Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shri Gauranger Purbbanchal Paribhraman
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শ্রীগৌরাঙ্গের পুৰ্বাঞ্চল পরিভ্রমণ
আসাম ও লাকা দক্ষিণ লীলা প্রস
প্রসিদ্ধ গ্রন্থকার ভক্তলেখক
যুক্ত অচ্যুতচরণ চৌধুরীতনিধি
কর্তৃক লিখিত
প্রকাশক -শ্রীকুমুদবন্ধু রায় এম, এ
চাতলপার, ত্রিপুরা।
অল ইণ্ডিয়া পাব্লিশিং কোং লিঃ
৩০ নং কর্ণওয়ালিশ টি, কলিকাতা।
১৩২৮ বঙ্গাব্দ ফানী পৃণিমা।
গ্রন্থ বিক্রয় সমর্থ হামের সাহায্যার্থে এক।
মূল্য ০ আনা মাত্র।
No text on this page.
।
ra -
“দেওয়ান প্রতিষ্ঠিত বাড়ীতে শ্ৰীকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রীগৌরাঙ্গ দেব”
No text on this page.
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলু প্রসঙ্গ। শান্তিপুর ও কাটোয়া টলমল। সুন্দর শােভন উদ্যান ; সুন্দর শােভন গুল্মলতা, সুন্দর শােভন পত্র পুষ্পে সুশােভিত, সুন্দর শােভন সমীরণে দোলিতেছে, নাচিতেছে সৌরভিত করিয়া দিক মাতাইতেছে। সকলই সুন্দর। সকলই শােভন। হঠাৎ চতুর্দিক গাঢ় তমসায় সমাচ্ছন্ন হইল, গাঢ় মেঘমালায় আবরিত হইল, দেখিতে দেখিতে বারিধারা ঝরিতে লাগিল। আজ শান্তিপুর টলমল, বন্যা প্লাবিত হইয়া টলমল করিতেছে । ফেনিল তরঙ্গমালা রবিকরে জ্বল জ্বল জ্বলিতেছে, কল কল কলধ্বনি তুলিতেছে। প্লাবন-সলিল উত্তাল তরঙ্গ তুলিয়া নাচিতেছে, সলিলাশ্রিত সকলকে নৃত্যতালে নাচাইতেছে, ঘূর্ণিপাকে ফিরাইতেছে। সে সমুজ্জ্বল সলিল-শিওরে সকলেই ভাসিতেছে। সলিল-স্রোত-বেগে কুল হইতে অকূলে গিয়া পড়িতেছে ; কাহায়ই স্বতন্ত্রতা নাই, স্বাধীনতা নাই; যাইতেছে, ভাসিয়া অনন্তের পথে সকলেই ধাইতেছে । নিমাই কাটোয়ার কেশবভারতীর নিকট সন্ন্যাস মন্ত্র গ্রহণ করিয়াছেন; বৃদ্ধা জননীর স্নেহবন্ধন, তরুণী ভাৰ্যার প্রেমের প্রবল আকর্ষণ, তাহাকে বাঁধিয়া রাখিতে পারে নাই। নিমাই নদীয়ায় রাজার স্থায় ছিলেন ;
২ গৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। শত শত ভক্ত তাহাকে সাক্ষাৎ ভগবান্ বলিয়া বিশ্বাস করিতেন। লােক রাজার বাধ্য হয়, তাহার ঐশ্বৰ্য্য মহিমায় ; অবনত রহে, তাহার দণ্ডভয়ে। ভক্তগণ নিমাইকে ভগবান্ জ্ঞান করিতেন, তাহারা জানিতেন যে, নিমাইর ঐশ্বৰ্য্য লােকাতীত—পার্থিব কোন ঐশ্বৰ্য্যই তাহার তুল্য নহে। কিন্তু তাহারা তজ্জন্য তাহাকে ভজনা করিতেন না। অর্চনা করিতেন তাহারা, তঁাহার প্রেমে—তাহার আকর্ষণে, স্বাতন্ত্র্য হারাইয়া, বিমুগ্ধ হইয়া ও প্রাণের অনাবিল আনন্দে তন্ময় হইয়া । যাহার বহিরঙ্গ লােক, যাহারা সে সুধার আস্বাদ তখনও পায় নাই, তাহারাও তঁাহার পরিচয় পাইলেন—জগাই মাধাই ও কাজি উদ্ধারব্যাপারে। তাহারা নিমাইর অমানুষী শক্তির পরিচয় পাইয়াছিলেন, পাইয়া তাহাকে অসাধারণ পুরুষ বলিয়াই অবধারণ করিয়াছিলেন। নিমাই কচিৎ বাজারে গেলে ব্যাপারীরা তাহাকে উত্তম উত্তম দ্রব্য দিত এবং বিনামূল্যে দিতে পারিলেই কৃতার্থ হইত। ফলতঃ নিমাইর কোন কিছুরই অভাব ছিল না। প্রয়ােজনীয় বস্তু, অনুগত জন, অসীম সম্মান, অগাধ বিদ্যা, বিমল বুদ্ধি, অপ্রতিহত যশ, অব্যাহত স্বাস্থ্য, অনন্যসাধারণ রূপ, কিছুরই অভাব ছিল না। তাহার বিদ্যুদ্দামদীপ্ত প্রভান্বিত সুরূপ। প্রেমবতী ভাৰ্য্যা, অজস্ৰপীযুষবষিণী স্নেহশীলা জননী, আজ্ঞাবহ ভৃত্য, অনুরক্ত কুটুম্ব, প্রেমাস্পদ বন্ধুবর্গ ; সংসারে যাহা কাম্য, বাহা লােভনীয়, সে সকলই ছিল । আর একটি ছিল, পূর্ণরূপে যাহা সত্ৰ দৃষ্ট হয় না, সেটি সুকোমল হৃদয়, সেটি পরদুঃখকাতর চিত্ত। পরদুঃখকাতর পরার্থপরের রাজসিংহাসনই বৃক্ষতল। কপিলাবস্তুর কুমারও একদিন এই বৃক্ষতলই আশ্রয় করিয়াছিলেন। ঐশ্বৰ্য-মদ-গল্পীদের নিকট রাজপদ অতি কাম্য ও লােভনীয় । কিন্তু ঐশ্বৰ্য্যাশালী রাজার প্রতি তাহাদের যে আকর্ষণ, তাহা ।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ; • ; সংগ্রহ বা দণ্ডভয় বর্জিত নহে। নিমাইর প্রতি সাধারণের যে আকর্ষণ, তাহাতে ভয় ছিল না, তাহা বাহিক নহে, ছলনা কাপটা তাহাতে ছিল না; তাহাতে কেবল শ্রদ্ধা ও প্রীতি ; তাহাতে কেবল প্রেম ও ভালবাসা। রাজার আর্থিক অভাব নাই, নিমাইরও কিছুমাত্র ছিল না ; কাজেই নিমাই নদীয়ায় রাজার ন্যায় ছিলেন, তিনি নদীয়ার দ্বিজরাজ”। কিন্তু যখন পতিতের তরে তাহার প্রাণ কঁদিয়া উঠিল, সে ঐশ্বৰ্য, সে সম্মান, সে সুখ, তিনি নিমেষে ত্যাগ করিলেন; অবহেলে ছাড়িয়া দিলেন। ঐশ্বৰ্য্যত্যাগের চেয়ে কঠিন ব্যাপার, বােধ হয়, লােকগৌরব বা সম্মান ত্যাগ ; তাহাও পারা যায়, কিন্তু মেহের বন্ধন—প্রেমের আকর্ষণ ছিন্ন করা বড়ই কঠিন। নিমাইকে ইহার কিছুতেই বাঁধিতে পারে নাই। কপিলাবস্তুর কুমার ভােগ বিলাসে লালিত হইতেছিলেন, যেদিন দেখিলেন জরামৃত্যু বিকট বদন ব্যাদনে অহােরহঃ বিলাস-শয্যা-শায়িত নর নারীকে কবলিত করিতেছে, তখনই তাহার ভয় হইল, প্রাণ কঁপিয়া উঠল, তখনই তিনি নরের এ ঘাের অশান্তির অনল নির্বাণ জন্য ছুটিলেন; কিছুই তাহাকে বাঁধিয়া রাখিতে পারিল না। নদীয়ার ব্রাহ্মণকুমার তখনই মাতার স্নেহনীড় ছাড়িয়া উড়িলেন, তখনই তরুণী পত্নীর প্রেমের বেষ্টন ছিন্ন করিলেন, যখন পাপপঙ্কে নিমজ্জিত পাতকীর তরে চিত্ত প্রপীড়িত হইল। তখন সহস্র সানুরাগ- সেবা,যশের-ঐশ্বর্যের সহস্র সমৃদ্ধ সিংহাসন তাহাকে রাখিতে পারিল না। সহস্র নেত্রে অশ্রু পাতিত করিয়া, সহস্রের প্রতিনিধিরূপে স্বয়ং অশ্রুপাত করিতে করিতে তিনি বৃক্ষতল আশ্রয় করিলেন। উন্মত্ত মাতাল চলিলেন। কপিলাবস্তুর কুমার যেমন নিৰ্বাণ অন্বেষণে চলিয়াছিলেন, কৃষ্ণ প্রেমের আকর্ষণে তেমনই ছুটিলেন।
৪ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। কোনদিকে দৃকপাত নাই, কোথায় পা পড়িতেছে বােধ নাই ; চলিতে হইবে, তাই চলিতেছেন! বাহ্যজ্ঞান বিরহিত এই উন্মত্ত উদাসীনের ভ্রম উৎপাদন করিয়া বহুকষ্টে ভক্তগণ তাহাকে শান্তিপুরে লইয়া আসিলেন। নিমাইর বিরহমেঘে নদীয়া তমসাচ্ছন্ন হইয়াছিল, পূর্ণচন্দ্র রাহু গ্রাসিত হইলে যেমন হয় তেমনি হইয়াছিল ; শান্তিপুরে প্রত্যাগমন করিলে শান্তিপুর টলটলায়মান হইল । ; পিতামহাদি প্রসঙ্গ। নিমাই কে ? যাহার তরে লােক এত উন্মত্ত, লােকের তরেও যিনি এমন কাতর, সে পুরুষটি কে? সে জন আর কে হবেন ? সে জন তােমারই নিজ জন, সে জন তােমারই প্রীতির পাত্র, তােমারই প্রেমাস্পদ। বিশুদ্ধমিশ্র নামক বৎসগােত্রীয় এক বৈদিক ব্রাহ্মণের পুত্র মধুকর তীর্থ ভ্রমণে বাহির হইয়া নানাতীর্থ ভ্রমণান্তর কামরূপ পীঠে গমনােদ্দেশে পথে শ্রীহট্ট দেশের বরগঙ্গা প্রদেশে উপনীত হন। এস্থানে তিনি ধৃতকৌশিক গােত্রীয় হিরণ্যগর্ভ নামক জনৈক বিপ্ৰগৃহে অতিথি হইয়াছিলেন। দৈবক্রমে এস্থানে তাহার বাতব্যাধি হয়। গৃহস্বামী তাহাকে যথাসাধ্য শুশ্রুষা করেন। আরােগ্য লাভ করিয়া সকৃতজ্ঞ মধুকর গৃহস্বামীর প্রস্তাবে ভঁহার বিবাহযােগ্যা তনয়া চণ্ডীদেবীকে বিবাহ করিলেন। এই বিবাহে দম্পতির চারি পুত্র হয় কীদি, রঙ্গদ, উপেন্দ্র ও কৃত্তিবাস। ১ম, ২য় ও ৪র্থ পুত্র বরগঙ্গাতেই বাস করিতে আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ; লাগিলেন; তৃতীয় তনয় উপেন্দ্রমি তপস্যার তরে গৃহত্যাগ করিয়া সস্ত্রীক ঢাকাদক্ষিণে চলিয়া আসিলেন। ঢাকাদক্ষিণ রম্যস্থান। সন্নিকটে “কৈলাসে” অনাদিলিঙ্গ শিব ; তন্নিম্নে পুণ্যময়ী “অমৃত কুণ্ড।” অধিবাসীবর্গের অন্তরেও নিরন্তর অমৃতধারা। পতি পত্নী প্রতিবাসীবর্গের প্রতি পাশ ছিন্ন করিয়া আর যাইতে পারিলেন না, এস্থানেই উভয়ে বাস করিতে লাগিলেন। অনিকেতঃ পুরুষ গৃহী হইলেন। এইস্থানে উপেন্দ্রমিশ্রের সপ্তপুত্ৰ জাত হয়, তাহার সপ্তপুত্রের মধ্যে জগন্নাথ তৃতীয়। জগন্নাথ প্রতিভাশালী ব্যক্তি ছিলেন, বিদ্যাশিক্ষার জন্য পিতাকর্তৃক তিনি নবদ্বীপে প্রেরিত হন। জগন্নাথমিশ্র নবদ্বীপে স্বীয় প্রতিভাবলে শীঘ্রই কৃতকাৰ্য্যতার পুরস্কার স্বরূপ “পুরন্দর” উপাধি প্রাপ্ত হন। এই সময়ে শ্রীহট্টের তরফ অঞ্চলে এক ভীষণ দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হইয়াছিল। এখনকার মত তখন আহাৰ্য্যাদি সরবরাহের সুবিধা ছিল না; যেখানে দুর্ভিক্ষ ঘটিত, চুরী ডাকাতি, অনাহার, রােগ ও মৃত্যু বিকট বেশে তথায় প্রকট হইত ; সমর্থ লােক দেশ ছাড়িয়া পলাইত ; যে পারিত বাচিত, অন্যে মরিত, গ্রাম লােকশূন্য হইত। তরফের জয়পুর গ্রামের রথীতর গােত্ৰীয় জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তী নিজভ্রাতা উপেন্দ্র ও স্ত্রী পুত্র, কন্যাদি সহ সেই দুর্দিনে নবদ্বীপে চলিয়া গেলেন। তিনি নবদ্বীপের ‘বেল পুখুরিয়া” পল্লীতে গৃহ নিৰ্মাণ করিয়া বাস করিতে লাগিলেন। “বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে”--নবদ্বীপে শীঘ্রই তঁাহার আদর হইল ; অল্পদিনেই তথায় তাহার প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাইল। নীলাম্বর কন্যাদায়গ্রস্ত ছিলেন। সেই সময় হট্টের বৈদিক-সন্তান জগন্নাথমিশ্র • ৬ শ্রীগৌরাঙ্গের পূৰ্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। “পুরন্দর” উপাধি প্রাপ্ত হওয়ায়, উৎফুল্ল চিত্তে এই বিদ্বান, তরুণ, সুশ্ৰী যুবকের করে স্বীয় সুন্দরী তনয়া শচী দেবীকে প্রাজাপত্য বিধানে সম্প্ৰদান করিলেন। শচী-পুরন্দরের সম্মিলন বড়ই শােভন হইয়াছিল। পুরন্দর সেই সুর-তরঙ্গিণী তীর ত্যাগ করিয়া, সরস্বতী পীঠ ছাড়িয়া দেশে আসিতে পারিলেন না। স্বামী স্ত্রীতে বিদ্যা বিলাসে আননে বাস করিতে লাগিলেন। একবার কিন্তু শচী পুন্দরকে নবদ্বীপ ছাড়িতে হইয়াছিন শচীর গর্ভে ৮ টি কন্যা জাত হইয়াছিল, ৮টিই মৃত্যুর করালগ্রাসে পতিত হওয়ায় দম্পত্তির মনে আর উৎসাহ ছিল না। অচিরমৃত অষ্টতনয়ার পর একটি পুত্রজাত হইয়াছিল—ইনি বিশ্বরূপ। যখন ৮৯ বৎসরের, তখন জগন্নাথের অহবান আসিল, উপেন্দ্ৰমিশ্র পুত্রকে দেশে যাইতে লিখিলেন। শচী, বিশ্বরূপকে মাতা বিলাসিনী দেবীর করে অর্পণ করিয়া পতির সহিত ঢাকা দক্ষিণে গেলেন। কিছুদিন তথায় অবস্থিতির পর শচী দেবীর পুনঃ গর্ভসঞ্চার হয়। রাত্রি প্রভাত প্রায়, এমন সময় একদা জগন্নাথজননী শােভা দেবী এক বিচিত্র স্বপ্ন দর্শনে জাগিয়া উঠিলেন। কলকণ্ঠ বিহগের জাগিয়া উঠিল, দেখিতে দেখিতে বালসূৰ্য্যও মুখ তুলিয়া চাহিলেন। কি আশ্চর্য স্বপ্ন! সদ্যোখিত পতিসদনে শােভাদেবী এই বিচিত্র স্বপ্ন কথা কহিলেন। শুনিয়া উপেন্দ্রমিত্র বলিলেন,-“শেষ নিশার স্বপ্ন সফল হউক। স্বপ্ন-নির্দেশ মতে পুত্রবধূকে নবদ্বীপেই পাঠাইতেছি।” “জগন্নাথে ভাৰ্য্যয়া সহিতে লঘু। স্বদেশ মগম বিদ্বান্ পিত্রে প্রতিং বিবর্ধমন্। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যোদয়াবলী । ? নামান্তর কলাবতী। ।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। প্রকৃতই অনতিবিলম্বে স্বল্পগর্ভা* শচীও পুরন্দরকে পুনর্বার প্রেরণের বন্দোবস্ত হইল। বিদায়ের পুর্বে শ্বাশুড়ী বধূকে কোলে লইয়া বলিলেন- “মা, আমি স্বপ্নে জানিয়াছি, তােমার এ গর্ভে মহাপুরুষ জাত হইবেন; তাহাকে এখানে পাঠাইবে ত?” শচী শ্বাশুড়ীর কাছে স্বীকৃত হইয়া নবদ্বীপে আসিলেন। এই গর্ভের সন্তানই নিমাই। ১৪০৭ শকে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় নিমাই জন্মগ্রহণ করেন। তাহার জন্মকালে গ্রহণ হইয়াছিল, এবং সকলেই হরিনাম করিতেছিল। নিমাই যেন সকলকে হরিনাম বলাইয়া নামের সহিত জন্মগ্রহণ করিলেন। বালক নিমাই। শােভার স্বপন যাহাই হউক; নিমাই এক অসাধারণ শিশু। জগন্নাথ নাম রাখিলেন বিশ্বম্ভর। সােণার শিশু যখন হাসিত, তখন স্বর্ণবৃষ্টি হইত, জ্যোৎস্না খেলিত, স্বর্গ-সুষমা প্রকটিত হইত। হরিনাম দৈবাৎ শুনিলে শিশু চকিত নেত্রে হরিণশিশুর মত উৎকর্ণ হইয়া চাহিত, তাহার ক্রন্দন থামিয়া যাইত। নারীরা এই ঈঙ্গিত পাইয়া হরি * “প্রয়াণং কৰ্ত্তমদযুক্তোঃ ভাৰ্যয় অল্প গর্ভয়া।” শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যোদয়াবলী। + কতদিন পরে শচীর মনেতে উল্লাস। পুৰ্ব্ব-শ্রীহট্ট ত্যজি কৈলা গঙ্গাতীরে বাস ॥” কৰি ধূপরাজকৃত “শ্রীগৌরাঙ্গ সন্ন্যাস” গ্রন্থ ( শ্রীহট্টের জনৈক প্রাচীন কবিকৃত ইহা একখানি অপ্রকাশিত গ্রন্থ।
