Makardah Saraswat Library, Howrah

Rishir Meye Ed.2nd

Sengupta, Nareshchandra · 2009/08/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ঋষিৱ মেয়ে
ন?
১৮ ০৪
আর্ট থিয়েটার লিমিটেড
প্রথম অভিনয়—১০ই পৌষ, ১৩৩২
শ্রীনরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত এম-এ, ডি-এল,
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রাবণ ১৩৩৭
এক টাকা

১৮ঠ ৪
হরিদাস চটাগ্যা
উদাস চট্টোপালিত:পস
২০৩১, কাওয়ালি ভাট
ক6িাকা
দ্বিতীয় সংস্করণ
৮িটার গ্রীনরে না ফোর
ভারতলাধটিংওয়াল
১০/
১dা ঈষ্ট, শনিক)

উ= সর্গ বঙ্গবাণীর ভাণ্ডারী, সাহিত্যসারথী সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত হরিদাস চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের কৱকমলে— আপনার সঙ্গে আমার সম্বন্ধের পরিচয়টা প্রকাশ করা আবশ্যক। সাহিত্যের ক্ষেত্রটীকে অনেক কবি বাণীর কমল-বন বলে বর্ণনা করে- ছেন। বাঙ্গলার সাহিত্যক্ষেত্রকে কিন্তু আমি জেনেছি--বিশেষরূপে রণক্ষেত্র বলেই। কয়েক বৎসর পূর্বে এখানে আমি যখন কম্পিতপদে উপস্থিত হয়ে ছিলাম, তখন আপনি আমার সারথ্য গ্রহণ করেছিলেন। রণভীরু উত্তরকে যেমন গাণ্ডীবী উৎসাহ দিয়েছিলেন, তেমনি উৎসাহ দিয়েছিলেন আপনি আমাকে। সেদিন যে রথের বা আপনি আনন্দের সহিত ধারণ করেছিলেন, একদিনের তরেও তা পরিত্যাগ করেন নি। সাহিত্য-সেবায় যদি কোনও কৃতিত্ব লাভ করে থাকি, দেবীর পূজায় যদি কোনও পুণ্য অর্জন করে থাকি, সে কৃতিত্ব, সে পুণ্য আমার একার নয়, তাতে আপনারও ভাগ আছে। “ঋষির মেয়ে আপনার উত্তেজনায় লেখা। আপনি আমাকে নাটক লিখতে বলেছিলেন। আমার এই মানস-কন্যা যখন মূর্তিমতী হয়ে দেখা দিল, তখন আপনি একে আর্ট থিয়েটাস লিমিটেডের কাছে পরিচিত করে দিয়েছিলেন। তাই আজ “ঋষির মেয়ে” আট থিয়েটাস লিমিটেডের অপূৰ্ব কলসৌষ্ঠবে বিভূষিত হয়ে বাঙ্গালী পাঠক ও নাট্যামােদর আশীৰ্বাদ ভিক্ষা করতে অগ্রসর হচ্ছে। সেই জন্য “ঋষির মেয়ে আপনার হাতে সমর্পণ করলাম। ইতি মেহানুগত শ্রীনরেশ-- কুশীলবগণ পুরুষ আপস্তম্ব ৮০ ৪০০ উগ্রবা ঋষি ঋষি আপস্তম্বের শিষ্য ০ ০ ০ . . . চারুদত্ত ইন্দ্রায়ুধ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ অগ্নিবর্ণ •• রাজশ্যালক ঋতুপর্ণ । ০ ০ ০ ৫০০ অগ্নিবর্ণের শ্যালক সত্যসেন মন্ত্রী, সেনাপতি, প্ৰাড়বিবাক, সভাসদগণ, পুরােহিত, প্রহরী, কায়স্থ, সংবাহক ইত্যাদি। खी শাশ্বতী ০ ০ ০ আপস্তম্বের স্ত্রী ০ ০ ০ ঐ কন্যা রাণী চিত্ৰলেখা বাসন্তিকা ৮ ০০ ০০০ অগ্নিবর্ণের স্ত্রী। ঐ গণিকা চারণী, দাসী, নর্তকীগণ ইত্যাদি।

উপােদঘাত বহুদিন যাবৎ প্রাচীন ভারতে ব্যবহার-শাস্ত্রের ইতিহাস আলােচনায় ব্যাপৃত আছি। ইহা অতি আয়াসসাধ্য ব্যাপার। যে দীর্ঘ সাধনায় এ ক্ষেত্রে সিদ্ধি অর্জন করা সম্ভব, তাহা আমার ক্ষুদ্র জীবন ও শক্তিতে সম্ভব হইবে কি না জানিনা। এ পর্যন্ত সে ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন খণ্ড-সমষ্টি ব্যতীত কোনও ধারাবাহিক কাহিনীর উপযুক্ত উপাদান সংগ্রহ করিতে পারি নাই। যাহা সংগ্রহ করিয়াছি তার সামান্য অংশ আমার ”Sources of Law and Society in Ancient India 49 Evolution of Law” গ্রন্থে প্রকাশ করিয়াছি। অবশিষ্ট, কোনও দিন প্রকাশ করা সম্ভব হইবে কি না জানিনা। কিন্তু এই আলােচনা পথে বেদ, ইতিহাস, গৃহ্য ও ধর্ম-সূত্র প্রভৃতি হইতে সুদূর অতীত যুগের এক সমাজ-চিত্র আমার কল্পনার সম্মুখে আকারিত হইয়া উঠিয়াছে। বলা বাহুল্য, সে চিত্রকে সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক বলিয়া দাবী করিবার মত প্রমাণ এখনও পাই নাই। কিন্তু যাহা কিছু প্রমাণ পাইয়াছি, তাহা কল্পনার তুলিকায় পূর্ণাঙ্গ হইয়া যে আকারে আমার কাছে প্রকাশিত হইয়াছে তাহাই “ঋষির মেয়ের প্রাণ। “ঋষির মেয়ে ইতিহাস নয়, নাটক। নাটক হিসাবে যদি ইহা সার্থক হয়, তবেই ইহা পাঠকের উপর কোনও দাবী করিতে পারে। সে হিসাবে হীনাঙ্গ হইলে ইহার ঐতিহাসিক সত্যাসত্য একেবারে বিচারের বহিভূত হইবে। ইহাকে ঐতিহাসিক নাটক বলা চলেও, চলেও না। মুখ্যতঃ যাহাকে ০ ঐতিহাসিক নাটক বলা যায়, তার প্রধান বিষয়-তার ঘটনা ও পাত্র- পাত্রী—ঐতিহাসিক। নাটকে কেবল ঐতিহাসিক উপাদানকে কল্পনার সহায়তায় পূর্ণাঙ্গ ও সজীব করিয়া একটা রসচিত্র গড়িয়া তােল হয়। ইহাতে ঐতিহাসিক ঘটনার স্বরূপ-বােধের সহায়তা হয়। এ অর্থে “ঋষির মেয়ে ঐতিহাসিক নাটক নয়। ইহার প্লটের কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই। আপস্তম্ব ঐতিহাসিক ব্যক্তি; কিন্তু তার জীবন বা ইতিহাস সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা নাই। তিনি কোন্ দেশে বাস করিতেন তাহাও কেহ বলিতে পারে না। আপস্তম্বীয় চরণের ব্রাহ্মণগণ দক্ষিণাপথে বাস করেন, এবং আপস্তম্ব-স্মৃতি সেই দেশেই প্রচলিত, ইহা হইতে কোনও কোনও মনীষি (যথা Buhler) বিবেচনা করেন, যে, আপস্তম্ব দক্ষিণ-দেশীয় ছিলেন। কিন্তু এ কথা একেবারেই অসম্ভব নয় যে, তিনি উত্তর-দেশ হইতে দক্ষিণে গিয়া নৃতন বিদ্যাকেন্দ্র ও বিদ্যাবংশ প্রতিষ্ঠিত করেন; অথবা তিনি উত্তরেই ছিলেন—তাঁর শিষ্য প্রশিষ্যেরা দক্ষিণে আশ্রয় লইয়াছিল। আপস্তম্ব গােত্রপ্রবর্তক ও মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি বলিয়া পরবর্তী কালে বিবেচিত হইয়াছেন। কিন্তু তিনি স্বয়ং তাহার ধৰ্মসূত্রে যাহা বলিয়াছেন,তাহাতে মনে হয় আপস্তম্বের ঋষিত্ব, পাশ্চাত্য Saintদিগের মত, তাহার মৃত্যুর বহুপরে তাহার উপর আরােপিত হইয়াছে। তিনি বলিয়াছেন ইদানীং (অর্থাৎ তাহার সময়ে ) মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি আর কেহ হয় না, কিন্তু শ্বেতকেতুর মত কেহ কেহ তর্ষি বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকেন। সুতরাং তিনি নিজে মন্ত্রদ্রষ্টা ছিলেন না ইহা নিশ্চয়। কিন্তু তার বেদ-বিদ্যায় অসাধারণ পাণ্ডিত্য বশতঃ লােকে তাঁহাকে শুন্তর্ষি বলিয়া সম্মান করা বিচিত্র নহে। এই ভাবেই আপস্তম্ভের চরিত্র এ নাটকে কল্পিত হইয়াছে। আপস্তম্ভ • : ১ ব্যতীত অন্য কোনও ঐতিহাসিক চরিত্র বা ঘটনা এ নাটকে নাই আপস্তম্বের চরিত্র সম্বন্ধে তাহার গৃহ ও ধর্ম-সূত্র লিখিবার ভঙ্গী দেখিয়া আমার একটা ধারণা হইয়াছে,সেই ধারণা ইহাতে প্রকাশ করিয়াছি। কিন্তু আর এক শ্রেণীর ঐতিহাসিক নাটক হইতে পারে। তাহার চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক,কিন্তু সেই কাল্পনিক কাহিনীর দ্বাৰা অতীত কোনও যুগের সমাজের চিত্র উপস্থিত করা হয়। সেকালের রীতি-নীতি আচার-ব্যবহার সরস ভাবে চিত্রিত করা এই প্রকার নাটকের উদ্দেশ্য। “ঋষির মেয়েকে এই শ্রেণীর ঐতিহাসিক নাটক বলা যাইতে পারে । সুতরাং ইহার ঐতিহাসিক ভিত্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা হইতে পারে। সেকালের সমাজের যে চিত্র আমরা পাই তাহা পূর্ণাঙ্গ নহে। তাহার উপাদান নানা স্থান হইতে সংগ্রহ করিতে হয়। বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষ, কল্পসূত্র, ধর্মশাস্ত্র প্রভৃতি এবং পুরাণাদি প্রাচীন, সাহিত্য হইতেই উপাদান সংগ্রহ করিতে হয়। সে সব উপাদানের কালগত পৌব্বাপর্য নির্ণয় করা অসম্ভব। আমি এ নাটকে প্রধানতঃ আশ্রয় করিয়াছি আপস্তম্বের গৃহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্র। কিন্তু স্থল-বিশেষে আমি এক দিকে বেদ ও ব্রাহ্মণ ও অপর দিকে যাজ্ঞবল্ক্য, ও নারদ প্রভৃতি পরবর্তী স্মৃতি হইতে উপাদানসংগ্রহ করিতে কুণ্ঠিত হই নাই। ঋগ্বেদে যে অনুষ্ঠানের কথা আছে, তাহা আপস্তম্বের কালে ছিল না, এবং যাজ্ঞবল্ক্য ও নারদে যে ব্যবস্থা আছে তাহা আপস্তম্বের ধৰ্ম্মসূত্রে নাই বলিয়াই যে অপশুম্বের যুগে ছিল না, একথা জোর করিয়া বলা যায় না । একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা আমার বক্তব্যের প্রমাণ দিব। সুদত্তার সহিত চাদত্তের প্রণয় সম্ভাবনার ভিত্তি কচ ও দেবযানীর উপাখ্যান। অতি প্রাচীনকালে ভারতে এরূপ প্রণয় সম্ভব না হইলে এরূপ উপাখ্যান রচিত বা প্রচলিত হইতে পারিত না তাহা ছাড়া আর যাহা প্রমাণ আছে তাহা ঋগ্বেদ ও অথর্ব বেদের নানা মন্ত্র বিক্ষিপ্ত। তাহা হইতে তত্ত্ব সঙ্কলন করিয়া aimmer তাহার Altindischen Leben গ্রন্থে (৩০৭-৩০৮ পৃ) সেকালের প্রেমের যে চিত্র দিয়াছেন, তাহা এ প্রেম কাহিনীর সম্ভাবনা সুচিত করে। তবে সেই অবস্থা যে আপস্তম্বের যুগে ছিল কি না, এ কথা বলা অসম্ভব। চারণী এ নাটকে আসিয়া গান গায়। এ চারণী রাজস্থানের চারণী নয়। বৈদিক যুগে কোনও চারণীর পরিচয় আমি পাই নাই। কিন্তু, একটা কথা নানাস্থানে দেখিতে পাই, অতি প্রাচীন যুগে আর্যাবর্তে এবং ইরাণে “গাথা” গীত হইত। Jolly তার Recht und Sitte গ্রন্থে এই সমাচীন অনুমান করিয়াছেন যে, এই গাখারই কতকগুলি মুখে মুখে প্রচলিত ও কাল ক্রমে সঙ্কলিত হইয়া মহাভারত ও রামায়ণে পরিণত হইয়াছিল। খুব সম্ভবতঃ এ সব গাথা ছিল Ballad শ্রেণীর—দেব-দেবী ও মহাপুরুষের কীৰ্ত্তিকথা সম্বলিত । এ গান গাহিত কে? সে কথা আমরা জানি না। মনুর স্মৃতিতে (৮ম অ ৩৬২ শ্লো) চারণদারদিগের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাহা হইতে অনুমান হয় চারণীগণ হীনচরিত্রা আােপজীবিনী নারী-বিশেষ ছিল। আমি কল্পনা করিয়াছি এই নারীগণ সুদূর হইতে গৃহে গৃহে গাথা গাহিয়া বেড়াইত ও নায়ক নায়িকার মিলন ঘটাইত। এ কল্পনার পক্ষে প্রমাণ কিছু নাই। কিন্তু ইহা মােটেই অসম্ভব নয়। ধর্মসভা ও অধিকরণের যে চিত্র অঙ্কিত হইয়াছে, তাহা খুব সম্ভব আপস্তম্বের যুগে ঠিক এ আকারে ছিল না। গৌতম আপস্তম্ব বিষ্ণু প্রভৃতি ধসূত্রে এ কথা পাই যে, ব্যবহার দর্শন রাজা বা তদভাবে মন্ত্রী বা অন্য অতীত যুগ ব্রাহ্মণের কর্তব্য ছিল। সভায় বসিয়া বিচার করিতে হইত। প্রাবি- বাকের উল্লেখ পাই। কিন্তু বিচার পদ্ধতি সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ পাই পরবর্ত্তি ধর্মশাস্ত্রে। তন্মধ্যে নারদ ও কাত্যায়ন প্রধান। এই সকল গ্রন্থে যে সব সত্যোত্তর, মিথ্যোত্তর, প্রত্যবন্দন ও প্রমাণের ভাব ঘটিত তর্ক আছে, তাহা হয় তাে আপস্তম্বের সময়ে সম্ভব ছিল না; কিন্তু তাহা আপস্তম্ব লিখিয়া যান নাই বলিয়াই যে তাহা নিশ্চয় তার সময়ে ছিল না, এ কথা বলা যায় না। ব্যবহার নির্ণয়ের বিবরণ লিখিতে আমি প্রধানত নির্ভর করিয়াছি স্মৃতি-গ্রন্থের উপর। কিন্তু দুই এক স্থলে মৃচ্ছকটিকের সুপরিচিত বিচার দৃশ্য হইতে উপাদান সংগ্রহ করিয়াছি। মৃচ্ছকটিকের বিবরণ অনেক বিষয়ে স্মৃতির বিধান হইতে ভিন্ন। তাই আমি গ্রহণ করি নাই। ঢাকা সাহিত্য পরিষদের প্রকাশিত প্রতিভা পত্রে “প্রাচীন ভারতে ব্যবহারের পরিচয় দিয়াছি। তাহার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হইতে অমাত্যের পরীক্ষা-বিধি গ্রহণ করিয়াছি। কৌটিল্যে রাষ্ট্রনীতির বিস্তারিত বিবরণ আছে। আপস্তম্ব বা অন্য কোনও স্মৃতি গ্রন্থে তত বিস্তৃত বিবরণ নাই। কিন্তু কৌটিল্যে যে নীতি অনুসৃত দেখিতে পাই, তাহার সঙ্গে অর্থ শাস্ত্রের মূল সূত্রের মােটের উপর সামঞ্জস্য হয়। নাটকের একাধিক স্থানে পাষণ্ডীর উল্লেখ করা হইয়াছে। পরবর্তী স্মৃতিশাস্ত্রে ‘পাষণ্ডী” শব্দ বৌদ্ধের সঙ্গে একার্থক বলিয়া ব্যবহৃত হইয়াছে। আপস্তম্বের সময় গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন নাই; ইহাতে অনেকে আপত্তি করিতে পারেন। কিন্তু পাষণ্ডী শব্দ মূলতঃ বেদবিরােধী সম্প্রদায় মাত্রের নাম স্বরূপে ব্যবহৃত হইত। গৌতম বুদ্ধের পূর্বে বৌদ্ধ ছিল কি না সে সম্বন্ধে সন্দেহ থাকিতে পারে, কিন্তু উপনিষদের যুগ হইতে যে বেদের ly কর্মকাণ্ড-বিরােধী এবং যজ্ঞে পশুহত্যা-বিরােধী মতবাদ প্রচলিত ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। মূল সাংখ্য এইরূপ বেদবিরােধী মত রূপে প্রথম আবির্ভূত হয় বলিয়া আমার বিশ্বাস। এই প্রকারে নানা স্থান হইতে উপাদান সংগ্রহ করিয়া আমি প্রাচীন কালের একটা ঐতিহাসিক চিত্র আঁকিতে চেষ্টা করিয়াছি। আমার কল্পনা ভ্রান্ত হইতে পারে, কিন্তু আমি যথাসম্ভব সত্যানুসরণ করিতে চেষ্টা করিয়াছি। রসের দিক হইতে নাটকের মূল্য বিচার সম্বন্ধে আমার বিশেষ কিছু বলিবার নাই। এ বিষয়ের বিচারক পাঠক ও দ্রষ্টা। কেবল আমার এই নিবেদন যে, এ বিচার করিতে সমালােচকগণ অলঙ্কার-শাস্ত্রের বাধা মাপ- কাটিকেই শেষ বা একমাত্র প্রমাণ বলিয়া ধরিয়া লইবেন না। রসের প্রধান পরীক্ষাম্বাদে। অলঙ্কার শাস্ত্র—তা’ সে প্রাচ্য হউক বা প্রতীচ্য হউক— কেবলমাত্র কয়েকটি বাহ্য পরীক্ষার সূত্র প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। এ গুলি যারা সৃষ্টি করিয়াছেন, তারা অসামান্য রসজ্ঞ ছিলেন এবং তাদের মতামত অন্ধের পক্ষে যষ্ঠির ন্যায় উপকারী। কিন্তু সে যষ্ঠিচক্ষু নয়। অলঙ্কার শাস্ত্রের বিধি-নিষেধ অবহেলা করিয়া রসিক কবি চিরদিনই নূতন রসসৃষ্টি করিয়াছে, চিরদিন করিবে। পরবর্তী আলঙ্কারিক আবার সেই রসের বিশ্লেষণ দ্বারা অলঙ্কারে নূতন সূত্র গড়িবে। এরূপ না হইলে বাল্মীকি ও হােমার হইতে বার্ণার্ড শ ও রবীন্দ্রনাথ পৰ্যন্ত কেহই নূতন রস সৃষ্টি করিতে পারিতেন না। আমি অলঙ্কার শাস্ত্রে পারদর্শী নই, সুতরাং আমার নাটকে যে আমি আলঙ্কারিকের সকল নীতি অনুসরণ করিয়াছি এরূপ বলিতে পারি না। কিন্তু আমার ভিতর যে টুকু রসানুভূতি আছে তাহার সাহায্যে রস রচনা ॥ করিয়াছি - রসিক পাঠক আপনার অন্তরের রসের নিকষে তাহা যাচাই করিলে কৃতার্থ হইব। আর্ট থিয়েটার লিমিটেডের অভিনেতা ও কর্তৃপক্ষের নিকট আমি এ নাটকের সর্বাঙ্গীন সৌষ্ঠব সাধনের জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞ। তাহারা যে অশ্রুতপূৰ্ব চেষ্টা ও আয়ােজন করিয়াছেন, তাহাতে এ নাটকের শশাভাবর্ধন করিয়াছে। ইহা অভিনয়ের চেষ্টা করিতে গিয়া ইহার সংশােধন ও উন্নতি সাধন কল্পে তাঁহারা বহু সহায়তা করিয়াছেন। তাহার ফলে আমাকে প্রথম রচিত বইখানি আদ্যোপান্ত বহু পরিবর্তন করিতে হইয়াছে। ইহার ফলে কেবল যে ইহার অভিনয়ে সৌকর্য সাধিত হইয়াছে তাহা নহে, ইহার রস সম্পদ বৃদ্ধি হইয়াছে বলিয়া মনে করি। বিশেষভাবে এ বিষয়ে আমি শ্ৰীযুক্ত অপরেশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়, শ্ৰীযুক্তহরিদাস চট্টোপাধ্যায় ও শ্ৰীযুক্ত প্রবোধচন্দ্র গুহের কাছে ঋণী। আমি সঙ্গীতে অধিকারী নই। তাই এই নাটকের জন্য কয়েকটিগান সুকবি শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র দেব রচনা করিয়া দিয়াছিলেন এবং অভিনয় কালে সেই গানই গীত হইয়াছিল। তার মধ্যে কয়েকটি আমি অবিকল গ্রহণ করিয়াছি। দুই এক স্থলে আমার কল্পিত চারণী-চরিত্রের সঙ্গে কথঞ্চিৎ সামাঞ্জস্য রক্ষার জন্য তাঁহার রচিত গান সামান্য পরিবর্তন বা পরিত্যাগ করিতে হইয়াছে। তার যে গান নাটকের ভিতর পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছি তাহা গ্রন্থ-শেষে মুদ্রিত হইল। নরেন্দ্র বাবুর কাছে আমি বিশেষ ভাবে ঋণী। আমার ভাগিনেয় চিত্র-কুশলী শ্ৰীমান চারুচন্দ্র রায় এই নাটকের অভিনয়কালে যে চিত্র ও আহাৰ্য্য সংগ্রহ ও পরিকল্পনা করিয়াছেন তাহাতে অভিনয়কালে ইহার শােভ অশেষ সমৃদ্ধি লাভ করিয়াছিল। তাহার প্রতি দ •৭ আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অনাবশ্যক। আর্ট থিয়েটারের শ্রীযুক্ত প্রবােধচন্দ্র গুহ মহাশয় এই নাটক সমৃদ্ধ বেশে দর্শক-সমাজে উপস্থিত করিবার জন্য যে অসামান্য প্রয়ােগ-নৈপুণ্য এবং অসাধারণ চেষ্টা, যত্ন ও পরিশ্রম নিয়ােগ করিয়াছেন, তাহাতে আমি বিশেষ উপকৃত হইয়াছি। আর একটা কথা বলিবার আছে। নাটকের সম্বন্ধে আমার যে পূর্ণাদর্শ, তাহা আমি এ নাটকে অনুসরণ করিতে চেষ্টা করি নাই। সে আদর্শের সম্পূর্ণ অনুশীলন করিলে আমার নাটক বাঙ্গলার নাট্যামােদর কাছে গ্রহণীয় হইত কি না সন্দেহ। নাটক ও উপন্যাস লেখার ভিতর একটা গুরুতর পার্থক্য এই যে, নাটকে পরিপূর্ণ রূপে অভিনেতা ও শ্রোতার মনের দিকে চাহিয়া লিখিতে হয় ; উপন্যাসে তার কোনও প্রয়ােজন থাকে না; তাহাতে লেখক নিরঙ্কুশভাবে আপনার আদর্শ অনুশীলন করিতে পারেন। আমি এ নাটকে যে আদর্শ ও পদ্ধতি গ্রহণ করিয়াছি তাহা চিরপ্রচলিত, তাহা সেক্সপীয়ারের পদ্ধতি এবং বাঙ্গালা নাট্যসাহিত্যের সাধারণ পদ্ধতি। ইহা আমার নিজের কল্পনানুযায়ী নাটকের আদর্শ-পদ্ধতি নয়। আমার আদর্শ কোনও দিন আমি আকাৰিত করিয়া তুলিতে পারিব কি না জানি না। পরিশেষে, যে বিশ্বদেবতা রসমূর্তিতে আমার ভিতর অধিষ্ঠিত হইয়া আমার চেষ্টা উদ্বুদ্ধ করিতেছেন এবং আমার সকল আয়ােজন তার ইচ্ছামত সাফল্য বা নিস্ফলতায় মণ্ডিত করিতেছেন, প্রণত হইয়া তাঁহারই চরণে ইহার কৰ্ম্মফল সমৰ্পণ করিতেছি। ইতি শ্রীনরেশ।

অভিনয়কালে প্রথম অঙ্ক, দ্বিতীয় দৃশ্যে নিম্নলিখিত গান দুইটা পুস্তকে মুদ্রিত গান দুইটার পরিবর্তে গীত হয়। যে অমরার রূপের ফাঁদে আপন হারা আলােক কাদে, বিলােক জুড়ে করুণ সুরে বাজে ব্যথার বাণী কোন স্বপনে আনমনে সে নামূল ধরায় আসি। আজ কি তারই চরণপাতে, অরূপরূপের দীপ শােভাতে, উঠল ভুবন হাসি'- চাইল সে যেই অাখির পানে আশার ভাষা জাগল প্রাণে মিলন অভিলাষী ; হৃদয় কমল উঠল ফুটে, চরণে তার পড়ল লুটে, নিবীড় ভালবাসি। তােমারই বিরহ বহি হৃদয় যেতেছে দহি জীবন হতেছে গিয়ে ক্ষীণ, তুমি সেথা ফুমেনে অনিন্দ্য নন বনে আনলে যাপিছ নিশিদিন, হিয়ার বেদনা ভরে হেথা মাের অাখি ঝরে ব্যথিত এ অন্তরে, জাগে শুধু নিরাশা মলিন বারেক এ ভাঙা বুকে ধরা দাও হাসি মুখে, মরিব পরশি সুখে, তােমারই ও চরণ রঙিন। করুণায় বিগলিয়া তাও কি দিবে না প্রিয়া তুমি কিগাে ব্যথালেশহীন? দ্বিতীয় অঙ্ক, চতুর্থ দৃশ্য, দ্বিতীয় ভাগে সখীদের গীত। নয়নে নয়নে দুটী নয়নে। সে কবে দেখা হবে মিলন অনুভবে কামনা জেগে রবে ভুলিয়া সব ভুল পরাণ পাবে কুল অখির ঝরা ফুল চয়নে। জীবনে ক্ষণকাল বাজিবে নব তাল স্বপন সুজাল বয়নে। নয়নে।

০ ০ ০ ।। ••• • . আর্ট থিয়েটার লিমিটেড (স্টার রঙ্গমঞ্চ) প্রথম অভিনয় ইং ২৫শে ডিসেম্বর ১৯২৫, বাং ১০ই পৌষ ১৩৩২। নাট্যাচাৰ্য শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ ঘােষ শিক্ষক ও অধ্যক্ষ অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সঙ্গীত শিক্ষক কাশীনাথ চট্টোপাধ্যায় ও জানকীনাথ বসু। নৃত্য-শিক্ষক ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় হারমােনিয়াম-বাদক ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বংশীবাদক ক্ষীরোদচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গতি সতীশচন্দ্র বসাক স্মারক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী প্রথম রাত্রির অভিনেতা ও অভিনেত্রীগণ অপশুত্ব শ্ৰীযুক্ত রাধিকানন্দ মুখােপাধ্যায় উগ্রশ্রবা দুর্গাপ্রসন্ন বসু চারুদত্ত দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্দ্ৰায়ুধ ইন্দুভূষণ মুখোপাধ্যায় অগ্নিবেশ সন্তোকুমার সিংহ সৌধিক বিজয়কৃত মুখােপাধ্যায় সুবাহ মনীন্দ্রনাথ দােষ অগ্নিবর্ণ অহীল চৌধুরী ঋতুপর্ণ নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সত্যসেন তুলসীচরণ চক্রবর্তী সংবাহক নলিনীমােহন দাস সৌধনক রমেশচন্দ্র দত্ত সেনাপতি ব্রজেন্দ্রনাথ সরকার মন্ত্রী শরৎচন্দ্র শূর ও আশুতােষ চক্রবর্তী এডবিবা ভুজেন্দ্রনাথ দে পুরােহিত বিশ্বনাথ চক্রবর্তী তারকনাথ ঘােষ প্রতিহারী-শ্রীযুক্ত বিনােদবিহারী ঘােষ, প্রফুল্লচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় প্রভৃতি শাশ্বতী যুক্তা সুশীলাদুন্দরী সাগরিকা শ্ৰীযুক্তা আশালত। নীহারবাল মাধবিকা সরস্বতী রাণী নন্দৰাণী চাণী রাজলক্ষী চিত্রলেখা রাণসুন্দরী मामी মতিবালা বাসন্তিকা ননীবালা নর্তকীগণ-যুক্ত ফিনােজলা, দুর্গারাণী, মতিবালা, সরস্বতী, আশালতা, তারকবাল, খসানা নকল..নলিজী, সুবাসিনী, সরােজিনী প্রভৃতি। . O । ০ ০০

ঋষিৱ
মেয়ে
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
আপস্তম্বের আশ্রম
( প্রথম দিবস)
( একটি আঙ্গিনা, পশ্চাতে পর্থে অগ্নাগার, ও বাম-পার্শ্বে রন্ধনশার। উভয়ের
মধ্য দিয়া দেখা যাইতেছে প্রাচীর ও তার মধ্যে একটি দ্বার। শাশ্বতী বন্দনারের
অভ্যন্তরে গৃহকর্মে রত, সুদত্ত অগ্নাগারের সামনে বসিয়া আলপনা নিয়েছে। প্রাচীর
i|ত্রে দ্বার পথে ইন্দ্ৰায়ুধ ও অগ্নিবেশ ইন্ধন করিয়া প্রবেশ করিল। ]
ইন্দ্রায়ুধ। ভগবতি! ইন্ধন গ্রহণ করুন।
[ শাশ্বতী দেবী ও সুদত্তা বাহিরে আসিলেন ]
সুত্তা। মা, এতে হবে সব রান্না ? আজ বে কত রান্না করতে
অগ্নিবেশ। আরও কাঠ লাগবে মা? বলুন, আমরা আবার নিয়ে
আসি।

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
শাশ্বতী। না, না, বাবা, এতেই হবে। আমার মেয়ের আজ আদেশ
হয়েছে দশরকম তরকারী ; কেন না,—চারুদত্ত সেই গুলাে খেতে বড়
ভালবাসে। তা এতেই হবে রে পাগলী ; আর কাঠ লাগবে না।
ইন্দ্রা। (স্বগতঃ ) ভাগ্যবান চারুদত্ত ! আমাদের সমাবর্তনের সময়
কে মনে করে আমাদের মনের মতন রান্না করবে ?
অগ্নি। তবে যাই মা, আমরা এই কাছেই থাক্‌ ; আবশ্যক হলে
আদেশ দেবেন, আরও ইন্ধন সংগ্রহ করে এনে দেবো।
শাশ্বতী। হ, এসাে বাবা !
[ শাশ্বতী ও সুদা ভাণ্ডারে প্রবেশ করিলেন। ইন্দ্রায় ও অগ্নিবেশ বামপাশে
অগ্ন্যাগারের সম্মুখ দিয়া প্রস্থান করিল। প্রাচীর দ্বার পথে অপর দুইজন ব্রহ্মচারী যশ
করিয়া ভাণ্ডারের সম্মুখস্থ অঙ্গনে দাড়াইল
১ম ব্রহ্মচারী। ভবতি ভিক্ষাং দেহি ।
২য় ৰ। ভবতি ভিক্ষাং দেহি ।
[ শাশ্বতী বাহির হইয়া উভয়কে ভিক্ষা দান করিলেন।]
শাশতী। কে তোমরা বাছা? তােমাদের নূতন দেখছি।
১ম। যথার্থ আজ্ঞা করেছেন দেবি, আমরা ভগবান উব
আরুণেয়ের অন্তেবাসী শিস্য। দেবি, প্রণাম হই।
[ প্রামান্তর ব্রহ্মচারীদ্বয়ের প্রাচীর দ্বার দিয়া প্রস্থান ;
শাশ্বত। কি অশুভক্ষণে এই উগ্রব। এদেশে এলে জুটেছিল ।
২]

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
যেদিন থেকে এসেছে, সেই থেকে স্বামীর আমার শান্তি নেই। কি কুক্ষণে
উগ্রশ্রবা এসেছিল !
[ শাশ্বতী গৃহে প্রবেশ করিলেন। অপর দুইটী ব্রহ্মচারীর বেশ ।।
১ম ব্র। দেবী, ভিক্ষা এনেছি, গ্রহণ করুন।
শাশ্বতী। [ বাহির হইয়া) সুদত্তা, পাত্র নিয়ে আয়।
[ সুদত্তা চুপড়ী লইয়া আনিল ব্রহ্মচারীদ্বয় তাদের বুলি ঝাড়িয়া তাহাতে
ঢালিল। সুদত্ত তাহার ভিতর হাত দিয়া নাড়াচাড়া করিতে করিতে শাশ্বতার সহিত
ঘরে গেল
১ম। উগ্রশ্রবার শিষ্য গুলি কি মূর্থ ! অম্লানবদনে ব’ললে কি না,
বেদ চারটে! শাস্ত্রে পাঁচশশা জায়গায় আছে, বেদ হ’ল এরী, আর বলে
কি না চার বেদ !
২য়। ওরা বলে, যে অথৰ্ব্ববেদ বলে না কি একটা বেদ আছে।
১ম। অথৰ্ব্ববেদ ? সে, আবার কি ?
২য়। আরে ঐ যে অথৰ্বাঙ্গিরস ! চক্রদত্ত যে এতদিন ধরে ঐ
অথৰ্বাঙ্গিরসের মন্ত্র আর তু তা দিয়ে সংসার চালিয়ে আসছে। উগ্রব।
বলেন যে, ওটাও নাকি একটা বেদ।
১ম। হাঃ হাঃ হাঃ! আচাৰ্য্যদেব তাে অথৰ্বাঙ্গিরসের নাম পয্যন্ত
শুনতে পারেন না।
[ উভয়ের দক্ষিণ দিক দিয়া এস্থান।
[ ৩

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃ
[ দক্ষিণ দিক দিরা আপস্তম্ব ও চারুদত্তের প্রবেশ ]
আপ। বৎস চারুদত্ত! আমি তােমাকে সকল বিদ্যা দান করেছি।
তােমার মত কৃতী শিষ্য আমি কখনও পাই নি। এমন মেধা, এমন
তিতিক্ষা, এমন জ্ঞানপিপাসার সঙ্গে সঙ্গে এত বিনীত নম্রস্বভাব।
আশীৰ্বাদ করি এবং দেবতার চরণে নিয়ত প্রার্থনা করি যে, তুমি চিরকাল
জয়যুক্ত হও। জানে, ধৰ্ম্মে ও চরিত্রে মহীয়ান হয়ে অক্ষয় কীৰ্ত্তি লাভ কর।
চারু। [ প্রণত হইয়া ] ভগবানের আশীর্বাদ অমােঘ হবে সন্দেহ
নাই।
[ এই সময় সুদত্ত ঘরের ভিতর হইতে বার বার ঘরের কাছে
আসিয়া সতৃক নয়নে চারুদন্তের দিকে চাহিতে লাগিল ]
অপ। যাও বৎস! অগ্নি প্রদক্ষিণ করে এসাে। তুমি স্নাতক,
এখন আর তােমার অগ্নিকে হব্য দেবার অধিকার নেই, স্মরণ রেখাে।
চারু। যথা আজ্ঞা।
( অগ্ন্যাগারে প্রবেশ করিল)
'আপ। মুত্তা!
[ সুদত্ত অগ্রসর হইয়া পিতার গা ঘেসিয়া দাঁড়াইল ]
মুত্তা। কেন বাবা?
আপ। চাদত্তের জন্য কি রান্না করলি ?
সুদত্তা। আমি কি রান্না করবাে ? মা করছে। কিছুই রান্না
হয় নি।
[ শাশ্বতী ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন ]
৪]

ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
শাশ্বতী। না কিছুই হয়নি। উনি বল্লেন, হরিণের মাংস চাই। তা
সংগ্রহ করে উঠতে পারি নি।
আপ। [ হাসিয়া ] আহা! আমাকে বললে না কেন? এই কাজ
প্রত্যুষেই তাে ব্যাধ এসেছিল আরণ্য মাংস নিয়ে।
সুদত্তা। শুলে মা ! আমি বল্লাম বাবাকে বল, তা তুমি
শুনলে না।
শাশ্বতী। ঘাট হয়েছে বাছা! মেয়ে চিনেছেন বাপকে, আর বাপ
চিনেছেন মেয়েকে। মা বেট দাসী, কেবল আছেন দোষের বােক
বইতে। [ হাস্য ]
আপ। তা তত অন্যায় বলনি দেবি! একজন তাে চাই সংসারের
মধ্যে যে দোষের বােঝ বইবে।
শাশ্বতী। কেন? আমি কি তােমার ভার বইবার গরু? যাই হােক,
তাই বলে মেয়েটার মাথা এমন করে চিবিয়ে খাবার দরকার নেই।
আপ। হাঁ সুদত্তা!—তাের মা, এ কি অন্যায় কথা বলে ? আমি
কি অনাৰ্য রাক্ষস, যে এমন শাস্ত্র বিগর্হিত বস্তু খাব?
সুদত্তা। না বাবা, আমার মাথা ঠিক আছে ; তুমি মার কথা
কাণে তুলে না।
[ চারুদত্ত অগ্নাগার হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল ; সুদত্তা সরিয়া গেল এবং ক্রমে গিয়
অগ্ন্যাগারের সম্মুখে দাড়াইয়া চারুদত্তর দিকে চাহিয়া রহিল
আপ। চারুদত্ত! তুমি আহারান্তে দেবীকে প্রণাম করে এ ;
আমি পাঠাগারে তােমার প্রতীক্ষা করবে।

প্রথম অঙ্ক
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
;
চারু। ভগবতী! প্রণত হই।
শাশ্বতী। চিরজীবী হও বৎস!
চারু। দেবি ! বারাে বৎসর পূর্বে আমি আপনার কোলে
এসেছিলাম। আপনার স্নেহেই আমার বৃদ্ধি ; আপনার দয়ায় আমি
গুরুদেবের নিকট বিদ্যা গ্রহণ করতে পেরেছি। আজ সমাবর্তনের
দিন, আপনি আমার কাছে কিছু বর গ্রহণ করুন!-আদেশ
করুন !
শাশ্বতী। বর! হ বৎস, চাইব। কিন্তু দিতে পারবে কি তা?
চারু। আদেশ করুন আপনি, যত কঠিন্ হােক্ তা, আমি প্রাণপণ
করে তা সংগ্রহ ক’রবাে।
শাশ্বতী। বৎস! দেবগণ আমাকে পুত্রধনে বঞ্চিত করেছেন; কিন্তু
তুমি আমার পুত্রের অধিক, তােমার কাছে আমি সেই বর চাই, যাতে
আমি আপনাকে ভাগ্যবতী বলে মনে করতে পারি। আমি তােমার
কাছে এই বর চাই, যে তুমি মানুষ হও। দেবগণের প্রিয়, সর্বলােকের
বরণীয় নরশ্রেষ্ঠ হয়ে, তুমি আমার মাতৃস্নেহের ঋণ পরিশােধ কর, এই
আমার ভিক্ষা ।
চারু। মায়ের যােগ্য ভিক্ষা! আপনার আশীৰ্বাদ মাথায় করে
জীবনে অগ্রসর হচ্ছি মা। জানি না, আপনার আশা সফল করতে
পারব কি না। কিন্তু আপনার চরণ-স্পর্শ করে শপথ করছি, যে
সত্য কখনও পরিত্যাগ করবে না, ধৰ্ম্ম কখনও ছাড়বে না। সত্য ও
ধৰ্ম্মকে মাথায় করে পুরুষকারের দ্বারা যা কিছু সম্ভব, অর্জন করবে।
তার পর আমার অদৃষ্ট, আর আপনার আশীৰ্বাদ !
৬]

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
[ সুদত্তার মুখ আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল, সে তন্ময় হইয়া
চারুদত্তকে দেখিতে লাগিল ]
শাশ্বতী। তােমারই যােগ্য কথা বলেছ বাবা! তুমি একটু অপেক্ষা
কর, আমি গােশালা থেকে একটু দুধ দুইয়ে নিয়ে আসি। আমার
কপিলার দুধ না খাইয়ে তােমাকে বিদায় দিতে পারবাে না।
[ বাম দিক দিয়া প্রস্থান।
সুদত্ত। বলি ওগাে ব্রহ্মচারী ঠাকুর !
চারু। ভুল হ’ল সুদত্তা ! এখন আর ব্রহ্মচারী নই, এখন এক ডুব
মেরে স্নাতক হয়ে পড়েছি। এখন জান, ইচ্ছে করলে এক্ষুনি বিয়ে করে
ফেতে পারি ?
সুদত্তা। কাকে ?
চারু। যার সে সৌভাগ্য হবে। তােমার যদি সে বিষয়ে কোনও
আবেদন থাকে, চটপট বলে ফেল। কেন না—
সুদত্তা। বােঝ বইবার এতবড় গর্দভ আর খুজে পাওয়া যাবে না।
চারু। চপলে, তােমার কথাটা বড় অসম্মানসূচক ! জান ত, গর্দভ
জন্তুটা সুবুদ্ধির জন্য বিখ্যাত নয় ?
সুদত্তা। তুমিও নও।
চারু। সে কি কথা? এই মাত্র শুলে, আচার্যদেব আমার মহা
সুখ্যাতি করে গেলেন, আর তােমার মা-
সুদত্তা। তাদের কাছে খ্যাতি পাওয়া কিছু শক্ত কথা নয়। কিন্তু
[৭

প্রথম অঙ্ক ) ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য | তোমার সুবুদ্ধির খ্যাতি আছে তা সেই দিনই বুঝব, যে দিন তােমার স্ত্রী তােমাকে বুদ্ধিমান বলে স্বীকার করবেন। চারু। এ যে তােমার বেজায় আবদার, সুদত্তা! স্ত্রীর কাছে বুদ্ধির জন্য খ্যাতি এ পর্যন্ত জগতে কোনও পুরুষ কখন পায় নি। কোনও দিন পাবেও না। আর তা ছাড়া যত দূর দেখা যাচ্ছে, এই—ওর নাম কি আমার স্ত্রী-অথাৎ—ওর নাম কি—সেটা বােধ হয় তােমাকেই হতে হবে। সুদত্তা। শােন বাচাল ব্রাহ্মণের কথা ! কি ধৃষ্টতা তােমার! আমাকে এমনি কথা অনায়াসে মুখের উপর বলে বসলে ? আমার এক্ষুনি এ স্থান ছেড়ে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে। চারু। না না, অত তাড়াতাড়ি নয়, একটু রয়ে সয়ে ; আমি একটা বাড়ী-ঘরের যােগাড় করি, নইলে গিয়ে উঠবে কোথায় ? সুদত্তা। উঃ! তুমি অতি দুঃশীল, দুশ্চরিত্র, দুর্ধর্ষ, দুৰ্ম্মদ, দুরাচার। আমার সম্বন্ধে এমন কথা ব’তে তােমার দ্বিধা বােধ হচ্ছে না? চারু। না—দ্বিধা হবার উপায় যে নেই সুদত্তা ! দুই বৎসর হল একদিন হঠাৎ তােমাকে যে কি চক্ষে দেখে ফেলেছি! হাঁ, তা স্বীকার কর যে, তুমিও তারই কাছাকাছি সময়েই আমাকেও একটা কি চক্ষে দেখে ফেলেছ। তার পর তার পর থেকে আমরা কথাটা পরস্পরের কাছে ভাল করে গােপন করতে পারিনি। এখন আর দ্বিধা করবো কার ভয়ে সুদত্তা ? সুদত্ত। স্পৰ্দা বটে! যাক, কি আর করবো ? জগতে স্পর্ধাই চিরকাল জন্ম হয়েছে, কাজেই প্রতিবাদ করে কি হবে ? এখন একটা y]

প্রথম অঙ্ক
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
কথা বলি, তুমিতাে শূন্য হাতে বড় দাতা হয়ে বসলে বর দিয়ে ' আমাকে
একবার বর দিতে চাইলে না?
চারু। সাহস হয় না সুদত্তা ! লােক বুঝে বর দিতে হয়। তােমাকে
যদি বলি, তুমি হয়তাে ভয়ানক একটা কিছু চেয়ে বসবে। এই, হিসাব
করে বর দিতে গিয়ে হরিশ্চন্দ্র বেচারা কি নাকাল হয়েছিলেন,
জান তাে ?
সুদত্তা। না গাে ঠাকুর, তেমন কিছু ভয়ানক আমি তােমার কাছে
চাইব না।
চারু। না, যৎসামান্য ;—যথা—মুক্তার একাবলী !
সুদত্তা। ওরে বাপরে! তুমি যে ভয় পেয়ে গেলে, তবে দেখছি
আর কিছু চাওয়া হল না।
চারু। আচ্ছা! সেই ভাল। আমি বরং নিজের পছন্দ মত তােমাকে
একটা উপহার দিচ্ছি।খুব দামী জিনিস—একদম নগদ—এই
আমার প্রাণ!
সুদত্তা। (হাত বাড়াইল) দাও।
চারু। আর দেব কি ? কথা বলবার আগেই সে তোমার অন্তর
ভাড়ারে পৌছে গেছে।
সুদত্তা। তবে আর নূতন দিলে কি? সে তো অনেক দিন হ';,
আমার ভাড়ারে জমা রয়েছে।
চারু। তবে তাে আর উপায় দেখছি না। আর তো আমার
নেই, এক আছি আমি। হুকুম কর তাে আমিই বর হ'য়ে বসি।
সুদত্ত। ইস, বড় স্পর্ধা দেখছি—তােমার থাকার মধ্যে আছে

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
কেবল মুখখানা, সেই সম্পদ নিয়ে আমার মত পদ্মিনীর বর হতে
ভরসা কর ?
চারু। এ রকম স্পর্ধার কাজ করাটাই আমার স্বভাব। আচ্ছা, এ
বর যদি না রােচে তােমার, তবে কি চাও তুমি ?
সুদত্তা। ( হঠাৎ গম্ভীর হইয়া চুপ করিল, পরে) মনে আছে
চারদত্ত ?-একদিন তুমি একটা স্বর্ণলতার কঙ্কণ রচনা করে আমাকে
দিয়েছিলে? আজ তুমি আমাকে তেমনি দু’টা কঙ্কণ দিয়ে যাও।
এত আস্ফালনের পর এই চাইলে সুদত্তা -এত দামী
জিনিস ?
সুদত্তা। আমার কাছে এর দাম যে কত, তা তুমি কি বুঝবে ?
চারু। ও কি! চোখে জল ! চপলার অঙ্গে মেঘ! সুদত্তা, কেঁদ না,
লক্ষ্মী। আমার বিদায়-ব্যথাকে আরও কঠিন করে না। এই নাও
তােমার কঙ্কণ, আমি যাবার আগে তােমাকে দিয়ে যাব বলে গােপনে
গেঁথেছিলাম। তুমি যখন চেয়ে আমার দানের মর্যাদা হরণ করলে
সুদ-তখন আমাকে তােমার হাতে এটা পরিয়ে দিতে দাও।
[ সুদত্তা নত নেত্রে হাত বাড়াইয়া দিল, চারুদত্ত চারিদিকে চাহিয়া তাড়াতাড়ি
কঙ্কণ পরাইয়া দিল ]
সুদত্তা। (চক্ষু মুছিয়া) এ কঙ্কণ তােমার রইলাে প্রিয়তম! এ হাত
বাধা রইলাে তােমারই কাছে।
চারু। ওই যে দেবী আসছেন।
১০ ]

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
[ দুগ্ধভাণ্ড হস্তে শাশ্বতীয় প্রবেশ }
শাশ্বতী। এসে বৎস, ঘরের ভিতর এসাে ; তােমার আহাৰ্য প্রস্তুত।
[ সকলের রন্ধন গৃহের অভ্যন্তরে প্রস্থান, চারুদত্ত আহারের জন্য আসনে বসিল।
হঠাৎ দক্ষিণ দিক হইতে আপস্তম্বের প্রবেশ
চারু।
আপ। চারুদত্ত!
[ চারুদত্ত ব্যস্ত হইয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিল ]
আপ। চারুদত্ত ! শুনলাম, তুমি চক্রদত্তের কাছে গিয়েছিলে। কি
জন্য গিয়েছিলে? বল?—চুপ করে রইলে কেন ?
চারু। অথৰ্বাঙ্গিরসের গুঢ় মৰ্ম্ম জানতে বড় কৌতুহল হয়েছিল
দেব, তাই গিয়েছিলাম।
আপ। তুমি জান, আমি তােমাকে বার বার উপদেশ দিয়েছি, যে
আথৰ্ব্বণিকগণ পাপিষ্ঠ। তাদের সঙ্গে সাহচৰ্যমাত্রই পাপ !
এ উপদেশ আৰ্য দিয়েছিলেন।
আপ। তারপর তুমি জান যে, উগ্রশ্রবা সে দিন সভায় এই তর্ক
উপস্থিত করেছিল যে, অথৰ্বাঙ্গিরস শ্রুতি। আমি তা অস্বীকার
করেছিলাম। সে দিন তর্কের সময় তুমি উপস্থিত ছিলে। জান তুমি
যে সমস্ত তর্ক যুক্তি উপেক্ষা করে—রাজা জয়মাল্য দিয়েছিলেন
উগ্রবাকে ? সেই দিন থেকে রাজ্যে আথৰ্ব্বণিকদের উপদ্রব বেড়ে
গেছে। লােকে বৈশ্যদেব পূজা পরিত্যাগ করে, চক্রদত্তের দৈত্যপূজার
আয়ােজনে ব্যস্ত হয়েছে।
চারু। আজ্ঞে, জানি।
[ ১১

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
আপ। তা জেনেও তুমি সেই আথৰ্ব্বণিকের কাছে উপদেশ গ্রহণ
করতে গিয়েছিলে ?
চারু। দেব, অপরাধ করেছি, ক্ষমা ভিক্ষা করি ।
আপ। কেন গিয়েছিলে শুনি?
চারু। সেদিন রাজসভায় আৰ্য উগ্ৰষবার তর্ক শুনে আমার মনে
এই অথৰ্ব্ব-বেদের মর্ম জানবার জন্য ভয়ানক কৌতুহল—
আপ। অথৰ্ব্ব-বেদ।
চারু। অথৰ্বাঙ্গিরস-কেবল মাত্র কৌতুহল তৃপ্তির জন্য চক্রদত্তের
কাছে গিয়েছিলাম।
আপ। গুরুদ্ৰোহী পাপিষ্ঠ ! আমার শিষ্য হয়ে, আমার গৃহে তুমি
অনায়াসে অথৰ্বাঙ্গিরসকে বেদ বলে প্রকাশ করলে ? তােমার জিহ্বা
তপ্তশলাকার দ্বারা বিদ্ধ করে প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত।
চারু। দেব, অধীনের স্পর্ধা ক্ষমা করবেন। অথৰ্ব্ববেদ—অথৰ্বাঙ্গি
রসকে বিপর্যস্ত করতে হলে, তার সম্বন্ধে কিছু জানা আবশ্যক বিবেচনা
করেন না কি ?
কোনও আবশ্যক নেই। বেদ বেদাঙ্গের অতীত জ্ঞান নাই,
তাই তােমার আমার পক্ষে যথেষ্ট। আজ যদি তুমি অথৰ্বাঙ্গিরস জানতে
চাও, তবে কাল চাণ্ডাল শাস্ত্ৰ জানতে চাইবে। এত যদি তােমার জ্ঞান
পিপাসা হয়, তবে তুমি আমার অঙ্গনে দাড়িয়ে থেকে আমার গৃহ কলঙ্কিত
কোরাে না।
চার্ক। কিন্তু দেব অথৰ্বাঙ্গিরসের অনেক সূক্ত বেদ থেকে অভিন্ন।
আপ। স্তব্ধ হও।
গুরুকে শিক্ষা দেবার স্পর্ধা কোরাে না।
১২]
আপ।

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
আমার মুখের ওপর কথা কবে এত বড় পণ্ডিত তুমি? যাও, দূর হও
'আমার গৃহ থেকে।
চারু। দেব!
আপ। যাও, বেরােও ; নিষ্ক্রান্ত হও।
[ চারুদত্ত উঠিয়া একবার আপস্তম্বের দিকে গম্ভীরভাবে কঠোর দৃষ্টিতে চাহিল ;
তারপর মুখ ফিরাইয়া চলিয়া গেল। শাশ্বতী অন্নপাত্র আসনের সম্মুখে রাখিয়া ছুটিয়া ঘর
হইতে বাহির হইলেন ; সুদত্তাও বাহির হইল )
শাশ্বতী। চারুদত্ত, কোথা যাও ? তােমার অন্ন দিয়েছি।
চারু। ( নেপথ্যে ) দেবি! মার্জনা করুন।
শাশ্বতী। এ কি করলে তুমি? কি বলে তুমি আজ বিদায়ের
দিনে এমন কথা ওকে বললে? যাও প্রভু, ওকে ফিরিয়ে নিয়ে এসাে।
আপ। না। ও আমার কেউ নয়।
[ সুদত্তা নতনয়নে ভাণ্ডার-দ্বারে দাঁড়াইয়া রহিল ]
শাশ্বতী। কেউ নয় ? প্রভু, চারুদত্ত যে তােমার প্রিয়তম শিষ্য,
তােমার পুত্রের অধিক। ভুলে যাচ্ছ কি প্রভু, সুদত্তাকে যে তুমি ওর
হতে সমর্পণ করবার জন্য আমার কাছে প্রতিশ্রুত হয়েছ ?
[ সুদত্তা চমকিত হইয়া চাহিল ]
আপ। ভুলিনি শাশ্বতী, ভুলতে পারিনি, কি স্নেহ দিয়ে আমি ওকে
বর্জিত করেছি! সুদত্তাকে ওর হাতে সমর্পণ ক’রবাে-এর চেয়েও বড়
আশা আমি ওর কাছে করেছিলাম ; মনে করেছিলাম, আমি মরে যাব,
কিন্তু আমার বিদ্যা, আমার যশ, চারুদত্তের হাতে সহস্রগুণ বর্জিত হয়ে
[১৩

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
লোকে জয়যুক্ত হবে। চারুদন্তের জ্ঞান, যুগযুগান্ত ধরে ভারত আন্দোলিত
করবে, আর তার জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে তার গুরুর খ্যাতি
প্রতিপত্তি। এত বড় আশা করেছিলাম শাশ্বতী, তাই এত বড় দাগ
পেয়েছি। সেই চারুদত্ত সমাবর্তনের অবসর পৰ্যন্ত প্রতীক্ষা না
করে আমার পরম শত্রুর কাছে আমার মাথা হেঁট করেছে। ও কি
দারুণ দুর্দৈব!
[ আপস্তম্ব গম্ভীরভাবে বামদিক দিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলেন, শাশ্বতী নতমস্তকে বিষণ্ণভাবে
দাড়াইয়া রহিলেন। সুদত্তা উদাসভাবে আকাশের দিকে চাহিয়া ভাণ্ডারধারে ঠে
দিয়া দাঁড়াইয়া রহিল ]
দ্বিতীয় দৃশ্য
আপস্তম্বের আশ্রম
(তিন দিন পরে)
[ শাশ্বতী ও আপস্তম্ব দক্ষিণ দিক হইতে প্রবেশ করিলেন ]
আপ। কি দারুণ অধৰ্ম্ম ! কি অবিচার! কি ঘাের অপমান।
আজ ত্রিশ বৎসর আমি এ রাজ্যে অক্ষুগ্ন-প্রতাপে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করে
এসেছি, ধর্ম ব্যবস্থা দিয়েছি। ঋষিকল্প ব’লে লােকে আমায় শ্রদ্ধা করে
এসেছে ; কোনও দিন রাজা বা কোনও সভাসদ আমার কথার উপর
কথা কইতে সাহস করে নি। আর আজ কি না কোথাকার অপােগণ্ড
অর্বাচীন উগ্রশ্রবাসে রাজার কাছে আমার চেয়ে বড় হ’ল ?
শাশ্বতী। রাজা কৌৎস তােমায় এমন অপমান করলেন ?
১৪ ]

প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য আপ। শুধু অপমান নয় দেবী, রাজ্যে তিনি দারুণ অধর্মের প্রতিষ্ঠা কলেন। এ রাজ্যের আর মঙ্গল নেই। শ্বাশতী। কেন কি হয়েছে প্রভু ? আপ। আজ সভায় মহীধর শ্রেষ্ঠ এক ব্যবহার উপস্থিত করেছিল। মহীধরের ভ্রাতার মৃত্যু হয়েছে, সেই তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। মণিভদ্র নামে এক যুবক তাতে আপত্তি করলে যে, সে মৃতের ক্ষেত্রজ পুত্র, এবং তার ধনাধিকারী। আমি বল্লাম, শ্রুতিতে জারজ ও ক্ষেত্রজে কোনও প্রভেদ নাই। ক্ষেত্রজ কখনও ধনাধিকারী হতে পারে না। .উগ্রশ্রবা আমার যুক্তির কোনও উত্তর দিতে পারলে না। তবু রাজা, উগ্রবাকে জয়ী সাব্যস্ত করে, ওই জারজ মণিভদ্রকে জয়পত্র দিলেন। কি দুর্দৈব ভেবে দেখ দেখি শাশ্বতী ? নিয়ােগের অনাৰ্যবিধি যদি শাস্ত্রীয় হয়, তবে অনাচারের আর বাকি রইলাে কি? সমাজ তো তাহলে ছারেখারে যাবে! শাশ্বতী। ছিঃ ছিঃ, কি লজ্জা, কি ঘৃণার কথা! এমন অধ করলেন রাজা! এখন উপায়? আপ। উপায় আর কিছু নেই শাশ্বতী। যে অনার্যদেশে উগ্রশ্রবা ধৰ্ম্ম ব্যবস্থাপক, তার আর উপায় নেই। আমাদের এ অভিশপ্ত রাজ্য পরিত্যাগই এক উপায়। কৌৎস নিজে অপুক—তার মহিষী যে দেশের কা, সেখানে নিয়ােগের অক্ষুণ্ণ প্রতাপ ; সুতরাং হয় তাে আর কিছুদিন পর কৌৎসের জারজ পুত্র হবে এ রাজ্যের অধীশ্বর ; ধৰ্ম্ম, নীতি সব অতল সাগরে ডুবে যাবে। আপস্তম্বের আশ্রম যে এ দেশে ছিল, তখন এইটাই আমার অখ্যাতির কারণ হবে। [ ১৫ প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য শাশ্বতী। দেশ ছেড়ে যাবে ? কেমন করে যাবে দেব ? এই ঘর দ্বার, এই সব অন্তবাসী, এতগুলি গরু, এসব কাদের দিয়ে যাবে ? কোথায় যাবে ? আপ। কোনও চিন্তা করাে না শাশ্বতী ! ধৰ্ম্ম এখনও আছেন। এই বিস্তীর্ণ দেশে এখনও এমন রাজা আছেন, যারা শ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধা রাখেন, সদাচারের উপর ভক্তিমান। আপস্তম্বকে সমাদর করে গ্রহণ করবার মত রাজা আর্যাবর্তে দুষ্প্রাপ্য হবে না। না হয়, আমি সুদূর দক্ষিণে গিয়ে, অনাৰ্য দেশে বেদের মহিমা প্রতিহত ক’রবাে ; অনাৰ্য রাজ্যে ঋষিদের ধর্ম স্থাপিত করবে। কিন্তু এ অভিশপ্ত রাজ্যে আর একবাে না। শাশ্বতী। তাই যদি তােমার অভিপ্রায় হয়, তবে তাই যাব প্রভু। আমি তােমার ছায়া বইতো নই। বড় আশা ছিল, অচিরে সুদত্তার বিবাহ দিয়ে দৌহিত্র মুখ দেখে পুণ্যলাভ ক’রূবাে ! কিন্তু আপ। হাঁ,-আর শুনেছ ? চারুদত্ত, সেই পাপিষ্ঠ, সে গিয়ে উগ্রবার কাছে শিষ্যত্ব স্বীকার করেছে। অকৃতজ্ঞ—গুরুভদ্রাহী পাপাত্মা ! শাশ্বতী। হা অদৃষ্ট! (দীর্ঘনিঃশ্বাস) আপ। ওঃ! শাশ্বতী ! এ যে কি জ্বালা, তা তুমি বুঝতে পার কি? চারুদত্ত আমার শত্রুকে আশ্রয় করে আমাকে বিধ্বস্ত করতে চেষ্টা করছে।—এ যে আমার নিজের হৃৎপিণ্ড নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠছে। আমার কোন পাপের ফলে এ দুঃখ বলতে পার? শাশ্বতী। তােমার পাপ প্রভু ? তুমি যে তােমার সমগ্র জীবনকে ১৬] প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য একটা যজ্ঞে পর্যবসিত করেছ! নিত্য কাম্য সকল যজ্ঞের ধূমে যে তােমার গৃহের আকাশ নিয়ত অন্ধকার হয়েছে। জ্ঞানে কখনও তুমি কারও অনিষ্ট করনি, অনিষ্টের চিন্তা কর নি—তােমার পাপ ?- আপ। ঠিক বলেছ শাশ্বতী—তাই আমার পাপ। আমি পাষণ্ডী নাস্তিকদের মত অহিংসার আচরণ করেছি, ধৰ্ম্মের রক্ষার জন্য হিংসা করতে অগ্রসর হই নি। তাই আমার এ শাস্তি। [ পরিক্রমণ করিয়া কিয়ৎক্ষণ পরে ] যদি উগ্রবাকে বেদ-বিরােধী জেনে, কেবল মাত্র শাস্ত্র যুক্তি ও তর্কের আশ্রয় না নিয়ে, তাকে হত্যা বা নির্বাসিত করতাম, তবে তো আমার এ বিপত্তি হত না রাজ্যে ধৰ্ম্মও বিপৰ্য্যন্ত হত না। ঠিক বলেছ শাশ্বতী, এই আমার পাপ-পাপের সঙ্গে বিরােধে আমি হিংসায় বিমুখ হয়েছি। কিন্তু আর হবে না। আমি হিংসা করবাে। [ কিঞ্চিৎ পরে] কেন করবাে না? আমি তাে পাষণ্ডী নই—আমার যজ্ঞাগার বলির পশুর রক্তে নিয়ত রঞ্জিত থাকে—আমি মানুষকে কেন হিংসা করবে না? যে ধৰ্ম্ম-বিরােধী, তাকে আমি হিংসা ক’রবাে। [ কিঞ্চিৎ পরে ] ছলে, বলে, কৌশলে, আমি ঐ পাপিষ্ঠ উগ্রশ্রবা ও তার হীনাচারী কপট শিস্য চারুতের সর্বনাশ ক’রবাে-রপর- তারপর সহধর্মিণী, জীবনের সব ঋণ শােধ করে আমরা বাণপ্রন্থে বাব। শাশ্বতী। (সভয়ে) দেব! তােমার ক্রোধে আমার প্রাণ কেঁপে উঠেছে। তুমি মহাতপা, তােমার ক্রোধই যে তােমার শত্রুকে ক্ষয় করবে। ক্রোধ সংবরণ কর প্রভু! তার চেয়ে চল না আমরা এখনই এ স্থান ত্যাগ [ ১৭ প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য করে বাণপ্রস্থে যাই। আমাদের জীবনের সব কাজ তত হয়ে গেছে প্রভু—কেবল সুদত্তা ! আপ। হাঁ, সুদত্তা! তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমি ইন্দ্রায়ুধকে সমাবৃত করে, তার হাতে কন্যা সম্প্রদান করবে। শাশ্বতী। তােমার সহধর্মিণী হয়ে, আমি তােমাকে এত বড় অধৰ্ম্ম করতে দেব না দেব! তুমিই তাে একদিন আমার কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ আপ। সে প্রতিশ্রুতি আমি রাখতে পারবো না শাশ্বতী! যদি রাখি, তবে আমি নিজ হাতে সুদত্তাকে বিধবা করব। শাশ্বতী। এমন সর্বনাশের কথা বােলােনা প্রভু! চারুদত্ত তােমা সন্তানের তুল্য ; তার অপরাধটাই এত বড় হবে-স্নেহ কি কিছুই নয়। সন্তান যদি পিতার কাছে, শিষ্য গুরুর কাছে ক্ষমা না পায়, স্নেহ যদি শাসনকে বশীভূত করতে না পারে, তবে পৃথিবী যে রসাতলে যাবে প্রভু দেব ! প্রসন্ন হও;-মায়ের হৃদয়ের এ প্রার্থনা অগ্রাহ্য করােনা। আপ। ক্ষান্ত হও পত্নী ! আমি পুরুষ, নারী নই। আমি ক্ষ। করতে জানি—কিন্তু সে পুরুষের ক্ষমা। আমার শক্তি বাকে পরাভূত করবে, তাকেই আমি ক্ষমা ক’রবাে। যে আমার অক্ষমতায় বিশ্বাস করে বিদ্রোহের দণ্ড নিয়ে দাড়িয়েছে—তার প্রতি ক্ষমা দুৰ্বলতা, কাপুরুষতা! আপস্তম্ব যে কাপুরুষ নয়, নারী নয়, তার যে হিংসার শক্তি আছে, একথ: যতক্ষণ না প্রতিষ্ঠিত হবে, ততক্ষণ আমার কাছে ক্ষমা নেই। [ বামদিকে প্রস্থান। ১৮ ] প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য শাশ্বতী। জীবনের সন্ধ্যায় এ কি কুগ্রহ আজ আমাদের উপর রােষদৃষ্টি দিচ্ছে ! হে ইন্দ্র দেবরাজ, ব্রতপতি অগ্নিদেব, হে নাসত্য যুগল, হে বরুণ, যেদিন তােমাদের সাক্ষী করে স্বামীর কল্যাণ হস্ত ধারণ করে আমি এ গৃহে এসেছি, সেই দিন থেকে সারা জীবন তাে একাগ্রচিত্তে তােমাদের সাধনা করে এসেছি। কোনও দিনতে প্রভু আমরা তােমার সেবায় পরায়ুখ হই নি ; তােমরাও চিরদিন প্রসন্ন হয়ে আমার স্বামীর নিয়ত মঙ্গল সাধন করেছ! আজ এ কি বিপত্তি তােমরা পাঠালে আমাদের ঘরে ! চারিদিকে যে অন্ধকার মেঘ কালো হয়ে উঠেছে ; এর ভিতর থেকে আলাে কে দেবে, হে দেবগণ! তােমাদের দাসীকে কে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবে তােমরা ছাড়া ! [ বামদিকে প্রস্থান। [ সুদত্তার প্রবেশ-নীরবে চিন্তা। গাহিতে গাহিতে চারণার প্রবেশ গীত জলদ ধারা গগনে হারা বরষা অবসান, ওঠেন। আজ গরজি বাজ বিজলী হতমান, ঝঞ্চা বায়ু বিগত আয়ু নিখিল যেন শিথিল স্নায়, উদিল ধনু রঙিন তনু নীরব কলগান ! মরত লােভ গোপনে আগুয়ান, [ ১৯ ৯ প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য আজি কি তাই ধরণীতলে জিনিতে প্রিয়া প্রণয়ী চলে সমর ছলে অসুর বলে, হরণ অভিযান। বিমদৰাজ করিল আজ পুরুর যােষা হরিতে সাজ প্রেম ললিত গীতি মাঝ বাজিল কৃতান! সুদত্তা। যা চেঁচানে। চারণী। আচ্ছা মা, এ গান পছন্দ না হয় আর একটা গাই- গীত সে যে বিদায় লয়ে গেছে ফিরে, কবে নীরবে ! সজল অখি তাল্প সোহাগ-বাণী-হারা মিলন মাগি সারা হাম যবে! মরমে ব্যথা তার মরে গুরুভার নিয়ত একা আর কেমনে সবে? বিরহে ঝরে যদি নয়ন নিরবধি ২০]

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয়
দৃশ্য
নীরস মরু হৃদি
সরস হবে!
জীবন নদীতীরে
ফুটিবে ফুল ধীরে
আসিবে সখা ফিরে
প্রেমানুভবে !
আসিবে সখা ফিরে
সরস যব শিরে
দুলিবে ফুল ধীরে
নীরবে যবে।
সুদত্তা। [ চমকিত হইয়া ] এ কি গান গাইলি চারণী ! কে তােকে
এ গান শেখালে ?
চারণী। যে শিখিয়েছে সে বলেছে, তুমি গান শুনলেই চিন্ত
পারবে।
সুদত্তা। কে সে ব ? চারুদত্ত ?
চারণী। ও মা, এতক্ষণ কি তাও বুঝতে পারনি ?
সুদত্তা। ( ব্যস্তভাবে ] তাের সঙ্গে কি তার আবার দেখা হবে
চারণী ?
চারণী। তিনি আমার সঙ্গে দেখা না করে কোথায় যাবেন? তােমর
উত্তর না শুনে যে তাঁর নড়বার যাে নেই। তিনি যে উগ্রস্রবার শিষ্য হয়ে
সেখানে আছেন।
সুদত্তা। শােন্ চারণী ! তাকে একটা খবর দেওয়া বড় দরকার।
তুই পারবি দিতে? কেউ জানতে পারবে না ?
[ ২১

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
•
চারণী। তা আর পারব না মা, এ যে আমার ব্যবসা।
সত্তা। না—সে কথা তােকে বলতেও আমার ভরসা হয় না।
[ কিছুক্ষণ ভাবিয়া ] তাকে একবার এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে
বলিস।
চারণী। কখন ? কোথায় ?
সুদত্তা। না কাজ নেই ; সে তাে আসবে না ! { কিছুক্ষণ পরে ]
কোনও মতে তুই আমার সঙ্গে তার একবার দেখা করিয়ে দিতে পারিস ?
চারণী। তা পারবাে না কেন? সরস্বতীর তীরে অশােক কুঞ্জে
সুদত্তা। না—না, আমি এ বাড়ীর বাইরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা
করতে পারবাে না। কিন্তু বাড়ীতে সে এলেও তত বাবা তাকে
অপমান করবেন ? একটা কিছু উপায় করতে পারিস চারণী ?
চারণী।
এক উপায় আছে। আমাদের চক্রদত্ত ঠাকুর একটা মন্ত্র
জানেন, সেটা বলে যদি আগুনে আহুতি দেওয়া যায়-তবে রাত্রে সবাই
অজ্ঞান হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই মন্ত্র দিয়ে যদি তুমি সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে
ফেলতে পার, তবে গভীর রাত্রে তিনি এসে নিশ্চিন্ত মনে তােমার সঙ্গে
দেখা করতে পারেন।
সুদত্তা। তুই সে মন্ত্র আমায় এনে দিতে পারিস ?
চারিণী। সে তাে আমার সঙ্গেই আছে। মহীধর শ্রেষ্ঠির মেয়ে আজ
আমার কাছে সে মন্ত্র চেয়েছিল ; চক্রদত্ত ঠাকুরের কাছে এই মাত্র সেটা
লিখিয়ে নিয়ে এসেছি। [ একখানা ফলক বাহির করিয়া সুদত্তাকে দিল ]
এই নাও, পড়ে দেখ ।
সুদত্তা। (পড়িয়া তাড়াতাড়ি ফলকখানা বস্ত্রাভ্যন্তরে লুকাইল)
২২]

