Majhu Public Library, Howrah

Rani Rashmani Ed.1

Santra, Prabodh Chandra · 2010/04/1

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রাণী রাসমণি।
( জীবন-চরিত)
শ্রীপ্রবােধচন্দ্র সাঁতরা কর্তৃক সঙ্কলিত।
RANI RASHMANI
BY
Prabodh Chandra Santra.
প্রথম সংস্করণ।
কলিকাতা, ইটালী
৩৮ নং পুলিশ হাসপাতাল রােড হইতে
শ্রীনরেন্দ্রনাথ দাস কর্তৃক প্রকাশিত।
১৩২৩ বঙ্গাব্দ।
মূল্য ॥ আট আনা মাত্র।

ললিত প্রেস।
২৫।১এ মেছুয়াবাজার থ্রট, কলিকাত,
ললিতমােহন রায় দ্বারা মুদ্রিত।

MĀJU. HOW R A Hy
Estd. 1902.
উৎসর্গ-পত্র।
যিনি আমার ইহ জগতের আরাধ্য দেবতা,
গৃহী হইয়া ও যিনি সংসার-বিরাগী,
জীবনে মরণে যাঁহার ঋণ
অপরিশােধনীয়,
সেই পিতৃদেবের শ্রীচরণে
এই গ্রন্থ
ভক্তি সহকারে
উৎসর্গীকৃত হইল।

No text on this page.

প্রবেন। আমাদের ভারতবর্ষ স্বতই রত্নপ্রসবিণী। ইহাতে একদিকে যেমন হীরক, স্বর্ণ, রৌপ্য, লৌহ, তাম্র, অভ্র ইত্যাদি ধাতু সকল উৎপন্ন হইতেছে, অন্যদিকে তেমনই বীর-সন্তান, বীরাঙ্গনা, দানশীল, পুণ্যবতী, বিদুষী রমণী সকলে ধরা শােতিতা হইতেছে। একদিকে যেমন, বীরপুরুষ, জন্মিয়াছেন; অন্য দিকে তেমনি ধার্মিক, পণ্ডিত, দাতা জন্মিয়া দেশের উপকার করিয়াছেন। সুদুর পাশ্চাত্য প্রদেশের কথা ছাড়িয়া দিলেও এক ভারতবর্ষে একদিকে যেমন রামচন্দ্র, যুধিষ্ঠির, অর্জুন, ভীষ্ম, সুবােধন, রাণাপ্রতাপ, প্রতাপাদিত্য, ভীমসিংহ, বাদল, ঝাঙ্গীর রাণী পদ্মিনী প্রভৃতি বীরগণ জন্মিয়াছেন, অন্যদিকে তেমনই কালিদাস, ভবভূতি, মাঘ, ভারবী, ভট্ট, খনা, লীলাবতী, উভয় ভারতী, গার্গী, পণ্ডিত রমাবাই, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র জন্মিয়া ধরা উজ্জল করিয়াছে। একদিকে যেমন দাতাকর্ণ, তাম্রলিপ্তের ময়ুরজ, তাজ, ময়নার বাহুবলী, উৎকলে অনঙ্গভীম,কর্ণাটের ভুপাল কাশীরাজ প্রভৃতি দানবীর সকল জন্মিয়াছেন, অন্য দিকে তেমনই, রাণী ভবানী, রাণী স্বর্ণময়ী, রাণী ভগবৎসুন্দরী, রাণ, হেমন্তকুমারি, রাণী রাসমণি প্রভৃতি দানশীল রমণীগণ জন্মিয়াছেন। জগতের ইতিহাসে যে সকল মহাত্মাদের ও পুণ্যবতী রমণীদের জীবনী রহিয়াছে তাহা পাঠে জানা যায় যে, যখনই ধরার কোন বিষয়ে অভাব হইয়াছে, তখনই পর্বনিয়া কোন রমণ বা পুরুষের আবির্ভাব নাই ( • ) •• ধরার অভাব পূরণ করতঃ তাহার কাৰ্য্য সাধন করিয়াছেন। কার্য ভঁহার, তিনিই করান, মানব উপলক্ষ মাত্র। যখনই ধরা পাপের ভার, প্রবলের অত্যাচার ও দ্য-তস্করের উপদ্রবে উৎপীড়িত, ব্যথিত, মথিত, হইয়াছে ; তখনই কোন বংশে কোন পুরুষ বা স্ত্রী আসিয়া তাহার শান্তি বিধান করিয়াছেন। দুর্ভিক্ষের প্রকোপ, জলপ্লাবন যুদ্ধ-বিগ্রহের সূচনা, অরাজকতার আবির্ভাব সকল সময়ে প্রয়ােজন মত করুণাময়ের ইচ্ছায় হইয়াছে ও তাঁহারই ইচ্ছায় শান্তি হইয়াছে। পূর্ব বঙ্গে যখন রাণী ভবানীর মত কোন রমণীর প্রয়ােজন হইয়াছিল, ভগবান তখনই তাঁহাকে সৃজন করিয়াছেন, আবার সন্তানসন্ততি থাকিলে হয়ত ধৰ্ম্ম কার্যের ব্যাঘাত হইবে, সেই জন্যই বােধ হয় পতি- পুত্র কাড়িয়া লইয়া তাহাকে দেশের কার্যের জন্য অবাধে মুক্তপ্রাণে, দান কার্যের সহায়তা করিয়াছেন। দক্ষিণ বঙ্গে যখন রাণী রাসমণির মত কোন পুণ্যবতী দানশীল। রমণীর প্রয়ােজন হইয়াছিল, তখনই ঈশ্বর তাঁহাকে দরিদ্রের, গৃহে পুত্রহীনা ও বিধবা করিয়া দশের উপকার, দেশের উপকার জন্য সৃজন করিয়াছিলেন। রাণী রাসমণি দরিদ্রের পর্ণকুটীরে জন্ম গ্রহণ করিয়াও অতুল বৈভবের অধিকারিণী হইয়াছিলেন, তিনি রাজপত্নী না হইয়াও ‘রাণী বলিয়া পরিচিত। রাণী ভবানী জমিদারের কন্যা ও রাজপত্নী এবং অর্ধবঙ্গেশ্বরী তিনি রাজ্যেশ্বরী মহারাণী। সুতরাং রাণী ভবানীর সহিত রাণী রাসমণির দান-যজ্ঞের তুলনা হইতে পারে না। তথাপি আমরা উভয়ের মহত্ব এক শ্রেণীর বলিয়া বিবেচনা করিতে পারি না কি? উভয়েই ধর্মশীলা পতিপুত্রহীনা আৰ্য বিধবা ; একই উদ্দেশ্যে উভয়ের মন, প্রাণ নিৰােজিত—দশের জন্য, দেশের জন্ম, ধর্মের অ, পূণ্যকাৰ্য্যে, ছিলেন।

( • ) দানযজ্ঞে উভর্মেই অজস্র অর্থ জলস্রোতের ন্যায় ব্যয় করিয়াছিলেন ; উভয়েই আদর্শ বঙ্গ-মহিলা। আদর্শ নরনারীর জীবনী পাঠে উপকার দর্শে- মানবের নৈতিক চরিত্র গঠনের সহায়তা করে। তাই সভ্য দেশ মাত্রেই জীবনী গ্রন্থ লিখিত হইয়া থাকে। বর্তমান গ্রন্থ খানিও সেই আশায় সঙ্কলিত হইল। এই অদর্শ বঙ্গ-মহিলা রাণীর চরিতাখ্যান সংগ্রহকল্পে আমার পূজ্যপাদ পিতৃঠাকুর ও খুল্লপিতামহ (প্রবীণ শ্ৰীযুক্ত দয়ালাদ সাতবা মহাশয়) আমাকে বিশেষরূপে সাহায্য করিয়াছেন। আশৈশব যাহাদের স্নেহছায়ায় লালিতপালিত ও বর্ধিত হইয়াছি, তাহাদের ঋণ যে অপরি- শােধনীয় !—কৃতজ্ঞতার কথা বাহুল্য মাত্র ! পূজনীয় শ্ৰীযুক্ত হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, তমলুকের ইতিহাস’-প্রণেতা শ্ৰীযুক্ত সেবানন্দ ভাবতী, সুনামগঞ্জেব উকীল শ্রীযুক্ত বসন্তকুমার রায় এম এ, বি এল ও কলিকাতা ভবানীপুৰনিবাসী শ্ৰীযুক্ত কালীপদ দাস বি এ প্রভৃতি মহাশয়গণের নিকটও অনেক সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি—ইহাদের নিকটও অচ্ছেদ্য কৃতজ্ঞতা শৃঙ্খলে আবদ্ধ হইলাম। পরিশেষে কলিকাতা ইটালী নিবাসী শ্ৰীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ দাস মহাশয়ের নিকট আমার হৃদয়ের গভীরতর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি, তিনি ইহার মুদ্রণ-কাৰ্য্যের ব্যয় ভার বহন না করিলে এই গ্রন্থ লােক-লােচনের গৌচরীভূত হইত কি না সন্দেহ। উপন্যাস ও জীবন-চরিতে পার্থক্য আছে। উপন্যাস পাঠে পাঠকের মনে যেমন আলাদের উদ্রেক হয়, জীবন-চরিত পাঠে তেমন হয় না বটে, কিন্তু তাহাতে জাতীয় চরিত্রের উৎকর্ষ সাধিত হয়। এই চরিতাখ্যান পাঠে যদি একজনেরও কিছু উপকার দর্শে, তাহা হইলে আমার পরিশ্রম সফল জ্ঞান করিব। পরিশেষে বক্তব্য এই যে, সময়াভাৰ, অর্থাভাৰ ও তদপেক্ষা মনীয় ( 1 ) যোগ্যতার অধিকতর অভাবে এই গ্রন্থ খানিকে তেমন মনের মত করিয়া তুলিতে পারি নাই। ইহাতে ভাষার পারিপাট্য তেমন হয় নাই। মুদ্রণ কার্মেরও বিশেষ প্রমাদ পরিলক্ষিত হইবে। নানা কাৰ্যে ব্যাপৃত থাকায় মনােযােগের সহিত প্রুফ দেখা হয় নাই বলিয়া স্থানে স্থানে ভূলভ্রান্তি রহিয়া গিয়াছে। তজ্জন্য আমি সাধারণের নিকট মার্জনার ভিখারী রহিলাম। এই বারে যে সমস্ত প্রমপ্রমাদ ও অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হইবে, পাঠকগণ দয়া করিয়া, ৩৮ নং পুলিশ হাসপাতাল রােড ইটালী কলিকাতা এই ঠিকানায় প্রকাশকের নিকট লিখিয়া পাঠাইলে পরবর্তী সংস্করণে তাহা সংশােধন করিয়া লওয়া যাইবে এবং গ্রন্থকার তজ্জন্য তাঁহাদের নিকট চিরবাধিত হইবেন। শ্রাবণ } বিনীত এবােধচন্দ্ৰ সঁতরা।

চীপত্র। ( পার্শ্বস্থ সংখ্যাগুলি পত্রাঙ্ক-জাপক) প্রথম খণ্ড। ১ম পবিচ্ছেদ। জন্ম-বংশানুচরিত-বাল্যজীবন ২য় জানবাজার জমিদার বংশের পূর্ব বিবরণ রাণীব বিবাহ ৩ বধুরাণী রাজচন্দ্র বাবুর অর্থাগম ••• ৪র্থ কলিকাতাব তৎকালীন অবস্থা রাজচন্দ্রবাবুর সহিত জন বেব সাহেবের বন্ধুত্ব ১৭ রাজচন্দ্র বাবুব সন্তানাদি তাঁহার সৎকাৰ্য্য २०-२२ ৬ষ্ঠ । রাণী রাসমণি কুঠী ২০ १म রাজচন্দ্রবাবুর পরলােক গমন ১ * * * 2s ১ম পবিচ্ছে। ১৮ ৪র্থ দ্বিতীয় খণ্ড। বিষয় কার্যাদি পরিদর্শন ও ব্রহ্মচর্য্য রথযাত্রা উৎসব দুর্গোৎসব ৪২-৪৪ দোল ও রাসােৎসব ৪৫-৪ মিণীব তীর্থ গমন ও বিপদ ণীর জন্মভূমি দর্শন ... রাণীর নবদ্বীপ যাত্রা, মহােৎসব ও ব্রাহ্মণ দিগকে দান ৪৯-৫১ . ০ १५

(•)
ম
পরিচ্ছেদ।
শব্দার লিক রহিত করণ
ব্রাহ্মণের কন্যাদায় উদ্ধার
সিপাহী বিদ্রোহ ও রাণীর উপঢৌকন প্রেরণ ৬১
রাণীর কুঠীতে গােরার উৎপাত
বিষয় ও সাধনা
(নীলকর দমন, জগন্নাথপুরে অত্যাচর নিবারণ,
টোনার খাল খনন ও দক্ষিণেশ্বর প্রসঙ্গ)
তৃতীয় খণ্ড।
১ম পরিচ্ছেদ। কাশী যাত্রার উদ্যোগ
কালী মন্দিরের স্থান নির্বাচন ও মন্দির নির্মাণ ৭৩
৭১
মন্দির দৃশ্য
১)
৪র্থ
৬ষ্ঠ
প্রতিষ্ঠা ও দান
ভবতারিণী মূর্তি ও সেবা পূজাদির ব্যবস্থা
রামকৃষ্ণ পরমহংস
রাণীর শেষ জীবন
কালীঘাটে রাণীর স্বর্গারােহণ
০ ০ ০
৭ম

বংশল।
১। রাণী রাসমণির পিতৃবংশ।
জগমােহন
হরেকৃষ্ণ+রামপ্রিয়া
(স্ত্রী)
রামচন্দ্র
গােবিন্দ রাণী রাসমণি
২। রাণী রাসমণির শ্বশুর বংশ।
প্রীতম (মাড়)
রামত
কালীপ্রসাদ
রচন্দ্র
নাচ+ অভয়চরণ
কালীচরণ
উমাচরণ
রাণী রাসমণি বেণীমাধব
নীলরতন
নীলগােপাল
হীরালাল

No text on this page.

রাণী রাসমণি। প্রথম খণ্ড। প্রথম পরিচ্ছেদ। জন্ম-বংশানুচরিত—বাল্যজীবন। কলিকাতার উত্তরে গঙ্গার পূর্বতীরবর্তী হালিশহরের নিকট কোপা নামে একটী গও গ্রাম আছে। পূর্বে কাঞ্চনপল্লীর “বাঘের খাল” হইতে ইছাপুর-নবাবগঞ্জের খাল পর্যন্ত হালিসহর ‘হাবেলি সহর’ পরগণা নামে খ্যাত ছিল, পরে উহা ২৪ পরগণার অন্তর্ভুক্ত হইয়া যায়। এই কোণা গ্রামের একটি দরিদ্র মাহিষ্য বংশে বঙ্গাব্দ ১২০ সালে ১১ই আশ্বিন বুধবার প্রাতঃকালে পিতা হরেকৃষ্ণ দাসের ঔরষে ও মাতা রামপ্রিয়া, গর্ভে প্রাতঃস্মরণীয় পুণ্যবতী রাণী রাসমণি জন্ম গ্রহণ করেন। গ্রাম্য ধাত্রী নিয়ােজিত থাকা সত্বেও প্রসবে বিল হই- তেছিল, রাণীর পিতা ধর্মপরায়ণ হরেকৃষ্ণ দাস ব্যাকুল হৃদয়ে দেবতার করুণা প্রার্থনা করিতেছিলেন, এমন সময়ে রাণীর পিতৃ-স্ব ক্ষেমঙ্করী আনন্দ সংবাদ জ্ঞাপন করিলেন যে, একটী কন্যা সন্তান হইয়াছে। তথনই হরেকৃষ্ণ দাস প্রতিবেশীর পুত্র কন্যাগণকে কিয়া দেবােন্দশ রানী রাসমণি। নাই। নবজাত কন্যার শুভ কামনায় “হরি-লুট” দেন। দুইটী পুত্র সন্তান হইয়া বহুদিন যাবৎ আর কোন সন্তানাদি হয় বহুদিন পরে কন্যা সন্তান হওয়ায় তাহার বিশেষ উৎফুল্ল হইলেন। পুত্র দুইটীর নাম রামচন্দ্র ও গােবিন। রামচন্দ্র বড়, গােবিন্দ ঘােট। বামপ্রিয়া রাণীর ১ বৎসর বয়ঃক্রম কালেই কন্যাকে ‘রাণী’ বলিয়া ডাকি- তেন, পরে রাসমণি নামকরণ হয়। বােধ হয়, ভবিষ্যতে রাণীর ন্যায় ঐশ্বৰ্য্য ভােগ করিতে হইবে বলিয়াই ভবিষ্যদ্বাণীর মত মাতৃমুখে রাণী নাম সূচিত হইয়াছিল। সেই অবধি প্রতিবেশীরাও ‘রাণী রাসমণি' বলিত। আমরাও রাণী রাসমণিকে রাণী নামেই অভিহিত করিতে থাকিব। রাণী রাসমণি দরিদ্রের কন্যা। দরিদ্রের কন্যার নাম রাণী ও অন্ধ পুত্রের নাম পদ্মলােচন বড়ই অসামঞ্জস্য উপমা সন্দেহ নাই। রাণী জন্মকালে সােণার ঝিনুক, রূপার চামচ বা মােহরের থলি লইয়া জন্ম- গ্রহণ করেন নাই বটে, কিন্তু তাহার ধন ও যশােভাগ্য ছিল এবং লঃ-চক্র যে বিশেষ শুভ ছিল সে কথা বলাই বাহুল্য। হরেকৃষ্ণ দাস (হারু ঘরামী) কোন প্রকারে জাতীয় বৃত্তি কৃষি কাৰ্যাদি ও গৃহনির্মাণাদি শিল্প কাৰ্য্য দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন। তাহার বাটীতে ৪ খানি মাত্র মৃৎ-রচিত তৃণাচ্ছাদিত গৃহ ছিল। হরেকৃষ্ণ দাসের পিতা জগমােহন দাসও দরিদ্র ছিলেন। তিনিও বিশেষ কিছু সম্পত্তি রাখিয়া যাইতে পারেন নাই। ঐ ৪ খানি ঘরের মধ্যে ২ খানি শয়নাগার, ১ খানি রন্ধন- শালা ও ভাণ্ডারগৃহ, ও অন্য খানি গােশালা, তাহাতে একটী সৎসা গাভী। বাহিরে একটী বসিবার দাওয়া। পার্শ্বে দক্ষিণ দিকে বাগান ও পুষ্করিণী। বাগানে কয়েকটা ফলের ও ফুলের গাছ। কয়েক বিঘা মাত্ৰ ধান্য ক্ষেত্রের উপস্বত্ত্ব, তাহাতেই এই ৬টী প্রাণীর গ্রাসাচ্ছাদন হইত।

প্রথম খণ্ড। কালে তেমন শিক্ষার বিস্তার না থাকিলেও হরেকৃষ্ণ দাস কিছু বাঙ্গলা লেখা পড়া জানিতেন। তিনি সহৃদয়, ধার্মিক ও পরােপ- কারী ছিলেন। তিনি বিবাদে সপশ্চাতে, বিপদে সর্বাগ্রে থাকিতেন। স্ত্রী রামপ্রিয়াও স্বামীর ন্যায় ধর্মপরায়ণা ছিলেন, দেব দ্বিজে উহাদেব প্রগাঢ় ভক্তি ছিল। এই কৃষ্ণ-ভক্তি-পরায়ণ দম্পতি যখন কোশাকোণী লইয়া সন্ধ্যাব- নাদি ও তিলক ধারণ করিতেন, রাণীও পিতামাতাব সমীপন্থা হইয়া দর্পণে মুখ দর্শন, তিলক ধারণ প্রভৃতি পূজা পদ্ধতির অনুকরণ করিতেন। বাল্য- কালে ধর্মাচরণের অনুকরণ-প্রিয়তা তাঁহার হৃদয়ে যে ধৰ্ম্মবীজ বােপণ করিয়াছিল তাহা ভবিষ্যতে পুণ্যময় জীবনের নিয়ামক হইয়াছিল। পিতা মাতার গুণ পুত্রকন্যায় বৰ্ত্তে। গৃহকর্ম ও অন্যান্য বিষয়েও রামপ্রিয়া কন্যাকে শিক্ষা দিতেন। হরেকৃষ্ণ দাসের বাটীতে রাত্রিতে কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসের মহাভারত ও ঐ রূপ বাঙ্গলা পুরাণাদি নিয়মিত পঠিত হইত। প্রতিবেশী অনেকেই শুনিতে আসিত। তখনকার দিনে হালিসহর অঞ্চলে এইজন্য হরেকৃষ্ণ দাসের নাম খ্যাত ছিল । রাণী শৈশবাবস্থায় সহচরীগণের সহিত, ধূলা খেলা করিতেন। বাটীর সংলগ্ন বাগানেই তাহাদের খেলার স্থান ছিল, খেলার মধ্যে প্রধান খৈল দোলনায় ৫১ খাওয়া। একটি আম গাছের ডালে দড়ি দিয়া ঝুলনা করা ছিল, পৰ্য্যায়ক্রমে সকলেই দোল খাইতেন। একদিন বৈশাখের দ্বিপ্রহরে রাণী দোল খাইয়া, একটি বহু প্রাচীন ডুমুর গাছের তলে বিশ্রম করিতে বসিলে, দেখিতে পাইলেন যে, একটি ডুমুরের গুচ্ছ মধ্যে একটি ফুল ফুটিয়া রহিয়াছে। রাণীর শুনা ছিল যে ডুমুরের ফুল দেখা যায় না, যদি কেহু দে সে পৃথিবীতে ধনী ও সুধী হয়। রাণী সহচরীদের নিকট ধফিল্পে”কেহই রাণী রাসমণি। বিশ্বাস করিল না, দেখাইতে গেলে তাহা আর দেখা গেল না ; বিলীন হইয়া গিয়াছে। হয় ত যাহার জন্য ফুটিয়াছিল সেই মাত্র দেখিয়াছিল, আন্তে দেখিবে কেন ? রাণীর মাতা শুনিয়া বলিলেন, “মা তুমি আমার রাজরাণী হবে।” এ উক্তি যে কালে সত্য হইয়াছিল তাহার আর সন্দেহ নাই। উত্তর কালে রাণী নিজ মুখে এই কথা অনেককে বলিতেন। আমি স্বয়ং কখনও পিপড়ের রা, সাপের পা, ডুমুরের ফুল, সাপের মাথার মাণিক কি গজমুক্তা দেখি নাই বা স্বাতী নক্ষত্রের জলবিন্দুও আমার মাথায় পড়ে নাই, অথবা এই সকলের তাৎপৰ্য্যই বা কি তাহা বুঝি না। এ জগতে অসম্ভবও সম্ভব হইতে দেখা যায়। যদি ইহা সম্ভব ও সত্য হয় যে; পুঠিয়া রাজবাটীতে পূজারী ব্রাহ্মণ অবস্থায় নাটোর রাজবংশের আদিপুরুষ বৃক্ষতলে দিবাভাগে নিদ্রিত ছিলেন, সৌরকর মুখে পড়িতেছিল, কোথা হইতে কালসর্প ফণা বিস্তার করিয়া নিদ্রার ব্যাঘাত হইতে সূৰ্য্যকিরণ রােধ করিয়াছিল এবং তিনি ইহার ফলে যখন রাজা হইয়াছিলেন, তখন রাণীর পক্ষেই বা ডুমুরের ফুল দর্শন অসম্ভব হইবে কেন ?) রাণী ক্রমে ক্রমে সপ্তম বৎসরে পদার্পণ করিলেন। এই সময়ে একটি বড় শােচনীয় ঘটনা ঘটিল। কাল অদৃষ্টি নিষ্ঠুর হাসি হাসিল। মঙ্গলময়ের উচ্ছায় রামপ্রিয় অষ্টাহ কালব্যাপী জুর বিকার রােগে ইহলােক ত্যাগ করি- লেন। রাণী কঁদিয়া আকুল হইলেন, কত লােকে কত বুঝাইল, সকলেই স্তোক দিতে লাগিল, “তােমার মা কাল আসিবে। কিন্তু হায়! কালে এমন কোন ‘কাল' আসিল না; যে কালে রাণীর মেহময়ী মাতা ডাগর ডান কাল ফল হল অনু ও একখানি ভালবাস-মাখা মুখ লইয়া রাণীকে লাভনা নিয়ে আসি। বড় সুচিকিৎসক। জমে সময়ের গুণে রাণী প্রথম খণ্ড। ৫ মাতৃ-শােক হইতে অল্পে অল্পে প্রকৃতিহা হইলেন। ক্রমে রাণী একাদশে পদার্পণ করিলেন। হরেকৃষ্ণ দাস পত্নীবিয়ােগ জনিত ব্যথা সত্ত্বেও তিনটা পুত্রকন্যা ও ভগিনী ক্ষেমঙ্করীকে লইয়া কষ্টে দিনাতিপাত করিতেছিলেন, এখন রাণী বয়স্থা হইতেছেন দেখিয়া পাত্রস্থ করিতে ব্যস্ত হইলেন। রাণীর জন্মের ষষ্ঠ দিনে বিধাতা পুরুষ অলক্ষ্যে রাণীব অদৃষ্টে যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা সফল হইতে চলিল। রাণীর ভাগ্যচক্র সময়রূপ আবর্তনে ঘুরিয়া কোন ভাগ্যবান পুরুষের অদৃষ্টের সহিত সংযােগ করিয়া দিল। পবিচ্ছেদে তাহা প্রকাশ করিতে প্রয়াস পাইয়াছি। এই সময়ে রাণীর বর্ণ সুগৌর, দেহ নাতিল নাতিশ, কৃষ্ণ কেশগুচ্ছ নিতম্ব চুম্বিত হইয়া তাহাকে সুন্দরী স্ত্রী জননাচিত শােভায় শশাভিত করিতেছিল। এই সময়ে যে রাণীকে দেখিত, সুন্দরী না বলিলেও সুলক্ষণা বলিত। পর পর।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। জানবাজার জমিদার-বংশের পূৰ্ব বিবরণ। রাণীর বিবাহ। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিষম রাষ্ট্রবিপ্লব কালে—বর্গীর হাঙ্গামার ভীষণ দুর্দিনে-প্রীতরাম দাস, পিতৃমাতৃহীন অবস্থায় দুইটী কনিষ্ঠ ভাতা রামতনু ও কালী প্রসাদকে লইয়া, জানবাজারের মান্না বাবুদের বাটীতে লালিত পালিত হইতেন। প্রীতরাম দাসের পিতার নাম কৃষ্ণরাম দাস। হাওড়া জেলার অন্তর্গত থােষালপুর গ্রামে তাঁহার বাসস্থান ছিল। এই প্রীতম বাবুই কলিকাতা জানবাজারস্থ মাহিষ্য জমিদার বংশের বিত্তার্জনকারী আদি পুরুষ। ইনি মা বাবুদের বাটীতে পিতৃস্বসা বিন্দুবালাব নিকটে থাকিয়া বাবু যুগল কিশাের মান্না ও বাবু অক্রুরচন্দ্র মান্না দুই ভাতার স্নেহছায়ায় বর্ধিত হইতেছিলেন। এই মান্না-বংশ অতি প্রাচীন বংশ। ইহাদের বাস গড়গােবিন্দপুর নামক স্থানে ছিল। এখন যেখানে রাজধানী দুর্গ (Fort William) রহিয়াছে, ঐ স্থানেই পূর্বে মান্না বাবুদের বাটী ছিল। পূৰ্ব্বে ইহাদেব বিশেষ প্রতাপ ছিল ও বহু ভূসম্পত্তি ছিল। বিন্দুবালার স্নেহে ও মান্নাবাবুদের যত্নে ও তত্ত্বাবধানে তরান ঐ বাটীর তৎকালীন পাঠশালায় পাঠাভ্যাস করেন। অত্রুর চন্দ্র মান্না মহাশয় তখন উনকিন সাহেবের দেওয়ান ছিলেন। উক্ত সাহেবের বেলিয়াঘাটায় লবণের কারবার ছিল, তাহাতে তিনি প্রতরাম বাবুকে সামান্য বেতনে মুহুরির কার্যে নিযুক্ত করিয়া দেন। বিশেষ মেধা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি থাকাতে প্রথম খণ্ড। লবণের কারবারে বঁটা ও উপরি আয় হওয়াতে অল্প দিনে তিনি বহু অর্থ উপার্জন করেন। পরে সাহেব গত হইলে কারবায় বন্ধ হইয়া যায়, প্রীতরাম বাবু তখন পূর্ব দেশীয় কোন বঙ্গজ বংশ দণ্ডের মহাজনের সহিত মিলিত হইয়া বেলিয়াঘাটায় বাঁশের আড়ত স্থাপন করেন। তাহাতেই “ড়” উপাধি সহ প্রচুর অর্থাগম হয়। বংশের ব্যবসা সত্ত্বেও তিনি টালার নিলাম হইতে দ্রব্যাদি খরিদ করিয়া আনিয়া সাহেবদের নিকট দ্বিগুণ চতুগুণ মূল্যে বিক্রয় করিতে লাগিলেন। ক্রমে রসদ যােগানের ভার লইলেন। তাহাতেও বেশ অর্থাগম হইতে লাগিল। এমন সময়ে যশােহরের ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব কাৰ্য্যোপলক্ষে কলিকাতায় আসিয়া মান্নাবাবুদের ভাড়াটীয়া বাটীতে স্বল্পকালের জন্য বাস করিতে- ছিলেন। কাৰ্যব্যপদেশে যুগল কিশাের মায়া মহাশয় প্রীতরাম বাবুকে সঙ্গে লইয়া সাহেবের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করার পর প্রীতম বাবুর একটি চাকুরির জঙ্গ বলেন। প্রিয়দর্শন, মেধাবী ও কাৰ্যকুশল প্রতরামকে:সাহেব সঙ্গে লইতে চাহিলেন। প্রীতমেরও একান্ত ইচ্ছা যে, ঘােপার্জিত অর্থে দশের মধ্যে দেশের মধ্যে একজন মানুষের মত হইব। যখন প্রবাদ ছিল, সাহেব চুইলে চাকুরী পাওয়া যায়, উইল করিলে লােক মরিয়া যায় ; স্ত্রীলােক লেখা পড়া শিখিলে বিধবা হয়, তখন অষ্টাদশ বৎসর বয়সে প্রীতরাম একাকী সাহসে ও অদৃষ্টে নির্ভর করিয়া সাহেবের সঙ্গে যশােহরে চলিলেন। তথা হইতে ঢাকায় কিছুদিন চাকরী করিয়াছিলেন। নাটোরের তদানীন্তন রাজা রামকান্ত রায়ের সঙ্গে পরিচিত হইলে, তিনি সচ্চরিত্র। কাৰ্যকুশলতা ও বুদ্ধিমত্তা দেখিয়া তাহাকে আপন ষ্টেটের দেওয়ান পদে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। কিছু দিন এই পদে সুখ্যাতির সহিত কাৰ্য্য করিয়া কলিকাতায় আসেন। কিছুদিন পরে, সাতাের পরগণা ও মকিমপুর তালুক নীলামের লাটে উঠিলে, সাতাের পরগণার নায়েব ৮ রাণী রাসমণি। ; শিবরাম সান্যাল ও প্রীতম বাবু উভয়ে পরামর্শ করিয়া, প্রীতম বাবুর নামেই উক্ত পরগণা দুইটী খরিদ করিয়া রাখেন। পরে শিবরাম সান্ন্যাল সালােতর পরগণা নিজে রাখিয়া জলগণ্ড, অনুর্বর, অসমতল, মকিমপুর পরগণা প্রীতম বাবুকে ১৯ হাজার টাকা ছাড়িয়া দেন। এই সময়ে প্রীতরাম বাবু জানবাজারে অবস্থিতি করিতেন ও বেলিয়াঘাটায় ইটী আড়ত খুলিয়া ছিলেন। একটীতে বাশ ও অপরটিতে মকিম- পুর তালুকজাত দ্রব্যাদি বিক্রীত হইত। প্রথমে ৪৫ বৎসর ঐ তালুক ছইতে কিছুই ধান্যাদি পাওয়া যায় নাই। পরে সময় সময় বন্যা আসিয়া পলি পড়িয়া গেল ; যাহা অসমতল ছিল সমতল হইয়া গেল ; যাহা জলগণ্ড ছিল তাহা বড় বড় দীর্ঘিকায় পরিণত হইল ; যাহা অনুর্বর ছিল তাহা উর্বর হইল। অল্পদিনের মধ্যেই ধান, পাট, মুগ, মসূয়, বংশ, গুড় ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হইতে লাগিল। লক্ষ্মী যাহার প্রতি সদয় হন, তাহার আর অভাব থাকে না। প্রতরাম দাসের ভাগ্য সুপ্রসন্ন, সুতরাং তিনি মকিমপুর তালুক হইতে যথেষ্ট আয়বান হইলেন। নাটোর ষ্টেটের দেওয়ান পদে সুখ্যাতির সহিত কাৰ্য করিয়া কলি- কাতায় ফিরিয়া আসিবার পর জানবাজারস্থ যুগল কিশাের মান্না মহাশয় তাহার কন্যার সহিত প্রীতরামের বিবাহ দেন। এই বিবাহে তিনি প্রীতরামকে যৌতুক স্বরূপ ১৬/• বিঘা জমী দান করেন। বিবাহের কিছুদিন পরে যৌতুকস্বরূপ প্রাপ্ত জমীতে একটা বাটী নিৰ্মাণ করাইয়া দুই ভাগ ও স্ত্রী সহ প্রীতম তাহাতে বাস করিতে লাগিলেন। কালে প্রীতম দুইটা পুত্ররত্ন লাভ করেন। জ্যেষ্ঠের নাম হরচন্দ্র ও কনিষ্ঠের নাম রাজচ। প্রীতমের জীবিতাবস্থায় তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র হরচন্দ্র অপু- এক অবস্থায় পরলােকগমন করেন। ১২০৮ সালে চাণক নামক স্থানে রাজচন্দ্রের প্রথম বিবাহ হয়। ঐ বৎসয়েই প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যু হওয়ায় প্রথম খণ্ড। 3 রাক্কচন্দ্র দ্বিতীয় বার দারপরিগ্রহ করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীও কিছুকাল পরে কালগ্রাসে পতিতা হন। রাজচন্দ্র দুইবার উপযুপরি পদ্বীহীন হইয়া পুনরায় দ্বারপরিগ্রহে বীতরাগ হইয়াছিলেন। কাজেই তাঁহার পিতা প্রীতম বংশলােপের আশঙ্কায় অস্থির হইয়া পড়েন। রাণী রাসমণির সুলক্ষণ সৌন্দর্য্যে * রাজচন্দ্রের চিত্ত বিবাহ সম্মতি দাৰে আকৃষ্ট হইয়াছিল। প্রতিরাম বাবুও বংশলোপের আশঙ্কার চিন্তা হইতে নিরস্ত হইয়াছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে এই ধনকুবের জমিদার বংশেই রাণীর বিবাহ সম্বন্ধ স্থির হইয়া গেল। প্রীতরাম বাবুর বন্দোবস্ত অনুসারে বাণীর পিতা হরেকৃষ্ণ দাস সপরিবারে কলিকাতার গােয়ালটুলীর একটা বাড়ীতে আগমন করিয়া রাজচন্দ্র বাবুর সহিত রাণীর শুভ পরিণয় ক্রিয়া সমাধা করেন। ১২১১ সালের ৮ই বৈশাখ তারিখে এই শুভ বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াছিল। বিবাহে বিশেষ আড়ম্বর কিছুই হয় নাই বটে, কিন্তু ভাগ্যবতী রাণী ভাগ্যবান ধনাট্যের গৃহবধূ হওয়ায় তাঁহার রাণী নামের সার্থকতা রক্ষিত হইয়াছিল। । * নৌকাযোগে ত্রিবেণীতে গঙ্গাৰ কৰিতে যাওয়া রাজচন্দ্র বাবু অভ্যাস ছিল। তাঁহার সঙ্গীরা কোণার ঘাটে সুলক্ষণা রাণকে দেখিী পৰিচয় এহণান্তর এক দিন আজ বাবুকে নৌকা হইতে দেখাইয়া ছিলেন। তাঁহাত্ব সম্মতি বুঝিয়া পরে ঘটক পাঠাইয়া - রাম বাবু হরেকৃষ্ণ দাসের নিকট বিবাহ প্রস্তাব করে। সেই প্রস্তাব কার্যে পরিণত হয়।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ। বধুরাণী-রাজচন্দ্র বাবুর অর্থাগম । রাণী রাসমণি শ্বশুরালয়ে আসিয়া নিজগুণে শ্বশুর, শাশুড়ী, স্বামী প্রভৃতি গুরুন ও আত্মীয়বর্গ সকলকেই মুগ্ধ করিয়াছিলেন। কি গৃহস্থালীর কাৰ্যে, কি দেবসেবায়, কি লোকজন শুক্রবায় সকল বিষয়েই তাঁহার সহিষ্ণুতা, বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মভাব পরিলক্ষিত হইতে লাগিল। সুলক্ষণা পুত্র- বধূ পাইয়া প্রীতরাম বাবু শেষ জীবনে সুখী হইয়াছিলেন। যে দিন হইতে রাণী রাসমণি শশুরালয়ে আসিয়াছিলেন প্রত্যহ শ্বশুর শাশুড়ীর পাদোদক পান করিয়া তবে আহার করিতেন। রাণীর কাৰ্য্যের অবসর নাই। প্রভাতে উঠিয়াই গৃহকর্মে নিযুক্ত হইতেন আর রাত্রি দ্বিপ্রহর পর্যন্ত তাঁহার কাৰ্য্যের শেষ নাই। ঠাকুর-ঘর পরিষ্কার, পুষ্পচষন প্রভৃতি কাৰ্য্যেও রাণীকে দেখিতে পাওয়া যাইত, আবার রন্ধনশালায়ওন্ধনের সাহায্য করিতে দেখিতে পাওয়া যাইত। শাশুড়ী তাহাকে কতবার বারণ করিতেন, তথাপি রন্ধনশালায় যাইতে বিরত হইতেন না। সংসারের কাজকৰ্ম্ম সারিয়া প্রতিদিন পূজাহ্নিক করিতেন। পিত্রালয়ে শৈশবেই তিনি মাতাপিতার অনুকরণে সমস্তই শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন। ধনকুবেরের রাজসংসারে আসিয়া তাহার চরিত্রের কিছুমাত্র ভাবান্তর হয় নাই, বরং তাঁহার ধর্মভাব ও চরিত্র আরও দিন দিন উৎকর্ষ লাভ করিতেছিল। বিশেষতঃ, তাহার স্বামী রাজা বাবুর শিক্ষাদান ফলে তিনি ক্রমেই অধিকতর গুণবতী হইতে সুযােগ পাইয়াছিলেন। পিতৃগৃহে যে শিক্ষা পাইয়া- ছিলেন শ্বশুরালয়ে আসিয়া আরও তাহার স্ফুটতর বিকাশ পাইতেছিল।

