মা নেই।”
চমকিয়া উঠিলাম। “মিনতি! মিনতি!—কই এতদিন ত এ নাম
ললাকের মুখে মুখে শুনিতেছি, এমন সরল, এমন মিষ্ট হইয়া কোন দিন
ত আমার কানে বাজে নাই ?”
অরুণবাবু বলিতেছিলেন, শুনেছি মিনতি, তােমারও মা নেই।
৪৭

কন্ধ আবেগ
তােমার মতন জ্ঞান হবার আগে আমিও মাকে হারিয়েছিলুম! কিন্তু
আবার মা পেয়েছি! শুধু সে কুন্তলার মা নয় মিনতি, সে আমারও
শুভ্র সুন্দর কপােলখানি বহিয়া তাঁহার অবিন্দু গড়াইয়া পড়িল ।
বলিলাম,-“আপনার মান
“হ মিনতি, এইখানেই করে নেব। খেয়ে দেয়ে দুটী এইখানেই
শুয়ে পড়বে, শরীরটা বড় ক্লান্ত হয়েছে।”
দশ
-জীবনে যত পূজা হলাে না
সারা,
জানি হে জানি আজও হয়নি
সারা।
কুন্তী, কুন্তলা আমার না জানি এখন কোন দূর ব্যবধানের
অন্তরালে চক্ষের দৃষ্টির বাহিরে—হাঁ, তবুও সে সুখী, তবুও সে
পরিতৃপ্ত! চিঠিতে সে লিখিয়াছিল,—“নারীত্বের সুখ আত্মত্যাগের
ভিতর, স্বার্থত্যাগের ভিতর!-মাতার স্নেহের দাবী ছাড়িয়া
সংসারের মমতার মায়া ছাড়িয়া, অর্থসুখ ত্যাগ করিয়া আজ সে যেখানে
৪৮

রুদ্ধ আবেগ . গিয়াছে তাহার প্রিয়তমের সহিত ; না জানি, নারীত্বের গৌরব- আজ তার মুখে কি সুন্দর আলােকের সৃষ্টিই না করিয়াছে। বাবা কালও বলিতেছিলেন—হ মা, অরুণের সঙ্গে যতটুকু মিশলুম, দেখলুম, মনটী তার খাটী দুধের মতন ! জল তাতে নেই বল্লেই হয়। দেখিস্ মা, দুদিনের অতিথি ও, কষ্ট যেন কিছু না হয়। তবে ? এই শুভ্র নির্মল-দেবতার পায়ে, সকলের এমন কি নিজেও অজ্ঞাতসারে সমস্ত প্রাণটুকু ঢালিয়া দিয়াছি, তাহাতে ? কি পাপ আছে ইস্, ঘুম যেন আর পােড় চক্ষে আসিতে চাহে না। কেবলি চিন্তা -চিন্তা! চিন্তায় একটী জাল হইতে ঘুরিতে ঘুরিতে আর একটী জো আসিয়া কখন কেমন করিয়া ধরা দিতেছি, নিজে বুঝিতে পারিতেছি না। ইজি-চেয়ার খানি বারান্দায় আনিয়া তাহাতেই গা গলিয়া দিলাম । সম্মুখে অনন্ত উৰ্ম্মিমালা বুকে ধরিয়া অসীম সমূদ্র ছুটিয়া চলিয়াছে। উত্তাল তরঙ্গমালা কি এক দুঃসহ-ব্যথা পাইয়াই, বােধ করি, বেলা- ভূমিতে ছুটিয়া আসিয়া বুক ফাটাইয়া মরিতেছিল। আকাশের গায়ে জীবন্ত শিশুর মত উজ্জল তারা-নীচে ক্ষুব্ধ অসীম সাগর-গর্জন, আর তাহাদের দ্রষ্টা হইয়া নিশুতি স্তব্দ রাতে আমি একা বিনিদ্র-নয়নে বসিয়া । এই যে সমস্ত ছাড়িয়া, কুন্তলা সংসার ছাড়িয়া চলিয়া গেল, ইহার জন্য দায়ী কে? কুন্তলা?-না সমাজ নিজে ? এই যে দুটী তরুণ অন্তর নিভৃতে সকলের অজ্ঞাতসারে নীরবে আপনাদের প্রাণ বিনিময় উপরে কাল- ৪৯ ৪

রুদ্ধ আবেগ
করিয়া লইল, তাহাদের সে মিলনের অন্তরায় হইয়াছিল কে ?—এই
যে জীবনের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা-প্রীতি স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়া অভাগিনী
নারী-
“মিনতি !”
“কে রণেনবাবু ?—ওঃ অরুণবাবু, আসুন !”
“না না, তুমি বােসাে, আমি আর একখানা চেয়ার.আছি!”
ঘরখানি হইতে তিনি নিজে চেয়ার টানিয়া লইয়া বসিলেন, আর
আমি স্থির হইয়া বসিয়া তাহা দেখিলাম। ছিঃ ! কি মনে করিলেন
তিনি ?
তুমি ঘুমােলে না যে মিনতি। এখানে কি বােজ এই সময়ে
এসে বসাে ?
ধীরকণ্ঠে বলিলাম—প্রায়ই !”
“আমার মতে, তােমার কবি হওয়া উচিত ছিল মিনতি।”
আগ্রহ-ভরা দৃষ্টি তাঁহার মুখের উপর তুলিয়া বলিলাম-কেন,
বলুন তাে ?”
“প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে প্রাণ যে কাব্যময় হয়ে পড়ে মিনতি।
কবি সৌন্দর্য দেখেই তাে প্রেমের সৃষ্টি করে-প্রেম থেকে—
“মিনতি, ঘুমুচ্ছ ?”
“কৈ, না!”
“অসুখ করেনি ত ? কৈ, দেখি হাতখানা ?”
কোলের উপর হইতে হাতখানি তিনি টানিয়া লইলেন। সে

রুদ্ধ আবেগ
স্পর্শে সমস্ত দেহটা একবার কপিয়া উঠিল। এ কি সুখের উন্মাদনা
প্রতি ধমনীতে বিদ্রোহের সৃষ্টি করিয়া গেল ?
ধর-ধরা গলায় আবার তিনি ডাকিলেন—“মিনতি ?”
এ কি হইল আমার! যত চেষ্টা করিয়া উত্তর দিতে যাই,
স্বর যেন গলার কাছে আসিয়াই থামিয়া যায় ! এ কিসের শক্তি আজ
আমায় মৌন মূক করিয়া দিল গাে?
“মীনু !”
আবার সেই কণ্ঠ ! ধীরে ধীরে আমার হাতখানি লইয়া তিনি
দুই হাতে চাপিয়া ধরিলেন। কি উন্মাদনা ছিল তাহাতেকে জানে ?
বিদ্রোহী শিহরণের তাড়নায় মস্তকটী আমার, তাহার কাপের উপর
ঢলিয়া পরিল।
এই তাে পাইয়াছি ! পলে পলে প্রতি দিন রজনী বাহার চিন্তায়
বিনিদ্রভাবে কাটাইয়াছি, ওগাে, এই ত আমার সেই দেবতা।
'আমার অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনের উজ্জল-দেবতা! মরণের পথে এখনই
এই মূহুর্তেই যদি ছুটিয়া যাইতে হয়, তাহাতেও বােধ করি সুখ আছে
“চল মীনু, শুতে যাই। রাত হয়ে গেছে।”
অরুণ বাবু নিজের ঘরে চলিয়া গেলেন। সেই নিস্তব্ধ অন্ধকার
প্রকৃতির দিকে তাকাইয়া বসিয়া থাকিতে আমারও ভাল
লাগিল না।

- এগার বাবা বলিতেছিলেন—“না মিনু, রণেনকেই তােমার বিয়ে করতে হবে ? অনেক ভেবে দেখেছি আমি,-তা ছাড়া আর উপায় নেই।" তা ছাড়া আর উপায় নেই। কৈ, এ কথা ত বাবার মুখে কোন দিন শুনি নাই ? সেদিনও ত তিনি বলিয়াছিলেন—ভেবে দেখ মা, শেষে যেন আজিবন অনুতাপ করিস না । “মীনু, তাহলে মত দি’ রন্তুকে ! ও কি ! কাদছিস?” ছিঃ ! এ কি দুর্বলতা আসিয়া পড়িল। অনেক কষ্টে বলিলাম- কিন্তু তাকে যে আমি অন্যভাবে দেখে আসছি, বাবা!" আমার মুখের দিকে তাকাইয়া বাবা বলিতেছিলেন—“শােন না, বস্তুকে, না হয় অরুণের অরুণের মতও আমি করাতে পারতুম, কিন্তু অরুণ !—সে যে হিন্দু মা?” “হিন্দু ! হিন্দুর কি প্রাণ নাই, হিন্দুর প্রাণে কি প্রেম নাই ; ভালবাসা নাই? তবে ?” এ কি মহা সমস্যা আজ আলো ঢাকিয়া দাড়াইল । বাবা বলিতেছিলেন বলে হিন্দুর হাতে তােকে ত আমি ফেলে দিতে পারি না, মা ! কুসংস্কার নিয়েই যে জীবন কাটিয়ে এসেছে, আমাদের সমাজে তার স্থান নেই ত মা ! হাঁ, তবে অরুণ যদি আমাদের পবিত্র ব্রাহ্মধৰ্ম্মে সন্তুষ্টচিত্তে দীক্ষিত হতে পারে, তবে মিনু, অরুণের সঙ্গেই তাের বিয়ে দেব। কিন্তু সে কি রাজী হবে মা?

রুদ্ধ অবেগ “ছিঃ ছিঃ, শুধু আমার জন্য তাহার ধর্ম ত্যাগ করিতে হইবে ? কৈ, এ পর্যন্ত কোন যুবকই ত তাহাতে স্বীকৃত হয় নাই ? হাঁ, এক, সময় ছিল, যখন ব্রাহ্মধৰ্ম্মের তৃৰ্য্য নিনাদ দেশ-দেশান্তর হইতে সহস্র সহস্র যুবককে আহ্বান করিয়াছিল। তাহারাও আত্মপর ভুলিয়া- “কি বলিস মিনু! বল্ মা এখনি বেরুতে হবে।” প্রাণ ভরিয়া • যাহাকে ভালবাসিয়া ফেলিয়াছি, তাহার নিকট হইতে সে ভালবাসা—সে প্রেম ফিরাইয়া লইব, কি করিয়া ? ওগাে অদৃশ্য বিরাট দেবতা ! একি মহা সমস্যায় আজ আমাকে ফেলিয়া দিলে ? ভালবাসা, লােকে বলে, পবিত্র, স্বর্গীয়-অতুলনীয় ! একবার যাহাকে স্বেচ্ছায় তুলিয়া দিয়াছি, কি বলিয়া আবার ভাহা চাঁহিয়া লইব ? “বাবা!” ‘কঁদিস নি মা ! ভেবে দেখ, এ বিয়েতে তাের মা আজ যেখানেই থাকুন, সুখী হবেন, অমত করিস না মিনু, ভাল করে সব বুঝে দেখ !” শুষ্ক চক্ষু দুইটা আমার জলে ভরিয়া আসিল। বুঝিলাম না, এ কি শান্তি আমায় লইতে হইতেছে! বাবা বলিলেন—“ছ, আর এক কথা মীনু ! যদি বােডিংএ গিয়ে তাের মন ভাল থাকে, তুই যা ! তবে হাঁ, যাবার আগে একটা সান্ত্বনা তাের এ বুড়ে-ছেলের প্রাণে দিতে হবে যে, ফিরে এসে তুই এই রন্তুকেই বিয়ে কবি, বল্ মা, এতে তাের মত আছে কি না ?”

রুদ্ধ আবেগ
t
“এই যে রন্তু যে! এস বাবা !”
একখানি বই হাতে করিয়া রণেনবাবু ঘরে ঢুকিলেন, মুখখানি
গম্ভীর—ঈষৎ মলিন !
“এই যে রস্তু, সেই কথাই বাবা, পাগলীটাকে বােঝাচ্ছিলুম্।”
রণেনবাবু সে কথার কোনই উত্তর দিলেন না, কেবল মাত্র আমার
স্বেদসিক্ত মুখের দিকে একবার তাকাইয়া লইলেন।
“কি করবি মা, বাের্ডিংয়েই যাবি ত?” .
বলিলাম-“ বাবা, তা-ই যাব !”
“বেশ, বেঁশ ! এই তাে আমার মেয়ের কথা ! আমি কি তােকে
চিনি না মীনু ? তবে হাঁ, শেষের কথাগুলিও মেনে চলিস্। চল হে
রন্তু, উঠবে না কি, একটু বেড়িয়ে আসা যাক্ !”
বাবা চলিয়া গেলেন, বইখানি লইয়া রণেনবাবুও তাহার পশ্চাৎ
পশ্চাৎ চলিলেন।
সত্যই-ততা! এ কি প্রতিজ্ঞা আজ পিতার সাক্ষাতে করিয়া
বসিলাম! রাখিতে পারিব কি ?
অস্তরের মধ্যে, যে ছবিখানি বসিয়া গিয়াছে, তাহাকেই আবার
জোর করিয়া উঠাইতে হইবে ! ওগাে আমার গােপন-চিত্তের
নিভৃত-দেবতা! কেন তােমার ওই সুন্দর তরুণ মূর্তি লইয়া আমার
সম্মুখে আসিয়াছিলেন ?
রণেনবাবুকে বিবাহ করিতে হইবে। দোষ কি ?
দিন মরণের গ্রাস হইতে আপনার প্রাণ তুচ্ছ করিয়া তিনি আমায়
এই ত সে
৫৪

রুদ্ধ আবেগ টানিয়া আনিলেন! তাহার কি একটা কৃতজ্ঞতা নাই ? ছিঃ, না, না, বাবার কথাই মানিয়া চলিব। সত্যের পথে—পবিত্রতার পথে, কর্তব্যের পথ হইতে যেন কোন দিন পথ-হারা না হই! হউক সে পথ পিচ্ছল, হউক তাহা দুর্গম,—সমস্ত বাধা বিপত্তি ঠেলিয়া সেই পথেই যাইতে হইবে ! কিন্তু পােড়া-মন কেন শুনিতে চাহে না !—আত্ম সমর্পণ করিয়া আর কেন সে ফিরিতে চাহে না! চলিবে—যুগ যুগ ধরিয়া সে সেই পথেই চলিবে, যেখানে তাহার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, আগ্রহ এবং মুক্ত- চিত্তের সমস্ত প্রতি ভালবাসা ঢালিয়া দিয়াছে ! অনাবিল স্নেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হয় হউক, কিন্তু ওগাে, যাহাকে একবার প্রাণ ভরিয়া ভাল। বাসিয়াছি, তাহাকে কি করিয়া বঞ্চিত করিব? এ প্রতারণা, এ হীনতা তাহার সহ্য হইবে কি? কিছুই ভাল লাগিল না, এ চিন্তার হাত হইতে নিস্কৃতি পাইবার জন্য চেয়ার ছাড়িয়া উঠিলাম, পার্শ্বের গলিটা দিয়া একটী বখাটে ছােকরা গাহিতে গাহিতে চলিয়াছিল—“যে যাহারে ভালবাসে সে তাহারে পায় না কেন?’–এ কি গান ? না আমারই ব্যথিত অন্তরের প্রতিধ্বনি। ৫৫ উদ্দেশ্য-বিহীন ব্যর্থ জীবন-ভার লইয়া—সংসারের চঞ্চল বিশৃঙ্খলতার হাত হইতে মুক্তি পাইয়া, বাের্ডিংএ ফিরিয়া আসিয়া হাঁফ ছাড়িয়া যেন বাঁচিলাম ! বাপ, কি অস্বস্তি! কি বেদনাভারকে, বুকে চাপাইয়া দিনগুলি কাটাইতেছিলাম ! আজ মনে হইল, সে সব ভার যেন হাল্কা হইয়া গিয়াছে তবুও, কি জানি, মাঝে মারে সমস্ত স্মৃতি আবার মনে পড়িয়া যাইত, বােডিংএ ফিরিয়া আসিলাম বটে, কিন্তু কুন্তী কৈ ?-অভাগিনী বােনটী যে আজ সমস্ত ছাড়িয়া বিদায় লইয়াছে। তাহার জন্য কেহ কি এক ফোঁটা চোখের জল ফেলিবে না? না না, এখানে সকলেই যে জানে, কুন্তলার বিবাহ হইয়াছে—স্বামীর সহিত কোথায় চলিয়া গিয়াছে। তবে ? লতিকা বলিল—“সত্যি ভাই মিনী, তুই যে আবার আসবি, আমরা কেউ স্বপ্নেও তা ভাবিনি !” মাধুরী বলিল—“আমি কিন্তু জান্তুম, ও 'আসবে ! বাপ, মােহিনী- মার্কা ঝােল কি ভূলা যায়? তা ছাড়া, Scientistরাও যে বলে গেছে --Earth is round. ইহাতেও যেন শান্তি আছে ! এই যে হাস্য-চপলা মেয়ে-গুলার সংসর্গ, ইহাতে মনটাকে তবু মুহূর্তের জন্য ভুলাইয়া দেয়,-আর

রুদ্ধ আবেগ
হইবেই বা না কেন? সংসারের কুটীলতা সমস্যা এখনও তত উহাদের
অন্তরে আসিয়া পৌঁছায় নাই।
মণিকা-দিদি বলিলেন—“কুন্তলার কোন খবর জান মিনতি ? বিয়ে
থা কোথায় হ’ল ?
বলিলাম—শুনি নি কিছু দিদি !”
কৈ, এ সময়ে বিথ্যা বলিতে কিছু আটকাইল না ত ! দিব্য
অসঙ্কোচে নিৰ্বিবাদে বাহির হইয়া গেল।
স্নান করিবার ঘণ্টা পড়িয়া গেল। গামছা কাপড় কঁাধে তুলিয়া
লতিকা আমার, ‘সীটে আসিয়া বসিল।
সত্যি ভাই মিনী, এ সব কি করেছিস, বল্ তাে ?”
“কেন রে ?”
এই এত কাপড়, বাউ,যুগ কাটাবি না কি ?”
দূর তা-ও কি কখন হয় ?”
সহসা কে পেছন হইতে বলিয়া উঠিল—“হবে না কেন?—বিয়ে
হলেই হয় !”
পেছন ফিরিয়া দেখি, রেণুকা !
রেণুকার বিবাহ হইয়া
গিয়াছে, স্বামী বিলাতে কৃষিবিদ্যা শিখিতে
গিয়াছেন এবং তাঁহারই আদেশানুসারে রেণুকা বােডিঙে দিন
কাটাইতেছে। লতিকা একটু গম্ভীর হইয়া বলিল—তুই এত
পেয়েছিলি বুঝি ?”
কেন পাব না? এর চেয়ে ঢের বেশী ! এ তাে”

রুদ্ধ আবেগ বা দিয়া বিরক্তভাবে লতিকা বলিয়া উঠিল—“আরে যা যা, ভারী “কি গাে দুষ্টু মেয়েরা সব, ঘণ্টা পড়ে গেছে, শােন নি বুঝি ?” মণিকা-দিদি একটু গম্ভীরকণ্ঠেই কথাগুলি বলিয়াছিলেন, আমার দিকে তাকাইয়া একট, মুচকি হাসিয়া বলিলেন—“কিগাে মিনতি রায় !” তুমি আবার New boardler হয়ে ঢুকলে না কি ? যাও, যাও, শীগগীর করে স্নান করে এস, আজ সব খেয়ে দেয়ে Zoologica! gardenএ যাওয়া হবে। হাঁ, নীচেই যখন যাচ্ছ, দয়ােয়ানকে বলে দিও যে, বেলা দুটোর সময় চারখানা ‘বাস’, যেন ready রাখে ; বুঝলে?” সম্মতি দিয়া নীচে নামিয়া আসিলাম। বাথ রুমে ঢুকিয়া দেখিলাম, সেখানে আমার কথাই হইতেছে। শােভা বলিতেছিল—কুন্তী নেই বলেই বােধ হয় মনটা ওর এত ভারী-ভারী, দুটীতে ছিল ঠিক যেন—এই যে ভাই মিনতি, তােমার কথাই মণি বলছিল ! মণিমালা ঝঙ্কার দিয়া বলিল—“শুধু মণি বলছিল কেন, সকলেই . ত বলছিলে বাপু!” কুন্তলা ! কুন্তী, আজ আমায় যে অন্ধকারে ব্যর্থতার যে নিষ্পেষণে তুই ফেলিয়া গিয়াছিল, তাহা হইতে উঠিবার শক্তি যে আমার আর নাই ভাই। যেখানেই থাকিস ভাই, আজ এ سے۔

রুদ্ধ আবেগ
অভাগিনী দিদির সহানুভূতি তুলিয়া নে !—তাের ব্যথিত চিত্ত পরিতৃপ্তি
লভুক!
তের
সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গিতেই দেখি, প্রতিমা চেয়ারটার উপর পা
ঝুলাইয়া দিয়া • অনবরত বকিয়া যাইতেছে-Charity is the
disposition of the heart which inclines men-6872t styreco
রগড়াইতে বলিলাম—সকাল-বেলাতেই charity, charity কছি
কেন রে প্রীতি ? কবিতা পড়ছি না কি !
আমার দিকে একটা কটাক্ষপাত করিয়া প্রতিমা বলিল,-“কবিতা
পড়তে যাব কোন দুঃখে ! Charityর essay লিখতে দিয়েছেন মিস
বােস্ মনে নেই ?”
“ই, তাই ত বটে! আজ যে শনিবার, সে খেয়ালটা আমার
মােটেই ছিল না, স্কুল বন্ধ থাকিলেও বােডিঙে প্রত্যেক শনিবার
একটী করিয়া প্রবন্ধ ইংরাজিতে পড়া হইত ! যাহারটা সুখ্যাতি
লাভ করিত, সে দিনের জন্য গৌরব লাভ তাহারই হইত ”
প্রতিমা বলিল—“তুমি Charity লিখবে না মীনু-দি?”
হাসিয়া বলিলাম—না ভাই, Charity ফ্যারিটীর দিকে আমার
মন ঘেঁষে না অত।”
নমিতা ষ্টোভ আলাইয়া চা তৈয়ার করিতেছিল, বলিল—“হবে
না কি এক কাপ, মিনুদি ?”

