Bally Sadharan Granthagar

Tara Dujan

Das, Nabagopal · 2009/10/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

3 JAN 1984 19 MAY 1989

No text on this page.

No text on this page.

তারা দুজন
শ্রীনবগোপাল দাস
জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাব্লিশার্স লিমিটেড
১১৯ ধর্থতলা ষ্ট্রীট,কলিকাতা

প্রকাশকঃ শ্রীসুরেশচন্দ্র দাস, এম-এ
জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পারিশাস লিঃ
১১৯, ধর্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা
পরিবর্ধিত নূতন সংস্করণ
আড়াই টাকা
পৌষ, ১৩৫২
.)
107
M
জেনারেল প্রিন্টার্স ম্যাণ্ড পারিশার্স লিমিটেডের
ষণ বিভাগে ( অবিনাশ প্রেস—১১১ ধর্মতলা টি,
কলিকাতা] সরেশ দাস এম-এ কর্তৃক মুদ্রিত

দিদিকে

No text on this page.

তারা দু'জন সুশান্ত আর শিপ্রা । বিধাতাপুরুষের অলক্ষিত হাতের স্পর্শকে তাহারা কেহই প্রথম জীবনে মানিয়া নিতে চাহে নাই, কিন্তু তাহার বিধান যে সাধারণ মানুষের অনধিগম্য তাহা তাহাদের জীবনে যতখানি প্রকট হইয়া উঠিয়াছিল বােধ হয় আর কাহারও জীবনে কখনও ততখানি হয় নাই। তাহাদের প্রথম পরিচয় হয় অনেকটা গতানুগতিকভাবে, অর্থাৎ, কুড়ি বছর আগে যদিও এইভাবে পরিচয় হওয়াটা গতানুগতিক ছিল না, আজকালকার রােম্যান্সের বাজারে ইহাকে নিতান্ত সাধারণ ব্যাপার ছাড়া আর কোন পর্যায়ভুক্ত করা বােধ হয় চলে না! সুশান্ত মামার বাড়ীতে মানুষ। তাহার তাহার মামীমা এবং শিপ্রার মা ছিলেন অন্তরঙ্গ সখী। তাই উভয়ের বাড়ীতেই ছেলেমেয়েদের আনাগােনা ছিল অব্যাহত। সুশান্ত অধিকাংশ সময়ই তাহার কলেজ নিয়া ব্যস্ত থাকিত। সেখানকার তর্কসভায় সে ছিল মস্ত বড় একজন পাণ্ডা। তাহার অবসর মিলিত রবিবারে, আর ছুটকোছাকা ছুটির দিনে । এমন একটা ছুটির দিনে সে শিপ্রাদের বাড়ীতে আসিয়াছিল, তাহার মামীমার সন্ধানে।

২ তারা দু'জন, চাকরের নির্দেশমত ঘরের পুরানাে মলিন পর্দাটা সরাইয়া দিয়া ঢুকিতে যাইবে, এমন সময় সে, থমকাইয়া দাঁড়াইল। কোলের কাছে একটা মাসিক কাগজ রাখিয়া উদাসভাবে বাহিরের খােলা আকাশের দিকে তাকাইয়া ছিল শিপ্রা । সুশান্ত দেখিতে পাইয়াছিল শুধু তাহার গ্রীবাভঙ্গী, আর সেই গ্রীবাকে আরও মনােরম করিয়া তুলিয়াছিল যে অলকগুচ্ছ তাহারই যেন একটা ছায়া। ঘরে অপরিচিত একটি মেয়ে বসিয়া রহিয়াছে এবং তাহার মামীমা সেখানে নাই দেখিয়া সুশান্ত ফিরিয়া যাইতেছিল। এইখানেই হয়ত আমাদের গল্পেব যবনিকাপাত হইত, কিন্তু সুশান্ত এবং শিপ্রার জীবনের সুখদুঃখের কাহিনী সকলকে শুনিতে হইবে বলিয়াই বােধ হয় সেই সময় সুশান্তর মামীমা পাশের বাড়ী হইতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সুশান্ত নাকি? আমার খোঁজে এসেছিলি বুঝি? তা চলে যাচ্ছি কেন? সুশান্ত থতমত খাইয়া বলিতে যাইতেছিল সে চলিয়া যায় নাই, কিন্তু মামীমা তাহার জবাবের অপেক্ষা না রাখিয়াই বলিয়া চলিলেন, বিনির সাথে দেখা করতে এসেছিলাম, শিপ্রা বললে পাশের বাড়ীতে আছে, তাই সেখানেই চলে গিয়েছিলাম। ওদের ছেলেটির বড় অসুখ, বিনিকে আবার ছােটমা বলে ডাকে, কিছুতেই চলে আসতে দিচ্ছে না। বিনি অর্থাৎ বিনােদিনী শিপ্রার মা, সুশান্তর মামীমার সখী। তা’ শিপ্রা কোথায় গেল? একটা পান অন্তত মুখে দিতে পালে বড় ভাল লাগত। বলিতে বলিতে তিনি শিপ্রা যে ঘরে ছিল সেখানে ঢুকিয়া পড়িলেন তারা দুজন এবং পরক্ষণেই সুশান্তকে ডাকিয়া বলিলেন, তুই বাইরে দাঁড়িয়ে রইলি কেন? ভেতরে আয় না ? বলা বাহুল্য, সুশান্তকে শান্ত সুবিনীত ছেলের মত শিপ্রার ঘরে ঢুকিতে হইল এই প্রথম সে শিপ্রাকে মুখােমুখি দেখিল। চেহারার মধ্যে অসাধারণত্ব কিছু নাই, কিন্তু মুখখানি অত্যন্ত কোমল। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যাম, চক্ষু দুইটি শান্ত অথচ বুদ্ধিতে প্রদীপ্ত, হাত দুইখানি নিটোল, বেশভূষা আড়ম্বরবিহীন। শিপ্রা ম্যাটিক ক্লাশে পড়ে । সুশান্তর শিপ্রাকে ভাল লাগিল । সুশান্তর মামীমা উভয়ের পরিচয় করাইয়া দিলেন।-এ হচ্ছে আমার ভাগ্নে সুশান্ত, সব সময় কলেজ আর বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত ; আর এ হচ্ছে শিপ্রা, যে ক্লাশের বই-এর ত্রিসীমানায় ও ঘেঁষতে চায় না, তবে অত্যন্ত লক্ষ্মী মেয়ে, তা স্বীকার করতেই হবে। সুশান্ত ছােট্ট একটি নমস্কার করিল। শিপ্রা যে.প্রতিসম্ভাষণ করিল তাহাকে নমস্কার বলিলে ভুল করা হইবে। সে যেন সুশান্তকে আহ্বান করিয়া বলিল, ওঃ আপনিই সেই সুশান্তবাবু, যার কথা মাসীমার মুখে রাতদিন লেগেই আছে ? সুশান্তই প্রথমে কথা বলিল। —আপনি অন্যমনস্কভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, বাড়ীতে আর কেউ ছিল না, তাই আপনাকে বিরক্ত না করে চলে যাচ্ছিলাম। শিপ্রা জবাব দিল । —পড়ায় আমার মন বসে না কিছুতেই, এসব নীরস জিওমেটি আর ধাতুরূপ শব্দরূপের যেন শেষ নেই। আদিহীন, অন্তহীন স্রোতে ৪ তারা দু'জন চলেছে এরা, আমরাও ভেসে চলি এদের সাথে।••••আনন্দ পাই নে। -আপনার প্রতি আমার সহানুভূতি আছে । পরীক্ষার বিভীষিকা যে কি জিনিষ তা ভুক্তভােগী ছাড়া আর কেহই বুঝতে পারে না। আমার এখনও একটা পরীক্ষা বাকী—তবে এটাই শেষ, অন্ততঃ আমার দৃঢ় সংকল্প, এর পর আর কোন পরীক্ষার দুয়ার মাড়াব না। আপনারা আশা করি বুঝিয়াছেন সুশান্ত এ-এ ক্লাশে পড়ে। এই ভাবে তাহাদের প্রথম পরিচয় । ইহার পর প্রতি ছুটির দিনেই সুশান্ত আসিতে সুরু করিল শিপ্রার পড়া বলিয়া দিতে। তাহাদের পরস্পরের সম্বােধন সহজ হইয়া আসিয়া দাড়াইল সুশান্তদা ও শিপ্রাতে। যতদিন শিপ্রার পরীক্ষার তাড়া ছিল ততদিন সময়টা এক রকম ভালই কাটিয়াছিল। শিপ্রা মেধাবী ছাত্রী নয়, তবু তাহাকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করিতেই হইবে, সুশান্তর এই সংকল্প ছিল। তাহার অধ্যবসায়ে এবং শিপ্রার চেষ্টায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ ছাত্র- ছাত্রীদের মধ্যে শিপ্রার নামও দেখা গেল। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হইবার পর অখণ্ড অবসর যখন আসিয়া উপস্থিত হইল তখনই জটিলতার সৃষ্টি হইতে সুরু করিল। সুরু করিল। যে সুশান্ত এতদিন কৰ্ত্তব্যজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষকের মত শিপ্রাকে জ্যামিতির দুরূহ তত্ত্ব বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিল সে শিপ্রার সাথে আরম্ভ করিল কাব্যচর্চা। আর শিপ্রাও পরীক্ষার প্রহেলিকা হইতে ক্ষণিক নিষ্কৃতি পাইয়া গভীর উৎসাহে কাব্যালােচনায় যােগ দিল । কাব্য সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই সঙ্কীর্ণ। সত্য কথা বলিতে কি, তারা দুজন কাব্যরসের মধুর আস্বাদ আমি কোন দিনই উপভােগ করিতে পারি নাই, কিন্তু কবিতার বিরুদ্ধে আমার কয়েকটি তীব্র অভিযােগ আছে, যাহা আমি সুশান্ত-শিপ্রার জীবন হইতে সংগ্রহ করিয়াছি। আমার মনে হয় ইতিহাস বা দর্শনের মধ্যে যে একটা আভিজাতিক ছন্দ আছে, কাব্যের মধ্যে তাহা নাই : কাব্য হইতেছে স্ফটিক স্বচ্ছ স্রোতস্বিনীর মত—ইহার স্পর্শে তরুণতরুণীর অঙ্গে লাগে মাতলামি, ইহার আবৰ্ত্ত তাহাদিগকে পরিণত করে অতি তুচ্ছ ক্রীড়াবস্তুতে। সুশান্ত-শিপ্রার অবসর জীবনেও কাব্য এই অনর্থের সৃষ্টি করিল। ব্রাউনিং-এর সনেটু আর শেলীর লিরিক্-এর মধ্য দিয়া তাহারা পরস্পরকে পরস্পরের কাছে ধরা দিয়া বসিল। সুশান্তর কোলে মাথা রাখিয়া শিপ্রা বলিল, আমি সুন্দর হ’ব শুধু তােমার জন্য, আমার অন্তর-নিংড়ানাে সুখদুঃখের গরিমা বাড়বে তােমারই পায়ের ধূলাের আশ্রয়ে। আর সুশান্তও শিপ্রাকে আদর করিয়া জবাব দিল, তুমি আমায় দেখিয়েছ নূতন জীবনের আলাে, অনিন্দিত তােমার মাধুরী, তােমাকে সাথী পেয়ে আমি জীবনের পটভূমির সব কিছু সংশয় জয় করে নিতে পারব এই আমার বিশ্বাস। আমরা আশা করিয়াছিলাম সুশান্ত শিপ্রার জীবন-নাট্যের রােম্যান্টিক অংশটার সমাপ্তি হইবে এইখানেই -প্রজাপতির অনুগ্রহে। কিন্তু বিধাতাপুরুষ বাদ সাধিলেন। শিপ্রার মা এবং সুশান্তর মামীমার মধ্যে এতদিন যে নিবিড়সখীত্ববন্ধন ছিল তাহা ছিড়িয়া গেল সুশান্ত-শিপ্রার অনর্থসৃষ্টিকারী কাব্যচর্চার ফলে। সুশান্তর মামীমা স্বপ্নেও ভাবিতে পারেন নাই সুশান্তর সাথে শিপ্রার বিবাহে তাহার মা’র কোন আপত্তি থাকিতে পারে। সুশান্তর মত জামাই যে-কোন মেয়ের মা’র কাম্য-এই ছিল তাহার বিশ্বাস।

তারা দুজন শিপ্রার মা’র লক্ষ্য ছিল অন্যদিকে। সুশান্তকে যে তঁাহার ভাল লাগে নাই এমন নয়, কিন্তু জামাই হিসাবে তাহাকে পাইবার জন্য তিনি আদৌ উদগ্রীব ছিলেন না। তাঁহার লক্ষ্য ছিল আর একটি ছেলের দিকে, সে সবেমাত্র দুইটা বিলাতি ডিগ্রী এবং ব্যারিষ্টারীর ছাপ লইয়া দেশে ফিরিয়াছে। শিপ্রাদের রক্তে ছিল কৌলিন্যের ধারা, তাহার উপর তাহাদের ছিল অর্থ, যাহা পৃথিবীর সব পিপাসা মিটাইবার পক্ষে সহায়তা করিতে পারে। শিপ্রার মা বিননাদিনী সংক্ষেপে তাহার সখীকে জানাইয়া দিলেন যে শিপ্রার বিবাহ ঠিক হইয়া অাছে ব্যারিষ্টার এবং কেম্বুিজগ্র্যাজুয়েট সমীর রায়ের সহিত, কাজেই সুশান্তর সঙ্গে তাহার বিবাহের কথা উঠিতেই পারে না। সমীর রায়ের সহিত শিপ্রার বিবাহ যদিওবা একেবারে ঠিক ছিল না, সুশান্তর মামীমার প্রস্তাবের পর বিনােদিনী সে বিষয়ে একটু অবহিত হইলেন। সমীরকে জামাইরূপে পাইবার জন্য তিনি স্বামীর ব্যাঙ্কের খাতা তুলিয়া ধরিলেন সমীরের বাবা-মার চোখের সম্মুখে। কয়েক হাজারে রফা হইল। সমীরও কোন আপত্তি করিল না, কারণ সে বুদ্ধিমান্ ; দেখিল, কৃতকাৰ্য ব্যারিষ্টার-রূপে বসিতে হইলে প্রথম কয়েকটা বছর অন্যের দেওয়া অর্থের প্রয়ােজন অনেকখানি বেশী। তাহা ছাড়া, যে দুই-একবার সে শিপ্রাকে দেখিবার সুযােগ পাইয়াছিল তাহাতে সে বুঝিয়াছিল শ্ৰী এবং সৌন্দর্যের দিক দিয়াও শিপ্রা তাহার সহধর্মিণীরূপে নিতান্ত বেমানান হইবে না। আপনারা মনে করিবেন না সমীর-শিপ্রার বিবাহের এই সমস্ত আয়ােজন চলিয়াছিল সুশান্ত বা শিপ্রার অজ্ঞাতে। মামীমার কাছে সুশান্ত +l তারা দুজন ৭ যথাসময়ে জানিতে পারিল শিপ্রাকে চিরকালের প্রিয়ারূপে পাইবার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। ওদিকে মা’র কাছে তীব্র এক ধমক খাইয়া শিপ্রা বুঝিল যে সুশান্ত পায়ের ধূলার আশ্রয়ে তাহার নারীত্বকে গৌরবমণ্ডিত করার সুযােগ সে পাইবে না। সুশান্ত এবং শিপ্রা সংসারের কুটিল আবত্তের সম্মুখীন হইল এই প্রথম। পরস্পরের দৈন্য, আলস্য এবং অসহায়তা বিশ্লেষণ করিয়া তাহারা কি দেখিতে পাইল জানি না, তবে তাহার পর যে সব ঘটনা ঘটিল তাহাতে আমি, তাহাদের জীবনের চিত্রকর, বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া উঠিলাম । সুশান্ত শিপ্রার কাছে আসিয়া বলিল, শিপ্রা, বােধ হয় শুনেছ মাসীমা তােমাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চান না। শিপ্রা ঘাড় নাড়িয়া জানাইল সে শুনিয়াছে। সুশান্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মত খানিকক্ষণ নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার পর বলিল, বল ত কি করা যায় ? --কি করবে ?••••শিপ্রা সুশান্তর প্রশ্নের উত্তর দিল আর একটি প্রশ্নে। সুশান্ত বুঝিতে পারিল না ইহার পর কি বলা উচিত। সে শুধু শিপ্রার হাত দুইটি ধরিয়া বলিল, আশা করি সমীর রায়ের সঙ্গে বিয়েতে তুমি খুব অসুখী হবে না।••••আর আমাদের এই খেলা, এটা খেলার স্মৃতিরূপেই আমাদের বুকে বেঁচে থাক্‌, একে সত্যিকারের মর্যাদা কখনো দিয়ো না, দিলে জীবনের প্রারম্ভে মস্ত বড় একটা ভুল করা হবে । শিপ্রা দিল না, হাসিল না, খুব শান্ত সহজ সুরে বলিল, চেষ্টা করব, সুশান্তদা । আমি, তাহাদের জীবনের চিত্রকর, আশা করিয়াছিলাম বিবাহের তারা দুজন রাত্রে বা তাহার আগের দিন শিপ্রা যাইবে সুশান্তর কাছে, সকলের অগােচরে, দেবদাসের পাৰ্বতীর মত। আমি আশা করিয়াছিলাম শিপ্রা সুশান্তর বুকে মাথা রাখিয়া বলিবে, এ জীবনে যদিও তােমাকে পেলাম না তবু আমি তপস্যা করতে থাকব, আছে জীবনে আমাদের মিলন যেন হয় অব্যাহত। আমি এমনও আশা করিয়াছিলাম, সুশান্ত হয়ত দেবদাসের মত শিপ্রার অঙ্গে এমন একটা চিরস্থায়ী দাগ রাখিয়া যাইবে যাহা তাহাকে চিরকাল মনে করাইয়া দিবে সুশান্তর প্রতি তাহার শান্ত সংষত ঔদাসীন্যের কথা। কিন্তু যাহা আশা করিয়াছিলাম তাহার কিছুই ঘটিল না। গােধূলি লগ্নে হাসি-আনন্দের কলরােলের মধ্যে সমীর-শিপ্রার বিবাহ হইয়া গেল। সুশান্ত শিপ্রার বিবাহে যােগদান করিল না, তাহাকে স্নেহ বা আশীৰ্বাদসূচক কোন উপহারও পাঠাইল না। ইহার পর আমি বৎসর তিনেক শিপ্রার কোন খবর রাখিতে পারি নাই। শিপ্রা চলিয়া গেল স্বামীগৃহে, আর আমি আসিলাম সুশান্তর সঙ্গে বােম্বাই-এ। সত্য কথা বলিতে কি, সমীর-শিপ্রা কি করিতেছে তাহা জানিবার কৌতূহলকে ছাপাইয়া উঠিয়াছিল নিঃস্ব সুশান্তর প্রতি আমার সহানুভূতি ! আমি জীবনের ঘটনাবৈচিত্রের চিত্রকর। জীবনের চিত্রশালায় নরনারী কি ভাবে চলিতেছে, কখন তাহারা হাসিতেছে, কখন তাহারা কাদিতেছে, আমি যথাসম্ভব বিশ্বস্তভাবে আঁকিতে চেষ্টা করি। মানুষের অন্তরের নিবিড়তম বেদনা, তাহার দিশাহারা ব্যাকুলতা, এ সমস্ত আমার ছবির মধ্যে সাধারণতঃ ফুটিয়া ওঠে না, যতক্ষণ না তাহার একটা বহিঃ- তারা দু’জন প্রকাশ হয়। শিপ্রার বিবাহের পর যে তিন বৎসর আমি সুশান্তর সঙ্গে সঙ্গে ছিলাম কোন দিন এমন একটা মুহূর্তও দেখি নাই যেদিন সুশান্ত শিপ্রার কথা ক্ষণিকের জন্যও স্মরণ করিয়াছে। সুশান্তর অজ্ঞাতে আমি তাহার ডায়েরীর পাতা উল্টাইয়া দেখিয়াছি, দেখিতে পাইয়াছি শিপ্রা সম্পর্কে তাহার শেষ উক্তি তাহার বিবাহের তারিখে–সংক্ষেপে লেখা : আজ শিপ্রার বিয়ে হয়ে গেল।..কিন্তু তাহার পর কোন দিন সে পরােক্ষে ও শিপ্রার নাম বা তাহাদের যৌবনােচ্ছল খেলার উল্লেখ করে নাই। সুশান্তর লিখিবার টেবিলে, তাহার সুটকেশে, তাহার মণিব্যাগে কোথাও শিপ্রার ছােট্ট একটি ফটোও আমি দেখিতে পাই নাই। সুশান্তর জীবনের এই তিন বৎসরের কথা বলিতে সুরু করিয়াছিলাম । যাহা দেখিয়াছি তাহাও যেন আমার কাছে কেমন প্রহেলিকাময়, কেমন রহস্যাবৃত বলিয়া মনে হয়। আমি দেখিলাম সুশান্ত অন্য কোন মেয়েকে ভালবাসিতে পারিল না, অন্ততঃ এই তিনটি বৎসর সে যেন জোর করিয়া নিজেকে নারী-সংস্পর্শ হইতে এড়াইয়া চলিল। অথচ জীবনটাকে কেন এমন করিয়া নিয়ন্ত্রিত করিল তাহার বিন্দুমাত্র আভাসও আমি তাহার কথাবার্তা বা বাহিরের ভাবভঙ্গী হইতে বুঝিতে পারি নাই। সে কিছুদিন কাজ করিল একটা সংবাদপত্রের প্রেসে। রাত্রির পর রাত্রি অক্লান্ত পরিশ্রমে সে কম্পােজিং, প্রিন্টিং ও প্রুফ রিডিং-এর কাজ তত্ত্বাবধান করিত, ভাের পাঁচটার সময় স্থানীয় এজেন্টএর লােকদের হাতে কাগজ- গুলি দিয়া সে ছুটি লইত।••••এভাবে এক বৎসর কাটিয়াছিল । পর হঠাৎ একদিন প্রেসের স্বত্বাধিকারীর সহিত দুই-একটা কথা কাটা- • কাটি হওয়ায় সে এই চাকুরী ছাড়িয়া দিল। মাস তিনেক সে আর কোন কাজের সন্ধানে বাহির হইল না—এতদিন প্রেসে সে যে অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়াছে তাহার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সে তিনমাস কাটাইল অনাবিল আলস্যে, ১০ তারা দুজন নিবিড় ঔদাসীন্যে। তিনমাস পর সে সুপ্তোখিতের মত ভাবিতে সুরু করিল। কি ভাবিয়াছিল তাহা জানা আমার পক্ষে সম্ভবপর হয় নাই, কারণ সুশান্ত স্বভাবতই স্বল্পভাষী, কিন্তু দেখিলাম সে লেখায় মন দিল। গল্প বা কবিতা লেখা নয়—গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাশীল প্রবন্ধ। কলেজে তর্কসভায় বুদ্ধিমান বক্তা বলিয়া সুশান্তর খ্যাতি ছিল, প্ল্যাটফরম্ হইতে নামিয়া আসিয়া লেখনী ধারণ করিয়াও তাহার সেই খ্যাতি অক্ষুন্ন রহিল । আমাদের দেশে গল্প লেখকরাই গল্পলেখাকে জীবিকারূপে অবলম্বন করিয়া গ্রাসাচ্ছাদনের সুবিধা করিতে পারেন না, প্রবন্ধ লেখক ত কোন্ ছার। কিন্তু সুশান্তর অর্থ সঞ্চয়ের প্রতি কোন স্প হা ছিল না। সামান্য যাহা কিছু উপার্জন করিত তাহাতেই তাহার স্বল্প ও সাধারণ অভাবগুলি মিটিয়া যাইত। এইভাবে আরও এক বৎসর নয় মাস কাটিয়া গেল। ইহার মধ্যে উল্লেখযােগ্য কোন ঘটনাই সুশান্তর জীবনে আমি ঘটিতে দেখি নাই। তাহার আড়ম্বরহীন বৈচিত্র্যবিরল জীবন পাতার পর পাতা খুলিয়া চলিল, সেখানে একটি কালির আঁচড়, এতটুকু তুলির চিহ্নও আমি দেখিতে পাইলাম না । বিবাহের পরই শিপ্রা স্বামীগৃহে চলিয়া গিয়াছিল। সমীরের শিপ্রাকে ভাল লাগিয়াছিল, যদিও শিপ্রার চেয়ে তাহার বেশী ভাল লাগিয়াছিল তাহাকে পাইবার পাথেয়টুকু। বেশ সৌখীনভাবে অফিস ও ড্রয়িং রুম সাজাইয়া সমীর রায়, বার-য়্যাল, প্রাটিস্ সুরু করিল। শিপ্রা সমীরকে ভালবাসিতে চেষ্টা করিল। সুশান্তর সঙ্গে তাহার কয়েক দিনের সাহচর্য্যটাকে সে বিগত জীবনের স্মৃতি বলিয়া মন হইতে তারা দুজন মুছিয়া ফেলিতে প্রয়াস পাইল। কিন্তু যখন আকাশে বাতাসে আলাের স্রোতে ফুলের গন্ধ ভাসিয়া আসিত, নিজের অপরিপূর্ণ জীবনের ফাকের মধ্য দিয়া অননুভূতপূৰ্ব একটা করুণ সুর বাজিয়া উঠিতে চাহিত, তখন তাহার সব এলােমেলো হইয়া যাইত। স্বামী সমীর, তাহার নূতন সাজানাে সংসার, সমস্ত সে ভুলিয়া যাইত ; তাহার মনে পড়িত তাহার ছিন্ন জীবনের সবচেয়ে গােপন কথাটি, যাহার বেদনার মধ্যে সে অনুভব করিত বিচিত্র একটা পুলক, যাহা শারদাকাশের মেঘের উপর ক্ষীণ রৌদ্রের রেখার মত তাহার অন্তরাকাশের শুভ্রতাকে করিয়া তুলিত আরও গৌরবােজ্জ্বল, আরও ঐশ্বৰ্য্যসম্পন্ন। শিপ্রার মনের বিচিত্র লীলা সমীর বিশেষ বুঝিতে পারিত না, সেদিকে তাহার নজরও ছিল না। স্বামীর যাহা কিছু দাবী শিপ্রা সমস্তই মিটাইতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিত, তাহা ছাড়া সাংসারিক স্বাচ্ছন্দ্য যাহা দরকার তাহাও সমীর পূরামাত্রায় পাইত। কাজেই মাসের মধ্যে একটি দিন যদি শিপ্রা অন্যমনস্কভাবে বসিয়া থাকিত, স্বামীর চায়ের টেবিলে আসিয়া বসার দৈনন্দিন কর্তব্যে শৈথিল্য প্রকাশ করিত, সমীর হাতে ক্ষুব্ধ বা ক্ষুন্ন হইত না। এইপ্রকার ত্রুটি জীবনযাত্রার অপরিহার্য একটা অঙ্গ, একটা বৈচিত্র্যদায়ক পরিবর্তন মনে করিয়া সে বরং খানিকটা আত্মপ্রসাদ অনুভব করিত। এইভাবে শিপ্রা-সমীরের জীবন একটানা স্রোতে ভাসিতে ভাসিতে চলিয়াছিল। সচরাচর যেমন দেখা যায় তাহার চেয়ে বেশী একটু নিবিড়তা, পরস্পরের জন্য বেশী একটু ঔৎসুক্যই বাহিরের লােকে তাহাদের মধ্যে লক্ষ্য করিত এবং আদর্শ দম্পতি হিসাবে তাহাদের দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা হইত। কিন্তু যাহারাই শিপ্রার অন্তরের আবরণটি খুলিয়া দেখিতে চেষ্টা করিয়াছে তাহারাই বলিতে বাধ্য হইয়াছে যে তাহা ১২ তারা দু'জন বেদনায় লাল এবং সেখানে রহিয়াছে সুতীব্র একটা কঠিনতা যাহার সংস্পর্শে কোমল এবং কমনীয় সব কিছুই প্রতিহত হইয়া আসে। শিপ্রার অন্তরের ক্ষত কোন দিন সারিত কি না জানি না, কিন্তু আমাদের বিধাতাপুরুষ আসিয়া আবার এক বিপ্লবের সৃষ্টি করিলেন। দুই বৎসর সমীরের গৃহলক্ষ্মীভাবে থাকার পর নিঃসন্তানা শিপ্রা বিধবা হইল। সমীরের সহিত অপ্রত্যাশিতভাবে বিবাহে শিপ্রা বিহ্বল হয় নাই, কিন্তু তাহার মৃত্যুতে সে সত্যই বিহ্বল হইয়া পড়িল। ইতিমধ্যে শিপ্রার বাবা-মা দুইজনেই মারা গিয়াছিলেন, কাজেই সংসারে দাঁড়াইবার মত কোন আশ্রয়ই তাহার ছিল না। সমীর অবশ্য কোন ঋণ রাখিয়া যায় নাই, কিন্তু তাহার সঞ্চয়ও বিশেষ কিছু ছিল না। শিপ্রা দেখিল তাহার সম্মুখে পড়িয়া রহিয়াছে মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর-তাহাকে বাঁচিতে হইবে এবং ভালভাবে বাঁচিতে হইবে। সুশান্তর কথা তাহার মনে হইয়াছিল। বিগত জীবনের সৌরভের মত ভাসিয়া আসিয়াছিল সুশান্তর কানে-কানে কথা বলা, তাহার সলজ্জ সম্ভাষণ। কিন্তু সুশান্ত কোথায়, কী ভাবে আছে তাহা যে সে কিছুই জানে না। কাজেই সে সাময়িকভাবে সুশান্তর চিন্তা মন হইতে বিসর্জন দিল। একটি বৎসর কাটিল নানা বিশৃঙ্খলায়। জীবনের ভবিষ্যৎ পথ স্থির করিয়া লইতে গিয়া সে অনেকবার ভুল করিল, স্পর্ধা করিয়া সে অনেক কিছুতে হাত দিল, আবার কিছুদিন পরেই সে মলিন মুখে ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইল। অবশেষে একটি মেয়ে-প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সে একটি বৃত্তি পাইল—বিলাতে গিয়া শিক্ষা-সম্পর্কীয় একটা ডিপ্লোমা লইয়া আসিবার জন্য। শিক্ষাক্ষেত্রেই ভবিষ্যৎ জীবনটা কাটাইয়া দিবে সে স্থির করিয়া ফেলিল।

তারা দু'জন
আমাদের গল্পের শেষাঙ্কে আসিয়া পৌছিলাম।
শিপ্রা বােম্বাই-এ আসিল, পরের দিন তাহার ইউরােপগামী জাহাজ
ছাড়িবে। বােম্বাই শহরটা একবার দেখিয়া লইবার জন্য সে এপ্ল্যানেড,
এর মােড়ে ট্রামের অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া ছিল।
সুশান্ত ও কি যেন একটা কাজে সেখান দিয়া যাইতেছিল। হঠাৎ
তাহার নজর পড়িল শিপ্রার দিকে। ঠিক সেই তিন বছর আগেকার
শিপ্রার মত, তবে যেন একটু রােগা হইয়া গিয়াছে।
সুশান্ত ভাবিতে লাগিল শিপ্রাকে সম্ভাষণ করিবে কি-না। যদি
সমীর কাছাকাছি কোথাও গিয়া থাকে তবে হয়ত শীঘ্রই আসিয়া পড়িবে
এবং তখন শিপ্রা হয়ত রীতিমত বিব্রত বােধ করিবে।
সে খানিকক্ষণ শিপ্রার দিকে তাকাইয়া রহিল। পৰ্যবেক্ষণের পর
তাহার মনে হইল, শিপ্রা একা। সে অগ্রসর হইয়া গেল ।
শিপ্রা তাকাইয়া চিনিতে পারিল। সুদীর্ঘ তিন বৎসর পর সুশান্তর
সহিত তাহার দেখা, তাহার চোখের সম্মুখে দিনের আলােগুলি যেন দপ
করিয়া জ্বলিয়া উঠিয়া আবার হঠাৎ নিভিয়া গেল ।
শিপ্রাই প্রথমে কথা বলিল, সুশান্তদা ।
-হ্যা, আমি। তা তুমি এখানে কোত্থেকে? তােমার স্বামী, মি:
রায়, কোথায় ?
শিপ্রা মলিনভাবে হাসিল। নিজের সীমন্তের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ
করিয়া বলিল, উনি বছর খানেক হ’ল মারা গেছেন। আমি একা••
বিলেত চলেছি।
সংবাদের আকস্মিকতা সুশান্তকে ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত করিয়া
দিয়াছিল। তাহার পর একটু
তাহার পর একটু আমতা আমতা করিয়া বলিল, তােমার
বাবা-মা ?•••ােমার-তােমার ছেলেমেয়ে ?

১৪
তারা দু'জন
আগেরই মত হাসিয়া শিপ্রা জবাব দিল, বাবা-মা ওঁর আগেই চলে
গেছেন। আর, ছেলেমেয়ে ? আমি ত আগেই বলেছি সুশান্তদা,
আমি একা।
-তুমি কবে বিলেত যাচ্ছ ? কেন ? কতদিন থাকবে ?•••এক
নিঃশ্বাসে সুশান্ত এতগুলি প্রশ্ন করিয়া বসিল ।
-বিলেত যাচ্ছি কাল, ভিক্টোরিয়া জাহাজে।
বৃত্তি পেয়েছি, একটা
শিক্ষা-ডিপ্লোমা নিয়ে আসব।
বছর দুই থাকতে হবে।
সুচীভেদ্য একটা অন্ধকার যেন সুশান্তকে গ্রাস করিবার উপক্রম
করিতেছিল। সে বলিল, তােমার হাতে ত সময় আছে শিপ্রা, আমার
দুটো কথা বলার ছিল, আমার সঙ্গে একটু আসবে?
শিপ্রা মুহূর্তের জন্য কি ভাবিল। তাহার পর বলিল, চলাে•••
উভয়ে হাঁটিয়া চলিল সমুদ্রের ধারে, বড় বড় ডকগুলি যেখানে শেষ
হইয়া গিয়াছে। একটা খােলা জায়গা দেখিয়া উভয়ে বসিল ।
সুশান্তই কথা সুরু করিল।
-তুমি বিলেত যাচ্ছ, বাকী জীবনটা কি তুমি শিক্ষয়িত্রী-ভাবেই
কাটিয়ে দিতে চাও, শিপ্রা ?
একটু যেন তিরস্কারের সুরে শিপ্রা বলিল, তা ছাড়া আর কোন পথ
আমার খােলা আছে কি, সুশান্তদা? বিধবা মেয়ের স্থান আমাদের দেশে
এখনও অগৌরবের। এরই মধ্যে চলনসই একটা ব্যবস্থা আমাকে ত
করে নিতে হবে, নয় কি ?
লজ্জিত সুরে সুশান্ত বলিল, সে কথা আমি অস্বীকার করছি না,
শিপ্রা...কিন্তু ভাবছিলাম, আর কি কোন পথই তােমার খােলা নেই ?
—দেখছি না ত !
সুশান্ত যেন একটু ভরসা পাইল। আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বলিল, বিগত
=

তারা দু'জন জীবনের স্মৃতি আমি জোর করে তােমায় মনে করিয়ে দিতে চাই নে শিপ্রা, কিন্তু আমায় বিশ্বাস করাে, এই তিনটি বছর আমি কাটিয়েছি আলাে-নেবানাে উৎসব-প্রাঙ্গণে ভীরু প্রহরীর মত। নিজেকে ডুবিয়ে রাখবার চেষ্টা করেছি কাজে অকাজে, বাইরে কাউকে এমন কি আমার নিজের মস্তিষ্ককেও জাতে দিইনি আমার অন্তরের কথা।•••তিন বছর আগে সাহস সঞ্চয় করে যে ন্যায়সঙ্গত দাবী জানাতে পারিনি, আজ সেটা ভিক্ষার মত তােমায় জানাচ্ছি। —আমাকে কী করতে বলো ?••••খুব সহজভাবেই শিপ্রা প্রশ্ন করিল। -বিধবাবিবাহে আমার কোন আপত্তি নেই, শিপ্রা |••••কম্পিতকণ্ঠে সুশান্ত বলিল। --কিন্তু আমার আছে।••••সুদৃঢ় স্বরে শিপ্রা জবাব দিল । সুশান্ত এতক্ষণ যে কল্পনা-সৌধ রচনা করিয়া তুলিতেছিল, শিপ্রার এই সংক্ষিপ্ত জবাবে তাহা মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হইয়া গেল। সে বেদনাপাণ্ডুর মুখে বসিয়া রহিল। শিপ্রা কথা বলিল, খুব ধীরে ধীরে, খুব সংযত সুরে । —এমন একটা দিন ছিল, সুশান্তদা, যেদিন তােমার কাছ থেকে এই রকম একটা দাবীরই প্রতীক্ষা করেছিলাম। সেদিন আমি ছিলাম নিতান্ত অসহায়, সংসারের নির্মমতায় অভ্যস্তা কিশােরী। সেদিন যদি তুমি এতটুকুও জোর গলায় আমাকে বলতে যে আমাকে তােমার চাইই, তা হলে আমিও অনেকখানি জোর পেতাম ; তােমার সঙ্গে সমান ওজনে গলা মিলিয়ে আমিও বলতে পারতাম, সুশান্তকে আমার চাইই।•••তুমি তােমার দাবী জানালে না, উপেক্ষিত ব্যাহত শিপ্রা আশ্রয় খুঁজল যে তাকে আশ্রয় দিতে চাইল তারই বুকে। কিন্তু সেখানেও সে শান্তি পেল না।

১৬. তারা দু'জন সুদীর্ঘ দুই বৎসরের বিবাহিত জীবন সে কাটাল অভিনয় করে—মনের গভীরতম প্রদেশে তার স্বামীর রইল প্রবেশ নিষেধ, সেখানে শুধু খেলা করতে লাগল শিপ্রা আর তার কিশােরী জীবনের প্রিয়। তুমি জান আমি সন্তানহীনা, এটাকে আমি বিধাতার বিধান বলব না, এটা যে হ’তে বাধ্য ছিল। আমি স্বামীর কাছে নিজেকে উৎসর্গ করতে বাধ্য হয়েছি কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নিজেকে দিতে ত কখনও পারিনি! এই অসম্পূর্ণ মিলনের ফলে সন্তান কি কখনও আসতে পারে, সুশান্তদা ?...যাক সে কথা। দু’বছর পর যখন আমি সংসারে এসে দাড়ালাম সম্পূর্ণ একা, তখন প্রথমটা বিল হয়ে পড়েছিলাম। সংসারের আঘাতের সম্মুখীন এরকম করে ত আর কখনও হইনি! কিন্তু এই একটী বছরের মধ্যে আমার নিজেকে আমি ফিরে পেয়েছি, সুশান্তদা..আমার মনে হয় না আর কখনও আশ্রয়ের জন্য আমাকে লালায়িত হতে হবে। এক নিঃশ্বাসে এতগুলি কথা বলিয়া ফেলিয়া শিপ্রা হাঁপাইতে আরম্ভ করিল। সুশান্ত চুপ করিয়া শিপ্রার কথাগুলি শুনিল, তাহার পর গভীর শ্রদ্ধায় তাহার ডানহাতখানি শিপ্রার হাতের উপর রাখিল। শিপ্রা কোন বাধা দিল না।••••সমুদ্রের ঢেউ উচ্ছল হইয়া উঠিল, ঝির ঝির করিয়া একটা বাতাস তাহাদিগকে সন্ত্রস্ত করিয়া দিয়া গেল, দূরে একটা বন্দর-প্রত্যাগত জাহাজের বাঁশীর শব্দ শুনিতে পাওয়া গেল । সুশান্ত ধীরে ধীরে বলিল, বেশ রাত হয়ে যাচ্ছে শিপ্রা, চলাে। যেন অশ্রুতবাণী শুনিতেছে এইভাবে অন্যমনস্ক শিপ্রা জবাব দিল, চলাে।

