Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Guru Prasad

2010/03/31

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

“গুরুপ্রসাদ”
চিরকুমার, মহামা
শ্রীমৎ পাগলব্রহ্মচারী বাবার কয়েকটি
অভ্রান্ত উপদেশ।
-
প্রকাশক
শ্ৰীযুতীমােহশত।
দুধের বাঁধ “হরিভজন কুটীর,”
পােঃ ঘাটাল, জেঃ মেদিনীপুর ।
বৈশাখী সংক্রান্তি
মূল্য
প্রকাশকগণ কর্তৃক সর্বস্ব সংরক্ষিত।

মুদ্রাকর—শ্রীরাজকুমার রায়
“পশুপতি প্রেস”
৩০ নং হরীতকী বাগান, কলিকাতা।

উৎসর্গ পত্র।
ভাই সব! বহুকালের পতিত এই জমিটুকু বহু খেটে,
কঁাটা কঁকর উলু বেনা তেড়ে হাসিল করে ঠাকুর আবাদ
করেছিল,তারই আগলের গুণে বহু আপদ বালাই এড়িয়ে
সেই আবাদী বীজ হ'তে গাছ হয়েছে, কয়েকটি ফুল ও
হয়েছে, পাছে ফল হয়, তাই ফুল ক’টি ছিড়ে তার পাযে
দিচ্ছি। তারই মরাইয়ের ধান নিয়ে ভেনে কুটে নৈবেদ্য
করেছি,ভক্তি গঙ্গা-জল,জ্ঞান চন্দন ও দুটোই আমার নেই,
তবে সময় সময় দু এক ফোঁটা চোখের জল পড়ে। তাই
মিশিয়ে দিচ্ছি !'তঁারই মুখে শুনেছি জ্বর মাঝে গুরু আছেন,
আর গুরু ব্ৰহ্ম, গুরু বিষ্ণু এও তারই উপদেশ, তবে ভাই!
গঙ্গা ত বিষ্ণুর পা ঘেমেই বেরিয়েছিল, তা হলে আমার
চোখের জলই গঙ্গাজল! ধর ঠাকুর, গন্ধ নাই ব'লে ঘৃণা ক’র
! এ শাছ তােমারই লাগান, “মন্নাথঃ শ্রী জগন্নাথথা,
মদ্গুরুঃ শ্ৰজগদ্গুরু। মমাত্মা সৰ্ব্বভূতাত্মা তস্মৈ শ্রীগুরবে
নমঃ।
আয় ভাই সব ! পূজা শেষ হয়েছে, এইবার প্রসাদ
নিবি আয়। কাড়াকাড়ি ক'রে খেতে হয় ! দেরি করিস
! প্রাপ্তিমাত্রেণ ভােব্যং, আয় ভাই! তােরা যে
আমার ভােগের ঐশ্বব্য, ত্যাগের অভ্যাস, যােগের কৌশল,
তাই বড় আদরের গুরুপ্রসাদ তােদের দিচ্ছি! বিলিয়ে
খাবি, নইলে শান্তি পাবিনা, কেউ না চাইলেও দিবি, এ যে
গুরুপ্রসাদ।
"তােদের সুখে সুখী

No text on this page.

উপহার
• • • ৮ ০ ০ + ০ + ০।
৪ । । ।
1 ৪ ও ০ ০ ০
৬ ৫ ০ ০ ০ + ০ ০

No text on this page.

বিজ্ঞাপন।
আমাদের দুধের বাঁধ “হরি ভজন কুটীর হইতে আরও দুই
খানি পুস্তক প্রকাশিত হইয়াছে। সত্বর আরাধনা” নাম্নী
পুস্তিকা শ্রাতা ভগিনীদের করকমলের শােভাবর্ধন করিবে,
আর্য ঋষিগণ যে সামগানের দ্বারা আপন আপন আরাধ্যের
আরাধনা করিতেন, আমাদের আরাধনা” সেই সঙ্গীত-উপাদানে
গঠিত, প্রত্যেক গানটি আপনাকে ধীয়ে ধীরে আপনার প্রার্থিত
প্রদেশে নিয়ে যাবে। সঙ্গীতাচাৰ্য যতীন্দ্র নাথ চক্রবর্তী (বর্তমানে
যিনি পাগল গুরুদাস নামে খ্যাত), তাঁর যত্নে সঙ্গীতগুলি সুর,
লয়ে গঠিত, রাগিনী, তাল বিচার সহিত ব্যবস্থা আছে।
আর একটি পুস্তক কিছুদিন পূর্বেই প্রকাশিত হইয়াছে
নাম “সাধন-সােপান* গীতি-পুস্তক, মহাত্মা পাগল বাবার ১১৪
থানি গান, এবং পাগল গুরুদাসের ৪০ খানি পান তাহাতে
আছে। গানগুলি সৰ মৰ্ম্মস্পশী, সাধন-সােপান প্রকৃতই সাধনার
সােপান, স্পর্ধা ক'রে বলতে পারি অধ্যাত্ব রাজ্যে এরূপ পুস্তক
অতি বিরল, বহু তপস্যালব্ধ ধন, শাস্ত্র পড়ে গান রচনা করা নয়।
আত্মজ্ঞানী প্রত্যক্ষদর্শী মহাত্মার অভ্রান্ত উপদেশ ।
বিনিময়ে যে অর্থ গ্রহণ করা হয়, মাত্র অকৃতদার ব্রহ্মচারী এবং
আশ্ৰমাগত সাধু সেবার ব্যয়ের জন্য। ইতি-
প্রাপ্তিস্থান
দুধের বাঁধ “হরিভজন কুটীর
পাের ঘাটাল, জেলা মেদিনীপুর।

সূচীপত্র। বি পৃষ্ঠা বিষয় আবেদন পত্র মায়া একেশ্বরবাদী পরিচয় পত্র ৪ উৎসব পত্র ঠাকুরের সংষম সত্যের নিকট মিথ্যার দাসত্ব ৯ ৮৬ শরণ মনন ১৮ ৮ 2 কৰ্ম্ম, জ্ঞান, ভক্তি যে ঈশ্বর চায় সে কিছু নির্বাণ নিষ্কাম কর্ণ সত্য এবং তপস্য। আমি কি সাকার, নিরাকার প্রকৃতি কয়েকটা উপদেশ # ত্যাগ বা গ্রহ ত্যাগ ঠাকুরের দেহ তাগের চায় না ৩৭ रिमाम ১৩ ১০৪ গৃহস্থ ভক্তদের প্রতি যুক্তির দ্বারা নাম করা উচিত ব্রহ্মচারীদের প্রতি নিত্যক্রিয়া-প্রণালী ব্রহ্মচারীদের নিত্যক্রিয়া পদ্ধতি আমার কোষ্ঠীপত্র পরিশিষ্ট ১১৪ १२ কচি সচি সন্ধ্যাসী

গুরুপ্রসাদ।
আবেদন পত্র।
ঠাকুর! তােমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আজ লেখনী ধারণ
করেছি, জানি না পরিণাম কি? তােমার ইচ্ছা, অপ্রকট
ভাবে দিনকতকের জন্য ভবের ভাব দেখে চলে যাবে। কিন্তু
ঠাকুর। ফুল ফুটলে ভ্রমরকে নিমন্ত্রণ করতে হয় না,চঁাদ উঠলে
কুমুদিনীকে বিজ্ঞাপন করতে হয় না। আলাের স্বভাবই
প্রকাশ, তবে ফানস পরিয়ে দিলে আরও একটু উজ্জ্বল হয়,
কিন্তু আলো না থাকলে ফানসের কোন শক্তি নাই।
চমার বাহাদুরী চক্ষুষ্মানের কাছে, অন্ধের কাছে নয়।
তােমার আদেশ ছিল “আমার কোনও ঘটনা তুমি প্রকাশ
ক’র না কিন্তু ঠাকুর ? চন্দ্র আত্মগােপন করে থাকবে,
খদ্যোত সেই আসন অধিকার করবে, সেও আমি সহ
করতে নারাজ, তার জন্য যদি আমায় মহানরকে গমন
করতে হয়, ক্ষতি নাই। কিন্তু যেন স্মৃতিভ্রষ্ট না হই! যেন
স্মরণ থাকে—“আমি তােমার, তুমি বিশ্বের”। আমি

গুরুপ্রসাদ। তােমাকে অনন্ত অব্যক্ত অসীম ধ্যানাতীত প্রভৃতি উপাধি দেবাে না। কারণ বােঝা বড় করে বাঁধলে, নিজে মাথায় তুলতে পারব না। তুমি আমার ঘরের ঠাকুর! ঠাকুর ! তােমারই মুখে শুনেছি “চন্দ্র ছাপে না তারক উজোর,সূৰ্য্য ছাপে না বাদর ছাই। রণ পড়ে কঁহা রাজপুত ছাপে,দানী ছাপে কঁহা মাগন যাই”। অর্থাৎ প্রার্থী এলে দাতা কখনও আত্মগােপন করে না, তবে দাতা! গােপনে কেন ? জগৎ যে প্রার্থী! উপযুক্ত দাতা খুজে পাচ্ছে না, তারা যে অসম্পূর্ণ। তারা যে অভাবী !–উপযুক্ত দাতা খুজে পাচ্ছে না ! কি যেন হারিয়েছে, কি যেন একটা অভাব, তাদের রক্তবহা ধমনীর মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে। স্বভাবী! এসাে, তাদের হারানাে রত্ন খুঁজে দাও! তােমায় ত গােপনে থাকতে দিব না ! এস সখা! এস স্বামী ! এস পিতা! এস পরমার্থ- দাতা! অলক্ষ্য হতে লক্ষ্যে এস ! পথভ্রষ্ট পথিকের পথ- নির্ণায়ক ধ্রুবতারা! অকৃপার মেঘে আচ্ছন্ন থেকো না ! প্রকাশ হ'য়ে বলে যাও“এই পথ !”তােমারই শ্রীমুখবিনিঃ- সৃত কয়েকটি অভ্রান্ত উপদেশ,এই পুস্তকে প্রকাশ করব। তুমি সত্য বারিধি! অসীমাধার ! আমার আধার অতি ক্ষুদ্র ! যতটুকু সংগ্রহ করেছি, তাই অভাবীদিকে দিব । সুস্বাদু সুপথ্য বিলিয়ে না খেলে আনন্দ পাব না। আমি এতদিন অলসেই ছিলাম, আমার জীবনের আনন্দ গুরু- ! এমন

প্রসাদ।
ভ্রাতাগণ, আমার নিদ্রিত-বৃত্তিকে জাগিয়েছে। আয় ভাই
সব! যদি জাগালি, তবে শক্তি সাহস দে। আমি যে ভাই
দুর্বল। দে ভাই। কর্মের শেষে তােদের শক্তি তােদর
ফিরিয়ে দিব, সুদের দরুণ আমার নিজের কর্মশক্তি পর্যন্ত
তােদের দিয়ে আমি চিরতরে নিশ্চিন্ত হব! আয় ভাই ।
তাই ভাই মিলে একটা আনন্দেরহাট বসাই। জয় ঠাকুর।

পরিচয় পত্র।
বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত তালডাঙ্গা থানার অধীন
মণিপুর গ্রামে আমার গুরুমঠ “নিত্যানন্দ আশ্রম” নামে
ধ্যাত; আজ প্রায় বিশ বৎসর হ’ল গ্রামের প্রান্ত সীমায়
আশ্রম স্থাপিত হয়। আশ্রম চত্বরের উত্তরাংশে “আদিনাথ”
নামক লিঙ্গমূর্তি স্থাপিত, মধ্যস্থলে ঠাকুর পূর্ব হতে আপন
সমাধিমঞ্চ প্রস্তুত করে রেখেছেন, পশ্চিমাংশে পূৰ্বমুখে
দুকুঠরী খােড়ো ঘর ঠাকুরের থাবার জন্য, এক কুঠরীতে
ঠাকুর থাকেন, পাশের কুঠরীতে সমাগত ভক্তবৃন্দ বসে
ঠাকুরের সঙ্গে কথাবার্তা আলাপাদি করেন। আজ প্রায় তিন
চার বৎসর,ঠাকুর দিবসে ঘরের বাহিরে আসেন না, সর্বদা
ঘরে কপাট বন্ধ থাকে, ঐ পাশের কুঠরীতে হাতখানেক
লম্বাচওড়া গরাদে-শূন্য একটি জানালা আছে, সেখান
থেকে ঠাকুরের দশন হয়। দক্ষিণদিকে একটি খােড়ে ঘর
আছে, ঠাকুরের ভােগরাগ তৈয়ারীর জন্য । এবং ৩৪
মূর্তি অকৃতদার ব্রহ্মচারী প্রায়ই থাকেন, ঐ ঘরেই তাদের
আড্ডা। ব্রহ্মচারী অনেক আছেন, তার মধ্যে অক্ষয়ানন্দ,
নিৰ্মলানন্দ,জগদানন্দ, বিভূত্যানন্দ, এরা নিত্য পরিষদের
ন্যায় ; দক্ষিণ পশ্চিম কোণে একটি ইদারা, ইদারার
পাশেই প্রবেশ পথ ঠাকুরের কুটীরের পেছনে,একটি ছােট

গুরু প্রসাদ । পুষ্করিণী, ঠাকুর নূতন তৈরী করেছেন। আশ্রম হ’তে অল্প, দূরেই একটি পুষ্করিণী, নাম “খােড়ে”, খােড়ে খুব ঝড় ! হ'লেও নিতান্ত ছােট নয়,জল খুব ভাল না হলেও অব্যবহার্য্য নয়, সৌন্দর্য্যে আমাদের বঙ্কিম বাবুর “বারুণী পুষ্করিণী”র মত,ঘাসের ফ্রেমে আঁটা আয়নার মত না হলেও, উষ্কখুক, মাথা নেড়া থান পর। বিধবা বানীর মত বটে! তার জল খড়ি গােলার মত, তাই নাম খোড়ে, পাড়ের নীচেই জঙ্গল, উত্তরাংশেই কয়েকটি আমগাছ; খুব বাতাস, সেইজন্য গাছ- গুলি সর্বদা চঞ্চল,দেখলে মনে হয় যেন কতকগুলি ভটচাজ পণ্ডিত বসে শাস্ত্র বিচার করছে । মােটের মাথায় স্থানটী সুন্দর,(উদাসীর চ’ক্ষে) ঈশ্বর-ভালােদ্দীপক বটে। পশ্চিম পাড়ে একটি প্রাচীন বটগাছ, ঠাকুর সেইখানে বসে সাধন করতেন, আজও সেখানে সন্ধ্যার পর ঠাকুর যান, সেখানে গেলে ঠাকুরের একটু ভাবান্তর উপস্থিত হয়। ঠাকুর বলেন, এই গাছতলায় সজ্ঞানে অজ্ঞান,বহু রাত কেটেছে। জগৎ ঘুমাচ্ছে, আমি এখানে জেগে বসে আছি। কখনাে অচৈতন্য, পেঁচার ডাকে মনে পড়ত, আমি খােড়ের ধা: আছি। ঠাকুরের কথার হাবভাবে বােঝা যায়, ঠাকুর সেখানে হারান জিনিষ খুঁজে পেয়েছেন,আমাদের মত মরু- ভূমি হৃদয়ও সেখানে গেলে একটু সপসপে জবজবে হয়।

উৎসব পুত্র। বৈশাখের ১লা হ’তে সংক্রান্তি পর্যন্ত সমাগত ব্যক্তি- দিগে ফল জল দেওয়া হয়, এবং সংক্রান্তি থেকে উৎসব আরম্ভ হয়। দিবারাত্রব্যাপী অবিরাম হার-সংঙ্কীৰ্ত্তন, এবং অবিচারে অন্নদান,কোনও বৎসর তিনদিন, কোনও বৎসর পাঁচদিন অবস্থানুরূপ ব্যবস্থা হয়, ঐ সময় প্রায় ৪৫ শত ছাত্র সম্মিলিত হয়, তারপর সন্নাসী,যােগী, ব্রহ্মচারী বাউল, ফরি ভৈরব, ভৈরবী, নেড়, নেড়া, অনেক আসে। ঠাকুরের নিকট সকলের সমান অধিকার। এক সময়ে চল্লিশ পঞ্চাশ দল কাৰ্তন; খােল,মাদল, টোল, দগড়,করতাল কেঁদ্ " সংযােগে ভক্তগণের উদ্দাম নৃত্য। তার পর দীয়তাঃ ভুজ্যতাং,নাও নাও,পও খাও শব্দ,মধ্যে মধ্যে সুকণ্ঠ গায়ক, সুমৃদঙ্গীসহযােগে সমবেত ব্রহ্মচারীগণ কর্তৃক উদ্ধানেত্রে হরিনাম কাৰ্ত্তন! দেখলে জগৎ ভুল হয়ে যায়! তার উপর ঠাকুরের হাসিভরা মুখ,সুধাভরা কথা,শুলে মনে হয় সত্য- যুগের সূচনা হচেছ ! “পূর্ণব্রহ্ম রাম” সীতা উদ্ধার করে ফিরবার সময়, ভরদ্বাজ ঋষি যেরূপ অতিথি-সৎকার করে ছিল, যােগ বলে অসংখ্য বানর ও রাক্ষসের মনােমত খাদ্য বাসস্থানাদি দিয়েছিল, ঠাকুরের ইচ্ছায় মণিপুরেও সেইরূপ গাড়া গাড়ী ভারে ভারে দ্রব্য সব অবিরাম আসছে।

গুরু প্রসাদ। আজ প্রায় ৪৫ বৎসর পূর্বে উৎসবকালীন এক বিভ্রাট উপস্থিত হয়, গ্রামস্থ এক ব্রাহ্মণের জমিতে কুমড়া কাকুড়, চেলো প্রভৃতি তরকারি ছিল, উৎসবকালীন ঐ ব্রাহ্মণই সব আনাজ সরবারহ করবেন, এই ব্যবস্থা থাকে, অবশ্য আমরা ক্রয় করে নেবাে, কিন্তু উৎসবের পূর্বদিন ঐ ব্রাহ্মণের বিবাহ সম্বন্ধ স্থির হয়ে যায়, সেইজন্য তিনি তার নিজের চাযের জিনিষ আর বিক্রয় করবেন না। আমাদের নিকট প্রকাশ করলে। আমরা কিংকর্তব্য- বিমূঢ় হয়ে পড়লাম, ঠাকুরও একটু চিন্তিত হলেন, স্থির সমুদ্রে চিন্তা-তরঙ্গ উঠল, এমন সময় আশ্রম বাহিরে গাড়ীর শব্দ পাওয়া গেল, ঠাকুর বল্লেন দেখ ত কে এল। গিয়ে দেখা গেল, সে সব গাড়ী মাত্র কুমড়া চেলাে, কঁাকুড়ে বােঝাই ! জয় কুর! আনন্দের আর সীমা নাই,সু- শৃঙ্খলে কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হ'ল; পরে জানা গেল,একজন কোনও বিপদে পড়ে ঠাকুরকে জানিয়ে ছিল, যদি এই বিপদ হতে উদ্ধার পাই তাহলে আপনার উৎসবের খরচের জন্য যাব- তীয় তরকারী আমি দেবাে, ঠাকুরের ইচ্ছায় বিপদে উদ্ধার পেয়েছে, তাই খানিকটা জমীতে ঠাকুরের জন্য ঐ সব তরকারী চাষ করেছিল,উৎসব সমাগত জেনে পাঠিয়েছে।

ঠাকুরের সংযম।
আর এক বৎসর উৎসবকালীন এক উন্মত্ত ব্রাহ্মণ
সংকীৰ্ত্তন মধ্যে প্রবেশ করে উদ্দাম নৃত্য আরম্ভ করলেন,
ঠাকুর সে সময় ঘর হতে বেরিয়ে দুয়ারে আসন ক'রে
বসেছেন। (এটি রাত্রিকালের ঘটনা) হঠাৎ ঐ ব্রাহ্মণ
নাচতে নাচতে ঠাকুরের দিকে এল,ঠাকুর হাস্যমুখে ব'সে
ব্রাহ্মণের গতিবিধি দেখছেন, ব্রাহ্মণ নাচতে নাচতে
ঠাকুরের মাথায়,খুব জোরে ২ চাপড় মেরে দিলে,আরও
মারূবে উদ্দেশ্য,ঠাকুর তার হাত ধরে ফেল্লেন, সেই মুহূর্তে
প্রায় পঞ্চাশ জন যুবক, উন্মত্তের ন্যায় ঐ ব্রাহ্মণকে মারতে
দৌড়াল, কিন্তু কৃপাসিন্ধু ঠাকুর ঐ ব্রাহ্মণকে নিজের বুকের
মধ্যে চেপে ধ’লেন, কেউ যেন তাকে মারতে না পারে।
সকলে ঠাকুরের ইচ্ছা বুঝে নিরস্ত হ’ল : ঠাকুর ব্রাহ্মণকে
সঙ্গে নিয়ে আশ্রমের বাহিরে গেলেন এবং ঐ ব্রাহ্মণকে
মিষ্টবাক্যে সান্ত্বনা ক’লেন,ব্রাহ্মণের অসাক্ষাতে আমাদিগে
বল্লেন, ঐ ব্রাহ্মণ বড় ভক্ত, আমাকে বড় ভালবাসে,
আমার সংযম পরীক্ষার জন্য এই ঘটনা ক'রেছে ।
একটু পরেই দেখলুম, ঐ ব্রাহ্মণ ঠাকুরের পা ধরে
কাদতে লাগলেন, সে রােদনে পাষাণও গ'লে যায়, যারা

গুরু প্রসাদ।
মায়ূতে গেছল, তার কান্না দেখে তারাও কেঁদে ফেল্লে,
আমি অবাক। এক ইন্দ্রজাল, ধন্য ঠাকুর এর নাম
সংযম। জানি মা ঠাকুর তুমি কে?
সত্যের নিকট মিথ্যার দাসত্ব।
গত বৎসর উৎসবকালীন আমি আমার আশ্ৰম হ'তে
বেরিয়ে চন্দ্রকোণা রােডে পৌছালাম। পূজনীয় সাধক
অধরাদ গােস্বামীর সহিত সাক্ষাৎ হ’লতিনি আমায়
আদর করে খানিকটা দৈ খাইয়ে দিলেন, তার ইচ্ছা
তঁার সঙ্গে আমায় মেদিনীপুর নিয়ে যান, কিন্তু আমি
ঠাকুর দর্শনে যাচ্ছি, দেহান্ত হলেও আমার প্রেতাত্মা
মণিপুর যাবে, কাজেই গোঁসাইজীর আদেশ পালন
হ’ল না, একটু পরেই পশ্চিমের গাড়ী এলাে, গাড়া থেকে
কয়েকটি গুরুভ্রাতা আমায় ডাকছে দেখতে পেলাম,
গাড়ী থামতেই তারা আমায় ধরে নিয়ে তাদের গাড়ীতে
গেল, কথাবার্তায় আমরা বাঁকুড়া পৌছালাম, সেই
মুহূর্তেই রওনা হয়ে পরদিন বেলা প্রায় ৮টার সময়
মণিপুর পোঁছালাম। ঠাকুর খুব খুসী, স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে
বলুন, যাও সব স্নান ক'রে এসাে, নাম আরম্ভ হবে।
ছােট সত্যানন্দ এসে পৌছাল, এক সঙ্গে স্নান করে
এলাম। নাম আরম্ভের ভার আমার উপরে ছিল, নাম
আস্ত হয়ে গেল। হঠাৎ কোথা হতে এক উন্মত্ত। ভৈরবী
এসে সংকীৰ্ত্তন মধ্যে প্রবেশ ক'ল্লে, চুল এলো থেলো,গায়ে

রুপ্রসাদ।
কাপড় নাই শূন্য দৃষ্টি, সকলেই অবাক; কিন্তু আমি যে
সময় বারভূম বেড়াইতে যাই, তখন ঐ ভৈরবীকে দেখে-
ছিলাম, পরিচয়ও হয়েছিল, ভৈরবী জানে না আমি
ওখানকার লােক, কিছুক্ষণ পরেই মহাপ্রভুর ভােগের
ব্যবস্থা হ'ল, নিবেদন হবার পূর্বে ঐ ভৈরবী জোর
ক'রে খানিকটা ভােগ নিয়ে ঠাকুরের ঘরে ঢুকল,ঠাকুরকে
ধরলে তােমায় খেতে হবে, আমি খাইয়ে দেবাে।
সাধারণ লােকের সমক্ষে, বিশেষতঃ ভােগ নিবেদনের
পূর্বে এক অপরিচিতা রমণীর হাতে কিরূপে খাবেন,তাহলে
সমাজে ব্যভিচার করা হয়। এদিকে সাধারণ লােকের
মধ্যে একটা জল্পনা কল্পনা চলছে যে মহাসিদ্ধা ভৈরবী,
ঠাকুরকে পরীক্ষা করতে এসেছে, এখন ঠাকুরকে না দেখে
সকলে ভৈরবীর দিকেই চেয়ে আছে। যদিও আমার দেখতে
অসহ্য হচ্ছে,কিন্তু কি করি,ভৈরবীর অভিনয়ে সকলে মুগ্ধ ;
ভৈরবী ঠাকুরের ঘরের মধ্যে গিয়ে আসন ক'রে ব'সেছে,
কোন কথার উত্তর দেয় না, একদৃষ্টে ঠাকুরের দিকে চেয়ে
আছে। শুনতে পেলাম ঠাকুর বলছেন, এ ত কাঠ খড় নয়
মা! যে পুড়িয়ে দিবি। কেন একটা অভিনয় করে শান্তি
নষ্ট করছিস। ভৈরবী নিরুত্তর, ঠাকুর আমায় ডাকলেন,
আমি গেলাম। ঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন ব্যাপার কি? আমি
বল্লাম অভিনয় ; ঠাকুর বল্লেন ‘তা বুঝেছি, এখন উপায়
কি ?তুমি না হয় বাপু ওর হাতে দুটি খেয়ে ওকে ঘর থেকে
;

গুরুপ্রসাদ। বের করে নিয়ে যাও, তুমি খেতে পারবে ত ? আমি বল্লাম আপনার শান্তির জন্য আমি নরকেও যেতে পারি। আমি ভৈরবীর কাছে গেলাম, ভৈরবী চোখ বুজিয়ে ধ্যান- মগ্নার মত বসে আছে ; আমি বল্লাম একবার চোখে চেয়ে দেখ,ভৈররী কথা শুনলে না,আমি একপ্রকার জোর করেই তাকে চাওয়ালাম এবং বল্লাম,আমি ঠাকুরের ছাত্র,উনি আমি ভিন্ন নয়,আমায় খাইয়ে দাও,তাহলেই ওঁকে খাওয়ান হবে। ভৈরবী আমার মুখ দেখে একটু দোমে গেল। ঠাকুরের ইচ্ছায় আমার কথামত কাজ ক’বুলে। বহু কষ্টে ভৈরবীকে ঘরের বাহিরে নিয়ে এলাম, গোপনে অনেক বুঝালাম, কেন এমন অশান্তি কবুছ ? তখন ভৈরবী বল্লে উনি আমায় শান্তি দেন না কেন? আমায় শান্তি না দিলে আমি ছাড়ব না। সে দিন গেল, আবার ধুলাটের দিন ভৈরবী ধ’লে, ঠাকুর তােমায় ধুলাট ক'ৰ্ত্তে হবে,এই বলে ঠাকুরের ঘর ঢুকে কান্না আরম্ভ করলে। ভীষণ কান্না কিছুতেই থামে না,কি করবেন,ঠাকুর ভৈরবীর সঙ্গে ভীষণ সংকীৰ্ত্তন স্রোতে ঝাঁপ দিলেন। ভৈরবী যত ধূলামাটী নিয়ে ঠাকুরের মাথায় দিতে লাগল, ঠাকুর উদ্ধ-নেত্র, কোনও দিকে লক্ষ্য নাই, লােক সবে মানতে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে, একে ঠাকুর গেছেন, তার উপর ভৈরবী আছে। মানুষের উপর মানুষ পড়তে লাগল,মারা যাবার উপক্রম। ঠাকুর ঘটনা দেখে নিজেরঘরে ফিরে এলেন, উৎসব সমাধা হ’ল। পরে দেখলাম ভৈরবী আর সেরূপ

নাই; সে স্থির হয় ।
'! আশ্রমের কাজক
ক’রছে, যেতে বল্লে --.। '। এ যাব না, কাঁদে। আমরা
উৎসবান্তে চলে এলাম,ভৈরবী রইল । কিছুদিন পর দেখি,
ভৈরবী আমার কুটীরে এসেছে,আমাদে: নিত্যানন্দ আশ্রমের
নিদর্শন লোহার বালা হাতে আছে, আর একটি ঠাকুরের,
“ফটো” বুঝলাম ঠাকুর তাকে দয়া করেছেন। একমাস
প্রায় এখানেছিল, পরে আমি মৌনব্রতী আছি বলে
চলে গেল, আমিমনে মনে বল্লেম “ঠাকুর! সত্যের
প্রভাবে মিথ্যার মাথা আপনি নুয়ে পড়ে !”

