Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Nirajan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
নীৱাজন
শ্রীঅপুৰকৃষ্ণ ভট্টাচাৰ্য
চক্রবর্তী সাহিত্য-ভবন
মূল্য এক টাকা
প্রাপ্তিস্থানঃ-সাহিত্য-ভবন প্রেস
২৭ নং ফড়িয়াপুকুর ষ্ট্রীট, কলিকাতা
বজবজ,
চক্রবর্ত্তী সাহিত্য-ভবন হইতে বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী কর্তৃক
প্রকাশিত এবং কলিকাতা ২৭ নং ফড়িয়াপুকুর ষ্ট্রীট
সাহিত্য-ভবন প্রেসে তৎকর্তৃক মুদ্রিত।
वकीन
No text on this page.
প্রাণাধিক পুত্র- স্বৰ্গত রামগােপাল ভট্টাচার্যের পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশে “নীরাজন” কাব্যগ্রন্থখানি উৎসর্গ করিলাম ১লা বৈশাখ সন ১৩৪৫ সাল নং নন্দরাম সেন স্ট্রীট, কলিকাতা। শ্রীঅপূর্বকৃষ্ণ ভট্টাচাৰ্য্য সুশিল্পী ও সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত বিশু মুখােপাধ্যায় মহাশয় “নীরাজনের প্রচ্ছদপট অঙ্কিত করিয়া এবং “তপােবন” মাসিক পত্রিকার পরিচালক সুসাহিত্যিক শ্রীযুক্ত বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী বি-এল মহাশয় নিজ ব্যয়ে গ্রন্থখানি প্রকাশের সমস্ত ভার এবং প্রকাশকের সর্বপ্রকার দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া আমাকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করিয়াছেন। আমার জীবনকাব্যে বন্ধুদ্বয়ের ভালবাসার দান অক্ষয় রহিবে। আমি উভয়কে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপনকরিতেছি। -গ্রন্থকার সূচীপত্র ০ ০ ০ ০০৮ ••• | ০ ০ E ৪০ ০ ০ ••• ••• ১২ ১৩ ১৩ ১৮ ••• ০৮। ০ ০ ০ ••• ২২ ১নীজন ২। কত রাত্রি ৩। সংসারের সিন্ধুতীরে ৪। যুগসন্ধ্যাক্ষণে ৫। স্বপন-সুদূর ৬। মহাঝা ৭। অগ্নিবীণা ৮। নরনারায়ণ ৯। মৃত্যুহীনতা ১০। উনপঞ্চাশী ১১। স্বরগের চেয়ে বড় ১২। মেঠোপথ ১৩। খেয়াঘাট ১৪। কৃষাণপল্লী ১৫। উদাসিনী ১৬। মরু ও মধুপ ১৭। জাগাে ভগবান ১৮। বৈশাখী পূর্ণিমা ১৯। পূজারিণী ২০। বিদ্রোহী ২১। সেই বেদনাই গুমরি উঠিছে ২২। বিরহে ২৩। জীবনের তরী ২৪। ভুখারী ২৫। কবর-ঈ-মমতাজ ০ ০ ০ २8 ২৫ ২৭ ০ ০ ০ ২৯ ••• ৩২ ৩৩ ৩৬ ৫ •• ••• ৩৯ ••• ৪০ . ৪১ ০ ০ ০ ৪২ ••• ৪৪ ৮ ২৬। মানবতা ২৭। আত্মার আত্মীয়া c . ২৮। বন্ধু ২৯। দেবদাসী ৩০। উপেক্ষিত ৩১। আলােকের বার্তাবহ ৭ ৩৩। ফুল ফুটিবার রাতে ৩৪। মিলনে ৩৫। রানু ১৪ ••• ৮। ০ ০ ০ ১৯ ৭২ ।। ৩৬। চলল দূরে যাত্রা করি ৩৭। অবেলায় ৩৮। হে নটী নগরি ৩৯। বলিদান ৪০। প্রবাসের পথে। ৪১। নাহ ৪২। চাহি আমি বেদনাই ৪৩। হে আত্মবিশ্বত জাতি ৪৪। শিপ্রাতটে ৪৫। জাগরণী ০৮০ • ৭৪ y ••• ০ ০ ০ ••• ৭৮ ৮৭
নীৱাজন
পরাপর ব্রহ্মরূপী পরমাত্মা করিয়া ঈক্ষণ
প্রকাশিতে বিখমুৰ্ত্তি যবে হ’ল আনন্দ মগন,
ঋত সত্য সঙ্গে জাগে বহুরূপে যেই ভর্গজ্যোতি
তারি মাঝে অভূদিত ভাবময়ী মহা-সরস্বতি !
ব্যোমগর্ভে শরীর সুপ্তি ভাঙি সপ্তাখের রথে,
গাহিল বন্দনা তব মহাৰ্য্য চৈতন্যের পথে।
বিশ্ব-শ্বেত-শতদলে হংসােপরি মহাশ্বেতা তুমি,
সৃষ্টির প্রথম উষা অর্ঘ্য দিল ওচরণ চুমি।
সপ্তস্বর্গ হৃদে রাখি তুমি ক’র প্রাণশক্তি দান,
মহাশক্তি সমুদ্ভবা তাই দাও সত্যের সন্ধান।
তব বীজ মন্ত্রবলে জ্ঞান-সূৰ্য্য অন্তর-আকাশে
অসত্যের সৃষ্টি নাশি’ শিবতত্বে বিজ্ঞান প্রকাশে।
তারুণ্যের পুণ্য-গীতি ওঠে মাগাে তােমারি ইঙ্গিতে,
ব্ৰহ্মার সুজন-লীলা-পুষ্প ফোটে তােমারি সঙ্গীতে।
সত্যদ্রষ্টা ঋযি-কণ্ঠে স্তোত্র তব নিত্য সমুখিত,
শব্দব্রহ্মে তান-লয় তব বাণী নৃত্য-মুখরিত।
ধ্বংসের কুটি ভঙ্গী স্তব্ধ করি’ অমৃতের গানে
সুর-মন্দাকিনীরা আনিয়াছ নিখিলের প্রাণে।
বীণার ঝঙ্কারে তব বসন্তের সমীরণ বহে,
আনন্দের ধ্যানে বসি তপস্বীর। তপোবনে রহে।
মাের গুব্ধ জীবনের রজনীর পাষাণ-দেউলে
তোমারে মা আবাহন করি’ ছন্দ-কাব্য-কুন্দ ফুলে,
শোণিত-চলনে মাখা পুষ্পায়িত পাদপীঠ তলে
মঙ্গল-কলস পূর্ণ হােলো মাের তপ্ত অশ্রুজলে।
তােমার চরণ-পদ্ম চিত্তে লয়ে করি আরাধন,
যুগের প্রদীপ জ্বালি সাজিয়েছি তব নীরাজন।
ত্রিবিদ্যাদায়িনী দেবি। সন্তানের লহ গাে প্রণাম,
শক্তি দাও সেবকেরে পূর্ণ হােক মৌন মনস্কাম।
No text on this page.
নীজন
No text on this page.
কত রাত্রি
এখনাে কি রাত নিকষের মত কালাে,
দেশের পাখীরা ক্ষুৎ পিপাসায় কঁদে ?
এখনাে কি পথে পড়েনি ঊষার আলাে-
যুগের উদয়-লক্ষনীর করাঘাতে ।
জীবনের নদী ছুটিতেছে কোন্ পানে
পায় কি হেরিতে ও দুটী অন্ধ আঁখি ?
কল্লোল-গীতি উঠিতেছে কোন্ খানে
পাও কি শুনিতে হৃদয় বন্ধ রাখি ?
কেন যে অশ্রু শিশিরের মত ঝরে
তুষার-শীতল কুসুমের বাগিচায়,
স্নেহের মুকুল মরিছে বিশ্ব পরে
নীরব নিশীথে নিৰ্মম শীতবায়,
কভু কি প্রশ্ন করেছ কাহারাে কাছে ?
স্বপনের ছবি আঁকিতেছ ঘুমে আজ,
শিখিয়াছ যাহা, আসিল না কোনাে কাজে
শিখিয়াছ কিবা ? কহিতে পাই যে লাজ ।
নীরাজন
অন্ধ পথিক বেদনার গান গেয়ে,
মেঠো পথে চলে বাউলের বেশ পরি’
ভারতের শুভ আদি-বয়সের মেয়ে
বঙ্গজননী চলে তার হাত ধরি।
মায়ের পরাণে অতীতের স্মৃতি জ্বলে,
পরণের শাড়ী ছিড়ে গেছে বহুদিন।
নয়নের জ্যোতি নিভিয়াছে পলে পলে,
বারে বারে মা’র বাজে তবু ভাঙা বীণ !
কতটা রাত্রি ?--হ’তে পারে শেষ রাত
ঘুম ভেঙে ফেল, থেকনা ঘরেতে শুয়ে
ক’রগাে বারেক করুণ নয়নােত,
ব্যথার পরাগ পড়ে আছে বনভুয়ে।
সবারে বাঁচাতে বাহিরিয়া এস ভাই,
যে পথে পাখীরা কাঁদিতেছে অবিরত,
যে পথে বন্ধু আলোকের রথ নাই
জীবনের গতি হইতেছে প্রতিহত।
সংসারের সিন্ধু-তীরে
সে কোন্ নিষ্ঠুর পতি স্বার্থসিদ্ধিপ্রয়ােজনে, করুণ সঙ্গীতে
পুত্রহারা রক্ষোবধু সরমার হৃদয়ের চিতাটি জ্বালায় ।
দুর্বাসার কোপানলে দুষ্মন্তের উপেক্ষিতা বসন্ত নিশীথে
ভূতলে লুটায় কোথা ? পুষ্পগুলি শুষ্ক তার বিচ্ছেদ মালায়।
কোথায় অহল্যা কাদে পাষাণের অন্ধকারে আর্তনাদ করি’
সীতার নয়নজল উথলিছে দূর কোন্ অশােক কাননে,
দ্রৌপদীর হাহাকারে ঝরিতেছে ধরণীর আশার মঞ্জরী,
বিরলে বসিয়া রহে দগ্ধ ভাগ্য দময়ন্তী বিশুষ্ক আননে;
কোথা নর-নারায়ণ সর্বহারা বুভুক্ষায় হয়েছে উতল,
তাের কি পশে না কাণে, অন্তরে ওঠে না ব্যথা-বেদনা-লহর ?
অশান্ত শিশুর সম তুই শুধু কল্পনার কুড়ায়ে উপল
সংসারের সিন্ধুতীরে কাটাইলি জীবনের সারাটি প্রহর।
ঈশানে বৈশাখী বায়ু বহিয়া এনেছে এবে দুরন্ত ঝটিকা,
প্রশান্ত সাগর-কূলে পশ্চিমের মেঘপুঞ্জ ঘনাইয়া আসে,
কে জানে কখন তাের হারাইবে স্বপ্নে-রচা জীবন-নাটিকা,
আত্মভােলা ওরে কবি! আনন্দেতে মগ্ন তুই প্রেমের সুবাসে।
ওই যে ক্রন্দন-রোল দিক্ হ’তে দিগন্তরে উঠিছে ফুলিয়া,
তারি মাঝে আয় তুই, অকারণে রয়েছি, সবারে ভুলিয়া।
যুগ-সন্ধ্যা-ক্ষণে
নিখিলের বেদনার গান গাহি পেয়েছি বেদনা,
তবু মন চায় মাের সেই গান শুনাতে আবার।
দুখের প্রদীপ জ্বালি’ আমি করি ব্যথার সাধনা,
তবু দীপ নিভে যায় বারে বারে, ঘন আঁধার
ঝটিকার অভিসার চলিয়াছে কাল-সিন্ধুসনে,
শত শত আৰ্তনাদ উঠিতেছে সম্মুখে আমার ;
রুদ্র-ব্যিাণের ধ্বনি শুনিতেছি যুগ-সন্ধ্যা-ক্ষণে,
উদাসী জীবন-চরে মেঘেদের ঝরে অশ্রুকণা।
মরুর বালুতে কভু বহিল না জলভরা নদী,
ও শুধু তৃষায় বন্ধু কাঁদিতেছে, পৃথিবীর পথে
যুগের বিষাক্ত বাণী মৰ্ম্মে তীর দিতেছে আঘাত।
কালের মন্দিরা বাজে, খধূপেরা হয়েছে উন্মাদ,
তিমির শর্বরী নামে সুদূরের অস্তাচল হতে
বল মােরে ফিরিবে কি কালচক্র গতি ?
ব’ল বন্ধ!
৬।
স্বপন সুদূর
অনন্ত কালের স্রোতে অগণিত জীবন-তরণী
ছুটিতেছে অনুক্ষণ দূরে রাখি সংসারের সীমা।
অনন্ত আকাশ পানে যতদূর চেয়ে দেখি আমি
উড়ে যায় বিহঙ্গেরা উদ্ধপানে বরিয়া নীলিমা।
অনন্ত কালের পথে নিত্য নব পদ-চিহ্ন পাই,
নিত্য তারা মিশিতেছে নিখিলের ধূসর ধূলায়।
অনন্তকালের গীতি কোথা হতে সমুত্থিত হয়ে,
আত্মার আবেশ লভি চৈতন্যের শক্তিরে দুলায়!
মুহূর্তের মহানন্দে যারা হেথা করিয়া গুঞ্জন,
অনন্তকালের প্রাণে অণু হয়ে মিশিছে নিভৃতে
তাহারা আসে কি পুনঃ বসন্তের দক্ষিণা সমীরে
যেথায় অঞ্চল পাতি সর্বহারা কঁদিছে নিশীথে।
উদয় অস্তের মাঝে যত ওঠে সুন্দরের সুর,
কোথায় মিলায়ে যায় ?—চিন্তাতীত স্বপন সুদূর
মহাঝঞ্চা
.
