Dipsikha Library, Howrah
Jishukhrista Ed.5
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
যিশুখৃষ্ট
মহামান্য ডিরেক্টর বাহাদুর কর্তৃক বঙ্গদেশের যাবতীয় স্কুলের জয়
প্রাইজ ও লাইব্রেরী পুস্তকরূপে অনুমােদিত
[ কলিকাতা গেজেট—২৩শে মে, ১৯৪০]
স্বর্গীয় বরদাকান্ত মজুমদার
প্রণীত
১৭sb1948
Dist. HOWRAH.
TUOTANGTA
यूमा कोकबामा
বৃন্দাবন ধর এণ্ড সন্স, লিমিটেড,
স্বত্বাধিকারী : আশুতােষ লাইব্রেরী
৫নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা ;
৩৮নং জন্ রােড, ঢাকা
;
পঞ্চম সংস্করণ
inb5
grah
মুদ্রাক-গােবিন্দপ ভট্টাচার্য
শৈলেন প্রো
সিমলা খ্রীট, কলিকাতা
ZARRA why it human innovation
No text on this page.
সূচীপত্র বিষয় नी আনন্দ-সংবাদ ৪ ০ ০ ১ জন্ম . . এ ০ ০ ০ . . . মিশরে পলায়ন উৎসব ০ ০ ১২ ০ ০ ০ গুরু জন দীক্ষাগ্রহণ ০ ০ ২০ ৫০ ২৪ ০৮০ ০ ০ ০ দেবলীলা পতিত-উদ্ধার যিশুর উপদেশ অলৌকিক কাৰ্য্য বিশ্রাম-বিনে ধর্মোপদেশ বিশ্রাম-দিনের যথার্থ অর্থ মৃতদেহে জীবনদান শিক্ষা-প্রদান ধৰ্ম্ম-প্রচার ০ ০ ০ ওঃ .
পৃষ্ঠা
বিষয়
মান্না রুটি
দেবদেশ
• ০ ০
.
০ ০ ০
৬৪
ষড়যন্ত্র
আত্মদান
૧ર
লীলা-শেষ
৭৭
::
পুনরুত্থান
DIPSP
spic
Dist Howall
যিশুখৃষ্ট
প্রথম পরিচ্ছেদ
আনন্দ-সংবাদ
পৌষ মাসের প্রথমভাগ । অল্প অল্প শীত, আকাশ
কুয়াশাচ্ছন্ন ;-সেই রাত্রে ‘থে লাহে’ নগরের পার্বত্য প্রান্তরে
কতকগুলি মেষপালক মেষ চৌকি দিতেছিল। দলে দলে শান্ত
ভেড়াগুলি নিঃশব্দে ইতস্ততঃ চরিয়া বেড়াইতেছিল।
বেথলাহে-রাজা দায়ুদের নগরী। দায়ূদ মেষপালকের
গৃহে জন্মিয়া রাজা হইয়াছিলেন। ইহুদীদিগের ধর্মশাস্ত্রে
লিখিত ছিল—ঈশ্বর এই দায়ু’দর বংশে মেসায়া ( অবতার)
রূপে জন্মিয়', পতিত ইহুদী জাতিকে উদ্ধার করিবেন।
তাহারা
ভাবিত—রাজার বংশধর মেসায়া অবশ্যই রাজা বা তপ
প্রতাপশালী হইয়াই জন্মিবেন।
যিশু
প্যালেস্টাইন-ইহুদীদের দেশ। প্রধানতঃ উহ তিনভাগে
বিভক্ত ছিল। উত্তরে গ্যালিলি, দক্ষিণে জুডিয়া ও মধ্যে
সামারিয়া। বেথ লাহে জুডিয়ার অন্তর্গত ক্ষুদ্র নগরী। বহু
প্রাচীন নগরী হইলেও, ইদানীং ইহার শ্ৰী-সৌষ্ঠব লুপ্ত
হইয়াছিল। বহুসংখ্যক মেষপালক ছাড়া অন্য শ্রেণীর লােকের
বসতি অল্পই ছিল।
বস্তুতঃ বেথলাহেকে মেষপালকের দেশ
বলিলেও অত্যুক্তি হইত না।
মেষপালক বলিলেই শান্ত, শিষ্ট, নিরীহ লােক বুঝায় ;
কিন্তু বেথ লাহেমের মেষপালকেরা তদ্রুপ ছিল না। সর্বদাই
তাহাদিগকে পার্বত্য দ ও নেকড়ের আক্রমণ হইতে আপন
আপন পশুলকে রক্ষা করিতে হইত। এজন্য তাহারা
সতর্ক, সাহসী, কষ্টসহিষ্ণু যােদ্ধার প্রকৃতি প্রাপ্ত হইয়াছিল।
বহু মেষপালক একত্রিত হইয়া পার্বত্য প্রান্তরের চতুর্দিকে
মেঘদল ছাড়িয়া দিত। তাহারা পর্যায়ক্রমে একদল জাগিয়া
সাবধানে পশুগুলিকে চৌকি দিত, অন্যদল ঘুমাইত। তাহাদের
সময় অতীত হইলে, নিদ্রিত দলকে জাগাইয়া দিয়া, তাহারা
আবার ঘুমাইত। এইরূপে তাহারা পরস্পরের সাহায্যে কাৰ্য
সম্পন্ন করিত।
সে-রাত্রেও অমনি একদল মেষপালক সেই পৰ্বতগাত্রস্থ
প্রান্তরে পশু চৌকি দিতেছিল। মেষপাল আপন মনে নিঃশব্দে
চরিয়া বেড়াইতেছিল। সহসা এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিল।
২
সে-দেশে তখন খুব বেশী শীতের প্রাদুর্ভাব না হইলেও,
সেই প্রান্তর ও পাহাড়শ্রেণী ধূমের ন্যায় কুয়াশাচ্ছন্ন হইয়া
গিয়াছিল। সহসা গিরিশিরের কুয়াসারাশি দূরীভূত হইয়া,
তাহ এক অপূৰ্ব আলােকরশ্মিতে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সেই
আলােক তীব্র নহে-অতি স্নিগ্ধ—অতি মনােরম। সেই
আলােকের জ্যোতিতে চতুর্দিকস্থ প্রান্তর উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল।
চতুর্দি যেন কোন অজানা স্বপ্নদেশের সুমধুর সঙ্গীতে ভরিয়া
গেল। সঙ্গে সঙ্গে সেই আলােকপথে-আকাশ হইতে নামিয়া
-এক দেবদূত মেষপালকগণের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।
এই অলৌকিক ঘটনায় তাহারা সকলেই বিস্মিত হইয়া
গেল, ভয়ে মুখ রক্তশূন্য হইল, সৰ্বাঙ্গ থধ করিয়া কাপিতে
লাগিল-কাহারও মুখে কথা সরিল না।
ধীরে ধীরে-বীণার স্বরে দেবদূত কহিল-“ভয় করিও না।
আমি তােমাদের কাছে সমস্ত জগতের আনন্দ-সংবাদ দিতে
আসিয়াছি। তােমাদের মধ্যে আজি বিশ্বের ত্রাণকর্তা
জন্মিয়াছেন। এই নগরের এক গৃহস্থের 'অশ্বশালায়, অশ্বের
আহার-পাত্রে সেই অলৌকিক শিশু শায়িত আছেন।”
দেবদূতের কথা শেষ হইতে না হইতেই-সারি সারি
অপ্সরার দলে আকাশ ভরিয়া গেল। স্বর্গীয় তানে ঈশ্বরের
জয়গানে সেই প্রান্তর প্লাবিত হইতে লাগিল। স্বপ্নবিষ্টর স্যা
স্তব্ধ ও বিস্মিত মেষপালকেরা অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল।
যিশুখৃষ্ট
দেবদূত ও অপ্সরাবৃন্দ অদৃশ্য হইলে, মেষপালকেরা পরস্পর
পরস্পরের পানে ক্ষণেক আশ্চৰ্য্য হইয়া চাহিয়া রহিল। তৎপরে
বয়ােজ্যেষ্ঠ বলিল-“যাহা স্বচক্ষে দেখিলাম, স্বকর্ণে শুনিলাম,
তাহা কেমন করিয়া অবিশ্বাস করি ? চল শীঘ্র যাইয়া আমরা
সন্দেহ মিটাইয়া আসি।”
তখন সকলে অতি ব্যস্ত হইয়া শিশুরূপী ত্রাণকর্তাকে
দেখিতে চলিল।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ জুডিয়ার রাজা হেরড, তাহার রাজধানী জেরুজালেম। হেরড নিজ দেশে অত্যন্ত প্রতাপশালী নৃপতি হইলেও, রােম- সম্রাটের অধীন ছিলেন। সেই সময় রােম-সম্রাট এক আজ্ঞা প্রচার করিলেন- ‘রােম সাম্রাজ্যের অন্তর্বর্তী যে সকল দেশ, নগর ও গ্রাম আছে, সকল স্থানের সকল প্রজাকেই আপন আপন জন্মভূমিতে গিয়া নাম লিখাইয়া আসিতে হইবে। রাজা হেরড রােম-সম্রাটের আজ্ঞা লঙঘন করিতে পারিলেন । সমগ্র ইহুদী দেশে সম্রাটের হুকুমমত ঐ আদেশ ঘােষণা করিলেন । জোসেফ, বেথলহেমে দায়ু’দর বংশে জন্মিয়াছিলেন কিন্তু তিনি জন্মভূমি পরিত্যাগ করিয়া, ন্যাজারেথে গিয়া বাস করিতেছিলেন। তিনি ছুতারের কাৰ্যে জীবিকা অর্জন করিতেন। জোসেফের গৃহে তাহার বাগদত্তা ভাবীপত্নী মেরীও থাকিতেন। মেরীর গর্ভলক্ষণে জোসেফের মনে দ্বিধা জন্মিলে, একরাত্রে ;
তি
দেবদূত তাহাকে স্বপ্নে দেখা দিয়া বলিলেন-“তুমি চিন্তা করিও
না, তোমার পত্নী পরম পবিত্রা সাধ্বী। তাঁহার গর্ভে মেসায়া
-ত্রাণকর্তা জন্মিয়াছেন, নাম রাখিও -“যিশুখৃষ্ট।” জোসেফ
দেবদূতের আদেশে মেরীকে পরম যত্ন করিতে লাগিলেন।
রাজার আদেশে যখন সকল দেশের সকল লােকই নাম
লিখাইবার জন্য আপন আপন জন্মভূমির দিকে চলিল,
জোসেফ,ও স্বীয় সসত্ত্বা পত্নী মেরীকে সঙ্গে লইয়া, আপন
জন্মভূমি বেথলহেমে আসিলেন। কিন্তু তখন চারিদিক্ হইতে
লােকের আগমনে ক্ষুদ্র নগর পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল, কোথাও
আর তিলার্ধ স্থান ছিল না। সুতরাং বাধ্য হইয়া, এক
গৃহস্থের আস্তাবলে জোসেফ, বাসা লইলেন।
সেই দরিদ্রের অপরিচ্ছন্ন আস্তাবলে—দীন মাতার
ক্রোড়ে—দীনের ত্রাণকর্তা মহাপুরুষ যিশুখৃষ্ট জন্মিলেন। নহিলে
আর ভগবানকে ‘দীননাথ' বলে কেন ?
রাজা হের অতিশয় নিষ্ঠুর ও অত্যন্ত ক্রুর-প্রকৃতির
ছিলেন। মৃত্যুভয় তাহার অত্যন্ত প্রবল ছিল।
কারণে কাহারও উপর বৃথা সন্দেহ হইলে তিনি তৎক্ষণাৎ
তাহাকে মৃত্যুদণ্ড দিতেন। এইরূপে সহস্র সহস্র নিরীহ প্রজা,
তাঁহার কোপে পডিয়া অকালে জীবন দিয়াছিল। ক্রমতি,
কুকৰ্ম্মা, নিষ্ঠুর রাজা আপনার শাসনদণ্ড অক্ষত রাখিবার
অ যতই নরহত্যা, যতই অত্যাচার করুন না কেন, কিন্তু তিনি
অতি তুচ্ছ
নিজে একদণ্ড শান্তি পাইতেন না। এক ভীষণ ব্যাধি আক্রমণ
করিয়া তাহাকে দিন দিন মৃত্যুর দ্বারের নিকটবর্তী করিতে
লাগিল রাজা যতই রােগ-যন্ত্রণা ভােগ করিতে লাগিলেন,
যতই মৃত্যু নিকটবর্তী হইতে লাগিল, তঁাহার প্রাণের ভয় ততই
অধিক বাড়িল, ততই তিনি কঠোর হইতে কঠোরতর হইতে
লাগিলেন। তাহার নিষ্ঠুর আদেশে রাজ্য বিভীষিকায় ভরিয়া
গেল।
সেই সময় ইহুদী দেশের পূর্বপ্রান্তস্থিত পারস্য হইতে
কতকগুলি জ্যেতির্বি পণ্ডিত জেরুজালেমে উপস্থিত হইলেন।
ধর্মশাস্ত্রের লি খত, বহুদিনের প্রত্যাশিত—ইহুদীদের রাজা
কোথায় জন্মিয়াছেন—তাই তঁাহারা দেখিতে আসিয়াছেন।
একটি “তারা” সেই দূবদেশ হইতে—মানুষেব পথ
দেখাইয়া—তাহাদিগকে এখানে আনিয়াছে। তারা দৃষ্টে তাহারা
গণনায় জানিয়াছেন যে সেই মহাপুরুষ জন্মিয়াছেন।
এই দূরদেশাগত পণ্ডিতমণ্ডলীর কথা শুনিয়া রাজা হেরড
অন্তরে অন্তরে কঁপিয়া উঠিলেন। ইহুদী জাতির ভবিষ্যৎ রাজা
জন্মিয়াছেন—তবে ত তঁাহার সাম্রাজ্য গেল !