তারা দু'জন
১৭
পরের দিন শিপ্রা যখন ভিক্টোরিয়া জাহাজে ওঠে তখন জেটিতে সে
অনেকবার একখানা পরিচিত মুখের সন্ধান করিয়াছিল, সন্ধান মিলে
নাই।
আমি, সুশান্তর জীবনকার, জানি সে কোথায় ছিল। সে গিয়াছিল
তাহার সেই ভূতপূৰ্ব সংবাদপত্রের স্বত্বাধিকারীর কাছে। তাহার নিজেরই
অপরাধ হইয়াছে স্বীকার করিয়া সে আবার প্রেস-ম্যানেজারের কাজে
বহাল হইল।
সুশান্ত আগের মত রাতের পর রাত আবার সেই প্রেসে কাজ
করিতেছে।

পুরানাে চিঠি সন্ধ্যার একটু আগে ব্যারিষ্টার সতীশ নন্দী প্রকাণ্ড একটা চুরুট যুঁকিতে ফুকিতে বেশ খুশী মেজাজে তাঁহার লাইব্রেরী ঘরে ঢুকিলেন। সাধারণতঃ এই সময়টায় তিনি কোন কাজ করেন না, কিন্তু হাইকোর্টের প্রতিপক্ষের প্রবীণ ব্যারিষ্টারকে আইনের একটা কূটতর্কে হারাইয়া দিয়া তিনি বেশ সুস্থ ও কর্মক্ষম বােধ করিতেছিলেন, তাই ভাবিলেন আইন বার্ষিকীর পুরানাে সেটগুলি আরেকবার নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিবেন তাহার নজিরগুলি সত্যই প্রাসঙ্গিক হইয়াছে কি না। অন্ধকার হইয়া আসিয়াছে, সুইচটা টিপিয়া বইএর আলমারীর দিকে অগ্রসর হইতেই তিনি দেখিলেন তাহার অত্যন্ত আদরের নাতি পাঁচ বৎসরের নীতীশ তাহার মূল্যবান্ নথিপত্র টেবিল হইতে মেঝেতে নামাইয়া তাহার উপর পেন্সিলের আঁচড় কাটিতেছে। নীতীশ দাদামহাশয়কে দেখিয়াই পলায়নপন্থা অবলম্বন করিতেছিল, মিঃ নন্দী তাহার গতিরোধ করিয়া গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করিলেন, এসব কী হচ্ছিল ? সােজা প্রশ্নের সােজা উত্তর দিতে নীতীশ খুব পটু। জবাব দিল, দলিল লিখছিলাম। নীতীশ মিঃ নন্দীর একমাত্র মেয়ে প্রতিমার একমাত্র ছেলে। তাহার আসন যে সাধারণের অনেক উচুতে তাহা সে বেশ ভালভাবেই জানে।••• দাদামহাশয়ের কেরাণী যে সব দলিলপত্র লেখে তাহার দিকে তাহার নজর অনেক দিন হইতেই আছে, আজ সুযােগ পাইয়া নিজেকে দাদামহাশয়ের পুরানাে চিঠি দ্বিতীয় সহকারীরূপে প্রতিষ্ঠিত করিবার উদ্যোগ করিতেছিল, হঠাৎ রসভঙ্গ হইয়া যাওয়ায় সে মােটেই খুশী হয় নাই। মিঃ নন্দী নীতীশকে আদর করিয়া বলিলেন, বুঝেছি, খুব লিখতে শিখেছ। কিন্তু দাদুর কাছে লিখবার শাদা কাগজ চাইলেই ত পারে।••• নূতন দলিল লিখে দিতে পারবে। বলিয়া নীতীশের পিঠ চাপড়াইয়া তাহার হাতে এক টুকরা শাদা কাগজ এবং একটা লালনীল পেন্সিল দিয়া মিঃ নন্দী তাহাকে সাময়িক ভাবে লাইব্রেরী হইতে বিদায় করিয়া দিলেন। আইন বার্ষিকীর পুরানাে সেটগুলির মধ্যে যে এত মূল্যবান তথ্য আছে মিঃ নন্দী শান্তভাবে কখনও তলাইয়া দেখেন নাই। বুদ্ধির স্বাভাবিক প্রখরতার জোরেই তিনি ব্যবসায়ে মাঝারিরকমের প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়াছিলেন, অধ্যবসায় দ্বারা সাফল্যের উচ্চশিখরে ওঠার প্রয়াস ছিল তাহার স্বভাব বহিভূত। তাই আজ যখন একটির পর একটি আইন- বিপাের্টের বই খুলিয়া পড়িতে সুরু করিলেন তখন কিছুক্ষণের জন্য তিনি বাহজ্ঞানলুপ্ত হইয়া পড়িলেন। স্বল্প ব্যবহারে বইগুলি ধূলি আবৃত হইয়া গিয়াছিল। পকেট হইতে রুমাল বাহির করিয়া মিঃ নন্দী সযত্নে সেগুলি ঝাড়িতে সুরু করিলেন। ১৯১৫ সালের একখানা মােটা বই অন্যমনস্কভাবে ঝাড়িতেছিলেন। এমন সময় টুক করিয়া একটি নীলাভ থাম মাটিতে পড়িল। বিস্মিত হইয়া মিঃ নন্দী সেটি তুলিয়া লইলেন। দেখিলেন, তাহারই হাতে লেখা ঠিকানা সেই খামটির উপরে, চব্বিশ

২০
তারা দু'জন
বৎসর আগেকার লেখা, যখন তাহার হস্তাক্ষর ছিল একটা গৌরব
করার বস্তু।
সুন্দর পরিষ্কার অক্ষরে ঠিকানা লেখা রহিয়াছে ?
“শ্রমৈত্রেয়ী দেবী,
৬৫, আমহাষ্ট ষ্ট্রীট, কলিকাতা।”
চব্বিশ বৎসর আগে চিঠিখানা ঠিক যেভাবে বন্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন
সেই ভাবেই বন্ধ রহিয়াছে। পঞ্চম জর্জের প্রতিকৃতিবাহী দুই পয়সার
ডাকটিকিটটি পৰ্য্যন্ত অক্ষতভাবে বিরাজমান।
মুহূর্তের জন্য মিঃ নন্দী অনুভব করিলেন, পৃথিবীটা যেন তাহার পায়ের
নীচ হইতে অপসৃত হইয়া যাইতেছে। দৃঢ় নিয়ন্ত্রিত নিয়মে বাঁধা জীবনের
আবরণটা যেন আকস্মিক এক আঘাতে খসিয়া পড়িল ।
কম্পমান বক্ষে সসঙ্কোচে মিঃ নন্দী খামটা ছিড়িলেন। যেন চুরি
করিতেছেন, নিজের লেখা চিঠি পড়িবার যেন তাহার কোনই
অধিকার নাই।
চিঠিখানা লেখা হইয়াছিল পাটনায়, মিঃ নন্দী তখন সেখানে কলেজে
পড়িতেন।
সহজ স্বাভাবিক চিঠি :
“মৈত্রেয়ী,
তােমার সঙ্গে শীগগীর আর দেখা হবে কি না জানিনা, আজ
লিখছি তােমাকে শুধু এইটুকু জানাতে যে তােমাকে আমার বড় ভাল
লেগেছে। আমি মার কাছে তােমার কথা বলতে চাই, কিন্তু তার আগে
তােমার সম্মতি দরকার। তুমি কোন রকম সঙ্কোচ বা দ্বিধা না করে
তােমার মতামত লিখে জানিয়ে। অমি সেই অনুযায়ী কাজ করব।
সতীশ।”
-

পুরানো চিঠি চিঠির উপর ডাকটিকিট লাগাইয়াও ডাকবাক্সে ফেলা হয় নাই, তাহার ইচ্ছাকৃত অবহেলা ইহার জন্য দায়ী নহে। যতদূর স্মরণ করিতে পারিলেন, চিঠিখানা তিনি যথাস্থানে পাঠাইবার জন্য চাকর ভুলুয়ার হাতে দিয়াছিলেন, সেই বােধ হয় ভুল করিয়া বাক্সে ফেলে নাই। অথচ সপ্তাহ খানেক পরেও যখন কোন জবাব পাইলেন না তখন তিনি ভুলুয়াকে প্রশ্ন করিয়া- ছিলেন, চিঠি পােষ্ট করা হইয়াছে কিনা, এবং সে জবাব দিয়াছিল, হঁা, সে বাবুর নির্দেশমত নিজে পােষ্টাফিসে যাইয়া চিঠিটা বাক্সে ফেলিয়া আসিয়াছে ! ১ মিঃ নন্দীর মনের চিন্তাধারাগুলি কেমন যেন এলােমেলাে হইয়া আসিল। মৈত্রেয়ী—অশােক বসুর মেয়ে মৈত্রেয়ী—যাহাকে তিনি স্ত্রীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহিয়াছিলেন, তাহা হইলে তাহাকে উপেক্ষা করে নাই! হয়ত সে কতদিন কত সপ্তাহ ধরিয়া তাহার চিঠির প্রতীক্ষা করিয়াছে এবং অবশেষে যখন কোনই সংবাদ পায় নাই তখন ভাবিতে বাধ্য হইয়াছে যে সতীশ তাহাকে ভুলিয়া গিয়াছে। অথচ এদিকে অসহায় সতীশ নন্দী দুর্ভাবনায় অনিশ্চয়তায় ছটফট করিয়াছেন, কিন্তু প্রতিকারের কোনই পথ খুঁজিয়া পান নাই। চলচ্চিত্রের ছবির মত বাকী কয়েকটা বৎসরের কাহিনী মিঃ নন্দীর চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিল।••তখন তিনি এ-এ পড়িতেছেন, মৈত্রেয়ীকে বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশের পর বৎসর খানেক গত হইয়াছে। কলিয়ারী ম্যানেজার সুদর্শন দত্ত তাহার কন্যা নলিনীর সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব করিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে লােভ দেখাইলেন জামাইকে তিনি বিলাত পাঠাইবেন, ব্যারিষ্টারি পড়ার তারা দুজন জন্য। বিলাত যাইবার লােভ সম্বরণ করিতে না পারিরা সতীশ নন্দী রাজী হইলেন। তাহার পর গতানুগতিকভাবে নলিনীর সঙ্গে তাহার বিবাহ হইয়া গেল। বিবাহের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সতীশ নন্দী একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কিন্তু বিবাহ পৰ্ব্ব যখন শেষ হইয়া গেল তখন সাধারণ অন্যান্য যুবকদের মত পত্নীত হইতে তাহার এতটুকু দেরী হইল না। তাহা ছাড়া পিতৃগৃহ হইতে নলিনী শিক্ষা পাইয়া আসিয়াছিল যে বিলাতগামী স্বামীকে স্ববশে রাখিতে হইলে নিজেকে বেশ একটু আত্মপ্রতিষ্ঠ হইতে হইবে। এই শিক্ষার ব্যবহারিক প্রয়ােগে তাহার নৈপুণ্য অচিরেই পরিস্ফুট হইল। সতীশ নন্দীর বিলাত প্রবাসকালে তাহার প্রথম সন্তান একমাত্র মেয়ে প্রতিমার জন্ম হয়। ইহার ছয় বৎসর পর তাহার একমাত্র ছেলে পরেশের জন্ম। পরেশ এখন কলেজে পড়ে। প্রতিমার অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সেই বিবাহ হইয়া গিয়াছিল, তাহার ছেলে নীতীশ মিঃ নন্দীর অত্যন্ত আদরের। মিসে নন্দী-নলিনী—এখন আর তন্বী বধু নহে। বাইশ তেইশ বৎসরে দৈহিক এবং মানসিক অনেক পরিবর্তনই তাহার ঘটিয়াছে। মেদমজ্জার অংশ বাড়িয়াছে, গলার স্বর আগের চেয়ে গম্ভীর হইয়াছে, গৃহের এবং গৃহের অধিবাসীদের উপর অখণ্ড আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। মিঃ নন্দী অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়, তাহা ছাড়া স্ত্রীর বিশাল দেহের সম্মুখীন হইলে তিনি স্বভাবতঃই একটু সঙ্কুচিত হইয়া পড়েন, নিরীহ সরীসৃপের মত সমস্ত অধিকার স্ত্রীর হাতে সঁপিয়া দিয়া তিনি অবশেষে তাহার স্থান খুঁজিয়া নিয়াছিলেন তাহার এই লাইব্রেরী ঘরটির মধ্যে। এখানে বসিলে তিনি বাইরের সব কিছু ঝড় ঝাপটার হাত হইতে মুক্তি পুরানাে চিঠি পা, এখানে তাহার সাথী থাকে তাহার দামী বাধানাে মােটা বইগুলি, তাঁহার মক্কেল সম্প্রদায় এবং অধুনা তাহার নাতি নীতীশ । আলো চোখে লাগিতেছিল, মিঃ নন্দী উঠিয়া আলােটা নিভাইয়া দিলেন। তাহার পর স্তব্ধভাবে নীল খামখানা হাতে নিয়া বসিয়া রহিলেন। ইহাকেই বলে ভবিতব্য। যদি চব্বিশ বৎসর আগে তিনি তাহার অলসতা বর্জন করিয়া নিজে চিঠিখানা ডাকবাক্সে ফেলিতেন তবে আজ তাহার জীবন হয়ত সম্পূর্ণ অন্যপথে চলিয়া যাইত! হয়ত আদালতের ছায়া কোনদিন তাহাকে মাড়াইতে হইত না, হয়ত তিনি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপকরূপে কত সুনাম অর্জন করিতেন। আর তাহার পারিবারিক জীবনে হয়ত (হয়ত কেন, নিশ্চয়ই) প্রতিফলিত হইত সম্পূর্ণ নূতন এক রূপ, রং, আশা।•••চব্বিশ বৎসর পর তরুণী মৈত্রেয়ীর হাতের স্পর্শ মিঃ নন্দী যেন পুনরায় অনুভব করিলেন। তাঁহার দিবাস্বপ্ন রূঢ়ভাবে ভাঙ্গিয়া দিল তাহার স্ত্রী নলিনী। দরজার বাহিরে দাঁড়াইয়া প্রশ্ন করিল, ভেতরে আসতে পারি ? -এসাে।••••অত্যন্ত ক্লান্তস্বরে মিঃ নন্দী বলিলেন এবং শশব্যস্তে চিঠিখানার উপর একখানা বই চাপা দিলেন। ঘরে ঢুকিয়া সন্দিগ্ধভাবে নলিনী প্রশ্ন করিল, সন্ধ্যার অন্ধকারে চুপটি করে কী ভাবছিলে? আজ বুঝি কেস-এ হেরে এসেছ? মিঃ নন্দী হাসিলেন। হায় নলিনী, তুমি মানুষের সুখদুঃখ, একাগ্রতা ঔদাসীন্য বিচার করে। ব্যবহারিক সাফল্যে এবং টাকাপয়সার মাপকাঠিতে! কী করিয়া তুমি বুঝিবে ছােটখাট এই সব দুঃখদের

তারা দু'জন
উদ্ধেও মানুষ উঠিতে পারে, উদাসী গৃহবিরাগী মন কখনও কখনও
বর্তমান ভবিষ্যৎ ভুলিয়া যাইয়া রৌদ্রভরা নীল নির্জন অতীতের কোলে
সান্ত্বনা খুঁজিতে যায় !
শুধু বলিলেন, না, হারিনি। বরং জিতে এসেছি ।
নলিনী বিশ্বাস করিল না।
একটু পরে প্রশ্ন করিল, কার চিঠি পড়ছিলে ?
যাকে বলে শ্যেনদৃষ্টি—এতটুকু কাগজও চোখ এড়ায় না! মিঃ
নন্দী বলিলেন, ও কিছু নয়।
এক মক্কেলের চিঠি ।
-হু!••••তা’ বাতি জ্বাছ না কেন?
—এই ত বেশ আছি।
—আমি বাতিটা জ্বেলে দিচ্ছি।••••বলিয়া অনুমতির অপেক্ষা না
রাখিয়াই নলিনী সুইচটা টিপিয়া দিল। হঠাৎ রূঢ় আলো চোখে আসিয়া
পড়ায় মিঃ নন্দী চক্ষু মুদিলেন।
-মকেল বুঝি ধন্যবাদ জানিয়েছে ?
-না, তার কেস্ সম্পর্কে কতকগুলাে নতুন পয়েন্ট লিখেছে।
নলিনী বুঝিল স্বামী তাহাকে বিশেষ কিছু বলিতে চাহেন না।
জানে এইখানে তাহার ক্ষমতা প্রতিহত—স্বামীর দুর্ভেদ্য গাম্ভীর্য সে
কিছুতেই ভাঙ্গিতে পারিবে না। সে চিঠি সম্পর্কে আর কোন প্রশ্ন
করিল না।
—নীতীশ কোথায় ?•••সে শুধু বলিল।
-নীতীশ ? এই ত একটু আগেও এখানে ছিল, তােমার ঘরেই
বােধ হয় গেছে।
নলিনী উঠিল। চলিয়া যাইবার সময় বলিল, আজ মিঃ বিশ্বাসদের
ওখানে ডিনার রয়েছে, ভুলে যেয়াে না যেন, সময় মত ড্রে করূতে এসাে।
?

পুরানাে চিঠি ২৫ নলিনী ঘর হইতে বাহির হইবামাত্র মিঃ নন্দী চিঠিটা টেবিল হইতে তুলিয়া সযত্নে তাহার ডুয়ারে বন্ধ করিয়া রাখিলেন। পরের দিনটা মিঃ নন্দী অত্যন্ত অন্যমনস্কভাবে কাটাইলেন। এক বহু পুরাতন মক্কেল একটা কে নিয়া আসিয়াছিল, মিঃ নন্দী কিছুতেই মন দিতে পারিতেছিলেন না। খানিকটা শুনিয়া শ্রান্তভাবে বলিলেন, আজ থাক রসিক বাবু, শরীরটা ভাল লাগছে না। বার লাইব্রেরীতেও তিনি বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে অন্যান্য দিনের মত মন খুলিয়া কথাবার্তা বলিতে পারিলেন না। তাহার সমসাময়িকেরা উপদেশ দিল, নন্দী, তুমি ভয়ানক খাদ্ছ, কিছুদিন বিশ্রাম নাও। একবার কাশ্মীর ঘুরে এসো।••জুনিয়ারের আড়ালে যাইয়া মন্তব্য প্রকাশ করিল, বুড়ো নন্দী নিশ্চয়ই প্রেমে পড়েছে। পৃথিবীটার উপর অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া মিঃ নন্দী সে দিন গৃহে ফিরিলেন । কেন এমন হয় ? মানুষ ঐকান্তিকভাবে যাহা চায় তাহা সে পায় না কেন? মিঃ নন্দী হঠাৎ স্থির করিয়া বসিলেন, মৈত্রেয়ীর খোজ করিবেন। বিশাল কলিকাতা সহরে চব্বিশ বৎসর আগেকার পরিচিত লােককে খুঁজিয়া বাহির করা সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু মিঃ নন্দী প্রবীণ ব্যারিষ্টার, ফন্দী ফিকির সবই তাহার জানা আছে, দিন সাতেকের মধ্যেই তিনি মােটামুটি খবর বাহির করিয়া ফেলিলেন। মৈত্রেয়ীর বিবাহ হইয়াছিল এক মুন্সেফের সঙ্গে, ভদ্রলােক এখন বর্ধমানে সহকারী জজ। বিশাল সংসার তাহাদের—চার ছেলে এবং তারা দু'জন তিন মেয়ের মা সে। মেয়েদের কল্যাণে নাতি নাতনীও আছে অন্ততঃ চার পাঁচটি । মিঃ নন্দী একটু দমিয়া গেলেন। এতদিন পৰ্য্যস্ত মৈত্রেয়ীকে তিনি কল্পনা করিতেছিলেন শুধু আরেকজনের গৃহলক্ষ্মীরূপে-মাতা এবং মাতামহী মৈত্রেয়ীর সম্মুখীন হইতে তিনি বিশেষ ভরসা পাইতে- ছিলেন না। অনেক ভাবিয়া স্থির করিলেন নিজের কোন পরিচয় না দিয়াই তিনি একবার মৈত্রেয়ীর স্বামী-গৃহে উপস্থিত হইবেন এবং একবার মৈত্রেয়ীকে দেখিবার সুযােগ খুঁজিবেন। তিনি নিজে ব্যারিষ্টার, বর্ধমানের সহকারী জজের আদালতে একটা কেস্-এ অবতীর্ণ হওয়ার বন্দোবস্ত করাটা তাহার পক্ষে বিশেষ কঠিন হইল না। কেষ্ট। সেদিন বেশ জমিয়াছিল। সুনিপুণভাবে মিঃ নন্দী যখন তাহার মক্কেলকে জিতাইয়া দিলেন তখন জজ সাহেব মিঃ বসু পৰ্য্যন্ত বেঞ্চ হইতে তাহাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতে বাধ্য হইলেন। কোর্টের পর বিকালবেলা মিঃ নন্দী গেলেন মিঃ বসুর বাংলােতে। দেখিলেন অসংখ্য ছেলেমেয়ে পরিবৃত হইয়া জজসাহেব বারান্দায় বসিয়া চা খাইতেছেন। মিঃ বসু মিঃ নন্দীকে সাদরে আহ্বান করিলেন। —আমি আজই কলকাতায় ফিরে যাচ্ছি, যাবার আগে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলুম, আপনি আজ যে ধীরভাবে আমার নজিরগুলাে শুনেছেন সেজন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। অমায়িক মিঃ বসু বলিলেন, বিলক্ষণ কলকাতা থেকে আপনারা মাঝে মাঝে আমাদের পাড়াগাঁয়ে এলে আমাদের বিচারক্ষমতাও যে পুরানাে চিঠি অনেকখানি বেড়ে যায়। এখানকার বার কি আইনের কিছু বােঝে ? আপনাদের সংস্পর্শে এসে এদের চোখ অনেকখানি খুলে যায়, নিজেদের গলদ কোথায় তা উপলব্ধি করতে পারে। আইন, স্থানীয় বারলাইব্রেরী, হাইকোর্টের নূতনতম কায়দাকানুন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সরকারের অদূরদর্শিতা ও পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলােচনা করিতে করিতে মিঃ নন্দী হাঁফাইয়া উঠিয়াছিলেন। তাহার অনুসন্ধিৎসু চোখ খুঁজিতেছিল বসুজায়াকে। —এরা বুঝি আপনার ছেলেমেয়ে ?•••মিঃ নন্দী প্রশ্ন করিলেন -ছেলেমেয়ে নাতিনানী দুই-ই মেশানাে আছে।•••এই দুটি হচ্ছে আমার বড়মেয়ে অমিতার ছেলে, এটি হচ্ছে আমার মেজমেয়ে প্রীতির মেয়ে, আর এটি হচ্ছে আমার নিজের ছেলে—সর্বকনিষ্ঠ। বেশ খানিকটা গৰ্ব্ব ও আত্মপ্রসাদ লক্ষিত হইল তাহার কথায়। মিঃ নন্দী ভাবিতেছিলেন কীভাবে বসুজায়ার কথা উল্লেখ করিবেন। বলিলেন, আপনি যদি কখনও কলকাতায় যা আমার বাড়ীতে একবার পায়ের ধূলাে দেবেন। মিসেস্ নন্দীও খুব খুশী হবেন। মিসেস নন্দীর উল্লেখে জজসাহেবের চেতনা হইল। বলিলেন, হ্যা, নিশ্চয়ই যাবো, নিশ্চয়ই যাবাে, অনেক ধন্যবাদ। হ্যা, মিসেস বসুর সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দি’...উনি অবশ্যি খুব বেশী বেরােন না, ছেলেমেয়ে নাতিনাত্নীদের নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। চাকরকে ডাকিয়া বলিলেন, মাকে একবার খবর দে ত! মিনিট পর পরে গজেন্দ্ৰগতিতে মিসেস্ মৈত্রেয়ী বসু আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার মুখে বেশ একটুখানি বিরক্তির ছায়া। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা না করিয়াই সম্পূর্ণ একজন অপরিচিত ভদ্রলােকের ২৮ তারা দুজন সম্মুখে তাহাকে আসিতে আদেশ দেওয়া হইয়াছে ইহাই তাহার বিরক্তির প্রধান কারণ। মিঃ নন্দী প্রথমে নিজের চক্ষুকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছিলেন না। এই সেই মৈত্রেয়ী ? তাহার সেই তন্বী কমনীয় দেহ, শান্তশ্যামল চোখের সস্নেহ অভ্যর্থনা, যাহা তাঁহাকে চব্বিশ বৎসর পূৰ্ব্বে পুলক চঞ্চল করিয়া তুলিয়াছিল, তাহা কোথায় মিলাইয়া গেল ? স্থলাঙ্গিনী মেদবহুল মুখে কোটরগতচক্ষু মাতামহী মৈত্রেয়ীর সঙ্গে তাহার প্রিয় মৈত্রেয়ীর এতটুকু সাদৃশ্যও যে নাই ! মিসেস্ বস্তু মিঃ নন্দীকে চিনিতে পারিলেন কিনা বােঝা গেল না, ভাল করিয়া একবার তাহার দিকে তাকাইলেনও না। স্বামীকে বলিলেন, আমি এখন বড় ব্যস্ত আছি, কেন ডেকেছ ? মিঃ বসু তাহার অতিথিকে দেখাইয়া বলিলেন, ইনি কলকাতা থেকে এসেছেন, আমার কোর্টে একটা কে ছিল, সেই উপলক্ষেই এসেছিলেন, আমাদের নেমন্তন্ন করে গেলেন কলকাতায় এর ওখানে যেতে। নিতান্ত নিরাগ্ৰহভাবে বসুজায়া বলিলেন, সে বেশ ত, যাওয়া যাবে, কিন্তু আমি এখন একটুও দাঁড়াতে পারছিনা। অমির খােকাটা কঁদছে, অমি বাইরে বেরিয়েছে, আমি চলুম। অমি মানে তাহার বড়মেয়ে অমিতা। যে ভাবে আসিয়াছিলেন সেই ভাবেই বসুজায়া চলিয়া গেলেন । একটু কাষ্ঠ হাসি হাসিয়া মিঃ বসু বলিলেন, ওঁকে দোষও দেওয়া যায় না, চারিদিক থেকে এত উৎপাত উপদ্রব লেগে রয়েছে যে একটি মিনিটও শান্তভাবে বসবার অবসর পান না।••••সংসারধর্ম পালন করা রীতিমত শ্রান্তিকর, মিঃ নন্দী। মিঃ নন্দী ঘাড় নাড়িয়া জানাইলেন এবিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ একমত।

পুরানাে চিঠি ২৯ জজসাহেবের বাংলাের হাওয়া তাহার কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিকর বলিয়া বােধ হইতেছিল। তিনি আর দেরি না করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন। ডাকবাংলােয় আসিয়াই তিনি ড্রাইভারকে হুকুম দিলেন গাড়ী তৈরী করিতে—অবিলম্বে কলিকাতায় ফিরিয়া যাইবেন। কলিকাতায় নিজের বাড়ীতে যখন পৌছিলেন তখন রাত আটটা বাজিয়া গিয়াছে। নলিনী সাজিয়া গুজিয়া কোথায় যাইবার জন্য তৈরী হইতেছে। স্বামীকে এত শীঘ্র ফিরিতে দেখিয়া বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করিল, ওকি, তুমি আজই ফিরে এলে ? -হ্যা, কাজ শেষ হয়ে গেল, শুধু শুধু ম্যালেরিয়ার মশার কামড় খেতে ইচ্ছা হল না। —সে বেশ করেছ, আজকাল তুমি বাড়ীতে থাকতেই চাও না, তবু যে ম্যালেরিয়ার ভয়ে পালিয়ে এসেছ আমাদের লাভ। তােমার খাবার তৈরী করতে বলি ।•••নলিনী বেশ খুশী মেজাজেই কথাগুলি বলিল। —হঁ্যা, বলল।•••বলিয়া মিঃ নন্দী তাহার লাইব্রেরী ঘরে ঢুকিলেন। ড্রয়ারটা খুলিয়া সেই নীল খামের চিঠিখানা আরেকবার পড়িলেন। তাহার মুখের কোণে ফুটিয়া উঠিল বিচিত্র একটি হাসি। সারাদিন গুমােটের পর গ্রীষ্মবেলাবসানে যেন ঝির ঝির করিয়া খানিকটা বাতাস বহিয়া গেল। সৌন্দৰ্য্য, স্নিগ্ধতা, কমনীয়তার পূজারী মিঃ নন্দীর দৃষ্টিশক্তি আজ যেন নুতন করিয়া খুলিয়া গেল। শান্তভাবে চিঠিখানা টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া তিনি ওয়েষ্টপেপার বাস্কেটে ফেলিয়া দিলেন।

তারা দু'জন
নলিনী লাইব্রেরী ঘরে আসিয়া ঢুকিল। বলিল, ডিনার তৈরী হয়ে
গেছে, তুমি হাতমুখটা শীগগীর করে ধুয়ে নাও
-হ্যা, যাচ্ছি।
—ডিনারের পর মেট্রোয় ছবি দেখতে যাবে? অনেক দিন পর
ভাল ছবি এসেছে। প্রতিমাও যেতে চাচ্ছিল।
ছবি ? কী ছবি আছে ?
-স্পেন্সার ষ্ট্ৰেসি ও হেডি লামারের বেশ ভাল একটা ছবি।
প্রেমের কাহিনী ত?••••না, তােমরা দুজনেই দেখে এসাে। আমি
বরং কালকের কেসটার কাগজপত্র একটু দেখে রাখি।
=

স্বপন বসুর সম্মানে অসীম যে উৰ্মিলাকে ভয়ানকভাবে ভালবাসিত সে সম্বন্ধে বন্ধুমহলে কোনদিনই মতবৈধ ছিল না। বন্ধুর দল সুযােগ পাইলেই ঠাট্টা করিয়া বলিত, ওহে অসীম, বৌকে ত সবাই ভালবাসে, তুমি এ আর নূতন কি দেখাচ্ছ,বরং আঁচলের মিষ্টি বন্ধনটাকে একটু উপেক্ষা করে তােমার , পুরুষত্বের পরিচয় দাও। অসীম হাসিত-সুখে এবং গর্বে। তাহার এবং উর্মিলার ভাল- বাসাটা যে বিবাহের পরও পুরাতন হয় নাই, তাহাদের ভালবাসার নিবিড়তা প্রতিনিয়ত বাহিরের লােকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে—ইহা ভাবিয়া তাহার মনে অপূৰ্ব একটা পুলকের সৃষ্টি হইত। গৃহের শান্ত সুখদ আবেষ্টন হইতে নিজেকে প্রতিসংহার করিবার চিন্তা কোনদিনই তাহার মনে উঠিত না। আর উর্মিলা সম্পর্কেও এ কথা বলিতেই হইবে যে তাহার মত স্ত্রীর সাহচর্যে যে কোন স্বামীর গৃহপ্রতি শতগুণ বাড়িয়া ওঠা উচিত। দৈনন্দিন জীবনের ছােটখাট খুঁটিনাটিতেও সে আনিত এমন একটা মাধুৰ্য্য—এমন একটা স্বপ্নাবেশ—যাহার বন্ধন উপেক্ষা করিয়া পুরুষ শক্তির একটা শূন্য পরিচয় দেওয়াটা অসীম মনে করিত ঘােতর মুর্থতা। ভালবাসিয়া তাহাদের বিবাহ হইয়াছিল। বিবাহের পর তিন বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, তবু প্রথম প্রেমের উন্মাদনা তাহাদের এতটুকু কমে নাই, সংসারের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে দুইটি মনের বিচিত্র লীলা- ছন্দের একটুকু ব্যতিক্রম হয় নাই। 107] তারা দুজন বিবাহিত জীবনের গাঢ় নিবিড়তাকে আরও পরিপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছিল তাহাদের পরস্পরের ঔদাৰ্য্য! অসীম ও উম্মিলার মধ্যে কোন লুকোচুরি ছিল না। ছােট বড়, সাধারণ অসাধারণ, প্রতিদিনের সব কথাই তাহারা নিজেদের কাছে খুলিয়া বলিত...বর্তমানের ঘটনা এবং অতীতের স্মৃতি দুই-ই। সেদিন অসীম খুব উৎসাহ নিয়া অফিস হইতে বাড়ী ফিরিয়াছিল । তাহাদের বহু দিনের কল্পনা, কয়েক সপ্তাহের ছুটি নিয়া তাহারা যাইবে আগ্রায়, শাজাহানের তাজ দেখিতে। কতদিন উর্মিলা স্বামীর বক্ষলীনা হইয়া বলিয়াছে, ওগাে, তুমি আমায় কতটুকুই বা ভালবাস ! শাজাহানের ভালবাসার কাছে তােমার ভালবাসা কত সামান্য, তুমি কি কখনাে ভেবে দেখেছ? অসীম প্রতিবাদ করিয়া বলিয়াছে, কিন্তু তবু ত তােমার কল্পনার শাজাহানের অন্য প্রেমিকার অভাব ছিল না। তার প্রাসাদে দেশ- বিদেশের কত সুন্দরীর অলক্তরাগের দাগ আজও লেগে রয়েছে। উর্মিলা একটুও না হঠিয়া জবাব দিয়াছে, ইতিহাস ভালভাবে পড়নি, তাই এরকম বুলি আওড়াচ্ছ। তুমি কি একেবারেই ভুলে গেলে যে সে সব সুন্দরীর অলক্তরাগ ত দূরের কথা, তাদের মুখের দিকেও শাজাহান তাকাতেন না। তার মন ছিল মমতাজে ভরপূর। তাই মরবার শেষ মুহূর্তেও তিনি তার স্বপ্নসৌধের দিকে না তাকিয়ে পারেননি ! তর্ক আলােচনার পর স্থির হইয়াছিল, যেমন করিয়াই হউক আগ্রায় যাইতেই হইবে। সেখানে শাজাহানের মর্মবস্মৃতির উপর দাঁড়াইয়া স্বপন বসুর সম্মানে অসীম প্রমাণ করিবে যে শাজাহানের এই কীৰ্ত্তির মাঝে অন্তর নিংড়ানো ভালবাসা ছিল না এতটুকুও, ছিল শুধু অহমিকার একটা উদ্ধত প্রকাশ। আর উর্মিলাও সমান ওজনে জবাব দিয়াছিল, সে দেখাইবে তাজের প্রত্যকটি পাথর, প্রত্যেকটি ধূলিকণার মধ্যে বাচিয়া রহিয়াছে শাজাহানের অপরিসীম মৃত্যুহীন প্রেম। তিন সপ্তাহের ছুটি মঞ্জুর হইয়াছে, তাই অসীম খুব উল্লাসের সহিত বাড়ীর দিকে রওনা হইয়াছিল। উন্মিল। উৎসুক প্রতীক্ষায় বসিয়া রহিয়াছে, ছুটি মঞ্জুরের খবরটা পাইলেই তল্পিতল্পা বাঁধিতে শুরু করিবে, এই ছিল তাহাদের আয়ােজন। বাড়ীতে ঢুকিয়া অসীম দেখিল চিরদিন উর্মিলা যে ভাবে তাহার প্রতীক্ষায় দোরগােরায় দাঁড়াইয়া থাকে আজ তাহার ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে। অসীম চিন্তিত হইয়া উঠিল, উৰ্মিলার কোন অসুখ করে নাই ত? তাড়াতাড়ি সে ঘরে ঢুকিয়া পড়িল। দেখিল, উর্মিলা চুপ করিয়া শুইয়া আছে। অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া প্রশ্ন করিল, উৰ্ম্মি, কী হয়েছে? অসুখ করেনি ত ? উন্মিলা নীরব। কাছে অগ্রসর হইয়া কপালে হাত দিয়া অসীম দেখিল। না, আর হয় নাই। তবে ? —অফিস থেকে ফিরতে দেরী হয়েছে বলে রাগ করেছ বুঝি ? বলিয়া সে আস্তে আস্তে ঠোট দুটি উৰ্মিলার কপালের কাছে নিয়া আসিল।