আসে যদি মহাঝা দুর্ণিবার পৃথিবীর পরে
মরণের হিন্দোলায় আর্তনাদ নিরবধি ওঠে,
বিদায়ের অশ্রুগীতি বিহঙ্গের কণ্ঠ হ’তে ঝরে
বন হ’তে বনান্তরে পুষ্প যদি আর নাহি ফোটে,
তুমি যেন মর্মভেদী ক্রন্দনের তুলিওনা সুর
জীবনের অভ্যুদয় ভবিষ্যতে হইবে মধুর।
মরণের মহােল্লাসে নাহি ক্ষতি জগতের মাঝে,
মেঘমন্দ্রে বজ্রপাত হয় যদি পলকে পলকে
প্রলয়ের গরজনে কাল-সিন্ধু-উৰ্মিদল নাচে
চূর্ণ হয়ে যায় যদি গ্রহ তারা ঝলকে ঝলকে,
তুমি যেন ভেবনাক’ নিরুদ্দেশে রহিবে সকলি,
তাহারা জাগিবে পুনঃ জীবনের শুনিয়া কাকলী ।
আসে যদি মহাঝা, অমঙ্গল ভাবিও না ভুলে,
রহে যদি অস্তাচলে স্বর্ণারুণ সুনিদ্রিত হয়ে’-
বাদলের বার্তা বহি শৰ্বরীর চিত্ত যদি দুলে,
মহাকাশ-অন্ধকারে শশাঙ্কের তনু যায় ক্ষয়ে,
তুমি যেন ধ্বংস মাঝে নিঃস্ব প্রাণে হয়ােনা আকুল,
নূতনের রূপ নিয়া জীবনের জাগিবে মুকুল।
নীরাজন
প্রতিদিন পুঞ্জীভূত সংসারের যত মহাপাপ
দূর হবে মহাঝঞা স্পর্শ লভি এই পৃথ্বী হ’তে,
বন্ধনের নাগপাশে দুৰ্ব্বলের আত্ম-অনুতাপ
পীড়নের বহ্নিশিখা নাহি রবে প্লাবনের স্রোতে।
তুমি যেন হাসিমুখে আত্মদান করিও তখন,
ফুরায়ে দিওনা যেতে সৃজনের বিবাহ-লগন।
৯
অগ্নিবীণা
নূতন যুগের সূৰ্য্য তিমিরে ডুবে গেছে অভিমানে
নৃত্য করিছে কাল,
বন্ধুর পথে দাড়ায়ে বন্ধু হের আজ সবখানে
শত শত কঙ্কাল।
দুৰ্বার বেগে সংহাররূপা ছুটে আসে নটরাজ,
ত্রিশূলে তাহার দামিনীর দ্যুতি বলকে ভূবন মাঝ ।
মাথার উপরে ঝঞ্ঝা-তড়িৎ কাঁপায় পৃথ্বী শুধু
কালবােশেখীর ডাকে,
সর্বনাশের রুদ্র-যাগেই শিহরিছে দিধু
ঘােমটার ফাঁকে ফাঁকে।
স্বপন-বিলাস স্বর্গ সুষমা অন্তরে আজ নাই,
জন-অরণ্যে ক্রন্দনধ্বনি নিশিদিন ধরে পাই।
মানব মনের কামনা-শেফালী ঝরেছে নয়নলােরে
দিকে দিকে হাহাকার !
সবুজ শােভার পাগল শিশু যে কোথায় পালালাে ওরে-
কাদে প্রাণ সবাকার ।
বনের বিহগ নীড়হারা হয়ে ঘুরে মরে এক সাথে,
মাধবী-কুঞ্জে আসেনা ভ্রমর কবিতার মালা হাতে।
নীরাজন
পাপের পঙ্কে ডুবেছে মানব, পুণ্য গিয়াছে ঘুচে,
দুগ্ধ জীবনট।
শিবের দেউলে শিবার হাস্য, পূজারী পাইনা খুঁজে,
নাহি মঙ্গলঘট।
কেদার-বাহিনী মন্দাকিনীর নাহি আর কলনাদ,
তাহারি বক্ষে গড়িয়া উঠেছে পাপের পাষাণ-বধ।
তাইতাে ঈশান শুনায় বিষাণ শঙ্কা জাগায় যত,
মেঘের মাদল বাজে।
প্রলয় নিশান বিশ্বে উড়ায় নিখিল বেদনাহত,
শঙ্কর ওই নাচে।
সৃষ্টির সাথে তার অভিযান ভস্ম মাখিয়া দেহে,
শ্মশানকালীর করাল মুরতি ফুটায় সকল গেহে।
দীর্ণ বুকের রক্ত-প্রদীপ রাত্রি দিবস জ্বলে
মহাশ্মশানের কোলে,
ভয়াল মুর্তি সম্মুখে একি! হাড়ের মালাটি গলে
নৃত্য তালেই দোলে।
ভীম-ভৈরব এসেছে এবার আর্তনাদের সনে,
অগ্নিবীণায় উঠিছে রাগিণা ব্যথার আলিঙ্গনে।
১১
নর-নারায়ণ
তুমি এস নারায়ণ নররূপে ভারতে আবার
পাঞ্চজন্য শঙ্খ তব সিন্ধুকূলে উঠুক বাজিয়া,
চতুর্দিকে ঘনীভূত হইয়াছে গভীর আঁধার
এখনি উঠিবে ঝড় ঈশানের বিষাণে নাচিয়া।
পীড়িত ভারত চাহে হে আদর্শ! তােমারি শরণ,
স্বর্গ হতে নেমে এস সুদর্শন চক্র নিয়া তুমি ;
তােমার বিহনে আজি বীৰ্যহীন লভিছে মরণ,
তােমারে স্মরিয়া কঁদে অনাথিনী মাের জন্মভূমি।
কুরুক্ষেত্র শ্মশানেতে গান্ধারীর আর্ত হাহাকার
যুগে যুগে উঠিতেছে।
বীৰ্য্যহীন কাঁদে পার্থ তব,
ধরিতে পারে না এবে জ্যোতির্ময় সে গাণ্ডীব তার
ভারতের দগ্ধ ভাগ্যে, আসিল না অভ্যুদয় নব!
ছায়াচ্ছন্ন তপােবনে বেদব্যাস কহে নাক কথা,
গণ-দেবতার লিপি স্তব্ধ,—সহিতেছে তীব্র ব্যথা।
মৃত্যুহীনতা
জীবনের যাত্রাপথে দূর পানে চাহি
ভেবেছ কি কোন দিন
এ অনন্ত লােকে ;
আনন্দ-কল্লোলধ্বনি থেমে যাবে সব।
মহা-নিদ্রা বিমলিন
মূৰ্ত্ত হবে চোখে !
নিবিড় কাজল মেঘে ঘনীভূত রবে জাকুটি-ভীষণ রাতি
আকাশ ভরিয়া,
দুরন্ত আবেগভরা বাজাইয়া বাঁশী উঠিবে ঝটিকা ক্ষুব্ধ
আলােক হরিয়া ;
মানবের পুঞ্জীভূত বেদনার গান শুনিবে দিগন্ত মাঝে
সকরুণ শােকে।
তামসী শৰ্বরী আর পােহাবে না পুনঃ-
ধরিত্রীর বক্ষে রবে
কঙ্কালের স্তুপে ;
নিঃশব্দ চরণ ফেলি তুমি যাবে কোথা
আসিবে দেবতা যবে
রুদ্রভীম রূপে,
নীরাজন
মহাকাল সিন্ধু হতে উদগ্র সঙ্গীত ধ্বনিবে তরঙ্গ তুলি
ব্যোমপৃথী নিয়া,
দূর গিরিশৃঙ্গ পরে’ অগণ্য আঘাতে যােগমগ্ন তপস্বীর
চমকিবে হিয়া,
বন হ’তে বনান্তরে কাঁদিয়া কলদিয়া ধ্বংস হবে বনস্পতি
মহাকাল শূপে !
জলদের সিংহনাদে কাতর পরাণ
পুষ্পদল ভগ্নবুকে
ঝরিবে নিমিষে,
সংক্ষুব্ধ দিগন্তযাত্রী হবে দিশাহারা
অন্ধকারে মগ্ন দুখে
দূরে যাবে মিশে।
মৰ্ম্মপটে লীলায়িত রক্তিম রেখারে হারাইবে নিরুদ্দেশে
বসন্তের পাখী,
ধরণার শ্যাম স্নেহ না পেয়ে লতিকা চিরতরে মুদিবে যে
আপনার আঁখি,
কলাপীর আর্তনাদে নামিবে বরষা, মেদিনী কাঁপিবে সদা
বাসুকীর বিষে।
তবে কেন বিলাসের বন্দনায় রত,
ঐশ্বর্যের ললাটিকা
১৪
নীরাজন
পরি রাজ বেশে,
থেমে যাবে স্বার্থতার বিপুল নৰ্ত্তন ;
তােমারি আয়ুর শিখা
নিভে যাবে শেষে।
আগুন লেগেছে যেথা অশনি পরশে, ফিরাও তােমারি রথ
সেই দিকে আজি ;
আপনারে রিক্ত করি নিভাও তাহারে, উঠুক তােমারি পথে
জয়শঙ্খ বাজি।
তােমার জীবন হতে বাঁচে যদি জীব, মৃত্যুহীন হবে তুমি
ক’র তাই হেসে।
উনপঞ্চাশী
এ নহে যক্ষ-বধূর বিরহ-মথিত দীরঘ শ্বাস
রামগিরিশিরে বধূর বেদনামাখাননা পরাণ-ত্রাস!
অণু পরমাণু নীহারিকাদল কেঁদে ওঠে তারা সব,
ময়ুর ময়ূরী তবুও থামেনা, তুলিতেছে কেকারব।
ওরা তাে বুঝেনা, যে মেঘ জমেছে—নহে শ্রাবণের মেঘ,
মহাসিন্ধুর হৃদয়ে জাগায় উনপঞ্চাশী বেগ!
ওরা তাে বুঝেনা, যে মেঘ জমেছে রুদ্র তাহাতে নাচে ;
আগুন ঝলকে দধীচির দেওয়া বৃত্ৰবধের বাজে।
হর হর রব গগনে গরজে শুনিয়া শঙ্কা পাই,
আপনার হাতে রচিত কুঞ্জ হয়ে যাবে বুঝি ছাই।
বিপুল ঝঞা এসেছে এবার মেঘের মমতা ঢাকি,
বিজলী চমকে কম্পিত ধরা, নীড়হারা বন-পাখী।
ধিকি ধিকি জ্বলে শ্মশানে শ্মশানে শত শত নর-চিতা,
পীড়িত ভুবন ভগ্নকণ্ঠে করুণ অশ্রু-গীতা।
বিলাস-প্রাসাদ, পর্ণকুটীর, কীৰ্ত্তি সৌধ যত,
ধ্বান্ত তিমিরে কালের ত্রিশূলে নিমিষেই হবে হত ।
তীর্থ-পথিক দূর হতে আসি মন্দির নাহি পায়,
তীর্থ-শিলার বিরাট সমাধি-তারি পানে বৃথা চায়।
নীয়াজন
অতীত মধুর হারানাে-দিনের পড়ে আছে পদ-চিন,
তাহারি উপরে শবাসনে আজি বছি যে সমাসীন।
প্রভাতের নাহি জাগরণ-রেখা, নিরাশা-আঁধারে নিশা,
. লেলিহ-জি বাকী-ফণায় মূর্ত প্রলয়-তৃষা।
ধ্যানপ্রশান্ত মহাহিমগিরি ধরণীর আদি ঋষি,
শিহরিয়া কাপে আর্তনাদের ব্যথা শুনে দশদিশি।
জ্ঞানের প্রতাপে ভুবনবিজয়ী-মানব-শক্তিধর
বিধাতার সাথে করি অভিযান কপিতেছে থর থর।
বুঝে নাই সে তত এক লহমায় ছারেখারে যাবে সব
হিরণগর্ভ পরমপুরুষ করিলে শরব!
মানব এনেছে সুখের স্বরগে দুখের অগ্নিশিখা,
মুছিতে চেয়েছে আপনার বলে নির্মম বিধি-লিখা।
দোষী-তাে মানব ?—ঈশ্বরদ্রোহী কহে তাই মহাকাল
নব শতাব্দী বক্ষে এবার রবে শুধু কঙ্কাল।
এই যে যুগের মহাবিপ্লব দেবতার নাম ভুলি,
ইহারি কারণে অকারণ মরে নিরীহ পরাণগুলি।
বৈদিক যুগ হয়তাে ফিরিয়া আসিবে প্রলয় পরে,
স্বস্তিবাচন করিবে স্রষ্টা মহামানবের তরে।
;
স্বরগের চেয়ে বড়
দুইধাৱে মাঠ, মাঝখানে সরু পথ,
এদিকে ওদিকে সুন্দর বেণু,
তারি মাঝে আমি তােমারে বেসেছি ভালাে,
তারি মাঝে মাের হরে’ নিলে তনুমন।
আম-কাঁঠালের চারিদিকে পাতা ঝরে,
শাখায় শাখায় দুলিতেছে পাখীগুলাে।
মন্দ মধুর বাতাসের ছোঁয়া লেগে
শিমুলগাছের কেটে ফেটে পড়ে তুলল।
জলভরা বিল বায়সের আঁখি সম
তারি বুকে কাঁপে আকাশের সাদা মেঘ।
কৃষাণের দল সে সলিলে বারাে মাস
শস্যদেবীর করিতেছে অভিষেক।
ধানের শিশুরা হাতছানি দিয়ে ডাকে,
বন উপবনে রাখালের বাঁশী বাজে ;
তারি মাঝে মাগাে রহিয়াছ আলাে করে,
ছয় ঋতু সদা তােমারে ঘিরিয়া নাচে।
আঁকা বাঁকা পথ, আশে পাশে ঝাউগাছ,
মাঝে মাঝে খুধু করিছে পথের প্রাণ,
নীজন
ধুলায় ধূসর সারা দেহখানি তার,
রৌদ্রজ্বালায় পুড়ে যায় বুকখান।
কত জীবনের চলার ছন্দগুলি
কাব্যগাথায় মিলিয়াছে নিজেরাই,
পল্লীবীণার ছিড়ে-যাওয়া কত তার
তমার কাছে মা কেবলি কুড়ায়ে পাই।
লতা-পাতা-ঘেরা কৃষাণের কুঁড়ে ঘর,
ধানের গােলও ছােট বড় দেখা যায়।
তারি কোল ঘেঁসে চলিয়াছে ছােট নদী,
আধফালি চাঁদ ফিরে ফিরে যেন চায়।
জলের দুলাল করতালি দিয়া নাচে,
মায়ার যাদুতে হরেছে হৃদয়-মধু,
কাশবন হাসে তার পানে চেয়ে চেয়ে,
তারি সাথে খেলা করে কল্লোল-বধূ!
