Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Hindola

Sen,surendranath · 2009/12/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

হিন্দ্রোলা

No text on this page.

}
হিলাে
শ্রীসুরেন্দ্রনাথ সেন
প্রণীত
মূল্য আট আনা

**
প্রকাশক
শ্ৰীমােহিতলাল মজুমদার বি, এ,
৯০, আমহাষ্ট ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
কান্তিক প্রেস
২•, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রীহরিচরণ মান্না দ্বারা মুদ্রিত

উৎসর্গ পত্র পশ্রদ্ধাস্পদ সুহৃদুভম ডাঃ শ্ৰীযুক্ত সতীশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এম, এ; এ, এল, ডি ; করকমলেষু আজ দোলপূর্ণিমা ; আপনার হৃদয়াবগুষ্ঠিত মানসী কাব্য- সুন্দরীর নিত্য হিন্দোললাৎসবে, অনুরাগ অাবীরসহ এই বসন্ত-উপহার পাঠাইলাম। এলাহাবাদ। দোলপূর্ণিমা, ১৩২*। ভবদীয় গুণমুগ্ধ ভক্ত সুরেন্দ্রনাথ সেন।

No text on this page.

প্রকাশকের নিবেদন মুদ্রণ ও প্রকাশকাৰ্য্যের যাহা কিছু ত্রুটি তাহা প্রকাশকের, গ্রন্থকার দূরাবস্থানহেতু কিছুই দেখিবার সুযােগ পান নাই। এইজন্য বহুযত্ন সত্ত্বেও অক্ষমতা-প্রযুক্ত যে দুই চারিটি ভুল রহিয়া গিয়াছে, তাহার জন্য প্রকাশকই দায়ী। বঙ্গীয় কাব্যসাগর- সঙ্গমে কত ক্ষুদ্র-বৃহৎ স্রোতস্বিনী আসিয়া মিলিত হইতেছে; প্রকাশক আর একটি নূতন ধারাকে সেইখানে আনিয়া সম্মিলিত করিলেন,তাহারই মঙ্গলাচরণকল্পে শঙ্খস্বনানন্তর তঁাহার নিবেদন সমাপ্ত হইল।

No text on this page.

সূচী ••• ••• ১ বাসন্তিকা আমার মালা বীণা ••• ২ g ০ অন্তর দেবতা ••• ••• ••• •• t মরণ নিশীথে নদীতীরে জ্যোৎস্না নিশি ••• ০৫০ ••• ১০ ••• ••• ••• ১১ ১৩ ••• ০ ০ ০ ••• ১৪ ৮০০ ০৮। ৮০০ ০ ০ ১৬ সাম্বনা দশভুজা কোন্ পথে ? হাসি তরুণীর হাসি প্রিয়ার হাসি শিশুর হাসি প্রৌঢ়ার হাসি ১৮ ••• ••• ৫০ বৃদ্ধার হাসি • ০ ০ ০ ১৯ ২০ ২১ ২২ ২৩ ২৪ . . . মলিন হাসি ঘােমটা-খােলা মুক্তকেশী ••• ০ ০ ০ . . . ০ ০ ০ ‘চোখ গেল’ নিরাভরণা ০ ০ ০ ০ অয়স-বন্ধন ••• ২৫ ২৬ ২৭ ২৮ ২৯ ৩০ ৩১ ৩২ সিন্দুর মানিনী তরুণী নিদাঘে ০ ০ ০ . ৫০ স্নান করা ••• ৫০০ । ৮ ০০ ৩৪ রুদ্ধ অশ্রু (১) রুদ্ধ অশ্রু (২) ভিত্তিতে সিন্দুর বিন্দু ছিন্নবস্ত্রাবৃত শিশু ০৫ ••• ৩৭ ৪৫ | ০ ০ ০ ০ ০ নিশান্তে বঙ্গলক্ষ্মীর প্রতি হিন্দোলা ৪৬ sp ৪৭ •••

হিন্দোল
বাসন্তিকা
মােহন যামিনী মােহিনী কামিনী চন্দ্রমা মাধুরী হাসে,
ছুরিত বসন্তে কুসুম-ফুটন্তে শােভন চারু বিকাশে,
মাধবীকুঞ্জে মালতীপুঞ্জে গুঞ্জরিছে অলি-পাতি,
ওই শুন বিজনে মােদিত কূজনে কোয়েল মধুমদে মাতি’,
পুলক-বিকম্পিত হৃদয়-তরঙ্গিত কল্লোলিনী জলধারে
ঝমকি’ ঝলকে, চমকে ছলকে, তরল প্রভাময়ী হারে।
নবীন বসন্তে হৃদয়-দুরন্তে বিলসিত মানস-ভাতি,
প্রকৃতির ঈপ্সিত জগজনপূজিত আইস মধুমদে মাতি।

হিন্দোল।
আমার মালা
হৃদিবনে চয়ন করিয়া
এক রাশি ক্ষুদ্র বনফুল,
ধুয়ে তাহা নয়নের লােরে,
গাঁথি’ তাহ হৃদয়ের ডােরে,
সাজায়েছি এক গাছি মালা
কোথায় কোথায় অলিকুল।

হিন্দোল
এ নহে রে লাজুক মল্লিকা
অফুট প্রেমের ছায়া-ছবি,
এ নহে রে গৰ্ব্বিত গােলাপ
ফুলকুলে সৌরভের রবি
এ নহে রে হসিত করবী
অতি উগ্র প্রণয়ে আকুল,
এ সুধু রে কালিমা-জড়িত
ক্ষুদ্র অতি ক্ষুদ্র বনফুল।
যেখানে ফুটেছে এরা বহেনি তথায়
মধুর মলম,
প্রভাতি শিশিরকণা উষার ছায়ায়
রচেনি এদের কোলে মকুতা-বলয়।
আমল নীরদরাশি অধরে বিজলীহাসি
ধােয় নাই এদের কালিমা,
দোয়েল পাপিয়া পিক
কুজে নাই চারিদিক
গাহিয়া অঙ্গর-কণ্ঠে এদের মহিমা।

হিন্দোলা এরা শুধু ফুটিয়াছে প্রাণের গভীর রাতে, হৃদয়ের গভীর নিঃশ্বাসে ; ক্ষণিক শিশির নহে, টল টল অশ্রুজল এদের বদনে সদা ভাসে। নিঃশ্বাস-বাতাস লেগে উৰ্ম্মি যত উঠে জেগে হৃদয়ের শােণিতের স্রোতে, ধমনীর তালে তালে ধায় যত ঢেউ গুলি মরিতে এদের চরণেতে। কি ঘাের ঝঙ্কার দিয়ে স্মৃতির বাঁশরী বাজে হৃদিবন করিয়া আকুল- যেন কি মন্ত্রের গুণে জাগিয়া উঠে গাে এরা ফুটিয়া উঠে গাে বনফুল! ৪

