Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Marko Polo
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রসিদ্ধ
দেশ-পর্যটকদিগের
আবিষ্কার কথা
মার্কো পােলে
গঙ্গাচরণ দাসগুপ্ত বি. এ., বি. টি.
প্রণীত
অরূপ গ্রন্থাবলী
( ১ )
ক্যাপটেন কুকু
১২ খানি ছবি, তার ৪ খানি তিন রঙের
( ২ )
কলম্বাসের জীবনকথা
১২ খানি ছবি, তার ৪ খানি তিন রঙের
No text on this page.
Rischgits Collection. I
মার্কো পােলাে
From the portrait in the possession of Mgr. Badia. Rome.
চুঠেতি
প্রসিদ্ধ দেশ-পৰ্যটকদিগের আবিষ্কার-কথা
মার্কো পোলা
শ্রীগঙ্গাচরণ দাসগুপ্ত বি.এ, বি.টি.
ম্যাকমিলান এণ্ড কোং লিমিটেড়
২৯৪নং বহুজার স্ট্রীট, কলিকাতা
১৯২৯
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Printed by S. B. Bhattacharyya at the Model Litho & Printing Works,
66-1A, Baitakhana Road, Calcutta.
ভুমিকা
আজকাল উড়াে জাহাজ, রেলগাড়ী, ষ্টীমারে চড়ে কত লােক
নদী, পর্বত, সাগর, মহাসাগর, বন, মরুভূমি সহজে পার হয়ে
পৃথিবী ঘুরে আছে। অনেক বছর আগে নিজের দেশ ছেড়ে
বিদেশে যেতে কেউ বড় সাহস করত না।
মার্কো পােলাে প্রায় সাড়ে ছয় শাে বছর পূর্বে এশিয়ার কত বন,
মরুভূমি, পাহাড়, প্রান্তর হেঁটে পার হয়েছিলেন তার সংখ্যা করা যায়
। তিনি সমুদ্রপথে চীন থেকে ভারত, পারস্যে এসেছিলেন।
তিনি তখনকার দিনে এসিয়ার নানা রাজ্যের যে সব কাহিনী
দিয়ে গেছেন তা পড়ে আমরা সেই সময়কার সামাজিক অবস্থা,
ধন-সম্পদ, ব্যবসাবাণিজ্য সব কিছুর এক নিখুত ছবি দেখতে
পাই।
মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি বের হয়ে পঁচিশ বছর কাল
এসিয়ার বহু দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর ভ্রমণের কাহিনী
পড়ে তরুণ ভারতের যুবকরাও নতুনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ক,
নতুন জ্ঞান আর আনন্দ এনে এদেশে নতুন প্রাণের বিপুল উৎসাহ
ও লাবণ্য আমাদের জরাজীর্ণ সমাজের মধ্যে ফুটিয়ে তুলুক,এই
কামনা করি।
সুচী
০ ০ ০
০০০
৮
০৮০
০ ০০
০৫
০৫ ০
ভিনিসের কথা
পােলাে বংশ
মার্কো পােলোর বিদেশযাত্রা
৭
বিদেশে মার্কো পােলাে
১৩
দেশের দিকে
২০
মার্কোর ভ্রমণকাহিনী কেমন করে লেখা হ’ল ২৪
ভ্রমণকাহিনীর প্রথম অংশ
মরুভূমির মাঝে মার্কো পােলাে
৪১
মঙ্গোলদের দেশে মার্কো
কুবলাইএর রাজধানী
চীনের কথা
০৮।
•••
০ ০ ০
অন্য সব দেশের কথা
ছবির সূচী
st
২৪
০ ০ ০
মার্কো পােলাে
মুখপত্র
নিকোলাে ও ম্যাফিয়ােকে কুবলাই খাঁ স্বর্ণফলক দিচ্ছেন ১১ পৃষ্ঠায়
পােলাে তিনজন ভিনিস ত্যাগ করে যাচ্ছেন
১৩
পােলাে তিনজন ভিনিস শহরে ফিরে এসেছেন
২২
ভিনিসে পােলাে বংশের গৃহের প্রবেশ দ্বার
পােলােদের কুলমৰ্যাদার চিহ্ন ও পামির অঞ্চলের ভেড়া ৪৬
জেঙ্গিস খাঁর মৃত্যু
৫১
হাজার বুদ্ধের গুহা
চীনের বিরাট প্রাচীর
লামা বা তিব্বতদেশের পুরােহিত
হাংচৌএ ‘পশ্চিম হ্রদে’ পদ্মদ্বীপ
পূৰ্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের মাঝে পােলােদের জাহাজ
স
১১
অ
৮৭
बिकान को नि: कृषि ভেনিস তা তার দেশ रूप कायम काम বিজও মমা জলি য়া আন্মিনি। श आत्मज पोजना यांना कामगार न সমরকন্দ : (समान दामाद ইন্দ काबिज जवा বলখ नि-आन् नांव वा छोडनन् दिद ८१ स्क्वान आध ज মিয়া पाव सार लि, रेमनान गरी TER बझापग खांबवर्ष माम काशा बा; इं.क বোর্নি कल शाका . 800 2000 800 साल মার্কো পােলাের ভ্রমণ পথ
মার্কো
পােলে
ভিনিসের কথা
বাণিজ্যে দেশের উন্নতি। আজকাল ইংরেজ জাতি ও মার্কিন
জাতি পৃথিবীর মধ্যে ধনে মানে বড়। এর কারণ ব্যবসা বাণিজ্যে
এই দুই জাতিই সবার চেয়ে এগিয়ে আছে। তাই এদের দেশ
টাকায় ভরা, এদের খাতির সবার সেরা।
প্রায় হাজার বৎসর আগে ভিনিস বড় হয়েছিল এই
বাণিজ্যের জোরে। ইয়ােৰােপের দক্ষিণে ইটালি দেশ, এই
ইটালি দেশের উত্তর-পূর্ব উপকূলে ভিনি সহর। সমুদ্রের ওপর
এই সহরটি; সহরের মধ্যে অনেক খাল, কারণ সহরটি কতকগুলি
ছােট দ্বীপের ওপর তৈয়ারী। ফলে হয়েছিল যে অধিবাসীরা
জাহাজ, নৌকা চালাবার কাজে কোন অসুবিধা বােধ করত না।
२
মার্কো পােলো
;
ভিনি একটি মহাদেশের দক্ষিণে ; আরও দু’টি মহাদেশ এসিয়া
ও আফ্রিকা তার কাছাকাছি। সেই জন্য ব্যবসা বাণিজ্য হিসাবে
ভিনিসের যতটা সুবিধা ছিল ততটা সুবিধা খুব কম সহরেরই দেখা
যায়। এই সুবিধা পেয়ে সেখানকার লােক বাণিজ্যে যথেষ্ট মন
দিয়েছিল, আর সেই জন্য নিজেদের ও দেশের খুবই উন্নতি করতে
পেরেছিল।
বিলাতের মহাকবি শেপীয়রের নাম তমরা অনেকেই
শুনেছ নিশ্চয়। শেক্সপীয়রের একটি নাটক আছে, নাম তার
‘ভিনিসের বণিক। সে-নাটকের গল্পের কথা তােমরা অনেকেই
হয় তােত বাবা বা দাদার কাছে শুনেছ, অনেকে সে-গল্প পড়েও
থাকতে পার। ভিনিসের বণিক আন্টোনিয়াের ছিল অনেক
জাহাজ; সাত সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে সে-সব জাহাজ দেশ বিদেশে
যেত, জাহাজ-বােঝাই মালপত্র নিয়ে দেশ বিদেশে বেচা কেনা
করত, আর আন্টোনিয়াের ভাণ্ডারে ধনরত্ন নিয়ে এসে ঢেলে দিত।
সহরের মধ্যে আন্টোনিয়াের নাম ডাক ছিল যে তিনি একজন
উঁচুদরের বণিক।
আন্টোনিয়াের মত অনেক বণিকই ভিনিসে ছিল; তা না
হলে ভিনি অত বড় নাম করতে পারত না। এই বইতে যার
কথা লেখা হবে তাঁর বংশ বাণিজ্যের জন্যই বড় হতে পেরেছিল।
মার্কো পােলাের বাপ, কাকা বণিক ছিলেন; তাই তারা নানা দেশে
ঘুরেছিলেন। মার্কো পােললা তাঁদের সঙ্গে থেকে অনেক দেশে
বেড়াবার সুযােগ পেয়েছিলেন।
ভিনিসের কথা
এখন পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই রেলপথ হয়েছে, দু'এক
দিনে লােকে দু’চার মাসের পথ চলে যাচ্ছে। টেলিগ্রাফের তার
বসিয়ে লােকে হাজার হাজার ক্রোশ দূরের দেশের খবর দু’ মিনিটে
এনে দিতে পারছে। খবরের কাগজে সেই সব খবর ছাপা হয়ে
পৃথিবীর সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। অজানা দেশ বলতে
দুনিয়ায় আর বেশী কিছু নেই বললেই হয়।
কিন্তু এমন এক দিন ছিল যখন এদেশের খবর ওদেশ
রাখত না। পাশাপাশি দেশে যারা বাস করত তাদেরও এই
অবস্থা ছিল। লােকে বিদেশে যেতে ভয় পেত। ভয়ের কারণও
যে ছিল না, তা নয়। একে তাে বিদেশ বিভূই,-অজানা পথ, ঘাট,
অচেনা লােক, তার ওপর সে-সব লােককে ভাল করে বিশ্বাস
করতে সাহস হত না। বিদেশে চোর ডাকাতের ভয় ছিল, রাজা
যদি ভাল না হতেন তবে সুবিচারের আশা খুব কমই ছিল।
সুতরাং সেকালে যারা বিদেশে বেরিয়ে পড়ত, তাদের সাহস,
মনের জোর যে খুব বেশী ছিল সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই।
ভিনিসের অধিবাসীদের একটা সুবিধা ছিল যে বিদেশ
যাওয়ার ভয়টা তাদের অনেকটা কমে গিয়েছিল। ব্যবসা বাণিজ্যের
খাতিরে অনেক জায়গাতেই তাদের যেতে হত। মিশর দেশ
বা ইজিপ্ট, ইয়ােরােপের অন্তর্গত তুরস্ক, সিরিয়া, পারস্য প্রভৃতি
স্থানে তাদের বেশ যাতায়াত ছিল। সে-সব দেশে ভিনিসের
অনেক লােকেই গিয়েছিল। শুধু ভিনি নয়, ইটালী ও অন্যান্য
দেশের দু'একটা সহরের লােকেও বিদেশে বাণিজ্য করতে যেত।
মার্কো পােলাে ইটালীর জেনােয়া নগরের লােকও বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাদের নামও পৃথিবীর ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। মার্কো পােলাের নাম পৃথিবীর মধ্যে যে এত বিখ্যাত হয়েছে, তার কারণ মার্কো শুধু এই কয়টি দেশে গিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন না। বড় বড় মরুভূমি তিনি পার হয়েছিলেন, যে চীন দেশে যাওয়া একটা বিষম কাণ্ড ছিল, সেই দেশে তিনি গিয়েছিলেন; ভূমধ্যসাগরের তীরের দেশের লােক হয়ে সেই যুগে তিনি প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগরের বুকের ওপর জাহাজে চড়ে ভেসেছিলেন, সুমাত্রা, সিংহল, ভারতবর্ষ দেখেছিলেন। এমন কাজ সে-যুগে আর কারও দ্বারা হয় নি। সব দেশেই তিনি ইচ্ছা করে যান নি, অনেক জায়গাতেই তাঁকে ঘটনাচক্রের মধ্যে পড়ে পরের হুকুমে যেতে হয়েছিল। নানা দেশের বিবরণ যা তিনি দিয়েছেন তা সব ঠিক না হলেও, তবু যা তিনি করেছেন, আর যা তিনি পৃথিবীর লােককে জানিয়ে দিয়ে গিয়েছেন তাই যথেষ্ট, এর জন্যই তার নাম পৃথিবীর ইতিহাসে চিরদিন থাকবে।
। পেলাে বংশ মার্কো পােলাের জীবন চরিত যাঁরা প্রথমে লিখেছিলেন তাঁদের ধারণা, পােললা বংশ খুব একটা উঁচু বংশ। যারা জীবন-চরিত লেখেন তাঁরা ভাবেন, যার জীবনী লিখতে হবে সে যে সব রকমে বড় এটা প্রমাণ করতে পারলেই বুঝি একটা বড় কাজ করা হল। যে লােক বড় হয়েছে সে যে বংশগৌরবেও বড়, এটা প্রমাণ করবার জন্য জীবন-চরিত-লেখকের প্রাণপণে চেষ্টা করে থাকেন। এই জন্য মার্কো পােলাের আগেকার জীবনীতে বলা হয়েছে তিনি এক সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে। ভিনিসের সম্রান্ত বংশ কয়টির প্রধান ব্যক্তিরাই মন্ত্রণা সভার সভ্য ছিলেন। এই সমিতি ভিনিসের শাসনকার্য প্রভৃতি সবই চালাতেন। যিনি মার্কোকে বংশ হিসেবে সম্ভ্রান্ত বলেছেন তিনি কিন্তু নিজের কথার কোন প্রমাণই দেন নি। পােলাে বংশের সঠিক খবর পাওয়া যায় মার্কো পােলাের পিতামহ পৰ্যন্ত। মার্কোর ঠাকুরদাদা আন্দ্রিয়া পােলাে’ সম্ভবতঃ কস্তান্তিনােপল সহরে ব্যবসার জন্য একটা দোকান খুলেছিলেন। তিন ছেলে ছিল তাঁর ; বড় ছেলের নাম ছিল মার্কো; যাঁর জীবনকথা এই বইতে লেখা হবে, সেই মার্কোর সঙ্গে ;
মার্কো পোলে এই মার্কোর নামের মিল আছে; কিন্তু দু’জনের মধ্যে ভাইপাে ও জ্যেঠামহাশয়ের সম্পর্ক। সাহেবদের দেশে ছেলের নামের সঙ্গে বাবা, ঠাকুরদাদা, জ্যেঠা বা কাকার এ রকম নামের মিল হয় ; তা দেখে আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই। ‘আন্দ্রিয়া’র মেজ ছেলে ‘নিকোলাে’ মার্কো পােলাের পিতা ; নিকোলাের আর এক ভাই ছিল, নাম তার ‘ম্যাফিয়াে’ । মার্কো পােলাের বাবা, জ্যেঠা, কাকা তিনজনেই ব্যবসা চালাতেন। জ্যেঠামহাশয়ের কারবার যাতে ভাল চলে সে জন্য তিনি কনস্তান্তিনােপ ছাড়া আরও একটি জায়গায় ছােট রকমে ব্যবসা চালাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। ইয়ােররাপে রুশিয়ার দক্ষিণ অংশে যে ‘ক্রিমিয়া উপদ্বীপ আছে, তারই মধ্যে ‘সলডেয়া' নামে এক জায়গায় এই দোকান ছিল। এ ছাড়া এই জ্যেঠামহাশয়ের সম্বন্ধে আর বিশেষ কিছু জানা যায় না। আন্দাজ ১২৮০ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর প্রায় বছর বিশ পঁচিশ আগে থেকেই তার আর দুই ভাই নিকোলাে ও ম্যাফিয়ে কস্তান্তিনােপলের কারবারে যােগ দিয়েছিলেন। নিকোলাে কনস্তান্তিনােপলে যাওয়ার যাওয়ার আগে বিবাহ করেছিলেন ; বিদেশে যাওয়ার সময় কিন্তু তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন না, ভিনিসেই রেখে গেলেন। বছর খানেক পরে নিকোলাের ছেলে হ’ল। এই ছেলেই সুবিখ্যাত মার্কো পােলাে’ ।
মার্কো পােলাের বিদেশযাত্রা ১২৫৪ খ্রীষ্টাব্দে ভিনিস সহরে মার্কো পােলাের জন্ম হয়। জন্মের পর পনের বছরের মধ্যে মার্কো বাপের দেখা পান নি। নিকোলাে ও ম্যাফিয়াে এমন অদ্ভুত ঘটনাচক্রের মধ্যে পড়েছিলেন যে তাঁরা পনের বছরের মধ্যে আর দেশে ফিরতে পারেন নি। নানা রকম মালপত্র নিয়ে দুই ভাই এক জাহাজে উঠে ভূমধ্য- সাগর ও ‘বসফোরস্ প্রণালী নির্বিঘ্নে পার হয়ে এসে পৌঁছলেন ‘কস্তান্তিনােপলে। ইয়ােরােপের তুরস্করাজ্য তখন মুসলমানদের অধীনে আসে নি। কস্তান্তিনােপলের সম্রাট তখন বড়ুই। ‘কস্তান্তিনােপূলে’ দিন কতক বিশ্রাম করে তারা চললেন কৃষ্ণসাগর পার হয়ে সডেয়া’ বন্দরে। তার পর তাঁরা গেলেন উত্তর দিকে—‘ভন্ন নদীর ওপর দিয়ে “কিপচাক্’ রাজ্যের রাজ- ধানী ‘সারাই’ নগরে। এখানকার রাজা ছিলেন বর্ষা। ভন্ন নদীর তীরে যে তার বংশ বাস করত ইনি ছিলেন তাদের প্রভু। পােলােরা দুই ভাই নিজেদের কাছে যে সব মণি, জহরত ছিল তা রাজাকে দেখালেন, আর সব চেয়ে দামী গােটা কতক জহরত কে উপহার দিলেন। রাজার নজর ছিল খুব উঁচু।
মার্কো পােলাে তিনি উপহার নিলেন বটে, কিন্তু তার বদলে আরও দামী জহরত থানকতক পােলােদের দিলেন। নিকোলো ও ম্যাফিয়াে এক বছর বার আশ্রয়ে বাস করে দেশে ফিরবেন বলে সব ব্যবস্থা করতে লাগলেন। কিন্তু ভিনি দেখা তাঁদের কপালে সেবার ঘটল না; এমন কাণ্ড ঘটে গেল যে বছর তের চৌদ্দর মধ্যে তারা আর দেশে ফিরবার সুযােগ পেলেন না। ব্যাপারটা কি জানতে হলে তখন- কার দিনে ঐ অঞ্চলের ইতিহাসের একটুখানি জানতে হবে। মঙ্গোল-নেতা জেঙ্গি খা নিজের ও অনুচরদের বাহুবলে চীন থেকে ভন্ন পৰ্য্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। এর জন্য কত লােক যে মরেছিল, কত গ্রাম যে পুড়েছিল, কত সহর যে ধ্বংস হয়েছিল, আর কত রাজ্য যে শশ্মশান হয়েছিল, তা আর মুখে বলে বা লিখে জানিয়ে দেবার উপায় নেই। জেঙ্গিসের পরে এই প্রকাণ্ড সাম্রাজ্য ক্রমে ক্রমে ভাঙ্গতে লাগল। পােলােরা যখন ব্যবসার জন্য ‘বা’র রাজ্যে এসেছিলেন তখন সাম্রাজ্য ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছে। তখন চীন অঞ্চলের কর্তা ছিলেন জেঙ্গিসের নাতি কুবলাই। ‘কুবলাই’এর দাদা মঙ্গকু’ আগে এদিকে শাসন করতেন; মঙ্গকু’র পরে ১২৫৯ খ্রীষ্টাব্দে কুবলাই খাকান্ বা সম্রাট হন। কুবলাই’এর আর এক ভাই, ‘হলাকু’ এসিয়ার পশ্চিম অঞ্চলে ছিলেন; তিনি পারস্য, আর্মেনিয়া, মেসােপে মেসােপােটেমিয়া ও আশ-পাশের রাজ্যগুলি শাসন করতেন। হলাকু’র নাম ইতিহাসে স্থান পেয়েছে কারণ তিনি মুসলমানদের বিখ্যাত নগর বােগদাদ ধ্বংস করেন।
মার্কো পােলাের বিদেশযাত্রা ‘হলাকু এক রকম স্বাধীন ভাবেই রাজত্ব করতেন। হলাকুর রাজ্যের উত্তরদিকে ভন্ন নদীর তীরে ছিল তাঁর আত্মীয় বার রাজত্ব। বৰ্কাও এক রকম স্বাধীন ছিলেন। দু’জনের রাজ্যের সীমায় একটি প্রদেশ নিয়ে ‘হলাকু’ ও ‘বকা’র মধ্যে রাগারাগি হয়। মন কষাকষি থেকে শেষে মারামারি, লড়াই বাধে। তাতে ‘বা’র সৈন্য হেরে যায়। পােলাে দুই জন অর্থাৎ নিকোলাে ও ম্যাফিয়াে দুই ভাই তখন ‘বা’র রাজ্যে। দুই রাজায় যুদ্ধ চলছে, সুতরাং তাদের ফিরবার পথ বন্ধ। বার রাজ্য থেকে পালিয়ে তাঁরা এসে পৌঁছলেন বােখারা। এখানে ও সমরখন্দে রা ব্যবসা লাগিয়ে দিলেন। এই রকমে প্রায় তিন বছর কেটে গেল। এই সময় আবার একটা কাণ্ড ঘটল। হলাকু মােটের উপর স্বাধীন হলেও ‘কুবলাই'কে তাতার জাতির মাথা হিসাবে খাতির করতেন। তাই তিনি কুবলাই’য়ের সভায় দূত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। দূত বােখারায় এসে দুই ভাইকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। পােলাে দুইজন এতদিন এই অঞ্চলে বাস করে তার ভাষা বেশ শিখেছিলেন। দূত জানতেন যে কুবলাই ইয়ােরােপের সাহেব কখনও দেখেন নি ; আর তার ভাষায় কথা কইবার ক্ষমতা আছে, এমন দুজন সাহেবকে কুবলাইএর কাছে নিয়ে গেলে তিনি বড় আহলাদ করবেন ; আর দু’জনকে নিশ্চয় সম্মান দেখিয়ে পুরস্কার দেবেন। পােলােদের কথাবার্তা, ব্যবহার দেখে দূত নিজে সন্তষ্ট হয়েছিলেন।
মার্কো পােলাে
দূত যখন পােলােদের নিকট কুবলাই’এর কাছে যাওয়ার
প্রস্তাব করলেন, তারা আপত্তি করলেন না; কারণ তারা জানতেন
বাড়ী ফিরবার পথে তখন নানা বিপদ, শীঘ্র বাড়ী ফেরা অসম্ভব।
আর দূতের সঙ্গে অত বড় এক সম্রাটের কাছে গেলে লাভের
সম্ভাবনা রয়েছে অথচ বিপদের ভয় নেই। তাঁরা ব্যবসাদার লােক,
সব দিক বুঝে রাজী হলেন।
পৌছতে তাদের এক বছর লাগল। পথ চলতে চলতে মাঝে
মাঝে তাঁদের থামতে হয়েছিল, কারণ কখনও বা বরফ, কখনও
বা নদীর জল বেড়ে তাদের আটক করেছিল।
কুবলাই দুই ভাইকে সমাদর করে বেশ ভাল ব্যবহারই
করেছিলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন অনেক কথা।
ইয়ােরােপের নানা দেশের খবর কি, সেখানকার রাজারা কি রকম
লােক, কি ভাবে তারা দেশ শাসন করেন, বিচার করেন, যুদ্ধ চালান,
দেশের লােকের আচার ব্যবহার কি রকম, ধৰ্ম্ম কি-ইত্যাদি সব
বিষয় তিনি খুঁটিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করলেন। ইয়ােরাপের ধর্মগুরু
তখন রােমের ‘পােপ। পােপের বিষয় অনেক আলােচনা হ'ল।
পােলাে দু জন তাতার ভাষায় কথা বলতে পারতেন, তাই আলাপের
কোন অসুবিধা হ’ল না। কুবলাই তাঁদের কথাবার্তায় খুব তুষ্ট
হলেন।
নিজের আমীর ওমরাদের সঙ্গে পরামর্শ করে কুবলাই একদিন
দুই ভাইকে বললেন,—“আপনাদের এক কাজ করতে হবে। আমার
দূত হয়ে আপনাদের যেতে হবে ‘পােপ’ মহাশয়ের কাছে। আমার
No text on this page.
নিকোলো ও ম্যাফিয়ােকে কুবলাই খ। স্বফলক দিচ্ছেন From Sir Henry Yule's “Book of Marco Polo" (John Murray).
মার্কো পােলাের বিদেশযাত্রা ; একজন আমীর ‘কোগাত আপনাদের সঙ্গে যাবেন। যে সব কাজ করতে হবে তারা মােটামুটি শুনলেন; কুবলাই পােপকে তার ভাষায় লেখা একখানি পত্রও দিলেন। পত্রে লেখা ছিল অনেক কথা। কুবলাই পােপকে বলেছিলেন নানা শাস্ত্রে পণ্ডিত এক শাে লােককে পাঠিয়ে দিতে; তারা তর্ক করে এ দেশের লােককে যেন বুঝিয়ে দিতে পারেন যে এদের দেবতারা কিছুই নয় এবং খৃষ্টানদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম। কুবলাই পােলােদের আরও বলে দিয়েছিলেন যেন তারা ফিরে আসবার সময় জেরুসালেম্ থেকে পবিত্র তেল আনেন। জেরুসালেম নগরে প্রভু যিশুখ্রীষ্টের সমাধির সমুখে যে প্রদীপ জ্বলে তারই একটু তেল আনতে হবে। চিঠি ছাড়া কুবলাই দু’ভাইকে আর একটা জিনিষ দিয়েছিলেন, সে হচ্ছে একটি সােনার ফলক। ফলকের ওপর কুবলাই’এর রাজ- চিহ্ন ক্ষোদা ছিল। মঙ্গোল সাম্রাজ্যের যে কোন খানে এই ফলক নিয়ে নির্ভয়ে, কোন অসুবিধা ভােগ না করে যাওয়া যেত। পথ চলবার যদি অসুবিধা হয়, ঘােড়া, লােকজন, নৌকার অভাব যদি হয়, সে অঞ্চলের শাসনকর্তাকে এই ফলক দেখালেই তিনি ঘাড় হেঁট করে সব জোগাড় করে দেবেন; খাওয়া দাওয়া, থাকা, শােওয়া এ সবেরও ভার শাসনকর্তার ওপর পড়বে, আর খরচপত্র দরকার হলে তিনি দেবেন। সােনার ফলকের এত মহিমা সম্রাটের ফলক সঙ্গে থাকাতে পােলােদের কোন অসুবিধা বা বিপদ হল না। অবশ্য তাদের কিছু কিছু অসুবিধা ভােগ করতে হয়েছিল; কিন্তু তার ওপর মানুষের কোন হাত ছিল ।
মার্কো পােলো
। অতিরিক্ত বরফ বা বৃষ্টি পড়ে কি নদীর জল বেড়ে উঠে
তাঁদের পথ মাঝে মাঝে বন্ধ করে দিয়েছিল। এইজন্য গাজা
বন্দরে পৌছতে তাদের তিন বছর লাগে।
গাজা থেকে তাঁরা এলেন ‘একর’ নগরে। সে ১২৬৯
খ্রষ্টাব্দের কথা। সেখানে তাঁরা শুনলেন, নােম যিনি পােপ
ছিলেন তিনি মারা গিয়েছেন, আর তাঁর জায়গায় নতুন পােপ,
এখনও করা হয় নি। খবর শুনে পােলাে দুজনের মন দমে গেল।
পােপের প্রতিনিধি একজন ‘একর নগরে ছিলেন, নাম তাঁর ছিল
‘থিয়ােবড়। তিনি এদের পরামর্শ দিলেন দিন কতক অপেক্ষা
করতে।
কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তার তাে কোন ঠিক ছিল না।
দুই ভাইতে মিলে পরামর্শ করলেন,—এই ফঁাকে একবার দেশে
ঘুরে আসা যাক। আর ভিনিও ইটালিতে, রােম’ও ইটালিতে।
রােমে যখন নতুন ‘পােপ’ হবেন তখন ভিনি থেকে গিয়ে তাঁর
সঙ্গে দেখা করার সুবিধাও হবে। সুতরাং দেশে যেতে আর
আপত্তি কি?
