Bally Sadharan Granthagar
Shailakantha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শৈলকণ্ঠ।
শ্রীকৃষ্ণকালী গুহ প্রণীত।
৫
১৩৮
কলিকাতা।
৭৮ নং আমহাষ্ট ধ্রুট, “নিউব্রিটানিয়া” যন্ত্রে
হরিচরণ মান্না কর্তৃক মুদ্রিত।
ঐ-১০:
মূল্য।
আট পেপারে ছাপা, ফুলমকে বাধা, সােণার জলে নাম লেখা-৪
রেশমে
ঐ কাপড়ে ঐ ঐ
মাইরি ফিনিশ, পেপারে ছাপা, কাপড়ে বাথ, সোণার জলে নাম লেখা
কাগজের মলাট
ঐ
?
০ ০ ০
বুক সংখা
ভূখি 376
যে গ্রন্থই লিখ না কেন, তাহার একটা ভূমিকা চাই।
ছিল সে কালের কথা। আজ কাল তাহা বড় আবশ্যক করে
। অধুনা সাহিত্যজগতে যেরূপ বাঙ্গলা গল্প-উল্লাস-নাটিকায়
ছড়াছড়ি হইয়া পড়িয়াছে, তাহাতে এই ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্রকাশ করা
বিড়ম্বনা মাত্র। তবে জানিয়া শুনিয়া এ চেষ্টা কেন ? তাহার
উত্তরে আমরা এইমাত্র বলিতে পারি যে, আমরা যশেম প্রার্থী
এক্ষণে উপন্যাস লিখিয়া “বঙ্কিমচন্দ্র” না হইতে
* 'রিলে কেহ আর তাহার “উজ্জল-মধুর দেখিতে পান না ।
আর কড়ি মধ্যমে (সুর ধরিয়া) “নাচিতে” “নাচাইতে”**
“হেলিতে” “দুলিতে'’ সুর ধরিয়া কেহ মাতাইতে না পারিলে
যশস্বী হইতেও পারেন না। আমরা সমান্য উপকরণে সরল
• ভাষায় এই ক্ষুদ্রউপন্যাস শেষ করিলাম।
নহি।
আমার প্রধান সুহৃদ আগরা ব্যাঙ্কের ভূষ্টপূৰ্ব্ব লেজার-কিপার
বিং “নির্বাপিত-দীপ” প্রণেতা ৩৮ নং, শ্যামবাজার ফ্লীট নিবাসী
বু অমৃতলাল নিয়ােগি • যিনি “শৈলকণ্ঠ” পড়িয়া কত আনন্দ
প্রকাশ করিয়াছিলেন, যিনি পুস্তক প্রকাশের জন্য সর্বদা আমাকে
লিতেন, সেই বন্ধুপ্রবর গত ১৩০৫ সনের ১লা চৈত্র অকালে
চালগ্রাসে পতিত হইয়া আমাদিগকে দুঃখসাগরে ভাসাইয়া
গয়াছেন। এই “শৈলক” পূর্বে প্রকাশ হইলে তাহার কত
আনন্দ হইত।
পরিশেষে “শ্মশান” প্রভৃতি প্রণেতা শ্ৰীযুক্ত বাবু বঙ্কিমবিহারী
সি মহাশয় নিস্বার্থ ভাবে এই পুস্তকের মুদ্রাঙ্কনাদি কার্যের সমস্ত
টার গ্রহণ করিয়াছেন, এবং তাহারই জন্ঠ এই কাৰ্য শেষ হইল।
তি
কৈজুড়ি-টাঙ্গাইল,
শ্রীকৃষ্ণকালী গুহ
৫ই শ্রাবণ ১৩০৮।
শৈলকণ্ঠ।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
মনােরম।
ঘের প্রখর তাপে কোন এক পুত্রকোতুয়া
গ্র। দুঃখিনী মাতা সূর্যাস্তের পর করতলে কপােল।
বিশ্বাস করিয়া প্রাসাদোপরি উপবেশন করত,
অনন্তমনে ম্লানমুখে পুত্রের ভায়না ভাবিতেছেন।
কখন বা শােকাবেগ বৃদ্ধি হওয়ায় বিগলিত
ধার চকু হইতে বারিধারা বাহির হইয়া গণ্ডদেশ বক্সি পড়ি
তেছে। চকিরণে উহা মুক্তামালার ন্যায় দেখাইয়া মুকুলে
মত। প্রাসাদোপনি পতিত হইতেছে। আবার তিনি কানও বা
।
শৈক।
* * * * * *
s
শোকবিহার ন্যায় মুর্হিত হইয়া প্রাসাদের ছাদের উপর
পতিতা হইতেছেন। মুখে রক্য নাই,—স্পন্দহীন,—কেবল এক
একবার বলিয়া উঠিতেছেন—“বাছা আমার কোথায় কি ভাবে
আছে, আমি হতভাগিনী মাতা জীবিত থাকিতেও তাহার কোন
সন্ধান করিতে পারিলাম না।” এমন সময়ে একটা বালিকা
আসিয়া বলিল -“মা ! তুই সদা দিস্ কেন?
আমার
ক্ষুধা পেয়েছে কিছু খেতে দিবি না? না মা ! আমি খাব না ! তুই
সৰ্ব্বদা কেন কাঁদিস তাহা একবার আমাকে বল, তার পর খাব।”
মাতা চক্ষু মুছিয়া একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বালিকার
প্রতি চাহিয়া বলিলেন :—-“মা মনােরমে ! আমি সর্বদা যে
কি জন্য কাঁদিতেছি, তাহা তাের নিকটে বলিলে কি হইবে বল ?
তুই ছেলেমানু—কিছু বুঝিতে পারিনি।”
মাতার এই কথা শুনিয়া মনােরমা আর কিছুই বলিল না,
কেবলমাত্র মুখভারি করিয়া তাহার ক্রোড়দেশ অধিকার করিল।
বালিকার তখনকার সে ভাব দেখিয়া অনুমান হইল, সে যেন মনে
মনে বলিতেছে যে -“তুমি যতই কেন না বল আমি খাব না,
কথাও বলিব না।” মাতা তাহার সেই ভাব অনুমান করিতে
পারিয়া বলিলেন-“আ পাগলি! তুই কি সে কথা না শুনিলে
খাবিই না? আচ্ছা, যদি এতই হইয়া থাকে তবে চল নীচে যাই,
সেইখানে বসিয়া তোর নিকট সকল কথা বলিব।”
মাতা ও
কন্যা কথোপকথনের জন্য নিমগৃহে প্রবেশ করিলেন। আমরা
এই সময়ে ওই বালিকা, মনােরমা বিষয়ে কিছু বলিয়া রাখি।
মানারগা। মমেরমা বালিকা, যেন প্রভাত কিরণে ফুটনােন্মুখ পদ্ম। বাল্য- কাল যে কি সুখের সময়, তাহা আর কাহাকেও বুঝাইয়া দিতে হয় । বাল্যকালের সমুদায় লীলা, আনন্দ, নিশ্চিন্ত ভাব কি কোমল। সুতির অবলম্বনে কালের পশ্চাদ্দেশে আর একবার বিচরণ করিতে কাহার বা ইচ্ছা যায়? যে কালের নির্ভাবনায় সকলই সুসময় বোধ হইত, যে কালের সরলতা ও অনভিজ্ঞতানিবন্ধন কিছুতেই কুতাৰ উপলব্ধি হইত না, সকলই সুন্দর ও উৎকৃষ্ট বলিয়া জ্ঞান হইত। যাহারা বাল্যকাল উত্তীর্ণ হইয়া যৌবনে পদার্পণ করিয়াছেন, তাহারাই জানেন, বাল্যকাল কি সুখময়, কি মধুময়, কি আনন্দময় ছিল। বােধ হয় তাহাদের ইচ্ছাও হয় যে, তাঁহারা আবার বলল প্রাপ্ত হন। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম এমন কঠিন যে, তাহা আর হয় বাল্যকালে বাল্যসুখ কি মধুর জিনিষ, তাহা বুঝা যায় না। সেই প্রেমানন্দ ধূলা-খেলা, সেই উলঙ্গ বেশ, সেই কোমল মুখের মধুর হাসি যদি যােবনে কেহ মনে করিয়া দেয়, মনে বড় কষ্ট হয়। মনােরম এখনও বালিকা, তাহার এখনও ধূলা-খেলা যায় নাই, কিন্তু তাই বলিয়া এখন সে গ্রামের অন্যান্য ছেলেমেয়ের মত মাথায় ধূ দিয়া খেলা করে না। মনােরমা সুন্দরী, কি প্রকার সুন্দরী, এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেই আমরা বলিতে নাচার। আমরা কেমন করিয়া সেই সুকোমল বালিকা-মূৰ্ত্তি কেবল একটা মাত্র হংসপুচ্ছ সাহায্যে চিত্রিত করিয়া দেখাই? মূল কথায় এই মা বলিতে পারি, যদি কোন পাঠক কি পাঠিকা কোন বালিকায় রূপে মুগ্ধ হইয়া মনে করিয়া থাকেন যে, ইহার মত সুন্দরী আর ৪ শৈলকণ্ঠ। পৃথিবীতে দ্বিতীয়া নাই, তবে সেই রূপ দর মধ্যে পুনরুদ্দীত করুন। আমাদের মনােরমাও সেইরূপ। ইহু বাতীত যে, আমরা তাহার সেই সুবঙ্কিম জগল, সেই দেহবিনিন্দিত মুখকান্তি, আকৰ্ণবিস্ফারিত চক্ষুযুগল, রক্তিমাভ অধরোষ্ট, সেই কোমল চেহারা, সেই নিটোল গঠন, সেই বর্ণ, যাহা ভাস্কর চিত্র করিতে সমর্থ ; --যাহা কেবল একমাত্র জগদীশ্বরের তুলিতেই তুলিতেই চিত্রিত হইয়া থাকে,—আমরা সেই চিত্র কেমন করিয়া লিখিয়া দেখাইব? মনাে- রমার বয়স ৮ বৎসর। কিন্তু গঠনমাধুর্যে তাহাকে ১১ কি ১২ বৎসর বলিয়া বােধ হইত। দুঃখিনী মাতা ব্যতীত তাহার 'আর কেহই ছিল না। এক ভ্রাতা অাছেন, তিনিও আজ ৪ বৎসর নিরু- দেশ। তাহার কোন সন্ধান পাওয়া যাইতেছে না। মনোরমার পিতা খুৰ সম্পত্তিশালী লােক ছিলেন। তিনি আজ কালের লােক ইলে “মহারাজা, রায়বাহাদুর, A. B. C. D” ইত্যাদি অনেক উপাধি পাইতেন। তাহার বার্ষিক আয় প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা ছিল। কিন্তু তাহার পরলােক গমনের অল্পদিন পরেই তাহার এক জাতি চক্রান্ত করিয়া সেই সমস্ত সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন এবং তাহাদিগকে ভদ্রাসন হইতে বহিস্কৃত করিয়া দেন। রামপুরে মনােরমার পিতা একখানি বাড়ী প্রস্তুত করিয়াছিলেন। তাহারা এক্ষণে অন্যোপায় না দেখিয়া সেই বাড়ীতে যাইয়া আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। নিকটে সামান্য যে টাকাকড়ি ছিল, তাহারও অধিকাংশ সেই দুষ্ট বুদ্ধি জ্ঞাতি লুটপাট করিয়া লইয়াছিল। যাহা কিছু সঙ্গে ছিল, তারাই তাহাদের শ্রীরামপুরে সামান্তভাবে দিনাতিপাত সনার হইতে লাগিল । যখন এই সকল ঘটনা হয়, তখন মােরখার বয়স.৪ কি-৫ বৎসর। মনােরমার ভ্রাতা যিনি নিরুদ্দেশ হইয়াছেন, তঁাহার নাম অমরেশচন্দ্র । এই সমস্ত ঘটনা সংঘটন কালে অম- রেশচন্দ্ৰ কলিকাতায় ছিলেন । কলিকাতায় কোন কুঠিতে হারপিতা অনেক টাকা আমানত রাখিয়াছিলেন। অমরেশ তাহা জানিতেন, কিন্তু খাতা না পাইলে টাকা লওয়া যায় না জানিতে পারিয়া, খাতার অনুসন্ধানের জন্য গুপ্তভাবে বাটী হইতে পলাইলেন। দুঃখিনী বিধবা পুত্রের জন্য সর্বদাই বিমর্ষ থাকিতেন, এবং নানারূপ চিন্তা করিতেন। কিন্তু কোন সংবাদ না পাইয়া দিন দিন আরও হতাশ হইতে লাগিলেন। তাহার এমন একটি লােকও ছিল না যে, তাহার একটু উপকার করে। ক্রমে ভিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর গত হইল, তথাপি বিধবা পুত্রের কোন সংবাদ পাইলেন না। এ দিকে মনােরমা ক্রমে বয়ােধিকা হইল এবং মাতারবির্ষের কারণ বুঝিতে পারিল। পূৰ্ব্বে মনােরমা কিছু চঞ্চল ছিল এখন আর তাহার সে চঞ্চলতা নাই। এখন সর্বদা সে এখন সৰ্ব্বদা সে মাতা নিকট বসিয়া লেখা পড়া শিখিত, এবং তাহাদের সমস্ত পূর্বকথা শুনিত। মাতা এখন তাহাকে লেখা পড়া শিখাইতে, কি পূৰ্ব্ব ঘটনা বলিতে কুষ্ঠিত হইতেন না। সরলা বালিকা মাতার দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ করিত এবং সময়ে সময়ে মাতার গলা ধরিয়া কন করা মাতাকে সান্ত্বনা করিবার প্রয়াস পাইত।
স
•
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
শৈলকণ্ঠ।
মরেশচন্দ্র এক্ষণে কোথায় ? কি কারণেই বা
নিরুদ্দেশ, পাঠক! তাহার কিঞ্চিৎ আভাষ আমরা
পূর্বাধ্যায়েই দিয়াছি। কেমই বা মাতার সহিত
সাক্ষাৎ করেন না? তিনি ত নিকটেই আছেন।
বড়লােকের ছেলে হাজারও খারাপ অবস্থাপন্ন হউন
মা কেন, তথাপি তাহার উন্নত হৃদয়ের সংবৃত্তিগুলি কিছুতেই
নষ্ট হয় না। যে দিন তিনি শুনিলেন যে, দুর্মতি জ্ঞাতি জাল্প কাগজ
প্রস্তুত করিয়া তাহার যথা সৰ্বস্ব লইয়াছে, সেই দিনই তাহার
মনে বিরাগ জন্সিল। আরও যে দিন শুনিলেন যে, তাহার মাতা
ও ভগ্নীকে ভদ্রাসন বাটী হইতে দুরীভূত করিয়াছে, সেই দিন হইতে
তাঁহার হৃদয়ে ক্রোধানল প্রজ্জ্বলিত হইল। বাড়ী যাওয়া পরি
ত্যাগ করিলেন। মাতার সহিত, ভগ্নীর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন
শৈলক। না। জ্ঞাতি-শক্ত নিপাতের জন্য মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করিলেন। উকীলের বাড়ী গেলেন, কাগজ পত্র উকীলের বাটীতে তৈয়ারী করাইলেন। সুপ্রিম কোর্টে মােকদম উপস্থিত হইল কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত মোকদ্দমা হারিলেন। উকিল বাবু পরামর্শ দিলেন যে, “আপনি সুপ্রিম কোর্টে মােকদ্দমা হারিয়াছেন বটে, কিন্তু আপনার পক্ষে বিলত আপিলের বেশ জোর আছে। আপনি বিলাত আপিল করুন, অবশই আপিলে সুফল পাইবেন।” অমরেশ উকীল বাবুর পরামশীনুসারে বিলাত আপিলের যােগা ও করিলেন। আপিল করা হইলে মনে মনে স্থির নিশ্চয় করিলেম :-“যদি বিলাত আপিলে মোকদ্দমা হরি তাহা হইলে এ মুখ আর কাহাকেও দেখাইব না । কোন নির্জন স্থানে বাস করিয়া এ দগ্ধ হৃদয়ের অবশিষ্ট অংশ যাপন করিব।” আজ কাল যেমন অল্প সময়েই বিলাতের মােকদ্দমা নিষ্পত্তি হয়, পূর্বে তাহা হইত না। এমন কি আপিলের প্রায় ৪ কি ৫ বৎসরের পর সংবাদ আসিত। মরেশ স্থির করিলেন, যখন এতদিনই মাতা ও ভগিনীর সহিত সাক্ষাৎ করি মাই, তখন আর মােকদ্দমার সুসংবাদ না আসা পর্যন্ত কাহারও সহিত সাক্ষাৎ করিব না। আজ প্রায় ৭ কি ৮ বংসর অতীত হইল তিনি বাটী ছাড়িয়াছেন, মাতা ও ভগ্নী কোথায় এবং কি অবস্থায় আছেন, তাহাও অবগত নহেন। দুষ্ট জ্ঞাতি যখন তাহাদিগকে ভদ্রাসন হইতে তাড়াইয়া দিয়াছে, তখন তাহারা জাবিত আছেন কি মা, তাহাও জানিতে পারিলেন না। মনে মনে বলিলেন : “পরমেশ্বর আমার কপালে যে কত কষ্ট লিখিয়াছেন, তাহার ইয়তা শৈলকণ্ঠ। ....... নাই। যদি জ্ঞাতি আমার মাতা ও ভগিনার মৃত্যুর কারণ হইয়া থাকে, আর যদি পরমেশ্বর আমাকে দিন দেন তাহা হইলে সম্পূর্ণ শাস্তি প্রদান করিবই করিব। কিছু টাকা লইবার জন্য কুঠি- ওয়ালাকে খাতা দেখাইলাম, কত অনুনয় বিনয় করিলাম, কিছু তেই সে টাকা দিল না। বুঝিয়াছি এও সেই জ্ঞাতিক চক্র। আজ রবিবার, ব্যাঙ্কও বন্ধ। যে টাকা আনিয়াছিলাম, তাহা সমস্তই ব্যয় হইয়াছে। আজ আমার নিকট একটি ও পয়সা নাই যে, তারা আহারীয় যােগাড় করি। একরূপ অনাহারেই আছি ক্ষুধায় শরীর শীর্ণ হইয়াছে। কি করি কিছুই ঠিক করিতে পারিতেছি । সূৰ্য্যদেবও অগ্নিমূর্তি ধারণ করিয়াছেন। আর চলিতেও পারি না। কোথাও একটি বৃক্ষ দেখিতে পাই না যে, তাহার ছায়ায় বসিয়া কিছুকাল বিশ্রাম করিব । কেমনেই বা এই মাঠ পার হইয়া উকীল বাবুর বাসায় যাইব? বাই-ঐ যে মাঠের দক্ষিণ পার্শ্বে যে কয়টি বৃক্ষ দেখা যাইতেছে, ঐ স্থানে যাইয়া বিশ্রাম করিগে। এখানে বসিয়া থাকিলে আর কি হইবে?” এই বলিয়া অতি ধীরে ধীরে ক্লান্ত কলেবরে সেই বৃক্ষাভিমুখে চলিলেন। প্রায় অর্ধ ঘণ্টা পরে ক্ষুৎপিপাসায় অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া তথায় যাইয়া উপস্থিত হইলেন। “এটী যে, বটবৃক্ষ, কেমন সুন্দর বাতাস বহিতেছে, কিছুক্ষণ এই স্থানে বিশ্রাম করিয়া লই। শরীরে এখন আর এমন 'শক্তি নাই যে, বিশ্রাম না করিয়া এক পোয়া পথ চলিতে পারি। কিছুকাল বিশ্রাম করিয়া, এই পুষ্করিণীর জল পান করিয়া, তার পর সন্ধ্যার প্রাক্কালে উকীল বাবুর বাড়ী যাই।” মনে মনে এই স্থির
শৈলকণ্ঠ।
করিয়া চাদরখানা বৃক্ষতলে বিস্তার করিয়া শয়ন করিলেন। বৃক্ষের
অপর পার্শ্বে আর একটি যুবক বসিয়া কিঞ্চিৎ উচ্চস্বরে বলিতে,
ছেনঃ“কোথায় মাতা,কোথায় বা প্রাণসমা ভগিনী তাহাদের
কিছুই আমি জানিলাম না। প্রায় এক বৎসৰুমতীত হইল
তাহাদের কোন সংবাদই লইলাম না। আমার মত হতভাগ্য
জগতে কে আছে?” অমরেশচন্দ্র তাহার এই সব কথা শুনিয়া চক্ষ
কিত হইলেন ও মনে মনে ভাবিলেন, “ইহার অবস্থা আর আমার
অবস্থা প্রায় একপ্রকার দেখিতেছি। যাই দেখি, লোকটীর সহিত
একবার আলাপ করিগে, তাহা হইলেই বুঝিতে পারিব ” অমরেশ
চন্দ্র বৃক্ষের সেই পার্শ্বে যাইয়া দেখিলেন, একটি যুবক হাঁটুতে মাথা
সংলগ্ন করিয়া বসিয়া আছেন। মনে মনে স্থির করিলেন, যাহার
কারােক্তি তিনি শুনিতে পাইয়াছেন, তিনি এই হইবেন। এ
ভাবিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন -“মহাশয় ! আপনার নাম কি ?”
অপােৰদনকারী মস্তক উত্তোলন করিয়া দেখিলেন, তাহার সম্মুখে
একটা সুন্দর যুবক দণ্ডায়মান। যুবকের আকৃতি দেখিয়াই তার
তাহাকে ভালবাসিতে ইচ্ছা হইল। “মহাশয়। আপনি কি আমার
নাম জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন ?”
“ছ মহাশয় !”
আমার নাম শৈলক। আপনার নাম ?”
“অমরেশচন্দ্র।”
“নিবাস ?”
“নিবাসের স্থিরতা নাই। আপনার নিবাস ?”
শৈলক। ‘ভবানীপুর “কোথায় যাইবেন?” “ভবানীপুর।” শৈলকণ্ঠ কিছুকাল মনে মনে কি ভাবিলেন। তাহার পর অমরেশকে বলিলেন-“মহাশয় ! আপনি বলিলেন যে, আপনার বাসস্থানের নিশ্চয়তা নাই। সে কি কথা? দীন, দুঃখী, ভিখারী যে, তাহারও বাসস্থান আছে।” অমরেশ বলিলেন-“যাহার নিজের শরীরের কিছুমাত্র মমতা নাই, আত্মীয় স্বজন বলিয়া একটুও স্নেহ নাই, সুখদুঃখের পরিণাম- ন নাই, জীবন যাহার চির অন্ধকারে আবৃত, তাহার আবার বস্থানের প্রয়ােজন কি ? আজ আপনার সহিত সাক্ষাৎ হইল, আপনি যদি দুই-চারিটি মিষ্টি কথা বলেন তাহা হইলে আপনার সঙ্গেই সঙ্গী হইব। সকলেরই যে বাসস্থান আছে, তাহা নহে।” অমরেশচন্দ্র অতি কষ্টে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন। শৈল।—সে সত্য বটে। আপনি এখন কোথায় যাইতেছেন ? আপনার আকার-ইঙ্গিতে বোধ হইতেছে, আপনি আমার মত বিপদগ্রস্ত। অম।আমি এখন কোন কাৰ্যোপলক্ষে ভবানীপুরে যাই- তেছি। আপনি একাকী বসিয়া যে সকল কথা বলিয়াছিলেন, তাহা শুনিয়া আমার যাহা বিবেচনা হইয়াছিল, আপনিও তাহাই বলিতেছেন। আপনিও না ভবানীপুরে যাইবেন? শৈল।আমিও ভবানীপুরে যাইব।
শৈলকণ্ঠ।
= 4 sr * * *
অম তবে একটি সঙ্গী পাইলাম, ভালই হইল। এক্ষণে আসুন,
দুজনে নিজ নিজ দুঃখকাহিনী বলিয়া স্ব হৃদয়ের যাতনা লাঘৰ
করি। বেলা শেষ হইলে যাওয়া যাইবে। রৌদ্রের সময় আর
চলা যায় না।
শৈল বুলিলেন-“আমারও ইচ্ছা যে, আপনার সহিত কিছুকাল
একত্রে বসিয়া আলাপ করি।” হৃদয়বেগ সম্বরণ করিতে না
পারিয়া নিজ জীবনবৃত্তান্ত অমরেশ আদ্যোপান্ত সমস্ত বলিলেন।
বলিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন আপনার অবস্থা একবার বলুন।
শৈলকণ্ঠ বলিলেন আমার অবস্থা আর আপনার অবস্থা
প্রায়ই সমান, যে কিছু সামান্য তারতম্য আছে, তাহাই বলি। আপনি
বিলাত আপিল করিয়াছেন, আমার মােকদ্দমা সুপ্রিম কোটে
আছে। আপনি প্রায় ৭ কি ৮ বৎসর বাড়ীছাড়া হইয়াছেন, আমি
প্রায় এক বৎসর বাড়ীছাড়া হইয়াছি। আপনার মাতা ও ভগিনী
কোথা আছেন, তাহা আপনি জানেন না, আমি আমার মাতা
ও ভগিনী কোথায় আছেন, তাহা জানি। এই প্রভেদ।”
অম।আপনার উকীল বাবুর নাম কি ?
শৈল -ধীরেনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
অম।তিনি আমারও উকীল।
শৈল বলিলেন-“চল ভাই! এখন যাওয়া যাক। দিব
অবসানপ্রায়।”
অমরেশ বহুকাল পরে
পরে তাই সম্বোধন শুনিয়া তাহার
পূর্বকথা সব মানসপটে উদিত হইল। মনে হইল, যখন মদের
শৈলক। -~~~ তাহাকে দাদা দাদা বলিয়া, ডাকিয়া হাত ধরিয়া, মাতার নিকট লইয়া যাইয়া, সুমধুর স্বরে মাতাকে ডাকিয়া, তাহার নিকট হইতে, খাবার লইয়া, তাহার সহিত বসিয়া খাইত,-আহারান্তে কথন, দাদা, কখন ভাই, কখন বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ওষ্ঠ দুখানি কুঞ্চিত করিয়া মধুর স্বয়ে অমরেশ বলিয়া ডাকিয়া তাহার নিকট নৃতা: কচিত, সে সুখ, সে মনােমােহন নৃত্য, সেই আধ আধ স্বরে দাদা, ভাই, অমরেশ সম্বােধন এখন কোথায় ? সেই সব পূৰ্ব্ব স্মৃতি মনে উদিত হওয়ায় তাহার নয়ন হইতে দরবিগলিতরে বারিধারা পতিত হইতে লাগিল। শৈলকণ্ঠ অমরেশচত্রের এই ভাব দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন ঃ- এই অমর। সহসা তােমার এরূপ ভাব হওয়ার কারণ কি ?” অমরেশ বলিলেন -“তাই শৈল! তােমার ভ্রাতৃ সম্বােধনে আমার ভগিনীর কথা মনে হইয়া এইরূপ চিত্তচাঞ্চল্য হইয়াছে।” শৈল মনে মনে বলিলেন –“ভ্রাতৃস্নেহের কি অসাধারণ ক্ষমতা। এমর জগতে সকলই নশ্বর, কিন্তু ভ্রাতৃহে, অনন্ত। প্রকাশ্যে বলিলেন-“চল ভাই! এখন যাওয়া যাক। সন্ধ্যা হইয়া আসিল।” তবে চল” বলিয়া উভয়েই প্রস্থান করিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
খোসখবর।
১
কীল বাবু কোন প্রয়ােজন বশতঃ অবরে প্রবেশ
করিলেন। অমরেশ ও শৈল যাইয়া উপস্থিত
হইলেন। বাটীর সরকার সাৰকাশ পাইয়া ভড়র
তড়র করিয়া তামাক সেবন করিতেছিলেন,
এমন সময় জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাবু কোথায়
সচকিত ভাবে মুহরী উত্তর করিল—“বাড়ীর ভিতর টিয়া-
ছেন, শীঘ্রই আসিবেন। বসুন।”
উতয়ে পথশ্রান্তে অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলেন। তাহার নিকটস্থ
বিছানায় উপবেশন করিলেন। তথায় “সমাচার-চত্রিকা" একখানা
পড়িয়াছিল, অমরেশ সেইখানি লইয়া পাঠ করিতে লাগিলেন।
তাহার সর্ব প্রথমে যে বিজ্ঞাপনটি দেওয়া আছে, তাহা পাঠ করিয়া
চমৎকৃত হইলেন। বিজ্ঞাপন এই ঃ-
শৈলক।
মাতা মৃত্যুশয্যায় শায়িতা, ভ্রাত নিরুদ্দেশ, আমিও অবলা
বালিকা... তাঁহার চিকিসাদির সাহায্য করে এমন একটিও
লােক নাই। বড় বিপদে পড়িয়াছি। যদি ত্বরায় দাদা আসিয়া
সাহায্য না করেন তাহা হইলে এ জীবনে মাকে আর দেখিতে
পাইবেন না। যদি মাতার মৃত্যুর পূর্বে দাদা না আসেন
তাহা হইলে আমার যে কি দশা হইবে, তাহা বলিতে পারি না।
আমিও মাতার অনুগামিনী হইব। যদি কোন দয়ালু ব্যক্তি
অতুগ্রহ করিয়া আমার দাদাকে অতি সত্বর আমার নিকট আনিয়া
দিতে পারেন তাহা হইলে তঁাহাকে অবস্থাভেদে পারিতােষিক
দেওয়া যাইবে। আমার দাদার নাম, ঐ অনরেশচন্দ্র ঘােষ।
বয়স ২৪ কি ২৫ বৎসর। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, দেখিতে সুপুরুষ,
মুখশ্রী সুন্দর, দক্ষিণ হস্তের তলায় কাল একটি বড় দাগ আছে,
যাহা লােকে জট, জরুল' না কি তিল বলে। ইতি তারিখ,
১৭ই শ্রাবণ।
শ্ৰীমতী মনোরমা দাসী
২৯ শ্রীরামপুর ।
জেলা-হুগলী ।
শৈল অমরেশের মুখপানে একদৃষ্টে চাহিয়া বলিলেন –“ভাই।
তােমাকে আবার বিমর্ষ দেখা যাইতেছে কেন ?”
অমরেশচন্দ্র বলিলেন-“না ভাই! বিমর্ষ হব কেন? উকীল
বাবু এখনও যে আছেন না? এখনও কি গৃহকাৰ্য শেষ হলো না ?”
খোসখবর .. শৈল অমরেশের হস্ত হইতে পত্রিকাখানি লইয়া বিজ্ঞাপনটি পাঠ করিয়া বলিলেন “এই বিজ্ঞাপনদাত্রীকে কি তুমি জান?” অমরেশচন্দ্র কিছুকাল ভাবিয়া তার পর বলিলেন –“তাতে প্রয়ােজন কি ?” শৈল।-জিজ্ঞাসা করিতেছি, একে তুমি জান কি না? ভাব- দর্শনে বোধ হইতেছে, এ তােমাৱ বাকেহ হবে। এ বিজ্ঞাপন তােম। সংক্রান্ত হইবে। তােমার নাম অমরেশ, বিজ্ঞাপনেও এই নাম দেখিতেছি। আচ্ছা তােমার হাতখানা দেখাও দেখি ? তাহা হইলে সব গােল মিটে যাবে।” এই বলিয়া হস্ত টানিয়া লইয়া হস্তস্থিত জরুল দেখি বলিলেন : -“তুমিই সেই অমরেশ, ইহাতে কিছু সন্দেহ নাই।” অম।আমিও ভাই ! ঠিক করিতে পারিতেছি না। আমারও ভগ্নীর নাম মনােরমা। যাহা হউক, উকীল বাবু আসিলেই আমি তাহাকে মােকদ্দমার বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়া শ্রীরামপুরে যাইব স্থির করিয়াছি। শৈলক হাসিয়া বলিলেন :-“আমাকে সঙ্গে নেবে কি?” অম।—এত দূর অনুগ্রহ হবে কি? শৈল।- নিলে যাইতে আপত্তি নাই। অমরেশচন্দ্র বলিবেন :-“ভাই! তােমার দর্শনাবধি যে আমার মনে কি এক অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হইয়াছে, তাহা প্রকাশ করিয়া বলিতে পারি না। প্রথমে তােমার সহিত আপনি
শৈলক।
ধীর।
শব্দ ব্যতীত অন্য কিছু বলি নাই। এই এক ঘণ্টার মধ্যেই তাহা
তুমিতে পরিবর্তিত হইয়াছে। এক্ষণে মনে সাহস হইয়াছে যে,
ইহাতে তুমি কুপিত হইবে না। তােমাকে আমি সাহস করিয়া
আমার সহিত যাইতে বলিতে পারি নাই। তুমি যে নিজ হইতে
এই কথা বলিয়াছ, ইহার জন্য তােমাকে ধন্যবাদ দি। • তােমায়
প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলাম।
শৈল।-উকীল বাবু আসিয়াছেন।
ধীর। [ হাসিতে হাসিতে আসিয়া }-অমর বাবু! পারি-
তােষিকের টাকা কই ?