হিন্দোল
বীণা
ভগ্ন গৃহে ধূলি-মাখা বীণাখানি হায়,
পড়ে আছে এক পাশে—খােলটি রঙ্গীন,
কীটদষ্ট শত স্থানে, ফেল ফেল্‌ চায়,
অনাদরে হতাদরে সহিছে দুর্দিন।
হে বীণা, যাহার করে ললিত সুস্বরে
করিতে লাে কুহকিনি, কত আলাপন,
সঙ্গীতের ইন্দ্রজালে লহরে হরে
রচিতে এ খােড় ঘরে নন্দনকানন,
সে করের স্পর্শ স্মৃতি জাগে কি জীবনে,
আলােড়ি কাঠের দেহ শিরায় শিরায়-
শিশু যথা মাতৃস্তন নেহারি’ স্বপনে
কল্পিত-অমৃত-পানে অধর কঁপায় ?
হেমন্তে বাসন্তী পিক দেখে কি দেয়ালা ?
উচ্ছরিছে কুহুতান—দিগন্ত উজালা ।

হিন্দোল।
অন্তর-দেবতা
কি বুঝাতে বক্ষোপরি রাখিয়াছ হাতখানি?
প্রবেশ নিষেধ হেথা বুঝাতে কি এই কথা
রাখিয়াছ বক্ষোপরি সুকুমার হাতখানি?
তুষার-আবৃতশির হৈমকূট সারি সারি
নয়নে ঝলসি লাগে, মােহ ভয় হৃদে জাগে,
লজঘন-প্ৰয়াস তরে আমি কি গাে অধিকারী ?
বহু কষ্ট বহি মাথে, চলি’ কণ্টকিত পথে,
এ তীর্থ দেখিব বলি গৃহ ত্যজি’ আসিয়াছি।

হিন্দোল।
মােরে ফিরাওনা আর, চাহ দৃষ্টি করুণার
দৌবারিক, খােল’ দ্বার, শ্রীচরণে তব যাচি।
কোমলেও কঠিনতা এত কি গাে থাকে।
হ’ত যদি লৌহ-দ্বার, করিতাম চুরমার,
তুজবলে প্রবেশিয়া হেরিতাম চাই যা’কে।
হেরিতাম সীমা মাঝে বাধা কোথা সীমাহীন,
হেরিতাম কোথা বাঁধা সুকোমলে সুকঠিন।
শিলাময় শৈলনাথে পুষ্প-অর্ঘ্যে পূজিলে রে
সে ও তত গলিয়া যায় ভকতে করুণা করে।
পুষ্পস্তর সরাইয়ে চাই রে দেখিতে আমি,
গঠিত কি উপাদানে আমার আরাধ্য স্বামী।
তুলে’ লও হাতখানি, ভারেতে পীড়িত বক্ষ,
দাও সে সুবর্ণ-চাবি, স্বহস্তে খুলিব কক্ষ।
হৃদয়ের আরাধনা যার কাছে ভস্মন্তপ
নয়ন নগন করি হেরিব সে দেব-রূপ।
তাহার প্রীতির মন্ত্র শিখিব তাহারি কাছে,
সফল সাধনা সে কি আমার কপালে আছে?
ম
৭

হিদােলা
মরণ
হেথায়, না ফুরাতে মালা-গাঁথা ফুল যায় ঝরিয়া,
মধুমাস না ফুরাতে যায় পিক মরিয়া,
রাকা-শশী না উঠিতে রাহু তার পিছে ধায়,
উৎসব না ফুরা’তে দীপ সব নিবে যায়,
ডুবে যায় জলধনু পলকে মেঘের থরে,
দলকে দামিনী হাসে—সেও হায় যায় মরে,
ৰায় চলে, সুথ আশা, কত সাধ ভালবাসা,
শিশুর স্বপন সম শারদ-জোছনা-রাতে,
প্রভাতে শিশির যথা কনক চাঁপার পাতে ;
বনের বিহগ পিছে হের ওই ব্যাধ ধার,
অরুণ-প্রতিভা বিতরুণেই মরে যায়।

হিন্দোল
নিশীথে নদীতীরে
আজি নদীতীরে ধীরে ধীরে কে সে গায়,
ক্ষীণ অফুটন্ত কোরকের গন্ধ প্রায় !
যেন রে সরমের শাসনেতে ত্রাসিত
অতি চুপি চুপি কার গলা শােনা যায় ?
যেন রে নীরবতা হইয়াছে মুখরা,
যেন রে মুখরতা ডুবিতেছে নীরবে
আজি কি সুখ হায়, গলে ফাস বাঁধিয়া
শরণ লইয়াছে বিরহের বিভবে ?
কে বা সে কায়াহীন ছায়াহীন উদাসী ?
উঠেছে কা’র হিয়া বিলাপিয়া উছাসি?
সুখের স্বপনের তপনেতে তাপিত,
কঠিন সরমের শাসনেতে ত্রাসিত
করে কার হিয়া বিলাপিয়া হায়-হায় ?
আজি নদীতীরে ধীরে ধীরে কে সে গায় ?

হিন্দোল।
জ্যোৎস্না-নিশি
জোছনায় ভরা ধরা
হের ও তমালতলে
রাজিছেন শ্যামচন্দ্র
চারিধারে পরী-সখী
নীরদে ঘিরেছে যেন
কি সুখে পূরিত ধরা
কি মধুযামিনীআজি !
মােহন মালিক গলে
অপূৰ্ব্ব শােভায় সাজি।
করে তার কর রাখি’
দামিনী-লতিকা-রাজি।
কি মধুযামিনী আজি ।
তমাল-তরুর তুলে
ট’লে টলে চলে যায়,
জ্যোৎস্না-মদিরা-পানে
বহিছে যমুনা ধারা-
নুপুর বাজিছে পায়,
হইয়ে পাগল পারা।
কুহরি’ উঠিছে হাসি-
উঠিছে ছুটিছে বাজি’!
কি মধুযামিনী আজি ।
-
শ্যামের কুহকী বাঁশী
দিগন্তের শ্যাম প্রান্তে
কি সুখে পুরিত ধরা

হিন্দোল।
শােক
আমারে যেওনা ফেলে
আমারে নিয়ে যাও,
বারেক ফিরে চাও।
করুণায় আঁখি মেলি
জীবন-উষাকালে
পরাণে গড়েছিলে
তােমরা সবে মিলে
মধুর সুখ-ঠাই।
অসীম অবরােধ
হৃদয়ে দূর-বােধ,
দেছিলে ভাসাইয়ে
উদার প্রেমে ছায়ি।

