Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Chinar

Sen,surendranath · 2010/01/10

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

চিনার
গঃ সুরেশদুনাথসেন,
এম-এ., এল-এ-ডি,

প্রকাশক
শ্ৰীঅনন্তকুমার সেন
পাবলিক লাইব্রেরী
এলাহাবাদ
প্রিন্টার
শ্রীকালীকিঙ্কর মিত্র
ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড
এলাহাবাদ

নিবেদক অনেক দিন আগে, কোনও এক গ্রীষ্মবকাশে লেখক যখন প্রথম দার্জিলিং ভ্রমণে যান, সেই সময়ে দার্জিলিংয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও কাঞ্চন জঙ্ঘার তুষারশ্রেণী তাহার মনে যে-সব কল্পনা ও ভাবের উদ্রেক করিয়াছিল, তিনি তাহাই সনেটে গ্রথিত করিয়া “তুষার” নামে বাহির করিয়াছিলেন। আজ আবার সনেটে গ্রথিত তাহার কাশ্মীর-স্মৃতি “চিনার” নামে বাহির হইল। চিনারের কতকগুলি কবিতা পূর্বে “উত্তরায় বাহির হইয়াছিল। কতকগুলি স্থানীয় কথা। মাঝে মাঝে সনেটে ব্যবহৃত হইয়াছে। সেই কথাগুলি বুঝাইবার জন্য পরিশিষ্টে সামান্য ব্যাখ্যা যােগ করিলাম। ১লা জানুয়ারী শ্ৰীঅনন্তকুমার সেন

No text on this page.

চিনার
১
বসুধা-চরণ-চুম্বী বিতস্তার কূলে।
মুরলী-আরাব আমি শুনেছি শুনেছি,
বিশাল বিরাটব্যাপী হিমাদ্রির মূলে
মেঘান্তরে তােমা, নাথ ! চিনেছি চিনেছি।
ভুল’ নাই যমুনার প্রেম-আলিঙ্গন,
কূলে কূলে টলমল আবীর কুফুমে ;
ভুল’ নাই ব্ৰীড়াময়ী রাধার বদন
গণ্ডে নবরাগ নিত্য কুসুমে কুসুমে।
শত অলি-মুখরিত স্নিগ্ধ তরুছায়ে
ঝরিত পরাগ শিরে, কদম্বকেশর।
কমল-কোরক-পাতে কোরক বিছায়ে,
ভুল’ নাই অধরের নীরব মর্মর।
বিদারি’ তুষার-বক্ষ,তর আকুলি’
কুহরিছে কলতান—স্মৃঙ্গির মুরলী !

চিনার
২
আসিয়া অবন্তীপুরে বাসন্তী লীলায়
কোন্ গুপ্ত কামনার সাধনার তরে
রচেছিলে ছায়া-নাট্য ? শান্ত মহিমায়
মণ্ডিয়া বৈরাগ্য-টীকা ধুতুরার শিরে।
তুলিয়া অজস্র ফণা বাসনার অহি
করিছে প্রমাদ-নৃত্য তাথিয়া তাথিয়া ;
ডমরু গম্ভীর নাদে বাজে রহি’ রহি,
নূপুর শিহরি’ উঠে চরণ ব্যাপিয়া।
মায়াময়ী ভবানীর ছায়াময়ী হাসি
ভেসে যায় অলক্ষিত। অঞ্চলের সীমা
অচঞ্চল ! হে অচল। তুষারবিলাসি ।
এ কোন্ নবীন ঠাট বৈরাগ্য-গরিমা ?
সাধনের ভাঙে ভাের নয়নের কোণে
মঙুল বৃন্দার কুঞ্জ পড়ে কভু মনে ?

চিনার সারি গাঁথি’ ‘সফেদার’ শ্যামল তােরণ -লক্ষ্য তার চির উচ্চ ত্রিদিব-বিমান- ধূসর মেরুর প্রান্তে শ্যাম আস্তরণ কি অপূৰ্ব্ব ! গিরিশৃঙ্গে রঙ্গিন নিশান নৃত্যমান জলদের কি রূপ ঝলকে ! তুঙ্গ ঘিরি’ ঘূর্ণমাণ সহস্র বলাকা, তুষার দুর্গের’ পরে রজতে কনকে উদ্ভাসিত অনন্তের বিজয়-পতাকা। ঝটিকায় উচ্ছ্বসিত দুরন্ত “উলার”। কি ছার তােমার গর্ব-পাষাণ-শৃঙ্খলে বন্দী তুমি! কোন্ দর্পে কর চুরমার বিমােহন অলিরাজ্যগ্রন্থিত মৃণালে ? কাল-প্রতিবিম্ব হেরি' আয়ত মুকুরে, উঠে না আকুল গাত্র রােমাঞ্চে শিহরে ?

চিনার
৪
কাহার মুকুর তুমি দিগন্তবিস্তার
পৃথিবীর অন্তরালে এ স্তব্ধ বিজনে?
নিশান্তে দিবার অন্তে জ্যোতির বাহার।
মােতি ঝলে কার গলে রজতে হিরণে ?
ভালে টীকা ললাটিকা কি শুভ্র চন্দন।
জ্যোতিষ্মন্ মূর্তি হতে গাম্ভীৰ্য উথলে !
শত নাগ-কন্যা করে চরণ বন্দন,
গুঞ্জরি' হেনায় রাঙা চরণের তলে,
জলদের কেশদামে বিচ্ছুরে বিজলী,
—লম্বিত উষ্ণীষে কিবা হীরক ঝলকে।
হেমন্ত-ফুরণে, সদ্য হয়ে কুতূহলী,
কি জ্বভঙ্গী। দিগঙ্গনা পুলকে চমকে।
উর্দ্ধে হিমাগার নিয়ে শম্প চারিধার,
শৃঙ্গারমুকুর কিবা শিল্পী বিধাতার ।

চিনার
'।
বিরাট দিগন্তব্যাপী আয়ত মুকুরে
হে অসীম! দেখ যবে আপনার মুখ,
হও কি আপন-হারা ? হৃদয়ের স্তরে
ফুটে উঠে কি কল্পনা-কামনা-কৌতুক ?
ঘােমটার অন্তরালে একটি ঝিলিকে
পূরায় কি হৃদয়ের আকুল পিয়াসা ?
অমানি’ বিজন পথে—বিজলী ক্ষণিকে
ঘুচায় কি সন্ত্রাসিত আঁখির কুয়াসা?
নাচে শত প্রজাপতি নলিনীর দলে।
ছায়া নাচে! ইন্দ্ৰচাপ লহরে লহরে!
ভাসে কত পানকৌড়ি কাকচক্ষু জলে
সৃজিয়া
বুদ্বুদ,
হর্ষে মরাল সঞ্চরে।
গ্রীবা কঁপে, ছায়া নাচে অপূৰ্ব দর্পণে।
হে অরূপ ! তব রূপ অঙ্কিছ কেমনে?

