Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Swapna-chabi Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
স্বপ্ন-ছবি শ্রীসত্যেন্দ্রকুমার রায়।
লালা বিনয়কৃষ্ণ,
হার্ডিঞ্জ হােষ্টেল, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ।
৮৮নং আশুতােষ মুখার্জি রােডস্থিত
আনন্দমােহন প্রেস হইতে
ভূতনাথ সরকার কর্তৃক মুদ্রিত
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
[ মূল্য একটাকা মাত্র
দীপ ত্রি বিষয় পৃষ্ঠা f ৮ ও ৩ H ১২ ১৫ ১৬ স্বপ্ন-ছবি সবিতৃ উষা স্বপ্ন-প্রিয়া দেবতা, বিষাণী আদি-মানব মুহুর্তের তীরে ধরিত্রী বর্ষা-বিদ্যুতে স্মৃতি প্রতীক্ষা ১৮ । ... ২০ ২২ * ৩৪ ব্যবধান স্বয়ম্বর ৪ :: ৪৯ তরঙ্গের তীরে কালিদাসের প্রতি .. ইয়েটস্-এর প্রতি ... আপনার প্রতি ৫৪ বিষয় পৃষ্ঠা গােলি-অবকাশ গােধূলি-অবকাশ তারার খোঁজে স্মরণে ও ও ও ও ও ৬১ সমর্পণ ৬২ ৬৩ ১৯ H ••• ৭০ ৭১ বিরােধ বিফলের আবেদন ... অস্তালােক প্রতিরূপ শাস্তি অপমানে বহ রহ তুমি রহ পরিচয় স্বপ্ন-বােঝ গােধূলি-তটে বিজয়ী *... আমার স্বপন তরুতলে ••• ৭৮ * :: : ৮২ নির্জন প্রেম ৮৪ সুর-সুন্দরী নির্জন আহ্বানে बिल ৮৭ ৮৯ বিষয় পৃষ্ঠা অসময় ৯০ বর্ষণ ৯১ : অনুদ্দেশ ... ৯৩ ... ১৪ .. ৯৭ ৯ ১২ একাকার গােধূলির রাণী मको তিমিরের রাণী আবর্তন রেখা-বিহীন কান্তকাল এষঃ আষাঢ়-তলা বিদায়-ক্ষণে সখী-হীন ১০৮ ••• ১১০ ১১২ ১১৩ অবাধ্য ... ১১৭ বাদল-দিনে ১১৯ ১২০ ১২১ ••• ১২৪ ••• ... ১২৬ রূপান্তর অগ্নি-তলে অগ্নি-অাখি উৎসব তিমিরের-তলে ব্যর্থ সন্ধান দৃষ্টি সােনার হংস ১২৮ * * *
বিষয়
পৃষ্ঠা
।
::
১৪২
১৪
সােনার হংস
কে-তুমি
বন্দিনী
নিঃসঙ্গ
ছায়া-সরােবর
কুলায়
ব্যর্থ
১৪৭
১৪১
sie
•••
::
সন্ধ্যার দেশে।
সার্থকতা।
যাওয়া-আসা
:::
১৬১
অবসান
No text on this page.
No text on this page.
ন
উৎসর্গ-লিপি
বন্ধু । আমার গােধূলি-স্বপনে অবকাশ!
যাহাদেরে সুখে ধরেছিনু মনে বারোমাস,
স্বপ্ন-দোলায়, শিহরি’-পুলকি’ গুঞ্জনে,
ভুজে-ভুজে-বাঁধা চপল প্রাণের ভুঞ্জনে,
আজ তাহাদের আমার লেখায় অভিসার :
তােমারে দিলাম উপহার!
মাের বিপরীত : রূপান্তরের আবেশে
গলায়েছে মােরে, পরায়েছে কত-কি বেশে।
যখন-তখন তাদের পরশ-শিহরে
যেখানে-সেখানে আমার হৃদয় ৰিহরে :
প্রলয়-নিশার উমি-বিলয় বাসনা
তা’র স্পন্দনে মিলায় আপন চেতনা।
সুর-সুন্দরী, –তরুণ আঁখির লালসে
আঁচল খসায়ে’ ধরা দিয়ে গেছে পারশে,
সন্ধ্যা যখন অবসাদ আনি’ ভুবনে
ছড়ায়ে দিয়াছে বিজন তরুরে গােপনে,
ক্লান্ত পাখীর সাড়া তুলে নিতে আসে,
হাজার শাখার শিথিল-প্রসারে, হরষে ;
ওড়া-পাখীদের মত্ত পাখার ঝাপটি
আকাশের গান যবে ধরে’ লয় সাপটি ;
•
মাের প্রিয়াদের সফন্স, বিবশ অখিতে
আমার মূর্তি ভাসে যবে হেসে কাড়িতে
কপােত-করুণ, ধূসর পাখার পরাণে,
আবেগের রাঙা ব্যস্ত মধুর ধেয়ানে।
--আজ ধরা দিল বাহিরে, রঙের আভাসে,
হৃদয়-দোলানাে আমার মুগ্ধ আকাশে,
অতি-জগতের স্বপন-ওড়ানাে বাতাসে,
ধরার স্বপন বিকল যেথায় হুতাশে ।
সেদিনের বেগ কোথায় তাদের, যেদিনে
প্রথম পরশ পেয়েচি স্বপন-পুলিনে ?
এসেচে ক্ষণিক-বিদায়ের বেলা আঁধারি’,
কালাে এলােচুল ধরায়, আমায় প্রসারি,
পাণ্ডু-নয়ন, আকাশের নীল শিখরে ;
পূণিমা-চঁাদ দূর-বনানীর শিয়রে
অগ্নি-আবেগ বুকে লয়ে’ কবে সহসা
যেতে-যেতে পথে যেমন ঈড়ায় বিবশ,
স্নান শােকাতুর কঠোর চাহনি হানিয়া,
বেদনায় যেন কত-কি গিয়াছে ভুলিয়া !
অনেক হয়েচে,~~
আমার স্বপনে পূর্ণ তাদের কামনার,
আদিম-বেদনা-হর্ষ-জড়িত সাধনার !
তাহারা চেয়েচ :
০
অধরে-অধরে আর্ত কঁাদার কিশলয়
মুঞ্জরি’ উঠে সন্ধ্যা-ঋতুর বন-ময়।
তােমার মনের মেঘের আগুনে অভিসার
বন্ধু! তাদের ;—তােমারে দিলাম উপহার।
বন্দি
মে, ১৪ : ১৯৩০
No text on this page.
‘অনন্তমন্যদ্রুশদস্য পাজ
কৃষ্ণমন্তদ্ধরিতঃ সং ভবন্তি ।
--ঋগ্বেদ,
..
‘অবিদা সয্যা এ মম দুখং বিনােদেমি,
জদি ণিদ্দং লভামি।
-ভাস।
‘কেনাপুৎক্ষিপতেব পশ্য ভুবনং মৎপাশ্বমানীয়তে।
কালিদাস।
No text on this page.
No text on this page.
প্রলয়ের গান
প্রলয়ের, রুদ্রের জয়-গান গাহাে :
অন্তিম সন্ধ্যার বন্দনা বাহে।
সৃষ্টির শতদল প্রলয়ের পারে
তুমুল আনন্দের নৃত্যের ধারে
উত্তান পৃথ্বীর প্রার্থনা তারে
উত্তাল ছন্দের ক্রন্দন বাহে,
উচ্ছসি’ ভাঙো সব, উদ্দাম চাহে,
প্রলয়ের, রুদ্রর জয়গান গাহে
No text on this page.
No text on this page.
.
স্বপ্ন-ছবি
বাতাস-পরে লঘু যাদের চরণ-গুলি খামে
সাগর-মেঘে, কুসুম-রেণুতে,
তাদেরে আজ ধরিতে চাহি গানে ;
স্বপন-মাঝে সহজ ছবি, যাহারা মৃদু নামে
ঘুমের কোলে বিলীন-বেণুতে
লভিতে চাই তাদেরে আহ্বানে।
উষার মতে, নিশার মতাে আবর্তিয়া চলে
অন্ত-হীন সমান* যারা পথে
হারায়ে যেতে’ আকুল প্রতিদিন ;
প্রয়াস কিবা ? স্থিতি কোথায় ?-কোমল কথা বলে
বিরূপণ তারা মনের হার-স্রোতে :
বাঁধিতে চাই,—মলিন গীতি দীন!
পরশ যাদের জটিল ভুলে কঠিন আসি’ লাগে,
ছায়ার লােকে বিজনে, দুরে সরি
নিজেরে মনে স্বপন-ছায়া মানি',
গােপনে মনে করুণ তারা ছন্দে যেন জাগে।
—আলােরে, তারে আলােক নাহি ধরি।
বাতাস, তারে বাতাস নাহি জানি।
সমান-সাধারণ ( ঋখেদ ১,১১৩,৩}
+ পিৰিতি-পুতি (খেদ ১,১১৩,৩)
4.
ল্প-ছবি
তােমরা-তা’র উন্ধে হাে ভুবন চোখে রাখি’
বরণ-সুখে অধীর, মধু ভাসি’ ;
এসােনা কহে,--চাহিয়া আছে সবি।
শ্রান্ত মােরা মলিন রাগে; তােদেরে ফিরে ডাকি।
গাপিয়া মহাে, সবারে ভােলা হাসি’ :
ছন্দে-ধরা আনিছে মধু কবি ।
সবিতৃ
স্বর্ণ-রথে স্বর্ণ-দণ্ড অন্তরীক্ষে তুলি’
হে সবিতৃ, সুন্দর সবিতৃ,
উদ্ধ-পথে এসো, এসাে অন্তর আকুলি’ ।
অন্ধকার অর্ধ-ছিন্ন করি’ এ-ধরিত্রী
কঁপিছে ক্রন্দন-ভীত, হিম-বা স্প-মাঝে
স্পন্দন-কাতর-বক্ষ : দুটী বাহু বাজে
নৃত্য-মাঝে স্তব্ধ সব ভুলি’ ।
স্বর্ণ-বাহু দুরাশায় দাও প্রসারিয়া,
শান্ত করাে মুগ্ধে আবরিয়া ।
হেথা আমি বসে আছি অরণ্যের ধারে
পাতি’ মাের উৎসুক নয়ন
বায়ু-রাশি আসে ক্ষীণ-আলােক-সঞ্চারে
শীর্ণার ব্যাকুল কূলে অর্ধ-অচেতন,
তরঙ্গ-বিদারে মাতি’ ; কাছাকাছি গ্রাম
কোনাে নাই ; শঙ্কাতুর, নির্জন বিরাম
স্ফীত-বক্ষে উন্মত্ত বিস্তারে ;
কালো পাখী উড়ে গেল আচম্বিতে ত্রাসে
দীর্ণ-মেঘ, পাণ্ডুর আকাশে'
;
স্বপ্ন-ছবি
.
।
কোথা তুমি, কোথা অশ্ব, কোথা তব রথ,
হে সবিতৃ, প্রদীপ্ত-আনন।
হাহাকার জাগি নাচে ভেদি’ সুপ্ত পথ
মরমের ; রিক্ত আশা, নিষ্ফল ক্রন্দন,
রুদ্ধ ভয় মানবের আসে দলে-দলে
অসহায়, উৎকণ্ঠিত, অব্যক্ত কল্লোলে ;
এ-অরণ্য, এ-নদী-পবতি
মিলাতেছে মূচ্ছা-হত বিবশ, মলিন,
নিজেদের সঙ্গীতে বিলীন
হেথা তুমি ওঠো জাগি', ওঠো, চাহাে, চাহে !
পীতকেশ উড়ক চঞ্চল ।
এখনি আসিবে ঊষা। জীবন-প্রবাহ
বর্ণে-বর্ণে তরঙ্গিত, কাতর, কোমল
খুলি’ যা’ বিদেশের স্থির অন্তঃপুরে,
যেথা তুমি হে-মধুর, দূর হতে দূরে!
নির্বাপিত-সমস্ত-প্রদাহ
তখন চাহিবে মৃদু, শান্ত, স্বচ্ছ, হারা,
বর্ণহীন, হাসি-অশ্রু-ছাড়া।
৭
মােদেরে অমর করে নিত্য সুধা আনি’,
স্বপ্ন-স্রোতে দাও, দাও ছাড়ি’!
৫ স্বপ্ন-ছবি মৃত্যু বক্ষে দৃঢ় চাপি বারম্বার হানি’, কঠিন আঘাতে তার নিষ্ঠুর বিদারি’ চাহিতেছে তীব্র, লােভাতুর । হে দেবতা, এসো নামি’ : মাের। ভীত ; ক’য়াে দুটী কথা নিঃস্ব মােরা তােমারে আহ্বানি। তব রূপ পূর্ণ করি’, দীপ্ত করি’ সবে হে অমর, পঁাড়া গৌরবে । আমারে উচ্ছ্বাসি’ ভাঙি তরঙ্গের মতো হে পবিত্র, তােমা’ পরশিতে : ফেনিল শীকর-কণা-চিন্তা, ভাব, ব্ৰত- কাতর, উৎক্ষিপ্ত-পক্ষ তােমারে চুমিতে সিন্ধু-বক্ষে,:বালু-স্তরে, তট-বনানীর প্রস্ফুট কুসুম-পানে মর্মান্ত-অধীর কোথা যায়, কোথা অবিরত। উৰ্দ্ধ হ'তে ছায়া তব নিয়ে আসি’ পড়ে যেথা মাের ছায়া কঁদি’ মরে। -এখনি এসেচো দেখি ! এসেচো মহান, প্রজ্জ্বলন্ত-কল্যাণ-নয়ন। হে ধরিত্রী, ওঠো জাগি’ পরিপূর্ণ-প্রাণ, ছুড়ে ফেলো যত্নে-গাঁথা অন্ধ আবরণ !
-হবি
-
হে মানব, চাহাে, চাহহা,–দূরে জ্যোতি
সুবৰ্ণ-বিচিত্র-রথে ; কোথা তব গান ?
কোথা পুষ্প পেলব, অম্লান ?
কোথা পণ্ড, বিহঙ্গে?-ধরাে সম-তান ;-
পুণ্য রােলে সরে আহ্বান !
দেবতা সম্মুখে মাের : শুধু ক্ষণকাল
বাধে তব সপ্তাশ্ব হরিত।
পূত চক্ষে হেরি তব দীপ্ত বাষ্প-জাল,
অনন্ত আবেগ-ভরা স্তিমিত অতীত :
সিংহ সেথা দৃপ্তরবে প্রকম্পিত করি’
গিরিশৃঙ্গ, চাহে মত্ত চরণ সম্বরি’ ;
বায়সেরা উন্মুখ, বিশাল
ঝঙ্কা-মেঘে আক্ষালিয়া চিরদিন চলে ;
গাভী-গণ খাম শম্প-দলে ।
মুহুর্তে উঠিয়া গেছি প্রলয়ের বুকে
সৃজনের নৃত্য-কলতানে :
তুমুল, বিল, হারা আনন্দের সুখে
শূন্যে আমি দুলি, ভাসি বিজড়িত প্রাণে।
উন্মুখ, উন্মুক্ত ছায় উৎসারিয়া কঁপে
রুবেগে তালব্ধ, অস্ফুট বিলাপে ;
ক্ষীণ তারা নিস্তব্ধ কৌতুকে
৭
স্বপ্ন-ছবি
ধরণীর অরণ্যেরে শিথিল বন্ধনে
উত্তোলিতে চাহে প্রতি-ক্ষণে !
হে দেবতা, আর কেন ?-রঙীন্ ছলনা
নিরানন্দ আবতে নৃত্যের !
সেথা হ’তে ফিরি’ চাই ব্যাকুল, বিমনা
ভাষা যেথা ঘুরে’ মরে এক্ষত চিত্তের।
হে প্রধান, ছাড়াে রথ নিভৃত আকাশে,
মেঘের তরঙ্গ তোলে শুভ্র পথ-পাশে।
স্ফীত-চক্ষু, লুপ্ত-অশ্রু-কণা
মােরা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-ভরে তােমা-পানে চাই ;
-মাঝখানে কতখানি নাই।
তবু, তবু করে পান ; সােম্য মধু আনি
গীত-পাত্রে উচ্ছল, ফেনিল।
মানবের হাসি-অশ্রু মাের মাঝে টানি’
তােমারে দিলাম তুলে’ কুয়াশা-জটিল।
হে সবিতৃ, ঊষা তব দূর-স্বর্গ হতে
এখন দাড়ালাে থামি’ আলােকের স্রোতে
দাও তারে সামান্য এ-বাণী।
পরশ লাগে না হায়! কোথা তুমি যাও ?
কোথা মােরা ?—আশীবাদ দাও।
স্বপ্ন-ছবি
যাও, তবে যাও এবে; মধ্যাহ্ন-গগন
—তব তরে, তব প্রতীক্ষায়--
ধ্বনিত-কর্মের-রােল, ব্যাপ্ত-শিহরণ।
দেখা দিও সব-সাথে বরণ-সন্ধ্যায়
পত্রের বিন্যাস-মাঝে, গােধূলির শিরে,
শ্যামল প্রান্তর-কোলে, তটিনী গভীরে,
লােকালয়ে কুয়াশা-মগন ।
হে নবীন, হে প্রবীণ, এসাে, তবে এসাে,
বক্ষে তুলি সবে ভালােবেসো।
শ্রান্ত অশ্ব মুক্ত করো, রথ দিয়ে খুলে
উন্মথিয়া দুরন্ত স্বপন ;
স্বহস্তে গুণ্ঠন টানি’ ছড়াইয়া ভুলে,
মুক্তি দিয়ে। ধরিত্রীরে, বিশ্রাম-স্পন্দন।
বেণু ধরি’ মহারণ্যে বাজাবো চকিত,
মহাশূন্যে লয়ে যাবে আপনারে ভীত,
যেথা তব সুপ্তি মৃদু দুলে।
—আলােরাশি উচ্ছ্বসিত ভরিছে এখন,
হেসবিতৃ, স্বপন-ক্রন্দন।
উষ
মুক্ত করি’ অন্ধকার-দ্বার,
নৃত্য-তালে খুলি’ বক্ষ,মায়ার সম্ভার
বিকীরিয়া স্বর্গে-মতে আনন্দ-সঙ্গীতে,
স্বর্ণ-রথে, স্বর্ণ-অশ্বে অপূব ভঙ্গীতে,
সদ্য-স্নাত, আলেকের পুলক-বসনে
আসিয়াছ তুম ঊষা ! নিপুণ বয়নে
গাঁথাে আলো, গাঁথো প্রাণ, গাঁথাে উন্মাদনা,
অশ্রু-প্লুত আমার চেতনা।
স্পশে তব শিহরি’ চঞ্চল
উড়ে যায় নীড় ছাড়ি’ বিহঙ্গের দল,
গানে-মত্ত, অনন্তের আশে ; গাভী-গুলি
বিশাল প্রান্তর-পানে বিস্তারে আকুলি :
বিশ্ব বসুন্ধরা স্কুট-পুষ্পে, কলােচ্ছ্বাসে
উৎসারিতে চায় তব চরণের পাশে :
দ্রুত-স্পন্দ গতি-মাঝে মােৱা সবে হার :
আনাে নব জীবনের ধারা।
হে নব্যসী, * তুমি প্রতিদিন
অন্তরীক্ষে উৰ্দ্ধপথে অক্ষয়, নবীন
* নব্যসী-চির-নুন, চির-পুরাতন (খে)
স্বপ্ন-ছবি
১০
এনেছে স্বর্গের সুধা, মতের পিপাসা :
শুভ স্বপ্ন সকাতর বহি’ অন্ধ আশা
ছুটেছে তােমার পানে, কোমল শৃঙ্খলা
চরণে-চরণে ধরি। আজো তব চলা,-
নাহি তার শেষ কোনােদিন ! আজো তাই
মতবাসী তােমারেই চায়।
সৃজন-প্রত্যুষ হ'তে তব
দেবতারা ছিল কত প্রতীক্ষায়-নব :
আলােকবিজয়ী ইন্দ্র সুধা-পাত্র হাতে
অর্ধপথে থেমেছিল তােমার পশ্চাতে ;
বৃহস্পতি অনুচ্চ মন্ত্রের বর্ণে কত
সেধেছিল তােমারেই, তব ধ্যানে রত
সবিতৃ গােপনে আলো ঢালি’ তব পানে
চেয়েছিল তব নৃত্য-গানে
অগ্নি জাগি' মতের প্রাঙ্গণে
ফুকারি’ জাগালাে নরে : তব আরাধনে
প্রজাপতি প্রচারিল আলােকের গান,
গুপ্ত ছিল,-মানবেরে : লভিয়া আহ্বান
দ্বিধা-
কম্প্র-স্ত-পদে ব্যাকুল ঋত্বিক
সােম-রস দিল আনি’ চাহি’ অনিমিখ :
১১
স্বল্প-ছবি
}
তব দান-সঙ্গীতের অন্তঃপুরে বসি’
কেঁপেছিল অনন্ত রােদসী।
*
যুগান্তর পরে হেথা আজ
চিত্র রথ, শান্ত অশ্ব করিছে বিরাজ
নয়ন-সম্মুখে : তব পুণ্য, দীপ্ত হাসি
এসেছে বহিয়া রক্ত, পুঞ্জ-মেঘ-রাশি,
বিস্তীর্ণ প্রান্তর, কীর্ণ বন, স্বচ্ছ স্রোত,
স্তব্ধ লােকালয়, হিম-সিক্ত বাঁকা পথ
পূর্ণ করি’ মুক্ত বাতায়নে,বাক্য যেথা
ফিরে চুমি’ মুগ্ধ নীরবতা।
—বিষাদের ছায়া-মাত্র বহি’
পশিব না মন্দিরে তােমার ; মােরে দহি’
ব্যথা কোনাে উর্ধে উঠিবে না। তাই আজি
লই তুলে যেথা তুমি রয়েছে বিরাজি,
সুপবিত্র সবিতৃ-মণ্ডলে, ঊষা-লােকে ;
হে সুন্দরী, তব স্নিগ্ধ, হিরণ্য আলােকে
সৃষ্টি-শতদল,--তারি একটী পল্লব
মােরে করে নিপূর্ণ-গৌরব।
* রােদসী—দুলােক-লোক (ঋগ্বে)
হে সুন্দরী, হে মােহিনী প্রিয়া,
ভ্রষ্ট, দীর্ণ পত্র-পরে এসে বিকাশিয়া
সূর্যাস্তের পর-প্রান্ত-ছায়া-লােক হতে,
পরিপূর্ণ স্বপ্ন-চক্ষে উন্মাদনা-স্রোতে।
নির্জন তটিনী-বক্ষে নিতান্ত-একাকী,
কোথা আমি, কোথা চেয়ে থাকি ।
f
দৃরে গ্রাম নিঃশব্দ, কাতর ;
তটে রুদ্ধ ভাঙি পড়ে তরঙ্গ মন্থর
বারম্বার সচকিত ; বিহঙ্গের সাবে
অকস্মাৎ-শু-পক্ষ আলােক-উৎসবে,
অন্তহীন মহাকাশে ; ক্ষুব্ধ বসুন্ধরা
প্লুত-হৃদি, মুগ্ধ, ব্যথা-ভরা
এসো, এসো; প্রিয়া, ব্যর্থ আমি,
আপনার অতীতের ধ্বংসস্তুপে নামি :
দীর্ণ-বক্ষ, রক্তচক্ষু, পাণ্ডুর-আনন,
বিশীর্ণ, বিস্তীর্ণ-ব্যথা, অস্থির-কম্পন।
এসাে, এসাে ; তব পানে অনুনয় ঠেলি
ব্যস্ত, জীর্ণ দু’টা পাখা মেলি'।
স্বপ্ন-ছবি
১৩
বুঝি তব বাণী ভেসে আসে
অস্ফুট কল্লোল-মাঝে, মেঘের আকাশে।
মাের রিক্ত, লুব্ধ প্রাণ মত্ত কঁপি উঠে,
উদ্ধ-পানে অসহায় বিস্তারিয়া ছুটে :
অর্ধ-পথে অকস্মাৎ মূচ্ছি’ পড়ি যায় ;
কোথা প্রিয়া, কোথা তুমি হায় !