দ্ধ আবেগ
“না ভাই, আজ আর নয়, শরীরটে বড় খারাপ।”
“কোন দিনই-বা তােমার শরীর ভাল থাকে বল ? সােম মঙ্গল
মাথা ধরা, বুধ গুরু জ্বর, শুক্র শনি পেটের ব্যাথা, রবিবারে বুক
ধড়ফড়,কেমন, হয়েছে কি না, বলিয়া প্রতিমা সগর্বের হাসি
হাসিয়া আমার মুখের দিকে তাকাইল ।
শােভা কবিতা লিখে বলিল—“হলাে না’ত প্রতি, শেষ লাইনটা
মিই না যে !”
“কথা কত বেশী হয়েছে দেখছি না?”
সকাল-বেলাটা কোনরূপে কাটাইয়া দিয়া মধ্যাহ্নটা শুইয়া
কাটাইতেছিলাম, মাধুরী বলিল—“শুলে হবে না মীনু দি—অনেক
দিন তােমার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলা হয়নি, নাও, ওঠ।”
“দোহাই ভাই, তাের পায়ে পড়ি, আজকে আর না।”
মাধুরী হাসিয়া বলিল—
“পা ধরে টানাটানি করলে কুন্তলা ছাড়তে মীমুদি! মাধুরী
বােস ছাড়বে না।”
কুম্ভলা ! হাঁ, সত্যই তাে! হতভাগিনী স্নেহ প্রীতি ও
প্রগাঢ় ভালবাসা দিয়া আমায় এমন ডুবাইয়া রাখিয়াছিল যে,
একটী দিনের তরেও তাহার কথার নড় চড়
হইতে পারি নাই।
মেহসিক্ত মিনতির ভিতর তাহার যেন কেমন একটা আদেশ
থাকিত, আর সে দাবী-দাওয়া বােধ করি আমি-ই তাহাকে স্বেচ্ছায়
দিয়াছিলাম !
৬০

ব্ধ আবেগ
মাধুরীর বুকের উপর তাহার মাথা রাখিয়া অনুনয়পূর্ণ কণ্ঠে
বলিল—“কি ভাবছে মীমুদি ওঠো, লক্ষ্মীটী!”
“না, ছাড়িবে না ! মেহের ভালবাসায় মুগ্ধ করিতে ইহারাও
জানে। বাহির হইতেছি, তলব পড়িল শনিক-দির ঘরে।
আমাকে দেখিয়া মনিকাদি বলিলেন—এই যে মিনতি যে ?
কুন্তলারা তােমাদের কেউ হন কি ? তার দাদা তােমার ভিজি-
টর হয়ে এসেছেন। বাও সাত নম্বর ঘরে, বুঝলে ?
কুন্তলার দাদা! অরুণবাবু ? কোনরূপে টলিতে টলিতে বিছা-
নায় আসিয়া শুইয়া
পড়িলাম। আমি কেমন করিয়া তাঁহার
সহিত দেখা করিব ? বাবার কাছে স্বেচ্ছায় যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি,
আজ নিমেষেই যে তাহা টুটিয়া
যাইবার সম্ভাবনা। ওগো, কেন
তুমি আসিলে? এই ত বেশ হাসি-খেলার মধ্য দিয়া, উদ্বিগ্ন অস্থির
চিত্তকে একরূপ বশ করিয়া আনিয়াছিলাম ; কেন তুমি আবার
তােমার ঐ মূৰ্ত্তি লইয়া আমার সম্মুখে আসিলে ?
“দিদিমণি !”
“কে, দরােয়ান!,
“আপকো ভেট কো বাস্তে আদমী বৈঠাল বা !”
“হাঁ, একটু বতে বলগে যাও, যাচ্ছি।”
দৰােয়ান কিছু বুঝিল কি? এ অশ্রুসিক্ত মুখ দেখিয়া আমার
নিভৃত চিত্তের চঞ্চলতা ঐ অশিক্ষিত লােকটী কিছু জানিল কি ?
ছিঃ ! একি করিতেছি ? বাহিরে তিনি আমার অপেক্ষার

রুব্ধ আবেগ
সম্মুখে আয়নায় একবার মুখটা ভাল করিয়া দেখিয়া লই, কি জানি,
যদি এ ক্ষণিক দৌৰ্ব্বল্যের কোন ছাপ তাহাতে লুকাইয়া থাকে !
“এই যে, এসাে, এত দেরী হলাে যে মীনু ?”
এ বিলম্বের উত্তর কি দিব ? তাহা হইলে ত সেই ঘৃণ্য
মিথ্যারই আশ্রয় লইতে হয়, কিন্তু তাহা ছাড়া আর উপায় কি ? অন্তরে
যাহার হীনতার রাণীগুলি জমাট বাঁধিতেছে, বাহিরের সামান্য একটা
মিথ্যাতে তাহার অধিক ক্ষতি কি হইতে পারে ?
বলিলাম—“ব্যাড মিন্টন খেলা হচ্ছিল, খপর পাইনি।”
কৈ, গাউণ্ডের কাছ দিয়ে এলুম, তােমায় ত দেখতে পেলুম না?”
এবার কি বলিব ? মুখ দিয়া অস্ফুট কণ্ঠে বাহির হইল—“বােধ
হয়, দেখতে পান নি।”
চোখ দুইটী তাহার জ্বলিয়া উটিল, দীপ্ত অথচ স্নিগ্ধস্বরে বলিলেন –
কে,—আমি ? এ কথা বিস্বাস হয় তােমার মিনতি ? শুধু ঐ কজন
কেন—অসংখ্য ভিড়ের মধ্যে থাকলেও দূর থেকে আমি আমার
মিনুকে চিনে নিতে পারি।”
“আমার মিনু ? সমস্ত শরীরটা সহসা আমার কঁপিয়া উঠিল,
ছিঃ, বাহির হইতে কেহ শুনিয়া ফেলিল না’ত?
কুন্তলার কিছু খবর পেলেন ?”
মিনু, খবর কিছুই পাই-নি—আর না পেলেও বােধ করি
কিছু ক্ষতি হবে না। মীনু ?”
আবার সেই স্বর—যাহার মৃদু ঝঙ্কারে একদিন সমস্ত হারাইয়াছি,

রুদ্ধ আবেগ যাহার কোমলতার সুর অন্তরের প্রতি তন্ত্রীটীকে কঁপাইয়া দিয়াছিল । “আর কতদিন এখানে থাকতে হবে, লক্ষ্মীটী !” ধীরে ধীরে বলিলাম—“তার ত এখনও কিছু ঠিক নেই অরুণ- বাবু! বােধ হয়, এ বছরটা থেকেও যেতে পারি।” ইস, বড় রােগা হয়ে গেছ তুমি মিনু, কিছু খেতে টেতে দেয় না এরা, নয় ?” মৃদু হাসিয়া বলিলাম-“তা দেয়।” আরও অনেক কথা হইল, শেষে তিনি আমার মুখের দিকে তাকাইয়া বলিলেন—“আর কিন্তু তােমায় ছেড়ে আমার থাকতে ইচ্ছে করছে না মীনু ! ছিঃ, ভিজিটিং রুমে বসিয়া এ সব কথা কহিতে লজ্জায় মাথাটা যেন আমার নীচু হইয়া আসিতেছিল, এই এতগুলি মেয়ে—যদি কাহারও কাণে যায় ! ছিঃ, ভাবিতেও গা কেমন করে ? অরুণবাবু বলিতেছিলেন—“জানি না মী, কোন শুভ মুহূর্তে তােমায় দেখেছিলুম। সেই দিন থেকে মনের সমস্ত অশান্তি গ্লানি আমার ধুয়ে মুছে গেছে! কেবল নির্জন বেলাতটে একখণ্ড শুভ্র স্তরের মতই সেখানে পড়ে আছে তােমার স্মৃতি, তােমার সৌন্দৰ্য্য, তােমার হাসিমাখা মুখখানা—আর কিছু নয়।” নীরবে আরও কয়েক মিনিট কাটিল, অরুণবাবু বলিলেন—“তবে আজ উঠি ।

রুদ্ধ আবেগ - ‘মৗধু ওকি! কঁছ? ছিঃ, আবার আসবাে।” ওগাে হৃদয়ের দেবতা, এ ক্রন্দন ব্যথায় ঝরে নাই—দুঃখের পীড়নে আসে নাই, এ আসিয়াছে তােমারই এই প্রশান্ত দেবমূৰ্ত্তিকে অভিনন্দন দিতে।” যাইবায় সময়ে আমার হাত দুইটী চাপিয়া ধরিয়া তিনি বলিলেন- “জেন মীনু, বিশ্বসংসার' ওট-পালট হয়ে গেলেও তুমি আমার, আর আমি তােমার। অভাগিনী আমি-- স্থিরদৃষ্টিতে কম্পিত পদে দাঁড়াইয়া সমস্ত শুনিলাম,"ফন চমক ভাঙ্গিল, অরুণবাবু নাই! লতিকা বলিতেছে, “এখনও দাড়িয়ে কেন মীমুদি, চল রুমে যাই।” চৌদ্দ তােমারি মাঝে এমনি করে নবীন করি লও গাে মােরে- এই জনমে ঘটালে মাের জনম জনমান্তর- সুন্দর হে সুন্দর। গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ী আসিয়াছি! বাবা বলিলেন-“চল মীনু, গরমটা বাইরে কোথাও কাটিয়ে আসি-কি বলিস?” “কোথায় যাবে, বাবা ।” ৬৪ রুদ্ধ আবেগ “তাের মামার বাড়ী যাবি?হাজারিবাগে।” মামার বাড়ী ?-অভাগিনী মায়ের স্মৃতি-মন্দির-পবিত্র পুণ্য- তীর্থ ! বলিলাম—তাই চল বাবা, সেই ভাল।” বহুদিন—বহুদিন পরে আবার চলিয়াছি সেই স্থানে-যেখানে জন্মলাভ করিয়া, যে স্থানের জল বায়ু—আমার ক্ষুদ্র অসমর্থ দেহের পুষ্টি সাধন করিয়াছিল। রণেনবাবু আজ মাসখানেক হইল ‘মাইনিং’ পড়িবার জন্য ইথােরায় গিয়াছেন, যাইবার পর মাত্র একখানি পত্র তাহার নিকট হইতে আসিয়াছে, তাহাও আমাকে নয়, বাবাকে নিবিয়াছেন। চিঠির একস্থানে লিখিয়াছেন—“মানুষের মন চায়—তৃপ্তি, মানুষের প্রাণ চায়—আকাঙ্ক্ষার পূরণ; অন্তরের অন্তরতম পুরুষটী চায়—ভাল- বাসা! কিন্তু কাকাবাবু আজ সে সমস্তই আমার কাছে আকাশ- কুসুমের মত হয়ে উঠেছে! তৃপ্তি, ভালবাসা, সুখ আমায় ইহজীবনে নাই। আর আমিও আর আমিও বােধ হয় এখন তা চাই না, আমার মন এখন চায়-কৰ্ম্মজীবনের মধ্য দিয়ে কোন রকমে দিনগুলি কাটিয়ে দিতে! সে-ই এখন আমার সুখ, তৃপ্তি পাওয়া না পাওয়া সব। এখানে এসে অবধি শরীরটে বড় ভেঙে পড়েছে—খাটুনী বড় বেশী আপনি কেমন আছেন জানাবেন। মিনতি’র লেখাপড়া কেমন চলছে লিখবেন।” ভগ্নহৃদয়ে-ব্যর্থতার বােঝাকে নিজের পিঠের ওপর চাপিয়ে নিয়ে যে চলিয়া গেছে, সত্যই তাে তার জীবনে তৃপ্তি সুখ,-এই

রুক আবেগ
সমস্ত ভূয়াে বাক্য-নৈরাশ্যপূর্ণ অন্ধকারাবৃত! কিন্তু সে জন্য দায়ী
কে ? তিনি নিজেই নহেন কি ?
মামার বাড়ী পোঁছাইতেই একটা হুলস্থুল পড়িয়া গেল, বড়মামা
বলিলেন—কিরে পাগলী, মনে পড়লাে, এ বাড়ীর কথা? আমি বলি,
বুঝি ভুলেই গিয়েছি।
মামি-মাদের আনন্দ আর ধরে না। ভাগ্নীটাকে লইয়া তাহারা
কি করিবেন—কোথায় লুকাইয়া রাখিবেন খুঁজিয়া পান না, ছােট
মামি-মা আমাকে বুকের ভিতর চাপিয়া ধরিয়া সুর করিয়া গান
ধরিলেন
এমন রূপের ডালি নিয়ে, লুকিয়েছিলি
কোন্ বনে-কোন্ বনে-
আহারে বসিলে দিদিমা বাবাকে বলিলেন—“তা মেয়ের বিয়ের
কি বন্দোবস্ত কলে বাবা?”
“তেমন ছেলে আর পাচ্ছি কৈ, বলুন মা !আর তা ছাড়া,
পড়চে যখন, পড় না। হিন্দুর ঘরের মেয়ে নয় তাে যে, গৌরীদানের
ফল নেবার জন্যে লাফালাফি করতে হবে !”
“কি পড়চে এখনও ?”
“এইবার তাে ম্যাট্রিকুলেশন্ ক্লাসে উঠলাে!—একটা বছর মাত্র
আর বৈ ত নয়।”
দিদিমা বলিলেন,-‘মিনীর-আমার মুখখানা হয়েছে ঠিক তার মায়ের
মতন! আহা, মা-হারা দিদি আমার ।
৬৬

রুদ্ধ আবেঃ “সেই যখন দু' বছর বয়স, তখন দেখেছিলুম, আর চোদ্দ বছর পরে আবার এই দেখলুম!” বাবা বিস্মিত হইয়া বলিলেন- কেন, আর দেখেন নি ?” “দেখলুম আর কৈ বাবা ? সেবার ওর মা যখন এসেছিল, ও ত তখন তােমার কাছে—আগ্রায় ! তারপর সেবার উৎসবের সময় ? সে-ও তাে তুমি ওকে নিয়ে গিরিডি না কোথা গিছিল ! আর দেখলুম, কোথা বাবা ?” সন্ধ্যার সময় মামীরা ধরিলেন—অর্গান বাজাইয়া একটা গান গাহিতেই হইবে ! এই যে এতদিন ধরিয়া ৰােডিঙে থাকিয়া বৎসরের পর বৎসর কৃতীত্বের সহিত সঙ্গীত-শিক্ষায় প্রাইজ পাইয়া আসিতেছি, তাহার নমুনা এখানে দিতেই হইবে । বলিলাম-“সব ভুলে গেছি মামী মা!” “তা সেই ভুল-ই গাও দেখি? ভুলই শুনব আমরা !” কোন আপত্তি টিকিল না, একি মহা সমস্যায় পড়িলাম ! হাঁ, আর একদিন ঠিক এমনি পড়িয়াছিলাম কুন্তীদের বাড়ীতে । কুন্তলার বৌদিদি-ও কোন আপত্তি গ্রাহ্য করেন নাই, বিশেষতঃ অরুণবাবুর সুন্দর অনুরােধ ! “কৈ, গাও মীনু !” বড়-মামীমার একমাত্র কন্যা সুরমা বলিল—“আমি অর্গান বাজাচ্ছি, তুমি গাও দিদি।” ৬৭

বন্ধ আবেগ
সুরমা আমারই সমবয়স্ক—এই দিদি সমােধনটা তেমন মিষ্ট লাগিল
, বলিলাম—তুমি বাজাতে পার সুরমা ?”
“মােটেই না। তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি ! তুমি গাও তত?”
আপত্তি টিকিল না আদৌ। সুরমা বলিল—“একটা রবিবাবুর গান
গাও মীনু দি-আমি বাজাই।”
শেষে বাধ্য হইয়াই গাহিতে হইল, সুরমা চাপাফুলের মত আঙ্গুল
গুলিকে রীডের উপর নাচাইয়া নাচাইয়া বাজাইতে লাগিল -
আসবে পথে আঁধার নেমে
তাই বলে কি রইবি থেমে,
ও তুই—বারে বারে জাবি বাতি
হয়ত বাতি জ্ববে না।
তা বলে ভাবনা করা চলবে না ।
সম্মুখে শিথিল কালাে আঁধারের বুক চিরিয়া সে সুর বাহিরে
গিয়া মুক্ত বাতাসের বুকে লুটাইয়া পড়িতেছিল, তাহারই এক একটা
ঝঙ্কার আসিয়া হৃদয়ের সমস্ত ব্যর্থতাকে যেন সুদৃঢ় করিয়া সহ-শক্তি
দিতেছিল, অপলুকনেত্রে আমার মুখের দিকে তাকাইয়া সুরমা বাজাইয়া
চলিল—
বদ্ধ দুয়ার দেখলি বলে
অমনি কি তুই আসবি চলে,
তােরে বারে বারে ঠেলতে হবে-

রুদ্ধ আবেগ
হয়ত দুয়ার খুলবে না,
তা বলে, ভাবনা করা চলবে না !
জানি না, কত যুগ যুগান্তর ধরিয়া এমনি কাতরভাবে প্রিয়তমের
সুন্দর প্রতি-মন্দিরের দুয়ার ঠেলিতে হইবে। কত পল দণ্ড—যুগে
যুগে সে উদ্যম লইয়া দ্বার উন্মােচনের জন্য সমস্ত চেষ্টাকে প্রয়ােগ করিতে
হইবে ! পথের মাঝে অন্ধকার দেখিয়া ক্ষান্ত হইলে চলিবে না, তাহার
মধ্যেই যে সাফল্য।
“ও কি, কঁচো কেন মীনু ?”
“সত্যই তাে এ কি করিতেছি ? পােড়া অশ্রু কি স্থান কাল মানে
—এত লােকের মাঝে । ছিঃ !”
সুরমা বলিল—“কি বচো কাকীমা, রবিবাবুর গান শুনে কাঁদেনি
এমন লােকই নেই। যেমন গান—তেমনি সুর।”
“দিদি !”
“কে, সুধীর ?—আয় না, ভিতরে আয়।”
“এ নাম পূর্বে কোথায় শুনিয়াছি না? বাহিরে আসিয়া মামীমাকে
চুপি চুপি বলিলাম—“ইনি কে মামীমা ?”
“কার কথা বলছি, সুধীর ?—ও, এই পাড়াতেই থাকে।”
“বেশ ছেলে। কি করেন বল তত ?”
“কেন রে, সম্বন্ধ করবি না কি? তা, ওর আগেই হয়ে গিয়েছে
লাে।”
মুখ ঈষৎ বিকৃত করিয়া বলিলাম-“যাঃ, জিজ্ঞেস করলেই

রুত্ব আবেগ মামী-মা বলিলেন, “না-রে পাগলি, ঠাট্টা নয়, এখানে মিত্তিরদের বাড়ী কাজ করে, তিরিশ টাকা করে পায়। সংসারে স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই ওর।” “বিয়ে হয়েছে কোথায় ? বাধা দিয়ে মামী-মা বলিলেন—“সে কি আর ঠিক বিয়ে হয়েছে। রেজেষ্টারী হয় নি মােটেই।” এ কি! এ যে সমস্তই মিলিয়া যাইতেছে। কুন্তীকুন্তল তবে কি ইহারই নিকট আছে ?” বলিলাম—“ও'র স্ত্রীর নাম কি কুন্তলা, মামীমা ?” বিস্মিতনেত্রে আমার মুখের দিকে তাকাইয়া মামী-মা বলিলেন- “তুই কি করে জালি মীনু, এ! ইস্, বড় অভাগিনী রে, বড় দুঃখিনী। হিন্দুর মেয়ে—কি আর কবে ? তা, তুই তাকে জালি কি করে মিনু ?” “এই যে, বড় বৌদিদি যে? ইনি ?” মামী-মা হাসিয়া বলিলেন—“বাঃ, বেশ লােক ত তুমি ঠাকুরপাে, এ তােমার সমস্ত কথা বলতে পালে, আর তুমি—ছিঃ ছিঃ ঠাকুরপাে?” তিনি বিস্মিত হইয়া আমার মুখের দিকে তাকাইতেই মামীমা হাসিয়া বলিলেন—“তােমার কুন্তলাকে জিজ্ঞেস কর ঠাকুরপাে, মিনতি রায়কে চেনে কি-না?”—কাণ দুইটা তখন আমার অসম্ভব রকম গরম হইয়া উঠিয়াছিল। ৭০ পনের কুন্তলা বলিতেছিল—স্বপ্নেও ভাবিনি মীনু, সুদূর বাংলার সীমানা ছেড়ে এসে, আবার হাজারীবাগে তাের দেখা পাব ! কত দিন কত রাত্রি এই ছিন্ন, মলিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে তােদর কথা ভেবেছি, বাড়ীর কথা ভেবেছি, বাের্ডিংএর কথা ভেবেছি,—চোখ দুটো জলে ভরে এসেছে! বৌদিদিদের কথা ভেবেছি, দাদার কথা ভেবেছি- জানি না ভাই, তাদের কাছে যে অপরাধটা করেছি, এ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত আছে কিনা? কিন্তু কি করবাে-আমরণ যন্ত্রণা সহ্য করে আত্মঘাতী হওয়ার চেয়েও এই চির নির্বাসনকে স্বেচ্ছায় তুলে নেওয়াই শ্রেয় মনে হলাে, তাই বিয়ের দিন সন্ধ্যাবেলাতেই এর সঙ্গে চলে এলুম ! কুন্তলা নীরব হইল, গােধূলীর রঙীন আলােক তখন গাছের পাতায় পাতায় অপূৰ্ব আলােকের সৃষ্টি করিয়াছিল ; মলয় বাতাস আসিয়া চারিপাশে আপনার সুবাস ছড়াইতেছিল। কুন্তলা আবার বলিল- এই যে দেখছিস্ চারিধারে দারিদ্র্যের ছাপ, অভাবের শত চিহ্ন, মাঝেও আমি সুখে আছি অনেকটা, যতটা বােধ হয় আমি সেই অতুল ধনবানের ঘরেও পেতুম্ না ! কেন, কে জানে! কাল রাত্রে আমাদের এমন অবস্থা হয়েছিল যে, পেট ভরে ভাল করে দুটা খেতেও পাই নি ! কঁদিস্ নি মিনী, এ-ও যে আমাদের সুখ • ভাই! ৭১ .