প্রথম খণ্ড। বিবাহেব পব বাজচন্দ্র বাবুব উবােতর বুদ্ধি হইতেছিল। তাহাব অজস্র অর্থাগম হইতে লাগিল। নানাদিক হইতে নানাভাবে দিন দিন বহু অর্থ সংগ্রহ হইতেছিল। জমিদাবীর আয়, ব্যবসায়ে আয় ক্রমেই বাড়িতেছিল । } এই সময়ে তিনি কলিকাতার মধ্যে যে সমস্ত জনী ও বাটা ইত্যাদি ক্ৰয বা প্রস্তুত করাইয়াছিলেন তাহার তালিকা এই ;- স্থান কুঠী ও জাম পরিমাণ। ২ দোতলা কুঠী সমেত বি ৯/১৮+ ২৬/০ shoje ৭৪ ১২৭? ভ Jত ১৪y ৩ জমি ২/০ ১১ নং রসেল স্ট্রীট পলক স্ট্রীট ধর্মতলা উট ফ্রী স্কুল স্ট্রীট ধৰ্ম্মল ীট কোবার্ণ সেন উমাচরণ দাসের লেন মার্কেট স্ট্রীট মনােহব দাস ষ্ট্রীট ভাক্তাব সেন ১ রামহরি মিস্ত্রী লেন ফ্রী স্কুল স্ট্রীট ৪ ত ভ ১৭ ৪৭ /••? ২/৪ ৬৪ कूटी দোতলা জমি कूरी ৭১ * কথিত আছে, একদিন একচেঞ্জ অফিসের নীলামে ৫০ হাজার টাকা লাভ করিয়া ছিলেন। এই রূপ প্রায়ই তিনি অথার্জন করিতেন।

বাণী বাসমণি। পবিমাণ। কুঠী ও জমি দোকান ৭২ ফ্রী স্কুল স্ট্রীট জমি জমি ঐ ১/০ /২০ গুদাম ১৮০ ঐ । ৪ দোতলা ১/২০ জমি ৮৩০ ২|||| ১৪/০ ৩৮, ৩৯, ৪০ মার্কেট স্ট্রীট জান বাজাব স্ট্রীট ১০ মির্জাপুব লেন ৩৬ নীলমণি হালদাব লেন ২০১-২০৫ পুবাতন চীনাবাজাব ৮ ওয়েলেসলী জুট ঐ ৭৭ ধৰ্ম্মতলা দুটি জানবাজার ইট ১ মুনসি সদবদী লেন ৪ গোয়ালটুলী ৪৫ মটস্ লেন ১৮ মার্কেট ফুট জানবাজাব স্ট্রীট ধম্মতলা স্ট্রীট ৭ উমাচবণ দাসেব লেন ৮৭ তালতলা ১/২/৩ কুষ্ঠী জমি /6y০ /6o ১২ কুঠী জমি ||৪০ ত |•|• ৭৬ ১০/০ দ/ জমি বস্তি ঐ 18 জান বাজার ৯০০ ৩৭ ১৮ দোকান বন্তি // ৩• ১১২ প্রথম খণ্ড। ৯ ঐ ঐ জমি কুঠী ও জমি পরিমাণ। ১১৫ জানবাজার ঐ /৩/• ৭৫১ ধৰ্ম্মতলা ষ্ট্রট কুঠী ও আন্তাল ২০ ৪ ফ্রী স্কুল স্ট্রীট দোকান 20 ||/ ৫ গােয়ালটুলী বস্তি ও লেন ।•/• ১২ মাকু ইস্ স্ট্রীট ১০ ১৬ মিশ্রী খানসামা লেন ৪০ ১২ শাখারীটোলা লেন /২০ ১, সরিফ দপ্তরী বস্তি । ২ কীড ষ্ট্রীট ত্রিতল কুঠী ৫|৪|| ১ ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান স্ট্রীট দ্বিতল ১৯৪০ ২৪ চৌরঙ্গী ঐ ২০ ২৫ ওয়েলেস্পী জমি ও দোকান ১২ ৬৪ জানবাজার স্ট্রীট জমি ২া ১৫ মট লেন ।১০ ১২ কোড়া বরদার লেন বস্তি । ৯ তালতলা ঐ ২০ বেলেঘাটা রাজার, বগন, কুঠী, জমি, পুষ্করি ২৫/৩ জগুবাবুর বাজার ভবানীপুর কালিঘাট বাগান, কুঠী, পুষ্করিণী, গঙ্গার ঘাট সিতি বাগান, পুষ্করিণী ৩৪ t রাণী রাসমণি। কলিকাতা মধ্যে তাহার এই সমস্ত সম্পত্তিব আয় যে কত তাহা পরিমাণ অনুমান করুন। এই সমস্ত জমি ও কুঠীর মধ্যে অনেক গুনি আশাতীত মূল্যে বিক্রীত হইয়াছিল। বসেল ষ্ট্রীটের জমি ও কুঠী প্রায় দুই লক্ষ টাকায় গবর্ণমেণ্ট ক্রয় করিয়াছিলেন। এত দ্বতাত নফলস্থ ঘীপুকুর, জগন্নাথপুব, মকিমপুব ও কল বা হোসেনপু। এই চারিটী মহালের আয়ও যথেষ্ট ছিল। রাজচন্দ্র বাবু স্বকীয় অধ্যবসার প্রতিভা, ব্যবসায়ে তবুদ্ধিতা ও সচ্চবিত্রতা বলে তৎকালীন বঙ্গীয় ধন কুবের বর্গেব অগ্রণী হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন। বাণী বাসমণি ন্যায় গুণবতী ভাৰ্য্যা সম্মিলন তঁাহার সুযশ ও সুনাম লাভের অন্য ত কারণ ছিল।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। রাজচন্দ্র বাবুর সহিত জনবেব সাহেবের বন্ধুত্ব। সে সময় কলিকাতার অবস্থা বিশেষ উন্নত ছিল না। এখন যেখানে বৈঠকখানার বাজার সেইখানে একদিন অশ্বথ তলায় বসিয়া চাণক (Job Charnock) সাহেব ফরসীতে ধুমপান করিতেছিলেন ও কুণ্ডলীকৃত ধুমরাশি উদগীরণ করিতে করিতে ভাবিতেছিলেন যে কলি- কাতাই বাণিজ্যের উত্তম স্থান। সে কল্পনা আজ সত্যে পরিণত হইয়া ফলপ্রদ হইয়াছে। ১৬০০ খৃঃ রাণী এলিজাবেথের রাজত্বের শেষভাগে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোং রাজকীয় সনদ লাভ করিয়া ৩০১৩৩ পাউণ্ড ৫ শিলিং ৮ পেন্স বা বর্তমানের ৪,৫২,০০০ টাকা মূলধনে কাৰ্য্য আরম্ভ করেন। মূলধন ১০১ ভাগে বিভক্ত ছিল। ইংলণ্ডেশ্বর ১ম চার্লসের রাজত্বকালে ১৬৪৫ খৃঃ উক্ত কোং দ্বিতীয়বার নূতন সনন্দ প্রাপ্ত হন। এই সময়ে বৌ- বাজার, শিয়ালদহ, শিবতলা, মৃজাপুর প্রভৃতি স্থান লবণ হ্রদের আধার ছিল। কেল্লার নিকটবর্তী স্থান সমূহকে গড়গােবিন্দপুর বলা যাইত। উহার আয়তন ১০৪১৩০ বিঘা ছিল। এখন যে প্রশস্ত গড়ের মাঠ দৃষ্ট হয়, তখন উহাতে হােগল বন ছিল। কুমারটুলী, বাগবাজার স্থান সমূহকে সুনুটী বলা যাইত, উহার পরিমাণ ১৮৬১০/২০ বিঘা ছিল। ইটালী, বেণিয়াপুকুর, ভবানীপুর স্থান সমূহকে ডিহি কলিকাতা বলা যাইত। ইহার পরিমাণ ১৭০৪/৩ বিঘা ছিল। হলওয়েল সাহেব এই সীমা নির্দেশ করেন।

রাণী রাসমণি। তখন খাদ্য দ্রব্যাদি এত মহাৰ্থ ছিল না; বেশ সুলভ ছিল—চাউল ১ ১০ মণ ; তৈল /৭, ৮ সের টাকায় ; ঘূত ১০ ২,সময়ে সময়ে ধৃত ১২ টাকা মণ পাওয়া যাইত। গুড় ১০৩, ১০ মণ। লবণ • সের ; দুগ্ধ ১৬২০ সের টাকায় ; মৎস্য ৮১০ টাকা মণ পাওয়া যাইত। পুলিশ প্রহরীর এত আড়ম্বর ছিল না। পুলিস কর্মচারী থাকিবার স্থানকে কড়ি বলিত। চৌকিদার বাহাল ছিল, তাহারা তরবারি ব্যবহার করিত। সময়ে সময়ে বড় বড় লাঠীও থাকিত। ক্রমে ক্রমে ব্যাটম বা জল সৃষ্টি হয়। ইহাদের গায়ে জামা, পায়জামা, মাথায় পাগড়ী, লাল টুপি ছিল। তখন রাজপথের এত সৌষ্ঠব ছিল না। রাস্তা ঘাট ইষ্টকচূর্ণ দ্বারা নির্মিত হইত। রাজপথের দুই ধারেই পয়ােনালী ছিল। আবর্জনা তদ্বারা বাহিত হইয়া গঙ্গায় পতিত হইত। রাজপথের দুই পার্শ্বে নারি- কেন তৈল, পরে এর তৈল, পরে কেরােসিন, পরে গ্যাসলােক হয়। কলিকাতার চতুঃপাশ্ববর্তী স্থান সমূহ পল্লীগ্রাম বলিয়াই বােধ হইত। সন্ধ্যার পর আর কেহ পথ চলিত না, প্রাণাপহারী দস্যু-ভীতি প্রবল ছিল। আলি নামক মুসলমানের নাম অনুসারে আলিপুর হয়। কিড (Col kid) সাহেবের নামে খিদিরপুর নাম হয়। চিত্ৰেশ্বরী সর্বমঙ্গলার নামে চিৎপুর হয়। মাণিক নামক মুসলমান পীরের নামে মাণিকতলা হয়। জেলেপাড়া, ছুতারপাড়া, কাঁসারিপাড়া, কুমারটুলী, বেণেটোলা, শুড়ীপাড়া, এই সকল স্থানে লােকে জাতীয় ব্যবসায় করিত বলিয়া ঐরূপ নাম হয়। মহারাজ নবকৃষ্ণ শশাভাবাজারে ও ঠাকুরবংশ পাথুরিয়া ঘাটায় বাস করিতেন। রায় রায়ান্ মহারাজ রাজবল্পত বাহাদুর সুতাটীতে বাস করি- তেন। মহারাজ নন্দকুমারের পুত্র রায় রায়ান গুরুদাস চড়কডাঙ্গায় বাস তেন।' গবর্ণন্ন ভান্সিটাট সাহেবের মুৎসুদ্দি আব্দুল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম খণ্ড। দেওয়ান রামচরণ রায় পাথুরিয়াঘাটায় থাকিতেন। দেওয়ান গঙ্গা গোবিন্দ সিংহ জোড়াসাঁকোয় থাকিতেন। দেওয়ান হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায় বহুবাজারে থাকিতেন। ইহাদের অনেকের সহিত রাজচন্দ্র বাবুর সৌক্ষ্য ছিল। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, অকুল দত্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ, সুব রাজা রাধাকান্ত দেব বহাদু তির সহিত বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। লর্ড অকল্যাণ্ড সাহেবের সঙ্গে বিশেষ প্রণয় ছিল। কলিকাতাব এইরূপ অবস্থায় লণ্ডন নগরীস্থ তদানীন্তন ধনকুবের ও অভিজাতবর্গের অগ্রণী মহাত্মা জন বেবাহেব ভারতবর্ষ পরিদর্শন করিতে আসিয়াছিলেন। “যে ইষ্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানী ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিতেছিলেন, জন বেব সাহেব সেই ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীব এক জন প্রধান অভিজাত অংশীদার ছিলেন। তিনি অতীব কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া বাণিজ্যের অছিলায়, প্রায় ছদ্মবেশে অনাড়ম্বরে কোম্পানীর নবিজিত ভারতবর্ষ দেখিবার জন্য আগমন করেন। তিনি ব্যতীত মহামান্য ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কোন অভিজাত মালিক না কি আর ভাবতবর্ষে পদার্পণ করেন নাই। তিনি কলিকাতা আসিয়াই (রায় বাহাদুক। রাজচন্দ্র দাস মহাশয়ের উদার ভাব দর্শনে অতীব প্রীত হইয়া তাহার সঙ্গে আজীবন বন্ধুত-শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত হইয়া পড়েন। মহাত্মা জন বেব তাহাকে অপার সম্পদে ও গৌরবে উদগীত করেন। তিনি ইংলণ্ডে প্রত্যাগমন করিয়াও বন্ধুর কথা বিশ্বত হইতে পারেন নাই ; তাই ১৮২৮ খৃঃ জানুয়াৰী মাসে একটী স্বর্য ঘড়ি রাজচন্দ্র দাস মহাশয়কে অপার স্নেহের চিরুপ । # প্রদীয় বংশধর পঞ্চাশ জন আরোহী বেষ্টিত ইয়া চতুরবানে অষণ করা প্রভৃতি লাত্তির অধিকার সনদ ত্রৈলােক্য গবুর হয়ে নিহিত ছিল। ভারতবর্ষের বড় লাট বাঙ্গালীদের মধ্যে সর্ব প্রথম কাজ দাশ এশল্পের উন নিমন্ত্রণ রক্ষা করেন ।

১৮
রাণী রাসমণি।
পাঠাইয়া দেন। ঐ ঘড়িটা এখনও রাজচন্দ্র বাবুর অন্যতম দৌহিত্র
ত্রৈলাের্ক বাবুর পুত্রদের নিকট রহিয়াছে। উহাতে নিম্নলিখিত বর্ণাবলী
খােদিত আছে --
"A TOKEN OF ESTEEM
SENT BY
JOHN BEBB ESQ. OF LONDON
TO HIS FRIEND
BABU RAJ CHANDRA DAS,
Jaa%ary 1826.”

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। রাজচন্দ্র বাবুর সন্তানাদি ও সৎকাৰ্য্য। দেয়া বঙ্গাব্দ ১২১৩ সালে রাণীর প্রথম কন্যা পদ্মমণি এক জন্ম হয়। মহা ধুমধামে তাহার নামকরণ ও অন্নাশন হয়। ১২১৮ সালে রাণীর দ্বিতীয় কা কুমারীর ও ১২২৩ সালে তৃতীয় কন্যা, করুণার জন্ম হয়। ১২২৪ সালে প্রীতরাম বাবু জর নােগে স্ত্রী যােতমায়, রাজচন্দ্র, দুই কন্যা, দুই পুত্রবধু, তিন দৌহিত্রী ও নগদ ৬ লক্ষ টাকা' ও জমিদারী রাখিয়া পরলােক গমন করেন। বহু আড়ম্বরে রাজ- চন্দ্র, বাবু পিতৃশ্রাদ্ধ সমাধা করেন। বহু দিপেশাগত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, ভাট ভিখারী, অনাথ, আতুর প্রভৃতি দান, পান, ভােজন, বিদায়ে পরিতুষ্ট হয়। ১২২৬ সালে রাণী এক মৃতপুত্র প্রসব করেন। ১২৩০ সালে তিনটা ঘটনা হয় ; প্রথম—৩০ সালের ভীষণ বঙ্গা, তাহাতে রাণীর বিপন্নদিগকে আশ্রয় দান, পান ভােজনের ব্যবস্থা করিতে বহু অর্থ ব্যয় হয় ; দ্বিতীয় ৰাণীর চতুর্থ কন্যা জগদবার জন্ম হয় ; তৃতীয়---রাণীর পিতা হয়ে মাস পরলােক গমন করেন। রাণী পিতার চতুর্থ করিবার জন্য গঙ্গা তীরে যাইয়া দেখেন-বাট অতিশয় পঙ্কিল, বন্ধুর, ইকর ইতস্ততঃ বিলভাবে পতিত, মানের বিশেষ সুবিধা। সে দিবস কাৰ্য্য সমাধা হইলে বাল আসিয়া, মাজচক্র বাবুর নিকট ঐ খাট বাঁধাইয়া দিবার প্রস্তাব করেন। আজ বাবু স্বীকৃত হন ও গ্যারিজন আফিসের (Garrison office) রাণী রাসমণি। অনুমতি লইয়া বহু অর্থব্যয়ে ‘বাবু বােড’ ও ‘বাবুঘাট নির্মাণ করাইয়া দেন। অদ্যাপিও ঘাটের উপর এই কয়েকটী কথা প্রস্তর ফলকে খােদিত আছে। The Right Honorable Lord William Cavendish Bentinck, G.C.B. & G.C.H. Governor General, &c., &c., &c. with a view to encourage the direction of private munificence to works of public utility has been pleased to determine that this ghaut constructed in the year 1830 at the expense of Baboo Raj Chunder Doss shall hereafter be called Babco Raj Chunder Doss's Ghaut." ছত্রিশ থাম ও চাদনীযুক্ত ঘাট। ঐ ঘাটের উপর দিয়া এখন পাের্ট । ট্রাষ্ট রেলওয়ে গিয়াছে। সে দিন এই ঘাট কোর্ট অব ওয়ার্ড কর্তৃপক্ষের চেষ্টায় মেরামত হইয়াছে। এই ঘাটে আজও রাণী রাসমণির কথাগুলি যেন প্রতিধ্বনি করিতেছে। লােকে উহাকে বাবুঘাট বলে। রাণী রাসমণি যেমন গুণবতী, তেমনই মনস্বী স্বামী পাইয়া তাহাব সদ্গুণরাশির উন্মেষ লাভে সুযােগ ঘটিয়াছিল। রাজচন্দ্র বাবু অতুল যের অধিপতি হইয়াও একদিনও নিরলস অবস্থায় নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। প্রত্যই তাহাকে ব্যবসা ও জমিদারীর কাৰ্য্য পৰ্যবেক্ষণ করিতে ব্যস্ত থাকিতে হইত। বড় বড় সাহেব সুবার সহিত তাহার বিশেষ প্রণয় ছিল। তিনি রাণী রাসমণির ন্যায় গুণবতী ধৰ্ম্মশীলা স্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত কোন কাৰ্য্য করিতেন না। বলা বাহুল্য, রাণী রাসমণি প্রীতরাম বাবুর অতি আদরের পুত্রবধু হইয়াছিলেন। সেই আদরেই তাঁহার হৃদয়ে ও মনে যে সকল গুণ ছিল তাহা প্রস্ফুটিত হইতে থাকে। বাণীর সহিত পরামর্শ করিয়া রাজচন্দ্ৰ বাৰু বহুবিধ সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান কৰিছিলেন, তন্মধ্যে কয়েকটা মাত্র আমরা উল্লেখ করিতেছি :- প্রথম খণ্ড আহিরীটোলায় গঙ্গায় সাধারণের মানের ঘাট। মাতার নাম ও স্মৃতিরক্ষা করিবার জন্য ও জনসাধারণের অসুবিধা দূর করিবার জন্য বাজচন্দ্র বাবু, বহু অর্থব্যয়ে ঐ ঘাট নির্মাণ করাইয়া দেন। নিমতলায় মুম্ষু গঙ্গাযাত্রীদিগের জন্য গৃহ নির্মাণ। পূর্বে বড় কষ্ট ছিল। রাণী রাজচন্দ্রবাবুকে বলিয়া এই খানে ১টী গৃহ, ১টী দ্বারবান, ২টী ভৃত্য ও একজন চিকিৎসক নিযুক্ত করেন। উহা এখন পাের্ট ট্রাষ্ট বেলের পার্শ্বে পড়িয়া আছে। মেটকা হলে গবর্ণমেন্ট লাইব্রেরীর উন্নতিকল্পে এক কালীন ১০০০০ দশ হাজার টাকা দান । বেলেঘাটার খালেব জন্য নিজ জমি গবর্ণমেন্টকে দান করেন। খালের উপর পুল তৈয়ারী হইবার আগে সাধারণে যাহাতে বিনা ব্যয়ে পারাপার হইতে পাবে তজ্জন্য রাজচন্দ্র বাবু, ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। নিজ জমি বিনা মূল্যে ছাড়িয়া দেওয়াই সেই ব্যবস্থা। চাণকেরালপুকুর অন্য লােকের ছিল। তিনি নিজ ব্যয়ে উহা খনন করাইয়া সাধারণের জলকষ্ট নিবারণ করেন ও আশীর্বাদভাজন হন। আর একটি ঘটনায় রাজচন্দ্র বাবুর সত্যপ্রিয়ত' ও মহত্বের নিদর্শন প্রকটিত। হুক ডেভিডসন এণ্ড কোং নামক কোন বিদেশী বণিককে দেউ- লিয়া জানা সত্ত্বেও তাহার ভগিনীপতী রামরতন বাবু এক লক্ষ টাকা ঋণ দেওয়াইয়া দেন। রামরতন বাবু উক্ত কোম্পানীর মুৎসুদ্দি ছিলেন। তখন বাজচন্দ্র বাবুর মা কঠিন পীড়ায় মৃত্যু শয্যায় শায়িতা, তথাচ তিনি ঐ টাকা দেন। জলে ফেলিয়া দেওয়ার মত এক লক্ষ টাকা দেওয়া হয়। সাহেব আসিলে, রাজচন্দ্র বাবু মাতার পীড়ার কথা বলিয়া তিন দিন পরে টাকা দিবেন বলেন ; তাহাতে সাহেব বলেন—“কল্যই টাকা না দিলে বিশেষ ক্ষতি হইবে।” ‘ভাল তাহাই হইবে বলিয়া রাজস্ব বাবু সাহেবকে বিদায় রাণী রাসমণি। রাত্রে নিলেন যে সাহেব দেউলিয়া হইয়া বিলাত যাইতেছেন। প্রাতে রামরতন বাবু সাহেবকে লইয়া আসিলে রাজচন্দ্র বাবু বিনা আপ, ত্তিতে অম্লানবদনে টাকা গণিয়া দিলেন। পরে রামরতন বাবকে বলিলেন-- “আমার টাকা কি টাকা নয়, সাহেব দেউলিয়া হইয়াছেন জানা সত্ত্বেও আপনার জন হইয়া এ কাজটা করা কি ভাল হইয়াছে ?” উত্তবে বাম- রামরতন বাবু বলেন-“আপনিও বিশেষ অবগত ছিলেন, ‘না’ বলিলেই ত পারিতেন।” তাহাতে রাজচন্দ্র বাবু বলেন—“একবার এই মুখে দিব বলিয়া আবার ‘না’ বলিতে শিখি নাই।”

যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। রাণী রাসমণি-কুঠী। রাজচন্দ্র বাবু ৭১ নং স্কুল স্ট্রীটে দ্বিতল বাটা প্রস্তুত কৰাইয়া বাস করিতেছিলেন। পরে এখন যে বাটী পাঁচ অংশে বিভক্ত হইয়াছে ঐ বাটা প্রস্তুত হয়। বিচিত্র সৌধের বিচিত্রতা অনেকাংশে না দেখিলে বুঝি বর্ণনায় কুলাইবে না। যদি চিত্রকর হইতাম, যদি তুলিকায় এই মনােরম সৌধ অঙ্কিত করিয়া সাধারণকে দেখাইতে পারিতাম, তবেই বোধ হয় বাসনা পূর্ণ হইত এখন যে দেহুড়িতে ফ্রীস্কুল স্ট্রীটের দিকে দ্বারবাগণ বসিয়া থাকে, উহাই আদি সিংহর ও প্রবেশ দ্বার। বৃহদাকার প্রাকাবের বৃহদাকার তােরণ। বৃহৎ কপাটের বক্ষে লৌহল বসান। ঐ বৃহৎ কপাটের আধাভাগে অাবার একটি ক্ষুদ্রায়তন কপাট আছে। বাত্রি ১০টার পর বৃহদ্বার বন্ধ হইবার নিয়ম। বৃহদ্বার বন্ধ হইয়া গেলে ঐ ক্ষুদ্র ব্যর আগম নির্গমের জন্য ব্যবহৃত হইত। অবশ্য উৎসবে বৃহষ্কার সারা রাত্রি উন্মুক্ত থাকে। সিংহবার উত্তীর্ণ হইলেই দুই ধারে বারবাদিগের বিপ্রামাগার, শয়নাগার, প্রহরার স্থান। কানের ভিত্তি গাত্রে দৃষ্টিপাত করিলে দেখা যাইত, উহাতে ঢাল, তরবারি, সড়কি, বক, রৌপ্যনির্মিত শঙ্কর মৎস্যের পুচ্ছ, বঙ্গম, বর্শা, ভােজালি, খেটক, খর, টাঙ্গী, পিতলের গুল বাথান ভিতরে বি চাল মােটা মােটা পাকা বাঁশের, লাঠী ; সেই সকল ২৪ রাণী রাসমণি। লৌহ গােলক, কানে স্থানে ঢােলক, ডুগডুগী, ডম্বৰু, সারঙ্গী, সেতার, আঁঝ, খঞ্জনী, কর- গল, বাঁশের বাঁশী ইত্যাদি প্রমােদোপাযোগী, বৌবাবিকদিগের হােলী ও বসনেৰ সম্বল, আবার তাহাব পার্শেই মুদগর, লৌহধনুক, কাঠে বল পরীক্ষার পাপড়া, গসা কালসারের শৃঙ্গনির্মিত রৌপ্যমণ্ডিত আততায়ীব আক্রমণ-রােধী হাতিয়ার, বলবৃদ্ধির পরিচায়ক অস্ত্রগুলি সজ্জিত আছে। আবার তার পাশ্বেই পাগড়ী, মুরাঠা, উষ্ণীষ, তাজ, কোমরবন্ধ, বুকবন্ধ, চাপরাস ইত্যাদি শােভা পাইতেছে। তার পর একধারে কতকগুলি লং প্রস্তুতের কুণ্ডি ও নিম্বদণ্ডের বৃহৎ বৃহৎ ঘােটনদণ্ড সজ্জিত রহিয়াছে। দগুলি যেন এক একটি বংশদণ্ডের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। মধ্যে মধ্যে উপবে একটি আলােকাধার । একজন দ্বারবানের কি বিশাল বক্ষ, পেশী সম্বিত ভুজযুগ, গলদেশে স্বর্ণমণ্ডিত কামরাঙ্গা ফলের হাসুলি, হাতে রূপার বলয়, কর্ণে বীরবৌলী, অঙ্গুলে অঙ্গুরীয় । অন্য একটী দ্বারবান্ ভয়ানক মূর্তি --গজস্কন্ধ, গজচক্ষু, দেহ স্কুল ও মাংসল, পেশী রূঢ় ও সরল, উচ্চতায় সকল দ্বৌবারিক অপেক্ষা কনিষ্ঠ, বলে সৰ্বশ্রেষ্ঠ, কেশ-বিরল মস্তক, ঐ টী কুস্তিগীব, সহসা দেখিলে মনে হয় যেন কুম্ভকর্ণেব প্রদৌহিত্র কি বৃকোদরের দূর সম্পর্কীয় জ্ঞাতি ভ্রাতা। এইরূপ ২৫/৩০ জন দৌবারিক অল্প অগ্রসর হইলেই দুই ধারেই চলন পথ । চলন পথ পার হইলেই দুই ধারে উপরে যাইবার দুইটী সােপান শ্রেণী । বামদিকের সােপান শ্রেণী দিয়া উপরে অন্তঃপুরে যাইতে পারা যায় ও দক্ষিণ দিকের সােপান শ্রেণী দিয়া উপরে বৈঠকখানায় যাইতে পারা যায়। অগ্রে নিয়তলার কথাই বলা যাইতেছে। এই চলন পথ তিন দিক ব্যাপি। উত্তরভাগে দেবার স্থান, ঠাকুর দালান। মধ্যে বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, প্রাঙ্গণে বাধ্য কাঠ গড়া। তিন দিককার চলন পথের পাশ্বেই ক্ষুদ্র প্রথম খণ্ড ক্ষুদ্র গৃছ। কোনটী দেওয়ানখানা, কোনটী গােমস্তাব, কোনটা সরকাদের, কোনটী পাচক ব্রাহ্মণের, কোনটী পূজক ব্রাহ্মণের, কোনটী গৃহশিক্ষকেব, কোনটী ভাণ্ডাবিব, কোনটী ফরাসের, কোনটী বাতিঘর, কোনটা ভৃত্যের আবাস, কোনটী ঢাকী ও চুলীর জন্য, কোনটী প্রতিমা-নিৰ্মাতা কুন্তকারের জন্য, একটী ঘড়ী ঘর, উহাতে একটি কাসার বড় পেটা ঘড়ি থাকিত ৪ ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাদিত হইয়া সময় ঘোষণা করিত। উহা এখনও আছে। পূৰ্ব্বদিকের গৃহগুলি উৎসবে, পার্বণে, আহারীয় দ্রব্যাদি স্তরে স্থরে রাখা হইত। কোনটীতে রথ, রথের আসবাব সরঞ্জাম, ঘােড়া, সারথি, পতাকা, রঞ্জু ও আশাসােটা ইত্যাদি থাকিত। কোন উদ্বোধনে ব্রাহ্মণদিগের বাসের জন্য ব্যবহৃত হইত। কোনটি দারায়, গােবিন্দ অধিকারী ও আর আর সঙ্গীত সম্প্রদায়ের বাসস্থান নির্দিষ্ট ইত কোনটী পূজার সময় পূজোপকরণ সজ্জিত হইত। কোনটিতে দোলের সময়কার আবির, কুমকুম, ফাগ, রং পিচকারী, মঠ, ফুলের মালা ইত্যাদি রাখা হইত। কোনটিতে আড়ালি, স্বর্ণছত্র, রৌপ্যছত্র বাধা উত্তরদিকে তিন মহল ঠাকুর দালান। শেষ মহলে ঠাকুরের স্থান। উপরে ৩২ ডালের ঝাড়, দুই পার্শ্বে ২৫ ডালের করিয়া দুইটী ঝাড়, নীচে ঠাকুরের কাছে সেজ জ্বলিত। পার্শ্বে একটী বৃহৎ মৃন্ময় দীপ গব্য সুতেও কার্পাস তুলা সহযােগে জ্বালিত হইত। উহাই দুর্গা প্রদীপ। ঠাকুর দালানটা সমস্তই পঙ্কের কাজ করা। থামে দেওয়ালগিরী ও চিত্রপট শােভা পাইত। উপরে বহুমূল্যের দোয়া। মধ্য মহলে যােড়শােপচারে পূজো- পকরণ রাখিবার ও ব্রাহ্মণদিগের বসিবার স্থান। শেষ মহলে দর্শকদিগের, স্থান। শেষ মহলের পরেই কতিপয় সােপান শ্রেণী পরে প্রাঙ্গণ বলিদানের স্থান। দক্ষিণ দিকের গৃহগুলি পার হইলেই ফুলবাগান, তা এখন স্থানা- রাণী রাসমণি। ভাবে পাকশালা, অশ্বশালা, গােশালা, এবং যান বাহন রক্ষার স্থান হই, আছে। উপরে বৈঠকখানা, উপরে ঝড় লণ্ঠন, সেজ, দেওয়ালগির, বেল লণ্ঠনে গৃহ আলােকিত হইত। বড় বড় মুকুরে গৃহ প্রাচীর শােভিত ছিল। মহিষের বৃহৎ বৃহৎ শৃঙ্গ, মৃগশৃঙ্গ ও চর্ম, কালসারের শৃঙ্গ ও চর্ম, ব্যাঘ্ন চৰ্ম্ম, ও মৃজাপুরী কারুকার্য খচিত গালিচায় শশাভা পাইত। পূর্ব দিকে দৰদালান ও রঘুনাথ জীউর স্থান। এটা প্রথম মহল। প্রথম মহল পার হইলেই দ্বিতীয় মহল। নীচে উপরে দুইটী চলন পথ প্রথম মহল হইতে দ্বিতীয় মহলে লইয়া গিয়াছে। ইহাতে নীচে ও উপরে অনেক গুলি গৃহ সজ্জিত। তাহা এখন যদুনাথ চৌধুৰী মহাশয়ের পুত্রগণের অংশে পড়িয়াছে। সদর ও মফঃস্বলে বিভক্ত করিয়া পঞ্চ ভ্রাত। পঞ্চ পাণ্ডবের মত প্রিয় পরিজন, পুত্র কন্যা লইয়া বাস করিতে- ছেন। অধুনা ইহারাই যেন রাণীর গৌরব কতকাংশে অক্ষুন্ন রাখিয়া- ছেন। ইহাই দ্বিতীয় মহল। দ্বিতীয় মহলে ছাদে যাইবার একটি গােল সড়ী আছে। ইহার পরেই তৃতীয় মহল। ইহাতে ১টী প্রাণ ও নীচে উপরে অনেকগুলি গৃহ আছে। ইহা গণেশ বাবুর অংশে পড়িয়াছে। তার পরেই ৪র্থ ও ৫ম মহল। ইহা বলাই বাবুর অংশে ছিল তিনি স্বেচ্ছায় উহা সীতানাথ বাবুকে বিক্রয় করিয়া ইটালীতে যাইয়া পৃথক বাটা নির্মাণ করাইয়া বাস করিতেছেন। ষষ্ঠ মহলে একটা পুষ্করিণী ছিল। তাহা মৃত্তিকায় পূর্ণ করিয়া এখন উহাতে গৃহাদি নির্মিত হইয়াছে। সপ্তম মহালের অংশ বিশেষ গৃহ ও অ- শালা হইয়াছে। ইহাতে নূনাধিক ৩ শত গৃহ, ৬৮ী প্রাণ আছে। ১২২ সালে ইহার নির্মাণকাৰ্য্য আর হইয়া ১২২৮ সালে শেষ হয়। সার্জয় বিভূমিতে ৮'বৎসরে ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই কুঠি নির্মিত হয়। ইফাই “রাণী-সঙিফুট” নামে অভিহিত।

প্রথম খণ্ড এতদ্ব্যতীত উমাচরণ দাসের লেনে রাণী যদুনাথ বাবুর জন্য স্বতন্ত্র একটী বাটী নির্মাণ করান। দুঃখের বিষয়, জাবশায় যদুনাথ বাবুকে ঐ বাটীতে বাস করিতে হয় নাই। ইহার বহু বৎসর পবে রাণীর ৪র্থ কন্য জগদম্বা ১৫ নং মার্কেট স্ট্রীটে ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটী ৰাটী প্রস্তুত করান। তাহাতে এখন ঘারিকা বাবুর সন্তানেরা বাস করিতেছেন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ। রাজচন্দ্র বাবুর পরলােকগমন। এক দিন রাজচন্দ্র বাবু আফিস গাড়ীতে ভ্রমণ করিতেছিলেন, সহসা তাহার সর্দিগৰ্মী ভাব উপস্থিত হইল। সংজ্ঞাশূন্য হইয়া গাড়ীতেই হেলিয়া পড়িলেন ও মাত্র ইঙ্গিতে চালককে বাটী যাইতে আদেশ করিলেন । অনতিবিলম্বে গাড়ী আসিয়া বাটীর দ্বারে পৌছিল, দ্বারবান্ কৰ্মচাৰী শশব্যন্তে আসিয়া উপতে লইয়া পালঙ্কে রাজচন্দ্র বাবুর সংজ্ঞাশূন্য দেহ শায়িত করিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সহরের বড় বড় ডাক্তার, মান্য, গণ্য, সান্ত, ধনী, পরিচিত ব্যক্তিরা রাজচন্দ্র বাবুর পার্শ্বে আসিয়া উপস্থিত হই- বহু জনে বহু উপায়, বহু ঔষধ নির্বাচন করিলেন। রাস্তায়, বাটীর সন্ম খে, সিড়ীতে নীচে উপরে ঘাস, বিচালী, সতরঞ্চ, গালিচা বিছাইয়া দেওয়া হইল, যেহেতু গাড়ীর ঘর্ঘর শব্দে পদশকে রােগীর রােগ বাড়িতে পারে। বাণী কোষাগার উন্মুক্ত করিয়া দিলেন; কিন্তু সকল চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া রাজচন্দ্র বাবু বেলা ৫০ ঘটিকার সময় ১২৪৩ সালে ৪৯ বৎসর বয়সে ৩ কন্যা, ৩ জামাতা, ৪৫ দৌহিত্র ও দৌহিত্রী রাখিয়া অংশুবাত (Heat Appoplexy) রােগে দিব্যলােকে প্রস্থান করিলেন। তাঁহার পুত্রসন্তান ছিল না ; রহিল মাত্র কীর্তি, কীর্তিমতী পত্নী, আর রহিল নগদ ৬৮ লক্ষ টাকা। ৮ লক্ষ টাকা বেঙ্গল ব্যাঙ্কের শেষার, ২ লক্ষ টাকা প্রিন্সকে ঋণ ও ১ লক্ষ টাকা হক ডেভিডসন এণ্ড কোংকে ঋণ দেওয়া। রাণী আছাড়িয়া পড়ি লেন। রুনা যায়, ৩ দিন ৩ রাত্র রাণী অনশনে ধরাসনে ছিলেন। বলিয়াছি, • প্রথম খণ্ড। সময় বড় সুচিকিৎসক; সময়ে সকল শােক প্রশমিত হয়। 'রাণীরও সময়ে সে শােক প্রশমিত হইল। বর্ধমানের মহারাজের মত এককালীন ব্রাহ্মণকে শত বা সহ বিঘা ভূসম্পত্তি দান বা পুরুষানুক্রমে বৃত্তির ব্যবস্থা বা কাটের ভুপালের মত সহস্র স্বর্ণমুদ্রা বিনিময়ে কাশী নরেশের নিকট আত্মবিক্রয় না করিলেও বাজচন্দ্র বাবু তাঁহার সমমােচিত সাধ্যমত দানে দীন দুঃস্থ, অনাথ, আতুর, অন্ধ, পঞ্জ কত শত লােকের অভাব মােচন করিয়া ধরায় অমর হইয়া হইল। আছেন। শােকে দুঃখে এক মাস গত হইল। শ্রাদ্ধের দিন আসিল। শ্রাদ্ধের আয়ােজন হইতে লাগিল। বাগবাজারনিবাসী গুরুদেব রামসুন্দর চক্রবর্তী, পুরােহিত উমাচরণ ভট্টাচাৰ্য্য আর আর বহুলােক সমবেত হইয়া দানসাগর শ্রাদ্ধের ব্যয়-তালিকা প্রস্তুত করিলেন। শ্রাদ্ধ দিনে সােণার যােশ, বৃষােৎসর্গ ও তিলকাঞ্চন ইত্যাদি যথানিয়মে সমাধা হইল। বৃষ চিহ্নিত করিয়া ছাড়িয়া দেওয়া সংকীৰ্ত্তনসহ বৃষকাষ্ঠ গঙ্গাতীরে প্রােথিত করা হইল। নানা দিপেশাগত নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণপণ্ডিতগণ উপস্থিত হইলেন। বহুল পরিমাণে বনাত, কম্বল, তৈজস, বস্ত্রাদি ক্রয় ও বিতরণ করা হইল। প্রথম দিন শ্রদ্ধের উপকরণদিগর সজ্জিত হইলে, প্রাঙ্গণ পূর্ণ হই গেল ; ব্রাহ্মণেরা যোেহার কাৰ্য্য করিতে লাগিলেন। যাহার যাহা প্রাপ্য, তাহাকে তাহা দেওয়া হইল। পর দিবস ব্রাহ্মণ-ভােজন, মহা কোলাহলে রাজ অট্টালিকা আকুলিত করিয়া তুলিল। ভােজন শেষ হইলে, বিদায়ের সময় আসিল। মিষ্টান্ন, সদ্বত গােধুমচূর্ণ-পেটিকা, দধি, ক্ষীর, ব্যঞ্জন এক এক জনে প্রচুর লইলেন। রাণীর ‘অনুজ্ঞা ছিল যে, কে যেন মনঃক্ষুগ্ন না হয় ; তাহাই হইল। ব্রাহ্মণগণকে উপরূপ রাণী রাসমণি। দক্ষিণ ও দান করা হইল। ব্রাহ্মণ বিদায়ের পর কাঙ্গালী বিদায় আরম্ভ হইল। সেও এক বিষম ব্যাপার! তাহাও সম্পন্ন হইল। তার পরদিবস নিয়ম ভঙ্গ। উহাও সমারােহে শেষ হইল। সকল কাৰ্য্য সমাধা হইলে, আবার কাঙ্গালী-বিদায়ের ঘােষণা দেওয়া হইল। না জানি, কত লােকরই সেদিন সমাবেশ হইয়াছিল। অন্ধ, আতুর, অতিথি,খঞ্জ, দীন, দুঃস্থ, দুঃখী, বধির, ভাট, ভিক্ষু, পঙ্গু ইত্যাদি ইত্যাদি কতই না আসিল। আনু- মানিক ২৫/৩০ হাজাব কাঙ্গালী সমাবেশ হইল। জানবাজার ফ্রীল ট, সমস্ত স্থানে বংশদণ্ড ও রজ্জর সাহায্যে বন্ধনী দেওয়া হইল। বাটীতে কোথাও সুপাকার লুচি সজ্জিত রহিয়াছে, কোথাও স্তুপাকার বস্ত্র, কোথাও মিষ্টান্ন, কোথাও ব্যঞ্জন, কোথাও মৃৎপাত্র, কোথাও মৃন্ময় ভাণ্ড, কোথাও কদলী পত্র ইত্যাদির সমাবেশ রহিয়াছে। তৎপর উষাকালে কাঙ্গালী-বিদায় আরম্ভ হইল। ১টী মৃন্ময় পাত্রে করিয়া লুচি, সন্দেশ সন্দেশ ও মিষ্টান্ন, অন্য মৃৎ-ভাণ্ডে করিয়া ব্যঞ্জন, ১ পানি বস্ত্র ও অর্ধ মুদ্রা করিয়া সকলকে জান করা হইল। ইহার মধ্যে ইতরবিশেষ ছিল না। বাল বৃদ্ধ যুবা প্রৌঢ় প্রৌঢ়া সকলকেই সমানভাবে জান করা হইল। সারা দিন ও সারারাত্রি সমভাবে দানকাৰ্য্য চলিল। পরদিন প্রায় দেড় প্রহরের সময় দান কাৰ্য শেষ হইল। সকলেই রাণীয় জয় জয়কার করিতে করিতে ও আন্তরিক আশীর্বাদ করিতে করিতে আপনাপন স্থানে চলিয়া গেল। ইহার পর দিবস রাণী তুলট করেন। তাঁহার দেহের ওজনে তোলদতে রৌপ্যমুদ্রার পরিমাণ কৰা হয়। মােট ৬১৭ টাকা টাকা রাণীর • দেহের পরিমাণে হয়। এই মুদ্রা ব্রাহ্মণদিগকে দান করা হয়। একে একে 'ব্রাহ্মণগণ বিদায় লইলেন। শেষ এক জন সন্ন্যাসী কালিয়া উপস্থিত। ইনি আর কেহই নহেন, যিনি রাজচন্দ্র বাবুর প্রথম খণ্ড। ৩১ জীবদ্দশায় অকস্মাৎ দর্শন দিয়া, অযাচিতভাবে “রঘুনাথ জী” ঠাকুর * দিয় গিয়াছিলেন। রাণী তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করাতে সন্ন্যাসী পরিচয় দিলে রাণী বিশেষ সমাদর করেন। রাণী তাঁহাকে বলেন যে, তিনি তাহাকে কিছু দিবেন, কিছু না দিলে যেন ঠাহাব প্রাণে তৃপ্তি হয় না। তাহাতে সন্ন্যাসী হাসিয়া বলিলেন যে, “দে। চিজ গমকো দেনা, লােটা, আউর কম্বল।” সন্ন্যাসীর অনাসক্তি দেখিয়া রাণীর চক্ষে জল আসিল। একটা-লােটা ও একটা কম্বল তাহাকে দেওয়া হইল। তিনি রাণীকে আশী- বাদ করিলেন ও রঘুনাথ জীউ দর্শন করিতে চাহিলেন। রাণী সসঞ্জমে * একদিন বৈশাখ মাসের দ্বিপ্রহরে রাজচন্দ্র বাবু নিদ্রা যাইতেছিলেন। এমন সময়ে জনৈক সন্ন্যাসী আসিয়া উপস্থিত। সন্ন্যাসীর গলদঘর্ম হইতেছিল, বােধ হয় বহুদূর হইতে আসিয়াছেন। সন্ন্যাসীর উন্নত দেহ কুণ কিন্তু বলিষ্ঠ, মাথায় জটা, পরিধানে গৈরিক, গাত্রে গৈরিক বস্ত্রের আবরণ, নগ্নপদ ধূলি ধূসরিত। তিনি দেউড়ীতে আসিলেই খাবানের তঁাহার আগমন কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি রাজচন্দ্র বাবুর সঙ্গে দেখা করিতে চাহিলেন । দ্বারবানে প্রথমে অস্বীকার করিল, আপত্তি করিল, শেষে অনেক বাকবিতারপর অন্দরে দাসী দ্বারা সংবাদ দেওয়া হইল। রাজচন্দ্র বাবু বৈঠকখানায় আসিয়া সন্ন্যাসীকে উপরে আসিতে বলিলেন। তাহার অভিপ্রায় জানিতে চাহিলে, তিনি বলিলেন যে আমার নিকট রঘুনাথ জিউ ঠাকুর আছেন, আপনাকে দিব, আপনি উহার সেবা করিবেন, আপনার মঙ্গল হইবে, আমি বহু দূর দূর তথপৰ্য্যটনে যাইব, ফিরিব কিনা সন্দেহ। কারও কিছুক্ষণ কথা বার্তার পর রঘুনাথজী ঠাকুরটী সন্ন্যাসী রাজচন্দ্র বাবুকে দিলেন । উহা মাত্র অর্থ হস্ত পরিমিত বিষ্ণুমূর্তি। বিনিময়ে রাজচন্দ্র বাবু কিছু দিতে চাহিলে সন্ন্যাসী হাসিয়া বলিলেন “আমি দরিদ্র ভিক্ষুক নহি।” তিলা দেরী না করিয়া তিনি চলি গে। শশধাশে গকুর প্রতিষ্ঠা করা হইল। পরে এই মূর্তি চুরি যায়। সন্ধ্যাকালে আমায় সময় বিশাল বাটী বাদি-নিষনে মুখরিত হইয়া কি অনির্বচনীয় আনন্দ ও খ- ৩া মনে আনিয়া দিত।

রাণী রাসমণি।
উহাকে রঘুনাথ জীউ দর্শন করাইয়া প্রণত হইলে আশীর্বাদ করতঃ
সন্ন্যাসী বিদায় হইলেন।
শ্রাদ্ধে সমারােহ ব্যাপার নির্বাহ হইল।
দধিদুগ্ধে, পায়সে,
ক্ষীরে, বাঞ্জনে, মিষ্টান্নে বৃহৎ রাজ অট্টালিকা বাসের অনুপযােগী
হইয়া উঠিল। পুনরায় সংস্কার করা হইল। দাস, দাসী, দৌবারিক,
দেওয়ান, নায়েব, গােমস্তা, সরকার, কারকুন, ভাণ্ডাবী, পাচক ব্রাহ্মণবা
বই পরিশ্রমের পর বিশ্রাম লইল।