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
১৭ 3।
স। আমি তাের কাছে চিরঋণী রইলাম। রাত্রি দুই প্রহর অন্তে
চারুদত্তকে আমাদের অগ্ন্যাগারে আসতে বলিস। যদি দরজা বন্ধ দেখে,
তবে যেন সে ফিরে যায় ; তা হলে বুঝতে হবে, যে মন্ত্র নিস্ফল হয়েছে।
চারণী। তা সংবাদ তত দেব দেবী !—কিন্তু তিনি বিশ্বাস করবেন
কেন? একটা অভিজ্ঞান তে চাই। তা ছাড়া আমার পুরস্কার পাব
কিছু?
সুদত্তা। [গল হইতে সােণার মালা খুলিয়া তাহাকে দিল ]
এই নে তাের অভিজ্ঞান ও পুরস্কার। এখন পালা। নইলে মা টের
পাবেন।
চারণী। যাই মা, প্রণাম হই। প্রজাপতি তােমার উপর প্রসন্ন
[ এখান।
সুদত্তা। কি ভীষণ দুঃসাহসে প্রবৃত্ত হচ্ছি ? কে জানে কোথায় এর
পরিণতি! মরবাে, না জয়যুক্ত হব, কে জানে? সমস্ত অন্তর আমার থেকে
থেকে কেঁপে উঠছে! ভয়ে মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে ! যদি না পারি ! যদি মন্ত্র
সফল না হয়। যদি কেউ টের পায় ! তবে–দারুণ কলঙ্ক-মৃত্যুর অধিক
অপমান-আর চাদত্তের সর্বনাশ ! থাক, কাজ নেই! [ পরে ] কিন্তু
তাকে যে পাব আমি—পেতে যে হবেই আমার ! এ না হলে
কেমন করে পাব ? বড় আশা বড় লােভ ! এ আশা তাে ছাড়তে
পারি না!
[ প্রস্থান।
[ ২৩

প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে দ্বিতীয় দৃশ্য [ ইহার পর রঙ্গমঞ্চ অন্ধকার হইবে। তারপর গভীর রাত্রে সুদত্ত। ধীরে ধীরে কম্পিত পদে দ্বার খুলিয়া ভাণ্ডার গৃহে প্রবেশ করিয়া সেখান হইতে পুজার উপচার গ্রহণ করি। অগ্ন্যাগারে প্রবেশ করিল। সেখানে অগ্নির সম্মুখে দাঁড়াইয়া আহুতি দিতে লাগিল ] श्मण সুদত্তা। স্বস্তু মাতা স্বস্তু পিতা স্বস্তু স্বা, স্বস্তু বিশ্বপতিঃ। স্বসন্তু সৰ্বে জ্ঞাতয়ঃ সয় মভিতে জন! য আস্তে যশ্চ চরিত যশ্চ পশ্যতি নােজন, তেষাং সংহন্মে। অক্ষনি যথেং হং তথা। সহস্র শৃঙ্গো বৃষভাে যঃ সমুদ্রাদুদায়রৎ। তেষাং সহমাে না বয়ং নিজনান্ স্বরূপঃ য্যমি। প্রােষ্টেশয়া বহেশয়া নারীৰ্য্যস্তল্পণীবরী। স্ত্রিয়াে যাঃ পুণ্যগন্ধাস্তা সৰ্ব্বাঃ আপয়ামসি। [ অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিয়া ] অগ্নি, ব্রতপতি! তুমি আমার ব্রত সফল কর ! শাস্ত্রে বলে তুমি আমার শৈশবের স্বামী ! তুমি আমাকে প্রাপ্তকালে আমার স্বামীর হাতে সমর্পণ করে দাও আজ। অন্তর্যামী দেব, তুমি তো জান, চারুদত্তই আমার স্বামী ! পিতা আমাকে মনে মনে তার হাতে সম্প্রদান করেছেন। আমি তার বান্দা বধূ। দেব, তােমার চিরদিনের সেবিকাকে অভীষ্ট স্বামীর হাতে সমর্পণ করে আজকা যজ্ঞ সফল কর। [ অগ্নি প্রদক্ষিণ ও প্রণাম পরে বাহিরে আসিয়া ] চক্র দত্তের নির্দেশ তাে অভ্রান্তভাবে অনুসরণ করেছি! ওই তত সবাই ঘুমােচ্ছ, উঠানে কুকুরটা পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে ঘুমােচ্ছ ! দেব, তােমার দয়ায় আমার ব্রত আজ সফল হােক! ২৪ ]

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
[ পশ্চাৎ হইতে চাদত্তের প্রবেশ। সুদত্তা ভয়ানক চমকিত হই। ভয়ে
পিছাইয়া গেল। তারপর চারুদত্তকে চিনিতে পারিয়া আনন্দে
আত্মহারা হইয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিল ]
ওঃ!—তুমি? কি ভয় পেয়েছিলাম আমি। দেখ এখনও আমার
সৰ্বাঙ্গ কঁপছে।
চারু। [ ধীরে ধীরে তার বাহুবেষ্টন মুক্ত করিয়া ] সুদত্তা, এ গভীর
নিশীথে কেন তুমি আমায় ডেকেছ ?
সুদত্তা। [ কম্পিত কণ্ঠে ] তুমি—তুমি আমাকে এই অগ্নি সাক্ষাৎ
গ্রহণ কর।
চারু। তােমার পিতার অনুমতি না নিয়ে ?
সুদত্তা। সেজন্য দ্বিধা করােনা চারুদত্ত ! পিতা আমাকে তােমার
হাতে সম্প্রদান করতে প্রতিশ্রুত।
চারু। প্রতিশ্রুত ?কার কাছে ?
সুদত্তা। মার কাছে! সেই জন্যই আমি তােমাকে ডেকেছি।
আমি তােমারই পূজায় নিবেদিতা ; তুমি গ্রহণ করে, আমার পিতার
প্রকৃত আকাক্ষা সফল কর। আমার জীবন সার্থক কর।
চারু। কি আনন্দ সুদত্তা! কিন্তু, তাই যদি হয়, তবে এমন গোপনে
কেন? আমি তােমার পিতার কাছে তােমাকে ভিক্ষা চাইব।
সুদত্তা। বাবা তােমার উপর এখন ভয়ানক কষ্ট হয়েছেন।
তিনি কিছুতেই সম্মত হবেন না। কিন্তু তুমি আমাকে গ্রহণ করলে পর,
আর তাে তিনি তা ফেরাতে পারবেন না।
[ ২৫

প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য চারু। কিন্তু সে রাগ থাকবে না সুদত্তা! আমি, অথৰ্বাঙ্গিরস পাঠ করে এই সিদ্ধান্ত করেছি, যে সেটা স্বতন্ত্র শ্রুতি নয়। আমি যে দিন বিচার করে এই কথা প্রতিষ্ঠিত করবে, সেদিন আর তার রাগ থাকবে । তুমি মিথ্যা ভয় পাচ্ছ, সুদত্তা। তুমি নিশ্চিন্ত থাক। ছয়মাস অন্তে আমি এসে তােমাকে গ্রহণ করবে। [ চাদত্তের কথা শুনিতে নিতে সুদত্তার মুখে ক্রমে ভাবান্তর উপস্থিত হইল। সে ক্রমে দূরে সরিয়া কুঞ্চিত করিয়া রুষ্ট দৃষ্টিতে চাদত্তের দিকে চাহিল ) সুদত্তা। [ তীব্রকণ্ঠে ] ভীরু! কাপুরুষ ! অধাৰ্মিক চারুদত্ত! এমনি করে নারীকে প্রলুব্ধ করে করে প্রত্যাখ্যান করতে লজ্জা হ’ল না তােমার? যাও দূর হও। ছি ছি, কি লজ্জা! আপস্তম্বের কন্যা আমি উপযাচিকা হয়ে আত্মসমর্পণ করতে এসেছি। ধৃষ্টা আমি ;-আমার উপযুক্ত অপমান হয়েছে। চারু। আমার উপর অবিচার কোর না সুদত্তা সুদত্তা। ক্ষান্ত হও পাপাচারী! লজ্জা হয় না তােমার আবার ওই সব কথা বিনিয়ে বলতে ? [ পরে ] কিসের জন্য তুমি এসেছ এখানে ? আমাকে ধর্মপত্নী করবার জন্য যদি না এসে থাক, তবে কি সাহসে তুমি নিশীথে চোরের মত তােমার গুরুর গৃহে প্রবেশ করেছ ? আমাকে কি মনে করেছ তুমি ? আপস্তম্বের কন্যা স্বয়ংবৃতা হতে পারে, কিন্তু সে স্বৈরিণী নয় ! [ পরে যাও দূর হও। (শুষ্কভাবে হাসিয়া ) ছয় মাস পরে। তখন যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে আমার অদৃষ্টে কি আছে জান? আমি ইন্দ্রায়ুধের সহধর্মিণী হব—পিতার এই অভিপ্রায়। ২৬ ] প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য চারু। ইন্দ্ৰায়ুধ ! সে তোমার পদনখের যােগ্য নয়। সুদত্তা। কেন? চারুদত্তের লাঞ্ছিত, প্রত্যাখ্যাত, পরিত্যক্তা অভিসারিণী কার অযােগ্য হতে পারে ?—বেশ হয়েছে। আর বক্তৃতায় প্রয়ােজন নেই। তুমি তােমার বিপুল অবসর নিয়ে ধীরে সুস্থে কৰ্তব্য করে যাও, আমি যাই আমার অদৃষ্টের অনুসরণে [ প্রস্থানােদ্যোগ। চারু। সুদত্তা, যেওনা—দাড়াও ; এমন নিষ্ঠুর হয়ে আমার দগ্ধ হৃদয় দুই পায়ে দলিত করে যেওনা। নির্মম! ফিরে এসাে ! এসাে ! যা সব চুরমার হয়ে ! এসাে সুদত্তা (সুদত্তার হাত ধরিয়া টানিয়া আনিয়া) দাড়াও এই অগ্নির সম্মুখে,—দাও তােমার হাত—এস- [ অগ্নির সম্মুখে দাড়াইয়া সুদত্তার বাম হস্ত নিজের দক্ষিণ করপুটের ভিতর ধরিয়া) গৃভামি তে সৌভগত্যায় হস্তং, ময়া পত্যা জরদর্যথাস। ভগাে অর্যমা সবিতা পুরন্ধিম হং ত্বাদুর্গাহ পত্যায় দেবাঃ সুদত্তা। (চমকিত হইয়া) ওকি!—সর্বনাশ! পদশব্দ । চারু। কউ আসছে! পালাও। সুদত্তা। কোথায় পালাব? দুয়ারের সামনেই তাে পায়ের শব্দ। চল, ওই কোণে লুকাই। চারু। অমি পালাব না সুদত্তা, তুমি পালাও। শীগগির যাও। সুদত্তা। পাগল! তুমি ধরা পড়লেইতাে আমিও মরবাে। এসাে। ( চারুদত্তকে টানিয়া অগ্ন্যাগারের কোণে লইয়া গেল ) [ ২৭ প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য [ দক্ষিণ দিক হইতে আপস্তম্বের প্রবেশ ] আপ। আজ নিশীথে আমি উগ্রশ্রবা ও চারুদত্তের বিনাশের জন্য অভিচার ক’রবাে। দেব বৈশ্বানর আমার সহায় হােন। [ অগ্ন্যাগারের দ্বারে আসিয়া ]-এ কি? এখানে যজ্ঞের উপচার কেন ? বৈশ্বানর সদ্য হব্য পেয়ে প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছেন। এ কি ব্যাপার! কোন দেবতা বা অসুর এসে আমার গৃহাগ্নিতে কোন অজ্ঞাত হােম করে গেছে ? এ পদচিহ্ন কার ? ( অগ্নি হইতে একখণ্ড কাষ্ঠ উঠাইয়া পদচিহের অনুসরণ করিলেন) দেবতা নয়, গন্ধৰ্ব্ব নয়, মানুষ ! চোর! [চারুদত্তের বস্ত্রাকৰ্ষণ করিয়া তাহাকে বাহির করিলেন। চারুদত্ত বস্ত্রদ্বারা মুখ ঢাকিয়া রহিল] অগ্নিবেশ, ইন্দ্রায়ুধ ! চোর! চোর! এস সকলে।-কে তুই বল ? (সম্মুখে আসিয়া বলপূর্বক চারুদত্তের মুখাবরণ উন্মােচন করিয়া) এ কি! চারুদত্ত ! তাহাকে ছাড়িয়া দিয়া দূরে দাড়াইলেন। ক্রমে ক্রমে অন্তবাসিগণ ব্যস্তভাবে প্রবেশ করিল) হাঃ! হাঃ! বেশ! বেশ ! আপনি এসে ধরা দিয়েছে। যূপকাষ্ঠে গলা বাড়িয়ে দিয়েছো! বেশ, বেশ! বৈশ্বানর আজ নররক্তে পরিতৃপ্ত হবেন ভাল বিদ্যা শিক্ষা করেছ চারুদত্ত, তােমার নূতন গুরুর কাছে! অগ্নিবেশ! তুমি একবার উগ্রবাকে ডেকে নিয়ে এসাে। তিনি এসে শিষ্যের বিদ্যার পরীক্ষা নিয়ে যান। [ অগ্নিবেশ প্রস্থান করিল। এখন বল পাপিষ্ঠ, কোন্ অপকার্যের জন্য তুই গভীর রাত্রে আমার অগ্ন্যাগারে প্রবেশ করেছিস? নিরুত্তর কেন? ( চপেটাঘাত করিয়া । ব শীগগির! কোন্ বস্তু চুরী করবার জন্য তুই এসেছি ? চারু। দেব! আমি চুরী করতে আসি নি ২৮]

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
আপ। না—চুরী করবে কেন? তবে কি অগ্নিপূজা করবার জন্য
সঙ্গোপনে আমার বাড়ীতে এসেছ ? বল! উগ্রশ্রবা তােকে পাঠিয়েছে
কেমন ?
চারু। না, তিনি এর কিছুই জানেন না।
আপ। অবশ্য জানেন! রােসস, কথাটা আমার কাছে ক্রমে
পরিষ্কার হয়ে আসছে। ঠিক ! তুমি চুরী করতে এসাে নি, উগ্রশ্রবা
তােমাকে পাঠিয়েছে আমার বিরুদ্ধে অভিচার করতে। তুমি চক্রদত্তের
কাছে এই বিদ্যা শিখতে গিয়েছিলে? অথৰ্ব্বপন্থী উগ্রশ্রবা তােমাকে দিয়ে
এই অপকাৰ্য্য করিয়ে নিচ্ছে। হয়তো সেও সঙ্গে আছে। দেখি, একটু
অনুসন্ধান করে দেখি। (অনুসন্ধানােদ্যোগ )
চারু। (আপস্তম্বের পায় পড়িয়া) দেব! আমায় বিশ্বাস করুন,
আমি একা অপরাধী। আমার শাস্তি বিধান করুন। আমিই নিজের
পাপ লােভ বশে এ অপকাৰ্য্য করেছি, দারিদ্র্য ক্লেশ সহ্য করতে না
পেরে—(স্বগতঃ ) ছিঃ, মিথ্যা কথা বলবাে?
আপ। কি? থামলে কেন? এত বড় মিথ্যাটা গলায় আটকে
গেল? বেশ একটু ভাল করে দেখা যাক। [ অগ্ন্যাগারে প্রবেশােদ্যোগ ]
চারু।
দেব! বৃথা ক্লেশ করছেন, আমি একাই অপরাধী।
নিবৃত্ত হােন্।
আপ। এতেই প্রমাণ হচ্ছে তুমি একা নও। ইন্দ্রায়ুধ, এ
পাপিষ্ঠকে ধরে রাখ, আমি দেখি।
চারু। (স্বগতঃ ) হা অদৃষ্ট
আপ। [ অগ্ন্যাগারে প্রবেশ করিয়া কোণের দিকে চাহিয়া ]
[ ২৯

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
এই যে উগ্রবা—লুকিয়ে কেন ? নারী বেশে ! বেশ, বেশ! এগিয়ে এসাে,
আর লুকোচুরি কেন? মুখের বসন উন্মােচন কর। [ সুদত্তাকে টানিয়া
আনিয়া—বলপূৰ্ব্বক সুদত্তার মুখের উপর হইতে হাত ও কাপড় সরাইয়া
ফেলিলেন ] এ কি! সুদত্তা ![ স্তম্ভিত হইয়া দূরে সরিয়া দাড়াইলেন ]
[ বামদিক হইতে শাশ্বতীর প্রবেশ ]
আপ। শিষ্যগণ তােমরা বাইরে যাও।
[ শিষ্যরে বাম দিকে প্রস্থান।
শাশ্বতী। এ কি শুনি প্রভু !
এ কি শুনি প্রভু ! চারদত্ত চোর ?
আপ। না শাশ্বতী, চোর নয় ; চোরের অধিক! চেয়ে দেখ তার
সঙ্গে কে ?
শাশ্বতী। সুদ ! সৰ্ব্বনাণী ! চারুদত্ত, তুমি আমায় এই বর দিলে ?
চাক। মা, আমি আপনার অপরাধী সন্তান, আমায় শাস্তি দিন।
আপনার কন্যা পবিত্র, নিস্পাপ ।
সুদ। [ শাশ্বতীর চরণ ধরিয়া] মা আমিই আপরাধী। ইনি নিস্পাপ
চারু। দেব, পাতকীর শাস্তি দিন ; সাহসিকের দণ্ড বিধান করুন।
মেহবশে আমায় শাস্তি দিতে কুণ্ঠিত হন, কোন্ প্রাণান্তকর প্রায়শ্চিত্ত
আমায় করতে হবে বলুন ; আমি তাই করবে।
আপ। কি শাস্তি দেব চারুদত্ত ; যে হস্তে দণ্ড তুলবে তা যে তুমি
ভেঙ্গে দিয়েছে আমার।
শাশ্বতী। প্রভু! কি করবে ভেবে ! সমস্ত জীবনের অবিচলিত
ধর্মসাধনার এই মর্মান্তিক পরিণতি দিয়ে দেবগণ আমাদের শাস্তি দিয়ে-
ছেন। চল প্রভু, আর কাজ নেই সংসারে। চল আমরা বনে যাই।
৩০]

প্রথম অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
দ্বিতীয় দৃশ্য
চারু। [ প্রকাশ্যে ] দেবী, বৃথা আপনারা কষ্ট পাচ্ছেন। আপনার
যা ভাবছেন, তা সত্য নয়। আমি মন্ত্রবলে আপনার কন্যাকে অভিভূত
করে তার কষ্ঠ হ’তে এই হার চুরী করেছি—আর কিছুই আমি করি
নি। আপনার কন্যা নিস্পাপ ! [ হার বাহির করিয়া দেখাইল ]
সুদত্তা। মিথ্যা ! মিথ্যা এ হার আমি
আপ। চুপ কর স্বচ্ছন্দচারিণী, ক্ষান্ত হ’। এ হার তুই দিয়েছিস
চারুদত্তকে ?
সুদত্তা। না কিন্তু
আপ। চুপ কর। দেবী ! তুমি সুদত্তাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।
শাশ্বতী। [ সুদত্তাকে ধরিয়া ] চল হতভাগিনী ; প্রভু! চারুদন্তের
এ কথায় বিশ্বাস করে তুমি ওর ওপর অবিচার কোরাে না। আমি স্পষ্ট
বুঝতে পারছি চারুদত্ত মিথ্যা বলছে।
আপ। কিন্তু দেবি, এ হার ?
সুদত্ত। ও হার আমি
আপ। চুপ কর ! যাও দেবী, তুমি ওকে নিয়ে ;
;
[ শাশ্বতী ও মুদার বামদিকে প্রস্থ,ন।
চারুদত্ত ; কি ভীষণ অপরাধ তুমি করেছ বুঝতে পেরেছ বােব হয়। তুমি
চুরি করতে আসনি, যে জন্য এসেছিলে, আমি তা বুঝেছি। কিন্তু তার
প্রায়শ্চিত্ত এই যে, তুমি চোরের দণ্ড স্বীকার করে নেবে। রাজসভায়
ব’লবে তুমি চুরী করতে আমার ঘরে এসেছিলে। পারবে ?
চারু ! [ স্বগতঃ ] আঁ! চোরের দণ্ড-মৃত্যু দণ্ড! মৃত্যুদণ্ডের

প্রথম অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য চেয়ে শতগুণ ভীষণ—কলঙ্ক ! মিথ্যা কলঙ্কের বােঝা মাথায় করে পৃথিবী হ'তে বিদায় নেব। বেশ ! তাই হাে! [ প্রকাশ্যে ] যা আদেশ করবেন, তাই করতে আমি প্রস্তুত। কিন্তু দেব, আমায় বিশ্বাস করুন, আপনার কন্যা নিস্পাপ ! { অগ্নিবেশ ও উগ্রশ্রবার প্রাচীর দ্বার দিয়া প্রবেশ ] উগ্র। আৰ্য আপস্তম্ব ! এ অসময়ে হঠাৎ আমাকে স্মরণ করছেন কেন ? আপ। হাঁ ! আপনার প্রিয় শিষ্যের কীর্তি দেখাবার জন্য। উগ্র। [দেখিয়া ] চারুদত্ত! তুমি এখানে? কি করতে এসেছ এখানে তুমি ? আপ। চারুদত্ত, বল তুমি কি করতে রাত্রে আমার গৃহে প্রবেশ করেছিলে ? চারু। আমি নিশীথে গােপনে গুরুদেবের গৃহে প্রবেশ করে তার কন্যার কারণ চুরী করেছি। উগ্র। কি বল্লে ? চুরী ? চারুদত্ত চোর? বিশ্বাস হচ্ছে না চারুদত্ত। সত্য বল। চারু। হাঁ দেব-আমি চোর। উগ্র। বেশ! তা এ জন্য আমাকে ডাক্বার প্রয়ােজন ছিল না আচাৰ্য্য! চারুদত্তের এ অগৌরব আমার নয়, সে আপনারই শিষ্য। [ উগ্রবা গমনের উদ্যোগ করিলেন। আপস্তম্ব হঠাৎ এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করিয়া বিরক্ত হইয়া উঠিলেন ] ৩২ ]

দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
আপস্তম্বের আশ্রম
(পরদিন )
[ শাশ্বতী ও সুদত্তা ক্রন্দনতা ]
শাশ্বতী অভাগিনী কন্যা আমার। এ সব কথা তুই আমাকে সে
সময়ে বলি নি কেন?
[ ইন্দ্রায়ুধের প্রবেশ
সুদত্তা
কি সংবাদ ইন্দ্রায়ুধ !
হয় }
ইন্দ্রা। আমার যেতে বড় বিলম্ব হয়ে গিয়েছিল দেবী! বিচার শেষ
হয়ে গেছে।
সুদত্তা। আর বলতে হবে না। তােমার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছি,
কি দুঃসংবাদ তুমি বহন করে এনেছ। ওঃ! (মুখ ফিরাইল)
ইন্দ্রা। চাৰুদত্তের নির্বাসন দণ্ড হয়েছে।
সুদত্তা। নিৰ্বাসন! বেঁচে আছে তবে প্রিয়তম? এ রাক্ষসী
তােমায় বধ করতে পারে নি। দেবরাজ, বৈশ্বানর, বিশ্বে দেবগণ,
তােমাদের চরণে কোটি কোটি প্রণিপাত--এখন বল দাও দেবগণ, বল
দাও আমাকে আমার ধর্মাচরণে
এস্থান।
[ ৩৩

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
শাশ্বতী। শােন শােন রাক্ষসী—থাম তুই-ইন্দ্রায়ুধ ধর ওকে!
( ইন্দ্ৰায়ুধের প্রস্থান ।
[ অন্তেসিগনসহ অপশুদের প্রবেশ
শাশ্বতী। এ কি! এ কি প্রভু! তােমার এ কি দশা।
[ আপস্তম্ব গম্ভীর ভাবে আসিয়া একটী বৃক্ষতলে বসিলেন ]
[ অন্তেসিগণের প্রস্থান।
শাশ্বতী। কি হয়েছে প্রভু!
আপ। কিছু নয়। ( ভাবিতে লাগিলেন)
শাশ্বতী। প্রভু! চারুদত্ত কি
আপ। থাম, ও কথা বলল না, ও নাম আর এ বাড়ীতে তুমিও
করাে না। আর কেউ যেন না করে।
শাশ্বতী। (দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া ) তাই যদি তােমার আদেশ
হয়, তাই হবে। কিন্তু একটা ভিক্ষা দেবে না আমায়? সে দেশ ছেড়ে
যাবার আগে একবার তাকে দেখতে।
আপ। না !
শাশ্বতী। কিন্তু প্রভু! (নরব )
আপ। কি ?
শাশ্বতী। থাক্। তােমার শরীর ভাল নেই—সে কথা নাই শুলে।
আপ। (শুষ্ক হাসি হাসিয়া) না শাশ্বতী, এখন আর কোনও
সংবাদেই আমাকে আঘাত করতে পারবে না। তুমি বল ।
শাশ্বতী। এই-সুদত্তা ব’লে, চারুদত্ত অগ্নি সাক্ষাতে তার পাণিগ্রহণ
করেছে।
৩৪ ]

দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য আপ। (দীর্ঘ নিঃশ্বাস সহকারে) তা জানি ! শাশ্বতী। [ তীব্রস্বরে তা জেনে তুমি তাকে নির্বাসিত করেছ ? কি ভয়ানক! ওঃ! [ কিছুক্ষণ পর নম্রভাবে ] প্রভু! ক্ষমা কর ! আমায় দয়া কর ! চির দিন আমি তােমাকে দেবতা বলে পূজা করে এসেছি। আজ কেন আমার মনে এ বিদ্রোহ জেগে উঠছে। আমি নারী—কি জানি ! তুমি পরম জ্ঞানী, তুমি যা করেছ তাই ভাল। কিন্তু আমি যে মনকে বুঝতে পারছি না। আমাকে শান্ত করে দাও দেব । আপ। (কিছুকাল পরে) তপ্তজল শীতল হতে আগুনের কাছে আশ্রয় চাচ্ছে। দেবী ! সান্ত্বনা তােমায় দেবে কে ? আমি। আমার হৃদয়ে যে দাবানল জ্বলছে তা কে নেবে। কি ভীষণ ! কি মর্মন্তুদ সে জ্বালা ! ওঃ।- [ হাতের ভিতর মাথা গুজিয়া দিলেন ] শাশ্বতী। প্রভু! প্রভু! ও কি। তুমি শান্ত হও,-স্থির হও! তােমার দিকে যে আমি চাইতে পারছি না। আমায় ক্ষমা কর প্রভু! আপ। তুমি ব্যস্ত হয় না শাশ্বতী, অমি শান্ত হয়েছি, হাঁ, কি বলেছিলে তুমি! আমার উপর তুমি শ্রদ্ধা হারিয়েছ, বেশ ! আমি তো আর শ্রদ্ধার পাত্র নই শাশ্বতী ! শাশ্বতী। দেব! পাপিষ্ঠার দুষ্ট জিহ্বার চপলতা দিয়ে আমাকেই শাস্তি দিও না। আমি অপরাধ করেছি! তুমি ধৰ্ম্ম-প্রাণ ঋষিকল্প মহাপুরুষ তােমার প্রতি যদি শ্ৰদ্ধা হারাই, তবে জগতে শ্রদ্ধা করব কাকে? আপ। না দেবী! তােমাকে তিরস্কার করবার জন্য বলছি না। সত্যই বলছি, আমি আর শ্রদ্ধার যােগ্য নই। কাল ছিলাম। আজ আর [ ৩৫

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
নেই ! কাল আপস্তম্ব ছিল সত্যনিষ্ঠ, ধর্মপ্রাণ, ব্রতপরায়ণ,আজ
আপস্তম্ব মিথ্যাবাদী, সন্তানদ্রোহী, পাপিষ্ঠ ! আমি চারুদত্তকে শাস্তি দিতে
গিয়েছিলাম শাশ্বতী,—কিন্তু সে আমাকে চরম শাস্তি দিয়ে গেছে—আমার
সেই নির্মম দণ্ড মাথা পেতে নিয়ে ! সে কথা বুঝতে পারলাম আমি, যখন
মন্ত্রী চারুদত্তের উপর দণ্ডনিয়োগ করলেন।
শাশ্বতী। ওঃ ! তখন তুমি বলে না কেন যে, তোমার ভুল
হয়েছিল ?
আপ। সে কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু দারুণ অভিমান আমার কণ্ঠরােধ
করলাে। মন্ত্রীর কথা যেন আমার গায়ে বৃশ্চিক দংশনের মত বিধে গেল,
কিন্তু আমি পারলাম না। আমার তখন মনে হ’ল যে, সত্য কথা যদি
বলি, তবে সুদত্তার মান আমার বিলিয়ে দিতে হবে—সুদত্তার মুখ চেয়ে
সত্য কথা বলতে পারলাম না।
শাশ্বতী। হা হতভাগিনী!
আর। রক্ষীরা যখন তাকে নিয়ে গেল, তখন আমার মনে হল যে,
আমার সারাজীবনের সুকৃতি, আমার যত্নসঞ্চিত যজ্ঞ ফল, যেন আমাকে
ছেড়ে গেল। ঠিক সেই সময় ইন্দ্রায়ুধ আমার কাছে গিয়ে বললে, সুদত্তা
চারুদন্তের পাণি-গৃহীত। তখন হঠাৎ আমার মাথার ভিতর আগুন জ্বলে
উঠলো—সমস্ত বিশ্ব এক মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল। আমি সংবিৎ
হারালাম। শাশ্বতী আমার মত দুঃখী কে?-
[ অগ্নিবেশের প্রবেশ ]
অগ্নি। দেব, অগ্নিহােত্রের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়।
আপ। (ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া ) , যাই। চল শাশ্বতী।
৬ ]

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
[ অগ্নিবেশ আপস্তম্বকে ধরিতে গেল। আপস্তম্ব তাহাকে সরাইয়া দিলেন ]
কোনও প্রয়ােজন নেই অগ্নিবেশ। আপস্তম্ব স্থবির নয়। যাও,
আমি নিজেই যাব।
[ ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিলেন ]
শাশ্বতী। (স্বগত)ওরে হৃদয় আমার, কিছুতেই কি পারবি না তাের
দুঃখের বন্যা চেপে রাখতে ? বারে বারে এ কি ক্ষোভ, এ কি ব্যথা, এ
কি বিদ্রোহ উদ্বেলিত হয়ে উঠছে, আমার সকল শক্তি অভিভূত করে
দিচ্ছে। এ কি হল ? কি হ’ল আমার? একটি ক্ষুদ্র দিনে আমার সুখের
বিরাট প্রাসাদ একেবারে ধূলায় মিশিয়ে গেল। আমার মন্দিরের স্বর্ণ-পাট
হ’তে আমার একমাত্র দেবতা চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পদতলে লুষ্ঠিত হয়ে পড়লো।
তবে আর আমি কি নিয়ে বেঁচে থাকবে ?
[ আপস্তম্ব যাইতে যাইতে হঠাৎ ফিরিয়া দাড়াইলেন
এক দৃষ্টে শাশ্বতীর দিকে ফিরিয়া চাহিলেন ]
আপ। অগ্নিহােত্র ! না শাশ্বতী আমি হােম করবাে না। কিসের
যজ্ঞ, কিসের হােম? চিরজীবনের যজ্ঞের যদি এই ফল হ’ল তবে
কেন হােম করবাে!
শাশ্বতী। সে কি প্রভু
আপ। হাঁ, তাই ঠিক, নাস্তিক লােকায়তের মতই ঠিক। যজ্ঞ
শুধু একটা কথার ভেঙ্কী! দেবতা একটা মিথ্যা কল্পনা ! দেবতা নেই,
[ ৩৭

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
ধর্ম নেই। নইলে আজন্ম তপােনিষ্ঠার কি এই ফল হতে
পারে !
শাশ্বতী। প্রভু না জানি কোন্ দেবতার কাছে কোন্ অজ্ঞাত
অপরাধ করে আমাদের এ দুর্গতি—আর দেবতার অসম্মান করে
দেবরােষ টেনে এনাে না।
আপ। শাশ্বতী—তুমি বুঝতে পারছে না আমার কথা !—আমি
সারাজীবন, সত্যকে শ্রেষ্ঠ ব্রত বলে সাধন করেছি, ধৰ্ম্ম মাথায় রেখে
স্পর্ধাভরে সমস্ত জগতের অধর্মকে লাঞ্ছিত করেছি। আর আজ সেই
নিষ্ঠার এই ফল !—তার ফলে আজ সে সত্য ধৰ্ম্ম হারিয়ে আমি যে
একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। কেন? এত বড় পাপ কি করেছি
শাশ্বতী ?
শাশ্বতী। দেব—প্রভু, স্বামী ! আমি,-আমি কি বলবাে তােমায়,
আমি নারী—আমি মা, আমি কি বলবাে-( রােদন )
আপ। তুমি মা—এ কথা কেন বলছে শাশ্বতী ? তবে কি ? বুঝছি
তুমি ভাবছাে আমি আমার সন্তানের প্রতি অবিচার করেছি। তার
প্রতি আমার ধৰ্ম্ম করিনি—হতে পারে।
.
[ ক্রোধ চাপিয়া পরিক্রমণ করিতে লাগিলেন ]
শাশ্বতী। (হঠাৎ মুখ তুলিয়া) প্রভু, এখনও তো সময় আছে ?
এখনও হয় তত সর্বনাশ হয় নি। এখনও যাও প্রভু! চারুদত্তকে ফিরিয়ে
নিয়ে এসাে।
আপ। চারুদত্তকে ফিরিয়ে আনবো ? কেমন করে শুনি ? রাজার
৩৮]

দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য কাছে গিয়ে বলব—আমি মিথ্যা বলেছিলাম ? না শাশ্বতী, না। পুরুষ আমি—নারী নই। অপরাধ করেছি ? বেশ। মাথা উচু করে দেবতার কাছে তার শাস্তি গ্রহণ করবে। কিন্তু মানুষের কাছে মাথা নীচু-কখনও না। শাশ্বতী। (সাশ্রু নেত্রে) এ কি কঠোর প্রতিজ্ঞা দেব! ভেবে দেখ, এতে শুধু তােমার সর্বনাশ নয়—তােমার সন্তানের সর্বনাশ ! আপ। সন্তান কোন্ ছার-সমস্ত বিশ্ব ছারখার হলেও এ উচু মাথা নীচু হবে না। শাশ্বতী। কিন্তু সত্যের প্রতিষ্ঠা প্রভু!- আপ সত্য, ধর্ম, আপনি প্রতিষ্ঠিত হবে—আমার নিপীড়িত আত্মার ভস্মস্তুপের উপর। কিন্তু যে রাজ্যে আমি সবার মাথার উপর বসে আপনার গৌরব প্রতিষ্ঠিত করেছি, সেই রাজ্যের ধূলায় আমি আমার সম্মান লুটাতে দিতে পারবাে না। শাশ্বতী ! ও সঙ্কল্প ত্যাগ কর। বরং চল, আমরা এ রাজ্য ছেড়ে বনে যাই। শাশ্বতী। (নতজানু হইয়া) তােমার মান তােমার থাক্। আমায় শুধু অনুমতি দাও। আমি কোনও কথা বলব না। শুধু মায়ের অন্তর সহায় আমার চক্ষের জলের জোরে চারুদত্তকে ফিরিয়ে আনবব, রাজার ক্ষমা অর্জন করব! দয়া কর প্রভু। দয়া করে অনুমতি দাও। অকরুণ হয়ে না প্রভু! কোনও দিন ত তুমি আমার প্রতি নিষ্ঠুর হওনি ! আজ আমায় এ আদেশ দাও। আমি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি। আপ। না, না, না,। [ ৩৯

ঋষির মেয়ে
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
[ সেবীরকের প্রবেশ ]
শাশ্বতী। দেবে না আদেশ? ( দৃপ্তভাবে দাড়াইয়া আপস্তম্বের দিকে
একমুহূৰ্ত্ত কঠোর দৃষ্টিতে চাহিল। তারপর অবসন্ন হইয়া বসিয়া পড়িল)
ওঃ কি কঠোর পুরুষ ! (নােদন )
সৌবী। দেবী! রাজপথে দেখে এলাম, সুদত্তা দেবী, ইন্দ্রায়ুধের সঙ্গে
পাগলের মত ছুটে চলেছেন দণ্ডশালার দিকে। আমি অনেক অনুনয় ,
করলাম, কিছুতেই ফেরাতে পারলাম না।
শাশ্বতী। কি সর্বনাশ! তার কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। প্রভু
( আপস্তম্বের পায় ধরিয়া) অনুমতি দাও। নইলে নইলে আমার
সুদত্তাও যে ফিরবে না।
আপ। (গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া শাশ্বতী যাও, তাদের ফেরাও।
[ শাশ্বতী ও সৌবীরক বেগে বামদিকে প্রস্থান করিলেন। আপস্তম্ব
ধীরে ধীরে দক্ষিণদিকে প্রস্থান করিলেন ]
[ চারণীর গাহিতে গাহিতে বামদিকে হইতে প্রবেশ ]
গীত
ধরার মাঝে ব্যথার বিষ
অকৃপণ করে নিতি বিতরিয়া,
ওগাে দেবরাজ সাধ-কোন কাজ,
গাথ কোন মালা আঁখিজল দিয়া।
কুসুম তুলিতে কাটা বিধে হাতে
ছায়া ঘুরে ফিরে আলােকের সাথে ;
৪•]

