Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Amader Shiksha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আমাদের শিক্ষা।
৯৯%
শ্রীপ্রমথ চৌধুরী।
কমলা ব্রুকডিপাে, লিমিটেড।
কলিকাতা, বাকীপুর ।
প্রমথ চৌধুরী, এম্-এ, বায়-য়্যাট।
৩, হেষ্টিংস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রিন্টার -শ্রীনৃপেন্দ্রনাথ দে,
মেটকা প্রেস,
৭৯ নং বলরাম দে ফ্রাই, কলিকা।
ভূমিকা। যে সাতটি প্রবন্ধ একত্র করে ছাপাচ্ছি, তার প্রথমটি বাদে বাকী কটি সবই ফরমায়েসি লেখা অর্থাৎ পরের অনুরোধে লেখা। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ এ তিনটি প্রবন্ধ তিনটি বিভিন্ন সভায় বিভিন্ন সময়ে উক্ত। অতএব এ কটির ভিতর একটা স্পষ্ট ধারাবাহিকতা নেই। কিন্তু এখন পড়ে দেখছি যে শিক্ষা সম্বন্ধে আমার মূল মতগুলি এই কটি লেখার মধ্যে ফুটে উঠেছে। দ্বিতীয় প্রবন্ধে আমি দেশের লোকে এই কথাটা বোঝাতে চেষ্টা করেছি সে মাতৃভাষা আমাদের শিক্ষার বাহন না হলে আমরা যথার্থ শিক্ষিত হব না। তৃতীয় প্রবন্ধে আমার বক্তব্য এই যে ইংরাজিতে যাকে বলে Culture আর সংস্কৃতে বৈদগ্ধ্য, সেটি হচ্ছে সভ্যতার একটি উচ্চাঙ্গ এবং এ অঙ্গ পুষ্ট করবার প্রধান উপায় সাহিত্য চর্চা। চতুর্থ প্রবন্ধে আমি দুটি জিনিষের প্রতি আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রয়াস পেয়েছি। আমার প্রথম কথা এই যে, স্কুলের শিক্ষা কঁচা হলে কলেজের শিক্ষা ব্যর্থ হয়। সুতরাং স্কুলের শিক্ষার যাতে উন্নতি হয় সেই বিষয়ে প্রধানত সকলের উদ্যোগী হতে হবে। আমার দ্বিতীয় কথা এই যে, যে শিক্ষার বলে মানুষে কৃতী বৈশ্য হয় একমাত্র সে শিক্ষা আমাদের মধ্যে চবে না এবং যদি চলে তার ফলও ভাল হবে না। বাঙালীজাতির * মনে যে সহজ ব্রাহ্মণবুদ্ধি আছে সেটিকে নষ্ট করা আর বাঙালীর বিশেষত্বকে নষ্ট করা একই কথা।
: এ প্রবন্ধ কটি ইউনিভারসিটি কমিশনের রিপোের্ট প্রকাশিত হবার পূর্বে লিখিত, প্রথম তিনটি বহুদিন পূর্বে এবং চতুর্থটি অব্যবহিত পূর্বে। আমার মত আমি পুনঃপ্রকাশিত করতে সাহসী হচ্ছি এই কারণে যে উক্ত কমিশনের নিকট এ সকল মতই গ্রাহ হয়েছে। নববিদ্যালয় সম্বন্ধে তিনটি মাত্র প্রবন্ধ লিখে থামবার কারণ—তারপর যে সব বিষয়ের আলােচনা করতে হত, সে সব শিক্ষক ব্যতীত অপব কারও পক্ষে তেমন মনােভ হত না। শ্ৰীপ্রমথ চৌধুরী আমাদের শিক্ষা। ** স্পর্শ করলে দেহের যে অঙ্গ একেবারে সাড়া দের না, সে অঙ্গ মৃত-আর যে অঙ্গ অতিরিক্ত সাড়া দেয়-সে অঙ্গ রুগ্ন। আমাদের ব্যবহারে মনে হয় যে, ব্যথ। আমাদের সকল গায়ে ;কেননা কেউ আমাদের গায়ে হাত দিলে, আমরা অসঙ্গত ভাবে চীৎকার করে উঠি- অসম্ভব রকম ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি। শুধু তাই নয়, দেখতে পাই অনেকের ধারণ। যে সহ্য গুণটা মেয়েলি-ধৰ্ম্ম এবং চীৎকার করাতেই পুরুষ মানুষে পৌরুষের পরিচয় দেয়। আমাদের সব চাইতে বেশী ব্যথা লাগে, যদি কেউ আমাদের অহঙ্কারে আঘাত করে,--তার কারণ আমরা জাৎকে জাং রাতারাতি বেজায় অহঙ্কারী হয়ে উঠেছি। আমাদের বিশ্বাস যে বর্তমান যুগে আমরা ভারতবর্ষের সর্বাগ্রগণ্য জাতি। এ দাবীর মুলে আছে আমাদের শিক্ষা। মাথা-গুণতি হিসেবে বাঙ্গালী যে সব চাইতে উচ্চশিক্ষিত, তার প্রমাণ বােধহয় সেন্সা-রিপাের্ট থেকেই পাওয়া যায়। তারপর এ যুগের নবশিক্ষা আমাদের জাতীয়-দেহে যে কতকটা নবজীবন এনে দিয়েছে, আমাদের মনে যে ইউরােপীয় সভ্যতার রং একটু বেশী করে ধরেছে এ সত্য ও প্রত্যক্ষ। সুতরাং আমাদের শিক্ষার কেউ নিন্দা করলে, অমনি আমাদের গাত্রজ্বালা উপস্থিত হয়। প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির কেউ বদল করতে চাইলে আমরা মনে মনে প্রমাদ গণি । সম্প্রতি এ দেশের ইংরাজি-কাগজ ওয়ালারা আমাদের শিক্ষার উপর কলমের খোঁচা দিতে শুরু করেছেন অমনি আমরা অস্থির হয়ে উঠেছি। আমি পূৰ্বেই বলেছি খোঁচা খেয়ে খিচুনিটে দেহমনের স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। পরনিন্দা ২ আমাদের শিক্ষা। পরখ করে দেখলে, দেখতে পাওয়া যায় যে, তা প্রায়ই নেহাৎ বাজারে মাল, অর্থাৎ তা যেমন সস্তা তেমনি খেলে। সে যাই হােক আমাদের শিক্ষিত-সম্প্রদায়কে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের কপালে লােকে-লােক-লাঞ্ছনা ও ঘরে গুরুগঞ্জনা দুই লেখা আছে। এই ডাইনে বাঁয়ে আক্রমণের ভিতর দিয়ে আমাদের জাতীয় জীবনের নূতন পথ কেটে বেরিয়ে যেতে হবে। সে শক্তি যদি আমাদের না থাকে ত আমরা যথার্থ শিক্ষিত নই। কেননা যে জ্ঞান বিজ্ঞান মানুষের আত্মশক্তিকে প্রবুদ্ধ না করে, তা শুধু বিদ্যার পাপের বােঝ। আর তা ছাড়া আর আজকাল যে নিন্দার ভাগী হয়ে পড়েছি, তার ওজন যতই বেশী হােক ; তার মু; যাচাই- সাপেক্ষ। আমাদের শিক্ষার উপর একদল ইংরাজ এই কারণে নারাজ যে তার ফলে আমরা এ দেশের প্রচলিত রাষ্ট্রতন্ত্রের বদল চাই ; আর আমাদের গুরুজনদের মধ্যে একদল এই কারণে নারাজ যে, আমরা এ দেশের প্রচলিত সমাজতন্ত্রের বদল চাই। এরা উভয়েই চান যে আমরা শিক্ষা পাব নতুন, কিন্তু আমাদের মন থেকে যাবে সনাতন। এক কথায় এরা চান যে বাঙ্গালী তার মনের আবাদ করবে, কিন্তু তাতে কোনও ফসল ফলবে না। শিক্ষার এ রকম যদি কোনও আদর্শ-পদ্ধতি থাকে ত মানব-সমাজ আজ পর্যন্ত তা আবিষ্কার করতে পারে নি। আর যদি কস্মিকালে পারে ত বাঙ্গালাদেশে তা বিশেষ কাজে লাগবে না; কেননা বাঙ্গালীর দেশের মত বাঙ্গালীর মনও. মরুভূমি সুতরাং এ ক্ষেত্রে যে ভাবের বীজ বােনা যাবে, তা উপ্ত ও অঙ্কুরিত হতে বাধ্য। সে আমাদের মাটির গুণে—বিলেতি লাঙ্গলের দোষে নয়। সুতরাং সমালােচকদের খোঁচাখুচিতে অধীর হয়ে পড়বার বিশেষ কোনও কারণ নেই—তবুও যে আমরা চঞ্চল হয়ে উঠি—তার থেকে কি এই প্রমাণ হয় না যে আমাদের উচ্চশিক্ষাভিমানের ভিৎ এখনও তেমন পাকা হয় নি এবং সেইজন্য তার উপর কেউ হস্তক্ষেপ করলে আমরা অযথা রকম ভয় খাই ?
আমাদের শিক্ষা। আমার মতে কিন্তু আমাদের গায়ে যে খেচি। মারে, সেইআমাদের পরম সুহৃদ। খেচার ধর্ম হচ্ছে মানুষকে সজাগ করে দেওয়া এবং এখন আমাদের ঘুমের অবসর নেই, যে করেই হােক এ যুগে আমাদের হৃদয় মনকে জাগিয়ে রাখতেই হবে। আর যদি জাতীয চৈতন্যকে জাগরূক করবার শক্তি আমাদের ভিতরে না থাকে ত বাইরের ধাক্কা আমাদের পক্ষে আদরের সামগ্রী হওয়া উচিত। আমাদের শিক্ষা সম্বন্ধে পরনিন্দা যে আমাদের গায়ে সয় না—তার কারণ ও বস্তুতে আমরা নিজেই সন্তুষ্ট নই; এবং সন্তুষ্ট হবার কোন কারণও নেই। শুধু আমরা কেন , পৃথিবীর অনেক জাতই—স্বদেশের শিক্ষাপদ্ধতির উপর বিরক্ত এবং সে বিরক্তির কারণ পৃথিবীতে আদর্শ শিক্ষা বলে কোনও বস্তু নেই, এবং থাকতে পারে না। শিক্ষা নিয়ে মানুষ আজ পর্যন্ত শুধু Experiment করছে এবং কাজে কাজেই Experience-এর ফলে—শিক্ষাপদ্ধতির নিত্য নতুন পরিবর্তন হতে বাধ্য। শিক্ষার যে একটা আদর্শ পদ্ধতি হতে পারে, এ অমূলক ধারণা আছে শুধু অশিক্ষিত জনসাধারণের এবং প্রচলিত শিক্ষাই যে আদর্শ শিক্ষা এ অদ্ভুত বিশ্বাস আছে শিক্ষিত জনসাধারণের। শিক্ষা নিয়ে মানুষে চিরকাল শুধু Experimcnt করে আসছে, এ কথা সত্য হলেও পৃথিবীর অপর সব দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের এ বিষয়ে একটা প্রকাণ্ড প্রভেদ আছে। ইউরােপের সকল দেশের শিক্ষাপদ্ধতিই জাতীয় জীবনের সঙ্গে সঙ্গে কালক্রমে গড়ে উঠেছে—অবশ্য সমভাবে নয়। সে দেশের মামুলি শিক্ষা কখনও বা জাতীয় জীবনের গতির সঙ্গে পা ফেলে চলতে পারে নি, এবং সেই কারণে তা নবযুগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, আবার কখনও বা সে শিক্ষা জাতীয় জীবনকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে এবং সমাজকে নবমন্ত্রে শিক্ষিত করে জাতীয়-জীবনের নবতন্ত্র সৃষ্টি করেছে। গত একশ বৎসরের ইউরােপের ইতিহাস এই সত্যের পরিচয় দেয় যে ইংলণ্ডের শিক্ষার ধাৎ হচ্ছে জীবনের আমাদের শিক্ষা। । পশ্চাৎপদ থাকা আর জার্মাণির অগ্রসর হওয়া। কিন্তু ধীরেই হােক আর দ্রুতবেগেই হােক—ইউরােপের সকল দেশেই শিক্ষার পদ্ধতি জাতীয় জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই পরিবর্তিত হয়ে আসছে ; কারণ সে দেশের লােকেরা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন, যে শিক্ষার সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ। কখন বা নবশিক্ষ। নবযুগের বােধন করে, কখন বা নবযুগ নবশিক্ষার আবাহন করে, এই যা তফাৎ। অপর পক্ষে আমাদের নবশিক্ষা আমাদের জাতীয় বুদ্ধি কিম্বা জাতীয় নির্বদ্ধিতা থেকে জন্মলাভ করেনি। একালের স্কুল কলেজ দেশের মাটিতে গজায় নি, আকাশ থেকে পড়েছে-সুতাং এ বস্তু আমরা এখনও ভাল করে চিনিনে। সুতরাং এর ফলাফল সম্বন্ধে পাঁচ- জনের সন্দিহান হওয়া নিতান্তই স্বাভাবিক।—শুধু তাই ময়, এই শিক্ষা দেশের মাটিতে শিকড় গাড়বে কি না, সে বিষয়েও অনেকের সন্দেহ আছে। কেননা তা মূলত বিদেশী। এ সন্দেহ অবশ্য একেবারে অকারণ। যে শিক্ষার বলে নব-ইউরােপের বুদ্ধি ও চরিত্র গড়ে উঠেছে, তা আদিতে সম্পূর্ণ বিদেশী ছিল। গ্রীক ল্যাটিন সাহিত্যের ও খৃষ্ট ধর্মেয় অজ্ঞতায়-ইউরােপীয় সভ্যতা যে কি রূপ ধারণ করত, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি নে সম্ভবত ইউরােপীয়েরাও পারেন না। পরস্পরের জ্ঞানের ও ভাবনার আদান প্রদান থেকেই বিশ্বমানবের মনের সাম্রাজ্য যুগপৎ স্থিতি ও বিস্তৃতি লাভ করছে। মনােজগতে যে জাতি একঘরে সে জাতি পতিত। আমাদের জীবনের সঙ্গে আমাদের নবশিক্ষা যে আজও সম্পূর্ণ খাপ খায় নি—তার কারণ, তা অতি নৃতন। এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ত সে দিন হয়েছে। আমাদের এ স্বল্পায়ুঃ জাতের মধ্যে এমন লােক বােধ হয় আজও আছেন—যারা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাত-কর্মের সময় উপস্থিত ছিলেন। সুতরাং আমরা যে এই নবশিক্ষাকে একেবারে আপনার করে নিতে পারি নি, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। Qxford, Cambridge, Paris, আমাদের শিক্ষা। . • Bologna প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়েস প্রায় হাজার বৎসরের কাছাকাছি আর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সবে ষাট পেরিয়েছে ; সুতরাং ইউরােপে শিক্ষা নিয়ে আজও যদি experiment চলে—তবে আমাদেরও যে তা চলবে তাতে আর আটক কি? সত্য কথা এই যে, আমাদের এই শিক্ষা প্রথমতঃ বিদেশী, দ্বিতীয়তঃ নূতন ; সুতরাং এর মতিগতি ফেরাবার, এর রীতিনীতি পরিবর্তনের যথেষ্ট অবসর আছে। আশা করি, এ ধারণা কেউ মনে পােষণ করেন না যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একপুরুষে এত বনেদি বড়মানুষ হয়ে উঠেছে—যে তার হালচাল আর বদলানাে যাবে না। আমাদের শিক্ষার এই অর্বাচীন পদ্ধতি যাতে দেখতে দেখতে চোখের সুমুখে প্রাচীন না হয়ে ওঠে, নূতন যাতে সনাতন না হয়, তার জন্য এর প্রতি আমাদের জাতীয় মন নিয়ােগ করতে হবে, শিক্ষা সম্বন্ধে public opinion-এর সৃষ্টি করতে হবে, জাতীয় শিক্ষা জাতীয় বিচারবুদ্ধির অধীন করতে হবে। যে নিন্দা প্রশংসার ভিতর বিচার নেই, বিবেচনা নেই, তা অবশ্য একটা উপদ্রব বিশেষ। অনেকের বিশ্বাস যে ইংরাজিতে যাকে বলে public opinion তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অজ্ঞতাপ্রসূত—সুতরাং ও বস্তুর রাজনীতিতে যে সার্থকতাই থাক, শিক্ষানীতিতে কোনই সার্থকতা নেই। যেখানে বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে কারবার, সেখানে বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ছাড়া অপর লােকের মত প্রকাশ করবার কোনও অধিকার নেই—কেননা, সে মতের কোনও মূল্য নেই। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। দেশে দেশে, যুগে যুগে, মানুষে মানুষে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও উপায় সম্বন্ধে এতটা মতভেদের পরিচয় দেয় যে বােধ হয়, ধৰ্ম্ম সম্বন্ধেও পৃথিবীতে ততটা মতভেদ নেই। শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ণয় করবার পক্ষে publie opinion-এর যথেষ্ট সার্থকতা আছে কেননা জাতীয় জীবনের আদর্শ কেবল মাত্র পুথিগত বিদ্যার সাহায্যে স্থির করা যায় না, সে আদর্শ জাতীয় আশা ভরসা দিয়েই গড়া এবং কোনও বিশেষ দেশের কোনও বিশেষ যুগের সামাজিক আর্থিক ও রাজনৈতিক অবস্থার গুণেই জাতীয় মতিগতির লক্ষ্য নৃতন হয়। বিদ্যালয়ের এবং আমাদের শিক্ষা। উদ্দেশ্য শিক্ষাদান করা, আর সমাজের অভিপ্রায় তার ফলভােগ করা—সুতরাং এ উভয়ের সম্পর্ক আপেক্ষিক ও ঘনিষ্ঠ। বিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবন অন্ধ এবং জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিদ্যা পঙ্গু। আর এর প্রমাণ সকল দেশেই পাওয়া যায় যে শিক্ষা দেওয়া যাদের ব্যবসা তাদের মধ্যে অধিকাংশ লােক শিক্ষার পদ্ধতির উপর এতটা নজর দেন, যে শিক্ষার উদ্দেশ্যের কথাটা তারা প্রায়ই ভুলে যান। বিদ্যালয় নামক যন্ত্রটার কলকজায় তেল দেওয়াটাই , তাদের কাছে হয়ে ওঠে গুরুতর কর্তব্য। সুতরাং বিদ্যালয়বস্তুটি যে সমাজ- দেহের একটি বিশেষ অঙ্গ, সে বিষয়ে গুরুমহাশয়দের সদাসর্বদা সতর্ক করে রাখবার জন্য তাদের মনের উপর বাবােমাস public opinion-এর চাপ রাখা আবশ্যক। নচেৎ এমন দিন আসে, যখন সমাজ হঠাং আবিষ্কার করে যে শিক্ষা জিনিসটে জীবন-যাত্রার সহায় হওয়া দূরে থাক, তার বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। তখন প্রচলিত শিক্ষা-পদ্ধতির বিরুদ্ধে public opinion একটা হুজুগে পরিণত হয়। বাইরের একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় সামাজিক মন যখন চমকে উঠে চোখ মেলে, সব ঝাপসা দেখে, তখন শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তনের জন্য তার আর ত্বর সয় না। ফলে সকলে মিলে শিক্ষার উন্নতি সাধন কবুতে গিয়ে অনেক সময়ে তার বিভ্রাট ঘটায়। এ কথা যদি সত্য হয়, তাহলে সামাজিক মনকে শিক্ষা সম্বন্ধে অহর্নিশ সচেতন করে রাখা যে জাতির পক্ষে কল্যাণকর সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই এবং তার জন্য চাই public opinion অর্থাৎ দু’এক জনের সেই মত যা দশজনে নিজের বলে গ্রাহ্য করে নেবে। আমাদের দেশে আজকের দিনে প্রচলিত শিক্ষা সম্বন্ধে কোনরূপ সঙ্গত public opinion নেই। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যথেষ্ট এবং কতকাংশে অযথা অসন্তোষ আছে।” এক দলের মতে এ শিক্ষায় শুধু কুফল ফলছে। কিন্তু কুফলটা যে কি সে বিষয়ে এঁরা সকলে একমত নন; কেননা, সে সম্বন্ধে তাঁদের কারও কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। এদের কথাবার্তা শুনে মনে হয় যে শিক্ষার কোনরূপ ফল ফলাটাই,এদের মতে দোষ ; কেননা সে ফল নতুন। নব- আমাদের শিক্ষা। শিক্ষার প্রভাবে মানুষের মনে যে নূতন ভাবের সৃষ্টি হবে, এ ত ধরা কথা। সুতরাং এই নূতনত্বটাই যদি দোষের হয় ; তাহলে, শিক্ষার পাট উঠিয়ে দেওয়াই কৰ্ত্তব্য। স্কুল কলেজের দুয়ােরে চাবি দেওয়াটা অবশ্য শিক্ষার • পথ পরিষ্কার করা নয়। এরা তাই স্কুল কলেজ একেবারে বন্ধ করবার পক্ষপাতী নন। এঁরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সদর ফটক বন্ধ করে খিড়কির দরজা খুলে রাখা হােতূ ; কেননা আজকাল সেখানে যত লােক ঢােকে তত বেরােয় না এবং যত লোক বেয়ােয়, তত বেরােনা উচিত নয়। বিদ্যার্থীর সংখ্যা কমিয়ে দেওয়াটা যারা শিক্ষা বিস্তারের সদুপায় মনে করেন, তাদের কথার কি জবাব দেওয়া যাবে ভেবে পাওয়া যায় না। সুতরাং এ শ্রেণীর সমালােচকদের কলরব শিক্ষক এবং ছাত্র উভয়েই উপেক্ষা করতে বাধ্য। এদের ধারণা যে শিক্ষার উন্নতি সাধনের একমাত্র উপায় হচ্ছে তার বিস্তৃতি কমিয়ে আনা। উচ্চশিক্ষা লাভ করবার শক্তি যে সকলের নেই—এ কথা সত্য। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও বহুলােককে সুযােগ না দিলে ঘােগ্যতমের উদ্বর্তনের আশা করা যায় না। এরা ভুলে যান যে, যথার্থ শিক্ষিত ব্যক্তি স্বশিক্ষিত ; স্কুল কলেজ শুধু মানুষকে নিজ গুণে নিজ চেষ্টায় শিক্ষিত হয়ে ওঠবার সুযােগ দেয় এবং সাহায্য করে-এর বেশী আর কিছু নয়। যে জাতি এই সুযোগ যত বেশী পায়, সে জাতি তত বেশী সুশিক্ষিত। অনেকের মতে আবার এ শিক্ষা অচল, কেননা তা নিস্ফল। এরা বেশ স্পষ্ট দু’শ্রেণীতে বিভক্ত। এঁদের এক দলের মতে আমাদের বর্তমান শিক্ষা যথেষ্ট অর্থকরী নয়। এরা চান—বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈশ্য বিদ্যালয়ে পরিণত করতে। এ শ্রেণীর লােক শুধু ভারতবর্ষে নয় সকল দেশেই আছে। এদের আর এক দলের মত ঠিক এর বিপরীত—এদের বুলি হচ্ছে Knowledge for know ledge's saic—অর্থাৎ এদের আদর্শ হচ্ছে সেই বিশ্ববিদ্যালয় যার শিক্ষার প্রসাদে মানুষ বৈশ্য নয় নিঃস্ব হবে। বলা বাহুল্য এ দুই মত সমান সত্য হতে পারে না; কেননা এদের পরস্পরের মনের ভিতর আকাশ পাতাল ৭)।
b আমাদের কথা। প্রভেদ আছে। এ দুয়ের ভিতর যদি একটি গ্রাহ করতে হয়, তাহলে আমরা বরং শেষােক্ত মতে সায় দেব। কেননা, মনকে ঘুম পাড়িয়ে দেহকে কর্মক্ষম করা আর যে দেশেরই আদর্শ হােক ভারতবর্ষের হতে পারে না। আমরা যে প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারী, সে সভ্যতার যদি কিছু মাহাত্ম্য থাকে ত সে এই গুণে যে, তার কাছে বাইরের চাইতে ভিতরের মূল্য ঢের বেশী ছিল। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই দেখা যায় যে, এ উভয় সঙ্কট আসলে কাল্পনিক। এরা উভয়েই নিতান্ত একদেশদর্শী। সমাজ নিষ্কর্মা জ্ঞানীও চায় না—অজ্ঞ কৰ্ম্মীও চায় না। সমাজ চায় যে সমাজিক মানব একাধারে জ্ঞানী ও কর্মী হবে। এবং সেই হচ্ছে আদর্শ বিদ্যালয়—যা মানুষকে একসঙ্গে কিছু হতে এবং কিছু করতে শেখাবে। এই সােজ। কথাটা মানুষকে বারবার শােনানাে দরকার কেননা, আমরা হয় সাংসারিক নয় মানসিক অভ্যুদয়ের লােভে দিনে দশবার তা ভুলে যাই। সুতরাং জ্ঞানমার্গ ও কৰ্ম্মমার্গের সমালােচকদের কথা সম্পূর্ণ গ্রাহ না হলেও সম্পূর্ণ উপেক্ষণীয় নয়, কেননা এদের দুজনের কথার ভিতর আংশিক সত্য আছে। কিন্তু আমরা—যারা নবশিক্ষাকে বিফল বলে অবজ্ঞা করিনে এবং তাতে কুফল ফলছে বলে ভয় করি নে—আমরাই কি এ শিক্ষায় সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট? অবশ্য না। তার কারণ, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এর আশানুরূপ সুফল ফলছে না। এই ত্রুটির কারণ কি সে বিষয়ে আমাদের আর উদাসীন হয়ে থাকা চলবে না। সুতরাং আমি দেশশুদ্ধ লােককে আমাদের শিক্ষা সম্বন্ধে একটু মনােযােগ দিতে অনুরােধ করি, যাতে করে আমরা এ বিষয়ে একটা সঙ্গত public opinion খাড়া করতে পারি। ইউরােপের সমস্যা হচ্ছে শিক্ষার সঙ্গে জীবনের যােগ রক্ষা করা এবং আমাদের হচ্ছে এ উভয়ের যােগসাধন করা। ফাল্গুন ১৩২৩ শ্রীপ্রমথ চৌধুরী।
বাংলার ভবিষ্যৎ। (মির্জাপুর ফিনিক্স ইউনিয়ন লাইব্রেরিতে পঠিত ) বঙ্কিমচন্দ্র যখন প্রথম বঙ্গদর্শন প্রকাশ করেন, তখন তিনি বাঙ্গালীর পক্ষে বাংলা লেখার ঔচিত্য এবং সার্থকতা সম্বন্ধে একটি দীর্ঘ বক্তৃতা করতে বাধ্য হন। বঙ্গদর্শনের “পত্ৰসূচনা” বঙ্গসরস্বতীর তরফ থেকে একাধারে আরজি, জবাব ও সওয়াল-জবাব। বাংলা লেখার জন্য, বাঙ্গালীর পক্ষে স্বদেশী শিক্ষিত সমাজের নিকট কোনরূপ কৈফিয়ৎ দেওয়ার প্রয়ােজন যে একদিন ছিল, এ ব্যাপার আজকের দিনে আমাদের কাছে বড়ই অদ্ভুত ঠেকে। -“যতদিন না শিক্ষিত জ্ঞানবন্ত বাঙ্গালীরা বাংলা ভাষায় আপন উক্তি সকল বিন্যস্ত করিবেন, ততদিন বাঙ্গালীর উন্নতির কোনও সম্ভাবনা নাই” বঙ্কিমের এ উক্তির সত্যতা যে যুক্তিতর্কের অপেক্ষা রাখে, এ আমাদের ধারণার বহিভূত, কেননা এ সত্য আমাদের কাছে, স্বতঃসিদ্ধ হয়ে না উঠলেও লীকাৰ্য্য হয়েছে; কিন্তু বঙ্কিম যে সময়ে লেখনী ধারণ করেন, সে সময়ে এ সত্যকে মেনে নেওয়া দূরে থাক, কেউ ধরে নিতেও প্রস্তুত ছিলেন না। সে যুগে ছিল ইংরাজির রেওয়াজ এবং ইংরাজিরই প্রতিপত্তি। সেকালের শিক্ষিত সম্প্রদায়—অর্থাৎ ইংরাজি শিক্ষিত সম্প্রদায়, ইংরাজি লিখতেন, ইংরাজি ছাড়া আর কিছু লিখতেনও না, এবং সম্ভবত কথাবার্তাও কইতেন ঐ রাজ- ভাষাতেই। নতুবা নতুবা বঙ্কিমের এ কথা বলবার কোনই আবশ্যকতা ছিল না যে, “ইংরাজি-লেখক, ইংরাজি-বাচক সম্প্রদায় হইতে নকল ইংরাজ ভিন্ন কখন খাটি বাঙ্গালীর সমুদ্ভবের সম্ভাবনা নাই।” এ খুব বেশী দিনের কথা নয়। বঙ্কিমচন্দ্রের এ লেখার তারিখ হচ্ছে পয়লা ১০ আমাদের শিক্ষা। বৈশাখ, ১২৭৯ সাল। জাতীয় জীবনের হিসাবে, পঁয়তাল্লিশ বৎসর অতি স্বল্পকাল, কিন্তু এই স্বল্পকালের মধ্যেই বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মনে মাতৃভাষা সম্বন্ধে একটা বিশেষ ভাবান্তর ঘটেছে, বাংলা ভাষার প্রতি অভক্তি স্পষ্ট অতিভক্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের মধ্যে বাংলা লেখার প্রবৃত্তি বর্তমানে যে কতটা অদম্য হয়ে উঠেছে, তার পরিচয় আমাদের মাসিক সাহিত্যেই পাওয়া যায়। যে দেশে পঁয়তাল্লিশ বৎসর পূর্বে, একখানি মাসিক পত্র বার করতে হলে বঙ্কিমচন্দ্রের ন্যায় অসাধারণ লেখকেরও জবাবদিহি ছিল, সেই দেশে আজকের দিনে নিত্য নূতন মাসিক পত্রের জন্ম ও মৃত্যু হচ্ছে, অথচ তার জন্য আমাদের সাধারণ লেখকদেরও কারও কাছে কোনরূপ কৈফিয়ৎ দিতে হয় না। এই কলিকাতা সহর থেকে মাসে মাসে কত কাগজের যে আবির্ভাব ও তিরােভাব হয়, তারই সংখ্যা নির্ণয় করা অসাধ্য, কেননা এ ক্ষেত্রে জন্মমৃত্যুর কোনও সঠিক রেজিষ্টারি রাখা হয় না। যদিচ এখন কাগজের আকাল পড়েছে -তথাপি বাজারে নূতন কাগজের কোনও অভাব নেই। তারপর বাংলার পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণের নানা নগরী ও উপনগরী থেকে, নানা আকারের নানা বর্ণের নানা পত্র পরম্পর রেষারেষি করে’ শূন্টমর্গে উড্ডীন হয়ে সাহিত্য-গগনের শােভা বৃদ্ধি করছে ! বঙ্গসরস্বতীকে ঢাকা দান করেছে “প্রতিভা”, মৈমনসিং “সৌরভ”, বহরমপুর “উপাসনা”, এবং কুচবের পরিচারিকা”। এক কথায়, এ বিষয়ে অনুষ্ঠানের ত্রুটি বাংলা দেশের কোন অঞ্চলেই দেখা যায় না। শুধু তাই নয়, নব-বঙ্গসাহিত্য বঙ্গ- দেশের সীমা অতিক্রম করে অঙ্গ ও কলিঙ্গ দেশেও স্বীয় প্রসার লাভ ও প্রভাব বিস্তার করছে। তা ছাড়া এমন কথাও শুনতে পাই যে, গুজরাট মারাঠী হিন্দী প্রভৃতি হাল সাহিত্যের প্রধান সম্বল হচ্ছে বাংলা বইয়ের ভাষায় অনুবাদ। ( ৩ ) এক হিসেবে এটি একটি আশ্চর্য ঘটনা, কেননা এ যুগে এদেশে ইংরাজির বাংলার ভবিষ্যৎ। চর্চা কমা দূরে থাক, এতটা বেড়ে গিয়েছে যে, ইংরাজি ভাষাকে এখন বাঙ্গালীর দ্বি-মাতৃভাষা বলা যেতে পারে, যদি না বৈয়াকরণেরা মাতৃ-শব্দের ঐরূপ দিকে আপত্তি করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের যুগে, ইংরাজি-শিক্ষিত বাঙ্গালী হাতে গােনা যেত, আর আজকের দিনে তাদের সংখ্যার সন্ধান নিতে হলে, সরকার বাহাদুরের আদমসুমারির খাতার অনেক পাতা ওল্টাতে হয়। সেকালের শিক্ষিত সম্প্রদায় বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় যাকে বলে “ইংরাজি-বাচক”, তাই ছিলেন কিনা জানি নে, কিন্তু এ কথা আমরা সবাই জানি যে, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এদেশে এক নব সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়, যে সম্প্রদায় বাংলা কথা ভুলেও মুখে আনতেন না, এমন কি ঘরেও নয়। সেই ইঙ্গবঙ্গ সম্প্রদায়ের লােকেরাও যে আজ বাংলা বলেন, বাংলা লেখেন, এমন কি প্রকাশ্য সভাসমিতে খাটি বাংলায় বক্তৃতা পর্যন্ত করতে পিছ-পাও হন না, তার পরিচয় লাভ করবার জন্য আপনাদের অন্যত্র যেতে হবে না। আমার এ কথার সত্যতা সম্বন্ধে উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীর চকর্ণের বিবাদ ঘটবার কোনই সম্ভাবনা নেই। বঙ্গ-সাহিত্যের পক্ষে এ সব অবশ্য খুবই শ্লাঘার বিষয়। কিন্তু আমাদের সাহিত্যের দেহুপূষ্টির এই সব প্রত্যক্ষ লক্ষণ দেখে যদি কেউ মনে করেন যে, “বাংলা বনাম ইংরাজি” এই ভাষার মামলায় বাদীর পক্ষে পূরােপুরি জয়লাভ হয়েছে—তাহলে তিনি নিতান্তই ভুল করবেন ; যা হয়েছে তা হচ্ছে তামিম হিকী। ওদিকে একটু দৃষ্টিপাত করলে সকলেই দেখতে পাবেন যে, আমাদের আইন আদালত, স্কুল কলেজ, রাজদরবার রাজনীতি, জ্ঞান বিজ্ঞান, সবই অদ্যাবধি ইংরাজির পূরাে দখলে রয়েছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষিত সম্প্রদায়ের বেশীর ভাগ গণ্যমান্য লােকেরা এ সকল ক্ষেত্রে ইংরাজির দখল বজায় রাখাই সঙ্গত ও কর্তব্য মনে করেন। মাতৃভাষা ইংরাজির হাত থেকে সেইটুকু মাত্র ছাড়া পেয়েছে, যেটুকু তার পক্ষে কেঁদে বাঁচার জন্য দরকার। এইই যথেষ্ট প্রমাণ যে, বঙ্গ-সাহিত্যের যে বড়দিন..এসেছে, সে দিনে বাংলা - ১২ আমাদের শিক্ষা। ভাষা শিক্ষিত সমাজে অবজ্ঞার পাত্র না হলেও, শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠে নি। পূর্বে মাতৃভাষাকে শিক্ষিত সম্প্রদায় যে যথেষ্ট অবজ্ঞা করতেন, তার প্রমাণ, তারা অনেকেই বাংলা লিখতেন না; আর আজ যে সেই সম্প্রদায় সে ভাষাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেন না, তার প্রমাণ, তারা প্রায় সকলেই বাংলা লেখেন। “প্রবৃত্তিরে নরাণাং নিবৃত্তিস্তু মহাফলা”-এ শাস্ত্র-বচন যে লেখা সম্বন্ধেও খাটে, এ জ্ঞান সকলের থাকলে, অনেকে বঙ্গ-সাহিত্য রচনা করতে প্রবৃত্ত হতেন না। আমি দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে, এদের অনেকের গান ও গল্প পড়ে আমার মনে হয়, বাংলা লেখাটা এদের পক্ষে একটা সখ মাত্র, অবসরবিননাদনের একটি বিশিষ্ট উপায়—ভাষায় যাকে বলে বিশুদ্ধ আমােদ। কিন্তু সকলেরি মনে রাখা উচিত যে, যা অবকাশরঞ্জনী, তা কাব্য নয়—এবং যা অবসরচিন্তা, তা দর্শন নয়। ঐ ধ্যান ঐ জ্ঞান না করলে সাহিত্যের যথার্থ চর্চা করা হয় না। লক্ষ্মীর সেবার অবসরে সরস্বতীর সেবা করা যে কৰ্তব্য, সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই, তবে প্রশ্ন হচ্ছে তার প্রকৃষ্ট পদ্ধতিটি কি? আমার মতে বেশীর ভাগ কাজের লােকেরা নিজে না লিখে, পরের লেখ। পড়েই ছুটির যথেষ্ট সদ্ব্যবহার করতে পারেন। জ্ঞানকর্মের বিভাগটা উপেক্ষা করলে,'কি জ্ঞান কি কৰ্ম্ম কিছুরই গুণবৃদ্ধি হয় না। মানুষে সাহিত্যে যে ভাবের ঘর বাঁধে, সে খেলার ঘর নয়, মনের বাসগৃহ। তাসের ঘর কিণ্ডারগার্টেনেই শশাভা পায়, সাবালক সমাজে নয়। সুতরাং যারা মাতৃভাষার যথার্থ ভক্ত, তাঁদের পক্ষে সে ভাষাকে সাহিত্যের রাজপাটে বসাবার জন্য এখনও বহুদিন ধরে বহু চিন্তা বহুচেষ্টা করতে হবে। বঙ্গ-সরস্বতীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়াই আমাদের একমাত্র কাজ নয় ; তাতে ভক্তির পরিচয় দেওয়া হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানকর্মের হয় না। অতএব জীবনের সকল ক্ষেত্রে বাংলাভাষার স্বত্বস্বামিত্ব সাব্যস্ত করবার জন্য, প্রতিপক্ষের সঙ্গে আমাদের পদে পদে তর্ক করতে হবে, বিচার করতে হবে, এবং প্রয়ােজন হলে বিবাদ বিসম্বাদ করতেও প্রস্তুত হতে হবে। এক কথায় বঙ্গ-সরস্বতীর সেবককে তার সৈনিকও হতে হবে।
