Bally Sadharan Granthagar

Chora - Bali

Ghosh, Hemendraprasad · 2009/08/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

চোৱা-বালি
ma
।
AWM
WWW

No text on this page.

উেপহার
O/ON
เติได้” ม4%9
Creaม
21 )
สามี-erk ตัล
9 จ.
eeeeeeeeeeee

No text on this page.

কমলিনী সাহিত্য-মন্দিরের স্বত্বাধিকারী,
শ্ৰীযুত গােষ্ঠবিহারী দত্ত
ও
শ্ৰীযুত শরৎচন্দ্র পাল
সমীপেষু
সবিনয় নিবেদন,
আপনারা বাঙ্গালা সাহিত্যে সুখপাঠ্য উপন্যাসের
বহুলপ্রচারকল্পে যে চেষ্টা করিতেছেন, . তাহার সহিত
আমার সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে। সেই সহানুভূতির
জন্যই আমি আপনাদের চেষ্টায় যােগ দিয়া এই
“চোরাবালি” উপন্যাস দিলাম।
আপনাদের চেষ্টা—সফল ও জয়যুক্ত হউক। ইতি,
অগ্রহায়ণ, ১৩২৬।
বিনীত
হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ।

No text on this page.

. সাহিত্য-গগনের কোন কোন্ উজ্জ্বল নক্ষত্র “কমলিনী-সাহিত্য-মন্দিরের কীর্তিধ্বজা আলােকিত করিতেছেন- তালিকা দৃষ্টে মুগ্ধ হউন যুক্তা স্বর্ণকুমারী দেবী। নিরুপমা দেবী। ইন্দিরা দেবী। শৈলবালা ঘােষজায়া। তমাললতা বসু। শ্ৰীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সুরেশচন্দ্র সমাজপতি। হরিসাধন মুখােপাধ্যায়। চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় বি, নারায়ণ ভট্টাচার্য। কালীপ্রসন্ন দাস গুপ্ত এম, এ। সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায় বি, এল। বিভূতিভূষণ ভট্ট। ক্ষেত্রমােহন ঘােষ। গিরিজাকুমার বসু। নগেন্দ্রনাথ ঠাকুর। কৃষ্ণচন্দ্র কুণ্ড এম, এ। প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায় (সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের পৌত্র) শরৎচন্দ্র পাল (অধ্যক্ষ ও লেখক), ব্ৰজমােহন দাস। প্রতি মাসের ১লা তারিখে সাহিত্যজগরেণ্য উল্লিখিত সুলেখক- লেখিকাবৃন্দের একনি করিয়া মনােম উপন্যাস আপনাদের হাতে দিতে পারব। শ্ৰীগােষ্ঠবিহারী দত্ত শ্রীশরৎচন্দ্র পাল। . } (কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির)

No text on this page.

পৌষের চতুর্থ সম্পূর্ণ উপন্যাস
শ্ৰীযুক্তা শৈলবালা ঘােষজায়া গ্রথিত
উপন্যাস-সাহিত্যে গােলকুণ্ডার মুক্তার মালা
মহিমা দেবী
১লা পৌষ প্রকাশিত হইবে।

PRESS
HOOLCH
CALCUTTA

words:
পুস্তক সংখ্যা
পরিগ্রহণ সংখ্যা ১22
চোৱা-বালি।
.
প্রথম পরিচ্ছেদ।
রাত্রিতে অভিনয় হইবে। কিন্তু সন্ধ্যার পূর্বেই রঙ্গালয়ের
টিকিট-ঘর বন্ধ করিয়া দিতে হইয়াছিল ; কারণ, রঙ্গালয়ে যত
লােকের স্থান হইতে পারে, তদপেক্ষাও অধিক লােকের জন্য
টিকিট সন্ধ্যার পূর্বেই বিক্রয় হইয়া গিয়াছিল। লােক টিকিট
ঘরের দরজায় আঘাত করিতেছিল, এবং রাস্তায় ভিড় করিয়া
দাড়াইতেছিল। শেষে বাধ্য হইয়া রঙ্গালয়ের কর্তারা গেট বন্ধ
করিয়া দিলেন। তখন লোেক গেটের বদ্ধ কপাট ঠেলিতে
লাগিল। রাস্তায় গাড়ী চলা দুষ্কর হইয়া উঠিল। রঙ্গালয়ের
অধ্যক্ষ পুলিসে সংবাদ দিতে বাধ্য হইলেন, এবং পুলিস আসিয়া
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইল। পুলিসের ইনপেক্টর চতুর লােক
তিনি কোনরূপ হাঙ্গামা বাধাইতে অনিচ্ছুক ছিলেন, তাই
অশ্বারােহী পুলিস আনিলেন—শিক্ষিত, ঘােড়া ভিড়ের মধ্যে
•
১

সেনা-বালি ইতেই জনতা ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল। শেষে ফুটপাথের উপর স্থানে স্থানে লােক রহিল—মধ্যের রাস্তা পরিষ্কার হইয়া গেল। সে রাত্রিতে ‘চন্দ্রশেখর’ অভিনয় হইবে। বাঙ্গালীর নাট্যকলানুরাগ সহসা এমন প্রবল হয় নাই যে, সেই জন্য সেদিন রঙ্গালয়ে স্থানাভাব হইয়াছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধাও দর্শকদিগকে চুম্বাকৃষ্ট লৌহবৎ আকর্ষণ করে নাই। তবে এমন অপ্রত্যাশিত লােকসমাগমের কারণ কি? সে দিন ‘দলনী বেগমের’ অংশ যে অভিনয় করিবে, তাহারই জন্য এই জনতা। আমাদের কোন বন্ধু বলেন, বাঙ্গালা রঙ্গালয়ের সর্বোৎকৃষ্ট অংশ—বিজ্ঞাপন। রঙ্গালয়ের যত কবিত্ব--যত রচনাচাতুরী -- যত চিত্তাকর্ষক ভাষা, সবই বিজ্ঞাপনে ব্যয়িত হয় ; তাই নাটকের বা অভিনয়ের জন্য আর বড় কিছু অবশিষ্ট থাকে না। রঙ্গালয়ের বিজ্ঞাপন পাইলেই তিনি তাহা সাগ্রহে পাঠ করেন। বিজ্ঞাপনেও লিখিত ছিল--- “দলনী বেগম সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের অপূর্ব সৃষ্টি। দলনী —প্রেমবিলা—প্রেমােন্মাদিনী-প্রেমে আত্মহারা-প্রেমের জন্য আত্মঘাতিনী। সেই দলনী বেগমের ভূমিকা যিনি গ্রহণ করিবেন, তিনিও দ্বিতীয় দলনী। তিনি দলনীর যাতনা ও বেদনা আপনার বক্ষে বহন করিতেছেন। তিনি কে ? সে কথা বলিব না। আসিয়া দেখুন।” বঙ্গালয়ের কর্তারা “দলনী”র পরিচয় না দিলেও সে পরিচয় গােপন থাকে নাই। মৃগনাভীর সৌরভ এবং বহ্নির জালা বরং . ২