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
নয়নের জলে অধরের হাসি
নিতি যায় ভেসে মরে গুমরিয়া ।
ওগাে দেবরাজ তােমার আরতি
চিরদিন হবে পরাণ পীড়িয়া ?
মানবের ভাঙ্গা হৃদয়ের পরে
মন্দির তব উঠিবে গড়ি?
[ গান গাহিতে গাহিতে দক্ষিণদিক দিয়া প্রস্থান ।
তৃতীয় দৃশ্য
বনের ধারে সরস্বতী নদী-তীর
ললাটে চৌচিহ্ন পদাঙ্ক সংযুক্ত চারুদত্ত
চারু। ব্যস! সব শেষ! কাল প্রত্যুষে কত আশা নিয়ে জীবন
আরম্ভ করতে অগ্রসর হয়েছিলাম। আজ প্রভাতে সকল আশার
সমাধি হয়ে গেল! ধৰ্ম্মরাজ! এ তােমার কি বিচার হল। অপরাধ যদি
করেছিলাম, তবে মৃত্যুদণ্ড কেন দিলে না দেব ! মরে বেঁচে থাকা যে
আরও ভয়ানক।
[ সুদত্তা বেগে প্রবেশ করিয়া তাহার সম্মুখে ঃড়াইল!
সুদত্তা। এই যে প্রিয়তম !
চারু। সুদত্তা!-আপস্তম্বের কন্যা!
সুদত্তা। এ কি ভীষণ তিরস্কার প্রভু !
৪১

দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ তৃতীয় দৃশ্য চারু। ফিরে যাও সুদত্তা, তােমার পিতৃগৃহে ফিরে যাও। সুদত্তা। চারুদত্ত ! ভুলে যাচ্ছ কি, যে তুমি অগ্নি সাক্ষাৎ আমার পাণিগ্রহণ করেছ! তুমি আমায় ত্যাগ করে কোথায় যাবে? আমি যেতে দেবব না—তােমায় অধর্ম করতে দেব না। চারু। অধৰ্ম্ম ! ধৰ্ম্ম আছে কি? সুদত্তা। জানি না আর কোথাও ধৰ্ম্ম আছে কি না। কিন্তু জানি ধৰ্ম্ম তােমাতেই আছে। তােমার ভিতর বিশ্ব-দেবতার পূর্ণ বিকাশ দেখছি, ধর্মের বিরাট রূপ দেখছি। আর কিছু দেখতে চাই না। চারু। সুদত্তা, ফিরে যাও। সুদত্তা। কোথায় যাব? কার আশ্রয়ে ? সে দিন অগ্নিদেবের সাক্ষাতে তুমি আমাকে যে বিরাট আশ্রয় দান করেছ, সেই তো আমার একমাত্র আশ্রয়। তাই আমি অবলম্বন করবাে ! এ ছাড়া আমার অন্য আশ্রয় নেই। তুমি ছাড়া আমার পথ নেই। [ দুই বাহু দিয়া প্রবল বেগে চারুদত্তকে বেষ্টন করিয়া ধরিল ] চারু। দেবগণ! এ কি লীলা তােমাদের? এই তত এক মুহূর্ত সমস্ত বিশ্ব আমার চোখে তিক্ত বিস্বাদ হয়ে উঠেছিল। এখন কোন মায়ায় আবার সে অপূর্ব সুষমায় ভরে উঠলাে ! কি সুধার ধারায় আজ আমার হৃদয়ের সব গ্লানি নিঃশেষে মুছে গেল ! সুদত্তা! প্রিয়তমে! আমার ক্ষমা কর। বুঝতে পারিনি কত বিশাল তােমার প্রেম! ভেবেছিলুম যে বিশ্বের ভিতর বিন্দুমাত্র আশ্রয় আমার নাই। জানতাম না যে তােমার ঐ প্রেম-সাগরে আমার অনাদি-অনন্ত আশ্রয় আছে। এসাে প্রিয়তমে। ৪২ ] দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ তৃতীয় দৃশ্য আর কিছুতেই আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। (আলিঙ্গন করিয়া বসিল) সুদত্তা। (স্মিত প্রসন্ন মুখে) আঃ ! কি স্নিগ্ধ, কি শীতল ! [ চারুদন্তের মাথায় মুখে হাত বুলাইতে লাগিল তাহার কপালে ক্ষত দেখিয়া চমকিত হইল ] এ কি! প্রভু! তােমার এ ক্ষত কিসের, আঘাত পেয়েছ ? চারু। না সুদত্তা, এই ক্ষত আমার দূর্ভাগ্যের রাজটীকা ! এটা শ্বপদ চিহ্ন—চোরের দণ্ড। রাজা ব্রাহ্মণ বলে, আমার জীবন নিলেন না। কিন্তু আমার কপালে এই কলঙ্কের দাগ দিয়ে নির্বাসন দিয়েছেন। সুদত্তা। কি নিষ্ঠুর! ওঃ!- [ চক্ষু আচ্ছাদন করিল। কিছু পরে ইন্দ্ৰায়ুধের প্রবেশ ] ইন্দ্রা। এই যে দেবী এখানে ! পেয়েছ চারুদত্তকে! বেশ! কিন্তু বিশ্রামের অবসর নেই চারুদত্ত। সুদত্তাকে নিয়ে তুমি পালাও। সুদত্তা। কেন ? । বনের বাহিরে দুইখানি রথ ও বহু লােকজন! আচাৰ্যানী সমস্ত অন্তেবাসী ও বহু রাজপুরুষ নিয়ে তােমার সন্ধানে বেরিয়েছেন। তােমাকে দেখতে পেলে বল পূৰ্ব্বক নিয়ে যাবেন। চারু। (উঠিয়া) ইন্দ্রায়ুধ। তােমার বন্ধুত্বের ঋণ কখনই শােধ করতে পারব না। ইন্দ্রা। সে কথা পরে ভেবে। এখন পালাও। ওদিকে কোথায় যাচ্ছ? ওধার দিয়েই তারা আসবে। চারিদিক দিয়েই তারা বনে অনু- [ ৪৩

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
সন্ধান করবে। সরস্বতী উত্তীর্ণ হয়ে রাজ্যান্তর যাওয়া ছাড়া আর গতি
নেই।
চারু। দেবী এখন পূর্ণতােয়া, খরস্রোতা ! কোন মতেই তাে পার
হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু উপায় যদি না থাকে তবে মা সরস্বতীর উপরই
নির্ভর করতে হবে। সুদত্তাকে আমার পিঠে ভাল করে বেঁধে দাও
ইন্দ্রায়ুধ।
ইন্দ্রা। রসে, এক উপায় আছে। ওই দেখছে। রঞ্জুর সেতু!
চারু। হ্যা, ওর ওপর দিয়ে আমরা পার হয়ে যাব। কিন্তু সুদত্ত।
পারবে কি ?
স্বত্তা। পারব আমি।
[ সুদত্তা ও চারুদত্তের বেগে প্রস্থান।
[ পরে চারুদত্ত ও সুদত্তা রজুসেতু অবলম্বন করিয়া নদী উত্তীর্ণ হইল।
ইন্দ্ৰায়ুধ ওপারে দাড়াইয়া রহিল ]
চারু। বিদায়, ইন্দ্রায়ুধ ।
সুদত্তা। ইন্দ্রায়ুধ ভাই, বিদায়।
ইন্দ্রায়ুধ। বিদায়! প্রজাপতি তােমাদের রক্ষা করুন। এখন এরা
নিরাপদ। কিন্তু, এ সেতু ছিন্ন করে ফেলতে হবে। নইলে তারা
ধরা পড়তে পারে।
[ সেতু ছিন্ন করিয়া প্রস্থান ।
৪৪ ]
]

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
[ সদলবলে শাশ্বতীর প্রবেশ ]
শাশ্বতী। পদ চিহ্ন দেখতে পাচ্ছ তােমরা ? কিছু চিহ্ন পাচ্ছ ?
বীর। পাচ্ছি মা, কিন্তু বুঝতে পারছি না।
শাশ্বতী। কি বুঝতে পারছ না ?
বীর। এই দু’টী পদ চিহ্ন নদীর দিকে গেছে। যেন নদীর গর্ভে
কিছুই বুঝতে পারছি না মা !
শাশ্বতী। কি বলছ বীরভদ্র ! নদীর গর্ভে পদচিহ্ন লুপ্ত হয়েছে-
দুইজনেরই!
বীর। “ দেবী, তাই মনে হচ্ছে।
শাশ্বতী। তবে তারা নদীতে প্রাণ ত্যাগ করেছে। হা! হতভাগিনী
-মা আমার। একি অভিশাপ দিয়ে গেলি।
[ বসিয়া পড়িলেন।
বীর। কিন্তু এও সম্ভব যে, এই পথে তারা নদী উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।
শাশ্বতী। এই ভীষণ নদী পার হওয়া, সেও কি সম্ভব। সে চেষ্টা
যদি করে থাকে তবেও তারা গেছে। অগ্নিবেশ! আমাকে ধর।
{ অগ্নিবেশের বাহু অবলম্বন করিয়া বসিয়া পড়িলেন) আমি আর মাথা
ঠিক রাখতে পাচ্ছি না। মা আমার ! আমাদের শেষ অনাদরের এ কি
ভীষণ শাস্তি দিলি মা !
[ আপশুষের প্রবেশ ]
আপ। এই যে শাশ্বতী! সন্ধান পেলে দেবী ? নীরব কেন দেবী।
শাশ্বতী। (স্বগতঃ ) কি বলব প্রভু!
আপ। তাকে পাওনি ! জানতে পেরেছ কি কোথায় আছে তারা।
সুদত্তা তার স্বামীর আশ্রয় পেয়েছে কি ?
[ ৪

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
শাশ্বতী। কি বলব প্রভু ! মুখে আমার কথা বেরুচ্ছে না। কিছুই
জানতে পারিনি। যা জেনেছি, তাতে এই বুঝেছি যে, হয়তাে তারা আর
নেই। (রােদন)
আপ। নেই! মরে গেছে ! আঁ!-
শাশ্বতী। হাঁ প্রভু। দেবী সরস্বতী কাল রূপ ধরে তাদের গ্রাস
করেছেন। আমাদের সর্বস্ব হরণ করেছেন। (রােদন)
আপ। (নীরবে কিছুক্ষণ থাকিয়া) যাক্ শেষ হয়ে গেছে।
ক্ষীণ আশাটুকুও নেই—সংসারে আমাকে বেঁধে রাখবার। দেবী ক্ষোভ
করাে না। শােক করবার কিছুই নেই। যমরাজ তাদের গ্রহণ করেছেন।
কেন তা জগৎপতি জানেন! কিন্তু এখন আমরা মুক্ত। আমাদের
আহ্বান এসেছে—চল দেবী, বনে গিয়ে আমরা সেই পরমপুরুষের ধ্যানে
তার চরণে জীবন নিবেদন করে দিই।
শাশ্বতী। চল প্রভু! আর তো ঘরে বাস করতে পারবাে না।
ঘরের চারিদিক হতে মায়ের কণ্ঠ আমায় দিন রাত তিরস্কার করবে। বন
ছাড়া আর পাষাণী আমার স্থান কোথায় প্রভু। বড় আশা করেছিলাম,
চাদত্তের হাতে সুদত্তাকে সৰ্বস্ব যৌতুক দিয়ে সমর্পণ করে বনে যাব!
সেই যাচ্ছি—আগে কেন গেলাম না ।
আপ। কেন দেবী! আশা তো পূর্ণ হয়েছে। তােমার সুদত্ত
চাদত্তের কাছে তো চিরকালের আশ্রয় পেয়েছে। সরস্বতী তাদের অনন্ত
গৃহ রচনা করেছেন। দেবগণ আমাদের আশা পূর্ণ করেছেন। কিন্তু
ঠিক আমাদের মনের মতন করে নয়।-এ কি? ইন্দ্রায়ুধ
৪৬]

দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ তৃতীয় দৃশ্য [ ইন্দ্ৰায়ুধের প্রবেশ ] ইন্দ্রায়ুধ। হ দেব! অপরাধী শিস্য আপনার। আমার শাস্তি বিধান করুন। আমি আপনার আদেশ ও দেবীর আদেশ অগ্রাহ্য করেছি। প্রায়শ্চিত্ত বিধান করুন। শাশ্বতী। ইন্দ্রায়ুধ ! আমি বড় আশা করেছিলাম—তুমি মাকে আমার ফিরিয়ে আনবে। ইন্দ্রা। অপরাধ করেছি মা ! কিন্তু সুদত্তার কাতর মুখের দিকে চেয়ে আমি পারলাম না—আপনার আজ্ঞা পালন করতে। সুদত্তা যে সাগরের পানে স্রোতস্বিনীর মত প্রচণ্ড বেগে দণ্ডিত, পীড়িত, অপমানিত চারুদন্তের কাছে ছুটে চলেছিলেন, আমি পাষাণে বুক বেঁধে তাকে ফেরাতে পারলাম না। তার সঙ্গে গেলাম। শাশ্বতী। তার পর কি হ’ল বৎস, সব আমাকে খুলে বল। ইন্দ্রা। প্রথমে আমরা গেলাম অধিকরণে, সেখানে থেকে শুনতে পেলাম, চারুদত্তকে দণ্ডশালায় নিয়ে গেছে। তার পর দণ্ডশালায় ঘুরে লােকের মুখে শুনে শুনে আমরা বনের ভিতর প্রবেশ করলাম। সেখানে সুদত্তা আমাকে ছেড়ে গেলেন। বল্লেন, তুমি এখানে থাক,আঃ আমার অন্তরের আলাে সম্বল করে তাকে খুঁজে বের করবো! শাশ্বতী। খুঁজে পেয়েছিলে বাছা! ইন্দ্রা। হাঁ মা, তাঁদের একত্র রেখে বন প্রান্তে ফিরে এসে দেখলাম, দেবী রথে করে রাজপুরুষ ও লােকজন সঙ্গে নিয়ে তাদের সন্ধানে এসেছেন, আমি তখন ফিরে গিয়ে তাদের সংবাদ দিলাম। সংবাদ শুনে চারুদত্ত সুদকে পৃষ্ঠে বেঁধে সরস্বতী উত্তীর্ণ হবার জন্য প্রস্তুত হলেন। [ s৭ দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ তৃতীয় দৃশ্য শাশ্বতী। কি সর্বনাশ করেই তুমি ইন্দ্রায়ুধ, তখন যদি তাদের সংবাদ না দিতে তবে তাে আমি বাছাকে পেতাম। কেন তুমি তাদের খবর না দিয়ে আমায় দিলে না ইন্দ্রায়ুধ ! ইন্দ্রা। পারলাম না দেবী। সুদত্তা দেবীকে যদি চারুদন্তের কণ্ঠ থেকে চ্যুত করতেন, তবে তাঁর মৃত্যুর অধিক ক্লেশ হত। তাই আমি তাদের পলায়নে সাহায্য করেছি। দেব অপরাধী শিষ্যকে শাস্তি দিন। শাশ্বতী। কি ভম ইন্দ্রায়ুধ ! আমি তাকে কেড়ে নিতে আসিনি বৎস! আমরা যে তাকে চারুদন্তের হাতে সমর্পণ করে সংসারে প্রতিষ্ঠিত করতে এসেছিলাম। কি ভ্রান্তি ! কি সর্বনাশ করেছ তুমি ইন্দ্রায়ুধ ! ইন্দ্রা! আঃ! কি ভ্রম! ওঃ! দেবী আমার প্রায়শ্চিত্ত বিধান করুন । আপনাদের উপর অবিশ্বাস করে কি ঘাের অনিষ্ট করেছি আমি! কিন্তু আমায় অনুমতি করুন, আমি আগে তাদের ফিরিয়ে আনি। আপ। ফিরিয়ে আনবে ? কোথা থেকে ইয়ুধ ? ইন্দ্রা। বহুকষ্টে নদী উত্তীর্ণ হয়ে তারা পুরুরাজ্য অভিমুখে গিয়েছে। শাশ্বতী। আঁ! তারা বেঁচে আছে তবে ! নিরাপদে আছে তারা! চল চল ইন্দ্ৰায়ুধ আমরা সকলে গিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনি। [ সকলের প্রস্থান। ৪৮]

চতুর্থ দৃশ্য
প্রথম ভাগ
বন পথ
[ চারুদত্ত ও সুদত্তা ]
[ গভীর বনমধ্যেএকটি বৃক্ষতলে চারুদত্ত ও সুদত্তা। সুদত্ত ভীত হইয়া
চারুদত্তের বাহু অবলম্বন করিয়া কাঁপিতেছে ।
চারু।
সুদত্তা। এ কোথায় এলাম ! ভয়ে যে আমার প্রাণ কেঁপে উঠছে!
গভীর বন ! নিবিড় অন্ধকার! চারিদিকে শ্বাপদের গর্জন শােনা যাচ্ছে।
কোথায় যাব? আমরা কোথায় আশ্রয় পাব ? আমার যে বড় ভয় হচ্ছে।
শ্বাপদের গর্জন শুনে ভয় পাচ্ছ সুদত্তা ? অরণ্যের অন্ধকারে
ভীত হচ্ছ? এ কি সরস্বতীর তীব্র বন্যার চেয়ে ভয়ানক! তুমি যে আমায়
ধরে হাসিমুখে সরস্বতীর জলে ভাসতে গিয়েছিলে সুদত্তা! তখন
তাে ভয় পাওনি, এখন ভয় কেন প্রিয়ে ?
সুদত্তা। কিন্তু আমার বড় ভয় কচ্ছে। তা ছাড়া আর পা তুলতে
পারছি না। আর কত দূর যেতে হবে এই পথে?
চারু। জানি না সুদত্তা, আমরা পথ ভ্রান্ত হয়ে ঘাের অরণ্যে এসে
পড়েছি। দিন না হলে এখান থেকে বার হতে পারবাে না। কখনও
পারব কি না, তাই বা কে জানে।
সুদত্তা। আঁ! তবে কি উপায় হবে ?
৪৯

দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ চতুর্থ দৃশ্য চারু। সুদত্তা। স্থির হও। যখন তুমি এ হতভাগ্যকে বরণ করেছ, তখন বিপদ তত তােমার নিত্য সহচর হবেই। বিচলিত হয়াে না দেবী। বিচলিত হয়ে হয় তাে বিপদকে আরও হাত বাড়িয়ে ডেকে আনবে। স্থির হও সুদত্তা। সুদত্তা। (চারুদত্তকে জড়াইয়া ধরিয়া) কেমন করে স্থির হব আমি। আমায় শিখিয়ে দাও, কেমন করে তুমি তােমার ঐ অবিচল ধৈৰ্য্য রক্ষা করছাে! চারু। সুদত্তা! ভেবে দেখ, মানুষ জন্মে তাে মরবার জন্যে। তবে মরণকে ভয় করলে চলবে কেন ? জীব যে পাপ করেছে তারই তত কেবল মরণে ভয়। আমরা তাে জীবনে কোনও পাপ করিনি, আমরা কেন ভয় পাব ? [ সুদত্তা বিস্ময়-বিহ্বল দৃষ্টিতে চারুদন্তের মুখের দিকে চাহিল। চাহিয়া চাহিয়া তাহাকে ছাড়িয়া চারুদত্তের পায় প্রণাম করিল } সুদত্তা। দেবতা! চিনতে পারিনি। শৈশব থেকে তােমাকে শুধু সখা বলে জেনে এসেছি। ভালবেসেছি, কিন্তু তােমায় চিনতে পারিনি। তুমি এত বড়! না, না, প্রিয়তম, তােমার পাশে আছি—আমার আর কোনও ভয় নাই। চারু। সত্যই ভয় নাই সুদত্তা! দেবতার উপর বিশ্বাস কর। সুদত্ত। হে ইন্দ্র, হে অগ্নি, হে নাসত্য যুগল, হে স্বৰ্গস্থ দেবগণ, আমার স্বামীকে রক্ষা কর। চারু। সুদত্তা! তুমি এই গাছে ওঠ। আমি তােমাকে তুলে দিচ্ছি ৫০]

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
তা হলে তুমি অনায়াসে উঠতে পাবে। এই গাছের উপর আমাদের
রাত্রি যাপন করতে হবে।
[ সুদত্তাকে গাছে উঠাইয়া নিজে উঠিল
[ মশাল হন্তে একদল চণ্ডালের প্রবেশ ও শীকার অন্বেষণ করিতে করিতে প্রস্থান।
সুদত্তা। কে ওরা !
চারু। চুপ কর সুদত্তা, ওরা চণ্ডাল দস্যু। অরণ্যেই ওদের বাস।
ওরা পশুর অধম’, নরমাংস খায়, আৰ্য্যগণের ওপর অশেষ অত্যাচার করে।
চুপ করে লুকিয়ে থাক, ওদের হাতে পড়লে আর নিস্তার নেই।
দ্বিতীয় ভাগ
অগ্নিবর্ণের বিলাস-গৃহ
[ দাসীদ্বয় প্রবেশ করিয়া গৃহে আলাে জ্বালাইল ]
[ নেপথ্যে নর্তকীদের নাচ ]
[ বামদিক হইতে অগ্নিবর্ণ ও দক্ষিণদিক হইতে মন্ত্রীর প্রবেশ ]
মন্ত্রী। এই যে অগ্নিবর্ণদেব, আমি সমস্ত রাজ্য ঘুরে আপনাকে খুজে
বেড়াচ্ছি। এমন স্থান নেই যেখানে আপনার সন্ধান করিনি।-আপনাকে
রাজা স্মরণ করেছেন।
অগ্নি। কৃতার্থ হলাম। তাঁর স্মৃতিশক্তি যে অত্যন্ত প্রখর এ রকম
শুনেছি। সেই কোন সকালে আজ তার সঙ্গে দেখা হয়েছে, তার পর
[ ৫১

দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ চতুর্থ দৃশ্য এই রাত্তিরে পর্যন্ত তার আমার কথা মনে রয়েছে। এতবড় আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি কেবল রাজা-রাজড়ারই সম্ভব! মন্ত্রী। হা, হা, আপনি বড় রহস্যপ্রিয়। অগ্নি। কিন্তু রহস্য আমার থাকতে দিচ্ছেন কই, আপনারা মন্ত্রী ম’শায় ? রহস্যের রসই হচ্ছে, না জানায়। তাই যাতে কেউ জানতে না পারে—এমনি করে, একেবারে নগর ছেড়ে বনের বুকের মধ্যে এসে বাস বেঁধেছি।-কেন ভাবুন দেখি ? রহস্য! আপনারা সবাই ভাববেন অগ্নিবর্ণ গেল কোথায় ? আর জানতে পারবেন না, এই রহস্য। কিন্তু এখানেও আপনারা মাসের মধ্যে দু’বার তেড়ে আসেন। মন্ত্রী। না এসে উপায় কি অগ্নিবর্ণদেব ? রাজা যে আপনার উপর বড় অনুরক্ত। অগ্নি। ওই তত ভুল। তাঁর রক্তটা বিষম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, তাই নানা রকম বাজে জিনিসে অনুরক্ত হচ্ছেন। আপনারা একটু চেষ্টা চরিত্র করে তাকে বিরক্ত করে না তুলতে পারলে, আমার আশঙ্কা হয় যে, আমার রক্ত এ অনুরাগের চোটে বিষাক্ত হয়ে যাবে—হয় তাে বা একদিন দেখতে পাব যে, সুন্দরী নারীর বিলাস লাস্যেও সে রক্ত তপ্ত হবে না—আপনার মতন। সে কি দুর্দশা হবে ভেবে দেখুন দেখি। মন্ত্রী। সে থাকগে, এখন একটা গুরুতর কাৰ্য্য উপস্থিত হয়েছে। মালব-রাজের কাছে দূত পাঠাবার দরকার হয়েছে। পুরুরাজ অতিরিক্ত শক্তিমান হয়ে উঠেছেন, তাঁর শক্তির প্রতিবােধ করবার জন্যে মালব-রাজের সঙ্গে সন্ধি করা একান্ত প্রয়ােজন। রাজা আপনাকে সেই দৌত্যে নিযুক্ত করতে চাচ্ছেন। ৫২] ! দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ চতুর্থ দৃশ্য অগ্নি। দূত। আমার কাছে দুতের কথা বলতে চান রাজা! আপনি ভুল শুনেছেন মন্ত্রী, রাজা দ্যুতের কথা বলেছেন। দূতে আমি সৰ্ব্বদা প্রস্তুত-ইচ্ছা করলে আপনি বসে একহাত খেলে যেতে পারেন। মন্ত্রী। না, না, অগ্নিবর্ণদেব, পরিহাস করবেন না। রাজকাৰ্য- অগ্নি। আমার এখানে তার চেয়ে প্রচণ্ডতর আত্মকাৰ্য্য আছে। আমি যেতে পারবাে না। মন্ত্রী। অগ্নিবর্ণদেব, আপনার এই ব্যসন-লিপ্স দেখে রাজা রাণী এবং আমরা সবাই ব্যথিত। আপনার বিদ্যার অন্ত নেই, বাহুতে আপনার শক্তি আছে, আপনার মত বুদ্ধিমান এ রাজ্যে ক’জন আছে। আপনার এই অতুলনীয় শক্তি আপনি কেবল বিলাসে অপচয় করছেন—এ যে কি পরিতাপের কথা, তা কি আপনার কখনও মনে হয় না। অগ্নি। অপচয়!—সমস্ত জীবনটাই তো একটা অপচয়। হিসাব করে দেখুন মন্ত্রী, আমরা সবাই করছি কি? জন্মের দিন থেকে আরম্ভ করে, পায় পায় আমরা কেবল আমাদের পৈতৃক জীবনটা অপচয় করতে করতে শেষ গিয়ে একটা নিঃশ্বাসে তাকে ফুকে দিচ্ছি। জীবনে যতই যা করুন সবার এক লক্ষ্য, এক পরিণতি মৃত্যু। মরবার জন্যই বেঁচে থাকা। সে পরিণতিতে পৌছুতে আপনিও যেমন পারবেন আমিও তেমনি পিরবােহয় তাে, আপনার চেয়ে তাড়াতাড়ি পারবে। আর এই জন্ম ও মৃত্যুর ভিতরকার সংক্ষিপ্ত অবসর, এটুকু কেবল দুর্ভাবনা দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত না করে যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেৎ” নীতিটা অনুসরণ করা ভাল নয় কি ?

দ্বিতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ চতুর্থ দৃশ্য মন্ত্রী। (দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া) যাক, সে কথা আপনাকে বুঝাব এমন শক্তি ভগবান আমাকে দেন নি। আমি রাজার আদেশে এসেছি, রাজাকে কি নিবেদন করবাে বলুন। অগ্নি। বলবেন যে, তার এই শ্যালকটিকে দিয়ে যে তিনি ফাকি দিয়ে রাজকাৰ্য্য করিয়ে নেবেন, সে চলবে না। কালে ভদ্রে, আপনার খুসী অনুসারে এক আধটা কাজ তার করি বলেই তিনি যে আমাকে জোয়ালে বেঁধে লেজমােড়া দিয়ে রাজ-কাৰ্য্যে লাগাবেন, সে চলবে না। নিরঙ্কুশ ভাবে সকল চিন্তা বিরহিত হয়ে নিরবচ্ছিন্ন সুখের সাধনাই যদি না করতে পারবাে তবে রাজার শালা হয়ে লাভটা কি বলুন দেখি! তা হলে রাজা হতেই বা আপত্তি কি ছিল ? মন্ত্রী। রাজার নিকটতম কুটুম্ব আপনি-রাজ্যে অতুলনীয় প্রতিষ্ঠা আপনার, আপনার অগ্নি। প্রতিষ্ঠা ! একটু বুঝে সুজে বলুন মন্ত্রী-মশায়। বলি কারও শালা হওয়াটা তত খুব গৌরবের কথা নয়—শালা কেউ বা টেঙা হয়, কেউ বা বেঁটে হয়, কেউ বা ফস, কেউ কালাে ; কিন্তু সবাই শালা--এটা তাদের সাধারণ পরিচয়, আর এ পরিচয়টা গৌরবের নয়। মন্ত্রী। হা, হা, তা, অগ্নিবর্ণদেব, ভগ্নি থাকলেই শালা হতে হয়- সবারই হয়। অগ্নি। ঠিক—আর সেই জন্যে লােকে ভগ্নীপতি থেকে যথাসম্ভব তফাতে থাকে। যাতে সে যে শালা এ কথা লােকে সহসা টের না পায়। কিন্তু যে ভগ্নীপতির কাছে থাকে, ভগ্নীপতির অম্নে যে পুষ্ট, সে একেবারে দাগী শালা—তার আর শালাত্ব লুকোবার যাে নেই। সেই ৫৪ ] ;

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
শালা আমি। কেন হয়েছি ভেবে দেখুন ? কেবল নিৰ্বিরােধে বিনা
চেষ্টায় জীবন ভরে ফুর্তি করব বলে। আমার সে সাধু চেষ্টায় আপনারা
বাধা দেবার উপক্রম করছেন, এটা কি ভাল?
[ সংবাহক সীধু পাত্র আনিল। অগ্নিবর্ণ তাহা পান করিল ]
সংবাহক। আৰ্য, দেবী আপনাকে স্মরণ করেছেন।
অগ্নি। ওই শুনেছন মন্ত্রীবর, রাজার চেয়ে কত বড় লােক আমাকে
স্মরণ করেছে—এ ডাক ছেড়ে রাজার কাছে যাওয়া যায় না।
মন্ত্রী। কিন্তু, আমার উপর রাজার আদেশ যে আপনাকে ছেড়ে
কিছুতেই যাব না।
অগ্নি। পরম আনন্দের কথা ! যাবেন না আপনি! থেকে যান।
আজ রাতটা আমার সঙ্গে আনন্দ করুন। বাসন্তিকার গান তত শশানেন
নি কোনও দিন! জীবন সার্থক করুন। ওরে তাের ঠাকরুণকে বলগে,
মন্ত্রী মশায় আজ অতিথি,
[ সংবাহকের প্রস্থান।
মন্ত্রী। না, না, না, এমন আজ্ঞা করবেন না। আমার আজ রাত্রে
মন্ত্রণা সভায় উপস্থিত হতেই হবে!
অগ্নি। রাজ-আজ্ঞা উপেক্ষা করবেন, আমাকে ছেড়ে যাবেন ?
মন্ত্রী। না, আপনাকে নিয়েই যাব আশা করছি।
অগ্নি। আপনার আশার সাহস আছে! আমার যাবার কিছু মাত্র
সম্ভাবনা নেই দ্বিজোত্তম। কেন না, আমার এখানকার যে টান, সেটার
[ ৫৫

ঋষির মেয়ে
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
[ চতুর্থ দৃশ্য
রাজার আজ্ঞার চেয়ে ঢের বেশী জোর। ওই দেখুন আসছে, চেয়ে দেখুন
দেখি, ওদিকে ওই পটল-চেরা চোখ, ওই নবনীত-কোমল বাহু, ঐ
সুললিত দেহলতা-এর বন্ধন ছেড়ে কি যাওয়া যায় !
মন্ত্রী। এ কি! না না—অগ্নিবর্ণদেব ।
অগ্নি। না কি! সুন্দরী নয় বলতে চান ওকে? একটু মােটা
হয়ে পড়েছে—কিন্তু গজেন্দ্রগামিনী মােতিমদশনী, ও নারীললামের কাছে
আপনার রাজার চন্দ্রমুখ দাঁড়াতে পারে ঠাকুর?
মন্ত্রী। না, না-
বাসন্তিকা। (বামদিক হইতে প্রবেশ করিয়া) কি ‘না’ মন্ত্রী মশায়,
আমি ‘না’? এত বড় জলজীয়ন্ত মেয়েমানুষ একটা, আমি আপনার
কাছে শুধু একটা “না” হয়ে গেলাম!
ক্ষান্ত হও প্রগল্ভা নারী, আমার সঙ্গে উপহাস করতে
সাহস কোরাে না।
বাস। কেন মন্ত্রীবর, আপনি কি হাসির উপর আসেধ জারী করছেন
কি? আপনার কাছে হাসির প্রবেশাধিকার নেই ? কিন্তু
মন্ত্রী।
[ গান ]
হাসি কারো বা মানে না।
স্বর্গ মর্ত্য ঘুরে বেড়ায়, মানে না মানা।
নেচে গেয়ে হাসিয়ে বেড়ায়,
হাঁড়িমুখ সে ঘুচিয়ে দেয়।
সে কারেও রেয়াত করে না।
৫৬ ]

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
হাওয়ার মাঝে তার সাড,
প্রাণের গােড়ায় দেয় নাড়া,
বেয়াড়া তায় কেউ আঁটে না।
[ মন্ত্রীর দাড়ী ধরিয়া নাড়িয়া দিল ]
মন্ত্রী। অগ্নিবর্ণদেব। আপনার কাছে আমি এমন ব্যবহার প্রত্যাশা
করিনি। একটা পতিতা নারী আপনার প্রশ্রয়ে বর্ধিত হয়ে আমাকে
এমনি অমৰ্য্যাদা করছে; আপনি তা দাড়িয়ে দেখছেন! এ অমৰ্য্যাদা
আমার চেয়ে আপনার বেশী
অগ্নি। আমার অমৰ্য্যাদা! মন্ত্রীবর! বাসন্তিকা আমাৰ মৰ্যাদা
একেবারে নিজের টাকে গুজে রেখে দিয়েছে, তার সেখান থেকে বেরাে-
বার জো নেই।
বাস। তাই নাকি! তােমার আবার মর্যাদা আছে না কি গাে।
সে দেখতে কেমন? ওজনে কতখানি।
অগ্নি। ওই দেখলেন, ও আমাকে কতখানি গ্রাহ্য করে ?
মন্ত্রি। ধিক্‌ অগ্নিবর্ণ, ক্ষত্রিয় হয়ে, রাজবংশে জন্মগ্রহণ করে একটা
তুচ্ছ বারবনিতার অপমানে আত্মপ্রসাদ লাভ করছে। এতে ঘৃণাবােধ
(করবার মত আত্মসম্মানও তােমার অবশিষ্ট নেই। আর তােমার সম্মুখে
তােমার গৃহে, সম্মানিত অতিথির সে পাপিষ্ঠা অসম্মান করছে, তাতে
তৃপ্তিলাভ করছে! মনুষ্যত্বকি তােমার ভেতর লুপ্ত থেকে হয়েছে ?
তােমার জন্মগৌরবের এক ফোটাও অবশিষ্ট নেই? ধিক
[ এস্থান।

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
অগ্নি। বাঁচা গেল। বুঢ়ােটা বিষম জ্বালাতন আরম্ভ করেছিল।
বলে কি রাজকাৰ্য্য! চুলােয় যা রাজকাৰ্য্য! যার রাজ্য আছে, সে
রাজকাৰ্য্য করুক—আর আমার—[ বাসন্তিকাকে আলিঙ্গনবদ্ধ করিল ]
বাস। আমরা আমাদের কাৰ্য্য করি।
অঘ্নি। ঠিক বলেছ বাসন্তিকা। এস, আজ এইখানে চাদের
আলােয়-আনন্দ মিলন করা যাক।
[ বামদিক হইতে সংবহকের প্রবেশ ]
অগ্নি। সংবাহক! পাত্রাদি নিয়ে আয়, নর্তকীদের ডাক।
[ সংবাহক আসন পাতিয়া দিল, উভয়ে উপবেশন করিলেন। দাসীরা আসিয়া নৃত্য
করিতে লাগিল। সংবাহক সীধুভা আনিয়া তাহা হইতে মদ ঢালিয়া অগ্নিবর্ণকে দিল।
অগ্নিবর্ণ বাসন্তিকাকে দিল। বাসন্তিকা পান করিল। অগ্নিবর্ণ আর একপাত্র লইয়া
মুখে
দিল। ]
প্রথম ভাগ
[ চণ্ডালগণ পুনরায় প্রবেশ করিয়া বৃক্ষতলে বসিল। তারপর তারা বৃক্ষের উপর শব্দ
শুনিয়া উর্ধে চাহিল। একজন বলপূর্বক চারুদত্তকে টানিয়া নামাইল। সকলে তাকে
বন্ধন করিল।]
সুদত্তা। (চীৎকার করিয়া) কে আছ—রক্ষা কর, ব্রাহ্মণের
প্রাণরক্ষা কর! ব্রাহ্মণের প্রাণরক্ষা কর!
অগ্নি। ( লাফাইয়া উঠিয়া) ওকি! কোথায় এ আৰ্তনাদ ?
সংবাহক। আমার অস্ত্র।
৫৮ ]