হিন্দোল
হৃদয়-উপবনে বহিত সুখশ্বাস,
সুখের সমীরণে আশার তরুগুলি
নাচিত দুলি’ দুলি’, ফুটিত বারমাস।
অসীম পৃথিবী এ আমারি হ’ত বােধ,
ছােট দু’বাহু দিয়ে ধরিয়া ধরাখানি
যেন রে করেছিনু সবটুকু অববােধ।
তুষিতে মােরে যেন ফুটিত যত ফুল,
আমারি তরে যেন বনরাণী বিয়াকুল
সােহগে বেঁধে দিত লতিকার এলােচুল।
তখন হাসি ছিল, হাসিতে জানিতাম,
পরের ব্যথা দেখে কাঁদিতে পারিতাম।
ব্যথিত হলে প্রাণে, সরল অভিমানে
তােমার কাছে এসে দু’জনে কাদিতাম।
কোথা সে ছেলেবেলা, কোথা সে ছেলেখেলা,
প্রাণের সে হাসাহাসি, প্রণয়ের প্রতিদান।
অচেনা দেশে হায়, সকলে ভুলে যায়,
শৈশব-স্মৃতিটুকু—তাহাও অবসান।
১২

হিন্দোল
সান্ত্বনা
সে যদি না চাহিল আমারে, তােরাও কি চাবিনি আমায়?
চাদ-মুখ তােদের হেরিলে শান্তি আসে ব্যাকুল হিয়ায়।
কচি কচি তােদের আননে আধ আধ’ তােদের ভাষায়
হেরি আমি রবি-বিভা, কাণে মাের সুধা বরষায় ;
আয় চাদ, কাছে তােরা আয়, হিয়ার নিকটে আয় আয় ।
সে না হয় না বাসিল ভালাে, তােরা তাে আমারে ভালবাস,
কোলে বােস, মুখর গুঞ্জনে রচে ফেল্ বসন্ত-আবাস।
যে চাহে বারেক দেখে যা’, মরিনি কাহারও উপেক্ষায়,
মঞ্জরিত নবীন বল্লরী নবীন সরস বরিষায়
তবে তােরা আয়, কাছে আয়, হিয়ার নিকটে আয় আয় ।

হিন্দোল
দশভুজা
এস মা ভাস্কর-তেজে মহিমার অপূৰ্ব ছটায়,
উজ্জ্বল-কিরণ-স্পর্শে অনুপ্রাণিত হােক প্রাণ,
রাজরাজেশ্বরী-বেশে এস মা গাে গৌরব-লীলায়,
সৌন্দৰ্য্য-প্রভাবে আজি দুঃখ-নিশা হােক অবসান।
অশুভহারিণী এস, বিজয়িনী, দনুজদলনী,
সিংহারূঢ়া, অসি-করা, সন্তানে কর মা বলীয়ান ;
বিশ্ববিমােহিনী-বেশে এস মা গাে, কনক নলিনী,
করুক ভকত-হিয়া গুঞ্জরিয়া চরণ আম্রাণ।
বিতরি’ উদার হস্তে জ্ঞান, পুণ্য, বিজয়, সম্পদ,
প্রসারিত দশভুজ অনন্তের দশদিশি ভায় ;
গণপতি, সরস্বতী বন্দে মাতঃ পদ-কোকন,
বিজিত বিজয়ী স্কন্দ, চঞ্চলা ইন্দিরা বাধা পায়।
দাও মাগাে জ্ঞানচক্ষুঃ—পারি যেন করিবারে পূজা
তােমার অনন্তমুর্তি-দিগন্ত্যাপিনী দশভুজা।
১৪

হিন্দোল
কোন্ পথে?
কোথা লয়ে যাও মােরে? শ্রান্ত আমি, চোখে আসে ঘুম,
চলেছি অচেনা পথে চিরদিন তােমারই সঙ্কেতে
লুব্ধ মােরে দেখায়েছ ঝক্‌মকে অপূৰ্ব কুঙ্কুম,
চূর্ণ ইন্দ্রচাপে পূর্ণ প্রজাপতি কুসুম-অঙ্কেতে
চঞ্চলিয়া ছুটিয়াছি তারি পানে সারাদিনমান।
জানি নাই আলেয়া সে খেলাঘরে বনরাণীদের,
চিনি নাই পরীদের ফুলে-গড়া আলােক-বিমান,
ব্যর্থ আমি ধাইয়াছি কুঞ্জে কুঞ্জে বন-পাদপের।
মুহূর্তে ভাঙ্গিয়া দিলে স্বপ্নময় বাল্য-খেলাঘর,
মুহূর্তে কামাখ্যাপুরী নেত্রপটে করিলে প্রকাশ
মােহিনীর আকর্ষণ, প্রাণপূর্ণ শিশুর আদর,
মহামানবের প্রেম, ব্যাপ্তি যার অনন্ত আকাশ।
আনিয়া অনন্ত-তীরে হেলাইয়া বিদ্যুৎ-তর্জনী
গম্ভীর অম্বরে আজি কোন্ পথ নির্দেশিছ ধনি?

হিন্দোল
হাসি
তুমি কি সজীব-সুধা, প্রকৃতির প্রাণ,
পৃথিবী ভরিয়ে দাও শ্যামলে শ্যামলে?
তুমি কি উচ্ছাস-ভরা বসন্ত-আহ্বান
জগৎ কূজিত কর কোকিলে-কোকিলে?
তুমি কি অরূপ হর্ষ স্বরূপ হইয়ে
কুসুম স্তবকে ফুট তরু-লতিকায় ?
তুমি কি চিত্তের সুখ হৃদে মুকুলিয়ে
বাঁধা থাক যুবতীর যৌবন-সীমায় ?
যৌবনের দীপ্তি, শােভা, কোমলতা নিয়ে,
ঢালিয়া তাহাতে পূর্ণ চন্দ্রের চন্দ্রিমা,
অরুণের পাখা হ’তে কিরণ হরিয়ে
কে রচেছে অপার্থিব হেন মধুরিমা ?
রূপের ঝলকে গেছে আনন ভরিয়ে
ও সুধা-হাসির তব কোথা আছে সীমা।

হিদোলা
তরুণীর হাসি
;
তুমিই তারার আলাে নীল স্বচ্ছ গগনের গায়,
তুমিই লতায় ঢাকা মুকুলিত-কুসুম-বিকাশ,
সরল সঙ্কোচ তুমি, পল্লবিত লাজুক লতায়,
তুমিই বালার্ক-ছটা—-নিশা-শেষে উষার প্রকাশ,
সিথিতে সিন্দুর তুমি, তারকিত রক্তিম লীলায়,
সফেন তরঙ্গ তুমি-নদীবক্ষে প্রীতির উচ্ছাস,
তুমিই কনক-ইন্দু,- নীল সিন্ধু রূপে উছলায় ;
তুমিই সলিলে স্নাতা নলিনীর লােহিত আভাস।
আশৈশব প্রকৃতির মনােহারী রূপ-বৃন্দাবনে
দীক্ষিত পূজারী আমি চিনিয়াছি তােমারে মােহিনি,
জানি আমি কোন্ ভাষে গুঞ্জে অলি কুঞ্জ-নিকেতনে,
জানি গাে অধরে কার অন্তঃপুরে ঘুরিছে সােহিনী।
বিশ্বের সৌন্দৰ্য-হ্রদে ডুবাইয়া কনক-তুলিকা,
শ্যামল-লতিকা কোলে কে আঁকিল বিমল যুথিকা।
२