ভিনিসে এসে নিকোলাে তাঁর ছেলে মার্কো’কে প্রথম দেখলেন;
‘মার্কে’র বয়স তখন প্রায় পনের বছর। নিকোলাের স্ত্রী আগেই
মারা গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে আর দেখা হল না।
দেশে মাস কতক কেটে গেল। নিকোলাে ও ম্যাফিয়ে
আবার ফিরে চললেন। বালক মার্কোকে তারা সঙ্গে নিলেন।
মার্কোর দেশভ্রমণ এই ভাবেই শুরু হল।
No text on this page.
** ; - iis o', ৫r :'' ! ":. sort.jol, পোলো কয় জন ভিন ত্যগ করে যাচ্ছেন ৪ বিদেশে মার্কো পােলাে সতের বছর বয়সে মার্কো বিদেশে বের হলেন। পচিশ বছরের মধ্যে আর তিনি বা তার বাবা ও কাকা দেশের মুখ দেখতে পান নি। এই পঁচিশ বছর তিনি নতুন নতুন দেশ দেখে বেড়িয়েছেন, নতুন নতুন লােকের অদ্ভুত অদ্ভুত ভাষা শুনেছেন; শেষে এমন অবস্থা হয়েছিল যে তিন জনের চেহারা ও কথাবার্তার ঢঙ বদলে গিয়েছিল; তাঁরা নিজেদের ভাষায় ভাল করে কথা কেমন ভাবে বলতে হবে তা পৰ্যন্ত প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন। ১২৭১ খ্রীষ্টাব্দে তিন জনে একর’ নগরীর দিকে যাত্রা করলেন। প্রতিনিধি থিয়ােব, অনুমতি দিলেন, তাঁরা জেরুসালেমে গিয়ে পবিত্র সমাধির প্রদীপ থেকে তেল নিয়ে আসতে পারবেন। তারা তেল নিয়ে ফিরে এলে পরে প্রতিনিধি তাদের হাতে, ‘কুবলাই’এর নামে পত্র দিলেন; চিঠিতে লেখা থাকল কি কারণে এদের এত দিন দেরী হ’ল। পােলদা তিন জন লেয়াস্ বা আলেজাটোর দিকে যাত্রা করলেন। তারা সেখান থেকে জোগাড়যন্ত্র করে পূর্ব দিকে বেরিয়ে পড়বার আগেই খবর এল,নতুন পােপ ঠিক করা হয়েছে, থিয়ােবডই পােপ হয়েছেন। তাঁর নাম হ’ল পােপ দশম ‘গ্রিগরী।
১৪ মার্কো পোেলল ; পােলাে তিনজনকে ‘একরে’ ফিরিয়ে আনা হল। গ্রিগরী ‘কুবলাইকে’ অন্য চিঠি লিখে দিলেন আর দু’জন খ্রীষ্টান পাদ্রী বা সন্ন্যাসীকে ঠিক করে দিলেন, তাঁরা পােলােদের সঙ্গে কুবলাইএর কাছে যাবেন। সম্রাট চেয়েছিলেন এক শাে জন পণ্ডিত,—গেলেন মাত্র দু’জন। তখনকার দিনে অত দূরে ইচ্ছা করে যেতে কি বেশী লােক রাজী হয়? নতুন পােপ, এই দুজনকে নানা রকম ক্ষমতা দিয়েছিলেন ; আর কুবলাইকে দেবার জন্য পত্র ও দামী দামী উপহারও এঁদের হাতে দেওয়া হল। পাদরী দুজনকে বেশী দূর যেতে হ’ল না। সেই সময় বিবার্স বন্দুকদার নামে একজন সুলতান আর্মেনিয়া আক্রমণ করে খুন, লুটপাট আরম্ভ করে দিয়েছিলেন। সুলতান বড় ভয়ঙ্কর লােক ছিলেন। পােলােদের যেখান দিয়ে যেতে হবে সেই অঞ্চলে তাঁর অত্যাচার আরম্ভ হয়েছে শুনে পাী দু’জন চিঠি পত্র, উপহার সব পােলােদের হাতে দিলেন, সঙ্গে যাবার সাহস আর করলেন না। পােলাে তিন জন দক্ষিণে অনেকটা ঘুরে চলতে লাগলেন। মার্কোর বাপ, কাকা অনেক বিপদের মুখে পড়েছেন, ভয় তাদের কেটে গিয়েছিল। মার্কো ছেলেমানুষ, কাজেই উৎসাহ বেশী; তা ছাড়া এ অঞ্চলের কাণ্ড কারখানা সম্বন্ধে তিনি কিছুই জানতেন না, সুতরাং বিপদ যে কি রকম হতে পারে সে-বিষয়ে তার কোন ধারণাই ছিল তাই বিপদের আশঙ্কা করবার কোন কারণও তার হয় নি। সাড়ে তিন বছর লেগেছিল এদের ফিরে যেতে। শীতকালের দারুণ শীত,বরফ, জল ঝড়ের জন্য মাঝে মাঝে তাদের আটক থাকতে ;
বিদেশে মার্কো পােলাে
সহরে।
হয়েছিল। কুবলাই তখন ছিলেন ‘কেমেনফু’ নামে একটা বড়
জায়গাটির আসল নাম কাইপিং-ফু, সেখানে গ্রীষ্মকালে
সম্রাট লােজন নিয়ে বাস করতেন। সহরটি চীনের বিরাট
প্রাচীরের বাইরে, ‘পিকিন্থেকে ‘কালগ হয়ে যেতে ৩৬৭ মাইল।
কুবলাই যখন খবর পেলেন যে পােলােরা আসছেন, তাঁর ভারি
আহলাদ হ’ল। তিনি যে এদের আবার দেখতে পাবেন এ আশা
এক রকম বােধ হয় ছেড়েই দিয়েছিলেন। এখন তারা আসছেন
শুনে তিনি লােক পাঠিয়ে দিলেন দের সেখানে নিয়ে আসতে
ও যা কিছু দরকার হবে তা তাদের জুগিয়ে দিতে। তখনও তাদের
আসতে ৪০ দিন দেরী।
সম্রাটের সমুখে এসে পােলাে তিনজন উবুড় হয়ে সটান শুয়ে
পড়ে তাকে নমস্কার করলেন। কুবলাই তাঁদের উঠতে বললেন ;
তার পর পথের কষ্ট, বিপদ, পােপের সঙ্গে কথাবার্তা কি কি হয়েছিল
ইত্যাদি বিষয় বলবার হুকুম করলেন। তারা সব কথা বলে পােপের
পত্র ও উপহার কে দিলেন। কুবলাই খুব সন্তুষ্ট হয়ে তাদের
কাজের প্রশংসা করলেন। পবিত্র তেলটি তিনি খুব ভক্তির সহিত
নিয়ে, যত্ন করে তুলে রাখবার হুকুম দিলেন।
শেষে কুবলাইএর চোখ পড়ল মার্কোর ওপর। তিনি জিজ্ঞাসা
করলেন,—এটি কে?—নিকোলাে উত্তর দিলেন,—এটি আপনার
গােলাম, আমার ছেলে। কুবলাই শুনে খুব আনন্দ প্রকাশ
করলেন। সভায় সকলেরই আনন্দ যে পােলােরা এসেছেন।
সম্রাটের উৎসাহ পেয়ে মার্কো ভাতার ভাষা শিখতে ও
মার্কো পােলে
•
তাতারদের আচার ব্যবহার জানতে লাগলেন। অল্প সময়ের মধ্যে
তিনি গােটাকতক ভাষায় কথা কইতে শিখলেন, আর চারটি ভাষায়
লিখতে, পড়তে পর্যন্ত পারতেন।
মার্কো কাজের লােক হয়ে উঠেছেন দেখে কুবলাই একটা
কাজের ভার দিয়ে তাকে একটা দূর জায়গায় পাঠালেন।
সেখানে যেতে ছ'মাস লাগে। সম্রাট মার্কোকে বলে দিলেন,
তুমি যে কাজ করে আসবে শুধু তার বিবরণ পেয়ে আমি খুসি
হবাে না, যে সব দেশ দেখবে তার অধিবাসীদের আচার ব্যবহার
কি রকম, আমি জানতে চাই; আর জানতে চাই কোথায় কি কি
অদ্ভুত নতুন কাণ্ড ঘটছে ; এই সব আমাকে যদি বলতে পার
তা হলে আমি খুব খুসি হবে।
মার্কো যা যা করা উচিত এবং যা করলে সম্রাটের আহলাদ হবে
তাই করে ফিরে এলেন। তাঁর কাছে নতুন নতুন কথা শুনে
কুবলাইএর ভারি আনন্দ। তিনি বললেন,—“এ ছােকরাটি
যদি বাঁচে তা হলে একটা কাজের লােক ও বড় লােক হবে
দেখছি।”
কুবলাই মাােকে আরও অনেক কাজের ভার দিয়েছিলেন ;
সেই সব কাজ উপলক্ষে তাঁকে সাম্রাজ্যের নানা দূর দেশে ও
সাম্রাজ্যের বাইরে নানা জায়গায় যেতে হয়েছিল। মঙ্গোলদের
প্রাচীন রাজধানী কারাকোর, দক্ষিণ ইন্দো-চীনের ‘চম্পা' এসব
জায়গায় তিনি গিয়েছিলেন ;-আরও গিয়েছিলেন ভারতবর্ষে,
সুমাত্রা, পারস্য উপসাগরে। এ ছাড়া জাপান, আবিসিনিয়া,
বিদেশে মার্কো পোেলাে ১৭ সকোট্রা প্রভৃতি আরও দূর জায়গার খোঁজ নিয়েছিলেন ও সেই সব অঞ্চলের নানা গল্প সংগ্রহ করেছিলেন। এই রকম করে অনেক বছর কাটল। মার্শের বাবা ও কাকার মন বড় খারাপ হয়ে উঠল, তাদের আর কিছু ভাল লাগছিল না। তাঁদের মনে হচ্ছিল যে বাড়ী ফিরে যেতে পারলে যেন বাঁচেন। ধন রত্ন তাঁরা যথেষ্টই পেয়েছিলেন, টাকার লােভে বিদেশে থাকবার ইচ্ছা আর তাদের ছিল না। তাঁরা আরও ভাবছিলেন কুবলাই বুড়াে হয়ে পড়েছেন, যদি তিনি মারা যান, তাদের দেশে ফেরা সহজ হবে না। একদিন কুবলাইএর মনে বেশ স্ফুর্তি রয়েছে দেখে নিকোলাে খুব সম্মান দেখিয়ে নিবেদন করলেন যে সম্রাট যদি দের তিন জনকে বাড়ী ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন, তা হলে তাঁরা কৃতার্থ হন। কুবলাই ব্যস্ত হয়ে তাঁকে বললেন,-“কেন তােমরা বাড়ী যেতে চাও? এতখানি পথ যেতে কত বিপদ আপদ হতে পারে। তােমাদের যদি টাকাকড়ির দরকার হয়ে থাকে আমি তােমাদের যা আছে তার দ্বিগুণ দিচ্ছি। আমি তােমাদের বড় স্নেহ করি, তােমাদের ছেড়ে দিতে আমি পারি না।” এর ওপর তাে আর কথা বলা চলে না। পােলােরা দেশে ফেরবার আশা ছেড়ে দিলেন। কিন্তু অদ্ভুত উপায়ে একটা সুযােগ জুটে গেল। ‘লিভান্টের মালিক অর্থাৎ এসিয়ার পশ্চিম অঞ্চলের সুলতান আর্গ হনের স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন চীনের মেয়ে ; ২
১৮
মার্কো পােলো
তাই আর্গহন্ কুবলাইএর কাছে তিনজন দূত পাঠিয়ে দিয়ে
জানালেন যে এদের সঙ্গে একজন ঐ বংশের মেয়েকে পাঠিয়ে
দেওয়া হােক। তার আগেকার স্ত্রী এসেছিলেন চীন থেকে ;
সেই স্ত্রী মরবার সময় এই রকম ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে তার
মৃত্যুর পর আর্গই যেন চীন থেকে সেই বংশের কোন মেয়েকে
আনিয়ে বিয়ে করেন।
কুবলাই খোঁজ করে আর্গ হনের জন্য একটি সুন্দরী পাত্রী ঠিক
করলেন। নাম তার কোথাচী—আর্গহনের আগেকার স্ত্রী যে
বংশের মেয়ে ইনিও সেই বংশের। বয়স তাঁর সতের। আর্গহনের
লােজন ‘কোগাচীকে নিয়ে চলে গেল। কিন্তু মাস কতক
পথ চলে তাদের সবাইকে ফিরে আসতে হল। মাঝে যে সব
দেশ ছিল তাদের মধ্যে মারামারি, কাটাকাটি বেধে রক্তারক্তি
চলছিল ; চারদিকে অশান্তি, তার মধ্যে দিয়ে পথ চলা নিরাপদ নয়
এই ভেবে তারা আবার কুবলাইএর কাছে ফিরে এলেন।
মার্কো সেই সময় ভারত অঞ্চল থেকে ফিরেছেন ; সম্রাটের
হুকুমে গােটাকতক জাহাজ নিয়ে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
তিনি কুবলাইকে সেই সব জায়গার অদ্ভুত অদ্ভুত বিবরণ সব
শােনাচ্ছিলেন, আর বলছিলেন সমুদ্রপথে কোন ঝাট বা বিপদ
কে ভােগ করতে হয় নি। সেই সব কথা আর্গ হনের দূতদের
কানে উঠল। তারা গিয়ে পােলােদের সঙ্গে একবার কথাবার্তা
বলে সম্রাটের কাছে গিয়ে প্রার্থনা করলেন, তাঁরা জলপথে
আর্গ হনের কাছে যাবেন, তবে সমুদ্রপথের সম্বন্ধে তাঁদের কোন
বিদেশে মার্কো পােলাে = জ্ঞান নেই, সে জন্য সম্রাট যেন অনুগ্রহ করে পােলােদের অনুমতি দেন তাদের সঙ্গে যেতে। পােলাে তিন জন সমুদ্রে বেড়িয়েছেন, জাহাজে চড়েছেন, সমুদ্র সম্বন্ধে তাদের বেশ জানা আছে, তারা যদি দূত কয়জনের সঙ্গে যান, এদের অনেকটা সাহস হয় । কুবলাই কথাটা শুনে বেশ খুসি হলেন না, কিন্তু দূতদের প্রার্থনায় অগত্যা পােলােদের ছেড়ে দিতে স্বীকৃত হলেন। তিনি পােলাে তিন জনকে ডাকিয়ে তাদের খুব স্নেহ দেখালেন, অর বলে দিলেন কাজ মিটিয়ে, দেশ দেখে তারা যেন আবার ফিরে আসেন। কুবলাই তাদের দু'খানা সােনার ফলক দিলেন। কুবলাইএর বিশাল সাম্রাজ্যের যেখানেই তারা যান না কেন এই ফলক সঙ্গে থাকলে তাদের কোন ভয়ের কারণ থাকবে না, যা যখন দরকার তখনই পাবেন, —তা লোকজনের সাহায্যই হােক, থাকবার, পথ চলবার ব্যবস্থাই হােক, আর তাঁদের সঙ্গে যত লােক জন থাকবে তাদের খাবার ব্যবস্থাই হােক। যেবার নিকোলো ও ম্যাকিয়াে পােপের সঙ্গে দেখা করতে যান সেবারও কুবলাই তঁাদের এই রকম একখানা সােনার ফলক দিয়েছিলেন,-পূর্বেই তা বলা হয়েছে। কুবলাই পােলােদের আরও বলে দিয়েছিলেন তারা যেন তাঁর দূত হয়ে পােপ, স্পেনের রাজা, ইংরেজদের ও ফরাসীদের রাজা ও ইয়ােররাপের অন্যান্য খ্রীষ্টান্ রাজাদের সঙ্গে দেখা করেন। তার পর আহনের দূত তিন জন ও কোথাচীনের সঙ্গে তারা যাত্রা করলেন। কুবলাই পােলােদের মণিরত্ব অনেক দিলেন, আর দু’বছরের মত পথ খরচও দিয়েছিলেন।
৫ দেশের দিকে চীন থেকে তাঁরা যাত্রা করলেন তের চৌদ্দখানা জাহাজ নিয়ে। প্রত্যেক জাহাজে ছিল চারটে মাস্তুল, আর এক একখানা জাহাজে নয়খানা পাল খাটাবার ব্যবস্থা ছিল। চার পাঁচ খানা জাহাজে প্রায় আড়াই শশা করে মাল্লা ছিল। তিন মাস জাহাজ চালিয়ে এলেন তারা একটা দ্বীপে। মার্কো এর নাম বলেছেন জাভা। বাস্তবিকই সেটা জাভা নয়, সেটা সুমাত্রা। সে কালের ভ্রমণকারীরা প্রায় সকলেই এই ভুলটা করতেন। এই সমুদ্রযাত্রায় অমঙ্গল, দুর্ঘটনা ঘটেছিল অনেক। মাঝি মাল্লা ছিল অনেক, কিন্তু তাদের মধ্যে ছ'শাে জন মরেছিল। আর্গ হনের দূত তিন জনের মধ্যে দু’জন মরেছিলেন, বেঁচে ছিলেন শুধু এক জন, নাম র ‘কোজা। পােলাের কেউ মরেন নি। কোগচীনের জন্যই এত কাণ্ড; সুখের বিষয় তাঁর কিছু হয় নি। সুমাত্রায় যখন তারা এলেন তখন ঝড় বৃষ্টির সময়, তাই সেখানে তাঁরা তিন মাস দেরী করে তার পর জাহাজ ছাড়লেন। পারস্যে পৌছতে তাঁদের আরও দেড় বছর লেগেছিল। জেট থেকে জাহাজ ছেড়ে পারস্যে যেতে ছাবিবশ মাস লেগেছিল। জেটনের এখনকার নাম ‘চোয়া-চু-ফু; আগে ইয়ােরােপে তার নাম ছিল
দেশের দিকে
২১
‘চিন্চু। মাল্লারা অনেকে মরেছিল সেই জন্যই বােধ হয় এত দেরী
হয়েছিল।
তারা যখন আর্গ হনের রাজ্যে এলেন তখন আর্গহন আর বেঁচে
নেই। আর্গহনের ছেলে ‘ঘাজান’ শেষে কোগচীনকে বিয়ে
করেন।
যখন পােলােরা ‘হরমজে নামলেন তখন আর্গহনের ভাই
‘কিয়াকাতু’ পারস্য ও আশপাশের দেশ শাসন করছিলেন; ঘাজান
তখন ছিলেন রাজ্যের উত্তর সীমান্তে ষাট হাজার সৈন্য নিয়ে,
পাছে শক্ররা দেশে ঢােকে সেই জন্য ঘাটি আগলে। কিয়াকাতুর
কথা মত পােলাের কোথাচীনকে ঘাজানের কাছে রেখে এলেন।
তার পর নিজেরা মাস কয়েক কিয়াকাতুর কাছে থাকলেন। বেশী
দিন থাকতে তাঁর সাহস করলেন না; কারণ তারা তার দেশে এত
বছর কাটিয়ে এটা বুঝেছিলেন শীঘ্রই একটা রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটবে।
সুতরাং দেরী করলে বাড়ী ফিরতে পারবেন কি না সন্দেহ, এই
ভেবে তারা কিয়াকাতুর কাছ থেকে বিদায় নিলেন। তিনি তাদের
চারটি সােনার ফলক দিলেন; এক একটা হাত খানিক লম্বা ও
আঙ্গুল পাঁচেক চওড়া। ফলক কয়টিতে লেখা থাকল,—এদের
যা দরকার তাই দিতে হবে, যেন এদের কোন অসুবিধায়
পড়তে না হয়; যারা এই হুকুম না মানবে তাদের প্রাণদণ্ড হবে।
পােলােরা এই জন্য ঐ অঞ্চলে পথে বিশেষ কষ্ট পান নি, সময়ে
সময়ে পথের বিপদ থেকে তাদের রক্ষা করবার জন্য দু'শাে ঘােড়-
সওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেত। পথে যেতে যেতে ভঁরা শুনলেন
;
२२
মার্কো পােলাে
যে কুবলাইএর মৃত্যু হয়েছে। খবর শুনে তাঁদের মনে চীনে
ফিরবার যেটুকু ইচ্ছা ছিল তাও লােপ পেল।
তাঁরা ‘ট্রেবিজণ্ডে’ গেলেন, সেখান থেকে গেলেন ‘কনস্তান্তি-
নােপলে’, তার পর ‘নিগ্রোপ হয়ে ১২৯৫ খ্রীষ্টাব্দে এলেন
ভিনিসে।
ভিনিসে পৌছে তারা গেলেন নিজেদের বসত বাড়ী। সেখানে
গিয়ে তারা পড়লেন মহা মুস্কিলে। তাদের বাড়ীর লােক, আত্মীয়
স্বজনের ধারণা ছিল তাঁরা অনেক কাল আগে মরে গিয়েছেন।
তারা এদের চিনতেই পারল না। তাদের চেহারা হয়ে গিয়েছিল
অন্য রকম ; দেখলে অনেকটা তার দেশের লােক বলেই মনে
হত; নিজেদের ভাষা প্রায় তারা ভুলে গিয়েছিলেন; তাঁদের কাপড়
চোপড়ের ছাঁট কাট অদ্ভুত রকমের ছিল। তারা যেন তার
দেশের লােক এ ধারণা প্রথম দেখাতে সবারই মনে হত।
কাজেকাজেই তাদের আত্মীয় স্বজনের ভুল হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।
পােলােরা ভেবে চিন্তে একটা মতলব ঠিক করলেন, যাতে
আত্মীয় স্বজনের মনে কোন সন্দেহ না থাকে, আর ভিনিসের
সকলে তাদের খাতির করে। পােললা বংশের সকলকে একদিন
রা. নিমন্ত্রণ করলেন। যেখানে ভােজের ব্যবস্থা হয়েছিল
সেখানে পােললা তিন জন লাল সাটিনের লম্বা পােষাক পরে
উপস্থিত হলেন। ভােজের আয়ােজন হয়েছিল খুব ভাল রকম।
অতিথিরা হাত ধুয়ে খেতে বসলেন; এদিকে এরা সাটিনের পােক
ছেড়ে লাল রেশমের পােষাক পরলেন, আর হুকুম দিলেন আগেকার
. .
পোলাে তিনজন তিনি শহরে ফিরে এসেছেন
From Si llenry lule's Buck of Marco Polo" John Murray).
No text on this page.
দেশের দিকে পােষাক সব কেটে কুটে চাকর বাকরেরা ভাগ করে নি। দু' একটা জিনিষ খাওয়া হয়ে গেলে এরা ঘর থেকে বেরিয়ে লাল ভেলভেটের পােষাক পরে এলেন; রেশমী পােষাকগুলােও চাকর- দের দেওয়া হ’লতারপর এ পােষাকগুলােও চাকরেরা পেল; এর পর তারা সাধারণ পােষাক পরে এসে অতিথিদের বললেন যে এই রকম দান মঙ্গোলদের প্রত্যেক ভােজেই হয়ে থাকে। তখন যারা খেতে বসেছিলেন তাঁদের মধ্যে আস্তে আস্তে কথা চলতে লাগল। একজন বললেন, “নিকোলাে ও ম্যাফিয়াের চেহারা যেন চেনা চেনা বােধ হচ্ছে। আর একজন তাতে সায় দিলেন। ক্রমে সকলের মুখেই অতি আস্তে আস্তে ঐ একই কথা। খাওয়া শেষ হ’ল। চাকরের পাত্র সব নিয়ে ঘর থেকে চলে গেল ; তখন মার্কো তিনটে পােষাক নিয়ে এলেন। এই তিনটে গায়ে দিয়ে মার্কো, মার্কোর বাবা ও কাকা বাড়ীর দুয়ারে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন কেউ তাঁদের চিনতে পারে নি। পােষাক তিনটির ভেতরকার সেলাই কাটতেই হুড় হুড় করে বড় বড় দামী পদ্মরাগ- মণি, হীরে জহরত বেরিয়ে এল। আর অবিশ্বাসের কারণ কি থাকতে পারে ? অতিথিরা এক- বাক্যে বলে উঠলেন,—“ঠিক! ঠিক! আমরা চিনতে পেরেছি। অনেক দিন হয়ে গিয়েছে বটে, তবু আপনার লােককে কি কেউ ভুলতে পারে ?” টাকার এমনি মহিমা! সহরের যে যেখানে ছিল সকলে এসে তিনজনের সঙ্গে কোলাকুলি করে তাদের নাম করতে লাগল।
মার্কো ভ্রমণকাহিনী কেমন করে লেখা হল যখনই কুবলাইএর সম্বন্ধে পােলাে গল্প করতেন তখন লাখ কথাটা খুব ব্যবহার করতেন। কুবলাইএর লাখ লাখ টাকা বছর বছর আসে, সহরগুলােতে লাখ লাখ টাকা, কুবলাইএর লাখ লাখ সৈন্য, বাগানে লাখ লাখ বিঘে জমি, লাখ লাখ তার চাকর। লাখ ছাড়া পােলাের কথা ছিল না, তাই দেশের লােকে উপহাস করে তার নাম দিল ‘লাখী’; তাদের বাড়ীর সঙ্গে পৰ্যন্ত ‘লাখী কথাটা জুড়ে দেওয়া হল। দু’এক বছর মার্কোর সম্বন্ধে আর বিশেষ কিছু শােনা যায় নি। সে সময় তিনিস’, ‘জেনােয়া’ আর ‘পিসা’,এই তিনটি সহরে দারুণ বিবাদ চলছিল। দু'একটা যুদ্ধে ভিনি জেনােয়াকে হারিয়ে দেয়, কিন্তু জেনােয় জয়ের আশা না ছেড়ে নানা রকম যােগাড়যন্ত্র করতে লাগল। পােলােদের আসার এক বছর আগে জেনােয়া জলযুদ্ধে ভিনিসূকে হারিয়ে দিল। বছর তিন চার পরে জেনােয়া ভাল ভাল জাহাজ নিয়ে আর একবার যুদ্ধ করবার জন্য আদ্রিয়াটিক উপসাগরের দিকে চলল। ভিনিসও জাহাজ পাঠিয়ে দিল। যুদ্ধে একখানা জাহাজ মার্কোর অধীনে থাকল। এবারও ভিনিসের হার হ’ল। সাত হাজার ভিনিসের লােক বন্দী হয়েছিল, তার মধ্যে মার্কোও ছিলেন।
|
২৬
eir fi
h
TALAZI DHES
SOTTOPORTICO
E, CURIL
b[L TON,
= = = = =
ভিনিসে পােলো বংশের গৃহের প্রবেশ দ্বার
from Sir Henry Yules “ Book of Marco Polo" (John Murray).