চিনার
সুবৰ্ণ-কিরীট শিরে হে ‘নগ্ন’ ভূধর !
হর্মুখের স্কন্ধোপরি ঈষৎ হেলিয়া
কি দেখিছ ছায়ছবি ? বাল রবিকর
ধূম্রবর্ণ মেঘপ্রান্তে বিজলী অঙ্কিয়া
রাঙিল কি ইন্দ্রজাল! তুষার-ললাটে
ফাগুনের পিচকারী ! অপূৰ্ব ফোয়ারা !
কি অদ্ভুত চিত্রলেখা জরির কপাটে!
ছুটিছে সবুজ ক্ষেত্রে কনকের ধারা।
প্রভার বুদ্বুদ এ কি—নিমেষে নিমেষে
ভাঙে-ভােলা মহেশের মদির চাহনি।
রক্তিম বেদীর ‘পরে—প্রিয় কন্যা হাসে
পীতাম্বরা, বিশ্বধরা মরালবাহিনী!
স্বর্গ-গঙ্গা-উপবীত উরসে ঝলকে।
একি সৃষ্টি। রূপ-বৃষ্টি পলকে পলকে!

চিনার
৭
হে হর্মুখ! তব মুখ হেরিয়াছি আমি
নিশান্তে। কান্তিতে-ভরা কনক-কণিকা।
ভেদি’ মেঘ-জটাজুট ধায় উৰ্দ্ধগামী
উজ্জ্বল দিগন্তব্যাপী—জ্বালাময়ী শিখা
পৰ্বত-কনর হ'তে, পিঙ্গল নয়ন
পাকাইয়া, উদগারিল বাসুকি অঙ্গার ।
উদ্ভাসিয়া স্বর্ণ-লঙ্কা দানব-দহন
জুড়ি’ অগ্নিবাণ—দিল ধনুকে
টঙ্কার !
মেঘের উষ্ণীষ তলে-রৌদ্র ঝলমলে।
হে সৌখীন ! কি বিচিত্র সূর্যকান্ত মণি
কিবা উত্তরীয় তব গৈরিকে শ্যামলে।
ভীষণ গাম্ভীর্যে তব অবাক্ অবনী।
ভালে অবলেপ কিবা চন্দন তুষার।
কটিতটে নদী ছােটে—দোলে চন্দ্রহার !

চিনার
to
উর্ধে চাহি’—কি প্রশান্ত অনন্ত নীলিমা
চাহে আঁখি ডুবে যাই সে শ্যাম অতলে
গভীর নিবিড় রাজ্যে। মহিমার সীমা
কোথায়? নাহি কি সেথা,—সে নীলাভ জলে
একটি বুদ্বুদ—ক্ষুদ্র তরঙ্গের লেশ ?
ঘূর্ণ্যমাণ ঝটিকার প্রবল আঘাতে
ডুবে না রবির তরী? ভগ্ন অবশেষ
তারকার—পড়েনাক শৈবাল শিখাতে।
ভাসে কি মরালশ্রেণী ও রূপ-সায়রে ?
ক্ষণপ্রভা দীপ্তি-মাখা সফর সফরী
সকৌতুক চাহনীতে মুকুতা বিচ্ছুরে?
নাচে কি প্রবাল-হর্মাে কিন্নর-কিন্নরী ?
কোথা সে অরূপ পঁড়ি–ছায়া-নৌকা কোলে,
নীরবে বাহিছে হাল কালের হিল্লোলে ?

চিনার
নিম্নে চাহি’ ঝাঁপাইয়া পড়েছে আকাশ,
নিবারিতে তাপ ক্লান্তি এ বিশাল নীরে।
প্রকৃতির রুদ্ধ শ্বাস। নিস্তব্ধ বাতাস
একটু হিল্লোল নাহি চিনারের শিরে
পাখীর মধুর গান,শাখীর মর্মর,
নৃত্য-রঙ্গে তরঙ্গিত মৃদুল মঞ্জীর
—নীরব। লীলার মন্ত্রে যেন যাদুকর
ছুয়েছে রূপার কাঠি! নিদ্রায় গভীর।
কিবা স্থির নীল জলে নলিনীর হাসি-
সে হাসির ছায়াছবি ভাসিতেছে জলে।
পাখা অবনত করি, কমলবিলাসী
প্রজাপতি-ঘুমাইছে নলিনীর দলে।
মুখখিন্ন প্রাণ মাের! অলস নয়ন
অধীর লভিতে ওই বাঞ্ছিত শয়ন।

চিনার
জীমূতে বরিয়া
বিশ্ব বিধুনিয়া
এ স্বপন-নিকেতনে স্তব্ধ নিরালায়
মনে হয় আসিয়াছি কোন্ ছায়াপুরে
মায়ার মােহন রাজ্যে। তিমিরে মিলায়
পৃথিবীর কলস্বর—দূরে—
-দূরে—অতি দূরে।
বুঝি এই মত স্থানে বিরহে ব্যাকুল
দূত
যক্ষ গেয়েছিল গান, বনানী আকুল
মর্মরিয়া উঠেছিল কঁপিয়া কঁপিয়া !
ত্যজিয়া কপিলাবস্তু,
কাটি প্রেম-ফঁাদ
রাজপুত্র বুদ্ধ বুঝি এই শিলাসনে
আছিলেন ধ্যানমগ্ন ! বাসনা-প্রমাদ
হয়েছিল ভস্মীভূত সাধনা-ইন্ধনে।
তপাগ্নি জ্বলিছে তারি হৈমকূট চূড়ে?
ভস্ম-অবলেপ আছে তুষার নিবিড়ে ?

চিনার
১১
আজিকার মত বুঝি স্তব্ধ দ্বিপ্রহরে
সৃষ্টির আদিম কাণ্ড করি’ সমাপন,
বিধাতা স্বপনাবেশে, বুঝি, শ্রান্তিভরে
রচিলেন আপনার কমল-শয়ন।
সতিমির ‘বীর’ কুঞ্জে —চিনারের ছায়
রাখি নিজ গাভীদল গুর্জর গুর্জরী
লভিছে বিশ্রাম সুখে। পত্র লতিকায়
নাহি মৃদু শিহরণ—মর্মরি’ মর্মরি।
মেঘহীন, সুনিবিড়, নীলাতপ তলে
বিস্তৃত “উলার” শান্ত সুপ্তিতে মগন।
ভুলি’ গুঞ্জরণ অলি নলিনীর দলে
দেখিতেছে কি স্বপন ? পরী সখীগণ !
দুষ্ট এরিয়াল, কবে জ্যোৎস্না নিশাতে
করেছিল রাসলীলা কমলের পাতে ।

চিনার
বুঝি এই মত স্থানে শ্রান্ত দ্বিপ্রহরে
মুদিয়া অলস আঁখি, মদির উদাসী
রাখি মাথা নলিনাক্ত বিথান উপরে,
ভুঞ্জিত মৃণাল-সুধা, কমলবিলাসী!
কি কাজ সম্পদে? হায় ইন্দ্রাণী চঞ্চলা।
বাসনা অনন্ত সিন্ধু! কোথা শান্তি তায়?
প্রজাপতি পাখা সম কীর্তির মেখলা,
স্পর্শমাত্র, বিচূর্ণিয়া ধূলায় মিলায়!
আকাশে ফেলিয়া জাল গাঁথি’ তারা-হার,
পরিবে আশার মালা-বিকচ নলিন?
সে ফুল শুকায়! যথা নিশার নীহার।
ইন্দ্রধনু ক্ষণিকেই আকাশে বিলীন।
স্বর্গচুম্বী কীর্তিস্তম্ভ ধূলায় মিশায়।
ইতিহাস মনে হয় পরিহাস প্রায় !

