Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Merry Carpenter

Mitra,kumudini · 2010/01/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মেরী কাপোস্টার।
কুমুদিনী মিত্র বি, এ,
প্রীত।
দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু কর্তৃক
প্রকাশিত।
ব্রজ সৎ ৭৮।
মূল্য।• আনা মাত্র।

কলিকাতা ৬নং কলেজ স্কোয়ার সাম্য-ৰঞ্জে, সেখ আবদুল লতিফ দ্বারা মুদ্রিত।

No text on this page.

No text on this page.

তস্মিন্ প্রীতিন্ত প্রিয়কাৰ্যসাধনঞ্চ
তদুপাসনমেব।”
“তাহাকে প্রতি করা এবং তাহার প্রিয়কাৰ্য্য সাধন
করাই তাহার উপাসনা।”

No text on this page.

উৎসর্গ। পরম পূজনীয়া মাতা ঠাকুরাণী শ্রীচরণেষু মা, নারী-জীবনের লক্ষ্য যাহা, বাল্যকাল হইতে তা তােমার নিকট শুনিতেছি। চির দিন যে আদর্শের কথা বলিতেছিলে, মেরী কার্পেন্টারের জীবনীতে তাহা পাই- লাম। ভক্তির সহিত সেই পুণ্যজীবনী তােমাকে অর্পণ করিয়া কৃতার্থ হইলাম। ১৫ই জুন, সেবিকা কুমুদিনী

No text on this page.

ভূমিকা। মেরী কার্পেন্টারের ভ্রাতুস্পুত্র এসৃলি কার্পেন্টার মহা শয়ের লিখিত জীবন-চরিত যখন পড়ি, তখন মনে হইয়া- ছিল যে, কেহ যদি মেরী কার্পেন্টারের সেই জীবনচরিত, খানি বাঙ্গালাতে অনুবাদ করিয়া প্রকাশ করেন, তাহা হইলে এদেশীয় নারীগণের মহােপকার হয়। তৎপরে অনেক শিক্ষিত মহিলাকে মেরী কার্পেন্টারের জীবন- চরিত পঁড়িতে অনুরােধ করিয়াছি। যে দিন গ্রন্থকী এই প্রবন্ধটী “মেরী কার্পেন্টার’’ হলে পাঠ করেন, সে দিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তখন আমি তাঁহাকে ইহা পুস্তিকাকারে মুদ্রিত করিতে অনুরােধ করি। আমার অনুরােধে তিনি ইহা মুদ্রিত করিতেছেন। ঈশ্বর করুন, তাঁহার এই উদ্যম ও চেষ্টা সুফল প্রসব করুক। মেরী কার্পেন্টারের এই জীবনচরিতখানি সংক্ষিপ্ত বটে, কিন্তু ইহা পাঠ করিলে এদেশীয় নারীগণ বিশেষ উপকৃত হইবেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। “মানবের সেবাই ঈশ্বরের সেবা”- মেরী কার্পেন্টারের জীবন রামমােহন রায়ের এই মহা- বাক্যের কি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থল। ধন্য এরূপ নারীর দার্জিলিং, } শিবনাথ শাস্ত্রী। ৩০এ মে, ১৯০৬।

No text on this page.

মেরী কার্পেন্টার । ঘ জনহিতৈষিণী, মনস্বিনী মহিলা এই পৃথিবীতে আসিয়া ইহাকে ধন্য ও উন্নত করিয়া গিয়াছেন, যে রমণী- কুলশিয়ােমণি, পরার্থে আত্মবলিদান এবং জাতি ধৰ্ম্মনিধ্বি- শেষে দশের ও দেশের কল্যাণ কামনায় জীবনােৎসর্গ করিয়া ত্যাগস্বীকারের জ্বলন্ত দৃষ্টান্তস্বরূপা ও লােকশিক্ষার আদর্শ- রূপিণী হইয়া রহিয়াছেন, যিনি দীর্ঘকালব্যাপী অজ্ঞান- তিমিরাচ্ছন্না চিরাবরুদ্ধা ভারত ললনাদিগের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী-শ্রবণে দরবিগলিত হইয়া ভারতে আগমনপূর্বক স্ত্রী-শিক্ষাবিস্তারের জন্য প্রভুত ক্লেশ স্বীকার করিয়াছিলেন —সেই প্রাতঃস্মরণীয়। পুণ্যশ্লোক বরণীয় রমণীর চরিলাে- চনা পরম শিক্ষারস্থল। সেই স্বার্থত্যাগিনী পুণ্যবতী মহিলার কর্মময় জীবনের ঘটনাবলী অধ্যয়ন করিতে করিতে শরীর মেরী কার্পেন্টার । রােমাঞ্চিত হইয়া উঠে। তাহায় সঙ্কল্পিত ব্ৰত উদ্যাপন করিতে যে, কি কঠোর পরিশ্রম, অনন্যসাধারণ ত্যাগ- স্বীকার এবং অলােকসামান্য সহিষ্ণুতা অবলম্বন করিতে হইয়াছিল, তাহা বর্ণনাতীত। সেই পূতচরিত্রা, সংসার- সন্ন্যাসিনী, মহীয়সী মহিলার নাম “মেরী কার্পেন্টা।” জন্ম ও শৈশব শিক্ষা। মেরী কার্পেন্টার ১৮০৭ খৃষ্টাব্দে ৩রা এলে ইংলণ্ডে অন্তর্গত এক্সিটা (Exeter) নগয়ে শৈশব ও শিক্ষা। জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা ডাক্তার ল্যান্ট কার্পেন্টার (Dr. Lant Carpenter) এই নগরের ধর্মাচাৰ্য্য ছিলেন। তাঁহার মাতাও অতিশয় ধৰ্মশীলা নারী ছিলেন। পিতা মাতা হইতেই তিনি তাহার ধর্মপ্রবণা প্রকৃতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অসাধারণ স্মরণশক্তি এবং প্রখরা বুদ্ধি থাকাতে, শৈশবে তাহার বিদ্যাশিক্ষা অতি সহজসাধ্য এবং দ্রুত হইয়াছিল। পরজীবনের কাৰ্যকুশ- লতা এবং জগতের প্রয়ােজনে নিযুক্ত হইবার আকাঙ্ক্ষার অঙ্কুর অতি শৈশবেই দেখা গিয়াছিল। তিনি দুই বৎসর বয়সে যখন পিতার সহিত ভ্রমণে বহির্গত হইতেন, তখন ক্ষেত্রে কৃষকদিগকে পরিশ্রমে নিযুক্ত দেখিয়া শৈশবের আধ

মেরী কার্পেন্টার।
আধ ভাষায় বলিতেন “I want to be useful, I want
to be useful” অর্থাৎ আমি কাজের লােক হইতে চাই ।
পিতা যতক্ষণ না তাহাকে কোন কাৰ্য্য করিতে দিতেন,
ততক্ষণ শান্ত হইতেন না। তিন বৎসর বয়সেই ধর্মভাব
তাহার হৃদয়ে অতি আশ্চৰ্য্যরূপে অঙ্কুরিত হইয়াছিল।
বাল্যকালেই পিতার পরােপকারপ্রবৃত্তি পূর্ণরূপে তাহার
হৃদয় অধিকার করিয়াছিল। তিনি বার বৎসর বয়সে তাঁহার
পিতার রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ে বালকবালিকাদিগকে শিক্ষা
দিতে আরম্ভ করেন ; এই অল্প বয়সেই বালকবালিকাদিগের
উপর আশ্চর্য্য প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। এক দিকে
যেরূপ পিতার কাৰ্য্যে সহায়তা করিতে আরম্ভ করেন, অন্য
দিকে স্কুলে লাটি ও গ্রীক ভাষা এবং গণিত,প্রাকৃতিক
বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা অধ্যয়ন করিতে থাকেন ; ভূবিদ্যা এবং
বিজ্ঞানের সহজ তত্ত্বগুলিও এই বয়সেই আয়ত্ত করিয়া
ফেলিয়াছিলেন। তাঁহার সহধ্যায়ী মহাত্মা ডাক্তার মার্টিনন
(Dr. Martineau) বলিয়াছেন,-“আমি সর্বপ্রথমে যখন
কুমারী কার্পেন্টারুকে দেখি ; তখন তাহার বয়স বার
বৎসর। এই অল্প বয়সেই তাহার গাম্ভীর্য এবং ধীরতা
দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হই। তাহার সম্মুখে আসিলেই
নিজেকে কত হীন মনে হইত ; যখন তাহার সহিত কথা

মেরী কার্পেন্টা। ; বলিতাম, তখন নিজের জ্ঞানের অল্পতা বুঝিতে পারিতাম।” ১৮১৭ খৃষ্টাব্দে তাহার পিতা খ্রিষ্ট নগরে স্থানান্তরিত হন। শৈশবের ক্রীড়াভূমি এক্সিটার পরি- শিক্ষয়িত্রীর কার্য্য। ত্যাগ করিতে তঁাহার তরুণ হৃদয়ে অতি আঘাত লাগিয়াছিল ; কিন্তু, এই ব্রিষ্ট নগরেই তাহার পর-জীবনের মহং কাৰ্য্যাবলীর সূচনা হয়। ১৮২৭ খৃষ্টাব্দে তিনি কয়েকটি বালিকার শিক্ষাকার্যের ভার লইয়া ওয়াইট দ্বীপে গমন করেন। তৎপরে বিদেশ-ভ্রমণে বহির্গত হন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া তিনি তাঁহার পিতার স্থাপিত বিদ্যালয়ে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন। এই কাৰ্য্যে তাহার মাতা ও ভগিনী তাঁহাকে সাহায্য করেন। পূৰ্বে তঁাহার পিতাই এই বিদ্যালয়ে প্রধানতঃ শিক্ষা দিতেন; কিন্তু, এই সময় হইতে তিনি শিক্ষকতা পরিত্যাগ করিয়া ধৰ্ম্মাচার্যের কাৰ্যেই সম্পূর্ণরূপে নিযুক্ত হন। তৎপরে ১৮৩১ খৃষ্টাব্দে মেরী কার্পেন্টার রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের সুপারিন্টেণ্ডেন্টের পদ গ্রহণ করিলেন। এই সময়ে তাহার ছাত্রদের তত্ত্বাব- ধান উপলক্ষে তাহাদের গৃহে গমন করিয়া, এই সকল দরিদ্র এবং অজ্ঞান বাকদিগের দুর্দশা উপলব্ধি করেন। ঈশ্বর চঁহাকে যে মহৎ কার্যের জন্য এ তে প্রেরণ ; ৪ মেরী কার্পেন্টার। করিয়াছিলেন, তাহার ভাব এখন হইতে তাহার প্রাণে উদিত হয়। পাপে, তাপে, দারিদ্রে নিপীড়িত স্বদেশ- বাসীর দুঃখ দূর করিতে তিনি কৃতসঙ্কল্পা হন। তাহাদের অজ্ঞন-অন্ধকারাচ্ছন্ন শােচনীয় অবস্থা তাহার কোমল প্রাণকে বিগলিত করে। তিনি তাহার জীবনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করেন এবং সর্বশক্তিমান্ পরমেশ্বরের নিকট বল ভিক্ষা করি পরার্থে আত্মবিসৰ্জন করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। কিন্তু কি ভাবে পরের জন্য আত্মােৎসর্গ করিবেন, কোন্ উপায় অবলম্বন করিলে, কি কাৰ্য্য করিলে, তাহার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে, তাহা তখনও দেখিতে পান নাই; তথাপি সঙ্কল্প পরিত্যাগ করেন নাই। ঈশ্বরই তঁাহার পথ প্রদর্শন করিবেন, এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করিয়া তিনি প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। মেরী কার্পেন্টারের চরিত্রে এই একটি প্রধান গুণ ছিল যে, যাহা একবার মহৎ বলিয়া, সত্য বলিয়া ধরিতেন, শত বাধা বিপত্তি তাহা হইতে তাহাকে বিচলিত করিতে পারিত না। আত্মােৎসর্গের এই ভাবকে সবল করিবার জন্য তিনি এই সময়ে মহৎ জীবনাবলী অধ্যয়ন করেন। ঈশ্বর তাহার প্রার্থনা আশ্চৰ্য্যরূপে পূর্ণ করিলেন এবং জীবনের কার্য্য দেখাইয়া দিলেন।

মেরী কার্পেন্টার। মহাত্মা রাজা রামমােহন রায় ডাক্তার টকাম্যান। “ক্ষণমিহ সজ্জনসঙ্গতিরেকা। ভবতি ভবার্ণবতরণে নৌকা। • এই মহাজনবাক্য মেরী কার্পেন্টারের জীবনে সম্যক্‌- রূপে প্রতিফলিত হইয়াছিল। তিনি পরার্থে আত্ম-বিসর্জনে প্রস্তুত হইয়াছিলেন বটে; কিন্তু, কোন্ পথাবলম্বন করিলে শ্রেয়ঃ হইবে, তাহা তখনও অবধারণ করিতে পারেন নাই। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া মহাদুশ্চিন্তার মধ্যে দিন অতি- বাহিত করিতে লাগিলেন। পর বৎসরে (১৮৩৩ খৃষ্টাব্দে) প্রাতঃস্মরণীয় মহাত্মা রাজা মহাত্মা রাজা রামমােহন রায় এবং আমেরিকার জন- রামমােহন রায়। হিতৈষী ডাক্তার টাম্যান্ (Philanthrophist Dr. Tuckerman) ইংলণ্ডে গমন করেন। এই দুই মহাপুরুষের সংসর্গে আসিয়া তাহার কার্যকারিণী শক্তি বিকাশ প্রাপ্ত হইল। এই দুই মহাত্মা তঁাহার জীবনের গতি দুই দিকে ফিরাইয়া দিলেন। রাজা রামমােহন রায় ভার তের দিকে তাহার মনােযােগ আকর্ষণ করেন এবং

মেরী কার্পেন্টা।
ভাক্তা টকারম্যান অসহায় দরিদ্র অজ্ঞান বালক বালিকা-
দিগের সেবার জন্য তাঁহাকে বিশেষরূপে অনুপ্রাণিত
করেন। গত জীবনের শিক্ষা, ধৰ্ম্ম-বিশ্বাস, দৃঢ়চরিত্র
তাঁহাকে এই দুই কার্যের জন্য এই নবীন বয়সেই প্রস্তুত
করিয়াছিল। অজ্ঞানতিমিরাচ্ছন্ন ভারতের সেই শশাচনীয়
দিনে রাজা রামমােহন রায় সত্যের জন্য যে প্রকার
কষ্ট সহ্য করেন এবং যেরূপে সকল প্রকার কুসংস্কার, বাধা-
বিঘ্ন ছিন্ন করিয়া ইংলণ্ডে গমন করেন, তাহাতে মেরী
কার্সে-টারের হৃদয় তাহার প্রতি গভীর-শ্রদ্ধাবনত হয়।
রাজার ধৰ্ম্ম-বিশ্বাস, অপূৰ্ব স্বার্থত্যাগ মেরী কার্পেন্টারের
হৃদয়ে ভারতের দুঃখ দূর করিবার ইচ্ছা জাগরিত করিয়া
দেয়। ইহার ত্রিশ বৎসর পরে তিনি ভারতবর্ষে আসিতে
সমর্থ হইয়াছিলেন। রাজার মৃত্যুর পর মেরী কার্পেন্টার
রাজার সম্বন্ধে একটী অতি গভীরভাবপূর্ণ কবিতা রচনা
করেন। রাজার নশ্বর দেহকে যখন ষ্টেপ-সমাধি-
মন্দিরে প্রােথিত করা হয়, তখন ডাক্তার কার্পেন্টার সেই
কবিতাটি পাঠ করেন।
"Thy nation sat in darkness, for the night
Of pagan gloom was o'er it. Thou wast born
Midst superstition's ignorance forlorn ;
Yet in thy breast there glowed a heavenly light