তখনই তিনি প্রধান পুরােহিতবর্গ এবং শাস্ত্রজ্ঞ ও আইনজ্ঞ
ব্যক্তিগণকে ডাকাইয়া নবশিশু কোথায় জন্মিয়াছে—নির্ধারণ
রিতে আদেশ দিলেন।
এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কাহারও পক্ষে কঠিন হইল না।
৭
মিঃ
কারণ বংশানুক্রমে তাহার ধর্মশাস্ত্রে পড়িয়া আসিতেছে—
“বেথলহেমে রাজা দায়ুদের বংশে ইহুদীদের ভাবী রাজা মেসায়া
জম্মিবেন।”
বেথ লাহে! বেথলহেম ত অতি নিকটে, রাজধানী
জেরুজালেম হইতে মাত্র তিন ক্রোশ দূরে।
তবে সে শিশুকে
বিনাশ করিতে কতক্ষণ? রাজা হেবড়ের মনে আশার সঞ্চার
হইল। তিনি আপন মনােভাব গােপন রাখিয়া, আনন্দের ভাণ
করিয়া পূৰ্বদেশের পণ্ডিতমণ্ডলীকে বলিলেন –“আপনাবা অতি
ধীরভাবে বেথলেহেমেব প্রতি ঘরে ঘবে গিয়া অনুসন্ধান করুন।
শিশুর দর্শন পাইলেই আনাকে আসিয়া সংবাদ দিবেন। আমি
স্বয়ং গিয়া তাঁহার পূজা কৰি আসিব।”
হয়, পণ্ডিতমণ্ডলীর জ্যোতিঃশাস্ত্রে যতই বুৎপত্তি থাকুক
কেন, কিন্তু তাহারা রাজাব কপটতা ও খলতার আবরণ
ভেদ করিতে পারিলেন না। তাহারা আনন্দিত
মনে
বেথলহেমের দিকে চলিলেন।
কি আশ্চর্য্য!--পথে বাহির হইতেই আবার সেই তারা
পথ দেখাইয়া চলিল ! এবার সেই তারা
এবার সেই তারা হইতে অত্যন্ত
মিগ্ধোজ্জল
জ্যোতিঃরাশি নির্গত হইতেছিল। তাহাতে
বেথলহেমের পথ আলােকিত হইয়াছিল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ মিশরে পলায়ন সম্রাট দায়ুদর বংশে ইহুদীদের ভাবী রাজা জন্মিবে। সুতরাং জ্যোতির্বিদগণ শিশুকে ধনীর প্রাসাদে দেখিবার আশা করিয়া- ছিলেন। কিন্তু তাহাদের পদপ্রদর্শক তারকা যখন সকল ধনীর প্রাসাদ ছাড়াইয়া, নগবের প্রান্তস্থিত এক দীন গৃহস্থের আস্তাবলের উপর গিয়া স্থির হইল, তখন তঁাহারা আশ্চর্যান্বিত হইলেন। কিন্তু তাহাদের বিশ্বাস অগাধ । সেই আস্তাবলে প্রবেশ করিয়া সেই শিশুর অলৌকিক জ্যোতিঃৰাশি দর্শনে তাহাদেব যা কিছু সন্দেহ ছিল দূব হইয়া গেল । তাহারা সেই অশ্বের আহার পাত্রে শায়িত নবজাত শিশুব সম্মুখে ভূমিতে লুটাইয়া সাষ্টাঙ্গে প্রণাম কবিলেন এবং কাঞ্চন ও বিবিধ গন্ধ দ্রব্যাদি দ্বারা তঁাহাব পূজা করিলেন । রজনীতে এক অদ্ভুত স্বপ্নে দেবদূতেব মুখে তঁাহারা রাজা হেরডের যথার্থ অভিসন্ধি অবগত হইয়া, অন্তরে শিহরিয়া উঠিলেন। প্রতিজ্ঞা করিয়া আসা সত্ত্বেও, শিশুর সন্ধান দানের জন্য তাঁহারা আর জেরুজালেমে প্রত্যাগমন করিলেন না--
যিশুখৃষ্ট
অন্যপথে স্বদেশে ফিরিয়া গেলেন। স্বপ্নে দেবদূত কর্তৃক আদিষ্ট
হইয়া জোসেফ, স্বীয় পত্নী ও শিশুপুত্র সঙ্গে লইয়া, নানা
পৰ্বত-প্রান্তর, বন-উপবন, নদ-নদী ও বিশাল মরুভূমি অতিক্রম
করিয়া বহু দূরবর্তী মিশর দেশে পলায়ন করিলেন।
হের মহা ঔৎসুক্যে পণ্ডিতমণ্ডলীর প্রত্যাগমন
প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। তাঁহারা ফিরিলেন না দেখিয়া তিনি
ভয়ানক ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন। তঁাহার মন মরণ-ভয়ে অত্যন্ত
শঙ্কিত হইল। তিনি অবিলম্বে সৈন্য
তিনি অবিলম্বে সৈন্য পাঠাইয়া বেথলহেমের
দুই বৎসরের অনধিক বয়স্ক সমস্ত শিশুসন্তান হত্যা করাইলেন।
দেশময় হাহাকার উঠিল। কিন্তু তখন শিশু যিশুখৃষ্ট, মাতা-
পিতার অঙ্কে থাকিয়া, নিরাপদে মিশরের পথ অতিবাহন করিতে
লাগিলেন।
এই দুস্কার্য্যের পর হেরডও আর বেশী দিন জীবিত রহিলেন
।
রাজা হেরডের মৃত্যুর পর, তাঁহার পুত্র রাজা হইলে,
জোসেফ, মেরী ও শিশুপুত্রকে লইয়া মিশর হইতে দেশে ফিরিয়া
আসিলেন। কিন্তু নূতন রাজার ভয়ে বেথলহেমে না থাকিয়া
স্যাজারেথে তাহার নিজ বাটীতে আসিয়া বাস করিতে লাগিলেন।
এখানে তিনি পূর্বের ন্যায় সুত্রধরের কাজ করিয়া জীবিকা
নিৰ্বাহ করিতেন। যিশুও সময় সময় তাঁহার সাহায্য
করিতেন।
যিশুখৃষ্ট
যিশুর জন্মের পূর্বাবধি পরম পবিত্ৰা ধাৰ্ম্মিকা মেরী
নানারূপ স্বপ্নে ও দেবদূতের সন্দর্শনে তাহার পুত্রের ভবিষ্যৎ
জীবনের কতকটা আভাস পইয়াছিলেন। তিনি ঈশ্বরের এই
অপার করুণায় আপনাকে ধন্য ভাবিয়া, যিশুকে ভবিষ্যতের
উপযােগী করিয়াই লালনপালন ও শিক্ষাদান করিতে লাগিলেন।
ইহুদীদের দেশে, ধর্ম ও গার্হস্থ্য দৈনন্দিন জীবনের প্রত্যেক
কাৰ্য্যই কঠিন আইন-বিধিবদ্ধ ছিল। সেই আইন অনুযায়ী
—শিশুর বয়স দ্বাদশ বর্ষ হইলে—সে স্বাধীন হইত, তাহার
উপর আর মাতা-পিতার অধিকার থাকিত না। তথাপি সে
মাতাপিতার আজ্ঞাধীন থাকিতে বাধ্য হইত । তাহার পূর্ব
হইতেই তাহাকে স্কুলে দেশের সমস্ত আইন শিখিতে হইত
এবং দেশ-প্রচলিত নানা ব্যবসা শিক্ষা লাভ করিয়া আপন
জীবিকার্জনের জন্য প্রস্তুত হইতে হইত।
দ্বাদশ বর্ষে পড়িলে জোসেফ, এবং মেরীও তাঁহাদের
সন্তানকে লইয়া সিনাগােগে * অৰ্পণ করিলেন।
* সাধারণের মন্দির-দেবস্থান।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
উৎসব
ইহুদীদের দেশে নানা উৎসবের মধ্যে, বৎসরে একবার
করিয়া একটা মহােৎসব হইত-তাহাকে নব-জীবনের মহােৎসব
বলা হইত। তাহাদের রাজধানী জেরুজালেমে একমাত্র
জিহােভা মন্দির ছিল। তজ্জন্য নিকটের ও দূববর্তী সমস্ত
দেশের পরিবারবর্গ সেই সময় তথায় সমবেত হইত। দলে
দলে নরনারী একসঙ্গে মহা উৎসাহে দুপথ অতিক্রম করিয়া
আসি। পথে এক দলের সঙ্গে অন্যান্য দল জুটয়া বড় বড় দল
হইয়া যাইত। সকলেরই এক উদ্দেশ্য -এই লক্ষা, তরাং
হাদের পরস্পবেব একত্রে মিলিত হইবাব পক্ষে কোন দ্বিধা
থাকিত না। কবল দ্বাদশ বর্ষেব সূন বয়স্ক শিশুৰ তাহাতে
যােগ দিতে পারি না।
জেরূজালেম বিস্তীর্ণ ও প্রকাণ্ড নগর হইলেও, উৎসবে
সময় তথায় স্থান কুলাইত না। নগরের মধ্যস্থ ও বাহিবের
প্রান্তর সকল ও ছোট ছোট পত্ৰাচ্ছাদিত কুটী-শ্রেণীতে ভরিয়া
যাইত।
তথায় দলে দলে লােক এক সপ্তাহ আনন্দে কাটাইত;
* মৃত্যুহস্তে রক্ষা পাইয়া স্বাধীনতা ও জীবন লাভের মহোৎসব।
* একমাত্র সর্বনিয়ন্তা অনন্ত শক্তিশালী পরমেশ্বর।
১২
।
যিশুখৃষ্ট
মহােৎসব শেষ হইলে—অষ্টম দিনে আপন আপন দেশাভিমুখে
চলিয়া যাইত।
সেই সময় নগর ব্যাপিয়া বৃহৎ মেলা বসিত। সেই মেলায়
নানাবিধ দ্রব্যাদি ও পশুপক্ষী বিক্রয় হইত। পূজা, হােম,
স্তোত্র, গীতবাদ্য ও নগরেব কোলাহলে আকাশমণ্ডল মুখরিত
হইয়া উঠিত। দেশে শোক-সন্তাপের চিহ্নমাত্রও থাকিত না।
সকলেরই হৃদয়ে অদম্য উৎসাহ, সকলেরই মুখে আনন্দের ভাতি
প্রকাশ পাইত।
দ্বাদশ বংস,বব কম বয়স্ক কোন বালকই তথায় যাইতে
পাইত না। দেশের আইন অনুসারে দ্বাদশ বৎসরে বালকগণ
সাবালক ও স্বাধীন হইত, তখন অভিভাবকগণের সঙ্গে মেলায়
গেলে, তাহাদের উপব আর অভিভাবকদের
বিশেষ দৃষ্টি
রাখিবার আবশ্যক হইত না। অভিভাবকগণও দেশান্তরের
বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-কুটুম্বগণের সহিত বৎসরান্তে একবার
মিলিত হইয়া, বালকগণের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিবার অবসর
পাইত না।
দ্বাদশ বৎসর বয়ঃক্রমে যিশুখৃষ্ট,
মাতা-পিতার সঙ্গে,
সর্বপ্রথম জেরুজালেমের মহােৎসবে গমন করিলেন।
মহােৎসব শেষ হইলে আবার সকল লােক দলে দলে স্ব স্ব
দেশাভিমুখে ফিরিল। যে দলে মিলিত হইয়া জোসেফ, ও মেরী
গিয়াছিলেন—উহা ছিল একটা বড় দল। সেই দলে যিশুর
বিখ্যাত
দলের
সমবয়স্ক বালকও বিস্তর ছিল।
মধ্যে কোথাও না
কোথাও আছেন ভাবিয়া মাতা-পিতা যাত্রাকালে যিশুর খোঁজ
করিলেন না। শেষে একদিনের পথ গমনের পরে-বহুক্ষণ
পর্যন্ত না দেখিতে পাইয়া তাহার অনুসন্ধান আরম্ভ হইল।
তন্নতন্ন করিয়া দল খোঁজা হইল-ছেলে মিলিল না। তখন
জোসেফ, ও মেরী মহা উৎকণ্ঠিতচিত্তে পথের প্রতিদলে প্রতি
লােককে জিজ্ঞাসা করিতে করিতে আবার নগরের দিকে
ফিরিলেন।
নগরের হাটে, মাঠে, পথে, ঘাটে, প্রত্যেক গৃহে সারাদিন
অন্বেষণ করিয়া তাহার সন্ধান মিলিল না। তখন নিরাশহৃদয়ে
জনক-জননী জিহােভা-মন্দিরে গমন করিলেন। তথায় এক
অতি আশ্চর্য দৃশ্য দর্শনে তঁাহার চমৎকৃত হইয়া গেলেন।
দেশের প্রধান পুরােহিতগণ, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতমণ্ডলী ও
আইনজ্ঞেরা অধিকাংশ সময়ই মন্দিরে কাটাইতেন। সেখানে
সেই সকল দেশপূজ্য আচাৰ্যগণের মধ্যে প্রফুল্লমুখে বালক যিশু
বসিয়াছিলেন।
তাঁহাদের মধ্যে নানা শাস্ত্রীয় আলাপ ও কঠোর বিষয়
সমূহের মীমাংসা চলিতেছিল। বালক অবলীলাক্রমে সেই
সকল কঠোর ও জটিল তত্ত্ব সমূহের সরল মীমাংসা করিয়া
দিতেছিলেন। বালকের অদ্ভুত শক্তি, জ্ঞান ও প্রতিভার বিকাশ
দেখিয়া সকলে চমকৃত ও ধন্য ধন্য করিতেছিলেন।
১৪
যিশুখৃষ্ট
এমন পুত্ররত্ন লাভ করিয়া মাতা-পিতা যে আপনাদিগকে
কত গােরবান্বিত মনে করিতেছিলেন—তাহা অবর্ণনীয়। তঁাহারা
যখন তাহাদের সেই অসামান্য-গুণসম্পন্ন পুত্রকে সঙ্গে লইয়া
পুনরায় গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন—তখন উভয়েরই অন্তঃকরণ
অনির্বচনীয় আনন্দে ভরিয়া গিয়াছিল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
এই ঘটনার পর অষ্টাদশ বৎসর কাটিয়া গেল। যিশুর
বয়ঃক্রম ত্রিশ বৎসর হইল। এই সময়ের মধ্যে তাহার জীবনে
বিশেষ কোন উল্লেখযােগ্য ঘটনা ঘটে নাই।
যিনি মানবজাতির শােক-সন্তাপ মােচন ও পাপ-তাপ হরণ
করিতে আসিয়াছিলেন—মানবজাতিকে ধর্মের পথ দেখাইতে
গুরুরূপে যিনি অবতীর্ণ—সেই মেসায়ার ( অবতারের )
বাল্যজীবন যে আদর্শে গঠিত ও চালিত হওয়া উচিত তাহার
জীবন সেইরূপ ভাবেই কাটিল। তিনি আপনা হইতেই সরল,
সত্যপ্রিয়, উদার, মুক্তকণ্ঠ, স্বার্থহীন, পরসেব-নিরত, ধার্মিক,
পবিত্র ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া উঠিলেন। শিশুর ন্যায় অনাবিল
পবিত্র হৃদয়ে ধৰ্ম্মের মধুব জ্যোতিঃ মিশিয়া তাহার বদনমণ্ডলে
এক অপার্থিব দিব্য জ্যোতিঃ ক্রীড়া করিতে লাগিল,-চক্ষু
দুইটিতে এক অপূর্ব স্বর্গীয় আলােক প্রকাশ পাইল।
বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তঁাহার শরীরও দিব্যকান্তি-বিশিষ্ট হইল।
তেমন সম্পদ মানবে বিরল। যে কেহ তাহার পানে
১৬
চাহিত সে আর চক্ষু ফিরাইয়া লইতে পারিত না। তঁাহার কণ্ঠ
শুনিলে মানব মন্ত্রমুগ্ধবৎ তাঁহার বশীভূত হইত।
যখন এইরূপ মনুষ্যত্বের সঙ্গে দেবত্ব মিশিয়া-হাকে
ভবিষ্যৎ কার্যের উপযােগী করিয়া-নরশ্রেষ্ঠ দেশপূজ্য মেলায়।
করিয়া তুলিল, তখন তিনি ত্রিশ বৎসরে পড়িয়াছিলেন।
সেই সময়ে জেজালেমের পূর্ব-প্রান্তস্থিত ভীষণ পৰ্বতময়
মরুপ্রান্তরে আর একজন অদ্ভুতকৰ্ম্মা ঋষি ভঁহার জন্য পথ
প্রস্তুত করিতেছিলেন—তাহার নাম ‘গুরু জন্।
গুরু জন্ সম্পর্কে যিশুর জ্ঞাতিভ্রাতা হইলেও, ইতিপূর্বে
তাহাদের পরস্পরের কখনও দেখা-সাক্ষাৎ হয় নাই। তিনি
দেবাদিষ্ট হইয়া, মেরীর এক জ্ঞাতিভগ্নী এলিজাবেথের গর্ভে
জন্মিয়াছিলেন । যিশু ভূমিষ্ঠ হইবার পূর্বে তাঁহার মাতা-
পিতা ভাবী পুত্রকে দেবকার্যে অর্পণ করিবার
মানস করিয়াছিলেন। ইহুদীদের নিয়মে এরূপ মানসকৃত
উৎসৃষ্ট ব্যক্তির কতকগুলি কঠোর নিয়ম পালন করিতে
হইত।
মানসে উৎসর্গীকৃত ব্যক্তি কখনও চুল কাটিতে, গোঁফ-দাড়ী
কামাইতে বা নখ কাটিতে পারিত না। সে কোনরূপ
মাদকদ্রব্য সেবন করিতে পারিত না-এমন কি, আঙ্গুর
হইতে সুরা প্রস্তুত হয় বলিয়া, তাহার পক্ষে আঙ্গুর ভক্ষণ
পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। সে কখনও শব স্পর্শ করিতে পারিত
১৭
“যিশু
। তাহাকে এই তিনটি কঠোর নিয়ম ও কতকগুলি আনুষঙ্গিক
নিয়মও পালন করিতে হইত।
সচরাচর লােকে কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে এক মাসের জন্য
এইরূপ মানস করিত, কখন কখন কেহ কেহ এক বৎসরের
জন্যও করিত। ঐ নির্দিষ্ট সময় অতীত হইলে, তাহারা
দেব-মন্দিরে গিয়া দাড়ী, গোঁফ, চুল দিয়া আসিত। তৎপরে
তাহারা আবার সংসারী হইত। কিন্তু জন্ জন্মিবার পূর্বেই,
তাহার মাতা-পিতা দেবাদিষ্ট হইয়া মানস করিয়া তাঁহাকে
চিরদিনের মত দেব-চরণে উৎসর্গ করিয়াছিলেন।
অন্যান্য বালকবালিকাদের ন্যায় জন্ নিজগৃহে বাল্যজীবন
উপভােগ করিতে পান নাই। তিনি আজীবন পরিত্যক্ত,
প্রান্তর-ক্রোড়ে প্রতিপালিত, প্রান্তর-ক্রোড়ে বন্ধিত হইয়া এক
অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন আশ্চৰ্য্য মনুষ্য হইয়া উঠিলেন। সেই
পৰ্বত ও প্রান্তরের সংগৃহীত বন্যমধু ও পঙ্গপাল খাইয়া তিনি
জীবনধারণ করিতেন। সেই বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তরে কোথাও জল
ছিল না। পর্বতােপরিস্থ গর্তে বর্ষার জল স্থানে স্থানে জমিয়া
থাকিত। অত্যন্ত তৃষ্ণাতুর হইলে, জন্ আঁজলা করিয়া গর্তে
চুমুক দিয়া সেই জল পান করিতেন।
পান-ভােজন, আহার-বিহার, সমাজ-সংসার, ঘর-বাড়ী,
পােষাক-পরিচ্ছদ—জ অতি তুচ্ছ, অতি অকিঞ্চিৎকর ও নগণ্য
জ্ঞানে সমস্তই পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। তিনি এক উদ্দেশ্য
১৮
যিশু লইয়া জন্মিয়াছিলেন, বনে বনে পর্বতে প্রান্তরে সেই উদ্দেশ্যই সাধন করিতেছিলেন। তাঁহার দীর্ঘ কেশ, দীর্ঘ দাড়ী-গোঁফ, দীর্ঘ নখর, নগ্ন পদ- স্কন্ধদেশ হইতে জানু পৰ্যন্ত কেবলমাত্র উন্মে আবৃত। অনশনে কৃশ হইলেও, তাঁহার দেহ বলিষ্ঠ ও সুগঠিত। তাঁহার চক্ষু হইতে এক স্বর্গীয় অগ্নির ভীষণ তীব্র জ্যোতিঃ বাহির হইত। তিনি অহােরাত্র বিশ্রাম-বিহীনভাবে চারিদিকে প্রান্তরে প্রান্তরে ঘুরিয়া কেবল উচ্চকণ্ঠে চীৎকার করিয়া বলিতেন :- “ঈশ্বরের পথ প্রস্তুত কর—পরিষ্কার কর—কৃত পাপের জন্য অনুতাপ কর; স্বর্গরাজ্য তােমাদের নিকটে আসিয়াছে।” ১৯
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
দীক্ষাগ্রহণ
এই বন্যপ্রকৃতির অদ্ভুত লােকের কথা শীঘ্রই দেশময় রাষ্ট্র
হইয়া পড়িল। তখন নিকট ও দূরবর্তী দেশের সকল স্থান
হইতেই দলে দলে স্ত্রী-পুরুষ তাহাকে দেখিতে আসিল। সেই
পার্বত্য প্রান্তরে প্রত্যহই বহু লােক সমবেত হইত।
বিস্মিত, কেহ স্তম্ভিত, কেহ বা মন্ত্রমুগ্ধবৎ তাহার কথা শুনিত।
। জন্ও সর্বদাই সমাগত লােক সকলকে উচ্চকণ্ঠে বলিতেন :-
“ঈশ্বরের পথ প্রস্তুত কর-পরিস্কার কর-কৃত পাপের জন্য
অনুতাপ কর ; স্বর্গরাজ্য তােমাদের নিকটে আসিয়াছে।”
সেই ভীষণ প্রান্তরে, নিস্তব্ধ পার্বত্য প্রকৃতির ক্রোড়ে
সেই অলৌকিক মনুষ্যের গভীর কণ্ঠস্বরে কি এক আশ্চর্য
ছিল। তঁাহার বাক্য যাহারা শুনিত তাহাদের
অধিকাংশই ভয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া পড়িত—তাহাদের
অন্তরে পাপের গ্লানিতে অনুতাপের অগ্নি জ্বলিয়া দিত।
তখন পরকালের ভয়ে ভীত হইয়া, বহু লোেক আমার গতি
কি হইবে বলিয়া, তাঁহার পায়ে লুটাইয়া পড়িত।
যাহারা এইরূপে তাঁহার নিকটে নিজ নিজ পাপ স্বীকার
৭
২০
করিত, তাহাদিগকে তিনি জর্ডন নদীর তীরে লইয়া গিয়া দীক্ষিত করিতেন। এইরূপে ‘দীক্ষা-গুরু জন নামে তিনি চতুর্দিকে খ্যাতিলাভ করিলেন। প্রত্যহই তাঁহার কাছে লােকের সমাগম বাড়িতে লাগিল। সেই সময়ে অন্যান্য লােকের মত যিশুও একদিন তাহার নিকট গিয়া উপস্থিত হইলেন। পর্বত-বেষ্টিত প্রান্তর মধ্যে আপন বন্যপ্রকৃতির গৌরবে জন্ দাড়াইয়া ছিলেন, নিকট ও দূরাগত বহু স্ত্রী-পুরুষ চতুর্দি বেষ্টন করিয়া তাহার উপদেশ শুনিতেছিল। তিনি আপনার অদ্ভুত ক্ষমতায় ও বাগ্মিতাবলে লােকের মনে, পাপের ভয় ও অনুতাপের আশার কথা দৃঢ়বদ্ধ করিয়া দিতেছিলেন ; লােকে মুগ্ধবৎ তন্ময় হইয়া শুনিতেছিল। তাহারই মধ্যে একপ্রান্তে দাড়াইয়া যিশুও এই অলৌকিক মনুষ্যের আশ্চৰ্য কাৰ্য দেখিতেছিলেন। সমাগত জনমণ্ডলীর কেহই তঁাহার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য করে নাই। সহসা তিনি ধীরে ধীরে জনের দিকে অগ্রসর হইলেন। সহসা জনের হৃদয়ে অপূৰ্ব্ব পুলকের সঞ্চার হইল, সর্বাঙ্গে রােমাঞ্চিত হইল, স্বর্গ হইতে সহসা যেন এক অপূৰ্ব আলােক নামিয়া তাঁহার চক্ষুর দীপ্তি উজ্জ্বল করিয়া দিল। তিনি মােহাবিষ্টের মত যিশুর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন—আর সেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার মুখ হইতে যে আপনিই বাহির হইল- ২১
বি
ঐ ঈশ্বরের মেষশাবক আসিতেছে দেখ, উনি পৃথিবীর
পাপরাশি মােচন করিবেন।”
জন্ পূর্বে কখনও যিশুকে দেখেন নাই—সুতরাং চিনিতেন
। কিন্তু তাহার অপরূপ সৌন্দৰ্য্য, বদনের দেবপ্রতিভা,
নয়নের স্বর্গীয় রশ্মি দেখিয়া তিনি আশ্চর্যান্বিত হইয়া গেলেন।
দর্শনেই তাঁহার মনে কেমন অপূৰ্ব্ব পুলকের সঞ্চার হইল ।
জনের নিকটে আসিয়া যিশু দীক্ষিত হইতে চাহিলে—জন্
আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিলেন—“আপনিই আমাকে দীক্ষা দিয়া
উদ্ধার করুন—আমি আপনাকে কিরূপে দীক্ষিত করিব?”