অম।-সংবাদ কি ?
আপনার মােক জিত হইয়াছে। দুই কোটের
খরচা সমেত পাইবেন। [ শৈলের প্রতি আনার নিকটও
শঘ্রই পারিতােষিকের টাকা চাব।
শৈল।-মােকদ্দমার কি রায় দিয়াছে ?
ধীর।—রার আজ পর্যন্ত বাহির হয় নাই। কেবল মাত্র
বাদী প্রতিবাদীর উকিলের বক্তৃতা হইয়া রহিয়াছে। যেরূপ দেখা
গেল, তাহাতে আপনার পক্ষে জয় হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা।
তবে আপনার অদৃষ্ট। আমি মশাই! জোগাড়যন্ত্র করিতে ক্রটি
করি নাই এবং অনেক পরিশ্রমও করিয়াছি। এক্ষণে বােধ হই,
তেছে যে, পরিশ্রম আমার সার্থক হইবে।
অম।-মােকদ্দমার সংবাদ কি কোন পত্রিকায় বাহির হইয়ায়ে
না রায় আসিয়াছে ?
খোসব!
১৭
ধীর।-এই দেখুন লণ্ডন টাইমস্” পত্রেও বাহির হইয়াছে।
আদালতেও রায় আসিয়াছে। তাহাও দেখিয়া আসিয়াছি।
অম।-আজ আমাদের কোন বিশেষ কাৰ্যোপলক্ষে রাতেই
wয়ামপুরে যাইতে হইতেছে। যদি শারীরিক সুস্থ থাকি তাহা
হইলে মত শীঘ্র পারি আপনার পারিতােষিকের টাকা আনিয়া
দিব। আর পাথেয় স্বরূপ আমাকে উপস্থিত ১০ টাকা দিন।
ইহাও ঐ সঙ্গে আনিব।
ধীর।এখন রাত্রি প্রায় ৯টা হইয়াছে। আজ যাওয়া আমি
তাল বিবেচনা করি না। বেশী টাকা একত্রে প্রয়ােজন থাকিলেও
পাইতে পারেন।
শৈল।-আমিও অমর বাবুর সহিত যাইব প্রতিশ্রুত হইয়াছি,
এবং উভয়ে আসিয়া আপনার পুরস্কারের টাকা প্রদান করিব।
উকীল বাবুর নিকট তাহার বিদায় লইয়া আলীপুরের
খালের নিকট আসিলেন। শৈল অমরেশকে বলিলেন-“ভাই !
তুমি এখান হইতে একখানা নৌকা ভাড়া কর, আমি শীঘ্রই
আসিতেছি।” অমরেশ নৌকা ভাড়া করতে গেলেন। শৈল
তাড়াতাড়ি একটা ডিস্পেন্সারিতে যাইয়া আবশ্যকমত কিছু ঔষধ
কিনিয়া আনিলেন। যখন শৈল ঔষধ লইয়া আসিলেন, তখন
অমরেশ একখানা নৌকা ভাড়া করিয়া উভয়ে শ্রীরামপুরাভিমুখে
চলিলেন। শৈল মাঝিকে বলিলেন –“যদি আমাদিগকে রাত্রি
১১টার সময় শ্রীরামপুরে পৌছাইয়া দিতে পার তাহা হইলে
বসিস্ দিব।”
শৈলক মাঝি বসিসের লোভে সজোরে নৌকা চালাইতে আরম্ভ করল। এমন সময় জোয়ার আসিয়া গঙ্গা উজান বহিল। নৌকা দক্ষিণ বাতাসে পাসভরে জাহুবী-বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া তালে তালে নাচিতে নাচিতে নক্ষত্ৰবেগে ছুটিল। দেখিতে দেখিতে যুমুড়ি, বেলুড়, বারাকপুর, বালি উত্তরপাড়া ও কোন্নগর পশ্চং রাশিয়া ১০ ঘটিকার কিছু পরে নৌকা শ্রীরামপুর যাইয়া পৌছিল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
:0;
ভিখারিণী।
মরেশ ও শৈলক
নৌকা হইতে নামিয়া সহরে
প্রবেশ করিলেন। মনােরমা ও তাহার মাতা
যে কোন বাড়ীতে থাকেন, তাহা তাঁহারা কেহই
অবগত নহেন। তাহাতে আবার রাত্রি ভয়ানক
অন্ধকার, রাস্তা ঘাট ভাল করিয়া জানা না থাকায়
বাড়ী খুজিতে বড় কষ্ট হইতে লাগিল। কাহার নিকট বা
জিজ্ঞাসা করিবেন, * বা বলিয়া দিবে, তাহার কিছুই ঠিক করিতে
পারিতেছেন না। কেবল অন্ধকারে যে দিকে পথ পাইতেছেন,
সেই দিকেই যাইতেছেন। যাইতে যাইতে একটি কুটীরের দ্বারে
উপস্থিত হইলেন। গৃহে একটি মৃন্ময় প্রদীপে একটী ক্ষীণালোক
জ্বলিতেছে। দর্শন করিয়া বিবেচনা করিলেন, গৃহে অবশ্যই
লােক আছে। অমর জিজ্ঞাসা করিলেন -“ঘরে কে আছ ?”
শৈলকণ্ঠ। * * * AAAAAAA AAAA, PA • : *** কুটীর হইতে উত্তর হইল ঃ-“ভিখারিণী ।” অমরেশের একটু সাহস হইল। পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন- “হাগ বাছা! তুমি কি বলিতে পার, এই গ্রামে মনােরমা নামে একটী বালিকা কোন বাড়ীতে আছে? তোমরা ত সকল বাটীতে ও সর্বত্র যাতায়াত কর?” তিখা।—এত রাত্রিতে সেই বালিকাকে আপনার কি .য়োজন? অম-শুনিয়াছি মনােরমার মাতা অত্যন্ত পীড়িত। তাই আমরা তাহাকে দেখিতে আসিয়াছি। ভিখা।-আপনার নাম কি ? সম। -ঐঅমরেশচন্দ্র- ভিখা।-আহ! আপনার মাতা মৃত্যুশয্যায় পড়িয়াছেন, প্রাণ ওষ্ঠাগত। আপনাকে দেখিবার জন্য কেবল জীবিত আছেন। অমরেশচন্দ্র দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া, অতি ব্যগ্রভাবে বলি- লেন-“তবে শীম দের খােল।” তিখা।-এ বাটী তাহাদের নহে। অম।—কোন্ বাকী ? “আসুন, দেখাইতেছি”. বলিয়া ভিখারিণী বাহিরে আসিয়া বলিল -“আমার পশ্চাৎ পাং আনুন। অদৃষ্টের ভীষণ চক্র কে বুঝিতে পারে ? সুখের পর দুঃখ, তার পর সুখ, তার পর দুঃখ কে জানিয়া রাখে?
ভিখারিণী । AN fanticon সংসারে নিয়ত ইহা বিঘূর্ণিত হইতেছে। জীবনে ইহাই সুখ। যদ্যপি জীবন চিরদুঃখময় হইত, যদ্যপি অনন্ত বিশ্ব মার্তণ্ডপে সতত তাপিত হইত, যদ্যপি অন্ধতমসায় পৃথিবী আৰুত হইত, তাহা হইলে সুখসচ্ছলতা, স্নিগ্ধকরী বিরামদায়িনী রাত্রি, প্রফুল হাস্যময়ী জ্যোৎস্নাকে কে পাইবার জন্য লালায়িত হইত ? সুখী মনে করিতে পারেন, “আমার চিরজীবন এই অবস্থায়ই অতিবাহিত করিব দুঃখীও মনে করিতে পারেন, “আমার চিরকাল এই ভাবেই যাইবে।” অমরেশ এত কাল কত কষ্ট সহ্য, কত লাঞ্ছনা ভােগ করিয়া মনে করিয়াছিলেন, সময়ে একদিন এই সকলই সুখে পরিণত হইবে। কিন্তু সে সুখাশাও এখন স্বপ্ন অলীক এবং মরীচিকার ন্যায় প্রবঞ্চনামূলক বলিয়া তাহার নিকট বোধ হইতে লাগিল। কিছু দূর যাইয়া, অমরেশ ভিখারিণীকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “আর কতদূর যাইতে হইবে ? ভিখারিণী বলিল -“আসুন, আর অধিক দুর যাইতে হইবে না।” ,
=
রে
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
সুখ ও দুঃখ ।
কটি বৃদ্ধা রুশয্যায় শায়িত। দক্ষিণ পার্শ্বে দুইটি
যুবক ম্লানমুখে উপবিষ্ট আছেন। বাম পার্শ্বে একটি
নবীন বসিয়া ধীরে ধীরে বাতাস করিতেছেন,
ও ঔষধ প্রস্তুত করিতেছেন। মাঝে মাঝে পশ্চিম
পার্শ্বস্থ যুবককে জিজ্ঞাসা করিয়া শয্যাশায়িনীকে
ঔষধ সেবন করাইতেছেন। : পশ্চিম পার্শ্বস্থ যুবক আর কেহ,
নহেন,—আমাদের সেই পূর্বপরিচিত শৈলকণ্ঠ। শৈলের পিতা
কবিরাজী ব্যবসা করিতেন। তাই শৈল আয়ুর্বেদীয় মতের অনেক
ঔষধ জানিতেন, এবং নিজেও M. B, পরীক্ষোত্তীর্ণ ডাক্তার।
বৃদ্ধা ডাক্তারি ঔষধ সেবন করিতেন না জানিয়া, শৈল তাহাকে
আয়ুৰ্বেদীমতের ঔষধ ব্যবস্থা করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে কোন
ফল দর্শিল না। অবস্থা ক্রমে ক্রমে খারাপ হইতে লাগিল।
সুখ ও দুঃখ।
মাতার এইরূপ অবস্থা দেখিয়া, অমরেশ নিতান্ত কাতর হইয়া
পড়িলেন, এবং পূর্ব পার্শ্বে বসিয়া নিঃশব্দে রােদন করিতে
লাগিলেন। কখন বা শােকাবেগ বৃদ্ধি হওয়ায় পীড়িতা মাতাকে
সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন :- “মা ! তােমার অঞ্চলের ধন
তােমার নিকটে বসিয়া রােদন করিতেছে ! মা ! একবার কথা
বল মা! মা! তুমি রাজরাণী হইয়াও কাঙ্গালিনীর মত হইয়া-
ছিলে, আজ তােমার সেই অতুল সম্পত্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইয়াছি।
এখন আর তোমায় কাঙ্গালিনী বলিয়া ঘৃণা করে, এমন লােক
কে আছে ?”
এই প্রকার বহুবিধ বিলাপ করিয়া তিনি রােদন করিতে
লাগিলেন।
শৈলের আজ সুখের দিন, দুঃখেরও দিন! সুখের দিন কেন ?
সুখের কথা এখন বলিবার সময় নহে। দুঃখের সময়ে সুখের
কথা ভাল লাগে না, এবং আমরাও বলিতে ভালবাসি না। সেই
জন্যই এই স্থানে সে সব বলিব না।
শয্যাশায়িনী জানিতেন না যে, আজ তাহার বহুকালহারা
অঞ্চলের ধন তাহারই জন্য রােদন করিতেছে। মনােরমা শৈলের
কথামত মাতকে ঔষধ সেবন করাইলেন।
ঔষধ সেবনের
কিঞ্চিং পরে বৃদ্ধা মৃদুস্বরে বলিলেন--“মনো! একটু জল।”
মনােরমা শৈলকে জিজ্ঞাসা করিলেন -“জল দেওয়া উচিত
কি ?”
শৈল বলিলেন -“দিলে ক্ষতি নাই।”
২৪, শৈলকণ্ঠ। মনোরমা শৈলের কথামত মাতাকে একটু জল দিলেন। খাইয়া বৃদ্ধা ধীরে ধীরে অনােমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “কাহার সহিত কথা বলি? ও কে ?” মনােরমা ধীরে ধীরে মাতার কর্ণের নিকট মুখ রাখিয়া বলিল -“দাদা আসিয়াছেন ও তাহার সঙ্গে এই ডাক্তার বাবু আসিয়াছেন। আমি তাহার সহিত কথা কহিতেছি। মনােরমার কথা শুনিয়া বৃদ্ধা বিছানায় উঠিয়া বসিতে ইচ্ছা করিলেন, কিন্তু পারিলেন না। উঠিতে না পারিয়া, ক্ষীণ স্বরে ডাকিলেন -“অমর!” অমরেশ তাহার নিকট আসিয়া রােদন করিতে লাগিলেন। মাতা তাহাকে রোদন করিতে নিষেধ করিলেন। বলিলেন -- ‘াদিয়া ফল কি? এখন আমি যাহা বলি, তাহা শুন। এখন যদি তুমি বালকের মত কঁাদ তাহা হইলে আর আমার মনের কথা বলা হইল না। যাহা জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করিয়াছি, তাহাও পারিব না।” অমরেশ চক্ষু মুছিয়া বলিলেন-“আমি আর কাঁদিব না। আহা বলিবার আছে বলুন।” . মাতা ধীরে ধীরে বলিতে আরম্ভ করিলেন -“বাছা। আমার অবস্থা এ প্রকার হইত না। . কেবল আজ ৮ বৎসর তােমাকে না দেখিয়া, অনাহারে অনিদ্রায় আমার অবস্থা এত খারাপ হইয়াছে। তুমি কেন এত দিন আমাদিগকে ভুলিয়া গিয়াছিলে ? ”
খোসখবর
.
অমরেশ ' সংক্ষেপে সমস্ত কথা তাহার নিকট বলিলেন।
মাতা তাহা শুনিয়া বলিলেন-“মােকদ্দমার কি হইয়াছে ?”
অমরেশ বলিলেন-“ছােট আদালত হইতে বিলাত আপীল
পর্যন্ত সমস্ত খরচ। সহিত আমার পক্ষে জিত হইয়াছে।”
এইকথায় বৃদ্ধার ম্লানমুখ একটু প্রফুল্ল হইল, অধরে একটু হাসি
দেখা দিল, যেন --মেঘের আড়াল হইতে সৌদামিনী খেলিল ।
তিনি একটু মুখ কুঞ্চিত করিলেন। কিছুকাল পরে আবার বলি-
লেন-“মনোরমাকে ভুলিও না। আমি বােধ হয়
চিব না। উহাকে একটি সৎপাত্রে অর্পণ করিও।”
বৃদ্ধার সেই মুখভঙ্গিতে প্ৰকাশ পাইল, জ্ঞাতি যেমন তাহাকে
কষ্ট দিয়াছিল, তাহার উপযুক্ত শাস্তিই হইয়াছে।
শৈলকণ্ঠ অনরেশকে বলিলেন –“দেখ অমর! তুমি বুদ্ধিমান।
তােমায় অধিক আর কি বলিব ? তুমি যদি এখন বালকের ন্যায়
রােদন কর তাহা হইলে সকল দিক নষ্ট হইবে। কােন পরিত্যাগ
কর, একটু সাহসে নির্ভর কর, আর আমি যাহা বলি তাহা শুন।”
অমরেশ হৃদয়-উদ্বেগ গােপন করিয়া অতি ধীরে ধীরে বলি-
লেন রােদনে যে কোন ফল নাই, তাহা আমি জানি।
কিন্তু মনত মানে না। তুমি যাহা বলিবে বল।”
শৈল বলিলেন-“আমার বােধ হয় ইহাকে বিশেষরূপে শুশ্রষা।
করিলে বাচিলে বাঁচিতে পারেন। আরও একটি কথা আছে।”
অম।--তুমি যেরূপ করিতে বলিবে, আমি তাহাই করিতে
সহ অাছি। আর একটি কথা কি ?