মেরী কার্পেন্টার।
Of purest truth and love ; and to thy s ght
Appeared the day-star of approaching morn.
What ardent zeal did then thy life adorn,
From deep degrading guilt to lead aright
Thy fallen people ; to direct their view
To that bless'd Sun of Righteousness, whence beams
Guidance to all that seek it - faithful-true;
To call them to the saviour's living streams.
The cities of the East have heard thy voice :
'Nations, behold your God! Rejoice, rejoice !
Far from thy native clime a sea-girt land
Sits thron'd among the nations; in the breasts
Of all her sons immortal freedom rests;
And of her patriols many a holy band
Have sought to rouse the world from the command
Of that debasing Tyrant who detests
The reign of truth and love. At their behests
The slave is free ! and Superstition's hand
Sinks powerless. Hitherward thy steps were bent
To seek free commune with each kindred soul,
Whose highest powers are ever willing lent
To free their race from Folly's dark control.
To our blest isle thou didst with transport come :
Here thou hast found thy last, thy silent home,
Bright hopes of immortality were given
To guide thy dubious footsteps, and to cheer
Thine earthly pilgrimage. How firm and clear
Arose thy faith--that as the Lord hath risen,

মেরী কার্পেন্টা। So all His followers shall meet in heaven! Thou art gone from us; but thy memory, dear To all that knew thee, fades not: still wc hear And see thee yet as with us ne'er are riven The bands of Christian live ! Thy inortal frame With us is laid in hcly silent rest; Thy spirit is immortal, and thy name Shall by thy countrymen be ever blest. E'en from the tomb thy words with power shall rise, Shall touch their hearts and bear them to the skles. রামমােহন রায়, পৃথিবীর মনীষীদিগের মধ্যে অনন্যসাধা- রণ, ভারতের গৌরবস্থলবঙ্গের প্রাতঃস্মরণীয় মহাজন। তিনি ভারতের অতি দুঃসময়েই পৃথিবীতে আসিয়াছিলেন। কি ধৰ্ম্মনীতি, কি সমাজতত্ত্ব, কি রাজনীতি,—এমন বিষয় ছিল না—যাহার সংস্কারকল্পে তাহাকে হস্তক্ষেপ করিতে হয় নাই। এমন সৰ্ব্বতােমুখী প্রতিভা লইয়া অতি অল্প লােকই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। এমন সৰ্ব্বদেশ ও সৰ্ব্ব- লােক-মান্য মহাপুরুষের গুণাকৃষ্ট হওয়া কুমারী মেরী কার্পেন্টারের মত কোমল-হৃদয় পরােপকারিণী রমণীর পক্ষে স্বাভাবিক। মেরী কার্পেন্টার রাজার নিকট হইতে বহু সদুপদেশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন এবং “মানবের হিতকর কাৰ্য্য করাই যে, পরমেশ্বরের যথার্থ উপাসনা” তাহা রাজার চরিত্রে বিশেষরূপে উপলব্ধি করিয়াছিলেন এবং রাজার মেরী কার্পেন্টার। চরিত্রকে আদর্শ করিয়াই আপনাকে কৰ্ম্ম-সমুদ্রে ভাসাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি রাজার প্রতি তাহার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও প্রগাঢ় ভক্তির নিদর্শনস্বরূপ রামমােহন রায়ের একখানি জীবন-বৃত্ত লিখিয়াছিলেন। মেরী কার্পেন্টার প্রণীত জীবন- বৃত্ত খানি না থাকিলে আমরা রাজার সম্বন্ধে অনেক বিষয়ে অজ্ঞ থাকিতাম। ডাক্তার টকাম্যান্ ইংলণ্ডে আসিয়া ডাক্তার কার্পে- টারের গৃহে অতিথি হয়েন। মেরী ডাক্তাক্ টকাম্যান্। কার্পেন্টা ডাক্তার্টকারম্যানের সহিত একদিন কোন দরিদ্র পল্লীর মধ্য দিয়া গমন করিতেছিলেন, এমন সময় একটী অতি দরিদ্র অপরিচ্ছন্ন বালককে তঁাহা- দের সম্মুখ দিয়া দৌড়িয়া পলায়ন করিতে দেখিলেন। ডাক্তা টকাম্যান্ বলিলেন,-“এই বালকের পশ্চাদমুসরণ করিয়া ইহার বাসস্থান পৰ্যবেক্ষণ করিতে হইবে।” তখন তাহার এই উপদেশ যদিও কার্যে পরিণত হয় নাই, কিন্তু এই বাক্য মেরী কার্পেন্টারের হৃদয়ে বিদ্ধ হইয়া গেল, এবং তদ- বধি জীবনের একটা গুরুতর কর্তব্যের প্রতি মনােযােগ দেওয়া হইতেছে না, এই চিন্তা তাহাকে যাতনা দিতে লাগিল। এই চিন্তাই তাহার প্রাণে নব আকাঙ্ক্ষা, নব প্রতিজ্ঞা আনয়ন করে। ইহার ৩৬ বৎসর পরেও তিনি এই ঘটনাকে তাহার ১০

মেরী কার্পেন্টার।
জীবনের এক শুভ মুহুৰ্ত্ত বলিয়া স্মরণ করিতেন। তৎপরে
১৮৩৫ খৃষ্টাব্দে ডাক্তা টকাম্যানের উপদেশ-মতে দরিদ্র
ব্যক্তিদিগের গৃহ পরিদর্শন করিবার জন্য “ওয়াকিং এও
ভিজিটিংসসাসাইটী”(working and Visiting Society)
নামে এক সমিতি স্থাপিত হয়। ইহার সভ্যেরা কয়েকটি
জেলা নির্দিষ্ট করিয়া লইলেন এবং তন্মধ্যস্থিত দরিদ্র
দিগের নৈতিক এবং আর্থিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিতে
লাগিলেন। মেরী কার্পেন্টার ইহার সেক্রেটারি হইলেন।
তিনি কুড়ি বৎসরের অধিক কাল ইহার সেক্রেটারি ছিলেন।
যখন প্রত্যেক সভ্য কয়েকটি স্থান নির্দিষ্ট করিয়া লইলেন,
তখন মেরী কার্পেন্টা দরিদ্র-তম এবং অপকৃষ্টতম স্থানগুলি
পরিদর্শন করিবার ভার নিজের উপর লইলেন। এই
কার্যে তিনি নিম্নশ্রেণীর সমুদয় অবস্থা সম্পূর্ণরূপে অবগত
হন। এই ব্যক্তিদিগের জঘন্য অবস্থা কত সময় তাঁহার
মনে মৃণা এবং বিরক্তি সঞ্চার করিত, কত বাধা সম্মুখে
উপস্থিত হইত; কিন্তু, তিনি এ সকলই জয় করিয়া
কর্তব্য পথে স্থির রহিলেন। প্রায় দেড় বৎসর-পরে তাহার
কার্যের সুফল ফলিল। তাঁহার পরিশ্রম কিঞ্চিৎ সার্থক
হইল। এই সময়ের মধ্যেই কত ব্যক্তি অসাধুতা এবং
পানাসক্তি পরিত্যাগ করিয়া ঈশ্বরপরায়ণ হইয়াছিল, কত

মেরী কার্পেন্টা। বালকবালিকা পাপ-পঙ্ক হইতে উথিত হইয়া নীতিমান্ হইয়া ছিল। এই কাৰ্য ব্যতীত তিনি একটী দৈনিক বিদ্যালয় এবং রবিবাসরীয় বিদ্যালয় স্থাপন করিয়াছিলেন। আত্মশিক্ষা। এই সকল কাৰ্য্য তাহার জ্ঞানার্জনে কোন বাধা দিতে পারে নাই। এই সকল কাৰ্য্য ব্যতীত তিনি কাব্য, চিত্রাঙ্কণ, ভূবিদ্যা, শরীর-বিদ্যা মনােযােগের সহিত অধ্যয়ন করিতে থাকেন এবং ফিলজফিক্যাল্ ইনষ্টিটিউশনে (Philosophical Institution) অর্থাৎ দার্শনিক বিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তিনি যে সকল স্থানে ভ্রমণ করিতে যাইতেন, সে স্থান হইতে ভূতত্ত্বের নমুনা সংগ্রহ করিয়া আনিতেন। এ বিষয়ে প্রধান প্রধান পণ্ডিতগণের বক্তৃতা শ্রবণ করিতেন এবং তাহাদিগকে গৃহে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া গিয়া ভূতত্ত্ব- বিষয়ে কথােপকথন করিতেন এবং সংগৃহীত নমুনাগুলি দেখাইতেন। জ্ঞানলাভে এবং জ্ঞান প্রসঙ্গে তিনি প্রভূত আনন্দ পাইতেন। কাব্যের প্রতিও তিনি অনুরাগিণী ছিলেন। কিন্তু যে সকল কাব্যে এবং সাহিত্যে তাহার প্রকৃতিগত ধর্ম ও উচ্চতম নৈতিক আদর্শকে হীন করা হইয়াছে মেরী কার্পেন্টা। দেখিতেন, তাহার প্রতি তিনি অতিশয় বিরাগ প্রকাশ করিতেন। কবিদিগের মধ্যে একমাত্র ওয়ার্ডওয়ার্থকেই তিনি আদর্শ কবি জ্ঞান করিতেন। ওয়ার্ডওয়ার্থের প্রশংসাকারীও তাঁহার বন্ধু বলিয়া পরিগণিত হইতেন। তিনি দুই বার দুইটী বৃহৎ বিষয় লইয়া কাব্য রচনা করিতে মনন করেন। বাল্যকাল হইতেই জ্ঞানার্জন করিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করা, তাহার জীবনের একটি উচ্চ আকাঙ্ক্ষা ছিল। তিনি এ বিষয়ে এই সময়ে তাহার দৈনন্দিন লিপিতে লিখিয়াছিলেন, “যে সকল বিষয়ে আমার আত্মা পরিতৃপ্ত হয়, আমি সেই সকল বিষয় লিপিবদ্ধ করিয়া স্থায়ী ভাবে এ পৃথিবীতে রাখিয়া যাইতে চাই। কখন কখন আমার ইচ্ছা হয় যে, আমি যেন এমন কিছু রাখিয়া যাইতে পারি, যাহা আমার মৃত্যুর পর চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে এবং ভবিষ্যদ্বংশীয়গণ তাহা স্মরণ করিবে । কিন্তু, আমার এই শেষ ইচ্ছ, আমার শক্তির অতীত বলিয়া মনে হয়।” মেরী কার্পেন্টারের এই মহতী ইচ্ছা সম্পূর্ণরূপে সফল হইয়াছিল। তিনি এমন কিছু রাখিয়া গিয়াছেন, যাহা মানবহৃদয়ে চিরদিন মুদ্রিত হইয়া থাকিবে। কাব্য ব্যতীত তিনি চিত্র- বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন। চিত্রের মধ্যে তাঁহার প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেমের নিদর্শন পাওয়া যায়। তিনি

মেরী কার্পেন্টার।
প্রায়ই প্রকৃতিসম্বন্ধেই চিত্র অঙ্কন করিতেন। উপযুক্ত
শিক্ষকের নিকট শিক্ষালাভ করিয়া তাহার চিত্রসম্বন্ধেও
বহু জ্ঞান জন্মিয়াছিল। তিনি তাহার অঙ্কিত একখানি
চিত্র মহাত্মা থিয়ােডাের পার্কাকে উপহার দেন। থিয়াে-
ডাের পার্কা এই চিত্রখানি তাহার পাঠগৃহে রাখিতেন।
মেরী কার্পেন্টারের নৈতিক দৃষ্টি অতি প্রখর ছিল।
কি সাহিত্য, কি কাব্য, কি চিত্রবিদ্যা নীতির দিক দিয়া
দেখিতেন। তিনি প্রত্যেক বিষয়ের গুণাগুণ নৈতিক
আদর্শ দ্বারা বিচার করিতেন। এমন কি, চিত্রকরের চরিত্র
দেখিয়া চিত্রের সৌন্দৰ্য্য বিচার করিতেন। নৈতিক আদর্শ
এত দূর উচ্চ না হইলে, এ প্রকার তেজঃপূর্ণ চরিত্র না
হইলে কি তিনি তাহার জীবনের বিপৎ-সঙ্কুল-কাৰ্য্য সকল
সংসিদ্ধ করিতে সমর্থ হইতেন?
পিতৃ-বিয়ােগ।
মেরী কার্পেন্টার ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দে নিদারুণ শােক প্রাপ্ত
হন। অতিরিক্ত পরিশ্রমে তাঁহার পিতার স্বাস্থ্য ভগ্ন হয়।
ডাক্তারের পরামর্শে স্বাস্থ্যলাভােদ্দেশে তিনি বিদেশভ্রমণে
বহির্গত হন; পরে লেগুহর হইতে মার্সেলিস্ যাইবার সময়
;
১৪

মেরী কার্পেন্টা।
জলমগ্ন হইয়া প্রাণত্যাগ করেন। এই আকস্মিক বিপদ শ্রবণ
মাত্রেই মেরী কার্পেন্টা এবং তাহার ভ্রাতাভগিনীদিগের
মাতৃদেবীর প্রাণে সান্ত্বনাদান সর্বপ্রধান চিন্তার বিষয় হইল।
তাহারা সকলেই মাতার প্রাণে শান্তি আনয়ন করিতে চেষ্টিত
হইলেন। মেরী কার্পেন্টা তাঁহার পিতার কাৰ্য্যের সহায়
ছিলেন এবং তাহার পরামর্শ ও উপদেশ-মতে প্রত্যেক কাৰ্য্য
নিৰ্বাহ করিতেন। পিতার অভাব তাহার দুর্বিষহ হইয়া
পড়িয়াছিল। কিন্তু ঈশ্বরের মঙ্গলস্বরূপে নির্ভর করিয়া এবং
তাহার করুণায় বিশ্বাস স্থাপন করিয়া মেরী কার্পেন্টার
ও হার মাতা এই দারুণ শােক সহ্য করিতে সমর্থ
হইয়াছিলেন। তিনি বিশ্বাস করিতেন যে, তাঁহার
পিতা এ লােক হইতে আর এক উন্নত ললাকে গমন
করিয়াছেন এবং তাঁহার পিতা সেই লােকে আছেন
বলিয়া সেই অদৃশ্য-রাজ্য তাহার নিকটতম বােধ হইত।
প্রগাঢ় ঈশ্বরবিশ্বাসিনী ছিলেন বলিয়াই, তিনি এই শােকে
শান্তি লাভ করিয়াছিলেন। পিতার মৃত্যুর এক বৎসর
পরে তিনি দৈনন্দিন লিপিতে তাঁহার মানসিক অবস্থা এই
রূপ লিখিয়াছিলেন,-“এ পৃথিবীতে যাহাকে আমরা সর্বা-
পেক্ষা ভালবাসিতাম, তাঁহাকে হারাইয়া যদিও বাহিরে
শােক প্রকাশ করিতেছি ; কিন্তু ভিতরে শান্তি বিরাজমান।