চোরাবালি
গােপন রাখা যায়, তবুও বড় ঘরের গুপ্ত কথা গোপন রাখা
যায় না-জনরবের জিহ্বায় 'তাহা অতিরঞ্জিত হইয়া বাহিরে
ছড়াইয়া পড়ে, এবং সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশিতে মিশিতে শেষে
কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যা তাহা স্থির করাই দুঃসাধ্য
হইয়া উঠে।
প্রায় ছয় মাস পূর্বে কলিকাতার কোন বড় ঘরের একটা
গুপ্ত কথার আলােচনা পথে ঘাটে হাটে হইয়াছিল। পথে লােক
সেই কথার আলােচনা করিতে করিতে বলিয়াছিল—“মেয়েটারই
বা দোষ কি ? রক্তমাংসের শরীর ত বটে-কতটা অত্যাচার
সহ্য হয়। ইহাতে যদি বড় ঘরের অকালকুষ্মণ্ডগুলার শিক্ষা
হয়—সেও ভাল।” ঘাটে মেয়ে-মহলে সে কথার আলােচনা
হইয়াছিল । গঙ্গার ঘাটে আসিয়াও মেয়েরা সেই কথার কত
ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। মেয়েদের মধ্যে আবার যাহারা
আপনাদের অতীত জীবনের ইতিহাস মুছিয়া ফেলিতে পারিলে
শান্তি পায়, তাহারাই বেণী করিয়া বলিয়াছিল—“পােড়া কপাল !
কেন—জ্বালা জুড়াইবার কি আর জায়গা ছিল না ? আর জায়গা
জুটিলে ত মা গঙ্গার কোলেও আসিতে পারিত। তা নয়,
র ছাড়িয়া আসা ! মরণ আর কি ।” হাটে লােক বলাবলি
করিয়াছিল—“ভালই হইয়াছে—স্বর্গ বল, নরক বল—সবই এই
পৃথিবীতে। মানুষের অত পাপ কি সহে ? দর্পহারী মধুসূদন
আছেন, তাই পাপীর এই শাস্তি ; নহিলে কি ভদ্র ঘরের মেয়ে।
ভদ্র ওরে বধু—অমন করিয়া কূলে কালি দেয় ? কূলে কালি

. । চোরাবালি -ই আর কি ? ঘর যখন ছাড়িয়া আসিয়াছে, তখন আর গ্রহ রহিল কি?” যাহাকে লইয়া এত কথা—সেই প্রভাত-নলিনীই রঙ্গালয়ে দলনী বেগম সাজিবে। তাই এত জনতা। ছয় মাসে যে আলােচনার ধূলি বিস্মৃতির পথে পতিত হইয়াছিল, বিজ্ঞাপনের দমকা বাতাস আবার তাহাই উড়াইয়া সহরময় ছড়াইয়া দিয়াছিল। সঙ্গে সঙ্গে কত গুজবই রটিয়াছিল—যাহার অত্যাচারে প্রভাত- নলিনী ঘর ছাড়িয়া অকূলে ভাসিয়াছিল, সে শতাধিক গুণ্ডা যােগাড় করিয়াছে—পুলিসকে লক্ষ টাকা দিয়াছে—পুলিস কোনও কথা বলিবে না, গুণ্ডারা রঙ্গমঞ্চ হইতেই প্রভাত-নলিনীকে ধরিয়া লইয়া যাইবে । কোথায় যাইবে ? সে কথার কোন সদুত্তর কেহ দিতে পারে নাই। তবে এমন একটা হাঙ্গামার সম্ভাবনা থাকায় অভিনয়ের সঙ্গে আর একটা অভিনয় বিনা ব্যয়ে দেখিবার আশাও লােককে প্রলুব্ধ করিয়াছিল। হুজুগটা বেশ জমিয়া গিয়াছিল। হুজুগ জমিবার অনেক কারণও ছিল। বাঙ্গালীর মেয়ের ক্ষে সব অত্যাচার সহ্য করাই স্বাভাবিক, প্রতিবাদ করা বা প্রতিশােধ লওয়া যেন তার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। পদদলিত কৃমি- কীটও দংশন করে, কিন্তু পদদলিত। বাঙ্গালী বালিকা-কিশােরী- যুবতী কেবল অশ্রুবর্ষণ করে ; আত্মঘাতিনী হয়, তবুও প্রতীকার- চেষ্টা করে না। সেরূপ কাজ তাহার সংস্কারবিরুদ্ধ-প্রকৃতি- বিরুদ্ধ। ভ্রমরের বড় স্পর্ধা তাই সে স্বামীকে লিখিয়াছিল- ; চোরাবালি “ত দিন তুমি ভক্তির যগ্য, ততদিন আমারও ভক্তি ; যত দিন তুমি বিশ্বাসী, তত দিন আমারও বিশ্বাস।” কিন্তু ভ্রমরের স্রষ্টাই তাহার সে তেজ চূর্ণ করিয়া দিয়াছেন। শেষে সেই ভ্রমর রােহিণীর রূপমদিপানবিহ্বল--কৰ্তব্যত্যাগী-চরিত্রহীন স্বামীর চরণ- ধূলি মস্তকে লইয়া মহাযাত্রা করিয়াছিল। বাঙ্গালীর মেয়ে কখন সমাজের বিরুদ্ধে—সংসারের বিরুদ্ধে স্বামীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করে নাই। প্রভাত-নলিনী তাহাই করিয়াছিল। সে স্বামীর গৃহ ও আশ্রয় ত্যাগ করিয়া আসিয়াছিল। কলঙ্কের পশরা মাথায় তুলিয়া লইয়াছিল, কলঙ্ক তাহাকে কতটুকু স্পর্শ করিয়াছিল এবং স্পর্শ করিয়াছিল কি না—তাহা বুঝিবার অবসর বা সুযােগ কাহারও হয় নাই—হইবে কি না তাহাও সন্দেহ। কিন্তু সে সে সব কথা ভাবিয়া দেখে নাই। সে আপনাকে বড় ভাবিয়াছিল—আত্মরক্ষাই আপনার কৰ্ত্তব্য বিবেচনা করিয়া- ছিল। আত্মরক্ষা যে অনেক সময় আত্মত্যাগের উপায় হয়-মুক্তি যে অনেক সময় বন্ধনেই পরিণতি লাভ করে, তাহা সে বুঝিত -বুঝিবার মত শিক্ষা বা দূরদৃষ্টি তাহার ছিল না। সে কিশােরী—সুন্দরী—বিবাহিত-জীবনে কেবল যাতনা ভােগই করিয়াছে—তাহার সংসার তাহার পক্ষে নরক হইয়া উঠিয়াছিল। সে সেই নরক হইতে পলাইয়া আসিয়াছে—জগতে সকলের জীবন-সম্ভোগে যে অধিকার, সেই অধিকার সে আপনার প্রাপ্য মনে করিয়াছে। যে প্রেমের জন্য-স্নেহের জন্য ভালবাসার জন্য মানুষ স্বার্থত্যাগ করিতে পারে—দাসত্ব স্বীকার করিতে