৩৪ তারা দু'জন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত উৰ্মিলা উঠিয়া বসিল। বলিল, এসব অভিনয় ভাল লাগে না আমার অভিনয় ?••••অসীম বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া খানিকক্ষণ তাকাইয়া রহিল। তাহারপর বলিল, তুমি কী বলছ, উৰ্ম্মি ? আমার ছুটি মঞ্জুর হয়েছে, আগ্রায় যাবার জন্য তৈরী হয়ে নাও...উঠে পড়, টাইম-টেবটা দেখতে হবে যে। -আমি আগ্রায় যাবাে না..কোথাও যাবে না !•••দৃঢ়স্বরে উর্মিল। ৰলিল। । উৰ্মিলার কথার সুর কেমন যেন বদলাইয়া গিয়াছে, ভয়ানক কঠিন- ভাবে সে অসীমের কথার জবাব দিতেছে! অসীম বুঝিল একটা কিছু ঘটিয়াছে । বলিল, আমাকে আর দোদুল অবস্থায় রেখাে না, উৰ্ম্মি। বলো, কী হয়েছে? স্বামীর স্নেহপূর্ণ কথায় উন্মিলার কান্না পাইতেছিল। কোনক্রমে উদ্গত অশ্রু রােধ করিয়া সে বলিল, অমলার কথা ত কোনদিন আমায় বললানি’? অমলা, সে আবার কে ? একটু বিরক্ত হইয়া অসীম বলিল, কী পাগলের মত যা তা বছ ? অমলা আবার কে? ঝাঁজের সহিত উৰ্মিলা বলিল, অমলা তােমার কতদিনের চেনা বান্ধবী, তাকে এরই মধ্যে ভুলে গেলে গাে ? তােমর পুরুষমানুষের এরকমই হৃদয়হীন বটে শেষের কথাটাতে বেশ খানিকটা শ্লেষ । এবার অসীম রীতিমত রাগ করিল। বলিল, শােন উর্মিলা, কে তােমার মাথায় কী ঢুকিয়েছে জানি না। আজ ছুটির খবর নিয়ে অনেক তুমি, উন্মি স্বপন বসুর সম্মানে উৎসাহ করে এসেছিলাম, তােমার কাছ থেকে এরকম অভ্যর্থনা যে পাব তা আশা করি নি। উর্মিলা একটু লজ্জিত হইল, কিন্তু তবু অরুদ্ধকণ্ঠে বলিল, আমায় মাপ করে, তিন বছর পরে তােমার কাছ থেকে এতখানি লুকোচুরির পরিচয় পাব তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি..তাই আমার একটু দুঃখ হয়েছিল। এই বলিয়া সে স্বামীর দিকে একখানা খােলা চিঠি চুড়িয়া দিল। চিঠিখানা মেয়েলি হাতে লেখা। সােজা ভাষায় যাহাকে বলে প্রেমের চিঠি, এ তাই। লেখা আছে : “বন্ধু, জানি আজ হয়ত আমায় চিনে নিতে তােমার অনেক দেরী হবে.••• বহু পুরানো স্মৃতির পাতা খুলতে তুমি মােটেই আনন্দ বােধ কবে না। তােমার শান্ত সুশৃঙ্খল জীবনে চাঞ্চল্য আতে আমার মােটেই ইচ্ছা ছিল , কিন্তু তুমি কোথায় কী ভাবে আছ তা নিজের চোখে দেখবার অদম্য একটা আকাঙ্ক্ষা আমার জেগেছে, তাই তােমার বিরাগভাজন হবার সম্ভাবনাটাকেও উপেক্ষা করে আমি তােমার ওখানে শীগগীরই যাব স্থির করেছি। দিন ছয়েকের মধ্যেই তুমি আমার টেলিগ্রাম পাবে, ঠিক কোন্ সময় আমি যেতে পারব তার নির্দেশসহ। এখন বিদায়। ইতি তােমার বন্ধু অমলা” চিঠিখানা পড়িয়া অসীম কুঞ্চন করিল। তাহার স্মৃতির পাতা উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিল সেখানে অমলা নামে কোন মেয়েই কোনরকম আঁচড় কাটিয়া রাখিয়া যায় নাই। তবে ? উর্মিলা তীক্ষভাবে স্বামীর মুখের ভাববৈচিত্র্য লক্ষ্য করিতেছিল।

তারা দু'জন সেখানে শুধু একটা প্রহেলিকার ছায়া দেখিয়া সেও অবাক বােধ করিল। তবে কি চিঠিটা মিথ্যা? অসীম বলিল, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না উৰ্ম্মি। অমল বলে কাউকে ত আমি জানি না !•••তাহার কথার মধ্যে একটা না-বুঝতে-পারা হতাশার সুর। -তুমি সত্যি বলছ ?•••সন্দিগ্ধস্বরে উৰ্মিলা প্রশ্ন করিল। -সত্যি গাে, সত্যি। এটা নিশ্চই একটা বাজে চিঠি, কোন ফক্কড় ছেড়ার কাজ। অসম্ভব নয়। অসীমের বন্ধুদের উপহাসের কাহিনী উন্মিলাও জানে, হয়ত বা তাহাদেরই কেহ একটা নুতন ধরণের ঠাট্টা করিবার উদ্দেশ্যে এরকম চিঠি পাঠাইয়াছে। কিন্তু লেখাটা যে নিতান্ত মেয়েলি ! সন্দেহ-দোলায় দোদুল্যমান হইয়া উৰ্মিলা স্বামীর দিকে তাকাইয়া রহিল। অসীম বলিল, আমার মনে হয় এ বিনয়ের কাণ্ড। ওই সব সময় আমাকে ঠাট্টা করে বেশী, আমি নাকি তােমাকে পেয়ে সব পৃথিবী ভুলে গেছি !...কিন্তু... উর্মিলার মনে যে খটকা লাগিয়াছিল অসীমের মনেও তাহারই সুর প্রতিধ্বনিত হইল। বিনয় ত অবিবাহিত...বৌ ছাড়া আর কাহার সাহায্যে মেয়েলি হাতের এমন চিঠি সে পাঠাইতে পারে ? একটু হাসিয়া সংশয়টা উড়াইয়া দিবার প্রয়াস করিয়া উৰ্মিলা বলিল, তুমিও যেমন বােকা ! বৌ না থাকলে বুঝি কাউকে দিয়ে এরকম চিঠি লেখানো যায় না? কেন, কত বােন, দাদার আদারে এরকম একটা চিঠি লিখে দিতে রাজী হয় ! আজকালকার বােনদের ত তুমি চেন না ! একটা খোঁচা দিবার সুযােগ পাইয়া তা বটে ! উৰ্মিলাকে মৃদু স্বপন বসুর সম্মানে ৩৭ অসীম বলিল, তুমি বুঝি এরকম করে দাদাদের সাহায্য করেছিলে, উম্মি ? তর্জনী দিয়া অসীমকে আঘাত করিয়া উৰ্মিলা বলিল, আমার আবার দাদা কোথায় ছিল গাে, মশায় ? অসীম তবু হঠে না। বলিল, কেন, তােমার কলেজের বন্ধুদের দাদা একজনও ছিলেন না? কপট রােষে চোখ ঘুরাইয়া উর্মিলা জবাব দিল, একজন ছিলেন, কিন্তু তনি এভাবে আমার সাহায্য চান নি। তিনি এসে আমাকে বলেছিলেন, উর্মিলা, যদি অভয় দাও তাহলে বলি, তােমার ঐ শান্তসুন্দর চোখদুটি আমাকে মুগ্ধ করেছে, তােমার সাবলীল গতিভঙ্গী আমার মনে আনন্দের তরঙ্গ তুলেছে, তােমার টুকরাে টুকরাে কথা গানের সুর হয়ে আমার চিত্তের মণিকোঠায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে•••• ইহার ইতিহাস আছে। উর্মিলার সাথে অসীমের প্রথম পরিচয় হয় তাহার নিজের বােন সুমিত্রার দৌলতে। সুমিত্রা এবং উন্মিলা ছিল সহপাঠিনী। দুইদিন দেখা শুনার পরই উৰ্মিলাকে অসীমের এত ভাল লাগিয়া গিয়াছিল যে সব রকম দ্বিধা সঙ্কোচ উপেক্ষা করিয়া সে সােজাসুজি তাহার কাছে নিজের মনের দুয়ার খুলিয়া দিয়াছিল। এই সাহসিকতার জন্য তাহাকে অনুতাপ করিতে হয় নাই এতটুকুও, তাহার এই আত্মনিবেদন উর্মিলাকে চিরস্থায়ীভাবে পাইবার পথটা অনেকখানি সরল করিয়া দিয়াছিল। এই পুরাতন কাহিনী নিয়া গত তিন বৎসরের মধ্যে অসীম উৰ্মিলার মধ্যে কত যে পরিহাস হইয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। ছােট খাট কলহ- দ্বন্দ্বের মধ্যে যখনই তাহারা এই পুরাতন অথচ চিরনূতন দিনটির কথা ভাবিয়াছে তখনই তাহাদের সব কিছু বৈষম্যের সমাধান হইয়া গিয়াছে।

তারা দুজন তাহাদের পরস্পরকে না-বুঝিতে-চাওয়ার ক্ষণিক স্পৃহাকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে বুঝিতে-চাওয়ার চিরন্তন আকুলতা। আজও সেইভাবে সন্ধিঘােষণা হইল। উন্মিলা স্বামীর বুকে মুখ লুকাইয়া স্বীকার করিল যে তুচ্ছ একটা উড়ােচিঠিতে ক্ষণিকের জন্যও আস্থা স্থাপন করিয়া সে অসীমের ভালবাসার প্রতি ঘােরতর অবিচার করিয়াছে। অসীমও উৰ্মিলাকে আদর করিয়া বলিল যে তাহার এই ক্ষণিক অনাস্থাটুকু তাহার ভালবাসার মাধুৰ্য্যকে বাড়াইয়া দিয়াছে অনেকখানি বেশী। পরের দিন ভােরের গাড়ীতে আগ্রা রওনা হইতে হইবে। উর্মিলা জিনিষপত্র গুছাইতে সুরু করিল। রাত্রের খাওয়া দাওয়ার পর তাহারা শুইতে যাইবে এমন সময় বাহিরে পিয়ন হকিল, তার হায়, বাবু•••• শশব্যন্তে দুয়ার খুলিয়া অসীম টেলিগ্রামটি হাতে নিল । দেখিল, আবার সেই বন্ধু । সুদীর্ঘ টেলিগ্রামে লেখা আছে : “ভােরে তিনটের গাড়ীতে আমি তােমার ওখানে পৌছব—অত্যন্ত অভদ্র সময়, মাপ করাে, আর কোন ট্রেন নেই, সােজা তােমার ওখানে যাব, বৌদি’কে নমস্কার।••তােমার উর্মিলা শঙ্কাকুল ভাবে স্বামীর দিকে তাকাইয়াছিল ! প্রশ্ন করিল, কার টেলিগ্রাম ? কোন খারাপ খবর নয়ত? বাঁ হাত দিয়া মাথাটা টিপিয়া ধরিয়া অস্ফুট একটা “উঃ” বলিয়া অসীম টেলিগ্রামটা স্ত্রীর হাতে তুলিয়া দিল।

স্বপন বসুর সম্মানে ৩৯ ? উৰ্মিলা এবার রীতিমত ভুল বুঝিল। স্বামীর এই কাতরােক্তিতে আর তাহার কোন সন্দেহ রহিল না যে অমলা মেয়েটির যথার্থ একটা অস্তিত্ব আছে এবং এতক্ষণ অসীম তাহা লুকাইতে চেষ্টা করিতেছিল মাত্র।•••বন্ধুদের পরিহাস? উৰ্মিলা আর এই সুলভ ব্যাখ্যায় ভুলিবে না। গম্ভীর ভাবে বলিল, তাহলে তােমার অমলার থাবার আয়ােজন করতে হয় আমাদের শােবার ঘরটাই ছেড়ে দেই, কী বল ? অসহায়ভাবে অসীম উৰ্মিলার দিকে তাকাইল। অস্ফুটস্বরে বলিল, আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না, উৰ্ম্মি। তুমি বিশ্বাস করাে, এখনও আমি বলছি, এ অমলা কে আমি বিন্দু বিসর্গও জানি না। স্বামীর অস্বীকারােক্তি গায়ে না মাখিয়া আগেরই মত শান্ত-সংষত স্বরে উৰ্মিলা বলিল, আমি ত তােমার কাছে জবাবদিহি চাই নি’! আমাকে যখন দয়া করে বৌদি বলে সম্বােধন করেছে তখন তার উপযুক্ত অভ্যর্থনা করা আমার উচিত এবং আমি তা করব। এবার উন্মিলার চোখে এক ফোটাও জল আসিল না। অসীমের জন্য তাহার দুঃখ হইতেছিল এবং কেবলই তাহার মনে গুমরাইয়া উঠিতেছিল একটা তীব্র অভিযােগ—এরকম কপটতা করিবার কোন প্রয়ােজন ছিল কি? চিঠিটা পাইয়াই যখন উর্মিলা প্রথম সন্দেহ করিয়াছিল এবং স্বামীকে সােজাসুজি প্রশ্ন করিয়াছিল তখন যদি স্বামী সরল ভাবে তাঁহার জীবনের একটা গােপন অধ্যায়ের কথা খুলিয়া বলিতেন তাহা হইলে ত সব মিটিয়া যাইত। যে স্বামীকে সে এত নিবিড়ভাবে ভালবাসে, যাহার মহত্বের কথা ভাবিতেও তাহার বুক গর্বে ভরি টিঠে, সেই স্বামী আজ কেন এমন করিয়া নিজেকে ধুলার আসনে টানিয়া নিয়া আসিলেন ? আজ যে তাহাদের মধ্যে অভেন্য একটা ব্যবধানের সৃষ্টি হইতে চলিল ইহার জন্য দায়ী কি অসীম নিজে ৪০ তারা দু'জন নয়? তাহার অবিমৃষ্যকারিতায়ই না আজ উৰ্মিলা আগের মত মাথা উচু করিয়া তাহার দিকে তাকাইতে পারিতেছে না! ক্ষিপ্রহন্তে উর্মিলা তাহাদের গােছান জিনিষপত্র খুলিয়া ফেলিল। আগ্রার তাজ? সে জীবনে কখনও যাইবে না সেখানে। কোন্ অহঙ্কারে সে দেখিতে যাইবে ভালবাসার এই অপূর্ব সৃষ্টি, যখন সে নিজে এতখানি রিক্তা। তাজের উপর ঠিকরাইয়া-পড়া আলাে বার বার প্রকট করিয়া তুলিবে তাহার মনের অমাবস্যা। অপমানে লজ্জায় সে যে মুখ লুকাইবার স্থানও পাইবে না। অসীম একবার মৃদু প্রতিবাদ করিয়া বলিল, অনেক রাত হয়েছে, উর্মি, এখন না হয় শুতে চলে! চোখে অগ্নিবাণ বর্ষণ করিয়া উৰ্মিলা জবাব দিল, তােমার ঘুম পেয়ে থাকে তুমি ঘুমােতে পার, আমি ঘর দোর না গুছিয়ে কিছুতেই স্বস্তি পাব না ! অসীম আরেকবার বলিল, একটু যেন বাড়াবাড়ি হচ্ছে না কি, উর্মিলা? উর্মিলা কুদ্ধস্বরে উত্তর দিল, তােমার চেয়ে বেশী নয় !••••তারপর একটুখানি শ্লেষ মিশাইয়া বলিল, তুমি ঘুমিয়ে পড়াে, ঠিক তিনটের সময় যখন তােমার বান্ধবীর আর সময় হবে তখন তােমায় জাগিয়ে দেব। আমার মন ত তােমার মত ছোট নয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অসীম একটা ঈজিচেয়ারে হেলান দিয়া চোখ মুদিল। আর ওদিকে শুইবার ঘরে উৰ্মিলা তাহার স্বামীর বান্ধবীর অভ্যর্থনার আয়ােজন আরম্ভ করিল।

স্বপন বসুর সম্মানে ৪১ মনের এরকম অবস্থায় কি ঘুম আসে? অসীমের বারবারই মনে হইতেছিল যে একটা প্রকাণ্ড ষড়যন্ত্র করা হইয়াছে তাহার বিরুদ্ধে, হয়ত ইহার মধ্যে উৎপীড়নও আছে অনেকখানি। অমলা নাম্নী মহিলা (তিনি কি তরুণী না বয়স্কা ?) যখন তাহার সামনে আসিয়া দাঁড়াইবেন তখন সে কী বলিবে ? তীব্রকণ্ঠে সে বলিবে, আপনার নাটুকেপনা দেখাবার আর জায়গা পান নি ?••••এখখুনি বেরিয়ে যান এ বাড়ী থেকে, নইলে পুলিশ ডা। কিন্তু, না, এভাবে অভ্যর্থনা করা চলিবে না, অন্ততঃ উর্মিলা তাহা হইতে দিবে না। তাহার দৃঢ়প্রত্যয় জন্মিয়াছে যে অমলাকে সে সত্যসত্যই চেনে, সে তাহার বিগত জীবনের অতিপ্রিয় একজন বান্ধবী। উর্মিলা অমলার প্রতি কোনপ্রকার রূঢ় আচরণ মােটেই সহ করিবে না। আত্মসম্রমসম্পন্ন উর্মিলা হয়ত অমলাকে জড়াইয়া ধরিয়া অভ্যর্থনা করিবে, হয়ত কত মিষ্টভাবে বলিবে, আসুন, আপনি যে এতদিন পরে আপনার পুরানাে বন্ধুকে মনে করেছেন তাতে আমরা দু'জনই যে কত খুশি হয়েছি তা বলতে পারি না। আর অমলা ( অসীম সাহস তাহার, নহিলে এমনভাবে রাত তিনটায় সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন ভদ্রলােকের বাড়ীতে হাজির হইতে ভরসা পায় ?) হয়ত বা কত মিথ্যা কাহিনীই বলিয়া যাইবে—তাহার অজ্ঞাতে এবং তাহাকে কাছে রাখিয়া উভয়তই। প্রতিবাদের সুযােগও অসীম পাইবে না, অন্ততঃ উর্মিলা সে সুযােগ দিবে না। ভাবিতে ভাবিতে কখন অসীম ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল তাহার মনে নাই। সে স্বপ্ন দেখিতেছিল যেন সে আগ্রায় গিয়াছে, একা। তাজের সম্মুখে সে দাঁড়াইয়া আছে, আর শাজাহান যেন আসিয়া খানিকটা করুণামিশ্রিত দৃষ্টিতে তাহার দিকে তাকাইয়া বলিতেছেন, ওহে মূৰ্থ তরুণ, আমার ४२ তারা দুজন জীবনের পৃষ্ঠা থেকেও কি তােমার শিক্ষা হল না? মমতাজকে আমি ভালবেসেছিলাম বলে কি জীবনের সুদীর্ঘ যাত্রার মধ্যে আর সব সুন্দরীদের এড়িয়ে চলেছিলাম ?...স্ত্রীকে ভালবাস, তাকে শ্রেষ্ঠা প্রেমিকার আসন দাও তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু পুরুষের অসীম প্রেমের দু’একটি কণা অন্য নারীকে দান করলে প্রেমের যথার্থ মৰ্যাদার লাঘব হয় , বরং তার গৌরব বাড়ে!•••অসীম যেন প্রতিবাদ করিয়া কী বলিতে যাইতেছিল, হঠাৎ সে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল উর্মিলার ডাকে। সুন্দর সংযত বেশে উর্মিলা দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। বলিতেছে, ওগাে, আড়ইটে বাজল, তােমার বান্ধবীর আসবার সময় হ’লচটপট উঠে পড়ে। সঙ্কটের মুহূর্তটা যতই অগ্রসর হইয়া আসিতেছিল অসীম ততই ব্যাকুল বােধ করিতেছিল। উৰ্মিলার দিকে অপরাধীর মত তাকাইয়া সে বলিল আমার শেষ মিনতি—আমায় অবিশ্বাস করােনা উৰ্ম্মি, তুমি ছাড়া আমার আর কোন বান্ধবী নেই। —সে শীগগীরই দেখতে পাওয়া যাবে।...সংক্ষেপে উর্মিলা বলিল। ত্রিশ মিনিট ত নয়, যেন ত্রিশ ঘণ্টা! অসীম এবং উর্মিলা দুইজনেই পাশাপাশি বসিয়া আছে, দুইটি চেয়ারে। উভয়েই উৎকর্ণ, অথচ কাহারও মুখে কথা নাই। যেন অত্যন্ত রহস্যময় একটা কিছু ঘটিবার প্রতীক্ষায় উভয়েই উদগ্রীব হইয়া রহিয়াছে। ঘড়িতে ঢং ঢং করিয়া তিনটা বাজিল। মিনিট দুই যাইতে না যাইতেই বাহিরে একটা ট্যাক্সির শব্দ পাওয়া গেল। ট্যাক্সিটা তাহাদেরই দোরগােড়ায় আসিয়া দাঁড়াইল।

স্বপন বসুর সম্মানে ৪৩ উর্মিলা অগ্রসর হইয়া গেল, দরজা খুলিয়া অতিথিকে অভ্যর্থনা করার দায়িত্ব যে প্রধানতঃ গৃহকর্তীর। অসীম বা অমলা কেহই তাহাকে তাহার এই সুপ্রতিষ্ঠিত আসন হইতে বিচ্যুত করিতে পারিবে না। দরজা খুলিতেই প্রিয়দর্শন একটি যুবক—তাহার স্বামীর বয়সী হইবে, যদিও দেখিতে দেখায় কলেজে পড়া এক ছােকরার মত—একগাল হাসিয়া নমস্কার করিয়া বলিল, আপনিই বুঝি বৌদি ? বিস্মিতসুরে উর্মিলা বলিল, হঁা; কিন্তু অমলা কৈ? অবাক হইয়া ছেলেটি তাহার দিকে তাকাইল। বলিল, অমলা? সে আবার কে ? —কেন? ওঁর বন্ধু ! ( ‘বান্ধবী' কথাটা উচ্চারণ করিতে যাইয়া জিহ্বার গােড়ায় কেমন যেন আটকাইয়া গেল।) ততক্ষণে অসীমও দুয়ারের সামনে আসিয়া দাড়াইয়াছে। উন্মিলার কাধের উপর উকি দিয়া বলিল, উর্মি, এ যে অমল, অমলা নয় ! আগন্তুক ছেলেটি—তাহার নাম সত্য সত্যই অমল—অমল-অমলা সম্পর্কিত হেঁয়ালিটা যেন বুঝিতে পারিতেছিল না। সে খানিকটা অপ্রস্তুত ভাবে প্রশ্ন করিল, আপনি কি আর কারো অপেক্ষা করছিলেন, বৌদি’? অসীম ইতিমধ্যে উর্মিলাকে পিছনে টানিয়া নিজেই অগ্রসর হইয়া গিয়াছে। দুই হাতে অমলকে আহ্বান করিয়া বলিল, আরে হতভাগা, তিন বছর পরে তুই যে এমন ধুমকেতুর মত এসে হাজির হবি তা যে আমি কল্পনায় ও আনতে পারি নি’! আয়, শান্ত হয়ে বােস, তাের বৌদি তাের জন্যে যা’ সব স্পেশ্যাল বন্দোবস্ত করে রেখেছেন তাতে তুই রীতিমত অবাক হয়ে যাবি। উর্মিলা বােকার মত দাঁড়াইয়া ছিল। তাহা হইলে কি সবই অমলের ষড়যন্ত্র ? অমলই কি কোন মেয়েকে দিয়া চিঠিটা লেখাইয়াছিল, যাহাতে

৪৪
• তারা দু'জন
এরকম একটা দাম্পত্য-কলহের সূচনা হয় ? সেই অভিলাষেই কি সে
নিজের নামটা একটু বদলাইয়া লিখিয়াছিল, অমলা ? কিন্তু অমলের
ভাবভঙ্গিতে ত মনে হয় না, সে এই ষড়যন্ত্রের বিন্দুবিসর্গও জানে!
অমল চেয়ারে বসিয়া অসীমের দিকে তাকাইয়া বলিল, সত্যি ভাই
অসীম, ব্যাপারটা কিছু বুঝতে পারছি না
অসীম তাহার মাথায় মৃদু একটা আঘাত করিয়া তাহার লেখা
চিঠিখানা সম্মুখে ধরিয়া বলিল, এটা কী? এবার ব্যাপারটা বুঝতে
পেরেছিস ত ?••••আর ন্যাকামি করি না।
তবু অমল বুঝিতে পারিল না। হতাশভাবে বলিল, কৈ, এর মধ্যে ত
কোন সমাধান খুঁজে পেলাম না !
এবার উন্মিলা কথা বলিল, নীচে কী সই করেছেন একটুখানি লক্ষ্য
করে দেখুন ত ঠাকুরপাে••
-কেন? আমার নাম! বিস্মিতভাবে অমল বলিল।
—তাের নাম বুঝি অমল ?•••অসীম বলিল।
এবার অমল ভাল করিয়া দেখিল । তাহার পর উচ্চ হাসির রােলে
নিস্তব্ধ রাত্রিটাকে মুখরিত করিয়া বলিল, হায় বৌদি, আমার বন্ধুকে
অবিশ্বাস করবার একটুখানি সুযােগ পেয়ে আপনার বুদ্ধি বুঝি এতখানি
গুলিয়ে গিয়েছিল যে আপনি একটু নজর করে দেখতে পাননি’ নাম লেখা
আছে অমল, অমল নয়। শুধু নামের শেষে একটা কালির আঁচড়
তার আপনারা কি নাম দেন জানি না—কী রকম করে মিশে এই
অহেতুক অনর্থের সৃষ্টি করেছে।
অসীম ও উর্মিলা তবু দমিল না। বলিল, কিন্তু এরকম ভাষায় চিঠি
লেখার মানে? কোন পুরুষ বন্ধু কি কোন পুরুষ বন্ধুর কাছে এভাবে
চিঠি লেখে?

স্বপন বসুর সম্মানে ৪৫ অমল তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, কেন লিখবে না ?•••পুরুষ বন্ধু পুরুষদের কাছে এরকম চিঠি লেখে কিনা জানি না। কিন্তু মেয়েরা তাদের বান্ধবীদের কাছে যে এরকম চিঠি অহরহ লিখে থাকে তার অন্ততঃ ডজন- খানেক প্রমাণ আমি এখ খুনি দিতে পারি! আর মেয়েরা যদি তাদের বান্ধবীদের কাছে এভাবে লিখতে পারে তাহলে আমরা ছেলেরা আমাদের অতিপ্রিয় বন্ধুদের কাছে লিখলেই কি যত অপরাধ ? অসীম, আমাদের পক্ষ সমর্থন করে তুমি অন্ততঃ স্বীকার করে যে আমি অন্যায় কিছ, লিখিনি’! অকাট্য যুক্তি। অসীম হাসিল । এবার উন্মিলার পালা। বলিল, কিন্তু, ঠাকুরপাে, মেয়েলি হাতের লেখাটা কোথেকে এল?••••তাহার মুখে ঈষৎ হাসি, যেন বলিতেছে, এবার জব্দ! অমল বলিল, ওঃ••••এ যে আমার নিজের হাতের লেখা !••••শুধু স্বপন বসুর সম্মানার্থে অক্ষরগুলাে একটুখানি যাকে বলে গােলাকার করেছি, এই যা। —স্বপন বস্তু? সে আবার কে ?••••অসীম উন্মিলা উভয়েই সমস্বরে প্রশ্ন করিয়া উঠিল । স্বপন বসুর নাম শােননি’ তুমি, অসীম ?.... তােমাকেই দোষ দি’ কী করে? কলেজ ছেড়ে সেই যে মােটা লেজারের আঁক কতে ঢুকেছ তারপর ত’ বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকাবার সময়টুকু পর্যন্ত পাওনি’!•••স্বপন বসু হচ্ছেন আমাদের তরুণদের আইডিয়াল, অর্থাৎ আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তার একটা থিওরি হচ্ছে এই যে আমরা ছেলেরা ভয়ানক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি সমস্ত সুকুমার এবং কোমল আবেষ্টনী থেকে, যা প্রতিরােধ করা নিতান্ত দরকার। এবং এটা ।

৪৬
তারা দু'জন
প্রতিরােধ করূতে হলে আমাদের ভিড়তে হবে মেয়েদের দলে এবং
অবলম্বন করতে হবে মেয়েদের অস্ত্র, মায় তাদের বিচিত্র ভঙ্গীর রেখা
বিন্যাস, যার অতি অকিঞ্চিৎকর একটু নিদর্শন তােমরা দেখতে পাচ্ছ
আমার এই সংষত দুরভিসন্ধি-বর্জিত চিঠিটাতে।

মুক্তি নন্দিনী স্তব্ধভাবে বাহিরের দিকে তাকাইয়া ছিল। মেঘমেদুর আকাশের শ্যামলিম, আলােছায়ার লুকোচুরি, বর্ষা আবাহনের সুর- প্রকৃতির এই বৈচিত্রগুলি তাহার সর্বদেহে মনে এক নুতন ঝঙ্কার তুলিতেছিল। তাহার বিবাহ স্থির হইয়া গিয়াছে। ভাবী স্বামী সমরেশ এম্-এতে ফাষ্ট ক্লাশ ফাষ্ট, জাৰ্মাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা উপাধিধারী, কলিকাতার একটা বড় কলেজের নামজাদা অধ্যাপক। তাহার পাণ্ডিত্য সুধী সমাজে সুবিদিত, তাহার আড়ম্বরহীন ব্যবহার সর্বত্র প্রশংসিত, তাহার অমায়িকতায় ছাত্রসম্প্রদায় মুগ্ধ! বয়স তাহার বত্রিশ হইলে কি হয়, তারুণ্যের উচ্ছলতা এখনও ফস্রোতের মত নীরবে নিভৃতে মাঝে মাঝে প্রকাশ হইয়া পড়ে, এবং তাহার আভাস পায় তাহার অন্তরঙ্গ বন্ধুমণ্ডলী। নন্দিনীর আত্মীয় বান্ধবী সকলেই তাহার সৌভাগ্যের প্রশংসা করিতেছিল। দুই একজনের যে ঈৰ্যাও হইতেছিল না এমন নয়। সুচিত্রা, যাহাকে সে সবচেয়ে বেশী ভালবাসে, আসিয়া বলিয়া গিয়াছিল, তুই একটু সাবধানে থাকিস, নন্দিনী, এ বিয়েতে অনেকেরই বুকে শেল বাজছে, শেষ পর্যন্ত ভালয় ভালয় ব্যাপারটা চুকে গেলে রক্ষা পাওয়া যায়। হার উত্তরে নন্দিনী শুধু হাসিয়াছিল।

৪৮ তারা দু'জন সমরেশকে তাহার পছন্দ হয় নাই একথা বলিলে সত্যের অপলাপ করা হইবে। নন্দিনী অন্ধ নয়, সমরেশের যে সব গুণ তাহাকে সকলের কাছে প্রিয় করিয়া তুলিয়াছিল তাহার উপযুক্ত মর্যাদা দিতে নন্দিনী জানে। তাহা ছাড়া তাহার নারীত্ব তৃপ্ত হইয়াছিল আরেকটি কারণে। মা-বাবা বন্ধুবান্ধবদের অনুরােধ উপরােধ সুদীর্ঘ সাতটি বৎসর উপেক্ষা করার পর হঠাৎ এক সতীর্থের বাড়ীতে নন্দিনীকে দেখিয়া সমরেশের ভয়ানক ভাল লাগে এবং সে তাহার চিরকৌমার্য ব্রত ভাঙ্গিতে রাজি হয়। সমরেশের এই সাদর আহ্বান নন্দিনীর জীবনের শুষ্কতা অনেকখানি দূর করিয়া দিয়াছিল, অভাব বেশ খানিকটা ভরিয়া আসিয়াছিল। তবু বলিষ্ঠ দুইটি সবল বাহুর নিবিড় আলিঙ্গন লাভের সম্ভাবনায় তাহার মন পুলকিত হয় নাই। কোথায় যেন একটা তার বেসুর বাজিতেছিল, সে অনুভব করিতেছিল ঠিক যেমনটি হইলে সৰ্বাঙ্গসুন্দর এবং সুষ্ঠু হইত তেমনটি যেন হইল না। অলককে নন্দিনী যথার্থই ভালবাসিয়াছিল। যৌবনের প্রথম আহ্বানে সমস্ত দেহে যখন সে অনির্বচনীয়ের বাণী শুনিতে পাইতেছিল তখন অলকের সঙ্গে তাহার দেখা হয়। অলক ছিল তাহার চেয়ে বছর চারেকের বড়—তাহারই মত প্রাণবন্ত, সজীব অলক নন্দিনীকে প্রিয়ারূপে গ্রহণ করিতে পারে নাই। নন্দিনীর প্রতি তাহার অনুভূতি ছিল অনেকটা সখ্যভাবের। তাহার স্নেহ ছিল শুভসাধনের, প্রসাধনের নয়। প্রথমে নন্দিনী এতটুকুও ক্ষুব্ধ হয় নাই। অলকের হৃদয়ের বৈশিষ্ট্যই মুক্তি ৪৯ ছিল একটা বিরাট উদারতা, যাহার মধ্যে বিশ্বের অসংখ্য নরনারী নিঃসঙ্কোচে আসিয়া আশ্রয় নিতে পারে, অথচ বিন্দুমাত্রও ঈর্ষান্বিত হইবার কারণ খুঁজিয়া পায় না। অলক যখন তাহার স্বাভাবিক বেপরােয়া ভঙ্গীতে নন্দিনীকে বলিত, নন্দিনী, তােমার বিয়ে হয়ে গেলে তােমার বর কিন্তু তােমাকে আমাদের বন্ধুগােষ্ঠীতে মিশতে দেবে না, নন্দিনী কোন প্রতিবাদ করিত না বা বলিত না যে সে কখনও বিবাহ করিবে না। শুধু বলিত, সে দেখা যাবে•• | তাহার পর অলকের জীবনে সত্য সত্যই একটি নারীর আবির্ভাব হইল—বন্ধুর মূর্তিতে নয়, প্রিয়ারূপে। সুকৃতির মধ্যে অলক এমন কতকগুলি বিশিষ্ট বৈচিত্র্য দেখিতে পাইল যে অনায়াসে সে তাহাকে তাহার পরিচিত মেয়েবন্ধুদের দল হইতে আলাদা করিয়া দেখিতে সুরু করিল। নন্দিনী ব্যথা পাইল। প্রথমটায় সে সুকৃতির সঙ্গে রীতিমত প্রতিযােগিতা করিয়া চলিল, অলকের ভালবাসা আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে। সুকৃতির চপল চঞ্চলতা, তাহার বিলাসিতা সমস্তই সে অলকের সামনে উপস্থাপিত করিয়া প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিল সুকৃতি অলকের ভালবাসার যােগ্য নহে। কিন্তু ফল হইল বিপরীত। কোন প্রকার বাধা না পাইলে অলক হয়ত ধীরে ধীরে সুকৃতির আকর্ষণ কাটাইয়া উঠিতে পারি, কিন্তু এই গায়েপড়া সুকৃতিচরিত্র বিশ্লেষণে সে নন্দিনীর উপর রীতিমত বিরক্ত হইয়া উঠিল এবং তাহার প্রতি তাহার যে স্নেহটুকু ছিল তাহাও সে তুলিয়া নিয়া সুকৃতির কাছে উৎসর্গ করিল। ইহার বৎসর খানেক পরে সমরেশের সঙ্গে নন্দিনীর বিবাহ স্থির হইল । ৪

তারা দুজন
সেও উষ্ণা-
নন্দিনী অন্যমনস্ক ভাবে বাহিরের দিকে তাকাইয়া রহিয়াছিল, হঠাৎ
সুকৃতি আসিয়া উপস্থিত। বেশ একটু ঈর্ষাসূচস্বরে বলিল, খুব বর
জুটিয়েছিস যাহােক, এবার তােকে আর পায় কে?
সুকৃতির প্রতি প্রীতি নন্দিনীর কোন দিনই ছিল না।
সূচক স্বরে জবাব দিল, কলেজে-পড়া ভবঘুরে ছােরার বদলে ধীমান্
প্রােফেসারের গলায় মালা দিতে কোন মেয়েরই আপত্তি হবে না
আশা করি ।
সুকৃতি শ্লেষটা বুঝিল, কিন্তু গায়ে না মাখিয়া বলিয়া চলিল, সেটা
খুবই সত্যি, নন্দিনী। একজাতের পুরুষের সাথে প্রেম করা চলে, কিন্তু
বিয়ে চলে না। বিয়ে—সে যে সারা জীবনের বন্ধন-তখন একটু শান্ত
ভাবে ভাবতে হয় বৈ কি!
তাহার পর সে বলিয়া চলিল, অলককে তাের বরের কথা বলাম,
সেও খুশি হয়েছে। ও নিজেই তােকে কগ্রাচুলেট করতে আস্ত, কিন্তু
বেচারী আজ দিন দশেক ধরে জ্বরে বিছানায় পড়ে আছে, আমাকেই
বার্তাবহ করে পাঠাল ।
নন্দিনী উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল ।
-অলকের জ্বর হয়েছে ? কই, কিছু শুনিনি ত! কোথায় আছে?
কে দেখছে ?
—আছে ওদের বাড়ীতেই। বুড়ী পিসীমা আছেন, যতদূর সম্ভব
দেখছেন। ডাক্তার বলছিলেন আর যদি এরকম চলতেই থাকে তাহলে
একজন নাস রাখতে হবে। আমি ত বােজ বিকেল বেলা একবারটি
অলকের খোঁজ নিয়ে আসি, তবে জানিস্ ত, আমার অসংখ্য কাজ, সব
দিন একটু বসে কথা বলাও হয়ে ওঠে না।
সুকৃতির কথার মধ্যে একটা উদাসীনতার সুর নন্দিন। লক্ষ্য

করিল। মুক্তি সে আরও চিন্তিত হইয়া প্রশ্ন করিল, সীরীয়াস কিছু নম্বত, সুকৃতি ? -না, সীরীয়াস কেন হবে? তবে অনেকদিন ধরে জ্বর চলছে, বেচারী বড় বােগা আর দুর্বল হয়ে পড়েছে, বিছানা ছেড়ে উঠতে পাছে না । মুহূর্তের জন্য অলকের চেহারাখানা নন্দিনীর চোখের সম্মুখে ভাসিয়া উঠিল। দীর্ঘ ঋজু দেহ, বলিষ্ঠ বাহু, আত্মপ্রতিষ্ঠ মুখশ্রী। কতদিন বক্সিংএ সে বাছাইকরা গােরা বক্সারদের হারাইয়া দিয়াছে, অবলীলাক্রমে। সেই অলক আজ রােগশয্যায় এত কাতর যে বিছানা ছাড়িয়া উঠিবার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত নাই। কিন্তু তাহার নিজের হাত পা যে একেবারে বাধা। বাগদত্তা বধু সে, কেমন করিয়া অলকের গৃহে যাইবে ? তাহার মা ত কিছুতেই রাজী হইবেন না। তাহা ছাড়া যদি সমরেশ শুনিতে পায় ?—শত্রুর ত অভাব নাই, সুচিত্রা একটু আগেই তাহাকে সাবধান করিয়া দিয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া সে অলকের কাছে যাইবে কোন্ অহমিকায়? অলক ত তাহাকে চায় না, কোন দিন চায় নাই! সে চায় সুকৃতিকে—চঞ্চলা সুকৃতিকে, যাহার অলকের প্রতি এতটুকু দরদ নাই।••তাহার বুক ফাটিয়া লাল অশ্রু উদগত হইতে চাহিতেছিল। সংক্ষেপে সুকৃতিকে বলিল, তােরা ত ভাই বােজই যাস, আমাকে মাঝে মাঝে খবর দিস, কেমন থাকে। সন্ধ্যায় সমরেশ আসিল। বিবাহ স্থির হইয়া যাওয়ার পর সে প্রায়ই নন্দিনীকে দেখিতে আসে। নন্দিনী তাহার কাছে বিরাট একটা তারা দুজন কৌতুহল। এতদিন সে অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনায়ই ডুবিয়া ছিল, এখন যেন একটু ছুটি পাইয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিয়াছে। তরুণ বয়সের রােম্যান্সের উদ্দীপনা হয়ত তাহার নাই, কিন্তু অনুসন্ধিৎসা আছে প্রচুর। নন্দিনী রােজই সহজভাবে সমরেশের সঙ্গে কথা বলে, তাহার সাথে সাহিত্য, আর্ট, বিজ্ঞান সম্পর্কে তর্ক করে। সমরেশ বেশ প্রােফেসারী গাম্ভীর্যে তাহার ভাবী বধূর মানসিক কৃষ্টির উন্নতিসাধনে যত্নবান হয়। তাহার পর হাসিগল্প, বন্ধুবান্ধবীদের কাহিনী ইত্যাদির মধ্য দিয়া কখন যে দুই তিন ঘণ্টা কাটিয়া যায় তাহা সমরেশ টেরই পায় না। সমরেশের সাহচর্য যে নন্দিনী উপভােগ করে না এমন নয়। মনে সে সমরেশের ধীশক্তির প্রশংসা করে, তাহার শান্ত চাঞ্চল্যবিহীন চরিত্রের সম্মুখে মাথা নত করে । সময় সময় অননুভূতপূৰ্ব একটা গর্কে তাহার বুকও বুঝি ভরিয়া ওঠে। কিন্তু সেদিন সান্ধ্যমিলনটা অন্যান্য দিনের মত জমিল না। অলকের অসুখের সংবাদ পাইয়া তাহার সংযত-করিয়া-নিয়া-আসা হৃদয়তন্ত্রী আবার যেন কেমন বেসুরে বাজিতেছিল, কথােপকথনের স্রোতে সে কিছুতেই নিজেকে ঢালিয়া দিতে পারিতেছিল না। অবশেষে সমরেশ প্রশ্ন করিল, তােমার শরীরটা কি ভাল নেই আজ ? -না, বেজায় মাথা ধরেছে।••••নন্দিনী বলিল। উদ্বিগ্ন হইয়। সমরেশ বলিল, তাহলে তােমায় আজ আর আটকে রাখব না, তুমি যাও, ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর । নন্দিনী জীবনে বােধ হয় কখনও কাহারও কাছে এতখানি কৃতজ্ঞ বােধ করে নাই, আজ সমরেশের এই নিষ্কৃতি দেওয়াতে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল।