মেরী কার্পেন্টার।
;
তাঁহাকে এ পৃথিবীতে আর পাইব না সত্য ; কিন্তু আমি
বিশ্বাস করি যে, তাঁহাকে আমরা পবিত্র স্থুতি এবং স্বর্গীয়
প্রেমে পাইয়াছি। প্রভু আমাদিগকে অত্যন্ত আঘাত দিয়া-
ছেন, কিন্তু এই আঘাতের মধ্যে তাহার পিতৃহস্ত নিকটতর
বােধ হইতেছে। তিনি আঘাত দিয়া আবার পূর্ণ শান্তিও
দিয়াছেন। এই বৎসর আমাদের নিকট অতি প্রিয় এবং
পবিত্র হউক; কেন না এই বৎসরে আমার প্রিয়তম পিতা
পার্থিব দুঃখ, শােক এবং ক্লান্তির হস্ত এড়াইয়া অমর
লােকের চিরশান্তি-আশ্রমে গমন করিয়াছেন।”
কর্মক্ষেত্রবিস্তার।
পিতার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরে তাহার ভক্তি-
ভাজন বন্ধু ডাক্তার টকাম্যান্ পরলােক গমন করেন।
ডাক্তার টকারম্যানের উন্নত চরিত্র এবং
ডাক্তার টকারম্যানের জীবনের উচ্চ আদর্শ তিনি কখনও
মৃত্যু।
বিস্মৃত হন নাই। তাহার পরজীবনে যখন
একটির পর একটি জনহিতকর কাৰ্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল,
তখনই ডাক্তার টকাম্যান্ তাহাকে যে মহান ভাবে

মেরী কার্পেন্টার। অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন, তাহার পূর্ণ বিকাশ হইয়াছিল বলিয়া তাহাকে ধন্যবাদ করিতেন। মেরী কার্পেন্টা তাহার রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের ছাত্র- দিগের প্রাণে জ্ঞানানুরাগ জাগরিত মিউজিয়ম দান। করিবার জন্য তাহার ভূতত্ত্ব এবং অন্যান্য জিনিষের একটি ছােট মিউজিয়ম্ অর্থাৎ কৌতুকা- গার তাহাদিগকে দান করেন। পূৰ্ব্বে এই সকল নিকৃষ্টচরিত্র ব্যক্তিদিগের পল্লী এবং গৃহ পরিদর্শন করিবার সময় তঁাহার হৃদয়ে কখন কখন ঘৃণা এবং বিরক্তির সঞ্চার হইত; কিন্তু তাহাদিগের মধ্যে কয়েক বৎসর কাৰ্য্য করি- বার পর সমাজের নিম্নশ্রেণীর প্রতি তাহার করুণার উদ্রেক হয় এবং তাহাদিগের কাৰ্যে প্রচুর আনন্দলাভ করেন। এই সময়েই তিনি এই হতভাগ্যদিগকে এত দূর ভালবাসিতে পারিয়াছিলেন যে, কত মাতা মৃত্যুশয্যায় শায়িত হইয়া সন্তানকে তাহার হস্তে নিঃশঙ্কচিত্তে সমর্পণ করিয়া যাইত। পাপে, তাপে তাপিত ব্যক্তিগণ তাহার নিকট সম্পূর্ণ সহানুভূতি পাইবে জানিয়া অনুতপ্ত হৃদয়ে তাহার নিকট আসিত। মেরী কার্পেন্টাও প্রকৃত অনুতপ্ত পাপীকে সৎপথে ফিরিতে দেখিয়া অপার আনন্দ লাভ করিতেন এবং ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতেন। ।

সেখী কার্পেন্টার।
মেরী কার্পেন্টার যখন এইরূপে নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে কাৰ্য্য
করিতেছিলেন, তখন ১৮৪৩ খৃষ্টাব্দে
মহাত্মা জন পাউণ্ডসের লর্ড য়্যালি নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষা-
শিক্ষা প্রণালী।
বিস্তারের জন্য পার্লামেন্টে এক প্রস্তাব
উপস্থিত করেন। কিন্তু অধিকাংশ সভ্যের প্রতিবাদে তাহা
আইনে পরিণত হইতে পারে নাই। আইনের সাহায্যে
আপাততঃ এই কাৰ্য্য সংসাধিত হইবার কোন সম্ভাবনা না
দেখিয়া কয়েকটি জনহিতৈষী ব্যক্তি নিজ নিজ নগরে নিম্ন
শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন।
১৮৩৯ খৃষ্টাব্দে বিখ্যাত জনহিতৈষী মহাত্মা জন্ পাউণ্ডসের
মৃত্যু হয়। তিনি যে প্রকারে রাস্তার দুর্দান্ত, অসচ্চরিত্র
বালকবালিকাদিগকে তাহার গৃহে লইয়া গিয়া তাহাদিগকে
শান্ত করিতেন এবং ধর্ম ও নীতিশিক্ষা দিতেন, তাহা
অনেকেরই মনােযােগ আকর্ষণ করে। তাহারা এই মহাত্মার
পন্থা অবলম্বন করিয়া দরিদ্রবিদ্যালয় স্থাপন করিতে আরম্ভ
করেন।
মেরী কার্পেন্টার দেখিলেন, এই দরিদ্র বিদ্যালয় স্থাপন
অবৈতনিক বিদ্যালয় তাহার জীবনের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিবার
স্থাপন। সুন্দর উপায়। ১৮৪৬ খৃষ্টাব্দে অসহায়
দরিদ্র-বালকবালিকাদিগের জন্য তিনি দরিদ্র-বিদ্যালয় স্থাপন

মেরী কার্পেন্টা। করিলেন। প্রথমত, এই সকল অশান্ত এবং অসচ্চরিত্র বালকবালিকাদিগকে শান্ত এবং বাধ্য করিতে, তাঁহাকে বহু ক্লেশসহ্য করিতে হইত। একদিন কিছুক্ষণ শিক্ষা করিবার পর বালকবালিকাদিগের মধ্যে এক জন বলিয়া উঠিল “এস, এখন যুদ্ধ করা যাক।” যখনই এই কথা বলা—আর তৎক্ষণাৎ প্রায় কুড়িটি বালকবালিকা মিলিয়া মারারি করিতে আরম্ভ করিল। কিয়ৎক্ষণের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হইল বটে; কিন্তু এইরূপ ঘটনা প্রায়ই ঘটিত। ইংলণ্ডের ন্যায় শীতপ্রধান দেশে এই বালকবালিকাদের মধ্যে কাহারও জুতা, মােজা, কি কোন প্রকার গাত্রাবরণ ছিল না ; অনেকের গৃহও ছিল না। তাহারা লােকের বাড়ীর সিড়িতে কিংবা নদীতীরস্থ বিশ্রামস্থানে রাত্রিতে নিদ্রা যাইত এবং দিনে চৌৰ্য্য প্রভৃতি অসৎ উপায়ে জীবিকা অর্জন করিত। মেরী কার্পেন্টার এই স্কুলে প্রধানতঃ, ধর্ম এবং নীতি শিক্ষা দিতে লাগিলেন। তাহ- দের মধ্যে জ্ঞানানুরাগ বর্ধিত করিবার জন্য তাহাদিগকে কখন পৃথিবীর মানচিত্র বা ভূ-গােলক দেখাইতেন; কখ- নও ইতিহাস হইতে হইতে গল্প বলিয়া, কি কোন বিখ্যাত কবির কাব্যের কথা বলিয়া তাহাদের চঞ্চল মনকে শান্ত করিতেন। কখনও বা ভূতত্ত্বের কোন নিদর্শন দেখাইয়া

মেরী কার্পেন্টার ।
তাহাদের মনে পৃথিবীর আশ্চর্য নির্মাণকৌশলের ভাব
জাগাইয়া দিতেন। তিনি কিরূপ ভাবে বালকবালিকা-
দিগকে শিক্ষা দিতেন, তাহা তাহার দৈনন্দিনলিপি হইতে
উক্ত নিম্নলিখিত অংশ পাঠ করিলেই বুঝা যায়।
“পৃথিবীর মেরুদণ্ড কিঞ্চিৎ হেলিয়া আছে বলিয়াই যে,
ঋতুর পরিবর্তন হয়, তাহা তাহাদিগকে দেখাইলাম এবং
বুঝাইয়া দিলাম। তাহারা ইহাতে অতিশয় আদিত
হইল।”
“এই ক্লাসের ছেলেরা কখনও মানচিত্র দেখে নাই।
মানচিত্র বুঝিতে তাহাদের অনেকক্ষণ লাগিয়াছিল। একটি
ছাত্র মানচিত্রে ব্রিষ্ট এবং বাথ নগর দেখিয়া অত্যন্ত
আনন্দিত হইল। আমি সর্বদা অগ্রে জ্ঞাত স্থানগুলি দেখা-
ইয়া পরে অজ্ঞাত স্থান দেখাই।”
“পূৰ্ব সপ্তাহে আমি ছাত্রদিগকে কয়েকটি ফার্ণ দেখা-
ইয়াছিলাম। তাহারা ইহার সৌন্দৰ্য্য বুঝিতে পারিয়াছিল ;
কিন্তু ইহা যে, কি জিনিষ তাহা কেহই বলিতে পারিল না।
কেহ বলিল, ইহা তাল গাছ। আমি ফার্ণ সম্বন্ধে তাহাদিগকে
যাহা ৰলিলাম, তাহা তাহারা অতি আগ্রহের সহিত শ্রবণ
করিল।”
“ম্যাকবেথের গল্প তাহাদিগকে বলিলাম ; বেশ ধুবিলাম

মেরী কার্পেন্টার। যে, ইহা তাহাদের মনে মুদ্রিত হইয়া গেল। তাহারা সেক্ষ- পিয়ারের নাম জানিত। কোন ভােজনালয়ের উপর তাহারা তাহার প্রস্তরনির্মিত মস্তক দেখিয়াছে।” তিনি এইরূপে তাঁহার ছাত্রদিগের মানসিক অবস্থার ক্রমােন্নতি অতি আগ্রহের সহিত পৰ্যবেক্ষণ করিতেন এবং ভঁহার শিক্ষানুসারে যদি কেহ কোন সৎকাৰ্য করিত কিংবা তাঁহার উপদেশ মনে রাখিত, তবে তাহার স্মৃতি তিনি যত্নপূৰ্ব্বক রক্ষা করিতেন। একদিন তিনি তাহার কোন অন্ধ বন্ধুকে বায়ুনিষ্কাশনযন্ত্র প্রণালীটী ছাত্রদিগকে বুঝাইয়া দিবার জন্য নিমন্ত্রণ করেন। এই ৰক্ততাতে ৩০০ শত বালকবালিকা উপস্থিত ছিল। তিনি এই দিনের বক্তৃতাসম্বন্ধে লিখিয়াছেন—“এক বৎসর পূর্বে আমি কল্পনাও করিতে পারি নাই যে, তাহারা এইরূপ ধীরতার সহিত বক্তৃতা শ্রবণ করিবে কিংবা জ্ঞানলাভে এই প্রকার আনন্দ পাইবে।” মেরী কার্পেন্টার প্রধানতঃ ধর্মশিক্ষা দ্বারাই এই সকল কঠিন হৃদয়গুলিকে আয়ত্ত করিতে পারিয়াছিলেন। তিনি রবিবার দুই বেলা এবং অন্যান্য দিনও ইহাদিগকে ধৰ্ম্মশিক্ষা দিতেন। এই সকল দরিদ্র বালকবালিকাদিগের ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা তঁাহার জীবনকে মধুর করিয়াছিল।

মেরী কার্পেন্টার। বাটী ক্রয়। দরিদ্রবিদ্যালয়ের ক্রমােন্নতি এবং ছাত্রছাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি হইতে লাগিল। তিনি ইহার জন্য ১৮৫০ অবৈতনিক বিদ্যালয়ের খৃষ্টাব্দে একটি বৃহৎ বাট ক্রয় করেন। বাল্যজীবনে আমােদ কত দূর প্রয়ােজন এবং বালকবালিকাগণ নির্দোষ আমােদর সুবিধা না পাইলে, কিরূপে কুপথে চলিয়া যায়, মেরী কার্পেন্টার, তাহা বুঝি- তেন। এই দোষ নিবারণাৰ্থ তিনি এই বাটীসংলগ্ন ভূমির কিয়দংশ লইয়া ক্রীড়াভূমি নির্মাণ করেন। ইহাতে বালক- বালিকাগণ আর রাস্তায় গিয়া অসৎ ক্রীড়াতে রত হইত । কিছুদিন পরে এই বাটীসংলগ্ন কয়েকটি গৃহ লইয়া তিনি গৃহশূন্য এবং অনাথ বালকবালিকাদিগের জন্য আশ্রম স্থাপন করেন। কত বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া এই সকল দুর্দান্ত, নীতিহীন বালকবালিকাদিগের অন্যায় কাৰ্য্য এবং অত্যাচার সহ্য করিয়া স্কুলটি যখন এক বৎসর টিকিল, তখন ইহার আশ্চৰ্য্য উন্নতি দেখিয়া সকলে অবাক হইলেন। লােকে বলিতে লাগিল, যে সকল বালক বালিকা দেখিয়া লােকে ভয় করিত, তাহারা কোন্ মন্ত্রবলে এই প্রকার শিষ্ট, শান্ত এবং সৎপ্রকৃতিসম্পন্ন হইয়াছে? দেশবিদেশে মেরী কার্পেন্টারের দরিদ্র-বিদ্যালয়ের কথা প্রচারিত হইল।

মেরী কার্পেন্টার। রিদ্র বিদ্যালয়ের ক্রমােন্নতি দেখিয়া মেরী কার্পেন্টা- রের আর একটা ইচ্ছা বলবতী হইল। নৈশ বিদ্যালয়। তিনি দরিদ্র কৃষিজীবী ও শ্রমজীবিগণের স্থাপন। শিক্ষা ও নৈতিক উন্নতির জন্য মনঃসংযােগ করিলেন। এই দরিদ্র-বিদ্যালয়ের সহিত তিনি একটি নৈশ- বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ইহা স্থাপিত হওয়াতে নিম্ন শ্রেণীর শত শত তরুণবয়স্ক পুরুষ ও রমণী ইহাতে যােগদান করেন। এই সকল পুরুষ এবং রমণীর চরিত্র ও স্বভাব এতদুর বিকৃত ছিল যে, তাহাদিগকে দেখিয়া মেরি কার্পেন্টারের দৃঢ় হৃদয়ও কম্পিত হইত। কিন্তু তাহার উন্নত চরিত্র- প্রভাব, ক্রমে ইহাদিগকেও জয় করিয়াছিল। এই সকল দুর্দান্ত নরনারী পরজীবনে এক একটি মানুষ তৈয়ার হইয়া মেরী কার্পেন্টারের নিকট তাহাদের জীবনের ঋণ জ্ঞাপন করিয়া যে সকল বিবরণ লিখিয়াছে, তাহা পাঠ করিলে শরীর রােমাঞ্চিত হয়। মেরী কার্পেন্টার, দরিদ্রবিদ্যালয়ের বালক-বালিকাদিগের মধ্যে কাৰ্য্য করিতে করিতে, দেখিতে সংশােধন বিদ্যালয়ের পাইলেন যে—অনেক বালক এই বিদ্যা- প্রস্তাব। লয়ে প্রবিষ্ট হইবার সময়েই বিখ্যাত চোর হইয়া আসিয়াছে। তখন অল্পবয়স্ক বালকবালিকা চৌর্য্য

