Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Shri Chaitanya

Bhattacharya,khitishchandra · 2010/01/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

জ্জীess
মপঠ সংস্করণ
১ম গ্রন্থ
শ্রীচৈতন্য
--
‘মশার যুদ্ধ
প্রণেতা
শ্রীক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য প্রণীত।
শ্রীক্ষিতীশচন্দ্র)
ফাঙ্গুনী পূর্ণিমা ১৩০ বাংলা
প্রকাশক :-
নৰ্ভন কুলজ। লাইব্রেরী
পাের কুলাউড়া; শ্রীহট্ট।
প্রথম সহস্র
[ মূল্য মাত্র সাড়ে তিন আনা।

প্রকাশক :-
ভট্টাচার্য্য ব্রাদাস
নন কুলজা লাইব্রেরী।
পােঃ কুলাউড়া ; শ্রীহট্ট।
;
-“মহৎচরিত সবে কবায় স্মরণ
মােরাও করিতে পারি মহৎ জীবন
রাখিয়া যাইতে পারি মমাদেরও পশ্চাতে
আদর্শ রূপেতে কীর্তি, সময় সেকতে।
-Long Felloro.
প্রিন্টার পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী
বিদ্যোদয় প্রেস
১৭ নং রাধানাথ বােস লেন
কলিকাতা।

সাহিত্য চর্চার জন্য গবর্ণমেন্ট বৃত্তি প্রাপ্ত
বৈষ্ণব সাহিত্যের রথী ও ভক্ত লেখক
শ্ৰীযুক্ত অচ্যুত চরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি মহাশয় কর্তৃক লিখিত
ভূমিকা
প্রখর গ্রীষ্ম, উত্তাপে যেন অগ্নিকণা ছড়াইয়া
পড়িতেছে ; একটু শীতল ছায়ার জন্য জীবকুল আকুল।
ভয় নাই; বায়ু বহিতে আরম্ভ হইয়াছে, মেঘমালা
ছায়াদানে উন্মুখ শীঘ্রই বারি বর্ষণে ধরা শীতল হইবে ।
সর্বত্র একই নিয়ম। যখন অন্যায় অনাচারে দেশ
প্রাণহীন হইয়া পড়ে, তখনি শান্তিদিতে মহাপুরুষেরা
লােকের দ্বারে হাজির হইয়া থাকেন।
সার্ধ চারিশতবর্ষ পূবে এইরূপে এক লীলা পুরুষােত্তম
এদেশে আবিভূত হইয়া দেশের দুর্গতি দূর করিয়াছিলেন।
গ্রন্থকার সুন্দর সরল ভাষায় শিশুদের জন্য তাহার সুন্দর
চরিত কথা এ পুস্তিকায় নিবদ্ধ করিয়াছেন ।
শ্রীহট্টের গৌরবসম্পদ চরিতমাল ক্রমশঃ প্রকাশ
হয়, এমন একটা বাসনা বহু পূৰ্ব্বে মনে হওয়ায়, তাহার
সূচনা করা হইয়াছিল। এই উদ্যমে তাহা পূর্ণ হইলে
প্রকৃতই সুখের বিষয় হয়।
শ্ৰীঅচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি।

আমাদের প্রকাশিত আর একখানি পুস্তক
মশার সুজা ।
‘একখানি চটি বই, কিন্তু খুব মূল্যবান্ ; গল্প ও
রহস্যচ্ছলে লেখক অনেক প্রয়ােজনীয় বিষয়ের
সমালােচনা করিয়াছেন। ম্যালেরিয়ার বাহন মশক
কুল আমাদের প্রবলতম শত্রু, ক্ষিতীশ বাবু সেই
মশার হাত হইতে বাচিবার সহজ সহজ পন্থা নির্দেশ
করিয়াছেন ; এজন্য তিনি বঙ্গবাসীর ধন্যবাদাহ,-
স্বাস্থ্য সমাচার। হাস্য রসের মধ্যেও অনেক
ভাবিবার কথা আছে, এই ম্যালেরিয়া প্রপীড়িত
বঙ্গদেশে এরূপ গ্রন্থের বহুল প্রচার হওয়ার প্রয়ােজন
আছে।” ‘পড়িলে অনেকে নৃতন কিছু শিখিতে
পারিবেন।'—প্রবাসী।
বহু সপ্তাহিক সংবাদ পত্রে, বড় বড় সাহিত্যিক
ও দেশহিতৈষীগণ কর্তৃক উচ্চ প্রশংসিত। মূল্য
চারি আনা সিল্কেবাঁধা ছয় আনা। কলিকাতায় গুরুদাস
চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সে পাওয়া যায়।
নর্তন
কুলজা
লাইব্রেরী
পােঃ কুলাউড়া; শ্রীহট্ট।

স্বদেশ স্বজাতি কীৰ্ত্তি করিলে শবণ, গৌরবেতে বুক যার নাহি উঠে ফুলে ; আশাহীন, লক্ষহীন, মৃত-প্রাণ নিয়ে আছে কি এমন কেহ এভব মাঝারে ? -~-Scott. দেশের এবং জাতির অতীত গৌরব পাঠ করিলে মনে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষার উদয় হয় তাহাই জীবননান্নতির প্রধান সােপান। তাই স্বদেশ ও স্বজাতির গৌরব-কাহিনী জগতের প্রত্যেক অ্যুদয়- শীল জাতির কাছেই একটা বিশেষ গৌরবের বস্তু। কিন্তু আমরা বিদেশের বর্ণনায় মুগ্ধ তনু মন ; মােহবশে দেশ পানে চাইনে কখন। গৌরব ‘আমাদের শ্রীহট্ট কম কিসে? কিন্তু দুঃখের বিষয় শুধু শিশুরা নহে—শ্রীহট্টের অনেক যুবকেই জানেন না যে-জ্ঞান, প্রেম, ভক্তি, কাব্য, ন্যায়, ও ললিত কলার পরিচয্যায়, ধর্মক্ষেত্রে ও সমরক্ষেত্রে একদিন এই অধুনা পতিত শ্রীহট্টের কৃতিসন্তান পূৰ্বভারতে আর্যজাতির বিজয় গৌরব প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন । সুতরাং বিস্মৃতির অতল সলিলে পূৰ্বপুরুষদের কীর্তিকে ভাসাইয়া দিয়া নিজকে জগত সমক্ষে অকৰ্ম্মন্য ও দুর্বল বলিয়া ভাবিতে শিখেন। এমতাবস্থায় মনে কোনরূপ উচ্চাকাঙ্ক্ষ। জাগ্রত হয় না ; শৈশবাবধি স্বদেশ ও স্বজাতির গৌরব কাহিনী পাঠ করিলে মনে কদাপি এইরূপ ভাব উপস্থিত হইতে পারে না। ইতিপূর্বে “শ্রীহট্ট-গৌরব চরিতাবলী” নাম দিয়া দুইখণ্ড বড় পুস্তক প্রকাশিত হইয়াছে; কিন্তু শিশুপাঠ্য এইরূপ পুস্তকের অভাব অনুভব করিয়া বহুদিন হইতে“শ্রীহট্ট-গৌরবচরিতাবলীর শিশুপাঠ্য সংস্করণ প্রকাশ করিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলাম। আমার মত শক্তি হীনের পক্ষে এরূপ বিপুল কাৰ্য্যে হাত দেওয়া উচিত ছিলনা কিন্তু ০ গতবৎসর প্রবেশিকা পরীক্ষার পর কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের উৎসাহ ও সৌজন্যে উহাতে প্রবৃত্ত না হইয়া থাকিতে পারিলাম না। এই নিমিত্ত শ্রীহট্টের ছোটবড় যাহাদের সঙ্গে দেখা করিয়াছি তাহাদের নিকট হইতেই যথেষ্ট উৎসাহ পাইযাছি। যাহাকে নিয়া শ্রীহট্টের বেশী গৌরব তাহার পণ্য চরিত প্রথমে দিয়া এই গ্রন্থাবলী আরম্ভ করা হইল; নতুবা চৈতন্য সম্বন্ধে অসংখ্য ভাল পুস্তক থাকা সত্ত্বে উহা প্রকাশের, কোনই প্রয়ােজন ছিল না। এই পুস্তক প্রণযণে যে সমস্ত পুস্তকের সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি তন্মধ্যে হট্ট মাতার সুসান বৈষ্ণবঢ়ড়ামণি যুক্ত অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি মহাশয়ের “শ্রীচৈতন্য চরিত" ও “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত বিশেষ ভাবে উল্লেখযােগ্য ; স্থানে স্থানে তাহা হইতে অবিকল উদ্ধৃত করিয়া দিয়াছি । এজন্য তাহার কাছে সবিশেষ কৃতজ্ঞ । আমার বন্ধু শ্ৰযুক্ত প্রতুলচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, শ্ৰীযুক্ত পূণচন্দ্র সিংহ ও শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী প্রভৃতি চিত্রশিল্পীগণ পুস্তকখানিকে চিত্রে চিত্রময় করিয়া দিয়া আমার কৃতজ্ঞতা ভাজন হইয়াছেন। পুস্তকখানিকে, সুন্দর করিবার জন্য যত্ন ও অর্থব্যয়ের কোনই ত্রুটি হয় নাই। এতদ্দেশে এরূপ বহু চিত্রপূর্ণ সুন্দর ছাপানাে বই এত সুলভে ইতিপূর্বে আর প্রকাশিত হয় নাই। বই ছাপিয়া লাভ করা আমাদের উদ্দেশ্য নহে বরং ক্ষতির সম্ভাবনাই অধিক। তবে এবিষয়ে দেশবাসীর উৎসাহ ও সৌজন্য পাইলে আমরা ক্রমে ক্রমে সকল জীবনী 'গুলিকেই এই ভাবে ছাপাইয়া দেশের শিশুদের হাতে তুলিয়া দিবার আশা রাখি। ইতি- গবর্ণমেণ্ট আটস্কুল হােষ্টেল ৩৪ নং কর্পরেশন ষ্টীট কলিকাতা। বিনীত- শ্ৰক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য

পতিতপাবন
শ্রীচৈতন্যের
পুণ্যকাহিনী
কমলে
অর্পিত হইল।
st news
T-Banerje

সচিত্র শ্রীহট্ট-গৌরব চরিতাবলীর
দ্বিতীয় গ্রন্থ
শ্ৰীযুক্ত চারুচন্দ্র চৌধুরী প্রণীত
শাহজালাল
বহু চিত্রে পূর্ণ হইয়া এমনি সুন্দর ভাবে ছাপা হইয়া
শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে ।
শ্রীহট্ট জিলার বিভিন্ন স্থানের সকল প্রধান লাইব্রেরী ও
শিলচর সরস্বতী লাইব্রেরীতে আমাদের প্রকাশিত
সকল পুস্তক পাওয়া যায়।
0
নর্তন কুলজা লাইব্রেরী
পাের কুলাউড়া ; শ্রীহট্ট।

প্রাভ
শ্রীহট্টের বালক বালিকাগণ।
আমাদের জন্মভূমি এই ভূমি—“শ্রীহট্টের গৌরব
করিবার বিষয় নিতান্ত অল্প নহে। এদেশের প্রতিধুলি
কণাতে আমাদের কত অতীত গৌরবের পুণ্যস্মৃতি
মাখানাে আছে।
আমাদের জন্মভূমি শ্রীহট্ট, বঙ্গের একটি অতি
প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ স্থান। ‘প্রায় চারি সহস্র বর্ষ ধরিয়া
এই অঞ্চলে আৰ্য কীর্তির বিজয় বৈজয়ন্তী উড়িয়াছিল—
সে সময় বাঙ্গালার অনেক আধুনিক সমৃদ্ধ অঞ্চল,
বিস্তীর্ণ সলিল রাশিতে নিমজ্জিত ছিল।
আধুনিক যুগে শ্রীহট্টের অবস্থা যাহাই হউক না
কেন—একদিন ছিল যখন ধৰ্ম্ম, বিদ্যা, শিল্প ও বাণিজ্য
প্রভৃতির জন্য শ্রীহট্ট মহা সম্পদশালী ছিল।
‘শ্রীহট্ট বৈষ্ণব প্রসূতি ভূমি। ভাই বােনগণ।
‘আমাদের পিতৃভূমি প্রেমের অবতার শ্রীচৈতন্যের
পিতৃভূমি, আমাদের জন্মভূমি, জ্ঞান ও ভক্তির অবতার
অদ্বৈতাচার্য্যের জন্মভূমি। আরও অনেক প্রসিদ্ধ
বৈষ্ণব এই শ্রীভূমিতেই জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।

19/
৩)
“দিধীতি” প্রণেতা নৈয়ায়িক-শ্রেষ্ঠ রঘুনাথ শিয়ােমণিও
এই শ্রীহট্টেরই সন্তান।
কেবল যে এখানে হিন্দু ধৰ্ম্ম প্রচারক ও শাস্ত্রকারদের
আবির্ভাব হইয়াছিল এমন নহে এই শ্রীভূমিই আবার
আরবদেশীয় সুপ্রসিদ্ধ পীর শাহজলালের কর্মভূমি।
এই সুজলা সুফলা স্বভাব-সম্পদপূর্ণ। শ্রীহট্টেই পণ্ডিত
গৌরীশঙ্করের মত সাহিত্যিকের আবির্ভাব হইয়াছিল ।
শুধু তাহাই নহে, এদেশে আরাে কত কত মহাপুরুষ
জন্মগ্রহণ করিয়া আমাদের গৌরব বাড়াইয়া দিয়াছেন,
তাহা শুনিলে তােমরা অবাক হইবে! আমরা একে
একে ক্রমে তাহা তোমাদিগকে শুনাইব; কিন্তু শুধু
অতীত গৌরব করা কি ভাল দেখায়, সে গৌরব
উদ্ধার করাও কি উচিত নয় ? তােমাদের শুধু মনে
রাখিতে হইবে
;
মহাজ্ঞানী মহাজন, যে পথে করে গমন;
হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়।
সেই পথ অনুসরি, স্বীয় কীৰ্ত্তিজা ধরি
আমরাও হব বরণীয়।
*=

No text on this page.