হিন্দোল প্রিয়ার হাসি কমলার ঝাপি হ’তে স্পর্শমণি হরে’ কে সাজাল প্রিয়মুখ সােণায় সােণায় ! কোন্ জলকন্যা ভাসি’ রূপের সায়রে তরঙ্গে করিছে কেলি অধর-সীমায় কোন গন্ধী খুলে গেছে রূপের কারাবা— সৌন্দৰ্য-সৌরভে হল বিশ্ব ভরপূর ! কোন যাদুকর আনি’ লাবণ্যের আভা রচিল কামাখ্যা-পুরী রতনে প্রচুর ! নীলাভ আকাশ হতে ঝরে স্নেহ-ধারা, ঝরে কামিনীর স্নিগ্ধ পল্লব কোমল, ঝরে শেফালির শুভ্র প্রেম-উপহার- রূপে গন্ধে ভরে যায় যামিনী-অঞ্চল ;-- লাগে কি তােমার কাছে কোন রূপরাশি, অধরের বৃন্তে যবে ফুটে উঠে হাসি ? ১৮

হিন্দোল।
শিশুর
হাসি
হেরিয়াছি মুগ্ধ-নেত্রে যুবতীর হাসি,
লাজ-নম্র প্রফুল্লতা বঙ্গীয় বধূর,
কনক-অঙ্কিত চারু শেফালির রাশি,
শ্ৰীঅধরে সুধা ক্ষরে মধুরে মধুর!
দেখেছি অপূর্ব দৃশ্য দোল-পূর্ণিমায়—
হিন্দোলায় আন্দোলিত হাসির হিল্লোল,
উঠিছে পড়িছে হাসি কি তরঙ্গ-রােল!
চন্দ্রে চন্দ্রে গড়াগড়ি গগনের গায়।
আমি কিন্তু ভালবাসি তরুণ অধরে
অরুণাক্ত হরষের দুরন্ত উচ্ছাস—
তমসায় বন্যা ছােটে, দলে দলে ঝরে
যামিনী-অঞ্চলে শুভ্র-কামিনী-বিকাশ ।
সজীব এ গীতিকাব্য—কোথায় তুলনা?
শিল্পী বিধাতার এ যে অপূৰ্ব্ব খেলনা!
১৯

হিন্দোল।
প্রৌঢ়ার হাসি
গিয়াছে সেদিন, যবে চোরের মতন
হাসি আসি’ দেখা দিত অধর-দুয়ারে,
আপন হরষে হ’ত সঙ্কোচ কেমন,
লুকাতে কনক-কণা বসনের আড়ে।
গিয়াছে সেদিন আজি,-রূপ-বৃন্দাবনে
দোল পূর্ণিমার রাত্রি, দুলিছে হিন্দোল।
কি উৎসব! হৃদয়ের কেলি-কুঞ্জ-বনে
বহিছে বিপুল গর্বে বাসন্তী হিল্লোল!
অঙ্গে অঙ্গে যমুনার রঙ্গীন্ সােহাগ,
কূলে কূলে টলমল আবীরে কুঙ্কুমে
কি দুরন্ত হর্ষ-স্রোত! কিবা অনুরাগ
ভাতিছে অধর-বৃন্তে অশােক-কুসুমে!
ফুটন্ত-কামিনী-আস্তে কি হাস্য উছলে !
খুলে খুলে পড়ে ঝরে যামিনী-অঞ্চলে।
२०

হিলোলা
বৃদ্ধার হাসি
বিষাদিনি! দেখিতেছ এ কোন্ স্বপন।
চারিদিকে অন্ধকার বরিষার রাতি,
ভেদিয়া মেঘের স্তর চঁাদের কিরণ
মাঝে মাঝে দেখা দেয়, গােধূলির ভাতি
কভু বা উজলে আসি’ পশ্চিম গগন ;
ভগ্ন মন্দিরের মাঝে জ্বলে ক্ষীণ বাতি
যথায় ধুতুরা গলে তপসে মগন
বিশ্বনাথ, ভস্ম মাখি’, ভূমি-শয্যা পাতি’!
অনন্তের উপকূলে রয়েছ দাঁড়ায়ে
কি করুণ আলাে-ছায়া অঙ্কিত অধরে!
হেমন্ত-তুষার যেন হিমাদ্রির গায়ে ।
বরিষায় রৌদ্র যেন, রৌদ্রে বৃষ্টি ঝরে।
বিধবা-অধরে যথা তাম্বুলের রাগ,
কি করুণ অভিনয়—শ্মশানে শােহাগ ।

হিদোলা
মলিন হাসি
চাহ যবে বরাননি, অরুণ লােচনে,
যুগ আকুঞ্চি’ রােষে, তাও প্রাণে সয়—
গগনে গরজে ঘন জীমূত সঘনে,
চমকে চপল, যেন ঘটিবে প্রলয় ।
অলক্তাক্ত অরুণের কিরণ হরিয়ে
আরক্ত মুখানি হ’ল রাগে লালে লাল ;
যেন রে দুরন্ত শিশু অকালে মাতিয়ে
উড়াল হােলির ধূমে আবীর, গুলাল !
কোপিনি, তুহার কাছে চিরকাল হারি ;
কিন্তু রে মলিন হাসি, কি ঘাের কাহিনী
কহিছে ও শুষ্কাধর হৃদয় বিদারি’!
ফুরিছে শ্মশানে যেন সাহানা রাগিণী !
দিগন্ত ব্যাপিয়া আছে ঘন মেঘরাশি,
তার মাঝে চালােক,—কি উদাস হাসি।
২২

হিন্দোল
ঘােমটা-খােলা
ঘােমটা গিয়াছে সরে’, এত লাজ তা’য়--
মুখানি দেখাতে বালা এতই নারাজ।
বায়ু দেখ, অপ্রতিভ মুখ পানে চায়,
বিস্ময়-বিহবল ভাবে করেছি কি কাজ।
বিশ্বের সৌন্দৰ্য-হ্রদ মথিয়া মথিয়া
তুলিল এ রূপরাশি কোন্ যাদুকর ?
ছুটিছে সলিল-রাশি দু’কূল প্লাবিয়া,
বহিছে শােভার স্রোতে রূপের নিঝর।
কোন দোল-পূর্ণিমার আবীরে, আমরি !
আনন মণ্ডিত হ’ল লােহিতে লােহিতে ?
কোন বাসন্তীব স্পর্শ-পুলকে শিহরি’
ফুটিল অশােক পুষ্প গুচ্ছে আচম্বিতে ?
বৃথা ও ঘােমটা-টানা, বসন-সীমায়
এ রূপ-ফোয়ারা কভু রুদ্ধ করা যায় ?