গোলা-বালি
নাই।
নাই।
পারে-সুখ বিসর্জন দিতে পারে, তাহা সে পায় নাই ; তাই সে
মুক্তির সন্ধান করিতেছিল। সে তাহার কারাকক্ষে সৰ্বত্ৰ সন্ধান
করিয়া শেষে যে পথ পাইয়াছে, সেই পথেই পলায়ন করিয়াছে ।
সে পথ তাহাকে কোথায় লইতে পারে তাহা সে ভাবিয়া দেখে
লােকের নিন্দা প্রশংসা সে মূল্যবান বলিয়া মনেও করে
কেন না, তাহা সংসারীর পক্ষে প্রয়ােজন—সংসারত্যাগীর
কাছে ধূলিবৎ মূল্যহীন।
এই সেই প্রভাত-নলিনী, যে আজ দলিনী বেগমের সাজে
রঙ্গমঞ্চে আবিভূত হইবে । তাই তাহাকে দেখিবার জন্য
দর্শকদিগের এত আগ্রহ।
কেন সে রঙ্গালয়ে আসিল তাহা লইয়াও লােক কত জল্পনা
কল্পনা করিতেছিল। অত বড় বংশের মুখে কালি মাখাইয়াও কি
তাহার তৃপ্তি হয় নাই—তাহার প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ হয় নাই
যে, সে কালি গাঢ়তর করিবার জন্য রঙ্গালয়ে আসিয়া
আপনার গৃহত্যাগ-সংবাদ প্রচার করিতেছে ? সে কি নিতান্ত
লজ্জাহীনার মত অপরিচিত জনতার প্রশংসা লাভের জন্য উৎসুক
হইয়া এমন ভাবে আপনার রূপের ও অভিনয়নৈপুণ্যের বিজ্ঞাপন
দিতেছে ?
নারী-হৃদয়ের রহস্য-দেবতাও তাহা জানিতে
পারেন না, মানুষ কোন ছার। কে সে কারণ নির্ণয় করিতে
প্রভাত-নলিনীর পিতা দরিদ্র ছিলেন। তিনি কলিকাতার
কোন সওদাগরী আফিসে মাসিক ৩০ টাকা বেতনে কেরাণীগিরি

সেনা-বালি করিয়া কোনরূপে সংসার প্রতিপালন করিতেন। একখানি জীর্ণ সেঁতসেঁতে একতলা বাড়ীতে তাহার বাস ছিল। তবে তাহার পত্নীর গৃহিণীপনায় কোনরূপে সেই সঙ্কীর্ণ আয়ে সংসার চলিত মুদীর এক মাসের ধার রাখিয়া কায়ক্লেশে আয়ে ব্যয় কুলাইত- কেবল যশােদার দড়ী বাঁধিতে কুলাইত না। এই আয়-ইহার উপর সংসারটি ছােট নহে—বিধবা ভগিনী, দুই কন্যা, এক পুত্র, স্ত্রী ও আপনি। যদি কোন মাসে কোন ছেলের জন্য ডাক্তার ডাকিতে হইত, তবেই সে মাসে বাজার-খরচের সামান্য বরাদ্দও কমাইতে হইতনহিলে কুলাইত না। সংসারে বিলাসের লেশমাত্র ছিল না—জীবনে বাহুল্যের বর্ণপাত হইতে পারিত না। ছেলেমেয়েরা যত বড় হইতেছিল, ততই অভাব তাহাদের বিদ্যালয়ের বেতন, পুস্তকাদির মূল্য, জামা জুতার খরচ, এ সবই বাড়িয়া যাইতেছিল বাড়িতেছিল না কেবল-- গৃহস্বামীর বেতন। ইহার উপর আবার যখন বাড়ীওয়ালা বাড়ীর ভাড়া মাসিক দুই টাকা বাড়াইতে চালি, তখন প্রভাত-নলিনীর পিতা অন্ধকার দেখিলেন। সন্ধ্যার পর কোথাও ছেলে পড়াইলে আর পাঁচটি টাকা আয় হয়, কিন্তু তাহা হইলে ছেলেমেয়েদের আবার পড়ান হয় না। বিধবা ভগিনী বলিলেন, “মেয়েদের আবার পড়ান কেন ? উহার কি চাকরী করিতে যাইবে? গরিবের ঘরে অত দরকার নাই।” মেয়েরা পাড়ার মিশনারী স্কুলে পড়িত-বেতন মাসে চারি আনা। কিন্তু মেয়েদের স্কুল ছাড়াইতে মেয়েদের বাপের মন সরিল না ; বাড়িতেছিল ; ;