।
•
শৈলকণ্ঠ।
শৈল।-কথাটি এই, আমার নিকট যে সকল আয়ুর্শেদীয়
ঔষধ'আছে, তাহা পুরাতন বলিয়া ফল পশিতেছে না। 'ভায়ী
চিকিৎসা করিলে কি ভাল হয় না?
অম।যদি ডাক্তারীমতে চিকিৎসা করিলে জীবনের আশা
থাকে তাহা হইলে উহা করার কোন দোষ আমি দেখি না।
কারণ যদি সুফল ফলে তবেই মঙ্গলের বিষয় বলিতে হইবে।
তােমার যাহা ভাল বলিয়া বােধ হয়, তাহাই কর। আমার
তাহাতে কোন আপত্তি নাই।
শৈল ।—পীড়া কঠিন,রজনী প্রভাত না হইলে আমি ঠিক
বলিতে পারি না, কতদূর কৃতকার্য হইব।
গম।-তবে বৃথা সময় নষ্ট করিবার প্রয়ােজন নাই।
ভাক্তারী মতে চিকিৎসা করিতে ক্ষতি কি?
শৈলকণ্ঠ মনােরমাকে একটু পরিষ্কার জল আনিতে বলিলেন।
মনােরমা অবিলম্বে জল আনিয়া দিল। শৈলকণ্ঠ ঘন্টায় ঘন্টায়
মূতন ঔষধ প্রস্তুত করিয়া বৃদ্ধাকে সেবন করাইতে লাগি-
লেন। বৃদ্ধা ডাক্তারী ঔষধ সেবনে ক্রমে ক্রমে কিঞ্চিৎ সুস্থতা
লাভ করিতে লাগিলেন। ক্রমে রজনী প্রভাত হইতে লাগিল ,
অবস্থারও উত্তরােত্তর উন্নতি দেখা যাইতে লাগিল। প্রভাতে
শৈল বলিলেন :—“এখন আর কোন ভয় নাই।”
এই বলিয়া তিনি উঠিয়া বাহিরে গেলেন। মনােরমা অম+
৫শের নিকট শৈলকণ্ঠের প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
আনন্দ।
আসি।
খিতে দেখিতে দিনের পর দিন যাইতে লাগিল।
মাতা ক্রমে পথ্য পাইলেন। মাতা সুস্থ হইলে
অমরেশ একদিন বলিলেন :—“একদিন কলি-
কাতায় যাইয়া উকীল বাবুকে পারিতােষিক দিয়া
ধীরেন বাবুকে বলিয়া আসিয়াছি,
‘অল্পদিন মধ্যে আপনার পারিতোষিক প্রদান করিব। কিন্তু
আজ প্রায় ১৫ দিন হইয়া গেল তবুও তঁাহার নিকট যাইলাম
। তিনি মনে মনে কি বিবেচনা করিবেন ? আবার হাইকোর্ট
হইতে ডিক্রীও বাহির করিতে হইবে। ডিক্রী জারি না করিলে
বিষয় সম্পত্তি ইত্যাদি কিছুই দখল লওয়া যাইতে পারে না।”
মাতা অমরেশের কথায় বলিলেন--“বাছা অমর! তােমাকে
আমি আজ আট বৎসর পর পাইয়াছি। এখনও তােমায় দেখিয়া
২
শৈলক।
* * * * *
আমার নয়ন পরিতৃপ্ত হয় নাই, সাধ মিটে নাই। আর কয়েক
দিন পর যাইও। এখনও আমি ভাল করিয়া সুস্থ হই নাই।
এ অবস্থায় আমাকে ফেলিয়া কি প্রকারে যাইবে ?”
অমরেশ আর কোন কথা বলিলেন না, চুপ করিয়া রহিলেন।
মাতার অনেক দিনে ইচ্ছা, শৈলকণ্ঠের কথা অমরেশকে জিজ্ঞাসা
করেন। কিন্তু কখনই অমরেশকে
অমরেশকে একেলা না পাওয়ায়
জিজ্ঞাসা করিতে পারেন নাই। আজ অমরেশকে একা পাইয়া
তাহার কৌতুহল পরিতৃপ্তির জন্য জিজ্ঞাসা করিলেন—“শৈলের
সহিত তােমার আলাপ কত দিন হইয়াছে ?”
অম।-শৈলের সঙ্গে আমার অনেক দিনের আলাপ নহে।
ম! যে দিন আমি বাড়ী আসিব, সেইদিন যখন কলিকাতা হইতে
ভবানীপুরে যাইতেছিলাম, তখন পথে শৈলের সঙ্গে আমার
আলাপ হয়। তার পর দুই জনে একত্রে উকীলের বাী গিয়া
ছিলাম। উকীল-বাড়ী যাইয়া মনােরম প্রদত্ত বিজ্ঞাপন পাঠে
যখন আমি বাড়ী আসিতে ইচ্ছা করিলাম, তখন শৈলকণ্ঠও
আমার সঙ্গে আসিতে চাহিল। আমি তাই সঙ্গে করিয়া
আনিলাম।
মাতা।—শৈলকণ্ঠ খুব সৎ ছেলে।
অম।-মা। সে আমার যেরূপ উপকার করিয়াছে, তাহা
আমি জীবনে কখন ভুলিতে পারিব না। আমি যখন বাড়ী
আসি, তখন আমার নিকট একটিও পয়সা ছিল না।
আমি
উকীল বাবুর নিকট দশ টাকা ধার করিয়া লইয়াছিলাম। শৈল
আনন্দ।
২৯
নিজের টাকায় নৌকা ভাড়া করিল, আমার সে টাকা রহিয়া গেল।
কে বা কখন কেবলমাত্র একদিনের আলাপে এত করিয়া থাকে ?
তাহারই যত্নে, তাহারই চিকিৎসার গুণে তােমায় ভীষণ মৃত্যু-গ্রাস
হইতে রক্ষা করিয়াছি
মাতা।—শৈলকণ্ঠের কে কে আছে ?
অম—মাতা ও একটী ভগিনী।
মাতা।-বাতী কোথায় ?
অম।-আমার নিকট বলিয়াছে, তযানীপুর। কিন্তু কোন্
ভবানীপুর, তাহা আমি বলতে পারি না। বােধ হয়--কলিকাতা
ভবানীপুর নয়।
মাতা বলিলেন –“অমর! তােমাকে আমি যেরূপ ভালবাসি,
শৈলকেও আমি সেইরূপ ভালবাসি। তােমাকে যেমন মুহূর্ত না
দেখিলে মন কেমন করে, সেই প্রকার শৈলকেও না দেখিলে মন
যেন কেমন কেমন করে। আমার বিবেচনা হয়, শৈলও যেন
আমার পুত্র। শৈলের কথাগুলি আমার নিকট বড় মিষ্ট লাগে।
শৈল এখন কোথায় গিয়াছে ?”
অম।—বোধ হয় বৈঠকখানায় গিয়াছে।
আমি যাই,
তাহাকে লইয়া আসি।
অমরেশ শৈলকণ্ঠকে আনিবার জন্য বৈঠকখানায় যাইতে
লাগিলেন। আইতে যাইতে মনে মনে কতই তাঁহার প্রশংসা
করিলেন, তাহার অন্ত নাই, 'মাতা শৈলকে ভালবাসেন, এই
কথা মনে হওয়ায় আনসাগরে নিমগ্ন হইলেন।
D
০
শৈলক,
আনন্দে হাসিতে হাসিতে বৈঠকখানার রজার নিকট উপস্থিত
হইয়া “শৈল” বলিয়া ডাকিলেন। কোন উত্তর পাইলেন না।
মনে ভাবিলেন, শৈল মাইয়াছে। এই ভাবিয়া দরজার নিকট
যাইয়া দরজা ঠেলিলেন। দেখিলেন, দরজা ভিতর হইতে বন্ধ ।
ভিতর হইতে কপাট বন্ধ দেখিয়া মনে মনে কি ভাবিলেন।
ভাবিতে ভাবিতে আবার “শৈল শৈল” বলিয়া ডাকিলেন, আবার
দরজায় আঘাত করিলেন । এবারেও কোন উত্তর পাইলেন না।
মনে মনে স্থির করিলেন, “শৈল বােধ হয় শ্রান্তি দূর করিবার
মানসে কপাট বন্ধ করিয়া নিদ্রিত হইয়াছে। বৃথা এখন আর
তাহাকে বিরক্ত করিবার প্রয়ােজন নাই। যাই, মাকে যাইয়া
বলি, শৈল কপাট বন্ধ করিয়া নিদ্রিত হইয়াছে ; কত ডাকিলাম
তবুও উঠিল না।” এই ভাবিয়া যেমন কিরিতেছেন, অমনই শৈল
হাসিতে হাসিতে কপাট খুলিয়া অমরেশকে ডাকিলেন। অমরেশও
শৈলের হাসির সহিত যােগ দিয়া বলিলেন :—“তুমি কপাট বন্ধ
করিয়া বসিয়াছিলে কেন? এত ডাকিলাম তবুও উত্তর দিলে না ।
ভাকিয়া ডাকিয়া উত্তর না পাওয়ায় মনে করিয়াছিলাম, তুমি
মাইয়া পড়িয়াছ। সেইজন্য ফিরিয়া যাইতেছিলাম। মা
তােমাকে ডাকিয়াছেন,—চল।”
উভয়ে হাসিতে হাসিতে অন্দরমহলে চলিয়া গেলেন। অমরেশ
মায়ের নিকট বাইয়া বলিলেন :“মা! শৈলকণ্ঠ আসিয়াছে।”
মাতা শৈল ও অমরেশকে বসিতে দিয়া মনােরমাকে ডাকিলেন।
কি মনােরমার কোন উত্তর পাইলেন না। সকল ঘর অনুসন্ধান
আমল।
৩)
*******
করিয়া দেখিলেন। কোথাও দেখিতে পাইলেন না। শেষে নিজেই
কিছু আহারীয় আনিয়া অমরেশ ও শৈলকে খাইতে দিলেন।
তঁাহারা আহার করিতে লাগিলেন। মাতা অমরেশকে বলি-
লেন -“যে অবধি তুমি বাড়ী আসিয়াছ, ও আমি একটু সুস্থ
হইয়াছি, সেই অবধি মনােরমা আর আমার কাছে সর্বদা
থাকে না।
অমরেশের মাতার কথা শুনিয়া, শৈলকণ্ঠ মাথা নামাইয়া একটু
হাসিলেন। তাহার সে হাসির একটু তাৎপর্য ছিল। • তাহার
সে হাসি কেহ দেখিতে পাইলেন না। সেই জন্য তিনি কেন
হাসিলেন, তাহাও কেহ বুঝিতে পারিলেন না।
মাতা শৈলকণ্ঠকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন -“তুমি আমা-
দের যে উপকার করিয়াহ, তাহা জীবন থাকিতে কখন ভুলিতে
পারিব না।”
শৈলকণ্ঠ মাথা হেঁট করিয়া রহিলেন—খাওয়া বন্ধ হইয়া
গেল।
অমরেশ তাহাকে বলিলেন--“শৈল ! তােমার বড় লজ্জা!
খাওয়া ছেড়ে কি মাথা নামাইয়া থাকিতে হয় ? খাও না।”
শৈলকণ্ঠ আবার খাইতে আরম্ভ করিলেন। মাতা আবার
বলিতে লাগিলেন -“বাছা! আমার কাছে আবার লজ্জা কি ?