রুদ্ধ আবেগ “কুন্তী !” “না মীনি, তুই এখনও জানি না, এ ভালবাসা জিনিষটা কি ? আগুন দেখেছিস্? দেখতে বেশ সুন্দর-উজ্জল, কিন্তু সে-ও আবার পুড়িয়ে মারে। মীনি ?” তাহাকে বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরিলাম। “কেন ভাই?” “এ পর্যন্ত কাউকে তাের পছন্দ হয়েছে ? ভালবেসেছিস্?” এ কি প্রশ্ন ?—এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যে আমার অবশ শিথিল শক্তির বাহিরে গােয় কে ভাই তিনি! দাদা? “চমকে উঠলি যে কুন্তী! আজও জানি না কুন্তী, তাের দাদা আমার অন্তরের কতটা স্থান অধিকার করিয়াছে ! সূচীভেদ্য অন্ধকারে ক্ষীণ আলােক-রেখা পাইলে ভ্রান্ত পথিক যেমন লাফাইয়া উঠে, কুন্তলাও তেমনি শিহরিয়া উঠিল। “হিন্দু হতে পাবি, মীনি ? ভেবে দেখ দিদি খুব ভাল করে, শেষে সব যেন হারাস নি, পাবি ?” “তুই এ কথা কেন জিজ্ঞেস করছিস্ কুন্তী ?” “না না, ভুল হয়েছে দিদি, ক্ষমা কর!” দুই হাতে আবেগের সহিত কুন্তলা আমায় জড়াইয়া ধরিল, কয়েক ফোঁটা তপ্ত অশ্রুবিন্দু বুঝি মিলন- অভিষেকের শান্তি-বারি আনিয়া দিল । ওগাে নৈশগগনের উজ্জ্বল দেবতা, দীপ্তচক্ষু মেলিয়া আজ চাহিয়া } ৭২ রুদ্ধ আবেগ দেখ, ইহার চেয়েও পবিত্র স্নেহ ভালবাসা ধরিত্রীর বুকে কখনও স্থান লভিয়াছে কিনা? সত্যই তাে, এই যে আপনার মান, গৰ্ব্ব, আত্মীয়—সমস্ত ছাড়িয়া শুধু আপনার প্রিয়সমগ্র জগতের চেয়েও প্রিয় বস্তুটী লইয়া যাের দারিদ্রকে বরণ করিয়া লইয়াছে, কৈ, তাহাতে ত নারী এতটুকু দুঃখিত হয় নাই, বরং স্বামীগর্বে অন্তর তাহার উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। কুন্তলা বলিল—“আচ্ছা মীনু, স্বামীর চেয়েও আর কাউকে বেশী ভালবাসা যায় না, নয় ?” তাহার গাল দুইটা টিপিয়া দিয়া বলিলাম—“দর পােড়ারমুখী, ও কথা মনে আনাও যে পাপ।” “সত্যি মীনু, আমারও তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, ভাবি, সমস্ত সংসার উলট পালট হয়ে গেলেও আমি যেন আমার স্বামীর পায়ে মাথা রেখে মরতে পারি! এখনও মাঝে মাঝে ভাবি, এই স্বামীর জন্যে মাকেও ছেড়েছি মীমু, কিন্তু তিনি কি আর আমাকে ক্ষমা করবেন ?” তা ছাড়া, উপায় আর ছিল না যে ভাই।” কুন্তলা চুপ করিল, সন্ধ্যার বিষাদজড়িত স্নান-আঁধারকে বরিয়া লইবার জন্য শঙ্খধ্বনিতে চারিদিকে ভরিয়া উঠিয়াছিল। “কুন্তী !” আমার এ সহসা আহ্বানে কুন্তলা চমকিয়া উঠিল। বলিলাম- “লক্ষ্মী দিদিটী—যা দিচ্ছি, উপেক্ষা করিস নি, নে ভাই!” কুন্তলার চক্ষু দুইটা জ্বলিয়া উঠিল—‘সাহায্য দিচ্ছ মীনু ! না १७

রুক আবেগ
ভাই, মরে গেলেও আজ তা নিতে পাবে না, এ দারিদ্রকে যখন
স্বেচ্ছায় মাথায় তুলে নিয়েছি, তখন তার ফলভােগ করূতে দে ভাই,
তা-ও যে আমার কাছে মিষ্টি ! রাগ করলি দিদি ?”
জোর করিয়া বলিলাম-“এ দান নয় কুন্তী, মনে কর, তােদর
বিয়ের
“হাঁ, তাহলে নিতে পারি মীনু-দিদি ! কিন্তু এ দারিদ্র্য দেখে
সাহায্য তােমায় করতে দেব না।”
“কুন্তী, কুন্তলা ! জানি না ভাই, আজ যে শিক্ষা তাের দিদিকে
দিলি, সে শিক্ষার মূল্য কত, গৌরব কত ?”
কুন্তলা বলিল—“তাের মামার বাড়ী থেকে গাড়ী এসেছে ভাই।
নে, এইটে শুধু মুখে দিয়ে যা ! কিন্তু পেট ভরবে না মােটেই!”
“বিদুরের ক্ষুদ কুঁড়ােতে পেট কার-ই বা ভরে বল্ ? চিঠি লিখি
ভাই, বুঝলি ?—হাঁ, বাের্ডিঙে !”
বাড়ী ফিরিতেই মামীমা বলিলেন, “কি, বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলাে,
মিনতি। খাওয়ালে কি ?”
সুরমা কথা কাড়িয়া বলিল—“সন্দেশ, রসগােল্লা, রাজভােগ।”
একটু গম্ভীর ভাবে বলিয়া ফেলিলাম—“না সুরমা, তার চেয়ে বড়
জিনিষ, সন্দেশ রসগােল্লা তার কাছে ঢের তেঁতাে।”
৭৪

যােল
আমায় যদি না-দেখা দাও
কর মােরে হেলা
কেমন করে কাটবে আমার
এমন বাদল-বেলা।
ওগাে আমার অন্তরাত্মার একমাত্র আরাধ্য-দেবতা! এই পরিত্যক্ত
জীবনটাকে তােমার সুন্দর কোমল পায়ে আশ্রয় দিয়া এ নগণ্য অন্তরকে
সফল করিয়া তােলধন্য কর ! শত বিষাদ-জড়িত অন্ধকার ভরা
পথের মাঝে সুখপূর্ণ আলােকজ্যোতিঃ ছড়াইয়া দাও। আঃ, ইহাতেও
যেন শান্তি আছে।
এই ত দেখিতে দেখিতে পনেরটা দিন কাটিয়া গেল। হাজারি
বাগ হইতে চলিয়া আসার পর কুন্তলার কাছ হইতে মাত্র একখানি
পত্র পাইয়াছি। হতভাগিনী তাহার দেবতার জন্য যে আত্ম বিসর্জন
দিয়াছে, তাহার সাফল্য কতদুর সুন্দরভাবে তাহাতে দেখা দিয়াছে
তাহাই লিখিয়াছে—আরও লিখিয়াছে যে, আত্মবিসর্জনের ভিতর
উৎকণ্ঠা আছে, সন্দেহ ও ভীতির চিহ্ন আছে—তাহার আশা করা
বৃথা!
ছোট পড়িবার ঘরটীতে বসিয়া এই সব ভাবিতেছিলাম। কোন
সুদূর কল্পনা হইতে ধীরে ধীরে একটী মহা অভিনয় সংঘটিত হয়—
৭৫

রুদ্ধ আবেগ ? অস্পষ্ট স্মৃতি পরিয়ে ধীরে ধীরে কেমন করিয়া গােপনে একটী সুদৃঢ় আত্মীয়তা সৃষ্টি করে, তাহা প্রথমে কেহই জানে না! হায় রে অজ্ঞাত মূঢ় জীবন! মরীচিকা লক্ষ্য করিয়া তুমি ধাবমান হও—সত্য আলােকের সহিত তােমার পরিচয় কোথায় ? এই যে এক দুই করিয়া পনেরটা দিন কাটাইয়া দিলাম, এই যে ধীরে ধীরে পরিস্ফুটতা মলিন হইয়া দেখা দিল, কৈ, ইহার মধ্যে আপনার প্রাপ্য দুঃখপূর্ণ সমস্যা লইয়া ত বিচার করিলাম না! কুন্তলা যে সেদিন হঠাৎ বলিয়া উঠিল যে, স্বামীর চেয়ে আর কাহাকেও ভালবাসা যায় কি-না?—এ কথার সত্য উত্তর কে দিবে? নির্ভীক সত্যকামী উন্নহৃদয় ? হ, তাহা পারে বটে, কিন্তু যে স্থানে একটা বাধ্য-বাধকতার ভিতর দিয়া একজনকে স্বামীত্বে বরণ করিয়া লইতে হয়, যেস্থানে অন্তরের আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে সে বরণকে অগ্রাহ্য করে, সেস্থানে সে স্বামীত্বের মূল্য কি ? ওগাে, ভালবাসা তাহাকে দৃঢ়চিত্ত হইয়া অর্পণ করা যায় কি করিয়া ? নারী! সমস্ত জগতের দুর্বলতা, অক্ষমতার সার হইতেই বুঝি এই নারীত্বের সৃষ্টি দূর ছাই, এ সব কি ভাবিতেছি ? চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া পড়িলাম, কিন্তু কোথায় গিয়া এ চিন্তার হাত হইতে রক্ষা পাইব? চারিদিকেই যে তাহার রক্তদৃষ্টি আমায় ঘিরিয়া ফেলিয়াছে! কেমন করিয়া এ দীপ্ত উজ্জ্বল “মীমু!” ১ ৭৬ রুদ্ধ আবেগ চমকিয়া উঠিলাম। পেছন ফিরিয়া দেখিলাম, রণেনবাবু দাড়াইয়া চক্ষে সেই সরস দৃষ্টি, মুখে সেই কোমলতা—কয়েকটী মাসের মধ্যে তাঁহার মুখের সৌন্দর্য যেন চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। “অসময়ে হঠাৎ দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গেছ, না মীনু ? আমার আবার কিছুই ঠিক ছিল না, কলেজ বন্ধ হতে, কি মনে হলাে জানি , কালই বেরিয়ে পড়লুম, বাড়ীর সব ভাল ত?” এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করিলাম, কিন্তু ভিতর হইতে কে যেন তাহার সমস্ত বল প্রয়ােগ করিয়া সজোরে আমার জিহ্বা টানিয়া: রিল ! ওগাে, তাহাকে দমন করিবার শক্তি আমার কই, কোথায়—কে দিবে ? আমতা আমতা করিয়া বলিলাম—“নীচে বাবা আছেন- “হ মিনতি, তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, ওপরে এসেছি 'তােমার সঙ্গে দেখা করতে।” বজ্রের মতন গম্ভীর হইয়াই তাহার স্বরটা আমার কাণে আসিয়া বাজিল। এ রুদ্র-বাণী, কৈ, কোনদিন ত তাঁহার মুখ হইতে শুনি নাই, এত কোমল, এত ধীর অথচ এত গম্ভীর। আমার মুখের দিকে তাকাইয়া তিনি বলিতেছিলেন—“শুধু দেখা করতে আসি নি মীরু তােমার সঙ্গে! এসেছি—আমাদের জীবনের মাঝখানে যে মহা সমস্যা আজ সুদৃঢ় পাঁচিলের মত এসে দাঁড়িয়েছে, তারই বিচ্ছেদ করতে! সে বাধা একটা কালাে মেঘের মত ঘনীভূত ৭৭ রুদ্ধ আবেগ হয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ আকাশকে কালাে করে দিয়েছে, শান্তি ও ভালবাসা দিয়ে আবার সেই আকাশকে আমি রঙিয়ে দিতে চাই মীনু । তবে তার প্রধান উপায় তােমার হাতে মীনু।” এ কি গুরু কম্পন, এ কি চাঞ্চল্য আমার মূঢ় দুৰ্বল হৃদয়ে তুমি জাগাইয়া দিলে প্রভু ? আমি যে আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না ইহার জন্য । চুপ করে থেক না মিনতি, কারণ সময় আমার খুবই অল্প, আজই আমি গিরিডি চলে যাচ্ছি ! আমি কেবল আজ জানতে চাই, তুমি আমি তােমার যােগ্য কিনা? বল মিনতি, আজ তােমার উত্তরের ওপর আমার ভবিষ্যৎ জীবনের সুখ-দুঃখ সব নির্ভর করছে।” নারী আমি, বিধাতু, অভিশপ্ত লাঞ্ছিত জীব ! জগতের সমস্ত অধিকার-হারা কামনা-হারা নারী ! তাহারই আজ একটী কথার উপর পূর্ণ অধিকারগত একটী পুরুষ-জীবনের ভবিষ্যৎ সুখ-দুঃখ নির্ভর করিতেছে! ওগাে, কেমন করিয়া এ কথা আজ বিশ্বাস করিব ? কিন্তু, কিন্তু স্বেচ্ছায় যাহার সুন্দর মূর্তি দেখিয়া আপনার সমস্ত অধিকার সমস্ত কামনা বিলাইয়া দিয়াছি, কেমন করিয়া ওগাে,-না না, এ ক্ষীণ দুৰ্বল জীবনে তাহা পারিব না! তাহা হইলে শুধু আজ নয়, কাল নয়,—আজীবন, আমরণ একটা বিশ্বাসঘাতকতার তীক্ষ্ণ কণ্টককে বুকে লইয়া বেড়াইতে হইবে। “তাহলে আমাকে এমনই চলে যেতে হলাে মিনতি! তবে জেনাে, এ জিজ্ঞাসা, এ মহা সমস্যার সমাধান করতে আমি স্বেচ্ছায় তােমার কাছে আসিনি, তােমার বাবার আদেশেই ৭৮ রুদ্ধ আবেগ সহসা তিনি চুপ করিয়া গেলেন, এক একটী স্বর তাহার—আমার অন্তরে গিয়া যে বিদ্রোহের সূচনা করিতেছিল, তাহার ঘাত-প্রতি- ঘাতে বুকের এক একখানি পাঁজরা যেন তাহারই আঘাতে ভাঙ্গিয়া পড়িতেছিল। কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া আবার তিনি গাঢ়কণ্ঠে বলিলেন- “আচ্ছা, আসি তা হলে মিনতি, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তুমি সুখী হও এর বাড়া বার আমার আর কিছু নেই, আর বােধ করি, তার অধিকারও নেই। গিরিডি থেকে কবে কোথায় যাব তার ঠি নেই, তবে এখানে আসা আমার বােধ হয় এই শেষ।” ওগাে অন্তরের মৌন-দেবতা, এ কি সুদৃঢ় সুকঠিন অস্ত্র দিয়া আমার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করিয়া দিলে ? ফিরে এসাে, ওগাে ফিরে এসাে!—আজ এ তীব্র অভিমান হইয়া পুরুষ তুমি কোথায় ছুটিয়া যাইবে ? এসাে—জোর করিয়া আজ এ নারীর অন্তর শত আঘাত প্রতিঘাতে চূর করিয়া দাও ! কিন্তু কোথায়, কেমন করিয়া–না, —রণেনবাবু? এসাে ভাই, আমার এ তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে আজ চূর্ণ করিয়া দাও! ইস্! “মীনুদিদি!” “কে, মনীষা, আয় ভাই।” ৭৯ সতের স্কুল খুলিতে আর মােটে দশটা দিন বাকী। সংসারের অশান্তি দুৰ্বল অন্তরের কাছ হইতে এবার বােধ হয় মুক্তি পাইব, সরল পথ চিনিয়া যে অনন্তের পথের দিকে এক পা এক পা করিয়া অগ্রসর হইতে পারে, জীবনে তাহার ভয় কি ?—সত্যই যাহাকে প্রাণ দিয়া ভালবাসিয়াছি, ভাল হউক, মন্দ হউক তাহাকেই আমার অন্ধকার ভবিষ্যতের ‘আলােক-দণ্ড বলিয়া মানিয়া লইতে হইবে! তবে ? কোথায় রহিল আমার স্বাধীনতা, আর কোথায় রহিল আমার ইচ্ছাশক্তি? ঘুরিতে ঘুরিতে আবার ত সেই কর্তব্য-পূর্ণ বাধ্য- বাধকতার ভিতর আসিয়া পড়িলাম ! কুন্তলা লিখিয়াছে, ছয়টী মাসের মধ্যেই তাহাদের সংসারে ভগবান-প্রেরিত একটী অতিথি আসিতেছে। সূখী হউক, চিরশান্তি আসিয়া তাহাদের সংসারের ভিত্তির সহিত মিশিয়া যাউক, ভগবানের নিকট আমার ইহাই একমাত্র প্রার্থনা, আন্তরিক ইচ্ছা। কুন্তলার ছেলে হইবে, সংসারের সব চেয়ে বড় দায়ীত্ব এবার সে হাতে পাইল। নারীত্বের সাফল্য-নারীত্বের গৌরব এই স্থানে। মা হওয়ার চেয়ে নারীর আর কি সুখ থাকিতে পারে? মাতৃত্ব- আগীয় পবিত্র প্রাতির পরিচয়।

রুদ্ধ আবেগ সুধীরবাবুর সহিত ক্ষণিক পরিচয়ে যে সুখ পাইলাম—হাঁ, গর্ব করিবাব বটে! অমন স্বামী পাওয়া গৌরবের বিষয়, অমন ভাই পাওয়া গৌরবের বিষয়—কি স্নিগ্ধ উদার ব্যবহার। আজ কয়েক দিন ধরিয়া শরীরটা এত খারাপ ঠেকিতেছে। কে, মনীষা! আয়, ভেতরে আয় ! দারিদ্রের তীব্র অভিশাপকে স্বেচ্ছায় মাথায় তুলিয়া সংসারে বিশৃঙ্খলতাকে যদি কেহ বরণ করিয়া থাকেন ত—এই মনীষার বাবা! ছিঃ, অসৎচরিত্রের আবর্তনে আপনাকে ফেলিয়া যে দুঃখ কষ্ট তিনি সংসারে বসাইতেছেন, আহা, দেখিলেও কষ্ট হয় । মনীষা সেদিন বলিয়া ফেলিয়াছিল, তাহার বিবাহের জন্য তাহার মা রােজই কাঁদেন, কত দেবদেবীর নিকট মাথা খুঁড়েন, কিন্তু হা রে! অদৃষ্টে যাহার দুঃখের—বিপদের বােব বহন আছে, মুক্ত থাকিবে তাহারা কি করিয়া ? “মনীষা।” ডাক শুনিয়া মনীষা বােধ করি চমকিয়া উঠিয়াছিল, করুণ অথচ উদ্বেগপূর্ণ দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল। “তঁাদের ওখান থেকে আর কোন খবর এসেছে, শুনেছ ?” মনীষা চুপ করিয়া রহিল, সমস্ত মুখটা সহসা সিদুরের মত লাল হইয়া উঠিল। “তা হলে হয়েছে মনীষা ?” মুখ নীচু করিয়া অস্ফুটকণ্ঠে মনীষা উত্তর দিল—হয়েছে।” ৮১

রুদ্ধ আবেগ
স
“হয়েছে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা কর বােন—এইখানেই যেন
সুখী হতে পারিস ? বল মণি, এ বিয়েতে তাের বাবার মত আছে ত?”
“কিন্তু আমরা যে বড় গরীব, মীনু-দিদি !” মনীষার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ
হইয়া আসিল।
গরীব ? হা তাই ত! এক পয়সার সংস্থান আজ যাহার নাই,
কেমন করিয়া সে এই মহা-দায়ীত্বের ভারকে কঁাধে তুলিতে সশ্নত হয় ?
হারে অভাগী, এ কি বিড়ম্বনা তাের ?
“উপায় ?”
মাথা নীচু করিয়াই সজল চোখে মনীষ বলিল—“উপায় ভগবান
মীমুদিদি, এখানে না হলে
বাধা দিয়া বলিয়া ফেলিলাম—“তােমার বাবা বাড়ী আছেন মনীষা ?
আচ্ছা, শীগগীর একবার তাঁকে আসতে বল না ভাই, নীচেকার ঘরে।
বুঝলে?”
আঃ! ইহাতেও যেন আরামের একটা ধারা আসিয়া সমস্ত
অন্তরকে জুড়াইয়া দেয়, কিন্তু এ কি—একটা ?-প্রতিদিন কত
হতভাগ্য দারিদ্র্যের কবলে পড়িয়া মরণের কোলে মাথা পাতিয়া
দিতেছে, তাহার যে সংখ্যা নাই। অভাবের পীড়নে, অন্নের অভাবে
সংসারের মধ্যে প্রত্যহ কত নৃশংস হানকাৰ্য্য অবাধে অন্নানভাবে
চলিয়া যাইতেছে, তাহা যে গণনাতীত। কিন্তু হৃদয়ে যাহার এ বেদনার
গিয়া আঘাত দিতে পারে নাই, সে কি করিয়া বুঝিবে এ তীব্র
দাহন ?
৮২

?
রুদ্ধ অবেগ
ভয়িংরুমে বসিয়া কত কি ভাবিতেছি, হঠাৎ মনীবার বাবা ডাকি-
লেন—“মীনু, আমায় ডেকেচ মা?”
“ কাকাবাবু, বসুন।”
এবার কি প্রশ্ন করিব ? এই ত একটা উত্তেজনার বশে ভদ্রলােককে
ডাকাইয়া পাঠাইলাম।
“কোন কাজ আছে কি ছােট-মা, বল ?”
“মনীষার বিয়ে কোথায় ঠিক করলেন, কাকাবাবু ?”
কথা কয়েকটী বলিতে গিয়া হঠাং জিভ, যেন আটকাইয়া
আসিতেছিল।
বিষাদ-সিক্ত স্বরে তিনি বলিলেন —“বিয়ে ত ঠিক করেছি মা!
কিন্তু
“কিন্তু কি, কাকাবাবু?”
“টাকার দরকার মা! গরীবের ঘরে আগুন লাগলেও গরীব বােধ
হয় এতটা সৰ্বস্বান্ত হয় না, যতটা হয় মেয়ের বিয়ে দিতে। সে সব
তােমরা বুঝবে না মা, আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তা-ও যেন
বুঝতে না হয়।”
“কত টাকা হলে কাজ মিটে ?”
“সে যে অনেক টাকা ছােট মা! তবে আর দুশাে টাকা পেলেই,
বােধ হয় আমি চালিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তা-ও যে অার পাওয়া
সম্ভব হয় না, মা!”
* ভগবান, এক শাস্তি! এই শাস্তি এই দরিদ্র জাতিটার উপর তুমি

রুদ্ধ আবেগ
প্রদান করিতে কুণ্ঠিত হইতেছ না ? ওগাে, সারা জীবনব্যাপী একি
মর্মন্তুদ করুণ দৃশ্য তুমি এ হতভাগ্যদের জীবনপটে ফুটাইয়া তুলিতেছ ?
“কাল সকালে একবার দয়া করে আসবেন কাকাবাবু! আমার
ইচ্ছে, এ বিবাহে-”
দৃপ্তচক্ষু তাঁহার জ্বলিয়া উঠিল, বলিলেন—দান দিবার কথা
বলছো মা?
“না কাকাবাবু, সে স্পর্ধা এখনাে আমার হয়নি, তবে মনীষাকে
ছােট বােন বলেই দেখে এসেছি, দিদি হয়ে কিছু আমি ওকে দিতে
চাই কাকাবাবু!”
“বেশ, তাই করাে মা। হাঁ, আর এ বিয়েতে তুমি না যােগ দিলে
বড়ই দুঃখিত হ’ব আমি। দিদি যদি না বােনের
“না কাকাবাবু -মনীর বিয়েতে আমি যাবই।”
“মনীষা, দিদিটী আমার ! আশীৰ্বাদ করি, তাের আরাধ্য দেবতার
পায়ে আমরণ স্নেহ প্রীতিকে আঁকড়িয়া ধরিয়া পড়িয়া থাক। এ তাের
অ-জন্মান্তরের আশা-অন্ধকার-মাখা কালাে জীবনের মধ্যে এ তাের
উজ্জ্বল আলােকের সুস্পষ্ট রশ্মি ?”
৮৪