চিনার
মরণ দাড়ায়ে আছে জীবনের পাছে,
সত্ত্বার শিয়রে হাসে কুহকিনী মায়া।
উদ্যম আশার পিছে নিরাশা বিরাজে,
পূর্ণিমার পাছে ধায় অমানি’র ছায়া।
ঘুরে মরে নর-কীট ‘সুখ’ ‘সুখ' করে—
সুখ, শুধু রঙে-ভরা দুঃখের মুখােস্।
ঘন নীলিমায় শান্ত আকাশ-শিবিরে
নিষ্ঠুর ধাতার দোলে অশনির কোষ !
ফুরাতে মিলনের মধুর স্বপন
বিরহ জাগিয়া উঠে পাণ্ডুর-অধরা,
মন্থিয়া সাগর-জল দেব ত্রিনয়ন
গরল করেন পান-শিহরে অমরা।
নহে দাবানল কভু সূর্যের মহিমা!
কালান্তক মৃত্যু নহে স্বর্গ-মধুরিম !

চিনার
১৪
চৌদিকে নাচিছে রঙ্গে কুহকী আলেয়া
ধন, মান, যশ-বহ্নি ধ ধ জ্বলে,
ধমনী করিছে নৃত্য তাথিয়া তাথিয়া,
কেহ পুড়ে মরে হায় রূপের অনলে।
শৈশব ফুরায়ে যায় সুন্দর শ্যামল,
যৌবন ফুরায়ে যায় উদ্যমে আকুল,
রবিকরে শুষ্ক হয় পুষ্প-পরিমল ;
মূরছি’ লুটায় ভূমে লতিকার চুল।
কার কবে তৃষা মিটে আঁখির মিলনে ?
মদির মৃণাল-ভুজে? সুখখিন্ন হিয়া
ভ্রান্তির কান্তারে ঘােরে, সংসার-পুলিনে
বিলাপিয়া অবসাদে কঁপিয়া কঁপিয়া।
উন্মত্ত পতঙ্গ, রূপ-তরঙ্গ-সম্পাতে
শমাদানে পড়ে ঝাপি’ শ্রাবণী নিশাতে।

চিনার
খুঁজি যারে হায় ! তারে হাতে নাহি পাই।
ধাই যার পাছু পাছু সেই যায় দূরে।
আরক্ত বুকের জ্বালা কোথায় মিটাই ?
প্রাণ-তন্ত্রী বাঁধি কার চরণ-নূপুরে ?
নদী চাহে বেলাভূমি, তট চাহে নদী-
দুজনায় পাশাপাশি—তবু যেন দূর,
সমীরের স্পর্শে কেন কম্পিত ব্রততী—
বায়ু গন্ধ-ভারে, কেন মর্মরি’ আতুর ?
হৃদি-বদ্ধ প্রেম চাহে আলিঙ্গিতে ভাষা,
কর জুড়ি’ ভাষা করে বিলাপ বেদন।
অক্ষরের কারাগারে ভাবের পিয়াসা
অপূর্ণ ! পাষাণবদ্ধ অহল্যা মতন!
ক্লান্ত আমি। ছায়া-অন্ধ তিমির নিবিড়ে
লহ ক্রোড়ে, হে বাঞ্ছিত! রাখ স্নেহ-নীড়ে।

চিনার
দিনান্তে আকাশপ্রান্তে ডুবে যায় রবি
আবার সে হাসে আসি’ পূরব গগনে,
উদ্ভাসিয়া নীলাকাশ, শ্যামল অটবী
কনকিয়া, বিভূষিয়া হীরকে রতনে।
অপূৰ্ব্ব মায়ার কুঞ্জ ছায়া-নিকেতনে
চিনার কঙ্কালসার হয়, আহা যবে,
হেমন্তে,নির্জীব গাত্রে মধুর স্ফুরণে
বসন্ত ভরিয়া দেয় শ্যামল বৈভবে।
গ্রীষ্মতাপে ক্লিষ্টা নদী ভরে কূলে কূলে,
ফণা তােলে তরঙ্গিণী ডমরু নিনাদে
জলদের; বসুন্ধরা ভরে ফলে-ফুলে,
অপূর্ব গালিচা পাতা শ্রাবণী প্রভাতে!
মােরাই অভাগা, হায়, বসে বিশ্ব-হাটে
অধধামুখে। চিরশ্রান্তি অঙ্কিত ললাটে!

চিনার
১৭
হে সিন্ধু! ত্যজিয়া হিম-তুষার-শিখর
যেদিন লভিলে স্থান বিতস্তার বুকে
সেদিন কি পড়ে মনে? বাল রবিকর
কেমনে রাঙিয়া দিল কপােলে চিবুকে ?
বু বু মৃদু সুরে বায়ু লাগে গায়,
নূপুর বণিয়া উঠে কল্লোলে কল্লোলে।
ঝলমলে সারা অঙ্গ তরঙ্গ-লীলায়,
আকুল প্রাণের বেগ হিল্লোলে হিল্লোলে।
কে আছিল এ উদ্বাহে মন্ত্র-পুরােহিত ?
বাঁধিল করেতে কর তরল সােহাগে ?
কোন্ বৈতালিক-কণ্ঠে, মিলনের গীত
ছলকিল কল তানে নব অনুরাগে ?
মিলন আবর্তে-প্রাণে আনন্দ সম্ভার
মিলনের স্মৃতিচিহ্ন ফুটিল চিনার।
2

চিনার
১৮
হে চিনার ! তব মূলে তরঙ্গ-লীলায়
চির মিলনের ব্যথা মঞ্জুল নূপুর
রণিছে আকুল হর্ষে! প্রতি কণিকায়
উথলিছে ছন্দোবদ্ধ সে অনন্ত সুর।
ভাসি’ আসে সেই গীতি ব্যাকুল ভাষায়
তরল আবেগ-ভরা মুখর মৃদুল ?
ভাসি’ আসে সেই সুর দীপ্ত পিপাসায়
অতিক্রমি’ তটভূমি আকাঙ্ক্ষা-আকুল ?
পরশে বাঁধিতে চায় নিবিড় বাঁধনে
নীলাঞ্চল লীলাভরে যায় স'রে স'রে !
দোদুল অধর কঁাপে মৃদুল স্ফুরণে,
লালসা বাড়িয়া উঠে হৃদয়-দুয়ারে।
ক্ষীণ চাহে লীন হতে অনন্ত প্রভায়-
ব্যর্থ হিয়া বিলাপিয়া করে হায় হায় !