No text on this page.
মার্কোর ভ্রমণকাহিনী কেমন করে লেখা হল মার্কোকে মুক্ত করবার জন্য অনেক চেষ্টা ভিনিস থেকে করা হয় ; পণ হিসাবে অনেক টাকা ধ'রে দেওয়া হবে এমন কথা পৰ্য্যন্ত বলা হ’ল; কিন্তু মার্কো মুক্তি পেলেন না। মার্কোর বাবা দেখলেন তাঁর একমাত্র ছেলে,—তার অত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, অন্য জায়গায় আটক থাকলেন, সুতরাং সম্পত্তি ভােগ করবে কে? তিনি তাই শেষ বয়সে আবার বিয়ে করলেন। এই বিয়ের ফলে পরে তাঁর তিনটি সন্তান হয়। জেনােয়া-জেলে আটক হয়ে থেকে মার্কো একটা বড় কাজ করে ফেললেন। সেই হিসাবে তাঁর বন্দী হওয়াটা পৃথিবীর পক্ষে ভালই হয়েছিল। কারণ তিনি যে সব দেশ দেখেছেন তার একটা কাহিনী ওই জেলে বসে লেখা হল। মার্জে.এসিয়ার চারটে ভাষায় লিখতে জানতেন বটে, কিন্তু ভিনিসের ভাষা,যেটা তার মাতৃভাষা,—সেটা খুব ভাল জানতেন ব’লে বােধ হয় না। সুতরাং নিজে ইচ্ছা করে কোন বই সম্ভবত তিনি লিখতেন না। কিন্তু জেনােয়াতে তাঁর সঙ্গে ‘রষ্টিসিয়ানাে’ নামে আর একজন বন্দী থাকতেন, বাড়ী ছিল তার ‘পিসা’ সহরে। তিনি লেখাপড়া জানতেন, নিজে দু'একখানা গল্পের বইও লিখেছিলেন। মার্কের কাহিনী শুনে তার খুব ইচ্ছা হল সেগুলাে একখানা বইতে লিখে ছাপিয়ে দেবেন। মার্কোকে বুঝিয়ে বলাতে তিনি মুখে মুখে গল্প বলতে রাজী হলেন। রষ্টিসিয়ানো শুনে শুনে সে সব কাগজে লিখে নিতে লাগলেন। মার্কোর ভ্রমণ বৃত্তান্ত যা বের হল তার অনেক ভাষায় অনুবাদ ২৬ মার্কো পােলো হয়। ইটালী দেশের নানা ভাষায় তার অনুবাদ তাে হ’লই, তা ছাড়া স্পেনিস্,পর্তুগীজ, এমন কি আইরিশ, ভাষাতেও তার অনুবাদ হয়। প্রায় তিনশাে’ বছর পরে রামুসিয়াে’ অনেক পরিশ্রম করে একটা বই বের করেন, সেটাতে অনেক নতুন জিনিষ ছিল, আর অনেক ব্যাপার ঠিক করে লেখা হয়েছিল। রামুসিয়াে মার্কোর ভ্রমণ বৃত্তান্ত একখানি তার এক বন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এ বইখানা সম্ভবতঃ মার্কোর নিজের হাতে পাশে লেখা নতুন কতকগুলি বিষয় দেওয়া একটা বইএর লাটিন অনুবাদ। এসব ব্যাপার তাে পরে ঘটেছিল। রষ্টিসিয়ানাে মার্কোর বৃত্তান্ত তাঁর মুখে শুনে লিখে নিলে পর মার্কো মুক্ত হন। তিনি ভিনিসে এসে বিয়ে করেন। তাঁর ছেলে হয় নি; তিনটি মেয়ে ছিল, নাম তাদের ‘মরেটা’, ‘ফ্যান্টিনা, আর ‘বেলেলা । মার্কো যখন খালাস পেয়ে ফিরে আসেন তখন তার বাপ জীবিত ছিলেন কিনা সন্দেহ। মার্কোর কাকা ম্যাফিয়াে এরপর প্রায় বছর পনের বেঁচে ছিলেন। ১৩২৪. খ্রীষ্টাব্দে সত্তর বছর বয়সে মার্কোর মৃত্যু হয়। মরবার আগে তিনি যে ‘উইল’ করেন তা এখনও দেখতে পাওয়া যায়। তিনি “উইলে যে সব দান করে গিয়েছেন, তা থেকে বােঝা যায় না যে তিনি লাখপতি ছিলেন। পােলােদের পুত্র-পৌত্রের বংশ আন্দাজ ১৪১৮ খ্রীষ্টাব্দে লােপ পায়। আরও পরে পােলােদের দৌহিত্র বংশের খবর পাওয়া যায়। মার্কো থেকে পাঁচ পুরুষ পরে ‘মার্ক, আন্টোনিয়ে ট্রেভিসানাে ১৫৫৩ খ্রীষ্টাব্দে ভিনিসের ‘ডিউক বা শাসনকর্তা হয়েছিলেন।
৭ n ভ্রমণ-কাহিনীর প্রথম অংশ মার্কো অনেক কথাই বলে গিয়েছেন। তার মধ্যে অনেক নতুন খবর ছিল, নতুন বলেই লােকের কাছে তা অদ্ভুত ঠেকেছিল ; তাই সকলে তখন তা বিশ্বাস করে নি। আজকালকার ভ্রমণ- কারীরা, যারা ঐ সব অঞ্চল ঘুরে দেখে এসেছেন, তারা বুঝেছেন মার্কো যা যা বলেছেন সব ঠিক কথা। তবে মার্কো এ-সব দেখে শুনে অনেক দিন পরে রষ্টিসিয়ানােক মুখে মুখে বলে গিয়েছিলেন রষ্টিসিয়ানাে নানা জায়গার নাম লিখতে হয়ত কিছু গােলমাল করেছেন। মার্কোর ভ্রমণ বৃত্তান্তে যে সব নাম পাওয়া যায় তা বড় গােলমেলে। হয়তাে মার্কো একভাবে নাম উচ্চারণ করে- ছিলেন, রষ্টিসিয়াননা অন্যভাবে সেগুলো লিখেছেন। তা ছাড়া মার্কো যা নিজের চোখে দেখেন নি, পরের কাছ থেকে শুনেছেন তার মধ্যে কিছু ভুল থাকা বেশ সম্ভব। যাই হােক, মার্কোর বৃত্তান্তে ভুল যা আছে তা ঠিক কথাগুলাের তুলনায় খুবই সামান্য। আজ- কালের পণ্ডিতরা অনেক পরিশ্রম করে মার্কোর ভ্রমণবৃত্তান্তে দেওয়া নামগুলাে মিলিয়ে নেবার চেষ্টা করেছেন। সব জায়গা আজ কাল চেনা দায়। তবু প্রায় সব নামই লােকের নামই হােক, আর জায়গার নামই হােক—ঠিক করে নিতে পারা গিয়েছে।
২৮ মার্কো পােলো তিনি ‘আৰ্ম্মিনিয়া’র বর্ণনা করে ভ্রমণকাহিনী আরম্ভ করেছেন। তিনি দু’টা আৰ্ম্মিনিয়ার উল্লেখ করেছেন,-একটা বড় আর্মিনিয়া, আর একটা ‘ছােট আৰ্ম্মিনিয়া। তিনি এ দু’টার বেশী বিবরণ দেন নি, কারণ এ অঞ্চলে ভিনি ও জেনােয়ার বণিকদের গতিবিধি ছিল। তিনি বলেছেন,—আৰ্ম্মিনিয়াতে অনেক নগর ও কেল্লা আছে। এখানকার ভদ্রলােক সব এক কালে খুব সাহসী বীরপুরুষ ছিল, কিন্তু ক্রমে তাদের অধঃপতন ঘটেছে, তারা একেবারে অপদার্থ হয়ে পড়েছে। বড় আৰ্ম্মিনিয়া’র উত্তর অংশে ‘জর্জিয়া’র দিকে এক রকম তেল পাওয়া যায়। এত বেশী তেল মাটি থেকে বোেয় যে এক সঙ্গে একশাে জাহাজ বােঝাই করা যেতে পারে। মার্কো যে জায়গার কথা বলেছেন সেটা আর বুঝতে কষ্ট হয় না। বাকু ও ‘বাটুম’ বন্দর এখনও পেট্রোলিয়মের জন্য বিখ্যাত হয়ে রয়েছে। তার পর তিনি একটি প্রাচীন প্রাচীরের কথা বলেছেন ; ‘ডারবেল্টে’ সেকেন্দর শাহ এটি তৈরী করেছিলেন উত্তর দিক হতে শত্রুর আক্রমণ রােধ করবার জন্য। কাস্পীয় সাগরের তীরে যে দেবদারু কাঠ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্তে তারও উল্লেখ আছে। তখনকার কালে এই সব অঞ্চলের কোথায় কি পাওয়া যায়, লােকদের আচার ব্যবহার কেমন ছিল ইত্যাদি অনেক বিষয় তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্তে লেখা আছে। এসিয়ার লােক নতুনের ভক্ত নয় ; দু’ শশা, চারশাে বছর আগে দেশে যে অবস্থা ছিল সে অবস্থা সহজে বদলে যায় না। তাই আজকাল ঐ সব দেশে যারা গিয়েছেন, তারা নিজেদের চোখে দেখা জিনিষ ও কানে-শােনা
ভ্রমণ-কাহিনীর প্রথম অংশ
কথার সঙ্গে মার্কো পােলাের বৃত্তান্তের মিল দেখে আশ্চৰ্য্য
হয়ে যান।
কাস্পীয় হ্রদের দিকে যাওয়ার পথের বিবরণের সঙ্গে সঙ্গে
তিনি ‘টিফলিসে’ রেশম তৈয়ারীর কথা বলেছেন; তখনকার
কালেও ‘মােস নগর তুলার আবাদ ও কাপড়ের জন্য বিখ্যাত
ছিল ; মােস’ নাম হ’তেই ‘মসলিন্ নামের উৎপত্তি।
কুদ্দীস্থানের অধিবাসীরা সে সময়েও যে খুব দুর্দান্ত ছিল তা
মার্কোর বিবরণ থেকে জানা যায় ; তারা বড় খারাপ লােক ছিল,
আর তাদের কাজ ছিল বণিকদের জিনিষ লুঠ করা।
মার্কো পরে ‘য়্যাসাসিন্ বা গুপ্ত হত্যাকারীদের সম্প্রদায়ের
উল্লেখ করেছেন। এই দলের লােকদের কাজ ছিল খুন করা।
এদের সর্দার ছিল একজন বুড়ে। পাহাড়ের ওপর এর আড্ডা
ছিল তাই এর নাম হয়েছিল—পাহাড়ের বুড়াে। লােকটি যেমন
ধূর্ত, তেমনি নিষ্ঠুর। একটি উপত্যকার ওপর সে একটি অতি
সুন্দর বাগান ও প্রাসাদ তৈরী করে রেখেছিল। সেখানে হরেক
রকম আমােদ আরামের জিনিষ ছিল। সে প্রাসাদে কারও
ঢুকবার উপায় ছিল না, কারণ সম্মুখেই ছিল একটা ভারি শক্ত
কেল্লা ; যত শক্রই আসুক না কেন, সেটা জিতে নেবার সাধ্য তাদের
হত না। বুড়াের অধীনে একদল যুবক থাকত; যারা যুদ্ধ করতে
ভালবাসে এমন জোয়ান ছেলে সব বাছাই করে সে নিত। তাদের
মধ্যে থেকে এক একবার জন কতককে নিয়ে, তাদের এক রকম
নেশার জিনিষ খাইয়ে দিয়ে অচৈতন্য করে সেই প্রাসাদের মধ্যে
।
;
;
মার্কো পোেলাে ; আনা হত। সেখানে সুন্দর সুন্দর জিনিষপত্র দেখে, খাওয়া দাওয়ার সুখ ও নানা আরাম ভােগ করে তাদের মনে হ’ত-- এই-ই বুঝি স্বর্গ। দিন চার পাঁচ পরে আবার নেশায় অচৈতন্য করে তাদের বাইরে নিয়ে আসা হত। তখন বুড়াে তাদের জিজ্ঞাসা করত,—“তােরা এতদিন ছিলি কোথায় ?” মূখ তারা, কিছু তলিয়ে বুঝবার ক্ষমতা তাদের ছিল না; তারা উত্তর দিত,—“স্বর্গে ছিলাম।” তখন বুড়ো বলত,—“আমার অনুগ্রহেই তােরা স্বশরীরে স্বর্গে যেতে পেরেছিলি। যদি সব বিষয়ে আমার হুকুম মেনে কাজ করতে পারি, নিশ্চয় জানবি তােরা সবাই স্বর্গে যেতে পারবি।” ফলে এই হ’ল,—এই সব লােকের মরণের ভয় একেবারে ঘুচে গিয়েছিল ; কারণ তারা জানত, সর্দারের হুকুম তামিল করতে যদি তাদের মরণও হয়, তা হলেও তারা স্বর্গে চলে যেতে পারবে। বুডাের কাজ ছিল লুঠপাট করা ; আর যাদের শত্রু বলে মনে হত তাদের পিছনে লােক লাগিয়ে তাদের খুন করা। ‘ডামাস্ক অঞ্চলে এবং ‘কুদ্দীস্থানে’ বুড়াের দু’জন পাকা সাকরে ছিল, তারাও বুড়াের মত বদ কাজ করে দিন কাটাত। আশপাশের সকলেই বুড়াে ও বুডাের এই খুনে দলকে ভয় করত। ‘হলাকু খা” এই বুড়াের দফা রফা করেন । তিনি বুড়াের কেল্লা তিন বছর ধরে ঘেরাও করে জিতে নিয়ে বুড়ােকে মেরে ফেলেন ও তার খুনী দল ভেঙ্গে দেন। ‘হলাকু খা’ কি রকম করে বােগদাদ সহর জিতে নিয়েছিলেন তার বিবরণ মার্কো দিয়েছেন। মার্কো বলেছেন,-বােগদাদে ;
ভ্রমণ-কাহিনীর প্রথম অংশ অনেক সােনার কাজ ও রেশমের জিনিষ হয়, সেখানকার বিশ্ব- বিদ্যালয়ে নানা বিদ্যার আলােচনা হয়। বােগ্দা যে কত বড় সহর ছিল তা মার্কোর বিবরণ থেকে বেশ বােঝা যায়। বােগদাদ থেকে পােলাের গিয়েছিলেন ‘তাব্রিজ’ সহরে। এটিও বেশ বড় জায়গা, আর এখানে অনেক লােকের বাস, সােনা ও রেশমের কাজ হ’ত অনেক। ভারতবর্ষ, বােগ্দা প্রভৃতি জায়গা হ’তে এখানে মাল আমদানী হত, আর সেই সব মাল ইয়ােরােপে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইটালীর বণিকরা, বিশেষতঃ জেনােয়ার লােক এখানে দলে দলে আসত। বারাে দিনের পথ চলে মার্কো পারস্যে এসেছিলেন। পারস্যের এক কালে খুব খ্যাতি ও ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তার জাতি দেশটির তখন সর্বনাশ করেছিল। মার্কো এই প্রসঙ্গে পারস্যে প্রচলিত একটা গল্প বলেছেন। গল্পটি এই-- একজন সাধু পুরুষ জন্মেছেন শুনে তিনজন রাজা পূবদেশ হতে তাঁকে দেখতে গেলেন; শিশুকে উপহার দেবার জন্য তারা নিয়ে চললেন তিন রকম জিনিষ,সােনা, এক রকম গুগগুল-ধূপ, যা পূজা প্রভৃতি ধৰ্ম্মকর্মে পােড়ান হয়, আর এক রকম গুগগুল, যা ওষুধের কাজে লাগে। তারা ভেবেছিলেন যদি শিশু সােনা নেন তা হলে বুঝতে হবে তিনি রাজা, যদি প্রথম রকম গুগগুল নেন, তা হলে জানা যাবে যে তিনি ভগবান, আর দ্বিতীয় রকম গুগগুল নিলে জানতে হবে যে তিনি চিকিৎসক। শিশু যেখানে জন্মেছিলেন সে জায়গায় তারা এলেন। তিন জনের মধ্যে যাঁর বয়স সব চেয়ে
মার্কো পােলদা
কম, তিনি প্রথমে কে দেখতে গেলেন। তিনি গিয়ে দেখেন
শিশুর বয়স ঠিক তার মত। তার পর তার চেয়ে বয়সে বড় যিনি,
তিনি গিয়ে দেখেন শিশুর বয়স ঠিক তারই মত। তৃতীয় জনও
গিয়ে দেখলেন তাই। তিন জনেই ভারি আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
পরে তিন জন যখন একত্র হয়ে তাঁরা কে কি দেখেছেন সে-বিষয়ে
গল্প করলেন, তখন তাঁরা আরও আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তখন
তাঁরা পরামর্শ করে ঠিক করলেন, তাঁরা তিন জন এক সঙ্গে গিয়ে
কে দেখবেন। এক সঙ্গে গিয়ে রা দেখলেন শিশু দেখতে
ঠিক শিশুরই মত; তাঁর বয়স তেরাে দিন, তাঁকে তেরাে বছরের
থােকার মতই দেখাচ্ছিল। তারা ভক্তিতে গদ গদ হয়ে তাকে
নিজেদের আনা উপহার দিলেন। শিশু তিন রকমের উপহারই
নিয়ে একটি ছােট ডালাবন্ধ বাক্স তাঁদের দিলেন। বাক্স নিয়ে
তিন জন দেশের দিকে চললেন।
যখন পথ চলতে চলতে কিছুদিন কেটে গেল তাদের ইচ্ছা হল
বাক্সটি খুলে দেখেন তার মধ্যে কি আছে। তারা সেটি খুলে দেখেন
ভেতরে একখণ্ড পাথর। তাঁরা পাথরটা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন,
শিশু কেন যে তাঁদের এটা দিলেন তা বুঝতেই পারলেন না।
সব জিনিষের বা ব্যাপারের এক একটা অর্থ থাকে। যখন
রাজা তিন জন তাদের আনা উপহার শিশুকে দিলেন, শিশু তা
সব কয়টিই নিয়েছিলেন; তারা তাই দেখে ভেবেছিলেন যে ইনিই
প্রকৃত ভগবান, প্রকৃত রাজা, আর প্রকৃত চিকিৎসক। এ ধারণাটা
তারা ঠিকই করেছিলেন, কিন্তু পাথরটা দেওয়ার অর্থ তারা খুঁজে
;
ভ্রমণ-কাহিনীর প্রথম অংশ পলেন না। সেটির অর্থ—তাঁদের মধ্যে যে বিশ্বাস জন্মেছে সেটি থিরের মত দৃঢ় হবে। এ অর্থ তারা বুঝতে না পেরে একটি Fয়াের ভেতর পাথরটি দিলেন ফেলে ; অমনি সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থকে অগ্নিশিখা নেমে কুয়াের ভেতর ঢুকতে লাগল। যখন রাজা তন জন এই কাণ্ড দেখলেন তারা বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলেন। তঁারা এটা বুঝলেন যে পাথরের মনে আছে, আর সে মানে সাধারণ লােকে বুঝবে না। তখন পাথরখানা ফেলে দেওয়ার জন্য তাদের মনে ভারি অনুতাপ হতে লাগল। তখন সে আগুন থেকে একটু আগুন নিয়ে তারা দেশে এসে একটা সুন্দর ভাল মন্দির তৈরী করে গ’তে রেখে দিলেন। সেখানকার লােকে অনবরত সে আগুন জ্বালিয়ে রাখত, দেবতা জ্ঞান করে তার উপাসনা করত, আর যত হােম, যাগযজ্ঞ হত, সব ঐ আগুন থেকে নিয়ে করা হত। প্রাচীনকালে পারস্যের লােকে আগুনের পূজা করত। তাই মনে হয়, যীশুখ্রীষ্টের গল্পের মধ্যে আগুনের গল্প ঢুকিয়ে তারা একটা নতুন গল্পের সৃষ্টি করেছিল। পােলাের বইতে পারস্যের সব নগরের যে বিবরণ পাওয়া যায় তাদের নাম একটু আধটু বদলে নিলে আজকালকার অবস্থার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। এখনকার কালে পারস্যে যারা অনেক দিন কাটিয়েছেন, তাঁরা বলেন পােলাে সে-দেশের যে বিবরণ দিয়ে গিয়েছেন তা প্রায় ঠিক। মার্কো বলেছেন,-পারস্যে ভাল ভাল ঘােড়া পাওয়া যায় ; এখান থেকে ঘােড় ভারতবর্ষে চালান গিয়ে বিক্রী হয়। এখানে ৩৪ মার্কো পােলাে ভাল ভাল গাধাও আছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, গাধার দাম অনেক সময় ঘােড়ার চেয়ে বেশী, কারণ গাধা খায় কম, বােঝ বয় বেশী, আর হাঁটে অনেক দূর। উটও আছে, কিন্তু উটগুলি খুব তাড়াতাড়ি চলতে পারে না। উট একেবারে না থাকলে এদেশে মুস্কিল, কারণ এমন অনেক জায়গা আছে, যার আশপাশে বহু দূরের মধ্যে ঘাস জন্মায় না। মার্কো ‘ব্রিজ দিয়ে পারস্যে ঢু’কে ‘কাজবিন্ হয়ে ‘সেবায় পেীছেন। সেবা’ এখনও আছে, নাম তার এখন ‘সেভা'; সেবা ‘তিহারাণে’র পঁচিশ ক্রোশ দক্ষিণে, এখন তার ভাঙ্গাচোরা অবস্থা। সেবার কথা বলতে গিয়েই মার্কো ‘তিনজন ঋষি’র গল্প করেছেন। তিনি তার পর যান ‘ইয়েজ’ নগরে; নগরটি রেশমের কাজের জন্য বিখ্যাত। তার পর ‘কারমা প্রদেশের কথা। মার্কো এর প্রশংসা করেছেন। কারমা পারস্যের পূর্ব সীমান্তে। এখানে পাহাড়ে অনেক ভাল ভাল পাথর, দামী রত্ন পাওয়া যায় ; অনেক অস্ত্র, যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম এখানে তৈরী হয়। এখানকার স্ত্রীলােকের হাতের শিল্প কাজ বিখ্যাত; তারা সূচ দিয়ে রেশমের কাপড়ে সব রকম জীবজন্তুর মূর্তি বুনতে পারে। তারপর আট দিনের পথ চলে পােলােরা একটা পাহাড়ে পৌছেছিলেন। সমতল ভূমির ওপর অনেক নগর ও কেল্লা, কিন্তু পাহাড়ের ওপর গােটা কতক রাখালের কুঁড়ে ঘর ছাড়া লােকের বসতি ছিল না; তবে ফলের গাছ ছিল অনেক। এই অঞ্চলে শীতকালে এত ঠাণ্ডা পড়ে যে লোকে অনেক কাপড় চোপড় গায়ে জড়িয়েও
ভ্রমণ-কাহিনীর প্রথম অংশ
শীতের কষ্ট ভােগ করে। পাহাড় পেরিয়ে আবার একটা সমতল
ভূমি। এ অঞ্চলে বেদানা, ‘পীচ, আরও নানারকম ফল জন্মায়।
পােলল এখানকার এক রকম বড় ষাড়ের কথা বলেছেন, তাদের
লােম শাদা, পাতলা ; শিং ছােট্ট, কিন্তু সূচাল নয়, মােটা। উটের
মত পিঠে তাদের কুঁজ। তারা খুব ভার বৈতে পারে। যখন
গদের পিঠে ভার চাপাবার দরকার হয়, তারা উটের মত হাঁটু
গেড়ে বসে, তার পর বােঝা চাপান হলে আবার উঠে দাঁড়ায় ;
এই রকম ভাবে ভার নিতে তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
এ অঞ্চলের ভেড়াও অদ্ভুত। সেগুলাে গাধার মত দেখতে বড়,
আর তাদের প্রকাণ্ড মােটা লেজ, ওজনে এক একটা লেজ প্রায়
সের পনের। এদের মাংস বেশ ভাল। ভেড়ার বর্ণনা থেকে
বােঝা যায় মার্কো দুম্বা ভেড়ার কথাই বলেছেন।
এ সব দেখতে গেলে অঞ্চলটা যে ভাল ছিল তা বলতে পারা
যায়। কিন্তু সেখানে একটা ভয়ের কারণ ছিল, সে হচ্ছে ‘কারাউন।
নামে একদল ডাকাতের উৎপাত। লােকের ধারণা ছিল,
তাররা ছিল এদের বাপ, মা সব ছিল ভারতবর্ষের মেয়ে ।
সম্ভবতঃ এ ধারণা ভুল। বােধ হয় তার সৈন্যদের মধ্যে যারা সব