Peripe tre

শ্রীচৈতন্য
প্রথম পরিচ্ছেদ।
আদি কথা ।
গঙ্গাতীরে অবস্থিত নবদ্বীপ বঙ্গের একটি অতি
প্রাচীন ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান। এককালে এখানে
হিন্দু রাজাদের রাজধানী ছিল ; আজও নবদ্বীপের
স্থানে স্থানে তাহার ধ্বংশাবশেষ বৰ্তমান আছে।
শুধু তাহাও নয়, এক সময়ে নবদ্বীপ বিদ্যা, বাণিজ্য,
সভ্যতা ও ধন সম্পদের জন্য অত্যন্ত প্রসিদ্ধলাভ
করিয়াছিল। চারিশত বৎসর পূর্বে শাস্ত্ৰালােচনার
জন্য নবদ্বীপ ভারত-বিখ্যাত হইয়াছিল, সেই সময়েই
নবদ্বীপে সুপ্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক বাসুদেব সার্বভৌন ও
রঘুনাথ শিরােমণি এবং অদ্বৈতাচাৰ্য্য ও স্মাৰ্ত্ত রঘুনন্দন
প্রভৃতি পণ্ডিত মণ্ডলীর আবির্ভাব হইয়াছিল।
শত শত পণ্ডিত তখন নবদ্বীপে চতুষ্পাঠী খুলিয়া
অধ্যাপনা করিতেন এবং নানা স্থানের অসংখ্য ছাত্র
তাহাদের কাছে গিয়া বিদ্যা শিক্ষা করিত। নবদ্বীপে

শ্ৰেীচৈতন্য
স
;
তখন বিদ্যাহীনের আদর একেবারেই ছিল না। পথে
ঘাটে যে কোন স্থানে দুইজনে দেখা হইলেই শুধু বিদ্যার
আলোচনা হইত।
কিন্তু হইলে কি হয় ? ছছাট বড় সকলেই শাস্ত্রের
কথা নিয়া দিবা রাত্র শুধু তর্ক বিতর্কই করিত; কিন্তু
শাস্ত্র মানিয়া ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম বড় একটা করিত না। শুধু
নবদ্বীপের নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের অবস্থাই তখন এইরূপ
হইয়া পড়িয়াছিল। ধৰ্ম্মের নামে লোকে নানা অপকৰ্ম্ম
ও অন্যায় কাজ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। এইরূপে
ধৰ্ম্ম ও নীতিহীন হইয়া দেশের অবস্থা একেবারে
শােচনীয় হইয়া পড়িয়াছিল।
বিশেষতঃ তখন ছিল—পাঠান রাজত্ব ; পাঠানদের
প্রবল প্রতাপে সনাতন হিন্দুধর্ম একেবারে লােপ পাইতে
বসিয়াছিল। ঠিক সেই সময়েই
ঠিক সেই সময়েই শ্ৰীকৃষ্ণ-চৈতন্যরূপে
পতিতপাবন ভগবান
পাতকী তারিতে,
করুণা করিতে ;
জীবের দুর্গতি হেরিয়া-
আসিল নদেতে,
প্রেম বিলাইতে ;-
মানব মূরতি ধরিয়া।
২

শ্রীচৈতন্য
জন্ম ।
ইতিহাস প্রসিদ্ধ নবদ্বীপে মায়াপুর নামে একটি
প্রাচীন পল্লী আছে। সাধারণতঃ উহা “শ্রীহট্টীয় পল্লী”
বলিয়াই অভিহিত হইত, কারণ এখানে ব্রাহ্মণ বৈদ্য
প্রভৃতি, শীহট্ট জিলার অনেক লােক থাকিতেন।
এই মায়াপুরে জগন্নাথ মিশ্র নামে একজন ধৰ্ম্মানুরাগী
সরল স্বভাব ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। শ্রীহট্ট জিলার
ঢাকা দক্ষিণ নামক স্থানে তঁাহার বাসস্থান ছিল। তাহার
পিতার নাম উপেন্দ্র মিশ্র। জগন্নাথের সাত সহােদর
ছিলেন ; তন্মধ্যে তিনি তৃতীয়। সংস্কৃত শিক্ষার জন্য
অল্প বয়সে মাতা পিতা, ভাই বন্ধু ও ঘর বাড়ী সমস্ত
ছাড়িয়া তিনি পুণ্যভূমি নবদ্বীপে আসিয়াছিলেন। লেখা
পড়ায় তাহার বিশেষ মনােযােগ ছিল। পাণ্ডিত্যের
জন্য কালে তিনি “পুরন্দর” উপাধি প্রাপ্ত হন। অমায়িক
ব্যবহারে ও অন্যান্য নানাবিধ গুণে তিনি নবদ্বীপ
বাসীর শ্রদ্ধার পাত্র হইয়াছিলেন।
গঙ্গাবাসের জন্য জগন্নাথ দেশের মায়া কাটাইয়া,
এই মায়াপুরে বাড়ী প্রস্তুত করিয়া বাস করিতে থাকেন।
নীলাম্বর চক্রবর্তী নামক নবদ্বীপবাসী জনৈক সুপ্রসিদ্ধ

চৈতন
জ্যোতিষীর শচীনামী পরমা সুন্দরী কন্যার সহিত তাঁহার
বিবাহ হইয়াছিল। উক্ত চক্রবর্তী মহাশয়ের পূৰ্ব্বনিবাস
শ্রীহট্টের জয়পুর নামক স্থানে ছিল। শ্রীহট্টে একবার
এক ভীষণ দুর্ভিক্ষ হয় ; তখন তিনি শ্রীহট্ট ত্যাগ
করিয়া নবদ্বীপে আসেন এবং পরে আর দেশে ফিরিয়া
যান নাই।
কালক্রমে জগন্নাথ মিশ্রের বিশ্বরূপ নামে একটি
পুত্র জন্মে এবং ইহার কিছু দিন পরে ক্রমে পর পর
আটটি মেয়ে জন্মিয়া মৃত্যু মুখে পতিত হয়। উহাতে
মিশ্র দম্পতীর মনােকষ্টের একশেষ হয়। তখন পিতার
আদেশে শচীদেবী সহ জগন্নাথ একবার দেশে বেড়াইতে
যান; এবং কিছুকাল সেখানে থাকিয়া আবার সস্ত্রীক
নবদ্বীপে ফিরিয়া আসেন।
সেই সময় শ্রীহট্টে অবস্থান কালে শচীদেবীর গর্ত
লক্ষণ প্রকাশ পায়, এবং এই গর্তেই ১৪০৭ শকাব্দে
প্রেমের অবতার চৈতন্যদেব জন্ম গ্রহণ করেন।
সে বৎসর ফাণী পূর্ণিমাতে চন্দ্র গ্রহণ হইয়াছিল,
গ্রহণোপলক্ষে বঙ্গদেশের সর্বত্র হিন্দু নরনারীগণ আনন্দে
মগ্ন ছিলেন, সকলেই ধৰ্ম্ম কর্ম ও স্নান তর্পণে ব্যস্ত
ছিলেন ; হরিধ্বনিতে দিগদিগন্ত মুখরিত হইতেছিল।

শ্রীচৈতন্য
•
।
এহেন
নবদ্বীপ বাসীর ও সেদিন গঙ্গাস্নান, দান ধ্যান ও
পূজা পাৰ্বণাদিতে ব্যস্ত ছিলেন, ঘরে ঘরে কুললক্ষমীরা
আনন্দে হুলুধ্বনি দিতে ছিলেন ;-দশদিক মঙ্গল শঙ্খ
ঘণ্টা নিনাদে ও পবিত্র
ধূপ-ধূনার গন্ধে মুখরিত হইতে
ছিল। বালক বালিকা যুবক বৃদ্ধ সকলেই সে দিন
ধৰ্ম্ম কৰ্ম্মে মাতিয়াছিল ; নবদ্বীপে সেদিন আনন্দের হাট
বসিয়াছিল।
শুভদিনে শুভক্ষণে চৈতন্যদেব ভূমিষ্ঠ
হইলেন। “যিনি হরিনামের বিজয়ভেরী বাদন করিয়া
ভারতবাসীকে মােহনিদ্রা হইতে জাগাইয়া ছিলেন,
তাহাদেরই ধৰ্ম্মজ্ঞান উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন , তাহার জন্ম
কালেই তৎসূচনা হইয়াছিল। সুন্দর শিশুটিকে দেখিয়া
মিশ্ৰদম্পতীর আনন্দের সীমা রহিল না।
অতিশয় জাক জমকের সহিত জগন্নাথ পুত্রের
জন্মোৎসব সম্পন্ন করিলেন; পুত্রের মঙ্গলার্থ ব্রাহ্মণ
পণ্ডিত ও দীন দুঃখীকে প্রভূত ধন দান করিলেন।
শচীদেবীর পিতা শিশুর জন্ম লগ্ন গণনা করিয়া বলিলেন,
উহার শরীরে মহাপুরুষের লক্ষণ বর্তমান আছে ;
-উহা
হইতে জগতের অশেষ কল্যাণ সাধিত হইবে।
শিশুর নাম রাখা হইল—“বিশ্বম্ভর” কিন্তু শচীদেবী
;

শ্রীচৈতন্য
তাহাকে “নিমাই” বলিয়া ডাকিতেন ; দেখিতে গৌরবর্ণ
ছিল বলিয়া অনেকেই তাহাকে “গৌরাঙ্গ” বলিয়া ডাকিত
এতদ্ব্যতীত তাঁহার আরও অনেক গুলি নাম ছিল ;
সর্বশেষ নাম—“মীচৈতন্য ।
বাল্যলীলা।
মাতা পিতার আহলাদের মধ্যদিয়া নিমাইচাঁদ দিন
দিন বাড়িতে লাগিলেন। তঁাহার রূপে জগন্নাথের ঘর
আলােকিত হইয়া উঠিল।
শিশু নিমাইকে যে একবার
দেখিত, সেই মুগ্ধ হইত ;-সংসারের ভাবনা চিন্তা
তাহার মন হইতে ক্ষণেকেরতরে চলিয়া যাইত। পাড়ার
মেয়েরা রােজ একবার করিয়া বালক নিমাইকে দেখিয়া
কোলে করিয়া যাইতেন
-তবুও যেন তাহাদের সাধ
মিটিত না।
শৈশবাবধিই নিমাই একটু অস্বাভাবিক রকমের
এবং বড় চঞ্চল ছিলেন। হরিনামে তাহার বড় প্রীতি
ছিল ; ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিলে কেহই তাহাকে
শান্ত করিতে পারি না। একদিন একটি স্ত্রীলােক
“হরি হরি” বলিয়া হাততালি দেওয়াতে তঁাহার ক্রন্দন