আঠার আজ মনীষার বিবাহ-শুধু বিবাহ নয়, আজীবন সুখ-দুঃখের ডাব লইয়া আজ যিনি তাহার সম্মুখে আসিয়াছেন, আমরণ তাহারই দাসী হইয়া থাকা! ইহাতেও না জানি কত সুখ, কত গৰ্ব ! স্বামী এই যে ছােট্ট দুটী অক্ষর, ইহার মধ্যে কত বড় দায়ীত্ব লুকান আছে, কত মিষ্টতা, কমনীয়তা লুকাইয়া আছে—ওগাে, তাহা কে জানিবে ? ক্লান্ত পথিক যেমন সঙ্গী-হারা অবস্থায় ক্লান্তি বিনােদনের জন্য আশ্রয় ভিক্ষা করে, ইহাও ঠিক তেমনি। মনীষাও আজ তাহার চলা শেষ করিয়াছে, এখন সে ক্লান্ত—আর তাহারই আশ্রয় হইয়া না জানি কোন্ দেবতা তাহার সম্মুখে আসিবেন ! বাবা ঘরে ঢুকিলেন, অন্যান্য দিনের চেয়েও স্বরটা আজ যেন তাহার কিঞ্চিৎ গম্ভীর। ডাকিলেন—মিনতি।” “কেন বাবা ?” “মনীষাদের বাড়ী যাবে না? তার বাবাবেতে এসেছিলেন।” শরীরটা বড়ই খারাপ ঠেকিতেছিল, বলিলাম—“না বাবা, শরীরটা বড় খারাপ !” “তবে কথা দিয়েছিলে কেন, মিনতি।” কৈ, এ মূৰ্ত্তি ত বাবার কোন দিন দেখি নাই!—এত কঠোর, এত কক্ষ, চোখ ফাটিয়া আমার, জল আসিবার উপক্রম হইল ; এমন কি ; ৫

রুদ্ধ আবেগ
দোষ আজ করিয়াছি, যাহার জন্য আজ আমার এই শাস্তি।
ডাকিলাম-“বাবা।”
মুখ ফিরাইয়া তিনি বলিলেন—কিছু
বলতে ote
আমায় ?
কণ্ঠস্বরে তাঁহার সেই বিরক্তি! আমার মুখের দিকে তাকাইয়া
তিনি বলিতেছিলেন—ভেবেছিলুম মিনতি, আমার মেয়ে আমার
মেয়ের মতনই থাকবে, অবাধ্যতা তার কোনদিন
“ব!”
“কেদ না, মিনতি ! সব শুনেছি, সব জেনেছি আমি, রণেনও
আমায় বলেছে যে; এ অপমানকে সে স্বেচ্ছায় তুলে নিতে আসে নি,
দিয়েছে শুধু আমারই জন্যে ! শেষ একটা ইচ্ছে তাের কাছে
চেয়েছিনু মিনী, আর ভেবেছিলুম, সে ইচ্ছে পূরণ তুই করবি-ই।
সেদিনের কথা মনে পড়ে ?”
অন্তরটা আমার কেবলি মােচড় খাইয়া উঠিতেছিল, সত্যই তাে
যে প্রতিজ্ঞা তাঁহার সম্মুখে করিয়াছি, কৈ, তাহা রাখিতে পারিলাম
তাে। শক্তি দাও ভগবান, এ কি শক্তিহারা আমায় তুমি করিয়া
দিলে !
সুদুর অনন্ত যেস্থানে আপনার সীমা হারাইয়া মাটীর সহিত
লজ্জায় সঙ্কোচে মিশিয়া গিয়াছে, মূঢ়ের মত সেইদিকে তাকাইয়া
বসিয়া রহিলাম। কোন্ তরুণ চিত্তের সুস্বর-লহরী তখন বাহিরে মুক্ত
বাতাসের বুকে আসিয়া লুটাইয়া পড়িতেছিল। আর সেই তরুণ

বদ্ধ আবেগ কণ্ঠের মৃদু ঝঙ্কার বাতাসের সহিত মিশিয়া কাণের ভিতর ধ্বনিয়া উঠিতেছিল— জাগ্রত কর, উদ্যঅর- নির্ভয় কর হে, মঙ্গল কর, নিরলস কর নিঃসংশয় কর হে! ওগাে, একি মহা উদ্বোধন-বাণী আজ তুমি বাতাসের ভিতর দিয়া আমার কাণে শুনাইয়া গেলে ! হে বিরাট দেবতা, দাও-এ সুপ্ত নির্জীব জীবনকে তােমার সুধারস দিয়া জাগ্রত করিয়া দাও, অসংযত দুৰ্বল চিত্তকে নিরলস করিয়া তাহাতে মঙ্গল-বারি স্নিক্ত করিয়া দাও। একি গান ? না আমাকেই সাহস প্রদান করিবার জন্য সুদূর হইতে আশ্বাসবাণী আসিতেছে। অন্তরের প্রতি মটী কঁপাইয়া একি প্রার্থনা-বাণী ধ্বনিয়া উঠিতেছে- যুক্ত কর হে সবার সঙ্গে, মুক্ত কর হে বন্ধু, সঞ্চার কর হে সকল কর্মে শান্ত তােমার দুন । বাবা ডাকিলেন—“মিনতি, মীনু।” “কেন বাবা ?” আবেগভরে আমার মাথাটীকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন- “রাগ করলি মা ?–মনে কষ্ট হয়েছে মা, ছিঃ!” ৮৭ রুদ্ধ আবেগ ত এ কি। বাবারও দুই চোখ বহিয়া অবাধ্য অশ্রুবিন্দু ছুটিয়া আসিল-অশ্রু নয়—স্নেহের উৎস। “তাকে ফিরিয়ে আন বাবা? তােমার কথাই “কিন্তু কোথায় সে গিয়েছে, বলে ত যায় নি মা! বড় অভিমানী সে, মীনু। যাবার সময় কোথায় গিয়েছে— “আমি জানি বাবা!” দীপ্ত চক্ষে আমার মুখের দিকে তাকাইয়া তিনি আগ্রহভরে বলিলেন-“জানিস্ মীনু ! কোথায় মা? বল, আজই তাকে টেলিগ্রাম করেনি” কিন্তু মুখের কথা চাপিয়া ধরিয়া বাবা বলিলেন—“বুঝেছি মা! কিন্তু আমি ডাকলে আবার সে আসবেই। বল মা, কোথায় সে আছে?” মুখ নীচু করিয়া ধীরে ধীরে বলিলাম-“গিরিডিতে।” “ঠিক জানিস্ ত? মুকুল, মুকুন্দ- দ্রুতগতিতে তিনি বাহির হইয়া গেলেন। মূঢ় আমি, নারী আমি, ইতে সাদা ফ্যাকাশে আকাশের দিকে তাকাইয়া রহিলাম, অন্ত রের ভিতর হইতে কে যেন গুমরিয়া গুমরিয়া কাঁদিয়া উঠিতেছিল- বিদায় করেছ যারে নয়ন জলে, এখন ফিরাবে তারে ! কিসের ছলে ! ৮৮

রুদ্ধ আবেগ
থামাও থামাও তােমার ও সুর, ওগাে অন্তরের গােপন পথিক।
আর তােমার মর্মভেদী ক্রন্দনের ধ্বনিতে আমায় পাগল করিও না ।
এই যে নিরলস দিনগুলি চক্ষের সুমুখ দিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া
যাইতেছে, ইহাদের কি সুখ? কর্তব্য সাধন করিতেই ইহাদের
আনন্দ! বেদনা নাই, ব্যথা নাই, আকুলতা নাই—আছে কেবল
নিরবচ্ছিন্ন কর্তব্যপূর্ণ মুহূর্তগুলি !
আচ্ছা, আবার কি তিনি আসিবেন ? যে অভিমান, যে অনাদর,
যে হতাশ লইয়া তিনি ফিরিয়া গিয়াছেন সমস্ত ভুলিয়া আবার কি
তিনি আসিবেন ? যাইবার সময়েও তাঁহার সে শেষ বিদায়-বাণী-
“এখানে আসা আমার বােধ হয় এই শেষ।” ' তবে ? তবে ? ওগাে,
কেমন করিয়া আবার
রন্তুকে টেলিগ্রাম করে দিলুম। মা, দেখিস, আবার যেন সব
হারাস্ নি। জানিস, তাের বুড়াে ছেলের আশীৰ্বাদ তােদের ঘিরে
রাখবে।
এত বড় অভয়বাণীটার পরও যেন অন্তরটা আমার সুস্থির হইতে
পারিতেছিল না, কে যেন কঁদিয়া কঁদিয়া গাহিতেছিল—
মধু-রাতি পূর্ণিমার—ফিরে আসে বার বার
সে জন ফেরে না আর
যে গেছে চলে।
৮৯

উনিশ
মনীষার বিবাহ হইয়া গিয়াছে, অভাগিনী নারী আজ হইতে
এক মহা কর্তব্যেয় ভারকে স্কন্ধে তুলিয়া লইয়া, সংসারে প্রবেশ
করিল। আজ আর সে বালিকা নহে, স্বামীর পত্নী, সংসারের
কত্রী ।
বল বলিয়াছিলেন, বড় খুসী হয়েছি মা তাের কাজ দেখে।
আমার মেয়ের এই ত চাই, বিপদে সাহায্য করা, তৃষ্ণায় জল দেওয়া
কত বড় পুণ্যের কাজ। কিন্তু মা, একটা বড় ভুল করেছি ।
ভুল! কৈ, এমন কোন কথা ত মনে হইতেছে না। বিস্মিতকণ্ঠে
বলিলাম,—“কি বাবা?”
বাবা হাসিয়া বলিলেন,-“সে ভুল আর কিছু নয় মা ! আমাকে
লুকিয়ে টাকা দিয়েছি—কিন্তু তা হলেও আজ যে কাজ তুই করেছিস,
কি ববব মা, গর্বে আনন্দে বুক আমার ফুলে উঠেছে! আশীৰ্বাদ
করি, চিরদিন যেন এইভাবে পরের কাজ করে যেতে পারি! মীনু,
তাের মাকে মনে পড়ে ? সেও একদিন ঠিক এমনি করে, আমায়
জানিয়ে, একটা গরীব সংসারকে অনাহার থেকে বাঁচিয়েছিল।”
“মা আমার, আজ যেখানেই থাক, এ হতভাগীর কাতর প্রার্থনা
বাণী তােমার চরণে আশ্রয় লভুক ;-তােমার স্মৃতি, তােমার পবিত্রতা
আমার এ হীন অন্তরে চিবােজ্জল হইয়া বর্তমান থাকুক।”

রুদ্ধ আবেগ
আজ কয়েকদিন ধরিয়া বাবার মনটা ভারী প্রফুল্ল দেখাইতেছে।
বাবা বলিলেম,-“মীনু, বায়োস্কোপ দেখতে যাবি মা, চ, দেখে
আসি।”
বলিলাম,—“না বাবা, শরীরটা তেমন ভাল নেই, তুমি বরং
“সাবধানে থাকি মা, আমি তা হলে ঘুরে হাসি, বুঝলি ?”
বাবা চলিয়া গেলেন। গত মাসের পুরাণ মানসীখানা লইয়া বাহিরে
ইজি-চেয়ারটার উপর বসিয়া পড়িলাম।
অন্যমনস্ক মানসীর পাতাগুলি লইয়া কতক্ষণ নাড়া-চাড়া করিতে-
ছিলাম, মনে নাই, মুকুন্দ আসিয়া খবর দিল, নীচে একটী ভদ্রলােক
আমারই অপেক্ষায় না কি বসিয়া আছেন।
“কি রকম তাকে দেখতে মুকুন্দ ?”
“বেশ ফরসা রং, পাঞ্জাবী গায়ে, নাম বল্লেন-অরুণবাবু !”
সজোরে আমায় কে যেন একটা ধাক্কা মারিল। এ কি নিষ্ঠুর
খেলা তুমি খেলিতেছ দেবতা ! যত তাহাকে ভুলিতে চাহি, ততই
তাহার তরুণ সুন্দর মূর্তিখানি আমার চক্ষের সুমুখে ধরিয়া তুমি
আমার প্রতিজ্ঞা কল্পনা সমস্ত ভাসাইয়া দিতেছ! কৈ, কোনদিন
ত তােমার কাছে অপরাধ করি নাই ? তবে কেন আজ এ মহা শাস্তি,
ওগাে বিরাট দেবতা।
* “তাকে ওপরে আসতে ববব, দিদিমণি ?”
, যাও, আমি যাচ্ছি।”

রুদ্ধ আবেগ
বিষাদ-জড়িত নিরলস-জীবনে আজ একি আধ আলল, আধকালাে
ছায়া পড়িয়াছে ।
ঘরে ঢুকিতেই অরুণবাবু বলিলেন--“ঘরে এস মী! ওখানে
দাড়িয়ে কেন ?”
“আপনাকে চা দেবাে?”
“চা, হাঁ, তা দিতে পার এক কাপ !”
কাপটীকে মুখে তুলিতে তুলিতে তিনি বলিলেন,-“প্রভাতবাবুর
সি দুর-কোটা পড়েছ মীনু ?”
অস্ফুটকণ্ঠে বলিলাম,-“পড়েছি !”
“মনে পড়ে ? পল সাহেব চা খেতে খেতে সুশীকে কি বলেছিল,
সেই যে—”
“আই ওয়ান্ট নাে সুগার ইন্ মাই টী।”
“হােয়েন্ লাভলি সুশী সিট বাই মী!”
বলিয়াই তিনি উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিলেন। কাণ দুইটা আমার
আগুনের মত গরম হইয়া উঠিল, বলিলাম,—“কম হয়েছে কি ?”
“না, মােটেই না।” .
অরুণবাবু বলিতেছেন,—“আর তিনমাস মী! তারপরেই টাটায়
চলে যাব। আড়াইশাে টাকার একটা কাজ সেখানে পেয়েছি। তিনমাস
পরেই ‘জয়েন করতে হবে। কিন্তু তার আগে মীমু, আরও—আরও
কাছে তােমায় পেতে চাই।”
হায় রে মুঢ় মানব ! জীবনে যে আশাকে পােষণ করিয়া তুমি

রুদ্ধ আবেগ দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আগ্রহভরে কাটাইয়া দাও, সে আশার সাফল্যের আলােক কোনদিন তােমার চক্ষে লাগে কি ? না, যে অন্ধকারেই তােমার জীবন, আবার সেই অন্ধকারেই তােমার মৃত্যু। অস্ফুটস্বরে অন্তরের সমস্ত বল সঞ্চয় করিয়া ধীরে ধীরে বলিলাম, “কিন্তু কি মীনু ? উপার্জনক্ষম না হয়ে আমি-ই বা তােমার ভার কি করে নেবব, তার ব্যবস্থা আজ পেয়েছি।” অন্ধ যুবক ! আমার গােপন-চিত্তের নিভৃত দেবতা, আজ কোন্ ভাষায় তােমায় বুঝাইব যে, শক্তিহারা, কামনা-হারা নারী আমি, মাস্তু অধিকার আজ হারাইয়াছি। “মিনতি, কঁদছে?” ‘কৈ, না!” “শােন মীনু, আমি মানুষ হতে চাই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে, আর তার জন্যে তােমার সাহায্য চাই আরও বেশী করে। কেঁদ না লক্ষ্মটী, ঈশ্বর আমাদের এ কাজে সাহায্য করবেন।” “কে, অরুণ নাকি! বসসা বাবা, বসে। এই একটু ঘুরে এলুম।” বাবা ঘরে ঢুকিলেন, মুখখানি তাঁহার কিঞ্চিৎ গম্ভীর হইয়া উঠিয়াছে। “তারপর খবর কি?” অরুণবাবু বলিলেন,-“খবর আর সব ভাল, আসছে মার্চে টাটায় যাচ্ছি, একটা সার্ভিস সার্ভিস পেয়েছি,আয়রণ ফ্যাকটরীতে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।”

রুদ্ধ আবেগ “বাঃ, বেশ, বেশ !-কি রে পাগলী’ অরুকে চা দিয়েছিস্?” আমাকে উত্তর দিতে হইল না, অরুণবাবু বলিয়া উঠিলেন,—“হা, তা দিয়েছে। আপনার শরীর ভাল ?” বাবা ইতস্ততঃ করিয়া বলিলেন,-“তা এক রকম ভাল, তবে মেয়েটার বিয়ে না দিয়ে কিছুতেই সুস্থির হতে পারছিনে, বাবা !” কী মলিন শিথিল ছায়া আসিয়া মুখ ঢাকিয়া দিল, জ্যোতিঃহীন বিরস মুখের উপর এ তীব্র আঘাত তুমি প্রদান করিলে, ওগাে সত্য-সুন্দর ? বাবা বলিতেছিলেন—“রন্তু বােধ হয় শগগীরই আছে মা, ওপরের ঘরটা মুছিয়ে রাখিস্ ! আর হাঁ, অরুণ তুমিও ক’টা দিন এখানে থেকে যাও না বাবা! বিয়ের পরেই-ও কি, উঠলে কেন বাবা?” জড়িতস্বরে অরুণবাবু বলিলেন,-“বড় মাথা ধরেছে কাকাবাবু, যাই, একবার পিসীমার বাড়ী হয়ে যাব ! নমস্কায় মিস্ রায় !” দ্রুতপদে তিনি বাহির হইয়া গেলেন। ওঃ! কি আঘাতই না আজ তিনি পাইয়া গেলেন। প্রিয়তম ! দেবতা আমার! ভাবিও না, এ আঘাত আজ শুধু তােমার হৃদয়কেই নির্মমভাবে চূর্ণ করিয়া দিয়াছে,-আমারও ক্ষীণ-দুৰ্বল অন্তরখানি ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। সে ভাঙ্গা আর জোড়া লাগিবে না, বােধ হয় যুগ যুগ ধরিয়া তােমারই মুখের পানে তৃষিত নয়নে তাকাইয়া থাকিয়া অম্লানে মৃত্যুকে বরণ করিয়া লইবে । শান্তি, সহানুভূতি ? ওগাে তীব্র কি বিষ, এ ভগ্নপ্রাণে সহ হইবে না। ৯৪ বিশ পােড়া চক্ষে ঘুম যেন আসিতে চাহে না। এই ত এক দুই করিয়া রাত্রি বারটা বাজিয়া গেল। কোলাহলপূর্ণ সহরখানা ঘুমনকাটির পরশ পাইয়া নীরব নিঝুম হইয়া গেল,—কিন্তু ঘুম কোথায় ? ধীরে ধীরে উঠিয়া ছাদে আসিয়া বসিলাম। উপরে “কালাে আকাশের বুকে, প্রদীপের মত নক্ষত্রগুলি কেমন দিনের পর দিন আপনার কাজ করিয়া যাইতেছে। চন্দ্রমা আপনার হাসি অকাতরে পৃথিবীর বুকে লুটাইয়া দিতেছে ! আঃ! কি সুখেই না আছে উহারা ? নাই, ক্লান্তি নাই, শুধু কৰ্তব্যপূর্ণ দীর্ঘ দিনগুলির সাথে নিরলসভাবে চলিয়া যাইতেছে। অরুণবাবু চলিয়া গিয়াছেন,—তাজ তিনদিন হইল, রুদ্ধ অভিমানে বক্ষ তাহার ভরিয়া উঠিয়াছে। কিন্তু কি করিব ? ছাগশিশুর হাত পা বঁধিয়া হাড়ীকাঠে ফেলিয়া রাখিলে তাহার যে অবস্থা, আজ আমারও তাই! ইচ্ছাশক্তি, স্বাধীনতা সমস্তই আজ হারাইয়াছি। বাশী, নয় ? কে, কোন্ বিরহী ওগাে এই বিজন-রাতে বশীর সাথে তােমার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ ঢালিয়া দিতেছ ? জগতের আলাে হইতে লুকাইয়া থাকিয়া, অন্ধকারে বিজনে তােমার যত্নসঞ্চিত ক্রন্দন-রাশী বাতাসের গায়ে ছড়াইয়া দিতেছে ? আহা, বেচারী— বেচারী আমার ।