চেয়ে বদ দের ‘কারাউনা’ বলা হত। এদের মধ্যে মঙ্গোল,
তুর্কী, কুর্দ আরও কত কি ছিল। তারা যে শুধু এই সমতল
ভূমির ওপর অত্যাচার করে বেড়াত তা নয়; তারা ভারতবর্ষের
মধ্যেও ঢুকেছিল লুঠতরাজ করতে, এমন কি সম্ভবতঃ লাহাের পর্যন্ত
পেঁৗছেছিল। আজকালকার হাজারা জাতি ও বেলুচীরা বােধ
মার্কো পােলদা হয় তাদের বংশধর। ঘিলজাই পার্বত্য জাতি হাজারদের নাম দিয়েছে মােগল । এ অঞ্চলে আর একটা উৎপাত ছিল, সেটা এক রকম শুকননা কুয়াসা; সাধারণতঃ আমরা যে কুয়াসা দেখি তার মধ্যে জলের অতি সূক্ষম সূক্ষম কণা থাকে। কিন্তু এ কুয়াসায় জলের লেশমাত্রও থাকে না, তাতে চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে যায়। মার্কো বলেন,‘কারাউনারা মন্ত্রতন্ত্রের জোরে এই কুয়াসার অন্ধকার সৃষ্টি করত। এই অন্ধকারে গা ঢেকে ঐ ডাকাতের দল লুঠ করতে বেরােয়। তাদের পথ ঘাট সব জানা, পাশাপাশি ঘােড়া ছুটিয়ে তারা চলে, তাদের কোন কষ্ট হয় না। মার্কো একবার তাদের হাতে প্রায় ধরা পড়েছিলেন। তিনি কোন রকমে ভগবানের দয়ায় পরিত্রাণ পেয়ে কাছাকাছি একটা গ্রামে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান; কিন্তু তাঁর দলের সাত জন ছাড়া বাকী সকলে ‘কারাউনাদের হাতে পড়েছিল। ডাকাতরা তাদের কতকলােককে গরু বাছুরের মত বিক্রী করেছিল; আর জন কতককে মেরে ফেলেছিল। ‘কারাউনাদের স্বভাবই ছিল এই। তাদের হাতে বুড়াে বুড়াে লােক পড়লে মেরে ফেলত, কারণ বুড়ােদের বেচে তো পয়সা পাওয়া যাবে না, বুড়াে চাকর কিনবে কে ? যাদের বয়স কম তারাই অন্য লােকের ক্রীত দাস হয়ে প্রাণে বেঁচে রইত। তবে ‘কারাউনারা সত্য সত্যই অন্ধকার সৃষ্টি করতে পারত না; যখন অন্ধ কার হত তারা নিজের কাজের সুবিধা করে নিত। তাদের ভয়ে গ্রামের
ভ্রমণ-কাহিনীর প্রথম অংশ
লােক গ্রামের চারধারে মাটির উঁচু দেওয়াল গেঁথে বাস
করত।
এই সমতল অঞ্চলের ওপর দিয়ে সাত দিনের পথ চললে
‘হরূমজ’ বন্দরে পৌছান যায়। শেষের দিকের পথ মােটেই ভাল
নয়, একেতাে তখন সেটা ‘উৎরাই’—অর্থাৎ ওপর থেকে নীচের
দিকে নামতে হয়, তা ছাড়া পথে রাহাজানির ভয়ও ছিল খুব।
‘
হজ’ তখন পারস্যের জমির ওপর ছিল, তার পর তাতারদের
আক্রমণের ভয়ে বন্দরটি দ্বীপের ওপর বসান হয়। আট শশা বছর
আগে হরমজ, একটি বিখ্যাত বন্দর ছিল ; এখন এটি সামান্য একটি
গ্রাম, এর যা কিছু ব্যবসা বাণিজ্য, সব ‘বন্দর আব্বাসে’ উঠে
গিয়েছে।
মার্কো ‘হমজে’র খুব প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন,
সে অঞ্চলে নদী ও খেজুর গাছ যথেষ্ট, পাখীও নানা রকম আছে।
‘হমজ বন্দরে নানা দেশ থেকে বণিকেরা সব আসে ; মশলা,
মণি, মুক্তা, সােনা রূপার কাজকরা কাপড় চোপড়, হাতির দাঁতের
জিনিষ সব ভারতবর্ষ থেকে ‘হমজে আমদানী হয়। দেশী
বিদেশী লােকের ভিড়ে বন্দরটি সব সময় সরগরম থাকে। মার্কো
‘হমজে’র রাজার নাম বলেছেন রােশেনা ইবন্ আহমদ; ইনি
‘কারমানে’র সুলতানের অধীন। যদি কোন বণিক হজে মরেন
তার সম্পত্তি রাজাই পান। এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে অসহ্য গরম
পড়ে; ললাকে জলের মধ্যে ঘর তৈরী করে তখন তার মধ্যে বাস
করে। দুপুর বেলা এমন গরম হাওয়া চলে, যে লােকে দম
মার্কো পােলাে
যে
আটকে মারা পড়ে ; তাই প্রাণের দায়ে যতক্ষণ না হাওয়া থামে,
ততক্ষণ তার একগলা জলে দাঁড়িয়ে থাকে। কি রকম ভীষণ
অবস্থা তখন হয় তার একটা গল্প মার্কো করেছেন। হরমজের
রাজা খাজনা দেন নি বলে কারমানে’র সুলতান তার বিরুদ্ধে
হাজার ছয় সাত ফৌজ পাঠিয়ে দেন ; যােল শশা ঘােড় সওয়ার
আর পাঁচ হাজার পদাতিক এল হরমজ, আক্রমণ করতে।
লােকটা পথ দেখাবার জন্য আসছিল তার হ’ল পথ ভুল ; সৈন্যেরা
রাত কাটাবার জন্য এক জায়গায় থামল। পর দিন সকালে
বাতাস উঠল, সাত হাজার সৈন্য দম বন্ধ হয়ে মারা পড়ল। পাছে
মড়া পচার দুর্গন্ধে দেশে রােগ, মড়ক ছড়িয়ে পড়ে, তাই হজের
লােকে তাদের গাের দিতে গেল। গর্ত খুঁড়ে যখন তারা এক
একটা মড়ার হাত ধরে টানতে গেল তখন শুধু হাত খানা দেহ
থেকে খুলে এল। গরম হাওয়ায় মড়া সব শুকিয়ে কাঠ হয়ে
উঠেছিল।
মার্কো সেখানকার লােক ও জাহাজ সম্বন্ধে অনেক কথাই
বলেছেন। অধিবাসীরা রুটি বা মাংস খায় না ; তাদের খাদ্য হ’ল
খেজুর, নােনা মাছ ও পেঁয়াজ। তাদের জাহাজ মােটেই শক্ত ছিল
; কারণ জাহাজের তক্তা সব লােহার পেরেক দিয়ে আঁটা হত না ;
কাঠের গোঁজ ও নারকেলের ছােবড়ার তৈরী দড়ি দিয়ে তক্তা সব
আঁটা থাকত।
যেমন আলু কি তামাকের নাম তখন ইয়ােররাপে
কেউ জানত না, সেই রকম নারকেলের নামও তখন ইয়ােররাপের
লােকে শােনে নি। মার্কো তাই নারকেলের নাম দিয়েছেন
ভ্রমণ-কাহিনীর প্রথম অংশ ‘ভারতবর্ষের বড় বাদাম। নারকেলের খােসা বা ছােবড়া থেকে কেমন করে ঘােড়ার বালাচির মত লম্বা লম্বা আঁশ বের করা হয়, মার্কো তার বিবরণ দিয়েছেন; আর বলেছেন সেই আঁশ দড়ির মত পাকিয়ে কেমন করে শক্ত করা হয়, আর তাই দিয়ে কেমন করে জাহাজের তক্তা এটে ফেলা হয়। ছােড়ার দড়ি যা তৈরী হয় তা বেশ শক্ত, জলে তা পচে না, ছােট খাট সমুদ্রের ঢেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। এক একখানা জাহাজের একটা মাস্তুল, একটা পাল, একটা হাল থাকত; জাহাজের পাটাতন ছিল না; তবে মাল বােঝাই করে তার ওপর একটা ঢাকা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। জাহাজের কাঠের ওপর আলকাতরা দিয়ে রঙ, তারা করত না, শুধু মাছের তেল ঘষে দিত। এই রকম জাহাজে চড়ে সমুদ্রের ওপর দিয়ে দূরে যেতে হলে প্রাণ হাতে করেই যেতে হত। ভারতবর্ষের সঙ্গে হরমজের বেশ বাণিজ্য চলত; অনেক মাল, অনেক ঘােড়া হজ, থেকে জাহাজে ক'রে ভারতবর্ষে রপ্তানী হত। জাহাজগুলাে একেতাে মজবুত নয়, তার ওপর সমুদ্রে ঐ অঞ্চলে খুব বেশী ঝড় হয়; ফলে মালসুদ্ধ অনেক জাহাজ ভেঙ্গে সমুদ্রে তলিয়ে যেত। পােলাের দক্ষিণে হরূমজ, পৰ্য্যন্ত এসেছিলেন কেন ঠিক বুঝা যায় না। তারা তুর্কীস্থানের মধ্য দিয়ে বরাবর পূর্বদিকে যান নি তার কারণ ‘লিভান্ট’ অঞ্চলের মালিক হলাকু’র সঙ্গে ভয়ানদীর তীরে তাতারদের যে দল ছিল তাদের রাজা ‘বকা’র ঝগড়া চলছিল। কিন্তু তারা যখন ‘কারমানে এসেছিলেন তাঁরা অনায়াসে উত্তর- পূব দিকের পথ ধরে যেতে পারতেন। তা না গিয়ে রা
৪০
মার্কো পোেলাে
এলেন আরও দক্ষিণে ‘হমজে। পােলাের ব্যবসাদার লােক,
বােধ হয় ভঁরা ‘হমজে বাণিজ্যের কথা শুনে সেখানে
এসেছিলেন। আরও হয়ত তাঁদের মতলব ছিল সেখান থেকে
জাহাজে চেপে তারা পূর্ব দিকে যাবেন, আর সেখানে গিয়ে
জাহাজের অবস্থা দেখে হয়ত তাঁরা সে মতলব ছেড়ে
দিয়েছিলেন। তাই বােধ হয় অগত্যা তারা আবার কারমানের
দিকে চললেন ; তবে যে পথ তারা ধরলেন সেটা অন্য পথ ।
‘কারাউনাদের ভয়েই বােধ হয় তাঁরা পথ বদলেছিলেন।
এই পথটার সম্বন্ধে মার্কো বেশী কিছু বলেন নি। সে জায়গাটা
সমতল কিন্তু সেখানে রুটি যা তৈরী হয় জলের দোষে তা
প্রায় অখাদ্য। সেখানে মাটি থেকে এক রকম গরম জলের
ফোয়ারা উঠত ; সে সব ফোয়ারায় অনেকে স্নান করত, কারণ
সে জলের অনেক গুণ ছিল তাতে অনেক রােগ সহজে
সেরে যেত।
এতদিন মােটের ওপর ভাল জায়গার ওপর
দিয়েই
পােলােদের পথ গিয়েছিল। ক্রমে এখন খারাপ জায়গার মধ্যে
দিয়ে দের যেতে হল। এ সময় যে ভাল পথ, বড় সহর
তারা একেবারে পান নি তা নয়। তবে অনেক জায়গাতেই
তাদের পার হতে হয়েছিল ছােট, বড় অনেক মরুভূমি। মরুভূমিতে
অনেক অসুবিধা, বিপদ ছিল ; তার মধ্যে সব চেয়ে বড়
হ’ল জলের কষ্ট। মার্কোর বিবরণ থেকে তখনকার মরুভূমির
এক একটা সুন্দর ছবি পাওয়া যায়।
•
৮
মরুভূমির মাঝে মার্কো পােলাে
‘কারমা থেকে উত্তর দিকে তিন দিন ঘােড় চালিয়ে
একটা মরুভূমির মধ্যে পােলাের এলেন। পথ বড়ই খারাপ;
সঙ্গে জল নিয়ে না এলে দারুণ কষ্ট পেতে হয়, এমন কি
প্রাণ পৰ্যন্তও যেতে পারে। কিছু দিন আগেও যাঁরা সেই
মরুভূমি পার হয়েছেন, তাঁরাও এই একই কথা বলছেন।
বেশ বুঝা যায় মার্কো বাজে কথা বলেন নি।
মার্কো বলেছেন, প্রথম তিন দিন ভাল খাবার জল একেবারে
মিলবে না। গােটা কতক জলাশয় পাওয়া যায় বটে, কিন্তু
তার জলের রঙ সবুজ, যেন লতা পাতা পচান জল, আর
যেন মুন গােলা। সে জল যে খাবে, তা
মানুষই হােক
আর পশুই হােক, তার পেটের অসুখ করবেই। চার দিনের
দিন মাটির তল দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এমন একটা নদী পাওয়া
যায়। পারস্যের এই অঞ্চলে এ রকম অন্তঃসলিলা নদীর কথা
খুব প্রাচীন বইতেও লেখা আছে। তার পরেও দিন তিন চার
ধরে পথের এই ভীষণ অবস্থা। সুখের মধ্যে এই যে সেখানে
‘কারাউনা’ বা হিংস্র বুননা জানােয়ারের উৎপাত নেই। শেষের
কয় দিন পথে মাঝে মাঝে বুনাে গাধা দেখা গিয়েছিল।
৪২ মার্কো পােলাে সাত দিন পরে একটা বড় সহরে তাঁরা এলেন, মার্কো তার নাম দিয়েছেন কবি। সেখানে ইস্পাতের ওপর পালিশ করে বড় বড় আয়না তৈরী হয়, আর চোখের জন্য এক রকম কাজল পাওয়া যায়। খনি থেকে দস্তার চাপ উঠিয়ে তা আগুনে গলিয়ে কি উপায়ে দস্তা ও ‘টুটি’ নামে জিনিষ তৈরী হত তার বিবরণ মার্কো দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন এই ‘টুটি চোখের রােগে ভাল ঔষধ। কবিহা সহর ছাড়িয়ে আবার মরুভূমি ; তা পার হতে আটদিন লাগে। এর মধ্যেও গাছপালা, ফলমূল, জল পাওয়া যায় না। জল যা পাওয়া যায় তা অতি বিশ্রী, পশুতে পৰ্যন্তও তা ছোঁয় না। এই মরুভূমি পার হ'লে পারস্যের উত্তর সীমান্তে এক প্রদেশে পৌছান যায়। সেখানে অনেক সহর ও কেল্লা আছে। মার্কো জায়গাটার প্রশংসা করেছেন। তিনি একটা অদ্ভুত গাছের কথা বলেছেন, নাম তার ‘সূর্য্যের গাছ’ বা ‘শুকনাে গাছ। বেশ বড় গাছ, পাতার একদিক শাদা আর একদিক সবুজ। বাদামের মত এক রকম ফল এর হয়, তবে তার মধ্যে কিছু থাকে না, শুধু খােসাই সার। কাঠের রঙ, হলদে, বেশ শক্ত, ভারী কাঠ। ক্রোশ পঞ্চাশের মধ্যে অন্য কোন গাছ নেই, কেবল একদিকে পাঁচ ক্রোশ দূরে অন্য রকম গাছ দেখতে পাওয়া যায়। অধিবাসীরা মার্কোকে বলেছিল যে এইখানে সেকেন্দর শাহ পারস্যরাজ দরায়ুসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। সহরগুলােতে ভাল ভাল জিনিষ আছে, আবহাওয়াও ৪৩ ; মরুভূমির মাঝে মার্কো পােলাে ভাল ; অধিবাসীদের চেহারাও ভাল। মার্কো বলেছেন ঐ অঞ্চলের স্ত্রীলােকদের মত এমন সুশ্ৰী স্ত্রীলােক তিনি আর কোথাও দেখেন নি। পােলােরা তারপর ‘খােরাসা’ ও আফগানিস্থানের পশ্চিম অংশ দিয়ে চললেন। তাঁরা যে পথ দিয়ে গিয়েছিলেন তা ঠিক এখন বুঝবার উপায় নেই। শেষে তারা ‘বখ’ নগরে পৌছলেন। এক কালে ‘বখ, খুব বড় বড় ও সুন্দর সুন্দর প্রাসাদে পূর্ণ ছিল, কিন্তু জেঙ্গি খাঁ তার দফা রফা করেছিলেন। পােলােরা যে সময় গিয়েছিলেন, তখন তার ভাঙ্গাচোরা অবস্থা, লােকের সংখ্যাও কমে গিয়েছিল। ‘লিভান্ট’ অঞ্চলে তাতার রাজার অধিকারের শেষ সীমা ছিল ‘বখ। তার পর বারাে দিন ধরে যে দেশের মধ্য দিয়ে তারা পথ চলেছিলেন সেটা ছিল যেন শ্মশান; সেখানে কোন জন- মানব ছিল না। ডাকাতের অত্যাচারে ও সৈন্যদের যাওয়া আসায় লােকেরা দেশ ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিল। ও দেশে নদী ও শিকার করবার পশু ছিল বিস্তর। সেখানে সিংহও পাওয়া যেত। পথে খাবার মিলত না ; তাই পথিকেরা দিন কতকের খাবার সঙ্গে নিয়ে পথ চলত। ওখানে মুনের পাহাড়ের কথা পােলাে বলেছেন। ত্রিশ দিনের দূরের পথ হেঁটে লােকে আসত এখান থেকে নুন নিতে; লােহার গাঁথি দিয়ে মুন ভাঙ্গতে হত, এত শক্ত পাহাড়ের গা। এ অঞ্চলটায় খাবার বেশ পাওয়া যায়। পুরুষেরা মাথায় হাত দশেক লম্বা মােটা দড়ি জড়িয়ে পাগড়ীর মত করত, বুনন পশুর চামড়া দিয়ে তারা পােষাক করত।
৪৪ মার্কো পােলো তার পর পােলােরা এলেন ‘ কিম’ নগরে, তার আশ পাশে পাহাড়ের ওপর অনেক কেল্লা, মাঝ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক নদী। এখান থেকে তিনদিনের পথ চলে মার্কো এলেন ‘বাদাকশানে। ললাকে বলে এখানকার রাজারা সেকেন্দর শাহর বংশধর। সেকেন্দর পারস্যের রাজা দরায়ুসকে হারিয়ে দিয়ে তাঁর মেয়েকে বিয়ে করেন। বাদাকশানে’র রাজবংশ এদের থেকেই জন্মেছে, অন্ততঃ মার্কো তাই শুনেছিলেন। দেশটা মণি-রত্নে ভরা। পাহাড়ের গায়ে খনি থেকে এই সব খুঁড়ে বের করা হয়। মার্কোর বাপ, কাকা দামী পাথরের ব্যবসা করতেন, কাজেই মণি-রত্ন সম্বন্ধে খোঁজ খবর করা মার্কোর পক্ষে স্বাভাবিক। মার্কে বলেছেন যে ‘বাদাকশানের রাজা নিয়ম করে দিয়েছেন, তার হুকুম বা পরােয়ানা না নিয়ে যে মণি খুঁড়ে বে’র করবে তার প্রাণ যাবে। মণি খুড়বার সম্বন্ধে এত ধরাবাঁধা বা কড়াকড়ি না থাকলে এত বেশী মণি বা দামী পাথর বের হবে যে তার আর কোন দাম থাকবে না। সেখানে খনি থেকে রূপা, সীসা প্রভৃতি ধাতুও পাওয়া যেত। দেশটা ঠাণ্ডা ; সেখানে ভাল ভাল ঘােড়া ছিল, তাদের খুর এত শক্ত যে ‘নাল’ মারবার দরকার হ’ত , শুধু খুর নিয়েই তারা পাহাড়ের পথে ছুটতে পারত। ভাল শিকরে পাখীও সেখানে মিলত। ভাল যব গম সেখানে জন্মাত আখরােটের ও তিলের তেলের কথাও মার্কো বলেছেন। সেখান- কার নদী সব ভাল, সমতল ভূমি বড় ও পাহাড়গুলাে উচু ও খাড়াই। অসুখ হলে পাহাড়ের ওপর গিয়ে দিন দুই তিন বাস ৪৫ মরুভূমির মাঝে মার্কো পােলাে করলে লােকের অসুখ সেরে যায়। মার্কো নিজে বছর খানেক অসুখে ভু’গে এই রকমে সেরেছিলেন। সেখানকার পুরুষদের সম্বন্ধে মার্কো বলেছেন যে তারা পশুর চামড়া পরে ও ভাল তীর ছুঁড়তে ও শিকার করতে পারে। মেয়েদের পােষাক একটু অদ্ভুত ছিল। সেখানকার লােকের ধারণা ছিল, যে স্ত্রীলােককে যত মােটা দেখাবে সে তত সুন্দর। তাই স্ত্রীলােকেরা কোমরে ষাট সত্তর গজ কাপড় জড়িয়ে রাখত। এ অঞ্চল সম্বন্ধে মার্কো খুব বেশী বিবরণ দিয়েছেন, তার কারণ তিনি এখানে অসুখে পড়ে প্রায় এক বছর ছিলেন, কাজেই সে সময় তিনি অনেক জিনিষ দেখতে শুনতে পেয়েছিলেন। এখানকার খোঁজ বড় একটা কেউ রাখত না। মার্কোর পরে অনেক বছরের মধ্যে এখানে কোন ইয়ােররাপের লােক আসে নি। মার্কো নিজে একজন ছােট্টখাট্ট জহুরী; তিনি বলেছেন এখানে প্রবালের আদর খুব বেশী। ইয়ােরােপ থেকে এখানে যে প্রবাল আমদানী হত তা খুব বেশী দরেই বিক্রী হত। ভারতবর্ষ বা কাশ্মীর সম্বন্ধে তিনি আর বেশী কিছু বলেন নি ; তারপর তিনি পামির অঞ্চলে এলেন,এটা ‘বাদাকশানে'র উত্তর-পূর্ব দিকে। মার্কো বলেছেন,-“বাদাকশান রাজ্যের পর রাজার ভায়ের রাজ্য, তার পর আর একটা প্রদেশ। এইটার পর তিন দিন ধরে ‘চড়াই’ আরম্ভ—অর্থাৎ উঁচু ঢালু পাহাড়ে উঠতে হয়, শেষে একটা খুব উচু পাহাড় দেখা যায়; দুই পাহাড়ের মধ্যে একটা বড় হ্রদ আছে; সমতলভূমির ওপর দিয়ে একটি সুন্দর নদী বয়ে যাচ্ছে; নদীর তীরে ;
,
৪৬
মার্কো পােলাে
এত ভাল ঘাস জন্মায় যে রােগা ঘােড়া বা ষাঁড় যদি দশ দিন
সেখানে চরে তা হ'লে মােটা হয়ে যাবে।” এটা মার্কোর নিজের
কথা—একটুও না বদলে তুলে দেওয়া হয়েছে। নদীটির নাম অক্সা।
মার্কো বলেছেন সেখানে বুনাে পশু যথেষ্ট। এক রকম বুনন
প্রকাণ্ড ভেড়ার কথা তিনি বলেছেন, শিঙ, তার ছয় বিঘত লম্বা
আর বেশ মােটা। সেখানকার রাখালেরা এই শিঙ থেকে খাবার
রাখবার জন্য বড় বড় বাটি তৈরী করে, আর খোয়াড়ের বেড়া দেবার
জন্যও তাদের শিঙ, কাজে লাগায়।
মার্কো এই সব কথা যখন বলেছিলেন তার দেশে তা আজগুবি
বলে হেসে লােকে উড়িয়ে দিয়েছিল ; কেউ এ সব কথা বিশ্বাস
করতে চায় নি। যখন পাঁচ শশা বছরেরও পরে ক্যাপটেন্ জন্
উড় ঐখান দিয়ে যাবার সময় ঐ ভেড়া স্বচক্ষে দেখে তার বিবরণ
পৃথিবীর লােককে জানিয়ে দিলেন,-সে হ’ল ১৮৩৮ খ্রীষ্টাব্দের
কথা,তখন পৃথিবীর সকলে বুঝল, মার্কো বাজে কথা বলে যান
এখন পােলাের নাম অনুসারে ঐ জাতের ভেড়ার নাম
দেওয়া হয়েছে।
মার্কো এই অঞ্চলটার নাম বলেছেন ‘পামির’, সেই নাম এখনও
চলছে। মার্কো বলে গিয়েছেন এই অঞ্চলটির এক দিক থেকে
আর এক দিকে যেতে বারাে দিন লাগে। লােকের বাস এখানে
নেই; পথিক যারা যাবে তাদের খাবার দাবার সঙ্গে নিয়ে পথ
জায়গাটা এত ঠাণ্ডা যে কোন পাখী সেখানে দেখা
যায় না। মার্কো ঐ দেশের আর একটা মজার কথা বলেছেন
নি।
চলতে হয়।
পেলেদের বুলমসাদ। চহ্ন
Phot: 2 /, htty
পামির অঞ্চলের ভেড়া
No text on this page.