রাণী রাসমণি। দ্বিতীয় খণ্ড। প্রথম পরিচ্ছেদ। বিষয়-কাৰ্যাদি পরিদর্শন-ব্রহ্মচর্য্য। শতির পারলৌকিক জিয়া সমাপনান্তে বহু কষ্টে পতিবিমােগজনিত শােকাপনােদপূর্বক রাণী ব্ৰহ্মচারিণীর ন্যায় দিন যাপন করিতে লাগিলেন। প্রত্যহ প্রাতে শয্যা ত্যাগ করিয়া প্রাত্য সমাধা করিতেন; তদনন্তর পট্টবস্ত্র পরিধানপূর্বক ঠাকুর রঘুনাথ জীউকে প্রণাম করিয়া স্ফটিকের মালা লইয়া জপ করিতেন। একটী নােটা তুলসীর মালা তাহার গলায় থাকিত ; তাহার নিয়েই এক গাছি সােণার হার শােভা করিত। বৈরাগ্যের নিদর্শন ও কাঞ্চনের আসক্তি যেন উজ্জলে মধুরে মিশা- মিশি করিত। রাণীর পুত্রসন্তান ছিল না; চারিটা মাত্র কন্যা-সি'তীর রামচন্দ্র আটার সহিত প্রথম কলা পদ্মমণির ও প্যারীমােহন চৌধুরীর সহিত দ্বিতীয় কন্যা কুমারীর বিবাহ হয়। তৃতীয়া কন্যাকরুণাময়ীর সহিত মথুরামমােহন বিশ্বাসের বিবাহ হইয়াছিল, কিন্তু একটা মাত্র পুত্র সন্তান ; রাণী রাসমণি। রাশিয়া করুণাময়ী পরলােক গমন করিলে, চতুর্থ কন্যা জগদম্বার সহিত পুনঃ মধুমােহন বিশ্বাসের বিবাহ হয়। তিনটী জামাতাই বিশেষ সদ্গুণ- সম্পন্ন ও বুদ্ধিমান্ ছিলেন। তাঁহারা জানবাজারের বাটীতেই অবস্থিতি করিতেন। রাজচন্দ্র বাবু যে অতুল ঐশ্বৰ্য্য রাখিয়া পরলােক গমন করিয়াছিলেন তাহার রক্ষণাবেক্ষণকল্পে রাগ বিশেষভাবে বিষয়কর্মের ও জমিদারী হিসাবপত্রের কাগজ পৰ্যবেক্ষণ করিতেন। তাহার জামাতাগণের মধ্যে কনিষ্ঠ মথুরামােহন বিশ্বাস মহাশয় বিশেষ চতুর, কৌশলী ও ইংরাজী ভাষাভিজ্ঞ ছিলেন ; তিনি রাণীর দক্ষিণ হস্ত স্বরূপ সমস্ত কার্যের তত্ত্বাব- ধান করিতেন। এক সময়ে প্রিন্স দ্বারকা নাথ ঠাকুর কথা প্রসঙ্গে বলেন - সকল অতুল বৈ রক্ষণাবেক্ষণের জ একজন ম্যানেজার ৰাখিলে ভাল হয়, আপনি স্ত্রীলােক একিনী সকল দিক বজায় করিতে পারিকেন কি ? রাণী ফকনিকার অন্তরালে, মধ্যে মথুর বাবু; রাণী মনে মনে হাসিলেন ও বলিলেন, তুৰে তেমন বিশ্বাসী তােক পাওয়া দুষ্কর। হাতে প্রিন্স বলেন, আমাকে যদি ম্যানেজার করা হয়, তবে আমিই সকল দিক বজায় রাখি।'. রাণ বলেন-সে ত খুব গল কথা। আমি এখনও জানিতে পারি নাই যে কোথা, কাহার নিকট, কি কি পাওনা আছে ; তবে জানিতাম আমার স্বামী কে দুই লক্ষ টাকা ঋণ দিয়া ঘা, সেই লকা যদি এখন গয় যায়, তবে আমার বিশেষ উপকার হয়? প্রিল বলিলেন-- সে টাকা আমি শীগ্রই দিব কল্য বিবেচনা করিম ও বিষয় বলিক পকিন প্রিন্স আসিলে আবার কথা বার্তা হইতে দ্বিতীয় খণ্ড। লাগিল। প্রিন্সই প্রথমে বলিলেন-“উপস্থিত আমার নিকট টাকা নাই, তবে যদি বলেন আমার একখানি তালুক ঐ টাকার পরিবর্তে লিখিয়া দিতে পারি। রাণী বলেন—ঐ সম্পত্তির বার্ষিক আয় কত ? প্রিন্স উত্তর করিলেন—‘শালিয়ানা ৩৬ হাজার টাকা, মূল্য হিসাবে দুই লক্ষ টাকার অধিক। রাণী সম্মত হইলে প্রিন্স রংপুর দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত পরগণা স্বরূপপুর তালুক লিখিয়া দেন। বর্তমানে তাহার আয় বার্ষিক ৬৩ হাজার টাকা। কিছুদিন গত হইলে প্রিন্স রাণীর নিকট ম্যানেজার নিয়ােগের কথা উপস্থাপিত করিলে রাণী চতুর জামাতা মথুর বাবুর দ্বারা বলিলেন- -আমি বিধবা স্ত্রীলােক, আমার এই সামান্য বিষয়, আপনার মত যােগ্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে তত্বা বধান করিতে বলা আমার ধৃষ্টতা মাত্র। আমার পুত্রস্থানীয় ভাবা উত্তরাধিকারী জামাতারাই ইহার কার্য পরিচালনা করিবেন। প্রিন্স কৌশলে পরাজিত হইলেন, বলিলেন-“উত্তম, বুঝিলাম রাণী সামান্য স্ত্রীলোেক নহেন। বিষয়াদি রক্ষণে এত তীক্ষবুদ্ধি না হইলে কি একজন শ্রীলােক এত সম্পত্তি ভােগ করিতে পারিতেন। প্রতিদিন পূৰ্ব্বাহে জমিদারী ও অন্যান্য বিষয় সংক্রান্ত মতামত প্রকাশ, আদেশপত্রে স্বাক্ষর, হিসাব পরিদর্শন, কর্মচারী নিয়ােগ প্রভৃতি কাৰ্য্য সম্পন্ন হইত। কাগজ পত্রে রাণী রাসমণি স্বয়ং সহি করিতেন। মধুমােহন সকল কাৰ্যই একরূপ সমাধা করিতেন, তবে কেবলমাত্র রাণীর সহিত পরামর্শ ও স্বাক্ষরের প্রয়ােজন হইত। বেলা দ্বিপ্রহরের সময় রঘুনাথ জীউর প্রসাদী ফলমূল প্রভূতি আহারের পর বিশ্রাম করিতেন। অপরাহ্নে আবার বিষয়কর্মের আলােচনা করিয়া রাণী রাসমণি। সন্ধ্যার সময় দেবানায় নিযুক্ত হইতেন। আৰ্য বিধবা ব্রহ্মচর্য অবলন কবিয়া এইরূপে পবিত্র পুণ্যময় জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন। বাণীর নিকট ব্রাহ্মণ পণ্ডিতবর্গের বিশেষ আদর ছিল। তিনি আৰ্য্য শাস্ত্রেব আললাচনা ও পুথি পুরাণাদি পাঠ ও কথকতা শ্রবণ করিতে অত্যন্ত ভাল বাসিতেন। তঁাহার বাটিতে পণ্ডিতগণ শাস্ত্রের বিধি নিষেধাদি সম্বন্ধে সময়ে সময়ে আলােচনা করিতেন; তিনি ঔৎসুক্য সহ- কাবে তাহা শুনিতেন ও তদনুসারে স্বীয় কর্মময় জীবন অতিবাহিত কবিতে চেষ্টা কৰিতেন। একদিন পণ্ডিতেরা কথা প্রসঙ্গে সহমরণ ও ব্ৰহ্মচর্যের শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধ সম্বন্ধে এইরূপ আলােচনা করিতেছিলেন- “আর্য জাতির বিধিদাতা ভগবান মনু বলেন- “মৃতে ভরি সাধ্বী স্ত্রী ব্ৰহ্মচর্যে ব্যবস্থিত। স্বর্গং গচ্ছত্যপুত্রাপি যথা তে ব্রহ্মচারিণঃ ॥” অর্থাৎ অপুত্রক হইলেও সাধ্বী বিধবা স্ত্রীগণ ব্রহ্মচর্য বলে ব্রহ্মচারীব প্রায় স্বর্গে গমন করেন। অন্যান্য সংহিতাতেও ঐ ভাবের কথা আছে। সংহিতাকারগণ সহমরণ ও ব্রহ্মচর্য দুই পথই প্রশস্ত বলিয়া গিয়াছেন। পুরাণাদি শাস্ত্রেও উভয় পথই প্রশস্ত বলিয়া উল্লিখিত আছে। মনুসংহিতায় ব্রহ্মচর্যের প্রাধান্য কীর্তিত হইলেও সত্য ত্রেতা দ্বাপর যুগে সহমরণ প্রথা প্রচলিত ছিল। সর্বপ্রথম যে স্বায়ম্ভুব মন্বন্তর সেই মন্বন্তরেই স্বায়ম্ভুব মনু-বংশীয় রাজচক্র- নী পৃথুর মহিষী অর্চি সহমৃতা হইয়াছিলেন। এই পৃথুর নামেই পৃথী বা পৃথিবী নামের উৎপত্তি। রামায়ণে বহু সতীর সহমরণের প্রসঙ্গ আছে, কিন্তু দশরথের মৃত্যুর পর তাহার ভাৰ্যাগণ ব্রহ্মচর্য ব্রত অবলম্বন করিয়া ছিলেন। কোশল্যা দেবা সহমরণের জন্য প্রস্তুত হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু তা হন নাই। এঞ্চেয় আট জন প্রধান মহিষী মাত্র সহমৃতা দ্বিতীয় খণ্ড। হইয়াছিলেন। মহাভারতে মহারাজ পাণ্ডুর উভয় পত্নীর মধ্যে কনিষ্ঠা মাদ্রী সহমৃতা হইয়াছিলেন, কিন্তু কুন্তী ব্রহ্মচারিণী হইয়া পুত্রগণের রক্ষণাবেক্ষণ ও লালন পালন করিয়াছিলেন। অনেকের মতে ব্রক্ষচৰ্য্যই শ্রেষ্ঠ বলিয়া বিবেচিত হয়। কেন না সহমরণাপেক্ষা ব্ৰহ্মচর্যের কঠোর অধিকতর। সহমরণে দেহ পুড়িয়া ছাই হইয়া যায়—পার্থিব জ্বালা যন্ত্রণা কুরাইয়া যায় ; আর ব্রহ্মচর্য সে হিসাবে তুষানল। ব্রহ্মচর্যে আজীবন আলাযন্ত্রণা ভােগ করিতে হয়। ব্ৰহ্মচর্যে জগতের হিতসাধন হয়। বিধবা যদি ঐশ্বৰ্য্যশালিনী হন, তঁাহার ব্রহ্মচর্য হেতু তাহার ঐশ্বর্যের—অর্থের সদ্ব্যবহারে জগতের বহু উপকার হইতে পারে। এ সংসারে পুণ্যবতী ব্ৰহ্মচারিণী বিধবাদিগের দ্বারা কত সদনুষ্ঠান হইয়া থাকে তাহার কি ইয়ত্তা করা যায় ? তদ্ব্যতীত যদি বিধবা পুত্রকন্যাবতী হন, আর সেই পুত্র কন্যা যদি অপােগণ্ড শিশু হয়, তাহাদিগকে সংসারে ভাসাইয়া দিয়া স্বামীর সহগমন করিলে, জননীর সন্তান পালন ধর্মে বিঘ্ন ঘটে। সহ- মরণে কামনার প্রভাব, আর ব্রহ্মচর্যে নিষ্কাম কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান। পতির পরলােকের পর ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া রাণী রাসমণিও অনুদান, জলদান, তীর্থ সকল পৰ্যটন, ধৰ্ম্মকাৰ্যের অনুষ্ঠান প্রভৃতি সমাপ্ত করতঃ পবিত্রভাবে জীবন যাপন করিয়া যে সুষশ ও সুনাম অর্জন করিয়া গিয়াছেন, আজিও বঙ্গের আবালবৃদ্ধবনিতার মুখে তাহার প্রবাদ শুনিতে পাওয়া যায়। উত্তর কালে পুণশীলা রাণী রাসমণি যে ভাবে দেবসেবায় মনপ্রাণ সমর্পণ করিয়াছিলেন তাহার প্রকৃষ্ট পরিচয় এখনও দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গাতীরবর্তী দেবালয়ে দেদীপ্যমান রহিয়াছে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। রথযাত্রা উৎসব। সন ১২৪৫ সালে রথযাত্রা উৎসব করিবার জন্য রাণীর মানস হয়। তিনি তাঁহার কনিষ্ঠ জামাতা ময়ুব বাবুকে উহার উদ্যোগ ও আয়াে জন করিতে বলেন। বাঙ্গলায় নানা স্থানে নানাপ্রকার রথ আছে কিন্তু রাণীর ইচ্ছা যে দারুময় রথ না করিয়া ধাতুম রথ করেন। মথুর বাবুর সঙ্গে একমত হইয়া রৌপ্যময় রথ করিবাব স্থিব হইল। মথুব বাবু বলিলেন যে অনুমতি করেন ত বিখ্যাত জহুরী হামিণ্টন কোম্পানী দাবা রথ প্রস্তুত করাইলেই উত্তম হয়। তাহাতে রাণী বলেন যে কেন আমাদের দেশীয় কারিগর দ্বারা রথ প্রস্তুত কবান হউক, সিতী ও ভবানীপুরে বহু উত্তম কারিগর আছে, তাহাদিগকে বঞ্চিত কবিয়া কোন বিদেশীয় কারিগর দ্বারা কাৰ্য্য করান আমার ইচ্ছা নহে। আমাদের দেশের শিল্প কাৰ্য্য, বিশেষ দেবতার কাৰ্য, আমাদের দেশের লােকে না করিয়া বিদেশী লােকে করিবে কেন? সিতী ও ভবানীপুর হইতে উত্তমােত্তম কারিগরদিগকে আনাইয়া, বেতন ধার্য্য করিয়া, বাটীতে রাখিয়া কাৰ্য্য আরম্ভ করিয়া দেওয়া হউক। তাহাই কইল ; সিতী ও ভবানীপুর হইতে কয়েকজন ভাল ভাল কারিগর আনাইয়া শুভদিন দেখিয়া রথ প্রস্তুত করান হইতে লাগিল। সেও এক বিরাট ব্যাপার। তাহাদের বাসস্থান, আহাৰ্য ইত্যাদি সকলই সরকার হইতে দেওয়া হইতে লাগিল। দুইজন ধর্মভীরু, বিশ্বাসী কর্মঠ কর্মচারীব উপর ভৌপ্য ব্যয়ের হিসাব রাখিবার ভার দেওয়া হইল। দিবারাত্র দ্বিতীয় খণ্ড। পরিশ্রম করিয়া আষাঢ় মাসে রথ প্রস্তুত হইল। মান যাত্রার দিন মহাধুম ধামে রথ প্রতিষ্ঠা করা হইল। বহু ব্রাহ্মণ ভােজন ও বিদায় দেওয়া হইল। মোট ১২২, ১১৫, টাকা ব্যয় হইল। মা সমারােহে মহানগরী কলি- কাতার রাজপথে জন সাধারণের নয়নানন্দকর নৌপ্যময় বুধ বাহির হইল। রার জীবনকালে কয়েক বৎসর খুব ধূমধামে উৎসব হইয়াছিল। গােযানে রৌসন চৌকি, সানাই, ঢাক, ঢােল, কাড়া, নাগরা, বশী, জগঝম্প ইত্যাদি শতাধিক বাদ্যকর গণ শব্দে দিক মুখরিত করিয়া চলিত। শতাধিক উড়িষ্যা দেশবাসীর সুমিলিত সঙ্গীত, তৎ পশ্চাতে বাউলের দল, যাত্রার দল, বালক সঙ্গীতের দল, সংকীৰ্ত্তন সম্প্রদায়, ভাড়ের দল, নানাবিধ রং, তামাসা, পুলিকার নাচনির দল ; তৎপরে বাগবাজারের সখের নাম গান। বাগবাজারের হাফ আকড়াইয়ের দলের নাম জাদা দোহার গণ আসিতেন। ইহাদের অন্ত মাসাবধি কাল পূর্ব হইতে বাটীতে গান সাধ যাতায়াতের, জলযােগের, তাম্বুল, তাম্রকূট ইত্যাদির ব্যয় বহন করা হইত। তাহার পশ্চাতেই গােয়ালটুলীর সখের দলের নাম গান। মধুসূদন দাস ও লােক নাথ হােড় প্রভৃতির তত্বাবধানে এই সখের দল বাহির হইত। রথযাত্রা ও পুনর্যাত্রা উপলক্ষে প্রতিবৎসর ২ হইতে ৩ মণ হিসাবে যুঁই ফুলের মালা গড়ে) খরিদ করা হইত। উহা হরি সংকীর্তন ও সখের দলের গায়ক দিগকে দেওয়া হইত। তারপর রথের সমখে রাণীয় গুরুদেব স্বর্ণছল তলে নগ্নপাদ জামাতাদিগের সমভিব্যাহারে মাকারে পগিবেষ্টিত, গদ ও চেলী পরিত ও উপৰীতাকারে উত্তরীয় বক্ষে বিলম্বিত, বদনে কপালে চন্দনচর্চিত গলায় ফুলমাল, তুলসীমালা, স্বর্ণহার শােভিত হইয়া চলিতেন তাহাদের পশ্চাতে নায়েব দেওয়ান, সরকার, গােমন্তা, ঐরূপ যাইতেন, সঙ্গে সঙ্গে দাসগণ আড়ানিতে ব্যজন করিতে,কাতে ।

৪০ রাণী রাসমণি। কবিত। বাইতেন। তাহাবাও নববস্ত্র পরিহিত, নব উষ্ণীষ শােভিত, হইয়া প্রসন্নমনে চলিতেন। মধ্যে মধ্যে গােলাপ-পাশ গােলাপ-বারি উদগীবণ করিয়া সৌরভে দিক আমােদিত ও দেহে পতিত হইয়া দেহমন্তক স্নিগ্ধ ৪৫ শত লােক রথ রঞ্জু ধরিয়া বথ বহন করিত, রঘুনাথ জীউ বথে আসীন হইতেন। সাহাবই পশ্চাতে দ্বিচক্রযান, চতুশ্চক্রযান, ঘুড়ী চৌঘুড়ী, নানাবিধ যানে রাণীর দৌহিত্র দৌহিত্রীগণ নগ্নপাদ, নব- বস্তু-ফুলমালা-শােভিত, তিলক-খচিত, চন্দন চর্চিত হইয়া যাইতেন। সারি সারি গােযানে করিয়া এরও তৈল, শুক নারিকেল শস্য, বাত্রে আলােকের জন্য আলােকাপার, প্রস্তুত তাম্বুল, তাম্রকূট, হুকা, গড়গড়া, ফসী, ও একটি বৃহৎ মৃৎপাত্রে করিয়া অগ্নি বাহিত হইত। এতদর্থে ১০/১২ খানি গােষান চলিত। সকল যানেব পার্শ্বেই দৌবাবিক উলঙ্গ তববার বংশষ্টি লইয়া সাবধানে প্রহরায় নিযুক্ত। পুরােভাগ হইতে অন্তঃসীমা পর্যন্ত স্কুল রজ্জবদ্ধ বংশদণ্ড সমন্বিত হবিনামাঙ্কিত লােহিত পতাকা পত কে রবে উড্ডীয়মান থাকিত। এইভাবে অর্ধক্রোশব্যাপী পথ জুড়িয়া রথ চলিত। সঙ্গীতে, বা®ে, কোলাহলে, হরিবোলে দিক মুখরিত হইত। মধ্যে মধ্যে বিরাম ও পােনােদন, তাম্বুল ও তাম্রকূট সেবন, নাম গান হইত, পুনরায় চলিত। রথ আয়তনে ক্ষুদ্র হইলেও চক্র চতুষ্টয় ব্যতীত সকলই রৌপ্যময়। সুতরাং অভিনব সামগ্রী দেখিবাৰ জস্য দেশ বিদেশ হইতে লােক সমাগত হইত। তখনকার দিনে রথ- যাত্রা ও পুনর্যাত্রা উপলক্ষে অষ্টাই কালব্যাপী উৎসবে রাণী নূনপক্ষে আট হাজার টাকা প্রতি বৎসর ব্যয় করিজেন। এই উপলক্ষে আত্মীয় কুটু সকলকে বাটীতে নিমন্ত্রণ করা হইত ও পরম পরিতােষ সহকারে অষ্টাহ কাল পান ভােজনে তুষ্ট করা হইত। এক বৎসর রাণী সহরের সাঃ সাহেবনিগকে নিমন্ত্রণ কবিপ্না

দ্বিতীয় খণ্ড।
৪১
১টী ভােজ দেন ও পরিপাটী রূপে বাটী সজ্জিত করেন। সাহেব, মেম,
সকলে বাটী দেখিয়া বড়ই সন্তুষ্ট হইয়া বলিয়াছিলেন--“Our eyes
never met such a gorgeous, pompous extraordinary
occasion like this.

তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ; দুর্গোৎসব। পূর্বে রাজচন্দ্র বাবুর সমষেও দুর্গোৎসব হইত; তবে রাণী বিধবা याब পর হইতে বিশেষ জাকজমকে ও ধুমধামের সহিত পূজা হইতে লাগিল। পূর্ববঙ্গে বাণী ভবানীর দুর্গোৎসব ব্যতিবেকে জক্ষিণবঙ্গে রাণী রাসমণির দুর্গোৎসবেব মত দুর্গোৎসব বােধ হয় আর কোথাও হইত না। পূজার বস্ত্রাদি, ব্ৰতী ব্রাহ্মণদিগের জন্য গব- দেব জোড়, গুরুদেব ও পুরােহিতের জন্য বেশি জোড়, কন্যা, জামাতা, দৌহিত্র, দৌহিত্রীদিগের জন্য নববন্ত্র, উত্তরীয় ; সরকাব, গােমস্তা নায়েব, দেওয়ান, কারকুন, চোপদার, দৌবারিক, ফরাস, ভাণ্ডারী, দাস, জাসী, পাচক, পূজারীব্ৰাহ্মণদিগের জন্য যথাযােগ্য বস্ত্ৰ, উত্তৰীয়, অমার্জনী, মুরাঠা, তাজ, সাটী ; আত্মীয়াকুটুন্দিনীদিগের জন্য সাচী, সিন্দুর; কুমারী সধবাদিগের জন্য সাটী শাখা, সিন্দুর, বিষ্ঠাখী ব্রাহ্মণ বালকদিগের জন্য ধুতি, উড়ানি, বহুল পরিমাণে ক্রয় করা হইত। দৌবারিকদিগেকে বসিস দেওয়া, অধস্তন কর্মচারীদিগকে প্রতিমার দক্ষিণাদানের জন্য টাকা দেওয়া হইত, দৌহিত্র দৌহিত্রী- দিগকেও প্রণামী দিবার জন্য টাকা দেওয়া হইত। পুজার সময় ১০/১২ হাজার টাকা নিয়মিত বার্ষিক দেওয়া হইত। ২২/২৩ হাজার খরিদ করা হইত। প্রতিমার পূজায় ১০ হইতে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হইত। ভােজনের ব্যয়ও প্রায় ১৫/২০ হাজার টাকা সর্ব সমেত মােট ৫৭ হইতে ৬০ হার টাকা ব্যয় হইত। ৫৭ শত সধবা গিকে সাটা শাখা, সিন্দুর দেওয়া হইত। কুমামীদিগকে (সংখ্যায় ১০০০ ।

দ্বিতীয় খণ্ড। ১২০০ হইবে) নববস্তু পরাইয়া পরিতােষপূৰ্ব্বক ভােজন করান হইত। জগজ্জননীর আগমনে, আনন্দময়ীর অধিষ্ঠানে, দিবসয় ব্যাপিয়া বাদ্যকােলে, দাসদাসীর কোলাহলে, দৌহিত্রদিগের আনন্দগােলে,ব্রাক্ষণদিগের দীং ভােজ্ঞতাং রবে, নিমন্ত্রিতদিগের আগমনে, বৃহৎ ভবন আনন্দ হিল্লোলে প্রবাহিত হইত। পূজার পূর্ব হইতে এক পক্ষ কাল ৰােখন হইত দেবীর পূজাবসানে অষ্টাহব্যাপী আমােদ ব্যসনে পর্যবসিত হইত। কোন দিন দাশুরথী রায়ের পাচালী, কোন দিন গােবিন্দচন্দ্র অধিকারীর যাত্রা, কোন দিন হাফ, আকড়াই, কোন দিন ফুল আকড়াই, কোন দিন বালক সঙ্গীত ইত্যাদি প্রকার নানাবিধ আমােদ মােন হইত। এক বৎসর দুর্গাপূজার সময় ষষ্ঠীর দিন প্রত্যুষে ব্রাহ্মণগণ যখন লােক জন সমভিব্যাহারে বাদ্যবােলে দিক কম্পিত করিয়া নবপত্রিকা স্নান করাইতে যাইতেছিলেন, তখন কোন সাহেব বাবুলােডের পার্শ্ববর্তী অট্টালিকার নিদ্রিত ছিলেন, তাহার নিদ্রায় ব্যাঘাত হওয়াতে তিনি বাদ্য শব্দ করিতে নিষেধ করেন। কে তাহা শুনে? সাহেব অচিরে পুলিসে দরখাস্ত দেন ও সঙ্গে সঙ্গে নিজে যাইয়া এ বিষয়ের প্রতিবিধান করিতে বলেন। তৎপর দিবস রাণী আরও অধিক বার সঙ্গে দিলেন, এইরূপে মহা আড়ম্বরে পূজা সমাধা হইল, তিন দিন কাটিল, পূজা শেষ হইলে রাণীর নিকট নিষেধ সূচক পত্ৰ আসিল। ক্রমে মােক বাধিল। রাণী উত্তমােত্তম লােক বন্দোবস্ত করিয়া রাজচন্দ্র বাবুর কত গ্যারিজন অফিসারের মঞ্জুর করা দলিল পত্র লইয়া কোর্টে পাঠাইলেন ও বলিয়া দিলেন—“আমার রাস্তা, আমি ধাহা ইচ্ছা কৰি, ইহাতে সরকার বাহাদুর বাধা দিলে আমি যে ব্যয়ে রাস্তা-করিয়াছি তাহার দ্বিগুণ ব্যয়ে উহার উচ্ছেদ করিয়া দিব।” তুমুল মােকদ্দমা বাধিয়া-গেল। শেষ ফল হুকুম অমান্য করার জন্য রাণীর ৫০ টাকা জরিমানা। রাণী ছাড়িবার ৪৪ রাণী রাসমণি। পাত্ত নহেন, জরিমানার টাকা দিয়াই বড় বড় গরাণ কাঠ দিয়া জান- বাজারের বাটী হইতে বাবুঘাট পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে দৃঢ়রূপে বেড়া দিয়া অন্য রাস্তার যাতায়াতের পথ বন্ধ করিয়া দিলেন। সরকার হইতে কড়া তাগাদা আসিল-“বেড়া খুলিয়া লওয়া হউক।” রাণী বলিলেন- “আমার রাস্তা সরকারের প্রয়ােজন হয়-আমাকে উচিত মূল্য দিলে রাস্তা ছাড়িয়া দিব, নচেৎ নহে।” মহা গণ্ডগােল বাধিয়া গেল। সারা বঙ্গে রাণীর নামে জয় জয়কার পড়িয়া গেল। তখন কোম্পানী অনুবােধ করিয়া রাস্তা খােলাইলেন। রাণীর প্রতিজ্ঞা রহিল। জরিমানার টাকা ফেরত দেওয়া হইল। রাণী ঐ রাস্তা বরাবর আসে রাখিয়াছিলেন। এই ঘটনা লইয়া সাধারণে রাণীর নামে ছড়া বাঁধিয়াছিল— “অষ্টঘােড়া গাড়ী দৌড়ায় রাণী রাসমণি। রাস্তা বন্ধ কত্তে’ পাল্লেনা কোম্পানী।” সকল বিবাদ মিটিয়া গেল, এই সময় হইতে সময় নির্ধারিত করিয়া সরকার হইতে পাইবার প্রথা হইল। ইহা হইতেই পাশের সৃষ্টি রি দিন বহু দূর দূর হইতে কুস্তিগীর আসিত। বল পরীক্ষা করা হইত। তাহাতে ১০২০৫০, এমন কি २०० টাকা পর্যন্ত পারিতােষিক দেওয়া হইত। জেতা ব্যক্তি যাহা পাইত পরাজিত তাহার এক চতুর্থাংশ পাইত। ধৃত ও সিন্দুর লেপন করিয়া একটা শীর্ষবিহীন ডাব ফেলিয়া দেওয়া হইত, এবং বলে যে সকলকে পরাজিত করিয়া লইতে পারিত সে ১০ টাকা পুরস্কার ও একখানি বন্ত্র পাইত। সে সময়ে কত দর্শক আসিত। কত উৎসাহ লােকের মুখে দেখা যাইত। কি আনন্দের দিনই যে কালের গর্ভে লীন হইয়াছে।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
লে বিদায়
দোল ও রাসােৎসব।
দেওয়া
রঘুনাথ জীউ ঠাকুরের দোল ও রাসােৎসব হইত যে দে
সে বুঝিবে না, দোলের সময় কি বিরাট ব্যাপার হইত। গাে
বিখ্যাত গায়ক জোয়ালাপ্রসাদ আসিয়া সন্ধ্যার পর ।
র, পূর্বরাগ,
লকে আনন্দিত
সকলকে গানে পরিতৃপ্ত ও মােহিত করিতেন। তেমন গা
* একটা খেলা
ভারতে জন্মিবে না।
দিকে দুই জন
দোলের দিন প্রাতঃকালে রঘুনাথ জীউকে ঠাকুর
অন্যের গতি
ও মঞ্চোপরি স্থাপন করা হইত। রাণীর জামাতাগণ গান ও পট্ট
করিয়া অগ্রে অগ্রে গঙ্গাজল বর্ষণ করিতে করিতে আসিতেন
পুরােহিত ঠাকুর লইয়া আসিতেন। তাহার অভিষেক কাৰ্য্য সন্ন
হইলে সকলে ঠাকুর প্রণাম, ব্রাহ্মণ গুরুজনকে প্রণাম, প্রণামী প্রদান
ও দোলের পাৰ্বনী লইয়া দোল খেলিত। ১৭১২টা গােযাৰে করিয়া
পিচকারি, ফাগ, আবীর, কুমকু, নানাবিধ চিনির খেলনা আসিত।
নববস্ত্র, পাৰ্বনী, পিচকারী, রং সকলকে দেওয়া হইত। ফাগ, আবীর,
কুকু, অন্দরে বাহিরে স্তরে স্তরে রাখা হইত। যাহার যত ইচ্ছা লইত,
মাখিত, খেলিত, পরস্পরের অঙ্গে দিত, কাহারও নিষেধ ছিলনা। কেহ
কাহাকে কুমকুম্ মারিত, কেহ কাহাকে পিচকারি দিত, রং গােলাপজলে
সিক্ত থাকাতে সৌরভে দিক আমােদ করিত। অন্তঃপুরে, বাহিরে,
উপরে, নীচে, ভিত্তিগাত্রে, প্রাঙ্গণে যে দিকে দৃষ্টিপাত করলে পাল

