Makardah Saraswat Library, Howrah
Debi Kishori Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দা
ভশনী
> >>
শ্ৰীমনােজ বসু
পি:মি:সরকার এণ্ড কে
২শ্যামাচরণ দে মুট। কলকাত
প্রকাশক
শ্রীপ্রকাশচন্দ্র সরকার
পি, সি, সরকার এণ্ড কোং
২, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রথম সংস্করণ,
আশ্বিন,১৩৪১
দেড় টাকা
প্রিন্টার
শ্রীশচীন্দ্ররঞ্জন দাস, বি, এ,
সিংহ প্রিন্টিং ওয়ার্কস,
৩৪১বি, বাদুড় বাগান ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
শ্ৰীযুক্ত গুরুসদয় দত্ত- শ্রীচরণকমলেষু শ্ৰীমনোজ বসু বীরাষ্টমী---- বঙ্গাব্দ ১৩৪ ১
No text on this page.
১ ১৫৫২.
দেবীকিশােরী
খুব রাতে রম টিপি-টিপি ঘরে ঢুকিয়া দেখে, আলো নিভাননা
-কিন্তু হেমলাল জাগিয়া আছে। মশারী হাওয়ায় উড়িতেছে,
বাহিরে পরিষ্কার জ্যোৎস্না...হেমলাল বাহিরের দিকে চাহিয়া বসিয়া
বসিয়া চুরুট টানিতেছিল। রমার পায়ের শব্দে পিছন ফিরিয়া
তাকাইয়া একটু হাসিল।
তারপর অতিশয় সন্ত্রস্তভাবে উঠিয়া তাড়াতাড়ি দুই হাতে
একখানা রেকাবী তুলিয়া ধরিল বধূর দিকে। রেকাবীর উপর
সবুজ মখমলের সুন্দর একজোড়া
চটি
রমা বলিল—জুতাে ? কি হবে এতে ?
হাসিমুখে হেমলাল কহিল-গলায় দিতে হয়, জান না?
—মালা গেঁথে, তাইই উচিত। রমা ম্লানভাবে একটু হাসি ।
একটু চুপ করিয়া কহিল-খবর শুনেছ ?
হেমলল পুলকিত স্বরে কহিতে লাগিল-শুনি নি আবার ?
মা’র চিঠি তােমার চিঠি একদিনেই পাই। সেই থেকে আসার
জন্য ছটফট করছি। বড় বাবুটাও হয়েছে তেমনি পাজি-এ-হপ্তায়
নয় ও-হপ্তায় নয় করতে করতে এই দু-তিন মাস।......ওঃ রমা,
কি যে ভয় হয়েছিল, ভালয় ভালয় হয়ে গিয়েছে খুব রক্ষে
স্বামীর স্নেহভরা কথায় রমার চোখ ছলছল করিয়া আসিল।
দেবীকিশােরী
হেমলাল বলিতে লাগিল-ষ্টেশনে টিকিট কিনে তারপর মনে হল,
তাইত একটা কিছু নিয়ে যাওয়া ত উচিত ; সামনের মাথায় এক
জুতাের দোকান— তাই সই। নাও, তােমার বখশিস নাও গাে
বলিয়া হাসিয়া জুতােজোড়া আগাইয়া ধরিল।
মাও হাসিতে গেল ; হাসিতে গিয়া ঝর ঝর করিয়৷ চোখের
জল পড়িল। হেমলালের বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না।
চোখ মুছাইয়া সস্নেহে জিজ্ঞাসা করিল-মেয়ে হয়েছে বলে
কোন কথা হয়েছে বুঝি, সত্য কথা বল রমা, কেউ কিছু
বলেছেন ?
রমা ঘাড় নাড়িল ।
হেমলাল বুঝাইতে লাগিল--ওতে দুঃখ করতে নেই। সকলের
মনের অবস্থাটা একবার বােঝ। বাড়ীর মধ্যে আট-আটটা মেয়ে।
এক অনুপমার বিয়ের দেনা এখনাে সামলে ওঠা যায় নি।
বৌদিদিদের কারাে ছেলে হল না একটা। মা এবার বড় আশা
করেছিলেন ; ডেকে হেঁকে বলতেন সবাইকে, দেখাে ছােট বোমার
আমার— কেন, তােমার সামনেই ত কতদিন।
রমা বলিল—হ্যা।
--তবে দেখ। রাগ করা কি উচিত?
রমা বলিল—রাগ কিসের ? রাগ অদৃষ্টের উপর। মা
বলেছিলেন, ছােট বৌমারও যদি মেয়ে হয় আমি ঠিক কাশী চলে
যাব। সত্যি সত্যি যখন তাই হল, শুনলাম কেঁদে ফেলেছিলেন।
দেবীকিশােরী আমি তাই দিন-রাত ষষ্ঠীর পায়ে মনে মনে মাথা খুড়েছি...সেই বড় যন্ত্রণার সময়েও যষ্ঠীতলার দিকে কতবার যে প্রণাম করেছি হেমলাল জিজ্ঞাসা করিল, বােধকরি দুষ্টামি করিয়া---কোন সময়ে ? এ সব কথা বলিয়া ফেলিয়া রমা একেবারে রাঙা হইয়া গিয়াছে। বিষন্ন মুখের উপর হাসি ফুটিল। হেমলালের স্বরের অনুকৃতি করিয়া মুখ নাড়াইয়া কহিল-কোন্ সময়ে ?...আমি জানিনে যাও- হেমলালের মন জুড়াইয়া গেল। বধুকে টানিয়া জোর করিয়া সে পাশে আনিয়া বসাইল। বলিল--যাক গে বাজে কথা ; তােমার সে ষষ্ঠীর ধন কোথায় লুকিয়ে রেখে এলে বল দিকি ? আন তাকে —দেখব। বলিয়া স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে জোৎস্নার আলােয় রমার দিকে চাহিয়া রহিল। বলিতে লাগিল ষ্টেশন থেকে যখন বাড়ী আসি ষষ্ঠীতলায় খুব সুন্দর চাপার গন্ধ পেলাম। জুতাে খুললাম, রাত্রে আর তােমার ষষ্ঠী ঠাকরুণ ঠাহর করতে পারবেন না—ভাবলাম ভিতরে গিয়ে নিয়ে আসি গােটাকতক ফুল ; শেষ পর্যন্ত সাহস হ’ল সাপের ভয়ে। কেমন হ’ত বল দিকি—এই এখানে এখানে এখানে সব ফুল গুজে দিতাম। রমা শিহরিয়া জিভ কাটিল।--ওমা, ওকি কথার ছিরি তোমার? ঠাকুর দেবতা নিয়ে খেলা ? না না—অমন সব বলতে নেই, গড় কর বলিয়া গলায় আঁচিল দিয়া নিজেই তাড়াতাড়ি অসম্মানিত অদৃশ্য দেবীর উদ্দেশে নমস্কার করিল। ;
দেবীকিশােরী ; । বাড়াটার পশ্চিমে আম-কাঁঠালের পুরাণাে বাগিচা ; সেটা ছাড়াইয়া গাঙের ঠিক উপরে ঘন বেত ও আগাছার ঝােপ-জঙ্গলের মধ্যে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়া বহু কালের একটী অশ্বত্থ গােছ-গাছ সেটাকে বলা উচিত নয় এবং কেবল শুধু ঐ অশ্বথটি নয়, উহার চারিপাশের ছায়াচ্ছন্ন ভাট-কালকাসুন্দেগুলিও নাকি এই রকম যে একখানা ডাল ভাঙিলে তাহারা অবিকল কচি শিশুর মত কাতরাইয়া উঠিবে দেশের দিনকাল দিন দিন বদলাইয়া যাইতেছে, এই লইয়া এখন কেহ কেহ ঠাট্টা বিদ্রুপ করে, কিন্তু এ অঞ্চলের বাইশ- খানা গ্রামের মধ্যে কোন দুঃসাহসী আজও কিছু পরীক্ষা করিয়া দেখে নাই।...ঐ অশ্বত্থতলে নির্জন গ্রামসীমায় কত কাল হইতে যষ্ঠীদেবী তার লক্ষকোটী সন্তান কোলে-কাখে লইয়া সংসার পাতিয়া আছেন। ঢাক ঢোল বাজাইয়া ষষ্ঠীর পূজা দিতে হয় না, বেশী মানুষ জন সেদিকে যায় না, যাহাদের বয়স পারাইয়াও সন্তান হয় না কিম্বা যে আনড়িী কিশােরীরা মাতা হইয়া হিমসিম খাইয়া যাইতেছে ষষ্ঠী তাহাদেরই দেবতা। ষ্টেশনের রাস্তা হইতে নামিয়া গিয়াছে সরু একটি পায়ে-চলার পথ-~~-একজন মানুষ কোন রকমে অনেক কষ্টে কাপড় বাঁচাইয়া ঢুকিতে পারে, জঙ্গল কাটিয়া ইহা কেহ করিয়া দেয় নাই। সুখে দুঃখে গৃহিণীরা বধু ও কন্যাদের লইয়া ঐ পথে বৃক্ষদেবতার কাছে মানত করিতে যান, সেকালের বুড়ীরাও অমনি সেকালের বধুদের লইয়া যাইতেন, গ্রামের পত্তন হইতে এমনি চলিয়া আসিতেছে। শত শত বৎসর ধরিয়া গ্রামলমীদের পায়ে d ( ৪ ) দেবীকিশােরী -; পায়ে ঐ সঙ্কীর্ণ পথটুকু জাগিয়া উঠিয়াছে। খুব জাগ্রত দেবী, এই ষষ্ঠী ঠাকরুণ—অসীম তাহার করুণ। তুমি অভুক্ত থাকিয়া পবিত্র মনে যদি আঁচল পাতিয়া পড়িয়া থাকিতে পার, অশ্বথের একটি পাতা নিশ্চয় তােমার আঁচলে পড়িবে । পাতটি মাথায় ঠেকাইয়া যত্ন করিয়া তুলিয়া আনিও! যাহাদের নূতন ছেলে মেয়ে হইয়াছে, দিনে রাতে সবসময় ষষ্ঠী তাহাদের বাড়ী আনাগােনা করেন। ছেলে কঁদিয়া উঠিলে শিয়রে আসিয়া বসেন, ঘুমাইলে তাহার সহিত কত কি কথাবার্তা কহিতে গাকেন; শিশুর বিপদ আপদ সব-সময় পাহারা দিয়া ঠেকাইয়া বেড়ান। যতদিন ছেলে বড় না হয় ঠাকরুণের আর সােয়াস্তি নাই। সর্বমঙ্গলা ষষ্ঠী ঠাকরুণ-তঁার সম্বন্ধে কোন রকম অসম্ভ্রমের কথা বলিতে নাই । রমা প্রণাম করিয়া মনে মনে কহিল–অপরাধ নিও না দেবি, ছেলেপিলের অমঙ্গল না হয়...! স্বামীর দিকে চাহিয়া কহিল- তােমার বড় আধিখ্যেতা। আর ব’লােনা কক্ষনাে ! বুঝলে? হেমলাল বলিল-মেয়ে দেখব কখন ? বখশিসটা আগামই দিলাম—দেখি, দেখি, জুতো পায়ে হ’ল কিনা হাসিয়া রমা কহিল—বখশিস বরঞ্চ কাল মা’র হাত দিয়ে দিও-পায়ে নয়, তিনি পিঠের উপর ঝাড়বেন।
দেবীকিশােরী
কি যে বল, ছি-ছি--হেমলাল সাদরে বধুকে আবার টানিয়া
আনিল। বলিতে লাগিল—বাড়ীসুদ্ধ সবাই বুঝি হেনস্থা করে।
আমি কিন্তু একবিন্দু দুঃখিত হইনি। ভগবান যা দিয়েছেন তাই
ভাল। কিন্তু মা জুতাে মারতে পারেন, সত্যি সত্যি তুমি বিশ্বাস
কর রমা? ঘরের লক্ষী তুমি
ঘরের লক্ষী তুমি—এসব ভাবলেও যে পাপ হয়-
—আর আমার বুঝি পাপ হয় না মশাই, যখন তখন আমার
পায়ে হাত দেবে-
হেমলাল কথা বলিতে বলিতে কখন যে অলক্ষিতে পায়ে জুতা
পরাইয়া দিতেছিল, রমা টের পাইয়া চমকিয়া পা গুটাইয়া লইল।
বলিতে লাগিল -মাগো, কি দুষ্ট, তুমি, আমায় ভালমানুষ পেয়ে
ভুলিয়ে এদিকে জুতাে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নানা-না-
বলিয়া ছেলেমানুষের মত মাথা নাড়িতে নাড়িতে উঠিয়া দৌড় দিল।
প্রথমে গিয়া বসিল, দূরের একটা চৌকীতে। সেটাও তেমন
নিরাপদ নয় দেখিয়া খাটের ঠিক মাঝখানে বিছানার উপর পা
দু’খানি সাড়ীর মধ্যে আচ্ছা করিয়া ঢাকিয়া আঁটিয়া সাটিয়া অনড়
হইয়া বসিল।
দেখি, আহা ও রমা একটুখানি সরেই বস না ছাই—উহু
রমার সহিত জোর জবরদস্তি করিয়া এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কাহারও
পারিবার জো নাই। হেমলাল অতঃপর রীতিমত অনুনয় বিনয়
আরম্ভ করিল।
শােন লক্ষীটি, আমার বড় ইচ্ছে হয়েছে—শুনবে না আমার
দেবীকিশােরী
কথা ? এই একটা সামান্য কথা ত মােটে—কত লােকে স্বামীর
জন্য কত কি করে থাকে-
অবশেষে হেমলাল গুম হইয়া বসিয়া রহিল।
=
বাতাসে নৌকার পালের মত মারী উড়িতেছে। এতবড়
গ্রামখানির কোথাও একবিন্দু সাড়া-শব্দ নাই। হঠাৎ নিস্তব্ধতা
ভাঙিয়া উঠানের দিকে একপাল শিয়াল ঝগড়া বাধাইয়া খাক
খ্যাক করিয়া উঠিল।
দুজনেই চমকিয়া তাকাইল। রমা বলিল—শেয়ালের কি
ভয়ানক দৌরাত্ম হয়েছে, দিনদুপুরেও এইরকম করে মানুষ জন
কিচ্ছু মানে না। আমি খুকীকে নিয়ে আসিগে মা’র কাছে
রয়েছে, আলগা ঘর ; তিনি হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছেন এতক্ষণ—
হাত ধরিয়া রাগতভাবে হেমলাল কহিল---তার আগে শুনবে
না আমার কথা ?
—বলিয়া জেদ করিয়া রমা বঁড়াইল।
আমি নিজে পরতে জানি—দাও আমায়। এ কেমন ধারা বিদঘুটে
সখ ? শেষকালে যমদূত এসে নরকে নিয়ে যাক--বলবে, স্বামীকে
দিয়ে যেমন জুতাে পরিয়ে নিয়েছিলি হতভাগী,
-~-পাপ হবে না বলছি, তবু এক কথা একশ’ বার
রমা ব্যাকুল হইয়া তাড়াতাড়ি তাহার মুখে হাত চাপা দিল।
বলিল--জুতাে
( ৭ )
দেবীকিশােরী
-ওগাে, আস্তে। ওই ওখানে মা ঘুমুচ্ছেন—তােমার কাণ্ডজ্ঞান
নেই একটু ?
হাত সরাইয়া শান্তকণ্ঠে হেমলাল কহিল—পা যদি তুমি না
বের কর, আমি চেঁচিয়ে বাড়ি ফাটিয়ে ফেলব ; মাকে ডেকে তুলে
বলব, রমা আমাকে লাথি মেরেছে-
—এত বড় সত্যিকথা বেরুবে মুখ দিয়ে ?
সত্যি হােক মিথ্যে হােক—বলবই, যদি আমার কথা না
শােন—
রমা বলিল—তাই করো। তাতে খুব সুখ্যাতি বেরুবে।
মা ভাববেন, বৌ আর ছেলে কি ধনুৰ্দর হয়েছে আমার।
-শুনবে না তবে ? ওমা, মাগাে—হেমলালের কণ্ঠ ক্রমেই
উচ্চে উঠিতে লাগিল।
ভীত রমা তাড়াতাড়ি পা বাহির করিয়া দিল। রাগ করিয়া
অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া একেবারে কাঠের পুতুলের মত আড়ষ্ট
হইয়া বসিয়া পড়িল।
হেমলাল ইতস্ততঃ করিল, এই অবস্থায় এখন আর ঘটাইবে
কি না। জুতা জোড়া হাতে তুলিতেই দেখিল, না—ব্যাপার যা
ভাবিয়াছিল তাহা নয়, রমা আড়চোখে তাকাইতেছে, মুখে
কৌতুকের দীপ্তি। দুই হাতে জোর করিয়া তার মুখ ফিরাইয়া
ধরিয়া বলিতে লাগিল—শােন রমা, কি রকম জেদী তুমি! পাপই
যদি হয়...বেশত আমি কথা দিচ্ছি যতখানি খুসী আমার পায়ের
( ৮ )
দেবীকিশোরী ধূলাে নিও-আমি কিছু আপত্তি করব না। জুতা পরিতেই হইল, উপায় কি? বধূর আপাদ-মস্তক সগর্বেব বারকয়েক চাহিয়া হেমলাল বলিল—কেমন মানিয়েছে, দেখ ত ? মুখ বাঁকাইয়া তাচ্ছিল্যের সুরে রমা বলিল—ছাই।- হেমলাল বলিল—তা বই কি! তুমি দেখতে পাচ্ছি কিনা এ দেখবার ভাগ্যি থাকা চাই বুঝলে? আয়নায় দেখে এসে বলাে তারপর। সত্যি রমা, আমি ভাবি অনেক সময়, কত বড় ভাগ্যবান যে আমি রমা ঝঙ্কার দিয়া উঠিল ওখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কুচ্ছ করতে হবে না-ঘুম পায় না তােমার, রাত যে কত হল- হেমলাল কহিল-অত বড় পাপের বােঝা তােমার কাঁধে চাপিয়ে ঘুম আসে কি করে ? প্রণাম করে পাপটা আগে খণ্ডন কর—আমি দাঁড়িয়ে আছি- স্বামীর সঙ্গে মুখােমুখি হইয়া রমা মুখ টিপিয়া টিপিয়া হাসিতে লাগিল, তারপর উঠিয়া দাড়াইল । হেমলাল তখন ডান হাত তুলিয়া রীতিমত আশীর্বাদের ভঙ্গিতে দাড়াইয়াছে। বলিল—এস, এস—নববস্ত্র নতুন জুতাে এই সব পরলে গুরুজনকে প্রণাম করতে হয়। রমা ফিক করিয়া হাসিয়া আবার খাটের উপর বসিয়া পড়িল। বলিল—না, আমি পারব না--ওরকম করলে আমি কক্ষনাে...ইঃ ভারী একেবারে আচার্য্যি ঠাকুর হয়েছেন- । ( 9 )
দেবীকিশােরী
হেমলাল অধীর হইয়া উঠিল।দাড়িয়ে দাড়িয়ে পায়ে ব্যথা
ধরল যে-
-এসে শােও না তুমি।
—বেশ আমার দোষ নেই—বলিয়া হেমলাল খাটের উপর
বসিল। বলিল—-কিন্তু ভাল করলে না রমা, যমদূতগুলাে কি রকম
গরম তেলের পিপেয় করে জাল দেয় পটের ছবিতে দেখেছ ত ?...
মেয়ে আন এবার
রমা যেন খুকীকে আনিতেই ঐ ঘরে যাইতেছে এমনিভাবে
দোরের দিকে মুখ করিয়া উঠিল। হঠাৎ মুখ ফিরাইয়া চট
করিয়া স্বামীর পা ছুঁইল এবং সেই হাত নিজের মাথায়। হেমলাল
হাসিয়া কি বলিতে গিয়া দেখিল, রমা ছুটিয়া বাহির হইয়া গিয়াছে।
সাদা জ্যোৎস্নায় মেজের উপর খাটের ছায়া, জানলার গরাদের
ছায়া, দোলনার ছায়া, শিকার উপর সাজানাে হাঁড়ি-মালসার
ছায়া——ঘরময় যেন চিত্রবিচিত্র আলপনা দিয়া গিয়াছে। রমা
মেয়ে লইয়া আসিয়া দাঁড়াইল।
হেলাল দেশলাই ধরিয়া যতবার দেখিতে যায়, কাঠি বাতাসে
নিভে।
রমা বলিল--আলােটা জ্বালই না গাে, ঘর অন্ধকার করে
বসে আছ---আচ্ছা লােক, আমার ত গােড়ায় ঘরে ঢুকতেই সাহস
হচ্ছিল না।
2
( ১০ )
দেবীকিশােরী
হেমলাল বলিল—কি মনে হচ্ছিল বল দিকি ? ভূত ? যেন
একটা ভূত এসে তােমার খাটের উপর বসে বসে চুরুট টানছে—
?
.
রমা বলিল-গােয়ালঘরে সন্ধ্যে দেখিয়ে আমি এক পিদ্দিম
তেল দিয়ে রেখে গেছি, বেশ দিব্যি তা নিভিয়ে বসে আছ--
শুধু শুধু তেল পুড়বে কেন ?
প্রদীপ ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া হেমলাল মেয়ে দেখিতেছিল। বলিল
হবে না? এখন থেকেই ত বুঝে সমঝে চলতে হবে। এখন
আর সেদিন নেই, এখন আমি বলতে বলতে গর্বিত ভঙ্গিতে
রমার দিকে চাহিল।
রমা বলিল-হা, দিগগজ হয়েছ।
ঘুমন্তু মেয়ে ন্যাকড়ার মত বিছানার গায়ে লাগিয়ে আছে । আর
ও খানিকক্ষণ সেইদিকে তাকাইয়া থাকিয়া হেমলাল বলিল--কিন্তু
এ যে স্বয়ং মহাকালী নেমে এসেছেন, উপায় কি হবে বল ত ?
রমা মেয়ের দুপাশে দু’টি পাশবালিশ দিয়া পরম স্নেহে গায়ের
উপর কথা টানিয়া দিল। বলিল--তােমাদের চেয়ে ঢের ফর্শা...
আর বলতে হবে না—যাও, যাও। কিছুক্ষণ পরে আবার বলিল---
তােমরা কেউ ওকে দেখতে পারবে না, আমি তা জানি। আমি
তাই এখন থেকে-
গলায় যেন কি আটকাইয়া রমার কথা থামিল।
অবনত মুখে
একাগ্র মেয়ের দিকে চাহিয়া রহিল।
( ১১ )
দেবীকিশােরী হেমলাল প্রশ্ন করিল--এখন থেকে কি—বল্লে না ? ঘাড় নাড়িয়া রমা বলিল—আমি যদি না বলি- -বলো, বলাে--- -বলছিলাম যে পিদ্দিমটা নেভালে কেন ? -বাতাসে আপনি নিভেছে ; কিন্তু ও ত বাজে কথা-~- খোঁপার পাশে ক'...গােছা আলগা চুল উড়িতেছিল, খপ করিয়া তাই ধরিয়া হেমলল দিল এক টান। বলিতে লাগিল -বড় ইয়ে হয়েছ, কথা ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কেমন ? আঃ, লাগে লাগে—বলছি—বলিতে বলিতে শাস্তির যন্ত্রণায় রমা হাসিয়া ফেলিল। বলিল—আমি এখন থেকে খুকীর বিয়ের পয়সা জমাচ্ছি, মেয়ের ভাবনা ভাবতে হবে না তােমাদের -বটে ? কতগুলাে হ’ল ? —মােটে তিন চারটে- রমা খুব হাসিতে লাগিল। বলিল- ও আমি পারিনে ; একদিন একখানা বই পড়ে ভয়ানক সঙ্কল্প করে বসলাম, রোজ একটা করে পয়সা জমাব। দিন পাঁচ সাত বেশ চলল, শেষে একদিন দুদিন কখনও বা তিন দিন বাদ পড়ে যায়। এদিন বাক্স খুলে দেখি বিস্তর জমেছে ; তখুনি রূপহলুদ ব্রতের সিদুর কিনতে দিলাম। এখন এই তিনচারটে আছে হয়ত সেদিনের সেই জ্যোৎস্নমগ্ন রাত্রিটি নিভৃত গ্রাম প্রান্ত দিয়া কত শীঘ্র কেমন করিয়া উড়িয়া চলিয়া গিয়াছিল তােমরা যাহারা সব ঘুমাইয়া ছিলে কিছুই তাহা জানিতে পার নাই। দ্বাদশীর চঁাদ ( ১২ )
দেবীকিশােরী
পশ্চিমে গঙ-পারে ঢলিয়া পড়িল, ঝটপট করিয়া বাদুড়ের ঝাক
ফিরিতে লাগিল, দেখিতে দেখিতে উঠানের বাতাবীলেবু গাছটি
আবছা আঁধারে রহস্যাচ্ছন্ন হইয়া উঠিল ।...আর একপাশে মেয়ে
ঘুমাইয়া। প্রদীপের আলাে কঁপিতেছে। রমা ও হেমলাল পাশা-
পাশি বসিয়া আছে।
খুকী আবার কাদিতে লাগিল। এ ঘরে আসিয়; আর দু’তিন
বার কাঁদিয়া উঠিয়াছে। এবারে বড় ভয়ানক কান্না, রমা কিছুতেই
শান্ত করিয়া উঠিতে পারে না।
হেমলাল বলিল-এ যে রূপকথার সুতােশঙ্খ সাপ।
সুতাের মত এক ফোটা মানুষ---অত বড় শখের আওয়াজ বেরুচ্ছে
কি করে ? মেয়ের যেমন রূপ, গুণও তেমনি---
রমা বলিল—মেয়ে দেখতে বড় মন্দ নয় গো, কালকে দিনমানে
দেখাে, এখন তুমি শুয়ে পড়–
হেমল মনের বিরক্তি আর সামলাইতে পারিল না। বলিল—
শুয়ে কি হবে ? সমস্ত রাতের মধ্যে আজ চোখ বুজতে দেবে না।
এসে অবধি কেবল কঁদছেই—একবার হাসতে দেখলাম না
—আচ্ছা, তুমি ঘুমােও আমি বাইরে নিয়ে শান্ত করছি--
বলিয়া বিবর্ণমুখে রমা মেয়ে লইয়া বাহির হইয়া গেল।
।
চারিদিকে বেশ রােদ উঠিয়া গিয়াছে, হেমলল সেই সময়ে
চোখ মেলিল। দেখে, নীচে মেজের একপাশে খুকী থুমাইয়া
( ১৩ )
দেবীকিশােরী
-
আছে। রাত্রির অভিমানের একফোটাও রমার মুখে লাগিয়া নাই।
হাসিমুখে রমা ডাকিতে লাগিল—দেখ, ওগাে দেখসে একবার
ঘুমন্ত মেয়ের উপর ঝুকিয়া পড়িয়া সগর্বে রমা স্বামীকে দেখাইতে
লাগিল—কত মাণিক ঝরছে ঐ দেখ--তুমি যে বলছিলে মেয়ে
হাসতে পারে না•••
আমরা দেখিতে পাই না, কিন্তু শিশু যখন ঘুমায় ষষ্ঠীদেবী
শিয়রে আসিয়া বলেন—খুকী, তাের ম মরেছে রে...। খুকী
দেখে, মা যে তাহার পাশেই রহিয়াছে । দেবীর দুষ্টামি ধরিতে
পারিয়া খুকী হাসিয়া ওঠে ।
হাসিতে হাসিতে আবার দেখা যায় খুকী কঁদিয়া উঠিল।
ষষ্ঠীদেবী তখন বলিতে থাকেন--মা নয়, ও খুকী মরেছে তাের
বাবা:•• বাবাকে খুকী কোন দিকে না দেখিয়া বাবার জন্যে
ডুরাইয়া কঁদিয়া ওঠে।
দেবী আবার বলেন—ঐ তােদর ঘরে আগুন লাগল রে খুকী,
সঙ্গে সঙ্গে খুকী চমকিয়া চোখ মেলিয়া চাহিয়া পড়ে।...
যতদিন ছেলেমেয়ের কথা না ফোটে দেবী তাহাদিগকে
হাসাইয়া কঁাদাইয়া খেলা দিয়া বেড়ান ; কথা বলিতে শিখিলে আর
তিনি দেখা দেন না, পাছে কারও কাছে তার কীর্তি-কথা প্রকাশ
করিয়া দেয়।
( ১৪ )
দেবীকিশােরী মেয়ে জাগিয়া উঠিয়াই কঁদিতে লাগিল। রমা অপরাধীর মত তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল—আমি ওঘরে নিয়ে যাচ্ছি...বলিয়া ভয়ে ভয়ে স্বামীর দিকে তাকাইল। হেমলাল হাসিয়া বলিল—রাতে ঘুমের সময় যতটা রাগ হয় এখন অবশ্য তেমন হবে না; কিন্তু আমি ভাবছি রমা, মেয়ে অত কঁদুনে হলে কি করে চলে ? এ বাড়ীতে মেয়ের কিছু কমতি নেই যে কাদলে অমনি ষাট ষাট করে বিশ-পঁচিশ জন কোলে তুলে নাচাবে--- রমা বলিল—এমন ত কাঁদে না, ওর হয়ত পেট কামড়াচ্ছে... এত সাবধানে আছি আমি, একবেলা করে খাই সর্বদা টিক টিক করে বেড়াচ্ছি, তবু হয়ত কিসে কোন অত্যাচার হয়েছে•••ভাের- বেলা মা তাই বকাবকি করছিলেন, আমাকে বলছিলেন রাক্ষুসী— বলিতে বলিতে অধােমুখে মেয়ের দিকে চাহিয়া রমা চুপ করিল। হেমলাল বলিল—কিন্তু তােমার খাওয়ার সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কটা কি ? -ও আমার দুধ খায়। হঠাৎ হেমলাল রমার মুখ তুলিয়া ধরিল। রমা মৃদু হাসিয়া বলিল—দেখছ কি? সমস্ত রাত জেগেছি—তাই অমনি। তুমি ঘুমিয়ে পড়লে আমি তারপর সমস্তটা রাত ওকে নিয়ে রােয়াকে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি। সকাল হয়ে গেলে তবে চুপ করল।•••মা মিথ্যে কিছু বলেন নি ; খাওয়ার কি অত্যাচার হয়ে থাকবে। ( ১৫ )
দেবীকিশােরী
আহা, কথা বলে বুঝিয়ে দিতে পারছে না—কি কষ্ট হচ্ছে দেখত
বাছার!
;
আবার কি কাজে এঘরে আসিয়া হেমলালের সহিত দেখা
হইল।
রমা বলিল—একটা সত্যি কথা বলবে ?
হেমলাল সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চাহিল।
—কাল বলছিলে, মেয়ে হয়েছে বলে তুমি দুঃখিত হওনি ;
খুকীকে দু’চক্ষে কেউ দেখতে পারে না, ও বড় অভাগী...তুমি
বলছিলে তুমি মােটেই দুঃখিত হও নি-বলিয়া রমা ম্লান হাসি
হাসিল।
হেমলাল বলিল-দুঃখ করে আর করব কি বল ? ভগবান
যা দিলেন তা মেনে নেওয়াই উচিত।
-~-মুখ দেখে মায়া হয় না তােমার ? রমা স্বামীর দিকে দুটি
চোখের আকুল দৃষ্টি স্থাপিত করিয়া বলিল -আচ্ছা, কি মনে হয়
বল, তােমার কি ইচ্ছে হয় ইচ্ছে হয় যে ওর ভালমন্দ হয়ে যায়
কিছু ? ছােখ ছল ছল করিয়া আসিল, অনেক কষ্টে কোন
রকমে সে কান্না ঠেকাইল।
হেমলাল বলিল--কাল সমস্ত রাত ঘুমােও নি, তােমার চেহারা
খারাপ হয়ে গেছে রমা, যাও নেয়ে ফেলগে-তারপর দুটো মুখে
দিয়ে একটু ঘুমিয়ে নাও
( ১৬ )
দেবীকিশােরী
হঠাৎ রাগিয়া উঠিয়া রমা বলিতে লাগিল--তােমরা সব এক
রকমের, আমি জানি-জানি। এই আমার জুতাে এল, হেনো
তেনাে কত ছাইপাশ আসে ওর নাম করে আনলে কিছু? সিকি
পয়সা দামের একটা কিছু-পারলে আনতে?
হেমলাল কহিল--মনে ছিল না। নিয়ে আসব এইবার—
—আনতে হবে না তােমার। ও চায় না তােমাদের ভিক্ষের
দান—আমি ওকে নিয়ে যেখানে হয় চলে যাব একদিকে বলিতে
বলিতে রমা কঁদিয়া ফেলিয়া দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল।
শাশুড়ীর মধুর কণ্ঠ পূবের ঘর হইতে ভাসিয়া আসিল-অ
বৌমা, ইদিকে এস বাছা, কুলের চেরাগ আবার জেগে উঠেছেন—
পিণ্ডি গিলিয়ে দিয়ে যাও
দুপুরে হেমলাল পাড়ায় বাহির হইয়াছে, রমা পড়িয়া পড়িয়া
ঘুমাইতেছে। হঠাৎ তাহার মনে হইল, হেমলাল রাগ করিয়া
খুকীকে যেন লাথি মারিয়া হন হন করিয়া কোথায় চলিয়া যাইতেছে।
তাড়াতাড়ি চোখ মেলিয়া খুকীকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইল।
খুকী বিভাের হইয়া ঘুমাইতেছে। ক্রমে বেলা গড়াইয়া আসিল।
আবার রমা স্বপ্ন দেখিল, লাল চেলী-পরা হাসি-হাসি মুখ এক
কিশােরী খুকীকে কোলে লইয়া বলিতেছে—রমা, নিয়ে চললাম
( ১৭ )
২
দেবীকিশােরী
তাের মেয়েকে, এ বাড়ীর কেউ ওকে দেখতে পারে না; এখানে
থেকে মেয়ে শুকিয়ে দড়ি হয়ে যাচ্ছে-
রমা যেন বলিল—কাল থেকে বড় কঁদছে ভাই, মােটে দুধ
খাচ্ছে না-কি যেন হয়েছে—
-কই? কোথায় ? বলিয়া কিশােরী মেয়ে তুলিয়া দেখাইল।
কোলের মধ্যে পুটপুট করিয়া খুকি তাকাইতেছে, রূপ যেন ফাটিয়া
পড়িতেছে, ছােট্ট ছােট্ট হাত মুঠা করিয়া গলে দেওয়া, হাত সরাইয়া
দন্তহীন মাড়ি মেলিয়া খুকী হাসিতে লাগিল। কান্না কোথায় ?
-এস, আমার সােনা এসবলিয়া হাত বাড়াইয়া রমা কোলে
লইতে গেল। খুকী লাল চেলীর আড়ালে মুখ সরাইল। কিশােরী
বলিল ও আর তােমার কাছে যাবে না বােন, আমি ষষ্ঠী ঠাকরুণ
ওর কষ্ট দেখে থাকতে পারলাম না, নিয়ে যেতে এসেছি...
বলিতে বলিতে মেয়ে লইয়া দেবীকিশােরী যেন বাতাসে
মিলাইয়া গেল। রমার ঘুম ভাঙিল।
ধড়মড় করিয়া জাগিয়া
উঠিয়া দেখে, কোল খালি—সত্যই খুকী তাহার নাই।
সামনেই হেমলাল। অস্বাভাবিক উত্তেজিত কণ্ঠে রমা
জিজ্ঞাসা করিল-খুকী ? আমার খুকী কোথায় গেল?
হেমলাল কিছু বুঝিল না। বলিল—তা কি করে বলব, আমি
ত এই আসছি--
রমা ছুটিয়া একেবারে কাছে আসিয়া বলিতে লাগিল লুকিয়ে
( ১৮ )
নবীকিশােরী • রেখেছ নাকি ? ঠাট্টা করাে না—সত্যি বল। আমি খারাপ স্বপ্ন দেখেছি—কেউ নিয়ে গেছে নাকি ? হেমলাল কহিলে—-মা হয়ত নিতে পারেন, দেখ জিজ্ঞাসা করে মাকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বলিলেন--হ্যা, মেয়ে আমার তিন কুল উদ্ধার করবে, তাই লুকিয়ে রেখে সােহাগ করছি- বাড়ীর প্রতিজনকে জিজ্ঞাসা করা হইল, কেহই কিছু জানে না। খুব খোঁজাখুঁজি শুরু হইল। উদ্বেগ-কম্পিত স্বরে হেমলাল বলিল -~-শেয়ালে নিয়ে যায় নি ত? আমি এসে দেখি, উনি ঘুমুচ্ছেন —দুয়াের খােলা হাঁ হাঁ করছে--- রমা মুখ ও জিয়া আছাড় খাইয়া পড়িল। শিয়ালদের দৌরাত্মের নানা ঘটনা বহুজনে বলিতে লাগিল। তখন ঘর দোর ছাড়িয়া আশপাশের জঙ্গল নাটাবন বাঁশতলা প্রত্যেক সন্দেহজনক স্থান--- কোথাও খুঁজিতে বাকী রহিল না। রমার কাছে আসিয়া হেমলাল বসিয়া পড়িল। কাদো কাদো গলায় বলিল—সত্যিই বুঝি সর্বনাশ হয়ে গেছে রমা রমা মুখ তুলিতে গিয়া স্বামীর সে দৃষ্টি সহিতে পারিল না। বলিল—আমায় ফাঁসি দাও-ফাসি দাও—আমি হতভাগী মেয়েকে যমের মুখে দিইছি— দুই হাতে মুখ চাপিয়া দ্রুতপদে রমা উঠিয়া গেল। আলুথালু শােকাচ্ছন্ন বেশে সে ছুটিল। ছায়ান্ধকার আম- বাগানের মধ্যে কেহই লক্ষ্য করিল না, ছুটিতে ছুটিতে রাস্তার উপর ( ১৯ ) দেবীকিশােরী গিয়া পড়িল। সাড়া পাইয়া ভাটবনের দিক হইতে ক’টা শিয়াল পলাইয়া গেল। আর রমার সন্দেহমাত্র রহিল না, এইখানেই তাহার খুকী পড়িয়া আছে, কাল রাত্রি হইতে বড় কান্না কাদিতে ছিল—কাদিয়া আর সে জ্বালাইবে না। বেত ও বৈঁচির কাটা ঠেলিয়া পাগলের মত রমা সেই অপরাহ্নের আবছা অন্ধকারে বিরাট সহস্র-বাহু অশ্বথের মূলে আসিয়া আছড়াইয়া পড়িল—ও ষষ্ঠী ঠাকরুণ, আমার খুকীকে ফিরিয়ে দাও। তারপর ঘন ছায়ায় অস্পষ্ট ঝুরির ফাঁকে ফাঁকে চারিদিকে খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিল। মনে হইল, উপর হইতে আকাশভেদী ডালের এখানে ওখানে কোটরের মধ্যে ষষ্ঠীদেবীর লক্ষ্যকোটি ছেলেমেয়ে সব তাহাবে তাকাইয়া তাকাইয়া দেখিতেছে। বাতাস আসিয়া ভাটবন দুলিতে লাগিল, উগ্ৰ কটু গন্ধ পাতার খস খস শব্দ, যেন কত লােক চারি- পাশে নিঃশব্দে চলাফেরা করিতেছে। সেইখানে সেই ঝােপ জঙ্গলের মধ্যে বসিয়া মাথা কুটিয়া কুটিয়া রমা কাদিতে লাগিল-- আমার খুকী কোথায় আছে, বলে দাও দেবী, বলে দাও- ...ঝুর ঝুর করিয়া অশ্বথের পাকা পাতা পড়িয়া তলা ছাইতে লাগিল। কতক্ষণ কাঁদিয়া কঁদিয়া আবার সে পাগলের মত বাহির হইয়া আসিল। হেমলল খুঁজিতে আসিতেছিল। বলিল—কোথায় গিয়েছিলে ? খুকী যে তােমার কেঁদে খুন হচ্ছে- ( ২০ )
দেবীকিশােরী
ঘরের মধে অতি মধুর কান্নার আওয়াজ। ব্যাকুল আগ্রহে
ঘরে গিয়া রমা ক্রন্দনরতা মেয়েকে বুকে লইল, অশ্রুচোখে হাসিয়া
উঠিল। বলিল—কোথায় পেলে ?