যিশু কেবলমাত্র বলিলেন—“আপত্তি করিও না, ইহার
প্রয়ােজন আছে। দীক্ষিত না হইলে কোনরূপ ধৰ্ম্মের কাৰ্য্যে
অধিকার জন্মে না।”
তখন জর্ডন নদীতে যিশুকে লইয়া গিয়া, জন্ সেই জলে
তাঁহাকে দীক্ষিত করিলেন। সেই হইতে অদ্যাবধি জর্ডনের
জল অতি পবিত্র বলিয়া বিবেচিত হয়।
দীক্ষার পর নদী হইতে উপরে উঠিতেই, এক আশ্চর্য ঘটনা
ঘটিল। সহসা আকাশমণ্ডল হইতে ঈশ্বরের পরমাত্মা শ্বেত
কপােতরূপে অবতীর্ণ হইয়া যিশুর মস্তকে বসিল ; তৎপরে
তাঁহার মধ্যে মিশিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে দৈববাণী হইল—
“এই আমার প্রিয়তম পুত্র-ইহাকে জগতের পাপতাপ হরণ
করিতে পাঠাইলাম।”
;
২২
শিশু
সেখানেই জন্ যিশুকে ‘মেসায়া’ বলিয়া ঘােষণা করিলেন।
দীক্ষার পরে যিশু আপন অন্তরে এক আশ্চর্য শক্তি অনুভব
করিলেন। সেই শক্তিতে চালিত হইয়া তিনি গভীর পার্বত্য
প্রদেশে গমন করিলেন। সেখানে নির্জনে বসিয়া, চল্লিশ দিন
অনাহারে ঈশ্বরচিন্তা ও প্রার্থনায় মগ্ন রহিলেন।
চল্লিশ দিন উপবাসে একাগ্রচিত্তে প্রার্থনা করার পর তিনি
ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হইলেন। তখন সয়তান আসিয়া তাঁহাকে
নানারূপে অত্যন্ত প্রলােভিত করিতে লাগিল; কিন্তু তিনি
কিছুতেই টলিলেন না। তাঁহার সাধনা সিদ্ধ হইল। তিনি
সত্যধর্ম প্রচার করিতে আরম্ভ করিলে,
দেখিতে দেখিতে বহু পােক চিকশি
েিদর
মধ্যে দ্বাদশ জনই প্রধান শিষ্য ছিল,
{}): 19,
*
vist. White
সপ্তম পরিচ্ছো
দেবলীলা
শিষ্যগণ সহ যিশু ন্যাজারেথে আপন বাটীতে আসিলেন।
মাতা মেরী যিশুর শিষ্যগণের নিকট হইতে পুত্রের কার্যাবলী
অবগত হইয়া আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিলেন।
স্যাজারেথের নিকটবর্তী ‘কেনা গ্রামে মেরীর দূরসম্পৰ্কীয়
একঘর কুটুম্ব বাস করিত। সেই সমূয়ে তাহাদের বাটীতে এক
বিবাহ হয়। তাহারা সশিষ্য যিশু ও মেরীকে নিমন্ত্রণ করিল।
যিশু নির্দোষ আমােদ-প্রমােণ নিষেধ করিতেন না। তিনি
সশিষ্য মাতার সহিত নিমন্ত্রণে উপস্থিত হইলেন।
ইহুদীদের বিবাহের রীতি অনুসারে বরের কোন আত্মীয়
বা বন্ধু নিমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গের পরিচর্যার জন্য অধ্যক্ষরূপে নিযুক্ত
হইয়া থাকে। তাহার হস্তে বিবাহ-উৎসবের সমস্ত কর্তৃত্ব প্রদত্ত
প্রথমে সাধ্যানুযায়ী উত্তমরূপে আহারাদি করাইয়া
অভ্যাগতগণকে সুরা দিয়া সম্মান করিতে হয়। নিমন্ত্রিতগণকে
প্রদানের পূর্বে প্রত্যেক দ্রব্যই অধ্যক্ষকে সামান্য পরিমাণে
খাইয়া পরীক্ষা করিতে হয়।
অধ্যক্ষের হিসাবের ভুলেই হৌক, অথবা লােক-সংখ্যা
হয়।
।
যি) অতিরিক্ত হওয়াতেই হৌক, সুরার অনটন হইল। অনেকগুলি নিমন্ত্রিত ব্যক্তি বাকী ছিল, কিন্তু সুর আর এক বিন্দুও ছিল না, সমস্তই ফুরাইয়া গিয়াছিল। নিমন্ত্রিতেরা ফিরিয়া গেলে ইহুদীদের রীতি অনুসারে কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন অত্যন্ত হেয়, অপমানিত ও নীচু হইয়া থাকিতে হইবে। সর্বনাশ!—এক্ষণে উপায় ? মাতার মনের দৃঢ় ধারণা-পুত্র অমানুষিক শক্তিশালী। কুটুম্বের এই বিপদে বিচলিত হইয়া মেরী, পুত্রকে সমস্ত অবস্থা জানাইলেন। সমস্ত শুনিয়া যিশু চাকরুদিগকে হুকুম করিলেন— “জলের কলসী সকল জলপূর্ণ কর।” চাকরের সমস্ত কলসী জলপূর্ণ করিয়া আনিলে, সেইগুলি অধ্যক্ষের নিকট দিবার জন্য তাহারা পুনরাদিষ্ট হইল। চাকরেরা কিছুই না বুঝিয়া আদেশ পালন করিল। অধ্যক্ষ সেই সকল কলসীর জল চাকিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া গেল। সেই সকল কলসীর জলই সর্বোৎকৃষ্ট সুরায় পরিণত হইয়া গিয়াছে । এত উৎকৃষ্ট সুরা সে জীবনে কখনও আস্বাদন করে নাই। গ্যালিলি প্রদেশের কেনা’ গ্রামে, যিশু জীবনে প্রথম আশ্চৰ্য কাৰ্য সম্পন্ন করিলেন। তাহার গৌরব ঘােষিত হইল, শিষ্যগণ ও অন্যান্য অনেকে তাহাকে ঈশ্বরের অবতার বলিয়া বিশ্বাস করিল। এই ঘটনার পরে যিশু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের আধার ‘কপার- নিয়াম’ নামক ক্ষুদ্র দেশে, তাঁহার শিষ্য সাইমন’ জেলের বাটাতে
যিশু
শান্তিতে বাস করিয়া আপন কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন। সাইমন
দরিদ্র মৎস্যজীবী। তাহার নিজের একখানি ঘােট নৌকা
ছিল। যিশু সেই নৌকায় উঠিয়া তীরে সমাগত দরিদ্র
মৎস্যজীবীদের মধ্যে ধর্মপ্রচার করিয়া ধীরে ধীরে আপন
শান্তিরাজ্য বিস্তার করিতে লাগিলেন।
জেরুজালেমে ‘নব-জীবনের মহােৎসব’ প্রতি বৎসরই হইত ।
তিনি কপার-নিয়ামে অবস্থানকালে সেই মহােৎসবের সময়
উপস্থিত হইল। তিনি সেই ধর্মোৎসবে যােগদান করিবার
জন্য জেরুজালেমে গমন করিলেন।
রাজপথ হইতে আরম্ভ করিয়া জিহােভার মন্দির-প্রাঙ্গণ
পর্যন্ত মেলার ধুম পড়িয়া গিয়াছে। চতুর্দিক হইতে নানা
রকম ব্যবসায়ী লােক এবং কসাইয়ের আসিয়া দোকান খুলিয়া
শঠতা-প্রবঞ্চনা প্রভৃতি অত্যাচারে মন্দির কলুষিত করিতেছে।
পুরােহিতদের লাভ ছিল বলিয়া কেহই নিষেধ করিত না।
সুতরাং দিনে দিনে পাপের স্রোত বাড়িয়া চলিতেছিল।
এই সকল কাণ্ড দেখিয়া পূর্ব পূৰ্ব্ব বারে যিশুর মনে
অত্যন্ত ব্যথা লাগিয়াছিল। কিন্তু তখনও ‘সময় হয় নাই
বলিয়া তিনি কিছুই বলেন নাই। এবারে এ-দৃশ্য তাঁহার অসহ
হইল। তিনি একহন্তে একগাছি দড়ির চাবুক লইয়া তাহাদিগের
মধ্যে উপস্থিত হইয়া বলিলেন—“শী পালাও ; আমার
পিতার মন্দির বাণিজ্য-ব্যাপারে কলুষিত করিও না।”
২৬
যিশুখৃষ্ট
তাঁহার স্বরে এমন একটা অমানুষিক দৈব-শক্তির গাম্ভীৰ্য্য
ছিল, বদনমণ্ডলে এমন অভূতপূর্ব
এমন অভূতপূর্ব দেব-মহিমা প্রকটিত
হইতেছিল যে, সকলেই মহাভয়ে শীই সে-স্থান পরিত্যাগ
করিল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ পতিত- উর এতদিন পর্যন্ত কেবল দরিদ্র মৎস্যজীবী ও নিশ্রেণীস্থ দরিদ্র লােকই তঁাহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতেছিল। এখন হইতে দুই-চারিজন করিয়া মধ্যবিত্ত ও ধনী আসিয়া জুটিতে লাগিল। ‘নিকোডােমাস' নামক একজন বিশিষ্ট ধনী ও উচ্চ রাজকর্মচারী রাত্রিকালে গােপনে আসিয়া যিশুর নিকট উপদেশ শুনিয়া অনুতপ্ত হইলেন। তঁাহার চক্ষু খুলিল। যিশুই শাস্ত্র-কথিত সেই ‘ঈশ্বর-পুত্র’ ( অবতার) বলিয়া তাহার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল। সেইখানে উৎসবান্তে বহু ব্যক্তিকে যিশু দীক্ষিত করিলেন; তৎপরে পুনরায় গ্যালিলি অভিমুখে চলিলেন। জুডিয়া হইতে গ্যালিলি প্রদেশে যাইতে, মধ্যে সামারিয়া সামারিয়া দেশের লােকদিগকে ইহুদীরা অত্যন্ত ঘৃণা উৎসব বা অন্য কোন কাৰ্য উপলক্ষেও ইহুদীরা তাহাদিগকে কাছে ঘেঁসিতে দেয় না। এমন কি, তাহাদের দেশ মাড়াইলে বা ছায়া মাড়াইলে ইহুদীরা স্নান করিয়া শুদ্ধ হয়। কোথাও যাইতে হইলে-যদি সামারিয়া দেশ রাস্তায় পড়ে—তাহা হইলে, ইহুদীরা সে-পথ ছাড়িয়া অন্য দূর পথ দিয়া ঘুরিয়া যায়। ২৮
ইহুদীদের মধ্যে যদি কেহ সামারিয়ার উপর দিয়া যায়, কিংবা
সে-দেশের কোন লােকজনের সঙ্গে কথা বলে, তাহা হইলে
তাহাকে প্রায়শ্চিত্ত করিয়া জাতে উঠিতে হয়, নহিলে সে
জাতেঠেলা ‘একঘরে হইয়া থাকে। সামারিয়া দেশের লােকেরাও
ইহুদীদিগের এই অকারণ ঘৃণায় ও অন্যায়ে মর্মপীড়িত হইয়া
ইহুদী দেখিতে পারে না। তাহারাও ইহুদী দেখিলে রাগে
ও ঘৃণায় তফাতে সরিয়া যায়।
জেরূজালেমের উৎসবান্তে সশিষ্য যিশু গ্যালিলি প্রদেশে
যাইতে, এই পরিত্যক্ত, ঘৃণ্য, ‘একঘরে’ সামারিয়া দেশে উপস্থিত
হইলেন। তখন বৈকাল। শিষ্যের খাদ্যদ্রব্য কিনিবার জন্য
বাজারের দিকে গেল ; তিনি নগর-মধ্যস্থ এক কূপের নিকট
বসিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন।
সেই সময় সেই দেশের জনৈক স্ত্রীলােক ঐ কূপ হইতে
জল লইতে আসিল। যিশু পিপাসার্ত হইয়া তাহার নিকট
জল চাহিলেন। একজন ইহুদী তাহার নিকট জল চাহিতেছে
দেখিয়া, স্ত্রীলােকটি ঘৃণা ও ক্রোধে “জল দিব না' বলিল।
যিশু তাহাকে বলিলেন-“হায়, যদি তুমি ঈশ্বরের পরম
করুণার কথা আত থাকিতে এবং কে তােমার কাছে জল
চাহিতেছে চিনিতে পারিতে, তাহা হইলে তুমি এখনই তঁাহার
কাছে শান্তিজল চাহিতে। যে লােক তােমার ঐ জল পান
করিবে, তাহার ত আবার পিপাসা হইবে, কিন্তু আমি যে জল
২৯
যিঃ । দান করিব, তাহা পান করিলে জীবনে কখনও আর পিপাসা থাকিবে না।” স্ত্রীলােকটি তাঁহার নিকট সেই শান্তিজল চাহিল। তখন যিশু তাহাকে তাহার আজীবনের পাপ-পুণ্যের কথা সমস্ত বলিয়া দিলেন। স্ত্রীলােকটি শুনিয়া বিস্মিত হইয়া কহিল- “আপনি কে? একমাত্র মেসায় এই সকল কথা বলিতে পারেন।” যিশু বলিলেন—“আমিই সেই মেয়া।” স্ত্রীলােকটির অগাধ বিশ্বাস জন্মিল। সে দেশময় উচ্চকণ্ঠে এই সংবাদ প্রচার করিল। তখন সেই দেশশুদ্ধ পতিত সামারিয়ার লােক আসিয়া যিশুর পদতলে পড়িল। দুইদিন সেখানে থাকিয়া, তিনি সকলকে উপদেশ দিয়া-দীক্ষিত করিয়া, পতিত জাতিকে উদ্ধার করিলেন; তারপরে পুনরায় তারপরে পুনরায় আপন দেশের দিকে যাত্রা করিলেন। তখন দেশময় যিশুর নাম প্রচারিত হইয়া গিয়াছিল। সকলে তাহাকে ঈশ্বরের অবতার জানিয়া পূজা করিতে লাগিল। দলে দলে কত অন্ধ, খঞ্জ, মূক, বধির, পক্ষাঘাতগ্রস্ত আসিয়া উপস্থিত হইল। তিনি কাহাকেও স্পর্শ দ্বারা, কাহাকেও বাক্য দ্বারা, কাহাকেও বা কেবল মাত্র নয়নের ইঙ্গিতে একবার চাহিয়াই আরাম করিতে লাগিলেন। চতুর্দিকে সঁহার এই
যিশুখৃষ্ট
সকল অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার কথা ছড়াইয়া পড়িল । 'লে দলে
লােক আসিয়া দীক্ষিত হইতে লাগিল।
যিশু যখন ‘কেনা’য় অলৌকিক কাৰ্য সকল করিতেছিলেন,
তখন কপার-নিয়ামের একজন ধনীর একমাত্র পুত্রের
মৃত্যুকাল উপস্থিত হইয়াছিল। সেই ধনী ব্যক্তি যিশুর আশ্চৰ্য্য
ক্ষমতার কথা শুনিয়া তাঁহাকে লইতে আসিল। যিশু ধনীর
বাড়ীতে না গিয়াই বলিলেন—“ঘরে ফিরিয়া যাও, তােমার
পুত্র বাঁচিয়াছে।”
ধনী লোকটি বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়া মৃত্যুশয্যাশায়ী
পুত্রের নবজীবন দর্শনে আশ্চর্যান্বিত হইয়া গেল।
এইরূপে যিশুর গৌরব-গীতে দেশ প্লাবিত হইতে চলিল।
তিনিও আপন গুণে, মহত্তে, অমায়িকতায়, নম্রতায় এবং আশ্চৰ্য্য
কাৰ্য্যাবলীর দ্বারা ধীরে ধীরে চতুর্দিকে ধৰ্ম্মরাজ্য বিস্তার করিতে
লাগিলেন।
DIPSIKHA LIBRARY
Mee. No. 4a5...D8••54
spis
Dat how
নবম পরিচ্ছেদ যির উপদেশ কিছুদিন পরে যিশু আপনার দেশ ন্যাজারেথে আসিলেন কিন্তু হায়, আপন দেশের লােক তাহাকে চিনিতে পারিল না। ইহুদীদের ধর্মশাস্ত্রানুসারে ঈশ্বর ছয় দিনে পৃথিবী সৃজন করিয়া সপ্তম দিনে বিশ্রাম করিয়াছিলেন। সেইজন্য তাহারাও সপ্তাহে একদিন করিয়া বিশ্রাম করিত। সেদিন তাহারা কোন কাজকর্ম করিত না, কেবলমাত্র আমােদ-আলাদ করিয়া কাটাইত। যিশু তাহাদের সেই বিশ্রাম-দিনে, মন্দিরে গিয়া, ধৰ্ম্মপ্রচার করিতে লাগিলেন এবং সেই বিশ্রামের দিনের জন্য পৃথরূপে কতকগুলি উপাসনার বিধান করিলেন। স্যাজারেথের মন্দিরেই তিনি সর্বপ্রথম প্রচার ও শিক্ষাদানে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। তিনি বলিতে লাগিলেন—“ঈশ্বরের আত্মা আমার মধ্যে আসিয়াছে। তিনি আমাকে দরিদ্র- পরিত্রাণের জন্য পৃথিবীতে পাঠাইয়াছেন।” সমবেত জনমণ্ডলী প্রথমে শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইল তৎপরে ক্রমে ক্রমে রাগ করিয়া বলিল-“কি এত বড় ও জোসেফ, চুতারের পুত্র ; ও কোন সাহসে অমন • স্পর্ধা!