তােমাতে ও অমরেশে আমার নিকট প্রভেদ নাই।”
আহারান্তে অমরেশ শৈলকে বলিলেন:- “এখন শীঘ্রই এক
বার কলিকাতা যাওয়া উচিত।”
*,
শৈলকণ্ঠ। শৈল।-আমিও তাহা তােমাকে বলিৰ বলিব মনে করিয়া- ছিলাম। অম।-আমি একটা কথা তোমায় বলিতে চাই, রাখিবে? শৈল।—কি কথা? আমি তোমার কথা না রাখি কবে ? অম।-মা এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হন নাই, সেইজন্য আমি ইতস্ততঃ করিতেছিলাম। না গেলেও নয়। এখন গিয়া কুঠী হইতে টাকা লইব, তার পর ব্যাঙ্কের বার শােধ করিব। আর কত সুদ গণা যায় ? দুই লক্ষ টাকার কোম্পানির কাগজ ব্যাঙ্কে আছে, তাহাও নিতে হইবে। শৈল।-কি করিতে হইবে ? অম।—মা যে পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ না হন, ও আমি যে পর্যন্ত কলিকাতা হইতে না ফিরিয়া আসি, সে পর্যন্ত তােমাকে আমা- দের বাড়ী থাকিতে হইবে। তুমি থাকিলে মার ঔষধ গুলি নিয়ম- মত প্রস্তুত করিয়া দিতে পারিবে। শৈল।-আমারও কলিকাতায় প্রয়ােজন আছে, তাহা তুমি জান। উকীল বাবুকে টাকা দিতে হইবে। আর ঈশ্বর না করুন, মােকন। যদি আমি হারি তাহা হইলে অ' বিলাত আপিল করিব। তাহারও বন্দোবস্ত করিতে হইবে। অম।--তােমার কলিকাতায় যে যে কাৰ্য্য করিতে হইবে, সব আমি করিয়া আসিব। সে জন্য তােমায় ভাবিতে হইবে না। শৈলেরও মনের ইচ্ছ, তিনি শ্রীরামপুরে আর কয়েক দিন থাকিয়া যান। তথাপি মােখিক আপত্তি দেখাইলেন, এবং যেন
আনন্দ।
********
অমরেশের কথায় বাধ্য হইয়া থাকিতে সম্মত হইলেন। শৈল বাড়ী
থাকায় সম্মতি প্রকাশ করিলে অমরেশ মাতাকে বলিলেন :-
“আমার কলিকাতা যাওয়া বিশেষ প্রয়ােজন হইয়াছে। যখন
শৈলই বাটীতে থাকিতেছে, তখন আপনার শুশ্রুষার কোন প্রকার
ত্রুটি হইবে না। আমি আগামী কল্যই কলিকাতা যাওয়ার ইচ্ছা
করি। সেখানে যাইয়া আমার নিজের কাৰ্য্যও করিতে হইবে,
ও শৈলের কাৰ্য্যও করিতে হইবে। এখন আপনি অনুমতি দিলেই
যাইতে পারি।”
মাতা অমরেশের কথায় সম্মত হইলেন এবং বললেন ;–
“কলিকাতার কাৰ্য্য সারিয়া যত শীঘ্র আসিতে পার, তাহাতে
বিলম্ব করিও না।”
মাতার অনুমতি লইয়া পরদিন অনরেশ কলিকাতায় যাত্রা
করিলেন।
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
দুইটী ছবি ।
মরেশচল কলিকাতায় গেলে পর একদিন বৈকালে
শৈলক সন্ধ্যা-সমীরণ-সেবন-মানসে বাহির হইয়া-
ছেন। মনােরমা কি ভাবিতে ভাবিতে বৈঠক
খানায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। চারিদিকে
দৃষ্টিপাত করিয়া বিশেষ করিয়া কি খুজিলেন।
খুজিয়া খুজিয়া, সুন্দর অধরে শরতের নির্মল আকাশের বিজলীর
মত একটু মৃদুহাসি হাসিয়া, একখানা কেদারার উপৰু যাইয়া
বসিয়া বচ্চস্বরে বলিলেন : “বােধ হয় তিনি শীঘ্র আসিবেন
না। রােজ রােজই ত এমনি সময় বেড়াইতে যান, আর রাত্রি
হইলে আসেন ? তবে আজ কেন শীঘ্র আসিবেন ?” এই কথা
বলার পর টেবিলের উপরিস্থিত সমস্ত বইগুলি একে একে সব
পুলিয়া দেখিতে লাগিলেন। টেবিলে ও পশ্চাতের সেলফে যত গুলি
দুইটা ছবি। . *+ , , , , • • • • • পুস্তক ছিল, সমস্তই দেখিলেন। সমস্তগুলিই ইংরেজী নামে তাহিত। তন্মধ্যে সাহিত্য-দর্শন – বিজ্ঞান-স্মৃতি-ইতিহাস- কাব্য --উপন্যাস-নাটক গ্রন্থের পরিমাণই অধিকাংশ। একে একে সমস্ত পুস্তকের নামগুলি পাঠ করিলেন, কিন্তু কোন খানিতেই মন আকর্ষিত হইল না। অবশেষে মহাকবি সেপিয়রের গ্রন্থাবলী খুলিয়া তাহার ছবিগুলি বিশেষ মনোযােগ সহকারে দেখিতে লাগি, লেন। কেথারিণের মস্তকের ওড়না দেখিয়া তাহার ওড়ন। পরিতে সাধ হইল। গৃহের চারিদিকে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলেন, অনতিদূরে আলানার উপরে দুইখানা ওড়না সুন্দররূপে কুচান রহিয়াছে। উঠিয়া যাইয়া এক সানা ওড়না লইয়া আসিলেন। আসিয়া আবার সেই ছবিখানি একাগ্রচিত্তে দেখিতে লাগিলেন। দেখিলেন, তাহার স্বামী এক দৃষ্টে, অনিমেষ-লােচনে, দীন নয়নে তঁাহার প্রতি চাহিয়া আছেন, আর কেথারিশ মুখভঙ্গি করিয়া অন্য দিকে কি দেখিতেছেন। কেথারিণের এ ভাব তাহার ক্ষুদ্র হৃদয়ে ভাল বিবেচনা হইল না। তিনি অনুমান করিলেন যে, যে ওড়না পরে, তাহার চরিত্রই খারাপ হয়। সে পতিসােহাগিনী হইয়া চিরজীবন সুখে কাটাইতে পারে না। মনে এই ধারণা হওয়ায় মনােরমার আর ওড়না পরা হইল না। ধীরে ধীরে ওড়না খান টেবিলের উপর রাখিয়া দিলেন। কেথারিণের প্রতি অতিশয় ঘৃণা জন্মিল। উহার ছবি আর দেখিবেন না, এই স্থির করিয়া অন্য ছবি দেখিবার মানসে পুংকের পৃষ্ঠা উল্টাইতে লাগি- লেন। হঠাৎ তঁাহার নয়ন পথে পতি প্রাণা সতী জুলিয়েটের ’ শৈলক চিত্রপট পতিত হইল। এক মনে, এক দৃষ্টে সেই চিত্রপটখানি দেখিতে দেখিতে আত্মবিলা হইয়া বলিতে লাগিলেন : “সখি ! ঘত দেখিলাম, ইহার মধ্যে তুমিই সুগী। যে হৃদয় বকে হৃদয়ে ধারণ করিতে পারে, সে দুঃখী হইলেও সুখী। তােমার মত সুখী কে আছে ? দেখিতেছি, তুমি তােমার হৃদয়বল্লভকে হৃদয়ে ধারণ করিয়াছ। তবে তােমার মুখ স্নান কেন ? সুখের সময় দুঃখের চিই কেন ? প্রদীপ্ত সৌদামিনী-কোলে কাল মেঘ কেন ? অমলধবল কান্তিতে কালিমা সঞ্চার কেন? বুঝিয়াছি, প্রাণ শীতল ইলে দগ্ধ প্রাণের জাল। প্রথমে অপসাবিত হইয়া যায়। তখন মুগের ভাব বিষাদিত, কিন্তু তাহাতে একটু হাসিমাখা থাকে। বিশেষ লক্ষ্য না করিলে তাহা অনুমান করা যায় না।” এই বলিয়া মনােরমা অন্য মনে পুকখানা বন্ধ করিলেন । কিন্তু সেই মনােমােহন দৃশ্য তাহার নয়ন কোণে অঙ্কিত রহিল। মনে মনে স্থির করিয়া রাখিলেন, তিনিও একদিন জুলিয়েটের মত তাহার হৃদয়বল্লভের হৃদয়ে অমনি করিয়া হৃদয়ে হৃদয় স্পর্শ করাই বেন। তাহার পর চুপ করিয়া বসিয়া থাকিয়া কি ভাবিতে ভাবিতে দুই চারি খানা কাগজ অন্যমনে ছিড়িয়া ফেলিলেন। এবার একখানা ভাল কাগজ আনিয়া লিখিতে আরম্ভ করিলেন। কি লিখিলেন, বা কাহাকে লিখিলেন, তাহা তিনিই জানেন। তার কাগজখানা নষ্ট না করিয়া টেবিলের উপর যত্নে রাখিয়া দিলেন। তাহার পর সায়াহ্ন-গগনের শাে দেখিবার মানসে একটা জানালার নিকটে যায়। গরাদিয়া ধরিয়া দাড়াইলেন।
দুইটা ছবি । . জানালার ধার হইতে জাহুবীর নীল জলের উপর অস্তগমনােখ সূর্যের হেমরশ্মির প্রতিবিম্ব অতি সুন্দর দেখাইতেছিল। পূৰ্ব্ব- পারের বৃক্ষ ও অট্টালিকাগুলিতে সূর্যের স্তিমিত আলােক পড়িয়া- ছিল। তাহার প্রতিবিম্ব জলে পড়িয়া নাচিতেছিল। মনােরমার হৃদয়খানিও সেই সঙ্গে নাচিতেছিল। দিনমণি অস্তাচলে গমন করিলেন। পাখী গুলি কোলাহল করিয়া আপনাপন বাসায় চলিল। গাভীগুলি বংস সঙ্গে করিয়া পুলকে গৃহস্থের গৃহাভিমুখে ধাবিত হইল। গঙ্গায় ভাটা পড়ি- য়ছে, তজ্জন্য গাধাবােট গুলি নােঙ্গর তুলিয়া ছাড়িয়া দিল । ভাটার টানে গজগমনে আস্তে আস্তে চলিতে লাগিল। অন্ধকার হইতে লাগিল। ভিখারিণী প্রদীপ জ্বালিয়া আনিয় টেবিলে রাখিয়া গেল। মনােরমা আস্তে আস্তে আসিয়া পুনরায় কেদারায় বসিয়া একমনে টেবিলের উপরিস্থিত সেই কাগখানা দেখিতে লাগিলেন। তাহাতে কত কি লিখিলেন। লিখিত লিখিতে কতবার হাসিলেন, তাহার সংখ্যা করা যায় না। কণ্ঠ যে এ ঘরে থাকেন, তাহা তিনি ভুলিয়া গিয়াছিলেন । করিয়াছিলেন, এ তাহার পাঠাগার বই ত নয় । কিন্তু শাই তাহার সে ভ্রম দুর হইল। শৈলকণ্ঠ সন্ধ্যা-সমীরণ সেবন করিয়া ধীরে ধীরে আসিয়া গৃহে প্রবেশ করিলেন। মনােরম লেখায় ব্যস্ত ছিলেন, তজ্জন্য তাহাকে দেখিতে পান নাই। মনােরমাকে অমরেশচন্দ্র করিয়া বলিলেন :--“কখন এলে ?” শৈল মনে গৃহ মধ্যে শৈলকণ্ঠের গলার আওয়াজ পাইয়া মনােরম। হঠাৎ কেদারা হইতে উঠিয়া পলাইবার চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন; কিন্তু পারিলেন না। দেখিলেন, শৈলকণ্ঠ দ্বারে দণ্ডায়মান। আস্তে আস্তে যাইয়া এক কোণে লুকাইলেন। শৈলকণ্ঠ তখন চিনিতে পারিলেন যে, এ অন্য কেহ নহেন, - মনােরমা। তিনি শশব্য3ে দ্বার ছাড়িয়া দাড়াইলেন। মনােরমা সঙ্ক চিত ভাবে অতি সাব- নে গৃহ হইতে নিস্তা হইলেন। তাড়াতাড়ির জন্য যে কাগজ গান এত যত্নে ও পরিশ্রম করিয়া লিখিয়াছিলেন, তাহা লইয়া যাইতে ভুলিয়া গেলেন ।
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
যুগল চিত্র।
লকণ্ঠ অনিমেষ-লােচনে মনােরমার সেই মৃদুমন্দ
শৈ গতি দর্শন করিয়া হৃদয়ে অপার আনন্দ অনুভব
করিতে লাগিলেন। যতক্ষণ তাহাকে দেখা গেল,
ততক্ষণ আর চক্ষু
ফিরাইতে পারিলেন না। যুবক
যুবতীর যখন প্রথম প্রণয়ের অঙ্কর জন্মে, তখন
সমস্তই সরলতা ও আনন্দময় হয়, কিন্তু একটু লজ্জা-আবরণে ঢাকা
থাকে। মনের সরলতা দৃষ্টিতে প্রকাশ পায়, কিন্তু লজ্জা প্রাণ
ভরিয়া তাহা দেখিতে দেয় না। চারি চক্ষুর মিলন ? ছি! ছি !
লােকে কি বলিবে ? দিন যাবে -রবে না। তখন সহস্র চক্ষু একত্রে
মিলন হইলেও লােকে ছি ছি বলিবে না।
শৈলকণ্ঠ গৃহে প্রবেশ করিয়া কাপড় ছাড়িয়া জানালার ধারে
যাইয়া বসিলেন। দেখিলেন, জাহুবী-জলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরণঃ-
৪ ০
শৈলকণ্ঠ।
।
* * * * *
গুলি আলো জ্বালিয়া সারি বাধিয়া বীচিমালার উপর দিয়া গজল
গমনে চলিয়া যাইতেছে। একখানি নৌকা হইতে মধুর কণ্ঠে
গতধ্বনি হইতেছে। তাহার পশ্চাৎ একখানা হইতে ঐক্য তানে
বাজনা বাজিতেছে। তাহার পর একখানায় ইংরেজী বাজন
তাহার পর একখানি বজরা। তাহাতে বৈদ্যুতিক আলােক দ্বারায়
সাজান হইয়াছে। তাহার পর ছােট বড় নৌকার এই প্রকার
কত কি। বুঝিতে পারিলেন, “বর” যাইতেছে। এ সব তঁাহার
ভাল লাগিল না। যে মােহিনী মূর্তি তিনি হৃদয়-রাজ্যে অন্বে-
সণ করিতেছিলেন, তাহার অনুরূপ দেখিতে পাইলেন না।
একভাবে অনেকক্ষণ বসিয়া বসিয়া হতাশ মনে চিন্তায় নিমগ্ন
পাকায় শৈলকণ্ঠের মনের স্থিরতা দূর হইল। মেঘস্পৃষ্ট বায়ু বাতায়ন
পথে প্রবেশ করিয়া তাহার হতাশ মনের চিন্তা বিরত করিতে
লাগিল। শীতল-নৈশ-বায়ু-স্পর্শে তাহার মনে হইল, অনেকক্ষণ
তিনি বাতায়নপথে বসিয়া আছেন। উঠিয়া টেবিলের ধারে
সাইয়া পড়িতে বসিলেন। পড়িতে বসিয়া প্রথমেই মনােরমালিখিত
সেই কাগজখানির উপর তাহার দৃষ্টি পতিত হইল। শৈলক
সবিস্ময়ে দেখিলেন, কাগজে একটী যুগল-চিত্র। একটী যুবক, অপরটা
যুবতী। একটী অন্যটীকে আলিঙ্গন করিতেছেন। চিত্রটী অতি
সুন্দররূপে চিত্রিত হইয়াছে। যুবতী যেন সবে মাত্র যৌবনে
পদার্পণ করিতেছেন,—এখনও বালিকা-ভাব মুখে স্পষ্ট বিদ্যমান
রহিয়াছে। দেহলতা এখনও পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় নাই। চঞ্চল চক্ষুদুটী
সরলতা মিশ্রিত হইয়াছে। লজ্জায় আবার তাহা ঈষৎ হেঁট হইয়া
যুগল চিত্র।
অতি সুন্দর দেখাইতেছে। আর প্রেমালিঙ্গন করিতে যাইয়া
সুন্দর ওষ্ঠাধরে যে মধুর হাসি হাসিতেছেন, তাহা যেন অপরে
লাগিয়া রহিয়াছে। কোটি চন্দ্র যেন সে মুখের জ্যোতির নিকট
পরাভূত হইতেছে। যুবতীর সেই অমিয় ভাব দর্শন করিয়া
যুবকের মুখে যে একটা স্বর্গীয় ভাবের উদয় হইয়াছে, সেটী আরও
চমৎকাররূপে চিত্রিত হইয়াছে।
শৈলকণ্ঠ তাবিলেন, তিনি যেন এই উভয়কেই কোথায়
দেখিয়াছেন। শৈলকণ্ঠের চক্ষু চিত্রেই আকৃষ্ট ছিল, তাই এতক্ষ
দেখিতে পান নাই যে, উহার নিম্নভাগে আবার কি লিখিত আছে :
সে লেখা পড়িয়া আরও চমংকৃত হইলেন। লেখা পড়িয়া বা
লেন :-“এ কি স্বপ্ন ?”
নিম্নদেশে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে --
“যুক্ত বাবু শৈলকণ্ঠ রায় ।
তাঁহার শত দাসীর একজন
শ্ৰীমতী মনােরম দাসী ।
হস রে প্রাণেশ হাস।”
শৈলকণ্ঠ শেষ কথাটা পড়িয়া আর হাসি সংবরণ করিতে
পারিলেন না। একাকীই অনেকক্ষণ হাসিলেন। আর অনিমেষ
লােচনে সেই চিত্র দেখিতে লাগিলেন। দেখিলেন কি স্বর্গীয় ভাব
সম্মুখে উপস্থিত। হৃদয় যদ্যপি এ ভাবে বিভাের না হইল তবে
২২
শৈলকণ্ঠ।
ক
জীবন ধারণ বৃথা। এতদিনে বুঝিলেন, এ নশ্বর জগং প্রেমে
বাঁধা। কার প্রেম ? প্রেমই প্রেমের এম।
জগতে যদ্যপি
প্রেম না রহিল তবে মর্ত্যে আর নরকে প্রজেদ কি ? হৃদয় বড়ই
অস্থির হইল । হৃদয়াবেগে বলিয়া ফেলিলেন :-“কেনই বা বৃথা
মরীচিকার আশায় বসিয়া প্রাণ উৎসর্গ করি?”
এমন সময়ে তাহার পশ্চাং হইতে কে বলিয়া উঠিল ;-
“হতাশ হইবার ত কোন কারণ দেখি না।”
শৈলকণ্ঠ মুখ ফিরাইয়া দেখিলেন, ভিখারিণী।
ভিখারিণী সমস্তই দেখিয়াছিল, সমস্তই শুনিয়াছিল। বলিল :-
“দাদা বাবু! লজ্জা পাইলেন কি ?”
শৈল।-তুমি এখানে কেন ?
ভিখা।--কেন, আমার কি এখানে আসিতে নাই ?
শৈল।-না, তা বলিতেছি না ভিখারিণী ।
ভিখা।-তবে কি বলিবেন ?
শৈল।-তুমি একাকিনী এত রাত্রিতে একজন পরপুরুষের
শবে গাসিয়া সচ্ছন্দে কপা বলিতেছ,-তােমার ভয় হয় না ?