হিল্লোলা
মুক্তকেশী
বেণীর-বন্ধন-মুক্ত কৃষ্ণকেশ-রাশি
লহরে লহরে আহা পড়েছে ছড়ায়ে !
গুচ্ছে গুচ্ছে তরঙ্গিত আনন্দে উচ্ছাসি
প্রিয়া-চারু-কটিদেশ রয়েছে জড়ায়ে।
পরশ-পুলক-স্পর্শে কঁপিয়া পিয়া
কেহ বা চুম্বিছে আসি’ কপােল-সীমায়,
কুসুমিত হৃদে কেহ রয়েছে ব্যাপিয়া
“উদ্বেলিত বাসনার তীব্র পিপাসায়” ;-
পেয়েছে ফণিনী-দল সুধার আস্বাদ,
ঘিরিয়াছে শত শিরে ও চন্দ্রবদন,-
কি উল্লাস! কি উচ্ছাস! কি তীব্র আলাদ
অচেতন তব স্পর্শে লভে কি চেতন ?
সম্বর সম্বর বেণী। হাসে শতদল
সরসীতে! ঝাঁকে ঝাঁকে মধুপ পাগল !
.
=
২৪

হিন্দোল।
‘চোখ গেল
এতই রূপের তেজ, চোখ গেল তাের।
নীল চশমায় পাখি, ঢাক’ রে নয়ন ;
বসুন্ধরা রূপে ভরা নাহি তার ওর,
জুড়ে আছে মহাঠাট পৃথিবী গগন।
সীমাহীন মহাশূন্য ধরি’ নিজ মাথে
ঝলকিছে শত গিরি তুষারধবল,
অনন্ত চির-মুকুরে-তরঙ্গ প্রপাতে,
পুষ্প-ফলে,
পক্ষী-গলে সৌন্দৰ্য্য
তরল
ঝরিছে,-অপূৰ্ব্ব ঝারা দিবসে নিশীথে !
স্বর্ণ-ইন্দু-সীমন্তিনী যামিনী-শােভায়,
উষার ভূষায়, দীপ্ত রবির প্রভায়,
শিশু-আস্তে, সম্মােহন রমণী-হাসিতে
ঝরিছে রূপের বহি, মদন-দহন!
সে অনলে ঢাক’ পাখি, ঢাক’ রে নয়ন।

হিন্দোল।
নিরাভরণা
ক
;
কাঞ্চন ভূষণ আসি’ কহে যােড়হাতে,
হে রূপসি! তব অঙ্গে দাও মােরে স্থান
তােমার রূপের দীপ্ত-কিরণ-সম্পাতে
মােরাও উঠিব হেসে, আমাদের মন
তােমারি করুণ শুধু। কুসুমের গায়
উঠে না কি প্রজাপতি ? নক্ষত্ৰ-বিভাস
হয় কি কুন্তলচ্যুত লক্ষ্মী-পূর্ণিমায় ?
সঙ্গত ছাড়ে কি কভু সঙ্গীত উচ্ছাস ?
এত গৰ্ব্ব নাহি রাখি, যাহে ভাবি মনে,
আমরাই রূপ-স্রষ্টা, প্রাণ-সঞ্চারিণী
মায়াবী সােণার কাঠি। রতন-ভূষণে
তুমিই সজীব কর হে বিশ্বমােহিনি।
তুমি যবে নগ্নদেহে দাঁড়াও আসিয়া
মূর্হিত কাঞ্চন থাকে ধূলায় লুটিয়া !
ৰ

হিদোলা
অয়স-বন্ধন
–
শ্ৰীঅঙ্গের অলঙ্কার চমকে শিহরি’,-
রূপরাজ্যে দস্যু আসি’ বুঝি সিধ কাটে
তুমি কি গাে বিজয়িনী রয়েছ প্রহরী,
অয়শিকল সম রূপের কবাটে ?
আলােকের খর কর না ধাঁধে নয়নে,
তুমি কি শশীতে তাই মসীর কালিমা ?
চয়ণিত কুসুমের হসিত শয়নে
কোন্ মুগ্ধ অলি তুমি, মায়ার মহিমা ?
আকাশ সমুদ্র যেথা মিলিছে আসিয়া
তুমি কি সে ছায়া-রেখা অনন্ত মিলনে ?
লক্ষ্যহীন দুটি প্রাণ টানিয়া আনিয়া
বাঁধিয়াছ কর্তব্যের অয়স-বন্ধনে ?
ত্যজিয়া শ্যামল ছায়া বন-বিহঙ্গিনী
মায়ার পিঞ্জরে আসি’ হয়েছে বন্দিনী।
२१

হিন্দোল
সিন্দুর
নহে ও সিন্দুর-বিন্দু! স্বামীর সােহাগ
হর্ষে রাঙ্গা ফুটিয়াছে সীমন্ত উজলি।
কোথায় অনলে দীপ্ত কনকের রাগ,
নীরদ-অলকে কোথা চপল বিজলি ।
কোথায় লালের উৎস, রঙের ফোয়ারা
শ্যামকুঞ্জে কূলে কূলে দোল-পূর্ণিমায় ।
হিঙ্গুলে শ্যামলে কোথা সৌন্দর্য্যের ধারা,
অস্তগামী দিনেশের সায়াহ্ন-শয্যায় !
পুলকে শিহরি’ যথা বরিষার নীরে
ফুটে জলে শতদল পলকে পলকে,
লাবণ্যের দীপপুঞ্জ । চিত্রকুটশিরে
চৈত্রে যথা ফুল হাসে ঝলকে ঝলকে,
কি সৌন্দৰ্য্য! দেখ, দেখ, স্বর্ণ ইন্দু ভায়
গিরিশৃঙ্গে, রূপসিন্ধু হর্ষে উছলায়।
=
=

হিন্দোল
মানিনী
লাবণ্যের তরঙ্গিনী কূলে কূলে কূলে
শ্ৰীঅঙ্গে নাচিতেছিল, আকুলি’ দুকূলে ;
নীল স্বচ্ছ নয়নের স্থির তারকায়,
হসিত নিবিড় রক্ত অধর-সীমায়,
তরঙ্গিত অলকের মুক্ত অলকায়,
কুসুমিত হৃদয়ের মৃদু হিন্দোলায়,
চারু হাসে, মধু ভাষে, জ্যোৎস্না ও ফুলে
শ্ৰীঅঙ্গে পড়িতেছিল লাবণ্য উথুলে,
এ ত’ সখি বেশ ছিল। অমৃতে গরল
কেন হায় ঢেলে দিলে ? অনল তরল
মণ্ডিল কে ঊষাভলে ? রূপ-পদ্ম জুড়ে
এ কি ঝড়! এ কি দ্বন্দ্ব কঠোরে মধুরে ।
মানময়ি, রূপহ্রদে এ কোন ঝটিকা ?
সজীব গীতগােবিন্দ—এ কি প্রহেলিকা!
!
২৯