চােরাবালি আহা-না হয় তাহারা গরিবেরই মেয়ে, তাই বলিয়া আজকাল যখন সব মেয়েই লিখাপড়া শিখে, তখন তাহারাই কেবল মাসে চারি আনার জন্য তাহাতে বঞ্চিত থাকিবে ? এখন নূতন সমস্যা উপস্থিত হইল। কেবল চারি আনা খরচ নহে; যদি ছেলে পড়াইয়া মাসে পাঁচ টাকা আয় হয়, তবে ? যে কাজটা করিতে লােকের ইচ্ছা না থাকে, সেটা না করিবার করিবার ছলেরও অভাব হয় না। তাই প্রভাত-নলিনীর পিতা দিদিকে বলিলেন, “আমি একটা ছেলে পড়ান চাকরী খুজি—পাইলেই মেয়ে দুইটাকে স্কুল ছাড়াইব। যে কয়দিন না পাই, সেই কয় দিন যেমন চলিতেছে, তেমনই চলুক।” দিদির তাহাতেও মন উঠিল না; তিনি বলিলেন, “তত দিনই ৰা স্কুলে রাখা কেন?” কেন—তাহা প্রভাত-নলিনীর পিতা মুখ ফুটিয়া বলিলেন না- দরিদ্রের আশা প্রকাশ করিলে লােক পাগল মনে করে। মেয়ে দুইটির—বিশেষ প্রভাত-নলিনীর একটা সম্পদ ছিল ; ছিল- অসামান্য রূপ। তাই তাহার পিতার আশা ছিল—হয় ত সে এমন ঘরে পড়িতেও পারে যে, তাহাকে দারিদ্র্যের দংশনাতন ভােগ করিত হইবে না। সে আশার পূরণপথে যে সব অন্তরায় ছিল, তাহাও তিনি জানিতেন। তাহার মত দরিদ্র কেরাণীর সঙ্গে ধনীরা কুটুম্বিত করিবেন কেন? আর আজকাল যেরূপ দিনকাল পড়িয়াছে, তাহাতে গহনা না হইলে রূপের জলুস খুলে না। এখন লােক আর কুলশীলৰংশ দেখিয়াই শাঁখা-শাড়ী-পরা মেয়ে লইতে । তবুও-তবুও আশা ত্যাগ করা যায় না। যে যুদ্ধে ভােলা-বালি ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ-দেহরক্ষা করিয়াছিলেন, শেষে শল্যের নেতৃত্বে সেই যুদ্ধ জয় করিবার আশা বা দুরাশা ও কৌরবগণ পরিহার করিতে পারেন নাই। কিন্তু কন্যার পিতা যখন আশাপূরণের কোন পথই দেখিতে পাইতেছিলেন না, তখন প্রজাপতির নির্বন্ধ অতর্কিত পথ অবলম্বন করিল। এক দিন মধ্যাহ্নে এক ঘটকী আসিয়া বাড়ীর দরজার কড়া নাড়িল। প্রভাত-নলিনীর পিসীমা আসিয়া দ্বার খুলিয়া দিলে ঘটকী যেন সন্ধিগ্ধভাবে চারিদিকে চাহিল--এই অন্ধকার, ভাঙ্গা বাড়ী-কৰ্ত্তা কি তাহাকে এই বাড়ীতেই পাঠাইয়াছেন ? শেষে সে জিজ্ঞাসা করিল—“হাগা বাছা, এই কি মােহিত রায়ের বাড়ী ?” পিসীমা বলিলেন, “তুমি কোথা থেকে আছ ?” ঘট কী বলিল, “চল, বাছা, বলি । এ বাড়ীতে কি মেয়ে আছে ?” পিসীম যেন আকাশের চাদ হাতে পাইলেন-ঘটক ঘটকীরা ডাকিলেও গরিবের বাড়ী মাড়ায় না। তবে এ কোন্ সৌভাগ্য যে ঘটকা আপনি আসিল ? তিনি যত্ন করিয়া ঘটকীকে বসিবার জন্য একখানা মাদুর বিছাইয়া দিলেন । বসিয়া গামছায় মুখ মুছিয়া ঘটকী যে সম্বন্ধের কথা বলিল, তাহাতে পিসীমা একেবারে নির্বাক হইয়া গেলেন। তাহাকে -গঙ্গাস্নানে যাইতে পল্লীর মােড়ে-বড় রাস্তার উপর যে বড় বাগান ও ফটকওয়ালা বাড়ীর সম্মুখ দিয়া যাইতে হয়, সেই বাড়ীর একমাত্র ছেলের সঙ্গে বিবাহের সম্বন্ধ ! এ কি বিপ! যাহারা মেয়ে দেখিতে আসিলে বসাইবার স্থান মেয়ের বাপের নাই, তাহারা নাে-বালি মেয়ে লইবেন—গহনাপত্রের দাবীদাওয়া করিবেন না—এমন কি দরকার হইলে খরচের সাহায্যও করিতে পারেন—এ কি স্বপ্ন ? কিন্তু ঘটকী ত তাহাই বলিয়া গেল ! ভ্রাতাকে জিজ্ঞাসা না করিয়াই তিনি বিবাহে সম্মতি দিলেন—কেবল একবার প্রভাত-নলিনীর মাতাকে বলিলেন, “কি বল বৌ?—মােহিতকে আবার জিজ্ঞাসা করা কেন ?” কথাটা শেষ হইয়া গেলেও ঘটকী কিন্তু নানা কথায় দেরী করিতে লাগিল। দরিদ্রের সংসার, সব কাজ আপনারা করিতে হয়, তাই ঘটকী উপস্থিত থাকায় প্রভাত-নলিনীর মাতা ও পিসীমা কিছু বিব্রত হইয়া পড়িতেছিলেন। এখনই ছেলেমেয়েরা স্কুল হইতে আসিবে—তাহাদের রুটীগুড় দিতে হইবে—বাসন মাজা, ঘর থােয়া সবই বাকি। কিন্তু ঘটকী উঠিল না। ক্রমে ছেলেদের ফিরিবার সময় হইল- দ্বারে ঘা পড়িল। পিসীমা তাড়াতাড়ি উঠিয়া দরজা খুলিয়া দিলেন, এবং প্রভাত- নলিনীকে চোক টিপিয়া জানাইলেন, যেন সে কোনরূপ চাঞ্চল্য প্রকাশ না করে। মেয়ে কিন্তু সে কথা বুঝিল না—জিজ্ঞাসা করিল, “পিসীমা, তােমার চোকে কি কিছু পড়েছে ?” পিসীমা মুখ বাঁকাইয়া বলিলেন, “না।” প্রভাত-নলিনী পিসীমা’র এই ব্যবহারে বিস্মিত হইল।. ঘটকী মেয়ে দৈখিয়া তবে ফিরিয়া গেল। চৌধুরী-গৃহিণী কৰ্ত্তার পসনে নির্ভর না করিয়া ঘটকীকে মেয়ে দেখিয়া যাইতে বলিয়া দিয়াছিলেন। আসল কথা, চৌধুরী বাড়ীর কর্তা পুত্রদায়ে বিব্রত হইয়া লো-বালি পড়িয়াছিলেন। তঁাহার অগাধ অর্থ, বৃহৎ পরিবার-এক পুত্র । ছেলেটি জন্মিয়া পর্যন্ত শুনিয়াছে, সে বড়মানুষ। কর্তা যখনই তাহাকে শাসন করিবার চেষ্টা করিয়াছেন, গৃহিণী তখনই তাহার • সে চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিয়াছেন। এইরূপে বদ্ধিত হইলে যাহা হয়, ছেলের তাহাই হইয়াছিল। ছেলে দুলালচন্দ্র “বেচাল" হইতেছিল। এ রােগের এক বই দ্বিতীয় ঔষধ কৰ্ত্তার জানা ছিল । তিনি সুন্দরী-- ডাগর মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিবাহ দিতে উদ্যোগী হইলেন; ভাবিলেন, এই ঔষধেই রােগ সারিবে। তাই তিনি সুন্দরী পাত্রীর সন্ধান করিতেছিলেন। এই সময় পাড়ার মিশনারী স্কুলের নূতন গৃহপ্রবেশ ও বার্ষিক পুরস্কার বিতরণের উৎসবে কৰ্ত্তার নিমন্ত্রণ হইয়াছিল, এবং তথায় পুরস্কার-বিতরণের সময় তিনি প্রভাত-নলিনীকে দেখিয়াছিলেন। তাহার পর তিনি স্কুলের ঝির কাছে সন্ধান লইয়া জানিয়াছিলেন--- প্রভাত-নলিনীর পিতাও, ব্রাহ্মণ। তাই তিনি ঘটকীকে তাহার বাড়ী পাঠাইয়া- ছিলেন। প্রভাত-নলিনীর পিতার অবস্থা তিনি জনিয়াছিলেন ; কিন্তু তিনি মেয়েটিকে দেখিষাই কাজ করিতে লুব্ধ হইয়াছিলেন- টাকার কথা মনেও করেন নাই। মােহিত আফিস হইতে ফিরিয়া আসিয়া যখন সম্বন্ধের কথা শুনিলেন, তখন তিনি চুপ করিয়া রহিলেন'আনন্দ করিবেন কি শঙ্কিত হইবেন—ঠিক বুঝিতে পারিলেন না। অত বড় ধনীর ঘরে মেয়ে দিতে তাহার ভয় করিতেছিল। তাহার মত ময়লা কাপড়-পরা কেরাণী যে সে বাড়ীর ফটকও পার হইতে পারিবে