মজৈন্য
বন্ধ হইল ; সেই হইতে তাহার ক্রন্দন থামাইতে হইলে
হরিনাম রূপ ঔষধি প্রয়ােগ করা হইত।
আর একদিন শচীদেবী নিমাইকে ঘুম পাড়াইয়া
গৃহকর্মে ব্যস্ত ছিলেন ; হঠাৎ ফিরিয়া দেখেন, নিমাই
ঘুম
হইতে উঠিয়া একটি সাপের সঙ্গে খেলা করিতেছেন।
এদৃশ্যে মায়ের প্রাণ শিহরিয়া উঠিল, সকলে হায় হায়
করিতে লাগিলেন ; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কোন প্রকার
অনিষ্ট না করিয়া সাপ একদিকে সরিয়া পড়িল। বাল্য
কালাবধি নিমাইয়ের জীবনে এইরূপ নানা অদ্ভুত ঘটনা
ঘটিতে লাগিল।
ক্রমে নিমাই হাঁটিতে শিখিলেন, তখন সর্বদাই
এদিক ওদিক ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। কখন
গিয়া গঙ্গায় পড়িবেন, কখন কে তাহার শরীর হইতে
মূল্যবান্ অলঙ্কারাদি লইয়া যাইবে ইত্যাদি ভাবিয়া
পিতা মাতা অত্যন্ত চিন্তিত হইলেন। এই সময়ে পথে
পাইয়া একদিন অলঙ্কারের লোভে একচোর, সন্দেশ
দিবে বলিয়া তাহাকে ভুলাইয়া কোলে করিয়া লইয়া
যায়। কিন্তু বহু রাস্তা বিশিষ্ট নবদ্বীপে তাহার ভ্রম
উপস্থিত হওয়াতে, পথঠিক করিতে না পারিয়া সে
আবার নিমাইয়ের বাড়ীর কাছে আসিয়া উপস্থিত হয়।

;
;
;
সেই সময়ে মিশ্র মহাশয় প্রভৃতি নিমাইকে খুজিতে
ছিলেন ; বেগতিক দেখিয়া নিমাইকে ছাড়িয়া চোর প্রাণ
লইয়া পলাইয়া যায়।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে নিমাইয়ের চাঞ্চল্য ও দিন
দিন বাড়িতে লাগিল; তঁাহার উপদ্রবে পাড়া পড়শী।
অভিষ্ঠ হইয়া উঠিল। নিমাই রােজ রােজ পাগলামীর
এক একটা নূতন নমুনা প্রকাশ করিতে লাগিলেন। মা
শুদ্ধাচারিণী ছিলেন, কিন্তু নিমাই শুচি শুচি না মানিয়া
ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন ; অস্পৃশ্য কুকুর লইয়া খেলা
করিতে আরম্ভ করিলেন।
নিমাইচাদ একদিন মায়ের তাড়নার ভয়ে আস্তাকুড়ে
গিয়া তাবৎ পরিত্যক্ত হাড়ি জমাইয়া তাহার উপর
বসিলেন। মাতা তঁাহাকে কত বুঝাইলেন, স্নান
করিয়া ঘরে আসিতে বলিলেন; কিন্তু কে তার কথ?
শােনে ?—নিমাই অচল অটল ভাবে তেমনই বসিয়া
রহিলেন। অবশেষে রাগ করিয়া শচীদেবী বলিলেন,
“নিমাই তুই কি রকম ছেলে ; যার শুচি অশুচি জ্ঞান
নাই সে কি আবার ব্রাহ্মণ ?” নিমাই বিজ্ঞের মত উত্তর
করিলেন, “মা, তুমিই না সেদিন বলিয়াছিলে যে
‘ভগবান সর্বত্র বিরাজমান তখন এই আস্তাকুড় অশুচি

চৈতন্য
হইল কিরূপে? দেবালয়ে ফুল চন্দনের মধ্যে যেমন
এই পরিত্যক্ত আবর্জনার ক্রিমি কীটের মধ্যেও
আমার প্রেমের ঠাকুর তেমনই আছেন।” ছেলের
কথায় মা ত অবাক্ !
তঁাহার আব্দারাদিও এই রূপ অদ্ভুত রকমেরই ছিল।
একদিন মা ষষ্ঠীর পূজার নৈবেদ্যাদি লইয়া যাইতে
ছিলেন, নিমাই ধরিয়া বসিলেন তাহা খাইবেন। মা
“ষাট ষাট” বলিয়া তাহাকে কত বুঝাইলেন; পূজার
পর প্রসাদ পাইবেন বলিলেন, কিন্তু নিমাই তাহা
শুনিলেন না—খাইয়া তবে ছাড়িলেন।
কোন এক একাদশীতে হিরণ্য ও জগদীশ নামে
মিশ্ৰমহাশয়ের প্রতিবেশী দুই পণ্ডিত বিষ্ণুর নৈবেদ্য
প্রস্তুত করিয়াছিলেন; নিমাই মাকে কহিলেন তিনি
তাহ খাইবেন। শচীদেবী নানা কথায় ছেলেকে
প্রবােধ দিতে চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই তাহাকে
শান্ত করিতে পারিলেন না! পণ্ডিতদ্বয় যখন উহা
শুনিলেন, তখন তাঁহাদের মনে হইল বালকের দেহে
ভগবান গােপাল রূপে বিরাজ করিতেছেন : সুতরাং
তাহারা নৈবেদ্য আনিয়া নিমাইকে খাইতে দিলেন।
আর একদিন নিমাইয়ের বাড়ীতে এক ব্রাহ্মণ

শ্রীচৈতন্য
অতিথি হন। তিনি পাক করিয়া যেমন দেবতাকে
অন্ন দিতেছেন, অমনি নিমাই গিয়া ছোঁ মারিয়া একমুঠা
ভাত লইয়া গেলেন, ব্রাহ্মণের আর দেবতাকে দেওয়া
হইল না। মিশ্ৰমহাশয়ের বহু অনুরােধে তিনি আবার
পাক করিলেন, আবার অকস্মাৎ কোথা হইতে আসিয়া
নিমাই একগ্লাস খাইয়া ফেলিলেন। ব্রাহ্মণ আবার
পাক করিলেন, নিমাই আবার খাইলেন; অবশেষে
ব্রাহ্মণের মনের গােল ঘুচিল। নিমাইকে বাল গােপাল
মনে করিয়া ব্রাহ্মণ আর ঘৃণা না করিয়া বালকের
উচ্ছিষ্টই খাইলেন।
শৈশবে ব্রজের ননীচোরা কানাইয়ের মত নিমাইও
প্রতিবেশীদের ঘরে ঢুকিয়া দুগ্ধাদি চুরি করিয়া খাইতেন ;
কিন্তু তাহার কি এক মােহন শক্তি ছিল যে, কেহই
তাহার উপর রাগ করিতে পারি না। কানাই যেমন
রাখালদের সঙ্গে থাকিতেন, পাড়ার ছেলেদের লইয়া
নিমাইও তেমনই নাচিয়া গাহিয়া বেড়াইতেন, কখন
বা লােক জনকে বিরক্তও করিতেন। অন্যান্য অনেক
বিষয়েও কানাইয়ের সঙ্গে তাহার সাদৃশ্য ছিল।

শ্রীচৈতন্য
শিক্ষা।
ক্রমে নিমাই একটু বড় হইলেন, তখন
মিশ্ৰমহাশয় তাহাকে হাতে খড়ি দিয়া পাঠশালায়
পাঠাইলেন। এবার নিমাইয়ের স্বভাবেরও একটু
পরিবর্তন হইল ; নিমাই শান্ত শিষ্ট হইয়া লেখাপড়ায়
খুব মন দিলেন।
এই সময়ে একটি ঘটনা ঘটিল।
জগন্নাথ জ্যেষ্ঠ
পুত্র বিশ্বরূপকে বিবাহ দিতে ইচ্ছা করিলেন, কিন্তু
বিশ্বরূপ সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া গােপনে সংসার ত্যাগ
করিয়া চলিয়া গেলেন। বিশ্বরূপের শোকে মিশ্ৰদম্পতী
অতিশয় কাতর হইলেন; কিন্তু ছেলে যাহাতে এই
কঠোর ধর্মপালন করিতে পারে তাহার জন্য তাহারা
ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিলেন।
অল্পবয়সে লেখাপড়া শিখিয়া বিশ্বরূপ পরম পাণ্ডিত্য
উপার্জন করিয়াছিলেন; তাই জগন্নাথের মনে ভয় হইল,
পাছে নিমাইও লেখা পড়া শিখিয়া সংসার ত্যাগ
করিয়া চলিয়া যান; সুতরাং তিনি তাঁহার পড়াশুনা
বন্ধ করিয়া দিলেন। কিন্তু ফলে বিপরীত হইল।
এবার তাহার চাঞ্চল্য পূৰ্ব্বাপেক্ষা আরাে বাড়িল ;
;

শ্রীচৈতন্য
তাহার অত্যাচার উপদ্রবে তিষ্ঠা দায় হইল।
পাড়াপড়শীর নিকট হইতে প্রত্যহ তাহার নামে
শতশত নালিশ আসিতে লাগিল। পিতামাতা সকলকে
মিষ্ট বাক্যে তুষ্ট করিয়া দিতেন, আর বিশেষতঃ
নিমাইয়ের উপর কেহ বিরক্ত হইতে পারিত না ;
তাহার স্বভাব সুন্দর মুখ পানে দৃষ্টি পড়িলেই সকলের
রাগ জল হইয়া যাইত।
তাঁহার ব্যবহারে রাগ করিয়া শচীদেবী একদিন
তাহাকে মারিতে উদ্যত হইলে নিমাই আস্তাকুড়ে যাইয়া
আশ্রয় লইলেন। মা দুঃখ করিয়া বলিলেন, “নিমাই এ
তাের কি হইল, তুই কি ছিলি আর কি হইলি ?”
নিমাই বলিলেন, “আমাকে যে লেখা পড়া শিখাও
এই তার ফল।” শেষে বাধ্য হইয়াই তাহাকে
আবার বিদ্যালয়ে পাঠান হইল।
নিমাইচঁাদও খুব
মনােযােগের সহিত লেখা পড়া করিতে লাগিলেন।
এই সময়ে জগন্নাথ পুত্রের উপনয়ন ক্রিয়া যখা
বিধি সম্পন্ন করিলেন। গৈরিক বসন পরিহিত, মুণ্ডিত
মস্তক, নবীন ব্রহ্মচারী নিমাইয়ের কর্ণে যখন গায়ত্রী
মন্ত্র দেওয়া হইল ; তখন এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিল।
তাহার চক্ষু হইতে অবিরল ধারে আনন্দাশ্রু ঝরিতে
••

.

No text on this page.

শ্রীচৈতন্য
••
লাগিল; ভাবের আবেগে নিমাই ভূমিতে পড়িয়া মূচ্ছিত
হইয়া নানা উচ্চাঙ্গের ভাব সমূহ প্রকাশ করিতে
লাগিলেন। তাঁহার দেহ হইতে তেজ নির্গত হইতে
লাগিল, এভাব সাধারণ মানুষের হয় না। উপস্থিত
সকলেই তাহা দেখিয়া বিস্মিত হইলেন; সেই হইতে
সকলের দৃঢ় বিশ্বাস হইল—নিমাই সাধারণ মানুষ
নহেন।
উপনয়নের পর ছেলের মন বুঝিয়া মিশ্ৰমহাশয়
তাহাকে টোলে পাঠাইলেন। নবদ্বীপে গঙ্গাদাস
পণ্ডিতের টোলের তখন খুব নামডাক ছিল , নিমাই
তঁাহার কাছে সাহিত্য ও ব্যাকরণ শিখিতে আরম্ভ
করিলেন। পড়া শুনায় তঁাহার অত্যন্ত মনােযােগ
দেখিয়া সকলে বিস্মিত হইলেন। অল্পদিনেই সাহিত্য
ও ব্যাকরণে তাহার অসাধারণ জ্ঞান জন্মিল
এই সময়ে এক দুর্ঘটনা ঘটিল, মাত্র কয়েক দিনের
জ্বরে জগন্নাথ মিশ্র গঙ্গালাভ করিলেন। তাহার মৃত্যুতে
মিশ্র পরিবারে দুঃখের ছায়া পড়িল। যাহা হউক
নিমাই যথাবিধি পিতৃশ্রাদ্ধ সমাপন করিলেন।
পিতার মৃত্যুর পর হইতে তাহার চাঞ্চল্য ও
অনেকটা দূর হইল এবং সে অবধি তাঁহার মুখে

গাম্ভীর্য্যের একটু ছায়া পড়িল। নিমাই আবার পড়া
শুনায় মন দিলেন; এবং অসীম প্রতিভা ও স্মৃতিশক্তি
বলে মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই সাহিত্য, ব্যাকরণ,
স্মৃতি, দর্শন ও জ্যোতিষ প্রভৃতি শাস্ত্রে পরম পণ্ডিত
হইলেন।
মই।
;
এত পড়িয়া শুনিয়াও কিন্তু নিমাইয়ের মন উঠিল
; তখন নবদ্বীপে ন্যায় শাস্ত্রের বড় আদর ছিল সুতরাং
ন্যায় আয়ত্ত করিবার জন্য তিনি নবদ্বীপের সুপ্রসিদ্ধ
নৈয়ায়িক পণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌমের টোলে পড়িতে
লাগিলেন। সেই সময়ে নিমাই ন্যায়ের একখানি
উৎকৃষ্ট টীকা রচনা করেন। তখনকার একটা ঘটনায়
তাহার চরিত্রের উদারতা ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায় :-
একদা সেই ন্যায়ের টীকা খানি হাতে লইয়া রঘুনাথ
শিরােমণি নামক নিজ সহাধ্যায়ী কোন ছাত্রের সহিত
নিমাই, নৌকায় গঙ্গা পার হইতে ছিলেন। সেই সময়ে
রঘুনাথ তাহা দেখেন। পুস্তক খানি পড়িয়াই রঘুনাথ
অশ্রু বিসর্জন করিতে থাকেন।
=