শ্রীগৌরাঙ্গের পূৰ্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। ^^^^^^^^^ বলিয়া শিশুকে হাসাইত ও কোলে লইত। হরিনাম শুনিলে শিশু কমনীয় সােণার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহু প্রসারিত করিয়া কোলে উড়িয়া পড়িত। কিন্তু দীর্ঘকাল হরিনাম না শুনিলে শিশু কাদিতে থাকিত। হবিনামে এই প্রীতি দেখিয়া নারীগণ এই গৌরবর্ণ শিশুর “গৌরহরি” নাম রাখেন। নিমাই আরাে কিছু বড় হইলেন। শচী তাহাকে চক্ষুর অন্তরাল করিতেন না। তবুও নিমাই কখন কখন বাড়ীর সম্মুখের রাস্তায়, পাড়ার বালব দল লইয়া কি অপূৰ্ব্ব খেলা খেলিতেন! সে হরিনামের খেলা। নিমাই বালকদল সহ ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচিতেন, বালকেরাও নাচিত ও হরি হরি বলিত। পথিকেরা দাড়াইয়া এ শিশুহেল দেখিত। দেখিতে দেখিতে তাদের কি জানি কি মােহ জন্মিত, তাহারা আত্ম বিস্মৃত হইয়া শিশুদলে মিশিয়া নাচিতে থাকিত। শচী পুত্ৰান্বেষণে আসিয়া এচিত্র দেখিয়া বিস্মিত হইতেন বলিতেন—“হাগা, এ পাগল ছেলেকে লইয়া একি করিতেছ? তােমাদের কি দয়ামায়া নাই ?” তখন তাহাদের মােহ ভাঙ্গিত, লজ্জিত ও আশ্চৰ্য্যা- ন্বিত হইয়া তাহারা পলাইত। শচীর এ অসাধারণ ছেলেটির আচরণ এইরূপ ছিল । শুধু সাধারণ লােক নহে, জ্ঞানী প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ ও নিমাইকে দেখিলে মােহিত হইয়া যাইতেন। অদ্বৈতাচার্যের জন্মস্থান শ্রীহট্টের অন্তর্গত লাউডের নবগ্রাম। তিনি কৈশাের বয়সে শান্তিপুরে গমন করিয়াছিলেন। সারদা পীঠ নবদ্বীপে তিনি কখন কখন আসিয়া বাস করিতেন। এখানে শ্রীহট্টবাসী বাস শ্রীরাম, রত্নগর্ভ, কামদেব প্রভৃতি বৈষ্ণবগণ লইয়া একটা সভায় ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে তিনি আলাপ আলােচনা করিতেন। কিশাের বিশ্বরূপ ।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। এ সভার এক সভ্য ছিলেন। পাক প্রস্তুত হইয়া গেলে, শচীমা কখন কখন খাওয়ার জন্য ডাকিয়া আনিতে, নিমাইকে অদ্বৈত সভায় বিশ্বরূপের কাছে পাঠাইতেন। নিমাই নাচিতে নাচিতে দাদাকে আনিতে ছুটিত। অদ্বৈত সভায় গিয়া ভ্রাতাকে মাতার কথা বলিত। অদ্বৈত বালককে দেখিতেন, আর তাহার মন যেন কি জানি কেন তন্ময় হইয়া বাইত । অদ্বৈত ভাবিতেন ‘এ বালককে দেখিলে আমার কৃষ্ণনিষ্ঠমন এমন চঞ্চল হইয়া উঠে কেন? এ বালক কি আমার আরাধ্যদেব।” এ কথাটি অনেকেরই মনে জাগিত। মুরারি গুপ্তের জন্মস্থান শ্রীহট্টে। মুরারি বৈদ্য জাতীয়, নবদ্বীপে অধ্যয়ন করিতেন ; বিশ্বরূপের ন্যায় কিশাের বয়স্ক। মুরারি একদিন সতীর্থ ছাত্ৰবৰ্গসহ আলাপ করিতে করিতে পথ দিয়া যাইতেছেন। আলাপ মায়াবাদ সম্বন্ধে । মুরারি হাতমুখ নাড়িয়া বলিতে বলিতে চলিতেছেন। নিমাই ও তঁাহার অনুসরণে ও অনুকরণে হাত মুখ নাড়িয়া চলিয়াছেন। দেখিয়া ক্রুদ্ধ হইয়া মুরারি ধমক দিয়া বলিলেন- “কি দুষ্ট ছেলে।” বালক বলিল-“ভাল! খাবার বেলা দেখা যাবে।” মুরারি একথা ভুলিয়া গিয়াছেন; তিনি যথাকালে আহারে বসিয়াছেন। এমন সময়ে কোথা হতে ধূলি-ধূসরিত অঙ্গ দিগম্বর নিমাই তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া, তাহার থালায় প্রস্রাব করিয়া দিলেন। বলিলেন- “যে ভক্তি অগ্রাহ্য করে, তার খাদ্য ইহাই।” জলন্ত অনলের ন্যায় ঘুর্ণিতনে তুলিয়া মুরারি চাহিলেন। মুরারি কি দেখিলেন দেখিলেন—বালক দাড়াইয়া হাসিতেছে ; আর তাহার বদনভাতিতে গৃহ যেন দীপ্ত-আলােকিত ! মুরারির আর খাওয়া হইল না, শিশুর অনুসরণে তিনি শচী গৃহে আসিয়া বালককে প্রদক্ষিণ ও পুনঃ পুনঃ ?
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। প্রণাম করিতে লাগিলেন। “মুরারি, কর কি? এ শিশুকে প্রণাম করিতেছ কেন ?” জগন্নাথ মিশ্র বলিলেন। মুরারি কিছুমাত্ত অপ্রস্তুত হইলেন না, বলিলেন-“আপনার এ শিশুটি কেমন, এটা কোন্ বস্তু, পরে তাহা জানিতে পারিবেন।” মুরারি চলিয়া গেলেন, শচী পুনরায় বিস্মিত হইলেন। শিক্ষার্থী-অধ্যাপক। বিদ্যারম্ভের পর নিমাই একবার মাত্র দেখিয়া বর্ণমালা ও ফলা আদি শিখিয়া লইয়াছিলেন। ভ্রাতা বিশ্বরূপ অহনিশি জ্ঞানালােচনায় নিমগ্ন থাকিতেন, তাহার ফলে তত্ত্বজ্ঞ বিশ্বরূপের নশ্বর পদার্থে বিতৃষ্ণা বশতঃ সন্ন্যাসে মতি হইল ; তিনি গৃহত্যাগ করিলেন। শিক্ষার চমৎকারিতায় নিমাইর অধ্যাপক ও সহপাঠী সকলই বিস্মিত হইয়াছিল। জগন্নাথ ভীত হইয়া, বিশ্বরূপের ঈদৃশ শিক্ষানুরাগ মনে করিয়া তাহার পাঠ বন্ধ করিয়া দিলেন। বিশ্বরূপের গৃহত্যাগের পর জগন্নাথ দেহত্যাগ করেন। তাহার পর পুত্রের আগ্রহে শচী পুনৰ্বার পুত্রকে অধ্যাপক গৃহে পাঠাইলেন। গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে নিমাই দুই বৎসরে ব্যাকরণ ও সাহিত্য শিক্ষা করিয়া, নিজ পুরােহিত বিষ্ণুমিশ্রের গৃহে গমন করেন ; সেখানেও দুই বৎসরে জ্যোতিষ ও স্মৃতি শাস্ত্রে ব্যুৎপন্ন श्न। তৎপরে দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন জন্য সুদর্শন পণ্ডিতের গৃহে উপনীত হন, এখানেও তাহার অধ্যয়ন দুই বৎসর মাত্র ; দুই বৎসরে (ন্যায় বর্তীত) বেদান্তাদি অন্যান্য দর্শনে ব্যুৎপন্ন হন। তখন নবদ্বীপে ন্যায়ের বড় আদর, ন্যায় না শিখিলে পণ্ডিত সমাজে গণ্য হওয়া আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ ১১ যাইত না। বাসুদেব সাৰ্বভৌমের ন্যায়ের টোল তখন প্রসিদ্ধ ; নিমাই, এখানে অল্প কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। এই টোলে রঘুনাথ ও অধ্যয়ন করিতেন। তীক্ষ্ণধী সম্পন্ন শ্রেষ্ঠ ছাত্র রঘুনাথ শ্রীহট্টবাসী। রঘুনাথ নবদ্বীপের পাঠ শেষ করিয়া পরে মিথিলায় গমন করেন ও পক্ষধরের গৰ্ব চূর্ণ করিয়া নবদ্বীপের মহিমা বাড়াইয়া তুলেন। একদিন নিমাই স্নানে চলিয়াছেন। এয়ােদশ :বর্ষীয় চঞ্চল বালক দেখিতে পাইলেন, চতুষ্পঠীর শ্রেষ্ঠ ছাত্র যুবক রঘুনাথ এক বৃক্ষমূলে বসিয়া রহিয়াছেন। প্রখর রৌদ্র, শীতল ছায়াতলে রঘুনাথ ধ্যানমগ্ন, বাজ্ঞান নাই। শাখারূঢ় পক্ষীর যে অঙ্গে বিষ্ঠাত্যাগ করিয়াছে, সে বােধও নাই। দেখিয়া নিমাই হস্তস্থিত গাড় হইতে কিঞ্চিৎ জল তাহার উপর ছিটাইয়া দিলেন। রঘুনাথের ধ্যান ভঙ্গ হইল, চাহিয়া দেখিলেন, সুন্দর নবীন কিশাের দাড়াইয়া হাস্য করিতেছেন। নিমাই বলিলেন-“এত কি গভীর চিন্তা করিতেছ ?” “একটা ফাকির উত্তর অন্বেষণ করিতেছি, সমাধান হইতেছে না।” রঘুনাথ বলিলেন। “যাহার সমাধানে তােমার এত চিন্তা, ভাই, বড় কৌতুহল হইতেছে, একবার তাহা শুনিতে।” নিমাইয়ের এ কথা শুনিয়া তুমি আর কি বুঝিবে নিমাই!” বলিয়া প্রথমে রঘু একটু তাচ্ছল্যের হাসি হাসিলেন, তারপর-“আচ্ছা বলিতেছি “বলিয়া প্রশ্নটা উচ্চারণ করিলেন। আর কি আশ্চর্য! শ্রবণমাত্ৰ নিমাই কোন চিন্তা না করিয়াই তৎক্ষণাৎ তাহার প্রকৃত উত্তর দিলেন। রঘুনাথের বিস্ময়ের সীমা থাকিল না, বলিলেন-“নিমাই, তুই কি দেবতা?” এই রঘুনাথ সুপ্রসিদ্ধ “দীধিতি” গ্রন্থের রচয়িতা, ন্যায়ের এমন গ্রন্থ জগতে আর হয় নাই। এই দীধিতি যখন তিনি লিখিতেছিলেন, শুনিতে পাইলেন, সেই সময় নিমাইও ন্যায় সম্বন্ধে কি লিখিতেছেন।
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। শুনিয়া একদিন গঙ্গা পার হওয়ার সময় নিমাইকে ইহা সত্য কিনা জিজ্ঞাসিলেন। নিমাই বলিলেন “সত্য।” লিখাটুকু সঙ্গেই আছে জানিয়া রঘুনাথ তাহা শুনিতে চাহিলে, নৌকায় বসিয়া নিমাই পাঠ করিয়া শুনাইতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পাঠ করিয়া নিমাই মুখ তুলিয়া চাহিয়া দেখেন, রঘুনাথের মুখ বিবর্ণ, চক্ষে জলধার! “ভাই, বিস্মিত হইতেছ কেন? আমি বড় সাধে গ্রন্থ লিখিতেছি। বড় আশা ও বিশ্বাস ছিল যে এ গ্রন্থ দ্বারা অমর হইব ; সে ধারণা আজ চলে গেছে। তুমি দুছত্রে যাহা লিখিয়াছ, তাহা প্রকাশ করিতে আমার দুপাত লাগিয়াছে। তােমার এ গ্রন্থ থাকিতে আমার গ্রন্থ দেখিবে কে ?” রঘু রুদ্ধকণ্ঠে কহিলেন। করুণার কিশাের মূৰ্তি করুণায় গলিয়া গেলেন। তখনই স্বীয় পরিশ্রমের বস্তু ছিড়িয়া গঙ্গায় বিসৰ্জন করিলেন! “কি করিলে ভাই! কি করলে?” বলিয়া রঘুনাথ ধরিতে না ধরিতে গ্রন্থ স্রোতে ভাসিয়া ও ডুবিয়া গেল ! এইরূপে জগৎ এক অমূল্য বস্তু হারাইল! নিমাই বলিলেন-"অপ্রতিষ্ঠ তর্ক শাস্ত্র, ইহার আর ভাল মন্দ কি ?” সেদিন হইতে তিনি সে অফল শাস্ত্রের অধ্যয়নও ছাড়িয়া দিলেন। রঘুনাথ আবার ভাবিলেন-‘নিমাই কি দেবতা?' ন্যায়াধ্যয়ন ছাড়িয়া অতঃপর নিমাই পঞ্চানন অদ্বৈতের কাছে দুই বৎসর বেদ অধ্যয়ন করেন। প্রথমে বেদ ও পরে ভাগবত শেষ করেন। অদ্বৈত তাহাকে “বিদ্যাসাগর” উপাধি দিলেন। তখন নিমাইর বয়স ষোল বৎসর মাত্র। সেই অল্প বয়সেই নিমাই নবদ্বীপে ব্যাকরণের টোল সংস্থাপন করেন। টোলে হার ছাত্র ধরিত না। অধ্যাপনাকালে তিনি ব্যাকরণের একটি টিকা লিখেন। বিদ্যাসাগরী টীকা” নামে তাহা চলিয়াছিল।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ এই সময়ে কাশ্মীর দেশবাসী কেশব নামক এক দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত ভারতের সর্বত্র বিজয় মাল্যে ভূষিত হইয়া বাঙ্গালার সারদ পীঠে আগমন করেন। এই অসাধারণ পণ্ডিতের কথা শুনিয়া নবদ্বীপের পণ্ডিতবর্গ ভীত হইলেন। নবদ্বীপের পণ্ডিতবর্গ শাস্ত্র- বিচারে ভীত নহেন, কিন্তু কথা প্রচারিত হইল যে “ইনি সরস্বতী মন্ত্রে সিদ্ধ ; বিচারে অপরাজেয়। নিমাই পণ্ডিতগণের ভয়ের কারণ শুনিলেন ; কিছু বলিলেন না- ঈষদ্ধান্য মাত্র করিলেন। সেদিন দিবায় কাহারও সহিত দিগ্বিজয়ীর বিদ্যাযুদ্ধ হইল না; সন্ধ্যায় নিমাই চন্দ্রকরােজ্জ্বলা জাহ্নবী তীরে বসিয়া প্রকৃতির সুধাময়ী মূর্তি হেরিতেছেন। চন্দ্রের শুভ কিরণ মালা তাহার বদনে পতিত হইয়া কি অপূর্ব সুষমায় সে স্থল হাসিতেছে । কুসুম পরিমল লইয়া ধীরে সমীরণ বহিয়া যাইতেছে, ধীরে ধীরে আকাশে শুভ্র পাতলা মেঘ তুলার ন্যায় উড়িতেছে। এমন সময় সসহচর কেশব সে পথ দিয়া চলিয়াছেন। নিমাইর সঙ্গে পণ্ডিতের দেখা হইল, উভয়ে পরিচয় হইল; এবং একটা শ্লোক ব্যাখ্যা লইয়া অবলীলাক্রমে নিমাই সেই দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতকে পরাভূত করিলেন । পণ্ডিত বিস্মিত হইলেন, পরদিন প্রত্যুষেই তিনি নিমাইর দ্বারে উপনীত হইলেন, বারবার প্রণাম করিতে লাগিলেন ; বলিলেন “পণ্ডিত, আমি জানিয়াছি, তুমি মনুষ্যবেশী নারায়ণ !”