৪৭
কিন্তু
;
মরুভূমির মাঝে মার্কো পােল
‘সেখানে আগুন জ্বালা হলে বেশ দাউ দাউ করে জ্বলে না, আর
তার তাত ও ভাল হয় না। অন্য জায়গায় আগুনের ওপর জল
বসিয়ে জ্বাল দিলে জল টগবগ করে ফুটে ওঠে, আর জলের
মধ্যে যা থাকে তা সিদ্ধ হয়। এখানে জল ফুটে ওঠে
জিনিষ সিদ্ধ হয় না। এর কারণ বিজ্ঞানের বইতে বুঝিয়ে দেওয়া
আছে। উঁচু জায়গায় জল অল্প তাত পেলেই ফুটে ওঠে। পামির
অঞ্চল বেশ উচু জায়গা, তাই কম তাতে জল ফুটে ওখানে। আগুন
যে দাউ দাউ করে কেন জ্বলে ওঠে না, মার্কো তাও বুঝতে
পারেন নি; তা'র কারণ আগুন জ্বালা হ’ত সরু সরু ছােট কাঠ
কিম্বা গােবরের ঘুটে দিয়ে ; অত উঁচু জায়গায় বায়ুও খুব হাল্কা ;
সেই জন্যই আগুনের তেজ কিছু কম বলেই মনে হত।
পামির থেকে মার্কো গিয়েছিলেন পূর্ব দিকে ও উত্তর-পূর্ব
দিকে। চল্লিশ দিন ধরে তাঁরা পাহাড় পর্বত, নদ নদী পার হয়ে
চলেছিলেন; পথে লােকালয়, গাছপালা বড় একটা ছিল না।
পর্বতের ওপরে কুঁড়ে ঘর বেঁধে অসভ্য লােক বাস করত; তাদের
কাজ ছিল শিকার করা, বুননা পশুর চামড়া ছিল তাদের কাপড়।
তারা মােটেই লােক ভাল ছিল না। দেশটার নাম মার্কো
দিয়েছিলেন-‘পালাে’ বা ‘বলাের। ইয়ার্কদের দক্ষিণে এ
দেশ।
তার পর এলেন তিনি কাশগারে। এটা খাকান অর্থাৎ
সম্রাট কুবলাইএর অধীন ছিল। জায়গাটি বেশ ভাল ; এখানে
আঙুর ও অন্যান্য ফলের বাগান, তুলা, শণের গাছ আছে ; জমিও
;
৩৮
মার্কো পােলো
উর্বর। বাণিজ্যের জন্য এখানকার অনেক বণিক দেশ বিদেশে
যায়। এখানে একদল খ্ৰীষ্টানের বাস ছিল।
পােলাে এইবার ‘সমরকন্দের কথা বলেছেন। তিনি সেখানে
নিজে যান নি, বােধ হয় বাবা, কাকার কাছে গল্প শুনে থাকবেন।
এটাও কুবলাইএর অধীন। এখানেও একদল খ্রীষ্টান বাস করত,
তবে মুসলমান অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের বেশ সদ্ভাব ছিল না।
সহরটি বেশ বড় ও বিখ্যাত। এ অঞ্চলে ভাল ভাল বাগান ও
উর্বর জমি ছিল।
ইয়াকন্দের সম্বন্ধে দু’চার কথা বলেই মাকে তার বিবরণ শেষ
করেছেন অধিবাসীরা হাতের শিল্প কাজ বেশ ভাল করে, কিন্তু
বেশীর ভাগ লােকের গলায় গলগণ্ড আর পায়ে গােদ ; জলের
দোষেই এ রােগ হয়ে থাকে।
‘খােটান’ সম্বন্ধে তিনি বলেছেন,-“এ অঞ্চলে জিনিষ পত্তরের
কিছু অভাব নেই কিন্তু লােকে লড়াই ভালবাসে না; হাতের শিল্পে
এদের নাম খুব।
তার পর মার্কো এলেন ‘চারক নামে এক অঞ্চলে। তিনি
এটাকে একটা প্রদেশ বলেছেন, আর বলেছেন এখানে কেল্লা,
নগর অনেক রয়েছে ; এক রকম দামী পাথরও পাওয়া যায়
এখানে। তবে জায়গাটা বালিতে ভরা, ভাল জল খুব কমই মেলে,
বেশীর ভাগ জল পানের উপযুক্ত নয়।
ও প্রদেশটায় আগে
যেটুকু আবাদের জমি ছিল, এখন তাও বালিতে ঢেকে নষ্ট হয়ে
গিয়েছে।
89
মরুভূমির মাঝে মার্কো পােলল
এইবার ভীষণ মরুভূমির পথ আরম্ভ হ'ল। চীনের লােকে
একে ‘বালির মহাসমুদ্র’ বলে। আজকালকার মানচিত্রে এর নাম
‘গােবি মরুভূমি। তার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ, যেটা ‘টালামাকা’
মরুভূমির দক্ষিণ দিক, সেইটাই তিনি পার হয়েছিলেন ; চারক
থেকে বেরিয়ে তিনি ‘লপে এসে পৌছেছিলেন। আসতে তার পাঁচ
দিন লেগেছিল। “সার অরেল্ ষ্টী ঠিক করেছেন, আজকালকার
‘চর্ক লিক’ই লপ। মার্কো বড় মরুভূমির মধ্যে ঢােকেন নি,
ল পার হতে নাকি এক বছর লাগত।
‘সার অরেল ষ্টী অষ্ট্রিয়া’র লােক। তিনি এই অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে
বেড়িয়ে খুব নাম করেছেন। আর এক জন বিখ্যাত ভ্রমণকারী ‘স্বে
হেডি। এর বাড়ী ‘সুইডেনে। স্বে হেডিও পৃথিবীর অনেক
জায়গায় ঘুরেছেন। তিনি ‘টাকলামাকান্ মরুভূমি পার হয়েছিলেন
ব’লে লােকে প্রথমে তার নাম জেনেছিল। এই অঞ্চলে ঘুরে
তারা যে বিবরণ দিয়েছেন তা থেকে বুঝতে পারা যায় মার্চের
অনেক কথাই সত্য।
এই সব মরুভূমি এখন অতি ভীষণ জায়গা, মার্কোর সময়েও
ভীষণ ছিল। কিন্তু এক কালে এখানে বড় বড় গ্রাম, সহর ছিল;
কত লােক এখানে বাস করত ! ‘সার অরে ধী’ ও ‘স্বে
হেডি মরুভূমির নানা জায়গা খুঁড়ে অনেক পুথিপত্র, পুরানাে
জিনিষ, নানা রকম সুন্দর সুন্দর কাঠের কাজ, ছবি প্রভৃতি
পেয়েছেন। এ থেকে জানা যায় এক কালে সেখানে সভ্য লােকে
বাস করত।
ক্রমে মরুভূমি সব গ্রাস করেছে, বালি উড়ে এসে
৪
মার্কো পােলাে পড়ে সব ঢেকে দিয়েছে, কিম্বা যেখানে নদী বা জলাশয় ছিল সব শুকিয়ে গিয়েছে, আর তাতে মরুভূমির আকার বেড়ে গিয়েছে। মার্কোর সময় যা অবস্থা ছিল এখন অবস্থা তার চেয়ে আরও ভীষণ হয়ে দাড়িয়েছে। ‘চারক’ থেকে পাঁচ দিন লাগে ‘লপ’ পেঁৗছতে। মার্কে বলেছেন,—পথে জল একেবারেই মেলে না, যদি বা মেলে তা খাওয়া এক রকম অসম্ভব। ‘লপে পেীছে বিশ্রামের জায়গা পাওয়া যায়। মার্কো বলেছেন, যে সব বণিক বা পথিক বড় মরুভূমির মধ্যে ঢুকবে, তারা এই খানে সব দরকারী জিনিষ জোগাড় করে নেয়। মরুভূমির মধ্যে ঢুকে যদি খাবার ফুরিয়ে যায়, সঙ্গে যে সব উট, গাধা থাকে তাদের মেরে মাংস খেয়ে লােকে নিজেদের প্রাণ বাঁচায়। এই মরুভূমির মধ্যে যেতে হলে পথিকরা উটই বেশী সঙ্গে নেয়, কারণ তাদের বার বার খেতে দিতে হয় না, আর খুব ভারী বােঝ তারা বয়ে নিয়ে যেতে পারে। মার্কো আরও বলেছেন,-“লপ’ ত্যাগ করে মরুভূমিতে ঢুকতে হয়। মরুভূমিটা লম্বালম্বি এত বড় যে লােকে বলে এক দিক থেকে আর এক দিকে পার হয়ে যেতে এক বছরেরও ওপর লাগে; আর এত চওড়া যে এখান থেকে আড়াআড়ি গিয়ে এটা পার হতে অন্ততঃ এক মাস লাগে। বড় মরুভূমিতে জীব-জন্তু, পশু-পক্ষী নেই। কিন্তু লােকের মুখ থেকে শােনা একটা অদ্ভুত কথা মার্কো বলেছেন, মরুভূমিতে অপদেবতা বাস করে ; তারা পথিকদের ভুলিয়ে তাদের প্রাণ নাশ মরুভূমির মাঝে মার্কো পােলাে করে। পথিকরা রাতে মরুভূমির ওপর দিয়ে যাবার সময় যদি কেউ পিছিয়ে পড়ে, বা দলের সঙ্গে না গিয়ে পিছনে ঘুমিয়ে থাকে, তা হলে সে যখন দল ধরবার জন্য তাড়াতাড়ি চলতে থাকে সে শুনতে পাবে ভূতে কথা বলছে ; এই ভূতগুলাের কথা শুনে তার মনে হবে এরাই বুঝি তার সঙ্গী। কখনও বা ভূতে তার নাম ধরে ডাকে ; ফলে সে এমনি বিপথে চলে যায় যে দলের সঙ্গে দেখা হয় না, মরুভূমির মধ্যে একলা অজানা পথে ঘুরে ঘুরে তার প্রাণ বের হয়। এই রকমে অনেকে মারা গিয়েছে। কেউ বা কথন কখন শশানে যেন অনেক লােক দল বেঁধে দূরে চলেছে। উট গাধা প্রভৃতি যা সঙ্গে চলে, তাদের গলায় ঘন্টা বা ঘুঙুর বেঁধে দেয়, তাই, তারা দলছাড়া হয়ে বেশী দূরে যেতে পারে না। ঘুমাবার সময় একটা নিশানা খাড়া করে দেওয়া হয়, যাতে পরদিন কোন্ দিকে চলতে হবে সেটা দেখিয়ে দেওয়া থাকে। যদি কেউ ঘুমিয়ে প'ড়ে থাকে সে উঠে এই নিশানা দেখে ঠিক পথে চলে দলের সঙ্গ ধরতে পারবে। এত ব্যবস্থা করে তবে মরুভূমি পার হতে হয় । ‘সার অরেল ষ্টী বলেছেন যে অন্ততঃ একবার তার মনে হয়েছিল, তিনি ও তাঁর চীনে কৰ্ম্মচারী ‘চ্যাং সু ইয়ে’ যেন: মরু- ভূমিতে এই রকম এক অস্পষ্ট শব্দ শুনেছিলেন। শব্দটা যে ভূতের কথা নয় তা নিশ্চয়, হয়তাে বালি থেকেই ওরকম শব্দ হয়ে থাকে। ত্রিশ দিনের পর মার্কো ‘সাচিউ’ নগরে এলেন। সাচিউ কথার মানে ‘বালির সহর।
৯ মঙ্গোলদের দেশে মার্কো ‘সাচিউ' চীনের সীমানায়—মরুভূমির পূর্বদিকে, একেবারে শেষ সীমায়। এখানে কিছুদিন আগে ‘সা অরেল ষ্টীন একটা সন্ন্যাসী- দের গুহা আবিষ্কার করেছেন। গুহার মধ্যে অনেক পুথি, ছবি প্রভৃতি পাওয়া গিয়েছে; এখন সে-সব বিলাতের যাদুঘরে আছে। সা অরে ষ্টীন্ জায়গাটাকে এর চীনে নাম ‘ট হুয়াঙ্গ দিয়ে- ছেন। মার্কো কিন্তু ও প্রদেশটার নাম দিয়েছিলেন ‘টাঙ্গ; কতকগুলাে তিব্বতী লােক এখানে একটা স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছিল; মঙ্গোলরা তাদের নাম দিয়েছিল ‘টাঙ্গট’, সেই নাম অনুসারে প্রদেশটার নাম হয়েছিল ‘টাঙ্গ। আজকাল যেটাকে ‘কাংসু প্রদেশ বলে, সেটাকে মােটামুটি ‘টাঙ্গ’ বলা যেতে পারে। “টাঙ্গট’ নামটা এখনও আছে; মঙ্গোলরা, এমন কি চীনেরাও সময়ে সময়ে তিববতকে এই নামে ডাকে। ‘টাঙ্গটের জন্য জেঙ্গি খ অনেক হাঙ্গামে পড়েছিলেন; তিনি কয়েকবার এটা আক্রমণ করেছিলেন। শেষ বারের আক্রমণে এটা জয় হয় কিন্তু যুদ্ধে জেঙ্গিসের গায়ে তীর বিধেছিল, তাতেই তিনি মারা পড়েন। মার্কো এই জায়গাটার সম্বন্ধে বলেছেন,—ওখানকার বেশীর ভাগ
No text on this page.
হ জ র বুদ্ধেৰ ।
মঙ্গোলদের দেশে মার্কে লােক দেবমূর্তি পূজা করে, অর্থাৎ তারা বৌদ্ধ, গৌতম বুদ্ধের উপাসনা করে। বৌদ্ধ নাম তিনি করেন নি। তিনি আরও বলেছেন যে এখানে এক শ্রেণীর জন কতক খ্ৰীষ্টান ও জন কতক মুসলমানও বাস করে। যারা দেবমূর্তির পূজা করে, তাদের বড় বড় মঠ ও মন্দির আছে; অনেক রকম দেবমুর্তিও আছে। এদের ভাষা নতুন ধরণের—সম্ভবতঃ সেটা তিববতী ভাষা। এরা ব্যবসা বাণিজ্য করে না, জমি চাষ করে ; ফসল জন্মানই এদের কাজ। ‘এখানে অনেক দেবমূর্তি আছে, এখানকার লােকে ছেলে জন্মালে উৎসবের দিনে খুব ভক্তি করে দেবমূর্তির সমুখে ভেড় বলি দেয়,এই বলেই এদেশের বিবরণ মার্কো শেষ করেছেন। হাজার বুদ্ধের গুহা,–যেখানে ‘সার অরেল্ চীন নতুন নতুন জিনিষ আবিষ্কার করে কত দিন কাটিয়েছেন, সে সম্বন্ধে মার্কো কিছু উল্লেখ করেন নি। গাছের ছালের তৈরী কাগজে দাস, দাসী, ঘােড়া, উট, পােষাক প্রভৃতির ছবি একে ছবিশুদ্ধ মৃতদেহ কেমন করে ‘টাঙ্গই অঞ্চলে পােড়ান হয়, মার্কো তার বিবরণ দিয়েছেন; এই সব ছবি পােড়ানর মানে, যে সব জিনিষ লােকজনের ছবি পােড়ান হ'ল পরলােকে মরা লােকটি অত দাসদাসী আর ঐ সব ঐশ্বৰ্য ভােগ করবে। তার পর মার্কো ‘কামুল’ ও ‘চিং ইন্ তালা প্রদেশের কথা বলেছেন। বােধ হয় আজকাল ঐ দুই প্রদেশের নাম ‘কভাে’ । দুই প্রদেশেই অনেক নগর। কামুল প্রদেশে জিনিষ পত্র বিস্তর পাওয়া যায়। অধিবাসীদের ভাষাটা আলাদা; তারা দেবমুর্তি ;
৫৪
মার্কো পােলাে
পূজা করে, আর তাদের কাজ হ’ল শুধু খেলা ধূলা, নাচ গান,
লেখা পড়া আর আমােদ প্রমােদ। বড় মরুভূমিটা কামুলের
এক দিকের সীমানা, আর এক দিকে একটা ছােট মরুভূমি আছে।
‘কামুলে’র পরে “চিং ইন্ তালাস্ প্রদেশ, এরও এক দিকে মরুভূমি।
এখানে জন কতক খ্রীষ্টানের বাস, মুসলমানও আছে, আর বাকী
লােকে মুর্তিপূজা করে। এই প্রদেশে লােহার খনি আছে।
তার পর তিনি কাস্পিচু’তে এলেন। ‘কাস্পিচু’র নাম এখন
কাঞ্চো। এখানে পােলােরা পূরাে এক বছর ছিলেন। মার্কো
বলেছেন,—এখানে অনেক মঠ, মন্দির, ও ছােট বড় অনেক
দেবমূৰ্ত্তি আছে। এখানকার সন্ন্যাসীরা পবিত্রভাবে জীবন কাটায়
কিন্তু সাধারণ লােকের আচরণ প্রায় পশুর মতাে।
‘কাস্পিচু থেকে মরুভূমি পার হয়ে কারাকোর সহরে
আসতে চল্লিশ দিন লাগে। এটা বেশ বড় জায়গা, বেড় তিন
মাইল, মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, কারণ সেখানে পাথর নেই।
কাছেই দুর্গ, দুর্গের ভিতর শাসনকর্তার প্রাসাদ। এই খানে
তাতারদের আগে আড্ডা ছিল। মার্কো তার পর জেঙ্গিস খাঁ কেমন
করে বড় হলেন তার বিবরণ দিয়েছেন।
তাতাররা আগে উত্তরদিকে ‘কুর্গা’ ও ‘ব অঞ্চলে বাস করত ;
সেখানে ছিল বড় বড় প্রান্তর ; সহর, নগর তাদের ছিল না; ছিল
কেবল পশু চরবার মাঠ, নদী ও হ্রদ। তাদের নিজেদের রাজা
ছিল না ; ‘আউন্স, খাঁ’ নামে এক রাজাকে তারা রাজা বলে মানত,
আর নিজেদের পশুর দশ ভাগের এক ভাগ তাকে বছর বছর দিত।
••
;
মঙ্গোলদের দেশে মার্কো ক্রমে ক্রমে তাতারদের সংখ্যা এত বাড়তে লাগল যে আউঙ্গ, খার ভয় হ’ল ; তিনি তাদের এদিকে ওদিকে ছন্নছাড়া করে রাখবার মতলব করলেন, কারণ তিনি ভেবেছিলেন নানা জায়গায় দলভাঙ্গা হয়ে থাকলেই তাদের ক্ষমতা কমে যাবে। সেই জন্য তিনি একটু একটু করে তাদের ছত্রভঙ্গ করবার চেষ্টা করলেন। তাতাররা তার মতলব বুঝতে পারল। এ রকম কাণ্ড বেশী দিন চললে নিজেদের ক্ষমতা লােপ পাবে জেনে তারা সবাই মিলে উত্তর দিকে চলে গেল, আর আউঙ্গ, খকে রাজকর দেওয়া বন্ধ করল। এইভাবে কিছু কাল গেল। অবশেষে ১১৬২ খ্রীষ্টাব্দে তাতাররা নিজেদের মধ্যে থেকে একজন সাহসী ও জ্ঞানী লােককে বেছে নিয়ে রাজপদে বসাল। এরই নাম জেঙ্গিস খা। জেঙ্গি অন্যায় কাজ কিছু করতেন না, তাই তাঁর প্রজারা কে ভালবাসত। তার নাম ক্রমে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠল। তিনি অনেক দেশ জয় করলেন। শেষে তাঁর ক্ষমতা ও সম্মান এত বাড়ল যে তিনি আউজ, খাঁর মেয়েকে বিয়ে করবার প্রস্তাব করে তাঁর কাছে দূত পাঠালেন। আউন্স, খাঁ এতে বড় অপমান বােধ করলেন। তিনি জেঙ্গিসকে তিরস্কার করে শাসিয়ে তার দূতকে হাঁকিয়ে দিলেন। জেঙ্গিস খ রেগে প্রকাণ্ড সৈন্যদল একত্র করে যুদ্ধযাত্রা করলেন। তিনি যে জায়গায় তাঁবু খাটালেন তার নাম ‘টাগুক। তার ক্রোশ কত দূরে আউঙ্গ, খাঁ তার বিশাল সৈন্যদল নিয়ে এগিয়ে এলেন। জেঙ্গিস খাঁ দৈবজ্ঞদের ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন যুদ্ধের ফল কি মার্কো পোেলাে ; হবে। তারা একটা কাঠি চি’রে দু’দিকে দু'খানা রাখল ; একটার নাম তারা দিল জেঙ্গি খ, আর একটা কাঠির নাম দিল আউঙ্গ, খা। তার পর বলল,—যুদ্ধে যার জয় হবে তার নামের কাঠি অন্য কাঠিটার ওপর এসে লাগবে। তার পর মন্ত্র আওনর সঙ্গে জেঙ্গিসের নামের কাঠি অন্য কাঠির ওপর এসে পড়ল। খ্ৰীষ্টান দৈবজ্ঞদের মন্ত্রের জোরেই এটা হ’ল বলে, জেঙ্গি এর পর খ্রষ্টানদের খুব খাতির করতেন। যুদ্ধে জেঙ্গিসেরই জয় হ’লকারণ লড়াই হ’বার আগেই তার ফল জানতে পেরে তার সৈন্যদের মনে খুব উৎসাহ হয়েছিল। আউঙ্গ, খ মারা পড়লেন। তাঁর রাজ্য, তার ধনদৌলত সব জেঙ্গিসের হাতে গিয়ে পড়ল। তাতারদের যুদ্ধ করবার রীতি মার্কো বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,যুদ্ধ করবার আগে তাতারদের নাকাড়া বাজাবার ঘটা হয় খুব। তার শব্দ হয় এত ভীষণ যে মনে হবে আকাশ বুঝি ভেঙ্গে পড়ছে। তাদের অস্ত্র শস্ত্র, সাজ সজ্জা বেশ ভাল ও দামী। ধনুর্বাণ, তরােয়াল ও গদা তাদের অস্ত্র। ধনুকই তাদের প্রধান অস্ত্র, তাদের মত তীরন্দাজ পৃথিবীতে মেলে না। মােষের চামড়া ও অন্যান্য শক্ত চামড়ায় তাদের বর্ম তৈরী হত। এক একজন তাতার রাজার সঙ্গে এক লাখ ঘােড়-সওয়ার থাকত; প্রতি দশ জনের ওপর এক জন কর্তা, প্রতি এক শাে জনের ওপর এক জন, প্রতি হাজারের ওপর এক জন, প্রত্যেক দশ হাজার সওয়ারের ওপর এক জন কর্তা বা সেনাপতি থাকত। এ ব্যবস্থার সুবিধা ;
জেঙ্গি খুঁর মৃত্যু From " Livre des Merveilles,"ly permissio:3 of the Bibliotheque Nationale.
No text on this page.
মঙ্গোলদের দেশে মার্কো এই যে দশ জন সেনাপতিকে হুকুম দিলেই রাজার কাজ মিটে যেত। . তাতার-সেনার খাবার ছিল জ্বাল দিয়ে ঘন করা বা শুকনাে ঘােড়র দুধ। তারা এই ক্ষীর দুধ সঙ্গে নিয়ে যেত। যদি তা ফুরিয়ে যেত, তারা ঘােড়ার শরীরের একটা শির কেটে রক্ত চুষে খেত। তখন ইয়ােরােপের লােকে ‘কডেন্সড মিল্ক বা ঘন দুধের কথা জানত না। এই ঘন দুধ আজ কাল টিনের মধ্যে বা শিশিতে থাকে, গরম জলে একটুখানি মিশিয়ে নিলেই একবাটি দুধের কাজ হয়। ইয়ােরােপের ললাকে এ কথা জানত না বলে মার্কোর এই বিবরণ বিশ্বাস করে নি। কিন্তু তাতারদের সৈন্যের মধ্যে এই ঘন দুধের প্রচলন খুব বেশী ছিল। অন্য দেশের লােকে যেমন গরু বা মােষের দুধ খায়, তাতারদের পান করবার জিনিষও তেমনি—ঘােড়ার দুধ। এর নাম ‘কুমি। মার্কো বলেছেন,—যখন সৈন্যরা দূরে লড়াই করতে যায়, তারা শুকিয়ে ঘন করা এই দুধ দু'টা চামড়ার বােতলে পূ’রে নেয় ; প্রত্যেক সওয়ারের সঙ্গে সের পাঁচেক এই ক্ষীর দুধ থাকে। এ ছাড়া মাংস বঁধবার জন্য একটা মাটির পাত্র, আর আশ্রয় ও বিশ্রামের জন্য একটা ছােট তবু তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকত। যখন তারা শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে, তারা একেবারে চড়াও হয়ে হাতাহাতি যুদ্ধ লাগিয়ে দেয় না। তারা শত্রুর চারদিকে ঘােড়া ছুটিয়ে ঘুরতে থাকে এবং অনবরত তীর ছোঁড়ে। কখনও ৫৮ মার্কো পােলাে বা তারা পালিয়ে যাওয়ার ছল করে ঘােড়া ছুটিয়ে দেয়, শত্রুরা যেমন পাছু পাছু আসে, অমনি মুখ ফিরিয়ে তাদের ওপর বাণ ছাড়ে। তাদের ঘােড়া সব এমনি শেখান যে তারা কুকুরের মত একবার এদিক একবার ওদিক ছুটতে থাকে ; শত্রুরা তাই তাতারদের সঙ্গে কোন মতে পেরে ওঠে না। তাতারদের যুদ্ধ-যাত্রার সময় রসদ পত্রের ভার কিছু থাকে না, খাওয়ার হাঙ্গামা তাদের কিছুই নেই; কষ্ট সহ্য করবার ক্ষমতা তাদের অসাধারণ ; বিশ্রামের জন্য বড় বড় তাবু খাটাবার দরকার তাদের হয় না। তাদের এমনি শিক্ষা যে ঘােড়ার পিঠের ওপর তারা ঘুম দিতে পারে। ঘােড়া আপন মনে চরছে, সওয়ার পিঠের ওপর ঘুমুচ্ছে, এ একটা অদ্ভুত ব্যাপার। দরকার হলে তার সওয়ার তাও পারে। তা ছাড়া তীর ছোঁড়ায় তারা খুব পটু। এক এক জন তাতারের কাছে ষাটটি বাণ থাকে, ত্রিশটি হাল্কা, ছােট্ট সূচাল মাথা, এগুলাে দূর থেকে ছুঁড়বার জন্য ; আর ত্রিশটি ভারী, বড় মাথা, এগুলাে কাছ থেকে ছুঁড়বার জন্য ; এই গুলাে দিয়েই শত্রুর বেশী ক্ষতি করা হত। তীর ফুরিয়ে গেলে তারা তরােয়াল, গদা আর বর্শা নিয়ে লড়াই করত। এ সব মার্কের কথা। এমন যােদ্ধাদের সঙ্গে লড়বে কে ? তাই তারা অনায়াসে ইয়ােররাপের প্রায় ‘রাইন নদীর তীর পর্যন্ত এগিয়ে মেরে, কেটে, পুড়িয়ে, লুঠে দেশ ছারখার করে দিয়েছিল। যুদ্ধের রীতি নীতি সম্বন্ধে খবর দেওয়া ছাড়া মার্কো তাতারদের অন্যান্য আচার ব্যবহার সম্বন্ধে অনেক খবর দিয়েছেন। তাদের মঙ্গোলদের দেশে মার্কো অনেক