••
চাহে, চাহহা করুণ, কোমল !
আনাে তব স্নিগ্ধ তনু, নয়ন উজ্জ্বল,
আনাে তব দীপ্ত বাহু, তৃপ্ত মধু-হাসি,
প্রমত্ত আবেগ আনন, অগ্নি রাশি-রাশি :
বর্ণ-হীন নিশ্চেতন লুপ্ত অবসাদে
শক্তি-হীন শূন্য-মাঝে কাঁদে।
হেমন্তের মধ্যাহ্ন-প্রান্তর
আমি যেন নভপ্রান্তে শিথিল, জজ’র :
ধূলি, তৃণ, তরু, পর্ণ,—সবি সংজ্ঞা-হীন,
করুণ, বিবর্ণ, হারা, অপার-বিলীন :
মেঘে তুলি’ ঝঞ্চা-সম বধির-চীৎকারে
এসো, এসাে আলােক-বিদারে।
তােললা, তােলো আবত প্রখর ;
বিস্তারিয়া, আচ্ছাদিয়া উড়াও কাতর
স্বপ্ন-ছবি
তৃণ-পর্ণ-ধূলি-একাকার অন্ধকারে
শূন্যে, রন্ধ্রে, গিরিশৃঙ্গে, অরণ্যের পারে ;
নিরাশ্রয় বক্ষ-মাঝে দোলাে, তুমি দোলে,
ব্যথা মাের উখিতে খােল।
কোথা তুমি, কোথা দৃষ্টি হানি,
বাক্যহীন কতক্ষণ,-জানি, নাহি জানি।
নেমে আসে রুদ্ধশ্বাস পুঞ্জ-অন্ধকার
তটিনী-কল্লোল-'পরে, অশান্ত-বিস্তার
কালাে-পাখা; সন্ধ্যা-তারা ধরণীর শিরে :
তবু একা কোথা চাহি ফিরে।
৬
স্বর্গ-বিভায় বসেছে তোমরা, যারা
অগ্নি জ্বালায়ে’ তুফানে মাতায়ে’ তােলো,-
ধীরে লয়ে যাও,-পাহাড় কাঁপা তারা-
স্বর্ণ কিরণে প্রসারি’ ভুবন খােলল :
দেবতা-মােদের, বন্ধন-হীন ঢালো তব নব ধারা।
চিত্র লীলায় আমরা খুলিব মন
আমাদের পানে, রথীর অশ্ব যথা;
আমরা চলিব--ভুলিব পরাণ-পণ—
তােমাদের পানে : মােদের কুলায় তথা ।
মন হ'তে তােললা, দেহ হতে খােলল যত-যত বন্ধন।
বিষাণী
অকস্মাৎ ফুকারিলে নির্জন বিষাণ,
হে বিষাণী
ছায়া-মূর্তি,-কর্মহীন অবসন্ন প্রাণ
দীর্ণ করি’ তবপানে টানি’,-
অন্ধকার-অরণ্যের আলােকের তীরে,
নিঃশব্দ বায়ুর স্রোত সঞ্চারিছে ধীরে
মুগ্ধ যেথা; পরিতৃপ্ত, মন্থর-কাকলি
গিরি-নদী সুকোমল যেথা গেছে চলি’ ;
পত্রের গুণ্ঠন টুটি’ শিহরি’-শিহরি’
যেথা গন্ধ-কুসুমের উঠিছে মুঞ্জরি'।
অকস্মাৎ কেন তব চকিত আহ্বান,
হে বিবাণী ?
অকস্মাৎ কেন বাজে শঙ্কিত সন্ধান
বিক্ষোভিয়া আকাশ-বনানী ?
অকস্মাৎশূন্য ব্যাকুল ধরণী
মূচ্ছাতুর, পুঞ্জ-পুঞ্জ তুলে আত ধ্বনি ;
অকস্মাৎ-সঙ্গিহীন উন্মত্ত আকাশ
উখিয়া তারকার অস্তিত্ব-বিলাস
১৭
স্বপ্ন-ছবি
কঠিন ভাঙিয়া পড়ে প্রলয়-কাতর ;
অকস্মাৎ-ব্যর্থ কাঁদে অরণ্য, নিঝর।
তরল বিশ্রাম টুটি’ দুরন্ত আখ্যান,
হে বিষাণী,
বিষাণের তব, শঙ্কা-কন্দ্র অভিযান
বক্ষে ভরি’ মােরে দিল আনি’ :
মূতি-হীন, স্থিতি-হীন, গলিত উচ্ছাসে
অকস্মাৎ ভুলি’ সব,—নিরুদ্ধ নিশ্বাসে
ব্যস্ত স্বপ্নে বিস্তারিয়া পাখার ক্রন্দনে
হারাইতে’ দূরতর স্তিমিত প্রাঙ্গণে,
যাই চলি’ প্রলয়ের পারে। হে বিষাণী,
মােরে আজ পূর্ণ করাে : তােমারেই জানি।
f
আদি-মানব
শান্ত হও ! বহ্নি আজ প্রলয়-মেঘে তীব্র দহে সাঁঝে,
শতেক-ধারা ; কঠিনতম শৃঙ্গে ভাঙিব যেন বাজে।
তুফান তা’র তরঙ্গিয়া বিবশ করি’ ধরায় আসি লাগে,
নয়ন-পুরােভাগে :
সিক্ত-সুরা নয়ন কা’র ব্যথায় ভরি’ আমার মনে রাজে?
আদি-মানব ?—তুমিই বুঝি! তপ্ত তব স্পর্শ লােকালয়ে
ভরিয়া দেয় প্রলয়েরই রুদ্র বেগে, অন্তহীন ভয়ে :
প্রান্ত-হতে-প্রান্তে যত হারায়ে’-যাওয়া মূচ্ছ। সঞ্চারে
কাতরতার পারে :
দুঃখ-সুখ হর্ষ-ব্যথা মরিয়া যায় বিলয়-বিস্ময়ে ।
তােমার রূপ রঙের মাঝে শিহরি’ সদা ধরার পানে চায়
অন্ধ ঘন পিপাসা ভরি’,—মেটেনি যাহা,–আকাশ-কিনারায় ;
আদিম প্রাতে শিশিরে বসি’ প্রিয়ার সাথে গােপন কথা
লভিয়া ব্যাকুলতা,
স্বপন-মাঝে সরম তুলি কেমনে সবে ভুলায়ে লয়ে যায়।
আজো তুমি এসেছো দেখি! আজাে তব প্রলয়-অসীমতা ;
বিদ্যুতের দীপ্তি-মাঝে আজো তব মুক্ত ব্যাকুলতা ;
১৯
স্বপ্ন-ছবি
আজো নয়নে জাগে শঙ্কা-ভরা বাসনা-হিল্লোল,
রঙের কল্লোল ;
আজো তব চরণে লাগে শিশিরে-ঘাসে-পুলক-সজীবতা!
আজো তাই বােদন-'পরে আমার প্রেম আকাশ-পথে হানি,
কুলায়-পথে বাতাসে ভাসে শ্রান্ত-ডান একটা ছােটো প্রাণী।
-তুচ্ছ অতি !—দেহ আমার তুলি তবু রঙের প্রাঙ্গণে
অসম স্পন্দনে :
তাহারে তােলাে, তাহারে ধরো, সহায়-হীন
বাসনা মাের মানি।
মুহূর্তের তীরে
সন্ধ্যা আজ করেছে আঘাত
তরঙ্গের প্রহারে-প্রহারে, আনন্দেরে অকস্মাৎ
উচ্ছাসিয়া তুলি’ তট-পৰতের দেহে ; ধরণীর
নক্ষত্র-ক্রন্দন মত্ত, উৰ্দ্ধ-পানে চলেছে গম্ভীর ;
আদিম প্রণয় নগ্ন, জড়ায়েছে স্মৃতির মন্দিরে
উৎসারিত মুহূর্তের তরে।
ক্ষান্ত করে তােমার ক্রন্দন ।
আকাশ-প্রাঙ্গণ-তলে বিশ্বে নাচে অশ্রুর স্পন্দন,
আদিম অনন্ত মুগ্ধ ; গ্রহ-দল আবর্তিছে দূরে
নির্জন আগ্রহে-বেগে আগুনের দীপ্ত অন্তঃপুরে,
কক্ষ ছাড়ি’ পরস্পরে বিশ্ব-মনে মিলাবার লাগি,
ধার-প্রহর কত জাগি।
।
চক্ষে মাের ভােলাে দুটী অখি,--
কতবার ফিরে গেছে শঙ্কিত, কম্পিত মােরে ডাকি,
করুণ হিল্লোল শুধু রাখি’! ভুলে যাও ব্যথা তব,
তুলে দাও অখও তােমারে, ছুড়ে ফেল মলিন নিষ্প্রভ
গৃহের বেদনা-কথা : টানে, টানাে আমারে,আমারে
একাকার-প্রলয়ের পারে।
২১
স্বপ্ন-ছবি
ব্যস্ত আসে স্বপ্নের অতিথি
তরঙ্গের শিখরে-শিখরে, তন্দ্রা-ঘন মহা-ভীতি
আলুথালু ছড়ায়ে’-ছড়ায়ে’, সঞ্চারি’ বিচিত্র পাখা,
চক্ষে জ্বালি’ অনন্ত কাহিনী মুক্তির আবেগ-মাখা,
প্রলয়ের দ্বার-তলে ভাষা-হারা একান্ত-নিভৃতে
নিজেদেরে রুদ্র সমর্পিতে।
তুমি কোথা ভিড়াও নয়ন :
ঝঞ্চা তব অঙ্গ হ’তে উড়ায়েছে মুহূর্তে বসন
আঁধার-রজনী-পানে : পদে-পদে ভ্রষ্ট আত্মা তব,
আমার আত্মার চির, নগ্ন-তম সঙ্গী করি’ লববা,
সুখ-হীন, দুঃখ-হীন, মূর্তি-হীন গলিত স্বপনে
প্রলয়ের অন্তিম জীবনে।
গ্রহ-দল তুমুল আহ্বানে
স্ত পাকার ভেঙে পড়ে প্রলয়ের মুহূর্তের টানে।
গ্রহ হতে গ্রহান্তরে উন্মথিয়া চলে আত্মা মাের,
উন্মত্ত পাখীর মত পক্ষে বহি’ আকাশের ঘাের
স্মৃত অবকাশে। এসসা তুমি! সৌন্দর্যের চিতা জ্বলে
বিশ্বগ্রাসী প্রলয়ের কোলে
ধরিত্রী
হে কঠিন, হে মলিনা, হে সুন্দরী, প্রসন্ন ধরিত্রী।
দিবসের ক্লান্ত বােঝা লয়ে
তীরে তব অস্তে গেল ম্লান হাস্যে বিষন্ন সাবিত্রী
ধুলার আঁধার-মাঝে, কুসুমের সৌরভে, বিস্ময়ে।
শ্রান্তি তব চক্ষে ভরি’ বসে আছে। অাঁচল বিছায়ে
অরণ্যের নীল তটে, বরণের স্বপনের ছায়ে ।
হে ব্যথিত ! অন্ত-হীন অবসাদ শূন্যবক্ষে চাপি’
ছায়ার প্রহর আমি যাপি !
আকাশ-প্রাঙ্গণ-কোণে এখনাে আসেনি কোনাে তারা ;
শুধু দীপ্ত বিদ্যুৎ চমকে
বিস্ফারিত মেঘের বরণে, অরণ্যেতে হ'তে হারা;
শুধু শ্রান্ত পাখীদের তন্দ্রাতুর সন্ধানের ঝোঁকে
অরণ্যের অলস ক্রন্দন উৰ্দ্ধ-পানে ফুটে উঠে
;
শুধু ঝরে-পড়া ফুল গােধূলির স্নান করপুটে !
বাঁশী মাের রিক্ত করি’ বসে আছ শিয়রে তােমার :
হে অশান্ত। শুধু হাহাকার।
আজিকার শ্রান্তি-মাঝে•তা-লােকে দিব বিসর্জন,
হৃদয়ে জমেছে গরু-ভার,
স্বপ্ন-হবি
হাতে-হাত-দিয়ে-চলা ক্ষুদ্র, খণ্ড, মলিন ক্রন্দন
কাঙালের আতুর স্বপনে, খুলি’ মেঘের দুয়ার
অন্তরে আসুক নামি’ বর্ষা-ঝকা বিদ্যুৎ-আনে,
তােমার যুগান্ত-ব্যথা যেথা নিত্যদিন গুণে’-গুণে
কাতরে ঝাপটে পাখা আপনারে লয়ে শঙ্কা-হত,
গতি-হীন, ব্যাকুল, বিব্রত !
*
হে উতলা! কোথা তব উপকূলে অন্তিম উচ্ছ্বাস
গগাধুলির পরশ-সঞ্চারে ?
কোথা তব প্রণয়ের বেগে-হারা, সুদীর্ঘ নিশ্বাস
ঝরা-ফুলে, ঘন বনে, নদী-বক্ষে, উন্মুক্ত পাথারে ?
কোথা তব স্বপনের বক্ষ-ভাঙা, আয়ত আবেশ,
স্বহস্রের স্মৃতি গয়ে’ অসীমের অনন্ত নিমেষ
নিমম ভুলের মাঝে উৎসারিয়া, আছাড়িয়া পড়ে
যেথা ৰুদ্ৰ শিহরে-শিহরে ?
হে উত্তান! অন্ধকার ঘন-কৃষ্ণ বাহু প্রসারিয়া
তােমারে আঁকড়ি নিতে চায়।
হে তুমুলা! শিথিল ধমনী তব! রক্ত উচ্ছ্বাসিয়া
দুরন্ত হৃদয়ে তব অগ্নির স্পন্দনে নাচে নাই
কই আর।—তােলল তব রুদ্রবাহু, বিথারাে কবরী
আকাশের অন্ধকারে নৃত্য-তালে-তালে। হে সুন্দরী।
২৪
শল্প-ছবি
অকস্মাৎ জেগে ওঠে আমাদের দোহার হৃদয়,
বিশ্বে আজ হক বিনিময়।
-আবার ফুকারি বাঁশী হে বিপুলা, তােমার ইঙ্গিতে
-দু’টা হাতে জড়ায়ে কবরী
মুখ ঢাকি’-তােমার নৃত্যের বেগে, অকূল-সঙ্গীতে,
সহস্র তারার পার্শ্বে অন্যমনে উন্মত্ত শিহরি’!
তােমার আনন্দ-স্পর্শে গ্রহ-দল বিকল, বিহ্বল
সহসা-স্খলিত-পদে নিজেদেরে মেনেছে সফল!
দু’টা তব চক্ষু হ'তে মত্ত দু’টা পাখী মর্মে পশে’
অকস্মাৎ আমারে বিবশে।
হে চঞ্চলা। নৃত্য তব ভেঙে পড়ে অরণ্য-ােমলে,
হৃদয়ের স্পন্দনে-স্পন্দনে।
হে অধীরা ! তব সাথে গ্রহ-দল তুমুল কল্লোলে
নেমে আসে ত-শ্বাস, পরস্পর চুম্বনে-চুম্বনে,
ব্যন্ত এত!-আমার হৃদয়-তলে ব্যগ্র হারাবারে,
স্বপ্নের আলােকে তার, রূপান্তর শেষ লভিবারে।
হে ধরিত্রী ! কোথা তুমি! কোথা তব ত্বরিতে আহ্বান
ভেসে যায় প্রলয়-আখ্যান।
বর্ষা-বিদ্যুতে
হে সুন্দরী স্বপনের। মেঘ-লােকে রয়েচো আসীনা :
বীণা তব নগ্ন বক্ষে লীনা,
শিথিল অঙ্গুলি-ঘাতে কম্পিত গুঞ্জনে আনমনে
ভরি’ দেয় চারি-চোখ-তুলে’-নেওয়া আত অবকাশে :
স্ত কেশ-জাল তব উড়ে পড়ে পশ্চিম গগনে
মৃদু, মুগ্ধ বাতাসের দ্বিধা-নম্র, অলস উচ্ছাসে :
সপ্তর্ষির রেখা টানি’ সবে
তােমার অঞ্চল-তলে সারসেরা মিলেছে গৌরবে।
ম
আজিকার রক্ত-সন্ধ্যা শুয়ে আছে ধরিত্রীর বুকে
আনন্দের মন্থর কৌতুকে,
তােমার আলস্য-আঁকা! দিবসের শ্লথ অবসানে,
যে-অসংখ্য চিন্তা-গুলি, তন্দ্রাতুর ব্যস্ত প্রতীক্ষায়,
চেয়ে’ রত-ভুলে গেছি অকস্মাৎ চাহি’ তব পানে,
তােমার সঙ্গীতে, তব স্বপ্নে-ভােলা আঁখির মায়ায়।
ধরার প্রাঙ্গণে তুমি নামি’
ধরা দাও, মুয়ে-পড়া কুসুমেরে লয়ে যেথা আমি।
ধরা দাও, অলস স্পন্দন কতক্ষণ র’বে বলে ?
কতক্ষণ ক্রন্দন-বিকল
প্ন-ছবি
২৬
,
বহি’ শ্রান্ত দুঃখ, সুখ বসে র’ব তােমার পশ্চাতে ?
কতক্ষণ ধরার আগুন জ্বালি’ নিজনে, গােপনে
তােমার অগ্নির আশে চেয়ে’ র’ব ক্ষুব্ধ দৃষ্টিপাতে ?
নূতন আনল যেথা নৃত্য-রােলে ঋলিত-চরণে
দুরন্ত স্বপনে তব ছায়,
তােমার শাশ্বতলােকে, মােরে ভােললা শেষ-প্রত্যাশায় !
-ঐ দেখাে, উড়ায়ে’ ধেয়েছে শূন্তে ঘন অন্ধকার
-ধরিত্রীর শেষ উপহার!
আকাশের প্রাক্ত-হতে-প্রান্তে-মাতা ঝঙ্কার সঞ্চার
চরম আনন্দে, বেগে মেঘেদেরে ছড়ায়ে-জড়ায়ে,
প্রলয়-আবেগ তুলি’ জীর্ণ-পর্নে অনন্ত-বিস্তার,
তরুণ পল্লব-গুলি ধূলি-বঙ্গে বিছায়ে’-বিছায়ে,
যেন তব চরণের আশে :
সদ্য-জাগা হৃদি মাের আজিকার আবেশে হুতাশে ।
সবিতার আলােকপরশে যে-অঞ্চল অপসরি’
সঙ্কুচিতা, আনন আবরি’
ছুটেছিল মহাব্যস্ত, অন্ধকার আজি তাহা খােলে
কঠিন, প্রলয়-হাশ্যে ধরিত্রীর শঙ্কিত শিয়রে :
-তব ভয় ?-তােমার আতুর বক্ষ মাের বাক্ষে দোলে
সব হাৱা আলিঙ্গনে, মানবের মৃত্তিকার ঘরে।
বর্ষা-স্রোতে বিদ্যুৎ-বিদার
নিরুদ্দেশ গৃহ-পানে!--অগ্নি ! অগ্নি! সব একাকার!
खि
No text on this page.