বাংলার ভবিষ্যৎ। -- ( ৪ ) বিদেশী সাহিত্যের ঐশ্বর্যের তুলনায় আমাদের স্বদেশী সাহিত্যের দারিদ্র্যের পরিচয় লাভ করে হতাশ হবার অবশ্য কোনই কারণ নেই। লােকভাষা যে, কোন দেশেই রাতারাতি স্বরাষ্ট্র হয়ে ওঠে নি, তার প্রমাণ বর্তমান ইউরােপের সকল সাহিত্যের ইতিহাসেই পাওয়া যায়। অপর ভাষা অপর সাহিত্যের অধীনতাপাশ থেকে, ইউরােপের কোন নব ভাষাই একদিনে মুক্তিলাভ করতে পারে নি। সাহিত্যে সম্পূর্ণ আত্মপ্রতিষ্ঠ হবার পূর্বে ইউরােপের অনেক দেশেই দেশী-ভাষাকে পর পর তিনটি বাধাকে অতিক্রম করতে হয়েছে। মােটামুটি ধরতে গেলে, লােকভাষার কমােন্নতির ইতিহাস হচ্ছে এই :- প্রথমত কোনও মৃতভাষার, দ্বিতীয়ত কোমও বিদেশী ভাষার, এবং তৃতীয়ত কোনও কৃত্রিম ভাষার চাপ থেকে বেরিয়ে যাওয়া। প্রায় হাজার বৎসর কাল ল্যাটিন যে ইউরােপের সাহিত্যের ভাষা ছিল, .এ সত্য অবশ্য আপনাদের সকলের নিকটই সুবিদিত। এই দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মশাস্ত্র, ব্যবহারশাস্ত্র, ইতিহাস, ভূগােল প্রভৃতি বিষয়সকল একমাত্র ল্যাটিন ভাষাতেই লিখিত হত। অপণ্ডিত লােকে অবশ্য ইউরােপের এই মধ্যযুগেও কথা ও কাহিনী, ছড়া ও পাঁচালি প্রভৃতি নিজ নিজ ভাষাতেই রচনা করত, কিন্তু সেই লােক-সাহিত্য শিক্ষিত সমাজে সেকালে সাহিত্য বলে গণ্য হয় নি সুতরাং সে সাহিত্য সেকালে যে কোনরূপ পদমর্যাদা লাভ করে নি, সে কথা বলাই বাহুল্য। এই ল্যাটিনের হাত থেকে ইউরােপীয় সাহিত্য যে বেশী দিন মুক্তিলাভ করে নি—তার প্রমাণ, Bacon তার Novum Organum, Spinoza তার Ethics, এমন কি Newton তঁার Principia ল্যাটিন ভাষাতেই রচনা করেন। ইউরােপের কোনও কোনও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাটিন ভাষায় Thesis লেখবার পদ্ধতি আজও প্রচলিত আছে। আপনারা শুনে আশ্চর্য হবেন যে, বর্তমান যুগের দিগ্বিজয়ী দার্শনিক Bergson, তাঁর প্রথম গ্রন্থ, আদিতে ল্যাটিন ভাষাতেই রচনা করেন। এ ব্যাপার যথার্থই, ১৪ আমাদের শিক্ষা। বিস্ময়কর, কেননা ইউরােপের দার্শনিক সমাজে লিপি-চাতুৰ্যে বার্গসর সমকক্ষ দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই ;-তার হাতের কলম যথার্থই সােণার কাঠি, যার স্পর্শে মনােজগতের শুফতরুও পত্রে পুষ্পে মুঞ্জরিত হয়ে ওঠে-দর্শনও কাব্য হয়ে ওঠে। লােকভাষার উপর মৃতভাষার প্রভাব ও প্রভুত্ব যে কতটা দুরপনেয়, তারই প্রমাণস্বরূপ এ ব্যাপারের উল্লেখ করলুম। জৰ্মান দেশে আজও এমন সব পণ্ডিত আছেন, যাদের পাণ্ডিত্য লাটিন ভাষাতেই লিপিবদ্ধ হয়,কিন্তু তার কারণ স্বতন্ত্র। শুনতে পাই সে জাতির কোনও কোনও পণ্ডিত স্বভাষায় লিখলে, সে লেখা এত জড়ানাে হয় যে, তারা নিজেই তা পড়তে পারেন না, অন্তে পরে কা কথা। কাজেই তাদের ল্যাটিনের শরণাপন্ন হতে হয়, কেননা সেই ভাষার প্রসাদে তাদের মনের ময়লা কেটে যায়। সে যাই হােক, আসল ঘটনা এই যে, ইউরােপের লােকভাষাসকল যেদিন ল্যাটিন ভাষার প্রভুত্ব হতে মুক্তিলাভ করে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে শিখলে, সেই দিন ইউরােপের মধ্যযুগের অবসান হয়ে নবযুগের সূত্রপাত হল ;-এক কথায়, ইউরোপীয়দের মতে সেই শুভ দিনে ইউরােপের মনের রাত কেটে গিয়ে সেখানে দিনের আলাে দেখা দিলে ( ৫ ) মৃতভাষার অধীনতা হতে মুক্তিলাভ করবামাত্র দেশী ভাষা সব সময়ে একেবারে আত্মবশ হয়ে উঠতে পারে না; অনেক ক্ষেত্রে তা আবার একটি বিদেশী ভাষার শাসনাধীন হয়ে পড়ে। কোনও দেশের উপর বিদেশীর রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব, সেই দেশীয় ভাষার উপর প্রভুত্বের একটি স্পষ্ট ও প্রধান কারণ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, একটি বিদেশী ভাষা সরকারি ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বিজিত জাতির ভাষা ও সাহিত্যের উপর জয়লাভ করতে পারে না। রােমের অধীন হয়েও গ্রীস, পুরাকালে ভাষায় ও সাহিত্যে তার স্বরাজ্য সম্পূর্ণ রক্ষা করেছিল। ফারসিও এদেশে বহুকাল সরকারি ভাষা ছিল—কিন্তু আমাদের ভাষার উপর ফারসি ভাষার এবং আমাদের সাহিত্যের উপর ফারসি বাংলার ভবিষ্যৎ। সাহিত্যের প্রভাব একরকম নেই বলেও অত্যুক্তি হয় না। অপরপক্ষে এমনও দেখা যায় যে, একটি বিদেশী ভাষা যাজভাষা না হয়েও অপর ভাষার উপর একাধিপত্য করেছে। বিজিত গ্রীসের সাহিত্যের হাতের নীচেই নােমর ল্যাটিন সাহিত্য গড়ে ওঠে। এ কালের ইউরােপেও এ সত্যের যথেষ্ট নিদর্শন আছে। কিছুদিনের জন্য ফরাসি ভাষা ইউরােপে একরাট-ভাষা হয়ে উঠেছিল —ইউরােপের প্রায় সকল প্রদেশের সাহিত্যই এক যুগে ফরাসি সাহিত্যের প্রতাপে অভিভূত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইউরােপের সাহিত্যের ইভলিউসানে, ইতালির reversion যথার্থই একটা অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। যারা জীবজগতের ইভলিউসানতত্ত্ব অবগত আছেন তারাই জানেন যে, জীবের কমােন্নতির ধারা একবােখাও নয়, একটানাও নয়। ইভলিউসানের সঙ্গে সঙ্গে reversion, উন্নতির পিঠ পিঠ অবনতিও দেখা দেয়। কিছুদূর এগিয়ে তারপর পিছুহটা বােধ হয় মানব সভ্যতারও নৈসর্গিক ধৰ্ম্ম, নচেৎ যে ভাষায় দান্তে, পেট্রাক, বােকাচ্চিয়াে, মাকিয়াভেল্লি প্রভৃতি জগদ্বিখ্যাত লেখকেরা কাব্যে ও ইতিহাসে সাহিত্যের অক্ষয়কীৰ্ত্তি সকল রেখে গিয়েছেন, সেই ভাষা অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি ভাষার আনুগত্য স্বেচ্ছায় বরণ করে নিত না। ইতালির নবযুগের আদি কবি Alfieri তার আত্মকথায় লিখেছেন যে, তিনি তার স্বকালের সাধুপদ্ধতি অনুসারে প্রথমে ফরাসি ভাষাতেই নাটক রচনা করতেন, কিন্তু সৌভাগ্যবশতঃ ক্রমে তার এই জ্ঞান জন্মাল যে, সে-সকল নাটক, কাব্য নয়—শ্রীহীন শক্তিহীন প্রাণহীন কাঠের পুতুল মাত্র। এ কথা শুনে মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রথম বয়েসের কথা মনে পড়ে। এর পরেই ইতালীয় ভাষা আবার তার স্বরাজ্য লাভ করেছে। ইতালির সাহিত্যের খবর আমরা বড় একটা রাখিনে; তার কারণ, ইতালি আল্পস পর্বতের এ পারের দেশ, অর্থাৎ আমাদের এদিকের দেশ, আমাদের বিশ্বাস একালের ইতালীয়েরা পারে শুধু রাস্তায় রাস্তায় অর্গান বাজাতে, আর রঙ-বেরঙের মিষ্টান্ন তৈরি করুতে। কিন্তু সেই সঙ্গে তাদের হাতে কাব্যের 'আমাদের শিক্ষা। অর্গানও যে চমৎকার বাজে, এবং দর্শনের মিষ্টান্নও যে সুন্দর তৈরি হয়, তার প্রমাণ D'Annunzio এবং Benedetto Croce-র দক্ষিণ হন্তের কীর্তি। যে মার্টিন লুথারের প্রচণ্ড আক্রমণে রােমান চর্চ ও ল্যটিন ভাষার সর্ব- জনীন প্রভুত্ব চিরদিনের জন্য ক্ষুন্ন হয়ে পড়ল, সেই মার্টিন লুথারের স্বদেশ জর্মাণীর সাহিত্যও আবার পাটে ফরাসি সাহিত্যের মায়ায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দী ছিল ফরাসি সাহিত্যের একটি স্বর্ণযুগ। এই সাহিত্যের প্রভাব জৰ্ম্মণীর শিক্ষিত মনকে প্রায় একশ’ বৎসরের জন্য একেবারে অভিভূত ও মায়ামুগ্ধ করে রেখেছিল। ফলে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আরম্ভ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত, ফরাসি সাহিত্যের অনুকরণে জর্মাণীতে যে সাহিত্য রচিত হয়, তার কোনরূপ মূল্য কোনরূপ মৰ্যাদা নেই। এই ফরাসি সাহিত্যের গুণে ফরাসি ভাষাও জৰ্মাণদের কাছে একটি নব Classic হয়ে ওঠে। নব জৰ্মাণীর আদিকা Frederick the Great নিজের রসনা ও লেখনীকে সক্লেশে ফরাসি ভাষাতেই বলতে ও লিখতে শিখিয়ে ছিলেন,—অর্থাৎ যিনি ইউরােপে জর্মাণ জাতির রাষ্ট্রীয় শক্তি সুপ্রতিষ্ঠিত করবার জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন, স্বয়ং তিনিই বাহােসে বাহালতবিয়তে এবং খােসমেজাজে ফরাসি সাহিত্য ও ফরাসি ভাষার সার্বভৌমিক আধিপত্য শিরােধার্য করে নিয়েছিলেন। কিমাশ্চৰ্য্যমতঃপরং ! কিন্তু এর চাইতেও আশ্চর্যের বিষয় আছে। শুনতে পাই জগদ্বিখ্যাত জৰ্মাণ দার্শনিক Leibnitz এই যুগে তার দার্শনিক গ্রন্থসকল ফরাসি ভাষাতেই রচনা করেন—সম্ভবত এই বিশ্বাসে যে, তার মাতৃভাষা দর্শন রচনার পক্ষে উপযােগী নয়। এ বিশ্বাস যে কতদূর অমূলক তার প্রমাণ, তার পরবর্তী এবং ইউরােপের নবযুগের অদ্বিতীয় দার্শনিক কান্টের গ্রন্থ সকল। সে সকল গ্রন্থ যে এ যুগের দর্শনশাস্ত্রের Classic হয়ে উঠেছে, শুধু তাই নয়, কান্টের রচনার প্রসাদে ইউরােপের মনে এমন একটি ধারণা জন্মে গেছে যে, জৰ্মাণ ভাষাই হচ্ছে দর্শন রচনা করবার পক্ষে সৰ্ব্বাপেক্ষা উপযােগী ভাষা। অতএব দেখা গেল, .
বাংলার ভবিষ্যৎ। মার্টিন লুথার যেমন প্রথমে ল্যাটিনের হাত থেকে উদ্ধার করে জৰ্ম্মান্ ভাষাকে পায়ের উপর দাঁড় করান, কান্ট তেমনি পরে স্বভাষাকে ফরাসির অধীন থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে সে ভাষাকে নিজের পায়ে চলতে শেখান। স্বভাষায় আত্মপ্রকাশ করবার স্বাধীনতা লাভ করে জাৰ্ম্মন্ সাহিত্য যে কতদুর ঐশ্বৰ্য্য লাভ করেছে, সে কথা বলা নিষ্প্রয়ােজন। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আরম্ভ করে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত—এই একশত বৎসর হচ্ছে জম্মা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। এ যুগের সাহিত্যৰথীদের নামের ফর্দ দিতে হলে পুথি অসম্ভবরকম বেড়ে যায়, এবং সে ফর্দ দেবারও কোন দরকার নেই। কাব্য দর্শন ইতিহাস বিজ্ঞান প্রভৃতি সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে জৰ্মাণ মহারথীদের নাম শিক্ষিত সমাজে কার নিকট অবিদিত? জৰ্ম্মান্ প্রতিভার এই আকস্মিক এবং অভূতপূৰ্ব বিকাশের প্রত্যক্ষ কারণ এই যে, জৰ্ম্মান্ ভাষা এবং সেই সঙ্গে জৰ্ম্মা আত্মা তার স্বরাজ্য লাভ করেছে। অপরপক্ষে, যে গুণে ফরাসি ভাষা রুষীয় জৰ্ম্মান্ প্রভৃতি ভাষার উপর প্রভুত্ব করেছে, সেই গুণেই তা এ যাবৎ স্বীয় সুনীতি ও সুরুচি রক্ষা করে এসেছে। ফরাসি হচ্ছে বড় ঘরের সন্তান, প্রাচীন ল্যাটিনের বংশধর ; সুতরাং এ ভাষা তার আত্মজ্ঞান কখনই হারায় নি, তার আভিজাত্যের অহঙ্কারই তার আত্মরক্ষার কারণ হয়েছে। ফরাসি প্রভৃতি লাটিন জাতিরা বহুকাল যাবৎ জৰ্মানদের বর্বর বলেই উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে এসেছিল। বর্বর শব্দের মৌলিক অর্থ হচ্ছে সেই জাতি, যার ভাষা বােঝা যায় না। সুতরাং এ জাতি যে কস্মিকালেও অজ্ঞাতকুলশীল জৰ্মান্ ভাষার প্রাধান্য স্বীকার করে নি, তা বলা বাহুল্য। এমন কি, যে জৰ্মান্ দর্শন গত শতাব্দীতে পৃথিবীর শিক্ষিত সমাজের মনের উপর একছত্র এবং অখণ্ড রাজত্ব করেছে - সে দর্শনও ফরাসি মনকে বেশী দিন আত্মবশে রাখতে পারে নি। প্রসিদ্ধ ফরাসি লেখক Taine গত ১৮ আমাদের শিক্ষা। শতাব্দীর মধ্যভাগে এই মত প্রকাশ করেন যে, জৰ্মানী তৎপূর্ববর্তী একশ’ বৎসর যা চিন্তা করেছে—তৎপরবর্তী একশ বৎসর সমগ্র ইউরােপকে সেই চিন্তার পুনশ্চিন্তা করতে হবে। করতে হবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী যে খেটেছে, তার প্রমাণ আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই পাই। এ যুগের যে ইংরাজি দর্শন আমরা চৰ্চা করি—তা যে গত যুগের জৰ্ম্মা দর্শনের পুনরাবৃত্তি মাত্র, তার পরিচয় নব-কাটিয়ান, নব-হেগেলিয়ান প্রভৃতি নামেই পাওয়া যায়। আমরা দূর এসিয়াবাসী হয়েও, জৰ্ম্মা দর্শনকে দূরে রাখতে পারি নি ; বরং সত্য কথা বলতে হলে, গত ত্রিশ বৎসর ধরে আমরাও শুধু জৰ্মানীর তৈরি বৈজ্ঞানিকখাদ্য উদরস্থ কছি, আর তার জাবর কাটছি। মনােজগতে যে, ল্যাটিন নামক একটি প্রদেশ আছে যা কুয়াশায় ঢাকা নয়—এ কথা আমরা নিজেরা আলাের দেশের লােক হয়েও, একরকম ভুলেই গিয়েছিলুম। এক বর্ণ জৰ্মা জেনেও Nietsche-র বই আমরা অ অনেকেই পড়েছি এবং তার কথার দুকুল-ভাসানাে বন্যায় হাবুডুবুও খেয়েছি, কিন্তু ফরাসি দার্শনিক Guyot-র নাম আমরা অনেকেই শুনি নি, যদিচ উভয়েই মনােরাজ্যে একই পথের পথিক ; দুয়ের ভিতর প্রভেদ এই যে, যে পথে ফরাসি Guyot ধীর পদক্ষেপে । অগ্রসর হয়েছেন, সেই পথে জৰ্মান্ Nietsche তাণ্ডবনৃত্য করেছেন। নকুলীশ-পাশুপত দর্শনে দেখতে পাই যে, পাশুপত সম্প্রদায়ের সাধনমার্গে, উপহারসংজ্ঞক ছয়প্রকার ক্রিয়া ছিল। তার মধ্যে প্রধান চারটি হচ্ছে, হা হা করে’ হাস্য করা, গন্ধৰ্ব্ব শাস্ত্রানুসারে গীত গাওয়া, নাট্যশাস্ত্রানুসারে নৃত্য করা, এবং হুঙ্কার করা—অর্থাৎ পুঙ্গবের ন্যায় চীৎকার করা। Nietsche-র লেখা, পড়ে আমার মনে হয় যে, নকুলীশ-পাশুপত দর্শন ভারতবর্ষে তার ভবলীলা সংবরণ করে, জৰ্মানীতে আবার পুনর্জন্ম লাভ করেছে। গেটে এবং কান্ট সাহিত্যের জগদগুরু হলেও, এ কথা নিঃসন্দেহ যে, বিশ্বমানবের মনের উপর আধুনিক জৰ্মান্ মনের প্রভাব যেমন অকারণ, তেমনি মারাত্মক ; কেননা জৰ্ম্মান্ দর্শন অপর জাতির মনের আকাশ ঘুলিয়ে দেয়। জৰ্মা আত্মার অশেষ •• বাংলার ভবিষ্যৎ। গুণের মধ্যে একটি হচ্ছে কুয়াশা সৃষ্টি করবার শক্তি, এবং সে কুয়াশার গতিরােধ করাও যেমন কঠিন, তার প্রকোপে মনের স্বাস্থ্যরক্ষা করাও তেমনি কঠিন। এ সত্য ফরাসি জাতিই সর্বপ্রথমে আবিষ্কার করে। যে সময়ে জান্ আত্ম। আমাদের ঘাড়ে চড়তে শুরু করে—ঠিক সেই সময়ে তা ফরাসিদের ঘাড় থেকে নেমে যেতে সুরু করে। আজ প্রায় ত্রিশ বৎসর পূর্বে Taine-এর একটি ধনুর শিষ্য Maurice Barres, ল্যাটিনমনের উপর জৰ্মা মনের এই বিজাতীয় উপদ্রবের উচ্ছেদকল্পে লেখনী ধারণ করেন। যে পুস্তকে তিনি মনােজগতে জন্মান্ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘােষণা করেন—সে পুস্তকের নাম Under the Eyes of the Barbarians। জৰ্ম্মান্ জাতির আদিম বর্বরতা যে এ যুগে বৈজ্ঞানিক বর্বরতার আকার ধারণ করেছে, বর্তমান যুদ্ধের বহুপূর্বে তা ফরাসি- মনীষীদের কাছে ধরা পড়ে, এবং তাও এক হিসেবে ভাষাসূত্রে। জর্মান্ সাহিত্যের ফরাসি পাঠকেরা হঠাৎ আবিষ্কার করেন যে, জৰ্মা অভিধানে এমন একটি কথা আছে, যা ফরাসি অভিধানে নেই—এবং সে হচ্ছে পরশ্রীকাতরতা। অপরপক্ষে জৰ্মাণ অভিধানে humanity শব্দের সাক্ষাৎ অণুবীক্ষণের সাহায্যেও লাভ করা যায় না। মাতৃভাষা, জাতির পৈতৃক প্রাণরক্ষার পক্ষে যে কতদূর সহায়, তারই প্রমাণস্বরূপ,-“ঈষৎ অবান্তর হলেও,এ ব্যাপারের উল্লেখ করলুম। ( ৭ ) আমি ইতিপূর্বে বলেছি যে লােকভাষা, মৃতভাষা এবং বিদেশীভাষার অধীনতাপাশ মােচন করতে পারলেও, অক্লেশে সম্পূর্ণ আত্মপ্রতিষ্ঠ হতে পারে না। মৌখিক ভাষার স্বরাজ্যলাভের তৃতীয় পরিপন্থী হচ্ছে পুথিগত কৃত্রিম- ভাষা—অর্থাৎ সাধুভাষা। এ বিষয়ে এ প্রবন্ধে আমি বেশী বাক্যব্যয় করতে চাই নে; কেননা ইতিপূর্বে এ বিষয়ে আমি বহু বক্তৃতা করেছি ; সে সব কথার পুনরুক্তি করা এ ক্ষেত্রে আমার পক্ষে প্রেয়ও নয়, শ্রেয় ও নয় ; তবে কথাটা একেবারে হেঁটে দিলে এ প্রবন্ধের অঙ্গহানি হয়, এই কারণে সংক্ষেপে এ বিষয়ে আমার মত বিবৃত করতে বাধ্য হচ্ছি। ';
আমাদের শিক্ষা। মানুষে মৃতভাষা ত্যাগ করে যখন প্রথমে লোকভাষা অর্থাৎ মৌখিক ভাষায় লিখতে আরম্ভ করে—তখন সেই মৃতভাষার রচনাপদ্ধতির আদর্শেই রচনা করা তার পক্ষে স্বাভাবিক। এর উদাহরণও ইউরােপীয় সাহিত্যে পাওয়া যায় ;-পদে ও বাক্যে Latinism এর আমদানি ইংরাজির আদি গঙ্গ-লেখকেরাও যথেষ্ট করেছিলেন। সুতরাং আমরাও যে তা করব, সে ত নিতান্ত স্বাভাবিক। বাংলা গদ্যের বয়েস সবে একশ বছর হলেও, তা এক যুগ পিছনে ফেলে এখন দ্বিতীয় যুগে চলছে। প্রথম যুগে, সংস্কৃত গদ্যের অনুকরণে এবং সংস্কৃত শব্দের উপকরণে বাংলা গদ্য লেখা হত। যে যুগ চলছে, তাতে বাংলা গদ্য গঠিত হয়েছে ইংরাজি বাক্যের অনুকরণে এবং সংস্কৃত শব্দের উপকরণে। আমার বিশ্বাস, এখন আমরা তার তৃতীয় যুগের অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্বাধীনতার যুগের—মুখে এসে পৌচেছি। আমার এ বিশ্বাস ভুল হতে পারে, কিন্তু একথা নিঃসন্দেহ যে, পরভাষার অনুকরণে এবং উপকরণে যে লিখিত ভাষা গঠিত হয়, সেই পুথিগত ভাষা অনেক অংশে নিজ্জীব। তারপর আর একটি কথা আছে। যার জীবন আছে, তার নিত্যনূতন বদল হয়। জীবন হচ্ছে একটি ধারাবাহিক পরিবর্তনের স্রোত মাত্র ; সেই কারণেই জীবন্ত ভাষা ক্রমপরিবর্তনশীল, এবং যুগে যুগে তা নূতন মূর্তি ধারণ করে ; অপরপক্ষে লিখিত ভাষা অক্ষরের মধ্যে অক্ষয় হয়ে বসে থাকে। নৈসর্গিক কারণেই, লিখিত ভাষার কাছ থেকে কথিত ভাষা কালবশে এতটা দূরে সরে যায় যে, সে দুই ভাষা প্রায় দুটি বিভিন্ন ভাষা হয়ে ওঠে। তখন মৃতভাষার সঙ্গে জীবন্ত ভাষার সেই প্রাচীন বিবাদ আবার নূতন আকারে দেখা দেয় ; কেননা পূর্বযুগের লিখিত ভাষা পরযুগের কাছে সম্পূর্ণ মৃত না হলেও, অর্ধমৃত ত বটেই। মৃতভাষার সঙ্গে জীবন্ত ভাষার বিরােধের চাইতে সাধুভাষার সঙ্গে চলতি ভাষার কলহের-কলরবটা, কিছু বেশী , কেননা এ হচ্চে জ্ঞাতি-শত্রুতা। তা ছাড়া লিখিত ভাষাই হচ্ছে সাহিত্য-জগতে মৌখিক ভাষার যথার্থ শিক্ষাগুরু। সুতরাং মৌখিক ভাষার ;
বাংলার ভবিষ্যৎ। পক্ষে সাহিত্যরাজ্য অধিকার করবার প্রয়াসটা সত্য সত্যই শিষ্যের পক্ষে গুরুকে ছাড়িয়ে ওঠবার চেষ্টা। এ অবস্থায় সাহিত্যের দ্রোণাচার্য্যেরা যে সাহিত্যের একলব্যদের অঙ্গুলিচ্ছেদের আদেশ দেবেন, তাতে আর আশ্চর্য কি?—এতে অবশ্য ভয় পেলে স্বভাষাকে স্বরাট করে ভােলা যাবে না। এ কথাটা শ্রুতিকটু হলেও সত্য যে, গুরুভক্তি না থাকলে যেমন সনাতন বিদ্যা অর্জন করা যায় না, তেমনি গুরুমারা বিদ্যে না শিখলেও নূতন সাহিত্যের সর্জন করা যায় না Plato, Aristotle-এর যুগ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি, সকল দেশের সকল যুগের সাহিত্যের ইতিহাস এই সত্যের পরিচয় দিয়ে আসছে। অতএব বইয়ের ভাষার সঙ্গে মুখের ভাষার যুদ্ধটা নিরর্থকও নয়, নিষ্ফলও নয়। মৃতভাষার সঙ্গে জীবন্ত ভাষার, বিদেশী ভাষার সঙ্গে স্বদেশী ভাষার লড়াইও ত ঐ বইয়ের ভাষার সঙ্গে মুখের ভাষার জীবন-সংগ্রাম বই আর কিছুই নয়। ( ৮ ) ইউরােপ হতে সংগৃহীত এই ইতিহাসের আলোেক বঙ্গভাষার উপর ফেলে দেখা যাক, আমাদের মাতৃভাষার বর্তমান অবস্থাটা কি? বঙ্গভাষার পুরাতত্ত্ব আমরা আজও পুরাে জানি নে; কিন্তু বঙ্গ সাহিত্যের ইতিহাস আমাদের কাছে একেবারে অবিদিত নয়। এ ইতিহাসের দু’টি সম্পূর্ণ পৃথক অধ্যায় আছে। আমাদের সাহিত্যের যে যুগ গত হয়েছে সেটিকে নবাবী যুগ, এবং যে যুগ আগত হয়েছে সেটিকে সাহেবি যুগ বলা যায় । নবাবী যুগের সাহিত্যে, ছড়া পাঁচালি পদাবলী ও সংস্কৃত কাব্যের প্রাকৃত অনুবাদ ব্যতীত আর কিছুই পাওয়া যায় না; এক কথায় এ সাহিত্য হচ্ছে পদ্যে লেখা গান ও গল্পের সাহিত্য। কিন্তু নবাবী আমলে বাঙ্গালী যে একমাত্র উদরার ব্যতীত অপর কোন বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করে নি, এ কথা সত্য নয়। সে যুগে এ দেশে ধর্মশাস্ত্র ও ন্যায়শন্ত্রের যথেষ্ট চর্চা ছিল। জনরব যে, মনুসংহিতার মম্বার্থমুক্তাবলীর রচয়িতা কুল্লুকভট্ট তাহিরপুরের রাজবংশের, ২২ আমাদের শিক্ষা। এবং কুসুমাঞ্জলীর প্রণেতা উদয়নাচাৰ্য, ভাদুড়িকুলের আদিপুরুষ। এ প্রবাদ সত্য বলে গ্রাহ্য করে নেবার দিকে আমার মনের একটা স্বাভাবিক ঝোক আছে, কেননা আমি জাতিতে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ । তৎসত্বেও, প্রমাণের অসম্ভাবহেতু এ কিম্বদন্তিতে কোনরূপ আস্থা স্থাপন করা যায় না। কিন্তু বাঙ্গালীর হাতে যে একটি নব্যন্যায় এবং একটি নব্য স্মৃতি গড়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বঙ্গদেশজাত এ সকল সংস্কৃত শাস্ত্রের মূল্য যে কি, সে বিষয়ে মতামত প্রকাশ করবার অধিকার আমার নেই। সংস্কৃত শাস্ত্রে সুপণ্ডিত আমার জনৈক দ্রাবিড় বন্ধু বলেন যে, বাঙ্গলার নব্যন্যায় যে নব্য, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই—কিন্তু তা ন্যায় কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে! অষ্টাদশতত্ব রচনা করে রঘুনন্দন বাঙ্গালী জাতির উপকার কি অপকার করেছেন, সে বিষয়েও যথেষ্ট মতভেদের অবসর আছে। কিন্তু এই সকল গ্রন্থই প্রমাণ যে-নবাবী আমলেও বাঙ্গালী জাতির বুদ্ধিবৃত্তি একেবারে ঘুমিয়ে পড়ে নি, এবং বাঙ্গালী সমাজতত্ত্ব সম্বন্ধে চিন্তা করতে বিচার করতে কখনই ক্ষান্ত হয় নি। কিন্তু সে যুগে আমাদের জ্ঞান ও চিন্তার একমাত্র বাহন ছিল সংস্কৃত ভাষা, যেমন মধ্যযুগে ইউরােপের ছিল ল্যাটিন। সে কালে বুদ্ধিবিদ্যার বিষয়ের উপর হস্তক্ষেপ করবার লােকভাষার কোনই অধিকার ছিল না। সুতরাং ইংরাজ আসার পূর্বে এদেশে বাংলা ছিল, মধ্যযুগে যাকে বলত একটি vulgar tongue-অর্থাৎ ইতর ভাষা। ইংরাজি আমলে বংলা সাহিত্যের যথেষ্ট শ্রীবৃব্ধি হয়েছে, কিন্তু আমাদের দর্শন বিজ্ঞানের বাহন আজ সংস্কৃতের পরিবর্তে ইংরাজি হয়েছে। কথাটা যে সত্য তার প্রমাণ স্বরূপ দু’ একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। সার জগদীশচন্দ্র বসু, ডাক্তার প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং ডাক্তার ব্রজেন্দ্র নাথ শীল প্রভৃতি দেশপূজ্য মনীষীগণ তাদের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক গ্রন্থসকল ইংরাজি ভাষাতেই রচনা করেন। অর্থাৎ Leibnitz-এর যুগে জর্মন্ ভাষার যে অবস্থা ছিল- আজ এই বিংশ শতাব্দীতে বংলা ভাষা ঠিক সেই অবস্থাতেই আছে, .