স্বভাব।
ভক্ত সঙ্গে ঠাকুর।
ঠাকুর। বাপ, সব! চরিত্র গঠন কর, স্বভাবী হও,
তার একটি নাম “স্বভাব” স্বভাবী না হলে তাকে পাওয়া
যায় না। মাত্র আসন মুদ্র মন্ত্র যন্ত্র শিখলে কিছু হবে না,
যদি স্বভাবে গলদ থাকে। মনে কর আমি সাধু, তােমার
বাড়ী অতিথি হ'লেম, বহু শাস্ত্র আলােচনা করলেম,
যচক্র ভেদের প্রণালী বুঝলাম, আর ভােরে উঠে
তােমার কম্বলটা বগলে ক'রে স'রে পড়লাম, কেমন
সাধু বুঝ দেখি ? বিকারেই লােক ভুল বকে, বিকার
কাটলে যা ছিল তাই, অষ্টাঙ্গ যােগ ঐ বিকারের ঔষধ।
বিকার কাটার নামই স্বভাব, কোটী জন্ম যােগ যাগ
তপস্যা নাম কীর্তন করলে কিছু হবে না, কিন্তু স্বভাবী
হয়ে একবার ডাকলেই সে ডাক তার কাণে পৌছায়।
বাপ, মনোজয় করতে হবে। মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন,
রাজা করে রাজ্য বশ যােদ্ধা করে রণ জয়ী,
আপন মনকে বশ করে যাে সবসে সেরা
দেখ বাপ! বায়ুর আঘাতে জল ন'ড়ে গিয়ে যেমন
v

গুরুপ্রসাদ।
তরঙ্গ উপাধি পায়, তেমনি বাসনা-বায়ুর আঘাতে আত্মার
একাংশ নড়ে গিয়ে মন উপাধি পায়। বায়ু স্থির হলে জল
স্থির হবে।
তখন যে জল সে জল। তেমনি বাসনা বায়ু
খামলেই মন উপাধির নাশ, তখন নিষ্কম্প দীপশিখার ন্যায়
অবিকৃত আত্মা! তারই নাম স্বভাব। সঙ্গ কোর্যে
হবে, স্বভাবীর সঙ্গ, যার সঙ্গ করবে তারই সাম্য পাবে,
কিন্তু স্বভাবী ত জগতে খুব কম । নিজের মধ্যে খুঁজে
বের করতে হবে, দেখ শ্বাস প্রশ্বাস কোনও কামনা নিয়ে
উঠছে মা পড়ছে না, তুমি যতই অন্যমনস্ক হও ওর ভুল
নাই। তা হলে বায়ুর সঙ্গ কর, সৎসঙ্গ করা হবে, স্বভাবীর
সঙ্গ করা হবে, তাকেই শাস্ত্রে বলে “কেবল গে”।
কলির জীবের পক্ষে এমন সহজ সুগম পন্থা আর নাই,
যােগী ভােগী রােগী ত্যাগী সংসারী শ্রমজীবী সকলেই
করতে পারে, কোনও কাজ পণ্ড হবে না। নাম মন্ত্র ঐ
শাসে প্রশ্বাসে জপ করতে হবে, তার নাম মনে প্রাণে
ঐক্য করা। কেউ কেউ বলেন, হেলায় নাম করলেও
উদ্ধার হবে, তাহ'লে বাপ! ঐ ফণণাগ্রাফ গুলা উদ্ধার
হ'য়ে যেত! তারাও ত নাম করে গাে? মহাত্মা তুলসী
দাস বলেছেন,
মাল ত করমে ফিরে জীব ফিরে মুখ মাহি।
মনুয়া ত দশ দিশ ফিরে উত সমরণ নাহি।

এ প্রস।
তবে স্মরণ কাকে বলে ?
অজপা সমরণ হােত হায়,
কহে সন্ত কি এহি ঠোর
কর জিহবা সমরণ করে,
উ ত মন কি দৌড়।
অর্থাৎ হাতে মালা মুখে নাম আর মন দশদিক ঘুরে
বড়াচ্ছে, একে স্মরণ বলে না, অজপার দ্বারায় যে স্মরণ
তাকেই প্রকৃত স্মরণ বলে। ঠাকুর ভাবে গর গর হইয়া
গাহিতে লাগিলেন,
মন ভাব কাশীনাথে, বসি কর্ণিকাতে,
দ্বিদলেতে কর ধারণা ;-
গুরু বাক্য রাখ, মধ্যেই দেখ,
বিরাজ করিছে সে জনা।-
মনপ্রাণ আর স্থির করে আঁখি,
জপ উল্টা নাম উল্টা নেত্র রাখি,
রত্নাকর পাপী, হইল বাল্মীকি-
এমনি নামের মহিমা।
জপিতে জপিতে উল্টা সােজা হয়,
জপিলে পাইবে কথার নির্ণয়,
ভেবে পাগলা কয়, (হলে) তিনে তিন লয়,
একমাত্র রয় সে জনা ।
ক

প্রসাদ।
জন
(গীতান্তে আবার বলছেন)
পু। ইন্দ্রিয়দের রাজা মন, মনের রাজা প্রাণ,
প্রাণ স্থির হ'লে মন আপনি স্থির হবে, অর্থাৎ মনের
লয় হয়ে যাবে,
( সমালোচনা )
ছােঃ সত্যানন্দ। এস ভাই, আমরা ঠাকুরের কথা
কটা সমালােচনা করে দেখি, বুঝবার সুবিধা হবে।
স্বভাবী মানে কি? যে আপন ভাবে আপনি থাকে,
যেমন চন্দ্র, সূৰ্য্য বায়ু আকাশ ইত্যাদি। কারও আশঙ্কায়
বা আনুরােধে কাজ করে না, সকলের মধ্যে আছে, অথচ
নির্লিপ্ত! নিলা বন্দনায় বিচলিত হয় না, হর্ষ বিষাদ,
সুখ দুঃখ, দয়া, ক্রোধ, কর্তব্য, অকৰ্তব্য, কিছুরই ধার
ধারে না, কিছু ক’ছি ব'লেও ভাবে না, ক’রুবে না
বলেও সংঙ্কল্প করে না, তারি নাম স্বভাব বা তারই
নাম স্বভাবী। যেমন নিদ্রিত ব্যক্তির নিকট নিন্দা বন্দনা
যাই কর, সে বিকৃত হয় না, আমাদিগে ঠাকুর সেইরূপ
স্বভাবী হতে বলছেন, আর হবার উপায় বলছেন,
প্রাণের সঙ্গ করা। তা ভাই ঠাকুরের কৃপায় যতটুকু
জেনেছি, বৃত্তিরােধের এমন উপায় ত আর নাই । মনই ত
নব নব বৃত্তির জন্মদাত, আর তাদের প্রতিপালক হচ্ছে
প্রাণ, অর্থাৎ প্রাণের সাহায্যেই সমুদায় বৃত্তির প্রকাশ

গুরু প্রসাদ।
১৭
হয়, তাহলে মন যদি প্রাণে মিশে যায়, আর চিন্তা কি ?
“পূৰ্ণানন্দ” গীতায় ভগবান্ অনক উদ ৫
দিয়েছেন, যে কঠোর অভ্যাস আর তা
বৈরাগ্যের সাহায্যে বায়ুর ন্যায় দুর্ভোর
মনও বশ্যতা স্বীকার করে। ঠাকুরের একটি
গান আছে গুরুদাস দাদা একবার গা ।
গীত।
স্বভাবেতে অভাব রবে না, কর স্বভাবের সাধন,
স্বভাবের ভাবী না হলে, অভাব কভু যাবে না ।
থাকরে আপন স্বভাবে, স্ব ভাবে সকলি পাৰে,
দশে না এলে স্ব ভাবে, সে ভাব পাবে না।
যত যা দেখ বাহিরে, সবি আছে আপন ঘরে,
ভাৰ ভিতৰুে।
মিলবে স্বতন যত্নে কর স্ব ভাব সাধনা।
স্বভাবতে হ'য়ে পাল
স্বভাবে হরি হরি বল,
স্বভাব-স্বরূপ সম্বল শমন ছোবে না।
ভাই অভ্যাসের অচলা শক্তি, এমন কি অভ্যাস কাকে
স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়, অভ্যাস ত্যাগ কর, সব
ছেড়, অভ্যাস ছেড় না।

স্মরণ মনন।
খড়ের ধার।
পরমানন্দ, বড় সত্যানন্দ, ছােট সত্যানন্দ, ভক্তদাস,
গুরুদাস, রাঘবানন্দ,সেবানন্দ, জ্ঞানদা, আশুতােষ প্রভৃতি
ভক্ত সঙ্গে ঠাকুন। ঠাকুর আপন মনে গাহিতেছেন।
গীত।
আমার বলিতে যাহা কিছু আছে সকলি চরণে সঁপিও।
সদা স্মরণ মননে রহিও।
প্রাণ যায় যা থাকে থাক, কত এলো গেল লাখে লাখ,
যাহার অভাবে সব ফাঁকে ফাঁকি,
সে জনারে সদা ভাবিও।
বল কেবা আছে কার, কেবা পর আপনার
যিনি হুঁসাতে কঁাদাতে, মারিতে রাখিতে,
তাহারে সতত ডাকিও।
ভেবে পাগল কহিছে সার, উপায় নাহিরে আর,
শয়নে স্বপনে, জনমে মরণে, সেই বিভু গুণ গাহিও ।
ওরে যে যার স্মরণ নেয়, সে তাকে রক্ষা করে, মহাত্মা
তুলসীদাস বলেছেন,
যে যাকে স্মরণ লেখা হয়,
সাে তাকো রাখে লাজ।
উলট জলে মছলি চলে,
বহি যায় গজরাজ, ॥

শুরু প্রসাদ। ১৯ দেখ, নদীতে যত বড় স্রোত হ’ মাছ জলের শরণা- গত বলে, তার অবাধ গতি, কিন্তু হাতী ভেসে যায়। একটা গল্প শুন,- একদিন মহাত্মা কবীর ভিক্ষায় বেরিয়েছেন,-পথে কতগুলি ব্রাহ্মণের সঙ্গে দেখা হ’ল, তারা জিজ্ঞাসা কবুলেন বাপু! কবীরের আশ্রম কোথা বলতে পার? কবীর বল্লেন কেন প্রভু! সে নীচ জাত, ভিক্ষা করে খায়, তার সঙ্গে আপনাদের দরকার কি? ব্রাহ্মণের। বল্লেন নাহে বাপু ! কবীর মস্ত বড় সাধক হয়েছে, খুব যােগশক্তি লাভ করেছে, শুনি তার আশ্রম থেকে কেউ অভুক্ত ফেরে না, তাই আজ আমরা তার আশ্রমে অতিথি কবীর ভাবলে, সৰ্ব্বনাশ, এই মুহূর্তে এতগুলি ব্রাহ্মণের খাবার আমি কোথা পাব ? কাজেই আত্ম- পরিচয় না দিয়ে বল্লে যান ঠাকুর ! ঐ সামনে তার কুটীর, বেশী দূর নাই। নাই। (ব্রাহ্মণেরা অবশ্য কবীরকে পরীক্ষা করতে যাচ্ছে) কবীর অন্যদিকে চল, মনে শান্তি নাই, সামনে ব্রাহ্মণ অতিথি দেখেও তাকে আত্ম-গােপন করতে হ’ল ! দুঃখের সীমা নাই, চখে জল এল, আর ভিক্ষায় গেল না, একটি গাছতলায় বসে, নিজের জন্যে ধিকার দিয়ে কাঁদতে লাগল, ভাবছে আমায় কুটীরে না দেখে এই রৌদ্রে ব্রাহ্মণেরা ফিরে যাবেন। আমার ইহ, পরকাল সব গেল। এখানে ভক্তবৎসল ভগবান, অস্থির গুরু প্রসাদ। হয়েছেন, ভক্তের চ'খে জল পড়েছে, চঞ্চল হয়ে পড়ে ছেন, চিন্তা করে দেখলেন, তার প্রাণের ভক্ত কবীর অতিথি বিমুখ হবার ভয়ে কঁদছে, আর থাকতে পালেন , সত্বর কবীর মূর্তি ধারণ করে কবীর-আশ্রমে এসে বললেন। ব্রাহ্মণেরা গিয়ে উপস্থিত হলেন। ছদ্মবেশী কবীর শশব্যস্তে বল্লেন আসুন, আসুন, দাসের কি সৌভাগ্য । আশ্রম পবিত্র হলো, मौन কৃতার্থ হ’ল। তখনি জল নিয়ে ব্রাহ্মণদের পা ধুইয়ে দিলেন,ব’সতে আসন দিলেন,আহারের উদ্যোগ করে দিলেন, যিনি বিশ্ব-ভাণ্ডারী! সামান্য কয় জন ব্রাহ্মণ ভােজনের জন্য তার আর চিন্তা কি ? ব্রাহ্মণের পরিতােষরূপে ভােজন করে, ধন্য কবীর! ধন্য কবীর !! ব’তে ব’তে গৃহে ফিরছেন, পথে আবার কবীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ব্রাহ্মণেরা অবাক, এইমাত্র কবীরকে আশ্রমে দেখে আছেন, সম্মুখে আবার কবীর ? ব্রাহ্মণগণ ভাব- লেন, তা হতে পারে, একই মূৰ্ত্তির দুজন মানুষ অনেক দেখা যায়। কবীর জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন প্রভু! কবীর কিরূপ অতিথি সৎকার ক'লে ; ব্রাহ্মণেরা আনন্দে বলেন, ধন্য, ধন্য, এমন পরিতৃপ্ত জীবনে হই না। কবীর অবাক, হাত জোড় করে ব’ছে, প্রভুরা কি দাসকে বিদ্রুপ ক’রূছেন? এই ত আপনাদের দাস কবীর, আপনা- দের সম্মুখে, আমিই ত যাবার সময়, আপনাদিগে আশ্রম- গত দেখেও অক্ষম ব'লে আপন পরিচয় গােপন করে- প্রসাদ। ২১ ছিলাম, তবে কে আপনাদের অতিথি সৎকার করলে দেব। ব্রণেরা বলে দূর পাগল ! এইমাত্র কবীর আমাদের সন্তোষের সহিত ভােজন করালে, আর তুমি কি বলছ। তখন কবীর চীৎকার করে কাঁদতে লাগল, বল্পে ঠাকুর। তা নইলে সংসারের সকল সুখ বিসর্জন দিয়ে সাধু কি তােমার নাম নিয়ে থাকতে পাত! যাে করে, সে হার করে, কহে ত কবীর কবীর। ব্রাহ্মণগণ ঘটনা বুঝতে পেরে, কবীরের পদধারণে উদ্যত, বলে আমাদের ক্ষমা কর, আমরা তােমাকে জব্দ ক’ বলে এসেছিলাম। কবীর ব্রাহ্মণদিগে সান্ত্বনা করে বিদায় দিলেন, ঠাকুর গাহিতে লাগিলেন- হে অনাদি অনন্ত অপার, বর্ণিতে স্বরূপ সাধ্য আছে কার। তুলনা উপমা জগতে মেলেনা, তুলনা উপমা পার ॥ তুমি বিশ্বরূপ বিশ্ব-মূলাধার, তােমাতে উৎপত্তি অখিল সংসার, মিথ্যা সমুদয় অহং ইত্যাকার তােমাতেই স্থিতি লয় আবার ভূ-ভুবঃ-স্ব-মং-জন-তপ, শুদ্ধ সত্য তুমি তােমারি স্বরূপ শব্দ-স্পর্শ রূপ গন্ধ-রসকূপ তােমাতেই প্রকাশ মহিমা তােমার। আদি মূলবর্ণ বর্ণমালা তুমি তুলনা উপমা তোমারি হে তুমি তুমি ব্ৰহ্মা বিষ্ণু হর শূলপাণি তােমাতেই তুমি ওহে সারাৎসার ।

কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি। ভক্ত সমভিব্যাহারে ঠাকুর স্থান-আশ্রম কুটীর । ভক্তদাস, গুরুদাস, সত্যানন্দ, পরমানন্দ, প্রভৃতি। পরমানন্দ। আচ্ছা বাবা! বৈষ্ণব বাবাজীরা বলে, যে আমাদের কর্ম নিষেধ, আমরা কর্ম মানি না। ঠা। বাপু! কাজ ফুরালে সে আর আসরে থাকে ! যাত্রায় দেখিনি, যার যতক্ষণ কাজ আছে, তাকে আসরে থাকতেই হবে, কাজ ফুরালে, অমনি পােষাক খুলে বাসায় চল্ল। এটা কৰ্ম্মক্ষেত্ৰকৰ্ম্ম শেষ হলে এখানে থাকবার যাে নাই, তুমি কৰ্ম্ম ক’ব না মনে করলেও তােমার মন কৰ্ম্ম কবে, আর ক'ব, ক’ব না, ও দুটোই যে কৰ্ম্ম। কাদা মাখাও কৰ্ম্ম, ধুয়াও কৰ্ম্ম। ক’বার ইচ্ছা, আর না করার ইচ্ছা, উভয়েই সঙ্কল্প চাই। বাপ। নাম করাও কৰ্ম্ম, চিন্তা করাও কৰ্ম্ম, শ্বাস- প্রশ্বাস গ্রহণ-ত্যাগও কৰ্ম্ম, কৰ্ম্মই যে জন্মান্তর গ্রহণের বীজ রে। প। দেখুন বাবা। বৈষ্ণবরা জ্ঞানী বা কৰ্ম্মী দেখলে কাছ দিয়ে চলে না, মাতাল দেখলে গুলিােের যেমন পালায়, তেম্নি ভাবে সরে যায়, বলে ভক্তি নষ্ট হবে।

গুরুপ্রসাদ। ঠাঃ। ওটা তাদের বুঝবার ভুল, ভগবানকে যে সাধন ক’রুতে হয়, এটা ত জ্ঞানের সাহায্যেই জেনেছে, গুরু যা উপদেশ দেয়, বিবেকের সাহায্যেই ত বুঝতে হয়, আর জ্ঞানকে মানি না, জ্ঞান মার্গে গেলে ভক্তি নষ্ট হবে, এও যে জ্ঞানের সাহায্যে জেনেছে, তাহলে জ্ঞান চাই। আর কৰ্ম্ম, দেখ কৰ্ম্মের সাহায্য ভিন্ন গুরু-আদেশ পালন করা যায় না, জাগ্রৎ, স্বপ্ন, সুষুপ্তি, তিন অবস্থা- তেই কৰ্ম্ম বর্তমান, আর ভক্তির অনুষ্ঠান করতে হলেও কম্মের দ্বারাই অভ্যাস করতে হয়, তা হলে কৰ্ম্ম ছেড়ে থাকা যায় না। তার পর ভক্তি, আচ্ছা ভক্তি না এলে, সে সাধন করবে কেন ? আগে উপাস্যের উপর ভক্তি এসেছে, তার পর উপাসনার অনুষ্ঠান, তা হ'লেই বুঝ, জ্ঞান কৰ্ম্ম ভক্তি, কেউ কাকেও ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। জলেতে, চিনিতে, নেবুতে মিশালে যেমন পবিত্র পানীয় হয়, তেমনি জ্ঞান, কৰ্ম্ম, ভক্তিতে মিশিয়ে, চরিত্র খানিকে গড়ে তুলতে হবে। যিনি প্রকৃত বৈষ্ণব, তিনি এ তত্ত্ব অবগত আছেন, তিনি কাকেও ঘৃণা করেন না, মাত্র অজ্ঞানী গোঁড়া গুলা ঐরূপ ব’কে মরে, এই বিশ্বটাই যােগে চলেছে, সেও জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত যােগের সাহায্যেই বেঁচে আছে। তার জন্মটাই একটা যােগ, শুক্র- শােণিতে যােগ হয়ে তবে জন্মেছে, অথচ যােগী দেখে ঘৃণায় নাসিকা কুঞ্চিত করে, জ্ঞানের সাহায্যে বেঁচে আছে,

গুরুপ্রসাদ।
মা, বাপ, পত্নী, পুত্র জ্ঞানের সাহায্যেই চিনেছে, বিষ্ঠা,
চন্দন, আগুন, জল, লাভ, লােসান, আলো আঁধার,ভাল,
মন্দ, প্রতি পদক্ষেপটি জ্ঞানের দ্বারাই বিচার করে ক’বুতে
হচ্ছে, নইলে ব্যাটা কোন দিন মরে যেত,তবু বলে জ্ঞানীর
সঙ্গ করব না, স্নান করে আরসী নিয়ে বসে গােপী-চন্দন
গুলে,গােল, লম্বা, তিন কোণে, চার কোণে দো ফোঁকড়া,
তে ফেকড়া তিলক সেবা করছে, যা ছমাস হাত সাধলে
তবে ঠিক হয়, ঝুলির মধ্যে হাত গলিয়ে একটি করে মালা
সরান, তার সঙ্গে নাম বলা, আর একটা মালায় গণনার
সংখ্যা রাখা; সেই সময় দাতা-ভকত এলে তার খাতির
অভ্যর্থনা করা, এক চোরের খাটুন খাটছে, অথচ বলবে
আমরা কৰ্ম্ম মানি না, নৈলে বাপ! সাধক মাত্রেই যে
বৈষ্ণব। সাধক অবস্থায় সকলেই শাক্ত, ভগবৎ কৃপা লাভ
করলেই বৈষ্ণব, যিনি জ্ঞান কৰ্ম ভক্তিবিনের
সম্মিলন করেছেন, তিনিই ত্রিবেণী-
সঙ্গমে নিত্য স্নান করছেন। তিনিই প্রকৃত
বৈষ্ণব, তার চরণে কোটী কোটী প্রণাম, তিনি আমার
প। আচ্ছা বাবা ! বাইরে বরং বেশ থাকি, কিন্তু
একটু ধ্যান ধারণা করব বলে স্থির হয়ে বসলেই যত
চিন্তা তখনি এসে জুটে, এর কারণ কি বাবা?
ঠাঃ। বাপু। মটা কিরূপ জান, যেন একটি লম্বা

গুরু প্রসাদ।
२०
দড়িতে একটা লােহার বল বাঁধা আছে, ধাক্কা দিয়ে
দুলিয়ে দিলে, ধাক্কার জোর না কমা পর্যন্ত দুলবে, জোর
কমলেই আপনি থামবে, তুমি গােটা দিন তাকে ধাক্কা
দিয়ে দুলাচ্ছ, তারপর ঘরে গিয়ে ধ্যান করতে বলে,
সে থামবে কেন? অপেক্ষা কর, ধাক্কার জোর কমুক, তবে
ত থামবে। লাইনে ঠেলা গাড়ী দেখেছিস ? (অর্থাৎ ট্রলী)
খানিকটা ঠেলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিলে, সেই জোরে
কতকদূর চলে যায়, তার মধ্যে তাকে থামাতে হলে
ব্রেক্ ক’সতে হয়, অর্থাৎ যুক্তির সাহায্যে থামাতে হয়।
যােগশাস্ত্রে সেরূপ ক্রিয়া আছে, তার নাম “উড্ডীয়ান
অবরােধ”, সেটা ঐ ব্রেক কসা,কিন্তু সেটাও গায়ের জোরে,
যেমন ছোঁদে গাই দোয়া, দাড়িয়ে দুধ দেয় না বলে ঐ
ব্যবস্থা, যদি দাড়িয়ে দেয়, তার তুল্য মজা নাই। স্বভাবে
যাক, দাঁড়িয়ে দুধ দেবে। ঠাকুর গাহিতেছেন—
উপদেশ আর শুবি কিরে ভাই--
প্রথম ভাগ কি মনে নাই ?
মিথ্যা তুল্য পাপ, সত্য তুল্য যে তপস্যা নাই।
যেজন আছে সত্য পালনে,
কাজ কিরে তার অন্য সাধনে,
সত্য হতে পায় সে সত্য সনাতনে -
ভূ-ভুব স্ব-মহ-জনতপ সকল ফেলে সত্য ভাই।

গুরুপ্রসাদ।
সত্য যেজন করেছে আশ্রয়,
সতত আনন্দে রয়, সে হয় না নিরাশ্রয়,
পায় অন্তিমে শ্রীপদে আশ্রয়,
পাগলা কয় বলেছেন গুরু গোঁসাই ॥
ঠাঃ। বাপু। বাইরে সাধু সাজা বেশী কথা নয়,
এক পয়সার রং নিয়ে কাপড়গুলি রাঙ্গিয়ে নাও,
নিজের চুল দাড়ি, না কাটলেই হ’ল, কোনও কৈফিয়ৎ
নেই, তার উপর একটা চিমটে, আর গাঁজায় দম
দিতে পারলেই বাস, মস্ত বড় সাধু। বাপু! আজকাল
যদি কোনও লােক দেখে, সাধু গ্রামের দিকে যাচ্ছে,
অমনি লাঙ্গল গরু ফেলে ঘরের দিকে দৌড়ায়, ঘটী,
বাটি, বো, ঝি, সামলাতে । কি জানি, সাধু গ্রামে
যাচ্ছে, কি করতে কি করে বসে। আজকাল
ছালা-বওয়া গরুর চেয়ে সাধু বােঝাই নেয় বেশী,
সংসারের যত জিনিষ সাধুর পিঠে, সংসারে যা পাবে নি,
সাধুর ঝােলায় তা পাবে। কি বলব বাপ! জগতের কাছে
সাধুসাজা বেশী কথা নয়। নিজের কাছে সাজাই গােল।
কারণ মনের অগােচর পাপ নাই। পাপ পুণ্য যাই কর,
তুমি ত সব জান, তােমার বিবেক যখন তােমায় সাধু
ব’লবে, তখন তুমি প্রকৃত সাধু। গুরুদাস একটি গান
কর বাপ।

গুরুপ্রসাদ।
গীত।
ভিতর বাহির সমান কর আগে,
তত্ব পাবে তবে সে জনার।
মনে যা ভাব মুখে তা বল,
কথায় কাজে হক এক আকার ।
সে সত্যের ভাল, মিথ্যার মন্দ, বিচ্ছেদে বিরহ,
মিলনে আনন্দ, সে যােগীর যুক্তি, ত্যাগীর মুক্তি,
ভক্তের ভক্তি, জ্ঞানীর বিচার।
সে আশার লালসা, ত্যাগের শন্তি,
সংযমে সত্য, চঞ্চলে ভ্রান্তি,
সে এ বিশ্ব যন্ত্রের সুনিপুণ যন্ত্রী,
চাঁদের জোছনা, অমার অাধার ।
গুরুদাস বলে যদি দেখ বি তারে,
তবে বাহিরের দেখা ছাড়ি, চল ভিতরে,
আগে ব্ৰহ্মদ্বার ভেদি, উঠ রে সহস্রারে,
মিশে যাবি একাকারে, ফিরিবি না আর।
ঠাঃ।
দেখ বাপ, ভাবের ঘরে চুরি করিসনি, যা
ক’রবি প্রকাশ্যে কবি, এমন কাজ ক’বি যেন গােপন
না ক’রুতে হয়, এমন কথা ব’বি, যেন গােপনে না
ব’তে হয়, মন মুখ এক করে ফেল আর কিছু করিস
বা না করিস।

গুরুপ্রসাদ।
পঃ। বাবা! কৰ্ম্মক্ষয়ের উপায় কি ?
ঠা। কৰ্ম্মই কৰ্ম্মক্ষয়, ঘটী বাটির ময়লা তুলতে
হ'লে তাতে আবার কাদা বালী দিয়ে মাজতে হয়, চালের
কুঁড়া তুলতে হলে আবার তাতে কুঁড়া দিয়ে ছাঁটুতে হয়,
পায়ে কাঁটা ফুটলে, আর একটা কাটা দিয়ে তুলতে হয়,
পরে দুটো কাটাই ফেলে দিতে হয়। তেমনি কর্মের
দ্বারাই কৰ্ম্মের ক্ষয় ক’তে হয় । প্রারব্ধ নীরবে ভােগ
করে যাও, আর সৃষ্টি কর না।
সত্যানন্দ। আচ্ছা বাবা! গতজন্মের ঘটনা আমা-
দের স্মরণ হয় না কেন ?
ঠাঃ। ওরে বহু বস্তা চাপা পড়ে গেছে বলে ! মনে
কর, এক দোকানে, সাবেক দু’বস্তা চিনি থাকতে থাকতে
অাবার এক জাহাজ চিনি আমদানী হ’ল, সাবেক বস্তার
উপরেই হালের চিনির বস্তা সব রাখা হ’লএখন সাবেক
বস্তা বার করতে হলে বহু বস্তা সরাতে হবে ; তেমনি
আমাদের গত জন্মের ঘটনার উপর এ জন্মের বহু ঘটনা
চাপা পড়েছে, সরাতে পারলেই সাবেক ঘটনা বেরিয়ে
পড়বে, তার উপর জন্ম মৃত্যু দুটা ভীষণ ধাক্কা গিয়েছে,
তাতেও কতক ভুল হয়েছে।
ছছাঃ সঃ। আচ্ছা বাবা, ধৰ্ম্ম জগতে এত মতভেদ
কেন ?
ঠাঃ। ধৰ্ম্ম জগতে ব’লনি, অজ্ঞানের জগতেই যত