গরু, ভেড়ার পাল প্রভৃতি থাকত। গ্রীষ্মকালে যেখানে গরু, ভেড়ার জন্য ঘাস পাওয়া যায় এমন জায়গায় তারা থাকে। শীত- কাল এলে তারা গরম দেশে চলে যায়; এই জন্য সময়ে সময়ে তাদের দু তিন মাস ধরে নতুন জায়গার সন্ধানে চলতে হয়। তাদের থাকবার ঘর তৈরী করা শক্ত কিছু নয়। গােল গােল ঘর, সরু কাঠ বা বেতের ওপর পুরু পশমের কাপড় দিয়ে মােড়া। অন্য জায়গায় যাবার সময় তারা ঘর বাড়ী চার চাকার একটা গাড়ীর ওপর বসিয়ে দেয়, কারণ তাদের ঘরগুলো এমনিভাবে তৈরী যে সেগুলােকে ভাঁজ করা, বাড়িয়ে দেওয়া, খাটান, নামান প্রভৃতি সহজেই করা যেতে পারে। তাদের একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল, তারা যেখানেই তাদের এই তঁাবু-ঘর নিয়ে গিয়ে আবার বসাত, ঘরের দুয়াের সব সময় দক্ষিণ-মুখাে করে রাখত। তাদের গাড়ীগুলাে ছিল প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড। পােলােদের সময়কার এক জন লােক গাড়ীর সমুখের কিম্বা পিছনের দিকে চাকা দু’টির মধ্যে কতটা ফাক আছে মাপতে গিয়ে দেখেন, একটা চাকা হ’তে আর একটা চাকা প্রায় ১৪ হাত দূরে, চাকার ‘ধুরা বা যে লম্বা কাঠের দুই দিকে চাকা ঘুরতে থাকে, সেটি জাহাজের মাস্তুলের মত মােটা ও বড়। বাইশটা ঘাড়ে—এক এক সারে এগারটা—এই প্রকাণ্ড গাড়ী টানত। এ ছাড়া ছই বা ছাউনী দেওয়া ছােট আর বেশ সুন্দর এক গাড়ী তাদের থাকত। এই গাড়ীতে তারা স্ত্রী, ছেলেপিলে, জিনিষ পত্র নিয়ে যেত। এগুলাে দু’চাকার গাড়ী, ষাঁড় কিম্বা উটে এ মার্কো পােলো গাড়ী টানত। এর ছাউনী তৈরী হ’ত মােটা পশমী কাপড়ে, সে কাপড় এত পুরু যে বৃষ্টি বাদলে তার কিছুই করতে পারত না, তার মধ্যে দিয়ে এক ফোটা জলও ভেতরে ঢুকত না। মার্কে। তার স্ত্রীলােকদের গুণের প্রশংসা করেছেন। সংসারের সব কাজ তারা করে, ঝগড়া বকাবকি তারা মােটেই করে না। এক এক জন তাতারের অনেক স্ত্রী থাকে, কিন্তু প্রথম স্ত্রীরই সম্মান বেশী। এই সব সতীনদের মধ্যে বেশ সদ্ভাব। পুরুষদের কাজ কেবল শিকার, বাজ পাখী উড়িয়ে পাখী মারা, যুদ্ধ বিদ্যা শেখা ও দরকার হলে যুদ্ধ করা। ছেলেবেলা থেকে তাতাররা তীর ছুড়তে শেখে। তাদের খুব ভাল শিকরে অর্থাৎ পাখী শিকার করতে পারে এমন পােষা বাজ পাখী থাকত, তাদের কুকুরগুলােও খুব ভাল। যাদের পােষা গরু, ঘােড়া বা উট থাকে, তারা তাদের গায়ে একটা চিহ্ন দিয়ে মাঠে চরবার জন্য ছেড়ে দেয় ; সঙ্গে রাখাল বা সহিস’ কেউ থাকে না। যদি কেউ কারাে ঘােড়া চুরি করে, শাস্তি তার মৃত্যু ; তরােয়াল দিয়ে তার কোমর কেটে দু’খণ্ড করে ফেলা হয়; দামী বা ভাল জিনিষ চুরি করলেও এই শাস্তি। কম দামী বা সামান্য কোন জিনিষ চুরির শাস্তি লাঠির ঘা। জিনিষ অনুসারে লাঠির ঘা বাড়ে বা কমে। সাত ঘা থেকে আরম্ভ করে এক শাে ঘা লাঠির ব্যবস্থা আছে। অনেক সময় লাঠির ঘাএর চোটে চোরের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। তাতারদের বিশ্বাস যে স্বর্গে এক পরমেশ্বর আছেন। তাঁর কাছে তারা বুদ্ধি ও স্বাস্থ্যের জন্য প্রার্থনা করে। তাদের ঘরে মঙ্গোলদের দেশে মার্কো ; দেবতার এক হােট মূর্তি থাকে ; মুর্তিটি তারা গরম কাপড়ে জড়িয়ে রাখে। দেবতার নাম ‘নতিগে। এই দেবতাকে তারা খুব ভক্তি করে, কারণ তাদের ধারণা, এরই অনুগ্রহে তারা সন্তান ও শস্য পায়। এই দেবতার বাঁ দিকে তার দেবীর মূর্তি, ও সমুখে দেবতার সন্তানদের মূর্তি গড়িয়ে তার রাখে। নিজেরা খাওয়ার আগে তারা দেবমূর্তির মুখে মাংসের চর্বি লাগিয়ে দেয়, এবং খানিকটা মাংসের ঝােল দুয়ারের বাইরে অন্য অন্য দেবতাদের উদ্দেশে ফেলে দেয়। এই রকম করে দেবতাদের খাইয়ে তারা নিজেরা খেতে বসে। তাতারদের রাজারা মরলে তাঁদের গাের দেওয়ার ব্যবস্থা সম্বন্ধে মার্কো যা বলেছেন তা বেশ নতুন কথা। জেঙ্গি খার বংশের সম্রাট বা রাজপুত্র কেউ মরলে তাঁকে ‘আলতাই পৰ্ব্বতের ওপর গাের দেওয়া হয়। যেখানেই তিনি মরুন না কেন, মৃতদেহ নিয়ে সেখানে যাওয়া হয় ; তার জন্য যদি একশাে দিনের পথ হাঁটতে হয় তবু এ নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না। সম্রাটের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় যদি পথে কাহারও সঙ্গে দেখা হয়, তার আর রক্ষা নেই। “পরলােকে সম্রাটের কাজ কর গে যাও”-বলে তখনই তাকে কেটে ফেলা হয়। সম্রাটের ভাল ভাল ঘােড়াগুলােকেও মেরে ফেলা হয়। কুবলাইএর আগেকার সম্রাট মঙ্গকু খাঁর মৃত্যুর পর যখন মৃতদেহ আলতাই পর্বতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সঙ্গে যে সব সৈন্য চলছিল তারা হাজার দশেক লােককে এইভাবে মেরে ফেলেছিল।
মার্কো পােলাে ‘বগু’র প্রান্তরের কথা আগেই বলা হয়েছে। বগু অঞ্চলটা সম্ভবতঃ ‘বৈকাল হ্রদের আশপাশের দেশ। মার্কো বলেছেন- ‘কারাকোর’ ও আলতাই পৰ্বত ছেড়ে চল্লিশ দিন উত্তর দিকে চললে ‘বগু’ অঞ্চলে আসা যায়। বগু’ অঞ্চলের দক্ষিণ থেকে উত্তর সীমানায় যেতে ষাট দিন লাগে। এখানকার লােক বড় অসভ্য ; তারা পশু শিকার করে মাংস খায়। এখানে হরিণ যথেষ্ট পাওয়া যায়; লােকে হরিণের মাংস খুব খায়, আবার হরিণ পুষে তার পিঠের ওপর চড়ে। মার্কোর কথা থেকে বােঝা যায় যে তিনি বন্ধু হরিণের কথা বলেছেন। এখানে শীত প্রচণ্ড, শীতকালে সব পশু পক্ষী দেশ ছেড়ে পালায়, তাই লােকে গ্রীষ্মকালে যা শিকার করতে পারে তাই খেয়ে শীতকালও কাটাতে হয়। শস্য বা মদ এখানে মেলে না। এখানকার লােক কুবলাই খাঁর অধীন। এখান থেকে মহাসমুদ্র চল্লিশ দিনের পথ। সমুদ্রের কাছে একটা বড় পাহাড় আছে ; সেখানে হাড়গিলে পাখী ও ‘শিকরের বাসা। সেখান থেকে ভাল ভাল শিকরে কুবলাইএর জন্য আনা হয়। ‘বৈকাল হ্রদ অঞ্চলে মার্কো নিজে যান নি। সে অঞ্চল যে আপন চোখে দেখে এসেছে এমন একজন লােকের কাছ থেকেই তিনি সাইবিরিয়ার অধিবাসীদের বৃত্তান্ত শুনেছিলেন। যে ‘আলতাই’ পৰ্বতে জেঙ্গিস্ খাঁর কবর আছে, সেটা সাইবিরিয়ার দক্ষিণের বড় আই’ পর্বত নয়; খুব সম্ভব এটি ‘উর্গা’ সহরের কাছে, বনজঙ্গলে ঢাকা উচু একটি পাহাড়। এর নাম ‘বুান কালদুন'; এ কথাটির মানে, ‘ভগবানের পাহাড়। কুবলাই গ্রীষ্মকালে বাস করবার মঙ্গোলদের দেশে মার্কো । জন্য যে চারটি প্রাসাদ চার জায়গায় করেছিলেন তার একটি এই ‘ আই’ পর্বতের গাছের ছায়া-ঢাকা কোন একটা জায়গায় তৈরী হয়েছিল। উত্তরদিকের দেশ বা সমুদ্রের সম্বন্ধে আর কিছু না বলে মার্কো নিজের দেখা সব জায়গার বিবরণ দিয়েছেন। জায়গাগুলাে কোথায়, তা ঠিক করে বলা কঠিন। বােধ হয় তিনি আজ কালকার ‘উঙ্গ, চাং'এর উত্তর দিক দিয়ে গিয়েছিলেন। মার্কো বলেছেন,-কাম্পি- চু’র পূর্বদিকে এরইউ’ রাজ্য, আশপাশে আরও দুই একটা রাজ্য আছে, এসব কুবলাইএর অধীন। এগুলাের মধ্যে এক শ্রেণীর খ্রীষ্টান, আর কিছু কিছু মুসলমানের বাসও আছে। এই অঞ্চলে এক রকম ষাঁড় পাওয়া যায়। ইংরাজী বইতে এর নাম ‘ইয়াক। আমরা একে চমরী গাই বলতে পারি, কারণ আমাদের দেশে এর লেজ আমদানী হয়; ঐ লেজ হ'তে চামর তৈরী হয়। মার্কো বলেছেন, এগুলাে বুনাে ষাঁড়, দেখতে বড়—প্রায় হাতীর মতাে। আকারটা মার্কো বাড়িয়ে বলেছেন ; বাস্তবিকই এগুলাের সঙ্গে হাতীর তুলনা হয় না। তার পর তিনি বলেছেন, ‘এগুলাে দেখতে বেশ, গায়ে শাদা, কালাে লােম, ঘাড়ের লােম বিঘত তিনেক লম্বা ও ভারি সুন্দর, রেশমও বােধ হয় তার কাছে লাগে না; অন্য জায়গার লােম ছােট ঘােট। মার্কো লম্বা লােম কতকগুলো ভিনিসে নিয়ে গিয়েছিলেন, এত ভাল এগুলাে তার লেগেছিল। অনেক আঁড় পােষ মানে; তাদের বাছুর সব যখন বড় হয় তারা খুব ভার বয়; লাঙ্গলে জুড়লে তারা অন্য গরুর দ্বিগুণ কাজ করে।
৬৪ মার্কো পােলাে এই অঞ্চলে যে মৃগনাভি পাওয়া যায়, মার্কো তাও উল্লেখ করেছেন। কস্তুরী হরিণের বর্ণনাও মার্কো দিয়েছেন। তিনি বলে- ছেন,-জন্তুটা ছাগলের মত, আকারে বড়, দেখতে হরিণের মত ; তবে শিং নেই। চেহারাটা এর বেশ সুন্দর। পূর্ণিমার সময় এর পেটের তলে নাইএর কাছে ঘন রক্তের মতাে একটা জিনিষের থলি হয়। পূর্ণিমার সময় লােকে তাকে শিকার করে থলিটা বের করে নিয়ে রােদে শুকোয়। এই রকম করলে উৎকৃষ্ট মৃগনাভি পাওয়া যায়। এর মাংসও খেতে ভাল। মার্কো এর মাথা ও পা শুকিয়ে বাড়ী নিয়ে এসেছিলেন। তার পর মার্কো এক জায়গায় এলেন, সেখানে উটের ললামের সুন্দর কাপড় হয়। পথের মধ্যে ‘হােয়া হাে’ অর্থাৎ পীত নদীর একটা প্রকাণ্ড বাঁক পড়েছিল, সেটা পােলােরা ভাল করে দেখে নিয়েছিলেন। এখানে মার্কো খুব সম্ভবতঃ চীন দেশের বিরাট দেওয়াল দেখতে পেয়েছিলেন। এই দেওয়াল যিশুখ্রীষ্টের জন্মের প্রায় দু'শাে বছর আগেকার তৈরী; গােবি মরুভূমির হাওয়াতে এই দেওয়ালের কোন কোন স্থানে বালি জ’মে ঢেকে গিয়েছে। কোথাও বা হাওয়ার ঘায়ে মাটি খসে পড়েছে। দেওয়ালের ইটগুলি স্থানে স্থানে কঁচা; ১৪ ইঞ্চি লম্বা, ৭ ইঞ্চি চওড়া ও ৪ ইঞ্চি পুরু ইটগুলি রােদে শুকিয়ে নিয়ে দেওয়াল গাঁথা হয়েছে; মাঝে মাঝে ঝাউ গাছের ছােট ঘােট ডাল পালা ইটের গাঁথনির ভেতর দেওয়া হয়েছে,যাতে হাওয়ার ধাক্কাতে মাটি সহজে ঝরে এক
No text on this page.
No text on this page.
মঙ্গোলদের দেশে মার্কো
তৈরী।
না পড়ে। অনেক স্থানে পাকা ইট ও গ্রেনাইট পাথর দিয়ে
দেওয়াল গাঁথা। দেওয়ালের উপর স্থানে স্থানে দূরে দূরে পাহারা-
ওয়ালাদের থাকবার ঘর রয়েছে—ওগুলাে ১৫ ফিট স্কোয়ার,
২০ হতে ৩০ ফিট উচু ; পাকা ইটের
দেওয়ালটি
২০০০ মাইল লম্বা ; উহা পাহাড়ের উপর দিয়ে, উপত্যকা, গিরিপথের
ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছে। উপরের দিকে উহা প্রায় ২০ ফিট
চওড়া। এই দেওয়াল হােয়াংহাে নদীর উপর দিয়ে চার স্থানে
পেরিয়ে গেছে। মার্কো যখন এই দেওয়াল দেখেছিলেন তখন
এই দেওয়ালের জীর্ণ অবস্থা ছিল।
তারপর একটা নগরে গিয়ে তারা দেখলেন সেখানে যুদ্ধের
অস্ত্র-শস্ত্রের কারখানা, ভাল ভাল অস্ত্র তৈরী হচ্ছে। সেখানকার
এক পাহাড়ে খুব বড় রূপার খনি আছে, আর শিকারের জন্তুও
খুব পাওয়া যায়। এই পাহাড়টাই বােধ হয় ‘আলাশা।
তার পর চলতে চলতে এলেন তারা কুবলাইএর তৈরী ‘জানাডু
সহরে।
১০ কুবলাইএর রাজধানী মার্কো প্রথম রাজধানীর নাম দিয়েছেন ‘সা বা শাংটু। ইংরাজী বইএ নামটা বদলে ‘জানাডু হয়ে গিয়েছে। এটা সম্রাটের গ্রীষ্মকালে বাস করবার জায়গা ;-‘পিকি’ থেকে ‘কালগ হয়ে ৩৬৭ মাইল। আজ কালকার ‘কাইপিংফু’র কাছে কুবলাইএর এই কীৰ্ত্তির ধ্বংসের অবশিষ্ট যা কিছু আছে তা এখনও দেখতে পাওয়া যায়। ভিনিস্ ত্যাগ করার পর প্রায় চার বছর পথে পথে পােলােদের কেটে গিয়েছে। চার বছর পরে পােলােরা সাংটু সহরে এলেন। এসে যা দেখলেন তা ইয়ােররাপের কোন রাজ্যের রাজধানীতেও তখন ছিল না। পােলােরা ঢুকলেন একটা প্রকাণ্ড বাগানে। বাগানের চার- দিকে আট ক্রোশ লম্বা এক প্রাচীর মধ্যে ফোয়ারা, নদী, ছােট ছােট প্রস্রবণ, মাঠ ও সম্রাটের প্রাসাদ ; বাগানের মধ্যে ‘শিকরে’ ও বুননা জন্তুও ছিল। কুবলাইএর শিকারের সখ ছিল খুব ; তিনি এক পােষ চিতা বাঘ নিয়ে মাঝে মাঝে ঘােড়ায় চড়ে এই বাগানের মধ্যে বেড়াতেন। •• ;
কুবলাইএর রাজধানী এই বাগানে ছিল কুবলাইএর এক প্রাসাদ। বাড়ীটি মর্মর পাথরে তৈরী; প্রত্যেক ঘর সােনালী আভায় ঝলমল, দেওয়ালে নানা রকম গাছ, লতাপাতা, পাখী, জীবজন্তু, মানুষের ছবি। ছবিগুলাে এত সুন্দর করে আঁকা যে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। বাগানে আর একটি প্রাসাদ ছিল ; মার্কো বলেছেন সেটি বেতের তৈরী। বেতের বর্ণনা যা তিনি দিয়েছেন তা থেকে মনে হয়, এ বেত আর কিছুই নয়, বাঁশ। প্রাসাদটি এমনি কায়দায় তৈরী যে সেটি ইচ্ছামত খুলে ফেলে সম্রাট যেখানে হুকুম করেন সেইখানে নিয়ে গিয়ে আবার খাড়া করা যেতে পারে। এ প্রাসাদটির গায়েও সােনালী আভা, ভেতরে অতি সুন্দর কাজ করা। মার্কো আরও বলেছেন,—যে প্রাসাদের ছাদও বেতের তৈরী, বেতের গায়ে এমন ভাল পাকা রঙ দেওয়া যে যতই বৃষ্টি হােক না কেন, ছাদ কিছুতেই পচবে না। পাছে ঝড়ে প্রাসাদের ক্ষতি করে, সেই জন্য দু’শাে রেশমী দড়া দিয়ে সেটি আটকান। জুন, জুলাই ও আগষ্ট-বছরের মধ্যে এই তিন মাস সম্রাট ‘জানাডুতে বাস করতেন। কখনও তিনি মৰ্ম্মর প্রাসাদে, কখনও বা বেতের প্রাসাদে থাকতেন। ২৮শে আগষ্ট তিনি পিকিন্ যাত্রা করতেন, তখন বেতের প্রাসাদ খুলে নেওয়া হত। কুবলাইএর অধীনে যে সব রাজা ছিলেন তাঁরা শাদা মাদী ঘােড় কুবলাইকে উপহার পাঠাতেন। তাঁর ঘােড়াশালায় দশ হাজারেরও বেশী শাদা ঘােড়া ছিল, সবগুলােই ধবধবে শাদা, একটুও অন্য রঙের ফুটকি দাগ তাদের গায়ে ছিল না। এদের মধ্যে যে সব মাদী মার্কো পােলাে ঘােড়া ছিল, তাদের দুধ কুবলাই ও তাঁর পরিবারের লােক ছাড়া আর কেউ খেতে পেত না। যখন মাদী ঘােড়াগুলাে মাঠে বেড়াতে যেত, তাদের কাছ দিয়ে কানাে যাওয়ার হুকুম ছিল না; এমন কি সাম্রাজ্যের মধ্যে যাঁরা প্রধান প্রধান লােক, তাঁরাও হয় পাশে দাড়িয়ে অপেক্ষা করবেন, না হয় ঘুরে অন্যদিক দিয়ে যাবেন ;-সম্রাটের কাছে ঘােড়ার এমনি কদর ছিল। যে দিন সম্রাট পিকি যাবেন সে দিন পথে এই সব মাদী ঘােড়ার দুধ ছড়িয়ে দেওয়া হত ; এই দুধ চূড়ানর উদ্দেশ্য, পৃথিবী, বাতাস ও অপদেবতাদেরও দুধের ভাগ দেওয়া। অপদেবতা, তন্ত্র, মন্ত্র এ সব সম্বন্ধে বিশ্বাস সে যুগে সব জাতির মধ্যেই ছিল। জানাডু’তে সম্রাটের সভায় অনেক তন্ত্র মন্ত্র জানা দৈবজ্ঞ ছিল, তারা নাকি ইচ্ছা করলে বৃষ্টি বাদল আনতে বা তাড়াতে পারত। তাদের নাম ছিল ‘বষি’, তাদের জন্মভূমির নাম অনুসারে কখন কখন তাদের ‘তিব্বতী’ বা ‘কাশ্মীরী’ বলা হত। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নাম ছিল ‘ভিক্ষু। বােধ হয় এই ‘ভিক্ষু’ কথা হতেই ‘বষি’ কথার সৃষ্টি হয়েছিল। বষি’রা তিব্বতের লাল কাপড় চোপড় পরা লামা বা পুরোহিত ছাড়া আর কেউ নয়। মার্কো এদের ইন্দ্রজাল বিদ্যার গােটা কতক পরিচয় দিয়েছেন। এরা নাকি আকাশ দিয়ে বাটি উড়িয়ে দিতে পারত, নদীর স্রোত উল্টা দিকে ফিরিয়ে দিতে পারত। কখনও বা তারা আকাশে একটা দড়া ছুঁড়ে দিয়ে একটা ছেলেকে তার ওপর উঠতে বলত, তার পর রেগে ছেলেটার পিছনে পিছনে উঠে তাকে কুচি কুচি , লামা বা তিব্বত দেশের পুরােহিত
No text on this page.
কুবলাইএর রাজধানী করে কেটে মাটিতে ফেলে দিত। শেষে খণ্ড খণ্ড মাংস সব জুড়ে একটা লাথি মেরে তাকে বাঁচিয়ে দিত। * মার্কো ‘পিকিনের কথাও বলেছেন। এটা অবশ্য খুব প্রাচীন সহর! পিকিনের মানে-“উত্তর রাজধানী। জেঙ্গিস খাঁ সহরটা ১২১৫ খ্রীষ্টাব্দে অধিকার করেন। তার আগে এর নাম ছিল- ‘ইয়েকিং'। কুবলাইকে দৈবজ্ঞেরা বলেছিল,-“ইয়েকিং' বিদ্রোহী হবে ; তাই তিনি ১২৬৪ খ্রীষ্টাব্দে ‘তাতু' নামে একটা নতুন সহর এর পাশাপাশি একটা ছােট নদীর ওপারে স্থাপন করেন। এখন যেটা তাতারদের সহর আছে সেটা এই ‘তু’, আর যেটা চীনে সহর সেটা ছিল ‘ইয়েকিং'। মার্কো সহরটার খুব প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, সহরটার বেড় চব্বিশ মাইল ; এটা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ; প্রাচীর নীচের দিকে প্রায় বত্রিশ হাত চওড়া, আর উচু প্রায় ত্রিশ হাত, প্রাচীরের ওপরে বেড়াবার রাস্তা আছে, এত চওড়া সে প্রাচীর । প্রাচীরের গায়ে ন'টা ফটক, মার্কো বলেছেন বারােটা। এক একটা ফটকের ওপর প্রাসাদের মত উঁচু এক একটা বড় জমকালে চূড়া; আর প্রত্যেক ফটকে হাজার লােক পাহারা দেয়। সহরে এত বাড়ী আর এত লোক যে ধারণা করতে পারা যায় না। প্রত্যেক ফটকের বাইরে এক একটা ছােট্ট নগর বা উপনগর—এই উপনগরগুলােতে আরও বেশী লােকের বাস। বিদেশী পথিক " ; * এই রকম ঐন্দ্রজালিক ব্যাপারের বিষয় ভারতবর্ষেও অনেকে প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের দেওয়া বিবরণ নানা বইতে দেখা যায়।
৭০
মার্কো পােলাে
এবং বণিক যারা আসে তারা উপনগরে থাকে।
সহরের রাস্তার
দু’ধারে দোকান। প্রতিদিন যত গাড়ী রেশম এখানে ঢােকে তা
হাজারের কম নয়। ‘এ সহরে এত দামী ও দুষ্প্রাপ্য জিনিষ আসে,
ও এত বেশী পরিমাণে আসে যে পৃথিবীর আর কোন সহরে এমন
আসে না; কারণ নানা দেশের লােক এখানে নানা জিনিষ নিয়ে
আসে।
পিকিনে রাত হলে একটা ঘণ্টা বাজান হত ; তিনটে ঘা
পড়বার পর রাস্তায় আর কারাে বের হবার হুকুম ছিল না। কেবল
অসুখ বিসুখ করলে বা স্ত্রীলােকের সন্তান প্রসবের সময় হলে
বাড়ীর লােকে কিছু আনবার জন্য বা কাউকে ডাকতে রাস্তায় বের
হতে পারত। ত্রিশ চল্লিশ জন করে পাহারাওয়ালা রাস্তায় ঘুরে
বেড়াত।
পিকিনের তখন নাম ছিল,-“কালু। মার্কো কালু সহরে
কুবলাইএর যে প্রাসাদ ছিল তারও বিবরণ দিয়েছেন। এটা
সম্রাটের শীতকালে থাকবার জায়গা।
প্রাসাদের চারধারে তিনটে বড় প্রাচীরের বেড। প্রথম ও
দ্বিতীয় প্রাচীরের মাঝে সৈন্যরা থাকত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রাচীরের
মধ্যে আটটা বড় বাড়ী ছিল, সে গুলােতে সৈন্যদের যুদ্ধের সাজ
সরঞ্জাম থাকত। একটায় ঘােড়ার জিন, লাগাম, রেকাব, একটায়
তুণ, ধনুক, বাণ প্রভৃতি অস্ত্র-শস্ত্র,—এই ধরণের ব্যবস্থা ছিল।
তৃতীয় প্রাচীরের মাঝেও অনেকখানি জায়গা ছিল।
মধ্যে আবার আটটা বাড়ী, এক একটায় সম্রাটের দরকারী জিনিষ