মেরী কার্পেন্টার।
প্রভৃতি অপরাধে অপরাধী হইলে, তাহাদিগকে পূর্ণবয়স্ক
ব্যক্তিদিগের সহিত একই কারাগারে বাস করিতে হইত।
শাস্তি দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য—চরিত্র সংশােধন।
কিন্তু ক্রমাগত দণ্ডিত হইয়া, বার বার জেলখানায়
বাস করিয়া ইহাদের চরিত্র আরও কঠিন এবং দূষিত
হইত। অধিকন্তু যেরূপ ভাবে পূর্ণবয়স্ক ও অল্পবয়স্ক
বালকবালিকাদিগকে শাস্তি পাইয়া একই কারাগৃহে
বাস করিতে হইত, তাহাতে বালকবালিকাদিগের চরিত্র
সংশােধিত না হইয়া বরং উত্তরােত্তর অধােগতি প্রাপ্ত
হইত। তিনি ইহার বিষময় ফল, সম্পূৰ্ণৰূপে উপলব্ধি করিতে
পারিয়াছিলেন। মেরী কার্পেন্টার, যদিও কাহাকেও
কাহাকেও সৎপথে আনিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, কিন্তু তিনি
বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, দরিদ্রবিদ্যালয় দ্বারা এই প্রকার
লকবালিকাদিগের চরিত্র সংশােধন করা যাইবে না।
ইহাদিগকে মানুষ করিতে হইলে, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রকার বিদ্যা-
লয়ের প্রয়ােজন। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা দ্বারা তাহার এই
সঙ্কল্প দৃঢ়তর হইতে লাগিল। তিনি এই বিষয়ে অভিজ্ঞ
কয়েকটি প্রধান ব্যক্তির সহিত ইহার প্রয়ােজনীয়তা-সম্বন্ধে
পত্রালাপ করেন এবং অল্পবয়স্ক অপরাধীদিগের বিবরণ
সংগ্রহ করিয়া তাহা আলােচনা করিতে আরম্ভ করেন।

মেরী কার্পেন্টায়। কয়েক মাস এই বিষয় আলােচনা করিয়া অল্পবয়স্ক অপ- রাধীদিগের স্বতন্ত্র বিদ্যালয় থাকা অতিশয় প্রয়ােজনীয়, সম্বন্ধে একখানি পুস্তক লিখেন। সমাজের মঙ্গলের জন্য যে, তিন প্রকার বিদ্যালয়ের প্রয়ােজন, তাহা এই পুস্তকে তিনি সাধারণকে বুঝাইতে চেষ্টা করেন। প্রথমতঃ অবৈতনিক বিদ্যালয়, দ্বিতীয়তঃ শিল্পবিদ্যালয়, তৃতীয়তঃ অল্পবয়স্ক অপ- রাধীদিগের জন্য জেলখানার পরিবর্তে সংশােধন-কারাগার অথবা বিদ্যালয়। তিনি এই পুস্তকে সুন্দর যুক্তি এবং বহু সত্য ঘটনা দ্বারা সংশােধন-বিদ্যালয়ের আবশ্যকতা প্রতিপন্ন করেন। এই বিদ্যালয়ের জন্য কোন্ উপায় এবং কি কি নিয়ম অবলম্বন করিতে হইবে, তাহাও এই পুস্তকে লিপিবদ্ধ করেন। ইংলণ্ডের লােক ইতঃপূৰ্বে কখনও এই বিষয়ের চিন্তা করেন নাই; কিন্তু, মেরী কার্পেন্টারের একা- গ্রতা এবং একনিষ্ঠার ফলে তাঁহারা এবিষয়ে মনােযােগ দিতে বাধ্য হন। তাঁহারই যত্নে এসম্বন্ধে দুইটি সভা হয় এবং তাহাতে অল্পবয়স্ক অপরাধীদিগের সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা ও তাহাদের উদ্ধারের উপায়, সভার সমক্ষে বিবৃত করেন। পার্লামেন্টেও তাহার বক্তব্য উপস্থিত করা হয়। কিন্তু আইন দ্বারা এই প্রয়ােজনীয় বিষয় সিদ্ধ হইবার শী কোন সম্ভাবনা তিনি দেখিলেন না। ২৫

মেরী কার্পেন্টায়।
মেরী কার্পেন্টার, যাহা ভাল বুঝিতেন, তাহা সহজে
পরিত্যাগ করিতেন না। সংশােধন
সংশােধন-বিদ্যালয়-
বিদ্যালয়-স্থাপনের প্রস্তাব পার্লামেন্টে
স্থাপন।
গৃহীত হইল না বলিয়া সঙ্কল্প ত্যাগ
করিলেন না। বরং আরও দৃঢ়তর হইয়া যাহাতে এই সকল
বালকবালিকা স্বতন্ত্র ভাবে নীতিপরায়ণ ব্যক্তির কর্তৃত্বে
বাস করিয়া ধৰ্ম্মশিক্ষা, বিদ্যাশিক্ষা, শিল্পশিক্ষা করিয়া
সমাজের হিতকারী হইতে পারে, তাহার জন্য তিনি স্বয়ং
সংশােধন-বিদ্যালয় (Reformatory School) স্থাপন
করেন। তাহার কোন বন্ধুপ্রদত্ত একটি বাটীতে এই বিদ্যা-
লয় স্থাপিত হয়। তঁাহার এই মহােদ্দেশ্য যখন দেশমধ্যে
প্রচারিত হইল, তখন চতুর্দিক হইতে টাকা আসিতে
লাগিল। তাহার অন্য এক বন্ধু এই বিদ্যালয়ের জন্য চেয়ার,
টেবিল প্রভৃতি প্রদান করিলেন। ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে ১১ই
সেপ্টেম্বরে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দিনের বিষয়
মেরী কার্পেটার লিখিয়াছেন—“অদ্য আমার মন, আশা
অথচ ভয়ে পূর্ণ। আমি যাহাতে এই কাৰ্য্য উপযুক্তরূপে
চালাইতে পারি, তাহার জন্য প্রার্থনা ব্যতীত আর কিছুই
সম্বল নাই”। তিনি দরিদ্রবিদ্যালয়ে শিক্ষা দান করিয়া যে
সময় পাইতেন, তাহা এই সংশােধনবিদ্যালয়ে দান করিতেন।
২৬

মেরী কার্পেন্টায়।
এতদিন ইহার জন্য যে প্রকার চিন্তা ও অনিশ্চয় ছিল,
তাহা দূর হইয়া তাহার হৃদয় শান্তিপূর্ণ হইল। দরিদ্রবিদ্যা-
লয়ের ছাত্রগণকে যে অগাধ প্রেম দ্বারা সৎপথে আনিতে-
ছিলেন, সংশােধন-বিদ্যালয়ের ছাত্রগণের প্রতিও তাঁহার
সেই প্রেম ধাবিত হইল। তাহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—কঠিন,
নির্দয় ব্যবহার দ্বারা মানব-হৃদয়, মানব-চরিত্র কখনও
পরিবর্তিত হয় না।
কিন্তু, প্রেম ও কোমল ব্যবহারই
মানবচরিত্র-পরিবর্তনের একমাত্র উপায়। তিনি এই
প্রেম দ্বারাই এই সকল অশিষ্ট, অদম্য, কঠিনহৃদয়গুলিকে
সম্পূর্ণরূপে অবনত করিয়া সৎপথে চালিত করিয়াছিলেন।
এক মাস যাইতে না যাইতে দেখা গেল, এই বিদ্যালয় দ্বারা
প্রভূত কল্যাণ সাধিত হইতেছে। তিনি লিখিয়াছেন “একটী
ছােট বালক যাহাকে বাধ্য হইয়া আবদ্ধ করিয়া রাখা
গিয়াছিল, সে যখন আমার নিকট নীত হইল, তখন আমার
স্কন্ধে হস্তাৰ্পণ করিয়া ক্রন্দন করিতে করিতে, তাহার সকল
দুঃখকাহিনী আমাকে বলিল। আমি তাহাকে আদরের
সহিত কয়েকটী চুম্বন করাতে, তাহার সকল দুঃখ দূর
হইল। আমি বেশ বুঝিতে পারিলাম যে, আমি যে
তাহাকে ভালবাসি, তাহা সে বেশ জানে। আমি তাহার
ভালবাসা পাইয়া ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিলাম”। এইরূপে

মেরী কার্পেন্টার। মেরী কার্পেন্টার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাপীদিগকে পুণ্যবান্ করিতে লাগিলেন। শীত, বৃষ্টি অগ্রাহ্য করিয়া তিনি প্রত্যহ ব্রিষ্ট- লের দরিদ্র বিদ্যালয় হইতে কিংউস্থিত এই সংশােধন- বিদ্যালয়ে পদব্রজে গমন করিতেন দরিদ্র-বিদ্যালয় এবং সংশােধন-বিদ্যালয় যাহাতে গবর্ণ- মেন্ট কর্তৃক অনুমােদিত এবং সাহায্যপ্রাপ্ত হয়, তাহার জন্য মেরী কার্পেন্টার ঘােরতর পরিশ্রম করিতে লাগিলেন। সম্মুখে মহানিষ্ট সাধিত হইতেছে, ঈশ্বরের সন্তানগণের উন্নতির কোন উপায় হইতেছে না, অথচ ইহার প্রতিকারের কোন চেষ্টা না করিয়া নিশ্চেষ্ট ভাবে বসিয়া থাকা মেরী কার্পেন্টারের স্বভাব ছিল না। এই দুই স্কুলের জন্য তিনি গবর্ণমেন্টের নিকটে কত আবেদনপত্র পাঠাইয়াছেন, পালা- মেন্টের সভ্যদিগের সহিত দেখা করিয়া ইহার প্রয়ােজনীয়তা বুঝাইয়া দিয়াছেন, ইহার জন্য কত সভা-সমিতি করিয়াছেন, তাহা ভাবিলে অবাক হইতে হয়। এ দিকে গৃহের যে সকল কৰ্তব্য, তাহাও সম্পাদনে ত্রুটি করিতেন না। ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে তাঁহার পরিশ্রমের ফল ফলিল। পার্লামেন্টের সংশােধন-বিদ্যালয় পার্লামেন্ট কর্তৃক অনু- অনুমোদন। মােদিত হইল। তৎপূর্বে এই সকল অপরাধীদিগকে এই বিদ্যালয়ে রাখিতে তিনি গবর্ণমেন্ট ২৮ মেরী কার্পেন্টার । হইতে কোন প্রকার সাহায্য পাইতেন না। তাহারা বিদ্যা- লয় হইতে পলায়ন করিলে কিংবা কোন প্রকার অন্যায় কাৰ্য্য করিলে, বিচারক কি পুলিসের সাহায্য করিবার অধি- কার ছিল না। মেরী কার্পেন্টার কেবলমাত্র কয়েকটি শিক্ষক ও শিক্ষয়িত্রীর সাহায্যে এই সকল দুর্দান্ত অপরাধী- দিগকে অতি স্নেহের সহিত পরিচালনা করিয়া রক্ষা করিতেন। এই বৎসরেই তিনি “রেড় লজ” নামক বাটীতে বালিকাদিগের নিমিত্ত স্বতন্ত্র সংশােধন-বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই সময়ে তিনি রবিবাসরীয়-বিদ্যালয়, দরিদ্র-বিদ্যালয় এবং কিংউড স্থিত সংশােধন-বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত থাকিয়া প্রত্যেক বিদ্যালয়ের কার্য সম্পাদন করিতেন। বালিকাদিগের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই নব বিদ্যালয় এখন হইতে তাঁহার সর্বাপেক্ষা অধিক মনোেযােগ আকর্ষণ করিল। অত্যধিক পরিশ্রমে তিনি এই সময়ে পীড়িত হইয়া পড়েন ; কিন্তু, সুস্থ হইয়া পুনরায় এই সমুদয় কাৰ্য্য করিতে আরম্ভ করেন। তাঁহার অসুস্থতার সময়ে সমুদয় বিদ্যালয়ের ছাত্র- ছাত্রীগণ তাহার জন্য এতদূর ব্যাকুল হইয়াছিল যে, এই সময়ে পাছে তাহাদের কোন ব্যবহারে তিনি মনােবেদনা প্রাপ্ত হন, সেই ভয়ে তাহারা কোন প্রকার অন্যায় কাৰ্য্য করিত না। মেরী কার্পেন্টা পরে এই বাটীতেই বাস করেন।

মেরী কার্পেন্টার।
আয়র্লণ্ডবাসিনী খ্যাতনাগ্নী কুমারী কন্ ব্ৰহ্মবাদিনী
ব্ৰহ্মবাদিনী ছিলেন। তিনি একেশ্বরবাদীদিগের
কুমারী কন্।
ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিয়া খ্ৰীষ্টধর্মের প্রতি
বিশ্বাস হারাইয়াছিলেন। যখন তদীয় পিতা মিঃ চার্লস্
কবকে তাহার ধৰ্ম্মপরিবর্তনের কথা জ্ঞাপন করেন, তখন
তাঁহার পিতা ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহাকে গৃহ হইতে বহিস্কৃত
করিয়া দেন। ব্রহ্মবাদিনী কুমারী কব, যখন পিতা
কর্তৃক পরিত্যক্ত হন, তখন মেরী কার্পেন্টার, তাহাকে
সাদরে আহ্বান করিয়া নিজ বাড়ীতে স্থান প্রদান করেন।
কুমারী কন্, মেরী কার্পেন্টারের সংসর্গে আসিয়া আপনাকে
কৃতার্থ মনে করিয়াছিলেন। তিনিও মেরী কার্পেন্টারের
মহচ্চরিত্রে ও পরার্থপরতায় অনুপ্রাণিত হইয়া দেশের ও দশের
উপকারার্থে আপনাকে সমর্পণ করিয়াছিলেন। দরিদ্রা-
বাসের উন্নতি-সাধন, অত্যাচারী স্বামীদিগের হস্ত
হইতে স্ত্রীলােকদিগের পৃথক্ করণ, রুগ্ন, জীর্ণ, শীর্ণ, অসহায়
দরিদ্রদিগের সাহায্যার্থ সভা স্থাপন, পশু-ব্যবচ্ছেদ নিবারণ
প্রভৃতি নানাবিধ সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান ও সম্পাদন করিয়া-
ছিলেন। এই সকলই যে, মেরী কার্পেন্টারের সংসর্গের
ফল, তাহাদের কার্যবিবরণ দেখিলেই সহজে প্রতীয়মান
হয়।