নিমাই উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন,
“ভাই” আমি ও ন্যায়ের একখানি ভাষা লিখিয়াছি ;
আমার বড় আশা ছিল ;শ্রেষ্ঠ ন্যায় গ্রন্থ বলিয়া
জগতে চিরদিন উহার আদর থাকিবে। কিন্তু এখন
দেখিতেছি তােমার পুস্তক যেরূপ সহজ ও সুযুক্তিপূর্ণ
হইয়াছে তাহাতে আমার পুস্তকের আদর হওয়া দূরে
থাকুক;—কেহ একবার হাতে লইয়াও দেখিবে না।
হায় নিমাই! এতদিনে আমার সমস্ত আশা ভরসা;-
আমার এতদিনের শিক্ষা সাধনা ও পরিশ্রম সকলই ব্যর্থ
হইয়া গেল।”
রঘুনাথের কথা শুনিয়া উন্নত-হৃদয় নিমাইয়ের মনে
বড় আঘাত লাগিল। তিনি তৎক্ষণাৎ গ্রন্থখানি গঙ্গার
অতল সলিলে ফেলিয়া দিলেন এবং বলিলেন, “ভাই।
এই তুচ্ছ ভাষ্যের জন্য এত দুঃখ করিয়া কাজ কি? যা
উহা জাহ্নবী গর্ভে লীন হইয়া যাক।” এই ঘটনায়
রঘুনাথের বিস্ময়ের অবধি রহিল না।
রঘুনাথের লিখিত
পুস্তক খানির নাম—“দিধীতি।”
উহা ন্যায় শাস্ত্রের এক অতুল সম্পদ। রঘুনাথ শ্রীহট্ট
জিলার পঞ্চখণ্ড নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন, স্বীয়
অসাধারণ প্রতিভাবলে তিনি শুধু “শ্রীহট্টগৌরব” নয়

-“ভারত গৌরব” হইয়াছিলেন । শ্রীহট্ট গৌরব
চরিতাবলীর চতুর্থ গ্রন্থে তাহার অত্যাশ্চর্য জীবন
কাহিনী শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।
নিমাই কৃত ন্যায় গ্রন্থখানি দিধীতি অপেক্ষা কত
ভাল হইয়াছিল। তিনি ইচ্ছা করিলে তাহা দ্বারা জগতে
অতুল
কীর্তি রাখিয়া যাইতে পারিতেন; কিন্তু তিনি
তাহা না করিয়া ত্যাগের দ্বারা সেই কীৰ্ত্তি আরও
গৌরব মণ্ডিত করিয়া গিয়াছেন। এই ঘটনায় তাহার
বন্ধুবাৎসল্যেরও পরিচয় পাওয়া যায়।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে নবদ্বীপের বল্লভাচার্যের
পরমা গুণবতী কন্যা লগমীদেবীর সহিত তাহার বিবাহ
হয়। . বল্লভাচার্যের পূর্ব নিবাস ও শ্রীহট্টে ছিল।
পাণ্ডিত্য ।
অতঃপর বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠ অদ্বৈতাচার্যের নিকট নিমাই
কিছুদিন বেদ-ভাগবতাদি অধ্যয়ন করেন এবং অল্পদিনেই
উক্ত জটিল শাস্ত্র। আয়ত্ত করিয়া “বিদ্যাসাগর” উপাধি
প্রাপ্ত হন এং ব্যাকরণের একটি টোল খুলিয়া
ছাত্রগণকে অধ্যাপনা আরম্ভ করেন।
সেই সময়ে
তঁাহার বয়স ষােল সতর বৎসরের মত ছিল।

শ্রীচৈতন্য
কিন্তু বয়সে ছােট হইলে কি হয় ? পরম যত্নের
সহিত ছাত্রদিগকে পড়াইতেন বলিয়া তাহার টোলে
অনেক ছাত্র জুটিল। বিশেষতঃ তখনকার একটি ঘটনায়
তাহার গভীর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাইয়া দিন দিন নূতন
ছাত্র তাহার কাছে পড়িতে আসিতে লাগিল।
তৎকালে কেশব নামক কাশ্মীর দেশীয় একজন
দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত ছিলেন। স্বীয় বিদ্যাবলে তিনি মিথিলা,
কাশী,
কাঞ্চী দ্রাবিড় প্রভৃতি স্থানের সকল প্রসিদ্ধ
বড় বড় পণ্ডিত দিগকে পরাস্ত করিয়া, বিজয় বৈজয়ন্তী
উড়াইয়া বিরাট জাক জমকের সহিত নবদ্বীপে আসিয়া
উপস্থিত হন।
নবদ্বীপও তখন সংস্কৃতচর্চার জন্য ভারত-বিখ্যাত
ছিল। তঁাহার আগমনে নবদ্বীপের পণ্ডিতগণ ভাবিয়া
আকুল হইলেন ;-আর বুঝি নবদ্বীপের মান থাকে না।
তঁাহারা ভীত হইয়া বিনা তর্কেই পরাভব স্বীকার করি-
বার মনস্থ করিলেন; কিন্তু নিমাইয়ের কাছে কথাটা
ভাল লাগিল না। কিন্তু তখন তিনি মােটে ব্যাকরণের
টোল খুলিয়াছেন; বড় বড় পণ্ডিতেরা ঘঁহার কাছে
পরাভব স্বীকার করিলেন, তঁাহাকে তর্কে হারাইতে
হইবে। যাহা হউক তিনি দমিলেন না।

শ্রীচৈতন্য
একদা এক জ্যোৎস্না-সিক্ত রজনীতে পবিত্র সলিলা
জাহ্নবী পুলিনে বসিয়া নিমাই পণ্ডিত ছাত্রগণকে পড়া-
ইতে ছিলেন। এমন সময় সেই পণ্ডিত আসিয়া ভয়ঙ্কর
আস্ফালন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন নিমাই
ব্যাকরণের বিচারে অলৌকিক রূপে সেই দিগ্বিজয়ী
পণ্ডিতকে হারাইয়া দেন। ভারতের নানাস্থানের বড়
বড় পণ্ডিতদিগকে হারাইয়া শেষে এক ব্যাকরণীয়
পণ্ডিতের কাছে পরাজিত হইয়া সেই অহঙ্কারী পণ্ডিতের
চৈতন্য জন্মে। নিমাই সাধারণ মানুষ নহেন বুঝিয়া
তিনি ঠাহর শরণাপন্ন হন।
‘রাত্রিকালে এই পণ্ডিতের সহিত নিমাইয়ের বিচার
করার অভিপ্রায় এই যে, তিনি মানীজনকে সর্বসমক্ষে
অপদস্থ করিতে ভাল বাসিতেন না। অল্প বয়স্ক হইলেও
নিমাই এই মহত্ত্ব শিক্ষা দিয়াছেন যে, মানী ব্যক্তির
মান কদাচ খর্ব করিবে না; মানীর মান রাখিয়া
আপনার কর্তব্য সমাধা করিবে।
মহাপুরুষগণ লােক শিক্ষার জন্য জগতে আসেন
নিমাই চরিত্রে এইরূপ অনেক শিক্ষার জিনিষ পাওয়া
যায়।

পূর্ববঙ্গ ভ্রমণে।
এই সময়ে নিমাই পূর্ববঙ্গ ভ্রমণে বাহির হন।
সেখানকার লােক পূৰ্বেই হার গভীর পাণ্ডিত্যের
কথা শুনিয়াছিল; সুতরাং দলে দলে অনেক ছাত্র তাহার
কাছে ব্যাকরণ শিক্ষা করিতে আসিতে লাগিল। নিমাই
পণ্ডিতও পরম যত্নে তাহাদিগকে শিক্ষা দিতে লাগিলেন।
ছাত্রদিগের সুবিধার জন্য ইতিপূর্বে তিনি একখানি
ব্যাকরণের টীকা লিখিয়াছিলেন ; সেই টীকা খানিই
তিনি তাহাদিগকে পড়াইয়া ছিলেন। উহা “বিদ্যাসাগরী
টীকা” নামে খ্যাত ও প্রচারিত হইয়াছিল, কিন্তু দুঃখের
বিষয় উহা আজকাল আর নাই ।
বঙ্গের নানাস্থানে ঘুরিয়া অবশেষে নিমাই ব্ৰহ্মপুত্র
নদের তীরে আসিয়া উপস্থিত হন। তথায় ভক্তগণের সঙ্গে
নিমাই
সুমধুর
হরিনাম সংকীৰ্ত্তন করেন। অতঃপর
;
‘পুণ্যবান্ পিতৃস্থান দেখিতে নিমাই,
গেলেন শ্রীহট্টে পূর্ববঙ্গে পুণ্যবতী ;
দেখিলেন পূর্ববঙ্গ শস্য সুশ্যামলা
অন্নপূর্ণা জগতের!
-কবিবর নবীনচন্দ্র সেন।

শ্রীচৈতন্য
শ্ৰহট্টে প্রবেশ করিয়াই প্রথমে নিমাই নিজ
প্রপিতামহের স্থান বুরুঙ্গাতে যান এবং তথায় পিতামহ
উপেন্দ্রমিশ্রের সাক্ষাৎ লাভ করেন ; সুতরাং সে যাত্রা
আর তিনি ঢাকাদক্ষিণ যান নাই।
এই সময়ে তপন মিশ্র নামক এক ব্যক্তি তাহার
ভক্ত হন এবং মুক্তির উপায় চাহিলে নিমাই তাহাকে
হরিনাম দেন। নিমাইয়ের কথামত তিনি সস্ত্রীক কাশীতে
গিয়া বাস করিতে থাকেন। পরে নিমাই যখন কাশীতে
গিয়াছিলেন তখন তাহার বাড়ীতেই ছিলেন।
দীর্ঘকাল ভ্রমণের পর নবদ্বীপে ফিরিয়াই নিমাই যখন
শুনিলেন যে সর্পদংশনে লক্ষমীদেবীর মৃত্যু হইয়াছে, তখন
তাঁহার দুঃখের সীমা রহিল না। পরমা গুণবতী পুত্রবধূর
মৃত্যুতে শচী মাতারও মনােকষ্টের এক শেষ হয়। যাহা
হউক নিমাইয়ের প্রবেধে তাহার দুঃখ কিঞ্চিৎ দুর হয় ;
কিন্তু অল্পকাল পরেই মায়ের আদেশে নিমাই সনাতন
মিশ্রের গুণবতী কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিবাহ করেন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
ভক্তিপথে।
ইহার কিছুদিন পরে নিমাই পিতৃপিণ্ড দান করিবার
জন্য গয়ায় যান। সেখানে বিষ্ণুপদ দর্শন করিয়া তাহার
চক্ষু হইতে অবিরল ধারে অশ্রু ঝরিতে থাকে। এই সময়
ঈশ্বরপুরী নামক জনৈক মহাপুরুষ গয়ায় উপস্থিত
ছিলেন। তাঁহার সহিত নিমাইয়ের সাক্ষাৎ হইল।
দুইজনেই দুইজনকে চিনিতে পারিলেন। হরিভক্তের
সহিত মিলিয়া নিমাই একেবারে ভক্তিসাগরে নিমগ্ন
হইলেন এবং পুরীর নিকট হইতে দীক্ষা গ্রহণ করিলেন।
সেই হইতে তাহার চাঞ্চল্য প্রভৃতি চিরতরে রহিত
হইয়া গেল। নিমাই ভক্তি-পাগল হইলেন ; মুখে শুধু
হরিনাম—আর নয়নে অবিরল ধারা। নিমাই নূতন
মানুষটি হইয়া গৃহে ফিরিলেন।
তাহার নূতন ভাব দেখিয়া সকলে বিস্মিত হইলেন;
নিমাই ক্ষুধা নিদ্রা ভুলিয়া দিবারাত্রি হরিনাম জপিতে
লাগিলেন; আর ভাবে তন্ময় হইয়া ঘন ঘন মূচ্ছা যাইতে
লাগিলেন। কখন হাসেন, কখন কঁাদেন ; আর নয়নে
অশ্রু সে ত দিবারাত্র লাগিয়াই আছে।
••