বাংলার ভবিষ্যৎ। সাহিত্যের স্কুলে আজও তা প্রমােসন পায় নি, তার ইতরতার কলঙ্ক আজও ঘােচে নি। ( ৯ ) বলা বাহুল্য বঙ্গসাহিত্য যতদিন কেবলমাত্র গল্প ও গানের গণ্ডীর ভিতর আটক থাকবে—ততদিন শিক্ষিত সমাজে বঙ্গভাষা যথার্থ প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবে না। কেননা শ্ৰেষ্ঠকাব্য সাহিত্যের মুকুটমণি হলেও, সস্তা কথা ও গাথা নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর পদার্থ। নিকৃষ্ট কাব্যসাহিত্যের পরিমাণ বৃদ্ধি হওয়াতে কোন সাহিত্যেরই গৌরব বৃদ্ধি হয় না, এবং অক্ষম হন্তের অযত্নপ্রসূত গান ও গল্প প্রায়ই উৎকৃষ্ট হয় না; কেননা যথার্থ কাব্যসৃষ্টির জন্য চাই স্রষ্টার প্রাক্তনসংস্কার এবং অসামান্য প্রতিভা। এবং সকলেই অবগত আছেন যে, প্রতিভাশালী লেখক এবেলা ওবেলা হাটে বাজারে মেলে না। হালে বঙ্গসাহিত্যের একটি নূতন চাল দেখে আমি ঈষৎ ভীত হয়ে পড়েছি। সম্প্রতি আমাদের সাহিত্যে রসমাহত্ম-কীৰ্ত্তন ও রসতত্ত্ব-বিচারের বেজায় ধূম পড়ে গিয়েছে। এতে অবশ্য ভয়ের কোনও কারণ থাক্ত না, যদি না সাহিত্যে রসের লােভে তার সারের দিকটা উপেক্ষা করবার একটা সম্ভাবনা এসে পড়ত। কদলী বৃক্ষের অন্তরে সার নেই—আছে কেবল রস ; সে কারণ আমরা যদি বঙ্গসাহিত্যে সেই নিটোল সুগােল মসৃণ চিক্কণ নধর সরস বৃক্ষের চাষের প্রশ্রয় দিই, তাহলে বঙ্গসরস্বতীর কপালে নিশ্চয়ই শুধু কদলী ভক্ষণই লেখা এস্থলে আমি সকলকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে,—ভাষার উৎপত্তি কর্মে, আর তার পরিণতি জ্ঞানে। ভাষা ব্যতীত মানুষের চিন্তা প্রকাশ করবার অপর কোনও উপায় নেই। অপরপক্ষে আমরা যাকে বলি রস, আর ইংরাজরা emotion,—সে বস্তু প্রকাশ করবার নানা উপায় আছে—যথা, স্বেদ কম্প মূচ্ছ। বেপথু শিৎকার চিৎকার প্রভৃতি। সুতরাং এ কথা নির্ভয়ে বলা যেতে পারে যে, জ্ঞান ও চিন্তার বাহন হয়েই ভাষা তার স্বরূপ ও স্বরাজ্য লাভ করে। কাব্য সাহিতের শীর্ষস্থান অধিকার করে, কেননা একমাত্র কাব্যেই, জ্ঞানের ভাষা আছে।
আমাদের শিক্ষা। কর্মের ভাষা ও ভক্তির ভাষা, এই ত্রিধারার ত্রিবেণীসঙ্গম হয়। তিনিই যথার্থ কবিপদবাচ্য, যার হৃদয়রসের সঙ্গে বহুলপরিমাণে জ্ঞানের সার, যার বুকের রক্তের সঙ্গে অনেকখানি মনের ধাতু অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশ্রিত থাকে। সত্য ও সুন্দর যে কারও কারও হাতে একই বস্তু হয়ে ওঠে, তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ কলিদাস সেক্সপিয়ার দান্তে মিলটন গেটে রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি মহাকবিদের কাব্য। সুতরাং বঙ্গ সাহিত্যের বর্তমান অজ্ঞান অবস্থা আমাদের কাছে মােটেই সন্তোষজনক নয়। বঙ্গসরস্বতী কালে যে আমাদের মনােজগতের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হবেন—এই দুরাশাই আমাদের উচ্চ আশা। অতএব কি অবস্থায় এবং কি কারণে লােকভাষা পরবশ হয়ে পড়ে, আর কি ব্যবস্থায় এবং কি উপায়ে তা আত্মবশ হয়ে ওঠে, তারও কিঞ্চিৎ আলােচনা করা দরকার। অবস্থা বুঝলে তার ব্যবস্থা করা সহজ। মাতৃভাষাকে স্বপ্রতিষ্ঠ করবার লােভ যে আমরা কিছুতেই সম্বরণ করতে পারি নে, তার কারণ আমরা জানি যে “সৰ্ব্বং আত্মবশং সুখং” আর “সৰ্ব্বং পরবশং দুঃখং। ( ১০ ) জীবন্ত ভাষার উপর মৃত ভাষার প্রভুত্বের কারণ নির্ণয় করবার জন্য, ল্যাটিনের উদাহরণ নেওয়া যাক্। পুরাকালে ল্যাটিন যে ইউরােপের পশ্চিম- ভাগের উপর একাধিপত্য করেছিল তার কারণ, সেকালে ল্যাটিন ছিল সে ভূভাগের রাজভাষা। গ্রীকভাষ সে যুগে রােমানদের বিদ্যাশিক্ষার ভাষা হ'লেও, সে ভাষ। রাজভাষা নয় বলে রােমের অধীনস্থ অপর দেশসকলে তা অপরিচিত ছিল। তবে রােমান সম্রাজ্যের ধ্বংশের পরও ল্যাটিন যে আর * এক হাজর বছর ধরে ইউরোপে নির্বিবাদে প্রভুত্ব করে তার কারণ নােম তার রাজত্ব হারিয়ে স্বর্গত্ব লাভ করলে ; যে নােম ছিল প্রাচীন যুগের করাজ্যের কেন্দ্র, সেই রােম হয়ে উঠল মধ্যযুগের ধর্মরাজ্যের Eternal City, অর্থাৎ অমরাপুরী। এক কথায়, রােমানরা খৃষ্টধর্ম অবলম্বন করবার পর ল্যাটিন হল দেবভাষা। কোনও বিশেষ ধর্মের ভাষা, অর্থাৎ যজনজ বাংলার ভবিষ্যৎ। ধ্যান-ধারণা উপাসনা-আরাধনা তন্ত্র-মন্ত্র স্তব-স্তোত্রের ভাষা যে, সেই ধর্মাবলম্বী লৌকিক মনের অলৌকিক শ্রদ্ধা ও ভক্তি আকর্ষণ করে, বিশেষত সে ভাষার অর্থ যদি জনগণের জানা না থাকে,-এ সত্য ত জগদ্বিখ্যাত। ল্যাটিনের প্রতাপ ইউরােপে আজও অক্ষুন্ন থাকৃত, যদি না Renaissance এবং Reformation ইউরােপের মনকে রােমান-চর্চের একান্ত বশ্যতা থেকে মুক্ত কত। মধ্যযুগের শেষভাগে গ্রীক সাহিত্যের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে ইউরােপ মানুষের স্বাধীনচিন্তা ও স্বােপার্জিত জ্ঞানের সাক্ষাৎ লাভ কলে। এর ফলে, রােমের ধৰ্ম্ম-মন্দিরের অটল ভিত টলটলায়মান হ’ল, এবং সেই সঙ্গে ল্যাটিন ভাষারও দৈবশক্তি লোপ পাবার উপক্রম হল। গ্রীক ভাষার প্রভূত ঐশ্বৰ্য্য ও অপূর্ব সৌন্দর্য্যের তুলনায় ল্যাটিন ভাষা - ইউরােপের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের চোখে ক্ষীণসত্ব ও হীনপ্রভ হয়ে পড়ল। এই গ্রীক সাহিত্যের চর্চায় সে যুগের মনীষিগণ নূতন দর্শন বিজ্ঞানের সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলেন। কিন্তু স্বাধীনচিন্তাপ্রসূত দর্শন বিজ্ঞান, সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মতত্ত্বকে বিচলিত করতে পারলেও, বিপর্যস্ত করতে পারে না। এক ধর্মমতের স্থান অধিকার করতে পারে শুধু আরেক ধৰ্ম্মমত। তাই লুথারের প্রবর্তিত Reforination-ই জৰ্ম্মানিক ভাষাসমূহকে ল্যাটিনের অধীনতা থেকে যথার্থ মুক্তি দান করলে। (১১) লুথার যেদিন জৰ্মানীর লােকভাষায় বাইবেল্পের অনুবাদ করলেন, সেই দিনই জম্মণ সাহিত্যের পাকা বুনিয়াদের পত্তন হল। ভাষার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক যে অতি ঘনিষ্ঠ, এ সত্য সকলের নিকট সুস্পষ্ট না হলেও, নিঃসন্দেহ। মানুষের মনের বাইরে ভাষা নেই, এবং ভাষার বাইরেও মন নেই। ভাষা ও মন হচ্ছে একই বস্তুর অন্তর ও বাহির। সুতরাং ধর্মমত ভাষান্তরিত হলে, রূপান্তরিত হতে বাধ্য। একটি উদাহরণ নেওয়া যাক। ইউরােপ খৃষ্টধর্ম অবলম্বন করবার অব্যবহিত কাল পরেই সে দেশে দুটি সম্পূর্ণ পৃথক খৃষ্ট ৪ আমাদের শিক্ষা। সংঘের সৃষ্টি হল-একটি বােমে আর একটি কষ্টান্টিনােপলে। রােমান সাম্রাজ্য তার অধঃপতনের মুখে যে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, খৃষ্টধর্ম তার অত্যুত্থানের মুখে ঠিক সেই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। এর মূল কারণ যে ভাষার পার্থক্য, তার পরিচয় এ দুটি সংঘের নামেই পাওয়া যায় ;- একটির নাম গ্ৰীক চর্চ, অপরটির নােমান। New Testament যদি গ্রীক, অর্থাৎ ইউরােপের ভাষায় লেখা না হত, তাহলে এসিয়ার ধর্ম ইউরােপে গ্ৰাহ হত কি না, সে বিষয়েও আমার সন্দেহ আছে। ভাষার শক্তিতে আমি এতটাই বিশ্বাস করি। এদেশের বৌদ্ধধৰ্ম্মও যে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তার মূলেও ছিল ঐ ভাষার পার্থক্য। মহাযানের ভাষা সংস্কৃত, হীনযানের পালি। অপরপক্ষে পৃথিবীতে যখন কোন নূতন ধর্মমত জন্মলাভ করে, তখন তার বাহন হয় একটি নূতন ভাষা। বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয়েছিল পালিতে, এবং জৈনধৰ্ম্ম মাগধী প্রাকৃতে ;-সুতরাং লুথার যখন খৃষ্টধর্মের নূতন সংস্করণ প্রকাশ করলেন, তখন তাকে ল্যাটীন ত্যাগ করে জার্মান ভাষারই আশ্রয় নিতে হল। তিনি এ উপায় অবলম্বন না করলে Protestantism ইউরােপ্লে একটি স্বতন্ত্র ধর্ম হিসেবে কখনই প্রতিষ্ঠালাভ করতে পারত না। তার প্রমাণ, ল্যাটিনের অপভ্রংশ যাদের মাতৃভাষা, ইউরােপের সেই সকল জাতি আজিও রােমান ক্যাথলিক; রােমান্স ভাষাই রােমান চর্ডের সঙ্গে তাদের মনের প্রধান যােগসূত্র। অপরপক্ষে যে-সকল জাতির ভাষা জৰ্মানিক, সেই সকল জাতিই প্রটেষ্টান্ট। একই কারণেই বাংলা সংস্কৃতের প্রভুত্ব হতে মুক্তিলাভ করেছে। চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পরেই বাংলা সাহিত্যের প্রকৃত অত্যু: দয়ের সূত্রপাত হয়েছে। মহাপ্রভু যেদিন ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে বৈষ্ণব ধর্মের, জ্ঞান ও কর্মের উপরে ভক্তির প্রাধান্য প্রচার করতে উদ্যত হলেন, সেদিন তাকে সংস্কৃত ত্যাগ করে বাংলার আশ্রয় নিতে হল। চৈতন্যের ধর্ম সংস্কারকে বাংলাদেশের Reformation বলা অসঙ্গত নয়। তারপর এসেছে বাংলার ভবিষ্যৎ। আমাদের Renaissance;-ইউরােপ একদিন যেমন গ্রীক সাহিত্য আবিষ্কার করে ল্যাটিন ভাষার একাধিপত্য থেকে মুক্তি লাভ করে, আমরাও তেমনি ইংরাজি সাহিত্য আবিষ্কার করে সংস্কৃত ভাষার একাধিপত্য হতে মুক্তি লাভ করেছি, এবং সে একই কারণে। পশ্চিম ইউরােপে গ্রীক, ধর্মের নয়, বিদ্যাশিক্ষার ভাষা বলেই গ্রাহ হয়েছিল; আমাদের কাছেও ইংরাজি তেমনি, ধর্মের নয়, বিদ্যাশিক্ষার ভাষা বলেই গ্রাহ্য হয়েছে। ল্যাটিন অবশ্য তাই বলে ইউরােপে বাতিল হয়ে যায় নি ;-সে ভাষার অধ্যয়ন অধ্যাপনা আজও সে দেশে সজোরে চলছে। কিন্তু সে বিদ্যাশিক্ষার ভাষা হিসাবে। অবশ্য রােমান ক্যাথলিক-জাতির কাছে সে ভাষা আজও কতকপরিমাণে ধৰ্ম্মের ভাষা বলে মান্য, কিন্তু প্রধানত বিদ্যাশিক্ষার ভাষা বলেই গণ্য। আমাদের বাঙালীদের কাছে সংস্কৃত আজকের দিনে ঐ হিসাবেই গণ্য ও মান্য। (১২) অতএব দেখা গেল যে পরভাষা, তা মৃতই হােক আর বিদেশীই হােক, থােকভাষার উপর প্রভুত্ব করে এই গুণে যে, তা জ্ঞানবিজ্ঞানের ভাষা, এক কথায় বিদ্যাশিক্ষার ভাষা; বলা বাহুল্য ধর্মের ভাষাও আসলে বিদ্যার ভাষা। অপর বিদ্যার সঙ্গে এ বিদ্যার প্রভেদ এই যে, তা অপরা বিদ্যা নয়—তা হচ্ছে theology, অর্থাৎ-ব্রহ্মবিদ্যা। এই গুণেই ইংরাজি আজ বাংলার উপর প্রভুত্ব করছে। এ প্রভুত্ব হতে মুক্তিলাভ করবার একমাত্র উপায় হচ্ছে বাংলাকে বিদ্যাশিক্ষার ভাষা, অধ্যয়ন অধ্যাপনার ভাষা, এক কথায় বিদ্যালয়ের ভাষা করে ভােলা। আমাদের উচ্চ আশা এই যে, ভবিষ্যতে বাংলা উচ্চশিক্ষার ভাষা হবে ; শুধু বাল্য বিদ্যালয়ে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ভাষা পাবে প্রথম আসন, এবং ইংরাজি দ্বিতীয় আসন গ্রহণ করবে। যতদিন বাংলা, হয় বিদ্যালয়ের বহিভূত হয়ে থাকবে, নয় ইংরাজির অনুচর কিম্বা পার্শ্বচর হিসাবে সেখানে আমাদের শিক্ষা। স্থান পাবে, ততদিন বাংলা সাহিত্য সৰ্বাঙ্গসুন্দর ও সর্বশক্তিশালী হয়ে উঠবে না। এবং বাঙালীর প্রতিভাও ততদিন পূর্ণ বিকাশ লাভ করবার পূর্ণ সুযােগ পাবে না। সাহিত্যেই জাতীয় মনের প্রকাশ, অতৰ সাহিত্যের ঐশ্বর্য্যেই জাতীয় মনের ঐশ্বর্যের পরিচয়। আমি পূর্বেই বলেছি, ভাষা ও মন একই বস্তুর এ পিঠ আর ওপিঠ। বাংলা ভাষাকে বিদ্যালয়ের ভাষা করে তােলবার পথে কত এবং কি গুরুতর বাধা আছে, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন, তৎসত্বেও আমি বলি, সে-সকল বাধা আমাদের অতিক্রম করতেই হবে—নচেং বাঙালীর মন চিরকাল অর্ধপক অবস্থাতেই থেকে যাবে। বঙ্গ সাহিত্যের গুরুগম্ভীর প্রবন্ধনিবন্ধাদি পাঠ করলেই দেখা যায় যে, সে সকল রচনা কোনও অংশে পাকা আর কোনও অংশে কঁাচা। এ সব লেখার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের একটা পারিবারিক সাদৃশ্য আছে। পঠিত পুস্তকের স্মৃতি লেখকদের যেখানে অক্ষুন্ন সেখানে লেখা পাকা, আর যেখানে ক্ষুর, সেখানে কাচা। রবীন্দ্রনাথের কাব্যে যে মনের পরিচয় পেয়ে ইউরােপ যুগপৎ বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছে, সেই পৰু কষায় মন আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে একান্ত দুলর্ভ। এর কারণ, আমাদের মনকে দিবারাত্র পরভাষার জাগ দিয়ে অকালপক্ক করে ভােলা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের ভাষা না হলে আমাদের ভাষা যে তার পূর্ণশ্রী পূর্ণশক্তি লাভ করবে না, একথাও যেমন সত্য, অপরপক্ষে আমাদের সাহিত্য, জ্ঞান বিজ্ঞানের সাহিত্য না হলেও যে তা বিদ্যালয়ে গ্রাহ্য হবে না, এ কথাও তেমনি সত্য। বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শনের পত্ৰসূচনায় লিখেছেন- “এদিকে কোন সুশিক্ষিত বাঙ্গালীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় “মহাশয় আপনি বাঙ্গালী, বাঙ্গালা গ্রন্থ বা পত্রাদিতে আপনি এত হতাদর কেন”? তিনি উত্তর করেন “কোন্ বাঙ্গলা গ্রন্থে বা পত্রে আদর করিব? পাঠ্য রচনা পাইলে অবশ্য পড়ি”। আমরা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি যে এ কথার উত্তর নাই”।
বাংলার ভবিষ্যৎ। আজকের দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষেরা যদি আমাদের ঐরূপ প্রয় করেন, তাহলে আমাদেরও মুক্তকণ্ঠে না হােক রুদ্ধকণ্ঠে স্বীকার করতে হবে যে, সে প্রশ্নের উত্তর নেই। তবে আমাদের এ ক্ষেত্রে কর্তব্য যে কি, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই ;-বাংলা ভাষায় আমাদের বিদ্যার সাহিত্য গড়ে তুলতে হবে, এবং সে জন্য বহু শিক্ষিত লােককে কায়মনােবাক্যে বহুদিন ধরে পরিশ্রম করতে হবে। ইতি মধ্যেই আমাদের মধ্যে কেউ কেউ মাতৃভাষাতেই ইতিহাস এবং দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধসকল রচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন । কিন্তু সে সাহিত্যের যে তেমন কিছু গৌরব, কিম্বা সৌরভ নেই তার কারণ, একদিকে ইংরেজি ভাবের আর একদিকে সংস্কৃত ভাষার চাপের মধ্যে পড়ে, আমরা অকুণ্ঠিত চিত্তে ভাবতেও পারি নে, মুক্তহস্তে লিখতেও পারি নে। ( ১৩) উপসংহারে আমার বক্তব্য এই যে, মৃতভাষা ও পরভাষার প্রভুত্ব থেকে মাতৃভাষাকে আমি মুক্ত করতে চাই -বলে, এ ভুল যেন কেউ না করেন যে, আমি সংস্কৃত ও ইংরাজির পঠনপাঠন বন্ধ করে দিতে চাই। আমার বিশ্বাস, তা করলে বঙ্গ সাহিত্যে ইভলিউসান হওয়া দূরে থাক, একটা বিষম ও সম্ভবত ভীষণ reversion এসে পড়বে। সংস্কৃত ও ইংরাজি সাহিত্যের চর্চা থেকেই আমরা সেই মনের বল ও হাতের কৌশল লাভ করব, যা আমাদের সাহিত্যের মুক্তির কারণ হবে। বর্তমানে ইউরােপের সকল ভাষাই গ্রীক ল্যাটিনের অধীনতা হতে মুক্তিলাভ করেছে, কিন্তু তাই বলে সে দেশে গ্ৰীক ল্যাটিনের অধ্যাপনা বন্ধ হয় নি। বরং সাহিত্য-রাজ্যে ইউরােপের এই স্বদেশী যুগে উপরােক্ত ক্ল্যাসিকের চর্চা যত গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে, ক্ল্যাসিক-শাসিত যুগে তার সিকির সিকিও হয় নি। যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, ক্লাসিক চর্চা করবার সার্থকতা কি? তাহলে সে দেশের কাব্যরসের রসিক উত্তর দেবেন যে, ঐ দুটি প্রাচীন ভাষায় যে, কাব্যান্থত সঞ্চিত রয়েছে, তার রসাস্বাদ না করলে মানব জনম বিফল হয় ;
আমাদের শিক্ষা। দার্শনিক বলবেন, মনের উদারতা ও হৃদয়ের গভীরতা লাভ করবার জন্য অতীতের সাহিত্যের পরিচয় লাভ করা একান্ত প্রয়ােজন ; বৈজ্ঞানিক প্রমাণ করতে উদ্যত হবেন যে, অতীতের সভ্যতার সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে পরিচয় না থাকলে, আমরা বর্তমান সভ্যতার যথার্থ প্রকৃতি ও মতিগতির পরিচয় পাব না, কেননা বর্তমানের ক্রমগঠিত হয়েছে অতীতের গর্তে; এবং আর্টিষ্ট দেখিয়ে দেবেন যে, ক্লাসিক সাহিত্যের এমন একটি গুণ আছে, যা বর্তমান সাহিত্যে পাওয়া দুর্ঘট এবং সে গুণের নাম হচ্ছে আভিজাত্য। এ সকল উক্তিই সত্য; সুতরাং সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্যের সম্যক চর্চা আমাদের চিরদিনই করতে হবে। বলা বাহুল্য পৃথিবীর অসংখ্য মৃত-ভাষার মধ্যে, গ্রীক ল্যাটিন ও সংস্কৃত, এই তিনটি আৰ্য ভাষাই ক্লাসিক-অপর কোনােটিই নয়। এ স্থানে একটি কথার উল্লেখ করা দরকার। অলঙ্কারশাস্ত্রের ভাষায় বলতে গেলে, ইউরােপে গ্ৰীক ল্যাটিনের বাণী সেকালে ছিল প্রভুসম্মিত, একালে তা হয়েছে সুহৃদ-সম্মিত, অর্থাৎ-আগে যা ছিল বেদবাক্য, এখন তা হয়েছে ন্যায়কথা ! আশা করি কালে সংস্কৃতসরস্বতীর বাণীও আমাদের কাছে তার প্রভুসম্মিত চরিত্র হারিয়ে সুহৃস্মিত হয়ে উঠবে। তা যে দূর ভবিষ্যতেও কান্তাবাণী হয়ে উঠবে, সে ভয় পাবার কোনও কারণ নেই। এই তিনটি ক্লাসিকের মহা গুণ এই যে, তার প্রত্যেকটিই পুরুষালি সাহিত্য, মেয়েলি নয় ;সে সাহিত্যে আধ আধ ভাষ কি গদগদ ভাষের স্থান নেই, সে সাহিত্য যেখানে কোমল সেখানে দুর্বল নয়, যেখানে সানুরাগ সেখানে সানুনাসিক নয়। এ কারণেও সংস্কৃতের চর্চা আমাদের পক্ষে অত্যাবশ্যক এবং অবশ্যকর্তব্য, ' কেননা বাংলার বাণীর কান্তাসম্মিত হয়ে পড়বার দিকে একটা স্বাভাবিক ঝোঁক এবং রােখ আছে। আজকের দিনে ইউরােপের কোনও ভাষাই অপর কোনও ভাষার আওতায় পড়ে নেই,—সে ভূভাগে এখন সবাই স্বাধীন, সবাই প্রধান ; অথচ সে দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় এই জাতিস্বাতন্ত্রের যুগেও স্বদেশী ভাষা বাঙ্গলার ভবিষ্যৎ। ব্যতীত আরও অন্তত দুটি তিনটি বিদেশী ভাষা সাগ্রহে এবং সানন্দে শিক্ষা করেন। এর কারণ কি ?-এর কারণ, সভ্যজগতের এ জ্ঞান জন্মেছে যে, মানুষের মনােজগৎ কেউ আর এক হাতে গড়ে নি, এর ভিতর নানা যুগের নানা দেশের হাত আছে। সে কারণ, বিদেশী ভাষা ও বিদেশী সাহিত্যের চর্চা ছেড়ে দিলে, মানুষকে মনােরাজ্যে একঘরে এবং কুণণা হয়ে পড়তে হয়। একমাত্র জাতীয় সাহিত্যের চর্চায় মানুষের মন জাতীয় ভাবের গণ্ডীর মধ্যেই থেকে যায়, এবং এ বিষয়ে, বােধহয় দ্বিমত নেই যে, মনােরাজ্যে কুপমণ্ডুক হওয়াটা মােটেই বাঞ্ছনীয় নয়, সে কূপের পরিসর যতই প্রশস্ত, ও তার গভীরতা যতই অগাধ হােক না কেন। এবং এ কথাও অস্বীকার করবার জো নেই যে, যে-জাতি মনে যতই বড় হােক না কেন, তার মনের একটা বিশেষরকম সঙ্কীর্ণত আছে, এবং তার মনের ঘরের দেয়াল ভাঙ্গবার জন্য বিদেশীমনের ধাক্কা চাই। বিদেশীর প্রতি অবজ্ঞা, বিদেশী মনের অজ্ঞতা থেকেই জন্মলাভ করে এবং এই সূত্রে জাতির প্রতি দ্বেষ হিংসাও প্রশ্রয় প্রায়। অপরের মনের সম্পর্কে এলে, তার সঙ্গে মনের মিল হওয়াটা মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক ; কেননা তখন দেখা যায় যে, অপর জাতির লােকেরাও আসলে মানুষ, এবং অনেকটা আমাদের মতই মানুষ। সুতরাং বিদেশী সাহিত্যের চর্চায়, শুধু আমাদের মন নয়, হৃদয়ও উদারতা লাভ করে, আমরা শুধু মানসিক নয়, নৈতিক উন্নতিও লাভ করি। অতএব মনােজগতে যথার্থ মুক্তি লাভ করতে হলে, আমাদের পক্ষে বিশ্বমানবের মনের সংস্পর্শে আসা দরকার। সত্য কথা এই যে, মনােজগতে বৈচিত্র্য থাকলেও কোনও দেশভেদ নেই; আমরা আমাদের মনগড়া বেড়া দিয়ে তার মনগড়া ভাগ বাটোয়ারা করি, সত্যের আলােকে এ সব অলিক প্রাচীর কুয়াশার মত মিলিয়ে যায়। এ কথা আমি বিশ্বাস করি বলে, আমার মতে, আমাদের পক্ষে শুধু ইংরাজি নয়, সেই সঙ্গে ফরাসি এবং জৰ্মানও শেখা দরকার। ইংরাজি ভাষা অবশ্য সমগ্র ইউরােপের সমস্ত জ্ঞান ও চিন্তা আমাদের মনের ঘরে পৌছে দিচ্ছে, কিন্তু ৩২ আমাদের শিক্ষা। । অনুবাদের মারফৎ সাহিত্য পড়া গ্রামােফোনের মারফং গান শােনার মত ; অর্থাৎও উপায়ে মানুষের প্রাণের কথা আমাদের কানে যধ্বনির আকারে এসে পৌছায়। সে যাই হােক, আজকের দিনে ইংরাজির চর্চা ত্যাগ করলে বিশ্বমানবের বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বার স্বহস্তে বন্ধ করে দেওয়া হবে। বাংলা আমাদের শিক্ষার প্রধান ভাষা হলে ইংরাজি-বাণী আর প্রভুসম্মিত থাকবে না, সুস্মিত হয়ে উঠবে—প্রভু তখন যথার্থ সখা হয়ে উঠবে। আর একটি কথা বলেই আমার প্রবন্ধ শেষ করব। ( ১৪ ) আজকের দিনে ভারতবাসীর মুখে “সরাজ” ছাড়া অপর কোনও কথা নেই। দেশের স্বরাজ্য পরের কাছে হাত পেতে পাওয়া যায় কি যায় না, তা আমি বলতে পারি নে ; কিন্তু এ কথা আমি খুব জোরের সঙ্গে বলতে পারি যে, মনের স্বরাজ্য নিজহাতে গড়ে তুলতে হয়। তার পর দেশের স্বরাজ ইংরাজি ভাষার প্রতাপে লাভ করা গেলেও, মনের স্বরাজ। একমাত্র স্বভাষার প্রসাদেই লাভ করা যায়। সুতরাং সাহিত্যচর্চা আমাদের পক্ষে একটা সখ নয়, জাতীয় জীবন গঠনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়—কেন না এ ক্ষেত্রে যা কিছু গড়ে উঠবে, তার মূলে থাকবে জাতীয় আত্মা এবং জাতীয় কৃতিত্ব। এক জাতের বুদ্ধিমান লােক আছেন যারা বলেন যে, আমাদের পক্ষে একটা বড় সাহিত্য গড়ে তোেলবার চেষ্টাটা সম্পূর্ণ বৃথা। তাদের মতে সাহিত্যের অত্যুদয় জাতীয় অভূদয়কে অনুসরণ করে। এবং নিজের মতের পক্ষে তাঁরা Pericles-43 Athens, Augustus-47 6979, Elizabeth-49 5179 1978 Louis xiv-এর ফ্রান্সের নজির দেখান। এ মত গ্রাহ করার অর্থ, আত্মার উপর বাহবন্ধুর শক্তির প্রাধান্য স্বীকার করা। কিন্তু অদৃষ্টবাদ মাযের পুরুষ- কারকে খর্ব করে, অতএব বিজ্ঞানসম্মত হলেও তা অগ্রাহ। সুখের বিষয় এ মত মেনে নেবার কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। যদি সাহিত্যের অত্যুদয় একমাত্র রাষ্ট্রশক্তির উপর নির্ভর করত, তাহলে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলার ভবিষ্যৎ। জর্মানীতে অমন অপূৰ্ব সাহিত্যের সৃষ্টি হত না, কারণ সে যুগে জন্মানীর রাষ্ট্রীয়- শূন্যের কোঠায় গিয়ে পড়েছিল। নেপােলিয়ান যেদিন সমবেত জৰ্মান জাতিকে পদদলিত করে Jena নগরে প্রবেশ করেন, সেদিন সে নগরে গেটে ও হেগেল উভয়েই উপস্থিত ছিলেন, এবং সম্ভবত এদের একজন কাব্যের, আর একজন দর্শনের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন; কেননা বিজয়ী ফরাসিদের তপের গর্জন যে এঁদের যােগনিদ্রা ভঙ্গ করেছিল—এ কথা ইতিহাসে লেখে না। আর এ যুগে জৰ্মান জাতি সাংসারিক হিসাবে অপূর্ব অভ্যুদয় লাভ করেছে কিন্তু জম্মান সাহিত্য সে অভ্যুদয়ের অনুসরণ করে নি। বরং সত্য কথা এই যে, সে দেশে লক্ষ্মীর আস্ফালনে সরস্বতী পৃষ্ঠভঙ্গ দিয়েছেন। আসল ঘটনা এই যে, যুগবিশেষে দেশবিশেষের জাতীয় আত্মা যখন সজ্ঞান ও সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন কি সাহিত্য কি সমাজ সবই এক নূতন শক্তি লাভ করে, এক নৃতন মূর্তি ধারণ করে। তখন জাতির আত্মশক্তি নানা দিকে নানা ক্ষেত্রে বিকশিত ও প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। Pericles-এর Athens প্রভৃতি এই সত্যের নিদর্শন। কিন্তু এমন হওয়া আশ্চৰ্য্য নয় যে, জাতীয় আত্মা প্রবুদ্ধ হয়ে উঠলেও অবস্থার গুণে বা দোষে তা বিশেষ একটা দিকেই মাথা তুলতে পারে, হয় সাহিত্যের দিকে, নয় শিল্পবাণিজ্যের দিকে। সুতরাং জাতি হিসাবে আমরা শক্তিশালী নই বলে, আমাদের সাহিত্য-সৃষ্টির চেষ্টা যে বিড়ম্বনা, তা হতেই পারে না। তা ছাড়া সাহিত্যের প্রধান কাজই যখন জাতীয় আত্মাকে প্রবুদ্ধ করা, তখন তার অবসর চিরকালই আছে। আমার শেষ কথা এই যে, বাংলার ভবিষ্যৎ ও বাঙ্গালীর ভবিষ্যৎ মূলে একই বস্তু। অগ্রহায়ণ, ১৩২৪ প্রমথ চৌধুরী বই, পড়।# প্রবন্ধ আমি লিখি এবং সম্ভবত যত লেখা উচিত তার চাইতে বেশিই লিখি, কিন্তু সে প্রবন্ধ সর্বজনসমক্ষে পাঠ করতে আমি স্বভাবতই সঙ্কুচিত হই। লােকে বলে আমার প্রবন্ধ কেউ পড়ে না। যে প্রবন্ধ লােকে স্বেচ্ছায় পড়ে , সে প্রবন্ধ অপরকে পড়ে শােনানটা অবশ্য শ্রোতাদের উপর অত্যাচার করারই সামিল। এ সত্বেও আমি আপনাদের অনুরােধে আজ যে একটি প্রবন্ধ পাঠ করতে প্রস্তুত হয়েছি তার কারণ, লাইব্রেরি সম্বন্ধে কথা কইবার আমার কিঞ্চিৎ অধিকার আছে। কিছুদিন পূর্বে ‘সাহিত্য’ পত্রে আমার সম্বন্ধে এই মন্তব্য প্রকাশিত হয় যে, আমি একজন “উদাসীন গ্রন্থকীট”। এর অর্থ, কোনও কোনও লােক যেমন সংসারের প্রতি বীতরাগ হয়ে বনে গমন করেন, আমিও তেমনি সংসারের প্রতি বীতরাগ হয়ে লাইব্রেরিতে আশ্রয় নিয়েছি। পুস্তকাগারের অভ্যন্তরে আম্বি যে আজীবন সমাধিস্থ হয়ে রয়েছি, এ জ্ঞান আমার অবশ্য ইতিপূর্বে ছিল না। সে যাই হােক, আমার আ-কৈশাের বন্ধু শ্ৰীযুক্ত সুরেশচন্দ্র সমাজপতির দত্ত এই সার্টিফিকেটের বলে এ ক্ষেত্রে বই পড়া সম্বন্ধে দু'চার কথা বলতে সাহসী হয়েছি। লাইব্রেরিতে বইয়ের গুণগান করাটা আমার বিশ্বাস অসঙ্গত ( ২ ) আজকের সভায় যে দু’চার কথা বলব, সে আলাপের ভাষায় ও আলাপের ভাবে, অর্থাৎ—তাতে কাজের কথার চাইতে বাজে কথা ঢের বেশি থাকবে। ও কটেজ লাইব্রেরি ও ভবানীপুর ইনস্টিটিউটের সাহিত্য-শাখার অধিবেশনে ১৯১৮ সনের ১৯শে মে তারিখে পঠিত।
বই পড়া। এই বিংশ শতাব্দীতে লাইব্রেরির সার্থকতা এবং উপকারিতা সম্বন্ধে বিশেষ কোনও কথা বলবার কি প্রয়ােজন আছে? এ সম্বন্ধে যা বক্তব্য তা ইতিপূর্বে হাজার বার কি বলা হয় নি ? তবে বই পড়ার অভ্যাসটা যে বদ-অভ্যাস নয়, এ কথাটা সমাজকে এ যুগে মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দেওয়া আবশ্যক ; কেন না মানুষে এ কালে বই পড়ে না—পড়ে সংবাদপত্র। এ যুগে সভ্য সমাজ ভােরে উঠে করে দুটি কাজ—এক চা-পান আর সংবাদপত্র পাঠ। একটি বিলাতি কবি চায়ের সম্বন্ধে বলেছেন যে, “The cup that cheers but not inebriates”, অর্থাৎ,—চা-পান করলে নেশা হয় না অথচ ফুর্তি হয়। চা-পান করলে নেশা না হােক, চা-পানের নেশা হয়। সংবাদপত্র সম্বন্ধেও একই কথা খাটে। তারপর অতিরিক্ত চা পানের ফলে মানুষের যেমন আহারে অরুচি হয়, অতিরিক্ত সংবাদপত্র পাঠের ফলেও মানুষের তেমনি সাহিত্যে অরুচি হয়। আমরা দেশসুদ্ধ লোক আজকের দিনে এই মানসিক মন্দাগ্নিগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। সুতরাং সাহিত্যচর্চা করবার প্রথাটা যে সভ্যতার একটা প্রধান অঙ্গ, এই সত্যটার চারদিকে আজ প্রদক্ষিণ করবার সংকল্প করেছি। ( ৩ ) কাব্যচর্চা না করলে মানুষে জীবনের একটা বড় আনন্দ থেকে স্বেচ্ছায় বঞ্চিত হয়। এ আনন্দের ভাণ্ডার সর্বসাধারণের ভােগের জন্য সঞ্চিত রয়েছে। সুতরাং কোনও সভ্যজাতি কস্মিকালে তার দিকে পিঠ ফেরায় নি। এদেশেও নয়, বিদেশেও নয়। বরং যে জাতির যত বেশি লােক যত বেশি বই পড়ে, সে জাতি যে তত সভ্য, এমন কথা বললে বােধ হয় অন্যায় কথা বলা হয় না। নিদ্ৰাকলহে দিনযাপন করার চাইতে কাব্যচর্চায় কালাতিপাত করা যে প্রশংসনীয়, এমন কথা সংস্কৃতেই আছে। সংস্কৃত কবিরা সকলকেই সংসার- বিষবৃক্ষের অমৃতােপম ফল কাব্যামৃতের রসাস্বাদ করবার উপদেশ দিলেও সেকালে সে উপদেশ কেউ গ্রাহ করতেন কিনা, সে বিষয়ে অনেকের মনে আমাদের শিক্ষা। সন্দেহ আছে, কিছুদিন পূর্বে আমারও ছিল। কেননা নিজের কলমের কালি, লেখকেরা যে অমৃত বলে চালিয়ে দিতে সদাই উৎসুক, তার পরিচয় একালেও পাওয়া যায়। কিন্তু একালেও আমরা যখন ও-সব কথায় ভুলিনে, তখন সেকালেও সম্ভবত কেউ ভুলতেন না, কেননা সেকালে সমজদারের সংখ্যা একালের চাইতে ঢের বেশি ছিল। কিন্তু আমি সম্প্রতি আবিষ্কার করেছি যে, হিন্দুযুগে বই পড়াটা নাগরিকদের মধ্যে একটা মস্ত বড় ফ্যাসান ছিল। এ স্থলে বলা আবশ্যক যে, “নাগরিক” বলতে সেকালে সেই শ্রেণীর জীব বােঝাত -একালে ইংরাজিতে যাকে man-about-town বলে। বাংলাভাষায় ওর কোনও নাম নেই, কেননা বাংলাদেশে ও-জাত নেই। ও-বালাই যে নেই, সেটা অবশ্য সুখের বিষয়। ( ৪ ) যদি অনুমতি করেন ত এই সুযােগে প্রাচীন ভারতবর্ষের নাগরিক সভ্যতার কিঞ্চিৎ পরিচয় দিই। সেকালে এদেশে যেমন একদল ত্যাগী-পুরুষ ছিলেন, তেমনি আর একদল ভােগী-পুরুষও ছিলেন। ভারতবর্ষের আরণ্যক-ধর্মের সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচয় আমাদের সকলেরই আছে, কিন্তু তার নাগরিক ধর্মের ক্রিয়াকলাপ আমাদের অনেকের কাছেই অবিদিত। এর ফলে ভারতবর্ষের প্রাচীন সভ্যতার ধারণাটা আমাদের মনে নিতান্ত একপেশে হয়ে উঠেছে। সে সভ্যতার শুধু আত্মার নয় দেহের সন্ধানটাও আমাদের নেওয়া কর্তব্য, নচেৎ তার স্বরূপের সাক্ষাৎ আমরা পাব না। সেকালের নাগরিকদের মতিগতি রীতি-নীতির আদ্যোপান্ত বিবরণ পাওয়া যায় কামসূত্রে। এ গ্রন্থ রচিত হয়েছিল অন্তত দেড় হাজার বৎসর পূর্বে, এবং এ গ্রন্থের রচয়িতা হচ্ছেন ন্যায়দর্শনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার স্বয়ং বাংস্যায়ন, অতএব কামসূত্রের বর্ণনা আমরা সত্য বলেই গ্রাহ করতে বাধ্য ; বিশেষত ও-সূত্র যখন সংস্কৃত সাহিত্যে শাস্ত্র হিসেবেই চিরকাল গণ্য ও মান্য হয়ে এসেছে। আমি উক্ত গ্রন্থ থেকে নাগরিকদের গৃহসজ্জার আংশিক বর্ণনা এখানে উদ্ধৃত করে দিচ্ছি।