যি কথা মুখে আনে। ওরূপ কথা একমাত্র মেসায়া বলিতে পারেন—অন্য কাহারও বলিবার অধিকার নাই।” তখন তাহারা ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া যিশুকে মারিয়া ফেলিবার জন্য মন্দির হইতে বহিস্কৃত করিয়া পার্বত্য দেশে তাড়াইয়া লইয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু তাহাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হইল। তিনি নিরাপদে ‘গ্যালিলি হ্রদের দিকে গমন করিলেন। আপন দেশের বাহিরে সর্বত্রই তাহার বিপুল নাম-প্রচুর সম্মান। তাঁহাকে দেখিয়াই—দলে দলে লােক আসিয়া তাহার নিকট উপস্থিত হইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে সে-স্থান লােক-সমুদ্রে পরিণত হইয়া উঠিল। যাহাতে সকলে তাহাকে দেখিতে পায় এবং তাহার মুখ- নিঃসৃত অমিয়বাণী শুনিতে পায়, তজ্জন্য তিনি পার্শ্বস্থ এক পর্বতগাত্রে আরােহণ করিলেন। তারপর তিনি তথা হইতে সকলকে উপদেশ দিতে লাগিলেন। সেরূপ মহত্তর উপদেশ তৎপূর্বে ইহুদী দেশে আর কেহ কখনও দেয় নাই। সেই উপদেশগুলিই খৃষ্টধর্মের প্রধান ও মূল ভিত্তি। “যাহাদের অন্তঃকরণ পবিত্র, যাহাদের মন নম্র, যাহারা আপন কার্যের জন্য অনুতাপ করে, যাহারা ধৰ্ম্ম-পিপাসু, যাহারা দয়াশীল, যাহারা শান্তি-স্থাপক-—তাহারা সকলেই ধন্য। যাহারা ঈশ্বরের প্রেমে আত্মহারা হইয়া সহ অত্যাচার নীরবে সহ করে, তথাপি সেই পরমেশ্বরকে পরিত্যাগ করে না पिच তাহারা ধন্য। সেই সকল লােকের জন্য পরমেশ্বর যে পুরস্কারের ব্যবস্থা করিয়াছেন তাহা মানুষ স্বপ্নেও ভাবিতে পারে না।” “যাহারা নিরহঙ্কার, দীনাত্ম—তাহারা স্বর্গরাজ্য পাইবে। শােকৰ্ত্তেরা সান্ত্বনা পাইবে। বিনয়ীরা পৃথিবীর আধিপত্য পাইবে, অর্থাৎ পৃথিবীর লােক তাহাদের অধীন হইবে। ধর্ম- পিপাসুদের পিপাসা মিটিবে। দয়াবানেরা দয়া পাইবে। যাহাদের অন্তঃকরণ পবিত্র ও নির্মল তাহারা ঈশ্বরের সন্তান’ নামে কথিত হইবে।” “তােমাদের মধ্যে যাহারা সংসারী তাহারা সংসার পরিত্যাগ করিও না। তােমরা সংসারের আলােক-স্বরূপ হও—যেন সে আলোকে সকলেই সত্যপথ দেখিতে পায়।” “ক্রোধ, ঘৃণা, হিংসা, লােভ প্রভৃতিকে কদাচ মনে স্থান দিবে না। তােমাদের হৃদয়ের প্রত্যেক চিন্তা যেন পবিত্র হয়।” “তােমাদের শাস্ত্রে আছে—হত্যা করিও না-দণ্ড পাইবে। আমি বলিতেছি—ক্রোধমাত্র করিও না, তাহা হইলেই দণ্ডভাজন হইতে হইবে। কেহ কাচ কোন প্রকার শপথ করিবে না। পাপে, কেহ কদাচ কাহারও প্রতিদ্বন্দ্বী হইও না। যদি কেহ তােমার দক্ষিণগণ্ডে চপেটাঘাত করে, তৎক্ষণাৎ তাহাকে বামগণ্ড বাড়াইয়া দিবে। যে একখানি বস্ত্রের জন্য বিবাদ করে, তাহাকে তােমার অন্য বস্ত্রখানিও দিবে। যে জোর করিয়া তােমাকে একক্রোশ ৩৪
যিশু
লইয়া যাইতে চায়—তাহার সহিত আপন ইচ্ছায় দুইক্রোশ
যাইবে। ভিক্ষার্থীকে ভিক্ষা দিবে, ঋণপ্রার্থীকে বিমুখ করিও না।
তােমরা শুনিয়াছ-‘শত্রুকে ঘৃণা ও মিত্রকে ভালবাসিতে হয়।
আমি বলিতেছি—‘শত্রু ও মিত্র সকলকেই সমান ভালবাসার
চক্ষে দেখিবে। কেহ অভিশাপ দিলে—তাহাকে আশীর্বাদ
করিবে; কেহ ঘৃণা করিলে, তাহার উপকার করিবে; যাহার
হিংসা ও অত্যাচার করে, ঈশ্বরের কাছে তাহাদের মঙ্গল কামনা
করিবে।”
“তােমরা সকলেই সেই
এক পিতার
সন্তান। সাধু-
অসাধু, পুণ্যবান-পাপী-সকলকেই তঁাহার সূৰ্য্য সমানভাবে
কিরণ দেয়। তাহার বৃষ্টি সকলের উপরেই সমানভাবে বর্ষিত
হয়। ভালবাসার বিনিময়ে ভালবাসা—প্রীতির বিনিময়ে
প্রীতি—তাহাতে মহত্ত্ব নাই—সে সকলেই করে।”
“অতএব সকলকে সমান চক্ষে দেখতােমাদের পিতার
মত পূর্ণ হও।”
যিশুর অসংখ্য উপদেশের মধ্যে এই কয়টিই প্রধান।
দশম পরিচ্ছেদ
অলৌকিক কাৰ্য্য
যিশু সকল সময়েই তাহার শিষদিগকে সঙ্গে লইয়া
বেড়াইতেন না। কখন কখন তিনি নির্জনে, পৰ্বতে ও
প্রান্তরে প্রবেশ করিয়া চিন্তা, ধ্যান ও প্রার্থনায় কাটাইতেন।
হ্রদের তীরে বহুলােক-সমাগম দেখিলে, তিনি মৎস্যজীবীদের
নৌকায় উঠিয়া শিক্ষাদান করিতেন।
তাঁহার প্রিয়শিষ্য সাইমনকে তিনি ‘পিটার’ নাম
দিয়াছিলেন। তাহারা দুই ভাই একখানি ক্ষুদ্র নৌকায় মৎস্য
ধরিয়া ব্যবসা করিত । তাহাদের অন্য দুইজন অংশীদারও
ছিল।
একদিন প্রাতে জেনিসারেথের হ্রদপ্রান্তে গিয়া যিশু
দেখিলেন, পিটারেরা দুই ভাই জাল ধুইয়া তুলিয়া রাখিতেছে।
সেইদিন তাহারা একটি মৎস্যও পায় নাই। যিশু তাহাদের
নৌকায় উঠিয়া, সমস্ত অবগত হইলেন। তিনি পিটারকে
বলিলেন—“নেৰ্কা হ্রদের মধ্যে জাল ফেল।”
পিটার বলিল—তাহারা সমস্ত রাত্রি সেখানে জাল
ফেলিয়াছে—কিন্তু মাছ পায় নাই, মাছ আর সেখানে নাই।
তবু প্রভুর আজ্ঞা পালনের জন্য জাল ফেলিল।
যিশু
তখন
কি আশ্চৰ্যজাল অতিশয় ভারী ঠেকিল, দুই ভাইয়ের
পক্ষে টানিয়া উঠান কষ্টসাধ্য। অন্য নৌকায় তাহাদের অঙ্গ
অংশীদার দুইজন ছিল, তাহাদিগকেও ডাকা হইল।
সকলে মিলিয়া অতিকষ্টে জাল তুলিল। এত মাছ উঠিল যে,
দুইটি নৌকা পূর্ণ হইয়া গেল—আর তিলধারণের স্থান
রহিল না।
মাছের ভারে নৌকা ডুবিয়া যায় ! এই আশ্চর্য
ব্যাপার দেখিয়া পিটারের মুখ শুকাইল, সে জোড়হাতে
কপিতে কাপিতে যিশুকে বলিল-“দোহাই প্রভু, আমি
মহাপাপী, আমাকে পরিত্যাগ করুন।”
ঈষৎ হাসিয়া যিশু বলিলেন—“আইস, তােমাকে মানুষ
ধরিবার ধীবর করিব।”
তাহারা দুই-ভাই সৰ্বস্ব ছাড়িয়া যিশুর পিছনে পিছনে
চলিল। তারপর যিশুর উপদেশে তাহারা সহস্র সহস্র ব্যক্তির
প্রাণে ধৰ্ম্মের আলো জ্বালিয়া শান্তি দিতে লাগিল।
ইহুদীদের মধ্যে কুষ্ঠব্যাধি ভীষণ পাপের ও ভয়ের কারণ
বলিয়া পরিগণিত হইত। ঐ ব্যাধিগ্রস্তকে সকলেই ভয়ে
পরিত্যাগ করিত। সেই লোেককে লােকালয় ছাড়িয়া দূর প্রান্তর
বা পৰ্বত-গহবরে একাকী বাস করিতে হইত। এইরূপে আত্মীয়-
পর সকলের দ্বারা পরিত্যক্ত হইয়া সেই লােকের জীবন অত্যন্ত
দুর্বিষহ হইয়া পড়িত।
ঐরূপ ব্যাধিগ্রস্ত এক ব্যক্তি কোনরূপে যিশুর আশ্চর্য
M
কার্যকলাপের বিষয় শুনিয়াছিল। সে অগাধ বিশ্বাসে নির্ভর
করিয়া কোনও রকমে অতিকষ্টে ভঁহার নিকটে আসিয়া বলিল
--“প্রভু, আপনি ইচ্ছা করিলেই আমাকে আরােগ্য করিতে
পরেন।”
তাহার অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভর দেখিয়া যিশু সন্তুষ্ট হইলেন;
তৎক্ষণাৎ তাহাকে স্পর্শ করিয়া বলিলেন—“আমি ইচ্ছা করি,
তুমি রােগমুক্ত হও।”
আশ্চৰ্য্য ঘটনা !সে ব্যক্তি সেই মুহূর্তেই নবীন দেহ
প্রাপ্ত হইল।
একদিন একজন জন্মান্ধ আসিয়া যিশুকে বলিল-“প্রভু,
দয়া করিয়া আমাকে দৃষ্টিশক্তি দান করুন। আপনি আদেশ
করিলেই হইবে।”
যিশু তাহার চক্ষে আপন হস্ত বুলাইয়া বলিলেন-“তােমার
আপন বিশ্বাস অনুযায়ী দৃষ্টিশক্তি লাভ কর।” সে ব্যক্তি নূতন
দৃষ্টিশক্তি লাভ করিল।
তৎপরে একজন ভূতগ্রস্ত বােবাকে সকলে মিলিয়া যিশুর
নিকট উপস্থিত করিল। তাহার বাক্শক্তি না থাকিলেও
চক্ষুদ্বয় হইতে ভীষণ তীব্র আলো বাহির হইতেছিল। তাহাকে
দেখিলেই লােকে ভয়ে পলাইত -যেন সে খাইয়া ফেলিবে।
অথচ সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রােগীর ন্যায় অবশ—অক্ষম ছিল।
যিশুর আজ্ঞামাত্রেই তাহার অভ্যন্তরস্থ দুষ্ট আত্মা পলাইল ।
৩৮
বিডি
তখন সেই লােকটি সহজ মনুষ্যের মত বেশ কথাবার্তা কহিতে
লাগিল।
সমবেত জনমণ্ডলী বড়ই চমৎকৃত হইয়া গেল। সকলেই
একবাক্যে কহিল—“এ-দেশে এরূপ আশ্চৰ্য কাৰ্য কেহ কখনও
সম্পন্ন করিতে পারে নাই। মানুষের পক্ষে ইহা অসম্ভব-ইনিই
সেই ‘মেসায়া’।”
একাদশ পরিচ্ছেদ বিশ্রাম-দিনে ধর্মোপদেশ ইহুদীদের মধ্যে বিশ্রামের দিন’ অতি কঠোর নিয়মে প্রতিপালিত হইত। সপ্তাহের প্রতি শনিবার এই বিশ্রাম- দিন ধার্য ছিল। শুক্রবার বেলা তিনটার পর হইতেই সকলকে সতর্ক হইতে হইত। রাজধানী জেরূজালেমের জিহােভা-মন্দির এবং প্রত্যেক নগর ও গ্রামস্থিত মন্দির ( সিনাগােগ) হইতে তিনবার উচ্চ ঘণ্টাধ্বনি হইত। সেই ঘণ্টাধ্বনি—বিশ্রাম-দিন প্রারম্ভের সঙ্কেত। সেই দিনে কেহ কোন ভালমন্দ কার্য করিতে পারি না। কোন গৃহে অগ্নি আলা হইত না, কেহ রন্ধন করিতে পারিত না—শুক্রবারের মধ্যাহ্নে আহাৰ্য প্ৰস্তুত করিয়া রাখিতে হইত। কেহ কোনরূপ ভার বহন করিতে পাইত না ; এমন কি, সকলেই আপন আপন জামার জেব শূন্য করিয়া ফেলিত। সামান্য একটি ছুচও কেহ বহন করিতে পাইত না। অত্যন্ত কঠিন ব্যাধি হইলেও বিশ্রাম-দিনে কেহ চিকিৎসা করাইতে পারিত না। দৈবাৎ পড়িয়া গিয়া বা অন্য কোন কারণে কাহারও হাত-পা ভাঙ্গিয়া গেলে তাহা বঁধিতে ৪০
যিশু
পারিত না। কেহ জলে ডুবিয়া
কেহ জলে ডুবিয়া হাবুডুবু খাইলেও তাহাকে
তােলা হইত না। আগুন লাগিয়া গ্রাম ছাই হইয়া গেলেও
একটি জিনিসও কেহ সরাইতে পারিত না। লােক মরিলেও
সেই অবস্থাতেই পড়িয়া থাকিত। এমন কি, বিশ্রাম-দিনে
শত্রু আসিয়া আক্রমণ করিলে, কাহারও একটি হাত পর্যন্ত
তুলিবার অধিকার ছিল না। সেদিন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা
সকলকেই—মৃতের ন্যায়নিষ্কৰ্ম্মা, স্থির, নির্জীব হইয়া থাকিতে
হইত।
নচেৎ আইনের শাসনে কঠোর শাস্তি পাইতে হইত।
এইরূপ অদ্ভুত সংস্কার-বশে আইন বিধিবদ্ধ হইয়া ইহুদীদের
বিশ্রাম-দিন—অতি কঠোর দিনে পরিণত হইয়াছিল।
জেরুজালেমের বেথসভা নামক স্থানে একটি স্বাভাবিক
নিঝর ছিল। সময়ে সময়ে নিঝর হইতে এমন জল প্রবাহিত
হইত যে, তাহাতে অবগাহন করিলে সর্বপ্রকার ব্যাধি আরােগ্য
তজ্জন্য সেই স্থানের চতুষ্পর্শ্বে বহুবিধ রােগী আসিয়া
রােগমুক্তির আশায় অপেক্ষা করিত।
একটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত ৰােগী আটত্রিশ বৎসর ধরিয়া তথায়
পড়িয়া ছিল। তাহার এমন কেহ সহায় ছিল না যে, নিঝরের
জল প্রবাহিত হইলে, তাহাকে তুলিয়া লইয়া স্নান করাইয়া
জলও সর্বদা বহিত না, মাঝে মাঝে হঠাৎ আসিয়া
পড়িত। এই আটত্রিশ বৎসরে তাহার চোখের উপরে শত শত
রােগী স্নান করিয়া আরােগ্য হইয়া গেল। অসমর্থ সে-
দেয়।
৪১
বিত
।
হায় !
কি করিবে? তথাপি, যদি কখনও কোন দয়ালু ব্যক্তি আসিয়া
তাহাকে স্নান করাইয়া দেয়, সেই ক্ষীণ আশায় বুক বাঁধিয়া
সেখানে পড়িয়া ছিল।
একদিন প্রাতঃকালে সহসা কে তাহাকে বলিল—“তুমি
কি আরােগ্য লাভ করিতে চাও?”