মুক্তি ত্রিবেলা খােল। ছাদে শুইয়া শুইয়া নন্দিনী অলকের কথা ভাবিতে লাগিল। তাহার কেবলই মনে হইতেছিল, রােগশয্যায় পড়িয়া অলকের চোখের কুহেলিকা নিশ্চয়ই কাটিয়াছে, সে সুকৃতির অন্তঃসারশূন্যতা উপলব্ধি করিতে পারিয়াছে, অন্তরে অন্তরে সে হয়ত নন্দিনীকেই কামনা করিতেছে, কিন্তু ভবিতব্যের নিষ্ঠুর বিধানের সঙ্গে প্রতিযােগিতায় পরাজয় স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছে। তাহার অদম্য আকাঙ্ক্ষা হইতেছিল, একবার চুপি চুপি অলককে দেখিয়া আসে। নিভৃতে অলককে প্রশ্ন করে, এখনও তােমার অহমিকার ভুল ভাঙ্গল না, অলক ? কিন্তু চারিদিকে জোড়া জোড়া চোখ তাহাকে পাহারা দিতেছে। অলকের অসুখের সংবাদ নন্দিনীর মা জানেন এবং ইহাও জানেন যে এতটুকু সুযােগ পাইলে নন্দিনী অলকের বােগশয্যার কাছে ছুটিয়া যাইবে। তাই তিনি সব সময় নন্দিনীকে চোখে চোখে রাখিতেছিলেন । তাহ ছাড়া সমরেশদের বাড়ীও ত বেশী দূরে নয় ! মায়ের তীক্ষ্ণ চোখ এড়াইয়া যদিও বা নন্দিনী বাহির হইয়া পড়ে, কে জানে পথের মাঝখানে তাহার সঙ্গে সমরেশেরই দেখা হইয়া যাইবে কিনা! সমরেশ যদি প্রশ্ন করে, এত রাতে সে কোথায় যাইতেছে, তাহা হইলে সে কী জবাব দিবে? এই শৃঙ্খলিত জীবনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করিবার একটা তীব্র আগ্রহ নন্দিনীর মনে গুইয়া গুইয়া মরিতেছিল। আসন্ন বন্ধন এবং তৎসহ আরও বিধিবদ্ধ জীবন যাত্রার সঙ্কেত তাহাকে হয়ত বেপরােয়া করিয়া তুলিত, কিন্তু সুকৃতিকে পাইয়া অলক তাহাকে কী নির্মমভাবে উপেক্ষা করিয়াছিল তাহা মনে পড়িতেই সে খানিকটা আত্মস্থ হইল ।

৫৪ তারা দু'জন নন্দিনী। পরের দিন অলকের কোন খবরই নন্দিনী পাইল না। তাহার একমাত্র বার্তাবহ সুকৃতি, কিন্তু সুকৃতিকে সে দিন রাত আটটা পর্যন্ত দেখাই গেল না। সমরেশ নন্দিনীর ক্লিষ্ট মুখখানা দেখিয়া বেশ একটু সকাল সকালই বিদায় নিতেছিল, এমন সময় সুকৃতি আসিয়া ঘরে ঢুকিল। নন্দিনী স্থান-কাল-পাত্র ভুলিয়া উৎসুক কণ্ঠে প্রশ্ন করিল, সুকৃতি, অলকের খবর কী? হাফাইতে হাঁফাইতে সুকৃতি বলিল, ঐ কথাই ত বলতে এসেছি, আজ বড় ডাক্তার এসেছিলেন, উনিত দেখে টাইফয়েড, বলে সন্দেহ প্রকাশ করে গেলেন। বিকেল থেকে দু’জন নাসের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। নন্দিনীর মুখ মুহূর্তের মধ্যে শাদা হইয়া গেল। পরক্ষণেই সমরেশের কৌতুহলী চোখ তাহার দিকে নিবদ্ধ দেখিয়া সে শুষ্ক কণ্ঠে বলিল, অলক, আমাদের খুব পুরাতন এক বন্ধুর, আজ ক’দিন থেকে জ্বর, সুকৃতি বলছে সম্ভবতঃ টাইফয়েড, •••ছেলেটি বড় ভাল। সমরেশ স্বভাবতঃই সহানুভূতিসম্পন্ন। বলিল, তাহলে ত তােমার তাকে একবার দেখতে যাওয়া উচিত। পলকের জন্য নন্দিনীর মন নাচিয়া উঠিল । কিন্তু মায়ের কথা মনে হইতেই ম্লান মুখে বলিল, আজ বাদে কাল বিয়ে। মা যেতে দেবেন না। —বিয়ে, তাতে কী হয়েছে? বিয়ে হবে বলে আত্মীয় বন্ধুদের অসুখবিসুখে যেতে নেই নাকি ?•••বিস্মিত সুরে সমরেশ প্রশ্ন করিল। সুকৃতি এবার নলিনীকে উদ্ধার করিল। বলিল, না, তা নয়, তবে হিন্দুঘরের কতকগুলো সংস্কার আছে জানেন ত, সমরেশ বাবু! নিতান্ত মুক্তি বাধ্য না হলে বাগদত্তা বধূকে অবিবাহিত পুরুষের রােগশয্যায় যেতে নেই, লােক বলে তাতে অকল্যাণ হয়। -আমি এসব সংস্কারের মধ্যে কোন লজিক খুঁজে পাই না।•••এই মন্তব্য প্রকাশ করিয়া সমরেশ সে দিনের মত বিদায় নিল। সারারাত নন্দিনী ঘুমাইতে পারিল না। তাহার মনের মধ্যে প্রকাণ্ড একটা দ্বন্দ্ব, একটা আলােড়ন চলিতেছিল। অলকের প্রতি তাহার ভালবাসা কোনদিনই সম্পূর্ণভাবে নিভিয়া যায় নাই, আজ তাহার অসহায় অবস্থার কথা শুনিয়া তাহা সুপ্তোত্থিত হইয়া উঠিল। তাহার মনে পড়িতে লাগিল তুচ্ছ সব ঘটনা, খুঁটিনাটির সমাবেশ। রাত্রির অন্ধকারময় স্তব্ধতার মধ্যেও সে শুনিতে পাইল তাহার রক্তের দ্রুত তাণ্ডব নৃত্য, যখন সে ভাবিতে লাগিল একদিন কী নিরভিমান হইয়া সে নিজেকে অলকের কাছে বিলাইয়া দিতে প্রস্তুত হইয়াছিল। কিন্তু অলক তাহার উপচার গ্রহণ করে নাই তাহার হাত পা যে নিতান্তই বাধা! সমরেশের ভাবী বধূ হিসাবে তাহার কর্তব্য এবং আত্মসম্মানবোেধ তাহাকে বারবার প্রতিহত করিতেছিল। আর তাহার প্রতি সমরেশের প্রগাঢ় বিশ্বাস, তাহার অতীত জীবন সম্পর্কে কৌতুহলের অভাব তাহাকে অত্যন্ত পীড়া দিতেছিল। নন্দিনী স্থির করিল সে সাহস সঞ্চয় করিয়া সমরেশের কাছে সমস্ত কথা খুলিয়া বলিবে। সমরেশের বুদ্ধি ও বিচার শক্তির উপর তাহার বেশ শ্রদ্ধা জন্মিয়াছিল, সে আশা করিল সমরেশ তাহাকে পথ নির্দেশ করিয়া দিতে পারিবে। সংগ্ৰামত মনটার উপর হাসির আলিম্পন তারা দু'জন আঁকিয়া সহজভাবে থাকা তাহার পক্ষে এক প্রকার অসম্ভব হইয়া উঠিতেছিল। সমরেশ যখন আসিল সে নিজেই প্রস্তাব করিল তাহারা একটু বাহিরে বেড়াইতে যাইবে। নন্দিনীর শরীর গত কয়েকটা দিন ধরিয়াই অসুস্থ যাইতেছে এই ধারণার বশবর্তী হইয়া সমরেশ কোন প্রশ্ন না করিয়া সানন্দে রাজী হইল। জীবনের গােপনতম ইতিহাস—যাহা ভাবী স্বামী হয়ত কিছুতেই দরদ দিয়া বুঝিতে পারিবে না—খুলিয়া বলিব এই সাধু সঙ্কল্প করা সহজ, কিন্তু সঙ্কল্পকে কার্যে পরিণত করা সহজ নয়। কথা পাড়িতে যাইয়া বারবার নন্দিনীর জিহ্বার আগায় আটকাইয়া গেল। অবশেষে সমরেশেরই একটি প্রশ্নে নন্দিনী সুযােগ পাইল। সমরেশ জিজ্ঞাসা করিল, হঁ্যা, তােমাদের অলক ছেলেটির আর কোন খবর পেয়েছ ? কেমন আছে? -না আজ কোনই খবর পাই নি। বোধ হয় আগের মতই আছে। —তােমাদের বাড়ীর অদ্ভুত সংস্কার আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না। একজন অতি নিকট আত্মীয় বা বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, তুমি বিয়ের ক’নে বলে তােমার যাবার অধিকার নেই, এ আমার কাছে অত্যন্ত বাড়াবাড়ি মনে হয়। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া নন্দিনী বলিল, আমার ভয়ানক ইচ্ছা করে একবার দেখতে যেতে, কিন্তু কুসংস্কার যে আমারও নেই তা জোর করে বলতে পারি না। তাহার পর একটু ইতস্ততঃ করিয়া নন্দিনী বলিতে সুরু করিল, মুক্তি সুতির কাছে কাল যা’ শুলাম তাতে মনে হ’ল অসুখে ভুগে ভুগে বেচারী একেবারে বদলে গেছে। সুস্থ শরীরে ওকে যারা দেখেছে তারা তাকে প্রশংসা না করে পারে নি’....বাংলা দেশে এরকম বলিষ্ঠ, সাহসী সুদর্শন ছেলে খুব কম মেলে। বলিতে বলিতে নিজেরই অজ্ঞাতে নন্দিনীর মুখ চোখ উৎসাহদীপ্ত হইয়া উঠিতেছিল । সে বলিয়া চলিল, আমরা ওকে জানি ছেলেবেলা থেকে, খেলার সাথী হিসাবে আমাদের পরিচয়। তারপর দেখতে দেখতে ও বড় হয়ে উঠল.... সমরেশ তাহার কথার মধ্যে বাধা দিয়া বলিল, তােমরাও ত বড় হয়ে উঠলে —হ, সে ত ঠিকই। ...বলিয়া নন্দিনী আবার তাহার কাহিনী সুরু করিতে যাইতেছিল, হঠাৎ তাহার সন্দেহ হইল, সমরেশের এই মন্তব্যের মধ্যে প্রচ্ছন্ন শ্লেষ নাই ত? সে তাহার দিকে তাকাইল।••••না, নিতান্ত সাধারণ ভাবেই সে কথাটা বলিয়াছে। তাহার বিগতজীবন সম্পর্কে সমরেশের এই বিরাট ঔদাসীন্য তাহাকে ব্যথিত করিল। সমরেশ কি চিরকালই ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যাইবে ? তাহার স্নেহ-ভালবাসা কি সমস্ত বিবাহিত জীবনে এরকম নিম্নগামীই রহিবে ? মন্দিনীকে তাহার প্রিয়ভাবে সে কি কোনদিন দেখিতে পারিবে না? সমপ্রাণ সখাসখীর মধুর সম্পর্ক কি তাহাদের মধ্যে কোনদিনই গড়িয়া উঠিবে না ? যে সূত্র ধরিয়া নন্দিনী তাহার ইতিবৃত্ত বলিয়া চলিয়াছিল তাহা যেন রূঢ় অনম্র একটা আঘাতে হঠাৎ ছিড়িয়া গেল। নন্দিনী স্থির করিল, সমরেশের কাছে অলকের কথা আর বলিবে না। সমপ্রাণতার যেখানে অভাব সেখানে সন্দেহের অবকাশ আছে প্রচুর। আজ যদি অলক তারা দুজন সমরেশের স্থানে আসীন থাকিত তাহা হইলে হয়ত নন্দিনী তাহর পূৰ্বরাগের কথা অবলীলাক্রমে বলিয়া যাইতে পারিত। অলকের ঈর্ষা, অলকের অভিযােগের মধ্যে সে বিচিত্র একটা সান্ত্বনা খুঁজিয়া পাইত। কিন্তু সমরেশ অলক হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন—দুর্ভেদ্য একটা প্রাচীর দিয়া তাহার অন্তঃকরণ সুরক্ষিত, সে প্রাচীর লঙ্ঘন করা নন্দিনীর ক্ষমতাবহিভূত। নন্দিনী তাহার বন্ধু সুচিতার একটা কথার অন্তর্নিহিত সত্যতা আজ অনুভব করিল। ত্রিশাের্কে যাহারা বিবাহ করে তাহারা স্নেহ করে, ভালবাসে না। ইহার তিনদিন পরে যথারীতি সমরেশের সঙ্গে নন্দিনীর বিবাহ হইয়া গেল। বিবাহের মধ্যে মালা বদলের সময় নন্দিনীর হাতটা কাপিয়া উঠিয়া- ছিল, আস্ত একটা দুর্ঘটনার সূচনা সে তাহার স্নায়ুতে স্নায়ুতে অনুভব করিয়াছিল। কিন্তু দুর্জয় সাহস সঞ্চয় করিয়া সহজ ভাবে সব অনুষ্ঠানগুলিই সে পালন করিল। শান্তমনে নিজের পথ সে বাছিয়া নিয়াছে, প্রত্যাবর্তন করিবার সময় ও সুযােগ তাহাকে যথেষ্ট দেওয়া হইয়াছিল, কিন্তু তাহা সে গ্রহণ করেনাই। এখন পরাজয় স্বীকার করিলে চলিবে কেন? সুকৃতির অনুগ্রহে এই কয়দিন অলকের খবর সে নিয়মিতভাবে পাইয়া- ছিল। একই ভাবে আছে—টাইফয়েড, শক্ত অসুখ,দুই একদিনে নীরােগ হইবার সম্ভাবনা নাই, তবে ডাক্তার বলিয়াছেন ভয়ের কোন কারণ নাই। নার্সের নিপুণ সেবা চলিতেছে, এই অসুখে সেবানৈপুণ্যই বেশী দরকার, সেমেহের চেয়ে।

মুক্তি বিবাহের রাত্রিতে সমরেশের সঙ্গে এই প্রথম একশষ্যায় শুইতে নন্দিনী কোনই সঙ্কোচ বা দ্বিধা করে নাই। যাহা অবশ্যম্ভাবী তাহার কাছে হাসিমুখে আত্মসমর্পণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ ইহা সে মর্মে মর্মে বুঝিয়াছিল এবং স্বীকার করিয়াছিল। তাহার অশান্তি হইতেছিল একটা কারণে। অলকের স্মৃতি সে কিছুতেই মন হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারিতেছিল না। তাহাকে সব চেয়ে বেশী পীড়া দিতেছিল অলকের এই মৃত্যুর সাথে সংগ্রাম। অলক যেন কিছুতেই তাহার পরাজয় স্বীকার করিতে চায় না, এতদিন সে সমস্ত বিষয়ে প্রভুত্ব করিয়া আসিয়াছে, মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আসিয়াও সে যেন মৃত্যুকে উপহাস করিতে চায়। যেন সে জোরগলায় পৃথিবীর কাছে প্রচার করিতে চায়, আমি অপরাজেয়, আমি নির্ভীক, আমি সত্য। •অলকের বলিষ্ঠ দেহ-মনের ছায়া নন্দিনী সৰ্ব্বত্র দেখিতে পাইতেছিল। বিবাহের পরদিন নন্দিনীকে স্বামীগৃহে যাইতে হইবে। মা বারবার আঁচল দিয়া চোখের জল মুছিতেছিলেন। সমরেশের মত শান্ত, ধীর, স্নেহপ্রবণ স্বামীর অঙ্কশায়িনী হইয়া নন্দিনী সুখীই হইবে তাহা তিনি জানিতেন, তবু মাঝে মাঝে তাহার স্নেহাশঙ্কিত মনে একটা সন্দেহ খোচা দিয়া উঠিতেছিল। তাহা ছাড়া, অলক সম্পর্কিত সংবাদটা—জরের ক্রাইসিস সে মৃত্যুর সাথে আপ্রাণ যুদ্ধ করিতেছে—তিনি নন্দিনীর কাছে গােপন করিয়া রাখিলেও তাহার মনে হইতেছিল বােধ হয় একবারটি নন্দিনীকে রােগীর কাছে পাঠাইয়া দিলে ভাল হইত সানাইয়ের করুণ রাগিণী বাজিয়া উঠিয়াছে। সময়েশ ও নন্দিনী মায়ের পায়ের ধূলা নিয়া বাহিরে আসিয়া গাড়ীতে উঠিবে, এমন সময় - ৬০ তারা দু'জন উদ্ধশ্বাসে পাশের বাড়ীর একটি ছেলে আসিয়া খবর দিল, এইমাত্র অলক মারা গিয়াছে। নন্দিনীর মুখ ছাইএর মত শাদা হইয়া গেল। তাহার মা রুদ্ধ অশ্রু আর চাপা দিতে না পারিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন। সমরেশ বলিল, নন্দিনী, চলল, একবার ওবাড়ীতে হয়ে আসি। নন্দিনী কোন কথা বলিল না। অশ্রুহীন বিবর্ণ মুখখানা তুলিয়া ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, সে যাইবে। একটু ইতস্ততঃ করিয়া সমরেশ প্রশ্ন করিল, আমি আম্ব, না তুমি একাই যাবে ? সমরেশের এই প্রশ্নে নন্দিনীর মন গভীর কৃতজ্ঞতায় ভরিয়া উঠিল । সে অস্ফুট কণ্ঠে বলিল, তুমি এখানেই থাকো, আমি আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আছি। ছুটিতে ছুটিতে নন্দিনী অলকদের বাড়ীতে ঢুকিল। অলকের বৃদ্ধ। পিসীমা অলকের বিছানার উপর লুটাইয়া হাউহাউ করিয়া কাঁদিতেছেন। নাস জানালার কাছে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। রােগীর দেহে প্রাণ নাই এই সিদ্ধান্ত জানাইয়া দিয়া ডাক্তার চলিয়া গিয়াছেন। সুকৃতি একটা চেয়ারে বসিয়া রুমাল দিয়া চোখের জল মুছিতেছে। পাশের বাড়ীর জানালা হইতে কৌতূহলী ছেলেমেয়ের দল তাকাইয়া আছে—তাহাদের মা তাহাদিগকে জানালা হইতে সরিয়া আসিতে বলিতেছে। শুভ্র দুগ্ধফেননিভ বিছানার উপর নিমীলিতচক্ষু অলক চিরনিদ্রায় নিদ্রিত—আজই সকালে বিছানার চাদর, তাহার গায়ের জামা-কাপড় মুক্তি বদলাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। আঠারাে দিনের রােগে ভুগিয়া অলকের দেহ শীর্ণ হইয়া গিয়াছে, মৃত্যুর পাণ্ডুরতা ছাপাইয়া তাহার শরীরে ফুটিয়া উঠিয়াছে, যুদ্ধের শ্রান্তি। কিন্তু তাহার মুখের কোণে একটি অনির্বচনীয় হাসি, যেন মৃত্যুর কাছে সাময়িক ভাবে পরাজয় স্বীকার করিয়াও সে বলিতেছে, আমি যেখানে যাইতেছি তাহা জন্ম মৃত্যুর বাহিরে, সেখানে আমি তােমাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিতেছি, তােমাকে পরাস্ত করিব। নন্দিনী স্তব্ধভাবে অলকের মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল। সুকৃতি তাহার বধূবেশ আড়চোখে লক্ষ্য করিয়া দেখিল । বেশীক্ষণ নয়, মিনিট দশেক ঐ ভাবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া নন্দিনী যেমন ছুটিয়া আসিয়াছিল তেমনই ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। মুক্তি, মুক্তি! আজ সে মুক্তি পাইয়াছে। সে বন্ধনের নাগপাশ তাহাকে এতদিন বাঁধিয়া রাখিয়াছিল তাহা আজ অযাচিতভাবে খসিয়া পড়িয়াছে। দাম্ভিক অলক শেষ পর্যন্ত তাহার মহানুভবতা হইতে এতটুকু ভ্রষ্ট হয় নাই। সমরেশ নন্দিনীর জন্য অপেক্ষা করিতেছিল । এত শীঘ্র তাহাকে ফিরিতে দেখিয়া সে একটু বিস্মিত হইল। জিজ্ঞাসুনেত্রে সে নন্দিনীর দিকে তাকাইল। —কী আর হবে ওখানে থেকে, সব শেষ হয়ে গেছে। ••••শান্ত সহজ সুরে নন্দিনী বলিল । তাহার পর সমরেশের ডান হাতটি নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়া সে বলিল, আর দেরী করােনা, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, বাড়ী চলাে।

অন্তরালের আলাে মন্দির-দুয়ারে আসিয়া কে যেন ডাকিল, ওগাে, কে আছ কোথায়, দুয়ারটি একবার খােলাে। বহু বৎসরের পুরাতন মন্দির। সময়ের আঘাতে তাহার শ্রী হইয়াছে ম্লান, তাহার দীপ্ত প্রদীপ হইয়া আসিয়াছে নির্বাণােখ। তবু মনে হয় সময় যে আঘাত দিয়াছে তাহা যেন দরদ মেশাননা, তাহার যত কিছু কঠোরতা, যত কিছু গ্লানি সব ছাপাইয়া যেন উঠিয়াছে এক স্বপ্নময় অমরতা। মন্দিরের পূজারিণী করবী অন্ধনিমীলিত চোখে বসিয়া বসিয়া বােধ হয় স্বপ্ন দেখিতেছিল। দেবী সর্বমঙ্গলার দুয়ারের প্রহরী সে। বর্ষাধিক কাল ধরিয়া স্বপ্নাদেশ চলিয়া আসিয়াছে, রাত-দুপুর হইতে উষার আলো ফুটিয়া না ওঠা পর্যন্ত মন্দির-দুয়ার আগলাইয়া বসিয়া থাকিবে একজন কেহ। মুহুর্তের জন্যও যদি এই সতর্ক ব্যবস্থায় ফাক পড়ে তবে দেবী হয় ত কষ্ট, কুপিত হইয়া চিরদিনের জন্য চলিয়া যাইবেন, সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের যত কিছু শ্ৰী, যত কিছু মহিমা অন্তর্হিত হইয়া যাইবে। মন্দির-দুয়ারের এই প্রহরীর সাথীরূপে কত বর্ষা, শরৎ, বসন্তের বাতাসই না করবীর কানের কাছে চুপি চুপি কথা বলিয়া গিয়াছে!"বয়স যখন তাহার বারাে তখন হইতেই সে দেবীর স্বপ্নাদেশ পালন করিবার ব্ৰত নিয়াছিল। তাহার পর কত বিনিদ্র, অর্ধ-নি, আলাে-ছায়ায় ভরা ৬ অন্তরালের আলো রাত্রি চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু সে তাহার ব্রত ভােলে নাই! দিনের পর দিন ব্যগ্র হইয়া অনাগতের দিকে অগ্রসর হইয়া গিয়াছে, মানব বিধাতা তাঁহার নিজের হাতে লেখা পুথির পাতা একটি একটি করিয়া করবীর সামনে তুলিয়া ধরিয়াছেন, তবু অকারণ ঔৎসুক্য তাহার জাগে নাই... পুঁথির লেখক স্বেচ্ছা-প্রণােদিত হইয়া যাহা তাহাকে দেখান নাই সে সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন সে কখনও করে নাই। কিশােরের সরম-কুষ্ঠিত উষা বহুদিন অতীত হইয়া যৌবনের আকুল মধ্যাহ্নে মিশিয়া গিয়াছিল, কিন্তু করবীর মন হইতে সে উষার স্বপ্ন আজও মুছিয়া যায় নাই। যৌবনের প্রান্তসীমায় আসিয়া তাহার অন্তরটি ছিল কিশােরীর অন্তরের মত—পৃথিবীর খুঁটিনাটির রহস্য সে তাহার ডাগর চোখ দুইটি দিয়া সব সময়েই যেন নূতন করিয়া আবিষ্কার করিত, অচেনা, অজানাকে অনুভব করিবার আনন্দ সব সময়ই যেন তাহার মনকে পুলকাপ্লুত করিয়া রাখিত। বর্ষার অশ্রান্ত বর্ষণের কোলাহল শুনিতে শুনিতে করবী বােধ হয় এই সব বিগত দিনগুলির কথাই ভাবিতেছিল। এমন সময় সে সচকিত হইয়া উঠিল বাহিরে পথিকের আহ্বানে। উৎকর্ণ হইয়া সে শুনিলভুল হয় নাই ত? না, সত্যই কে যেন ডাকিতেছে—দুয়ারটি একবার খােললা গাে•••• সিঁড়ি দিয়া নামিয়া আসিতেই একটা দমকা হাওয়া আসিয়া করবীর গেরুয়া রং-এর আঁচলখানি একটু এলােমেলো করিয়া দিল। কোন প্রকারে নিজের স্ত্রস্ত শ্লথ বসনখানা কুড়াইয়া নিয়া রুদ্ধ দুয়ারের অর্গল খুলিতে করবী অগ্রসর হইয়া গেল।

৬৪ তারা দুজন দেহ। বাহিরে নিবিড় অন্ধকার-মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাইতেছে, সেই আলােয় বর্ষার বারিধারাগুলি যেন স্বতন্ত্র সজীব হইয়া প্রকাশিত হইতেছে । করবী দুয়ার খুলিয়া আহ্বানকারীর আগমন প্রতীক্ষায় দাঁড়াইল। প্রথমে ঢুকিল একটি পুরুষ-প্রশস্ত তাহার ললাট, ঋজু তাহার আর তাহারই বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে বাঁধা একটি রমণী । বিদ্যুতের একটি আলাের রেখায় করবী দুইজনকে একবার দেখিয়া নিল। মেয়েটি পুরুষটির সাথে জড়াইয়া রহিয়াছে নিতান্ত নির্ভরশীল। একটি বল্লরীর মত ! মুখখানি তাহার ম্লান, দেহে নীলাভ শাড়ীর রংটি তাহার স্বাভাবিক পাণ্ডুরতাকে ফুটাইয়া তুলিয়াছে আরও স্পষ্ট করিয়া। সৌন্দর্য্যের অভাব যে এককালে ছিল না তাহার চোখ দুইটির উজ্জ্বলতায়ই তাহার প্রকাশ •••করবীর মনে হইল, যেন অতীত এক গরিমার ভগ্নাবশেষ আসিয়া দাঁড়াইল তাহার সম্মুখে, আর তাহাকে প্রাণপণে আঁকড়াইয়া ধরিয়া রহিয়াছে বিদ্রোহী এক আত্মা। প্রথমে কথা বলিল পুরুষটি । অন্ধকারের মধ্যে করবীর উপস্থিতি অনুভব করিয়া বলিল, এই অসময়ে আপনাকে যে কষ্ট দিলাম সে জন্য ক্ষমা করবেন, অন্য কোন উপায় না থাকাতেই এ করতে হলাে। স্মিতমুখে করবী উত্তর দিল, এ ত আমার কাজ, এ মন্দির ত অনাহূত পথিকদের জন্যই। একটু যেন উষ্ণ হইয়া পুরুষটি বলিল, কিন্তু আমি অনাহূত হয়ে আজ আসিনি, দেবীর আহ্বানেই এ দুৰ্য্যেগ মাথায় করেও এসেছি। -সে কী ?“করবী বিস্ময়াকুল হইয়া উঠিল। সাথীটির দিকে নিবিড় স্নেহভরা চোখে একবার তাকাইয়া পুরুষটি অন্তরালের আলাে বলিল, ইনি হচ্ছেন আমার স্ত্রী, অনেকদিন ধরেই এর রুগ্নতা আমাকে চিন্তিত করে তুলেছে, অনেক চিকিৎসা করিয়েও কোন ফল হয়নি। আজ শুয়ে শুয়ে তাই ভাবছিলাম, ঐকান্তিকভাবে যা কামনা করি তা সফল হয় না কেন? ভাবতে ভাবতে বােধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এমন সময় দেবী এসে আমার সামনে উপস্থিত হলেন••• বলিতে বলিতে তাহার মুখচোখ অননুভূতপূৰ্ব এক রােমাঞ্চে কণ্টকিত হইয়া উঠিল। গভীর স্নেহে সরম-কুন্ঠিতা বধুর চিবুকটি তুলিয়া ধরিয়া সে বলিতে লাগিল, দেবীর অধরে ঠিক এই রকমের একটি হাসি, যেন আলেয়ার আলাে, মনের মধ্যে ধাঁধার সৃষ্টি কতেই যেন রয়েছে•••• সাথীটির পাণ্ডুর মুখ ঈষৎ রক্তাভ হইয়া উঠিল, সে তাড়াতাড়ি পুরুষটির বুকের মধ্যে মাথ। গু জিল। —দেবী এসে বললেন, ওগাে সাধক, তােমার সাধনার মধ্যে ইচ্ছা ত আছে অনেকখানি, কিন্তু ইচ্ছাকে বাস্তবে পরিণতি দেবার মত শক্তি আছে কি? পরীক্ষায় জিততে পারূবে ত?•••আমি এর জবাবে কী বলেছিলাম মনে নেই, কিন্তু দেবীর মুখের ঈষৎ প্রসন্ন হাসির রেখাটি আমার মনের কোণে এখনও ভাসছে। দেবী বললেন, এখ খুনি উঠে তােমার পরিণীতাকে নিয়ে আমার মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনায় বসে। আমি বলছি তার মুখে দেহে স্বাস্থ্যের শ্রী ও লাবণ্য ফিরে আসবে। আমার এই পূজার নির্মাল্য হবে তােমার স্নেহের গভীরতা, আর আরতির ধূপগন্ধ বিকশিত হয়ে উঠবে তােমার অন্তরের ঐকান্তিকতার ঐক্যতানিক সৃষ্টিতে।•••তাই আমি ছুটে এসেছি। করবী মুগ্ধভাবে আগন্তুকের কাহিনী শুনিতেছিল, আর তাহার প্রত্যে- কটি উচ্ছাস এবং আবেগ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে লক্ষ্য করিতেছিল। মন্দিরের প্রহরীরূপে এইপ্রকার অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন সে আর কখনও হয় নাই।