বই পড়া। “বাহিরের বাসগৃহেও অতি শুভ্রচাদরপাতা একটি শয্যা থাকিবে, এবং তাহার উপর দুইটি অতি সুন্দর বালিশ রাখিতে হইবে। তাহার পার্শ্বে থাকিবে প্রতিশয্যিকা। এবং তাহার শিরােভাগে কুচ্চস্থান ও বেদিকা স্থাপিত করিবে। সেই বেদিকার উপর, রাত্রিশেষ অনুলেপন, মাল্য, সিকৃথকুরগুক, সৌগন্ধিকপূটিকা, মাতুলুঙ্গত্ব, তাম্বুল প্রভৃতি রক্ষিত হইবে। ভূমিতে থাকিবে পতংগ্রহ। ভিত্তিগাত্রে নাগদাবসা বীণা। চিত্রফলক। বর্তিকা-সমুদগকঃ। এবং যে কোনও পুস্তক।” উপরােক্ত বর্ণনা একটু ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে—কেননা এর অনেক শব্দই বাংলাভাষায় প্রচলিত নেই। আমি কতকটা টীকা ও কতকটা অভিধানের সাহায্যে ঐ সকল অপরিচিত শব্দের বাচ্য পদার্থের যে পরিচয় লাভ করেছি, তা আপনাদের জানাচ্ছি। প্রতিশয্যিকার অর্থ ক্ষুদ্ৰ পৰ্যঙ্ক, ভাষায় যাকে বলে খাটীয়া। এ খাটীয়া অবশ্য নাগরিকরা নিজেদের গঙ্গাযাত্রার জন্য প্রস্তুত রাখতেন না! তার মাথার গােড়ায় থাকত …স্থান। কূৰ্চ্চ শব্দের সাক্ষাৎ আমি কোনও অভিধানে পাই নি। তবে টীকাকার বলেন, শয্যার শিরােভাগে ইষ্টদেবতার আসনের নাম কূর্চ। আত্মবান নাগরিকেরা ইষ্টদেবতার স্মরণ ও প্রণাম না করে শয়নগ্রহণ করতেন না। সুতরাং কূর্চ হচ্ছে একপ্রকার ব্রাকেট। সেকালের এই বিলাসী সম্প্রদায়, আমরা যাকে বলি নীতি, তার ধার এক কড়াও ধারতেন না; কিন্তু দেবতার ধার ধােল আনা ধারতেন। এ ব্যাপার অবশ্য অপূৰ্ব্ব নয়। একালেও দেখা যায় মানুষের প্রতি অত্যাহিত অত্যাচার করবার সময় মানুষে ইষ্টদেবতাকে ঘন ঘন স্মরণ ও প্রণাম করে। যা ও সব কথা। এখন দেখা যাক বেদিকা বস্তুটা কি?-বেদিকাতে যত প্রকার দ্ৰব্য রাখবার ব্যবস্থা আছে, তাতে মনে হয় ও হচ্ছে টেবিল। এবং টীকাকারের বর্ণনা থেকে বােঝা যায় যে, এ অনুমান ভুল নয়। তিনি বলেন বেদিকা ভিত্তিসংলগ্ন, হস্তপরিমিত চতুষ্কোণ এবং কৃতকুট্টিম অর্থাৎ—inlaid. অনুলেপন দ্রব্যটি হয় চন্দন, নয় মেয়েরা যাকে বলে রূপটান, তাই। মাল্য ৩ আমাদের শিক্ষা। অবশ্য ফুলের মালা। কি ফুল তার উল্লেখ নেই, কিন্তু ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, আর যাই হােক গাঁদা নয়; কেননা তারা বর্ণগন্ধের সৌকুমাৰ্য্য বুঝতেন। সিকৃথকরক হচ্ছে—মােমের কৌটা। সেকালে নাগরিকেরা, ঠোট আগে মােম দিয়ে পালিস করে নিয়ে, তারপর তাতে আতা মাখতেন। সৌগন্ধিকপূটিকা হচ্ছে ইংরাজিতে যাবে বলে powder-box। বােতল হয়ে বাক্স হবার কারণ, সেকালে অধিকাংশ গন্ধদ্রব্য চুর্ণ আকারেই ব্যবহৃত হত। দেয়াল ছেড়ে ঘরের মেজের দিকে দৃষ্টিপাত করলে প্রথমেই চোখে পড়ে পতংগ্রহ, অর্থাৎ-পিকদানী। তারপর চোখ তুললে নজরে পড়ে, ভিত্তি- সংলগ্ন হস্তিদন্তে বিলম্বিত বীণা। টিকাকার বলেন সে বীণা আবার “নিচোল- অবগুণ্ঠিতা”। বাংলার অনেক পদ্যলেখকদের ধারণা নিচোল অর্থে শাড়ী। শাড়ীপরা বীণা”র অবশ্য কোনও মানে নেই। নিচোল অর্থে গেলাপ। জয়দেব যে শ্রীরাধিকাকে বলেছিলেন “শীলয় নীল নিচোলং” তার অর্থ “নীলরঙের একটি ঘেরাটোপ পর”। ইংরাজি ভাষায় ওর তর্জমা হচ্ছে- Put on a dark blue cloak, এখন আবার প্রকৃত প্রস্তাবে ফিরে আসা যাক। তারপর পাই চিত্রফলক। সংস্কৃত কাব্যের বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়, পুরাকালে ছবি কাঠের উপরে আঁকা হত, কাপড়ের উপরে নয়। বর্তিকা সমুগকের অর্থ তুলি ও রঙ রাখবার বাক্স। তারপর বই। নাগরিকদের গৃহের এবং দেহের এই সাজসজ্জার বর্ণনা থেকেই বুঝতে পারবেন তারা কি চরিত্রের লােক ছিলেন। তারপর প্রশ্ন ওঠে, বই নিয়ে এ প্রকৃতির লােকেরা কি করতেন? কেন না নাগরিকেরা আর যাই হন, তাঁরা যে সব উদাসীন গ্রন্থকীট ছিলেন না, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নেই পুস্তক কি তবে এঁদের গৃহসজ্জার জন্য রক্ষিত হত, যেমন আজকাল কোন কোন ধনীলােকের গৃহে হয়? এ সন্দেহ দৃঢ় হয়ে আসে, যখন টীকাকারের মুখে শুতে পাই যে- “এই সকল বীণাদিন্দ্ৰব্য সর্বদা উপঘাতের, অর্থাৎ-ব্যবহার করিয়া নষ্ট বই পড়া। করিবার জন্য নহে। কেবল বাসগৃহের শােভা সম্পাদনাৰ্থ ভিত্তি নিহিত হস্তিদন্তে ঝুলাইয়া রাখিতে হইবে। কালে ভদ্রে কখনাে প্রয়ােজন হইলে তাহা সেখান হইতে নামাইতে হবে।” পূর্বোক্ত সন্দেহের আরও কারণ আছে। সূত্রকার যখন বলেছেনঃ কশ্চিৎ পুস্তক, অর্থাৎ—“যা হােক একটা বই”,—তখন ধরে নেওয়া যেতে পাবে যে সে বই, আর যে কারণেই হাে’ক, পড়বার জন্য রাখা হত না। কিন্তু টিকাকার আমাদের এ সন্দেহ ভঞ্জন করেছেন। তাঁর কথা এই ওযঃ কশ্চিৎ এটি সামান্য নির্দেশ হইলেও, তখনকার যে-কোনও কাব্য তাহাই পড়িবার জন্য রাখিবে, ইহাই যে সূত্ৰকারের উপদেশ, তাহা স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে।” টীকাকারের এ সিদ্ধান্ত আমি গ্রাহ করি। বীণা ও পুস্তক দুই সরস্বতীর দান হলেও, ও-দুই গ্রহণ করবার সমান শক্তি এক দেহে প্রায় থাকে না। বীণাবাদন বিশেষ সাধনাসাধ্য, পুস্তকপঠন অপেক্ষাকৃত ঢের সহজ। সুতরাং বই পড়ার অধিকার যত লােকের আছে, বীণা বাজাবার অধিকার তার সিকির সিকি লোেকেরও নেই। এই কারণে সকলকে জোর করে বিদ্যাশিক্ষা দেবার ব্যবস্থা এ যুগের সকল সভ্য দেশেই আছে; কিন্তু কাউকে জোর করে সঙ্গীত- শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা কোনও অসভ্য দেশেও নেই। অতএব নাগরিকেরা বীণ। দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখতেন বলে যে পুথির ডুরি খুলতেন না, এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত হবে। সে যাই হোক, টীকাকার বলেছেন “যে-সে বই নয়, তখনকার বই”; এই উক্তিই প্রমাণ যে, সে বই পড়া হত। যে বই এখনকার নয় কিন্তু সকালের, যাকে ইংরাজিতে বলে classic, তা ভদ্রসমাজে অনেক লােক ঘরে রাখে পড়বার জন্য নয়, দেখবার জন্য। কিন্তু হালের বই লােকে পড়বার জন্যই সংগ্রহ করে, কেননা অপর কোনও উদ্দেশ্যে তা গৃহজাত করবার কোনরূপ সামাজিক দায় নেই। . আর এক কথা। আমরা বর্তমান ইউরােপের সভ্য সমাজেও দেখতে পাই যে, “এখনকার” বই পড়া সে সমাজের সভ্যদের ফ্যাসানের একটি প্রধান অঙ্গ। Anatole France-এর টাটকা বই পড়ি নি, ১০ আমাদের শিক্ষা। এ কথা বলতে প্যারিসের নাগরিকেরা যাদৃশ লজ্জিত হবেন, সম্ভবত Ripling- এর কোনও সদ্যপ্রসূত বই পড়ি নি বলতে লণ্ডনের নাগরিকেরাও তাদৃশ লজ্জিত হবেন ; যদিচ Anatole France-এর লেখা যেমন সুপাঠ্য, Kipling- এর লেখা তেমনি অপাঠ্য। এ কথা আমি আন্দাজে বলছিনে। বিলেতে একটি ব্যারিষ্টারের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। জনরব তিনি মাসে দশ বিশ হাজার টাকা রােজগার করতেন। অত না হাে’ক, যা রটে তা কিছু বটেই ত। এই থেকেই আপনারা অনুমান করতে পারেন তিনি ছিলেন কত বড় লােক। এত বড় লােক হয়েও তিনি একদিন আমার কাছে, Oscar Wilde-এর বই পড়েন নি, এই কথাটা স্বীকার করতে এতটা মুখ কাচুমাচু করতে লাগলেন, যতটা চোরাকাতরাও কাঠগড়ায় দাড়িয়ে guilty plead করতে সচরাচর করে না। অথচ তার অপরাধটা কি ?—Oscar Wilde-এর বই পড়েন নি, এই ত? ও সব বই পড়েছি স্বীকার করতে আমরা লজ্জিত হই। শেষটা তিনি এর জন্য আমার কাছে কৈফিয়ৎ দিতে সুরু করলেন। তিনি বললেন যে, আইনের অশেষ নজির উদরস্থ করতেই তার দিন কেটে গিয়েছে, সাহিত্য পড়বার তিনি অবসর পান নি। বলা বাহুল্য এ রকম ব্যক্তিকে এদেশে আমরা একসঙ্গে রাজনীতির নেতা এবং সাহিত্যের শাসক করে তুলতুম। কিন্তু সাহিত্যের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই, এ কথা কবুল করতে তিনি যে এতটা লজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন তার কারণ, তাঁর এ জ্ঞান ছিল যে তিনি যত আইনজ্ঞই হােন, আর যত টাকাই করুন, তার দেশে ভদ্রসমাজে কেউ তাঁকে বিদগ্ধজন বলে মান্য করবে না। সংস্কৃত বিদগ্ধ শব্দের প্রতিশব্দ cultured ! বাৎস্যায়ন যাকে নাগরিক লেন, টীকাকার তাকে বিদগ্ধ নামে অভিহিত করেন। থেকে প্রেমাণ হচ্ছে যে, এদেশে পূরাকালে culture জিনিসটা ছিল নাগরি কতার একটা প্রধান ‘গুণ। এ স্থলে বলা আবশ্যক যে, একালে আমরা যাকে সভ্য বলি, সেকালে তাকে নাগরিক বলত। অপরপক্ষে সংস্কৃত বই পড়া। ৪১ ভাষায় গ্রাম্যতা এবং অসভ্যতা পৰ্য্যায়-শব্দ-ইংরাজিতে যাকে বলে synonyms. . ( ৫ ) এর উত্তরে হয়ত অনেকে এই কথা বলবেন যে, সেকালে বই পড়াটা ছিল বিলাসের একটা অঙ্গ। বাৎস্যায়নই যখন আমার প্রধান সাক্ষী, তখন এ অভিযােগের প্রতিবাদ করা আমার পক্ষে কঠিন। এ যুগে অবশ্য আমরা সাহিত্যচর্চাটা বিলাসের অঙ্গ বলে মনে করি নে, ও চর্চা থেকে আমরা ঐহিক এবং পারত্রিক নানারূপ সুফললাভের প্রত্যাশা রাখি। আপনারা সকলেই জানেন যে, সংস্কৃত সাহিত্যে “মাল্য চন্দন নিতা” এ তিন একসঙ্গেই যায়, এবং ও তিনই ছিল এক পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু আমাদের কাছে মাল্যচন্দনের সামিল, বনিতাও নয়, কবিতাও নয়। কাজেই আমাদের চোখে সেকালের নাগরিক সমাজের রীতিনীতি অবশ্য দৃষ্টিকটু ঠেকে। কেননা আমাদের চোখের পিছনে আছে আমাদের মুন, এবং আমাদের মনের পিছনে আছে আমাদের বর্তমান সামাজিক বুদ্ধি। এই কারণেই প্রাচীন সমাজের প্রতি সুবিচার করতে হলে, সে সমাজকে ঐতিহাসিকের চোখ দিয়ে দেখা কর্তব্য। তাই আমি উদাসীন গ্রন্থকীট হিসেবে নাগরিকদের উক্তরূপ সাহিত্যচর্চার ফলাফল একটুখানি আললাচনা করে দেখতে চাই। বলা বাহুল্য ঐতিহাসিক হতে হলে প্রথমত বর্তমানের প্রতি উদাসীন হওয়া চাই, দ্বিতীয়ত প্রাচীন গ্রন্থের কীট হওয়া চাই। আরও অনেক হওয়া চাই, কিন্তু ও দুটি না হলে নয় । যে সমাজে কাব্যচর্চা হচ্ছে বিলাসের একটি অঙ্গ, সে সমাজ যে সভ্য- এই হচ্ছে আমার প্রথম বক্তব্য। যা মনের বস্তু তা উপভােগ করবার ক্ষমতা বর্বর জাতির মধ্যে নেই, ভােগ অর্থে তারা বােঝে কেবলমাত্র দৈহিক প্রবৃত্তির চরিতার্থতা। ক্ষুৎপিপাসার নিবৃত্তি পশুরাও করে, এবং তা ছাড়া আর কিছু করে না। অপরপক্ষে যে সমাজের আয়েসীর দলও কাব্যকলার আদর করে, সে সমাজ সভ্যতার অনেক সিড়ি ভেঙ্গেছে। সভ্যতা জিনিসটে ।
০২ আমাদের শিক্ষা। ৫ কি? এ প্রশ্ন কেউ জিজ্ঞাসা করলে দু’ কথায় তার উত্তর দেওয়া শক্ত। কেননা যুগভেদে ও দেশভেদে পৃথিবীতে সভ্যতা নানা-মূর্তি ধারণ করে দেখা দিয়েছে, এবং কোন সভ্যতাই একেবারে নিরাবিল নয় ; সকল সভ্যতার ভিতরই যথেষ্ট পাপ ও যথেষ্ট পাক আছে। নীতির দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে সভ্যতা ও অসভ্যতার প্রভেদ যে আকাশপাতাল, এ কথা নির্ভয়ে বলা যায় না। তবে মানুষের কৃতিত্বের মাপে যাচাই করতে গেলে, দেখতে পাওয়া যায় যে, জ্ঞানে বিজ্ঞানে কাব্যকলায় শিল্পে বাণিজ্যে সভ্যজাতি ও অসভ্যজাতির মধ্যে সাত সমুদ্র তের নদীর ব্যবধান। জনৈক ফরাসী লেখক বলেছেন যে, যিনিই মানবের ইতিহাস চর্চা করেছেন, তিনিই জানেন যে মানুষকে ভাল করবার চেষ্টা বৃথা।' এ হচ্ছে অবশ্য ক্ষুব্ধ মনের ক্রুদ্ধ কথা, অতএব বেদবাক্য হিসেবে গ্রাহ্য নয়। সে যাই হােক, এ কথার উত্তরে আমি বলি যে মানুষকে ভাল করা যাক্, ভদ্র করা যায়। পৃথিবীতে সুনীতির চাইতে সুরুচি কিছু কম দুলভ পদার্থ নয়। পুরাকালে সাহিত্যের চর্চা মানুষকে নীতিমান না করলেও রুচিমান করত। সমাজের পক্ষে এও একটা কম লাভ নয়। ধরে নেওয়া যাক সেকালের নাগরিক সমাজ কাব্যকে মনের বেশভূষার উপকরণ হিসেবে দেখত। তারা যে হিসাবে ওষ্ঠে যুবক ধারণ কতেন সেই হিসাবেই কষ্ঠে শ্লোক ধারণ করতেন। এ অনুমান নিতান্ত অমূলক নয়। সংস্কৃত ভাষায় একটি নাতিষ শ্লোকসংগ্রহ আছে, যার নাম “বিদগ্ধ-মুখ- মণ্ডন”। ওরকম নামকরণের ফলে কাব্য অবশ্য রঙের কোঠায় পড়ে যায়। সে যাই হােক, নাগরিকদের বই পড়া যে একেবারে ভস্মে ঘি ঢালার সামিল ছিল না, এবং তাদের বৈদগ্ধ্য যে তাদের মনুষ্যত্ব অনেকটা রক্ষা করেছিল, একটি উদাহরণের সাহায্যে তার প্রমাণ দিচ্ছি। চরিত্রহীন অথচ কলাকুশল নাগরিকদের সেকালে সাধারণ সংজ্ঞা ছিল. “বিট”। এই বিটের একটি ছবি আমরা মৃচ্ছকটিকে দেখতে পাই। ঐ নাটকের রাজশ্যালক শকারের সঙ্গে বিটের তুলনা করলেই নিরক্ষর ও বিদগ্ধ জনের প্রকৃতির তারতম্য স্পষ্ট দেখতে বই পড়া। । পাওয়া যায়। উভয়েই সমান বিলাস-ভক্ত, কিন্তু শকার পশু আর বিট সুজন। শকারের ব্যবহার দেখলে ও কথা শুনলে তাকে অর্ধচন্দ্র দিতে হাত নিসপিস করে, অপরপক্ষে বিটের ব্যবহারের সৌজন্য, ভাষার আভিজাত', মনের সরসতা এত বেশি যে, তাকে সাদর সম্ভাষণ করে’ ঘরে এনে বসাতে ইচ্ছে যায়-দু’দণ্ড আলাপ করবার জন্য। বৈদগ্ধ্য যে একটি সামাজিক গুণ, এ কথা অস্বীকার করায় সত্যের অপলাপ করা হবে। মার্জিত রুচি, পরিষ্কৃত বুদ্ধি, সংযত ভাষা ও বিনীত ব্যবহার মানুষকে চিরকাল মুগ্ধ করে এসেছে এবং সম্ভবত চিরকাল করবে। এ সকল বস্তু সমাজকে উন্নত না হােতূ অলঙ্কৃত করে। এবং এ সকল গুণ কাব্য ও কলার চর্চা ব্যতীত রক্তমাংসের শরীরে আপনা হতে ফুটে ওঠে না। তবে এ কথা ঠিক যে, প্রাচীন সভ্যতা এ সকল গুণের যতটা মূল্য দিত, আমরা ততটা দিই নে। তার কারণ সে কালের সভ্যতা ছিল aristocratic, আর এ কালের সভ্যতা হতে চাচ্ছে democratic. সেকালে তারা চাইতেন আকার,—আমরা চাই বস্তু। তঁারা দেখতেন মানুষের ব্যবহার, আমরা দেখতে চাই তার ভিতরটা। তাঁরা ছিলেন রূপভক্ত, আমরা গুণলুব্ধ। ক্লাসিক সাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক সাহিত্যের তুলনা করলে এ প্রভেদ সকলেরি চোখে ধরা পড়বে। এ যুগের সাহিত্যমাত্রেই রােমান্টিক, অর্থাৎ---তাতে আর্টের ভাগ কম এবং আত্মার ভাগ বেশি। এর কারণ, এ যুগের কবিরা কাব্যে আত্মপ্রকাশ করেন। এ যুগের কবি জনগণের প্রতিনিধিও নন মুখপাত্রও নন, সুতরাং সে কবির মন নিজের মন, লৌকিক মনও নয়, সামাজিক মনও নয়। আর সেকালের কবিরা সামাজিকদের মনােরঞ্জন করতে চেষ্টা করতেন। সেকালের সামাজিকেরা কলাবিং ছিলেন বলে, সেকালের কবিতা রচনায় বস্তুর অপেক্ষা তার আকারের দিকেই বেশি মনােযােগ দিতে বাধ্য হতেন। সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্রে দেখতে পাই, কবি কি বললেন, তার চাইতে কি ভাবে বললেন তার মর্যাদা ঢের বেশি। সুতরাং নাগরিকদের কাব্যচর্চার ফলে প্রাচীন সাহিত্য যে আর্টিষ্টিক হয়েছে, এ কথা নিয়ে বলা ৪৪ আমাদের শিক্ষা। যেতে পারে। এই সব কারণে আমরা স্বীকার করতে বাধ্য যে নাগরিকদের কাব্যচর্চা একেবারে নিস্ফল হয় নি, কেন না তার গুণে ক্লাসিক সাহিত্য অসামান্য সুষমা ও সামঞ্জস্য লাভ করেছে। কাব্যে আর্টের মূল্য যে কত বড়, সে আলােচনায় আজ প্রবৃত্ত হব না, কেন না সে আলােচনা দু’ কথায় শেষ করবার জো নেই। বহু যুক্তি বহু তর্কের সাহায্যে ও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কেন না আমি পূর্বেই বলেছি এ যুগের ডিমােক্রাটিক আত্মা আর্টকে উপেক্ষা করে, অবজ্ঞা করে, সম্ভবত মনে মনে হিংসাও করে,—বােধ হয় এই কারণে যে, আর্টের গায়ে আভিজাত্যের ছাপ চিরস্থায়িরূপে বিরাজ করে। অথচ ডিমােক্রাসির এ সত্য সর্বদা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, লৌকিক মন বস্তুগত বলেই তা materialism-এর দিকে সহজেই ঝোঁকে। এ বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য আর্টের চর্চা আবশ্যক। বই পড়ার সখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সখ হলেও, আমি কাউকে সখ হিসেবে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাই নে। প্রথমত সে পরামর্শ কেউ গ্রাহ করূবেন না, কেননা আমরা জাত হিসেবে সৌখীন নই, দ্বিতীয়ত অনেকে তা কুপরামর্শ মনে করবেন, কেননা আমাদের এখন ঠিক সখ করবার সময় নয়। আমাদের এই বােগ শােক দুঃখ দারিদ্রের দেশে জীবন ধারণ করাই যখন হয়েছে প্রধান সমস্যা, তখন সে জীবনকে সুন্দর করা মহৎ করার প্রস্তাব, অনেকের কাছেই নিরর্থক এবং সম্ভবত নিৰ্মমও ঠেকবে। আমরা সাহিত্যের রস উপভােগ করতে আজ প্রস্তুত নই; কিন্তু শিক্ষার ফললাভের জন্য আমরা সকলেই উদ্বাহু। আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষা আমাদের গায়ের জ্বালা ও চোখের জল দুই দূর করবে। এ আশা সম্ভবত নয়ই—দুরাশা; কিন্তু তাহলেও আমরা তা ত্যাগ করতে পারিনে, কেননা আমাদের উদ্ধারের অন্য কোনও সদুপায় আমরা চোখের সুমুখে দেখতে পাই নে। শিক্ষার মাহাত্মে আমিও বিশ্বাস করি, এবং যিনিই যা বলুন সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ, সে বিষয়ে বই পড়া। কোনও সন্দেহ নেই। লােকে যে তা সন্দেহ করে, তার কারণ এ শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ তার কোনও নগদ বাজারদর নেই। এই কারণেই ডিমােক্রাসি সাহিত্যের সার্থকতা বােঝে না, বােঝে শুধু অর্থের সার্থকতা। ডিমােক্রাসির গুরুরা চেয়েছিলেন সকলকে সমান করতে, কিন্তু তাদের শিষ্যরা তাদের কথা উল্টো বুঝে প্রতিজনেই হতে চায় বড়মানুষ। একটি বিশিষ্ট অভিজাত সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েও, ইংরাজি সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা ডিমােক্রাসির গুণগুলি আয়ত্ত করতে না পারি, তার দোষগুলি আত্মসাৎ করেছি। এর কারণও স্পষ্ট। ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়। আমাদের শিক্ষিত সমাজের লােলুপ দৃষ্টি আজ অর্থের উপরেই পড়ে রয়েছে, সুতরাং সাহিত্যচর্চার সুফল সম্বন্ধে আমরা অনেকেই সন্দিহান। যারা হাজারখানা Law-report কেনেন, তাঁরা একখানা কাব্যগ্রন্থও কিনতে প্রস্তুত নন, কেননা তাতে ব্যবসার কোনও সুসার নেই। নজির না আউড়ে কবিতা আবৃত্তি করলে মামলা যে দাঁড়িয়ে হারতে হবে, সেত জানা কথা। কিন্তু যে কথা জজে শশানে না, তার যে কোনও মূল্য নেই, এইটেই হচ্ছে পেশাদারদের মহাভ্রান্তি। জ্ঞানের ভাণ্ডার যে ধনের ভাণ্ডার নয়, এ সত্য ত প্রত্যক্ষ, কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও এও সমান সত্য নয় যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের ভাণ্ডার শূন্য, সে জাতির ধনের ভাড়েও ভবানী। তারপর যে জাতি মনে বড় নয়, সে জাতি জ্ঞানেও বড় নয় ; কেননা ধনের সৃষ্টি যেমন জ্ঞানসাপেক্ষ, তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টিও মনসাপেক্ষ। এবং মানুষের মনকে সবল সচল সরগ ও সমৃদ্ধ করবার ভার আজকের দিনে সাহিত্যের উপর ন্যস্ত হয়েছে। কেননা মানুষের দর্শন-বিজ্ঞান ধৰ্ম্ম-নীতি অনুরাগ-বিরাগ আশা-নৈরাশ্য, তার অন্তরের স্বপ্ন ও সত্য-এই সকলের সমবায়ে সাহিত্যের জন্ম। অপরাপর শাস্ত্রের ভিতর যা আছে, সে সব হচ্ছে মানুষের মনের ভগ্নাংশ ; তার পুরাে মনটার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় শুধু সাহিত্যে। দর্শন বিজ্ঞান ইত্যাদি সব হচ্ছে মন- গঙ্গার তােলা জল, তার পূর্ণ স্রোত আবহমান কাল সাহিত্যের ভিতরই সােক্কালে আমার শিক্ষা। সবেগে বয়ে চলেছে; এবং সেই গঙ্গাতে অবগাহন করেই আমরা আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত হব। অতএব দাঁড়াল এই যে, আমাদের বই পড়তেই হবে, কেন না বইপড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ান্তর নেই। ধর্মের চর্চা চাই কি মন্দিরের বাইরেও করা চলে, দর্শনের চর্চা গুহায়, নীতির চর্চা ঘরে, এবং বিজ্ঞানের চর্চা যাদুঘরে ; কিন্তু সাহিত্যের চর্চার জন্য চাই লাইব্রেরি । ও চ চ্চা মানুষে কারখানাতেও করতে পারে না, চিড়িয়াখানাতেও নয়। এ সব কথা যদি সত্য হয়, তাহলে আমাদের মানতেই হবে যে, লাইব্রেরির মধ্যেই আমাদের জাত মানুষ হবে। সেই জন্য আমরা যত বেশি লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার হবে। আমার মনে হয় এদেশে লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয়, এবং স্কুলকলেজের চাইতে কিছু বেশি। এ কথা শুনে অনেকে চমকে উঠবেন, কেউ কেউ আবার হেসে উঠবেন। কিন্তু আমি জানি আমি রসিকতাও করছি নে, অদ্ভুত কথাও বলছি নে; যদিচ এ বিষয়ে লােত যে আমার মতের সমরেখায় চলে না, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। অতএব আমার কথার আমি কৈফিয়ৎ দিতে বাধ্য। আমার বক্তব্য আমি আপনাদের কাছে নিবেদন করছি, তার সত্যমিথ্যার বিচার আপনার করবেন। সে বিচারে আমার কথা যদি না টেকে, তাহলে তা রসিকতা হিসেবেই গ্রা করবেন। আমার বিশ্বাস, শিক্ষা, কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষিত, মাত্রেই স্বশিক্ষিত। আজকের বাজারে বিদ্যার দাতার অভাব নেই, এমন কি এক্ষেত্রে দাতাকর্ণেরও অভাব নেই; এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দুরস্থ করেই নিশ্চিন্ত থাকি,এই বিশ্বাসে যে, সেখান থেকে তারা এতটা বিস্তার ধন লাভ করে ফিরে আসবে, যার সুদে তারা বাকী জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এ বিশ্বাল নিতান্ত অমূলক। মনােরাজ্যেও দান - এ you • খ " বই পড়া ও গ্রহণসাপেক্ষ, অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে গ্রহীতার কথাটা একেবারে ভুলে যাই। এ সত্য ভুলে না গেলে আমরা বুঝতুম যে, শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষা দান করায় নয়, কিন্তু ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায়। শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন, মনােরাজ্যের ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারেন, তার কৌতুহল উদ্রেক করতে পারেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারেন, তার জ্ঞান-পিপাসাকে জলন্ত করতে পারেন—এর বেশি আর কিছু পারেন । যিনি যথার্থ গুরু, তিনি শিষ্যের আত্মাকে উদ্বোধিত করেন এবং তার অন্তর্নিহিত সকল প্রচ্ছন্ন শক্তিকে মুক্ত এবং ব্যক্ত করে তােলেন। সেই শক্তির বলে সে নিজের মন নিজে গড়ে তােলে, নিজের অভিমত বিদ্যা নিজে অর্জন করে। বিদ্যার সাধনা শিষ্যকে নিজে করতে হয়। গুরু উত্তরসাধক মাত্র। আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষার পদ্ধতি ঠিক উল্টো। সেখানে ছেলেদের বিদ্যে গেলানাে হয়, তারা তা জীর্ণ করতে পারুক আর নাই পারুক। এর ফলে ছেলেরা শারীরিক ও মানসিক মন্দাগ্নিতে জীর্ণ শীর্ণ হয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসে। একটা জানাশােনা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা না। আমাদের সমাজে এমন অনেক মা আছেন, যাঁরা শিশুসন্তানকে ক্রমান্বয়ে গরুর দুধ গেলানােটাই শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষার ও বলবৃদ্ধির সর্বপ্রধান উপায় মনে করেন। গােদুগ্ধ অবশ্য অতিশয় উপাদেয় পদার্থ, কিন্তু তার উপ- কারিতা যে ভােতর জীর্ণ করবার শক্তির উপর নির্ভর করে, এ জ্ঞান ও-শ্রেণীর মাতৃকুলের নেই। তাদের বিশ্বাস ও-বস্তু পেটে গেলেই উপকার হবে। কাজেই শিশু যদি তা গিলতে আপত্তি করে, তাহলে সে যে ব্যাদড়া ছেলে, সে বিষয়ে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না। অতএব তখন তাকে ধরে বেঁধে জোর জবর- দস্তি দুধ খাওয়ানাের ব্যবস্থা করা হয়। শেষটা সে যখন এই দুগ্ধপান ক্রিয়া হতে অব্যাহতি লাভ করবার জন্য মাথা নাড়তে, হাত-পা ছুড়তে শুরু করে, তখন স্নেহময়ী মাতা বলেন “আমার মাথা খাও, মরামুখ দেখাে, এই ডােক, আর এক ঢোক, আর এক ঢােক” ইত্যাদি। মাতার উদ্দেশ্য যে খুব সাধু, সে ৪৮ আমাদের শিক্ষা। -- * * * বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই; কিন্তু এ বিষয়েও কোন সন্দেহ নেই যে, উক্ত বলা কওয়ার ফলে মা শুধু ছেলের যকৃতের মাথা খান, এবং ঢােকের পর ঢেকে তার মরামুখ দেখবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে চলেন। আমাদের স্কুলকলেজের শিক্ষা- পদ্ধতিটাও ঐ একই ধরণের। এর ফলে কত ছেলের সুস্থ সবল মন যে infantile liver-এ গতানু হচ্ছে, তা বলা কঠিন। কেননা দেহের মৃত্যুর রেজিষ্টারি রাখা হয়, আত্মার মৃত্যুর হয় না। ( ৭ ) * আমরা কিন্তু এই আত্মার অপমৃত্যুতে ভীত হওয়া দূরে থাক, উৎফুল্ল হয়ে উঠি। আমরা ভাবি দেশে যত ছেলে পাস হচ্ছে তত শিক্ষার বিস্তার হচ্ছে। পাস করা ও শিক্ষিত হওয়া যে একবস্তু নয়, এ সত্য স্বীকার করুতে আমরা কুষ্টিত হই। শিক্ষাশাস্ত্রের একজন জগদ্বিখ্যাত ফরাসী শাস্ত্রী বলেছেন যে, এক সময়ে ফরাসীদেশে শিক্ষা-পদ্ধতি এতই বেয়াড়া ছিল যে, সে যুগে France was saved by her idlers; অর্থাৎ যারা পাস করতে পারে নি, কি চায় নি, তারাই ফ্রান্সকে রক্ষা করেছে। এর কারণ, হয় তাদের মনের বল ছিল বলে কলেজের শিক্ষা তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল ; নয় সে শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করেছিল বলেই তাদের মনের বল বজায় ছিল। তাই এই স্কুল-পালানাে ছেলেদের দল থেকে, সে যুগের ফ্রান্সের যত কৃতকৰ্ম্মা লােকের আবির্ভাব হয়েছিল। সে যুগে ফ্রান্সে কিরকম শিক্ষা দেওয়া হত তা আমার জানা নেই, তবুও আমি জোর করে বলতে পারি যে, এ যুগে আমাদের স্কুলকলেজে শিক্ষার যে রীতি চলছে, তার চাইতে সে শিক্ষাপদ্ধতি কখনই নিকৃষ্ট ছিল না। সকলেই জানেন যে, বিদ্যালয়ে মাষ্টার মহাশয়ের নােট দেন, এবং সেই নােট মুখস্থ করে ছেলেরা হয় পাস। এর জুড়ি আর একটি ব্যাপারও আমাদের দেশে দেখা যায়। এদেশে একদল বাজিকর আছে, যারা বন্দুকের গুলি থেকে আরম্ভ করে উত্তরােত্তর কামানের গােলা পর্যন্ত গলাধঃকরণ করে। তারপর বই পড়া। ৪৯ একে একে সবগুলি উগলে দেয়। এর ভিতর যে অসাধারণ কৌশল আছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই গেলা আর ওলানাে দর্শকের কাছে তামাসা হলেও—বাজিকরের কাছে তা প্রাণান্ত-পরিচ্ছেদ ব্যাপার। ও-কারদানি করা তার পক্ষে যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি অপকারী। বলা বাহুল্য, সে বেচারা ঐ লােহার গােলা-গুলির এক কণাও জীর্ণ করতে পারে না। আমাদের ছেলেরাও তেমনি নােটনামক গুরুদত্ত নানা আকারের ও নানা প্রকারের গােলা-গুলি বিদ্যালয়ে গলাধঃকরণ করে পরীক্ষালয়ে তা উদগীরণ করে দেয়। এর জন্য সমাজ তাদের বাহবা দেয় দিক, কিন্তু মনে যেন না ভাবে যে এতে জাতির প্রাণশক্তি বাড়ছে। স্কুলকলেজের শিক্ষা যে অনেকাংশে ব্যর্থ, সে বিষয়ে প্রায় অধিকাংশ লােকই একমত। আমি বলি শুধু ব্যর্থ নয়, অনেক স্থলে মারাত্মক ; কেননা আমাদের স্কুলকলেজ ছেলেদের স্ব-শিক্ষিত হবার যে সুযােগ দেয় না, শুধু তাই নয়- স্ব-শিক্ষিত হবার শক্তি পর্যন্ত নষ্ট করে। আমাদের শিক্ষা-যন্ত্রের মধ্যে যে যুবক নিষ্পেষিত হয়ে বেরিয়ে আসে তার আপনার বলতে আর বেশি কিছু থাকে না, যদি না তার প্রাণ অত্যন্ত কড়া হয়। সৌভাগ্যের বিষয় এই ক্ষীণপ্রাণ জাতির মধ্যেও জনকতক এমন কঠিন প্রাণের লােক আছে, এহেন শিক্ষা পদ্ধতিও যাদের মনকে জখম করলেও একেবারে বধ কতে পারে না। আমি লাইব্রেরিকে ইস্কুলকলেজের উপরে স্থান দেই এই কারণে যে, এ স্থলে লােক্লে স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দচিত্তে স্ব-শিক্ষিত হবার সুযােগ পায় ; প্রতি লােক তার স্বীয়শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। স্কুলকলেজ বর্তমানে আমাদের যে অপকার করছে, সে অপকারের প্রতিকারের জন্য শুধু নগরে নগরে নয়, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য। আমি পূৰ্ব্বে বলেছি যে, লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয় ; তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল। ৭ আমাদের শিক্ষা। ( ৮ ) অতঃপর আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে, “বই পড়ার পক্ষ নিয়ে এ ওকালতি করবার, বিশেষত প্রাচীন নজির দেখাবার কি প্রয়ােজন ছিল ? বই পড়া যে ভাল, তা কে না মানে?” আমার উত্তরসকলে মুখে মানলেও, কাজে মানে না। মুসলমান ধৰ্ম্মে মানব জাতি দুই ভাগে বিভক্ত--এক যারা কেতাবি, আরেক যারা তা নয়। বাংলার শিক্ষিত সমাজ যে পূৰ্বদলভুক্ত নয়, এ কথা নির্ভয়ে বলা যায়। আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় মােটের উপর বাধ্য না হলে বই স্পর্শ করেন না। ছেলেরা যে নােট পড়ে এবং ছেলের বাপেরা যে নজির পড়েন, সে দুই-ই বাধ্য হয়ে, অর্থাৎ পেটের দায়ে । সেই জন্য সাহিত্যচর্চ। দেশে একরকম নেই বললেই হয়, কেননা সাহিত্য সাক্ষাৎ- ভাবে উদরপূর্তির কাজে লাগে না। বাধ্য হয়ে বই পড়ায় আমরা এতটা অভ্যস্ত হয়েছি যে, কেউ স্বেচ্ছায় বই পড়লে আমরা তাকে নিষ্কর্মার দলেই ফেলে দিই। অথচ একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না, যে জিনিস স্বেচ্ছায় না করা যায়, তাতে মানুষের মনের সন্তোষ নেই। একমাত্র উদর- পূৰ্ত্তিতে মানুষের সম্পূর্ণ মনস্তুষ্টি হয় না। একথা আমরা সকলেই জানি যে, উদরের দাবী রক্ষা না করলে মানুষের দেহ বাঁচে না; কিন্তু একথা আমরা সকলে মানি নে যে, মনের দাবী রক্ষা না করলে মানুষের আত্মা বাঁচে না। দেহরক্ষা অবশ্য সকলেরি কর্তব্য, কিন্তু আত্মরক্ষাও অকৰ্তব্য নয়। মানবের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে যে, মানুষের প্রাণ, মনের সম্পর্ক যত হারায়, ততই তা দুর্বল হয়ে পড়ে। মনকে সজাগ ও সবল রাখতে না পারলে, জাতির প্রাণ যথার্থ স্থা ৰ্ত্তিলাভ করে না। তারপর যে জাতি যত নিরানন্দ, সে জাতি তত নির্জীব ১ একমাত্র আনন্দের স্পর্শে ই মানুষের মনপ্রাণ সজীব সতেজ ও সরাগ হয়ে ওঠে। সুতরাং সাহিত্যচর্চার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে জাতির জীবনীশক্তির হ্রাস করা, অতএব কোনও নীতির অনুসারেই তা কর্তব্য হতে পাবে না,—অর্থনীতিরও নয় ধৰ্ম্মনীতিরও নয়।