কে এমন দয়ালু যে এই আটত্রিশ বৎসর পরে
তাহাকে তুলিয়া লইয়া স্নান করাইয়া দিবে! সে নিরাশ-হৃদয়ে
সজল-নয়নে কহিল-“মহাশয়, আমার এমন কেহই নাই যে
আমাকে তুলিয়া লইয়া স্নান করাইয়া দেয়।”
যিশু সস্নেহে তাহার হাত ধরিয়া বলিলেন-“উঠ, তােমার ।
বিছানা তুলিয়া লইয়া আপন বাড়ীতে যাও।”
যিশুর স্পর্শ ও বাক্যের সঙ্গে সঙ্গেই তাহার ব্যাধি পলাইল,
দেহে অপূর্ব শক্তি অনুভূত হইল! সে নবশরীর লাভ করিয়া
মহানন্দে আপন গৃহে চলিয়া গেল। সকলেই তাহাকে দেখিয়া
চমৎকৃত হইল। সে তখন একবাক্যে যিশুর মহিমা প্রচার
করিতে লাগিল।
সে-দিন বিশ্রামের দিন ছিল—সুতরাং ইহুদীদের আইনমতে
সে-দিন একাৰ্য্য করিয়া যিশু মহা অপরাধী হইলেন। তাই
আইন-ব্যবসায়ীরা আপনাদের ক্ষমতা ও আধিপত্য নাশের
ভয়ে তাহার ঘাের শক্ত হইয়া দাঁড়াইল। যিশুকে নষ্ট
করিবার অভিপ্রায়ে তাহারা দল বাঁধিয়া নানারূপ ষড়যন্ত্র
৪২
যিশু
করিতে লাগিল ; চতুর্দিকে যিশুর নামে নানারূপ মিথ্যা
অপবাদের প্রচার করিতে লাগিল।
শত সহস্র দীন-দরিদ্র-শত সহস্র পাপী-তাপী প্রতিদিন
যিশুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিল; কেবল ধনী ও ক্ষমতাশালীরা
তাহার প্রাণবধের সুযােগ খুজিতে লাগিল।
যিশু সে-স্থান ত্যাগ করিয়া তাঁহার প্রিয় জেনিসারেথ
হ্রদের দিকে চলিলেন—লক্ষ লােক তাহার অনুগমন
করিল।
;
লক্ষ
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ বিশ্রাম-দিনের যথার্থ অর্থ অন্য এক বিশ্রাম-দিনে যিশু তঁাহার শিষ্যদল সমভিব্যাহারে এক শস্যক্ষেত্রের উপর দিয়া যাইতেছিলেন। শস্যসকল পরিপক্ক হইয়া বায়ুভরে দুলিতেছিল। অত্যন্ত ক্ষুধার্ত শিষ্যগণকে যিশু সেই শস্য খাইতে আদেশ করিলেন। তাহারা বিশ্রাম-দিনে সেই শস্য ছিড়িয়া খাইল। এই সংবাদ প্রচারিত হইলে দেশময় হুলুস্থুল পড়িয়া গেল। অন্য দিনে এরূপ খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল না; কিন্তু বিশ্রাম-দিনে ক্ষুধায় মরিয়া গেলেও এরূপ শস্য তুলিয়া খাওয়া নিষেধ। তখন রাজ্যের লােকেরা ক্রোধে অন্ধ হইল। যিশু বিশ্রাম-দিনে রােগী আরােগ্য করেন, মন্দিরে মন্দিরে গিয়া ধর্মপ্রচার করেন, যদৃচ্ছা গমনাগমন করেন, শস্য তুলিয়া ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন—সুতরাং তিনি মহা অপরাধী। অথচ যিশুর সম্প্রদায়ে প্রতিদিনই সহস্র সহস্র লােক বাড়িতেছে, সুতরাং তাহাদের ক্ষমতা দিন দিনই লােপ পাইতেছে। তাহাদের মধ্যে প্রধান কয়েকজন গিয়া যিশুর নিকট এই সকল কার্যের জন্য কৈফিয়ৎ চাহিল। ৪৪
যিষ্টি
যিশু তখন সমবেত লক্ষ লক্ষ জনমণ্ডলীর মধ্যে, তাহাদেরই
আইন ও ইতিহাসে বর্ণিত ‘বিশ্রাম-দিনের যথার্থ অর্থ
তাহাদিগকে বুঝাইতে লাগিলেন। বিশ্রাম-দিনে সর্বদা
সর্বস্থানেই সৎকাৰ্য অনুষ্ঠেয়। সে-দিন ঈশ্বনােপাসনা ও
দান-ধ্যানের দিন এবং প্রাণরক্ষার জন্য সেদিন সকল কাৰ্যই
বিধেয়।
কিন্তু ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী ! তাহারা তর্কে
পরাজিত হইলেও এবং মনে মনে বুঝিলেও কার্যে কিছুই বুঝিল
। যাহাতে যিশু বিশ্রাম-দিনে এইরূপ আরও অপকর্ম করেন
এবং যাহাতে তাহারা যিশুর বিরুদ্ধে আরও অধিক প্রমাণ সংগ্রহ
করিতে পারে তদুদ্দেশ্যে মনের ভাব গােপন করিয়া, তাহারা
এক ব্যক্তিকে যিশুর নিকট অগ্রসর হইতে কহিল।
সে ব্যক্তির
দক্ষিণ হস্ত পচিয়া বহুদিন হইতে অতি ক্ষুদ্র ও শুষ্ক হইয়া
গিয়াছিল। সে তাহা আরােগ্য করিবার আশাতেই তাহার
নিকট আসিয়াছিল,
আসিয়াছিল, কিন্তু ভিড় ঠেলিয়া অগ্রসর হইতে
পারে নাই।
যিশু বদমায়েদের মনােভাব অবগত হইয়া ঈষৎ হাসিলেন
পরে সেই ব্যক্তিকে বলিলেন-“হাত বাড়াও।” সঙ্গে সঙ্গে
তাহার হস্ত স্বাভাবিক ও কর্মঠ হইল। দুৰ্জ্জনেরা মনে মনে
গর্জন করিতে করিতে ফিরিয়া গেল।
যিশু তখন সেই সমবেত জনমণ্ডলী লইয়া এক পৰ্বতগাত্রে
৪৫
যিশু
উঠিলেন। নিম্নে ক্রোশ ব্যাপিয়া লক্ষ লক্ষ ব্যক্তি, তঁাহার
অমিয়মাখা কথা শুনিবার জন্য উৎকর্ণ হইয়া রহিল।
সেই সময়ে এমন অবস্থা হইয়াছিল যে, তিনি আর এক
মুহূর্তও বিরাম পাইতেন না। কোথাও গিয়া পলাইয়াও তাহার
নিষ্কৃতি ছিল না। কি দিন, কি রাত্রি তিনি যখন যেখানে
যাইতেন—দেশের দূরদূরান্ত হইতে লক্ষ লক্ষ লােক সর্বকৰ্ম্ম
ছাড়িয়া মুগ্ধের ন্যায় তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিত। তিনি
অক্লান্ত পরিশ্রমে তাহাদিগকে উপদেশ দিতেন :-
“কখনও লােক দেখাইয়া দান করিও না, এমন কি
তোমাদের বাম হস্ত যেন জানিতে না পারে যে, দক্ষিণ হস্ত
কি দিল।
“লােক দেখাইবার জন্য বা নামের জন্য রাজপথে, ধর্মগৃহে
বা প্রকাশ্য স্থানে উপাসনা করিও না। নিজকক্ষে দ্বাররুদ্ধ
করিয়া উপাসনা করিবে।”
“উপাসনাকালে এক কথা বারংবার পুনরুক্তি করিও না।
তােমাদের চাহিবার পূর্বেই ঈশ্বর জানেন কি তােমাদের
অভাব।”
“এই বলিয়া প্রার্থনা করিবে—হে স্বর্গ পিত, তােমার
নাম পবিত্র। স্বর্গের ন্যায় এখানেও তােমার সুখের রাজ্য
হউক। স্বর্গের ন্যায় মর্তেও তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হউক।
আমাদের অদ্যকার আহার প্রদান কর। আমরা যেমন
যিশুখৃষ্ট
আমাদের দীনহীন ঋণীদিগকে ক্ষমা করি, তুমিও সেইরূপ
আমাদের ঋণ ও পাপ ক্ষমা কর—আমাদিগকে কখনও লােভে
ফেলিও না। আমাদিগকে পাপ হইতে পরিত্রাণ কর। তােমার
রাজ্য চিরদিনই গৌরবান্বিত হউক।”
“কাহারও দোষ লইও না—সকলকেই ক্ষমা করিবে।”
“উপবাস করিয়া, ভণ্ডদের মত, শুষ্কমুখে তাহা প্রকাশ করিও
না, অতি গােপনে স্বর্গীয় পিতার নামে উপবাস করিবে।
মুখ
প্রক্ষালন ও মাৰ্জন করিবে, মুখ দেখিয়া যেন কেহ জানিতে না
পারে যে তুমি উপবাস করিয়াছ।”
“পৃথিবীতে অর্থ সঞ্চয় করিও না। কল্য কি খাইবে ভাবিও
, সরল বিশ্বাসে তাহার উপর ঐকান্তিক নির্ভর রাখিবে।
দয়াময় আপনিই তােমাদের সকল অভাব পূর্ণ করিবেন।”
এইরূপ নানাবিধ মধুমাখা সরল উপদেশ দিয়া যিশু
পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য বিস্তার করিতে লাগিলেন।
বহুদিন যাবৎ প্রাণাধিক পুত্রকে না দেখিয়া-মেরী তাহার
আত্মীয়বর্গের সহিত পুত্রকে দেখিতে আসিলেন ; কিন্তু তখন
সেখানে লােকের সমুদ্র! তিনি জনতা ভেদ করিয়া অগ্রসর
হইতে পারিলেন না। কতকগুলি শত্রুভাবাপন্ন লােকও যিশুর
বিরুদ্ধে অধিকতর প্রমাণ সংগ্রহের নিমিত্ত সেই জনতার মধ্যে
মিশিয়াছিল।
যিশুর উপদেশদান থামিলে, কতকগুলি লোক একটি
মূক,
৪৭
বিখ্রষ্ট
অন্ধ ও ভূতগ্রস্তকে তাঁহার সম্মুখে আনিল। যিশু তমুহূর্তে
তাহাকে আরােগ্য করিলেন। ভূত পলাইল, সেই ব্যক্তি
একসঙ্গেই দৃষ্টি ও বাশক্তি লাভ করিল ! ইহা দেখিয়া
লােকের বিশ্বাস আরও দৃঢ়তর হইল। সকলেই উচ্চকণ্ঠে
জয়ধ্বনি করিল—“এই সে অবতার (মেসায়া) খৃষ্ট।”
এই ব্যাপারে শত্রুপক্ষেরা একটা সুযােগ পাইল। তাহারা
মনের ভাব গােপন রাখিয়া সকলের মন ভাঙ্গাইতে লাগিল।
তাহারা উচ্চকণ্ঠে
বলিল—“ও ব্যক্তি ঐশ্বরিক শক্তিশালী
সত্য; কিন্তু অবতার নহে-ও ভূতের ওঝা।” কিন্তু কেহই
তাহাদের কথা বিশ্বাস করিল না ।
সেই সময়ে কতিপয় লোেক অতিকষ্টে ভিড় ঠেলিয়া যিশুর
নিকট আসিয়া জানাইল—তাহার মাতা, ভ্রাতা ও বন্ধুবর্গ
অপেক্ষা করিতেছে।
যিশু বলিলেন—“আমার মাতা, ভ্রাতা ও বন্ধুবর্গ কাহারা ?”
তৎপরে শিষ্যদিগকে দেখাইয়া তিনি বলিলেন—“ইহারাই আমার
যাহারা আমার স্বর্গীয় পিতার কার্য সম্পন্ন করে ও
আদেশ পালন করে, তাহারাই আমার মাতা, তাহারাই আমার
ভ্রাতা এবং তাহারাই আমার বন্ধু।”
এই ঘটনার পর যিশু ন্যাজারেথে শেষবার গিয়া কয়দিন
মাতার নিকট অবস্থান করিলেন। ছয়দিন পরে বিশ্রাম-দিন
উপস্থিত হইলে তিনি আবার সেখানকার মন্দিরে ( সিনাগােগ)
সব।
৪৮
বিখই
গিয়া ধর্ম প্রচারে প্রস্তুত হইলেন। তখন তাঁহার স্বদেশবাসীরা
আবার তাঁহাকে তাড়াইয়া দেশের বাহির করিয়া দিল।
তিনি গ্যালিলি হ্রদের তীরে চলিয়া আসিলেন।
বহু সহস্র লােক তথায় সমবেত হইল। তিনি সকলকে
উপদেশ ও শিক্ষা দান করিয়া সেই হ্রদ পার হইলেন এবং
পরে তাহার পূর্ব-সীমান্তবর্তী দেশে যাত্রা করিলেন। তাঁহার
নৌকায় এবং অন্যান্য নৌকাতেও বহু লােক তাহার সঙ্গে সঙ্গে
মুগ্ধের মত চলিল।
৪৯
ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ
মৃতদেহে জীবনদান
অতিরিক্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত হইয়া নৌকার উপর যিশু
ঘুমাইয়া পড়িলেন। হ্রদের স্থির, শান্ত, নীল জলের উপর
দিয়া নৌকা হেলিয়া দুলিয়া চলিতে লাগিল।
অর্ধেক পথ যাইতেই সহসা ভয়ানক তুফান উঠিল । বৃক্ষের
মত প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঢেউ উঠিয়া নৌকাগুলিকে প্রতি মুহুর্তে
অতলে ডুবাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল ঢেউয়ের গুরুগম্ভীর
শব্দ ও তুফানের ভীষণ গর্জনে কানে তালা ধরিল। নাবিকেরা
শত চেষ্টাতেও নৌকা ঠিক রাখিতে পারিতেছিল না। যিশু
তখন অকাতরে নিদ্রা যাইতেছিলেন।
এইরূপে মৃত্যুভয়ে অস্থির হইয়া শিষ্যেরা ঝড়ের কথা
যিশুকে জানাইল। যিশু প্রকৃতিকে ধমকাইয়া বলিলেন—
“শান্ত হও।” তুফান তৎক্ষণাৎ কোথায় লুকাইল ।
সংক্ষুব্ধ সেই বিশাল বারিধি আবার তদ্দণ্ডেই শান্তমূর্তি ধারণ
করিল। সঙ্গীয় লােকগণ এই অদ্ভুত ক্ষমতা দর্শনে একেবারে
স্তম্ভিত হইল; তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল—“এই ত
বি
সাক্ষাৎ ঈশ্বর, নচেৎ সমুদ্র ও বায়ু আর কার আদেশ শুনিয়া
স্তব্ধ হয় ?
নৌকা পরপারে উপনীত হইলে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটিল।
এক ভীষণাকৃতি ভূতগ্রস্ত পাগল সেই হ্রদতীরে এক কবরের
মধ্যে থাকিত। সে বহু লােকের অনিষ্ট করিয়াছে, তজ্জন্য
দেশবাসী সকলেই তাহাকে অত্যন্ত ভয় করিত। বহু লােক
মিলিয়া কয়েকবার ঐখানে তাহাকে দৃঢ়রূপে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া
রাখিয়াছিল। কিন্তু কে জানে—কি এক অদৃশ্য শক্তিবলে-
প্রতিবারেই সে শিকল ভাঙ্গিয়া ফেলিত ।
যিশুকে দূর হইতে আসিতে দেখিয়া সে সহসা দৌড়িয়া
গিয়া তাঁহার পদতলে লুটাইয়া বলিল—“হে সর্বশক্তিমান
মহিমান্বিত ঈশ্বর-পুত্র যিশু, আমরা আপনার নিকট কোন
অপরাধ করি নাই, আমাদিগকে তাড়াইবেন না।”
যিশু বলিলেন—“ও ব্যক্তিকে ছাড়িয়া বাহির হও।”
দুষ্ট প্রেতাত্মা তখন তাহাকে মুক্তি দিয়া কাপিতে কঁপিতে
যিশুর সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল। যিশু তাহার নাম জিজ্ঞাসা
করিলে সে বলিল -“আমি একক নহি, অনেকগুলি একত্রে
আছি।”
অদূরে পর্বতােপরি প্রায় সহস্রাধিক মেষ চরিতেছিল।
যিশু সেইগুলিকে দেখাইয়া বলিতেন--“তােমরা উহাদের মধ্যে
আশ্রয় লও।”
বি
তখনই প্রেতাত্মা অদৃশ্য হইল এবং পরমুহূর্তেই সেই পশুল
দৌড়িয়া গিয়া হ্রদগর্ভে ডুবিয়া প্রাণত্যাগ করিল ।
মুহূর্তে এই ঘটনা দেশময় রাষ্ট্র হইলে, দেশবাসী সকলে
মহাভয়ে কঁপিতে কাঁপিতে যিশুর নিকটে আসিয়া বলিল—
“হে মহাত্ম, দয়া করিয়া আপনি আমাদের দেশ হইতে প্রস্থান
করুন।”
কাহারও অনভিপ্রায়ে তাহাকে জোর করিয়া যিশু আপনার
দলে আনিতেন না। তৎক্ষণাৎ তিনি সে-স্থান ত্যাগ করিয়া
গ্যালিলি অভিমুখে প্রত্যাবর্তন করিলেন।
এপারে বহু লােক তাঁহার আগমনের প্রতীক্ষায় ছিল।
তন্মধ্যে ‘জেরাস' নামে এক ক্ষমতাবান মহাধনী ও মানী ব্যক্তি,
উর্ধমুখে তঁাহার প্রত্যাগমন প্রতীক্ষা করিতেছিল।
গৃহে তাহার
দ্বাদশ বর্ষীয়া একমাত্র কন্যা মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিল।
তজ্জন্য যিশুকে লইয়া যাইতে আসিয়াছিল।
শ্রবণমাত্রেই যিশু তাহার সহিত গমন করিলেন। যিশু
যখন সেই বাটীতে পেীছিলেন—তখন কন্যাটি মরিয়া গিয়াছে।
সকলেই নিরাশ হইয়া কঁদিতে কঁদিতে বলিল—-“আর প্রভুর
আগমনে ফল কি?-বালিকা মরিয়া গিয়াছে।”
যিশু সকলকে কঁদিতে নিষেধ করিয়া, কন্যার পিতা
মাতাকে সঙ্গে লইয়া মৃতার গৃহে প্রবেশ করিলেন এবং তাহার
নাম ধরিয়া ডাকিলেন। তৎক্ষণাৎ, সেই কন্যা নিদ্রোখিতার
বিষ্ট
ন্যায় চক্ষু মুছিতে মুছিতে উঠিয়া আসিয়া সুস্থশরীরে সম্মুখে
দাড়াইল!