শ্রীচৈতন্য মূখেরা সহৃদয়তাবশতঃ শচীদেবীকে সাবধান করিয়া দিতে ভুলিল না। তাহারা বলিল “মা তােমার নিমাই পাগল হইয়াছে, এখন সময় থাকিতে ভাল চিকিৎসক দেখাইয়া মধ্যমনারায়ণের ব্যবস্থা করিলে হয়ত সুফল ফলিতে পারে।” একথায় শচীদেবীর প্রাণ উড়িয়া গেল। তখন নবদ্বীপে অদ্বৈতাচাৰ্য, শ্রীবাস পণ্ডিত, মুরারি- গুপ্ত, চন্দ্রশেখর আচাৰ্যরত্ন, শ্রীরাম পণ্ডিত প্রভৃতি * মুরারি বৈদ্যজাতীয় ছিলেন ; নবদ্বীপে নিমাই ও তিনি একই পাড়ায় থাকিতেন এবং এক টোলেই উভয়ে পড়িতেন। বয়সে অনেক ছােট হইলেও নিমাই মুরারিকে সর্বদা অত্যন্ত বিরক্ত করিতেন। মুরারি শ্রীচৈতন্য দেবের একজন প্রধান ভক্ত ছিলেন। “মুরারি নিমাইর জন্ম হইতে সকল ঘটনাই দেখিয়াছেন এবং তাহার প্রধান প্রধান লীলার অনুসঙ্গী ছিলেন, এই সকল দৃষ্ট ঘটনাবলী অবলম্বনে ১৪৩৫ শকাব্দে তিনি “চৈতন্য চরিত” নামে এক সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করেন ; গৌরলীলা সম্বন্ধে ইহাই আদি গ্রন্থ। পরবর্তী কবিগণ এই গ্রন্থ অবলম্বনে শ্রীচৈতন্য চরিত্র বর্ণনা করিয়াছেন। * মুরারিগুপ্ত কেবল সংস্কৃত শ্রীচৈতন্য চরিত রচনা সমাপ্ত করিয়াই লেখনী ত্যাগ করেন নাই, তাহার সরস লেখনী মাতৃভাষার সেবায় ও নিয়ােজিত হইয়াছিল। বঙ্গ ভাষায় তাহার বিরচিত পদাবলী কবিত্বে অতুল্য ; হট্ট- বাসীর ইহা অল্প গৌরবের কথা নহে যে, যখন বঙ্গভাষা শৈশব অতিক্রম করে নাই, তখন তাহাদেরই স্বদেশবাসী জনৈক মহাত্মা কর্তৃক ইহা পরিপুষ্ট হয়, এবং সেই মহাত্মা কর্তৃক লীলা- গ্রন্থ লিখিবার সুত্রপাত করা হয়। -শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত

চৈতন্য
কয়েকজন শ্রীহট্টবাসী ভক্ত ছিলেন ; এতদ্ব্যতীত গদাধর,
হরিদাস, মুকুন্দদত্ত, নরহরি, দামােদর, শুক্লাম্বর ব্রহ্মচারী
গােবিন্দ, পুরুষােত্তম, গঙ্গাদাস, চক্রেশ্বর প্রভৃতি আরও
অসংখ্য ভক্ত ছিলেন। নিমাইয়ের এই নূতনভাব
দেখিয়া তাহাদের আনন্দের সীমা রহিল না !
তাহারা শচীদেবীকে বুঝাইলেন যে, নিমাই পাগল
হন নাই, ভগবানে প্রবল ভক্তিবশতঃ এইরূপ নানাপ্রকার
ভাব প্রকাশ করিতেছেন; শাস্ত্রে এই সকল ভাবের বিষয়
লিখিত আছে আর এ ভাব যার তার হয় না। তাহাদের
কথায় শচীদেবী আশ্বস্তা হইলেন।
ভক্তসকে।
এবার দেশে ফিরিয়া নিমাইয়ের মন আর অধ্যা-
পনাতে বসিল না ; কাজেই টোল উঠিয়া গেল। তিনি
এখন নিশিদিন হরিনামে মজিয়া থাকেন, ব্যাকরণের
পরিবর্তে হরিনাম শিক্ষা দেন ; আর বেদ শাস্ত্রাদির
পরিবর্তে ভক্তিশাস্ত্র চর্চা করেন। শ্রীবাস পণ্ডিতের
বাড়ী তাহার বাড়ীর পাশে ছিল ; রোজ রাত্রে সেখানে
হরিনাম সংকীৰ্ত্তন হইতে লাগিল। কীৰ্ত্তন প্রথা পূর্বে
ছিল না, নিমাই কীৰ্ত্তন গান সৃষ্টি করেন। নবদ্বীপের

শ্রীচৈতন্য
অসংখ্য লােক তাহাতে যােগ দিল ; এই কীৰ্ত্তন তরঙ্গে
নানাদিক দেশ হইতে স্রোতস্বতীর মত ভক্তগণ আসিয়া
জুটিলেন।
ইহাদের মধ্যে একজনের নাম নিত্যানন্দ। ইনি
ব্রাহ্মণ ছিলেন ; বীরভূম জেলার একচক্র গ্রামে তাহার
জন্ম হইয়াছিল। শৈশবাবধি সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া নানা
তীর্থ পৰ্যটন করিতে করিতে অবশেষে নবদ্বীপে আসিয়া
তিনি শ্রীগৌরাঙ্গের সহিত মিলিত হন।
এবার মণি
কাঞ্চন সংযােগ হইল, নিত্যানন্দকে পাইয়া গৌর যেন
পূর্ণ হইলেন। তাহাদের দুইজনকে দেখিলে ব্রজের কানাই
বলাই বলিয়া মনে হইত।
আর এক জনের নাম ছিল-হরিদাস। হরিদাস
জাতিতে মুসলমান ছিলেন। এই কারণে তিনি যবন
হরিদাস নামে খ্যাত। বৈষ্ণবধৰ্ম্মে হার অত্যন্ত নিষ্ঠা
ছিল ; তাই তিনি উহা গ্রহণ করিয়াছিলেন। মুসলমান
ধৰ্ম্ম পুনঃ গ্রহণের জন্য মুসলমান শাসনকর্তা তাঁহার
উপর পাশবিক অত্যাচার করিয়াছিলেন; কিন্তু তিনি
অসহ্য যন্ত্রণা সহিয়াও তাহা হইতে বিন্দুমাত্র বিচলিত
হন নাই।
এইরূপে গৌরীদাস, রঘুনন্দন, সূৰ্য্যদাস প্রভৃতি

শ্রীচৈতন্য
;
আরাে কত ভক্ত জুটিলেন; সকলে মিলিয়া হরিনামে মত্ত
হইলেন। নবদ্বীপে হরিনামের প্রবল তরঙ্গ উঠিল
সেই বিপুল তরঙ্গে বাধা দিতে আসিয়া কত নাস্তিক
তৃণের মত ভাসিয়া গেল ;-মধুর হরিনাম শুনিয়া তাহা-
দের উদ্ধার হইল। সেই বিশাল তরঙ্গে শুধু বঙ্গদেশ
নয়, ক্রমে সমগ্র ভারতবর্ষ ডুবিল ; সেই শান্তি বারিতে
স্নান করিয়া হাজার হাজার লােক ধন্য হইল ;-তাহা
পান করিয়া কত পাপী তাপী শীতল হইল।
পতিত-পাবন।
পাপী তাপীর দুঃখে দয়াল গৌর আর নীরবে
থাকিতে পারিলেন না; এবার পুণ্যের পথ দেখাইয়া
তাহাদিগকে উদ্ধার করিবার জন্য তিনি ব্যাকুল হইলেন।
পাপী তাপীর জন্য যাহার প্রাণ কাঁদে তিনিই ত মহাপুরুষ;
স্বয়ং ভগবানই যদি উহাদিগকে ভাল না বাসেন
তবে পতিত পাবন” বলিয়া লােকে কাহাকে ভক্তি
করিবে? আর কাহাকেই বা “অনাথ বন্ধু” বলিয়া
ডাকিবে ?
গৌরের আদেশে নিত্যানন্দ ও হরিদাস নবদ্বীপের
ঘরে ঘরে হরিনাম বিলাইতে বাহির হইলেন , এবং

শ্রীচৈতন্য ছােট বড়, পণ্ডিত মূখ, উত্তম অধম, পাপী তাপী, সকলকেই হরিনাম শুনাইতে লাগিলেন। সেই সময়ে নবদ্বীপে জগাই মাধাই নামে দুই ব্রাহ্মণ সন্তানের হাতে সহরের শান্তি রক্ষার ভার ছিল। রাজ- ক্ষমতা পাইয়া উহারা অত্যন্ত দুর্দান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। চুরি ডাকাতি মিথ্যা প্রবঞ্চনা নরহত্যা প্রভৃতি এমন কোন কাজই ছিল না—যাহা তাহারা না করিতে পারিত, কিন্তু তাহাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করিবার যাে কাহারও ছিল না ; করিলে তাহার ঘর বাড়ী পােড়াইয়া, ভিটায় ঘুঘু চরাইয়া তবে তাহারা ছাড়িত। তাহাদের উপদ্রবে নদীয়াবাসীর মনে শান্তির লেশ মাত্র ছিল না। একদিন নাম প্রচারে বাহির হইয়া নিত্যানন্দ ও হরিদাস উহাদিগকে দেখিতে পান, উহাতে তাঁহাদের কোমল প্রাণে বড় ব্যথা লাগে। তাহারা যেমন উহাদের কাছে গিয়া হরিনাম শুনাইতে আরম্ভ করিলেন, অমনি তাহারা তাড়া করিয়া আসিল। দৌড়িয়া কোন মতে তাহারা সেদিন বাঁচিলেন। কিন্তু উহাদের পরিণাম ভাবিয়া তাহারা আর একদিন উহাদিগকে হরিনাম শুনাইলেন, কিন্তু ‘চোর না

শ্রীচৈতন্য
শুনে ধর্মের কাহিনী; মাধাই রাগ করিয়া তাহার
উপর কলসীর ভাঙ্গা গলা ছুড়িয়া মারিল। সে আঘাতে
নিত্যানন্দের সােণার শরীর হইতে অবিরল ধারে
রক্ত ঝরিতে লাগিল; কিন্তু নিত্যানন্দ সেদিকে ভ্রূক্ষেপ
করিয়া মাধাইকে কোল দিয়া বলিলেন –
“মালি তাতে ক্ষতি নাই ;-
একবার হরি বলরে ভাই।”
হাজার পাষাণ হইলেও মহত্ত্বের কাছে মানুষ মাথা
নত না করিয়া পারে না। পাষণ্ডেরা যখন দেখিল যে,
নিজের শরীরের দিকে না চাহিয়া নিত্যানন্দ আবার
তাহাদিগকে সেই হরিনামই যাচিতেছেন, তখন তাহাদের
চেতনা জন্মিল। ইতিমধ্যে গৌরাঙ্গও তথায় আসিয়া
উপস্থিত হইলেন। নিত্যানন্দ উহাদিগকে ক্ষমা করিয়া
হরিনাম দিয়া উদ্ধার করিবার জন্য গৌরকে অনুরােধ
করিলেন জগাই মাধাই তাহাদের পায়ে পড়িল। দয়াল
গৌর নিতাই তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া কোল দিলেন।
তাহাদের কৃপায় দুই মহাপাপী পাপকাজ ছাড়িয়া
হরিনামে মজিল। হরিনামের মহিমা দেখিয়া নদীয়া
বাসীর বিস্ময়ের সীমা রহিল না। ভঁহারা হরিনামে
তন্ময় হইল।

কিন্তু সৎকাজের শত্রু অনেক। একদিকে যেমন
একদল লােক হরিনামে মজিল, তেমনি আর একদল
উহার ঘাের বিরােধী হইল; এবং কীৰ্ত্তনের নানা বিঘ্ন
জন্মাইতে লাগিল। তাহারা নবদ্বীপের কাজির কাছে
নিমাইয়ের নামে নানা অভিযােগ করিল।
এতটা বাড়াবাড়ি কাজির সহ হইল না। একদিন
কোন এক বৈষ্ণবের খােল ভাঙ্গিয়া তিনি হুকুম জারি
করিলেন যে, কেহ আর হরি সংকীৰ্ত্তন করিতে পারিবে
। একথা শুনিয়া গৌরের মনে বড় দুঃখ হইল কিন্তু
তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলেন না। তিনি ঘােষণা
করিলেন যে সেদিনই তিনি নগর সংকীৰ্ত্তনে বাহির
হইবেন। এ সংবাদে ভক্তগণের প্রাণ নাচিয়া উঠিল,
হাজারে হাজারে ভক্তগণ খোল করতাল লইয়া সেদিন
নগর সংকীৰ্ত্তনে বাহির হইলেন। হরিনাম গাহিতে
গাহিতে গৌর আগে আগে চলিলেন ভক্তগণ তাহার
পশ্চাতে পশ্চাতে চলিলেন। সেদিন হরিনামে নদীয়া
নগরী মাতিয়া উঠিল। নগর পরিভ্রমণ করিয়া কীৰ্ত্তনের
দল ও ভক্তগণ সহ গৌর কীৰ্ত্তন করিতে করিতে যাইয়া
কাজির বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন।
যে কাজি একদিন নগরের কীৰ্ত্তনে বাধা দিয়াছিলেন,