ধ্যানের প্রদীপ জ্বালিয়াছে বুড়াে বট,
পূজা উপচার সেথা বহে ফুলরাণী ।
গাঁয়ের বাউল একতারা নিয়ে গায়,
মাটির বুকেতে সুন্দর বেদীখানি।
গ্রামের দেবতা সেথায় বিরাজ করে,
পালপার্বণে অঞ্জলি দেয় সবে।
পল্লবঘন-কুঞ্জ-কানন মাঝে
মহাধুমধাম জাগে নানা উৎসবে।
১৯
নাৱাজন
আঁধার আলাের দোনার দোলে দোলে
তুমি মা আমারে শুনায়েছ কত গান,
তােমার ঘরের খুদকুঁড়াে খেয়ে মেখে
আমি মা পেয়েছি নবনন্দিত প্রাণ।
তােমার অতীত আমি করি আরাধনা,
তােমার কীৰ্ত্তি-গরিমা বক্ষে ধরি।
লক্ষনী-বাণীর মিলন-তীর্থ ছিলে,
ভাবভুবনের ছন্দের শতনরী।
পিতামহদের কেদার-বাহিনীধারা
তােমার পথে মা বহিতেছে ধীরে ধীরে,
পিতামহীদের প্রসাদী কুসুম যত
চলিয়াছে ভেসে তাহারি পুণ্য নীরে।
কত সাধকের মনের মরাল হেথা
সুরে ও কথায় নাচিয়াছে প্রতিদিন,
কত ভাবুকের ধূসর পাণ্ডুলিপি
বাস্তুভিটার গর্ভে হয়েছে লীন।
জীবনের কত পান্থশালার খুঁটি
ভেঙে পড়ে আছে তােমার পথের পরে,
কত অভাগীর নয়নের নীলমণি -
হারায়ে গিয়াছে—নয়নের বারি ঝরে।
গাঁয়ের লােকেরা হিংসায় ভরা জানি,
স্বার্থের লাগি করিছে পরের ক্ষতি,
নীরাজন
দূর হ’তে ভাবি কতনা মহৎ তারা,
কাছে এসে হেরি তাহাদের অধােগতি।
তবু যে আমার সহােদর সম তারা,
দোষে গুণে গড়া ওদের বাসি যে ভালাে।
হয়তাে অদূরে ওরাই আনিবে দেবি,
মানব-জীবনে দেব-জনমের আলাে।
দেশে দেশে যশ লভিয়াছি যত আমি,
যত সম্মান-ভালবাসা-সমাদর,
সে সব তােমারি—তােমারি আশিসে মাগাে
মুখরিত মাের কাব্যের নিঝর।
নটী-নগরীর নিঃশ্বাসে প্রতিদিন
শুকায়ে যায় মা শােণিতের কণাগুলি।
তােমার পরশে তাহাদের ফিরে পাই
তব চুম্বনে সব ব্যথা যাই ভুলি।
যদিও জননী হইয়াছ অনাথিনী,
ছেড়া-কাঁথা পরি রহিয়াছ অনশনে,
তবুও তুমি যে স্বরগের চেয়ে বড়
শিয়াল আর বৈচির কাটা বনে।
মেঠোপথ
এই মেঠোপথ গেছে একে-বেঁকে আশেপাশে বাশবন,
হারানাে সুরের সুপ্ত স্মৃতি যে ওর সাথে অগণন।
চির অনাদর পেয়েছে যাহারা ছােট ছোট পেঁয়াে প্রাণ,
যাদের বুকের শােণিত-অর্ঘ্যে ক্ষিতি পে’ল অবদান,
যাদের কাহিনী আজো ইতিহাস কহে নাই কোনােখানে,
সেইসব দীন সবহারাদের সন্ধান এই জানে।
এই মেঠোপথে গােযানের দাগ করেছে ক্ষিতিরে ক্ষত,
লাঙ্গলের দাগ ধানের ক্ষেতেও এখনাে রয়েছে শত।
পথচলাচল থামায়েছে কবে কালের দণ্ডধর,
দূরেতে দরগা, মুয়াজ্জিনের পাইনা কণ্ঠস্বর,
কে-ই বা কহিবে—মৌন নিখিল জনহীন সব ঠাই,
হৃত-বৈভব পল্লী-জননী কাঁদে বসে একা তাই।
এই মেঠোপথে কত খুন হ’ল স্বার্থের অজুহাতে,
নিকষের মত নেমেছে আঁধার যখন নিশীথ রাতে,
তাজা শশাণিতের তপ্তপ্রবাহে শিহরিল বনফুল,
রাঙা হয়ে গেল ঢেউ-খেলে-যাওয়া বাতাসের এলােচুল।
সবলের খর শাণিত কৃপাণে সব-হারাদের দেহ
ছিন্ন হয়েছে, তবু তল্লাস কভু করে নাই কেহ।
२२
নীরাজন
এই মেঠোপথে বাউলের সুর উঠেছে ভােরের বেলা,
ভ্রমর নেচেছে তার সাথে সাথে কাননে করিতে খেলা।
নীলকমলের জাগরণে রবি নিত্য চুমিত তারে,
মাঠে মাঠে যেত রাখাল ছেলেরা ফুলের গন্ধভারে।
হাঁসের দলের হ’ত উচ্ছাস অদূরে বিলের জলে,
পল্লীমেয়েরা গাহন করিত, ওদের খেলাতাে ছলে।
এই মেঠোপথে কালের শঙ্খ বাজিয়াছে কোন্দিন
কে-ই বা জানেগাে ধ্বংসের নাচে মাধুরী হয়েছে লীন।
অসীম আকাশ, উদার বাতাস, তারি মাঝে মনে হয়
সব-হারাদের কাব্য শুনাতে ধানক্ষেত চেয়ে রয়।
নাহি আর হায়, গােধূলি বেলায় গােধনের পিছু-যাওয়া,
হল কঁাধে চলা, বাঁশের বাঁশীতে ভাটিয়ালী গান-গাওয়া ।
এই মেঠোপথে ওই বুড়াে বট—ওরই তলায় কবে
বুড়াে মােড়লের ডাকেতে এসেছে গাঁয়ের লােকেরা সবে।
উহারি ছায়ায় কত জল্পনা জমিজমা নিয়ে রােজ
হাঁকাহাঁকি আর ডাকাডাকি হ’ত, আজ নাহি কোনােখোঁজ
দূরে দেখা যায় পােড় ভিটেগুলি শষ্প লতায় ঢাকা,
যেখানে আজিও জ্যোছনা বিছায় স্বপন-রজত পাখা।
খেয়াঘাট
ওই খেয়াঘাট রয়েছে ঘুমায়ে অতীতের স্মৃতি বক্ষে ধরি
পাশে বুড়ো বট ব্যথায় কাতর কতনা হারানাে কাহিনী স্মরি।
বিষাদের ছায়া পড়েছে লুটায়ে মৌননদীর হৃদয়মাঝে,
খরনিদাঘেই ঘুঘুরা কাঁদিছে নদী-কিনারার বকুলগাছে।
‘চোখ গেল’ পাখী ডেকে ডেকে যায়, সহিতে পারে না বেদনা আর,
জনহীন ওই বন-প্রান্তরে কে-ইবা শুনিবে কথাটী তার ।
ওপারের তীর আবছায়া হেরি শ্যাম-মধুময় আধেক বাঁকা,
পার-হয়ে-যাওয়া পথিকদলের আছে কি সে আর চিহ্ন আঁকা।
হারায়েছে তরী, তীরে বসে আছি, মাঝি ভাই আর আসে না ছুটে,
জীবনের গান থেমে গেছে বুঝি সব সাধ আশা গিয়াছে টুটে।
উদাসীবাতাস বয়ে যায় ধীরে ঢেউগুলি কাঁপে নদীর বুকে,
কোথায় গেল যে পথিক-জীবন! পথের ধূলা যে কাঁদিছে দুখে।
এই খেয়াঘাটে ডাকিছে অশ্রু আমারে পঁচিশ বছর পরে,
আজ শুধু বন—চারিদিকে বন, মন তাই মাের কেমন করে।
২৪
কৃষাণ-পলী
এই ছােট গ্রাম তরুবীথিঘেরা ধানক্ষেত চারিপাশে,
তারি মাঝে হেরি ছােট ছােট কুঁড়ে শিশুদের মত হাসে
তারি মাঝে হেরি কৃষাণীবধুর আঙিনায় আঁকা ছবি,
ভােরের ভজন গাহিতে গাহিতে যার পানে চাহে রবি।
ধানের গােলা ও গরুর গােহাল দলিজখানার কাছে,
ফুল ধরিয়াছে আলাে করে’ ওই রাঙা ডালিমের গাছে।
পুইমাচাটীও রহে পরিপাটী গাঁদা ও দোপাটী চারা,
কচি কচি ঘাস পুণ্য ভিটায় হয়েছে আপনহারা।
এই ঘােট গ্রাম মােরগের ডাকে ঘুম ভেঙে ওঠে বােজ,
ঝিল্লির তানে ঘুমায়ে পড়েগাে, রাখেনা কাহারাে খোঁজ
ঝিল্লির তানে সন্ধ্যা-নূপুর-নিকণ কানে শুনি
দরগাখানায় ফকির সাহেব জ্বালে তার প্রিয় ধুনি।
রাত হয়ে আসে, আঁধারের বুকে, মাটীর প্রদীপ দিয়া,
কৃষাণীবধূরা ধান ভানে সবে পেঁকিশালাতেই গিয়া।
সারাদিন ধরি কৃষাণের কাজ খেত-খামারেই আছে,
কৃষাণী বধূর কর-পরশেই স্বরগ হেথায় রাজে।
২৫
নীরাজন
এই ছােট গ্রাম, এর মাঝে হাসে ঘােট ঘােট ছেলেগুলি,
এর বুকে তারা কত খেলা করে মার কোলে বসে দুলি,
এর বুকে নাচে প্রজাপতিদল, রােশনি ফোটায় মনে
বনবিবি যেথা চেরাগ জ্বালিছে দরগাতলার কোণে।
মাথার উপরে রেশমী মেঘের উড়েছে আঁচল সাঁঝে,
সন্ধ্যা-মালতী রাঙা হয়ে ওঠে, রাখালের বাঁশী বাজে।
ছােট ছােট দীঘি কমিলতায় ‘নাল’ ফুলে শােভা পায়,
মৌন প্রাণের শ্যামলিমা মাের নয়ন জুড়াতে চায়।
এই ঘােট গ্রাম নম্র আনত চাষীদের হাতে গড়া,
যেথায় শুনিগাে আজানের ধ্বনি, মাণিকপীরের ছড়া,
যেথায় শুনিগাে কোরাণের বাণী ভক্তিপুলক চিতে
পরম শ্রদ্ধা জাগে যে আমার হৃদয়ের চারিভিতে।
সরলতাভরা চাষীদের কথা মধুমাখা মনে হয়,
ওরা তাে জানে না কপটতা কভু, শয়তান ওরা নয়।
শয়তানী আছে সভ্যতা যেথা সৃজিল ভদ্রলােক,
গােলামখানার জ্ঞান-বিজ্ঞানে ধাঁধায় ভরেছে চোখ।
উদাসিনী
নদীর বেলায় পড়ে আসে বেলা ধীরে ধীরে
গাগরী ভরিয়া ফিরে চলল,
কেন উদাসিনী বুঝিতে পারিনা, চাহ ফিরে,
ঘাটেতে রয়েছ কেন বললা ?
বনের কুটীর তােমারে যে ডাকে নাম ধরে
ও গাঁয়ের মেয়ে ! বারে বারে,
ঘরে ফিরে এল শ্যামলী ধেনুরা মাঠ-চরে’
খুজিছে তােমাকে চারিধারে।
লতিকা বিতানে কুসুমবধূরা খনে খনে
তােমারি লাগিয়া ব্যাকুলিত।
রাখাল ছেলের বাজিতেছে বাঁশী বনে বনে,
সুরে সুরে হৃদি সুললিত।
আকাশ বাতাস করে কানাকানি সাবধানে,
গুঞ্জনরত মধুকর।
দিনের দেবতা চলে যায় অতিদূর পানে,
হে’র তার গতি মন্থর।
নীরাজন
-
সন্ধ্যারাগের মাধুরী-মিশানাে মনােহারী
ভুবনে পাঠাবে সঙ্গীত
গগন-দেউলে আরতির দীপ সারি সারি
এখনি জ্বালাবে পুরােহিত।
শেষের খেয়ার পারের পথিক গাহে গান,
হৃদি তার নাচে দুলে-দুলে,
এপার ওপার তারি মাঝে নদী ব্যবধান
ঢেউ তার ওঠে ফুলে-ফুলে।
দিন-রজনীর এই মােহানায় ছল-ছলি
কেন রহে তব আঁখি-তারা।
দূরে কি জীবন-বলাকার দল গেছে চলি,
তাই কিগো মন দিশাহারা ?