গৃহময় আবার আনন্দধ্বনি উঠিল। খৃষ্টের জয়নাদে
আকাশ-বাতাস পূর্ণ হইয়া গেল।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
শিক্ষা-প্রদান
ইহুদীদের দেশে নিমন্ত্রণের ব্যাপার চমৎকার। নিমন্ত্রিত
ব্যক্তিগণকে মধ্যাহ্ন সময়ে খাইতে যাইতে হইত। তাহারা
উপস্থিত হইলে বাটীর কর্তা প্রত্যেকের পা ধােয়াইয়া, মস্তকে
তৈল ও গন্ধদ্রব্য দিয়া, তৎপরে গলা ধরিয়া মুখ চুম্বন পূৰ্ব্বক
অভ্যর্থনা করিত।
একটি বিস্তৃত ঘরে বড় টেবিল পড়িত, তাহার তিনদিকে
ঘােট ঘােট কোচ দিয়া সাজাইতে হইত। নিমন্ত্রিতেরা তাহার
উপর, বামদিক চাপিয়া অর্ধ-শায়িত অবস্থায় বাম হাতের উপর
বাম গণ্ড রাখিয়া দক্ষিণ হস্তে আহার
করিত ।
তাহাদের হাঁটু
পর্যন্ত কোচের উপর স্থান পাইত, পা-গুলি বাহিরে ঝুলিত।
যিশুখৃষ্টের নাম-ডাক শুনিয়া ও ক্ষমতা দেখিয়া ‘সাইম
নামক একজন ঈর্ষান্বিত সম্রান্ত ব্যক্তি তাহাকে অপমানিত
করিবার অভিপ্রায়ে নিজ বাটীতে নিমন্ত্রণ করিল। যিশু মুখ
দেখিয়া বা কথা শুনিয়াই লােকের মনের কথা জানিতে
পারিতেন। তিনি সাইমনের মনােভাব জানিয়াও, নিমন্ত্রণ রক্ষা
করিতে তাহার বাটীতে উপস্থিত হইলেন।
৫৪
সাইমন ইচ্ছা করিয়াই, অন্যান্য অভ্যাগতের ন্যায়, যিশুর পা ধােয়াইয়া মস্তকে তৈল দিয়া, বা মুখ চুম্বন করিয়া তঁাহাকে অভ্যর্থনা করিল কেবলমাত্র অঙ্গুলি-সঙ্কেতে তঁাহার বসিবার স্থান দেখাইয়া দিল। যিশুও খাইতে বসিলেন। সাইমনের বাটীর নিকটে একজন হীন-চরিত্রা পাপী রমণী বাস করিত। সে আপন পাপকার্যের জন্য বহুদিন হইতেই অনুতপ্ত হইয়াছিল। যিশুর শরণ লইবার ঐকান্তিক ইচ্ছা থাকিলেও—পাছে পাপী বলিয়া যিশু তাড়াইয়া দেন—সেই ভয়ে সে এতদিন তাহার নিকট যাইতে সাহস করে নাই। সাইমনের বাটীতে যিশুর এইরূপ অবমাননা দেখিয়া স্ত্রীলােকটি নিজ চক্ষুজলে তঁাহার পা ধােয়াইয়া আপন কেশদামে মুছাইয়া দিল ; তারপর তাহার নিজের একটি বাক্স হইতে সুগন্ধি দ্রব্য বাহির করিয়া তাহার চরণযুগল রঞ্জিত করিল। তৎপরে সেই পদযুগল চুম্বনপূর্বক আপন শিয়ােদেশে ধরিয়া স্ত্রীলােকটি রােদন ও অনুতাপ করিতে লাগিল। যিশু তাহাতে কোন প্রকার বাধা দিলেন না। যিশু সাইমনের মনােভাব অবগত হইয়া, অগ্ৰেই বলিলেন- “একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, উত্তর দাও। এক মহাজনের দুইজন খাতক ছিল। একজন পাঁচশত ও অপর জন পঞ্চাশ টাকা ধারিত। যখন তাহার কিছুতেই পরিশােধ করিতে । ৫৫ D
বিষ্ট
পারিল না, মহাজন উভয়কেই ক্ষমা করিলেন। তাহাদের
উভয়ের মধ্যে কে সঁহাকে অধিক ভালবাসিবে ?”
এই প্রশ্নের যথার্থ উদ্দেশ্য বুঝিতে না পারিয়া সাইমন
বলিল-“যাহাকে অধিক ক্ষমা করা হইল।”
যিশু বলিলেন-“ঠিক কথা।” তৎপরে হাত দিয়া
স্ত্রীলােকটিকে দেখাইয়া যিশু বলিলেন-“ঐ স্ত্রীলোককে
দেখিতেছ ? ও মহাপাপী। নিমন্ত্রিত হইয়া তােমার বাটীতে
আসিলেও তুমি আমার পা ঘােয়াইলে না-ও চক্ষের জলে
ধােয়াইল, আপন চুলে মােছইল। তুমি আমার মাথায় তৈল
দিলে নাও আমার পায়ে সুগন্ধি দ্রব্য মাখাইল। তুমি
আমাকে চুম্বন করিলে নাও অনবরত আমার পদ-চুম্বন
করিতেছে। তজ্জন্য, ও মহাপাপী হইলেও উহার রাশি রাশি
পাপ মার্জনা করা হইল-কারণ ও আমাকে অধিক ভালবাসে।
আর যে কম ভালবাসে-সে কম ক্ষমা পাইবে।”
তখন যিশুর বদনমণ্ডল হইতে এক স্বর্গীয় ভাতি বাহির
হইতেছিল।
সাইমন ও তাহার অপর নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ অবাক হইয়া
গেল ! তাহারা আশ্চর্যান্বিত হইয়া আপনাদের মধ্যে বলিতে
লাগিল- “কে এ মহাত্মা-পাপীর পাপ ক্ষমা করিয়া পরিত্রাণ
করেন? তবে যিশুখৃষ্ট কি যথার্থই সেই মেসায়া ?”
তখন যিশু উঠিয়া স্ত্রীলােকটির দিকে অগ্রসর হইয়া
যিশুধু
বলিলেন—“তােমার মনের বিশ্বাস ও অনুতাপ তােমাকে রক্ষা
করিল, যাও—শান্তিলাভ কর।”
ধনগর্বিত অভিজাতদিগকে যিশু এই শিক্ষা দিয়া গেলেন
'যে, যাহারা নিজেদের পাপ জানিয়াও অনুতপ্ত হয় না, তাহাদের
পরিণাম, অনুতাপকারী মহাপাপী অপেক্ষাও ভয়াবহ।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
-প্রচার
;
দ্বাদশজন প্রিয় শিষ্যকে, যিশু দুই দুইজন হিসাবে ছয়ভাগে
বিভক্ত করিয়া, গ্যালিলি প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে প্রচারকার্য্যে
পাঠাইয়াছিলেন। তাহারা নিজ নিজ কার্য সম্পন্ন করিয়া
পুনরায় তঁাহার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন যিশু
কিছুকাল নির্জনে বিশ্রাম করিবার জন্য বেথসড প্রদেশের
নিকটবর্তী মরুপ্রান্তরে যাত্রা করিলেন; কিন্তু তাহার অদৃষ্টে
বিশ্রামসুখ ছিল না। লক্ষ লক্ষ লােক তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ
ধাবিত হইল।
তাহাদিগকে দেখিয়া যিশু রাগ করিলেন না, তাহার মনে
দয়া হইল। তিনি সেইখানেই তাহাদিগকে নানাবিধ উপদেশ
দিতে লাগিলেন।
সমস্ত দিন অতিবাহিত হইয়া সন্ধ্যা হইল—তথাপি বিরাম
সমবেত জনসঘ সারাদিন জলস্পর্শ করে নাই, মুগ্ধের
ন্যায় তঁাহার বচন-সুধা পান করিয়া ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলিয়া ছিল ।
সন্ধ্যা হইল—সম্মুখে ভীষণ মরুপ্রান্তর। তথাপি কাহারও
সেদিকে লক্ষ্য ছিল না। তখনও সকলে তঁাহার কথা শুনিবার
জন্য উৎকর্ণ হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল।
নাই।
৫৮
যিশুখৃষ্ট প্রিয় শিষ্য পিটার বলিল—“প্রভু, রাত্রি আগত, সম্মুখে ভীষণ মরুপ্রান্তর—পাঁচ হাজার লােকের সকলেই উপবাসী- ইহারা কি করিবে ?” যিশু বলিলেন-“তােমরা ইহাদিগকে ভােজন করাও।” শিষ্যের প্রভুর কথা শুনিয়া অবাক্ হইয়া গেল। তাহারা রাত্রিকালে মরুভূমিতে পাঁচহাজার লােককে কি খাওয়াইবে ? যিশু তাহাদের মনের ভাব বুঝিয়া বলিলেন—“ছিঃ স্বল্প- বিশ্বাসী মানুষ।” তৎপর যিশুর আদেশে শিষ্যেরা জনমণ্ডলীর কাহার কাছে কি আছে অনুসন্ধান করিতে গেল। হায়! সকলেই আহার- নিদ্রা, পরিশ্রম ভুলিয়া মুগ্ধের ন্যায় চলিয়া আসিয়াছে—কেহই কিছু সঙ্গে আনে নাই। বহু অন্বেষণে এক বালকের নিকট পাঁচখানি মাত্র কটি ও দুইটি ক্ষুদ্র মৎস্য মিলিল। আর কাহারও নিকট কিছুই ছিল না। যিশু তখন সেই বালকের নিকট হইতে সেই রুটি পাঁচখানি ও মৎস্য দুইটি চাহিয়া লইলেন। আদেশক্রমে শিষ্যেরা সেই পাঁচ সহস্র লােককে সেই প্রান্তরমধ্যে দলে দলে বসাইল । যিশু সেই রুটি ও মৎস্য খণ্ড খণ্ড করিয়া শিষ্যদের হস্তে দিলেন—শিষ্যের সকলকে পরিবেষণ করিয়া খাওয়াইতে লাগিল। যখন যখন সকলের সকলের পরিতৃপ্তরূপে ভােজন শেষ হইয়া গেল—তখনও বিস্তর রুটি ও মৎস্য উদ্বৃত্ত রহিল।
ষিত
সকল লােক চমৎকৃত হইয়া সমস্বরে চীৎকার করিয়া
উঠিল—“ইনিই সেই শাকথিত মেসায়া ( অবতার)।
কখনও এরূপ কাৰ্য্য করিতে পারে না। ইহাকে আমরা রাজা
করিব। ইনি স্বীকার না করিলেও জোর করিয়া ইহাকে মাথায়
তুলিয়া লইব-সিংহাসনে বসাইব। ইনিই ইহুদীদের প্রকৃত
রাজা। হেরড, এ্যাম্মিপাসকে এখনই আমরা সিংহাসন
হইতে নামাইব।”
যােড় মান্না রুটি সেই উত্তেজিত জনসঘের মনােভাব অবগত হইয়া, যিশু তৎক্ষণাৎ কঠোরস্বরে তাহাদের নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতে বলিলেন এবং শিষদিগকে আদেশ করিলেন যে, তাঁহাকে সেইখানে একাকী রাখিয়া; তাহারা নৌকাযােগে আবার ‘কপারনিয়ামে’ ফিরিয়া যাউক। যিশুকে রাজা করিবার ইচ্ছা জনসঙ্রে মনে ঐকান্তিক প্রবল হইলেও, তাঁহার এমনই শক্তি ছিল যে, তাহার আদেশ কেহই অমান্য করিতে পারিল না। সকলেই ভগ্নমনে কপার- নিয়াম অভিমুখে ফিরিল। শিষ্যেরা কেবল নৌকারােহণে প্রত্যাবর্তন করিল। যিশু একাকী সেইখানে পরিত্যক্ত হইয়া নিকটস্থ পৰ্বতে উঠিয়া প্রার্থনায় মগ্ন হইলেন। শিষ্যদের এবার বড় কষ্ট হইল। নৌকাৱােহণে ফরিয়া যাইতে যাইতে তাহাদের প্রাণ উদাস হইয়া উঠিল। যিশু সঙ্গে নাই—তাহার দশদিক্ শূন্য দেখিল, তাহাদের প্রাণের ভিতর হাহাকার উঠিল। কি করিবে? ক্ষুন্নমনে নীরবে তাহারা প্রভুর আদেশ পালন করিতে লাগিল।
যিশুখৃষ্ট
সহসা বিষম তুফান উঠিল। প্রকাণ্ড ঢেউ উঠিয়া ক্ষুদ্র
নৌকাখানিকে ভয়ানক আছড়াইতে লাগিল। রজনীর অন্ধকারে
চতুর্দি আচ্ছন্ন। তথাপি সেই অন্ধকার ভেদ করিয়া দূরে
পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গের চূড়ায় তূলার ন্যায় শুভ্র ফেনরাশি দৃষ্ট
হইতেছিল। সেই অন্ধকার সাগরবক্ষে সে-দৃশ্য অতি ভয়াবহ।
পূৰ্ব্ববারে তাহারা প্রভুর সঙ্গে ছিল, এবার তাহারা অনাথ,
একক। কে রক্ষা করিবে-এবার প্রাণনাশ নিশ্চিত।
প্রতি মুহূর্তেই ক্ষুদ্র নৌকাখানি জলমগ্ন হইবার উপক্রম
হইতেছিল। তখন সকলে প্রাণভয়ে উচ্চৈঃস্বরে ডাকিল
“কোথায় আছ প্রভু!
আমরা মরিএক্ষা কর।”
সহসা সকলে আশ্চর্য হইয়া দেখিল, সেই উত্তাল
তরঙ্গসংক্ষুব্ধ প্রচণ্ড সাগরবক্ষে ভীষণ তুফান উপেক্ষা করিয়া,
নৈশ অন্ধকারে মিশিয়া কে একজন দীর্ঘাকৃতি পুরুষ অবাধে
হাঁটিয়া তাহাদের নৌকার অভিমুখে আসিতেছে! সকলেই
তাহাকে প্রেতযােনি মনে করিয়া ভীত হইল; কিন্তু পরক্ষণেই
তাহাদের চিরপরিচিত প্রভুর কণ্ঠস্বর শ্রুত হইল। সকলেই
চমৎকৃত হইয়া চাহিয়া রহিল—যিশুই সাগরবক্ষে অবলীলাক্রমে
হাঁটিয়া আসিতেছিলেন ! যিশু নৌকায় পা দিতেই তুফান
থামিয়া গেল-সমুদ্ৰ স্থির হইল
প্রাতঃকালে কপার-নিয়ামে আসিতেই এক মহা বিপত্তি
আরম্ভ হইল। রাত্রে যিশুর নিকট হইতে আদিষ্ট হইয়া যে
যিশুখৃষ্ট
“পাঁচ সহস্র
লােক কপার-নিয়ামে ফিরিয়াছিল তাহারা
তাহাদিগের ভােজনের অত্যদ্ভুত ব্যাপার রাত্ৰিমধ্যেই দেশময়
রাষ্ট্র করিয়াছিল। এক্ষণে আরও বহু লােক তাহাদের সঙ্গে
জুটিল। তাহারা বলিল-“আমরা ত ওই ব্যাপার প্রত্যক্ষ
করি নাই। তিনি আমাদিগকে অন্য প্রমাণ দিউন যে, তিনি
ঈশ্বর-পুত্র, স্বর্গ হইতে আসিয়াছেন। তিনি আমাদিগকে স্বর্গের
রুটি ( মান্না) আনাইয়া ভােজন করান-আমরা তাঁহাকে রাজা
করিব।”
যাহারা ইতিপূর্বে ভােজন করিয়া আসিয়াছিল, সেই পাঁচ
হাজার লোেকও স্বর্গীয় দেবভােগ (মান্না রুটি ) খাইবার লােভ
সংবরণ করিতে পারিল না। পাঁচখানি রুটিদ্বারা পাঁচ হাজার
লােক খাওয়ান তাহারা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল—নিজেরাই খাইয়া
আসিয়াছে। সুতরাং মান্না রুটি আনিয়া খাওয়ান যে যিশুর
পক্ষে আদৌ কঠিন কাৰ্য্য নহে তাহা তাহারা জানিত এবং
চাহিলেই যে করুণাময় যিশু তাহাদের অভিলাষ পূর্ণ করিবেন,
তাহাও তাহাদের বিশ্বাস হইল।
তখন অন্য সকল বিষয় ভুলিয়া সেই বিপুল জনমণ্ডলী মান্না
রুটি খাইবার লােভে যিশুর প্রত্যাগমন প্রতীক্ষা করিতে
লাগিল। তাহাদের আর কোনকিছুর প্রতি দৃষ্টি বা লক্ষ্য
রহিল না। সকলেই উম্মত্তের ন্যায় ‘মান্না রুটি, মান্না
করিতে লাগিল।
৬৩
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
দেবাদে
যিশু যখন কিছুতেই মান্না রুটি খাওয়াইয়া তাহাদের
রাজা হইতে রাজী হইলেন না, তখন
তন সেই অকৃতজ্ঞ
জনস নিরাশ হইয়া ক্ষেপিয়া উঠিল। সকলেই তাঁহাকে
পরিত্যাগ করিয়া গেল—এমন কি তাঁহার প্রিয় শিষ্যেরাও
ইতস্ততঃ করিতে লাগিল।
তিনি পূৰ্বেই বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, তাঁহার সময়
ফুরাইয়া আসিয়াছে। তিনি করুণস্বরে শিষ্যদের জিজ্ঞাসা
করিলেন—“তােমরাও কি অন্য সকলের মত আমাকে পরিত্যাগ
করিয়া যাইবে ?”