গুরুপ্রসাদ।
মত ভেদ। মাত্র বােঝবার ভুল, যারা ধর্ম নিয়ে বিবাদ
আরম্ভ করেছে, ধর্ম সাধন তাদের উদ্দেশ্য নয়, ধার্মিক
নাম নিয়ে লােকের কাছে পসার জমাবে এই ইচ্ছা। কেউ
কেউ হুজুগেও নেমেছে, যেমন ঐ বন্দে মাতরমের দল।
যারা হুজুগে নেমেছিল, দু এক জনকে ধরে জেল ফাসী
দিতেই তারা একবারে ঘরে ঢুকে মাছের আঁচল ধরে
ব’সল। কিন্তু যারা দেশের অবস্থা দেখে, হিন্দুর পূর্ব
গৌরব স্মরণ করে, প্রাণের টানে নেমেছে, তারা অটল,
শত বাধাবিঘ্নেও তা দিকে উদ্দেশ্য হ’তে টলাতে
পারেনি
ছোঃ সঃ। আচ্ছা বাবা, শাস্ত্রে ধৰ্ম্মের নানা প্রকার
ব্যবস্থা না করে সােজাসুজি একটা পথ করলেই ত
হত ।
ঠাঃ। বাপু? ঐ কারণেই হিন্দুশাস্ত্র সকলের শীর্ষ
স্থান অধিকার করেছে, অবস্থা বা অধিকারী ভেদে ব্যবস্থা
আছে ব'লে, ইথু, ঘণ্টাকর্ণ, কুলকুলতির বার থেকে,
নিগুণ ব্রহ্মোপাসনার ব্যবস্থা মাত্র হিন্দু শাস্ত্রেই আছে,
অন্য ধর্মে সকলের জন্য এক ব্যবস্থা, তােমার ধাতে সহ
হ’ আর না হক। কেমন জানিস্ ? এক কবিরাজ
ছেলেকে মুখ দেখে মৃত্যুর পূর্বে মােণ খানেক হরীতকী
গুড়িয়ে ছেলেকে বলে, তুই ত কিছু শিখলি না, তাের
কাছে যে কোনও রােগী আসুক, এই হরীতকী গুড়া

শুরু প্রসাদ। তাকে দিবি, কিন্তু বাপ, ! হরীতকী ভাল জিনিষ হ'লেও যার পেটের অসুখ হয়েছে, তার পক্ষে ত মৃত্যুর ব্যবস্থা করা হবে ! দেখ, দোকানে যদি সব চোদ্দ আঙ্গুল মাপেরই জুতা রাখা হয়, তােমার পায়ে হক আর না হ’ক নিতেই হবে! না নাও তােমার জুতা পরা হবে না, বল দেখি কি অসুবিধা ! দেখ বাপ! তােমার জল খাবার জন্য একটু মােহনভােগ করে দিলেই তুমি সন্তুষ্ট, কিন্তু দীনে সাঁও- তালের জন্যে যদি সে ব্যবস্থা করা হয়, সে বলবেই ‘কি দিলি হে। চিট্যা চিট্যা মত লাগছে, কাজেই তার জন্য চিড়া, লঙ্কা মুন ব্যবস্থা করূতে হবে। বাপ! সবাই এক জনকেই চাচ্ছে, শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি সকলেই ব’লছে, আমার ঠাকুর সব চেয়ে বড়, তা হলে সব চেয়ে যে বড়, তাকেই সবাই চাচ্চে ত ? অথচ সব চেয়ে বড় দুটা হতে পারে না। তবেই বুঝ, সবাই এক জনকেই চাচ্ছে, কেবল নামে গােল বেঁধেছে, কেউ বলে ব্ৰহ্ম, কেউ কৃষ্ণ, কেউ শিব, কেউ রাম ইত্যাদি। তাহলে নামেই ভুল, মালে ভুল নাই। সেই এক বস্তুই জ্ঞানীর ব্রহ্ম, যােগীর আত্মা, ভক্তের ভগবান, শাক্তের শক্তি, শৈবের শিব, যে যা বলে সব কবুল। ঠাকুর গাহিতে লাগিলেন-

গুরুপ্রসাদ।
একি শক্তি বলে, ত্রিজগৎ চলে, স্ব-ভাবে স্বভাব,
কভু নাহি মিলে, কেন হিংসা দ্বেষ, বুঝিনা বিশেষ
চল পাপ দেশ ত্যজিয়া যাই
মিথ্যা অহং জ্ঞানে দুদিনের তরে,
কোথায় রহিবে বল দুদিন পরে, দেখিলে প্রত্যক্ষ,
গেল লক্ষ লক্ষ, এক বিনা বিশ্বে কিছু যে নাই ।
এস এস সবে ভাই ভাই মিলে,
করি কোলাকুলি নাচি হরি বলে
হাড় অহংকার, বল কেবা কার, মিলায়ে ত্রিতার,
এস গুণ গাই ।
( আগে মানুষ হও)
ছোঃ সঃ। আচ্ছা বাবা! যারা ঘট পটকে ঈশ্বর
জ্ঞানে পূজা করে, তারাই ত সাকারবাদী ?
ঠাঃ। হাঁ সাধারণের ধারণা তাই বটে, কিন্তু বিচারে
দেখ, তারাও নিরাকারবাদী, কারণ, যে প্রতিমাকে তারা
ঈশ্বরজ্ঞানে পূজা করে, পূজার পূর্বে তারি কাঁধে চেপে
চোখ চাকায়, আবার পূজার পরে দুলে বেহারার কঁাধে
চাপিয়ে জলে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেয়, বলে আর ওতে
ঠাকুর নেই। তা হলে বােঝ, তাদের ধারণা, পূজার
সময় ঠাকুর এসেছিল, বিসর্জনের পর চলে গেছে। সে
ঠাকুর দেখতে পাওয়া যায় নি। দেখতে হলে সাধম

গুরু প্রসাদ।
ক’তে হয়। তাহলে তারাও নিরাকারবাদী? বাপু!
ঈশ্বরদর্শনের পূর্বে সবাই নিরাকারবাদী! দর্শন হ'লে
সাকারবাদী, তবে একেশ্বরবাদী হওয়া খুব ভাল। যা
উপাস্য নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার নাই। শুধু তুমি
তুমি বলে ডাকনা! সেকি,তা:নিজে এসে
ব'লে যাবে। আগে মানুষই হওনা, তার পর ত
ঠাকুর! আগে মানুষ, তার পর ব্রাহ্মণ, তার পর দেবতা,
তার পর ঈশ্বর, তার পর ব্রহ্ম, তা না হয়ে আগেই উপাস্য
নিয়ে মাথা ফাটাফাটি ; কেবল কার উপাস্য বড়, কে
পাবে, কে পাবেনি, এই চর্চা। ওরে এমন অধঃ-
পতন জগতে আজও সৃষ্টি হয়নি, যেখান
থেকের্তার কাছে যাবার পথ নেই। ঠাকুর
গাহিলেন।
গীত।
মন তুই ঠাকুর চিলিনে।
দেহ-ঘর দেখে ঘাের, লেগেছে তাের, ঘর ত ঢুকলিনে।
অজপার সনে গােপনে গােপনে কভু ত মিলিনে,
দ্বিদলের মাঝে সে জন বিরাজে বারেক দেখলিনে।
নশ্বরে মিছে ভুলে গেলি মন, স্বরূপ চিলিনে,
উল্টো-নয়নে মিশে মনে প্রাণে, মুরসে ডুবলিনে ॥
দেহ-রথ খান্ চলে কার বলে বিচারে বুঝ, লিনে,

গুরুপ্রসাদ।
কয়টি চক্রেতে চলে রথ খা চালায় কোন্ জনে,
কতজন আছে আদেশে সে কাজে বারেক দেখলিনে।
কেমন এ দেহ রয়েছে কেমনে গড়েছে কোন্ জনে,
মিছে এলি পাগল ভবের মাঝারে বারেক ভাবলিনে।
বাপ! সৰ্ব্বদা বিচারে থাক, প্রতি বাক্য,প্রতি পদক্ষেপ
বিচারে কর। বিচারই জ্ঞানের সােপান, সর্বদা বিচার
কর, সত্য বস্তু কি ? দেহ কি ? জগৎ কি? আমি কে ?
আমার কর্তব্য কি ? যতদিন কৰ্ম্ম আছে, মন্দ ছাড়, ভাল
কর, যখন কৰ্ম্মত্যাগের সময় হবে, তিনি ব্যবস্থা ক'রে
দেবেন, ফলের জন্য চিন্তা কর না। গীতায় বলেছে-
‘কৰ্ম্মণ্যে বাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন কৰ্ম্ম করে
যাওক ক'রে যাও—ওরে কৰ্ত্তা সাজার বড় জ্বালা,
কর্তার অধীনে থাকার তুল্য মজা নাই, প্রভু হতে যাসনি,
গুরু সাজতে গিয়ে শেষে গরু সেজে বসতে হয়। শিষ্য
প্রভু প্রভু ক'রে সত্ত্ব বুদ্ধি উকারটি কেড়ে নেয়, উকার
হচ্ছে সত্ব গুণময় বিষ্ণু ! গু শব্দের উকার গেল ত গরু
হ’ল। খুব সাবধান, আমি বাবা এক পৈঠা নীচের
লোেক, আমি বাবা সােহং নয়, আমি নাহং কেবল ত্বংহি,
ত্বংহি করেই বেঁচে আছি। ওরে গুরু কেউ কারো নয়,
গুরুর গুরু হিসাব করে যা দেখি, শেষে সেই আসল
গুরুতে ঠেকবে। যেখানে আনন্দের হাট, গুরু শিষ্য

গুরুপ্রসাদ।
নাস্তি পাট। দেবার কিছু নেই, কেবল জাগিয়ে দেওয়া।
তােমারি মধ্যে সব আছে, গুরু কি জানিস ? ধাড়ী হাঁস,
ডিমে তা দিয়ে গরম করে দেয়, সময় হলেই অজ্ঞান
আবরণ ফেসে বিবেক বাচ্ছা আপনি বেরিয়ে পড়ে,
একটি গান কর বাপ! বলবার জন্য অনেক কথা দরকার,
করবার জন্য বেশী কথা চাইনি, ওরে প্রথম ভাগের কথা
কটা পালন কর্তেই যে বহু জন্মের দরকার, বেদ বেদান্ত
পরের কথা, গাও বাপ গুরুদাস।
গীত।
॥
তােমা হতে কাছে কে আছে আমার
দেখিনা বারেক তবু চাহিয়া,
তুমি ধরিয়া ক্ষেপণি করে জীবনতরণী মম,
যুগে যুগে আসিতেছ বাহিয়া
কভু ফেলিয়া ঘুর্ণিপাকে আপনি ভাবিছ বসে,
সামালিয়া তরী পুনঃ ঢলিয়া পড়িছ হেসে
কভু বা উৰ্মিতালে, হেলে দুলে তরী চলে
কে জানে কোথায় যায় ভাসিয়া ॥
দেখি না এমন মাঝি এমন ক্ষেপণি ধর।
হাসান কঁাদান ছবি দেখি না এমন ধারা
বিরহ-মিলনে গড়া পুলক-বিষাদে ভরা
রয়েছে বিশাল ধরা তব মুখ চাহিয়া।

গুরুপ্রসাদ। ঠাঃ। পরমানন্দ। আচ্ছা বাবা। প্রত্যেক মানুষের স্বভাব রকম রকম হয় কেন ? ওরে গুণ অনুসারে স্বভাব, দেখিসনি এক মাটি এক বায়ু, এক জল, এক উত্তাপ নিয়ে সকল গাছ হয়, কিন্তু তেঁতুল টক, তাল মিষ্টি, লঙ্কা ঝাল, এক ঔরসে এক গর্ভে জন্ম নিয়ে এক মাতৃস্তন্যে পুষ্ট হয়ে কেউ সাধু কেউ চোর হয়, সব তাঁর ইচ্ছা। সংসারটা তার মনােহারী দোকান, সব রকম জিনিষ থাকতে হবে, কম্বল শুদ্ধ জিনিষ বলে শুধু কম্বল রাখলে দোকান চলবে না। প। বাবা। আমাদের বুঝবার ক্ষমতা নেই বলেই আপনাকে এত বিরক্ত ক’চ্ছি। ঠাঃ। কে বল্লে তােমার বুঝবার ক্ষমতা নেই ? তুমিই ত বুঝচ, তুমি না বুঝলে আমার বুঝায় কি তােমার বুঝা হবে ? তুমিই বুঝছ, আমি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি মাত্র। ঠাকুর ভক্ত সঙ্গে ভাবে গরগর হইয়া গাহিতেছেন- - এ বিশ্ব-সংসারে, ভালবাস যারে, তাহারি মাঝারে সে জনে দেখ না সদা লক্ষ্যে লক্ষ্য রাখনা। সবই বিভুরূপ সব রূপে তিনি, তরি তেজে সবে করে আমি আমি,

গুরু প্রসাদ।
বিচারিয়ে দেখ কে তুমি কে আমি,
আমাতেই আমি দেখনা ।
আমি তিনি তুমি সব বল মুখে,
আমি তুমি তিনির মাঝে লক্ষ্য রেখে,
সতত বিহর আত্মানন্দ সুখে,
কেন অহং দুঃখে যাতনা।
যাহার মায়াতে হয়েছ পাগল
লক্ষ্য রেখে তঁারে সােজা পথে চল
মোহ দূরে যাবে, সংশয় মিটিবে
তারেই মনপ্রাণ সপনা।

যে ঈশ্বর চায় সে কিছু চায়না।
ঠাঃ। বাপ, সব ! স্মরণ মননের কাছে
কাছে কিছুই
নাই, মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন,
জপ তপ সংযম সাধন,
সব সমরণ কি মাহি।
কহে তুলসী বহু বিচারি,
সমরণ সে কুচ, নাহি।
স্থিরচিত্তে ডাক, বল ঠাকুর, তােমার কি রূপ, কি নাম,
কিছুই জানি না, তুমি আমায় দেখা দাও, আমি তােমায়
চাই, তােমার দেয় কিছুই চাই না। আমি তােমায় ভাল
বাসব, বাস, আর কিছু ভাবতে হবে না। উদ্দেশ্যটা ঠিক
রাখিস, যে আমি ঈশ্বর চাই, সাধনে ভুল হয়, সে
নিজে এসে ব'লে যাবে। কোন পথ সােজা হবে,
এই বিচার ব'সে ব'সে ক'লে, কখনও কলিকাতা
পৌছান হবে না, হাঁটতে শুরু কর, ঘাের হক, আর
সােজা হক, কলিকাতা একদিন পৌছাবেই নিশ্চয়,
পথিককে জিজ্ঞাসা করে নিলেও চলবে, কাজ শুরু করে
দাও, খুব নাম-জাহির সিদ্ধাইওলা বড় গুরু খুঁজে সময়
নষ্ট ক’রনি, যে পথ দেখায়, সে হাঁটে না, হাঁটবে তুমি,
৪

৩৮
গুরুপ্রসাদ।
যদি বড় গুরু চাও, গীতাকে গুরু কর, ভগবান্ গুরু হবে,
গুরু বড় হলেই যদি শিষ্য বড় হয়,তবে ভগবান্ বুদ্ধদেবের
বহু শিষ্য ছিল, সবাই কি যুদ্ধ হয়েছে ? জগৎগুরু
শঙ্করের বহু শিষ্য ছিল, সবাই কি নিৰ্বাণ-মুক্তি পেয়েছে ।
তােমার যেমন আধার, যেমন বিশ্বাস, যেমন অধ্যবসায়,
সেইরূপ বস্তু লাভ হবে, কেউ কেউ খুব সিদ্ধাইওলা
গুরু খোজে, যেমন শূন্যে উড়ে যায়, জলে হেঁটে যায়,
ইত্যাদি, কিন্তু লাভ হওয়া দূরে থাকুক, লােকসান সম্পূর্ণ।
শিষ্যের সদাই মনে হয়, কবে সেই উড়ে যাওয়া বিদ্যটা
পাব, কাযেই প্রথম কৰ্ম্মে অনাস্থা হয়। দেখ, একটি গল্প
শুন,—এক গুরুভক্ত শিষ্য, একটি আশ্চৰ্য্য ঘটনা দেখে
ছিল, শূন্যে যেন
এক তড়িমূৰ্ত্তি পুরুষ, আর আটটি
বিদরণী স্ত্রীলােক যাচ্ছে, ভাবে বােধ হ'ল, পুরুষটি যেন
পালিয়ে যাচ্ছে, রমণীগুলি কি যেন প্রার্থনা নিয়ে তার
পাছে পাছে দৌড়াচ্ছে, কারণ বুঝতে না পেরে, গুরুর
কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলে। গুরু বল্লেন বাপু! ওই
যে শূন্যে পুরুষ মূর্তি দেখেছ, ও একজন সাধক, আর যে
বিদ্যুদ্বরণী আটটি রমণী দেখেছ, ওরা অণিমা, লঘিমা আদি
অষ্ট সিদ্ধি, ঐ সাধকের সাধন উদ্ভূত, সাধককে বলছে
আমাদিকে গ্রহণ কর, কিন্তু ভগবৎকৃপাপ্রার্থী সাধক, গুরু-
মুখে শুনেছে, ঐশ্বৰ্য্য লাভ করলে ঈশ্বর লাভ হয় না, তাই
ভয়ে পালাচ্ছে, অষ্ট সিদ্ধি, দাসীর মত পাছু পাছু যাচ্ছে।

গুরুপ্রসাদ।
দেখ বাপ! যে ঈশ্বর চায়, সে এ বিশ্বের
কিছু চায় না।
লােভী গুরু ত্যাগী শিষ্য।
ঠাঃ । দেখ বাপ । গুরুগ্রহণ বিষয়ে একটা লক্ষ্য
রাখা উচিত, গুরু স্বভাবী কিনা ? সন্তুষ্টি লাভের জন্য যার
আশ্রয় নিচ্ছি, 'নমে তিনি সন্তোষ হয়েছেন কিনা ?
কারণ গুরু লােভী হলে বড় বিপদ, শিষ্যের চালের লাউ
থেকে গােয়ালের গরুটি পর্যন্ত তার আশা, কাযেই শিষ্য
নাচার। তাই মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন,
লােভী গুরু লাচি চেলা,
দুমু নরকমে ঠেলি ঠেলা,
একটা গল্প শােন। একজন রামায়ণ শুনতে গিয়েছিল,
গিয়ে দেখে, গান বেশ জোমেছে, শ্রোতারা সকলেই
থালা, বাসন, কাপড়, পয়সা, ফেরী দিচ্ছে, সেও গান
শুনূতে ব’সূল, ঘটনা চক্রে একজনের হাত লেগে তার
মাথার পাগড়ীটী আসরে পড়ে গেল, গায়েন মনে করলে
ফেরী দিলে, সে কুড়িয়ে নিয়ে নিজের লােকের কাছে
দিলে। যার পাগড়ী. সে লজ্জায় কিছু বলতে পারলে না,
আসর থেকে উঠে গেল, পথে একজন জিজ্ঞাসা করছে,
কিহে গান কেমন হচ্ছে? সে বল্লে গান ভাল হচ্ছে,
তবে “পড়লে বাবার লয়,”—বাপ, লােভী গুরুর কাছে
পরিত্রাণ নেই। আর একটা গল্প শােন

গুরুপ্রসাদ।
এক রাজা গুরুকে সর্বস্ব দান করেছিল, কিন্তু গুরু
ভাবলে, যদি কখনাে রাজার ভােগ লালসা আবার জাগে,
তাহলে ত যুক্তির দ্বারায় কেড়ে নিতে পারে, সুতরাং
রাজা যাতে মরে তার চেষ্টা করতে হবে। এইরূপ চিন্তা
করে, একদিন রাজাকে গুরুদেব ব'ল্লে চল বনভােজন
করতে যাই, গুরুভক্ত রাজা প্রস্তুত, সকলে মিলে একদিন
বনভােজনে যাত্রা করা হ’লভীষণ জঙ্গলে গিয়ে গুরু বল্লে
বাপু! তুমি একটু জল চেষ্টা করে আন.বড় পিপাসা হয়েছে।
গুরুগত প্রাণ রাজা ব্যস্ত হয়ে জলপাত্র নিয়ে চ’ল্ল,
গুরুর ধারণা নিশ্চয় রাজাকে কোনও জানােয়ারে ধরে
খেয়ে ফেলবে, রাজা জল অন্বেষণ করতে গিয়ে গভীর
জঙ্গলে উপস্থিত হল, চারিদিকে হিংস্র জন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে,
কিন্তু রাজার উপর তারা কেউ হিংসা করলে না। রাজা
জল খুঁজে পায় না, গুরু পিপাসিত, চিন্তায় অধীর হয়ে
পড়েছেন, হঠাৎ দেবর্ষি নারদ সেই পথে এসে উপস্থিত,
রাজাকে দেখে দেবর্ষি জিজ্ঞাসা ক'লেন, বাপু তুমি কি
খুজছ? রাজা বললেন প্রভু! গুরু আমার পিপাসায়
কাতর, আমি জলের সন্ধানে এসেছি, কিন্তু জল ত এ বনে
পাচ্ছি না। নারদ বল্লেন জল ত এ বনে নাই, আচ্ছা তুমি
এই ফলটি নিয়ে যাও, তােমার গুরুকে দেবে, এই ফল
খেলেই তােমার গুরুর পিপাসা দূর হবে। রাজা আনন্দের
সহিত ফল নিয়ে চ’ল, কিছুক্ষণ পরে গুরুর নিকট

গুরু প্রসাদ।
পোঁছাল, গুরু দেখলে, মরেনি ত এখনো, মনোভা।
চেপে জিজ্ঞাসা করলে জল পেয়েছ ? রাজা বনে,
আজ্ঞা না, জল পাই না, এক মহাত্মা একটি ফা দিয়েছে,
বলেছেন, এই ফল খেলেই পিপাসা দূর হবে। এ বনে
এ ফলের নাম কি ? রাজা ফলের নাম জানে না, ব’
ফলের নাম আমি জানি না, গুরু বনে যাও, ৮। {
ফলের নাম জেনে এস, রাজা আবার সেই পথে চলে ।
কিছু দূর গিয়ে আবার নারদের সঙ্গে দেখা হ'ল, ক
জোড়ে বল্লেন প্রভু! এ ফলের নাম কি ? অৰ্য্যা
দেবর্ষি বল্লেন, বাপু! আমি ত ফলের নাম জানি না,
শিবের নিকট আমি এই ফল পেয়েছিলাম, আচ্ছা চ,
আমি তােমায় নিয়ে শিবের কাছে যাই। যােগবলে নার
সেই মুহূর্তে রাজাকে নিয়ে কৈলাসে গেল। মাহরাও
ফলের নাম জিজ্ঞাসা করায় তিনি ব’ল্লন কামি, ক্ত ।
না, ব্রহ্মা আনায় এই ফল দিগেছিল। এইরূপে কৈলাস,
ব্ৰহ্মলাে, বিষ্ণুলােক ঘুরে বিষ্ণুর কাছে জানা গেল,
এই ফলের নাম ফলের মধ্যেই আছে। রাজা ফুল নি ?
গুরুর কাছে এল। গুরু দেখে যাক, ভাং ভাই ৩
মরেনি ত এখনাে? করজোড়ে রাজা বলেন প্রভু! এ
ফলের নাম, ফলের মধ্যেই আছে, ভাসুলেই দেখতে
পাবেন, গুরু ফা ভেঙ্গে দেখে, তাতে লেখা আছে “যেমন
কৰ্ম্ম তেমনি ফল” ফলের একভাগে ছবির মতন অক।

৪২
গুরুপ্রসাদ।
আছে, রাজার গুরুকে নরকে ফেলে যমদূত সব লােহার
মুগুর মারছে, আর এক ভাগে অাকা আছে, রাজা স্বর্ণ
সিংহাসনে উপবিষ্ট, বিদ্যাধরীগণ চামর ব্যজন করছে,
দেখ বাপ! “যেমন কর্ম তেমনি ফল”।
একটু গান হ’ক না গাে-অনেক কথা ত হয়ে গেল,
আমি একলাই বলব ?-
গীত।
=
নাকের সােজ। চলতে হবে মন, শুরে গুরুর সার বচন।
দুই ধারে দুই নাসার ছিদ্র, যাওয়া আসা হচ্ছে কেবল
তাহারি মধ্য, আছে দুয়ের মাঝে আর যে ছিদ্র ;
কর তার মাঝে মূল অম্বেষণ।
একে শীত একে উষ্ণ ভাই,
থাবি কিসে বলনা তুষ্ট মন ততরে সুধাই ;
দিবা নিশি হুস ফুসানি এতে কতদিন আর বাঁচবি ধন?
তাের ছটফটানি ঘুচে যাবে ভাই,
আয় না জোরে বাক্য ধরে ঘরে ঢুকে যাই,
বসে থাকবি রে চোরা কুটীরে সদাই হয়ে সচেতন।
যার শাসনে জগৎ চলে সে ব'সে সেইখানে
দেখবি যদি মনরে পাগল, আয় শুদ্ধ মনে ;
সেথা যমের বাপের নাই অধিকার,
সত্য স্বরূপ বচন।

গুরুপ্রসাদ।
৪৩
বিশ্বাস।
ঠাঃ। দেখ বাপ! বিশ্বাস ভিন্ন উপায় নেই, বিচার
ক'রে কি করবি, তার সৃষ্ট অতি ক্ষুদ্র একটি পদার্থের
কারণ নির্ণয় বিচারের দ্বারায় করতে যাও, কিছু দূর গিয়ে
বুদ্ধিবৃত্তি হারিয়ে যাবে, বিচাৰ্য, বিচারক, বিচার, এক
হয়ে যাবে। তার সৃষ্ট, সবই অনন্ত,তাই বেদান্তের বাক্য।
মুসারে এবং তার করণ কারণ দেখে তার অস্তিত্ব স্বীকার
করে নাও-বেদান্তের সার বাক্য, অস্তি, ভাতি, প্রিয়,
ঈশ্বর আছেন, তার প্রকাশেই বিশ্ব প্রকাশ, এবং সে প্রিয়,
ভালবাসার, এই সৃষ্টির সামঞ্জস্য দেখে, তিনি আছেন
বিশ্বাস করে তঁাকে ভালবাস, শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য,
মধুর, এই পাঁচ ভাবের যে ভাবে ইচ্ছা, গুরু, প্রভু, সখা,
পুত্র, পতি, যে ভাবে তােমার ইচ্ছা ! যােগ, যাগ, তপস্যা,
নাম, আদি যাই কর, মনে রেখো, এগুলি উপায়, উদ্দেশ্য
নয়, উদ্দেশ্য ঈশ্বর লাভ, উদ্দেশ্য ভুলে যেন উপায়ের পায়ে
মাথা খুড়িনি। ভাত রাঁধার সমস্ত অনুষ্ঠান করে যেন
হাঁড়িতে চাল দিতে ভুলিনি, জন্ম জন্ম ব’সে জ্বাল
দিলেও ভাত পাবি নি, অন্তঃসারশূন্য হ’সনি, ধান আর
আগড়া, দেখতে একই রকম, কিন্তু আগড়া অন্তঃসারহীন,
অর্থাৎ তার ভিতর ঢাল নাই, তাই সে ত্যজ্য। তাতেই
চৈতন্যদেব বলেছেন, ভগবৎ-কৃপালাভ উদ্দেশ্যশূন্য যােগী,

৪৪
গুরুপ্রসাদ।
ন্যাসী, কর্মী, জ্ঞানীর সঙ্গ ত্যাগ করতে, তাতে যােগের
দোষ বুঝায় না, কৰ্ম্ম জ্ঞানেরও দোষ বােঝায় না, মাত্র
কৰ্ম্মীর দোষ। ঈশ্বর পাবার উদ্দেশে যে যােগ
সেই যােগই যোগ, নচেৎ কর্মভােগ মাত্র।
মোট কথা উনানেই রাঁধ, কি ষ্টোতেই বধ, কাঠের
জ্বালেই রাধ, বা কয়লার আঁচেই রাধ, উদ্দেশ্য ভাত,
গুরুবাক্যে বিশ্বাস রাখা চাই, ইচ্ছাস্বত্বে গুরুর সঙ্গে
অদ্বৈত ভাব আরােপ ক’রনি। প্রভু ভৃত্য, বা পিতা পুত্র
ভাবটাই রাখবে, নাস্তিক হতে যেওনি, বেদাও বাক্যে
সংশয়ও মহাপাপ, সে অস্তি, নিশ্চয় বিশ্বাস করবে।
আর না করলেও উপায় নাই, অগত্যায়ও করতে হবে।
হরে কৰ্ত্তাহী ন কর্ম কি এত মুমিনে
চলে? গুরুদাস। একটি গান গাও ত বাপ ।
গীত।
তােমারি অন্ত কে পায় ? মায়াময়,
তােমারি মায়াজালে, বদ্ধ জীবদলে, শকতি নাহি কারও
বারেক আঁখি মিলে চায়।
জগদুপা তুমি তুমি হে উপাসক,
ভুমিই ব্যাধি পুনঃ তুমি বটে ভিষক,
তুমিই হত পুনঃ তুমি হন্তারক, আছ, বা থাকিবে,
তুমিই অনাদি অব্যয়।