চিনার
একটি চিনার-পত্ৰ চলিয়াছে ভাসি’
নদীর তরঙ্গোপরি কঁপিয়া কঁাপিয়া।
শুকান পাতার গায়ে—উঠিছে উদ্ভাসি’
চঞ্চল তরঙ্গদল ; অঞ্চল ব্যাপিয়া
ঝকিছে তারার গুচ্ছ, বাধা তুচ্ছ
করি’ ;
কাপাইয়া গিরিপথ ঘাের গরজনে
কভু মৃদু কলভাষে-মর্মরি’ মর্মরি’
সলাজ বিরহ-গাথা কুহরে বিজনে।
পাষাণ চাপিয়া দিলে হৃদিপিণ্ডোপরি
উঠে না করুণ তান অধরে কাহার ?
জননীর শূন্য অঙ্ক কঁপে থরথরি’ ;
ভগ্ন-তার শিতারের শােন হাহাকার।
আমিও সংসার-জলে চলিয়াছি ভাসি’
চিনারের ছিন্নপত্র! উলঙ্গ, উদাসি!

চিনার
ফুটিয়া উঠিছে ওই শুষ্ক পত্রোপরি
শতাব্দীর ইতিহাস রেখায় রেখায়!
জোছনায় উদ্ভাসিত কালের শর্বরী।
কিঙ্কিণী বাজিয়া উঠে অনন্ত সীমায়।
পারস্যের উপন্যাস ছত্রে ছত্রে লেখা;
-অরুণের রাগরাঙা তরল অনল।
পিপাসিত হৃদয়ের স্নিগ্ধাজ্জ্বল শিখা!
হৃদিবৃন্তে বিকশিত রক্ত শতদল !
ঐশ্বর্যের নিকেতন রূপের ভাণ্ডার
মদির-কল্পনা-রাজ্য ইরাণ ত্যজিয়া
এদেশে আদেশে কার আসিল চিনার ?
সে বাণী ধ্বনিছে আজো অনন্তে বাজিয়া
পত্রের মর্মব নহে—ব্রজবিহারায়’
পরীর
নূপুর
শুনি চিনার-ছায়ায়।

চিনার
শয্যা মাের ছেড়া কথা,ঘর-খােড়ে ঘর,
সম্বল ভিক্ষার ঝুলি-ভ্রমি দ্বারে দ্বারে।
ছিন্নবস্ত্রে আচ্ছাদন—অতৃপ্ত জঠর,
দরিদ্রের দুর্বলতা জগতে প্রচারে।
অন্তহীন শূন্যতাকে পূর্ণ ভরি’ দিয়া
অক্লান্ত যেথায় ঝরে রবির কিরণ,
শ্রাবণ কাজরী গাহে, বিশ্ব বিধুনিয়া
আর্দ্র, ব্যাকুলতা-মাখা বর্ষার ঝুরণ ;
ইন্দিরার ঝাঁপি হতে কুড়ায়ে বৈভব
বসন্ত ‘হরির লুট’ বিতরণে রত।
মানব স্বাতন্ত্র-রাজ্যে নিৰ্বা-নীরব।
রহিয়াছি ঝুলি কাঁধে মাথা অবনত !
কি পেয়েছি ? এ তণ্ডুল, তিক্ত স্বেদ-রসে,
এ পরাণ-সিক্ত বিষে ! অলসে-অবশে।

চিনার
২২
বিশ্বে চাহে কয়জন অযাচিত দান?
শেফালি ঝরিয়া যাক মাটীর ধূলায়।
উইক তিয়াষাকুল বিহগীর গান,
শুখাক শিশিরপাতি সােনালী ঊষায়।
প্রমােদ-মুখর রাত্রে সজ্জিত দীপালি
তৈলশেষ দীপাধারে হােক ভস্মসার।
পূজারী শঙ্কায় এস্ত ! দেবাসন খালি।
দেবতা চাহে না কভু অর্ঘ্য করুণার।
রবিকর সারা বিশ্ব ধরিবারে চায়,
শশীর তরল স্পর্শে সাগর বিকল।
সমীরে ধরিতে ক্লান্ত কুসুম শুখায়,
রজনী-অলকে শ্রান্ত জোনাকির দল।
ছুটে যায় হিয়া হায় দুয়ার সীমায়,
অঙ্কিত প্রাচীরে নহে হেথায় হেথায়”।

চিনার
কেন নয়নের ক্লেদ চাহিয়া চাহিয়া ?
ঝলসি’ গিয়াছে আঁখি রূপের ঝলকে!
সুখ হ'তে শ্রান্তি ভাল। তিমির ছাইয়া
বিরাম-দায়িনী নিশা! সুপ্তি আন’ চোখে
প্রাণেরে ডুবায়ে দাও গভীর অতলে
স্মৃতির মরাল যেথা জানে না তার।
বসন্ত স্ফুরণে নাহি ধমনী বিকলে,
ছুটে তুরঙ্গ-রঙ্গে—রক্ত বাসনার ?
ল’য়ে চল সেই রাজ্যে—শূন্য নিকেতনে
সত্ত্বার থাকে না যেথা নিমেষ চেতন।
মরণ-প্রহরী রবে, নিৰ্বাক্, নিঃস্বনে
কায়াহীন ছায়াহীন জীমূত-কেতন।
শ্যামল সে সুপ্তি মাঝে দিও না স্বপন,
কান্তার শ্রীকান্তি-মধু ! চির জাগরণ !

চিনার
২৪
একদিন তরে মােরে লুপ্ত করে ফেল।
মুছে ফেল’ একেবারে আমার “আমারে,
তারাহীন যামিনীর অন্ধকার ঢাল’
নিবিড় তিমির চাপে ঢাকি’ ভারে ভারে।
চেতনা ভাটিয়া দাও পাহাড় চাপিয়া,
স্বপনের ইন্দ্রজাল মন্ত্রে দাও ভাজি।
আকাশ গম্বুজ ভেদি’—অনন্ত ব্যাপিয়া
দাও শূলী-ভবেশের ত্রিশূলটি টাঙ্গি।
বাসনার ছিদ্রে-ভরা সাধনার বাঁশী,
রুদ্ধ করে দাও তার শতেক দুয়ার,
গ্রাসি’ ফেল কালাকাল চন্দ্রে সূৰ্যে নাশি
ভাঙ্গি’ ফেল কিরণের কনক শিতার।
মূৰ্ছনা গমক তার–পক্ষ বিস্তারিয়া
অতলের মহা রাষ্ট্রে যাক মিশাইয়া।

চিনার
সীমাবদ্ধ জীবনের অসমাপ্ত আশা
রঙ্গিন ফানুষ হয়ে ব্যোমপথে ধায়।
আলােকের প্রজাপতি, প্রেমের পিপাসা
বায়ু-কোলে পাখা তুলে ডাকে “আয়, আয়।”
বাঁশী বাজে নানা সুরে যমুনা-পুলিনে,
আর্দ্র করে নেত্র কভু নন্দ-যশােদার,
কাপায় মরম কভু বিকচ নলিনে,
পূজার কুসুমে ভারি বক্ষ শ্রীরাধার ।
সেই বাঁশী ভেসে যায় কাননে কান্তারে,
করে ভিখারীরে রাজা,রাজারে ভিখারী;
প্রতিধ্বনি আসে তারি নিমাইর দ্বারে।
হে শ্যাম ! চতুর ! তুমি কিসের পসারী ?
আমার পসরাখানি লহ করে তুলে,
অতলে ঢালিয়া দাও অনন্তের মূলে