পিটার বলিল—“আমরা দ্বাদশজন আপনাকে ছাড়িয়া
কোথায় যাইব প্রভু? আমরা নিশ্চিত জানিয়াছি—আপনিই
ঈশ্বর-পুত্র-অবতার খৃষ্ট।”
যিশু বলিলেন—“আমি তােমাদের দ্বাদশজনকে বাছিয়া
লইয়াছি, কিন্তু ইহার মধ্যে একজন সয়তান আছে। সে-ই
আমার মৃত্যুর কারণ হইবে।”
যিশুর কথা শুনিয়া সকলে সভয়ে পরস্পরের মুখাবলােকন
করিতে লাগিল।
৬৪
যিশুখৃষ্ট
যিশুর তিন বৎসরের গ্যালিলির রাজত্ব ফুরাইয়া আসিল।
ফরিশি ওমরাহ, পুরােহিতদল এবং আইনজ্ঞেরা পূৰ্ব্ব হইতেই
তঁাহার বিনাশের মন্ত্রণা করিতেছিল। এক্ষণে অকৃত
জনসাধারণ মান্না রুটি খাইতে না পাইয়া এবং তাহাকে রাজা
করিতে না পারিয়া, ব্যথিতহৃদয়ে তাহাকে পরিত্যাগ করিল।
তিনি বুঝিলেন তাহার সময় ফুরাইয়া আসিয়াছে। অতএব,
তাঁহার দ্বাদশজন শিষ্যকে তাহার অবর্তমানে প্রচারকার্যের
উপযােগী করিবার জন্য, তাহাদিগকে সঙ্গে লইয়া ‘
হাম
পর্বতের নিম্নে অবস্থান করিলেন। সমস্ত প্যালেস্টাইনের
মধ্যে সেই স্থানের দৃশ্য সর্বাপেক্ষা মনােরম।
সেই মনােরম নির্জন প্রকৃতির ক্রোড়ে যিশু সর্বপ্রথম
শিষ্যদের নিকট ক্রুশে আপনার আগত মৃত্যু ও পুনরুত্থানের
বিষয় ব্যক্ত করিলেন। শিষ্যের শুনিয়া মর্মাহত হইল ।
তখন তিনি পিটার, জন্ ও জেম্স্ নামক শিষ্যত্রয়কে সঙ্গে
লইয়া সহস্রাধিক ফুট উচ্চ সেই পৰ্বতের উপর উঠিতে
লাগিলেন। অন্য নয়জন নিয়ে অপেক্ষা করিতে লাগিল।
পর্বতের শিখরদেশ বরফাচ্ছন্ন আকাশের
মিশিয়াছে। সেইখানে উঠিয়া যিশু প্রার্থনায় মগ্ন হইলেন।
শিষ্যত্ৰয় মােহাচ্ছন্নবৎ নিৰ্বাক্ হইয়া বসিয়া রহিল।
সহসা স্বর্গ হইতে এক দিব্য আলােক নামিয়া যিশুর
চতুর্দিক ঘিরিল। সে আলােক সূর্যের নহে—চন্দ্রের নহে—
যিশষ্ট নক্ষত্রের নহে—অগ্নির নহে; আলােক অতি স্নিগ্ধ অথচ অত্যন্ত উজ্জ্বল। শিষ্যত্রয়ের নয়ন ধাঁধিয়া গেল। তাহারা দেখিল—সেই আলােকে স্বর্গ হইতে দুই সিদ্ধাত্মা, মােসেস ও এলিয়াস নামিয়া আসিয়া যিশুর সঙ্গে কথা কহিতেছেন। যিশু সত্বর জেরুজালেমে গমন ও তঁাহার ভাবী মৃত্যুর কথা সঁহাদিগকে বলিতেছেন। শিষ্যত্রয় মহাভয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া প্রণাম করিল। তখনই একখণ্ড কৃষ্ণ-মেঘ সেই অপূৰ্ব আলােকরাশি ঢাকিয়া ফেলিল। সিদ্ধাত্মা দুইজনকে আর দৃষ্ট হইল না। সেই মেঘমধ্য হইতে মেঘের ন্যায় গম্ভীর স্বরে কে বলিল- “এই আমার প্রিয়তম পুত্র, ইহার উপর আমি বড় প্রীত, তােমরা ইহার অনুগত হও।” মৃত্যুর পর যিশু যতদিন না পুনরুত্থিত হন, ততদিন পৰ্যন্ত কাহারও নিকটে একথা প্রকাশ করিতে তিনি শিষ্যত্রয়কে নিষেধ করিয়া দিলেন। তখন
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
ষড়যন্ত্র
•
আবার জেরুজালেমে বাৎসরিক ‘নব-জীবনের উৎসবের
দিন আসিল। যিশু স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিবার
জন্য জীবনে শেষবারের মত জেরুজালেম অভিমুখে চলিলেন
তাঁহার যন্ত্রণাময় মৃত্যুতে শিষ্যগণকে, ধৈৰ্য্য ধারণের
সৰ্ব্বদাই নানারূপ শিক্ষা ও উপদেশ দান করিতে লাগিলেন।
জেরূজালেমের পার্শ্বেই পর্বতমালা। তাহারই
গাত্রোপরি সহর নির্মিত। সহর হইতে অল্পদূরে পৰ্ব্বতের
একাংশের নাম ‘জলপাই-পৰ্বত'। সেই স্থান জলপাই বৃক্ষসমূহে
ও অন্যান্য বিবিধ বৃক্ষ ও পুষ্পে সৰ্ব্বদাই প্রফুল্ল।
প্রফুল্ল। স্থানটি
বড় নির্জন, শান্তিময় ও আরামপ্রদ।
সশিষ্য যিশু সেই স্থানে আশ্রয় লইলেন।
তৎপরে তিনি
সেখান হইতে জেরূজালেমের মন্দিরে গিয়া শিক্ষা ও উপদেশ
দিতে আরম্ভ করিলেন।
ইহুদী জাতির মনের দৃঢ়তা ছিল না—তাহা প্রতিমুহূর্তেই
পরিবর্তিত হইত। পূৰ্ব্ব হইতে, তাহার উপদেশ শুনিয়া এবং
ভূরি
ভূরি অলৌকিক
কাৰ্যকলাপ দেখিয়া, সকলেই
৬৭
যিশুখৃষ্ট ‘ঈশ্বর-পুত্র’ ( অবতার) ভাবিয়া তাহাকে পূজা করিয়াছিল । যিশু নিজে রাজা হইতে ও তাহাদিগকে মান্না রুটি খাওয়াইতে অস্বীকার করায়, তাহারাই আবার তঁাহার বিদ্রোহী হইয়াছিল। এক্ষণে সহসা আবার তাঁহাকে দেখিয়া সকলেই তঁাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিল। পুরােহিতো, আইন-পরিচালকেরা এবং ফরিশি ওমরাহের এবার বড় ভীত হইল। দিন দিন যিশুর প্রতাপ যেরূপ বৰ্ধিত হইতে লাগিল, তাহাতে তাহারা আর নিশ্চিন্তে চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। প্রত্যেকেই আপন ক্ষমতা ও অধিকার লােপের ভয়ে চিন্তিত হইল। তাহাদের আহার- নিদ্রা ঘুচিয়া গেল। কিরূপে যিশুকে নষ্ট করিবে—সকলেই দিবানিশি সেই চেষ্টায় ফিরিতে লাগিল; কিন্তু কেহই কিছু স্থির করিয়া উঠিতে পারিল না। সেই সময়ে ‘মার্থা ও মেরীদের’ বাটী ছাড়িয়া কয়েক দিনের জন্য যিশু স্থানান্তরে গিয়াছিলেন। তাঁহার অনুপস্থিতিকালে মাথা ও মেরীর ভ্রাতা লেজাবস মরিয়া গিয়াছিল । লেজারসের মৃত্যুর চারিদিন পরে যিশু ফিরিয়া আসিয়া কবর হইতে লেজারসকে জীবিত করিয়া উঠাইয়া আনিলেন। এই সংবাদ ত্বরিতে চতুর্দিকে রাষ্ট্র হইয়া গেল। পুরােহিত, আইন- পরিচালক ও ওমরাহদিগের ভয় চতুগুণ বৃদ্ধি পাইল । সেই সময়ে যিশু আরও কতিপয় অন্ধের চক্ষু দান করিলেন । ; ৬৮
যিশুখৃষ্ট
ওমরাহের যাহাদিগকে ‘ছােটলােক ও পাপী বলিয়া নাসিকা
কুঞ্চিত করিত, যিশু তাহাদের সঙ্গে একত্রে ভােজন ও ভ্রমণ
করিতেন। তিনি বলিতেন—“নীরােগদের চিকিৎসকের আবশ্যক
নাই, যাহারা রােগী-চিকিৎসক তাহাদেরই জন্য।” তিনি
আরও বলিতেন যে, তিনি গরীব-দুঃখী ও পাপী-তাপীর
পরিত্রাণের জন্যই আসিয়াছেন।
তখন উৎসব উপলক্ষে দূর-দূরান্ত হইতে লক্ষ লক্ষ লােক
জেরুজালেমে সমাগত হইয়াছে। চাক্ষুষ এই সকল অলৌকিক
ঘটনা দর্শনে বিপুল জন প্রবাহ যেমন তাহার প্রতি আকৃষ্ট
হইতে লাগিল, পুরােহিত প্রভৃতিদের আশঙ্কাও সেই পরিমাণে
বাড়িতে লাগিল। তাহারা প্রকাশ্যে যিশুকে কিছু বলিতে
সাহস পাইল না। কারণ সেরূপ করিলে সেই উন্মত্ত জনসঘ
বিদ্রোহী হইয়া তাহাদিগকেই নষ্ট করিয়া ফেলিবে। তাহারা
যিশুর বিরুদ্ধে প্রথমে দেশবাসীকে বিধিমতে উত্তেজিত করিবার
প্রয়াস পাইল, কিন্তু তাহাতে ফল হইল না। তখন তাহারা
যিশুর কথার প্যাচ ধরিয়া তদ্দারা যিশুকে অপরাধী করিবার
চেষ্টা পাইল; কিন্তু যিশু তাহাতে সকলকে পরাজিত করিলেন।
তখন তাহারা নিরাশহৃদয়ে মহাশঙ্কিত হইয়া গুপ্তসভার
অধিবেশন করিতে লাগিল। সেই সভায়—রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের
কর্তা—প্রধান পুরােহিত ‘কৈয়াকা’ বলিল—“যেরূপেই
হউক—যত প্রকার অসৎ উপায়েই হউক-অবিলম্বে যিশুকে
যিশুখৃষ্ট
হত্যা করিতে হইবে, নচেৎ আমাদের নিস্তার নাই।
তােমর মিথ্যা সাক্ষী সংগ্রহ কর এবং যিশুকে নিভৃতে
ধরাইবার জন্য পুরস্কার ঘােষণা কর।”
কাৰ্যও সেইরূপ হইল। মিথ্যাসাক্ষী সংগৃহীত এবং
পুরস্কার ঘােষিত হইল ; কিন্তু কেহই যিশুকে ধরাইয়া
দিল না।
উৎসব সময়ে প্রতিদিনই যিশু জলপাই-পৰ্বত হইতে
জেরূজালেমে আসিতেন এবং শিক্ষা ও উপদেশ প্রভৃতি প্রদান
করিয়া আবার ফিরিয়া যাইতেন। সকল সময়েই তিনি সহস্র
সহস্র লােকে পরিবৃত থাকিতেন বলিয়া পুরােহিত প্রভৃতির।
তাহার শরীরে হস্তক্ষেপ করিতে সাহসী হয় নাই। তাহারা
স্থির করিল যে, উৎসবান্তে রজনীযােগে এ কাৰ্য্য সমাধা করিতে
হইবে।
যিশু ইচ্ছা করিলেই জেরুজালেম হইতে অবলীলাক্রমে
পলাইয়া আত্মরক্ষা করিতে পারিতেন, অথবা ইঙ্গিত প্রকাশেই
ইহুদীদের রাজা হইতে পারিতেন; কিন্তু তিনি তাহা করিলেন
। পার্থিব ধনসম্পদরাজ্য যে স্বর্গরাজ্য-প্রাপ্তির প্রধান
অন্তরায়, তাহা তিনি সকল প্রকারে দেখাইয়া গেলেন। “যে
দীনহীন, সে-ই স্বর্গরাজ্যের অধিকারী।”—ইহা তিনি সকলকে
বুঝাইয়াছিলেন। তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন
এবং শিষ্যগণকেও প্রস্তুত করিয়া তুলিতে লাগিলেন।
;
৭০
যিশুখৃষ্ট উৎসবের শেষদিন শিষ্যগণে পরিবৃত হইয়া শেষ ভােজনকালে যিশু বলিলেন-“আমার সময় নিকটবর্তী হইতেছে। তােমাদেরই দ্বাদশজনের মধ্যে একজন বিশ্বাস- ঘাতকতাপূৰ্ব্বক আমাকে ধরাইয়া দিবে।” সকলেই অত্যন্ত বিচলিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল—“প্রভু, আমি কি ?” কিন্তু তিনি এমন সঙ্কেত দ্বারা ‘জুডাস্-ইসকেরিয়টের নাম করিলেন যে, তখন কেহই তাহা বুঝিতে পারিল না। তিনি পুনঃ পুনঃ বলিতে লাগিলেন-“আমার তিনটি আদেশ সৰ্ব্বদা সযত্নে মনে রাখিও ‘প্রেম, দান ও দয়া।” ভােজনান্তে জুডাস্-ইসকেরিয়টু সহসা কাৰ্যব্যপদেশে উঠিয়া গেল। অন্যান্য শিষ্যেরা ভাবিল-জুডাস্ বুঝি প্রভুর কোন আদেশ প্রতিপালন করিতে গমন কবিল। হায় জুডাস্! তখন সয়তান তাহার সমস্ত হৃদয়টুকু অধিকার করিয়া বসিয়াছিল। যিশু শিষ্যগণে পরিবৃত হইয়া আবার জলপাই-পৰ্বতে গমন করিলেন ।
উনবিংশ পরিচ্ছেদ
আত্মজান
বহুক্ষণ সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে, রজনীর অন্ধকারে
পৃথিবী ছাইয়া ফেলিয়াছে। জেরুজালেমের প্রধান পুরােহিত
কৈয়াকাসের বাটীতে এক বৃহৎ গুপ্তসভা বসিয়া গিয়াছে।
রাজ্যের যত বড়লােক একত্রিত হইয়াছে। উজ্জ্বল আলােকে
নৃশংসদের বিবর্ণ
মুখে, জিঘাংসার আভা উদ্ভাসিত হইয়া নরকের
অনুচরবৃন্দের ন্যায় অতি বীভৎস দেখাইতেছিল।
সহসা জুডাস্-ইসূকেরিয়ট তথায় উপস্থিত হইয়া পরিচয়
দিল যে, সে যিশুর দ্বাদশজন নির্বাচিত প্রিয়শিষ্যের মধ্যে
একজন। সভাস্থ সকলেই আশ্চর্য্য হইয়া তাহার মুখপানে
চাহিল।
এমন সময়ে সহসা এস্থানে তাহার আগমনের কারণ
কেহই বুঝিয়া উঠিতে পারিল না।
তখন আর কালবিলম্ব না করিয়া সয়তান তাহার গুপ্ত
অভিসন্ধি ব্যক্ত করিল-“আমি যদি আমার প্রভুকে অদ্য
রাত্রেই ধরাইয়া দি, তবে সেই কাৰ্য্যের নিমিত্ত আমাকে কত
টাকা দিবেন?”
সভাস্থ লােকেরা তখন তাহাকে মহা আদর-অভ্যর্থনা
৭২
যিশুখৃঃ ; করিতে লাগিল। পরিশেষে ত্রিশটি মাত্র রৌপ্যমুদ্রায় একাৰ্য্যের চুক্তি হইয়া গেল ! বিশ্বাস-ঘাতক জুডা ত্রিশটি মুদ্রা গণিয়া লইল ; তৎপরে মহাসভার প্রদত্ত পাঁচ শত সৈন্য সঙ্গে লইয়া নিরস্ত্র নিঃসহায় নিব্বিবােধ যিশুকে ধরিবার অভিপ্রায়ে জলপাই-পৰ্বতের অভিমুখে গমন করিল। সৈন্য- গণের সহিত এইরূপ ইঙ্গিত রহিল যে, জুডাস্ গিয়া যে ব্যক্তিকে চুম্বন করিবে—তিনিই যিশুখৃষ্ট। তাহাবা অবিলম্বে তাহাকে বাঁধিবে । এদিকে সন্ধ্যার পরই সশিষ্য যিশু জলপাই-পৰ্বতে গমন করিয়াছিলেন । ২তই রাত্রি বাড়িতে লাগিল তাহার সময় নিকটস্থ বলিয়া তিনি শিষ্যগণকে দৃঢ়চিত্ত করিতে লাগিলেন এবং প্রলােভনের হাত এড়াইবার জন্য তাহাদিগকে প্রার্থনা কবিতে বলিলেন। তৎপরে শিষ্যদের নিকট হইতে কিঞ্চিৎ দূরে গিয়া হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া তিনি ঐকান্তিক মনে প্রার্থনা করিতে লাগিলেন- “হে পিতঃ ! যদি তুমি ইচ্ছা কর তবে এ যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হইতে আমাকে বক্ষা করিতে পার।” পরক্ষণেই তিনি আবার বলিলেন—“না, না, তােমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।” তখন স্বর্গ হইতে এক দেবদূত নামিয়া আসিয়া, হাব অন্তরে বল সঞ্চারিত করিয়া দিল। তিনি উঠিয়া আসিয়া দেখিলেন যে, তঁাহার শিষ্যেরা তঁাহার বিয়ােগজনিত ভাবী দুঃখের আতিশয্যে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। তিনি তাহাদিগকে যিশুখৃষ্ট বলিলেন—“ঘুমাইতেছ কেন? যাহাতে প্রলােভনে পড়িতে হয়, তজ্জন্য প্রার্থনা কর।” কিয়ৎক্ষণ পরে প্রার্থনারত যিশু হঠাৎ বলিলেন--“সময় হইয়াছে, ঈশ্বর-পুত্র বিশ্বাসঘাতক কর্তৃক পাপীদের হস্তে অর্পিত হইল দেখ।” সেই সময়ে অদূরে অস্ত্র-ঝনঝনা শ্রুত হইল। সকলেই আশ্চর্যের সহিত দেখিল—একদল সশস্ত্র সৈন্য আসিতেছে। হঠাৎ সেই সৈন্যদলের মধ্য হইতে এক ব্যক্তি চীৎকার করিয়া উঠিল—“প্রভু প্রভু” এবং পরমুহূর্তে জুডাস্-ইস্ক- রিয় আসিয়া যিশুকে চুম্বন করিল। যিশু তখন স্থির, ধীব-জগদীশ্বরের হস্তে আত্মসমর্পন করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছেন। তঁাহাব হৃদয়ে অপরিমিত বল এবং বদনে অপূৰ্ব্ব স্বর্গীয় ভাতি বিকশিত হইতেছিল। তিনি ঈষৎ হাসিয়া জুড়াকে বলিলেন-“স্নেহের অমৃতচুম্বনকে বিশ্বাস- ঘাতকতায় কলঙ্কিত করিলে?” পরক্ষণেই সৈন্যগণের পানে ফিবিয়া বলিলেন-“তােমরা কাহাকে চাও ?” তাহারা বলিল—“ন্যাজারেথের যিশুকে।” —“আমিই সেই—আমাকে লইয়া যাও।” সৈন্যেরা কিন্তু কেহই অগ্রসর হইতে সাহসী হইল না। যিশুর অচঞ্চল অপরূপ স্থৈৰ্য্যের মধ্যে কি এক দেবভাব মিশ্রিত ছিল যে, সৈন্যরা তাহাকে স্পর্শ করিতে ভীত হইল, ৭৪
তখন
যিশুখৃষ্ট
সকলেই পশ্চাৎ হাঁটিয়া গিয়া মৃত্তিকা স্পর্শ করিয়া তাহাকে