গুরুপ্রসাদ।
স্রষ্টারূপে তুমি করিছ সৃজন,
পাতারূপে পুনঃ তুমি কর পালন,
সংহারীরূপে নাশিছ ত্রিলােকে
তােমাতে উদ্ভব পুনঃ তােমাতে সবি লয়।
অলক্ষ্যে থেকে তুমি খেলিছ কত খেলা,
ভাবিত ভব বিধি বুঝিতে তব লীলা,
বিধি-পুরন্দর শশী দিবাকর মােহিত সুরনর
তােমার মোহিনী মায়ায়।
ঠাঃ। দেখ একজন মুটে রামায়ণ শুনতে গেছল,
গিয়ে শুনলে, গায়েন গাচ্ছে “রাম তােমার নাম নিলে
ভৰ নদী পার হওয়া যায়, পারের কড়ি লাগেনি,”—মুটে
শুনে ভাবলে আমায় ত দিন নদী পার হয়ে কাজে যেতে
হয়, যেতে আসতে দিন পয়সা লাগে, যাক আজ থেকে
রাম নাম বলে পেরিয়ে যাব, যখন ভবনদী পার হওয়া
যায়, সে না জানি কত বড় নদী। আর আমি যা পার
হই, এত খুব ছােট নদী,-অক্লেশে পার হতে পারব।
মনে মনে স্থির করে নদীর ধারে গিয়ে জয়রাম ব'লে
নামল,-বিশ্বাসে পারও হয়ে গেল, এইরূপ কিছুদিন
পার হয়ে প্রতিদিন পারে যে পয়সাগুলি লাগত, সেই
পয়সাগুলি নিয়ে আবার রামায়ণ শুতে গেল, গায়েন
ঠাকুরকে ডেকে বল্লে –ঠাকুর, আপনি আমার বড়
উপকার করেছেন, জীবনে আমার বহু পয়সা বাঁচবে, এই

ও প্রসাদ। ! কয় দিনের পারের পয়সা ক’টি আপনি নে। গায়েন ঠাকুর ভাবছে, কি ব’লছে, আমি ওর অনেক পয়সা কিসে বাঁচালেম ; জিজ্ঞাসা করলে বাপু! ব্যাপার কি বল দেখি ? মুটে বলে প্রভু! সেদিন আপনার মুখে শুনে ছিলাম, রাম নামে ভবনদী পার হওয়া যায়, তাই সেদিন থেকে, আমার আর পারের পয়সা লাগেনি, আমি জয়রাম বলে পার হয়ে চলে যাই। তাই আপনাকে এই পয়সা- কটি দিতে এসেছি, গায়েন ঠাকুর অবাক ! বলে—বল কি হে! আমায় দেখাতে পার? মুটে বলে সে কি ঠাকুর। আমি ত জলের উপর দিয়ে যাই, আপনি সম্ভব জল ছাড়া দু'হাত উচু দিয়ে যান, গায়েন ব’লে আচ্ছা চল, আমি তােমার সঙ্গে যাব, মুটে সঙ্গে চল, নদীর ধারে গিয়ে ‘জয়রাম’ বলে মুটে নাল, জল তার পায়ে লাগেনি, ব্রাহ্মণও দেখাদেখি ‘জয়রাম’ বলে নামল, কিন্তু বিশ্বাস নাই ! ক্রমে তার একহাঁটু, এক উরুত হতে লাগল, ব্রাহ্মণ কাপড় গুড়াচ্ছে, শেষে কঁাছা খুবার যােগাড় ক’চ্ছে, মুটে ডাকচে, আসুন ঠাকুর ! ব্রাহ্মণ বলে—আরে বেটা কাপড় যে ভিজে যায় ! মুটে ঘুরে চেয়ে দেখে, গায়েন ঠাকুর কঁাছা খুলছে,মুটে বলে, ও ঠাকুর! রামও ব'লবে,কাছাও খুলবে, তা হলে হবে কেন? দেখ বাপু! বিশ্বাসের এমনি গুণ। ঠাকুর ভাবে গান ধরিলেন-

গুরুপ্রসাদ।
৪৭
গীত।
সুখের মরণ মরবি যদি মন, তবে কররে মরণ সাধন।
সাধন ভজন জানবি কেবল জন্ম মরণ কারণ
মরতে যখন হবে তখন আগে হ'তেই মর,
মরার ভিতর তাজা জিনিষ, তার তদন্ত কর,
প্রেমের মরা ম’রতে পারুলে, এড়াবি জম্ম মরণ।
হঠাৎ মরণ পথে যেতে বড় দুঃখ হবে,
যাওয়া আসা থাকে যদি, ভয় ভেঙ্গে যাবে,
বারেক স্থির হয়ে তুই দেখরে ভেবে,
কোন ঘরে সুখের মরণ।
কত দুলে দুলে অন্তকালে, আঁখি উল্টাবে,
পাবিনা স্থান মরণ ঘরে, দূর করে দেবে,
হচ্ছেই যখন খাসের দোলন
উল্টে ধরনা দুনয়ন |
ঠাঃ। দেখ, প্রহলাদের বিশ্বাসের জোরে স্ফটিকস্তম্ভ
হ’তে নৃসিংহ মূর্তি প্রকাশ, ধ্রুবের বিশ্বাসের জোরে বনের
বাঘ ভালুক তাকে হিংসা করুত না, বিশ্বাসে দস্যু রত্না-
কর ‘মরা মন্ত্র জপ করে বাল্মীকি, বিশ্বাসে মহাত্মা কবীর
রামানন্দের মুখনিঃসৃত রাম নাম নিয়ে সিদ্ধ হয়েছিল,
বিশ্বাসের জোরে রামদাস হনুমান্, শত যােজন সাগর
অক্লেশে পার হয়েছিল, কেবল রাম নামে বিশ্বাস ছিল
।

ও ৮
গুরু পলাদ।
বলে, আর রাম নামে বিশ্বাস বলেই বুক চিরে দেখিয়ে-
ছিল, তার বুকের মধ্যে রাম নাম লেখা আছে। বিশ্বাস
হারিও না। বাপ, গুরুদাস ! একটু রামনাম গাও ত বাপ!
গীত।
;
“জয় সীতারাম”
একবার মনের সাথে প্রাণ মিশায়ে বল রে ;-
বল হরে রাম হরে রাম দিওনা বিশ্রাম রে।
জয় নিৰ্ব্বাণনায়ক নবদূর্বাদলশ্যাম রে ;-
জয় নরকার্ণবতারণ নটবর নয়নাভিরাম রে।
জয় জানকী-মনমােহন নীলতনুনিন্দিত কাম রে ,
জয় মারমদমর্দন রঘুনন্দন ঘনশ্যাম রে ।
জয় হরকোদণ্ডভঞ্জন মনােরঞ্জন প্রাণারাম রে ;-
জয় জনকানন্দবর্ধন জীবমূর্ধনিবাসী রাম রে।
অনলে তৃণসম দহে পাপ জাপলে শ্রীরামনাম রে ;-
শিব বিরিঞ্চি নারদ ব্যাস অজ্ঞাতগুণগ্রাম রে।
জয় জয় রাম, জয় সীতারাম, জপ মন অবিরাম রে ;-
জপিতে জপিতে যাতনা জুড়াবে লভিবি পরম ধাম রে ।
সপিছে পাগল করমের ফল তােমার চরণে রাম হে;-
জয় রাঘবায় নমঃ দাও হে শাস্তি
গুরুদাসে প্রাণারাম হে।
–
ঠা। হাঁ বাপ! বহু শাস্ত্র পড়ে কি হবে। প্রথম

এ প্রস।
৪
ভাগের উপদেশ কটা পালন করতেই যে বহু জন্মের
দরকার রে! উপদেষ্টার অভাব নেই, পালনকারীর অভাব।
যদি পরিত্রাণের আশা থাকে, তবে এক কথা নিয়ে বসে
থাকবে, আর যদি জাহির হয়ে গুরুগিরি ক’তে চা,
তাহ'লে বহু দরকার, সাজসজ্জা বেশ, ভূষা, বচন, রচন,
মন্ত্র-যন্ত্র, জটা-দাড়ি সব চাই, না হলে খদ্দের পটবে না।
ধৰ্ম্ম-বণিক হ’স না বাপ! ধার্মিক হবার চেষ্টা কর,-
একটা গান শােন। ঠাকুর গাহিতে লাগিলেন,
গীত।
তুই এক কথা রাখ মনে।
দু’শ পাঁচ'শ শিখলে ক্ষেপা, দুঃখ পাবি নিদানে ।
একে লক্ষ্য রেখে তুই অলক্ষ্য দেশ নে জেনে
পতঙ্গ সম হও রে আকুল, রূপ হেরে নয়নে
এক বিশ্বাসে থাক রে মন ভাব রে একজনে
বারাঙ্গনা সতী নারী হয়েছে কোন খানে ।
মূল ছেড়ে জল কোথা ঢালিস,
হিসাব নাই তাের কেনে
বাড়ল পাগল তের হাসি কাণ্ড দেখে শুনে।

গৃহস্থ ভক্তদের প্রতি।
।
আজ কতকগুলি গৃহস্থ ভক্ত এসেছে, ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা
করছে, বাবা ! আমাদের কর্তব্য কি ?
ঠাঃ। সকল কাজের মধ্যে তার নাম, দিনান্তে
আমায় আধঘণ্টা করতে হবে, এটা মনে রাখতে হবে।
অলসতায় বা ভ্রমে যেমন সংসারের কাজ একটি বইতে দাও
নি, তেমনি ভগবানের নাম করা যে আমার একটি
মুখ্য কর্তব্য,এটি বেশ স্মরণ রাখতে হবে। একটি গাই যদি
এক পুয়া দুধ দেয়,অথচ রাত ১০টায় দুইতে হয়, সেটি যেমন
অলসতা করে বাদ দাওনি, এটিও তেমনি যেন কোনও দিন
বাদ না পড়ে ! ভূতের বেগার খাবার সময়, পূর্ণ যুবকের
উদ্যম নিয়ে যাও, আর যাঁর কৃপায় বেঁচে আছ, যিনি তােমার
প্রয়ােজন মত সমস্ত জিনিষ মুখের কাছে যুগিয়ে দিচ্ছেন,
তােমার জন্য সদাই ভাবছেন, তােমার মনােরঞ্জনের জন্য
পত্নীরূপে, প্রতিপালনের জন্য পিতারূপে, স্তন্যদুগ্ধ দানে
মাতৃরূপে, সখ্যতায় বন্ধুরূপে, পিপাসানিবারণের জন্য
জলরূপে, বাঁচিয়ে রাখবার জন্য বিশ্বপ্রাণ সমীরণরূপে,
পরিপাকের জন্য বৈশ্বানর অগ্নিরূপে, খাদ্যের জন্য শস্যরূপে,
শ্রবণ-কথনের জন্য আকাশরূপে, আনন্দ-দানের জন্য
পৃরূপে, জ্ঞানদানের জন্য গুরুরূপে, সর্বজ্ঞের জন্য

গুরু সদ।
আত্মারূপে তােমার ভিতরে বাহিরে অবস্থান করূছেন,
তঁাকে ভাববার বেলাই যত অলসতা। তখন এক মুহূর্তে
বৃদ্ধ হয়ে যাও। তাঁর নামসুধাপানে এত অগ্নিমন্দা।
যদি কেউ বলে, একটু ভগবানের নাম করি এস, তখন
বল, আর ভাই সমস্ত দিন খেটে খুটে পারিনি, কিন্তু সেই
মুহূর্তে যদি কেউ বলে, আজকের বৃষ্টিতে মাছ উঠবে, চল
যাই, তখনই অমাবস্যার রাত্রে লাঠিলণ্ঠন নিয়ে, মরা-বাঁচার
চিন্তা না করে দৌড়াবে, জগতের কোনও বাধা তােমায়
আর ধরে রাখতে পাবে না। বাপু! সমস্ত জীবনটা যা
ক’বৃছ, সব ত দায়ে পড়ে, স্বেচ্ছায় একটু কিছু কর না।
প্রাণপাত করে অর্থসঞ্চয় করছ, কিন্তু গিন্নীর বিনা
হুকুমে একটি পয়সায় হাত দিবার যে
নাই স্মরণ করে দেখ দেখি, যতদিন অর্থ নিয়ে ব্যবহার
ক’ছ,—মাত্র দায়ে প'ড়েই খরচ করেছ কিনা? স্বেচ্ছায়
বােধ হয় কাকেও দু’পয়সা দিতে পারনি, এই প্রাণের
দায়ে, মানের দায়ে,পেটের দায়ে, লজ্জার দায়ে, সমাজের
দায়ে, মাতৃদায়ে, পিতৃদায়ে, কন্যাদায়ে, ইত্যাদি
দায়ে প'ড়ে!
বােঝ দেখি বাপ।
যে অর্থ মাত্র
দায়ে প'ড়েই দিতে হয়, স্বেচ্ছায় দিবার সাধ্য নাই, সে
অর্থ কি তােমার হতে পারে? তুমি ত ভাণ্ডারী! যেন
প্রভুর হুকুমে দিচ্ছ! কৰ্তব্য চাবুক মেরে
তোমায় দেওয়াwে! যদি তোমার নিজের অর্থ,

গুরু। f তবে স্বেচ্ছায় কিছু ব্যয় কর, অর্থাৎ না দিলেও সে কিছু ক’তে পারেনি, তবু আমি প্রয়ােজন দেখে দিলাম, সেই ত প্রকৃত তােমর অর্থ ! শঙ্করাচাৰ্য বলেছেন, অর্থমনর্থং ভাবয় নিত্যম, নাস্তি ততঃ সুখলেশং সত্য। পুত্ৰাদপি ধনভাজাং ভীতি, সৰ্বত্ৰৈষা কথিত নীতিঃ । শাস্ত্রে আরও বলেছেন, অর্থানমজ্জনে ক্লেশস্তথৈব পরিরক্ষণে। নাশে দুঃখং ব্যয়ে দুঃখং ধিগৰ্থাত্ ক্লেশকারিণ। বাপু, অর্থের সদ্ব্যবহার কর, সংসারী সংসারীর কর্তব্য পালন কর্তে পারুলে সন্ন্যাসী হ'তে নিকৃষ্ট নয়। দেখ, একটি গাছে শুক-সারি দু’টি পাখী থান্ত, ঘটনাচক্রে দুটি পথিক ঐ গাছতলায় রাত্রিবাসের জন্য রইল, কিছু কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বেলে ব'সে আছে, এমন সময় শুক এসে পৌছাল, সারিকে জিজ্ঞাসা করলে এর কে? সারি বল্লে পথিক, আজ এই গাছতলায় আশ্রয় নিয়েছে। শুক বলে সারি! তাহলে ওরা ত আজ আমাদের অতিথি, আমরা গৃহস্থ, অতিথি উপবাসী থাকলে মহাপাপ, গৃহ- ধৰ্ম্ম নষ্ট হবে, কিন্তু অন্য খাদ্য আমি কোথায় পাব ? আমি আমার দেহদানে আজ অতিথির সৎকার করব। এই কথা বলে শুক পথিকদিগে সম্বােধন করে বললে, মহাশয়গণ, গুরুপ্রসাদ। গৃহস্থের ধর্ম। আপনারা আজ আমার অতিথি। অতিথিসৎকার ধৰ্ম্ম । আমার ত আমার ত অন্য কিছু নাই, তাই আমি সেচ্ছায় আমার দেহ আপনাদের সেবার জন্য দিচ্ছি, উপেক্ষা করবেন না। এই বলে শুক প্রজ্বলিত অগ্নির উপর পড়ে গেল, প্রজ্জ্বলিত অগ্নির তেজে সঙ্গে সঙ্গেই মৃতু্য হ'ল। সারি দেখে ভাবলে, স্বামীর দেহেও ত অতিথিদের পূর্ণভােজন হবে না, তবে আর কেন ? ‘জয় স্বামী’ ব’লে আগুনে পড়ল,পথিকরা অবাক ! দেখ বাপ গৃহস্থের কর্তব্য কি ভীষণ ! সন্ন্যাসী হ’তেও কঠিন ব্রত নয় কি? ধড়া চূড়া বেঁধে লােটা চিমটে নিয়ে না বেরুলে ভগবান মিলে না-কে বলেছে? ভগবান্ কি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে যে, তাকে খুঁজে ধরতে হবে ? কিছু করতে হবে না, দিনান্তে সংসার-কর্তব্য শেষ করে আত্ম- কৰ্তব্যটা ঠিক রেখাে! হাজারটা দিয়ে রেখাে। যে চাকর প্রতিদিন কাজে হাজির থাকে, বিশেষ কাজ না ক’র্তে পারুলেও মণিবের একটা লক্ষ্য থাকে যে, লােকটার। কামাই নাই। ডাক, ডাক, ডাকার ভুল করনি, তা না হলে যাবার সময় বড় ঠকা বােধ হবে, মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন, দয়া ধরম কি মূল হায়, নরুক মূল অভিমান। তুলসী দয়া ছােড়িও মৎ যব কণ্ঠাগত প্রাণ। ধর্যের মূল দয়া, নরকের মূল অভিমান,

গুরু পসাদ।
দয়া ছেড়ে নি। চৈতন্যদেবও বলেছেন, জীবে দয়া, নামে
রুচি। আজকাল হয়েছে কি জান বাপ! কেউ ভবিষ্যৎ
চিন্তা দূর করবার জন্য মরাইয়ে ধান, বাক্সে টাকা বেঁধে
রাখছে, আর কেউ তার পাশের বাড়ীতে অন্নাভাবে
জীবন তাগ করতে বসেছে, বেশ্যালয়ে গিয়ে মুহূৰ্তমধ্যে
রাশি রাশি অর্থ ব্যয় করছে, ভিখারীকে একটি
পয়সা দিবে না, যে মুহূর্তে ভিখারীকে গলাধাক্কা দিবার
ব্যবস্থা করছে, সেই মুহূর্তে যদি বাড়ীর
থেকে খবর আসে, ছেলের ধনুষ্টঙ্কার হয়েছে, গিন্নি মাথা
কুচে, অমনি কৰ্ত্তব্য চাবুক হারাতে লাগল, নিয়ে
আয় ডাক্তার, বা এক মুহূর্তে বিশ টাকা বেরিয়ে গেল ।
স্তু কোনও উপায় নাই, তার উপর নালিশ চলে না।
বাপু ম’রতে হবে, সসাগরা ধরণীর অধিপতি হলেও মরতে
হবে। রাজাই হও, বাসাই হও, পেট ভরূলে আর খেতে
পারবে নি, তবে বাপু দুমুঠো ভাতে যখন তােমার
পেট ভরে যায়, তখন অত খেটে মর কেন ? অবস্থার
উপর সন্তুষ্ট থাক, মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন,
গােধন, গজধন, আউর রতনধন খান।
যব আওত, সন্তোষ ধন, সব ধন ধুলিকা সমান।
কৰ্ম্ম করে যাও, ফলের জন্য ভেবাে না, কৰ্ম্মেই
তােমার অধিকার, যা হবার তা হবে,কথাটা মনে রেখে
কৰ্ম্ম করে যাও।

=
যুক্তির দ্বারা নাম করা উচিত।
ঠাকুর ভক্ত-সঙ্গে।
(স্থান-আশ্রম কুটীর)
ভক্তদাস, গুরুদাস, পরমানন্দ, রাঘবানন্দ প্রভৃতি।
প। বাবা, কেউ কেউ বলেন, কলিতে যােগ যাগ
তপস্যায় কিছু হবে না, কলিতে নামই সত্য,
ঠাঃ। কলিতে নাম সত্য, আর সত্য, ত্রেতা, দ্বাপরে কি
মিথ্যা ছিল ? যা সত্য, চিরকাল সত্য। যেমন
ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা, তেমনি বস্তু প্রকাশের জন্য
নাম। নাম উচ্চারণের পূর্বে নামধারীকে স্মরণ হয়, তুমি
আমার নাম করবার পূর্বেই আমার মূৰ্ত্তি তােমার মনে
হবে, তাই কলিযুগে নামের ব্যবস্থা, কিন্তু যারা ব্ৰহ্মকে
কোনও পদার্থ বলে স্বীকার করে না, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সকল
বিষয়ই মিথ্যা, এ জ্ঞান যাদের হয়েছে, তারা মানবে
কেন? রূপ বা গুণ নিয়েই ত নামকরণ হয়, তারা
বুঝেছে ব্ৰহ্ম নিগুণ,
নিরাকার, তা হলে নাম করবে
কার ?
প। আজ্ঞে চৈতন্যদেব বলেছেন, কলিতে নাম
ভিন্ন গতি নাই।
ঠাঃ। ঠিকই বলেছেন, চৈতন্যদেব কি মিথ্যাবাদী ?
তবে কি জানি, ওটা প্যাটেন্ট ঔষধ, অধি-
কাংশেরই উপকার হবে। তিনি দেখলেন—মােটেই কিছু

প্রসাদ।
করে নি, না করার চেয়ে করা ভাল, ঈশ্বরের নাম মনে
করে “হরি হরি” কি রাম রাম” করুক। আবার তিনিই
বলেছেন, “কোটী জন্ম করে যদি নাম সংকীর্তন, তথাপি
পায় ব্ৰজের ব্রজেন্দ্রনন্দন। অর্থাৎ চঞ্চলমনা টিয়া
পাখীর মত নাম করলে কি হবে ? কলের গানেও হরি-
নাম গাচ্ছে,-তা হ'লে কি উদ্ধার হয়ে যাবে? চৈতন্য
দেবের উদ্দেশ্য, ছড়ান মনটা অনবরত নাম বলতে বলতে,
একমুখী হ’ক, পরে কর্তব্য নিজেই নির্ণয় করে নিবে,
আর প্রথম প্রথম পথে নামাবার জন্য সুবিধা দেখিয়েছেন,
একবার কৃষ্ণ নামে যত পাপ হরে, পাপীর কি সাধ্য বল
তত পাপ করে ? কিন্তু আবার বলেছেন, তৃণাদপি
সুনীচেন,হিংসা নিন্দা ত্যাগ দিয়ে মনে প্রাণে ঐক্য করে,
তা হলে মুক্তি চাই, মনে প্রাণে, কি উপায়ে এক করা
যায়, জানতে হবে, তা হলে যােগের সাহায্য নিয়ে যুক্তির
দ্বারা নাম করতে হবে। শুধু গলাবাজী করলে হবে না।
মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন, “নাম রতন পায় কত, গাঁট
বাঁধ না খােল। নাহি পন নাহি পরখ, নাহি গ্রাহক নাহি
মূল।” যদি পূর্বজন্মের সুকৃতিতে নাম রতন পেয়েছিস,
গাঁট বেঁধে রাখ, খুলিস নি, এর গ্রাহক নাই, মূল্য নাই।
পঃ। বাবা আজকাল সব দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে
যেচে যেচে নাম বিলি করছে।
ঠাঃ। বাপু, যেচে দিলেও নিবে কেন ? যদি নেয়,

কা। . ক ব্যবহার করবে নি, যে গুড় খেয়েছে, সে জল খুঁজে খাবে, যে টক্ খেয়েছে, তাকে জল দিলেও খাবে নি, জোর ক'রে দাও, কুলকুচা কবে ফেলে দিবে। বাপু! এটি হিন্দুধর্ম, অবস্থা বুঝে ঔষধের ব্যবস্থা আছে। নাড়ী ধ'রে বায়ু পিত্ত, কফের কোটা বেশী কম হয়েছে দেখে ঔষধ দেয়, এ দেশে এক নিয়ম খাটবে নি। সাধন ভজনটা কি জানি? মরণের আখড়া দেওয়া। এখন থেকে আখড়া দিয়ে রাখলে, সে সময় ভুল হবে নি। কিন্তু শেষপর্যন্ত কে থাকবে, বিচার করতে হবে, শেষের সময় হাত পা অবশ হবে, চোখে দেখতে পাবে না, কানে শুনতে পাবে না, বা রোধ হয়ে যাবে, কিন্তু বায়ু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাবে তা হ'লে বায়ুর সঙ্গে যদি নাম গেঁথে দেওয়া যায়, তবেই শেষের মুহূর্তে উপকার দিবে! তখন গলাবাজী চলবে না। আরও একটা বিচার করে দেখ, যদি মূৰ্তিদর্শন ভিন্ন ঈশ্বর সাধনা না হয়, তাহ'লে অন্ধের হবে না, যদি নাম শ্রবণ ভিন্ন না হয়, তাহলে বধিরের হ’ল না, যদি নাম: কথন ভিন্ন না হয়, তাহলে বােবার হ’ল না, যদি তীর্থ- ভ্রমণ ভিন্ন না হয়, তাহলে খঞ্জের হ’ল না, যদি অৰ্চনপাদ- সেবা ভিন্ন না হয়, তাহলে পঙ্গুর হ’ল না, তাহলে সম্পূর্ণ অবয়ব সবল নিরােগী ব্যক্তি ভিন্ন ঈশ্বর সাধনা হবে না। এই কি তার উদ্দেশ্য ? তা নয়, তা নয়, ভেবে এমন একটা সাধনার জিনিষ বার কর, যা সকলের আছে, বা সব সময় এ প্লাদ। থাকে। সেটি আমাদের শ্বাস, প্রশ্বাস ; অন্ধ, খঞ্জ, বধির, মূক, পঙ্গু সকলেরই আছে, ঐ প্রাণের সাহায্যে নাম জপ করতে হবে। তাহলে তােমার প্রকৃত স্মরণ করা প্রাণ স্থির হলে মন স্থির, মন স্থির হ'লেই দৃষ্টি স্থির, মন প্রাণ দৃষ্টি যদি স্থির হ’ল, আর কি চাও? মনই ইন্দ্রিয়দের পরিচালক, মন যদি স্থির হয়ে গেল, ইন্দ্রিয়গণ বাধ্য হয়ে স্থির হবে, মন না দেখলে চোখের দেখা দেখাই নয়, মন না শুনলে কাণের শােণা শােণাই নয়, মন যদি কোনও বিষয়ে চিন্তা করে, সে সময় সামনে লােক গেলে দেখা যায় না, কেউ ডালে শােনা যায় না, সুতরাং মনকে স্থির করতে হবে, আজিই সে স্থির হ'তে চাইবে না, বহুকাল এলো মেলে বেড়াচ্ছে, তার পেছনে পাহারায় থাকতে হবে, বিবেককে তার পেছনে পাহারায় রাখ, অন্য দিকে গেলেই ফিরিয়ে আনুক, তবে সে অব লম্বনশূন্য হয়ে এখন থাকবে না; যেমন বালকের হাত হ’তে পুতুল কেড়ে নিতে হলে মূয়া দিতে হয়, তেমনি তাকে একটা কিছু কাজ দিতে হবে, মনকে ঐ কাজ দাও, শাসে প্রশ্বাসে নাম জপ করুক, এই প্রণালীতে নাম কর, নামের নীরসতা ঘুচে যাবে, সরস হবে, নাম নামী অভেদ বোধ হবে। নইলে খড় তােল, গরু তােল, কপাট খােল, হরিবােল সবই এক। গুরুদাস সেই গানটি গাও ত বাপ-

গুরু প্রসাদ।
৯
‘মুখে জয় সীতারাম বলিতে বলিতে',
গু-মুখে জয় সীতারাম বলিতে বলিতে, বন্ধুগণ মুখে
শুনিতে শুনিতে, কং। আমার জীবন যাবে।
সহস্রারজ্যোতিঃ দেখিতে দেখিতে,
অনাহত ধ্বনি শুনিতে শুনিতে,
অস্তজগতে ভ্রমিতে ভ্রমিতে
কবে আমার জীবন যাবে ?
অজপায় নাম জপিতে জপিতে,
হৃদয়ে মূৰ্ত্তি তব আঁকিতে আঁকিতে,
ব্রহ্মে লগ্ন মন থাকিতে থাকিতে,
ক্ষুদ্রবিন্দু মহাসাগরেতে মিশিবে ;-
যেভাবে এসেছি যেন সেইভাবে পারি যেতে,
বাসনা কামনা সব, থাকে পড়ে এ জগতে,
ক্ষুদ্র জ্যোতিঃ যেন মিশে সে মহাজ্যোতিতে,
এ দীন ভাবিছে, ভবে সেদিন আসিবে কবে?
আহা! বেশ গান, দেখ, বাপ! নিগুণ ভাবটা
অন্তরে রাখবি, আর বাইরে সগুণ দেখবি, আর রসনায়
নাম বলবি, তাহ'লে আট ঘাট বাঁধা রইল, কারাে সঙ্গে
বিবাদ হবে নি, রসগােল্লার মত উপরে রস, ভিতরে রস,
বড় মধুর হবে, নীরস মরুভূমি দিয়ে হাঁটবার দরকার
কি? সরস সরল পথ থাকতে।