—মনােরমা নিয়ে গিয়েছিল।
মনােরমা হাসিতে হাসিতে বলিল—আচ্ছা ঘুম তাের বৌদি,
এত ডাকাডাকি, কিছুই সাড়া নেই। মেয়ে উঠিয়ে নিয়ে গেলাম,
তবু টের পেলিনে। একদিন ঘুমন্ত অবস্থায় তােকে চুরি করে
নিয়ে যাব।
হেমলাল রাগের ভঙ্গিতে বলিয়া উঠিল-খবরদার। আজ
তাের বৌদিকে কাঁদিয়ে বেড়ালি সারা বিকাল, আবার একদিন
আমায় নিয়ে ঐ মতলব ? বেরাে--।
সকলে চলিয়া গেলে রমা কহিল—ও সাধু পুরুষ, কেবল আমি
কেঁদেছি-তুমি কঁদোনি?...নাও, তােমার মেয়ে নাও, আমি একা
একা বয়ে বেড়াতে পারিনে-
হেমলাল সভয়ে এক পা পিছাইয়া কহিল--যাই কর, মেয়ে
মাথায় দিও না, সাত মেয়ে হবে তা হলে
সজল মেহদীপ্ত চোখে খুকীর দিকে চাহিয়া রমা কহিল--দেখ,
মুখ দেখে মায়া হয় না তােমার ? ওকে তােমার ভালবাসতে
হবে। খু-উ-উ-ব—
( ২১ )
লাল চুল ছ'মাস্ক ধরিয়া বিয়ের দিনই সাব্যস্ত হয় না। তারপর দিন ঠিক হইল ত গােল বাধিল জায়গা লইয়া। মােটে তখন দিন পনের বাকী, হঠাৎ নীলমাধবের চিঠি আসিল—কাজিডাঙা অবধি যাওয়া কিছুতেই হইতে পারে না, তাহারা বড় জোর খুলনায় আসিয়া শুভ- কৰ্ম্ম করিয়া যাইতে পারেন। বিয়ের ঘটক শীতলচন্দ্র বিশ্বাস ; চিঠি লইয়া সে-ই আসিয়া ছিল। ভিড় সরিয়া গেলে আসল কারণটা সে শেষকালে ব্যক্ত করিল। প্রতিপক্ষ চৌধুরীদের সীমানা কাজিডাঙার ক্রোশ তিনেকের মধ্যে। বলা ত যায় না, তিন ক্রোশ দূর হইতে কয়েক শত লাঠিও যদি আচমকা বিয়ের নিমন্ত্রণে চলিয়া আসে! তাহারা বরাসন হইতে বর তুলিয়া রাত্রির অন্ধকারে গাঙ পাড়ি দিয়া বসিলে অজ পাড়াগায়ে জলজঙ্গলের মধ্যে কেবল নিজেদের হাত কামড়ান ছাড়া করিবার আর কিছু থাকিবে না। পাত্র জমিদারের ছেলে ; জমিদারের ছেলে ঐ একটি মাত্র। অতএব এই ছ'মাস ধরিয়া যে জমিদারবাড়ি শুভকর্মের গুরুতর আয়ােজন চলিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। সেই আয়ােজনের সত্যকার চেহারাটা সহসা উপলব্ধি করিয়া আনন্দে মেয়ের বাপের হৃৎকম্প উপস্থিত হইল। অথচ মিনুর মা আড় হইয়া পড়িলেন। ( ২২ ) লাল চুল -ঐ তেইশে মেয়ের বিয়ে আমি দেবােইবার বার এইরকম গােছ-গাছ করে শেষ কালে যে...না হয় তুমি সেই বি-এ ফেল ছেলের সঙ্গে সম্বন্ধ ঠিক করে ফেল কিন্তু অত বড় ঘর ও বরের লােভ ছাড়িয়া সােজা কথা নয়। শেষ পর্যন্ত আবশ্যকও হইল না। সহরের প্রান্ত সীমায় ভৈরব নদীর ধারে সেরেস্তাদার বাবু এক নূতন বাড়ি তুলিতেছিলেন। বাড়ীটা তিনি কয়েক দিনের জন্য ছাড়িয়া দিতে রাজী হইলেন। সামনের ফাঁকা জমির ইট কাঠ সরাইয়া সেখানে সামিয়ানা খাটাইয়া বরযাত্রী বসিবার জায়গা হইল। পিছনে খাওয়ার জায়গা। যদি দৈবাৎ বৃষ্টি চাপিয়া পড়ে তাহা হইলে দোতলার দরদালানে সত্তর আশী জন করিয়া বসাইয়া দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। বিকালে পাঁচ খানা গরুর গাড়ী বােঝাই আরও অনেক আত্মীয় কুটুম্ব আসিয়া পড়িল। লগ্ন সাড়ে আটটায়। রাণী বলিল--মাসিমা, হিরণের বিয়ের বেলা আপনি বড় অন্যায় করেছিলেন। সবাইকে তাড়িয়ে দিয়ে আপনি যে জামাই নিয়ে খাওয়াতে বসবেন—সে হবে না কিন্তু মিনুর মা হাসিলেন। -না, সে হবে না, মাসিমা। সমস্ত রাত আমরা বাসর জাগব, কোন কথা শুনব না, বলে দিচ্ছি। নয় ত বলুন, এক্ষুনি ফের গাড়ীতে উঠে বসি। ( ২৩ )
দেবীকিশােরী
রসুই ঘরের দিকে হঠাৎ তুমুল গণ্ডগােল। বেড়ার উপরে কে
জ্বলন্ত কাঠ ঠেস দিয়া রাখিয়াছিল, একটা অগ্নিকাণ্ড হইতে হইতে
বাঁচিয়া গিয়াছে। সকলের বিশ্বাস, কাজটা বামুন ঠাকুরের ; তাই
রাগ করিয়া কে তার গাঁজার কলিকা ভাঙ্গিয়া দিয়াছে। পৈতা
হাতে বারম্বার ব্রাহ্মণ সন্তান দিব্য করিতেছিল—বিনা অপরাধে
তাহার গুরু দণ্ড হইয়া গেল, অগ্নিকাণ্ডে কলিকার দোষ নাই।
তিন দিনের মধ্যে কলিকা মােটে সে হাতে লয় নাই।
বেলা ডুবিয়া যাইতে শীতল ঘটক আসিয়া উঠানে দাঁড়াইল।
--খবর কি ? খবর কি ?
শীতল কহিল-খবর ভাল। বর, বরযাত্রী সব ওঁদের বাসাবাড়ী
পৌঁছে গেছেন। জজ বাবুর বড় মােটর এনে সাজানাে হচ্ছে।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এসে পড়বেন।
তারপর হাসিয়া গলা খাটো করিয়া কহিতে লাগিল-একশ’
বরকন্দাজ গাঙের ঘাট আগলাচ্ছে। কি জানি, কিছু বলা যায় না।
আমাদের কর্তাবাবু একবিন্দু খুঁত রেখে কাজ করেন না।
মােটরের আওয়াজ উঠিতেই ধুপধাপ করিয়া আট দশটা মেয়ে
ছুটিল তেতলার ছাতে। সকলের পিছন হইতে নিরু বলিল—যাওয়া
ভাই, অনর্থক। ছাত থেকে কিছু দেখা যাবে না। তার চেয়ে
গােলকুঠরির জানলা দিয়ে
কৌতুহল চোখমুখ দিয়া যেন ছিটকাইয়া পড়িতেছে ;
( ২৪ )
লাল চুল
ঠাট্টাতামাসা~-ছুটাছুটি—মাঝে মাঝে হাসির তরঙ্গ ; তার মধ্যে যুক্তি
বিবেচনার কথা কে শুনিবে ?
রাণী সকলের আগেভাগে ঝুকিয়া পড়িয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে
আঙুল দিয়া দেখাইল-ঐ, ঐ--বর—-দেখ—
-মরবি যে এক্ষুণি পড়ে’–ছাতের এখনাে আলসে হয়নি
দেখছিস্? বলিয়া আর একটি মেয়ে রাণীকে পিছে ঠেলিয়া নিজে
আগে আসিল। যেন সে মােটেই পড়িয়া মরিতে পারে না।
জিজ্ঞাসা করিল—কই ? ও রাণী, বর দেখলি কোন দিকে।
—গলায় ফুলের মালা—ঐ যে। দেখতে পাওনা--তুমি
যেন কি রকম সেজদি।
সেজদি বলিল—মালা না তাের মুণ্ডু। ও যে এক বুড়ো
সাদা চাদর কঁাধে। থুথুড়ে মাগাে, তিন কালের বুড়ো—ও
বরের ঠাকুরদাদা। বর এতক্ষণ
বর এতক্ষণ কোন কালে আসনে গিয়ে
বসেছে-
হাতের উপর হইতে বরাসনে নজর চলে না, দেখা যায় কেবল
সামিয়ানা।
নিরু বলিল—বলেছি ত অনর্থক। তার চেয়ে নীচে
গােলকুঠুরীর জানালা দিয়ে দেখিগে চল্।
-চল, চ--
অন্ধকারে নদী মৃদুতম গানের সুর তুলিয়া বহিয়া যাইতেছে।
ওপারেও যেন কিসের উৎসব—অনেকগুলা আলাে, ঢাকের
( ২৫ )
দেবীকিশােরী
বাজনা,... সহসা এক ঝলক স্নিগ্ধ বাতাস উহাদের রঙীন
সাড়ি, কেশ-বেশের সুগন্ধ, উচ্ছল কলহাস্যের টুকরাগুলি উড়াইয়া
ছড়াইয়া বহিয়া গেল।
---ঘুমিয়ে কে রে? মিনু ? ওমা .. মাগো, যার বিয়ে তার
মনে নেই ; পালিয়ে এসে চিলে কোঠায় ঘুমােননা হচ্ছে!
রাণী হাত ধরিয়া নাড়া দিতে মিনু একবার চাহিয়া চোখ
বুজিল।
নিরু বলিল—আহ। সারাদিন না খেয়ে নেতিয়ে পড়েছে।
ঘুমােক না একটু-আমরা নীচে যাই—
সেজদি ঝঙ্কার দিয়া উঠিল—গিন্নিপন রাখ, দিকি। আমরাও
না খেয়ে ছিলাম একদিন। ঘুমােনাের দফা শেষ আজকের দিন
থেকে। কি বলিস রে রাণী
বিশেষ করিয়া রাণীকেই জিজ্ঞাসা করিবার একটা অর্থ আছে।
কথাটা গােপনীয়, কেবল সেজদি আড়ি দিতে গিয়া দৈবাৎ জানিয়া
ফেলিয়াছিল। রাণী মুখ টিপিয়া হাসিল। দুই হাতে ঘুমন্ত
মিনুর গলা জড়াইয়া ধরিয়া চুমা খাইয়া বলিতে লাগিল—মিনু
ভাই, জাগো---আজকে রাতে ঘুমােতে আছে ? উঠে বর দেখসে
এসে। তারপর মিনুর এলাে চুলে হাত পড়িতে যেন শিহরিয়া
উঠিল দেখেছ ? সন্ধ্যেবেলায় আবার নেয়ে মরেছে হতভাগী।
শুয়ে শুয়ে চুল শুকানো হচ্ছে। ভিজে চুল নিয়ে এখন উপায়?
এই রাশ বাঁধতে কি সময় লাগবে কম ?
?
( ২৬ )
দেবীকিশােরী
নীচে উলুধ্বনি উঠিল। পিসিমা, নন্দরাণী, শুভা
শুভ 'ওদের
সব গলা।
চর্চ
—চুল বাঁধতে হবে—ওঠ, মিনু, শীগগির উঠে আয়—বলিয়া
মিনুর এলােচুল ধরিয়া জোরে এক টান দিয়া রাণী ছুটিয়া দলে
মিশিল। সিড়িতে আবার সমবেত পদধ্বনি।
ধড়মড় করিয়া মিনু উঠিয়া বসিল। তখন রাণীরা নামিয়া
গিয়াছে, ছাতে কেহ নাই। ঘুমচোখে প্রথমটা ভাবিল এটা যেন
তাদের কাজিডাঙার বাড়ির দক্ষিণের চাতাল। আকাশ ভরিয়া
তারা উঠিয়াছে ; ছাতে ঝাপসা ঝাপসা আলাে ওদিকে ভয়ানক
গণ্ডগােল উঠিতেছে।...সব কথা মিনুর মনে পড়িল—আজ তার
বিয়ে, সে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, সকলে ডাকাডাকি লাগাইয়াছে...।
হঠাৎ নীচের দিকে কোথায় দপ করিয়া সুতীব্র আলাে জ্বলিয়া
অনেকখানি রশ্মি আসিয়া পড়িল ছাতের উপর। তাড়াতাড়ি
তাগাইয়া গিয়া সি ড়ি ভাবিয়া যেই সে পা নামাইয়া দিয়াছে...
চারিদিকে তুমুল হৈ-হৈ পড়িয়া গেল ।
আসর ভাঙিয়া
সকলে ছুটিল। হারমােনিয়াম বাজাইয়া গান চলিতেছিল, পায়ের
আঘাতে আঘাতে সেটা যে কোথায় চলিয়া গেল তার ঠিকানা
একেবারে একতলার বারান্দায় পড়িয়া মিনু
নিশ্চেতন।-জল, জল...মােটর আনন...ভিড় করবেন না মশাই,
রহিল না।
( ২৭ )
দেবীকিশােরী সরুন—ফাক করে দিন...আহা-হা কি করে, মােটরে তােল শীগগির... গামছা কঁাধে কোন দিক হইতে কন্যার বাপ ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া আছাড় খাইয়া পড়িলেন। জজ বাবুর সেই মােটরে চড়িয়া মিনু হাসপাতালে চলিল। বড় রাস্তায় রশি দুই পথ গিয়া মােটর ফিরিয়া আসিল, আর যাইতে হইল না। ০ রসুনচৌকি থামিয়া গিয়াছে। দরজার পূর্বদিকে ছােট লাল চাদরের নীচে চারিটা কলাগাছ পুতিয়া বিয়ের জায়গা হইয়াছিল। সেইখানে শব নামাইয়া রাখা হইল। কঁচা হলুদের মত রং, তার উপর নূতন গহনা পরিয়া যেন রাজরাজেশ্বরী হইয়া শুইয়া আছে। কনে-চন্দন আঁকা শুভ্র কপাল ফাটিয়া চাপ চাপ জমা রক্ত লেপিয়া রহিয়াছে, নাক ও গালের পাশ বহিয়া রক্ত গড়াইয়াছে—মেঘের মতো খােলা চুলের রাশি এখানে সেখানে রক্তের ছােপে ডগমগে লাল। ভিতরে-বাহিরে নিদারুণ স্তব্ধতা—বাড়িতে যেন একটা লােক নাই। শবের মাথার উপরে একটি খরজ্যোতি গ্যাস জুলিতেছে। বাড়ির মধ্য হইতে স্তব্ধতা চিরিয়া হঠাৎ একবার আর্তনাদ আসিল- ওমা, ও মাগাে আমারও আমার লক্ষিমমাণিক রাজরাণী মা- নীলমাধব সকলের দিকে চাহিয়া ধমক দিয়া উঠিলেন—হাত পা গুটিয়ে বসে আছ যে- ( ২৮ ) লাল চুল । বরশয্যা প্রকাণ্ড মেহগ্নি-পালিশ খাট কজনে টানিয়া নামাইয়া আনিল। এতক্ষণ বেণুধরকে লক্ষ্য হয় নাই। এইবার ভিড় ঠেলিয়া আসিয়া শবের পায়ের কাছে খাটের বাজুতে ভর দিয়া - সে স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইল। হাতের মুঠায় কাজললতা তেমনি ধরা আছে। কাচের মত স্বচ্ছ অচঞ্চল আধ-নিমীলিত দুটি দৃষ্টি, মৃতার সেই স্তিমিত চোখ দুটির দিকে নিষ্পলক চাহিয়া চাহিয়া বেণুধর দাড়াইয়া রহিল। বাপ ঝুকিয়া পড়িয়া পাগলের মত আৰ্তনাদ করিয়া উঠিলেন —একবার ভাল করে’ চা” দিকি...চোখ তুলে চা–ও খুকী,••• নীলমাধব ছুটিয়া আসিয়া তাহার হাত ধরিয়া ফেলিলেন। কিন্তু তিনি থামিলেন না, সজল চোখে বারম্বার বলিতে লাগিলেন- ও বেয়াই, বিনি দোষে মাকে আমার কত গালমন্দ দিয়েছি—কোন সম্বন্ধ এগুতে চায় না, তার সমস্ত অপরাধ দিনরাত মা ঘাড় পেতে নিয়েছে, একবার মুখ তুলে একটা কথা কয়নি। ও খুকী, আর বকব না---চোখ তুলে চা একবার ভিড় জমিয়া গিয়াছিল। নীলমাধব ক্রুদ্ধ কণ্ঠে চীৎকার করিয়া উঠিলেন—কতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে এই দেখবে তােমরা ? আটটা বেজে গেছে, রওনা হও। সাড়ে আটটায় লগ্ন ছিল—বেণুধরের বুকের মধ্যে কাপিয়া উঠিল, যেন শুভ লগ্নে তাহাদের শুভদৃষ্টি হইতেছে, লজ্জানত ( ২৯ ) দেবীকিশােরী বালিকা চোখ তুলিয়া চাহিতে পারিতেছে না, বাপ তই মেয়েকে সাহস দিতে আসিয়া দাড়াইয়াছেন।...ফুল ও দেবদারু-পাতা দিয়া গেট হইয়াছিল, সমস্ত ফুল ছিড়িয়া আনিয়া সকলে শবের উপর চালিয়া দিল। বেণুধর গলার মালা ছিড়িয়া সেই ফুলের গাদায় ছুড়িয়া দ্রুত বেগে ভিড়ের মধ্য দিয়া পলাইয়া গেল। ছুটিতে ছুটিতে রাস্তা আঁধি আসিল ; সর্বাঙ্গ দিয়া ঘামের ধারা বহিতেছে, পা টলিতেছে, নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া যাইতেছে। মােটরের মধ্যে ঝাপাইয়া পড়িয়া উন্মত্তের মতাে সে বলিয়া উঠিল চালাও এক্ষুনি গাড়ী চলিতে লাগিলে হুশ হইল, তখনো আগাগােড়া তাহার বরের সাজ, একবােঝ কোট কামিজ, তার উপর সৌখীন ফুল- কাটা চাদর--বিয়ের উপলক্ষ্যে পছন্দ করিয়া সমস্ত কেনা। একটা একটা করিয়া খুলিয়া পাশে সমস্ত স্তুপাকার করিতে লাগিল। তবু কি অসহ্য গরম ! বেণুর মনে হইল, সর্বদেহ ফুলিয়া ফাটিয়া এবার বুঝি ঘামের বদলে রক্ত বাহির হইবে। ক্রমাগত বলিতে লাগিল, চালাও-খুব জোরে চালাও গাড়ী সােফার জিজ্ঞাসা করিল-কোথায় ? --যেখানে খুসী। ফাঁকায়-গ্রামের দিকে তীর বেগে গাড়ী ছুটিল। চোখ বুজিয়া চেতনাহীনের মতাে বেণুধর পড়িয়া রহিল। ( ৩০ ) লাল চুল সুমুখ-আঁধার রাত্রি, তার উপর মেঘ করিয়া আরও আধার জমিয়াছে। জনবিরল পথের উপর মিটমিটে কেরােসিনের আলো যেন প্রেতপুরীর পাহারাদার। একবার চোখ চাহিয়া বাহিরের দিকে তাকাইয়া বেণু শিহরিয়া উঠিল, এমন নিবিড় অন্ধকার সে জীবনে দেখে নাই। দুধারের বাড়িগুলির দরজা-জানালা বন্ধ, ছােট শহর ইহারই মধ্যে নিশুতি হইয়া উঠিয়াছে। মধ্যে মধ্যে আম কঁঠালের বড় বাগিচা।...সহসা কোথায় কোন দিক দিয়া উচ্ছল হাসির শব্দ বাজিয়া উঠিল, অতি মৃদু অস্পষ্ট কৌতুক চঞ্চল অনেকগুলা কণ্ঠস্বর-বউ দেখিয়ে যাও, বউ দেখিয়ে যাও, বউ দেখিয়ে যাও গো- আশপাশের সারি সারি ঘুমন্ত বাড়ীগুলির ছাতের উপর, আম- বাগিচার এখানে সেখানে, ল্যাম্পপােষ্টের আবছায়া নানা বয়সের কত মেয়ে কৌতূহল-ভরা চোখে ভিড় করিয়া বউ দেখিতে দাঁড়াইয়া আছে। তারপর গাড়ীর মধ্যে দৃষ্টি ফিরাইয়া এক পলকে যেন তাহার গায়ে কাঁটা দিয়া উঠিল। বধু তাহার পাশে রহিয়াছে, সত্যই একটি বউ মানুষ ঘােমটার মধ্যে জড়সড় হইয়া মাথা নােয়াইয়া একবারে গদীর সঙ্গে মিশিয়া বসিয়া আছে, গায়ে ছোঁয়া লাগিলে যেন সে লজ্জায় মরিয়া যাইবে। তারপর খেয়াল হইল, সে তার পরিত্যক্ত জামা-চাদরের বােঝা,-মানবী নয়। এই গাড়ীতেই মেয়েটিকে হাসপাতালে লইয়া চলিয়াছিল ; সে বসিয়া নাই, তার ( ৩১ ) দেবীকিশােরী t দেহের দু-এক ফোঁটা রক্ত হয়ত গাড়ীর গদীতে লাগিয়া থাকিতে পারে। শহর ছাড়িয়া নদীর ধারে ধারে গাড়ী ক্রনে মাঠের মধ্যে আসিল। হেড-লাইট জ্বালিয়া গাড়ী ছুটিতেছে ; চারিদিকের নিঃশব্দতাকে পিষিয়া 'ভাঙিয়া চুরিয়া খােয়া-তােলা রাস্তার উপর চাকার পেষণে কর্কশ সুকরুণ আর্তনাদ উঠিতেছে। একটি পল্লী- কিশােরীর এই দিনকার সকল সাধ-বাসনা বেণুধরের বুকের মধ্যে কঁদিয়া বেড়াইতে লাগিল। চাকার সামনে সে যেন বুক পাতিয়া দিয়াছে। বাহিরে ঘন তিমিরাচ্ছন্ন রাত্রি--জনশূন্য মাঠ-কোন দিকে আলাের কণিকা নাই। সৃষ্টির আদি যুগের অন্ধকারলিপ্ত নীহারিকামণ্ডলীর মধ্য দিয়া বেণুধর যেন বিদ্যুতের . গতিতে ছুটিয়া বেড়াইতেছে, আর পাশে পাশে পাল্লা দিয়া ছুটিয়া মরিতেছে নিঃশব্দ- চারিণী মৃত্যুরূপা তার বন্ধু। লাল বেনারসীতে রূপের রাশি মুড়িয়া লজ্জায় ভাঙিয়া শতখান হইয়া এখানে এক কোণে তার বসিবার স্থান ছিল, কিন্তু একটি মুহূর্তের ঘটনার পরে এখন তার পথ হইয়াছে সীমাহীন আশ্রয়হীন বিপুল শূন্যতা-রাত্রির অন্ধকার মথিত করিয়া বাতাসের বেগে ফরফর শব্দে তার পরণের কালো কাপড় উড়ে, পায়ের আঘাতে জোনাকী ছিটকাইয়া যায়, গতির বেগে সামনে ঝুকিয়া-পড়া ঘন চুল-ভরা মাথাটি—মাথার চারি পাশ দিয়া রক্তের ধারা গড়াইয়া গড়াইয়া বৃষ্টি বহিয়া যায়, এলাে চুল উড়ে,-দিগন্তব্যাপী ভগমগে লাল চুল ! ( ৩২ ) লাল চুল দুই হাতে মাথা টিপিয়া চোখ বুজিয়া বেণুধর পড়িয়া রহিল। গাড়ী চলিতে লাগিল। খানিক পরে পথের ধারে এক বটতলায় থামিয়া হাটুরে চলার মধ্যে বাঁশের মাচায় অনেকক্ষণ মুখ ও জিয়া পড়িয়া থাকিয়া অবশেষে মন কিছু শান্ত হইলে বাসাবাড়ীতে ফিরিয়া আসিল। নীলমাধব প্রভৃতি অনেকক্ষণ আসিয়াছেন। বরযাত্রীর অনেঝে মেল ট্রেন ধরিতে সােজা ষ্টেশনে গিয়াছে। কেবল কয়েকজন মাত্র—যাহারা খুব নিকট আত্মীয়-বৈঠকখানার পাশের পাশের ঘরে বালিশ কঁাথা পুটুলি বই যা হয় একটা কিছু মাথায় দিয়া যে যার মতাে শুইয়া পড়িয়াছেন। অনেক রাত্রি। হেরিকেনের আলো মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছে। আলাের সামনে ঠিক মুখােমুখি নির্বাক নিস্তব্ধ গম্ভীর মুখে বসিয়া নীলমাধব ও শীতল ঘটক। বেণুকে দেখিয়া নীলমাধব উঠিয়া আসিলেন। বলিলেন- কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়লে-মােটর নিয়ে গিয়েছ শুনে ভাবলাম, বাসাতেই এসেছ। এখানে এসে দেখি তাও নয়। ভারী ব্যস্ত হয়েছিলাম। জজ বাবুর বাড়ীতে বিজয় গিয়ে বসে আছে এখনো। বেণুধর বলিল--বড় মাথা ধরল, ফাঁকায় তাই খানিকটে ঘুরে * এলাম- —বলে যাওয়া উচিত ছিল—বলিয়া নীলমাধব চুপ করিলেন ।
দেবীকিশােরী ছেলে নিশ্চল দাঁড়াইয়া আছে দেখিয়া পুনরায় বলিলেন--- তােমার খাওয়া হয়নি। দক্ষিণের কোঠায় খাবার ঢাকা আছে, বিছানা করা আছে, খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়–রাত জাগবার দরকার নেই। ঘরে গিয়া নীলমাধবের ভয়ে ঢাকা খুলিয়া খাবার খানিকটা সে নাড়াচাড়া করিল, মুখে তুলিতে পারিল না । দালানের পিছনে কোথায় কি ফুল ফুটিয়াছে, একটা উগ্র মিষ্ট গন্ধের আমেজ। মিটমিটে আলােয় রহস্যাচ্ছন্ন আধ-অন্ধকারে চারিদিক চাহিয়া চাহিয়া মনে হইল, ঘর ভরিয়া কে-একজন বসিয়া আছে, তাহাকে ধরিবার জো নাই—অথচ তাহার স্নিগ্ধ লাবণ্য বন্যার মতাে ঘর ছাপাইয়া যাইতেছে ; কোণের দিকে দলিল-পত্র ভরা সেকেলে বড় ছাপ বাক্সের আবডালে নিবিড় কালাে বড় বড় চোখ দুটি অভুক্ত খাবারের দিকে বেদনাহত ভাবে চাহিয়া নীরব দষ্টিতে তাহাকে সাধাসাধি করিতেছে। আলাে নিভাইতেই সেই দেহাতীত ইন্দ্রিয়াতীত সৌন্দৰ্য্য অকস্মাৎ বেণধরকে কঠিন ভাবে বেষ্টন করিয়া ধরিল।••• ; বাহিরের বৈঠকখানায় কথাবার্তা আরম্ভ হইল। শীতল ঘটক নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিয়া উঠিল--পােড়াকপালী আজ কার মুখ দেখে উঠেছিল। তারপর চুপ। অনেকক্ষন আর কথা নাই। শীতল আবার বলিতে লাগিল—বুদ্ধি এ ছিল মেয়েটার। ( ৩৪ ) লাল চুল মনে আছে কৰ্ত্তাবাবু, সেই পাকা দেখতে গিয়ে আপনি বলেন । আমার মা নেই, একজন মা খুঁজতে এসেছি। আপনার কথা শুনে মেয়েটি কেমন হেসে ঘাড় নীচু করে রইল— নীলমাধব গম্ভীর কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন—থামাে শীতল । একেবারেই কথা বন্ধ হইল, দুজনে চুপচাপ। আলাে জ্বলিতে লাগিল। আর ঘরের মধ্যে বেণুধরের দুই চক্ষু জলে ভরিয়া গেল ; জীবনকালের মধ্যে কোন দিন যাহাকে দেখে নাই, মৃত্যুপথবৰ্ত্তিনী সেই কিশােরী মেয়ের ছােট ছােট আশা আকাঙ্ক্ষাগুলি হঠাৎ যেন মাঠ বাড়ি বাগিচা ও এত রাস্তা পার হইয়া জানালা গলিয়া অন্ধকার ঘরখানির মধ্যে তাহার পদতলে মাথা খুঁড়িয়া মরিতে লাগিল। তারপর কখন বেণু ঘুমাইয়া পড়িয়াছে ; জানালা খােলা, শেষ রাতে পূর্ববদিগন্তে চাদ উঠিয়া ঘর জ্যোৎস্নায় প্লাবিত করিয়া দিয়াছে, দিগন্তবিসারী ভৈরব শান্ত জ্যোৎস্নার সমুদ্রে ডুবিয়া রহিয়াছে। হঠাৎ তাহার ঘুম ভাঙিল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল, কি একটা ভারি ভুল হইয়া যাইতেছে...হঠাৎ বড় ঘুম আসিয়া পড়িয়া- ছিল...কে আসিয়া কতবার তাহাকে ডাকাডাকি করিয়া বেড়াইতেছে। ঘুমের আলস্য তখনও বেণুধরের সর্বাঙ্গে জড়াইয়া আছে ; তাহার তন্দ্রাবিবশ মনের কল্পনা ভাসিয়া চলিল- ঠক্ঠক্ঠক খিল-আঁটা কাঠের বাটের ওপাশে দাঁড়াইয়া চুপি চুপি এখনো যে ক্ষীণ আঘাত করিতেছে বেণুধর তাহাকে স্পষ্ট দেখিতে পায়। ( ৩৫ )
দেবীকিশােরী
।
হাতের চুড়িগুলি গােছর দিকে টানিয়া আনা, চুড়ি বাজিতেছে
শেষ প্রহর অবধি জাগিয়া জাগিয়া তাহার শ্রান্ত দেহ আর
বশ মানে না। চোখের কোণে কান্না জমিয়াছে। একটু আদরের
কথা কহিলে একবার নাম ধরিয়া ডাকিলে এখনি কঁাদিয়া
ভাসাইয়া দিবে। ফিসফিস করিয়া বন্ধু বলিতেছে—দুয়াের খুলে
দাও গাে, পায়ে পড়ি
উঠিয়া তাহাকে ডাকিয়া আনার দরকা; কিন্তু মনে যতই
তাড়া, দেহ আর উঠিয়া গিয়া কিছুতেই কষ্টটুকু স্বীকার করিতে রাজি
নয়। বেণধর দেখিতে লাগিল, বাতাস লাগিয়া গাছের উপরের
লতা যেমন পড়িয়া যায়, ঝপ করিয়া তেমনি দোর গােড়ায় বধূ
পড়িয়া গেল। সমস্ত পিঠ ঢাকিয়া পা অবধি তাহার নিবিড়
তিমিরাবৃত চুলের রাশি এলাইয়া পড়িয়াছে—বেণুধর দেখিতে
লাগিল।
ক্রমে ফর্শা হইয়া আসে। আম বাগানের ডালে ডালে সদ্য
ঘুমভাঙা পাখীর কলরব... ও ঘর হইতে কে কাসিয়া কাসিয়া
উঠিতেছে। দিনের আলাের সঙ্গে মানুষের গতিবিধি স্পষ্ট ও
প্রখর হইতে লাগিল। বেণুধর উঠিয়া পড়িল ।
সকালের দিকে সুবিধা মত একটা টেণ আছে। অথচ
নীলমাধব নিশ্চিন্তে পরম গম্ভীরভাবে গড়গড়া টানিতেছিলেন।
বেণু গিয়া কহিল-সাতটা বাজে-
লাল চুল
বিনাবাক্যে নীলমাধব দু’টা টাকা বাহির করিয়া দিলেন ।
বলিলেন—চা-টা তােমরা দোকান থেকে খেয়ে নাও
—বাড়ী যাওয়া হবে না ?
-না—বলিয়া তিনি গড়গড়ার নল রাখিয়া কি কাজে বাহিরে
যাইবার উদ্যোগে উঠিয়া দাড়াইলেন।
বেণধর ব্যাকুল কণ্ঠে পিছন হইতে প্রশ্ন করিল–কবে যাওয়া
হবে ? এখানে কতদিন থাকতে হবে আমাদের ?
মুখ ফিরাইয়া নীলমাধব ছেলের মুখের দিকে চাহিলেন ।
সে মুখে কি দেখিলেন, তিনিই জানেন-ক্ষণকাল মুখ দিয়
তাহার কথা সরিল না। শেষে আস্তে আস্তে বলিলেন--শীত
টক ফিরে না এলে সে ত বলা যাচ্ছে না।
অনতিপরেই বৃত্তান্ত জানিতে বাকী রহিল না। শীতল ঘটক
গিয়াছে তাহিরপুরে। গ্রামটা নদীর আড় পারে ক্রোশ খানেকের
মধ্যেই। ওখানে কিছুদিন একটা কথাবার্তা চলিয়াছিল। খুব
বনিয়াদী গৃহস্থ ঘরের মেয়ে; কিন্তু ইদানীং কৌলীন্য টুকু ছাড়া
সে পক্ষের অন্য বিশেষ কিছু সম্বল নাই। অতএব নীলমাধব
নিজেই পিছাইয়া আসিয়াছিলেন।
বিজয়কে আড়ালে ডাকিয়া সকল আক্রোশ বেণু তাহারই
উপর মিটাইল। কহিল—কশাই তােমরা সব।
অথচ সে একেবারেই নিরপরাধ। কিন্তু সে-তর্ক না করিয়া
( ৩৭ )
দেবীকিশােরী বিজয় সান্ত্বনা দিয়া কহিল—ভয় নেই ভাই, ও কিছু হবে না। ওঠ ছুড়ি তাের বিয়ে, সে কি হয় কখনাে? কাকার যেমন কাণ্ড- একটু পরেই দেখা গেল, ঘটক হাসি মুখে হনহন করিয়া ফিরিয়া আসিতেছে। সামনে পাইয়া সুসংবাদটা তাহাদিগকেই সর্বাগ্রে দিল—পাকাপাকি করে এলাম ছােটবাবু তবু বিজয় বিশ্বাস করিতে পারিল না। বলিল—পাকাপাকি করে এলে কি রকম? এই ঘণ্টা দুই তিন অংগে বেরুলে——কোন খবরাখবর দেওয়া নেই। এর মধ্যে ঠিক হয়ে গেল? শীতল সগর্বেব নিজের অস্থির বুকের উপর একটা থাবা মারিয়া কহিল--এর নাম শীতল ঘটক, বুঝলেন বিজয় বাবু, চল্লিশ বছরের পেশা এই আমার। কিছুতে রাজ্ঞী হয় না—হেনো তেনাে কত কি আপত্তি। যুস মন্ত্রে সমস্ত জল করে দিয়ে এলাম। বলিয়া শূন্যে মুখ তুলিয়া ফুৎকার দিয়া মন্ত্রটার স্বরূপ। বুঝাইয়া দিল। বেণধর কহিল--আমি বিয়ে করব না। শীতল অবাক হইয়া গেল। সে কেবল অপর দিকের কথাটাই ভাবিয়া রাখিয়াছিল। একবার ভাবিল, বেণুধর পরিহাস করিতেছে। তাহার মুখের দিকে চাহিয়া এদিক ওদিক বার দুই ঘাড় নাড়িয়া সন্দিগ্ধ সুরে বলিতে লাগিল—তাই কখনাে হয় ছােটবাবু, লক্ষী- ঠাকরুণের মতো মেয়ে ছবি নিয়ে এসেছি, মিলিয়ে দেখুন- কালকের ও মেয়ে এর দাসী বাদীর যুগ্যি ছিল না। d,
লাল চুল
বেণুধর কঠোর সুরে বলিয়া উঠিল—কিন্তু আমি যা বলবার
বলে দিইছি শীতল, তুমি বাবাকে আমার কথা বােলো---
বলিয়া আর উত্তর প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না রাখিয়া সে ঘরের
মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল।
ক্ষণপরে তাহার ডাক পড়িল।
নীলমাধব বলিলেন—শুনলাম, বিয়েয় তুমি অনিচ্ছুক ?
বেণ মাথা হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
নীলমাধব বলিতে লাগিলেন---তা হলে আমাকে আত্মহত্যা
করতে বল ?
কোন প্রকারে মােরিয়া হইয়া বেণুধর বলিয়া উঠিল—কালকের
সর্বনেশে কাণ্ডে আমার মন কি রকম হয়ে গেছে বাবা, আমি
পাগল হয়ে যাব। আর কিছু দিন সময় দিন আমায়—বলিতে
বলিতে স্বর কপিতে লাগিল। এক মুহূর্ত সামলাইয়া লইয়া
বলিল-~-মরা মানুষ আমার পিছু নিয়েছে--
জ বাঁকাইয়া নীলমাধব ছেলের দিকে চাহিলেন। একটু
খানি নরম হইয়া বলিতে লাগিলেন—আর এদিকের সর্বনাশটা
ভাবাে একবার। বাড়ীসুদ্ধ কুটুম্ব গিস্ গিস্ করছে, সতের গ্র
নেমন্তন্ন। বউ দেখবে বলে সব হা করে বসে আছে। যেমন
তেমন ব্যাপার নয়, এত বড় জেদাজেদীর বিয়ে---আর চৌধুরীদের
সেজকৰ্ত্তা আসবেন
( ৩৯ )
দেবীকিশােরী অপমানের ছবিগুলি চকিতে নীলমাধবের মনের মধ্যে খেলিয়া গেল। চৌধুরীদের সেজকা অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি, তিলার্ধ দেরী না করিয়া জপের মালা হাতে লইয়াই খড়ম খটখট করিতে করিতে সমবেদনা জানাইতে আসিবেন—আসিয়া নিতান্ত নিরীহ মুখে উচ্চ কণ্ঠে এক হাট লােকের মধ্যে বৃদ্ধ অতি গােপনে জিজ্ঞাসা করিবেন, বলি ও নীলমাধব, আসল কথাটা বল্ দিকি, বিয়ে এবারও ভাঙল–মেয়ে কি তারা অন্য জায়গায় বিয়ে দেবে ? ভাবিতে ভাবিতে নীলমাধব ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন। বলিলেন —না বেণুধর, বউ না নিয়ে বাড়ী ফেরা হবে না। পরশুর আগে দিন নেই। তুমি সময় চাচ্ছিলে-বেশত, মাঝের এই দুটো দিন থাকল। এর মধ্যে নিশ্চয় মন ভাল হয়ে যাবে। বারােয়ারীর মাঠে যাত্রা আসিয়াছে। বিকাল হইতে গাওনা সুরু। বেণুধর সমবয়সী কন দুই তিনকে পাকড়াইয়া বলিল- চল যাই। বিজয় বলিল--আমার যাওয়া হবেনা ত। বিস্তর জিনিষ পত্তোর বাঁধাছাদা করতে হবে। রাত্রে ফিরে যাচ্ছি। -কেন ? গ্রামে গিয়ে খবর দিতে হবে বউভাতের তারিখ দুটো দিন পিছিয়ে গেল। কাকা বললেন, তুমিই যাও বিজয়। ( ৪০ )
লাল চুল
-গাড়ী সেই কোন রাতে—আমরা থাকব বড়জোর এক
ঘণ্টা কি দেড় ঘণ্টা---চল চলবেণুধর ছাড়িল না। সকলকে
ধরিয়া লইয়া গেল।
পথের মধ্যে বিজয়কে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করিল---বিয়ে পরশু
দিন ঠিক হল ?
--পরশু রাত্রে ?