প্রতীক্ষা
পােবনে শকুন্তলা
[ আত্ম-গত ]
বন-জ্যোৎস্না ?—তাহার পানে চাহিয়া আছি বলে
চতুর হাসি দোলে :
সখীরা কহে, জানাে কি সবে, কেন সে উৎসুক।
-হৃদয়ে কৌতুক
ভরিয়া আছে অজানিত প্রিয়তমের তরে;
নিবিড় তা’র করে
পড়িতে বাঁধা প্রিয়সখীর ফাটিয়া পড়ে রূপ
—মিলবে অনুরূপ।
প্রিয়ংবদা অনসূয়ারে ডাকিয়া হাসি’ কহে,
-আমাতে স্রোত বহে।
নব-মালিকা, কেসর তরু বসন্তের দিনে
পেয়েছে সোহে চিনে।
বন-জ্যোৎস্না ?—শুধাই ফিরে। কুসুম-যৌবনে
পেলব বন্ধনে
পেয়েছে তার বসালটারে, অনেক-পল্লবে,
নীরব গৌরবে।
প্ন-ছবি
বন-জ্যোৎস্না পেয়েছে তারে, পেয়েছে স্বয়ম্বরে,
পাক্ সে চিরতরে।
মালিনী আজ বহিয়া যায় সন্ধ্যা-আলােকে :
সবার পড়ে চোখে ;
বনানী চায় আললারে ধরি’ হরিত কিসলয়ে
গহন বিস্ময়ে,
শান্ত এই-সন্ধ্যা-সম ঋষির তপােবন ;
থেমেচে গুঞ্জন।
বাঞ্ছিতেরে পেয়ে সবাই শুভ্র হাসি’ চায় :
সবাই দেখে যা।
আমার ব্যথা বুঝেছে তারা, কছে কানাকানি
সখীরা দুয়ে, জানি।
আমার ব্যথা ?—আকাশ-পথে র্যগ্র বাহু মেলি
সকল বাধা ঠেলি’
কাহারে চায় ধরিতে বুকে নিঃস্ব সমর্পণে
হারায়ে গিয়ে মনে!
জানি কেন বসিয়া আছি, কাহার প্রতীক্ষায়
আকুল তরুচ্ছায় ?
মনের সীমা সরিয়া যায়,-তী, খর বেগ,
যেমন রাঙা মেঘ,
৩১
অল্প-ছবি
যেমন নদী বিপুল, ভরা, অন্ধ উচ্ছ্বাসে
তীরেরে তার গ্রাসে ;
সবার মনে মিশিয়া যায় করুণ অনুনয়ে
সবার ব্যথা বয়ে।
কোথায় চাওয়া?—দূরের দিনে,-আসেনি যারা আজ
ভাঙিয়া সব কাজ,
একটী রূপে, একটা স্রোতে আসুক তা’র নামি’ :
তাদের তরে আমি।
অধীর আমি, যাহার নাই, যাহারা দূরে আছে
আমারে ধীরে যাচে।
তাদের হাওয়া সবারে চুমি আমারে বাজি’ লাগে :
ত ব্যথা জাগে !
কোথায় তারা?-নব-মালিকা, আমায় তুমি কহ,
তাদের কথা বৃহহ।
বন-জ্যোৎস্না, তাদের কথা ছড়াও তব ফুলে
গভীর, হারা ভুলে।
মালিনী তা’র ডুবায়ে রাখে স্রোতের কল্লোলে,-
—অতীত কোথা দোলে !
বনের পাখী, বনোমৃগ, বলােনা ভবিষ্যত,
কোথায় আমার পথ !
স্বপ্ন-ছবি
হয়ত, তারা আসবে যারা এখন হতেই কাঁদে,
খলিত হয়ে বাঁধে,
হয়ত, তারা,-ভাতে ভয়,আসবেনা কোনাে কালে :
মরণ আছে ভালে।
কোথায় তা’য়া?-বিষাদ-মাখা বেলা যে গেল পড়ে,
মুছি’ বুঝি মরে !
তবুও কহি, একটি রূপে আসুক তারা নামি’ :
তাহার তরে আমি।
’দের ছায়া পড়েছে বুঝি, যায় না কিছু বােঝা!
সাঙ্গ হবে খোঁজা ?
অশ্রু এবে ঘনায়ে উঠি’ নয়ন করে থােধ,
তুলেছে প্রতিশোেধ!
বাসনা আজ, বেদনা আজ জড়ায়ে নিয়ে মােরে
টানিছে ঘন-ঘােরে।
কেমন করে মুছববা আমি? শান্ত কোথা আঁখি ?
তাইত কেঁদে’ ডাকি।
-ভ্রমর আসে? কানের কাছে করুকু গুন,
করুক তত-খণ।
সখীর দলে চাহিয়া কহি, ধাচিতে দাও মােরে :
কোথায় যাবে সরে’?
-হবি
চারদিকে আজ আঘাত লেগে’ ঢেউ-এর মতাে
উঠি
বুঝি বা এবে টুটি!
ললিত তবু তুলছি মনে সেই-যে গান-খানি :
‘আসবে সে যে জানি।
ঘুম ত আজ ঘুমিয়ে গেছে, স্বপ্ন যত, তারা
স্বপ্ন-মাকে হারা।
-আক্ প্রিয় : কলস-সম উজাড়ি দিব আমি
চরণে তা’র থামি।
ছায়া
তমসার প্রতি সীতা
রাখাে, রাখে কুষম-চয়ন : মনােজব
দাড়ায়েছে অরণ্যের শেষে; প্রিয়তম
আসে ঐ,-রুক্ষ কেশ, কুঞ্চিত ললাট,
দীপ্ত চক্ষু স্বপ্ন-হত, বিশীর্ণ কপােল,
অধর স্ফুরিত মৃদু, -ঊষার আলােকে
সমস্ত অরণ্য-শীধু নিতে’ বক্ষে তার
অপূর্ব আগ্রহ-ভরে : প্রিয়ার সন্ধান
ব্যাপ্ত করি’ তাহাদেরে। হে তমসা, রাখাে
ফুল ; মােরে যেতে দাও : গম্ভীর নির্ঘোষ
কানে আসি’ বাজে তার ; উৎকণ্ঠ পরাণ
ধায় ছুটে’ ব্যগ্র বাহু তুলে। কেন বাবা ।
কেন তবে কঠিন নিষেধ ?—জাগরণ
তা’র, অপূর্ব জড়িমা লয়ে’ নিদ্রাশেষে,
নব-কম-মিলনের মাঝে খর-স্রোতে
নিঃশব্দে মিশিতে চায়, চায় টুটিবারে।
সখী, তুমি মােরে মূর্তি দাও।
ঐ চাহে :
বিন্দু দুই অঞ তার কপােল গড়ায়ে :
প্ন-ছবি
p
এ অরণ্যে প্রিয় শান্তিহীন। আমি যাবাে।
উষা দূর অন্তরীক্ষে প্রিয়ের পশ্চাতে
খুলি’ বক্ষ নৃত্য-তালে-তালে : আলাে তার
তরু-বীথি পূর্ণ করি’ কম্পন-পুলক -
চুমি’-চুমি’ প্রেরণা-সঙ্গীতে নেচে’ ফিরে
উন্মনা হৃদয় তুলি’ ভুবনে-ভুবনে।
বক্ষ মাের জাগি’ উঠে, ছুটে চলে যায়,
কেঁদে মরে প্রিয়ের পরশে ; সখী, কহহাে,
কেমনে রুধিবাে তারে ? কেমনে ফিরাবাে ?
ঘুমাবারে কহিবে কেমনে ?
-ঐ কঁদে,
মােরে অনুমানি’। অশ্রুর স্পন্দন তার
মােরে ছুয়ে’ রিক্ত ফিরে যায় : তবু চায়
আমারে,আমারে আজ : প্রখর পিপাসা
আমি যেন, আমি যেন ব্যথা তা’র-ব্যথা
মূর্তিমতী।—মূর্তিমতী ?—শুধু ছায়া হায়!
মৈঘের বরণ-মাঝে, আলাে-অন্ধকারে,
বাম্প-বক্ষে, নদীর হিল্লোলে, পুষ্প-গন্ধে,
পত্রের মমরে, বায়ু-স্রোতে, চিন্তা-মাঝে,
অসম আবেগে দিন মাের যায় কেটে’ :
কোথা সেই কঠিন ভূতল, পুলকিত
ফুলে-ফলে? কোথা মূর্তি আবেগ-অধীর ?
কোথা সেই অমােঘ বন্ধন অঙ্গে-অঙ্গে?
এই যে চুম্বন দিমু, আঁকি’ ওষ্ঠাধরে
বহুক্ষণ ধরি’,-স্তম্ভিত নিশ্বাস তার,
শিয়রে বসিয়া,—কোথা তার তৃপ্তি কোথা।
গিরিশৃঙ্গে বাষ্প-মেঘ বৃথা রয় চাপি।
-শুধু তার অতৃপ্ত বাসনা মােরে চেয়ে
গুমরি কাঁদিয়া মরে বায়ুর গুঞ্জনে
দু’টা পাণ্ডু অশ্রু-কণালয়ে’, মােরে ফিরে
কাদাতে’, কঁদিতে; ব্যস্ত তার বাহু দুটা
শূন্যে ঘিরি’ শেষে নিস্তেজ, করুণ, ক্ষীণ
পরুষ পাণে আছাড়ি টুটিতে’ চায় ;
হায়, অসহায় !
প্রিয়-সখী, এসাে কাছে !
জীবনের প্রবাহ উদ্দাম, অতি-স্নিগ্ধ
তােমাতে লভেছে অঙ্গ,-কল্যাণ মূরতি,
শান্ত তা’রে করাে তুমি। অদৃশ্য রহিয়া
দিয়াে তা'রে শক্তি যত, যত প্রাণ, যত
আছে বিশ্বের ভাণ্ডারে ; সে যে প্রিয়তম !
আজি বহু বর্ষ পরে পরশ তাহার
বুঝি ছায়া-আবরণ ফেলিবে টুটিয়া !
শােণিত চঞ্চল কঁপে ; আবর্ত প্রখর
মর্মস্থান আলােড়িয়া তােলে ক্ষণে-ক্ষণে ;
৩৭
স্বপ্ন-ছবি
;
স্ফীত বক্ষ ; দীর্ঘশ্বাস তপ্ত, ব্যগ্র
ফিরে মাতাইয়া; দেহ-লতা উচ্ছ্বসিত ;
অস্থির-কম্পন, ষায় টুটি’ তা’র পানে
যদিও ছায়ার সবি!-তা’ও কতক্ষণ!
•
৪
রাত্রি-শেষে অন্তরিক্ষে পূর্ণ করি দেহে
দূর হতে চেয়ে’ চলে,—চাদ আর মেঘ :
মেঘ তার বর্ণে-বর্ণে টানে পরিবেশ
আপনি রঞ্জিত হয়ে’ প্রিয়ার কিরণে :
নব প্রাতে তাহাদেরে তবু যেতে হয়,
স্খলিত-বিষম-পদে, বিলীন জীবনে।
হেথা আছি দণ্ড দুই। জীবন-গুঞ্জন
মানবের, কাছে এসে সাড়া নাহি পেয়ে
ফিরে যায় সকাতর কাঁদিয়া-কাঁদিয়া
বিহঙ্গেরা দেহে-গাঁথা পরিপূর্ণ-প্রাণ
সঙ্গীতে ডুবায়ে’ মােরে বিস্তারিছে দু’টী
পাখা আকাশের পথে ; আমারে ব্যথিয়া
মােরে চায় প্রিয়তম : আমি কত-দূরে! ?
এতখানি!—তবু মােরে ছেড়ে যেতে হবে।
হে তমসা, প্রিয়-সখী, তবে মােরা যাই
দু’টী অঞ কোনােমতে করি’ বিসর্জন।
২ স্বল্প-ছবি - । 1 d লতা-গৃহে বন-দেবী বাসন্তীর সাথে যখন কহিবে প্রিয়,-পল্লব লতার আলােকে শিশিরে প্লত,-তারি স্পর্শ পেয়ে আচম্বিতে, হয়ত, ফিরিবে ; মনে হবে, নাহি পেয়ে মাটির ধরারে মেঘ দেয় বৃষ্টি-ধারা; তারি দু’টা কণা লেগে আছে শ্যামল পল্লবে, বাতাসের আন্দোলনে করিতে চকিত হর্ষ-ভারে অকস্মাৎ ;- মনে হবে সে-মুহুতে হয়ত, আমারে! আজি তাই নিঙাড়ি’ বেদনা মাের শত- লক্ষ-বার, দু’টা ছায়া-অশ্রু-কণা যেন বাজে করুণ আঘাতে, পল্লবে লতার শেষ-বিদায়ের কালে শিশিরের জলে !
ব্যবধান
প্রবনে বাসনা
থামে, থামাে তুমি ! আঁধার-নিশার পারে
কখন্ হারায়ে’ গিয়াছে ঘুমে ;
আকাশের তারা আলোকের সঞ্চারে
পুষ্প-বীথির সৌরভ লয় চুমে।
এ-হেন সময়ে বনে
মােরে প্রয়ােজন ?—কি তব পড়েছে মনে ?
সাজি ভরি’ ফুল, পাতা:
মাের হাতে চাও কৌতুক-মালা গাঁথা ?
বেশ ! দেব চেটী, তােদের কুমারী-রে :
আমি যে স্নিগ্ধা, আমি যে নিপুণ,—আমি !
এত কেন ত্বরা ?-অধরের থরােথরে
গুঞ্জরি ক্ষীণ মোর পানে চেয়ে সহসা গেলে যে থামি!
‘চিন্তা-শূন্যহৃদয় আমার ---নাকি ?
সত্য বচন! কা’র নয় আজ সখী ?
বটের কোটরে নিদ্রা-বিহীন পাখী
দূরে, উৎসবে করুণ যেতেছে লখি’ :
স্ফীত তা’র দু’টী ডানা,
আঁধারের পথে ভেঙেছে কঠিন মানা।
স্বপ্ন-ছবি
৪
আধেক পাপড়ি খুলে
কুসুমেরা-ঐ অন্ধ, গিয়াছে ভুলে।
সব অসহায় আকাশে, ধরার তলে
আপনার-কবে-উৎসব-আসে ভাবি :
তােমার হৃদয়ে, বলাে, আজ নাহি জ্বলে
দূরের পিপাসা স্বপ্ন-নিবিড়, উৎসব-সীমা প্লাবি’?
-আর কথা নয়। কোথা তব ফুল, লতা?
-এই-খানে থাক্ !–রাজা তাের কোন্খানে ?
‘চতুশশালায়’ ?—চঞ্চল বিবশত।
আমারে ডােবায় চাপিয়া মনে, প্রাণে।
আমার মিনতি তােরে :
আজিকে সত্য রেখােনা গােপন করে।
রাজার চাহনি-তলে
খোঁজার হুতাশ কোনাে-কিছু নাহি ঝলে ?
ফুলের মমে ভ্রমর বসার মতাে
কাহারো মূর্তি আপনার গানে হারা
ভাসেনি, জানােকি, নিবিড়, করুণ, স্বত ?
ব্যস্ত হয়েছো ?—আর কেন ফুল ?—এইত হয়েছে সারা
-আমি কোথা যাব?—ইজুদী-তরু-তলে
আমার শয়ন বিছানাে রয়েছে বেশ।
৪১
বল্প-ছবি
তুমি যাও সখী; আর এবে দেরী হলে
মঙ্গল-হানি। উৎসব হ’ শেষ।
তারপরে নির্জনে
এসাে, এসাে তুমি, যদি তব লাগে মনে।
উৎসব-আলো আসে
পুর-নারীদের মন্থর উল্লাসে ;
যেন দেহ-হীন অযুত প্রেতাত্মারা
আলােকের তলে আশ্রয় খুজে ফিরে
অকূল আকাশে হারায়ে’ পথের ধারা :
বিদায় বন্ধু। ওকে আসে, দেখ,, চম্পক-পাতা চিরে।
—চলে গেছে তারা। সঙ্গী-বিহীন পড়ি
জড়িত, গহন ব্যথা শুধু প্রকাশিতে
তীব্র-দহন ভাষা আমি খুজে মরি !
প্রলয়-মগন আমার হৃদয়-টীতে
বিশ্বের কম্পন,
কেঁদে ফিরে চায় আমারে অনুক্ষণ :
বিরহ-রিক্ত মায়া
আমার মাঝারে দোলায় আত ছায়া।
গাঁথা-মালিকার পুষ্পের পাতে-পাতে
নিশ্বাস মাের লাগেনি কিছু-কি, হবে ?
আমার অশ্রু বাতাসের সাথে-সাথে
ওড়েনি কিছুই ?—বৃথা সান্ত্বনা; অবােধ মুছেছে কবে।
স্বপ্ন-ছবি
৪২
ধরণী আকাশে ব্যর্থ চাহিয়া রয়
রাত্রি-দিবস নিজেরে আঁকড়ি তুলি’ :
নিজেদের-গড়া কারাগার শুধু বয়
আলােকে-আঁধারে নিজেদেরে যাই’ ভুলি’ ;
সৌরভ-আবরণ
হাওয়ারে ভুলায় কুসুমের স্পন্দন।
নিষ্ঠুর ব্যবধান,
কবে, কোন্-ক্ষণে, হ'বে তার অবসান !
বৃথা, বৃথা কঁাদা! মাঝখানে কে-যে থাকি’
আমার অশ্রু নিম ম লয় কাড়ি’!
আমি যেন আজ কুলায়-হারানাে পাখী,
ধরণী-ধূলায় পক্ষ বিছাই, ভুলিবারে যদি পারি।
। -
স্বয়ম্বর
-
সূর্য-লােকে সাবিত্রীর মুখ হ’ল ভার
মলিন সে-অপরাহ্;ে মত-সভা-মাঝে
তপতীর অনুরূপ নাহি মেলে বর
কোনােখানে ! বিষাদের স্লানচ্ছায়া তাই
আচ্ছাদিল ধরণীর উন্মুখ চেতনা
ক্ষণে-ক্ষণে, ভয়ের কম্পিত ভাষা তার
উচ্ছ্বাসিয়া সমুদ্রে, পর্বতে, ক্ষুব্ধ করি’
সন্ধানের পথ।
গহন অরণ্যে হেথা
চটুল-চরণ কৃষ্ণ-মৃগে অনুসরি’
সম্বরণ পথ হারাইয়া ঘুরে-অশ্ব
তা’র ভূমি-তলে পড়ি’; সৈন্য-অনুচর
দূরে বৃথা অম্বেষণে,-নাহি পায় পথ ;
রিক্ত, দীর্ঘ ছায়া তার নির্জন বিষাদে
তারে আরো ভীত করে : সহসা চকিত
সম্মুখে কাহারে দেখে,—সে-কোন্ সুন্দরী,
এলাইয়া তা-ঘন কুটিল কবরী
সুকোমল বাম বাহু’-পরে,-চক্ষে জ্বলে
অনন্ত স্বপন,-তরু-তলে একাকিনী,
গল্প-ছবি
88
মন্থর গুঞ্জনে বসি’ আছে, রক্তবাস
ডান হাতে মাঝে-মাঝে আন্দোলিত করি,
আললাকিয়া বন-স্থল।নামালাে নয়ন ;
অন্তরের পুঞ্জীভূত ব্যর্থ বেদনার
একান্ত স্বপন তবু না মানে বন্ধন ;
উচ্ছসি’ অজস্র ভাষা;—এতকাল পরে
মূর্তি লয়ে’ আসিয়াছে নির্জন-সাধনা
নির্জন নদীর তটে : তাই সে শুধালো,
বিক্ষোভ, চাঞ্চল্য তা’র লুক্কায়িত রাখি’
উৎপাটিত দুটী কিশলয়ে, সকরুণ,
কে তুমি সুন্দরী হেথা ?—পেলব অধরে
তােমার মধুর হাস্য নিশ্চল দাড়ায়ে
আছে, আমার হৃদয়-মাঝে তব ছবি
যথা।...তােমার সৌন্দর্য লয়ে’ তরু, তৃণ,
মুঞ্জরিছে সুখে ; তােমার আনন্দ লভি’
অরণ্যের পাখী গুঞ্জরিছে কলধ্বনি
তা’র। কো-স্বর্গ আছে। পুণ্য করি’, বলো
মােরে হে-সুন্দরী।--সে তপতী ; নিরুত্তর।
সন্ধ্যার আলােক-মাঝে কখন্ মিলালাে,
সম্বরণ নাহি জানে! কহিল আবার,
বিষাদ-প্রদোষ তার রুদ্ধ কণ্ঠে টানি,
‘আমারে তােমার করাে; বাড়াইল বাহু
আবিষ্ট আগ্রহে, ভরে বঙ্গে তা’রে নিতে
স্বল্প-ছবি
প্রাণপণ। কোথা সে-সুন্দরী কোথা! শুধু
বাহু তা’র ব্যর্থ ফিরে’ বাজে বুকে! চাহে
চারিধারে অন্তিম প্রয়াস-ভরে ; তবু
মিলিল না !
তখন সন্ধ্যার বনে বাম্প
ঘুরে-ফিরে অন্ধকার গাঢ়তর করি;
গীতি-হীন পাখীদের পাখার ঝাপটি
অরণ্যের ক্লান্তবক্ষ ছিন্ন-ভিন্ন করে
তখন দুঃসহ মাতি : সম্বরণ একা,
আত-পদে ছুটে যায় সম্মুখের বনে
লঙ্ঘিয়া সহস্র বাধা মনের বিকারে,
চাহে না পিছন-পানে : দীর্ঘশ্বাস তার
শঙ্কিত আশ্রয় খোঁজে আকাশের মেঘে।
তপতীর না মিলে উদ্দেশ। তবু চলে :
সর্ব-অঙ্গ তার ক্ষত হয়ে গেছে, তবু
সে বিরাম নাহি; অজানিতে বারম্বার
ফুকারিয়া ডাকে, কহে, এসো, এসো তুমি,
এসো এ-দরিদ্র-পাশে।'—আহ্বান তাহার
নির্মম ফিরায়ে দেয় ক্ষীণ প্রতিধ্বনি।
অকস্মাৎ-কেন জানি-দাড়ালো স্তম্ভিত
নদী-তীরে বটমূলে : আলােকের রেখা
হয়ত, দেখেছে সেধা ; হয়ত পেয়েছে
ছবি
তরুণ, অমিত-স্পর্শ সুর-সুন্দরীর।
আপনার পানে করুণ চাহিয়া শেষে
তাকালাে বাহিরে বিল ভুলের মাঝে
বাক্যহীন ; সমস্ত অতীত তা’র খসি খসি’
পদ-প্রান্তে যায় গড়াগড়ি। একবার
শুধু গুঞ্জরি’ উঠিল ব্যথা; পরক্ষণে তার
লুটাইল অচেতন। নদীর কল্লোল
সে-মুহূর্তে বটবৃক্ষে কাপালো নিষ্ঠুর।
}
**
সুন্দরী সহসা আবার দিয়েছে দেখা ;
শিরে তা’র হস্ত রাখি’ শুধালো মধুর,
‘সম্বরণ, হেথা কেন অসম্ভব-আশে ?