১৪ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। Ud নিমাই পূর্ববঙ্গে। এই সময়ে নিমাই বিবাহ করিলেন। স্ত্রীর নাম লক্ষ্মীপ্রিয়া। যখন লক্ষ্মীপ্রিয়ার বয়স দুই বৎসর মাত্র, তখন তাঁহার পিতা বল্লভাচাৰ্য কাশিনাথ ও বনমালি নামক দুইজন সঙ্গী এবং স্ত্রী ও কন্যা সহ জন্মভূমি শ্রীহট্ট ত্যাগ করিয়া নবদ্বীপে আগমন করেন। প্রাচীন নবদ্বীপে শ্রীহট্টীয় বৈদিকদের একটি পল্লী বসিয়াছিল ; উহাকে “বৈদিক পাড়া” বলিত। শ্রীহট্টবাসিগণেব তথায় একটি *সমাজ” ছিল, সে সমাজেই পরস্পরে বিবাহদি হইত। বনমালির ঘটকতায় নিমাই ও লক্ষ্মীপ্রিয়ার বিবাহ সম্পন্ন হইয়াছিল। বিবাহের প্রায় দুই বৎসর পরে নিমাই পূৰ্ব্ববঙ্গে গমন করিতে ইচ্ছা করেন। “শ্রীহট্টে তাহার পূর্ব পুরুষদের বাটী। পিতার জন্মস্থান দেখিতে কৌতুহল জন্মিবে আশ্চর্য কি ?” * শচী নিমাইকে চক্ষের অন্তরাল করিতে পারিতেন না, নিমাই তাহাকে প্রবােধ দিয়া বলিলেন-“মা, ভাবনা করিও না, দিন কয়েক মধ্যেই ফিরিয়া আসিব । অর্থ ব্যতীত ভরণপোষণ চলে না, পদ্মাতীরে শিক্ষা দান ও অর্থোপার্জন করিয়া শীঘ্রই ফিরিতেছি।” **বঙ্গদর্শন--১২৮৪ সাল। নিমাই সশিয় চলিলেন এবং অল্পদিনেই পদ্মাবতী তীরে আসিলেন। পূর্ববঙ্গের শস্য-শ্যামল স্নিগ্ধ বিশাল বক্ষ নদীর উদ্দাম উচ্ছাস ; বিশ্বনিয়ন্তার এ বিচিত্র লীলাক্ষেত্রে নিমাইর হৃদয় উদ্বেলিত হইয়া উঠিল। স্বপ্ৰকাশ রবি আর আপন প্রভাব লুকাইয়া রাখিতে পারিলেন না, কিরণজালে পূর্ববঙ্গ উচ্ছাসে উচ্ছাসে পরি- ;
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। প্লাবিত করিলেন ! নবদ্বীপে যাহা লুক্কায়িত, যাহা আচ্ছাদিত ছিল, পূর্ববঙ্গে তাহা ব্যক্ত হইল, প্রস্ফুট হইল। নিমাই কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হইয়া হরি নামে পূর্ববঙ্গ মুখরিত করিলেন; অশ্রুত ও অদৃষ্টপূৰ্ব কীর্তন প্রথা প্রবর্তন করিলেন। পূৰ্ব্ববঙ্গ তালে তালে তাহার সঙ্গে নাচিয়া উঠিল। চৈতন্য মঙ্গলে তাই লিখিত হইয়াছে- “নাম সঙ্কীৰ্ত্তন প্রভু নৌকা সাজাইয়া। পার কৈল সব লােক আপনি যাচিয়া ।” শ্রীচৈতন্য ভাগতকার এই জন্যই লিখিয়াছেন— “অদ্যাপিও সেইভাগ্যে সৰ্ব্ববঙ্গদেশে। চৈতন্য সঙ্কীৰ্ত্তন করে স্ত্রীপুৰুষে ॥” এস্থলে মহানুভব পাঠক, “সর্ব বঙ্গদেশে” পদ-প্রয়ােগের প্রতি লক্ষ্য করিবেন। ইহাতে কেবল পদ্মাতীরবর্তী দেশমাত্র নহে, সমগ্র বঙ্গদেশই বুঝাইতেছে। যাহাহউক, তত্তিরপুরের ঘাটে শ্রীগৌরাঙ্গ পদ্মা পার হইলেন। হইয়া পদ্মার বালুকাময় চর পার হইয়া গােপাল পুরে গমন করিলেন। পদ্মা-যমুনা সঙ্গমে উপনীত হইয়া তিনি স্নানতৰ্পণ করিলেন। তাহার পর কিছু কাল ফরিদপুরে হরিনাম ও বিদ্যা বিতরণের পর বিক্রমপুরের অন্তর্গত নুরপরে গেলেন ও স্বকৃত টিপ্পনীযােগে কিছুকাল শিক্ষাদান করিলেন। এই সময় তাহার সঙ্গী কেহ কেহ নবদ্বীপে প্রত্যাগমনের ইচ্ছা করিলেন ; ঐ সময়ে তঁাহার শ্রীহট্ট গমনের অভিলাষ জন্মে। প্রেম বিলাসে লিখিত আছে : -- নুরপুর এখন পন্নগর্ভে।
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। “কিছুদিন থাকি প্রভু ভাবি মনেতে। যাইতে হইল মাের শ্রীহট্ট দেশেতে । পিতৃ জন্মস্থান পিতামহেরে দেখিয়া । পদ্মাবতী তীরে ঝাট আসিব ফিরিয়া ।” প্রভু সঙ্গীদিগকেও তাহা বলিলেন ; তাহারা পদ্মাতীরে থাকিয়াই তাহার প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। মহাপ্রভু যাত্রা করিয়া অনতিবিলম্বেই সুবর্ণগ্রামে উপস্থিত হইলেন। বৰ্ত্তমান ময়মনসিংহ জেলা তখন বিভিন্নভাগে বিভক্ত ছিল, নামও ভিন্ন ভিন্ন ছিল। তিনি সুবর্ণ গ্রাম হইতে উত্তরপূর্ধ্বমুখী হইয়া লাঙ্গলবন্ধে গিয়া ব্ৰহ্মপুত্ৰ স্নান করিলেন, এইস্থানে শীতলক্ষা-ব্রহ্মপুত্র- সঙ্গম। কথিত আছে যে বলরামের করত লাঙ্গলাকষ্ট হওয়ায় ইহা তীর্থরুপে পরিণত হইয়াছে। তথা হইতে নিমাই পঞ্চমী ঘাটে গমন করেন, পঞ্চমী ঘাট হইতে পরশুরাম যজ্ঞস্থল ঘিঘাটে যান এবং তৎপর প্রাচীন নগর নগর এগারসিন্দুরে উপস্থিত হন। এগারসিন্ধুর হইতে তৎপূৰ্ববা বেতাল গ্রামে এবং বেতাল হইতে সন্নিকটবর্তী প্রাচীন ভিটাদিয়া গ্রামে পেীছেন। এই ভিটাদিয়াতে লক্ষ্মীনাথ লাহিড়ীর সহিত মিলিত হন ও তাহার গৃহে চারিদিন তিনি কীৰ্ত্তনরসে ছিলেন। লক্ষ্মীনাথের গৃহ সন্নিকটে একটী বকুল বৃক্ষ মূলে উভয়ে উপবেশন করিয়া ইষ্ট গােষ্ঠী করিতেন। চারিদিন পরে ভিটাদিয়া হইতে চলিয়া তিনি শ্ৰহট্টে প্রপিতামহ গৃহে গৃহে উপনীত হন। উপনীত হন। প্রেম বিলাসে লিখিত আছে : * “প্রভুকে সঙ্গে করি লক্ষ্মীনাথ লাহিড়ী। লইয়া গেলেন তিনি আপনার বাড়ী” স্বরূপ চরিত (স্বরুপ চরিত ময়মন সিংহেয় গ্রন্থকার রচিত একখানা অতি প্রাচীন অমুদ্রিত গ্রন্থ।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ১৭ “লক্ষ্মীনাথে বর দিয়া প্রভু গৌরহরি। কিছুদিন শ্রীহট্টেতে আসিলেন চলি বরগঙ্গা গ্রামে প্রভু উত্তরিলা গিয়া ।” শ্রীহট্টের বরগঙ্গা শ্রীগৌরাঙ্গের প্রপিতামহের স্থান, এইস্থানে প্রপিতামহের পুত্রয় ছিলেন। পিতামহ সস্ত্রীক ঢাকা দক্ষিণে চলিয়া গিয়াছিলেন, পূর্বে বলিয়াছি। উপেন্দ্র মিশ্র কখন কখন বরগঙ্গায় আসিতেন, ভ্রাতৃবর্গও ঢাকা দক্ষিণে ভ্রাতৃগৃহে যাইতেন। মেই সময়ে উপেন্দ্র মিশ্র সস্ত্রীক বরগঙ্গায় ছিলেন সুতরাং শ্রীগৌরাঙ্গের সেই স্থানেই পিতামহ দর্শন ঘটল। উপেন্দ্ৰমিশ্র তালপত্রে একখানা চণ্ডী লিখিতেছিলেন; শ্রীগৌরাঙ্গ পিতামহের আরব্ধ কাৰ্য্যটী সুসম্পাদন করিয়া দিয়াছিলেন। তিনি যে কয়দিন তথায় ছিলেন, পিতামহীই পরম যত্নে পাক করিয়া পৌত্রকে অমৃতাহার করাইয়াছিলেন। একদিন অসময়ের একটা পরিপক কাঠাল সংগ্রহ করিয়া নাতিকে খাইতে দিয়াছিলেন ; বৃদ্ধার মেহামৃতে কঁঠালের স্বাদ বহুগুণে বৃদ্ধি করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু কি দুর্দৈব, বৃদ্ধ উপেন্দ্ৰমিশ্র একদিন দৈবাৎ দেহত্যাগ করিলেন। শ্রীগৌরাঙ্গ পিতামহের চিতাভ পুণ্যময় বরবক্র জলে বিসৰ্জন করিয়া আসিলেন। যে কাজ তাঁহার পিতাকেই করিতে হইত, তিনিই তাহা দৈব প্রেরিত হইয়া করিলেন এবং তাহাতেই বরগঙ্গায় আগমন সফল বােধ করিলেন। যদি তখন বরগঙ্গায় তাহার আগমন না ঘটিত, তবে পিতামহ দর্শন ঘটিত না, পিতামহের মনেও একটা ক্ষোভ রহিয়া যাইত। ভস্মাস্থি বিসৰ্জন করিয়া গৌরাঙ্গ গৃহে আসিলেন ; বৃদ্ধা পিতামহী কি করুণ রােদন করিয়া উঠিলেন! নিমাই তাহাকে কত কথা কহিলেন, কত প্রবােধ দিলেন। কিন্তু একি ? তাহার নিজের শ্রীগৌরাঙ্গের পূৰ্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। নেত্র-বারি বারণ না মানিয়া কেন আপনি ঝরিতে লাগিল। রাত্রে সুনিদ্রা হইল না; কি এক উদাসভাবে সারা হৃদয় সমাচ্ছাদিত হইল। কি এক অজ্ঞাত আতঙ্ক যেন উকি দিতে লাগিল। হঠাৎ শচীমাকে মনে পড়িল, পত্নী লক্ষ্মীপ্রিয়ার রূপ চক্ষে ভাসিয়া উঠিল! কেন ? চিত্ত এত চঞ্চল হইয়া উঠিল কেন? নিমাই উৎকণ্ঠিত হইলেন এবং সেই দিনই নবদ্বীপে যাত্রা করিলেন। সঙ্গিগণ পদ্মাতীরে তাহার অপেক্ষায় ছিলেন, তাহাদিগকে লইয়া যথাকালে গৃহে আসিলেন। শ্রীহট্ট প্রসঙ্গ—চঞ্চল অধ্যাপক। নিমাই উৎসাহ ভরা বুকে হস্তফুল্লমুখে বাড়ী আসিয়াছেন। হায়! তাহার সাধের লক্ষ্মীবিলাসগৃহ” যে আজ লক্ষীশূন্য ! হায় হায় ! বিষাদিনী জননী যে গৃহকোণে বসিয়া নীরবে অশ্রুবর্ষণ করিতেছেন! কি বলিয়া পুত্রকে মুখ দেখাইবেন, তিনি সম্মুখে আসিতেছেন না! নিমাই গৃহে কাহারো সাড়া পাইলেন না—ভৃত্য ঈশান ও সরিয়া পড়িয়াছেন। নিমাই মা মা বলিয়া ডাকিলেন ; রুদ্ধস্রোত বালির বাধটা ভাঙ্গিয়া দিল, শচী বধূ সম্বােধনে কঁদিয়া উঠিলেন। কি হইল হঠাৎ?-প্রজ্বলিত দীপ্ত আলো নিৰ্বাপিত হইল, আঁধারে দিক আবরিত করিল। নিমাইর বদন ক্ষণতরে মলিন হইয়া গেল! বুঝা হইয়াছে—সবই বুঝা গিয়াছে ; কাহাকেও কিছু বলিতে হয় নাই; হৃদয়ই সব বলিয়া দিয়াছে ; অবস্থাই সব প্রমাণিত করিয়াছে। পিতামহ-গৃহে-বরগঙ্গায় অবস্থান কালে কেন হঠাৎ চিত্তফলকে বিষাদ- ।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ১৯ হায় পতিত হইয়াছিল, কেন হঠাৎ কি এক উদাসভাবে হৃদয় আচ্ছাদিত করিয়াছিল, কেন পুনঃ পুনঃ জননীকে মনে পড়িতেছিল, কেন লক্ষ্মীপ্রিয়ার প্রভাময়ী মূর্তি নয়ন-সমক্ষে ভাসিয়া উঠিয়াছিল, তাহা বুঝিলেন। বুঝিয়া ধীরে ধীরে—অতি ধীরে জননীর কাছে গেলেন, গিয়া কঠোর ধৈরজ সহকারে নানা কথায় জননীরে প্রবােধ দিলেন। অনন্তর স্নানাহার সমাপন করিতে না করিতেই প্রতীবাসীবর্গ সাক্ষাৎ করিতে আসিতে লাগিলেন। এই সমাগত জনবর্গের মধ্যে অনেকেই পূর্ববঙ্গের, তথা শ্রীহট্টের, অধিবাসী ছিলেন। নিমাই পূর্ববঙ্গে ও শ্রীহট্টে গিয়া সে দেশের কথ্যভাষা শিক্ষা করিয়া আসিয়া- ছিলেন। কৌতুকী নিমাই সদ্য সদ্য তাহার পরিচয় দিতে ভুল করিলেন না। চৈতন্যভাগবতকার লিখিয়াছেন :- “বঙ্গদেশী বাক্য অনুকরণ করিয়া, বাঙ্গালাের কদৰ্থেন হাসিয়া হাসিয়া।” এ ব্যঙ্গের মাত্রা কিন্তু শ্রীহট্টবাসীদের প্রতিই অধিক ছিল- “বিশেষ চালেন প্রভু দেখি শ্রীহটিয়া ; কদৰ্থেন সেইমত বচন বলিয়া।” (ঐ) একজন শ্রীহট্টবাদীর সে বিজপে ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটিল, বলিলেন- “এত ব্যঙ্গ বিদ্রুপ তােমার মুখে শােভা পায় না, ভাল- “তুমি কোন্ দেশী লােক? কহত নিশ্চয় ?” (ঐ) অবসর পাইয়া অন্যে বলিলেন- “পিতা মাতা আদি করি যতেক তোমার ; বল দেখি শ্রীহট্টে না হয় জন্ম কার ?” (চৈতন্য ভাগৰত)।
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। এবার নিমাইর পরাস্ত হওয়া উচিত ছিল। তাঁহার পিতার জন্মস্থান শ্রীহট্টের ঢাকা দক্ষিণ, মাতার জয়পুরে। তাঁহার মেসে চন্দ্রশেখর, আর শ্বশুর বল্লভাচার্য প্রভৃতি শ্রীহট্টবাসী, তা তিনি বুঝিতে পারিলেও ব্যঙ্গবাহুল্যে প্রশ্ন ঢাকিয়া ফেলিলেন। পুরুষােত্তম সঞ্জয় নবদ্বীপে একজন ধনী ও গণ্যবক্তি ছিলেন, ইহার বহিরাঙ্গনেই নিমাইর টোল ছিল। নিমাইর আগমনে আবার পুরুষােত্তম গৃহ ছাত্ৰ কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিল। আবার নিমাইর পূর্ব চাঞ্চল্য দেখা দিল, কিন্তু এবারকার বিদ্রুপবানটা বৈষ্ণবদের উপরেই অধিক বর্ষিত হইতে লাগিল। নবীন বৈষ্ণবগণ তাহাকে দেখিলে ভয়ে পাশ কাটি" যাই "ন। একদিন মুকুন্দ দত্ত দেখিতে পাইলেন, নিমাই শিষ্যসহ পথ ? আসিতেছেন, তাহাকে সেই পথে যাইতে হইবে, মধ্যপথে উভয়ের সম্মিলন অনিবার্য। কিন্তু নিমাইর সম্মুখে পড়েন, ইহা তাহার ইচ্ছা নহে। তিনি একটু ইতস্ততঃ করিলেন, তাহার পর অন্য পথ ধরিলেন। মুকুন্দের অভিপ্রায় চতুর পণ্ডিতের কাছে ধরা পড়িল, অমনি তিনি মুকুন্দকে ডাকিতে লাগিলেন। অল্পবয়স্ক হইলেও এত বড় পণ্ডিতের আহ্বান অগ্রাহ্য করা চলে না, মুকুন্দ শুষ্কমুখে সম্মুখীন হইলেন। তখন নিমাই বলিতেছেন—“মুকুন্দ, আমাকে দেখে পলাও কেন?” মুকুন্দ কি উত্তর দিবেন? তাহাকে নিরুত্তর দেখিয়া বলিতেছেন- “বুঝিয়াছি, তােমর বৈষ্ণব, অবৈষ্ণবের সহিত বৃথা কথা কহিতে ভাল লাগে না; তা বেশ, আমিও বৈষ্ণব হইতে চেষ্টা করিব।” বলিয়া অমনি উচ্চহাস্য। শিষগণও হাসিতে লাগিল; মুকুন্দও হাসিয়া গন্তব্য পথে চলিলেন।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ২১ আর একদিন প্রতিবাসী ও পিতৃবন্ধু শ্ৰবাস সশিষ্য নিমাইকে পথে পাইয়া বলিলেন—“ভাল নিমাই! এ তােমার কেমন ব্যবহার ; তুমি বৈষ্ণব পাইলেই বিদ্রুপ করে থাক শুনিতে পাই। তুমি পণ্ডিত হইয়াছ, বয়স ও বৃদ্ধি হইতেছে, এখন কি আর চাপল্য শশাভা পায়?” নিমাই ভালমানুষটীর মত মাথা হেঁট করিয়া শুনিতেছিলেন। কথা শেষ হইলে বিনয় নম্রভাবে তেমনি হেট মাথে বলিলেন—“আরো কিছুদিন পড়াশুনা করে নেই, তারপর বৈষ্ণব হইতে আমারও ইচ্ছা। কিছুক্ষণ থামিয়া পরে পুনঃ বলিতেছেন “তবে যে সে বৈষ্ণব হইব না, এমন বৈষ্ণব হইব যে ব্রহ্মা শিব পৰ্য্যন্ত আমার দ্বারস্থ হইবেন। এই বলিয়াই হাস্য করিয়া উঠিলেন। ‘চঞ্চলকে ভাল উপদেশ দিতে আসিয়াছিলাম, ভাবিয়া শ্ৰীবাস আর দাড়াইলেন না। শ্ৰীধর পরম সাধু, দরিদ্র ব্রাহ্মণ। নবদ্বীপে একখানা কুড়ে ঘর আছে, স্ত্রী স্বামীতে তাহাতে কোনরূপে বাস করেন। মােচা, কলা, ঘােড়, শাক সজি বিক্রয় দ্বারা যে যৎসামান্য মিলে, তাহাতেই কষ্টে সৃষ্ট জীবিকা নির্বাহ করেন। এই দীন বৈষ্ণবের সহিত নিমাইর কল লাগিয়াই থাকিত। বাজারে দূরে সশিষ্য নিমাইকে আসিতে দেখিয়াই শ্ৰধর হার জন্য ভাল মােচা বাছিয়া রাখিয়া দিলেন ও যাওয়া মাত্র তাহা দিয়া বলিতেছেন-“পণ্ডিত, এটি তােমায় দিলাম, মূল্য দিতে হইব না; তুমি কোন উৎপাত না করিয়া চলিয়া যাও।” “কি উৎপাত ? তােমার যে গুপ্তধন আছে, তাহা অচিরেই প্রকাশ করে দিতেছি ; তুমি আর লােক তাড়াইতে পারিবে না।” নিমাই সহাস্যে বলিলেন। শ্ৰধর—“দোহাই ঠাকুর, চলিয়া যাও।”