অভিবাদন করিল। যিশু পুনঃ পুনঃ তাহাদিগকে
বলিলেন-“সময় হইয়াছে, আমাকে লইয়া চল, আমার
শিষ্যদিগকে কিছু বলিও না।”
তখন সাহস পাইয়া সৈন্যেরা আসিয়া তাহাকে ধরিল।
যে ব্যক্তি যিশুর অঙ্গে প্রথম হস্তাৰ্পণ করিয়াছিল, ठोर
পার্শ্ব হইতে পিটার তরবারি দ্বারা তাহার কর্ণমূলে আঘাত
করিল-কান কাটিয়া পড়িল। তদ্দর্শনে যিশু, পিটারকে
তরবারি পরিত্যাগ করিতে বলিয়া, আহত ব্যক্তির কর্ণমূলে
হস্ত প্রদান করিলেন—তৎক্ষণাৎ কর্ণ জুড়িয়া সে স্বাভাবিক
অবস্থা প্রাপ্ত হইল ।
যিশুকে লইয়া সৈন্যগণ মহাসভায় উপস্থিত করিল।
শিষ্যদের মধ্যে পিটার ও জন সঙ্গে আসিল ; অন্য সকল
সেই পৰ্বত হইতে চলিয়া গেল।
সেই মহাসভাকে ‘সেহেদ্রি বলিত। সেই সভাই
দেশের দণ্ডমুণ্ডের
কর্তা ছিল—যাহা ইচ্ছা করিতে
পারিত।
সেই মহাসভায়—নিরপরাধ যিশুর বিচারের যে প্রহসন
হইয়াছিল, তাহা বিস্তারিত লিখিয়া লেখনীকে কলঙ্কিত
করিতে ইচ্ছা করি না। কোনও মতে উৎকোচ প্রদানে প্রস্তুত
দুইটি মিথ্যাসাক্ষীর সাহায্যে যা তা করিয়া যিশুকে বিদ্রোহী
;
৭৫
যিশুখৃষ্ট
সাব্যস্ত করা হইল এবং অতি ত্বরিতে ক্রুশে বিদ্ধপূৰ্ব্বক তাহার
প্রাণদণ্ডের আদেশ প্রদান করা হইল।
সৈন্যেরা তাঁহার সর্বাঙ্গে থু থু দিতে দিতে এবং তাহাকে
নানারূপ প্রহার ও কদৰ্য গালি দিতে দিতে, মৃত্যুদণ্ড মঞ্জুরের
রােমীয় শাসনকর্তা পাইলেটের নিকট উপস্থিত
করিল।
বিংশ পরিচ্ছেদ লীলা-শেষ যিশুকে দেখিয়া রােমীয় শাসনকর্তা পাইলেটের মনে কি হইল বলিতে পারি না ;—তিনি কিছুতেই যিশুকে দোষী সাব্যস্ত করিতে পারিলেন না। যিশুকে যিশুকে দুই-চারিটি কথা জিজ্ঞাসা করিয়া ও তাহার উত্তর পাইয়া তাহার উপর পাইলেটের দঢ় ভক্তি ও বিশ্বাস হইল। তিনি স্পষ্টাক্ষরে বাবংবার সকলের সম্মুখে বলিলেন-“এ ব্যক্তি নির্দোষ, আমি ইহার প্রাণদণ্ডাজ্ঞা দিতে পারিব না।” তখন তাহাকে ইহুদীদের রাজা হেরড এ্যান্টিপাশের নিকট উপস্থিত করা হইল। তিনিও যিশুর প্রশান্ত মূর্তি দেখিয়া তাঁহার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা দিতে সাহসী হইলেন না, পুনরায় তঁহাকে পাইলেটের নিকট প্রেরণ করিলেন । পাইলেট বারংবার সকলের সমক্ষে উচ্চকণ্ঠে বলিলেন- “যিশু নির্দোষ।” উন্মত্ত ওমরাহের দল পাইলেটের কথা কানে তুলিল না। সকলে উত্তেজিত হইয়া চীৎকার করিতে লাগিল—“আমরা কোন কথা শুনিব না, ইহাকে ক্রুশে চড়াইয়া মার—নচেৎ ৭৭
যিশুখৃষ্ট
সুতরাং এই
তুমিও ইহার দলস্থ একজন রাজদ্রোহী বলিয়া আমরা সম্রাট
সিজারের নিকট নালিশ করিব।”
পাইলেট ইচ্ছা করিলেই যিশুকে অনায়াসে মুক্তি দিতে
পারিতেন, কিন্তু রাজ্যের প্রধান প্রধান ব্যক্তিবর্গের মনােভাব
অবগত হইয়া তিনি তাহাতে সাহস করিলেন না। তিনি
বারিপাত্র আনাইয়া সর্বসমক্ষে আপন হস্তদ্বয় প্রক্ষালন
করিলেন এবং উচ্চকণ্ঠে সকলকে বলিলেন—“এ ব্যক্তি সম্পূর্ণ
নির্দোষ, আমি ইহার মৃত্যুদণ্ড দিতে পারি না, কেবল তােমাদের
আদেশমত আমি দণ্ড দিতে বাধ্য হইলাম।
নির্দোষের রক্তপাতের জন্য আমি অপরাধী নহি।”
দণ্ডাজ্ঞা প্রচার হইতে না হইতেই নারকীরা সেই মহাপুরুষকে
টানিয়া বাহিরে আনিল ; তঁাহাকে বেগুনী রঙ্গের পােষাকে
সজ্জিত করিয়া তাঁহার মস্তকে কন্টকময় মুকুট পরাইয়া দিল।
তৎপরে প্রকাণ্ড কাষ্ঠনির্মিত ভারী ক্রুশ তাহার স্কন্ধে চাপাইয়া,
নানা প্রকার নির্যাতন করিয়া—দুই পার্শ্বে দুইজন মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা-
প্রাপ্ত চোরের মধ্যবর্তী করিয়া, তাহাকে বধ্যভূমিতে লইয়া
যাওয়া হইল।
মহাপুরুষ ধীর স্থির প্রশান্তবদনে সমস্ত অত্যাচার, সকল
উৎপীড়ন অনায়াসে সহ করিতে করিতে চলিলেন। তিনি
কেবল প্রার্থনা করিতেছিলেন-“হে পিতঃ ! ইহাদিগকে
ক্ষমা কর—ইহারা জানে না যে, কি কাৰ্য্য করিতেছে।”
৭৮
যিশুখৃষ্ট পামরেরা তখন তাঁহার বস্ত্রাদি কাড়িয়া লইয়া তাঁহাকে কুশে বিদ্ধ করিতে লাগিল। চতুর্দিকের বহু লােক সেই নৃশংস দৃশ্য দেখিতে আসিয়াছিল। অধিকাংশ লােকের চক্ষুই জলপূর্ণ ছিল। স্ত্রীলােকেরা অত্যন্ত মর্মাহত হইয়া রােদন করিতেছিল। তন্মধ্যে ন্যাজারেথ হইতে যিশুর আত্মীয়গণ ও তাহার মাতা মেরীও আসিয়াছিলেন। মেরীর তখনকার অবস্থা অবর্ণনীয়। তাঁহার দিকে দৃষ্টিপাত মাত্র যিশু জনকে দেখাইয়া বলিলেন-“ওই দেখ, তােমার পুত্র।” তৎপর মাতাকে দেখাইয়া জনকে বলিলেন-“ওই দেখ, তােমার মাতা।” সেই সময় হইতে জন্ মেরীকে আপন আবাসে লইয়া গিয়া—মাতার ন্যায় যত্নে রাখিলেন। যিশুর সঙ্গে যে দুইজন চোরের মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা হইয়াছিল, তাহাদের একজন বলিয়া উঠিল—“যদি তুমি যথার্থই খৃষ্ট, তবে আপনাকে ও আমাদিগকে রক্ষা কর।” কিন্তু তৎক্ষণাৎ দ্বিতীয় চোর তাহাকে ধমকাইয়া বলিল—“চুপ, ঈশ্বরকে ভয় করিস্ না? আমরা দোষী, ন্যায়মতেই সাজা পাইতেছি, কিন্তু ইনি নির্দোষ।” তৎপরে যিশুর দিকে ফিরিয়া সে বলিল— “প্রভু, আপনি যখন আপন রাজ্যে প্রবেশ করিবেন, এ দীন- হীন অপরাধীর কথা তখন স্মরণ রাখিবেন।” যিশু সেই অনুতপ্ত চোরের প্রতি আশাতিরিক্ত সদয় উত্তর ৭১
যিশুখৃষ্ট
করিলেন—“তােমাকে নিশ্চিত বলিতেছি, অদ্য আমার সহিত
তুমি স্বর্গে গমন করিবে।” তৎপরে তিনি অত্যন্ত আবেগভরে
চীৎকার করিয়া উঠিলেন—“হে ঈশ্বর, হে ঈশ্বর, কেন তুমি
আমাকে এ সময় পরিত্যাগ করিতেছ ?” তৎপরেই তিনি
আবার চীৎকার করিয়া উঠিলেন—“হে
ঈশ্বর, আমি
তৃষ্ণার্ত।”
তখন দিবা দ্বিপ্রহর ; কিন্তু সেই দ্বিপ্রহরেও সহসা
চতুর্দিক ভীষণ অন্ধকারে ছাইয়া ফেলিল—কোলের বস্তুও দেখা
যাইতেছিল না। যাহারা এ ঘটনা দেখিতেছিল—সকলেই
মহাশঙ্কায় অভিভূত হইয়া পড়িল। সেই ভীষণ অন্ধকার ভেদ
করিয়া আবার মহাপুরুষের কণ্ঠধ্বনি উঠিল—“শেষ হইয়াছে।
হে পিতঃ ! তােমার করে আমি আত্মসমর্পন করিলাম।”
সব ফুরাইল। সেই অন্ধকারে
কেহ কিছুই দেখিতে
পাইতেছিল না---কেবল যিশুর শেষ বাক্য শুনিয়াছিল।
তন্মুহূর্তে ভয়ানক ভূমিকম্পে বসুধা শতধা বিদীর্ণ হইবার
উপক্রম হইল এবং সঙ্গে সঙ্গে জিহােভা-মন্দিরের আবরণ মুক্ত
হইয়া গেল। সেই আবরণ বৎসরে একবার মাত্র প্রধান
পুরােহিত কর্তৃক উন্মুক্ত হইত, অন্য কাহারও অধিকার ছিল না।
সেই আবরণ মুক্ত হইবামাত্র বহু কবরদ্বার উদঘাটিত হইল
এবং তথা হইতে বহু সাধুপুরুষের মুক্তাত্মা উখিত হইয়া, সেই
কুশ-পার্শ্বে সমাগত হইল।
৮০
যিশুখৃষ্ট সমবেত জনমণ্ডলী—এমন কি, ওমরাহ, আইন-পরিচালক, পুরােহিতবৃন্দ এবং সৈন্যগণ-মহাভয়ে বিবর্ণ হইয়া পড়িল। সকলেই বুক চাপড়াইয়া হায় হায়’ করিতে লাগিল। তখন সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিল- “ইনি যথার্থই ঈশ্বরের অবতার খৃষ্ট!” গােলগােথা নামক স্থানে জোসেফ, নামে এক ব্যক্তির একটি উদ্যান ছিল। জোসেফ, দেশের একজন বড় ওমরা ও সেহেদ্ৰি মহাসভার সভ্য , কিন্তু তিনি ও নিকোডিমীস এই দুইজন যিশুর বিচারকার্যে যােগ দেন নাই। তঁাহারা শাসনকর্তা পাইলেটের অনুমতি লইয়া জোসেফের সেই উজানে মহাপুরুষের মৃতদেহ বহুসম্মানে কবরস্থ করিলেন এবং সেই কবরের উপরিভাগে এক বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড স্থাপন করিলেন । পাইলেট স্ব-ইচ্ছায় তাহার উপর এই কয়টি কথা খােদিত করিলেন- ইহুদীদিগের প্রকৃত রাজা “যিশুষ্ট” ৮১
পরিশিষ্ট
পুনরুত্থান
মহাপুরুষকে এইরূপ অন্যায় নির্যাতনে হত্যা করিয়াও
সেহেন্ িসভার সভ্যগণের ভয় দূর হইল না। মহাপুরুষ
বলিয়া গিয়াছেন—‘তিন দিন পরে তিনি সশরীরে উঠিবেন।
তাহা হইলেই ত সৰ্ব্বনাশ ! দেশের লােক পূৰ্ব্বাপেক্ষা
অধিকতর বিশ্বাসে তাঁহার পশ্চাতে সমবেত হইবে, তাহাদের
ক্ষমতা একেবারে বিলুপ্ত হইবে । এত অন্যায় করিয়া তাহারা
তবে কি ফল লাভ করিল?
তাহারা তখন শাসনকর্তা পাইলেটকে অনুরােধ করিয়া
মহাপুরুষের কবরের সম্মুখে প্রহরীর বন্দোবস্ত করিয়া দিল।
পাছে তাহার শিষ্যগণ আসিয়া প্রভুর মৃতদেহ কবর হইতে
উঠাইয়া লইয়া যায় ।
তিন দিন পরে রবিবারের প্রত্যুষে কবর-রক্ষক প্রহরী সহসা
সভয়ে দেখিল-কবরের প্রস্তরের উপর দিব্যকাস্তি মহাপুরুষ
যিশু উজ্জল বিভায় চতুর্দি আলােকিত করিয়া দণ্ডায়মান
আছেন ।
৮২
যিশুখৃষ্ট প্রহরীরা মহা আতঙ্কিত হইয়া মূচ্ছিত হইল। যিশু ধীরে ধীরে সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে প্রহরীরা প্রকৃতিস্থ হইয়া প্রধান পুরােহিতের নিকট এই বার্তা জ্ঞাপন করিল। কৈয়াকা ও অপরাপর সকলেই এই সংবাদে মহ ভীত হইয়া ভাবিল-এই সংবাদ নগরমধ্যে রাষ্ট্র হইলে ত এখনই বিষম বিভ্রাট ঘটিবে। তাহারা প্রহরীগণকে বিশেষরূপে সতর্ক করিয়া দিল—যেন এ বার্তা তাহারা ঘুণাক্ষরেও অপর কাহারও নিকট ব্যক্ত না করে। তাহারা বলিবে যে, তাহারা ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, উঠিয়া দেখিল-যিশুর মৃতদেহ কবর হইতে কে চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছে। মেরী নামক এক ধাৰ্ম্মিকা রমণী প্রত্যই সঙ্গিনী-সহ অতি প্রত্যুষে মহাপুরুষের কবর পূজা করিতে আসিত। সেদিন কবর শূন্য দেখিয়া সে মহাভয়ে কঁদিতে কাদিতে মহাপ্রভুর শিষ্যগণের নিকটে দৌড়িয়া গিয়া খবর দিল যে, মহাপুরুষ কবর হইতে অন্তর্হিত হইয়াছেন। হইয়াছেন। এই সংবাদ শ্রবণ করিয়া জন্ ও পিটার প্রভৃতি দ্রুতবেগে তথায় আসিয়া উপস্থিত হইল। হঠাৎ বিদ্যুৎ-ঝলকের দিব্য আলােকে তাহারা দেখিতে পাইল- তাহাদের প্রভু গৌরবমণ্ডিত হইয়া কবর হইতে উঠিয়াছেন। চিনিতে পারিয়া তাহারা মহানন্দে তাহার পদে লুটাইয়া পড়িল। একদিন শিষ্যদের একজন কাৰ্যান্তরে অন্যত্র গিয়াছিল। ৮৩
বিষ্ট
বাকী দশজন মহাপুরুষের শিষ্য একত্রে ভােজনে বসিয়াছিল।
তাহারা দেশের লােকের ভয়ে ভিতর হইতে দ্বার রুদ্ধ করিয়া
দিয়াছিল। সহসা সেই রুদ্ধার্গলের মধ্যে তাহাদের সম্মুখে
মহাপুরুষ আবির্ভূত হইলেন সকলেই প্রেতযােনি মনে
করিয়া মহাভয়ে অস্থির হইয়া উঠিল।
তখন ধীরে ধীরে মহাপুরুষ বলিলেন—“ভীত হইও না।
তােমাদের অন্তর শান্তিপূর্ণ হউক।” এই বলিয়া তিনি হস্ত-পদ
ও অঙ্গের ক্ষত দেখাইয়া পুনরায় বলিলেন—“ এই
দেখ,
আমিই
১
—সেই!”
শিষ্যগণ আনন্দিত হইল। তিনি আহারে বসিয়া রুটি
ছিড়িয়া তাহা আশিল্পূর্ণ করিয়া সকলকে বিতরণ
করিলেন।
দশজন শিষ্য প্রভুর দর্শন পাইল—কিন্তু তখনও একজন
বাকী ছিল। তাহাকে দেখা দিবার জন্য, অষ্টম দিনে তাহাদের
ভােজন-সময়ে রুদ্ধদ্বার কক্ষের মধ্যে তিনি পুনরায় আবির্ভূত
হইলেন। সেদিন তিনি তাহাদিগকে একটি অমূল্য উপদেশ
দিয়া প্রস্থান করিলেন—
“যাহারা চোখে না দেখিয়াও
সরলভাবে বিশ্বাস করে—
তাহারাই ধন্য।”
একদিন সাইমন পিটার ও কতিপয় শিষ্য গ্যালিলি-ত্রুদে
৮৪
।
তখন।
যিশুখৃষ্ট
মৎস্য না পাইয়া ফিরিবার উদ্যোগ করিতেছিল, তখন উয়ার
ছায়ায় অঙ্গ ঢাকিয়া তীর হইতে কে হাঁকিল—“নৌকার দক্ষিণ
পার্শ্বে জাল ফেল।” তাহারা তাহাই করিল।
কি আশ্চর্য্য-এ কি জাল যে প্রচুর ক্ষুদ্র-বৃহৎ মৎস্যে
ভরিয়া গিয়াছে। তখন তাহারা যিশুকে দেখিতে পাইয়া
হ্রদের জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িল এবং সাঁতরাইয়া আসিয়া
মহাপুরুষের পদবন্দনা করিল। যিশু, পৃথিবীতে
শেষবারের মত, সকলের সঙ্গে একত্রে বিদায়-ভােজ খাইতে
বসিলেন।
আহারের শেষে মহাপুরুষ পিটারকে দুইবার জিজ্ঞাসা
করিলেন—“তুমি কি আমাকেই সর্বাপেক্ষা ভালবাস?
পিটার দুইবারই উত্তর দিল—“প্রভু, আপনিই জানেন যে,
আপনাকেই ভালবাসি।”
তখন সন্তুষ্ট হইয়া যিশু তাহাকে বলিলেন-“আমার
মেষশাবকগণকে খাওয়াইও।”
খাওয়াইও।” তৎপরে, পিটারকে, তাহার
ভবিষ্যৎ ভীষণ মৃত্যুর কথা বলিলেন। তাহা শুনিয়া পিটারকে
বিন্দুমাত্রও বিষন্ন দেখা গেল না। প্রভুর জন্য প্রভুর কাৰ্য্যে,
যতই ভীষণ মৃত্যু হউক না—তাহাতে যথার্থ শিষ্যের বিন্দুমাত্রও
দুঃখ বা উৎসাহহীনতা থাকিতে পারে না।
এইরূপে সর্বপ্রকারে ধরায় পাপীত্রাণের জন্য শিষ্যগণকে
প্রস্তুত করিয়া, তিনি সেই হ্রদতীরবর্তী পর্বতে আরােহণ করিতে
৮৫
যিশুখৃষ্ট
লাগিলেন। অতি ক্ষুদ্র উজ্জ্বল বিন্দুর স্যায় মেঘের ক্রোড়ে
তাঁহাকে দেখা যাইতে লাগিল। তারপর একখানি কৃষ্ণমেন্ধে
সহসা সমস্ত আবৃত করিয়া ফেলিল ।
এইরূপে মহাপাতকীদিগের ত্রাণকর্তা যিশুখৃষ্ট ধরার পাপ
আপনার স্কন্ধে বহন করিয়া -অসহ নিৰ্যাতন সহ্য করিয়া
আমাদিগের জন্য স্বর্গে যাইবার দিব্য সােপান নিৰ্মাণ করিয়া
গিয়াছেন।
“যে কেহ তাহাকে বিশ্বাস করিবে,
সে স্বর্গে অন-জীবন
লাভ করিবে।”
SS
in
.
সমাপ্ত
দ
RATARATHI
*
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.