হিন্দোল
তরুণী
আমি বড় ভালবাসি তরুণীর কোলে
দুরন্ত দাম্বাল ছেলে, রােদনে আকুল ;
কভু বা বসন টানি’ মুখ দেয় খুলে,
মুক্ত করে দেয় বন্দী কবরীর চুল !
কূল ভাঙ্গি’ রূপবন্যা লহরে হরে
প্লাবিয়া দেহের বাঁধ বহিছে উছলি’
ছেলে কোলে সুকুমারী সামালিতে নারে,
অঙ্গের বাঁধন যেন পড়ে খুলি খুলি।
সহসা নীরদ-মুক্ত পূর্ণ শশীকলা
নগন সৌন্দর্যে হাসে বিশ্ব মাতাইয়া ।
কুসুম-স্তবক-ভারে লতিকা বিকলা
ধরণীর পানে যেন পড়ে নােয়াইয়া !
মাথা দোলে, বক্ষ দোলে, দোলে চারু কটি,
কঁপে চারু আঁখিতারা—আশার দেউটি ।

হিন্দোল।
নিদাঘে
সুনীল গগন হ’তে খসিলে তপন
হাসে কি ধরার মুখ দীপ-দরশনে ?
একবার গেলে রূপ,ছলিলে যৌবন,
আর কি ফিরিয়া আসে রতন-ভূষণে?
তবে কেন কুহকিনি, বৃথা আকিঞ্চন
সােণার মােহন হারে সাজিতে মােহিনী ?
মুকুরে হেরিতে পুনঃ রূপের স্বপন,
ফিরাতে কালের গতি, রােধিতে তটিনী ?
সুকুমার শিশুটিকে তুলে লও কোলে ,
কপােল রাঙ্গিয়া দাও নিবিড় চুম্বনে,
অধর মণ্ডিত কর সােহাগ তরলে,
সংসার প্লাবিত কর স্নেহের কিরণে ;-
জীবন-নিকুঞ্জে হবে বসন্ত-সঞ্চার,
কূলে কূলে উথলিবে রূপের জোয়ার।
৩১

হিন্দোল
আন-করা
সে দিন কি মনে পড়ে প্রেয়সি আমার ?
গুপ্ত চাবি দিয়ে হৃদি-খিড়কির-দ্বার
খুলে দিলে,-নগ্ন আত্মা উল্লাসে কঁপিয়া
প্রেম-সরােবরে তব পড়িল ঝপিয়া।
শত মন্দাকিনী হতে পূতবারিধার
মৰ্ম্মে মৰ্ম্মে পরশিল, আত্মাতে আত্মাতে !
প্রথম মিলন-ভীতি! তুমি কর্ণধার
জ্যোৎস্না-বিধৌত সেই পূর্ণিমার রাতে !
‘নয়নে অনল আর অধরে গরল
কোথা ফেলে এসেছিলে সেই শুভদিনে ?
ফেনাঙ্কিত তরঙ্গের অমৃত তরল
সিঞ্চিয়া দেবতা করি’ বরিলে অধীনে।
প্রয়াগ-সঙ্গম এযে !-আতুর হৃদয়
অবগাহি’ ঝলকিছে একি পুণ্যময়!

রুদ্ধ অশ্রু
()
যদি সখি, একবার আগ্নেয় ভূধরে
লুক্কায়িত বহ্নিরাশি ভস্ম-আবরণ
সরাইয়া উঠে ফুটি’ জ্বলন্ত নিঝরে,
কেমনে বাঁধিবে সেই প্রমত্ত বারণ?
যদি সখি, একবার শ্রাবণ-জোয়ার
বিজলি-বন্ধন ভাঙ্গি’, উঠে লাে উছলি,
ভেসে যাবে নদী, নদ, গিরি, বনস্থলী,
কি দিয়া রুধিবে সেই স্ফীত বারিধার ?
যদি সখি, একবার লাজ-বাঁধ টুটে
মম-নিঝর হতে অশ্রু উথলিয়া
ছুটে গাে-উদ্দাম স্রোতে দু’কূল প্লাবিয়া,
রুদ্ধ কি হইবে তাহা অঞ্চলের খুঁটে ?
পল্লব করেছে সিক্ত ক্ষুদ্র অশ্রুকণা,
কিন্তু তার পাছে আছে অনন্ত ঝরণা।

হিলো।
রুদ্ধ অশ্রু
(২)
ও যে অঞ্চলের নিধি, বাঁধা থাক্‌ খুটে
কৃপণের ধন আহা, ঢাক সযতনে!
চারিদিকে দ-ভয় ? এ ভীষণ বনে
অনিবার চারিধারে হাহাকার উঠে;
লুকাও লুকাও সখি, লাজ-আবরণে,
কিম্বা বাঁধ’ অভিমান-কঠিন-বন্ধনে ;
কেতকী রক্ষিত হয় কণ্টক-বেষ্টনে,
কোরকে পশিলে কীট লুকায় গােপনে।
যে অশ্রু দিয়াছে দেখা নয়নের তীরে
লাজ-ঘােমটায় সখি, রাখ লাে আবরি’ ;
কঠোর বিদ্রুপ-আঁখি চারিদিকে ফিরে
থাক সখি, শুকনেত্রে হৃদয়ে বিদরি।
সংসার-শাসন-রাজ্যে এই তত বিধান
অশ্রুহীন আঁখি, হৃদে আমুল কৃপাণ!

হিন্দোল।
ভিত্তিতে সিন্দুরবিন্দু
ধুলিময়, কালীময়, জনশূন্য ঘরে
ভিত্তিতে ঝকিছে ভাতিসিন্দুরের দাগ ;
কোন্ বিপত্নীক হেথা প্রিয়মুখ স্মরে’
একেছে দাম্পত্য স্মৃতি রক্তিম সােহাগ।
মুছিয়া ভালের ফোঁটা, অনল-অক্ষরে
লিখেছে বৈধব্য-গাথা কোন্ অভাগিনী ?
গৃহ ছাড়ি’ সতীত্বেরে বলিদান করে
লিখেছে কে রক্ত-বর্ণে কলঙ্ক-কাহিনী ?
চমৎকার ইন্দ্রজাল—একি ভােজবাজি।
শূন্য গৃহে মুখরিত একি কলধ্বনি।
ফুটিছে সিন্দুরে শত সােহাগের সাজি
কভু অশ্রু, অভিমান,প্রেমের নিকণি।
কভু মেঘ-গরজন, কভু হাসে শশী
কি অপূর্ব দৃশ্যপট-মায়ার আরশি
!