. ৬৬ তারা দুজন বলিল, কিন্তু উষার আলাে ফুটে উঠ বার অাগে ত দেবীর ঘর খােলা হবে না ! -কেন? -এ যে চিরদিনের নিয়ম এখানে! তুমি যদি দেবীর পূজায় বসতে চাও তাহলে অপেক্ষা করতে হবে। উষ্ণ ভাবে পথিক বলিল, দেবীর সাক্ষাৎ আদেশের চেয়েও বড় হবে জড় বিচারহীন নিয়মের একটা বন্ধন? তাহলে দেবীকে পূজা করতে শেখেননি আপনি ! আগন্তুকের কথার ঔদ্ধত্যে প্রথমে করবী একটু স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল। পরে মৃদু হাসিয়া সে বলিল, বেশ, তােমাকে আজ আমি অবসর ও সুযােগ দিচ্ছি। আমার এই আঠারো বৎসরের সাধনায় যা পাইনি’ তা যদি তুমি দেবীর কাছ থেকে নিতে পার, তবে আমি বুঝব বৃথাই গেছে আমার প্রার্থনা, বিফল হয়েছে আমার আত্মনিবেদন প্রত্যুত্তরে পুরুষটি শুধু হাসিল। সেই হাসির প্রত্যেকটি কণার মধ্যে দিয়া যেন ছিটকাইয়া বাহির হইল তাহার মেহাবিষ্ট গভীর আত্মপ্রত্যয়। সঙ্গিনীর দিকে একবারটি তাকাইয়া যেন আর-কেহ-শুনিতে-না-পায় এমন ভাবে বলিল, পারব না কি গাে? সঙ্গিনী লজ্জায় অভিভূত হইয়া মাথা নত করিল। দেবীর ঘরের দুয়ার খুলিয়া দিয়া করবী বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। তখনও টিপ টিপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছেছে, আর বিদ্যুতের আলাে মাঝে মাঝে চকাইয়া উঠিয়া মন্দিরের চূড়াকে উদ্ভাসিত করিয়া দিতেছে। উদাসভাবে করবী অশ্রান্ত ধারাবর্ষণের শব্দ শুনিতেছিল। তাহার গায়ে, মুখে, বসনে যে বৃষ্টির প্রহার আসিয়া লাগিতেছিল সেদিকে তাহার ক্ষেপই ছিল না। কী জানি কেন পথিকের সংশয়হীন অকুণ্ঠিত অন্তরালের আলাে ৬৭ বাণী তাহার মনের মধ্যে গভীর একটা আলােড়নের সৃষ্টি করিয়া তুলিয়াছিল। চোখটা বাহিরের কালাে দিগন্তরেখার দিক হইতে সরাইয়া নিয়া সে মাঝে মাঝে তাকাইতেছিল দেবীর ঘরের দুয়ারের দিকে, যেখানে সঙ্গিনীকে ব্যাকুলভাবে জড়াইয়া ধরিয়া পুরুষটি প্রণত হইয়া বসিয়াছিল দেবীর সম্মুখে। প্রদীপের স্তিমিত আলােকে দুর হইতে করবী পুরুষটির মুখের একটু অংশ দেখিতে পাইতেছিল এবং যতই দেখিতেছিল বিস্ময়ে সে অভিভূত হইয়া উঠিতেছিল। পথশ্রমের সমস্ত অবসন্নতা ছাপাইয়া যেন অভূতপূর্ব একটা আশা ও প্রত্যয়ের আলাে পুরুষটির মুখের প্রত্যেকটি রেখায় ফুটিয়া উঠিয়াছিল। কতক্ষণ যে তাহারা সেই একই ভাবে প্রণত হইয়া ছিল তাহার খেয়াল করবীরও ছিল না। তাহার চেতনা হইল গভীর নীরবতা ভাঙ্গিয়া মৃদু একটি কথায়। কথা বলিতেছিল পুরুষটি, সঙ্গিনীর দিকে তাকাইয়া । -দেবীর প্রসন্নতা লাভ করেছি গাে, এইমাত্র বললেন যে তার অপরি- সীম শক্তির কয়েকটি কণা তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন তােমার মধ্যে, এখুনি। সঙ্গিনীটি উন্মুখভাবে মুখ তুলিয়া তাকাইল, মুখে তাহার দুর্লভ একটি হাসি। সকল সৌন্দৰ্য্য, রহস্য ও বিপুলতা ফুটিয়া উঠিল তাহার সেই হাসিতে। কোমল স্নেহে তাহার হাতখানা ধরিয়া পুরুষটি বলিল, এখন চলতে পাবে, নয় কি গাে? সঙ্গিনীটি অস্ফুট কণ্ঠে বলিল, পারব । ৬৮ তারা দুজন অবাক বিস্ময়ে করবী তাহাদের কাণ্ড দেখিতেছিল। আলাে আঁধারের অপূৰ্ব্ব মায়ার মধ্যে অভিনীত এই দৃশ্য দেখিয়া তাহার চোখের পলক পড়িতেছিল না। রুষটি সঙ্গিনীর হাত ধরিয়া ধীরে ধীরে তাহাকে উন্মুক্ত মন্দির-প্রাঙ্গণে নিয়া আসিল, এবার তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া নয়, দুইটি আঙ্গুলের স্পর্শ দিয়া শুধু। সঙ্গিনীটি হয় ত বা ক্লান্ত অবসন্নতায় আনত হইয়া পড়িতেছিল, কিন্তু পুরুষটি উৎসাহ-দীপ্ত কণ্ঠে বলিতেছিল, ভয় কি গাে, দেবীর শক্তির অমূল্য কণাগুলাে যে এসে তোমার গায়ে লেগেছে। তাহার কথায় ছিল অদ্ভুত এক মাদকতা, উৎসাহে ছিল শ্যামলতার নবীন স্পর্শ। সেই আনন্দেই উদ্বুদ্ধ হইয়া পথিকটির সাথী চলিতেছিল নুতন এক ব্যগ্রতায়, আকস্মিকতার পুলকে। তাহার মুখখানা যেন রূপান্তরিত হইতেছিল বিদ্যুৎ-রেখায় আঁকা একটি ছবিতে। ধীরে ধীরে তাহারা দুইজনে মন্দির-দুয়ারের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। করবী ছিল তাহারই একপ্রান্তে—সে একটুখানি অগ্রসর হইয়া আসিল। গৰ্ব্বদীপ্ত কণ্ঠে পুরুষটি বলিল, ওগো মন্দিরের সেবিকা, এতদিন দেবী পূজা পেয়েছেন শুষ্ক ভক্তির, তঁার অর্ঘ্য হয়েছে নির্ব্যক্তিক এক পুষ্পসম্ভার, তাই তিনি সাড়া দেন্ নি।...কিন্তু আজ তিনি তার মায়া-আসন ছেড়ে উঠেনা এসে পারুলেন না, কারণ আমি যে তাকে ডেকেছি পরিপূর্ণ এবং বিপুল বিশ্বাসের অবদান দিয়ে। অন্য কোন সময়ে করবী কাহারাে মুখে এমন উদ্ধত কথা শুনিলে হয় ত তাহাকে তীব্রকণ্ঠে তিরস্কার করিত, তাহার অহমিকাকে চুর্ণ করিয়া অন্তরালের আলো দিত নির্দয় অঙ্গুলী-নির্দেশে। কিন্তু আজ তাহার মুখ দিয়া একটি কথাও বাহির হইল না। সে শুধু স্তব্ধ হইয়া উদাসভাবে তাকাইয়া রহিল। উষার মাঙ্গলিক আললা তখন ধীরে ধীরে ফুটিতে আরম্ভ করিয়াছে। আর তাহারই ছটায় প্রকৃতি দেবীর অবগুণ্ঠনের মধ্য দিয়া দেখা যাইতেছিল বিদ্যুৎ-রেখায় আঁকা তাহার স্বপ্নময় রূপ—মেঘের পাহাড়, মেঘের ঢেউ, মেঘের রহস্যময় ঐক্যতানিক সৃষ্টি যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি কাহিনী লেখার স্বভাব আমার কোনদিনই ছিল না এবং জীবন- কাহিনী যে একদিন লিখিতে হইবে তাহা স্বপ্নেও কল্পনা করি নাই। কিন্তু আমার বন্দী কথাটা আমার মনের মধ্যে পাখা ঝাপটাইয়া মরিতেছে, তাহাকে যদি বাহিরের বাতাসে আদৌ আসিতে না দেই তবে তাহার প্রতি অত্যন্ত অবিচার করা হইবে। তাই আমি লিখিতে বসিয়াছি। আমার নাম আমি লিখিব না। আমি যেন নামগােত্রহীন, আমার নাম যেন অনিমেষ।••••আর তাহার নাম ? তাহার নামও আমি লিখিতে পারিব না, কারণ হয়ত কেহ আমার এই জীবনস্মৃতি পড়িবেন, হয়ত তিনি আমাদিগকে চিনিতে পারিবেন, যাহা আমি চাই না। আমার এই স্মৃতির পাতায় সে সুমিত্রা নামেই পরিচিত হইয়া থাকুক। সুমিত্রার সঙ্গে আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স পঁচিশ, তাহার বয়স উনিশ। রঙীন্ স্বপ্নের আবেশে তাহার মন ছিল বিহ্বল, পুলক চঞ্চল, তাই আমাকে দেখিয়াই সে আমার প্রেমে পড়িয়া গিয়াছিল। তাহার মনে হইয়াছিল আমাকে জীবন হইতে বাদ দিলে তাহার নারীত্ব রহিবে অসম্পূর্ণ, অবাস্তব। অত্যন্ত গভীরভাবেই সে অনুভব করিয়াছিল তাহার সৃষ্টি হইয়াছে শুধু আমারই জন্য । আমারও সুমিত্রাকে ভাল লাগিয়াছিল। এই ভাললাগা ভালবাসার পর্যায়ে হয়ত তখনও পৌঁছায় নাই, কিন্তু আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, আমি বিশ্বাস করি ভালবাসার প্রথম স্তরে থাকে শুধু ভাললাগা, বিশেষ করিয়া যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি ৭১ পুরুষের দিক হইতে। কাজেই হৃদয়সম্পদে নিজেকে সুমিত্রার চেয়ে বিশেষ খাটো মনে করিবার মত কোন কারণই আমি খুঁজিয়া পাই নাই। এইভাবে আমাদের বিবাহিত জীবন শুরু হইয়াছিল এবং প্রথম বৎসরটি আমাদের কাটিয়াছিল একটি রৌদ্রোজ্জ্বল শারদ প্রভাতের মত। এই একটি বৎসরের মধ্যে আমরা পরস্পরকে নিবিড় করিয়া পাইয়াছিলাম সমগ্রভাবে—দেহ এবং মন উভয়েরই সম্মিলিত মিলনের মধ্যে খুঁত ছিল না এতটুকু। আমাদের সবকিছু ভােলা বিভাের হয়ত আরও অনেকদিন অব্যাহত থাকিত, কিন্তু হঠাৎ একটি সন্ধ্যার তুচ্ছ এক ঘটনায় সুমিত্রা যেন মায়াস্বপ্ন হইতে জাগিয়া উঠিল। আমি কলেজে অধ্যাপনা করিতাম এবং ভাল অধ্যাপক বলিয়া আমার কিছু খ্যাতিও ছিল। পদার্থবিদ্যা এবং গণিতশাস্ত্রেই আমার ছিল ব্যুৎপত্তি। এই দুইটি বিষয় অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনার ক্ষেত্রে ছিল আমার অপ্রতিহত রাজত্ব, এখানে আমি কাহারও কোন অনধিকার প্রবেশ মােটেই সহ করিতে পারিতাম না। হয়ত ইহা আমার গোঁড়ামি, হয়ত ইহা আমার মনের ক্ষুদ্রতা, কিন্তু যাহা আমার স্বভাব তাহাকে অতিক্রম করিয়া ওঠার মত সৎসাহস আমার ছিল না। আমার এই গোঁড়ামির আর একটা দিক আছে। যেমন আমি অপরের অনধিকার প্রবেশ সহ্য করিতে পারি না তেমনই অপরের রাজ্যেও আমি কোনপ্রকার অনধিকারচর্চা করি না। আমার মতে প্রত্যেক নরনারীর চারিদিকে এমন একটা পরিমণ্ডল থাকা উচিত যেটা হইবে তাহার নিজস্ব, যেখানে সে বিচরণ করিতে পারিবে স্বাধীন স্বাচ্ছন্দ্যে। আমার ধারণা ছিল প্রত্যেক মানুষই এইপ্রকার একটা স্বাতন্য, १२ তারা দুজন স্বাধীনতা রীতিমত পছন্দ করে। মেয়েরা, বিশেষ করিয়া স্ত্রীসম্প্রদায়, যে ইহার ব্যতিক্রম তাহা আমার জানা ছিল না। যদি জানা থাকিত তবে, হয়ত, যে প্রকাণ্ড ভুল করিয়া বসিয়াছি তাহা করিতাম না, সুমিত্রাকে এত আকস্মিকভাবে হারাইতে হইত না। যে কথা বলিতে সুরু করিয়াছিলাম তাহা ভুলিয়াই গিয়াছিলাম। হ্যা, সেদিন সন্ধ্যায় বেশ খানিকটা ক্লান্ত হইয়াই বাড়ী ফিরিয়াছিলাম। আমার পড়ার ঘরে ঢুকিয়াই দেখি, সুমিত্রা উপুড় হইয়া আমার একটা বই খুলিয়া কি যেন দেখিতেছে। আমি যে ঘরে ঢুকিয়াছি তাহা সে লক্ষ্যই করে নাই। বেশ খানিকটা বিরক্তিমিশ্রিত স্বরে আমি বলিলাম, ও কি হচ্ছে ? আমার উপস্থিতি এবং প্রশ্নের আকস্মিকতায় সুমিত্রা বােধ হয় একটু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া উঠিল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলাইয়া নিয়া সে বলিল, তােমার মােটা মােটা বইগুলো দেখছিলাম। যে কটুমটে ভাষা, কিছু যদি বােঝা যায়। তাহার সপ্রতিভতায় আমি আরও অপ্রসন্ন হইয়া বলিলাম, যেসব জিনিষ বােঝনা তা নিয়ে ঘাটাঘাটি করে। কেন, সুমিত্রা ? সব কিছুই যে তােমাকে জানতে হবে এমন দিব্যি ত কেউ দেয়নি। আমার স্বরের তিক্ততা লক্ষ্য করিয়া সুমিত্রা ভীতভাবে আমার দিকে তাকাইল, যেন সে অমার্জনীয় একটা অপরাধ করিয়া ফেলিয়াছে। অতি অনুতপ্তস্বরে সে বলিল, আমি জান্তাম না তােমার বই ঘাটলে তুমি বিরক্ত হবে, আমায় ক্ষমা করে। তখনই যদি আমি সুমিত্রাকে বুকে টানিয়া নিতাম, তাহাকে আদর করিয়া বলিতাম, না, আমি বিরক্ত হইনি’ মােটেই—হয়ত কলেজের ক্লান্তিতে মনটা ছিল বেসুরো এবং তাই আমি হয়ে পড়েছিলাম একটু যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি অসংলগ্ন, তাহা হইলে সেদিনকার দ্বন্দ্বে সেখানেই যবনিকা পড়িত এবং আমরা আবার রূপান্তরিত হইতাম কপােত কপােতীতে। কিন্তু সাধারণ আমরা নিয়তিকে এড়াইয়া যাইব কোন্ দুঃসাহসে? তাই নিজের ক্রটি- স্বীকার ত আমি করিলামই না, বরং তাহার অব্যবহিত পরে এমন কতকগুলি ব্যবহার করিয়া বসিলাম যে সুমিত্রার কোমল মন প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খাইয়া বিপর্যস্ত হইয়া গেল। আমার রূঢ়তা একটুও গায়ে না মাখিয়া সুমিত্রা নিজের হাতে নিয়া আসিল চায়ের ট্রে। বলিল, শীগগির করে চা’টা খেয়ে নাও, আমি তােমাকে খুব মজার একটা জিনিষ দেখাচ্ছি। আমি কোন জবাব দিলাম না। নিস্পৃহভাবে চায়ের পেয়ালা তুলিয়া নিলাম। সুমিত্রা আমার গা ঘেঁষিয়া দাড়াইল। বলিল, জানাে, আজ আমি ভারী সুন্দর একটা গান লিখেছি। গান লেখা ও গানে সুর দেওয়া সুমিত্রার জীবনের একটা বড় বিলাস। বিলাস বলিলে বােধ হয় অবিচার করা হয়, কিন্তু আমার বস্তুতান্ত্রিকমন চিরদিন তাহা বিলাসই মনে করিয়া আসিয়াছে। বলা বাহুল্য, সুমিত্রার এই প্রয়াসকে আমি কোনদিনই উদারভাবে দেখিতে পারি নাই, ইহার মধ্যে আমি দেখিয়াছি শুধু চঞ্চলতার অভিব্যক্তি, সংসারের সঙ্গে নিজেকে মানাইয়া নিতে না পারার একটা নিদর্শন। তাই আজ সুমিত্রা যখন উচ্ছ্বাসের সহিত তাহার নূতন গান রচনার কথা বলিল তখন বিনানুমতিতে আমার অধ্যাপনার বই ঘাটাঘাটি করার জন্য আমার মনে যে অপ্রসন্নতার সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা সপ্তমে চড়িয়া দাড়াইল গভীর বিরাগে। বলিলাম, তােমাকে কতদিন বলেছি, সুমিত্রা, এইসব ছাইপাশ লেখায় y ৭৪ তারা দুজন সময় নষ্ট করােনা, তবু তুমি আমার উপদেশে কাণ দেওয়া সমীচীন মনে করনি। আসলে কিন্তু আমি সুমিত্রার গান রচনায় কখনও বা দেই নাই বা কখনও পরিষ্কারভাবে বলি নাই যে এসব আমি পছন্দ করি না। আমার অননুমােদন আমি এতদিন মনের মধ্যেই পােষণ করিয়া রাখিয়াছিলাম, যদিও আমার অজ্ঞাতে এ বিষয়ে সুমিত্রার বিরুদ্ধে আমার অনেকগুলি অভিযােগ পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিতেছিল। সুমিত্রা একটু হাসিয়া জবাব দিল, কিন্তু আমার যে ভাল লাগে ! এই ছেলেমানুষী উত্তর আমার কাছে অসহনীয় বলিয়া বােধ হইল। বেশ একটু ঝাঁঝের সহিতই বলিলাম, তুমি যদি তােমার এই অভ্যাস না বদলাও সুমিত্রা, তাহলে তােমার সঙ্গে একত্র থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠবে। সুমিত্রা অবাকৃবিস্ময়ে আমার দিকে তাকাইল। আমার মুখ দিয়া যে এমন কঠিন কথা বাহির হইতে পারে স্বপ্নেও সে কল্পনা করে নাই। তাহার কি মনে হইয়াছিল জানিনা, কিন্তু যে বিহ্বল দৃষ্টিতে সে আমার মুখের দিকে মিনিট দশেক তাকাইয়াছিল তাহা আমি এখনও ভুলিতে পারি নাই। অন্যান্য রাত্রির মত সেদিন রাত্রিতে আমি যখন সুমিত্রাকে নিবিড় আলিঙ্গনপাশে বন্ধ করিলাম, আমি অনুভব করিলাম আমরা যেন আগেকার প্রিয়-প্রিয়া নহি, আমরা যেন অভ্যাসের নিগড়ে বাধা গতানু- গতিক প্রেমপন্থী স্বামী-স্ত্রী মাত্র। ইহার পর হইতেই আমাদের মধ্যে ব্যবধানের একটা প্রাচীর গড়িয়া যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি উঠিল। আমার চোখের সম্মুখে নগ্নভাবে প্রকটিত হইতে লাগিল সুমিত্রার চপলতা ও চাঞ্চল্য। এতদিন তাহার ছেলেমানুষীকে আমি উদার চোখে দেখিয়া আসিয়াছিলাম, তাহার উচ্ছলতার মধ্যে দেখিয়া- ছিলাম প্রাণের স্পন্দন, সজীবতার আকুল আহ্বান। এখন তাহা নিছক অস্থির-চিত্ততা বলিয়া প্রতীত হইতে লাগিল। আমার বিরাগ দৈনন্দিন ছােটখাট ঘটনার মধ্যে সুমিত্রাকে জানাইয়া দিতেও আমি ত্রুটি করিলাম । সুমিত্রা আমার ব্যবহারে ব্যথা পাইয়াছিল নিশ্চয়ই, যদিও সে মুখ ফুটিয়া আমাকে কিছু বলে নাই। তাহার চরিত্রের মধ্যে ছিল এমন একটা অনমনীয় দম্ভ যাহার সম্মুখে আমার সব কিছু বিরক্তিপ্রকাশ প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসিতে লাগিল। ফল হইল এই যে মনে মনে আমি আরও অশান্ত, আরও অসন্তুষ্ট হইয়া উঠিলাম । আর একটা দিনের কথা আমার মনে পড়িতেছে। আমি দুইটা সিনেমার টিকিট কিনিয়া নিয়া আসিয়াছি, মালিন ডিয়েটি স্ এবং ক্লার্ক গেএর ছবি। সুমিত্রা বহুদিন সিনেমা দেখে নাই, আমি ভাবিয়া- ছিলাম আমার এই হঠাৎ টিকিট নিয়া আসায় সে খুব খুসী হইবে। সুমিত্রার কিন্তু কোন ভাববৈলক্ষণ দেখা গেল না। আমার উৎসাহােজ্জল মুখের দিকে তাকাইয়া সে শুধু বলিল, তােমার সিনেমা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে বুঝি ? আমি অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বলিলাম, তা কছে বই কি। যদি ইচ্ছে না কত তাহলে নিশ্চয়ই পয়সা খরচ করে টিকিট কিনে নিয়ে আসতুম না!

१७ তারা দু'জন ওঃ! কিন্তু আমার ভাল লাগবে কি না একবার ভেবে দেখেছ কি ? মুহূর্তের মধ্যে আমার স্মরণ হইল মার্কিন ডিয়েটিস এবং ক্লার্ক গে ইহাদের একজনকেও সুমিত্রা পছন্দ করে না। এই দুই অভিনেতা- অভিনেত্রীসম্বলিত একটা ছবি আমরা একবার দেখিতে গিয়াছিলাম বিবাহের অব্যবহিত পরে এবং ইন্টারভ্যালের সময়ই আমরা উঠিয়া আসিয়াছিলাম, কারণ সুমিত্রা বলিয়াছিল, পয়সা দিয়ে টিকিট কিনেছি বলেই যে বাজে ছবি দেখার শাস্তি ভােগ করতে হবে এমন কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই!••আমি অবলীলাক্রমে ভুলিয়াই গিয়াছিলাম এই নিতান্ত-অকিঞ্চিৎকর-নয় ঘটনাটি। কিন্তু সুমিতার শ্লেষ আমার ভাল লাগিল না। আমিও সমান ওজনে জবাব দিলাম, উচ্চশ্রেণীর অভিনয় যে গ্রাম্যমেয়েদের বুদ্ধি এবং রসবােধশক্তির অতীত ভুলেই গিয়েছিলাম। বুঝতে পারে এমন সঙ্গীর অভাব হবে না, তােমার আবার প্রয়ােজন নেই।••••বলিয়া আমি একাই চলিয়া গেলাম সিনেমায়। কিন্তু কি-জানি-কেন সেদিন ডিয়েটিস এবং গেল এর ছবি আমার মনকেও স্পর্শ করিল না এবং ইন্টারভ্যালের সময় আমি উঠিয়া আসিলাম । উঠিয়া আসিলাম সত্য, কিন্তু আমার মনের মধ্যে অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হইতে লাগিল এবং তাহার জন্য আমি দায়ী করিলাম সুমিত্রাকে, তাহার উদারতার অভাবকে। বলা বাহুল্য, সুমিত্রার দিকটা আমি একেবারেই লক্ষ্য করি নাই। যদি করিতাম তবে বোধ হয় ফিরিবার একটা পথ থাকিত। সুমিত্রা বুঝিয়াছিল আমি তাহাকে আর ক্ষমার চক্ষে দেখিতে প্রস্তুত নহি এবং তাই তাহার ছােটখাট দুৰ্বলতাকে আমি অহেতুকভাবে বড় করিয়া দেখিতে সুরু করিয়াছি। ফলে, সে নিজেকে ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত ••••কিন্তু যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি ৭৭ করিয়া নিয়া আসিয়াছিল তাহার নিজের জগতে, যেখানে তাহার অপ্রতিহত রাজত্ব। আমার অজ্ঞাতে, গৃহ হইতে আমার প্রাত্যহিক অনুপস্থিতির অবকাশে সে আরও উৎসাহের সহিত গা’ ঢালিয়া দিল গানরচনায় এবং গানে সুর দেওয়ায়। নিঃশব্দে তাহার এই নিষিদ্ধ কাজ করা যে আমি সময় সময় অনুভব করি নাই এমন নয়, কিন্তু আমার বিরক্তি প্রকাশের পরও যদি সে স্বাধীন ইচ্ছায় এবং বুদ্ধিতে তাহার এই বিলাসে আত্মনিয়ােগ করে তবে আমার কিছুই বলিবার নাই। তাহার পরিমণ্ডল নিয়া সে থাকুক তাহার আনন্দে, আমি অনধিকার প্রবেশ করিব না মােটেই। আমিও চাই, আমার পরিমণ্ডলের ছায়া যেন সে ভুলিয়াও না মাড়ায়। স্বাতন্ত্রপ্রিয়তার অহমিকায় আমি ভুলিয়াই গিয়াছিলাম যে নারী স্বাতন্ত্র চায় না। সে চায় বন্ধুত্ব, সে অনুভব করিতে চায় যে তাহার প্রিয়ের অনুরাগ ঘিরিয়া আছে তাহার নিজের প্রত্যেকটি চপলতায়, বিলাসে, ছােটবড় কাজে অকাজে। সুমিত্রাও চাহিয়াছিল যে আমি তাহার সব কিছু লীলাচাঞ্চল্য, তাহার প্রত্যেকটি অনুরাগ বিরাগকে দেখি ক্ষমাসুন্দর চোখে। কিন্তু তাহার অভিলাষ পূরণ করিতে আমি এতটুকু চেষ্টাও করিলাম না। এইভাবে দিন চলিতে লাগিল। আমাদের দুইজনের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশঃ আরও বিশাল, আরও দুরতিক্রম্য হইয়া চলিল। বাহিরের আচরণ অটুট রহিল সত্য, কিন্তু অন্তরে অন্তরে আমরা উভয়েই অনুভব করিতে লাগিলাম আমাদের ভালবাসায় ঘুণ ধরিয়াছে। তবু আমরা অভিনয় করিয়া চলিলাম, কারণ অভিনয়ের সাহায্যে বাস্তবের নগ্নতা খানিকটা অন্ততঃ ঢাকা পড়ে।

৭৮ তারা দুজন ইহার মধ্যে সুমিত্রার একবার অত্যন্ত শক্ত একটা অসুখ হইয়াছিল। রােগশয্যায় তাহার সস্নেহ পরিচর্যা করিতে আমি কোনই কার্পণ্য করি নাই, হয়ত বা চিরদিনের জন্য সুমিত্রাকে হারাইবার সশঙ্ক সম্ভাবনাও আমার মনের মধ্যে মাঝে মঝে উদিত হইত তাহার রােগপাণ্ডুর শীর্ণ মুখখানার দিকে তাকাইলে আমার পুঞ্জীভূত সব কিছু বিরক্তি দ্রবীভূত হইয়া আসিত। কিন্তু দিন পনেরাের মধ্যেই সুমিত্রা রােগশয্যা ছাড়িয়া উঠিল এবং আমরাও ফিরিয়া আসিলাম আমাদের আগেকার অভিনয়ের ভূমিকায়। ইহার অব্যবহিত পরেই আমাদিগকে নৈনিতালে আসিতে হইল— ডাক্তারের পরামর্শে। সুমিত্রার শরীর সম্পূর্ণভাবে সারিতে হইলে পাহাড়ের হাওয়ার দরকার এবং ডাক্তার বলিলেন নৈনিতালের পাহাড় ও লেই হইবে সবচেয়ে উপকারী। তাই আমরা নৈনিতালে আসিলাম। ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত লিপির দুই একটি পাতাও যদি তখন দেখিতে পাইতাম তাহা হইলে হয়ত আমি সুমিত্রাকে নিয়া যাইতাম মুসৌরী বা শিমলা বা দার্জিলিঙএ-নৈনিতালে কিছুতেই নয়! নৈনিতালে প্রথম সপ্তাহটা কাটিয়াছিল বেশ অনাবিল আনন্দে। কিছুদিনের জন্য আমরা যেন আমাদের লুপ্তপ্রায় ভালবাসাকে ফিরিয়া পাইয়াছিলাম। লেকভিউ হােটেলের দোতলায় সবচেয়ে কোণের সুইটুট। আমরা ভাড়া নিয়াছিলাম । আমাদের ঘরের সম্মুখের অনতিপ্ৰসর বারান্দায় বসিয়া আমরা দুইজনে তাকাইয়া থাকিতাম লেকের জলের দিকে আর লক্ষ্য করিতাম পথচারীচারিণীদের বিচিত্র বেশভূষা। অপরিণতবয়স্কা বালিকার মত সুমিত্রা হাসিত আর তাহার হাসিতে আমিও সহজভাবে যােগ দিতাম। প্রকৃতির আবরণের সাহায্যে ভিতরের ভাঙন প্রতিহত করা যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি ৭৯ সাময়িকভাবে সম্ভবপর হইতে পারে, কিন্তু অনির্বাণ অভিযােগের আঁচড়ে যে ভালবাসা ক্ষতবিক্ষত হইয়া রহিয়াছে তাহা এইপ্রকার বাহিক প্রলেপে কখনও স্বাভাবিক সুস্থতায় ফিরিয়া আসিতে পারে না। তাই প্রথম সপ্তাহের নূতনত্ব কাটাইয়া উঠিবার পর আমরা বুঝিতে পারিলাম সংসারের দৈনন্দিন দুর্বলতা ও কার্পণ্যবর্জিত আমাদের আনন্দবিহ্বল পুরানাে দিনগুলি চিরকালের জন্য আমাদের আয়ত্তের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। নৈনিতালের লে এবং পাহাড়ে বােধ হয় মাদকতা আছে। তাই হারানাে স্বাস্থ্য খানিকটা ফিরিয়া পাইয়াই সুমিত্রা আবার তাহার বিলাস, গানরচনা এবং সঙ্গীতে মন দিল। এইসব তুচ্ছ কল্পনা-ছড়ানো কাজে সে বােধ হয় অদ্ভুত একটা প্রেরণা পাইত। কারণ আমি লক্ষ্য করিলাম দৈনন্দিন আহারবিহারে আহার সময়ানুবর্তিতাও যেন অনেকখানি চলিয়া গেল। আমার মনে পড়িতেছে একদিন আমি পােষাক পরিয়া হােটলের লন্এ পায়চারি করিতেছি, সুমিত্রাকে নিয়া যাইব বেড়াইতে, নৈনিতাল হইতে মাইল কুড়িএকুশ দুরে ভাওয়ালী নামে ছােট এক সহরে। ট্যাক্সিষ্ট্যাণ্ড এ ট্যাক্সি অপেক্ষা করিতেছে। আমি পুনঃ পুনঃ আমার হাতঘড়িটার দিকে তাকাইতেছি। আধঘণ্টা হইয়া গেল, তবু সুমিত্রার দেখা নাই। অধীর হইয়া আমি সিড়ি বাহিয়া উপরে চলিয়া গেলাম আমাদের ঘরে। দেখি অর্ধসজ্জিত। সুমিত্রা টেবিলের উপর ঝুকিয়া একাগ্রচিত্তে কি লিখিতেছে। আমার পায়ের শব্দ শুনিতে পাইয়া সে মুখ তুলিয়া তাকাইল। একটু হাসিল। আমি বুঝিলাম সে তাহার প্রিয় বিলাসে নিমগ্ন।

তারা দু'জন
বলিলাম, এদিকে ট্যাক্সি দাড়িয়ে রয়েছে, সুমিত্রা, আর তুমি এখন
ছাইপাশ লিখতে বসেছ ?
-ছাইপাঁশ না গো, নৈনিতালের অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে স্মরণ করে
কয়েক লাইন লিখছি !••••বেশ একটু আবদারের সুরেই সুমিত্রা
বলিল।
—তাহলে তুমি ভাওয়ালীতে যাবে না ?
—আজ না হয় না-ই গেলাম। ভাওয়ালী ত ফুরিয়ে যাচ্ছেনা,
ফুরিয়ে যাচ্ছে আমার প্রাণের স্পন্দন, আমার রসের উৎস।
আমি রীতিমত রাগিয়া উঠিলাম।
—আমার কষ্টোপার্জিত পয়সা এইভাবে নষ্ট করে তােমার
স্বার্থপরতার পরিচয় না দিলেই আমি খুসী হতাম, সুমিত্রা! একটু
আগেও যদি বলতে তােমার যাবার ইচ্ছে নেই তাহলে আমি শুধু শুধু
ট্যাক্সিওয়ালাকে ভাড়ার পয়সা দিয়ে আতাম না।
-ওঃ, তুমি এরই মধ্যে ট্যাক্সি ভাড়া করে বসে আছ ? তাহলে
আমি এখুনি আসছি। আর দু’মিনিটমাত্র, তার বেশী দেরী হবেনা।
দরকার নেই। তুমি তােমার কবিতা নিয়ে থাকো। আমি
ট্যাক্সিওয়ালাকে আমার দণ্ড দিয়ে আসি।••••বলিয়া আমি রাগে
গজগজ করিতে করিতে বাহির হইয়া গেলাম। যাইতে যাইতে
অনুভব করিলাম, সুমিত্রা একটু হাসিয়া আবার তাহার লেখায়
মন দিল।
৩
আমাদের সুইটএর পাশের সুইটটা অনেকদিন খালি ছিল। একদিন
লক্ষ্য করিলাম সেখানে একজন আধ্যবয়সী ভদ্রলােক আসিয়াছেন।

যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি
৮১
ভদ্রলােকের বেশভূষা একটু অসাধারণ ; অধিকাংশ সময়ই তিনি গেরুয়া
রংএর একটা আলখাল্লা পরিয়া থাকিতেন এবং তাহার বান্দ্রী চুল
অর্ধেকটা ঢাকিয়া তাহার মাথার উপর বিরাজ করিত আধাগান্ধী ও
আধারাবীন্দ্রিক একটা টুপি। তাহার বিচিত্র বেশভূষা দেখিয়া আমি
তাহাকে যথাসম্ভব এড়াইয়া চলিতে সুরু করিয়াছিলাম।
লেকের ধারে একদিন ভদ্রলােকের একেবারে সামনাসামনি পড়িয়া
গেলাম। আমাকে দেখিয়াই তিনি একটু হাসিলেন এবং নমস্কারের
ভঙ্গীতে মাথাটা একটু হেলাইলেন। অগত্যা বাধ্য হইয়া আমাকেও
একটু থমকাইয়া দাঁড়াইতে হইল।
ভদ্রলােকই প্রথমে কথা বলিলেন।
-অনেকদিন থেকেই আপনার সঙ্গে আলাপ কব ভাবছি,
হােটেলে পাশাপাশি কামরায় রয়েছি, কিন্তু কোন না কোন কারণে
আলাপটা হয়ে ওঠেনি।
মুখে হাসি টানিয়া বলিলাম,
হ্যা,
আপনাকেও আমি
দূর থেকে ক’দিন ধরে দেখছি।••••আপনি ত দিন তিনচার হ’ল
এসেছেন, না ?
—হ্যা। কিন্তু আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আমার এর মধ্যেই আলাপ
হয়ে গেছে••••অত্যন্ত অসাধারণ মেয়ে, সচরাচর এরকম প্রতিভা দেখতে
পাওয়া যায় না।
বলা বাহুল্য আমি বিস্ময়াপুত হইয়া উঠিলাম। সুমিত্রা ত তাহার
এই নূতন পরিচিতের কথা আমাকে বলে নাই !
ভদ্রলােক বলিয়া চলিলেন, প্রথম আলাপেই আপনার স্ত্রীর কথা
বলছি বলে কিছু মনে করূবেন না যেন। হাজার হােক্, বয়সে প্রৌঢ়ত্বের
কোঠায় পৌঁচেছি, মেয়েরা আমাদের কাছে নিজেদের যেরকম অসঙ্কোচে

তারা দুজন প্রকাশ করে ফেলে, অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সের লােকদের কাছে সেরকম কখনও করতে পারেনা।••••আপনি কি মনে করেন না•••• বলিয়া জিজ্ঞাসুনেত্রে ভদ্রলােক আমার দিকে তাকাইলেন। —অনিমেষ। আমার নাম অনিমেষ মিত্র । --আমার পরিচয়ও দিই, আমার নাম নরেশ চক্রবর্তী।•••হা, আপনি কি মনে করেন না অনিমেষবাবু, আপনার স্ত্রীর প্রতিভা সত্যই অসাধারণ ? এই বয়সে উনি যে গান রচনা করেছেন এবং তাতে সুর দিয়েছেন তা দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। গান জিনিষটা আমি একটু আধটু বুঝি, তাই বছ আপনি ওঁর এই ক্ষমতাটা কিছুতেই নষ্ট হতে দেবে না। এর পূর্ণ বিকাশ হ'লে আমাদের দেশ গৰ্ব্ব কবার মত কিছু জিনিষ পাবে ! এক নিঃশ্বাসে নরেশবাবু কথাগুলি বলিয়া গেলেন। আমি অধীর হইয়া উঠিয়াছিলাম। সত্য কথা বলিতে কি, নরেশবাবুর এই গায়েপড়া উপদেশ দানে আমি মোেটই প্রীত হইতে পারি নাই। —আপনার সঙ্গে অন্য এক সময় কথা বলব। ••বলিয়া শশব্যন্তে আমার গন্তব্যস্থানাভিমুখে যাইবার ভাণ করিয়া আমি বিদায় নিলাম। নরেশবাবুর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের বিষয় সুমিত্রাকে আমি কিছুই বলিলাম না। আমার মনের রুদ্ধ অন্তঃপুরে তাহার বিরুদ্ধে তীব্র অভিমান গুমরাইয়া গুমরাইয়া মরিতে লাগিল। সুমিত্রা আজকাল আমাকে এতখানি পর ভাবে যে নরেশবাবুর সঙ্গে পরিচয়ের কথাটা পৰ্যন্ত আমাকে জানানাে সঙ্গত মনে করে নাই ? অথবা সে কি ভাবে যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি আমি তাহার উচ্চকৃষ্টিগত কাজগুলির রসগ্রহণ করার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ? নরেশবাবুর মত আমি তাহার অন্ধ স্তাবক না হইতে পারি, কিন্তু সত্যিকারের প্রতিভার সম্যক্ মর্যাদা দিতে কি আমি জানিনা ? ঈর্ষার যবনিকা আমাকে এতখানি মােহাচ্ছন্ন করিয়া তুলিল যে সুবিধাবাদী আমি অবলীলাক্রমে ভুলিয়া গেলাম, সুমিত্রা তাহার নিজের শক্তিগুলি কোনদিনই আমার নিকট হইতে গোপন করিয়া রাখিতে চাহে নাই, বরং আমারই অবজ্ঞা, আমারই কৃপণতা তাহাকে বাধা দিয়াছে তাহার নিজেকে আমার সম্মুখে খুলিয়া ধরিতে। আজ যদি সে আমাকে বাদ দিয়া সহানুভূতিসম্পন্ন রসজ্ঞ নরেশ বাবুর কাছে আত্ম- প্রকাশ করিয়াই থাকে তবে তাহার জন্য প্রধানতঃ আমিই কি দায়ী নহি ? পরদিন চা খাইতে খাইতে আমি সুমিত্রাকে বলিলাম, জানাে, শান্তিনিকেতন থেকে রবিবাবুর একদল ছাত্রছাত্রী নৈনিতালে আসছেন, এখানে দু’তিনদিন অভিনয় নাচগান হবে। -জানি। নুতন একটা খবর দিতেছি, সুমিত্রা উৎসুক এবং উৎফুল্ল হইবে ভাবিয়াছিলাম, তাহার শান্ত জবাবে আমি দমিয়া গেলাম। তবু প্রশ্ন করিলাম, বুকিং এখন থেকেই শুরু হয়েছে, এক সন্ধ্যার জন্য দুটো সীট বুক করে এলে হয় না? ঠোঁটের কোণে একটা বক্র হাসি টানিয়া আনিয়া সুমিত্রা বলিল, তুমি যাবে শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের অভিনয় দেখতে ? ঘুম পাবেন ? মুহূর্তের জন্য আমি নিজের স্থৈর্য হারাইয়া ফেলিলাম। তীব্রকণ্ঠে বলিলাম, আমার অন্যায় হয়েছে তােমাকে আমার সঙ্গে যেতে অনুরােধ করেছি! নরেশবাবুর সঙ্গে যেতে পারুলে তুমি বােধ হয় বেশী খুশী হবে, ག ༔ ৮৪ তারা দুজন সুমিত্রা হা করিয়া আমার দিকে তাকাইয়া রহিল। আমি সমান ওজনে বলিয়া চলিলাম, আমি এসব উচ্চাঙ্গের কৃষ্টি কিছুই বুঝিনা, রসজ্ঞ নরেশবাবু তােমাকে ভাল করে বুঝিয়ে দিতে পারবেন।••••তা আমি নিতান্ত ঈর্ষাপরায়ণ নই, দুটো টিকিট আমিই না হয় কিনে দিচ্ছি, তােমরা দু’জনে দেখে এসো। এবার সুমিত্রা কথা বলিল। -তুমি কী যা তা বলছ ? স্বল্পপরিচিত একজন ভদ্রলােকের সম্বন্ধে এসব কর্দৰ্য্য ইঙ্গিত করতে তােমার একটুও লজ্জা হয় না? সুমিত্রা বােধ হয় আরও কিছু বলিতে যাইতেছিল, আমি বাধা দিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিলাম, স্বল্পপরিচিত নিশ্চয়ই, তবু যদি তােমরা এরকম লুকোচুরি না করূতে! —লুকোচুরি ? লুকোচুরি কোথায় করলাম? •••বিস্মিতমুরে সুমিত্রা প্রশ্ন করিল। -লুকোচুরি নয় ? নরেশবাবুর সঙ্গে তােমার আলাপ হয়েছে আজ বােধ হয় হপ্তাখানেক হল, তিনি তােমার প্রতিভা সম্বন্ধে শতমুখ হয়ে সারা নৈনিতালে তােমার জয়গান করে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু তুমি আমার স্ত্রী, আমাকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দিয়েছ তার সঙ্গে তােমার গভীর পরিচয়ের কথা ? আমার স্বরের নিবিড়তাকে হাল্কা করিয়া দিবার প্রয়াস করিয়া সুমিত্রা বলিল, ওঃ, এই? ••তবে তােমায় বলি, নরেশবাবুর সঙ্গে প্রথম এবং শেষ আলাপ হয়েছে কাল দুপুরে, যখন তুমি গিয়েছিলে তােমার প্রােফেসারবন্ধুর সঙ্গে দেখা কতে। তারপর শান্তভাবে তােমার সঙ্গে কথা বলার সুযগ পেলাম কই ? সন্ধ্যের সময় যখন তুমি হােটেলে ফিরূলে তখন দেখলাম তােমার মুখখানা অমাবস্যার অন্ধকারে যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি ৮৫ ঢাকা, আমার সঙ্গে নিছক ভদ্রতাসূচক দু’একটা ‘হা’, ‘না’ ছাড়া একটি কথাও বললে না তুমি ! তারপর আজ সকালবেলা চা খেয়েই তুমি বেরিয়ে গেলে তােমার বন্ধুর কাছে•••• ফিরে এলে একটু আগে! আমি ভেবেছিলাম এখন তােমার কাছে নরেশবাবুর কথা বলব, কিন্তু তুমিই হঠাৎ ভদ্রলােককে জড়িয়ে কতকগুলাে বিশ্রী ইঙ্গিত করে বলে । ছিঃ•••• অবিশ্বাসের সুরে আমি বলিলাম, একদিনের আলাপেই নরেশবাবু তােমার প্রশংসায় উচ্ছল হয়ে উঠলেন ? তােমার মােহিনীশক্তি আছে, সুমিত্রা! -তুমি যদি আমায় বিশ্বাস না করে তাহলে আমি হাজার জবাব- দিহি করেও তােমার দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটাতে পারব না। আমার শেষ কথা এই, লুকোচুরি করা আমার স্বভাব নয়। যেদিন আমি বুঝব তােমার গৃহে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছে আমি নিজেই তােমাকে বলব, সে সৎসাহসটুকু আমার আছে। বলিয়া সুমিত্রা দৃপ্তভঙ্গীতে টেবিল ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সুমিত্রার কথায় আমি তৃপ্ত হইতে পারিলাম না। অশান্তচিত্ত নিয়া বাহির হইয়া পড়িলাম আমার বৈকালিক ভ্রমণে। অসংখ্য অভিযােগ মাথা উচাইয়া আমার মনকে ক্ষতবিক্ষত করিতে লাগিল। প্রতিদিনের কাজকৰ্ম্ম, ভয়ভাবনা, কৃপণতা বিশ্লেষণ করিয়া আমি শুধু দেখিতে পাইলাম সুমিত্রা আমার প্রতি মােতর অবিচার করিয়াছে, আমাকে নির্মমভাবে ঠকাইয়াছে। অভিমানের, ঈর্ষার স্তবকে স্তবকে আমার বুক ভরিয়া উঠিল।

তারা দুজন সন্ধ্যার একটু পরে আমি হােটেলে ফিরিলাম। ঘরে ঢুকিতে যাইব এমন সময় কাণে আসিল একজন পুরুষমানুষের কথাবলার শব্দ এবং একটি মেয়ের চাপা কান্নার স্বর। আমি থকাইয়া দাড়াইলাম। শুনিলাম, নরেশবাবু বলিতেছেন, তুমি শান্ত হও, সুমিত্রা, তােমার মত বুদ্ধিমতী মেয়ের এত অধীর হলে কি চলে? উত্তরে অশ্রু রুদ্ধকণ্ঠে সুমিত্রা কি বলিল আমি শুনিতে পাইলাম না। নরেশবাবু আবার বলিলেন, তােমার স্বামী এখ খুনি এসে পড়বেন, তুমি মুখহাত ধুয়ে সুস্থ হয়ে বসো, নইলে তিনি কি ভাববেন বল ত? রাগে আমার গা জ্বলিয়া যাইতেছিল। সুমিত্রার প্রতারণা যে এতদূর গড়াইয়াছে আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিতে পারি নাই। -আমি তাহলে এখন আসি, কেমন ? বলিয়া নরেশবাবু বাহির হইয়া আসিলেন। আমাকে বারান্দায় দণ্ডায়মান দেখিয়া তিনি যেন একটু অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলেন, কিন্তু পলকের মধ্যে নিজেকে সামলাইয়া নিয়া বলিলেন, এই যে অনিমেষবাবু, আজ আপনাদের কি হয়েছে বলুন ত ? আমি এসেছিলাম আপনার স্ত্রীর দু'একটা রচনা শুনতে, কিন্তু তিনি হঠাৎ কেন যে এতখানি বিহ্বল হয়ে উঠলেন বুঝতে পালাম না। •••তা আপনি এসে পড়েছেন ভালই হয়েছে•••• নরেশবাবু হয়ত আরও কিছু বলিতেন, আমি তাঁহাকে অবসর না দিয়া সোজা ঘরে ঢুকিয়া দরজাটা বন্ধ করিয়া দিলাম। আমাকে ঢুকিতে দেখিয়া সুমিত্রা অশ্রু কলঙ্কিত মুখ তুলিয়া বসিল। বলিল, দেখাে, তােমার সঙ্গে খােলখিল কয়েকটা কথা বলা নিতান্ত দরকার।

যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি ৮৭ তীব্র শ্লেষমিশ্রিত কষ্টে আমি জবাব দিলাম, না বললেও চলবে, আমার চোখকান দুই-ই আছে, আর বুদ্ধিশক্তিও একেবারে বিলুপ্ত হয়নি’, কিছু কিছু বুঝতে পারি। নরেশবাবুর সঙ্গে এখন তোমার দেখা হয়েছে ? -অসময়ে এসে রসভঙ্গ করেছি, তাই দেখা হয়ে গেল, নইলে হয়ত আজকের লীলাও আমার অজ্ঞাতই থেকে যেত। অনুনয়মিশ্রিত সুরে সুমিত্রা বলিল, তুমি বারবার ভয়ানক ভুল কছ । তােমার ভুলটা আমি ভেঙ্গে দিতে চাই, আর আমার এই কান্নার কারণটা কি তাও বলতে চাই। উদ্ধতভাবে আমি জবাব দিলাম, কোন প্রয়ােজন নেই...তুমি শুধু আমাকে জানিয়ে দিয়ে আমি কিভাবে চলে তােমার সুখশান্তি অব্যাহত থাকবে, আমি নিজেকে সেইভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে চেষ্টা করব। সুমিত্রা ইহার উত্তরে কিছু বলিতে যাইতেছিল, আমি বাধা দিয়া বলিলাম, এখ খুনি বলার দরকার নেই, ভেবেচিন্তে কাল বলে। আমি তােমার ইচ্ছা পালন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। সুমিত্রার সঙ্গে এই আমার শেষ কথা, এই আমার শেষ সম্ভাষণ। এখন ভাবিতেছি, কেন আমি শান্তভাবে সুমিত্রার কথাগুলি শুনিতে স্বীকৃত হই নাই, কেন আমি ভুলের মােহে আচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছিলাম। সুমিত্রা, আমার সুমিত্রা, অতি অভিমানিনী, এই বড় কথাটা কেন আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম ? তাহার অনির্বাণ বেদনার এতটুকু অংশ যদি আমি নিতে প্রস্তুত হইতাম তবে আজ তাহাকে বােধ হয় হারাইতাম ! আমি যে তাহাকে ভালবাসি, অতি নিবিড়ভাবে ভালবাসি, এই বড় সত্যটা কেন আমি জোর গলায় সুমিত্রাকে সম্মুখে বলিলাম না?