ব্ৰহ্মচারীদের প্রতি।
(স্থান-খড়ের ধার )
তদাস, গুরুদাস, রাঘবানন্দ, সেবানন্দ, পরমানন্দ,
বড় সত্যানন্দ, সত্যানন্দ, জ্ঞানদা, আশুতােষ,
হেমাঙ্গপ্রভৃতি ভক্তসঙ্গে ঠাকুর।
ঠাঃ। দেখ, বাপ! জোর ক'রে কিছু ক’তে
যা নি, সব সময় সাপেক্ষ, ফল ধরলে ফুল আপনি খসে
যাবে, সব ভুল হয়ে যাবে, নইলে রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ,
শব্দ, সবই বেশ ভাগ করা হচ্ছে, রসনায় আস্বাদ
বিস্বাদ, নাসায় দুর্গন্ধ সুগন্ধ, কর্ণে শ্রাব্যাশ্রাব্য, চক্ষুতে
সুন্দর কুৎসিত, চামড়ায় স্পর্শ, সমস্ত জ্ঞানই আছে,
আহার নিদ্রা
মৈথুন, ভয়, ক্রোধ,
সবই আছে,
অথচ কৰ্ম্ম ক’বার বেলা গুণাতীত হয়ে বসলে চলবে
কেন? এখনও আদরে আনন্দ আছে, উপেক্ষায় অভিমান
আছে, লােকসানে দুঃখ আছে, তােষামদে নেশা হয়, যশে
স্ফুৰ্ত্তি হয়, অথচ মুমুক্ষু হয়ে বসলে চলবে কেন? সেটা
অলসতা বা দুর্বলতা ভিন্ন কিছু নয়, তমােণর ক্রিয়া
কি জানিস্ ! অলসতা, তন্দ্রা, ভ্ৰম, প্রমাদ। মনে ক’চ্ছ খুব
বৈরাগ্য হয়েছে, তা নয়, সে বৈরাগ্যে মােক্ষ পাবে না।

গুরু প্রসাদ।
পঙ্গু করে দেবে, ভিতরে সঙ্কল্প চেপে রেখে বাহ ইন্দ্রিয়
দমন, কপটতা বা ধুত্ত তা ভিন্ন কিছু নয়, মাত্র প্রভুত্ব
করব এই আশা ! ওরে আগে দাসত্ব কর, তবে
প্রভুত্ব! আগে উপার্জন কর, তবে ত ব'সে খাবি। ধৰ্ম্ম
যে মােক্ষের সােপান, সৎকর্মের দ্বারা প্রারব্ধ ক্ষয়
করতে হবে, সৎকৰ্ম্মানুষ্ঠানে চিত্তশুদ্ধি হবে, চিত্ত নিৰ্ম্মল
হবে, তবে ত তাতে আত্মজ্যোতিঃ প্রতিফলিত হবে। আমি
মােক্ষকামী ধৰ্ম্মকাজ করব না, পাগলের প্রলাপ ভিন্ন
কি বলা যায়, এ কথা বিজ্ঞাপন ক'রূতে হবে কেন?
উপর থেকে তার ব্যবস্থা হবে, অনাসক্ত হ'য়ে কর্তব্য যা
সামনে পড়ে, করে যাও, যদি বল ফল-কামনা না ক’লেও
কর্মের স্বভাব, সে ফল প্রসব ক'রবে, শাস্ত্র তারও বিধি
দিয়েছে, কৰ্ম্মফল ইষ্টে অর্পণ করতে হয়। তাহলে ঐ
বীজে আর গাছ হবে না, কারণ সিদ্ধ করা ধানে
আর গাছ হবে না, তবে আন্তরিক দিতে হবে,
মুখে ‘কৃষ্ণায় নমঃ' ব'লে যশের জন্য কাণ পেতে থাকলে
চলবে না, বাপ, সব! তঁাকে ভালবাসব ব’লে ভালবাস,
কিছু চেও না, মােক, মুক্তি, সিদ্ধি, আরোগ্য, কিছু না,
শুধু তােমায় ভালবাস্, ধৰ্ম্মবণিক হ’সনি, কর্তব্য
সম্মুখে এলে সিংহের মত তাকে আক্রমণ করে সমাধা
করবে। তবে পূর্ব হ'তে মাত্র কস্মেরি জল্পনা-কল্পনা কর
নি, বাহে পেলে পাই যাবে, “পাইখানা, পাইখানা,

গুরু প্রসাদ।
চিন্তা করনি, আত্মার মােক্ষ, জগতের হিত, সাধুর কৰ্ত্তব্য,
যদি তাই না ক’রূবে ত জনসঙ্গে কেন ? ধড়াচূড়া বেঁধে
আশ্রম করে, বচন রচন দিয়ে, তাদের খাবে, তাদের
উপকার কিছু করবে না। দেখ বাপ! জ্ঞান-দানের তুল্য
দান নাই, দয়ার তুল্য ধৰ্ম্ম নাই, তুমি মােকামী সংসারে
কেন? পৰ্বত-গুহায় যাও, তা নয়—সুখটিও চাই, ক’বও
কিছু, সে ত প্রবঞ্চক। সাবধান, ভুমি সাধু, যে কোনও
উপায়ে জগতের হিত কর, জগতের সেবা কর, তিনিই
নিজ মুখে বলেছেন, “বীজং মাং সৰ্ব্বভূতানাং বিদ্ধি পার্থ
সনাতনম্। বুদ্ধিবুদ্ধিমতামস্মি, ভেজস্তেজস্বিনামহম্ ।
।
উপনিষং বলেছেন,
এবং যঃ সৰ্ব্বভূতেষু, পশ্য ত্যাত্মানমাত্মনা।
স সর্বেৰ সমতামেতৎ ব্ৰহ্মেভ্যোপি পরং পদম।
শঙ্করাচাৰ্য বলেছেন,
ভব সম চিত্ত, সৰ্ব্বত্রত্বং,
বাস্য চিরা, যদি বিষ্ণুত্বং।
গুরু নানক বলেছেন,
"
পাথর পূজে চুতিয়া, পুছ পুছ পস্তায়,
নানক পূজে আত্মা, ঘট ঘট শালগ্রাম।

গুরুপ্রসাদ।
মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন,
সব কই ঘটমে হরি বৈঠা হায়,
পাছান তা নেহি কৈ।
আপকো নাভিকা গন্ধঃ মৃগ নাহি জান ত,
ঢুড় ব্যাকুল হৈ ।
আরও দেখ, কৃষ্ণ অবতারে ভগবান্ দেখিয়েছেন,
অনাসক্ত ভাবে কৰ্ম্ম কিরূপ করূতে হয়, তার কি কৰ্ম্ম
ক’রবার কিছু দরকার ছিল? না কোনও স্বার্থ ছিল ?
তুমি কি কৃষ্ণ অপেক্ষাও যােগী ? তিনি আসক্তি ত্যাগ
ক'রেকর্ম করেছেন, আর তুমি কৰ্ম্ম ত্যাগ করে আসক্তি
রেখেছ, উল্টা বুঝলি রাম ! নিষ্কাম মানে কি কৰ্ম্মে শক্তি-
হীনতা? নিগুণ মানে কি গুণহীন ? ব্রহ্মের কোনও শক্তি
নাই ? আর তার কোনও গুণ নাই ? কেমন ? ওরে
তা নয় তা নয়, অমূল্য মানে মূল্যহীন নয়, মূল্য দেওয়া
যায়নি। বিশেষতঃ যারা অকৃতদার, তাদের কর্তব্য
আরও গুরু, তারা বিধিনির্ণীত কৰ্ত্তব্যকে ঠেলেছে, কেন
ঠেলেছে, স্বাধীনপ্রাণে বিশ্বের কল্যাণ করবে বলে, তা
দিকে কোনও কাজে বাধা পেতে হবে না, তা দিকে পিছু
দিকে তাকাতে হবে না, কেবল সম্মুখের দিকে ছুটবে,
সে ত নিজের জন্য কিছু করছে না, সে যা করছে, স্বার্থে
নয় পরার্থে, তা না করে অলসতাকে প্রশ্রয় দিয়ে বৈরাগের
দোহাই দিয়ে পরের মাথায় কঁঠাল রেখে শুধু বসে খাবে,

গুরু প্রসাদ।
সেটা ঘাের তমােগুণের লক্ষণ, খুব সাবধান,দেখ মহাজনরা
কি করে গেছেন, রাম, কৃষ্ণ, পরশুরাম, গৌরাঙ্গ, বামন,
বুদ্ধ, শঙ্করাচাৰ্য, রামকৃষ্ণ পরমহংস, বিবেকানন্দ, সকলেই
কাজ করেছেন, যার যেমন আধার। এটা যে কৰ্ম্মক্ষেত্র,
এখানে যখন আসা হয়েছে, তখন অবিচারে স্বীকার কর,
কৰ্ম্ম করতে এসেছি, ঋণ শােধ করতে এসেছি, জোর
করে না কর, আবার আসতে হবে, তাই শাস্ত্রে বলেছেন,
“যাবঃ ক্ষীয়তে কৰ্ম্ম কল্পকোটীশতৈরপি”।
কোটী কল্পেও যদি কৰ্ম্মক্ষয় না হয়, বিশ্রাম দুবাশা।
ভাব, কাজ করলেই ত কাজ ফুরাবে, হাঁটলেই ত পথ
ফুরাবে। এখন আমার কথা না শুনতে পার, মনে মনে
অহংব্ৰহ্ম হতে পার, কিন্তু মনে রেখাে-
অবশ্য মেব ডােক্তব্যং কৃতং কৰ্ম্ম শুভাশুভ।
কর্ম ভিন্ন কর্ম ক্ষয়ের দ্বিতীয় উপায়
নাই। পিপাসা নিবারণের জন্য জলই একমাত্র উপায়,
যদি বল, জ্ঞানাগ্নিদগ্ধ-কৰ্ম্মানং, সে জ্ঞানের উৎ
পত্তিও কর্মের দ্বারায়, সৎকৰ্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা
চিত্তশুদ্ধি না হলে জ্ঞানের প্রকাশ হয় না। ওরে
নীতােয়ান প্রজার দুন মাল্গুজারি। কৰ্ম্মশূন্য থাকি
নি, ভাঙ্গা ঘরে ভূতের বাসা, জোর করে গুরু সাজি নি,
বাহিরে কৰ্ম্ম ছাড়লে যদি মুক্তপুরুষ হয়, তা হলে পঙ্গুর

গুরু প্রসাদ।
মত মুক্ত পুরুষ ও কেউ নয়, তাকে যে ধরে হাগাতে
হয়। দেখ বাপ! নিজের মতে চলিনি, জোর করে প্রভূ
হ’তে যানি। সব যাবে, কাজ করে যাও, পুরস্কারের
জন্য ভাবতে হবে নি, তবে কাজেরও প্রকারভেদ আছে,
মাটি কাটার নামও কাজ, কিন্তু সকলের জন্য ব্যবস্থা নয়।
অবস্থা বিশেষে কৰ্ম্মের ব্যবস্থাও আছে। কৰ্ম্ম তিনপ্রকার,
কায়িক, বাচনিক, মানসিক, তার মধ্যে যার বৃত্তিতে যেটি
খাপ খায়, সদ্গুরুর আদেশ অনুসারে সে সেইরূপ কাজ
করবে। আর যদি মােক্ষই চাস, জগতের সেবা করা
মােক্ষলাভের সরল পথ নয় কি! মনে কর একটি
মানুষকে যদি ঠিক ভালবাসা যায়, তাকে ভাবতে ভাবতে
কত সময় আমি ভুল হয়ে যায়, কিন্তু ঐরূপ পাঁচ দশ বিশ
করে যখন সারাজগৎকে ভাল বাসতে পারি, তখনি ত
আমি ভুল হয়ে যাবে ! জগৎকে ঈশ্ব জ্ঞান হবে. “সৰ্বং
খল্বিদং ব্রহ্ম” জ্ঞান এসে যাবে, তাহলেই ত হ’ল, বিয়ে
করে সংসারী হলে টাকা চাই চাই করতিস্, এও মোক্ষ
চাই মােক্ষ চাই কাছস্ একই কথা, দেহি দেহ ত ঘুচল
। কাবাে সঙ্গে মিশবার যাে নাই, তাহলে মােক্ষ পাব
না, কিছু কাজ করার যাে নাই -তাহলে মােক্ষ পাব না,
কারো সঙ্গে কথা কবর যাে নাই, মােক্ষ খারাপ হয়ে
যাবে । এত বন্ধনের বিনিময়ে ন্ধন, ভুল সেরে নে, ভুল
সেরে নে, অবস্থা মত কাজ করে যা, সংসাররি হাত পা

গুরুপ্রসাদ।
বাঁধা, তাদের মাথায় যে কর্তব্য আছে, তাই তাদের যথেষ্ট।
তােমরা স্বাধীন, সাধ্যমত সৎকর্ম কর, অন্ততঃ যতদিন
কৰ্ম্ম আছে, সময় হলে তিনি অবসর করে দিবেন, কি
হবে, তােমার ভাববার দরকার কি? সদসৎবিচার
করে অনাসক্ত ভাবে কৰ্ম্ম করে যাও, যখন তােমার
ইচ্ছায় আপনি কৰ্ম্ম হয়ে যাবে, তখন কৰ্ম্ম ত্যাগ ; আর
কৰ্ম্ম করতে হবে না। তুমি করতে চাইলেও তিনি
করতে দিবেন না।

প্রশ্নোত্তর। (স্থান-হরিভজনকুটীর ) ভক্তসঙ্গে ঠাকুর, পরমানন্দ, বড় সত্যানন্দ, ছােট সত্যানন্দ, ভক্তদাস, গুরুদাস প্রভৃতি। ভক্তদাস। আচ্ছা বাবা কি ধ্যান করব? ঠা। যা তােমার ভাল লাগে । অর্থাৎ যাকে ভাল- বাস, মহর্ষি পতঞ্জলি বলেছেন, “যভিমতধ্যানাদ্বা”- ভ। বাবা আমাদের ভালবাসার কি একটা স্থির হয়েছে, কখনও এটা কখনও ওটা,- ঠা। তবে কোনও চিন্তা না করে স্থির হবার চেষ্টা করবে, কোনও সঙ্কল্প আসতে দিবে না। মন কি কৰ্ম্মশূন্য হয়ে থাকবে বাবা! ঠা ঐ যে কৰ্ম্ম রইল, সঙ্কল্প তাড়ান! যােগের.. পঞ্চম অঙ্গ প্রত্যাহারমনকে প্রাণের সঙ্গে রাখবার চেষ্টা। টলে জীব,অটলে শিব। প্রত্যাহাৱ পরিপক্ক হলেই শ্যান। বাবা ! অবলম্বন শূন্য হয়ে থাকা আমাদের পক্ষে কষ্টকর, বা দুরাশা।

গুরু প্রসাদ।
ঠা। তবে ..••• অনুষ্ঠানে বিনা কল্পনায় যে জ্যোতি
দর্শন হবে, তাই ধ্যান করবে—
বাবা প্রতিদিন ত দর্শন হয় না।
ঠা। । নাই বা হ'ল, কোনও বস্তু একবার দেখলে,
তারপর না দেখলেও কি সে বস্তু স্মরণ হয় না
আজ্ঞা তা হয় ।
ঠা । তবে তাই চিন্তা করবে। কেউ কেউ গুরু
মূর্তি ও চিন্তা করেন, কিম্বা রাম, কৃষ্ণ, কালী, শিব প্রভৃতি
ও চিন্তা করেন।
আচ্ছা বাবা ! আপনি যে বলেছিলেন,-মুদ্রা
মানে ঘরে খিল দিয়ে নির্জনে বসা, কিন্তু মূত্রা এটেও
দেখেছি, তখনও ভিতরে গােলমাল থাকে।
। তা থাকবে বৈ কি? যদি পাঁচজন লোেক ঘরে
ঢুকিয়ে খিল দাও? কিম্বা ঘরে লােক আছে তখন খিল
দাও? তাহ'লে ? ঘর খালি করে খিল দাও। তার ক্রিয়া
ত তােমরা পেয়েছ, ইচ্ছ৷ মাত্রেই সঙ্কল্পশূন্য হতে পারবে।
ভ। আচ্ছা বাবা! সাধন করা কিসের জন্য?
ঠা ; প্রকৃত বিশ্রাম লাভের জন্য ।
সাধারণ মানুষ কি বিশ্রাম পায় না।
ঠা। কৈ পায়, তাহলে জ্বলে ম'র কেন ?
কেন সংসারের কাজ শেষ করে তারা ত বিশ্রাম
লাভ করে।

রুপ্রসাদ।
ঠা। হাঁ, সে মাত্র দেহটাকে ছিচড়ে নিয়ে যেয়ে,
বিছানায় ফেলে! মন কিন্তু কৰ্ম্ম করে। বরং যখন এ
ধার ওধার ঘুছিল, তখন ভাল ছিল, বিশ্রামে দ্বিগুণ
জালা, চিন্তা রাক্ষসী তখন গােটাটা গিলে ফেলে ।
তাহলে প্রকৃত বিশ্রামটি কি ? কিরূপেই বা
লাভ হয়।
ঠা। যে দিন কর্তব্য নামধারী দায়িত্বের হাত হ'তে
মুক্তি পাবে, যে দিন নিজের কিছু প্রয়ােজন বলে থাকবে
, যেমন বাপের বেটা সংসারের কোনও ধার ধারেনি,
অভাব স্বভাব ভালমন্দ বাবা জানে, তার মানে জড়তা
নয়, স্বেচ্ছায় কৰ্ম্ম করা। তবেই যিনি ভাল, মন্দ, সুখ,
দুঃখ, কৰ্তব্যাকর্তব্যের পরপারে গেছেন, তিনি গুণাতীত,
গুণ তার দাসত্ব করছে। লেখাপড়া বিধি নিষেধ, তার
ন্য নয়।
ত। আচ্ছা বাবা! প্রাণায়ামের প্রয়োজন কি?
ঠা। এই হাত পা এলে গেলে যেমন জিরাতে হয়,
অর্থাৎ বিশ্রাম দিতে হয়, সেইরূপ প্রাণকে বিশ্রাম দেওয়া,
এলে গেলেই ত মুস্কিল গাে! এই দেহ রথের ঐ যে
সারথি ! স্থিরত্বই সাধনা। বায়ু স্থির না হলে মনস্থির
হবে না।
“চলে বাতে চলচ্চিত্তম, নিশ্চলে নিশ্চলং ভবেৎ।
চঞ্চলতাও যে অভ্যাসের দ্বারা লাভ করেছ,নইলে

গুরুপ্রসাদ তুমিই ত মাতৃগর্ভে আধহাত জায়গায় ছিলে, আজ সারা বিশ্ব দৌড়েও তােমার সাধ মিটে নাই। সুতরাং অভ্যাসে য়া লাভ করেছ অভ্যাসেই তাকে ত্যাগ করতে হবে। মণিপুর থেকে বাঁকুড়া যেতেও হঁটুতে হবে, ফিরতেও হাঁটুতে হবে। যে সিড়ি ছাতে উঠবার, সেই -িড়িই নামবার, সুতরাং কৰ্ম্মের দ্বারাই কম্মের ক্ষয় করতে হবে। আচ্ছা বাবা ! সংসারে থেকে কি যােগ সাধন ঠা। হয় না ? সংসারে থেকেই ভাল হয়, রাজর্ষি জনক মহা- যােগী ছিলেন, তাই ব্যাসদেব পুত্র শুকদেবকে, জনকের নিকট যােগ শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন। আরাে দেখ, গীতায় বলছে, “যুক্তাহারবিহার” অর্থাৎ আহার, বিহার, নিদ্রা, চেষ্টা, কম্মু, সব নিয়ম মত করতে হবে, যােগের দ্বিতীয় অঙ্গ নিয়ম, তাহলে বাইরে ঘুরে বেড়ালে নিয়ম থাকবে কি করে ? ভগবান্ আরও বলেছেন, “শুচো দেশে প্রতিষ্ঠাপ্য স্থিরমান মুত্তমম্ । তাহ'লে আশ্রম প্রয়ােজন। কোনও কোনও মহাজন বলেছেন, “যােগী বৈঠা ভালা, সন্ন্যাসী রন্তা ভাল,” আর যারা এই পথ প্রদর্শক। সেই সব ঋষিদের কথা ভাব, প্রায় অনেকেই বিবাহিত, এবং পুত্র কন্যাদিও ছিল, শাস্ত্র- যুক্তি অনুসারে পত্নাগমনে সংসারীর ব্রহ্মচর্য রক্ষা হয়,

গুরু সাদ।
তারপর বুঝে দেখ, কোনও ভূত্য যদি প্রভুর নির্দিষ্ট কৰ্ম্ম
শেষ করে, আবার এসে প্রভুর একটু সেবা করে, তার
উপর প্রভু কত সন্তোষ হয় ! দেখ বাপ! অনাচারী
সন্ন্যাসী অপেক্ষা স্বভাবী গৃহস্থ ভাল, আজকাল সন্ন্যাসীর
অবস্থা দেখছ ত? সহর ঘেসে একটি আশ্রম করে ভড়ং
ভাড়ং দেখিয়ে বেশ দু’পয়সা উপায় করে জমী, জমা,
বাড়ী, চাকর, দরোয়ান, নালীশ, মােকর্দমা, আরাে যা
কিছু ক’ৰ্ত্তে নাই, সবই চলছে। একটু যবনিকার
আড়ালে।
তার চেয়ে কর্তব্যনিষ্ঠ সংসারী ভাল।
সে
মেষচৰ্ম্মাচ্ছাদিত মেষ, এ যে সিংহচৰ্ম্মাচ্ছাদিত মেষ, বড়
খারাপ।
পঃ।
বাবা ! আমাদের ওখানে একজন বৈষ্ণব
আছে, সে রূপার দাত খুটনীতে করে রাধাকৃষ্ণের ফটোর
দাঁত খুঁটে দেয়।
বলে আমাদের সেবা:ধৰ্ম্ম।
ঠাঃ। । দাত খুটে দেয় বটে, কিন্তু গা হাত পা
টিপে দেয় কি! তার বেলা বে টা জানে ভেঙ্গে যাবে, তখন
জ্ঞান আছে, যে ওটা কাগজ, কালি আয়না।
দেখুন বাবা! রামানন্দ সাধুর বড় আচারী,
তাদের কাছে আমাদের থাকাই মুস্কিল।
পঃ।

শুচি অশুচি।
ঠা।
দেখ বাপ! প্রথম প্রথম আচার মেনে চলা
মাল। মন পবিত্র হয়, তা বলে যেন শুচিবাই না হয়।
তারপর যখন বুঝবে, এই সারাটা বিশ্বে পাচটা জিনিষ,
মাটী, জল, আগুন, হাওয়া, আকাশ, আবার ঐ পাঁচটা
একটা হ'তেই হয়েছে, একটা হাঁসেরই পাঁচটা ডিম।
তখন কোন্টা শুচি আর কোষ্টা অশুচি বলবে ? তবে
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ভাল। অার শাস্ত্রেও বলেছে,--
“নং মনােমল-ত্যাগ; শৌচ ইন্দ্রিয়নিগ্রহঃ।
অভেদদর্শনং ধ্যানং জ্ঞানং নির্বিষয়ে মন।”
অর্থাৎ মনের ময়লা ত্যাগের নামই স্নান। ইন্দ্রিয়
বশীভূত করার নাম শৌচ, পাঁচ ঘুচিয়ে এক করার নাম
ধ্যান। বিষয় হতে মন আলাদা হলেই জ্ঞান লাভ।
বিষয় মানে মাত্র টাকা কড়ি জমী জমা নয়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ
যাবতীয় বিষয়। শুধু পদ গামছা ঘসে ঘসে পদের ছাল
তুলে ফেলে কি হবে? এক আঙ্গুল ভিতরেই যে আবার
তাই ! চোখ বুঝিয়ে ধ্যানে বলে কি হবে, মাঝে মাঝে
এলাে মেলাে ভাবনা, আর ঘাের অন্ধকার, আর খপরের
কাগজ পড়ে ব্ৰহ্মজ্ঞান, তাতে কি হবে, অপক্ক রা ।

অকপ্রসাদ।
৭৩
প। আচ্ছা বাবা! যার দরিদ্র খেটে খায়, তাদের
উপায় কি?
ঠাঃ। কেন তারা সদ্গুরুর আশ্রয় নিয়ে সৎ নাম
গ্রহণ করে স্বাসে প্রশ্বাসে জপপ্রণালী গুরুর নিকট
জেনে সর্বদা জপ করবে । সংসারের কর্তব্যও সমাধা
করবে। কাজের সময় শ্বাস প্রশ্বাস ত বন্ধ থাকে নি,
পরে দিবারাত্রের মধ্যে, যখন তার সুবিধা হবে, স্থির
হয়ে বসে তঁার রূপ চিন্তা করবে। আর ঈশ্বর আছেন,
তাকে ভালবাসতে হবে, সেটা সর্বদা মনে রাখবে, আর
আমায় মরতে হবে, এই কথাটা দিনে রাত্রে দু চারবার
স্মরণ করবে। তা হলে ঈশ্বর তার উপর শীঘ্র সন্তোষ
হবেন।

সন্ন্যাসী।
?
ঠাঃ।
পঃ। আচ্ছা বাবা! সন্ন্যাস নেবার নিয়ম কি
সন্ন্যাস নেওয়া মানে ? সন্ন্যাস ত একটি
অবস্থা। একটি মানুষেরই চারটি অবস্থা হয়, ব্রহ্মচর্য্য,
গার্হস্থ্য, বাণ প্রস্থ, সন্ন্যাস, তা না হয়ে সেই পাঁচসিকা
দিয়ে ভেক নিয়ে বৈষ্ণব হবার মত ?
আজ্ঞে এই যে সন্ন্যাসের ঘরে গিয়ে সন্ন্যাস
পঃ।
নেয় না ?
ঠাঃ। হুঁ হাঁ, কাক যেমন ময়ূরপুচ্ছ দিয়ে গা ঢেকে
ছিল, ওরে বাপু! সন্ন্যাসীকে স্পর্শ করলে স্নানের
ব্যবস্থা আছে, কারণ মৃতব্যক্তি-স্পর্শজনিত দোষ হয় ।
সন্ন্যাসীকে নিজের পিণ্ড নিজে দিতে হয়, তা হলে ভাব
শাস্ত্রের উদ্দেশ্য কি ? মৃতব্যক্তি যেমন সুখ, দুঃখ, নিন্দা,
বন্দনা, মান, অপমান, ভাল, মন, কিছুতেই বিচলিত হয়
,-জীবন্তে সজ্ঞানে সেই অবস্থা প্রাপ্ত হলে, তাকে
বলে সন্ন্যাস। দায়ভাগে ব্যবস্থা আছে, সন্ন্যাসীর শ্রাদ্ধে
বা সম্পত্তিতে অধিকার নাই।
ওরে বাপু!
তিনটি
জগৎ জয় করে গেলে তবে অধ্যাত্ম জগতে প্রবেশ করা
যায়। হস্ত পদ চক্ষু কর্ণাদির দ্বারায় বহির্জগৎ, মনের

গুরু প্রসাদ। ৭ দ্বারায় অন্তর্জগৎ, বুদ্ধির দ্বারায় বৌদ্ধ জগৎ পার হলে ভবে আত্মায় রমণ। তখন সন্ন্যাস অবস্থা, নৈলে শাক ভাত খেয়ে কালীয়া কোপ্তার ঢেকুর তুল্লে কি হবে ? আজকাল সন্ন্যাসী চিন্বার মাপকাঠী হচ্ছে খবরের কাগজে কটা পাশ করেছে, কেমন লেক্চার দেয় ? কত বড়লােক শিষ্য আছে। এর কারণ কি জানিস্ ? মানুষের দোষ নাই, সােণা চিনতে হলে কষ্টি পাথরের দরকার। কিন্তু তাদের কষ্টি পাথর নাই. কিসে বুঝে নেয়? প্রায়ই মানুষ নিজের মন নিয়ে কাজ করে নি। নিজের মন নিজের বশে নেই, অপরের ইচ্ছায় চালিত হয়ে পড়েছে, কারো বার আনা, কারো মােল আনাই ; অধিকাংশ লােকই গিন্নির যুক্তিতে কাজ করে, কেউ কেউ আশ পাশের দু’চারজনকে জিজ্ঞাসা করে, নাম মাত্র। মনে কর, কোনও একটা যুক্তি স্থির করতে হলে, মনটাকে গুছিয়ে নিয়ে বসতে হবে ত? কিন্তু বেচারাদের মনের আদায় নাই, গয়ংগচ্ছে পড়ে গেছে। দেখ, তাস খেলার সময় যদি পাশে বসে একজন বলে দেয়, এটা দাও ; দু’চার- বারের পর, আর তার মত না নিয়ে কাগজ দেওয়া যায় তখন যে খেলছিল, সে জয় টাক কঁাদে ক'রে ব'সে রইল। বাজাতে লাগল অপরে। সে মাত্র কাগজ কুড়াচ্ছে, সাজাচ্ছে, নিজের ইচ্ছায় যদি কখনও একখানা তা দিব মনে করে, পাশের লােকটি বলে, হা হা হা নি।

গুরুপ্রসাদ।
দিও নি, থাম দেখি, খানিক পরে হয় ত বল্লে আচ্ছা দাও,
সেইটাই দিতে হ'ল, কিন্তু নিজের ইচ্ছায় হ’ল না। কি
ক'রে সন্ন্যাসী চিনবে? পাঁচ সের গুড় ওজন ক'বুতে
হলে, বাটখারাটাও ত পাঁচ সের চাই ? পরের মতে
চলে চলে এক ত নিজের মন হারিয়ে ফেলেছে, তার
উপর কল্পনার যেরূপ আড়ম্বর, মিথ্যা যেরূপ প্রতিপত্তি
লাত করেছে, তাতে ত চিনার উপায়ই নাই। যার চোদ্দ
পুরুষ যােগে গঙ্গাস্নান করে নি, সে লিখছে যােগশাস্ত্র,
রাশি রাশি ক্রিয়া মুদ্রা, আসন, লিখে দিচ্ছে, নিজে কিন্তু
আসনের মধ্যে শবাসন, মুদ্রার মধ্যে রৌপ্য মুদ্রা, আর
ক্রিয়ার মধ্যে আহার নিদ্রা, মৈথুন জানেন। কি বলব
বাপ! তবে যদি পরিত্রাণ চা, ত্রাহি ত্রাহি ক'রে কাঁদ,
জাহির হতে যানি। ওরে ব্রহ্মচারী, যােগী, ত্যাগী,
সন্ন্যাসী, অবধূত, পরমহংস, সবই এক একটি উপাখি,
উপাধি, উপাধির তুল্য ব্যাধি নাই, স্বর্গের দ্বার হ'তে ঘাড়ে
ধরে টেনে আনে। হাটে ধৰ্ম্ম মিলে না-নামায়
যে ভাত কুড়িয়ে খাচ্ছে, সেখানে চেষ্টা
কবি, সাধু মিলেও মিলতে পাবে।

কৰ্ম্মফল।
প। আচ্ছা বাবা! আত্মজ্ঞান লাভ করলেও কি
কৰ্ম্মফল ধ্বংস হয় না ?
ঠাঃ। না ধ্বংস হয় না,তবে দুর্বল হয়। হাত হতে তীর
ছেড়ে দিলে, সে তীরের উপর তীরন্দাজের আর কোনও
কর্তৃত্ব থাকে না, ছাড়বার পর যদি বুঝতে পারে, যে মানুষ
টাকে তীরটা লাগবে, তাহ'লেও নিরুপায়, কৃতকর্মের ফল
ভােগ করতেই হবে। মনে কর প্রবাসী পুত্রের মৃত্যু
সংবাদ পেয়ে মা মাথা খুঁড়ে কপাল কেটে ফেল্পে, তার
পর জানা গেল, খপর মিথ্যা, পুত্র মরে নি। রােদন থামল
বটে, কিন্তু কপালের ঘা কি তখুনি সারে?