তা ছাড়া কি
চুপ করিয়া খানিক কি ভাবিয়া বেণুধর করুণ ভাবে হাসিয়া
উঠিল। বলিল—-রাত্রি আসছে, আর আমার ভয় হচ্ছে। তুমি
বিশ্বাস করবে ন্ম বিজয়, ঐ অপঘাতে-মরা মেয়েটা কাল সমস্ত
রাত আমায় জ্বালাতন করেছে
আবার একটু স্তব্ধ থাকিয়া উচ্ছসিত কণ্ঠে সে বলিতে লাগিল
—মরা ব্যাপারটা আর আমি বিশ্বাস করছিনে---এত সাধ আলাদ
ভালবাসা পলক ফেলতে না ফেলতে উড়িয়ে পুড়িয়ে চলে যাবে-
সে কি হতে পারে ?-মিছে কথা। এ আমার অনুমানের কথা
নয় বিজয়, কাল থেকে স্পষ্ট করে জেনেছি।
বিজয় ব্যাকুল হইয়া বলিল—তুমি এসব কথা আর বােলো
ভাই, আমাদেরও শুনলে ভয় করে।
—ভয় করে ? তবে বলব না। বলিয়া বেণু টিপি টিপি
হাসিতে লাগিল। বলিল--কিন্তু যাই বল, এই শহরে পড়ে
( ৪১ )
দেবীকিশােরী থাকা আমাদের উচিত হয় নি—দূরে পালানাে উচিত ছিল। এই আধক্রোশের মধ্যেই কাণ্ডটা ঘটল। যাত্রা দেখিয়া বেণু অতিরিক্ত রকম খুসী হইল। ফিরিবার পথে কথায় কথায় এমন হাসি রহস্য—যেন সে মাটি দিয়া পথ চলিতেছে না। তখন সন্ধ্যা গড়াইয়া গিয়াছে। পথের উপর অজস্র কামিনী ফুল ফুটিয়াছে। ডালপালাশুদ্ধ তাহার অনেকগুলি ভাঙিয়া লইল। বলিল—-খাসা গন্ধ ! বিছানায় ছড়িয়ে দেবাে- একজন ঠাট্টা কিরিয়া বলিল—ফুলশয্যা দেবী আছে হে-~- -কোথায় ? বলিয়া বেণু প্রচুর হাসিতে লাগিল। বলিল -এ পক্ষের দিন রয়েছে ত কাল। আর তাহিরপুরেরটারও বিজয়, তােমাদের নতুন সম্বন্ধের ফুলশয্যের দিন করেছে কবে ? বিজয় রীতিমত রাগিয়া উঠিল—ফের ঐ কথা? এ পক্ষ- 'ওপক্ষ-বিয়ে তােমার ক’টা হয়েছে শুনি ? —অাপাততঃ একটা ; কাল যেটা হয়ে গেল—আর একটার আশায় আছ– বিজয়ের কাধ ধরিয়া ঝাকি দিয়া বেণু বলিতে লাগিল—ও বিজয়, ভয় পেলে নাকি ? ভয় নেই, আজ সে আসবে না। আজকে কালরাত্রি-বউয়ের দেখা করবার নিয়ম নেই। খাওয়া দাওয়ার পর বেশ প্রফুল্ল ভাবে বেণুধর শুইয়া পড়িল। কিন্তু ঘুম আসে না। আলাে নিভাইয়া দিল ; কিছুতে ঘুম ( ৪২ )
লাল চুল
আসে না। পাশে কোন বাড়ীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘড়ি বাজিয়া
যাইতেছে। চারিদিক নিশুতি। অনেকক্ষণ ধরিয়া ঘুমের
সাধনা করিয়া কাহার উপর বড় রাগ হইতে লাগিল। রাগ করিয়া
গায়ের কম্বল ছুঁডিয়া ফেলিয়া কাহাকে শুনাইয়া শুনাইয়া জোরে
জোরে বাহিরে পায়চারী করিতে লাগিল । খণ্ড চঁাদ ক্রমশঃ তাম
বাগানের মাথায় আসিয়া ঠেকিয়াছে।...আবার সে ঘরে ঢুকিল ।
বিছানার পাশে গিয়া মনে হইল, ফেঁাস করিয়া নিঃশ্বাস ফেলিয়া
লঘুপায়ে কে কোথায় পালাইয়া গেল। বাতাসে বাগিচার গাছ
পালা খস খস করিতেছে। বেণধর ভাবিতে লাগিল, নতুন
কোরা কাপড় পরিয়া খস খস করিতে করিতে এক অদৃশ্যচারিণী
বনপথে বাতাসে বাতাসে দ্রুতবেগে মিলাইয়া গেল।
পরদিন তাহিরপুরের পাত্রীপক্ষ আশীর্বাদ করিতে আসিলেন
হাসিমুখেই আশীর্বাদের আংটি সে হাত পাতিয়া লইল। মনে
মনে বাপের বহুদর্শিতার কথা ভাবিল। নীলমাধব সত্যই
বলিয়াছিলেন, এই দুটা দিন সময়ের মধ্যেই মন তাহার আশ্চর্য
রকম ভাল হইয়া উঠিয়াছে। চুরি করিয়া এক ফাঁকে বাপের
ঘর হইতে পাত্রীর ছবিটা লইয়া আসিল। মেয়ে সুন্দরী বটে।
প্রতিমার মতাে নিখুঁত নিটোল গড়ন।
সেদিন একখানা বই পড়িতে পড়িতে অনেক রাত হইয়া গেল।
শিয়রে তেপায়ার উপর ভাবী বধুর ছবিখানি। স্নান দীপালােকিত
( ৪৩ )
দেবীকিশােরী
চুণ-কাম-খসা উচু দেয়াল, গম্বুজের মত খিলান-করা সেকেলে ছাত,
তাহারই মধ্যে মিলনােৎকণ্ঠিত নায়ক-নায়িকার সুখ-দুঃখের সহগামী
হইয়া অনেক রাত্রি অবধি সে বই পড়িতে লাগিল...একবার কি
রকমে মুখ ফিরাইয়া বেণুধর স্তম্ভিত হইয়া গেল, স্পষ্ট দেখিতে
পাইল, একেবারে স্পষ্ট প্রত্যক্ষ--তাহার মধ্যে এক বিন্দু সন্দেহ
করিবার কিছু নাই-জানলার শিকের মধ্যে দিয়া হাত গলাইয়া
চাপার কলির মত পাঁচটি আঙ্গুল লীলায়িত ভঙ্গীতে হাতছানি দিয়া
তাহাকে ডাকিতেছে। ভাল করিয়া তাকাইতেই বাহিরের
নিকষকালাে অন্ধকারে হাত ঢুৰিয়া গেল।
সে উঠিয়া জানলায়
আসিল। আর কিছুই নাই, নৈশ বাতাসে লতাপাতা দুলিতেছে।
সজোরে সে জানলার খিল আঁটিয়া দিল।
আলাের জোর বাড়াইয়া দিয়া বেণুধর পাশ ফিরিয়া শুইল।
চটা-ওঠা দেয়ালের উপর কালের দেবতা কত কি নক্সা আঁকিয়া
গিয়াছে। উল্টা-করা তালের গাছ...একটা মুখের আধখানা...
ঝু টি-ওয়ালা অদ্ভুত আকারের জানােয়ার আর একটা কিসের টুটি
চাপিয়া ধরিয়া আছে...বুল কালি ও মাকড়শা জালের বন্দীশালায়
কালো কালো শিকের আড়ালে কত লােক যেন আটক হইয়া
রহিয়াছে...
চোখ বুজিয়া বুজিয়া দেখিতে লাগিল--
অনেক দূরে মাঠের ওপারে কালাে কাপড় মুড়ি দেওরা সারি
( ৪৪ )
লাল চুল সারি মানুষ চলিয়াছে—পি পড়ার সারির মতাে মানুষের অনন্ত শ্ৰেণী। লােকালয়ের সীমানায় আসিয়া কে-একজন হাত উচু করিয়া কি বলিল। মুহূৰ্তকাল সব স্থির। সবার কি সঙ্কেত হইল। অমনি দল ভাঙিয়া নানাজনে নানাদিকে পথ-বিপথ ঝোপ- জঙ্গল আনাচ কানাচ না মানিয়া ছুটিতে ছুটিতে অদৃশ্য হইয়া গেল।... এই রাত্রে আঙিনার ধূলায় কোথায় এক পরম দুঃখিনী এলাইয়া পড়িয়া থাকিয়া থাকিয়া দাপাদাপি করিতেছে -ওমা–মাগো আমার ও আমার লক্ষীমাণিক রাজরাণী অন্ধকারের আবছায়ে ছােট ঘুলঘুলির পাশে তন্বী কিশােরীটি নিঃশ্বাস বন্ধ করিয়া আড়ি পাতিয়া বসিয়া আছে। শিয়রে নূতন বধু চুপটি করিয়া বাসর জাগে। বর বুঝি ঘুমাইল।... বেণুধর উঠিয়া বসিয়া পরম স্নেহে তিমুখে শিয়রে তেপায়ার উপরের ছবি খানির দিকে তাকাইল। কাল সারা রাত্রি তাহারা জাগিয়া কাটাইবে। রুদ্ধ জানলায় সহসা মৃদু মৃদু করাঘাত শুনিয়া বেণুধর চমকিয়া উঠিল। শুনিতে পাইল, ভয়ার্ত চাপা গলায় ডাকিয়া ডাকিয়া কে ( ৪৫ ) দেবীকিশােরী যেন কি বলিতেছে। একটি অসহায় প্রীতিমতী বালিকা বাপ-মা এবং চেনা-জানা সকল আত্মীয় পরিজন ছাড়িয়া আসিয়া ঐ জানলার বাহিরে পাগল হইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আজ বেণুধর তিলার্ধ দেরী করিল না ; দুয়ার খুলিয়া দেখে, ইতিমধ্যে বাতাস বাড়িয়া ঝড় বহিতে সুরু হইয়াছে। সন সন করিয়া ঝড় দালানের গায়ে পাক খাইয়া ফিরিয়া যাইতেছে । -এসাে “উহু- এসাে বাতাসে দড়াম করিয়া দরজা বন্ধ হইয়া গেল। বেণুধর নির্নিরীক্ষা অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য পলায়নপরার পিছনে পিছনে ছুটিল। ঝােড়ো হাওয়ায় কথা না ফুটিতে কথা উড়াইয়া লইয়া যায় ; তবু সে যুক্তকরে বারম্বার এক অভিমানিনীর উদ্দেশে কহিতে লাগিল-মিছে কথা, আমি বিয়ে করব না; আমি যাবনা কাল। তুমি এসাে ফিরে এসাে নিশীথ রাত্রি। মেঘভরা আকাশে বিদ্যুৎ চমকাইতেছে । ভৈরবের বুকেও যেন প্রলয়ের জোয়ার লাগিয়াছে। ডাক ছাড়িয়া কুল ছাপাইয়া জল ছুটিয়াছে। বেণুধর নদীর কুলে কুলে ডাকিয়া বেড়াইতে লাগিল। মৃত্যু ও জীবনের সীমারেখা এই পরম মুহূর্তে প্রলয়-তরঙ্গে লেপিয়া মুছিয়া গিয়াছে। পৃথিবীতে এই ক্ষণ ( ৪৬ ) MAKARDAH- KRS লাল চুল প্রতিদিন আসিয়া থাকে। দিনের অবসানে সন্ধ্যা-তারপর রাত্রি পলে পলে রাত্রির বক্ষস্পন্দন বাড়ে—তারপর তানেক, অনেক —অনেক ক্ষণ পরে মধ্যে আকাশ হইতে একটি নক্ষত্র বিদ্যুৎ- গতিতে খসিয়া পড়ে, বন ঝন করিয়া মৃত্যুপুরীর সিংহদ্বার খুলিয়া যায়, পৃথিবীর মানুষের শিয়রে ওপারের লােক দলে দলে আসিয়া বসে, ভাল বাসে, আদর করে, স্বপ্নের মধ্য দিয়া কত কথা কহিয়া যায়--- আজ স্বপ্নলােকের মধ্যে নয়, জাগ্রত দুই চক্ষু দিয়া মৃত্যুলােক- বাসিনীকে সে দেখিতে পাইয়াছে। দুটি হাত নিবিড় করিয়া ধরিয়া তাহাকে ফিরাইয়া আনিবে। দিগন্তব্যাপ্ত মেঘবরণ চুলের উপর • ডগমগে লাল কয়েকটি রক্তবিন্দু প্ৰলয়ান্ধকারের মধ্যে আলেয়ার মত বেণুধরকে দূর হইতে দূরে ছুটাইয়া লইয়া চলিল। '। Fbd: 1:0, ( ৪৭ )
স্বপ্নের খােকা
তার ঘুম
আশালতার মনে হইল, মা-মা-মা—করিয়, টানিয়া টানিয়া বড়
আকুল স্বরে পাশ হইতে থােক। কাদিয়া উঠিল।
ভাঙ্গিয়া গেল।
স্বামী একেবারে গায়ের উপর আসিয়া পড়িয়াছেন। নাড়িয়া
ঠেলিয়া ব্যাস্তভাবে তাহাকে ডাকিতে লাগিল— ওগাে, সরাে—
একেবারে চেপে পড়েছ ওকে, সরে যাও একটু
ঘুমের ঘােরে শ্ৰীশ জিজ্ঞাসা করিল—কি হল ?
-খােকা কঁদছে, তুমি ব্যথা দিয়েছ ; শুনতে পাচ্ছ না ওর
কান্না? ও ত আমার কাঁদবার ধন নয়—
ঘর অন্ধকার। বৈশাখ মাসে অকাল বর্ষা শুরু হইয়াছে।
জানলার ওপাশে রেল লাইনের ধারে ধারে কসাড় জঙ্গলে ঠাণ্ডা
জোলাে বাতাস সরসর খসখস শব্দ করিয়া বেড়াইতেছে। মাঝে
আচমকা তাহার এক এক ঝাপটা ঘরে আসিয়া ঢােকে, কবাট
নাড়াইয়া, মশারী উড়াইয়া দিয়া চলিয়া যায়। গলার স্বরে মনে
হইল, আশার চোখ দিয়া বুঝি জল পড়িতেছে ।
ঐশ খুব কাছে আসিয়া সস্নেহে তার মাথাটি বুকের উপর
তুলিয়া লইল। বলিতে লাগিল—ও আশা, স্বপ্ন দেখলে নাকি...
চুপ করে ঘুমােও, ভয় কি!...
( ৪৮ )
স্বপ্নের খােকা = তারপর ঘণ্টাখানেক হইবে কি না হইবে, শ্ৰীশ আবার ঘুমাইয়া পড়িয়াছে—এবারে আশা ধড়মড় করিয়া একদম বিছানার উপর উঠিয়া বসিল। সে শুনিতে লাগিল, খুব শ্লেষ্মা হইয়া অসুখ করিলে গলা দিয়া যেমন ঘড়ঘড় আওয়াজ হয় ঘরের মেজে কি আর কোনখান দিয়া তেমনি ধরণের যেন এবষ্টা অস্পষ্ট চাপা কাতরাণি...আর কাটা কবুতরের মত কি যেন এদিক-সেদিক পাখ। ঝাপটাইয়া বেড়াইতেছে। আশা বসিয়া রহিল, কোন সাড়াশব্দ দিল না। ক্রমশঃ শুনিতে লাগিল, সেই একটানা গলার আওয়াজ একটু পরিস্ফুট হইয়া তাহাকেই ডাকিয়া ডাকিয়া বেড়াইতেছে। খােকার গল—সেইরকম মিষ্টি জড়ানাে-জড়ানাে, অবিকল । উজ্জ্বলমুখে সেই অন্ধকারের মধ্যে সে খাট হইতে নামিয়া দাড়াইল। যেন রেললাইন ছাড়াইয়া কত দেশ-দেশান্তর নদী- সমুদ্রের পরপার হইতে স্তিমিত-তারা রাত্রির স্তব্ধতা চিরিয়া, কুঁড়িয়া শব্দ আসিতেছে। আবার সন্দেহ হয়, এ ডাক ঘরের মধ্যেরই...অনেক-অনেক নীচের পাতালপুরী হইতে সমস্ত মাটি ইট ও সিমেন্ট ভেদ করিয়া অতিশয় করুণ ক্ষীণকণ্ঠে থােকা তাহাকে ডাকিয়া ডাকিয়া কাঁদিতেছে—মা, মা, মা, মা,- পা ছড়াইয়া দিয়া বহুকালের অসংস্কৃত সুকী-ওঠা মেজের উপর পাষাণ প্রতিমার মত সে বসিয়া রহিল। সঙ্গে সঙ্গে দুচোখ ছাপাইয়া নিঃশব্দে জল পড়িতে লাগিল। জানলা দিয়া বাহিরে কেবলমাত্র সিগন্যা-পােষ্টের রক্তচক্ষুটি দেখা যায়। আশা ( ৪৯ ) দেবীকিশােরী ভাবিতে লাগিল, কোন দেশে এই রাত্রে ঘুমভাঙা একটি অসহায় ছেলে কঁদিয়া কাঁদিয়া গলা চিরিয়া ফেলিতেছে, ওখানে ছেলে শান্ত করিবার কি কেউ নাই ?... আরও অনেক রাত্রে মেঘ কাটিয়া চঁাদ উঠিল, ঘরের মধ্যে জ্যোৎস্না আসিয়া পড়িল। হঠাৎ একসময়ে জাগিয়া উঠিয়া শ্ৰীশ দেখিল, আশা বিছানায় নাই, নীচে সিমেন্টের উপর এলােচুলের বােঝা এলাইয়া ঝড়াপটায় আহত পাখিটির মত পড়িয়া রহিয়াছে। কাছে আসিয়া দেখিল, সে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে অঘােরে ঘুমাইতেছে। সে ছবি দেখিয়া শ্ৰীশের মন কেমন করিয়া উঠল, সােনার পদ্মের কি দশা হইয়া যাইতেছে দিন দিন । ভােরে জাগিয়া প্রথমটা অশ। এরকমভাবে নীচে পড়িয়া থাকিবার মানে বুঝিতে পারিল না। শেষে মনে পড়িতে লাগিল। ভাগ্যিস্ উনি এখনাে জাগেন নাই, জাগিয়া এই দশা যদি দেখিতে পাইতেন লজ্জার কি আর কিছু বাকী থাকিত ? তাড়াতাড়ি চুল ও কাপড়চোপড় ঠিক করিয়া ভালমানুষ হইয়া বিছানার উপর যাইবে এমন সময় ঠাহর হইল—সর্বনাশ, মেজেয় পড়িয়া থাকিবার ১ময়েও যে তার পাশে ছিল পাশবালিশ, মাথার নীচে ছােট আকিয়াটা! কঁদিতে কাদিতে যখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল বালিশ নিশ্চয় সে নিজে খাটের উপর হইতে নামাইয়া আনে নাই। মাথার নীচে বালিশ কে ওঁ জিয়া দিল তবে ? শিয়রের দিকে আবার একখানা হাত পাখাও পড়িয়া রহিয়াছে।
স্বপ্নের খােকা
ঘরের মধ্যে তখনও স্পষ্ট আলো হয় নাই আবছা আলো শ্রীশের
মুখে আসিয়া পড়িয়াছে। করুণ অসহায় মুখ—ঘুমন্ত অবস্থায়ও
যেন মনের দুশ্চিন্তা কাটে নাই। আশা সঙ্কল্প করিল, প্রাণপণ চেষ্টা
করিয়া যেমন করিয়া থােক সে ভাল হইয়া উঠিবে, খোকার কথা
একবিন্দু ভাবিবে না আর , ওঁকে আর ভাইয়া মারিবে না...
ন’টা পঁচিশের লােকাল ট্ণে বিদায় হইলে ঘণ্টা দুয়েকের
মধ্যে আর গাড়ী নাই। সেই ফাকে শ্ৰীশ বাজারে গিয়া নূতন
একজন এলােপ্যাথি ডাক্তার লইয়া আসিল। আশাকে খবর
দিতে সে হাসিয়াই খুন।
তুমি পাগল হলে নাকি ? ঠিক পাগল হয়েছ...নিশ্চয়-~-
~~-হয়েছি হয়েছি, বেশ। বলিতে বলিতে বারকতক সন্দিগ্ধ
দৃষ্টিতে আশার দিকে তাকাইয়া হঠাৎ শ্ৰীশ খপ করিয়া তার ডান
হাত টানিয়া বাহির করিল।—কি সর্বনাশ বলাে দিকি—আবার
রান্না ঘরে হলুদ বাটতে বসে গেছলে ?
একেবারে হাতে নাতে ধরা পড়িয়া গিয়া আশা আর জবাব
দিতে পারিল না।
চেঁচাইয়া বাড়ীমাত করিয়া হাত-মুখ নাড়িয়া শ্ৰীশ বলিতে
লাগিল--কাপড়ের নীচে হাত ঢাকা হচ্ছে, তখনই বুঝেছি।
এত করে মানা করি রান্নাঘরে আগুনের কাছে যেও না...পয়সা
দিয়ে রাধুনী রাখলাম কি জন্যে ? আজ আমি কুরুক্ষেত্র করে
হাড়ব। ভালমানুষ পেয়ে কথা গ্রাহ্য হয় না, না?
৫১ )
দেবীকিশােরী
আশা বলিল—ইস, ভালমানুষ না আরাে কিছু। আমায়
ছুয়ে দিলে ত ষ্টেশনের ঐ সাতবাসী কাপড়ে—কেন আমায় ছুয়ে
দিলে বল ত? কিছু আর বাচবিচার রইল না তােমার জ্বালায়
শ্লেচ্ছ কোথাকার—
হুড়মুড় করিয়া কুলুঙ্গী হইতে মশলা-ভরা বিস্কুটের টিন পাঁচ
সাতটা পড়িয়া গেল, সেই সঙ্গে আলনার কাপড় জামা একরাশ
এবং আচারের জারটিও মাটিতে পড়িয়া শতকুচি হইয়া গিয়াছিল
আর কি--
আশা তাড়াতাড়ি আসিয়া সেটা ধরিয়া ফেলিল। এবারে
সত্যসত্যই বিরক্ত হইয়া বলিল—ও কি হচ্ছে আমার মাথামুণ্ড ?
কি চাই, বল্লেই ত হয়। সব হাঙুল পাণ্ডুল করে...আমার
একবেলা লাগবে গােছতে•••কি খুঁজছ ?
অপ্রতিভ হইয়া শ্ৰীশ কহিল,—সাবান খুঁজছিলাম। তুমি
শিগগীর হলুদ মাখা হাত ধুয়ে সাফ হয়ে এস, ডাক্তার দাড়িয়ে
আছে-
আশা ধীরে সুস্থে একটা একটা করিয়া জিনি-পুত্ৰ তুলিয়া
গােছাইতে লাগিল, জবাব দিল না।
ক্ষণকাল চুপ করিয়া আবায় শ্রীশ কহিল—যাও, দেরী কোরে
না, শিগগীর এস, এক মিনিটের মধ্যে
-ইঃ হুকুম চালাচ্ছেন, ভারী হয়ে হয়েছেন। আসব না
আমি শিগগীর, এই গিয়ে কুয়ােতলায় বসলাম, আসব সে-ই
( ৫২ )
স্বপ্নের খােকা বিকেল বেলায়—বলিয়া কয়েক পা গিয়া আবার আশা ফিরিয়া দাড়াইল। বলিল—আমায় বলা হ’ল না, কওয়া হ’ল না, ডাক্তার আনা হয়েছে-দেখাে কি বেকুব করি আজ তােমাকে। টাকা পয়সা আমার বাক্সে তাে, ভিজিট এক পয়সাও বের করব না, দেখি— সেইখানে দাড়াইয়া টিপিটিপি হাসিতে লাগিল, অপর পক্ষের যত ব্যস্ততা দেখে ততই হাসিতে থাকে। শ্ৰীশ কাছে আসিয়া অনুনয়ের ভঙ্গীতে কহিল--না, না- দেরী কোরো না আর, যাও--যাও-- যাচ্ছি গাে-বলিয়া আশা ঝঙ্কার দিয়া উঠিল। স্বামীর দুই কাধে বাহু দুটি রাখিয়া স্নিগ্ধ স্নেহাদ্ৰকণ্ঠে কহিল— আচ্ছা, এই যে সব ডাক্তার কবরেজ হেনাে তেনাে---আমার কি হয়েছে যে তুমি এত করছ ? ----আয়না ধরে দেখ আগে কি হয়েছে—তারপর বােলো, ছাই হয়েছে বলিয়া খিল খিল করিয়া হাসিয়া আশা স্বামীর বিশুল্কমুখে আনন্দ আনিবার প্রয়াস করিল। সােনার চুড়ি ঝিনমিন করিয়া বাজাইয়া একখানা হাত তুলিয়া ধরিয়া বলিল- দেখছ, কত মােটা হয়েছি আমি দেখ একবার। তুমি কেবল মিছেমিছি ভাববে তা কি হবে ? শ্ৰীশ বলিল-মিছেমিছি বই কি- —এমন ভীতু মানুষ, তােমায় নিয়ে কি যে করি- সহসা রাত্রির ঘটনা মনে পড়িয়া আশা আর হাসিতে পারিল না। ( ৫৩ )
দেবীকিশােরী
নিশিরাত্রে কোনদিকে কেউ যখন জাগিয়া থাকে না, মৃত্যু
পুরীর সিংহদ্বার খুলিয়া যায়, আপনার জনকে দেখিবার জন্য সেই
সময়ে দলে দলে ওপারের লােক পৃথিবীর পথে বেড়াইতে আসে !
কাল রাতে তার মা-হারা খােক। ঐ জানালার ধারে কি কোন
খানে আসিয়া তাহাকে মা-মা-বলিয়া ডাকিয়াছিল ।
যে-খােকাকে চার বছরের মধ্যে একটা দিন সে কোলছাড়া
করিতে পারিত না, সে আবার কোলে আসিতে চাহিয়াছিল,
দিনের আলােয় এই কথা ভাবিতে গিয়া ভয়ে আশার বুকের
মধ্যে কাপিয়া উঠিল। ক্ষণকাল অধােমুখে স্তব্ধ হইয়া রহিল,
তারপর সহজ গলায় বলিল—দেখ, রােগ আর কিছু নয়—বডড
খারাপ স্বপ্ন দেখি। তােমার ডাক্তারে তার কি করবে ?
—ডাক্তারী ওষুধ আছে।
-~-ছাই আছে, তা হলে কি থােকন আমার—আশার ঠোট
কাপিতে লাগিল, আর শব্দ বাহির হইল না। অন্যদিকে মুখ
ফিরাইয়া তাঁচল টানিয়া দ্রুতবেগে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
সেদিন শুইবার আগে আশা নৃতন ডাক্তারের দেওয়া উৎকট
বিস্বাদ ঔষধ পরপর দুই দাগ খাইল। অত রাতে চুলের বােঝা
ভিজিয়া গেল, বালিশ বিছানাও ভিজিয়া যাইবে তবু অঞ্জলি
ভরিয়া ভরিয়া মাথায় জল দিল। গােবিন্দ গােবিন্দ—বলিতে
বলিতে শুইয়া পড়িল, ঐ নামে নাকি দুঃস্বপ্ন বিছানার ত্রিসীমানায়
ঘেঁসিতে পারে না। শুইয়া শুইয়া মনে করিতে লাগিল, কালো
( ৫৪ )
স্বপ্নের খােকা বকনা গরু কাটাঝিটকের জঙ্গল জবাফুল জলের কলসী আর কিছুতে কোনক্রমে থােকার কথা মনে ঢুকিতে দিবে না। তখন অনেক রাত্রি। জ্যোৎস্না উঠিবার কথা, কিন্তু সন্ধ্যা হইতে আকাশ মেঘে আঁধার হইয়া চারিদিক গুমট করিয়াছে । হঠাৎ ঘুম ভাঙিয়া আশার মনে হইল, বরফের মতাে শীতল কচি কচি পাঁচটা আঙ্গুল কে যেন তার মুখের উপর দিয়া চোখ-কান- গালের উপর বুলাইয়া লইয়া গেল। একবার চোখ মেলিয়া আবার তখনই চোখ বুজিয়া সতর্ক হইয়া রহিল, এইবার যেই মুখের উপর হাত লইয়া আসিবে অমনি ধরিয়া ফেলিয়া চেঁচাইয়া উঠিবে।•••কিন্তু সে বুঝি টের পাইয়াছে, আর আসিল না। একটু পরে শুনিতে লাগিল, মেজের উপর তালে তালে ঘুটঘুট শব্দ হইতেছে, মূতন জুতা পরিয়া অনভ্যস্ত পায়ে সানন্দে চলিয়া বেড়াইবার মত ভাবটা। আর আশা বিছানায় শুইয়া, থাকিতে পারিল না, উত্তেজনার বশে উঠিয়া বসিল। মুখ-চোখ আনন্দে চকচক করিতে লাগিল, হাসিমুখে শব্দের তালে তালে হাততালি দিয়া বলিতে লাগিল— হাঁটি হাঁটি পা-পা-- থােকন হাঁটে দেখে যা--- অন্ধকারের মধ্যে দেখিতে লাগিল, সাদা সাদা দুধে দাত মেলিয়া থােকন হাসিতেছে। চার বছরের, খােকা তাহার মৃত্যু পারের দেশ হইতে আবার এক বছরেরটি হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে,
দেবীকিশােরী
এক বছর বয়সে নূতন হাঁটিতে শিখিয়া যেমন করিত ঠিক তেমনি।
হাত বাড়াইয়া আশা ডাকিতে লাগিল—এসো, এসো, মাণিক
এসাে, আমার ধন এসাে~-
খােক আসে—আসে—এক পা দু’পা তিন পা করিয়া
আসিতে থাকে--আবার আসে না, দাড়াইয়া দাড়াইয়া দুষ্টমী
ভরা চোখে চায়, মিটিমিটি হাসে, কোলে সে অসি না।
—চলে আয় ও দুষ্ট ছেলে, আসবি নে ? ও খােকন,
আসবিনে তুই আর ? দুই হাত বাড়াইয়া স্বপ্নাচ্ছন্ন আশা উঠিয়া
পঁড়াইল। ছেলে ঐ আঙ্গুল মুখে পুরিয়া ড্যাডেবে চোখ মেলিয়া
হাবার মত তাকাইয়া আছে। আকুল হইয়া ছুটিয়া গিয়া আশা
তাহাকে জড়াইয়া ধরিল। ধরিয়া দেখে তার সাদা সেমিজটা
টাঙাইয়া দেওয়া ছিল, তাহাই। ও মাগাে--বলিয়া সে ডুকরাইয়া
কঁদিয়া উঠিল।
সেই শব্দে এঁশের ঘুম ভাঙিল। উঠিয়া দেখে আগের রাত্রির
মতো আশা নীচে পড়িয়া আছে। জোরে জোরে ডাকিয়াও সাড়া
পাইল না। আলল জালিয়া দেখে, চোখ বুজিয়া আছে, আপাদ
মস্তক যেন বিদ্যুতের ছোঁয়ায় কঁপিয়া কঁপিয়া উঠিতেছে, দাতে দাত
লাগিয়া গিয়াছে। চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে দিতে কতক্ষণ
পরে আশা পাশ ফিরিয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিল—ও মাগাে
মুখের উপর ঝুকিয়া পড়িয়া শ্ৰীশ ডাকিতে লাগিল-ও
আশা'আশা, একটাবার কথা বল, ভয় করছে ?
( ৫৬ )
স্বপ্নের থােক।
—-না—বলিয়া যেন সহসা সম্বিৎ পাইয়া কাপড় চোপড়
গােছাইয়া আশা উঠিতে গেল। শ্ৰীশ বাধা দিয়া কহিল-উঠো
না, ওখানে অমনি থাক, পাটিটা পেতে দিচ্ছি"বাতাস করব ?
সমস্ত রাত আলাে জ্বালা রহিল। শ্ৰীশ একরকম জাগিয়া
কাটাইল। মাঝে মাঝে একটু ঘুমের ভাব আসে কিন্তু একটা
কিছু পড়িলে কি খুট করিয়া সামান্য কোন শব্দ হইলে অমনি
সে লাফাইয়া উঠিয়া বসে। আশা সারারাত্রের মধ্যে আর
গােলমাল করিল না, চোখ বুজিলেই যেন দেখিতে পায় বড় বড়
কেঁকড়ানাে চুল—তার হারাণে থােকা ডাগর চোখ মেলিয়া মুখে
আঙ্গুল পুরিয়া খানিক একদৃষ্টিতে চাহিয়া চাহিয়া মাকে দেখিতেছে,
খানিক খানিক আবার চোখ নামায়। এক একবার আশা নিজেই
ভাবে, এসব মিথ্যা—স্বপ্ন, তবু চোখ বুজিয়া যতক্ষণ ঘুম না
আসিল মনের আনন্দে থােকাকে দেখিতে লাগিল।
মনে মনে ভাবে, রাত্রি যেন না পােহায়, ভাের যেন মােটে
না হয়"
রােদে চারিদিক ভরিয়া গিয়াছে, তখনও শ্ৰীশ বিছানায়
পড়িয়াছিল। ঘরের মধ্যে ঢাকার ঘড় ঘড়ানি শুনিয়া চোখ মেলিয়া
দেখিল, খােকার ঠেলা গাড়ীটা একপাশে সযতে গত কয়েক দিন
পড়িয়াছিল, আশা তাহার উপর রাশীকৃত পুতুল সাজাইয়াছে এবং
সাটিনের সেই লাল জামাটি—যেটি খােকার গায়ে পরাইয়া দিয়
বছর দুই আগে এক বিজয়া দশমীর দিন আশা বলিয়াছিল-গড়
( ৫৭ )
দেবীকিশােরী কর, ওঁকে গড় করত থােকা...সব বােঝে তােমার ছেলে, দেখবে কি সুন্দর প্রণাম করবে এখন - থােক। কিন্তু ঘাড় নােয়াইয়া আশা যে রকম চাহিয়াছিল সেভাবে প্রণাম করিল না, দুই হাত জোড় করিয়া নমস্কারের মতাে একটা ভাব করিল। দুই রকমই সে শিখিয়াছে, কোনটা কখন করিতে হয় ঠিক করিতে পারে না। আশা হি হি করিয়া হাসিতে হাসিতে ফাটিয়া পড়িতে লাগিল। ---ওরে বােকা, গুরুজনকে বুঝি অমনি সেলাম করে ? সাহেব হয়ে গেলি নাকি ? খােকা আমার সাহেব—কেমন রঙ দেখেছ ?—ঠিক সত্যিকার সাহেব। তুমি একটা টুপি কিনে দিও—লাল টুপি- খােকাও দেখাদেখি হাসিয়া উঠিল। পদ্মের পাপড়ীর মত রাঙা ঠোট দুখানি চাপিয়া শব্দের শেষ দিকটায় অসঙ্গত জোর দিয়া সে এক অপরূপ ভঙ্গীতে মায়ের কথার উপর বলিয়া উঠিল— তুপ-পী-ই-ই- সেই লাল টুকটুকে ছােট্ট জামা এবং লালটুপিটিও ঠেলাগাড়ীর উপর রাখিয়া ঘড়ঘড় করিয়া আশা ঠেলিয়া লইয়া যাইতেছিল। শ্ৰীশ জিজ্ঞাসা করিল --ওসব কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? আস্তাকুড়ে—বলিয়া আশা বিষন্ন-দৃষ্টি তুলিয়া চাহিল। বলিল —এক কাজ কর, তুমি এগুলাে একেবারে গাঙের জলে ফেলে দিয়ে এস। যেখানে থােকা গেছে, তার জিনিষ পত্তোর যাক সেখানে-~-- ( ৫৮ )
স্বপ্নের থােকা
শ্ৰীশ উঠিয়া আশার হাত হইতে গাড়ী সরাইয়া রাখিয়া কহিল
—পাগল হ'লে আশা? তুমি এসব মােটেই আর ভাবতে পাবে
। এই শােন, আমার মুখের দিকে চাও একবার---
আশা বলিল—তােমার গা ছুঁয়ে বলছি, ভাবতে আমি চাইনে
সে ফি রাত্তিরে আসবে, আমি কি করব—এসে মা-মা-করে হাত
নেড়ে নেড়ে ডাকে। সে কি কম শওর? নিজে গেল, এবার
আমাকে নেবে।
আজ তার কিছু আর এবাড়ীতে রাখবনা,
ঝেটিয়ে বিদেয় করব। ঐগুলাে দেখলে ঘর যেন খালি ঠেকে,
সেই সব ছাই ভস্ম কথা মনে পড়ে যায়—
বলিয়া অবসন্নভাবে একখানা চৌকির উপর বসিয়া পড়িল ।
বলিতে লাগিল -দিনমানে এই আমাকে দেখছ এই রকম, তার
রাত্তিরে যেন কি হয়ে পড়ি। সারাদিন ফন্দি আঁটি যাতে সে
আসে, কিন্তু শুয়ে আলাে নিভিয়ে দিলেই অস্থির হয়ে পড়ি।
মন ছটফট করতে থাকে এ কি সাংঘাতিক রােগ ? আমি মরে
যাব---এবার আর বাঁচব না—আমাকে বাঁচাও তােমরা।
দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া আশা অনেকক্ষণ চুপ করিয়া রহিল।
হঠাৎ মুখ তুলিয়া হাসিবার চেষ্টায় বিকৃত মুখে বিকৃতস্বরে বলিল---
আমি বলি কি, এ বাড়ী-ঘর-দোর সে চিনে ফেলেছে। এখন
থেকে কিছুদিন পালিয়ে যাই, ঢল । এমন দেশে যাব সেখানে
সে যেতে পারবে না। এখন ছুটি চাইলে ছুটি দেবেনা তোমাকে ?
সেই দিনই শ্ৰীশ ছুটির দরখাস্ত দিল। বুড়া স্টেশনমাস্টারও সেই
( ৫৯ )
দেবীকিশােরী
কথা বলিলেন। বলিলেন—কচি বয়স, প্রথম শোক---তাই বড়
বেজেছে। কিছুদিন কোন ভাল জায়গায় নিয়ে রাখগে, ঠিক হয়ে
যাবেন। আমার মনে আছে শ্ৰীশ, যেদিন বিপিন ডাক্তার জবাব
দিয়ে গেল বিকেল বেলার দিকটা ঝণ্টকে নিয়ে বাজারে যাচ্ছি,
খান দুই কাপড় আর কি-কি কিনতে, দেখি মা-লক্ষী ইদারার
চাতালের উপর কলসীরেখে জল তুলছেন মুখ শুকনাে এতটুকু,
আমায় দেখে ঘােমটা টেনে দিয়ে জল নিয়ে চলেন---আহা, যেন
চোখের উপর দেখতে পাচ্ছি,..
ইহার পর কয়েকটা দিন বেশ ভালই কাটিল, কোন গোলমাল
নাই, আশা একেবারে সহজ সাধারণ মানুষ। সেদিন নাইট
ডিউটি সারিয়া শেষরাতে বাসায় আসিয়া শ্ৰীশ দেখিল, আশা
জানালার উপর চুপ করিয়া বসিয়া আছে। আলাে জ্বলিতেছে।
ঘরে পা দিতেই অস্বাভাবিক উত্তেজিত স্বরে আরক্ত মুখে আশা
বলিতে লাগিল—তুমি বিশ্বাস করবে না, সন্ধ্যে
বিশ্বাস করবে না, সন্ধ্যে রাতে আমি
রান্নাঘরে ছিলাম, ঘুমােই নি—স্বপ্ন দেখিনি—খােকা এসেছিল।
আমায় কি বল্লে জান ?
সে স্বপ্নবিষ্টের মত বলিয়া যাইতেছে, শ্ৰীশ শুনিতে
লাগিল।
—-বল্লে, মা, আমায় দু’টো ভাত দিবি ? এই দেখ, গায়ে
জুর নেই---গা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। দু'টো ভাত খাব কাঠাল-বিচি
ভাতে দিয়ে। আর বল্লে কি
( ৬০ )
স্বপ্নের খােকা
থাকিস ?