৭১ •• কুবলাইএর রাজধানী সব থাকত। তার পরও প্রাচীর ছিল, সেই সব প্রাচীরের মধ্যে কুবলাইএর প্রাসাদ। অত বড় প্রাসাদ কোনখানে ছিল না। মর্মর পাথরের তৈরী একটা প্রকাণ্ড বেদীর ওপর প্রাসাদটি গাঁথা বেদীর ধারে ধারে অনেকটা জায়গা, মৰ্ম্মর পাথরের মােটা রেলিং দিয়ে ঘেরা। প্রাসাদের ঘরগুলো সােনা রূপার পাত দিয়ে মােড়া, দেওয়ালের গায়ে জীবজন্তু, পাখী, ‘ড্রাগ, যােদ্ধা ও দেবতার মূর্তি আঁকা। প্রাসাদ এক তালা, কিন্তু ঘর সব খুব উচু, আর ছাদ এত মজবুত যে মনে হয় তা চিরকাল খাড়া থাকবে। ছাদের গায়েও নানা ছবি, লতা পাতা আঁকা। ঘরে ঢুকবার জন্য দু' পাশে মর্মর পাথরের সিঁড়ি। প্রাসাদের বড় ঘরে সম্রাট ছ’ হাজার লােককে এক সঙ্গে বসিয়ে ভােজ দিতে পারতেন—এত প্রকাণ্ড সে ঘর! এর চার ধারে ঘােট ঘােট ঘর। এক দিকে কতকগুলাে ঘর ছিল, সেখানে সম্রাটের সােনা, রূপা, মণিমুক্ত থাকত। প্রাসাদের ছাদের ওপরে লাল নীল সবুজ ও বেগুনে রঙের এমন শক্ত ও চকচকে লেপ দেওয়া থাকত যে তা কাচের মত ঝকঝক্ করত। প্রাসাদের চার ধারে যে সব দেওয়াল ছিল, তার কাছে কাছে অনেক গাছ পুতে দেওয়া হয়েছিল; কোন কোন জায়গায় শিকারের পশু সব ছিল, তার মধ্যে কস্তুরী হরিণ, শাদা হরিণ, কাঠ বিড়ালী প্রভৃতি অনেক ছিল রাস্তা যত ছিল সব বেশ বাঁধানাে। পশুদের ৭২ মার্কো পোেলাে চরবার জমির চেয়ে রাস্তাগুলাে ছিল হাত খানিক উঁচু, তাই তার ওপর কাদা হওয়া বা জল দাঁড়ান অসম্ভব ছিল। বৃষ্টির জল গড়িয়ে আশ-পাশের জমিতে চলে যেত, এতে জমির ওপরকার গাছপালাগুলাের উপকার হত। প্রাসাদের বাগানের মধ্যে একটা উচু ঢিবি তৈরী করা হয়েছিল। যেখানেই সুন্দর গাছ আছে খবর আসুক না কেন, সম্রাট হাতী পাঠিয়ে মাটি ও শিকড় সুদ্ধ সেটাকে আনিয়ে এখানে লাগাতেন। ঢিবির ওপর একটা বেশ কাজ করা ঘর ছিল, সেখান থেকে আশ পাশে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যেত। ঢিবি তুলবার জন্য যে সব জায়গা থেকে মাটি কেটে গর্ত করা হয়েছিল সেগুলােকে সম্রাটের হুকুমে বড় বড় পুকুর করা হয়; একটা পুকুরের মধ্যে নানা রকমের অনেক মাছও ছেড়ে রাখা হয়েছিল। কুবলাইএর রাজধানী, কুবলাইএর প্রাসাদ ও সভা, তার ধন- দৌলত, লােক-জন, হাতী-ঘােড় প্রভৃতি দেখে মার্কোর ধারণা হয়েছিল—এত বড় সম্রাট আর কোন দেশে নেই বা কখনও হয় নি। তিনি কুবলাই সম্বন্ধে অনেক কথাই বলেছেন। তাঁর চার রাণী, ছেলে মেয়ে অনেকগুলি। ছেলেরা সবাই বীর ও সাহসী। রাজপ্রাসাদের মেয়েগুলিকে এক সুন্দর উপায়ে বাছনি করা হত। রাজকর্মচারীদের নানা প্রদেশে পাঠানাে হ’ত একশাে করে . সুন্দরী যুবতী প্রত্যেক প্রদেশ হতে নির্বাচন করে পাঠাতে। প্রত্যেক মেয়ের গায়ের রঙ, চুল, ভুরু, মুখ, ঠোঁট, হাত পায়ের গড়ন ' কুবলাইএর রাজধানী ইত্যাদি পরীক্ষা করে প্রত্যেক বিষয়ে একটা নম্বর দেওয়া হত। সৌন্দর্য্যের সব বিষয় ধরে মােট নম্বর দাড়াত ২৪। যারা ২০ হ'তে ২৪ নম্বর পেত, তাদের সুন্দরী মেয়েদের শ্রেণীতে ধরা হত। সব মেয়েদের পিকিনে এনে তাদের আর একটি কমিটির নিকট উপস্থিত করা হত। কমিটি সব মেয়েদের দেখে চল্লিশ পঞ্চাশ জন সুন্দরীকে রাজপ্রাসাদের যােগ্য বলে বাছনি করতেন। কাজেই রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীরাই রাজবাড়ীতে স্থান পেতেন। সম্রাট যৌবনে অনেক যুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু মার্কো বলেছেন যে সম্রাট সিংহাসনে বসার পর একবার মাত্র যুদ্ধ করেছিলেন। কুবলাই যত যুদ্ধ করেছিলেন তার মধ্যে ‘ইউ’ প্রদেশে ‘তালিফু’ অঞ্চলে শান্’ বা ‘ই’ রাজ্য ধ্বংস করাটাই বড় কাণ্ড। এটি ১২৫৩ খ্রীষ্টাব্দের কথা। ধরতে গেলে এক হিসাবে এই জয়লাভের সঙ্গে আজকালকার শ্যাম রাজ্যের সম্পর্ক রয়েছে, কারণ এই যুদ্ধে ‘শানে’রা হেরে গিয়ে দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ; তার পর হতেই শ্যাম রাজ্যের উৎপত্তি। সিংহাসনে বসে কুবলাইকে যে একবার যুদ্ধ করতে হয়েছিল সে ব্যাপারটিও বড় সােজা নয়। কুবলাইএর এক আত্মীয় বিদ্রোহী হন, নাম তার ‘নয়া। নয়ানের বয়স তখন ত্রিশ, অনেক প্রদেশের মালিক তিনি, তিন লাখ ঘােড়-সওয়ার তার তবে ছিল। তাই আঁর মাথা গরম হয়ে উঠল। তিনি ঠিক করলেন,“কুবলাইএর অধীন আর থাকা হবে না। সম্রাটের আর এক আত্মীয় ‘কাইডু সম্রাটের পরম শত্রু ছিলেন। নয়া কাইডুর কাছে দূতের মুখে ৭৪ মার্কো পােলাে ব’লে পাঠালেন,“আসুন, আমরা দু’দিক হতে দু’জনে কুবলাইকে আক্রমণ করি। কুবলাই সব জানতে পারলেন ; তাড়াতাড়ি একলাখ পদাতিক ও লাখ তিন, চার ঘােড়-সওয়ার যােগাড় করে তিনি চললেন নয়ানকে শাস্তি দিতে। পাকা যােদ্ধা তবু তিনি বেশী যােগাড় করতে পারেন নি ; প্রাসাদে ও বাগানে যে সব লােক জন থাকত তারাই ঘােড় চড়ে গিয়েছিল যুদ্ধ করতে। ‘কুমি’ খেয়ে দিনের পর দিন অবিরাম ঘােড়া ছুটিয়ে তারা কুড়িদিন পরে এক পাহাড়ে এসে হাজির হ'ল। পাহাড়ের নীচে সমতল ভূমিতে ‘নয়ান’ সৈন্য নিয়ে ছিলেন। কুবলাই যে এত তাড়াতাড়ি এসেছিলেন তার কারণ ছিল। তার মতলব ছিল নয়ানকে দল পাকান বা যােগাড়যন্ত্রের বেশী সময় না দেওয়া। সে মতলব সিদ্ধ হয়েছিল। নয়ানে’র ফৌজ কুবলাইএর সাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করবার উদ্যোগ করল। যুদ্ধের আগে তাতারদের নিয়ম,-বাজনা বাজিয়ে চেঁচিয়ে গান করা ; দুটো তার দেওয়া এক রকম যন্ত্র তাদের ছিল, সেইটা তারা বাজাত। কালমা তাতাররা এই সেতারের নাম দিয়েছে- ‘বালা লাইকা'। এই রকম গান বাজনা দুই দলে খানিকক্ষণ চলল ; তার পর যেই সম্রাটের ‘নাকাড়া বাজল, অমনি কাটাকাটি বেধে গেল। মার্কে বলেছেন, এত তীর ছোড়া হচ্ছিল যে আকাশ যেন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, বৃষ্টির ধারার মত বাণ সব আকাশ থেকে পড়ছিল।
৭৫
কুবলাইএর রাজধানী
এত বড় ভয়ানক যুদ্ধ খুব কমই দেখা যায়। পদাতিক সৈন্য বাদ
দিয়ে ধরলেও উভয় পক্ষে ঘােড়-সওয়ার সৈন্য সাড়ে সাত লাখের ওপর
ছিল।
এই যুদ্ধে সব সুদ্ধ কত লাখ লােক যে মারা পড়েছিল
বলা যায় না।
যুদ্ধে নয়ানের হার হ’লতিনি আর তাঁর বড় বড় সর্দার সব
বন্দী হলেন। জেঙ্গিস্ খাঁর রক্ত তাঁর দেহে ছিল, তাই তাঁর মাথা
কেটে ফেলে, অন্য উপায়ে তার প্রাণ বধ করা হল। সম্রাট
বংশের রক্ত পাছে মাটিতে পড়ে তাই তাকে একটা কম্বলে পূরে
বার বার উলটে পালটে একবার তুলে একবার ফেলে এমনি করে
থেঁতলান হ’ল যে তাতেই তার প্রাণ বেরিয়ে গেল।
এটা তাে গেল তাতারদের বিদ্রোহ। মার্কো চীনেদের একটা
ছােট খাটো বিদ্রোহের কথাও বলেছেন। কুবলাই পূর্ব পুরুষের রাজ্য
হিসাবে চীন দেশটা পান নি; নতুন দেশ জিতে নিয়ে যেমন গায়ের
জোরে শাসন করতে হয়, তিনিও চীনদেশ সেই ভাবে শাসন
করতেন। সেই জন্য তিনি দেশী চীনেদের বিশ্বাস করতে পারতেন
, বিদেশীদের ওপরই বেশী নির্ভর করতেন; তাতার, মুসলমান বা
খ্রীষ্টানদের বড় বড় কাজ দিতেন। তারাই তার প্রাসাদে চাকরী
পেত, আর যে সব কাজে বিশ্বাসী লােক দরকার সে সব কাজও
তাদের দেওয়া হত। এরা তাই চীনেদের হয়েছিল চক্ষুশূল।
আহমদ নামে একজন তুর্কীস্থানের মুসলমান ‘সির দরিয়া’র
তীর থেকে চীনে এসে কুবলাইএর কাছে বড় চাকরী পেয়েছিলেন।
আহমদের ও তাঁর পচিশ ছেলের কঠোর ব্যবহারে চীনেরা খুব চটে
;
মার্কো পােলাে ছিল। কতকগুলাে চীনে মতলব করল যখন ‘জানাডু’র গ্রীবাসে আহমদ থাকবেন, তখন তাকে মেরে ফেলতে হবে। এদের সর্দার হলেন দু’জন সেনাপতি,-একজনের নাম ‘চেন্ চু’, তিনি এক হাজার সৈন্যের নেতা; আর এক জনের নাম ‘ভান্ চু’, তিনি দশ হাজার সৈন্যের নেতা। ষড়যন্ত্র বেশ পাকিয়ে উঠল। ঠিক হয়ে থাকল যে অমুক দিন একটা উঁচু জায়গায় আগুন জ্বেলে দেওয়া মাত্রেই, আশপাশের সহরে ঐ রকম আগুন জ্বালা হবে, আবার সেই সব আগুন দেখে দূরের সব সহরেও আগুন জ্বলবে ; অমনি হত্যাকাণ্ড আরম্ভ হবে, যেখানে যত দাড়ীওয়ালা তােক দেখতে পাওয়া যাবে তাদের সবাইকে খুন করা হবে। দাড়ীওয়ালা লােকের মানেই বিদেশী লােক, চীনের লােকের দাড়ী নেই : দাড়ী ছিল তাতারদের, মুসলমানদের আর খ্রীষ্টানদের। এই ভাবে বিদেশীদের •মারবার মতলব ঠিক হয়ে গেল। কিন্তু শেষে মতলব গেল ফেঁসে। কুবলাইএর ছেলে ‘চিউকিউ’- এর সঙ্গে দেখা করবেন বলে আহমদ গেলেন প্রাসাদে; চেন্চু প্রস্তুত হয়েই ছিলেন—তার মাথা কেটে ফেলবার জন্য ! কিন্তু সহরের রক্ষী সৈন্যদলের নেতা ‘কোগাতাই’ আহমদের সঙ্গে সঙ্গে আসছিলেন, তিনি ব্যাপার বুঝে ‘ভান্ চু’কে একটা তীর ছুড়ে মেরে ফেললেন আর নিজের সঙ্গে যে ক’জন রক্ষী সৈন্য ছিল তাদের হুকুম দিয়ে ‘চে চু’কে গ্রেপ্তার করালেন। চীনেদের দলের নেতা রইল না ; তাই আগুন জ্বালিয়ে বিদ্রোহের সঙ্কেত আর দেওয়া হল না। এই রকমে এ ব্যাপারের শেষ হয়। - কুবলাইএর রাজধানী ৭৭ কুবলাই নিষ্ঠুর ছিলেন না; কারণ মার্কো বলেছেন, ঝড়বৃষ্টি বা পঙ্গপালের অত্যাচারে দুর্ভিক্ষ হলে তিনি প্রজাদের খাবার দিতেন। তার প্রাসাদে গরীব দুঃখী লােক গেলে সকলে কাপড় ও এক এক খণ্ড রুটি পেত। প্রতি দিন প্রায় ত্রিশ হাজার লােক এই জন্য আসত। মােটের ওপর কুবলাইএর সাম্রাজ্যে শান্তি ছিল। বড় বড় সামন্ত আর সেনাপতিদের তিনি উৎসবের দিন ভােজ দিতেন। মার্কো এই সব ভােজের বিবরণ দিয়েছেন। সম্রাট একটা উঁচু বেদীর ওপর খেতে বসতেন, তিনি থাকতেন দক্ষিণ মুখখা হয়ে, তাঁর প্রধান রাণী তাঁর বাঁ দিকে বসতেন। সম্রাটের বংশের রাজপুত্ররা বসতেন তার নীচের আসনে, তাদের মাথা সম্রাটের পায়ের চেয়ে উচু হয়ে থাকতে যাতে না পারে, এমন নীচু জায়গায় তাঁরা বসতেন। সামন্তরা, তাদের স্ত্রী আর সেনাপতিরা বসতেন আরও নীচের আসনে ; সার সার আসন এমন সাজান থাকত যে সম্রাট যেখানে বসে থাকতেন সেখান থেকে সব দেখতে পেতেন। তারা খেতেন টেবিলে । সৈন্যদের বসবার আসন ছিল কার্পেটের ওপর। ঘরের মধ্যে ভজের ব্যাপার; বাইরে হাজার চল্লিশ লােক থাকত দাড়িয়ে, তাদের মধ্যে কুবলাইএর প্রজারাও থাকত; তারা উপহার নিয়ে কুবলাইকে দিতে আসত; আর থাকত বিদেশী লােক, তারা আশ্চৰ্য্য আশ্চৰ্য্য জিনিষ নিয়ে দেখাতে আসত। সম্রাটের কাছে একটা সুন্দর কাজ করা চৌকা দেরাজের মধ্যে একটা খাঁটি সােনার বড় পাত্র ছিল ; দেরাজটির গায়ে নানা জন্তুর ;
৭৮ মার্কো পােলাে মূর্তি, আর চারধারে সােনালী মাখান। পাত্রটির আশে পাশে ঘােট ঘােট পাত্র ; বড় পাত্রের মধ্যে মদ বা দামী সুগন্ধ মশলা দেওয়া শরবৎ ; তা থেকে ছােট ঘােট পাত্রে মদ বা শরবৎ নেওয়া হত। দেরাজের ওপর সম্রাটের পানপাত্র সাজানাে থাকত, আর থাকত কতকগুলাে খাটি সােনার তৈরী কলসী, তাদের এক একটির মধ্যে সাত আট জনের খাওয়া চলতে পারে সেই পরিমাণে মদ বা শরবৎ থাকত। এই কলসী এক একটা রাখা হত দুই জনের মধ্যে ; সেই সঙ্গে দু’টো সােনার বাটিও থাকত। যারা ভােজ খেতে আসতেন, রা প্রত্যেকে এই বাটিতে শরবৎ বা মদ ঢেলে নিয়ে খেতেন। মহিলা যারা খেতে আসতেন তাদেরও এই ব্যবস্থা ছিল। এই সব কলসী ও পান পাত্রের দাম খুবই বেশী। সম্রাটের সােনা রূপার থালা বাসন ও আর আর সােনারূপার জিনিষ এতছিল যে কেউ সে রকম দেখেনি, বা শশানে নি, আর বললেও বিশ্বাস করতে চাইবে না। জন কতক সামন্তের কাজ ছিল লােক জন এলে দের পদ অনুসারে ঠিক জায়গায় বসিয়ে দেওয়া প্রত্যেক দুয়ারে দৈত্যের মত প্রকাণ্ড আকার দু'জন লােক দণ্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত তাদের কাজ ছিল, ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠ কেউ যেন না মাড়িয়ে যায়,-এ দেখা। দু'এক জন সামন্ত পাশে দাড়িয়ে বিদেশী লােকদের সাবধান করে দিতেন, তারা যেন চৌকাঠে পা না দিয়ে ঘরে ঢােকেন, পা দিলে কপালে দুভার্গ্য আছে। যিনি চৌকাঠে পা দিতেন তাঁর পিঠে দু’ এক ঘা দণ্ড পড়ত, কিম্বা তার পােষাক কেড়ে নেওয়া হত;
কুবলাইএর রাজধানী অর্থদণ্ড না দিলে তা আর ফেরত পাওয়া যেত না। ভােজ শেষ হলে লােকে যখন বেরিয়ে যেত, তখন কোন কড়াকড়ি ছিল না ; কারণ কুবলাই জানতেন, ভোজে মদ খাওয়ার পর তাদের নিশ্চয়ই নেশা হবে, আর সে জন্য তাদের পাও এলােমেলাে পড়বে। কুবলাই ছিলেন খুব সৌখীন সম্রাট ; দুর্গন্ধ তিনি সহ্য করতে পারতেন না। যে সব সামন্ত তাঁর খানসামার কাজ করতেন, তাঁদের নাক মুখ ঢেকে রাখতে হ’ত সােনার জরীর কাজ-করা রেশমী রুমালে। পাছে তাঁদের নাক মুখের কোন দুর্গন্ধ সম্রাটের খাবার অপবিত্র করে দেয়, সেইজন্য এই ব্যবস্থা। সভার মেজে থুতু ফেলবার হুকুম ছিল না। আমীর ওমরা যারা সভায় যেতেন, তাঁরা সঙ্গে একটা ছােট্ট পিকদানী রাখতেন; থুতু ফেলবার দরকার হলে পি- দানীর মধ্যে ফেলে, ঢাকনী দিয়ে পাশে সরিয়ে রাখতেন। যখন সম্রাট কিছু পান করতেন, ভােজে উপস্থিত যারা থাকতেন সকলেই হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নােয়াতেন, আর নানা রকমের বাজনা বেজে উঠত। ভােজের সময় বড় ঘরে ও আশ পাশে প্রায় হাজার পঞ্চাশ লােক থাকত; বাজনা শুনে তারা বুঝত সম্রাট শরাব পান করছেন। এক একবার সম্রাটের মুখে কিছু শরাব গেলেই এইরূপ বাজনা বাজত। এ না হলে কি আর সম্রাটের খাওয়া হয় । সম্রাটের জন্ম দিন ও বছরের প্রথম দিন ছিল সব চেয়ে বড় উৎসবের দিন। ২৮শে সেপ্টেম্বর তারিখ ছিল সম্রাটের জন্ম দিন। সেদিন বারাে হাজার সামন্ত ও সেনাপতি সেজে গুজে আসতেন। কুবলাইএর পােষাকের যে রঙ, ও ঢঙ তাদেরও সেই রকম রঙ, ঢঙ, মার্কো পােলা হত; তবে কুবলাইএর পােষাক যেমন পিটিয়ে পাতলা করা সােনার পাতের তৈরী ছিল, তাদের সে রকম বা অত দামী পােষাক ছিল না । তাদের এক একটা সােনার কোমরবন্দ থাকত ; কোমরবন্দ ও অন্যান্য পােষাক যা তারা পরতেন সব সম্রাটের দেওয়া, পােষাকের কোন কোনটায় এত মণিমুক্তা বসান থাকত যে এক একটার দাম ছিল দশ হাজার মােহর। এক একটা উৎসবে কুবলাই ও তাঁর আমীর ওমরা সব এক এক রঙের পােষাক পরতেন। এ সব পােষাক সম্রাটই তাদের দিতেন। বৎসরে সম্রাট তেরবার এই রকম পােষাক দান করতেন। উৎসবের সময় সম্রাটের রাজ্যের সব তাতার, ও তাঁর সাম্রাজ্যের অধীন সব রাজা ও শাসনকর্তা তাকে ভাল ভাল উপহার দিতেন; কিন্তু এক একটা উৎসবে সম্রাটের খরচও হ’ত খুব। পৃথিবীতে তার মত আর কোন সম্রাটেরই এ রকম খরচ করবার ক্ষমতা ছিল না। বছরের প্রথম দিনের উৎসবেও এই রকম কাণ্ড হত ; তফাৎ ছিল এই যে সে দিন রাজা প্রজা, স্ত্রী, পুরুষ সকলকেই শাদা পােষাক পরতে হত ; আর সম্রাটকে উপহার যা দিতে হত তার সংখ্যা ছিল নয়ের ন'গুণ। যদি কোন প্রদেশ থেকে ঘােড় পাঠাত। তবে একাশীটা ঘােড়া আসত, যদি কোন প্রদেশ থেকে সােনা আসত, তবে তারা পাঠাত একাশীটা মােহর। এই দিন দামী সাজ-পরা লাখ খানেক ঘােড় কুবলাই উপহার পেতেন। আমীর, ওমরা, দৈবজ্ঞ, ডাক্তার, পণ্ডিত, রাজপ্রাসাদে বা রাজ- সরকারে যারা চাকরী করত, সকলে প্রাসাদের বড় ঘরে জমায়েত সে দিন
কুবলাইএর রাজধানী
হ’তেন, আর বাইরে থাকত হাজার হাজার প্রজা। সকলে হাজির
হ'লেই এক জন বড় পুরােহিত উঠে উঁচু গলায় চার বার বলতেন,
“মাথা নােয়াও”, আর সকলে কুবলাইএর নাম লেখা একটা ফলকের
কাছে মাথা নােয়ত ; ফলকটি থাকত একটি সাজানাে গােজাননা
বেদীর ওপর।
উৎসবে দেখবার মত একটা ব্যাপার ছিল,—সম্রাটের হাতীদের
সারবন্দী হয়ে যাওয়া। পাঁচ হাজার হাতীর গায়ে দামী রঙীন কাপড়
মুড়ে, এক একটার পিঠে নানারকম পাত্র আর মূল্যবান জিনিষ
বােঝাই দুটো বড় সিন্দুক চাপিয়ে তাদের চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হত।
ভােজের পরে ভােজবাজী যারা জানে তারা এসে নিজেদের
নানা কেরামতি দেখাত।
এত গেল ভােজ, উৎসবের ব্যাপার। কুবলাইএর শিকারের
ঘটাও ছিল খুব। তাঁর পােষা শিকরে, পােষ সিংহ ও চিতা
থাকত। তার দু’জন সামন্ত ছিল, তাদের পদবী ছিল ‘চিনুচি’-
অর্থাৎ ‘শিকারী কুকুরের রক্ষক। এরা দুই ভাই, এঁদের অধীনে
দশ হাজার করে লােক থাকত, এদের এক দলের পােষাক ছিল
সব লাল, আর এক দলের নীল। এই দুই ভাইকে প্রত্যেক দিন
এক হাজার জীব শিকার করে এনে দিতে হত; কুবলাইএর
প্রাসাদের লােক জনের খাওয়া চলত এই সব জীবের মাংসে।
যখন সম্রাট শিকার করতে বের হতেন, এই দুই জন সামন্ত সঙ্গে
চলতেন। একজন দশ হাজার লােক ও পাঁচ হাজার ডালকুত্তা
নিয়ে যেতেন ডান দিক দিয়ে, আর একজন তার দলবল কুকুর
৮২ মার্কো পােলল ; নিয়ে যেতেন বাঁ দিক দিয়ে। কুকুরগুলাে সম্ভবতঃ তিব্বতী ডাল- কুত্তা। এরা খুব জোরাল ; দরকার হলে দু’টো কুকুরে একটা চিতাবাঘ বা বুনাে শূয়াের শিকার করতে পারত। সম্রাট মার্চ মাসের প্রথম দিনে শিকারে বের হতেন, তিন মাস তিনি ফিরতেন না। তাঁর সঙ্গে দশ হাজার শিকারী, পাঁচ শশা শিকরে থাকত। শিকারীদের তবে শিকরে বাজগুলাে থাকত। এ ছাড়া জলচর পাখী শিকারের জন্য আলাদা শিকরে থাকত। শিকরে সব এক জায়গায় থাকত না। এখানে এক শাে, আর এক জায়গায় দু’ শাে এই ভাবে পাখীগুলাে ভিন্ন ভিন্ন লােকের তাবে রাখা হত। লােকগুলাের পদবী ছিল ‘টস্কাওল’, তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে ছােট বাঁশী ও কাপড়ের বা চামড়ার ঢাকনী থাকত। বাঁশী বাজালেই শিকরে ফিরে আসত, তখন তার মাথা ও চোখে ঢাকনী দিয়ে বেঁধে রাখা হত। ‘কুবলাই’এর তবুও ছিল একটা বৃহৎ জিনিষ। সুন্দর সুন্দর তবু ছিল তাঁর দশ হাজার ; এতে দরকার হলে তার ছেলেরা, সামন্ত, এবং তাদের স্ত্রী সকলে থাকতে পারত। যে তাঁবুতে দরবার হত সেটার মধ্যে হাজার লােক ধরতে পারত। সেটা ও শােবার তাঁবুগুলাে সিংহের চামড়ায় ঢাকা। তার ভেতরের দিকটা দামী ললাম দিয়ে মােড়া। মানুষের যে এত ঐশ্বৰ্য্য থাকতে পারে, লােকের তা ধারণাতেই আসে না। সেই জন্য পােলাে যখন ভিনিসে এই মহাব্যাপার গল্প করে বলতেন, সবাই মাথা নেড়ে অবিশ্বাসের হাসি হাসত। চোখে না দেখলে কি এ সব কেউ বিশ্বাস করতে চায় ?