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
[ সংবাহক চর্ম ও বর্ষা আনিয়া দিল। অগ্নিবর্ণ তাহা কাড়িয়া লইয়া ছুটিল। বাসন্তিকা
বাধা দিতে গেল।]
অগ্নি। (কুটী করিয়া) বাসন্তিকা, আমি নরাধম—কিন্তু আমি
ক্ষত্রিয়
[ বেগে প্রস্থান।
[ ৫৯

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
অগ্নিবর্ণের অন্তঃপুর
[ অলিন্দসংলগ্ন আসনে চিত্রলেখা ও সুদত্তা আসীন ]
সুদত্তা। আয়ুষ্মতী, তুমি অশেষ সম্পদবর্তী। কিন্তু তােমার শ্রেষ্ঠ
সম্পদ তােমার স্বামী। অমন বীরের পত্নী হওয়া পরম সৌভাগ্যের কথা।
চিত্র। মুখে আগুন তার। তুমি আর বীর খুজে পেলে না সখি?
স্বামীর নিন্দে করতে নেই, আমার মন্দভাগ্য, তাই বলতে হচ্ছে ওর মত
দুরাচার পাপিষ্ঠ আর এ রাজ্যে নেই।
সুদত্তা (স্বগতঃ ) কি সর্বনাশ! দুর্ভাগ্য অগ্নিবর্ণ ! তােমার গুণ
গ্রহণ করবার যােগ্য পত্নী তােমার নাই।
[ মাধবিকার প্রবেশ ]
মাধ। দেবী! প্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, আৰ্যার মধ্যাহ্ন-সেবা
সুসম্পন্ন হয়েছে কি না?
চিত্র। তার জন্য তাঁকে মাথা ঘামাতে বারণ করছে।
আমার। তাকে বলগে সব হয়েছে।
[ স্বগতঃ ] কি অপ্রিয়বাহিনী এই নারী! অমন দেবকান্তি,
৬০ ]

তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য বীর, সদালাপী স্বামী এর, কিন্তু তাকে একটি মিষ্টি কথাও এ পর্যন্ত বলতে শুনলাম না। [ প্রকাশ্যে ] তােমার দাসীগুলি ভারি সুন্দরী। চিত্র। না হবে কেন ? দাসীর রূপে তো আমার প্রয়ােজন নেই যার প্রয়ােজন, সে যে দাসী বেছে আনে। ওরা দাসী বললেও হয় গৃহিণী বললেও হয়। ওরা দয়া করে কেবল আমাকে গৃহিণী বলে বইতে। নয়। সুদত্তা। তােমার মত সুন্দরী স্ত্রীতেও তােমার স্বামীর মনােরঞ্জন হয় না ? চিত্র। হয়েছে। আমার সঙ্গে তার দেখা শােনা হয় কখন? বহু তপস্যায়—কালে ভদ্রে। বেশীর ভাগ সময় কাটান তিনি বিলাস-গৃহে। ঘরে এলে দাসীদের সেবার অবকাশে কদাচিৎ একটু-আধটু দর্শন পাই বইতাে নয়। সুদত্তা। কিছু মনে করাে না ভদ্রে, কিন্তু হয়তাে তুমি অন্যায় অনুযােগ করছে। তিনি রাজার শ্যালক, রাজকার্যে তাঁর অনেক সময় ব্যয় হয়। চিত্র। হুঁ তা হয়। রাজকাৰ্য—মানে রাজার কাৰ্য। রাজার যখন নারীর প্রয়ােজন হয়, বা প্রমােশালায় প্রমােদ-সহচরের প্রয়ােজন হয়, তখন সেই সব রাজকার্য করা ছাড়া স্বামীর আমার অন্য রাজকাৰ্য্য নাই। দেবী! তুমি কল্পনা করতে পারবে না, আমি কত মনভাগিনী। সুদত্তা। [ স্বগতঃ ] এও কি সম্ভব! সেই দেবতুল্য রাজমূর্তি, বীরত্বের অবতার হয়ে স্বয়ং রামচন্দ্রের মত যিনি আর্তের ত্রাণে অবতীর্ণ হয়েছিলেন—এ কি সম্ভব যে তিনি সামান্য গণিকাসক্ত, বিলাসী বই [ ৬১ তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য কিছুই নয় ? [ প্রকাশ্যে ] দেবী, তিনি যাই হন, তার নিন্দা তােমার ও আমার দু’জনের পক্ষেই অসঙ্গত। তুমি তার ধর্মপত্নী। আমার তিনি জীবন দিয়েছেন, মান রক্ষা করেছেন। চিত্র। সে তাে অনেকবার শুনেছি তােমার কাছে, কিন্তু কিছুতেই উঠতে পারছি না। আমার স্বামী যে হঠাৎ বিলাস-গৃহে বাসন্তিকার আলিঙ্গন থেকে আপনাকে মুক্ত করে বনের ভিতর ছুটে আৰ্ত্ত ত্রাণ করতে গেলেন, এটা আমার কাছে এত বিস্ময়কর মনে হচ্ছে, যে কি বলবাে। একবার ভােটরাজ এই নগর আক্রমণ করেছিল। সাতদিন যুদ্ধ করে রাজা তাকে পরাজিত করেন। সে সাতদিন আমার স্বামী নিশ্চিন্ত হয়ে বিলাস-গৃহে লীলা করছিলেন। কেবল রাজার শ্যালক ও তার প্রমােদ- সহায়ক বলে তার কোন শাস্তি হয়নি। সুদত্তা। আমার কাছে এই কথাটাই অত্যন্ত আশ্চৰ্য্য মনে হচ্ছে। চিত্র। তাই মনে হচ্ছে, যে তােমাকে রক্ষা করার ভিতর বােধ হয় কোনও একটা সাজান ব্যাপার আছে। অপরাধ নিও না দেবী, কিন্তু আমার সন্দেহ হয়, যে স্বামী আমার তােমার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে এই সাজান যুদ্ধ একটা সৃষ্টি করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য সাধু নয়। সুদত্তা। আমি ব্রাহ্মণী-পরস্ত্রী। এ কথা আমার পক্ষে বড় অসম্মানকর, ভদ্রে! চিত্র। দেবরাজ জানেন, তােমাকে অসম্মান করবার কোনও অভিপ্রায় আমার নেই দেবী। কিন্তু আমি আমার স্বামীর চরিত্র জানি। তাঁর ব্রাহ্মণীতেও আপত্তি নেই। লােকে জানে না, কিন্তু বাসন্তিকাও ব্রাহ্মণকন্যা ছিল। দেবী, আমার স্বামীর নামে কুৎসা করে আমার ৬২] ঋষির মেয়ে তৃতীয় অঙ্ক ) [ প্রথম দৃশ্য আনন্দও নেই—গৌরবও নেই। কিন্তু আমার অনেক দেখে শুনে আশঙ্কা হয়, তাই তােমাকে বলছি—তুমি নিজেকে খুব নিরাপদ মনে করাে না। [ বামদিক দিয়া অগ্নিবর্ণের প্রবেশ ] অগ্নি। সখি! প্রণত হই। সুদত্তা। চিরায়ুষ্মন হও। অগ্নি। সাধ্বী, সুভাষিণী সহধর্মিণী ! অতিথির কাছে পতির অপযশ কীর্তন করে পুণ্য সঞ্চয় করছিলে, বাধা দিতে বাধ্য হলাম। দেবী, এ কয়দিন নানা কাৰ্য্যে তােমার সংবাদ নিতে পারিনি। তােমার সেবার কোনও ত্রুটী হয়নি তাে? সুদত্তা। (স্বগতঃ ) অসম্ভব! এই তাে সেই দেবমূৰ্ত্তি! এর ভিতর এত পাপ অসম্ভব! ( প্রকাশ্যে ) সে কি ভদ্র, তোমার ও তােমার পত্নীর সেবা ও যত্নের আতিশয্যে আমরা কুণ্ঠিত হয়ে পড়েছি। অগ্নি। কিছু কুষ্ঠিত হয় না দেবী, তােমাদের মত মান্য অতিথির সম্বৰ্ধনা করবার অবসর আমাদের অধিক হয় না। শােন দেবী, চিত্রলেখা যা বলেছে তা সত্য না হােক মিথ্যা নয়। এ আমি পরম সৌভাগ্য বলে মনে করছি যে তােমার ও আমার পরিচয়ের ভিতর আর কিছু না থাকুক, কোনও অসত্যের আবরণ রইল না। আমি ঠিক যা তার চেয়ে একটুকুও ভাল বলে আমি তােমার কাছে পরিচিত হচ্ছি না। সুদত্তা। এই কথাই কি আমায় বিশ্বাস করতে হবে, বীরবর, যে বনে তােমার যে মূর্তি দেখেছিলাম—বিপদে স্থির, সংগ্রামে ধীর, আর্তের [ ৬৩

ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
তৃতীয় অঙ্ক ]
সহায়’ ক্ষাত্ৰ ধৰ্ম্মের অবতার, তােমার যে মূৰ্ত্তি—সেটা স্বপ্ন, সেটা মিথ্যা,
আর—আর লম্পট, গণিকাসক্ত বিলাসী অগ্নিবর্ণ ই সত্য ?
অগ্নি। (নতমুখে) বলতে পার কি তুমি দেবী, কোনটা সত্য ?
সুদত্তা। পারি—তোমার যে মূৰ্ত্তি আমি দেখেছি সেইটাই সত্য।
বীর, ক্ষত্র তুমি! তুমি মহান্।
চিত্র। (স্বগতঃ ) বুঝেছি! ব্রাহ্মণীর অবস্থা ভাল নয়! যাক্, সাগরে
বাস করি, শিশিরবিন্দুতে কি ভয়? দূর হােতূ, এখন শিগগির আমার ঘর
ছাড়লেই বাঁচি। (প্রকাশ্যে ) সে যাক, এখন সখীর ঘরে যাবার যানের
আয়ােজন হলাে ?
অগ্নি। (স্বগতঃ ) বড় ব্যস্ত হয়েছে চিত্রলেখা একে তাড়াতে। এমনি
করেই অন্ধ মুর্থ আপনার সৌভাগ্য দুই হাতে ঠেলে। (প্রকাশ্যে )
সখি, তােমার এই শ্রদ্ধার জন্য তােমাকে নমস্কার।
চিত্র। (স্বগতঃ ) এত বড় স্পর্ধা! এত অপমান আমার। আমার
কথা গ্রাহ হল না। আমার চেয়ে বড় হল এই অতিথি-পত্নী ? অতিথি-
পত্নী! ইনি যে চিরদিনের অতিথি হবেন, সে তো দিব্যচক্ষে দেখতে
পাচ্ছি। আমি দাড়িয়ে এ অপমান সইব, সে মেয়ে আমি নই।
[ সদর্পে স্থান।
সুদত্তা। কোথা যাও ভদ্রে ?
যেতে দেও ওঁকে। ওঁর প্রচণ্ড গৃহকৰ্ম্ম আছে। তুমি একটু
অপেক্ষা কর সখি, আমি তােমার যানের আয়ােজন করে আসি।
অগ্নি।
[ এখান।
৩ ]

তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য সুদত্তা। কি অভাগ্য এই অগ্নিবর্ণ ! পত্নীর স্নেহে বঞ্চিত হয়ে বেচারীর কি দুঃখ, তা আমি আজ বুঝতে পারছি। এই যে তুমি এসেছ। [ অপরদিক হইতে চারুদত্তের প্রবেশ চারুদত্ত আবিষ্ট ভাবে মুগ্ধ দৃষ্টিতে সুদত্তার দিকে চাহিয়া তাহাকে ক্রমে আলিঙ্গন বদ্ধ করিল ] চারু। সুদত্তা—কি আনন্দ আমার এত আনন্দ যে সইতে পারছি আমি। সেই ভীষণ রাত্রে যখন আমাদের আরব্ধ সংস্কার ভেঙ্গে গেল- নিদারুণ বিচ্ছেদ, অসহ্য লাঞ্ছনায় যখন আমি পীড়িত হ’লাম, তখন তাে ভাবিনি এ আনন্দ আমার অদৃষ্টে আছে-ভাবিনি যে সে অসম্পূর্ণ সংস্কার সম্পূর্ণ করে আমি তােমাকে কোনও দিন ধৰ্ম্ম ব্যবহারে অন্তরে বাহিরে নিঃশেষে আমার করে কোনও দিন পাব ! সেই অসম্ভব কল্পনা আজ সফল—এখন তুমি আমার গৃহপত্নী—আমার হৃদয়ের তুমি সম্রাজ্ঞী ! কি সৌভাগ্য আমার! কি আনন্দ! সুদত্তা। (চারুদত্তের বুকের ভিতর মাথা রাখিয়া ) কি আনন্দ। কি নিবীড় অতুলন সুখ! [ অলিন্দের পার্শ্ববর্তী দ্বার দিয়া প্রবেশ করিয়া অগ্নিবর্ণ থমকিয়া দাঁড়াইল। তার পর সরিয়া দ্বারপথে দাড়াইল ] অগ্নি। (নেপথ্যে) সখা, আসতে পারি ? চারু। ( আপনাকে মুক্ত করিয়া) এস সখা। অগ্নি। অসময়ে এসে পড়েছি—ক্রৌঞ্চমিথুনের মধ্যে হঠাৎ ব্যাধের ণিীর মত। বান্ধবী, আমায় ক্ষমা কর। [ ৬৫ [ প্রথম দৃশ্য তৃতীয় অঙ্ক ) ঋষির মেয়ে সুদত্তা। ক্ষমা করতে পারি সখা, যদি ভবিষ্যতে তুমি এরকম বিনয়ের আড়ম্বর আর কর। তুমি যে আমাদের কাছে সদা স্বাগত। অগ্নি। দেব-দম্পতি, তােমরা আমার আতিথ্য গ্রহণ করে আমায় কৃতার্থ করেছে। সখা! তুমি বয়সে নবীন, কিন্তু জ্ঞানে কত প্রবীণ, তা আজকের সভায় পণ্ডিতগণ মুক্তকণ্ঠে বলেছেন। তােমার সখ্য লাভ করে আমি সৌভাগ্যবান। চারু। সখা, সৌভাগ্য আমার যে, তােমাকে জীবনদাতা ও সখারূপে পেয়েছি। আজ রাজা আমাকে সম্মান দিয়েছেন সত্য, কিন্তু সে সম্মানের ভিতর তােমার যে কতখানি হাত আছে, তা আমি খুব জানি। তােমার মত মহাপ্রাণ তােমার মত হৃদয়বান লােক যে এতটা করবে, সে কিছুই বিচিত্র নয়। কিন্তু তবু কৃতজ্ঞতায় অন্তর ভরে উঠেছে মহাত্ম। আশীর্বাদ করি, মহাপুরুষের শ্রেষ্ঠ স্বর্গ, ধৰ্ম্মপ্রাণ ক্ষত্রিয়ের পরম পুরুষার্থ তােমার আয়ত্ত হােক। সুদত্তা। আর আমি আশীৰ্বাদ করি যে, তুমি জীবনে মরণে, বাকে ও কর্মে, তােমার যে প্রকৃত সত্তা তার যােগ্য হও। অগ্নি। (প্রণাম করিয়া) কৃতার্থ হলাম। তােমাদের আশীর্বাদ ব্যর্থ হবে না। দেবী, তােমার রথ প্রস্তুত। [ সুদত্ত যাইতে অগ্রসর হইল, ঘরের কাছে যাইয়া ফিরিয়া চাদত্তের দিকে চাহিল। অগ্নিবর্ণ হাসিল ] সখার যেতে কিছু বিলম্ব হবে। তােমাদের এই বিচ্ছেদ ঘটিয়ে যে অপরাধ করলাম, তার প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ আমি শ্রীমান অগ্নিবর্ণ নিজেকে তােমার গৃহে নিমন্ত্রণ করে ফেললাম। ৬৬] তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য সুদত্তা। কি সৌভাগ্য আমার ! কিন্তু গরীব ব্রাহ্মণের অন্নে রাষ্ট্রীয় শ্যালকের ক্ষুধা মিটবে কি সখা ? অগ্নি। প্রগলভে! রাজার সঙ্গে আমার ভগ্নীর বিয়ে হয়েছে বলে কি আমি সমস্ত রাষ্ট্রের শ্যালক হয়ে গেলাম ! যাও দেবী নিমন্ত্রণের নামমাত্র অগ্নিবর্ণের অন্তরাগ্নি প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। অতিথি সৎকারের আয়ােজন করগে। [ সুত্তার প্রস্থান। অগ্নি। সখা, তােমার সঙ্গে একটা গুরুতর পরামর্শ করতে চাই- আমার জীবন-মরণের কথা ! তুমি, আমার কথা প্রাণ গেলেও প্রকাশ করবে না স্বীকার কর। চারু। কখনই প্রকাশ করব না। কি এমন গুরুতর কথা? অগ্নি। তুমি তাে অনেকবার বলেছ সখা যে, ক্ষত্ৰধৰ্ম্ম ও রাজগুণ আমার ভিতর পূর্ণ গৌরবে বর্তমান আছে। তুমি সত্যবাদী, তাই আমার মনে হয় যে, তােমার কথা হয়তো সত্য। কিন্তু ভেবে দেখ আমি করছি কি? কেবল অলস-বিলাসে জীবনটার অপচয় করছি। আমার ধিক্কার জন্মে গেছে এ জীবনে। আমি এখন আমার একটা যােগ্য কাজ চাই—আমি রাজা হতে চাই। তুমি আমার সহায় হবে কি? চারু। তুমি রাজা হবে, আমি সহায় হব—আমি কিছুই বুঝতে পারছি না সখা। অগ্নি। তুমি সহায় না হলে কিছুই হবে না। রাজনীতিতে তােমার তুল্য পণ্ডিত আমি কখনও দেখিনি। তােমার সহজ বুদ্ধি এ বিষয়ে [ ৬৭ তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য আশ্চর্য রকম প্রখর। সেই বুদ্ধির সহায়ে আমি এক বিরাট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে পারি—যদি তুমি ইচ্ছা করে আমার সহায় হও। আমি তােমাকে আমার মন্ত্রী হতে বলছি। সম্মত থাক তো এখনি এই মুহুর্তে আমি তােমাকে সেই পদে অভিষিক্ত করব। চারু। এ কি পরিহাস সখা ! রাজ্য কোথায় তােমার যে মন্ত্রি নিয়ােগ করছো? অগ্নি। রাজ্য আছে, সে রাজ্য আমার হবে, যদি তুমি আমার মন্ত্রদাতা হও। শােন বলি, আমাদের রাজা নানা কারণে সকলের বিরক্তিভাজন হয়েছেন। মন্ত্রী সেনাপতি প্রভৃতি সবাই তাঁকে দূর করবার জন্য সঙ্কল্প করেছে। তারা চায় আমাকে রাজা করতে। সকলে আমার স্বপক্ষে, রাজার পরাজয় অনিবার্য। কিন্তু আমি এ দায় গ্রহণ করতে কিছুতেই সম্মত নই, যদি তুমি না রাজী হও। চারু। সখে, তুমি কি আমার সঙ্গে পরিহাস করছে? না সত্যি এমনি একটা মত্ত কল্পনা তােমার মাথায় ঢুকেছে ? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। অগ্নি। পরিহাস নয় বন্ধু ! বুঝতে পারছে না! আমি তােমাকে স্পষ্ট করে বােঝাচ্ছি। [ অগ্নিবর্ণ বাহির হইয়া দ্বারের অন্তরাল হইতে সেনাপতিকে লইয়া পুনঃপ্রবেশ করিল। অগ্নি। সেনাপতি, চারুদত্তকে বুঝিয়ে বল। সেনা। আৰ্য্য ! আমাদের কাছে রাজার অধিকার অসহ্য হয়ে উঠছে। তিনি চোর, অধর্মাচারী, রাজধর্মে তিনি একান্ত বিরাগী, কেবল বিলাস ৬৮) তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য নিয়ে মত্ত আছেন। কত অনাচার অত্যাচার যে দেশে হচ্ছে, তা বলবার নয়। ধৰ্ম্ম রসাতলে যাচ্ছে। প্রবলের উৎপীড়নে দুৰ্বল ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ছে। বাহিরের শত্রুরা আস্ফালন করছে, কখন যে তারা আমাদের আক্রমণ করবে, তার ঠিকানা নাই। আমাদের শক্তি আছে এ সব নিবারণ করতে ; কিন্তু রাজার দুর্বলতা ও আলস্যে আমরা অকর্মণ্য হয়ে কেবল মূঢ়ের মত রাজ্যের সর্বনাশ দেখছি। অগ্নিবর্ণদেব রাজা হলে আমাদের এ দুর্দশা থাকবে না। তিনি বীর, জনপ্রিয়, কেবল বিলাস-লালসা ত্যাগ করলে তার তুল্য ব্যক্তি কে আছে ? তার অধীনে কেবল আমরা নিজের রাজ্য রক্ষা করতে পারবাে না চারু। থামুন সেনাপতি । আপনারা যে সব কথা বলছেন, সে আমার অশ্রাব্য। রাজা আমার বৃত্তিদাতা, তার অনিষ্ট চিন্তা করাও আমার মহাপাপ। অগ্নি। কিন্তু সখা, বৃত্তি তত তােমায় রাজা দেন না, রাজ্যের কোষ থেকে তুমি বৃত্তি পাও। রাজ্যের মঙ্গলের জন্য চারু। রাজ্যের মঙ্গল অধৰ্ম্মের দ্বারা কখনও হবে না। রাজা আমার উপকারী, তার অহিত-চিন্তা আমার অধৰ্ম্ম-এ কাৰ্য্য আমার দ্বারা হবে না। আর শােন সখা, তুমিও এ চিন্তা পরিত্যাগ কর। রাজা তােমার পরমাত্মীয়। তার প্রসাদে তুমি পুষ্ট, তার হতে তােমার সমস্ত সম্পদ ও প্রতিপত্তি, তুমি তার বিরুদ্ধে দাড়িও না। অগ্নি। কিন্তু ধর্ম ও রাষ্ট্র যে সবার চেয়ে বড় সখা! ধর্ম যখন অপমানিত হল, তখন বেণ রাজাকে ব্রাহ্মণগণ বধ করতে দ্বিধা করেন নি। [ ৬৯ তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ প্রথম দৃশ্য রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য যদি রাজাকে বা পরমাত্মীয়কেও বধ করা দরকার হয়, ক্ষত্রিয়ের তাও করা কর্তব্য। চারু। শােন বন্ধু, এমন কোনও অধর্ম নেই, যার পক্ষে শাস্ত্র বা যুক্তি উপস্থিত করা যায় না। ধর্ম রক্ষা করা, অধকারীকে শাস্তি দেওয়া শক্তিমানের অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু এমন স্থান আছে যেখানে তার চেয়েও বড় ধৰ্ম্ম তাতে বাধা দেয়। উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা সবার বড় ধৰ্ম্ম। তা ছাড়া রাজার অধৰ্ম্মাচরণের কথা আমি সম্যক জানি । যদি অনুসন্ধানে সে কথা আমার গােচর হয়, তবে আমি রাজার সম্মুখীন হয়ে সম্পূর্ণ ধর্মসঙ্গত উপায়ে তার প্রতিরােধ করতে চেষ্টা করব। গােপন ষড়যন্ত্র করে গুপ্ত-বিদ্রোহে তাকে অভিভূত করবাে না। সেনা। কিন্তু যদি কোন ক্ষত্রিয় প্রবল হয়ে রাজশক্তিকে বিধ্বস্ত করতে অগ্রসর হয়, সে কি ধর্মবিরুদ্ধ ? চারু। যদি ধর্মপথে সে কার্যোদ্ধারে অগ্রসর হয়, তবে তাতে অধৰ্ম হয় না। অগ্নিবর্ণ, সেনাপতি, যদি তােমাদের রাজ্যলাভের ক্ষতলাচিত আকাঙ্ক্ষা থাকে, শৌর্য থাকে, সাহস থাকে, শস্ত্রপাণি হয়ে অগ্রসর হও, বীরভােগ্যা বসুন্ধরা, তােমাদের সামনে বিস্তীর্ণ রয়েছে। শক্তি থাকে, ভারতের সকল রাষ্ট্র জয় করে মহাসাম্রাজ্য স্থাপন কর। যদি তােমাদের মনে হয় যে, রাজাকে উচ্ছেদ করে নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা উচিত, তবে এদেশ ত্যাগ করে যাও, তার পর রাজাকে রীতিমত ধৰ্ম্মযুদ্ধে আহ্বান কর। তার প্রসাদে পুষ্ট হয়ে কপটাচারী হীন কতন্ত্রের মত তার আশ্রয়ে থেকে গুপ্ত আঘাতে তাকে বিপৰ্য্যন্ত করা ক্ষাত্র-ধৰ্ম্ম নয়, চৌধৰ্ম্ম। ৭০]

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
অগ্নি। সখা-
চারু। থাক্ সখা, আর যুক্তি তর্কে প্রয়ােজন নাই। আমি এ
অধৰ্ম্ম কাৰ্যে তােমাদের সহায় হতে পারবাে না। বরং যদি তােমরা আর
অগ্রসর হও, তবে আমি সভাসদের কর্তব্য করতে বাধ্য হব। আমায়
তােমাদের শত্রুতাচরণ করতে হবে।
সেনা। ( তরবারি কোষমুক্ত করিয়া) সে অবসর পাবে না ব্রাহ্মণ,
তুমি আমাদের মন্ত্রণা অনেক বেশী জেনে ফেলেছ। এখন যদি তােমাকে
আমরা দলে না পাই, তবে তােমাকে এই মুহূর্তে বধ করে আমাদের
নিশ্চিন্ত হতে হবে।
চারু। সেনাপতি! তােমার এই কপট অক্ষত্রিয় অনাৰ্য্য আচারের
প্রতিরােধ করি এমন শক্তি আমার নাই। কিন্তু তােমার সকল স্পৰ্দাকে
তাচ্ছিল্য করে হাসতে হাসতে মৃত্যুকে বরণ করতে পারি, এ ক্ষমতা
আমার আছে।
সেনা। তবে তাই হােক। (তরবারি উত্তোলন)
অগ্নি। (সেনাপতিকে বাধা দিয়া) ক্ষান্ত হও সেনাপতি।
[ ৭১

দ্বিতীয় দৃশ্য চারুদন্তের অগ্ন্যাগার [ অগ্ন্যাগারের বেদীর সম্মুখে দক্ষিণ পার্শ্বে দাড়াইয়া সুতা অগুরুর ধুমে চুল শুকাইতেছে। তার পার্শ্বে একটা আস্তরণের উপর চিত্রপট ও চিত্রাঙ্কনের উপকরণ রহিয়াছে। বামে ধারপথে অগ্নিবর্ণ প্রবেশ করিয়া সুদত্তার এই মুর্তি দেখিয়া স্তব্ধ লুব্ধ দৃষ্টিতে দাড়াইয়া রহিল। পরে দ্বারের বাহিরে গিয়া ডাকিল।] অগ্নি। সখা সুদত্তা। এস সখা- অগ্নি। [ চিত্রপটের কাছে আসন গ্রহণ করিয়া ] সখি! সখা কোথায় ? সুদত্তা। (বসিয়া) তিনি কি বিশেষ প্রয়ােজনে রাজবাড়ী গেছেন। অগ্নি। কিন্তু এ ভর-সন্ধ্যায় তিনি কোন বাইরের কাজে গেছেন। এখন যে প্রণয়ের মধুরতম অবসর। আজ এই ফাল্গুনের সন্ধ্যায়, মৃদু মলয়ের বীজনের ভিতর, শত কুসুম গন্ধের ভিতর, লক্ষ ভ্রমর গুঞ্জনের ভিতর, সখা আমার প্রণয়িনী ছেড়ে উধাও হলেন কোথায়! আজকার দিনে বিরহ কি ভাল সখি ? সুদত্তা। ভাল যদি নয়, তবে তুমি কেন মিছামিছি বিরহ দহন ভােগ করছে সখা ? চিত্রলেখা বােধ হয় এতক্ষণ বিরহের আগুনে সাঁতলে ৭২] তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য অগ্নি। বেশ মিষ্টি কথাগুলি বলছিলে সখি, কিন্তু তােমার ঐ শেষ কথাটায় যেন এক রাশ মিষ্ট ক্ষীরের মধ্যে কতকগুলাে রােচনা ঢেলে দিলে, হায় সখি! আমার প্রণয়-সহচরীর কল্পনায় কি তােমার চিত্রলেখা ছাড়া আর কারও নাম মনে আসতে পারলাে না ? সুদ। কেমন করে মনে পড়বে সখা ! তােমার কি মনে নেই, তুমি বিবাহের সময় অগ্নির সাক্ষাতে কি মন্ত্র বলে তাকে গ্রহণ করেছিলে ? তােমার হৃদয়ে যে সেখানে গাঁথা রয়েছে সখা ! তােমার এ পােড়া দেহ নিয়ে যেখানেই তুমি বেড়াও না কেন, হৃদয় তােমার চিরদিনের তরে সেই মন্দিরেই পূজা করবে। অগ্নি। আচ্ছা, তুমি আমার দেহটার অত অগৌরব করলে কেন সুদত্তা ? পােড়া দেহ! কেন? আমি কি এতই কুৎসিত? সুদত্তা। কুৎসিত! তােমার তুল্য রূপবান দেখিনি। আর তােমার মত এমন গুণবানই বা কে আছে ? মনে কর, সেই রাত্রে সেই বনের কথা ! তােমার সেদিনকার সেই মূর্তি যে চিরদিন আমার বুকের ভিতর আঁকা থাকবে—তােমার সেই মূৰ্ত্তিরই ধ্যান করি সখা। [ অগ্নিবর্ণ উল্লসিত দৃষ্টিতে সুদত্তার দিকে চাহিল। পরক্ষণেই সে মুখ ফিরাইয়া হঠাৎ দ্বারের দিকে চলিল ] সুদত্তা। ওকি সখা, চল্লে যে ! [ অগ্নিবর্ণ ফিরিয়া আসিল, মাথা নীচু করিয়া দন্তে অধর চাপিয়া কিছুক্ষণ দাড়াইয়া মহিল, তারপর মুখ তুলিয়া মুগ্ধদৃষ্টিতে সুদত্তার দিকে চাহিল। ] অগ্নি। সুদত্ত, কি সুন্দর তুমি! যেন একটা আগুন-পতঙ্গের মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ ! ভাবছি—ভাবছি—তুমি কি সুন্দর সুদত্ত ! [ ৭৩ তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য সুদত্তা। ( মাথা নত করিয়া লজ্জিত ভাবে ) ছিঃ, ও কথা কেন ? অগ্নি। কেন? এ কথার কোন হেতু নেই সুন্দরী। রূপ জিনিসটা বিশ্বকর্মার একটা অহেতুকী সৃষ্টি। হঠাৎ একটা আনন্দের ঝেকে তিনি একে গড়ে ফেলেছেন—আর সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বের ভিতর সে আনন্দের স্পর্শ লেগে গেছে। বিশ্বের লােক নিতান্ত হেতুশূন্য প্রীতি নিয়ে রূপের পূজায় বিভাের হচ্ছে। সখি, বিশ্বকৰ্ম্মা তােমাকে এমন একটা সম্পদ দিয়ে গড়েছেন যে পূজা তােমার পায় আপনি এসে গড়িয়ে পড়বে। তার কোনও হেতু থাকবে না, হেতু খুজে কখনও পাওয়া যাবে না। সুদত্তা। (ছবি ইত্যাদি তুলিয়া দাঁড়াইল) সখা এ প্রসঙ্গ ছেড়ে দাও কেন আমায় লজ্জা দেও—অপরাধী কর? [ ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে অপহৃত হইতে লাগিল ] অগ্নি। ছাড়তে পারছি না সখি। ছাড়তে যদি বল তবে বিদায় করে দাও তােমার ঐ রূপরাশিকে। লুকিয়ে ফেল তােমার ঐ সম্মােহন বেণী ! ( হঠাৎ সুত্তার চুলে হাত দিয়া) আঃ কি সুন্দর [ দুই হাতে মুখের উপর চুল চাপিয়া ধরিল ] স্নিগ্ধ তােমার কেশরাশি। সুদত্তা। [ ছিটকাইয়া দূরে দাড়াইল, তার হাত হইতে চিত্রের উপাদান পড়িয়া গেল ] পাপিষ্ঠ দূর হও। সুদত্তা! পাপিষ্ঠ আমি, লম্পট আমি, সে কথা আমি যত জানি, তত আর কেউ জানে না। কিন্তু পারছি না—অতুলনীয় ঐ রূপ- রাশি সামনে দাড় করিয়ে তুমি আমায় ক্ষেপিয়ে তুলেছ। আমি—আমি তােমাকে চাই, তােমায় না পেলে আমি মরে যাব। কেন তুমি আমার হবে না সুদত্তা ? (সুদত্তার হাত ধরিল) ৭৪ ] অগ্নি।

তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষিয় মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য সুদ। দূর হও—দূর হও—তুমি পাপাশয় ! ব্রাহ্মণ-কন্যার অঙ্গস্পর্শ করতে সাহস করছো তুমি? ছাড় ছাড় বলছি। [ হাত ছাড়াইয়া দূরে বাম দিকে দাড়াইয়া ] এই মুহূর্তে এখান হতে দূর হও। অগ্নি। (হাসিয়া) সুদত্তা—আমার কাছে অত বৃথা আস্ফালন করাে না। তুমি ও তােমার স্বামী যে কি বস্তু সে কথা তােমরা অন্যের কাছে গােপন করতে পার, কিন্তু আমার কাছে তা অবিদিত নেই। আমি এক মুহূর্তে তােমার স্বামীর ও তােমার সর্বনাশ করতে পারি জান ? সুদত্তা। পাপ কপটাচারীর অন্যায় অত্যাচারে আমার স্বামীকে কোনও দিন লাঞ্ছিত করতে পারবে না। শােন অধার্মিক-ধৰ্ম্ম যার আশ্রয়, কেউ তার অনিষ্ট করতে পারে না। অগ্নি। হাঃ হাঃ, এ দর্প তােমার মুখে শােভা পায় না সুদত্তা। যার স্বামীর ললাটে চৌরদণ্ডের অক্ষয় তিলক, সে আবার ধর্মের কথা বলে কোন সাহসে ? [ সুদত্ত ভয়ানক কাপিয়া উঠিল। ভীত চকিত দৃষ্টিতে অগ্নিবর্ণের দিকে চাহিল ] অগ্নি। (হাসিয়া) কি ? তেজ তােমার গেল কোথায় সুন্দরী ? এখন বুঝতে পারছ, আমার শক্তি কোথায়? এখনও কি আমায় বাধা দেবে? তােমার স্বামী এখন রাজার কাছে মহা সম্মান পেয়েছেন। আরও সম্মান পাবেন। শীঘ্রই অমাত্যপদ লাভ করবেন। সে সব নষ্ট করবে তুমি ? মিথ্যাবাদী বঞ্চক বলে এ রাজ্য হতে আরও নূতন কলঙ্ক দিয়ে তাঁকে নির্বাসিত করাবে ? সুদত্তা। সখা, বন্ধু, বীর তুমি; এমন সর্বনাশ আমার কোরাে না। [ ৭৫ তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য • ৩ স্বামী আমার মহাধাৰ্ম্মিক। তিনি চোর নন—ওই দণ্ডের ছাপ মিথ্যার বিজয়-টিকা। এই হতভাগিনীর জন্যই তিনি সে মিথ্যা দণ্ড বরণ কোরে নিয়েছিলেন ; আমার জন্য আর তাঁকে লাঞ্ছিত করাে না। তুমি ত নীচ নও। বন্ধু আমার, প্রিয় সখা আমার, তােমার সকল ক্রোধ, সকল অভিশাপ, সকল লাঞ্ছনা আমায় দাও। আমার স্বামীর এমন সর্বনাশ করাে না! কি? নীরব রইলে কেন সখা ? আমার দিকে চেয়ে দেখ তুমি যে আমার প্রাণদাতা, আমার মান যে তুমিই রক্ষা করেছ সখা, চেয়ে দেখ, আমার তুমি অনিষ্ট করতে পারবে না। এত নীচ তুমি হতে পার না। তুমি যে মহৎ, তুমি যে বীর, তুমি ত ছােট নও সখা ! একবার তােমার অন্তরের দিকে চাও বীর! তােমার আত্মা যে তােমায় এ মােহকে তিরস্কার করছে। অগ্নিবর্ণ, আমি ব্রাহ্মণ-কন্যা, চিরজীবন দেবতার সেবা করেছি, আমি তােমার পায়ে পড়ি সখা, আমায় দয়া কর । [ অগ্নিবর্ণের পায়ের উপর পড়িয়া তার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল ] অগ্নি। (স্বগতঃ ) কি সুন্দর! রূপের কি বিচিত্র লীলা ওই তন্বীর সমস্ত অঙ্গে। তেজস্বিনী পরাভূত হয়েছে, একেবারে নুয়ে পড়েছে তার রূপরাশি নিয়ে। শেফালীর স্তুপের মত সে আমার পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়েছে। এখন তাে আমি অনায়াসে পারি ওকে আমার প্রবল আলিঙ্গনের ভিতর নিষ্পেষিত করে ফেলতে। কিন্তু পারছি কই ? এ কাকে জাগিয়ে তুললে আমার অন্তরের ভিতর সুদত্তা? পারছি না ? এ কাকে আমার ভিতর থেকে টেনে বার করলে এই নারী! সুদত্তা। ( পা ছাড়িয়া উঠিয়া) দয়া হবে না, এত বড় নিষ্ঠুর তুমি? তবে কি আমি ভুল বুঝেছি ? না—এই পােড়া রূপ তােমার আত্মায় চক্ষু ৭৬] তৃতীয় অঙ্ক ) ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য ঝলসে দিয়েছে ? তাই কি ? তবে দাড়াও সখা, তােমার সামনে আমি এই রূপ নিঃশেষ করে নষ্ট করছি। [ আগুনের কাছে গিয়া আগুনের উপর মুখ বাড়াইয়া দিতে গেল ] অগ্নি। (নতজানু হইয়া সুদত্তাকে নিবৃত্ত করিয়া) ক্ষান্ত হও দেবী, এমন সৰ্ব্বনাশ করে না। আমার সব অপরাধ ক্ষমা কর। দেবী তুমি ? সামান্য মানুষ ভেবে আমি অপরাধ করেছি। তোমার পায়ের ধুলা দাও দেবী আশীর্বাদ কর যে আমার ভিতর যে আত্মাকে তুমি আজ জাগিয়ে দিলে, আর যেন সে ঘুমিয়ে না পড়ে (পদধূলি গ্রহণ করিল ) সুদত্ত। ( নিকটে আসিয়া কম্পিত কণ্ঠে ) আশীৰ্বাদ করি, সকল দেবতা তােমায় ধর্মপথে অক্ষুন্ন রাখুন। চিরদিন তােমার ভিতর ধৰ্ম্ম জয়যুক্ত হােক্ অগ্নি। তবে আসি দেবী ? ভক্ত দাস বলে আজ থেকে আমায় স্মরণ কোরাে। সুদত্তা। [ হাত ধরিয়া উঠাইয়া ] এসো সখা। [ উত্তোলন। [ চিত্রলেখা প্রবেশ করিয়া ক্রুর দৃষ্টিতে পর পর উভয়ের দিকে ঢাহিতে লাগিল, অগ্নিবর্ণ ও সুদত্তা উহাকে দেখিয়া চমকিত ও স্তব্ধ হইয়া চিত্রাপিতবৎ দাড়াইয়া রহিল ] এখন মিটেছে তােমার কেলি, নাগর মহাশয় ? যদি মিটে থাকে, তবে দয়া করে আমার সঙ্গে আসতে আজ্ঞা হয়। [ অগ্নিবর্ণ নতমুখে চিত্ৰলেখার সঙ্গে চলিয়া গেল ] সুদত্তা। [ স্তব্ধনেত্রে তাহাদের দিকে চাহিয়া রহিল। তাহারা বাহির [ ৭৭ ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য তৃতীয় অঙ্ক ] হইয়া গেল ] কি ভয়ানক! এত বড় মিথ্যা কলঙ্ক আমায় দিলে চিত্র- লেখা? আর এ দারুণ মিথ্যার বিরুদ্ধে একটাবার মাথা তুলে দাড়াতে সাহস করলে না অগ্নিবর্ণ। মন্ত্ৰস্তব্ধ ভুজঙ্গের মত, পদানত দাসের মত, মিথ্যাকে মাথায় করে নীরবে মাথা নীচু করে চলে গেল ! ভীরু! ভীরু! [ চারুদত্তের প্রবেশ ও চিন্তিতভাবে পরিক্রমণ ] সুদত্তা। চমকিত হইয়া (স্বগতঃ ) দেব বৈশ্বানর ! আৰ্যপুত্রের এ কি মূর্তি! চারু। [ গভীর নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া ] সুদত্ত ! চল আমরা এ দেশ ত্যাগ করে যাই। সুদত্তা। (শঙ্কিত কম্পিতকণ্ঠে ) এ দেশ ছেড়ে যাবে! সে কি প্রভু চারু। হ্যা, এ দেশ ছেড়ে যাব। এ দেশ বাসের যােগ্য নয়। এখানকার ভূমিতে পাপ জম্মায়! এখানকার বাতাস পাপে বােঝাই! এখানকার জলে পাপের বীজ বহন করে। সুদত্তা। (শিহরিয়া দন্তে অধর দংশন করিয়া) এ কথা কেন বলছ ? চারু। বলছি—জেনেছি বলে। নিজের চক্ষে দেখেছি-পাপের বিষাক্ত ফণা আমাকে দংশন করবার জন্য উদ্যত হয়েছে। এখানে ব্যভিচার রাজত্ব করে। পুরুষ এখানে নির্বিচারে অকল্পনীয় ব্যভিচার কোরে গৌরবের সঙ্গে মাথা তুলে থাকে; লােভ এখানে সহােদরের অধিক প্রীতির বুকে ছুরি মারতে চায়। পুরুষশ্রেষ্ঠের পত্নী সামান্য লােকের কাছে প্রেম ভিক্ষা করে, আর তার কলুষিত প্রেমের জন্য নরশ্রেষ্ঠ স্বামীর প্রাণবধ ৭৮]

তৃতীয় অঙ্ক )
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
পর্যন্ত করতে প্রস্তুত হয়। ব্রাহ্মণী স্বেচ্ছায় স্বৈরিণীর বৃত্তি অবলম্বন করে
নগরের বুকের উপর স্পা করে বেড়ায়। এ নরক! এত পাপ যে
জগতে আছে, তা জানতাম না।
[ সুদত্তা মাথা নীচু করিয়া গভীর নিঃশাস লইতে লাগিল ]
সুদত্তা। (হঠাৎ তীব্রকণ্ঠে) মিথ্যা কথা সব ! তােমার ভুল।
চারু। সব ভুল ! ওই পাপিষ্ঠ অগ্নিবর্ণ ভুল? ও নিজমুখে যে
পাপের কথা স্বীকার করেছে সে ভুল ? আজ এই পাপ সন্ধ্যায় যে ভীষণ
পাপের কথা নিজ কর্ণে শুনেছি সে ভুল।
[ সুদ চমকাইয়া উঠিল।
চারু। তুমি জাননা সুদত্তা, কি সব কথা শুনেছি আমি
সুদত্তা। [ তীব্রভাবে ] কি শুনেছাে ? কি বলেছে সে মিথ্যাবাদী
লম্পট অগ্নিবর্ণ ।
চারু। (অন্যমনস্কভাবে) থাক সে কথা, শােন সুদত্তা আমি স্থির
করেছি আজ রাত্রেই এ রাজ্য ছেড়ে আমরা চলে যাব।
সুদত্তা। (একটু চিন্তা করিয়া ব্য গ্রভাবে ) বেশ! তাই চল, তাই
চল!
চারু। বেশ, তবে তুমি প্রস্তুত হও—আমি রাজার সঙ্গে দেখা করে
আসছি।
[ প্রস্থান।
[ সুদত্ত চিন্তিত অবস্থায় দাঁড়াইয়া রহিল।
[ ৭৯

তৃতীয় দৃশ্য
রাজার মন্ত্রণাগার
[ রাজা ও চারুদত্ত ]
রাজা। বটে! এমন ভীষণ ষড়যন্ত্র ! অগ্নিবর্ণ আমার বিরুদ্ধে
ষড়যন্ত্র করছে ? কেউ আমার সহায় নেই ? কার সঙ্গে মন্ত্রণা করবাে?
প্রতিহারি !
[ প্রতিহারি নমস্কার করিয়া দাড়াইল ]
মহিষীকে সংবাদ দাও। তাকে জানাই, তার গুণবান ভাইয়ের কথা
চারু। ক্ষমা করবেন মহারাজ! মহিষীকে ডাকবেন না, আমার
আরও কথা আছে।
রাজা। যাও তুমি। ( প্রতিহারীর প্রস্থান) আরও কথা? মহিষীর
সম্বন্ধে কিছু ?
চারু। হ মহারাজ। এ কথাও আমার আপনাকে বলতে হচ্ছে।
হয়তাে আমি ভ্রান্ত ; হয় তাে সাগরিকার দ্বারা বঞ্চিত হয়েছি; কিন্তু
আজ সন্ধ্যাবেলায় সাগরিকা আমায় বলেছে যে,মহিষী তাকে আমার কাছে
পাঠিয়েছেন—তিনি আমার প্রণয় প্রার্থিনী ; তার জন্য তিনি নাকি রাজার
জীবন হিংসা পর্যন্ত করতে প্রস্তুত। এ বিষয়ে সত্য মিথ্যা আপনি বিচার
৮০]

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
করুন রাজন্। আমি যা শুনেছি আপনার কাছে নিযেদন করতে বাধ্য।
রাজা। বটে, বটে! আচ্ছা, এইখান থেকেই বিচার আরম্ভ করা
যা। প্রতিহারী! সাগরিকা। [ কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া ] শােন
ব্রাহ্মণ ! আমি এখন তােমার সব কথাই অবিশ্বাস করছি। তুমি কথা
গুলো সাজিয়েছিলে বেশ, বিশ্বাসও অনেকটা করেছিলাম আমি কিন্তু
মহিষীর নামে কলঙ্ক দেবার চেষ্টা করেই তুমি সব মাটী করলে। মহিষী
আমার পরম হিতাকাঙ্কিণী, তিনি—অসম্ভব । আর তােমাকে তিনি
কেন ভালবাসতে যাবেন ? তুমি কি একটা অজ্ঞাতকুলশীল, কদাকার
ব্রাহ্মণ যুবক। আমার প্রসাদ ব্যতীত একেবারে নিঃসম্বল। তুমি
মিথ্যাবাদী ।
চারু। (হাসিয়া) এই জন্যই বলে “বিনাশ কালে বিপরীত বুদ্ধি” ।
আমি মিথ্যাবাদী নই রাজা—মিথ্যা আমার ব্যবসা নয়—জাতি ধৰ্ম্ম নয়।
রাজা। যা সে কথা এখনি তা প্রমাণ হয়ে যাবে।
[ সাগরিকার প্রবেশ ]
সাগরিকা ! তুই এই ব্রাহ্মণের কাছে গিয়েছিলি, আজ সন্ধ্যাবেলায় ?
সাগ। না—সন্ধ্যাবেলায় সমস্তক্ষণ আমি রাণীর সঙ্গে বসে পাশ
খেলেছি ; মহিষীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করুন।
রাজা। শুনলে চারুদত্ত। এখন তােমার কি বলবার আছে ?
চারু। কি আর বলব রাজন! আপনার এই অন্তঃপুরিকা
মিথ্যাবাদিনী।
[ ৮১

তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ তৃতীয় দৃশ্য , সাগ। মিথ্যাবাদী, স্পর্ধিত ব্রাহ্মণ। জান তুমি কাকে এ কথা বলছো ? রাজন, আপনি মহিষীকে ডেকে সত্য নির্ণয় করুন, আর যদি আমার কথা সত্য হয়, তবে এ ব্রাহ্মণের উপযুক্ত শাস্তিবিধান করুন। [ সাগরিকার প্রবেশ ] রাজা। বেশ, ডাক্ মহিষীকে— চারু। কোনও প্রয়ােজন নাই ; এ পরিচারিকা যেরূপ অকুণ্ঠিত চিত্তে মিথ্যা বলছে, তাতেই বুঝতে পারছি রাজা, যে মহিষী সত্য বলবেন না। রাজা। কি? এত বড় স্পর্ধা তােমার? মহিষীকে তুমি মিথ্যাবাদী বলতে সাহস কর ? জান, তােমার এ দুঃসাহসের দণ্ড প্রাণদণ্ড? চারু। শাস্ত্রে যে দণ্ডই থাকুক, প্রাণদণ্ড আমার হবে তা জানি ; কেন না দেখতে পাচ্ছি রাজন্ আপনার দুৰ্ব্বদ্ধি উপস্থিত হয়েছে। আপনি বিচারে অক্ষম। কিন্তু বিচার করুন রাজ, আমি তুলা, অগ্নি, জল বা বিষ, যে কোনও দিব্যপ্রমাণ দ্বারা আমার কথার সত্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে প্রস্তুত আছি। রাজা। বেশ, স্মরণ থাকে যেন, যদি দিব্যের দ্বারা বিশুদ্ধ না হও, তবে কাল শূলে তােমার মৃত্যু হবে। প্রতিহারী! [ প্রতিহারীর প্রবেশ ] দণ্ডাগার থেকে দিব্যের লৌহ উত্তপ্ত করে নিয়ে এসো। যজ্ঞাগার থেকে দিব্যের উপচার নিয়ে এসাে। এইখানেই তােমার দিব্য শােধন হবে। [ প্রতিহারীর প্রস্থান। চারু। উত্তম। রাজ, আমি প্রস্তুত। ৮২ ] তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ তৃতীয় দৃশ্য ( দাসীর প্রবেশ) দাসী। দেব! মহিষী আপনাকে অন্তঃপুরে স্মরণ করেছেন। রাজা। চল যাচ্ছি। [ দাসী ও রাজার প্রস্থান। চারু। মহিষী অন্তঃপুরে স্মরণ করেছেন। পাপিষ্ঠার কি এতক্ষণে ব্ৰহ্মবধের ভয় হয়েছে ? রাজার কাছে আমার প্রাণ ভিক্ষা করবে ? পাপাশয় নারীর কি এতটা সৎসাহস হবে ? সাগ। [ বাতায়নের অপর পার্শ্ব হইতে মুখ বাড়াইয়া ] মূর্খ ব্রাহ্মণ, রাজার কাছে এসেছ নালিশ কর্তে! মরণ কি এমনি করেই ডেকে আনতে হয় ? চারু। দূর হও পাপিয়সী! চারুদত্ত মৃত্যুকে ভয় করে না। সাগ। কিন্তু, চারুদত্তের মৃত্যুসম্ভাবনার যে আমার সখীর ভীষণ দুর্দশা উপস্থিত -বেচারী যে কান্নাটা কঁদছে, দেখলে তােমারও দয়া হত। চারু। (বিষন্ন ভাবে) সাগরিকা ! কৰ্তব্য বড় কঠোর। সাগ। কিন্তু তুমি তার চেয়েও কঠোর। মহিষীর মত রমণী-শ্রেষ্ঠ তােমাকে প্রেম নিবেদন করলে, তুমি তা অনায়াসে প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষান্ত হলে না—তার সর্বনাশ করতে এসেছ। তুমি বুঝতে পারছে, অবশ্য, যে তুমি বিশুদ্ধ হলে মহিষীর মৃত্যুদণ্ড হবেই। স্ত্রীবধের পাতক হবে তােমার! চারু। তা সত্য। আমি স্ত্রী-বধের জন্য দায়ী হব। কিন্তু এ যে আমার কর্তব্য সাগরিকা ! ( চিন্তা করিয়া) সাগরিকা ! তুমি মহিষীকে [ ৮৩

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
আশ্বস্ত করছে। আমিই মৃত্যুদণ্ড গ্রহণ করবে। তাকে আমি রক্ষা
করবাে।
সাগ। এখন আর কেমন করে রক্ষা করবে ?
চারু। দিব্য নির্দোষ সাব্যস্ত হওয়া দেবতার হাত, কিন্তু যে দোষী
প্রমাণিত হতে চায়, তাকে কোন দেবতা রক্ষা করতে পারে না। তােমার
সখীকে নিশ্চিন্ত হতে বল, আমিই দণ্ড গ্রহণ করবে।
সাগ। আর তােমার স্ত্রী ?
চারু। সুদত্তা ?-অগ্নিদেব তার উপায় করবেন।
( বামদিক হইতে মহিষীর প্রবেশ )
মহিষী। দেব, আমাদের অপরাধ ক্ষমা করুন ।
( রাজার বামদিক হইতে প্রবেশ)
আৰ্যপুত্র! ব্রাহ্মণের সঙ্গে এ কি পরিহাস ?
(চারুদত্ত বিস্মিত-নেত্রে উভয়ের দিকে চাহিলেন)
রাজা। ধর্মাত্মা ব্রাহ্মণ ! তুমি সকল পরীক্ষায় শােধিত হয়েছ।
চারু। পরীক্ষা রাজন্ ? কিসের পরীক্ষা?
রাজা। তােমার অমাত্যপদের পরীক্ষা ব্রাহ্মণ ! পরীক্ষার জন্যই
অগ্নিবর্ণ, সেনাপতি ও সাগরিকাকে আমি তােমার কাছে পাঠিয়েছিলাম,
সে পরীক্ষায় তুমি জয়ী ! কাল প্রাতে রাজসভায় সর্বসমক্ষে তােমার
অভিষেক হবে।
৮৪)

চতুর্থ দৃশ্য
অগ্নিবর্ণের অন্তঃপুর
[ আসনের উপর অগ্নিবর্ণ আসীন। চিত্রলেখা তাহাকে পুষ্পমাল্য ভূষিত
করিয়া তার পায় পুষ্পাঞ্জলি দিল। তার পর উঠিল ]
চিত্র। আমার ব্রত শেষ হয়েছে। যাও, এখন তােমার ছুটি,
তােমার যেখানে খুসী সেখানে যাও। আর তােমাকে আমার কোনও
প্রয়ােজন নাই।
অগ্নি।
কোনও প্রয়ােজন নাই চিত্রলেখা? তুমি আমার ধর্মপত্নী।
চিত্র। ও কথাটা ভুলে যাও। ধর্মের নাম তােমার মুখে নাই আন্‌লে ?
তার চেয়ে ততক্ষণ বাসন্তিকার চর্চা করলে জীবন সার্থক হবে,-বিষ্ণু
আজকাল বাসন্তিকারও বুঝি কপাল ভেঙ্গেছে-সুদত্তার নাম জপ
হচ্ছে।
অগ্নি। চিত্রা! একটা প্রার্থনা তােমার কাছে আমার,-এ প্রসঙ্গে
দয়া করে সুদত্তার নামটা টেনে এনাে না।
চিত্র। কেন আনবাে না দয়া করে? আমি কি এতই অধম যে,
তােমার প্রেয়সীর নামটাও মুখে আনবার সাধ্য নেই।
অগ্নি।
সে তাে প্রেয়সী নয় প্রিয়ে ?
চিত্র। আর মিছে অভিনয়ে কাজ নেই।
অগ্নি। মিথ্যা কথা নয় চিত্রলেখা, সত্য। আমার কথা বিশ্বাস
কর। তােমায় স্পর্শ করে শপথ কচ্ছি।
[ ৮৫

ঋষির মেয়ে তৃতীয় অঙ্ক ] [ চতুর্থ দৃশ্য চিত্রা। আমাকে স্পর্শ করে শপথ করেছিলে, বাসন্তিকার কাছে আর যাবে না,—সে শপথ রক্ষা করেছ ? অগ্নি। আজ করবে। আর একটা অবসর আমাকে দাও চিত্রা, আমি আর সে অগ্নিবর্ণ নই। চেয়ে দেখ আমার মুখের দিকে। এখন আমি শপথ করছি, ধর্মপথ ছাড়া আর আমার অন্য পথ নেই। কেবল তুমি একটু আশ্রয় না দিলে ধৰ্ম্ম আমার হবে না। তুমি আমার পত্নী, আমি তােমার পায়ে ধরছি চিত্রা, চিত্রা। [ পা সরাইয়া লইয়া ] দূর হও পাপিষ্ঠ, লম্পট ! তােমার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নাই।যাও। [ দক্ষিণ দিকে প্রস্থান। অগ্নি। এত তেজ! আর আমি অগ্নিবর্ণ নীরবে দাঁড়িয়ে শুলাম। এই নারীর কাছে আমার সব পৌরুষ কোথায় বিলুপ্ত হয়ে যায় ! ওর মুখের দিকে আমি চাইতে পারি না। কেন পারি না? চিত্রলেখার প্রতি স্বামীর কর্তব্য আমি করিনি—সেই অপরাধ আমাকে ওর কাছে দুর্বল করে রেখেছে। কিন্তু তা করিনি কেন ? চিত্রলেখা, তার জন্য তুমি দায়ী নও? তুমি তাে কোন দিন সুদত্তার মত মহিয়সী হয়ে আমার সম্মুখে দাড়িয়ে আমায় আমার অন্তরাত্মার সঙ্গে মুখখামুখি করে দাওনি ! চিত্রলেখা যদি চিত্রলেখা না হয়ে সুদত্তা হত, তবে অগ্নিবর্ণ আজ দেবতা হত। [ বামদিক হইতে বাসন্তিকা দাসীর প্রবেশ দাসী। দেব, ভর্তৃকা বাসন্তিকা আপনাকে স্মরণ করেছেন, তিনি দ্বারে রথে বসে অপেক্ষা করছেন। ৮৬]

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋযির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
অগ্নি। বাসন্তিকা!-না-না। যাও দাসী, তাকে বল গিয়ে, আমি
তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবাে না। আর কখনও আমার সঙ্গে তার
সাক্ষৎ হবে না। [ দাসীর প্রস্থান ] সুদত্তা! দেবী ! তুমি আমাকে
রক্ষা করেছ। আমি যে হীন নই, সে কথা তুমিই আমাকে শিখিয়েছ।
তােমার চরণে কোটী কোটী নমস্কার !
[ সীধুভণ্ড লইয়া সংবাহকের প্রবেশ ]
সংবা। দেব, গ্রহণ করুন।
অগ্নি। [ পাত্র গ্রহণ করিয়া আবার প্রত্যর্পণ করিয়া } সংবাহক, নিয়ে
যাও, ওসব—আমি পান করব না।
সংবা । সীধু পান করবেন না ! এ যে আমি বহু যত্নে আপনার
জন্যে আজ প্রস্তুত করেছি আৰ্য্য।
অগ্নি। আর আমি কোনও রকম আসব পান করবাে না ঐ
আমার সর্বনাশের মূল-ও পাপ !
সংবা। এরূপ আজ্ঞা করবেন না দেব ! আৰ্য নাগভট্ট সেদিন
বলেছিলেন, উত্তর দেশে সীধু পানের ব্যবস্থা শাস্ত্রে আছে।
অগ্নি। থাক, তার চেয়ে বড় ধৰ্ম্মের আমি সন্ধান পেয়েছি।
সংবা। কিন্তু প্রভু! অনেক দিনের অভ্যাস আপনার, হঠাৎ ত্যাগ
করলে স্বাস্থ্যহানি হতে পারে।
অগ্নি। হােক। ও বিষ আর আমি খাব না।
সংবা। আজকের দিনটা খেলে
দিনটা খেলে হত না ? অনেক যত্ন করে
করেছিলাম।
[ ৮৭

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
অগ্নি। দূর হও পাপিষ্ঠ ! আমার আদেশ পালন করতে অভ্যাস
সংবা। [ স্বগতঃ ] এ কিরে বাপু। রাজ্যের শ্রেষ্ঠ বিলাসী অগ্নিবর্ণ,
সীধু তার প্রাণের দোসর! তার আজ এতে অরুচি! এ ভাল হচ্ছে না
ভাল হচ্ছে না। যাক, এখন যাই। এ প্রতিজ্ঞা টিকবে না। পাত্রটা
রেখে যাই!
[ সীধু পাত্র রাখিয়া দক্ষিণ দিকে প্রস্থান।
[ বামদিক হইতে পান-বিহ্বল বাসন্তিকার প্রবেশ ]
বাস। আমার উপর এ কি আদেশ পাঠিয়েছ রসিকরাজ! চারদিন
তুমি উধাও, আমার বাড়ীর চৌকাট ডিঙ্গাওনি, আর আজ এই বসন্তের
চাদনীর রাতে তােমার বাড়ীর দ্বারে এসেছি চঁাদ, তাও ফিরিয়ে দিতে
চাও। সে হবে না সখা, চল।
অগ্নি। আমি যাব না বাসন্তী ! তুমি ফিরে যাও।
বাস। যাবে না কেন সখা ? আমি যে আজ চারদিন, রাতদিন
তােমার প্রতীক্ষায় কুঞ্জ সাজিয়ে বসে আছি—তৃষ্ণায় আমার ছাতি ফেটে
যাচ্ছে। প্রিয় আর আমাকে কষ্ট দিও না।
অগ্নি। আমাকে ক্ষমা কর বাসন্তী।
বাস। ক্ষমা-ক্ষমা করবাে না প্রিয়তম
৮৮ ]

তৃতীয় অঙ্ক )
ঋষির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
গীত
বঁধু চেওনা ক্ষমা,
শুধু চেওনা ক্ষমা !
যাহা চাও আর
সকলি তোমার
তােমারই এ প্রিয়তমা;
জীবনে মরণে
প্রণয় বরণে
সহকার-বঁধু সমা!
অন্তর মধু
আহরিয়া বঁধু
অধরে ধরিব হিয়া,
সার্থক হবে
পদতলে তব
আপনারে ডালি দিয়া,
আর যাহা চাও
নাও সবই নাও
যত কিছু পাও সুষমা
অগ্নি। বাসন্তী, যে অগ্নিবর্ণ তােমার প্রমােশালার শােভা সম্পাদন
করত, সে নেই, তার দেহের ভিতর আর এক অগ্নিবর্ণ এসে অধিষ্ঠান
করেছে। এ তােমাকে চেনে না এর সঙ্গে ভােমার কোনও সম্পর্ক নেই।
বাসন্তী। কোনও সম্পর্ক নেই ? কি বললে অগ্নিবর্ণ ? কোনও
সম্পর্ক নেই? ভাল করে বুঝতে পারছি না আমি! সুরায় আমার মাথার
[ ৮৯

অগ্নি।
তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ চতুর্থ দৃশ্য
ভিতর সব ধেয়াটে হয়ে যাচ্ছে—কোনও সম্বন্ধ নেই ? এও কি সম্ভব ?
অগ্নিবর্ণ এ কথা বলছে?
অগ্নি। হা বাসন্তী, এই কথাই সত্য।
বাসন্তী। এত চট করে এ কথা সত্য হলে চলবে কেন প্রিয়তম !
অতীতের কথা একবার স্মরণ কর। সেই নবােদ্ভিন্ন যৌবনা ব্রাহ্মণ-কন্যা
সে পাপের কথা স্মরণ করিয়ে আমায় কষ্ট দিয়ে লাভ কি
বাসন্তিকা ?
বাস। রস-রস-স্মরণ কর। তুমি বলিষ্ঠ বাহুতে আমাকে
জড়িয়ে ধরে ঘােড়ায় চড়লে; বায়ু বেগে নদী প্রান্ত কান্তার অতিক্রম
করে ঘােড়া ছুটল—আমি সে কিছুই দেখতে পেলাম না, কিছুই ভাবতে
পারলাম না। আমার বক্ষের ভিতর তােমার বক্ষের স্পন্দন পৌছে আমার
সব চেতনা হরণ করে নিলে—আমি তােমার মুখের দিকে চেয়ে সব ভুলে
গেলাম। সেই আমি বাসন্তিকা—সেই তুমি অগ্নিবর্ণ !
অগ্নি। সে আমি নই বাসন্তিকা -তুমি ভুল করেছে। আমি ছিলাম
মােহাচ্ছন্ন, সাহসােন্মত্ত, কাণ্ডজ্ঞানহীন যুবক, আর তুমি ছিলে সাহসিক।
স্বৈরিণী।
আমার পুনর্জন্ম হয়েছে, আপনাকে চিনতে পেরেছি।
আর তুমিও ঠিক সেই বাসন্তিকা নও-তুমি এখন গণিকা, গুপ্তা নও।
আমিই তােমার একমাত্র প্রেমাস্পদ নই
বাসন্তী। এ কথা তুমি আমায় বল্লে ? বেশ ! কিন্তু একবার মনে
করাে অগ্নিবর্ণ, কে আমায় গণিকা করেছে। তােমার মুখ চেয়েই আমি
ঘর ছেড়ে এসেছিলাম ; তুমি বলেছিলে,তাই আমি তােমার প্রমােদ-বান্ধবের
সেবা পরেছিলাম। তখন যে তাতেই তােমার আনন্দ ছিল, সে কথা ভুলে
৯০ ]

তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ চতুর্থ দৃশ্য যেও না অগ্নিবর্ণ! আমার এ দশা তুমিই করেছ ; আজ তােমার নেশা কেটে গেছে বলে তুমি আমায় বিদায় দেবে ? অগ্নি। বাসন্তিকা! আমি তােমার ওপর অবিচার করবাে না। আমার বিলাস গৃহে যে সম্পদ আছে, সবশুদ্ধ আমি তা তােমাকে দান করলাম । যে বৃত্তি আমি তােমাকে দিয়েছি, সে বৃত্তি আজীবন দোব। তােমার যে অপকার করেছি, তার জন্য এই মূল্য নিয়ে আজ তুমি আমায় মুক্তি দাও। বাসন্তী। কেন? আজ নূতন প্রেয়সী জুটেছে বলে ? গণিকার প্রেমের আশা মিটে গেছে, সখার গৃহে স্বৈরিণীর প্রেম নিয়ে খেলা করতে সাধ হয়ছে ? সুদত্তা কি আমার চেয়ে সুন্দরী ? অগ্নি। চুপ কর পাপীয়সী! তোর মুখে সুদত্তার নাম বাসন্তী। যােগ্য নয়। তা হবে।কিন্তু তােমারও সে যােগ্য নয়। অগ্নিবর্ণ, বাসন্তিকা তােমার ঘরের স্ত্রী নয় যে, সব অত্যাচার শুধু মাথা পেতে নেবে। আমি কালসাপিনী, দংশন করতে জানি। আমাকে যদি ত্যাগ কর তবে সুদত্তাকে হারাবে। এখান থেকে যাব আমি তার কাছে, আমার সব কথা তার কাছে আমি বলে দেব। কি বঞ্চক তুমি, সে কথা তার কাছে প্রকাশ করবাে। ভেবেছ কি তার পরও সে তােমায় আলিঙ্গন করতে ছুটে আসবে? অসম্ভব-শতমুখী দিয়ে সে তােমার সম্ভাষণ করবে। তা যদি না হয়, যদি সে মুগ্ধা আমারই মত আত্মবিশ্বতা হয়, তবে বিষ দিয়ে তার প্রাণ বিনাশ করবাে তুমি আমার,আমি তােমায় সহজে ছাড়বে না। চল্লাম। [ স্থানােদ্যোগ। [ ৯১ ঋষির মেয়ে তৃতীয় অঙ্ক ] [ চতুর্থ দৃশ্য • অগ্নি। থাম থাম বাসন্তিকা ! কি ভীষণ তুমি, যা ভাবছো সব মিথ্যা, সুদত্তা আমার প্রণয়িনী এ অসত্য কথা তােমায় কে বল্লে ? বাসন্তী। কে বলবে? এ রাজ্যে চারুদত্ত ছাড়া এ কাহিনী কে না জানে আজ? আর চারুদত্তও জানবে-সে জন্য চিন্তা কোর না। অগ্নি। কি সর্বনাশ! এ যে ভীষণ অসত্য বাসন্তিকা ! দয়া কর তুমি, রক্ষা কর আমাকে। আমার যথাস্বর্বস্ব তােমাকে দিচ্ছি, তুমি আমায় এ বিপদ থেকে মুক্তি দাও। বাসন্তী। ধনের লােভ দেখাচ্ছ আমায় অগ্নিবর্ণ ? আমি কি ধনের লােভে কুবের মত স্বামী ছেড়ে এসেছিলাম? আজ তুমি তুচ্ছ ধনের লােভ দেখাচ্ছ ? কেন বলবে না তুমি? আমি আজ তুচ্ছ গণিকা বই তাে নই। [ নােদন ] অগ্নি । কেঁদ না বাসন্তিকা,তুমি কেঁদ না, বুঝতে পারলাম বাসন্তিকা, ধর্মের পথ যত সহজ সরল মনে হয়েছিল, তত সহজ সে নয়। পাপের হাতে একবার ধরা দিলে অষ্টবন্ধন দিয়ে সে মানুষকে জড়িয়ে ধরে তার হাত থেকে মুক্ত হওয়া সহজ নয়। [ সীধুপান ] বাসন্তিকা, শান্ত হও, অধীর হয়াে না একবার আমার কথা ভাব অপরাধী আমি, হীন আমি, কিন্তু ভেবে দেখ বাসন্তী। আমি ভেবে দেখবাে কি অগ্নিবর্ণ আমার ভাবনা চিন্তায় তুমি কোন পথ রেখেছ ? আমার কথা তুমি কোন দিন ভেবেছ ? [ বিহ্বল হইয়া কঁদিতে লাগিল ] অগ্নি। [ সীধু পান ] বাসন্তী, বাসন্তী কেঁদ না। আমার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে, তােমার এ দশা দেখে-শান্ত হও। থাম—তােমার এত ব্যথা আমি ৯২ ]

ঋষিব মেয়ে
[ পঞ্চম দৃশ্য
তৃতীয় অঙ্ক ]
সইতে পারি না। সুদত্তা, পারলাম না মানুষ হতে! অন্তরের দেবতা
আমার, তুমি ক্ষমা কোরাে। চল বাসন্তিকা। কেঁদো না, চল তােমার
কুঞ্জে চল।
[ উভয়ের বামদিক দিয়া প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য
চারুদত্তের অগ্ন্যাগার
[ সুদত্তা ব্যস্ত হইয়া চারুদত্তের প্রতীক্ষা করিতেছে, ও বারবার দ্বারের কাছে ছুটিয়া
যাইতেছে। শেষে চারুদত্ত বামদিকের দ্বার পথে প্রবেশ করিল। ]
সুদত্তা। এত দেরী করলে তুমি? একেবারে প্রভাত হয়ে গেছে।
চল, আর বিলম্ব করাে না, আমি সব জিনিসপত্র রথে তুলে দিয়েছি,
রথ প্রস্তুত, চল।
চারু। [ হাসিয়া ] কোথায় যাব সুদত্তা? যাবার আর প্রয়ােজন নাই।
সুদত্তা। প্রয়ােজন নেই। সে কি কথা?
চারু। রাজা আজ আমাকে অমাত্য পদে অভিষিক্ত করবেন।
সুদত্তা। [ স্বগতঃ ] কি সর্বনাশ! যাওয়া হল না! তবে তো আজ
আমার মাথার ওপর মিথ্যার শত বজ ভেঙ্গে পড়বে। কি উপায়
করবাে আমি?
চারু। এ কি সুদত্তা ? এমন সুসংবাদ শুনেও তুমি আনন্দিত হচ্ছ
? তােমার মুখ ক্লিষ্ট, বিষন্ন হয়ে উঠছে কেন প্রিয়ে ?
[ ৯৩