শ্ৰীশ চোখের জল সামলাইয়া লইয়া বলিল—চুপ কর, চুপ কর
তুমি, আমি আর শুনব না—
বাধা পাইয়া আরও অধীরভাবে হাত মুখ নাড়িয়া আশা বলিতে
লাগিল—শােন, শােন,...আমি বল্লাম, ও খােকা তুই কোথায়
সে হাত দিয়ে ঐ গাঙের দিকে দেখিয়ে দিল। বলে
বড় কষ্ট হয় মা, কেবল সাগু আর বার্লি খেতে দেয়, ভাত খেতে
দেয় না। এই দেখ, আমার গা জুড়িয়ে গেছে--তবু ভাত
দেবে না।
শ্ৰীশ ভাবিল, আশা বুঝি সত্যিই পাগল হইয়া গেল।
খাবার ঢাকা দেওয়া ছিল, কিন্তু শ্ৰীশের আর খাওয়া দাওয়া
হইল না। কোন দিন কোন অবস্থাতেই আশা স্বামীর এতটুকু
অযত্ন হইতে দেয় না আজ যে বিকাল হইতে সুরু করিয়া এত
খাটুনীর পর সে অনাহারে বসিয়া রহিল আশার সে খেয়ালই নাই ।
ৰাকী রাতটুকু তাহার কেবল ঐ একই কথা। খােকা আসিয়াছিল,
সে খুব মােটা হইয়াছে, স্বাস্থ্য ভাল হইয়াছে, রূপ যেন ফাটিয়া
পড়িতেছে। খােকার গায়ে গােলাপী-সিল্কের ফ্রক, চুলে সি থি
কাটা। কপালে টিপ, চোখে কাজল। চোখ কচলাইয়া
সারামুখে কাজল মাখিয়া ভূত হইয়াছে।
হইয়াছে। খােকা কত কথা বলিল।
কত হাসিল। উচ্চারণ তাহার এখন খুব স্পষ্ট হইয়াছে, আবার
বাঁধুনী দিয়া বেশ পাকা পাকা কথা কহিতে পারে যে।...
শ্ৰীশ অবিশ্বাস করিলে আশা আরও উত্তেজিত হইয়া উঠে।
( ৬১ )
দেবীকিশােরী তর্ক করিয়া ঝগড়া করিয়া জোর গলায় বুঝাইতে চায়, সে যাহা দেখিয়াছে তাহা স্বপ্ন নয়—সত্য, অতি সত্য- অতএব শ্রীশ সায় দিয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু রাত পােহাইবামাত্র কোন দিকে না তাকাইয়া, তাড়াতাড়ি আশা ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল, শ্ৰীশকে মুখ দেখাইতে তার লজ্জা করিতেছিল। টিপি-টিপি বৃষ্টি শুরু হইয়াছে। ইহার মধ্যে এক ফাঁকে গাঙের ঘাট হইতে স্নান করিয়া আসিল !...উকি ঝুকি দিয়া দেখিল, রাত্রি-জাগরণের পর শ্ৰীশ এইবার শুইবার উদ্যোগে আছে। আশাকে দেখিতে পাইয়া হাসিমুখে কহিল--এই যে, এরি মধ্যে দিব্যি নেয়ে ধুয়ে, বা-রে-- একটু সলজ্জ হাসিয়া আশা শিয়রে আসিয়া বসিল। একটু পরে স্বামীর চুলের ভিতর আঙুল চালাইতে চালাইতে স্নেহ-সুকোমল কণ্ঠে কহিল—কি রকম রােগা হয়ে যাচ্ছ তুমি—ঘুম পাচ্ছে, না? যা কাণ্ড লাগিয়েছি আমি। একটু স্নানভাবে হাসিল। বলিল— খান দুই লুচি ভেজে নিয়ে আসি—কাল রাত্রে তুমি কিছু খাওনি একেবারে—যাই-- ঐশ বলিল--তুমি যাচ্ছ নাকি? তা হলে কিন্তু খাব না— আশার হাসিভরা মুখ এক নিমেষে অন্ধকার হইল। ক্ষুন্ন স্বরে কহিল—এমন কপাল করে এসেছি...থাক, আমি যাব না। বামুন- মেয়েকে বলছি। ( ৬২ )
স্বপ্নের খােকা
শ্রীশেরও দুঃখ হইল। বলিল-রাগ করতে নেই, লক্ষিম।
তুমি ভাল হও আগে—তারপর যত খুসী রেধে খাইওখাইয়েছ ত
বরাবর—আচ্ছা, না হয়...মােটে দু’ খানা, আমার ক্ষিদে নেই--
খানার, বেশী না হয় যেন---
আশা মহাউৎসাহে উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল-দু’ খানা নয়,
খানা।...আট খানার কম কিছুতে শুনব না—এই ত এত টুকুটুকু,
ওর কমে কেমন করে পাতে দেব ? আর একটুখানি হালুয়া
আর কিছু করব না, ভয় নেই গাে-
শ্ৰীণ বলিল—যাও, শুনবে না ত! শরীরের অসুখ-বিসুখ--
—অর্থ। ভারী ডাক্তার হয়ে পড়েছেন উনি। তোমার
ডাক্তারীপণায় যাই যে কোথায়! বলিয়া চঞ্চলপদে হাসিতে
হাসিতে আশা বাহির হইয়া গেল।
সেইদিন হেড কোয়ার্টার হইতে লােক আসিয়া শ্ৰীশের চার্জ
বুন্নিয়া লইল। ছুটি; বেলা তখন দু’টা তিনটা। আনন্দ-দীপ্ত
মনে শ্রীশ বাড়ি চলিল। এমন সময়ে কোন দিন সে ফিরিতে
পারে না। জিনিষ-পত্র কি আর এমন বেশী, আজ রাত্রের
গাড়ীতেই রওনা হইয়া যাওয়া যাক। হঠাৎ এই খবর শুনিয়া
আশা খুব উৎফুল্ল হইবে, চলিয়া যাইবার জন্য সে যা ব্যস্ত হইয়াছে !
দু’জনে মিলিয়া এখন হইতে বাঁধা ছদা সুরু করলে আর
কতক্ষণ?
শােবার ঘরে আশা নাই, রান্না ঘরও তালাবন্ধ। বামুন-মেয়েকে
দেবীকিশােরী
!
জিজ্ঞাসা করিতে সে ভাঁড়ার ঘর দেখাইয়া দিল ।
চমক দিবার
অভিপ্রায়ে টিপি-টিপি সেখানে ঢুকিয়া শ্ৰীশ একেবারে বিমূঢ় হইয়া
গেল, আর কথা বলিবার জো রহিল না।
জানলাহীন আধ-অন্ধকার ছােট্ট সঙ্কীর্ণ ঘরটি, তাহার মধ্যে
খােকার পোষাক, জুতা-জামা, বল, মার্বেল, পুতুল রেললাইন হইতে
কুড়াইয়া আনা একরাশ নুড়ি—সমস্ত মেজের উপর ছড়াইয়া
দিয়া তাহাদেরই মাঝখানে আশা চুপ করিয়া বসিয়া আছে
কাদিতেছে না, নিঃশব্দ, নিশ্চল বােধ করি বা চোখের পলকটিও
পড়িতেছে না। ইহার চেয়ে আর্তনাদ করিয়া সে বাড়ী ফাটাইয়া
ফেলে না কেন ?
হঠাৎ স্বামীকে দেখিয়া আশা ভয়ানক অপ্রতিভ হইয়া গেল।
চুরি করিতে গিয়া ধরা পড়িয়াছে, এইরকম ভাব। মুখ লাল করিয়া
কৈফিয়তের ভাবে আপনা-আপনি বলিল—ভাবলাম, দুপুর বেলাটায়
একটু গুছিয়ে গাছিয়ে রাখি, তােমার ত ভাব জানি—কোন্ দিন হুস
করে এসে বলবে, ছুটি মিলে গেছে--এক্ষুণি চলাে— বলিয়া
একটুখানি হাসিল।
শ্ৰীশও পাল্টা একটু হাসিল।
সহসা আশা ব্যস্ত হইয়া দাঁড়াইল। কহিল-দেখ, কাণ্ড
আমার। তুমি এসেছ আর বসে বসে বাজে বকছি। এসসা খাবার
দিই গে—-
শ্ৰীশ বলিল—চলো-
( ৬৪ )
স্বপ্নের থােকা বাহিরে আলােয় আসিয়া শ্ৰীশ আশার হাত ধরিল। –শােন আশা, মুখ ফিরাইতে শীশের বেদনাহত মুখ আশার নজরে পড়িল । শীশ বলিতে লাগিল--আমি একটা কথা জানতে চাচ্ছি, রােজই দুপুর বেলা তুমি এই রকম ওর জিনিষ পত্তোর ছড়িয়ে বসে থাক ? আশা ঘাড় নাড়িল এবং মুখেও কি একটা প্রতিবাদ করিতে যাইতেছিল, শ্ৰীণ অসহিষ্ণুভাবে বাবা দিয়া বলিল—-ফাকি দিও না আমি বেরিয়ে গেলে তুমি রােজ ঐ রকম চুপ করে বসে থাক, না ? হাঁ-না—আশা কিছুই বলিতে পরিল না। একটু পরে কহিল আহা, হাত ছাড় দিকি --খাবার তৈরী করা আছে, নিয়ে আসি.. ক্রুদ্ধ কণ্ঠে শ্ৰীশ কহিল-খাবার আনতে হবে না তােমার খাবার আমি ছুঁড়ে ফেলে দেব- আশাকে পাশে লইয়া সে খাটের উপর চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তাড়াতাড়ি দু’জনে মিলিয়া জিনিষপত্র বাঁধাছাদা করিবার আর উৎসাহ রহিল না। হঠাৎ শ্ৰীশের দিকে চাহিয়া হাসিতে হাসিতে আশা কথা বলিল—কি রকম হাঁড়ি পানা মুখরে বাবা- ভয় করে। তুমি বড় দুষ্ট হয়ে যাচ্ছ দিন দিন। সকাল আজকে এলে কি করে ?-পালিয়েছ বুবি ? কোনদিন স্টেশন মাষ্টার ধরে ফেলবে আর গুরুমহাশয়ের মতো চ্যাংদোলা এত সকাল ( ৬৫ ) দেবীকিশােরী করে ধরে নিয়ে যাবে। আমি ছােটকালে যে গুরুর কাছে পড়তাম ঠিক তােমার ঐ স্টেশন মাস্টারের মতাে তার দাড়ি ছিল- সত্যি— শ্ৰীশ বলিল-ভুলােতে চাচ্ছ ? আমি তােমার ব্যথার ব্যথা নই, যে আমি জানি--- চুপ ! বলিয়া আশা তাড়া দিয়া উঠিল। পরে শান্ত সুরে বলিল-~~-ঐ রকম বল্লে আমার কত কষ্ট হয় জান ? আজকে জিনিষ গুছোতে গেছলাম। ওর ঐ পুতুল টুল নামিয়ে নিয়ে হাত যেন অবস হয়ে গেল, কিছুতে আর হাত তুলতে পারলাম না। বলিতে বলিতে স্বর উত্তপ্ত হইয়া উঠিল। বলিতে লাগিল—দোষ ও তােমারি। গাঙের জলে ফেলে দিয়ে এস-~-আমি বাঁচি। সারা বিকাল দুজনে খুব খাটিয়া বা পেটরা গােছাইয়া সন্ধ্যা দিকে নদীর ধারে একটু বেড়াইতে বাহির হইল । সে দিবে লােকজন কেহ নাই। এই রকম মাঝে মাঝে তাহারা বেড়াইত। শ। জিজ্ঞাসা করিল-কোথায় যাওয়া যাবে আগে ? এক্ষুণি ঠিক করে ফেল । ঐশ বলিল,-পুরী। সমুদ্দরে যাওয়া সে যে কি আরা তুমি জান না আশা, ঠিক যেন নাগর দোলায় চেপে দুলতে দুলতে ফিরে এসে বালির বিছানায় গড়িয়ে পড়া আশা বলিল-না, না, পাহাড়ে যাই চলোদার্জিলিং বি আর কোথাও--- বলিতে বলিতেই ছাৎ করিয়া মনে আসিল ( ৬৬ )
স্বপ্নের খােকা
অসমতল পাহাড়ের দেশে খােকাকে লইয়া চলাফেরা করা যাইবে
ত—সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়িল, খােকা যে নাই। এক বছর
আগে এই স্টেশনে আসিয়াছিল ইহাৱা তিনজনে, আজ রাত্রে
অবােধ বালকটীকে রেল লাইনের ওপারে বুড়ী-ভৈরবী তলায়
গাঙের কোলে একলা ফেলিয়া রাখিয়া চলিয়া যাইতে হইবে।
আশা বলিল-~~-তা যেখানে হয় হােগে----আজই যেতে হবে
কিন্তু, শেষটা যে তুমি বলে বসবে গােছানাে হয়ে উঠল না-
শ্ৰীশ কহিল—কাপড়ের বোঁচকা কটা বেঁধে নিলেই ত হয়ে
গেল, আর কি ? গাড়ী সেই রাত দুটোয়। খুব হয়ে যাবে।
শশাবলিল—খুব---খুব—ভারী ত ! আধ ঘণ্টার মধ্যে আমি
সব ঠিক করে দেব, আর বেড়াব না --চল দেখি বাড়ী-~-
উৎসাহভরে আশা আগে আগে চলিল। কয়েক পা চলিয়া
আবার গতি মন হইল।
--একটা কথা বলব, রাগ করবে না ?
—কি ?
আশা বলিতে লাগিল—একটু ঘুরে যাই চল । যেখানে
খােকাকে তােমরা রেখে এসেছিলে সেই জায়গাটা একবার দেখব।
আর ত কোন ভয় রইল না। আজ চলে যাচ্ছি, কতদিন পরে
আসব, শরীরের যে দশা—এ জন্মে আর আসি না আসি, তুমি
রাগ কোরো না।
শ্ৰীশ আপত্তি করিল না। বলিল—চলাে--
( ৬৭ )
দেবীকিশােরী চারিদিকে দু-দশখানা পােড়া কাঠ, ভাঙা কলসী, ভাঙা খাটিয়া আজই বােধ হয় একটা চিত। পুড়িয়াছে, তাহার চিহ্নবশেষ। চাহিয়া দেখিল, আশার চোখ অস্বাভাবিক রক প্রদীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। সে জিজ্ঞাসা করিল--কোনখানে ?--ফোনখানে ? এতক্ষণে শ্ৰীশ বুঝিল, আশাকে এখানে অনা অত্যন্ত ভুল হইয়াছে। বলিল—এখানে নয়, আগে আর একটা শ্মশান আছে সেখানে রাত হয়ে এল, আজ আর যাওয়া যাবে না— -আমি যাবাে শ্ৰীশ তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া টানিয়া কহিল---না। চল, ফিরে যাই- এক ঝাকিতে হাত ছাড়াইয়া তীব্রকণ্ঠে আশা কহিল— বাড়ী আমি যাব না, খােকনের জায়গা না দেখে যাব না আমি বাড়ী। এই আমি বসলাম, নিয়ে যাও দেখি কেমন। সেই শ্মশান ঘাটায় এখানে-সেখানে মানুষের মাথা, পাজরার হাড়, জঙ্গল, বর্ষার জল-কাদা, তাহার মধ্যে আশা বসিয়া পড়িল । অনেকক্ষণ চুপচাপ বসিয়া রহিল। অন্ধকার হইয়া আসিল, তখন আশা জিজ্ঞাসা করিল—আমায় নিয়ে যাবে না তা হলে ? -আজ নয়। --তবে চল বাড়ী। বলিয়া গুম হইয়া বসিয়া রহিল। একটু পরে ব্যাপারটা উড়াইয়া দিবার উদ্দেশ্যে হাসিয়া শ্ৰীশ বলিল—খিদে যা পেয়েছে আশা, একটু উঠে দাও না কিছু ( ৬৮ )
স্বপ্নের খােকা
আশা নড়িল না, নিস্তব্ধ বসিয়া রহিল।
শ্ৰীশ বলিতে লাগিল--হাত পা কোলে করে বসে রইলে,
বেশ তাে লােক—বড় যে বলছিলে, আধ ঘণ্টার মধ্যে বেঁধে
ছেদে সব ঠিকঠাক করে দেবে। কেবল তােমার মুখের লড়াই
আশা চেঁচাইয়া বলিয়া উঠিল----আমি পারব না, যাও---
আচ্ছা তুমি থাকো, আমি করছ---বলিয়া শ্ৰীশ আলনার
সমস্ত কাপড়ের রাশ মেজেয় ফেলিয়া ভাঁজ করিতে লাগিল।
আশা বসিয়া বসিয়া তাই দেখিতে লাগিল। তারপর হঠাৎ
লাক্তপাখীর মত ছুটিয়া আসিয়া যেন ছোঁ। মারিয়া তার হাতের
কাপড় কাড়িয়া লইয়া কান্নাভরা গলায় বলিল কত জ্বালাবে
আমায় শুনি ? আমায় খুন করে ফেল না কেন ?-চুলগুলি
অবিন্যস্ত, মুখচোখ লাল হইয়াছে। শ্ৰীশকে ফেলিয়া দিয়া সেই
কাপড়ের বােঝার মধ্যে আশা চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
সহসা আর্তনাদের মত বলিয়া উঠিল—মাগাে মা---কি নিষ্ঠুর
হুম, কি পাষাণ তুমি, আমায় দেখালে না—
শ্ৰীশ বিকৃত কণ্ঠে বলিল,—আশা, তােমায় মিথ্যে কথা
বলেছিলাম---যেখানে গিয়েছিলাম ঐখানেই--
ঐখানেই ?—দেখিতে দেখিতে অাশার মুখের ভাব অদ্ভুত
রকম উজ্বল হইয়া উঠিল। ছুটিয়া স্বামীর কাছে আসিয়া মুখের
একেবারে কাছে মুখ আনিয়া বারম্বার প্রশ্ন করিতে লাগিল
ওগাে,
ঠিক বলছু ঐখানে ? ঐখানে আমার
ঐখানে ?
( ৬৯ )
দেবীকিশােরী
খােকামণিকে রেখে এসেছ ? কোনখানটায় বল ত—কেয়াঝাড়ের
পাশটায়, না?
শ্ৰীশ আশাকে টানিয়া বুকের উপর আনিল। তারও কান্না
পাইতেছিল।
হাতমুখ নাড়িয়া আশা বলিতে লাগিল—আমি ত জানি, তখনি
ভেবেছিলাম। ঐ কালো কালাে কেয়ার জঙ্গল, শুড় উঠেছে,
যেই গিয়েছি অমনি যেন ডেকে উঠল—মা। তুমি ঢাকলে কি
শুনি ? আমি স্পষ্ট শুনেছি—আমি তাকে দেখেছি—কসাড়
জঙ্গলের মধ্যে কেষ্ট ঠাকুরের মতো। যাবে আর একবার ?
-বামুন-মেয়ে,
বামুন-মেয়ে-বলিয়া শ্ৰীশ বার কয়েক
ডাকাডাকি করিল। তখনাে সে আসে নাই। তখন শ্ৰীশ
কোলের উপর আশাকে শােয়াইয়া বাতাস করিতে লাগিল।
আর যে কি করিতে হইবে বুঝিতে পারিল না।
আশা জড়াইয়া বলিতে লাগিল—যেন ফিশ ফিশ করে বলে,
মা, আমাকে ফেলে যাচ্ছিস, একলা একলা ভয় করবে আমার, ,
কড়ির পুতুলগুলাে দিয়ে যাস—খেলবো।
বলিতে বলিতে থামিল। সহসা কোল হইতে সজোরে মাথা
তুলিতে গেল। বলিল—বুড়াে বয়সে তােমার এ কি রকম ।
খােকা যদি এসে পড়ে কি লজ্জা-মাগাে! তুমি সরে গিয়ে
বােসে—
বাতাস করিতে করিতে অবশেষে আশা চোখ বুজিল।
( ৭০ )
স্বপ্নের খােকা একটু দেখিয়া আস্তে আস্তে মাথা নামাইয়া নীচে একটা বালিশ দিয়া শ্ৰীশ ডাক্তারকে ব্যাপারটা জানাইবার জন্য বাহির হইল।। ফিরিয়া আসিতে রাত একটু বেশী হইল। আসিয়া আশাকে পাওয়া গেল না। বামুন-মেয়েকে জিজ্ঞাসা করিতে সে আকাশ হইতে পড়িল।-ওমা, আমি ত ত জানিনে, আমি ওদিকে ছিলাম। আর আমি ভাবলাম, আপনারা বেড়াতে গেছেন, হয় ত নগেনবাবুর বাড়ী গেছেন, এখনও ফেরেন নি কোনদিন কোন অবস্থাতেই যে আশা একা-একা বাড়ীর গণ্ডী ছাড়িয়া বাহির হইয়া যাইতে পারে তাহা কল্পনাতীত। ঘর দুয়ার পাতি-পাতি করিয়া দেখা হইল। বাহিরে বড় অন্ধকার। নদীপারে ঘন কালাে মেঘ করিয়াছে। লণ্ঠন হাতে লইয়া গাঙের ধারে ধারে শ্ৰীশ ডাকিয়া বেড়াইতে লাগিল—আশা, ও আশ- লণ্ঠন ফিরাইয়া হঠাৎ দেখিল, সাদা কাপড়-পরা একজন বউ মতাে গাঙের অনেক জলে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া কি করিতেছে। লণ্ঠন রাখিয়া জলে নামিল। কাছে গিয়া দেখিল, এক বােঝা পােয়াল, জোয়ারের টানে কোনখান হইতে ভাসিয়া আসিয়াছে। এমন সময় ঝন্টু চাপরাসী হাঁপাইতে হাঁপাইতে আসিয়া খবর দিল—মা ঠাকরুণ বাড়ীতেই আছেন, নীচে হইতে উঠিয়া ছাতের উপর গিয়া ঘুমাইয়াছিলেন, এখন জাগিয়া বৃত্তান্ত শুনিয়া তাহাকে ডাকিতে পাঠাইয়া দিয়াছেন। ( ৭১ )
দেবীকিশােরী
এ।
ছাতে গিয়া
খুঁজিয়া দেখার কথাটা কাহারও মনে হয়
নাই বটে।
খােলা হাওয়ায় অনেকক্ষণ ঘুমাইয়া আশা সুস্থ হইয়া উঠিয়াছিল ।
এখন সে সেই রাশীকৃত কাপড় একা-একা ভক্ত করিয়া বোঁচকা
বাঁধিতেছিল। শ্ৰীশকে দেখিয়া সহজ স্বাভাবিক কণ্ঠে হাসিয়া
বলিল—আজই যাব কিন্তু, গাড়ীর এখনো ঢের সময় আছে।
গাড়ী আসিলে ঝণ্টচাপরাশী মেয়ে-গাড়ীর বেঞ্চের উপর
লম্বা বিছানা করিয়া দিল। আশা চারিদিক তকাইয়া তাকাইয়া
দেখিল, গাড়ীর মধ্যে একটি প্রাণীও জাগিয়া নাই, যে যার মতাে
জায়গা লইয়া ঘুমাইয়া আছে। শ্ৰীশ পাশের গাড়ীতে রহিল।
গুম-গুম করিয়া গাড়ী পুলের উপর উঠিতে তাড়াতাড়ি সে
জানলা দিয়া মুখ বাহির করিল। দেখিতে দেখিতে ষ্টেশনের
আলাে, নীচে গাঙের নৌকায় ক্ষীণ ল্যাম্পের আলাে, অস্পষ্ট
জ্যোৎস্নায় নদী-স্রোতের ঝিকিমিকি সমস্ত অদৃশ্য হইয়া গেল।
তারপর আশা শুইয়া পড়িল।
চাকায় চাকায় লাইনের উপর বাজিতেছে ।
কী জোরে
গাড়ী চলিয়াছে, উঃ— রােজ দুপুর রাত্রে আমরা যখন ঘুমাই
এ গাড়ী এমনি ত চারিদিক তােলপাড় করিয়া ছুটিয়া চলে !
আজও জগৎশুদ্ধ ঘুমাইতেছে, আর কতলােককে লইয়া গাড়ী
চলিয়াছে।''
( ৭২ )
স্বপ্নের খােকা
মরিয়া গেলে মানুষ কোথায় যায় ? মরিবার পর কি তারা
দৌড়িতে পারে ? রেলগাড়ীর সঙ্গে পাল্লা দিয়া দৌড়িতে পারে ?
বুঃী ভৈরবীর শাশানঘাটা হইতে পােল কি দেখা যায় ? তা
বিকালে কিন্তু নজর পড়ে নাই। যদি এই সময়ে পূলে উ।
কিনারাটায়, দাড়াইয়া কেউ কাঁদিয়া উঠিত----ওমা কোথায়
যাচ্ছিস? কোথাও চল্লি আমায় ফেলে ?
ও রাক্ষুসী ?
মাঝে মাঝে স্টেশনে গাড়ী থামে, লােকজনের উঠা:মা,
হৈ-চৈ ঘণ্টার বাজনা""আবার গাড়ী হুসস করিতে করিতে
ছুটিতে আরম্ভ করে মাঠের মধ্য দিয়া গ্রামের মধ্য দিয়া"। ঠাণ্ডা
মাঠের বাতাসে ঘুম ক্রমে আঁটিয়া আসিল, আশা তার কিছু
জানিতে পারিল না।
তখনাে ভাল করিয়া ফর্শা হয় নাই, গাড়ীর মধ্যে আল্লবয়সী
গার একটি বধূ জাগিয়া উঠিয়া এদিক ওদিক তাকাইয়া কলকণ্ঠে
কহিয়া উঠিল—ও দিদি, দেখ—খােকার কাও দেখ। আমি
জানি তােমার কাছে শুয়ে রয়েছে। ওমা তামার কি হবে-~~-~-
দস্যিছেলের আপন পর জ্ঞান নেই, একবিন্দু আচেনা নেই, এ
বইটির কোলে কেমন নেতিয়ে রয়েছে, দেখ না-- যেন 'ওরি ছেলে।
কখন গেল ?
ওদিকের বেঞ্চে প্রৌঢ়া মহিলাটি বিপুল বপু লইয়া তাড়াতাড়ি
উঠিয়া বসিয়া বলিলেন--তাই নাকি? ও তবে আমারই ভুল
( ৭৩ )
দেবীকিশােরী
ছােটবউ। ছিল বেশ আমার কাছে ঘুমিয়ে—তারপর দেখি
খােকা আমার চোখের পাতা ধরে টানছে, বলে—ম যাব। পাশ
ফিরে শুয়ে আছে বউটি, দেখতে অবিকল তাের মতাে। আমি
চিনতে পারি নি—ওকেই দেখিয়ে দিলাম। খােক কোলে গিয়ে
শুয়ে পড়ল আর বউটাও অমনি আলগােছে জড়িয়ে ধরে বুকের
মধ্যে টেনে নিল। বউটারও কিন্তু আচ্ছা ঘুম।
ঘুমের মধ্যে আশার মনে হইল, তাহার নিবিড় বাহুবেষ্টনের
মধ্য হইতে খােকাকে কে ছিনাইয়া লইতেছে। আরও ব্যগ্রভাবে
ছেলেকে বুকের মধ্যে চাপিয়া তাড়াতাড়ি চোখ মেলিয়া তীক্ষকণ্ঠে
বলিয়া উঠিল—কে ?
তাহার ভাব দেখিয়া খােকার মা একটু থমকিয়া গেল।
বলিল-“খােকাকে নিয়ে যাব এইবার
—কেন ? কেন ? বলিয়া আশা ঝোঁকের মাথায় উঠিয়া
হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গিয়া প্রথমটা ব্যাপার বুঝিতে পারে
বসিল।
নাই।
বধূ বলিল—ইষ্টিশান এসে পড়ল, এইবার আমরা নেমে যাব।
সেই নিমতে-গৌরীপুর যেতে হবে, ইষ্টিশানে গরুরগাড়ী এসে
থাকবার কথা।•••কি রকম ভালমানুষের মত আপনার কোলের
উপর পড়ে আছে দেখছেন, অথচ ওর যে দুষ্টুমি, কি আর বলব।
ঐ হচ্ছেন আমার বড় জা, খােকনের জেঠাই মা। ও দিদি, এই
( ৭৪ )
স্বপ্নের খোকা জুতাে পড়ে রয়েছে-নামবার সময় হাতে করে নিয়ে তুমি। খােকনবাবু, চোখ মেল, বাড়ী যাবে না, ওঠো খােকা জাগিয়া অচেনা মানুষ দেখিয়া আশার কোল হইতে এর কোলে ঝাপাইয়া পড়িল। আশা হাত বাড়াইয়া ডাকিতে লাগিলবাড়ী যাচ্ছ থােকন বাবু ? এসাে তাে জুতাে পরিয়ে দিই--বাবু হয়ে বাড়ী যেতে হয়। যাঃ—বলিয়া তাহার কচি হাতের আঘাতে খােকা আশার প্রসারিত হাত সরাইয়া দিল। জংশন-স্টেশন। গাড়ী অনেকক্ষণ থাকে। ইঞ্জিনে জল ইতে লাগিল। পাশের কামরা হইতে একজন পুরুষ অভিভাবক নামিয়া আসিয়া ছেলেটিকে কোলে লইল। বউটি ও তাহার বড়’জা সাবধানে নামিয়া পুরুষটির পিছে পিছে প্লাটফরম পার হইয়া ছই দেওয়া গরুর গাড়ীতে গিয়া উঠিল। আশা দেখিতে লাগিল। বৈশাখের শেষ । সােনার বরণ ডাঁসা খেজুর-ভরা, খেজুর-ভরা খেজুর-বন, ছড়া-বাঁধা হলদে হলদে সোঁদালফুল, বাবলাফু, বেগুনী রঙের আকুন্দফুল, শিরীষগাছভরা অগুন্তি সূচের মতো শিরীষফুল, উগমগে লাল কৃষ্ণচূড়ার ফুল। পেঁপেতলায় ছোট্ট একটি কুড়ে, তার ও-পাশে কাল গরু একটা, টিনের ঘর, কলাবাগান, তালাবনে গাছে গাছে কচি তাল পড়িয়াছে। তার পাশ দিয়া মেটে রাস্তা চলিয়া গিয়াছে, তারপর মাঠ—মাঠ—মাঠ, উলুক্ষেত- । ( ৭৫ )
দেবীকিশােরী
বাকের মুখে
গরুর গাড়ী কঁাচ কেঁচ করিতে করিতে খেজুর বন তালবনের
ফাঁকে ফাঁকে মাঠের মধ্য দিয়া চলিতে লাগি ,
একটা অপগাছের আড়ালে খানিকক্ষণ তাদৃশ হইল, তারপর
আবার দেখা গেল ; গাড়ী চলিতেছে—চলিতে চলিতেছে
ক্রমশঃ দৃ: তে দুরতর হইয়া যাইতেছে। চার ধূলায় ধুলায়
ছিনটা অন্ধকার।
রায়রায়ানের দেউল ; ক্রোশ-শেকের ভিতর গ্রাম নাই, দিগন্ত-নিসারী পাস। বিল। চৈত্র-বৈশাখেও এখানে-সেখানে পানাভরা জল, খানিকট বা পাক---রাত্রে ঐ সব জায়গার আলো জ্বলে। "খন মানুষ কেহ ওদিকে যায় না, যাইবার উপায় থাকে না। সুপারীকাঠের ছােট ছােট নৌকা ও তালের ডােঙা গ্রামের কিনারে কয় পড়িয়া পড়িয়া শুকায়। বর্ষায় ভরা-বিলের আর এক মূৰ্ত্তি! শােলা, কলমীলতা, এ কেঁচো ঘাস জাগিয়া ওঠে ; ডােঙা ছুটাছুটি করে হাজারে হাজারে। এ অঞ্চলের লােকের হামেশাই কিল্লাবাড়ির গঞ্জে যাইতে হয় ; বিল ঘুরিয়া অতদূর যাইতে হাঙ্গামা অনেক। বর্ষার সময়টা সােজ। বিল পাড়ি দিয়া যাওয়ার বড় সুবিধা। গ্রাম ছাড়াইয়া ক্রোশ-দুই আগাইলে দেখিতে পাইবে, অনেক দূরে জলের মধ্যে সবুজ সুউচ্চ দ্বীপের মত খানিকটা। তার উপর বড় বড় তালের গাছ আকাশ কুঁড়িয়া দাঁড়াইয়া আছে। আগাইয়া দেখিবে, ঝােপ-জঙ্গল, ঘরের মটকার মত উঁচু মাটির স্তুপ, মানুষে নাগাল পায় না এমনি তাজত্ব নলবন বাতাসে বাজিতেছে। সামনে পিছনে ডাহিনে বাঁয়ে সা-স। করিয়া, জল ৭টিয়া ডেঙ। ছুটিতেছে, ঠক-ঠক করিয়া কাঠের উপর লগির আওয়াজ...দ্রুত ( ৭৭ )
দেবীকিশােরী
গমনশীল মানুষে মানুষে পলকের জন্য চোখোচোখি...কদাচিৎ
দু-এক টুকরা আলাপন। নিঃশব্দতার
নিঃশব্দতার অতলে কথার ধ্বনি
ডুবাইয়া দেখিতে দেখিতে আরোহীগুলি মূহুৰ্ত্তমধে। নলবনের ফাঁকে
কে বিলুপ্ত হইয়া যায় ।
--আস্তে ভাই, সামাল-পাথরে ডােঙার তনা ফাসবে ।
তাইত বটে! নুতন কেহ ডোঙা চালাই- আসিলে এমন
জায়গায় পাপর দেখিয়া চমকিয় ওঠে।
—পাহাড় নাকি ?
--না, রায়রায়ানের দেউল।
বিলের সে দিকটা একেবারে ফাকা, একগাyি ঘাসের আগও
নাই। কিন্তু ভোরের দিকে সেখানে গিয়া পড়লে আর চোখ
ফিরাইবার উপায় থাকে না। সাদা, বেগুনী, ল রঙের শাপলা
ফুলের মধ্যে পথ হারাইয়া বিভ্রান্ত হইয়া যাইতে হয়।
জলের
মধ্যে বড় বড় পাথরে-খােদা ভাঙাচোরা কত মুৰ্ত্তি... ময়ুরে সাপ
ধরিয়াছে—ময়ুরের ঠোট আছে, পা নাই...পদ্মফুল-পাপড়িগুলি
ভাঙিয়া থ্যাবড়া হইয়া গিয়াছে...হাত ও নাক ভাঙা, উড়ন্ত অপ্সরী
তাল্প অল্প মাথা জাগাইয়া আছে।
--আহা-হা, এমন দেউল ভাঙল কে গাে ?
—রায়রায়ান নিজেই।
এই যে ভাঙা দেউল, এখান হইতে অনেক-অনেক দূরে
( ৭৮ )
রায়রায়ানের দেউল
একটি গ্রাম ; সে গ্রামের নাম আজকালকার লোকে বলিতে পারে
না। একদিন শেষ রাতে সুন্দরী কাঠের ভরা অাসিয়া লাগিল
সেই গ্রামের ঘাটে। বর্ষার দুর্গম পথ, টিপটিপ বৃষ্টি পড়িতেছে,
বাতাস বহিতেছে। সকলে মানা করিল, রাতটুকু নৌকায় নৌকা
কাটাইয়া সকালবেলা বাড়ি যাইও। রামেশ্বর
রামেশ্বর শুনিল না,---সাত
দিন আজ বাড়ি ছাড়া, ঘরে তরুণী বউ। আর মা-বাপ মর ছোট
বৈমাত্রেয় ভাইটি। বাবার বেলা বধুর চোখে জল দেখিয়াছিল,
অনেক রকম আবদার ছিল তার। নৌকা খুলিয়া দিয়াও সেদিন
নেশ্বর ভাবিতেছিল--কাজ নাই এই কাঠের ব্যবসা করিতে গিয়া;
নমিয়া যাই। ভাবনাকুল মনে চুপ-চুপ চুপ-ছপ দাড় ফেলিয়া
ওরা আটটি দিন ও সাত রাত্রি আগে তারা গ্রাম ছাড়িয়া চলিয়া
গিয়াছিল।•••
পিচ্ছিল পথে আছাড় খাইয়া জলকাদা মাখিয়া অনেক দুঃখে
শেষে রামেশ্বর বাড়ি আসিল। হঠাৎ চমকাইয়া দিবে এই
‘ব ভলবে আগে কাহাকেও ডাকিল না, টিপি-টিপি থেড়ো ঘরের
দাওয়ায় উঠিল । সবল দুটি বাহু দিয়া নড়বড়ে দরজায় দিবে
এইবার প্রচণ্ড ঝাকি । ঘুম উড়িয়া গিয়া ঘরের মধ্যে উঠিবে
ভয়ার্ত কোলাহল। তারপর বাহির হইতে পরিচিত উচ্চকণ্ঠের
হাসি ফাটিয়া পড়িবে। তারপর দীপ জ্বলিবে। তারপর
দরজায় ঘা দিতে রামেশ্বর হুমড়ি খাইয়া ঘরের ভিতর পড়িল।
খােলা দরজা। কেহ নাই। বউকে আর কি বলিয়া ডাকিবে,
( ৭৯ )
দেবীকিশােরী অন্ধকারে ভাইটির নাম ধরিয়া ডাকিতে ডাকিতে লাগিল-মধুকর, । সে রাত্রি কাটিয়া দিন আসিল। এবং মধুকরেরও খোজ হইল জ্ঞাতিসম্পর্কের এক খুড়া তাহাকে বাড়িতে লইয়া রাখিয়াছেন। খোজ হইল না কেবল বধুটির, যাবার দিন বড় * কঁদিয়া যে বিদায় দিয়াছিল তারপর দু-দিন ধরিয়া এ{মের মঙ্গলার্থীরা দলের পর দল অফুরন্ত উৎসাহে রামেশ্বরকে সমবেদনা জানাইয়া যাইতে লাগিলেন। বড় অসহ্য হইল। আবার এক রাত্রিশেষে পাঁচ বছরের ভাইটির ঘুম ভাঙাইয়া রামেশ্বর ভহিকে কাধে তুলি, দীর্ঘ লাঠি গাছটি লইয়া তারার অস্পষ্ট আলােকের সাঁকোর উপর দিয়া সে চোরের মত গ্রাম-নদীটি পার হইয়া গেল। মনের ঘৃণায় দেশ ছাড়িয়া চলিয়া গেল। কুড়ি বছর পরে ঘােড়ায় চড়িয়া লােকজন সৈন্যসামন্ত লইয়া ফিরিয়া আসিলেন রায়রায়ান রামেশ্বর। আজমীরের এক বৃদ্ধ সেনানীর বুকে ছুরি মারিয়া ঘােড়াটি কাড়িয়া আনা ; নাম তার কুণ্ডল,-সে কি ঘােড়া!--এক তাল উচু, ছুটির সময় যেন বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে। এই কুড়ি বছর রামেশ্বর ভাগ্যের সঙ্গে অবিরাম বড়াই করিয়াছেন, কপালের উপর বমি বলিরেখায় অবােধ্য অক্ষরে সেই সব দিনের কত কি ভয়ঙ্কর কাহিনী লেখা ( ৮০ ) রায়রায়ানের দেউল রহিয়াছে। রায়রায়ান জায়গীর লইয়া আসিয়াছেন, সেই জায়গীরের দখল লইয়া প্রথমেই বাধিল ভরত রায়ের সঙ্গে। ভদ্রার দক্ষিণ পারে খালের মুখে ভরতগড়। কিল্লাবাড়ি হইতে ফৌজদারের কামান আনিয়া প্রাকারের ধারে বসানাে হইয়াছে। প্রথম দু-দিন খুব তােপ দাগা হইয়াছিল। এখন চুপচাপ। ভরত রায়ের লােক প্রাকারের মুখ কাটিয়া দিয়াছে, গড়ের চারিদিক নদীর জলে কানায় কানায় ভর্তি। ভিতরে কি একটা কাণ্ড চলিয়াছে, কিন্তু বাহির হইতে তাহার একবিন্দু আঁচ পাইবার যযা নাই। সেদিন বড় অন্ধকার রাত্রি। রায়রায়ানের ঘুম নাই। শিবির হইতে খানিকটা দূরে ভদ্রার কূলে আপনার মনে পায়চারি করিতেছেন। হঠাৎ খস-খ- খরায়রায়ানের কান খাড়া হইয়া উঠিল, কেয়া-ঝাড়ের ভিতরে অতিশয় ক্ষীণ যৎসামান্য আওয়াজ। প্রবল জোয়ারের টান তাহাতে যে ঐ শব্দটুকু না হইতে পারে এমন নয়। রামেশ্বরের তবু সন্দেহ হইল। তীক্ষ দৃষ্টি বিসারিত করিয়া দেখিতে লাগিলেন। দেখিলেন--ঠিক! কেয়া-জঙ্গলের নিবিড় ছায়ার মধ্যে আগাগােড়া আবৃত করিয়া একখানা বজরা অতি চুপি- চুপি উজান ঠেলিয়া যাইতেছে। কাহাকেও ডাকিলেন না, নিজের বিপদের আশঙ্কা মনে হইল না, ঐ দিকে লক্ষ্য রাখিয়া তিনি আগাইতে লাগিলেন। পরিখার মুখে আসিয়া পথ আটকাইল। সেখান হইতে দেখিতে লাগিলেন,-চোখ অন্ধকারে জ্বলিতে লাগিল—দেখিলেন, নৌকা নিঃশব্দে গড়ের পিছনে সঙ্কীর্ণ নালার ( ৮১ ) দেবীকিশােরী ; মুখে আসিয়া লাগিল ; সঙ্গে সঙ্গেই কয়টি সাদা পুটলী নালায় গড়াইয়া আসিয়া নৌকায় পড়িল আর চক্ষের পলক ফেলিতে না ফেলিতে নৌকা পাক খাইয়া তীব্র জলস্রোতে বিদ্যুতের বেগে অদৃশ্য হইয়া গেল। রায়রায়ান ছুটিতে ছুটিতে তঁাবুর দিকে ফিরিলেন । খানিকটা দূরে একটি কেওড় ওঁড়িতে ঠেশ দিয়া মধুকর মৃদুস্বরে বাঁশী বাজাইতেছিল; বড় মধুর বাঁশী বাজায় সে; দ্রুত পদশব্দে চমকিয়া তাহার হাতের বাঁশী পড়িয়া গেল ; নিঃশব্দে মধুকর দাদার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। ---চলাে--- == -কোথায় ? ---রাণীয়ের মােহানার। রাণাইয়ের মােহানা ক্রোশ পনের ষােল দূর। গাঙটা সেখানে চারিমুখ হইয়া গিয়াছে। ভরত রায়ের সঙ্গে দেবগঙ্গার চালাদারের সম্প্রতি খুব বেশী ; নৌকা যদি সে দিকে যায় তবে রাণাই হইতে ডাইনে মােড় ঘুরিবে। স্থলপথে আগে গিয়া সেখানে ঘাটি দেওয় দরকার। মুহুৰ্ত্ত মধ্যে আটজন ঢালীসৈন্য প্রস্তুত হইয়া মাঠের প্রান্তে আসিয়া দাঁড়াইল। অশান্ত কুণ্ডল মাটির উপর খুর দাপাইতে লাগিয়াছে। এতক্ষণে বায়রায়ানের মুখে হাসি ফুটিল। ঘােড়ার কঁাধে করাঘাত করিয়া বলিলেন-“থাম—থাম্ বেটা, সবুর সয়ন ( ৮২ )
রায়রায়ানের দেউল
বুঝি...আচ্ছ, আমি চললাম আগে আগে, তোমরা এস
শিগগীর---
মাঠ ভাঙিয়া কুণ্ডল ছুটিল।
নদীকুলে ঘোড়া ছাড়িয়া দিয়া রামেশ্বর মােহানার মুখে অপেক্ষ
করিতে লাগিলেন। মধুকরের পেীছিল যখন কৃষ্ণাদশমীর চাঁদ
দেখা দিয়াছে। নিযুপ্ত জেলেপাড়া, ঘাটে অগণিত ডিঙা বাধ'।
এক একটা ডিঙার ছইয়ের মধ্যে সকলে প্রস্তুত হইয়া বসিলেন ?