রাণী রাসমণি। হইয়া যাইত।' দোলের পর মাসাবধি কাল জানবাজারের রাস্তা লাল রক্তে রঞ্জিত হইয়া থাকিত। বাটীতে ভিতরে, উপরে, নীচে এত ফাগ, আবির পড়িয়া থাকিত যে সপ্তাহকাল ফাগের উপর দিয়াই সকলে যাতা- স্নাত করিত। কেহ কেহ বা অঞ্চল ও দুকুল ভরিয়া ফাগ লইয়া যাইত। পুনঃসংস্কার না করিলে বাটী বাসােপযােগী হইত না। সর্বোপবি ছদীবারিকদিগের আমােদ অত্যধিক। লাল রঙ্গে রঞ্জিত হইয়া নানাবিধ বাণীসহযােগে গান করিত। কোলাহলে আকুল করিত। কয়েক দিবস করিয়া বাইত না। মনে হইত যেন নিবৃত্ত হইলেই রক্ষা পাওয়া যায়। ফেবত দেওকহ অভুক্ত থাকিত না। রাস্তার ধারে ধারে নানাবিধ এই ঘটনা লইয়া সামগ্রী, শিশুদিগের মন ভুলান সামগ্রীর বাজার বসিত। “অষ্ট, বন্দোবস্ত ছিল। বাস্তানের মত রাসের দিনেও রঘুনাথ জিউকে ঠাকুর দালানে সকল বিবইত। ঠাকুরের সম্মুখে নানাবিধ নয়নরঞ্জন সাজ সজ্জিত সরকার হই’আলােকিত, গন্ধদ্রব্যে দেবস্থান ও অট্টালিকা আমােদিত সম্মুখে প্রমাণ মােমের কদম্ব বৃক্ষ, তাহাতে মােমের ফুল ও ফল, হন সজীব বলিয়া ভ্রম হইত। উপরে জাল দেওয়া হইত, জালে সােলার নানাবিধ কৃত্রিম পশু, পক্ষী, ফল, ফুল সজ্জিত থাকিত। উপরে ও নীচে ঘামের গাত্রে লাল সালু মােড়া, মকমলের ফুলগাছ, তাহাতে লৌহতার বিস্ত করা; ফুলসমেত তার, মাঝে মাঝে চুমকির কাজ থাকাতে রাত্রিতে বােধ হইত যেন প্রকৃত বৃক্ষে খদ্যোত সমাবেশ হইয়াছে, দিবাভাগে খধূপ প্রকাশ পাইলে সে দৃশ্য অপসারিত হইত। হিম, বৃষ্টি, রৌদ্র জন্য আবরণ স্বরূপ উপরে পাল দেওয়া হইত। উপরে নীচে চারিদিকে নিমন্ত্রিত গগের আসনের স্থান ইত। আতর, গােলাপ, পুষ্প, মাল্য, ভাত, তাম্রকুট, প্রভৃতি প্রদানে সকলকে পরিতােষ করা হইত ও দ্বিতীয় খণ্ড। শেষ চৰ্ব চোষ লেহ পেয়, সদ্বত গােধূম-চুর্ণ-পেটিকা, দধি-দুগ্ধক্ষীর, মিষ্টান্ন দ্বারা ভােজন কমান হইত। বহু ব্রাহ্মণ দিগকে নিমন্ত্রণ করা হইত ও ২ টাকা হইতে ১৬ টাকা পর্যন্ত যােগ্যতানুসারে মর্যাদা ও বিদায় দেওয়া হইত। এক খানি করিয়া আসন, একটী সদ্বীপ দ্বীপাধার প্রত্যেক ব্ৰহ্মণকে দেওয়া হইত, তাহার সন্ধার পর হইতে অন্ধ রাত্রি পর্যন্ত দালানে বসিয়া রাসপাধ্যায় পাঠ করিতেন। তৎপর এক এক জন ব্রাহ্মণকে এক একটি মৃন্ময় পাত্রে করিয়া জলযােগাৰ্থে মিষ্টান্ন দেওয়া হইত। তিন দিন কাল পূজা পাঠ করিয়া চতুর্থ দিনে সকলে বিদায় লইতেন। গােবিনা অধিকারীর এ ক্ষেত্রেও বাঁধা আসর, পূর্বরাগ, মান, বিরহ, গােষ্ট, মাথুর, মিলন, একে একে শুনাইয়া সকলকে আনন্দিত করিতেন। অন্যান্য নাচ তামাসাও হইত। শেষ দিন একটা খেলা হইত, একটী বাস্কে ১০, ১২, টাকা রাখিয়া প্রাঙ্গণে দুই দিকে দুই জন সচতুর লাঠীয়াল লাঠী খেলিত, খেলিতে খেলিতে কৌশলে অনন্যর গতি রােধ করিয়া যে বাক্স লইতে পারি তাহারই জয় হইত। জেত ব্যক্তি বা সমেত মুদ্রা পাইত ও পরাজিত ব্যক্তি মাত্র যাতায়াতের পাথেয় পাইত। ইহা দেখিতে না জানি কত লােকেরই সমাবেশ হইত। দূর দূর হইতে সানাই, বাঁশের বাঁশি, শুনাইতে বহু লােক আসিত ও পুরস্কার পাইত। জন্মাষ্টমীর পর নন্দোৎসবের দিন দধিকর্দমের বিশেষ আমােদ হইত। বড় বড় পালােয়ান, খ্যাতনামা কুস্তিগীর আসিত ও বল পরীক্ষা হইত। লক্ষ্মী পূজায়, সরস্বতী পূজায়, কার্তিক পুলার জগন্ধাত্রী পূজায়, সকল সময়েই সমারােহকাণ্ড ও বহু অর্থব্যয় হইত। এতদ্ব্যতীত বাটীতে উৎসব ত লাগিয়াই আছে, লোেক কানের দাসদাসীর কল কল রবে, বালক বালিকাদের হাস্য কনের ঝোলে, । বাসন্তী পূজায়, ৪৮ রাণী রাসমণি। কর্মচারীদিগের কাৰ্যব্যপদেশে গমনাগমনে ঘৌবারিকদিগের কথাবার্তার বাটী সৰ্বাদাই ক্ষুব্দ সাগর তরঙ্গবৎ প্রতীয়মান হইত। আজ প্রতরাম বাবুর বাৎসরিক,কাল হরেকৃষ্ণ দাস মহাশয়ের বাৎসরিক, পরশ্ব রাণীর শত্রু- ঠাকুরাণীর বাৎসারিক, তৎপরদিবস রাণীর মাতাব বাৎসরিক শ্রাদ্ধ, কোন মাসে কোন কন্যার সাধভক্ষণ, কাহারও অন্নপ্রাশন, কাহারও নামকরণ, কোন বৈবাহিকেব বাটী ভেট প্রেরণ, কোন দিন কোন সাহেবকে উপ- ঢৌকন প্রদান, কোন দিন কোন তালুক হইতে দ্রব্য সম্ভার সংগ্রহ কোন দিন রাণীর কোন তীর্থগমন ও তাহার উদ্যোগে বিরাট ব্যাপার ; এইরূপে সর্বদাই সকলে শশব্যস্ত থাকিত।

Estd. 1902. iso2. স MĀJU, HOWRAH! পঞ্চম পরিচ্ছেদ। রাণীর তীর্থগমন ও বিপদ। শ সন ১২৫৭ সালে রাণীর পুরুষােত্তমে জগন্নাথ দর্শনের ইচ্ছা হয় । অনেকানেক আত্মীয়-কুটুম্বিনী লইয়া রাণী তীর্থযাত্রা করেন। গঙ্গা উত্তীর্ণ হইযা সাগর-সঙ্গমের মুখে আসিয়া উপনীত হইলে রাণী বলেন- ‘ণী শীঘ্র বাহিয়া যাও, সময় অল্প, বক্‌সিস পাইবে। কর্ণধাৰ উৎসাহে উৎসাহে যাইতে লাগিল। এমন সময়ে অকস্মাৎ ঝড়বৃষ্টি আসিয়া উপ স্থিত; একে ত অনন্ত জলরাশির অনন্ত উচ্ছাস, কুল কিনারা নাই-- নিকটে আশ্রয় নাই, তাহার উপর এই দুৰ্যোগ। তীরে নৌকা লাগান হইল, আবও ৩৪ খানি নৌকা পশ্চাতে পড়িয়া আছে। মাত্র একটী দাসী ও দুইটী দ্বারবান সহিত রাণী একটু চিন্তিতাহইলেন। মনে মনে বলিলেন- ‘মা জাহ্নবী, আমার অদৃষ্টে কি জগদীশ দর্শন হইবে না, তােমারই শান্ত কোলে কি আজ আমার স্থান হইবে ? ঝড়ের ভীষণ বেগে নৌকা মগ্নপ্রায় হইল, রাণী নৌকা হইতে নামিয়া আশ্রয় অন্বেষণে ব্যস্তমনে ইতস্ততঃ চাহিলেন। দূরে একটা কুটীর দেখা গেল। রাণী দাসী সঙ্গে লইয়া উহাতেই আশ্রয় লইলেন। উহা এক ব্রাহ্মণ-পরিবাৰেব পর্ণকুটীব মাত্ৰ। পৰিচয় গােপন করিয়া বাত্রে তথায় বাস করিলেন। দুর্যোগের কালরাত্রি প্রভাত হইল। রাণী ১০০ টাকা ব্রাহ্মণ পরিবারকে প্রণামী দিয়া পুনশ্চ নৌকাবােহণে পুরুষােত্তম বাত্রা কবিলেন। সুবর্ণরেখায় পর পারে যাইয়া দেখেন যে, পুরী গমনাগমনের ভাল রাস্তা নাই। তঁাহাব ব্যয়ে সুবরেখা হতে পুরী পৰ্য্যন্ত রাস্তা প্রস্তুত কবান হইয়াছিল। 3 রাণী রাসমণি। বাণী জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা তিন জনকে তিনটা হীরকাদি-খচিত মুকুট দান কবেন, আনুমানিক ঐ তিনটীব মুল্য ষাট হাজার টাকা। এক হাজাব টাকা নগদ পাণ্ডাদিগকে দেন। পুরীতে একছত্র ভােজনে বিশেষ আনন্দ লাভ কবেন। তাহাৰ পৰ বৎসব গসাগর যাত্রা করেন। সে সময়েও বহু লােক তাব সঙ্গে গিয়াছিল। সেই বৎসরেই রাণী উত্তৰায়ণে স্নান কবিতে ত্রিবেণী যান, ত্রিবেণী হইতে নবদ্বীপ, নবদ্বীপ হইতে অগ্রদ্বীপ, এই সকল ভ্ৰমণ কবিয়া যখন প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন, তখন সন্ধ্যাব প্রাক্কালে চন্দননগবেব সমীপবর্তী গরুটীর জঙ্গলের নিকট ডাকাতেব হাতে পড়েন। উহাদেব বাসস্থান ঐ গৌহাটীব বাগানের শুলদেশে নিভৃত স্থানে ছিল। উদাবা অকস্মাৎ ১২ জনে মিলিয়া বাণীব নৌকা আক্রমণ কবিল। বাণীর সঙ্গে দ্বাৰবান ছিল, উহা লাঠী ধবিল; ডাকাত পক্ষ হইতে গুলি চলিল। বাণীব পক্ষেও বন্দুকের লক্ষ্যে দস্যুদলের ১ জন আহত হইল। করা বলিল,—বাণী মা আমৰা মানুষ খুন করিতে কাতর নই, “কন্তু সে জন্য আসি নাই, আমরা টাকা চাই, এখন টাকা দিবেন, না বক্তারক্তি হইবে? বাণী সকলকে নিবন্ত হইতে বলিয়া বলিলেন—কত টাকা চাই, আমার কাছে ও এখন টাকা নাই, তােমরা কত জন আছ? উত্তম হইলশমরা বার হন। রাণী বলেন-“তাল ১২ হাজার টাকা আমি কাল এমনি সময় এইখানে পাঠাইয়া দিল, সম্মত হও ভালই, নচেৎ আমার গলার হার ও এই রূপাৰ সামগ্রী কয়টা আছে কইয়া যাও।

দ্বিতীয় খণ্ড। স্যদল বলিল-“কাল সন্ধ্যার সময় টাকা পাই ভালই, মচেৎ রাণীম আপনার এপথে ত্রিবেণী স্নানে যাওয়া বন্ধ হইবে। রাণী বলিলেন---‘তাল, কাল অপেক্ষা করিবে। দ্যদল নিমিষে বনে মিশাইল। বাটী আলিয়া রাণী ১২টী ভােড়ায় করিয়া ১২ হাজার টাকা নৌকাযােগে আরবান দিয়া পাঠাইয়া দেন। হইবে কেন? যাহার স্বামী প্রতিশ্রুতি অনুসারে হক ডেভিডসান কোংকে ১ লক্ষ কাজলে ফেলিয়া দেওয়ার মত দিয়াছিলেন, তিনি যে অঙ্গীকার করিয়া ১২ হাজার টাকা দিবেন সে কথা বলাই বাহুল্য।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। রাণীর জন্মভূমি-দর্শন। রাণী জীবনে অনেকবার ত্রিবেণী গিয়াছেন, এইবার ইচ্ছা হইল জন্ম ভূমি দর্শন করিবেন। ত্রিশ পয়ত্রিশ বৎসরের পর রাণী কোণ। যাইতে স্থিরসংকল্প হইলেন। ত্রিবেণীতে স্নান করিতে যাইতেই হইবে। ফিরিবার পথে কোপা হইয়া আসিবেন। যেমন সংকল্প অমনি কার্যে পরিণতি। বহুকাল হইল, ক্ষেমঙ্করীও গত হইয়াছেন, রামচন্দ্র গােবিন্দ দুই ভ্রা রাণীর কাছেই থাকেন। জমীটুকু বৎসর বৎসর খাজনা দিয়া রাখা হইয়াছে বটে, কিন্তু গৃহাদি কিছুই নাই। রাণী কিছু টাকা ও দুইজন লােক পাঠাইয়া দিলেন, অস্থায়ীভাবে ২৩ রাত্রি সেখানে বাসােপযােগী গৃহ নিৰ্মাণ করিতে আদেশ দিলেন। বড়ই আক্ষেপের বিষয়, এত স্থানে রাণী এত কীর্তি করিলেন, কিন্তু পিতার বাল্ক ভিটায় মাত্র একখানি পােড় মাটীর ঘর যদি থাকিত, যেন কতই আনন্দের বিষয় হইত; কিন্তু তাহা হয় নাই। কেন হয় নাই তাহার তথ্যও পাওয়া যায় না। রাণীর আদেশ মত দুইখানি : মৃৎচিত গৃহ নির্মিত হইল। রাণী উত্তরায়ণে ত্রিবেণীতে স্নান করিয়া নিজ পিত্রালয়ে আসিলেন। হালি- সহর, কোণা, কাঞ্চনপল্লী, মালঞ্চ, জোঠ, বিজনে, হাজিনগর, নৈহাটী, কঁঠালপাড়া, হুগলী, বংশবাটী, বন্দেল, বালী ইত্যাদি দূরবর্তী নিকট- বর্তী ও গঙ্গার উভয় তীরবর্তী বহুলােক রাণীকে দেখিতে আসিল। রাণীও সকলকে দর্শন দিলেন। পিতৃভূমি দর্শন করিয়াই মাতার মেহ, পিতার মু, পিসিমার আদর, বাল্যসখীদিগের প্রণয় সকলই একে একে মনে ;

দ্বিতীয় খণ্ড। পড়িতে লাগিল। রাণী বালিকার মত কিছুক্ষণ কঁদিলেন। শান্ত হইলে বহু ব্রাহ্মণ, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, প্রতিবেশ, আসিঙ্গ কথাবার্তা কহিতে লাগিল। রাণী বাল্যকালের সখীদিগকে দেখিয়া বিশেষ আনন্দ পাইলেন। তাহার পর কাহাকেও অর্থ, কাহাকেও বস্ত্র, কাহাকেও আহার, কাহাকেও ঋণমুক্তি, কাহার নবজাত শিশুকন্যাদিগকে উপঢৌকন, কোন নববিবাহিত বর- বধূকে যৌতুকদান, গ্রাম্য অন্ধ-আতুর-উপায়হীনদিগকে অর্থ সাহায্য করিলেন। সধবা বিধবা, ব্রাহ্মণ শূদ্র, বালক বালিকা সকলেই রাণীর আদর পাইল। সকলেই আসিল, আসিল না কেবল বৃন্দাবন ঘােষের কন্যা। সংবাদ অবশ্যই সে জানিত ; ভিতরে কিছু কারণ ছিল। বৃন্দাবন ঘােষ জাতিতে সদোপ,কন্যার নাম তরুলতা, সে বাণীর বাল্যের খেলার সঙ্গিনী। রাণী তাহার সংবাদলইয়া জানিলেন যে,সেসধবা ও পিতৃগৃহে আছে। রাণী লােক দ্বারা বলিয়া পাঠাইলেন যে, যদি তুমি আমার সঙ্গে দেখা কর, তবে আমিই তােমার বাটী যাইব। এই কথা শুনিয়াই তরুলতা রাণীয় নিকট আসিলে, দুইজনেই কাছে বসিয় প্রেমা বর্ষণ করিতে লাগিলেন। পরে রাণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “সকলেই শুনিয়াছে যে আমি আসি- ছি, আর তুমিও শুনিয়াছ; কিন্তু তুমি কেন আইল নাই ? তরুলতা লজ্জায় যেন মরিয়া গেল। প্রথমে অনেক আপত্তি করিল, শেষে বলিল,-“মা বলিয়াছিলেন, রাণীদের বাড়ী যাস্না বা রাণীর সহিত খেলি না। রাণী শুনিয়া অবাক! কারণ কি জিজ্ঞাসিলেন। বলিতে চাহে না, শেষ বলিল—তােমায় আমায় এক দিন খেলিয়া আসিতে রাত হয়, তাহাতে তােমার পিসি না বলেন যে, এত রাত কম কি ভাল, তুমি আর রাণীর সহিত বেড়াইতে খেলিতে আসি না।

: রাণী রাসমণি। 1 এ কথা মা শুনিয়া আমায় বারণ করিয়াছিলেন। তার পর তােমাৰ বিবাহ হইল। তুমি দেশ ছাড়িয়া গেলে। “তবে যে আজ আসিলে?--রাণী হাসিয়া এই কথা বলিলেন। তরুলতা বলিল,-“থাকিতে পারিলাম না, আমারও একটু অভিমান হইয়াছিল যে রাণী না ডাকিলে যাইব না। রাণী বলিলেন—“ভালইহইল,তুমিনা জার্সিলে আমি যাই, আসিয়াছ তবুও যাই। মার কাছে মাশ চাহিতে হইবে। এ কাজটা করাই চাই।” তখনই দুইজনে চলিলেন। তরুলতার মাতা বৃজা হইয়াছেন, পিতা গত ইয়াছেন, মাতার সহিত সাক্ষাতে ২৪ দুই চারি কথায় আনন্দের প্রবাহ বহিল ।রাণী দাপচাহিলেন। তরুলতাকে অর্থবাদি দিয়া, তাহার মাতাকে একখানি মূল্যবান পট্টবস্ত্র ও কিছু অর্থ দিয়া ক্রিয়াৱি বাসের পর রাী বিদায় লইলেন। বিদায়ে কালে গ্রামের কয়েকজন ব্রাহ্মণ বৃদ্ধাঙ্গুঠে উপৰীত সংলগ্ন করিয়া আন্তরিক আশীৰ্বাদ জ্ঞাপনপূর্বক তাকে বলিলেন যে, পুণ্যবতী আমাদের সকলের গানের বড় অসুবিধা-গঙ্গায় একটি ঘাট করিয়া দিতে আমরা সকলে একবাক্যে অনুরােধ করিতেছি। তােমারই পিত্রা- লয়ে তােমার কীর্তি থাকিয়া জনসাধারণের উপকার করুক-রাণী তখনই ২৫ হইতে ৩৫ হাজার টাকা মঞ্জুর করিলেন। বাট নির্মাণ হইলে তাহাতে সঁহার মানাম খােদিত রহিল। এই সময়ে ইগলী নিবাসী কতিপয় লােক হগলীতে একটা গানের বাট দিবার প্রস্তাব কনে। বাণ তাহাতেও সম্মত হলেন। বাবুগঞ্জের নিকটেও রাণী রা* মণির খাট আছে। বা হইতে রাণী বংশটা হলের দর্শন করিতে যান। বলে- গরীর মন্দির অতীব বিচিত্র কৌশলে নির্মিত হইয়াছে। জাখা খি রাণ, * “শর সঙ্গে দেখা করিতে যান। রূণ নী সপ্তম পরিচ্ছেদ। রাণীর নবদ্বীপযাত্রা মহােৎসব ও ব্রাহ্মণদিগকে দান। রাণী একবার শ্রীচৈতন্যদেব দর্শন, মহােৎসব ও পণ্ডিত মণ্ডলীকে দান করিবার ইচ্ছা করিয়া নবদ্বীপ যাত্রা করিলেন। সঙ্গে মথুর বাবু, দাস, দাসী, দ্বারবান, গােমস্তা ও বহু দ্রব্য সম্ভার লইয়া গেলেন। যিনি প্রেমের অবতার, হরিনাম দিয়া জীবের মুক্তির সহজ উপায় করিয়া দিয়াছেন, পুণ্যধাম নবদ্বীপে আসিয়া সেই শ্রীচৈতন্যদেবের মূৰ্ত্তি দর্শন করিয়া বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে মহােৎসবে পরিতুষ্ট করেন। তৎপর পাঁচ শত জোড়া গরদের জোড় আনাইয়া প্রত্যেক ব্রাহ্মণকে তাহার এক এক খানি, পাঁচটী টাকা ও একটা নূতন কলসী দান করেন। এই উপলক্ষে প্রায় সাতদিনে ২০ হাজার টাকা দান দেওয়া হইল। তার পর সেই সময়ে গ্রহণ হওয়াতে রাণী স্নান করিয়া ৫৬ হাজার টাকার চাউল, ডাউল, বস্ত্র, উত্তরীয়, মিষ্টান্ন, তাম্রমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা ইত্যাদি দান করেন। সে সময়ে রাণীর নাম বঙ্গে যথা তথা ভূয়সী প্রশংসার সহিত কীর্তিত হইতে লাগিল। মুর্শিদাবাদে যেমন জগৎশেঠের নাম, পূর্ববঙ্গে যেমন অর্ধবঙ্গেরী রাণী ভবানীর নাম, বঙ্গদেশের রাণাঘাটে যেমন পাল চৌধুরীদিগের পূর্ব পুরুষধর, কয়াৰ পাত্তি ও শচন্দ্র পাক্তির নাম একদিন ঘরে ঘরে মুখে মুখে শুনা যাইত, এই সময়ে রাণীর নামও ঘরে ঘয়ে মুখে মুখে শুনা যাইত। না হইবে কেন? যাহায় সারা বলে দানের ইয়ত্তা নাই, তাহার নাম না হইবে কেন?

দ্বিতীয় খণ্ড।
তুমি যে হও স্ত্রী বা পুরুষ যেই হও জগৎ যখন তােমাকে
আহ্বান করিয়াছে, তুমি যখন জীবমঙ্গলের হেতু হইয়া
মঙ্গলময়ের কাৰ্যসাধন জন্য জন্মিয়াছ ও কাৰ্য্য করিতেছ, তখন
জগৎ তােমার ধন্যবাদ না করিয়া স্থির থাকিতে পারে ?
বাণী বাটা আসিলেন। দীর্ঘ চারি বৎসর তীর্থপৰ্যটন করিয়া বহুল
অর্থ ব্যয় করিয়া, আনুমানিক চারি পাঁচ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া বাটা
আসিলেন।

অষ্টম পরিচ্ছেদ। গঙ্গার জলকর রহিত করণ ও ব্রাহ্মণের কন্যাদায় উদ্ধার । এ সময়ে ধীবরকুল গঙ্গায় জাল ফেলিয়া মৎস্য ধরিত বলিয়া গবর্ণমেন্ট তাহাদের কর ধার্য করিলেন। রাজা রাধাকান্ত দেব প্রভৃতির নিকট ধীবর- গণ সাহায্য প্রার্থনা করিয়া অকৃতকার্য হইয়া সকালরাণীর নিকট আসিয়া কঁদিয়া ইহার প্রতীকর প্রার্থনা করিল। রাণী তাহাদিগকে আশ্বস্ত কবিয়া গবর্ণমেন্ট হইতে, ঘুড়ির নিকট হইতে মেটিয়াবুরুজে সীমা পর্যন্ত গঙ্গা ১০ হাজার টাকায় জমা লইয়া দড়ী দিয়া বংশদণ্ড বন্ধনে ঘেরিয়া দিলেন। ধীবরেরা মৎস্য ধরিতে লাগিল। কোন জাহাজ নৌকা জলপথে যাতায়াত নিষেধ হইল। গবর্ণমেন্ট পক্ষ হইতে রাণীর নিকট তলব আসিল, জলপথ মুক্ত করিয়া দেওয়া হউক ও সাধারণের ও সরকারি মালামাল যাতায়াতের অসুবিধা জনক জলপথ বন্ধ করার কারণ দর্শান হউক। রাণী লােকঘারা বলিয়া দিলেন যে, আমি কর দিয়াছি, সুতরাং ন্যায়ত আমি ঐ পথ রােধ করিতে পারি। আমার প্রজাদের অসুবিধা হইতেছে; বাস্পীয় পােতের গমনাগমন বশতঃ মৎস্য ইতস্ততঃ খাবিত হইতেছে ও ভিৰ সকল নির্গত হইতেছে; সুতরাং আমার অজারে বিশেষ ক্ষতি হইতেছে। শেবে অনেক তর্কবিতর্ক বিচারের পর আণর টাকা ফেরত দেওয়া হইল ও ধীবরগণকে নিয়ে মৎস্য ধরিতে অনুমতি দেওয়া হইল। রাণী কলপথ মৃক্ত করিয়া দিলেন। বাঙ্গলায় রাণীর নামে তার একবার তিীয় খ। জয় জয়কার পড়িয়া গেল, সেই সময়ে রাণীর নামে যে একটি গত রচিত হইয়াছিল ও যাহা মুখে মুখে গীত হইয় দেশে বিদেশে যাইত, তাহা নিয়ে উদ্ধত করিয়া দিলাম। “ধন্য রাণী রাসমণি রমণীর গণি। বাঙ্গলায় ভাল যশ রাখিলে আপনি জীনের দুঃখ দেখে দিলে আপনি। দিয়ে ঘরের টাকা পরের জঙ্ক বাচালে প্রাণ । যে যশ রাখিলে তুমি হইয়ে রমণী। ঘরে ঘৰুে তােমার নাম গাইব দিবস রজনী। গঙ্গার জলকর রহিত হইয়াছে। এই সময় এক ব্রাহ্মণ রাণীর নিকট কাগ্ৰন্ত হইয়া সেন ও অর্থ-ভিক্ষা করেন, রাণীর মনে কণার সঞ্চার হয় ও জিজ্ঞাসা করেন যে কত ব্য হইবে। ব্রাহ্মণ বলেন- দুইটা কন্যা বয়স্থা ও পাত্রস্থ করিবার যােগা হইয়াছে,আমার সামর্থ্য নাই যে তাহাদের শুভকাৰ্য্য সমাধা করি, নুনকরে ১ হাজার টাকা ব্যয় হইবে। রাণী বলেন--ভাল আমি লােক দিতেছি ও টাকা দিতেছি সঙ্গে লইয়া কাষের বিবাহ কাৰ্য্য সমাধা করুন। কথা মত ১৫০০ টাকা দিয়া রাণী একজন বিশ্বস্ত সরকারকে ব্রাহ্মণের বার্তা পাঠাইয়া দিলেন ; যথার্থই ব্রাহ্মণের দুইটা কন্যার বিবাহ দেয়াতে প্রায় ২২০০ টাকা ব্যয় হইল।, ব্রাহ্মণ আন্তরিক আশীর্বাদ নিলেন। সরকার ৩৪ শত টাকা লইয় ফিরিয়া আসিয়া সমস্ত জ্ঞাপন করিলে রাণী বিশেষ অসন্তুষ্ট হইলেন এবং বলিলেন যে, এবং বলিলেন যে, ঐ টাকা সমস্তই ব্রাহ্মণকে দাও আৰু বক্ৰী টাকা ব্রাহ্মণকে পাঠাইয়া দাও। তাহাই হইল। বহু বৎসর পরে ১ ব্রাহ্মণের বংশের ১৮ী বালক পদশায় রাণীর বাড়ীতে থাকিয়া উত্তর কালে শিক্ষিত হইয়া উপার্জনক্ষম হইয়াছিলেন ও মধ্যে মধ্যে রাণী রাসমণি। আসিয়া কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রাণীর বংশধরগণের নিকট জানাইতেন যে রাণীর অন্নে, রাণীর দয়ায় তিনি উন্নত হইতে পারিয়াছেন। এমন একজন কেন, অনেকেই আহার, বিদ্যালয়ের বেতন, পাঠ্যপুস্তকের মূল্য, বাদি পাইয়াছেন। অদ্যাবধি অনেক ব্রাহ্মণ-সন্তান রাণীর বংশধরগণের নিকট হইতে প্রতিপালিত হইতেছেন। জনৈক ব্রাহ্মণ-সন্তান বাদ্যশিক্ষা করিয়া উত্তম বাদক হইয়াছেন ও সঙ্গীতের সঙ্গে তান লয় সহকারে বিশুদ্ধ- ভাবে বাজাইতে শিখিয়াছেন।

নবম পরিচ্ছেদ। সিপাহী বিদ্রোহ ও রাণীর উপঢৌকন-প্রেরণ। সহসা ভারতবর্ষে অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল। কাশ্মীরের প্রান্তসীমা হইতে দক্ষিণ বঙ্গের শেষ সীমা পর্যন্ত বিদ্যুদ্বেগে প্রচারিত হইল, কাণপুরে সিপাহী বিদ্রোহী হইয়াছে। ইতিহাসবিদ জানেন যে ইহার কারণ কি? টোটায় শূকরের ও গাভীর চর্বি মিশ্রিত আছে ও সেই টোটা দন্ত দ্বারা ছিন্ন করিয়া বন্দুকে দিতে হইবে। সিপাহিবা এমন কাজ করিবে কেন? সুতরাং তাহারা বিদ্রোহী হইল। ইংরাজ দেখিলেই হত্যা করিতে লাগিল ও দলবদ্ধ হইয়া লুটপাট করিতে লাগিল। যখন কাণ পুরে সিপাহীদিগের পৈশাচিক অভিনয় হইতেছিল সেই সময়ে ইংরাজ বন্ধু, অদ্বিতীয় বীর, নেপাল-মন্ত্রী পৃথিবী বিক্রম জঙ্গ বাহাদুর, সসৈন্যে যাইয়া ইংরাজদিগকে সাহায্য করেন। রসদ, আগ্নেয়াস্ত্র, বন্দুক, তরবারি, বারুদ গুলি গােলা দিয়া সাহায্য করেন। রাণী রাসমণির নিকট সংবাদ পৌছিলে তিনি কি করা কর্তব্য স্থির করিতে লাগিলেন। যাহারা হিতৈষী তাহারা বলিলেন--কোম্পানীর কাগজ বেচিয়া ফেলা হউক, কোম্পানীর রাজ্য ত গেল। রাণী অনেক গবেষণার পর বলিলেন।- -কিছুই হইবে না, মাত্র লােক্ষয় হইবে, কোম্পানীর রাজত্ব থাকিবে। আমার ইচ্ছ। আমরা যখন ইংরাজের প্রজা তখন কিছু উপঢৌকন দেওয়া যাউক।” তাহাই হইল—নিম্নলিখিত দ্রব্যসম্ভার ইংরাজগণের সাহায্যের নিমিত্ত প্রেরণ করা হইল।