বই পড়া কাব্যানুতে যে আমাদের অরুচি ধরেছে, সে অবশ্য আমাদের দোষ নয়, আমাদের শিক্ষার দোষ। যার আনন্দ নেই সে নির্জীব, একথা যেমন সত্য ; যে নির্জীব তারও যে আনন্দ নেই, সে কথাও তেমনি সত্য। আমাদের শিক্ষাই আমাদের নির্জীব করেছে। জাতীয় আত্মরক্ষার জন্য এ শিক্ষার উন্টো টান যে আমাদের টাতে হরে, এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। এই বিশ্বাসের বলেই আমি স্বেচ্ছায় সাহিত্যচর্চার স্বপক্ষে এত বাক্যব্যয় করলুম। সে বাক্যে আপনাদের মনােরঞ্জন করতে সক্ষম হয়েছি কিনা জানিনে। সম্ভবত হই নি ; কেননা আমাদের দুরবস্থার কথা যখন স্মরণ করি, তখন খালি কোমল সুরে আলাপ করা আর চলে না ; মনের আক্ষেপ প্রকাশ করতে মাঝে মাঝেই কড়ি লাগাতে হয়। আপনাদের কাছে আমার আর একটি নিবেদন আছে। এ প্রবন্ধে প্রাচীন যুগের নাগরিক সভ্যতার উল্লেখটা, কতকটা ধান ভাতে শিবের গীত গাওয়া হয়েছে। এ কাজ আমি বিদ্যে দেখাবার জন্য করি নি, পুথি বাড়াবার জন্যও করি নি। এই ডিমােক্রাটিক যুগে aristocratic সভ্যতার স্মৃতি-রক্ষার উদ্দেশ্যেই এ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছি। আমার মতে এ যুগের বাঙালীর আদর্শ হওয়া উচিত প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা, কেন না এ উচ্চ আশা অথবা দুরাশা আমি গােপনে মনে পােষণ করি যে, প্রাচীন ইউরােপে Athens যে স্থান অধিকার করেছিল, ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষে বাংলা সেই স্থান অধিকার করবে। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার বিশেষত্ব এই যে, তা ছিল একধারে dcmocratic এবং aristocratic; অর্থাৎ—সে সভ্যতা ছিল সামাজিক জীবনে democratic, এবং মানসিক জীবনে aristocratic, সেই কারণেই গ্রীক সাহিত্য এত অপূৰ্ব্ব, এত অমূল্য। সে সাহিত্যে আত্মার সঙ্গে আর্টের কোনও বিচ্ছেদ নেই, বরং দু’য়ের মিলন এত ঘনিষ্ঠ যে, বুদ্ধিবলে তা বিশ্লিষ্ট করা কঠিন। আমাদের কর্মীর দল যেমন একদিকে বাংলায় ডিমােক্রাসী গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন, তেমনি আর একদিকে আমাদেরও পক্ষে মনের aristocracy গড়ে তােলবার
আমাদের শিক্ষা।
চেষ্টা করা কর্তব্য। এর জন্য চাই সকলের পক্ষে কাব্য-কলার চর্চা। গুণী ৩
গুণজ্ঞ উভয়ের মনের মিলন না হলে, কাব্য-কলার আভিজাত্য রক্ষা করা
অসম্ভব। সাহিত্য-চর্চা করে দেশসুদ্ধ লােক গুণজ্ঞ হয়ে উঠুক—এই হচ্ছে
দেশের লােকের কাছে আমার সনির্বন্ধ প্রার্থনা।
শ্রাবণ, ১৩২৫।
প্রমথ চৌধুরী।
আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবনসমস্যা। এ স্কুলের কর্তৃপক্ষদের অনুরােধে আজ এ ক্ষেত্রে যে বিষয়ের আলােচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছি, সে বিষয়ের আমি ব্যবসায়ী নই। ছেলে-পড়ানাে এবং স্কুল-চালানাে সম্বন্ধে আমার কোনরূপ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই। প্রথমত আমি কখনও স্কুলমাষ্টারি করি নি ; তার পর আমি নিজে নিঃসন্তান, সুতরাং ঘরেও কোন ছেলের শিক্ষার ভার আমাকে নিজের হাতে নিতে হয় নি; এবং অবস্থার কৃপায় পরের ছেলেরও প্রাইভেট-টিউটরি আমাকে কস্মিনকালে করতে হয় নি। এসব কারণে যদি কেউ বলেন যে, শিক্ষা সম্বন্ধে আমার পক্ষে কথা কওয়া সম্পূর্ণ অনধিকার চর্চা, তার উত্তরে আমার বক্তব্য এই যে, অনেক সময়ে দর্শকের চোখে অনেক জিনিস ধরা পড়ে, যা যারা কোনও বিশেষ কর্মে একান্ত ব্যাপৃত থাকেন তাদের চোখ এড়িয়ে যায় । এ সত্যের পরিচয় দাবা খেলায় নিত্যই পাওয়া যায়। পাকা খেলােয়াড়েরাও আনাড়ির উপরচাল অনেক সময়ে গ্রাহ্য করেন। আমি শিক্ষা বিষয়ে পরের ছেলের উপর কখনাে কোনও experiment করি নি ; কিন্তু বহুকাল থেকে মনােযােগ সহকারে সে experiment-এর পদ্ধতি এবং ফলাফল observe করে আসছি। সেই নির্লিপ্ত observation-এর ফলে আমার মনে শিক্ষার প্রকরণপদ্ধতি সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা জন্মেছে বলে আমার বিশ্বাস, এবং কতকটা সেই বিশ্বাসের বলে এ সভায় মুখ খুলতে সাহসী হয়েছি। এ সাহসের অন্য কারণও আছে। আমি একটি বিশেষ ছাত্রকে খুব ভালরকমই জানি, এবং সে ছাত্র হচ্ছেন স্বয়ং প্রমথ চৌধুরী। আমি বহুকাল পূৰ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করেছি, কিন্তু অদ্যাবধি se বালিগঞ্জ জগদ্বন্ধু বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত আলােচনা সমিতির প্রথম অধিবেশনে পঠিত।
৫৪ আমাদের শিক্ষা। বিদ্যার্থীই রয়ে গিয়েছি। এই বিদ্যার্থীটির শিক্ষার ভার আমি পঠদ্দশাতেই অনেক পরিমাণে নিজের হাতে নিই, তার পর থেকে যিনি ছাত্র তিনিই তার গুরু হয়েছেন। এ সূত্রেও গুরুগিরির সার্থকতা ও ব্যর্থতা সম্বন্ধে আমার কতকটা জ্ঞানলাভ হয়েছে। তাই বলে অবশ্য এ ভুল আমি কখনও করে বসি নি যে, শিক্ষার যে পদ্ধতি ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে উপযােগী, সেই পদ্ধতি সকলের পক্ষে সমান উপযােগী। জ্ঞানের ক্ষুধাও সকলের মনে সমান নয়, তারপর এ বিষয়ে মানুষের রুচিও বিভিন্ন, অধীত-বিদ্যা জীর্ণ করবার শক্তিও কমবেশ। শিক্ষা সম্বন্ধে আমার নিজের অভিজ্ঞতা যে কতদূর সঙ্কীর্ণ ও অশাস্ত্রীয়, সেই জ্ঞান আমার ছিল বলে, আমি ইউরােপের নব শিক্ষাশাস্ত্রের ও কিঞ্চিৎ চর্চা করেছি। (২) শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং উপায় সম্বন্ধে সকল দেশেই পণ্ডিতে পণ্ডিতে নানারূপ মতভেদ আছে। মানুষের মন নিয়ে যেখানে কারবার, সেখানে সকলের পক্ষে একমত হওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব ; তা সত্ত্বেও ইউরােপ ও আমেরিকার বহু শিক্ষাচাৰ্য ও দার্শনিকদের বহুদিনের সমবেত চেষ্টায় শিক্ষারও একটি science এবং Art ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। এ শাস্ত্রকে Science নামে অভিহিত করা নিতান্ত অসঙ্গত নয়। কেননা ছেলেদের মন ও দেহ সম্বন্ধে ইউরােপের বৈজ্ঞানিক মণ্ডলী এমন কতকগুলি সত্য আবিষ্কার করেছেন যা, দেশকাল- নির্বিচারে বালকমাত্রেরই সম্বন্ধে সমান সত্য। এবং এই সত্যের উপরেই শিক্ষার নব-পদ্ধতি গড়ে তোেলবার চেষ্টা হচ্ছে। শিক্ষার এই নব আর্টের সার্থকতা হচ্ছে এই যে, এ আর্টের জ্ঞান থাকলে শিক্ষকেরা ভুল পথে যান না। অর্থাৎ—তঁারা এর সাহায্যে ছেলেদের সুশিক্ষা দিতে পারুন আর নাই পারুন- কুশিক্ষা দেন না। এও একটা কম লাভের কথা নয়। সুচিকিৎসার গুণে রােগী রক্ষা পা আর না পা, কুচিকিৎসার ফলে সে বেচারা মারা যায়। এই শিক্ষা-শাস্ত্রের চর্চা করলে স্কুল মাষ্টারেরা আর হাতুড়ে থাকেন না।
আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবনসমস্যা। আমি আজকের সভায় এই Science এবং আটের আংশিক পরিচয় দেব স্থির করেছিলুম-এই মনে করে যে, সে পরিচয় দিতে গিয়ে আমি বিপদে পড়ব , অর্থাৎ-বিবাদের সৃষ্টি করব না। ইংরাজি ও ফরাসী গ্রন্থ থেকে শিক্ষা সম্বন্ধে যে সকল তথ্য সংগ্রহ করেছি, সে তথ্য বাঙলা করে আপনাদের কাছে নিবেদন করলে, আমি প্রথমত আত্মমত প্রকাশের দোষে দোষী হতুম না, Festa Professor James, Professor Findlay, Professor Dewcy, Alfred Fouille gyro বড় বড় মনীষীদের বাক্যাবলীতে আমার প্রবন্ধ অলঙ্কত করতে পারতুম ; তাতে আমার প্রবন্ধের যে গৌরব বৃদ্ধি হত, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই। সে যাই হােক, যে-কোন বিষয়েরই হােক না কেন, বৈজ্ঞানিক আলােচনার প্রধান গুণ এই যে, সে আলোচনায় আমাদের রাগদ্বেষ প্রকাশ করবার তেমন সুযােগ পাওয়া যায় না, এবং তার ফলে শ্রোতাদের অন্তরেও তাদৃশ রাগদ্বেষ আমরা উদ্রেক করি নে। আর ধর্ম এবং পলিটিক্সের মত, শিক্ষাও যে এ যুগে মানুষে মানুষে একটা মারামারি কাটাকাটির ব্যাপার হয়ে উঠেছে, ইউরােপের আজ একশ বৎসরের ইতিহাস পাতায় পাতায় এই অপ্রিয় সত্যের পরিচয় দেয়। বিশেষত শিক্ষার সমস্যা যখন হয় ধৰ্ম্ম, নয় পলিটিক্সের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন সেই সমস্যা নিয়ে লােক-সমাজকে যে কি পরিমাণ উত্তেজিত করা যায়, তার প্রমাণ এই যে, বর্তমান যুগে ফ্রান্স জর্মানি বেলজিয়াম ইতালি প্রভৃতি দেশে, মধ্যে মধ্যে গুলিগােলার সাহায্যে সে সমস্যার আশু মীমাংসা করা হয়েছে। আর এ কথা আমাদের সর্বদাই স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, জাতীয় শিক্ষা জিনিষটে অতি সহজেই ধম্ম পলিটিক্স ইকনমিক্স প্রভৃতি জাতীয় আধ্যাত্মিক এবং আর্থিক সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে । এর জলজ্যান্ত প্রমাণ আমাদের দেশেও স্বদেশী আন্দোলনের সময় পাওয়া গেছে। তখন পলিটিক্সকে মুখ্য করেই আমরা শিক্ষা সমস্যার একটা নূতন মীমাংসা করবার চেষ্টা করেছিলুম। তার ফল কি দাড়িয়েছে, তা আপনারা সকলেই জানেন। আমরা গড়তে চেয়েছিলুম একটি নব-নালন্দ—আমাদের আমাদের শিক্ষা। হাতে কিন্তু সেটি হয়ে উঠেছে একটি workshop, এ ব্যর্থতার কারণ কি? এর কারণ, আমরা শিক্ষাকে একটি বিশেষ পলিটিক্যাল উদ্দেশ্যসাধনের উপায়- স্বরূপ গণ্য করায়, যথার্থ শিক্ষার কোনও সুব্যবস্থা করতে পারি নি। উত্তেজনার মুখে কোনও কাজ করতে গেলে আমাদের পক্ষে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবারই সম্ভাবনা বেড়ে যায়, বিশেষত সেই সকল ব্যাপারে, যে ব্যাপারে সাফল্য লাভ করতে হলে কিঞ্চিৎ স্থিরবুদ্ধি ও দূরদৃষ্টির সহায়তা দরকার। বলা বাহুল্য লৌকিক আন্দোলনের প্রসাদে লােকের দৃষ্টি একমাত্র বর্তমানের উপরেই আবদ্ধ থাকে, এবং সে অবস্থায় লােকের অন্তরে হৃদয়াবেগ, বিচারবুদ্ধির স্থান অধিকার করে। এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করবার উদ্দেশ্য এই যে, যে-তর্ক আমি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলুম, আপনাদের সেক্রেটারি মহাশয় আমাকে পরােক্ষভাবে সেই তর্কে যােগদান করতেই আহ্বান করেছেন। আজকাল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতকাৰ্যতা নিয়ে দেশে একটা মহা আন্দোলন চলেছে। ফলে একটা দলাদলি সৃষ্টি হবার উপক্রম হয়েছে। এ আন্দোলনে লিপ্ত হতে হলে এর এক পক্ষ, নয় আর এক পক্ষ অবলম্বন করতেই হবে, নচেৎ কোন পক্ষই আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না, দু'পক্ষই সমান নারাজ হবেন। তার ফলে কোন পক্ষই আমার কথার কিছুমাত্র দাম দিতে রাজি হবেন না। অথচ এ ক্ষেত্রে কোন একটা দিক নিয়ে ওকালতি করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘরের খবর জানি নে,-না তার আয়ব্যয়ের হিসাব, না তার অধ্যাপকুণ্ডলীর গুণা- গুণ। বিশ্বসরস্বতীর মন্দিরে তার পূজো অথবা শ্রাদ্ধে দেশের টাকৃ পণ্ডিত- বিদায় কিম্বা কাঙালীবিদায়ে বরবাদ হচ্ছে, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞ। ছাড়া এ ক্ষেত্রে জজ হয়ে বসবার পক্ষে আমার একটু বিশেষ বাধা আছে। আমি হচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ঠিকে অধ্যাপক। এ অবস্থায়, আমার রায়ের নিরপেক্ষতায় কেউ বিশ্বাস করিবেন না। সে রায় যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটুও স্বপক্ষে হয়, তাহলে লােকে বলবে যে আমি ইউনিড়াসিটির মুন খাই বলে আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা। তার গুণ গাচ্ছি ; আর সে রায় যদি উক্ত বিদ্যালয়ের একটুও বিপক্ষে হয়, তাহলে লােকে বলবে যে আমি নিমকহারাম। এই উভয়সঙ্কটে পড়ে আমি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে না-ছুয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে দু’-চারটি সাধারণ কথা বলতে চাই। এ কালে একটি ইউনিভারসিটি চালানাে বহু ব্যয়সাধ্য এবং ইউরােপ আমেরিকার সকল শিক্ষাচার্যের মতে দিনের পর দিন সে ব্যয় বেড়েই যাবে। এক উচ্চ শিক্ষা বন্ধ করা ছাড়া, এ ক্ষেত্রে ব্যয়ভার লাঘব করার উপায়ান্তর নেই। ইউনিভারসিট কমিশনের রিপোের্ট অদ্যাবধি আমার দৃষ্টিগােচর হয় নি, সুতরাং তার ভিতর সাপ ব্যাঙ কি আছে, আমি কিছুই বলতে পারি নে। কিন্তু আমি ভরসা করে বলতে পারি যে, কমিসনের মতে, আমাদের বিশ্ববিদ্যা- লয় যে যথার্থ বিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারে নি, তার অন্তত একটি কারণ তার দারিত্র্য। দরিদ্র বিদ্যালয় যে কি করে বিদ্যার খয়রাত করবে, তার হিসেব পাওয়া কঠিন। এর উত্তরে অনেকে বলেন যে, সু-গৃহিণীর কাজ হচ্ছে আয় বুঝে ব্যয় করা। মায় বাড়াবার চেষ্টা না করে ব্যয় কমাবার দিকে যত্ন করা যারা সুবুদ্ধির কাজ মনে করেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গচ্ছেদের ব্যবস্থা দিচ্ছেন। Post-gra duate শিক্ষা ছেটে দেবার প্রস্তাব চারিদিক থেকে শােনা যাচ্ছে। এরূপ অন্ত্র চিকিৎসার ফলে ইউনিভারসিটির দেহভার অবশ্য অনেকটা লাঘব হয়ে আসবে, তবে তাতে তার স্বাস্থ্য ও শক্তি বাড়বে কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু এ প্রস্তাবের অর্থ কি জানেন ?-বিশ্ববিদ্যালয়ের উওমাঙ্গ ছেদন করা। উচ্চশিক্ষার উচ্চতা নষ্ট করা যে সে শিক্ষার উন্নতির সদুপায়, এ জ্ঞা আমার পূর্বে ছিল না ; আমার চিরকেলে বিশ্বাস এই যে, উচ্চ শিক্ষার সার্থকতা উচ্চ থেকে উত্তরােত্তর উচ্চতর হওয়ায়। উচ্চশিক্ষা সম্বন্ধে সেই ব্যবস্থাই যথার্থ সুব্যবস্থা, যার ফলে সমাজের অবস্থান্তর ঘটে, যার সহায়তায় মানুষ জীবনের নিমন্তর হতে উচ্চস্তরে আবােহণ করে। উচ্চশিক্ষা জিনিসটিকে আমরা যে ৮ আমাদের শিক্ষা। এতদূর বহুমূল্য মনে করি, তার এক মাত্র কারণ—আমাদের বিশ্বাস সে শিক্ষার প্রসাদে মানুষ উচ্চতর জীব হয়। আমার এ কথার উত্তরে উচ্চশিক্ষা সম্বন্ধে যারা ব্যয়-কুণ্ঠ নন তারা বলবেন যে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পােষ্ট-গ্র্যাজুয়েট বিভাগটি আগাগােড়া ফাঁকি ও ভূয়াে। এ বিষয়ে অনুষ্ঠানের ত্রুটি নেই, অথচ কাজে কিছু হয় না। এ বিভাগের কোন কোন ক্ষেত্রে নাকি অধ্যাপক আছে কিন্তু ছাত্র নেই; এবং যে সকল ক্ষেত্রে ছাত্র আছে, সে সকল ক্ষেত্রে অধ্যাপকেরা নাকি একেবারেই অকর্মণ্য। এ কথার প্রতিবাদ আমি করতে পারি নে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভাব- বশত। তবে বিনা প্রমাণে অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে এই অপবাদ গ্রাহ্য করে নিতে আমার মন সরে না। আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের শতকরা। নিরানব্বই জন হচ্ছেন আমাদের স্বজাতি। তাদের বিরুদ্ধে এ অপবাদ যদি সত্য হয়, তা হলে আমাদের জাতীয় বিদ্যাবুদ্ধির অহঙ্কার একদম চুর্ণ হয়ে যায়। সমাজ যদি শিক্ষকদের দুরছাই করে, তাহলে শিক্ষার কি সদগতি হয়? এই অধ্যাপকদের মধ্যে অন্তত এমন জনকতক যদি থাকেন, যারা অধ্যাপনার কাজটি তহিসাবে গ্রহণ করেছেন, তাহলেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত। বাইবেলের সেই পাকা কথাটা আমাদের সর্বদা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, many are called but few are chosen, 973 spratona farfau 16376 chosen few আছেন, সে বিষয়ে সন্দেহ মাত্র নেই। তারপর উচ্চশিক্ষার কোনাে কোনাে বিভাগে যে ছাত্র জোটে না, সে দোষ কি বিশ্ববিদ্যালয়ের, না সমাজের ? B. L. পড়বার জন্য হাজার হাজার ছেলে জোটে, কিন্তু উচ্চ অঙ্গের বিজ্ঞান শেখবার জন্য যে দুই চারিটির বেশি অগ্রসর হয় না, তার কারণ আমাদের মতে আইন: অর্থকরী বিদ্যা ; কাজেই সে বিদ্যা একটা অনর্থকরী হয়ে উঠেছে। এটা অবশ্য খুব আনন্দের বিষয় নয়। আসল কথা এই যে, উচ্চ শিক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদের সংখ্যার উপর নির্ভর আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা। করে না, নির্ভর করে তার উচ্চতার উপর। এস্থলে আমি আমার দার্শনিক গুরু Professor William James-এর গুটিকয়েক কথা উদ্ধৃত করে দেবার লােভ সম্বরণ করতে পারছি নে। তিনি আমেরিকার শিক্ষকমণ্ডলীকে এই সত্য সর্বদা স্মরণ রাখতে বলেন যে- "The renovation of nations begins always at the top among the reflective members of the State,and spreads slowly outward and downward." ইউনিভারসিটি মাত্রেরই উদ্দেশ্য জনকতক reflective members of the State তৈরি করা, এবং তার জন্য উপযুক্ত বন্দোবস্তও রাখা চাই। ( ৪ ) আমরা যে আন্দোলনের সৃষ্টি করেছি, সেটির আসল বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ত লর্ড কার্জনের University Act-এর ঠেলায় বহুদিন যাবৎ এই পথেই চলেছে। এতদিন ত কৈ আমরা এর হালচালের বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য করি নি। আজ কেন হঠাৎ আমরা এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলুম?- এর কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা-পরীক্ষার ফী ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে জনকতক ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পথ পাছে বন্ধ হয়, এই ভয়ে আমরা বিচলিত হয়ে উঠেছি। সম্ভবত তাই হবে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত যে, উচ্চশিক্ষা জিনিসটেই হচ্ছে আক্রা। ধরুন যদি বিশ্ববিদ্যালয় একদম অবৈতনিক হয়ে যায়, তাহলেও দরিদ্র-সন্তানের পক্ষে সেখানে শিক্ষালাভ করা একেবারে অনায়াসসাধ্য হবে না। কেননা প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হবার পরও আরও অন্তত চার-বৎসরের জন্য তার ভরণপােষণের ভার তার পরিবারকেই নিতে হবে। যােল বৎসর বয়সে পৃথি- বীর সকল দেশের ছেলেই উপার্জনক্ষম হয়, সে বয়সে তাকে কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রাখা একমাত্র অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু কি ধনী কি ? আমাদের শিক্ষা। দরিদ্র, সকলেই যদি নিজ নিজ ছেলেদের কর্ম হতে লম্বা অবসর দেন, তাহলে দেশের আর্থিক দুরবস্থা বাড়বে বই কমবে না। এ সমস্যা পৃথিবীর সকল দেশেই উঠেছে, এবং সকল শিক্ষাচার্যের মতে প্রতি জাতিকেই এ বিষয়ে অবস্থা অনুসারে ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এ সমস্যা পৃথিবীর কোন দেশেই বিশ্ব- বিদ্যালয়ের শিক্ষার সমস্যা নয়। এ হচ্ছে Secondary education-এর সমস্যা। ইউরােপ ও আমেরিকার মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের অধিকাংশ ছেলে ১৬ থেকে ১৮ বৎসর বয়সের মধ্যে স্কুলের শিক্ষা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। সুতরাং এই বয়সে তাদের কতদুর সুশিক্ষিত করা যায়, এই হচ্ছে সে দেশের শিক্ষার প্রধান সমস্যা। Secondary education-এর সঙ্গে সামাজিক জীব- নের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ, সুতরাং এ শিক্ষার ব্যবস্থা অবস্থা বুঝেই করতে হয়। উচ্চশিক্ষার কথা কিন্তু স্বতন্ত্র। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষার অবশ্য যােগ আছে, কেননা স্কুলের চৌকাট ডিঙ্গিয়েই কলেজে ঢুকতে হয়। কিন্তু তাহলেও এ দুই শিক্ষার উদ্দেশ্য স্বতন্ত্র, উপায়ও স্বতন্ত্র। আমি পূর্কে বলেছি যে, উত্তে- জনার মুখে বাণ নিক্ষেপ করলে সে বাণ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বর্তমান ক্ষেত্রে হয়েছেও তাই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে যা দাবী করছি, আসলে তা আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার নিকট প্রাপ্য। আমার এ কথা যে সত্য, তার প্রমাণ আমরা post-graduate শিক্ষা বন্ধ করতে চাচ্ছি। ধরুন তা যদি বন্ধু করা যায়, তাহলে যাকে আময়া বিশ্ববিদ্যালয় বলি, তা একটি দু-ভাগে বিভক্ত Secondary School-য়ে পরিণত হবে। আমাদের দেশের B. A এবং B. Sc. দু’জনে পৃথকভাকে যে শিক্ষা অর্জন করেন, জর্মানী প্রভৃতি দেশে যারা school-leaving certificate নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তারা প্রতিজনে ঐ উপরােক্ত দু’জনের শিক্ষার সম্বল নিয়ে জীবন- সংগ্রামে প্রবৃত্ত হয়। সুতরাং আমাদের বদ্ধপরিকর হওয়া উচিত, উচ্চ শিক্ষার মাথা হেঁট করবার জন্য নয়, মাধ্যমিক শিক্ষাকে খাড়া করে তােলবার জন্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা যে অনেক পরিমাণে নিস্ফল হয়, তার মূল আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা। কারণ এই যে, মাধ্যমিক শিক্ষার কঁাচা ভিতের উপর উচ্চ শিক্ষার পাকা এমারত গড়া যায় না। এখন প্রকৃত প্রস্তাবে আসা যাক। বিদ্যাভূষণ মহাশয় আমার এ প্রবন্ধের বিষয় নির্বাচন এবং সেইসঙ্গে নামকরণও করে দিয়েছেন। সে বিষয়ের নাম হচ্ছে আমাদের “শিক্ষা ও বর্তমান জীবনসমস্যা”। আমার মতে নামটা উন্টে দেওয়াই শ্রেয় ছিল, অর্থাৎ-আলােচ্য বিষয়টি যদি “জীবন ও বর্তমান শিক্ষাসমস্যা হত, তাহলে তার আলােচনা কতকটা আমার আয়ত্তের মধ্যে আসত। জীবন জিনিসটি চিরকালই একটা সমস্যা ; আর একমাত্র বিদ্যালয় কোনাে দেশে কস্মিনকালে সে সমস্যার মীমাংসা করতে পারে নি; কেননা শিক্ষা জিনিসটেই হচ্ছে জীবনের একটা বিশেষ অঙ্গ, এবং শিক্ষা-সমস্যাটা জীবন- সমস্যারই অন্তভূর্ত। - শিক্ষার প্রভাব জীবনের উপর অবশ্যই আছে, অন্তত থাকা উচিত কিন্তু সেই সঙ্গে একথাও স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, জাতীয় শিক্ষার উপর জাতীয় জীবনের প্রভাব প্রচ্ছন্ন হলেও প্রচণ্ড। বলা বাহুল্য যে, বিদ্যালয় জাতীয়-জীবন হতেই তার রস রক্ত সংগ্রহ করে, সুতরাং এ কথা নির্ভয়ে বলা যায় যে, শিক্ষার সার্থকতা কিম্বা ব্যর্থতা অনেকপরিমাণে জাতীয় জীবন ও ; জাতীয় মনের ঐশ্বৰ্য্য কিম্বা দৈন্যের উপর নির্ভর করে। স্কুলমাষ্টারের হাতে এমন কোনও পরশপাথর নেই, যার স্পর্শে ছেলেমাত্রেই সােনা হয়ে ওঠে। কি ভৌতিক জগৎ কি মানসিক জগৎ, উভয় ক্ষেত্রেই আলকেমিতে বিশ্বাস আমরা হারিয়ে বসে আছি। এ বিষয়ে মনে দুরাশা পােষণ করলে, অবশেষে আমাদের হতাশ হতেই হবে। প্রচলিত শিক্ষার দৌড় কতটা, সে বিচার না করেই দেশসুদ্ধ লােক তাদের ছেলেদের শিক্ষার সেই চলতি পথটা ধরিয়ে দেন, তারপর যখন দেখেন যে সে পথ ধরে তারা কোন একটা সিদ্ধি কিম্বা ঋদ্ধির রাজ্যে পৌছতে পারলে না, তখন তাঁরা স্কুল কলেজের উপর খড়গহস্ত হয়ে ওঠেন। এক কথায়, তাদের মনে স্কুলকলেজের উপর এক সময়ের অগাধ আমাদের শিক্ষা। এবং অযথা ভক্তি আর এক কালে সমান অগাধ ও অযথা রােষে পরিণত হয়। ছেলে পাস না করতে পারলে স্কুলকলেজের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, এমন বাপ-মা এদেশে দুলভ নয়। বলা বাহুল্য এরূপ মনােভাবের মূলে যতটা পুত্রবাৎসল্য আছে, ততটা বিচারবুদ্ধি নেই। আর এ কথাও নিশ্চিত যে, একমাত্র হৃদয়াবেগের বলে পৃথিবীটিকে জয় করা যায় না। কামনা শুধু আমাদের সাধনার পথ নির্দেশ করে দিতে পারে, তার বেশি কিছু পারে না। সুতরাং শিক্ষার কাছ থেকে কি ফল আমরা কামনা করি, প্রথমেই সেটি জানা দরকার। ( ৬ ) বিদ্যাভূষণ মহাশয় যে প্রশ্ন সাধু ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন, তার সাদা বাঙলা হচ্ছে—“আমাদের লেখাপড়ার সঙ্গে আমাদের পেটের সম্বন্ধ কি”? এ প্রশ্নটা অবশ্য মানুষে না জিজ্ঞাসা করে থাকতে পারে না, কেন না পেটের ভাবনা আমাদের অধিকাংশ লােকেরই আছে, তারপর আমাদের সম্প্রদায়ের লােক, অর্থাৎ-বাঙালী মধ্যবিত্ত ভদ্রলােকের পক্ষে এ ভাবনা সব চাইতে বড় ভাবনা এবং তাদের আশা যে স্কুল কলেজের শিক্ষার কৃপায় তাঁদের ছেলেরা হয় রসনা নয় লেখনীর সাহায্যে, শুধু যে-দুধেভাতে থাকবে তাই নয়, গাড়ি-ঘােড়াও চড়বে। আর যদি তা না হয় ত সে স্কুল কলেজের দোষ। বলা বাহুল্য যে, এ ইকনমিক-সমস্যার পুরণ, বিদ্যালয়ে একহাতে করতে একেবারে অসমর্থ। আমাদের জাতীয় দৈন্তের কারণ-অনুসন্ধান করতে হলে স্কুল কলেজের বাইরে বহুদূরে যেতে হবে, এবং জীবনের অপর সকল ক্ষেত্রে গিয়ে পড়তে হবে। যুবকদের জীবনসংগ্রামের উপযােগী করে গড়া অবশ্য শিক্ষার একটি প্রধান কিন্তু একমাত্র অর্থের দিকে নজর রাখলে আমরা শিক্ষার সকল অঙ্গ এবং সম্ভবত উত্তমাঙ্গই দেখতে পাব না। দেশসুদ্ধ স্কুল কলেজকে রাতারাতি Technical school-য়ে পরিণত করলে আমরা সভ্যতার উচ্চতম শিখরে এক লক্ষে যে আরােহণ করব না সে কথা বলাই বৃথা, যে কথা বলা প্রয়ােজন সে অঙ্গ, আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা । হচ্ছে এই যে, উক্ত উপায়ে আমরা যে শিল্প-বাণিজ্যে চোখের পলক না ফেলতেই ইউরােপের উপর টেকা দেব তার কোনই সম্ভাবনা নেই। একমাত্র Technical School-এর শিক্ষাও যে বিশেষ কোনাে কাজের হয় না, এ হচ্ছে ইউরােপের পরীক্ষিত সত্য। টেকনিকাল স্কুলে শিখে নাকি লােকে শুধু টেকনিকাল স্কুলের মাষ্টারি করতেই শেখে। হাতে কলমে শিল্প শেখবার যথার্থ স্থান হচ্ছে কারখানা আর তার বৈজ্ঞানিক অংশ শেখবার যথার্থ স্থান হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। এই কারণে যারা কারখানায় কাজ করে তাদের সেই কাজের Science শেখবার জন্য কোনাে কোনাে ইউনিভারসিটিতে এক একটি বিশেষ বিভাগ খােলা হয়েছে। কেননা একদিকে যেমন হাতে ধরে না শিখলে যথার্থ শিল্পী হওয়া যায় না, অন্য দিকে তেমনি বৈজ্ঞানিক শিক্ষার অভাবে বড় শিল্পী হওয়া যায় না। এই সব কারণে আমার মতে শিক্ষা সম্বন্ধে মূল প্রশ্নটা হচ্ছে তার সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের সম্বন্ধটা কি? ইহলােকে মস্তিষ্কই আমাদের একমাত্র নিয়ন্তা, হস্তপদাদি সব তার আজ্ঞাবহ অনুচর মাত্র। ( ৭ ) শিক্ষার যথার্থ উদ্দেশ্য কি, সে বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, শিক্ষাকে মানব-জীবনের কোনাে একটি সঙ্কীর্ণ উদ্দেশ্য সাধনের উপায়স্বরূপ মনে করলে সে শিক্ষা হয় নিস্ফল হয়, নয় তার ফল ভাল হয় না। আমাদের মনাে- মত কোনও একটি বিশেষ ছাঁচে সকলকে ঢালাই করা শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়, কেন সে উদ্দেশ্য সাধন করবার এ যুগে কোনাে উপায় নেই। ইউরােপে দেখা গিয়েছে যে, ও-হেন চেষ্টার ফলে শিক্ষকদের সেই মনগড়। ছাঁচ অধিকাংশ স্থলে ভেঙ্গে গিয়েছে এবং যেখানে ভাঙ্গে নি, সেখানে যারা তাতে ঢালাই হয়ে এসেছে তারা মানুষ না হয়ে জড়পদার্থ হয়েছে, এবং তাদের নিয়ে সমাজকে যথেষ্ট ভুগতে হয়েছে। মানুষ ধাতু নয়, কিন্তু দেহমনে একটি organism, এবং এই organism-এর ফুর্তির সহায়তা করাই শিক্ষার একমাত্র কাজ ; এক কথায় শিক্ষার ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতি সাধনের দ্বারা জাতীয় জীবনের ৬৪ আমাদের শিক্ষা। উন্নতি সাধন। মনে রাখবেন যে, আমরা যাকে জাতি বলি সে হচ্ছে আসলে কতকগুলি ব্যক্তির