চিনার
সুপ্ত শিশু মার বক্ষে যথা যায় মিশে,
বাঁধ’ মােরে তা’ হ'তেও গাঢ় আলিঙ্গনে।
অনন্ত পূজার থালে—একটি নিমেষে
আহুতি করিয়া দাও ভক্তি নিবেদনে
প্রাণের নৈবেদ্য থালি। দুপক্ষ প্রসারি’
অনন্তের,ঢাক’ মােরে, ডুবাও আমারে
তােমার অরূপ মাঝে—চিকুর বিস্তারি,
ডুবে যথা স্রোতস্বতী মহা সাগরে।
আলােকের বন্যামাঝে পূর্ণিমার রাতে
আত্মহারা তারা যথা মগ্নসুখে সুখী ;
হায় আজি সেই প্রেম বেঁধেছে কিরাতে
হিয়া তার আকুলিয়া-সাগর-উন্মুখী।
বাড়াবে কি হাতখানি? বাঁধি’ দিব রাখী,
আমি লীন হ'লে, শুধু তুমি রবে বাকি।

চিনার
২৭
কভু তােমা বলিয়াছি প্রাণের বেদন ?
জানায়েছি কোনাে ছলে প্রাণের তিয়াসে ?
আভাষে করেছি
কভু আত্ম-নিবেদন,
কথা বলে-গীত-ছলে—নীরব নিশ্বাসে ?
পিপাসিত আঁখি মেলি’ চেয়েছি কি হয় !
হেরিব বদনে দ্যুতি হসিত দশন ?
ক্লান্ত কবে বসিয়াছি অঞ্চলের ছায় ?
সেবিয়াছি কোন্ দিন চঞ্চল চরণ ?
বাসনার তীব্র বিষে, আপনা পাসরি’
বলয়িত বাহু-ডাের বেঁধেছি গলায় ?
আমার অধর হতে প্রাণের বাঁশরি
কুহরি' চেয়েছে কভু চুম্বিতে তােমায় ?
কামনা বাসনা মম-কামিনী পল্লব
যামিনী চরণপ্রান্তে ঝরুক নীরব।

চিনার
২৮
চিরদিন বােধ হয় দেখেছি স্বপন
সুররাজ্যে স্বপ্নপুরে ইন্দ্রজাল মাঝে,
মদির আলসে সিক্ত আমার নয়ন
খুজিয়া বেড়ায় কোথা কবিতা বিরাজে।
আমার মানস-বধূ বড়ই চপল,
যথা তথা গতি তার কাননে কান্তারে।
ধরিয়া কালের চক্র, প্রতি পল পল
সঞ্চরিছে সতিমির পারাবার-পারে।
নাহি মানে দেশভেদ, নাহি মানে কাল,
নাহি মানে বর্ণভেদ। অপূৰ্ব্ব যােড়শী !
শান্ত কান্তি ! আচম্বিতে, বিরাট। বিশাল।
সিংহারূঢ়া, স্মিতাধরা, হস্তে শােভে অসি!
চারিধারে ঘিরে তারে বলে শত অলি,
বনানীর প্রীতি-গান বিহঙ্গ-কাকলি।

চিনার
২৯
এ-স্বপ্নের ছায়া-চিত্র মদিরার ঘাের,
বাস্তবে-অলীকে গাঁথা অপূৰ্ব্ব মালিকা!
সারা রাত্রি সুধা পান করিয়া চকোর,
তারার আবাসে দেখে ভাসে কুহেলিকা!
নিঝর-জোয়ারে স্ফীত পৰ্বত-নন্দিনী
বুঝে না হিয়ায় স্পর্শে কিসের প্লাবন।
বাঞ্ছিত কস্তুরী হায় ! হৃদয়ে বন্দিনী,
কান্তারে ধাইয়া মরে খুজিতে রতন।
গুঞ্জরে অলির শ্রেণী কোন্ পিপাসায় ?
বনানী খুজিছে কারে পুষ্পিত নিঃশ্বাসে ?
চন্দ্রকর কারে খোঁজে শারদী নিশায় ?
কিসের বিলাপ উঠে বসন্ত বাতাসে ?
গাগরি করিয়া পূর্ণ বাসনার জলে
নীরবে ভাসায়ে দিব বিতস্তা-কল্লোলে

চিনার
নীরব সাধনা শুধু বিফল বেদন
তােমার স্তুতির লাগি, কোথা পাব ভাষ?
কল কলে ছল ছলে আত্ম-নিবেদন
তটিনীর। মর্মরিত সমীর-নিঃশ্বাস।
সতিমির “বীর”-কুঞ্জে ঘনান্ধ ছায়ায়
উদাস বিরহ-গাথা বন-কপােতীর ।
পৰ্বত পঞ্জর ভেদি_নটন লীলায়
ঝর ঝরে নিঝরের ফেনাক্ত রুধির !
গন্ধভারে ক্লান্ত বায়ু-তরঙ্গে ভাসিয়া
মধুকর গুঞ্জরিত মৃদুল নূপুর !
মেঘমঞ্চে এলায়িত কেশ বিস্তারিয়া
—দমকিত দামিনীর কিঙ্কিণী কেয়ুর ?
নক্ষত্ৰ-অক্ষর তুলি’ গাঁথি’ মৰ্ম্ম পাতে
যাহা বুঝি নাই, হায়! পারি কি বুঝাতে ?

চিনার
ওগাে আমি দিতে চাই নিজে দিতে ধরা,
ঋণ চাহ—দান চাহ—যাহা চাহ—সবি।
মৃদু ছন্দে ফুল-গন্ধে ভরা বসুন্ধরা,
গুঞ্জন-মুখর, দীপ্ত কনক অটবী,
শশী-দীপ্ত রজনীর শতেক কামনা,
আশার মােহন হাসি—বিকচ নলিন,
রবি-দীপ্ত জীবনের সব আরাধনা,
চির সাধনার ধন রক্তিম রঙ্গিন।
ভরা বােঝা পসরার খুলিলাম ডালি,
নহে হেথা বিকিকিনি দান-প্রতিদান।
সর্বস্ব লুষ্টিয়া লহ, পাত্র কর খালি,
বােঝা ভারে ক্লান্ত হিয়া অতি মুহ্যমান।
অবশেষে রাখ শুধু ধুতুরা উদাসী
ধৌত-চিতা বাসনার শুভ্র ভস্মরাশি।

চিনার
নহে ইহা হৃদি-বৃন্তে বৈরাগ্যশতক,
আত্মঘাতী হৃদয়ের ব্যর্থ বলিদান।
নহে ইহা বাত্যাপ্তি ফুল্ল কুরুবক,
বিদলিত গন্ধ মধু-ধূলায় শয়ান।
প্রমােদ নিশার শেষে নাট্য-অবসানে,
কামিনী-কবরীভ্রষ্ট বকুল-মালিকা!
নিশার তুষারসিক্ত সাধের বাগানে
নহে ইহা ঝরা ফুল—চুর্ণ শেফালিকা!
রণে হত অবনত শমন-সভায়
নহে ইহা সৈনিকের তপ্ত অশ্রুজল।
নৃত্যমান ধমনীতে চঞ্চল লীলায়,
হৃদয়-বৃন্তের ইহা রক্ত শতদল।
রূপ, রস, গন্ধ, ঢালি’ শিবানীর পদে,
ঐশ্বর্যে বিলীন হবে—পূর্ণ মনোেরথে !