মেরী কার্পেন্টার । অত্যধিক পরিশ্রমে পীড়িত হইয়া মেরী কার্গে- সুপারিন্টেন্টে, স্টার রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের সুপারিন্টে- পদত্যাগ। ণ্ডেন্টের পদত্যাগ করেন। তিনি পচিশ বৎসর এই কাৰ্য সুচারুরূপে সম্পাদন করিয়া যখন ইহা ত্যাগ করিলেন, তখন তাঁহার সহযােগী শিক্ষক ও শিক্ষয়িত্রী- গণ তাহাদের শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ তাহাকে উপহার প্রদান করেন। এক্ষণে রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের কার্য্য ত্যাগ করিয়া যে সময় পাইলেন, তাহা “রেড়ল”স্থিত বালিকাবিদ্যালয়ে ক্ষেপণ করিতে লাগিলেন। মেরী কা-ে ‘টারের মহা, প্রেমপূর্ণ চরিত্র প্রভাব এবং উন্নত আদ- শের মধ্যে থাকিয়া মনুষ্যসমাজের হেয় এই সকল বালি- কার চরিত্র, ব্যবহার এবং প্রকৃতির আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন হইতে লাগিল। যে সকল পুলিসকর্মচারিগণ তাহাদিগকে ধৃত করিয়া কারাগারে লইয়া গিয়াছিল, তাহাবাও এখন এই বালিকাদিগকে চিনিতে পারিল না। উন্নত, পবিত্র এবং উচ্চ-শক্তির প্রভাবে মনুষ্যচরিত্র এইরূপেই পরিবর্তিত হয়। নিরাশ্রয় বালকবালিকা ও কয়েদীদিগে- অবস্থার উন্নতিবিধান জন্য গবর্ণমেন্টের নিকট তিনি নানাপ্রকার সুযুক্তিপূর্ণ প্রস্তাব করিয়াছিলেন। কয়েদী দের অবস্থা সুচারুরূপে জ্ঞাত হইবার জন্য তিনি আয়লণ্ডের মেরী কার্পেন্টার। কারাগৃহের উন্নত প্রণালী পৰ্যবেক্ষণ করিতে আয়াও গমন করেন। যে সকল বালক বালিকা দরিদ্র-বিদ্যালয় এবং সংশােধন-বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া বাহির হইত, তাহাদের অর্থোপার্জনের সুবিধা করিয়া দিবার জন্য এবং তাহাদের উপর তীব্র দৃষ্টি রাখিবার জন্য “চিলড্রেন্স এজেন্সী (Childrens agency) স্থাপন করেন। তৎপরে শিল্প- বিদ্যালয় (Industrial schools) এবং শ্রমজীবীদিগের উপকারার্থ তাহাদিগের জন্য বিশ্রামাগার স্থাপন করেন। আমেরিকার দাস-সংগ্রাম। এই সময়ে আমেরিকায় দাসত্ব-প্রথার বিরুদ্ধে তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হয়। আমেরিকার দাস-যুদ্ধ এক ঐতি হাসিক ঘটনা। আমেরিকার দক্ষিণ উত্তর প্রদেশের অধি- বাসীরা, এমন কি, খৃষ্টীয়-ধৰ্ম্মযাজকেরাও এই জঘন্য দাসত্ব- প্রথা-প্রচলনের বিশেষ পক্ষপাতী ছিলেন। এতদ্দেশে নীল- করদিগের অত্যাচারকাহিনী সৰ্বজনবিশ্রুত। আসামের চা- কর কুলিদের উপর কম অত্যাচার করে নাই। আমেরি- কানের ক্রীতদাসদিগের উপর ততধিক অত্যাচার করিত। নির্যাতিত দাসদিগের দুরবস্থা সন্দর্শন করিয়া করুণাময়ী শ্ৰীমতী হেরিয়েট বিচার ষ্টো’র (Mrs Harriet Beecher) মেরী কার্পেন্টার। Stowe) হৃদয় বিগলিত হইয়া উঠিল। তিনি উপন্যাসের ছলে দাসদিগের প্রতি অমানুষিক অত্যাচার-কাহিনী ওজস্বিনী ভাষায় বিবৃত করিয়া টম-কাকার কুটীর (Uncle Tom's Cabin) নামে পুস্তিকা প্রকাশ পূৰ্ব্বক উত্তর আমেরিকার অধিবাসীদিগকে উদ্বোধিত করিতে লাগিলেন। এই উপন্যাস- পাঠে জনসাধারণ এই ঘৃণিত ব্যবসায়ের অনিষ্টকারিতা উপ- লব্ধি করে, এবং বিবেকবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত হইয়া উত্তর- প্রদেশবাসীরাই এই নৃশংস ব্যবসায় রহিত করিবার জন্য প্রথমে দণ্ডায়মান হয়। দক্ষিণ আমেরিকাবাসীরা কিন্তু ইহাতে সম্মত হইল না। এতদ্বারা গৃহবিচ্ছেদের সূত্রপাত হইল। অবশেষে ভীষণ সমরানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠে। এব্রাহিম লিঙ্কন প্রেসিডেন্ট হইলে, ১৮৬৪ সালে এই ঘৃণিত ব্যবসায় আইন দ্বারা রহিত হয়। আমেরিকার এই দাস-যুদ্ধের সময় ইংলণ্ডের অনেকে উত্তর-আমেরিকাবাসীদিগের সহিত সমবেদনা প্রকাশ করিয়া- ছিলেন। মিঃ হিউজ, মিঃ লড়লো, মিঃ ব্রাইট প্রভৃতি মনীষিগণ এই ঘৃণিত প্রথার বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করিয়া- ছিলেন। আমেরিকার এই দুরবস্থার কথা শুনি পরােপ- কারিণী কোমল হৃদয়া মেরী কার্পেন্টারের হৃদয় উদ্বেলিত হইয়া উঠিল। তিনিও আর নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিতে পারিলেন মেরী কার্পেন্টা। । মেরী কার্পেন্টার লায়ড গ্যারিসন, থিয়ােডাের পার্কার প্রভৃতি মনীষিগণের সহিত মিলিত হইয়া এই সংগ্রামে প্রাণমনঃ ঢালিয়া যােগ দেন এবং দাসত্বপ্রথার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করিয়া দাসত্বপ্রথার বিরােধীদিগকে উৎসাহিত করেন। দাসত্ব প্রথার বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরা ইহ- দের সহানুভূতি ও উৎসাহ বাক্যে আরাে প্রােৎসাহিত হইয়া সঙ্কল্প দৃঢ়তর করিতে এবং এই ঘৃণিত ব্যবসায় উচ্ছেদ করিতে সমর্থ হইয়াছিল। যে দেশে হউক না কেন, জনসাধারণের দুরবস্থার কথা শুনিলেই মেরী কার্পে- টারের প্রাণ আকুল হইয়া উঠিত; এবং তিনি তন্নিবারণে সৰ্বান্তঃকরণে যত্নবতী থাকিতেন ; যত দিন না কাৰ্য্য সংসাধন হইত, ততদিন তাহা হইতে বিরত হইতেন না। ভারতের কাৰ্য্য। ১৮৬০ খৃষ্টাব্দের শরৎকালে একজন ভারতবর্ষীয় খ্রীষ্টান ভারতে আগমনের ইংলণ্ডে গমন করেন। ত্রিশ বৎসর উদ্যোগ। পূৰ্ব্বে রাজা রামমােহন রায় ইংলণ্ডে গমন করিয়া মেরী কার্পেটারের হৃদয়ে ভারতের প্রতি যে স্নেহ, যে উৎসাহ অঙ্কুরিত করিয়া দিয়াছিলেন, এই নবাগত ভারতবাসীকে দেখিয়া তাহা প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। তিনি ৩৪

মেরী কার্পেন্টা।
ভারতে আগমন করিয়া এতদ্দেশের নারীদিগের শশাচনীয়
অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিতে স্থিরপ্রতিজ্ঞ হইলেন। ১৮৬৪
খৃষ্টাব্দে ১২ই জানুয়ারী তাহার দৈনন্দিন লিপিতে লিখিয়া-
ছিলেন, “আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, এখন হইতে ভায়-
তের স্ত্রীজাতির কল্যাণসাধন করিতে সমগ্র মনঃপ্রাণ
নিয়ােগ করিব। ঈশ্বর বল দিন, যেন এই প্রতিজ্ঞা পালন
করিতে সমর্থ হই।” গৃহে তাহার বহু মহৎ কাৰ্য্য ছিল ;
কিন্তু রামমােহন রায়ের জন্মভূমি ভারতের নারীদিগের
অজ্ঞানান্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা তাহার কোমল প্রাণকে এমনই
দ্রবীভূত করিয়াছিল যে, তাহার গৃহের কর্তব্যকাৰ্য্য
তাহাকে আর বাঁধিয়া রাখিতে পারিল না। তিনি আর
গৃহে থাকিতে পারিলেন না। তিনি ভারতে আসিবার
জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া পড়িলেন।
ঈশ্বরের আদেশে ১৮৬৬ খৃষ্টাব্দে তিনি বােম্বাই নগরে
পদার্পণ করিলেন। তিনি ভারতে আসিয়া
অভিজ্ঞতালাভ।
যে বিশেষ কিছু কাৰ্য্য করিতে পারিবেন,
তাহা কখন মনে করেন নাই। কিন্তু কারাগার এবং অন্যান্য
জনহিতকর কাৰ্যসম্বন্ধে তাহার অভিজ্ঞতার খ্যাতি এই সুদূর
ভারতেও ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। বােম্বাই নগরে উপস্থিত
হইবামাত্র ভারত গবর্নমেন্ট স্ত্রীশিক্ষা, কারাগারের উন্নতি

ফেনী ফার্পেন্টার। প্রভৃতি জনহিতকর কাৰ্যসম্বন্ধে তাহার মতামত জানিতে চাহিলেন। এইরূপে এখানে আসিয়াই তাহার সম্মুখে কাৰ্য্য করিবার নূতন পথ দেখিতে পাইলেন। নারীদিগের শিক্ষা, নারীদিগের অধঃপতিত, পদদলিত অবস্থার পরিবর্তন করিতে দৃঢ়সংকল্প হইলেন। যদিও তখন কলিকাতা, বােম্বাই, পুনা প্রভৃতি কয়েকটি নগরে বালিকাবিদ্যালয় ছিল,কিন্তু তাহাদের অবস্থা শােচনীয় ছিল। অতি অল্পসংখ্যক বালিকাই স্কুলে অধ্যয়ন করিত এবং প্রায় সকলেরই ১১১২ বৎসর বয়সে জ্ঞানার্জন শেষ হইত। যে জ্ঞানার্জনের অন্ত নাই, যে জ্ঞানলাভসম্বন্ধে মহাজ্ঞানী নিউটন্ বলিয়াছিলেন, “আমি এখনও জ্ঞান-সমুদ্রতীরে উপলখণ্ড আহরণ করিতেছি,” সেই জ্ঞানলাভ ভারতবর্ষীয়া বালিকাদিগের দশ, এগার বৎসরেই শেষ হইয়া যাইত। তিনি এই অবস্থা দেখিয়া অবাক হইলেন। তিনি আরও আশ্চৰ্য্যান্বিত হইলেন যে, স্ত্রীলােকদিগের শিক্ষা দিবার জন্য প্রায় প্রত্যেক স্কুলে পুরুষ শিক্ষক নিযুক্ত। শিক্ষয়িত্রী পাওয়া অতি দুর্লভ ছিল। বােম্বাই নগরে আসিবার কয়েক দিন পরে তিনি আহ্ মেদাবাদ নগরে গমন করেন। এই স্থানের কারাগৃহ, হাঁস- পাতাল, উন্মাদালয়, বিদ্যালয় প্রভৃতি পরিদর্শন করেন এবং তৎসঙ্গে ভারতবর্ষীয়দিগের চরিত্র এবং অভাবও পৰ্যবেক্ষণ

মেরী কার্পেন্টার
করিয়া ভারতের অবস্থা সম্বন্ধে প্রভূত জ্ঞানলাভ করেন।
তাঁহার প্রখর পৰ্যবেক্ষণক্ষমতা এবং তীক্ষ্ণ অনুভব শক্তির
দ্বারা তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রকার অধিবাসীদিগের
জীবনালােচনা করিয়া অপার আনন্দ সম্ভোগ করিতেন। তিনি
অবসর সময়ে ভারতের অসীম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য চিত্রিত
করিয়া ভারতের প্রতি তাহার অনুরাগ প্রকাশ করিতেন।
তিনি তাহার অমূল্য কাৰ্য দ্বারা ভারতানুরাগের পরিচয়
দিয়াছিলেন ; অধিকন্তু চিত্রকলা দ্বারাও তার হৃদয়ের
এই গভীর ভাব প্রকাশ করিয়া আনন্দ পাইতেন। আহ,-
মেদাবাদ নগরেই তাহার ভারতীয় কার্যপ্রণালী স্থির হয়।
ভারতে স্ত্রীশিক্ষার যে সকল অন্তরায় বর্তমান, তা তিনি
সাধারণ ভাবে জ্ঞাত ছিলেন। প্রাচীন কালে ভারতের
নারীদিগের শিক্ষার অতি উচ্চ আদর্শ ছিল সত্য ; কিন্তু এই
সময়ে দেশের লােকে এই সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন এবং
অমনােযাের্গী হইয়া পড়িয়াছিল। মেরী কার্পেন্টার কলি-
কাতা, পুনা, আহমেদাবাদ, মাদ্রাজ, বােম্বাই প্রভৃতি
স্থানের বালিকাবিদ্যালয়গুলি পরিদর্শন করেন। তিনি
কলিকাত আগমন করিয়া বেথুন স্কুল পরিদর্শন করেন।
এবং ব্রাহ্মসমাজের উপাসনায় যােগদান করেন।
তিনি ভারতের রাজপুরুষদিগের তিনটি বিষয়ের প্রতি
৩৭

মেরী কার্পেন্টা।
মনােযােগ আকর্ষণ করেন—স্ত্রীশিক্ষা, সংশােধন-বিদ্যালয় এবং
কারাবন্দীদের অবস্থা। তাহার অদম্য উৎসাহ, অক্লান্ত পরি-
শ্রমের ফলে দেশের লােকে এই তিন বিষয়ের প্রতি মনাে-
যােগ দিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। তাহারা সকলে স্ত্রীশিক্ষার
প্রয়ােজনীয়তা বুঝিতে লাগিলেন এবং নারীদিগকে শিক্ষা
দিতে উৎসাহ প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলেন। নারী-
জীবনের উদ্দেশ্য অতি উচ্চ এবং মহান্। উপযুক্ত শিক্ষা
পাইলে, নারী জগতে মহৎ কাৰ্য্য সাধন করিতে পারেন।
ভারতের নারীদিগের হীন অবস্থা, জীবনের হীন লক্ষ্য
দেখিয়া মেরী কার্পেন্টার অত্যন্ত দুঃখিত হন। মেরী
কার্পেন্টার দৃঢ়রূপে বিশ্বাস করিতেন যে, ভারতের নারী
শিক্ষিতা না হইলে ভারতবর্ষ কোন কালেও জগতে
মধ্যে উপযুক্ত স্থান অধিকার করিতে পারিবে না। তিনি
এই ভাব জনসাধারণের মধ্যে বিস্তার করিতে প্রাণপণে
চেষ্টা করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, “এই মহৎ
কাৰ্য্য সম্পাদন করিবার পথে বহু বাধা, বিঘ্ন বর্তমান আছে
সত্য, কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতা হইতে বলিতেছি যে,
দৃঢ় বিশ্বাস, অক্লান্ত অধ্যবসায় এবং অদম্য উৎসাহ থাকিলে
সকল বাধা বিঘ্ন দূরে পলায়ন করিবে, এই কার্যে সিদ্ধি-
লাভ করা যাইবে।”