ভিখারিণী একটু হাসিয়া বলিল -“আমরা দুঃখী লােক,
ভিক্ষা করিয়া খাই, আমাদের আবার পর পুরুষের কাছে যাইতে
ভয় কি ? বিশেষ আমি আপনাকে দাদা বাবু বলি,-ভাইয়ের কাছে
ভগিনীর আবার কিসের ভয়?”
শৈলকণ্ঠ ভিখারিণীর মুখ পানে চাহিয়া চমংকৃত হইতে লাগি-
লেন। মনে মনে ভাবিলেন -"গরীবের ঘরে এমন সরলা
যুগল-চিত্র।
৪৩
বালিকা জন্মে।” প্রকাশ্যে বলিলেন-“তবে সত্য সত্যই কি
তুমি আমার ভগিনী ?”
ভিখারিণী বিষন্ন ভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। দুই বিন্দু জল
তাহার গও বহিয়া পড়িতে লাগিল।
শৈলকণ্ঠ অত্যন্ত বিস্মিত হইয়া বলিলেন—“সে কি ! তুমি
কাদিতেছ কেন ?”
ভিখারিণী নয়না বাঞ্চলে মুছিয়া ফেলিল। বলিল -
“আপনার কথায়। ভগিনীকে কি ভাই কখন তিরস্কার করে ?”
শৈলকণ্ঠ বলিলেন “আমার অন্যায় হইয়াছে।”
ভিখা।—আমায় আর তিরস্কার করিবেন না ।
শৈল।—না।
ভিখা।তবে আমি আর আপনাকে লজ্জা কৰিব না ?
শৈল।-না।
ভিখা।-আপনিও আমাকে লজ্জা করিবেন না?
শৈল।—না।
ভিখারিণী পুত্তলিকাবৎ দাড়াইয়া আকাশ পানে চাহিয়া কি
ভাবিতে লাগিল। শৈলকণ্ঠও উঠিয়া তাহার নিকটে আসিয়া
দাড়াইলেন। ভিখারিণী খিল্ খিল্ করিয়া হাসিয়া উঠিল।
বলিল -“দাদা বাবু! প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, মিথ্যা কথা বলিবেন
না।”
শৈলকণ্ঠ হাসিয়া বলিলেন :“ভগিনীর নিকট মিথ্যা কথা
বলিতে নাই।”
৪৪
শৈলকণ্ঠ
ভিখারিণী মুখাবনত করিয়া বলিল -“আপনি কি মনাে-
রমার রূপে মােহিত হইয়া তাহাকে আত্মসমর্পণ করিয়াছেন ?
শৈলক বলিলেন :—“ভগিনী! তুমি দেখিতেছি সৰ্ব্বদর্শিনী।
তুমি দেবী না মানবী ?”
ভিখারিণী উচ্চহস্য করিয়া উঠিল। তাহার পর মুখে অঞ্চল
দিয়া হাসিতে হাসিতে উৰ্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল।
PENSE
নবম পরিচ্ছেদ।
পূৰ্ব্বরাগ।
মরেশচন্দ্ৰ কলিকাতা যাইয়া সমুদায় কার্যা শীঘ্ন
শীঘ্র সম্পাদনের জন্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন ।
এ দিকে শৈলকণ্ঠ শ্রীরামপুরে থাকিয়া অনেক
পরিশ্রমে ও ঔষধ দ্বাৱায় অমরেশের মাতাকে
একেবারে সুস্থ করিয়া তুলিলেন। মাতা শৈলকণ্ঠকে
এত ভালবাসিতে লাগিলেন যে, তাহা বলা যায় না। বােধ হয়,
শৈলের মাঠাও শৈলকে এত ভালবাসেন না। শৈল তাহার এত
ভালবাসা দেখিয়া মনে মনে ভাবিলেন, আমি কি ইহার গর্ভজাত
সন্তান ? সন্তানকে লোকে যে প্রকার স্নেহ করিয়া থাকে,
ইনিও সেই প্রকার আমাকে স্নেহ করিয়া থাকেন। অমরেশ
কলিকাতা যাওয়ার পর আমাকে এক মুহূর্ত না দেখিয়া
থাকিতে পারেন না। আমি সকালে বৈকালে বেড়াইতে যাই,
৪৬
শৈলকই ।
বাড়ী আসিলেই ব্যগ্রতা সহকারে জিজ্ঞাসা করেন, “কোথায়
গিয়াছিলে বাবা?” তাহার সেই স্নেহপূর্ণ বাক্যে মনে যে কত
আনন্দ হয়, তাহার আর তুলনা নাই। আমার মাতা আছেন,
ভগিনী আছে, আমি বাড়ী গেলেও ত তাহারা আমাকে দেখিয়া
এই প্রকার আনন্দিত হইবেন ? মাত নিকটে আসিয়া কত কি
জিজ্ঞাসা করিবেন,-ভগিনী হাসিতে হাসিতে নাচিতে নাচিতে
আসিয়া আধ আধ স্বরে কত আবােল-তাবােল বলিবে। কৈ মনােরম।
ত তাহার মত আমার নিকটে আসে না ? আমাকে দেখিলেই
লজ্জাবনতমুখী হইয়া ধীরে ধীরে অন্য দিকে চলিয়া যায়। মাতা
নিকটে থাকিলে যদিও নিকটে আসে, তথাপি কোন কথা বলে
না। জিজ্ঞাসিলে কথা ফোটে ফোটে ফোটে না। মাতা কোন
কার্য করিতে বলিলে ধীরে ধীরে সম্পাদন করে।
তাহার সেই
ভাব দেখিয়া মনে হয়, সে যেন কথা বলিতে আসে, কিন্তু ব্রীড়া
আসিয়া মুখ চাপিয়া ধরে। আমি কতদিন অলক্ষ্যে থাকিয়া
তাহার কথা শুনিয়াছি। অমন অমৃতমাখা স্বর আর যেন আমার
কর্ণকুহরে কখনও প্রবেশ করে নাই। আমার কর্ণকুহরে সেই
অমৃতস্রোত প্রবাহিত হইয়া প্রাণকে মাতােয়ারা করিয়া তুলিয়াছে।
পুরুষে যাহা করে, যাহা ভাবে, তাহা প্রায় যৌবনাবস্থায়
সকলের নিকট প্রকাশ করে,—কিছুই গােপন রাখে না। বিশেষ
বন্ধু বান্ধবদিগের নিকট বলিয়া থাকে, কিন্তু শৈলের মনােভাব
কাহারও নিকট বলিবার নাই। তাহার এমন কেহ নাই যে, তাহার
নিকট মনের কথা বলেন। মনের কথা অন্যের নিকট নালিলে
পূৰ্ব্বরাগ। • মন সুস্থ হয় না, বরং উহা অন্তরাত্মাকে দগ্ধ করে। কেবল সকল আশাগুলি একত্র হইয়া হৃদয় অশান্তিময় করিয়া দেয়। শৈলও যাহা ভাবেন, তাহা কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না, কেবল হৃদয়ের জালায় দগ্ধ হন। কখন ভাবেন যে, অমরেশ কলিকাতা হইতে আসিলেই তাহাকে সমস্ত কথা বলিব। আবার সেই ভাবনাতরঙ্গে থাকিতে থাকিতেই সে আশার নির্মুল করেন। ভাবেন, কেমন করিয়া এ কথা অমরেশকে বলিব ? সে শুনিলেই বা কি বলিবে? এই অল্পদিন আলাপে আমাকে যে সমস্ত বিশ্বাস করিয়া সমৰ্পণ করিয়া গিয়াছে, আমার কি উচিত এইরূপ বিশ্বাস ভগ্ন করা ? কিন্তু কি করিব ? আমার একান্ত বাসনা, কোন দিক নষ্ট না হয়। কিন্তু কি জানি কি আকর্ষণী প্রভাবে আমার মন- হস্তীকে বন্ধন করিয়াছে। অতি সূক্ষ্ম, অতি কোমল, অতি ভাবপূর্ণ বলিয়ন মনকে এত বুঝাই, কিন্তু অবােধ মন কিছুতেই বােঝে না। যাহার অন্তরে ভয়, সে কিছুই করিতে পারে না। যাহার অন্তরে ভয় নাই, সে কোন কাৰ্য্য করিতে একটুও ভাবে যখন মন যাহা করিতে বলে তখনই তাহা সম্পন্ন করিয়া ফেলে। ফুৎ লােকের অন্তরেই ভয় হয়। অসতের অন্তরে ভয় নাই। সংলােকে যাহা করিতে ইচ্ছা করে, পূর্বে তাহার বিষয় ভাবিয়া চিন্তিয়া লয়, পরিণামে কি দাড়াইবে। অসতের মনে যদি সে ভাবনা থাকিত তাহা হইলে পৃথিবীর অবস্থা এমত হইত না। সকল জাতির মনােভাব একপ্রকার হইলে কখনই কোন জাতি বা সম্প্রদায়কে হীনাবস্থায় পতিত হইতে হইত না। দেশের এত ।
৮
শৈলক ।
। ।। ।। ।। ।। ।।
করিত।
দুরাবস্থা হইত না, অন্যের দাসত্ব স্বীকার করিতে হইত না,
একজন বিপদে পড়িলে অপরে অকাতরে তাহর সাহায্য
এ কথায় অনেকে বলিতে পারেন, “তবে কি এখন
একের বিপদে অন্যের সাহায্য কেহ করেন না ?” আমরা বলিব,
“অতি বিরল। যদিও করেন তাহা স্বার্থপরতার জন্য, একতা
ধর্মে নহে।” কাষ নাই আমাদের একতা ধৰ্ম্মে,দাসত্বই
আমাদের শিরোভূষণ,-তাহাই মস্তকে লইয়া অহঙ্কারে কথা
একতা ধৰ্ম্ম বলিয়া কি করিব ? কয়জন লােক ইহার
আলােচনা করিবেন ? হয়ত অনেকে বলিবেন,-“এ পাগলের কথা
মাত্র,—এতে কোন ফল নাই ।
বলি।
“স্য পিতা কন্য মাতা করা ভ্রাতা সদর।।
কায়া-প্রাণে ন সম্বন্ধ ক) কস। পরিবেদন'।
পুরুষের যেমন চিন্তাশক্তি আছে, স্ত্রীলােকের কি তাহা নাই ?
অবশ্য আছে। তাহারাও ভাবিতে জানে। পুরুষাপেক্ষা স্ত্রীলােকের
ধৈর্য্য অনেক অধিক। পুরুষ যাহা ভাবে, ভাল হউক, মন্দ হউক,
সকলের নিকট প্রকাশ করে। স্ত্রীলোক তাহা করে না,-হৃদয়ের
নিভৃত স্থানে লুকাইয়া রাখে। আবার কখনও সেই সূব
ভাবিয়া
ভাবিয়া নিজে নিজেই ক্রন্দন করে। আবার সেই অশ্রুজল মুছিয়া
ফেলে, পাছে কেহ দেখিতে পায়। অশ্রুজলই তাহাদের হৃদয়-
উদ্বেগ শান্ত করিবার একমাত্র ঔষধী। তাহাদের মনে যতই
কেন কষ্ট হউক না, প্রাণ খুলিয়া একবার কাঁদিতে পারিলেই সকল
শান্তি অনুভব করে।
পূর্বরাগ।
৪৯
, # A = ৬৬
5 A5 ••••
পনের দিন পরে অমরেশ কলিকাতা হইতে বাড়ী ফিরিয়া
আসিলেন। আসিয়াই প্রথমে মাতার নিকটে শৈলের সঙ্গে যাইয়া
উপস্থিত হইলেন। মাতা অমরেশকে জিজ্ঞাসা করিলেন ।
“কলিকাতায় সমুদায় কাৰ্য কি নিৰ্বাহ করিয়া আসিয়াছ ?”
অমরেশ বলিলেন-“কলিকাতার কাৰ্য শেষ হইয়াছে। আর
যাইতে হইবে না। ডিক্রীর নকল পাইয়াছি, জারির সংবাদ আসি-
য়াছে, আর রামপুরে থাকিবার প্রয়ােজন নাই। শীঘ্রই চুচুড়াব
বাড়ী যাওয়ার আয়ােজন করিতে প্রস্তুত হই।”
মাতা।—দুষ্ট জ্ঞাতি ত আর গােল করিবে না ?
অম-তাহার আর গােল করিবার সাধ্য কি আছে ?
তাহার পর শৈলকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন : “শৈল। নিজের
কথায় ব্যস্ত থাকায় তােমার কথা এ পর্যন্ত কিছুই বলিতে পারি
লাই। ধীরেন বাবু বলিলেন :-‘তােমার মােক দমায় জিত
হইয়াছে। ”
শৈল মােকদ্দমা জিতিয়াছেন শুনিয়া মনে মনে খুব আনন্দিত
হইলেন। হর্ষে কিছুকাল কথা কহিতে পারিলেন না। 'অনেক
ক্ষণ পর বলিরেন—“তবে কালই আমি কলিকাতায় যাইয়া
উকিল বাবুর পারিতােষিকের টাকা দিয়া আসিব, এবং রায়
ফয়সালার নকলাদিও লইব। কি জানি সে যদি আবার প্রিতি,
কাউন্সিলে আপিল করে।”
অম।-তােমার আর কলিকাতা যাইতে হইবে না। উকিল
বাবুকে আমিই পারিতােষিকের টাকা দিয়া আসিয়াছি এবং রায়
শৈলকণ্ঠ।
ফয়সালার নকলও লইয়া আসিয়াছি। উকীল বাবু বলিলেন
যে, এই মােকদ্দমার আর বিলাত আপিল হইতে পারে না,-
হাইকোর্টেই ইহার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হইয়াছে।
এই বলিয়া অমরেশচন্দ্র একটী কাগজের তাড়া বাহির করিয়া
উল্টাইয়া পাল্টাইয়া কএকখানি মােক ক্ষমা সংক্রান্ত কাগজ বাহির
করিয়া শৈলের হাতে দিলেন। শৈল অতি ব্যর্থতা সহকারে উহা
পাঠ করিতে লাগিলেন। যতই পড়েন, ততই মনে মনে আনন
উপভােগ করিতে লাগিলেন। মুখ ক্ৰমে প্রসন্ন হইতে লাগিল।
দশম পরিচ্ছেদ
আশা ফলবতী
বন- প্রারম্ভের কান-লহরী শে নব নয়।
যৌ
চিন্তা মিথ্যাবাদন হয়, কি কানা মায়াবিন,
রূপ ধারণ করিয়া আশার আশ্বাস বাক্যে সুদর
ভবিষ্যতের পথে টানিয়া লইয়া যায়। তখন মা।
হয়, আশা বিশ্বাসঘাতিনী হইবে না।
সঙ্গে সঙ্গে তখন মনে আসিয়া কত কথাবই উদয় হয় ।
মনােরমা শৈলকণ্ঠের নিকট হইতে চলিয়া আসিয়া লয়
আপনার শয়ন কক্ষে প্রবেশ করিলেন। ভিধারিণী ও তঁাহাব
পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিয়া কক্ষে প্রবেশ করিল।
মনােরমা অনেকক্ষণ কি ভাবিয়া, তাহার পর ভিখারিণীর কাণে
কাণে কি বলিয়া দিলেন। ভিখারিণী কক্ষ পরিত্যাগ করিয়া
মনােরমার মুখমণ্ডল এক কমনীয় শান্তভাব
চলিয়া গেল।
শৈলক।
•
• • • • • • • • • ।
ধারণ করিল। নূতন জ্যোতিতে যেন চক্ষুযুগল আলােকিত
হইল। নূতন উল্লাসে সে লাবণ্যমর দেহখানি টলমল করিতে
লাগিল।
সাবধান মনােরমা ! তুমি বালিকা নহ, যুবতী ; কুরূপ।
নই, রূপবতী ; মূর্ণ নহ, শিক্ষিত। তােমার চিন্তাশক্তি
অাছে। তরুণ বয়সে প্রণয়ােল্লাসে সকলেই মােহিত হয়।
ইহাকে যৌবনের মােহিনী শক্তি বলে।
রজনী ক্রমে বাড়িতে লাগিল,—একে একে সমস্ত ক?