চিনার
ওই শােভে শ্রীনগরে সুবর্ণমন্দির,
বিতস্তা বহিয়া যায়, মাথা নােয়াইয়া
পদপ্রান্তে ; বহে যায় মৃদুল সমীর,
তরঙ্গে মন্দির-ছায়া গড়িয়া ভাঙ্গিয়া।
বিতস্তার নীল জলে করে ঝলমল
অস্তগামী দিনেশের বহুরূপী হাসি,
ভেসে যায় লাজরক্ত শতেক কমল,
ধৌত অর্ঘ্য ভবেশের প্রাসাদ-বিলাসী!
যেন কোনাে নাগ-কন্যা, আঁকিয়া বাঁকিয়া
চলিয়াছে অভিসারে। বারাণসী চেলি
ধূপছায়া শােভে অঙ্গে, শ্ৰীঅঙ্গ ব্যাপিয়া
হীর মরকত দীপ্তি-জল-রঙ্গে কেলি ।
শত শাখে পাখা নাড়ি দুলিছে চিনার,
সঞ্চারিয়া পত্রে পত্রে সঙ্গীত অপার !
৩
F. 3

চিনার
৩৪
তােমার অপূৰ্ব্ব মূর্তি হেরিলাম আজি
“তেজবাস ?” সিংহাসন বিশাল-বিস্তার !
ফেনাঙ্কিত সিন্ধু-ধারা—তারা-রত্নরাজি
গুচ্ছে গুচ্ছে উঠে পড়ে, করে নমস্কার !
অসীম ব্যাপ্তির মাঝে তীব্র নীরবতা
তরঙ্গ-তরঙ্গাঘাতে হতেছে মুখর।
পাষাণের বক্ষ-ক্ষত, ফেনাঙ্কিত ব্যথা,
ধ্বনিছে গম্ভীর নাদে, সহস্ৰ কন্দর।
এ নহে ললিত কলা! পাষাণ প্রকৃতি,
ভেদ করি’ মহা শূন্যে, নিৰ্বাক্, নিশ্চল,
তর্জনী তুলিয়া উর্ধে, অনন্তের গতি
নির্দেশিছে। ঝকমকে শ্ৰীঅঙ্গ ধবল ।
দ্যুতিমান দুই পাশে “শ্রীগগন” গিরি,
“নীলনগরাজ’; দুই ভীষণ প্রহরী!
;

চিনার
!.
তুমি কি হে চিরদিন যােগাসনে-লীন
ধ্যানমগ্ন ? সৰ্ব্ব দেহ আবৃত তুষারে,
মহাকাল-যুগান্তরে সদা যােগাসীন,
গম্ভীর নির্জনাবদ্ধ পাষাণ-শিবিরে
অর্চনার মহা অর্ঘ্য পত্র-পুষ্প-ফলে
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ভার—উদার-অতুল।
কি বিরাট কমণ্ডলু। হিমাদ্রির জলে
তরল তর্পণ-মন্ত্র উঠিছে আকুল !
মানবের হৃদাকাশে উঠে যবে মেঘ
নয়নে বহে না জল, বদনে বচন,
বেলাভূমে ভাঙ্গে আসি’ প্রাণের আবেগ
রক্তিম শােণিত-স্রোতে নীরব নিশ্চল !
সহস্র যােজনব্যাপী কি ঘাের স্তব্ধতা,
পাষাণের অভিধান, মৌন কাতরতা !

চিনার
প্রভাতে মেঘের ঘটা, রঙ্গের ছটায়,
তােমার মুকুটোপরি—মেঘ ছত্রধর
কি সুন্দর! কনকিত কিরণ প্রভায় !
নীরদের চারিধারে ঝলকে ঝালর।
কিরণের ফুলদানি—আবীরের থালি
হ’ল খালি। কিবা দীপ্তি প্রশান্ত আননে।
সহস্র নিঝর হর্ষে, দেয় করতালি।
লতা পাতা ফুল নাচে কাননে কাননে।
ঝলে শুভ্র উপবীত সুবিশাল গলে
কুহেলিকা-উত্তরীয় নট রঙ্গে কঁপে,
রক্ত-চন্দনের ফেঁাটা—বাল রবি জ্বলে
সুবৰ্ণ কিরীট শিরে নটন আলাপে !
বিক্ষেপিয়া পরিমল, নাড়ি’ শতদল
বহে যায় ধৌত অর্ঘ্য সিন্ধু নিরমল !

চিনার
৩৭
দুরন্ত পবন
গিরিপ্রান্তে ক্লান্ত রবি লভিছে শয়ন
রাখি’ মাথা তরঙ্গিত মেঘের বিধানে।
আলােড়ি' কেলুর
শ্রেণী
করিছে করুণ রােল
আকুল
উজানে।
দুধারের গিরিশ্রণী সম্পূর্ণ ব্যাপিয়া
উঠিয়াছে ইন্দ্রধনু অপূৰ্ব্ব তােরণ—
গভীর, অসীম, শান্ত নীলাভ ছাপিয়া
রতনে মণ্ডিত সেতু, বিশ্ব বিমােহন!
রঙ্গিন মেঘের স্তর বিম্বিত নিঝরে
ঝুরিছে ফুলের ঝােরা লীলার আবেশে
কত রঙ্গে! ইন্দিরার স্খলিত আঁচোরে
ঝলকিছে মণি-মুক্তা নিমেষে নিমেষে।
শুনি যেন কেকাধ্বনি প্রীতি-গরিমায়,
নাচে শিখী বই তুলি’ নটন লীলায়।

চিনার
৩৮
লীলানন্দে কত ছন্দে গাও তুমি গান !
কভু ঝটিকার রবে বিশ্ব কাপাইয়া,
বাজাইয়া মহাশূন্যে প্রলয় বিষাণ,
অযুত কন্দর হতে, ফণা উত্তোলিয়া,
ভীমনাদে, রণরঙ্গে নাব’ কভু আসি।
বিস্তারিয়া জটাজুট, আবরিয়া স্থিতি,
ঝকমকি’ মহাশূন্যে নিষ্কোষিত অসি,
বজ্ৰনাদে আন্দোলিত সংহার মূরতি ।
কভু তুমি গান গাও নিঝরের সুরে-
বনপথে বাজে যেন চরণ-নূপুর !
পাখীর
কূজনে কভু পত্রের মর্মরে
-শিঞ্জিত লীলার হর্ষে কনক কেয়ুর !
“অনন্তনাগের” কুণ্ডে উঠে অগ্নিধারা;
“শালীমারে” তারকিত রতন ফোয়ারা
;

চিনার
আমি বড় ভালবাসি মেঘের কাজোর
বাধাহীন আকাশের অনন্ত নীলিমা।
আমি বড় ভালবাসি বাসন্তী আঁচোর
ফুলে-ভরা, হাসি-ভরা ঐশ্বৰ্য্য-মহিমা।
ঝিল্লিমুখরিত পল্লী সুপ্তিতে মগন,
শান্তির তুলিতে আঁকা কান্তি জোছনার।
বন-কোলে হরিণীর আত্মসমর্পণ,
নিদ্রায় হেরিছে স্বপ্ন হরিৎ দূৰ্ব্বার।
ভালবাসি সূর্যোদয়, হৈমকূট-শিরে
দেবের দুয়ার হতে সােনার জোয়ার,
শ্যামল ছায়ার ছবি রতন শিবিরে,
পুষ্প-পত্রে লেখা নাট্য-চিত্র “শালীমার”।
নহে ইহা কাব্যগ্রন্থ, ভূর্জপত্রে লেখা,
অঙ্কিত শ্যামল ছত্রে অন্তরের রেখা!