রাজ্য তব পড়ে আছে দিগন্ত-বিস্তৃত,
সমুদ্রের স্ফীত ভাষা দিবস-রজনী
তারে পূর্ণ রাখিয়াছে।-তুমি ফিরে যাও।
দুর্ভর স্বপ্নের মতাে পশিল সে-বাণী
সম্বরণ-কর্ণ-মূলে : বাহুর বন্ধনে
তপতীরে বুকে টানি’ কানে-কানে কহে,
—বিশ্বের প্রলাপ-বাণী তারি মমে বসি’--
‘মােরে কেন এত অবহেলা ? তােমা লাগি
আজীবন সাধনা আমার। হে নিষ্ঠুরা,
আমারে ফিরায়ে’ দেবে ? তােমার আলােক
আমারে নিপূর্ণ করি’ লয়, লয় কাড়ি।
৪৭
স্বপ্ন-ছবি
।
=
প
আমার জীবন তােমার অঙ্গুলি-আগে :
মৃদু-মন্দ দাও দোলা, তারে লয়ে খেলে
হে-সুন্দরী, মনােমত; তবু ফিরায়াে না!”
অরণ্যের ব্যথা সেচকিত কণ্ঠ-স্বরে
কখন মুখরা হ’ল। কহিল সুন্দরী,
‘স্বর্গের প্রাঙ্গণে কেন তব অনুনয় ?
সম্বরণ, মােরে চেনাে ?—আমি সে-তপতী !”
সম্বরণ আঁখি তুলি’ তপতীর মুখে
কহিল অন্তিম কণ্ঠে, “আমার হৃদয়
ঘুরিয়া ফিরিয়া যায় তােমার দুয়ারে ;
তুমি তারে—'; অসম্পূর্ণ রয়ে গেল ভাষা।
সুন্দরী কখন আপন কণ্ঠের মালা
খুলি’ লয়ে’ তাহারে পরালো : বন-দেবী
পদ্মের কোমল পত্রে উপহার আনি’
সম্মুখে দাড়ালো আসি’: উন্মত্ত-কাকলি
বিহঙ্গেরা ক্ষান্ত করি’ পক্ষ-আস্ফালন
চাহিল কৌতুক-ভরে।
-আলেকের তটে
অকস্মাৎ পুলকের ঢেউ ; ভারমুক্ত
প্রসন্ন সাবিত্রী নামালাে আলােক-রথ
দূর-মর্ত্যলােকে ; শিহরিল অরণ্যানী ;
রক্তোজ্জল মেঘ-লােকে দেবতারা সবে
সস্মিত কৌতুকে।—হেথা রাজ-অনুচর
শা-ছবি
৪৮
প্রবেশিয়া বনে রাজারে দাড়ালাে ঘিরি।
সম্বরণ-তপতীর স্বয়ম্বর-সভা
স্বর্গ-মর্ত্য-আনন্দের বিজয়-ধ্বনিতে
সেদিন সন্ধ্যার কূলে হ’ল সমাপন।
বীণা-হাতে সেই-ক্ষণে তােমাদের ঘরে
শূন্য-মনে যেতেছিনু অরণ্যের পথে :
সবাই দাড়ালো ভিড়ি: সুন্দর স্বপনে
সম্বরণ-তপতীর কল্যাণ-বারতা
মােরে দিল আনন্দের শুভ্র আশীর্বাদে।
তরঙ্গের তীরে
‘অন্ধকার নিশিথিনী; মলিন, বিধুর
নিঃসঙ্গ রয়েছি চেয়ে’; দুরন্ত বাতাস
সমুদ্রে ঝপায়ে পড়ে বিদ্যুৎ-বর্ষায়
বিস্ফারিয়া ভট-গিরি, তরঙ্গেরে
উম্মুথিয়া তুলি’; কেহ কোথা নাই
নির্জন হৃদয়ে তার মােরে তুলে নিতে’ !
খসে গেছে নিশীথের তারা।
হে দুরন্ত
বা প্রলয়ের, ক্ষান্ত হও। থেমে যাও
মাঝপথে ! হে চপলা, সুদূরের মেঘে
তােমার আনন ঢাকো! হে বিপুল, রুদ্র
ঢেউ-গুলি, সমুদ্রের অকূল হৃদয়ে
ভুলে যাও বিরােধ-সঙ্গীত। মাের বার্তা
অলস স্বপন হ’তে প্রিয়েরে জাগায়ে’
পার্শ্বে মাের এনে’ দিক্ আমারে লভিতে
চিরতরে।
ঝঙ্কার প্রহারে সে-বারতা
শিহরিল স্বপ্নের গুণ্ঠনে শ্যামবর্ণে
সচকিত করি’,-জ্যোৎস্নার কামনা, ব্যথা
অল্প-ছবি
.
মেধ-আবরণে যেন লাগে সঙ্গীহীন
পথের তরুরে প্রসারিল বাহু তার,
সভয়ে চাহিল শ্যামবর্ণ চারিদিকে,
অমিত বিস্ময়ে হারা। ধীরে তুলি’ নিল
শিরে রক্ত শিরস্ত্রাণ, রক্ত পরিচ্ছদ
জড়ালে কোমল অঙ্গে : বিদ্যুতের শােভা
ঝলকিল খাম দেহে।
নিশীথের দেশ
হ’তে ভেসে আসে বাঁশীর সঙ্গীত ! ব্যথা
তা’র বাতাসে-বাতাসে --শ্যামবর্ণ চলে।
অকস্মাৎ উত্তরিল সমুদ্রের কূলে,
যেথা রুদ্র তরঙ্গের অসহ উচ্ছ্বাস
নিঃশেষে ভাঙিয়া পড়ে পর্বতশিখরে।
বাঁশী বাজে দ্রুত-তর। বনের সঞ্চারে,
আলুলিত তরঙ্গের বুকে, বিদ্যুতের
কাতর বিলয়ে শ্যামবর্ণ তোলে ব্যস্ত
আঁখি তা’র : দু’টী তারা নির্জন ধরায়
জানায় আগ্রহ, ব্যথা !
ঘন অন্ধকার
বঁশীর সঙ্গীতে শিহরি’ কঁপিয়া গেল।
আঁখির সম্মুখে ধরা দিল সমুদ্রের
সুন্দরী সহসা!-শ্যামবর্ণ প্রণমিল।
স্বপ্ন-ছবি
সুন্দরী কহিল, শ্যামবর্ণ ! বাঁশী মাের
তােমারে এনেছে হেথা; তুমি সাথে এসাে।
অধরের অস্ফুট সঞ্চারে শ্যামবর্ণ
থেমে গেল ! সুন্দরী ধরিল ফিরে,
‘আমার অশান্ত ব্যথা তােমা লাগি’ যত!
তুমি এসাে ! ছুড়ে দাও ধরার মিনতি,
ভুলে যাও গত ইতিহাস, খুলে ফেল
খণ্ড-খণ্ড বিকীর্ণ আবেগ ! এসাে সাথে ।
স্বপ্নালােকে পরস্পর-চুম্বনে-চুম্বনে,
আলিঙ্গনে, স্রস্ত কেশে, অসম স্পন্দনে
তরঙ্গের শিখরে-শিখরে মােরা দেহে
লভিব অনন্ত মুক্তি !
t
ক।
সুন্দরীর দেহে
শ্যামবর্ণ ধীরে তুলিল বিস্মিত আঁখি ;
সুন্দরী চাহিল ; কহিল অনুচ্চ স্বরে
কানে-কানে, ‘ত্বরা করাে !
শ্যামবর্ণ তবে
খুলি’ নিল শিরস্ত্রাণ, ছুড়ে দিল দূরে
রক্তবর্ণ পরিচ্ছদ। তরুণ আগ্রহ
স্বপ্ন তার ব্যাপ্ত করি’!
-ছবি
বাঁশীর আবেশে
সুন্দরীর ব্যাকুল ইঙ্গিত দূরে ঝলে!
শ্যামবর্ণ তার বায়ু-কেশ অনুসরি’
নামিল তরঙ্গে দ্রুত। সুন্দরী মিলালাে,
বাঁশী তা’র ক্ষান্ত কবে ! সহসা অদূরে
একটা নির্জন পাখী তরঙ্গের শিরে
ঝাপটিছে পাখা তার, নিজন কাকলি
দিগন্তের কাছে টানি’! চমকিছে
প্রবাল-আলােক অশান্ত-ভানার তলে!
দুটা ত্রস্ত, সুস্ত আঁখি তার পানে মেলি
শ্যামবর্ণ তরঙ্গেরে ঠেলে অন্ত-হীন।
কালিদাসের প্রতি
কবি ! আমারে আকুল করি’ আজি তব পূণ্য, মুগ্ধ গাথা
ছন্দে-রূপে অপরূপ,—বর্ষ-বর্ষ সৌন্দর্য-সুষমা
যেথা যত করিয়া চয়ন, সদ্য-স্নিগ্ধ নিরুপমা
একটী মালিকা-রূপে,—শ্রান্ত এই-বঙ্গে আছে পাতা :
স্পন্দন-নিশ্বাস লাগি’ জাগি উঠে করুণ হিল্লোল ;
ভ্রমর-গুঞ্জন-সম ভাসে পূর্ব-জনম-বেদনা ;
বিস্মৃত আবেশ আসে ; সৃষ্টি-মাঝে হৃদয় উন্মনা
বারম্বার ভুলে যায়, ভুলে যায় বিফল, বিল।
কোথা তুমি ?—সুরলােকে নিত্য-দীপ্ত কল্যাণের বুকে,
‘প্রবহ’ বাতাস যেথা মন্দাকিনী উর্ধে ধরি’ রাখে,
গ্রহ-উপগ্রহ-দলে কক্ষে-কক্ষে আবর্তিতে থাকে,
সেথা তব জনমের স্থান ; তােমার কাহিনী সুখে
মণ্ডনের বর্ণে-বর্ণে কল্প-লতা করেছে আশ্রয়,
সুর-সুন্দরীর কণ্ঠে প্লাবি’ দিতে সন্ধ্যা-মেঘ-ময়।
ইয়েটস্-এর প্রতি
কবি! রজনীর নিদ্রা-মাঝে স্বপ্ন-আলাে উৰ্দ্ধ-পথে ধরি’
শিথিল আবেশ-বক্ষ,-নক্ষত্রের উন্মনা-ভুবনে,
আদিম সহস্র মূর্তি আশে-পাশে যেথা প্রতিক্ষণে
যুদ্ধ করে শ্রান্তি-হীন, অন্য-মনে শিহরি’-বিহরি’
সমুদ্রের সুনীল কল্লোল-ছায়ে ; ছায়া-হীন নারী
কোন্ দূর বাষ্পলােকে, যেথা চাহি’ স্তিমিত-নয়ন
আনিছে প্রিয়তমে ; যেথা সব টুটে বিস্মরণ ;-
সেথা তুমি লয়ে গেছ এ-কঠিন ধরা-পৃষ্ঠ ছাড়ি।
।
তুমিই আনিলে মুক্তি! মন হ'তে চিন্তা সব ফেলি’
করুণ আখ্যান তব প্রলয়ের তমােলাশি টানি
তুমুল আনন্দে, নৃত্যে তন্দ্রা-ঘােরে মােরে দিল আনি’:
অমর কল্পনা ভাসে আপনারে উচ্ছ্বসিত মেলি।
আজি তাই মেঘ-লােকে গিরিশৃঙ্গে অপূর্ব-আলােকে
স্তুতি দিয়ে আঁখি খুলি চরাচর-নর-নারী-চোখে।
}
আপনার প্রতি
বহুরূপী ইন্দ্রধনু-বর্ণের উচ্ছ্বাসে আমনে
দুঃসহ আবেগে ক্ষণে-ক্ষণে রূপান্তরে আপনারে :
আকাশে মেঘের পথে ঝাপটিয়া পাখীরা সঞ্চারে
ব্যস্ত পাখা, কল-গান বিস্তারিয়া বন হতে বনে
মেঘ-দলে অনুসরি’ : অরণ্যের নৃত্যের পুলকে
উন্মত্ত, বিচিত্র পাখা উৎসারিয়া শিখীর বিকাশে :
সহায়, নগ্ন প্রেতাত্মারা হিম-সিক্ত, শুষ্ক ঘাসে
লক্ষ্য করি’ ছায়ার প্রসার নেমে আসে মর্ত্যলােকে।
বিশ্বের প্রভাব লয়ে’ বিংশ বর্ষ স্বপ্নের মন্দিরে
রূপ-হীন, গলিত আবেশে শঙ্কাতুর অনুনয়ে
নগ্ন-তম সুখ-দুঃখ-হর্ষ-ব্যথা-পুলক-বিস্ময়ে
কল্পনারে সাজায়েছছ,আপনার পূজারতি ধীরে।
রূপান্তর আজো তব : আজো তার জ্বলন্ত আহ্বান
তােমার অন্তর ভেদি’ : আজো তা’র নির্জন বিষাণ!
No text on this page.
গােধূলি-অবকাশ
No text on this page.
গােধূলি-অবকাশ
[ গান ।
সুখে শুয়ে আছি, ঘুম-ঘাের
এই-ঘুম-ঘাের
অবলায় :
তব চুম্বন
থরথর
কঁপে মৃদু আঁখি কিনারায়।
উত্তান পৃথ্বীর চরণে
আকাশের তারা নামে শরণে :
পথ ও বিপথ
নাহি জানা!
এস্ত, সৃজন-দ্বিধা নয়নে,
কবে-প্রলয়ােখিত, বিজনে
তব সাথে আসে,-
নাহি মানা !
মুগ্ধ অতিথি তারা,-স্বপনে
তুমুল বেদনা, আশা চয়নে,
কোথা,কতদূরে
মােরে টানা ।
তব চুম্বন
আঁখি-পর
অগ্নি জ্বালায়ে
বিশ্ব চকিত
দেহ-পর
সন্ধ্যা-মরণ
লতে হয় ?
শুধু যায়।
তারার খোঁজে
সেদিন-রাতে তাহারে বুকে ধরি’
আকাশ-পানে তারার সন্ধানে
চাহিয়াছিন্ন জড়িত-ঘাের মনে :
কেশের রাশি জড়ালাে আবরণে ;
হৃদয় হতে বারতা ছিল ভরি’ :
মেঘের দল তারারে কোথা টানে।
আজিকে-রাতে রয়েচি একা আমি
আকাশ-পানে তারার আশে-আশে :
আকাশ হ’তে স্বপ্ন তা’র ঝরি’
ভুলায়ে’ মােরে দিয়েছে ক্ষণে ভরি
আমার হয়ে এসেচে সবি নামি’ :
মেঘেরে চুড়ি’ তারার দল হাসে।
মরণে
[ গান ]
তুমি আমার জীবন-আকাশ পূরণ করি”
সন্ধ্যা-মেঘে বিলয়-কাতর বরণ ধরি ?
ভাসিয়া যাও স্বপন আমার হরণ করি।
জীবন-খানি গাঁথি আমি প্রেমে,
জীবন-খানি ভাঙিবে। থামি’ প্রেমে :
লতার দোলে জীবন-যাপন স্মরণ করি।
নদীর রােলে, ছায়ার অনুনয়ে
সকল সুর ডুবিয়া যায় ভয়ে :
আকাশে চাই বিলীন তােমার চরণ ধরি
চলিতে চাই সবার করুণ নয়ন ধরি,
বক্ষে আজি স্বপন-বিষাদ বরণ করি।
সমর্পণ
[ গান ]
হৃদয় আজ তােমার হাতে তুলে ধরি :
সবার চোখে স্রোতের টানে লহো পড়ি।
মেঘের মতাে গরজে-জলে ভারী,
তড়িৎ খেলে সকল দিকে তারি :
আকাশ টানে, বাতাস টানে, লয় ভরি'।
ক্ষণেক দুরে বনের কালাে দূর করি’
মিশিয়া যায় আলােক, মেঘ কোথা ঝরি’!
--টুটিয়া লও গভীর বরষণে,
মিশিতে’ দাও, প্লাবিতে মহা-খণে
হৃদয় আজ তােমার হাতে তুলে ধরি ।
ज সে
জড়ায়ে ব্যথা ছড়ায়ে’ সুধা সে
এখন আসে ?
মেঘের বুকে কোমল আলাে শুয়ে
কাপচে মৃদু পুলক-ব্যথা থুয়ে’ :
চরণ তাহার অন্ধ উচ্ছ্বাসে
জাগায়ে’ ঢেউ অধীর সেথা ভাসে ;
ছায়া-পথের আলােক-স্রোতে নাচে
কেশের রাশি, বক্ষ যারে যাচে;
অচল তার দূরের বনে খসে ;
সহসা-বুঝি ভুবন-মাঝে পশে !
:
বনানী ঘিরি নিবিড় নীরবতা :
আলাের মাঝে তুলেচে ব্যাকুলতা,
পরশ তার লেগেছে আজি ভুলে ;
স্বপন-'অাখি আকাশ-পানে তুলে
ছায়া তাহার কাতর আমি ধরি ;
তারার আলো সুরভি-মাঝে পড়ি’
কঁদিয়া চাহে গহন বনানীতে ;-
অধর তা’র অধরে মাের দিতে
চকিতে উঠি’ চাহি চারিভিতে :
৩৪ স্বপ্ন-ছবি । } কোথায় দ্রুত,-ব্যাকুল কোথা চলে। হৃদয়-খানি পিয়াসে-তা’র জ্বলে ! চলেছে কোথা, লহরী-বিদারে ভুবন হতে ভুবন-পরপারে ! জলের পাখী লহরী ছাড়ি এসে আকাশে বন-পাখীর সাথে মেশে : ভাসিয়া-যাওয়া শিথিল ক্রন্দন কুয়াশা-মাঝে মিলালাে স্পন্দন : দূরের বনের গন্ধ-হাওয়ার মতো মাতায়ে’ তুলি’, বিবশ করি’ স্বত- আকাশ, বন, সাগর হতে হায়, যায় সে চলে,—যায় সে চলে যায় !
বিবােধ
म
প্রাসাদ হতে বাহিরি’ প্রাতে আজি
চরণ-ধ্বনি মরিয়া যায় বাজি’;
নয়ন-রাঙা তুলেচে দূর-বনে,
পাহাড়ে লাগি’ সাগর গরজনে
যেথায় তার মিনতি রাখে ভরি,
আকাশ-মেঘে ব্যথা তাহার ধরি
পীড়িত কেশ পড়িছে চোখে উড়ি;
গন্ধ দেহে শ্বসিয়া মরে ঘুরি’ ;
নিদ্রাহীন বেদনে দেহ-লতা
টুটিয়া যায় লভিয়া ব্যাকুলতা :
আকাশ কঁাদে মেঘের আবরণে ;
বর্ষা-স্রোত বহিছে প্রাঙ্গণে।
সে
আমরা পথ ছাড়িয়া দিয়া চাহি,
আশার বুকে স্বপন-তরী বাহি’:
চলিয়া যায় চাহিয়া অনিমেষ ;
দুলিয়া যায় বেদনা-রাঙা বেশ।
বিরােধ যেন তাহার দেহে-মনে ;
র দেশে নয়ন টানে ক্ষণে।
স্বপ্ন-ছবি
আমরা ভবে নয়ন তুলি তালে
চরণ-দু’টার ওঠা-নামার কালে ;
সাগর-বন ধূসর, মৃদু চায় :
প্রাসাদ-দ্বারে যেমন হিম বায়
বর্ষা-মাঝে মিলায়ে যায় ঝরি',
আমরা যাই বিরােধে, ভুলে সরি।
বিফলের আবেদন
[ রন্দো }
ক্ষণ-কাল সখী, বহো তুমি তব পথে
গহন বাতাসে, আমার মানস-স্রোতে :
বিফল হৃদয় তােমারে উর্দ্ধে চায়
হতাশ হওয়ায় আকাশের কিনারায় ।
কবরী তােমার প্রলয়-আঁধারে লুটে,
নয়নে তােমার সৃজনের মায়া ফুটে,
চরণ চকিত শিশির-পুলক-স্নেহে,
আদিম সাগর খেলিছে তােমার দেহে
ক্ষণ-কাল সখী, রহে।
+
তরল ঘূর্ণি হৃদয়ে জড়ায়ে ধরে
বিরােধে, স্বপনে, আঘাতে বিলয়-তরে :
প্রয়াস আমার প্রাণপণ তব পানে :
অকূল বাতাসে তুলিয়া অন্ধ প্রাণে
ক্ষণ-কাল সখী, রহাে
অস্তালােকে
বরষা তবে গিয়াছে দূরে স্বপনে :
নয়ন তুলি’ তাহার দু’টী নয়নে,
জড়ায়ে’ হাতে চিকণ, কালো কবরী,
সহসা উঠি’ চরম আমি শিহরি’
কহিনু তারে, ‘আজিকে শেষ জীবনে ;
ভিড়াও ভাখি অস্ত-রবির ভুবনে।
কহেনি কথা, ভরেনি জল নয়নে ;
কহিনু তারে হৃদয়-ভাঙা যতনে,
‘তােমায় ছাড়ি’ এবার হবে ভরাতে
বিরাট ফঁাকা পরিচয়ের বােঝতে--
ফুটায়ে ফুল অলস, লীন শয়নে
সুরভী হাওয়া লাগিছে মৃদু তপনে !