মেরী কার্পেন্টা। তিনি কলিকাতায় আগমন করিয়া নিম্নশ্রেণীর বালক- বালিকাদিগের জন্য অবৈতনিক বিদ্যা- অবৈতনিক লয় স্থাপন করেন ইতােমধ্যে সার জন্ বালিকাবিদ্যালয়। লরেন্স সিমলা হইতে কলিকাতা আগ- মন করাতে তিনি গবর্ণমেন্ট-প্রাসাদে বাস করিবার জন্য নিমন্ত্রিত হইয়া তথায় গমন করেন। মেরী কার্পেন্টার স্ত্রীশিক্ষা, কারাগৃহের উন্নতি-সম্বন্ধে যে সকল প্রস্তাব করিয়াছিলেন, এবং যে প্রণালী স্থির করিয়াছিলেন, তাহা কাৰ্যে পরিণত করিতে সার জন্এবং লেডী লরেন্স, তাহাকে নানা প্রকারে সাহায্য করেন। তিনি গবর্ণমেন্ট প্রাসাদ হইতে ভারত নারী-সম্বন্ধে তাঁহার ভগিনীকে এই পত্র লিখিয়াছিলেন,-“গোড়া লােক গুলি আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসে না। আমি ভিন্নধর্মাবলম্বিনী, এই জন্য যে, তাহারা আমার সহিত দেখা করে না, তাহা নহে; আমি ভারতীয় স্ত্রীলােকদিগের অবস্থার উন্নতি করিতে এবং তাহাদিগকে শিক্ষা দিতে আসিয়াছি, এই একমাত্র কারণে তাহারা আমার নিকট আসে না। স্ত্রীলােকগণ শিক্ষিতা হইলে, তাহাদের অবস্থা উন্নত হইলে, পুরুষগণ তাহাদের স্ত্রীদিগকে আর সম্পূর্ণ দাসপাশে আবদ্ধ করিয়া রাখিতে পারিবে না, এই স্বার্থপর ভাবে প্রণােদিত হইয়াই মেরী কার্পেন্টার। এই গোঁড়া লােকগুলি সাবধানতার সহিত আমার সংস্রব ত্যাগ করিয়াছে। আমারও ইহাদের জন্য কোন সহানু- ভূতি নাই। কিন্তু এমন অনেক মহাপ্রকৃতিসম্পন্ন, বিদ্বান্, উন্নতচরিত্রের লােক আছেন, যাহাদের কাৰ্য্যের সহিত আমি পূর্ণরূপে সহানুভূতি করি।” মেরী কার্পে- ণ্টার কলিকাতায় অবস্থানকালীন কয়েকটি বক্তৃতা করেন। একটি সভাতে তিনি ইংলণ্ডের সমাজ-বিজ্ঞান সভার কাৰ্য বর্ণনা করেন। এই সভার পর বৎসরই বঙ্গদেশীয় সমাজ বিজ্ঞান সভা (Bengal Social Science Association) স্থাপিত হয়। উপযুক্ত বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হইল বটে; কিন্তু ; ফিমেল, নর্মাল উপযুক্ত শিক্ষয়িত্রী পাওয়া দুর্লভ। উপ- যুক্ত শিক্ষয়িত্রী ভিন্ন বালিকাদিগের শিক্ষা দেওয়ার আশা, সুদূরপরাহত। ইহা দেখিয়া তিনি শিক্ষয়িত্রী প্রস্তুত করিবার জন্য ফিমে নর্মাল (Female Normal School) স্কুল স্থাপন করিতে চেষ্টিত হইলেন। এই বিষয়ের প্রয়ােজনীয়তা বুঝাইয়া দিয়া ভারতের তদানীন্তন ষ্টেট সেক্রেটারী লর্ড সলবেরীকে সমুদয় অবস্থা অবগত করিয়াছিলেন। ভারতের তৎকালিক গবর্নর জেনারেল সার জন্ লরেন্স, বঙ্গেশ্বর সার রিচার্ড টেম্পল, শিক্ষা বিভাগের স্কুলের প্রস্তাব। ৪০ মেরী কার্পেন্টার। ডিরেক্টর ও প্রধান প্রধান রাজকর্মচারীদিগকে স্ত্রী- শিক্ষা এবং ফিমেল নৰ্ম্মা স্কুল স্থাপনের গুরুতর প্রয়াে- জনীয়তা বুঝাইয়া দেন। মেরী কার্পেটার এক বৎসর ভারতে থাকিয়া, স্ত্রীশিক্ষা, কারা-সংস্কার, কয়েদীদিগের শিক্ষা প্রভৃতি কতক গুলি গুর.. তর কার্যের অবতারণা করিয়া ইংলণ্ডে গমন করেন। ইংলণ্ডে গমন করিয়াও তিনি উপরি-উক্ত বিষয় সম্বন্ধে ভারতের গৰ র্ণর জেনারল, বােম্বাইয়ের গবর্ণর এবং ভারতের প্রধান প্রধান উৎসাহী লােকদিগের সহিত পত্রালাপ করেন এবং সুযুক্তিপূর্ণ প্রভাব দ্বারা গবর্ণমেন্টের মনােযাগ আকর্ষণ করিতে চেষ্টা করেন। তিনি দেখিলেন, ভারতের উৎসাহী ব্যক্তিগণ যদি এই বিষয়গুলিসম্বন্ধে গবর্ণমেন্টের নিকট আবেদন করেন, তবে কাৰ্য্য,অচিরে সিদ্ধ হইবার সম্ভাবনা। তাহারই পরামর্শ- মতে ভারতের প্রধান প্রধান উদ্যোগিগণ গবর্ণমেন্টের নিকট স্ত্রীশিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা-সম্বন্ধে আবেদন করেন। এই আবেদনের ফলে গবর্ণমেন্ট ফিমে নৰ্ম্মা স্কুল-স্থাপনের জন্য বাৎসরিক ২২৫০০ টাকা নির্ধারণ করেন। মেরী কার্পেন্টার ইংলণ্ডে এই সংবাদ শ্রবণ করিয়া অত্যন্ত আশা- দ্বিতা হন এবং ভারতের স্ত্রীশিক্ষার হিতৈষীদিগকে সত্বর এই শুভকার্যে নিযুক্ত বার জন্য অনুবােধ করেন ।

মেরী কার্পেন্টার। ১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে ৭ই নবেম্বর মেরী কার্পেন্টার পুনরায় লেডি সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের ভারতবর্ষে আগমন করেন। ভারতবর্ষে পদ গ্রহণ। আগমন করিয়া তিনি ফিমে না স্কুলের কোন প্রকার চিহ্ন না দেখিয়া গবর্ণমেন্টের সাহায্যে স্বয়ং বােম্বাই সহরে এই প্রকার একটি বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া তাহার লেঙা সুপারিন্টেন্টের পদ গ্রহণ করেন। তাঁহার এই মহাদৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হইয়া বহুলােক স্ত্রী-শিক্ষা কাৰ্য্যে অগ্রসর হন এবং কয়েকটি বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। তাহারই যত্ন এবং চেষ্টায় কয়েকটি দানশীলা মহিলা ও ধনী পুরুষ এই সকল বিদ্যালয়ে বৃত্তিদান করিতে স্বীকৃত হন। কিন্তু অতি- রিক্ত পরিশ্রমে পীড়িত হইয়া তিনি পুনরায় ইংলণ্ডে প্রত্যা- বৰ্তন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। পূৰ্বে দুইবার ভারতবর্ষে আগমন করিয়া অকৃত্রিম অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের সহিত যে বীজ বপন করিয়া- ছিলেন, তৃতীয় বার এদেশে আসিয়া তাহার কিঞ্চিৎ ফল দেখিয়া ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আশান্বিত হন। দুঃখিনী ভারত-নারীর প্রতি যে অপার্থিব প্রেমে অনুপ্রাণিত হইয়া তাহাদের দুঃখ দূর করিতে চারি বৎসর পূর্বে ভারতে আসিয়াছিলেন, শত লােকের অবজ্ঞা, উপহাস, কঠিন আচরণ এবং নিরাশার মধ্যেও তাহা অটল ছিল। তিনি ৪২

মেরী কার্পেন্টার।
মনে করিয়াছিলেন, তাহার এই আগমনই ভারতে শেষ
আগমন হইল। ইহা ভাবিয়া স্ত্রীশিক্ষা-সম্বন্ধে তিনি লিখিয়া-
ছিলেন, “আমি জানি যে, যদিও বিষয়ী এবং স্বার্থপর ব্যক্তি
গণ ইহা অবিশ্বাস করিবে এবং এই বিষয় লইয়া উপহাস
করিবে, কিন্তু এদেশে এমন অনেক মহানুভব, উন্নত-প্রকৃ-
তির লােক আছেন, যাহারা এই কার্যের শক্তি অনুভব
করিয়া ইহাতে প্রকৃতই আনন্দ লাভ করিয়াছেন। তাহারা
যে, দেশমধ্যে এই ভাব প্রজ্জ্বলিত করিবেন, তাহাতে
আর সন্দেহ নাই। আমি বিশ্বাস ও আশার সহিত
বলিতেছি, ভারতবর্ষে এই কাৰ্য্য উত্তরােত্তর উন্নতি লাভ
করিবে। অতএব ভারতবর্ষ, এখন তােমার নিকট বিদায়
হই।”
ইংরাজ এবং ভারতবাসীদিগের মধ্যে প্রতিস্থাপনের জন্য
তিনি ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিষ্ট নগরে ন্যাশন্যাল ইণ্ডিয়ান্ এসাে-
সিয়েশন্ (National Indian Association) স্থাপন
করেন। তিনি এই এসােসিয়েশন্ দ্বারা ইংরাজদিগের মধ্যে
ভারত সম্বন্ধে অধিকতর জ্ঞানবিস্তার করিতে প্রয়াস পাইয়া-
ছিলেন। তিনি ইহা দ্বারা ভারতের সামাজিক অভাব, সাদা-
রণ লােকের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার, স্ত্রীশিক্ষার উন্নতি, কারা-
গৃহসমূহের সংস্কার এবং অল্পবয়স্ক অপরাধীদিগের জন্য

মেরী কার্পেন্টার।
সংশােধন-বিদ্যালয় স্থাপন প্রভৃতি প্রয়ােজনীয় বিষয় সম্বন্ধে
ইংলণ্ডের লােকের মনোেযােগ আকর্ষণ করিতে চেষ্টা
করিয়াছিলেন।
১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে মেরী কার্পেন্টার শেষ বার ভারতবর্ষে
চতুর্থ বার আগমন করেন। এবারে ভারত-নারী-
ভারতে আগমন। দিগের অবস্থা পূৰ্ব্বাপেক্ষা উন্নত দেখিয়া
অত্যন্ত আনন্দিত হন। পূৰ্ব্বে যাহারা জ্ঞানালােকের
আস্বাদ কিছুমাত্র পায় নাই, তাহাদের মধ্যে কাহাকে
কাহাকে শিক্ষাপ্রাপ্ত দেখিয়া অত্যন্ত আশান্বিতা হন।
তাহার প্রাণগত পরিশ্রমের ফল যে ফলিয়াছে, ইহাতে
ঈশ্বরের নিকট গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। পুনাতে
তিনি একদিন একটি স্কুল পরিদর্শন করিতে গিয়াছিলেন।
স্কুলগৃহে প্রবেশ করিতেই সুন্দর ইংরাজীতে কে যেন
তাহাকে সাদর অভ্যর্থনা করিল। তিনি ফিরিয়া দেখেন,
বিচিবাই-নাম্নী একটী মহিলা তাঁহার সহিত কথা বলিতে-
ছেন। বিচিবাই বলিলেন, “নয় বৎসর পূর্বে আপনিই
আমাকে ইংরাজী শিক্ষার প্রতি অনুরাগিণী করেন। তাহার
ফল এক্ষণে আমি আপনার সহিত ইংরাজীতে কথা
বলিতে পারিতেছি।” কিন্তু তখনও দেশে আশানুরূপ
স্ত্রীশিক্ষা প্রবর্তিত হয় নাই, কিংবা মহিলাদের হীন অবস্থার