চিনার ৪০ দেখা যায় ছায়া-প্রায় দূরে গ্রামখানি কুহেলি-কাজোরে ঢাকা নিশার গভীরে প্রকৃতি নীরব স্থির! ক্লান্ত শূলপাণি লভিছেন শান্তি যেন মহাকাল-তীরে। অভিমান অনুরাগ মৰ্ম্মের মর্মর, গ্রাম্য জীবনের নিত্য হৃদয়স্পন্দন। আলো-ছায়া রেখাঙ্কিত অনন্ত নিঝর ক্ষুদ্র সুখ, ক্ষুদ্র দুখ, প্রেমের বন্ধন, অলক্ষিত রজনীতে অযাচিত দান- পরাগ প্রসূন-ভারে ক্লান্ত সমীরণ । শূন্য কক্ষে বক্ষ চাপি’ সজল বিথান- এই স্রোতে বহে যায় মানব-জীবন। রাত্রে অলি বদ্ধ ছিল কোন্ পুষ্প-পাতে ? কোথা তার ইতিহাস বসন্ত প্রভাতে ?

চিনার
৪১
সৃষ্টির তরুণ কোলে অরুণ-আলােকে
আছিল কি ওই গ্রামে জীবনস্পন্দন
মানবের? হৃদি-বৃন্তে রক্তিম পুলকে
ক্ষরিত বাসনা-ধৌত প্রাণের চন্দন ?
চিরদিন সূৰ্যকর চুম্বিবে ধরণী,
আকাশ বেষ্টিয়া রবে বিশ্বের মেখলা,
রবির অঙ্গুলি স্পর্শে, চন্দ্রকান্তমণি
চিরদিন গলিবেই। শ্রাবণ কাজোলা
ঢালিবে মুক্তার ঝােরা চিনারের শিরে,
আলােড়িয়া বাসনার ব্যাকুলিত শাখা।
বিলাপিবে ক্রৌঞ্চবধূ বিতস্তার তীরে
অপগত ভালবাস-অবনত পাখা !
হে আদিম পুরাতন ! কালের সীমায়
সৃষ্টির উত্থান কোথা—পতন কোথায় ?

চিনার
৪২
গ্রামের সীমানা হতে, যে সমীর আসে
সে কি জড়-প্রকৃতির অধীর নিশ্বাস ?
তবে কেন মনে হয় এ শূন্য প্রবাসে,
পরিচিত প্রণয়ীর প্রাণের উচ্ছ্বাস
লাগিল মৰ্ম্মের মূলে ! বাহুর বলয়ে
এ কি প্রিয় শিহরণ! এ কি ধরাধরি!
সেই স্পর্শ ধায় কেন তরল নিলয়ে
নদীতে ? কঁপিছে নদী! নেচে উঠে তরী।
বিজন কুটীর হতে, কার মৰ্ম্ম-কথা
ফুটিয়াছে রাত্রি-গাত্রে তারার অক্ষরে ?
দীর্ঘশ্বাসে বাঁধা কার প্রাণের বারতা
শাসন-বন্ধন ভাঙ্গি’ পবনের ভরে,
ভেদিয়া প্রাচীর, লঘি’ গ্রামের সীমানা
বিশ্বহাটে ধরিয়াছে প্রাণের নিশানা ?

চিনার
৪৩
কবে যে বসন্ত এল, চলে গেল কবে ?
তুই ছিলি বদ্ধ কোন্ মায়ার স্বপনে ?
বিহগের কলতানে পাপিয়ার রবে
চঞ্চলিত বনস্থল! মৃদু গুঞ্জরণে
শত অলি-মুখরিত সাহানার সুর
ব্যাপ্ত যবে কুঞ্জে কুঞ্জে আন্দোলিয়া শাখা,
পত্রে পত্রে বেজেছিল অপূৰ্ব্ব নূপুর
আকুল পুলকে ভরা, দোলাইয়া পাখা;
সন্তরিয়া রূপহুদে, আকাশে বাতাসে
খেলেছিল অনুক্ষণ কপােত-দম্পতী।
বাঞ্ছিত অরূপ স্পর্শে, বিলাসে, বিকাশে
হয়েছিল মৰ্ম্মে-রাঙা কানন-ব্রততী ।
বসন্ত বিগত, দেশে ঝরিছে তুষার ;
আরে ক্ষ্যাপা ! আজি কেন বাঁধিছ শিতার ?

চিনার ৪৪ হে সৈনিক। হৈমকূটে গৰ্বিত অধরে বাজাইয়াছিলে তব বিজয়-বিষাণ- সে অধর পাংশু বর্ণ হইল অচিরে হেরি আন্দোলিত ওই কালের নিশান। কোথায় রহিল তব বিজয়-দুন্দুভি ? কোথায় রহিল তব সমর-পতাকা ? ভেসে আসে বায়ু-ভরে রাগিণী পূরবী, মহাকাল-করে নড়ে রােষের শলাকা। চারণের স্তুতি-গান কর্ণপ্রান্তে পশি’ কেন হায় করিতেছে ধমনী বিকল ? নৃমুণ্ডমালিনী অসি কোষঅঙ্কে বসি’ কহে, আঁখি ছল-ছলি সকলি বিফল।” কি কাজ উদ্যমে তবে ? মৃণাল-শয়নে আমরা ভুঞ্জিব শান্তি, অলস স্বপনে।

চিনার
৪৫
শতাব্দী—শতাব্দী ধরে বিতস্তার তীর
কলঙ্কিত হইয়াছে মানব-রুধিরে।
শত অক্ষৌহিণী হেথা বেঁধেছে শিবির
উপেক্ষিয়া মেঘচুম্বী পাষাণ-প্রাচীরে।
জয়ক্ষিপ্ত নায়কের দীপ্ত পদাঘাত
পঞ্জর সহেছে কত মৌন হাহাকারে !
সহস্র বৎসর ধরে অশনিসম্পাত
দহিয়াছে রাজ-ছত্র জ্বলন্ত কুঠারে !
কেন হয়েছিলে দেশ। ঐশ্বর্য্যে উর্বর ?
কেন হয়েছিলে দেশ ! সৌন্দর্যে অতুল ?
কেন সূজেছিলে দস্যু লােলুপ বৰ্বর ?
হে বিধাতা! অঙ্কপাতে কি করিলে ভুল ?
নন্দনে চন্দন যদি আদরে রােপিলে,
তাহারে ভুজঙ্গ-করে কি লাগি সঁপিলে ?