সমষ্টি এবং তাছাড়া আর কিছুই নয়। আর ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যখন মনের ও শক্তির পার্থক্য এবং তারতম্য আছে তখন শিক্ষারও এক উদ্দেশ্য হতে পারে না। শিক্ষার সেই ব্যবস্থাই সুব্যবস্থা যাতে বহু লােকের ব্যক্তিত্ব স্থত্তি লাভ করে এবং যার ফলে জাতীয় শক্তি নানা দিকে বিকশিত হয়ে ওঠে এবং জাতীয় জীবন অপূৰ্ব বৈচিত্র্য ও ঐশ্বৰ্য লাভ করে। সকলের মাথাই যে ইউনিভারসিটির ক্ষুরে মােড়াতে হবে এমন কোনই কথা নেই। দেশসুদ্ধ লােকের মানুষ হওয়া চাই, কিন্তু সকলেরই পণ্ডিত হবার দরকার নেই। শিক্ষার এ উদ্দেশ্য যে সকলে সহজে মানতে চান না, তার কারণ, এদেশে আজও সকলে মানুষকে জীবহিসেবে দেখেন না, অনেকেই যন্ত্র হিসেবেই দেখেন। তারপর অপরাপর জীবের সঙ্গে মানুষের একটি প্রকাণ্ড তফাৎ আছে। মানুষের অন্তরে মন বলে একটি পদার্থ আছে, জীবজগতের অপর কোনাে প্রাণীর ভিতর যা নেই। পশু পক্ষীরা আজ তিন হাজার বৎসর পূর্বে যে যেখানে ছিল, আজও ঠিক সেইখানেই রয়েছে। কিন্তু মানবসমাজ এই তিন হাজার বৎসরের মধ্যে জ্ঞানে বিজ্ঞানে শিল্পকলায় অম্নে বস্ত্রে ধনে রত্নে যে এতটা ঐশ্বর্য- বান হয়ে উঠেছে, মানুষ যে আজ এ পৃথিবীর অদ্বিতীয় প্রভু, সে পরিণতির মূলে আছে তার মানস-বল। মানুষের উন্নতির কারণ এই যে তার মনকে শিক্ষা দেওয়া যায়,অর্থাৎ—তার আত্মশক্তিকে ফোটানােও যায় বাড়ানােও যায়। আমরাই হচ্ছি একমাত্র সেই শ্রেণীর প্রাণী যারা তাদের অভিজ্ঞতা সঞ্চিত করতে পারে, এবং তা পরস্পরকে আদান প্রদান করতে পারে। আমরাই শুধু মনের কারবার করতে পারি এবং সেই সঙ্গে জ্ঞানের মূলধনও বাড়াতে পারি। শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, আজ যারা ছেলে আর কাল যারা মানুষ হবে, পূর্ব পুরুষের সঞ্চিত জ্ঞানের তাদের উত্তরাধিকারী করা, এবং সেই সঙ্গে তাদের অন্তরে নূতন জ্ঞান সঞ্চয় করা ও নূতন কৰ্ম্ম-কৌশল লাভ করবার প্রবৃত্তি ও শক্তির উােেধন করা। যে যতটা জ্ঞান আত্মসাৎ করতে পারে, এবং যতটা আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা। কৰ্ম্ম-শক্তি লাভ করতে পারে, সে ততট। শিক্ষিত। কিন্তু দুই-ই হচ্ছে আসলে মনের জিনিষ এবং এ-দু’য়ের ভিতর সম্বন্ধ অতি ঘনিষ্ঠ। জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয় করাই বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতির সর্বপ্রধান উদ্দেশ্য। একটা ইংরাজি বচন আমাদের মনের উপর এ যুগে অযথা রকম আধিপত্য লাভ করেছে, সে হচ্ছে struggle for existence, এ কথা নিত্য শুনতে পাওয়া যায় যে, সেই শিক্ষাই যথার্ণ শিক্ষা বা আমাদের struggle for existence-এর সহায়। ঐ মন্ত কথাটার সাদা অর্থ হচ্ছে “আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা”। এ প্রচেষ্টা জীব-মাত্রেরই অস্থি মজ্জাগত, এবং যেহেতু আমরাও জীব সে কারণ ও-প্রবৃত্তি আমাদের পক্ষেও নৈসর্গিক। কিন্তু পশু-পক্ষীর সঙ্গে আমাদের প্রভেদ এই যে আমাদের ভিতর উপরন্তু আর একটি প্রবৃত্তি আছে, যার নাম আত্মােন্নতির প্রবৃত্তি। আমার শুধু আত্মরক্ষা করেই সন্তুষ্ট থাকিনে, মনে ও চরিত্রে মনুষ্যত্বের নিম্নস্তর হতে উচ্চস্তরে ওঠবার প্রচেষ্টাও আমাদের প্রকৃতিতে স্বাভাবিক। এবং শিক্ষা হচ্ছে এই প্রচেষ্টার প্রধান সহায়। যদি কেউ বলেন যে তা বটে, তবে আগে আত্ম- রক্ষা পরে আত্মােন্নতি। এর উত্তরে আমার বক্তব্য ও দুয়ের ভিতর ওরূপ পূর্বাপর সম্বন্ধ নেই। আত্মােন্নতির প্রচেষ্টাই যে আত্মরক্ষার প্রকৃষ্ট উপায়, এর প্রমাণ মানবজাতির সভ্যতার ইতিহাস স্পষ্টাক্ষরে দেয়। ( 8 ) মানবজাতির যুগযুগান্তরের সঞ্চিত জ্ঞানে মানুষ মাত্রেরই যে অধিকার আছে এবং সে অধিকারে অধিকারী হলে, মনুষ্যত্ব যে স্মৃৰ্ত্তি লাভ করে এই বিশ্বাসের বলে ইউরােপ ও আমেরিকায় ষ্টেটের খরচায় প্রতি বালককে শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতি বালক শিক্ষিত হতে বাধ্য। এরই ata Compulsory primary education. তারপর বার চৌদ্দবৎসরে এদের মধ্যে অধিকাংশকে জ্ঞানার্জনের দায় হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর প্রধান কারণ economic,দরিদ্রের সন্তানের এই বয়সেই জীবিকা অর্জনের প্রয়ােজন হয়, কেননা তাদের বেশি দিন নিষ্কর্মা আমাদের শিক্ষ। রাখায় তাদের এবং সমাজের সমান ক্ষতি হয়। আরও একটি কারণ আছে। যারা ছেলের মনের খোঁজ রাখেন তাদের মতে কৈশােরে পদার্পণ করবামাত্র অনেক ছেলের মনে কাজ করবার প্রবৃত্তি এবং সেই সঙ্গে জ্ঞান-চর্চায় অপ্রবৃত্তি জন্মায়,—অর্থাৎ তারা বাধা না খেয়ে সংসারে চরে খেতে চায়। সুতরাং ও বয়সে তাদের জোর করে কর্মক্ষেত্র হতে দূরে রাখার কোনই সার্থকতা নেই। নিষ্ক্রিয় হলে যে জ্ঞানী হতেই হবে এমন কোনও নৈসর্গিক নিয়ম নেই। আমা- দের যত ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে তার ভিতর অনেকে যে যুগপৎ অশিক্ষিত ও অকর্মণ্য হয়ে বেরােয় তার অন্যতম কারণ এই যে চৌদ্দ পােনেরো বৎসর বয়সে তাদের মনােমত কাজে তাদের লাগতে দেওয়া হয় নি। তারপর চৌদ্দ থেকে আঠারাে বৎসর বয়েস পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত অল্পসংখ্যক ছেলেদের শিক্ষার জন্য যে ব্যবস্থা করা হয় তার নাম secondary educaticn. ইউরােপে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের অধিকাংশ ছেলেদের বিদ্যালয়ের শিক্ষা এইখানেই শেষ হয়। যৌবনে পদার্পণ করা মাত্র তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। আমাদের সম্প্রদায়ের লােকের পক্ষে এই Secondary education-ই সব চাইতে মূল্য- বান, কারণ এই শিক্ষাই আমাদের অধিকাংশ লােকের জীবনযাত্রার প্রধান সহায়। আঠার বৎসর বয়সে বিদ্যালয় থেকে নানা বিষয়ে সেই শিক্ষালাভ করে বহির্গত হওয়া আমাদের পক্ষে শ্রেয়, যে শিক্ষার ফলে জীবনের যে কোনও কর্মক্ষেত্রে আমরা কৃতিত্ব লাভ করতে পারব। আমাদের economic অবস্থার সঙ্গে এই শিক্ষাই যথার্থ খাপ খায়। সুতরাং এ শিক্ষার যাতে সুব্যবস্থা হয় সেই বিষয়েই আমাদের একান্ত যত্নবান হওয়া কর্তব্য। আর এই বয়েসের মধ্যেই যে যথেষ্ট সুশিক্ষিত হওয়া যায় তার প্রমাণ ইউরােপের সকল দেশেই পাওয়া যাবে। তারপর যে ক'টি বাকী থাকে তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে চেষ্টা করে। এও কতকটা অবস্থার গুণে। উচ্চশিক্ষা ইউরােপের অবস্থাপন্ন সম্প্রদায়ের এক রকম একচেটে বললেও হয়। বাইশ তেইশ বৎসর বয়েস পর্যন্ত এক পয়সা রােজগার না করে পরিবারের অম্নে প্রতিপালিত এবং পরি- আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা। দূর বারের অর্থে উচ্চ শিক্ষিত হতে পারে এমন যুবকের দল সকল দেশেই দুর্লভ। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন যে তবে কি দরিদ্রসন্তান উচ্চশিক্ষা লাভের সুফলে বঞ্চিত হবে ? তার উত্তর অবশ্য হবে যদি না তাদের নিজগুণে Scholarship নেবার ক্ষমতা থাকে। দরিদ্র সমাজও যদি পৃথিবীর সকল ভাল জিনিষে ধনীর সঙ্গে সমান অধিকারী হত তাহলে দারিদ্র্য ত আর কষ্টের কারণ হত না। এরপ হওয়া উচিত কি না, সে হচ্ছে শিক্ষার নয় সমাজের সমস্যা। ইউরােপের বহুলােকের মতে কোনও সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের এতটা অর্থগত পার্থক্য থাকাটা মােটেই মঙ্গলজনক নয়। এদের চেষ্টায় যদি Socialistic State গড়ে ওঠে তাহলে হয়ত mass education এবং high education একাকার হয়ে যাবে। কিন্তু যতদিন সমাজে বড় ঘােটর প্রভেদ থাকবে ততদিন শিক্ষা- রও উচ্চ নীচ প্রভেদ থাকবে। তবে এ সব প্রশ্ন আমাদের মুখে শােভা পায় । এই জাতিভেদের দেশে আমরা সমাজে ছােট বড় প্রভেদ মােটেই করতে চাই নে, তার উপর এদেশে ধনীর অপেক্ষা দরিদ্রেরাই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে বেশি লালায়িত, তার কারণ অধিকাংশ ছেলের বাপ ছেলেকে উচ্চ-শিক্ষিত করতে চান না, সুধু ধনী করতে চান। এবং সেই কারণ উচ্চ- শিক্ষাকে যতদূর সম্ভব সস্তা করবার জন্য সকলে ব্যর্থ। এ মনােভাব স্বাভাবিক হলেও প্রশ্রয় পাবার উপযুক্ত নয়। আমার বিশ্বাস এইরূপ পারিবারিক মনােভাব দিয়ে জাতীয় শিক্ষা-সমস্যার সমাধান করা যায় না। ঘরের প্রদীপ ঘরই আলো করতে পারে কিন্তু বাইরের অন্ধকার ঘােচাতে পারে না; তার জন্য চাই বাইরের আলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষা যে কতটা অকিঞ্চিৎকর সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞান তবে আমার দুঃখের কারণ এই যে, আমাদের দেশের তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত সম্প্রদায় যথার্থ সুশিক্ষিত সম্প্রদায় নন। যদি তারা সত্যই সুশিক্ষিত হতেন তাহলে কোন আপশােষের কারণ থাকত না, কেন না আমার দৃঢ় ধারণা যে যে-জাতির অনেকে সুশিক্ষিত সে জাতির কি আর্থিক কি আধ্যাত্মিক দুই ক্ষেত্রেই উন্নতি অনিবার্য। •• আমাদের শিক্ষা। ( ৯ ) এ সত্য নিঃসন্দেহ সৰ্ববাদী সম্মত যে, যে-শিক্ষা মানুষের মনকে মুক্তি দেয় - শক্তি দেয় না, সে শিক্ষা শিক্ষাই নয়। আর জীবনের উপর যে মনের কোন সু-প্রভাব নেই সে মন মুক্তও নয়, শক্তিশালীও নয়; এক কথায় শিক্ষি- তই নয়। আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় যে জীবনকে চেপে ধরতে পারেন নি, এবং নিজ শক্তিতে তা যে মনােমত করে গড়ে তুলতে পারছেন না, তার প্রমাণ আজকের দিনের এই অন্ন-সমস্যা। এই ব্যর্থতার পরিচয় একমাত্র economic ক্ষেত্রে নয়, জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সমান পাওয়া যাবে। এই নব-শিক্ষার প্রভাব যে আমাদের সামাজিক জীবনের উপর এক রকম নগণ্য—তা কে অস্বী- কার করবে ? আর এ কথাও নিঃসংশয় যে আমরা যাকে ইকনমিক-সমস্যা বলি সেটি আমাদের সামাজিক মনােভাব, সামাজিক চরিত্র ও সামাজিক বিধি নিষেধের, এক কথায় সামাজিক জীবনের বিশেষরূপে অধীন। যদি কোন সমাজের প্রিয়প্রথা ও চিরাগত সংস্কার সকল বর্তমান যুগে Struggle for existence-এর অনুকুল হওয়া দূরে থাক প্রতিকূল হয় তাহলে সে প্রথা ও সে সংস্কার বজায় রেখে জীবন-সংগ্রামে কি করে জয়ী হওয়া যেতে পারে ? একমাত্র রসনা ও লেখনীর বলে ? লেখনী ও রসনার শক্তিতে আমি অবি- শ্বাসী নয়—কিন্তু সে শক্তি সত্যের আশ্রয়েই প্রতিষ্ঠা লাভ করে ও বৃদ্ধি পায়। মনােজগৎ ও বস্তুজগৎ এ উভয় রাজ্যের যথার্থ জ্ঞানের উপরই মানুষের আত্ম- শক্তি প্রতিষ্ঠিত। রসুন ও লেখনী দুইই অবশ্য মিথ্যাকে জন্ম দিতে পারে এবং তাকে প্রশ্রয়ও দিতে পারে, কিন্তু তার দ্বারা ব্যক্তি বিশেষকে কিম্বা জাতি বিশেষকে সুস্থ করতে পারে না, সজ্ঞান করতে পারে না, সক্রিয় করতে পারে । আর সত্যের উপর জীবন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, সত্যপ্রিয় হওয়া চাই সত্যসন্ধিৎসু হওয়া চাই"সত্যসন্ধ হওয়া চাই। বিদ্যালয় ছেলেদের কাছে যুগযুগান্তর-সঞ্চিত জ্ঞানের ভাণ্ডার খুলে দেয়, আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা। সে জ্ঞান আত্মসাৎ করা আর না করা সম্পূর্ণ ছেলের এক্তিয়ার। উচ্চশিক্ষা যুবকদের সঙ্গে মনুষ্যত্বের উচ্চ মনােভাব উচ্চ আইডিয়ালের পরিচয় করিয়ে দিতে পারে—কিন্তু সে ভাব সে আইডিয়াল, যুবকদের মনে ঢুকিয়ে দিলেও সম্পূর্ণ বসিয়ে দিতে পারে না, যদি বাপ মা শিক্ষকের এবং সমাজ বিদ্যালয়ের সহায়তা না করে। ভুলে যাবেন না যে বিদ্যালয় একমাত্র শিক্ষালয় নয়- প্রতি পরিবার এক একটি শিক্ষালয় আর সমাজ হচ্ছে একটি মহাবিদ্যালয় । সমাজ যদি বিদ্যালয়ের উল্টো টান টানে তাহলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার ফল কি হবে? স্কুল কলেজে অর্জিত জ্ঞান আমাদের মনের উপর একটা বােঝমাত্র হয়ে থাকবে, এবং সে ক্ষেত্রে সংগৃহীত আইডিয়াল সুধু বক্তগত হয়ে থাকবে। এখন আমি আপনাদের জিজ্ঞাসা করি, সমাজ কি সত্যই চায় যে স্কুল কলেজের শিক্ষা সত্য সত্যই দেশের ছেলের মনে বসে যাক এবং তারা স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে স্বাধীন ভাবে জীবন যাপন করতে শিখুক? অপর পক্ষে এই কথাটাই কি সত্য নয় যে, সমাজ চায় এই নব-শিক্ষা যেন ছেলেদের মন স্পর্শ না করে ; এবং যে মন দিয়ে স্কুল কলেজের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে হবে আর যে মন দিয়ে জীবনের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে হবে—এ দুই মন সমান্তরাল রেখায় ইংরাজিতে যাকে বলে parallel lines-য়ে চলুক। আমরা চাই যে আমাদের ছেলেরা স্কুলে বলবে পৃথিবী গােল, আর ঘরে এসে মানুবে যে পৃথিবী ত্রিকোণ। কেন না একবার যদি তারা তাদের শিক্ষার দ্বারা আমাদের সামাজিক সংস্কার গুলােকে যাচাই করতে সুরু করে তাহলে তারা হয়ত দেখতে পাবে যে অনেক জিনিস যা আমরা চৌকোশ বলে ধরে নিয়েছি তা সুধু গােল নয়, মহাগােল। এরূপ মনােভাবের মূল কি তা আমি সম্পূর্ণ জানি। আমাদের শিক্ষা একে বিদেশী, তায় আবার নূতন—আর আমাদের সমাজ একে স্বদেশী তায় আবার প্রাচীন, সুতরাং এর একটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে অপরটিকে হীনবীৰ্য্য করে দিতেই হবে। তাই অন্ধ সংস্কারের সাহায্যে আমরা শিক্ষাকে পঙ্গু করে ফেলতে সদাই যত্নবান। • আমাদের শিক্ষা। আমি পূর্বে বলেছি যে, যে শিক্ষায় মানুষের মনকে যুগপৎ মুক্তি ও শক্তি দেয়, সে শিক্ষা শিক্ষাই নয়, কেননা তাতে মানুষকে person করে তােলে না। বহুকাল পূৰ্বে জগৎ-পূজ্য জৰ্মান দার্শনিক কান্ট এই মহাসত্যের আবিষ্কার করেন যে, person শব্দের অর্থ হচ্ছে Self conscious seif-determining individual. মানুষে পশুতে এই খানে তফাৎ যে, পশু মাত্রেই কতকগুলি নৈসর্গিক প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত, তাদের ভিতর personality বলে কোনও জিনিস নেই। এইখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। মানুষের মনে এবং চরিত্রে Self consciousness and self-de termination-এর শক্তি উদ্বুদ্ধ করতে হলে তাকে চিন্তা করবার ও কাজ করবার স্বাধীনতা দেওয়া একান্ত দরকার। তারপর আর একটি কথা আমরা যাকে শক্তি বলি তার অর্থ হচ্ছে reality-র উপর প্রভুত্ব করবার ক্ষমতা—বলা বাহুল্য reality-র জ্ঞান না জন্মালে কেউ আর তার উপর প্রভুত্ব করতে পারে না। আমাদের নব-শিক্ষার প্রসাদে আমাদের reality-র জ্ঞান বাড়া দূরে থাক ক্রমে যে কমে আসছে তার কারণ আমাদের নব-শিক্ষা আমাদের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। শিক্ষা জিনিসটি সব দেশেই একটি সমস্যা। কিন্তু আমাদের পক্ষে সেটি যে এত ভীষণ সমস্যা হয়ে উঠেছে তার প্রধান কারণ সে শিক্ষা আমাদের জীবনের পক্ষে অস্পৃশ্য। আমাদের রাজনৈতিক অবস্থা, ইকনমিক অবস্থা; সামাজিক ব্যবস্থা সবই এমন, যে আমাদের শিক্ষালব্ধ জ্ঞান-বুদ্ধি জীবনের কোন ক্ষেত্রেই খাটাবার আমরা সূযােগ পাই নে, এবং কোনো কোনাে ক্ষেত্রে তা খাটাবার আমাদের অধিকার পৰ্য্যন্ত নেই। এ অবস্থায় মনের সুখে থাকতে পারেন শুধু তঁারা যারা নিজের জীবন স্বচ্ছন্দে কেটে গেলেই পরের জীবনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না, এবং পরের দুরবস্থা যদি কালেভদ্রে চোখে পড়ে ত এই বলে, মনকে আশ্বস্ত করেন যে, সে দুরবস্থা তাদের পাপেরই শাস্তি। কিন্তু এদেশে এমন লােকেরও অভাব নেই যারা এই অতিনিন্দিত নব-শিক্ষার প্রসাদে স্বজাতির এই বর্তমান দুর্গতি সন্তুষ্ট আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা চিত্তে গ্রাহ্য করে নিতে পারেন না, কিম্বা মােটার গাড়ীতে চড়ে কলেজষ্ট্ৰীট দিয়ে যাবার সময় ইউনিভারসিটি Buildings নামক বুরােক্রাট এবং পেটিয়টের সমান চক্ষুশূল সরস্বতীর মন্দিরটকে অম্লান বদনে ভূমিসাং করে দেবারও প্রস্তাব করতে পারেন না। দেশ উদ্ধারের অত সহজ মীমাংসা করবার পক্ষে তাঁদের জ্ঞান ও বুদ্ধি উভয়েই প্রতিবাদী হয়। ভবিষ্যতে বাঙালী জাতি, আমাদেরই অনুরূপ হবে, আমাদেরই মত তারাও নির্জীব, নিরানন্দ এবং পরভাগ্যোপজীবী হয়ে থাকবে, আমাদেরই মত তারা সুধু ধনে নয় মনে ও চরিত্রেও মধ্যবিত্ত হবে, অামাদেরই মত তার। জীবনের উৎসবের দর্শক মাত্র থাকবে, কিন্তু তাতে যােগ- দান করবার অধিকার লাভ করবে না; এ কথা মনে হলে এ শ্রেণীর লােকদের মন নৈরাশ্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তখন জীবনের স্বাদ তাদের মুখে তিতত লাগে। কিন্তু এ নৈরাশ্যকে প্রশ্রয় দিতে আমরা মােটেই চাই নে। একটি ইংরেজ লেখকের কথার পুনরাবৃত্তি করে বলছি যে, খানায় পড়ে থাকলেও আকাশের তারা দেখবার অধিকারে সানুষ বঞ্চিত হয় না। আমাদের ভবি- ষ্যতের গগনে সেই তারা দেখতে পাই বলে আমরা শিক্ষার উন্নতির জন্য এত লালায়িত। যদি কেউ বলেন যে আমরা যা দেখছি সে তারা নয়—আকাশ- কুসুম, তার উত্তর তথাস্তু-কিন্তু তাই বলে খানায় পড়ে থাকাটাই যে বুদ্ধিমানের কাজ, এ কথা মানতে আমরা প্রস্তুত নই। ওঠবার চেষ্টা আমাদেরই করতেই হবে, ফলাফল অদৃষ্টের হাতে। ( ১০ ) আমি বরাবর শিক্ষার উন্নতি, সমাজের উন্নতি, জাতির উন্নতি প্রভৃতি নানারূপ উন্নতির কথা বলে আসছি কিন্তু কি উপায়ে সে উন্নতি সাধন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষ কোনও কথা বলি নি। বর্তমান শিক্ষার সর্বাগ্রে কোন্ সংস্কার করা প্রয়ােজন, সংক্ষেপে সেই কথাটা বলে আমি আমার বক্তৃতা শেষ করব। কারণ আমার ধারণা যে, সে সংস্কার না করে অপর সংস্কার করতে যাওয়া হচ্ছে শিক্ষার গােড়া কেটে আগায় জল দেওয়া।
१२ আমাদের শিক্ষা। = উন্নতি অবশ্য পরিবর্তন সাপেক্ষ। জড়পদার্থের ধর্ম এই যে তার নিজের ভিতর থেকে কোনও পরিবর্তনের তাগিদ আসে না। লােকাষ্ঠ অনন্তকাল পৰ্য্যন্ত এক অবস্থাতেই থাকতে পারে, যদি বাশক্তি তার পরিবর্তন না ঘটায় জীবের ইতিহাস হচ্ছে নিত্য তার অবস্থার পরিবর্তনের কাহিনী। প্রথমত বৃদ্ধির তারপর হ্রাসের। বীজ হতে বৃক্ষ জন্মায়, বড় হয়, একটা সীমা পর্যন্ত বাড়ে তারপর উত্তরােত্তর তার জীবনী-শক্তির হ্রাস হয়ে এসে শেষে তার মরণ দশা উপস্থিত হয়। কিন্তু এই হ্রাসবৃদ্ধি হয় নৈসর্গিক কারণে, এ অবস্থান্তর ঘটার ভিতর তার মনের কিম্বা ইচ্ছার কোন কাৰ্য নেই। তার জীবন-মরণ দুই-ই দৈবাধীন, সে বেচারা অপমৃত্যুকেও এড়াতে পারে না, আত্মহত্যাও করতে পারে না। * মানুষের ধর্ম কিন্তু স্বতন্ত্র। আমাদের দেহের হ্রাসবৃদ্ধির উপর আমাদের বিশেষ কোনও হাত নেই। আমরা ইচ্ছা করিলে পৰ্বত প্রমাণ উচুও হতে পারি নে, চিরদিন দেহে ছােট-ছেলেও থেকে যেতে পারি নে। কিন্তু মনের হ্রাসবৃদ্ধি অনেকটা আমাদের আয়ত্তাধীন। আমরা ইচ্ছা করলে মনে ছােট ছেলেও থেকে যেতে পারি, জ্ঞানী গুণীও হয়ে উঠতে পারি। তাই সমাজ সভ্যতা প্রভৃতি জিনিস মানুষ তার মনােমত করে গড়তে পারে এবং সে গড়ার ভিতর মানুষের ইচ্ছা শক্তিই আসল শক্তি। সংক্ষেপে মানুষে আত্ম-চেষ্টায় তার অবস্থার অশেষ পরিবর্তন ঘটাতে পারে, এবং মানব সমাজের উন্নতি তার অভিপ্রায়কে অনুসরণ করে—সে উন্নতি অদৃষ্ট নয়, পুরুষকারের উপর নির্ভর করে। অপর পক্ষে মানুষ আত্মহত্যাও করতে পারে। মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেকে বদলাতে পারে সে পারে সে বদল উন্নতিও হতে পারে অবনতিও হতে পারে। প্রতি বদলের মুখে এ উভয় সঙ্কটে মানুষকে যে পড়তে হয় সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে এ কথাও নিঃসন্দেহ যে অবনতির ভয়ে যদি মানুষের আত্ম-পরিবর্তনের চেষ্টা বন্ধ করে তাহলে সেই সঙ্গে তার উন্নতির পথও রােধ করা হবে। সুতরাং এ আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা। বিষয়ে মানব-সমাজকে experiment করতে দিতেই হবে, ফলে উন্নতি কি অবনতি হবে তার প্রমাণ ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে। মন ও জীবনের এই লড়ালড়ি পৃথিবীর সকল দেশে চিরদিনই চলে আসছে, কারণ মন চিরকালই জীবনকে নূতন পথ দেখাতে চায়, আর জীবন চিরকালই তার অভ্যস্ত পথ ত্যাগ করতে আপত্তি করে। এ যুগের সৰ্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক Bergson বলেন যে, জীবনের পক্ষে এক জায়গায় জমে গিয়ে জড়-পদার্থে পরিণত হবার দিকে একটা সহজ প্রবণতা আছে, সেই জন্য মনের কর্তব্য হচ্ছে তাকে ক্রমান্বয়ে টেনে তােলা, নূতন নূতন পথে তাকে চালিত করা। নব শিক্ষার সহিত প্রাচীন সমাজের এই লড়াই সব দেশে সব যুগেই হয়ে আসছে। আমাদের দেশে যে হচ্ছে তার ভিতর কিছুমাত্র নূতনত্ব নেই। এমন কি দু-পক্ষ সকল দেশে একই বুলি আওড়ান। নূতন জ্ঞান এবং, তৎপ্রসূত নূতন আইডিয়াল জীবনকে ডেকে বলে, আমাকে অনুসরণ কর, তােমাকে উন্নতির পথে নিয়ে যাব, আর প্রথা-গ্রস্ত জীবন বলে যে-পথে বহুদিন চলে আসছে সে পথ ত্যাগ করলে সৰ্ব্বনাশ হবে, কেননা তােমার ঐ নূতন পথ ত্রিদিবের নয়, রসাতলের পথ। • তবে নূতনত্বের মধ্যে এইটুকু যে অপর দেশে নবশিক্ষা সামাজিক জীবনকে খাড়া করে তােলে আর আমাদের দেশে সামাজিক জীবন নব শিক্ষার কোমর ভেঙ্গে দেয়। এর কারণ কি ?—উত্তরও সহজ, আমাদের নব শিক্ষা বিদেশী শিক্ষা বলেই, জীবনের উপর তার প্রভাব কম। কিন্তু এ উত্তর সহজ হলেও সত্য নয়। পৃথিবীর ইতিহাস যুগ যুগ ধরে, এই সত্যেরই পরিচয় দিচ্ছে যে, এক জাতির মন অপর আর এক জাতির মনের স্পর্শে জেগে ওঠে, সংঘর্ষে সজ্ঞান হয়। কালক্রমে জাতীয় মন যখন নিবে আসবার উপক্রম হয়, তখন বাইরে থেকে তাকে উসকে দেওয়া দরকার। সত্য, তা সে দেশীই হােক বিদেশীই হােক সত্য, এবং সত্য ছাড়া আর কিছুই নয়। এদেশে শিক্ষার এ-দুর্গতির কারণ যে সে শিক্ষা বিদেশী ভাষাতে দেওয়া হয় ।
। আমাদের শিক্ষা। আমরা এই বলে জঁক করি যে ইংরাজি আমরা যেমন শিখি পৃথিবীর অপর কোনও জাত তেমন শিখতে পারে না। কথাটা কিন্তু সত্য নয়। অপর জাতের সঙ্গে নিজেদের তুলনা না করে যদি নিজেদের বিদ্যের বহরটা মেপে দেখি ত, দেখতে পাই যে আমাদের অধিকাংশ লােকের ইংরাজি জ্ঞান যেমন মুষ্টিমেয় তেমনি খেলাে। অধ্যাপকেরা বই না পড়িয়ে নােট দেন বলে তাদের উপর চারধার থেকে আক্রমণ হচ্ছে। কিন্তু এ নােট-দানের কারণ কি ? বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যার্থীদের অধিকাংশের ইংরাজিভাষায় দখল এত কম যে তারা Text-book পড়ে তার মর্ম উদ্ধার করতে পারেন না, নিজের ইংরাজিতে সে মৰ্ম্ম প্রকাশ করা ত তাদের একেবারে সাধ্যের অতীত। অবস্থায় অধ্যাপকদের দায়ে পড়ে, বিশ্ববিদ্যার সার-সংগ্রহ করে তার এমন সব নিরেট বড়ি পাকিয়ে দিতে হয়, ছেলেরা যা কলেজে গিলে সেনেট হলে উগলে । দিতে পারে। ফলে দাড়িয়েছে এই যে, যে যত বেশি বড়ি গিলিয়ে দিতে পারে সে তত ভাল অধ্যাপক, আর যে যত বেশি বড়ি ওগলাতে পারে সে তত ভাল ছেলে। তারপর আর একটি কথা, হাজার অপ্রিয় হলেও সত্যের খাতিরে আমি বলতে বাধ্য। অধ্যাপক মহাশয়দের মধ্যে অনেকের ইংরাজি, জ্ঞান ছাত্র-বাবুদের জ্ঞানের চাইতে বড় বেশি প্রবৃদ্ধ নয়। এর কারণও স্পষ্ট। কাল যারা শিষ্য ছিলেন আজ তারা গুরু। হতে পারে যে জৰ্ম্মাণ ফরাসী ইতালীয়দের চাইতে আমাদের ইংরাজি জ্ঞান বেশি। তার কারণ এ শিক্ষার আমরা যে দাম দিই সে দাম তারা দেয় না। সে দাম হচ্ছে স্ব-ভাষাকে ভাসিয়ে দেওয়া এবং সেই সঙ্গে বাহজ্ঞান হারানাে। বিদেশী ভাষার মারফৎ পাওয়া-শিক্ষা আমাদের মনে বসে না, কথার কথা থেকে যায়। আমি এ সম্বন্ধে পূৰ্বে এত বক্তৃতা করেছি যে এস্থলে তার পুনরুক্তি নিষ্প্রয়ােজন। আমাদের স্কুলে ছেলের মন এবং বস্তুজগতের মধ্যে, ইংরাজি ভাষা একটি পুরু পর্দার মত ঝুলে থাকে, ফলে তাদের মনে reality-র জ্ঞান এক প্রকার নষ্ট হয়েই যায়। বস্তুর সঙ্গে শব্দের সম্বন্ধ যে বাচ্য বাচকের সম্বন্ধ, বালককালে আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা । বিদেশী ভাষা শিখতে গেলে সে জ্ঞান হারানো অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। কারণ, বিদেশী ভাষার শব্দের সঙ্গে বস্তুর কোনও সাক্ষাৎ যােগাযােগ নেই, আছে শুধু স্বদেশী শব্দের সঙ্গে। Translation এবং re-translation-এর প্রসাদে শুধু এক ভাষার সঙ্গে অপর ভাষার সম্বন্ধের জ্ঞান জন্মে। ভাষার সঙ্গে reality-র যােগাযােগের জ্ঞান জন্মে না। স্কুলে এ জ্ঞান একবার হারালে কলেজে এসে আর তার পুনরুদ্ধার করা যায় না। এর প্রমাণ স্বরূপ একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। সম্প্রতি আমি এ বৎসরের প্রাথমিক B L-এর কাগজ পরীক্ষা করছি, শখানেক কাগজ দেখা হয়েছে, তার মধ্যে পাঁচখানিতে moveable এবং immoveable property-র কি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে জানেন?—দু’দিন পরে যারা উকিল হবেন তাদের ধারণা যে-সম্পত্তি অচল, তাই immoveable property, যথা—পৰ্বত; এবং যে-সম্পত্তি সচল তাই হচ্ছে moveable property, যথা-নদী। স্থাবর- অস্থাবর সম্পত্তির প্রভেদট। যে কি তা বাড়ীর চাকর দাসীরাও জানে, কিন্তু স্কুলের ইংরাজি শিক্ষার কৃপায় B. A. B. Sc, রাও জানেন না। একজন লিখেছেন যে, incorporeal property হচ্ছে সেই সম্পত্তি which has no physical existence, জবাব ঠিক হয়েছে, কিন্তু তিনি তার উদাহরণ দিতে গিয়ে copyright ইত্যাদির নাম উল্লেখ না করে, উল্লেখ করছেন “air.” কিমাশ্চর্যমতঃপর! কিন্তু এর চাইতেও আশ্চর্যের বিষয় আছে। যিনি লিখেছেন air হচ্ছে সেই বস্তু যার কোনও physical existence নেই শুনতে পাই তিনি হচ্ছেন B. Sc. পাশ ! এই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে, স্কুলে সকল শিক্ষা ইংরাজি ভাষার মারফৎ হওয়াতেই আমাদের শিক্ষা এতটা নিস্ফল হচ্ছে ? আপনারা যদি Secondary School-য়ে ইংরাজিকে Second language করতে পারেন তাহলে আমার বিশ্বাস দশ বৎসরের ভিতর বাঙালী জাতির মনের চেহারা ফিরে যাবে, এবং তখন দেখা যাবে আমাদের শিক্ষায় ও জীবনে আর আকাশ-পাতাল প্রভেদ নেই।
আমাদের শিক্ষা। *, আমি এই বলে এ প্রবন্ধ আরম্ভ করেছি যে, আমি একজন স্টুডেন্ট এবং সেই ষ্টুডেন্ট হিসেবেই আমি বর্তমান শিক্ষা-সমস্যার আলােচনা করেছি, অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সমস্যাটা কি তাই বুঝতে চেষ্টা করেছি, তার কোনও কাটা-ঘঁটা মীমাংসা করে দিতে সাহসী হই নি। আমি মানি যে পেটের ভাবনা অবশ্য । আমাদের সর্বপ্রধান না হলেও সর্বপ্রথম ভাবনা কিন্তু সেই সঙ্গে এও জানি যে পেট যদি মস্তিষ্কের চালক হয়, তাতে পেটের কিছু লাভ হয় না, কিন্তু মস্তিষ্কের অশেষ ক্ষতি হয়। বাঙালী যে মায়ােয়াড়ি নয় এ দুঃখ আমরা আগেও করেছি। রামমােহন রায় ও রবীন্দ্রনাথের স্বজাতির সর্বনাশ যে literary education-এর ফলে হয়েছে, এই বিশ্বাসের বলে আমরা তথাকথিত Scientific education-এর জন্য লালায়িত হয়ে উঠেছিলুম। ফলে কলেজে একদল ছেলেদের গােড়াথেকেই একমাত্র বিজ্ঞান শিক্ষা দেবার বন্দোবস্ত করা হল। সে শিক্ষার প্রসাদে আমরা কি লাভ করেছি? আমাদের আশা ছিল, যে ছেলেরা কাব্য দর্শন ইতিহাস ব্যাকরণ ত্যাগ করে বিজ্ঞান ধরলেই, এক কথায় লাইব্রেরী ছেড়ে ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেই বঙ্গমাতা অন্নপূর্ণা হয়ে উঠবেন, অন্তত B. Sc.-দের ঘরে টাকা রাখবার আর জায়গা থাকবে না কিন্তু আজ কি দেখতে পাচ্ছি ?—দেশ ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ হয়ে ওঠা দূরে থাক, B. Sc.-র অন্নচিন্তা B, A-র চাইতে একচুলও কম নয়, এবং উভয়ের বাজার-দর এক, বড় বাজারেও, বৌ-বাজারেও। আপনারা এই কথাটা স্মরণ রেখে শিক্ষার নূতন ব্যবস্থা করবেন যে বাঙালী আসলে সরস্বতীভক্ত জাত এবং তারা যেদিন ভাবের চর্চা থেকে বিরত হবে, সেদিন তারা তাদের স্বধৰ্ম্ম হারাবে। রামমােহন, রবীন্দ্রনাথের স্বজাতি কলকারখানা গড়তে না পারুক, তার চাইতে একটা ঢের বড় জিনিস গড়েছে এবং তার নাম হচ্ছে নব-ভারত।