৮৮ তারা দুজন আজ ভােরবেলা একপেয়ালা চা খাইয়াই আমি বাহির হইয়া গিয়াছিলাম। সুমিত্রা আমার আগেই বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়া গিয়াছিল, তাহার সঙ্গে আমার দেখা হয় নাই। চা খাইতে খাইতে আমি শুধু শুনিয়াছিলাম তাহার হাতের চুড়ির নিক্কন, বেশপরিবর্তনের শব্দ। যখন ফিরিলাম তখন একটা বাজিয়া গিয়াছে। অভ্যাসমত আমি সুমিত্রার খোঁজ করিতে গেলাম আমাদের শােবার ঘরে কিন্তু সেখানে তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। ভাবিলাম হয়ত সে কোথাও বেড়াইতে বাহির হইয়া গিয়াছে। আমি বসিবার ঘরে চলিয়া আসিলাম। ঘরে ঢুকিবার সময় পাশের টেবিলটা লক্ষ্য করি নাই। এখন সেই দিকে নজর পড়িল । দেখি একখানা চিঠি সেখানে পড়িয়া আছে। কৌতুহলী হইয়া চিঠিখানা তুলিয়া নিলাম। উপরে আমার নাম, সুমিত্রার হাতের পরিচিত লেখা। সুমিত্রা লিখিয়াছে। “শ্রীচরণেষু, ভেবেছিলাম মুখেই তােমাকে আমার কথাগুলো বলব, একদিন অহঙ্কার করে বলেছিলাম, যখন তােমার গৃহে বাস করা আমার পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠবে তখন তা বলবার সৎসাহসের অভাব আমার হবে , কিন্তু ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাতে চিঠির আশ্রয় নিতে হ’ল, আমার এই দুৰ্বলতাটুকু তুমি ক্ষমা করো। তােমার অবিশ্বাস, তােমার শ্লেষের সম্মুখে মুখখামুখি দাঁড়াতে আমার ভয় করে না, কিন্তু সঙ্কোচ হয়। এই সঙ্কোচকে কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। নরেশবাবু এবং আমার মধ্যে কোনই বিশেষ সম্বন্ধ নেই। তাকে জেনেছি মাত্র দু’দিন এবং হয়ত তাকে ভুলেও যাব দুদিন পরে।

যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি আমাদের দুর্ভাগ্য, তার সঙ্গে আমার প্রথম দিনের আলাপ হয় তােমার অনুপস্থিতিতে, কিন্তু ভদ্রলােকের কোনই অসাধু উদ্দেশ্য ছিল না এবং নেই তা তোমাকে শপথ করে বলছি। তিনি একটু কবিপ্রকৃতির লােক, নিজেও এক কালে কবিতা লিখতেন, কথায় কথায় তার কাছে আমি বলে ফেলেছিলাম আমার গানরচনার কথা। শুনে তিনি এতখানি উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন যে তিনি আমাকে প্রায় বাধ্য করেছিলেন আমার দু’একটা রচনা তাকে দেখাতে। প্রৌঢ় ভদ্রলােকের সনির্বন্ধ অনুরােধ আমি এড়াতে পারিনি। তাছাড়া তার প্রশংসা আমাকে হয়ত একটুখানি অপ্রকৃতিস্থও করে ফেলেছিল, কারণ তুমি জানো, প্রশংসা দূরে থাক এতটুকু উৎসাহও আমি কখনও তােমার কাছ থেকে পাইনি। তারপর নরেশবাবুকে নিয়ে কাল তােমার সঙ্গে আমার কথা কাটা- কাটি হ’ল, যার কোন প্রয়ােজন ছিল না। তুমি রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলে, আর আমি হতচেতন, মুম্ষুর মত বসে রইলাম। এমন সময় এলেন নরেশবাবু, তােমারই খোঁজে। আমাকে দেখে তিনি সােৎসাহে সুরু করুলেন তােমার সঙ্গে তার আলাপের কথা, বললেন তুমি কতখানি গৌরব বােধ কর তােমার স্ত্রীর প্রতিভাসম্পর্কে। ••••কথাটা অতি সাধারণ, কিন্তু তার মধ্যে এমন একটা উপহাসের খোঁচা অনুভব কলাম যে আমি অশ্রুসংবরণ করূতে পালাম না। নরেশবাবু রীতিমত অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, অত্যন্ত স্নেহের স্বরে বললেন, আমি তার মেয়ের মত, যদি আমার কোন আপত্তি না থাকে তাহলে আমার অশ্রুর কারণ তাকে খুলে বলতে পারি। ••••কি আমি বলব ? আমি কিছুই বলতে পারিনি। নরেশবাবু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে সান্ত্বনাসূচক দু’একটা কথা বলে বেরিয়ে চলে গেলেন এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এলে তুমি। তােমার কথায় বুঝলাম নরেশবাবুর আমার কাছে আসাটা দেখেছ, কিন্তু তারা দুজন | বুঝিয়ে বলবার এতটুকু সুযােগ তুমি দিলে না! তুমি শুধু বললে, কোন প্রয়ােজন নেই। তুমি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছ, যার স্মৃতি আমি চিরকাল আঁকড়ে ধরে থাকব, সযত্নে সগর্বে। কিন্তু একটা অভাব তুমি পূরণ করতে চেষ্টা করােনি কোনদিন। কোথায় যেন পড়েছি, নারী কাদায় তৈরী খেলার পুতুল নয়, আবার সুরে তৈরী বীণার ঝঙ্কারমাও নয়। •••তুমি আমাকে চিরদিন চেয়েছ তােমারই আসক্তি-অনাসক্তির প্রতিচ্ছবি প্রিয়ারূপে এবং আমার কাছে এসেছ দয়িতের বেশে। বন্ধুর মূর্তিতে তুমি কখনও আসনি এবং আমাকে তােমার বন্ধু বলে স্বীকারও করােনি'। তুমি জাননা, গতানুগতিকভাবে আমাদের বিয়ে হয়নি’, আমরা পরস্পরকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম, কাজেই আমি যখন দেখলাম আমাদের জীবনেও সাধারণ দম্পতির পরস্পরের সম্বন্ধে কোন ব্যতিক্রম হ’ল না তখন আমি 'অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলাম। আমার এই ক্ষোভ তুমি দূর করে দিতে পাতে অনায়াসে, কিন্তু তুমি সে প্রয়াস ত করলেই না, বরং তােমার মনে এসে আশ্রয় বাঁধল অবিশ্বাস, ঈর্ষা আর অহেতুক অভিমান। আমি এতদিন যেন স্বপ্নে চলেছিলাম, আমার পরিমণ্ডলের খােলাবাতাসে বাধা পাইনি’, তোমার এই অবিশ্বাস, ঈর্ষা, অভিমানের ভিড়ে ধাক্কা পেলাম। হাজার কথার আবর্জনা, হাজার বেদনার প থেকে অতি খাটি একটি সত্য প্রতিভাত হয়ে এল, তুমি আমাকে কোনদিন যথার্থভাবে ভালবাসনি। আমি আর সব সহ কতে পারি, কিন্তু তুমি আমাকে ভালবাসনি এই নগ্ন সত্যটা কিছুতেই সহ্য করতে পাছিনা। হয়ত আমার ভুল, হয়ত আমার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ বর্ণান্ধ হয়ে এসেছে, কিন্তু আমি অনুভব কছি আমাদের পুরানাে সাধারণ সহজ দিনগুলাে ফিরিয়ে আনতে হলে যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি বেশ কিছুদিনের ব্যবধানের দরকার, ব্যবধানের অবসরে যদি আমরা পরস্পরকে খুঁজে পাই। আমি চললাম রাণীখে এ, সেখানকার একাডেমি অব্‌ মিউজিক। আমার যে বিলাস তােমাকে প্রতিনিয়ত ক্লিষ্ট করে তুলেছে তা আমি বর্জন কতে পারছিনা, কারণ তা আমার অন্তরের গভীরতম প্রদেশ থেকে উদ্ভূত। যদি তুমি এই ব্যবধানের অবসরে আমার এই বিলাসকে ক্ষমার চক্ষে দেখতে পারে, যদি ভবিষ্যতে তুমি মনে করে এই বিলাসলিপ্ত আমাকে দিয়ে তােমার কোন প্রয়োজন আছে, তাহলে আমাকে জানিয়ে, আমি তােমার গৃহে ফিরে আসব। কিন্তু আমার সনির্বন্ধ অনুরােধ, তুমি এখনই আমার খোঁজ করতে শুরু করেনা, কারণ আমাদের যে বিরােধ তার সামঞ্জস্য দু'একদিনে হবেনা। শেষ কথা এই, নরেশবাবু আমার এই রাণীখে এ যাত্রার কথা কিছুই জানেন না, তাকে তুমি এর জন্য অপরাধী করােনা। রাণীখে এর খবর পেয়েছি আমি সংবাদপত্রের অনুগ্রহে এবং সেখানে আমার পরিচিত একজন মেয়ে বন্ধু আছে। সেখানে আমার বিশেষ কোন কষ্ট হবেনা। -তােমার স্ত্রী।” এ কী নিদারুণ চিঠি সুমিত্রা লিখিয়া গিয়াছে ! আমি কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারিতেছিনা আমার অভিমানিনী সুমিত্রা আমাকে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। এত বড় ভুলের বােঝা আমি সহিব কেমন করিয়া ?••••সেত আমাকে বলিয়াছিল যখন তাহার মনে হইবে আমার গৃহে বাস করা তাহার পক্ষে অসহনীয় হইয়া উঠিয়াছে তখন খােলাখুলিভাবে সে আমাকে বলিবে! কেন সে বলিল না? কেন সে আমাকে এতটুকু ৯২ তারা দুজন সুযােগ দিল না যাহাতে আমি তাহাকে বলিতে পারি, আমার ভুল হইয়াছে, আমি তাহাতে অবিশ্বাস করি নাই । সুমিত্রা লিখিয়াছে, আমাদের দুইজনের একত্রে থাকা একপ্রকার অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে, তাই কিছুদিনের ব্যবধান দরকার, যদি এই ব্যবধানের অবসরে আমরা পরস্পরকে নূতন করিয়া চিনিতে পারি । কিন্তু এই শাস্তির ত প্রয়ােজন ছিল না !•••রাণীখে! কোথায় এই রাণীখে? ইহার সন্ধান সে কি করিয়া পাইল? আমার গৃহের নীড় ছাড়িয়া সে কি শান্তি পাইবে রাণীখেটএর একাডেমিতে ? সুমিত্রা বলিয়াছে আমি যেন তাহার খোঁজ না করি, তাহার সন্ধানে আমি রাণীখে না যাই, কারণ আমার উপস্থিতি তাহার বেদনাবিল মনকে আরও অশান্ত করিয়া তুলিবে। কিন্তু তাহাকে ছাড়িয়া আমি কি করিয়া এই নৈনিতালে থাকিব? দিনের পর দিন পাহাড়ের শ্রেণীর দিকে তাকাইয়া থাকিতে থাকিতে আমার চোখ যে ক্লান্ত হইয়া আসিবে, আমার মন যে চঞ্চল হইয়া উড়িয়া যাইতে চাহিবে এইসব শৈলশ্রেণীকে অতিক্রম করিয়া সুমিত্রা যেখানে আছে সেইখানে। পাশের সুইট এ নরেশবাবুর গলা শুনিতে পাইতেছি। তিনি জানেন সুমিত্রা কোথায় চলিয়া গিয়াছে। আমি অন্যায়ভাবে তাহাকে সন্দেহ করিয়াছি! কিন্তু আমি আমার এই দীনতা, এই অসহায়তা কিছুতেই তাহার কাছে প্রকাশ করিতে পারিব না ! সুমিত্রাকে আমি ফিরাইয়া আনিব, রাণীখেটুএ সে পৌঁছাইবার আগেই আমি তাহার পথরােধ করিয়া দাঁড়াইব। তাহাকে বলিব, সুমিত্রা আমার ভুল হয়েছে, আমাকে ক্ষমা কর, তুমি ফিরে চলো। সুমিত্রা নিশ্চয়ই আমার অনুরােধ শুনিবে। যখন সে দেখিবে ক্ষত বিক্ষত পদে আমি ছুটিয়া আসিয়াছি শুধু তাহাকে ফিরাইয়া নিয়া যাইতে, যদি দ্রুত তুমি না যেতে চমকি তখন তাহার সব অভিমান অভিযােগ নিশ্চয়ই দ্রবীভূত হইয়া যাইবে। হ্যা, এই ঠিক। সুমিত্রা রাণীখেটএ গিয়াছে সাধারণের পথ বাহিয়া। আর আমি যাইব উত্তুঙ্গ পাহাড়গুলি অতিক্রম করিয়া, অনধিগম্য অথচ সংক্ষিপ্ত পথের পথিকরূপে সুমিত্রা একাডেমির বারে পৌঁছাইবার পূর্বেই আমি তাহার সম্মুখে যাইয়া দাঁড়াইব, তাহার ক্ষমা ভিক্ষা করিব। আমাকে সে নিশ্চয়ই ক্ষম! করিবে। কিন্তু এই কাহিনী আমি কালীর আঁচড়ে লিপিবদ্ধ করিলাম কেন?•সুমিত্রার সাক্ষাৎ যদি না পাই তবে কি সার্থকতা থাকিবে এই অসংলগ্ন অন্তর-নিংড়ানাে ইতিবৃত্তে ? সুমিত্রাই যদি আমাকে ভুল বুঝিতে পারিল তবে কেন আমি সহানুভূতি ভিক্ষা করিব পৃথিবীর জনসাধারণের কাছে ? আবার বুঝি ভুল করিয়া বসিলাম। কাহিনী লিখিতে না বসিয়া, অমূল্য দুইটি ঘণ্টা এইভাবে নষ্ট না করিয়া, আমার উচিত ছিল অবিলম্বে সুমিত্রার সন্ধানে যাত্রা করা।••••কে জানে সে ইহারই মধ্যে একাডেমির অন্তঃপুরচারিণীভাবে অধিষ্ঠিত হইয়াছে কিনা। , আর দেরী করিব না। নীরন্ধ এই অন্ধকার অপসৃত হইবার পূৰ্বেই আমি যাত্রা করিতেছি। হে ভগবান, তুমি আমাকে নিরাশ করিও না।

বাধা ব্রেকফাষ্ট টেবিলে বিশ্রী একটা কাণ্ড ঘটিয়া গেল। সকালবেলা খবরের কাগজে ডুব দিয়া থাকাটা চিরকালই প্রবীরের স্বভাব, এবং এজন্য স্ত্রী প্রমীলার তরফ হইতে অনুযােগও সে কম শােনে , কিন্তু আজ তাহার অন্যমনস্কতা যেন চরম সীমায় আসিয়া পৌছিয়াছিল। খবরের কাগজের পাতা উল্টাইতে যাইয়া প্রবীরের ডান হাতটা গিয়া পড়িল তাহারই সম্মুখে স্থাপিত তাহার জন্য তৈরী গরম চায়ের পেয়ালার উপর এবং মুহূর্তের মধ্যে চা দুধ বিশৃঙ্খলভাবে ছড়াইয়া পড়িয়া নুতন টেবিল- ক্লথটাকে ত নষ্ট করিলই, অধিকন্তু তাহার একটা ঝলক গিয়া পড়িল প্রমীলার অতি সখের হাল্কা সবুজ রংএর জর্জেট শাড়ীটার উপর। প্রবীর অত্যন্ত অপ্রস্তুত হইয়া ছড়ানাে পেয়ালা এবং দুধের পাত্রটাকে সামলাইতে অগ্রসর হইয়াছিল, কিন্তু স্ত্রীর জকুটির সম্মুখে কেমন যেন সঙ্কুচিত হইয়া সে জড়ভরতের মত তাহার চেয়ারে স্থানু হইয়া বসিয়া রহিল। অবশ্য একথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, যে কোন স্ত্রী তাহার সখের শাড়ীর এরকম দুরবস্থায় রুষ্ট হইবেই, বিশেষ করিয়া সেই দুরবস্থা যদি ঘটে তাহার স্বামীর অতি একগুয়ে অভ্যাস-দাসত্বের জন্য। কিন্তু প্রমীলার বিরক্তিও যেন আজ সীমা অতিক্রম করিয়া গেল। কোলের ন্যাপকিনটা স্বামীর মুখের দিকে বেশ একটু জোরের সহিতই নিক্ষেপ করিয়া প্রমীলা টেবিল ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। তীব্রকণ্ঠে বাধা বলিল, ভােলা মনের নমুনা ত ৰােজই দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আজ আমার সকালবেলার যাত্রাটা ইচ্ছা করে পণ্ড না করূলেই পারতে। প্রবীর বলিতে যাইতেছিল প্রমীলার যে শাড়ীটা নষ্ট হইয়াছে তাহার জোড়া বাজারে দুষ্প্রাপ্য নহে, কিন্তু সে তাহাকে কোন কথা বলিবার অবসর না দিয়াই গট গট করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। আসলে কিন্তু কাণ্ডটা ঘটিয়াছিল প্রবীরের অন্যমনস্কতার জন্য নহে। সেদিনকার কাগজের ছােট্ট একটি খবরই ছিল ইহার জন্য দায়ী। খবরটা আর কিছুই নয়, পশ্চিমের বিখ্যাত ব্যবসায়ী মিঃ শিবরাম ব্যানার্জি সস্ত্রীক কলিকাতায় আসিয়াছেন, বড়দিনের আমােদ প্রমােদ উপভােগ করিতে। পাঠকপাঠিকারা নিশ্চয়ই ভাবিতেছেন, এই খবরের মধ্যে এমন কী আছে যাহা প্রবীরের স্নায়ুগুলিকে হঠাৎ এতখানি চঞ্চল করিয়া তুলিতে পারে? বড়দিনের সময় কলিকাতায় ত এ রকম অনেক ধনী এবং সৌখীন ব্যক্তিরই আনাগােনা হইয়া থাকে, শিবরামবাবুও যে আসিবেন তাহার মধ্যে অস্বাভাবিকতা কী আছে ? কিন্তু যাহারা প্রবীরের জীবনের ইতিহাস জানে তাহারা তাহার এই চাঞ্চল্যে মােটেই বিস্মিত হইবে না। শিবরাম ব্যানার্জির পত্নী গীতা ব্যানার্জির কলিকাতায় আসার সংবাদই প্রবীরকে হঠাৎ বিপর্যস্ত করিয়া ফেলিয়াছিল। সে প্রায় আট বছর আগেকার কথা। প্রবীর তখন সবেমাত্র কলেজ তারা দুজন ছাড়িয়া যুনিভার্সিটিতে ঢুকিয়াছে। গীতা গাঙ্গুলী (তখনও সে শিবরাম ব্যানার্জির স্ত্রী হয় নাই) ও প্রবীরের পরস্পর জানাশােনা বেশ একটু রােম্যান্টিক স্তরে আসিয়া পৌছিয়াছে। গীতার বাবা কলিকাতার বিখ্যাত ব্যারিষ্টার, অর্থ গৌরবও তাহার প্রচুর। মেয়ে যখন আঠারাের কোঠায় পা দিয়াছে তখন হইতেই তিনি ভাবিতে সুরু করিয়াছেন হয় কোন আই-সি-এস্ না হয় কোন ধন- কুবেরের সাথে তাহার বিবাহ দিবেন। গীতা অবশ্য তাহার বাবার এই উচ্চাভিলাষের কথা ঠিক বুঝিতে পারে নাই, তাই অত্যন্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে প্রবীরের সাথে মিশিতে তাহার কোনই দ্বিধা ছিল না। দুইজনের মধ্যে মধুর একটি বন্ধুত্ব গড়িয়া উঠিয়াছিল এবং প্রবারের দিক দিয়া তাহা অতি শীঘ্রই রূপায়িত হইয়া উঠিয়াছিল ভালবাসায়, যদিও গীতার মনের অবগুণ্ঠন তখনও সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত হয় নাই। প্রবীরকে তাহার এই অবিমৃষ্যকারিতার জন্য দোষ দেওয়া যায় না। অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে সে-বড়লােকের মেয়ে গীতার কাছে যাহা ছিল সহজ লীলা চপলতা, প্রবীরের চোখে তাহা আনিত এক নেশার আমেজ। গীতার টুকরা টুকরা কথা, তাহার আন্তরিক প্রতি, প্রবীরের কাছে প্রতিভাত হইত নবীন শ্যামল মেঘের প্রথম প্রসাদবৃষ্টির মত। অবশেষে একদিন সে দুঃসহ সাহসে বলীয়ান্ হইয়া গীতার কাছে তাহার মনের গােপনতম কথাটি খুলিয়া বলিল। গীতার হৃদয়ান্তরালেও ইহার প্রতিধ্বনি ধ্বনিয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে সমস্তই কেমন যেন এলােমেলো হইয়া গেল। প্রবীর গীতাকে ভালবাসিলেও তাহাকে বিবাহ করিবার মত মনের জোর সঞ্চয় করিতে পারিল না। ধনী গৃহে অতি আদরে পালিতা দুহিতা বাধা ১৭ তাহাদের বিধিবদ্ধ গৃহে হয়ত নিজেকে মানাইয়া নিতে পারিবে না এই সন্দেহে তাহার ভালবাসার তীব্রতা সাময়িকভাবে কমিয়া আসিল। এদিকে আই-সি-এস জামাতা সহজলভ্য নয় দেখিয়া গীতার বাবা ধনী ব্যবসায়ী মিঃ শিবরাম ব্যানার্জির সঙ্গে মেয়ের বিবাহ স্থির করিলেন এবং গীতাও ব্যবহারিক জীবনে প্রবীরের কল্পনাবিলাসী প্রেমের চেয়ে শিবরাম ব্যানার্জির সাদর অভ্যর্থনার মূল্য বেশী উপলব্ধি করিয়া এই বিবাহে রাজী হইয়া গেল। প্রবীরের প্রথম পূজার ডালি তাহার মানসী হয়ত সানন্দেই গ্রহণ করিত, কিন্তু দুরধিগম্য সংশয় এবং সঙ্কোচ তাহাকে একটা সীমারেখার বাহিরে যাইতে দিল না । বৎসর দুই পরে প্রবীর তাহারই মত মধ্যবিত্ত এক পরিবারের মেয়ে প্রমীলাকে বিবাহ করিল। প্রমীলাকেও সে পছন্দ করিয়াই বিবাহ করিয়াছিল। প্রথম প্রেমের উদ্দাম উচ্ছাস সে হয়ত প্রমীলা সম্পর্কে অনুভব করে নাই, কিন্তু তাহাকে তাহার ভালই লাগিয়াছিল এবং সে আশা করিয়াছিল তাহাদের বিবাহিত জীবন সহজ ছন্দে চলিয়া যাইবে। কিন্তু বিবাহের বৎসর খানেকের মধ্যেই সে দেখিল, প্রমীলার মধ্যে যে শান্ত গৃহলক্ষ্মীকে সে দেখিতে পাইবে ভাবিয়াছিল তাহার স্থান অতি দ্রুতগতিতে অধিকার করিতেছে একটি গর্বোদ্ধতা সুখবিলাসী নারী। প্রবীর তাহার য়ুনিভার্সিটির সম্মানজনক ডিগ্রীর কল্যাণে শীঘ্রই একটা মােটা চাকুরী জোগাড় করিয়া ফেলিল এবং তাহার এই অবস্থা পরি- বর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রমীলাও কেমন যেন বদলাইয়া গেল। যে প্রমীলা ইতিপূর্বে অভিজাত সমাজের ছায়াও মাড়াইত না সে এই সমাজের १ } তারা দু'জন অন্তভুক্ত হইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিল। বাড়ীতে পার্টি,'বিলাতি হােটেলে বনাচ ও ডিনার, তুর্ক রিলীফ ফাণ্ডের জন্য চ্যারিটি অভিনয় ইহার প্রত্যেকটিতে প্রমীলা বিশিষ্ট অংশ নিতে সুরু করিল। প্রবীর প্রথমটায় একটু আপত্তি করিয়াছিল। বলিয়াছিল, সংসারের সুখনীড়ে বাহিরের এই সমস্ত উপসর্গ না আনাই ভাল। কিন্তু প্রমীলা স্বামীর এই আপত্তিতে কান দেয় নাই। হয়ত প্রবীরের প্রতি প্রমীলার কিছু অভিযােগও ছিল। স্বামীর মুখেই সে তাহার প্রথম জীবনের উচ্ছাসের কাহিনী শুনিয়াছিল এবং যেটুকু প্রবীর ভালভাবে গুছাইয়া বলিতে পারে নাই তাহা সে তাহার বুদ্ধি দিয়া কল্পনা করিয়া নিয়াছিল। প্রবীর যে তাহাকে নিছক সুবিধার জন্য বিবাহ করিয়াছে এই অনুভূতি তাহাদের পরস্পরের মেহের সম্পর্কটাকে অনেকখানি শিথিল করিয়া আনিয়াছিল। কিন্তু বিবাহের প্রথম দুই বৎসর স্বামীর প্রতি কর্তব্যে প্রমীলা এতটুকুও ত্রুটি করে নাই। তাহার পরিবর্তন দেখা দিল তাহাদের প্রথম সন্তান অশােকের জন্মের মাস ছয়েক পরে। পত্নী এবং মাতা দুইভাবে প্রবীরের প্রতি তাহার সযত্ন কৰ্ত্তব্য সমাধা করিয়া প্রমীলা শান্ত বিবেকে অভিজাত সমাজের ঘূর্ণিপাকে নামিয়া পড়িল। প্রথমে প্রবীর দুঃখ পাইয়াছিল—সে প্রমীলার কাছে আশা করিয়াছিল শান্তি, মেহ, পরিচর্যা। প্রমীলা যখন বিধিবদ্ধ প্রণালীতে তাহার দেয় স্নেহটুকু তাহাকে দিয়া সরিয়া দাঁড়াইল তখন সে ক্ষুব্ধ হইলেও কোন অভিযােগ করিতে পারিল না। পুরানাে জীবনের পাতা উল্টাইয়া সান্ত্বনা পাইবার মত বয়স এবং উদ্দীপনাও তাহার চলিয়া গিয়াছিল, কাজেই উভয়ত বঞ্চিত হইয়া সে তাহার বই এবং খরের কাগজে মনকে নিয়ােজিত করিতে চেষ্টা করিল।

বাধা ৯৯ তাহার জীবনে হাসির টুকরা স্বরূপ রহিল তাহার ছেলে অশােক। যে মেহ সে প্রমীলাকে দিবার জন্য আন্তরিকভাবে উৎসুক হইয়াছিল তাহা প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসিয়া অশােকের উপর বর্ষিত হইতে লাগিল। গীতার কথা সে ভাবিত না। সে জানিত গীতা একরকম স্বেচ্ছায় ধনী মিঃ শিবরাম ব্যানার্জিকে বিবাহ করিয়াছে, তাহার জীবনে কোন অসম্পূর্ণতা নাই। তাহা ছাড়া প্রমীলার আর যে ক্রটিই থাকুক না কেন, গতানুগতিক পাতিব্ৰত্যে তাহার এতটুকুও ভুলচুক হয় নাই। কাজেই আত্মসম্মানবােধসম্পন্ন, দৃঢ়নিয়ন্ত্রিত প্রবীর তাহার নােঙ্গরহীন মনকে প্রতিক্রিয়া হিসাবেও গীতা সম্পর্কে কল্পনা বিলাসে ডুবাইতে সমর্থ হইল না। কিন্তু সেদিনকার খবরের কাগজের ঐ সংবাদটুকু তাহার বাধাধর। জীবনযাত্রাকে কেমন যেন এলােমেলাে করিয়া দিল। রুষ্ট। প্রমীলা যখন গগ করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল তখন প্রবীরের হঠাৎ মনে হইল, গীতা কখনই এরকম করিয়া তাহাকে উপেক্ষা করিত না!•••তাহার মনে হইল, আজ যদি সে অন্যমনস্কভাবে গীতার ইহার চেয়েও দামী একটা শাড়ী নষ্ট করিয়া ফেলিত, গীতা তাহাকে শুধু একটা মৃদু তিরস্কার করিত, হয়ত বলিত, ছিঃ, এরকম তুমি, চা ফেলে শাড়ীটার কী করলে বলে। দেখি !••••তাহার পরই প্রবীরের অপ্রতিভ ভাব দেখিয়া সে হয়ত তাহার চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া তাহার পাশে আসিয়া দাড়াইত। প্রবীরের মাথাটা তাহার বুকের কাছে টানিয়া আনিয়া বলিত, ওঃ ছাই, কলকাতা সহরে শাড়ীর ত আর অভাব নেই, আছে মাসে আমাদের বিয়ের দিনে না হয় তুমি এর চেয়েও সুন্দর আরেকটা শাড়ী কিনে দিয়ে, কেমন ? প্রবীর হয়ত শ্রদ্ধায়, কৃতজ্ঞতায় গীতাকে তাহার আরও কাছে টানিয়া আনিত, এই সামান্য ঘটনাটার পরিসমাপ্তি হইত নিবিড় আলিঙ্গনে, অধস্পর্শে।

১০০ তারা দুজন -বাবা, বাবা, দেখো আজ তােমার জন্য কেমন সুন্দর ফুল নিয়ে এসেছি।••••বলিতে বলিতে তাহার পাঁচ বৎসরের ছেলে ঘরে ঢুকিল। প্রবীর তাহার দিবাস্বপ্ন হইতে জাগিয়া উঠিয়া বসিল। অশােককে কোলের কাছে টানিয়া সস্নেহে তাহার উচ্ছঙ্খল চুলগুলি কপাল হইতে সরাইয়া দিতে দিতে বলিল, বাঃ, ভারী সুন্দর ফুল ত! কোথায় পেলে, বাবা ? উৎসাহদীপ্ত কণ্ঠে অশােক বলিল, আজ সেই নতুন পার্কে গিয়েছিলাম যে! সব গাছে ফুল হয়েছে—লাল, নীল, হলদে। তুমি বিকেলবেলা চলাে, আমি তােমায় নিয়ে যাবাে। ছেলের অভিভাবকত্বে নিজেকে ছাড়িয়া দিতে প্রবীরের এতটুকুও আপত্তি নাই। সে গলা মিলাইয়া বলিল, নিশ্চয়ই যাবো! তা এ ফুল- গুলাে তুমি আমার লাইব্রেরী ঘরে রেখে এসাে, কেমন ? সেই যে টেবিলের উপর কঁাচের ফুলদানীটা আছে, তার মধ্যে।••••দেখাে, ভেঙ্গে যেন না যায় ! —না, ভাঙ্গবে না, বাবা।••••বলিতে বলিতে অশােক তাহার বাবার হুকুম তামিল করিতে ছুটিল। . প্রমীলা তখন নিজের বেশভূষা পরিবর্তন করিয়া বাহিরে যাইতেছিল। অশােক মাকে দেখিয়া থকাইয়া দাঁড়াইল। সে মাকেও ভয়ানক ভালবাসে, মাকে আজ ভারী সুন্দর দেখাইতেছে, অশােক মুগ্ধনেত্রে তাকাইয়া রহিল। প্রমীলা অশােককে ছুটিতে দেখিয়া প্রশ্ন করিল, তুমি কোথায় ছুটছ, অশােক ?