তুমি ফিরে চল আপন কুটীরে হেথা হতে,
যারা গেছে দূরে তারা যাক।
যারা আছে তব পরাণ ধরিয়া কোন মতে
তাদের কর না হতবাক।
''
মরু ও মধুপ
আমরা বন্ধু মেঘের বলাকা মরুর আকাশে গাঁথি,
উল্লাসে নাচে বিদ্যুভরা কাজল বর্ষা-রাতি।
দুৰ্যোগ-ঘন ঝঙ্কার সাথে করেছি মিতালি ভাই,
বজ্র আগুণ আঁধারের বুকে আমরা জ্বালাতে চাই।
মলয় বাতাস তােমাদের ঘিরে থাকুক রাত্রিদিন,
রক্ত-প্রদীপে বাসর রচিয়া বাজাই রুদ্র বীণ।
উল্কার সাথে করি উৎসব, ধূমকেতু ভালবাসি,
উনপঞ্চাশী বায়ু যে মােদের হয়েছে বিশ্বগ্রাসী।
তুরাণীদ আমরা সেজেছি তীক্ষ্ণ বর্ষা হাতে,
বেদুঈন সম নিষ্ঠুর মােরা ফুল ফুটিবার রাতে।
তুড়িতে মােদের তুবড়ির শিখা অগ্নি-ফোয়ারা হয়,
তােমাদের মত আমাদের হৃদি বীৰ্যবিহীন নয়।
মেঘের বলাকা তােমরা দেখিয়া যক্ষবধূর লাগি
কাঁদিয়া ভাসাও, বিরহ-বেদনে ভাবব তারে হতভাগী।
মেঘদূত নিয়া ক’র উৎসব প্রেমিক-সম্প্রদায়,
কামী যক্ষের বন্ধু তােমরা, রমণী-ভিখারী হায়।
যাজ্ঞসেনীর বস্ত্রহরণে দারুণ ক্ষেপিয়া উঠি
দুঃশাসনের রক্ত পানের নেশায় আমরা ছুটি।
নীরাজন
সীতার লাগিয়া সােণার লঙ্কা করিয়াছি ছারখার,
ভাঙিয়াছি মােরা মথুরাপুরীর কংশের কারাগার।
তােমাদের মত এখােল লইয়া কাঁদি নাই পথে পথে,
ভগবান সাথে ভগবতগীতা গাহি অৰ্জ্জুন-রথে।
তােমাদের ভালে শ্বেতচন্দন, কণ্ঠে তুলসী-গাথা,
আমরা সিদুর পরিযে ললাটে—ধ্বংসের উদ্গাতা।
আমাদের প্রভু ননীচোরা নয়, পার্থসারথী সে যে,
আমাদের মিতা মৃত্যু-দেবতা বেড়ায় শ্মশানে নেচে।
জননী মােদের রণ-রঙ্গিণী ভৈরবী শবাসনা,
চরণে তাহার লুটায়ে পড়িছে কালের কুটিল ফণা।
সর্বহারার বন্ধু আমরা, সর্বনাশের সনে,
ভবিষ্যতের স্বর্গ রচিব সুদূর প্রভাতী মনে।
ভাঙন নদীর মতই আমরা আপন খেয়ালে চলি,
বন্ধন মােরা খুলিয়া ফেলেছি, দুপায়ে সমাজ দলি।
তােমরা প্রাসাদ রচিছ নিত্য ভােগবিলাসের তরে,
আকাশের চাদ, কাননের ফুল তব পালঙ্ক পরে
প্রেয়ীর প্রাণে জাগায় স্বপ্ন—চোখ ভেঙে আসে ঘুমে,
দয়িত পরশে গালের উপর পড়িছে হর্ষ চুমে।
সদা মিহি সুরে কথা কহ সবে ভীরু মানবের দল,
মােদের কণ্ঠ-ধ্বনিতে কাঁপিছে গিরিদরী ভূমিতল।
আমাদের হেরি তােমাদের জাগে হৃদয়-কুঞ্জে ত্রাস,
মরু-বেদনায় জন্ম লভেছি, মােদের নাহিক নাশ।
নীরাজন
কালকূট মােরা পান করে করে শক্তি লভেছি ভবে,
ভয়াল সাপেরে জড়ায়েছি গলে, ভস্ম মেখেছি সবে।
ক্ষুৎপিপাসায় আৰ্ত্ত যাহারা, রােগে শােকে কঙ্কাল,
তাহাদের লাগি উড়াব এবার এ-যুগের জঞ্জাল।
সাম্যের বীজ ছড়াব আমরা মানব জাতির প্রাণে।
আগামী যুগের সূৰ্য্য উদিবে আমাদের গানে গানে।
সুদূর কালের অস্তাচলের অবগুণ্ঠন টানি,
আমরা শুনাব ভুবনে ভুবনে মৃত্যু জয়ের বাণী।
জাগাে ভগবান
কাঁপিছে পৃথ্বী ! বিদ্রোহ-ধ্বজা উড়ায়ে আসিছে রুদ্র কাল,
প্রেতের অট্ট হাস্যে থেমেছে এই দুনিয়ায় ছন্দতাল।
নভােমন্দিরে পূজার থালায় নাহি চন্দন-পুষ্পরাগ,
সাগরবালার প্রাঙ্গণে নাহি বাড়ব ঋষির অগ্নি-যাগ।
হৃদয়-আকাশে জমেছে আঁধার বাহিরে ঝরেছে অশ্রলাের,
দীর্ঘনিশাসে কাঁদিয়া বাতাস ভেঙেছে বনের তন্দ্রা ঘাের।
দুখের কাঁটায় হয়েছে নিবিড় প্রগতির পথ রুদ্ধ আজ,
আর্ত ভুবনে পীড়িত মানব, বক্ষে তাহার বিদ্ধ বাজ।
পাষাণ-পুরীর প্রাকার ভেদিয়া ভেসে আসে কাৰ আৰ্ত্ত সুর
লক্ষীমায়েরে শৃঙ্খলে বাঁধি কে করে তাহার শঙ্খ চুর।
জীবন-শেষের শেষ-জাগরণ মহা-বেদনায় পূর্ণ হেরি,
সৃষ্টি বাঁধন হয়েছে শিথিল মরণের আর নাহিক দেরী।
মিলন রাতের বাসন-প্রদীপ নিবে গেছে,-বধু মর্মাহত,
অঙ্কে তাহার নব-যৌবন-কুসুম-মালিকা নিদ্রাগত।
রক্ত-কমলদলে ভগবান জাগাে মানবের মুক্তি লাগি,
অঞ-বাদল ঝঞার পথে তােমার আলাের দীপ্তি মাগি।
বৈশাখী পূর্ণিমা
বিশাখা নক্ষত্রে যবে বৈশাখের প্রথম উদয়
রুদ্র ভৈরবের সম দীপ্তচক্ষু মহা জ্যোতির্ময়,
বৈরাগীর বেশ পরি’ কবে কোন্ বিস্মৃত লগনে
সৃষ্টির আদিম দিনে মহাযােগী বসি’ পদ্মাসনে
প্রথম প্রণব মন্ত্রে বেদ পাঠ করি বিশ্বভূমে
বিস্তারিল তেজপুঞ্জ, দিকে দিকে মহাযজ্ঞ-ধুমে
ধরণীর জীর্ণ ধূলা অকল্যাণ অভিশাপ যত
উড়িতে লাগিল ধূম্র বাতাসের স্পর্শে অবিরত,
শীর্ণ সন্ন্যাসীর সেই তপস্যার উগ্র হােমানলে
তােমার জীবন শিখা দিল দেখা তপ্ত নভস্তলে।
গাঢ় ঘন তমসায় সন্ধ্যা যবে গােষ্ঠে নামে চুপে,
কল্যাণ-সঙ্গীত গাহ নভােলোকে শুভ্রতারারূপে
হবন-দুহিতা পুণ্য বৈশাখের, হে দেবি, তােমারে
গগন-দেউলে হেরি পূজারিণী নক্ষত্র মাঝারে ;
মঙ্গল আরতি লাগি তব শঙ্খ বাজাইলে আসি’
ললাটে চন্দন পরি’ রূপচ্ছন্দা র’হ পৌর্ণমাসী,
সত্য শিব সুন্দরের মহােৎসব ক’র পুষ্পদোল
ভাগবত প্রেমে তব পুলকিত প্রাণের হিন্দোল।
নীরজন
তােমার পবিত্ৰ প্ৰভা শুচি শুভ্র পূর্ণচন্দ্র মাঝে
যুগ হতে যুগান্তরে বর্ষে বর্ষে নব রূপ সাজে
শান্তির অলকানন্দা আনে বহি’ অনন্ত আকাশে,
তাহাতে গাহন করি গ্রহতার মহানন্দে ভাসে !
অচিন্ত্য অব্যক্ত সত্ত্বা বাল্মিকীর মহা আমন্ত্রণে
রঘুকুলচন্দ্ররূপে বৈশাখের পুণ্য তপােবনে
দেখা দিল অকস্মাৎ সাম্য মৈত্রী বিশ্বে প্রচারিতে
অস্ত্রের ঝনা আর ক্ষাত্র শৌর্য দর্প বিদূরিতে।
শঙ্করের আবির্ভাব বৈশাখের পবিত্র ভৃঙ্গারে,
ধরণীর অন্ধকার দূরে গেল স্পর্শ করি যারে,
তুমি সেই বৈশাখের পুণ্য তিথি হে মধু-পূর্ণিমা,
অঙ্কে তব জন্ম নিল শাক্যসিংহ-যাহার মহিমা
ভারতের প্রান্ত হতে এশিয়ার বনপথ দিয়া
সমগ্র ধরণী মাঝে উদ্ভাসিল তমাে বিরিয়া,
পদে দলি রাজ্য আর ঐশ্বর্যের সত্য-অন্বেষণে
গহন অরণ্যে গেল রাজপুত্র শান্ত সৌম্য মনে,
জীবদুঃখে সকাতর সে তপস্বী লভিল নিৰ্বাণ ;
তোমারই আবির্ভাবে বুদ্ধত্বের জাগিল প্রজ্ঞান।
মহাসমাধির পথে তুমি দিলে দর্শন তাহারে,
অঙ্কে তব জন্ম তার, দেহত্যাগ তােমারি মাঝারে।
নীরাজন
ত্রয়ী’র সন্ধান দিলে ত্রিরত্নের উপাসকে তুমি,
ধর্মচক্র প্রবর্তনে জ্ঞানাঙ্কুর তুলিলে কুসুমি।
পালন করেছ কত সাধকেরে হে বিশ্বকল্যাণি
ভারতের সিন্ধুতটে শুনায়েছ অহিংসার বাণী,
কীৰ্ত্তি তব কীৰ্ত্তনীয়। দেবত্বের জনম-কল্পনা
করিতেছ জনলােকে মাঙ্গল্যের দিয়া আলিপনা
নরহরি অবধূত—শ্রীনিবাস আচার্য্য প্রভুর
জন্মতিথিরূপে তুমি এ বঙ্গের স্মরণ-মধুর
অতীত দিনের কথা বাঙ্গালীর আনাে চিত্তপটে,
বন্দনার অর্ঘ্য লহ হে বৈষ্ণবি মন্দির ও মঠে।
পূজারিণী
মায়া-হরিণী তারে বলে গাঁয়ের লােকে,
আজো মুরতি তারি ভাসে সবার চোখে।
সেই সুরূপা মেয়ে তার হৃদয় ছেয়ে
ছিল স্বরগ-জ্যোতি-পে’ল কেমনে ওকে
সেযে প্রভাত-বেলা বােজ সিনান পরে
যেত কুসুম-ডালা নিয়ে পূজার তরে
শিব-দেউল মাঝে যেথা দেবতা রাজে,
যেথা বটের পাতা আজো ব্যথায় ঝরে।
যেতে মৃদুল বায়ে রথতলাটী ছাড়ি
রেখে দীঘিটা বাঁয়ে আর ডাহিনে বাড়ী।
গায়ে উষার আলাে তারে মানাতে ভালাে,
তার গেরুয়া রঙে ছিল ছােপানাে শাড়ী।
যেতাে বাসনা যত দেব-চরণে থুয়ে,
যেতাে সরমে সে যে ধীরে মাথাটী নুয়ে,
তার জীবন-গীতি কাঁদে নীরবে নিতি
আলাে-আঁধার ছায়ে ওই শ্যামল ভুয়ে।
নীরাজন
তার কাকণ বাজে বাঁকা নদীর ঘাটে,
তার নুপুর-ধ্বনি ওঠে গাঁয়ের বাটে,
ঘন গাছের কোলে তার কুসুম দোলে,
তার শ্যামলী ধেনু কাঁদে নিরালা মাঠে।
আজ গাঁয়ের পথে ওই হিজল বনে
খড়-কুটীর দেখি পড়ে তাহারে মনে।
ফুল-বীথিকা তলে বন-লতিকা দলে,
মধুমাছিরা খোঁজে সেই হারানাে ধনে।
কোন্ কুহেলি রাতে দূর-দূতীরে দেখে
গেছে তাহারি সনে স্মৃতিচিহ্ন রেখে ;
কোন্ অচেনা পারে, কোন্ পথের ধারে
তার আঁচল ওড়ে—তারে পাইনা ডেকে।
নাহি দেউলে পূজা শুধু দেবতা রহে,
বন-দেবীর বুকে বড় যাতনা বহে,
ভাঙা পইঠা পরে শিবা জটলা করে,
আজ শক্তি বিনা শিব বেদনা সহে।
বিদ্রোহী সিন্ধুবলাকার শ্রেণী চলে গেছে বহুক্ষণ-দিগন্তের পারে, বিহঙ্গের স্তব্ধ গীতি। দিবসের নির্বাপিত হােমকুণ্ড-ধারে পূরবীর কণ্ঠ শুনি, গায়ত্রীর-রূপ-ছন্দা যজ্ঞটীকা পরি’ মন্ত্রপাঠ করে একা, আনন্দের পুষ্পদল ফোটে চিত্ত-ভরি। সপ্তর্ষির জ্যোতিঃপুঞ্জ জাগে নাই নীলাম্বরে, অন্ধকার ছবি ধরিত্রীর মৰ্ম্মে রহে, বসে আছি উপকূলে, বিদ্রোহের কবি ! শান্ত হও, আর কেন ? হৃদয়ের সন্ধি ক’র অনন্তের সনে, কেন তুমি রুদ্ররূপে আনিয়াছ উন্মাদনা ধূর্জটির মনে। অন্তহীন দ্বন্দ্ব তব চলিয়াছে অবিশ্রান্ত অসীমের মাঝে নিত্য মহাকাল সাথে। কি বেদনা বক্ষে তব নিশিদিন বাজে কহ তাহা, হে চঞ্চল! তব নীল তরঙ্গের উন্মাদনা রাখি’ ক্ষান্ত হও ক্ষণকাল। দিবসের হােমাগ্নির ভস্ম দেহে মাখি’ এস মােরা সন্ধ্যাজপে দেবতার নাম নিয়া ধ্যান করি চুপে, অশান্তির উদ্দীপনা রাখাে তব, সুনির্মল ! রহ সৌম্যরূপে।
সেই বেদনাই গুমরি' উঠিছে
••••
স্বপনের ফুল ঝরে গেছে কবে পড়ে আছে শুধু মালা,
যৌবন কাদে গােপন-গুহায়—একি এ দারুণ জ্বালা !
বাদলের ধারা ঝরে নাক আর, মেঘহীন সব ঠাই ;
আমার নয়নে তবুও বাদল-শরতের আলাে নাই।
বাসর-স্মৃতির কোনাে মাধুরিমা আসে নাক’ পথ ভুলি,
দোর দিয়ে শুধু করে আনাগােনা দুর্যোগ দিনগুলি।
প্রাণের দেউলে যে-দীপ নিবেছে তাহারে পাইনা ফিরে,
থেমেছে আমার বলাকার গান জীবন-সিন্ধু তীরে।
বােধন-শঙ্খ দিকে দিকে বাজে-কানন-বধুর দল
বরণডালাটী ধরেছে মাথায়—-আঁখিতে আলাের ঢল !