নব-বিদ্যালয়। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চরণেষু - ক্যাটালগ ঘাটা যাদের অভ্যাস আছে, তারাই জানেন যে এমন সব বই আছে যার নাম পড়েই তা পড়তে লােভ হয়। আপনি আমাকে যে ফরাসী বইখানি পাঠিয়েছেন, সেখানি হচ্ছে ঐ জাতের। “নব-বিদ্যালয়”, এই নাম পড়েই, এই বইয়ে অনেক নূতন সত্যের সাক্ষাৎ লাভ করবার আশা আমার মনে জেগে উঠল ; এবং শুনে সুখী হবেন যে, বইখানি আদ্যোপান্ত পাঠ করে সে আশায় আমি নিরাশ হইনি। আমাদের দেশের স্কুলকলেজের প্রতি আমরা অনেকেই যে অসন্তুষ্ট ; তার প্রমাণ ত আমাদের লেখায় বক্তৃতায় নিত্যই পাওয়া যায়। আমাদের স্কুলকলেজে আমাদের ছেলেরা যে মানুষ হচ্ছে না, এ কথা ত ঘরে-বাইরে দু’বেলা শুনতে পাই; কিন্তু কি করলে যে তা হবে, সে বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা বড় বেশি লােকের মাথায় নেই। তা যদি থাকত, তাহলে আমাদের এমন কথা শুনতে হত না যে, ইংরাজি পড়েই বাঙালীর ম্যালেরিয়া হয়েছে। এর পর ছেলেদের স্কুলকলেজ ছাড়িয়ে আবার পাঠশালা ও টোলে পাঠাবার প্রস্তাব দেশহিতৈষী লােকেরা যে করবেন, তাতে আর আশ্চর্য কি? এ প্রস্তাব খুব পেট্রিয়টিক হতে পারে, কিন্তু মােটেই কাজের নয় ; কেননা শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রসর হওয়ার একমাত্র উপায় যে পশ্চাৎপদ হওয়া, এ বিশ্বাস যাদের আছে তারাও সে বিশ্বাস অনুসারে নিজেরা কাজ করতে প্রস্তুত নন। সভা-সমিতিতে স্কুলকলেজের উপর ঝাল ঝেড়ে আমরা নিজেদের ছেলেদের আবার সেই স্কুলকলেজেই পাঠাই। ফল কথা এই যে, যে ভাবে শিক্ষা চলছে সে ভাবে তা চলা উচিত নয়-এ কথা বলায় ততক্ষণ কোনই লাভ নেই, যতক্ষণ না কি করে তা •• ৭৮ আমাদের শিক্ষা। চালানাে উচিত, সে কথা আমরা বলতে পারি সে কথা যে আমরা বলতে পারি নে, তার কারণ শিক্ষা সম্বন্ধে আমরা যেমন অজ্ঞ তেমনি উদাসীন। ইউরােপেও আজকাল সে দেশের সনাতন শিক্ষা-পদ্ধতির প্রতি অনেকেই অসন্তুষ্ট। সেই অসন্তোষের ফলে বেলজিয়ম, জৰ্মাণী, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশে গুটিকয়েক নব-বিদ্যালয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই বইখানিতে এর মধ্যে একটি স্কুলের শিক্ষার প্রকরণ-পদ্ধতির আমূল বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এতে যা আছে তা মামুলি স্কুলের আনাড়ি সমালােচনা নয়। আসলে এতে সরকারি শিক্ষার এক বর্ণও সমালােচনা নেই। গ্রন্থকার স্বয়ং একটি নব-বিদ্যালয়ের অষ্টা এবং সর্বেসর্বা কর্তা। তিনি সুইজারল্যাণ্ডের শিক্ষকমণ্ডলী কর্তৃক অনুরুদ্ধ হয়ে, তার স্কুলের উদ্দেশ্য এবং কাৰ্য্য সম্বন্ধে মুখে যে-সকল কথা বলেছেন, সেই সকল কথা একত্র করে পুস্তকাকারে প্রকাশ করেছেন। গ্রন্থকারের একটু পরিচয় দিই। ইনি ছিলেন বেলজিয়ামের নবইউনি- ভারসিটির একজন অধ্যাপক। এর নাম Faria de Vasconcellos শিক্ষাই এর ধৰ্ম্ম, শিক্ষাই এর কৰ্ম্ম, এবং স্বজাতির শিক্ষার উন্নতিকল্পেই ইনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। প্রফেসার ফারিয়া ১৯১২ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে বেলজিয়ামে ব্রিজ নামক গ্রামে তার এই নব-বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন। জর্মাণরা বেলজিয়াম অধিকার করবার পর এ স্কুল বন্ধ হয়, এবং প্রফেসার ফারিয়া জেনেভায় নির্বাসিত হন। তাঁর অপরাধ, তিনি বিশ্বমানবের সাম্য- মৈত্রী ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, এবং সেই বিশ্বাসের উপরেই তিনি তার নবশিক্ষার পদ্ধতি গড়ে তোেলন। তার মতে, এই যুগযুগান্তরের সভ্যতার ফলে মানুষ তার আদিম পশুত্ব হতে অনেকটা মুক্তিলাভ করেছে, এবং তার দৃঢ় ধারণা যে মানুষের সঙ্গে মানুষের মারামারি কাটাকাটির মূলে যা আছে তা মানবধর্ম নয়—পশুপ্রবৃত্তি। মানুষের অন্তরে তার আদিম হিংস্রতা আজও লুপ্ত হয় নি শুধু সুপ্ত হয়ে রয়েছে। যে শিক্ষার বলে মানুষের ভেদবুদ্ধি প্রবল হয়, সে শিক্ষার ফলে মানুষের আদিম পশুত্ব জেগে ওঠে ; nationalism. প্রভৃতি ৯ --- নব-বিদ্যালয় । কথার সাহায্যে ছেলেদের অন্তরে সেই সুপ্ত ব্যাঘ্ৰকেই জাগ্রত করে ভােলা হয় ; সুতরাং শিক্ষার মন্দির থেকে ও-সকল শব্দ বহিস্কৃত করে দেওয়াই কর্তব্য। তার স্কুলের ছেলেদের মনে তিনি বিদেশী ও বিজাতির প্রতি মৈত্রীর ভাব উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিলেন । তার ফলে তিনি বলেন, তারা মানুষ হয়েছে, কাপুরুষ হয় নি। প্রমাণ, শত্রুর আক্রমণ থেকে স্বজাতি ও স্বদেশকে রক্ষা করবার জন্য তার স্কুলের বড়ছেলেরা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। নিজে পশু না হলে যে, পশুর বিরুদ্ধে দাঁড়ান যায় না—এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন, যদি অনেক বুদ্ধিমান লােকের মত তাই। বেলজিয়ামের উপর জৰ্মাণী যে নিষ্ঠুর ও প্রচণ্ড আঘাত করেছে তাতে প্রফেসর ফারিয়ার উক্ত বিশ্বাস ঘা খেয়েছে- কিন্তু ভাঙ্গা দূরে যা টলেও নি। যখন জৰ্মাণরা সমগ্র বেলজিয়ামকে পদদলিত পীড়িত ও বিধ্বস্ত করছিল, সেই সময়ে তিনি জেনেভা সহরে এই কথা বলেন। “এ দুর্দিনেও মানবসভ্যতার প্রতি আমাদের আস্থা এবং শ্রদ্ধা সমান অটল রয়েছে। আমি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করি যে, ব্যক্তির উপরে, জাতির উপরেও, মানবাত্মা বলে একটি পদার্থ আছে। এই যুদ্ধের পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা ও বীভৎস অত্যারেও মানুষের আত্মার প্রদীপ কখনও নিৰ্বাপিত হবে না; সে অক্ষয় প্রদীপের চিরবর্ধমান শিখা যুগের পর যুগে যত উর্কে আরােহণ করবে, বিশ্বমানবের জীবনের পথ তত আলােকিত হয়ে উঠবে।” এর পর বােধহয় এ কথা স্পষ্ট করে বলবার দরকার নেই যে, প্রফেসার ফারিয়া একজন ঘাের Idealist; কিন্তু তার থেকে যদি কেউ মনে করেন যে তিনি একজন খেয়ালি লােক, এবং তার স্কুল হচ্ছে একটি খামখেয়ালি ব্যাপার, তাহলে তিনি নিতান্তই ভুল করবেন। এই ছােট্ট বইখানির ভিতর তিনি শিক্ষা সম্বন্ধে যে অগাধ জ্ঞান ও অসাধারণ অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন, তা দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়। শিক্ষা জিনিসটে তিনি কবির চোখ দিয়েও দেখেন নি, দার্শনিকের চোখ দিয়েও নয়। সনাতন শিক্ষাপদ্ধতির বিরুদ্ধে তার অভিযােগই এই যে, সে পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক নয়, ও-হচ্ছে আসলে একটি আমাদের শিক্ষা। ; আন্দাজি ব্যাপার। প্রচলিত শিক্ষা, শিশু ও বালকের শরীর মন ও চরিত্রের সম্যক জ্ঞানের উপরে প্রতিষ্ঠিত নয় বলেই, সে-শিক্ষার রীতি হচ্ছে মনােজগতের অন্ধকারে ঢিল মারা। যে সত্য প্রমাণিত ও পরীক্ষিত, সেই সত্যের উপরেই তিনি তার নবশিক্ষাপদ্ধতির প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার স্কুলে ছেলেদের দৈহিক মানসিক ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হত, কিন্তু ধর্মশিক্ষা দেওয়া হত না। প্রফে- সার ফারিয়া পাতায় পাতায় মানবাত্মার উল্লেখ করেছেন; কিন্তু মানবাত্মা বলতে তিনি বােঝেন—মানুষের সেই ব্যবহারিক আত্মা, যার পরিচয় পাওয়া যায় পৃথিবীর দর্শনে, বিজ্ঞানে, কাব্যে, আর্টে, শিল্পে, বাণিজ্যে, সমাজে ও রাষ্ট্রে। তদতিরিক্ত অপর আত্মার সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ নীরব ; সে আত্মার অস্তিত্বে তিনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এ বিশ্বাস তিনি করে যে সে বস্তুকে শিক্ষা দেওয়া—আর যারই হােক-তার সাধ্য নয়। অর্থাৎ-reality-র জ্ঞানের সাহায্যে দেহে মনে ও চরিত্রে সুস্থ সবল সক্রিয় ও সক্ষম মানুষ গড়ে ভােলাই হচ্ছে তার ideal, এবং একমাত্র এই ideal-এরই তিনি ভক্ত। এবং এই ধর্মের সাধনপদ্ধতিই হচ্ছে তার শিক্ষাপদ্ধতি। ( ৩ ) ইমারত গাঁথতে হলে মানুষের পক্ষে সব আগে তার গােড়াপত্তন করা আবশ্যক, এবং তার জন্য চাই জায়গা বাছ। প্রফেসার ফারিয়ার মতে যিনি একটি নববিদ্যালয় স্থাপন করতে চান, তার প্রথম কর্তব্য হচ্ছে ঐ জায়গা বাছাই করা। এই সহজ কথাটা যে মানুষে প্রায়ই ভুলে যায়, তার পরিচয় ত আমরা নিত্যই পাই। আমরা যেখানে একটু ফাক পাই, সেইখানেই স্কুল বসিয়ে দিই। গাছ পোতবার সময়ও আমরা এর চাইতে ঢের বেশি সতর্ক হই; যেন গাছের জীবন মানুষের জীবনের চাইতে বেশি মূল্যবান। প্রফেসার ফারিয়ার শিক্ষা-বিজ্ঞানের প্রথম সূত্র এই যে, স্কুলের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে পল্লীগ্রাম, সহর নয় ! সহর নামক ইটের পর্বতের গুহায় আজন্ম বাস করে মানবসন্তান যে, দেহ মন ও চরিত্রে পূর্ণ-শ্ৰী, পূর্ণ-শক্তি লাভ করবার সুযােগ নব-বিদ্যালয়। ৮১ পায় না,-এ কথা আমরা যােলআনা মানলেও অনেকে এক কড়াও মানেম । খােলা আকাশের তলায় পরিষ্কার আলাে ও বাতাসের মধ্যে বাস করাই যে ছােট ছেলের শরীরের পক্ষে স্বাস্থ্যকর ও মনের পক্ষে শ্রেয়ঙ্কর, এ কথা বুঝতে যাদের দেরি লাগে, তাদের জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, তারা কি স্বচ্ছন্দচিত্তে তাদের ছেলেদের খনির গর্ভে মানুষ হতে দিতে স্বীকৃত হবেন,-হােক না সে খনি বিজুলি বাতিতে আলােকিত আর বিজুলি পাখায় ব্যজনিত? ছােট ছেলের পক্ষে সহর একটি কারাগার মাত্র, সে কারাগারে আমরা যে তাদের বন্ধ করে রাখতে কুণ্ঠিত হই নে, তার কারণ আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি হচ্ছে আসলে জেলের পদ্ধতি। সচরাচর স্কুল যে জেলখানার আদর্শেই গঠিত হয়, এ দুয়ের সাদৃশ্যের প্রতি নজর দিলে সকলেই তা প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। এই জেলখানা থেকে ছেলেদের উদ্ধার করবার মানসেই ইউরােপে এই সব নব-বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। স্বাধীনতাই হচ্ছে এই সব স্কুলের মূলমন্ত্র ; কেননা এদের কর্তৃপক্ষের। এই মহা সত্যের আবিষ্কার করেছেন যে, অবাধ স্বাধীনতার মধ্যেই মানুষ তার মনুষ্যত্ব লাভ করে, অর্থাৎঐ অবস্থাতেই তার দেহ মন ও চরিত্রের পূর্ণ অভিব্যক্তি হয় ; এবং বলা বাহুল্য যে, ছােট ছেলেও মানুষ,কেননা বৃদ্ধত্ব ও মানুষ্যত্ব এক বস্তু নয়। স্বচ্ছন্দে চলবার ফেরবার দৌড়বার লাফাবার জন্য ছেলেদের পক্ষে সে মাঠ চাই, এ কথা যে আজকাল অনেকেই মানেন তার প্রমাণ, সহুরে স্কুলও খেলার মাঠের জন্য লালায়িত। ছেলেরা কিন্তু শুধু জমির উপর ছুটোছুটি করেই সন্তুষ্ট থাকে না, তারা গাছে চড়তে চায়, জলে নাতে চায়। একমাত্র স্থলচর হয়ে তাদের সুখ নেই, মাঝে মাঝে খেচর ও জলচর হতে পারলেই তারা আনন্দে থাকে। এ স্বাধীনতা তাদের দেওয়া একান্ত আবশ্যক। কিন্তু সহরের খেলার মাঠে তারা সাঁতার কাটতে পারে না, ডালেও চড়তে পারে না। সুতরাং স্কুল সেই জায়গাতেই হওয়া উচিত যেখানে মাঠ আছে, গাছ আছে, জল আছে। আমরা সকলেই জানি যে, মানবজাতি তার শৈশবে প্রকৃতির কোলেই • ১১ ৮২ আমাদের শিক্ষা। নূতনত্ব ও সার্থকতার লালিত পালিত হয়েছে। সুতরাং মানব-শিশুর পক্ষে প্রকৃতির কোলেই মানুষ হওয়া স্বাভাবিক ;কেননা যারা ছােট ছেলের মনের খবর রাখেন তারাই জানেন যে, আদিম মানবের সঙ্গে তাদের প্রকৃতির একটা মজ্জাগত মিল আছে। মানবজাতি যেমন প্রকৃতির সঙ্গে কারবার করে’ যুগের পর যুগ ধরে দেখে এবং ঠেকে শিখে সভ্য হয়েছে, শিশুকেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে মানুষ হতে হবে ; এই হচ্ছে নব-বিদ্যালয়ের স্রষ্টাদের মত। প্রকৃতির হাত ধরে এবং প্রকৃতিকে হাতে ধরেই মানুষের মন যে সজ্ঞান এবং সক্রিয় হয়ে ওঠে, এই বিশ্বাসের বলেই নব-বিদ্যালয়ের নব-শিক্ষাপদ্ধতি রচিত হয়েছে। যখন মানসিক শিক্ষার অধ্যায়ে এসে পড়ব, তখন সে পদ্ধতির পরিচয় দেব। এস্থলে এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, শিক্ষার এই নব-পন্থীদের মতে সহুরে স্কুলে তাদের পদ্ধতি অনুসারে শিক্ষা দেওয়া একেবারেই অসম্ভব, সুতরাং স্কুলের স্বস্থান হচ্ছে সহরের বাইরে। স্কুলের আস্তানা সহরের বাইরে হলেও বহুদূরে হওয়া উচিত নয় —এই হচ্ছে প্রফেসার ফারিয়ার মত। তার স্কুল ব্রাসেল থেকে পঞ্চাশ মিনিটের রেলের পথ। স্কুল যে একটি বড় সহরের এক ঘণ্টার রেলপথের বাইরে হওয়া উচিত নয়—এ বিষয়ে তিনি দৃঢ়মত। এ অবশ্য একটি নূতন কথা, সুতরাং এ বিষয়ে তার কি বক্তব্য আছে শােনা যাক। তিনি বলেন- “লােকালয়ের বাইরে স্কুল স্থাপনা করার উদ্দেশ্য এ নয় যে, আমরা ছেলেদের একটা বড় সহরের সংস্পর্শ থেকে একেবারে দূরে রাখতে চাই, কিম্বা রাজধানী নামক সভ্যতার কেন্দ্রস্থলে মানুষের হৃদয়মনের শিক্ষার জন্য যে অতুল ঐশ্বৰ্য্য সঞ্চিত রয়েছে, টষ্টয়ের মত তা প্রত্যাখ্যান করতে চাই। এ কথাটা আমি খুব স্পষ্ট করে খুব উচু গলায় বলতে চাই যে, এই প্রকৃতির কোলে ফিরে আসার অর্থ আমাদের কাছে এ নয় যে, আমরা বনবাসের কোনরূপ অপূৰ্ব্ব মাহাত্ম কিম্বা দৈবী-শক্তিতে বিশ্বাস করি। সেরকম অদ্ভুত বিশ্বাস যে আমাদের নেই—এ কথাটা পরিষ্কার করে বলা আবশ্যক, কেননা নব-বিদ্যালয়। প্রায়ই দেখতে পাই যে এমন লােক ঢের আছেন যাদের ধারণা যে আমাদের নব-বিদ্যালয়ের প্রধান গুণই এই যে, আমরা সহরের সয়তানের বেড়াজাল ছিড়ে পালিয়ে এসেছি। লােকালয়-বহির্ভূত মাঠের মধ্যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করবার সুফল যে কি, তা পূর্বেই বলেছি, কিন্তু সহরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখবার সুফল থেকেও আমরা ছেলেদের বঞ্চিত করতে চাই নে।” / আমাদের ভাষায় বলতে হলে, ব্রহ্মচর্য্য ও বানপ্রস্থ যে একই আশ্রম, প্রফেসার ফারিয়া এ কথা মানেন না। তাঁর মতে শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষকে সংসার থেকে পালাতে শেখানো নয়, তার জন্য তাকে প্রস্তুত করা। প্রথম আশ্রমের সার্থকতা হচ্ছে মানুষকে তার দ্বিতীয় আশ্রমের উপযােগী করায়। স্কুল সন্ন্যাসীর আশ্রমও নয়, ভিক্ষুর মঠও নয়। এঁদের মতে বিদ্যালয় হচ্ছে সংসার-রঙ্গালয়ের নেপথ্যশালা। জীবন নাটকের অভিনয় সকলকেই করতে হবে, সে নাটক ট্রাজেডিই হােক আর কমেডিই হােক; সেই অভিনয় ভাল করে সুন্দর করে করতে শেখানােটাই হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ; সুতরাং সে শিক্ষাশালা প্রথমে নেপথ্যেই রাখা দরকার। শিক্ষানবিশীর যুগে সামাজিক জীবনের যবনিকার অন্তরালে যাবার এও একটা কারণ। এখন দেখা যাক, সহরের সঙ্গে স্কুলের সম্পর্কটা নিকট হওয়ায় ছেলেদের কি লাভ। মানুষের যুগযুগান্তরের জ্ঞানকর্মের ফল প্রতি দেশে বড় বড় সহরেই সঞ্চিত রয়েছে। তারপর যে উপাদানের সাহায্যে জ্ঞান ও কৰ্ম্ম বৃদ্ধি লাভ করে, সে উপাদানও ঐ বড় বড় সহরেই সংগৃহীত হয়। একটি বিষয়ের এখানে উল্লেখ করা দরকার। এই নব-শিক্ষার প্রধান অবলম্বন হচ্ছে বস্তুবই নয়। নব-বিদ্যালয়ে বইয়ের শিক্ষা ছেলের বস্তুজ্ঞানের অনুসরণ করে। এই কারণেই Museum, Zoo, Botanical Gardens প্রভৃতিতে নব-বিদ্যালয়ের ছেলে- দের ঘন ঘন যাতায়াত করতে হয়, এবং বলা বাহুল্য এ সব জিনিষ বড় সহরেই থাকে—পাড়াগাঁয়ে থাকে না। তারপর নব-শিক্ষকের দল, ছেলেদের ভাল ছবি দেখানাে এবং কনসার্ট শােনাননা, তাদের সৌন্দৰ্য-জ্ঞান এবং ।
৮৪ আমাদের শিক্ষা। নেই। সহৃদয়তার অনুশীলনের জন্য একান্ত প্রয়ােজন মনে করেন, এবং উচুদরের ছবি দেখতে হলে, উচুদরের গানবাজনা শুনতে হলে, সহর ব্যতীত গত্যন্তর দেশের বড় বড় বক্তাদের বক্তৃতা শােনাও এঁদের মতে শিক্ষার একটি প্রধান উপায়। ছেলেরা বড় হলে যে-সামাজিক জীবনে প্রবেশ করবে, সেই সমাজিক জীবনের সকল উচ্চ অঙ্গের সঙ্গে ছেলেবেলা থেকেই তাদের সাক্ষাৎ পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার। ছাপার অক্ষরের ভিতর দিয়ে সে পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয় না। সংক্ষেপে, প্রফেসার ফারিয়ার বক্তব্য এই যে, একদিকে যেমন সামাজিক জীবনের যত কিছু কদৰ্য্যতা ও হীনতা সহরে পুঞ্জীভূত হয়েছে, অপর দিকে তেমনি সে জীবনের যত কিছু সৌন্দর্য্য ও মহত্ব ঐ সহরেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সুতরাং সহরের পাপ ও কদৰ্যতা থেকে ছেলেদের দূরে রাখবার জন্য ছেলেদের সহরের বাইরে রাখা যেমন দরকার, সভ্যতার মহত্ব ও ঐশ্বর্যের সঙ্গে তাদের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ করবার জন্য ছেলেদের সহরের সন্নিকটে রাখাও তেমনি দরকার। আর এক কথা। আমি পূৰ্ব্বে বলেছি যে, স্বাধীনতাই হচ্ছে নব-বিদ্যা- লয়ের মূলমন্ত্র। তাই এ শ্রেণীর স্কুলের শাসনতন্ত্র হচ্ছে স্বায়ত্তশাসন। স্কুলের শাসনসংরক্ষণ সবই ছেলেদের হাতে, এমন কি ছেলেদের পঞ্চায়তে মাষ্টার- দের কোনই স্থান নেই। প্রফেসার ফারিয়া এই ছাত্ৰশাসনতন্ত্রের লম্বা বর্ণন করেছেন। সে সব কথা বারান্তরে বলব। এ ক্ষেত্রে এইটুকু বলা দরকার যে, স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখবার জন্য স্কুলের পক্ষে সহরের কাছ ঘেসে থাকা দরকার। কেনাকাটি হাটবাজার ত ছেলেদেরই করতে হয়, তা ছাড়া দরকার পড়লে উকীলের পরামর্শ, এঞ্জিনিয়ারেব পরামর্শ নেওয়া প্রভৃতি প্রাপ্ত বয়স্ক লােকদের কাজও ছেলেদেরই করতে হয়। সহরের বিরাট কৰ্ম্মজীবনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ যে, এবেলা ওবেল। তাদের সহরে যাতায়াত করতে হয়। স্কুলের বিষয়কৰ্ম্মের ভার ছেলেদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য তাদের স্বাবলম্বন শেখানো।
নব-বিদ্যালয়। ; ( ৪ ) এই নব-বিদ্যালয়ের আর একটি নিয়ম আছে, যেটি আমার কাছে ভারি নূতন লাগল। এ স্কুল অবশ্য বাের্ডিং স্কুল, কিন্তু তা হলেও এ স্কুলে সস্ত্রীক হেডমাষ্টার ছাড়া অপর কোনও মাষ্টারকে থাকবার স্থান দেওয়া হয় না। এর প্রথম কারণ, এ স্কুল পরিবারের আদর্শে গড়া। ছেলেরা এ স্কুলে যথার্থই গুরু- গৃহে বাস করে, গুরু এবং গুরুপত্নীই তাদের পিতৃমাতৃস্থানীয় । সংসারে আমরা যেমন এক পরিবারের ভিতর আর এক পরিবারকে স্থান দিতে স্বতঃই নারাজ কেননা ও-দুয়ে ভাল করে খাপ খাওয়ানাে যায় না; তেমনি এই নব-বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের একের বেশি গুরুকে সেখানে স্থান দিতে নারাজ—কেননা, এই পারি- বারিক স্কুলে নানা গুরুকে একত্র রাখলে তাদের পরস্পরকে খাপ খাওয়ানাে যায় । প্রফেসার ফারিয়া বলেন, পূর্ব অভিজ্ঞতার ফলেই তিনি এই নিয়ম করতে বাধ্য হয়েছেন। একাধিক মাষ্টারকে একান্নবর্তী করবার ফলে দুটি একটি নব- বিদ্যালয় ভেঙ্গে গেছে। অনেক সন্ন্যাসীতে যে গাজন নষ্ট হয়—এ হচ্ছে তার কাছে পরীক্ষিত সত্য। তার বিশ্বাস পাঁচটি মাষ্টারকে একত্র রাখলে তাদের ভিতর দলাদলির সৃষ্টি হতে বাধ্য। এ বিষয়ে ভাললােক মন্দলােকের কোন কথা নেই। মানুষ যতই ভাল হােক না, তার ধাত বলে একটা জিনিস আছে, এবং অনেক স্থলে মতে মিললেও, পাঁচজনের ধাতে মেলে না। এবং পাঁচজনে যত কাছাকাছি যত ঘেঁসাঘেসি করে থাকে, তাদের পরস্পরের ধাতু-বৈষম্য তত ফুটে ওঠে। প্রফেসার ফারিয়া বলেন, যে ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের বিদ্বেষ প্রকাশ্য- বিরােধে না দাড়ায়, সে ক্ষেত্রে তা প্রচ্ছন্ন অবস্থায়ই থাকে এবং প্রচ্ছন্ন বিষের মত তা অলক্ষিতে স্কুলদেহকে জর্জরিত করে। এই কারণে স্বয়ং প্রফেসার ফারিয়া ব্যতীত তঁার স্কুলের সকল মাষ্টারই ব্রাসেলসে বাস করতেন—অতএব ব্রাসে হাতের গােড়ায় না থাকলে এ স্কুল চলত না। যদি বলেন, যে-গাঁয়ে স্কুল সেই গাঁয়েই মাষ্টারদের আলাদা বাসা করে দিলেই ত হত, ব্রাসেলস পাঠাবার কি দরকার ছিল ?—তার উত্তর, তার নব- আমাদের শিক্ষা। বিদ্যালয় ক্রোরপতির স্কুল নয়। এদের নব-শিক্ষাপদ্ধতি কার্যে পরিণত করবার জন্য নব-বিদ্যালয়ে বহু মাষ্টার এবং অতি উচুদরের মাষ্টার চাই—কেননা প্রফেসার ফারিয়া বলেন, স্কুলের ভালমন্দ, যারা তা চালায় তাদেরই উপর নির্ভর করে, নিয়মাবলীর উপর নয়। তার ৩৫টি ছেলের স্কুলে ১৭টি মাষ্টার ছিল, এবং এঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিষয়ে এক একটি গণ্যমান্য ব্যক্তি। স্কুলের তহবিলে লাখ দুলাখ টাকা না থাকলে এ দরের মাষ্টারদের সব বাধা-মাইনের চাকর করে রাখা যায় না। এরা প্রায় প্রত্যেকেই ব্রাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক । হপ্তায় একদিন আধদিন এসে এঁরা ছেলেদের শিক্ষা দিয়ে যেতেন। এ কাজ তারা আহলাদের সঙ্গেই করতেন, কেননা সহরে ছদিন সকাল সন্ধ্যে কাজ করে একদিন গাছপালা ফুলফলের দেশে গিয়ে দিনমান ছােট ছেলেদের নিয়ে কাটানতে এরা অতিশয় আনন্দ বােধ করতেন। এই পালায় পালায় পড়ানতে স্কুলের কোনই ক্ষতি হত না; কেননা নব-বিদ্যালয়ে একদিনে পাঁচ বিষয় পড়াবার নিয়ম নেই। একদিনে একটি বড় জোর দুটি বিষয় পড়ানাে হয়, তার বেশি নয়। আজ এই পর্যন্ত। ক্ৰমে অবসর মত, এই নব-বিদ্যালয়ের সবিশেষ পরিচয় দেব। ;
নব-বিদ্যালয় (২)। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীচরণেষু ( ৫ ) আজ আমি শরীরচর্চা সম্বন্ধে নব-বিদ্যালয়ের প্রকরণ-পদ্ধতির কিঞ্চিৎ পরিচয় দেব। আগে থাকতেই বলে রাখি, এ পত্রে মূলের চাইতে টীকাভাষ্য ঢের বেশি হবে, কেননা শরীরের কথাটা এদেশে শুধু বিদ্যালয়ের কথা নয়- লােকালয়েরও কথা। ছেলেবেলায় যে ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে আমরা মানুষ হয়েছি, তার ওষুধের প্রতি শিশির গায়ে, একালের অনেক ওষুধের শিশির গায়ে যেমন বড় বড় লাল হরফে poison ছাপানাে থাকে, তেমনি বড় আর তেমনি লাল হরফে ছাপানাে থাকুত, “শরীরমাদ্যং খলু ধৰ্ম্মসাধন”। এ বচন শাস্ত্রীয় কি উদ্ভট তা জানিনে, কিন্তু ঐ ক’টি কথা আমার মনের মধ্যে একেবারে লাল কালিতে ছেপে গিয়েছে, তার কারণ দশ থেকে চৌদ্দ বৎসর বয়েস পর্যন্ত, এই চার বৎসর ধরে ঐ বাক্যটি আমার চোখের সুমুখে প্রতিনিয়ত ছিল। “শরীরমাদ্যং খলু ধৰ্ম্মসাধন”—এ ধৰ্ম্মজ্ঞান আজ দেশসুদ্ধ লােকের মনে জন্মেছে। তবে উক্ত ধৰ্ম্মের সাধন-পদ্ধতি যে কি, সে বিষয়ে আমাদের তেমন স্পষ্ট ধারণা নেই। নিত্যনিয়মিত ওষুধ খাওয়া যে বলাধানের সদুপায় নয়- এ সম্বন্ধে বােধহয় এক ঔষধবিক্রেতা ছাড়া আর সকলেই একমত। কিন্তু সদুপায়টা যে কি, তা জানবার জন্য শারীর-বিজ্ঞানের কিঞ্চিৎ জ্ঞান সঞ্চয় করা প্রয়ােজন। আমি কিঞ্চিৎ বিশেষণটি ইচ্ছে করেই লাগিয়েছি, কেননা এক্ষেত্রে সাধারণ জ্ঞানের মূল্য বিজ্ঞানের চাইতে নিতান্ত কম নয়।
৮৮ আমাদের শিক্ষা। নব-বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষদের মতে, আজকালকার ভাষায় যাকে বলে দেহের অনুশীলন-তার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহের শক্তি ও সৌন্দৰ্য্য সাধন করা। সৌন্দৰ্য্য জিনিষটে যে শক্তির উপর নির্ভর করে, এ বিষয়ে সকল প্রাচীন সভ্যতাই একমত। রূপ-তা সে দেহেরই হােক আর মনেরই হােল্ক, ভাবেরই হােক আর ভাষারই হােআকারের উপরেই যে নির্ভর করে, এবং আকারের সঙ্গতি ও সৌষ্ঠব যে স্বাস্থ্য ও বলের উপরেই নির্ভর করে, এই হচ্ছে ক্লাসিক মত। দেহের শক্তি ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তােলাই যে দেহচর্চার মুখ্য উদ্দেশ্য- এ-কথা এ-কালেও বােধহয় বেশির ভাগ লােক স্বীকার করেন। অতএব সে উদ্দেশ্যসাধনের সদুপায় কি, এই হচ্ছে শিক্ষার প্রথম সমস্যা। কেননা এ পৃথিবীতে দেহই হচ্ছে প্রাণের ভিত্তি। নব-বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষদের মতে, এর সর্বপ্রধান উপায় হচ্ছে ছেলেদের স্নান আহার নিদ্রার একটা সুব্যবস্থা করা। প্রথমে ঘুমের কথাটাই ধরা যাক। নব-বিদ্যালয়ে ছেলেদের নয় থেকে এগারাে ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা ঘুমতে দেওয়া হয়। তাদের মতে এর কম হলে ছেলেদের স্বাস্থ্য বজায় থাকে না। দিনে যদি ভাল করে জেগে থাকতে হয়, তাহলে রাত্তিরে যে ভাল করে ঘুমনে দরকার, এ বিষয়ে আমি নিজে সাক্ষী দিতে পারি। রাত জেগে পড়ার ফলে ছেলেরা যে দেহমনে ঝিমিয়ে পড়ে, এই প্রত্যক্ষ সত্যকে অগ্রাহ্য না করলে বাঙালী জাতটা আমার বিশ্বাস এর চাইতে ঢের বেশি সজাগ হতে পারত। তারপর নব-বিদ্যালয়ে ছেলেদের শােবার ঘরের দুয়াের-জানালা কখনও বন্ধ করা হয় না। এ বিষয়ে শীত গ্রীষ্মের কোনও তফাৎ নেই। আমাদের এই গরম দেশে আমরা শুধু দরজা-জানালা নয়-শার্শি পর্যন্ত এঁটে সুই ; ঠাণ্ডা লাগবার আমাদের এতই ভয়। কিন্তু রুদ্ধ-ঘরের বদ্ধ-বায়ুর ভিতর মানুষ হওয়ায় আমাদের ছেলেমেয়েদের বাল্যে সর্দিকাশি কামাইও যায় না, কমও হয় না; তারপরে যৌবনে হয় তাদের ক্ষয়কাশ। বাঙলাদেশের এই নব-বিদ্যালয়। রাজধানীতে রাজযক্ষ্মার প্রতাপ,—বিশেষত মেয়েমহলে,যে দিনের পর দিন কি রকম বেড়ে চলেছে, তার সন্ধান যে-কোনও ডাক্তার-কবিরাজের কাছে পাবেন। অবরােধ-প্রথায় যে মানুষের স্বাসরােধ করে, তার প্রমাণ আমাদের ঘরে ঘরে পাওয়া যায়। আলাে-হাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে শুধু মানুষ মারবার জন্য, এরূপ বিশ্বাস করায় ভগবানের উপরেও সুবিচার করা হয় না, নিজের বুদ্ধিরও পরিচয় দেওয়া হয় না। দুয়াের বন্ধ করলেই যে মানুষে তার ভিতর বন্দী হয়—এ জ্ঞান থাকলে, আমরা আমাদের বাসাগারকে কারাগার করে তুলতুম । বাহিরকে বাহির করেরাখলেই ঘর হয়ে পড়ে কবর। দিবারাত্র খােল। হাওয়ার ভিতর বড় হলে, শরীর যে কত সুস্থ ও কত বলিষ্ঠ হয়, তার পরিচয় ঐ নববিদ্যালয়েই পাওয়া গেছে। অধ্যাপক ফারিয়া বলেন যে, তাঁর স্কুলের ছেলেরা এক বৎসর দ্বার-মুক্ত ঘরে ঘুমতে অভ্যস্ত হবার ফলে, তাদের শীত গ্রীষ্ম সহ করবার শক্তি এতটা বেড়ে গেছে যে, তাদের মধ্যে অনেক, দেশ যখন বরফে জমে যায়, সে সময়ও রাত্তিরে সখ করে মাঠের ভিতর তাবু খাটিয়ে তার নীচে শােয়, এবং তাতে তাদের নিউমােনিয়াত বড় কথা—শ্লেষ্মও প্রকুপিত হয় না। এ একটা কম বড় শিক্ষা নয় ; কেননা সকলেই জানেন যে, অকাতরে শীতগ্ৰীয় সহ করবার শক্তির নামই তিতিক্ষা। আর যাতে করে তিতিক্ষা আমাদের অঙ্গের ভূষণ হয়, তার জন্য ত সকলেই চীৎকার করছেন। আর একটি কথা। নব-বিদ্যালয়ের ছেলেদের গ্রীষ্মকালে দিনে ঘুমতে দেওয়া হয়। সে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের “মা দিবাং স্বল্পী” এ নিষেধ মেনে চলতে হয় না। তার কর্তৃপক্ষদের মতে ছেলেদের পক্ষে শুধু গ্রীষ্মকা নয়, সকল কালেই, দিনে অন্তত খানিকক্ষণের জন্য চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা নিতান্ত দরকার, নচেৎ বড় হলে তারা পুরােপুরি খাড়া হয়ে দাড়াতে পারে । অস্থিত-বিদেরা আবিষ্কার করেছেন যে, বায়াে চৌদ্দ বয়েসের আগে ছেলেদের পিঠের দাঁড়া মজবুত হয় না, সুতরাং সে বয়েসে দিনভর দেহের বােঝা বইতে হলে তাদের মেরুদণ্ডটা বেঁকে যায়, নুয়ে পড়ে। অধিকাংশ আমাদের শিক্ষা। লােকের পৃষ্ঠদণ্ড যে ঋজু নয়, তা সভ্যসমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই নজরে পড়ে। দেহের এরূপ বঙ্কিম ভঙ্গীটা সুদৃশ্য ত নয়ই, স্বাস্থ্যকরও নয়। আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা পৃষ্ঠদণ্ডকে ঋজু করা এতই আবশ্যক মনে করতেন যে, তার জন্য তঁাদের হঠযােগের সব ভীষণ প্রক্রিয়া অভ্যাস করতে হত। সময় থাকতে দিনদুপুরে একটু শুয়ে নিলে যদি সেই সুফল লাভ করা যায়, তাহলে তা যে করা কর্তব্য এ বিষয়ে আশা করি দ্বিমত নেই। ( ৬ ) নিদ্রার পরই ওঠে আহারের কথা। কথায় বলে -“আহারনিদ্রা যত বাড়াও তত বাড়ে। এ কথার অর্থ—ও-দুই কমানাে সমান কর্তব্য। নব- বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের। এর প্রথম অংশ গ্রাহ্য করেন, শেষ অংশ করেন না। তাদের মতে ছেলেরা যত ঘুমােয় ঘুমক, কিন্তু তাদের ভােজনের একটা সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া কর্তব্য। সভ্যসমাজের বেশির ভাগ লােক যে মরে অতি ভােজনের ফলে,—উপবাসে নয়, এ জ্ঞান যদি সাধারণ লােকের থাকত, তাহলে পৃথিবীর রােগ সােক অনেকটা কমে আস্ত। আমাদের দেশে এ জ্ঞানের বিশেষ দরকার আছে, কেননা আমরা আর যাই হই, জাত হিসেবে মিতাহারী নই। ভারতবর্ষের ইতিহাস আমাদের পেটের মধ্যেই পাওয়া যায়। আৰ্য মুসলমান ও ইংরাজের, আর কিছু না হােক, আহার আমরা যুগপম্পরায় উদরস্থ করেছি। কাচকলা সিদ্ধ আদি করে কোপ্তা কাবাব চপ কাটলেট সবই আমাদের সমান ভক্ষ্য। পেটে খেলে পিঠে সয়, এ প্রবাদের জন্ম বাঙলাদেশে। অনেকে বলেন যে এতে বাঙালী জাতি তার assimilation শক্তির পরিচয় দেয় ; শুধু তাই নয়, যারা স্বদেশী ডাল রুটির সাহায্যে জীবন ধারণ করে, তাদের আমরা ছাতুখাের বলে অবজ্ঞা করি। আমাদের রসনা বিদেশী ভাষা বেরূপ অনায়াসে আত্মসাৎ করে, আমাদের উদর বিদেশী আহারও তদ্রুপ 'অনায়াসে আত্মসাৎ করে। নানা প্রকারের চ চোষ্য লেহ পেয়ের রসাস্বাদন করায় সম্ভবত ক্ষতি এ নব-বিদ্যালয়। নেই, কিন্তু তার পরিমাণ একটা সীমার ভিতর আবদ্ধ রাখা স্বাস্থ্যনীতির হিসেবে নিতান্ত প্রয়ােজন। Assimilation-এর শক্তি তার প্রবৃত্তির সঙ্গে খাপে খাপে মিলে যায় না। জীর্ণ করবার শক্তির চাইতে আমাদের ভােজন করবার প্রবৃত্তি ঢের বেশি হওয়ায়, বাঙালার যুবকদের হয় মন্দাগ্নি, আর প্রৌঢ়- দের বহুমুত্র। বহু লােকের দেখতে পাই একটা ধারণা আছে যে, ও-দুই বােগর দ্বারা বাঙালী তার চিন্তাশীলতার পরিচয় দেয়। সে ধারণা নিতান্তই ভুল। উদর ও মস্তিষ্ক এক অঙ্গ নয়, এবং এক প্রকৃতির অঙ্গ নয়। এর একটি নিরেট, আর একটি ফাপা ; অতএব এ দুয়ের ক্ষুধাও এক নয়, খােরাকও এক নয়। এর অধমটির খােরাক কম জোগালে উত্তমটির শক্তি বাড়ে। আমার বিশ্বাস এই ঔদরিকতাই আমাদের সকল দুর্বলতার মূল কারণ। আমরা জাতকে জাত যে এতটা স্ত্রী-শাসিত-সেও ঐ পেটের দায়ে। শুতে পাই অপর দেশের স্ত্রীলােকে পুরুষদের হৃদয় তুষ্ট করে তাদের পােষ মানায়- কিন্তু দেখতে পাই এদেশের স্ত্রীজাতি পুরুষদের উদর পুষ্ট করে তাদের বাগ মানায়। রন্ধনই এ দেশে দম্পেত্যের প্রধান বন্ধন। এই সব কারণে, আমার মতে সর্বপ্রথমে আমাদের আহার-বিজ্ঞানের চর্চা করা দরকার; এবং এ শিক্ষা স্কুল থেকে সুরু হওয়াই কর্তব্য। বাল্যকালে অপরিমিত আহার করলে, যৌবনে দুষ্ট ক্ষুধাকে আর শিষ্ট করা যায় না। দেশভেদে জাতির খাদ্যাখাদ্যের ভেদ হয়। সুতরাং বেলজিয়ামের স্কুলের আহারের ব্যবস্থা আমাদের স্কুলে নাও চলতে পারে ; তবে আমরা যখন সর্বভূক, তখন এই কথাটা আমাদের জানা দরকার যে, নব-বিদ্যালয়ে ছেলেদের মাংসভক্ষণ নিষেধ। এ স্কুলে দুধ ঘি আটা, ফল মুল ও শাক সবজিই ছেলেদের প্রধান আহার। (৭) নব-বিদ্যালয়ে স্নান প্রাতঃকৃত্য এবং সায়ংকৃত্য। সেখানে ছেলেদের দিনে দুবার নাইতে হয়, সকালে ঘরে ও বিকালে পুকুরে। বারােমাস সকলের আমাদের শিক্ষা। পক্ষে ঠাণ্ডা জলেরই ব্যবস্থা। গরম জল ওষুধের মত ডাক্তারের প্রিসক্রিপসান ব্যতীত কাউকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। সাঁতার-কাটার সুফলে এঁদের বিশ্বাস এত অগাধ যে, সকল : ছেলেকেই সঁতার শিখতে হয়, এবং নিত্য অভ্যাস করতে হয়। এক সহুরে ছাড়া এদেশের আর সকল ছেলেদের অবগাহন-মান একটা নিত্যনৈমিত্তিক কৰ্ম্ম, সুতরাং এ বিষয়ে দেয় কাছে আমাদের কিছু শেখবার নেই-একটা জিনিস ছাড়া; নব-বিদ্যালয়ের ছেলেদের নেয়ে উঠে গা মুছতে দেওয়া হয় না! বরাদে হাওয়ার তাদের গায়ের জল গায়েই শুকোয়। অর্থাৎ তাদের দেহ থেকে এক ভূতকে আর দুই ভূত দিয়ে তাড়ান হয়—এতে নাকি সে দেহের পঞ্চভূতে মিলিয়ে যাবার সম্ভাবনা অনেকটা কমে আসে। ছেলেরা যাতে করে পুরােদস্তুর sun-dried হয়, তার জন্য আনান্তে তাদের দিগম্বর অবস্থায় থাকতে হয়, কেননা এ বিদ্যা- লয়ের কর্তৃপক্ষদের বিশ্বাস যে, শরীরের কোন অঙ্গকেই অষ্টপ্রহর অসুৰ্যম্পশ্য করে রাখা সঙ্গত নয়। এ কথাটার বিশেষ করে উল্লেখ করবার কারণ, সমাজ- দেহের অর্ধাঙ্গকে অসুৰ্যম্পশ্য করে রাখায় সে দেহ যে সুস্থ থাকে, এ বিশ্বাস কোন কোনও জাতের আছে। সেই সৰ্বনেশে ধারণাকে দূর করতে হলে, আলাে-হাওয়ায় গুণকীৰ্ত্তন ফাঁক পেলেই করা উচিত। ডেরিকৌপীন ধারণ করলে রক্তমাংসের শরীর যে ইস্পাত হয়ে ওঠে, তার কারণ সে শরীরকে রােদে পুড়িয়ে জলে ভােবানাে হয়। স্নান, আহার, নিদ্রা—এ সকলের কাজ হচ্ছে শরীর রক্ষা করা। শরীরকে বলিষ্ঠ ও সক্রিয় করবার জন্য আরও পাঁচরকম উপায় অবলম্বন করতে হয় । সে সকল উপায় মােটামুটি চার শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। (১) খেলা। (২) দৌড় ঝাপ (Sports)। (৩) ব্যায়াম (Gymnastics)। (৪) কাজ।