মায়া।
ঠাঃ।
সত্যানন্দ। আচ্ছা বাবা! মায়া কাকে বলে?
আবরণকে মায়া বলে, অজ্ঞানকে মায়া বলে,
আশাকে মায়া বলে, যেমন আয়নার উপর ময়লা পড়লে
তাতে নিজের মুখ দেখা যায় না, মেঘ করলে যেমন সূৰ্য্য
দেখা যায় না, সেইরূপ কতকগুলা কামনা বাসনা ঢাকা
পড়ে আমাদের জ্ঞানকে প্রকাশ হতে দেয় না। কামনা
বা আশাই মায়া, মিথ্যাকে সত্যজ্ঞানই মায়া।
আচ্ছা বাবা! প্রকৃতিই ত গুরুরূপে মানুষকে
পলে পলে শিক্ষা দিচ্ছে, কেন মানুষ ধরতে পারছে না।
ঠা। কি করে ধ’রুবে ? গুদাম খালি নাই। মনে
কর একটা বাটী যদি গুড়ে বােঝাই থাকে, আর তাতে
দুধ রাখা যায় কি ? তেমনি সর্বদা বিষয় চিন্তায় বা অন্যান্য
চিন্তায় গুদাম বােঝাই, আর সেখানে কিছু ধ’রবার
উপায় নাই। অসদ্ভাব যখন যতটুকু খালি
ক’রুবে, তখনি সদ্ভাব ততটুকু ঢুকে
যাবে, ভাল তােমায় খুঁজতে হবেনি, মন্দ
তাড়াও, মন্দ শূন্য হলেই ভাল। বহু মহা-
পুরুষ এই জগতে তাদের তপস্যা-সঞ্চিত সদ্ভাব রেখে
গেছে, সে সব ভাব বায়ুর সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আধার
খালি পেলেই ভুকে পড়বে, তার জন্য তােমায়
চেষ্টা করতে হবে না।

একেশ্বরবাদী। রাখবানন্দ। আচ্ছা বাবা! আপনি বলেন একেশর- বাদী হওয়া খুব ভাল, কিন্তু কি যুক্তিতে একেশ্বরবাদী হওয়া যায় ? ঠা। বৎস! অনধিকারীর নিকট এ সব বলতে নাই, দেখ বাপ! সর্বদাই চিন্তা করতে হবে, এবিশ্বের কৰ্ত্তা একজন কেউ আছে, তার নাম ব্ৰহ্মই হউক, আত্মাই হউক, রামই হউক,বা যাই হউক। তুমি যদি রামকে ভাল: বাস, তাহলে ভাবতে হবে, রামই এ বিশ্বের একমাত্র কর্তা, দৃশ্য, অদৃশ্য, জড়, চৈতন্য, যা কিছু সব রামই হয়েছেন, এটি বাহিরের ভাব। আর একটু সূক্ষে বুঝ, তুমি থাকতে একের অস্তিত্ব রাখা মুস্কিল, কারণ রাম, আর তুমি দুই হ’ল, তা হ'লে “একমেবাদ্বিতীয়”, শব্দের অর্থ হয় না। তাহলে দেখ, “অয়মাত্মা ব্ৰহ্ম” বলা ভিন্ন অর্থাৎ আমি ব্ৰহ্ম না বল্লে “একং ব্ৰহ্ম দ্বয়ং নাস্তি” সপ্রমাণ করা যায় না। গুরুদাস সেই গানটি গাওত বাপ! ভয় ঘুচেছে এবার আমি ভরসা পেয়েছি, গুঃ। ভয় ঘুচেছে এবার আমি ভরসা পেয়েছি, যদি একটা বই দুটা নাই তবে স্বর্গ কি,আর নরক কি ? আমি আদি অন্ত মধ্য আমি বােদ্ধা আমি বােধ্য, আমি মহৎ ক্ষুদ্র আমি পুরুষ প্রকৃতি- আমি ভূভুব, মহ, জন, তপ, সত্য সপ্তব্যাহৃতি।

গুরুপ্রসাদ।
আমি দ্রষ্টা আমি দৃশ্য আমি স্রষ্টা আমি বিশ্ব,
দ্বিজ, ক্ষত্র, শূদ্র, বৈশ্য, আমিই সব জাতি ;-
আমি নির্লিপ্ত নিষ্ক্রিয় মুক্ত অথচ সবেই আছি।
সৰ্বঘটে আমি থাকি, করি না কিছু ব’সে দেখি,
দাতা, তােক্তা, নয় গাে আমি, কর্মের সাক্ষী
জগৎ আমাতেই হয় উৎপত্তি, আমাতেই নেয় সমাধি।
রাঃ। আচ্ছা বাবা! যদি বলি, রাম তুমিই একমাত্র
আছ ?
ঠাঃ। বিচার করে দেখ, বাপ! তুমি বলে তার
পূর্বে একটা ‘আমি’ আছে, ‘তুমি’ দ্বিতীয় পুরুষ, ‘আমি’
প্রথম পুরুষ, সুর না থাকলে রেখাব গান্ধার প্রকাশ হতে
পারে না, তুমির প্রকাশক আমি, আমি না থাকলে তুমি
কথার সৃষ্টিই হত না। সুতরাং “অয়মাত্মা ব্ৰহ্ম” বলা
ভিন্ন এক প্রমাণ করার দ্বিতীয় বাক্য নাই। ইহা
অবিতর্কিত সত্য।
রাঃ। আচ্ছা বাবা! ব্ৰহ্ম অনন্ত, অব্যক্ত, অসীম,
তাহলে আমি কি করে ব্রহ্ম হব ?
ঠাঃ। আমি বলি তুমিও অনন্ত, অব্যক্ত, অসীম,
নাম উপাধি ছাড়, তাহলে তুমি মানুষ, মানুষের আদি
খুজে খুজে যাও, অনন্তে পৌঁছাবে।
আর এই অনন্ত
বায়ু রাশির সঙ্গে তােমার নানার বায়ু কি ভিন্ন? অসীম
আকাশের সঙ্গে তােমার ঘটাকাশ কি পৃথক্ ? জাগতিক

রুপ্রসাদ। উত্তাপ হ'তে তােমার দৈহিক উত্তাপ কি পৃথক? তুমিই জাগ্রতে ব্যক্ত, সুষুপ্তিতে অব্যক্ত, আর ব্রহ্ম যদি অনন্ত হয়, তা হলে তুমি খণ্ড বা সীমাবিশিষ্ট কি করে হবে? ব্ৰহ্মকে অখণ্ড ৰ'লে, আবার অন্য কোনও বস্তুর পৃথক অস্তিত্ব কল্পনা করলে, ব্ৰহ্ম অখণ্ড এ বাক্য অস্বীকার যত মরা সােণাই হউক, সোনা ত? খাদ উড়িয়ে দিলেই পাকা! বৃক্ষের যে কোনও স্থান স্পর্শ কর, গাছ ছুয়েছি বলা চলবে, অর্থাৎ এক স্বীকার করতে হ'লে আত্মা ব্ৰহ্ম ভিন্ন উপায় নাই, বেদান্ত বাক্যের সহিত মিলিয়ে দেখ, বেদান্তের সারবাক্য অস্তি, ভাতি, প্রিয়, অস্তি অর্থে আছে, ভাতি অর্থে প্রকাশ, প্রিয় অর্থে ভাল- বাসা। তা হলে দেখ, আমার অস্তিত্বেই বিশ্বের অস্তিত্ব, আমার প্রকাশেই বিশ্বপ্রকাশ,আর আমিই আমার শ্রেষ্ঠ ভালবাসার, আমি না থাকলে বিশ্ব আছে না আছে কে দেখত? আর ব্রহ্ম যে আছে নিশ্চয়,কে স্বীকার কত ! পুত্র শােকে মাতা, কি পতি শােকে পত্নী, মাথা খুড়ছে, বলছে আমি ম’লাম না কেন? তখনি তাকে যদি বলা হয়, তােমার গলা কেটে ফেল্লে তােমার ছেলে বাঁচবে, সে স্বীকার করবে না, কেন স্বীকার করবে? সে যদি রইল না, পুত্র পতির মরা বাঁচায় তার ক্ষতি বৃদ্ধি কি ? তাহলে আমি আমাকে যত ভাল বাসি,তেমনভালবাসা কাকেও বাসিন, গুরু প্রসাদ। প্রেমিক। ; যদি কেউ পারে, সে অতি বিরল। তারি নাম বিশ্ব- যে আপন ভুলে পরকে ভালবাসতে পারে, সে জাগতিক উপমার নয় কারণ যাহা বিরল, তাহা সার্বজনীন উপমিত নয়। যেমন কোনও কোনও মেয়ের পেটে দুটা ছেলে হয়। তবে ‘অহং ব্ৰহ্ম মুখে বলা বাচালতা মাত্র, ওটিকেল নিজের ভাব, বা মুলধন। একটি গান কর বাপ, গুরুদাস! গুঃ। ক্ষেপা মন রে বেহু’সে, এসে কি কল্লি আমির দেশে তুই আসল আমি ভুলে গেলি, নকল আমি মিশে। তুই জন্মাবধি ভিতর কাণা, চিবি আমি কিসে মহাকাশে উড়ছে আমি, ছায়া ঘটাকাশে । সেই আমিটাই এই আমি রে, মােটে নাই তাের দিশে ; আছে এক আমিতেই লক্ষ আমি, ঘটে ঘটে মিশে। ঘটের নাশে এক আমি পাই হিসাবে নিকাশে; সেই আমির জোরে বেড়ায় আমি কত খেলে হেসে। তুই বারেক ত চিলিনা আমি, আমির ঘরে এসে ; আমি আমি বলে সবাই কিন্তু আমিতে না মিশে ; শেখা কথায় বললে আমি, আমি চিবি কিসে? সে ভিতর আমির নাই রে খপর বাহির আমির দেশে। এই আমি আমার কিছু নয় মন, সেই আমি আমার শেষে ; সেই আমি রে ধ’রতে হয় মন, আমির ভিতর মিশে। আসল আমি ভুললি পাগল, আপন করম দোষে ॥

মুক্তি
রাঘবানন্দ। আচ্ছা বাবা। জীবন্তেও কি
মুক্তি
ঠাঃ। । জীবন্তেই হয়, মুক্তি মানে কি ? যেদিন
তুমি অধীনতার বাইরে যাবে। স্বাধীন হবে, সঙ্কল্প
বিকল্পের পরপারে যাবে, তােমাৰ যে মন মনে করে
রেখেছে অামি বন্দী, সেই মন নিজেকে মুক্তভাব চিন্তা
ক’রূবে, সেই দিন তুমি মুক্তপুরুষ। মুক্তি মানে ত বাঁধন
খােলা ? বাঁধন খােলার মানে কি বন্দীর মৃত্যু! আর মুক্ত
হবেই বা কে? বিশ্বব্যাপী আত্মা, সূতায় মালা গাঁথার ন্যায়
দেহ গাঁথা আছে, মালা ভেঙ্গে পড়ে গেলে কি, সূতার
মুক্তি হয়, আত্ম চির-মুক্ত, তুমি চঞ্চল অবস্থায় কৰ্ম্মপাশে
বন্দী হয়ে আছ, তুমি মনে মনে কৰ্ত্তা সেজেছ, এইটা
করব, এইটা করব না, আমি গেলে সংসার মারা যাবে,
পত্নীর চোখের জল, পুত্র কন্যার হাসিমুখ, বাড়ী, বাগান
পুখর, ঐ গুলিই তােমার বাঁধনের দড়ি, তােমার ঐ মন
যখন বিচার করবে, আমি কে ? বন্ধন কিসের ? আমারই
বা কে? কোথা হতে এসেছি ; আমার চঞ্চলতা কেন ?
আমার স্থান কোথায় ? তখন ভূত সরে যাবে, বঁধন
ছিড়ে যাবে। তখন বনেই যাও, সংসারেই থাক,শতঝার
মধ্যে স্থির থাকতে পাবে। মদ না খেয়ে মদের

৮৪
গুরু প্রসাদ।
দোকানের পাশে বসে থাকলে, যেমন মজা দেখা যায়,
তেমনি মজা দেখতে পাবে। তাকেই বলে জীবন-মুক্ত ভাব।
রা। আচ্ছা বাবা! এই সংসার কোলাহলের মধ্যে
থেকে সমস্ত কর্মের মধ্য দিয়ে সে ভাব লাভ হবে?
ঠাঃ। হাঁ সেইটিই মধুর! সেই প্রকৃত বীর সাধক।
তা না হয়ে মুক্তি পাব মনে করে জোর করে সব কাজ
ছেড়ে দিয়ে জড়ের মত থাকায় সুখ কি ? তার চেয়ে
গলায় দড়ি দিয়ে মরলে হ’ল। তাহলে আর কোন
মন্দ কাজ করতে হবে নি। ওরে তার নাম একটি
আনন্দ, তাকে পেতে অত নিরানন্দ ভােগ করূতে হবে
কেন? পেটে মরে, কথা না কয়ে, আগুনে পুড়ে, জলে
ডুবে, দূ দূর, কথা কইবার শক্তি পেয়েছিস্ ক’য়ে নে।
বােব যে দম ফেটে মরছে, হাঁসবার শক্তি পেয়েছি,
হেঁসে নে, শিয়াল কুকুর হাসতে পারে নি বলে যে পশু
উপাধি পেয়েছে, কৰ্ম্মের শক্তি পেয়েছিল, বিচার করে
কৰ্ম্ম করে নে, পঙ্গু যে কপালে চাপড়াচ্ছে, যা যা
পেয়েছি, সদসং বিচার করে ব্যবহার কর. ভাল, মন্দ,
একটা মাদুরীর উল্টা সােজা, মাদুর কিলেই সােজ।
উল্টা দুই পিঠ কিনতে হবে। একজন বেশ্যার জন্য ফুল
তুলছে বলে আমি নারায়ণ সেবার জন্য ফুল তুলব না?
দুগ্ধ সুরাপায়ীর পক্ষে কুফলদায়ক, তা বলে কি দুগ্ধ
ত্যাজ্য? আসক্তি ত্যাগ করাই মুক্তির উপায় ।

স্থিরত্ব।
রাঃ। বাবা তবে যে আপনি বলেন স্থিরত্বই সাধনা ?
আবার কৰ্ম্ম ক’তে বলছেন কেন তবে?
ঠাঃ। ওরে ! স্থিরত্বই সাধনা, একথা শুধু আমি বলি
,ভগবাক্য, সে স্থির কেমন জানিস্ ? পৃথিবীর ভার
মাথায় নিয়ে যেমন বাসুকী স্থির! বিশ্বের পালনভার
নিয়ে যেমন বিষ্ণু স্থির ! বিশ্বের সংহার ভার নিয়ে যেমন
মহাদেব স্থির ! ছাপ্পান্ন কোটী যদুবংশের নেতা হয়ে
কুরুক্ষেত্রের ভারতযুদ্ধের প্রধান উদ্যোগী হয়ে দুষ্টের
দমন, এবং সাধুর পরিত্রাণের ভার মাথায় নিয়ে যেমন
শ্রীকৃষ্ণ স্থির, শতপুত্র শােকে যেমন বশিষ্ঠ স্থির, প্রলয়
ঝাঘাতেও যেমন সমুদ্রগর্ভ স্থির, কোটী কোটী
অত্যাচার উৎপীড়নেও যেমন হিন্দুধর্ম
স্থির, কন্দর্প নিন্দিত রূপবাকে দর্শন করেও জরা-
জীর্ণ ব্যাধিগ্রস্ত স্বামী বুকে নিয়ে যেমন
হিন্দু-ললনা স্থির, শাখা প্রশাখার প্রভূত আন্দো-
লনেও যেমন বৃক্ষমূল স্থির, সেই প্রকৃত স্থির, নৈলে
ভাঙ্গা দেওয়ালও ত স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে! তা ব'লে
কি তার স্থিরত্বের অনুকরণ করতে হবে?

নিৰ্বাণ ।
রা। আচ্ছা বাবা নিৰ্বাণ কাকে বলে ?
ঠাঃ। নির্বাণ মানে নিবে যাওয়া,তবে নিভবে কি ?
নিভবে প্রাণের চঞ্চল অবস্থা মন, চঞ্চলতাই মনের
অস্তিত্ব, চঞ্চলতা থামলেই মনের লয়, সমাধি বা নির্বাণ।
যেমন একটি জ্বালা মশাল নিয়ে যদি খুব জোরে ঘুরাণ হয়,
তাহলে একটা আগুণের চাকার মত দেখায়, তখন আর
মশাল মনে করা যায় নি। কিন্তু ঐ আগুনের চাকার
মত যে আকারটী সেটি কেবল জোরে ঘুরাবার জন্যই
হয়েছে,ঘুরাণা বন্ধ করলেই চাকার মত আকারের
নাশ। যেই মশাল সেই মশাল। তেমনি কামনা বাসনা
রূপ চঞ্চলতার নাশ হলেই মন উপাধির নাশ। অর্থাৎ
সঙ্কল্প বিকল্প বর্জিত অবস্থার নামই নির্বাণ।

নিষ্কাম কর্ম।
বাবা নিষ্কাম কৰ্ম্ম কাকে বলে।
ঠাঃ। সমস্ত কর্মকেই বলে। যা কিছু করছি সমস্তই
ঈশ্বরের কৰ্ম্ম, বাপ, থাকতে কি বেটার নামে ষ্টেট চলে,
আর সে বাপ, মরবারও নয়। প্রকৃতই যে সমস্ত কৰ্ম্ম
তার! তুমি কৰ্মচারী! রাজার সৈন্যরা যুদ্ধে যায় দেখেছ ?
বন্দুক ছােড়ে, তলােয়ার খেলে, মরে মারে, কিন্তু জয়
পরাজয়, লাভালাভ, সব রাজার, তােমার কৰ্ম্ম নয়, তুমি
আদেশ প্রতিপালক যন্ত্র। তােমার দ্বারা যা হতে
পারে তিনি করিয়ে নিচ্ছেন। এই ভেবে বিবেকের সহিত
যুক্তি করে কৰ্ম্ম করে যাও, সবই নিষ্কাম কৰ্ম্ম হবে।
নৈলে একটি বেগুনগাছ লাগিয়ে দিয়ে বলে “গােড়া
বকশিস দাও দুচার মাস ভাত না খেয়ে, তেল না মেখে,
কাছ খুলে, বল্লে তপস্যা করলাম “মােক্ষ দাও”। তা
দিবে কেন ?

সত্য এবং তপস্যা। রা। আচ্ছা বাবা! তপস্যার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কি ? ঠাঃ। বাপু! সত্যের তুল্য তপস্যা নাই, জ্ঞানের তুল্য দান নাই, দয়ার তুল্য ধৰ্ম্ম নাই, মিথ্যার তুল্য পাপ নাই অভিমানের তুল্য নেশা নাই, ক্রোধের তুল্য রিপু নাই, ধৈর্যের তুল্য বন্ধু নাই,ক্ষমার তুল্য দণ্ড নাই,উপাধির তুল্য ব্যধি নাই, হরিনামের তুল্য নাম নাই, সন্তোষের তুল্য আরােগ্য নাই,স্থিরত্বের তুল্য সাধনা নাই, মনের তুল্য গতি নাই, গুরুর তুল্য উপাস্য নাই, তাগের তুল্য শান্তি নাই, মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন, সাঁচ বরাবর তপ নেহি, ঝুট বরাবর পাপ। যিক্কো হৃদয়ে সাঁচ হায়, তিকো হৃদয়ে আপ। ৮ আরও বলেছেন- সাঁচ্চা কহাে দীন রহহ, ছােড় পরধন কি আশ, ইসমে যব ন| হরি মিলে ত জামিন তুলসীদাস। কিন্তু বাপ! আজকাল গল্পের জমাটি হবে না- বলেও মিথ্যা বলে, পাঁচটা সাজিয়ে বললে, লােক হবে, বাহবা দিবে, কিন্তু যারা তার গল্প শুনে হাসে,তারাই বলে, ও শালা ফক্কড়, মিথ্যাবাদী,ওর কথা বিশ্বাস কর না। দেখ পাওনা কি হল? বাপ সত্যই ব্রহ্ম, শাস্ত্রেও বলেছে, “সত্যং জ্ঞান মনস্তং ব্ৰহ্ম”। যার ধ্বংস হয় না তাহাই সত্য, অর্থাৎ আত্মাই সত্য। আত্ম-নিৰ্ণয়ই তপস্যা।

‘আমি’ কি ?
জ্ঞা। আচ্ছা বাবা! আমি শব্দটি কি ? বা আমি
কে ? কৃপা করে বুঝিয়ে বলুন।
ঠাঃ। আমার’ বাদ দিলে হাতে যা থাকে, তাই
‘আমি’ । লােকে বলে আমার হাত, আমার পা, আমার
মাথা, আমার মন, আমার ইন্দ্রিয় সমষ্টি, আমার রিপু
সকল, তাহলে এ সব ত আমার, আমি টা অনুসন্ধান
করে দেখ, যদি বল দেহ আমি, মৃত্যুর পর দেহ ত অক্ষত
থাকে, অথচ অপ্রয়ােজন বােধে পুড়িয়ে ফেলে। তাহলে
দেহও আমি নয়! যদি বল, মন আমি, তাহলে নিদ্রিত
অবস্থায় মন ত থাকে না, যদি বল প্রাণ আমি, তা হলে
কুম্ভককালীন প্রাণের গতি রােধ হয়ে যায়, প্রাণ
আত্মায় লয় হয়ে যায়, তবু আমি থাকি। যদি বল, বুদ্ধি
আমি, তাহলে সদ্য প্রসূত বালকের ত কোনও বুদ্ধি থাকে
, যদি বল চিত্ত আমি, সমাধি কালে ত চিত্তবৃত্তি রােধ
হয়ে যায়,তবু আমি থাকে। চতুর্বিংশতি তত্ত্ব দেখ, ক্ষিতি,
অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ,
চক্ষু, কর্ণ, নাসা, জিহ্বা, ত্বক, হস্ত, পদ, গুহ, লিঙ্গ, বাক্য,
মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার, এই চবিবশ তত্ত্ব দেখ, এর মধ্যে

গুরু পসাদ।
কেউ আমি হতে পারে কি ? তারপর ষড়রিপু দেখ, কাম,
ক্রোধ, লােভ, মােহ মদ, মাৎসর্য্য, এরাও কেউ আমি
হতে পারে না, অথচ চতি গাড়ী দেখলেই বুঝতে হবে
ভিতরে চালক আছে, সেই চালকই আমি”।
যার শক্তিতে এই বিশ্বযন্ত্র চালিত, সেই আত্মাই
আমি, নইলে কীট হ'তে ব্রহ্মাদি পয্যন্ত সবাই বলছে
আমি, পথে লােক যাচ্ছে জিজ্ঞাসা কর, কে যায় ?
অবিচারে উত্তর দিবে আমি। বালককে সব শেখাতে হয়,
বাবা, দাদা, মা দিদি, কিন্তু ‘আমি’ কথাটি কেউ কি
শেখায় ? সেই বালককে জিজ্ঞাসা কর, কে যায় রে ?
স্বভাবেই ব’বে আমি, তাহলে বুঝ আমি কি ?
সহিষ্ণুতার চরম আদর্শ পৃথিবী গন্ধগুণ বিকাশে ব’ছে
আমি, গভীরতায় মরণ-ভীতি জাগিয়ে, উন্মত্ত শ্রোতাবেগে
ঐরাবতের দর্প দমিয়ে, তরঙ্গগৰ্জনে নাবিকের ধৈৰ্য্য
টলিয়ে, জল ব’লছে আমি। বিশ্বধ্বংসী শক্তি বুকে নিয়ে
উন্মত্ত যুবকের ন্যায় বুক চাপড়ে তেজ ব’ছে আমি।
কভু বা কুলবধূর মত গায়ে মৃদু হাত বুলিয়ে কভু বা
উন্মত্ত গর্জনে বিশ্বখানাকে তােলপাড় করে বিশ্বপ্রাণ
সমীরণ ব’লছে আমি। মহাপ্রলয়াভাস জগতের স্মৃতিতে
জাগিয়ে আকাশ বলছে আমি, পলকের প্রকাশে চোখ
ঝলসিয়ে বিদ্যুৎ ব’লছে আমি, রূপের প্রভায় বিশ্ব
প্রকাশ করে তিমিরারি অংশুমালী ব’ছে আমি,

গুরু প্রসাদ ।
রােহিনীর কাছ হতে বিদায় নিয়ে কুমুদিনীরঞ্জন, লম্পট
যুবকের ন্যায় হাতে হাতে গাঢ় তমঃরাশি ভেদ করে
নিশামণি চন্দ্র বলছে আমি, পদাহত তৃণ পদাপসারণের
পর মস্তকোত্তলন করে বলছে আমি, তাহলে বুঝে দেখ,
আমিই তাই, মাত্র কামনাজড়িত হয়ে জীব
ভাব প্রাপ্ত হ'মেছি! কৰ্ম্মের দ্বারায় চেষ্টা কর বাপ!
সে নিজ
বােধগম্য ' বাক্য চিরকাল
বাক্যই থাকবে, যতই গুছিয়ে বল,
কখনও সে কৰ্ম্ম হবে না।

সাকার,
নিরাকার।
জ্ঞা। আচ্ছা বাবা সাকার নিরাকার প্রভেদ কি ?
ঠাঃ। বাপু! দুই এক, নিরাকারেরই সাকার, উভয়ে
উভয়কে প্রকাশ করছে। মনে কর একটি সাদা কাগজ,
এইবার ধনুকাকৃতি দুটি কালীর রেখা টান, মধ্যে একটি
বিন্দু দাও, দেখ একটি চোখের আকার হ’ল, তাহলে বুঝ,
নিরাকারই ত আকার প্রকাশ করলে, অনন্ত শূন্যের দশ
হাত প্রাচীর দিয়ে ঘেরে নাও, একটি গৃহের আকার হবে,
প্রাচীর ভেঙ্গে দাও, যেই শূন্য সেই শূন্য। তবে বাপ, !
জ্ঞানীর চক্ষে সাকার নিরাকার এক, আকারহীনের নামই
নিরাকার, নইলে কিম্ভুত কিমাকার ! অভিধানে নিরাকার
শব্দেরই সৃষ্টি হত না! নিজে চিন্তা কর, সব বুঝতে
পারবে, অনন্তের সঙ্গে তার খোঁজে দে, ইলেকী আলাে
দেখেছিস্ মেসিনের সঙ্গে তার খোঁজে দিলেই যেখানে
ইচ্ছা যতক্ষণ ইচ্ছা জ্বালাতে পার।