রায় শেষ হইয়াছে, ঝাপসা ঝাপসা জ্যোৎস্না-সেই সময়ে জলের
উপর বজরার ছায়ামূৰ্ত্তি দেখা দিতেই—গুড়ুম !
বজরা হইতেও জবাব আসিল। তীরের উপর গাছে গাছে
পাখীরা ত্রস্ত হইয়াকলরব সুরু করিয়াছে। অকস্মাৎ অনেকগুলি
কণ্ঠর আর্তনাদ...ঝপ-ঝপ শব্দে মাঝনদীর জল ছিটকাইয়া
উঠল...বজরা চরকীর মত পাক খাইতে লাগিল।
রামেশ্বর তীব্র
আনন্দে চীৎকার করিয়া উঠিলেন—-হাসি !
দশটি ডিঙা সকল দিক হইতে বজরা ঘিরিয়া ধরিল ।
রক্তে রাঙা হইয়া গিয়াছে। একটি শবের কাল চুল জলের
ঠানে একবার ভাসিয়া সেইমুহূর্তে অতলে তলাইয়া গেল। মাল্লা
কয়জন গলুয়ে পড়িয়া কাতরাইতেছে। মধুকর লাফাইয়া
ভিতরে
ঢুকিল, ক্ষণপরে বাহির হইল ছোট একটি তােরঙ্গ
ভাল
ইয়া।
সমস্ত এই ?
( ৮০ )
দেবীকিশােরী - ভয়ে মধুকর বলিল, হাঁ দাদা, তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছি--আর কিচ্ছ নেই— এস দিকি। রামেশ্বরও ঢুকিতে যাইতেছিলেন, ইঙ্গিতে মধুকর নিরস্ত করিল। মৃদুকণ্ঠে বলিল—ওর মধ্যে রয়েছেন ভরত রায়ের স্ত্রী- কন্যা আর গড়ের আরও জন পাঁচ-সাত মেয়েলােক--- বজ কণ্ঠে রামেশ্বর বলিলেন--ডাক দেও পুরুষলােক যে আছে- মধুকর বলিল, পুরুষ কেউ নেই। ভরতের মেজ ছেলে ওঁদের নিয়ে পালাচ্ছিলেন, তিনি ঘায়েল হয়ে ভেসে গেছেন। সকলে এখন মড়ার মত। আপনি আর যাবেন না ও-দিকে। মুহূৰ্তকাল ভাবিয়া রায়রায়ান কূলে নামিয়া আসিলো। একজনকে বলিলেন-খােল ত তােরঙ্গ ; দেখি, আমাদের ছােট রায় কি নিয়ে এলেন- ডালা তুলিতেই মণিমুক্তা ঝক-ম করিয়া উঠিল। খুশীমুখে মধুকরের পিঠে থাবা দিয়া রামেশ্বর বলিলেন—বেশ, বেশ... এবারে তুমি নিজে রামনগর চলে যাও--তােরঙ্গসুদ্ধ দেওয়ানজীর হাতে দাও গিয়ে—গড়ের কাজে টাকার অভাব আর হবে না। আর এরা থাকবেন বন্দীশালায় কোন অসুবিধা না হয়, দেখবে মনের আনন্দে রামেশ্বর কুণ্ডলের পিঠে গিয়া বসিলেন। ( ৮০ ) রায়রায়ানের দেউল সেই দিন সন্ধ্যার পূর্বেই রায়রায়ানের গােলায় ভরতগড় সিয়া চুরমার হইয়া গেল ; সেদিক দিয়া না আসিল কোন প্রতিবাদ, না পাওয়া গেল একটা মানুষের সাড়াশব্দ। অনেক কষ্টে পরিখা পার হইয়া সৈন্যেরা গড়ে ঢুকিয়া দেখে, যা ভাব গিয়াছিল তা-ই—সকলেই পলাইয়াছে, জিনিষপত্র কিছুই পড়িয়া নাই, বারুদখানায় পয়ঃপ্রণালী খুলিয়া দিয়া খালের জল তােল হইয়াছে, গভের শূন্য কক্ষগুলি খাঁ-হা করিতেছে। বিজয়ে ক্লাসে রামেশ্বর রামনগর ফিরিয়া চলিলেন। নিজ নামে নগরের পত্তন মাত্র হইয়াছে, যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্যে কাজ বড় বেশী অগ্রসর হইতে পায় নাই। অসমাপ্ত চত্বরের প্রান্তে অতি প্রাচীন একটা বকুল গাছ। শ্রান্ত রামেশ্বর অপবা বেলায় প্রাসাদবক্ষ হইতে নবনির্মিত নগরীর দিকে অলস দৃষ্টিতে চাহিয়া চাহিয়া দেখিতেছিলেন, অকস্মাৎ চমকিয়া উঠিলেন। দেখিলেন, চরের প্রান্তে বকুলের ছায়াচ্ছন্ন তলদেশে অপ্সরীর মত লঘুগামিনী বড় রূপসী একটি মেয়ে। মধুকর কি কাজে সেইখানে আসিয়াছিল, রায়রায়ান জিজ্ঞাসা করিলেন—কে ও-টি ? -ভরত রায়ের মেয়ে। রামেশ্বর ভাইয়ের দিকে তাকাইলেন, মুখের উপর দিয়া কৌতুক-হাস্য মৃদু খেলিয়া গেল। বলিলেন--বন্দীশালায় বন্দীদের রাখার নিয়ম।এ কি করেছ ? কিন্তু নিয়ম হইলেও এ ছাড়া যে অন্য উপায় ছিল না, মধুকর ( ৮৫ )
দেবীকিশােরী
প্রাণপণে তাহা বুঝাইতে লাগিল। কারণ, বন্দীশালাটা ঠিক
নিরাপদ নয়...তা ছাড়া সেখানে থাকার অসংখ্য অসুবিধা...এমন
অসুবিধা যে রাখাই চলে না...
রামেশ্বর তবু মৃদু হাসিতেছেন দেখিয়া আরও বিব্রত ভাবে
মুধুকর বলিল—আপনি দেখেন নি তাই। দেখতেন যদি—সে যে
কি ভয়ানক কান্নাকাটি—
--কান্নাকাটি ? খুব ভয়ানক ? রামেশ্বর সহসা সোজা
হইয়া বসিলেন, মুখের কৌতুক হাস্য নিভি', চোখ জ্ব-জ
করিয়া উঠিল। স্নান অপরাহু-আলােয় রহস্যচ্ছন্ন অর্ধসমাপ্ত
বিস্তীর্ণ নগরী...পশ্চিমে মাঠের প্রান্তে রক্তিম আভা বিলের
জলে ডগমগ করিতেছে...দূরে, আরও দূরে সীমাহীন নিবিড়
অরণ্যশ্রেণী। বিশ বছর আগেকার একটি গরিব খােড় ঘর
অকস্মাৎ রায়রায়ানের চোখের সম্মুখে ফুটিয়া উঠিল
মধ্যে বিদায়যাত্রার আয়ােজন, কথা নাই,--নির্বাক বিদায়-চিত্র।
স্বাটে সুন্দরী-কাঠ আনিবার নৌকা প্রস্তুত হইয়া ডাকাডাকি
করিতেছে, ঘরের মধ্যে একটি কথা নাই, চোখ ভরিয়া গৌর গাল
দুটি বাহিয়া জল আসে, মুছাইয়া দিলে তখনই আবার ভরা চোখ...
অফুরন্ত, বাধা দিয়া ঠেকাইবার জো নাই।...
সহসা হা-হা-হা করিয়া যেন স্বপ্ন ভাঙিয়া রায়রায়ান হাসিয়া
উঠিলেন। হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিলেন-~-ভরত রায়ের
মেয়েটাকে দেখতে কেমন মধুকর ?
( ৬ )
রায়রায়ানের দেউল
মুখ লাল করিয়া অন্য দিকে চাহিয়া মধুকর কোন প্রকারে
জবাব দিল-ভাল। তাড়াতাড়ি সে বাহির হইয়া গেল।
ভাইয়ের গমন-পথের দিকে গভীর স্নেহে তাকাইয়া রায়রায়া
মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন। কিশাের বয়সের ইহাদের এই
পাগলামী বড় মিঠা লাগে। মধুকর চলিয়া গেলেও অনেকক্ষণ?
হাসি পাইতে লাগিল।
প্রাঙ্গণের কাছাকাছি একদিন মেয়েটার সঙ্গে মুখােমুখি দেখা
হইয়া গেল। সে একাকী দিক প্রান্তে একাগ্র চোখে তাকাইয়া ছিল।
—তুমি কে ?
গম্ভীর কণ্ঠে মুখ ফিরাইয়া থতমত খাইয়া মেয়েটি বলিল—
আমার নাম মঞ্জরী।
রায়রায়ান বলিলেন-“তুমি ত ভরত রায়ের মেয়ে।
বােব হয়, তােমাদের গড়ের ভিতর অবধি ঘুরে এসেছি। কিন্তু
অদৃষ্ট খারাপ, রায় মহাশয়ের দেখা পাই নি। বলতে পার,
তিনি কোথায় ?
আত্ম-গৌরবে রামেশ্বর যেন ফাটিয়া পড়িতে লাগিলেন।
বলিলেন—চুপ করে চোখ নীচু করে রইলে বড়। জবাব দাও।
গরজ আমারই। বীরবরের ঠিকানাটা পেলে তােমাদের বােঝা
নামিয়ে অব্যাহতি পাই। ভয় নেই গাে আমরা কেউ যাচ্ছি
। খালি তােমাদের পাল্কী করে পাঠাবাে
( ৮৭ )
দেবীকিশােরী
।
নিষ্ঠুর বিদ্রুপে মঞ্জরীর চোখ জ্বালা করিয়া জল আসিল।
সুন্দরীর চোখের জল বড় পরিতৃপ্তির সঙ্গে রায়রায়ান উপভােগ
করিতে লাগিলেন। বলিলেন--রাগ করাে না। ভাগ্যিস
আমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, না হলে কোথায় আশ্রয় পেতে
বল দিকি ?
-ভদ্রার জলে।
কুমারী মুখ তুলিল। অশ্রুভরা চোখ
অশ্রুভরা চোখ যেন জ্বলিতেছে।
বলিতে লাগিল-ভদ্রার জলে আশ্রয় হ’ত রায়রায়ান,—সে হত
ভাল আশ্রয়। আগে ত বুঝতে পারি নি যে আপনি
সামেশ্বর দীর্ঘকাল ধরিয়া হাসিতে লাগিলেন। ব্যঙ্গের সুরে
বলিলেন—কিছুই বুঝতে পার নি ? দেওড় শুনে কি ভাবলে
বল ত? ভাবলে, শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘােড়া-পাল্কী নিয়ে মানুষ
এসেছে-পটকা ছাড়ছে না ?
মঞ্জরী বলিল—ভেবেছিলাম, জোলাে ডাকাত। ঘুণাক্ষরে
আপনাকে সন্দেহ হয় নি। তারপর চোখ মুছিয়া দৃপ্তকণ্ঠে কহিতে
লাগিল—রায়রায়ান, আপনার সমস্ত খবর দেশের লােকে জানে।
চিরকাল আপনাকে একঘরে হয়ে থাকতে হবে——ভেবেছেন কি ?
মিছামিছি এত জকি করে এই সব গড় করছেন। আপনার ঐ
গড়খাইয়ের জলে ডুবে মরা উচিত
মেয়েটির দুঃসাহসে রায়রায়ান স্তম্ভিত হইলেন। কিন্তু
তুচ্ছতম প্রতিপক্ষের সামনে হঠাৎ রাগ দেখাইবার ব্যক্তি তিনি
।
( ৮৮ )
রায়রায়ানের দেউল
নহেন। বরঞ্চ আঘাত যে যথাস্থানে গিয়া বাজিয়াছে, তাহাতে
বড় আনন্দ হইল। সহাস্য নেত্রে তেমনি চাহিয়া বলিলেন—বটে ।
মঞ্জরী বলিতে লাগিল—এই জায়গীর কেমন করে আপনি
নিয়ে এসেছেন,—লােকে সমস্ত জানে। চাকলাদারেরা আপনাকে
হণ করে, তারা কোনও দিন আপনাকে দলে নেবে না। তারা
সব চাকলা গড়েছে গায়ের জোরে, আমীরওমরাহের ঘরে
মেয়েলােক ভেট পাঠিয়ে নয়-~-
“ভাল, ভাল—বলিয়া মৃদু হাসিয়া নির্লিপ্তভাবে রামেশ্বর
ফিরিয়া চলিলেন। কয়েক পা গিয়া মুখ ফিরাইয়া হাসিতে
হাসিতে বলিলেন—সুন্দরী, তােমাকেও তবে একটা সুখবর দিয়ে
যাই। আমীর-ওমরাদের ঘরে তুমিও যাবে, দুঃখ নেই, আমি কোন
পক্ষপাত করি নে।
অবনতমুখী পাষাণ প্রতিমার ন্যায় শুনিতে লাগিল।
রামেশ্বর বলিতে লাগিলেন—সুখে থাকবে। বুঝলে? আগামী
বুধবার যেতে হবে—প্রস্তুত থেকো।
কিন্তু ঐ মুখের কথাই। বুধবার তারপর দু-তিনটা কাটিয়া
গেল, কিন্তু কোথায় বা রামেশ্বর আর কোথায় তঁাহার সেই যাওয়ার
আয়ােজন। মানুষ ও পশু পাশাপাশি খাটিয়া দিনের পর দিন
নগর গড়িয়া তুলিতেছে। বড় বড় নৌকায় দেশ-বিদেশের
কাঠপাথর আসিয়া জড় হইতেছে, সেই পাথর ভাঙার শব্দ, করাতে
( ৮৯ )
দেবীকিশােরী কাঠ চিরিবার শব্দ। আজ কোথায় নূতন একটা স্তম্ভ উঠিতেছে, এই কোনদিকে কি একটা ধ্বসিয়া পড়িল লােকজন কাতারে কাতারে ছুটিতেছে—তাড়া খাইয়া আবার উল্টা দিকে ছুটিতে লাগিল। দীর্ঘদিন কোন দিক দিয়া কাটিয়া সন্ধ্যা হইয়া যায়, রাত্রির অন্ধকার গভীর হইতে গভীরতর হয়, তখন শত শত কামারশালায় জ্বলন্ত হাপরের পাশে হাতুড়ীর ঘয়ে লােহার উপর আগুনের ফুলকি উড়িতে থাকে, হাতুড়ী বাজে ঠ ঠঙ ১- দেওয়ান জীবনলালের উপর জায়গীর ও গড় তৈরির সমস্ত ভার। তাঁর তিলার্ধ বিশ্রাম নাই। জায়গীয়ের বিধিব্যবস্থা তবু কতক কতক হইয়াছে, কিন্তু গড়ের কাজ কবে যে মিটিবে, সে এক বিশ্বকৰ্ম্মা ছাড়া কেহ বলিতে পারে না। রাত্রে শুইয়া শুইয়া জীবনলালের মাথায় নূতন নূতন মতলব জাগে। পরিখা খোঁড়া হইয়াছে,--তার ওদিকে উঠিবে আকাশভেদী প্রাচীর, চারিদিকে চারিটি সিংদরজা, দুর্গার হইতে চারিটি রাস্তা সােজা সিংদরজা ফুড়িয়া পরিখার সেতুর উপর পৌছিবে। গভীর রাত্রি পর্যন্ত ভাবিয়া ভাবিয়া জীবনলাল মতলব খাড়া করেন ; দিনের কাজ- করে শেষে প্রসন্নচোখে তাকাইয়া তাকাইয়া দেখেন, সুন্দর সুবৃহৎ রাজধানী আকাশের নীচে ধীরে ধীরে মাথা তুলিয়া উঠিতেছে। নগরে ফিরিয়া ক’দিন অল্পকিছু বিশ্রাম লইয়া রায়রায়ানও এই-সব কাজের মধ্যে একেবারে ডুবিয়া গেছেন। খুব ভােরবেলা ( ৯০ )
রায়রায়ানের দেউল
ঘড়ং করিয়া দরজা খুলিবার মুখে এক একদিন একটু আধটু
তাঁহার গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। বন্দিনীদের পাঠাইয়া
দিবার তখনও কোন উপায় হয় নাই। মধুকর তাহাদের তদারক
করে, সমস্ত দিন সে প্রায় এই-সব লইয়া থাকে ; তারপর
গভীর রাত্রে সকলে শুইয়া পড়িলে অনেকক্ষণ অবধি নির্জ
অলিন্দে বসিয়া আপনার মনে বাঁশী বাজায়। সে সময়ে
ঘুম-ভাঙা শয্যায় রামেশ্বরেরও এক একদিন মনে হয় তাঁহার
বড় যত্নে বড় কঠিন শ্রমে গড়া নগরীর উপর মধুকরের বাঁশ
নিষুপ্ত রাত্রে মাঠের দিগন্ত হইতে স্বপ্নকুহকিনীদের ডাকিয়!
আনিতেছে।
একদিন নির্জনে রামেশ্বর হঠাৎ আসিয়া মঞ্জরীর সামনে
দাড়াইলেন।
—শোন
সপ্রশ্নদৃষ্টিতে মঞ্জরী চাহিল।
এক মুহূৰ্ত থামিয়া রামেশ্বর বলিতে লাগিলেন—সেদিন
আমার সম্বন্ধে তুমি মিথ্যা অভিযােগ করছিলে। ও সব শক্রদের
রটনা।
এ কয়দিনে মঞ্জরী অনেক বুঝিয়াছে, চোখের জল একেবারে
মুছিয়া ফেলিয়াছে। কৌতুক-চঞ্চল চোখ দু'টি নাচাইয়া সে
চুল্যিা যাইতেছিল। বাধা দিয়া রামেশ্বর বলিয়া উঠিলেন--বিশ্বাস
করলে কি-না, বলে যাও
( ৯১ )
দেবীকিশােরী মঞ্জরী কহিল-এ সাফাই-এর দরকার কি রায়রায়ন, আমি ত আপনার বিচারক নই— রায়রায়ান বলিলেন—তুমি আমায় বিয়ে কর-- খিল খিল করিয়া মঞ্জরী হাসিয়া উঠিল । আনেকক্ষণ চাপিয়াছিল, আর পারিল না। ক্রুদ্ধ হইয়া রামেশ্বর বলিলেন-তােমাকে তাই দিল্লী পাঠাতে পারি--জান ? আর তার অর্থ কি, তা-ও বােধ হয় বােঝাতে হবে না- শ —পারেন তা? বলিয়া চোখে মুখে হাসির দীপ্তি তুলিয়া তাহাকে নিতান্ত অগ্রাহ্য করিয়া প্রগল্ভ তরুণী চলিয়া গেল। ইহার পর প্রায়ই দেখা হইতে লাগিল। দেখিলেই মঞ্জরী হাসিয়া পলাইত। পলাইত। একদিন রামেশ্বর তাহার হাত ধরিয়া ফেলিলেন। তখনই ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন—জোর করবার শক্তি আছে মঞ্জরী, কিন্তু মন তা চায় না। বলিতে বলিতে গলার স্বর ভারী হইয়া উঠিল,—এ যেন সে লােক নয় সজলকণ্ঠে রামেশ্বর বলিলেন---আমার জীবনের খবর তুমি জান না...কিন্তু আর এই যুদ্ধবিগ্রহ ভাল লাগে না, এখন শান্তিতে একটুখানি মাথা গুজে থাকতে চাই- মঞ্জরী শান্ত স্থাবে শুনিতে লাগি, পলাইবার চেষ্টা করিল রায়রায়ান বিশ বছরের কাহিনী বলিয়া চলিলেন। সমস্ত ( ৯২ ) রায়রায়ানের দেউল বলিয়া গভীর নিঃশ্বাস ফেলিয়া চুপ করিলেন। ধীরে ধীরে মঞ্জরী চলিয়া গেল । বিকালবেলা মঞ্জরী একখানা আয়না পাঠাইয়া দিল। সঙ্গে ছােট্ট একটু চিঠি "তারপরে যে !বশ বৎসর কেটে গেছে, রায়রায়ান। যুদ্ধ বিগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন, সম্ভবতঃ অয়নায় চেহারা দেখবার ফুরসৎ হয়নি। তাই একটা অয়না পাঠিয়ে দিলাম। চিঠি পড়িয়া রামেশ্বর অনেকক্ষণ গুম্ হইয়া রহিলেন। কুটি-ভীষণ মুখে শুধু বলিলেন—আচ্ছা । ভরতগড়ের রাণীর কানে পৌছিল, পৌছিল, তঁার দুরন্ত মেয়ে রায়রায়ানের সঙ্গে একটা কাণ্ড করিয়া বসিয়াছে। এবারে রায়রায়ানের প্রতিহিংসা। ইহা যে কি বস্তু, রামেশ্বর অল্পদিন দেশে আসিয়াছেন তবু ঢালাদারের ঘরের শিশুটি অবধি তাহা বুঝিয়া ফেলিয়াছে। সকলের আহার-নিদ্রা বন্ধ হইল। কিন্তু পাহাকে লইয়া এতবড় ব্যাপার, সে দিন-রাত দিব্য হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইতে লাগল। ছি ড়িয়া ছিড়িয়া সেই চিঠি শতকুটি করিয়া ফেলিয়াও রায়- রায়ানের রাগ মিটে না। তারপর এক সময়ে সত্যসত্যই তিনি আয়না দেখিতে বসিলেন। কুড়ি বছর ভাগ্যের সঙ্গে নিদারুণ লড়াই হইয়াছ, সর্বাঙ্গে তার প্রতিটি আঘাতের চিহ্ন। সমস্ত মাথার মধ্যে একটি কালাে চুল নাই, মুখের উপর যে ছায়া পড়িয়াছে তাহা দেখিয়া নিজেরই প্রাণ আতঙ্কে কাপিয়া ওঠে,
দেবীকিশােরী
এ তরুণী ব্যঙ্গ করিবে ছাড়া আর কি ? বিশ বছর আগে
বেদনাবিদ্ধ যে যুবক গৃহত্যাগ করিয়াছিল, তাহার একবিন্দু চেহারা
আর খুজিয়া পাইবার উপায় নাই। সাদাচুলের রাশি দুই হাতে
টাকিয়া ধরিয়া আয়নার সম্মুখে বসিয়া রামেশ্বর সেই সব দিনের
কথা ভাবিতে লাগিলেন।
অকস্মাৎ সমস্ত রামনগর চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। পথে
দু-জন লােক একত্র হইলেই একটিমাত্র কথা। একজন সান্ত্রীকে
হীরার আংটি বকশিস দিয়া ভরতগড়ের রাণী বৃত্তান্ত শুনিলেন।
শুনিয়া বুকের রক্তে ফুল রাঙাইয়া শশানকালীর পূজার জন্য
গােপনে পাঠাইয়া দিলেন ভরত রায় অগ্রবর্তী, সঙ্গে আরও
চারি জন চাকলাদার , সকলে মিলিয়া রামনগর
ধ্বংস করিতে
আসিতেছেন। সৈন্য আসিয়া দুই ক্রোশের মধ্যে ঘাটি দিয়া
বসিয়াছে।
অলিন্দে সেদিন আর মধুকরের বাঁশী বাজিতেছে না, সেইখানে
গুপ্তমন্ত্রণা বসিয়াছে।
মধুকর শত্রু-শিবির আক্রমণ করিতে চায়। কৃষ্ণপক্ষের
রাত্রি, আকাণে চঁাদ উঠে নাই ; মধুকর জেদ ধরিয়াছে—এই
আঁধারে আঁধারে নিঃসাড়ে দলবল লইয়া শত্রুশিবিরে ঝাপাইয়া
পড়িবে।
রামেশ্বর মাথা নাড়িলেন। অসম্ভব, একেবারে অযৌক্তিক
( ৯৪ )
রায়রায়ানের দেউল
কথা। পাচ চাকলাদারের সমগ্র শক্তি সমবেত হইয়াছে, তার
সামনে রায়রায়ানের নব-নিযুক্ত ঢালির দল কয়টি বানের মুখে
একেবারে কুটার মত ভাসিয়া চলিয়া যাইবে।
পদশব্দ।--কে ? এতক্ষণে দেওয়ান জীবনলাল অসিয়;
পৌছিয়াছেন। জীবনলাল দৌত্যে গিয়াছিলেন, হাঁপাইতে পাইতে
আসিয়া খবর বলিতে লাগিলেন, দেবাঙ্গার চাকলাদার বলিয়া
পাঠাইয়াছেন—সকলের আগে ভরত রায়ের
পুরমহিলাদের
সসম্মানে পাঠাইয়া দিতে হইবে।
হইবে। তারা গিয়া বদি বলেন,
কোন দুর্ব্যবহার হয় নাই, সন্ধির বিবেচনা তারপর----
মধুকর লাফাইয়া উঠিল--কাজ নেই, দাদা। ওঁদের পাঠানো
ইব না। আমি সর্দারদের ডাকি।
কিন্তু ইহা কাজের কথা নয়। রামেশ্বর ভাইকে শান্তু
করিয়া বসাইলেন। জিজ্ঞাসাকরিলেন---দেওয়ানজী, গড়ের বাকী
জীবনলাল বলিল--শেষ হ’তে অন্ততঃ আরও ছ-মাস।
পাঁচটা কেন পঞ্চাশটা চাকলাদার এলেও পিছু হটব না। কিন্তু
এখন যা বলে মেনে নিতে হবে।
মধুকর
গর্জিয়া উঠিল—এই অপমান ?
--উপায় নেই। বলিয়া জীবনলাল ম্লান হাসিল। বলিল—
চোখের সামনে এই-সব ভেঙে ছারখার করবে—এ ত আমি বেঁচে
থেকে দেখতে পারব না, রায়রায়ান।
( ৯৫ )
দেবীকিশােরী মধুকর খানিক চুপ করিয়া বলিল—বেশ। কিন্তু হাঙ্গামার মধ্যে যাবার আগে গড়ের বন্দোবস্ত শেষ করে ফেলা উচিত ছিল কি ? ওরা আসবে-~~এ ত জানা কথা। এবার রামেশ্বর কথা কহিলেন। বলিলেন-- . জানা কথা কি বলছ মধুকর, এই স্বপ্নেও ভাবা যায় নি। চাকদারের। চিরদিন নিজেদের মধ্যে লাঠালাঠি করে আসছে। আজকেই কেবল এক হ’ল। এরা মতলব করেছে, সুবে বাংলায় অার নতুন জায়গীরদার চকতে দেবে না। জীবনলাল কহিল--আর ভরত রায়ও নানা মিথ্যে রটন করেছে। স্ত্রী-কন্যা বেইজ্জৎ হয়েছে বলে সকলের কাছে কেঁদে কেঁদে বেড়িয়েছে। মধুকর শেষ প্রস্তাব করিল—তবে আমরা লাই। ভরতকে জব্দ করব। মেয়েদের নিয়ে ঢাকার দিকে চলে যাই- জীবনলালের তাহাতেও মহা আপত্তি। বলিল-—সে হয় না। তাহলে মানুষ না পেয়ে আক্রোশ গিয়ে পড়বে রামনগরের উপর । সমস্ত শ্মশান হয়ে যাবে। এবারে সন্ধি হােক। আমি কথা দিচ্ছি, ছােট রায়, দু-মাস পরে দশগুণ শােধ তুলব-~- আরও অনেকক্ষণ ধরিয়া অনেক জল্পনার পর রামেশ্বর সকাল- বেলায় শিবিকার ব্যবস্থা করিতে হুকুম দিলেন। চত্বরের প্রান্তে বহুপ্রাচীন শাখাবহুল সেই বকুল গাছ; ফুল ( ৯৬ ) রায়রায়ানের দেউল ঝরিয়া ঝরিয়া বাতাসকে গন্ধমন্থর করিতেছে। তাহারই ছায়াতলে দাড়াইয়া রায়রায়ান নিঃশব্দে বিদায়-যাত্রা দেখিতেছিলেন। সবুজ কিংখাঝে মােড়া হাঙর-মুখাে মাঝের ঝালরদার শিবিকাখানি—ঐতি রামেশ্বর একাকী দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিতেছিল হঠাৎ নুপূরের শব্দে পিছনে তাকাইলেন। মঞ্জরী রূপে অলঙ্কার বেশের পারিপাট্যে ঝলমল করিয়া আসিয়া চুপ করিয়া দাড়াইল। রায়রায়ানের মুখ কালিবর্ণ হইয়া গেল। ইহারা আজ বিজয়ী ; তরুণীর মুখে-চোখে সেই অহঙ্কার যেন ফুটিয়া পড়িতেছে। মৃঃ- সরে মঞ্জরী বলিল—যাচ্ছি-- রামেশ্বর অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া রহিলেন। মঞ্জরী বলিতে লাগিল—আপনাদের যত্নে বড় সুখে ছিলাম ! আপনাদের আতিথ্যের কথা বাবাকে বলব- স্বরটা রায়রায়ানের কাছে ব্যঙ্গের মত ঠেকিল। রূঢ় সরে জবাব দিলেন--বেশ, ব’লো--একটা কথাও বাদ দিও না। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়িল। বলিতে লাগিলেন--আমার ইচ্ছে হচ্ছে কি ----ডিঙায় করে তােমাদের ভদ্রার মাঝখানে নিয়ে গিয়ে দিই তলা ফুটো করে। ছটফট করে ডুবে মর। কিন্তু সে ত হবার জো নেই, মধুকর আর জীবনলালের জ্বালায় সহসা মুখ ফিরাইয়া দেখিলেন,--হয়ত বুঝিবার ভুল হইয়াছে- মঞ্জরী দু’টি আয়ত চোখের গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে চাহিয়া আছে। চোখের কোণে অশ্রু টলমল করিতেছে। অর ঝর করিয়া সেই ( ৯৭ ) ৭
দেবীকিশােরী
অশ্রু গও বহিয়া ঝরিতে লাগিল। রামেশ্বর সেইদিকে চাহিয়
মণকাল চুপ করিয়া রহিলেন। তারপর ম্লান হাসিয়া বলিতে
লাগিলেন-তুমি গিয়ে স্বচ্ছন্দে সব কথা বলতে পার। এই-সব
অট্টালিকা জায়গীর স্বপ্নের মত এসেছে---আবার যদি চলে যায়
তামার কিছু ক্ষতি হবে না।
রাজকন্যা তাড়াতাড়ি হেট হইয়া রায়রায়ানের পদধূলি লইল।
বলিল আমি সমস্ত শুনেছি। এই রাজ্যপাট আপনার বীরত্বের
ইনাম। ইচ্ছে হলে এর চতুগুণ এখনই আজকেই আবার আপনি
তৈরি করতে পারেন---
রামেশ্বর মান হাসিয়: মাথার পলিত কেশের উপর হাত
বুলাইতে লাগিলেন। বলিলেন--আর পারিনে। কুড়ি বছর পরে
আয়নায় দেখলাম—সত্যিই বুড়াে হয়ে গিয়েছি ; দেহে বল নেই,
মনেও বল নেই।...এখন এ-সব শেষ করে গরিবের ছেলে হয়ে
আবার খােড়াে ঘরে যেতে ইচ্ছে হয়। ভােমায় জামি দিল।
পাঠাচ্ছিলাম—আরও কত অত্যাচার হয়েছে হয়ত—আমার সমস্ত
তাপরাধ তােমার বাবাকে লেঃ, মঞ্জরী--
মঞ্জরী দৃঢ়কণ্ঠে বলিল—মিথ্যা বলব কেন?
রামেশ্বর অবাক হইয়া চাহিলেন। মঞ্জরী বলিতে লাগিল।
দিল্লীতে কখনও আপনি পাঠাতেন না, সে আমি জানি। আপনার
মনের কথা সমস্ত জানি আমি । যাবার বেলায় তাই প্রণাম করতে
এলাম।
( ৯৮ )
রায়রায়ানের দেউল । বলিতে বলিতে সে থামিল। মুখের উপর এক ঝলক রক্ত নামিয়া আসিল। জোর করিয়া সঙ্কোচ কাটাইয়া বলিতে লাগিল-~- বাবা এবার অনেক আয়ােজন করে এসেছেন, আমি না গেলে অন্য হবে। আমি তাই ফিরে যাচ্ছি। আপনার রাজধানী গড নাওয়ারা---সমস্ত ব্যবস্থা ঠিক করে আমাকে নিয়ে আসবেন। তাই বলতে এলাম। নিয়ে আসবাে ? সম্মোহিত দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিয়া রামেশ্বর ধীরে ধীরে মাথা নাড়িতে লাগিলেন। বলিলেন--তুমি কি সত্যি কথা বলছ ? আমি বুড়াে হয়ে গেছি, মন বড় দুর্বল মন্ত্রী। মঞ্জরী রায়রায়ানের দুই পায়ের মধ্যে মাথা ও জিয়া চুপ করিয় অশক্ত বৃদ্ধ নয়--শ্রান্ত মহাবিজয়ী বীর তার সম্মুখে । অনেকক্ষণ পরে মাথা তুলিয়া অশ্রুভরা চোখে কুমারী হাসিল--- মনি, কিন্তু বড় মধুর হাসি । বলিল—নিয়ে আসবেন। জন্মাষ্টমীর রাত্রে আমরা প্রতিবছর গড়ের বাইরে শ্যামসুন্দরের মন্দিরে যাই। সঙ্গে জন-পঞ্চাশ মাত্র রক্ষী থাকে। এখনও তার ছ-সাত মাস দেরি। আপনি এর মধ্যে গড় শেষ করুন। কুণ্ডলকে নিয়ে যাবেন। আমি ভদ্রার কুলে কৃষ্ণচূড়ার তলায় অপেক্ষা করব- আপনি আর আপনার কুণ্ডল আমাকে উদ্ধার করবেন। ঝুনঝুন নূপুর বাজাইয়া মঞ্জরী ধীরে ধীরে শিবিকায় গিয়া বসিল রহিল। ( ৯৯ )
দেবীকিশােরী
গড়ের কাজে পরদিন হইতে চতুগুণ লোক লাগানো হইল।
পুরীর সামান্য কৰ্ম্মচারীটি পৰ্য্যন্ত বুঝিয়াছে, রায়রায়ান প্রতিহিংসার
জন্য অধীর হইয়া উঠিয়াছেন। জীবনলাল মহিলাদের পৌছাইয়া
দিতে গিয়াছিল, ফিরিতে রাত হইল। তারপর গভীর রাতে।
আগের দিনের মত আবার গুপ্ত পরামর্শ। চাকলাদারেরা সসৈন্যে
ফিরিয়া যাইতে রাজী হইয়াছেন; কিন্তু ভূষণার মধ্যে রামেশ্বরকে
এই নূতন গড় গড়িতে দেওয়া হইবে না।
জীবনলালের পরামর্শ, ইসলামাবাদের দিকে গিয়া ফিরিঙ্গীদের
শরণ লওয়া। সেখানে জায়গীরের বিলিব্যবস্থা করিতে
পাইতে হয় না। বাদশাহের নিকট হইতে একটি নূতন ফৰ্ম্মান
আনিবার অপেক্ষা মাত্র। কিন্তু রামেশ্বর ঘাড় নাড়িলেন।
তাহার নূতন করিয়া ভাগ্য খুঁজিবার উৎসাহ নাই।
একদিন রামেশ্বর কিল্লাবাড়িতে ফৌজদারের সঙ্গে পরামর্শ
করিতে গেলেন।
তারপর অনেক দিন ধরিয়া এই রকম পরামর্শ
জীবনলাল ইতিমধ্যে ইসলামাবাদের দিকে চলিয়া
গিয়াছে। গড়ের সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ ; অর্ধসমাপ্ত পরিখা ও
নগর শ্মশানের মত খা-খা করিতেছে।
পাকসীর বিল ইদানীং মজিয়া গিয়াছে, চৈত্র-বৈশাখে প্রায়
শুকাইয়া আসে। তখন দিগন্তব্যাপ্ত নিবিড়কৃষ্ণ অবিচ্ছিন্ন জলধারা
ক্রোশের পর ক্রোশ তরঙ্গিত হইত। বড় শুকনার সময়ে গােটা
বিশ-পঁচিশ চর মাত্র সীমাহারা বারিসমুদ্রের মাঝখানে অসহায়ের
চলিল।
;
( ১০০ )
রায়রায়ানের দেউল মত মাথা উচু করিয়া থাকিত। বিলের কিনারা দিয়া কিল্লাবাড়ি যাইবার পথ। মাসাবধি পরে কুণ্ডলের পিঠে চড়িয়া একদিন রামেশ্বর ফিরিয়া আসিতেছিলেন। ফৌজদার শেষ পর্যন্ত কোন সুবিধাই করিতে পারিলেন না। ফিরিবার পথে বিলের প্রান্তে আসিয়া বিদ্যুৎ চমকের মত একটি সঙ্কল্প হঠাৎ রামেশ্বরের মনে জাগিয়া উঠিল। রামনগরবাসী এবং চাকলাদার মহলে রাষ্ট্র হইয়া গেল, পরাজিত অবমানিত রায়রায়ান মনােকষ্টে বিবাগী হইতে বসিয়াছেন, দিবারাত্রি অন্তঃপুরের মধ্যে শ্যামসুন্দরের উপাসনায় তিনি মাতিয়া থাকেন। তারপর অনেক দিন পরে একদিন কুণ্ডলের পিঠে রায়রায়ান বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইলেন। সহস্র প্রজা সমবেত হইয়াছে। জীবনলালও সেইদিন ফিরিয়াছেন। সে চুপি চুপি বলিল--এ সবে কাজ নেই প্রভু, ইসলামাবাদ চলুন-- পটুগীজদের সঙ্গে সৰ্ত্ত হইয়া গিয়াছে ; ইসলামাবাদে রাজ- পত্তন করিতে আর গােল নাই। সেখান হইতে রাজ্য ক্রমশ বিস্তৃত হইয়া একদিন ভূষণাকেও গ্রাস করিবে,-জীবনলাল সেই স্বপ্নে মাতােয়ারা। কিন্তু রামেশ্বর রাজী নহেন। নিরন্ন সর্বস্বহারা হইয়া পথে পথে ঘুরিতে হইয়াছে, বিনিদ্র কত রাত্রি অজানা প্রান্তরের মধ্যে অশ্বপৃষ্ঠে কাটিয়াছে, দিন মাস বৎসরগুলি দেহের উপর পদাঙ্ক আঁকিয়া রাখিয়া দ্রুত পলাইয়া গিয়াছে। জীবনের শেষ প্রান্তে ( ১০১ )
দেবীকিশােরী
আসিয়া
নূতন
করিয়া তিনি আর সংগ্রামে মাতিবেন না। হাসিয়া
বলিলেন-জীবনলাল, ইসলামাবাদে তুমি রাজা কর। আমি
ফৰ্ম্মা এনে দেব।
জীবনলাল জিব কাটিয়া বলিল-প্রভু, আমার কাজ রাজ্য
‘গড়া-রাজত্ব করা নয়।
তবে মধুকরকে নিয়ে যাও। সে দেশ অরাজক, মগ আর
ফিরিঙ্গী ডাকাতদের মধ্যে আমি তিলার্ধ বিশ্রাম পাব না।
আমি পাক্সীর বিলের মধ্যে দেউল গড়ে শেষ কটা দিন
শান্তিতে থাকব।
কাছাকাছি পাঁচ-সাতটা সুদীর্ঘ চর, তাদের মাঝে অল্প অল্প
জল-কাদা। কুণ্ডলের পিঠের উপর বল্লম উঁচু করিয়া রায়রায়ান।
প্রথম যৌবনের দুর্ধর্ষ বিক্রম বুকের মধ্যে আবার নাচিয়া উঠিয়াছে।
তীক্ষ দৃষ্টিতে একবার সামনের দিকে তাকাইয়া রায়রায়ান
মাটিতে বল্লম চুড়িয়া মারিলেন। অমনি সারবন্দী হাজার কোদাল
পড়িল—বাষ্পস্। সেই হাজার হাত হইল দীঘির উত্তরসীমা।
বল্লম তুলিয়া লইয়া রায়রায়ান তীরবেগে কুণ্ডলকে ছুটাইলেন।
কুগুল উড়িয়া চলিল। একদমে আধ ক্রোশ গিয়া একলহম।
ঘােড় থামিল। রায়রায়নি বল্লম পুতিয়া রাখিয়া রামনগরে
ফিরিয়া আসিলেন।
হাজার হাজার কোদাল দিনের পর দিন পড়িতে লাগিল।
( ১০২ )
রায়রায়ানের দেউল
অবশেষে পোঁতা বল্লমের গােড়ায় আসিয়া দীঘি কাটা শেষ হইল।
মাটির স্তুপে আকাশভেদী পাহাড় হইয়াছে। দেশ-দেশান্তর
হইতে বড় বড় পাথরের চাই আসিয়া জমিতে লাগিল। দিনরাতি
সেই পাথর মাটিতে বসানাে হইতেছে, পাথরের উপর পাথর বসাইয়া
দ্রুত এক অতি বিচিত্র দেউল রচিত হইতেছে। কত স্তম্ভ, ক)
চূড়া, কত মনােহর কারুকার্য তাহার উপর। সমস্ত জীবনের
সঞ্চিত স্বর্ণভাণ্ডার উজাড় করিয়া রামেশ্বর পাকসীর বিলের মধ্যে
ঢালিতে লাগিলেন।
-আকাশ আলাে করে দাড়িয়েছে, চমৎকার ! চমৎকার !