রাণী রাসমণি।
২
৪০
হাতী
পাকা তুট্টা
বিস্কুট
১০০ খান
ছাগল
হঁসের ডিম, ১০০ টা
আটা
৫/ মণ
মুরগির ডিম ৫৯৮ী
ছোলা
লবণ
১০/ ”
পাকা কলা ৫০ কাদী
হুঁশ
চাউল
মুরগী
এই সময়ে রাণী নিজবাটীতে গােরা প্রহরীর বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন
কাণপুর বিজয়ের পর রাণীর উপর ইংরাজেরা বিশেষ স হন।
১০/ ”

দশম পরিচ্ছেদ। গােরার উৎপাত। এই সময়ে জানবাজারেয় বাটীতে একটি বড়ই লােমহর্ষণ ব্যাপার ঘটিল। সিপাহী-বিদ্রোহ অনল নির্বাপিত হইয়াছে। কতকাংশে উত্তর ও পশ্চিম বাঙ্গলায় শান্তি স্থাপিত হইয়াছে। তখন আনুমানিক ২০২৫০ শত (undisciplined soldiers) অশিক্ষিত সৈন্য ফ্রি স্কুলে বাস করিত । তাহাদের একজন (Officer Commanding ) অধিনায়ক ছিলেন । সেই সকল সৈন্যেরা বড়ই দুর্ধর্ষ ও অবাধ্য ছিল। সম্প্রতি তাহাদের কোন কাৰ্য্য না থাকাতে যদৃচ্ছা ভ্রমণ করিত ও সুবিধা পাইলেই বল প্রকাশ দ্বারা পথিকদিগের সর্বস্ব অপহরণ করিত। দুই তিন জনে,একজন পথিককে বলপূর্বক চাপিয়া ধরিত ও দুই এক জনে তাহার নিকট যাহা পাইত অপহরণ করিত। সমস্ত দিবাভাগ ও রাত্রি এক প্রহর দেড় প্রহর পর্যন্ত তাহারা স্থানে স্থানে দলবদ্ধ হইয়া জানবাজারের রাস্তায় ফ্রি স্কুল জীটে বিচরণ করিত। কোথাও মােক বিপণীতে আহারীয় মিষ্টান্ন সজিত রহিয়াছে, হঠাৎ তাহাই লইয়া পলায়ন করিত। কোথাও ব্যবসায়ী অমনস্কভাবে আছে তাহার তহবিল লইয়া পলাইত। যখন এইরূপ ব্যাপাৰ চলিতেছিল, তখন এক দিন জানবাজারের বাটীর সম্মুখে জনৈক পথিককে ধরিয়া তিন চাৰি জন মাতাল সৈনিক বল প্রমােগ, করিতেছিল। রাণী-রাসমণি-কুঠী’র ছাদে রাজ পাতাগণ বৈকালিক ভ্রমণ ও পাচারণ করিতেছিলেন। তখন সায়া। এ দৃ তাহাদের অসহ হইল। হারা উপর হইতে দ্বারবানদিগকে হুকুম দিলেন-“লাগাও” ।

৬৪ রাণী রাসমণি। অর্থাৎ মার। যেমনি হুকুম অমনি তামিল হইল, দ্বারবানেরা বড় বড় পাকা বাঁশের লাঠীর সদ্ব্যবহার করিল। ইত্যবসরে উপর হইতে জামাতা বাবুরা ফুলগাছে জল দিবার বৃহৎ মৃন্ময় জলাধার জল- শূন্য ও ভগ্ন করিয়া উপর হইতে নিক্ষেপ হইতে নিক্ষেপ করিলেন। তাহার ফলে জনৈক সৈনিকপুরুষের মস্তক আঘাত প্রাপ্ত হইয়া রক্ত পড়িতে লাগিল। উহারা ফ্রী স্কুলে যাইয়া তাহাদের দলে সংবাদ দিল ও প্রায় ৫০৬০ জন একত্রিত হইয়া উম্মুক্ত করবাল- রাণীর বাটীর সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন রবানেরা বৃহৎ লৌহ কবাট বন্ধ করিয়া দিয়াছে। ক্রোধিত প্রতিহিংসা-পরায়ণ মত্ত সৈনিকগণ অন্য উপায় না দেখিয়া সম্মুখে একটী অৰ্দ্ধভগ্ন কাষ্ঠান ছিল তাহা দ্বারা বৃহদ্বারের বক্ষে যে ক্ষুদ্র ছার ছিল তাহা ভাঙ্গিয়া ফেলিল ও ভিতরে প্রবেশ করিয়া দ্বারমুক্ত করিয়া দিল এবং সকলে একে একে আসিতে লাগিল। কুক্ষণেই শর্বরী প্রভাত হইয়াছিল। প্রথম প্রথম কয়েকজন সাহসী ও বলী ধানবানেরা বাধা দিল, শেষ বিবাদের অবস্থা ও বিপক্ষদল সুসজ্জিত ও রণ-নিপুণ দেখিয়া অদৃশ্য হইল। নিমেষে রাণীর নিকট সংবাদ গেল,কন্যা জামাতা দৌহিত্র ও দৌহিত্রী সকলে পশ্চাদ্বার দিয়া মান্না বাবুদের বাটীতে সরিয়া গেলেন। কেবলমাত্র রাণী, বস্ত্র সংযত করিয়া, উলঙ্গ কৃপাণ করে ভৈরবী মূর্তিতে ঠাকুর রঘুনাথ জীউর গৃহে একটি দ্বার উন্মুক্ত ও একটী বন্ধ করিয়া ঘরের মধ্যে রহিলেন। ছাদের উপরে গ্রন্থকারের খুল্ল পিতামহ তাহার ১৫ বত্সর বয়ক ১ম পুত্রকে ক্রোড়দেশে ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান ছিলেন ও গােবিন্দ নামক জনৈক বিশ্বস্ত ভৃত্য বাটীর ভিতর ছিল। অবারিত দ্বার পাইয়া ক্রোধোন্মত্ত সৈনিকল বাটিতে প্রবেশ করিতে লাগিল। নিয়ে যুগ্ম ময়ুর ময়ুরী ছিল তাহাদের উপর তরবারির দ্বিতীয় খণ্ড। ; ; ৬। আঘাত”করিতে গেলে, তাহারা স্থানান্তরে উড়িয়া গেল। মিকটেই যুগ্ম হরিণ-হরিণী ছিল, তাহাদিগকে কাটিয়া ফেলিল। নিম্নতলে বিশেষ কিছু ছিল না ; উপর তলে আসিলেই দেখিল, সকল গৃহের দ্বার উন্মুক্ত ; কি অন্দরমহলে কি সদরে সকল স্থানই জনমানবশূন্য—অবারিত। উপবে বৈঠকখানায় ৫২ ডালির ঝাড় ছিল, অঘাত করিতেই ঝন্ ঝন্ শব্দে জগতের নশ্বরতা জ্ঞাপন করিয়া ভাঙ্গিয়া গেল। গৃহ-প্রাচীরে বিলম্বিত মুকুর চূর্ণ করিয়া দিল। শয্যাবরণ তুলিয়া ছিড়িয়া ফেলিল, উপধান নষ্ট করিল; সেজ, দেওয়ালগিরী, বর্তিকার সমস্তই চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া ফেলিল। একদিকে বাদ্যযন্ত্রগুলি সজ্জিত ছিল, তাহাও নষ্ট করিল। পুষ্পবৃক্ষ সকল ভ্রষ্ট করিয়া দিল। এইবার অন্তঃপুরে প্রবেশ করিল রাণীর গৃহের মুকুর, আলেখ্য চিত্রপট, শয্যাস্তরণ সকলই নষ্ট করিল। এক ছড়া মুক্তার মালা ছিল, পাষণ্ডেরা তাহা পদদলিত করিল ; এক গাছি স্বর্ণহার ছিল, ছিড়িয়া দিল। রাণীর প্রিয় পক্ষীগুলির কাহারও পক্ষদেন, কাহারও পদচ্ছেন, কাহারও দেহ হইতে মস্তক বিচ্যুত করিয়া দিল ও তাহারা দাঁড়েই ঝুলিতে লাগিল। রূপার তৈজস পত্র ভাঙ্গিয়া ফেলিল। খুজিতে খুঁজিতে গােবিন্দ নামক ভৃত্যকে দেখিতে পাইয়া তাহার মেরুদণ্ডে তরবারির আঘাত করিল। সে সংজ্ঞা হইয়া পড়িয়া রহিল। সৌভাগ্যক্রমে রাণীর দিকে কেহই অগ্রসর হয় নাই। রঘুনাথ জীউ সে যাত্রা রক্ষা করিলেন। রাত্রি ১০টা পর্যন্ত এইরূপ লােমহৰণ পৈশাচিক অভিনয় চলিতে লাগিল। মধুর বাবু বাটী ছিলেন না, তাহার গাড়ী বাটী আসিলেই জনৈক দ্বায়বান সংবাদ দিল, তিনি তৎক্ষণাৎ কলিঙ্গা বাজারে যাইয়া ইনস্পেক্টরকে সঙ্গে লইয়া তাহাদের স্কুলের আবাস-খশিরে গেলেন এবং অধিনায়ক (Office commandnig) ও কতিপয় সৈ গণকে সঙ্গে লইয়া বাটী আধিলেন। তাহারা আসিয়াই নিতলে দাড়াইয়া রাণী রাসমণি। ভূৰ্য্যধ্বনি করিলেই সকলে একে একে সংযত হইয়া নামিয়া আসিতে লাগিল । নিম্নতলে ফিরিবার পথে একটী মনােরম কুকুর • ভীতস্ত হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতেছিল। নিমেষে তরবারির আঘাতে সে দ্বিখণ্ড হইল । অধিনায়ক সাহেব উপরতলে যাইয়া সকলকে ফিরিয়া যাইতে আদেশ দিলেন। এইরূপে সে দিনের উৎপাত থামিল বটে, কিন্তু ভবিষ্যতে উৎপাতের আশ- স্কায় তাহার পর ২ বৎসর কাল যাবৎ রাণী ১২ জন গােরা সৈনিক সদা সৰ্ব্বদা বাটীতে প্রহরায় নিযুক্ত রাখেন,সুখের বিষয় ইহার পর আর কোন গােলমাল হয় নাই। ইতেও তিনি সন্তুষ্ট হন নাই, তাঁহার যে সব আসবাব নষ্ট হইয়াছিল, সে সমন্তের ক্ষতিপূরণ বাবত সমস্ত টাকা সরকার হইতে আদায় করিয়াছিলেন।

একাদশ পরিচ্ছেদ। মীলকব দমন, জগন্নাথপুবে অত্যাচাৰ নিবাৰণ, টোনাব খাল খনন ও দক্ষিণেশ্বৰ-প্রসঙ্গ। বিষয় ওঁ সাধনা। বাণীব জমিদাবী মকিমপুর পরগণায় নীলকবে উৎপাত হয়। উৎ পড়িত প্রজাব কষ্ট শুনিয়া বাণী পঞ্চাশজন দ্বাবন পাঠাইলেন এবং স্বাক্ষরিত পত্ৰ দ্বাৰা নাযেবকে উপদেশ দিলেন, অত্যাচাৰী নীলকব সাহে পকে সমুচিত শাস্তি দিবে। নীলকর ডােনা যে উত্তম মধ্যম শিক্ষা প তাহাতে মৃতপ্রায় হয়। আদালতে মােকদ্দমা রুজু ইয়; কিন্তু ডিশমিশ কইষা যায়। সেই অবধি সেখানে নীলকরের উৎপাত স্থগিত হইল। বাণীব জগন্নাথপুব তালুকের চতুর্দিকেই নড়াইল-জমিদাব-বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাবন বায় মহাশয়ে জমিদারী; জগন্নাথপুব তালুকীও যাহাতে হাব দখলে আসে, এই তঁাহার ইচ্ছা। তিনি সেই অছিলাম বাণীব থাকা কর্মচারীবর্গ ও জাগণের উপর অমানুষিক অত্যাচাৰ আৰম্ভ করেন। প্রজার সর্বস্ব অপহরণ, গৃহাহ, নরহত্যা প্রভৃতি নানা পৈশাচিক ঘটনাক অতিনয় হইতেছিল। মাগী লােকজন পাঠাইয়া প্রতী- কানের ব্যবস্থা করলেন। মহাবী নামক সর্দায়পুবের নেতৃত্বে বঙ্গ প্লাঠিয়াল প্রজাগণের সহায় স্বরুপ জগন্নাথপুর আলুকে প্রেবিত হইল।

৬৮ রাণী রাসমণি। মহাবীর যেমন শক্তিশালী পুরুষসিংহ, তেমনই গম্ভীর-প্রকৃতি ও সদাশয় বাক্তি ছিল। সে অন্যায়রূপে কোন দাঙ্গা হাঙ্গামায় খনও লিপ্ত হইত না। মহাবীরের আগমনে অত্যাচার নিয়ন্ত হইল ; মামরতন বাবুব লােকজন ভয় পাইয়া সরিয়া গেল বটে, কিন্তু গুপ্ত ষড়যন্ত্রের হস্ত হইতে মহাবীর আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হইল না। মহাবীর নির্দয়ৰূপে আততায়ীর অন্ত্রের গুপ্ত আঘাতে প্রাণত্যাগ করিল ! মহাবীর রাণীর জামাতা মথুরবাবুর বিশেষ প্রিয় লাঠিয়াল ছিল; তাহার মৃত্যুতে রাণী ও মথুরবাবু ব্যথিত হইলেন। জগন্নাথপুর রাণীর নায়েব মহাবীর-হত্যার প্রতিশোধ, গৃহদাহজনিত প্রতিহিংসা, অর্থব্যয়-সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি ভাবিয়া বিপক্ষের উপব প্রচণ্ডবেগে নিপতিত হইবার জন্য আমােহন করিতেছিলেন। ২৪ পরগণা, বর্ধমান, হুগলী ও অন্যান্য স্থান হইতে বাছা বাছা লাঠিয়াল,পাইক, সড় কী- ওয়ালা, ফিঙ্গেওয়ালা ; পাপড়ীবাজ সংগ্রহ করা হইয়াছিল। টাঙ্গী, বল্লম, বর্শা, লাঠি,সড় কী,কুঠার, খোচ প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র লইয়া কৃষ্ণকায় ভীষণাকার লােক সমুহ “রাণী মায়ের জয়” “জয় রাণী রাসমণির জয়” রবে দিক বিকম্পিত করিয়া তুলিতে লাগিল। রামরতন বাবুও অবস্থা বুঝিয়া দাঙ্গার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন; কিন্তু রাণী মায়ের জয়” এইভীষণ হঙ্কারে তাঁহার লােজন স্তম্ভিত হইয়াছিল -অগ্রসর হইতে পারে মাই। শেষে রাণী নিকট হইতে আদেশ আসিল যে, অনর্থক দাঙ্গা-হাঙ্গামায় প্রয়ােজন নাই। কেবলমাত্র আমার কর্মচারী ও প্রজাকার্গের উপর কেহ অত্যাচার করিতে না পারে, এইরুল আত্মরক্ষার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই যথেষ্ট : মায়েৰ তাই করিলেন। দাঙ্গা-হাঙ্গামা কিছুই হইল না। রাণী মােফলা করলেন। দুই বৎসর মােক চলিয়াছিল, তাহাতে গাষী হইয়াছিকােণ। এখনও যশােহ, মঙ্গপুর অঞ্চলে কোনরূপ দ্বিতীয় খণ্ড। । দাঙ্গা হাঙ্গামার সূত্রপাত হইলে “রাণী মায়ের জয়” বলিয়া লাঠিয়ালেব। চীৎকার করিয়া থাকে। ইতিমধ্যে রাণী টোনার খাল খনন করিয়া মধুমতী নদীর সহিত নবগঙ্গার যােগ করিয়া দেন। অর্ধ মাইল ব্যাপী এই খালখননে ১ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়াছিলেন। ইহাতে তাহার প্রজাগণের অশেষ উপকার সাধিত হইয়াছিল ; কৃষিকার্যের উন্নতির সহিত প্রচুর শস্যোৎপাদনের সহায়তা করিয়াছিল। প্রজার ধনপ্রাণ মান রক্ষণে সহৃদয়া রাণী যে ভাবে প্রাণপণ চেষ্টা করিতেন, তাহা এখনকার তথাকথিত জমিদারগণের আদর্শ হওয়া উচিত। তিনি দানধ্যানে, তিনি দানধ্যানে, ধৰ্মকার্যে যেমন মননিবেশ করিয়াছিলেন, তেমনই জমিদারীর উন্নতি সাধন, প্রজার কষ্ট নিবারণ ও বিষয়াদি রক্ষণ-কল্পেও সুবন্দোবস্ত করিতেন। তিনি একদিকে যেমন বৈষয়িক তত্ত্বাবধান করিতেন, অপর দিকে তেমন দান- ধ্যানে ও ধৰ্ম্মকাৰ্য্যে প্রচুর অর্থব্যয় করিতেন। এই সহৃদয়া তেজস্বিনী কীর্তিমতী ঐশ্বৰ্যশালিনী বঙ্গমহিলার প্রকৃতি কিরূপ ছিল, তাহার জীবনের পূর্ব বিবৃত আখ্যানমাল হইতে পাঠক বুঝিয়া লইতে পারিবেন। ঐ আখ্যানমালায় দুই একটা স্তবক ধরিয়া তুলিয়া দেখিলে, যে গুণরাশির সৌরভ ফুটিয়া উঠে, তাহারই সুমিষ্টতম বিকাশ তাহার দক্ষিণেশ্বর নবরত্ন মন্দিরে-কালী বাড়ীতে। পরবর্তী তৃতীয় খণ্ডে ইহায় কিঞ্চিৎ পরিচয় দেওয়া যাইতেছে। দক্ষিণেশ্বর কালী বাড়ীর প্রতিষ্ঠায় আৰ্য-স্থাপত্যবিদ্যার মহিমা রক্ষিত হইয়াছে। তখনকার শিল্পচাতুর্য্য প্রকৃষ্টরূপে প্রদর্শিত হইয়াছে, আৰ্যজাতির ঐশ্বৰ্য্যভােগের সার্থকতার আদর্শ পরিস্ফুট হইয়াছে। আর তােগের সহিত ত্যাগের, সম্পদের সতি নিতার, বিষয়ের সহিত সাধনার, লীলার সহিত শ্মশানের, 'ধাবল্লভের সহিত শিবশিবানীয় সম্মিলন যে এখনও বাঙ্গালীর রাণী রাসমণি। দেশে সম্ভব, তাহা ঐ মন্দিরের পাদমূলে গঙ্গার তুরঙ্গরাজি গাহিয়া গাহিয়া বহিয়া যাইতেছে। প্রকৃতই এমন সৰ্বগুণসম্পন্ন নারী যে এই সে দিন বঙ্গদেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন ; আমাদের বাঙ্গালী রমণীর হৃদয়ে যে এমন তেজ, এমন বুদ্ধি, এমন অধ্যবসায়, এমন সহৃদয়তা ফুটিতে পাইয়া- ছিল ; ইহা ভাবিয়া কেবল কি তাঁহার বংশধরগণই গৌরবমণ্ডিত হইবেন না। সমস্ত বঙ্গবাসীও গৌরব বােধ কবিবেন ? ;

রাণী রাসমণি। তৃতীয় খণ্ড। প্রথম পরিচ্ছেদ। রাণীর কাশযাত্রার উদ্যোগ। সন ১২৪২ সালে রাণীর বিশের দর্শনে মানস হয়। রাণী তদনুযায়ী হুকুম দেন, কাশী-যাত্রার উদ্যোগ করা হউক। তখন ভারতে বাষ্পীয় পােত বা উর্ণনাত-তন্তুর ন্যায় রেল লাইন বিস্তৃত হয় নাই। যাত্রীরা একত্র দলবদ্ধ হইয়া ৫০০ বা তদধিক লোেক সমবেত না হইলে, কেহ তীর্থযাত্রায় সাহস করিত না। ৪৫ পানি নৌকা এক সঙ্গে যাইত, কি হল-পথে, কি জল-পথে, প্রাপাপহারী দতঙ্কর-ভীতি প্রবল ছিল। সে কারণ, রাণী যাতায়াতের জন্য যাহাতে কাহারও কষ্ট না হয়, সেই মত ৬ মাসের উপযােগী দ্রব্যাদি ২৫ খানি নৌকায় সজ্জিত করিলেন। বহু আত্মীয়, আত্মীয়, কুটুম্ব, কুটুম্বিনী সমাগত হইল রাণী রাসমণি। ৪ খানি আমাদের , ১ . अबक ১ ১ ১ : নৌকার তালিকা চাউলের জন্য কুটুথ কুটুম্বিনীদিগের জন্য খানি, তৈল, লবণ, ইত্যাদি নিজের জন্য ডাক্তার ও ঔষধ জামাতাগণ দ্বাববান ৪টী গাভী দাসীদেব বিচালী মােট ২৫ খানিবজরা প্রস্তুত হইল,যথাযথ ব্য-সম্ভার স্তরে স্তরে তাহাতে বিন্যস্ত করা হইল। কয়েক জন দাস দাসী দ্বারবান প্রহরায় নিযুক্ত রহিল। স্থিব হইল, আগামী কল্য প্রাতে যাত্রা করা যাইতে। বাণী যখন শােক- সন্তাপ-নাশিনী বিরাম-দায়িনী চেতনা-হারিণী নিদ্রার কোলে সুষুপ্তা, সেই সময়ে জগজ্জননী অন্নপূর্ণা দেবী স্বপ্নাবেশে তাঁহাকে আদেশ দিতেছেন, --“কল্যাণি, দেশে এখন তোমার সন্তানতুল্য প্রজার। অন্নকষ্টে পীড়িত, এ সময় কাশী যাওয়া মনন ত্যাগ কর; শিবশক্তির মূৰ্ত্তি এই থানে স্থাপন কর, আদেশ লঙ্ঘনে তােমার প্রিয়জনের অমঙ্গল হইবে।” নিদ্রা ভঙ্গ হইল। প্রভাতে রাণী হুকুম দিলেন, কাশী যাওয়া স্থগিত রছিল, দ্রব্য-সম্ভার বাটীতে না আনিয়া দানে বিতরণ, কবা হউক। নৌকা ছাড়িয়া দেওয়া হউক। হরিষে বিষাদ হইল, যাহাবা কাশী যাইবাৰ আনলে সারা রাত্রি যাপন করিয়াছিল, প্রভাতে তাহারা শুনিল, কাশী যাওয়া হইবে না। অনেকেই কারণ জানিবার জন্য উৎসুক হইল। রাণী কেবলমাত্র মধুর বাবুকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত বলিয়াছিলেন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। কালী বাড়ীর স্থান-নিৰ্বাচন ও মন্দির নির্মাণ। রাণী রাসমণি স্বপ্নাদেশে বারাণসী যাত্রার সঙ্কল্প পরিত্যাগপূর্বক “গঙ্গার পশ্চিম ফুল বারাণসী সমতুল” এই ধারণার বশবর্তিনী হইয়া কালী মন্দির স্থাপনের জন্য জামাতা মথুরামােহন বাবুকে গঙ্গার পশ্চিম তীরে স্থান অনুসন্ধান করিতে বলিলেন। কিন্তু বালী উত্তরপাড়া প্রভৃতি গ্রামে স্থান অন্বেষণ করিয়া বিফলমনােরথ হয়েন। তথাকার ‘দশ আনি’ ছয় আনি’ খ্যাত প্রসিদ্ধ জমিদারেরা-রাণী প্রভূত অর্থ দানে স্বীকৃত হইলেও-না কি বলিয়াছিলেন, তাহাঁদের অধিকৃত স্থানের কোথায়ও হারা অপরের ব্যয়ে নির্মিত ঘাট দিয়া গঙ্গায় অবতরণ করিবেন না! রাণী বাধ্য হইয়াই পরিশেষে ভাগিরথীর পূৰ্ব্বকুলে দক্ষিণেশ্বর নামক গ্রামে স্থান মনােনীত করিলেন। যে স্থানটী মনােনীত হইল, উহার কিয়দংশ হেষ্টিংস সাহেবের কুঠা ছিল এবং অপরাংশ মুসলমানদিগের কবর ডাঙ্গা ও গাজী সাহেবের পীরের স্থান ছিল। পঞ্চান্ন বিঘা ভূমি মার কুঠী পঞ্চান্ন হাজার টাকা মূল্যে খরিদ করা হয়। স্থানটীর আকার কুপৃষ্ঠেয় ন্যায় ছিল। ঐরূপ কুৰ্ম্মপৃষ্ঠাকৃতি শ্মশানই শক্তি প্রতিষ্ঠা ও সাধনার জন্য বিশেষ প্রশস্ত বলিয়া তন্ত্রশাস্ত্রে নির্দিষ্ট আছে। ইহার দক্ষিণে গবর্ণমেন্ট-মেগাজিন, উত্তরে যদুনাথ মল্লিকের বাগিচা, পূর্বে বসতি ও পশ্চিমে গঙ্গা। ধরিদের সন ১২৪২ সাল হইতে মন্দিরের কাৰ্য্য আরম্ভ হয়। প্রথমত গঙ্গার ধারে পােস্তা ও ঘাট বান্ধিয়া উঠান হয়। বহু ক্লেশে এই কাৰ্য্য প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে, এমন সময়ে পশ্চিম দক্ষিণ কোণস্থিত !

৭৪। রাণী রাসমণি। ঘুড়ির টেক হইতে সমাগত প্রবল বাণের আঘাতে তাহা ভাঙ্গিয় চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যায়। ইহাতে রাণী রাসমণি অসন্তুষ্ট হইয়া মেকিশ কোম্পানীকে এক লক্ষ যাইট হাজার টাকার চুক্তিতে পােস্তা ও ঘাট বান্ধিবার কন্টাক্ট প্রদান করেন। মেকিশ কোম্পানী ভাঙ্গা পােস্তা ও সাটের মূল পৰ্য্যন্ত উৎপাটিত করিয়া, অনেক নিম হইতে বান্ধিয়া, অতীব দক্ষতা ও কৌশল সহকারে কাৰ্য্য সমাপ্ত কবেন। ইহাতে রাণী রাসমণি চুক্তির উপরেও কোম্পানীকে অনেক টাকা পারিতােষিক প্রদান করেন। সঙ্গে সঙ্গেই আদর্শ অনুসারে মন্দিরের কাৰ্য্য আরম্ভ হইতে থাকে। এই মন্দিরের বিশাল আঙ্গিনা দৈর্ঘ্যে ৪৪০ ফিট এবং প্রস্থে ২২০ ফিট। এই আঙ্গিনা উত্তর দক্ষিণে গঙ্গাতটানুসারে বিস্তৃত। আঙ্গিনার পশ্চিম প্রান্তে উত্তর দক্ষিণে শ্রেণীবদ্ধ দ্বাদশ শিব মন্দির। মধ্যবর্তী মন্দির দ্বয়ের একটু বাহিরে সিংহকার ও নহবতখানা। তাহার লগ্ন পশ্চিমেই পাকা সড়ক, তাহার পশ্চিমেই পােস্তা হইতে বিশাল সােপান পংক্তি গঙ্গাগহ্বর পর্যন্ত বিস্তৃত—উহা মেকিশ কোম্পানী বান্ধিয়া ছিলেন। আঙ্গিনার উত্তর দক্ষিণ ও পূর্ব প্রান্তে একতালা দালান- পংক্তির ; তাহাদের প্রত্যেকটীর মধ্য হুল দিয়া বাহির হইবার অঙ্ক বড়, বড় তােরকার। আঙ্গিনার পূর্ব প্রান্ত ব্যাপিয়া বিষ্ণুমন্দির, কালীমন্দির ও নাট মন্দির এক্ষিণাভিমুখে সংসভাবে বিস্তৃত। মন্দির- দ্বয় ও নাট মন্দিরের পশ্চিমেই আঙ্গিনার বিশাল ভাগ ; উহার পশ্চিম প্রাতে দ্বাদশ শিবমন্দির। মন্দিরের কাৰ্য ১২৪২ সালে আরম্ভ হইয়া ১২৬০ সালে শেষ হয়। ইহাতে কিকিধিক হয় লক্ষ টাকা ব্যয়িত হইয়াছিল।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ। মন্দির-দৃশ্য। দক্ষিণেশ্বর অতি মনােরম স্থান। ইহা একাধারে চতুৰ্বর্গ ফল প্রদানে সমর্থ । প্রথমতঃ—ইহা ভক্ত জনের সাধনার প্রধান স্থল ; এমন শান্ত, নিস্তব্ধ, নিভৃত, ভক্তিমিশ্রিত স্থান আর বাঙ্গলা আছে কি না সন্দেহ। এখানে প্রথম পরমহংস রামকৃষ্ণ দেব—যাহার সিদ্ধির আরম্ভও শেষ এই- স্থানেই হইয়াছে; দ্বিতীয়—তােতাপুরী যিনি রামকৃষ্ণ দেবের অন্যতম গুরুদেব, রাকৃষ্ণ সহবাসে গুরু হইয়াও অনেক দূর সাধন মার্গে অগ্রসর হইয়াছিলেন; তৃতীয়—তৈরী, যিনি কোথা হইতে অজানিত ভাবে আসিয়া রাম কৃষ্ণ দেবকে মাতৃবঃ মেহে পালন করিয়াছিলেন ও রামকৃষ্ণ দেবেব সিদ্ধির পথ প্রশস্ত করিয়া নিজে বহুদূর সিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন; চতুর্থ— রাণী, যাঁহার আগমন হইবে জানিতে পারিয়াই যেন বহু পূর্বে তাহার পীঠস্থান স্বরূপে দক্ষিণেশ্বর নির্মাণ করাইয়া তাহার আসার আশায় উদগ্রীব হইয়াছিলেন এবং তাহার আগমনের পর মুক্তির পথে পথিক হইয়াই নশ্বর ধনায় অতুলনীয় কীৰ্ত্তি রাখিয়া:মহাপ্রস্থান করিলেন; পঞ্চম রাণীর জামাতা মধুর বাবু, রাণী গত হইবার পর যাহাকে রামকৃষ্ণ রসন্দার বলিতেন, রাম ও কৃষ্ণ এক সঙ্গে দুই ভাবে পাইয়া বহু উন্নত হইয়াছিলেন ; এই সকল মহাত্মার লীলা ক্ষেত্র।