২২ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। নিমাই—“তুমি যে নিত্য গঙ্গার অর্চনা কর, সে গঙ্গা আমার দাসী, তা কি জান?” “বিষ্ণু বিষ্ণু! দেবতা বলিয়াও ভয় নাই !” বলিয়া শ্ৰধর কানে হাত দিলেন। কিন্তু তখনি চাহিয়া দেখেন, নিমাইর বদনে কি এক স্বর্গীয় জ্যোতি খেলা করিতেছে। নিমাই হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেলেন ; শ্ৰীধর অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন। শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া—গয়া গৌরাঙ্গ। স্ত্রী বিজয়া দেবীর অনুমােদনে বৈদিক বিপ্র দুর্গাদাস জন্মভূি হট্ট পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক নবদ্বীপে আসিয়া বাস করেন। এই দ্বিজ দম্পতির পুত্র নাতন ও কালিদাস। সনাতন নবদ্বীপে রাজপণ্ডিতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তাই প্রেম বিলাস বলেন- “হট্ট নিবাসী দুর্গাদাস মহামতি, সস্ত্রীক নদীয়া আসি করিলা বসতি তার দুই পুত্র অতি গুণধাম। ইত্যাদি। সনাতনের কন্যার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া। নবদ্বীপে তখন বৈদিক বিপ্র বড় ছিলনা। শ্রীহট্ট হইতে যে সকল বৈদিক বিপ্র নবদ্বীপে উপনিবিষ্ট হইয়া ছিলেন, তাহাদের মধ্যেই আদান প্রদান চলিত। এই সমাজ টা নিতান্ত ক্ষুদ্র ছিল বলিয়া প্রায়ই পাত্র বা পাত্রীর অভাব হইত। সৎপাত্র না পাওয়ায় সনাতনের কন্যার বিবাহের বয়স যায় যায় হইয়া পড়িয়াছিল। বিষ্ণুপ্রিয়া রূপে ও গুণে অতুল্যা;-সুশীলা, সরলা, কমনীয়া, যেন বিদ্যুৎ-মণ্ডিত নবনীত-নির্মিত মূর্তি। বিষ্ণুপ্রিয়ার মনে কি হইত আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। v জানিনা কিন্তু এত প্রবীনা প্রাচীনাকে ফেলিয়া, গঙ্গাঘাটে যখনই শচী দেবীর সহিত দেখা হইত, বিনম্ৰা বালা তখনই তাঁহাকে প্রণাম করিতেন। শচী মােহিতা হইয়া কোলে লইয়া মুখ চুম্বন করিতেন। মনে হইত, ইহাকে বধূ করিলে হয় না? শ্রীহট্টবাসী ঘটক কাশীনাথ শচী দেবীর অভিপ্রায়ানুসারে এই সম্বন্ধ সুস্থির করিলেন । এক নিশামুখে বিষ্ণুপ্রিয়ার আশালতা পুষ্পিতা হইল; সৌরভিত সমীরণ সংবাদটী বহন করিয়া নবদ্বীপে ছড়াইয়া দিল। বিষ্ণুপ্রিয়া অহােরহঃ প্রেমসুধা পানে বিভাের হইয়া রহিলেন। কিন্তু হায়, এত সুখে মন কেন চমকিয়া উঠে; কেন কি অজ্ঞাত আশঙ্কার উদয় হয় ? বিবাহের প্রায় বৎসরেক পরে নিমাই পিতৃপিণ্ড প্রদান গয়াধামে গমন করেন। নিমাই বিষ্ণুপদ দর্শন করিলেন, দেখিতে দেখিতে চক্ষু পলকহীন হইল; দেখিতে দেখিতে তাহার বাহ্যজ্ঞান বিলুপ্তপ্রায় হইল ; দেখিতে দেখিতে তাহার নেত্র হইতে জলধারা বহিতে লাগিল। ধারার পর ধারা, ধারার ধিরাম নাই, বিশ্রাম নাই। এত জল কি মানুষের চক্ষুতে থাকে ? পাশের লােক নেত্ৰজলে ভিজিয়া গেল কেন না নেত্রজল পিচ কারীর মত ছুটিয়া পড়িতেছিল। লােক চমকিত হইল, গয়ার লোক বলিতে লাগিল, “ইনি মনুষ্যবেশী বিষ্ণু স্বয়ং। গয়াতে তখন এই জনরব রটিল যে, বাঙ্গালা দেশ হইতে এক ব্ৰহ্মণকুমার আসিয়াছেন, তিনি বিষ্ণু স্বয়ং। বাঙ্গালা দেশের যতী ঈশ্বরপুবী সে সময় গয়াতে ছিলেন, শুনিয়া তাহার কৌতুহল হইল, তিনি গিয়া দেখিলেন, ইনি নদীয়ার নিমাই পণ্ডিত, এই পুরী পূর্বে যখনই নিমাইকে দেখিতেন, তাহার মনে হইত, নিমাই মানুষ নহেন। কাজেই জনরবটীকে তিনি বরণ করিলেন। ঈশ্বর পুরী পরম ভাগবত, বহুদিনে তাহাকে দেখিয়া নিমাই ;
২৪ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। লুটাইয়া পড়িলেন ও তাহার নিকট হইতে দীক্ষামন্ত্র গ্রহণ করিলেন। দীক্ষান্তে নিমাই উন্মত্তের ন্যায় কৃষ্ণ দর্শনজন্য বৃন্দাবনমূখে ধাইলেন; বহু চেষ্টায় বহু যত্নে মেসাে চন্দ্রশেখর ও অপর সঙ্গিগণ তাহাকে বাড়ী লইয়া আসিলেন। নিমাই বাড়ী আসিলে অনেকেই তাহার সঙ্গে দেখা করিতে আসিলেন। কিন্তু এবার সম্পূর্ণ ভাবান্তর ! বৈষ্ণবগণ শুনিলেন, নিমাইর ভক্তি কথা ব্যতীত অন্য কথা মুখে নাই; তাহারা প্রকৃতই আনন্দিত হইলেন। শ্ৰবাস বলিলেন-“নিমাইর ন্যায় শক্তিধর দলে আসিলে, কাহাকেও ভয় করি না।” তদণ্ডেই তিনি নিমাইকে দেখিয়া কথার সত্যতা প্রত্যক্ষ করিলেন। জনে জনে জনে ভক্তগণ নিমাইর পরিচয় পাইলেন। জনে জনে তাহার ভক্তি, তঁাহার আকুল আৰ্তি, তঁাহার অননুভূতপূর্ব কৃষ্ণপ্রীতি দর্শনে পুলকিত হইলেন। নিমাই যথার্থই বলিয়াছিলেন- “আমি যে সে বৈষ্ণব হইক না।” অগাধ সলিলে ভাসমান জন হঠাৎ আশ্রয় পাইলে তদবলম্বনে জীবনের আশায় যেমন পুলকিত হয়, মরু সাগর-বাহী পথিক তপ্ত- বালুকা উত্তরণ করিতে করিতে হঠাৎ তরু ছায়াচ্ছন্ন ভূখণ্ড পাইলে যেমন তৃপ্ত হয়, পাষণ্ড পরিবেষ্টিত ভক্তবর্গও তেমনি পুলকিত, তেমনি উৎফুল্লিত হইলেন। তাঁদের আর ভয় নাই, যে জগাই মাধাইর ভয়ে নদীয়া প্রকম্পিত হইত, নিমাইর একটি ইঙ্গিতে হরিদাস ও নিতাই নামের স্রোতে তাদেরে ভাসাইয়া দিলেন ! কিন্তু খলের ক্রতা সহজে যায় না, মাধাই আরক্ত নেত্রে চাহিল, কলসীর কাণ তুলিয়া সােণার অঙ্গে প্রহার করিল! ধারে শশাণিত পড়িতে লাগিল। !
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ২৫ } জগৎ হাহাকার করিয়া উঠিল, সমীরণ হাহুতাশে সে। সে করিয়া বহিয়া গেল ! কিন্তু নিতাইর হৃক্ষেপ নাই ; পাতকীর তরে প্রাণ কাদিয়াছে, প্রেম নদীতে বাণ ডাকিয়াছে। নিতাই কহিলেন—“মাধাই ভাই! মেরেছিস মেরেছিস, একবার হরি বলে আমায় কিনে নে ভাই।” এই অমৃতবাণী জগৎ শুনিল ; দেবগণ এ অমৃতবাণী শুনিয়া বুঝি নৃত্য করিলেন। নিমাই আসিলেন; সে করুণার চিত্র প্রত্যক্ষ করিলেন। জগাই মাধাইও দেখিল—সেই মহিমাময় মূর্তি। শুনিল—সে কৃপার আহ্বান ; বুঝিল আপনাদের অপরাধের পরিমাণ। তাহারা কাপিতে লাগিল- যাহা কদাপি দেখে নাই, তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া তাহাদের সর্ব গর্ব, সর্ব দৰ্প কোথায় উড়িয়া গেল ; বিনত হইয়া পড়িল তাহারা সেই মহিমাময়ের মহৎ পদপ্রান্তে। নিমাই-করুণাময় নিমাইর করুণনেত্রে করুণার ধারা ঝরিতে লাগিল ; তাহাদের সকলই মার্জনা করিলেন; জগাই মাধাই দুই মহাপাতকী নিমেষে তরিয়া গেল! ভক্তগণ এ অতুল্যচিত্র বিলােকনে হরি হরি বলিয়া উঠিলেন ; জাগাই মাধাই ভক্ত মধ্যে পরিগণিত হইলেন। “হরি হরয়ে নমঃ কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ।” কীৰ্ত্তন ছিল না আগে ; নিমাই সর্বপ্রথম নামের মালা গাঁথিয়া •ােনলয় সহকারে সঙ্গীত করিবার প্রথা প্রবর্তিত করেন। এজন্য তিনি “সংকীৰ্ত্তনৈক পিতরম। মৃদঙ্গ করতাল যােগে উচ্চৈঃ সংকীৰ্ত্তনের সৃষ্টি হইল, নগরের লােক হরিনামে মাতিয়া উঠিল। যে সকল লােক নূতনের পক্ষপাতি নহে, শ্রীগৌরাঙ্গের পূবাঞ্চল পরিভ্রমণ। •• তাহার বিরুদ্ধে দাঁড়াইল। কিন্তু কীৰ্ত্তনের প্রবল স্রোতমুখে তাহাদের ক্ষীণরব ডুবিয়া গেল। তাহাতে তাহাদের ক্রোধ আরাে বৃদ্ধি পাইল এবং তাহারা মােসলমান কাজির আশ্রয় লইল। তখন মােসলমান- শক্তি হিন্দুধৰ্ম্ম-পীড়নে বিশেষ উৎসাহ দেখাইত ; কাজি ও শ্লাঘা বােধে অনতিবিলম্বে কাৰ্যে অবতীর্ণ হইলেন; কীৰ্ত্তনে বাধা দান করিলেন। কাজির পাইকগণ প্রবল উৎসাহে পথে পথে ঘুরিয়া নিরীহ বৈষ্ণব গণকে পীড়া দিতে লাগিল। প্রচারিত হইল-গৌড়ীয় সৈন্য বৈষ্ণব দলনে আসিতেছে। নগরে মহাভীতি সঞ্চারিত হইল। নিমাই ও এ জনরব শুনিলেন, তিনি। বুঝিলেন যে এ জনরব মিথ্যা হইলেও সাধারণে ইহার প্রভাব কম নহে। তিনি শ্রীবাসাদি ভক্তগণকে বুঝাইয়া বলিলেন যে এ জনর অমূলক। বলিতে বলিতে তাহার ভাবান্তর ঘটিল, নিমাই মুহূৰ্ত মধ্যে গম্ভীর হইলেন। হঠাৎ হাস্য কোলাহলপূর্ণ তরঙ্গিত প্রকৃতি নিবাত নিষ্কম্প স্থির হইয়া গেল। দেখিতে দেখিতে.নিমাইর বদন প্রজ্জ্বল প্রভায় পূর্ণ হইল। যে নিমাই আপনাকে দীন হইতেও দীন মনে করেন, তিনি তখন ঈশ্বর ভাবে অভিভূত হইয়া ভক্তগণকে অভয় দিতেছেন। নিমাই এখন আর নরশিশু নহেন, নিমাই ভগবানা- বেশে বলিতেছেন—“ কি ভয় তােদের, ভক্তগণ। স্বয়ং কৃষ্ণ যাদের হৃদয় সিংহাসনে সদা বিরাজিত, কি ভয় তাদের ? যদি রাজসৈন্ত আসে—কি ভয় তাতে? তারা হরি বলিয়া তােদের সহিতই নাচিবে । শমাণ দেখ।” নিকটে শ্ৰবাসের চার বর্ষ বয়স্কা ভ্রাতুস্পুত্রী নারায়ণী খেলিতেছিল, তাহাকে বলিলেন-“নারায়ণি ! তুমি কৃষ্ণপ্রেমে নৃত্য কর।” নারায়ণ -সেই চারিবৎসরের শিশু, আদেশ শুনিয়া চাহিল ; চাহিতে চাহিতে আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ২৭ } তাহার চক্ষু অপলক হইল, অঙ্গ কপিতে লাগিল। চাহিতে চাহিতে নেত্ৰ দিয়া কৃষ্ণ প্রেমের ধারা বহিল ; নারায়ণী ‘হা কৃষ্ণ বলিয়া কৃষ্ণবিরহে মূৰ্জিত হইয়া পড়িল। যখন বহুক্ষণ পরে তার চৈতন্য হইল, সে উঠিয়া “কৃষ্ণ কৃষ্ণ” বলিয়া নাচিতে লাগিল । ব্যাপার দৃষ্টে ভক্তবর্গ বিস্মিত হইলেন, ভক্তের ভগবান্ রক্ষক থাকিতে বৃথা ভয়ের স্থান নাই। 'বৈকুণ্ঠের পথ কুণ্ঠাশূন্য-ভয় বিরহিত । নিমাই বলিলেন—“ভক্তগণ আজি নগরে কীৰ্ত্তন বাহির হইবে, এ কথা প্রচারিত কর।” দাবানলের ন্যায় এ কথা প্রচারিত হইল ; কি এক দৈববলে সকলেই উৎফুল্ল মনে কীর্তনের জন্য প্রস্তুত হইলেন। এবং বেলা অবসান হইতে না হইতেই নগরের লােকে একত্রিত হইতে লাগিল। লােকের সংখ্যা নাই—সীমা নাই। বৰ্তিক-মশাল সহস্রে সহস্রে জ্বলিয়া উঠিল। আলােকিত নগর, আলােকিত মন, আল-কল্লোলিত নদীয়া । ভক্তগণ প্রেম-পুলকে পূরিয়া, প্রাণ ভরিয়া গােরাকে সাজাইল। কুসুম-পেলব তনুখানি ফুলে ফুলে খুলিল ভাল। দলে দলে কীৰ্ত্তন চলিল, হিল্লোলে হিল্লোলে ভক্তপ্রাণ নাচিতে লাগিল; মহলে মহলে নাচিয়া নাচিয়া নিমাই চলিলেন। নিমাই চলিলেন, কেথায় চলিলেন ? কাজির মহলায় চলিলেন। কাজি কোথায় ? যিনি হিন্দুধর্ম নিরোধে অতি তৎপর, আজি কোথায় তিনি? আজি অফাচিতভাবে তাহার গৃহে যে নিমাই বৈকুণ্ঠের ধন বিতরণ করিতেছেন, তিনি কি তাহা নিবেন না? আজি কোথায় • তিনি ? কাজি ! মনের কুণ্ঠা ছাড় ; ঐ যে বৈকুণ্ঠ-পতি বৈকুণ্ঠের ধন বিলাইতে তােমার দ্বারে উপনীত? এ সময় তােমার অনুশােচনা ২৮ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। । কেন? ভাসাইয়া দাও-অনুশােচনা ক্ষোভ! ইতিপূর্বে অন্যায় করিয়াছ, খােল ভাঙ্গিয়া কীৰ্ত্তন রােধয়াছ; তাতে কি হইয়াছে ? তাতে ত করুণাময়ের করুণ। কম পড়িবে না? তুমি কি শুন নাই যে মাধাই নিতাইর অঙ্গে প্রহার করিয়া ও ঐ দিগন্ত ব্যাপি করুণার হাত ছাড়াইতে পারে নাই ? ভয় কি, দুঃখ কি, কাজি! অগ্রসর হও। বন্যামুখে আত্মগােপন করিও না, বন্যায় গা ভাসাইয়া দাও, অনন্তের পথে ছুটিবে। সুবােধ কাজি তাই করিলেন । কৃষ্ণ-প্রেম-বন্যায় গা ভাসাইয়া দিলেন। আর কৃষ্ণ-প্রেম-প্রবাহ কাজিকে নাচাইয়া নাচাইয়া অনন্তের পথে ছুটিয়া চলিল। কাজি সে প্রেমামৃতে আপ্লাবিত হইয়া চিরতৃপ্ত হইলেন। কাজি আজি কীৰ্ত্তন বিরােধি নহেন, কাজি আজি পরম ভক্ত। কাজি প্রতিজ্ঞা করিলেন, তাঁহার বংশানুক্রমে কেহ হিন্দু ধর্মে বাধা দিবে না, বংশানুক্রমে কেহ গাে বধ করিবে না। হরিধ্বনি আকাশ কম্পিত করিল, ধন্য ধন্য রৰ উঠিল। নিমাই নৃত্য করিয়া হরিধ্বনির ভিতর দিয়া কীৰ্ত্তন লইয়া ফিরিয়া আসিলেন। সন্ন্যাসী । বিষের বীজ সহজে মরেনা। যে বীজোৎপন্ন বৃক্ষে বিষফল ফলে, সে বীজ বড় কঠিন। কিন্তু বৃক্ষে বিষফল বিলাইলেও তার ছায়া তপ্ত নহে, সে শীতলতা দিতে কৃপণ হইবে না। কাজি-দলন ব্যাপারে নদীয়ার বিষ বীজ অগ্নিগর্ভ ভূধরের ন্যায় বিষ উদগীরিত করিতে লাগিল। শুনিয়া ভক্তগণ ব্যথিত হইলেন। নিমাই সকল শুনিলেন } আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ~~~~~~~ আরও শুনিলেন—তাদের হলাহল বিজম্বিত মন্ত্রণা, সােণার অঙ্গে প্রহারের কল্পনা ! তাহাদের জন্য নিমাইর কোমল প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল। সত্যের তনয়-পুণ্যের পুত্র মানবের এ হীনতা কি যায় না? যাইবে,-নিমাইর করুণ প্রাণ কাদিয়াছে, আর থাকিবে না,যাইবে। বিষের বীজ হলাহল-গর্ভ অনল পূর্ণ বটে, কিন্তু তার উপলক্ষেই জগৎ শীতল ছায়া প্রাপ্ত হইবে নিমাই স্থির করিলেন, মানবের এ হীনতার প্রায়শ্চিত্য তিনি করিবেন। একবার স্বয়ং হাত পাতিয়া জগাই মাধাইর পাপ গ্রহণ করিয়াছিলেন ; এবার মানব জাতির হিত-তরে তিনি গৃহের বাহির হইবেন; কাঙ্গালের জন্য কাঙ্গাল হইবেন। তিনি স্পষ্ট বাক্যে ভক্তগণকে বলিলেন- “করিল পিপ্পলি খণ্ড কফ নিবারিতে, উলটিয়া আরাে কফ বাড়িল দেহেতে।” ( চৈতন্যভাগবত)। ভক্তগণ নিমাইর অভিপ্রায় যে না বুঝিলেন, এমন নহে। গদাধর শুনিয়াছিলেন, শুনিয়া তাহার বুদ্ধি-বিলােপ ঘটিল। রাম রাজা হইবেন, না কোথায় বনে চলিলেন! যশােদা পুত্রকে ক্ষীর নবনী খাওয়াইতেছেন, হঠাৎ অক্রুর তাকে হরে নিয়ে চল্লেন ! গদাধরের যখন জ্ঞান ফিরিয়ে আসিল-সংসার যেন তঁার চক্ষে ঘুরিতে লাগিল; তিনি তৎক্ষণাৎ দৌড়িয়া বন্ধু মুকুলের কাছে গেলেন, গিয়া হাফাইয়া বলিতেছেন :- ‘প্রাণের মুকুন্দ হে, আজি শুনিনু আচম্বিত ; কহিতে পরাণ যায়, মুখে নাহি বাহিরায়, গৌরাঙ্গ ছাড়িবে নবদ্বীপ ইহা ত না জানি মােরা; সকলে মিলিনু গােরা, অবনত মাথে আছে বসি, নিঝরে নয়ন ঝরে, বুক বাহি ধারা পড়ে; মলিন হইয়াছে মুখশশী!