হিন্দোলা ছিন্নবস্ত্রাবৃত শিশু কে তাের হরিবে আঁন প্রকৃতি-দুলাল। ছিন্নবস্ত্রে ধুলি মেখে নাচ তুই নাচ! তাের স্পর্শে ধূলা হয় আবীর-গুলাল, রে নট! তুহার কাছে শিখী পায় লাজ। দুরন্ত হরষে পূর্ণ অর্থহীন ভাষা- আদিম কবির একি মুখর গুঞ্জন! ত্রাসহীন স্বাধীনতা ! আকুঞ্চিয় নাসা করুক সমালােচক তাণ্ডব নৰ্ত্তন। আশৈশব মুগ্ধ নেত্রে হেরিয়াছি আমি সশৈবাল সরসীতে কনক-কমল- লাবণ্যের দীপপুঞ্জ,রবি অস্তগামী বিচ্ছুরিছে মেঘ-ছিদ্রৈ অনল তরল। ভেদিয়া পল্লব ছিন্ন হাসিছে মুকুল নগ্নরূপ-ভগ্ন খণ্ড জোনাকীর কুল!

হিশোলা
গুম্ফাষ্টক
(১)
শ্রীমুখের তাজ তুই, রূপের মুকুল,
রে গোঁফ, গােলাপ তুই, আমি বুলবুল।
ভারতীর স্বর্ণ-বীণা বাজে নাহি বাজে,
কবি-কুঞ্জে গুঞ্জরণ নহে তাের লাগি ;
অনাদৃত, জাতিচ্যুত সাহিত্যিক মাঝে-
নববঙ্গে তাের প্রতি সকলে বিরাগী।
নাসিকার বৈতালিক অলিতে গলিতে
অধরের নখরের শত পুরােহিত ;
যুগ্মভুরু মূর্ধজের মহিমার গীতে
বিগলিত পদধারা ঝরে সুললিত ;
শিকারী মার্জার হায়, হয় না বঞ্চিত,
কাহারাে কৰিস্রোত মেষপুচ্ছে ভাসে,
তােরি ভাগ্যে থাকে ভােলা কৌতুক সঞ্চিত,
নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের বাণ, যদি বা সন্তাষে।
৩৭

হিমেল
(২)
শৈশবের স্বপ্নরাজ্য ঢাকি অন্তরালে
নীরবে অঙ্কিলে পটে একি যবনিকা।
আহা কি সুন্দর তুলি, কি মােহন তালে
রচিলে যৌবন-নাট্য-অবতরণিকা।
কে না জানে বহুরূপী মকর-কেতনে?-
যৌবরাজ্যে, উড়ায়েছে সমর-পতাকা,
ভিন্ন করি’ ধন-নীল আকাশ-তােরপে
বসায়েছে দুই সারি অপূৰ্ব্ব বলাকা !
যুক্ত কে করিল পুনঃ মহেশের চাপ?
মেধাসন বাসবের খণ্ডিত মেখলা?
সুপ্ত এটুনা উদগারিল ধূম্রের প্রতাপ,
কাল কালিকা বেশে প্রকৃতি বিকলা
কমণ্ডলুজলে দুটি মদগুর নেহারি’
পুলকে আকুল ভােলা মশান-বিহারী।

शिनाना
(৩)
তব লাগি “কত নিশি রচেছি শয়ন”
বিফল বরিষা-রাতে ফুটেছে কামিন,
আকাঙ্ক্ষার প্রতীক্ষায় ‘আকুল নয়ন’,,
লুষ্ঠিত অঞ্চল সিক্ত সে দীর্ঘ যামিনী।
মিলনের বিরহের ছায়াময় তীরে,
চৈত্র-বৈশাখের সেই অনন্ত মিলনে,
শূনীড়ে ডেকেছে কপােত কপােতীরে-
এস, এস হে বাছিত, স্নেহ-আলাপনে
শূন্যেরে করিতে পূর্ণ, দিয়ে আচ্ছাদন
বারিতে নষ্মের লজ্জা, মরু সাহারায়
চিত্রি’ চারু ‘ওয়েসিস, অচিয়ে নন্দন,
বিচিত্র
কেলুর
সারি হিমাদ্রির গায় ;-
বাজিবে মঙ্গল-শঙ্খ, পাখী দিবে শিশ,
ধর-শিখরে যবে উঠিবে উষ্ণীষ ।

(৪) নরসুন্দরের কত-ধরেছি চরণ- এ মরুতে কীর্তিমান্ তুমিই কৃষাণ, ‘হারলী ‘হেজেলী ডজন-ডজন রহিয়াছে যেই ক্ষেত্রে সিঞ্চিতা বিধান তব দরশন-প্রার্থী আয়ত মুকুরে দেখিতাম সঙ্গোপনে তােমার স্বপন মানসবীক্ষণযন্ত্রে দূর পরীপুরে নিমেষে দেখা’তে তুমি নন্দন-ভবন। দূরে যেত অপমান, শৈশব-লাঞ্ছনা, প্রবীণ-গাম্ভীৰ্য-ভীতি হত অপসার, ক্ষণিক দর্শনে তব, যৌবন-বাঞ্ছনা! অর্গলিত পাঠশালা-কলেজ-দুয়ার, ছায়ালােকে ঝলকিত শ্বশুর-ভবন,- তুমি তার সিংহদ্বার, ভ্রমর-কেতন!

হিন্দোল
(৫)
কভু তুমি নবাম দুর্বার মতন
দেখা দাও শৈলশিরে পেলব কোমল ;
সৈনিক-লীলায় চড়ি’ বিজয়-তাের,
মঞ্চে কভু লাউ সম কর দলমল।
কষ্ট সজারুর মত কণ্টক ফুলা’য়ে
ব্যাপ্ত কর রাষ্ট্রে কভু শত অক্ষৌহিনী ;
কভু দেবি, গুচ্ছে-গুচ্ছে স্তবক ঝুলা’য়ে
লহরে শহরে এস মকর-বাহিনী।
কভু তুমি পাজা-রূপী পিঙ্গলবরণ,
কভু বা ঊষার রাঙ্গা ওড়নার প্রায়,
কভু যুগ্ম-চিমনির ধূম-উদগীরণ,
কভু নীল স্বচ্ছ আভা অপরাজিতায় ।
রঞ্জু নহ, লৌহ নহ, তব হিন্দোলায়
বিশ্বের রমণী দোলে প্রমােদ লীলায়।
৪১

হিন্দোল
তুমি নহ শুক সম আজন্ম-সন্ন্যাসী,
তবু দীর্ঘ জটাজুট, বল্কল ভূষণ ;
মরেছে কি সখী-প্রেমে সঙ্কুচিত হাসি ?
তার কি ঘােমটা তুমি লজ্জা-আবরণ?
প্রকৃতি তােমার তরে যে গণ্ডী রচিল,
সেই সীমাবদ্ধ কি গাে থাক নিরন্তর ?
তুমি রাজ-চক্রবর্তী, সে তাে না বুঝিল,
রাজ্য-সীমা বিস্তারিতে সতত তৎপর।
কভু তুমি কৃপাবান—জীবন-সন্ধ্যায়
শরদভ্র-শুভ্র-ভাতি বিতর মহীতে,
কভু তুমি ফণা তােললা ভীষণ লীলায়—
হে অহি, তােমার বিষ কে পারে সহিতে ?
অরুণ-অধরা যবে তরুণীরা চুমে,
নাহি কি লহরী আসি’ পড়ে বেলাভূমে ?
৪২