চোরাবালি
না! মেয়ের অদৃষ্টে সুখ হইতে পারে; কিন্তু তিনি কি আর
কখনও মেয়েকে আনিতে পারিবেন ? তাহারা পাঠাইবে কেন?
দরিদ্রের সংসারে সুখের মধ্যে ছেলে মেয়ে ; অন্ধকারে
তাহারাই আলাে। এতদিন মােহিত অজস্র দুঃখের মধ্যে ছেলে-
মেয়েকে লইয়াই সুখী ছিলেন। সেই মেয়েকে হয় ত আর
দেখিতেও পাইবেন না !
দিদি বলিলেন, “কি, চুপ কেন? ঘটকী বলে--তারা মেয়েকে
দু সূট গয়না দেবে—হীরের আর সােনার। হীরের বালা, হীরের
বাজু, হীরের মটুক ; মােতির মালা। বুঝলে?”
মােহিত ভাবিলেন, তবে কি তিনি আপনার সুখের জন্য
মেয়ের সুখ অবহেলা করিতেছেন? তিনি কি স্বার্থপর হইয়া
পিতার কর্তব্য ভুলিতেছেন? তিনি বলিলেন, “ভাল, আমি কালই
সব খোজ নেব।”
দিদি বলিলেন, “এর আবার খোঁজ! বাড়ীখানা দেখেছ ত?
আবারও খোঁজ - ঐ বাড়ীর এক ছেলে—কোনও বখরাদার
নেই। বুঝলে?”
মােহিত কেবল বলিলেন, “হঁ।”
ভ্রাতার ভাব দেখিয়া ভগিনীর পিত্তি জ্বলিয়া গেল। তিনি
আর বাক্যব্যয় না করিয়া দ্রুত মালা জপ করিতে লাগিলেন।
মােহিতের স্ত্রীও মােহিতের এই ভাব
ভাব দেখিয়া বিস্ময়ে
নির্বাক হইয়া গেলেন। চৌধুরী-বাড়ীতে মেয়ে দিতে আবার
বিবেচনা ।

চোরাবালি দিদি আষাঢ়ের আকাশের মত অন্ধকার মুখে ভ্রাতার বিচার- বুদ্ধির প্রতিবাদ করিতেছিলেন; স্ত্রী শ্রাবণের ধারার মত অবর্ষণ করিতে লাগিলেন। মােহিত যতই বুঝাইতে চাহেন—তিনি এমন কথা বলিতেছেন না যে, এ বিবাহ দিবেন না, তবে মেয়ের বিবাহ ভাল করিয়া ভাবিয়া দেখিয়া তবে উত্তর দিতে হইবে, তাহার স্ত্রী ততই সেই এক কথা বলেন, “তুমি কি এত সহিয়াও টাকার মৰ্ম্ম বুঝিলে না ?” টাকার অভাবে যাহারা ছেলেমেয়েকে কাপড় গহনা দিতে পারে না, তাহারা আবার চৌধুরী-বাড়ীর এক ছেলেকে মেয়ে দিতে খোজ লয় ! বাড়ীতে মােহিতের অবস্থা সপ্তরথি-পরিবেষ্টিত অভিমন্যুর দশার অনুরূপ হইল। তিনি পরাভব মানিলেন ; আপনাকে আপনি বুঝাইলেন, মেয়ের সম্বন্ধে কৰ্তব্য তাহার যেমন, মেয়ের মা’রও ত তেমনই। মেয়ের মা, মেয়ের পিসী, সকলেই যখন এ সম্বন্ধে এত আগ্রহ প্রকাশ করিতেছেন, তখন তিনিই বা কেন আপত্তি করেন ? তাহার পর মেয়ে দেখাইবার পালা ঘটকীর আসিয়া বলিল, চৌধুরী-গৃহিণী মেয়ে দেখিবেন—মেয়ে লইয়া যাইতেকিইইবে । মেয়ে লইয়া যাইতে হইবে!-মােহিতের কাছে এ প্রস্তাব অত্যন্ত আপত্তিজনক মনে হইল । আফিসের কেরাণী—“সাহেবের কাছে লাঞ্ছনা গঞ্জনা তাঁহার সামান্য বেতনের উপরি পাওনা হইলেও তিনি বলিলেন, “মেয়ে ঘাড়ে করে পরের বাড়ী নিয়ে যাব ?” স্ত্রী বললেন, “চুপ কর। তারা যদি আসেন, বসাবে কোথায়?”