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ পঞ্চম দৃশ্য
সুদত্তা। আমার বড় ভয় হচ্ছে স্বামী ! এত সৌভাগ্য কি ভাল?
অমাত্যের পদে শত্রুর সৃষ্টি হবে মাত্র। কে কি সর্বনাশ করবে কে জানে ?
চারু। আশু আনন্দের হেতুতে সুখী না হয়ে একটা কাল্পনিক দুঃখ
সৃষ্টি করে দুঃখ পাচ্ছ কেন সুদত্তা? ছিঃ! চল, আজ তােমাকে সভায়
নিয়ে যাই, আমার সম্মান ও সৌভাগ্য দেখে পরিতৃপ্ত হবে তুমি।
সুদত্তা। শােন। অভিষেকের সময় তােমার ওই কপালের ঘা যদি
কেউ দেখে ফেলে ?
চারু। তা পারবে না। আমার চন্দনানুলেপনে সব চিহ্ন ঢেকে
যায়—আমি দর্পণে দেখেছি।
সুদত্তা। কিন্তু একজন তবু টের পেয়েছে তােমার ঐ চিহ্নের কথা।
চারু। কে ?
সুদত্তা। অগ্নিবর্ণ-সে আমায় বলছিল।
চারু। কি বলেছে সে ?
সুদত্তা। সে বলেছিল-[ স্বগতঃ ] সৰ্ব্বনাশ! কি বলবে আমি ?
কেন আমি মরতে এ কথা তুলতে গেলাম ? [ প্রকাশ্যে ] সে কথা আমি
তােমার কাছে বলতে পারবাে না।
চারু। যাক, অগ্নিবর্ণ আমার বন্ধু ।
[ বামের পথে চিত্রলেখার প্রবেশ ]
চিত্র। বন্ধু নয় সখা, সে তােমার পরম শত্রু। আমার সৌভাগ্য
যে তােমার দেখা পেলাম, সৌভাগ্য যে তােমার পত্নীও এখানে আছেন।
শােন সখা, তােমার কাছে আমি এক উপাখ্যান বলবাে।
৯৪ ]

তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ পঞ্চম দৃশ্য সুদত্তা। [ ব্যস্ত হইয়া ] প্রভু, চল, রাজসভায় যাই, সময় হয়েছে, সখির কথা পরে শুনবাে। চারু। এ কি ব্যাপার! আমি কিছুই বুঝিতে পারছি না। আমার প্রাণদাতা সখার পত্নী হঠাৎ এসে আমাকে এ কি বিষম কথা শােনালে? বল সখি, তােমার কি বার্তা আছে ? সুদত্তা। প্রভু তােমার পায় পড়ি, তুমি এই নারীর কথা শুনে —একে বিদায় করে দাও। যা বলবার আছে, তা আমিই তােমায় বলবাে। ওর কথা শুনাে না তুমি, তােমার পত্নীর অনুরােধ রক্ষা কর। চারু। আমি আরও বিমুঢ় হচ্ছি! এ কি সুদত্তা! তুমি এ কথায় এত বিচলিত হচ্ছ কেন? ব্যাপার কি ? চিত্র। ওঁর বিচলিত হবার হেতু আছে সখা, কেন না আমার কথার সঙ্গে ওঁর বিশেষ সংশ্রব আছে। আমার কথাটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তােমার এই পত্নী অবিশ্বাসিনী, আমার স্বামী তার জার। সুদত্তা। মিথ্যা কথা! অতি নির্মম ভিত্তিশূন্য মিথ্যা এ প্রভু! চারু। এ অতি অবিশ্বাস্য কথা সখি ! তুমি জান না, সুদত্তা আমার জন্য কি করেছে, তাই তােমার এমন ভ্রান্তি জমেছে। আমি নিজের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করতে পারি, কিন্তু সুদত্তা অবিশ্বাসিনী এ কথা বিশ্বাস করতে পারি না। চিত্র। তবে আমার চক্ষু কর্ণকে আমার অবিশ্বাস করতে হয়। বিশ্বাস করা না করা তােমার ইচ্ছা। আমি যা দেখেছি, তা আমি তােমাকে বলছি শােন। কাল সন্ধ্যাবেলায় আমি আমার স্বামীর সন্ধান করতে [ ৯৫

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ পঞ্চম দৃশ্য,
এসে তােমার অগ্ন্যাগারে তাকে সুদত্তার সঙ্গে নির্জনে প্রেম-সম্ভাষণ
করতে দেখেছি।
চারু। এ কি কথা! সুদত্তা, অগ্নিবর্ণ কাল সন্ধ্যায় এসেছিল ?
সুদত্তা। [ ভয়ানক কপিতে লাগিল ; তার মুখ শাদা হইয়া গেল,
শুষ্ক-ওষ্ঠাধর সে বারম্বার জিহ্বা দ্বারা ভিজাইতে লাগিল ] এসেছিল।
চারু। এসেছিল ? তুমি তা আমাকে বল নি ত !
সুদত্তা। না বলিনি ! না বলবার হেতু ছিল।
চারু। কি কথা হয়েছিল তােমার, তার সঙ্গে?
সুদত্তা। [ দৃঢ় কণ্ঠে ] আমি বলবাে না। আমার শুধু এই উত্তর,
যে, এই হীন হিংস্র নারী যে ইঙ্গিত করছে, সে মিথ্যা, নিদারুণ মিথ্যা।
চিত্র। কোনটা মিথ্যা লাে কুলটা ?
চারু। ক্ষান্ত হও সখি। ক্ষান্ত হও সুদত্তা। সখি যা বলছেন তা
মিথ্যা হতে পারে; কিন্তু তার শােধন তােমার হাতে। অগ্নিবর্ণের সঙ্গে
সত্য সত্য তােমার কি কথা হয়েছিল তা প্রকাশ করতে তুমি কুষ্ঠিত হলে
তাে সখির অভিযােগ নিস্তীর্ণ হয় না। কি কথা হয়েছিল বল। আমি
তােমার স্বামী, আমার সে কথা জানবার অধিকার আছে।
সুদত্তা। কিন্তু আমার বলবার অধিকার নাই—আমি বলবাে না।
চারু। হু। সখি, অগ্নিবর্ণ কোথায় ?
চিত্র। বিলাসগৃহে বাসন্তিকার আলিঙ্গনে বদ্ধ হয়ে সীধুপান করে
তিনি অচৈতন্য হয়ে আছেন।
সুদত্তা। মিথ্যা কথা ! অসম্ভব! সে আমার কাছে প্রতিশ্রুতি
দিয়েছে-
[ হঠাৎ থামিয়া গেল ]
৯৬]

তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ পঞ্চম দৃশ্য চারু। প্রতিশ্রুতি ? তােমার কাছে অগ্নিবর্ণ বসন্তিকার সম্বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ? কি প্রতিশ্রুতি ? গােপনে আমার অসাক্ষাতে তার সঙ্গে তুমি এই প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করেছ! সে তােমার কাছে শপথ করেছে! সুদত্তা, আমার বিশ্বাস বড় শিথিল হয়ে যাচ্ছে, সখি চিত্রলেখার কথা অবিশ্বাস করতে পারছি না। সুদত্তা। তবে আমাকে শাস্তি দাও। চারু। হু', শাস্তি। ( চিন্তা করিয়া একটা কথায় উত্তর দাও। সখি চিত্রলেখা যে অপরাধ তােমার ওপর আরােপ করছেন, তা তুমি স্বীকার কর না ? সুদত্তা। না—সে মিথ্যা অভিযােগ। চারু। তুমি নির্দোষ ? নিস্পাপ ? এই অগ্নিবর্ণ সম্বন্ধে তুমি কোনও পাপাচরণ করনি ? সুদত্তা। না করিনি, আমি নির্দোষ, নিস্পাপ। চারু। সুদত্তা! এ অবস্থায় আমি বিনা প্রমাণে তােমাকে শা দিতে পারি না। [ চিত্রলেখা বিরক্ত হইয়া প্রস্থান করিল ] তােমাকে আত্ম-শােধনের একটা সুযােগ দিতে আমি বাধ্য। তুমি দিব্য প্রমাণে সম্মত আছ। সুদত্তা। প্রমাণ দিতে হবে ? বেশ-দেব প্রমাণ। [ স্বগতঃ ] প্রমাণ দিতে হবে—আমার কথা আর তােমার কাছে যথেষ্ট নয় স্বামী ? [ অগ্নির দিকে চাহিয়া ] দেব বৈশ্বানর! তােমার মত আপন আমার কে আছে দেব! শৈশব অবধি আমি তােমার সেবা করেছি, আমার প্রাণ, মান, আজ তাই তােমারই হাতে সমর্পণ করে দিলাম;তােমার [ ។ [ পঞ্চম দৃশ্য। তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে সুদত্তার মান তুমিই রক্ষা কর। [ প্রকাশ্যে ] আমি অগ্নির দিব্য দ্বারা আত্মশােধন করবােকিন্তু এখন নয়। তুমি সভায় যাও, মন্ত্রি ও সকল প্রধান সভাসদকে নিমন্ত্রণ করে এখানে নিয়ে এসাে, সবার সম্মুখে আমি অগ্নি পরীক্ষা দিয়ে আত্মসােধন করবাে। [ দক্ষিণ দিক প্রস্থান। চারু। [ বসিয়া পড়িল ] (স্বগতঃ ) একি ঘূর্ণাবর্তে ফেলে দিলে আমায় দেব বৈশ্বানর? আমার আশার প্রাসাদ যে একেবারে ধূলাে হয়ে গেল। সুদত্তা অবিশ্বাসিনী ! বিশ্বাস হয় না। অবিশ্বাস তাে করতে পারি না। সুদত্তা দোষী ? তার সমস্ত ব্যবহার তার স্বেদসিক্ত ললাট, শুষ্ক ওষ্ঠাধর, কম্পিত দেহ, চিত্রলেখাকে দেখে তার ভাবান্তর—সব যে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। যদি তাই হয়, তবে দেব! শক্তি হবে কি আমার পাপিনীর শাস্তি দিতে ? ধৰ্ম্মকে রক্ষা করবার শক্তি হবে কি ? আমি যে তাকে—সে যে আমার আপনার জীবনের চেয়ে বড়। অপরাধিনী যদি সে হয়, তবু কি তাকে শাস্তি দিতে পারবে? যদি দিতে হয়, তবে বল দিও দেব! [ বাম দিকে প্রস্থান। [ দাসীগণ আসিয়া পুজার উপকরণ অগ্ন্যাগারে রাখিল এবং ইন্ধন দিয়া অগ্নি বড় করিয়া আলিল। এবং আন্তরণ আসনাদি সম্মুখে বিছাইল। পরে সুদত্ত ধীরে ধীরে অগ্নির সম্মুখে আসিয়া অগ্নি প্রদক্ষিণ করিয়া প্রণাম করিয়া প্রস্থান করিল ) ৯৮] তৃতীয় অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ পঞ্চম দৃশ্য [ বামদিক হইতে চারুদত্ত, রাজা, মন্ত্রী, পুরােহিত, সভাসদগণ ক্রমান্বয়ে প্রবেশ করিয়া আসন গ্রহণ করিলেন। দক্ষিণদিক হইতে চিত্রলেখা ও দাসীগণ প্রবেশ করিয়া চারুদন্তের পশ্চাতে দাড়াইল ] পুরাে। চারুদত্ত, এ কুণ্ডের কি প্রয়ােজন? অগ্নির দ্বারা দিব্যকরণে অগ্নিকুণ্ডের তাে প্রয়ােজন নাই। [ জবাকুসুমের মাল্যে আদ্যোপান্ত বিভূষিতা, চন্দনলিপ্ত রক্তাম্বরা সুদত্তা এক-চন্দনাদি উপকরণ হস্তে প্রবেশ করিল | সুদত্তা। প্রয়ােজন আছে দেব। ইনি আমাদের গৃহাগ্নি নিত্যসেবার দ্বারা আমি এর পূজা করি, ইনিই আজ আমার সতীত্ব পরীক্ষা করবেন। ধৰ্ম্ম যদি আমায় রক্ষা করেন, তবে ইনিই তার পরিচয় দেবেন; যদি না রক্ষা করেন, তবে এরই কোলে আশ্রয় লাভ করবে। (চারুদত্তকে প্রণাম) অন্তর্যামী দেবতা! পূজা গ্রহণ কর দেব। এই লও—অর্ঘ্য, এই লও মাল্য-চন্দন। ( সমস্ত অগ্নিতে অৰ্পণ করিয়া ] মন্ত্রিবর, সভাসদগণ, আমি প্রস্তুত। মন্ত্রী। চারুদত্ত, দেবীর প্রতি তােমার কি অভিযােগ ? চারু। আমার অভিযােগ নয় দেব, অভিযােগ করছেন চিত্রলেখা । এস সখি, তােমার যা বলবার আছে বল। চিত্র। [ অগ্রসর হইয়া ] মন্ত্রিবর! আমি নিবেদন করি, সুদত্ত অসতী, ব্যভিচারিণী, আমার স্বামী অগ্নিবর্ণের জারিণী। মন্ত্রী। সাবধান হয়ে কথা কও দেবী! তুমি যে অভিযােগ করছে, [ ৯৯

ঋষির মেয়ে
তৃতীয় অঙ্ক ]
[ পঞ্চম দৃশ্য
সে প্রতিলােম ব্যাভিচার; এর বিরুদ্ধে প্রমাণিত হলে, তার দণ্ড বড়
ভয়ানক। স্বচক্ষে তুমি এঁর ব্যভিচার দেখেছ?
চিত্র। আমি স্বকর্ণে শুনেছি, আমার স্বামী একে প্রেমের কথা
বলেছেন, স্বচক্ষে দেখেছি, সুদত্তা স্মিতমুখে নিজের চরণতল হতে আমার
স্বামীকে এই অগ্নাগারে হাতে ধরে তুলেছে।
মন্ত্রী। কিন্তু তুমি কি বলতে চাও বসে! যে অগ্নিবর্ণের সঙ্গে
সুদত্তার ব্যভিচার ঘটেছে।
চিত্র। আমি এ কথা বিশ্বাস করি।
পুরাে। তবে এ অভিযােগ গুরুতর। সুত্তা আপনাকে শুদ্ধ করতে
পারলে গুরুদণ্ডভাগিনী হবেন।
চিত্র। অগ্নিবর্ণও হবেন।
সুদত্তা। চুপ কর হিংস্র-নারী। স্বামীহিংসায় তােমার আনন্দ একটু
দমন কর। দেব, সমস্ত দেবগণ আমার সাক্ষী—আমি সতী, সাধ্বী।
অগ্নিবর্ণ বা অন্য কোনও পুরুষ সম্পর্কে আমি কোনও অপরাধ করিনি।
আমি সকল দেবের অভিজ্ঞান, এই অগ্নিদেবকে এ কথা প্রমাণ করতে
আহ্বান করছি। দেব, তােমার হাতে আমি আত্মসমর্পণ করছি-তুমি
আমাকে শুদ্ধ কর। [ অগ্নি প্রবেশের চেষ্টা ]
পুরাে। [ সুদত্তাকে নিবৃত্ত করিয়া ] নিবৃত্ত হও সাহসিনী, অগ্নি প্রবেশ
দ্বারা পরীক্ষা শান্ত্র-বিগর্হিত। শােধন শাস্ত্রোক্ত প্রক্রিয়ায় করতে হবে।
প্রতিহারি, অগ্নি পরীক্ষার উপাদান নিয়ে এসাে।
সুদত্তা। দেব! জানকী দেবী অগ্নিপ্রবেশ করে আপনাকে শুদ্ধ
করেছিলেন।
১০০]

তৃতীয় অঙ্ক ]
।
ঋষির মেয়ে
[ পঞ্চম দৃশ্য
পুরাে। মহামানব ও দেবযােনির সকল কার্য্যের অনুকরণ করা হীনবল
মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
[ পুরােহিত সুদত্তার দুই হাতের উপর সাতটী
দুই হাতের উপর সাতটী অশ্বথ পাতা সূতা দিয়া
বাঁধিয়া তার পর হাতের উপর কতকগুলি ঘর্ষিত যব, শমীপত্র, দূর্বা ও ফুল সাজাইয়া
দিলেন। প্রতিহারী অগ্নিময় লৌহপিণ্ড আনিল ]
পুরাে বল,
ত্বমগ্নে সৰ্ব্বভূতানাং অন্তরসি পাবক।
সাক্ষীবৎ পুণ্যপাপেভ্যো জুহি সত্যংকবে মম।
[ সুদত্তা সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি করিল। পুরােহিত তাহার হস্তে লৌহপিণ্ড দিয়া তিনবার
তাহাকে মণ্ডল প্রদক্ষিণ করাইয়া লৌহপিণ্ড আগুনে ফেলিয়া দিলেন। তার পর
সুদত্তাকে সম্মুখে আনিয়া তিনি নিজে ব্যস্তভাবে সুদত্তার হস্তের বন্ধন মােচন করিতে
লাগিলেন। সকলে ঝুকিয়া দেখিতে অগ্রসর হইল। চারদত্ত একপাশে নীরবে বুকে
হাত দিয়া কম্পিত দেহে দাঁড়াইয়া রহিল। পুরােহিত, মন্ত্রী ও সভাসদগণ
এক সঙ্গে সােল্লাসে চীৎকার করিয়া উঠিলেন।
অক্ষত! নির্দোষ! জয় অগ্নিদেব ।
[ চারুদত্তের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। চিত্রলেখা বেগে প্রস্থান
করিল। চারুদত্ত স্নিগ্ধদৃষ্টিতে সুদত্তার দিকে চাহিল ]
মন্ত্রী। (গাত্রোখান করিয়া) সুচিস্মিতে, তুমি তােমার ধৰ্ম্মবলে !
দেবগণকে স্বর্গ হতে নামিয়ে এনেছ, আমরা দেখে ধন্থ, চরিতার্থ
হয়েছি। তােমার পুণ্যকাহিনী রাজ্যে অক্ষয় হয়ে থাকবে।
আসি চারুদত্ত!
[ বাম দিক দিয়া প্রস্থান।
[১০১

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ পঞ্চম দৃশ্য
[ চারুদত্ত ও সুদত্তা ব্যতীত সকলের অনুগমন। সুদত্তা ক্লান্ত হইয়া বসিয়া পড়িল ]
চারু। সুদত্তা, দেবী পুণ্যবতী ! ধন্য করেছ তুমি আমায় আজ,
কি আনন্দ আজ আমার তােমার গৌররে, তা তােমায় কি করে
জানাব। এস প্রিয়ে! আমার বক্ষে—এস।
[ চারুদত্ত বাহু বিস্তার করিয়া অগ্রসর হইল। সুদত্ত৷ উঠিয়া পিছাইয়া গেল ]
সুদত্তা। দাড়াও স্বামী, আমি তােমার ধর্মপত্নী, আমি গৃহপত্নী,
দাসী নই! তােমায় আমায় সম্বন্ধ ধর্মের সম্বন্ধ। অচলা শ্রদ্ধা, অটল
বিশ্বাসে এর প্রতিষ্ঠা। সে শ্রদ্ধা তােমার গেছে, সে বিশ্বাস আর নাই।
আর নয়। আপস্তম্বের কন্যা আমি—আর তােমার আলিঙ্গন দিয়ে
আমায় লাঞ্ছিত করাে না। স্বামী তুমি, নমস্য আমার, কিন্তু ওই
ক্লেদময় আলিঙ্গন—আর নয়।
[ বাম দিক দিয়া এস্থান।
১০২]

ষই দৃশ্য
অগ্নিবর্ণের বিলাসগৃহ
[ পাননান্মত্ত অগ্নিবর্ণ ও বাসন্তিকা আসীন। দাসীরা পরিচর্যা ও নৃত্যগীত করিতেছে।
[ সখীগণের গীত ]
( আজি) দাও ঢালি চিত সুখ তরঙ্গে,
খেলে চঞ্চল মলয় অঙ্গে,
হেসে গলে যাই ললিত ভঙ্গে,
ফাগুন আগুনে দুজনে।
ফুল হিল্লোলে হাসিছে চন্দ্র,
ভুবন জীবন আজি অতন্দ্র,
জাগে অন্তরে মধুর মন্ত্র,
আকুল কোকিল কুজনে।
(একি। বাসনা ব্যাকুল রঙীন দৃঙ্গ;
প্রেম উল্লাসে উতলা বিশ্ব,
মিলন মাঙিয়া নিখিল নিঃস্ব,
প্রণয় দেবতা পূজনে।
বাসন্তিকা। এইবার আমি গাইব।
আজি ললিত মধুর রাতে,
মধুর মলয় বাতে
শিহরিয়া উঠে হিয়া মাঝ
তাল ভােলা সারা ধরা, প্রেমে আজ মাতােয়ারা
মিটে গেছে সব তার কাজ।
[১০৩

তৃতীয় অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ ষষ্ঠ দৃশ্য,
তাই হিয়া ভর সুধা লুটে,
এনেছি অধর পুটে
লহ বধূ লহ লুটে আজ
পরাণে পরাণ বঁধু,
মাখামাখি হােক শুধু,
টুটে যাক লাজে সব সাজ।
[ বামদিক হইতে বেগে সুদত্তার প্রবেশ ]
সুদ। অগ্নিবর্ণ—হা অদৃষ্ট! এই দশা তােমার! আমি যে তােমার
আশ্রয়ে পিত্রালয়ে যাব বলে এসেছি।
অগ্নি। সুদত্তা! তুমি এসেছ? কেন এলে ?—এই আমি!
সুদ। না, এ তুমি নও। তুমি বিপন্নের সহায়। আর্ত নারী
তােমার সাহায্য ভিক্ষা করছে বীর, ওঠো, তােমার মত্ততা পরিহার কর।
অগ্নি। আর্ত! কে আৰ্ত্ত সুদত্তা ? আমার চেয়ে আর্ন্ত কে! আমি
বড় দুঃখী সুদত্ত।
সুদ। ভাই, আমি আর্ত! আশ্রয়হীনা !–ঘাের বিপদ আমার ।
বিপদসঙ্কুল-পথে তােমার আশ্রয় ভিক্ষা করছি। ওঠ—বিপদে আমায়
রক্ষা কর-আয় দাও।
অগ্নি। তােমার বিপদ! কি বিপদ সুদত্তা ? কি করতে হবে।
প্রাণ দেব? (দাড়াইয়া) কোন চিন্তা নেই—আমায় ধরে নিয়ে চল।
কোন চিন্তা নেই—তুমি যেখানে নিয়ে যাবে যাব, চল—ধর আমায়
( সুদত্তা ধরিতে গেল)
বাস। ( অগ্রসর হইয়া) হতভাগী ! আমার বাড়ী বয়ে এসেছ ঝগড়া
করতে, আমার জিনিষ কেড়ে নেবে, এত বড় দুবৃত্তা তুমি।
[ সুদত্তাকে ধাক্কা দিতে গেল, সুদত্তা সরিয়া গেল, সেই ধাক্কায় অগ্নিবর্ণ পড়িয়া গেল ]
১০৪]

ঋষির মেয়ে তৃতীয় অঙ্ক ] [ ষষ্ঠ দৃশ্য সুদত্তা। অগ্নিবর্ণ ! কীটের তুল্য এই হীনা নারী তােমাকে পদাঘাত করছে, আর বীরশ্রেষ্ঠ তুমি ধুলায় লুটিয়ে পড়েছ। এ অপমান কি তােমার অন্তরে পৌঁছায় না? ভাই, সময় নেই আমার, চল্লাম, যদি এখানকার কথা তােমার মনে থাকে, জ্ঞান হলে স্মরণ করে সখা, যে, আমি শেষ অনুরােধ করে যাচ্ছি, তােমার শৌর্যের আর অপমান করাে না। বাস। এখনও গেলিনি পাপিষ্ঠা ! এই, তােরা একে লাথি মেরে বিদায় করতে। [ দাসীরা সুদত্তাকে ধরিয়া বামদিকে ঠেলিয়া বাহির করিয়া দিল ] অগ্নি। (উঠিয়া তীব্রকণ্ঠে) বাসন্তিকা•• দূর হ! পাপিয়সী! এত বড় স্পর্ধা তাের! শােধনক! এখনই এই নারী ও তার দাসীদের এই প্রমােগৃহ থেকে দূর করে দাও, আর ওর মুখ তপ্ত লৌহ দিয়ে দগ্ধ করে দাও—সুদত্তা সুদত্তা [ বেগে প্রস্থান। [১০৫

চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম
আপস্তম্বের গৃহ-সংলগ্ন উদ্যান
[ বামদিক দিয়া চারণীর প্রবেশ ]
চাণী। এ বাড়ীটায় যেন সেই দিন থেকে আগুন লেগে গেছে। কি
কুক্ষণে মেয়েটা আমাকে দিয়ে দূতীগিরী করাতে গিয়েছিল। তার পর
তারা গেল; পিছনে পিছনে বুড়াে-বুড়ী ছুটলাে। শুনি, তারা রাজ্যে
রাজ্যে ঘুরে মেয়েটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আহা, বুড়ো-বুড়ী যখ গেল,
তাদের মুখ দেখে আমার যেন বুক ফেটে গেল। মনে হল, কেন আমি
মেয়েটার কথা শুনতে গেলাম। তা কি করবাে বল, এই হল আমার
ব্যব। ও কি, আজ যে এখানে মানুষের সাড়া পাচ্ছি। তবে বুঝি বুড়ো
ফিরেছে। দেখি, একটা গান শুনিয়ে, কিছু মিলে কি না।
গান।
সন্স নামিছে জীবনের তটে
নয়নের সাথে হ'তেহে ক্ষীণ
বাহ ঢলে পড়ে টলি চম
আর আহিল হীন।
১৬]

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ প্রথম দৃশ্য
হে দেব অরুণ অন্তরে আজ
নূতন তােমার প্রদীপ জ্বালাে,
হৃদয়ের কোণে লুকান আধার
ভাসাইয়া যাক নূতন আলো;
অাঁধার পরশে ম্লান হয়ে যথা
রজনী লুটিয়া জীবন হীন
তােমার অরুণ কর পশিয়া
উষা হ'য়ে জাগে চির নবীন।
ওই যে বুড়ো বুড়ী আসছে। না—ওদের মুখ দেখে সুবিধে বােধ হচ্ছে
। কাজ নেই বাপু! কে জানে, আমাকে ভস্মফস্ম যদি ক'রে
দেয়—পালাই।
[ বামে এহান।
[ আপ ও শাশ্বতী দক্ষিণ দিক দিয়া প্রবেশ করিলেন। আপস্ত
এক স্থানে মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। শাশ্বতী অপর
এক স্থানে বসিয়া কাঁদিতে লাগিলেন।
তুই মা?
শাশ্বতী। মাগাে, আবার তাে সেই ঘরে ফিরে এলাম। কোথায়
এক দিনের তরে তত ভাবিনি মা, যে তােকে না নিয়ে আবার
এই ঘরে ফিরে আসবাে। সুদামা আমার ।
আপস্তম্ভ। শাশ্বতী, আর বৃথা শােক করে কি করবে? তাকে
ততা আর ফিরে পাবে না। পাপের শান্তি আমাদের তাে ভােগ করতে
হবে। কিন্তু কিন্তু ভাবছি শাশ্বতী, একটা মিথ্যা কথাই কি এত বড়
চিরজীবনের সত্য সাধনা তার কাছে কিছুই না? (কিছুক্ষণ পরে)
[১০

[ প্রথম দৃ
চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
দেশ দেশান্তর ঘুরে এলাম, কোথাও তাদের সন্ধানের ক্ষীণ সূত্রটুকুও
খুঁজে পেলাম না।
[ বামদিক দিয়া সুন্দর প্রবেশ ]
সুদত্তা। মা-
[ শাশ্বতী ও আপস্তম্ব দুইজনে চমকিত হইয়া উঠিয়া দাড়াইলেন।
সুদত্ত ছুটিয়া গিয়া পিতামাতাকে প্রণাম করিয়া মায়ের
গলা জড়াইয়া ধরিল ]
শাশ্বতী। বেঁচে আছিস মা আমার ? আমার কোলে ফিরে
এসেছিস? আমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছি। প্রভু এ সত্য? স্বপ্ন
দেখছিনা ত?
সুদত্তা। মা, মা। (নােদন)
আপস্তম্ব। স্বপ্ন নয় শাশ্বতী, সত্য ! দেবরাজ মুখ তুলে চেয়েছেন
দেবী, আমার প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণ হয়েছে। সুদত্তা, আমার বুকে একবার
আয় মা।
[ সুদত্তা আণস্তষের কণ্ঠলগ্ন হইল )
শাশ্বতী। হ সুদত্তা, তুই এলি, চারুদত্ত কই ?
মুত্তা। তিনি আসেন নি।
আপ। কেন? কেন মা? সে কি আমার উপর রাগ ভুলতে
পারে নি ? না—তা কেমন করে হবে, তা হলে সে তােকে আসতে
দেবে কেন?
শাশ্বতী। তুই বা কি বলে তাকে ছেড়ে এলি?
(১০৮

ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
চতুর্থ অঙ্ক ]
সত্তা। আমি কি বলবব মা আমি তােমাদের—আমি মা বড়
অপমান হয়েছি—আমি তাকে পরিত্যাগ করে এসেছি।
শাশ্বতী। অ্য, সে কি! এ আবার কি নূতন সর্বনাশ করেছিস্ তুই ?
আপস্তম্ব। (অষ্টভাবে) সুদত্তা! স্বামিত্যাগিনী নারীর
শাশ্বতী। চুপ কর তুমি, পুরুষ তুমি, এসব কথা বুঝবে না। চল মা,
ঘরে চল, তাের সব কথা শুনি। বুঝেছি -আমাদের আবার যাত্রার
আয়ােজন করতে হবে। অভিমানিনী কন্যা আমার, অভিমানকে
মেহের চেয়ে বড় করিস না মা।
সুদত্তা। তােমরা কিছু বুঝতে পারছে না মা, বড় অপমান
শাশ্বতী। না বলতেই সব বুঝেছি মা-আমারও এক দিন তাের বয়স
ছিল। যাক্, চ, তাের কথা শুনিগে।
[ সকলের স্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য
অগ্নিবর্ণের অন্তঃপুর
ঋতুপর্ণ, সত্যসেন ও চিত্রলেখা
চিত্র। ভাই, তােমরা থাকতে এত বড় অপমান স’য়েও আমি বেঁচে
থাকবে? এমনি কি চিরজীবন লাঞ্ছিত, অপমানিত হয়ে কাটাব?
ঋতু। তাই তাে বােন্। তুমি কেন এর মধ্যে যেতে গেলে বল ?
একবার আমার কাছে জিজ্ঞাসা করলে না। আজকাল রাজসভায়
[১০৯

[ দ্বিতীয় দৃশ্য চতুর্থ অঙ্ক ] খরি মেয়ে চাদত্তের প্রতিপত্তির অন্ত নেই। তার হুকুমে রাজ ওঠেন বসেন। আর তুমি গিয়ে সেই চাদত্তের স্ত্রীর নামে অভিযােগ করে বসলে? সত্য। আমিও তাই ভাবছি। ওই যে দিব্যটা করলে, ওটা একটা যােগ-সাজসের ব্যাপার। পুরােহিত মশায় ইচ্ছা করলেই তো দিব্য ফাসিয়ে দিতে পারেন। ধর না কেন—লােহাটা যদি বেশ রীতিমত তাতান না হয়। চিত্র। নিশ্চয় তাই। নইলে আমি যা নিজ চক্ষে দেখেছি, সেটা দৈব প্রমাণে অসত্য হয়ে গেল। এ হতেই পারে না। কিন্তু সত্য হােক মিথ্যা হােক, ওই বিদেশী মেয়েটা যে আমার স্বামীর অঙ্গে আমার প্রসাদে পুষ্ট হয়ে উঠেছে। সেই নগণ্য কীটাণুকীটের কাছে এক-সভা লােকের সামনে এমনি অপমান হয়ে আমার এক দণ্ডও বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তােমরা থাকতে এ অপমানের প্রতিকার হবে না ভাই ? ঋতু। আচ্ছা, ওর ঘর জ্বালিয়ে দিলে হয় না? সত্য। তা নয়, ওই সুদত্তাটাকে আজ রাত্রে চুরি করে তার সর্বনাশ করা যাক। চিত্র। তাতে কি হবে? তাতে হবে না। ওই চারুদত্তকে রাজসভা থেকে নির্বাসিত করে ও মুত্তাকে যদি বেঁধে আমার কাছে দাসী করে উপস্থিত করতে পার, তবে আমার তৃপ্তি হবে। ঋতু। সেইটাই তাে শক্ত কাজ। চাৰুদত্তের প্রভাব আজকাল মন্ত্রীর চেয়ে বেশী না হােক কম নয়। ওঁকে ঘাটাতে গেলে নিজেদেরই নির্বাসন হবার সম্ভাবনা। চিত্র। ওর নামে ভয়ানক একটা অভিযােগ কর। যােগাযােগ করে ১১] চতুর্থ অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য এমন একটা কিছু কর, যাতে রাজা ওর রক্ত দর্শন না করে যেন না ছাড়েন। ভেবে চিন্তে একটা কিছু স্থির কর। না হলে ভাই, বােকে আর দেখতে পাবে না। [ দূরে অগ্নিবর্ণকে দেখিয়া ] ও কি ! স্বামী এত প্রত্যুষে বাড়ী ফিরে এসেছে। আমি যে বাসন্তিকার দাসীদের উৎকোচে বশীভূত করে দিন রাত ওঁকে সীধু পানে বিহ্বল করে বিলাস-গৃহে আটকে রাখবার ব্যবস্থা করেছিলাম। ও কি করে বাসস্তিকার হাত ছাড়িয়ে চলে এল? ও উপস্থিত থাকলে কি আমি সুদত্তাকে অভিযুক্ত করতেই পারতাম? চল, আমরা এখান থেকে পালাই। তােমাদের দেখতে পেলে অনর্থ করবে। পালাও, পালাও! শীগগিরি! চল, তােমাদের লুকিয়ে রাখিগে। ( সকলের বাম দিকে প্রস্থান। [ দক্ষিণ দিক হইতে অগ্নিবর্ণের প্রবেশ ] অগ্নি। কোথায় গেল সে রথ ! সারা রাত্রি, সারা দিন, নানা পথে খুজে এলাম, কোনও সন্ধান পেলাম না। কোথায় গেল এরা ? কেন গেল? সুদত্তা, খুজে কি পাব না তােমায় ? কোথায় যাবে তুমি? ভারতের প্রান্ত হতে প্রান্ত পর্যন্ত আমি তােমার অন্বেষণ করবে। দেবগণ যদি তােমার প্রাণ রক্ষা করে থাকেন তবে তােমাকে আমি খুজে পাবই আমি তােমাকে দেখাব যে, তােমার আদেশ আমি ভুলি নি-আমি মানুষ হয়েছি। [১১১

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
[ দক্ষিণ দিক দিয়া দুইটি ক্ষত্রিয় যুবকের প্রবেশ ]
১ম যু। দেব, বন্ধু প্রদ্যুম্নের মুখে আহ্বান শুনে আমরা এসেছি।
আমরা আপনার অনুচর হতে পারলে কৃতার্থ হব।
অগ্নি। জান তােমাদের কোথায় যেতে হবে? কি করতে হবে ?
২র যু। জানি যে, তার স্থিরতা নেই—কেবল জীবন পণ করে
সকল বিপদের ভিতর দিয়ে আপনার অনুসরণ করতে হবে। প্রয়ােজন
হলে শন্ত্রপাণি হয়ে পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত যেতে হবে।
অগ্নি। তােমরা তাতে প্রস্তুত ?
১ম যু। আজ্ঞে ।
অগ্নি। ভেবে দেখাে ভাই। আমি তােমাদের কোনও পুরস্কার দিতে
পারব কি না জানি না। হয়তাে বিপদ বরণ, চাই কি মৃত্যুই, তােমাদের
হবে একমাত্র পুরস্কার! এক পুরস্কার এই হবে যে, ক্ষাত্রধর্ম পালনের
তােমরা প্রচুর অবসর পাবে। বীরত্ব প্রতিষ্ঠিত করে বীরবাঞ্ছিত গৌরব
লাভই যদি তােমাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়, তবে তােমরা এসাে-আর
কিছুই আমি তােমাদের দিতে পারবাে না।
উভয় যু। আর কিছুই আমরা চাই না।
অগ্নি । বেশ, তােমরা প্রদ্যুম্নের সঙ্গে বনপ্রান্তে আমার প্রতীক্ষা
[ যুবকদ্বয় বামদিকে প্রস্থান করিল।
অগ্নি। আর এক দিন এ রাজ্যে তােমার অনুসন্ধান করবে—তার
পর-এ কি?-
১১২]