দ্বার।
প্রতি।
আচ্ছা বাবা! কেউ বলেছেন নারী নরকের
কেউ বলেন, নারী স্বর্গের সােপান ।
ঠা। দেখ বাপ! ওটা ভাবের মার পাচ, মায়ের
স্তর ঘেটে চটুকে দুধ খাওয়া গেছে, তাতে জীবন রক্ষা
হয়েছে আবার একটু ভাবের মারপ্যাচে, সেই স্তন দর্শন
করলেও আত্মহত্যা হয়, ওরা এক পায়ে ডুবায়, একপায়ে
উঠায়। যে রমণী সহধৰ্ম্মিণীরূপে ধৰ্ম্মের সাহায্য করে
স্বর্গের সােপান তৈরী করে দেয়, সেই রমণী স্বৈরিণী
রূপে ঘাড়ে ধরে নরকে ডুবায় ! যে রমণী পতির
মঙ্গল কামনায় দেবতার পায়ে বুক চিরে
রক্ত দেয়,সেই রমণী স্বহস্তে ছুরিকা ধারণ
করে পতির বুকে আমূল বিদ্ধ করে।
স্বর্গ নরকের চাবিকাঠি ওদেরই হাতে, ঘৃণায় বা উপেক্ষায়
রমণীর প্রাণে ব্যথা দিবে না, সৃষ্টি স্থিতি লয়, তিন শক্তিই
ওদের হাতে, ওরাই গর্ভে ধ'রে সৃষ্টি করে।
বুকের রক্ত দিয়ে পালন করে, রক্ত খেয়ে
সংহার করে। সাপ নিয়ে খেলা করতে যানি, যদি
যা তবে পাকা রােজার কাছে সর্প-বশীকরণ মন্ত্র আগে
শিখৰি, নৈলে ছুলেই মৃত্যু ! দূরে থেকে দণ্ডবৎ কবি।
লীলার কারণে তিনিই আধা আধা হয়ে পুরুষ প্রকৃতি
হয়েছেন, যদি রমণীর হাত হ'তে পরিত্রাণ পেতে চাস,
ছােট ছেলে সাজ, বালকের কাছে বেটীদের সব অহঙ্কার

১৪
গুরুপ্রসাদ
চূর্ণ হয়েছে, কেবল কিসে শিশু শান্তিতে থাকে, এই
চিন্তায় পাগল হয়ে পড়ে। একার মন্ত্র ‘মা’ বুলিটা
অভ্যাস ক'রে নে! তাহ'লেই হবে, রাধার প্রেমে পড়ে
কৃষ্ণচন্দ্রকে বহু নাকানী চোকানী খেতে হয়েছে।
মােহিনীর মােহে পােড়ে যােগেশ্বর শিবকেও নাকাল হতে
হয়েছে । স্বীয় কন্যার রূপে মােহিত হয়ে ব্রহ্মারও ধৈৰ্য্য
চ্যুতি, ইন্দ্র গুরুপত্নীরূপে, চন্দ্রও তাই; ব্যাস, পরাশর,
বিশ্বামিত্র, দুর্বাসাপ্রভৃতি ষাট হাজার বৎসর তপস্যা
করেও মােহিনীর মােহজালে আবদ্ধ হয়ে ছিলেন।
কিন্তু বর কিছু ক'তে পারেনি। সে
মা মা বলে জাল কেটে দিলে। তাই বলি
বাপ, সাবধান, ওরাই বন্ধনমুক্তির কর্তা! ওদিকে ঘৃণা
ক’র না, বৎস, আত্মায় রমণ করে বলে ওদের নাম
রমণী, আর একটি নাম নারী, ন+ অরি=নারী অর্থাৎ
ওর শত্রু নয়, আর এক নাম অবলা, এস্থলে অবলা শব্দে
বলহীন হতে পারে না, কারণ ওরা স্বয়ং শক্তি, শক্তি
অর্থেই বল, যেমন সকল বস্তুতেই আগুণ আছে, বলা
চলে, কিন্তু আগুণে আগুণ আছে বলা পাগলামি মাত্র ।
অর্থাৎ ওর শক্তিমতী নয় শক্তি। আর এক নাম, প্রকৃতি,
প্রঃ শব্দে শ্রেষ্ঠ, কৃতী
কৃতী অর্থে কৰ্ত্তা, সুতরাং ওরাই
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কৰ্ত্তা, বৎস! পুরুষ প্রকৃতির মিলনই ব্রহ্ম

কয়েকটী উপদেশ।
।
জগদানন্দ, নির্মলানন্দ, বিভূত্যানন্দ, অক্ষয়ানন্দ,
পীতাম্বর, হৃষিকেশ, গােসাঞিজী, হরেকৃষ্ণ
প্রভৃতি ভক্ত সঙ্গে ঠাকুর।
গােসাভিী আচ্ছা বাবা! ঈশ্বর কত দূরে
আছেন ?
ঠাঃ। আলো হতে আঁধার যত দূরে থাকে।
গাে। তাহলে ঈশ্বর কি আমাদের খুব কাছেই
আছেন ?
ঠা। এত কাছে, যে তুমিই তাই বল্লে তবে বুঝায়।
তুমি আর ঈশ্বর,
এদুইয়ের মধ্যে কোন আর প্রাচীর
নাই।
গাে। প্রাপ্তির উপায় কি ?
ঠাঃ। ঈশ্বর ভিন্ন অন্য প্রাপ্তির আশা ত্যাগ করা।
গো। আত্মার মুক্তি কাকে বলে ?
ঠা। প্রলাপের উক্তিকে।
গাে। কারণ?
ঠাঃ। আত্মা চিরমুক্ত।
তবে মুক্ত হয় কে ?
ঠাঃ। আমি বন্দী, এই সংস্কারগ্রস্ত মন।

গুরুপ্রসাদ।
গে। ত্যাগ কাকে বলে ?
ঠাঃ। আসক্তিশূন্য ভােগকে।
গগা। যােগ কাকে বলে ?
অনেককে এক করার নাম যোেগ !
গাে। ব্যাধি কাকে বলে ?
ঠাঃ। নাম উপাধিই ব্যাধি।
ঠাঃ।
গাে। আরােগ্য কাকে বলে?
ঠাঃ।
সকল অবস্থায় সন্তোষ থাকার নাম।
মােক্ষ কার নাম ?
ঠা। সুখ দুঃখের পরপার অবস্থা।
গে। শান্তি কাকে বলে ?
ঠাঃ। নিশ্চিতা লাভের নাম শান্তি
গে। ভ্রান্তি কাকে বলে ?
ঠাঃ। মিথ্যাকে সত্য জ্ঞান।
গাে। ব্রহ্মচারী কাকে বলে ?
ঠাঃ। যিনি মূর্ধাতে বিশ্রাম লাভ করেন।
গাে। ধ্যান কাকে বলে ?
ঠাঃ। নিরবচ্ছিন্ন তৈলধারার ন্যায় ভালবাসার
বস্তুকে চিন্তা করা।
গো। আসন কাকে বলে।
ঠাঃ। । সুখে স্থির হয়ে বহুক্ষণ বসে থাকা।
গগা। নিয়ম কাকে বলে ?

গুরুপ্রসাদ। ৯৭ ঠাঃ। সদ্গুরু বাক্য প্রতিপালন । গে। সদ্গুরু কাকে বলে? ঠাঃ। যিনি অজানাকে জানিয়ে দেন। গাে। শাস্ত্র কাকে বলে ? ঠাঃ। প্রত্যক্ষদর্শীর বাক্য। গ্যে। প্রত্যক্ষদশী কাকে বলে ? ঠাঃ । সত্যকে যিনি অনুভূতি করেছেন। গে। সংযম কাকে বলে ? ঠাঃ। উচ্ছলতা ত্যাগ। গাে। প্রাণায়াম কাকে বলে। প্রাণকে বিশ্রামে রাখা । ঠাঃ। গো। প্রত্যাহার কার নাম। ঠাঃ। মনের পেছনে পাহারা দেওয়া। গে। ধারণা কার নাম। ঠাঃ। একটা ধরে থাকা। গো। সমাধি কাকে বলে। ঠা। বিচাৰ্য, বিচারক, বিচার তিনের একত্ব। গগা। নির্বাণ কাকে বলে। ঠাঃ। আনন্দ নিরানন্দের পর পার। গগা । কি যুক্তিতে সত্য চেনা যায়। ঠাঃ । যে যুক্তিতে মিথ্যা চেনা যায়। গাে। মন স্থির হয় কিসে?

গুরু প্রসাদ।
ঠাঃ।
মন থাকতে মন স্থির হয় না, চঞ্চলতাই মনের
অস্তিত্ব।
চঞ্চলতা নাশের উপায় ?
ঠাঃ । মনের লয় করা।
গাে।
কি উপায়ে মনের লয় হয় ?
প্রাণের সঙ্গ কর, প্রাণ স্থির হলেই মন
স্থির হয় ।
বাতাস থাকতে ঢেউ থামতে দেখেছ কি ?
স্থির-তরঙ্গ কোথাও আছে কি ? আমি ই বাবা দেখি
ঠাঃ।
নাই।

গুরু ত্যাগ বা গ্রহণ। ছােট সত্যানন্দ, সত্যানন্দ, পরমানন্দ, আশুতােষ, হেমাঙ্গ, প্রভা, কুলদা, রাধিকা, সুশীল, প্রভৃতি ভক্ত- সঙ্গে ঠাকুর। আশুতােষ। আচ্ছা বাবা! গুরুত্যাগে অপরাধ হয় ? ঠাঃ। তা ত হয়, কিন্তু একদিন ত ত্যাগ করতে আ। কেন ত্যাগ করতে হবে বাবা! ঠাঃ। (মুচকি হাসিয়া) যেদিন গুরু মরে যাবে। সেদিন যদি গুরু ত্যাগ না কর, প'চে গন্ধ উঠবে। যদি দেহকে গুরু বলে ভাব, তাহলে ত্যাগ করতেই হবে আর যদি সত্যকে গুরু বলে ভাব, তাহলে তুমি ইচ্ছ। কলেও ত্যাগ করতে পারবে না। আচ্ছা বল দেখি বাপ! গুরু শব্দের অর্থ কি ? আ। যিনি অজ্ঞানত নাশ করেন। অজানাকে যে জানিয়ে দেয়, সেই গুরু কেমন ? আ। আজ্ঞা হাঁ তা বৈ কি? অজ্ঞানতা নাশের জন্যই ত গুরুর প্রয়ােজন। ঠাঃ। বেশ! আচ্ছা! অজানা জানা যায় কার দ্বারায় ?

সাদ।
আজ্ঞা বােধ হয় বিবেকের দ্বারায়।
ঠাঃ। উত্তম! বােধ হয় নয়,নিশ্চয় জানার নাম কি?
আ। আজ্ঞা, জানা অর্থে জ্ঞান বলেই ত জানি।
ঠাঃ! তাহলে যে অজানাকে জানিয়ে দেয়, সেই
শুরু। আর যে নিজে অজ্ঞান, অর্থাৎ নিজেই জানে না,
সে তােমায় জানাতেও পারবে না। সুতরাং গুরু উপাধি
তাকে দেওয়া যায় না। আর কে ত্যাগ করলে গুরু
ত্যাগ করাও হতে পারে না। কারণ তিনি যখন গুরু
নন। দেখ বাপ, তেলের দরকার হলে কলু বাড়ী যেতে
হয়, তেমনি জ্ঞানের দরকার হলে জ্ঞানীর কাছে যেতে
হবে ত? তুমিই পূর্বে বলেছ, গুরুর প্রয়ােজন জ্ঞানেরই
জন্য। তবে যদি সম্পর্কে গুরু বলতে চাও, অর্থাৎ
বাপের গুরু ব'লে, যাকে কুলগুরু বলে, তাহলে কুটুমের
মত সম্মান ক’রূতে পার,-যেমন বাপের উপরােধে
সৎমায়ের পায়ে গড়। আর দেখ, গুরুত্যাগ আমাদের
ধাতে সয়ে গেছে, কারণ, মাতৃগর্ভ থেকে পড়ে অবধি
শুরু করার কি বিরাম আছে? আর বদ হজমের ভয়
নাই। শাস্ত্রেও বলেছে,
মধুপুব্ধো যথা ভৃঙ্গঃ পুষ্পং পুষ্পস্তরং ব্ৰজেৎ।
জ্ঞানলুব্ধ স্তথা শিষ্যো গুরো গুৰ্বান্তরং ব্ৰজেৎ ॥”
সমস্ত কাজই ত খাতিরে চক্ষুলজ্জার আশঙ্কায়,
অনুরােধে করছ, গুরু গ্রহণটাও স্বাধীন ইচ্ছায় করবে
।

গুরু প্রসাদ।
, আঁধার নাশের জন্য ত আলােই প্রয়ােজন হয়, তবে
বাপু তােমার যদি কোদাল কুড়ালে হয় ত হউক।
আঃ। কেউ কেউ বলেন কুলগুরু ত্যাগে পাপ
আছে।
ঠাঃ । আরে গুরু ত্যাগে ত পাপ আছে, কিন্তু যদি
গুরুপদবাচ্য তিনি না হন, আর আমি তাকে গুরুরূপে
গ্রহণই বা কলাম কবে, যে ত্যাগের পাপভােগ করতে
হবে? বিশেষতঃ তােমার গুরুত্যাগ করতে হবে কেন ?
গুরুই যে তােমায় ত্যাগ করবে, তুমি জ্ঞানপিপাসু
হলেই তােমার কুলগুরু বল্‌বে সৎগুরু আশ্রয় করগে,
কারণ তার দোকানে তােমার প্রার্থিত মাল নাই। যদি
কোনও অন্ধকে বল যে আমায় গীতা পাঠ শিখিয়ে দেন,
সে ব’বে, আমার দ্বারায় হবে না বাপু! অন্যের কাছে
যাও। যদি দীক্ষা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে জ্ঞানীর কাছে
দীক্ষা নাও, আর যদি দীক্ষা হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে
পুনৰ্বার সৎ গুরুর আশ্রয় নাও, পূর্ব গুরুদত্ত মন্ত্র ত্যাগ
করতে হবে না। দেখ বাপ!•••••"কৃষ্ণায় নমঃ শব্দটি
শুধু মন্ত্র নয়, মনকে যে ত্রাণ করে, তার নামই মন্ত্র, যে
শব্দে বা যে বাক্যে মনের বন্দীভাব দূর করে, মুক্ত ভাব
প্রকাশ করে, সেই সমস্ত বাক্যের নামই মন্ত্র। দেখ,
সত্য, কোনও একটি নির্দিষ্ট আধারে বাস করে না। সে
বিশ্বব্যাপী, চিরকাল আছে বা থাকবে, সেইজন্য শাস্ত্রে

গুরুপ্রসাদ।
বলেছে, “গুরু বিশ্বেশ্বরঃ সাক্ষাৎ তারকব্রহ্ম নিশ্চিত”।
বাপু! আত্মজ্ঞানী গুরুর আশ্রয় নাও। মাত্র শাস্ত্রজ্ঞানীর
কাছে যেও না, বাক্যে ব্ৰহ্ম দেখিয়ে দিবে। তার নিজের
পুজি কিছু নাই, ব্যাস বশিষ্ঠের সাধনােত বস্তু, সে বেটা
মাত্র মুখস্থ করেছে, তারা আরো বেশী অজ্ঞান, তাদের
বিদ্যা জ্ঞানের অঙ্কশায়িনী নয়—সুতরাং অবিদ্যা বল্লেও
ক্ষতি নাই, মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন, কৰ্ম্ম বিনু কথ নি
কথে, অজ্ঞানী দিনরাত, আরও বলেছেন,
গিধ্ব উড়ে আকাশ পর, ভাবে বড় সিদ্ধা
ভাগাড় মে যব লপট রহে, যযা গিদ্মা সে। গিধ্ব।
দেখ বাপ! তেড়ি, দাড়ী, ভুড়ী, ঘড়ি, ছড়ি, বাড়ী,
দেখে ভুলিনি, শেষে হাতে দড়ি পড়বে। ও সব গুরু
ত্যাগ কথা বাদ দে, কুলগুরুর সঙ্গে তাের সম্বন্ধ ত
বার্ষিকের, সেটা দিস, আমার অনুরােধ, তাহলেই তিনি
সন্তোষ, তােমার পরিত্রাণের জন্য তিনি ভেবে বাঁচেন
, তবে বার্ষিকটা দিয়ে রেখো! যদি কখনও মিথ্যা
সাক্ষীর দরকার হয়, ডাকলেই গুরুদেবকে পাবে। হাতে
রাখা ভাল।
আঃ। কেউ কেউ বলেন কুলগুরুর নিকট বীজমন্ত্র
গ্রহণ করে পরে শিক্ষা-গুরু করবে।
ঠা। তা বাপ! মন্দ কথা নয়। যার কুলগুরু জ্ঞানী,
নিত্য ক্রিয়াশীল, তার দীক্ষা শিক্ষা, উভয়ই তঁার নিকট

গুরু প্রসাদ।
হতে পারে, আর যদি তা না হয়, তাহলে মন্ত্র গ্রহণেও
বিচার আছে। চাষীরা যখন বীজধান কিনতে যায়,
তখন হাল সনের বীজ খুজে বেড়ায়, পুরাতন ধান বা
কলাই, বীজের জন্য নেয় না, বলে ওতে চার হবে না।
তাহলে বােঝ, যে বীজের পাট হচ্ছে, অর্থাৎ প্রতি
বৎসর আবাদের দ্বারায় যাকে নূতন করে নেওয়া হচ্ছে,
সেই ধান বা কলাই, বীজের উপযুক্ত, বহুকাল হামারে
পড়ে থাকলে তার চৈতন্য শক্তি নষ্ট হয়। তেমনি বীজমন্ত্র,
যিনি নিত্য ধ্যান জপের দ্বারায় চৈতন্য না করেন, তাঁর
বীজমন্ত্র অচৈতন্য, তাতে অঙ্কুর হওয়া দুরাশা, সেইজন্য
নিত্য ক্রিয়াশীল গুরুর প্রয়ােজন। তাহলে
হাল সনের বীজ পাওয়া যাবে।
আঃ। তাহলে কিরূপ গুরুর আশ্রয় নেওয়া উচিত?
ঠাঃ। স্বভাবী, নিলোভ, জ্ঞানী, কৰ্ম্মী, অবস্থার
উপর সন্তুষ্ট, সদানন্দ, সংসারে উদাসী, শিষ্যের ভ্রম
অপনােদনে সমর্থ, এইরূপ গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করা
জ্ঞানী বা
কর্তব্য।

ত্যাগ।
জ্ঞাঃ।
বাবা গঙ্গাসাগর গিছলাম, দেখলাম কয়েকটি
ত্যাগী সন্ন্যাসী, কৌপীন পর্যন্ত নাই, তারাই সম্ভব প্রকৃত
ত্যাগী ।
ঠাঃ। (মুচকী হাসিয়া) হাঁ ত্যাগী বটে, তবে
কাপড়ের বিনিময়ে নিত্য পাঁচ মােণ কাঠ চাই, ধুনীর জন্য।
আর পাঁচপােয়া আটা, আড়াই পােয়া ডাল, পাঁচছটাক ঘি,
পাঁচছটাক চিনি, আধছটাক গাঁজা হ'লেই একদিন কোন
গতিকে চালিয়ে দিতে পারেন। প্রয়ােজন প্রায় সব
শেষ করে এনেছেন। পরনে কাপড় নাই বটে, তবে
সামনে গামছা পাতা আছে, আসন খুব স্থির বটে, কিন্তু
যদি মাড়ােয়ার মিঠাই বিলি করতে আসে, তাহলে আর
কার বাপে বসায়, সমস্ত যােগবল সেইখানেই খরচ
করবেন। বাপ! নকলে জগৎ ছেয়ে গেছে। যেমন এক
একটা পুখুরে দল বাঁধে, নীচে জল আছে, কিন্তু উপরে
গরু চরছে, সত্যের অবস্থাও তাই।
জ্ঞাঃ। আচ্ছা বাবা! কলিযুগে একবারে আকাঙক্ষা
শূন্য হলে চলবে কেন ? খেতে ত হবে।
ঠাঃ। বাপ! ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলে মাটী ফুড়ে
খাবার উঠবে। আর যদি ততটা আত্মনির্ভর না হয়,

শুরু প্রসাদ
তাহলে যতটুকু প্রয়ােজন, মাত্র তটুকু মালাক'
কেবল গ্রাসাচ্ছাদনের মত।
জ্ঞা। আচ্ছা বাবা যদি পাঁচজন অতিথি
ঠাঃ। যদি সংসারী হয়, সাধ্যমত অতিথিসংকারের
চেষ্টা করূবে, আর যদি ক্ষমতা না থাকে, মিষ্টবাক্যে বলবে,
বাবা আমার ক্ষমতা নেই, ক্ষমতা থেকে যেন মিথ্যা বলে
না, যদি ক্ষমতা থেকেও নেই বলে, তাহলে ঐ মিথ্যা
ঈশ্নর একদিন সত্যে পরিণত করে দিবেন। সত্যই আর
ক্ষমতা থাকবে না।
আর যদি ত্যাগের পথে থাক, অর্থাৎ
আশ্রমী না হও, কোনও দাবী নাই, আর যদি যােগাশ্রমী
হও, তাহ'লে থাকে দেবে, নয় আঙ্গুল বাড়িয়ে দেখিয়ে
দিবে, ঘােষেদের বাড়ী যাও, কিন্তু সঞ্চার এ বাক্য
খাটবে না ।
জ্ঞ। আচ্ছা বাবা তাহলে প্রকৃত ত্যাগীর লক্ষণ
কি? কাকেই বা বলে ? সেরূপ দু’একটি প্রমাণ দেন বাবা।
ঠা। প্রকৃত ত্যাগী শ্রীকৃষ্ণ, জনক, অম্বরীষ, রামচন্দ্র,
অর্থাৎ সবই ক'রছেন, অথচ অনাসক্ত, আচ্ছা বাপ,
কৌপীন খেচে বাঁধলে কি ভাত ছেড়ে দিলে, কাপড়
না পরুলেই কি ত্যাগ হ’ল, বাইরে ত্যাগ করে কি
কবি? চোখে ভােগ হচ্ছে, কাণে ভােগ হচ্ছে, নাকে
ভােগ হচ্ছে, জিহ্বায় ভােগ হ'চ্ছে, চামড়ায় ভােগ হচ্ছে,
চোখে সৌন্দৰ্য্য, কাণে সুস্বর, নাকে আঘ্রাণ, জিহ্বায়

প্রবাদ।
স্বাদ, চামড়ায় স্পর্শ, চারিদিকে ছেদা, ক’টি সালাবি।
মন যতক্ষণ চাইবে, ইন্দ্রিয় তার দাস, যে কোনও উপায়ে
দিবেই দিবে। মন যদি না চায়, তবে ইন্দ্রিয় আর বইবে
না। তখন ভােগ কি রকম হবে জানিস, যেমন বালককে
জামাজোড় পরিয়ে দিলে, যেমনি বাহে পেলে অমনি
ক্রিয়ানিষ্পত্তি, প্রস্রাব পেলে তখনি ক্রিয়ানিষ্পত্তি, রেগে
গেলেও ধুলায় শুয়ে পড়ল, তােমার পােষাক থাক
আর যাৰু। বিশ্বের সঙ্গে আমার কি প্রভেদ! ভােগ
করেই বা কে? ত্যাগ করেই বা কে? আমিই বা কে ?
মাটী, জল, আগুন, হাওয়া, আকাশ দিয়ে তৈরী দৈহে
ব'সে কি ত্যাগ করা চলে, একবার বিচার কর দেখি,
জগৎটাই যে ঐ পাঁচটা দিয়ে গড়া, তাহলে কি মাটী ২'র
মাটী ত্যাগ করবি, না জল হয়ে জল ত্যাগ করবি ।
আগুন হ'য়ে আগুন ত্যাগ ক’বি? হাসির কথা।
বৎস! যদি ত্যাগ করবি, আসক্ত ত্যাগ করু। গুরুদাস
সেই গানটি গাওত বাপ, !
গীত।
আমি কায়েও ছাড়তে পাব না,
এস দেবতা তেত্রিশ কোটী ।
কারো মনে ব্যথা দিব না, আমি সবার গােলাম ব টি ।
বিষ্ণু ছাড়ি ত বৈষ্ণবে মারে, রাম ছাড়ি মারে হনুমান,

গুরুপ্রসাদ।
শিব ছাড়ি যদি ভূতে ঘাড় ভাঙ্গে,
কালী ছাড়ি মারে ডাকিনী বেটী ।
আল্লা ছাড়ি ত মামদোয় মারে,
যীশু ছাড়ি মারে খৃষ্টান।
যদি আউল, বাউল, দরবেশ ছাড়ি ;-
যত নেড়া নেড়ী যাবে টি।
সূর্য ছাড়ি ত গলে পচে মরি,
বায়ু ছাড়ি যদি অক্কা।
রস রক্ত সব জল হতে হয়,
হাড় মাস গুলা হয় যে মাটী ।
আকাশ ছাড়ি ত বােবা কালা হই,
আগুন ছাড়ি ত কলেরা।
আলােক ছাড়ি ত আঁধারেতে মরি,
অাধার ছাড়ি ত ঘুমটি মাটী ।
অণু হ'তে বিন্দু বিন্দু হ'তে ধারা,
ধারা হ’তে নদী সাগর আদি,
গুরুদাস বলে একটি ছাড়িলে,
পূর্ণ ব্ৰহ্ম হয় না খাঁটি।

ঠাকুরের দেহ ত্যাগে সঙ্কল্প।
নিসর্গ হতে বাধা প্রদান।
আমি তখন কলিকাতায়, হঠাৎ ঠাকুরের এক পত্র
পেলাম, আমায় সত্বর যেতে লিখছেন, কোনও বিচার
করতে নিষেধ করেছেন। আমি তখনি রওনা হলেম।
মণিপুর গিয়ে পৌছালাম, আশ্রমস্থ ছাত্রগণের মুখ ম্লান,
সমস্ত মাণপুরবাসী যেন ম্রিয়মাণ, কারণ জিজ্ঞাসা ক’
লাম, সকলে বললে, ঠাকুর দেহ ত্যাগে সঙ্কল্প করেছেন,
গত কল্য সমাধি নিবার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন, দৈবকর্তৃক
বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন, কিন্তু সঙ্কল্প আজও ত্যাগ করেন নি
শুনে বড় মৰ্ম্মাহত হলাম, চখে জল এল, মনােভাব গােপন
ক'রে ঠাকুরের দর্শনে গেলাম, ঠাকুর ঘরের মধ্যে আছেন।
ঠাকুরের অজ্ঞাতে দুয়ারে গিয়ে প্রণাম করলাম। ঠাকুর
বলেন, এসেছ, এস, আমি তােমার জন্য বড় চঞ্চল
ছিলাম। ঠাকুর গত দিবসের ঘটনা নিজে মুখেই প্রকাশ
ক’রূতে লাগলেন, দেখ বাপ! এই আধারে থাকা,
আর আমার ইচ্ছা নয়, (এ কথা পূর্বে আরও দু'এক
সময় ঠাকুর আমায় বলেছিলেন, সেই সময় সমাধি-মঞ্চ
তৈরী করা হয়। তাই সঙ্কল্প করেছি, দেহ ত্যাগ ক’ব,
CUT

গুরু প্রসাদ।
কাল প্রস্তুত হয়ে বসেছিলাম, কোথা হতে এক পাগল
এসে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল, সে বিষম ধাক্কা, কপাট
ভেঙ্গে ফের যােগাড়। মন চঞ্চল হল, অগত্যা আমি
জিজ্ঞাসা করলাম, কে ? সে বলে কপাট খােল, আমি
ব’ল্লাম কেন কপাট খুলব? তুমি কে? সে বলে কপাট
খােল, নইলে কপাটের গুষ্ঠীর—এইরূপ অশ্লীল ভাষায়
গালাগালি দিতে লাগল, কি ক’ব চিটাটা হাতে নিয়ে
একটু তেজ করে কপাট খুললাম, পাগল আমাকে দেখে,
কাজ আছে,কাজ আছে,বলতে বলতে উদ্ধশ্বাসে দৌড়াল,
উদ্দেশ্যে বাধা পড়ল, সে সময় কয়েকটি ভক্ত এসে
পোঁছাল, কোনও একটি ভদ্রমহিলা তাদের পাঠিয়েছে,
তিনি খুব উন্নতমনা, তাদিকে বলেছে, তােরা এই মুহূর্তে
আশ্রমে যা, ঠাকুর কি করছে দেখে আয়, সেইজন্য তারা
এসেছে। যা তুমি এসেছ ভালই হয়েছে, নিশ্চিন্ত
থাকগে, তার ইচ্ছাই পূর্ণ হ’, ঐ সময় ঠাকুর একটি
গান রচনা করেছিলেন, সেটিও এখানে সন্নিবেশ
করলাম।
গীত।
এসময়ে কোথা গাে মা ওগাে শতদলবাসিনী।
একবার সহস্রারে হও মা উদয়, হেরিব চরণ দুখানি ।
দয়া করি একবার ত্যজ মূলাধার,
ত্যজ গগ জননি ত্যজ ব্ৰহ্ম দ্বার,