জানা-বালি
মােহিত বলিলেন, “আমার অবস্থা জেনেই ত তার
করছেন।” স্ত্রী বলিলেন, “তা হোক্‌-তােমাকে ত আর যেতে
হরে না।” মােহিত বলিল, “আর মেয়ে যদি তাদের পসন্দ না
হয়, তখন ?” গৃহিণী বলিলেন, “সে মেয়ের বরাত।” “তােমাদের
যা খুসী কর।” বলিয়া মােহিত হাল ছাড়িয়া দিলেন।
তখন ননদে ভাজে পরামর্শ হইতে লাগিল,কে মেয়ে লইয়া
যাইবেন? প্রভাত-নলিনীর মাতার যাওয়া যে অসম্ভব, তাহা
উভয়েই বুঝিলেন । একখানা গহনার মত গহনা নাই-ভাল
কাপড় জামা নাই, কুটুম্ব-বাড়ী প্রথম যাওয়া—যাওয়া যায় কি ?
বরং পিসীর যাওয়া সম্ভব-ব্রাহ্মণের ঘরের বিধবা—একখানা
রসা থান কাপড় হইলেই হয়। সে না হয় হইল-মেয়ে কি
পরিয়া যাইবে ? মেয়ের হাতে দুইগাছা মাটা বালা আছে বটে,
গলায় একছড়া হারও ত নাই। চাহিলেও যে প্রতিবেশীরা কেহ
বিশ্বাস করিয়া দিবে, এমন মনে হয় না। উপায়? অনেক
করিয়াও নদ ভাজ কোনও উপায় করিতে পারিলেন না।
মেয়ের যে সাজ ছিল, তাহাতেই তাহাকে লইয়া পিসীমা
চৌধুরীদের গৃহে গেলেন। বাড়ীর সাজসজ্জা দেখিয়াই তিনি
মুগ্ধ হইয়া গেলেন—এই ত ইন্দ্র ভবন। চৌধুরী-গৃহিণী আদর
করিয়া বেহাইনকে বগাইলেন--প্রভাত-নলিনীকে আদর
করিলেন। কিন্তু প্রভাত-নলিনীর পিতামাতার প্রতি একান্তই
দয়া করিয়া তিনি যে তাহাকে গ্রহণ করিতেছেন, গৃহিণীর কথায়
তাহা তিনি বেশ বুঝাইয়া দিলেন। কোনও পাড়াগেঁয়ে জমীদার
১৪

চেন্না-বালি • : জামতার মােক্তারের রূপবতী কন্যার সঙ্গে আপনার পুত্রের বিবাহ সম্বন্ধ পাকা করিয়া লগ্নপত্র করিবার সময় বলিয়াছিলেন, “ঈশ্বর, তুমি কিন্তু মনে রেখাে, তুমি আমার বেয়াই নও--আমার জামাইয়ের মােক্তার।” চৌধুরী-গৃহিণী এবং তাহার আশ্রিতার দল তেমনই পিসীমা’কে বুঝাইয়া দিলেন, প্রভাত-নলিনী-সে ঘরের বধূ হইলেও তিনি কিন্তু বেহাইন হইবেন না। পিসীমও তাহা বুঝিলেন; কিন্তু বাড়ীতে আসিয়া সে কথা ভাইকেও বলিলেন না। সে ত জানাই ছি—অত বড় বড়মানুষ, তাহারা কি কখন তাহাদের সমান মান করিবে ? এখন মেয়ের অদৃষ্টে ও ঘরে পড়া থাকিলে হয়। মেয়ের অদৃষ্টে তাহা ছিল। তাই ভাইঝিকে লইয়া পিসীমা বাড়ীতে ফিরিলে চৌধুরী-গৃহিণী তাহার আশ্রিতাদিগকে বলিলেন, “কৰ্ত্তার পসন্দ বটে! কি রূপ---যেন মা দুর্গা।” সকলেই বলিল, “সে কথা আর বলতে হয়!” গৃহিণী কর্তাকেও সে কথা বলিলেন। কৰ্ত্তা বলিলেন, “তবুও তুমি আমার পসন্দে বিশ্বাস কর না। আমি কি ন্যাকা না বােকা ?” বয়সকালে কর্তা যে রূপের জহুরী ছিলেন, সেই বিষয়ে ইঙ্গিত করিয়া গৃহিণী বলিলেন, “তােমার পসন্দ কেমন, তা আমি আর জানি না ? বলে --হাড় ভাজা ভাজা হয়েছে। এখনই না হয়— কৰ্ত্তা বাধা দিয়া বলিলেন, “এখন ছেলেটা বৌ নিয়ে শােধরালেই বাঁচি।” গৃহিণী বলিলেন, “শােধরাবে গাে-শােধরাবে । বয়সকালে-ওকি অার ধুতে হয়?”

ােন্না-বালি
;
ইহার পর ঘটনার স্রোত প্রবলবেগেই বহিতে লাগিল।
চার দিন পরেই কৰ্ত্তা পুরােহিত লইয়া আসিয়া হীরার নেকলেস
দিয়া প্রভাতনলিনীকে আশীর্বাদ করিয়া গেলেন, এবং কর্ত
যাইবার পরই সরকার আসিয়া মােহিতকে বলিল, “বাবু বলে
দিলেন, বাড়ীতে যদি লােহার সিন্দুক না থাকে—গহনাখানা না
হয় আমইক দিন; কি জানি, অনেক দামের জিনিষ!” মােহিত
বলিলেন, “তার ব্যবস্থা আছে।” তিনি বিরক্ত হইলেন; কিন্তু আর
হাত নাই।
পরদিন মােহিত আশীর্বাদ করিতে যাইবেন। কি দিয়া
আশীৰ্বাদ করিবেন ? দিদির সম্বলের মধ্যে ছিল খান দুই তিন
আকবরী মােহর ; তিনি তাহারই একখানা বাহির করিয়া দিলেন।
কিন্তু মােহিত যাত্ৰা করিবার পূর্বেই চৌধুরী-বাড়ীর সরকার
আসিয়া একটা অঙ্গুরী দিয়া গেল-বলিয়া গেল, “এইটা আশীৰ্বাদ
করবার জন্য ; দাম-পাঁচ হাজার টাকা।”
পাঁচ হাজার টাকার হীরা ! পিসীমা ও মােহিতের স্ত্রী সেই
অঙ্গুরী নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিলেন—মােহিতও দেখিলেন। হীরা
বটে! নাড়িলে আলো যেন ঠিকরিয়া বাহির হয়। সেই আলােকে
মােহিতের মনের বিরক্তির ও শঙ্কার অন্ধকারও যেন অপনীত
হইয়া গেল। মােহিত মনে করিল, মেয়েটার ভাগ্য ভাল।
আর সকলেই ত সেই কথা বলিতেছে। আফিসের “বড় বাবু হইতে
দপ্তরী পর্যন্ত সকলেই বলিতেছে-“জোর কপাল বটে! একেই
বলে--‘খােদ যব, দেতা, তব, ছপ্পর ফোঁড়কে দে।”
-