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ • ; দেখিয়া তখন প্রাণ, সদাকরে আনচান, সূধাইতে নাহি অবসর ; ক্ষনেক সম্বিত হৈল, তবে মুই নিবেদিল, শুনিয়া দিলেন উত্তর। আমিত বিবশ হৈয়া, তারে কিছু না কহিয়া, ধাইয়া আইনু তবপাশ ; * এইত কহি আমি, যে কহিতে পার তুমি ; মাের নাই জীবনের আশ । শুরিয়া মুকুন্দ কান্দে, হিয়া থির নাহি বান্ধে, গদাধরের বদন হেরিয়া গােবিন্দ ঘােষে কয়, “ইহা যেন নাহি হয়, তবে মুই যাইব মরুিয়া।” গদাধরের কথায় মুকুন্দের প্রাণ উড়িয়া গেল; গোবিন্দঘােষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিনি ও বিহ্বলিত হইলেন;—“হায় হায় ! এ হ'লে কি আর কেউ বাবে ?” ভক্তগণ সকলেই শুনিলেন, সকলেই কঁদিতে লাগিলেন! ইচ্ছাময়ের ইচ্ছার রােধ হইতে পারে না, স্বতন্ত্র পুরুষ কাহারাে পরন্ত্র নহেন। তিনি সত্যসঙ্কল্প, তিনি “সুদৃঢ়ব্রত।” কিছুতেই হইল না,—যিনি কুসুমকোমল, তিনি আজ হায়, বজ্ৰাদপি কঠোর হইলেন। লােকোত্তর নিমাইর এ চরিত্র- বৈশম আশ্চর্য্য বটে। সােণার সংসার, স্বজনের মেহামৃত, লােক-ললামভূতা স্বর্গ-সুন্দরী কিশােরী বনিতার অনাবিল প্রেম, কিছুতেই—কিছুতেই সে সঙ্কল্প শিথিল করিতে সমর্থ হইল না। জগতের যে বিষাদ-তমসায় তাহার চিত্ত ডুবেছে, এদের কিছুতেই চিত্তকে তাহা হ’তে তুলে আনিতে পারিল না। নিমাই চলিলেন। যাবে ?-যাও, তােমায় কে রাখবে ? কিন্তু প্রাণে যে ধৈরজ ধরিতেছে না। হৃদয় যে ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। তােমায় কি বুঝাইব ? পােড় চক্ষুও বারণ মানিতেছে না—ফাটিয়া জল পড়িতেছে; বুক ভাসিতেছে; কিন্তু কই, বুকের জ্বালা তাতে ত নিবিতেছে না? এ জ্বালা কি নিবিবে? নিমাই! তুমি আমার কে, তা কি জান?
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। • তুমি যে প্রাণের প্রাণ, তুমি যে প্রাণের চেয়ে ও অধিক ! তা হােক, যদি তুমি নিজ সুখের তরে-আপন স্বার্থের জন্যে আমাদেরে বর্জন করে যাইতে, মনকে প্রবােধ দিতে পারিতাম; কিন্তু তাত নহে, তুমি তােমার ঐ চাচর চিকুর পরিহার করেছ, কচ্ছা-করঙ্গ কৌপিন লইয়াছ, পথে দাঁড়াইয়াছ, শুধু আমাদের জন্য। আমরা যারা তােমায় হচ্ছ। করিয়া নিন্দে করিতে উন্মুখ, যারা সদা পাপ-লিপ্ত ও দুম্মুখ—তাদেরই জন্য তােমার এ বেশ। তাদেরই জন্য তােমার অবলম্বনহীনা প্রাচীন। জননী ও বালিক। ঘরনীকে ও কি উত্তপ্ত অগ্নি হৃদয়ে বহন করিতে হইল। এ জ্বালা যে নিমাই! মরিলেও ঘুচিবে না? নিমাই। তােমার কাছে আমাদের এ ঋণের তুলনা নাই ; এ ঋণ অশােধ্য। এ ঋণ-মানব ! পিতৃ ঋণ মাতৃ ঋণ হইতেও বড়, শশাধের চেষ্টাও অন্ততঃ করিলে গত্যন্তর নাই। এস ভাই! তাই সর্বাগ্রে এ ঋণ শােধের প্রাণপণ চেষ্টা করি। হেরে, প্রাণ কি তােমার আনচান করিতেছে না? ঐ যে নবীন উদাসীন দীন-নয়ন অশ্রুধারায় প্লাবিত কয়িয়া তােমার দ্বারে দাঁড়াইয়া আছেন? তাকে কি নিরাশ করিবে ? দাও-দাও, সােণার মানুষকে ভিক্ষা দাও; এস ভাই !—ছুটিয়া এস ; আগে ঋণ শােধের চেষ্টা কর— একবার হরি হরি বল । ইহাই ভিক্ষা ; তিনি যে আর কিছু চান না। ইহাই ভিক্ষা; এই ভিক্ষা নিবেন বলেই তিনি রাজ সিংহাসন ত্যজিয়া, প্রেয়সী পত্নীকে পরিত্যাগ করিয়া পথে দাড়াইয়াছেন। অতএব বল-হরি হরি বল ; বাহু তুলিয়া হরি হরি বল। জগৎ দেখিবে বাঙ্গালী ঋণ শশাধে চেষ্টিত, জগৎ জানিবে—বাঙ্গালী অকৃতজ্ঞ নহে। জগৎ তাহা হইলে বুঝিবে—বাঙ্গালী মরে নাই, বাঙ্গালীর প্রাণ আছে; বাঙ্গালী ;
শ্রীগৌরাঙ্গের পূৰ্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। আহ্বানে সাড়া দিতে জানে। বল ভাই-হরি হরি হরি ধ্বনিতে আকাশ পূর্ণ হােক, সমীরণ নাম-গীতি গাহিয়া দিশে দিশে বিচরণ করুক ; প্রতিধ্বনি প্রাণ মাতাইয়া গাউক-হরি, হরি, হরি! শ্রীচৈতন্য শান্তিপুরে—জসােড়ায় ও অম্বিকায়। সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া উন্মত্ত নিমাই বৃন্দাবনমুখে ধাইলেন ; ‘মুকুন্দ’ রব; অন্তর-চোর মুকুন্দকে ধরিবেন, জড়াইয়া ধরিবেন। মন চুরি করিয়া-বিরহে জ্বালাইয়া আর যেন পলাইতে না পারেন। হায় নিমাই! তুমি যে আর এক বিরহ-কাত নৰব!!"ক স্টেলে ছুটিতেছে, তার প্রাণে ও যে তােমারই মতন বিরহগুণ অলিতেছে, তা ত তুমি জানিতেছ না? তুমি যদি অবশে থাকিতে, যদি তােমার বাজ্ঞান থাকিত, তবে কদাপি পলাইতে পারিতে না। তােমার যেমন কোমল হৃদয়, তুমি কদাপি তাহা সহ করিতে পারিতে না। ঐ যে শত শত ভক্ত ধূলায় পড়িয়া হায় হায় করিতেছে, তাদের কথা না ভেবে পারতে না। তােমার বাহজ্ঞান নাই, বাহিরের কিছু জানিতে পারিতেছ না-না জান; কিন্তু ইহাদের প্রেমের টান ত ব্যর্থ হইবার নহে; সে টানে তুমি বাঁধা পড়িয়াছ। তিন দিন এদিক ওদিক ঘুরিয়া ধরা পড়িয়াছ ; তাই নিতাই তােমায় শান্তিপুরে আনিতে পারিয়াছেন। আজ শান্তিপুরে লােক ধরিতেছে না, নবদ্বীপ যেন ভাঙ্গিরা আসিয়াছে। ওগো পণ্ডিত! এই নিমাইকে না তােমরা সুনজরে চাহিতে পারিতে না, কেহ কেহ না তাঁহাকে মারিতে কল্পনাও ;
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। করিয়াছিলেন ? আজ কেন তাঁহাকে দেখিতে দৌড়িতেছ ? পারের নৌকায় লােক ধরিতেছে না, নৌকা আসিবার বিলম্ব টুকুও প্রাণ মানিতেছে না, সরিয়া গঙ্গা পার হইতেছে। ধন্য নিমাইর প্রীতি। অপূৰ্ব তাহার আকর্ষণ। আনন্দে নিমাই সকলকেই আলিঙ্গন দিতেছেন। ভক্তগণ শচী দেবীকে আনিয়াছেন। মাতা পুত্রে সাক্ষাৎ হইয়াছে। নিমাই মাকে বলিয়াছেন, চিত্তের বিক্ষেপে সন্ন্যাস গ্রহণ করিলেও তিনি জননীর আজ্ঞাবহ ; জননী যাহা বলিবেন, তাহাই করিবেন। অনেকেই আশা করিয়াছিলেন, শচী দেবী হয়ত বলিবেন-“বাছা দূরে যাইও না -প্রাণে মারিও না।” কিন্তু তাহারা ভাবেন নাই যে, ইনি গৌরাঙ্গের জননী। জননী বলিলেন-“বাছা আমার গৃহের বাহির হইয়াছে, তাঁহার অশুভ হয় অযশ হয়, নিজ সুখের তরে তাহা করিব না। নিমাই নীলাচলে থাকুক, নীলাচলে সময়ে সময়ে তােমরা যাইতে পারিবে— খবর পাইব।” শচীদেবীর কথায় ভক্তগণ বিস্মিত হইলেন, পুলকিত হইলেন। শচীর তখন আর একটা কথা মনে জাগিল। তিনি নিমাইকে চক্ষের অন্তরাল করিতে চাহিতেন না, তিনি যতই বাঁধিতেছিলেন, বিধাতা ততই খুলিতেছেন। নিমাই যখন গর্ভে, শ্বাশুড়ী তখন তাহাকে একটা অনুরােধ করিয়াছিলেন এ যাবৎ তাহা নিমাইর নিকট বলা হয় নাই। নিমাইকে শ্রীহট্টে তাহার কাছে একবার প্রেরণ করার জন্য অনুরােধ করিয়াছিলেন, কিন্তু নিমাইকে চক্ষুর অন্তরাল করিতে পারেন নাই বলিয়া শচী দেবী তাহা বলেন নাই। মিমাই পূর্ববঙ্গে যখন ইতি পূর্বে গমন করেন, তখন পদ্মাতীর পর্যন্তই যাইবেন জানিতেন, আরও অগ্রসর হইবেন বলিয়া জানিতেন না, কাজেই তখনও বলা হয় নাই। ;
৩৪ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। যদিও ঐ সময়ে পিতামহীসহ নিমাইর সাক্ষাৎ হইয়াছিল, কিন্তু সে শােভা দেবীর গৃহে নহে, এবং তখন শ্বাশুড়ীর অনুরােধও তাহাকে শচী জ্ঞাপন করেন নাই। এখন শচী দেবীর মনে হইল যে তিনি বড়ই স্বার্থপর, তাহার এই পাপেই হয়তঃ নিমাই আজ বৃক্ষতলবাসী হইল, তাহার চক্ষের বাহির হইতে হইল। শচী শিহরিয়া উঠিলেন ; নিমাই গৃহত্যাগী হইলেও কুশলে পাকুক, শত যােজন দুরে থাকলেও নিমাইর মঙ্গল হক, শ্বাশুড়ীর মনঃকষ্টে-তাহার নিজের দোষে, যেন নিমাইর অকুশল না হয়। শচী তখন নিমাইকে নির্জনে নিয়া শ্বাশুড়ীর সেই অনুরােধ-বৃত্তান্ত বলিলেন। মাতৃমুখে একথা শুনিয়া নিমাই মাতৃপ্রতিজ্ঞা রক্ষার তরে শান্তিপুর হইতে দ্বিতীয়বার শ্রীহট্টে-ঢাকা দক্ষিণে—আগমন করেন। মহাপ্রভুর সন্ন্যাস দর্শন করিয়া গঙ্গাধর মিশ্র পাগল হইয়া গিয়াছিলেন। নিমাইর নৃতন নামের “চৈতন্য” শব্দটী উন্মত্তের চিত্তে গাঁথিয়া রহিয়াছিল ; স্নানাহার ত্যাগ করিয়া সমস্ত দিবারাত্রে তিনি ঐ শব্দটা বলিতে বলিতে গঙ্গাতীরে ভ্রমিতেছিলেন। তালখড়ীর লােকনাথ যখন সন্ন্যাস কথা শুনিলেন, তখন তিনি মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। তিনি আর দেশে রহিলেন না, গৃহত্যাগ করিয়া বৃন্দাবনে চলিয়া গেলেন। নিমাইর ঐ নিদারুণ দীনবেশ দেখিলেন না। নদীয়ার পুরুষােত্তমও চৈতন্য সন্ন্যাসীকে দেখিতে শান্তিপুরে গেলেন না। নিমাইর উপর রাগ করিয়া তিনি ভক্তির বিরুদ্ধ জ্ঞান চর্চার স্থান কাশীতে গেলেন ও নিজেও সন্ন্যাসী হইলেন। জগদীশ পণ্ডিতের পূর্ববাস শ্রীহট্টে ছিল, ইহার স্ত্রীর নাম দুঃখিনী, আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। নদীয়ায় শচীর গৃহের সন্নিকটে বাড়ী ছিল। নিমাই যখন তিন বৎসরের শিশু, তখন এক একাদশী তিথিতে ইহার প্রস্তুত বিষ্ণুর নৈবেদ্য খাইবার অন্য দিতে লাগিলেন। ক্ৰন্দন কিছুতেই থামে না, অগত্যা জগদীশ নৈবেদ্য আনিয়া দিলেন। তাহার মনে হইয়াছিল যে, শিশুদেহে থাকিয়া গােপাল নৈবেদ্য চাহিতেছেন। যখন নিমাই বড় হইলেন, যখন ভক্তগণ ‘ভগবান্ বলিয়া তাহাকে অবধারণ করিলেন, তখন জগদীশের বড়ই আনন্দ। প্রেমিক যে জন, তাহার চিত্তপটে প্রেমাস্পদের জীবন নাটকের ভাবি ছায়াপাত হইয়া থাকে, ইহা বিচিত্র নহে। জগদীশ নিমাইকে পুত্ৰাধিক স্নেহ করেন, প্রাণাধিক ভালবাসেন ; নিমাই গৃহত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবেন, এ করুণ চিত্র একদা তঁাহার চিত্রফলকে জাগিয়া উঠিল। তিনি পুনঃ পুনঃ মুছিতে লাগিলেন, চিত্র পুনঃ পুনঃ স্পষ্ট হইতে স্পষ্টতর হইয়া ফুটিতে লাগিল। এ দৃশ্য দেখিয়া জগদীশ কাহাকেও কিছু না বলিয়া নদীয়া ছাড়িয়া সস্ত্রীক জগােড়ায় চলিয়া গেলেন। প্রং জগন্নাথ স্থাপন করিয়া তথায় বাস করিতে লাগিলেন। নিমাই ইহার পরে যখন প্রকৃতই সন্ন্যাস গ্রহণ করিলেন, দুঃখ ভারাক্রান্ত চিত্ত জগদীশের তখন অভিমান হইল, তিনি শান্তিপুরে গৌর দর্শনে গেলেন না! মাতা বিষ্ণুপ্রিয়াকে শান্তিপুরে নেওয়া হয় নাই, নিমাইকে দেখিতে জগদীশ গেলেন না। জগদীশ গুনিলেন সংবাদ পাইলেন যে নিমাই নীলাচলে যাইবেন। তখন মনে মনে একটি সঙ্কল্প করিয়া বসিয়া রহিলেন। নিমাই ভগবান, নিমাই অন্তর্যামী ; তবে জগদীশের ভয় কি? জগদীশের অন্তরের কথা-তাহার সঙ্কল্প কি নিমাইর বিদিত হইবে না।
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ।
;
জগদীশ চান কি ? জগদীশ চাহেন যে নিমাই যেন দূরদেশে না
যান। মাতৃ আজ্ঞায় জগন্নাথ-সমীপে রহিবেন। বেশ, তাহার
জশােড়ার বাড়ীতেও ত জগন্নাথ রহিয়াছেন, ওখানেই তবে নিমাই
থাকুন না; ইহাই জগদীশের মনােগত কথা, ইহাই সঙ্কল্প। প্রগাঢ় প্রেম
কিরূপে পণ্ডিতকেও শিশুর ন্যায় অযুক্ত কল্পনায় প্রলােভিত ও বিশ্ব
স্থাপিত করিতে দেয়, এ ঘটনাই তাহার প্রমাণ।
অভিমানী ভক্তের টান অভিমানকে আরও বৃদ্ধি করিয়া দেয় ?