“নববিদ্যালয় । ৯৩" খেলা সম্বন্ধে প্রধান বক্তব্য এই যে, যে শিশু যত খেলতে ভালবাসে, সে শিশু তত সুস্থ। সুতরাং তার খেলায় বাধা দেওয়ার অর্থ তার দেহমনের শক্তির ক্ষত্তিতে বাধা দেওয়া। শিশুরা দেহের শক্তি ব্যয় করেই যে তা সুদসুদ্ধ আদায় করে, এ কথা জ্ঞানী মাত্রেই জানেন। কিন্তু খেলে বেড়ালে মনেরও যে উপকার হয়, সে বিষয়ে সকলে নিঃসন্দেহ নন। অথচ ওদিকে একটু মনােযােগ করলে সকলেই দেখতে পাবেন যে, খেলার ভিতর বুদ্ধি খেলবার ঢের অবসর আছে। এমন একটা খেলার দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক— পৃথিবীর সকল দেশের সকল ছেলেরাই যুগ যুগ ধরে খেলে আছে। লুকোচুরি খেলা হচ্ছে বিশ্ব-শিশুর নিত্য লীলা। বলা বাহুল্য এ খেলার প্রসাদে অনুসন্ধিৎসা গবেষণা, সমীক্ষা পরীক্ষা, দিগদর্শন পরিদর্শন প্রভৃতি মহামূল্য চিত্তবৃত্তির সম্যক্ অনুশীলন হয়। বৈজ্ঞানিক সত্যের আবিষ্কারের জন্য একটি ছাড়া আর কোন্ চিৎশক্তির প্রয়ােজন হয়?—সত্যকথা বতে, পৃথিবীর মহা মহা বৈজ্ঞানিক দার্শনিকেরা সত্যের সঙ্গে লুকোচুরি ছাড়া আর কি খেলছেন ? ছেলেবেলায় ছেলেদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে লুকোচুরি খেললে, আমরা বড় হলে বিশ্বের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে লুকোচুরি খেলতে পারব। যারা দর্শনবিজ্ঞানের ধার ধারেন না, তাদের পক্ষেও এ খেলায় অভ্যস্ত হওয়া একান্ত প্রয়ােজন। সামাজিক জীবনে মানুষে লুকোচুরি ছাড়া আর কি খেলে ? রাজায় প্রজায়, প্রভু ভৃত্যে, স্ত্রী পুরুষে চিরদিন ত ঐ খেলাই খেলে আসছে; অতএব দাঁড়াল এই যে, শিশুদের খেলায় বাধা দেওয়া শিক্ষকের পক্ষে অকর্তব্য। তারপর তাদের কোনরূপ খেলা শেখানােও শিক্ষকের কর্তব্য নয়। অধ্যাপক ফারিয়া বলেন, শিশুদের খেলা একটু লক্ষ্য করে দেখলেই দেখা যায় যে, তারা নিত্য নতুন খেলা খেলে। তারা কল্পনা রাজ্যের অধিবাসী বলে, এ বিষয়ে তাদের উদ্ভাবনী শক্তি অসীম। তাদের কল্পনাকে তারা এবেলা ওবেলা খেলার রাজ্যে বাস্তব করে তােলে। এতেই তাদের আর্টিষ্টিক শক্তির চরিতার্থতা। সুতরাং খেলার ক্ষেত্রে তাদের একেবারে ছেড়ে না দিলে আমরা যে তাদের শরীরকে জখম আমাদের শিক্ষা। করি, শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে তাদের বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিকে ভোতা করি- আটিষ্টিক শক্তিকে চেপে দিই। এ সব কথা যদি সত্য হয়, তাহলে :- উঠ শিশু মুখ থােও, পর নিজ বেশ, আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ” এই শ্লোকটি হইতে পাঠেতে” শব্দটি বহিষ্কৃত করে দিয়ে তার স্থলে “খেলায় বসিয়ে দেওয়া সঙ্গত। ভােরের বেলায় শিশুরাও যদি সাদা কাগজের উপর কালির আঁচড়ের প্রতি মনােনিবেশ করে, তাহলে কার জন্যই বা “পাখী সব করে রব” আর কিসের জন্যই বা “কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল”? রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে বলে কি শিক্ষকদেরও শিশুর পাল লয়ে যেতে হবে স্কুলে ? Analogy-র বলে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হলে যে উন্টো উৎপত্তি হয়, তার প্রমাণ—স্কুলেও পাঁচন বলে। নববিদ্যালয়ে সব রকমের গাছপালা আছে, শুধু বেত নেই। সে যাই হোক, ভগবানের সৃষ্টির সকল জিনিসের ভিতর যে একটা যােগাযােগ আছে—সে জ্ঞান আমরা হারালেও, শিশুরা হারায় না; তাই তারা আলাে বাতাস পাখী ফুল সকলের সঙ্গে যােগ রেখেই আনন্দ পায়, আর সেই আনন্দই তাদের জীবনীশক্তিকে, বিকশিত করে। ( ৯ ) এত গেল খেলার প্রথম অধ্যায়। শিশুর চরিত্র সম্পূর্ণ স্বাধীন, সুতরাং তার খেলাও সম্পূর্ণ স্বচ্ছন্দ। বালকের খেলার প্রকৃতি সম্পূর্ণ বিভিন্ন। শিশুর খেলা ব্যক্তিগত, বালকের খেলা সামাজিক। শৈশব অতিক্রম করবার পর ছেলেদের মনে যখন সমাজের জ্ঞান জন্মায় তখন তারা দলবদ্ধ হয়ে খেলে। এ সব খেলার আগাগােড়া ধরাবাঁধা নিয়ম আছে। টেনিস, ফুটবল, ক্রিকেট প্রভৃতি হচ্ছে সব সামাজিক খেলা—অর্থাৎ দশে মিলে নিয়ম মেনে এ সব খেলা খেলতে হয়। এ সব খেলার প্রধান গুণ যে এতে ছেলেদের চরিত্রগঠনের সহায়তা করে। ব্যায়ামে নব-বিদ্যালয় । ১৫ ; শুধু শরীর গড়ে, কিন্তু এ শ্রেণীর খেলায় ছেলেদের মনে নীতির বীজ দেয়। এই শ্রেণীর খেলা হচ্ছে নব-বিদ্যালয়ের নীতিশিক্ষার একটি প্রধান অঙ্গ। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষকেবা উপদেশ দিয়ে নীতিশিক্ষা দেওয়ায় মােটেই বিশ্বাস করেন না। তারা বলেন, বহুকালের অভিজ্ঞতার ফলে একথা তারা জোর করে বলতে পারেন যে, নীতির উপদেশ দেওটা যে শুধু ব্যর্থ তাই নয়, ছেলেদের পক্ষে তা বিশেষ ক্ষতিকর। ওতে যে সুধু একটা নতুন দুর্নীতির শিক্ষা দেওয়া হয়, এবং তার নাম হচ্ছে “নৈতিক জ্যাঠামি।” এঁদের মতে নৈতিক জীবনের মূলে আছে Collective sense, অর্থাৎ-সেই জ্ঞান, যার ফলে প্রতি লােক নিজেকে সমাজদেহের একটি অঙ্গ বলে মনে করে। এবং যে উপায়ে এই জ্ঞান, এই অনুভূতি বাড়ানাে যেতে পারে, সেই উপায়ই হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার যথার্থ উপায় ;-বক্তৃতা নয়, নীতিপাঠ নয়, মারপিট নয়। এই সব খেলার ভিতর দিয়ে ছেলেরা নিয়মের মাহাত্ম বুঝতে শেখে, দশজনের সঙ্গে একাত্ম হতে শেখে, কাৰ্য উদ্ধারে জন্য স্বেচ্ছায় স্বার্থপরতা ত্যাগ করতে শেখে। অতএব ফুটবল প্রভৃতি খেলা সকল ছেলেরই শুধু দেহের নয়, আত্মার উন্নতি লাভের জন্য খেলা কর্তব্য। আইন মুখস্থ করতে নয়, স্বেচ্ছায় মানতে শেখবার সূত্রপাত ঐ খেলার মাঠেই হয়। ( ১০ ) খেলার পর আসে দৌড়ঝাপ- ইংরাজিতে যাকে বলে sports। খেলার সঙ্গে এর প্রভেদ এই যে, শরীরের এক একটি বিশেষ ক্রিয়ার এই উপায়ে অনুশীলন করা হয়। দৌড়নাে লাফানাে সকল খেলারই অঙ্গ, কিন্তু কি দৌড় কি লাফ কোনও খেলারই একমাত্র অথবা মুখ্য কর্ম নয়। খেলাতে দেহের সকল শক্তির একত্রে প্রয়ােগ দরকার। কিন্তু sports-এর উদ্দেশ্য, দৌড়বার শক্তি লাফাবার শক্তি প্রভৃতিকে আলাদা করে নিয়ে, সেই শক্তিকে বিশেষ করে বাড়িয়ে তােলা। এতে শরীরের যে শুধু এক একটা বিশেষ ক্ষমতা বেড়ে ওঠে তাই নয়, এতে ছেলেদের সাহসও বাড়ে। এর শিক্ষা হচ্ছে * আমাদের শিক্ষা। দেহের শক্তির সীমা উত্তরােত্তর অতিক্রম করবার শিক্ষা। সুতরাং এ শিক্ষার ভিতর পদে পদে বিপদ আছে। এই বিপদকে উপেক্ষা করতে শেখবার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের সাহস আপনাহতেই বেড়ে যায়। সুতরাং sports ছেলেদের শরীর মন দুই একসঙ্গে গড়ে তােলে। নব-বিদ্যালয়ে চৌদ্দ বছরের নীচে ছেলেদের sports শিখতে দেওয়া হয় না। এ কথাটা আমাদের মনে রাখা উচিত, কেননা শিক্ষা বিষয়ে আমাদের আর ত্বর সয় না—সে শিক্ষা শরীরেরই হােক আর মনেরই হােক । ( ১১ ) সব শেষে আসে ব্যায়াম শিক্ষা। এ শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহের প্রতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে স্বতন্ত্রভাবে বলিষ্ঠ করা,এবং সেই সঙ্গে সমগ্র দেহটাকে শক্তিশালী করা। একালের ব্যায়াম হচ্ছে পূরােমাত্ৰায় বৈজ্ঞানিক, অর্থাৎ-তা দেহের বিশেষ জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেকালের ব্যায়াম অনেক স্থলে মারাত্মক হত—কেননা কোনও একটা বিশেষ অঙ্গের মাংস বাড়াতে এবং পেশি ফোলাতে গিয়ে, অনেক স্থলে সমস্ত দেহটাকে একেবারে জখম করে ফেলা হত। অবৈজ্ঞানিক ব্যায়ামচর্চার ফলে, অনেকে লাভের মধ্যে হৃদরােগ খাসবােগ প্রভৃতি অর্জন করতেন। সমুদয়ের সঙ্গে অবয়বের যােগ যে কতকটা ঘনিষ্ঠ, এবং সে যােগসূত্র যে প্রাণ—এই জ্ঞানের অভাববশতই পালােয়ানেরা হয় স্বল্পায়ু, আর বাজিকরেরা পঙ্গু। Horizontal Bar-য়ে পাক খেতে খেয়ে শরীর যে দড়ি পাকিয়ে যায়, আর Parallel Bar-য়ে পালায় পালায় “ফড়িং” ও ময়ুর”-বৃত্তির সাধনা করে, তীরের মত শরীর যে ধনুকের মত হয়ে যায়, এ আমার চোখে দেখা। বৈজ্ঞানিক ব্যায়ামের চর্চায় অষ্টাবক্র হবার কোনই সম্ভাবনা নেই। এ ব্যায়ামের প্রকরণপদ্ধতি সব Ling Muller এবং Hebert-এর বইয়ে দেখতে পাবেন। সংক্ষেপে, যে ব্যায়ামকে Swedish Drill বলা হয়—সে হচ্ছে Ling-এর আবিষ্কৃত পদ্ধতি। Muller এবং Hdert তারই সংশােধিত সংস্করণ বার করেছেন। এ বিবয়ে আমি সম্পূর্ণ নব-বিষ্ঠালয় । অনভিজ্ঞসুতরাং এ ক্ষেত্রে বেশী বাক্যব্যয় করা আমার পক্ষে অমার্জনীয় অনধিকারচর্চা। তবে এই ব্যায়াম শিক্ষা দেবার পদ্ধতি সম্বন্ধে দু-এক কথা বলা আবশ্যক। নব-বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষদের মতে, এর শিক্ষক হওয়া উচিত ডাক্তার। প্রথমত, এতে প্রাণায়াম আছে ; আর গুরুর অসাক্ষাতে প্রাণায়াম ককূলে যে মুখে রক্ত ওঠে, তার প্রমাণ, আমার জানত অনেক ভদ্রসন্তান যােগ অভ্যাস করতে গিয়ে পেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এর ক্রিয়াগুলি নিতান্ত নীরস, কেননা এ খেলা নয়—পুরােদস্তুর শিক্ষা। নীরস বলে এ ব্যায়াম বিরক্তিকর হবার সম্ভাবনা, সুতরাং শিক্ষকের পক্ষে এর প্রতিক্রিয়ার সার্থকতা আগে থাকতে ছেলেদের বুঝিয়ে দেওয়া কৰ্ত্তব্য। হাত-পা পাগলের মত উল্টো- পাল্টাভাবে কেন নাড়ছি, তার অর্থ বুঝলে সে হাত পা মানুষে মনের খুসিতে নাড়ে। ব্যায়ামটা পুরােপুরি শরীরের শিক্ষা হলেও—ঐ সঙ্গে শরীর-বিজ্ঞা- নেও মােটামুটি কথা নব-বিদ্যালয়ের ছেলেরা শেখে। অধ্যাপক ফারিয়ার মতে খেলাধুলাে, দৌড়ঝাপ, ব্যায়াম, প্রাণায়াম সবই খালি গায়ে করা কর্তব্য। এর সার্থকতা যে কি, তা আমি বলতে পারিনে, ডাক্তারে বলতে পারেন। তুবে এ গরম দেশে দেহমুক্ত করলে আমরা যে মুক্তিলাভ করি, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই। ( ১২ ) ছেলেদের হাতের কাজ শেখানাে যে শিক্ষার একটা প্রধান অঙ্গ, এই হচ্ছে একালের শিক্ষা-বৈজ্ঞানিকদের একটা পাকা মত। নব-বিদ্যালয়ে ছেলেদের মূর্তি গড়তে, নক্সা আঁকতে, বই বাঁধতে, বেত বুনতে, কামার কুমাের ও দুতােরের কাজ করতে শেখানাে হয়। অধ্যাপক ফারিয়া বলেন, এ শিক্ষার উদ্দেশ্য ছেলেদের কামার কুমাের ছুতাের প্রভৃতি বানানাে নয়। তার মতে এ সব শিক্ষার প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহকে সক্ষম ও সক্রিয় করা। কর্মের প্রবৃত্তি ছােট ছেলের দেহ ও মনে অতিমাত্রায় থাকে। তারা একটা কিছু না করে, দু’দণ্ড স্থির থাকতে পারে না। এই কর্মপ্রবৃত্তিকে সুপথে চালানাে । আমাদের শিক্ষা। শিক্ষকের একটি প্রধান কর্তব্য। এ সব কাজে হাত দিয়ে ছেলেরা যে শুধু আনন্দ পায় তাই নয়, সেই সঙ্গে তারা যে হম্ভকৌশল লাভ করে, জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তার যথেষ্ট প্রয়ােজন ও সার্থকতা আছে। দ্বিতীয়তঃ, এই সব কাজের চর্চায় তাদের বুদ্ধিবৃত্তির বিশেষ চর্চা হয়। এর ফলে তাদের নিরীক্ষণ করবার শক্তি, তুলনা করবার শক্তি, কল্পনা শক্তি, গড়বার শক্তি, রূপজ্ঞান, আকারের জ্ঞান, পরিণামের জ্ঞান, মাত্রার জ্ঞান, সংখ্যার জ্ঞান, পরিপুষ্ট হয়ে উঠে। অধ্যাপক ফারিয়া বলেন যে, শিশুদের অবশ্য ও সব কাজ শেখানাে যায় না, সুতরাং তাদের কাদা দিয়ে আল বাঁধতে, ঘর তৈরি করতে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া কর্তব্য। সে ঘর তারা ক্রমান্বয়ে ভাঙ্গবে ও গড়বে- কেননা শিশুমাত্রেই অব্যবস্থিতচিত্ত। এ চিত্তকে ব্যবস্থিত করবার চেষ্টা যেমন ব্যর্থ, তেমনি ক্ষতি কর, কেননা এই সব বিরােধী মনােভাবের সংঘর্ষেই তাদের আত্মার প্রদীপ জ্বলে ওঠে। যারা ছােট-ছেলেদের এই ধূলােমাটির সংস্রব হতে আলগােছ করে, ভদ্রলােক করতে চান, অধ্যাপক ফারিয়া তাদের একটা সত্য স্মরণ রাখতে বলেন। সে হচ্ছে এই যে, এ পৃথিবীতে মাটি আর জল হচ্ছে ছােট- ছেলের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু। সুতরাং তাদের জল না ছুঁতে দিলে, ধুলােনা নাড়তে দিলে, ও দুয়ে মিলিয়ে কাদা না করতে দিলে, প্রিয়বস্তুর বিরহে তারা শরীর-মনে শুকিয়ে যায়। এ স্থলে বয়স্ক লােকদের জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে যে, এ পৃথিবীতে মাটি ও জলের চাইতে মহামূল্য বস্তু আর কি আছে? মানুষের সকল কর্মের মূল উপাদান হচ্ছে ক্ষিতি আর অপু, সুতরাং শিশুরা এ পৃথিবীতে এসে প্রথমে তারই পরিচয় লাভ করতে ব্ৰতী হয়। ঐখান থেকেই তাদের জীবনব্রত- উদ্যাপনের সুরু হয়। (১৩) * নব-বিদ্যালয়ের ছেলেদের কৃষিকৰ্ম্মও শেখানাে হয়। মানুষের আদিম কর্মক্ষেত্র, কৃষকের ক্ষেত্র,শিল্প-জীবির কারখানা নয়। সুতরাং ছেলেদের কর্মক্ষমতা সৰ্বাঙ্গসুন্দর কতে হলে, অদের অল্প-স্কি কষিকৰ্ম্ম শেখানাে ও নব-বিদ্যালয় । ৯৯ দরকার। লাঙ্গল চষয়ে কোদাল পাড়লে শরীর যে বলিষ্ঠ হয়, সে কথা বলা বাহুল্য; সুতরাং এ অধ্যবসায়ে মন ও চরিত্রের কি উপকার হয়, সংক্ষেপে তারই উল্লেখ করছি। কারখানায় আমরা জড়-পদার্থ নিয়ে কারবার করি, কিন্তু মাঠে আমাদের সজীব পদার্থের সঙ্গে কারবার করতে হয়। বীজ বােনা থেকে ধান পাকা পৰ্যন্ত আগাগােড়া একটা জীবনের অভিনয় চলে। জীব-তত্বের প্রথম অধ্যায় মানুষে ঐ শস্যক্ষেত্রেই পাঠ করতে পারে। এই সূত্রে আমরা যে জীবনের ক্রমবিকাশের জ্ঞানলাভ করি, শুধু তাই নয়,-সেই সঙ্গে সে জীবন যে আমরা রক্ষা করতে পারি, সংশােধিত করূতে পারি, পরিবর্ধিত করতে পারি, সে জ্ঞানও লাভ করি ; এক কথায় এই সূত্রে আমরা অত্মিজ্ঞানও লাভ করি। তার পর মাঠে কাজ করবার দরুণ, ছেলেরা নানা গাছপালা ফুল ফল কীট পতঙ্গ জীবজন্তুর সাক্ষাৎ পরিচয় লাভ করে। শুধু তাদের আকৃতি নয়, তাদের প্রকৃতিরও পরিচয় পায়। এই উপায়ে তাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার দিনের পর দিন পূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই জ্ঞানের ভিত্তির উপরেই তাদের কেবি বিজ্ঞানের শিক্ষা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। গাছপালা জীবজন্তুর সঙ্গে যে ছেলের সাক্ষাৎ পরিচয় আছে- বটানি, জুওলজির কথা তার কাছে আর শুধু বইয়ের কথা নয়-জীবনের কথা। কৃষিকর্মের আর একটি মহৎ ফল এই যে, ছেলেরা হাতেকলমে ‘ও-কাজ কলে বড় বয়সে কৃষিজীবিদের প্রতি আর অবজ্ঞা করে না। অলস ভদ্র- সন্তানেরা নিম্ন-শ্রেণীর লােকদের যে অবজ্ঞার চোখে দেখে, তার প্রধান কারণ যে, কৃষিকার্য্যের ভিতর যে কি মহত্ব ও মনুষ্যত্ব আছে, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অর। যে ছেলে ও-কাজ নিজে হাতে করতে চেষ্টা করেছে, সে ছেলে চির- জীবন কৃষি-জীবিদের মনে মনে শ্রদ্ধা করবে। সামাজিক হিসেবে এও একটা কম লাভ নয়। আজ এই পর্যন্ত। বারান্তরে শরীর ছেড়ে মনের শিক্ষার নবপদ্ধতির বিষয় আলােচনা করা যাবে। আষাঢ় ১৩২৫ নব-বিদ্যালয় । ( ভাষা-শিক্ষা) শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীচরণেষু আমরা যখন বাঙলা ভাষাকে স্কুল কলেজের ভাষা করে তােলবার প্রস্তাব করি, তখন আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একদল লােক, আমাদের উপর খঙ্গহস্ত হয়ে ওঠেন। তাদের বিশ্বাস বাঙলা, বিদ্যাশিক্ষার ভাষা হলে আমাদের ছেলেরা ইংরেজি শিখবে না। এর পাল্টা জবাব অবশ্য এই যে, তারা ইংরাজি না শিখতে পারে কিন্তু বিদ্যা শিখবে। কিন্তু এ জবাবে কারও মন ভিজবে না। আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিরা এর উত্তরে সমস্বরে বলবেন যে, সে বিদ্যে নিয়ে কি হবে--যার সাহায্যে জীবন যাত্রা নির্বাহ করা যায় না। ইংরাজি না জালে যে ভদ্রসন্তানের ‘দিন আনা দিন খাওয়া চলে না, এ কথা আমাদের দেশের নিরক্ষর লােকেও জানে। ও ভাষায় অজ্ঞ হলে যে আমাদের ওকালতি, ডাক্তারি, কেরাণীগিরি, মাষ্টারি, এমন কি রাজ- নীতির নেতাগিরি করাও বন্ধ হবে—এ কথা বলাই বাহুল্য। এবং এসব ক্রিয়া বন্ধ হলে বাঙালীর জীবনে আর কি কাজ থাকবে? ও অবস্থায় আমরা যে ঘরে বসে সাহিত্য রচনা করব তারও সম্ভাবনা কম। যা কথায় কথায় ইংরাজির তরজামা নয়, তা যে বাঙলা সাহিত্য, অন্ততঃ সাধু-বাঙলা সাহিত্য হতে পারে , তার প্রমাণ শতকরা নিরনব্বই জন বাঙালা গদ্য লেখকের লেখায় অর্থাৎ আমাদের সকলের লেখায় নিত্যই পাওয়া যায়। অতএব ইংরাজি না শিখলে যে বাঙলার সর্বনাশ হবে,এ বিষয়ে দ্বিমত নেই—এবং থাকতে পারে না। তবে বাঙলা না শেখাটা ইংরাজি শিক্ষার সদুপায় কি না সে বিষয়ে মতভেদ আছে।
নব-বিদ্যালয় । আমাদের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির প্রসাদে দেশের লােক যে ইংরাজি শিখছে—ইরাজি-নবিশদের এই ধারণাটি অনেকটা অমূলক। পাঁচ বৎসর বয়েস থেকে শুরু করে পঁচিশ বৎসর বয়েস পর্যন্ত দিনের পর দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে’-আমাদের বিদ্যার্থীরা যে, ইংরাজি ভাষার উপর কতটা অধিকার লাভ করে, তার পরিচয় যিনি কখন B. L. পরীক্ষার কাগজ পরীক্ষা করেছেন, তিনিই পেয়েছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদের হাতে উকিলের সনন্দ দিয়ে বিদায় করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে শতকরা নব্বই জন সাধু- ইংরাজি লেখা দূরে থাক শুদ্ধ ইংরাজিও লেখেন না, শতকরা পঁচিশজন লেখেন বাবু-ইংলিশ, আর শতকরা দশজন যা লেখেন, তা দিনেমার ওলন্দাজ কিম্বা আলেমানের ভাষা হতে পারে কিন্তু ইংরাজের নয় ; অথচ এরা সকলেই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট। এত দীর্ঘকালব্যাপী ইংরাজি ভাষার এই একাগ্ৰ চৰ্চা এতটা বিফল হয় কেন ? বাঙালী জাতি সরস্বতীর কৃপায় বঞ্চিত নয়, তবে আমাদের যুবকদের মধ্যে শিক্ষার এই ব্যর্থতার কারণ কি? কারণ এই যে, পাঁচ বৎসর বয়সে ছেলেরা ইংরাজি ধরে এবং পঁচিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত তারা দিবারাত্র এক ঐ ইংরাজিরই চর্চা করে। সকল শিক্ষার মত, বিদেশীভাষা শিক্ষাও কাল ও পাত্র সাপেক্ষ। শৈশব এ শিক্ষার উপযুক্ত..কাল নয়, বালক, এ শিক্ষার উপযুক্ত পাত্র নয়। শিশুর দেহের পক্ষে মাতৃদুগ্ধ যা, বালকের মনের পক্ষে মাতৃভাষাও তাই। অর্থাৎ মাতৃভাষার সাহায্য বিনা বালকের মন গড়ে ওঠে না। ছেলেরা যে ভাষা অষ্টপ্রহর শােনে, আর যে ভাষায় অষ্টপ্রহর কথা কয়, সেই ভাষার সাহায্যেই তারা পরের কথা বুঝতে ও নিজের কথা বােঝাতে শেখে। ছেলের মন ও ছেলের ভাষা, ও দুই হচ্ছে একই জিনিসের এ-পিঠ আর ও-পিঠ ; সুতরাং এ দুই এক সঙ্গে যেমন বেড়ে ওঠে তেমনি গড়ে ওঠে। তারপর আত্মপ্রকাশ করবার চেষ্টাতেই মানব-সন্তানের ভাষার উপর যথার্থ অধিকার জন্মে এবং সেই সঙ্গে মনের শক্তিও বৃদ্ধি পায়। শিশুর দেহের সঙ্গে তার মন এবং তার - আমাদের শিক্ষা। মনের সঙ্গে তার স্বভাষা-জ্ঞান যে এক রকম স্বাভাবিক নিয়মে গড়ে ওঠে, এ কথা বললেও অত্যুক্তি হয় না। অপরপক্ষে বিদেশী ভাষা, সজ্ঞানে শিখতে হয় ; সুতরাং তা শেখবার জন্য সেই মন চাই—যেমন বালকের নেই। বারাে বৎসর বয়সের পূর্বে বিদেশী ভাষা শেখ বার চেষ্টাটা ছেলেদের পক্ষে যে, শুধু কষ্টকর ও ব্যর্থ, তাই নয়—তার মনের পক্ষেও যথেষ্ট ক্ষতিকর। মদ্য মাংস সেবন ছােট ছেলের দেহের পক্ষে যতটা উপকারী, একটি বিদেশী ভাষার চর্চা ছােট ছেলের মনের পক্ষে তার চাইতে বেশি উপকারী নয়। আমরা ছােট ছেলেদের তা গিলিয়ে দিতে পারি কিন্তু তা জীর্ণ করবার শক্তি তাদের নেই। ফলে অল্প বয়েসে ইংরাজি শিখতে গিয়ে, আমাদের ছেলেরা ইংরাজিও ভাল করে আয়ত্ব করতে পারে না এবং লাভের মধ্যে শুধু মানসিক মন্দাগ্নি- গ্ৰন্ত হয়ে পড়ে। যে মন ছেলেবেলায় বিদেশী ভাষার চাপে জড় হয়ে পড়ে, সে মন কৈশাের ও যৌবনে তার পূর্ণশক্তি লাভ কতে পারে না। আমাদের অধিকাংশ যুবকদের মনের যে দম ও কশ নেই, তার একমাত্র কারণ আমাদের এই সৃষ্টিছাড়া শিক্ষা-পদ্ধতি। কিন্তু ইংরাজি শেখাটা আমাদের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করবার জন্য এতই প্রয়ােজন, যে আমাদের সমাজের যত বিধা ও বুদ্ধিমান লােক একবাক্যে বলবেন,হােক আমাদের ছেলেরা মনে পঙ্গু, তাদের ঐ পাঁচ বছর বয়স থেকেই A. B. c. শিখতে হবে, নচেৎ তারা বয়েসকালে ইংরাজি-নবিশ হতে পারবে না। না ভেবেচিন্তে কথা কওয়াটা, বিশেষত সেই সব বিষয়ে যে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একটা রােগের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। কেননা অপর দেশের শিক্ষার প্রণালী এবং তার ফলাফল সম্বন্ধে এরা যদি কিছু খোঁজ খবর রাখতেন, তাহলে এরা এ কথা জানতেন যে, বারাে বৎসর বয়েসের পরে, অর্থাৎ মাতৃভাষার উপর যথেষ্ট পরিমাণে অধিকার লাভ করবার পরে, ছেলেরা দু-তিন বৎসরে বিদেশী ভাষা যতটা আয়ত্ব করতে পারে, পাচ বংগর বয়েস থেকে শুরু করে তারপর দশ বৎসরের অবিরাম নৰ- বিষয়। চর্চায় তার সিকির সিকিও পারে না। এই কারণে নব-বিদ্যালয়ে ছেলেদের বারাে বৎসর বয়েসের আগে মাতৃভাষা ছাড়া আর কোনও ভাষার সংকে আষতে দেওয়া হয় না। এদেশেও পুরাকালে উপনয়নের পরই সংস্কৃত শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। অতএব ভাষা শিক্ষার প্রথম এবং প্রধান কথা হচ্ছে-মাতৃভাষা শিক্ষা। মাতৃভাষাও যে একটা শিক্ষার বিষয়, এ জ্ঞান আমরা হারিয়ে বসে আছি। আমাদের ধারণা, এ বিষয়ে বাঙালীমাত্রেরই অশিক্ষিত পটুত্ব আছে। সে পটুত্ব যে বেশির ভাগ লােকের নেই, তা তারা বাংলা লিখতে বসলে অবিলম্বে আবিষ্কার করতে পাবেন। সাহিত্যে আমাদের তুল্য মুখচোরা জাত যে অপর কোনও সভ্যদেশে নেই, তার কারণ আমাদের শিক্ষার গুণে আমরা আশৈশব আত্মপ্রকাশ করবার সুযােগ পাই নি। স্কুলের ছেলের পক্ষে স্বচ্ছনে ইংরাজিতে আত্মপ্রকাশ করা অসম্ভব এবং বাঙলাতে করা বারণ। এর ফলে আমাদের অধিকাংশ লােকের ভাষাজ্ঞান ছােট ছেলের জ্ঞানেরই সমতুল্য, খাওয়া-পরা চলা-ফেরার জন্য যতখানি ভাষাজ্ঞান থাকা প্রয়ােজন, অর্থাৎ কেবলমাত্র জীবনধারণের জন্য যে ক’টি কথা না জানলে নয়, আজকের দিনে অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালী সেই ক’টি নিত্য ব্যবহাৰ্য্য কথাই অক্লেশে ব্যবহার করতে পারেন। আমাদের অন্তরে মাতৃভাষার ভিৎ আছে কিন্তু সে ভিৎ এত কঁচা যে, তার উপর কি দেশী কি বিলেতী কোনও ভাষার পাকা ইমার খাড়া করা যায় না। অতএব মাতৃভাষা যদি আমরা শিক্ষা করি, তাতে করে ইংরাজি-শিক্ষার কোনও ক্ষতি হবে না; উপরন্তু, আমাদের মন সবল, সুস্থ এবং সক্রিয় হয়ে উঠবে। তখন আমাদের আর, এ বলে দুঃখ করতে হবে না যে, দেশে এত বিদ্যে আছে অথচ তা দেশের কোনও কাজে লাগে না। পৃথিবীর দর্শন বিজ্ঞান সাহিত্যের সকল বিদ্যা যে আমাদের মনের চক্রব্যুহে ঢুকতে পারে কিন্তু বেরুতে পারে না, তার কারণ আত্মপ্রকাশের সহজ পথটিই আমরা 'বাল্যকালেই ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি।
আমাদের শিক্ষা। মাতৃভাষাও শিক্ষা করবার জিনিষ, কিন্তু তাই বলে যে উপায়ে যে পদ্ধতিতে আমরা একটি বিদেশী অথবা একটি মাতৃভাষা শিক্ষা করি সে উপায় সে পদ্ধতি, মাতৃভাষা শিক্ষার পক্ষেও আবশ্যকও নয়—উপযােগীও নয়। বিদ্যারম্ভেই অমরকোষ ও মুগ্ধবােধ কণ্ঠস্থ করাই হয়ত সংস্কৃত শেখার সহজ উপায়, কিন্তু ব্যাকরণ অভিধানের সাহায্যে কাউকেও মাতৃভাষা শিখতে হয় ; সুতরাং ও উপায় অবলম্বন করতে শিশুদেরও বাধ্য করা অসঙ্গত। যে উপায়ে ছেলেরা ভাষা নিজে শেখে, সেই উপায় অবলম্বন করেই তাদের ভাষা শিক্ষা দিতে হবে, অতএব এ শিক্ষার গােড়ায় ব্যাকরণ অভিধানের কোনও স্থান নেই। বিদেশী ভাষা শিক্ষার একটা প্রধান অঙ্গ হচ্ছে, বিদেশী শব্দের স্বদেশী প্রতিশব্দ শেখা। কিন্তু মাতৃভাষার গােড়াকার শিক্ষা হচ্ছে- বস্তুর সঙ্গে তার নামের, বাচ্যের সঙ্গে তার বাচকের সম্বন্ধের জ্ঞান লাভ করা। ছেলেরা গ্রন্থ কিম্বা গুরুর সাহায্য না নিয়ে, আপনা হতেই যে-সব কথা শেখে সেই শব্দ-সংগ্রহই হচ্ছে সব ভাষারই মূল উপাদান, এই উপাদান করায়ত্ত্ব না করতে পারলে, ভাষার উপর পূর্ণ অধিকার জন্মে না, এবং একটি বিদেশী ভাষা শেখার মুস্কিলই এই যে, সে ভাষার মূল উপাদানের পুঁজি নিয়ে আমরা তার বিস্তৃত জ্ঞান লাভ করতে বসি নে। সুতরাং মাতৃভাষার শিক্ষা লেখাপড়া দিয়ে শুরু করবার দরকার নেই, অর্থাৎ হাতে খড়ি দেওয়াটা বিদ্যারম্ভের প্রথম ক্রিয়া নয়। নব-বিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষা-পদ্ধতির বিস্তারিত পরিচয় বারান্তরে
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.