গুরুপ্রসাদ।
নিয়ে সঙ্গে করে চল ব্ৰহ্মপুরে,
ব্রহ্মরন্ধ, ভেদি চলে যাই আমি।
ছাড় গাে জননি ছাড় সর্পাকৃতি,
হংস শব্দে যেন দিওনা দুর্গতি,
কঁপায়ে সােহহং মন্ত্রে, দেহ রূপ ক্ষিতি,
হেরে রূপ-জ্যোতিঃ ত্যজি গে অবনী।
পাগলা বলে মন কর কি এখন,
স্থির মনে প্রাণে স্মর শ্রীচরণ,
কি ভয় সে কালে, মহামন্ত্র বলে,
অবহেলে যাবে লক্ষ্যস্থলে তুমি ।

নিত্যক্রিয়া-প্রণালী।
সংসারীর জন্য।
সূৰ্য্য উদয়ের পূর্বে শয্যা ত্যাগ করিবে, পরে
প্রয়ােজন মত শৌচকৰ্ম্মাদি শেষ করিয়া মুখ ধুইবার সময়
একমুখ জল ভর্তি করে নিয়ে চোখে দশ পনরবার জলের
ঝাপটা দিবে, দু’হাতের দুটি আঙ্গুল জলে ডুবিয়ে
দুকাণের মধ্যে দিয়ে কর্ণগহ্বর পরিষ্কার করিবে।
দক্ষিণ হস্তের তর্জনী মধ্যমা অনামিকা এই তিনটি
অঙ্গুলি বদনবিবরে প্রবিষ্ট করাইয়া জিহ্বার মূল হইতে
অগ্রভাগ পর্যন্ত বারম্বার দোহন করিবে, পরে পবিত্র
আসনে উপবিষ্ট হইয়া ধূপ, ধুনা, গুগগুল প্রভৃতি গন্ধ
দ্রব্যের দ্বারায় মনে পবিত্র ভাব আনাইবে, পরে সদ্গুরু-
উপদিষ্ট ক্রিয়ার সাহায্যে নিজ নিজ ইষ্টমন্ত্র বা নাম জপ
করিবে; জপ শেষ হইলে কিছুক্ষণ স্থিরভাবে সকল চিন্তা
সরাইয়া আপন উপাস্যের মূর্তি চিন্তা করিবে, মনে মনে
আপন উপাস্যকে বলিবে, ঠাকুর তােমার কি নাম কি রূপ
জানিনা, নিজগুণে কৃপা কর। এই কর ঠাকুর,যেন তােমায়
ভাববার ইচ্ছা বলবত থাকে, তুমিই বিশ্বের কৰ্ত্তা একথা
যেন ভুলি না। আর কিছু করতে হবে না। নিত্যক্রিয়া
;

১১২
গুরুপ্রসাদ।
শেষ হলে নিজ নিজ সংসার-কর্তব্য সাধ্যমত প্রতিপালন
করিবে, মনে মনে চিন্তা করিবে যখন কৰ্ম্মক্ষেত্রে এসেছি
তখন কৰ্ম্ম করতেই এসেছি কৰ্ম্ম শেষ হইলেই চলে যেতে
হবে, এই বিচারে পূর্ণ উদ্যমে প্রফুল্ল বদনে কর্তব্য সমাধা
ক’রূবে, অনুতাপ বা বিরক্তি প্রকাশ করূবেনা। যদি
সুযােগ থাকে স্নানের পর প্রাতঃ ক্রিয়ার ন্যায় মধ্যাহ্ন ক্রিয়া
সমাধা করিবে। আবার সন্ধ্যায় বা সন্ধ্যার পর অর্থাৎ
তােমার সুবিধা মত প্রাতঃসন্ধ্যা, মধ্যাহ্ন সন্ধ্যা, আর সন্ধ্যা
এই তিন
সময় সাধ্যমত সদ্গুরু যুক্তি অনুসারে
ভগবচ্চিন্তা করিবে, আর যদি কৰ্ম্মবিপাকে তিনবার
সুযােগ না হয় তাহলে দুইবার যদি তাতেও অসুবিধা
বােধ কর তাহলে তােমার সুবিধা মত যে কোন সময়
একবার নিৰ্জ্জনে পবিত্র আসনে বসে সংসার চিন্তা ভুলে
নিজ পরিত্রাণের জন্য ঈশ্বর চিন্তা করতে ভুলনা।
সংসারকর্ম শেষ করে রাত্রিকালে আহারের পর
যখন শয়ন করবে, যতক্ষণ না নিদ্রা আসে তার নাম বা
মন্ত্র জপ করিবে। আর সর্বদা মনে মনে পথে, ঘাটে,
দোকানে, অফিসে,
নৌকায়, ষ্টীমারে, যখন যে অবস্থায়
থাকিবে, শুচি অশুচি বিচার না করিয়া নাম বা মন্ত্র জপ
করিবে। পরনিন্দা, পরচর্চা, প্রবঞ্চনা, শঠতা, লম্পটতা,
মিথ্যা, জালিয়াতি চুরি এইগুলি ত্যাগ কর। তােমায়
যােগ, যাগ, তপস্যা কিছু করতে হবে না, অবস্থার উপর

গুরু প্রসাদ। ১১৩ সন্তোষ থাক। তিনি যে অবস্থায় রেখেছেন তাতেই সন্তোষ হও, রাজার বিলাস বিভব দেখে নিজেকে দুর্ভাগ্য মনে করে জ্ব'লে ম’রনা, উত্থানশক্তিহীন পঙ্গুকে দেখে নিজের সবল হস্ত পদের দিকে চেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে কর, কোন চিন্তা থাকবে না। মহাত্মা তুলসীদাস বলেছেন- যাহা সুমতি তাহা সম্পত্তি নানা । যাহা কুমতি তাহা বিপদ নিদানা ! অর্থাৎ যেখানে সুমতি সেইখানেই সম্পত্তি যেখানে কুমতি সেইখানেই বিপদ।

ব্রহ্মচারীদের নিত্যক্রিয়া-পদ্ধতি। সত্যানন্দ, ছােট সত্যানন্দ, জগদানন্দ, অক্ষয়ানন্দ, নিৰ্মলানন্দ, বিভূত্যানন্দ প্রভৃতি। গীত। ঠাকুর আপন মনে গাহিতেছেন-- স্বরূপেতে মজ দেখি মন । কর স্বরূপে স্বরূপ অন্বেষণ । স্বরূপে স্বরূপ পেলে হেরবি স্বরূপ ত্রিভুবন। অজ্ঞান তমসাঘােরে কেন মর ঘুরে ঘুরে এস রে জ্ঞানস্বরূপ মাঝারে ;- স্বরূপ জ্যোতি লক্ষ্য করে হও স্বরূপসাগরে মগন। স্বরূপে স্বরূপ চিনিবে স্বরূপে স্বরূপ পাবে, স্বরূপেতে হয় স্বভাবী সত্য জানিবে, স্বরূপেতে সচ্চিদানন্দ হের রে পাগল মন। সত্যানন্দ। বাবা আমাদিগে নিত্যক্রিয়াপ্রণালী দয়া করে বুঝিয়ে বলুন। ঠাঃ। রাত্রি তৃতীয় প্রহরের পর শয্যা ত্যাগ করা উচিত, শৌচান্তে মূলশুদ্ধি ক্রিয়ানুষ্ঠান করিয়া হঠযােগাঙ্গ ধৌতি প্রভৃতি অর্থাৎ (ব্ৰহ্মাতন দণ্ডধৌতি বা বমন- ধৌতি) + যার যার অভ্যাস আছে সূর্যোদয়ের পূর্বেই সমাধা করিবে, পরে মুখপ্রক্ষালনকালীন (দন্তধৌতি, + গুরুউপদেশ-গম্য।

গুরু প্রসাদ।
জিহ্নমূলধৌতি, কপালধোতি, কর্ণবিবরণ-ধোতি, চক্ষু
ধৌতি, কপালভাতি), (সংসারের নিত্যক্রিয়ার মধ্যে
দ্রষ্টব্য) এই সমস্ত ক্রিয়া সূর্যোদয়ের পূর্বেই শেষ করিয়া
সহমত নিৰ্ম্মল জল কিছু পান করিবে, পরে ধূপাদি গন্ধ
দ্রব্য দ্বারায় পবিত্র মনে পবিত্র আসনে উপবেশন করিবে।
যদি শয্যাতেই উপবেশন করতে হয় তাহলে আসনশুদ্ধি
মন্ত্র উচ্চারণ করিবে ।
হ্রীং আধারশক্তয়ে কমলাসনায় নমঃ, হ্রীং মৃতকায়
নমঃ ফটু এই মন্ত্রে শয্যায় তিনবার অঙ্গুলি আঘাত করিবে,
পরে মনস্থিরের জন্য কিছুক্ষণ নাভিতে মনঃসংযম করিয়া
কাকিমুদ্রা দ্বারা বহিঃপ্রাণায়াম অনুষ্ঠান করিবে। পরে
গুরুদত্ত ক্রিয়ার সাহায্যে নাম বা মন্ত্র জপ শেষ করিয়া
সাধ্যমত সাধ্য বস্তুর ধ্যান ধারণা করিয়া আসন ত্যাগ
করিবে। বলা বাহুল্য সূর্যোদয়ের পূর্বেই প্রাতঃক্রিয়া
সমাধা কথা উচিত। পরে আশ্রমস্থ দেবদেবীর পূজার জন্য
পুষ্পদি চয়ন, যজ্ঞাদির জন্য সমিধ,
কাষ্ঠাদি আহরণ, এবং
মধ্যাহ্ন ভোেজনের অনুষ্ঠানাদির জন্য প্রয়ােজন মত কৰ্ম্ম
করিবে, যােগীর প্রাতঃস্নান নিষিদ্ধ। বেলা এক প্রহরের
পর স্নান করিয়া মধ্যাহ্ন ক্রিয়া শেষ করিবে। ক্রিয়ার অন্তে
আশ্রমস্থ দেবদেবীর পূজা এবং সাধ্যমত বেদান্ত, গীতা,
চণ্ডী, ভাগবত প্রভৃতি রুচিঅনুযায়ী যে কোন মহৎ গ্রন্থ
পাঠ করিবে, তারপর সন্তুষ্ট চিত্তে ভােজন করিয়া কিছুক্ষণ

গুরু প্রসাদ।
মৃদু পদচারণ করিয়া বামপাশ চাপিয়া কিছুক্ষণ শয্যায়
শয়ন করিবে। দিবানিদ্রা সর্বতােভাবে ত্যাগ করিবে।
বৈকালে যদি কোন নির্দিষ্ট কৰ্ম্ম থাকে সমাধা করিবে,
নচেৎ সৎসঙ্গে সদালাপ বা সৎগ্রন্থাদি পাঠ করিবে।
সন্ধ্যায় দেব দেবীর সান্ধ্য আরতীর অনুষ্ঠান করিয়া পবিত্র
আসনে উপবেশন করিয়া পবিত্র মনে সন্ধ্যা বন্দনা কৰ্ম্ম
সমাধা করিবে । পরে রাত্রি একপ্রহরের পর যৎকিঞ্চিৎ
লঘুভােজন করিয়া প্রায় একঘণ্টা শয্যাগ্রহণ করিবে না ।
শয্যায় শয়ন করিয়া, আজ্ঞাচক্রে মনঃসংযম পূর্বক ইষ্ট
চিন্তা করিতে করিতে নিদ্রাভিভূত হইবে । গুরুর শয্যা
ত্যাগের পূর্বে শয্যা ত্যাগ করিবে। সর্বদা স্মরণ রাখিবে
গুরুশুশ্রুষাকারীর কোন সাধন প্রয়ােজন হয় না, এবং
গুরু-ভক্তিহীনের কোন সাধন সিদ্ধ হয় না।
শুশ্ৰষয়। বিদ্যা” গুরু শুশ্রুষার জন্য যদি নিত্য-ক্রিয়া
পণ্ড হয় ক্ষতি নাই, কিন্তু নিত্য-ক্রিয়ার জন্য গুরু-শুশ্রষার
অবহেলা করিলে পতন অবশ্যম্ভাবী, ইহা ধ্রুব সত্য। নাটক
নভেল, হাসি, বিদ্রুপ, পরচৰ্চ্চা দুশ্চিন্তা দুর্বলতা ত্যাগ
করিবে।
“গুরু
?

আমার কোষ্ঠীপুত্র। আমার জন্মস্থান ঘাটাল দুধের বাঁধ, চন্দ্রলগ্নে অষ্টম গর্ভে শ্রাবণমাসে এই রত্নের উদয় হয়, ৮। ৯ বৎসর বয়সের সময় দুচোখ আমার দরকার নেই দেখে ঠাকুর একটি কেড়ে নিয়েছেন, বাল্যে আমার গুণে মুগ্ধ হয়ে পিতামাতা ত্যজ্য পুত্র করে এ দেশ ছেড়ে কোনও অজ্ঞাত প্রদেশে চলে যান, আমার ছয় ভাই চারি ভগ্নি ছিল, তারা আমাকে বংশের নিশান রেখে সকলে এগিয়ে ছেন, বংশের জলপিণ্ডস্বরূপ একটি ভ্রাতুস্পুত্র ছিল, সে আমাকে তার ভরণপােষণে অক্ষম দেখে দয়া করে ছুটী দিয়েছে, আমি এক প্রকার ধূমকেতু। গ্রামস্থ পাঠশালা স্কুলে যৎকিঞ্চিৎ লেখাপড়া শিখে- ছিলাম, তারপর ব্যাকরণের জটীলতা দেখে নমস্কার ক'রে ক্ষান্ত হয়েছি, তবে যে বই লিখতে বসেছি, আমি শপথ করে ব’তে পারি, আমার কবিত্ব শক্তি দেখাবার জন্য নয়, ঠাকুরের কথা কটা মিষ্টি লেগেছে, তাই পাঁচজনকে দিয়ে খেতে পারছি না। শুধু তাঁর কথা কটা টুকে দেব, আর লিখছি কাদের জন্য জান, ভাব-ভাষা সুর-লয়-হীন, হরিনাম শুনে যারা চোখের জল ফেলে, সেই ধৰ্ম্ম- প্রাণ হিন্দুর জন্য। এই পুস্তকে যা কিছু দোষ লক্ষ্য হবে, সেটি জাবেন আমার কেরামতিঅরি যেটি মাতৃ-

গুরু প্রসাদ।
শুন্যের মত আপনার ধৰ্ম্ম জীবন পুষ্ট ক’রূবে, সেটি
ঠাকুরের, বহু-তপস্যালব্ধ ধন। মাত্র সেই স্পর্ধা নিয়ে
লিখতে বসেছি, নৈলে আমার মত বাণীবিদ্বেষী ব্যক্তির
লেখনী ধারণ ধৃষ্টতা ভিন্ন কিছু নয়।
বাল্য হতে সঙ্গীত চর্চা করে সঙ্গীতে আমার একটু
অভিজ্ঞতা জন্মেছিল, কলিকাতাতেই অধিক সময় থাকতাম,
মতের একটা স্থিরতা ছিল না, যখন যেটা ভাল লাগত,
সেইটাই জগতের শ্রেষ্ঠ মত বলে মনে করতাম, কারণ
আমি যে সেই মতে চছি, অর্থাৎ আস্তিকও নয়,
নাস্তিকও নয়, একটা কিস্তুত কিমাকার, লােকের কাছে
গগন ফাটিয়ে বক্তৃতা করতাম। ভূত কি? ভূত নাই !
ও সব অন্ধ সংস্কার। কিন্তু অন্ধকারে পাতা নড়লে,
আমার ইচ্ছা না থাকলেও পায়ের নখ থেকে চুলের ডগা
পৰ্য্যন্ত কেঁপে উঠত, আমি একটু বলিয়ে কইয়ে ছিলাম,
তারপর কুস্তি, মুগুর, লাঠি ড্যাম্বল, গান, বাজনা, মন্ত্র
যন্ত্র প্রভৃতি সব নৈবিছিতেই ঠোকর দেওয়া ছিল।
আজ প্রায় আট বৎসর হ’ল কলিকাতায় আমার গুরু-
ভ্রাতা মদনদাস, এবং ভূমানন্দ ভায়ার নিকট আমি
ঠাকুরের পরিচয় পাই, গত জন্মের সংস্কার বশে পরিচয়েই
পীরিত জমে গেল, মিলনের পূর্বেই বিরহ যাতনা ভােগ
হ’তে লাগল, ষণ্ডামি ঘুচে গেল, পরিণামের চিন্তা এল,
মরুভূমির মত চোখ দুটায় জল দেখা দিল, মনে হ’ল এখন

গুরুপ্রসাদ।
যদি আমার মৃত্যু হয়, তা হলে ত জম্মটা বৃথায় গেল,
সংসারটা শূন্য বােধ হতে লাগল, স্বপ্নে আশ্বাস বাক্য
পেলাম।
আমি যেমন গঙ্গাসাগর যাব বলে নৌকায় চেপে
রওনা হয়েছি, কোন একটি জিনিষ কিনবার জন্য নেমে
কিনারায় যাচ্ছি, দেখি, ঠাকুর বসে আছেন, আমি সাধু
মূর্তি দেখে দাড়িয়ে পড়লাম, ঠাকুর মুচকী হেসে বল্লেন,
কি ? কোথায় যাচ্ছ ? আমি বল্লাম, আমি গঙ্গাসাগর
যাব, তিনি বলেন, তুমি যে গঙ্গাসাগর যাবে, তা আমি
জানি, এই পৰ্য্যন্ত।
২য় স্বপ্ন।
ব্যাকুলতা আমার ক্রমেই বৃদ্ধি হতে লাগল, পুনরায়
স্বপ্নে দেখলাম, কোনও এক পৰ্বত শিখরে বসে আমায়
ক্রিয়া দেখাচ্ছেন, অতি মনােহর স্থান, স্বপ্নে বহুক্ষণ
ঠাকুরের সঙ্গ হ'ল।
৩য় স্বপ্ন।
আমি চঞ্চল হয়ে কোনও ক্রিয়াবান্ যােগীর নিকট
দুই এক যুক্তি নিয়ে সাধন আরম্ভ করলেম। স্বপ্নে ঠাকুর
ক্রোধপূর্ণ আরক্ত লােচনে বললেন, কে তােমায় ক্রিয়া
ক’রুতে বলেছে, স্থির হও, সময়ে সব হবে, স্বপ্নে আরও
অনেক ঘটনা দেখেছি, প্রকাশের প্রয়ােজন নাই।
পরে ভারি ইচ্ছা-প্রেরিত স্বামী পরমানন্দের নিকট
আমার দীক্ষালাভ, ঠাকুর দীক্ষা দিতে সম্পূর্ণ নারাজ,

গুরুপ্রসাদ।
আমি আমার গুরুভ্রাতার নিকট অবগত হয়ে ছিলাম,
তাই বিনা চেষ্টায় গুজরাটনিবাসী মহাতেজস্বী সন্ন্যাসী-
পরমানন্দ বাবা আমার বাড়ীতে এসেই দীক্ষা দিলেন,
কিন্তু ক্রিয়াদি কিছুই দিলেন না, পরে আমি আর কর্মহীন
অবস্থায় থাকিতে না পেরে ঠাকুরের দুর্বার আকর্ষণে
একাই মণিপুর উপস্থিত হই, সেইদিন ঠাকুরের ডেঙ্গো
ফলার নামক উৎসবের উদ্যাপন, অষ্টম প্রহরের ধুলট
হচ্ছে, বহু নরনারী ঠাকুরকে অগ্রে নিয়ে হরিনাম সংকীৰ্ত্তন
করতে করতে আসছে, আমি সম্মুখে, ঠাকুর ঐ স্থান
হ’তে ফিরে আশ্রমে গেলেন, আমি কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের
ন্যায় দাড়িয়ে ছিলাম, সংকীৰ্ত্তনস্রোত আমার কাছ দিয়ে
চলে গেল, আমার গায়েও কিছু ধূলালী দিয়ে গেল,
পরে একজন ব্রাহ্মণ আমার পরিচয় নিলেন, তিনি সঙ্গে
করে আমায় জগন্নাথ দর্শনের সেতাের মত আমার প্রাণ
নাথের দর্শন করালেন, তবে সেই ব্রাহ্মণ, আমার কাছ
থেকে, দর্শনীবাবদে কিছু নেন না। ছ সাতদিন ঠাকুর
আমায় আমলই দেন্ না, যথেষ্ট ভালবাসছেন, কিন্তু
আসল কথার বেলা বলেন, যাও সদগুরু চেষ্টা করে নাও
গে, পরে অনেক কান্না-কাটির পর এবং আমার সাধু
বশীকরণ সঙ্গীতের সাহায্যে ঠাকুরের চরণে আশ্রয় পেয়েছি
বলে ত বােধ হয়। তারপর ঠাকুর জানেন ?

রিশিষ্ট
ভাই সব ! ঈশ্বরকে একটু ভালবাসা খুব কঠিন মনে
ক’র না, ঈশ্বর আমাদের খুব নিকটে, এত নিকটে, যে
ঈশ্বর আর আমাদের মধ্যে একটুও ব্যবধান নাই, কোনও
বাধা নাই, বড় আপনার, তার আত্মীয়তাই আমাদের
অস্তিত্ব। কোনও অনুষ্ঠান নাই,সকল কাজে পরের সাহায্য
নিতে হয়, অনেক যন্ত্রপাতি দরকার হয়, কিন্তু ঈশ্বরকে
একটু ভালবাসতে,কাহারও সাহায্য চাই না। বনে বাগানে
নির্ভানে নগরে যেখানেই থাক, সেইখান হতেই তার চিন্তা-
করা চ’বে, যেখানে বসে তঁাকে ভালবালুতে হয়,
সেখানে কোনও বাধা পৌঁছাতে পারে না, তাবসর নাই
বলবে ? আমার দিকে চেয়ে একবার বল দেখি ভাই,
সত্য কি অবসর নেই, গত জন্মের সংস্কার নাই বলবে,
একবার চেষ্টা করে দেখনা ভাই, আছে কি না আছে,
আর যদি নাই থাকে, এই জন্মেই প্রথম আরম্ভ কর, না
হলে ত আবার এসে বলবে, গতজন্মের সংস্কার নেই,
সংসার কর্ত্তব্য শেষ হ'লে, যে সময় সংসার তােমায় ছুটি
দেয়, সেটি তােমার ভাগের সময়, তােমার ভাগের সময়
হ’তে অবসর করে নিয়ে, নিৰ্জ্জনে ব’সেই একটু তার চিন্তা
কর না ভাই । আচ্ছা তােমাব সংসারে যে সব নির্দিষ্ট কুৰ্ম্ম
আছে, ঘটনাচক্রে যদি কোনও দিন আর পাঁচটি কৰ্ম্ম
বেড়ে যায়, তুমিই ত সমাধা কর ভাই ! বর্তমানে তুমি যে

গুরুপ্রসাদ। সম্পত্তির অধিকারী আছ, ঈশ্বর অনুগ্রহে, যদি আরও দ্বৈগুণ্য সম্পত্তি পাও, অনর্থ বােধে কি-পরকে দিয়ে দিবে? না কি দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে তােমারই মস্তিষ্কের চিন্তা শক্তিকে বাড়িয়ে, সেই সম্পত্তি পরিচালনা করবে ? তাতে ত কৈ অলসতা আসে না ভাই ! বরং আশা কর, সসাগর। ধরিত্রীর অধিপতি হতে পারলে ভাল হয়, স্বার্থে তুমি এত বড় কৰ্ম্মঠ, আর পরমার্থে এতবড় অলস কেন ভাই ? জন্ম জন্ম কেবল অর্থেরই পূজা কবে ? “অখণ্ড মণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্” এই বাক্যের অর্থ কি গােলাকার রৌপ্য মুদ্রা? বড় ঠকা হবে ভাই। একদিন বুঝতেই হবে, ম’তে হবে, এ কথা বলা বাহুল্য মাত্র । এ বিষয় আমাদের সকলেরই যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে, এ বিষয়টিতে আমরা প্রত্যক্ষদশী, কারণ আমাদেরই চোখের সামনে দিয়ে সে দেশের অনেক পথিক গমন করেছে। ভুলে থেকো না ভাই, এমন জ্ঞান-বিজ্ঞানসম্পন্ন মানব- জম্মটা মিথ্যার প্রলােভনে পড়ে বাজে খরচ কর না, পাশবচারে থেকো না, সত্যের আশ্রয় গ্রহণ কর, সত্য, সংযম জ্ঞান, তপস্যা, এ সব বাক্য কি পুস্তকেই লেখা থাকবে? মানুষে ব্যবহার করবে না? কোনও কষ্ট নেই, কোনও অনুষ্ঠান নেই, যেমন আছ তেমনিই থাকবে, বেশ, ভূষা, বচন, বচন, কিছু দরকার নেই, শুধু মােড়টা উল্টে দেওয়া ! মাত্র সদ্ভাবী হয়ে

গুরুপ্রসাদ।
সত্যের আশ্রয় নিয়ে ঈশ্বরে ভালবাসা ! সমস্ত কর্তব্যের
মধ্য দিয়ে তাকে সর্বদা চিন্তা করা। এটা কি এত কঠিন
ভাই ? বড় আনন্দ পাবে, আমি বড় আনন্দ পেয়েছি,
সত্য বলছি ভাই! স্বাধীনতার আলাে দেখতে পাবে;
বন্দীভাবের অন্ধকার চোখের সামনে থেকে চলে যাবে,
ঈশ্বর কর্তা সর্বদা মনে রাখ, তুমি কৰ্মচারী, আদেশমত
কৰ্ম্ম করে যাও, প্রবাসী পথিকের মত যাবার জন্য সর্বদা
প্রস্তুত থাক, পত্নী, পুত্র, ভ্রাতা, ভগিনী প্রভৃতি আত্মীয়
স্বজনকে ঈশ্বরের স্বরূপ মনে করে ভালবাস, দিনান্তে
সুযোগ মত নির্জনে বসে সদ্গুরুদত্ত নাম লয়ে জপ
কর, আর তাকে চিন্তা কর, যদি বল ঈশ্বরকে দেখিনি
তাকে চিন্তা করব কি করে ? ভাল বাসবই বা কি করে?
কিন্তু ভাই! মহাত্মা গান্ধীকে আমরা অনেকে দেখিনি,
কিন্তু তার সাধূচিত সদ্গুণ এবং ত্যাগের জীবন্ত মহিমা
আমরা কাণে শুনেছি, না দেখলেও তাকে ত ভাল বাসতে
পাছি, সেইরূপ, ঈশ্বর আছেন, তার অস্তিত্বই আমাদের
অস্তিত্ব, ভারি করুণা বৰ্ম্মের মত আমাদিগকে মেরে
রেখেছে, আর্যঋষিগণ তাকে দর্শন করেছিলেন, এই
সমস্ত প্রমাণের উপর বিশ্বাস করে তাকে ভালবাস,
তাকে চিন্তা কর, দর্শনের জন্য ব্যাকুল হও, ব্যক্তি
লতার পরেই বস্তুলাভ! সত্য,সত্য, সত্য।
এ উপদেশ নয় ভাই! ভাইয়ের আব্দার। আমি কৰি

গুরুপ্রসাদ।
নয় ভাই, লেখার সম্পূর্ণ অযোগ্য, আমি আচাৰ্য নয় ভাই ।
ছাত্র,
উপদেষ্টা নয় ভাই, পালনকারী। ভাবভাষা কিছুই
জ্ঞান নাই. পুস্তকের নীতি কিছুই জানি না, শুধু ঠাকুরের
কথা কটা তোমাদিগে জানাব, এই একমাত্র উদ্দেশ্য।
দোকানদারী নয় ভাই! আমি যে পুস্তক রচনায়
অনভিজু একথা অতি সত্য।
দেব । {ামার কাজ তুমি করিয়ে নিলে, মন্ত্রী ভিন্ন
যন্ত্রের কোনও শক্তি নাই, সত মূল বই হউক, প্রাণ
ভিন্ন দেহের কোনও প্রয়ােজন নাই যতই সুন্দর হউক।
দেবতা ভিন্ন মন্দিরের কোনও প্রয়ােজন নাই, যতই কাক -
কানা-খচিত হউক, তুমিই এই যন্ত্রের মন্ত্রী, তুমিই এই
দের প্রাণ, তুমিই এই মন্দিরের দেবতা।
এতৎ কস্মফলম লতাগুরু নারায়ণ-পূর্ণ পরগী চণ
অর্পণমস্তু। গুরবে নমঃ।
পাকাবাহী ভৃত্য।
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

যতীন্দ্রমােহন চক্রবর্তী
সুখের বাঁ “হরিভঞ্জন কুটীর
পেটাল, সে মেদিনীপুর।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Guru Prasad

Author
Not Available
Title
Guru Prasad
File name
Guru Prasad
Text
OCR done
Citation
1926
Published
2010/03/31
Publisher
Sri Jatindramohan, Medinipur
Language
Sanskrit
Pages
144
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essay
Keywords
Biswas
DLI number
511078
Barcode
4990010018259.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
vIK5ULRkcdN
Download PDF

Guru Prasad