লো-বালি আসিল। আশীর্বাদের পর বিবাহ, মধ্যে পনের দিনের ব্যবধান। কিন্তু মােহিতকে কোনও ভাবনাই ভাবিতে হইল না। মেয়ের গহনা- কাপড়-বরসজ্জা-বিবাহের খরচ সবই, চৌধুরী বাড়ী হইতে চৌধুরী-কৰ্তাই মােহিতের জন্য একখান্য বড় বাড়ী ভাড়া করিলেন—সেই বাড়ীতে বিবাহ হইবে। হিলে মাহিতের বাড়ীতে তাহার কুটুদি আসিলে দাড়াইযে কোথায় ? বিবাহ হইয়া গেল। গৃহিণীর ঐ এক ছেলে ; সুতরাং বাজনা, খাস গেলাস, শােভাযাত্রা, কিছুরই অভাব হইল না। ঘটার বিবাহ সে পাড়ায় অনেক দিন হয় নাই; আজকাল বড় হয়ও না। বিবাহের পর মেয়ে যখন বাপের বাড়ী আসিল, তখন তাহার এক গা গহনা-দেখিলে চক্ষু জুড়ায়। মেয়ের পিসীমা তখন মােহিতকে বলিলেন, “দেখলে ত ; কেমন ঘরে মেয়ে পড়েছে। মােহিত হাসিল। তাহার পর বিবাহের কয় দিনের সেই উদ্যোগ, আয়ােজন- সেই উৎসব, আন্দ, সব যেন স্বপ্ন হইয়া গেল। মােহিত আবার আপনার সেই বাড়ীতে ফিরিয়া গেল—আবার আফিসে লাঞ্ছনা- গঞ্জনা উপরি পাওনা' লইয়া দশটা পাঁচটা কলম পিষিতে লাগিল। আবার মাসকাবারে মুদীর হিসাব মিটাইয়া স্বামি-স্ত্রীতে ভাবিতে লাগিল—যে কয় টাকা রহিল তাহাতে মাসের অবশিষ্ট উনত্রিশটা দিন কেমন করিয়া চলিবে? আবার ছেলেমেয়ের অসুখ হইলে বা কাপড় ছিড়িলে—নুতন খরচ কোথা হইতে করিবে, সেই গেন্না-বালি ভাবনা। স্বপ্নের মধ্যে সত্য রহিল কেবল-প্রভাত-নলিনীর অভাব। চৌধুরী পরিবারে বন্ধুকে বাপের বাড়ী পাঠান রেওয়াজ নাই। বড়জোর সকালে পাঠাইয়া সন্ধ্যায় লইয়া যাওয়া। এ ক্ষেত্রে তাহ ও দুর্ঘট হইল। চৌধুরী-বাড়ীর বধূ মােহিতের কুঁড়েঘরে যাইবে, কেন করিয়া ? জন্মাবধি সে সেই কুঁড়েঘরই আলো করিয়া ছিল ; এ- ৭ ঘরে তাহার বাতি আর জ্বলে না। কিন্তু সে যে ঘরে গেল সে ঘরে ? সে ঘরে কি তাহার সুখ হইল ? মেয়ে আনা যে দুর্ঘট হইবে, তাহা মােহিত জানিত ; সে জন্য সে প্রস্তুত হইয়াই ছিল। তবে তাহারও বড় আশা ছিল, মেয়ে সুখী হইবে। তাহাও হইল না। চৌধুরী-কৰ্ত্তা যে আশায় ছেলের বিবাহ দিয়াছিলেন, সে আশা পূর্ণ হইল না। দুলালচন্দ্রের পক্ষে প্রভাত-নলিনী তাহার গাড়ী, ঘােড়া, সাজ, সজ্জা-এসব বিলাসের আসবাবের মধ্যে অন্যতম হইয়া রহিল। যেমন বাছিয়া হীরা জহরৎ কিনিয়া আনা হয়—এও তেমনই বাছিয়া রূপসী প্রভাত-নলিনীকে আনা হইয়াছে। চৌধুরী- দের কি পয়সার অভাব আছে যে, রূপসী বধু পাওয়া যাইবে না ? কড়িতে বাঘের দুধ মিলে।” বিশেষ, সে পরিবারে অন্দরের ও আবক্কর কড়া শাসন—স্বামি-স্ত্রীতে সাক্ষাৎ যখন তখন হইবার উপায় ছিল না। দুলালের শিক্ষা ও সংস্কার তাহাকে স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠ করিতে পারিত না-প্রভাত-নলিনীর রূপমােহও তাহার প্রেমকে আকৃষ্ট করিয়া আনিতে পারিল না। সে দিন দিন অধঃপতনের পথে অধিক অগ্রসর হইতে লাগিল। ১৮

ভেন্না-বালি
অনাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়িতে লাগিল । শেষে তাহার
ব্যবহার কৰ্ত্তারও অসহ হইয়া উঠিল। কিন্তু তিনি কোনও উপায়
করিতে পারিলেন না। তিনি আখের ভাবিয়া প্রভাত-নলিনীর
নামে পঞ্চাশ হাজার টাকার কোম্পানীর কাগজ কিনিয়া দিলেন,
এবং এক দিন গােপনে প্রভাত-নলিনীকে সে কথা জানাইয়া কাগজ
তাহাকে দিলেন।
}{
তাহার পর কর্তা একবার তীর্থ-ভ্রমণে বাহির হইলেন; গৃহিণী
সঙ্গে গেলেন। নানা তীর্থ দেখিয়া তাহারা বৈষ্ণবের সতীর্থসার
বৃন্দাবনে গমন করিলেন। তখন দোল-বৃন্দাবনে যাত্রীর
ভিড়, সব “কুঞ্জ” পূর্ণ। সেই সময় বিদেশে কর্তার বিসূচিকা
হইল। দুলালকে টেলিগ্রাম করিবার কথা হইলে তিনি আপত্তি
করিলেন--“আমার অদৃষ্টে যা আছে, হবে। যদি বৃন্দাবনের
রজে দেহ রক্ষা করি, সেত অনেক পুণ্যের ফল। তাকে খবর
দিয়ে আনিয়ে কাজ নেই। এখন বৃন্দাবনে বড় ব্যায়াম।”
দেহাবশেষ বৃন্দাবনের বুজেই মিশাইল---সহিরীর
লীলাস্থলেই তঁাহার ভবলীলা শেষ হইল। মরিবার আগে তিনি
গৃহিণীকে শেষ অনুরােধ করিলেন, “তুমি বৃন্দাবনেই বাস কর—
সংসারের ভারে যদি দুলালের মতিগতি ভাল হয়।” গৃহিণী আর
ফিরিলেন না— বৃন্দাবনেই বাস করিতে লাগিলেন। দুলালচন্দ্র
সব সম্পত্তির মালিক হইল ; খুব ঘটা করিয়া পিতৃশ্রাদ্ধ করিল।
কৰ্ত্তা খুব বিষয়ী লােক ছিলেন—এমন ভাবে সব ব্যবস্থা বাঁধিয়া
দিয়াছিলেন যে, দুলালচন্দ্র কখনই একেবারে পথের ভিখারী হইতে
১৯