রাণী রাসমণি। এমন দ্বিতীয়তঃ-ইহা স্বাস্থ্য প্রদ, নির্মল বায়ু জাহবী-শীকর-সম্পৃক্ত হইয়া সন্ধ্যার, প্রভাতে, দ্বিপ্রহরে রুগ্নদেহে নবজীবন দানে সমর্থ। পুণ্যতােয়া ভাগীরথী অহোরাত্র ছল ছল কল কল ভাষায় অনন্ত দেবের অনন্ত মহিমা অনন্তকাল গাহিয়া গাহিয়া সাগরােদেশে ছুটিয়াছে। তীর নানাবিধ পুষ্প সম্ভারের স্তর সন্নিবেশ। প্রকৃতই ইহা স্বাস্থপ্রদ। তৃতীয়তঃ—ইহার দেব-মন্দির, নাট্য-মন্দির, নবরত্ন চুড়াবিশিষ্ট কালীর মন্দির, রাধা গােবিন্দ জীউর মন্দির ইত্যাদিতে যে কলা বিষ্ঠা, শিল্প বিদ্যার পরিচয় আছে, তাহা পুরুষােত্তমের জগদীশের মন্দির ও ভুবনেশ্বর মন্দির ব্যতীত বঙ্গের কোন মন্দিরে বা রাজ প্রাসাদেও নাই। নির্নিমেষ নয়নে দেখিলে বুঝিতে পারা যাইবে যে, কলা বিদ্যার প্রকৃষ্ট পরিচয় উহাতে আছে। চতুর্থতঃ।—বিলাসিতার বিলাসীর পক্ষে নিভৃত মলয়মারুত-সেবিত কল-কবরী, গােলাপ-গন্ধরাজ, চম্পক- চামেলী, জবা-জাতি, বেলা-বকুল, মল্লিকা-মালতী, যুথিকা-রানী- গন্ধা বাসিত, আমােদে দিক আমােদিত, স্থান আর নাই। এই কারণেই ইহা চতুৰ্বর্গ দানে সমর্থ। অধম লেখকের সনির্বন্ধ অনুবােধ, যিনি এই মনােরম স্থান দর্শনে বঞ্চিত আছেন, একবার অবসর মত দেখিয়া আসিবেন। জাহ-বক্ষে যাহারা বাস্পীয় পােতে এ তরণী যােগে যাতায়াত করিয়াছেন, তাহারা দক্ষিণেশ্বর ঠাকুর বাটা দেখিয়াছেন। প্রথম দৃষ্টি পাতেই দূর হইতে দ্বাদশ শিবমন্দির ও নবরত্ন চুড়া দৃষ্টি গােচর হয়। নিকটে যাইলে দেখা যাইবে কেমন কৌশলে, বহু মুদ্রা ব্যয়ে, জাহীর অপ্রতিহত বেগ বােধ করিবার জন্য কোথাও সরল, কোথাও বক, কোথাও ঢালু- ভাবে রাণী পাকা পােস্তা বাঁধাইয়াছেন। ভিতরে রাধাশ্যামের যুগল - ৭০ তৃতীয় খণ্ড। মুক্তি ও অদ্যাশক্তি কালী মূর্তি পৃথক পৃথক মন্দিরে অবস্থিত। রৌপ্য সিংহাসনে রাধাশ্যাম বিরাজ করিতেছেন ; দেহে নানাবিধ, যেখানে যা সাজ, স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত। আদ্যাশক্তির মূর্তি একাদশ বর্ষীয়া বালিকার মত, শবরূপা শিবের উপর স্থাপিত। রৌপ্য নির্মিত বহুদ্ৰব্য চারিপাশে বিন্যস্ত। সম্মুখে নাট্য মন্দির। ত্ৰিমন্দিরেই কলাবিস্কার পরিচয় আছে। নাট্য মন্দিরে দারায়, গােবিন্দ অধিকারী, কবির দল, নানাবিধ যাদি ও আমােদ প্রমােদের স্থান ছিল। প্রাঙ্গণ বহু বিস্তৃত—এককালীন সহস্র লােকের সমাবেশ,উপবেশন,ভােজন হইতে পারে। জিন পার্শ্বেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহ ; কোনটা দেওয়ান খানা, কোনটা আলােক প্রস্তুতের স্থান, কোনটা ভােগরাগের স্থান, কোনটা রন্ধন শালা, কোনটা শয়নাগার। পূৰ্ব্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম তিন দিকেই ঘর । পশ্চিমে বাট ও চাদনী উহার সহিত সােপান শ্রেণী আসিয়া গঙ্গায় মিলিত হইয়াছে। দুই পার্শ্বেই পুস্পকানন। দক্ষিণ দিকে একটি দ্বার, পার্শ্বে আম্র- কানন ও নহবখানা। পূর্বে একটি দ্বার, পুষ্করিণী ও আম্রকানন। উত্তরে একটি দ্বায় ও দৌবারিকদিগের বিশ্রাম ও প্রহরার স্থান। সম্মুখেই প্রমােদ-ভবন বা চলিত কথায় “বাবুকুঠী” বাবুকুঠীর পশ্চাতেই পুষ্করিণী। দূরে পশ্চিম কোণে রামকৃষ্ণদেবের গৃহ। একদিকে পানি * বেল, নারিকেল কুল, দেশীকুল, প্রভৃতি ও হৈমন্তিক রবি শস্য উৎপন্ন করিবার স্থান পাশ্বেই আম্রকানন,উত্তমােত্তম দেবভােগ্য, রসনার তৃপ্তিকর রসাল বৃক্ষ। প্রমােদ ভবনের পার্শ্বেই সােপনশ্রেণী গঙ্গার সহিজ মিশিয়াছে, পার্শ্বেই নহবৎখানা। কিছু দূরে পঞ্চবটী—ইহা অতীব পবিত্র শান্তিপ্রদ নির্জন স্থান। উত্তর-পূর্ব কোণে একটা ক্ষুদ্রায়তন, অপেক্ষাকৃত স্বল্প বারিযুক্ত, পুষ্করিণী। পার্শ্বেই শৌচাগার। প্রমােদ-ভবনের অনতিদুরে গােশালা, অন্থশালা, যান রক্ষার ও শফটচালকগণ ও তাহাদের ৭৮ রাণী রাসমণি। সহচরদিগের বসিবাব স্থান এবং উদ্যান-রক্ষক ও তাহার উষ্ঠান সম্বন্ধীয় যন্ত্রাদি বক্ষার স্থান, তৎপর্শ্বে হস্তী থাকিবার স্থান। গঙ্গার পশ্চিম তীর হইতে পূৰ্ব্বতটবর্তী দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতি দৃষ্টি কবিলে দ্বাদশ শিবমন্দিরসহ সমস্তগুলি একটী মন্দির বলিয়া প্রীতি হয়। সে দিব্য দৃশ্য দর্শন করিলে মনে হয়, যেন দেবরাজ শতক্রতু শতযুপ-চিহ্নিত, শতচূড়া-নিৰ্ম্মিত, শত পতাকা-মাকুল স্বকীয় বিমান, বাণী রাসমণিব মন্দির ছলে ভাগী বগী তটে রাখিয়া অবগাহনার্থে গাঙ্গবারিতে নিমগ্ন হইয়াছেন। বস্তুতঃ দক্ষিণেশ্ববের মন্দির গৌড়দেশীয় ধৰ্ম্মানুবাগে বিজয়-পতাকা।

চতুর্থ পরিচ্ছে। প্রতিষ্ঠা ও দান। দেবদেবীমূর্তি নির্মাণারম্ভের দিবস হইতে রাণী যথাশাস্ত্র কঠোক তপস্যার অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ত্রিসন্ধ্যা স্নান, হবিষ্যান্ন তােজন, মাটিতে শরন ও যথাশক্তিজপপূজাদি করিয়াছিলেন। পরে মন্দির ও মূর্তি নির্মিত হইলে প্রতিষ্ঠার জন্য ধীরে-সুস্থে বিশেষ প্রশস্ত দিবসের নির্ধারণ হইতে ছিল এবং মূৰ্ত্তিটা ভগ্ন হইবার আশঙ্কায় বাক্সে বন্ধ করিয়া রাখা হইয়া- ছিল। এমন সময়ে যে কোন কারণেই হউক দেবীমূর্তি ঘামিয়া উঠে এবং রাণীকে স্বপ্নে প্রত্যাদেশ দেন—“আমাকে আর কত দিন এইভাবে আবদ্ধ করিয়া রাখিবি ? আমার যে এরূপে থাকিতে কষ্ট হইতেছে ; যত শীঘ্র পারি আমাকে সুপ্রতিষ্ঠা কর।” ঐরূপ প্রত্যাদেশ লাভ করিয়াই রাণী দেবী-প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়েন এবং মানযাত্রার পূর্ণিমার অর্থে অন্য কোন প্রশস্ত দিন না পাইয়া, ঐ দিনেই ঐ কাৰ্য্য সম্পন্ন করিতে সঙ্কল্প স্থির করেন। ১২৬১ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ তারিখে স্নানযাত্রার দিন মহাসমারােহে দুই লক্ষাধিক মুদ্রা ব্যয়ে দক্ষিণেশ্বরের দেবালয় প্রতিষ্ঠা কাৰ্য্য সম্পন্ন হয়। সেই স্নানযাত্রার দিন প্রভাত না হইতেই দক্ষিণেশ্বর পল্লী উৎসবের উল্লাসে জাগরিত হইয়া উঠিল। দিনদেব গগনাঙ্গণে উদিত হইয়া দেখিলেন, দেবালঙ্গের বিশাল প্রাঙ্গণ বিপুল পরিপূর্ণ, তথাপি জনস্রোত মন্দির- রাণী রাসমণি। ভিমুখে ধাবিত হইতেছে। দেখিতে দেখিতে শঙ্খ ঘণ্টাববে দিকচয় মুখবিত হইল। কোথাও উচ্চকণ্ঠে হরি-সংকীৰ্ত্তন্তে, কোথাও গগনভেদী বােম্বােম্ ববে, কোথাও জগন্মাতাব গম্ভীর জয় গানে, ভক্তিব পূর্ণোচ্ছাসে ভাগীরথী টন্ টন্ করিতে লাগিলেন। বহুদেশ বিদেশ হইতে বহু ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত, অনিমন্ত্রিত, অনাহত, অভ্যাগত আসিয়াছিলেন, বহু আত্মীয় কুটুম্ব বহু দিন হইতে আসিয়াছিলেন। গলী কুলিহান্তা হইতে লেখকের খুল্ল-পিতামহ,পিতামহী ও সাত বংশের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তালুক হইতে ও জমিদারি হইতে বহু দ্রব্য অনিত হইয়াছিল। নায়েব গােমা অনেকেই আসিয়া এক একটি কার্যের ভার লইয়াছিলেন। শালবাড়িয়া তালুক হইতে ২টা হস্তী আসিয়াছিল, ঐ হস্তী পৃষ্টে অতি উত্তম বিশুদ্ধ ঘূত আনিত হইয়াছিল। ব্রাহ্মণগণ একত্রিত হইলে স্থির হইল—কে হােম কাৰ্য ব্রতী হইবে, কে তন্ত্রপাঠক হইবে, কে উত্তর সাধক হইবে, কোন্ জন কোন্ কার্যের ভার লইবে। এই সমস্যা লইয়া মহা গােলমাল হইতে লাগিল গৌড়াঙ্ক-দ্রাবিড়-বৈদিক ব্রাহ্মণগণ একবাক্যে বলিলেন যে, আমরা নপাঠ করিব ও হােমকাৰ্য্য সমাধা করিব। অন্য শ্রেণির ব্রাহ্মণ গুণ বলিলেন আমরা এই কার্য সম্পাদন কৰিব। এইরূপে মহা কোলাহল লাগিয়া গেল। মধুর বাৰু তখন সকলকে স্থিরচিত্তে কর্তব্য নির্ণয় করিতে বলিলেন। সভা আহুত হইয়া মীমাংসা হইল, অন্তশ্রেণীর শ্রেত্রিয়গণ হােতৃ হইবেন। গােড়াঙ্ক-বৈদিক ব্রাহ্মণগণ মন্ত্র পাঠ করিবেন। পরমহংস রামকৃষ্ণ দেবের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামকুমার ভট্টাচাৰ্য হােম কয়েন। যাহা হউক বিষাদ মিটিয়া যায় এবং হােম কাৰ্য ও প্রতিষ্ঠাকাৰ্য নির্বিয়ে সমাধা হয়। নিম্নলিখিত সেই বৈদিক ব্রাহ্মণগণ সে ক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন।

পূৰ্ব্বহিজিলা। ) ১১ সুলতানপুব। দেবীপুর। ৪। ঐ ১) } o : তেঘরি। বাসুদেবপুর। ঐ বলরামবাটী। ঐ ঐ শ্রীরামপুর। বাস্তবাটী। ১) তৃতীয় খণ্ড। ১। লম্বোদর সার্বভৌম সাকিম ২। রাঘব তর্কসিদ্ধান্ত ৩। গৌরচন্দ্র বিদ্যালঙ্কায় বদন বাচস্পতি ৫। দ্বিজবর বিদ্যার ৬। ভাগবৎ বিদ্যালঙ্কার ৭। গুরুচরণ শিরােমণি ৮। ভুবনেশ্বর বিদ্যালঙ্কার ৯। ভােলানাথ সার্বভৌম ১০। তপস্বীরাম বিদ্যাবাগীশ ১১। ঈশ্বরচন্দ্র চূড়ামণি ১২। ঠাকুরদাস বিদ্যালঙ্কার ১৩। রামচন্দ্র চূড়ামণি ১৪। মনসারুণ বিদ্যালঙ্কার ১৫। মুক্তারাম বাচস্পতি ১৬। ক্ষেত্ৰনাথ তর্কবাগীশ ১৭। রামসুন্দর চক্রবর্তী (রাণীর গুরুদেব),, ১৮। উমাচরণ ভট্টাচাৰ্য (ঐ পুরােহিত) ১৯। বিশ্বনাথ তর্কপঞ্চানন ২০। ঈশানচাৱৰাগীশ ২১। মাষকুমার তর্কালঙ্কার ২২। পীতাম্বর চূড়ামণি ২৩। পঞ্চানন বিদ্যালঙ্কার ২৪। দিননাথ ঐ . ১১ ১) যাদড়া। ব্রাহ্মণপাড়া। বাগবাজার। বরাহনগর। গোলপাড়া। গােলপাড়া। জগদ্বল্লভপুর। ৩ পাকব।

৮২ রাণী রাসমণি। ২৫। মধুসূদন তর্কালঙ্কার সাকি ঐ চূড়ামণি গুস্কর। বেলকুলী। লসিনী। ঝিখিরা। ১) জগনগর। অনন্তরামপুর । হাকিমপুর। মেলে। কঁকড়াফুলি । গােপালনগর। a ২৭। গােপাল শিয়ােমণি ২৮। ক্ষেত্ৰনাথ বিদ্যালঙ্কার ২৯। গােলকচ ঐ ৩০। কার্তিকচন্দ্র ন্যায়রত্ব ৩১। মাধব শিরােমণি ৩২। মদনমােহন তর্কালঙ্কার ৩৩। ঈশানচন্দ্র বিদ্যার্ণব ৩৪। গণেশচন্দ্র সিদ্ধান্তবাগীশ ৩৫। মধুসূদন চূড়ামণি, ৩৬। নৃসিংহ বিদ্যারত্ন ৩৭। রণরাম ভট্টাচার্য্য ৩৮। ধনঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য্য ৩৯। নবকুমার চুড়ামণি ৪০। পরাণচন্দ্র বিদ্যারয় ১১। বিশ্বম্ভর ভট্টাচাৰ্য ৪২। গঙ্গাধর ঐ ৪৩। মনােমােহন ঐ ৪৪। সারদা বিদ্যাবাগীশ ৪৫। রামচন্দ্র চুড়ামণি ৪৬। ফকিরদাস ভট্টাচাৰ্য্য ৪৭। মৰমােহন তর্কালঙ্কার ৪৮। সীতারাম বিদ্যাভূষণ পাচারুল। কাশরা। ধামাই টিকর। দেওয়ানের ভেড়ী। বাসুদেবপুর। মধুবাটী। বাকীপুর। মির্জাপুর। ঐ মেলে। চাণক মণিরামপুর। ভাদুড়া। নাটাগড় দিক। পাঁতিহাস।

তৃতীয় খণ্ড। ৮৩ সাকিম সেয়াগড়। পাইকপাড়া। নয়াচক। সাচক। 2 ১) পানপুর । গােণ্ডলপাড়া। জগদ্বল্লভপুর । কেশব নগর। ওয়াদপুর। ঐ ইরাল ! আদান। ৪৯। সীরাম ভট্টাচাৰ্য ৫০। চণ্ডীচরণ বিদ্যাভূষণ ৫১। সার্থকরাম শিরােমণি ৫২। বৈকুণ্ঠনাথ ন্যায়রত্ন ৫৩। কৃত্তিবাস ভট্টাচাৰ্য্য ৫৪। বৈকুণ্ঠ স্যায়রত্ন ৫৫। পীতাম্বর চুড়ামণি ৫৬। রামকল্প ভট্টাচার্য্য ৫৭। কালীপদ বিদ্যার্ণব ৫৮। লাবাদ বিদ্যানিধি ৫৯। কাশীশ্বর বিদ্যারত্ন ৬০। মুক্তারাম ভট্টাচার্য ৬১। উমাচরণ ঐ ৬২। মহেশচন্দ্র চূড়ামণি ৬৩। কেশবচন্দ্র তর্কবাগীশ ৬৪। বৈকুণ্ঠনাথ ন্যায়রত্ব ৬৫। গােবিন্দচন্দ্র বিঙ্গভূষণ ৬৬। বৈকুণ্ঠনাথ স্বায়ত্ব ৬৭। কৃত্তিবাস তর্কর ৬৮। রাইচরণ ভট্টাচাৰ্য্য ৬৯। বৃন্দাবন ভট্টাচাৰ্য ৭০। পার্বতীচরণ ট্রাস ৭১। যদুনাথ সার্বভৌম ২) রাঘবত্র কালার ১১ ১১ ধাহান। গড় ভবানীপুর। বালীচক। ইটারাই। কলিকাতা বেলগেছিয়া। ১১ গােণ্ডলপাড় । কমলাপুর। মামুদপুর। মপুর। মাড়া, .

৮৪ রাণী রাসমণি। ভগবতীপুর। শশাবেড়িয়া। উগারদহ। গােণ্ডলপাড়া। ওয়াদিপুর। J J ৭৩। কালীচরণ চূড়ামণি সাকিম ৭৪। কাশীনাথ ভাগবতভূষণ ৭৫। শ্যামচরণ তত্ত্বনিধি ৭৬। প্রেমাদ বাচস্পতি ৭৭। বাণেশ্বর বিদ্যাভূষণ ৭৮। চিন্তামণি বিদ্যাসাগর ৭৯। বনমালী চুড়ামণি ৮। নবকুমার শিরােমণি ৮১। প্রতাপচন্দ্র হালদার ৮২। দেবীচরণ তর্কালঙ্কার ৮৩। রামধন ভট্টাচাৰ্য্য ৮৪। আনন্দগােপাল চূড়ামণি ৮৫। শ্রীভুবনমােহন ভট্টাচাৰ্য্য ৮৬। শ্ৰীব্রজনাথ চক্রবর্তী s তেঘরি। পােলবা ওয়াই। বাজেপ্রতাপ। থােষালপুর। রঘুনাথপুর। ওয়াদিপুর। এতদ্ব্যতীত নবদ্বীপ,কাশী, ভট্টপল্লী, পুরী,বিক্রমপুর, পুনা,মাজ্জাজ প্রভৃতি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশ হইতে সমাগত বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণগণ উপস্থিত ছিলেন। সকলেই যথাষােগ্য দক্ষিণ ও দান গ্রহণে পরিতুষ্ট হইলেন। অন্ন- পূর্ণা স্বরূপিনী রাণী দীন-দরিদ্রগণকে অকাতরে অন্ন বিতরণ করিলেন। বিপুল জনসং সে দিন পানভােজনে পরিতৃপ্ত হইয়াছিল। দধি-পুষ্করিণী, পায়স-সমুদ্রক্ষাগ-দুর্থ-সাগর,তৈল-সয়ােবর ঘৃত-কূপ, সূচী-পাহাড় মিষ্টান্ন- কাপ,কলা-পত্র-রাশি, মৃগল্পপাত্রের ঝুপ প্রভৃতির অপূর্ব দৃশ্যেপূণ্যশীলা রাণীর সেই অনুদান-জ্ঞ পরম শােভাসম্পন্ন হইয়াছিল। অসাধারণ প্রতিভা সম্পন্ন জোময়ী এই আনারী যে প্রণালীতে সেই বৃহদনুষ্ঠান নির্বাহ করিয়া গিয়া- তৃতীয় খণ্ড। হেন, অধুনা বাঙ্গলার তেমন বুদ্ধিমান শিক্ষিত ব্যক্তিও সে সকল-কাৰ্য্য ও সৌষ্ঠব সহসা ধারণা করিতে সমর্থ হইবেন না। তাঁহার এই দান কার্যের তুলনা নাই। তাহার এই পুণ্য কার্যের বিষয় চিন্তা করিলে শরীর রােমাঞ্চিত হয়। বঙ্গীয় মহিলা এই সে দিন গৌড়ীয় ধর্মানুরাগের বিজয়স্তম্ভ স্বরূপ—বাঙ্গা- লার স্থাপত্য বিদ্যার—কলা বিদ্যায় শেষ নিদর্শন যে কীত্তি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন, যে দানযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছেন, পুণ্যসলিলা ভাগীরথী তরঙ্গ-কল্লোলে অনন্তকাল তাহার জয়গীতি গাহিয়া গাহিয়া বহিয়া যাইবে। । দানেই তাহার বীরত্ব। তাহার হৃদয়ের অনুপম গুণরাশির সুমিষ্টতম বিকাশ এই দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে। এই তাহার প্রধান কীর্তি। এখানেই তাহার মহত্বের প্রতিষ্ঠা। এখান হইতেই তাহার সুকৃতির সৌরভে দিগ- দিগন্ত আমােদিত হইয়াছিল।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ দ। “ভবতারিণী মূর্তি” ও সেবা পূজাদির ব্যবস্থা। কালীমন্দিরের অভ্যন্তরে বেদীর উপরে ঘনরৌপ্যনিৰ্ম্মিত যথাক্রমে ছােট বড় দলে গঠিত রৌপ্য-শতদল ; উহার পরিধি প্রায় তিন হাত। এই বিশাল ঘন দৃঢ় রৌপ্যময় দল গঠিত শতদলের উপরে শিব ! তাহার উপরে স্থিতা আট নয় বর্ষ বয়স্কা একটা পাষাণময়ী বালিকা-মূৰ্ত্তিই দক্ষিণেশ্বরের প্রসিদ্ধ কালী। সে মূৰ্ত্তি অতীব আনন্দময়ী, দেখিলেই বাৎসল্য-ভক্তির সঞ্চার হয়। রাণী রাসমণি যেমন অপার ঐশ্বৰ্যশালিনী রাণী, এ কন্যাও তেমনই সৰ্বাভরণ-ভূষিত রাজকন্যা। শিরঃ, কর্ণ, কণ্ঠ, বক্ষঃ, কটি, পাদপদ্ম কাঞ্চন-রত্নাদিতে পরিব্যাপ্ত ও খচিত। পার্শ্বেই রৌপ্যময় খাট ও শয়নের বিবিধ সমুজ্জ্বল উপকরণ ; রূপার বাটা, রূপার কলস, হাঁড়ী, স্থালী, মাস চামর প্রভৃতি যথানিয়মে সজ্জিত। দেখিলেই মনে হয়, যেন রাজাভরণে গৰ্বি আনন্দময়ী দিব্য বালিকা। ইহার পূজার জন্যই রাণী রাসমণি অপার ধন জলস্রোতের ন্যায় দক্ষিণেশ্বরে ঢালিয়া দিয়াছেন। সে অর্থের দ্বারা একজন লােক মহারাজ উপাধি গ্রহণ, ধারণ ও পােষণ করিতে অবলীলাক্রমে সমর্থ হয়। কালীবাড়ীর সেবা নির্বাহের জন্য রাণী রাসমণি যে জমদারী দেবদত্তর দান করিয়াছেন তাহা দিনাজপুর জেলার ৭৩ ৭৪ নং *অনেকে বলেন প্রতিষ্ঠায় সময় দক্ষিণের দেবালয় গুরুকুলকে দান করিয়াছিলেন তৃতীয় খণ্ড। ৮৭ তৌীভুক্ত। উহার সদর জমা বার্ষিক চব্বিশ হাজার টাকা বার্ষিক স্থিত প্রায় ষাইট হাজার টাকা। এই জমিদারীর মূল্য চিন্তা করিলে বিস্মিত হইতে হইবে। রাণী রাসমণির জীবন কালে এই জমিদাবীর আয়ে কালীবাড়ীর বিরাট দেবসেবা ও অতিথি সেবার সামান্য অংশই নিৰ্বাহ হইত। এখনও এই জমিদারীর আয় দ্বারা কালীবাড়ীর পূজা, উৎসব ও আতিথ্যব্যয় সঙ্কুলান হয় না, আবও টাকা দিতে হয়। রাণীর জীবনকালের মহােৎসবে, অন্নদান যত্নে প্রতি বৎসর বহুতর টাকা অন্য তহবিল হইতে প্রদান করিতে হইত। তাহার সময়ে মন্দিরের সন্নিহিত স্থানের মাসিক ৫০ টাকার নূন বেতন- ভােগী যে কোন আফিসের কর্মচারী ইচ্ছা করিলে প্রতিদিন কালীর অন্ন- ভােগ প্রসাদ পাইতেন—বাসা খরচ করিতে হইত না। ইহা একটা নিয়ম মাত্র মূলে নিকটস্থ বাসাধারী প্রায় সকলেই কালীর প্রসাদ পাইতেন। এইরূপ বিরাট ব্যয় পশ্চিমের রাজ রাজারা ছাড়া অন্যের পক্ষে নির্বাহ করা কত কঠিন, তাহা চিন্তনীয় ! স্বর্গীয়া রাণী রাসমণি অম্লানচিত্তে, খােলা হৃদয়ে এই ব্যয়ভার অকাতরে বহন করিয়াছেন। মন্দিরের ভূমি ক্রয়, পােস্তা, ঘাট, মন্দির নির্মাণ, মন্দির প্রতিষ্ঠা, দেবােত্তর জমিদারী দান,সেবা, উৎসব ও আতিথ্যের বাবদ এক দক্ষিণেশ্বরের কল্যাণেই রাণী রাসমণি কিয় মন্দিরসংক্রান্ত দলিলপত্রে দেখা যায় যে, ১২৬৮ সালে অথবা ১৮৬১ খ্রীঃ ২৭শে আগষ্ট তারিখে রা দিনাজপুর বিভাগের জমিদায়ীসহ উক্ত দেবালয় দেবােত্তর সম্পরূপে রেঞ্জে করিয়া দিয়াছিলেন। মন্দিয়ের কাৰ্য ১২৪২ সালে আন্ত হইয়া অষ্টাদশ কাল পয়ে ১২৬০ সালে শেষ হয় এবং ১২৬১ সালে স্নান যায় দিন মন্দির প্রতিষ্ঠা হয় 'নুৎপয়ে উ লেখা পড়া করিল ব্লেগে করিয়া দেওয়া হইয়াছে।

৮ রাণী রাসমণি প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া গিয়াছেন। ইহা ছাড়া দেব-প্রতিষ্ঠা ও অন্যান্য বিবিধ তীর্থে অসত্রাদির কথা ত বলাই বাহুল্য। রাণী রাসমণি এই অপার অর্থ ব্যয় করিয়াও স্বকীয় জমিদারী প্রভৃতি সম্পত্তির বিন্দুমাত্র ক্ষতি করিয়া যান নাই। সেগুলি তাহার বংশধরগণের হস্তে ক্রমশঃই বিস্তার লাভ করিতেছে। দক্ষিণেশ্বরের কালী মাতার সেবার্থে রাণী রাসমণি ৭০। ৭৫ জন কর্মচারী এবং একটা ব্রাহ্মণ-পরিবারও নিযুক্ত করিয়াছিলেন। এই ব্রাহ্মণ পরিবারের নিবাস .জেলা হুগলীর অন্তর্গত কামারপুকুর গ্রাম। ইহারা রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ, খড়দহ মেল, গোপালের সন্তান, স্বভাব ; ইহারা চট্টোপাধ্যায়। কালী মাতার পূজা নির্বাহের জন্য রাণী রাসমণি খুদীরাম চট্টোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র রামকুমার চট্টোপাধ্যায়কে নিযুক্ত করেন। তাঁহার পুত্রপৌত্রগণ কালীমাতার পুজারীগিরি করিয়া আসিতেছেন। খুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের তিন পুত্র। জ্যেষ্ঠ রাম- কুমার, মধ্যম রামেশ্বর, কনিষ্ঠ গদাধর। রানেশ্ববের পুত্র রামলাল। এই দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ীর পূজারীর কাৰ্য্য অতীব শ্রমসাধ্য ব্যাপার। দৈনন্দিন কাৰ্য মধ্যে প্রতিদিন প্রাতে আরতি করিতে হয়, দশটায় সময় নৈবেদ্যভােগ, বারটার সময় অব্যঞ্জন ভােগ, ছয়টার সময় ছানাসনে- শাদি দ্বারা বৈকালিক ভােগ, রাত্রি আটটার সময় শীতলীভােগ লাগাইতে হয়। ইহা ছাড়া প্রতি অমাবস্যায় পূজা, বিশেষতঃ কার্ত্তিক অমাবস্যা, সাবিত্রী চতুর্দশী, স্নানযাত্রা ও জন্মতিথির পূজা বিশেষ কার্য্য। ইহা ছাড়া দূর্গোৎসব, বাসন্তী, রটন্তী, জগদ্ধাত্রী পূজা করিতে হয় ; প্রয়ােজন মতে বিষ্ণু অর্চনার উৎসব, খুন, জন্মাষ্টমী, মাস প্রভৃতিতে যােগ দিতে হয়। রামকুমার ভট্টাচাৰ্য দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার পর কালীমাতার পূজকপদে প্রথম নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তাহা মৃত্যুর পর, তদীয় কনিষ্ঠ