মেরী কার্পেন্টার । উন্নতি হয় নাই। তিনি এই শেষ বারেও ইংলণ্ডের এবং ভারতের প্রধান রাজকর্মচারীদিগকে এই বিষয়ে মনােযােগ দিতে একান্ত অনুরােধ করেন। এদেশের কল কারখানাগুলিতে যে সকল কুলী, মজুর কাজ করিত, তাহাদের অবস্থা বড় ফ্যাক্টরী আইন। শােচনীয় ছিল। কল-কারখানাতে অল্প বয়স্ক বালকবালিকাগণ কাজ করিত এবং পূর্ণবয়স্ক লোেক- দিগকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করিতে হইত। অথচ তাহাদের পারিশ্রমিক পৰ্যাপ্ত পরিমাণ ছিল না। মেরী কার্পেন্টার বােম্বাই, আহমেদাবাদ প্রভৃতির কল-কারখানাগুলিতে গিয়া তথাকার শ্রমজীবীদিগের দুরবস্থা দর্শনে ব্যথিতহৃদয় হন; এবং যাহাতে কল-কারখানাতে পাঁচ এবং তদুর্ধ বৎসর বয়স্ক বালকবালিকাদিগের নিয়ােগ এবং পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি- দিগের অতিরিক্ত পরিশ্রম নিবারিত হয়, তজ্জন্য তিনি যথা- সাধ্য চেষ্টা করেন। বােম্বাই নগরে কাপড়ের কলের কারখা- নাতে নিয়ােজিত বালক বালিকাদিগের শিক্ষার বন্দোবস্ত করিতে কর্তৃপক্ষকে উপদেশ দেন। তিনি যে স্থানে গমন করিতেন, সেই স্থানেই কারাগারের বন্দী অথবা কারখানার শ্রমজীবীদিগের পরিশ্রমের সময় নির্দিষ্ট করিতে চেষ্টা করি- তেন। তিনি দেখিয়াছিলেন, ইংলণ্ডের ন্যায় ভারতেও আইন মেরী কার্পেন্টার। দ্বারা কারখানার বালকবালিকাদিগের শিক্ষার বন্দোবস্ত এবং শ্রমজীবীদিগের পরিশ্রমের সময় নির্দিষ্ট করিতে না পারিলে, তাহার ফল অতি অশুভ হইবে। ইহা বুঝিয়া তিনি ভার- তের ষ্টেট সেক্রেটারীর নিকট ইহার প্রয়ােজনীয় প্রতিপন্ন করিয়া তাহার মন্তব্য প্রেরণ করেন এবং তাহারই যত্নে ভারত-গবর্ণমেন্ট ফ্যাক্টরী আইন বিধিবদ্ধ করেন। কারা-সংস্কার। মেরী কার্পেন্টার যে সকল জনহিতকর কার্যের অনু- ষ্ঠান করেন, ভারতের কারা-সংস্কার তাহাদের মধ্যে একটা উল্লেখযােগ্য ঘটনা। চুরি, ডাকাতি, বা হীনচরিত্রের জন্য রাজদণ্ডে দণ্ডিত কারাবাসীদিগের উপরও মেরী কার্পেন্টারের মধুময় স্নেহ সঞ্চারিত হইয়াছিল। তিনি এমনই করুণ- হৃদয়া ও ক্ষমাশীলা রমণী ছিলেন যে, সমাজের ঘৃণিত, রাজদণ্ডে দণ্ডিত কারাবাসিগণও তাহার নিকট কৃপার পাত্র বলিয়া গণ্য হইল। তিনি বুঝিলেন, অপরাধীদিগকে কেবল কঠিন শাস্তি দিলেই তাহাদের চরিত্র সংশােধন হইবে না। তাহাদিগকে ধৰ্ম্ম ও নীতি শিক্ষা দিয়া চরিত্রবান্ ৫ ৬ মেরী কার্পেন্টা । করা আবশ্যক। তিনি তাহাদের স্বাস্থ্য-সংরক্ষার, শিক্ষা বিধান ও জ্ঞানােন্নতির জন্য মনঃসংযোেগ করিলেন। মেরী কার্পেন্টার কারাগৃহের উন্নতিসম্বন্ধে ভারত গবর্ণমেন্টের নিকট কয়েকটি প্রস্তাব করেন। প্রথমতঃ, কয়েদীদিগের স্বতন্ত্র শয়নগৃহের অভাবের প্রতি কর্তৃপক্ষের মনােযােগ আকর্ষণ করেন। ভিন্ন ভিন্ন শয়নগৃহ না থাকাতে, এক একটি গৃহে প্রায় ৪০/৫০ জন কয়েদী শয়ন করিত। দ্বিতীয়তঃ, উপযুক্ত শিক্ষকের অধীনে রাখিয়া কয়েদীদিগকে শিক্ষা দেওয়ার প্রয়ােজনীয় প্রতিপন্ন করেন। তৃতীয়তঃ, তিনি বলেন যে, স্ত্রী-কয়েদীদিগের অব- স্থার উন্নতি করিতে হইলে, তাহাদিগেরও উপযুক্ত শিক্ষা ও ভিন্ন ভিন্ন শয়নগৃহের বন্দোবস্ত এবং স্ত্রী-কারাধ্যক্ষের তত্ত্বাবধানে তাহাদিগকে রাখিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে কারাগার সমূহের উন্নতি বিধান সম্বন্ধে আলােচনা করিবার জন্য ইংলণ্ডে এক অন্তর্জাতিক কংগ্রেস বসে। মেরী কার্পেন্টার কারাগারের উন্নতি বিধান সম্বন্ধে তাহার অভিজ্ঞতা লিপিবন্ধ করিয়া এই কংগ্রেসে এক প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই বিষয় লইয়া যে সকল জনহিতৈষী মহাত্মাগণের সহিত তাহার পত্রালাপ হইয়াছিল, তাহাদের সহিত তাহার সাক্ষাৎ পরিচয় হয়। তাহারা সকলে মেরী ৪৭

মেরী কার্পেন্টার।
কার্পেন্টাকে সাদর অভ্যর্থনা করেন, এবং তাহার প্রস্তাবিত
কারা-সংস্কারের বিষয় সমর্থন করেন। ইহার কিছুকাল পরে
আমেরিকার কারাগারের অবস্থা পরিদর্শন করিতে তথায়
গমন করেন। আমেরিকায়ও ভারতের স্ত্রীশিক্ষা এবং সাধা-
রণ অবস্থা সম্বন্ধে তিনি স্থানে স্থানে কয়েকটি বক্তৃতা
করিয়াছিলেন।
মেরী কার্পেন্টার শেষ বারে ভারতবর্ষে আগমন করিয়া
ভারতের প্রধান প্রধান নগর পরিদর্শন করেন এবং স্ত্রীশিক্ষা
ও কারাগৃহের অবস্থার বিবরণ, লর্ড সলবেরীর নিকট
প্রেরণ করেন। তিনি কারাগৃহসম্বন্ধে যে বিবরণ লিখিয়া
পাঠাইয়াছিলেন, তাহার পর বৎসরেই তাহা পার্লামেন্টে
বিচারার্থ উত্থাপিত হয়। অল্পবয়স্ক অপরাধীদিগের জন্য
সংশােধন বিদ্যালয়ের প্রয়ােজনীয়তা সম্বন্ধে তিনি যে সকল
প্রস্তাব করেন,তাহা ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে ভারত গবর্ণমেন্ট কর্তৃক
আইনে পরিণত হয়। বর্তমান সময়ে ভারতের বন্দীদের
যে অবস্থার উন্নতি দেখা যায় এবং ভারতে যে সকল সংশাে-
ধন বিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছে,মেরী কার্পেন্টার তাহার
মূল।
৪৮

মেরী কার্পেন্টার মৃত্যু। মেরী কার্পেন্টার ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে ৭০ বৎসর বয়সেও নবীন-তেজে,অদ্যম উৎসাহে সকল প্রকার কাৰ্য্য সুশৃঙ্খলার সহিত সম্পন্ন করিয়াছিলেন। ভারতবর্ষের নারীজাতির উন্নতির চিন্তা তাহার হৃদয়ে শেষ পর্যন্ত বর্তমান ছিল। ইংলণ্ডের মহিলাগণ যাহাতে পার্লামেন্টে পুরুষদিগের ন্যায় ভােট দিতে পারেন, সেজন্যও তিনি অতিশয় যত্নশীল ছিলেন। মাদ- কতা নিবারণের অনুকূলে যে সকল সভা-সমিতি হয়, তাহা তেও তিনি প্রাণমন দিয়া যােগদান করিয়াছিলেন। মানব চরিত্রের উন্নতিসাধনসম্বন্ধে যে সকল আন্দোলন হইয়াছে, সে সমুদয়ে তিনি যােগ দিয়াছেন এবং তাহার অসাধারণ বিজ্ঞতা দ্বারা সে সকল আন্দোলনই সফল করিয়াছেন। তিনি এই বৎসরেই পরলােক গমন করেন। ১৪ই জুনে দিবসের প্রত্যেক কর্তব্য সম্পাদন করিয়া পার্লামেন্টের সভ্যগণের সহিত জনহিতকর কাৰ্য্য সম্বন্ধে কথা বলিয়া, এবং চিঠি পত্র লিখিয়া রাত্রিতে শয়ন করিতে গমন করেন। পরদিন প্রাতে আর তাহার জীবন্ত, উৎসাহপূর্ণ তেজোয় মৃত্তি কেহ দেখিতে পাইল না। তখন অবিনশ্বর আত্মা তাহার নশ্বর দেহ ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছে।

মেরী কার্পেন্টার।
প্রাতঃকালে এই দুঃসংবাদ চারি দিকে রাষ্ট্র হইয়া
পড়িল। তাহার আকস্মিক মৃত্যুসংবাদে
মেরী কার্পেন্টারের
আত্মীয় স্বজন একেবারে শােকমগ্ন
সমাধি।
হইয়া পড়িলেন। অনাথ, দীন, দরিদ্র
লােক মাতৃহীন হইয়াছে বলিয়া আর্তনাদ করিতে লাগিল।
তাঁহার মৃত্যুসংবাদ তারযােগে ভারতে ও আমেরিকায়
প্রেরিত হইয়াছিল। তাহার মৃত্যুতে ইংলণ্ড, আমেরিকা এবং
ভারতবর্ষের জনসাধারণ সকলেই দুঃখিত হইয়াছিলেন। মেরী
কার্পেন্টারের মৃত্যুর চারি দিন পরে অর্থাৎ ১৯শে জুন বুধবার
অর্ণের ভেলের সমাধিক্ষেত্রে তাহার মাতার ও প্রিয় ভগিনী
এনার সমাধি-মন্দিরের পার্শ্বে মহাসমারােহের সহিত তাহার
নশ্বর দেহ সমাহিত করা হয়। বহু বন্ধু বান্ধব, ধনী, নির্ধন,
বালক বালিকা মিলিয়া মহাসমারােহের সহিত শ্রেণীবদ্ধ
হইয়া কুমারী কার্পেন্টারের শবদেহ সমাধিক্ষেত্রে আনয়ন
করিয়াছিলেন। এই শােকাৰ্ত্ত লােকশ্রেণীর মধ্যে কেবল যে,
ইংলণ্ডের লােকই ছিলেন, তাহা নহে; যখন তাহার মৃতদেহ
মহাত্মা রাজা রামমােহন রায়ের গৌরবমণ্ডিত সমাধি-মন্দি-
রের নিকটে পঁহুছে, তখন দুইটী ছােট ভারতবর্ষীয় বালককে
হাত ধরাধরিপূৰ্ব্বক ক্রন্দন করিয়া তাহাদের সহিত যাইতে
অনেকে দেখিয়াছিলেন।

মেরী কার্পেন্টার। মেরী কার্পেন্টারের সুদীর্ঘ কর্মময় জীবন ৭০ বৎসর বয়সে এইরূপে শেষ হইল। তাহার মৃত্যুর পর তাহার অমূল্য স্মৃতিরক্ষাৰ্থ শ্রমজীবী বালক বালকাদিগের জন্য দুইটি আশ্রম স্থাপিত হয়। তাঁহার অসাধারণ জীবনের কার্যাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ একটি প্রস্তর ফলকে খােদিত হইয়া ব্রিষ্ট্র নগরের উপ- সনালয়ে রক্ষিত হইয়াছে। তাঁহার সহাধ্যায়ী বন্ধু ডাক্তার মার্টি নাে প্রস্তর ফলকে খােদিত এই বিবরণ লিখিয়াছিলেন :- SACRED TO THE MEMORY OF MARY CARPENTER, Foremost among the founders of Reformatory and Industrial Schools in this city and realm. Neither the claims of Private duty nor the tastes of a cultured mind could withdraw her compassionate eye from the uncared-for children of the streets. Loving them while yet unlovely, sh so formed them to tho fair and good as to inspire others with her faith and hope, and thus led the way to a National system of moral rescue and preventive discipline. Taking also to heart the grievous !ot of oriental women in the last decade of her life she four times went to India,

মেরী কার্পেন্টার।
and awakened an active interest
in their education and training for serious duties.
No human ill escaped her pity, or cast down her trust
with true self-sacrifice she followed
in the train of Christ,
to seek and to save that which was lost
and bring it home to the father in heaven.
Desiring to extend her work of piety and love,
many who honoured her have instituted in her name,
some homes for the houseless young,
and now complete their tribute of affections
by erecing this memorial.
Born at Exeter, April 3rd, 1807,
Died at Bristol, June 15th, 1877.
বঙ্গানুবাদ।
এই রাজ্যের এবং নগরের সংশােধন এবং শিল্প-বিদ্যালয়
স্থাপয়িতাদিগের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্যা মেরী কার্পে-
স্টারের পবিত্র স্মৃতিরক্ষাৰ্থ ইহা
স্থাপিত হইল।
যাহার পারিবারিক কৰ্তব্যসমূহ কিংবা যাহার উন্নত, সুসং-
স্কৃত মনের উন্নততর প্রবৃত্তি, অযত্নে প্রতিপালিত, সমাজের
ঘৃণ্য বালকবালিকাদিগের শােচনীয় অবস্থা হইতে তাঁহার
সুকোমল, সস্নেহ দৃষ্টিকে প্রত্যাবৃত্ত করিতে সমর্থ হয়
নাই——যিনি এই প্রকার ঘৃণিত মানবদিগকে অগাধ প্রেমে
চালিত করিয়া সৎ এবং সুন্দর করিয়াছিলেন—যাহার

মেরী কাপেন্টর। সংস্রবে আসিয়া লােকে, বিশ্বাস এবং আশাতে পরিপূর্ণ হইয়াছেন এবং যিনি নৈতিক অধধাগতি হইতে মানবকে নৈতিক উন্নতির পথে লইয়া যাইবার এক সুন্দর উপায় উদ্ভাবন করিয়াছিলেন—যিনি শেষ জীবনে পূৰ্ব্বদেশীয় স্ত্রীলােকদিগের শশাচনীয় অবস্থায় দ্রবীভূত হইয়া ভারত- বর্ষে চারি বার গমন করিয়া সেই দেশের লােকদিগকে সুশিক্ষায় আগ্রহান্বিত করিয়াছিলেন—প্রত্যেক মানবীয় দুঃখ-দুর্দশা যাহার দয়া আকর্ষণ করিয়াছে ; কিন্তু বিশ্বাস ভগ্ন করিতে পারে নাই—যিনি প্রকৃত আত্মােৎসর্গের দ্বারা পাপ- পঙ্কে নিমজ্জিত মানবকে উদ্ধার করিয়া এবং ধর্মপথে আনয়ন করিয়া যীশু খৃষ্টের পদানুসরণ করিয়াছিলেন- তাহার প্রেম এবং দয়ার কাৰ্য্য বিস্তৃত করিবার অভিপ্রায়ে যাহারা তাহার নামে অনাথাশ্রম স্থাপন করিয়াছেন, তাহারা তাহার গৌরবময়ী স্মৃতি রক্ষাৰ্থ এই স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করিয়া তাহাদের অভিপ্রায় পূর্ণ করিলেন।” জন্ম, এক্সিটার নগরে, এপ্রিল ৩রা, ১৮০৭ খৃঃ।. মৃত্যু, ব্রিষ্টল নগরে জুন ১৫ই, ১৮৭৭ খৃঃ।