শ্রীচৈতন্য
আজ তাহার বাড়ীতেই হরিনাম সংকীৰ্ত্তন হইতে
লাগিল ;-তাহা দেখিয়া ও তিনি কোন বাধা দিতে
পারিলেন না। দূর হইতে সংকীৰ্ত্তনের কোলাহল
শুনিয়া ও লােক সমারােহ দেখিয়া তাহার অত্যন্ত
ভয় হইয়াছিল ; অনেকক্ষণ পরে তিনি ভয়ে ভয়ে
গৌরাঙ্গের কাছে উপস্থিত হইলেন। আজ তাহার
সমস্ত ক্ষমতা গৌরের কাছে অবনত হইল।
কাজির বুঝিতে বাকি রহিল না যে নিমাই
ভগবানের অবতার। তিনি আজ হাত তুলিয়া হরিনাম
গাহিতে গাহিতে ভক্তগণের সঙ্গে কীৰ্ত্তনে যােগ দিলেন,
ও প্রতিজ্ঞা করিলেন ;-তাহার বংশে কেহ আর কখনও
কীর্তনে বাধা দিবে না এবং হিন্দু ধর্ম গর্হিত কোনরূপ
কাজ করিবে না। সেই হইতে এই কাজি বংশ হিন্দু
ধৰ্ম্মানুরক্ত হইল।
এই ঘটনার পর নবদ্বীপে হরিনাম বিদ্বেষীর দল
একেবারে পরাজিত হইল। যে কাজি একদিন হরিনাম
বিদ্বেষী ছিলেন তিনিই এখন হরিনাম প্রচারে গৌরকে
নানা প্রকারে সহায়তা করিতে লাগিলেন; সুতরাং
নদীয়ার ঘরে ঘরে এবার নিশিদিন অবাধে হরিনাম
হইতে লাগিল।

শ্রীচৈতন্য
এই সময়ে একদিন অদ্বৈতাচাৰ্য্য শ্রীবাস পণ্ডিত
প্রমুখ ভক্তগণকে লইয়া নিমাই নিজ মেসস চন্দ্রশেখরা-
চার্য্যের বাড়ীতে “কৃষ্ণলীলা” নাটক অভিনয় করেন।
উহা এত স্বাভাবিক হইয়াছিল যে দর্শকগণ স্থান কাল
ভুলিয়া উহাকেই প্রকৃত ঘটনা বলিয়া মনে করিয়া-
ছিলেন।
সেই অভিনয়ই বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের প্রথম অভিনয়।
আজকাল যে, রঙ্গমঞ্চগুলি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানরূপে
পরিগণিত হইয়াছে ;-চারি শতাব্দী পূৰ্বে উহার পত্তন
“শ্রীহট্টের এই পাগল ছেলেরই কীর্তি।

No text on this page.

শ্রীচৈতন্য
গৃহত্যাগ।
[ শিল্পী—পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী।
নন কুলা লাইব্রেরী ]

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
সন্ন্যাস।
ইহার কিছুদিন পরেই নিমাই সন্ন্যাসী হন।
একদিন নিমাই নিত্যানন্দাদি ভক্তগণকে বলিলেন যে
সংসারসুখে মজিয়া থাকিলে আর তাহার চলিবে না।
তাহাকে অনেক কাজ করিতে হইবে। নিমাই সন্ন্যাসী
হইবেন শুনিয়া ভক্তগণ ভাবিয়া আকুল হইলেন,
স্নেহময়ী শচীদেবী ও সাধ্বী বিষ্ণুপ্রিয়ার মাথায় যেন
বজ্রাঘাত হইল; কিন্তু তাহারা, তাহার পথে বিপ্ন
জন্মাইতে ইচ্ছা করিলেন না। তাহারা, বুঝিলেন যে
গৌরসুন্দর শুধু
তাহাদেরই নয়—তিনি জগতের ;
জগতের জন্য যাহার প্রাণ কাঁদে, তাঁহাকে ক্ষুদ্র গৃহ
কোণে আবদ্ধ করিয়া রাখা কিছুতেই উচিত নয়।
ইহার অল্পদিন পরে ১৪৩১ শকাব্দে চব্বিশ বৎসর
বয়সে মাঘ মাসের এক গভীর নিশিথে নিমাই গােপনে
গৃহত্যাগ করিয়া কাটোয়ায় যাইয়া সন্ন্যাসী শ্রেষ্ঠ কেশব
ভারতীর নিকট হইতে সন্ন্যাস মন্ত্র গ্রহণ করিলেন। তখন
কেশব ভারতী তাহার নাম রাখিলেন—“শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য।”

শ্রীচৈতন্য
;
নবীন কিশাের নিমাই যখন সন্ন্যাসী সাজিসেন তখন
তাহা দেখিয়া কেহই অশ্রু সম্বরণ করিতে পারিল না।
তাহার অদর্শনে নবদ্বীপ অন্ধকার হইল ; ভক্তগণ
কঁদিয়া আকুল হইলেন। শচীমাতা ও সতী বিষ্ণুপ্রিয়ার
দুঃখের অবধি রহিল না।
সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া শ্রীচৈতন্য কৃষ্ণ প্রেমে উন্মাদ
হইয়া বৃন্দাবনাভিমুখে যাত্রা করিলেন, এবং নিশিদিন
পথে পথে হরিনাম বিলাইয়া বেড়াইতে লাগিলেন
নিত্যানন্দাদি ভক্তগণ তাঁহার সঙ্গে ছিলেন ; তাহারা
কৌশলে তাহাকে শান্তিপুরে, অদ্বৈতাচার্যের গৃহে লইয়া
আসিলেন। এই সংবাদ পাইয়া শচী দেবী ও ভক্তগণ
নবদ্বীপ হইতে শান্তিপুরে আসিলেন। শান্তিপুরে
আনন্দের হাট বসিল ; হরি ধ্বনিতে শান্তিপুরের
আকাশ বাতাস ছাইয়া ফেলিল।
এই আনন্দ উৎসবে কয়েক দিন কাটাইয়া শ্রীচৈতন্য
যখন মায়ের কাছে বিদায় চাহিলেন তখন শচীদেবী
বলিলেন, “বাবা আমাদের সুখের জন্য তোমাকে সংসারে
আবদ্ধ রাখিয়া তােমার ধর্ম নষ্ট করিতে চাহিনা; তবে
যাহাতে সদা সর্বদা তােমার মঙ্গলাদি জানি, তাহা
করিতে হইবে; তুমি যদি নীলাচলে গিয়া থাক; তাহা

শ্রীচৈতন্য
হইলে যাত্রীদের কাছ হইতে সতত তােমার কুশল
সংবাদ জানিব। আর এক কথা-নীলাচলে যাইবার
পূৰ্বে তােমাকে একবার শ্রীহট্টে গিয়া নিজ পিতা-
মহীর সহিত দেখা করিতে হইবে, কারণ শ্বাশুড়ী
ঠাকুরাণীর কাছে বহুপূর্বে আমি এইরূপ প্রতিশ্রুতি
দিয়াছিলাম।” শ্রীচৈতন্য পরম
চৈতন্য পরম মাতৃভক্ত ছিলেন,
মায়ের আদেশ মত তিনি নীলাচলে যাওয়াই স্থির
করিলেন।
ইভে।
মায়ের আদেশ মত নীলাচলে যাইবার পূর্বে
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীহট্টে গমন করেন। শ্রীহট্টের
নয়ন মুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্যাবলী দেখিয়া তিনি
অত্যন্ত মুগ্ধ হইয়াছিলেন। চৈতন্য প্রথমে বুরুঙ্গায়
গমন করেন; এবং তথা হইতে ঢাকাদক্ষিণ গিয়া স্বীয়
পিতামহীর কাছে উপস্থিত হন। তাঁহার পিতামহ
তখন জীবিত ছিলেন না।
পৌত্রকে দেখিয়া বৃদ্ধা অত্যন্ত আনন্দিত হন;
তঁাহার মনে হয় শ্রীচৈতন্য ভগবানের অবতার। এই
সময়ে বৃদ্ধা তাহাকে কৃষ্ণরূপে দেখেন এবং এই ঘটনার

চৈতন্য
স্মৃতি চিহু স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীচৈতন্যের মূৰ্তিদ্বয় নিজ
গৃহে স্থাপন
করেন; শ্রীচৈতন্যের পিতৃব্যবংশীয়গণ
আজও এই মুর্তিদ্বয়ের সেবা পরিচালনা করিয়া
আসিতেছেন।
এই প্রাচীন মূর্তি দেখিবার জন্য নানা স্থান হইতে
অসংখ্য লােকের আগমনে মহা প্রভুর পিতৃভূমি ঢাকা
দক্ষিণ একটি প্রধান বৈষ্ণব তীর্থে পরিণত হইয়াছে।
রথযাত্রা ও ঝুলনযাত্রার সময়ে এখানে বহু সহস্র যাত্রীর
সমাগম হয়। শ্রীহট্টের কোন নবাবের গােলাবরাম
নামক একজন দেওয়ান একবার ঢাকা দক্ষিণে আগমন
করেন। শ্রীহট্ট সহর হইতে ঢাকাদক্ষিণ পর্যন্ত তিনি
একটি রাস্তা প্রস্তুত করাইয়া ছিলেন। এতদ্ব্যতীত
তিনি একটি দীর্ঘিকা খনন ও মন্দির নির্মাণ করাইয়া
মন্দিরে মূর্তি স্থাপন করেন এবং এই নিমিত্ত বিবিধ
বৃত্তি ধার্য্য করিয়া দেন।
এই মূর্তির মহিমা অবগত হইয়া মণিপুর পতি
চিংফেং ঢাকাদক্ষিণে আগমন করেন। মণিপুর রাজ
মহিষী একটি অতি বৃহৎ কাংস্য ঘণ্টা প্রস্তুত করাইয়া
দেন, এই ঘণ্ট। আজও আছে।
মণিপুর রাজের সহিত শ্রীহট্টের কোন প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব

শ্রীচৈতনা
পণ্ডিত মণিপুরে গিয়া মণিপুরী জাতিকে বৈষ্ণব ধৰ্ম্মে
দীক্ষিত করেন। সেই সময় হইতে উহার অনেকটা
সভ্য হইয়া উঠে ।
নীলাচলে ।
ভাকা দক্ষিণ হইতে শ্রীচৈতন্য কামরূপ প্রভৃতি স্থানে
গিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। যাহা হউক অতঃপর
তিনি আবার শান্তিপুরে প্রত্যাবর্তন করেন, এবং তথা
হইতে নিত্যানন্দ গদাধর প্রভৃতি পাঁচজন ভক্তসহ
নীলাচলে যাত্রা করেন। পথে সমস্ত তীর্থে অবগাহন এবং
বিগ্রহ দর্শন করিয়া ক্রমে তিনি পুরীর সন্নিকটে যাইয়া
উপস্থিত হন। দূর হইতে শ্রীমন্দিরের দেখিয়াই
প্রভু ভাবে তন্ময় হন, মন্দিরে উপস্থিত হইয়া বিগ্রহ স্পর্শ
করিতে গিয়াই তিনি প্রবল ভগবৎ প্রেমে মূৰ্ছিত হইয়া,
ভক্তিমূলক নানা সাত্ত্বিক ভাব প্রকাশ করিতে থাকেন।
শ্রীচৈতন্য এক সময়ে ভারতবিখ্যাত নৈয়ায়িক পণ্ডিত
বাসুদেব সাৰ্বভৌমের কাছে নবদ্বীপে ন্যায় অধ্যয়ন
করিয়াছিলেন, মহাজ্ঞানী বাসুদেবের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ
হইয়া নীলাচলের স্বাধীন রাজা প্রতাপরুদ্র গজপতি
তাহাকে প্রভূত বৃত্তি দিয়া নীলাচলে আনয়ন করেন।