তৃতীয় খণ্ড।
৮৯
আতা গাধর রাণীর জামতা মধুর বাবুর কৃপায় পূজারীর কাৰ্য্যে ব্রতী হন
এই গদাধরই ভবিষ্যৎ রামকৃষ্ণ পরমহংস।
এই গঙ্গাতীরবর্তী দেবালয়—এই পূণ্যভূমিই তাহার ভাবী সাধনা-
ক্ষেত্র, জীবনের লীলাস্থল। বঙ্গের এই মহাপীঠ হইতেই তিনি ভাবীজীবনে
‘সব ধর্ম সত্য, যত মত তত পথ” এই উদারনীতি প্রচার করিয়াছিলেন;
মনের সাথে মায়ের পূজা করিতে পারিয়াছিলেন।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। রামকৃষ্ণ পরমহংস। পরমহংস রামকৃষ্ণের কতিপয় শিষ্য তাহার বাহ ও জীবন সম্বন্ধে অনেক কথা লিখিয়াছেন। তাহারা পরমহংসের ভজন ও উপদেশাদি সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন, তাহার উপরেই অনেকাংশে আমাদিগকে নির্ভয় করিতে হইবে; কিন্তু তাহার বাহ জীবনের অবস্থায় যাহা দক্ষিণেশ্বর ও দক্ষিণেশ্বর নবরত্নমন্দিরের স্থাপয়িত্ৰীসহ বিজড়িত, যাহা স্বাধীন প্রমাণা- তবেদ্য সেই অংশে তাহাদের বর্ণনার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিতে পারি মা; এই অংশে তাহাদের লেখা অপূর্ণ, অস্পষ্ট, মলিন ও সহৃদয়তা-বিহীন। অথচ, এই অংশের মধ্যেই পরমহংস রামকৃষ্ণের ধর্মজীবনগত জন্ম, শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য ও অবসান নিহিত রহিয়াছে। মাদি শাস্ত্রে দেখিতে পাই, প্রাকৃত জনক জননী হইতেও ধৰ্ম্মজীবনের পালকপালিকাগণের গণ অধিকতর গুরুভারাক্রান্ত। ধৰ্ম্মজীবনের সহায় ও আশ্রয়দাতৃগণের জীবনসহ ধার্মিকের জীবন অচ্ছেদ্য শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত থাকে। সেই শৃঙ্খল- সৌন্দৰ্য্য ও মহিমা হৃদয়ঙ্গম না হইলে, ধাৰ্মিক জীবন বুঝিয়া উঠা যায় না। এমন কি, ধৰ্ম্মজীবনের শত্রুগণ পর্যন্তও আলােকপ্রদ হয় এবং ধার্মিকের সঙ্গে সঙ্গে অমরতা লাভ করিয়া থাকে। পরমহংসের জীবন হৃদয়ঙ্গম করিতে হইলে, এই অংশ উপেক্ষা করিলে চলিবে না। যিনি তাহার ধর্ম- জীবন লিখিয়া কৃতকাৰ্য্য হইতে চাহেন, তাহাকে এই অংশের প্রতি সমু চিহ সহৃদয়তা প্রকাশ করিতে হইবে। আমরা তার জীবনী লিখিতে তৃতীয় খণ্ড। বসি নাই; তাহার জীবন সম্বন্ধে সাধারণ ভাবে কয়েকটা কথামাত্র এস্থলে বলা অভিপ্রায়—দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরসহ তাঁহার জীবন সম্বন্ধ বিজ- ড়িত—তাঁহার শয্যাসন পাদুকা এখনও দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে রক্ষিত। অথচ, পরমহংসের ভক্ত লেখক সম্প্রদায় যেন দক্ষিণেশ্বরের সম্পর্ক না করিয়াও তাঁহার জীবনী ধারণা করিতে সমর্থ বলিয়া মনে হয়। আমাদের ক্ষুদ্র বিবেচনায় তাহাদের লেখা এই অংশে অস্পষ্ট, অপূর্ণ ও মলিন। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের স্থাপয়িত্রী রাণী রাসমণির পরে তাহার একতম দৌহিত্র ও উত্তরাধিকারী মথুরাবাবুর পুত্র ত্রৈলােক্যনাথ বিশ্বাস মহাশয় আজীবন দক্ষিণেশ্বরের সেবাইতের কাৰ্য চালাইয়া গিয়াছেন। পরমহংস- ঘটিত বহু কাৰ্যই তাহার চক্ষের উপরে, তাহার কর্তৃত্বের অধীন ও রক্ষণা- বেক্ষণে ঘটিয়াছে ; তিনি পিতা ও মাতামহীর সতি পরমহংস সম্বন্ধীর বহু ঘটনাতেই স্বয়ং জড়িত ছিলেন, অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন এবং যাহা প্রত্যক্ষ করেন নাই, তাহাও তাঁহার জানিবার বিশেষ সুবিধা ও অধিকার ছিল। বলিতে কি পরমহংসঘটিত কোন কথাই তাহার অপরিজ্ঞাত ছিল না। তিনি যে ভাবে পরমহংস-সক্রান্ত ঘটনা বিবৃত করিয়াছেন, তাহা হইতেই পরমহংস দেবের বাহ জীবন সম্বন্ধে এইরূপ আভাষ প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে - “গদাধর পূজারী কার্যে নিযুক্ত হইয়া, প্রথমতঃ কালীবাড়ীর মানে- জার, সহকারী ম্যানেজার প্রভৃতি মুনিবর্গকে তুষ্ট করিতে সমর্থ হন। সুন্দররূপে কালীপূজা ও শিবপূজাদি চলিতে লাগিল। শেষে গদাধরের টী বাহির হইতে লাগিল। পূজকের যেরূপ নিষ্ঠা নিয়ম থাকা আবশ্যক, তাহাতে তাহার জুটা দৃষ্ট হইতে লাগিল,পূৰ্ব্ববৎ যথানিয়মে পূজাগুলি তিনি • ব্যরত প য় ও ৩য় সংখ্যা।

৯২ রাণী রাসমণি নিৰ্বাহ করিতে শৈথিল্য করিতে লাগিলেন। যে পূজার জন্য এত আয়ে- জন, সেই পূজায় বাধা পড়িতে লাগিল। ঠাকুরবাড়ীর কর্মচারিগণ যার পর নাই ক্ষুব্ধ কুদ্ধ ও দুঃখিত হইলেন। তাঁহারা গদাধরকে পূজারীয় অযােগ্য স্থির করিলেন। তাহাদের ইচ্ছা হইল, উহাকে বহিষ্কৃত করিয়া দেন। পরিশেষে তাহারা সমস্ত বিষয় মথুরবাবুর নিকট পেশ করিলেন। তিনি সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া, গদাধরকে কোন প্রকারের সাধক শ্রেণীর লােক বলিয়া সন্দেহ করিলেন, তাড়াইয়া দিলেন না; তাঁহার দ্বারা কাৰ্য্য চালাইয়া লইতে বলিলেন। অন্যের সাহায্য কাৰ্য একরূপ চলিল। রামকৃষ্ণের ভক্তগণ বলেন, তিনি প্রেম-বিহ্বলতাবশতঃ পূজাদি করিতে সমর্থ ছিলেন না। যাহা হউক, হার ব্যবহার সম্বন্ধে নানা অর্থই হইতে লাগিল। মথুরবাবু নিজে একজন সাধক লােক ছিলেন ; রাণী রাসমণি বিশেষ চেতনাসম্পন্ন নারী ছিলেন। তাহারা তাঁহার সমস্ত ক্ৰটী মার্জনা করিয়া, তাহাকে সমাদর করিতে লাগিলেন। কর্মচারিগণ আর করিবেন কি? তাঁহাদের উভয়ের এইরূপ সমাদরের ভাব দেখিয়া গদাধরের বিপক্ষগণ নীরব হইলেন। গদাধর উত্তয়ােত্তর পূজাদি কাৰ্য্যে সম্পূর্ণ অসমর্থ হইয়া পড়িলেন। তাঁহার নিকটে সাধুভাবাপন্ন লােক আসিয়া উপস্থিত হইতে লাগিলেন। অবশেষে মথুরবাবু পূজার জন্য অন্য বন্দোবস্ত করিয়া গদাধরকে জানবাজারের বাড়ীতে লইয়া গেলেন। সেই স্থানে তিনি কতক কাল বাস করিবার পর মথুরবাবু তাঁহাকে লইয়া তীর্থ পৰ্যটনে বহির্গত হইলেন। প্রায় অশীতিসহস্র মুদ্রা ব্যয়ান্তে তাহাকে লইয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন ও স্বাধীনভাবে চলিবার অধিকার জান করিয়া দক্ষিণেশ্বরে রাখিয়া দিলেন। “এই সমগ্রকাল, ব্যাপিয়া তাহাকে কোন কঠোর ভজন, তপস্যা ইত্যাদি করিতে দেখা যায় নাই; ধ্যানকামী এবং উন্মত্তের ন্যায় আচরণ- তৃতীয় খণ্ড। শীল দেখা গিয়াছে। তাহার মুখে গভীর জ্ঞানগর্ত কথা শুনা গিয়াছে ও তাহাকে বহিঃসংজ্ঞাহিত হইতে দেখা গিয়াছে, এই সম্বন্ধে কৰ্ম্মপর মনুষগণের ধারণা করা সহজ নহে। তবে মথুরবাবু ও রাণী রাসমণি স্বয়ং কতক অনুভব করিয়া এবং লােকের কাছে শুনিয়া তাহাকে বড় সাধক বলিয়া ভক্তি করিতেন। তাঁহাদের আশা ছিল, রামকৃষ্ণের প্রভাবে দক্ষিণেশ্বর জাগ্রত হইয়া উঠিবে। তাহারা রামকৃষ্ণের সাধনায় গুরু গভীর কথায়, সমাধির ভাবে তাহাকে অত্যন্ত শ্ৰন্ধা করিতেন ও ভাল বাসিতে লাগিলেন। মাতা যেমন শিশু পুত্রের শৌচাশৌচ, দোষাদোষ দর্শন করেন না, তাহাদের দৃষ্টিও রামকৃষ্ণের প্রতি সেইরূপ হইল। তাহারা তাহার কার্যে ত্রৈলােক্য বাবুর ন্যায় কঠোর কর্মীর সমালােচনা-চক্ষে দৃষ্টি করিতেন না; করিলে গদাধরের পক্ষে দক্ষিণেশ্বরে সেইভাবে সাধনমার্গে, চলা সহজ হইত কি না, বলিতে পারি না। এই সকল কথা চিন্তা করিলে মনে হয়, পরমহংস রামকৃষ্ণ নিজ সাধন ভজন জন্য, উন্নত জীবন লাভের জন্য, রাণী রাসমণি ও মথুরবাবুর নিকট কত ঋণী !!. সে মেহ, সে কৃপা, সে শ্রদ্ধা ও মমতা, মহান্ উদারতা নিজ জনক জননীর নিকটেও তিনি পাইতেন না। এই সকল কথা তার জীবন চরিতে অতীব ম্লান, অতি অস্পষ্ট যেন বিলুপ্তপ্রায় বলিয়া বােধ হয়। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি কঠোরকর্মী লৈােক্য বাবু পরমহংসের কাৰ্য্য সমালােচনার চক্ষে দেখিতেন-সঙ্গেও কদাচ এন্ধাভক্তি প্রদর্শনে জটা করেন নাই। তিনি পরমহংসের ভক্তি জ্ঞান ও সমাধি প্রভৃতি গুণ দর্শন করিয়া অতীৰ ভক্তি করিতেন; কিন্তু অনুষ্ঠান অংশে তাহাকে বিশেষ সালােচ্য মনে করিতেন। তাঁহার চক্ষে “দাহাকে, রামকৃষ্ণ বলে সে কোন কোন বিষয়ে খুবই ভাল ছিল”। গরতবর্ষের কঠোরকর্মী গৃহস্থ ও কর্ম সন্ন্যাসী মধ্যে বৈষম্য ঠিয়দিন রাী রাসমণি। র চলিয়া আসিতেছে। তবে যাহাদের কোন বিষয়ে নিষ্ঠা নাই, তাহারা খুব উদার হইতে পারেন, আর কিছু উদার হইতে পারেন জ্ঞানাভাস-সম্পন্ন ব্যক্তি। আসল হইতে দৃঢ়কর্মনিষ্ঠ সাধু গৃহস্থকে হীন বলা যায় না। ত্রৈলােক্য বাবু এইরূপ দৃঢ় কর্মনিষ্ঠ সাধু গৃহস্থ ছিলেন। রামকৃষ্ণ পরম- হংস কি ভাবে প্রথমতঃ পূজারী পদে বৃত হইয়া, কি আকারের অনুষ্ঠান করিয়া উন্নত জীবনের অবস্থায় পৌছিয়া ছিলেন, তাহার কিছু আভাস প্রদান করা হইল। তিনি একজন গরীবের সন্তান দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে পূজারীর কার্যে নিযুক্ত হইবার পরেও কতক কাল পর্যন্ত অর্থাৎ যৌবনাবস্থার অনেক অংশ ব্যাপিয়া একজন কর্মপুর গৃহস্থ, কৃতদার ও জীবিকার্থী। তাহার জীবনে স্বাধীনভাবে তীর্থ-পৰ্যটন, কৃচ্ছসাধনা ও বৈরাগ্য-কঠোরতা লক্ষিত হয় না, অথচ যেন অকস্মাৎ বিকশিতজ্ঞান বা জাগ্রত বলিয়া প্রতীত হয়। এই জন্য অনেকে তাহাকে ভগবৎকৃপাসিদ্ধ বলেন। তিনি একবার বৃন্দাবন পর্যন্ত তীর্থ-পৰ্যটন করিয়াছিলেন, কিন্তু সে মথুরবাবুর স্নেহভক্তির শীতল ক্রোড়ে উঠিয়া—তাহাতে মথুরবাবুকে পৰ্যাপ্ত দান ও অর্থব্যয় করিতে হইয়াছিল। তিনি দক্ষিণেশ্বরের উদ্যানে যেন অবরুদ্ধ, বহু ভক্তজন কর্তৃক সেবিত, পালিত ও রক্ষিত; তাহার শয্যা- সন, পাদুকা দক্ষিণেশ্বরে প্রাসাদ-মন্দিরের এক নিভৃত কোণে সুরক্ষিত বটে, কিন্তু দর্শন করিলে মনে একটা বিষাদের ছায়া পতিত হয়। মনে হয়, উহা যেন গভীর বনের লতাগুল্ম-পরিবৃত হইয়া লােকলােচনের অন্তরালে নিহিত। “রাণী রাসমণি একটা মহা পবিত্র প্রেরণায় পরমহংস রামকৃষ্ণের অদ্ভুত চরিত্রের বিকাশ ও প্রসারােপযােগ স্থান নির্মাণ করিয়াছিলেন আর তাহার প্রভাবশীল জামাতা মথুরবাবু ঐরূপ উচ্চ প্রেরণায় সেই দেব- চল্পির বিকাশের সময় অন্য যাহা কিছু প্রয়ােজন হইত, তৎসমুদায় যােগাইয়া স্বভাবসম্পন্ন তৃতীয় খণ্ড। ছিলেন। মধুর বাবু ধনী অথচ উচ্চ প্রকৃতিসম্পন্ন, বিষয়ী হইলেও ভক্ত, হঠকারী হইলেও বুদ্ধিমান; ক্রোধপরায়ণ হইলেও ধৈৰ্য্যশীল এবং স্থির প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনিও ইংরাজী ভাষাভি-কিন্তু কোন কথা বুঝাইয়া দিতে পারিলে উহা বুঝিয়াও বুঝিব না এরূপ ছিলেন না; ঈশ্বব বিশ্বাসী ও ভক্ত—কিন্তু তাই বলিয়া ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে যে বাহা বলিবে তাহাই যে চোক কাণ বুজিয়া অবিচারে গ্রহণ করিবেন তাহা ছলেন না, তিনি ঠাকুবই হউন বা গুরুই হউন বা যে কেহ হউন ; 'দার প্রকৃতি ও সরল--কিন্তু তাই বলিয়া বিষয় কৰ্ম্মে বা অন্য কোন বিষয়ে য় মূর্খের মত ঠকিয়া আসিবেন তাহা ছিলেন না। বাস্তবিকই পুত্রহীনা রণী রাসমণির অন্যান্য জামাত বৰ্তমান থাকিলেও বিষয় কবে আবধান ও সুবন্দোবস্ত করিতে কনিষ্ঠ মথুরবাবুই তাহার দক্ষিণ হন্তস্বরূপ ছিলেন এবং তাহারই বুদ্ধি-প্রাখর্যের সহায়তায় তৎকালে রাণী রাসমণির নামের অত দপদপা হইয়াছিল বােধ হয়। পরমহংস রামকৃষ্ণের ধর্ম- জীও এই উচ্চপ্রকৃতি সম্পন্ন মথুরবাবু ও রাণী রাসমণির স্নেহ ভক্তির শীতল ছায়ায় পালিত ও রক্ষিত হইয়াছিল।

সপ্তম পরিচ্ছেদ। রাণীর শেষ জীবন। কালীমন্দির নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠার পর রাণী যত দিন জীবিত ছিলেন, ধর্মকর্ম পুঙ্গাচৰ্চাদিতে পবিত্রভাবে অতিবাহিত করিয়াছিলেন। শৈশবেব সেই ধর্মাচরণ-প্রিয়তা, সেই পরােপকারত্ৰত আমরণ তঁাহাব পবিত্র জীবনে পরিলক্ষিত হইয়াছিল। পুণ্যবতী রাণী শেষ জীবনে খুব কমই জান বাজারে থাকিতেন, অধিকাংশ দিনই সপরিবারে দক্ষিণেশ্ববে কাটাইতেন। তিনি রামকৃষ্ণ দেবকে বিশেষ ভক্তি করিতেন এবং দক্ষিণেশ্বরে গেলেই তাঁহার নিকট বসিয়া ধর্মচর্চা, ভগবৎপ্রসঙ্গ ও সাধনতজন সম্বন্ধে কথা বাৰ্তা কহিতেন। রামকৃষ্ণদেব যে প্রাণের উচ্ছাসে মধুর কণ্ঠে গান করিতেন, সে গান একবার যে শুনিত সে আর ভুলিতে পারিত না। তাহাতে ওস্তাদি কালােয়াতি ঢং ঢং কিছুই ছিল না; ছিল কেবল, গীতােক্ত বিষয়ের ভাবটা আপনাতে সম্পূর্ণ আলােপ করিয়া মর্মস্পর্শী মধুরস্বরে ঐ ভাবের যথাযথ প্রকাশ ও তানলয়ের বিশুদ্ধতা। ভাবই যে সঙ্গীতের প্রাণস্বরূপ, একথা—যে তাহার গান শুনিয়াছে সেই বুঝিয়াছে। আবার তান লয় বিশুদ্ধ না হইলে ঐ ভাবই যে আত্মপ্রকাশে বাধা পাইয়া থাকে, একথাও তাহার মুখনিঃস্থত সঙ্গীত শুনিয়া এবং অপরের সঙ্গীতের সহিত তুলনা করিয়া বেশ বুঝা যাইত। রাণী রাসমণি যখনই দক্ষিণেশ্বরে যাইতেন তখনই রামকৃষ্ণ দেবের গান শুনিতেন। নিম্নলিখিত গানটা তাঁহার প্রিয় ছিল।

তৃতীয় খণ্ড। 'কোন্ হিসাবে হরহৃদে দাঁড়িয়েছ মা পদ দিয়ে । সাধ করে জিব বাড়ায়েছ, যেন কত ন্যাকা মেয়ে। জেনেছি জেনেছি তারা তারা কি তাের এমনি ধারা, তাের মা কি তাের বাপের বুকে দাড়িয়েছিল অনি করে।” গান শুনিতে শুনিতে রাণী বালিকার ন্যায় অশ্রু-বিসৰ্জন করিতেন। রামকৃষ্ণ দেব রাণীকে কালী মাতার অষ্টসখীর অন্যতম সখী বলিতেন। দক্ষিণেশ্বরে নবরত্ন-মন্দির নির্মাণের পূর্বে রাণী কালীঘাটে একটা বাগান, বাটী, পুষ্করিণী ও আদিগঙ্গায় স্নান করিতে যাইবার ইষ্টক- নিৰ্মিত সােপানাবলী প্রস্তুত করাইয়াছিলেন। পূর্বে এই স্থানেই কালী প্রতিমার পূজা, উৎসব, ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য সকলকে ভােজন ও দান করা হইত। দক্ষিণেশ্বরে কালীপ্রতিষ্ঠার পর হইতে কালীঘাটের উৎসব বন্ধ হয়—দক্ষিণেশ্বরেই মহাধুমধামে কালীমাতার পূজাদি হইতে থাকে। দরিদ্রের ঘরে জন্মগ্রহণ করিয়া অপার ঐশ্বৰ্য্যশালীর পত্নী ও অনন্ত- বৈভবের অধিকারিণী হইলেও তিনি শৈশবস্মৃতি একদিনের তরে দুলিয়া যান নাই। পুণ্যবতী আৰ্য বিধবা দানধৰ্ম্ম তীর্থ-পর্যটনে ও দেবসেবায় তাঁহার অনন্তু বৈভব জলস্রোতের ন্যায় ব্যয় করিয়া যেমন সুনাম অর্জন করিয়াছিলেন, তেমনই আবার গৃহধর্মে পাকা গৃহিণীপণা করিয়া সংসার পরিচালনে আদর্শণীয়া ছিলেন। দাসদাসী লােকজন আত্মীয়কুটুম কন্যা জামাতা দৌহিত্রদৌহিত্রীগণে পরিবৃত থাকিয়া সােণার সংসারে রাণী গিরি করিয়া অতুলনীয় অমায়িক বানাত ও জয়াপ্রকাশের জাল দৃষ্টান্ত প্রকটিত রাখিয়া গিয়াছেন।

৯৮ রাণী রাসমণি। কাশীযাত্রার উদ্যোগ করিয়া যাওয়া হইল না বলিয়া রাণী বিশেষ দুঃখিত ছিলেন না বটে, তথাপি কাশীতে একটী শিবমন্দির স্থাপনের জন্য তাব সঙ্কল্প ছিল, তজ্জন্য কিয়ৎ পরিমাণ ভূমিও তথায় সংগ্রহ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার জীবদ্দশায় তথায় মন্দির স্থাপিত হয় নাই। তাহাব অন্যতম দৌহিত্র ও দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ীর পরবর্তী সেবাইত ত্রৈলােক্যবাবু কাশীতে রাণীর সংকল্প মত ত্রৈলােকেশ্বব’ শিবলিঙ্গ স্থাপন পূর্বক একটা মন্দির নির্মাণ করাইয়া দিয়াছেন।

অষ্টম পরিচ্ছেদ।
।
কালীঘাটে রাণীর স্বর্গারােহণ।
কয়েক মাস হইতে রাণী উদরাময় রােগে ভুগিতেছিলেন,
কমে উহা কঠিন আকার ধারণ করিল। রাণী শয্যাগ্রহণ করি-
লেন। ডাক্তার কবিরাজ সকলেই হতাশ হইল। শেষ রাণীকে
স্বাস্থ্যকর স্থানে ৩ জলবায়ুর পরিবর্তন করিতে উপদেশ দেওয়া
হইল। অনেকানেক স্থান নির্দেশ করা হইল, কিন্তু রাণী দক্ষিণেশ্বর
কিংবা কালীঘাট এই দুই স্থানের এক স্থানে থাকিবার বিষয়
নিজেই স্থির করিলেন। কালীঘাটেই থাকা মত হইল।
চিকিৎসায় বিশেষ কোন প্রকার হইল না। ১২৬৭ সাল ৯ই কান
বুধবার দিনও কাটিল বটে, কিন্তু রাত্রি বুঝি কাটিল না।
কি হয়, একটা দুর্ভাবনা সকলেরই মনে উদয় হইতে লাগিল।
রাত্রি ৮ ঘটিকার সময় কালীমাতার অর্ঘ্য, গুরু পুরােহিত সকলের পদধূলি
শিরে লইয়া ও আর আর সকলকে আশীর্বাদ করিয়া তিনি রাজচন্দ্র
বাবুর সহিত পরলােকে মিলিত হইলেন। সকলেই কঁদিতে লাগিল,
সে কথা বলা বাহুল্য। কিত্যপতেজোমরুদ্ধে” পঞ্চভূত পঞ্চভূতে
মিশাইল।
তিন জামাতা, তিন কন্যা, ১৫/১৬ জন দৌহিত্রদৌহিত্রী,
দাসদাসী দ্বারবান কর্মচারী সকলকে, কঁাদাইয়া রাণী পৃথিবী হইতে
চির অবসর লইলেন। রাণীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই কালীঘাটেই
আদিগঙ্গার তীরে কেওড় তুলার” ঘাটে শবদাহ জন্য, চন্দনকাঠের
কি হয়

রাণী রাসমণি। চিতা প্রস্তুত হইল। লােকজন সকলেই রাণীর শবদেহ বহুমূল্য চীনাংক ও কৌষেয় বস্ত্র আবৃত করিয়া রৌপ্যতাম্র-মুদ্রাসহ লাজাঞ্জলি পথে বিতরণ করিতে করিতে লইয়া গিয়া চিতায় সমর্পণ করিলেন। সৰ্ব্বভূ ধূ ধূ শব্দে স্বল্পকাল মধ্যেই রাণীর দেহ গ্রাস করিল। বাঙ্গালী রমণীকুলের মণি, আদর্শণীয়া পুণ্যবতী রাণী রাসমণি জীবন-সংগ্রামে জীবনের মহাব্রত উদ্যাপনে জীবনের বিন্দু বিন্দু ব্যয় করিয়া অনন্তধামে মহাপ্রস্থান করিলেন । কন্যা-জামাতা দৌহিত্র, দৌহিত্রী প্রভৃতি বহুসংখ্যক আত্মীয় স্বজনেব সেবা ও সমাদরে জীবনের শেষ মুহূর্তেও সজ্ঞানে সকলের অশ্রুধারা সিক্ত হইয়া চিববিদায় গ্রহণ করিলেন! রাণী গৃহস্থালীতে গৃহলক্ষ্মী রূপা, অতিথি সেবায় অন্নপূর্ণা স্বরূপা, দাসদাসীদের পক্ষে জননীস্বরূপা, পতিপ্ৰাণাদিগের মধ্যে কাত্যায়নী রূপ, সুন্দরীদিগের মধ্যে শ্রীরূপা, জননীদিগের মধ্যে গণেশজননী সম, কন্যাদিগের মধ্যে একাধারে পিতৃমাতৃসমা, জানাদিগের পক্ষে অভি- ভাবক স্বরূপা, প্রজাদের পক্ষে করুণাময়ী, আৰ্ত্তদের পক্ষে দানশীল। ছিলেন। অর্থের সদ্ব্যয় করিয়াছেন বলিয়া বলিতেছি না ; অনেকেরই অর্থ আছে, কয়টি ধনকুবের কত গুলি টাকা এককালীন দেশের উপকারের জন্য ব্যয় করিয়াছেন ? অল্প মাত্রায় যাহারা করিয়াছেন তাহারা নামের জন্যই করিয়াছেন। রাণী নামের জন্য করেন নাই। তাহার জন্য কেহ কোন তৈলচিত্র, প্রভাচিত্র বা প্রস্তর-খােদিত মূৰ্ত্তিও করেন নাই, তবে বহু স্থানে তাহার কীৰ্ত্তি তাহার নাম ও মূর্তি জাগাইয়া রাখিয়াছে। রাণীকে শােক পাইতে হইয়াছে যেমন, আনন্দও পাইতে হইয়াছে তেমন। কৃতী না হইলে জগতের উপকার সাধন করিবার ইচ্ছা না থাকিলে তিনি ধনী ব্যক্তির মত কোন তীর্থে তৃতীয় খণ্ড। বাস করিয়া জীবন যাপন করিতে পারিতেন। কিন্তু তিনি দশের জন্য দেশের জন্য, দুঃখীর জন্য, আর্তের জন্য জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন। ভগবান আশীৰ্ব্বাদ করুন, যেন এই রাণী রাসমণির পুণ্যময়ী জীবন- কাহিনী পাঠ করিয়া বাঙ্গালী নরনারী নিষ্ঠার সহিত কৰ্তব্যসাধন, অধ্যবসায়, বীরােচিত গুণাবলীর অনুকরণে প্রবৃত্তি, ঐশ্বৰ্যভােগ সাধনার শিক্ষা করিয়া জাতীয় জীবন গঠনে সহায়তা লাভ করেন। । সম্পূর্ণ। LIBRARY MAJU FUBLIC Estd. 1902 KAIN, HOW RANI 紫

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rani Rashmani Ed.1

Author
Santra, Prabodh Chandra
Title
Jiban-charit
File name
Rani Rashmani Ed.1
Text
OCR done
Citation
1913
Published
2010/04/1
Publisher
Narendranath Das,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
123
Library
Majhu Public Library, Howrah
Classification
Biography
Keywords
Santra, Prabodh Chandra
DLI number
511317
Barcode
4990010018476.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
vaANghiGRXT
Download PDF

Rani Rashmani Ed.1