মেতেছে ধরণী তাহাদেরই সাথে, গাঁথিয়াছে গীতিহার,
ঘন হ’ল শুধু মাের আঙিনায় নিখিলের হাহাকার।
আলিঙ্গনের আলিম্পনায় কত পরিচয় আঁকা
ভুবন ভরিয়া রয়েছে—কেবল আমার সকলি ফাঁকা।
যে ব্যথা কখনাে পারে না জুড়াতে আশার গন্ধবহ,
যে ব্যথা সদাই বঞ্চিত মনে দোলা দেয় অহরহ,
অস্তগিরির কোন্ দূর পারে কাবােশেখীর মুখে
যে বেদনা-রাশি ঘনায়ে পড়িছে বাষ্পের কৌতুকে,
সেই বেদনাই গুমরি’ উঠিছে হয়তাে আমারো বুকে।
৩৯
বিরহে
বিরহী হিয়ার কত যে বেদনা বাদলের মেঘ জানে,
এ বিরহ কভু শেষ হবে কি গাে নিখিলের কোনখানে?
স্মৃতি-কালিন্দী বিষয়ে উঠিছে মনের কালিয়া-দহে,
শ্রবণ-রন্ধে কি যেন রাগিণী ব্যথার কাহিনী কহে।
বেসেছি ভালাে শ্যামসুন্দরে বকুলের ফুলবনে,
তনুমন্দিরে বন্দনারতি করেছিনু নিরজনে
মাের যৌবন-পিয়াসা বধুরে প্রেম-অঞ্জলি দিয়া
আমার রূপের দীপালী করেছি হৃদি তার আলােকিয়া।
খসে গেছে উঁদ বিগত নিশীথে সহকার বীথিমুলে,
খসে গেছে তারা তারি সাথে সাথে হৃদি-যমুনার কূলে।
ব্যর্থ আমার বয়ে-যাওয়া নদী সংসার-পথ মাঝে
যে গিয়াছে চলে সে না এলাে যদি মাের আঙিনার কাছে।
নদীর বেলায় পড়ে যায় বেলা, দূর পানে চেয়ে রই,
প্রেমের আগুন ধিকিধিকি জ্বলে, কাহারে বেদনা কই!
জীবনের তরী
অনন্ত কালের স্রোতে ভেসে যায় জীবনের তরী,
তাহারে বাঁধিতে বন্ধু, পারি নাই কোন উপকূলে ;
কোথায় চলেছি আজো সেই প্রশ্ন জাগে চিত্ত ভরি,
উত্তাল তরঙ্গমাঝে তরীখানি ওঠে ফুলে ফুলে।
আলো-অন্ধকারময় সম্মুখের দিচক্রবাল,
পথের নাহিক শেষ, চলিয়াছি দিবস-শর্বরী,
বারে বারে পাল তুলি, বারে বারে ভেঙে যায় পাল,
অধীর নয়ন হ’তে বিপর্যয়ে অশ্রু পড়ে ঝরি।
কোথা হতে যাত্রা শুরু মোরা তাহা গেছি সব ভুলে,
হাসি-অশ্রু-সুখ-দুঃখ-সমাচ্ছন্ন ধরিত্রীর গানে
আমরা বিভাের রহি। তরীখানি নাচে দুলে দুলে,
অজানা সাগরে সে যে ছুটিতেছে প্রবাহের টানে।
ভুবনের যত ঘাটে ভিড়াইতে গিয়াছি তাহারে,
দুরন্ত স্রোতের বেগে ভেসে যায় অকূল পাথারে।
১
ভুখারী
নয়নজলে যার ভিজেছে সারা বুক
জীবন-পথ মাঝে চলিতে চলিতে,
যাহারে কেহ কভু বাসেনি ভালাে মনে,
এসেছে সবে যারে দলিতে ছলিতে,
তাহারে তুমি ডাকো আপন-ঘরে ভাই,
জগতে আজো তার নাহি যে কোন ঠাই,
ও শুধু অভিমানে নীরবে ব্যথা সহে
ও জানে মানবেররা মানবতা নাই।
পরেছে চীরবাস, দেহেতে কালিমাখা,
এখনাে উপবাসী, নাহিক শকতি,
পাগল বলি তারে আঘাত দিওনাক,
ভুখারী নারায়ণে জানাও প্রণতি।
সমাজে তার দাবী আছে যে অগণন,
মানব-পরিবারে সেও তাে পরিজন,
মুকুলে ঝরে যায় তাহারি রূপকুঁড়ি,
তাইতাে জাগে হৃদে গভীর বেদন।
নীরাজন
উহারে অবহেলা করােনা তুমি কভু,
করােনা উপহাস মাতিয়া হরষে,
তােমারাে বেদনার আসিতে পারে দিন
বিপুল বসুধায় বিষাদ-পরশে।
তােমারাে প্রভাতের রঙীন্ জলছবি
মুছিয়া যেতে পারে, ডুবিতে পারে রবি,
তােমারাে আকাশের হয়তাে পারাবারে
ভাসিতে পারে তব বেদনার ছবি।
মরুভূ হােলাে যার হৃদয়নদীখানি
তাহারে বুকে নিয়া জুড়ায়াে বেদনা,
জীবনে দুখ সুখ সবারি আছে ভাই,
দুখীরে সুখে রাখা—এই তত সাধনা
শ্যামল তরু সম সেবিতে পারাে যদি
দুখীরে ছায়া দিয়া তুষিয়া নিরবধি,
জানিও আশাবীথি শুকায়ে যত গেছে,
তােমারি ফুলে ফুলে হবে ফলবতী।
কবর-মমতাজ
চলে গেছ তুমি, চলে গেছে রাজ্য তব, স্বর্ণসিংহাসন
হে সম্রাট সাজাহান।
প্রিয়ার স্মরণে সুদীর্ঘ বরষ ধরি’ বিরহ-ব্যথায়
করে গে’ছ যাহা দান,
রহি’ সমুন্নত যুগ হতে যুগান্তরে পূর্ণিমার সম
বসুধার হৃদাকাশে,
দীপ্তি তার চির অনিন্দিত অন্তরেই হতেছে বিম্বিত
অনন্ত সঙ্গীতে হাসে।
এ নহে কবর। কবিরা কহিছে এবে--ছন্দোবদ্ধ গাথা
পাথরের বক্ষোপরি
মূর্ত গরিমায়, কবিতা-বধুর ধারা-নূপুর নিকণে
সঙ্গীত পড়িছে ঝরি,
এই পুণ্যতীর্থে বিশ্বের অঞ্জলিভরা বন্দনার শ্লোকে
সৌন্দর্য্যের মুক্তাবলী
পুষ্পহিল্লোলিত, কালিন্দীর শ্যামতটে সমাধি-মন্দিরে
ইন্দ্রধনু পড়ে ঢলি
ওঃ
নীরাজন -
যেথা বারম্বার, আমি দিই একবিন্দু অশ্রু উপহার
চঞ্চল নয়ন হতে
নব মেঘদূত নিয়ত পঠনে তব পরম শ্রদ্ধায়
জীবনের যাত্রাপথে ।
হায়রে মানব! সম্রাট ভিখারী কিম্বা হওনাক যাহা
ক্রন্দন তােমারি সাথে
ঘুরিতেছে সদা, ফাল্গুনের স্মর-সুখ-স্মৃতি যায় চলে
সজল শ্রাবণ রাতে।
একনিষ্ঠ কোথা পাইয়াছ ভালবাসা ভারত-ঈশ্বর।
কুড়ায়ে আনিলে তারে,
এত আকিঞ্চন প্রেমের আরাধ্যা লাগি হতে সমাহিত
নীল নয়নের পারে
শিখিলে কোথায় ? মরুমাঝে ফোটে ফুল তব প্রার্থনায়
মৃত্যু কাঁদে ব্যর্থপ্রাণে
আপন ভগিনী কালিন্দীর স্নিগ্ধকোলে, যার বুকে তুমি
নিয়ত অমৃত গানে
প্রেয়সীরে তুষি’ গঠিলে নূতন স্বর্গ-নন্দনকানন
কালের কালিমা ধুয়ে,
শুভ্র করি তারে মরণ-শাসন দলি’ রূপসী যেথায়
জ্যোছনার মত শুয়ে।
৪৫
নীরাজন
জীবন-সন্ধ্যায় আগ্রার প্রাসাদে বসি’ বৃদ্ধ সাজাহান
মুক্ত জানালার ধারে,
জাহানারা সনে হেরিতে তােমারি তাজ, সাম্রাজ্যলক্ষীর
কথা কহি’ বারে বারে।
দীর্ণ হৃদি মাঝে অনন্ত বিরহ তব আনিত বহিয়া
নিখিলের হাহাকার,
জানে ইতিহাস, অন্তিম শয়নে তব সে কী আর্তনাদ,
বেদনার অশ্রুধার।
আজ তুমি নাই, কীৰ্ত্তি তব সমুজ্জ্বল—কিন্তু ভাবি হায়
গঠিল যাহারা তাজ,
তাদের কাহিনী গিয়াছে হারায়ে কবে কালস্রোতে ডুবি,
তব তরে মহারাজ!
এসেছিল সবে, সুন্দরী প্রিয়ারে ত্যজি জন্মভূমি হতে,
হয়তাে ফিরিয়া আর
পায়নি তাহারে হেরিতে আপন গেহে বহু বর্ষ পরে-
কাদিয়াছে অনিবার।
।
তাদের বিলাপ ভারতের ইতিহাস লিখে নাই কিছু,
তুমিও গিয়াছ ভুলে
শিল্পীদের কথা, তােমার বিরহে মিশে তাদেরি বিরহ
প্রস্তর বেদীর মুলে
৪৬
হয়েছিল এক—তাইত পাথর বুকে যে-বাণী সুকানন
রূপ নিল অর্ঘ্য দিতে।
শিল্পীর সাধনা করিয়াছে সত্য জয়ী তােমারে দুর্বার
জগতের চারিভিতে,
নতুবা সম্রাট হয়তাে তােমার সাধ পুরিত না কভু
কোটী স্বর্ণমুদ্রা ঢালি,
রেখে গেছ যাহা ধরণীতে শ্রেষ্ঠ সৌধ—স্বীয় পুণ্যস্মৃতি
শিল্পীর স্মৃতি প্ৰক্ষালি।
মানবতা
এই যে সংসার আলােক-আঁধারে নিত্য বিরাজে মায়া
এরি মাঝে এসে একা
প্রথম যেদিন নয়ন মেলিয়া হেরিনু লভেছি কায়া
—কি যেন ললাটে লেখা!
সেই দিন হ’তে স্বপনের ছবি ভুলালাে আমার মন
সবারি অন্তরালে,
আমি যে হারায়ে ফেলেছি বন্ধু, আমার সাধন-ধন
কিসের ইন্দ্রজালে ।
ভ্রান্তির বুকে আল্পনা এঁকে কল্পরাণীরে রাখি’
কুটীর করেছি আলা।
মিথ্যার সাথে করেছি মিতালী সত্যেরে দিয়ে ফাঁকি
বুঝিনি বিষম জ্বালা।
নর-নারায়ণে খুজিনি কখনাে বিশ্ব-দেউল-দ্বারে
খুজিয়াছি মধুদীপ,
দেখি রূপসীর উরসেতে আভা-সঁপিনু হৃদয় তারে
এমনি অভাগা জীব।
লক্ষণীর ক্রন্দনধ্বনি কাণ পেতে শুনি নাই
জানিনাকো কেন কাঁদে,
জীবের সেবায় চরম শান্তি—সে কথা ভুলিয়া যাই
পড়িয়া মােহের ফাঁদে।
নীরাজন
রূপের নেশায় উন্মাদ আমি অরূপেরে উপহাসি
সেকথা ভাবিনি মনে,
নারী-যৌবন হেরিয়া নিয়ত তারি কেন অভিলাষী
ভাবিনি সঙ্গোপনে।
ব্যথার লহরী লীলায়িত যাহা জীবন-নদীর বুকে
কূলে কূলে ফুলে ওঠে,
ঘুণী হাওয়ায় ক্ষুব্ধ হৃদয় গুমরিছে যত দুখে
পরাণে বেদনা ফোটে,
তাহাদের পানে চাহি নাই ফিরে বিরাট নিখিল মাঝে
শুধু বসে গান গাহি,
সেখানে আমার আত্মসুখের মিলন-মাধুরী আছে
মানবতা কিছু নাহি।
তাই কি বিষাণ রুদ্র বাজায় বানিশান তুলি
শ্মশানকালীর সাথে,
তাই কি হৃদয় কম্পিত হয়ে’ বারে বারে ওঠে দুলি’
তীক্ষ্ণ অশনি, পাতে!