মেরী কাপেণ্টার । উপসংহার। কুমারী মেরী কার্পেন্টার মৃত্যুদিবস পর্যন্ত কাৰ্য্য করিতে বিরত হন নাই। কি অত্যাশ্চর্য, অবর্ণনীয় কৰ্ম্মময় জীবন! শেষ দিন পর্যন্ত কেবল কাজ, কাজ, কাজ! পরার্থে আত্মােৎসর্গের কি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ! মানবের দুঃখ দূর করিবার কি আকুল পিপাসা ! ইচ্ছা করিলে সুখসৌভাগ্যে পরিবেষ্টিত হইয়া আরামে জীবন কাটাইতে পারিতেন ; কিন্তু তাহা অপেক্ষা চির-কৌমার্যব্রত অবলম্বন পূৰ্ব্বক শত অত্যাচার, বাধা, বিঘ্ন ও দুঃখকে তুচ্ছ করিয়া পরের জন্য আত্মবিসর্জনকেই বরণ করিয়াছিলেন। ঈশ্বরের প্রতি এবং তাঁহার সন্তান মানবের প্রতি এ কি গভীরপ্রেম! এই প্রগাঢ় প্রেমে অনুপ্রাণিত হইয়া তিনি নিজের সুখ তুচ্ছ করিয়া তাহা- দের জন্য প্রাণ সমৰ্পণ করিলেন। তাহার স্নেহ প্রবণ হৃদয়, জগতের মানব জাতির উপর বিক্ষিপ্ত হইয়াছিল। যখন যে দেশে জনসাধারণের দুরবস্থার কথা শুনিতেন, তখনই তাহাদের দুঃখবিমােচনে প্রাণ মন সমর্পণ করিতেন। ইংল- ণ্ডের অনাথ দরিদ্রদিগের উন্নতিবিধান, দরিদ্র কৃষিজীবী ও শ্রমজীবীদিগের জন্য নৈশবিদ্যালয় স্থাপন, হীনচরিত্র লােক- দিগের মানসিক উন্নতিকল্পে সংশােধন শিক্ষাগার প্রতিষ্ঠা, ৫৪ মেরী কার্পেন্টার। আমেরিকার দাসত্বপ্রথার বিরােধীদিগের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন,কারাবাসীদিগের শিক্ষা ও স্বচ্ছতার জন্য কারাসংস্কার প্রভৃতি নানা কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। এই অগাধ প্রেমে চালিত হইয়াই তিনি সুদূর ভারতের চিরনিগ্রহ- ভাজন, অধঃপতিতা, দুঃখিনী নারীদিগের অবস্থার উন্নতি করিতে ভারতে আসিয়াছিলেন। তিনি যেখানে যে সৎকাৰ্য্য হইতেছে দেখিতেন,—কি স্বদেশে, কি বিদেশে, সেখানেই অন্তরের সহিত যােগদান করিতেন। নিরাশ্রয়, দরিদ্র বালকবালিকাদিগের উন্নতি চিন্তা তাঁহার সমগ্র জীবন পূর্ণ করিয়াছিল। তাহাদের অবস্থার প্রতি লােকের মনােযােগ আকর্ষণ করিবার জন্য শত শত প্রবন্ধ লিখিয়া সভাসমিতিতে পাঠ করিয়াছেন। পার্লামেন্টের প্রতিপত্তিশালী সভ্যগণকে তাহাদিগের অবস্থার প্রতি মনােযােগ দিতে বাধ্য করিয়াছেন। তাহাদিগকে উন্নত এবং সুরক্ষিত অবস্থায় রাখিতে প্রাণ অৰ্পণ করিয়াছিলেন। তঁাহার অক্লান্ত অধ্যবসায়ের ফলে ত্রিশ বৎসর পরে দরিদ্র- বিদ্যালয়, পার্লামেন্ট কর্তৃক অনুমােদিত এবং সাহায্য প্রাপ্ত হয়। মেরী কার্পেন্টার অন্যান্য বহু জনহিতকর কার্যে লিপ্ত থাকিলেও, নিম্ন শ্রেণীর নিরাশয় বালকবালিকাদিগের মঙ্গল-সাধনে তিনি আজীবন ব্যাপৃত ছিলেন। A

মেরী কার্পেন্টার
ভারতবাসী এখনও নারীজাতিকে অতি হীন অবস্থা
এবং হীন আদর্শের মধ্যে রাখিয়াছেন। নারীগণ যাহাড়ে
সুশিক্ষিত হইয়া জগতের কাৰ্য্য করিতে পারেন, তাহারা
নারীদিগকে কি সেই সুযােগ প্রদান করিবেন না ? এই মহী-
মসী মহিলার জীবনী কি আমাদিগকে শিক্ষা দিতেছে না যে,
নারীজীবন অবজ্ঞার বস্তু নহে এবং উপযুক্ত শিক্ষা ও সুযােগ
পাইলে, নারীজীবন কত দূর উন্নত এবং মহৎ হইতে
পারে? নারী হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়া পৃথিবীতে কিছু
করিতে পারা যায় কি না,তাহা পুণ্যবতী মেরী কার্পেন্টারের
জীবন হইতে কি দেখিতে পাইতেছি না? তাঁহার অনুষ্ঠিত
কাৰ্য্যসমূহ কি সকল পুরুষ এবং রমণীরই অনুকরণীয় নহে ?
সম্পূর্ণ

মেরী কার্পেন্টার সম্বন্ধে মন্তব্য। Babu Rabindra Nath Tagore, the premier poet of Bengal writes :- তােমর প্রণীত “মেরী কার্পেন্টার” গ্রন্থখানি উপহার পাইয়া প্রীত হইলাম। আমার ছেলেদেব পড়িবার জন্য ইতিপূর্বে তােমার “শিখের বলিদান” একখানি আনাইয়া- ছিলাম। বইখানি পড়িয়া ছিড়িয়া শেষ করিয়া ফেলিতে বিলম্ব হয় নাই। দুঃখের বিষয়, ঘরের ছেলেদের হাতে দিবার মত এমনতর বই আর বাঙ্গলায় নাই। ভারত- বর্ষের ইতিহাস হইতে সকল প্রকার বীরত্বের দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করিয়া তােমাকে বই লিখিবার জন্য অনুরােধ করিবার অবসর প্রতীক্ষা করিতেছিলাম, আজ এই সুযােগে তাহা জ্ঞাপন করিলাম। মেরী কার্পেন্টার বীরাঙ্গনা। ইহারা কোন বিশেষ দেশের নহেন—ইহারা বিশ্বের অধিবাসিনী ;—এই জন্য ইহারা সকল দেশের স্ত্রীলােকেরই পূজনীয়া এবং পুরুষেরও ভক্তির পাত্রী। তথাপি ইহাদের কর্মক্ষেত্র অনেকটা পরি- ii মাণে আমাদের অপরিচিত হওয়াতে দেশের সাধারণ রমণী- দের নিকট ইহঁদের দৃষ্টান্ত হৃদয়ঙ্গম হয় না। শিক্ষিতা যাহারা আছেন, তাঁহারা এই গ্রন্থের শিক্ষা যদি যথার্থ হৃদয়ে গ্রহণ করেন, তবে উপকার পাইবেন। ইতি ১১ই আষাঢ়, ১৩১৩। শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। MARY CARPENTER-By Miss Kumudini Mitra, 'B. A.-A short well-written biographical sketch of Mary Carpenter, the well-known philanthropist and social reformer of Bristol. Mary Cerpenter's life is full of inspiration for women as much as for men. On the one hand she demonstrated by her example what vast scope of blessed and regenerating helpfulness to their fellowmen were open to women even in the midst of the many social and political limitations of her time. On the other hand she revealed the power of sympathy in reclaiming what were supposed to have been the 'wastage of humun society. India owes a special debt of gratitude to this noble lady, for her unceasing interest in all Indian quetsions and particularly the question of female education and we are glad that an Indian lady has taken the troubles of interpreting the story of Mary Carpenter's life to her sisters, who are not; in a position to read in the original. We hope it will be well appreciated. THE INDIAN MESSENGER. -1st July, 1906.

iii Miss: Kumudini Mitra, B. A., of Calcutta has presented to the reading public of Bengal a short but excellent life of Mary Carpenter, the celebrated phikanthropist of Bristol. Miss Mitra wields, an able pen, her interpretation of the philanthropist's life to her sisters is admirable and in everyway does credit to the author. May our educated sisters of Bengal be inspired, Ilke this rising author, with the high, ideals of Mary Carpenter's life! The Indian Social Reformer. BoM3AY.---auty 15, 1906. Sir Gurudas Bancrjce late Justice of the Calcutta High: Court., writes :- নারিকেলডাঙ্গা, কলিকাতা। ১৫ই আষাঢ় ১৩১৩। “শিখের বলিদান” এবং “মেরী কার্পেন্টার” নামক দুইখানি পুস্তক সাদরে গ্রহণ করিয়াছি, এবং ধন্যবাদের সহিত প্রাপ্তিস্বীকার করিতেছি। দুইখানি পুস্তকের কিয়দংশ পাঠ করিয়াছি, এবং পাঠ করিয়া প্রীত হইয়াছি। গ্রন্থদ্বয়ের ভাষা সরল ও বিশুদ্ধ। তাহাদের বিষয় যদিও বিভিন্ন, কিন্তু উভয়েই উন্নত ও পবিত্রভাব উদ্বোধক। ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি, গ্রন্থকত্রী সাহিত্য-জগতে প্রভুত যশােলাভ করুন। * = শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।

tv মেরী কার্পেন্টার—শ্রীকুমদিনী মিত্র বি, এ প্রণীত, মূল্য। আনা। যে বিদুষী রমণী “শিখের বলিদান” পুস্তক লিখিয়া যশস্বিনী হইয়াছেন, তিনি ভারতহিতৈষিণী কুমারী মেরী কার্পেন্টারের জীবনী লিখিয়া সহৃদয়তা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়াছেন। পুস্তকখানি স্ত্রীলােকমাত্রেরই বিশেষ পাঠ্য। বামাবােধিনী পত্রিকা-শ্রাবণ, ১৩১৩। মেরী কার্পেন্টার।-শ্রীকুমুদিনী মিত্র বি, এ প্রণীত। মূল্য | চারি আনা। এক খানি চিত্র সহিত। প্রাতঃ- স্মরণীয়া মেরী কার্পেন্টারের এই সুলিখিত জীবন-চরিত খানি পড়িলে বঙ্গনারীগণ বিশেষ উপকৃত হইবেন। আম- দের দেশের নারীগণের (শিক্ষিত মহিলাগণেরও) কাৰ্য- ক্ষেত্র, ইংরাজ মহিলাদের কাৰ্য্যক্ষেত্র হইতে স্বতন্ত্র। কিন্তু মহৎ জীবনের নকল করিয়া ত সেই জীবন হইতে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হইয়াই উন্নত জীবন লাভ করা যায়। অতএব সৰ্ব্ব দেশের পূতশীল। নারীগণের জীবন-চরিত আমাদের পাঠ্য। এই জন্য এই পুস্তিকা খানি আমাদের বালিকা, যুবতী ও প্রবীণদের হাতে দিবার বন্দোবস্ত করা উচিত। পুস্তক খানির ছাপা ও কাগজ বেশ সুন্দর। প্রবাসী–ভাদ্র, ১৩১৩।

'MARY CARI'ENTER."-This is a short biographical, sketch of Miss Mary Carpenter, the celebrated philanthropist of Bristol. This, we believe, is the first Bengalee rendering of the life of Mary Carpenter. The authoress, Miss Kumudini Mitra 1. A., is a talented daughter of our patriotic countryman, Babu Krishna Kumar Mitra, the editor of “Sanjibanec.” The excellent services of Miss Mary Carpenter in the spread of female education in this country justly call for a ready response in our educated girls of today. It is, therefore, in the fitness of things that a lady graduate of our University should undertake to bring out the life of one who did so inuch for the betterment of her sex. Miss Mitra is already known to the reading public of Bengal as the writer of that inspiring littlc book “Shikher Balidan,” The warm enthusiasm and utmost familiarity with which she narrates and explains the cvents and works of Mary Carpenter's lite not only interests the reacler but gives him an insight into the life of the philanthropist. The book is written in an elevated style, and altogether it is a pleasant and profitable reading both for the young and old The get-up of the book lcaves nothing to be desired and is. as inviting as the book itself. The Amrita Bazar Patrika.-July 23, 1936. MARY CARPENTER, BY KUMUDINI MITRA, K. A. It is a matter of satisfaction that this little book has been written. The life of Mary Carpenter possesses great interest to all lovers of India. She was a devi voted friend to the Indian people, and her treatment of Raja Rammohun Roy has placed the Bengalis especially in her debt. Itis gratifying that the first full'account of her life, in an oriental language, should be written in Bengali by a Bengali lady. The Book is well-written and well-printed, and I trust will have the large sale it deserves. ED: C. WOODLEY, Principal, L. 1. S. College, Bhowanipur. I have had great pleasure in reading the life of Mary Carpenter by Miss Kumudini Mitter, B. A. ; and would like to thank the authoress for giving me the opportunity of reading it. This book is one that will help to satisfy a real need among young Bengali girls, the need of a pure and instructive literature in their own language. The number of really healthy pure Bengali stories is very small and while we are seeking by education to encourage a love of reading, we find it very difficult to find books fit to read. This life of Mary Carpenter is pure and inspiring, and every girl who reads it should be the better woman for doing I would urge the writer to go on in this work and give us many more such helpful little books. FLORENCE SYP.ETT, Superintendent, London Mission Christian Girls School, Bhowanipore ( VII Babu Surendra Nath Banerjee, the great Orator and Political leader of Bengal, writes in the "Bengalee” of the 2nd August, 1906 : For some time two little books in Bengalee sikher Balidan and a Life of Miss. Mary Carpenter by Kumari Kumudini Mitra, B. A, have been lying on our table The authoress is the daughter of Babu Krisna Kumar Mitra, the well-known Editor of the Sanjibanti newspaper. We have read the books with pleasure and profit. The style is simple and vigorous, and there is a fascinating air of sincerity which has a charm all its own. comes Sikher Balidan is a book which ought to be in the hands of every school boy. It is a thrilling record of Sikh martyrdom. It tells us in a few well-written biographical sketches the story of the up-building of the Sikh character which made the Sikhs what they were and what we hope they will yet be. In all great movements boys and young men play a prominent - part, the divine message first to them ; and they are persecuted and they suffer for their faith. Suffer the little children to come unto me, are the words of the divinely-inspired tounder of Christianity ; and the faith that is inseparable from childhood and youth is the faith which has built up great creeds and has diffused them through the worla. Our boys and young men have been persecuted for thair Swadeshism ; and their sufferings have made Swaacshish strong and vigorous. The blood of the martyrs is the cement of the church ; and the sturdy

V111
save
faith of the Sikh, which braved death and disaster with
einflinching courage, was reflected in the heroic suffera
ings of its youthful martyrs. Our authoress tells us the
story of the martyrdom of Fatch Singh and Jarwar
Singh, the youthful sons of Guru Govind. The two
boys, confronted with their persecutor, never flinched
from the faith of their fathers. They were entreated to
themselves by abjuring their religion. They
firmly refused. They rose above all templation, even
the terrors of death. Mark the heroic words of these
boy-martyrs :-"He who has forsaken his God fcars
death. To the devoted death is real birth. We
rejoice in the presence of death. In death shall we
find our everlasting joy." Thus exclaimed the sons
of Guru Govind, and torture, followed by execution,
terminated their young lives. The little book rereals
the process of nation-building through the ordeal of
of fire and persecution, It should be in hands of
everybody who has his eyes open to the signilicance of
the events that are passing around us.
sk
>
*
*
ok
*
*

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Merry Carpenter

Author
Mitra,kumudini
Title
Merry Carpenter
File name
Merry Carpenter
Text
OCR done
Citation
1906
Published
2010/01/13
Publisher
Dwijendranath Basu
Language
Sanskrit
Pages
84
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Mitra,Kumudini
DLI number
511217
Barcode
4990010018385.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
tkYQZXhnUV4
Download PDF

Merry Carpenter