অভিমান করিয়া জগদীশ শান্তিপুরে গেলেন না; কিন্তু গৃহেও তিষ্ঠিতে
পারিতেছেন না; বিষম বিপদ!
ভক্তের প্রাণের টানে ভগবানের হৃদয় কাঁদিয়া উঠিল ; তখন :-
নিত্যানন্দ প্রতি কহে পাই পরানন্দ ;
শুন শ্রীপাদ সঙ্গে লইয়া তােমায় ;
জশােড়া গ্রামেতে অদ্য সাইব নিশ্চয়।
জগদীশ চরিত্র বিজয় গ্রন্থ। *
উভয়ে জােেড়ায় পৌছিলেন। জগদীশ ও দুঃখিনী আনন্দে জ্ঞান
হারা হইলেন। দুঃখিনী গৌরনিতাইর জন্য পায়স প্রস্তুত করিতে
লাগিলেন। স্নেহবিহলা জননী আনন্দে যে হাত দিয়া অগ্নিবৎ গর
দুগ্ধ আবৰ্ত্তন করিতেছেন, তাহাও বুঝিতেছেন না।
দৈবাৎ তখন
জগদীশের পুত্ৰবিয়ােগ ঘটিল, তাহাও তাহারা গ্রাহ করিলেন না ?
ইতিপূর্বে নদীয়ায় ও শ্রীবাস গৃহে এমন হইয়াছিল, কীৰ্ত্তনানন্দ ভক্ত
হইবে ভয়ে শ্রীবাস মৃতপুত্রের কথা চাপিয়া রাখিয়া কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন।
ভগবান্ এমন ভক্তের বশ না হইবেন কেন ?
T
কলিকাত
* (জগদীশ চরিত্রবিজয়’ একখানি অতি প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ।
বিকোষ আকিসে একখানা আছে।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ।
জগদীশ গৌরাঙ্গকে রাখিবেন। তাহার ত পুত্র গেল, শ্রীগৌরাঙ্গই
মৃতপুত্রের স্থান অধিকার করিলেন। গৌরাঙ্গ সত্যই অসােড়ায় থাকিয়া
গলেন। জসােড়ায় গৌরমূর্তি স্থাপিত হইলেন। সে মূর্তি স্বরূপ
হইতে অভিন্ন-“জীবন্ত প্রত্যক্ষ মূৰ্ত্তি !”
এ রহস্য দৃষ্টে নিত্যানন্দ
হাসিতে লাগিলেন ; সন্ন্যাসের বিষাদ ঝটিকার পরে এই তাহার প্রথম
“গৌর প্রেমে মত্ত সদা নিত্যানন্দ রায়।
একবার গৌরাঙ্গ প্রভুর পানে চায়,
আরবার প্রতিমূৰ্ত্তি করে দরশন ;
কিছু ভেদ নাই দেখি পরানন্দ মন।
দুই মহাপ্রভূ তিহঁ একত্র দেখিয়া ;
জগদীশ প্রতি কহে প্রসন্ন হইয়া,
ধন্য ধন্য জগদীশ কহিযে তােমারে,
দুই গৌর প্রকট হইলা তব গৃহে।”
( জগদীশ চরিত্ৰবিজয় গ্রন্থ ।)
“কিন্তু দুই গৌর জসােড়ায় রহিলেন না; একজন নীলাচলে যাবেন,
তাই নিত্যানন্দের সহিত চলিয়া গেলেন, আর একজন জগদীশ গৃহে
দুঃখিনীর কোলে উঠিয়া বসিলেন।
সন্ন্যাসী গৌর দর্শনে অম্বিকার গৌরীদাস পণ্ডিত ও শান্তিপুরে
গেলেন না। যিনি শচী বিষ্ণুপ্রিয়াকে এমন শেলাঘাত করিতে পারেন ।
তাহার উপর গৌরীদাসের অভিমান করা কি অসঙ্গত ব্যাপার?
নিমাই ভক্তের এ অভিমানের মূল্য বুঝিলেন, বুঝিয়া নিজেই
অম্বিকায় নিত্যানন্দ-সঙ্গতি চলিলেন। শ্রীগৌরাঙ্গ ভগবান, গৌরীদাসের
শ্রীগৌরাঙ্গের পূৰ্বাঞ্চল পরিভ্রমণ।
দৃঢ় বিশ্বাস। ভগবানের উপর মানুষের অভিমান, এ ভাব শুদ্ধ ব্রজের
ভাব। এইরূপ বিমলভাবেই ভগবান বশ হন—অধর ধরা পড়েন।
গৌরীদাস গেলেন না, তাই শ্রীচৈতন্যই আজ স্বয়ং গৌরীদাস গৃহে
উপনীত! তথায় গিয়া কি করিতেছেন ?
ঠাকুর পণ্ডিতের বাড়ী গােরা নাচে ফিরি ফিরি
নিত্যানন্দ বলে হরি হরি।
(তখন) কান্দি গৌরীদাস বলে পড়ি প্রভুর পদতলে,
কভু না ছাড়িবে মাের বাড়ী।
আমার বচন রাখ,
অম্বিকা নগরে থাক,
এই নিবেদন তুয়া পায়।”
তুমি ত গৃহত্যাগ করিয়াছ, আর ত নদীয়ায় যাইবে না; কিন্তু
তােমায় অনন্ত আকাশে উড়িয়া ফিরিতে দিব না, তোমায় এখানে
আটকিয়া রাখিব। এ অভিপ্রায় আমার নহে—সকলের, এ অভিপ্রায়
তােমার নিজজনের ; এখানে নিশ্চিত থাকিতে হইবে তোমায়।
তুমি স্বতন্ত্র পুরুষ, আমাদের কথা না শুনিতেও পার ; নিশ্চয় জানিও
“যদি ছাড়ি যাবে তুমি, নিশ্চয় মরিব আমি ।
কিন্তু রহিব সে নিরখিয়া কায়।”
এবার প্রভূ
কি করিবেন ? এষে শক্ত ঠাই ! তখন
“প্রভু কহে গৌরীদাস।
ছাড়হ এমন আশ;
প্রতিমূৰ্ত্তি সেবা করি দেখ ;
তাহাতে আছি যে আমি, নিশ্চয় জানিও তুমি
সত্য মাের এ বচন রাখ।”
গৌরীদাস মূৰ্ত নিয়া কি করিবেন? তিনি প্রাণের বেদনা
কাঁদিতে লাগিলেন। নিমাইকে দোষ দিয়া দেহত্যাগ করিবেন, ইহাই
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। সঙ্কল্প। কিন্তু ভগবানের জন্য কেহ প্রাণত্যাগ করিতে পারে না, করিতে গেলে ভগবানই তাহাকে রক্ষা করেন। গৌরীদামও পারিলেন না। যে শক্তি শচী ও বিষ্ণুপ্রিয়া হইতে বিদায় লইতে পারিয়াছে, সে অপরাজেয় শক্তি গৌরীদাসকেও প্রবােধ দিতে সমর্থ হইল। উপরি-উদ্ধৃত পদরচয়িতা গৌরীদাস পণ্ডিতের সহােদর তথায় উপস্থিত ছিলেন, তিনিই লিখিতেছেন :- “কহে দীনকৃষ্ণদাস চৈতন্য চরণে আশ, দুই ভাই রহিল। তথায়; ঠাকুর পণ্ডিতের প্রেমে বন্দি হৈল দুই জনে ভকত বৎসল তেই গায়।” (পদকল্পতরু)। কিরূপে রহিলেন? আপন অভিপ্রায়ানুসারে দারু মূর্তিরূপে। গৌরীদাসকে বলিলেন- নবদ্বীপ হৈতে নিম্ববৃক্ষ আনাইবে; মাের ভ্রাতা সহ মােরে নির্মাণ করিবে।” ( ভক্তি রত্নাকর )। তদনুসারে যে নিম্ববৃক্ষের নীচে সুতিকাগৃহে নিমাই জন্মগ্রহণ করেন, সেই নিম্ববৃক্ষ হইতে একখণ্ড কাষ্ঠ আনয়ন করা হয়; তাহাতেই অম্বিকায় গৌর নিতাইর বিগ্রহ বিনিৰ্ম্মিত। *গৌর নিত্যানন্দের সেই অবিকল মূর্তি। দৃষ্টিমাত্ৰ জীবে হয় প্রেমানন্দম্মুত্তি ॥” (অদ্বৈত প্রকাশ) অম্বিকায় গৌরীদান গৃহে পণ্ডিতের সমক্ষে তখন দুই দুই চারি মূর্তি, দেখা দিলেন। দুই-নিতাই, দুই গৌর! গৌরীদাস দেখিলেন—চারিমূর্তি অভিন্ন। কাহারা স্বরূপ, আর কাহারা বিগ্রহ, পরিচয় পাইলেন না। শাস্ত্রে
৪
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ
পাওয়া যায়—স্বরূপ ও বিগ্রহ অভেদ, গৌরীদাস গৃহে লােকে তাহা
দেখিল। গৌরীদাস ভাবিলেন যে কোন রহস্য অবশ্য প্রকটিত হইবে।
তিনি তাড়াতাড়ি উঠিয়া গিয়া পাক করিয়া চারিটি "পায়স” প্রস্তুত
করিলেন।
এখন গৌরীদাসের আগ্রহে চারিজনেই আহারে
বসিলেন। দুজনে যে বিগ্রহ, সে কথা আর বলার অবসর রহিল না।
তার পরে-
“পণ্ডিতের প্রেমলাগি দুই ভাই খাই মাগি,
দুই গেল নীলাচল পুরে।” (পদকল্পতরু)।
এইরূপে গৌর গৌরীদাসের সঙ্কল্প সিদ্ধ করিলেন, ভক্তের জয়
হইল! কারণ :-
“সত্য করি দুই ভাই ঘরেতে রহিল
প্রকাশ্য হইয়া দুই নীলাচলে গেল ।”
( প্রাচীন সুবল মঙ্গল গ্রন্থ।)
••
শ্রীচৈতন্য পূর্ববঙ্গে পুনৰ্বার শ্রীহট্টের বুরুঙ্গায় এবং
ঢাকা দক্ষিণে পিতামহী গৃহে।
পূৰ্ব্বে বলিয়াছি, শচীদেবী পুত্রকে পূর্বে স্বীয় শ্বাশুড়ীর অভিলাষ
বলিতে পারেন নাই, শান্তিপুরে তাহা ব্যক্ত করিলেন :-
“তব পিতামই কাছে এরূপ প্রতিজ্ঞা আছে
তােমাকে পাঠাতে তঁার ঠাই ;
তথা যাইয়া একবার বাঞ্ছাপূর্ণ কর তার,
তব কাছে এই ভিক্ষা চাই।
(শ্রীচৈতন্য বিলাস।)
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ৪১ জননীর এই প্রতিশ্রুতি পূরণার্থে শ্রীচৈতন্য দেবকে আর একবার শ্রীহট্টে যাইতে হইল; তিনি শান্তিপুর হইতে শ্রীহট্টাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তাহার সঙ্গে চলিলেন—মাতুল বিষ্ণুদাস। শ্ৰীচৈতন্যের সন্ন্যাস মূর্তি দর্শনে মাতুল বিষ্ণুদাসের মনে নিৰ্বেদ উপস্থিত হয়, তিনিও মনে মনে গৃহত্যাগের সঙ্কল্প করেন এবং তিনি নিৰ্ব্বন্ধ সহকারে শ্রীমহাপ্রভুর সঙ্গে পূর্ববঙ্গে চলিলেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর শ্রীমহাপ্রভু তাম্বুল ভক্ষণ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন, আহারান্তে মুখশুদ্ধির জন্য হরিতকীখণ্ড চৰ্ষণ করিতেন। পূর্ববঙ্গের পথে বিষ্ণুদাস তাহা যুগাইতেন। যেদিন পূর্ববঙ্গের মুখডােবা নামক স্থানে উপনীত হইলেন, তখন বিষ্ণুদাস পূৰ্বদিনের সংরক্ষিত হরিতকীর - অৰ্ধাংশ তাহার হাতে দিলেন। নিমাই—সেই মহিমামণ্ডিত নবীন সন্ন্যাসী বিষ্ণুদাসের প্রতি চাহিলেন, বলিলেন—“এমন সঞ্চয় বুদ্ধি যাহার, সে সন্ন্যাসীর সঙ্গী হইতে পারে না।” বিষ্ণুদাস ক্রন্দন করিতে লাগিলেন, কিন্তু নবীন সন্ন্যাসীর সঙ্কল্প অটুট রহিল। তথা হইতে নিমাই লীলাচ্ছলে অলক্ষিতে চলিয়া গেলেন। বিষ্ণুদাস মুখভােবায় রহিয়া গেলেন ; বিবাহ করিলেন। মুখভােবায় তাহার বংশীয়বর্গ অদ্যাপি আছেন। নীলাম্বর চক্রবর্তীর বংশ নবদ্বীপে নাই ; মুখভােবা তাহা এইরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। ; ; শ্রীচৈতন্য লীলাচ্ছলে শান্তিপুর হইতে শ্রীহট্টে বুরুঙ্গায় আসিয়া প্রকাশিত হইলেন। এইবার তিনি কুটুম্বগৃহে গেলেন না, শীতল ছায়া বিশিষ্ট একটি অশ্বখতলে উপবেশন করিলেন । বসন্তকাল, প্রকৃতি নবসাজে সজ্জিত ; শীতের নীহার-দগ্ধ পাদপরাজি বাসন্তিক বায়ুহিল্লোলে যেন প্রাণ প্রাপ্ত হইয়াছে। নবীন কিশলয়ে ৪২ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ লতাবিতান সজ্জিত হইয়াছে, স্তবকে স্তবকে কুসুম গুচ্ছ ঝুলিতেছে। সে এক গ্রাম্য পুষ্করিণীর প্রান্তবর্তী বৃক্ষবাটিকা। সেই বনাচ্ছন্ন ভূমে, দুই একটি গাভী চরিতেছিল, দুই একটা দয়েল তরুশাখে বসিয়া সঙ্গীত ঝঙ্কার তুলিতেছিল। এমনি সময় চৈতন্য অশ্বখতলে বসিয়া যেন শ্রান্তি দূর করিতেছিলেন। মধ্যাহ্নকাল, রৌদ্র ঝাঁ ঝাঁ করিতেছে। সােণর সন্ন্যাসীর অঙ্গ কান্তিতে অশ্বখতল হাসিতেছে, বিমল লাবণ্য-লহরী লীলা করিতেছে। প্রখর সুতীব্র রৌদ্র কিন্তু সেখানে যেন শুকিরেণণাজ্জ্বল স্নিগ্ধতা তরল স্রোতে বহিয়া যাইতেছে। জ্বালাময় রৌদ্রতাপে যখন প্রাণীমাত্রই পরিতাপিত, প্রভু দেখিলেন—তথায় একটী কৃষক সন্নিকটে হাল চাষ করিতেছে। নিরীহ গাে-দুটির অবস্থা দেখিয়া করুণাময়ের করুণ উপজাত হইল, তিনি রামদাস কৃষককে বলিলেন-“ভাই! ক্ষান্ত হও, এ দুটির অবস্থা দেখে কি তােমার দুঃখ দয়া হয় না?” প্রখর রৌদ্রে : ক্ষেত্র শুষ্ক হইয়া যাইতেছে, কৃষক নিরস্ত হইতে পারিল না। তাহার কথা শুনিয়া শ্রীমহাপ্রভু আবেগভরে বলিয়া উঠিলেন— “হরি হরি ! একি সর্বনাশ। ক্ষেত্র নষ্ট হৈবে বলি কর ধৰ্মনাশ।” ( শ্রীচৈতন্য রত্নাবলী।} আর কিছু বলিলেন না। তাহার অরবিন্দ নেত্র হইতে অবিরল ধারে বারিধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। দেখিয়া কৃষক বিস্মিত ও বুদ্ধিহারা হইল। করুণার এমন চিত্র সে কখনও দেখে নাই, সে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। আরও অদ্ভুত ! সন্ন্যাসীর মুখােচ্চারিত নামের কি অমোঘ শক্তি। পশু দুটা প্রথমে দাঁড়াইয়া উৰ্দ্ধ কর্ণে তাহা শুনিল, তার পরে মুখ তুলিয়া আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ৪৩ সমস্বরে অব্যক্ত ধ্বনি করিয়া উঠিল,-স্পষ্টতঃ যেন তাহারা হরিনাম : করিল ! “মধ্যাহ্নে তন্মুখীচ্ছদ গাবতূহরিধ্বনি” (শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যোদয়াবলী।) এই আশ্চর্য ব্যাপার বিলােকনে রামদাস ভীত হইল ও দৌড়িয়া গিয়া মহাপ্রভুর পদ প্রান্তে পড়িল। রামা তরিয়া গেল, আর প্রভু “রামদয়াল” নামে তথায় খ্যাত হইলেন। গৌরাঙ্গের জ্ঞাতি-তদীয় ভ্রাতৃ সম্পর্কীত গৌরীকান্ত গৃহে যাওয়া কালে এই সন্ন্যাসীকে দেখিয়া নিকটে আসিলেন ও তঁাহার চরণে প্রণত হইলেন। তখন উভয়ে পরস্পর পরিচিত হইলেন। এই সময়ে তদীয় ভ্রাতুস্পুত্র সম্পর্কিত গর্ভ ও তথায় উপনীত হইলেন। প্রভাবশালী সন্ন্যাসীকে দেখিয়াই বালক তাহার চরণে লুটাইয়া পড়িল। তাঁহার উভয়েই তাহার কাছে হরি নাম পাইলেন। রামদাস, গৌরীকান্ত ও শ্ৰগর্ত, এই তিনজন ধর হইয়া উঠিলেন; এই তিন মহাত্মা হইতে সে দেশ তরিয়া গেল। শত শত লােক’ ইহাদের কৃপায় সংসার সাগর পার হইতে লাগিল মহাপ্রভু বুরুঙ্গায় অশ্বথতলায় যথায় বসিয়াছিলেন, সে স্থান এক পবিত্রস্থান বলিয়া গণ্য ও সুরক্ষিত হয়। অদ্যাপি সেস্থান “শ্রীচৈতন্যের বাড়ী” বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। ; বুরুঙ্গা হইতে মহাপ্রভু ঢাকা দক্ষিণ আসিলেন, সায়াহ্নকাল, অস্তোন্মুখ সূর্যের সমুজ্জ্বল স্বর্ণ-কিরণ-রেখা হরিত পত্রাবলীতে প্রতিফলিত হইয়া দিক হরিদ্রাভ হইয়া উঠিয়াছে, এমন সময় প্রতপ্তকাঞ্চন লাঞ্ছিত- কান্তি সন্ন্যাসী শােভাগৃহে উপনীত হইলেন। বােধ হইল, যেন ঐ ৪৪ শ্রীগৌরাঙ্গের পূৰ্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। AN স্বর্ণ প্রতিমার অঙ্গ-কান্তিতে দিক প্রভাসিত হইয়া উঠিয়াছে; হরিত পত্রাবলী পীতদীপ্তি প্রাপ্ত হইয়াছে। শ্রীগৌরাঙ্গের জ্যেষ্ঠতাত পরমানন্দ মিশ্রের পত্নী সুশীলাদেবী এই নবীন উদাসীনকে প্রথমেই দেখিতে পাইলেন ও জরাতুর শ্বাশুড়ীকে সংবাদ দিলেন। ধীরে ধীরে ধীরে কোন প্রকারে বৃদ্ধা আসিলেন। দণ্ডীকে তাহার নারায়ণ বলিয়া বােধ হইল। এ ত নর নহে-নারায়ণ ছলনা করিয়া নরদেহ ধারণ করিয়াছেন শােভাদেবীর ভক্তি-প্ৰণত মস্তক ভূলুণ্ঠিত হইবার পূৰ্বেই শ্ৰীমহাপ্রভু তাহাকে নিজ পরিচয় প্রদান করিলেন। বৃদ্ধা শােভা দেবীর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে বধূ শচী অবশ্যই নাতিকে তাহার কথা বলিয়া, ঢাকাদক্ষিণে প্রেরণ করিবেন । এতদিন পরে তাহার সে সাধ মিটিল। বৃদ্ধা নাতিকে বহিৰ্বাটিকা হইতে গৃহে লইয়া গেলেন। সুশীলা পরম স্নেহে পায় পিষ্টক প্রস্তুত করিয়া খাওয়াইলেন। বৃদ্ধা বিবিধ- কথাবার্তায় প্রেমানন্দে সে রজনী যাপন করিলেন। মনঃসন্তোষিনী নামক গ্রন্থ পাঠে জানা যায় যে, তৎকালে বৃদ্ধার দুই পুত্র জীবিত ছিলেন এবং অবস্থা হীন হইয়া পড়িয়াছিলেন। বৃদ্ধা নাতীকে এ কথাও বলিতে ভুলেন নাই। যখন উভয়ে কথাবার্তা হইতেছিল, স্নেহের ভরে নাতির প্রতি তখন তাহার সন্ন্যাসীবুদ্ধি ছিল না। গ্নেহের গাঢ়তায় তখন নিৰ্ম্মল হৃদয় বৃদ্ধার নেত্রে গৌরাঙ্গের স্নেহা-মধুর অপূৰ্বরূপ প্রতিভাত হইল ; স্নেহ-বিহবল দেখিলেন—গৌরাঙ্গ সন্ন্যাসী-বেশী নহেন,-যেন গৃহস্থের সরল ছেলে! তখন যেন তঁাহার বাহ্যজ্ঞান ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হইয়া গেল, তিনি যেন এক অপূর্ব ভাব-মদিরাময় স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করিতেছেন। তদবস্থায় গৌরাঙ্গের প্রতি যেন তাহার হঠাৎ ঈশ্বরবুদ্ধি ;