আর আজীয়া ধরণীর পথপ্রান্তে অতি সঙ্গোপনে হে সুন্দরি! এলে যবে কাছে, স্পর্শে তব মুঞ্জরিল জীর্ণপুষ্পদল অন্তরের মৌনবীথিমাঝে, পুলকের অলক্তকে প্রেমের প্রাঙ্গণ দীপ্যমান, হাসে দূৰ্বাদলে— উষসীর ছন্দোবদ্ধ নূপুর-নিকণে রাত্রি শেষ হ’ল পূৰ্বাচলে। নিরন্তর যুগান্তের যত মর্মবাণী অনাসন্ন রহে অন্তরালে কল্পনার সিন্ধুপারে স্বপ্নময়ী সদা, জাগে তারা তব নৃত্যতালে আলাে করি’ ভুবনের দিকচক্রবাল। বাসনার শতদল ফোটে, বসন্তের সমীরণে ভ্রমর গুঞ্জনে কামনার স্রোতস্বিনী ছােটে। রূপালােকে উজ্জ্বলিয়া আত্মার আত্মীয়া! মাল্য দিলে পরম কৌতুকে, প্রণয়ের সত্যপ্রীতি পুষ্পসম ফোটে সুরভিত এই দীর্ণ বুকে। সৃজনের বীজ নিদ্রা অলক্ষ্যেতে ভাঙি হৃদয়ের আরক্তিম রাগে, নূতনের অভ্যুদয় নিভৃত-সাধনে আনিয়াছ তীব্র অনুরাগে। জীবনের তীর্থপথে নীরবমন্দিরে তুমি ক’র শিব আবাহন, মাঙ্গল্যের দীপশিখা ধরিয়া অন্তরে আমি শুনি তব আরাধন। •
বন্ধু
কত যুগ যুগান্তের পরিচয় তােমায় আমায়
হে অভিন্ন বন্ধু মাের ভুলাে নাই মাের বক্ষঃ বরি’
আনন্দের স্পর্শ দিয়া জীবনের প্রভাত বেলায়
টেনে নিলে বক্ষে মােরে সুগােপনে আলিঙ্গন করি’
কত জন্ম চলে গেছে নিয়তির কালচক্রে ঘুরি
কতদেশ দেশান্তরে পাতিয়াছি সাধের সংসার,
সৃজনের সমারােহে উড়ায়েছি স্বপনের ঘুড়ি
প্রাণের জাহ্নবীকূলে হৃদয়ের হ’ত অভিসার।
অতিদূর দূরান্তরে যাহাদের এসেছি ফেলিয়া,
তাহারা হয়তাে আজো গাহিতেছে মাের মধুগীতি ;
পড়িতেছে শেষলিপি বারবার নয়ন মেলিয়া ;
এসেছি নূতন পথে, সেথা আছে পুরাতন স্মৃতি।
তাহারা হয়তাে মােরে ভুলিয়াছে আনন্দ উচ্ছ্বাসে,
বিরহের হাহাকার বহেনাক তাহাদের গেহে,
যাহাদের সনে আমি প্রতিদিন প্রচুর উল্লাসে
যাপন করেছি কাল নানাকর্মে পূর্বতন দেহে।
কতবার তীর্থযাত্রা ক্ষণতরে হয়েছে ভুবনে
কেহতে জানেনা, বন্ধু! তুমি জাননা অন্তরে বিশেষ,
তব নাম জপে জপে রূপালােক পেয়েছি গােপনে
ধেয়ানে জমেছে রস, জড়ত্বের হয়েছে নিঃশেষ।
নীরাজন
তীর্থ হ’তে তীর্থে আসি’ প্রতিমারে করিয়া বরণ,
সুখ দুঃখ অর্ঘ্য দিয়া আমি চলি মাতায়ে ভূলােক।
অকস্মাৎ সমাধির স্তব্ধতায় হই যে মগন
তারে মৃত্যু সবে কহে—সমাধির এই তত পুলক।
ব্যথাতুরা স্নেহলতা, সকরুণ গৃহবলীভুক,
প্রাঙ্গণের পুষ্পতরু বেদনায় আর্তনাদ করে,
বিরহের ব্যাকুলতা উদ্বেলিয়া দেয় প্রাণে দুখ
মায়ার কুরঙ্গ কঁাদে, বিহঙ্গের অশ্রুকণা ঝরে।
সুষুপ্তির মহাসিন্ধু বয়ে যায় মরণের মাঝে,
আমার অস্তিত্ব কোথা জানিনাক—সুনিদ্রিত মন,
ধরণীর চক্রবালে মৌনসন্ধ্যা অশ্রুময়ী রাজে
তমস্বিনী বনাঙ্গনা নদীপথে কঁাদে অনুক্ষণ।
সমাধি ভাঙ্গিয়া যায়, জড়ত্বের জৈবজ্যোতি ভাসে
এই কি জনম বন্ধু ! মাতৃবক্ষে মায়ের পরশে
বালাকরঞ্জিত রাগে ঘুমভাঙা শতদল হাসে,
এ মানস সরােবরে রাজহংস দেদীপ্য হরষে।
সকলি নূতন হেরি, জীবধাত্রী মাের পাশে রহে
তার সাথে করি’ খেলা হয় কত জ্ঞানের উন্মেষ,
কল্পনার কাব্যকুঞ্জে মৃদু মৃদু সমীরণ বহে,
জীবনের মধুচক্রে পাইয়াছি রসের উদ্দেশ।
নীরাজন
দুঃখে সুখে সংসারের কর্মশালা আশায় খচিত,
নব নব ব্যাকুলতা পাইয়াছি তারি মাঝে আমি ;
ভালােমন্দ সাথে নিত্য নানা কাজে হই পরিচিত
তবুও আমারে ভ্ৰম পদে পদে করে দুরনামী।
তােমারে চিনেছি বন্ধু, নাম ধরে পারি না ডাকিতে,
অসীমে সসীমে ব্যাপ্ত জ্যোতির্ময় নিদ্রা জাগরণে,
ভ্রমিতেছ লক্ষ কোটি ভুবনের আঁখিতে আঁখিতে,
ব্যষ্টি হতে সংহতির প্রাণরূপে নানা আবরণে।
৫৩
দেবদাসী
দূরে রাখি’ সংসারের সুখদুঃখ কবে
পাষাণ দেবতা পদে পুষ্প-চিত্ত দিয়া প্রথম প্রভাতে,
তুমি এলে মন্দিরে প্রভুর সেবায়
গৈরিক বসন পরি’ স্বপ্ন অর্ঘ্য নিয়া পরম শােভাতে
অতীতের কালস্রোতে হারায়েছে তাহা ;
শুধু বাজে স্মরণের আলাে-অন্ধকারে মাধুরীবিলায়ে
অন্তরের মৌনতটে, গীতিকার প্রায়
হৃদি মাের উচ্ছ্বসিয়া মধুছন্দ হারে দীপিকা মিলায়ে ।
তুমি এলে যৌবনের কুসুম কুড়ায়ে,
দোলে তব মুক্তবেণী ঘনবীথি সম উতলা পবনে
অধরের প্রান্তভাগে শতদলগ্নতি
গণ্ডে রহে গােলাপের আভা নিরুপম বিলােল স্বপনে ;
আধফোটা অনাহত ঈষৎ উন্নত,
আবরণে দুটী কুঁড়ি বক্ষে তব ঢাকা কনক বরণে
রূপের অমিয়ধারা বহে অঙ্গ দিয়া
হৃদয়-প্রাঙ্গণে প্রেম-আলিপন আঁকা বঁধুর স্মরণে।
আপনারে নিবেদিত মন্ত্রপূত করি’
অর্চনায় সঁপিয়াছ দিব্য সৌম্য প্রাণ বিতরি পুলক
নীরজন
প্রণয়ের সাধনায় পাষাণদেবতা
কেঁপে ওঠে লভি তব শুদ্ধ সত্ত্ব গান, সুষমা-তিলক।
বাসনার বসুধারা সমুল্লাসে তুমি
ঢালিয়াছ দেবতার স্বর্গ-শুভ্র মনে, আবেগ ঝলকে,
জীবনের যত আশা সমুজ্জ্বল তব
অকুণ্ঠিত মরমের স্পর্শ সঙ্গোপনে আঁখির পলকে।
ধরণীর হােমানলে পূর্ণাহুতি দিয়া
বরণের মালাখানি পুণ্যকাম্যজপে লভিলে প্রভুর,
শয়ন আরতি ক’র গভীর নিশীথে
অন্তরালে হাসে বঁধু জ্যোতির্ময়রূপে বাজায়ে নূপুর।
দেবতার সঙ্গ সুখে বিভােলা রূপসী
প্রতিক্ষণে প্রতিচ্ছায়া মত্ত নৃত্য করে, সেবার সৌরভে
অসীম-সসীমে হ’ল একাত্ম মিলন,
ত্রিদিবের পারিজাত ফুটেছে অন্তরে প্রেমের গৌরবে।
উপেক্ষিত
জীবন সােপানশ্রেণী সংসারের পুরাতন ঘাটে
ভেঙে পড়ে—বিহঙ্গেরা যেথা হতে মাগিছে বিদায়,
পথিকের পদলেখা চিহ্নহীন হােলাে যার বাটে
আমার নয়ন দু’টী ব্যথাতুর সেই দিকে চায়।
মেঘরেণু অঙ্গে মাখি’ দিক বধূ করে আজো খেলা
তারি সাথে ছায়াপথে। অতীতের স্মৃতি-পুষ্প আনি’
এই ঘাটে একদিন ভেসেছিল বেহুলার ভেলা,
তােমাদের কাছে তার মূল্য নাই,উপেক্ষিত জানি।
কত না অবৰ্ত আসি তিলে তিলে করিয়াছে ক্ষয়
তাহারি সুদৃঢ় ভিত্তি। শক্তি তার করি’ অবহেলা
কালের প্রবাহ বহে! দূর পানে শুধু চেয়ে রয়
অস্তগামী সূৰ্য্য তার, ব’ল বন্ধু বসিবে কি পাটে?
যুগস্রোতে ভেসে যায় অতীতের পূজার কুসুম,
তাহারে নূতন ঘাটে আনিবার সাধ ছিল মনে,
যেথায় পঙ্কের মাঝে হাসিতেছে প্রাণের কুঙ্কুম,
গাহন করিতে নামে পঙ্কজিনী প্রভাতের সনে !
হৃদয়ের পণ্য যত ওঠে বিশ্ব চিত্ততরী হ’তে—
নিঃশেষে ফুরায়ে যাবে।
ভাবি তাই বড় বেদনায়,
কেনা-বেচা করি বটে! লাভ ক্ষতি রাখি কোন মতে
বহির বিপুল শিখা তবু জাগে আনন্দের হাটে।
আলােকের বার্তাবহ
তােমারে স্মরণ করি পরম শ্রদ্ধায়, তােমারে প্রণাম করি
পুস্পাঞ্জলি দিয়া,
অর্ধজগতের তুমি অরাধ্য দেবতা, সমগ্র বিশ্বের তুমি
ধ্যানের প্রদীপ।
বােধিসত্ত্ব সম ছিলে সত্যসাধনায়, ভাগবত ছন্দে গাঁথা
জীবন তােমার
এসেছিলে স্বর্গ হতে প্রভুর তনয়, আলােকের বার্তাবহ
মৃত্যুঞ্জয় শিব।
অহিংসার হােমানলে আত্মাহুতি দিয়া মানবতা দেখায়েছ
মানব জাতিরে,
মহান্ আদর্শ রাখি’ হে মৌন পূজারি! ব্রত তব উদ্যাপন
করেছ হরষে।
অত্যাচার, অবিচার, নিন্দা কুৎসা যত দুই হস্তে কুড়ায়েছ,
অতীব আনন্দে
পাপের নিয়েছ বােঝা পাপীরে তরাতে, তাহারে করেছ ধন্য
প্রেমের পরশে।
ক্রুশবিদ্ধ জ্যোতির্ময় হে মহা বৈষ্ণব ! প্রশান্ত আননে কহ
“ওরা তাে জানে না,
অবােধ সন্তান তব ভ্রমেতে পতিত, উহাদের ক’র ক্ষমা
হে পিতঃ আমার।*
নীজন
দীর্ণ বেদনার মাঝে একথা মানব পারে না কহিতে কভু
কঠোর পেষণে,
প্রাচ্যের পবিত্র বাণী প্রচারিয়া যীশু ঘুচায়েছে প্রতীচ্যের
অজ্ঞান আঁধার।
এ বিশ্বমন্দিরে তুমি নিত্য বরণীয়, তােমার জীবনগ্রন্থে
বেদমন্ত্র রহে,
তােমার পূজার পুষ্প শাশ্বত সুন্দর-যুগ হতে যুগান্তরে
গন্ধ তার বহে।
p
তীর্থযা
সংসারের কর্মসূত্র ছিন্ন করি’ অন্তরের কামনার স্রোতে
তুমি দূরে ছুটিয়ছি দেবতা-দর্শন লাগি গৃহতীর্থ হতে,
মােক্ষ পাবে মরণের অন্তরালে এই আশা মহাপুণ্য লভি,
পশ্চাতে চাহিয়া ফিরে না হেরিলে সকরুণ বেদনার ছবি।
আপনার গৃহ-তীর্থ-মন্দির-দেবতা তব রহে উপবাসী
পাষাণের পাদপীঠে। নৃত্য করে মহানন্দে শিবাদল আসি’
প্রাঙ্গণ ঘেরিয়া নিত্য,সেথায় চাহনি ফিরে ব্যাকুল নয়নে
কোথায় লভিবে পুণ্য? যদি কাঁদে নারায়ণ তােমারি ভবনে।
কোথায় পাইবে মােক্ষ ? লক্ষ্য তব দূর পানে। কাছে যাহা রয়
তাহারে করিয়া হেলা হয়েছে কি কোন দিন পুণ্যের সঞ্চয় ?
যেথায় চলেছ বন্ধু, সেথায় বন্ধুর পথে, গৃহের দেবতা-
সে তীর্থ-দেবতারূপে বিরাজিত, মৰ্ম্মে তব পাবে তীব্র ব্যথা।
ধরণীতে পীঠস্থান যত তীর্থ শোভিতেছে, তুলনায় তারা
গৃহতীর্থ সম নহে, অন্তর-গােমুখী হ’তে ভাগীরথী-ধারা
যেথায় ঝরিছে মঞ্জু নন্দন-কুসুম নিয়া হর্ষ কলােচ্ছ্বাসে,
খাতুদের মাধুকরীলব্ধ নানা উপচারে কুললক্ষী হাসে।
মন্ত্রের মন্থন হ’তে অমৃতের আবির্ভাব হয় গৃহমাঝে,
মাঙ্গলিক ধ্বনি ওঠে উদয়লক্ষীর সনে,—শুভ শঙ্খবাজে।
ফুল ফুটিবার রাতে
হ’ল না আমার ফুল ফোটানাে
ফুল ফুটিবার রাতে,
বিরহ আঁধার ক্ষ্যাপা বাউলের
নামে বাদলের সাথে।
স্বপন লােকের স্মরণ সুদূর,
ভেসে আসে ব্যথা পথিক-বঁধুর,
আশারি মুকুল ঢলে পড়ে ঘুমে
গান-হারা আঙিনাতে।
সজল মেঘের প্রাণের মাদল
গগনে গগনে বাজে,
কেয়ার বনেতে বরষা পাগল
পাতার কুটীরে রাজে।
ভরা জীবনের নদী কিনারায়
মাের আঁখি দুটী তারে ফিরে চায়,
দোতারা বাজায়ে গানেরি ভেলায়
যদি আসে নিরালাতে।
মিলনে
তােমার আমার সুর-সাগরে
বইছে প্রেমের দখিন হাওয়া,
প্রথম তারার গানখানি যে
সন্ধ্যারাণীর হয়নি গাওয়া।
কত জনমের কুসুমদলি’
ছিলে দূরে তুমি আমারে ছলি’,
পিছু পিছু যত গিয়েছি চলি
মিলন-পরাগ হয়নি পাওয়া।
তোমারি লাগিয়া অজানা দেশে
হ’ল কতবার তরণী বাওয়া,
দরশন তবু দিলে না কভু
আলেয়ার সাথে বিফলে যাওয়া।
পথ ভুলে বুঝি স্বপন তরী
এনেছ আমার চিত্ত ভরি’!