রুদ্ধ আবেগ বাঁশীর সুর আরও—আরও করুণ বাজিল- ভিজে হাওয়ায় থেকে থেকে, কোন্ সাথী মাের যায় যে ডেকে, একলা-দিনের বুকের মাঝে, ব্যথার তুফান তােলে। ওগাে ব্যথিত পথিক, থামাও, থামাও তােমার • সুর, 'এ অভাগিনীকে আর পাগল করিও না গাে ! একি মােচড় খাইয়া তােমার ও সুর কঁদিয়া কঁদিয়া বেড়াইতেছে! ফিরাও, ফিরাও- আঃ। বেশ বাতাস দিতেছে ত! কুন্তলা বলিয়াছিল,—“ভালবাসা স্বর্গীয় ধন নয় মীনু, পৃথিবীর লােককে কঁাদাতেই ওর সৃষ্টি ! ও মানুষেরই তৈরী। কুন্তী, দিদিটী আমার । আজ এ মহাসমস্যার যে আবর্তনে পড়িয়া পিষিয়া মরিতেছি, তাহা তােকে কি করিয়া জানাইব ভাই। মান সম্পদ সমস্ত ছাড়িয়া শুধু আপনার জিনিষটীকে লইয়া যে দারিদ্র্যকে তুই বরণ করিয়াছিস, দেখিলেও কান্না আসে, কিন্তু তাহাও যে কত সুন্দর, কত পবিত্র । মিল্লকদের বড় ঘড়িটায় ঢং ঢং করিয়া দুইটা বাজিয়া গেল, আর ভাল লাগিল না, বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়িলাম। সকালে একটা চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙ্গিয়া যাইতেই দেখি, হিন্দুস্থানী ঝি লখিয়া, ঠাকুরের সঙ্গে ঝগড়া বাধাইয়া বসিয়াছে। আমাকে ৯৬ রুদ্ধ আবেগ দেখিতেই উৎসাহ ভরে লখিয়া বলিল,-“দেখিয়ে ত দিদিমণি, এইসা করুনেসে, কেইশান কাম্‌ চলে গা?” ব্যাপার কি জিজ্ঞাসা করিলাম। ঠাকুর বলিল, “সকাল হইতে একটী লােক ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করিতেছিল, তাই সে, রাত্রের অবশিষ্ট ভাত ও লুচীগুলি লখীয়াকে দিয়া তাহাকেই, দিয়াছে, তাহাতেই হিন্দুস্থানী-মাগীর এত রাগ! লখিয়ার রায় শুনিতে হইল ঠিক অন্যরূপ। সে বলিল, “ভিখারীকে দান করিলে তাহাতে বাধা দেওয়া তাহার কুষ্টিতে লিখে নাই, তবে লােকটীকে সে না-কি একদিন পুলিশের হাতে দেখিয়াছে, চোর, জোচ্চোরকে প্রশ্রয় দেওয়া-” বলিলাম,-“সে কোথায়?” ঠাকুর বলিল,-“বােয়াকের সামনেই পাতা পাড়িয়া সে খাওয়া শুরু করিয়াছে।” আহা, দেখিলেও কষ্ট হয়, যেন কত যুগ-যুগান্তর ধরিয়া সে খাইতে পায় নাই—এরূপ যত্ন পায় নাই, আজ দুইটা-ই পাইয়াছে, দুইটা চোখ ভরিয়া তাহার দরদর ধারে জল গড়াইয়া পড়িতেছে। নিষ্ঠুর দেবতা! জানি না, কি সুখ তুমি পাও এই শীর্ণ ভিখারী লােকগুলিকে যন্ত্রণার নিষ্পেষণে ফেলিয়া । খাওয়া হইয়া গেলে লখীয়াকে দিয়া তাহাকে ভিতরে ডাকাইলাম। আহা, বড় অভাগা সে, আদর কখন পায় নাই, আজ পাইয়াও কঁদিয়া ফেলিল। বলিলাম,-“বাড়ীতে কে কে আছে তােমার ?” ৯৭ ৭ রুদ্ধ আবেগ “কেউ নেই মা! এই দুদিন আগেও যে আমায় আগলে পড়ে থাকত, সে স্ত্রীও কাল মারা গিয়েছে।” একখানি পাঁচ টাকার নােট তাহার হাতে দিতেই সে কঁদিয়া ফেলিল। এত বড় দান, জীবনে বুঝি সে এই প্রথম পাইল ;-এই পাঁচটী টাকা তাহার কাছে পাঁচ সহস্র কি বুঝি তাহারও অধিক। লখিয়া ঝি গজ গজ করিতে করিতে চলিয়া গেল। চোর ডাকাতকে প্রশ্রয় দেওয়া যে কত বড় অন্যায় কাজ, এবং সে অন্যায় ছেলেমানুষ আমি, না জানিয়া করিয়া ফেলিয়াছি, ইতস্ততঃ তাহারই অনুযােগ করিতে লাগিল ! হায় রে ! দান করিয়াও বুঝি কত সুখ আছে! কিন্তু সে সুখের আস্বাদ পায় জগতে কয়জন? আমােদ প্রমােদে রত থাকিয়', আলস্যে আপনাকে নিয়ােজিত করিয়া, জলস্রোতের ন্যায় অর্থ ঢালিয়া কয়জন সে আস্বাদ লাভের অধিকারী হইতে পারে ? সেই দানের গরিমায় বুকখানি আমার তৃপ্তিতে ভরিয়া উঠিল। আঃ! পাশের দােরায়ানদের ঘােট ঘরের ভিতর হইতে একটী বেশ মিঠা গলার আওয়াজ আসিয়া কাণে বাজিল। বুঝিলাম, কেহ গান গাহিতেছে- —বরি ঠবরি করি কিছু না পাওয়ে কেইসে নিঠর কালা বংশী না বাজাওয়ে, অমানিশা সখি পিয়ারা পিয়ারে— আজি কেইসে (হায়) নিশি পােহাল- ১৮ রুদ্ধ আবেগ গায়ক তরুণ, একটী আঠারাে উনিশ বছরের ছেলে, কোন বাছ- যন্ত্র না থাকিলেও তাহার মিষ্ট গলার গানটী ভারী চমৎকার লাগিতেছিল ! আঃ, ইহাদের সঙ্গীতের প্রতি সুরে, প্রতি ছন্দে সেই ভাব, গােপীদিগকে আপনার প্রেমে মজাইয়া নিষ্ঠুর দেবতা যে ছলনা করিতেছেন, তাহাতে অস্থির হইয়াই ব্যাকুলা নারীরা কাতর প্রার্থনা করিতেছে ! ওগো, বাজাও তােমার বাশী, যাহার প্রতি ঝঙ্কারে সৰ্বস্ব ফেলিয়া আমরা তােমার অনুগামী হইয়াছি! কি করুণ সুর ! আহা, শুনিলেও প্রাণ জুড়াইয়া যায়। যমুনা কি গাগরী, কেঁইসে হামারি, আজু সে তুয়ারি করি আপনারি, গােলেকবিহারী—হরে মুরারী গােপীগণরঞ্জন মন মজাইয়ে ! কে ওগাে অবােধ যুবক, আবার আমার প্রাণে উন্মাদনা জাগাইয়া তুলিতেছ ? এই ত সমস্ত ভুলিয়া-না না, ওকি বুঝিবে সে ব্যথা অশিক্ষিত সরল-প্রাণ যুবক! “মীনু।” “কে-বাবা » বইখানি হাতে লইয়া বাবা ঘরে ঢুকিলেন। বলিলেন- “না মা, রণেনের কোন খবর পেলুম না, গিরিডি থেকে তার চিঠি লিখেছে—এই দেখ, না; রণেন ওখানে মােটেই যায়নি

রুদ্ধ আবেগ
তবে লিখেছে যে, কবে যাবে তার ঠিক নেই, বিশেষ কাজে একটা
জায়গায় গেছে! কাল তাের স্কুল খুলবে, না?”
অন্তরটা যেন আমার হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল, বলিলাম, হাঁ বাবা,
গাড়ীটা ঠিক রাখতে বলাে।”
সীটের উপর বিছানা-পত্র গুছাইয়া বাহিরে আসিতেই দেখিলাম,
নােটীশ বাের্ডের উপর কালাে বর্ডার দেওয়া একটা নােটীশ মারা,
আর তাহা ঘিরিয়া প্রায় ডজন তিনেক মেয়ে হাঁ করিয়া তাকাইয়া
আছে। নােটীশটায় বড় বড় অক্ষরে লেখা-
অদ্য বুধবার শিক্ষয়িত্ৰী শ্ৰীমতী বিভা সেনের মৃত্যু উপলক্ষে স্কুল
বন্ধ থাকিবে এবং বৈকালে একটী শােক-প্রকাশক মিটিং বসিবে !
সকলের উপস্থিতি প্রার্থনীয়
প্রতিমা বলিল,-তা হলে আজ বন্ধ? দূর, এ জালে আমি কখন
এত আগে আসতুম?
চামেলী বলিল,-কেন, Condolenceএ অ্যাটে কবি না?
প্রতিমা বলিল, না ভাই, ও-সব অ্যাটেণ্ড ফ্যাটে আমার দ্বারা
হয় না।”
মীনু-দিদি যাবে ত?

রুদ্ধ আবেগ তৈরী হয় প্রতিমা আমার মুখের দিকে আগ্রহপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাইল। বলিলাম—নিশ্চয়ই যাব। প্রীতি, এই বিভাদিদি আমার কম উপকারটা করেছিলেন ? সেই সেবার একজামিনের সময় আমি আর কুন্তলা যখন ওঁকে গিয়ে ধরলুম যে, ইংলিশ আমাদের একেবারে নি, সারা দিন, সারা রাত খেটে আমাদের পড়িয়েছিলেন। “আর সে জন্যে একটা রিষ্টওয়াচও পুরস্কার পেয়েছিলেন বােধ হয়।” বলিলাম-“না প্রীতি, এ কথা একেবারে ভুল, সে রিষ্টওয়াচ উনি নেন নি, তিরস্কার করে ফেরৎ দিয়েছিলেন।” আহা, আজ এই একটী করুণ-ব্যথার সহিত কত স্মৃতিই না জাগিয়া আছে ! বিভাদির কথা মনে পড়িলেও দুঃখ হয়। আহা, দুঃখিনী নারী সে! বিবাহ হইল, কিন্তু বিবাহের পর তার স্বামীটী বাকিয়া বসিলেন—মেয়ে পছন্দ হয় নাই ! ইস, কি নিষ্ঠুর এই পুরুষ-জাতটা গো! মেয়েদের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলিতে ইহারা কত ভালবাসে, যেন তাহার মূল্য নাই !-স্রোতের ফুল ! যদি আশ্রয় না-ই দিলে, তবে ওগাে নিষ্ঠুর যুবক, কি অধিকার তােমার ছিল, একটী অবলার যথাসর্বস্ব লইয়া পরিহাস করা? তাহার ইহকাল- পরকাল নষ্ট করিয়া দিবার অধিকার কে তােমায় দিয়াছিল ? মূঢ় ভ্রান্ত ওগাে পথিক, ক্ষান্ত কর তােমার এ দুর্দমনীয় অত্যাচারপূর্ণ চলাকে। থামিয়া যাও।

রুস্ক আবেগ মনে পড়ে, বিভা-দিদি একদিন বলিয়াছিলেন—“নিজেদের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়তে শেখ মেয়েরা সব। পুরুষের মুখের দিকে তাকিয়ে একুল ওকূল দুকূল হারিও না, আগে নিজের চেষ্টা বলকে কাজে লাগাও, পরে অপরের কাছে সাহায্য নি-ও।” আজ বুঝিতেছি, সে কথার মূল্য কত ? মানুষ পৃথিবীতে থাকে, তখন তাহার কথার মূল্য কোথায় ? লােকে হাসিয়াই উড়াইয়া দেয়, কিন্তু যখন সে লােকের হাসি বিদ্রুপের বাহিরে যায়, পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকাইয়া দূর অনন্তের উদ্দেশে চলিয়া যায়, তখন মানুষ তাহার কথার মূল্য বােঝে, জানে, অনুতাপ করে। এই বিভা-দিদির কথা একদিন আমরা হেলায় কতই না উপেক্ষা করিয়াছিলাম, কিন্তু আজ ? তাহারই অনুশােচনায় দিন রাত্রি মরিয়া যাইতেছি যে গাে ! বিভাদিদি, দিদিটী আমার ! সহস্র নতি আজ তােমায় এখান হইতে করিতেছি, লইয়া ধন্য কর। “মীনু-দিদি, কাঁদছো নাকি?” “দুর পাগলী, কঁদতে যাব কোন্ দুংখে? আচ্ছা প্রীতি, বিভা- দিদির memorial একটা কিছু কলে হয় না? কি বলিস ভাই ?” প্রতিমা ঘাড় নাড়িয়া বলিল,-“ বেশ হবে মীনু-দিদি, সত্যি বলছি, তারই একটা বন্দোবস্ত করাে।” কিন্তু কে করিবে ? হায় রে ! হাঁ, এক করিতে পারিবার মত উদ্যমী উৎসাহী যদি কেহ ছিল ত কুন্তলা! কিন্তু সে-ও যে আজ ১০২ রুদ্ধ আবেগ কতদূরে—হয় ত বিভা-দিদির মৃত্যু-কাহিনী এখনও তাহার কানে যায় নাই । প্রতিমা বলিল—“আচ্ছা, একটা কাজ করূলে হয় না মীমু-দিদি ?” “কি ভাই ?” “ধর, এই Condolence meetingএ তুমি যদি একটা ছােট্ট বক্তৃতা দিয়ে আমাদের ইচ্ছেটা সকলকে জামিয়ে দাও!” মনে কেমন একটা সঙ্কোচের ভাব আসিয়া দেখা দিল, বলিলাম, ছিঃ ভাই! অতগুলি শিক্ষক, মেয়েরা—” “তাতে কি হয়েছে ? সে ত সকলেই দেয় । আচ্ছা, আমি লিখে দিচ্ছি, যা যা বলতে হবে। তুমি শুধু পড়া, কেমন ?” প্রতিমা চলিয়া গেল সেইখানে দাঁড়াইয়া অর্থহীন শূন্যদৃষ্টিতে আকাশের অলস উদ্দেশ্যহীন মেঘগুলির দিকে তাকাইয়া রহিলাম । এই ত জগতের গতি। কাল যাহার হাস্যচপল মুখ দেখিয়া মানব হাসিয়াছিল, সমস্ত পৃথিবী তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিলেও আজ তাহার সন্ধান পাওয়া যাইবে না ! আহারের পর প্রতিমা সহসা ঘরে ঢুকিল, সঙ্গে সঙ্গে তাহার আরও পাঁচ ছয়টী মেয়ে ঢুকিল। প্রতিমা একখানি কাগজ আমার কোলের উপর ফেলিয়া দিয়া বলিল—“নে ভাই, পড়ে দেখ।” বলিলাম—“তুই পড়, প্রীতি, শরীরটা বড় খারাপ লাগছে। প্রতিমা পড়িতে লাগিল- “দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বেশ নিরবচ্ছিন্ন সুখের মধ্য ইস, !

রুক আবেগ দিয়ে চলে যায়—কিন্তু তার মধ্যেও কখন যে বিষাদ-জড়িত একটা কালাে আঁধার এসে দেখা দেয়, কেউ জানেও না, চির উৎসবময় প্রাসাদেও কখন যে দুঃখ দৈন্য এসে পড়ে, কেউ কল্পনায়ও আনতে পারে না। সহসা অচেনা-অজানার মধ্যেই তার সৃষ্টি। আজ আমাদের কাছেও সেই রকম একটা ভয়ানক দিন এসে পড়েছে। শ্রদ্ধেয় শিক্ষয়িত্রী—যিনি একাধারে আমাদের বন্ধু, উপদেষ্টা বলে অভিহিতা ছিলেন, আজ কালের নির্মম পেষনে তাঁকে এই ছােট্ট কুটীর ছেড়ে দূর-দূরান্তরে চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু তার স্মৃতির জন্যে—তাঁরই ছাত্রী, ভগ্নী আমরা কিছুই কি করতে পারি না? আমি চাই, যাতে তাঁর আত্মার কল্যাণ হয়, যাতে সুদুর অন্তরালে বসেও তিনি দেখতে পান—তার অভাব আমাদের কতদূর মর্মাহত করেছে! সারা জীবন ধরে বুকের রক্ত দিয়ে তিনি আমাদের জন্যে যে শ্রম কষ্ট বহন করে গেছেন, আমরা চাই তার ব্যথিত তপ্ত চিত্তে একফোটা শান্তিজল দিতে-সে গুরু ভারকে লাঘব করে দিতে। কিন্তু ভগিনীগণ ! সে শান্তি পেতে হলে, তাঁরই একটা স্মৃতি- চিহ্ন নির্মাণ করা আমাদের সকলেরই কর্তব্য। আমাদের ইচ্ছা, এই কম্পাউণ্ডে তার মূৰ্ত্তি খােদিত করে রাখা হউক, যাতে প্রতি নিমেষে, প্রতি কাৰ্য্যে তার শান্ত সরল মূৰ্ত্তি আমাদের দৃষ্টিগােচর হয়ে সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে আমরা চলতে পারি ? আশা করি, অন্যান্য শিক্ষয়িত্রী এবং প্রধান শিক্ষয়িত্ৰী মহাশয়া স্কুলের একটি প্রস্তর- ১০৪

রুদ্ধ আবেগ
আমাদের সকলকেই এ কৰ্য্যে উৎসাহ প্রদান করে আমাদের
উদ্যমকে আরও শক্তিশালী করে তুলবেন। আমাদের স্থির দৃঢ় বিশ্বাস,
তাদের উৎসাহ পেলে আমরা আরও শীঘ্র এই কাৰ্য্যে নাতে
পারবাে।”
প্রতিমা চুপ করিল। হাসি বলিল,-“সত্যি ভাই প্রীতি, তুই
কবিতা লিখি না কেন, বল্ তাে?”
“তুই ছাপাবি ! ছাপা তত বল ?”
হাসি হাসিয়া বলিল,-“দূর, আমি কেন ছাপতে যাব? তাের
বিয়ের সময় তুই নিজেই ছাপাবি !”
প্রতিমা আমার মুখের দিকে তাকাইয়া বলিল,-“পড়বে 'ত
মীনু-দিদি ?”
তা’ ত পড় বাে, কিন্তু সকলে যদি হাসে ভাই ? হয় ত বলবে—
তাের কেন মাথা ব্যথা বাপু! তখন ?”
প্রতি গম্ভীর হইয়া বলিল,-“ও-সব কথায় কান দিও না মীমু-
দিদি, তুমি শুধু এটা পড়ে যাবে। নাও, উঠে পড়, চারটে বাজে
যে !
প্রতিমা চলিয়া গেল। হা রে অভাগী ! আজ তাের মত যদি
সকলেরই মন হইত? কুন্তী, দিদিটী আমার ! একদিন এই স্নেহ,
এই প্রীতি দিয়াই তুই এ অভাগিনীকে জড়াইয়া গিয়াছি—আজ এ
আবার-কে, প্রীতি ? চল ভাই, যাচ্ছি ।
শান্তি, শান্তি-ওগাে এ তপ্ত অন্তরে আজ শান্তি দাও প্রভু !

বাইশ সকালবেলা উঠিয়া আলস্য-জড়িত চক্ষে বিছানার উপর বসিয়াছিলাম, অন্তরের মধ্যে গত রাত্রের শােকসভার দৃশ্যটা বেশ স্পষ্ট হইয়াই ফুটিয়া উঠিয়াছিল, সহসা ঝি আসিয়া একখানি চিঠি দিল, উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা,—মিস, এম্ রায়। চিঠি খুলিতেই দেখিলাম, অরুণবাবু লিখিয়াছেন :- মিনতি ! আজ তােমাকে যে সম্ভাষণ কলুর, জানি না, তার অধিকার আমার আছে কি-না? যদি দোষ হয়ে থাকে, মার্জনা চাইছি; কিন্তু তার আগে একটা কথা বলতে চাই তােমাকে। আচ্ছা, মানুষকে জ্বলিয়েই কি তােমাদের সুখ মিনতি ? তার সুখ, তার আশাকে মুহূর্তের মধ্যে নিস্ফল করে লাভ কি তােমাদের, বলতে পার? কি জানি, মনে হয়, পুরুষের চোখের জল না দেখলে নির্মম তােমরা, তােমাদের শান্তি হয় না ! কলিকাতা ছেড়ে আমি টাটায় এসেছি। কিন্তু কেন বলতে পারি , সে আশাও আমার ব্যর্থ হয়েছে ; যেহেতু, তােমার মূর্তিকে এখনাে আমি ভূলতে পারি নাই; আর যতদিন তা না পারবে, ততদিন আমার শান্তি নাই, পলে পলে জ্বলে মরতে হবে। উঃ, কি নির্মম তােমাদের প্রাণ মিনতি ? মনে হলেও কেঁপে উঠি।

রুদ্ধ আবেগ ৫ একদিন রাতে তন্দ্রা যখন তার মৃদু পরশ নিয়ে আমার কাছে এসেছিল, যখন তার স্নিগ্ধ বাতাস আমার সঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ যেন মনে হলাে,-মিনতি, তুমি এসেছ, আবার তুমি আমার কাছে ফিরে এসেছ। উঃ, সেটা যদি সত্যি হ’ত মিনতি তার সৃষ্টি যদি বাস্তব জগতে হত, তা হলে ?-না থাক্‌, আর তােমায় বিরক্ত করবে না। এখানে এসে অবধি শরীরটা ভাল নাই, কেমন একটা অস্বস্তি, কেমন একটা ম্যাজ মেজে ভাব সৰ্ব্বদা আমার মনে হয়। আচ্ছা মিনতি, ভালবাসার মধ্যে কি কিছু অভিশাপ আছে ? আমি ত তােমায় প্রাণ ভরে ভালবাম, তােমাম স্মৃতি আমার সমস্ত কাজ ফেলে মাথা উঠিয়ে থাকতাে, আর মূঢ় আমি, মাঝে মাঝে মনেও হতে যে, হয়ত তােমায় পাব। কিন্তু সমস্ত আশা-ভরসা আমার ভেঙ্গে গেল সেইদিন, যেদিন তােমার বাবা আমার কাছে তােমার অন্যের সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব তুললেন। কি-জানি, আর হয়ত জীবনে দেখা হবে না মিনতি। তাই আজ পাগলের মত বা তা বকে চলেছি। আশা করি, ভাল আছ, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, তােমরা সুখী ইতিহতভাগ্য অরুণ । চিঠি হইতে মুখ তুলিতেই দেখি, শান্তি মশারীটা খুলিতে খুলিতে গুণ গুণ করিয়া গাহিতেছে- ১০৭

রুত্ব অবেগ
কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলাম না,
শুনাে ধূলাে যত, কে জানিত
আসবে তুমি গাে
অনাহুতের মত
দেবতা আমার ! এ কি তিরস্কারপূর্ণ তীব্র বাণী তােমার, আজ
আমার কাছে পাঠাইয়া দিলে? ইহা ত আমি ভাবি নাই, আশা
করি নাই, কল্পনায়ও আনিতে পারি নাই,-তবে? কিন্তু এ বিচ্ছেদ,
উভয়ের মধ্যে এ ব্যবধান কে করিয়াছে, কে জানে? তাহারই শত
ঘায় হৃদয় আজ আমার চূর্ণ হইয়া যাইতেছে।
“মীনু-দিদি, মুখ ধুতে যাবে না?”
তাই ত! এতক্ষণ বসিয়া করিলাম কি ? সমস্ত মেয়েই ত মুখ
ধুইয়া আসিয়া আপনার আপনার কাজে মন দিয়াছে,আর আমি ?
ছিঃ, একি দুৰ্বলতা আসিয়া আমায় জড়াইয়া ধরিল গাে!
মুখ ধুইয়া আসিতেই সেভেন্থ ক্লাশের যে ছােট্ট মেয়েটী কয়েকদিন
হইল বাের্ভিঙে আসিয়াছে, আমায় বলিল,-“একটু পড়া ব'লে
দেবেন ?
চোখ দুইটীতে বড় করুণ অনুরােধপূর্ণ দৃষ্টি। বলিলাম,-“বেশ ত,
বই নিয়ে এসাে। তােমার নাম কি ?”
“নাম? আমার নাম-মঞ্জুলা।”
“মঞ্জুলা ! বাঃ, বেশ নাম তাে? তােমাদের বাড়ী কোথায়
খুকী ?
১০৮

রুদ্ধ আবেগ
“বাথােরে।”
প্রতিমা মুচকাইয়া হাসিয়া বলিল—“বাথাের! সে কোথায় ?
পাথর টাথাের-আলা দেশে নয় তাে?”
মেয়েটী তেমনি করুণদৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকাইয়া
বলিল,-“না, হাওড়ায়।”
“তােমার কে কে থাকেন সেখানে, মঞ্জুল?”
মঞ্জুলা আমার মুখের পানে হাঁ করিয়া তাকাইয়া বলিল—“মা” দিদি
আর দাদা।”
প্রতিমা ফস্ করিয়া বলিয়া উঠিল—“আর বাবা?
মঞ্জুলা বলিল—“না, বাবা থাকেন না, তিনি কোথায় থাকেন,
তা-ও আমরা জানি না। মা মাঝে মাঝে কাঁদেন, কিন্তু বাবা আর ফিরে
আসেন না।”
হা রে অভাগী, চোখের দুই ফোঁটা জলেই যদি সংসারের কাজ
হইয়া যাইত, দূর হইতে আপনার প্রিয়টাকে কাছে টানিয়া লওয়া
যাইত, তাহা হইলে সকলেই কঁদিত, কিন্তু তাহা যে হয় না! কাদিয়া
কাদিয়া চক্ষু গলিয়া যাইলেও নিয়মের---অদৃষ্টের ব্যতিক্রম হইবে না!
সে যে বড় কঠোর, নিৰ্ম্মম গাে।
বিকালবেলা তখন, খেলিতে যাইবার উদ্যোগ করিতেছি, দরাে-
যান আসিয়া হাজির। “দিদিমণি না-কি আমাকে বােলাইয়াছেন।”
মণিকা-দিদির কাছে যাইতেই তিনি বলিলেন—“তােমার লােক এসে-
ছেন মিনতি, তােমার বাবার বড় অসুখ, তােমায় বাড়ী যেতে হবে !”
১০৯

রুদ্ধ আবেগ
বাবার অসুখ! বুকটা কে যেন আমার দোলা দিয়া দিল, বাহিরে
মুকুন্দ দাঁড়াইয়াছিল, আমাকে দেখিয়া বলিয়া উঠিল—
“মােটর এনেছি, শীগগীর করে।”
এ কি দুঃসংবাদ ধূমকেতুর মতই সহসা আমার শীর্ণ বুকে আসিয়া
ঘা দিল ।
}
তেইশ
.
বাড়ীতে আসিয়াছি আজ আট দিন, এই আটটী দিনের মধ্যে
বাবার শরীরের অবস্থা এত খারাপ হইয়া গিয়াছে যে, দেখিলে সহস
একটা ভয় মান জাগিয়া উঠে। চক্ষের কোলগুলি বসিয়া গিয়াছে,
তাহারই চারি পার্শ্বে একটা কালাে-দাগ যেন মৃত্যুর দূত হইয়া জমকিয়া
বসিয়াছে। বিপদের সাহায্য করিবার, বােগে শুশ্রুষা করিবার দ্বিতীয়
প্রাণীটী আর নাই। বাড়ীতে সাহায্য করিবার মাত্র একটী লােক—
মুকুন্দ। দরােয়ান—তাহাকে কখন ডাকিয়া পাওয়া যায়, কখনো
পাওয়া যায় না।
ডাক্তার বলিয়াছেন,-বােগ না-কি তেমন সহজ নহে, সাবধানের
সহিত শুশ্রুষা চাই, কিন্তু কি করিব ?
রণেনবাবু কি আর আসিবেন ? ছিঃ, একবার যাহাকে হেলায়
উপেক্ষা করিয়াছি, আবার তাঁহাকে কি করিয়া আহ্বান করিব ?