হিলো
(৭)
তুমি জড় অচেতন? তব তারে তারে-
অগণিত তব গত শিরায় শিরায়,
নাহি কি জীবন-স্পন্দ? কৃষ্ণমেঘভারে
ছুটে না অনল-উৎস বিজলী-বিভায় ?
তবে কেন ব্রজাঙ্গনা শিহরে তরাসে,
নেহারি’ গাম্ভীর্যে স্ফীত ও শ্যাম বদন।
কালিন্দী আকুল হয়, যেন নাগপাশে
কুঞ্জে হেরি’ দৃপ্ত করী মদনমােহন?
তুমি জড় অচেতন ? দ্রবি’ করুণায়
আষাঢ়ের মেঘ সম উদিলে শিখরে,
উল্লাসে শিখিনী নাচে দোহলীলায়
প্রমােদ-বাস-বাতি জ্বলে ঘরে ঘরে।
প্রেমপরায়ণা সতী আকর্ষি তােমায়
পরশ-হরষে কিবা ভালুক নাচায় ।

হিন্দোলা
(৮)
কাঠুরিয়া লয়ে করে কঠিন কুঠার
এল বুঝি কেলুকুঞ্জে—হও সাবধান!
শ্যামল সৌন্দর্য্য অন্ত অচিরে এবার,
নিশ্চিহ্ন করিবে বুঝি সাধের বাগান !
হে অধর-মধুকর, চুম্বন-লােলুপ,
প্রেম-দ্বন্দ্বী ভাবি ওরে এতই কঠোর।
ও’তে নহে অসিধারাব্রতী, কামরূপ,
ওরে কেন, আরক্তিম রুদ্রতে তাের?
কোন্ জামদগ্ন্য পুনঃ নামিল মহীতে ?-
ঝকিছে পরশু-বিভা, চমকে দামিনী !
লতা কঁপে, ফুল ঝরে, কে পারে কহিতে
ক্ষুরের কি খর গতি, কঁপিছে কামিনী ;-
প্রতীচ্যে ভীষণ রঙ্গে নাচিছে বিশাখা,
অন্ত হায় শ্যামরেখা, হেরি’ বিভীষিকা।
৪০

হিন্দোল।
নিশান্তে
আছিল আঁধার রাত্রি ঘুমাইয়া অনন্ত শয্যায়,
শিহরিল স্বপ্নদােরে নেহারিয়া বিচিত্র স্বপন,
আঁধারের আয়ু শেষ! পূৰ্বাঙ্গনে আকাশের গায়
-তমাে নাশি উজ্জ্বল তপন
তরুণ-অরুণ-দীপ্তি
মপুত ধনুর্বাণ ল’য়ে করে নামিল আসরে,
অগ্নিময় শরজালে ঢাকিয়া ফেলিল দশদিশি।
জাগিয়া উঠিল নিশা, মৃত্যু আদি কহিল কাতরে-
“ঢাক’ মােরে পক্ষপুটে, আলােক অসহ মাের নিশি,
অনন্ত-আঁধার-ঘেরা পর্বতের অতল গহ্বরে
ঝকিল বিদ্যুৎ-বিভা, সামান্য আকাশের গায়
উজলিল চন্দ্র-তারা, ঝলকিল সাগর-বিবরে
মাণিক্যের শুভ্রকান্তি, সৌর পিচকারী বিশ্ব ছায়।
হে রাত্রি! সম্বর ত্রাস মহাশূন্যে তােমারি বিস্তার,
জীবনের দুই পারে আছ ব্যাপি চির অন্ধকার।
৪৫

হিন্দোল।
বঙ্গলক্ষনীর প্রতি
**
*
তােমার মাগাে করব পূজা বঙ্গ-কুটীর-অঙ্গনেতে,
আলতা ছুঁয়ে শিউরে মাটি উঠবে ফাটি” পদ্মদলে ;
পায়ের ধূলা সি দূর হয়ে পড়বে ঝরে’ রঙ্গনেতে,
অশােক হবে হর্ষে সারা, ভরবে ঝাপি পত্রফলে ;
হাসবে কোথাও খােকা-খুকি, ফুটবে কোথাও যুথি জাতি,
বাজবে কোথাও রৌপ্য-তরল ঐচরণের গঙ্গাধারা ;
ঠেটী-পরা শুষ্কাধরা তুলসী তলায় জ্বালবে বাতি,
পূজার ঘরে শঙ্খধ্বনি, বাসর-ঘরে রস-ফোয়ারা।
কৃষাণ ল’য়ে ধানের ঢেরি আঙ্গনেতে আসবে যখন,
হাস্যমুখে হে মা রমা, সিক্ত ললাট মুছিয়ে দিয়াে ;
রৌদ্র সখা, বৃষ্টি সাথী,—যদি তাহার কাপে চরণ,
আশা-স্ফটিক মুখে ধরি বােলাে একবার, পিয়াে পিয়ে।
সেই কুহকে যদি মাগাে তোমার কৃষাণ আর না ভুলে
রুগ্ন-পাংশু থােকাটীকে তখন কোলে দিয়ে তুলে।
৪৬

হিন্দোলা
হেরিয়াছি তােমা সখি, সুনীল অনে,-
চঞ্চল অঞ্চল ওড়ে মেঘের হিন্দোলে,
দোদুল কুন্তল হ’তে গজমুক্তা ঝরে,
কাঞ্চী-বাজে, রূপ খেলে বিজলী-অনলে।
মুক্ত হস্তে রূপ-মুষ্টি চৌদিকে বিতরি’
বাধ কভু কুঞ্জে কুঞ্জে অপূৰ্ব্ব ঝুলন ;
লতা নাচে, তরু দোলে, পুলকে শিহরি’
ফুল হাসে, বিশ্ব উঠে করিয়া কুজন।
যখন মানসী বধূ! সুখ-খিন্ন প্রাণে
ভাল আর নাহি লাগে রেশম-শৃঙ্খল
আলস্যের, চাহ কি গাে ইন্দ্রের বিমানে?
চন্দ্রে সূৰ্যে পদ চাপি’ দুলিবে হিন্দোল ?
পূরবের ছায়ারেখা ঠেকিবে পশ্চিমে,
বিরহ-বিধুর আত্মা মিলিবে অসীমে?
.
৪

No text on this page.

Hindola

Author
Sen,surendranath
Title
Hindola
File name
Hindola
Text
OCR done
Citation
1913
Published
2009/12/8
Publisher
Mohitlal Majumder,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
59
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Sen,Surendranath
DLI number
512690
Barcode
4990010019741.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
uZrvcFOm7GX
Download PDF

Hindola