বাধা ১০১ চুমু খাইয়া } অশােক সােৎসাহে জবাব দিল, বাবার পড় বার ঘরে, আমি ফুল এনেছি যে, বাবা তার ঘরে রেখে দিতে বলল•••• মুহূর্তের জন্য প্রমীলার মুখে রূঢ়তার একটা ছায়া আসিয়া পড়িল, কিন্তু তাহা সে সাইয়া নিয়া নীচু হইয়া অশােককে একটা বলিল, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, অশােক, তুমি মামণির জন্য চেঁচামেচি করােনা যেন!••••বলিয়া স্বামীর দিকে একবারও না তাকাইয়া সে বাহিরে যাইয়া তাহার এক বন্ধুর মােটরে উঠিল । প্রবীরের সেদিন অফিস ছুটি—রবিবার। বাড়ীতে একা একা তাহার ভাল লাগিতেছিল না। লাঞ্চএর অনেক দেরী আছে, প্রমীলা কখন ফিরিবে কিছুই বলিয়া যায় নাই, খানিকক্ষণ লাইব্রেরী ঘরে পুরানাে বই খাতা নিয়া নাড়াচাড়া করিয়া সে শ্রান্তিবােধ করিতেছিল। অবশেষে সে স্থির করিল, গ্রেট ঈষ্টার্ণে লাঞ্চ খাইতে যাইবে। টেবিলের উপর ছােট্ট এক টুকরা কাগজে প্রমীলার জন্য এই সংবাদটুকু রাখিয়া সেও বাহির হইয়া পড়িল । প্রথমেই নিউমার্কেটে যাইয়া সে ছেলের জন্য মস্ত বড় একটা কাঠের ঘােড় কিনিল। অশােক অনেকদিন যাবৎ বাবার কাছে তাহার এই । আবেদন জানাইয়াছে, প্রবীর নানাকাজের ভিড়ে তাহা মঞ্জুর করিতে পারে নাই। আজ অশােকের প্রতি প্রমীলার ব্যবহারের মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা ঔদাসীন্য দেখিয়া সে দুঃখবােধ করিতেছিল এবং যাহাতে তাহার শিশুমনের উপর কোন প্রকার ছায়া না পড়ে সেই উদ্দেশ্যেই সে আজ এই উপহারটি কিনিয়া নিয়া চলিল। নিউ মার্কেট হইতে বাহির হইয়াছে এমন সময় প্রকাণ্ড একটা গাড়ী আসিয়া প্রধান প্রবেশদ্বারের সম্মুখে দাড়াইল এবং তাহার মধ্য হইতে বাহির হইল গীতা—একা।

১০২ তারা দু'জন গীতা স্বপ্নেও ভাবিতে পারে নাই এখানে এমন অপ্রত্যাশিতভাবে প্রবীরের সঙ্গে তাহার দেখা হইয়া যাইবে। পলকের জন্য সে নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার বুকের রক্তের প্রবাহ অসংখ্য শিরা উপশিরা অতিক্রম করিয়া তাহার সুগৌর মুখে ছড়াইয়া পড়িল। প্রবীরও চমকাইয়া গিয়াছিল, কিন্তু গীতার মত কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে হয় নাই। এতক্ষণ তাহার মনের আনাচেকানাচে আট বৎসর আগেকার স্মৃতি ঘুরিয়া ফিরিতেছিল বলিয়াই হয়ত সে আত্মস্থ থাকিতে সমর্থ হইয়াছিল। স্বপ্নজড়িতস্বরে গীতা প্রশ্ন করিল, তুমি, প্রবীর ? -হ্যা, আমি, গীতা । তুমি কলকাতায় এসেছ খবরটা আজ সকালবেলায় পেয়েছি, একজন নিজস্ব সংবাদদাতার অনুগ্রহে। তা তােমার স্বামী মিঃ ব্যানার্জি কোথায় ? গীতা হাসিল। এতক্ষণে সে তাহার আড়ষ্টতা কাটাইয়া উঠিয়াছে। বলিল, উনি চলে গেছেন ওঁদের কোন এক কারখানা দেখতে, বারাকপুরের দিকে। গাড়ীটা রেখে গেছেন আমার ব্যবহারের জন্য। প্রবীর ভাবিতেছিল দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া এই প্রকাশ্যস্থানে আর বেশী কথােপকথন করা সঙ্গত হইবে কি না। গীতা বােধ হয় তাহার মনের দ্বিধা বুঝিতে পারিল। সে নিজেই বলিল, কতদিন পর তােমার সঙ্গে দেখা, না ?•••• প্রায় ছয় বছর হবে ! প্রবীর তাহার ভুল সংশােধন করিয়া বলিল, ছয় বছর কী বলছ, আসছে জুলাই-এ আট বছর পূর্ণ হবে ! চটুল হাসি হাসিয়া গীতা বলিল, তােমার স্মৃতিশক্তি দেখছি আগের মতই প্রখর রয়েছে••••আমি ত সব গােলমাল করে ফেলেছিলাম। যা হােক্, চলো, মার্কেটে ঢুকে পড়ি, আমার একটা শাড়ীতে আজ চা বাধা পড়ে বিশ্রী দাগ হয়ে গেছে, এরা সেটা তুলে দিতে পারবে কিনা একবার জিজ্ঞাসা করে দেখি। প্রবীর প্রথমে ভাবিল গীতা উপহাস করিতেছে। পরক্ষণেই মনে হইল, উপহাস করিবে কেন? গীতা ত কিছুতেই জানিতে পারে না আজ তাহার গৃহেও শাড়ী এবং চা নিয়া কী ঘটনা ঘটিয়াছে !...কিন্তু আজকার দিনটাতেই গীতার শাড়ীও চায়ে নষ্ট হইয়া গেল। ঘটনার এই অদ্ভুত সমাবেশ তাহার কাছে কেমন যেন রহস্যাবৃত বলিয়া মনে হইল। মুখে কিছু বলিল না, কুলীকে অশােকের খেলনাটা তাহার নিজের গাড়ীতে তুলিয়া দিতে বলিয়া সে নীরবে গীতার সঙ্গে আবার মার্কেটে ঢুকিল। মার্কেটের কাজ যখন শেষ হইল তখন একটা বাজিয়া গিয়াছে। প্রবীর প্রশ্ন করিল, এখন কি বাড়ী ফিরে যাচ্ছ? গীতা জবাব দিল, , আজ সারা দিন রাতের মত ছুটি। বাইরেই কোথাও থেমে নেব। —তাহলে চলােনা গ্রেট ইষ্টার্ণে, আমিও আজ বাইরেই লাঞ্চ খাচ্ছি।••••অবশ্য যদি তােমার আপত্তি না থাকে। —প্রবীর, তুমি আজকাল আদবকায়দা একটু বেশী শিখেছ।•••• বলিয়া হাসিয়া গীতা জানাইল সে সানন্দে প্রবীরের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়াছে। প্রবীর তাহার নিজের গাড়ীটা বাড়ীতে পাঠাইয়া দিয়া গীতার গাড়ীতে উঠিয়া বসিল। গ্রেট ইষ্টার্ণের নিভৃত একটি কোণ খুঁজিয়া নিয়া উভয়ে বসিল। প্রবীর বিস্মিত হইয়া গেল গীতার সপ্রতিভয়, তাহার হাস্যচটুল কথা-

১০৪
তারা দুজন
বার্তায়। আট বৎসর আগে তাহাদের মধ্যে যে আনন্দমধুর বেদনার
অনুভূতি জাগিয়াছিল তাহার এতটুকুও যেন চিহ্ন নাই গীতার লীলাচপল
জিজ্ঞাসায়, তাহার সহজ স্নিগ্ধ উত্তরে ।
—তােমার খবর বলাে, প্রবীর। শুনেছি তুমি নাকি বেশ বড়
একটা ফার্মে ঢুকেছ, শীগগীরই ম্যানেজার হবার সম্ভাবনা আছে।•••
আমার অভিনন্দন জেনো।
—আমার খবর খুবই মামুলী, গীতা ।•••বছর ছয়েক হ’ল বিয়ে
করেছি, তার কিছুদিন পরই এই চাকুরীটা জুটে গেল, এখন মােটামুটি
আছি ভালই।••••একটি ছেলে হয়েছে, তার নাম রেখেছি অশােক।
ছেলের উল্লেখে গীতা যেন বেশী কৌতূহলী হইয়া উঠিল।
-তাই নাকি? তা হলে তােমার খােকাকে ত একদিন দেখতে
যেতে হবে! কত বড় হয়েছে ?
পাঁচ বছর।
—পাচ বছর ? তাহলে ত বেশ বড় হয়েছে। তা সে তার
বাবার মতই হয়ে উঠছে না ত ?—রােম্যান্টিক, অথচ রােম্যান্সকে
প্র্যাকটিক্যাল ভাষা দেবার বেলায় যত সঙ্কোচ, বিধা।
কথাটার মধ্যে কি প্রচ্ছন্ন একটা শ্লেষ নিহিত ছিল ?
প্রবীর একটু আহত বােধ করিল। বলিল, গীতা, মানুষ জীবনে
ভুল করে, কিন্তু সে ভুলের জন্য যদি তার অনুশােচনা হয়ে থাকে তাহলে
তাকে সে সম্বন্ধে ভৎসনা না করাই কি বন্ধুত্বের পরিচায়ক নয় ?
প্রবীরের মৃদু তিরস্কারে গীতা লজ্জিত এবং বিস্মিত বােধ করিল।
তাহার ধারণা ছিল বিগত জীবনের ইতিহাস নিয়া মনকে ভারাক্রান্ত করা
প্রবীরের প্রকৃতিবিরুদ্ধ, কিন্তু সহসা এই অনুশােচনার উল্লেখে সে নিজেও
যেন কেমন অন্যমনস্ক হইয়া গেল।

বাধা প্রবীর বলিল, আমার কাহিনী ত সবই শুলে, এবার তােমার তােমার ছেলেমেয়েদের-কথা শুনি। ম্লান হাসি হাসিয়া গীতা বলিল, আমি সে সৌভাগ্যে বঞ্চিত। —সে কী ?...বিস্মিত ভাবে প্রবীর প্রশ্ন করিল । তেমনই ম্লান সুরে গীতা বলিল, সত্যি তাই।••••আমার জীবনের এই দিকটা বােধ হয় অপূর্ণই রয়ে গেল। প্রবীর কী বলিবে বুঝিতে পারিতেছিল না। গীতার এই দুর্ভাগ্যে তাহার অন্তর মথিত করিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস পড়িল । কথােপকথনের মধ্যে একটু প্রফুল্লতা আনিবার প্রয়াস করিয়া গীতা বলিল, তার জন্য দুঃখ করে ত কোন লাভ নেই, প্রবীর। জীবনে যা’ আমরা কামনা করি সবই যদি পেতাম তাহলে তার উপযুক্ত মর্যাদা দিতে শিখতুম না।••ঐশ্বৰ্য্য, বিলাস, স্বাচ্ছন্দ্য সবই পেয়েছি, স্বামীর ওজনকরা স্নেহের দামও আমি আজকাল দিতে শিখেছি, যদি কিছু অসম্পূর্ণতা থেকেই থাকে তা নিয়ে প্রকাশ্যভাবে অভিযােগ করে নিজেকে ছােট করূতে চাই না। বলিয়া প্রবীরের দিকে তাকাইয়া গীতা হাসিল। লাঞ্চের বাকী সময়টা নিঃশব্দেই কাটিল। প্রবীরের ব্যথিত সহানুভূতিপ্রবণ মন আজ যেন একটু বেশী দরদী, একটু বেশী সাহসী হইয়াছিল। সে নিঃসঙ্কোচে গীতার হাতের উপর নিজের হাতটা একবার রাখিল। গীতা কোন আপত্তি করিল না। লাঞ্চ শেষ করিয়া বিল, চুকাইয়া দিয়া উভয়ে বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। গীতা প্রশ্ন করিল, তােমাকে তােমার বাড়ীতে আগে পৌছে দি’, কেমন?

১০৬ তারা দু'জন প্রবীর ইহার কোন জবাব না দিয়া বলিল, তােমার কি আজ আর কোন এনগেজমেন্ট আছে, গীতা ? —না, কেন? —মিঃ ব্যানার্জি, তােমার স্বামী, কারখানা থেকে কখন ফিরবেন ? -উনি ? উনি আজ ফিরবেন না, সেখানে রাতে কী একটা মিটিং আছে, সেটা শেষ হতে হতে অনেক দেরী হয়ে যাবে, তাই আমাকে বলে গিয়েছেন রাতটা ওখানেই কাটাবেন এবং কাল খুব ভােরবেলায় চলে আসবেন। —তােমাকে একেবারে একলাটি থাকতে হবে ? -এত নতুন নয়, প্রবীর। ওঁর চারিদিকে এত অসংখ্য কাজ যে তার মধ্যে আমি নিতান্তই বাহুল্য। সহধর্মিণীকে যে স্বামীর ধর্মে বাধা দিতে নেই, শাস্ত্রের এই মােটা অনুশাসনটা ভুলে যেয়াে না, প্রবীর। মুহূর্তের জন্য প্রবীর ভাবিল। তাহার পর আগ্রহপূর্ণকণ্ঠে বলিল, আমি আজ সন্ধ্যায় তােমার কাছে আসব গীতা ? গীতা যেন কথাটা শুনিতেই পায় নাই এইভাবে তাহার গাড়ীর দিকে অগ্রসর হইল । প্রবীর আবার বলিল, আমরা দুজনেই দৃঢ়শৃঙ্খলে বাঁধা, গীতা, আইনকানুনের গণ্ডী ছাড়িয়ে অসাবধানতার রাজ্যে পৌছবার কোনই সম্ভাবনা নেই আমাদের। কিন্তু পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্ব আমরা দাবী কতে পারি এবং সেই দাবীর জোরেই তােমায় প্রশ্ন করছি, আমি আ গীতা ? এ যেন নূতন এক প্রবীর! হঠাৎ-পাওয়া প্রিয়াকে আবার হারাইয়া ফেলার ভয়ে উদ্বিগ্ন দায়িতের কণ্ঠস্বর। গীতা আর সব পারে, কিন্তু প্রবীর যখন আকুলভাবে তাহার কাছে সামান্য এই করুণা ভিক্ষা করে বাধা ১০৭ তখন সে কিছুতেই তাহাকে রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করিতে পারে না। তাহা ছাড়া ইহার মধ্যে অন্যায় ত কিছু নাই! স্বামীর বিশ্বাসের অমৰ্য্যাদা সে করিতেছে না, তাহার বহু পুরাতন বন্ধুর সঙ্গে মন খুলিয়া একটু কথা বলিবে, এই ত! বলিল, আচ্ছা, তুমি এসো। ১২ নম্বর সাউথ এণ্ড পার্ক বােড়, বালিগঞ্জ। টেলিফোন হচ্ছে সাউথ ২৭৫। —আমি তাহলে এখন চলাম। একটা ট্যাক্সি নিয়েই চলে যাচ্ছি। আমার জন্য সম্পূর্ণ উল্টোপথে তােমার আবার কোন দরকার নেই। বাড়ীতে ফিরিয়া প্রবীর সােজা তাহার লাইব্রেরীঘরে ঢুকিল। প্রথমেই তাহার চোখ পড়িল তাহার টেবিলের উপর কাচের ফুলদানীটার দিকে। অশােকের সযত্নে রাখা ফুলগুলি শুকাইয়া আসিয়াছে। বােকা ছেলে, ফুলদানীতে ফুল রাখিয়াছে, কিন্তু তাহার মধ্যে জল না দিলে যে ফুল শুকাইয়া যাইবে তাহা জানে না ! একটা চুরুট ধরাইয়া প্রবীর আবার সেই সকালবেলার কাগজটা নিয়া বসিল। পড়িবার উদ্দেশ্যে নয়—ভাবিবার সুযােগ সৃষ্টি করার জন্য । গীতার সঙ্গে আবার দেখা হইবে-নিভৃতে, কোলাহল এবং কৌতূহলী দৃষ্টির বাহিরে। সম্ভাবনায় প্রবীর বেশ পুলকিত হইয়া উঠিতেছিল। কিন্তু মাঝে মাঝে কেমন একটা সঙ্কোচ যেন ঘাড় উচাইয়া তাহার কল্পনাকে ভারাক্রান্ত করিয়া তুলিতেছিল। সে সদম্ভে তাহার এই সঙ্কোচবন্ধন কাটাইয়া উঠিবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিল। একটু পরেই প্রমীলা আসিয়া ঘরে ঢুকিল।

১০৮
তারা দু’জন
প্রশ্ন করিল, তুমি বুঝি আজ আমার উপর রাগ করে বাইরে খেতে
গিয়েছিলে ?
নিস্পৃহকণ্ঠে প্রবীর জবাব দিল, একা ভাল লাগছিল না, তাই
বাইরে চলে গেলাম। রাগ কব কেন?
-কোথায় খেলে ?
গ্রেট ইষ্টার্ণে ।
-ওঃ।
তাহার পর একটু থামিয়া প্রমীলা বলিল, তুমি আজ এমন ব্যবহার
করলে মনে হ’ল অপরাধটা যেন আমিই করেছি। অথচ অমন দামী
শাড়ীটা যে একেবারে নষ্ট হয়ে গেল সেজন্য তােমার এতটুকুও দুঃখ
হ’ল না।
প্রবীর সংক্ষেপে বলিল, দুঃখ-প্রকাশ করবার সুযােগ ত দেওয়া
হয়নি’ !
প্রমীলা বেশ শান্ত সুরেই কথা বলিতে আরম্ভ করিয়াছিল, প্রবীরের
এই সংক্ষিপ্ত শ্লেষে সে তাহার স্থৈর্য আবার হারাইয়া ফেলিল। তীব্র
কণ্ঠে বলিল, আমার ঘাট হয়েছে তােমার বিশ্রামের ব্যাঘাত করূতে
এসেছি। আমার সখের যা কিছু আছে তা নষ্ট হয়ে গেলে তুমি যে
মনে মনে এতখানি আনন্দলাভ কর তা জানতুম না, আজ আমার নুতন
একটা শিক্ষা হল ।
প্রবীর তাহার মূল্যবান্ মুহূর্তগুলি এই প্রকার তুচ্ছ কলহে নষ্ট করিতে
মােটই ইচ্ছক ছিল না। সে প্রমীলার কথার কোন জবাব দিল না।
প্রমীলা রাগে গজ গজ করিতে করিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া
গেল।

বাধা সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিয়াছে। প্রবীর তখনও লাইব্রেরী ঘরে একটা ইজিচেয়ারে শুইয়া রহিয়াছে। গীতার প্রতি তাহার ভালবাসার স্মৃতি দূর সমুদ্রের ঢেউএর কান্নার মত তাহার বুকের মধ্যে উদ্বেলিত হইয়া উঠিতেছিল। তাহার গৃহ, তাহার আবেষ্টনী সমস্ত ভুলিয়া যাইয়া সে একাগ্ৰমনে ভাবিতেছিল তাহার বিগত জীবনের ছােট খাট ঘটনাগুলির কথা। গীতা এ কী পরশমণি ছোঁয়াইয়া দিয়া গেল যাহার ফলে সমস্ত পৃথিবী আজ প্রবীরের কাছে আবার রূপে, রংএ, আশায় ভরপূর হইয়া উঠিল ! অশােক আসিয়া ঘরে ঢুকিল। বাবাকে শুইয়া থাকিতে দেখিয়া প্রশ্ন করিল, বাবা, তুমি শুয়ে আছ যে ? ছেলের আহ্বানে প্রবীর যেন মর্ত্যলােকে ফিরিয়া আসিল। বলিল, বড় ক্লান্ত লাগছে, বাবা । তাহার পরই তাহার মনে পড়িল অশােকের জন্য যে খেলনাটা পাঠাইয়াছিল তাহা বােধ হয় গাড়ী হইতে নামানেই হয় নাই। বেয়ারাকে ডাকিয়া বলিল, গাড়ীতে একটা জিনিষ রয়েছে, নিয়ে আয় ত। অশােক উৎসুকভাবে জিজ্ঞাসা করিল, কী জিনিষ বাবা ? কার জন্য এনেছ? —তােমার জন্যে, সেই যে মস্ত বড় ঘােড়া তুমি চেয়েছিলে আজ নিয়ে এসেছি। -সত্যি?•••চোখ দুইটা বড় করিয়া অশােক তাহার বাবার দিকে তাকাইল। বেয়ার। কাঠের ঘােড়াটা আনিয়া লাইব্রেরী ঘরে রাখিল। আনন্দে উৎফুল্ল অশােকের আর দেরী সহে না, সে সুখে মুরুব্বিয়ানাভাবে ঘােড়ার উপর চড়িয়া বসিল।

১১০
তারা দুজন
প্রবীর বলিল, এবার খুশী হয়েছ ত, বাবা?••যাও, তােমার ঘরে
নিয়ে যাও, খেলা করােগে।
আটটা বাজিতে মিনিট কুড়ি বাকী। গীতার ওখানে যাইবার
জন্য তৈরী হইয়া প্রবীর আবার লাইব্রেরী ঘরে আসিল। প্রমীলা স্বামীর
সাজসজ্জা দেখিয়া প্রশ্ন করিল, আবার বেরুচ্ছ ?
-হ্যা।
—কখন ফিরবে ?
-তা দেরী হতে পারে, দশটা এগারােটা।
খেয়ে গেলে না ?
—বিশেষ ক্ষিদে নেই। আমার জন্য ঘরে ফ্লাঙ্কে কফি আর বিস্কুটের
টিনটা রেখে দিতে বলে। একটু সাপার খেয়ে শুয়ে পড়ব।••••আর
তুমি বসে থেকো না যেন।
-বেশ।••••বলিয়া প্রমীলা ছেলের কাছে চলিয়া গেল।
একটা সিগারেট ধরাইয়া প্রবীর বাহিরে যাইবে এমন সময় প্রমীলা
আবার ফিরিয়া আসিল। উদ্বিগ্নস্বরে বলিল, ওগাে একটা কথা শোেন•••
-কী ?••প্রবীর থকাইয়া দাঁড়াইল।
-অশােকের ভয়ানক জ্বর হয়েছে, গা’ যেন পুড়ে যাচ্ছে।
—সে কী? এই ঘণ্টাখানেক আগে সে কত খুশী হয়ে আমার
কাছ থেকে তার ঘােড়াটা নিয়ে গেল, আর এরই মধ্যে জ্বর।
বলিতে বলিতে প্রবীর প্রমীলার সঙ্গে ছেলের ঘরে ঢুকিল। অশােক
তাহার ছােট বিছানায় শুইয়া আছে, চোখ রক্তবর্ণ, আয়া কাছে বসিয়া
রহিয়াছে।

বাধা
১১১
.
বাবাকে দেখিয়া অশােক চীৎকার করিয়া বলিল, আমার কিছু
হয়নি’ বাবা, আমি তেতাে ওষুদ খাবাে না !
-না, বাবা, তােমাকে তেতে ওষুধ কেউ খাওয়াবে না। তুমি
চুপটি করে শুয়ে থাকে। দেখি ।•••প্রমীলা বলিল।
তাহার পর জিজ্ঞাসুনেত্রে স্বামীর দিকে তাকাইয়া বলিল, তুমি কি
তাহলে সত্যি বাইরে যাচ্ছ ?
প্রবীর কিছু বলিবার আগেই অশােক চীৎকার করিয়া বলিল, না,
বাবা, তুমি আজ আমার কাছে বসে থাকবে। আর সেই লাল ঘােড়ার
গল্প বলবে।
প্রবীর তাহার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাইল। আটটা বাজিতে
পাঁচ মিনিট বাকী।
গতানুগতিক ছন্দে জীবনযাত্রাই তাহার ললাটলিপি—ইহার মধ্যে
এতটুকু বৈচিত্র্য, এতটুকু উচ্ছলতা সে আনিতে পারিবে না ! অশােকের
আকুল আহ্বানের সম্মুখে তাহার নিজের স্বাধীনতা স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন
দিতেই হইবে ।
মুহূর্তের মধ্যে প্রবীর তাহার কর্তব্য স্থির করিয়া নিল। বলিল,
আমি কোথাও যাচ্ছি না, বাবা, এখুনি এসে তােমার সাথে গল্প করব।
তুমি লক্ষ্মী হয়ে মামণির কাছে একটু থাকো, আমি আমার বন্ধুকে একটা
টেলিফোন করে বলে আসি, আজ যাওয়া হবে না, কারণ থােকাকে লাল
ঘােড়ার গল্প বলতে হবে।
!

প্রত্যাবর্তন সুদীর্ঘ আঠারাে বৎসর পরে পুরীতে আসিয়াছি। পুরীর সমুদ্রের ফেনিলােচ্ছল জলরাশি, পুরীসৈকতের বালুকণার মায়া প্রায় কাটাইয়া উঠিয়াছিলাম, কিন্তু কী-জানি-কেন প্রৌঢ়ত্বের মধ্যাহ্নে আঠারাে বৎসরের পুরানো জীবনের ছবি চোখের সামনে এমন ভাবে ভাসিয়া উঠিল যে একদিন হঠাৎ হাবড়া ষ্টেশনে অন্যান্য স্বাস্থ্যকামীদের সঙ্গে আমিও পুরী এক্সপ্রেসে চাপিয়া বসিলাম। বিচারবুদ্ধি দিয়া তখন ভাবিয়া দেখি নাই—কাজটা কতখানি সঙ্গত হইতেছে। ভােরের আলাে ফুটিতে না ফুটিতে গাড়ী যখন ষ্টেশন প্ল্যাটফর্ম্-এ আসিয়া পৌছিল তখন যাত্রীদের কোলাহল, কুলীদের চীৎকার আর পাণ্ডাদের আকুল আহ্বানে আমার যেটুকু বুদ্ধি অবশিষ্ট ছিল তাহাও লােপ পাইবার উপক্রম হইল। কুলী যখন আমার স্যুটকেশটা একটা ট্যাক্সিতে লইয়া গিয়া তুলিল তখন বাধ্য হইয়া আমাকে বলিতেই হইল, অমিয়নিবাসমে চলাে••• সেবারও এই অমিয়নিবাসেই আসিয়া উঠিয়াছিলাম। পরিবর্তন বেশ কিছু হইয়াছে লক্ষ্য করিলাম। নুতন ম্যানেজার, নুতন চাকর, দারােয়ান, আসবাবপত্রও নূতন। তাহা ছাড়া, আধুনিকতার সহিত সামঞ্জস্য রাখিতে গিয়া ঘরগুলির ব্যবস্থাও বদলাইয়াছে। প্রত্যেক দুইটি ঘরের সঙ্গে একটি বাথরুম এবং যাহারা প্রথম শ্রেণীভুক্ত হইতে প্রত্যাবর্তন ১১৩ ইচ্ছুক তাহাদের জন্য ড্রেসিং টেবিল, সােফা, আয়নাবসাননা আলমারির বন্দোবস্তও আছে। মােট কথা, অমিয়নিবাস স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামদান- বিষয়ে কোন ত্রুটি রাখে নাই। কিন্তু আমার মনে হইল, এই সব নূতন আয়ােজনের মধ্যে আমি যেন কেমন খাপছাড়া, অসংলগ্ন। যে আঠারাে বৎসর আমি কলিকাতায় কাটাইয়াছি তাহা যেন পলকের মধ্যে আমার জীবন হইতে অপসৃত হইয়া গেল। অনুভব করিলাম, আমি আটত্রিশ বৎসরের প্রৌঢ় ব্যারিষ্টার মিঃ নরেশ মিত্র নহি, আমি যেন কলেজে-পড়া কুড়ি বৎসরের তরুণ যুবক নরেশ। সুপ্রিয়ার সঙ্গে যেদিন প্রথম অসম্ভাবিতরূপে দেখা হয় সেই মুহূর্ত গুলির স্মৃতি এতটুকুও ঝাপসা হইয়া যায় নাই। তখনকার তরুণীদের মধ্যে এযুগের সাবলীল স্বাচ্ছন্দ্য এবং মধুর স্বাধীনতা ছিল না সত্য, কিন্তু সুপ্রিয়া ছিল একযুগ অগ্রগামী। বােধ হয় সেই জন্যই আমি তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিলাম। সুপ্রিয়া তাহার বাবা-মার সঙ্গে অমিয়নিবাসেই আসিয়া উঠিয়াছিল। আমি যে ঘরে থাকিতাম তাহারই পাশে তঁাহারা থাকিতেন। বাবার অসুস্থতার জন্য সুপ্রিয়াকে অধিকাংশ সময় ঘরের ভিতরে থাকিতে হইত, বাহিরে সমুদ্রস্নানে বা ভ্রমণে তাহাকে কদাচিৎ দেখা যাইত। অমরবাবুর অসুস্থতা একদিন খুব বাড়িয়া ওঠে এবং তখন পাশের ঘরে আমার ডাক পড়ে। সুপ্রিয়াই আমাকে ডাকিতে আসিয়াছিল। সেই প্রথম আহ্বানের সুরটি আমার কানে এখনও বাজিতেছে। -দেখুন, বাবার শরীর আজ বড্ড খারাপ মনে হচ্ছে, ম্যানেজার মশায়ও নেই, আপনি একবার ডাক্তারবাবুকে খবর দিতে পারেন? ডাক্তার ডাকা, দোকান হইতে ঔষধ আনা, অমরবাবুর পরিচর্যা, এই সব বিষয়ে আমার তৎপরতা দেখিয়া আমি নিজেই সেদিন বিস্মিত ১১৪ তারা দু'জন হইয়া গিয়াছিলাম। পরে আত্মবিশ্লেষণ করিয়া দেখিয়াছিলাম, সুপ্রিয়ার আহ্বানই আমাকে প্রেরণা জোগাইয়াছিল। তাহার পর নানা কাজে অকাজে সুপ্রিয়াদের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘনীভূত হয়। আমার কল্পনাবিলাসী মন সুপ্রিয়াকে কেন্দ্র করিয়া অনেক স্বপ্ন রচনা করিতে সুরু করে, যদিও শেষ দিন পর্যন্ত ইহার আভাষটুকুও সুপ্রিয়াকে দেই নাই। বাধা সরিয়া পড়িল তাহাদের পুরীত্যাগের দিন। সুপ্রিয়াকে ডাকিয়া বলিলাম, সুপ্রিয়া, যদি অভয় দাও একটা কথা বলি। সুপ্রিয়া নিঃসঙ্কোচে তাহার বড় বড় চোখদুটি তুলিয়া আমার দিকে তাকাইল। বলিল, বলুন। —পুরীর এ কয়টা দিন যেন স্বপ্নের মধ্য দিয়ে কেটেছে। এই স্বপ্নকে আমি চিরন্তন করে রাখতে চাই। তুমি যদি অনুমতি কর, তােমার বাবার কাছে আমি বিবাহের প্রস্তাব করি। সুপ্রিয়ার মুখের ভাব এতটুকুও বদলাইল না। সে হয় না, আমি বাগদত্তা। সুপ্রিয়ার সঙ্গে এই আমার শেষ কথা। আমি তাহার কাছ হইতে ছুটিয়া পালাইলাম। আমার কানে শুধু বাজিতে লাগিল, সে হয় না, আমি বাগদত্তা ! তাহার পরদিনই আমি কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলাম। পরের মাসেই আমি চলিয়া গেলাম বিলাতে-ব্যারিষ্টারী পড়িতে। তিন বৎসর পর দেশে ফিরিয়া পূর্ণোদ্যমে প্র্যাকটিস সুরু করিলাম। শুনিলাম, অমরবাবু মারা গিয়াছেন, সুপ্রিয়ার বিবাহ হইয়া গিয়াছে সেই ভাগ্যবান পুরুষটির সঙ্গে যাঁহার কাছে সে বাগদত্তা ছিল। ভদ্রলােক পশ্চিমের কোন একটা করদরাজ্যে শিক্ষকতা করেন। সে শুধু বলিল- প্রতাব ওঁন ১১৫ আমার জীবনের বেসুরাে তার আর সুরে বাধিতে পারিলাম না। বাবা-মা’র অশ্রু, ভাইবােদের অনুরােধ-উপরোধ, বন্ধুদের উপহাস কিছুই আমাকে টলাইতে পারিল না। সুপ্রিয়াকে অবলম্বন করিয়া আমি যে সুখস্বর্গ রচনা করিয়াছিলাম তাহা আমার আয়ত্তের বাহিরে চলিয়া গেলেও তাহার আসনে অন্য কোন নারীকেই আমি প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হইলাম না। বৎসরের পর বৎসর কাটিয়া গেল। কৰ্ম্মজীবনের ব্যস্ততা আল- বিধুর অধিকাংশ মুহূর্তই পরিপূর্ণ করিয়া রাখিত, কিন্তু তবু এমন অনেক সময় আসিত যখন আমার কল্পনা উড়িয়া যাইত তরুণ যৌবনের সেই মদির দিনগুলির দিকে। আর তালস চোখ দুইটি বুজিয়া আমি ভাবিতাম, সুপ্রিয়া অন্যের গৃহলক্ষ্মী, তাহার অনুপম পরিচৰ্যা, স্নেহ ও প্রেম লাভ করিয়া আর একটি জীবন সৌরভমণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছে, আর সেই নিবিড় পরিপূর্ণতার মধ্যে ভাগ্যহত আমার স্মৃতি ক্ষণেকের জন্যও তাহাদের শান্তিময় জীবনকে ভারাক্রান্ত করিয়া তােলে না। যদি তুলিত, তবে হয়ত আমি খানিকটা সান্ত্বনা পাইতাম, কিন্তু ইহা কল্পনা করিবার মত সাহস আমার ছিল না। পুরীর দিকে সুদীর্ঘ আঠারাে বৎসর পা বাড়াই নাই। বাড়াই নাই। তাহার পর হঠাৎ একদিন ক্ষণিক খেয়ালের বশে আমার সেই পুণ্যতীর্থে আবার ফিরিয়া আসিলাম। অমিয়নিবাসের নুতন মানেজারটি অত্যন্ত গল্পপ্রিয়। প্রথম দিনই ১১৬ তারা দুজন তিনি আমাকে তাহার হােটেলের অনেক খবর দিবার জন্য উৎসুক হইয়া উঠিলেন। আমি ত এখানে আছি বছর চারেক হ’ল। এর মধ্যে কত লােক যে এখানে এলেন গেলেন তা বলতে গেলে মস্ত বড় একটা ইতিহাস হয়ে যায়। এই ত গেল বছর লক্ষ্মীপুরের রাজা এসেছিলেন তার একদল বন্ধু নিয়ে, সারা হােটেলটা রিজার্ভ করে রেখেছিলেন দু’হপ্তার জন্য। তারপর রােজ সন্ধ্যায় তাদের তাদের আড্ডা বস্ত, সেটা ভাঙ্গত রাত দুটো তিনটেয়....সে যে কি হৈ হৈ কাণ্ড কি বলব। আমি প্রশ্ন করিলাম, শুধু তাসের আড্ডা ? ঈষৎ ভঙ্গী করিয়া ম্যানেজার বলিলেন, রাজারাজরাড় কাণ্ড, শুধু তাসের আড়া হবে কেন ? ষ্টেশন থেকে পানীয় আর আহার যা আসত, তা সালাতে আমাদের চাকরগুলাে রীতিমত হিমসিম খেয়ে যেত! তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, রাজা বাহাদুর ছিলেন অত্যন্ত সচ্চরিত্র, আর কোন নেশাই ওঁর ছিল না। আমি হাসিলাম। সচ্চরিত্রতার মাপকাঠি যে দেশে বিশেষ শ্রেণীর মেয়েদের সঙ্গপরিহারে, সেখানে রাজা বাহাদুরকে কে না সাধু বলিবে? —তারপর এবছর পূজোর সময় এলেন কলকাতার বিখ্যাত ধনী মিঃ বাটুলিওয়ালা আর তার দুই মেয়ে। বাটুলিওয়ালার নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই, বম্বের লােক যদিও, তবু দুপুরুষ ধরে বাঙ্গলা মুলুকেই আছেন, আর নিজেও বাঙ্গালী বিয়ে করেছেন। তার মেয়ে দুটি ছিল অনুপম রূপসী। বাটুলিওয়ালা তার মেয়েদের নিয়ে আমাদের হােটেলে এসে উঠেছেন এই খবর যখন ছড়িয়ে পড়ল তখন এখানে সীট পাবার জন্য সে কী ভীড়, বিশেষ করে বিলাতফেরৎ ব্যারিষ্টার যুবকের মহলে। মেয়ে দুটিকে কিন্তু প্রশংসা না করে পারা যায় না। তাদের প্রত্যাবর্তন ১১৭ প্রেমপ্রার্থী সকলকেই তারা সমান ওজনে মিষ্টি হাসি আর অমায়িক ব্যবহারে এমন মুগ্ধ করে রেখেছিল যে বাটুলিওয়ালা পরিবার চলে যাবার পর কারাে কাছে এতটুকু নিন্দা শুনতে পাই নি, রুবি রােজির (মেয়ে দুটির নাম) প্রশংসায় ওরা সবাই হয়ে উঠেছিল শতমুখ । আমি বুঝিতে পারিলাম অভিজাত হােটেল-শ্রেণীর মধ্যে অমিয়নিবাস আজকাল শীর্ষস্থানে। আঠারাে বৎসর আগে আমার মত বেকার যুবক, আর অমরবাবুর মত রুগ্ন পেন্সনভোগীই ছিল ইহার প্রতীক অতিথি, আর এখন লক্ষ্মীপুরের রাজা আর বাটুলিওয়ালা-দুহিতারই এখানকার প্রধান পৃষ্ঠপােষক। সসঙ্কোচে আমি জানাইলাম, আমি একজন নগণ্য ব্যারিষ্টার মাত্র। ম্যানেজারটি অত্যন্ত সপ্রতিভ। আমার পরিচয়ের দৈন্যটুকু এক- প্রকার গায়ে না মাখিয়াই তিনি বলিলেন, ওঃ-আপনিই কলকাতার বিখ্যাত ব্যারিষ্টার মিঃ নরেশ মিত্র ? আমরা খুবই খুশী হয়েছি আপনি আমাদের এখানে এসে উঠেছেন, বিলিতি হােটেলে যাবার প্রয়ােজন বােধ করেন নি। আমি বিনীতভাবে জানাইলাম, আমার খ্যাতি মােটেই নাই। আর বিলিতি হােটেলে না যাইয়া অমিয়নিবাসে উঠিয়াছি, এখানে খানিকটা হৃদ্যতা মিলিবে এই আশায়। ম্যানেজার মহাশয় খুবই প্রীত হইলেন। বলিলেন, আপনাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দিকে লক্ষ্য রাখা ত আমাদের কর্তব্য। তা আপনি কি এই প্রথম এদিকে এলেন? সত্য গােপন করিলাম। সুদীর্ঘ আঠারাে বৎসর আগেকার কাহিনী এই নুতন আবেষ্টনীর মধ্যে টানিয়া আনায় ত কোন সার্থকতা নাই ! বলিলাম, হ্যা, এদিকে আর আসা হয়ে ওঠেনি। আমার এক মকেল ১১৮ তারা দু'জন আপনাদের হােটেলের এত সুখ্যাতি করেছেন যে শুধু আপনাদের এখানে থাকার লোভেই এবার আমি পুরীতে এসে পড়েছি। একগাল হাসিয়া ম্যানেজার বলিলেন, বিলক্ষণ !••তা আপনার কোনই অসুবিধে হবে না। এখানে যা যা দেখবার আছে, হপ্তাখানেকের মধ্যেই আপনাকে দেখিয়ে দেবার ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি। কলকাতায় ফিরে গিয়ে অমিনিবাসের সুখ্যাতি আপনাকে করতেই হবে যে ! পুরীর ভূগােল আমি ভুলিয়া যাই নাই, কিন্তু যেন ম্যানেজার মহাশয়ের নির্দেশ মতই চলিতেছি এই ভাব দেখাইয়া আমি পরদিন প্রত্যুষে চলিলাম বি, এ, আর হােটেলের দিকে—সমুদ্রসৈকত নাকি সেখানটায় অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং জনতাও সেদিকে অপেক্ষাকৃত কম। একা হাঁটিতে হাঁটিতে ক্লান্তিবােধ করিতেছিলাম—বহুদিন এই প্রকার ভ্রমণের অভ্যাস নাই। বি, এ, আর হােটেলও অনেকখানি পশ্চাতে রাখিয়া যেখানে ধূসর মাটির ধূপগুলি প্রায় সমুদ্রের কোলে আসিয়া মিশিয়াছে সেখানে উপস্থিত হইলাম এবং শ্রান্তি দূর করার উদ্দেশ্যে বালুকণার উপরেই বসিয়া পড়িলাম। বিপর্যস্ত চিন্তার ধারাগুলি লইয়া কতক্ষণ খেলা করিয়াছিলাম মনে নাই, হঠাৎ আমি অনুভব করিলাম আমি একা নহি। অদূরে আমারই মত উন্মনাভাবে সমুদ্রের দিকে তাকাইয়া বসিয়া আছে একটি আধুনিক তরুণী। মেয়েটি আমাকে লক্ষ্য করিয়াছে কিনা বুঝিলাম না। দেখিলাম, সে অনেকক্ষণ ধরিয়া একই ভাবে বসিয়া রহিয়াছে। তাহার মুখখানি ভাল করিয়া দেখিতে পাইতেছিলাম না। তাহার কেশ এবং বেশবিন্যাস হইতে সহজেই প্রতীত হইতেছিল-

প্রত্যাবর্তন
বাঙ্গালী, নব্যা এবং সমকুণ্ঠাবিহীনা। তাহার দিকে তাকাইয়া থাকিতে
আমার মন লাগিতেছিল না।
কিছুক্ষণ পরে মেয়েটি উঠিয়া দাঁড়াইল। পশ্চাতে যেখানে আমি
ছিলাম, একবারও দৃকপাত না করিয়া সে আবার সম্মুখের দিকে ধীর
ধীরে হাটিতে সুরু করিল।
আমি কৌতুহল বােধ করিলাম। অলস সময় কাটাইবার পক্ষে
কৌতূহলের মত বড় ঔষধ বােধ হয় আর নাই। আমিও উঠিয়া পড়িলাম
এবং মেয়েটির পশ্চাতে পশ্চাতে হাঁটিতে আরম্ভ করিলাম।
যেখানে মেয়েটি এতক্ষণ বসিয়াছিল তাহার নিকটবর্তী হইয়া লক্ষ্য
করিলাম—রুমালে বাঁধা একগােছ চাবি পড়িয়া আছে। মনে হইল
ভুল করিয়া ফেলিয়া গিয়াছে। আমি ক্ষিপ্রতার সহিত সেটি তুলিয়া
লইয়া বেশ দ্রুতগতিতে মেয়েটিকে অনুধাবন করিলাম এবং তাহাকে প্রায়
ধরিয়া ফেলিলাম।
আমার পায়ের শব্দ বােধ হয় সে শুনিতে পাইয়াছিল। আমি
তাহাকে ডাকিবার পূর্বেই সে পিছন ফিরিয়া তাকাইল এবং আমাকে
দ্রুত পদক্ষেপে আসিতে দেখিয়া থকাইয়া দাঁড়াইল।
আমি প্রৌঢ়ত্বের মধ্যাহ্নে পৌছিয়াছি, রীতিমত হাঁফাইতেছিলাম ।
রুমালে বাঁধা চাবির গােছাটি তাহার সম্মুখে তুলিয়া ধরিয়া বলিলাম,
মাপ করবেন, এটি কি আপনার ?
পলকের জন্য মেয়েটি যেন সরমে রাঙা হইয়া উঠিল। তাহার
পর নিজেকে সামলাইয়া লইয়া বলিল—ও হ্যা, আমি ভুলে ফেলে
এসেছিলাম বুঝি ?•••আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ।
জিনিষটি তাহার হাতে সমর্পণ করিয়া দিলাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপনের
আর অপেক্ষা করা সঙ্গত হইবে কিনা
কিনা ভাবিতেছিলাম,