তাহার হৃদয়ে জাগরিত হইতে লাগিল। যখন মনে হইল, চিত্রটা
(ফেলিয়া আসিয়াছেন, তখন লজ্জায় আপনা-আপনি মাথা হেঁট
করিয়া বসিলেন। তাঁহার মনে হইতে লাগিল, সকলেই যেন
সে চিত্র দেখিয়াছে। ছি! ছি! কি লজ্জার কথা ! কেন আমি
এ কাৰ্য্য করিলাম? যদি চিত্রবিদ্যা না শিখিতাম তাহা হইলে
ত আমায় আজ এ প্রকার বিপদগ্রস্ত ও অপদস্থ হইতে হইত না।
এই প্রকার ভাবিতে ভাবিতে মনােরমা মাইয়া শয়ন করিলেন।
তন্দ্রা আসিয়া তাহার চক্ষুযুগল আবৃত করিল। তিনি বিশ্রাম
দায়িনী নিদ্রার কোমল কোল আশ্রয় করিলেন ।
স্বপ্নে দেখিলেন, অমরেশচন্দ্ৰ কলিকাতা হইতে আসিয়াছেন।
তিনি মনােরমার জন্য কলিকাতার যত সুন্দর জিনিষ পাইয়াছেন,
তাহার সমস্তই আনিয়াছেন। বাক্স ভরা ভরা গহনা, পােটমেন্ট
ভরা ভরা জামা ও কাপড়, পেটারি ভরা ভরা পুতুল, সুগ
দ্রব্য, আতর, গােলাপ জল, মাথার ফিতা, কার, আয়না, চিরুণী,
ঘুমের ঘােরে
আশা ফলবতী।
আরও কত কি। কিন্তু কিছুই মনােরম প্রাণ ভরিয়া দেখিতে
পারিতেছেন না। তিনি দেখিতেছেন, সব বাক্সের উপর ও মধে,
সব গহনার সঙ্গে, সব জামার উপর, সব কাপড়ের উপর, প্রত্যেক
খেলনার সঙ্গে, প্রত্যেক জিনিষে সেই চিত্র। এ কি ! একখানা
চিত্র এত অসংখ্য হইল কেমন করিয়া ভিখারিণী সেই সমস্ত
দেখিয়া মুখে কাপড় দিয়া হাসিতেছে।
ভিখারিণী শৈলকণ্ঠের নিকট হইতে চলিয়া আসিবার সময়
দেখিল, অমরেশচন্দ্র আসিয়া পৌছিলেন। তাড়াতাড়ি মাতাকে
যাইয়া অমরেশচন্দ্রের আগমন:সংবাদ দিয়া, মনোরমার কক্ষে
প্রবেশ করিল
যাইয়া দেখিল, মনােরমা নিদ্রিতা, কিন্তু তাহার
সুন্দর অধরে লজ্জা-চিহ্ন। তাই দেখিয়া সে হাসিতে লাগিল।
ভিখারিণীর হাসিতে মনােরমার নিদ্রা ভঙ্গ হইল। মনােরম।
উঠিয়া বসিয়া ভিখারিণীকে দেখিবামাত্র বিস্ময়াপন্ন হইলেন।
ডাগর ডাগর চক্ষু হটী কোমল অঙ্গুলি ধারায় আস্তে আস্তে পরিষ্কার
করিয়া হাসিয়া কহিলেন – “কি হইল ? আশা ফলবতী ?”
ভিখারিণী কহিল --“তােমার সে কথায় কাজ কি ?”
মনোরমা অপ্রতিভ হইলেন ।
ভিখারিণী তঁাহার লড়া
দেখিয়া মুচকি মুচকি হাসিয়া কহিল :-“যার ধন সে পেয়ে,
আমায় দিবে কেন?”
মনােরমার মুখ ফুটনোন্মুখ পরের ন্যায় প্রফুল্ল হইল। ভিখা-
রিণীব মুখপানে চাহিয়া কহিলেন -“তবে তােমায় পাঠাইলাম
।
কেন ?”
৫৪
শৈলকণ্ঠ।
ভিখারিণী বলিল -“আমি তঁাহার সহিত দাদা
সম্পর্ক
পাতাইয়াছি। তিনি আমার দাদা, আমি তঁাহার ভশিনী।
আমার শৈল দাদা তােমায় বিবাহ করিবেন। চিত্ৰ আমি চাহিতে
পারিলাম না।”
মনােরমার মুখ গম্ভীর হইল,-অধােবদনে পৃথিবী পানে
চাহিয়া রহিলেন।
ভিখারিণী বলিল -“তােমার দাদা আসিয়াছেন।”
মনােরমা ছুটিলেন।
একাদশ পরিচ্ছেদ
মিলন।
ক মাস হইল অমরেশচন্দ্র শ্রীরামপুর ছাতিয়া
পৈত্রিক তদ্রাসন চুচড়ায় আসিয়াছেন। দুষ্ট জাতি
এখন তাহার পদানত হইয়াছে। বাড়ী আসার
দিন হইতেই আনন্দের ধূম পড়িয়া গিয়াছে। দ্বারে
নহবৎ বজিতেছে, নৃত্যগীতাদির হুলুস্থুল পড়িয়াছে।
প্রত্যহ শত শত প্রজা আসিয়া সাক্ষাৎ করিতেছে। অমরেশচন্দ্র
তাহাদের আহারাদির সুশৃঙ্খলা করিয়া দিয়াছেন। সকলেই
তাহার এই অভিনব কার্যপ্রণালীর প্রশংসা করিতেছেন। স্থানীয়
লেকের আর আনন্দের পরিসীমা নাই। শত্রু পক্ষ মিত্র পক্ষ সক
লেই এখন আসিয়া মিত্র হইয়াছেন। স্থানান্তর হইতে আত্মীয় স্বজন,
বন্ধু বান্ধব আসিয়া আবাসভবন আনন্দময় করিয়া তুলিয়াছেন।
শৈলক। আজ সকলের মনে আবার এক অভিনব উৎসাহ আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। আজ হইতে অমরেশচন্দ্রের বাড়ীতে আরও আমােদের ঘটা অধিক হইতে আরম্ভ হইয়াছে। জয়টাকৈর হৃদয়ােদীপক বাজনা সকলের মনে আরও উংসাই বর্ধন করি- তেছে। গায়কগণ কোকিলকণ্ঠ পঞ্চমে চড়াইয়া গান করিতে করিতে শ্রোতাদিগকে মােহিত করিতেছে। হাল ফেশানি যুবকগণ নর্তকীর নৃত্য ও সুগায়িকার গান দর্শন ও শ্রবণে আত্মবিহবল হইয়া হাসিতে হাসিতে নিশ্বাস ফেলিবার সময় পাইতেছে না। ছেলের দল সন্দেশ খাইবার সােতে দলে দলে আসিয়া বাড়ীর ভিতরে যাইতেছে। মনােরমার মাতা তাহাদিগকে যথেষ্ট সন্দেশ ও মিষ্টান্ন বিতরণ করিতেছেন। কেহ খাইতেছে, কেহ নাচিতেছে, কেহ গাইতেছে, কেহ বা খাইতে না পারিয়া পুটুলি বাধিয়া বাড়ী লইয়া যাইতেছে। মনােরমার মাতা এই আনন্দে মাতিয়াছেন। একটী দুই বৎসরের শিশুর হাতে তিনি একখানি আবি সন্দেশ দিয়াছিলেন, বালক সন্দেশ পাইয়া মনের আননে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাদ বিক্ষেপ করিয়া যখন হেলিয়া দুলিয়া চলিয়া যাইতেছিল,তখন হঠাৎ কাহার অস্পর্শে সে পড়িয়া গেল। সন্দেশও হস্তলিত হইল। একটা কাক আসিয়া সন্দেশটী লইয়া গেল। বালক ভা করিয়া কাদিয়া উঠিয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিল যে, সন্দেশ নাই। অমনি আবার ধূলায় পড়িয়া কাদিতে লাগিল। মনােরমার মাতার বাল- কের দিকে লক্ষ্য ছিল, তাই আসিয়া তাহাকে ক্রোড়ে লইয়া বলি- লেন -“কেঁদনা বাবা! আমি তােমাকে অনেক সন্দেশ দিব।”
মিলন।
বালকের ক্রন্দন থামিল না, সে কাঁদিতে কাঁদিতেই বলিল :--
“আমি আর থদেশ তাই না, আমার ঐ থদেশই ভাল থিল।”
মনােরমার মাতা বালককে সন্দেশের ঘরে নিয়া ছাড়িয়া দিয়া
বলিলেন :-“তােমার যাহা খুসি তাহাই লও। কেঁদ না!”
বালক রাশীকৃত সন্দেশ দেখিয়া ক্রন্দন ভুলিয়া গেল। হাসিয়া
একটা সন্দেশের ঝুড়ির ধারে যাইয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঙ্গুলি দ্বারা
তাহার কিনারা ধরিয়া টানিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু কৃতকার্য
হইতে না পারিয়া একদৃষ্টে মনােরমার মাতার প্রতি চাহিয়া রহিল
মনােরমার মাতা ভিখারিণীকে ডাকিয়া বলিলেন “এই
ছেলেটীকে ঐ সন্দেশ সহকারে উহার বাড়ী দিয়া আইস
ভিখারিণী মাতার আজ্ঞা পালন করিতে চলিল । পথে
যাইতে যাইতে বালক বলিল -“তুমি কার মা ?”
“আমি কাহারও মা নহি।”
“আমার মা ?”
“তােমার মা ঘরে।”
“ডিডি ?”
*খেলিতেছে।”
“তােমার মা থনদেশ।”
“আমার মা তােমাকে এই সন্দেশ দিয়াছেন।"
বালকের প্রাণে বড় আনন্দ হইল। হাত তুলিয়া আস্তে
আস্তে নাড়িয়া নাড়িয়া বলিল -“তােমার মা ভাল, আমাকে
থদেশ দিয়াছে ।”
৫৮
শৈলকণ্ঠ ।
“তােমার মা তােমাকে সন্দেশ দেন না ?”
বালক কোন উত্তর করিল না।
ভিখারিণী শিশু টীকে লইয়া যাইতেছে ; কিন্তু কোথায় লইয়া
যাইবে তাহা ত জিজ্ঞাসা করিয়া আসে নাই ? পথ দিয়া একটা
বৃদ্ধ। যাইতেছিলেন, ভিখারিণী তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল ।
“হা গা মা ! এই ছেলেটীর কোন্ বাড়ী?”
বৃদ্ধা ছেলেটীর মুখ পানে অনেকক্ষণ চাহিয়া চাহিয়া কি
দেখিলেন। তাহার পর ভিখারিণীর মুখপানে অনেকক্ষণ চাহিয়া
রহিলেন। অনেকক্ষণ চাহিয়া চাহিয়া চাহিয়া শেষে বলিলেন :
“তোমার নাম কি গা ?”
ভিখারিণী বলিল -“ভিখারিণী ।”
বৃদ্ধা বলিলেন- “তােমার ভিখারিণী নান হইল কেন?”
বৃদ্ধার কথা যেন ভিখারিণীর ক{ে অমৃত বর্ষণ করিতেছিল । তাই
বলিল -“হাগা মা! তুমি অত কথা জিজ্ঞাসা করিতেছ কেন ?
বৃদ্ধা ত অমন কথা কখন শুনেন নাই । তাহার কথা শুনিয়া
আর দাড়াইয়া থাকিতে না পারিয়া রাস্তার ধারে একখানা
বাড়ীর রকে যাইয়া বসিলেন, এবং ভিখারিণীকেও তথায় বসিতে
বলিলেন ।
ভিখারিণী তাহার নিকটে বসিলে বৃদ্ধা বলিলেন – “আমার
মা ! একটা মেয়ে ছিল। মেয়েটী যখন তিন বৎসরের তপন ছেলে-
ধরায় তাহাকে নিয়া যায়। সে যদি আজ থাকিত তবে তােমার
মত এত বড়টা হইত। যে দিন হইতে আমি আমার নয়নতারাকে
মিলন। | হারাইয়াছি সেই দিন হইতে আমি কঁদিয়া কঁাদিয়া চারিদিকে ছুটাছুটী করিতেছি। কোথাও তাহাকে দেখিতে পাই না। আজ তােমার চাদপানা মুখখানি দেখিয়া আমার সেই মুখখানি মনে পড়িয়াছে।” এই বলিয়া বৃদ্ধা কাদিতে লাগিলেন। হরবল্লভ রায় অমরেশচন্দ্রের জ্ঞাতি। এই বৃদ্ধা অমরেশচন্দ্রের মাতার অনেক সহায়তা করিতেন। সেইজন্য হরবল্লভ বৃদ্ধার মেয়েটাকে অপহরণ করিয়া লইয়া যান। বৃদ্ধা মেয়ে হারাইয়া পাগলের মত ছুটাছুটী করিতেন। হরবল্লভ ভিখারিণীকে চুরি করিয়া প্রথমে কলিকাতায় গিয়া তাহার এক বন্ধুর বাড়ীতে রাখেন। সেখানে ভিখারিণী প্রায় ৫ বসর ছিল। যখন ভিখারিণীর বয়স ৮ বৎসর তপন তাহাকে শ্রীরামপুরে আনিয়া এক বৈষ্ণবের বাড়ী রাখেন। সেইখানে থাকিয়া ক্রমে অমরেশচন্দ্রের মাতার সহিত তাহার, পরিচয় হয়। হরবল্লভ ভিখারিণীকে চিনিতেন। ভিখারিণী হর- বল্লভকে অনেকবার দেখিয়াছে, কিন্তু চিনিত না যে, এই হরবল্লভ। যখন বৃদ্ধা ভিখারিণীর নিকট বসিয়া কাদিতেছিলেন তখন হর- বল্লভ সেই পথ দিয়া যাইতেছিলেন। এ হরবল্লভ আর সে হবল্লভ নহেন। যিনি একদিন বৃদ্ধার নয়নতারাকে কাড়িয়া নিতে কুষ্ঠিত হয়েন নাই, সেই হরবল্লভ আজ হঠাং বুন্ধার নিকটে আসিয়া তাহার পাদস্পর্শ করিয়া বলিলেন –“আমায় আপনি ক্ষমা করুন ?” বুদ্ধা হঠাৎ হরবল্লভকে দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলেন। বলিলেন :- “আমার গলা টিপে মারিয়া ফেল। মাবিয়া ফেলিয়া তােমার শৈলকণ্ঠ। ছেলে নিয়ে ঘরে যাও, আমি তােমার ছেলেকে কিছু বলিব না। 'আমার যন্ত্রণার শেষ হউক।” ভিখারিণী একদৃষ্টে হরবন্ধুভের মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। ছেলেটী বাবা বাবা বলিয়া যাইয়া হরবল্লভকে জড়াইয়া ধরিল। রবল্লভ বাষ্পকুল লােচনে গদগদ কণ্ঠে বলিলেন-“পিসি মা? ছেলেবেলায় তুমি আমাকে কত ভালবাসিতে, কত আদর করিতে, কত আবদার সহিতে। আমার আজ সেই কথা মনে হইতেছে। আমি নরাধম, আমি ধনলােতে উন্মত্ত হইয়া কত গর্হিত কাৰ্য্যই করিয়াছি, তাহার সীমা নাই। আজ আমাকে শত বৃশ্চিকে দংশন করিতেছে। তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না কর, রক্ষা না কর তবে বােধ হয় নিশ্চয়ই আমার মৃত্যু নিকট।” এই বলিয়া ভিখারিণীর দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেন –“দিদি ভিখারিণী ! এই বৃদ্ধাই তােমার মাতা। তােমার নাম ভিখারিণী নহে, তােমারই নাম সরসৗবাল।” বৃদ্ধা যেন আকাশের চঁদ হাতে পাইলেন। ভিখারিণীকে টানিয়া আনিয়া আপন বক্ষে ধারণ করিলেন। আজ একাদশ বংসর বৃদ্ধা সরসীবালাকে হারাইয়া পাগলিনী হইয়াছিলেন। এক মুহুৰ্ত্ত সেই নয়নতারাকে হৃদয়ে ধারণ করিয়া হৃদয় শীতল করিলেন। তাহার পর হরবল্লভের দিকে চাহিয়া বলিলেন -“বাছা। তুমি যেমন আজ আমাকে শীতল করিলে, ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন তােমার সহস্র অপরাধ মার্জনা করিয়া তােমাকে সুবুদ্ধি প্রদান করেন।”
মিলন। মনোরমার মাতা মুক্ত বাতায়নে দাড়াইয়া এই অভিনব দ দেখিতেছিলেন, কিন্তু কিছুই বুঝিতে পারিতেছিলেন না। কোত্ব- হল নিবারণ জন্য সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। যদি সেই স্থানে সেই সময়ে বজ্রপাত হইত তাহা হইলে ও হরবল ভ তত আশ্চর্য্য বােধ করিতেন না। কিন্তু মনােরমার মাতাকে সেই স্থানে আসতে দেখিয়া নিশ্চল কাঠপুত্তলিকাবৎ দাড়াইয়া বহিলেন। তঁাহার সংজ্ঞা লােপ হইল। মনােরমার মাতা বৃদ্ধাকে দেখিয়া চিনিলেন। অমরেশচন্দ্র সেই ক্ষণে তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হাবল্লভ পুত্ৰটীকে কোলে করিয়া অমবেশের মাতার পদ প্রান্তে পড়িয়া ক্ষমা ভিক্ষা চাহিলেন। অমরেশচন্দের মাতা শিশুটাকে আপন ক্রোড়ে উঠাইয়া নি। হরলাভের মস্তক আঘ্রাণ করিয়া বলিলেন -“ভগবান যাহা করেন, তাহা মঙ্গলের জন্যই। তোমার যে অনুতাপ আরম্ভ হই. সছে, এইটাই তােমার মঙ্গলের কারণ। যখন ভিখারিণীর মাতা সুখী হইয়াছেন, তখন আমরা সকলেই সুখী তার পর অমরেশচন্দের দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেন-- “ইনি তােমার দাদা, ইহাকে প্রণাম কর । আর যাইতে ইহার কোন কষ্ট না হয়, তাহার ব্যবস্থা করিয়া দাও। হরবল্লভ এতদিন রাজভােগ পাইয়াছেন, তাহার যেন অন্যথা না হয়।” অমরেশচন্দ্র বলিলেন :—“আপনার আজ্ঞা শিরােধার্য।” হরবল্লভ দৌড়িয়া বাড়ী যাইয়া, সস্ত্রীক আসিয়া, অমরেশচন্দ্রের বাটীতে উপস্থিত হইয়া আনদে যোগ দান করলেন। ! !