ঘটনাক্রমে তিনি তখন শ্রীমন্দিরে উপস্থিত ছিলেন,
শ্রীচৈতন্যদেবকে চিনিতে না পারিলেও তাহার সার্বিক
ভাব সমূহ দেখিয়া তিনি অত্যন্ত মুগ্ধ হইয়া তাহাকে
নিজগৃহে বহন করিয়া লইয়া যান। সেখানে অনেক
সময় পরে তাঁহার মূচ্ছ। ভঙ্গ হয়। স্নেহ-বাৎসল্যে
অভিভূত হইয়া সার্বভৌম নবীন সন্ন্যাসীকে ধৰ্ম্ম পথে
অটল রাখিবার জন্য বেদান্ত শাস্ত্র শিক্ষা দিতে আরম্ভ
করিলেন; কিন্তু প্রভু যখন নিজে তাহাকে উহার অর্থ
বুঝাইতে লাগিলেন, তখন নিজের ব্যাখ্যা তাহার কাছে
ভ্রমপূর্ণ বলিয়া বােধ হইল। মহাপণ্ডিত সাৰ্বভৌমের
বুঝিতে বাকি রহিল না যে, শ্রীচৈতন্য মানুষ নন,
পাপী তাপীর উদ্ধারের জন্যই দয়াল মানব মূর্তি
ধরিয়াছেন। তিনি শ্রীচৈতন্যের চরণে প্রণত হইলেন
এবং তাহার কৃপায় পরম বৈষ্ণব হইলেন।
ভরিত বিখ্যাত মহাপণ্ডিত সাৰ্ব্বভৌম
শ্রীচৈতন্যের শিষ্য হইলেন এবং তাহাকে অবতার বলিয়া
বিশ্বাস করিলেন তখন ‘কাহারও শ্রীচৈতন্যদেবকে মানুষ
জ্ঞান থাকিল না। নীলচলরাজ প্রভুর অনুরক্ত হইলেন ;
ও এই ঘটনায় নীলাচলের বহু শােক পবিত্র বৈষ্ণব ধৰ্ম্ম
গ্রহণ করিল।
যখন

চৈতন্য
দাক্ষিণাত্যে।
ইহার কিছুদিন পরে শ্রীচৈতন্যদেব তীর্থ ভ্রমণে
দাক্ষিণাত্যে গমন করেন। দাক্ষিণাত্যের সকল প্রসিদ্ধ
স্থানে এমন কি সুদূর সেতুবন্ধ রামেশ্বর ও কন্যাকুমারী
প্রভৃতি স্থান পর্যন্ত প্রভু গিয়াছিলেন।
এই দক্ষিণ দেশেই সুপ্রসিদ্ধ বৈষ্ণব রামানন্দ রায়
ও গােপাল ভট্ট প্রভৃতি ভক্তগণের সহিত প্রভুর মিলন
হয়। পথে ঘাটে হরিনাম বিলাইয়া চৈতন্যদেব দাক্ষিণাত্যে
দুইবৎসর পাপীতাপীর উদ্ধার করিয়া বেড়াইলেন।
ত্ৰিমল্ল নগরে উপস্থিত হইয়া প্রভু বৌদ্ধদিগকে
বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করেন। মুন্নানগরের পন্থভীল ও
চোরানন্দী বনের নানােজির মত দস্যকে প্রভু ভক্তি
পথে আনয়ন করেন। প্রভু ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যে উপস্থিত
হইলে, তাহার প্রভাব দেখিয়া রাজা রুদ্র পতি তাহার
শরণাপন্ন হন ও ত্রিবাঙ্কুরবাসী বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে।
তারপর প্রভু রামগিরি মৎস্যতীর্থ প্রভৃতি বহুস্থানে
গমন করেন। নীলগিরি পার হইয়া প্রভু গুর্জরীনগরে
গিয়া অগস্ত্য-কুণ্ডে স্নান করেন। অতঃপর তিনি পুনা
হইয়া সুরাটে উপস্থিত হন; সেখানে অষ্টভূজা দেবীর

চৈতন্য
•
নিকট পশুবলি হইতে দেখিয়া তিনি অত্যন্ত বিচলিত
হন। তাঁহার ভাব দেখিয়া সেখানকার লোকের চৈতন্য
জন্মে ; তাঁহাদের মনে হইল, মা হইয়া দেবী কখনও
সন্তানের মাংস খাইতে পারেন না। সেই হইতে
সেখানকার বলিদান প্রথা চিরতরে রহিত হইয়া গেল।
নানাস্থানে হরিনাম প্রচার করিয়া অতঃপর প্রভু
বরদা রাজ্যে উপস্থিত হন ; তাহার দর্শন পাইয়া তথা-
কার রাজা ধন্য হন। তৎপরে আহম্মদাবাদ, সােমনাথ
প্রভৃতি বেড়াইয়া প্রভু প্রবাস তীর্থে উপস্থিত হন; এবং
তথা হইতে দ্বারকায় গমন করেন। সেখানে একপক্ষ
কাল থাকিয়া প্রভু নীলাচল যাত্রা করেন।
দক্ষিণদেশের সকল তীর্থ দর্শন করিয়া ও দুই বৎসর
পথে ঘাটে হরিনাম বিলাইয়া-দাক্ষিণাত্যে বৈষ্ণব
ধৰ্ম্মের বিজয় পতাকা উড়াইয়া প্রভু নীলাচলে
ফিরিলেন। তাহার কৃপায় অভক্তেরা অকুলে কুল
পাইল-সহস্র সহস্র লােক বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করিয়া
ধন্য হইল। তাহার অপার করুণায় বহু দাম্ভিক পণ্ডিত
নিজের ভুল বুঝিয়া ভক্তিরসে ডুবিলেন ;-বহু পতিত
পতিতার উদ্ধার হইল। এইজন্যই শ্রীচৈতন্য-অগতির
গতি; অনাথের নাথ-পতিত পাবন।
৩৮
;

শ্রীচৈতন্য
নীলাচলে
;
প্রভুর আগমনে নীলাচলে আবার আনন্দের হাট
বসিল ; ভক্তগণ আনন্দে উৎফুল্ল হইলেন। এই সময়ে
রাজা প্রতাপরুদ্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শরণাপন্ন হন।
বিষয়ী লােক, বিশেষতঃ রাজ রাজড়ার সহিত প্রভু বড়
মিশিতেন না; কিন্তু প্রতাপরুদ্রের ভক্তি বিশ্বাস
দেখিয়া তিনি অত্যন্ত মুগ্ধ হইয়া ছিলেন। প্রভুর
অপার করুণায় হরিনাম পাইয়া রাজা সপরিবারে কৃতার্থ
হইলেন।
প্রভুর আগমন সংবাদ পাইয়া বিভিন্ন স্থান হইতে
অনেক ভক্ত আসিলেন।
সংবাদ নবদ্বীপে
পৌছিলে অদ্বৈতাদি অসংখ্য ভক্ত নীলাচলে আসিলেন।
বহুদিন পরে গৌড়ীয় ভক্তগণকে পাইয়া প্রভু আনন্দে
মগ্ন হইলেন। সেদিন ভক্তগণসহ সন্ধ্যার পূর্বে তিনি
জগন্নাথদেবকে দেখিতে গেলেন এবং আরতির পর
মন্দিরের চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ভক্তগণ সহ সুমধুর
হরিসংকীর্তন করিলেন। নীলাচলবাসী সেদিন প্রথমে
সংকীৰ্ত্তন দেখিল।
ইহারপর রথযাত্রা আসিল, তাহার পর আরও দিন

শ্রীচৈতন্য - কতক পরমানন্দে কাটাইয়া প্রভু ভক্তগণকে বিদায় দিলেন এবং প্রত্যেক বৎসর রথযাত্রার সময় আসিতে বলিলেন। তাহাদের সঙ্গে জননীর জন্য জগন্নাথ দেবের মহাপ্রসাদ দিয়া প্রভু তাহাকে দণ্ডবৎ জানাইলেন। গৌড়ীয় ভক্তগণ চলিয়া গেলে নীলাচলের ভক্ত- গণকে লইয়া প্রভু আনন্দে মাতিলেন। তঁাহারা তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়াইতে বড় ভাল বাসিতেন, কিন্তু তিনি লক্ষপতি ভিন্ন কাহারও গৃহে খাইতেন না। যিনি প্রত্যহ লক্ষবার করিয়া হরিনাম লইতেন প্রভু তাহাকেই লক্ষপতি বলিতেন; সুতরাং সে অবধি অনেক ভক্ত প্রত্যহ লক্ষবার করিয়া হরিনাম লইতে লাগিলেন। শ্রীচৈতন্যদেবের প্রিয়সহচর ও ভক্ত গদাধরও তঁাহার সঙ্গে নবদ্বীপ ছাড়িয়া নীলাচলে আসিয়া ছিলেন। তিনি খুব সুমধুর স্বরে শ্রীমদ্ভাগবত পড়িতে এবং ব্যাখ্যা করিতে পারিতেন ভক্তগণকে লইয়া তাহা শুনিতে প্রভু বড় ভাল বাসিতেন। প্রভুর কৃপায় নীলাচলবাসী এইরূপে নিশিদিন ধৰ্ম্মকাহিনী ও হরিনাম শুনিয়া ধন্য হইতে লাগিল। eo শ্রীচৈতন্য শান্তিপুরে। ইহার পর শ্রীচৈতন্যদেব বৃন্দাবনে যাইতে মনস্থ করেন, কিন্তু ভক্তৃগণ আজ কাল করিয়া তাহাকে যাইতে দিলেন না। প্রতি বৎসর বঙ্গদেশীয় ভক্তগণ রথযাত্রা উপলক্ষে পুরীতে আসিয়া প্রভুর সহিত মিলিত হইতেন এবং কিছুদিন তাহার সঙ্গে কাটাইয়া দেশে যাইতেন। সন্ন্যাসের পর পঞ্চম বর্ষে প্রভু বৃন্দাবনে যাইতে কৃত- সংঙ্কল্প হইলেন। রাজা প্রতাপরুদ্র তাহার রাজ্য সীমা পৰ্যন্ত পরিস্কার করাইয়া স্থানে স্থানে গৃহ নির্মাণ ও কূপ খনন করাইয়া দিলেন। শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে সঙ্গে সহস্র সহস্র লােক চলিল ; জন্মভূমি দর্শন করিবেন বলিয়া তিনি নবদ্বীপের দিকে যাত্রা করিলেন। পথে প্রথমে প্রভু পাণিহাটী গ্রামে রাঘব পণ্ডিতের বাড়ীতে গমন করিলেন, এবং অতঃপর নানাস্থানে ভক্তগণের সঙ্গে দেখা করিয়া শান্তিপুরে উপস্থিত হন। প্রভুর আগমন বার্তা পাইয়া অসংখ্য ভক্ত শান্তিপুরে আগমন করিলেন। শচীমাতা ও অদ্বৈতাচাৰ্যাদি ভক্তগণ প্রভুকে পাইয়া আনন্দে ভাসিলেন। এই সময়ে সতী সাধ্বী বিষ্ণুপ্রিয়া স্বামীর পদে পতিত হইয়া তাহার কাষ্ঠ শ্রীচৈতন্য পাদুকা গ্রহণ করেন। তিনি উহা আজন্ম ভক্তি সহকারে পূজা করিয়াছিলেন। শান্তিপুর হইতে প্রভু রামকেলি গ্রামে গমন করেন। বঙ্গেশ্বর হুসেন শাহের মন্ত্রী শ্রীরূপ ও সনাতন নামক দুই ভাই সেখানে তাহার সহিত দেখা করেন। শ্রীচৈতন্য- দেবকে দেখিয়া তাহার সংসারে বীতরাগ হইয়া পড়েন এবং সংসার ত্যাগ করিয়া তাহার শরণাপন্ন হন। উহারা দুই ভাইই বিদ্বান ছিলেন। কথিত আছে তখন হুসেন শাহ, শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে এত লােক বিনা বেতনে চলিয়াছে দেখিয়া তাহার প্রভাব বুঝিয়া অত্যন্ত বিস্মিত হইয়াছিলেন; শ্রীচৈতন্যদেবকে ভগবানের অবতার বলিয়া তাহার দৃঢ় বিশ্বাস হইয়াছিল। এত লােক সঙ্গে লইয়া বৃন্দাবনে গেলে সুখ হইবেন বুঝিয়া প্রভু আবার নীলাচলে ফিরিয়া গেলেন। রবন। নীলাচলে গিয়াই প্রভু আবার বৃন্দাবন যাইবার জন্য উদ্বিগ্ন হইলেন। তখন বর্ষাকাল কাজেই সার্বভৌমাদি ভক্তগণের অনুরােধে প্রভু নীলাচলে বর্ষার চারিমাস কাটাইলেন।

No text on this page.