চিনার
৪৬
বসন্ত রচিল হেথা সাধের উদ্যান,
ভরে দিল সারা দেশ শ্যামলে শ্যামলে
কুঞ্জে কুঞ্জে ভরে দিল শত কলতান,
কানন কম্পিত হ’ল সঙ্গীতের রােলে।
আসিলেন লীলা-রঙ্গে কমল-আসনা-
দিলেন উদার হস্তে উজাড়িয়া ঝাপি।
শতদল-পুষ্প-ফল, সবি রত্ন-কণা !
বহিল অমৃত-ধারা শত কুম্ভ ছাপি।
বাজাইয়া কল কলে তরল নূপুর
বারুণী দিলেন দেখা উদয়-শিখরে।
শঙ্খনাদে আগমনী গাহিল মেদুর,
ঝরিল মুক্তার ঝারা অঝােরে অঝােরে ।
সর্বশেষে পঞ্চশর লীলার ললাম
সৃজিলেন দেবীমূৰ্ত্তি সুন্দর সুঠাম।

চিনার
৪৭
শতাব্দীর আবর্তনে প্রকৃতির গতি
ভিন্ন নহে, ছিন্ন নহে—চলেছে সমান।
শিখেনি পাহাড়-চূড়া মাথা অবনতি,
ঝটিকা ভােলেনি সুর প্রলয়-বিষাণ।
পার্বতীর
জন্মভূমে
শতাব্দী ব্যাপিয়া
যেমন ঝরিত পর্বে ঝরিছে তুষার।
জীমূত উঠিছে উচ্চে পক্ষ বিস্তারিয়া,
চিনার নাড়িছে রঙ্গে শ্যামল মিনার।
সৃষ্টির আদিম দিনে সৌন্দৰ্য-গৌরবে
যে ফুল ফুটিয়াছিল—ফোটে সেই ফুল
আজো বিশ্ব-অঙ্ক পােরা হরিৎ বৈভবে,
আজো নদী ধেয়ে যায় সাগরের কূল।
শুধু মানুষের রাজ্যে ঘটেছে প্রলয়,
ভিতরে বাহিরে গণ্ডী-সঙ্কীর্ণ হৃদয়!

চিনার
৪৮
মানুষ গণ্ডীতে বদ্ধ—বাঁধা তার বীমা।
শৃঙ্খলের ভিতরেই-হাত-পা প্রসার !
সাধ্য নাহি অতিক্রমে কাল কিংবা সীমা !
সংস্কার রূপক মাত্র আত্মার বিকার।
স্বাতন্ত্রের পরিমাণ রজ্জ্বর দীর্ঘতা,
শাসন দেশের রাজা, আমরা শম্বুক।
এ কলঙ্কে পূর্ণ হায়! অনন্তের খাতা,
এ আঘাতে ভগ্ন স্ত মানবের বুক!
কোন্ ছিদ্র দিয়া গৃহে পশিবে অনিল
বহি' শিরে বসন্তের উন্মুক্ত আহ্বান ?
প্রহরী দুয়ার দেশে—চেপে আছে খিল—
কে জানে খবর, কোথা ইন্দ্রের উদ্যান ?
চিরিয়া বায়ুর স্তর উত্তোলিয়া বেণী,
অটল দাড়ায়ে আছে পর্বতের শ্রেণী

চিনার
৪৯
উঠিলাম অভ্রভেদী তুষার-শিখরে,
চাহিলাম চারিদিকে বিস্ফারি’ নয়ন,
হেরিলাম শৈল-শ্রেণী কাতারে কাতারে
স্ফটিকে মর্মরে গাঁথা বিচিত্র স্বপন।
যেন কোন্ মহারথী ভৈরব লীলায়
গড়েছে দিগন্তব্যাপী পাষাণ-প্রাচীর!
যেন রে দানব কোন্-বজ্র-পরিখায়
রচিয়াছে ভীমকায় মহান্ শিবির !
অপূৰ্ব তুষারকুণ্ডে হােমাগ্নি জ্বালিয়া,
এ কাহার যজ্ঞবেদী, বিশাল বিরাট।
খর্ব করি’ মিশ্র গ—আকাশ ছাপিয়া
সমাধি রচেছে কোন্ বিশ্বের সম্রাট ?
সে তাজমহলে দীপ- চন্দ্র-সূৰ্য্য জ্বলে,
বিতস্তা সিন্ধুর ধারা ফোয়ারা উথলে ।
F. 4

চিনার
হে আদিম! অন্তহীন! নিৰ্বাক্‌! বিরাট।
কোন্ সে মাহেন্দ্রক্ষণে, অনন্ত প্রভাতে
মায়ানন্দে ছন্দোবদ্ধে রচিলে এ ঠাট ?
ঝকিল ওঙ্কার-বহ্নি আলােক-সম্পাতে।
উর্ধে, সৃজি’ সীমাহীন অনন্ত বিমান
কি অপূৰ্ব্ব মসিলেখা মাখাইলে তায়।
মহাকাল-করে সঁপি' ভৈরব বিষাণ,
সমুদ্রে বাঁধিলে কিবা বজ্র-পরিখায় !
রচি’ শত অভ্রভেদী পৰ্বত-শিখর
ধরিবারে নীলাতপ ভীম স্তম্ভোপরি ।
জিনি মুক্তা—তারাহারে সাজালে ঝালর !
অদৃশ্য রজ্জুতে দীপ—চন্দ্রে সূৰ্য্যে ধরি'।
আলােড়ি জীমূত-রাজ্য, বিকম্পি’ কৃপাণ
বিজলীর, -নির্দেশিলে কালের উজান !

পরিশিষ্ট চিনার-কথিত আছে, মােগল-সম্রাট জাহাঙ্গীর স্বীয় রাজ্ঞী নুরজাহানের কাশ্মীর উদ্যান সজ্জিত করিবার জন্য ইরাণ দেশ হইতে চিনার বৃক্ষ সৰ্ব্বপ্রথম আনয়ন করেন। ব্রজ- বিহারা’য় চিনারকুঞ্জ বাস্তবিকই দেখিবার জিনিষ। তেজবাস-চিরতুষারমণ্ডিত পৰ্বত। বিস্তা—সিন্ধু নদের একটি উপনদী; ইহার ইংরাজী নাম ঝেল। বীর-কাশ্মীরে willowকে “বীর” এবং pineকে “কেল” বলে। শাদীপুর-সিন্ধু ও ঝিলম্ এই দুই নদীর সঙ্গমস্থলের নাম শাদীপুর। এই সিন্ধু আমাদের সুপরিচিত Inclus নহে। সফেদা-ইংরেজী নাম পপুলার (poplar)। হর্মুখ—ইহা একটি পৰ্ব্বতের নাম। উলার হ্রদের সীমায় ইহা অবস্থিত। ‘নাংগো’, ‘গাঙ্গনগের ও ‘নীলনগরাজ গগনচুম্বী পৰ্বতত্রয় ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Chinar

Author
Sen,surendranath
Title
Chinar
File name
Chinar
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2010/01/10
Publisher
Anantakumar Sen, Allahabad
Language
Sanskrit
Pages
64
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Sen,Surendranath
DLI number
510995
Barcode
4990010018184.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
uDfVYHbo1Pj
Download PDF

Chinar