লোকে বলে, রায়রায়ানের সাধনপীঠ।
-কোন্ দেবতার প্রতিষ্ঠা হবে ?
কেহ বলিতে পারে না।
ক্ষাবর্ষণ মেঘন্ধিকার ভাদ্র-অষ্টমীর সন্ধ্যাকালে রামেশ্বর যাত্রা
করিলেন। মঞ্জরী ভুলে নাই--মন্দিরের লৌহ-সম্বন্ধ সুদৃঢ়
বেস্টনীর বাহিরে কৃষ্ণচূড়ার ভলে আঁচল ঝপিয়া সে প্রতীক্ষা
করিতেছিল, মুহূর্তে ঘোড়ায় চড়িয়া রায়রায়ানের পৃষ্ঠ-লগ্ন হইল।
রক্ষীরা সচকিত হইয়া দেখিল, দ্য কন্যাকে লইয়া পলাইতেছে ।
কড়কড় করিয়া মেঘ ডাকিয়া মুষলধারে জল নামিল। কুণ্ড
তীরবেগে ছুটিল। কুণ্ডলের কে অনুসরণ করিয়া পারিবে ? দেখিতে
দেখিতে ঘােড় নিখোজ হইয়া গেল।
রামনগরে যখন পেীছিল তখন শেষরাত্রি। পিঠের উত্তরীয়
( ১০৩ )
দেবীকিশােরী শুলিয়া রামেশ্বর কুমারীর দেহবল্লরী ধীরে ধীরে বাহুতে ধরিয়া ভুলিলেন। পদ্মের পাপড়ীর মত চক্ষু দুটি মুদিয়! মঞ্জরী ক্লান্তিতে এলাইয়া রহিয়াছে ; মেঘভাঙা ক্ষীণ জ্যোৎস্না হাসিয়া পড়িয়াছে তার ঘুমন্ত মুখের উপর । গভীর স্নেহে মুহূর্তকাল রামেশ্বর সেই মুখের দিকে চাহিলেন, তারপর অতি সন্তর্পণে তাহাকে সুকোমল উষ্ণ শয্যার উপর শােয়াইয়া দিলেন। মধুকরের ডাক পড়িল। আনন্দের প্লাবন রামেশ্বরের অন্তর ভরিয়া ছাপাইয়া বাহিরে আসিতেছে, পরাজয়ের সমস্ত গ্লানি নিঃশেষে ভাসিয়া গিয়াছে। রামেশ্বর বলিলেন-মঞ্জরী রইলেন। দিনের বেলায় নয়——কাল সন্ধ্যায় পর আঁধারে আঁধারে বজরায় ক'রে ওঁকে পৌছে দিও। আমি দেউলের দরজায় প্রতীক্ষ। করব- মধুকর বলিল-~এখনই যাচ্ছেন কেন ? আপনি বড় ক্লান্ত, কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন। রামেশ্বর কহিলেন--অবসর কোথা ভাই ? এখনও মন্দিরের চূড়ায় সােনার কলসী বসানাে হয় নি, কত কাজ বাকী কাল দেবীর প্রতিষ্ঠা হবে ; এর মধ্যে প্রস্তুত হতে হবে ত ? হাসিয়া তখনই তিনি রওনা হইয়া গেলেন। দীঘির জল কাকচক্ষুর মত টলমল করিতেছে ; সকালের সােনার আলোয় দেউল জলের উপর ছায়া ফেলিয়া দাড়াইয়া আছে। পরিতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া রায়রায়ান অসমাপ্ত কাজটুকু ; ( ১০৪ ) রায়রায়ানের দেউল সমাধা করিতে লাগিয়া গেলেন। লােকজন আর বেশী নাই, নেকেই বিদায় হইয়া গিয়াছে। দেউল-শীর্ষে সোনার কলসী বসানাে হইল, সারচন্দনে সমস্ত প্রকোষ্ঠ অনুলিপ্ত করা হইল, সহস বৃতের দীপ সাজান হইল—রাত্রে জ্বালান হইবে, ডিঙার পর ডিঙা ভরিয়া আসিতে লাগিল পাসী বিলের সমস্ত পদ্মফুল। --এত ফুল ? রায়রায়ানের পূজায় লাগিবে। রাত্রির দুই প্রহর অতীত হইয়াছে। রায়রায়ানের গুপ্ত পূজা, সেজন্য সন্ধ্যার আগেই সমস্ত লােক দেউল হইতে বিদায় করিয়া দেওয়া হইয়াছে, আর কেহ নাই। লােকালয় হইতে বহু দূরে প্রকাণ্ড বিলের নিঃশব্দ পাষাণপুরীর মাথায় অনন্ত তারকাশ্রেণী। কক্ষের দীপাবলী একের পর এক নিবিয়া আসিতেছে, হু-হু করিয়া নৈশ-বাতাসে বিলের জল ছল-ছল করিয়া উঠিতেছে, রামেশ্বর ছুটিয়া জলের প্রান্তে গিয়া দাঁড়ান ; বুঝি বজরা আসিয়া ভিড়িল । তাবার মেঘ জমিয়! তারা ঢাকিয়া অন্ধকার নিবিড় হইয়া আসিতেছে। সহসা রামেশ্বরের মনে হইল, মরিয়া প্রেত হইয়া তিনি যেন নির্জন দ্বীপভূমিতে ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন--কণ্ঠে ধ্বনি নাই, পদতলে মৃত্তিকা নাই, অন্ধকার ছাড়া দৃষ্টি করিবার বস্তুও কিছু নাই, প্রবল প্রবাহশীল অনন্ত বায়ু মণ্ডলে তিনি হাহাকার করিয়া বেড়াইতেছেন। অন্তরাত্মা সত্য সত্যই তাহার কঁপিয়া
দেবীকিশােরী
উঠিল, হা-হা-হা করিয়া অকস্মাৎ উদ্দাম হাসির সঙ্গে অমূলক ভয়
ভাঙিতে চেষ্টা করিলেন। মনে হইল, দূরের মসীকৃষ্ণ অন্ধকারের
মধ্য দিয়া জলরাশি উত্তাল তাড়নে ভেদ করিয়া দ্রুতবেগে কি যেন
আগাইতেছে। দুই চক্ষের সমস্ত দৃষ্টিশক্তি পুঞ্জিত করিয়া
অন্ধকারের দিকে নির্নিমেষ চোখে চাহিয়া অধীর কণ্ঠে চীৎকার
করিয়া উঠিলেন—মধুকর ! মধুকর !
ফিরিয়া আসিয়া আবার দ্বারপ্রান্তে বসিলেন। দীপ নিবিয়া
গিয়া অন্ধকারের মধ্যে বিশাল সৌধক্ষ অপরূপ রহস্যাবৃত
দেখাইতেছে। বাতাস উঠিয়াছে। ঝড়ের বাতাস নৈশ নিস্তব্ধতা
মথিত করিয়া নবনিৰ্ম্মিত দেউলের পাষাণ-প্রাচীরে আর্ভক্রন্দন
তুলিয়া দাপাদাপি করিতে লাগিল।...ক্রমে রামেশ্বর কোন সময়ে
সুমাইয়া পড়িলেন।
হঠাৎ বৃষ্টি-সিক্ত শীতল হস্ত আসিয়া লাগিল বাহুর উপর।
মূহূর্তে চমকিয়া জাগিয়া বলিলেন—এলি ? চোখ মুছিয়া
দেখিলেন,-মধুকর
নহে--জীবনলাল। জীবনলাল নমস্কার
করিল। উঠিয়া বসিয়া গম্ভীর কণ্ঠে রায়রায়ান বলিলেন—আবার
ইসলামাবাদ গিয়েছিলে না ? কবে ফিরলে ?
ভীবনলাল বলিল—আজ। সেখানে সমস্ত ঠিক করে
এসেছে। ছোটখাট গড়ের পত্তন হয়েছে-
একটু বিরক্তির সঙ্গে রায়রায়ান বলিলেন—সে-কথা আমার
সঙ্গে কেন দেওয়ানজী, ছােট রায়ের সঙ্গে বলাে।
( ১০৬ )
রায়রায়ানের দেউল
জীবনলাল আবার নমস্কার করিয়া বিনীত কণ্ঠে বলিল---
তিনি চলে গেছেন সেখানে। আমি শুধু খবরটা দিতে এসেছি---
মঞ্জরী তাহলে তােমার সঙ্গে এলেন ? ব্যস্ত হইয়া
রামেশ্বর উঠিয়া দাড়াইলেন।
জীবনলাল বলিল—না প্রভু, তিনিও স্বামীর সঙ্গে গেছেন ।
ছােট রায় সেই খবর দিতে আমায় পাঠিয়ে দিলেন।
নিবিড় তান্ধকারে কেহ কাহারও মুখ দেখিতে পাইলেন না।
অনেকক্ষণ কাটিয়া গেল, দু-জনেই পাষাণ মূর্তির মত দাড়াইয়া
আছেন। তারপর রায়রায়ান বসিলেন। হঠাৎ হাসিয়া উঠিয়া
প্রশ্ন করিলেন-মধুকর কি ব'লে পাঠাল ?
—তিনি বললেন, মঞ্জরী তার বাগদত্তা বধূ-আট মাস আগে
রামনগর প্রাসাদের অলিন্দে চন্দ্র-সূৰ্য্য সাক্ষী ক'রে গোপনে
মালা। বদল হয়েছিল। ভরত রায়ের কঠোর
শাসন থেকে তাকে ছিনিয়ে আনা—আপনি আর আপনার কুণ্ডল
ছাড়া জগতে আর কারও সাধ্য হত না। কৃতজ্ঞ চিত্তে তিনি
তাই আপনাকে প্রণাম পাঠিয়েছেন।
—বেশ, বেশ ! বলিয়া বিল কাপাইয়া রামেশ্বর তাবার হাসিয়
উঠিলেন।—আর রাণী মঞ্জরী—তিনি কিছু বললেন ?
জীবনলাল বলিল-রাণী বলে পাঠিয়েছেন, বাধ্য হয়েই তাকে
আপনার সঙ্গে একটু ছলনা করতে হয়েছিল। আপনি তাকে
ক্ষমা করবেন।
( ১০৭ )
দেবীকিশােরী
;
ভাের হইয়া গেলে জীবনলাল বিদায় লইতে আসিয়া দেখিল,
রামেশ্বর জলের দিকে নিবিষ্ট মনে চাহিয়া আছেন। পদশব্দে
মুখ তুলিয়া চাহিলেন; বলিলেন--জলে কেমন ছায়া পড়েছে দেখ ।
আমারও ছায়া পড়েছে—বডড বুড়াে হয়ে গেছি, না ?
কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, পাগলের মত।
জীবনলাল বলিল-প্রভু, বিদায় দিন এবার—ইসলামাবাদ
N
স্বাব।
—এখনই ?
•
--হা। নতুন রাজ্য গড়ছি, অবসর নেই। আশীর্বাদ করুন
রায়রায়ান, এবার যেন সফল
রামেশ্বর গভীর কণ্ঠে আশীর্বাদ করিলেন। তারপর বলিলেন
-আর একটা কাজ করে দিয়ে যাও, দেওয়ান মশাই। যারা
দেউল গড়তে এসেছিল, তারা রামনগরে এখনও পুরস্কারের
প্রতীক্ষায় অপেক্ষা করছে। তাদের একবার এখানে পাঠিয়ে দিয়ে
যাও-কাজ আরও বাকী আছে।
লােকজন আসিয়া পড়িল। রৌদ্রোজুল দেউল-চূড়ায়
সোনার কলসী বাক-ঝক করিতেছে, রামেশ্বর দেখাইয়া ইঙ্গিত
করিলেন নামাইয়া আনিতে। কাল এমনি সময়ে কত কষ্টে
কত কৌশলে কলসী ওখানে বসান হইয়াছে, গাতি দিয়া খুঁডিয়া
খুঁড়িয়া আবার তাহা খসাইয়া আনা হইল। কলসী উপুড় করিয়া
তাহার উপর বসিয়া রামেশ্বর হুকুম দিলেন—-ভাঙো দেউল।
( ১০৮
রায়রায়ানের দেউল
রায়রায়ান প্রকৃতিস্থ নাই, সকলেই বুঝিল । কেহ আর
হইল না।
রামেশ্বর পুনরায় বজ্রকণ্ঠে হুকুম দিলেন। কয়েক
জন রামনগরে ছুটিল খবর দিতে, কাল রাত্রে পূজা করিতে গিয়
রায়রায়ান একেবারে উন্মাদ হইয়া গিয়াছেন। রানেশ্বর কস
লইয়া ছুটিলেন কক্ষের মধ্যে ; কুলুঙ্গীর টানা খুলিয়া সঞ্চয়ের
অবশেষ সমস্ত সুবর্ণমুদ্রা বােঝাই করিয়া কহিলেন---ভঙে দেড,
'ভাঙো দেউল, ভাঙো দেউল। মুঠি মুঠি করিয়া স্বর্ণ-মুক্ত
সকলের কোলে ঢালিয়া দিতে লাগিলেন, স্বর্ণ মুঠি ধূলিমুঠির
নত ছড়াইতে লাগিলেন ; বলিতে লাগিলেন—ভাঙে, ভাঙে।
তারপর নিজেই গতি লইয়া উপরে উঠিলেন।
ঝুপ ঝুপ শব্দে ইট-পাথর টুকরা টুকরা হইয়া পড়িতে লাগিল।
মাসের পর মাস বাটালির আঘাতে পাষাণখণ্ডগুলি জীবন্ত প্রতিমার
রূপ ধরিয়াছিল। বৃদ্ধ রতনদাস শিল্পীদের সর্দার। নিজে
সে গাতি ধরিতে পারিল না, প্রাঙ্গণের এক ধারে দাঁড়াইয়া
চক্ষু মুছিতেছিল। উন্মাদ রামেশ্বর নামিয়া আসিয়া তাহাকে
দেখিলেন।
দেখিয়া মুখ হাসিতে ভরিয়া গেল।
মুখের উপরে অতি সন্নিকটে মুখ আনিয়া রামেশ্বর বলিতে
লাগিলেন কঁাদ্ছ কেন? চুল পেকেছে বলে ? এস আমার
সঙ্গে-
কেহ কিছু বুঝিবার আগেই বিশাল তরঙ্গায়িত ঘােড়াদীঘির
তলহীন ঘনকৃষ্ণ জলরাশির মধ্যে রামেশ্বর ঝাঁপ দিয়া পড়িলেন।
দেবীকিশােরী হায়-হায় করিয়া আকুল চীৎকার উঠিল। শত শত লােক তাহাকে ধরিতে সঙ্গে সঙ্গে ঝাপাইয়া পড়িল। এখন যুদ্ধ-বিগ্রহের দিনকাল নাই। সেকালের দুর্দন চাকলাদারের। মরিয়া গিয়াছে ; সুস্থ স্বচ্ছন্দ নিরুদ্বিগ্ন বাংলা দেশ । সেই অগ্নিবী তোপগুলিরও পরমগতি লাভ হইয়াছে। কামারের আগুনে পুড়িয়া কতক হইয়াছে কয়েদীর ডো কিংবা রাস্তা তৈরির রােলার ; কতকগুলি নদীর পলিমাটিতে একেবারেই লুকাইয়া গিয়াছে। গ্রামে ঘুরিতে গ্রামে ঘুরিতে ঘুরিতে তবু কদাচিৎ ধুলামাটি- মাখা দু-একটার হঠাৎ দেখা পাইয়া যাইও । হয়ত কোন অশ্বথ তলায় বিলুপ্ত-বংশ প্রাচীন অতিকায় কালের মত রোদ বৃষ্টির মধ্যে পড়িয়া আছে, মহাকাল পদাঘাতে ঠেলিয়া রাখিয় গিয়াছে, ইদানীং রাখালেরা গরু ছাড়িয়া দিয়া তাহার উপরে বসিয়া শশী বাজায়। এমনি একটা কিল্লাবাড়ির ঘাটের উপর পড়িয়া রহিয়াছে, দেখিতে পাইবে। সেইটা থাকায় ডোঙা বাঁধার বড় সুবিধা হইয়াছে। কিন্তু, সাবধান। ফুটফুটে জ্যোৎস্না দেখিয়া রাত্রে কোনদিন ঐ ঘাট হইতে ডোঙা খুলিয়া দিও না, সহস্র সহ ফুটন্ত শাপলা তােমাকে দিগভ্রান্ত করিবে। লগি ঠেলিতে ঠেলিতে হঠাৎ এক সময়ে পাষাণ-স্তপে ধাক্কা খাইবে, তাকাইয়া দেখিবে---একেবারে রায়রায়ানের দেউলের কাছে আসিয়া পড়িয়াছ। নিযুপ্ত রাত্রে দ্বীপের উপর তালগাছের ফাকে ফাকে তেরছা হইয়া পড়া জ্যোৎস্না ( ১১০ )
MAKARDAH- HUWBAR..
রায়রায়ানের দেউল
- -
হঠাৎ বাতাস উঠিয়া নলবন বাজিয়া উঠিবে ; মনে হইবে, নির্জন
বংসাবশেষ দেউলে রাররায়ান হাহাকার করিয়া বেড়াইতেছেন।
হইয়া যে-দিকে ডােঙা ঘুরাইবে, দেখিতে পাইবে সেকালের
প্রস্তরীভূত অসংখ্য অপরা ময়ুর ও পদ্মফুল। অল্প অল্প মাথ ;
লিয়া তাহারা তাকাইয়া থাকিবে, আলেয়ার মত পথ ভুলাইয়া
সমস্ত রাত্রি তােমাকে ঘুরাইয়া লইয়া বেড়াইবে–ফিরিবার পথ
জিয়া পাইবে না।
SAR
td:-).
খ
আলেয়া-
সেই কোন্ সকালে পঞ্চানন ঢারিটি নাকেমুখে জিয়া
জেলেদের লইয়া বাহির হইয়াছিল। পাশাপাশি দুইটা গ্রামের
তিন চারিটা পুকুরে সন্ধ্যা অবধি মোট আড়াই নণের উপর মাছ
ধরা হইয়াছে। গ্রাম-সীমায় বিলের ধার দিয়া তাহার ফিরিয়া
আসিতেছিল—আগে পঞ্চানন, পিছনে পিছনে মাছের ঝুড়ি ও
জাল লইয়া জেলেরা। জ্যোৎস্না রাত্রি।
হঠাৎ পেঁচা ডাকিয়া উঠিল।
রাখহরি জেলে অমনি থমকিয়া দাঁড়াইয়া কহিল-শুন
পাচ্ছেন, বাবু?
পঞ্চানন তখন অন্যমনা, বাড়ির লোেকদের নিদারুণ অত্যাচারের
কথা ভাবিতেছে। এই মাছ ধৰিবার কাজটা ঘাড়ে চাপাইয়া দিয়া
সারাদিন তাহাকে এমন ভাবে বাড়িছাড়া করিয়া রাখা তাহাদের
কোনক্রমে উচিত হয় নাই—তা’ কাল বাড়িতে যত বড় ভারী
ক্ৰিয়াকৰ্ম্ম থাকুক না কেন। বিরক্ত হইয়া বলিল—চল্ চল্,
তােরা দাড়াসনে--
কিন্তু পিছনে চাহিয়া দেখে চলিবার লক্ষণ কাহারও নাই ।
এই বিলের মাঝখান দিয়া অনেককাল আগে বােধ করি কোন
একটা রাস্তা ছিল; এখন আছে কেবল এখানে ওখানে খানিকট
( ১১২ )
আলেয়া ; করিয়া উচু জমি ; তাহাতে খেজুর গাছ, মাঝে মাবো এক আধটা বঁশঝাড়। সেই দিক দিয়া ডাক আসিতেছিল। রাখহরি সেই দিকে আঙুল তুলিয়া বলিতে লাগিল---উ-ই যেখানে পেঁচা ডাকছে--দেখুন একবার কাণ্ডটা বাবু, দেখছেন ? মিলে গেল না ? পঞ্চানন কহিল–তােরা দ্যাখ দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে, আমি চল্লাম বলিয়া রাগে রাগে কয়েক পা আগাইয়া শুনিতে পাইল, উহার বলাবলি করিতেছে---আ’লচোরা, আল’চোরা ! কৌতুহলশে সে বিলের দিকে তাকাইল। তাই ত! উহাই হয়ত আলেয়া : দেখিল, যেদিক হইতে পেঁচার ডাক আসিতেছে তাহারই অনেকটা পূবে বিলের মাঝামাঝি পাঁচ সাত জায়গায় আগুন জ্বলিতেছে আবার নিবিয়া নিৰিয়া যাইতেছে। পাড়াগাঁয়ের ছেলে, বিলের কাছাকাছি বসতি, এই আ’লচোরার গল্প পঞ্চানন আশৈশব শুনিয়া আসিতেছে। আ’লচোরা একরকম অপদেবতা, ভূত-প্রেতের জ্ঞাতিগোষ্ঠি হইবে হয়ত, তাহাদেরই মত মানুষের রক্তের উপর ঝোঁকটা কিছু বেশী। শিকারও বছরে জোটে নিতান্ত মন্দ নয়। আরও হয়ত বেশী জুটিত, কিন্তু আ’চোরদের মস্ত অসুবিধা এই যে কিছুতেই ডাঙায় উঠিয়া আসিতে পারে না। বিলের যে-অংশ বড় নাবাল, কয়টা খাল ডালপালা মেলিয়া চলিয়া গিয়াছে এবং বারমাসের মধ্যে কখনও জল শুকায় না তাহারই নিকটবর্তি অঞ্চলে সারারাত্রি ইহাৱা শিকারের সন্ধানে বিয়া ( ১১৩ ) দেবীকিশােরী বেড়ায়। মুখের ভিতরে দাউ দাউ করিয়া আগুন জ্বলে, যখন মুখ মেলে সেই আগুনের হল্কা বাহির হইয়া আসে, মুখ বন্ধ করিলে আগুন আর দেখা যায় না। যদি কোন পথিক তেপান্তরের বিলে রাত্রিবেলা একবার পথ হারাইয়া ফেলে আ’লচোররা অমনি তাহা বুঝিতে পারে, দলে দলে নানাদিকে মুখ মেলিয়া আগুন জালাইয়া পথহারাকে আরও বিভ্রান্ত করিয়া তােলে। পথিক মনে করে, বুঝি সেই দিকে গ্রাম, মানুষের বসতি—তা নহিলে আগুন জ্বলি- তেছে কেন? আকুল হইয়া ছুটিয়া যায়। হঠাৎ সামনের আগুন নিভিয়া অন্ধকার হয়, পিছনে খানিক দূরে জ্বলিয়া উঠে। আশায় আগ্রহে আবার সে সেই দিকে ছুটে। ছুটে। এমনি করিয়া নির্জন নিশীথে ছুটাছুটি করিয়া বেড়ায় আর আ’লচোৱা ভুলাইয়া ভুলাইয়া ক্রমশঃ তাহাকে জলার কাছাকাছি লইয়া ফেলে। তারপর ভয়ে ভয়ে ক্লান্তিতে শক্ত হইয়া যদি একবার মাটিতে পড়িয়া গিয়াছে-- আর রক্ষা নাই—অমনি মুহূর্তে রক্ত-বুভুক্ষু অপযােনির দল চারিদি হইতে জড়াইয়া ধরিয়া তাহার রক্ত শুষিতে আরম্ভ করে। রাত্রিকালে বহুবিস্তৃত বিলের মাঝখানে, যেখানে কাদির চেঁচাইয়া গলা ফাটাইয়া ফেলিলেও মানুষের সাড়া মেলে না, কেব সুবিপুল নিঃসঙ্গত: হিমশীতল বাতাসে মিলিয়া থমথম করিতে থাকে হঠাৎ খানিক দূরে আলাে দেখিলে বিপন্ন মানুষের সুদৃঢ় ধারণ হয়, উহা নিশ্চয় গ্রামের আলাে। কোটা গ্রামের আলাে আ কোষ্টা যে জলাভূমির, নজর করিয়া তাহা চিনিবার উপায় নাই ( ১১৪ ) আলেয়া কিন্তু চিনিবার একটা উপায় সর্বমঙ্গলা মহালক্ষী সদয় হইয়া করিয়া দিয়াছেন। কোন্ কালে কি কারণে তুষ্ট হইয়া তিনি বর দিয়াছিলেন, সেই অবধি তাঁর বাহন পেঁচা সমস্ত রাত্রি জাগিয়া জাগিয়া বিল পাহারা দেয়। আ’লচোরার পিছনে যদি কেহ ছুটে তমনি নিশ্চয় তাহার মাথার উপর পেঁচা ডাকিয়া উঠিবে তবে আতঙ্কে বিহ্বল হইয়া সকলে এই সঙ্কেত ধরিতে পারে না। এমন অনেক দিন হইয়া থাকে, নিস্তব্ধ গভীর রাত্রি, আশ- পাশের সমস্ত অঞ্চল নিযুপ্ত হইয়া পড়িয়াছে, সেই সময়ে হয়ত কোন গ্রাম-জননী হঠাৎ জাগিয়া উঠিয়া শুনিতে পান বিলের দিক হইতে লক্ষীপেঁচার কর্কশ আওয়াজ আসিতেছে। কোন এক অপরিচিত দুর্ভাগ্য পথিকের বিপদ আশঙ্কা করিয়া তাহার বুক কঁপিয়া উঠে। বিছানার উপর উঠিয়া বসিয়া আকুল কণ্ঠে অনেকক্ষণ ডাকিতে থাকেন—নারায়ণ! নারায়ণ!... ইহার পর চলিতে চলিতে আ’লচোরার প্রসঙ্গ হইতে লাগিল। পঞ্চানন তার কলেজে-পড়া বিদ্যা অনুসারে বুঝাইবার চেষ্টা করিতেছিল যে এই আলেয়া এক রকম বাতাস, তাহাদের পেটে চোরাবুদ্ধি কিছু নাই ; কিন্তু অপর পক্ষ বিশ্বাস করিতেছিল না। এইবার বাড়ির কাছাকাছি আসিয়া সে চুপ করিল, হাঠাৎ মনে অন্যপ্রকার আশঙ্কা জাগিতে লাগিল। এখন রাত্রি কত হইয়াছে কে জানে ? আবার আগের দিনের মত কাণ্ড ঘটিয়া না বসে। ( ১১৫ ) দেবীকিশােরী বাড়ি আসিয়া খাওয়া-দাওয়া সারিয়া সে তার তিলার্ধ দেরি করিল না, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকিবার মতলবে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে এমন সময়ে বড়দাদা কানের কাছে ফিস ফিস্ করিয়া বলিলেন- মাছগুলাে নিয়ে এলে এখন কোটা হচ্ছে--নজর রেখে, বুঝলে ? যত পাজীলােক নিয়ে কারবার রাগে পঞ্চাননের ব্ৰহ্মরন্ধ অবধি জুলিয়া উঠিল। কিন্তু সে রাগ যে প্রকাশ করিবার নয়। বলিল—-আমার বসবার যাে নেই, মাথা ধরেছে- সমস্ত দিন জেলেদের সঙ্গে যে-রোদে-রােদে ঘুরিয়াছে তাহাতে মাথাধরা বিচিত্র নয়। কাতর অবস্থা দেখিয়া বড়দাদা বলিলেন-- তবে একটুখানি দাড়াও, খেয়ে আসি দুটো বড়দাদার আবার তামাকের অভ্যাস আছে, খাওয়া শেষ করিয়া এক ছিলিম সাজিয়া লইয়া অবশেষে ধীরে-সুস্থে আসিয়া চৌকির উপর বসিলেন। তখন সে ছুটি পাইল। ঘরের প্রবেশ দরজায় দাঁড়াইরা যে দৃশ্য পঞ্চানন দেখিল আগের রাত্রিতেও ঠিক তাই দেখিয়াছিল। সুষমা শয্যার উপর যথারীতি নিস্পন্দভাবে লম্ববান। কুলুঙ্গির মধ্যে রেড়ির তেলের দীপটি মিট মিট করিয়া জ্বলিতেছে। গত মঙ্গলবারে বিবাহ হইয়াছে, নববধু আসিয়া পৌছিয়াছে মাত্র তিন দিন। ঠিক অন্যান্য বধূর মত সুষমা নয়, লজ্জা সরম যেন কিছু কম। কথাবার্তা কহিবার ফাক বড় বেশী এখনও মিলে নাই ; ( ১১৬ ) আলেয়া সেই পরশু রাত্রে বেড়ার ধারে এখানে-ওখানে আড়িপাতা মেয়ে- ছেলের কান বাঁচাইয়া সামান্য যা দুই চারিটি হইয়াছে তাহাবই মধ্যে লক্ষ্য করিয়াছে কথা বলিতে গিয়া সুষমা ঘাড় নাড়িয়া একরকম ভঙ্গী করে, সে দেখিতে বড় মজা। কিন্তু কাল উহাকে যে কি ঘুমে ধরিয়াছিল, সারারাত্রির মধ্যে কিছুতে চোখ মেলিল । আজও এই দশা। খানিক এমনি দাঁড়াইয়া থাকিয়া তারপর জোরে জোরে চটি জুতার শব্দ করিয়া পঞ্চানন খাট অবধি গেল। শুইতে গিয়াও আবার শুইল না, হঠাৎ পাঠলিপা বাড়িয়া উঠিল। মেডিকেল কলেজে থার্ড ইয়ারে সে পড়ে। প্রদীপ উস্কাইয়া কুলুঙ্গি হইতে দেলকো-সুদ্ধ বিছানার পাশে রাখিল এবং মিনিট খানেক ধরিয়া মােটা একখানা ডাক্তারী বই টানিয়া লইয়া পড়িতে লাগিল। যেখানে সে প্রদীপ রাখিয়াছে ঠিক তাহার পাশটিতে সুষমা চোখ বুজিয়া পড়িয়া রহিয়াছে। গােড়ায় তাহার ভয়ঙ্কর রাগ হইয়াছিল, কিন্তু চাহিতে চাহিতে সেই রাগ গিয়া হঠাৎ অনুকম্পায় বুক ভরিয়া আহা, নিতান্ত অসহায়ের মত করুণ মুখখানি উহার, কতটুকুই বা আর বয়স, ভিন্ন জায়গায় আসিয়াছে••• চেনা জানা কাহাকেও দেখিতে পায় না...সারাদিন হয়ত মুখ শুকনা করিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়, কাজকর্মের ভিড়ে কেউ নজর রাখে না.•• এখন কেমন একেবারে বিভাের হইয়া ঘুমাইতেছে ! সবুজ রঙের শাড়ীখানি সুন্দর সুগৌর ছােট তনুটিকে বেষ্টন করিয়া আছে, উঠিল। ( ১১৭ ) দেবীকিশােরী সর্বাঙ্গে গহনার বাহুল্য প্রদীপের ক্ষীণালােকে ঝিকমিক করিতেছে, খোপা এলােমেলাে হইয়া কয়েক গােছা চুল খাট হইতে মাটিতে ঝুলিয়া পড়িয়াছে। অতি যত্নে চুলগুলি লইয়া, কি খেয়াল হইল, সুষমার মুখের দু-পাশ দিয়া পটুয়ার মত যেন প্রতিমা সাজাইতে লাগিল। আরও যে কি করিত বলা যায় না, কিন্তু এই সময়ে কেমন সন্দেহ হইল সুষমা ঘুমায় নাই, চোখ মিটমিট করিয়া তাহাকে এক একবার দেখিয়া লইতেছে। ওঠাৎ ফিক করিয়া একটু হাসি। পঞ্চানন তাড়াতাড়ি চুল ছাড়িয়া মুখ ফিরাইয়া পুস্তকে মন দিল, আর ওদিকে বিছানার উপর উঠিয়া বসিয়া খিল খিল করিয়া হাসিতে হাসিতে সুষমা যেন ফাটিয়া পড়িতে লাগিল। গভীর মনােযেগের সহিত পঞ্চাননের অধ্যয়ন চলিয়াছে, দুষ্ট মেয়ে ফু দিয়া প্রদীপ নিবাইয়া আবার হাসিতে সুরু করিল। দক্ষিণের জানালা খােল, ঘরময় জ্যোৎস্না লুটাইয়া পড়িল। বই বন্দ করিয়া পঞ্চানন কহিল--যাঃ পড়তে দিলে না-- সুষমা কহিল--ইস, তা বই কি? পড়াশুনাে যা তােমার--- সব দেখেছি, দেখেছি। তােমার বিদ্যে হবে না হাতী হবে- পঞ্চানন যেন ভারী চিন্তিত হইয়া পড়িল। বলিল—হবে না ? সর্বনাশ! তাহলে উপায় ? সুষমা কহিল—উপায় আর কি ? মাছ ধরে খেও—বলিয়া সেই অপরূপ ভঙ্গীতে মুখ নাড়াইয়া ছড়া আবৃত্তি করিতে লাগিল- - ( ১১৮ ) আলেয়া লিখিব পড়িব মরিব দুঃখে, মৎস্য মারিব, খাইব সুখে পঞ্চানন কহিল—তাহলে মাছ ধরে খাওয়া ছাড়া আর অন্য উপায় নেই ? ও সুষমা, আজকে মাছ ধরে এনেছি--এই এত বড় বড়—দেখেছ ত? ছাই দেখেছ, তুমি তখন নাক ডাকাচ্ছিলে তার বধূ প্রতিবাদ করিয়া কহিলনা, দেখিনি আবার। তুমি আসা মাত্তোর দেখে এসেছি। কতক্ষণ ধরে দেখেছি—ঠিক তােমার পাশটিতে দাড়িয়ে। বল ত কোথায় ? পঞ্চানন সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল—কোথায় ? বড় কঁঠাল গাছটার আড়ালে। তুমি যখন মাছ-কোটার সময় চৌকীর উপর বসে ছিলে তখনও দাড়িয়ে আছি, কেউ দেখতে পেল না কি সর্বনাশ! যে বনজঙ্গল, স্বচ্ছন্দে সাপ-টাপ থাকিতে পারিত। লােকে দেখিলেই বা বলিত কি ? পঞ্চানন কহিল- ছি ছি, নতুন বউ তুমি—তােমার কি এতটুকু বুদ্ধি জ্ঞান নেই? ঐ রকম যায় কখনও ? সুষমা তাহার মুখের দিকে বড় বড় চোখ দুটি মেলিয়া জিজ্ঞাসা করিল-যেতে নেই ? নীরস কণ্ঠে পঞ্চানন কহিল—এও শিখিয়ে দিতে হবে ? এরই মধ্যে বাড়িতে আত্মীয়-কুটুম্বর মধ্যে যে ঢি ঢি পড়ে যাচ্ছে, সবাই বলছে বউ বেহায়া বেলাজ- ( ১১৯ )
দেবীকিশােরী
==
কথাটা নিতান্ত মিথ্যা নয়। শাশুড়ীর নিকট হইতে আজও এই
কারণে বধূর গোপন তর্জন লাভ হইয়াছে। মুখখানি অত্যন্ত ম্লান
করিয়া সুষমা নীচের দিকে চাহিয়া রহিল, কোন কথা কহিল না।
পঞ্চানন বলিতে লাগিল—আর কক্ষপণা কোন দিন আমন যেও
-বুঝলে ? তােমার বাপের বাড়ির লােক সব কি রকম ?
কেউ বলেও দেয় নি ?
সুষমা কি বলিতে গেল, কিন্তু অনেকক্ষণ বলিতে পারিল না।
ঠোট কাপিতে লাগিল। শেষে কহিল—তােমার পায়ে পড়ি,
আর বােকো না; মা আমার নেই যে—বলিতে বলিতে একেবারে
কাঁদিয়া ফেলিল।
এইটুকুতেই যে কেহ কঁদিতে পারে পঞ্চানন তাহা ভাবে নাই।
ভারী অপ্রতিভ হইল। বাস্তবিক ইহার মা নাই যে। সংসারের
কাণ্ডজ্ঞানহীন এক ফোটা অবােধ মেয়ে, আশৈশব বাপের আদরে
মানুষ, কেই বা তাহাকে বুঝাইয়া সমঝাইয়া শ্বশুরবাড়ি পাঠাইবে ?