চৈতন্য
G., BANERIE
বৃন্দাবন পথে।
[ শিল্পী --প্রতুলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
নন কুলজ। লাইব্রেরী )

শ্রীচৈতন্য অবশেষে শরৎকালে বিজয়া দশমীর পরদিন রাত্রি থাকিতে “কৃষ্ণ কৃষ্ণ” বলিয়া, বলভদ্র ভট্টাচাৰ্য নামক জনৈক অমুসঙ্গীর সহিত প্রভু বৃন্দাবন যাত্রা করিলেন এবং হিংস্র জন্তুপূর্ণ বনানী পার হইয়া কাশীতে আসিলেন। কাশী হইতে প্রয়াগও মথুরা হইয়া প্রভু বৃন্দাবনে উপস্থিত হইলেন। বৃন্দাবনের পবিত্র স্থানগুলি ও যমুনার কালাে জল দেখিয়া কৃষ্ণ স্মৃতিতে কৃষ্ণ প্রেমে তন্ময় হইয়া শ্রীচৈতন্য- দেব চৌরাশী ক্রোশ পরিমিত বৃন্দাবন ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইলেন। তাঁহার মুখে কৃষ্ণনাম শুনিয়া ও তঁাহার ভাবাবেশ দেখিয়া বৃন্দাবনবাসী কৃষ্ণ প্রেমে পাগল হইল ; তাহাদের বুঝিতে বাকী রহিল না যে,তিনি ভগবানের অবতার। বৃন্দাবন হইতে ফিরিবার পথে শ্রীচৈতন্যদেব মথুরাতে আসিলেন। তঁাহার সঙ্গে বলভদ্ৰাদি ভক্তগণ ছিলেন। পথে এক রাখালের বাঁশীর শব্দ ও গাে বৎসাদি দেখিয়া কৃষ্ণ স্মৃতিতে তিনি কৃষ্ণপ্রেমে মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। এমন সময় এক পাঠান রাজপুত্র কয়েকজন অশ্বারােহীসহ সেই দিকে যাইতেছিলেন। শ্রীচৈতন্যদেবকে মূচ্ছিত দেখিয়া তাহার মনে হইল, বােধ হয় উহার সঙ্গীরা ;

শ্রীচৈতন্য
টাকা পয়সা লইবার মতলবে এই সন্ন্যাসীকে নিশা
খাওয়াইয়া অচেতন করিয়াছে; সুতরাং তিনি ভক্তগণকে
বাঁধিয়া রাখিলেন, কিন্তু শ্রীচৈতন্যদেবের মূচ্ছা ভাঙ্গিলে
তাহাকে দেখিয়া এবং তাহার উপদেশ শুনিয়া তাঁহার
বৈষ্ণবধৰ্ম্ম গ্রহণ করিলেন।
সেখান হইতে প্রভু প্রয়াগে আসিলেন। শ্রীরূপ
এখানে আসিয়া আবার তাহার সহিত মিলিলেন। প্রভু
তাহাকে দশদিন ভক্তিতত্ত্ব শিক্ষা দিলেন এবং পরে
নির্জনে বসিয়া ভক্তিশাস্ত্র রচনা ও লুপ্ততীর্থ উদ্ধার
করিবার জন্য বৃন্দাবনে পাঠাইলেন।
কাশীতে।
প্রয়াগ হইতে প্রভু কাশীতে আসিলেন। এখানে
পূর্বোক্ত তপন মিশ্রের সহিত তাঁহার দেখা হইল;
তৎপুত্র রঘুনাথ শ্রীচৈতন্যদেবের বড়
অনুরক্ত হইয়া
উঠিলেন। প্রভু নীলাচলে গেলে রঘুনাথ সেখানে
গিয়াছিলেন; কিন্তু মাতাপিতার জীবনকাল পর্যন্ত
তাহাদের সেবা করিবার জন্য প্রভু তাহাকে কাশীতে
পাঠাইয়া ছিলেন।
কাশীতে তৎকালে বেদ বেদান্তাদির বড় আদর
se

শ্রীচৈতন্য ; ছিল; কিন্তু ভক্তি শাস্ত্রের চর্চা মােটেই ছিল না। শ্রীচৈতন্যদেব কাশীতে আদয়া ভক্তি শাস্ত্র প্রচার করিতে লাগিলেন। তখন কাশীর সকল সন্ন্যাসীর গুরু ছিলেন— প্রকাশানন্দ সরস্বতী। তাঁহার মত পণ্ডিত এক সাৰ্ব্ব- ভৌম ভিন্ন ভারতে তখন আর কেহ ছিল না। প্রভুর কৃপায় তিনি কৃষ্ণভক্ত হন। তিনিও প্রথমে শ্রীচৈতন্য- দেবের বিদ্বেষী ছিলেন, কিন্তু তাহাকে দেখিয়া ও তাহার নিকট হইতে ভক্তিতত্ত্ব শুনিয়া, তিনি প্রভুর চরণে প্রণত হন এবং তখন হইতে প্রবােন নামে খ্যাত হন। ইনি দুখানা উৎকৃষ্ট বৈষ্ণব গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছিলেন। হুসেন শাহের অপর মন্ত্রী সনাতন এই সময়ে আসিয়া প্রভুর সহিত সাক্ষাৎ করেন। ভক্তিশাস্ত্র শিক্ষা দিয়া শ্রীরূপের মত তাহাকেও প্রভু বৃন্দাবনে পাঠাইলেন, তাঁহারাই প্রভুর ইচ্ছামত বহুতর বৈষ্ণব শাস্ত্র প্রণয়ন ও প্রচার করিয়াছিলেন।

পরিচ্ছেদ
চতুর্থ
প্রেম বিহবল
কাশী হইতে শ্রীচৈতন্যদেব নীলাচলে ফিরিয়া
গেলেন। সংবাদ পাইয়া বঙ্গদেশীয় ভক্তগণ নীলাচলে
আসিয়া প্রভুর সহিত মিলিলেন। প্রভুও তাহাদিগকে
লইয়া আগেকার মত রথযাত্রা দর্শন ও কীৰ্ত্তনাদি
করিলেন, কিছুদিন পরে প্রভু তাহাদিগকে বিদায়
দিলেন। তাঁহার আদেশমত নিত্যানন্দাদি ভক্তগণ
গৌড়ে আসিয়া নাম প্রচারে গৌড়ভূমিকে ভক্তিরসে
ডুবাইতে লাগিলেন।
এই সময়ে বল্লভ ভট্ট নামক জনৈক পশ্চিম দেশীয়
পণ্ডিত ও কৃষ্ণদাস নামক এক ব্যক্তি প্রভুর শরণাপন্ন
হন, ও তাহার কৃপা লাভ করেন। কৃষ্ণদাসের পিতা
একজন খুব বড় জমিদার ছিলেন ; চৈতন্যদেব কৃষ্ণদাসকে
অনাসক্তভাবে সংসারে থাকিয়া ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম করিবার
উপদেশ দিয়া গাহস্থাশ্রমে পাঠাইলেন।
এইরূপে প্রভু কিছুদিন কাটাইলেন।
এবার নীলাচলে প্রত্যাবর্তনের পর হইতে প্রভুর
ভক্ত সঙ্গে
ভ

শ্রীচৈতন্য
এক নূতন ভাব উপস্থিত হইল; যত দিন যাইতে লাগিল,
ততই তিনি কৃষ্ণপ্রেমে তন্ময় হইতে লাগিলেন। তাহার
যে ভাব উপস্থিত হইল তাহা কেহ কখনও দেখে নাই।
তখন ভক্তগণের সঙ্গে প্রভু বড় মিশিতেন না;—সর্বদা
কৃষ্ণপ্রেমে বিহবল হইয়া থাকিতেন। চব্বিশ বৎসর
বয়সে সন্ন্যাস লইয়া প্রভু নীলাচলে আসেন, আর বার
বৎসর ভক্তিপ্রচারে ও ভ্রমণাদিতে কাটান ; জীবনের
অবশিষ্টকাল প্রভু এইরূপ তন্ময় ভাবেই কাটাইয়াছিলেন।
‘এই যে শ্রীচৈতন্যের ঈশ্বরানুরাগ, ইহাতে প্রার্থনা
নাই,-মুক্তির কথা নাই; ইহা ভক্তির চরম আদর্শ।
ইহার উপরে শিখিবার কিছু নাই—বলিবার কিছু নাই।
এক শ্রীচৈতন্যই ইহার উদাহরণ—দ্বিতীয় পৃথিবীতে
নাই।
••
অন্তর্ধান ।
দিন দিন তাহার প্রেম বিহ্বলতা বাড়িতে লাগিল।
স্বরূপ ও রামরায় তখন সর্বদা তাঁহার কাছে কাছে
থাকিতেন। একদিন চটক পৰ্বত দেখিয়া গােবর্ধন
ভ্রমে প্রভু ভাবাবেশে মূচ্ছিত হন। এইরূপ প্রায়ই
নানাভাবে তিনি মূচ্ছা যাইতেন।
=ণ,

শ্রীচৈতন্য
আর একদিন সমুদ্রের সুনীল জল দেখিয়া যমুনা ভ্রমে
প্রভু তাহাতে ঝাপাইয়া পনে। দৈবক্রমে এক ধীবর
সেদিন তাহাকে সমুদ্র হইতে উঠাইল। সেই হইতে
ভক্তগণ সর্বদা তাঁহাকে চোখে চোখে রাখিতেন; আর
কখনও তিনি বাহিরে যাইতে পারেন নাই। নীরবে
কৃষ্ণপ্রেমে তন্ময় হইয়া প্রভু এইরূপে জীবনের শেষ
দ্বাদশ বৎসর কাল কাটাইলেন ।
তারপর কৃষ্ণপ্রেমে বিল হইয়া ৪৮ বৎসর বয়সে
শ্রীচৈতন্যদেব একদিন জগন্নাথ দেবের মন্দিরে প্রবেশ
করিলেন -আর তাহাকে দেখা গেল না। ভক্তগণ
বুঝিলেন, প্রভু লীলা সম্বরণ করিয়াছেন। সেদিন
১৪৫৫ শকাব্দের আষাঢ়ের সপ্তমী তিথি।
কে
e

শ্রীচৈতন
শেষ কথা ।
1
পতিতপাবন রূপে প্রভু জগতে আসিয়াছিলেন।
পূর্ণমাত্রায় তাহা শেষ হইল। জগতবাসীকে পুণ্যের পথ
-ধর্মের পথ দেখাইয়া তিনি অন্তর্হিত হইলেন।
তাঁহার শিক্ষায় লােকে বুঝিল ;-ত্যাগ ব্যতীত কিছুই
হইতে পারে না, নির্মল চিত্তে ভগবানের নাম লওয়াই
মুক্তির প্রধান উপায়। ছােট বড়, উচ্চ নীচ সকলেই
এক ভগবানের সন্তান, সুতরাং নীচ বলিয়া কাহাকেও
ঘৃণা বা হিংসা করা উচিত নয় ।
শ্রীচৈতন্যদেব জগতে আসিয়াছিলেন—সাম্য
মৈত্রী প্রতিষ্ঠা করিতে, তাই ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল এমন কি
মুসলমানকেও তিনি কোন দিয়াছিলেন ।
ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম করিতে হইলেই যে সংসার ত্যাগ করিতে
হইবে, এমন কথা তিনি কখনও বলেন নাই বরং
নিলিপ্তভাবে সংসারে থাকিয়া ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম করাকেই
প্রশস্ত বলিয়া সকলকে উপদেশ দিতেন। তাই
তিনি, জমিদারনন্দন রঘুনাথ দাসকে সংসাশ্রমে
পাঠাইয়াছিলেন।
লােক শিক্ষার জন্য জীবনের প্রতি মুহুর্তে তিনি
=৯
:

;
নানারূপ উচ্চ আদর্শ দেখাইয়াছিলেন। তাঁহার
আবির্ভাবে জগতবাসী ধীহইয়াছিল—ধরায় শান্তি
স্থাপিত হইয়াছিল।
পাপীতাপীর জন্য নিজকে বিলাইয়া দিয়া শ্রীচৈতন্যদেব
জগতে এক নূতন জিনিষ আনিয়াছিলেন ; কোন কালে
কেহ তাহা দেখে নাই, শুনে নাই ;-তাহার, আস্বাদন
করে নাই। তাহার কৃপায় সে “অর্পিত” সুধা যুগে
যুগে ধরাবাসী পান করিয়া তৃপ্ত হইবে—অমর হইবে।
বাঙ্গালী জাতি ধন্য, তাঁহাদেরই শ্রীচৈতন্য সে
অনৰ্পিত অপ্রাকৃত কৃষ্ণপ্রেমরস জগতে বিলাইয়া
দিয়াছেন; শ্রীহট্টবাসী আরােও ধন্য যে শ্রীচৈতন্যদেব
তাহাদেরই।
;
সমাপ্ত।
2o

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Shri Chaitanya

Author
Bhattacharya,khitishchandra
Title
Shri Chaitanya
File name
Shri Chaitanya
Text
OCR done
Citation
1923
Published
2010/01/15
Publisher
Bhattacharya Brothers,srihatta
Language
Sanskrit
Pages
78
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Bhattacharya,Khitishchandra
DLI number
511402
Barcode
4990010018552.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
vWycrY8MUd2
Download PDF

Shri Chaitanya