১২০ তারা দু'জন মেয়েটিই দ্বিধামুক্ত করিয়া দিল। বলিল, আপনি কি এখন ফিরে যাচ্ছেন ? জবাব দিলাম, হ্যা, অনেক বেলা হয়ে গেছে। -তা হলে চলুন, আমিও ফিরছি, আজ আর বেশী দূর যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না। আমরা দুইজনে একসঙ্গে সুদীর্ঘ দুই মাইল পথ হাঁটিয়া আসিলাম। আমার প্রৌঢ়ত্বের মধ্যে মেয়েরা কোন নির্ভর খুঁজিয়া পায় কিনা ইতিপূর্বে পরীক্ষা করিয়া দেখি নাই, কিন্তু এই মেয়েটি অতি সহজেই আমাকে তাহার জীবনের অনেকখানি ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিল। তাহার নাম নন্দিতা, বয়স সতেরাে। কলেজে পড়িতেছিল, নানা অবস্থা বিপর্যয়ে পড়াশুনা বন্ধ করিয়া দিতে বাধ্য হইয়াছে। পুরীতে আসিয়াছে তাহার এক দূরসম্পর্কীয় মামার সঙ্গে—এই মামাই তাহার বৰ্তমান অভিভাবক। বাবা মারা গিয়াছেন তাহার বয়স যখন সাত, আর মাও চলিয়া গিয়াছেন বছর দুই হইল । সংসারে সে নিতান্তই একা, তাহার কোন ভাই বা বােনও নাই। -মা’র জন্যই আমার মনটা মাঝে মাঝে বড় খারাপ লাগে। বাবা চলে যাবার পর আটটি বছর মা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে আমাকে মানুষ করেছেন, অথচ আমাকে একমুহূৰ্ত্তও কিছু বুঝতে দেননি। তারপর মাও যখন চলে গেলেন, আমার এই মামাই এসে আমার ভার নিলেন এবং তখন থেকে আমি খানিকটা অনুভব কতে শিখলাম, মা আমার কী ছিলেন। মা’র কথা বলিতে বলিতে নন্দিতার চোখ অশ্রুসজল হইয়া উঠিল ।

প্রত্যাবর্তন -মামা বলেন, মেয়েদের বেশী লেখাপড়া করে কী হবে, তাই কলেজ ছাড়িয়ে দিয়েছেন। আমার কিন্তু কাজ ছাড়া জীবন এতটুকুও ভাল লাগে না। তাই মামা যখন বললেন তীর্থ উপলক্ষে পুরীতে আসবেন, তখন আমিও তার সঙ্গে চলে এলাম। আমি ত আর পুণ্যলােভাতুর হয়ে আসিনি, আমি এসেছি সমুদ্র দেখতে ••মামা অবশ্যি প্রথমে আমাকে আনতে রাজী হননি, তারপর কী ভেবে আর আপত্তি কবুলেন না। নন্দিতার সহজ সাবলীল ভঙ্গীটি আমার বেশ ভাল লাগিতেছিল। আঠারাে বৎসর পর পুরীর সমুদ্রসৈকতে আর একটি নারীর মধুর সাহচৰ্য্য আমার হৃদয়ের তন্ত্ৰীগুলিকে কেমন যেন নাড়া দিয়া তুলিতেছিল। কথা বলিতে বলিতে আমরা অমিয়নিবাসের কাছাকাছি আসিয়া পড়িয়াছিলাম। নন্দিতার কাছে বিদায় লইবার সময় বলিলাম, আমি ঐ কাছের হােটেলেই আছি-আবার বিকেলের দিকে যদি আপনি ওদিকে যা দেখা হবে। নন্দিতা ছােট্ট একটি নমস্কার করিয়া জবাব দিল, আমি ঐ নির্জন জায়গাটাই বেশী ভালবাসি। আজ বিকেলের দিকে আসতে চেষ্টা বৈকালবেলা ম্যানেজার আমার সঙ্গে আসিতে চাহিয়াছিলেন, আমি একটা ওজর দেখাইয়া তাহাকে নিবৃত্ত করিলাম। মনে হইল, তিনি যেন একটু ক্ষুন্ন হইলেন, কিন্তু নন্দিতার সঙ্গে আবার কথা বলিবার লােভ আমাকে এতখানি পাইয়া বসিয়াছিল যে বাধ্য হইয়া তাহাকে এড়াইতেই হইল।

১২২
তারা দু'জন
এবার বেশীদূর যাইতে হয় নাই। সমুদ্রতীর দিয়া খানিকটা অগ্রসর
হইয়াই দেখিলাম নন্দিতা অপেক্ষা করিতেছে।
আমাকে দেখিয়া সে হাস্যমুখী চপলা বালিকার মত ছুটিয়া আসিল।
প্রথম সম্ভাষণেই বলিল, আপনার কাছে আমার একটা মস্ত বড় নালিশ
আছে কিন্তু!
আমি কিছু বুঝিতে পারিতেছিলাম না, প্রশ্ন করিলাম, কী নালিশ ?
-আমি আপনার চেয়ে অ-নে-ক ছােট, আমায় আপনি নাম ধরে
ডাকবেন।
আমি হাসিলাম।—এই ? তথাস্তু।
আবার আমরা হাঁটিয়া চলিলাম, অদ্ভুত আমরা দুইজন। আমার
সঙ্গিনী সপ্তদশী তরুণী, হাসিলারে সাবলীলতায় তাহাকে বালিকা
বলিলেও চলে, আর আমি প্রৌঢ়ত্বের মধ্যাহ্নে উপনীত, শ্রান্ত, বিক্ষুব্ধ।
আমাদের মধ্যে কোন যােগসূত্র থাকা উচিত নয়, কিন্তু তবু আঠারো
বৎসর আগেকার প্রমত্ত বাতাস যেন থাকিয়া থাকিয়া বহিয়া একটি
সূক্ষ্ম সেতু রচনা করিতেছিল।
-আচ্ছা নন্দিতা, শুধু নাম ছাড়া আর কোন পরিচয়ই ত তুমি
তােমার বাবা কে ছিলেন, কী কতেন, কোথায়
থাকতেন?
-বাবা? বাবা কাজ করতেন পশ্চিমে, ভরতপুর ষ্টেটস্কুলের প্রধান
শিক্ষক হিসেবে। তার নাম স্বর্গীয় সুবিমল বসু। বাবা স্বৰ্গগত হবার
পর আমরা চলে আসি কলকাতায়।
আমি চমকাইয়া উঠিলাম। শুনিতে ভুল হয় নাই ত?
-তােমার দাদামশায়ের নাম?
—দাদু ? দাদুকে ত আমি দেখিনি! তার নাম স্বর্গীয় অমর গুহ।
দিলে না?

প্রত্যাবর্তন মা’র কাছে শুনেছি আমি জন্মাবার বছর খানেক আগেই উনি মারা গিয়েছিলেন। —অমর গুহ? বাঁশপুরের অমর গুহের নাতনী তুমি? আমার সুরের আকুল বিস্ময় লক্ষ্য করিয়া নন্দিতা বােধ হয় থতমত খাইয়া গিয়াছিল। ক্ষণেকের জন্য নীরব থাকিয়া বলিল, হঁা, কেন? আপনি তাকে চিনতেন কি ? কী উত্তর আমি দিব ? আঠারাে বৎসর আগে যে মায়ার বন্ধনে আমি জড়াইয়া পড়িয়াছিলাম, যে মায়ার মােহনস্পর্শ এখনও আমি অনুক্ষণ অনুভব করি, ভবিতব্য কি আজ আমাকে আবার সেই মরীচিকার সম্মুখে আনিয়া উপস্থাপিত করিল ? স্থির করিলাম, সত্য গােপন করিয়া যাইব। অথচ সুপ্রিয়ার কথা জানিবার জন্য আমি এত উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছিলাম যে নন্দিতার দাদামহাশয়কে আমি আদৌ জানি না এই বিরাট মিথ্যা কথা বলিলেও চলিবে না। জবাব দিলাম, হ্যা, ছেলেবেলায় আমি অমরবাবুকে একটু আধটু জাম, তবে তিনি ছিলেন বয়সে আমার অনেক বড়, গুরুজনের মত। অনেক বছর ধরে তার খবর আমি রাখিনি। ছিন্নবন্ধন কাহিনীর সূত্র ধরিয়া নন্দিতা বলিতে লাগিল, দাদুকে আমি দেখিনি, তবে দিদিমা আমার জন্মের পরও কিছুদিন বেঁচে ছিলেন। তার কথা অস্পষ্টভাবে আমার মনে পড়ে। দিদিমা মারা যাবার পর মা খুব মুষড়ে পড়েছিলেন, এও আমার মনে আছে। সুপ্রিয়া সম্পর্কে সােজা কোন প্রশ্ন করিবার মত সাহস সঞ্চয় করিতে পারিতেছিলাম না, যদি নন্দিতা সন্দেহ করিয়া বসে। কিন্তু একজন সহানুভূতিসম্পন্ন শ্রোতা পাইয়া নন্দিতার সঙ্কোচ অনেকখানি চলিয়া ১২৪ তারা দু'জন গিয়াছিল, প্রগলভা বালিকার ন্যায় সে তাহার কাহিনী বলিয়া চলিল। -মা কিন্তু আমায় বড় ভালবাসতেন এবং এটা সবচেয়ে নিবিড়ভাবে অনুভব করেছি বাবার মৃত্যুর পর। তার মনের কোন্‌খানে যেন একটা কত ছিল, কিন্তু আমি কখনও বুঝতে পারিনি সেটা কী। শুধু মনে পড়ে, গভীর রাত্তিরে তিনি কখনও কখনও আমায় বুকে চেপে ধরে বলতেন, ‘নন্দিতা, বড় হয়ে মাকে ভুলে যাননি যেন—তাের মুখ চেয়েই তাের মা বেঁচে থাকবে।...অথচ মা ত আমাকেও ফাকি দিয়ে চলে গেলেন। এতক্ষণ আমি নন্দিতার দিকে ভাল করিয়া তাকাই নাই। এবার আমি আমার এই নবীনা বন্ধুটিকে তীক্ষভাবে পৰ্যবেক্ষণ করিলাম।••••া, আমার আঠারো বছর আগেকার সেই সুপ্রিয়াই যেন শ্যামল মেঘের আড়াল হইতে উকি দিতেছে। সেই শান্ত আঁখিপল্লব, সেই হাসির আলো, বাম কানের পিছনে চূর্ণ কুন্তলের পাশে তিলটি পৰ্যন্ত বাদ যায় নাই। কথা বলিতে বলিতে আমরা অনেকদুর চলিয়া আসিয়াছিলাম সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারে নন্দিতার মুখে তাহার মায়ের কথাগুলি শুনিতে শুনিতে আমার মনটা কেমন যেন ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। বােধ হয় নন্দিতা আমার মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করিয়াছিল। অনুতপ্তসুরে বলিল, আমার ছােটখাট কাহিনী বলে আপনার সন্ধ্যাটা নষ্ট কলাম, কিছু মনে করবেন না যেন। সুপ্তোত্থািতের মত আমি বলিলাম, না, না, সে নয়, নন্দিতা। রাত হয়ে যাচ্ছে, আমাদের ফেরা উচিত, তাই ভাবছিলাম। অমিয়নিবাসে পৌছিতে তখনও মিনিট দশেকের পথ বাকী, এমন প্রত্যাবর্তন সময় নন্দিতা হঠাৎ থম্কাইয়া দাঁড়াইল। বলিল, আমার মামাবাবু আছেন বলে যেন মনে হচ্ছে। তাহার মুখে ভয়ের রেখা, স্বরটাও যেন কঁপিয়া উঠিল। নন্দিতার ভুল হয় নাই। ম্লান গােধূলির আলাের মধ্য হইতে অচিরেই একজন স্থূলকায় ভদ্রলােকের মূৰ্ত্তি ফুটিয়া উঠিল। নন্দিতার কাছে আসিয়া কর্কশকণ্ঠে সীতাংশুবাবু বলিলেন, এই রাতে মেয়ের কোথা যাওয়া হয়েছিল শুনি ? পুরী আবার জন্যে এত আকুলিবিকুলি, তখন বুঝতেই পারিনি পেটে পেটে বিদ্যে এত ! লােকটার বর্বর অসভ্যতা দেখিয়া আমি ক্ষেপিয়া উঠিতেছিলাম, কিন্তু আমার ডান বাহুতে একটা সাঙ্কেতিক তর্জনীস্পর্শ অনুভব করিয়া চুপ করিয়া গেলাম। নম্র অথচ দৃঢ়কণ্ঠে নন্দিতা জবাব দিল, ওদিকে একটু বেড়াতে গিয়েছিলাম, মামাবাবু। আপনি এত রাগ করছেন কেন?—এই ত সবে সন্ধ্যে হ’ল । দাতমুখ খিচাইয়া একটা শব্দ করিয়া সীতাংশুবাবু বলিলেন, আমার বাড়ীতে যতদিন আছ এরকম বেহায়াপনা কিছুতেই বরদাস্ত করব না নন্দিতা, এ আমি বলে রাখছি। বলিয়া সীতাংশুবাবু আমার দিকে তাকাইলেন, যেন আমিই নন্দিতার বেহায়াপনার জন্য দায়ী। ব্যাপারটা কিন্তু আর বেশীদূর গড়াইল না। নন্দিতা সীতাংশুবাবুর হাত ধরিয়া বলিল, আর এরকম দেরী হবে না মামাবাবু, এখন বাড়ী চলুন। আমার দিকে তাকাইয়া নমস্কারের ভঙ্গীতে মাথাটা ঈষৎ হেলাইয়া নন্দিত চলিয়া গেল। সীতাশুবাবুও রাগে গজ গজ করিতে করিতে তাহার অনুসরণ করিলেন।

১২৬ তারা দু'জন ইহার পর দুইদিন নন্দিতার দেখা পাই নাই। প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায় আমি সমুদ্রসৈকতের সেই নির্দিষ্ট স্থানটিতে গিয়াছি, উৎসুকভাবে দুইটি চঞ্চল চোখের প্রতীক্ষায় বসিয়া রহিয়াছি, কিন্তু আমার নবীনা বন্ধুর কোনও সাড়া মিলে নাই। মনটা একটু চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে, কিন্তু দুরন্ত চিন্তাগুলিকে শাসন করিয়া বলিয়াছি, তাহার মামা অপরিচিত লােকজনের সঙ্গে চলাফেরা পছন্দ করেন না, তাই সে আর কোন অনর্থের সৃষ্টি করিতে অনিচ্ছুক। তবু মনের আনাচে কানাচে একটি গােপন ইচ্ছা উকি মারিয়াছে, বুদ্ধি বিচারশক্তির এ উপেক্ষা করিয়া আমার হৃদয় চাহিয়াছে, যদি একবারটি নন্দিতা আসিত, যদি একবারটি তাহার অসম্পূর্ণ কাহিনীর শেষ পরিচ্ছেদগুলি আমাকে বলিয়া যাইত। নন্দিতার মধ্যে সুপ্রিয়াকে আমি যেন নূতন রূপে দেখিতে পাইতেছিলাম। সুপ্রিয়ার সরমকুণ্ঠাবিহীন চরিত্র—যাহা আঠারাে বৎসর আগে আমাকে তাহার দিকে আকৃষ্ট করিয়াছিল—যেন আরও শােভন, আরও শুভ্র হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে সপ্তদশ নন্দিতার হাসিতে, কথা বলায়, গতিভঙ্গীতে। হঠাৎ খেয়াল হইল, সুপ্রিয়াও ছিল সপ্তদশ। পুরীর বাতাস আঠারো বৎসর আগেও ছিল এমন আমনা, সমুদ্রের কলস্বরেও ছিল এই রকমের আকুলতা। ভােরের স্বপ্ন এবং সন্ধ্যাবেলার স্বপ্নবেশে সেই হারানাে দিনগুলির ধূসর আলাের রূপ নুতন করিয়া দেখিতে পাইলাম। এ আমার কী হইল? যে সুপ্রিয়া ছিল আমার কাছে শুধু একটা স্মৃতি সে আজ আবার মুর্তি পরিগ্রহ করিয়া আমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল কেন? আর যদিই বা সে আসিল, তাহার সপ্তদশী রূপে কেন আসিল ?

প্রত্যাবর্তন ১২৭ কেন সে জীবনপথে চলার শ্রান্তি লইয়া আমার কাছে আসিল না? কেন সে প্রৌঢ় নরেশ মিত্রের সম্মুখে প্রৌঢ়া সুপ্রিয়ারূপে দেখা দিল ? মনের গােপন অন্তঃপুর পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করিয়া দেখিলাম। শ্রান্ত শান্ত প্রৌঢ়া সুপ্রিয়াকে দেখিয়া কি আমি এতখানি আনন্দলাভ করিতাম? আমার ভালবাসা কি সুপ্রিয়াকে তাহার চিরপুরাতন অথচ চিরন্তন রূপে ও বেশেই দেখিতে চাহে নাই ? মনে হইল, আমি যেন জন্মদরিদ্র, আমার অনুভূতি যেন দায়িত্ববিহীন, তাই সুপ্রিয়াকে রূপায়িত মূর্তিতে দেখিবার জন্য আমার কোনই আগ্রহ নাই । কিন্তু নন্দিতা? আমি না হয় নন্দিতার মধ্যে আমার হারােনাে সুপ্রিয়াকে খুঁজিয়া পাইয়াছি, নিঃস্ব পথিক তাহার পুরাতন আশ্রয়যষ্টিটি লাভ করিয়া যেমন আনন্দ অনুভব করে আমি নন্দিতাকে পাইয়া তেমনই তৃপ্তিলাভ করিয়াছি, কিন্তু নন্দিতা আমার মধ্যে সহানুভূতিসম্পন্ন একজন বয়ােজ্যেষ্ঠ সম্মানিত ভদ্রলােক ছাড়া আর কিছু দেখিতে পাইয়াছে কি? দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় এইসব বিশৃঙ্খল চিন্তাধারা লইয়া খেলা করিতে করিতে আমার মনটাও কেমন বেসুরাে হইয়া গেল—আমি আজ প্রথম অনুভব করিলাম, নিখিলের আঙিনায় আমি নিতান্ত একা। অন্যমনস্কভাবে আমি হােটেলে ঢুকিয়া নিজের ঘরের দিকে যাইতে ছিলাম, ম্যানেজার আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, আপনার একটা চিঠি, আছে। আমার চিঠি? আমি ত কাউকে আমার ঠিকানা দেই নাই।

১২৮ তারা দুজন পরমুহূর্তেই মনে হইল, নিশ্চয় নন্দিতা লিখিয়াছে। দেখিলাম, আমার অনুমান সত্য। সংক্ষিপ্ত চিঠি : শ্রদ্ধাস্পদেষু, অত্যন্ত বিপদে পড়ে লিখছি, প্রগল্‌ভতা ক্ষমা করবেন। আপনার সঙ্গে পরামর্শ করা নিতান্ত দরকার, কাল ভােরবেলায় সেখানে আসবেন কি? -নন্দিতা সারারাত আমি ঘুমাইতে পারিলাম না। নন্দিতা লিখিয়াছে, সুপ্রিয়ার নন্দিতা বিপদে পড়িয়াছে, সে আমার উপদেশ প্রার্থী। এমন করিয়া সুপ্রিয়া ত কখনও আমার কাছে সাহায্য ভিক্ষা করে নাই ! নন্দিতার এই অনুবােধ আমি যেমন করিয়া হউক রাখিবই—তাহার লেখার প্রতি অক্ষরে যে আমি সুপ্রিয়ার স্পর্শ পাইতেছি। আমি অনুভব করিলাম, আমার প্রৌঢ়ত্বের নিবিড় ছায়ায় লুকানাে তরুণ হৃদয়টি যেন নুতন পত্রপুষ্পে বিকশিত হইয়া উঠিল। নন্দিতা আমার আগেই সেখানে অপেক্ষা করিতেছিল। আমাকে অগ্রসর হইতে দেখিয়া সে ছুটিয়া আমার কাছে আসিল। ভীরুকণ্ঠে বলিল, ভেবেছিলাম আপনি আমার চিঠি পানি। আমার ভিতরের প্রবীণ ব্যারিষ্টারটি সজাগ হইয়াই ছিল । কোন প্রকার ভূমিকা না করিয়া প্রশ্ন করিলাম, কী হয়েছে নন্দিতা ? কী বিপদের কথা তুমি লিখেছ ? সংলগ্ন অসংলগ্ন অনেক কথার স্রোত হইতে আসল কথাটি উদ্ধার করিলাম এই : সীতাংশুবাবু গত দুই বৎসর যাবৎ নন্দিতাকে তাঁহার গলগ্রহ বলিয়া মনে করিতেছেন, কোন উপায়ে তাহাকে কাহারও হাতে প্রত্যাবর্তন সমৰ্পণ করিয়া দিলে বাঁচেন। এতদিন স্ত্রীর ভয়ে কিছু করিতে পারেন নাই, এখন পুরীতে নন্দিতাকে একা পাইয়া এক তৃতীয় পক্ষের বৃদ্ধের সহিত বিবাহ স্থির করিয়াছেন। হয়ত এত তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা গড়াইত না কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে নন্দিতাকে দেখিয়া তাহার ভয় হইয়াছে, পাছে আমি তাহার শুভার্থী বন্ধু হিসাবে কোন বিঘ্ন ঘটাই। তাই তিনি শুভকাজটা অবিলম্বে সমাধান করিয়া ফেলিতে চাহেন এবং আজই রাত্রে নন্দিতার বিবাহ। অরুদ্ধকণ্ঠে নন্দিতা বলিল, ঐ বুড়োর ঘর আমি কিছুতেই কতে পারব না, নরেশবাবু। আমি ত বিয়ে করতে চাইনে, তবু মামা কেন আমায় গলগ্রহ বলে ভাবেন ? আমাকে যদি আর বছর দুই কলেজে পড়াতেন তা হলে আমি তার বােঝা হয়ে থাকতাম না কিছুতেই, নিজের কাজ নিজেই খুঁজে নিতাম। এখন যে আমার সে পথও রুদ্ধ, পালিয়ে গিয়েই বা আমি কী করব? আমার যা বিদ্যা তাতে সামান্য একটা চাকুরীও যে জুটবে না। নন্দিতার কথা শুনিয়া আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গিয়াছিলাম । সীতাংশুবাবু যে এতখানি খল প্রকৃতির মানুষ তাহা আমি স্বপ্নেও ভাবিতে পারি নাই। নীচ জেদের বশবর্তী হইয়াই তিনি মেয়েটার সর্বনাশ করিতে উদ্যত হইয়াছেন এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু উপস্থিত কী করা কর্তব্য? আমি কোন উপায়ই খুঁজিয়া পাইতেছিলাম না। শুধু সান্ত্বনা দিবার জন্য নন্দিতাকে বলিলাম, তুমি কিছু ভেব না, নন্দিতা। আমাকে তােমার বন্ধুভাবে যখন গ্রহণ করেছ তখন আমার ক্ষমতায় যতদূর সম্ভব আমি তােমাকে সাহায্য করবই। শুধু একটি প্রশ্ন আছে—এই বিবাহে তােমার আপত্তির অনেক কারণ তারা দুজন থাকতে পারে, একটা কারণের কথা আমি জানতে চাই, তােমার মন কি আর কোথাও বাধা রয়েছে ? হাস্যমুখী চপল নন্দিতা পলকের মধ্যে রাঙা হইয়া উঠিল। নতমুখী থাকিয়া ঘাড় নাড়িয়া জবাব দিল, না। —তা হলে একটা দিকে জিনিষটা সহজ হয়ে গেল।••••আমি সব ব্যবস্থা কছি, তােমার প্রতি আমার উপদেশ, তুমি বিয়ের সময় পর্যন্ত তােমার মামাবাবুর বিরুদ্ধাচরণ করাে না। কোন প্রকার প্রতিকূলতা পেলেই তিনি আরও রেগে যাবেন এবং হয়ত তােমাকে এমন কোথাও সরিয়ে নিয়ে যাবেন যেখানে তােমার সহায়তায় আসা আমার পক্ষে অসম্ভব হবে।••শেষ পর্যন্ত তােমার এই বিয়ে আমি ঘটতে দেব না এই ভরসা দিচ্ছি, তুমি শান্তধৈর্য্যে আমার জন্য অপেক্ষা করে। গভীর কৃতজ্ঞতার সুরে নন্দিতা বলিল, আমি জান্তাম আপনি উদ্ধারের একটা উপায় বার করবেনই। আমি নিশ্চিন্ত নির্ভরে আপনার জন্য অপেক্ষা করব। সারাটা দুপুর এবং সন্ধ্যা আমি ভাবিতে লাগিলাম। আমি প্রৌঢ়, আমার মধ্যে তারুণ্যের উচ্ছলতা মাই, কয়েকটা বিষয় আমি বেশ সুস্পষ্ট ভাবে দেখিতে পাইতেছিলাম। নন্দিতার এই বিবাহ যদি আমি ঘটিতে দেই তবে সীতাংশুবাবুর আশ্রয় হইতে তাহাকে চিরদিনের জন্য চলিয়া আসিতেই হইবে। আর এই বয়সে তাহার মত মেয়ের পক্ষে জীবনযুদ্ধে একা অবতীর্ণ হওয়া যে অতি কঠিন সে সম্বন্ধেও কোন সন্দেহ নাই। তাহার ভার নিতে হইবে আমাকেই। নন্দিতার ভার নিতে আমার কোনই দ্বিধা ছিল না, থাকিতে পারে না, প্রত্যাবর্তন ১৩১ কিন্তু আমি ভাবিতেছিলাম কী ভাবে তাহাকে আশ্রয় দিব। যদিও আমি আজও অবিবাহিত, যদিও আমি প্রৌঢ়, তবু আমার বিবাহের বয়স চলিয়া যায় নাই। এখনও অনেক কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা আমার সামান্য একটু সহানুভূতিপ্রার্থী হইয়া আমার বাড়ীতে আনাগােনা করেন। নন্দিতাকে আমার গৃহে স্থান দিব কী পরিচয়ে ? দুষ্ট লােকের ইতর ইঙ্গিতে নন্দিতার জীবন কি আরও দুর্বিষহ হইয়া উঠিবে না? তাহার এই তরুণ বিকাশােখ জীবনে কি একটা ছায়া আসিয়া পড়িবে না ? তাহাকে ভালবাসিয়া আদর করিয়া কয়জন যুবক বিবাহ করিতে রাজী হইবে? পলকের জন্য মনে হইল, আমি যদি নন্দিতাকে বিবাহ করি তবেই সকল সমস্যার সমাধান হইয়া যায় । বয়স আমার যত বেশীই হউক না কেন, আমার মন ত এখনও আঠারাে বছর আগেকার মতই সবুজ রহিয়াছে, ভালবাসার চরম রহস্য ত এখনও আমার কাছে অপরিজ্ঞাত। যে রঙীন্ উত্তরীয় দিয়া আমি সুপ্রিয়াকে আবরণ করিতে চাহিয়াছিলাম তাহার আশ্রয়ে ত আর কোন নারীকেই এ পর্যন্ত আসিতে দেই নাই। তাহা ছাড়া, নন্দিতাকে আমি ভালবাসি। হ্যা, এই ঘটনাসমাবেশের বিক্ষুব্ধ ঘাতপ্রতিঘাতে আজ আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি, নন্দিতাকে আমি ভালবাসি।••••নন্দিতা যে শুধু নন্দিতা নয়, সে যে সুপ্রিয়ারও নন্দিতা। তাহার মুখে সুপ্রিয়ার চিহ্নহীন লাবণ্য, তাহার চোখে সুপ্রিয়ার নামহীন কমনীয়তা, তাহার অন্তরে সুপ্রিয়ার দুর্লভ অফুরন্ত ঐশ্বৰ্য্য। সুপ্রিয়া আর নন্দিতা যে অভেদাত্মা, সুপ্রিয়াকে কেন্দ্র করিয়া যে রাগরাগিণী আমার মনে জাগিয়া উঠিয়াছিল তাহা কি নন্দিতার মধ্যে আসিয়া প্রত্যুত্তর পাইতেছে না? কিন্তু নন্দিতার দিকটা আমি একেবারেই ভুলিয়া যাইতেছি! আমি তারা দুজন না হয় নন্দিতাকে ভালবাসি, গভীরভাবে ভালবাসি, এমন ভালবাসি যে কোন তরুণ যুবক তাহার সারা হৃদয় দিয়াও তাহাকে ইহার এক-শতাংশ ভালবাসিতে পারিবে না, কিন্তু নন্দিতা ত আমাকে ভালবাসে না। আমি তাহার নমস্য—তাহার প্রীতির অর্ঘ্য পাইবার কোন অধিকারই ত আমার নাই। আমার প্রৌঢ়ত্বই যে আমার সবচেয়ে বড় শত্রু। আচ্ছা, নন্দিতাকে যদি আমি আমার জীবনের সব কথা খুলিয়া বলি? আমার অন্তগূঢ় অনুভূতির মর্যাদা কি সে বুঝিবে না? সে কি ভাবিবে আমি তাহাকে ভালবাসি না, ভালবাসি তাহার মধ্যে যে সুপ্রিয়া লুকানাে আছে তাহাকে? আর সে যদি আমার এই আকাঙ্ক্ষাকে উপহাস করে, যদি বলে, এ আপনার মনের খেয়াল, আপনার ঘােরতর কাৰ্যপটুতার একটা উদাহরণ মাত্র ? সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল, অথচ কিছুই স্থির করিতে পারিলাম না। শুধু কানে আমারই কথাগুলি বাজিতে লাগিল, নন্দিতাকে আশ্বাস দিয়াছি, শেষ পর্যন্ত তােমার এই বিয়ে আমি ঘটতে দেব না, তুমি শান্ত ধৈর্য্যে আমার জন্য অপেক্ষা করাে। ভাবিতে ভাবিতে বােধহয় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম। হঠাৎ কানে আসিল আমাদের ম্যানেজারের স্বর।ওকি মিঃ মিত্র, আপনি এখনও শুয়ে রয়েছেন, আপনার শরীর খারাপ বােধ হচ্ছে না ত ? শশব্যস্তে উঠিয়া পড়িলাম, উঃ, এ যে রীতিমত রাত হইয়া গিয়াছে। হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাইলাম, রাত নয়টা। তৎক্ষণাৎ খেয়াল হইল নন্দিতার বিবাহের লগ্ন যে রাত দশটায়। খুব সময় মতই ম্যানেজার আমার নিদ্রাভঙ্গ করিয়াছেন দেখিতেছি ।

প্রত্যাবর্তন -আমার বাইরে নেমন্তন্ন আছে, ম্যানেজার মশায়। আমাকে এখখুনি যেতে হবে, অজস্র ধন্যবাদ। কোন প্রকারে কঁাধে একটা চাদর ফেলিয়া আমি সীতাংশুবাবুর বাড়ীর দিকে ছুটিলাম। বাহিরের ঘর খােলা যেন আমার জন্যই কে খােলা রাখিয়াছে। বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করিলাম। বিবাহের সংক্ষিপ্ত আয়ােজন যাট বৎসরের এক বৃদ্ধ বরের আসনে বসিয়া আছেন, তাহার বিপরীত দিকে নতমুখী নন্দিতা। সীতাংশুবাবু পুরােহিতকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, লগ্নের আর কত দেরী, ঠাকুর মশায় ? লক্ষ্য করিলাম, নন্দিতার চোখের উৎসুক চাঞ্চল্যকেও ছাপাইয়া উঠিয়াছে শান্ত নির্ভর। সুপ্রিয়ার চোখেও আঠারাে বৎসর আগে একদিন এই আলাে দেখিয়াছিলাম। আমি সীতাংশুবাবুর সম্মুখে গিয়া দৃঢ়স্বরে বলিলাম, এ বিয়ে হতে পারে না। সম্মুখে হঠাৎ বজ্রপাত হইলেও সীতাংশুবাবু বােধ হয় এতখানি স্তম্ভিত হইতেন না। কিন্তু অদ্ভুত তাহার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। পলকের মধ্যে আত্মসংবরণ করিয়া তিনি শ্লেষের সুরে বলিলেন—সে সম্বন্ধে আপনি বলবার কে, মশায় ? আমার ভাগ্নীকে আমি যেখানে খুশী বিয়ে দেব, তাতে আপনার এত মাথাব্যথা কেন? আমি এতটুকু না দমিয়া আগেরই মত দৃঢ়তার সহিত বলিলাম,, আমি নন্দিতার বন্ধু, তাহার সবচেয়ে বড় আত্মীয়দের চেয়েও বেশী শুভাকাঙ্ক্ষী। এই বৃদ্ধের হাতে আপনি কিছুতেই নন্দিতাকে সমর্পণ করতে পারবেন না, অন্ততঃ আমি তা হতে দেব না। বর বােধ হয় এতক্ষণ ব্যাপারটা ঠিক বুঝিতে পারেন নাই।

তারা দুজন এখন তিনি প্রশ্ন করিলেন, এসব কি সীতাংশুবাবু? ইনি আবার কে ? তীব্রকণ্ঠে সীতাংশুবাবু জবাব দিলেন, ইনি হচ্ছেন আপনার কনের বন্ধু••আজকালকার মেয়ে বিয়ে করার সখ যাদের, তাদের এরকম দু-একজন বন্ধু বরদাস্ত করতেই হবে, রসময়বাবু, উনিশ শতাব্দীর বেরসিক হলে চলবে না। রসময়বাবু বরের আসন হইতে উঠিয়া পড়িলেন। সীতাংশুবাবুকে শাসাইয়া বলিলেন, হতভাগা জোচ্চোর, এই মেয়েকে আমি কিছুতেই বিয়ে করব না••••তুমি আমায় ঠকিয়ে হাজার টাকা নিয়েছ, আদালতে এর জবাবদিহি করূতে হবে.••রসময় করকে তুমি চেন না ! বরও বাঁকিয়া যাইবেন সীতাংশুবাবু ভাবিয়া দেখেন নাই । অনুতপ্ত স্বরে বলিলেন, আপনি রাগ করূবেন না রসময়বাবু, এ একজন বাইরের লােক, ভুল করে এসেছেল। তাই না কি মশায় ?—বলিয়া কাষ্ঠহাসি হাসিয়া আমার দিকে তাকাইলেন। সীতাংশুবাবুর এই সমাধান প্রয়াসে আমি মােটেই বিচলিত হইলাম না। বলিলাম, ভুল করিনি, সব জেনেশুনেই এসেছি।••••নন্দিতাকে আমি ক’নের আসন থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি। এবার সীতাংশুবাবু নিজমূর্তি ধরিলেন। -ওসব চালাকী আমার কাছে খাটবে না মশায়। আমি নন্দিতার মামা, আইনের চোখে আমিই তাহার একমাত্র অভিভাবক•••বেশী গােলমাল করবেন ত পুলিশ ডাকব। রসময়বাবুও ততক্ষণে প্রকৃতিস্থ হইয়া উঠিয়াছিলেন। সপ্তদশী নন্দিতাকে অঙ্কশায়িনী করিবার লােভটা বােধ হয় তিনি কাটাইয়া উঠিতে পারিতেছিলেন না। সীতাংশুবাবুর সঙ্গে গলা মিলাইয়া বলিলেন, যদি

প্রত্যাবর্তন
ভালো চান তবে আপনি মানে মানে সরে পড়ুন, নইলে আপনার বা মেয়ের
কারােই মঙ্গল হবে না।
ইহাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করিতেও আমার ঘৃণা বােধ হইতেছিল।
আমি নন্দিতার হাত ধবিয়া বলিলাম, নন্দিতা, উঠে এসো।
শান্ত নন্দিত নীরবে আমার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল।
আমি বলিলাম, আজ থেকে আমিই নন্দিতার ভার নিলাম। যদি
আপনাদের সাহস থাকে আদালতে যাবেন, আমি কলকাতার ব্যারিষ্টার
মিঃ নরেশ মিত্র।
মুহূর্তের জন্য উভয়েই ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া গেল। তাহার পর দুইজনেই
সুর মিলাইয়া বলিল, বিয়ের আসন থেকে মেয়ে উঠিয়ে নিলে শাস্ত্রানুসারে
মেয়ের আর বিয়ে হয় না সে জানেন, নরেশবাবু ?
এবার আমার শ্লেষের পালা। জবাব দিলাম, আমি ব্যারিষ্টার, সে
পরিচয় ত আপনাদের আগেই দিয়েছি, শাস্ত্রের এই সােজা কথাটা
আমার জানা আছে।
নন্দিতাকে লইয়া আমি ডাউন-এক্সপ্রেসে কলিকাতায় ফিরিতেছি।
আমার জীবনের কোন কথাই তাহাকে বলি নাই। সারাটা পথ শুধু
ভাবিয়াছি, কঃ পন্থা?
আমার এই বয়সে হঠাৎ খেয়ালের বশে কাজ করার মত সাহস নাই,
সাহস থাকিলেও প্রেরণা পাই না। আমার জীবনী শ্রোতা-শােরর
আমার পথ নির্দেশ করিয়া দিবেন কি ?
সমাপ্ত

—এই লেখকেরই
০০
..
৭
উপস
নিঃসহ যৌবন
অনবগুষ্ঠিত ( ২য় সংস্করণ)
সাগরদোলায় ঢেউ (২য় সংস্করণ)
চলতি পথের বাঁশ
হে আত্মবিশ্বত
২০
২০
•••
৮.০০
ছােট গল্প
.
৫০০০
ছিন্ন পাপড়ী
অসমাপ্ত
pur
১৷
{{)

No text on this page.

在

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Tara Dujan

Author
Das, Nabagopal
Title
Tara Dujan
File name
Tara Dujan
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2009/10/29
Publisher
Sri Suresh Chandra Das, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Essay
Keywords
TaraDujan
DLI number
513405
Barcode
4990010020385.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
vgy0GTEdmfU
Download PDF

Tara Dujan