মা থাকিলে কি এমনটি হইতে পারিত? একা বাপ তাহার পক্ষে
যে মা বাপ দুজন হইয়া দাঁড়াইয়াছেন, জীবনে এই সর্বপ্রথম সেই
বাপকে ছাড়িয়া পরের বাড়ি আসিয়াছে। যখন বরকনে বিদায়
হইয়া আসে তাহার ঘণ্টাখানেক আগে বাপে মেয়ে একথালে
করিয়া দিতে দিতে ভাত খাইতেছিল, হঠাৎ পঞ্চানন সেখানে
গিয়া পড়ে। শ্বশুর তাহাতে অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া পড়িয়াছিলেন।
সই সব পঞ্চাননের মনে পড়িতে লাগিল।
( ১২০ )
আলেয়া
এই অবস্থায় কি যে করিবে হঠাৎ বুঝিতে পারিল না।
আবার আলাে জ্বালিল। তারপর সস্নেহে দুই তিনবার সে সুষমার
চোখের জল মুছাইয়া দিল। আস্তে আস্তে কহিল--আমি আর
বকবাে না, সত্যি আর বকবাে না কোনদিন--বলিয়া কোলের উপর
বধূর মাথা টানিয়া লইল।
সুষমার কান্না আর থামে না।
পঞ্চানন কহিতে লাগিল--বাপরে বাপ, এক কথা কখন
কি বলেছি—বললাম ত যে আর কোনােদিন কিছু বলব না---বলিয়া
হাড় নীচু করিয়া তাহার মুখের কাছে মুখ আনিয়া জিজ্ঞাসা করিল,
---া সুষমা, আমি বকেছি বলে এখনও কষ্ট হচ্ছে তােমার ?
সুষমা ঘাড় নাড়িয়া জানাইলনা।
নিরবে সজল চক্ষুমেলিয়া সে স্বামীর দিকে তাকাইয়া রহিল।
পঞ্চানন কহিল-বাবার জন্যে প্রাণ পুড়ছে না ?
অমনি পঞ্চাননের কোলের মধ্যে আবার মুখ ও জিয়া পড়িয়া
সে কাঁদিতে আরম্ভ করিল।
পঞ্চানন কহিল--এই সবে তিনটে দিন এসেছ---কালকে
তােমার বউভাত, কত লােকজন আসবে, আমােদ-আহলাদ হবে--
এ সব চুকে যাক, তারপর আমি নিজে রেখে আত্ব। অমন
ক'রে কঁদে না। কই, চুপ কর। তবু?
সুষমা বলিতে লাগিল-না, আমি যাব—গিয়ে তক্ষুনি চলে
( ১২১ )
দেবীকিশােরী
আস--একবার বাবাকে দেখেই অমনি চলে আসব—বাবা ঠিক
মরে গেছে-
পঞ্চানন হাসিয়া উঠিল। বলিল—মরবেন কেন ? বালাই
যাট। তােমার বাপের বাড়ি কি এখানে যে বললেই অমনি ফস্
করে যাওয়া যায় ?
জানালার ওধারে একখানা উলুর জমি ছাড়াইলেই জ্যোৎস্না-
প্লাবিত বিল। সেইদিকে আঙুল তুলিয়া সুষমা কহিল—কেন
ওই ত ঐ বিলের ওপার, আমি বুঝি জানি নে ? আসবার সময়
পাল্কীতে বসে বসে সমস্ত পথ দেখে এসেছি--
পঞ্চানন কহিল-বিলটাই হবে যে পাঁচ-ছ কোশ--অত বড়
বিল এ জেলায় আর নেই----
অবুঝ বধূ তবু জেদ ধরিয়া কাঁদিতে লাগিল—না, ও তােমার
মিছে কথা—আমি যাব—যাব—তােমার দুখানি পায় পড়ি--
বলিয়া সত্য সত্যই পা ধরিতে যায়।
পা সরাইয়া লইয়া গম্ভীরভাবে পঞ্চানন কহিল--পাগল না
কি ? লােকে বলবে কি ?শােও ভাল হয়ে শােও—এমন ত
দেখিনি কখনও
ধমক খাইয়া শিষ্ট শান্ত হইয়া সুষমা শুইয়া পড়িল। একে-
বারে চুপচাপ।
দেওয়ালের ঘড়ি টট করিয়া চলিতেছে।
পঞ্চানন তাকাইয়া দেখিল। চালের গায়ে আড়ার ফাঁকে
গােলাকার হইয়া প্রদীপের আলাে পড়িয়াছে, ঘনপল্লব চোখ দুটি
( ১২২ )
আলেয়া একদৃষ্টে সেইদিকে মেলিয়া সুষমা চুপ করিয়া শুইয়া আছে ! এরকম মৌনতা বেশীক্ষণ সহ্য হয় না। রাগ করিয়া কহিল- ওঠ, চল--এক্ষুনি রেখে আসি- সুষমা কহিল—যাবে ? অমনি তড়াক করিয়া সে উঠিয়া দাড়াইল। কহিল--কই, তুমি ওঠ- এমনি নিরীহ বােকা যে আর একজন রাগ করিয়াছে, তাহাও বুঝিবার বুদ্ধি নাই, সুষমা বলিল—চল না। পঞ্চাননের রাগ থাকিল না, হাসিয়া ফেলিল। কহিল ---এখন ঘুম পাচ্ছে, কাল সকালে যাব। সুষমা কঁাদকদ হইয়া কহিল-~-এই যে বললে এক্ষুনি যাবে পঞ্চানন কহিল--আচ্ছা তুমি কাপড়চোপড় পরে নাও~~~ বাক্স পেটরা গােছও, আমি ততক্ষণ এক ঘুম ঘুমিয়ে নি-- এবার তাহার সন্দেহ হইল; বলিল-মিছে কথা, তুমি যাবে না- পঞ্চানন কহিল--ঘুম পাচ্ছে, এখন যাব না-কাল সক্কালে নিয়ে যাব। দেখেছ ত কত খেটেছি? দুপুরের রােদ্দর গিয়েছে মাথার উপর দিয়ে। এমন মাথা ধরেছে, উঃ—বলিয়া সে চোখ বুজিল। একটু পরে পঞ্চানন চোখ বুজিয়া বুজিয়াই অনুভব করিতে ( ১২৩ ) দেবীকিশোরী লাগিল, বিন মিন করিয়া গহনা বাজাইয়া সুষমা পাশে আসিয়া বসিয়াছে। তারপর তাহার অত্যন্ত কোমল কচি আঙুল কটি দিয়া সে তাহার কপালের দুই পাশ টিপিয়া দিতে লাগিল। চুপ করিয়া খানিকক্ষণ পঞ্চানন উপভােগ করিল শেষে চোখ মেলিয়া কহিল-- আর না, থাক এখন--- -আর একটু দিই। -কই, কাপড়চোপড় পরা হ’ল তােমার ? এখন ২াবে না ? সুষমা কহিল---না, কালকে যাব। এখন তােমার কষ্ট হচ্ছে সেদিন পঞ্চানন ঘুমাইয়া পড়িলেও কত রাত্রি অবধি সুষমা জাগিয়া বসিয়া রহিল। চুপি চুপি জানালার ধারে গিয় বাহিরের দিকে তাকাইয়া রহিল। উলুক্ষেতের এক দিকে একটি শীর্ণ নারিকেল গাছ, গোড়ায় রাখাল-ছিটার ঝােপ, তার উপরে তেলাকুচা ও বন-পুঁয়ের লতা দীর্ঘ গাছটিকে জড়াইয়া জড়াইয়া অনেক দূর অবধি উঠিয়াছে। সুমুখ জ্যোৎস্না রাত্রি। ক্রমে চঁাদ ডুবিয়া আস্তে আস্তে চারিদিক অন্ধকার হইয়া আসিতে লাগিল। আকাশের তারা উজ্জ্বলতর হইল এবং সুষমার দৃষ্টির সম্মুখে প্রায়ান্ধকার বিল সুবিপুল দেই এলাইয়া নিঃশব্দে পড়িয়া রহিল। বিলের ঐ ওপারে লাল ভেরেণ্ডায় ঘেরা উঠান ছাড়াইয়া গােল সিড়ি ছাড়াইয়া চিলে কুকুরীর পাশে দোতলার ঘরটিতে তার বাবা এতক্ষণ কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। ( ১২৪ )
লেয়।
;
ভাের হইতে না হইতে কাজের বাড়িতে হৈ চৈ ডাকাকের
অন্ত নাই। পঞ্চাননের ধুম ভাঙিবার অনেক আগে সুষমা উঠিয়
চলিয়া গিয়াছে। নানা কাজে তানেক বার পঞ্চাননকে বাড়ির
মধ্যে যাওয়া-আসা করিতে হইল, একবার গােয়ালাদের দইয়ের
হাঁড়ি রাখিবার জায়গা দেখাইয়া দিতে, একবার ঘি বাহির করিয়া
দিতে; আর একবার কে-একজন বুবি পান চাহিয়াছিল, পান
লইবার জন্য নিজেই সে সকলের আগে ছুটাছুটি করিয়া আসিল।
আসিয়া এঘর-ওঘর পান খুঁজিতে খুঁজিতে হঠাৎ দেখিল ভাড়ার
ঘরের পাশে ছােট কামরাটিতে সুষমা আপনার মনে বসিয়া সন্দেশ
পাকাইতেছে। ছােট্ট ছােট্ট দুটি হাত-~-চুড়ি ঝুন ঝুন করিতেছে।
শাড়ীর খানিকটা মেঝের ধূলায় মাখামাখি, সেদিকে নজরই নাই।
ঠিক পিছনটিতে গিয়া পঞ্চানন চুপি চুপি বলিল--আমায়
একটা দাও না
সুষমা প্রথমটা চমকাইয়া উঠিল। তারপর বলিল-~-না,
ভােজের আগ ভেঙে তমন
কিন্তু কে কার কথা শােনে ? পঞ্চানন খ করিয়া গোটা-দুই
সন্দেশ তুলিয়া লইয়াই দৌড়।
সুষমা চেঁচাইয়া উঠিল—-বলে দেব, দিয়ে সও----ওদিদি,
দিদিগাে, সব চুরি হয়ে গেল--
পঞ্চানন ফিরিয়া দাঁড়াইয়া কহিল,-চেঁচাচ্ছো? নতুন বউ
তুমি ?
-
( ১২৫ )
দেবীকিশােরী
এই সময়ে বড়বৌদিদিও কোথা হইতে আসিয়া হাজির।
বলিলেন–কি রে ছােট বউ, কি হল ?
ছােট বউ ততক্ষণে সুদীর্ঘ ঘােমটা টানিয়া লজ্জাবতী হইয়া
গিয়াছে ।
পঞ্চানন নিতান্ত ভাল মানুষের মত মুখ করিয়া কহিল-ও
একলা বসে সন্দেশ পাকাচ্ছিল আর খাচ্ছিল বৌদি, আমি এসে
তাই দেখলাম।
বড় বধূ মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিলেন—ত খাক ওর
পেছনে তােমার আর লাগতে হবে না, নিজের কাজে যাও
দিকি--
পঞ্চানন বলিল---বিশ্বাস করলে না? এখনও গাল বােঝাই,
তাই কথা বলতে পারছে না।
বড়ধু কৃত্রিম রাগ দেখাইয়া বলিলেন-যাও তুমি এখান থেকে
বছি। বলিয়া হাসিয়া ফেলিলেন বলিলেন—ওর বউভাতের
নেমন্তন্ন, ও মােটে খাবে না বুঝি ? সেই কোন সাল থেকে
লক্ষীর মত আমার কত কাজ করে দিচ্ছে। তুমি কাজ কর
দিদি, ওর কথা শুনাে না।
ঘােমটার মধ্যে সুষমার তখন ভারী মুস্কিল। দিদি হয়ত
সত্য সত্যই তাহাকে সন্দেশচোর বলিয়া ভাবিলেন, কিন্তু আস্থা
চোর যে কে তাহা ঐ সাধুমানুষটির হাতের মুঠা খুলিলেই ধরা
পড়িবে। একথা জানাইয়া দিবার নিতান্ত দরকার যে গাল তাহার
( ১২৬ )
আলেয়া
বােঝাই নয়, সে কথা কহিতে পারিতেছে না—নতুন বউ হইয়া
বরের সামনে কথা সে বলে কি করিয়া ?
বাহিরে পান পৌছাইয়া পঞ্চানন আবার ফিরিয়া আসিল।
এবার সুষমা সাবধান হইয়াছে। পায়ের শব্দ পাইয়া সমস্ত সন্দেশ
হাঁড়িতে তুলিয়া ফেলিল।
পঞ্চানন কহিল---শােন----
কাপড়ের নীচে হাঁড়িটি অতি সাবধানে ঢাকিয়া সুষমা মুখ
তুলিয়া চাহিল।
--সকাল বেলা সেই যে তােমায় বাপের বাড়ি নিয়ে যাবার
কথা ছিল, যাও ত চল—-
সুষমা বিরক্ত হইয়া কহিল...দেখছ না, কাজ করছি--
-একাজ হয়ে গেলে ?
তারপর কিসমিস বাছতে হবে, দিদি বলে দিয়েছেন।
তার পরে ?
সুষমা গিন্নীমানুষের মত পরম গম্ভীরভাবে কহিল-তারপরে ?
তােমার মােটে বুদ্ধি নেই। কাজকর্মের বাড়ি, কত লােকজন
আসবে, খাওয়া-দাওয়া হবে—আমার কি আজ মরবার ফাক
আছে ?
বলিবার ধরণ দেখিয়া পঞ্চাননের বড় কৌতুক লাগিতেছিল।
বলিল--তাহলে বল যে মােটেই বাপের বাড়ি যাবে না। আমার
দোষ নেই তবে-
===
( ১২৭ )
দেবীকিশােরী এবার সুষমা সহসা কোন জবাব দিল না, কি ভাবিয়ে লাগিল। তারপর বলিল—এখন এত সব কাজ ফেলে কেমন করে যাই বল ত ? রাত্তিরে যাব—ঠিক যাৰ- -তখন কিন্তু আমার ঘুম পাবে। -বলিয়া সুষমা তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া সকরুণ মিনতির স্বরে কহিল--রাত্তির হলে আমার বড়ড় মন কেমন করে, সত্যি বলছি—তুমি আমায় নিয়ে যেও বােকা বধূ টের পায় নাই কথাবার্তার মধ্যে কখন হাঁড়ির ঢাকনি সরিয়া গিয়াছে। পঞ্চানন সুযােগ বুঝিয়া ছো মারিয়া আবার একটা সন্দেশ তুলিয়া লইয়া ছুটিল। এই করিতে সে আসিয়াছিল। দরজার কাছে গিয়া বলিল,-বড় যে সাবধান তুমি, কেমন ? কিন্তু সুষমা একেবারে অপরাধ আমলে আনিল না, আগের কথাই পুনরাবৃত্তি করিল–ওগাে, যাবে তা নিয়ে? পঞ্চানন কহিল–তােমার দাদাকে বলে দেখো, তিনি ত আসবেন আজ নেমন্তন্নে। আমার ঘুম পায়। বিকাল বেলা সুষমা চুল বাঁধিয়া কপালে টিপ আঁটিয়া মহাআড়ম্বরে আলতা পরিতে বসিয়াছে এমন সময়ে নির্মল আসিয়া সরাসরি বাড়ির মধ্যে ঢুকিল। আলতা ফেলিয়া উচ্ছ্বসিত আনন্দে সে বলিতে লাগিল—এসেছ দাদামণি দেখ দিকি আমি কত ভেবে মরি--বেলা যায় তবু আসতে হয় না--বাবা এসেছেন ? { ১২৮ ) আলেয়া বলিতে বলিতে আগাইয়া আসিয়া দেখে পঞ্চানন তাহার পিছনে দাড়াইয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছে । তাড়াতাড়ি ঘোমটা টানিয় সুষা পিছাইয়া গেল। পঞ্চানন বলিল—আমি আর কেন দাড়িয়ে দাড়িয়ে অসুবিধে ঘটাই, আমি চললাম— বলিয়া চলিয়া যাইতেছিল, আবার ফিরিয়া কহিল—আর সে কথাটারও একটা বােঝাপড়া যেন হয়ে যায় ভাই, সন্ধ্যে হলেই তােমার বােনটি বাপের বাড়ির বায়না ধরেন---সারারাত কেঁদে কেঁদে চোখ ফোলান--আমায় ঘুমুতে দেন না- সুষমার মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলাইতে বুলাইতে নির্মল জিজ্ঞাসা করিল—সত্যিরে ? অ খুকী সত্যি? সুষমা চাহিয়া দেখিল পঞ্চানন চলিয়া গিয়াছে। ঘাড় নাড়িয়া মহা প্রতিবাদ করিতে লাগিল, “না দাদা, সব মিছে কথা---অমন মিথুক তুমি মােটে দেখ নি। আজকে অমনি সন্দেশ নিয়ে বলিতে বলিতে কথার মাঝখানে জিজ্ঞাসা করিল–বাবা এসেছেন ? নিৰ্ম্মল কহিল—বাবা আসবেন কি করে ? মেয়ের বাড়িতে এলে আর-জন্মে কি হয় তা শুনি নি ? সুষমা দুই হাতে নিৰ্ম্মলের বাহু জড়াইয়া কঁাদ-কঁাদ হইয়া কহি-বাবা কি মরে গেছেন ? ও দাদামণি সত্যি কথা বল- অামি খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। নিৰ্ম্মল হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল।-খুকী, কি পাগল ( ১২৯ ) ৯
ननोकि मानो
,
তুই। এই ক’দিন দেখিনি অমনি বুঝি মরে গেল ? তাহলে
আমায় কি এই রকম দেখতিস ?
তখন সুষমা ভয়ানক জেদ ধরিল—-ওরা কেউ আমায় নিয়ে
যাবে না দাদা, মিছে কথা বলে ফাকি দেয়। আমি আজ তােমার
সঙ্গে চ'লে যাব, আজই
হাসিতে হাসিতে নিৰ্ম্মল কহিল--আজই ?
হ্যা-
-~-পাল্কী-টাল্কী করতে হবে না ?
সুষমা বলিল-পাল্কী কি হবে ? ভারী ত পথ, এক ছুটে
যাওয়া যায়। ঐ ত বিলের ওপার—ঐ গাছপালাগুলো যেখানে ।
আমি তােমার পিছু পিছু চলে যাব। রাত্তিরে যাবার সময় আমায়
ডেকো-ডেকোডেকো কিন্তু। ডাকবে ত ?
নিৰ্ম্মল কহিল—আচ্ছা-
দাদা যে এত সহজে রাজী হইয়া গেল, তার উপর হাসি মুখ—-
সুষমা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া অবিশ্বাসের
সুরে বলিতে লাগিল-হু বুঝেছি, তােমার চালাকী—আমায়
বলে তুমি অমনি রাত্তির বেলা সে হবে না, কিছুতেই
হবে না-
খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপার একরকম চুকিয়া গেল, কয়েকজন মাত্র
বাহিরের লােক বাকী ছিল, তাহারাও এইবার বসিয়া গিয়াছে।
( ১৩০ )
আলেয়া নিৰ্ম্মল নূতন দাবা খেলা শিখিয়াছে, পঞ্চাননকে কহিল—আর কি, এইবার একহাত হােক, তুমি ছটা নিয়ে এস যাও- তখন রাত্রি অনেক হইয়াছে, চঁাদ পশ্চিমে ঢলিয়া পড়িয়াছে, খােড়ো ঘরগুলির ছায়া দীর্ঘতর হইয়া উঠান অন্ধকার করিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু নিৰ্ম্মল শুনিল না, একরকম জোর করিয়া তাহাকে পাঠাইয়া দিল। ছক ও বােড়ে লইয়া যাইবার মুখে পঞ্চানন দুষ্টামি করিয়া ঘুমন্ত মানুষের নাক ধরিয়া নাড়া দিল। ধড়মড় করিয়া সুষমা উঠিয়া বসিয়া দুই হাতে চোখ মুছিতে মুছিতে জিজ্ঞাসা করিল- দাদা ? দাদামণি চলে গেছে না কি ? পঞ্চানন জবাব দিল না, সকৌতুক স্নেহে ঢাহিয়া রহিল। সুষমা ভয়ানক ব্যস্ত হইয়া বলিতে লাগিল---কখন-কতক্ষণ বেরিয়েছেন ? পঞ্চানন বলিল—তুমি যেমন ঘুমিয়ে পড়েছিলে। আর ঘুমুবে ? আচ্ছা, আমি আসছি এখনি--শােও—বলিয়া হাসিতে হাসিতে বাহির হইয়া গেল। কিন্তু সুষমা শুইল না। ঘুমচোখে তাড়াতাড়ি উঠিয়া দক্ষিণের দরজা খুলিয়া ফেলিল। সামনেই উলুক্ষেতের সীমান্ত দিয়া বৈশাখ মাসের শস্যহীন শুষ্ক শূন্য বিল স্বচ্ছ জ্যোৎস্নায় ঝম করিতেছে। মাঝে মাঝে এখানে ওখানে উচু টিলা, তার উপর দীর্ঘাকর পত্ৰখন দুই চারিটা গাছ। চৌকাঠের উপর দাড়াইয়া সেই জ্যোৎস্নার ১৩১ দেবীকিশোরী } আলােকে সুষম দেখিল—স্পষ্টই দেখিতে পাইল--কিছুদূরে যে বড় টিলাটা তাহারই ছায়ায় ছায়ায় কে-একজন ধীরে ধীরে যেন ক্রমশঃ দূরে চলিয়া যাইতেছে, সাদা কাপড়ের উপর জ্যোৎস্না পড়িয়াছে। ঘর হইতে এক দৌড়ে ছুটিয়া উলুক্ষেত ছাড়াইয়া বিল কিনারায় দাড়াইয়া সে ভাল করিয়া দেখিতে লাগিল। মুক্ত বাতাসে আঁচল উড়িতে লাগিল। সে তাকাইয়া তাকাইয়া দেখিল -না, এখন কেহ চলিতেছে না, কিন্তু ঐ যে—নিশ্চয় সেই মানু- ষটাই খেজুর-গুড়ির আড়ালে বসিয়া তাহাকে দেখিতেছে, তাহাকে দেখিয়াই ঠিক ঐখানে অমনি বসিয়া পড়িয়াছে। দাদামণি গাে~ বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে বিল ভাঙিয়া সে ছুটিল। ছুটিতে ছুটিতে ছায়াচ্ছন্ন টিলার উপর গিয়া উঠিল। কেহ কোথাও নাই, গাছের কাকে একটুখানি জ্যোৎস্না পড়িয়াছে, গাছ দুলিতেছে, ছায়া কঁপিতেছে। তবু বিশাস হইল না, বার-বার এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করিয়া দেখিতে লাগিল। হঠাৎ মনে হইল, সে ভুল জায়গায় আসিয়া পড়িয়াছে, এ সে জায়গা নয়, এ গাছ নয়, আরও ডাইনে ...ঐ...ঐ...এখনও ঠিক তেমনি বসিয়া আছে। সারি সারি পাঁচ সাতটা কুয়া, পাড়ের উপর শােলার ঝােপ, ঝি ঝি ডাকিতেছে...ও দাদা, ও দাদা গেঃ, বলিয়া কঁদিতে কঁদিতে সেই ঝােপ জঙ্গলের পাশ দিয়া নিস্তব্ধ রাত্রির মধ্যমে বিলের ভিতর দিয়া সে চলিল। পিছনে গ্রামান্তরালে আস্তে আস্তে চাদ ডুবিল, দূরে কোথায় শিয়াল ডাকিতে লাগিল, চারিদিক অস্পষ্ট হইয়া আসিল। হঠাৎ সুষমার আলেয়া সর্বদেহ কঁপিয়া উঠিল, মাথার উপর দিয়া শোঁ শোঁ করিয়া এক ঝাক কালাে কালাে পাখী উড়িয়া যাইতেছে। আর না আগাইয়া সে ফিরিয়া যাইবার পথ খুঁজিতে লাগিল। কিন্তু পথ-রেখা নাই। ধানক্ষেতের উপর দিয়া ছুটিয়া আসিয়াছে, সেখানে যাতায়াতের পর পড়ে নাই, কোন্ দিকে গ্রাম আবছা অন্ধকারে কিছুই বােঝা যাইতে ছিল না; পিছন ফিরিয়া কেবল দাদা-দাদা-—বলিয়া গলা ফাটাইয়া চীৎকার করিতে লাগিল। হঠাৎ দেখিতে পাইল—আলাে জ্বলিতেছে...কাহাৱা যেন লণ্ঠন জ্বালিয়া এই দিকে আসিতেছে, এক, দুই, তিন, চার...অনেকগুলি। অনেকগুলি আলো সারি বাঁধিয়া নিকটবর্তী হইতে লাগিল। সুষমার কণ্ঠরােধ হইল। সমস্ত নিরীক্ষণ-শক্তি দুই চক্ষে পুঞ্জিত করিয়া অন্ধকারের মধ্যে সে দেখিতে লাগিল। বােধ হইল ঐ আলােকের প্রতিটির পিছনে এক একটি সুবিপুল নিকষ-কৃষ্ণ দেহ রহিয়াছে, সারবন্দী আলেয়ারা তাহাকেই লক্ষ্য করিয়া গুটি-গুটি চলিয়া আসিতেছে। কাপিতে কাপিতে প্রাণের আতঙ্কে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারাইয়া সুষমা দৌড়াইতে লাগিল। চাষ আরম্ভের আর দেরী নাই, তাই ক্ষেত সাফ করিতে চাষাবা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরিবার মুখে ধানের শুনা গোড়ায় আগুন ধরাইয়া দিয়া যায়। ছুটিতে ছুটিতে সেই পােয়ালপােড়া ছাই উড়িয়া সুষমার মুখে চোখে পড়িতে লাগিল। একটা ক্ষেতে তখনও ভাল করিয়া আগুন নিবে নাই। এক ঝাপটা বাতাস আসিল আর অমনি এক ( ১৩৩ ) MAFISALE. HOWPG দেবীকির্শেরী সঙ্গে বিশ পঞ্চাশ জায়গায় দাউদাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল । পিছনে তাকাইয়া দেখে সেদিকের আলােগুলি এখনও পিছন ছাড়ে নাই, ধরিয়া ফেলিল আর কি! চোখ বুজিয়া সে সেইখানে বসিয়া পড়িল । অনুভব করিতে লাগিল, তাহাকে ঘিরিয়া ভাহিনে বামে সম্মুখে পিছনে সংখ্যাতীত আগুনের গােল লাফালাফি করিয়া বেড়াইতেছে। সেইখানে সে লুটাইয়া পড়িল। বিলুপ্তাবশেষ চেতনার মধ্যে সুষমা শুনিতে লাগিল, অনেক দূরের এক একটা ডাক-খুকী...খুকী...কাহারা যেন কথা কহিতেছে...অনেকগুলিলােক...চীৎকার, কোলাহল, ব্যস্ততা। সে চোখ মেলিতে পারিল না, সাড়া দিতে পারিল না। কিন্তু চোখ না মেলিয়া দেখিতে লাগিল, বড় বড় কালাে মেটের মত আলেয়ার দল মুখ মেলিয়া দ্রুতবেগে গড়াইয়া গড়াইয়া আসিতেছে, আগুন লাগিয়া সমস্ত বিল জ্বলিতেছে ; সেই আলােকে অস্পষ্ট যেন দেখা যাইতে লাগিল, বিলপারের লাল ভেরেণ্ডার বেড়া, গােল সিঁড়ির একটুখানি, চিলেকোঠা... ( ১৩৪ ) যাও পাখী বলাে তারে- অন্ধকারে চোখের সামনে টাকার অঙ্কগুলা যেন কিলি-বিলি করিয়া বেড়াইতেছে ! তুল আর শুইয়া থাকিতে পারিল না, উঠিয়া আলাে জ্বালিয়া এই পঞ্চমবার দোকানের পাড়া-বহি যোগ দিতে বসিল। দু-এক পাতা উল্টাইয়া সহসা মনে পড়িল, তােরঙ্গের মধ্যেও ত খানকয়েক রসিদ আছে—সেগুলা দেখা হয় নাই, উহার মধ্যে ঐ একাশী টাকার হিসাৰ থাকিতে পারে। উৎকণ্ঠাভরে তাড়াতাড়ি তোরঙ্গ খুলিয়া সমস্ত জিনিষ, টুকিটাকি কাগজ-পত্ৰ উপুড় করিয়া মেজেয় ঢালিল। পাতি পাতি করিয়া তবু হিসাব মিলিল না। হিসাব ভাবিয়া আগ্রহে যাহা তুলিয়া লইল সেটা অনেক পুরানাে একখানা চিঠি নিৰ্ম্মলার লেখা। খুলিয়া দেখে, চিঠিখানি সচিত্র—এক সুন্দরী গােলাপ- ফুলের গাছে চড়িয়া আকাশমুখাে তাকাইয়া আছেন, আকাশে একটি উড়ন্ত পাখী, পাখীর পাখনার নীচে দিয়া দুই লাইন ছাপা কবিতা, সুন্দরীই পন্থাকারে সেই কথাগুলি কহিতেছেন- যাও পাখী, বলাে তারে সে যেন ভােলে না মােরে- বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর নিঃশ্বাস ফেলিয়া মাথায় হাত দিয়া অতুল সেইখানে বসিয়া পড়িল। শেষে দোকানের দরজা খুলিয়া গাঙের ঠাণ্ডা হাওয়ায় পায়চারি করিতে লাগিল। ( ১৩৫ )
দেবীকিশােরী
হট অনেকক্ষণ ভাঙিয়া গিয়াছে। গভীর রাত। গাঙে
এইবার জোয়ার লাগিবে, এই প্রতীক্ষায় ব্যাপারীরা চালার নীচে
অন্ধকারে গল্পগুজব করিতেছে, কেহ-বা ওখানেই পড়িয়া পড়িয়া
ঘুমাইতেছে। ময়রাদের দোকানে গান ও গুপীযন্ত্রের বাজনার আর
তেমন জোর নাই, এইবার থামিবে বােধ হয়।
পাতড়া-খাতায় গরমিল দেখিয়া শ্বশুর কথাকয়টি
বলিয়াছিলেন তাহা অত্যন্ত শান্ত এবং সংক্ষিপ্ত । অন্ধকারে
পায়চারি করিতে করিতে উহা ভাবিতে গিয়া অতুলের চোখ জ্বালা
করিয়া জল আসিল। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ইহাই ত হইল যে ঘর
আলােকরা ছেলে হইয়াছে, তােমরা মেয়েজামাই এখন আবর্জনার
সামিল।
মনে মনে সে বারম্বার বলিতে লাগিল—আর নয়, আর
নয়--অনেক হইয়াছে। এ আশ্রয়ে আর একদিন—একদণ্ড থাকা
চলিবে না, এই হাটুরে নৌকাতেই বিদায় হইয়া যাইতে হইবে।...
ঘরে আসিয়া লম্বা চিঠি লিখিয়া ফেলিল।—আমি চলিলাম,
আপনার টাকা চুরি করি নাই, আপনার দোকানের জন্য কি
রকম প্রাণপাত করিয়াছি তাহা ভাবিয়া দেখিবেন, আপনার তান্ন
গলা দিয়া ঢুকিবে না—এমনি ধরণের কত কি লিখিতে লিখিতে
বালির কাগজের এক ফর্দ ভরিয়া গেল। চিঠিখানা হাতবাক্সের
উপর দোয়াত চাপা দিয়া রাখিয়া তােরঙ্গটি এবং কাপড়, জামা,
চাদর পুটুলি করিয়া লইল। তারপর বদন ব্যাপারীর নৌকার
জিনিষপত্র রাখিয়া আসিয়া ডাকিল—-ও মধু!
( ১৩৬ )
যাও পাখী বলাে তারে
অনেক ডাকাডাকিতে মধুসূদন চোখ মুছিতে মুছিতে উঠিয়া
আসিল
অতুল কহিল--একবার দুয়ােরটা বন্ধ করে দে
মাণিক,
মধুসূদনের বিস্ময়ের আর সীমা রহিল না।--এখন চল্লেন
গানের আড্ডায় ? রাত তা হ'লে আজ কাবার হবে এক্কেবারে ?
ধন্যি আপনি, জামাইবাবু।
হাঁ~-গানের আডডায় যাইতেছে, আজ তাহার আছড় দিবার
দিনই বটে!
হাটুরে নৌকা, ছইয়ের বালাই নাই। আট দশখানা বৈঠা
পড়িতেছে, নৌকা উড়িয়া চলিয়াছে। পাড়ের গাছপালা বাড়ি-
ঘর-দোর অন্ধকারলিপ্ত নির্বাক নিস্তব্ধ প্রেতের মত । এক-এক
ঝাপটা বাতাস আসে আর জোনাকীর ঝাক গাছের পাতা হইতে
পিছলাইয়া খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক উড়িয়া বেড়ায়।
বদন ব্যাপারী বিশেষ ভদ্রতা করিয়া কহিল—আপনি আমাদের
সঙ্গে বসে কষ্ট করবেন কেন বাবু! আপনি ভদ্দোর লােক,
ঐ
সুনের বস্তায় মাথা রেখে শুয়ে পড়ুন আরাম কবে-
সরু বাঁশের মাচা, তার উপর আড় হইয়া শুইয়া পড়া মানে
একরূপ গােলাকার হইয়া পড়িয়া থাকা। হাত-দেড়েক পরিধির
মধ্যে এই ভাবে আরাম করিতে করিতে অতুল ভাবিতে লাগিল
এই চোরের মতন পলাইয়া না আসিয়া শ্বশুরের নিকট সরাসরি
যদি সে বিদায় চাহিত, তিনি কি বলিতেন ?
( ১৩৭ )
দেবীকিশােরী
যাও-কখনও বলিতেন না মুখে ! বড় মিষ্ট ভংখী লােক।
বছর বারাে-তেরাের মধ্যে টিনের ঘর উঠিয়া এত বড় দোতলা
কোঠাবাড়ি হইয়াছে, ঝাউগঞ্জের বাজারে অজি হৃষীকে ৭ হাজরার
জুড়ি নাই, তুলসী মাতোয়ারী এত করিয়া ইহার অর্ধেক খরিদ্দার
জুটাইতে পারে না, সে কেবল ঐ মুখখানির গুণে।...
সাত দিন তার হাট, হাটুরে নৌকা না থাকিলে সীমার-ঘাট
অবধি হাটিয়া যাইতে হয় । অন্যথা নৌকা-ভাড়া বিস্তর। আজ
না গিয়া যদি অতুল আর সাতটা দিন অর্থাৎ আগামী চাট পৰ্যন্তই
থাকিয়া যাইত এবং শ্বশুরকে বলিত-- আমি বাড়ি যাচ্ছি
হৃষীকেশ যাও ---কখনও বলিতেন না নিশ্চয়, তঁাহার সেই
ছাত-বিদারণ হাসি হাসিতেন—ক্ষেপেছ বাবাজী ? আর ক’টা
দিন পরে রামনবমী...সেই সময় দোকানে একটু ই টিয়ে হবে
তার আগে-
তার বার দুই তিন বলিলে অত। আমতা করিতেন; এবং
তারপরেও সহজে ছাড়িতেন না। কন্যা দৌহিত্রীর নাম করিয়া
পুঁটুলি বাঁধিয়া কিছু মিষ্টি সঙ্গে দিয়া দিতেন ; হয়ত কাপড়ও
খান-তিনেক। এবং প্রায়ই যে-কথাটা বলিয়া থাকেন যাইবার কালে
হয়ত আর একবার তাহা শুনাইয়া দিতেন-নিৰ্মলাকে নিয়ে আসব
একবার—শ্রাবণ মাসে। তাকে বুঝিয়ে বলল, ব্যস্ত না হয়।
শ্রাবণের পরশ্রাবণ পৃথিবীর অন্তকাল অবধি আসিবে, সুতরাং
শ্রাবণ মাসের জন্য নিৰ্ম্মলার ব্যস্ত হইবার হেতু कि
( ১৩৮ )
যাও পাখী বলাে তারে
বদন
নীল আকাশের অগণিত নক্ষত্রমালা অতুলের মুখের উপর•••
নৌকার নীচে ছলছলায়মান নদীজল...বৈঠার ছপাৎ ছলাৎ শব্দ...
ঘুমে অতুলের চোখ জড়াইয়া আসিতে লাগিল। ব্যাপারীরা মাঝে-
মাঝে কথাবার্তা কহিতেছে...দশক্রোশ বিশক্রোশ দূর হইতে কাহারা
যেন কি কহিতেছে, কত কি খাপছাড়া ভাবনা ভাবিতে ভাবিতে
অতুল ঘুমাইয়া পড়িল।
রাত থাকিতে থাকিতেই নৌকা ঘাটে লাগিল। এখান হইতে
ষ্টীমারে তারপর ট্রেনে গিয়া সন্ধ্যানগাদ বাড়ি পৌছিতে হয় ।
মাঝি ডাকিতে লাগিল-বাবু, বাবু। বাবু নয়, যেন বাবুদাদা।
অতুল চোখ খুলিল। ভাবিয়াছিল, চোখ মেলিভেই এক চঞ্চল দুষ্ট
শুশি কলহাস্যের তরঙ্গ তুলিয়া বলিয়া উঠিবে—বাবুদাদা, রােদ উঠে
গেছে, এখনও ঘুমুচ্ছ তুমি ?
চোখ মেলিয়া দেখিল, রােদ উঠিবার অনেক বাকী, সবে
পােহাতী তারা উঠিয়াছে।... মনে পড়িল, কালরাত্রে আট বছরের
অভ্যস্ত জীবন পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছে—সে দোকান নাই,
বাবুদাদা বলিয়া ডাকিবে সে বুলু নাই—তাহাদের চিরদিনের মত
ত্যাগ করিয়া আসিয়াছে, আর ফিরিবে না।
}
ষ্টীমার আসিল দেরি করিয়া। অতুল ডেকের উপর কম্বল
বিছাইয়া সুস্থির হইয়া বসিল। বড় অদ্ভুত ঠেকিতে লাগিল—
এ যেন ঠিক একখানা নাটক, আট বছরের অভিনয় শেষ
( ১৩৯ )
দেবৗকিশােরী
ভদ্রা নদীর
করিয়া যবনিকা ফেলিয়া এখন সকাল-বেলা বাড়ি ফিরিয়া
যাইতেছে।
আট বছর আগে ঝাউগঞ্জ আজকালকার মত এরকম ছিল না
এত আড়ত গুদাম লােকজনের হৈ-চৈ কিছুই না।
উভয় পারে কেবল ফাঁকা মাঠ—এদিকে খানকয়েক গােলপাতার
চালা, পূবদেশী বালামের নৌকা আসিয়া মাসের পর মাস ঘাটে
লাগিয়া থাকে, দু-দশ মণ করিয়া চাউল বিক্রী হয়। হৃষীকেশ এই
সময়ে টিনের ঘর বাঁধিয়া চাউল কিনিয়া মজুত করিতে শুরু
করিলেন। কাজ বাড়িল বিস্তর। কাজেই একটা মরশুম অন্ততঃ
আসিয়া দেখা শুনা করিবার জন্য জামাইয়ের কাছে জরুরি খবর
দিলেন।
সেই একদিন আসন্ন সন্ধ্যায় টেন ধরিতে যাইবার মুখে পান
চিবাইতে চিবাইতে খুব গােপনে সে নিৰ্মলাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল
—চিঠি দিও, কেমন ?
প্রত্যুত্তরে নিৰ্ম্মল ঘাড় নাড়িল দেখিয়া অতুল সহসা কথা
বলিতে পারিল না। বলিল—লিখবে না চিঠি ?