প্রতিরূপ
তুমি
!
কাহার মাঝে আমায় পেয়েছে।
ডুবিয়ে’-ফেলা কোলাহলের বুকে।
আজিকে তাও জানিয়ে দিয়েছে।
আমার হারা অবসাদের দুখে।
তোমার ব্যথা হওয়ার মতাে লাগে
আমার রাঙা হৃদয়-পুরােভাগে :
চঁাদের আলােয় মেঘের মতাে তাই
শূন্যে ঝুলি’ নয়নে তব চাই।
আমি
গাঁয়ের লােকের গানের শয়নে
ঝঝরানি বাতাস দোলে সুখে :
তােমার প্রেমে বিলীন হ'তে ক্ষণে
চলেছি আজ পরম আয়ােজনে
কাহার মাঝে আমায় পেয়েছো
সকল-দেখা চরম কৌতুকে ?
তুমি
শ্রান্তি
আজি
আকাশ-মেঘের বরণ কঁপে পল্লবে;
চির-যুগের শ্রান্তি নামে স্বপনে :
ঝলসি উঠি মধুর-তম ছল তবে
কোথায় গেছে নয়ন হ’তে নয়নে।
আমার পাশে রয়েছো তুমি বেদনায় ;
বৃথাই চাই তােমার ভরা চেতনায়,
বৃথাই খুঁজি মাতিয়ে'-তােলা যতনে !
অতীত-দিনের সাঁঝের মতো গৌরবে
পরশ তুলি’ ক্ষণেক-কঁপা, জীবনে
ভুলের মাঝে মিলায়ে যাই সৌরভে :
তােমার চাওয়া মােহন তার পিছনে !
হয়
অপমানে
তােমায় আমি বেসেছি ভালো কিনা,
তারা শুধায় কঠিন মনের রােষে,
‘ব্যভিচারের সকল ব্যথা দীনা’ :
আমার ব্যথা তাইত, তারা দোষে।
তাদেরাে আমি তুচ্ছ হাসি হেসে
ফিরায়ে' দিয়ে ভাবি মনের কােষে
তোমায়, আর তোমার নানা বেশে।
তোমার কেশ প্রলয় আনে মেঘে,
তােমার আঁখি সূর্য-চঁদে দোলে,
তোমার ভাষা হাওয়ার যত বেগে,
তােমার হাসি তারার আলো খােলে,
তোমার কঁাদা শিশিরে ব্যথা হানে,
স্বপন-ছোঁওয়া আমার সবি তােলে
তোমায় চেয়ে’, আর তােমার পানে।
||
রহাে, রহহ, তুমি রহে।
[ বলো ।
রহাে, রহাে, তুমি রহে। বাতায়নে দূরে :
পশ্চাৎ হ’তে অস্ত-আলােক-ঘুরে’
ক্লান্ত শয়নে যেথায় রয়েছি মেলি
শান্ত বাতাসে হাসিছে কান্ত খেলি।
অঞ্চল রাঙা নয়ন-সমুখে আসি’
বিজুলির মতাে দূরে যায় পরকাশি’ :
কুসুম-প্রয়াস তােমার নয়নে ক্ষণে,
রামধনু-হাসা স্বপন তােমার মনে :
-রহো, রহহ, তুমি রহো ।
ব্যথার আশার মরীচিকা শুধু রচি
দূর হয়ে যাক্!-বৃথাই ভাবনা খচি ।
সকল প্রয়াস ডুবে যা মৃদুতায়,
সন্ধ্যা-পরশে যেমন কোমল বায় !
-রহে, রহে, তুমি রহহ!
h
পরি
[ গান ]
কোন্-সে বালক-দিনে
কাহারে-ত চেয়েছি
কা’র তরে !
শরতের শাদা হাওয়া হাসি-ভরে,
আমারই তরে,
তারে নিয়েছিল চিনে,
কোন-সে বালক-দিনে!
।
অাজ প্রভাত-হাওয়া
তারি ধারে,
আজ সাঁঝের রঙ, তারি দ্বারে,
আজ বনের খেলা তারি পারে
যৌবন-নদী-তটে-পুলক-'পরে ।
স্বপ্ন-বােঝা
বর্ষা-প্রভাত, ঝরিছে অনল-বারি :
আকাশ-পুষ্পে বাঁধিয়া স্বপন-বােঝা,
দীপ্ত বাতাসে ফেলিয়া চরণ তার
হরিতে নামিছে পুলক-ব্যথায় নারী :
আকাশের পাখী,—সফল পাখার খোজা,
পাখার স্বপনে খুলে যায় উপহার,-
বাতাসে দোলায় চকিত, গহন কাকলির অভিসার।
নামিয়া এসেচে কঠোর ভুবনে নারী,
বিজন, মহান, কঠিন পলক-হারা :
চরণ-আঘাতে কুসুম শিহরি’ ফোটে ;
বন-বালিকারা হাতের বিনানী ছাড়ি’
কামনার সাথে মিশায় কামনা-ধারা ;
পাকা ধান রাখি’ কৃষাণ মুগ্ধ ছােটে ;
কাঙালের রাঙা অলস স্বপন চরণে তাহার লেটে।
সাগর-লহরী কঁপায়ে, মায়ে’ তােলে :
সাগরের প্রাণী হরষে ফুকারি’ কাদে ;
বালির পুলিন ফেনার লহরী ধরে ;
নাবিকেরা পােতে মলিন, ব্যাকুল দোলে,
৭৫
স্বপ্ন-ছবি
।
h
বৃথা-সঙ্গীতে থরােথরি’ সবে বাঁধে :
স্বপনের বােঝ ছুড়িয়া শিথিল করে
বর্ষা-প্রভাতে অনলের স্রোতে গিয়াছে আপন ঘরে।
স্বপনের বােঝা বাতাসে, মাটীতে, জলে :
আকাশের পাখী, কুসুম, বনের নারী,
কৃষাণ, কাঙাল, লহরী, সাগর প্রাণী,
নাবিকেরা সবে ব্যাকুল এসেছে দলে
বােঝার পিছনে ধরার কম ছাড়ি:
ছিড়ে গেল বােঝা ;-সকলের টানাটানি।
স্বপন-হাওয়ায় ফিরে গেল গৃহে ধরার স্বপন মানি'।
গােধূলি-তটে
সন্ধ্যা-আকাশ ফুলিছে তুফানে দূরে ;
ধরণী দু-ধারে আকাশে গিয়াছে উঠি ;
নয়ন-সমুখে প্রাসাদ-প্রাচীর-খানি
ধূসর ধ্বংস রয়েছে বক্ষ জুড়ে’-
দীর্ণ, কাঙাল স্বপন-সমান টুটি’
লহরী-আঘাতে খুঁজিছে মায়ার বাণী :
তরণী-মাঝারে বিজনে বসিয়া কাহারে আপন মানি
গহন ঘুমের আয়ােজন চুটি’ ত্রাসে
প্রাসাদ হইতে কপােত গিয়াছে উড়ি’
গােধূলি-আকাশ ধূসরি’ মাথার 'পরে ;
প্রাসাদ-শিখরে স্খলিত পদে সে আসে
নয়নে স্মৃতির স্তিমিত বেদনা। পূরি’ :
গোধূলি-আলাের সুকোমল থরােথরে
ক্ষুদ্র
জীবনে রিক্ত রোদনে চেয়েছি কাহার তরে।
লহরী-দোলায় তরণী অতপরবে
বিষম লেগেছে কঠিন পাষাণ-কূলে,
দী শুক্তি যেখানে ছড়ায়ে আছে,
যেখানে প্রবাল অলস টুটিছে সবে ;
৭৭
স্বপ্ন-ছবি
প্রাসাদের রাণী চেয়েছে প্রাসাদ-মূলে
অশথের পাতা ছিড়িয়া বুকের কাছে
হেলার স্বপন কাতরে ফেলিয়া পরাণ কাহারে যাচে!
আকাশ-কূলের ঐ-যে তারার মতাে
নয়ন আমার নয়নে দিয়াছে তুলে
কামনার দোলা ডুবায়ে মনের তলে :
আশার আলােক কঁপেনা জীবনে স্বত ;
অধর বহেনা বেদনার ভাষা ভুলে;
পরাণ আমার প্রসারি’ পক্ষ চলে ;
কাহার সমুখে শ্রান্ত অঙ্গ মেলেছি মুক্তি-জলে!
বিজয়ী
=
প্রিয়,
বক্ষে আমারে ধরো :
মিনতি তাহার কঁপিতেছে থরোথরো।
আকাশে আগুন জ্বালায়ে আসিছে ধেয়ে;
নারিকেল-শাখা সঞ্চারি’ ঘন আমাতে রয়েছে চেয়ে
বাতায়নে, পাশে বসিয়া তুমি কি করে?
প্রিয়,
ব্যাকুল চাহনি তার
অঙ্গে আমার তুলিতেছে হাহাকার :
রুধিবারে নারি ; আসিছে কাতর বেগে :
সকল অঙ্গ তাহারে তুলিতে রয়েছে বুঝি-বা জেগে
শােণিত তপ্ত ছুটিতেছে খর-ধার।
প্রিয়,
ঘনতর আরাে বাঁধাে !
ওকি, বিল, তুমিও করুণ কঁদো?
তাহার হাওয়া-যে লেগেছে আমার দেহে;
চরণের ধুলি সমুখে, পিছনে মেতেছে কঠোর স্নে
রুদ্ধ হৃদয়ে আমারে কঠিন ছাঁদো।
৭৯
স্বপ্ন-ছ।
প্রিয়,
আজিকে কোথায় ত্রাণ!
বুঝি নির্মম ঘুচায়েচে ব্যবধান !
প্রাণপণ তােলে প্রয়াস তােমার যত ;
আমার অন্ধ বেদনা-সাধনা নিঃশেষ হ’ল স্বত:
হারে চাহিয়া উচ্ছসি’ ভাঙে প্রাণ!
প্রিয়,
সন্ধ্যার দেশ হতে
এসেচে কখন, এসেচে রঙের স্রোতে !
আকাশের তারা নিবিড় হ’ল-যে কালো
বিবশ আমারে বাহুতে ফেলিয়া কোথায় যেতেচো,
ভালাে !
মােরে সে টানিচে তাহার বিজয়ী রথে !
আমার স্বপন
আমার স্বপন ভরা-পালে যায় উর্মির ছলছলে
পাহাড়ের ছায়া সুদূর-পিছনে রাখি,
যেথা অশান্তি দেবদারু-বন কামনার মতো দোলে
বাতাসের কোলে অরূপ ছলনা আঁকি :
নানা যাত্রীর নৃত্য-চটুল পুলকের মাতামাতি,
দুপুর-হাওয়ায় কিছু-কি রেখেচে বাকি ?
আমার স্বপন তোমাদের তরে আপনায় আছে পাতি।
তােমরা-যাহরা আকাশের মেঘে প্রলয়-আগুন আনাে
সন্ধ্যা-সকালে চপল খেলার ছলে,
তােমরা-যাহারা বাতাসের বেগে খর সংহার হানে
এক-নিমেষের একটী আকুল দোলে,
তােমরা-যাহারা বনানীর বুকে পরাগের ঢেউ তােলে
—সারা সাগরের পরাণ উথলি’ খােলে--
কত-জীবনের ঘন পরিচয় আজিকে কেমনে ভােলে ?
আমার স্বপন কত-দূরে যাবে ?—নেই তা’র আগু-পিছু !
তীর হতে বালি উড়িয়া আসিছে রাশি :
তােমাদের হাওয়া অসম আবেশে লেগেছে কি আজ কিছু ।
অকূল আশায় যেঙেছে কেন সে ত্রাসি’?
»
১
স্বপ্ন-ছবি
r
ধরা-যাত্রীর বােঝর বেদনা এখনি’ নামায়ে’ লও;
তোমরা ত্বরিতে দলে-দলে হেথা আসি’
কবরী বিথারি’ কঠোর লীলায় চিরকাল রও, রও!
তরু-তলে
বিজন তরুর তলে
আমরা দুজনে দাড়ায়েছিলাম অমর কৌতূহলে
দু’টা হাত তব চাপিয়া আমার গলে।
সাঁঝের কাঁপন ঝলে ;
সবুজ শাখার মঞ্জরী ছুয়ে হাঁসেরা ব্যস্ত চলে
ডানার ছায়ায় মোদের দৃষ্টি গলে।
বিলাবার অনুনয়ে
বক্ষ দোহার অসম শিহরি’ কেঁপেছিল বিস্ময়ে
নগ্ন, কাতর—তুমুল হর্ষ-ভয়ে।
সুনিবিড় নিশ্বাসে ,
কবরী মেতেছে ; মেঘের বাতাস ঘূর্ণা রচিয়া আসে
মুগ্ধ, ব্যাকুল চাহনির অধিবাসে।
হৃদয়ের স্রোত-গুলি
প্রলয়-রঙীন,-তােমারে চাহিয়া নিজেদেরে গেছে ভুলি’
সেথা হারায়েছে তীরে কুসুম-ধুলি।
স্বপ্ন-ছবি
তােমারে ধরিয়া থাকা।
নির্জনে, বুকে চপল, অবশ তােমারে চাপিয়া রাখা।
রিক্ত কাদায় আঁধার দিয়েছে ঢাকা।
সেদিন গিয়াছে চলে’ :
ধরার হর্ষ, ধরার বেদনা আমারে ধরিয়া ঝােলে
তাদের তীব্র, বিহ্বল কল্লোলে ।
এখনাে তরুর মূলে
নিমেষে, চকিতে সন্ধ্যার রঙ, নিজন যাদু খুলে,
আমার খোঁজার বিলয়-স্তিমিত কূলে।
এখনাে তােমার ভাষা
ক্ষীণ হয়ে পশে শিথিল শােণিতে জাগায়ে’ দুরূহ আশা :
পাখার কঁাদন বিবশে যখন বাসা।
স্বপনের সুন্দরী।
কমবিহীন অবসাদ আজ নির্মম আছে ধরি’ :
তােমারে কখন আমার আপন করি।
নির্জন প্রেম
আকাশের নীচে নেঘের প্রান্তে যবে
তােমারে খুজিতে’ বাহিরিনু কৌতুকে
তরু-সঞ্চারে বাতাসের পথ দেখি,
পাহাড়-সন্ধ্যা, গ্রামের সন্ধ্যা লভি’,
নির্জন প্রেম তখন আছিল এ কা।
--
১
আকাশ-তারায় কুয়াশা যখন মাত’
আড়াল করেছে মোদের দেখার পরে,
মাঠের কুয়াশা, পথের কুয়াশা-রাশি,
তােমার সুপ্ত, স্রস্ত দেহের পাশে
নিজন প্রেম তখনো জেগেচে একা।
শীত-বর্ষায় অন্ধ গৃহের কোণে
বাতায়নে, পথে তোমার বিরহ গণি’-
রতি হ'তে দিনে, দিন হ'তে রাতে সরি’,
এলাননা স্মৃতির জড়িত বেদনা খুলি',
নিন প্রেম আজো যাপে সঁখি, এক।।
সুর-সুন্দরী
আমার স্বপনে তােমার ছায়ার কঁাদ।
দ্রুত, চঞ্চল বাহিরে এনেচে ভুলে ;
গহন বনের নিদ্রা-নিবিড় বাধা
যেথা আকাশের রঙের স্বপন তুলে,
মহা-সাগরের ঘন কল্লোল জড়ায়ে গোপন-কূলে।
তােমার চলার আবেশ-আকুল ছায়া
চকিতে তাদেরে আকড়ি রয়েছে ধরি’ ;
মুকুল-নয়নে তােমার বিজন মায়া
সন্ধ্যা-ধরায় যেতেচে আঁধার করি
ডান বাহু তব আকাশ-তারায় স্রস্ত রয়েছে পড়ি'।
ভেঙে'-ভেঙে পড়ে তাদের গলিত ভাষা
রূপান্তরের বেদনা যেখানে জ্বরে :
আমার চাহনি, আমার শিহরা আশা
সুর-সুন্দরী ! অবােধ-কৌতূহলে
তব বিস্তার কঠিন ধরায় যেখানে-যেখানে চলে।
স্বপ্ন-ছবি
৮৬
সহসা তবুও মিলালে কোথায়, কহে,
সবার-অতীত, কেমনে, কিসের ছলে !
ব্যর্থ ধরায় শূন্যতা নিঃসহ ;
তারি ছায়ে তবু আমার মিনতি চলে :
ভীরু হংসের এলানাে কাকলি সন্ধ্যা-কমল-তলে ।
নিজন আহ্বানে
বন্ধু,
আমারে এবার ছাড়া :
নির্জন হাত আমারে বেঁধেছে তা’ররা !
ক্ষণে-ক্ষণে তা’র নিঠুর, আত মায়া
আমার দেহের, মনের স্রোতেতে ফেলিছে চরম ছায়া
বিদায়ের বেলা কঠিন করােনা আরাে !
বন্ধু,
রঙের রূপান্তর
নিঃসহ বেগে প্রলয়-আকাশ-পর।
ঝড়-বর্ষার তুমুল হাসি ও কাঁদি।
তা’র স্পর্শের শিহরণ-সাথে রচেছে নবীন ধাঁধা :
সাগরের ঢেউ ফুলিছে ভয়ঙ্কর!
বন্ধু,
আঁখি কেন তব চায়
কঠোর বিষাদে প্রভাত-তারকা-প্ৰায়?
শত কল্পনা তাহারে ছেয়েছে সুখে :
আমার শ্রান্তি ভেঙে’-ভেঙে পড়ে উদ্দাম কৌতুকে
নিবিড় পরশে অঙ্গের সীমানায়।
স্বপ্ন-ছবি
bobo
বন্ধু,
আবার রয়েছে ধরে’ ?
কুটিল কবরী লুটিয়া যেতেছে পড়ে ।
দেহ-লতিকার ফুল্ল, ব্যাকুল ভাষা
আদিম স্বপনে দুলিয়া-দুলিয়া তাহারে করেছে আশা:
সম্মুখ হ’তে কোথায় যেতেছে সরে’!
বন্ধু,
রাখো, রাখাে তর কথা।
তব কুঞ্জের মল্লিকা, শ্যাম-লতা
মুয়ে-মুয়ে পড়ে মােদের চরণ-ভারে :
সাঝের আঁধারে মােরা চঞ্চল রঙের স্বপন-ধারে
কেন তব এত নির্মম ব্যাকুলতা?
}
চেয়েছিনু কে তারে!
আমার মাঝারে গলিছে সকল, হারে!
অমিত আবেশে তাহারি জীবন-পানে?
সাগরের ঢেউ ঘুম কল্লোলে উচ্ছাসি’ তীরে আনে :
আমারে এবার সেকি কভু হায়, হাড়ে?
রিক্ত
[ রন্দো ]
যত-কিছু-ছিল দিনু কবে তােমাদেরে :
আত স্বপনে আমায় শ্রান্তি ঘেরে ।
দিন হ'তে দিনে ধরার বেদনা-গুলি,
ব্যর্থ বাতাসে বক্ষ মায়ে’ তুলি’
শত সঞ্চারে কঠোর চিহ্ন আঁকি
হারায়েচে দূরে আমারে আঁধারে ঢাকি’ :
সাঁঝ হ’তে সাঝে তােমাদের পিছু আশা
অসম ওঠায় ভেঙেচে কখন্ বাসা।
—যত-কিছু-ছিল দিমু।
।
কাটা-ধানক্ষেতে প্রখর শীতের হাওয়া
অস্ত-আলোর কুলায়েকের
চঞ্চলি’ আরাে উদাসীন ফিরে আসে :
পাখার কঁাদন ক্ষীণ হয়ে জমে ভাসে।
যত-কিছু-ছিল দিমু।
অসময় পাখীর ডানার তীব্র, গভীর ব্যথা কখন্ জেনেচে কাননের ছােটো কুঁড়ি! ফুটিবার আয়ােজন ছেয়ে গেছে প্রাণপণ : রাঙা-রাঙা, কচি পাপড়ির ব্যাকুলতা দূরে উড়িবার—এদিকে-ওদিকে ঘুরি’! কতদিন গেছে তারপরে,তারপরে বাতাস-মেঘের উৎসব থরথরে! কাননের ফুল- রঙীন্ আবেশে সহসা উঠেচে খুলি, আপনা-বিলানাে সৌরভ-মাঝে আকাশে উঠেচে দুলি। শুধু সে যে ফুটিল না, প্রলয়-ব্যন্ত আপনার ভাষা কোনােমতে কহিল না। ঘেঁড়া-খোঁড়া তার পাপড়ি-গুলিরে ধরে পাখার আকাশে চেয়েছে করুণ ধরার ধূলায় পড়ে।
বর্ষণ
আমার মনের দূর-সীমারেখা-পারে
তােমার মূর্তি পুলক-বিবশ সুখে
সন্ধ্যা-সকালে বরণের সঞ্চারে
অসীম ব্যথায় শিহরিত কৌতুকে।
মমের দ্বারে সারাদিন কান পাতি
বিজন স্মৃতির পরম আশার ধারে
কি তুমি শুনিতে আকুলি’ দিবস-রাতি ?