১১
চীনের কথা
কুবলাইএর অধীনে কাজ নিয়ে মার্কো অনেক জায়গায় ঘুরে
বেড়িয়েছিলেন। ‘জানাভু’ ও ‘পিকি’ ছাড়া তিনি আরও অনেক
বড় বড় সহর দেখেছিলেন। তার মধ্যে মাজি’ প্রদেশের ‘কিনসে’
সহরই প্রধান। মার্কো যে সহরের নাম ‘
কিসে’ বলেছেন তার
চীনে নাম ‘কিংজু অর্থাৎ ‘রাজধানী। আজকাল তার নাম ‘হাংচৌ'।
প্রদেশটা আগে কুবলাইএর অধীন ছিল না। এটা তিনি জিতে
নেন। প্রথমে তার ফৌজ তিন বছর ধরে ‘সাইয়ান্ ফু’ অবরােধ
করে। নগরটি ‘হান্ নদীর ওপর—নাম এখন তা’র ‘সিয়াং
ইয়াং'। জায়গাটা নেবার সময় পােলােদের কাছ থেকে সাহায্য
পাওয়া গিয়েছিল। পােলােদের সঙ্গে যারা চীনে গিয়েছিল তাদের
মধ্যে একজন জামা আর একজন নেষ্টর সম্প্রদায়ের খ্ৰীষ্টান ছিল।
এরা দু’জনই কলকজার কাজে পটু ছিল, তাই এরা এমন তিনটি
পাষাণ ছুড়বার কল তৈরী করে দিল, যা থেকে চার মণ ওজনের পাথর
কেল্লার মধ্যে ছুঁড়তে পারা যেত। ‘সাইয়া ফু’র লােকেরা তাতে
ভয় পেয়ে অধীনতা স্বীকার করল। জায়গাটা নিতে অনেক দিন
দেরী হয়েছিল বলে কুবলাই খুব চটে ছিলেন, এখন সেটা পে
যে খুব খুসি হয়েছিলেন তা বলাই বাহুল্য।
৮৪ মার্কো পােলদা এর পর কুবলাই ‘মাজি’ রাজ্য জয় করেন। মার্কো বলেছেন -ইয়াংসু নদী পার হয়ে মাজি রাজ্যে যেতে হয়। এ রাজ্যে ঐশ্বৰ্য্য ধরত না, কিন্তু অধিবাসীরা অতিরিক্ত আয়েসী হয়ে পড়েছিল বলে একেবারে অকেজো হয়েছিল। তাই মার্কো বলেছেন- মাজি’র লােক যদি যুদ্ধ করতে জানত, তা হলে পৃথিবী জয় করতে পারত। শুধু ধন দৌলত থাকলে কি হবে ? সে ধন রত্ন রাখবার শক্তি চাই। কিন্তু তাদের শক্তি মােটেই ছিল না। মাজির রাজা ‘টুসং’ অতি অপদার্থ, অসংযমী, কাপুরুষ ছিলেন। কুবলাইএর ফৌজ যখন দেশ আক্রমণ করে, তিনি তখন বেঁচে ছিলেন না। তাঁর দু’টি ছােট ছেলে হাজার খানিক জাহাজ নিয়ে পালিয়ে গেল। তাদের সঙ্গে নিয়ে যারা গিয়েছিল তারা ভেবেছিল সমুদ্রের মধ্যে কোন দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নেবে। লােকে ভাবে এক ; হয় আর। একটি ছেলে,-তার বয়স বছর চারেক-কান্ট থেকে কিছু দূরে জনমানবহীন একটি দ্বীপে গিয়ে মারা যায় ; আর একটিকে কোলে নিয়ে এক মন্ত্রী জলে ঝাপ দেন, ফলে দু’জনেরই মৃত্যু হয়। পুরুষের যা সাধ্য হ’ল না, স্ত্রীলােকে তাই করবার চেষ্টা করেছিলেন। ‘টুটুসং’এর বিধবা রাণী কিসে সহর রক্ষা করবেন বলে উদ্যোগ করলেন। কিন্তু কুবলাই ভাগ্যবান লােক ; রাণীর চেষ্টায় কোন ফল হ’ল না। কারণ তাঁর মন্ত্রীরা বলে বসলেন—“প্রাচীন কাল থেকে এ প্রবাদ চলে আসছে উত্তর দেশ হতে যে রাজা এদেশ অক্রমণ করবে—তার হাতে সুঙ্গ, রাজবংশ শােপ পাবে। প্রাচীনদের এ প্রবাদ উপেক্ষা করে আমরা যুদ্ধ করবে না”।
চীনের কথা ৮৫ তাই রাণী হার স্বীকার করে তাতারদের হাতে তাঁর সাধের কিসে সঁপে দিলেন। কুবলাই রাণীর সহিত খুব ভাল ব্যবহার করেছিলেন, ও যে সম্মান তাঁর পাওয়া উচিত সে সম্মান তাকে দেখিয়েছিলেন। মার্কো ‘সুচৌ’ সম্বন্ধে বলেছেন অনেক কথা। এটা বেশ বড় সহর, এখানে অনেক পণ্ডিত, খুব বড় রেশমের কারবার, আর ছ’হাজার সেতু বা পুল আছে। শেষের কথাটা থেকে সহরটা যে কত বড় ও জমকালাে ছিল তা বুঝতে পারা যায়। ইয়ােররাপের অনেকে সহরটিকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারি’ সহরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু মার্কো হাংচৌ সহরের যতটা প্রশংসা করেছেন তত প্রশংসা সুচৌ সহরটাকে করেন নি। হাংচৌ দেখে তিনি মুগ্ধ ও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন তাই তিনি শতমুখে তার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন,—এই সহরটির বেড় এক শাে মাইল। আর একজন খ্রষ্টান পুরােহিত • সে কালে এসিয়ার এই অঞ্চলের বিবরণ দিয়েছিলেন, তিনিও ‘হাংচৌ’এর বিস্তার সম্বন্ধে এই কথা বলেছেন। আফ্রিকা ভ্রমণকারী ইবন্ বতুতা ভারতবর্ষ প্রভৃতি অনেক দেশ ঘুরে- ছিলেন; তিনি বলেছেন এই সহরের এক দিক হতে আর এক দিক যেতে তিন দিন লাগত। মার্কো তাই বলেছেন,-“এত বড় ও এত সুন্দর সহর পৃথিবীর আর কোথাও নাই। এখানে পাথরের তৈরী বারাে হাজার পুল আছে; তাদের অধিকাংশই এত উঁচু যে তল দিয়ে বড় বড় জাহাজের বহর অনায়াসে চলে যেতে পারে। পাছে কোন, গােলযােগ হয় সেইজন্য বাবাে হাজার সেতুর প্রত্যেকটিতেই দশজন করে প্রহরী থাকত। সহরের মধ্যে ত্রিশ মাইল বেড় এমন ;
মার্কো পােলাে একটা প্রকাণ্ড হ্রদ আছে, তার চার ধারে বড় বড় প্রাসাদ ও বাড়ী, মঠ ও মন্দির রয়েছে। হ্রদের মধ্যে দু’টো দ্বীপ, দ্বীপের ওপর এক একটি অতি সুন্দর বড় বাড়ী; বাড়ী দু’টি এত ভাল করে সাজানাে, যে দেখলেই মনে হবে যেন সম্রাটের প্রাসাদ।” “মাজি’র যিনি সম্রাট ছিলেন, তার প্রাসাদের মত বড় বাড়ী পৃথিবীর কোথাও ছিল না। তার বেড় ছিল দশ মাইল, আর চারধারে ছিল মনােহর বাগান। সহরে তিন হাজার স্নানের জায়গা ছিল। এক একটি স্নানাগারে এক শাে লােকে স্নান করতে পারত। অমন সুন্দর, অত বড় স্নানাগার আর কোথাও দেখা যেত না। সহরের মধ্যে কত খাল, বাগান--যেন ভিনি সহর পূর্ব দিকে উঠে এসেছে। বড় হ্রদের ওপর কত নৌকা, বজরা ; ললাকে তার ওপর চড়ে ফুর্তি করে। তীরের রাস্তাগুলাে বেশ চওড়া ও বাঁধানাে ; রাস্তার দুধারে লােকের বাড়ী। বাড়ীর দরজার ওপর কর্তার নাম লেখা। নতুন লােক যারা এসে হােটেলে ওঠে, তাদের নাম হােটেলওয়ালার লিখে রাখতে হত। সহরে রাশি রাশি খাবার জিনিষ, প্রচুর মাছ, মাংস। দশটা বড় বাজারে হাজার হাজার লােক কেনা বেচা করছে। সহরের লােক গুণে শেষ করা যায় না। দিনে মরিচ যে কত খাওয়া হত তা ভাবলে সহরের লােক ও তাদের খাওয়ার পরিমাণ সম্বন্ধে একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। সহরে ৪৩ বস্তা মরিচ প্রতিদিন লােকের পেটে যেত, এক একটা বস্তায় প্রায় তিন মণ করে মরিচ থাকত। মার্কো এক জন কর্মচারীর কাছে এই খবর পেয়েছিলেন।
No text on this page.
२.१८ । भय इम'२.घनश চীনের কথা ৮৭ ; বাড়ীগুলাে বেশীর ভাগ ছিল কাঠের তৈরী, তাই প্রায়ই অগ্নি- কাণ্ড হত। আগুনের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য ব্যবস্থাও ভাল ছিল। কোথায় আগুন লাগে দেখবার জন্য অনবরত একদল পাহারাওয়ালা ঘুরত, আর কাছাকাছি একটা পাহাড়ের ওপর একটা উচু বড় স্তম্ভ তৈরী করে তার মাথায় একটা কাঠের তক্তা রাখা হয়েছিল; কোন খানে আগুন লাগলেই মুগুর দিয়ে তক্তায় ঘা মেরে চার দিকে জানিয়ে দেওয়া হত ; শব্দটা না কি অনেক দূর পর্যন্ত শােনা যেত। নানা দেশ থেকে লােকে জাহাজে চড়ে এখানে বাণিজ্য করতে আসত। কত রকম ভাল ভাল কাপড়, সােনা রূপার জিনিষ, মণি, মুক্তা, কত অদ্ভুত জিনিষ যে তারা আনত তা বর্ণনা করা যায় না। ভারতবর্ষ থেকেও অনেক জিনিষ আমদানী হত। মার্কো যে হ্রদটির কথা বলেছেন তার চীনে নাম ‘সি-হু; সাহেবরা তার নাম দিয়েছেন পশ্চিম হ্রদ। সেটি এখনও দেখা যায়। মার্কো বলেছেন সেটির ত্রিশ মাইল বেড়। মার্কো ‘মাইল’ কথাটা লি’ অর্থে নিয়েছেন। চীনে দূর জায়গা বােঝাবার জন্য বলে এত ‘লি’ দূরে, অত ‘লি’ দূরে। আমরা বলি ক্রোশ, ইয়ােরােপের ললাকে বলে মাইল আর চীনে বলে “লি’। তিন ‘লি’ হলে এক মাইল হয়, অর্থাৎ আমাদের এক ক্রোশে ছয় লি। হ্রদটার চার ধারে পাহাড় ; বেশী জল এখন নেই, জলের ওপর রাশি রাশি হলদে পদ্ম ফুল ভাসছে। এখানে চীন সম্রাটদের গ্রীষ্মকালে বাস করবার যে প্রাসাদ ছিল তা এখনও আছে, তবে তার মালিক এখন ৮ মার্কো পোলাে ; এক জন পয়সাওয়ালা সদাগর; তিনি বাড়ীর পুরানাে ঠাট বজায় রাখবার জন্য অনেক পয়সা খরচ করেছেন। সু-চ-উয়া প্রদেশের কথা মাকে বলেছেন,—“এই প্রদেশটি চীন রাজ্যের মধ্যে সকলের চেয়ে সমৃদ্ধ ; এ অঞ্চলের রাজধানীতে প্রায় দশলাখ লােক বাস করে ; আর তার চার দিকের দেওয়ালের বেড় প্রায় ২০ মাইল। সহরটির মাঝখান দিয়ে প্রায় আধ মাইল চওড়া এক নদী চলে গিয়েছে সমুদ্রের পানে। এই নদীর নাম কিয়াংসুয়ে; তাতে অসংখ্য নৌকো, পানসী, বজরা থাকত। এ নদীকে এখন “মী”নদী বলে,—উহা ইয়াংসু নদীর এক উপনদী। এই উপ- নদী দিয়ে বাণিজ্যের এত বেশী জিনিষ পত্তর চলাচল করে যে তা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। নদীর ওপর দিয়ে একটি পাথরের সেতু এখন দেখা যায়। উহা সাত কদম চওড়া, আধ- মাইল লম্বা ছিল। সেতুর দুধারে মার্বেল পাথরের সারি সারি থামের ওপর সেতুর ছাদ ছিল। সেতুর ওপর আফিস, দোকান পাট বসত,–এই সব আফিসে বাণিজ্যের শুল্ক আদায় হত; এই শুল্কও দৈনিক প্রায় ৮ হাজার টাকার কম নয়।” প্রায় সতের বছর ধরে মার্কো চীন ও আশ পাশের দেশে ঘুরেছিলেন; চীন সাম্রাজ্য সম্বন্ধে তিনি অনেক কথাই বলেছেন; চীনের সহর, চীনের নদী, চীনের লােকের আচার ব্যবহার, চীনের জিনিষপত্র এসব বিষয়ে তার ভ্রমণ কাহিনীতে অনেক কথা লেখা আছে। ইয়াংসু নদীর বর্ণনা করবার সময় তিনি বলেছেন,—“এটিকে নদী না বলে সাগর বললেই ভাল হয়।” তিনি ‘ সিজু’তে পনের হাজার জাহাজ
চীনের কথা
এক সঙ্গে দেখেছিলেন। সিজু’র এখনকার নাম ‘ইচিং সিয়েন।
মার্কো বলেছেন,—“ইয়ােরােপে খ্রীষ্টানদের দেশে সমস্ত নদী ও
সমুদ্রের ওপর যত জাহাজ-ভরা ধনরত্ন, মালপত্র ভাসে, তার চেয়ে
বেশী জিনিষ, বেশী টাকার মাল ভাসে এই এক ইয়াংসু নদীর
ওপর”।
কুবলাইএর কাগজের টাকা অর্থাৎ ‘নােটে’র কথা মার্কে
বলেছেন। তুত গাছের ভেতরকার কাঠ আর বাহিরের ছাল, এ
দু’য়ের মাঝখান থেকে এক রকম কালাে কাগজের মত পাতলা
ছাল পাওয়া যেত ;
সেই কাগজ নানা আকারে কেটে
নানা রকম ‘নােট' তৈরী হত ।
তৈরী হত। তার পর কুবলাইএর বড় বড়
কর্মচারীরা সেগুলাের ওপর নাম সই ও শীল মােহর করে দিতেন;
তার পর সম্রাটের কোষাধ্যক্ষ সম্রাটের শীল মােহরে সিদূর মাখিয়ে
তার ওপর ছাপ • দিতেন। যে দিন ‘নােট’ বের হত সে দিন
খুব ঘটা ও আঁকজমক হ’ত। এ নােট নিতে অস্বীকার করলে
শাস্তি ছিল মৃত্যু। তবে নােট
তবে নােট পুরানাে হয়ে ছিড়ে গেলে কিছু
পয়সা দিয়ে বদলে নতুন নােট নেওয়া যেতে পারত।
এই নােট সেকালে লােকে যে খুব পছন্দ করত না তা ঠিক।
এই নােট বেশী বের করার জন্য চীনের মঙ্গোল রাজবংশ লােপ
পায়। পারস্যেও মার্কোর সময় নােটের চলন হয় ; ছত্রিশ বছর
পরে ভারতের তগল সুলতান মহম্মদ ভারতে এই রকম নােট
চালাবার চেষ্টা করেন। এই দুই দেশেও এর ফল সাঙ্ঘাতিক
হয়েছিল।
;
মার্কো পােলাে . মার্কো পিকিনের মন্ত্রী সভার কথা বলেছেন। সভাতে বারাে জন সামন্ত বসে কাজ করতেন; এরা সাম্রাজ্যের চৌত্রিশটি প্রদেশে শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন। মার্কো প্রদেশগুলির নাম দেন নি ; এখন মােটে আঠারটি প্রদেশের নাম পাওয়া যায়। ' তার পর কুবলাইএর সাম্রাজ্যে ‘ডাক’ সম্বন্ধে তিনি যা বলেছেন তা জানবার মতাে কথা। বড় বড় রাস্তায় পঁচিশ মাইল অন্তর ‘ইয়া থাকত। আমাদের দেশে যেমন ডাক-বাংলা, চীনে তেমনি ‘ইয়া। সেখানে শােবার জায়গা ও বিছানা তো ছিলই, তা ছাড়া দু’শশা ঘােড়া থাকত ; কোন কোনটায় চার শশা ঘােড়াও থাকত। সৰ্বশুদ্ধ দশ হাজার ইয়া’ ও তিন লাখ ঘােড় ‘ডাক’ নিয়ে যাবার জন্য ছিল। এ ছাড়া তিন মাইল অন্তর এক একটা ছােট কেল্লা ছিল, এক একটার চার দিকে গােটা চল্লিশ ঘর থাকত; সেখানে যারা থাকত তারা পায়ে হেঁটে ডাক নিয়ে যেত। এক এক জনের কোমরবন্ধে ঘােট ঘােট ঘুঙুর থাকত; এক এক ডাক নিয়ে তিন মাইল গেলে পরে আর এক জন তাই নিয়ে আবার তিন মাইল যেত। এই রকমে দশ দিনের পথ এক দিনে শেষ হ’ত। পিকিন্ থেকে ফল নিয়ে পর দিন সন্ধ্যাবেলা হরকরা জানাডু’তে পৌছাত। কুবলাই ‘জানাডু’তে বসে ফলের সময় পিকিনের ফল খেতেন। জরুরী খবর পাঠাবার সুবিধা খুবই ছিল ; ঘােড়ায় চড়ে হরকরা ঘুঙুর বাজিয়ে দিনে দু’ শশা আড়াই শশা মাইল চলে যেত। নদী বা হ্রদ পার হবার সময় কোন অসুবিধা হত না, কারণ তিন চার খানা নৌকা সকল সময় প্রস্তুত থাকত। এক একটা ‘ইয়াম্বে’ ;
চীনের কথা ঘােড় তৈরী থাকত, দূরে ঘুঙুরের শব্দ শােনা গেলেই আর এক জন সওয়ার ঘােড় নিয়ে ডাক বইবার জন্য তৈরী হয়ে থাকত। যারা ডাক নিয়ে যেত তাদের বড় পরিশ্রমের চাকরী, তাই তারা বকশী পেতও খুব। পাছে দেশে দুর্ভিক্ষ হয় সেজন্য কুবলাইএর ব্যবস্থা ছিল ভারি সুন্দর। যখন ফসল বেশী জন্মাত, জিনিষপত্র সস্তায় বিক্রী হত। তখন রাশি রাশি শস্য কিনে বড় বড় ভাণ্ডারে বােঝাই করে রাখা হ’ত। সব প্রদেশেই এই রকম ভাণ্ডার ছিল। বৃষ্টির অভাবে বা পঙ্গপালের অত্যাচারে যখন দেশে দুর্ভিক্ষ হত তখন এই ভাণ্ডারের শস্য খেয়ে তােক বাঁচত। এ ছাড়া রাজপ্রাসাদ থেকে ভিক্ষা দানের যে ব্যবস্থা ছিল তার কথা তাে আগেই বলা হয়েছে। এ সব হ’ল কুবলাইএর ব্যবস্থার কথা। দেশের রীতি নীতি জিনিষপত্রের কথা অনেকই বলা হয়েছে। একটি নতুন জিনিষের কথা বলে এ অধ্যায় শেষ করা হবে। এগুলাে আমাদের কাছে নতুন নয়, ইয়ােররাপের ললাকে তখন তা জানত না। মার্কো এক জায়গায় বলেছেন,—“চীনে এক পাহাড় থেকে লােকে শক্ত কালাে পাথর কেটে নিয়ে আসে, সেগুলাে জ্বলে। কাঠের আগুনের চেয়ে এর আগুন বেশীক্ষণ থাকে, আর এর তেজও বেশী। রাতে জ্বালিয়ে দিলে সকাল পর্যন্ত আগুন থাকে। এগুলাে দাউ দাউ করে জ্বলে না, প্রথমে আগুন ধরবার সময় একটু জ্বলে।” মার্কো পাথুরে কয়লার কথা বলছেন তা বেশ বুঝতে পারা যায় কিন্তু ইয়ােরােপের লােকে তখন তা বুঝতে পারে নি। " ৪
১২
অন্য সব দেশের কথা
;
মার্কো চীন ছাড়া এদিকের আরও অনেক জায়গায় এসেছিলেন।
বােধ হয় তিনি বর্মায় ঢুকে মান্দালয় পৰ্য্যন্ত গিয়েছিলেন, তবে
লেয়স্ আর টঙ্কি তিনি চোখে দেখেন নি, লােকের মুখে তাদের
বিবরণ শুনেছিলেন।
কুবলাইএর কাজের ভার নিয়ে বার কতক সমুদ্র যাত্রা
করেছিলেন, কারণ জেট’ ও ‘সিঙ্কলনে’ যে জাহাজ তৈরী হ’ত
তার কথা তিনি বলেছেন। জেট সম্ভবতঃ ‘আময়’ কিম্বা আরও
উত্তরের বন্দর ‘সােয়াচো'; সিঙ্কল আজ কালকার ক্যান্টন্ বন্দর।
এসব জাহাজ ইয়ােরােপের তখনকার তৈরী অনেক জাহাজের চেয়ে
বড়। চীনেদের বড় বড় জাহাজের নাম জোন, এখন ইংরাজীতে
কথাটার উচ্চারণ হয়েছে জঙ্ক।
এ সব জাহাজের একটা পাটাতন,
চারটে মাস্তুল, আর দুটো মাস্তুল রাখবার ব্যবস্থা ছিল। জাহাজে
প্রায় ষাটটা কামরা থাকত, আর জাহাজের নীচে তিনপুরু কাঠ
থাকত।
জেট থেকে দেড় হাজার মাইল জাহাজে চড়ে মার্কো চম্পায়
গিয়েছিলেন ; কাম্বােজ পৰ্যন্ত ইন্দোচীনের নাম চম্পা। কাম্বােজে
‘আঙ্করের ধ্বংসস্তুপের কথা তিনি বলেন নি। চম্পার রাজার
No text on this page.
.
১,
C
}"
পূৰ্ক ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের মাঝে পেলেদের জাহাজ
From Sir Heniy Yule's Book of Marco Polo" (John Jourray).
অন্য সব দেশের কথা হাতী ছিল অনেক, আর ছেলেপিলে ছিল তিন শাে’র ওপর। চম্পার রাজা কুবলাইএর অধীন, তাই তিনি সম্রাটকে বছর বছর কুড়িটি হাতী উপহার দিতেন। ‘শ্যাম’ দেশের সম্বন্ধে তিনি বলেছেন যে তাদের রাজ্যে ঢােকা শক্ত, তা না হলে কুবলাই নিশ্চয় তা জয় করতেন। সুমাত্রার নাম তিনি দিয়েছেন ছােট জাভা। এ ভুলটা প্রাচীন ভ্রমণকারীরা সকলেই করেছিলেন। জাভা দ্বীপ সম্বন্ধে মার্কে বলেছেন,“এটা পৃথিবীর মধ্যে সব চেয়ে বড় দ্বীপ। একগটাও ঠিক নয়। তিনি আরও বলেছেন, অনেক দূর আর খরচ বেশী হবে বলে কুবলাই এটা জয় করবার চেষ্টা করেন নি। তিনি বলেছেন, —সুমাত্রায় আটটা রাজ্য ও আটটি রাজা ছিল। দেশের লােক অসভ্য ও মানুষের মাংস খেত। ইয়ােরােপে “ইউনিকর্ণ বলে এক জানােয়ার সম্বন্ধে প্রবাদ আছে। এর ঘােড়ার মত চেহারা, মাথায় একটা সূচাল শিঙ,। মার্কো সুমাত্রায় গণ্ডার দেখে ভেবেছিলেন এই বুঝি ইউনিকর্ণ। পােলাের। সুমাত্রায় এসেছিলেন দু'হাজার লোেক নিয়ে। ডাঙ্গায় নেমে গভীর গড়খাই ক'রে কাঠের বেড়ার পিছনে তারা আশ্রয় তৈরী করেছিলেন, নচেৎ বনের পশু ও রাক্ষস অধিবাসীদের হাতে পরিত্রাণ ছিল না। তারপর আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কথা। তিনি বলেছেন। অধিবাসীদের রাজা বা সর্দার কেউ নেই। তারা বনের পশুর মত থাকে, বড় কুকুরের মত তাদের মুখ। কাপড় কেউ পরে না, তারা খুব ৯৪ মার্কো পােলাে নিষ্ঠুর, যাদের হাতে পায় তাদেরই তারা খায়, তা মানুষ হােক আর পশুই হােক। আজকালকার অধিবাসীদের মানুষের মাংস খাওয়ার অভ্যাসটা গিয়েছে। ‘সিলাে বা লঙ্কা-দ্বীপের বিবরণ দেবার সময় তিনি শাক্যমুনি অর্থাৎ বুদ্ধের কথা বলেছেন, ‘আদমের শৈল’র কথাও বলেছেন। মুসলমানেরা বলে,—এখানে আদি মানুষ আদমের কবর, বৌদ্ধেরা বলে বুদ্ধের সমাধি এখানে। চুড়ায় একটা গৰ্ত্ত আছে ; মুসলমানেরা বলে এটা আদমের পায়ের দাগ, ব্রাহ্মণেরা বলে শিবের, আর বৌদ্ধেরা বলে গৌতম বুদ্ধের পায়ের দাগ। পর্তুগীজরা বলত এটা সম্ভবতঃ একজন খ্রীষ্টান সাধু পুরুষের পায়ের চিহ্ন। সিংহল দ্বীপের লােক মােটেই বীর নয়। তবে দেশটা স্বাধীন ছিল। মার্কো আরও বলেছেন চীন সম্রাট দূত পাঠিয়ে রাজার কাছ হতে বুদ্ধের দুটি দাঁত, কি চুল, আর ভিক্ষাপাত্র নিয়ে গিয়েছিলেন। ভারতবর্ষের সম্বন্ধে মার্কো ঠিক কথা বেশী বলেন নি। সম্ভবতঃ ভারতবর্ষের ভেতরে তিনি ঢােকেন নি, যখন এসেছিলেন, বন্দরে নেমে কাজ সেরে তার পর চলে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, -সিলােন থেকে ত্রিশ ক্রোশ পশ্চিমে ‘মাবার’ প্রদেশ। প্রদেশটাকে এখন করমণ্ডল উপকূল বলা হয়। মার্কো বলেছেন, দেশটিতে পাঁচটি রাজা, জায়গা খুব ভাল, কিন্তু লােকে উলঙ্গ অবস্থায় থাকে। রাজা ও তার পাঁচ শশা রাণীর পরনে কাপড় একটু আধটু আছে। ভারতবর্ষে এক জন খ্রীষ্টান সাধু-পুরুষ এক কালে এসে মারা পড়েছিলেন, অন্য সব দেশের কথা একটা ছােট নগরে তাঁর কবর আছে—একথাও তিনি বলেছেন। জায়গাটি মান্দ্রাজের কাছে, নাম মৈলাপুর । ‘মাবার’ থেকে হাজার মাইল উত্তরে মুৎফিলি। এটার প্রকৃত নাম তেলিঙ্গানা—কৃষ্ণা ও গােদাবরী নদীর মাঝে এ জায়গা, আর মাবার থেকে এটা বাস্তবিকই অত দূর নয় । কঙ্কন ও গুজরাটের উপকূলে যে জলদস্যুর উৎপাত আছে তিনি বলেছেন। গুজরাটের জলদস্যুরা জাহাজ ঘেরাও ক'রে লুঠ করে ; তবে তারা মলাক্কা প্রণালীর মালয় জলদস্যুর মত নিষ্ঠুর নয়, যাদের লুঠ করে তাদের প্রাণে মারে না। এরা জাহাজ লুঠ করে জাহাজের লােকদের ছেড়ে দিয়ে বলে,—“যাও, আবার ব্যবসা করে আরও জিনিষপত্র, টাকাকড়ি নিয়ে এসো, আবার যেন সে সব আমাদের হাতেই পড়ে।” তার পর যে সব দেশের কথা মার্কো বলেছেন, তার একটাও তিনি চোখে দেখেন নি। যা তিনি বলেছেন সব শােনা কথা। তিনি মাদাগাস্কার দ্বীপের কথা, জাঞ্জিবরের কথা, সেখানকার হাতী ও প্রকাণ্ড ‘র’ পাখীর কথা বলেছেন। আবিসিনিয়ার কথাও বলেছেন। মার্কো বলেছেন তিনটে ভারতের কথা। আবিসিনিয়া হ’ল ‘মধ্য ভারত’, একটা বড় ভারত’ মাবার থেকে কেসমাকোরান্ পৰ্য্যন্ত অর্থাৎ মেম্ বা বেলুচিস্থানের কোল পর্যন্ত ; আর একটা ‘ছােট ভারত’-এটা চম্পা বা কোচীন চীন হ’তে ‘মুৎফিলি’ পৰ্যন্ত বিস্তৃত। বড় ভারতে তেরটা বড় রাজ্য, আর ছােট ভারতে আটটা বড় রাজ্য আছে। ভারত সমুদ্রে আছে ১২,৭০০ দ্বীপ। মার্কো মার্কো পােলদা ভারতবর্ষ সম্বন্ধে যা বলেছেন তা অধিকাংশই বাজে; তবে তিনটে ভারতের কথা প্রাচীন ভ্রমণকারীদের সকলেই বলেছেন, সুতরাং সে হিসাবে মার্কোকে বেশী দোষ দেওয়া যায় না। মার্কো সম্বন্ধে শেষ কথা এই,—তিনি যা চোখে দেখে বা ভাল লােকের মুখে শুনে লিখেছেন, তা তখনকার ইয়ােররাপের লােকের কাছে আজগুবি বােধ হ'লেও বেশীর ভাগই ঠিক কথা। প্রায় সমস্ত এসিয়া তিনি ঘুরেছেন, কত দেশ দেখেছেন, কত জাতির কথা বলে গিয়েছেন। রাষ্টিসিয়ানাে’কে তিনি যখন নিজের কাহিনী বলেন, তখন তিনি নিজের লেখা কোন খাতা দেখে বলেন নি, নিজের স্মরণ-শক্তির ওপরই নির্ভর করেছিলেন। এত বছরের বিবরণ, এত দেশের খাটি গল্প নিজের মন থেকে নির্ভুল বলা যে কত শক্ত তা বােঝান যায় না। আমরা আজকার পড়া কাল ভুলে যাই, এক দিন যা দেখি কিছুদিন পরে তা গুছিয়ে সব বলতে পারি না। কিন্তু মার্কো যা বলে গিয়েছেন তার মধ্যে ভুল জিনিষ কত কম, আর ঠিক কথা কত বেশী । সেই জন্য ইয়ােয়ােপে মার্কের খাতির এখন বাড়ছে। মার্কে বাস্তবিকই যে কত বড় কাজ করে গিয়েছেন, আজকাল লােকের ধারণাতেই তা আসতে পারে না। প্রাচীন কালের রাষ্ট্র ও সমাজের এমন জীবন্ত ছবি খুব কম পৰ্যটক দিয়ে গেছেন। তার মতাে পৰ্যটক জগতে বিরল।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.