রুদ্ধ আবেগ ওগাে, সে যে বড় অভিমান করিয়াই চলিয়া গিয়াছে,আমার অন্ধকারাবৃত অজ্ঞানতার নির্মম আঘাতে কত আঘাত বেদনাই যে তাহাকে সহ্য করিতে হইয়াছে,-নারী আমি, সে আঘাতের মূল্য কি বুঝিব? হা রে অভাগী ! আজ উপেক্ষিতকে আহ্বান করিতেই তাের এত আগ্রহ, এত অনুতাপ ! নীচে উঠানে বসিয়া একটা হিন্দুস্থানী যুবক কাপড় শুকাইতে দিতে দিতে গাহিতেছিল, জনম অবধি হাম, রূপ নেহারি, নয়ন না তিরপিত ভেল- হায় রে মূঢ় যুবক! এত তৃষ্ণা আশা লইয়া তুমি কোথায় যাইবে ? সমস্তই যে তােমার বুকে জমাট বাঁধিয়া সারা জনম ভরিয়া কঁদাইবে, অমন আকুল চক্ষু তােমার তৃপ্তিলাভ হইতে পারিবে না! তবে? কেন মিছে এ নিমেষের কান্নাকে ডাকিয়া আনা? এ বুক-ভাঙা সুরকে কেন ঝঙ্কারে ঝঙ্কারে তুলিয়া দেওয়া ? হাঁ, তবে ইহাতেও যে সুখ নাই, তাহা নহে। এই পথ চাওয়াতে পান। খেলে যায় রৌদ্র-ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত। এই পথ চাহিয়া চাহিয়াই এই আকুল উদ্বেগভরা চক্ষুর সন্মুখ ১১১ রুব্ধ আবেগ দিয়া গ্রীষ্ম বর্ষা—এমন কি, ছয়ট ঋতুই ব্যর্থতার বােঝ লইয়া চলিয়া যাইবে। কিন্তু সে পথ-চাওয়াতে আনন্দের অভাব নাই। বাবা পাশের ঘরে ঘুমাইতেছেন। বেচারী মুকুন্দ তাঁহার শিয়রের কাছে বসিয়া বাতাস করিতেছে। আহা, বেচারীকে দেখিলেও দুঃখ হয়। উহার না আছে বাপ, না আছে মা, সংসারে কেহই নাই ! “চুপটী করে বসে কা’কে ভাবছ ভাই মীনু দিদি ?” চমকিত হইয়া পেছন ফিরিতেই দেখিলাম,-প্রতিমা:মুখ টিপিয়া হাসিতেছে। “একি, তুই যে ? আর সব কোথায় ?” প্রতিমা একটু গম্ভীর হইয়া বলিল—যা ডিউটীফুল • দরােয়ান রেখেছ, আর সব আবে কোখেকে বল ? আমিই-যা মিশির ঠাকুরের “দূর রাক্ষুসী, চল, দেখি সব কোথায় ?” প্রতিমার সহিত নীচে নামিয়া আসিতেই দেখিলাম- বাহিরে “বাস’ ভরা মেয়ে ! দ্বারের উপর টুলখানিতে বসিয়া মিশিরজী খইনী টিপিতে টপিতে সহিসকে উপদেশ দিতেছিলেন যে, আজকাল ডাকুলােকের এত উৎপাত আরম্ভ হইয়াছে যে, জেনানালােক- দিগকেও বিশ্বাস নেই। বুড়া লােক সে, এ বাড়ীর অনেক নিমক খাইয়াছে, অন্যায় হইতে দিতে রাজী সে মােটেই হইবে না। মেয়েদের উপরকার ঘরে বসাইলাম। মনে পড়ে, আর একবার ১ । ১১২

রুদ্ধ আবেগ
একদিন সকলে আমাদের বাটীতে আসিয়াছিল, তাহাদের কত্রী
হইয়াছিল—কুন্তলা।
অনেক্ষণ পরে প্রতিমা বলিল -“এবার আমাদের আসল কথা-
টাই হাে’ক। কি বল সব ?”
“নিশ্চয়ই—নিশ্চয়ই, সার্টেনলি !”
প্রতিমা একখানি খাতা সম্মুখে ধরিয়া বলিল-“নাও ভাই,
একটা সই করে দাওতাে?”
“কিসের সই, প্রতি ?”
প্রতিমা হাসিয়া বলিল—ভয় নেই মীনু-দিদি, হ্যাণ্ড-নােট লিখিয়ে
নিচ্ছি নে ! বরং আশ্চৰ্য্য হচ্ছি যে, এ কার্যের নেতা তুনি নিজে হয়ে
“ও! দে ভাই, সই করে দি’ :” এত লজ্জা হইতেছিল
আমার—ছিঃ!
প্রতিমা সহসা বলিয়া উঠিল—“তােমার মাথা খারাপ হয়েছে, নয়
মীনুদি’ ?”
কেন বলতাে, কম হয়েছে ? দে ভাই, আরও লিখে দি’!
“না না, সত্যি বলছি মীনু দিদি, দুশাে’ টাকা তুমি একা দেবে, এ
আমরা কেউই আশা করি নি।”
হাসিয়া বলিলাম-“না প্রীতি, আরও পঞ্চাশ জমা করে নাও
কুন্তলার নামে, বুঝলে?”
চামেলী বলিল—“মঞ্জুলা কত দিয়েছে, জান মীমু দিদি ? সে ত’
পাঁচ টাকা দিয়েছে।”

আবেগ
!
“আঃ, ইহাদের দেখিলেও শান্তি হয় ! ইহাদের কি বলিয়া আজ
ধন্যবাদ দিব গো! কি শিক্ষার জন্য আজ ইহারা আসিয়াছে ?
শিক্ষার পরিচয় আজ ইহারা স্বেচ্ছায় প্রদান করিল, তাহার কাছে এ
শিক্ষা যে কত হীন
প্রতিমা বলিল—“তুমি চলে আর পরদিনেই মীনু-দিদি, ইনস্
পেক্টেস এসেছিলেন। তিনি বলেন-” এ ধারণা যার মাথায় ঢুকেছে,
এ ইচ্ছা সাফল্যে পরিণত করতে যার প্রথম উদ্যম ও চেষ্টা দেখা
গিয়েছে, আমি তাকে দেখতে চাই। আজ সে অামারও বরেণ্য !
কিন্তু যখন শুনলে যে, তুমি চলে এসেছ, বেচারীর মনটা বড়ই মুষড়ে
গিয়েছিল।”
বলিলাম-“কিন্তু এ সম্মান সম্পূর্ণ আমার প্রাপ্য নয় ত প্রীতি,
এতে যে তােরও দাবী আছে ভাই ?”
“না ভাই, সম্মান তােমার একলা নীলু-দিদি! তুমি না চেষ্টা
করলে আমার ইচ্ছে হয় ত মনেতেই থেকে যেত, কাযে আর তা
হয়ে উঠতাে না! “কষ্ট যার, কেষ্ট তার—কি বলিস, মঞ্জুলী ?”
প্রতিমা মঞ্জুলীর গাল টিপিয়া ধরিল।
“কুন্তলার আর কোন খবর পেয়েছি, ভাই ?”
“না প্রীতি, সেই যে একখানা চিঠি ছ'মাস আগে দিয়েছিল,
তারপর আর পাইনি! আহা, থাক্‌, হতভাগিনী সে-যদি সুখেই
থাকে, তাই-ই থাক! আহা, বড় গরীব ? শােভা আসে নি
কেন রে ?”
১১৪

রুদ্ধ অাবেগ
প্রতিমা ঈষৎ হাসিয়া বলিল-“তা বুঝি জান না, ওর যে বিয়ে!
বিদেশে গিয়েছে।”
“শােভারও বিবাহ ? পাত্র কেমন জানি ?
“না ভাই, তা অতশত জানিনে, তবে হা, ভাল ঘরে পড়েছে,
সেই ভাল।”
মঞ্জুলা বলিল—“স্কুলে কবে যাবেন, মীনু-দিদি?”
একটা কৃত্রিম
ধমক দিয়া
বলিলাম-“যাবেন কি ? বল,
বাবে ?”
অপরাধীর মত থতমত খাইয়া, স্নানদৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে
তাকাইয়া সভয়ে বলিল—“স্কুলে কবে যাবে মানু-দিদি?”
দুই হাতে তাহাকে বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম-“এখনও
দেরী আছে ভাই, বাবার অসুখ করেছে কি-না, আগে সেরে উঠুন,
তারপর যাব।”
চামেলী বলিল—“তােমার জন্যে ওর’ যা মন কেমন করে! সত্যি
মীনু-দিদি, তুমি ভাই, যাদু জান, নয় ?”
মুকুন্দ ডাকিল-“দিদিমণি! ‘বাবু’ ডাকছেন?”
“বাই মুকুন। তাের ভাই একটু বােস, আমি আসছি!”
বাবার কাছে আসিতেই তিনি বলিলেন—“একটু আগে কিছু
বছিলি মা?”
“হাঁ বাবা, সেই
যে মেমােরিয়াল হবে বলেছিলুম,-তার
টাকাটা

রুদ্ধ আবেগ
বাবা হাসিয়া বলিলেন- “পাগলী আর কি ! সে কথা জিজ্ঞে
কবার কি দরকার ছিল মা? দিলেই পারতিন। কত নিবি?”
একটু সঙ্কুচিত হইয়া বলিলাম-“আমি দুশে সই করেছি, আর
কুন্তীর জন্যে পঞ্চাশ করেছি বাবা!”
একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাবা' বলিলেন--“তা বেশ করেছিস,
আহা, বড় দুঃখিনী সে,--নিয়ে যা টাকাগুলো।”
তাহাদের বিদায় দিয়া বাবার কাছে আসিয়া বসিয়া পড়িলাম !
চব্বিশ
কিন্তু দিন যে আর কাটিতে চাহে না! প্রতি পল, প্রতি মুহূর্ত
যেগুলা পূর্বে বায়স্কোপের ছবির মত নাচিতে নাচিতে চক্ষের
সম্মুখ দিয়া চলিয়া যাইত, আজ জীবনের এই দুৰ্যোগে এ কি দীর্ঘ
অলস যুগের মত আমার চক্ষের সম্মুখে দাড়াইয়া ?—আর যে পারি
দেবতা! দাও, একটা নিমিষে-একটী পলকে এ অলসতা ভাঙিয়া
দাও গাে !
কিন্তু সে কি আর আসিবে কে জানে, হয় ত বৃথা নয়নের জল
ফেলাই সার হইবে। যাহার প্রতীক্ষায় ভগ্ন, জীর্ণ, আহত এ জীবন
লইয়া পথের দিকে তাকাইয়া আছি, সে পথ হয় তো রুদ্ধ হইয়া
যাইবে, নয়নেয় দৃষ্টি ক্লান্ত হইয়া আপনিই লুটাইয়া পড়িবে! পথ
১১৪

রুদ্ধ আবেগ
চাহিয়া থাকার যে আনন্দ, সে অন হয় তো কোন দিন আমার
নিকট পোঁছাইবে না !
বাবার শরীর সম্পূর্ণ সারে নাই ; তবে ডাক্তারের আশা দিয়াছে,
বিনের কোন ভয় নাই। তাহাই হউক ভগবান, তাহার আশাকে
সণ করিয়া গড়িয়া তােল,আর কি
কিছুই চাহি । জীবনে ছায়া-
পথের মত, অন্ধকারে আলােক-রেখার মত সীমাহীন সাগরের মধ্যে
আশাক-স্তম্ভের মত যাহার আশ্বাস, সান্ত্বনা, বাহার হে আমাকে ঘিরিয়া
আছে, তাহাকে বঁাচাইয়া রাখ, দেবতা!
আকাশের মুখে আজ হাসি নাই, আলো নাই, বিধবার মত ক্ষীণ
স্নান! বাতাস আজ রুদ্ধ, বেদনার রাশি বহিয়া লইবার ক্ষমতা হয় তো
তাহার নাই। ধীরে ধীরে কালো কালো মেঘগুলি আকাশের বুকে
চাপিয়া বসিয়াছে ; নির্মম নিষ্ঠুরের মত এ কি তীব্র আচরণ গাে! এ
বাবা মানে না, বারণ মানে না, দস্যুর মত এ কি নিষ্ঠুরতা?
আকাশের মুখে কালিমা মাখাইবার এ কঠোর প্রয়াস তাহার কেন
গে?-কে জানে, হয়তাে একটা সূচভেদ্য অন্ধকারে চারিদিক
দিবে ?—আকাশের সে নিৰ্ম্মল পরিস্ফুট
হাসি, তাহার
মুখের সে সুন্দর আলো, কে জানে আবার ভাসিয়া উঠিবে কি না?
নিম নিষ্ঠুর ওগাে দুর্জয় দেবতা! আজ এ রুদ্র-দূতগুলিকে
ফিরাইয়া লও গাে !
আমার অন্তরাকাশেও আজ ধীরে ধীরে এ কি আধারের সৃষ্টি
সুক করিয়াছে গাে! নির্মম হে মাের অদৃশ্য দেবতা! এ কি
ডুবাইয়া দিবে
}
১১৫

রুদ্ধ আবেগ করিলে ? শ্বাস যে রুদ্ধ হইয়া আইসে, চক্ষের দৃষ্টি যে ক্ষীণ হইয়া আসিতেছে, কাল-বৈশাখীর মত প্রলয় ঝঙ্কার এ কি রুদ্র-মাতন সুরু করিয়াছ? দাও, একটী নিমেষে, একটী আঘাতে সমস্ত কালিমা দূর করিয়া দাও! সেই আঘাতে সমস্ত বেদনা অামার টুটিয়া যাউক। চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে ভাল লাগিল না, উঠিলাম। কিন্তু কি করিব,কোথায় যাইব? প্রতি পদক্ষেপের সহিত তাহার মূর্তি। যে ভাসিয়া উঠে! পা থামিয়া যায়, নড়িবার শক্তি থাকে না। সে স্মৃতিটা ভুলিতে পারিতেছি কৈ? কৰ্ম্মের ভিতর দিয়া সে মূৰ্ত্তি ফুটিয়া উঠে, নিদ্রায় স্বপ্নের উপর ভাসিয়া উঠে-শত বাধা অনিচ্ছা সত্বেও তো তাহাকে কিছুতেই আটকাইয়া আটকাইয়া রাখিতে পারিতেছি না ! সকাল হইতেই মনটা এত মুষড়াইয়া গিয়াছিল, কিছুই ভাল লাগে । ধীরে ধীরে অর্গানটার কাছে গিয়া বসিলাম। কি জানি, সঙ্গীতের সুরের মাঝে ব্যাকুল অন্তরের উদ্বেগটা যদি মিশাইয়া যায়, চিন্তাটা যদি ডুবিয়া যায়, তাহারই আশায়! কিন্তু সঙ্গীতের সে সুর আসে কৈ ? হাত যে কঁপিয়া উঠে, কণ্ঠ যে কোন এক অদৃশ্য শক্তি চাপিয়া ধরে। অতি কষ্টে অর্গানে সুর দিয়া বাজাইতে লাগিলাম, অন্তরের অন্তরতম প্রদেশ হইতে সে সুর ধ্বনিয়া উঠিল আমারই অজ্ঞাতে।গম্ভীর অথচ উনাল সে ধ্বনি ধ্বনিয়া উঠিল— ?

রুদ্ধ আবেগ
নীল আকাশের অসীম ছেয়ে ছড়িয়ে গেছে চাদের আলো
আবার কেন ঘবের ভিতর—আবার কেন প্রদীপ আলো,
রাখিস না আর মায়ায় ঘেরে
স্নেহের বাঁধন ছিড়ে দে রে,
উধাও হয়ে মিশিয়ে মাই, এমন রাত আর পাব না লো ।
অন্তহীন সীমাহীন আকাশের কোলে কয়েকখানি মে মিশ
খাইয়া উঠিতেছিল, তারজড়িত একটা আকুল পবন পথহারা
শিশুর মত ছুটাছুটী করিয়া বেড়াইতেছে ; কোথায়, কোথায় তাহার
আবাস, কে দেখাইয়া দিবে ? সঙ্গীতের সে সুরটা যেন তাঁহার
সমব্যথীর মত তাহার সঙ্গে সঙ্গেই ভাসিয়া চলিতেছিল, সে প্রতিধ্বনি
ভাসিয়া উঠিল—
সাঙ্গ আমার ধূলা-খেলা, সাঙ্গ আমার বেচা কেনা,
এসেছি করে হিসেব নিকেশ, যাহার যত পাওনা দেনা,
আজি বড়ই শ্রান্ত আমি, ওমা কোলে তুলে নে’ না
যেখানে ঐ অসীম সাদায়—
মিশেছে ঐ অসীম কালাে!
বাতাসের বুকে দুর কাপিয়া উঠিল। কিন্তু বুকের মধ্যে
আজ এ তীব্র আঘাত কেন গো? সুর ভুল হইয়া যায়, স্বর
থামিয়া যায়, অন্তরের যে তীব্ৰ-বেদনাটা, যে চিন্তাটা তুলিবার
জন্য এত কঠোর প্রয়াস, সেটা ত কৈ মুছে না, বরং আরও
১১৭

রুদ্ধ আগে স্পষ্ট হইয়া চক্ষের সম্মুখে ফুটিয়া উঠে ! চক্ষু অলাইয়া দেয়, দূর কোম এক কল্পনাকাশে ধীরে ধীরে একটা ছবি ফুটিয়া উঠে! সে ছবি কত সুন্দর, আশাতীত ! কিন্তু এ কী করিলে নিৰ্ম্মম দেবতা? ভিত্তি বাস্তব জগতে স্থান হারাইয়াছে নে। ধীরে ধীরে চক্ষে সম্মুখে ফুটিয়া উঠিল, সে কোন এক বিজন বোতট! ঠিক এমনি সে এক বাদল সন্ধ্যায় সমুদ্রের বোতটে তাহাকে কাছে পাইয়াছিলাম। কৈ, সে সময় তাে মুখ ফুটে নাই, সমস্ত ভাবা হৃদয়ের আকুলতাকে পিয়া রাখিয়াছিল, নির্জন সে বেলাটে আর কেহ ছিল না, হতভাগিনী আনি, তঁাহার বুকের কাছে দাড়াইয়াছিলাম। সে কী আকুলতা বুক ঠেলিয়া বাহির হইতে চাহিতেছিল,-সে-কী ব্যাকুল উদ্বেগ ! ‘উঃ, সে দিনটা, সে ক্ষণিকটা কি গাে একবারও ফিরিয়া আসিতে পার না? অনুতপ্ত মর্মাহত এ জীবনে কী এক বিন্দু শান্তিবারি সিঞ্চন করিতে পার না? বৃথা, আর কি তিনি আসিবেন ? যে অনাদর-যে উপেক্ষা লইয়া গিয়াছেন, কেমন করিয়া আবার ফিরিবেন গাে? এ কী, গান থামিয়া গিয়াছে ? ছিঃ, কখন গিয়াছে ? ছিঃ, কখন অন্যমনস্ক হইয়া গিয়াছি, হুস নাই! রীডগুলির উপর আঙ্গুল দিয়া কতক্ষণ বিমুঢ় ভাবে বসিয়াছিলাম, মনে নাই । সহসা কে ডাকিলেন-“মীনু ?” এ স্বর যে বড় প্রিয়, বড় পরিচিত গােয় ১১৮

পচিশ
বাবা বলিতেছিলেন-আর বােধ হয় আমি বাবা না মীনু !
কতদিন তন্দ্রায় দেখেছি, তাের মা এসেছেন। আমাকে বার বার করে
বছেন-‘মুহূর্তের বশে একটা মহা ভুল করে বসে। না, মিনা আমার
যাতে সুখী হয়, তাই করো!—বল্ মা মানু, কি করলে তৃই সুখী হেদ
আজই আমি আমার এই পঙ্গু জীর্ণ হাড় নিয়ে তা করবাে, বল্ মা?
কি উত্তর আমি দিব গো! মা-আমার, তােমার কন্যায় মুখের
জন্ম তুমি লালায়িত হইয়াছ, কিন্তু সে যে বহু দূরে মা! কৈ, এই
ত এতগুলি দিন চলিয়া গেল, কাহারও ত সন্ধান পাইলান না ।
যাহারা ছিল, সকলেই ত নৈরাশ্যের স্নান-আঁধার লইয়া একে একে
চলিয়া গেল।
যতগুলি পাখী ছিল, গেয়ে বুঝি চলে গেল,
সমীরণে মিলে গেল, বনের বিলাপ তান,
ভেঙ্গেছে ফুলের মেলা, চলে গেছে হাসি-খেলা
এতক্ষণে সন্ধ্যাবেলা, জাগিয়া চাহিল প্রাণ,
কখন বসন্ত গেল, এবার হ’ল না গান !