সেথা ঝঙ্কার বিপুল বেগের ভাষা
শঙ্কা-কাতর মেঘে-মেদে উল্লাসে
লাগিত কঠোর জাগায়ে’ দুরূহ আশা;
সেথা সকরুণ, সুকোমল উচ্ছ্বাসে
পাখীদের গান ফিরিত মধুর মােহে ;
সেথা সন্ধ্যার তন্দ্রা নিভৃতে ভাসা
হারানাে ব্যথার মুগ্ধ পরশ বহে'।
আজ দেখি কেন আমার আকাশ জুড়ে
বিদ্যুৎ-হানা তােমার মহােৎসব।
বপ্ন-ছবি
৯২
নগ্ন তারকা ঢাকা দিয়ে আজ ঘুরে
ভােমার মায়ার চকিত শ-রব।
তােমার মুক্ত অজস্র বর্ষণ
আমারে ডােবায় অতল, নিরালা পুরে:
কোথা তব বাহ ?-কোথা তার বন্ধন ?
F
।
অনুদ্দেশ
আমার পরে তােমার পাখা বিছানাে ?
--তাই কি হয়? আমার তুমি কি জাননা ?
সূর্য-তারা তােমার রবে আড়ালে
আমার শাখায় চরণ-দুটা বাড়ালে।
আমার শাখা হলে তােমার শিথান,
কেবল তােমার শিথিল দেহে ৰিমাননা।
ওড়ার তব আবেশ-মাঝে আমার তুমি কি জাননা?
নাই-বা আমার ফুল-ফোটার বেদনা
তােমার ছায়া, চকিত পরশ পেলনা।
নাই-বা আমার হাজার শাখার জীবনে
সন্ধ্যা তব মায়ার দোলা দিল নে?
নাই-বা মেঘের রামধনুর চেতনা
তােমার রঙে আমার দেহে এল না !
ক্ষণিক তব পাখার সাধা কোথায় তােলে বেদনা !
একাকার
সন্ধ্যা নেমেছে পশ্চিমে
রক্ত-মমঘের তরীতে,
সফল শয়ন অন্তিমে
নিমেষ নিমেষে ধরিতে
স্বপন তুলেছে আঁখিতে।
বিশ্ব সরালো গুণ্ঠনে
সাঝের মরণ-পরশে
প্রলয়-ভীষণ মুণ্ঠনে,
অমিত চকিত হরষে :
স্বপন আমার বিবশে ।
ঊর্ধ আকাশ রঙ্গিতে
ধরণী উঠিছে কাদিয়া;
পবন চপল ভঙ্গীতে
শিরীফদোলায় দুলিয়া
উঠিছে আকুল হাসিয়া।
বঙ্গবি
চটুল আঁধার বহ্নিতে
দেখালা ফুল নাচনা ;
পাখীর করুণ সঙ্গীতে
বনের সবুজ সাধনা
সহসা জানালাে বেদনা ।
শালের চরম মমরি
হাওয়ার আগুনে শিথিলে ;
আমার হৃদয়ে থরােথরি’
তােমার হৃদয় মিশিসে,
প্রলয় ভরিল,নিখিলে।
সাগর তুমুল কল্লোলে
ঊর্মি পুলিনে আছাড়ে,
যদি সে তাদেরাে নিল কোলে,
পবন সহসা বিদায়ে
আকাশ তাদের সাধা-রে
আজিকে বিশ্বকথা নয়.!-
অসম উঠিছে শিউরে :
অসীম পুলক, বিস্ময়
গন্ধে, মেঘের সিদুরে,
তােমার কাঁকণ-কেয়ারে।
গল্প-ছবি
১৬
+
H
তোমাতেসামাতে বনে
অমর স্বপনে থামিয়া :
কান্ত করেছে। নে ?
তােমাতে-খামাতে চাহিয়া
বিশ্ব ভুলায় ভুলিয়া!
গগাধূলির রাণী
গােধূলির রাণী ! ঘুম-ঘুম্ গুঞ্জনে
ভেসে আসে মৃদু ভরা-সন্ধ্যার কূলে
তব ব্যথা, মাের বেদনার শিহরণে?
দু-বনানীর শিয়রে আকাশ দুলে
তোমার হৃদয়ে আলােক-আঁচল ফেলি
রঙের মিনতি ছড়ায়ে ধূলায়, ফুলে।
আমার ছায়ায় কুসুম-হৃদয় মেলি’
শেষ করে দাও সব এই-বেলাবেলি !
ধরার আগুন খেলেছি নিভৃতে দোহে :
অতি-জগতের অগ্নির আহ্বান
মন্থর নামে আকাশ-তারায় বহে।
আজিকার রঙে স্বপনের সন্ধান
মােদের হৃদয়ে, আকাশের গ্রহে-গ্রহে :
গােধূলির রাণী !
শেষ করে তব গান ;
মলিন আবেগে হয়ত, আঁধার আসি
সফল বিশ্ব কেড়ে-কুড়ে যাবে ত্রাসি’
-এসেছে খার, এসেছে বাদুড়-পাতি
-ওকি! অতভয় !–কঁপিছে যে খয়ােধর !
ছবি
অসহায় তব কাদার আবেশে মাতি
জিইতে দিকে গহন, ভয়ঙ্কর
দু’-খানি ডানায় ভরিয়া এনেছে রাতি।
তিমির-দোলায় মােদের মাথার-পর
বা-কিছু মােদের সফল হবেনা,-আজি
করুণ, কঠোর তালে-তালে যায় বাজি’!
গােধূলির রাণী ! ভ্রষ্ট কুসুম তব
বরণ ছুলেছে, ভুলেছে স্বপন-সাথে
তিমিরের আগে অগ্নির উৎসব।
তবু, তবু কালো, হেন-অকালের রাতে
ঝরা-গগাধূলির পথের স্বপনে চাহে,
হাহাকার-তোলা শূন্যতা লয়ে’ হাতে।
ভুলে গেছ যদি গােধূলির উৎসাহ,
তিমিরের তীরে যা-কিছু-রয়েছে গাহে !
मौ
হে পাখী, দাঁড়াও তুমি!
তােমার ডানায় ওড়ার আবেশ-মাখা
প্রিয়ার চিহ্ন কাজলে রয়েছে আঁকা :
সুখে-টলােমলো আমাদের বন-ভূমি :
হে পাখী, দাড়াও তুমি।
হে পাখী, ব্যাকুল কেন?
আমাদের দ্বারে সাঁঝের রঙের খেলা,
হর্ষ-চপল পবনের হেলাফেলা।
ধন-অরণ্য তােমার কুলায় হেন :
হে পাখী, ব্যাকুল কেন ?
হে পাখী, কিসের স্বরা?
অকূল আঁধার তােমার ডানায় লুটি
আসেনি এখনাে খুলি’ তা’র কালাে ৰুটি।
তােমার আকাশ বনের প্রান্তে ধরা :
হে পাখী, কিসের ত্বরা ?
ft
+
স্বপ্ন-ছবি
হে পাখী, কাকলি তব
গৃহের প্রদীপে, আকাশ-তারায় আসি
শিথিলিয়া দেবে বনের হরষ-রাশি :
কূল-ছাপা সুখ দু’হাত ভরিয়া লববা,
হে পাখী, কাকলি তব ।
হে পাখী, পুলক ঝবে!
আমাদের বন তােমার স্বপন আনি’
পারেন দাঁড়াতে তােমারে নিবিড় টানি’
বিবশ তাহার বুকের সীমার পরে,
হে পাখী, পুলক-ঝরে ?
হে পাখী, তােমার এত ।
আমাদের বন সুখে আজ ঢলােঢ়লাে :
কোন্খানে ত্রুটি আমার, দেখেছো, বলাে!
তােমায়-আমায়-মিলনে গােধূলি যেত!
হে পাখী, তােমার এত !
.
হে পাখী, কাহার আশে ?
ধরণীর কো-দুর্গম-বন-শেষে
প্রভাত ঘুমায় আঁধারের কোল ঘেঁষে’ :
জাগাতে’ তাহারে বুঝি তা’র যাবে পাশে।
হে পাখ, কাহার আশে?
১১
স্বপ্ন-ছবি
-
হে পাখী, বুঝেছি তােরে।
সুখে-ভরা বন আমার আজিকে নয় !
আমার স্বপন তােমার ডানায় রয়
ধরার শিয়রে আকাশের থরথরে :
হে পাখী, বুঝেচি তােরে ।
হে পাখী, সঙ্গে লও।
আমার বিরহে আর্তবিলাপ তুলি’
খের বনানী ওড়াবেনা রাঙা ধূলি !
গহন আঁধারে যেখানে-বা তুমি রও,
হে পাখী, সঙ্গে লও !
হে পাখী, তােমার আমি।
ঘরের প্রদীপ রাখিবেনা আর ধরে।
আকাশের তারা কোথায় যেতেছে সরে’!
দূর-বনানীর গুঞ্জন গেছে নামি’!
হে পাখী, তােমার আমি।
তিমিরের রাণী
হে সখী, তিমির তীরে।
কালাে জল তব ধােয়ায় চরণ-তল
আকাশের গায়ে ছুড়ি কালো কল্লোল :
আদিম আঁধার অনন্ত যুগ ঘিরে ’
ভেঙে পড়ে তব শিরে :
হে সখী, তিমির-তীরে।
L
হে সখী, ঘােষ্টা ফেলে।
ধরার শিয়রে নির্জনে ধীরে আসি’
নির্জন প্রেমে বাজাই বিমনা বাঁশী :
তারার আলােকে হিয়া তার এলােমেলো
আঁধারে রজনী এলাে ;
হে সখী, ঘােটা ফেলে।
হে সখী, নয়নে তাের
ঢেউ’এর আগুনে শুয়ে আছে নিঝুম
অনাদি কালের উৎসব-কুঙ্কুম,
ফসল-ঝরানাে আধাে-আধো রাঙা ঘোর :
ঘুমায় ভয়ঙ্কর
হে সখী, নয়নে তাের।
গল্প-ছবি
হে সখী, ছায়ার গাথা।
তােমার ব্যস্ত, অশেষ রূপান্তরে
হাওয়ার স্বপন ভ্ৰস্তু আবেশে ঝরে ;
প্রথম শিশির অসম আলােকে মাতা।
তােমার অধরে পাতা
হে সখী, ছায়ার গাথা।
হে সখী, চকিত কিসে?
সােনার স্বপ্ন ভ্রষ্ট অগাধ জলে,
তুষার-গৌর তােমার চরণ-তলে
আজিও লুটায় উর্মি-আঁধারে মিশে,
সহসা চমকি’ সে :
হে সখী, চকিত কিসে?
।
হে সখী, এত কি ভয় ?
তুমুল হর্ষ আমার বাঁশীর স্বরে
ধরার প্রান্তে আঁধারে আছাড়ি’ মরে।
চপল উমি ফেনায় আবরি’ নয়,
ধরণী নীরবে রয়।
হে সখী, এত কি ভয় ?
স্বপ্ন-ছবি
১০৪
হে সখী, ব্যাকুল ত্রাসে?
আমার অলক তােমার কবরী-তলে
মন্থর দোলে কোমল আশার ছলে ;
আমার হৃদয় তােমার হৃদয়-পাশে :
এত কি আজিকে আসে-
হে সখী, ব্যাকুল ত্রাসে?
হে সখী, কাতর আঁখি ?
একদিন তুমি চেয়েছিলে, তব হৃদে
বিপুল বিশ্ব যেন ত্বরা যায় বিধে,
অন্ধ লােদনে সবারে সমুখে ডাকি
আঁধারের কূলে থাকি’
হে সখী, কাতর অাখি ?
হে সখী, এখনি তবে
আঁধারের মতো একখানি গুণ্ঠন
ক্লান্ত, কাতর তুলে লও প্রাণপণ :
অবােধ স্বপনে দুরন্ত আসে সবে,
তােমারে ছিনিয়া ল’বে।
হে সখী, এখনি তবে।
স্বপ্ন-ছবি
হে সখী, তিমির-রাণী!
আমার বাঁশীর ভুলে-ভরা চেতনায়
আকাশ-তারায় হারায়েছি সব, হায় !
তােমার নয়নে একটী চাহনি হানি।
-কিছু আজ নাহি জানি,
হে সখী, তিমির-রাণী!
আবর্তন
[ গান ]
সুন্দর ধরণীর প্রাতে
তরুণ আবেশ-ভরে
রঙের শিহর-পাতে
দাড়ালে শিশির-পরে
দু’জনে অশোেকমালা হাতে।
প্রাঙ্গণ-নদী-জলে
মুয়েছিল শাখা-দলে
কিংশুক অশােকের সাথে ।
সুন্দর ধরণীর প্রাতে।
ধরণীর দিবসের কঁাদ।
বাতাসের সঞ্চারে
আকাশেতে মিলায়েছে,
তরু-দল জড়ায়েছে বাধা :
দু’-জনার চারিধারে
করুণারে বিলায়েছে
দু’-জনার নয়নের সাধা।
ধরণীর দিবসের কঁাদা।
বহুবি
ধরণীর সুগভীর রাতে
তরু-দল হারায়েছে
কঠিন তিমির-বাতে :
প্রাঙ্গণে দাঁড়ায়েছে
তরুণ, কেতকী শয়ে মাথে।
তরুণী, সে মরণের
সুর লয়ে মরমের
বৃথা ডাকে ধরণীর প্রাতে।
ধরণীর সুগভীর রাতে ৪
রেখা-বিহীন
পুরাণে প্রেমের স্মৃতি-খানি আজ ছায়াতে দোলে,
স্বপন-কোলে।
হাজার পাখীর কল-গান দূর-আকাশে
বিজনে ভাসে
মেঘের সিদূরে তারার আড়ালে চরম ছলে।
তুমি কি চেয়েছো আদিম যুগের নিখুত-আমি,
দুয়ারে থামি’?
রেখা-নিদেশে পৃথক্-একটী জীবনে
ধরিল মানে ?
ধরার সন্ধ্যা তােমার দুয়ারে এসেচে নামি’ !
রেখায়-রেখায় আমার জীবন উথলি পড়ে
রূপান্তরে,
সবার জীবনে মিশেছে কেম-অলখে,
বিশ্ব-লােকে ;
সবার চেতনা অন্তবিহীন স্বপনে ধরে ।
স্বপ্ন-ছবি
গলার আবেশে গড়ার কিনারে পাখার দোলা,
সকল-ভােলা ।
তুমি কি আমায় ধরিবে তােমার উরসে,
আবেগ-বশে ?
হাজার যুগের কাঁদার আগুনে গণ্ডী খােলা!
‘কান্তকাল এষঃ
তােমাদের মন চুরি হ’ল হায়! হায়!
হাজার চোখের বিদ্যুৎ-উৎসবে
তােদের কেশের মেঘের আধার-তগে
চরণের পথ ভ্রস্ত নূপুরে ভীরু
লালসে মুখর করেচে বর্ষাকাল !
তােমাদের মন চুরি হ’ল হায়! হায়!
তােদের চোখের অঞ্জন দূর-মমঘে,
বাঁকা বিভ্রম উত্তাল নদী-জলে,
চরণের ধ্বনি হংস-কাকলি লভে,
তােদের হাস্যে হাসিতে বর্ষাকাল।
তােমাদের মন চুরি হ’ল হায়! হায়!
মালতীর সাথে কেতকীর মালা শিরে,
দু’টা-দুটা কানে অজুন-মরী,
বক্ষ-দোলায় নীল উৎপল-কাশি,
তােদের সাজাতে এনেচে বর্ষাকাল।
১১১
অ-ছবি
তােমাদের মন চুরি হ’ল হায়! হায়!
ঢেউ-এর আঁধার প্রলয়-মৃত্যু-আঁকা
অয়-সঙ্গে মেলেটে রুদ্র আনা :
তােদের শিয়রে পরম প্রতীক্ষায়
নিশার আঁধারে নিবিড় বর্ষাকাল ।
তােমাদের মন চুরি হ’ল হায়! হায়
আষাঢ়-তন্দ্রা
কোন্ রজনীর পরপার হতে আসিছে তন্দ্রা দিবসে !
বর্ষা-বাতাসে সব-একাকার আষাঢ়ে,
আঁধারের-পর-অাঁধারে
মেঘের অঙ্কে ধূসর চুমায় দূরে শালবন বিবশে !
বিদায়-ক্ষণে
আঁধারে আকাশ মলিন হ’ল
আমাদের দু-জনার শিরে :
মােদের দৃষ্টি-যে ক্ষীণ হ’ল
ভাঙা-হৃদয়ের রাঙা তীরে,
উৎসাহ-নেই-কালো-নীরে।
আজিকার ক্রন্দন নিবাও,
আকাশের তারা-দীপ যথা ;
নূতনের আনন্দে বিলাও
আমাদের হৃদয়ের কথা,
এত-যে জমেচে ব্যাকুলতা
তারপরে আর কোনাে কথায়
জীবনে কাতর ক’বােনাকো :
মিলা সকল মূক ব্যথায় ;
দূরে গিয়ে মােরে ভুলে’ থাকো,
নব রঙে সব-কিছু ঢাকো।
-হুৰি
১১৪
তা না হলে মুহূর্তে বিকল
তােমার পুলক হবে মিছে,
তা না হলে বিমর্ষ, বিভল
চেয়ে’ র’বে জীবনের নীচে,
স্বপ্ন সুদূরে রাখি’ পিছে
আজি আর কোনাে কথা কি বলে ?
--দেখা যদি হয় অবশেষে
এ-হেন আঁধার-আকাশ-তলে,
শুধু যাবাে চেয়ে’ আঁখি-দেশে,
আঁধার আকাশে যেথা মেশে !
সখী-হীন
হে সখী, নয়ন ঢাকো।
রঙ, হ’তে রঙে, মেঘ হ’তে মেঘে
ঝঙ্কার আলাে ভেঙে পড়ে বেগে ;
দেহ-মন হ'তে সমস্ত-মােরে কেন তুমি কাছে ডাকো?
হে সখী, চাহনি রাখাে ।
হৃদয়ের দ্বার খােলো :
তােরে এতদিন রেখেচি যেখানে
দু’জনার রঙে অতি-সাবধানে,
আদিম পথের ছায়ার শিয়রে, নির্জন প্রেম ভােলা
জাগালাে অকূল দোলা
হৃদয়ের স্পন্দনে
আগুন-পাখায় সপ্তভুবন
সপ্ত-ঋষিরে বহি নিজন
দুলিচে মত্ত রথ হ’তে রথে স্বপ্নের গুঞ্জনে
আজিকার মহা-খণে।
স্বল্প-হৰি
১১৬
। -
হে সখী, কোথায় তুমি !
গতি-আর-রঙে-সব-একাকার
আছাড়িয়া পড়ে হৃদি-পারাবার :
প্রলয়-রাতের স্রস্ত অতিথি ব্যস্ত পড়িছে মুমি’ :
বৃথাই তােমারে চুমি!
অবাধ্য
জাগ্রত ব্যথা-গণে
মিশে গেছে কোন্-ক্ষণে
স্বপ্নের বুকে ঘুমন্ত ব্যথা এলায়ে যেখানে বনে।
তাহারা পরস্পরে
বনের কলরে
অগ্নির বেগে পাখায়-পাখায় সহসা শিথিলি’ ঝরে।
অনাদি যুগের মােরে
কেমনে রাখিবে ধরে
হেলায়-খেলায় যেখানে-সেখানে ছড়ানাে রূপের কোরে ?
অনন্ত প্রেম, হায়!
অনন্ত মােরে চায় :
হে সখী, এখানে পুলক-বিকল আর বসে থাকা দায়।
গােধূলির ফুল-গুলি
নিজেরে ওড়ায় খুলি’
কাছে আছে দল, কচি-কচি পাতা,-সবারে নিমেষে ভুলি'।
কবি
১১৮
সাগরের ঢেউ যত
ব্যস্ত ভাঙিতে রত,
তােমার চরণে ঋলিত আবেশে যাহারা ঘুমাতাে স্বত।
ঘরের প্রদীপ তাের
নিবে’ যায়,—ধন ঘাের !--
এতদিন যাহ জলিত শিয়রে স্তিমিত শিখায় মাের।
অবাধ্য আমি হায় !
উত্তান কামনায়
ভুলে গিয়ে তােরে তােমার স্বপনে নির্মম মিশে যাই!
বাদল-দিনে
বাদলের দিনগুলো আকাশের বর্ষণে একাকার-স্বপ্নে কাপছে,
প্রথমে মেঘগুলো কাজলের সাধ-ভরা ধরণীর বক্ষে নামছে।
সখী, তাের ভয় কি ?—এ পথ-ঘাট কত-না দূরে আছে
দাড়ায়ে,
অতীতের ক্ষত-গুলো ভরে যাবে আজ সব : থাকেনা
আমারে জড়ায়ে।
বর্ষা যে ঘনিয়েছে! সকলের কাছে এলো, আমাদের
কুটীরের দুয়ারে :
ছায়া তা’র নেচে যায় আমাদের কিনারায়, ভাঙে হায়!
হৃদয়ের ওপারে!
ডেকে নে তারে আজ,স্বপ্নের ব্যথা-গুলাে যেমন চায়
.
দূরে আকাশে,
যদি কেউ আসে নেমে’ পুলকের আধাে-ঘুমে এলােচুলে
অপরূপ, বাতাসে!
রূপান্তর
আজকে রাতের তাের আমার সহচরী :
তুচ্ছ অতীত ডুবিয়ে দিয়ে’ লহহ ধরি’!
হাজার ফুলের পরাগ তােদের চরণে,
হাজার-তীর্থ-সলিল তােদের নয়নে,
হাজার যুগের নিবেদনের রােদনে
হৃদয় তােদের উঠচে দুলে থরােথরি’!
তােদের বুকের সব শেষের আশ্রয়ে
আমারে ধরে। কোমলতম বিস্ময়ে !
তােদের চোখের ব্যস্ত, রঙীন্ বিলয়ে
আমারে টানে মধুর তােদের নিলয়ে
তােদের বেগে আমার বেগ সভয়ে
চেতিয়ে তােলে আমার শেষ-পরাজয়ে !