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ৪ উপজাত হইল; অমনি দেখিতে পাইলেন কি যেন এক ইন্দ্রজাল প্রভাবে সেই সুন্দর গৌররূপ মনােমমাহন ইন্দ্রনীলমণিময় মূর্তিতে পরিবর্তিত হইলেন ! এ কি জাগ্রত স্বপ্ন ? বৃদ্ধা বিহবলা হইয়া রহিলেন! বৃদ্ধার বহু পূর্বের স্বপ্ন সফল হইল। যখন বৃদ্ধার চমক ভাঙ্গিল, দেখিতে পাইলেন—সম্মুখে সেই মহা মহিমান্বিত নবীন উদাসীনের উন্নত তনু শােভা পাইতেছে। এই যে শােভা দেবীর পরিদৃষ্ট দুইরূপ,-শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীকৃষ্ণ ; এই দুই মূর্তি বৃদ্ধা কর্তৃক ঢাকা দক্ষিণে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। শ্রীগৌরাঙ্গের বহুবিধ যুগলবিগ্রহ বঙ্গের বিবিধস্থানে অর্চিত হইতেছেন। গৌর নিতাই, গৌর গদাধর, গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া যুগলবিগ্রহ একাধিক স্থানে আছেন। কিন্তু গৌরাঙ্গের পার্শ্বে কৃষ্ণমূৰ্ত্তি এক ঢাকা দক্ষিণেই দৃষ্ট হইবেন; ঢাকা দক্ষিণ ছাড়া আর কোথায়ও নাই। কেন এই দুইমূৰ্ত্তি ঢাকা দক্ষিণে অর্চিত হইতেছেন, তাহার ইতিহাস এই দুই মূত্তি প্রচারিত করিতেছেন, আর তাহারাই ঢাকা দক্ষিণে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আগমনের প্রমাণ নীরবে প্রদান করিতেছেন। রজনী প্রভাতে শ্ৰীমহাপ্রভু পিতামহী গৃহ ত্যাগ করিয়া, সন্নিকটবর্তী “কৈলাস শৃঙ্গে” শিব ও “অমৃতকুণ্ড” দর্শন করিয়া ঢাকা দক্ষিণ হইতে চলিলেন। শিব এখনো আছেন, কিন্তু “অমৃতকুণ্ড” বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। এই সময়ে শ্রীমহাপ্রভু শ্রীহট্টবাসী চারিজন ভক্তকে আত্মসাৎ করিয়া, তাহাদিগকে হরিনাম প্রচারে প্রেরণ করিয়াছিলেন। রসতত্ত্ব বিলাস নামক একখানা প্রাচীনগ্রন্থে এই বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। * “নিগদ্য যুগধৰ্ম্মাদীন কৃষ্ণরূপং বিধায় যঃ। দর্শয়ামাস বৃদ্ধায়ে স্ব স্বরূপং দয়ানিধি”। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যোদয়ালী ।
৪৬ শ্রীগৌরাঙ্গের পূৰ্বাঞ্চল পরিভ্রমণ শ্ৰীমহাপ্রভু যেখানেই যাইতেন, মুহুৰ্ত্ত মধ্যে তঁাহার গমন সংবাদ সর্বত্র প্রচারিত হইয়া পড়িত। এক্ষেত্রেও তাহাই হইয়াছিল। সন্নিকটবর্তী স্থানবাসী অনেক লােক তাঁহার মুখােচ্চারিত হরিনাম শুনিয়া কৃতার্থ হইয়াছিল, তাহাদের জীবন স্রোত পরিবর্তিত হইয়াছিল। তন্মধ্যে শ্রীহট্টের রামদাস ও মাধবদাস ভ্রাতৃদ্বয় এবং জ্ঞানবর ও কল্যাণ- বরের কথাই উল্লেখ করা যাইতেছে। শ্ৰীমহাপ্রভু ইহাদিগকে নামােপদেশ দেন ; ইহারা তাহাতে পরম শক্তিলাভ করেন। তাহাদের এ আধ্যাত্মিক শক্তি শ্রীহট্ট-কাছাড় ময়মনসিংহ প্রভৃতি অঞ্চলের নরনারীকে কোথায় ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল! রামদাস ও মাধবদাস উত্তরদিকে এবং জ্ঞানবর ও কল্যাণকর পূৰ্বদিকে গমন করিয়াছিলেন। যথা- “এত বলি মহাপ্রভু ডাকে রামদাস, দুই ভাই সঙ্গে চলে মাধবদাস। এই নাম বিলাইব খুৰ দিগেতে, ১০। জ্ঞানব কল্যাণবর ডাকয়ে তুরিতে। মাের আজ্ঞা বল বাপু পুব দিগেকে ; যারে তারে এই নাম বিলাও ভালমতে॥” ( প্রাচীন রসতত্ত্ব বিলাস গ্রন্থ। জ্ঞানবর ও কল্যাণবর ঢাকা দক্ষিণের পূর্বদিকে—হেডম্ব রাজ্যে (বর্তমান কাছাড়ে) প্রচার করেন এবং রামদাস ও মাধবদাস শ্রীহট্টের উত্তরদিকে গমন করিয়াছিলেন। হেড়ম্ব তখন জন বিরল স্থান ছিল, সুতরাং কিছুদিনেই ইহারা সে দেশ বৈষ্ণব করিয়া, রাজাজ্ঞা লইয়া দেশে ফিরিয়া আসিলেন। ৪৭৫ শকাব্দে তঁাহার। স্বদেশ পঞ্চখণ্ডে প্রত্যাগমন ৫ করেন। যথা :- আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ৪৭ } রাজ আজ্ঞা লইয়া মিত্ৰ পুত্ৰাদি সঙ্গে লৈয়া ; চৌদ্দশত পাচক শাকে প্রাচ্যে উত্তরিলা। (রসূতত্ত্ব বিলাস।) রামদাস ও মাধবদাস উত্তরদিকে প্রচারে গমন করেন। তাহাদের প্রচার ক্ষেত্র কোন স্থান ? শ্রীহট্টের উত্তরাঞ্চল (বর্তমান সুনামগঞ্জের উত্তর ভাগ) ও সুসঙ্গ দুর্গাপুর প্রভৃতি স্থান যে তাঁহাদের প্রচার ক্ষেত্র ছিল, তাহা সহজেই বােধ হয়। তৎকালে বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার সৃষ্টি হয় নাই, সুসঙ্গ-দুর্গাপুর তৎকালে শ্রীহট্টেরই অন্তভুক্ত ছিল। সুসঙ্গ দুর্গাপুরে যে সকল হাজং জাতির বাস, তাহারা বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। তাহাদের গৃহগুলি পরিচ্ছন্ন, গােময়লিপ্ত এবং প্রত্যেক গৃহে তুলসীমঞ্চ আছে। ইহার বিনীত, অতিথি পরায়ণ, এবং জীব- হিংসা বিরত। তাহারা কীৰ্ত্তন কহিয়া থাকে, গুরু ও পঞ্চতত্ত্ব প্রণাম শ্লোকাদি বংশানুক্রমে জানে। ইহারা জন্মাষ্টমী, দোলযাত্রা ইত্যাদি পালন করে। তাহাদের অধিকারী-গৃহে রাধাকৃষ্ণ,-কোথায়ও বা গৌরমূর্তি পূজিত। অসভ্য সকল জাতিই স্থিতিশীল—অন্যের অনুকরণ তাহার করে , তাহারা পূর্বপুরুষাচরিত রীতি প্রাণাস্তেও ত্যাগ করে না। তদবস্তায় এই অসভ্য জাতীয় হাজংদের ঈদৃশ আচরণ একটা অসাধারণ বিষয় সন্দেহ নাই। জিজ্ঞাসা করিলে ইহারা বলে যে তাহারা প্রাচীন মহাজনানুরত। অবস্থা বিবেচনায় সে প্রাচীন মহাজন যে রামদাস ও মাধবদাস, তাহা সহজেই উপলব্ধি হয়। চারিশত বৎসর পূর্বে মহাপ্রভু শ্রীহট্ট আগমন করেন, চারিশত বৎসরের দীর্ঘ ব্যবধানেও তাহার সে আগমন-স্মৃতি বিলুপ্ত হয় নাই।
৪৮ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। যাহা হউক, বৃদ্ধা শােভাদেবীর পরিদৃষ্ট সে অপূৰ্ব্ব মূর্তি যুগল পরম যত্নে “গুপ্ত বৃন্দাবন ঢাকাদক্ষিণে প্রতিষ্ঠিত ও অর্চিত এবং জনগণের প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। + বর্তমানে শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহযুগল যে বাড়ীতে আছেন, উহা সেই প্রাচীন বাটিকা নহে। সে বাড়ী হইতে বিগ্রহযুগল পরে স্থানান্তরিত হইয়াছিলেন এবং সে প্রাচীন মিশবাড়ী” ৪ জঙ্গলান্তরাল- বর্তীও বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। এমন সৰ্বত্ৰই হয়, বৃন্দাবন বিলুপ্ত হইয়াছিল ; নবদ্বীপের গৌরজন্মস্থান অপরিচিত হইয়াছিল ; এই শ্রীহট্টের লাউড় প্রদেশে অদ্বৈতের জন্মস্থানও জঙ্গলাচ্ছাদিত ও অপরিচিত ছিল; কিন্তু স্বতঃপ্রকাশ নিত্যধাম চিরকাল লােক লােচনের বহির্ভূত থাকে না, “মিশ্রবাড়ীও রহে নাই। মােসলমান আমলে শ্ৰহট্টে “দেওয়ান” পদবিবিশিষ্ট রাজস্ব বিভাগের একজন শ্রেষ্ঠ কর্মচারী থাকিতেন। বহু পূৰ্বকাল হইতে শ্রীহট্টের স্বর্গীয় রাজা গিরিশচন্দ্রের পূর্বপুরুষগণ এই পদ অধিকার করিয়া আসিতে- • ঐ “এবং কৃষ্ণচৈতন্য জীবনিন্তারণায় চ। দ্বয়ীমুর্তি বিধােত্র স্বগোত্ৰাণ প্রতিপালয়ন। গুপ্ত বৃন্দাবনে রমে গুপ্তপার্ষদঃ সংবৃতঃ। ইত্যাদি। ( শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যোদয়াবলী।) । মৎ প্রফুল্ল মিশ্র স্বীয় কৃষ্ণচৈতন্যোদয়াবলীতে ঢাকাদক্ষিণকে গুপ্ত বৃন্দাবন নামে আখ্যাত করিয়াছেন। বাস্তবিক ঢাকাদক্ষিণ গুপ্তবৃন্দাবনই বটে; যেখানে ব্রজের নন্দ স্বরূপ জগন্নাথ মিশ্র উদ্ভুত হন ( যথা :-“সেই ব্রজেশ্বর ইহা জগন্নাথ পিতা সেই ব্রজেশ্বরী ইহা শচীদেবী মাতা।” ইত্যাদি শ্রীচরিতামৃত ] সেই স্থান বৃন্দাবন বই কি? আর যে স্থানে সেই “নন্দমুত” সাক্ষাৎ বিরাজিত, সে স্থানে বৃন্দাবনই বটে। $ ১৯৬৩ সালের একখানা দলিলেও এই নাম দৃষ্ট হয়।
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। ৪৯ • ছিলেন। কিন্তু ১৭৪০ খৃষ্টাব্দের পূর্বে ভিন্নস্থানবাসী একজন ধর্মাত্মা দেওয়ান এই পদ অলঙ্কৃত করেন, ইহার নাম গােলাব রায়। ইনি শ্রীহট্টে আসিয়া জানিতে পারিলেন, ঢাকা দক্ষিণে শ্রীমহাপ্রভুর বিগ্রহ বিরাজিত আছেন। তাহার তখন বিগ্রহ দর্শনে একান্ত বাসনা হইল ; কিন্তু তথায় যাওয়ার ভাল পথ না থাকায়, তিনি সহর হইতে মহাপ্রভুর বাড়ী পর্যন্ত সড়ক প্রস্তুতের জন্য সংসৃষ্ট জমিদারদের উপর পরওয়ানা জারি করিলেন। অচিরেই সেই আদেশ প্রতিপালিত হইল, নির্দিষ্টকাল মধ্যে সড়ক নির্মিত হইল। ঢাকা দক্ষিণের জমিদারের প্রতি একটি উৎকৃষ্ট মন্দির নির্মাণের আদেশ ছিল। দেওয়ান দেবদর্শনে আসিয়া সেই মন্দিরে বিগ্রহ স্থানান্তরিত করেন। সন্নিকটে কোথায় নাকি একটা মসজিদ ছিল, জমিদার পরিশ্রম লাঘবের জন্য সেই পরিত্যক্ত ভগ্ন মসজিদের ইষ্টক আনিয়া উক্ত নূতন মন্দিরে লাগাইয়াছিলেন। দেবতাব দেবলীলা বুঝা ভার । রাত্রে দেওয়ান এক বিচিত্র স্বপ্ন দেখিলেন। যিনি বিশ্বপিতা, সকলেই যাহার সন্তান, তিনিই যেন শ্রীবিগ্রহরূপে বলিতেছেন—“আমি ব্রাহ্মণের ভগ্ন কুটীরে ছিলাম ভাল, এ মন্দির যে মসজিদের ইষ্টক নিৰ্মিত, এখানে কেন আমাকে আনা হইল ?” প্রভাত হইল, দেওয়ান জাগিয়াই অনুসন্ধানে ধৃত হইলেন এবং জানিলেন যে স্বপ্ন সত্য। তখন দেওয়ান ঐবিগ্রহ সত্বর স্থানান্তরিত করিতে ব্যস্ত হইলেন। মিশ্রবংশ বৃদ্ধি সহকারে, তাহারা ভিন্ন ভিন্ন বাটিকা প্রস্তুত করিয়া প্রাচীন বাটীর সন্নিকটেই সকলে ছিলেন। দেওয়ান তাহাদের প্রার্থনা- মুযায়ী সকলের সুবিধার জন্য প্রাচীন উচ্চস্থান হইতে শ্রীমূৰ্তিযুগল সরাইয়া সকলের বাটীকার প্রায় মধ্যস্থলে শ্রীমূৰ্ত্তি আনয়ন করিতে মনে করিলেন ৪ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। এবং বর্তমানে শ্রীবিগ্রহদ্বয় যথায় আছেন, তথায় মন্দির নির্মাণ করাইয়া বিগ্রহ স্থানান্তরিত করিলেন। কেবল তাহাই নহে, সুন্দররূপে মূৰ্ত্তির সেবা পরিচালন জন্য তিনি বহু দেবােত্তর ভূমি দান করিলেন। সে ভূমির প্রায় অধিকাংশই এখন নাই, সামান্য মাত্র “চৈতন্যের ছেগা” নামে এখনও সেই স্মৃতি রক্ষা করিতেছে। দেওয়ানের সেই মন্দিরও পূৰ্বস্মৃতি জাগরিত করিয়া রাখিয়াছে। দেওয়ান যে দীঘি খনন করাইয়াছিলেন সেই “দেওয়ানের দীঘি”র তীরেই “চৈতন্যগঞ্জ” বাজার বসিয়াছে। আর দেওয়ান নির্মিত সেই প্রাচীন দেওয়ানের সড়ক” প্রতিবৎসরই কৃষক কর্তৃক ছেদিত হইয়াও এখনও বৰ্ত্তমান আছে। উপেন্দ্র মিশ্রের বাড়ী,-যথায় শােভাদেবীর সহিত সন্ন্যাসী শ্ৰচৈতন্যের সম্মিলন ঘটে, যে স্থান তাহার পুত চরণ-রেণু স্পর্শে বৈকুণ্ঠ- সম্পদ লাভ করিয়াছিল, তাহা “মিশবাড়ী” নামে খ্যাত। সম্প্রতি উহা পরিষ্কৃত হইয়াছে এবং সন্ন্যাসী চৈতন্যের আগমন-স্মৃতি উন্মেষক শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সন্ন্যাসমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন। [ মিশ্রবংশীয় প্রভুপাদ শ্ৰযুত ইন্দ্রকুমার মিশ্রের ঐকান্তিক যত্নে এই মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। উহা ভক্তাশ্রম নামে খ্যাত করা হইয়াছে; কিন্তু সৰ্বসাধারণে “মহাপ্রভুর দাদাইর বাড়ী” বলিয়া থাকে। মিশ্র মহাশয় এই আশ্রম প্রতিষ্ঠায় প্রায় সৰ্ব্বস্বান্ত হইয়া পড়িয়াছেন বলিলে অত্যুক্তি হয় না। ধন্য তাহার ভক্তি, ধন্য তাহার শ্রীচৈতন্যের চরণ নির্ভরতা ] শ্রীচৈতন্য আসামে। মহাপ্রভু ঢাকা দক্ষিণ হইতে আসামে প্রসিদ্ধ ব্ৰহ্মকুণ্ড দর্শনে গমন করিয়াছিলেন। আসামেহাজোতে মাধবের মন্দির অতি প্রসিদ্ধ ; শ্রীমহাপ্রভু প্রথমে এথায় আসিয়া মাধব দর্শন করেন ও বরাহকুণ্ডের উপরে একটি গােফাতে অবস্থিতি করেন। এইস্থানে তিনি • “পিতৃজন্মভূমি ভক্তাশ্রমে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু
No text on this page.
আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। muceni রত্নেশ্বর বিপ্রকে আত্মসাৎ করেন। ইহাকে তিনি ভাগবত শিক্ষা দিয়া মাধব মন্দিরের “পাঠক নিযুক্ত করেন। রত্নেশ্বরের নাম রত্নেশ্বর পাঠক হয় এবং তদবধি তথায় ভাগবত পাঠ ও সংকীৰ্ত্তন প্রথা প্রবর্তিত হয়। হাজো হইতে মহাপ্রভু পরশুরাম কুণ্ডে গমন করেন ও তথা হইতে ব্ৰহ্মকুণ্ডে গমন এবং স্থানান্তর পুনঃ মাধব মন্দিরে প্রত্যাগমন করেন। হাজোতে তিনি পূর্বকার গােফাতেই অবস্থিতি করেন, এইস্থানে তদবধি চৈতন্যের গােফা” বলিয়া অদ্যাপি কথিত হইয়া থাকে। এইস্থানে শ্রীমহাপ্রভু মাগুরীয় তর্কভূষণ ও কবিশেখরকেও ভাগবত শিক্ষা দিয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি বীণা যন্ত্র লইয়া নারদের ন্যায় হরিনাম গান করিয়াছিলেন । দামােদর দেব কর্তৃক আসামে “দামােদরীয় সম্প্রদায়” প্রবর্ভূত হয়, আসামে ইনি অবতারবৎ পৃজিত, ইহার সম্প্রদায়ের লােক সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য নহে। ইহাতেই তাহার প্রভাব বুঝা যায়। এই দামােদর মাধব দর্শনে আসিয়া শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখিয়া স্তম্ভিত হইয়া দাড়াইলেন ও তাহার চরণে পতিত হইলেন। দামােদর মাধব দর্শনে আসিয়া সাক্ষাৎ মাধব হইতে যে কৃপা লাভ করিলেন, তাহাতেই; তিনি আসাম প্রদেশ বৈষ্ণবধর্মের বিমল প্রভায় ভাসাইয়া দিলেন আর তাহাতেই আজ তিনি আসামে দেববৎ পূজিত। এই দামােদরের প্রধান শিষ্য ভট্টদেব কবিরত্ন আসামীভাষায় “সৎসম্প্রদায় কথা” নামক একখানা গ্রন্থ লিখিয়াছেন,তাহাতেই এই অপূৰ্ব বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। শ্রীমহাপ্রভুর সংবাদ শ্রবণে আসামের প্রধান ধর্ম প্রবর্তৃক প্রসিদ্ধ শঙ্করদেব তাহাকে দর্শন করিতে হাজোতে আগমন করিয়াছিলেন। কিন্তু তথায় তঁাহার আশা পূর্ণ হয় নাই, তখন শ্রীমহাপ্রভু হাজো ত্যাগ করিয়া চলিয়া আসিয়াছেন।
শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। শ্ৰীমহাপ্রভু অদ্বৈতাচার্যকে প্রণাম করিতেন । ইহাতে অদ্বৈত বড়ই অনুতপ্ত হইতেন। এজন্য তিনি রাগ করিয়া শ্ৰীমহাপ্রভু তাহাকে শাস্তি করেন, এই উদ্দেশ্যে শান্তিপুরে আসিয়া জ্ঞান ব্যাখা আরম্ভ করেন। মহাপ্রভু তাহা শুনিয়া যথার্থই ক্ষুব্ধ হন ও শান্তিপুরে আগমন করেন। শান্তিপুরে তঁাহার ঈশ্বরবেশ হয় এবং ভক্তি ব্যাখা না করার জন্য অদ্বৈতকে শাস্তি দেন। এ মহাপ্রভুর শাস্তি পাইয়া অদ্বৈত পুলকিত হন, ও তাহাকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম করেন। শাস্তি পাইতে পারে সে প্রণাম না করিবে কেন? এইরূপে শ্রীমহাপ্রভু ভক্ত বাসনা পূর্ণ করেন। প্রেম বিলাস গ্রন্থে লিখিত আছে যে অদ্বৈত প্রভুর জ্ঞানব্যাখা শ্রবণে কোন কোন অদ্বৈত শিষ্য ভক্তিপথ পরিত্যাগ করেন ; ঐ সকল শিষ্য অদ্বৈত কর্তৃক পরে প্রবুদ্ধ হইয়াও যখন তঁহার অবাধ্য হইয়া উঠিয়াছিল, তখন তৎকর্তৃক পরিবর্জিত হন। শঙ্করদেব ইহাদের প্রধান। ইনিই আসামে ধৰ্ম প্রবর্তক হইয়ছিলেন। কাজেই তিনি মহাপ্রভুর দর্শন পাইলেন না। কিন্তু তাহাতে তিনি অতঃপর নীলাচলে গিয়া দূর হইতে মহাপ্রভুকে দর্শন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। প্রাচীন গ্রন্থাদির পরিচয়। ইহাই শ্ৰীমহাপ্রভুর ‘ঢাকাদক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ ও আসামভ্রমণ লীলা কথা। এস্থলে একটা কথা আলােচ্য বটে। শচীদেবীর আজ্ঞায় শ্রীমহা প্রতু শান্তিপুর হইতে নীলাচলে গমন করেন। শ্রীচৈতন্য ভাগবত ও শ্ৰচৈতন্য চরিতামৃতে এক কথাই পাই । শান্তিপুর হইতে তাঁহার অন্যত্র গমন এই দুই প্রসিদ্ধ গ্রন্থে নাই। সন্ন্যাসের পুর্বে মহাপ্রভুর শহট্ট গমন কথাও ঐ দুই গ্রন্থে নাই। না থাকিলেও সে কথা এত আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। M স্বাভাবিক ও পরিজ্ঞাত, যে ( প্রাচীন গ্রন্থ ছাড়া) অনেক আধুনিক গ্রন্থকারও তাহা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। পরম ভাগবত রামদয়াল বাগ্চৗ এম ডি কৃত “গৌরাঙ্গ লীলা”, বিখ্যাত গিরিশ্চন্দ্র ঘােষ কৃত “চৈতন্য লীলা, মতিলাল রায় কৃত “নিমাই সন্ন্যাস”, কবি নবীনচন্দ্র সেন কৃত “অমৃতাভ,” সুরেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত সন্ন্যাসী, কুমুদনাথ মল্লিক কৃত “গৌরাঙ্গ,” এবং “শ্রীলক্ষ্মীপ্রিয়া চরিত,” প্রভৃতি বহুতর গ্রন্থে ইহা পাওয়া যায়। প্রেল বিলাস এক খান। প্রসিদ্ধ প্রাচীন বৈষ্ণব গ্রন্থ, উহাতে এবং ময়মনসিংহের “স্বরূপচরিত” নামক হস্তলিখিত বহু প্রাচীন কুল গ্রন্থে বিশেষভাবে ইহা বর্ণিত হইয়াছে। অতএব শ্ৰচৈতন্য ভাগবত বা শ্ৰচরিতামৃতে তাহার বিস্তৃত বর্ণনা বা উল্লেখ না থাকিলেই যে উহাকে ভিত্তিবিহীন বা মিথ্যা মনে করিতে হইবে, এমন বােধ হয় না। অগাধ শ্রীচৈতন্যলীলা-বারিধি হইতে যিনি যতটুকু পারিয়াছেন, রত্নেদ্ধার করিয়াছেন। সমস্ত লীলাই যদি এক বা দুই খানা গ্রন্থে পাওয়া যাইত, তবে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থ প্রচারের সার্থকতা রহিত না। শচরিতামৃত রচয়িতা স্বয়ং একথা বার বার স্মরণ করিয়া দিয়াছেন। শ্রীচৈতন্য ভাগবত ও শ্ৰচরিতামৃতে সন্ন্যাস গ্রহণের পর শ্রীমহাপ্রভুর শান্তিপুর হইতে নীলাচল গমনের কথাই পাওয়া যায়। কিন্তু—গৌরীদাস পণ্ডিতের ভাতা কৃষ্ণদাস কৃত পদে লিখিত আছে যে ঐ সময়ে মহাপ্রভু অম্বিকায় গৌরীদাস গৃহে গমন করিয়া ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণ করিয়াছিলেন। (পদ- কল্পতরু এবং ভক্তিরত্নাকর নামক প্রামাণ্য গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।) অদ্বৈতশিষ্য ঈশান দাস কৃত অদ্বৈত প্রকাশ গ্রন্থেও এ প্রসঙ্গ আছে,এবং অম্বিকা হইতে “নাম প্রেম প্রচারিতে অন্য দেশে”শ্রীমহাপ্রভু গমন করেন,ইহাও লিখিত আছে। সুবলমঙ্গল” নামক প্রাচীন হস্তলিখিত গ্রন্থেও এ আখ্যান পাওয়া যায়।
৫৪ শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বাঞ্চল পরিভ্রমণ। শান্তিপুর হইতে এই সময় শ্রীমহাপ্রভুর আর একস্থানে যাওয়ার কথাও প্রাচীন গ্রন্থে আছে; সে “জগদীশ চরিত্র বিজয়” গ্রন্থ। উহাতে পাওয়া যায় সে শ্রীমহাপ্রভু জগদীশ পণ্ডিতের মনােবাসনা পূর্ণ করিতে জসােড়ায় গিয়াছিলেন। মহাপ্রভু ঐ সময় শ্রীহট্টে আর একবার আগমন করেন। প্রভু সন্ন্যাসের পর এই আগমন প্রসঙ্গ ঐকৃষ্ণ চৈতন্যোদয়াবলী নামক সংস্কৃত গ্রন্থে লিখিত আছে। ঐ গ্রন্থ প্রভুর জ্ঞাতি ভাতা প্রদ্যুম্ন মিশ্র কর্তৃক তাহারই অনুমতি গ্রহণে লিখিত হইয়াছিল। ঐ গ্রন্থাবলম্বনে প্রায় দ্বিশতবর্ষ পূর্বে মনঃসন্তোষিনী রচিত হয়, এবং কিছু কাল হইল—“শ্রীচৈতন্যরত্নাবলী” ও “শ্রীচৈতন্যবিলাস” নামক গ্রন্থদ্বয় প্রণীত হয়। অতি প্রাচীন ( প্রায় ৪০০ বর্ষ পূৰ্ব্বে রচিত) আসামী ভাষায় লিখিত “সৎসম্প্রদায় কথা” নামক একখানা গ্রন্থে মহাপ্রভুর আসাম ভ্রমণ কথা পাওয়া যায়। তিনি ঢাকা দক্ষিণ হইতেই আসামের হাজোতে ও ব্ৰহ্মকুণ্ডে গমন করেন। সে প্রসঙ্গে * ইহাও বলিয়াছি যে রচয়িতা ভট্টেদব কবিরত্ন মহাপ্রভুর সমসাময়িক ছিলেন। ঐ গ্রন্থদৃষ্টে পরে আসামী কবিতায় আরও এক সুন্দর গ্রন্থ রচিত হইয়াছে। “এক লীলায় করে প্রভু কাৰ্য পাঁচ সাত। তীর্থের মহিমা, নিজ ভক্তে আত্মসাৎ।” ভক্ত গ্ৰহকার কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থে এই যে শ্রীচৈতন্য কেশব ভারতীয় শিষ্য হই সােমার ( upper Assam) পর্যন্ত প্রেমভক্তি এবৰ্তাইলা। এতে পূৰ্ব্বদেশের আচার্য শ্রীচৈতন্য ভৈ। পচে চৈতন্য ভারতী প্রভু মাধব দরশনে মণিকুট (হাজোতে যে পর্বতে মাধবের মন্দির) আসিল। বরাকুণ্ডের উপরে গােফাতে রহি মাধব দর্শনহৈল। পাচে রঙ্গের বি প্রক শৰণলগাই ভাগবত পড়াইরত্ন পাঠক নাদি মাধবর দ্বারত ভাগবত পড়িবে ছিল। আৰু যাত্র মহোৎসব সংকীৰ্ত্তন কৰ্ম্মকোমাধব দ্বারত প্রবৰ্তাইল।” ইত্যাদি মৎসম্প্রদায় কথা ৭মঃ আসাম ও ঢাকা দক্ষিণ লীলা প্রসঙ্গ। কথা বলিয়াছেন, এস্থলেই তাহা সম্যক্ প্রযুজ্য। মাতৃ প্রতিজ্ঞা সংরক্ষা, পিতামহীর বাসনা পরিতৃপ্তি তীর্থদর্থন ও ভক্ত আত্মসাৎ প্রভৃতি বহু কাৰ্যেই তাহা প্রকটিত। [ শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতাদি সুপ্রচারিত প্রাচীন গ্রন্থে শ্রীমহাপ্রভুর পূৰ্বদেশ পরিভ্রমণ প্রসঙ্গের উল্লেখ না থাকায়, কেহ কেহ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ঢাকা দক্ষিণাদি ভ্রমণ লীলার ঐতিহাসিকতায় সন্দীহান হন, তাহাদের সংশয় অপনােদনাৰ্থ “সুরমা” পত্রিকায় ও শ্রীভূমিতে লেখক কর্তৃক পূৰ্বে দুইটী প্রবন্ধ প্রচারিত হইয়াছিল। ভক্ত লেখক ও গ্রন্থকার শ্রযুক্ত হরিদাস গােস্বামী মহাশয়ের অভিপ্রায় যে শ্রীমহাপ্রভুর শ্রীহট্টা- গমন বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ হয়, ইতিপূৰ্বে স্বৰ্গত ভক্ত ৮যােগীন্দ্রচরণ দাস মােক্তার মুখে একথা জানিয়াছিলাম এবং তাহারই অল্পকাল পরে যুক্ত ইন্দ্রকুমার মিশ্র মহাশয়ের মুখে ভক্তপ্রবর শ্ৰীযুক্ত বৈকুণ্ঠনাথ বেদান্ত বাচস্পতি ভাগবত-ভূষণ মহাশয়ের অনুরােধাদেশ প্রাপ্ত হইয়া প্রাগুপ্ত প্রবন্ধ পুনমুদ্রণের আবশ্যকতা অনুভব করায়, তাহাই কিঞ্চিৎ বিবর্জিত ও রূপান্তরিত করিয়া প্রকাশিত করা হইল। কাজেই এই ক্ষুদ্র পুস্তকের প্রত্যেক কথা প্রাচীন প্রামাণ্য গ্রন্থাবলম্বনে লিখিত হইয়াছে যে, যে লীলা কথা বহুল প্রচারিত নহে, তাহা কোন প্রাচীন গ্রন্থাবলম্বনে লিখিত হইয়াছে ; প্রসঙ্গিত স্থানেই সে গ্রন্থের নামােল্লেখিত হইয়াছে ] লেখক ভক্তের আদেশ প্রতিপালন করিয়াই মুক্ত ; তাড়াতাড়ি প্রকাশ হওয়ায় ইচ্ছামত বিবর্ধিত করিতে অসমর্থ বিধায় অনেক অপূর্ণতা ও অসঙ্গতি দোষ অপরিহার্য হইয়াছে ; অবস্থা বিবেচনায় এ ত্রুটী মার্জনীয় হইবে কি? ইতি সমাপ্ত। শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্যসমর্পিতমস্তু। ;
বিষয় বিবরণ।
বিষয়
পৃষ্ঠা
০ ০ ০
৬ ০ ০
০ ০ ০
১৪
১। শান্তিপুর ও কাটোয়া টলমল
২। পিতামহাদি প্রসঙ্গ
৩। বালক নিমাই
৪। শিক্ষার্থী-অধ্যাপক
৫। নিমাই পূর্ববঙ্গে
৬। শ্রীহট্ট প্রসঙ্গ-চঞ্চল অধ্যাপক
৭। ঐবিষ্ণুপ্রিয়া—গয়ায় গৌরাঙ্গ কীৰ্ত্তনের বন্যা
৮। সন্ন্যাসী
৯। শ্রীচৈতন্য শান্তিপুরে—জসােড়ায় ও অম্বিকায়
১০। চৈতন্য পূর্ববঙ্গে—পুনৰ্বার শ্রীহট্টের বুরুঙ্গায় এবং
ঢাকা দক্ষিণে পিতামহাগৃহে
১১। শ্রীচৈতন্য আসামে
১২। প্রাচীন গ্রন্থাদির পরিচয়
০
২৮
৪ + ৩
৪ ০
০ ০ ০
প্রিন্টার–পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী,
বিদ্যোদয় প্রেস,
৮২ নং কাশীঘঘাযের লেন, কলিকাতা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.