মাের পরাণের তট নিরালা
এখনাে তােমার হয়নি চাওয়া।
রা
ভালবেসেছিলে মােরে কোন মধুমাসে !
এপারের এই উদাস বালুর চরে,
তরুণ বুকের কোমল পরশ নিয়া
তুমি এসেছিলে যৌবন-মদ ভরে।
তুমি এসেছিলে অপরূপ সুন্দরী,
মেঘ-রাঙা-শাড়ী-ফাঁকে ফাঁকে তনুজ্যোতি
হরিণ লােচনা ! কাজল তােমার চোখে
স্নিগ্ধচপল ছিল চাহনির গতি।
ওপারের ওই দীঘল ছায়াটী বুঝি
নদী-কিনারায় ডেকেছে তােমারে এসে,
চলে গেলে রাণু!
রিক্তাতিথির সাঁঝে
ভাব-কদমের পরাগ পড়েছে খসে।
ফুলের ফসল হবে না ক আর জানি,
আধখানি চাঁদ আকাশেতে নিবে যায়।
তুমি কেন রাণু! এসেছিলে এই পারে
মাের জীবনের পুষ্পিত বনছায় ?
ওপারের ঘাটে চেয়ে থাকি বার বার
মাের কাছে রাণু, সেই লাগে বড় ভালাে।
নীরাজন
ভাঙা পৈঠায় এই ঘাটে বসে ভাবি
কাহার কুটীরে আবার জ্বেলেছ আলাে ।
এপারের ঘাটে জবাফুল ভেসে আসে
তােমাদের ওই ওপারের ঘাট হতে
বিনিময়ে আমি পাঠাতে পারি না কিছু
পাগলা নদীর একটানা এই স্রোতে।
চলে দুরে যাত্রা করি
সুদূরের দেবালয়ে ওই শুন আরতির শঙ্খ ওঠে বাজি,
আনন্দ সঙ্গীত গাহি চলিয়াছে যাত্রিগণ দেব-দরশনে ;
ওরে মাের বন্দি-আত্মা, কামনার কারাগারে দ্বীপান্তরে আজি
মায়ার শৃঙ্খল পরি’ তুমি কঁাদ ব্যর্থতার বিপুল বেদনে।
বন্দীর শৃঙ্খলে তব যে-বেদনা অহরহঃ করিছে পাগল,
তাহারে ভুলিতে চাহ প্ৰেমমত্ত বিলাসের বিম্বসুধাপানে ?
হায়রে অবােধ ! ওযে, সুধা নহে—সংসারের উগ্র হলাহল !
তােমার চিত্তের মাঝে দ্বিগুণ বেদনা সহ উন্মাদনা আনে।
আসিবে হেথায় কবে তােমার মুক্তির দিন দর পথচারী
দক্ষিণের সমীরণে ; হেসে তুমি যাবে চলি’ অনন্ত উদ্দেশে ?
নয়নের অশ্রুবিন্দু তব স্মৃতিপথে যারা নিত্য দিবে ঝারি,
তাদের বিষন্ন মনে তােমার অলক্ষ্য বাণী উঠিবে কি ভেসে ?
জ্ঞানের শলাকা দিয়া কারাগার-লৌহদ্বার এস মােরা নাশি,
চল দূরে যাত্রা করি প্রভুর দেউলচূড়া যেথা ওঠে ভাসি।
অবেলায়
কি এক রাগিণী গাহে বসে একা সুদরের রাখাল নন্দন,
সুরে সুরে বেলা নেমে আসে।
গগনের দেবালয়ে দেবদাসী করিবারে আরতি বন্দন
চন্দ্রমারে ডাকে তার পাশে।
বাতাসের ছোঁয়া লেগে নুয়ে পড়ে শরবন, শিহরে পল্লব,
তুমি এলে ঘট ভরিবারে -
নূপুর-আঘাতে তব সৰ্বহারা উপলের হতেছে স্পন্দন
হদি নাচে অজানা উল্লাসে।
চকিত হরিণী সম চাহিতেছ চারিভিতে বাঁশী-কুহরণে
সরম-লালিমা-মাখা মুখ,
ঢাকিছ নিচোল বধূ লীলায়িত ধূপছায়া আঁচলের সনে
ব্যাকুল বাতাসে কঁপে বুক।
কুসুম-কোরকে শােভে বেণীর বন্ধনী তব বসন গুষ্ঠিত
প্রজাপতি উড়ে তার পিছু,
কমনীয় মুৰ্ত্তি তব নন্দনের পুষ্পসম হেরি’ শুভক্ষণে
মরতের ভুলে যাই দুখ ।
বহুযুগ আগে দেবি তােমারে দেখেছি যেন এমনি সময়
বাঁশী শুনে আসিতে একাকী,
সংসারের সব কায ফেলি গােপ-পল্লীবধূ জাগাতে বিস্ময়
প্রেমিকের পদরেণু মাখি’!
নীজন
অপবাদ শিরে নিয়া অনাঘ্রাত কুসুমের ডালি দিতে তুমি
আলাে-আঁধারের মােহানায়,
প্রেমের তরঙ্গে বন্ধু নাহন করিয়া হেথা চিত্ত রসময়
করেছিলে বধুয়ারে ডাকি।
বেলা গেল, বলাকারা চলে গেছে নিরুদ্দেশে সীমার বাহিরে
সন্ধ্যা-পান্থ নাহি গ্রাম্যপথে,
মাল্যমণ্ডিত সেই রাখালনন্দন যদি গােষ্ঠে নাহি ফিরে
ধেনু লয়ে অস্তাচল হতে,
শুধু যদি বংশী তার অনিত্য সংসারে বাজে গুঢ় অন্তরালে
নাহি দেখা দেয় দেহ ধরি’
হৃদয়ের ব্রজধামে খুজিবে কি তারে চিত্ত-যমুনার তীরে
মৰ্ম্ম-তমালের অরণ্যেতে ।
হে নট-নগৰি ।
এ বিংশ শতাব্দীর যন্ত্র-যুগে যন্ত্রণার গীতি
সর্বহারা নরকণ্ঠে যে ক্রন্দনে উঠিতেছে নিতি,
তুমি তার বিন্দুমাত্র শুনেছ কি হে নটী-নগরি ।
শুনেছ কি সিন্ধুতটে রুদ্রনট রক্তবস্ত্র পরি’
তােমার সংহার লাগি রণােল্লাসে দুর্যোগ বিলাসী!
অদূর ভবিষ্যে বিষ বারুদের বাষ্পে পৌরবাসী
ভস্ম হবে অকস্মাৎ। তব ক্লীব নাট্য সম্প্রদায়
কোথায় রহিবে, কহ, সেদিনের দৈন্য-দুর্দশায় !
শত শত পল্লী কঁদে, তুমি হাসাে প্রেমের উৎসবে,
ভাব নাই হে সুন্দরি ! কালচক্রে তুমি ধ্বংস হবে !
তােমার বন্দর হতে বাজিবে না জাহাজের বাঁশী,
অশ্রু পারাবারে তব দেহখানি দূরে যাবে ভাসি।
কৃত্রিম সৌন্দৰ্য্য তব সৰ্ব্বনাশী সভ্যতার দান,
স্বভাব-সুষমা নাহি, সুকোমল নহে চিত্তপ্রাণ,
জলৌকার মত কবে জন্ম নিলে জীবনের স্রোতে
জীবের শােণিতপায়ি! বিধাতার অভিশাপ হতে ।
কলঙ্ক-কালিমা-পঙ্ক মাখিয়াছ আনন্দিত মনে,
সমগ্র জাতির রক্ত শুষিতেছ গাঢ় আলিঙ্গনে
নীরাজন
তবু তুমি স্থির নহ। আকাঙ্ক্ষার উদগ্র স্পন্দন
প্রমত্ত যৌবনে তব নিত্য জাগে,—কেমনে ক্রন্দন
শুনিবে কোথায় ওঠে! উচ্ছঙ্খল বিলাসীর সাথে
নৃত্য ক’র নিশিদিন, সুরাপাত্র শােভিতেছে হাতে,
মত্ততায় বিবসনা। কোটি মুদ্রা দেহের বিলাসে
ঢালিতেছে ঘৃণ্য নর তব পদে যৌবন পিয়াসে।
সহস্র ছলনা তব স্বার্থে স্বার্থে ঘাত-প্রতিঘাতে
সংসারের যাত্রা পথে কঙ্কালের শুষ্ক মাল্য গাঁথে।
তােমার চক্রান্তে হেরি ভাগ্যলক্ষী বনবাসে যায়
দুখিনী জানকী সম। দূতক্রীড়া করিয়া হেথায়
সৰ্বস্বান্ত নর-পশু বাজি রাখে কুললক্ষনী যত,
দ্রৌপদীর সম তারা নির্যাতন সহি’ অবিরত
তােমার মৃত্যুর লাগি ঈশ্বরের করে আরাধনা,
দেহ-পণ্য বিনিময়ে তুমি ক’র ঐশ্বৰ্য্য সাধনা।
৬৮
বলিদান
মন্দির নহে—পাপের বিপণি,
মুর্তি যে ম্রিয়মান !
জাগাে, জাগাে ভগবান।
তুমি কি রহিবে পাষাণে নিহিত ?
সহিবে কি অপমান !
পণ্যের মত ধর্ম বিকায়, পূজারী ভক্ত নয়,
ক্ষুব্ধ হিয়ার রুদ্ধ শিলায় ব্যথার ফন্তু বয়,
ভক্তি-বিহীন ভাক্ত সাধনা কামকাঞ্চনময়,
ওঠে তারি জয়গান।
আর কতদিন—আর কতদিন হে আরাধ্য দেবতা !
অনক্ষরের পূজার কুসুম পঙ্ক সলিল সনে
তােমার চরণে অর্পিত হবে! কহিবে না কোন কথা !
তত্ত্বজ্ঞানীর একদা মন্ত্রে
নাচিত চন্দ্র তারা,
বৈরাগী একতারা
হেথায় বাজাত-সুরে সুরে তার
দিধু দিত ঝরা,
সারা জীবনের সন্ধ্যাপূজার মধুর শঙ্খরােলে,
স্তব-গুঞ্জন দীপ-নর্তনে সান্দ্র হৃদয় দোলে
নীরাজন
নীল মাধবের চিদূঘনরূপ চিত্ত-সাগর কোলে
আনিত মুক্তি-ধারা।
যুগসঞ্চিত ধ্বংসপ্রাকারে বল্লীকস্তপতলে
সেই সুন্দর স্বপ্ন-সুদূর শত শতাব্দী কাঁদে ;
পুণ্য প্রাচীন লেখ্যমালায় স্মরণের দীপ জ্বলে।
শিব সুন্দর! স্বস্ত্য যুগের
স্বস্তিবাচন কর
ভৈরব রূপ ধ’র।
গৈরিকবেশী যৌন-সাধক
ভােগীর শক্তি হ’র।
মহাতপন্থী মাজ্জার সম স্বার্থের সাধনায়,
মিথ্যার সাথে মিলিত হইয়া অশিবের কামনায়
সমাজ ধৰ্ম্ম করিছে বিকৃত, ঋষি ভাবে আপনায়
হৃদয় ঘৃণ্যতর,
বিধি ও বিধান ভেঙে দিতে সদা রচিতেছে নানাদল।
গর্বোদ্ধত ভণ্ড বক্ষে কর গাে অশনিপাত,
নর পিশাচের রুধিরে তৃপ্ত হউক ধরণীতল।
ঋষি-ভারতের এই মন্দিরে
নব ভারতের বাণী
মহাভারতের গ্লানি।
মঠে মন্দিরে চলে অনাচার
নারীর আঁচল টানি।
৭০
নীরাজন
অগ্নিবীণার ভৈরব রাগে রুদ্রতালের নাচে
ভস্ম করিতে মঠ মন্দির পাপের ধূলার মাঝে
জাগাে ঈশ্বর ! লাঞ্ছিত প্রভু ? বেদনার মত বাজে
নিখিল চিত্তখানি।
ঘূপ কাষ্ঠেতে যৌন-সাধকে বলি দিতে আমি চাই,
বিদ্রোহী বেশে চূর্ণ করি নিয়তির ইঙ্গিতে
পাষাণ মূর্তি আর মন্দির, যেথায় সত্য নাই।
১
প্রবাসের পথে
এই ধরণীর পান্থশালায় প্রবাসের পথে দিবস রাতে,
প্রতি পলে পলে অভিসম্পাত রাখী-বন্ধন করেছি হাতে;
প্রতিটী বছর ফুরালাে নীরবে আঁচল ভিজায়ে নয়ন-লােরে,
প্রতিটী দিনের প্রহরগুলি যে নিয়েছে বিদায় ব্যথার ডােরে।
যাহাদের কাছে পাঠায়েছ মােরে, যাহাদের কহি আপন জন,
যাহাদের লাগি উজাড় করেছি আমার শুভ্র পরাণ মন,
তাদের স্বার্থ-নিঃশ্বাসে দোলে অবিশ্বাসের কঠিন ডুরি,
কাঁদে যে আমার শ্মশানের মাঝে বৃদ্ধবটের নবীন ঝুরি।
এত আলাপন, এত পরিচয়—তার মাঝে পাই প্রবঞ্চনা,
ওঠে অন্তরে বিষাদের সুর, কতকাল সহি এ গঞ্জনা ?
যত দুখ পাই তব নাম জপি, চাহিনা যাইতে কাহারাে কাছে,
সবাকার নাম দাওগাে ডুবায়ে চাহি যে তােমারে বুকের মাঝে।
সুখের আশায় কুড়ায়েছি দুখ, লহ মােরে প্রভু আপন ঘরে,
যেথায় তােমার চুম্বন-মধু আশীষ কমল সদাই ঝরে।
নানু
খেলার সাথীরা ফিরে চলে যায়, ধীরে ধীরে আসে অন্ধকার,
খেলার পুতুল পড়ে আছে, সেই অভিমানী ছেলে এলাে না আর।
মাটীর স্বরগ গিয়াছে ভাঙিয়া ব্ৰজের মাধুরী হয়েছে লীন,
ধূলায় ধূসর স্মরণ মধুর তাহারি পায়ের কমল চিন্।
কোন্ সে নিঠুর মথুরার দূত নিয়ে গেল মাের গােপাল ধনে,
কোলের বাছারে মা’র কোল হ’তে ছিনয়ে নিয়েছে সঙ্গোপনে?
পূজার সময় নূতন বসন সব ছেলে মেয়ে পরেছে আজ,
আমার ‘গােপালে সাজাব কেমনে! এল না তাে ফিরে
রাখালরাজ !