রুদ্ধ অাবেগ
সুষুপ্ত রজনীর কোলে বিনিদ্র নয়নে কত কাদিয়াছি, কত আকুল
আগ্রহভরে পথে পানে তাকাইয়াছি, কিন্তু কৈ, কেহই ত আসিল
! বৃথা, বৃথা!
০
০
০
পনের দিন কাটিয়া যাইবার পর, বাবা আজ বিছানা ছাড়িয়া
উঠিলেন। চক্ষে সে দীপ্তি নাই, মুখে সে হাসি নাই—যেন কত
যুগ-যুগান্তর ধরিয়া বিষাদের কোলে মাথা ঢাকিয়াছিলেন, আজ
উঠিলেন। অন্তরে তাহার কেবল চিন্তা চিন্তা, কি করিয়া আমায়
সুখী করিবেন, তাহারই চিন্তা
০
০
৩
কিন্তু সে আজ কোথায় গাে ? যাহার স্মৃতিধ্যানই আমার একমাত্র
উপাসনা, যাহার পত্ৰ আমার ইহজীবনের ধর্মগ্রন্থ ! হায়, পৃথিবীতে যে
তাহার দানের প্রতিদান দিতে পারি নাই, প্রেমা অভিষেক করিলে সে
ঋণ আমার পরিশােধ হইবে কি? এ ক্ষুদ্র লাঞ্ছিত জীবনের নৈবেদ্যে
সে দেবতার পূজা হইবে কি? ওগাে-
যত প্রেম আছে সব প্রেম মােরে
তােমা পানে র’বে টানিতে,
সকলের তরে রবে তব প্রেম
আমার হৃদয়খানিতে।
বড় অভিমান করিয়াই ওগগা দেবতা আমার, তুমি চলিয়া
গিয়াছ ! আজ তাহারই স্মৃতি শত বৃশ্চিকের মত পলে পলে
১২৫

রুদ্ধ আবেগ আমায় দংশন করিতেছে। ইহাদের হস্ত হইতে কি করিয়া মুক্তি পাই ? কুন্তলার কাছ হইতে কাল একখানি পত্র পাইয়াছি। পবিত্র স্নেহ- প্রীতির উপহারস্বরূপ স্বামীর কাছ হইতে সে যাহা উপহার পাইয়াছে, তাহারই গর্বে শূন্য বক্ষখানি আজ তাহার পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। আজ সে জগতে মাতৃত্বের অধিকার পাইয়াছে,অনাবিল স্বর্গীয় প্রেমের অধিকার আজ তাহাকে জগদীশ্বর নিজে দিয়াছেন। কুন্তলা লিখিয়াছে,-- সে মহামূল্য রত্ন আজ ভগবান আমাকে দিয়াছেন, আশীৰ্বাদ কর মীনু-দিদি, দরিদ্রের ঘরে জন্মিয়াও যেন মানুষ হইয়া উঠে। বাবা ঘরে ঢুকিলেন, মুখ তাহার গম্ভীর, তথাপি মেহসিক্ত স্বর- মী। তাহার বুকে মাথা রাখিয়াই উত্তর দিলাম । বাবা বলিলেন–না মা, ভেবে দেখলুম, তাের আশা পূরণ করাই আজ আমার সৰ্বশ্রেষ্ঠ কৰ্তব্য! এ তাের মায়ের আদেশ ! বল্ মা, আজকেই অরুণকে লিখে দি’-সে এখানে চলে আসুক। হােক সে হিন্দু, তবু তার হাতেই তােকে আমি দেব। কিন্তু হাঁ মা, তা হলে এ বুড়ো ছেলেকে ছাড়তে হবে যে !” চক্ষুদ্বয় তাহার অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল। তিনি বলিতেছিলেন- “নইলে সারাজীবন ব্রাহ্মসমাজের কল্যাণ কামনায় আপনাকে ঢেলে দিয়ে, বাকী ক'টা বছরের জন্যে আবার কেন মা লােকের নিন্দা, গ্লানি রুদ্ধ অাবেগ কুড়িয়ে বেড়াব ? ‘আচাৰ্য পদ পাবার জন্যে আমি লালায়িত নই, কিন্তু মা, সমাজ ? তাকে আমি বড় ভয় করি ! বল্ মীনু, আজই তা হলে অরণকে লিখে দি’! বল্ মা?” বাবাকে ছাড়িয়া থাকিতে হইবে! ওগো প্রভু, একি মহা সমস্যায় আজ তুমি আমার ন্যায় ক্ষীণ দুৰ্বল নারীকে " ফেলিয়া দিলে ? বাবা বলিলেন—আমার জন্যে ভাবিস নে মা ! আমি আর ক'টা দিন বল্ না ? ক'টা দিনের জন্যে সারা জীবনটাকে নষ্ট করিস নি। খুব ভাল করে ভেবে দেখু! এই ত তাের মামারা ! তারাও তাে হিন্দু মা! তাের মাকে যখন বিয়ে করি,-না, তুই ভাল করে ভেবে দে! भी। কাহার একটী কাতর সুর যেন বাতাসের সহিত জড়াইয়া জড়াইয়া কানে আসিয়া বাজিতেছিল- শুধু তব ধন করি আশ আমি পরিয়াছি দীন বাস শুধু তােমারি লাগি করিয়া আশ মরমের কথা কহি গাে ! আঃ, এ কাহার মর্মান্তিক আর্তনাদ গাে! আহা বেচারী আমার । এ কী আত্মত্যাগের বাণী তুমি শােনাইতেছ, ওগাে ভােলা পথিক! যুগ যুগ ধরিয়া ও-কাতর আহ্বান চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়াইলেও তােমার ও-আশা সফল হইবে না। ২২

রুদ্ধ আবেগ
বাবা বলিলেন-তবে ভেবেই দেখ মা, কাল আমায় বলিস,
বুঝলি ?
বাবা উঠিয়া গেলেন। মৃঢ় স্তম্ভিতের ন্যায় নিশ্চল দেহ লইয়া আমি
সেইখানেই বসিয়া রহিলাম ।
ছাব্বিশ
শ্রান্ত ক্লান্ত সূৰ্য ৰখন সমস্ত দিনের কাৰ্য শেষ করিয়া জগতের কাছ
হইতে বিদায় গ্রহণ করেন, নিমেষের অন্তরালে কে থাকেন, কে জানে?
অমনি সন্ধ্যারাণীকে পাঠাইয়া দেন। সুখ-আবর্তনের অন্তরালে
থাকিয়া জীবন-নাটকের প্রতি অঙ্ক শেষ একখানি করিয়া দুঃখ-দৈন্যের
যবনিকা, কে ফেলিয়া দেয়-কে জানে? যে-ই হউক, অভিশপ্তা নারী
আমি, তঁহাকে সহস্র নতি করিতেছি। কৈ, পূৰ্বে ত এমন ছিলাম
!—যাক্।
‘মীমুদি’ ?”
“কে, মনীষা ? আয় ভাই, কবে এলি ?”
“আজকে। একি মনু-দি, তােমার অসুখ করেছে না-কি ?”
“দূর পাগলী, অসুখ কেন করূতে যাবে? স্নান করিনি, তাই অমন
দেখাচ্ছে।”
মনীষা হাসিয়া উঠিল-স্নান না করলে চোখ বসে যায়, কণ্ঠা বেরিয়ে
পড়ে, না মীনুর ?

রুমাবেগ
“তা নয়
. । মেয়েটাও দেখিতেছি ছাড়িবে না। ওরে অভাগী, এ ব্যথা
জানিবার জন্য তাের এত আগ্রহ কেন রে ?”
“শ্বশুরবাড়ী কেমন দেখলে, মনীষা ?”
“খুব ভাল, মীনু-দি’ কি পেরকাণ্ড বাড়ী,মটর, ঘােড়া--
মনীষা, গরু ঘােড়ার কথা বলিনি,
শ্বশুর শাশুড়ী
কেমন ?”
“তা ভাল মীনুদি’!”
“আহা, তাই হউক ! বিশ্বের কাছে অপরাধ করিয়া একে ত
দারিদ্রকে বরণ করিয়াছি, আজ দেবতার ঘরে গিয়া পুণ্য-আশিস লাভ
ক বােন্!”
!
০
০
০
.
৫
স্কুল হইতে বাবার নিকট একখানি চিঠি আসিয়াছে। মণিকা-
দি’ লিখিয়াছেন, সেই যে আট দিনের ছুটী লইয়া আমি প্রায় চারিট।
মাস স্কুল যাই নাই, তাহাতে লেখাপড়ার ক্ষতি এবার নাকি
যথেষ্ট হইয়াছে, প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়া কষ্টকর হইবে, সন্দেহ
নাই।
বাবা বলিলেন-“কি লিখে দি’ বলতে মীনু ? বাের্ডিঙে আর
যাবি ?”
বলিলাম-“যাব বাবা।”
“তাতে আমার বড় কষ্ট হবে কিন্তু মা ? খাওয়া দাওয়া, দেখা আর
ও-বুড়িটার দ্বারা হয়ে ওঠে না।”
১২

রুদ্ধ আবেগ
সত্যই তো, ছিঃ ! তাহার খাওয়া পড়ার তত্ত্বাবধান করিবার কেহই
নাই, আর আমি
“না বাবা, লিখে দাও,-বাের্ডিঙে আর আমি যাব না!”
“তাই---দি'। বাবা উঠিয়া গেলেন।
দারোয়ান চলিয়া গেল, বিছানা-পত্রগুলি বাঁধিয়া আনিবার উপদেশ দিয়া
আমি উপর উঠিয়া আসিলাম। সহসা হাঁপাতে হাঁপাইতে আসিয়া বাবা
ডাকিলেন—“মী ! মিনতি।”
“কি বাবা!
“এই দেখ মা, টাটা থেকে অরুণের টেলিগ্রাম এসেছে। যত
গগীর পারি যেতে লিখেছে। কি জানি না, এই হয় ত ঈশ্বরের
আদেশ-ইচ্ছা সব, ওই যাওয়ার উপলক্ষ্যই হয়তাে তােমাদের জীবন
দুটাকে একসঙ্গে বেঁধে দেবে ! চল মা, আজই যাই। আমিও ভেবে
দেখেছি মিনতি। ওই অরুণের সঙ্গেই তাের বিয়ে দেবাে।”
“কিন্তু -
বাবা বলিলেন—“সে হিন্দু, এই কথা বছিস? তাতে আমার কোন
আপত্তি নেই মিনতি! আমি আর কটা দিন মা ?”
ওগাে নির্মম সত্য-সুন্দর, আজ এ আবার কি মূর্তিতে তুমি দেখা
দিলে? যে রুদ্র-বাণী এতদিন আমার কর্ণে শুনাইয়াছিলে, তাহা অপেক্ষা
ইহা যে কত সুন্দর !–মা গাে, আজ যেখানেই থাকিস, তাকাইয়া দেখ,
অভাগিনী কন্যা তাের, তােরই ইচ্ছা পালন করিতে চলিয়াছে। কিন্তু
কিসের এ আহ্বান ?

রুদ্ধ আবেগ
তা হলে লিখে দি’ মা তাকে ? কিম্বা চল, তার বাড়ীতে গিয়েই
উঠি। হা হা, সেই ভাল মা! মুকুল, মুকুন্দ ! কোথায় গেল বেটা ?”
এখনি একখানা টাইম-টেবল কিনে আন মুকুন্দ ! যাও, শীগগীর।
তুই সব গুছিয়ে নে, মা! কি জানি, আর দেরী করূতে ভয় হচ্ছে ?
তুই শীগগীর নে মা ! আমি আমার জিনিষপত্র গুছিয়ে নি!
বাবা উঠিয়া গেলেন। আঃ, ওগাে আজ বুঝি অন্তরের সমস্ত
অন্ধকার নাশিয়া গেল। প্রিয়তম, বেবতা আমার। আমার
পবিত্র শুভ্র অর্ঘ্য লইয়া আমার নারীজীবনকে ধন্য করিয়া দাও,
তােমার ও নিষ্কলঙ্ক সুন্দর চরণে স্থান দিয়া আমায় পবিত্র করিয়া লও
গো! নারী আমি, পৃথিবীতে সমস্ত অধিকারহীনা, তােমার ভালবাসা
পাইবার অধিকার আজ আমায় দান করিয়া কৃতার্থ কর-ওগো
সত্যসুন্দর ! হে আমার গোপন-চিত্তের নিভৃত দেবতা! সমস্ত
অপরাধ আমার ভুলিয়া যাও, আজ তােমারই দুয়ারে দাড়াইয়া
ভিখারিণী আমি! আজ তোমার আহ্বানকে সগৌরবে মাথায়
করিয়া চলিয়াছি।
আমার মুগ্ধ প্রাণে, ওগাে প্রেম-ধারা :লে দাও,
আমার মুগ্ধ চোখে, সুষমা ছড়ায়ে দাও,
তােমারে ডাকিতে প্রাণে প্রাণে
মােরে শিখাইও প্রভূ, শিখাইও।
তােমারে খুঁজিতে পথখানি
উজলিও সখা উজলিও -
১২৬

রুদ্ধ অাবেগ গাে আমার হৃদয়-দেবতা! আপনার করিয়া আমায় গড়িয়া ও, আপনার মত সুন্দর করিয়া আমায় শিখাইয়া তাে, তোমার ও-সুন্দর কোমল স্পর্শে আজ সমস্ত বাদ-জড়িত, সমস্ত যিদ-জড়িত, কর্ণিমা-লিপ্ত দুভাবনার জাল ছিড়িয়া দাও, আজ আবার নূতন জীবন ইয়া সংসার- পথে নামিয়া এস গাে ! দিদিণি! চমকিয়া উঠিয়া পেছন ফিরিতেই দেখিলান, মুকুন্দ দাড়াইয়া । টাইটেল এনেছ মুকুন্দ ? কৈ, দেখি। বাবা ঘরে ঢুকিলেন। বইখানা অনেকক্ষণ ধরিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া শেষে বলিলেন—বিকেল সাড়ে ছটায় ট্রেণ মিনতি, তার আগেই আমাদের ঠিক হয়ে নিতে হবে। মুকুন্দ, যাবি ত সঙ্গে ? বাদলসিক্ত আকাশের কোলে পুঞ্জীভূত কালাে মেঘ গুলি এতদিন চারিদিক অন্ধকার করিয়াছিল, ওগো আজ আবার কে তুমি তোমার সুন্দর সহাস্য আনন লইয়া মেঘগুলাকে সরাইয়া দিলে ? এ যে আমি আশাও করিতে পারি নাই, কল্পনায় আনিতেও সাহস হয় নাই। কেন আজ এ কাঙালিনীকে স্বেচ্ছায় ডাকিলে গাে ? অরুণবাবুকে আবার আমি পাইব, ইহার চেয়েও-কিন্তু ধৰ্ম্ম ছাড়িতে হইবে ! হউক, তাহার জন্য শুধু ধৰ্ম্ম কেন, সমস্ত জগত ছাড়িয়া যাইতেও আমি প্রস্তুত। ওগাে আমার প্রাণের প্রিয়-দেবতা। তােমাকে খুঁজিয়া বাহির করিতে তােমার পথখানি উজ্জ্বল করিয়া রাথ! ১২৭ রুদ্ধ অাবেগ নে মা, দেরী করিস্ নি! সব গুছিয়ে গাছিয়ে নে। হ মুকুন্দ, একবার ষ্টেশনে গিয়ে একখানা সেকেণ্ড ক্লাশ –অচ্ছা থাক, আমি ই যাচ্ছি, তুই দিদিমণিকে সাহায্য কর, চট্‌ পট,--বুঝলি ? ইস্, সময় যেন আজ আর কাটিতে চায় না। কিন্তু কেন? সাতাশ কাল রাত্রে আসিয়া পৌছিয়াছি। কিন্তু এ কি হইল গাে ! মরীচিকা-লুব্ধ পথিকের মত ছুটিতে ছুটিতে এ কোথায়, কোন সীমানায় আসিয়া পড়িলাম গাে ! দেখিয়াছিলাম সুতীব্র উজ্জল আলােক, কিন্তু এ সূচীভেদ্য অন্ধকারে কে টানিয়া আনিল ?-মূঢ় ভ্রান্ত ওরে, এ যে আলেয়ার আলাে ! যে উচ্চাশা, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে বুকে ধরিয়া ছুটিয়া আসিলাম, কে জানিত, তাহার সৃষ্টি ব্যর্থতার মধ্যে। যাহার সুন্দর চরণ- যুগলকে বক্ষে ধারণ করিতে আসিলাম, আজ যে তিনি শয্যাশায়ী। কে জানে, এ কঠিন পীড়ার হস্ত হইতে তিনি মুক্তি পাইবেন কি ? তাহাই হউক ভগবা, যে তরুণ পুষ্প অকালেই শুকাইয়া উঠিতেছে, তাহাকে বাঁচাইয়া রাখ দেবতা! নির্মম নিষ্ঠুরের মত ১২.

রুদ্ধ আবেগ ছিড়িয়া ফেলিও না, তােমার সুধারস দানে আবার তাহাকে সঞ্জী- বিত করিয়া তােল। ডাক্তার আসিয়াছিল, বলিয়াছে, রােগ কঠিন সন্দেহ নাই, তবে জীবন-মরণের ভার না-কি ঈশ্বরের হাতে, অদৃষ্ট উপলক্ষ মাত্র, তাই যত্ন, সেবা, অক্লান্ত পরিশ্রম। জীবনের মূল্য তাহা অপেক্ষা কত উচ্চ, কত প্রয়ােজনীয়। চারিদিকেই লােহার শব্দ। কাণ যেন ফাটাইয়া দেয় এমনিই। আহা, তবুও ইহার মধ্যে কেমন একটা মিষ্টতা, কেমন একটা কমনীয়তা আছে। এই যে কুলী-বালকেরা ঘর্মাক্ত-বয়ানে, অবিশ্রান্তভাবে কাজ করিয়া যাইতেছে, বিশ্রাম নাই-ক্লান্তি নাই, না জানি, ইহাদের জীবন কত বৈচিত্র্যবিহীন—কত অনাড়ম্বরপূর্ণ। জগতে আসিয়াছে দুঃখের বােঝ চাপাইয়া,আবার চলিয়া যাইবে ঠিক তেমনি একটা দৈন্যতার বােঝাকে ঘাড়ে লইয়া। সুখ ভগবান্ ইহাদের দেন নাই, তবু ইহারা কত সুখী, কত শান্তিপূর্ণ জীবন কাটাইয়া দিতেছে! হায় রে ! মনুষ্য-জীবনের সফলতা তত এইখানে। সারা- জীবন ভরিয়া শুধু অভিশাপ, গালি কুড়াইয়া যাহারা দুই মুঠা অন্নের জন্য দাসত্বের শৃঙ্খলকে বরণ করিয়াছি, তাহারাই হইল দেশের নীচ, অসভ্য ;-আর যাহারা অকুণ্ঠিতচিত্তে দিনের পর দিন , রাতের পর রাত বিলাসিতার সু-উচ্চ হৰ্ম্মে বসিয়া ইহাদের উপর অযথা ৯ রুদ্ধ আবেগ প্রভুত্ব চালাইতেছে, তাহারাই দেশের মনুষ্য—আশা ভরসা সব, পৃথিবীর আলােক তাহাদের নিকট পৌঁছায় না, সভ্যতায় রশ্মি তাহারা দেখে নাই,—তাহাদের অপরাধ এই। তবু তাহারা কত বিনয়ী, কত নম্র। বেহারা সেদিন কথায় কথায় বলিয়াছিল—সাহেব এক একদিন রাতে কারখানাতেই থাকিয়া যান। খানা-পিনার ফুরসৎও খুব কম জোটে। শুধু কারখানা কেন, সমস্ত টাটা নগরে তাহার যে সুখ্যাতি আছে, শুনিলে তাহাদেরই আনন্দ ! হাজার হউক, তাহাদেরই মনিব তাে! প্রভুর বিজয়-বার্তায় কোন্ ভৃত্য গর্বিত হয় ? ইহাই তাে স্বাভাবিক। ইহাতে আশ্চর্য কি? জীবন-মৃত্যুর সন্ধিস্থলে দাড়াইয়া তবু এ কী আধ-আলল, আধ- কালাে-মিশ্রিত জাগ্রত স্বপ"র মত হৃদয় আমার পুলকে দুলিয়া উঠিতেছে ? তবু ক্ষণে ক্ষণে বুকটা যে কঁপিয়া উঠে, পা দুইটা যে দুলিয়া উঠে, অন্তর হইতে কে বলিয়া উঠে—ওরে অভাগিনী, আজ যে আঘাতকে বুকে তুলিয়া লইবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিস, কোথায় তাহার সার্থকতা রে, কে তাহার সামর্থ্য দিল ? এই তত সকল অনাদর-সকল অভিমান উপেক্ষা করিয়া দয়ি- তের আহ্বানে উপেক্ষিত-অনাদৃত সেই দয়িতের কুটীরেই ফিরিয়া আসিয়াছি। ভিখারীর মত ভিক্ষাই যে সে আমার উদ্দেশ্য গাে! আজ যে সকল অহঙ্কার—সকল দর্প চূর্ণ হইয়াছে গাে ! রিক্ত আজ, শূন্য আজ আমি ।