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে :-19r.[ দ্বিতীয়
অগ্নি। সখা! তুমি এখানে ?
একসঙ্গে বলিল)
চারু। সখা, সুদত্তা কোথায় ?
অগ্নি। সুদত্তা কোথায় জান না? কাল সন্ধ্যায় সে রথে করে নগর
ত্যাগ করে গেছে। আমি বায়ু বেগে ঘােড় চালিয়েও সারা রাত্রি
কোথাও তার সন্ধান পাইনি। কিন্তু তুমি সঙ্গে যাওনি? এ কি রহস্য
বন্ধু ? কোথা গেছে সে ?
চারু। আমিও সারা রাত্রি ধরে তাকে খুঁজে বেড়িয়েছি সখা,
সন্ধান পাইনি।
অগ্নি। এ যে একটা অসমাধেয় প্রহেলিকা!
কি হয়েছে ?
আমাকে বলতে পার কিছু।
চারু। পারি। হয়েছিল আমার মতিভ্রম। তােমার স্ত্রী অভিযােগ
করেছিলেন যে তুমি সুদত্তার জার। তিনি স্বচক্ষে তােমার প্রণয়
লীলা দেখেছেন
আমার স্ত্রী !-চিত্রলেখা!—পাপীয়সী! হু! তা তুমি
কি করলে?
চারু। আমি প্রথমে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করলাম। তার পর তিনি
বিশেষ জোর করে বলাতে, আমি সুদত্তাকে জিজ্ঞাসা করলাম।
স্বীকার করলে যে তুমি পূৰ্বদিন সন্ধ্যায় গিয়েছিলে; কিন্তু কি কথা
হয়েছিল তােমার সঙ্গে, সে কথা কিছুতেই বলতে স্বীকার হল না। তার
পর সে হঠাৎ কথায় কথায় বলে ফেললে যে, তুমি তার কাছে বাসন্তিকা
সম্বন্ধে কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছ। তার সেই কথায় আর তােমার বিষয় সব
কথা গােপন করবার চেষ্টায় আমার দারুণ সন্দেহ হল।
[১১৩

[ দ্বিতীয় দৃশ্য, চতুর্থ অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে অগ্নি। সন্দেহ হল? সুদত্তাকে সন্দেহ হ’ল ? মুখ! সে কি বলেনি যে সে নির্দোষ ? চারু। বলেছিল সে। অগ্নি। বলেছিল! তবু সন্দেহ ? হায় মুঢ়! এ কথা তুমি ভাবলে যে, সুদত্তা কখনও মিথ্যা কথা বলে না! এ কথা ভাবলে না যে, তা না হলে সে অনায়াসে একটা মিথ্যা উপন্যাস রচনা করে বলে তােমাকে ঠকাতে পারত! চারু। এ কথা আমার তখন মনে হয় নাই। পরে কাল সারা রাত্রি এই কথা ভেবে, নিজকে তিরস্কার করেছি—হাঁতখন আমি বল্লাম, তােমাকে দিব্য দ্বারা শশাধন করতে হবে। সে সম্মত হল—দিব্যের আয়ােজন হল। সুদত্তা সবার সমক্ষে অগ্নিপরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হল। কিন্তু আমি যে তাকে একমুহূর্তও সন্দেহ করেছিলাম, সেই অভিমানে সে আমাকে ছেড়ে গেছে। অগ্নি! মুখ! মূখ! মুখ তুমি! দেবীকে তুমি এমন করে অপমান করেছ! তুমি জান না চারুদত্ত, কত বড় সতী, কত বড় দেবী সে ? স্বামীর ঘরে থেকে, স্বামীব্রতা হয়ে যে কোনও তুচ্ছ নারী থাকতে পারে। তেমন সতী সুদত্তা নয়। সে সতী, আপন সতীত্বের গৌরবে পাপীকে ধার্মিক করতে পারে, অধমকে মহৎ করতে পারে—সে কথা জানবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার! মূর্থ হতভাগ্য স্বামী, এমন স্ত্রীর মর্যাদা বুঝলে না। সেই সাধ্বীকে তুমি অগ্নিপরীক্ষায় আহ্বান করলে কি সাহসে?—কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। ১১৪ ] চতুর্থ অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ দ্বিতীয় দৃশ্য চারু। আমার অপরাধ কি সখা ! ধর্মের যা আদেশ, 'অগ্নিদেব জানেন, তার থেকে আমি এক পদ সরে যাইনি। অগ্নি। ধৰ্ম্মের আদেশ! পাপমতি তােমরা! ধর্মের জীবন্ত মূর্তি কখনও অন্তরে তােমাদের জেগে ওঠেনি। তাই পরের মুখের ধার-করা বুলি নিয়ে, শাস্ত্রের বিধি-নিষেধের দোহাই দিয়ে ধার্মিক হতে চাও! আর তুমি! ধর্মের স্পর্ধায় তুমি কর সুদত্তার অপমান! তুমি তাে জান, তােমার ললাটে ঐ চোর-দণ্ডের অক্ষয় ছাপ রয়েছে! চন্দন দিয়ে কপাল ঢেকে তুমি ওকে আমার চোখের কাছে লুকোতে পারনি। জানি ও মিথ্যা—সুদত্তা বলেছে তুমি চোর নও। কিন্তু ভণ্ড, মিথ্যাচারী কি নও চারুদত্ত ? ওই দণ্ডের কথা গােপন করে, ওর ছাপ ঢাকা দিয়ে তুমি ললাকের কাছে সম্মান আদায় করছে—সাহস নেই তােমার সত্যকে আশ্রয় করাে, সাহসের সঙ্গে তােমার দণ্ডরেখা লােককে দেখাও—এই ধার্শ্বিক তুমি ! চারু। সখা, ঠিক বলেছ। আমি যে সুদত্তার কাছে অপরাধ করেছি, তা আমি আগেই জানি। কিন্তু আমার দণ্ডের কথা গােপন করে মিথ্যাচারে যে আমি ললাকের কাছে সম্মান ঠকিয়ে নিচ্ছি, এ কথা আমার এতদিন মনে হয়নি। ভাল করেছ—তুমি মনে করে দিয়েছ সখা, -তুমি বন্ধুর কাজ করেছে। আর আমি এ অপরাধ গােপন রাখবে না। যাক, এখন যাই অগ্নি। পাগল! এখন তােমার দণ্ডের কথা প্রকাশের অবসর নয়- প্রকাশের প্রয়ােজনও নেই। রাগের ঝোঁকে কথাটা বলে ফেলেছি, ক্ষমা কোরাে সখা। এখন রাগ করবারও সময় নয়—অভিমানেরও সময় [ ১১৫

[ দ্বিতীয় দৃশ্য,
চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
নয়। চলল, এখন সুদত্তার সন্ধানের উপায় করি। তুমি তার কাছে
অপরাধী। আমি তার চেয়ে বেশী অপরাধী। দু’জনের সমবেত চেষ্টায়
আমরা সতীকে আবার আপনার গৃহদুর্গে অধিষ্ঠিত করতে পারব। চল
যাই। র’স! সেই পত্নী, সর্বনাশীর ব্যবস্থা করে যাই। চিত্রলেখা!
থাক, থাকুক এখনও কিছুক্ষণ ! সুদত্তাকে ফিরিয়ে এনে তার পর
চিত্রলেখার ব্যবস্থা করা যাবে। চল!
[ দক্ষিণদিকে উভয়ের প্রস্থান।
[ বামদিক দিয়া চিত্রলেখা, ঋতুপর্ণ ও সত্যসেনের প্রবেশ ]
ঋতু। আর কি? আমিও তাই বলি! কপালের উপর এত চন্দনের
ঘটা কেন? আমার বরাবরই সন্দেহ ছিল, বেটার কপালে কোনও
গােলযােগ আছে।
সত্য। আমিও তাই ভেবেছিলাম। এইবারে বাছাধনকে বুঝিয়ে
দিচ্ছি। আমি বলি সবার আগে যাওয়া যাক মন্ত্রীর কাছে। সে বুড়ো
চারুদত্তকে বড় চারু-চক্ষে দেখে না। তাছাড়া এ তাে আবার এক
ঢিলে দু-পাখী।
চিত্র। আমার যে বড় ভয় হচ্ছে দাদা! আমার কি উপায় হবে ?
ঋতু। আরে তুমি মিছে ভয় পাচ্ছ। ও রাগ কতক্ষণ! তুমি
একবার চোখ রাঙালেই ঠাণ্ডা।
চিত্র। না না, কিন্তু এমন ওঁকে কখনও দেখিনি। আমার বড়
ভর হচ্ছে।
সত্য। কোন ভয় করােনা তুমি, আজই এর ব্যবস্থা কয়ছি।

তৃতীয় দৃশ্য
রাজ-সভা
[ মঞ্চের উপর মধ্যস্থ উচ্চাসনে রাজা, তার দক্ষিণপাশে পুরোহিত, বামপার্শ্বে অন্য
আর একটি আসন। পুরােহিতের দক্ষিণে সম্মুখে প্রাড,বিবাক, শূন্য আসনের সম্মুখে
কিঞ্চিৎ বামে মন্ত্রী। মঞ্চের নীচে উচ্চাসনে অমাত্য ও সভাসদগণ। দণ্ডায়মান
প্রতিহারী ও পৌরজন ]
রাজা। মন্ত্রী, অগ্নিবর্ণ রাজ্যে বিদ্রোহের সৃষ্টি করছে, এ আপনি
প্রমাণ করতে পারেন ?
মন্ত্রী। মহারাজ, বিশেষ প্রমাণ পেয়েই আমি এ অভিযােগ উপস্থিত
করতে সাহস করেছি। আপনার পরম-আত্মীয় অগ্নিবর্ণের নামে মিথ্যা
অভিযােগের শাস্তি কি, তা আমি জানি।
রাজা। কিছুই বুঝতে পাছি না। জানতাম অগ্নিবর্ণ বিলাসী
উচ্ছল, কিন্তু সে যে ষড়যন্ত্র করে আমাকে রাজ্যচ্যুত করবার কল্পনা
করতে পারে, সে ধারণা আমার ছিল না।
প্রথমে আমিও বিশ্বাস করিনি মহারাজ। পরে বিশ্বাসী
গুপ্তচরের মুখে শুনেছি, তিনি একদল ক্ষত্রিয় যুবককে বনের মধ্যে
সমবেত করে, তাদের সাহায্যে আপনাকে সিংহাসনচ্যুত করবার
সঞ্চয় করেছেন।
রাজা। চারুদত্ত তার সহচর ?
মন্ত্রী। পূর্বেই ত বলেছি রাজ, চারুদত্ত চোর—ললাটের স্বপদাঙ্ক চিহ্ন
ঢেকে রেখে সে নিজেকে সাধু বলে প্রতিপন্ন করেছে। তার অসাধ্য কি ?
রাজা। বেশ, শুনি অভিযুক্তেরা কি বলে !
[ ১১৭
মন্ত্রী।

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
[ চারুদন্তের প্রবেশ ]
চারু। মহারাজ কি আমায় স্মরণ করেছেন?
রাজা। হ্যা, চারুদত্ত, তােমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযােগ উপস্থিত
হয়েছে।
চারু। [ অমাত্যের আসনে বসিয়া | আমি অপরাধী রাজ, এ
কয়দিন সভায় উপস্থিত হয়ে রাজকাৰ্য্য করতে পারিনি। কোন বিশেষ
কারণে বড় বিব্রত হয়ে পড়েছি।
রাজা। সে কথা নয় চারুদত্ত। অভিযােগ গুরুতর, তুমি রাজার
বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছ।
চারু। রাজার বিরুদ্ধে চক্রান্ত! কিসের চক্রান্ত ? ও বুঝেছি,
মহারাজ আবার পরিহাস করছেন। ক্ষমা করবেন রাজন আমি এখন
এখন আমার মাথার ঠিক নেই।
মন্ত্রী। চারুদত্ত, তােমার বিরুদ্ধে অভিযােগ প্রমাণিত হয়ে
গেছে।
চারু। [ উঠিয়া একটু অগ্রসর হইয়া দাড়াইল ] অভিযােগ ? প্রমাণিত
হয়ে গেছে ? কিসের অভিযােগ ?
প্রাড়। অভিযােগ এই যে তুমি রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করবার জন্য
চক্রান্ত করেছ!
চারু। আমি রাজার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছি—এ কথা কে বলে ?
মন্ত্রী। গুপ্তচর মুখে আমরা বিশ্বাসযােগ্য সংবাদ পেয়েছি।
চারু। গুপ্তচর মিথ্যা সংবাদ দিয়েছে। আমি নির্দোষ! রাজা
স্বয়ং জানেন, আমি অবিশ্বাসের পাত্র নই।
১১৮]
||

ঋষির মেয়ে
বাণী।
চতুর্থ অঙ্ক
जीव मण
মন্ত্রী। তা প্রমাণ কর। প্রমাণ কর যে তুমি নির্দোষ !
চারু।
এ অতি আশ্চর্য্য ব্যবহার! মন্ত্রীবর! ব্যবহার সাধন করবে
কে এ অভিযােগ করেছে, তাকে উপস্থিত করুন। আমার
সাক্ষাতে সে তার অভিযােগ প্রমাণ করুক।
মন্ত্রী। অভিযােগ রাজা শুনেছেন, পূৰ্বপক্ষের উৎকৃষ্ট প্রমাণ
তিনি পেয়েছেন।
চারু। এ অপূর্ব ব্যবস্থা ! আমার অসাক্ষাতে পূৰ্বপক্ষের প্রমাণ
গ্রহণ করা হয়ে গেছে—সেই প্রমাণ খণ্ডন করতে হবে আমাকে,
কিন্তু আমি জানতে পারব না কে বাদী আর কেবা সাক্ষী আর
কিবা তারা বলছে। এমন অপূৰ্ব বিচার ব্যবস্থা কোনও শাস্ত্রে আছে
বলে আমি অবগত নই মন্ত্রী মহাশয়।
রাজা। কিন্তু গুপ্তচরের পরিচয় তাে তােমার কাছে প্রকাশ করা
যায় না। সে পরিচয় যদি প্রকাশ হয়ে যায়, তবে তারা কাজ করবে
কেমন করে ?
চারু। কিন্তু রাজ, এই তাে শাস্ত্র-ব্যবস্থা। এই তাে সকল
শাস্ত্রের সম্মত পদ্ধতি। পূৰ্ব্বপক্ষ ছাড়া ব্যবহার সাধন হয় না; কিার
হতে পারে না। আর গুপ্তচর বা কোন রাজপুরুষ শাস্ত্রমতে বাদী হতে
পারে না। আর যেই বাদী বা সাক্ষী থােক, আমার সম্মুখে ছাড়া তার
প্রমাণ বা সাক্ষ্য গ্রাহ হতে পারে না। ক্ষমা করবেন রাজন্ যে পৰ্যন্ত
শাস্ত্রমতে ব্যবহার উপস্থিত না হয়, সে পর্যন্ত আমার পক্ষে কোনও কথা
বলা অসম্ভব। আমি এই ধর্মসভার কাছে আবেদন করছি,তারা বলুন
যে এই বিধি শাস্ত্রসঙ্গত কি না।
[ ১১৯

চতুর্থ অঙ্ক।
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
প্রাড়,। রাজ চারুদত্তের কথা শাস্ত্র ও যুক্তিসঙ্গত; কিন্তু একটা
কথা বলতে পার বােধ হয়, চারুদত্ত,তুমি কোন দেশের লােক, আর
কি জন্য দেশ ত্যাগ করে এখানে এসেছ?
চারু। ক্ষমা করবেন-কোনও বিশেষ কারণে আমি এ প্রশ্নের
উত্তর দিতে অক্ষম।
[ দক্ষিণদিক হইতে অগ্নিবর্ণের প্রবেশ ]
মন্ত্রী। এই যে অগ্নিবর্ণদেব উপস্থিত হয়েছেন।
অগ্নি। আপনার দৃষ্টিশক্তির প্রশংসা করতে হয়। এতবড় সত্যটা
আবিষ্কার করে ফেলেছেন ?
রাজা। অগ্নিবর্ণ বাচালতা পরিত্যাগ করে স্থির ভাবে বিচারের
জন্য প্রস্তুত হও।
অগ্নি। বিচার! কিসের বিচার ?
মন্ত্রী। আপনার এবং চাদত্তের বিরুদ্ধে অভিযােগের।
অগ্নি। সে কথা অবগত আছি মন্ত্রীবর। আমার উপর আপনার
প্রীতি সুপ্রসিদ্ধ নয় ; চারুদত্তও আপনার অসন্তোষ উৎপাদন করেছেন।
তাই আপনি একটা মিথ্যা অভিযােগ উপস্থিত করেছেন, আপনার
উচ্ছলতার পথ নিরঙ্কুশ করতে। কিার করুন রাজা, এই কপটচারী
বৃদ্ধের উপযুক্ত শাস্তি বিধান করুন !
এড়ি।
অগ্নিবর্ণবে, আপনাদের বিরুদ্ধে যে অভিযােগ, তা নিরাকৃত
হলে আপনার অভিযােগ চলতে পারে না।
১২০ ]

চতুর্থ অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ তৃতীয় দৃশ্য অগ্নি। উত্তম। শুনি, আমার বিরুদ্ধে কি অভিযােগ, অভিযােক্তা কে ? মন্ত্রী। আমি অভিযােগ করেছি। রাজ, অগ্নিবর্ণদেব আপনাকে চারু। আশ্চৰ্য্য এ ব্যবহার! রাজা বা রাজপুরুষের অভিযােগে ব্যবহার হয় না, মন্ত্রী মহাশয়ের অভিযােগ অগ্রাহ। প্রাড়,। এ কথা রাজদ্রোহ বিষয়ে প্রযুজ্য নয়। মন্ত্রী, আপনি আপনার অভিযােগ বলে যান। মন্ত্রী। অগ্নিবর্ণদেব কিছুদিন হতে একদল ক্ষত্রিয় যুবককে সম্মিলিত করে’ বনে এক সেনা সমাবেশ করেছেন। উদ্দেশ্য—সহসা রাজ্যে বিদ্রোহ উপস্থিত করে’ সিংহাসন অধিকার। চারুদত্ত এ চক্রান্তে তার প্রধান মন্ত্রদাতা। চারুদত্ত কোশলনিবাসী ব্রাহ্মণ, সেখানে চৌৰ্য্যা- পরাধে দণ্ডিত হয়ে নির্বাসিত হয়েছেন। এ রাজ্যে এসে সে কথা গােপন করে অগ্নিবর্ণের সঙ্গে চক্রান্ত করে অমাত্য পদ অধিকার করে ক্রমে রাজার উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন। প্রাড়। এ অভিযােগের উত্তরে আপনার কি বলবার আছে অগ্নিবর্ণদেব। অগ্নি। এ কথার সম্যক উত্তর রাজসভায় দিতে আমি অক্ষম-সে উত্তরঅবিলম্বে ওই কপট চক্রীর মস্তক ছেদন। রাজা। অতি দুর্বিনীত তােমার ব্যবহার অগ্নিবর্ণ ! আমার কুটুম্ব বলে তােমার স্পর্ধা ক্রমেই সকল সীমা অতিক্রম করে উঠছে। অগ্নি। না রাজা, যতদিন আমার এই জ্ঞান ছিল যে আপনার কুটুম্ব, এই আমার প্রধান গৌরব, ততদিন এ স্পর্ধা আমার হয় নি। কিন্তু এখন আর আমার সে জ্ঞান নাই। আমি জানি বাহুতে আমার শক্তি আছে, [ ১২১

চতুর্থ অঙ্ক)
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
সত্য আমার আশ্রয়, এবং ধৰ্মই আমার একমাত্র প্রবৃত্তি, তাই আমি এখন
এত নির্ভয়।
প্রাড়। ক্ষান্ত হউন অগ্নিবর্ণ দেব, আপনি অভিযােগের কোন উত্তর
না দিলে এইটাই ধরে নিতে হবে যে অভিযোেগ
অগ্নি। তবে আমার উত্তর এই অভিযােগ আদ্যোপান্ত মিথ্যা।
পাড়। আপনি সেনা সংগ্রহ করেন নি ?
অগ্নি। করেছি, কিন্তু রাজদ্রোহের জন্য নয়।
রাজা। তবে কি জন্য?
অগ্নি। সে উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত নই।
প্রাড়। চারুদত্তের সঙ্গে চক্রান্ত মিথ্যা ?
অগ্নি। সম্পূর্ণ।
প্রাড। চারুদত্ত, তােমার কি উত্তর।
চারু। আমার বিরুদ্ধে অভিযােগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
প্রাড। তুমি কোশলদেশবাসী?
চারু। না।
রাজা। তবে কোথাকার লােক তুমি ?
চারু। সে কথা প্রকাশ কর্তে আমি অক্ষম।
মন্ত্রী। তুমি চোর দণ্ড প্রাপ্ত হয়ে কোশল থেকে নির্বাসিত হয়েছ।
[ চারুদত্ত সন্দিগ্ধ চিত্তে অগ্নিবর্ণের দিকে চাহিল ]
মন্ত্রী। নীরব কেন? রাজন্ এ কথা সহজ প্রমাণসাক্ষেপ। চারুদত্ত,
তােমার চন্দনানুলেপন মুছে ফেলে, রাজাকে পরীক্ষা করতে দেও তােমার
কপালে কিসের ছাপ আছে।
১২২]

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
-[ চারুদত্ত নিৰ্বাক্ হইয়া অধােমুখে দাড়াইয়া রহিল ]
মন্ত্রী। রাজন, অনুমতি হয় তাে আমি ওই চন্দনানুলেপ মুছে ফেলি।
[ রাজা ইঙ্গিত করিলেন, মন্ত্রী চন্দন মুছিয়া ফেলিলেন ]
দেখুন সকলে—শপদাঙ্ক !
[ সভাসদগণ ও রাজা মুখ বাড়াইয়া দেখিলেন)
রাজা।' বেশ, এখন তােমার আর কিছু বলবার আছে চারুদত্ত !
প্রাড। শােন চারুদত্ত, সত্যসেন তােমার বিরুদ্ধে এই সাক্ষ্য দিয়াছে
যে, তুমি কোশল দেশের দণ্ডিত ও নির্বাসিত চোর। এদেশে এসে
মিথ্যাচারের দ্বারা তুমি তােমার প্রকৃত পরিচয় গােপন করে রাজার
বিশ্বাস উৎপাদন করেছ, এবং অমাত্য পদ লাভ করে, অগ্নিবর্ণের সঙ্গে
চক্রান্ত করেছ। রাজার উচ্ছেদ সাধন ক’ববার জন্য অগ্নিবর্ণদেব তােমার
পরামর্শে সৈন্য সংগ্রহ করে রাজধানী আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছেন।
এ অভিযােগ সম্বন্ধে তােমার উত্তর কি ?
চারু। (দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া) এ অভিযােগ মিথ্যা।
প্রাড,। সম্পূর্ণ মিথ্যা ?
চারু। সম্পূর্ণ।
প্রাড়। চৌরদণ্ড ? (চারুদত্ত নিরুত্তর)
প্রাড। কি বল ?
চারু। একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়।
[১২৩

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
[ রাজা প্রভৃতি সকলে আলােচনা করিতে লাগিলেন]
প্রাড়। চারুদত্ত, রাজার সিদ্ধান্ত এই যে, তােমাকেই প্রমাণ করতে
হবে যে তুমি নির্দোষ। তােমার নির্দোষিতার কি প্রমাণ আছে ? তােমার
স্বীকারােক্তি এবং তােমার ললাটের চিহ্নে প্রমাণ হচ্ছে যে, তুমি
চৌরদণ্ড প্রাপ্ত হয়েছিলে। এখন এ সত্বেও যে তুমি চোর নও, সে বিষয়ে
কোন প্রমাণ আছে কি?
[ দক্ষিণ দিক হইতে আপস্তম্ব ও সুদত্তার প্রবেশ। আপস্তম্ব সকলের পশ্চাতে
সভামঞ্চের সম্মুখে দাঁড়াইয়া রহিলেন। সুদত্তা ব্যস্তভাবে লােক ঠেলিয়া অগ্রসর হইয়া
গেল। আপস্তম্ব -কুঞ্চিত করিয়া নত মস্তকে গভীর ভাবে চিন্তা করিতে লাগিলেন।]
সুদত্তা। সে প্রমাণ আমি দেব।
চারু। সুদত্তা!
প্রাভ। দেবী! আপনার সাক্ষ্য গ্রহণীয় নয়। আপনি নারী এবং
অভিযুক্তের পত্নী।
আপ। ( হঠাৎ মাথা খাড়া করিয়া সভামঞ্চের দিকে অগ্রসর হইয়া 1..
রাজ, আমি চাদত্তের নির্দোষিতার সাক্ষী।
চারু। এগুরুদেব!
আপ। আমি সত্য শপথ করে বলছি, যে চারুদত্ত চৌৰ্যাপরাধে
দোষী নয়। আমি ওর নামে মিথ্যা অভিযােগ করেছিলাম। চারুদত্ত
সম্পূর্ণ নির্দোষ হয়েও কেবল আমার সম্মান রক্ষার জন্য চৌৰ্যাপবাদ
স্বীকার করে নির্বিবাদে তার দণ্ড গ্রহণ করেছিল। রাজন্ আজ
১২৪]
।

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
এই ধর্মসভায় আমার সেই পাপাচার স্বীকার করে আমার অপরাধের
প্রায়শ্চিত্ত করছি।
. [ আপস্তম্ব মাথা নীচু করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন ]
সকলে। সাধু! সাধু!
রাজা। আৰ্য, আপনার পরিচয় অবগত নই।
আপ। আমি বাৎস্য গােত্রীয় আপস্তম্ব।
[ রাজা ও সভাসদগণ চমকিত হইয়া অসন পরিত্যাগ করিয়া উঠিলেন। রাজা
• আপনুষের কাছে নামিয়া আসিলেন ]
রাজা। বিশ্ববিশ্রুতকীৰ্ত্তি আপস্তম্বদেব, আপনার আগমনে এ রাজ্য
ধন্য হয়েছে। (দাসীর প্রতি ) ঘােষা, যাও, আৰ্য্যের জন্য পাদ্য অর্ঘ্য
নিয়ে এসো। আৰ্য্য আসন পরিগ্রহ করুন।
আপ। (স্বগতঃ ) বিশ্ববিশ্রুতকীৰ্ত্তি আপস্তম্ব! সে ছিল, আজ
সে-নেই। আর্যাবর্তের আকাশে, বাতাসে আজ তার নাম ধিক্কারে ভরে
গেছে—মিথ্যাচারী, সন্তানদ্রোহী, পাপিষ্ঠ আপস্তম্ব ! হিমালয়-শৃঙ্গের মত
তুঙ্গ ছিল আমার যশ-আজ, আজ তা ধূলার সাথে বালুকণা হয়ে মিলিয়ে
গেছে। “ওঃ তবু-তবু বেঁচে থাকতে হবে!
[ স্তব্ধভাবে শূনের দিকে অগ্রসর হইয়া তন্ময় হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন ]
রাজা। (তীব্র দৃষ্টিতে মন্ত্রীকে আদ্যোপান্ত নিরীক্ষণ করিলেন। তার
পর) চারুদত্ততুমি মুক্ত।
[ অগ্নিবর্ণের প্রস্থান।
[ ১২৫

চতুর্থ অঙ্ক ] ঋষির মেয়ে [ তৃতীয় দৃশ্য [ আপস্তম্ব উৎসুক ভাবে এই আদেশের প্রতীক্ষা করিতেছিলেন- আদেশ শুনিয়। আরামের নিঃশ্বাস ছাড়িয়া মুখ ফিরাইলেন। তার পর গভীর বিষাদে তার মুখ আচ্ছন্ন হইল। তিনি মুষ্টি দৃঢ়বদ্ধ করিয়া ভুমিলগ্ন-দৃষ্টি হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।] সুদত্তা। ( আনন্দে দুই হাত তুলিয়া) জয় মহারাজের জয়! ব্যায়াধিপতি, সকল দেবতা আপনাকে মঙ্গলে মণ্ডিত করুন। [ তার পর চাদত্তের দিকে ফিরিয়া তাকে প্রণাম করিয়া পা জড়াইয়া ধরিল ] আৰ্যপুত্র, ক্ষমা কর আমায় ! চারু। [ সুদত্তাকে ধরিয়া তুলিল ] ক্ষমা ! সুদত্তা, তুমি যে আমার । সব অপরাধ ক্ষমা করে ফিরে এসেছ, তাতেই আমি ধন্য হয়েছি। [ তার পর দুইজনে উৎফুল্ল হৃদয়ে আপস্তম্বের দিকে চাহিয়া প্রণাম করিল।, আপস্তম্ব শুষ্ক মুখে হাত বাড়াইয়া তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিলেন। রাজা দাঁড়াইয়া আপস্তম্বের দিকে চাহিয়া কি বলিবার উপক্রম করিলেন। অগ্নিবর্ণ ইতিমধ্যে বাহিরে গিয়া দাসী- বেশিনী চিত্রলেখা ও ঋতুপর্ণ এবং সত্যসেনকে লইয়া আসিলেন। অগ্নি। রাজা, ধৰ্ম্মকাৰ্য এখনও সম্পন্ন হয়নি, আমার অভিযােগের বিচার চাই। রাজা। অগ্নিবর্ণ, কি তােমার অভিযােগ, অভিযুক্ত কে ? অগ্নি। আমার অভিযােগ—ওই মন্ত্রী, এই পাচ্ছি, তুপর্ণ ও সত্যসেন, আর এই পাপিষ্ঠা চিত্রলেখার বিরুদ্ধে। এরা দুষ্ট চক্রান্তের দ্বারা আপনার অমাত্য চারুদন্তের প্রাণহানির চেষ্টায় মিথ্যা অভিযােগ করেছিল। ১২৬]

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
[ সকলে চমকিত হইয়া উঠিল। সুদত্তা হঠাৎ চিত্রলেখাকে চিনিয়া স্বামীর পা
ছাড়িয়া ছুটিয়া চিত্রলেখার পার্শ্বে গিয়া পরম করুণার সহিত তাহাকে জড়াইয়া ধরিল।]
[ রাজা প্রাবিবাকের সঙ্গে পরামর্শ করিতে লাগিলেন। দাসী পাদ্য-অর্থ লইয়া
আসিল। রাজা অগ্রসর হইয়া আপস্তম্বকে তাহা গ্রহণ করিতে বলিলেন।
আপস্তম্ব অন্যমনা হইয়া পাদ প্রক্ষালন করিলেন।]
অগ্নি।
সুত্তা। সখা, এ কি দুর্দশা করেছ তুমি সখীর ?
অগ্নি। তােমার সখা হবার ঘােগ্য ও নয় দেবী, ও দাসী।
সুদত্তা। না সখা, ও তােমার সহধর্মিণী, গৃহপত্নী।
ও পাপিষ্ঠা, গুরুতর অপরাধে অপরাধী ও। ও তােমার
হিংসা করেছে—তােমার স্বামীর হিংসা করেছে।
সুদত্তা। এই অপরাধ ? ভেবে দেখেছ সখা, কেন তা করেছে
চিত্রলেখা? সে শুধু তােমায় বড় ভালবাসে বলে, আর তুমি সে
ভালবাসার নিষ্ঠুর অপমান করেছ বলে। শক্তিমান স্বামী ! তােমার
অধিকারের দর্পে তুমি লাঞ্ছিত প্রেমের এই ক্ষুদ্র বিদ্রোহের শাস্তি দিতে
যাচ্ছ—কিন্তু তােমার অপরাধের শাস্তি কে দেবে অগ্নিবর্ণ ? [ অগ্নিবর্ণ
নতমস্তকে নীরব রহিল।]
চিত্রলেখা। আমা হতে তােমার এ ঘাের অনিষ্ট হয়েছে।
আমি আজীবন সময় তার প্রায়শ্চিত্ত করবে। আমি আজ থেকে
তােমার দাসীত্ব স্বীকার করছি। আমায় ক্ষমা কর সখি।
[ সুদত্তা চিত্রলেখার পায়ে পড়িতে গেল। অগ্নিবর্ণ চমকিত হইয়া দুইপদ অগ্রসর
হইয়া গেল। চিত্রলেখা সুদত্তাকে নিবৃত্ত করিয়া তাহার পদতলে পড়িয়া
পা জড়াইয়া ধরিয়া সানেত্রে বলি।
[ ১২৭

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
চিত্র। দেবী-দেবী তুমি! মানবী নও, আমার সকল অপরাধ ক্ষমা
কর দেবী।
[ সুদত্ত। তাহাকে উঠাইয়া আলিঙ্গন করিল ।
অগ্নি। দেবী, এ অপরাধীকেও ক্ষমা ভিক্ষা দাও! চিত্ৰলেখা,
তুমি মুক্ত। দেবীর স্পর্শে তােমার সব অপরাধ ধৌত হয়ে গেছে।
পুণ্য হৃদয়ে তুমি আজ আশ্রয় পেয়েছ, সে তােমার অশেষ সুকৃতির ফল।
ভাগ্যবতী তুমি। তােমাকে এই আশ্রয়ে রেখে আমি আজ নিশ্চিন্ত
হয়ে বিদায় নিচ্ছি।
সুদত্তা। বিদায় ? সে কি সখা ?
চারু। কোথায় যাবে তুমি, সখা ?
অগ্নি। আমি যাব সুদূর দক্ষিণাপথে, বাহুবল সহায় করে সেখানে
রাজ্য অর্জন করবাে, আৰ্য্য অধিকার স্থাপন করবে।
[ আপস্তম্ব চমকিত হইয়া অগ্রসর হইলেন। রাজাও উৎকর্ণ হইয়া
উঠিয়া দাড়াইলেন ]
[ চারুদত্ত বাধা দিবার জন্য হাত তুলিয়া কিছু বলিতে উদ্যত হইল।
অগ্নি। (চারুদত্তকে নিবৃত্ত করিয়া) নিবৃত্ত করে মাপ
ক্ষত্রিয়, ক্ষত্ৰধর্মপালন করতে যাচ্ছি, গৌরবশি চর আমার
যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। চারু মিয়ই যে আমায় এ পথ
দেখিয়েছ। তােমার পত্নীই য়ে জন্তরে এ নুতন আত্মাকে জাগিয়ে
তুলেছে। আজ তােমরা নিবৃত করতে তাে পাবে না। সখি,
স্মিত মুখে বিদায় দাও
১২৮]

চতুর্থ অঙ্ক ]
ঋষির মেয়ে
[ তৃতীয় দৃশ্য
আপ। (স্বতঃ) সুদূর দক্ষিণাপথ—সেখানে আপস্তম্বের কথা কেউ
শানেনি।
সুদত্তা। যাবে? [ কিয়ৎক্ষণ পরে ] যাও সখা। জয়যুক্ত হও।
আপ। [ অগ্রসর হইয়া অগ্নিবর্ণের পৃষ্ঠে হস্তাৰ্পণ করিয়া ] সাধু
অগ্নিবর্ণ, সাধু। অগ্রসর হও, জয়যুক্ত হও। আমি তােমার সহযাত্রী।
চা। প্রভু!
আপ। নিবৃত্ত করাে না বৎস! আমাকে যেতে হবে। জীবনের
এই জীর্ণ সন্ধ্যায় ধূলি-ধূসরিত আমার সম্মানকে পুনর্জীবন দেবার এত
বড় সুযােগ আর তাে আমি পাব না। আমি যাব। অনাৰ্য-ভুমি
বৈদিক যজ্ঞের ধূমে সুরভিত করব আমি। অগ্নিবর্ণ সেখানে আৰ্যকীর্তি
প্রতিষ্ঠিত করবে বীর্যে , দেবগণের আশীর্বাদে আমিও আৰ্যকীৰ্ত্তি স্থাপিত
করবাে ধর্মে।
চারু। (সুদত্তার কাছে অগ্রসর হইয়া) সুদত্তা, তুমি পিতাকে
পায় ধরে নিবৃত্ত কর।
সুদত্তা। পিতা না, বাধা দেব না। আমি নারী, কিন্তু আমি
ঋষির মেয়ে।
যবনিকা
[১২৯

No text on this page.

No text on this page.

Rishir Meye Ed.2nd

Author
Sengupta, Nareshchandra
Title
Rishir Meye Ed.2nd
File name
Rishir Meye Ed.2nd
Text
OCR done
Citation
1930
Published
2009/08/17
Publisher
Gurudas Chottopadhaya And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
148
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Drama Plays
Keywords
Drama
DLI number
513162
Barcode
4990010020165.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
v4aOQfXCkAB
Download PDF

Rishir Meye Ed.2nd