১ শৈলক এই প্রকার আনন্দ-কোলাহলে দুই দিন কাটিয়া গেল। অন্য তৃতীয় দিন । আজ শৈলকণ্ঠের সহিত মনােরমার পরিণয় কার্য} সাধা হইবে। তাহাদের মনে আজ আনন্দ কি বিষাদ, তাহ। বিবাহিত ব্যতীত অন্য কেহ বুঝিতে পারিবেন না। বাহারা কিছু বস্ত হইয়া বিবাহ করিয়াছেন, তাঁহারাই জানেন যে, বিবাহের পূধ্ব সময়ে তাঁহারা কি প্রকার অবৈস হইয়াছিলেন। আজ শৈলকণ্ঠের মনও সেই প্রকার অধৈৰ্য্য হইয়াছে। মনে মনে ভাবিতেছেন,—“কতগণে দিবাভাগ কাটিয়া যাইবে,-কতক্ষণে সেই সুখের সময় আসিয়া অধৈৰ্য্য প্রাণে ধৈৰ্য স্থাপন করিবে ? যাহাকে | এদিন হইতে হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী করিবার বাসনা ছিল, আঙ্গ তাহাকে পাইয়া জীবন চরিতার্থ করিব।' এই প্রকার চিন্তা ও অনলিলে ভাসিয়া ভাসিয়া যতই যান,---কেবল চারিদিকে অব শ্রাম আনন্দ দেখিতে পান। শৈলকণ্ঠ এইরূপ চিন্তায় অনেক দৰ যাইলেন। বাইতে যাইতে আর শেষ দেখিতে পাইলেন না। দেখিলেন, জগত প্রেমময়। তখন তাহার হৃদয়ে সুপের অবধি নাই। তাই বলিলেন –“যদি শেষ থাকিত তবে আমি পাই না কেন?” এস্থানে গ্রন্থকার বলিবেন :----আজ পাইতেছ না. ধৈর্য্য ধর, একদিন পাইবে। তখন সহস্র মনােরমারও মাধুরী- মিশ্রিত রূপের ছটা তােমার প্রাণ আকুল করিতে পারিবে না।” বেলা অবসানে সূর্যদেব বিমার্থ অস্তাচলশায়ী হইয়াছেন। এখন আহারাদির গােলযােগ নিটিয়া গিয়াছে । গােধুলি লগ্নে বিবাহ, সময় প্রায় হইয়া আসিল। আত্মীয়, কুটুম্ব ও নিমন্ত্রিত মিলন। সকলেই অন্যান্য কাৰ্য্য শীঘ্র শীঘ্র সম্পাদন কবির এই শুভ বিবাহে যোগদান করিবার জন্য বিবাহ বাড়ীতে আসিতে লাগিলেন । সকলই সুন্দর সুন্দর পরিচ্ছদে আবৃত হইয়া, গোপে তার, রূমালে ও মাথায় নানারূপ সৌগন্ধ পুস্পসার লাগিয়া, মাথায় টের কাটিয়া, আর গোলাপের ফররা উড়াইয়া, বৈঠকখানায় ইয়া বসিয়া খোস গল্প আরম্ভ করিলেন। ক্রমে সময় উপস্থিত হইল, বর সভাস্থই ছিলেন, তঁাহাকে লইয়া সকলেই ছায়াম গুপে উপস্থিত হইলেন। শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে অন্দরমহলে কান পাতা যায় না। পুরােহিত ঠাকুর উচ্চরবে মন্ত্র পাঠ করিতে লাগিলেন। স্বয়ং অমরেশ- চন্দ্র সম্প্রদানকার্য শেষ করিলেন। শুভদষ্টি হইয়া গেল। সেই সমৰে সমস্বরে অন্তরাল হইতে কোকিলকণ্ঠ সঙ্গীত হইতে লাগিল :- “গাও সবে আজ সুমধুর তানে প্রণয়-পীযূব মধুর গান। প্রণয়ী দুজনে জুড়া হেরিয়া মােদের প্রাণ। কর আরাধনা তঁাহার সদনে, তিনি হে পালক অখিল ভুবনে,- তার আশীর্বাদে এদের জীবনে মাতুক প্রণয়ে সম ভাবে প্রেম বহে গো যেন।” সকলেই নিস্তব্ধ হইয়া এক মনে গীত শ্রবণ করিতে লাগিলেন। তাহার পর নব দম্পতি বাসর ঘরে প্রবেশ করিলেন। ५ मिटक নিমন্ত্রিতদিগের আহারের ধূম পড়িয়া গেল।
#k দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। সমাপি নােম পরদিন স্বামীর সঙ্গে বজরায় চাপিয়া শ্বশুর- বাড়ী চলিলেন। স্বামীর সঙ্গে যাওয়া যদিও সুখ তবুও তাহার প্রাণ মায়ের জন্য ব্যাকুল হইল। অন বরত কাঁদিতে লাগিলেন। মাতা নানাবিধ মধুর বাক্য বলিয়া মনােরমাকে সান্ত্বনা করিতে প্রয়াস গাইলেন। কিন্তু কিছুতেই তাহার ক্রন্দন থামাইতে পারিলেন না। মনােরম। একদিন কাদিয়াছিলেন,-মাতা মরিবেন ভাবিয়া ;- আজ কাদিতেছেন,—সেই মাতাকে ফেলিয়া যাইতেছেন বলিয়া। কালের ওতি এ রকমই বটে। মনােরমার মাতা বলিলেন-“মা মনােরমে ! ফুল যতক্ষণ বৃক্ষে ফুটিয়া থাকে ততক্ষণই সুন্দর। তুমি তোমার কল্পবৃক্ষ স্বামীর সঙ্গে বাইতেছ, তােমাকে আজ কত সুন্দর দেখাইতেছে।
সমাপ্তি ।
হাসিয়া হাসিয়া স্বামীর সঙ্গে যাও। ভগবান তোমার মঙ্গল করিবেন।
আমিও দেখিয়া সুখী হইব। কাঁদিয়া যদি চলিয়া যাও ।
তােমার জলভরা চক্ষুদুটী সৰ্ব্বদা আমার নয়নে বিরাজ করিয়া
আমাকে অসুখী রাখিবে।”
মায়ের কথায় মনােরম স্বাঞ্চলে চক্ষু মুছিয়া, নিদাঘের কাল
মেঘের কোলের বিজুলীৰং সলজ্জ ভাবে একটু হাসিয়া, ধীরে ধীরে
মাতাকে প্রণাম করিয়া বিদায় হইলেন।
শৈলকণ্ঠের অনুরোধে ভিখারিণীও তাহাদের সঙ্গে চলিলেন।
শৈলকণ্ঠ বাড়ী পোহুছিলেই তাহার ভগিনী অনুপমা আনিয়া
শৈলকষ্টের গলা ধরিয়া কাদিতে আরম্ভ করিলেন। এ কান্না দুঃখের
নহে—সুখের। শৈলকণ্ঠ অনুপমার হস্তে মনােরমাকে সমর্পণ
করিয়া হাসিতে হাসিতে বাহিরে চলিয়া গেলেন। অনুপম
মনােরমার ঘােমটা খুলিয়া দিয়া ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তাহার মুখ
পানে চাহিয়া রহিলেন। ভিখারিণী হাসিয়া বলিল -“কি দেখি,
তেছ কেন ?”
অনুপমা হাসিয়া বলিলেন –“দাদা আমার বৌদিদির কমনীয়
গঠন ও চাদপানা মুখখানি দেখিয়াই ভুলিয়া গিয়াছেন। আমি
দেখিতেছি, আমার বৌদিদি বােবা।”
মনােরমার একটু লজ্জা বােধ হইল। আস্তে আস্তে মাথায়
কাপড় টানিয়া দিয়া ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন—“না ভাই।
তােমার অনুমান মিথ্যা।”
গৃহ মধ্যে হাসির গােল বাঁধিয়া গেল ।
শৈলক। গ্রামের স্ত্রীলােকেরা আসিয়া সকলেই বৌ দেখিয়া গেল। সকলেই বৌয়ের প্রশংসা করিতে লাগিল। বৌভাতের দিন স্ত্রী পুরুষ সকলেই উদর পরিতােষ করিয়া ভােঙ্গন করিল । বিবাহের কয়েক দিন পর শৈলকণ্ঠ ও মনােরমকে দেশ- প্রচলিত নিয়ম অনুসারে আপন বাড়ী আনার জন্য, অমলেশ চন্দ তাহাদের বাড়ী আসিলেন । শৈলকণ্ঠের মনে অপার আনন্দ। তাহার মাতা ও অনুপমা তাহাকে বিশেষ যত্ন করিলেন। একদিন অমরেশচন্দ্র মনােরর গৃহে প্রবেশ করিয়াছেন। মনােবা কি কাৰ্যা উপলক্ষে গৃহান্তরে চলিয়া গিয়াছেন। অনুপম। মুক্ত পাতায়নে বসিয়া আপন মনে গাহিতেছিলেন। সন্ধ্যা-সম। পার্শস্থিত উদ্যান প্রস্ফুটিত ফুল গুলির সহিত গেল কবিয়া, বাতায়ন পথে ধীরে ধীরে প্রবেশ করিয়া তঁাহার কেশগুচ্ছ দোলাইতেছিল। তিনি আকাশের দিকে চাহিয়া বলিতেছিলেন । “নিৰ্ম্মল তারকারাজি ফুটেছে গগনে। সুন্দর মলয়ানিল বহিছে সঘনে ॥” অমরেশচন্দ্র একটু আমুদে, অনুপমাও কম নহেন, কিন্তু সরলা। অমরেশচন্দ্র আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। বলিলেন ? “কবি ঠাকুর! প্রাতঃ প্রণাম । বলি যখন এত ভাব, তখন একা থাকা ভাল নয়,দো ছােট লও।” অনুপমা অমরেশচন্দ্রকে দেখিয়া লজ্জায় একটু নতমুখী হইয়া বলিলেন--“গরীব মানুষ,- দে। ছােট কোথা পাব ? তাতে আবার স্ত্রীলােক।”
সনাপি। ৬৭ অমরেশচন্দ্র বলিলেন –“তােমার দাদাকে বলিয়া একটা আনাইয়া দিব।” অনুপমা দেওয়ালের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া অরেশ- চন্দ্রকে একখানা ছবি দেখাইয়া বলিলেন –“আমি ত মনােরম নহি।” সেই সময়ে মনোরম! আসিয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। মনােরমা এক্ষণে শ্বশুর বাড়ী, অতএব শ্বশুর বাড়ীর চির মাদ। অনুসারে অর্ধ ঘােমটা দিয়া অতি ক্ষীণ স্বরে বললেন -" আমি বাড়ী যাইবার জন্য সমস্ত উদযােগ করিয়া রাখিয়াছি। না. রমার কথা শেষ হইতে না হইতেই অনুপমা জানালা হইতে ছুটিয়' আসিয়া তাহার অঘােমটা ফেলিয়া দিলেন। মনোরমা কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। সেই সময়ে বাহির হইতে শৈল অবশ, চন্দ্রকে ডাকিলেন। অমরেশ বাহিরে আসিয়া শৈলক ও তাঁহার মাতাকে দেখিতে পাইলেন। তাহাদের ভাবে বােধ হইল যে, কোন একটী গুরুতর বিষয়ের পরামর্শ করিবার জন্য উৎসুক দুই তাহাকে ডাকিতে আসিয়াছেন। এই ঘটনার তিন মাস পর শৈলকণ্ঠের বাটীতে মহা সমারােহে অনুপমার বিবাহ হইয়া গেল। বলা বাহুল্য, এ বিবাহের বর, স্বয়ং অমরেশচন্দ্র। ভিখারিণীকে বিবাহ দিবার জন্য সকলেই অনেক অনুরােধ করিলেন, কিন্তু ভিখারিণী তাহাতে কর্ণপাত করিল সখনই তাহাকে বিবাহের কথা বলা হইত তখনই সে বলি। "একজনের দাসী হইলে ত আর স্বাধীনভাবে গান গাহিয়া :-
";
ইতে পারি না। আমি সঙ্গীতরাজকে বিবাহ করিয়াছি। আমাকে
আর আপনারা অন্য বিবাহের জন্য অনুরােধ করিবেন না।”
ভিখারিণী গান গাহিয়াই সুখী হইত। কখন বা শ্রীরামপুরে
মাইয়া সেই বৈষ্ণবের বাড়ী থাকিত। কখন বা চুচড়ায় আসিয়া
অনুপমার নিকটে থাকিত। আবার কখন না মনোবনাকে দেখি-
বার জন্য ভবানীপুর বাইত। যেখানেই যাই বৃদ্ধা মাতাকে সঙ্গ
ছাড়া করিত না ।
অমরেশচন্দ্র মাঝে মাঝে অনুপমাকে বলিতেন :
“দো ছােট ল ও।”
এখন ? আর মনােবা নিকটে নাই । অনুপম। তাহার
নেট কেলি দিয়া শোধ নিবেন। মেইনা বিলাল কটাতো-
অরেশ চন্দ্রের পানে চাহিয়া ছুটি পলাই: হাতেন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.