রুদ্ধ আবেগ মীনু! শুনছিস মা ? পেছন ফিরিয়া দেখিলাম—বাবা। আগ্রহভরে তিনি বলিলেন- অরুণ এখন কেমন আছে মা? স্বরটা ছেড়েছে ? মীর্ণ তাহার মস্তকটা ক্রোড়ে লইয়া বসিয়াছিলাম, দেহের উত্তাপ তখনও যথেষ্ট। বলিলাম-না বাবা, কমে নিমােটে তুই খেয়ে আয় না মা, আমি বসছি। বলিলাম—না বাবা, আজ খাব না, শরীরটা মােটেই ভাল নেই। অন্তরে যাহার আকুল অগ্রহ---ব্যকুলতা, আহারে প্রবৃত্তি তাহার কোথায় ? আহার করিবার ইচ্ছা আমার আদৌ হইতেছিল না ! তাহার মাথাটাকে কোলে ভাইয়া বসিয়াই রহিলাম। বাবা বলিতেছিলেন—ক করিব মা, অরু না উঠলে আমিও তাে যেতে পারছি না। এবারে সমাজের উৎসবের সময় এসে গেল, তারও তত আয়োজন করতে হবে। জানিস তাে, আমি না থাকলে মন্দিরের কোন কাজই হয়ে উঠে না! বড়ই ভাবিয়ে তুললে, মা! বাবা চলিয়া গেলেন, অরুণবাবুর মাথাটা কোলে লইয়াই স্থিরভাবে আমি বসিয়া রহিলাম। কে জানে, এপ্রয়াস, এ যত্ন-সেবার সাফল্য কোনদিন পাইব কি না? আজ যে সেই অদূর ভবিষ্যতের দিকে তাকাইয়াই বসিয়া আছি বেতা! সে মুহূৰ্ত্ত কি আসিবে না? উঃ ! কে তুমি? অরুণবাবু মুখ ফিরাইলেন। মলিন-কাতর মুখখানি হার ঘর্মসিক্ত হইয়া উঠিয়াছিল চেতনা যেন ধীরে ধীরে ফিরিয়া আসিল।

রুদ্ধ আবেগ
কে, মিনতি ? তুমি-তুমি কখন এলে? এ যে আমি কখন
আশাও করিনি মিনতি ? রণেনবাবু আসেন নি ?
আজ কোন্ ভাষা দিয়া তােমায় জানাইব গো, অভিশপ্তা নারী
আমি, তােমার আরাধনা করিতেই ছুটিয়া আসিয়াছি। হীন এ
অন্তর, তােমার পূজার অর্ঘ্য নিবেদন করিবার জন্য ব্যকুল ! বুদ্ধকণ্ঠে
বলিলাম—তিনি আসেন নি, বাবা এসেছেন কাল রাতে ।
হতাশব্যঞ্জক মুখে কে যেন একটা তৃপ্তির আভাস ফুটাইয়া
তুলিল। ক্ষীণকণ্ঠে বলিলেন—জানি মিনতি, আমার অসুখ শুলে
কিছুতেই তুমি সুস্থির থাকতে পারবে না, তাই সকলের আগে
তােমাকেই টেলিগ্রাম করেছিল। কিন্তু আজ কুন্তলা যদি থাকতাে,
সুধীর যদি থাকতাে--কে জানে, তারা কোথায় আছে । যেখানেই
থাকুক, যদি তারা আজ
সহসা বলিয়া ফেলিলাম—আমি জানি।
আগ্রহভরে তিনি বলিয়া উঠিলেন—জানাে মিনতি,—জানাে ?
জানি।
কোথায় তারা আছে মিনতি ? বল, আজই তাদের লিখে দি’
এখানে চলে আসতে। যে ভার স্বেচ্ছায় তােমায় দিয়েছি, আজ সে
গুরুভার থেকে তােমায় মুক্ত করতে চাই ! বল, কোথায় তারা আছে ?
আজ কি করিয়া তােমায় বুঝাইব দেবতা, যে ভার তুমি দিয়াছ,
সে ভার দেবতার আশীষের মতই আমার কাম্য, পবিত্র অর্ঘ্য
যে গাে! তাহা হইতে মুক্তি যে আমি চাহি না গো ! যে দান
১৩২

রুদ্ধ আবেগ স্বেচ্ছায় করিয়াছ, আর তাহা কাড়িয়া লইও না। দাও, সে ভার পালন করিতে দাও। নারী আমি, দাসী আমি, অস্তরের পূর্ণ আনন্দ লইয়া তাহা পালন করিব। অরুণবাবু বলিতেছিলেন--কে জানে, মিনতি, আর হয় তাে আমি বাঁচবাে না। দিন রাত্রি-অন্তরের মধ্যে এই কথাটাই এই ভাষাটাই, কে যেন আমায় বার বার বুঝিয়ে দিচ্ছে। উড়িয়ে দিতে চাই, মুছে দিতে চাই, মুছে না। কালীর দাগের মত আরও স্পষ্ট, আরও উজ্জ্বল হয়ে ভেসে ওঠে। দাও মিনতি, আজই তাদের লিখে দাও, আসুক তারা—শেষ একবার তাদের দেখতে চাই,আর হাঁ, রণেনবাবুকে যার সঙ্গে তােমার বিয়ে হয়েছে, তাকেও-ও কি চমকে উঠলে যে ? মিনতি—মীয়- এ কী বিদ্রোহী আন্দোলন আমার স্থির নিশ্চল প্রাণে জাগাইয়া দিলে গাে! এ প্রাণ যে তােমারই দেবতা! কেমন করিয়া অপরের হস্তে প্রদান করিব ? যুগ যুগ ধরিয়া এ তৃষিত অন্তর যে তােমাকেই চাহে গাে, তােমারই নাম—তােমারই স্মৃতি যে সূচীভেদ্য অন্ধকারে একমাত্র আলােক-রেখা মিনতি। সে কী মী, তবে তুমি এখনও-উঃ, বড় যন্ত্রনা মিনী ? সহসা একটা আর্তনাদ করিয়া তিনি পাশ ফিরিেেলন। এ কী! কেন এমন হইল ? নিৰ্মম ওগাে সত্যসুন্দর, তােমার দিব্য জ্যোতিঃ এ অন্ধকারে ফুটাইয়া তােল গাে ! বাবা ডাকিলেন—মী! ১৩৩ আটাশ চারিটা দিন কাটিয়া গেছে, কিন্তু কৈ, জ্ঞান তাে আর আসে নাই। সেই যে সেদিন জ্বরের প্রাবল্যে প্রলাপ বকিতে বকিতে জ্ঞান হারাইয়াছেন, চক্ষের সম্মুখ দিয়া প্রতি পল—প্রতি দণ্ড লইয়া এই তাে চারিটা দিন কাটিয়া গেল । আধ-আলাে আধ-কালাে জাগ্রত স্বপনের মত কখন চেতনা ফিরিয়া আইসে, আবার নিমিষে চলিয়া যায় !–দূর চক্রবালপ্রান্তে সূর্যরশ্মির শেস হাসি-কান্নার মত। মহামিলনেয়, শুভ মিলনের পূর্বে এ কী বাধা, এ কী বিঘ্ন দীর্ঘ প্রাচীরের মত সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল গো! মা-আমার, এই জগতের বাহিরে আজ যেস্থানেই থাকিস, শুধু আশীৰ্বাদ কর মা, যেন এ দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করিতে পারি,-মৃত্যু- কামী পথিককে মরণের পথ হইতে ফিরাইয়া আনিতে পারি। এই আশীর্বাদ চাহি, আর কিছু নহে। অভাগিনী নারীর ভিক্ষা, সফল ক মা ! কুন্তলাকে টেলিগ্রাম করিয়াছি, কে-জানে, হয় ত আজই সে আসিবে,—আজই আমাকে সেবা-পরিচৰ্যার ভার ছাড়িয়া দিতে হইবে। দেবতা আমার, কাঙালিনীকে যে অধিকার স্বেচ্ছায় দিয়াছিলে, আজ তাহার কোন্ অমার্জনীয় অপরাধে আবার তাহা কাড়িয়া লইতেছে ? সমস্ত ত্যাগ করিয়া যে আজ এই সেবাটাকেই জীবনের সব চেয়ে মহৎ, ১৩৪ রুদ্ধ আবেগ সব চেয়ে বড় পাওয়া করিয়া লইয়াছিলাম, ইহাই যে একমাত্র সম্বল ছিল গাে ! কিন্তু সমস্ত হারাইয়া পথিকের মত আজ এ রিক্ত, উপেক্ষিত অন্তর লইয়া কোথায় যাইব? কে তাহার সাদর আলিঙ্গনে আমাকে ডাকিয়া লইবে ? কুন্তলা, দিদিটী আমার ! চাহিয়া দেখ, আজ তুই বিজয়ী—গী, আর ধূলায় লুষ্ঠিতউপেক্ষিত আমি,-নিন্দনীয় আমি ! পৃথিবীতে আজ আমার চেয়েও তুই প্রশংসনীয়—বয়েণ্যা ! নির্জন ঘরের মাঝে একাকী আমি চুপ করিয়া বসিয়াছিলাম, সহসা বাবা ডাকিলেন—মীনু। মেহসিক্তকণ্ঠে তিনি বলিলেন—কঁদিস্ নি মা, ভয় কি ! অরু লেরে উঠবে,-তবে দেখি, সেবা করতে ভুলিস নি, তাহলে জীবনে বড় অনুতাপ পাবি। কঁদিস্ নি মা ! রুগীর ঘতে তো অমন করে কাঁদতে নেই। তার চেয়ে বরং তাকে ডা—এ মহাপরীক্ষায় যিনি আজ তােকে ফেলেছেন! হাঁ, আজ তারা আবে, বছিলি না ? তা ঘরগুলাে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করিয়ে রাখ। নে মা, চটপট ! বাবা চলিয়া গেলেন। অরুণ বাবুর নিদ্রিত দেহটা ধীরে ধীরে কোল হইতে নামাইয়া দিয়া উঠিয়া পড়িলাম। এ বিশ্বে—সমগ্র জগতে, কৈ, আজ কাহারও করুণ সহানুভূতি পাইলাম না তাে! বিরাট মৃত্যু দেবতা! দুর্জয় দূতগুলিকে তােমার, ফিরাইয়া লও গাে ! নারী আমি, কাঙালিনী আমি, শুধু এই প্রার্থনাই তােমার নিকট করিতেছি। শত সহস্র নতি আমার, তােমার চরণে গিয়া পৌঁছাক । ১৩৫ রুদ্ধ আবেগ কুন্তলা আসিয়াছে, মাতৃত্বের পূর্ণ গর্বে আজ সে গৰ্বিত, তৃপ্ত ; জগতে তাহার দাবী আজ যথেষ্ট। যে কলঙ্কের ধারা, নিন্দার শ্রোতকে জীবনের ভূষণ করিয়া বরিয়া লইয়া সে আপনার পথ বাছিয়া লইয়াছিল, আজ সে কলঙ্ক তাহার, ঝরিয়া গিয়াছে, সে নিন্দা তাহার, লােপ পাইয়াছে। আজ সে মুক্ত, সুখী ! হোক না দরিদ্র, 'হৌক না দীর্ণ, অতি উচ্চ ধনীর গৃহে যে সুখ পাওয়া যায় না, আজ তাহার দীর্ণ জীর্ণ কুটীরে সে সুখ আসিয়া আপনি ধরা দিয়াছে। কুন্তলা, কুন্তী -দিদিটী আমার ! আজ আমিই যে রিক্ত ভাই, পাপের আমার শূন্য—ভিখারীর মত। কে তাহা পূর্ণ করিয়া দিবে ? ডাক্তার বলিয়াছে, জীবনের আশা যে একেবারে করা যায় না, তাহা নহে। সেবা ও শুশ্রুষার গুণে মৃত্যুপথ নাকি অনেকটা অতি- ক্রম করিয়াছেন। তবু এখনও যথেষ্ট সেবা চাই—যত্ন চাই—প্রাণের আবেগ চাই। মরণকামী পথিকের পক্ষে এগুলা না-কি বড়ই প্রয়ােজনীয় । মীনি। চমকিয়া পেছন ফিরিতেই দেখিলাম, কুন্তলা দাড়াইয়া, কোলে তাহার শিশুটী! মুখ ফিরাইতেই কুন্তলা হাসিয়া বলিয়া উঠিল—এখানে কি করছিস্ রে ? তাের কথা ভাবছি! ইস্! আমার, না দাদার ?

রুদ্ধ আবেগ খােকার গাল দুইটা টিপিয়া দিয়া সস্নেহে বলিলাম--এই থােকাটীর মায়ের ! কি বল থােক, মা বড় দুধু, নয় ? অবােধ শিশু কথা বুঝিল কি-না, কে জানে? খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। কুন্তলা বলিতেছিল—সত্যি ভাই মিনী, তাের টেলিগ্রাম যখন পেলুম, তখন এত ভয় হয়েছিল আমার, সে রাত্রে কিছুই খাই নি; শুধু কেঁদেই কাটিয়েছি ! দাদীর জীবনের যদি কেউ অধিকারী থাকে, সে একমাত্র তুই-ই মিনতি তুই। মরণের পথ থেকে টেনে এনেছিস, এ উপকারের প্রতিদান নেই, পৃথিবীতে বােধ হয় হতেও পারে না ! মিনী, বাের্ডিঙের কথা মনে পড়ে ? অস্ফুটস্বরে বলিলাম—পড়ে ভাই- আজও আমার মনে হচ্ছে মিনী, আমরা দুটাতে ঠিক যেন সেই বাের্ডিংঙেই আছি। আমাদের বন্ধুত্ব কোন্ শুভলগ্নে স্থাপিত হয়েছিল জানি না, কি শুভ মন্ত্রে সাধিত হয়েছিল, জানি না ভাই। তবে এ কথা বিশ্বাস না করে থাতে পারি না যে, পৃথিবীর বাইরে বে অচেনা দেশ আছে, সে দেশে আমরা দুটাতে ছিলুম ঠিক এক তারে, এক প্রাণ হয়ে ! এক সুরে আমাদের দুটি প্রাণ ঝঙ্কত হয়ে উঠত, এক গান আমাদের অন্তর গেয়ে উঠতাে,তাই এ জগতে এসেও আমরা বিচ্ছিন্ন হতে পারিনি। বল ভাই, ঠিক ই কি-না? সত্যি কথা বলবাে কি মিনী, আমার অন্তর এখন সেই দিনের প্রতীক্ষায় বসে আছে। যে দিন তােদর মিলন-আলােকে এ বাড়ী সােনার আলোয় রঙিয়ে উঠবে, উৎসবের বাজনায় চারিদিক ১৩৭

রুদ্ধ আবেগ
মুখরিত হয়ে উঠবে, ঠিক সেইদিনটীর প্রতীক্ষাই আমি করছি ।
মিনী !
৫
কেন ভাই ?
সত্যি কথা ববি ভাই? বল্ সত্যি করে, দাদাকে তুই কেমন,
কতটা ভালবাসি?
হা রে অভাগী ! আজ এ প্রশ্নের উত্তর মুখের বাণীতে দিতে হইবে
তােকে ? এতদিন অন্তরের প্রতি বিন্দুটীতে ইহার উত্তর যে জড়াইয়া
আছে গাে। বলিলাম, তুই এ কথা জিজ্ঞেস্ করছিস কুন্তী ?
ক্ষমা কর ভাই, ভুলে গিয়েছিলুম, ঈশ্বরের কাছে দিন রাত প্রার্থনা
কর, তাের এ আকাঙ্ক্ষা যেন সফল হয়! ভুলিস্ নি বােন্!
কুন্তী, দিদিটী আমার, ইহা যে ভুল হইবার নহে ভাই! জাগ্রতে,
স্বপনে, নিদ্রায় ইহাই যে আমার একমাত্র চিন্তা, একমাত্র ধ্যান ভাই।
মীনু।
কুন্তলা ডাকিল—ভিতরে আসুন কাকাবাবু ?
আকাশ, জল, বাতাস, আলাে
সবারে কবে বাসিব ভালাে
যে পথ দিয়া চলিয়া যাব
—সবারে যাব তুষি !
দশটা দিন কাটিয়া গিয়াছে। অরুণবাবু, সারিয়া উঠিয়াছেন,
তবে সে দুর্বলতা এখনও সম্পূর্ণ যায় নাই। মরণের পথ হইতে

রুদ্ধ আবেগ চলিয়া-আসা যুবক, অভিমানের তীব্র আবেগে আপনাকে বিসর্জন দিবা যে প্রয়াস লভিয়াছিল, আজ তাহারই অনুশােচনা তােমার অন্তরকে বিদগ্ধ করিবে যে গাে ! গােধূলীর রক্তিম-আলাে আকাশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। গাছের পাতায় পাতায় অপূর্ব সে রঙীন আলাে ফলিয়া উঠিয়াছে। জীবন- পথের কাহার একখানি সু-উজ্জ্বল মূৰ্ত্তি ধ্যান করিতে করিতে তাহারই দিকে আমি তাকাইয়া ছিলাম। এখানে আসিয়াছি, এই তাে একমাস হইল। শুধু ব্যর্থতাই আমার জীবনকে অলঙ্কৃত করিয়াছে ! নাই নাই, ওরে অভাগিনী—তাের ও-তৃষিত অন্তরের তৃষ্ণা মিটাইতে কেহই নাই—অতৃপ্ত, উপেক্ষিত তুই, ফিরিয়া”যা ! ব্যাকুলতার মূল্য আজ হীন, দয়িতের দুয়ারে এক বিন্দু শান্তিজলের জন্য মাথা ঠুকিয়া মরিলেও কেহ আসিবে না। আপনার গরবে আজ সকলেই উন্নত, ভিখারী তুই, কাঙালিনী তুই, কে তাের দিকে তাকাইবে যে? -না, বৃথা-বৃথা সে আশা ! নির্জন শূন্যঘরে একা বসিয়া আছি, সহসা কাহার একটা করুণ স্নেহসিক্ত স্বর আসিয়া আমার কর্ণে বাজিল—মীনু। এ তাে সেই স্বর ! ওরে অভাগিনী, এই স্বরই তো একদিন তাের সর্বস্ব চুরি করিয়া তােকে পথের ভিখারী করিয়াছে রে ! সম্মুখের চেয়ারটার উপয় বসিয়া পড়িয়া তিনি ক্ষীণকণ্ঠে বলিলেন- আমি যে তােমায় সব জায়গায় খুঁজে এলুম মিনতি, তুমি এইখানে, কে জানতে বল ? মিনতি। • রুদ্ধ অবেগ আমার হাত দুইখান তাহার কোলের উপর টানিয়া লইয়া আবার ডাকিলেন, মিনতি-মীনু। কী উত্তর দিব গাে ! স্বর যে রুদ্ধ হইয়া আইসে, কণ্ঠের শক্তি নাই, কেমন করিয়া উত্তর দিব ? ভেবেছিলুম মিনতি, এ শূন্য মূল্যহীন জীবনটাকে কাজের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেব, যাতে আর কারও চিন্তা, আর কারও মূৰ্ত্তি তােমার শূন্য আসনকে অধিকার করতে না পারে। ভেবেছিলুম, এ জীবনে, হয় পরলােকে গিয়ে তােমায় পাব সেখানকার বাধা-বন্ধন সমস্ত এড়িয়ে। তাই মিনতি, স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করতে গিয়েছিলুম। কিন্তু বড় কষ্ট যে ভাই, শেষ মুহূর্তেও যাতে তােমায় দেখতে পাই, টেলিগ্রাম করলুম, তার পর তার পর শুনলুম, তুমিই -কি আমায় মরণের গ্রাস থেকে অতি কষ্টে টেনে এনেছ? মীনু, লক্ষ্মীটী আমার । ওগাে স্বর্গের দেবতা,-ভাষা কাড়িয়া লইয়া কেন আমায় এমন মূক করিয়া দিলে ? এমন কি অপরাধ করিয়াছিলাম গাে- কেঁদো না মিনতি, আজ সে ঋণের কিছু শােধ আমি দিতে চাই। বল—বল, নেবে তুমি—প্রত্যাখ্যান করবে না? আলােক অন্ধকারের মাঝে এ কী বিদ্যুৎ-রেখা ঝলসিয়া উঠে অস্ফুট স্বরে বলিলাম-এমন ত কিছুই করিনি করেছ মিনতি, করেছ ! যে জীবন চলে যাচ্ছিল, তাকে ফিরিয়ে এনেছে! লােকে জিনিস হারায়, আর একজন কুড়িয়ে পায় ! সে কুড়িয়ে-পাওয়া জিনিস কা’র হয় মিনতি ? ১৪০

রুদ্ধ আবেগ
{
মুখ দিয়া আমার কথা বাহির হইতেছিল না, বুকটা কেমন দুলিয়া
উঠিতেছিল, নীরবেই বসিয়া রহিলাম। অরুণবাবু কম্পিত কণ্ঠে
বলিলেন-তেমনি আমার ও প্রাণটাও হারিয়ে যাচ্ছিল, তুমি কুড়িয়ে
পেয়েছ, তবে এ প্রাণ কার প্রাপ্য মিনতি ?.
আবেগে সাদরে আমায় তিনি বুকে চাপিয়া ধরিলেন। শক্তি-
হীনা আমি, তাহার বুকেই লুটাইয়া পড়িলাম। এ কী মদিরা গােয়
শাক বাজাতে পারি, দাদা?
দুয়ার ঠেলিয়া, দুষ্টুমীপূর্ণ হাশ্যে মুখ ভরাইয়া কুন্তলা ঘরে ঢুকিল ।
কী পুলকের তীব্র আবেগ সমস্ত ধমনী বহিয়া ছুটিয়া চলিল গাে!
সন্ধ্যার স্তিমিত আগমনে তখন শঙ্খের কোলাহল বায়ুস্তরে ঝঙ্কার
দিয়া উঠিতেছিল। দূর হইতে কাহার অস্পষ্ট সুর ভাসিয়া
আসিতেছিল—
তােমারেই করিয়াছি জীবনেরি ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হ’ব না’ক পথহারা ।
५ को
শেষ
১৪১

মর্তে-স্বর্গ নন্দনের রাতুল শােভা
ভূতলে-অতুল আলােক আভা
বাঙ্গালার নবাব সিরাজউদ্দৌলার
সৌন্দর্য্যের খেলা—রূপের মেলা
—হীরাঝিল—
নিৰ্মেতা
বঙ্কিম ভ্রাতুষ্পেত্রি-—দামােদর দৌহিত্র
মতিঝিল প্রণেতা
ঐতিহাসিক উপন্যাস সম্রাট
প্রথমনাথ চট্টোপাধ্যায়
অসংখ্য রত্নে—অপূৰ্ব্ব সাজে-অতুল চিত্রে—স্বর্ণ শােভায়
মহাবিস্ময় তরঙ্গে-বাংলার আকাশ আলােকোজ্জ্বল করে
অচিরে ভেসে উঠবে—
রামধনুর ন্যায় মোহন অঙ্গে।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ruddha Abeg

Author
Gupta, Sri Satyendrakumar
Title
Ruddha Abeg
File name
Ruddha Abeg
Text
OCR done
Citation
1927
Published
2009/08/19
Publisher
Sri Satyendrakumar Shil, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
513172
Barcode
4990010020174.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
tWZY8mIDw2z
Download PDF

Ruddha Abeg