এমন সময়ে ডাক পড়িল-সেজ-বউমা! বধু বাহির হইয়া
গেল।
অতুল তারপরেও দাড়াইয়া রহিল। কাজ সারিয়া নিৰ্মলা
নিশ্চয় আবার আসিয়া পড়িবে। কিন্তু রওনা হইবার আগে তার
কাজ কিছুতেই মিটিল না। পথ চলিতে চলিতে অতুল ভাবিতে
( ১৪০ )
যাও পাখী বলাে তারে খামের চিঠি লাগিল--ও যেন কেমন এক রকম...পলাইয়া পলাইয়া বেড়ায় মুখের উপর স্পষ্ট বলিয়া দিল যে চিঠি দিবে না, বলিতে একটু মায়াও হইল না--আচ্ছা লােক ! ঝাউগঞ্জে তখন সােমবারে সােমবারে পিওন আসিত। একদিন চিঠি আসিয়াছে, একেবারে খান তিন চার। অতুল তখন গরুর গাড়ী হইতে ফর্দ মিলাইয়া মিলাইয়া মাল নামাইতেছে। আড়চোখে তাকাইয়া তাকাইয়া দেখিতে লাগিল। হৃষীকেশ চশমা আঁটিয়া চিঠিগুলি পড়িয়া গােছাইয়া পাশে রাখিলেন। একখানাও নাই। রাত্রে দোকানের কাজ মিটিয়া গেলে সকলে ঘুমাইলে কেরাে- সিনের আলােয় সে নিৰ্মলাকে চিঠি লিখিতে বসিল। শেষ হইল যখন অনেক রাত্রি'। গাঙের ঘাটে নামিয়া ঠাণ্ডা জলে মুখ হাত ধুইয়া বিছানায় শুইল। তবু ঘুম আর আসে না।... দিন-পনেরাে পরে একদিন সকাল বেলায় হৃষীকেশ বলিলেন -~-বাবাজী, এই নাও রঙীন খাম, গন্ধে ভুর ভুর করিতেছে। বেকুব পিওন কি-না হৃষীকেশের হাতেই দিয়া গিয়াছে। নিতান্ত নিলিপ্তের ন্যায় খাম- খানি বাঁ হাতে ধরিয়া ব্যাপারীর সহিত অতুল যথাপূর্ব তর্ক করিতে লাগিল-হেঁ হে তাই বলে কি হয় ব্যাপারীর পাে? কামিনী- ভােগ ওর সাত জন্মে নয়, আমরা বুঝি চাল চিনিনে-~-দাম এক টাকা হিসেবে কম নিতে হবে- { ১৪১ )
দেবীকিশােরী
একটু পরেই কাজ মিটাইয়া আড়ালে গিয়া খামখানি খুলিল।
সবুজ, কাগজ তার উপর টকটকে রাঙা কালিতে ছাপা গােলাপ গাছ,
একটি মেয়ে, পাখী, কবিতা ইত্যাদি। কিন্তু কাগজ ও লেফাফার
এত আড়ম্বর করিয়া যে কথা-কয়টা নিৰ্ম্মল লিখিয়াছে তাহা পড়িয়া
অতুলের ইহাই কেবল মনে হইতে লাগিল-বৃথা সে রাত্রি জাগিয়া
জাগিয়া এত চিঠি লিখিয়া মরিয়াছে, একখানও তার হাতে পৌছে
নাই, পৌছিলে কি একটা কথার একটু রকমারি জবাব থাকিত না ?
হয় পােষ্টাপসে মারা গিয়াছে আর নয় টুনি কি বড়বৌদিদি...ছি
ছি ছি, কি লজ্জার কাণ্ড হইয়া গিয়াছে তাহা হইলে ! সে
তাহাদিগকে মুখ দেখাইবে কি করিয়া ?
আবার যখন হৃষীকেশের সামনে আসিল, তখন তিনি হিসাব
দেখিতেছেন। ইহারই মধ্যে একবার অতুলের দিকে নজর পড়িলে
প্রশ্ন করিলেন—বাড়ির খবর সব ভাল ? নিমু ভাল আছে ?
”
বিয়ে তখন বেশী দিন হয় নাই। অতুল লজ্জায় শ্বশুরের
সহিত মুখােমুখি উত্তর দিতে পারিল না, ঘাড় নাড়িয়া সায়
দিল।
বেশ বলিয়া হৃষীকেশ পুনশ্চ হিসাবের খাতায় মনসংযােগ
করিলেন। পাতার উপর পাতা উলটাইয়া চলিলেন ।
একটা কথা বলি-বলি করিয়া অতুল দাড়াইয়া রহিল। মনে
এক-একবার জোর আনে--বলেই ফেলি না কেন--মেয়েমানুষ
না কি ? আবার ভাবে--উহু, ভাত খেতে খেতে বললেই হবে--
( ১৪২ )
যাও পাখী বলো তারে
সেই ভাল হবে--একেবারে এক্ষুনি বললে শ্বশুর-মশায় ভাববেন----
দেখেছ, চিঠি পেয়েছে আর অমনি
এমনি অনেকক্ষণ গেল । সহসা মুখ তুলিয়া হৃষীকেশই কথi
কহিলেন, কাছে ডাকিলেন--শােনাে-
সলঞ্জে অভুল কাছে আসিয়া বসিল। বহুদর্শী লােক, কথাটা
প্রকাশ করিয়া না বলিতেই আন্দাজে বুঝিয়া ফেলিয়াছেন।
হৃষীকেশ কিন্তু যাহা বলিলেন তা একেবারে অভাবিত।
বলিলেন--- তুমি রাহুত-মশায়ের সঙ্গে এই চানে বড়বাজার যাও।
মহাজনের সঙ্গে জানাশােনা হওয়া দরকার, পর-অপর দিয়ে
কাজকৰ্ম্ম হয় না-
বলিয়া একবার এদিক-ওদিক দেখিয়া লইলেন। তারপর
খাতার একটা জায়গা নির্দেশ করি নে -- দেখ একবার
দিনে ডাকাতী। পােল থেকে পোস্ত। অবাধ মুটে ভাড়া লিখেছে
ছ-পয়সা--
পুনশ্চ একবার অধিকতর সন্তর্পণে চারিদিক দেখিয়া গলা
খাটো করিয়া বলিতে লাগিলেন--ঐ যে রাহুতমশায় কি মধুসূদনকে
দেখ, কমপাত্তোর কেউ নন। তোমায় শিখিয়ে দিই বাবাজী,
মুখে ওদের খুব করে বলবে যে আপনারা হলেন হেন-তেন---
ধৰ্ম্মভারও দেবে-কিন্তু দাড়িপাল্লায় সর্বদা যেন কড়া নজর থাকে,
ঐটে হ’ল আসল : এবার থেকে বড়বাজারের গগো তুমি করাে—
অতুল এইবার চোখ-কান বুজিয়া একরকম মরিয়া হইয়া বলিয়া
;
( ১৪৩ )
দেবীকিশােরী ৰসিল—একবার দিন-দুই বাড়ি থেকে ঘুরে আসি—মানে মা ওঁরা বড় ব্যস্ত হয়েছেন কি না— খাতা হইতে মুখ না তুলিয়া হৃষীকেশ সহজ ভাবেই জবাব দিলেন-মা’র প্রাণ, ব্যস্ত হয় না ? বেশ—যেও বাড়ি। বেয়ানকে চিঠি লিখে দাও-- বলিতে বলিতে চুপ করিয়া গেলেন। পাতার মধ্যে আবার কোন দিনে-ডাকাতীর সন্দেহ হইল বুঝি, মিনিটখানেক তাহারই সন্ধান করিলেন। তারপর আরম্ভ করিলেন--যত জুয়ােচোর ফোরেববাজ নিয়ে কারবার—বাবাজী, তাই বলি তােমাদের জিনিষ- পর তােমরা দেখে-শুনে বুঝে নিয়ে আমায় ছুটি দাও, আমি বাঁচি। বারাে ভূতে যে এত কষ্টের দোকান লুটেপুটে খাবে, কিছুতে প্রাণে সয় না। তুমি এসেছ না বেঁচেছি- বুলু তখন জন্মে নাই, সন্তানের মধ্যে ঐ নিৰ্মলা। নিশ্মলার আগেও ছেলে হইয়াছিল—প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষে মােট চারিটি। কিন্তু হৃষীকেশের অদৃষ্টে চারিটি ছেলেই গিয়াছে, গিন্নিরাও গিয়াছেন। তৃতীয় পক্ষ অবশ্য ঘরে আসিয়াছেন, কিন্তু তাহার ছেলেপিলে না হইবার মত অবস্থা। অতঃপর এ বয়সে হৃষীকেশের আর চতুর্থ পক্ষে ইচ্ছা নাই । অতুল চুপ করিয়া দাঁড়াইয়াই রহিল। ইতিপূর্বে বেয়ানকে চিঠি দিবার প্রসঙ্গ হইতেছিল, তাহাকে চিঠিতে কোন্ তারিখের কথা উল্লেখ করিবে, কালনা পরশুনা শনিবার সেটা সঠিক ( ১৪৪ )
যাও পাখী বলো তারে
না জানিয়া স্বস্তি পাইতেছিল না। হৃষীকেশ কিন্তু ক্রমাগত
হিসাব উল্টাইয়া চলিয়াছেন, বােধ করি বা পুত্ৰ-ব্যাকুলা বেয়ানের
কথা উঁাহার মনেই নাই।
অবশেষে অতুলই মনে করাইয়া দিল।-তা হলে মা’কে চিঠি
লিখে দিই——
মুখ তুলিয়া হৃষীকেশ জামাতার দিকে চাহিলেন।
-হ্যা লিখে দাও। মরশুম অন্তে আশ্বিন-কার্তিকের দিকে
হপ্তাখানেকের জন্যে যেও বাড়ি। দিন সাতেক—সে আমি এক
রকম করে চালিয়ে নেব। কি আর হবে ? তা বলে কি আর
বাড়ি ঘরে যাবে না ?...
এত বড় সুব্যবস্থার পরে অতুলের আর কথা বলিবার জো
রহিল না।
হৃষীকেশ বলিতে লাগিলেন--তাই লিখে দাওগে যাও। তার--
পর-জামাতার মুখের দিকে তাকাইয়া কি ভাবিয়া সুর অতিশয়
কোমল করিয়া বুঝাইতে লাগিলেন--বাড়ি-ঘর-দোর রইলই
-যাচ্ছে কোথা ? এই উঠতি-গঞ্জে আমাদের এখন একহাতি
কারবার। দশটা বছর সবুর কর দিকি। দশ বছরে ভেল্কি
খেলে যাবে। বাড়ি গিয়ে তখন টাকার বিছানা করে শুয়ে থেক।
সম্ভাবিত ঐশ্বর্যের আনন্দে হৃষীকেশের মুখ হাসিতে ভরিয়া গেল।
বলিলেন—বিকেলে কিন্তু চিটেগুড়ের নৌকো আসবে, বিকেলেই
গুদোমজাত হবে----মনে থাকে যেন, বাবাজী।...
(১৪৫ )
১০
দেবীকিশােরী সেই দশ বছর এখনও পুরে নাই, বছর দুই বাকী আছে। কিন্তু ভেল্কিবাজীর মতই ঘটিয়া গিয়াছে বটে! দেখিতে দেখিতে হৃষীকেশের টিনের ঘর গিয়া পাকা দালান-কোঠা হইয়া গেল। দোকানের পিছনে ঘেরাকম্পাউণ্ডে তৃতীয় পক্ষের শাশুড়ীর অধিষ্ঠান হইয়াছে। হইবে-না হইবে-না করিতে তাহার কোল জুড়িয়া সােনার মত ছেলে বুলু হইয়াছে। ততুলের সহিত বুলুর ভাবটা কিছু বেশী। রােজ ভােরবেল উঠিয়াই চোখ মুছিতে মুছিতে তাহার কোলে ঝাপাইয়া পড়িবে--বাবুদাদ ! দোকানের মাচায় উঠিয়া কখনও কখনও সে জেজুস চুরি করিতে যায়, পিরে- নাথ কি মধু ধরিয়া ফেলিলে চীৎকার করিয়া ওঠে—বাবুদাদা গো- অতুলের পরমশ ঐ বুলু ! ঐ এক ফোটা অবােধ বালক তার আট বছরের স্বপ্ন ভেল্কিবাজীর মত উড়াইয়া দিয়াছে। আট বছর পরে সে বাড়ী ফিরিয়া চলিয়াছে—টাকার বিছানা পাতিয়া শুইয়া থাকিবার জন্য নয়। পকেট ও তােরঙ্গ হাতড়াইলে আজ সাত টাকা এবং কয়েক আনার পয়সা যদি বাহির হয় মােটের উপর ।... স্টিমারে উঠিয়াই অতুল লক্ষ্য করিয়াছিল, পার্শ্ববর্তী জনকয়েক সহযাত্রী পরস্পর খাসা সদালাপ জমাইয়া বসিয়াছেন। আপনার ভাবনাতেই ছিল, কোনদিকে এতক্ষণ সে মনােযােগ করে নাই। সহসা সভয়ে লাভ দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল-ভদ্রলােকদের আলাপ- ( ১৪৬ ) যাও পাখী বলো তারে আলােচনা সম্প্রতি তর্কে পৌছিয়াছে, একেবারে যাহাকে বলে উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিক ব্যাপার! একজনে একখান উপন্যাস হাতে লইয়া ভীমবিক্রমে প্রতিপন্ন করিতেছেন, ইহার মত বই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আর দ্বিতীয় নাই। অপর পক্ষ ও চুপ করিয়া আছেন বলা যায় না। ফলে সমালােচনা এইরূপ চূড়ান্তে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে যে ঠিক ইহার পরেই ছড়িও ছাতাগুলির দরকার পড়িবার কথা। চারিদিকে যাত্রীর ভিড়—তবু উহারই মধ্যে যা-হােক করিয়া কম্বলটা একটু পিছাইয়া লইয়া সামনে তােরঙ্গ রাখিয়া অতিশয় সতর্কভাবে অতুল তাঁহাদের কথা শুনিতে লাগিল। অর্থাৎ ক্রিয়া আরম্ভের সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা অন্ততঃ সারেঙের ঘরের মধ্যে ঢুকাইয়া দিবে, তারপর ঐ তোরঙ্গ ও নিজের অপরাপর অঙ্গের ভাগ্যে যা ঘটে ঘটুক। পরক্ষণে তাকাইয়া দেখিল, ইঞ্জিনের কাছাকাছি জায়গাটায় লােকজন বসে নাই, একেবারে খালি, বােধ করি উত্তাপ বেশী । ৰলিয়া। কিন্তু ইঞ্জিনের উত্তাপে মানুষ মরে না। অতএব স্থান পরিবর্তন করিয়া অতুল সেখানে গিয়া শান্তিতে কম্বল পাতিল। মাঝে একবার নীচে গিয়া খালাসীদের দড়িবাঁধা বালতী চাহিয়া গাঙের নােনাজলে অারাম করিয়া স্নান করিল। ভোরের নিকট মিলিল বাতাসা ও বাসি পাউরুটি। তাই কিছু কিনিয়া খাইয়া পরম পরিতােষে শুইয়া পড়িয়া ষ্টীমার-চলার শব্দ শুনিতে শুনিছে মনে পড়িল, তােরঙ্গের মধ্যে তাহার সঙ্গেও খানকয়েক উপন্যাস আছে, কাল রাত্রে বাক্স গােছাইতে গোছাইতে নজর পড়িয়াছিল বটে। ( ১৪৭ ) দেবীকিশােরী খোজ করিয়া পাওয়া গেল খানকয়েক নয়- একখানি মাত্র উপন্যাস, নাম কুঙ্কুমকুমারী। তােরঙ্গের তলায় কতদিন হইতে পড়িয়া আছে, তার ঠিক নাই--পাতা বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে। খানিকটা পড়িয়া বুঝিতে পারিল, এ বই তাহার পড়; পাতা-কয়েক উলটাইয়া সেই জায়গায় আসিল, চমৎকার জায়গা, ঘটনাটা অতুলের বেশ মনে আছে—কুঙ্কুমকুমারীর অসুখ করিয়াছে, পােয। পায়রা উড়াইয়া দিয়া রাজকুমারী খবর পাঠাইরাছেন, জয়ন্তলাল নদী ঝাপাইয়া মাঠ দিয়া বন দিয়া ছুটিয়া চলিয়াছেন .. এখানে-সেখানে আরও খানিক চোখ বুলাইয়া অতুল বইখানা রাখিয়া দিল। এককালে তার কেবল দুইটি নেশ ছিল—নবেল পড়া ও গান-বাজনা। তৃতীয় নেশা জুটিল নির্মলার সহিত বিবাহ হইবার পর। দোকানে ঢুকিয়া অবধি রােকড় লিখিতে লিথিতে সে-সব কবে উল্টাইয়া-পাল্টাইয়া গিয়াছে। বই রাখিয়া দিয়া অতুল নির্মুলার পুরানাে চিঠি দু-চার খানা যাহা পাইল বাহির করিয়া পড়িতে লাগিল। শেষাশেষি এই ধরণের যে-সব চিঠি আসিত, তার কতকগুলির উত্তর দেওয়া হয় নাই, ভাল করিয়া পড়িয়াই দেখে নাই। কাজকর্মের মধ্যে খাম ছিড়িয়া খুঁজিয়া-পাতিয়া নীচের দিক হইতে আগে দেখিয়া লইত, শারীরিক কে কেমন আছে, তারপর আবার খামে ভরিয়া চাটাইয়ের নীচে বা বেনিয়ানের পকেটে রাখিয়া দিত, রাত্রিবেলা নিরিবিলি পড়িয়া দেখা যাইবে। কিন্তু সে আর ঘটিয়া উঠিত না। ইদানীং নির্মল ১৪৮ ) যাও পাখী ব’লাে াৱে চিঠিপত্র বেশী লেখে না। যা লেখে তা'ও এ ধরণের একেবারে নয় তিনটি মেয়ে হইয়াছে, তাহাদের কথাতে আজকালকার চিঠি ভরতি, তাহাদের জন্য এটা দরকার, সেটা দরকার ইত্যাদি। অনেক দিন আগে-সেই সব নূতন বয়সের কথা---একটা চিঠি লইয়া দুর্বিনীতা নির্মুলা স্বামীকে যা অপমান করিয়াঝিল দশজনের মধ্যে তাহা বলিবার কথা নয়। অতুল সকৌতুক স্নেহে তাহাদের প্রথম যৌবনের সেই ছেলেমানুষী-ভরা দিনগুলি ভাবিতে লাগিল। হৃষীকেশ একবার তাহাকে পাঠাইয়াছিলেন মাল কিনিতে। অতুল সটান চলিয়া আসিল বাড়ি ; রাহুত-মহাশয়ের সহিত গােপন ষড়যন্ত্র হইল দুই দিন মাত্র বাড়ি থাকিয়া মঙ্গলবার সকালে বড়বাজার গদীতে তঁাহার সহিত দেখা করিবে। দিনের মধ্যে দুপুর বেলাটায় নিৰ্মলার একটুখানি যা অবসর। পুরুষ-মানুষদের খাওয়া হইয়া গিয়াছে, বউরা সবে ভাত বাড়িয়া লইয়াছে এমন সময় অতুল ঘুরিয়া রান্নাঘরের সামনে দিয়া জুতা মমম্ করিতে করিতে গম্ভীর মুখে বাহিরের দিকে চলিয়া গেল। গানের আড্ডায় নিশ্চয়। নিৰ্ম্মল দুপুরে ঘুমায় না, এ ঘরে আসিয়া কঁাথার ডালা লইয়া বসিল। কতক্ষণ এমনি আপনার মনে সেলাই করিতেছে, খেয়াল নাই, হঠাৎ অতুল ঘরে ঢুকিল। ভয়ানক ব্যস্ত। কোনদিকে না তাকাইয়া সােজা আসিয়া টেবিলের জিনিষপত্র নড়াইয়া-সরাইয়া খুব ব্যস্তভাবে কি খুঁজিতে লাগিল। ( ১৪৯ )
দেবীকিশােরী
.
ছেgঘরে দুইটি প্রণী, একজনে গভীর মনােযোগের সহিত
সেলাই করিয়া চলিয়াছে, আর একজন টেবিল, টেবিলের তলা,
আলমারীর মাথা সমস্ত জায়গা তন্ন
জায়গা তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া
বেড়াইতেছে। ভাবখানা যেন ইহজন্মে ইহাদের দুটির পরিচয়
নাই।
নিৰ্ম্মলা মনে মনে ভাবিল, আর কাজ নাই। মুখ তুলিয়া
বলিল—আডডা জমা না ?
নিদারুণ বিরক্ত-ভরা মুখে অতুল একবার তাকাইয়া দেখিল,
কিছু বলিল না।
নিৰ্মলার কিন্তু গ্রাহ্য নাই, বসিয়া বসিয়া টিপি-টপি হাসিতে
লাগি। আবার কহিল—এখনও সন্ধ্যে হয় নি, ফিরে এলে যে
বড়ও শুনতে পাচ্ছি ?
কি বলছ ?
--বলছি, বডড গরম আজকে। বলিয়াই প্রগল্ভ হাসি।
অতুল রুখিয়া উঠিল—ও-ঘরে মা রয়েছেন, ঐ রকম হেসে
উঠতে jজ্জা করে না? বুড়ো হয়ে দিন দিন বৃদ্ধি বাড়ছে !
যেন ভারি ভয় পাইয়া গিয়াছে এমনি ভাবে শিহরিয়া কাপিয়া
নির্মল কলি-সর্বনাশ, বুড়ো হয়েছি নাকি ? না--না-বুড়ো
এখনও হইনি একেবারে, হয়েছি ? বল। বুড়ো হবার কথা
শুনলে বড় ভয় করে,—এই পাকা চুল, থর্থড়ে, মাগো—যা
বিচ্ছিরি
( ১৫০ }
যাও পাখী বলাে তারে
বলিতে বলিতে সে অভুলের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। বলিল
সরে—কি খুঁজতে হবে বল দিকি। জামার বােতাম ? এই যে
তােমার জামাতে লাগানাে রয়েছে—দেখতে পাও না ?
অতুল কহিল—বড্ড ফাজিল হয়েছ তুমি। দে মি
খুঁজছি--বােতাম ছাড়া আর কিছু বুঝি খোঁজা যায় না
বধূ পরম বিস্ময়ে চোখ দুটি বিস্ফারিত করিয়া কহিল–বােতাম
নয়—ভবে ? ও—আমাকে। আমি তা বুঝতে পারি নি। আমি
আলমারীর মাথায় থাকিনে কি না-
--ভারী অহঙ্কার, তােমায় খুঁজতে বয়ে গেছে তামার, শােন
নিৰ্মলা,—বলিয়া অতুল বিছানায় চাপিয়া বসিল। বলিতে লাগিল
শােন, তোমায় বলে দিচ্ছি স্পষ্ট করে, কিছু দরকার নেই
তােমাকে। কেন কিসের এত ? বাড়ী আমি কিছুতে আম
, নেহাৎ মার জন্যে মনটা কেমন হ’ল।...সকা: বেলা বাড়ী
এসেছি, এই সারাটা দিন কি করে করে বেড়াও শুনি ?
ক্লিষ্ট কণ্ঠে নিৰ্মলা কহিল—বড় গরম, মারা যাই, তুমি
থামাে---
অতুল আরও রাগিল।
-যেখানে ঠাণ্ডা সেইখানে চলে যাও, ধরে রাখছে কে ?
--তাই যাই—বলিয়া সত্যসত্যই চলিল।
দরজ অবধি গিয়া
হঠাৎ গাম্ভীর্যের মুখােস ফেলিয়া খিল খিল করিয়া হাসিতে হাসিতে
ফিরিয়া দাঁড়াইল।
( ১৫১ )
'দেবীকিশােরী
-
গলাম আর কি। তুমি বলে আমার মােটে রাগ হয়
, কি করব ?
খানিক পরে অতুলের একখানা হাত তুলিয়া লইয়া স্নিগ্ধ
মায়া-বিগলিত কণ্ঠে নিৰ্ম্মল বলিল--এবারে আর গরম নেই, বেশ
ঠাণ্ডা পড়ে গেছে-না ?
অতুল ঝাকি দিয়া হাত ছাড়াইয়া বলিল—যাও, যাও--তােমায়
খুব চিনেছি—এই তিন মাসের মধ্যে
-ফের ? বলিয়া নিৰ্ম্মল তাড়া দিয়া উঠিল। তারপর
স্বামীর মুখের দিকে দুটি চোখের স্থির দৃষ্টি স্থাপিত করিয়া
বলিল-রাগ তােমার পড়বে না আজ ?
অতুল বলিতে লাগিল—রাগের বড় দোষ কি-না, এই তিন
সাসের মধ্যে কখানা চিঠি দিয়েছ জিজ্ঞাসা করি?
--তাই কি মনে থাকে ?
অতুল ভঙ্গী করিয়া মাথা নাড়াইতে লাগিল।--মনে থাকে
; সেই ত বলছি, ঘষে মেজে রূপ আর ধরে বেঁধে---
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়িয়া নিৰ্ম্মল ফিক্ ফিক্ করিয়া
গসিতে লাগিল। শেষে আর চাপিতে পারিল না।—শােনাে--~-
শোনো—বলিয়া হাত দিয়া স্বামীর মুখ ফিরাইয়া ধরিল। এদিকে
ফেরে, শােনােই না গাে, টুনি বলে কি
সন্ত্রস্ত হইয়া অতুল কহিল—আমার চিঠিপত্তোর টুনি ওর
কেউ দেখেনি ত ?
( ১৫২ )
যাও পাখী বলো তারে নিৰ্মলা কহিল---না, দেখেনি আবার। তােমার ধোন তেমনি কি-না-না দেখে ছাড়ে। কি লজ্জা, মাগাে! তুমি যত ছাইভস্ম লিখতেও আমার কি নাম বের করেছে শুনবে ? বলিয়া নিৰ্মলা আবার হাসিতে লাগিল। তারপর কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া কহিল-বলে, প্রাণপ্রেয়সী দেখনহাসি''সব তোমার দোষ। -বলাে না কি ? বলিয়া রাগ ভুলিয়া অতুল হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। কহিল—দোষ আমার, তা সত্যি। কিন্তু নিলা, তােমার কোন চিঠিতে কোন দিন কেউ এক ফোটা দোষ ধরতে পারে নি। নির্মলা সকৌতুকে স্বামীর দিকে স্মিত দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল-~- দুষ্ট, আমার চিঠি হাটে-ঘাটে পড়িয়ে বেড়াতে তুমি ? অতুল কহিল—না, হাটে-ঘাটে আর কি--রাহুত-মশায় ওঁদের পড়তে দিতাম। পাকা লােক, এর আগে বিশ বছর জমিদারী এস্টেটে মহুরীগিরি করেছেন। তােমার চিঠি পড়ে বলতেন- চমৎকার, যেন পিতামহ ভীষ্মদেব লিখছেন। বলিয়া জামার পকেটে যে-একখানা চিঠি ছিল, সমালােচনা করিবার জন্য সেইটা বাহির করিয়া আনিল । আনিতেই নিৰ্ম্মল ফস করিয়া কাড়িয়া লইয়া চোখ বুলাইতে লাগিল। —দেখলে দোষের কিছু ? ছাপা কবিতা দু-লাইনের উপর আঙল রাখিয়া মুখের অপরূপ ( ১৫৩ ) দেবীকিশোরী ভঙ্গী করিয়ানিৰ্মলা বলিল—পড়তে জান গবচন্দের ? বুঝতে পার ? বলিয়া অতুল কোন কিছু দেখিবার আগেই তৎক্ষণাৎ চিঠি মুড়িয়া পাকাইয়া লুকাইবার আর কোন নিরাপদ স্থান নয় পাইয়া একেবারে গালের মধ্যে পুরিয়া ফেলিল। রাগ যা পড়িয়া গিয়াছিল মুহূর্তে আবার দাউ দাউ করিষা জুলিয়া উঠিল। –যা তা বােললা না বলছি-তােমার বড় বাড় বেড়েছে স্বামী গুরুজন নয় ? বলিয়া অবমানিত অতুলচন্দ্র মহা ক্রুদ্ধভাবে উঠিয়া দাঁড়াইল। অতুলের ভাবনা ভাসিয়া গেল হঠাৎ মারের বাশীর শব্দে বারংবার তীক্ষ বাঁশী বাজিতেছে। ছােট্ট একখানা নো যেন। মােচার খােলা একখানি-মারের ঠিক সামনে পড়িয়া গিয়াছে। সবাই ‘গেল গেল’ করিয়া উঠিল। কিন্তু নৌকা বাঁচিয়া গেল, তরঙ্গের দালায় দুনিতে দুলতে অতি অবহেলায় পাশ কটাইয়া খালে ঢুকিল। নদীকূলে শ্যামল গােলঝাড়, দিগন্তবিলারী বিল, মাঝে মাঝে এখানে-সেখানে তাল নারিকেল ও অন্যান্য গাছপালার ছায়ায় গ্রাম...। দেখিতে দেখিতে অমনি একটা গ্রামের মধ্যে ষ্টীমার চলিয়া আসিল।' জেলেডিঙ্গী দুলিতেছে, জেলেরা জাল ফেলিয়া তার উপর চুপ করিয়া বসিয়া আছে...এক ঝাক গাঙচিল যেন ষ্টীমারের সঙ্গে পাল্লা দিয়া উড়িতেছে। বাঁকের মুখে বাঁশী ( ১৫৪ ) যাও পাখী বলো তারে বাজাইতে বাজাইতে জল কাটিয়া ৪ামার চলিয়াছে-ৰ জোৰে চলিয়াছে—গাঙচিলের ঝাঁক কোথায় পড়িয়া রহিল--কত বিল, কত গ্রাম, কত ঘাট, রাখালছেলে, ঘােটা-ঢাকা স্নান-রতা গ্রাম-বধূ... অতুল ভাবিল, এই ত যাইতেছে--যদি গিয়া দেখে খুকীদের কারও অসুখ করিয়াছে...কিংবা শশানে, তাদের মা কাল হঠাৎ ঘাটের সিঁড়িতে পা পিছলাইয়া...মানুষের জীবন, কিছুই বিচি নয়। আচ্ছা, নির্মল কাজ-কর্ম সারিয়া এখন দুপুরে কি করিতেছে ?...এক মজা করিলে হয়, একটু ঘুরিয়া ডাক্তারখানা হইয়া সেখানে কম্পাউণ্ডার-বাবুর সহিত ঘণ্টা-দুই গল্পগুজব করিয়া অনেক রাত্রে চারিদিক নিশুতি হইয়া গেলে আজ নিৰ্মলার জানলায় গিয়া ঘা দিতে হইবে, চাপাগলায় ডাকিতে হইবে---সেজ। বউ, সেজ-বউ। গলা শুনিয়া বুঝিতে পারিবে কি ? বুঝিলে বিশ্বাস হইবে না। নিৰ্মলার চিঠির একখানা তখনও বাহিরে খােলা পড়িয়া ছিল, বাক্সে তােলা হয় নাই। অতুল পরম যত্নে নুহু ভাজ করিয়া রাখিয়া দিল। অকস্মাৎ প্রথম যৌবনের সেই সব বিগত স্বপ্ন তাহাকে যেন পাইয়া বসিল। মনে হইতে লাগিল, চিঠির কাগজের পাখীগুলি কেবল ছবির পাখী নয়--আসল পাখী। উপন্যাসের কুঙ্কুমকুমারীর মত একদা এক কিশােরী ঐ পাখীদের মুখে বার্তা পাঠাইয়া দিত--যাও পাখী বলাে তারে--সে কত কাল আগে। আর দূর দুর্গম দেশে দোকান-ঘরে পাট ও চালের বস্তার আড়ালে ( ১৫৫ )
দেবীকিশোরী
আবডালে অল বসিয়া বসিয়া রােকড় লিখিত, পাখী সেখানে
পৌছিতে পারিত না। আট বছর পরে উড়িতে উড়িতে পাখী
আজ এই সকাল-বেলা তাহার কাছে পৌছিয়াছে।
সে ছুটিয়া
চলিয়াছে নদী পারাইয়া, এই সব বিল-মাঠ-গ্রাম ভেদ করিয়া-
কোন ছায়াঘন নির্জন গ্রামের ধারে তার কুঙ্কুমকুমারী এখনও চুপ
করিয়া চাহিয়া আছে, চোখে তাহার পলক পড়িতেছে না!
লাল কালিতে বটতলার পরিষ্কার ছাপা বাজে চিঠির কাগজ,
এক পয়সায় আটখানি করিয়া বিক্রী হয়। সেই তুচ্ছাতিতুচ্ছ
কাগজের অতি সাধারণ পাখী, মেয়েলােকটি এবং তাহার মুখের কবিতা
দু-লাইন দেখিতে দেখিতে অতুলের কাছে জীবন্ত হইয়া উঠিল।
পগে অতুল কোথাও দেরি করিল না, তবু বাড়ি পৌছিতে
রাত্রি একটু বেশী হইল। মা ও পিসিমা উঠিয়া আসিলেন ।
নিৰ্ম্মল। আবার রাঁধিতে রান্নাঘরে ঢুকিল । একবার একটুখানি
মাত্র চোখাচোখি হইল, মুখে তাহার আনন্দের দীপ্তি।
তারপর ঘরে ঢুকিয়া জানালা খুলিয়া অতুল বিছানার উপর
গড়াইয়া পড়িল। ঝির ঝির করিয়া হাওয়া দিতেছে, প্রদীপের
ক্ষীণ শিখা কঁপিতেছে, খুকী তিনজন ঐ খাটে বিভাের হইয়া
ঘুমাইতেছে ; বাহিরে জানালার ওধারে লতাপাতার খসখস্ শব্দ,
বুনােফুলের গন্ধ, কালো অন্ধকার, সমস্ত মন তাহার অপরূপ
স্নিগ্ধতায় জুড়াইয়া গেল। এ জগতে কেউ যে তাহার উপর
••
( ১৫৬ )
যাও পাখি বলো তারে --- অন্যায় অবিচার করিয়াছে, ষ্টীমারে ও রেলে আজ তাতিয় পুড়িঃ সারাদিন না খাইয়া এত পথ চলিয়া আসিয়াছে, সমস্ত ভুলিন। নিশ্চিন্ত আরামে চক্ষু বুজিয়া আসিতে লাগিল। কিন্তু একেবারে খাওয়া-দাওয়া সারিয়া তারপরে ঘুম--এখ- নয়। ঘুম তাড়াইবার জন্য অতুল উঠিয়া ও-বিছানায় গিয়া বসিল, ঘুমন্ত ছোট খুকীর গালে যেন না জাগে এমনি সন্তর্পণে এক চুমা খাইল। হাসি একেবারে মেজোটির ঘাড়ের উপর ; চাপাইয়া দিয়াছে, জানালা দিয়া হাওয়া আসিয়া অগােছাল চুই উড়িতেছে, ঘুমাইয়াছে—তবু মুখের উপর কেমন যেন করুণ একটা ভাব–মেয়ে দুটিকে অতুল ঠিক করিয়া শােয়াইয়া দিল । রান্নাঘর হইতে ডাক আসিল। ভাত দিয়া নিৰ্ম্মল। মৃদু হাসিয়া কহিল-হঠাৎ যে বড় হাসিমুখে অতুল কহিল—তােমার চিঠি পেয়ে। নিৰ্ম্মল অবাক হইয়া গেল।-চিঠি ? চিঠি লিখলাম কবে ? , আমি লিখিনি ত। -লিখেছ, লিখেছ গাে--সেই যে সব লিখতে বলিয়া অতু ভালবাসা-ভরা দুটি চোখের দৃষ্টি নিম্মলার মুখে রাখিয়া বলিতে লাগিল—বুঝলে নির্মলা, ষ্টীমারে বসে বসে সেই সব আমলের চিঠির খানকয়েক পড়ছিলাম আজ। আর কোন দিন এমন ক’ পড়ে দেখিনি। কি মনে হ’ল, শুনবে? আনন্দোচ্ছল সুরে নিল। তাড়াত’ বলিয়া উঠিল—না--- ( ১৫৭ ) দেবীকিশােরী - রাক্ষ কর মশাই, শোনাতে হবে না। সেই সব ছাইপাশ আজও পুজি করে রেখেছ বুঝি ! বলিয়া চঞ্চলা হরিণীর মত ঘুপদে ও-ঘরে চলিয়া গেল ; বলিয়া গেল---উঠে পড়ে না যেন—দুধ অানতে যাচ্ছি, খুকী আজ আর দুধ খাবে না—সব দিন খায় না— দুধ গরম করিতে করিতে নিৰ্ম্মল! কহিল---সত্যি, ঠাট। নয়— কলকাতায় মাল কিনতে যাচ্ছ ? ক’দিন থাকবে বাড়ি ? —অনেক দিন। -কত দিন ? এক মাস : এক বছর? ততুল কহিল--যত দিন বাঁচব ততদিন। তোমাদের ফেলে রেখে আর কক্ষনাে কারও গােলামী করতে যাচ্ছিনে, নিৰ্মলা। প্রাণপাত করে খাটলাম আর এতকাল পরে শ্বশুর-শায় এই বললেন- মুখ দেখিয়া নিৰ্ম্মল বুঝিল, সে ঠাট্টা করিতেছে না। একটি একটি করিয়া অতুল দুঃখের কাহিনী বলিতে লাগল। শুনিয়া নির্মলার মুখের হাসি নিলি, গুম হইয়া রহিল। কথা শেষ করিয়া অতুল কহিল—শুনলে ত সব, বলো এইবার। ক্ষণকাল চুপ থাকিয়া নিৰ্ম্মল বলিল—ভাল কর নি- -বাবা কি অন্যায়টা বলেছেন যে রাগ করে চলে এলে? একাশ টাকার কি দিয়ে কি করলে তার হিসেব চাইবেন না ? একটু অপেক্ষা করিয়া উত্তর আসিল না দেখিয়া নিৰ্ম্মল আবার ( ১৫৮ )
SANOMAT LEBAB
যাও পাখী বলো তারে
বলিতে লাগিল--চিরটা কাল তােমার ঐ একভাব। তখনও যেমন
এই আধবুড়াে কালেও তেমনি। তিনটে মেয়ে হয়েছে, একবার
পরিণামটা ভাব। অত মান নিয়ে থাকলে ঘর-সংসার চলে না।
ততক্ষণে শেষ গ্রাস মুখে পূরিয়া অতুল উঠিয়া দাড়াইয়াছে।
ভারপর কাজকৰ্ম্ম সারিয়া এ ঘরে আসিয়া একেবারে নিঝঞ্জাট
অবস্থায় নির্মলা পুনশ্চ দীর্ঘ ছন্দে সুরু করিল--শােন, দেমাক
করে চলে ত এলে—এখন ধরে চতুভুজ হয়ে বসে থাকবে না
কি ? তিন তিনটে মেয়ে, একটা এই সাতে পা দিয়েছে। কালই
চলে যাও, নরম হয়ে বাবার হাতে পায়ে ধর গিয়ে--বলগে, রাগের
মাথায় যা লিখেছি——লিখেছি...ও কি ঘুমুচ্ছ যে বড় !
ডাকিয়া গায়ে নাড়া দিয়া কিছুতে আর অতুলের সাড়া পাওয়া
গেল না।
অতুল তখন স্বপ্ন দেখিতেছে--—সেই মারে বসিয়া যা-যা নবেলে
পভিয়াছে তাই। যেন জয়ন্তলালের কাছে পায়রা তাসিয়া
পেীছিয়াছে...বনবাদাড় ভাঙিয়া রাজপুত্র ছুটিয়াছে...ছুটিতে ছুটিতে
কতকাল গেল, পথের আর অন্ত নাই...অবশেষে রাজবাড়ি যখন
পেীছিল তার আগে কুঙ্কুমকুমারী মরিয়া গিয়াছে।
দীর্ঘ দিনের পরে ফিরিয়া আসিয়া রাজপুত্র প্রিয়তমার শবের
পাশে আছড়াইয়া পড়িল।
* * *
,
s, ii.
6.
( ১৫৯
No text on this page.
এই লেখকের লেখা গল্পের বই
বনমঃ
ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ডি, লি
চিত্রগুলি সার্থক কারণ সেগুলি সত্যচিত্র ; the romance of
our daily life-দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেও যে সুষমা ও রসানুভূতি
বিদ্যমান, আপনি তাহার সত্ত্বা প্রাণে প্রাণে উপলদ্ধি করিয়াছেন......
এবং তাহাকে প্রকাশ করিয়া আমাদেরও সুপ্ত বা ঈষজ্জাগরিত চেতনাকে
ও উদ্বুদ্ধ করিয়া দিয়াছেন।
পেরিচয়’--যে retrospect, চিন্তার গভীরতা এবং মনের
বেদনা বোধ থাকিলে লেখা চিরন্তনের পর্যায়ে গিয়া পৌছায় তাহা
মনােজ বসুর আছে।
দাম-~-এক টাকা বারো অনা।
নৰ
প্রবাসী?—লেখার মধ্যে এমন একটি অপরূপ সরসতা আছে
যে, যে বিস্ময় আর অবােধ আনন্দের সহিত ছেলেবেলায় রূপকথা
শােনা যাইত, বইথানি পড়িবার সময় তাহারই যেন একটা আবছায়া
স্মৃতি মনকে অভিভূত করিয়া বসে...... চরিত্রগুলি খুব সজীব-ডাকিয়া
সঙ্গে লইয়া ঘুরে।
দান-দেড় টাকা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.