কোন্ মথুরায় ফাকি দিয়ে তুমি গেছ নীলমণি শারদ রাতে,
সােণার গােকুল আঁধার করিয়া রাজা হতে গে’ছ কাহারি সাথে?
পৃথপানে তব চাহিয়া চাহিয়া যশােমতী কঁদে ধূলায় পড়ি,
গরীবের এই মাটির ঘরের ছিলে গো দুলাল দুখের নড়ি।
তােমার ‘দাদুরে অন্ধ করেছ ‘মানুরে’ করেছ পাগল তুমি,
‘বাবু’ বলে আর কে ডাকিবে মােরে বক্ষ জুড়ায়ে গণ্ড চুমি !
রােদনের সুর পশিবে কি কাণে অচেনা দেশের হয়েছ রাজা,
পাখিটী তােমার নিয়ে গেছ সাথে, পড়ে আছে শুধু সােণার খাঁচা।
4
চাহি আমি বেদনাই
ঘৃণায় আমার সাথে কহেনা যাহারা কথা
মােরে দেখি যায় দূরে রচি’ অপবাদ,
প্রতিদিন যারা মােরে নিন্দা করে, হে দেবতা !
তাহাদের আমি যেন করি আশীৰ্বাদ।
মানুষের কুৎসা গাহি’ সময় ফুরায়ে যায়
জীবনের সন্ধ্যা নামে অন্ধকার বাঁকে,
যাহারা দিতেছে ব্যথা, তাহারা জানেনা হায়!
তাহাদের ভবিষ্যত মরণেরে ডাকে।
তারা তাে চাহেনা প্রভু তােমার করুণাধারা
জগতের অভিশাপ কুড়ায়েছে হৃদে।
পরছিদ্র অন্বেষণে ভ্রমিতেছে দিশাহারা,
অশান্তির তীক্ষ্ণশর বক্ষে আছে বিধে।
মােরে তুমি শক্তি দাও—তাদের মঙ্গল গান
আমি যেন রচে যাই এ ধরণী-তলে।
আমার বিরুদ্ধে তারা যত করে অভিযান,
আমি যেন ক্ষমা করি অন্তরের বলে।
সংসারে মানুষ যত আমারে আঘাত করে
বেদনায় ভরে ওঠে এ হৃদয়খানি,
হে দেবতা! তুমি এসে তােমার মঙ্গল করে
আমারে পরশ ক’র বক্ষে তব টানি।
।
নীরাজন
নিশীথ শয়নে মাের অর্ধ নিমীলিত আঁখি
অবিরত চেয়ে থাকে তব আঁখি পানে,
আঁধার ঠেলিয়া প্রভু পরিচিত নামে ডাকি
জ্যোতির্ময় রূপে এস সান্ত্বনার গানে।
হে অরূপ! দেখিয়াছি যেই-রূপ, ভুলি নাই,
ভুলিবনা কোনদিন জীবনে আমার।
বেদনায় আসিয়াছ, চাহি আমি বেদনাই
তােমার পরশ সুখ পাব অনিবার।
হে আল্লবিত জাতি
উৎসবের স্মৃতি রাখি কত যুগ হ’ল অবসান
হে আত্ম-বিস্মৃত জাতি! কর নাই তাহার সন্ধান।
বিশীর্ণ বিচ্ছিন্ন মাল্য কণ্ঠে তব গর্বভরে দোলে,
সে মাল্যের মূল্য নাহি, মুলে তার মিথ্যা আছে বলে।
অতীতের জীবন-সোপান
অহল্যার মত কঁদে, মৃত্তিকা হয়েছে পাষাণ।
তােমার গৌরব-দিন আসিয়াছে শত শত বার,
ঝড়-বিদ্যুতের পথে মিশিয়াছে পদধ্বনি তার,
তারকা-কুসুম তব ফুটিয়াছে দিগন্ত-সীমায়,
রহস্যের পারাবারে দলগুলি নিস্তব্ধ নিশায়
উড়ে গেছে, নিখিল সংসার
বঞ্চিত মুহূর্তে তারে দিয়েছে কি অশ্রু উপহার।
তােমার গৌরব দিন ভারতের এক প্রান্ত হতে
মরু-মেরু পার হয়ে চলে গেছে আলােকের রথে,
গ্রহে গ্রহে তারাদলে তুলিয়াছে শুভ্র যবনিকা,
তাহার বিজয়বাৰ্তা ঘােষিয়াছে নীল সাগরিকা
অবিশ্রান্ত অনন্তের স্রোতে।
গেছ ভুলে স্থান তব ছিল কোথা অসীম জগতে।
নীজন
কল্পনার আন্দোলনে ভ্রান্তিভরা তব ইতিহাস
সিন্ধুপারে বসি’ যারা লিখিয়াছে করি’ উপহাস,
তাহাদের লিপিগুচ্ছ ছিড়ে ফেল, অসত্যের চাপে
সত্য যাহা অন্তরালে সমাহিত—তােমাদের পাপে
তাহাদের পূর্ণ অভিলাষ।
সত্যের সন্ধান কর, পরবাক্য ক’র না বিশ্বাস।
৭৭
শিপ্রাতটে
অখণ্ডসত্ত্বার সাথে প্রকৃতির গুপ্তঅভিসারে
বিরহ-মিলন-মান-অভিমান-অনুরাগ হতে
এ বিশ্বে উঠিছে যত খণ্ডরূপ আলাে-অন্ধকারে
অধীর চঞ্চল করি অনন্তের দীর্ঘ-যাত্রা পথে,
তুমি তার ক্ষুদ্রকণা পেয়েছিলে, কবি কালিদাস ।
সত্যরূপ প্রেমরূপ বক্ষে তার করিয়া বিকাশ
মােহমুগ্ধ মানবের মৃত্যুধৰ্ম্ম করেছ বিনাশ
তপস্যার তীব্ৰবলে,
ভারতীর রত্ন র’হ নিখিলের চিত্ত-শতদলে।
সসীম অসীমে নিত্য নবভাবে মিলনের মাঝে
যে-বেদনা বিরহের তবু ওঠে নিখিলের পরে
তুমি তারে অনুভব করে গেছ, কোথা বহিয়াছে
বেদনার স্রোতােধারা খুজিয়াছ জীবন-সাগরে।
যে-রাগিণী জাগে নাই কোনদিন কল্পনার পারে,
যে-কুসুম ফোটে নাই উষসীর মােহানার ধারে
তুমি তাহাদের কবি। আর্বিভাব তব আকস্মিক
ভারতের শিপ্রাতটে,
তােমার আরতি-শিখা আজো হেরি বিশ্ব-চিত্রপটে।
৭৮
নীরাজন
মেঘের বলাকাশ্রেণী আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
তােমারে ডেকেছে কবি অভিশপ্ত যক্ষের লাগিয়া,
বিরহ দূতীরে তুমি পাঠায়েছ বিস্মৃত বরষে
দুর বাতায়নে যেথা বিরহিণী রয়েছে জাগিয়া।
তােমার ছন্দের বর্ষা বয়ে গেছে দূর দেশে দেশে
সকল বন্ধন ভাঙ্গি’ স্বর্গলােকে মিশিয়াছে শেষে,
ব্যথার লহরী তব মেঘমলে অসাম উদ্দেশে
পাঠায়ে দিয়াছ তুমি
বিরহ রাগিণী যেথা কেঁদে কেঁদে পড়িয়াছে ঘুমি'।
শত নারী সৃজিয়াছ বিরহের কাব্যে তব কবি !
তার। বিশ্ব-হৃদয়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কামনার ধন।
অন্তর বিরহে তারা ক্ষণিকের চেতনার ছবি
তাহাদের পদধ্বনি রূপছন্দে বাজে অনুক্ষণ।
যুগে যুগে কত মেঘ ভেসে যায় ভুবনে ভুবনে,
তাহাদের কেহ কভু বন্ধুরূপে আমাদের সনে
হৃদয়ের বিনিময় করে নাই কোন কথা কহি।
তুমি তাহাদের নিয়া
এসেছিলে মন্দাক্রান্ত! ছন্দে নব সঙ্গীত গাহিয়া।
গগনের মেঘপুঞ্জে অন্তরের দিয়া পরিচয়
বন্দনীয় করে গেছ চিরন্তন বিরহের বাণী।
স্মরণের আলিম্পন তাকিয়াছ-মুছিবার নয়
তার বুকে বাজে বীণা আর শােভে বিশ্ববীণাপাণি।
জাগরণী
যুগের বাস ডাক্ দিল ওই
শ্যামল বনের দুয়ারে।
সব-হারা মাের অনাথা ভননি।
ঘুমায়ে না আর আঁধারে।
ব্যথা-বেদনার পােয় রজনী,
মহামানবের ওঠে জাগরণী,
দেবজনমের পড়েছে আলােক
সুখদুখভরা এপারে।
নবপ্রভাতের মন্দিরা বাজে,
যুগ-কীৰ্ত্তনে
ভূলােকে,
ছন্দ-মরাল তালি দিয়া নাচে
কুসুম ফোটার পুলকে।
নিবে গেছে তব হৃদয়ের চিতা,
জাগো, জাগাে, ওগো চির বঞ্চিত।
সপ্ত মুরের তেলে মুচ্ছনা
বাজায়ে দীপক বীণারে।
গ্রন্থকারের প্রথম কাব্য গ্রন্থ মধুছন্দা ছন্দ-বৈচিত্রে-পদ-লালিত্যেকাব্য মাধুর্যে অনবদ্য। বাংলার শ্রেষ্ঠ মনীষিগণ ইহাকে অভিনন্দিত করিয়াছেন এবং প্রত্যেক মাসিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও দৈনিক পত্র সমালােচনা প্রসঙ্গে ইহার উচ্চ প্রশংসা করিয়াছেন। কাব্য-জগতে মধুচ্ছা অনিন্দিত এবং নিষ্কলঙ্ক বলিয়া ইহার সার্থকতা আছে। বিবর্ণ রঞ্জিত প্রচ্ছদপট, ছাপা, কাগজ ও বাধাই সুন্দর। গ্রন্থের মধ্যে ৫৪টী কবিতা আছে। প্রিয়জনকে উপহার দিবার মতই হইয়াছে। মুল্য ১০ পাঁচ সিকা। কয়েকটী বিশিষ্ট পত্রিকার অভিমত নিয়ে উদ্ধত হইল প্রবাসী বলেন—“... প্রথমেই ছন্দের দোদুল পদ্মফুলে “মধুচ্ছা” রসমুক্তিতে আবির্ভুতা। • মধুচ্ছার ভাবে আবিষ্ট কবি এই মাটির ধরণীতে নামিয়া পার্থিব জীবনের সমস্ত ভােগকে মানব জীবনের উর্ধ্বমুখী শতদলের সঙ্গে একত্রে গাঁথিয়াছেন। গ্রন্থের মধুচ্ছা নামের ইহাই সার্থকতা। কবির কল্পনা কখনও ঊর্ধে উঠিয়াছে, কখনও বা মৃন্ময় জগতের টানে নীচে নামিয়া পৃথিবীর রূপে রসে নিজেকে হিল্লোলিত করিয়াছে। কোন কোন স্কুলে নিতান্ত ভােগের বস্তুর মধ্যে তাহার কাব্য রক্ত মাংসের দেহকে আশ্রয় করিয়াও দেহাতীত হইতে পারিয়াছে। কবির মূল সন্ধান যে উৰ্দ্ধমুখী ইহা তাহারই পরিচয়।•••এই কাব্যগ্রন্থখানি বঙ্গবাণীর শ্রীচরণে যে পদ্মের | রহিবে তাহাতে সন্দেহ নাই।” বঙ্গশ্রী বলেন-“...আজকালকার কবিদের মধ্যে যে কয়জন সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়াছেন অপূৰ্ব্ববাবু তাহাদের মধ্যে অন্যতম।:মধুচ্ছার সমস্ত কবিতাই আমাদের ভাল লাগিয়াছে। নিখুত ছন্দ, সুন্দর ভাষা, চমৎকার ভাব এই বই- খানিকে সাহিত্য ক্ষেত্রে একটা স্থায়ী আসন দান করিবে।” মাসিক মােহাম্মদী বলেন-"...কাব্য-সৌন্দর্যে ভরপুর তা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। “সন্ধ্যার পদ্ম” কবিতাটী কমপক্ষে দশ বারােবার পড়িয়াছি। এত সুন্দর ও মধুর হইয়াছে এই কবিতাটা যে একবার পড়িলে তার মূচ্ছনা বহুক্ষণ ধরিয়া বাজিতে থাকে।•••কবির ছন্দে হালকা চাপল্য নাই, আছে স্নিগ্ধ-গাভীৰ্য।”
( ২ ) দেশ বলেন- •••বাংলা সাহিত্যে অপু বাবু কবিতা লিখিয়া ইতিমধ্যেই খ্যাতিলাভ করিয়াছেন। “মধুচ্ছা” হার খ্যাতিকে অক্ষুন্ন রাখিবে।•••••.” সােনার বাংলা (ঢাকা) বলেন-“কবিকে আমরা সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাই এবং পাঠকদিগকে বলি “বন্ধু বরণ কর দ্বারে মধুচ্ছল।” অমৃত বাজার পত্রিকা বলেন—“...The poems are works pemsing... এডভান্স বলেন-“...The Vernacular poetry is now flooded with dogger Verses, but within it tho tone of Apurba Babu's poems is purc, rythem, rich and sonorous and ideas never hazy...Madhuchhanda will shed lustre to the Bangabharati for all times to come.“ ফরওয়ার্ড বলেন -"In thc doluge of cheap sentimentalism and casy omotionalism in the field of our Vornacular poctry we welcome the publication Madbuchhanda'...The poet is wellknown for his contributions in tho leading monthlics and his poems are als widely read. ...We read the book with pleasure and lovers of pootry will not fayl to sharo it with us." আনন্দবাজার পত্রিকা বলেন-“...শব্দ, ছন্দ এবং কল্পনার বৈচিত্র্যে “মধুচ্ছন্দা” কাব্যরসিকদের তৃপ্তি দিবে।” দৈনিক বসুমতী বলেন-“••গ্রন্থকার বাঙ্গলার কাব্য জগতে আপনার প্রাপ্য। স্থান অধিকার করিয়াছেন।” স্থানাভাবে আমরা মনীষিগণের এবং অন্যান্য পত্রিকার অভিমত দিতে পারিলাম না।
No text on this page.
No text on this page.