তােদের রঙে জীবন মাের উৎসাহি
গহন রাতের প্রান্তে-দূর নি চাহি’:
যেমন করে বাতাস পাখীর কূজনে
কূজন হয়ে’ মিলায় সারা ভুবনে,
যেমন করে মূল মেঘের স্বপনে
ধরণী-তল শ্যামল হয় অবগাহি।
অগ্নি-তলে
স্বর্গমগিং
প্রজান।
অনন্তলােকাপ্তিমখাে প্রতিষ্ঠাং বিদ্ধি বমেতং গুহায়াম।
কঠোপনিষদ।
জানি, জানি আজ অগ্নি উঠিছে আকাশে
গুহাতল হ’তে,--ধরণীর আশ্রয় !
জানি, জানি—দূরে মধুর দীপ্ত বাতাসে
ছড়ায়ে পড়েছে নির্জন বিস্ময়।
এ-হেন আলােকে কেশের আঁধার-তলে
কুসুমের মালা জড়ায়ে লয়েছি গলে :
-আসিছে সে উচ্ছলে!
14
:
আঁধার-আগুনে অগ্নি-আঁখির রজনী
কঁপিছে : বক্ষে প্রলয়ের আগ্রহ :
হাজার ঘৃণায় ছেয়েছে প্রণয়ে অবনী,
নিবিড় বিরােধ ছড়ায়েছে নিঃসহ।
প্রতিটা নিমেষ অকূল প্রবাহ বাহি’
দূরে আঁখি-তলে ঝলিতেছে উৎসাহি
আমার কামনা চাহি’
স্বপ্ন-ছবি
১২২
আমার বিলাসে তা’র আসিবার কামনা
তাইত, অগ্নি জেগেছে নিবিড়তর :
আমার স্বপনে তাহার নিত্য সাধনা
বিজন বেদনে কঁপে তাই, থরোথরাে।
হাওয়ার কঁাপনে হিমের পুলকে ভাসা
আনন্দ তার পরম নিভৃতে আসা
আমার সর্বনাশ!
গৃহের প্রদীপ জ্বেলেছি ব্যাকুল যতনে,
বিবশ অঙ্গ পেতেছি পূর্ণ করি,
আমন আমি চেয়েছি ক্ষণিক-সাধনে
অন্ধ স্বপ্ন উর্ধে, আকাশে ধরি’ :
আকাশ-অগ্নি নামিছে লক্ষ্যহারা
সব-জ্বালাবার পুলক করিতে সারা :
বক্ষে অধীরা ধারা!
অগ্নির পিছে এসেছে তিমিরে বিরলে :
দুটী আখি মাের শিহরি’ মুদেছে ত্রাসে,
কপােল-পরশ বুঝেচি আমার কপােল,
দুটি বাহু তা’র আমার বক্ষ-পাশে ;
দেহের চেতনা মরেছে দেহের পরে :
সব-ভােলাবার মিনতি নিবিড় ঝরে
কোমল কণ্ঠস্বরে।
স্বপ্ন-ছবি
কণ্ঠের মালা আমার ব্যথায়, সরমে
খসিয়া পড়েছে চকিতে, চরম-ভুলে :
আর্ত শােণিত আমার ক্ষুব্ধ মরমে
চেতিয়া থেমেছে তাহার কঠিন-কূলে :
বিকল বিশ্ব আমার সমুখে নামি’
ভীরু ক্রন্দনে সহসা গিয়াছে থামি’ :
হারায়েছি হায়, আমি !
অগ্নি-আঁখি
এ-হেন আঁধারে কোনাে কথা তুমি ক’য়ােনা !
হে সখী, বিজনে সহসা মিলালাে চেতনা।
তারকার প্রেম নেমেছে ধরার হৃদয়ে
বিদ্যুৎ-আঁকা, অন্তিম-রাঙা বিয়ে ;
কালাে কেশ তুলে ঝঞ্চা হাসিছে লুকায়ে ;
নির্জন বক ছুটে চলে ত্বরা কুলায়ে।
এসো, পাশে থাকি সম্বরি কথা নয়নে,
অকালের রাতে ভেসে যাবে হায়, তা নাহলে’ কার চরণে
ঘরের প্রদীপ আমাদের আছে জ্বালানো ;
তা’র ছায়াতলে হ'বে হ’ কথা বিছানাে !
মেঘের পসরা ঐ দেখ, দূর-আঙনে
নামানাে রয়েছে তােমার আঁখির সামনে।
ঘরের দেয়ালে আমাদের ছায়া কঁপিছে,
অগ্নি-আখির চরণে, হয়ত, সঁপিছে
নিঃশেষ করে আপনার কালাে বেদনা:
এসসা বাহু-পাশে : অধর কপায়ে ঐ-ধারে আর চেয়ােনা ।
-বৃথা, বৃথা কওয়া।কখন্ ওধারে বলেছো,
অাখির নিমেষে আপনারে তা’র করেচো।
স্বল্প-ছবি
সােনার অগ্নি তােমার নয়নে, জীবনে ;
অগ্নি-আবেগ তােমার হৃদয়ে শরণে!
দু’টা বাহু তা’র তােমারে ধরেচে আবেশে,
কথায়-পূর্ণ অকালের মহা-নিমেষে।
ঘরের প্রদীপ কখন্ ছায়ায় মরেচে !
শূন্যে, আঁধারে হাহাকার ল’য়ে আমার নয়ন চেয়েছে।
উৎসব
উৎসব লেগে গেছে অঙ্গনে,
আকাশের অঙ্গন-মাঝে :
সৰ চিত জেগে উঠে রঙ্গনে,-
মিছে আজ ক্রন্দন সাবে।
তারকায় ছেয়ে গেছে ছায়া-পথ,
চন্দ্রের দীপ-খানি জাগে,
উড়ে যায় ধরণীর মায়া-বথ :
সদ্য জেগেছে অনুরাগে ?
এতদিন ছিল যাহা তন্দ্রার
সুকঠিন আবরণ-পাশে
শাঙনের মেঘে-ঘন সন্ধ্যার
কালি লয়ে’ বিহ্বল ত্রাসে,
সহসা তা ফুটিয়াছে, উন্মাদ
পাণ্ডু কপােল রাঙি ধীরে ;
আজিকার উৎসব-সংবাদ
ব্যাকুল বেজেছে মঞ্জীরে।
১২৭
সর্গ-ছবি
নেমে আসে উৎসব উত্তান
আমাদের অঙ্গের দ্বারে :
অবসান লয় দূর-সন্ধান :
আঁখি তােলে হৃদয়ের পারে!
তিমিরের-তলে
গহন আঁধার পূর্ণ চরণে নামি
সহসা সমুখে থামি’
বনের প্রান্তে আলসে-এলানন সরণি
লেপিয়াছে একাকার :
ক্লান্ত শয়নে বিজন, বিপুল ধরণী
করিতেছে হাহাকার ;
এ-হেন আঁধারে ব্যস্ত, চকিত চরণে
বন্ধ নয়নে কোথা যাও কা’র শরণে?
সমুখে সাগর চেতিয়া ফুলিয়ে দুলি’
ঢেউ'এর আগুনে ভুলি।
কোন কাজ ছিল এ-হেন নিবিড় প্রলয়ে,
অশান্ত এই-রাতে ?
এত-কি বেদনা জমেছে তোমার হৃদয়ে,
কাহার নয়ন-পাতে ?
তব নয়নের তরল অগ্নি-পরশে
কণ্ঠের মালা ভ্রষ্ট, মলিন বিবশে ।
যে-মালা খসেছে, যে-আশ উঠেনি ভরি’,
যা-কিছু অতলে পড়ি
১২
স্বপ্ন-ছবি
-হাজার যুগের সব-সঞ্চয় রয়েছে
হেলার জড়িমা বহি,
তাদের সহসা-চেতনা কি তােরে ডেকেছে
সুপ্ত জীবন দহি’?
তােমার শিয়রে ঝঙ্কা উঠেছে গগনে
সাড়া তুলিবারে নির্জন তব ভুবনে!
—এতখানি যদি, ঢেউ-এর বিষম বুকে
আনন্দ-কৌতুকে
তােমার বক্ষ পাতি’ দাও ধীরে, যতনে
পদ্মের মতাে খুলি’ :
ভরা-অধরের ব্যাকুল, ঈষৎ-কাপনে
সব জ্বালা যাবে ভুলি’!
তব জাগরণে হয়ত, তখন পূরবে
সােনার উষার প্রসাদ ফুটিবে গরবে।
ব্যর্থ সন্ধান
সােনার সন্ধ্যা তিমিরের ব্যথা অকি’
কালো তরঙ্গে নেমেছে মৌন শিহরি’ :
শ্যাম দিগন্তে সুদূরে অচল রাখি’
কালাে কেশ-তলে মােদের বিশ্ব আবরি’
চপলা রজনী মন্দ-চরণে কোথা যেতেছিল বিহরি’!
হাজার নদীর মিলন-কাতর গানে,
ফেনার পুঞ্জে, তরুর তলায় বিজনে
ভ্রান্ত নয়নে ব্যথিতা শূন্য-পানে
চেয়েছি আমি সহ-নিঃস্ব জীবনে :
আঁধার-রজনী ঢেকেছিল কবে বন হতে বন-গহনে ।
অদৃশ্য বায়ু তােনার বেদনাময়
আমার কেশের আঁধারে লুকালাে সহসা
মনে হল যেন, দিবসের সঞ্চয়
তােমার চোখের আগুনে ঝাপিছে বিবশা ;
তব চরণের ধূলি নেচেছিল আমার অঙ্গ-পরশা !
মাের সঙ্গীত দেয়নিকি সান্ত্বনা
তব অতীতের কত-না-হারানাে রােদনে ?
।
sos
স্বল্প-ছবি
মাের আনন্দ করেনিকি আমনা
তব সােহগের সব-ভাঙিবার পীড়নে ?
তুমি কাছে এলে, মৃদু চুম্বনে হারালাম মােরে জীবনে।
তােমার-আমার মিলনে অন্ধ রাতি
শঙ্কা-কাতর থেমেছিল পথে, শিয়রে :
আমার আঁচলে দোহার শয়ন পাতি
ব্যাকুল স্বপন গড়েছিনু প্রতি প্রহরে !
-তুমি চলে গেলে ;-প্রভাত কখন্ জেগেছে
উর্মি-সাগরে !
এখনাে এখানে বসে আছি দিবানিশি,
-কালাে কল্লোলে আঁধারের ব্যথা-যাপনা !
আকাশে, বাতাসে, ধরার ধূলায় মিশি’
যারা চলে যায় বহি’ আপনার বেদনা,
তা’দের নয়নে ঝুকে পড়ে শুধু তােরে কাড়িবার
বাসনা !
আজিও উর্মি আছাড়িছে তটভূমি,
আজিও আমােক তাদের কাতর নয়নে।
শুধু ডেকে’ দেখা,-একি তুমি?—একি তুমি ?
কোনােমতে রুধি’ আপনার কালো রােদনে।
আঁধারের রাতে কেন বুনেছিনু ক্লান্ত, মলিন স্বপনে।
দৃষ্টি
ওরে অশান্ত, ওরে অশান্ত, ও কে দেখ, তাের শিয়রে
তা’র কত-না রজনী কেঁদেছে:তােমার দিনের প্রহরে-প্রহরে
আহা, এ-হেন মুগ্ধ সময়ে
কূলে-কূলে-ভরা সন্ধ্যার নদী এলাে তাের কালাে
নিলয়ে ;
আহা, দূর-তীরে মেঘে সবুজ-ধানের হিল্লোল লাগি’ শিহরে
তাের তপ্ত শােণিতে দেয়নিকি দোল আকাশের রাঙা প্রলয়ে
তার কালাে কেশ-ভার পড়েনিকি তাের বক্ষে, ব্যথিত
হৃদয়ে :
আহা, তিমিরের তীরে কাতরে
তাের প্রদীপের শঙ্কিত শিখা নিবে’নিবে’ ঐ এলরে ।
তাের এতনা দিনের বিজন সাধনা তবে কি বিফল হলরে ?
তা’র কালাে-কালাে কেশ বিদ্যুৎ-সম সােনার আগুনে জ্বলিছে
তাের বিলাপের অশ্রু বৃথাই নদী-কালাে-জলে মিশিছে।
আহা, সন্ধ্যা যে ডুবে যায়রে !
তবু ক্ষণকাল তার কেশ-জাল তুলি’ অপলক চাহাের
তাের ক্লা
ব্যর্থ স্বপ্নী
‘সফল স্বপন ফিরে’ দিতে পারি আজ
ব্যর্থ প্রেমের তীরে ?
স্বপ্নী-আমার ফুরায়েছে হেথা কাজ,
আঁখি দুটী ভােলা ধীরে ?
নিঙাড়ি’ হৃদয় ঝরায়ে চোখের জল
স্বপনের সুন্দরী
কয়েছে আবার, কেন তুমি বিহ্বল ?
সাধ্য কি আমি ধরি ?
শিথিল পীড়নে বক্ষে তাহারে বাঁধি”
--সীমা-হীন বন্ধন!
ক্ষণেক জগতে চেয়েছে করুণ কাদি’,
চেয়েচে পরাণ-পণ ।
কুয়াশা তখন শীতের বাতাসে মাতি’
তীক্ষ উঠিছে দুলি’;
ম্লান তারা-গুলি কঠিন করেছে রাতি
আঁধার-আকাশে ঝুলি।
জড়িত তাহার সুদূরে চাহিয়া থাকা,
যেমন দিনের পাখী
-ছবি
১৩৪
শীতের বাতাসে নামায়ে ক্লান্তপাখা
জীর্ণ কুসুম ঢাকি
রাতের আঁধারে চেয়ে’-চেয়ে থাকে বসে
হারায়ে গানের ধারা :
তাহার ধরণী সমুখে সহসা খসে
শূন্তে ইতেছে হার।
সহসা চকিত আকাশ আঁকড়ি’ ধরি’
-বৃথা খোজা আশ্রয় !
তরুণ স্বপ্নী উঠি’-উঠি’ যায় পড়ি;
নিবিড় অশ্রু বয়।
প্রিয়ার গলিত, মুগ্ধ, পেলব ভাষা
মমের কানে-কানে,
তবুও জড়ায়ে তাহার বিজন আশা
গহনে-গহনে টানে।
দিবস, রজনী,-বরষ গিয়াছে চলে
তাহার চোখের পথে
রিক্ত হাওয়ার ভ্রষ্ট স্বপন দলে’
নদী হতে পর্বতে।
স্বপ্নের সাথী আজিও ফেরেনি তার,
-জমাটু ব্যথার রাশি।
আকাশে, হৃদয়ে তটিনীর হাহাকার
কঠিন ধরণী গ্রাসি ।
.
স্বল্প-ছবি
হৃদয়ে তাহার চাহনি ফিরিছে ত্রাসে,
প্রলয়-আবেগ-তনয় :
শত-শত যুগ অন্তিম উচ্ছ্বাসে
নিবিড় যেতেছে গলে,--
তুমুল ছায়ার রুদ্র, কঠিন ভাঙা
আদিম-স্বপন-পারে,-
অন্তবিহীন বিশ্ব প্রলয়-রাঙা
পূর্ণ-নিমেষ-ধারে।
৮
শঙ্কা-কাতর তরুণ স্বপ্নী, আহা!
বাহিরে ঘুরালাে আঁখি ;
ভুলে যেতে চায় ব্যর্থ ফিরেছে যাহা,
তাহারে দিয়াছে ফাঁকি।
সন্ধ্যা তখন আঘাত দিয়াছে মেঘে,
বাতাস গিয়াছে নাবি’ ;
প্রিয়ার বােদন সহসা উঠেছে জেগে
স্বপ্নীর হৃদি প্লাবি’।
স্বপ্নী চলেছে,--বনানী ধরণী-তলে
কুসুমে দিয়াছে ছুড়ি;
আকাশে ওঠার বিহ্বল কলকলে
তটিনী গিয়াছে ঘুরি।
১৩৬
4
ছবি
স্বপ্নী চলেছে,-ধরণী অধীর বেগে
তারকার ক্রন্দনে
ছড়ায়ে দিয়াছে আকাশের মেঘে-মেঘে
নিমম স্পন্দনে।
স্বপ্নী চলেচে যেদিকে ঘুরেচে অখি,
কোথাও বিরাম নাই;
যেন নীড়-হারা গহন বনের পাখী
রাতের আকাশে হায় !
স্বপ্নী চলেচে,-নদী হ'তে তরু-তলে,
তরুহ’তে পবতে
সন্ধ্যা-প্রভাত কত-না অলখে ঝয়ে
যেতে-যেতে বাধা-পথে
কত-না বরষ মাথার উপরে কঁদি
এমনি গিয়াছে চলি’
কত-না ব্যথার নিকরুণ বােঝ বাঁধি
তাহার হৃদয়ে ঝলি'।
সহসা স্বপ্নী দাঁড়ালাে সাগর-পারে,
-প্রলয়ের উৎসব!
যােগ দিল সেও উর্মির অভিসারে,
ভুলে গেছে আহা, সব !
সােনার হংস
No text on this page.
সােনার হংস
বর্ষা-সন্ধ্যা তিমির-গগনে হারা
গিরি-তটিনীর তীরে ;
মেঘের পুঞ্জে, ফেনার দোলায়, সারা
হংস-কাকলি শিহরি’ উঠিছে ধীরে :
লুকানাে তারার হাওয়ার আগুন-তলে
গিরি-শিখরের বাতায়নে মাের অবসাদ উঠে জ্বলে।
সােনার হংস, এত-যে রয়েছে কাছে
আমার গিরির মূলে,
যেথা আঁধারের স্বপন লুকানাে আছে
বর্ষা-অগাধ, ফেনিল তটিনী-কূলে,
ঐ-সাগরের অবাধ হাওয়ার রথে
মাের বাতায়নে এসো, এসো আজ তব নির্জন হতে।
কি-তব সাধনা সেখানে রয়েছে, কহহ,
অন্ধ দিনের পথে ।
হথা দুর্গম শূন্যতা নিঃসহ
আমার হৃদয়ে, নিদারুণ পবতে !
বন্দী-আমার নিশিদিন আছে জাগি
হে-মাের হংস, তােমার ডানার সােনার প্রসাদ লাগি।
স্বল্প-ছবি
১৪
সােনার হংস, তিমিরে নিবও সাধ
জলের তিমির-তলে ;
আমার রজনী করােনাকে উন্মাদ
রিক্ত হুতাশে তােমার ধ্যানের ছলে :
আমার রজনী উন্মুখ তব তরে ;
তব উৎসুক ডানার বিলাসে আমার অশ্রু ঝরে !
হে মাের হংস, উদাস ডানায় লাগি
কত-না প্রলয়-রাতি,
কত-না ঝঙ্কা-তুফান গিয়াছে ভাঙি
কত-নিষ্ঠুব মত্ত আবেগে মাতি' :
কত-না মুগ্ধ সাঁঝের রঙের আশা
চকিত নিমেষে ডানার স্বপনে কুড়ায়ে পেয়েছে ভাষা !
ব
হে-মাের তাপস, তােমার দিনের স্মৃতি
নিবাও নিশার নীরে ;
হে-মাের বন্ধু, আমার রাতের গীতি
তােমার আসার পুলকের তীরে-তীরে ;
হে-মাের স্বপ্নী, আমার বেদনা-গুলি
তােমার ডানায় কাকলির তলে সার্থক হবে দুলি’!
১৪১
স্বপ্ন-ছবি
সােনার হংস, সহসা মেঘের আলাে
ঝলকি উঠিছে এবে ;
কঠিন আঘাতে ভেঙেছে নিবিড় কালাে :
আহা সুসময়!-পথ তব চিনে’ নেবে।
মাের দুটী বাহু বাতায়ন ছাড়ি’ মেঘে :
জানিনা, কি-আসা আসিছে। এখন তােমার অগ্নি-বেগে।
কে-তুমি
কে-তুমি আমার পাশে ?
সন্ধ্যা-নিভৃত বীথিকায়
অলস নয়ন দুরে চায়
স্বপন-জড়ানাে লালসে,
পূর্ণিমা-চঁদ উদিছে যেখানে হরষে ।
কে-তুমি নবীন অতিথি,
নীরবে ধরেছে দুটী হাত,
করেছে। কোমল আঁখি-পাত ।
-জানিনা তােমার কি-রীতি।
জানিনা, কি-গানে জাগায়ে তুলিবে কি-স্মৃতি।
তাপস, কি-তব সাধনা ?
অস্ত-তপনে, মনে হয়,
তােমায়ে দেখেছি চিন্ময়,
তােমার উদার প্রেরণা,
আমার পুলকে তােমার জীবন-যাপনা।
১৪৩
স্বপ্ন-ছবি
সাধক, সাধনা-একাকী।
আমার জীবন শত-ধারা,
তােমার বরণে হয়ে’ হারা
যুগে-যুগে পাবে সাড়া কি
কাছে আছো, তবু ভয়ে-ভয়ে আমি-যে ডাকি।
র
স্বপনের স্রোত সঁাতারি
এসেছে কখ, জানি নাই :
হৃদয়ে কখন, মানি নাই,
কূলে-কূলে ঢেউ আছাড়ি
চকিত করেছে সুপ্ত বেদনা বিধারি’
তুমি কি প্রাণের ভিখারী ?
আলােকের মতাে গলে যাই
তােমার চরণ-কিনারায়,
আনন্দ-যত নিঙাড়ি,
তুমুল আবেগে ক্ষণে-ক্ষণে মােরে বিদারি’!
* *
জীবন উঠেছে জ্বলিয়া!
অঙ্গুলি-ফঁকে আঁধারের
মাঝে বহে যারা আঁলােকের,--
আমারে নিয়াছে হরিয়া!
কে-তুমি বন্ধু, সহজে লয়েছ জিনিয়া?
বন্দিনী
এখানে রয়েছে। একা!
সােনার হংস সাদরে
আকাশে, ভূতালে, সাগরে,
অদূরে যেতেছে দেখা :
তােমার নূপূরে বাজেনি এখনাে তাদের কাকলি-রেখা ?
*
তোমার ভাবনা-রাশি
ব্যাকুল প্রয়াস বিফলি।
কালের তুফানে বিকলি’
দেশের পুলিনে ভাসি’
তােমার কাতর, পীড়িত বক্ষ দারুণ যেতেছে ত্রাসি’!
হৃদয়ে বিপুল ব্যথা
কামনার রঙে বিহরি’
অসম শিহরি’-শিহরি’
জানালাে যে বিকলতা।
সুন্দরী, আজ কার পানে চাবে বহি মমের কথা?
১৪৫
স্বল্প-ছবি
=
হৃদয় কত-কি সহে!
যে-আঘাত আজো লাগেনি,
যে-পুলক আজো মরেনি,
তােমারে সতত দহে :
ভ্রান্ত বিশ্বে যে-আশা ভ্ৰমিছে, তােমার হৃদয় বহে।
রুদ্ধ তোমার গৃহ।
তােমার কম বাধিছে,
তব সাথে বাদ সাধিছে :
তাদেরে মুক্তি দিয়াে :
গােধূলি-রঙের শেষ অবকাশ আপনার প্রাণে নিয়ে।
বাতায়নে আছো বসে’ :
সমুখে লয়েছে আরশি,
বাঁধিছো চিকুর সরসি’;
দু’-একটী গেছে খসে’ :
দেখনিকি তুমি, সুদূরের মেঘ আঁধারি’ মুকুরে পশে !
পড়েছে চপল ছায়া
অধিয়া তােমার নয়নে,
ধাঁধিয়া তােমার স্বপনে,
রচিয়া অন্ধ মায়া ;
তােমার মাঝারে অন্ধ আবেগ পেয়েছে চরম কায়া।
শল্প-ছবি
১৪৬
বাহিরে তারকা-দলে .
সােনার পাখায়-পাখায়
জীবন-মৰূর্ণ বিছাই’
পরস্পরের কোলে
আঁধারের তীরে পরম সােহগে অধীর যেতেছে গলে’!
সুন্দরী, তুমি হেথা
চিরদিন রবে একাকী
বহি’ আপনার ব্যথা কি
মনে-মনে যেথা-সে ?
ভুলে যাবে শেষে তুমি বিশ্বের,তোমারে ডেকেছে
বন্দিনী, আমি দ্বারী ।
চাবী দাও মােরে নিভৃতে ;
খুলে দেব দ্বার নিশীথে ;
ধরার সীমানা ছাড়ি
চলে যাবে কোন উযার গগনে মােরা দুটী নর-নারী !
নিঃসঙ্গ, ঐ উদাস, অলস পক্ষ বিছায়ে গেলাে কে, হেথা, কোথা হতে কোন্-খানে ? মাের ক্লান্ত নয়ন দূরে-দূরে ঘুরে’ চেয়ে থাকে, কিবা জানে! দূর প্রবাসী পাখার ধূসর, মন্দ আলােকে, এই জল-তল তন্দ্রিল কত বিবশ, কাতর সঞ্চার বহি’ অসহায় ক্রন্দিল । মাের নর্মের কোলে দোলা দিল কোথা চির-রবি-হীন দূর-কিনারের আশা; ক্ষণে বন্দী এ-প্রাণ খােলা ছিল সেথা, যেথা উড়ে যাবে শান্ত পাখার ভাষা। তবু নাহি জানি, মাের ব্যথাগুলি তারে কিবা পরশিল! । হেথা পাশে আছে বসে আমনা তুমি, ওগাে কে, মাের বিস্মৃত দিনগুলি ঐ দূর-আকাশের তারকায় গাঁথি’ আজি এ- নিশীথে খুলি’ ? মাের ভােলা-দিবসের তুচ্ছ ব্যথার চমকে হায় ! ভুলে গেছাে তুমি সব : যেন হাজার তপন অন্ধ করেছে নয়নের উৎসব। }
বল্প-ছবি
১৪৮
ভব
চরণ-আঘাতে জল-তুল
বুথা কল্লোলি’ কঁাদে আপন তীরের আশে :
মাের বিকল, আতুর আঁখি-জল
বৃথা ব্যাকুলিয়া ঝরে তােমার প্রাণের পাশে :
নাহি জানি মাের ব্যথা-গুলি, তব ফুটালো কি ফুল-দল।
হায়! তােরা আন্না, আমি চিরদিন অলখে,
নাই মাের তরে অবকাশ !
মাের মন্থরগতি শূন্য প্রহর থাক্ তবে বারো মাস !
তবু তােমাদের ধীর, জানা-নাহি-যায় পুলকে
যবে সরােবর উঠি কঁাদে,
মাের স্বপ্ন-বিহীন নিঃস্ব জীবন বুকে-বুকে তারে বাঁধে!
মাের চিরকাল বুধা-কম্পন,
যেন, বায়ু-হিল্লোলে তরু-শিখরের শাখা।
মাের চিরকাল বৃথা-ক্রন্দন :
মাের স্বপনের তীর ঘুমের আঁধারে ঢাকা ।
আজ তাই জানি, মাের তরে শুধু বুক-চাপা নির্জন !
ছায়া-সরােবর
মাের সরােবর যুগে-যুগে বুকে আঁকড়ি’ ছায়া
আলস-ক্লান্ত চাহিয়া রয়েছে দিবস-নিশি!
দূর-ট-বনে গর্জন-গুরু, নিবিড়-কায়া
মেঘেরা বিফল কবে ফিরে গেছে আঁধারে মিশি
কোনাে সঞ্চার আনেনি সাঁঝের ভাষা
মমের মাঝে বিদারি’ বিপুল আশা :
ঊষার আলােকে তােলেনি উতলা ঢেউ :
বন-মমরে পশেনি কখনাে কেউ।
শুধু দিন-রাত ছায়া-ছবি বুকে আলসে-হারা,
কল্লোল-হীন স্বপ্নের ধ্যানে বিকল, হায়!
ওড়ার আবেগে গগনের পথে চলিলে তারা
মাের-সরােবর চলে-যে-ছায়ায়, কাতর চায় !
-
৭
আজিকে আবার সরােবর-পারে রুদ্র-কায়
বর্ষার মেঘ বিষাণে তুলেছে তীব্র সাড়া :
তােমার প্রলয়-ডানার আঘাতে রাখাে সে-মায়া,
দিয়ােনা নিশায় চকিতে উধাও হইতে হারা।
সােনার হংস, বর্ষা-মেঘের ধারে
তৰ আনন্দ দুর্বার সঞ্চারে
গল্প-ছবি
খুলি’ দিবে দ্বার অকাতর বর্ষণে :
হিল্লোল মাের জাগিবে অসাড় মনে ;
কুলে-কূলে জল উথলি উঠিবে অমিত বেগে
গহন বনের অন্তর ভেদি চপল গানে :
ছন্দ ও ছবি একাকার হয়ে মাতিবে জেগে’
প্রলয়-সাঁঝের কূল-হারা আশা-নিরাশা-পানে।
* *
1
সােনার হংস, প্রলয়-রাতের অতিথি তুমি,
সৃষ্টি প্রভাতে শান্ত আলােকে যেয়ো না চলি’ :
মাের সরােবর চিরদিন রবে পক্ষ চুমি
সঙ্গীতে তব সঞ্চারে মৃদু নিভৃতে গলি’!
মাের-সবােবর অতল-আলিঙ্গনে
দোলা দিবে তোরে অনন্ত 'নজনে
তােমার স্বপ্ন নিবিড় পড়িবে ঝরি’
সােনার কিরণে নৃত্য-চটুল করি।
সােনার হংস, দূরে যেতে’ তব কেন এ-সাধ?
তােমার-আমার জীবন সফলি’ উঠিবে নাকি?
সন্ধ্যা-প্রভাতে তােমার বিজন আশীর্বাদ
জীবনে আমার ফক্ ছায়ারে সুদূরে রাখি।
+
কুলায়
প্রলয়-রাতের প্রাঙ্গণে তাের কুলায় :
সেথা আয়রে পাখী, আয়রে, তুই অয় !
আপনাকে তাের ভুলে-যাওয়ার পালা :
স্বপ্ন আগুন-জ্বালা !
আয়রে, ডানায় ভাঙুরে বন-ছায়ায় !
ফুল যে ফুটে’ ডাকে ব্যাকুল ফাগুনে,
ফাগুন এসে চলে সেথায় নানে
হাজার ফুলের হাজার পাপড়ি-নাড়া,
ব্যস্ত, বিকল সাড়া,
আপনাকে তা’র লুটিয়ে দিতে’ ডানায় ।
!
রাতের পারে নবদিনের রচনায়
যে-মেধ চলে সাঝের রাঙা বেদনায়,
তুফান-ভাঙা নদীর আশা-গুলি
অবহেলায় ভুলি’,
আসে ত তােমার লাগি হাওয়ায়।
সপ্লছবি
১৫২
বর্ণে, গানে, গন্ধে গাঁথা কুলায়’
সব-অবসান স্বপ্ন চোখে দুলায় :
যে-আসে সেই ফসল জ্বালায় তার
রুধি’ কালের দ্বার :
আয়রে ত্বরা টুটি ধরার মায়ায় ।
।
ব্যর্থ
সুন্দরী বন্দনী,
দুর্গ-দুয়ারে ছড়ায়ে আঁচল
বসে-বসে’ তুমি হলে চঞ্চল :
চির-পরিচিত আঁধারের পথে বাজে তব শিঞ্জিনী :
ত্বরিতে, তরাসে, অভিমানে, নিরাশায়
হায়! আজো বৃথা বেলা যায়।
সাঁঝের আলােক কঁপে
সােনার মুকুরে, যেথা দিনমান
দেখেছে আপন মুখখানি ম্লান,
দেখেছাে তােমার কালো কেশ-ভার সহসা নয়ন ঝাঁপে।
আপনারে দেখা,হবে নাকি কভু শেষ ?
হেরাে, সন্ধ্যা ঘনালা বেশ!
শঙ্কিত ক্রন্দন .
**
তােমার অধরে দ্রুত সরি’
ডুবে যায়, যেন ভরা-পালে তরী
অস্ত-আলােকে রাঙা দিগন্তে অসহায় নিজন।
নিশীথের তারা সাঁঝের আলােকপারে,
ছবি
১৫
শোনােনিকি তার রথ ?
রথ-শিখরের বাজে কিকিনী,
অসি-ঝঙ্কারে মিশায় কাহিনী :
বাতাসে ঘনায়ে’ ভেসে আসে ধ্বনি ভাঙি পথ-পর্বত।
সুদূরে, আকাশে দেখনিকি তার ধ্বজা?
ভার হল তব বােঝ।
পাষাণ-প্রাকার-নীচে
পথ-'পরে জমে আছে যত ধূলি,
বর্ষণ, হাওয়া গেছে,—গেছে ভুলি’!
শুধু দিন-রাত চেয়ে'-চেয়ে আছে দূরের চাকার পিছে।
সােনার মুকুরে আপন আঁখির তলে
আপনার ছায়া বলে!
বথ তার আসে বেগে !
এত কাছে তব রয়েছে দুয়ার!
ধূলায়, আঁধারে হ’ল একাকার।
সহসা কুয়াশা-নিবিড় তিমির বরণ মুছিল মেঘে !
নিমেষে সে-রথ আকাশের কিনারায় ;
তবু তুলিলেনা মুখ হায় !
T
সপ্ন-ছবি
বন্দিনী, হায়! হায়! ·
মােনার মুকুর, আড়াল ধূলার
বৃথা করে দিল জীবন দোহার।
দিবস, রজনী বাঁধা-পথে এসে বারবার ফিরে যায়।
জানিনা কখন, কতনা যুগের শেষে
তােমার রজনী দিবসে তাহার মেশে।
সন্ধ্যার দেশে
যেতে-যেতে তুমি কেন
বনের আড়ালে সন্ধ্যা-গগনে হেন
দাড়ালে শ্রান্ত,—কাতর জাঁখির জলে ?
হাজার চাহনি তোমার আঁখির তলে
জ্বলেনিকি কভু নিবিড় ধ্যানের মাঝে
সব-অবসানে নিঃশেষে নিতে প্রাণের নগ্ন সাজে ?
হাঁসেরা গিয়াছে চলে’ :
বনের কুসুম ঝরেছে মাটীর কোলে।
হাজার যুগের দুঃখ-সুখের গানে
তােমার আঁচলে শঙ্কিত পাখা হানে।
তুমি অসহায়, ফিরিবারে চাও পিছে ?
কঠিন আঁধার প্রতি রজনীর তারায় সমর্পিছে ।
সহসা উদাস তুমি ?
ডাকেনিকি তােরে সমুখের বনভূমি ?
তোমার চরণে কম্পিত শাখা-দল
দেয়নিকি ঢেলে’ চঞ্চল ফুল-ফল?
সার নানীর ঈদ ব্যাকুলতা
উন্মুখ হয়ে তব সঙ্গীতে কয়নিকি কোনাে কথা।
।
১৫৭
পাহৰি
সহসা উতলা হাওয়া
আঁধারিল তৰ সমুখে পথ-চাওয়া।
বন হতে বনে সঞ্চরি’ দ্রুততায়
কুমে, অলকে তােমার নয়ন ছায়।
অস্ত-বির পার হতে ব্যথা জাগে,
নমরে, রঙে তােমার হৃদয়ে ব্যস্ত শরণ মাগে!
নির্জন গৃহ মাের :
চিরকাল সেথা আঁধার প্রলয়-ঘাের :
তব মূৰ্তির, ভীষণ অগাবে তার,
পলাতকা স্মৃতি কঁদিছে বারম্বার :
তােমার নূপুর মূখর প্রসাদ ঢালি’
সহসা নীরব হয়েছে, আমার স্বপনে করেছে খালি।
বিরহিনী, কোথা ঠাই ?
কবে---একদিন তােমার পরশ-ছায়
আমার এ-গৃহ হয়েছিল সার্থক
কুসুমে, আগুনে,-তুলিয়া দুঃখ-শােক।
আজি রজনীর তিমিরের আঙিনায়
পশ্চাতে তব রহিয়াছে পড়ে ভাষা-হীন নিরালায়।
দুড়ে দাও ব্যথা-ভার,
ভুলে যাও মােন মমের হাহাকার !
অল্প-ছবি
১৫৮
স্যার দেশে প্রলয়ের বাঁশী জাগে :
তােমার নূতন প্রভাতের তীরে লাগে
সঞ্চার-তা’র পাখার গানের সাথে ;
সুখ-দুঃখের স্মৃতি মুছে ফেলে আসন্ন এই-রাতে।
সার্থকতা
ঝড়-বরষার উন্মাদ খেলা-শেষে
ভ্রষ্ট কুসুম যেখানে ধুলায় মেশে
নিবিড় মেঘের আঁধারে,
সােনার স্বপনে সহসা-চপল শাখা
ফুটালে কুসুমে প্রভাত-বহ্নি-আঁকা :
তােমার গল্প শিথিল হাওয়ায় ভেসে
জাগলাে আবার তাহারে।
তােমার অচল ঊষার আশার মতো
চমলি তার হৃদয়ে প্রণয়ে-নত,
ভুলালাে সকল ভাবনা :
প্রতিদিন তার শাখার কঁাদন-পারে
প্রলয়কা নিভৃতে কয়েছে তারে
‘জন তব মাের লাগি” বুঝি যত :
শেষ হক তবে সাধনা।
ৰু ৰাৰবার ফিরায়ে দিয়েছে তারে
s= বা পথের ধারে,
স্বল্প-ছবি
নিত্য-নূতন জনমে
তােমার উদার করুণা-প্রসাদ লভি
তা’র প্রত্যহ জীবন, মরণ,সবি
অর্পিছে মৃদু টলােমলল সঞ্চারে,
তােমার চরণে প্রণমে!
শত জীবনের প্রস্ফুট শত-দল
লও, তুলে লও, বুকে ধরে অচপল,
যেয়ােনা উদাস আলসে :
তা’র সুখ-দুখ সার্থক হ' আজি
চরণে-চরণে করুণ, কোমল বাজি',
কর-পল্লব ভুলে’ যদি করে ছল,
তোমার পরম পরশে !
»
যাওয়া-আসা
বর্ষা যখন নেমে আসে
এই-পথ-প্রান্তের
আমাদের কুটীরের
আধখোলা দুয়ারের পাশে,
বিদ্যুৎ ভেঙে যায়,
তোমাদের পাখা ছায়
অশ্বৰে সঞ্চারি ত্রাসে।
দুর্যোগে জাগে কত কাহিনী ।
পথ-ঘাট একাকার
ভেসে যায়, নাহি পার,
উড়ে যায় তােমাদের বাহিনী।
তন্ত্র-কাতর রাতি জাগে।
উম্মাদ, অস্থির
টলোেমলাে ধরণীর
তীরে, মেঘে ঢেউ এসে লাগে :
সহসা কেতকী, নীপ
লে’ দেয় ফুল-দীপ
ধূসর উষার পুনােভাগে।
স্বপ্ন-ছবি
১৬২
=
ফান যবে শেষ থামে
এই-পথ-প্রান্তের
আমাদের কুটারের
খুলে’-যাওয়া দুয়ারের বামে,
সঙ্গীত মেঘে লীন
ক্লান্ত মলিন ক্ষীণ
তােমাদের পাখা ধীরে নামে।
আমরা তােদর শেষ-কাহিনী।
কলনে নিরালায়
ধূলার আড়ালে, হায় ।
ওড়ে ফের তােমাদের বাহিনী।
রুক্ষ দিবস ছিল চাহি
কঠিন নয়ন-জলে
ধরণীর হৃদি-তলে,
তিমির-রজনী কবে বাহি’!
ধরণীয় অঞ্চল
ভয়ে ঝরা ফুল
আঁধারে আপন আর নাহি।
।
1
অবসান
শ্রান্ত আজ স্বপ্নের স্পন্দনে,
হৃদয়ের ব্যর্থতার অন্তহীন বিদ্রোহী ক্রন্দনে!
স্বপ্নের শঙ্কিত লােক ডুবে যায় চক্ষের পলকে
রক্ত দিগন্তের তলে : সায়াহ্নের স্তিমিত আলােকে
দু’টা পূর্ণ স্বর্ণ শস্য-কণা, যা পেয়েছি এতদিনে,
ধরে আছি কন্দ্র হাতে, জীবনেরে শেষ প্রসারিয়া,
বিস্তারিয়া মত্ত আশা চারিধারে,-আকাশে, বিপিনে
নিরের বক্ষ বিদারিয়া।
উড়ে গেছে সন্ধ্যার বলাকা;
ঝরে গেছে গােধূলির মেঘ ; বিবর্ণ হয়েছে শাখা;
অরণ্যের, সমুদ্রের কোলে ঘনায়েছে ছায়া-স্তর ;
বিশ্বের ক্রন্দন ক্ষুব্ধ নেমে গেছে কম্পিত, মন্থর :
সিন্ধুর বিজয়-শঙ্খ ফুকারিলে কেন অকস্মাৎ,
অসময়ে,-তরঙ্গে তরঙ্গ তুলি’ চেয়ে আকাশে,
বর্ণ-হীন, গন্ধহীন তটে হানি’ প্রচণ্ড আঘাত
তন্দ্রা ভাঙি’ সঞ্চারিয়া ত্রাসে ?
।
*
জ্বলে নাই প্রদীপ আমার :
শ্রান্তদেহে, সুস্ত মনে জীবন-মৃত্যুর হাহাকার
কত-বার-পরিচয়ে ; অশান্ত, উন্মাদ চক্ষে জ্বলে
নির্জন-প্রাঙ্গণে শুয়ে প্রজ্বলন্ত দূর নভঙ্কলে
স্ব-ছবি
এত-ক্ষণ-চাহিবার সকরুণ, ভীষণ উদার,-
আবর্তিয়া, উখিয়া নিরালার তুচ্ছ দুঃখ-সুখে :
হে প্রশান্ত, জীবনের দ্বার-দেশে অগাধ, অপার
তােলাে কেন প্রলয়-কৌতুকে ?
জন্মে-জন্মে তব প্রতীক্ষায়
ছিনু বসে’ পথ-পার্শ্বে, গিরিশৃঙ্গে, অরণ্যের ছায়,
তরঙ্গের আলিঙ্গনে, গ্রহে-গ্রহে, সন্ধ্যার বরণে,
পুঞ্জীভূত বরষায় সঙ্কুচিত মেঘের মরণে
বিরহীর মুক্ত বাতায়নে, শ্যাম, তপ্ত মৃত্তিকায়,
তরুদল মুঞ্জরিছে বেথা অসম স্পন্দনে মাতি',
বায়ুর হিল্লোল-অঙ্কে, স্বপনের কোমল ধারায়
কামনার স্বর্ণাঞ্চল পাতি।
আজিকে নামুক অবসান,
হে বিদেশী ! থেমে যা জীবনের-মরণের গান :
নির্বিকার শান্তি তব, আমার অশান্ত ব্যথা-সাথে
লভুক নিৰাণ চির : দিনে-রাতে, সন্ধ্যায়-প্রভাতে
যে-অগ্নি রেখেছি আহরিয়া, জ্বলুক অনন্ত চিতা
দোহাকার একসাথে:মৃত্যুনাশা, অমর অতিথি,
ধ্যানমগ্ন বিশ্ব এবে পার্শ্বে বসি” উচ্চারিছে গীতা :
ভয়ে উড়ে যায়, যাক স্মৃতি।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.