জােনা-বালি
পারিবে না। বন্ধুর জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থা ত তিনিই করিয়াই দিয়া
ছিলেন। গৃহিণীর মাসহারা ছিল।
গল্প আছে, পল্লীগ্রামের চাষা “রাণী রাসমণির বর্ণনা
করিয়াছিল—একপাশে চিনির ছালা, আর একপাশে চিঁড়ের
ছাল,সেন যেটা ইচ্ছা খাইতেছে। তাহার বিশ্বাস ছিল, চিনি
ও-ডে যত ইচ্ছা খাইতে পাওয়াই ঐশ্বর্যের পরাকাষ্ঠা।
তেমনই দুলালের মনে হইল, অর্থ থাকিলে জীবনে সুখসম্ভোগের
দুইটি উপায় আছে--সুরায় আর সুন্দরীতে। সে সেই নেশাতেই
বিভাের রহিল। প্রভাত-নলিনীর কষ্টের অবধি রহিল না।
তাহার অঙ্গের আভরণ যেন তাহাকে সূচীবিদ্ধ করিতে লাগিল।
সে মনে করিতে লাগিল—অর্থেই কি সুখ হয় ? দরিদ্র পিতার
সংসার—মেহে প্রেমে ভালবাসায়—কত সুখের। তবে পিতামাতা
কি ভাবিয়া--কিসের জন্য তাহাকে বড়মানুষের ঘরে দিয়াছেন ?
পিতামাতা যে কত আশায়—কত ভাবিয়া সে কাজ করিয়াছেন,
তাহা সে বুঝিতে পারিল না। কিন্তু বাপ মার উপর তাহার রাগ
হইতে লাগিল। আর রাগ হইতে লাগিল আপনার উপর, আর
আপনার অদৃষ্টের উপর।
তাহার যে রূপ দরিদ্রের গৃহ আলো করিতে পারিত-স্বামীর
চিত্ত জয় করিতে পারিত-প্ৰেম আকৃষ্ট করিয়া সার্থক লাভ
করিতে পারিত, যে রূপের জন্যই সে চৌধুরীদিগের প্রাসাদে
আসিয়াছে, এখন সেই রূপই তাহার সুখের পথে কঁাটা হইয়া
উঠিল। স্ত্রী যে অসাধারণ রূপসী, সে কথা দুলাল সকলেরই মুখে

নাে-বালি শুনিয়া আসিয়াছে।. এত রূপ। এ রূপ লইয়াই ত বিপদ! যদি প্রভাত-নলিনীর দুই একটি ছেলে হইত, তবুও না হয় সে ছেলে . লইয়া ব্যস্ত থাকিত-রূপের তীব্রতা ম্লান হইয়া যাইত। কিন্তু তাহা হয় নাই—সে রূপ যৈন স্থির সৌদামিনীর মত; তাহার ঔজ্জ্বল্যে চক্ষু যেন ঝলসিয়া যায় ! ঘরে এত রূপ রাখিয়া দুলাল কি নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে? সে যে শ্রেণীর লােকের সঙ্গে দিন যাপন করে, বিশ্বাস তাহাদের প্রকৃতিবিরুদ্ধ। সেই অবিশ্বাসের আবহাওয়ায় বর্ধিত হইয়া দুলালের প্রকৃতি সন্দেহশীল হইয়া উঠিয়াছিল । তাহার সন্দেহের অত্যাচার প্রভাত-নলিনীকে পীড়িত করিতে লাগিল। চৌধুরী-বাড়ীতে আবরুর কড়াকড়ি বরাবরই ছিল। মেয়েদের ছাতে উঠা, বারান্দায় দাড়ান, কাহারও সম্মুখে আসা- এ সব সে বাড়ীতে চলে না। এখন কড়াকড়ি বাড়িল। ছাতের সিড়ির দরজায় চাবি পড়িল—বারান্দায় চিক পড়িল-ইত্যাদি। কিন্তু সন্দেহ একবার আরব্ধ হইলে বাড়িয়াই চলে। দুলালের তাহাই হইল। অন্দরের দ্বারে চাবি পড়িল। কিন্তু তাহাতে কি শেষে প্রভাত-নলিনীর ঘরেও চাবির ব্যবস্থা হইল। প্রভাত-নলিনী অনেক সহ্য করিয়াছিল, কোনও কথা কহে নাই। এবার সে মুখ ফুটিয়া জিজ্ঞাসা করিল—“এ কি ? দুলাল, বলিল, “আমার খুসী!” “আমার অপরাধ ?” “অপরাধ কি আমায় জানতে দেবে? তােমার রূপই তােমার অপরাধ। হইবে ? ২১

চোরাবালি,
“কিন্তু ঐ অপরাধই এক দিন তােমাদের কাছে আদরের
হয়েছিল।”
তা জানি, নইলে কুঁড়ে ঘর থেকে ফুল কুড়িয়ে কেউ
রাজবাড়ীতে আনে না।”
“রাজড়তে আসাই ঝকমারী হয়েছে। কিন্তু তুমি ঠিক
জেনাে, এ অত্যাচার আমি সহ্য করব না।”
“সহ্য করবে না ? যেন সে তােমারই এক্তিয়ার! যত বড়
মুখ নয়, তত বড় কথা!” দুলাল আবার স্ত্রীর দিকে চাহিল--
এত রূপ ! এ কি বিশ্বাস করা যায় ?
প্রভাত-নলিনী বলিল, “আচ্ছা !”
প্রভাত-নলিনী যে দিকটায় থাকিত, সে দিকে কয়টা ঘর ও
দালান। যে দ্বার দিয়া আসিতে হয়, প্রভাত-নলিনী সেই দ্বারের
কাছে আসিয়া বসিল। ঝি সেই দ্বারে চাবি বন্ধ করিতে আসিলে সে
বলিল, “খবরদার-চাবি বন্দ করাে না।” ঝি বলিল, “আমরা
মনিবের চাকর-যেমন হুকুম, তেমনই করি, আমার দোষ কি ?”
প্রভাত-নলিনী বলিল, “দোষ তােমার নয়--কিন্তু তুমি চাবি
দিও না।”
বৈকালে বাহির হইয়া যাইবার পূর্বে দুলাল দেখিতে আসিল,
দ্বার বন্ধ হইয়াছে কি না। সে দেখিল, দ্বার মুক্ত। ঝি বলিল,
প্রভাত-নলিনী চাবি দিতে দেয় নাই। দুলাল ঝিকে জবাব দিল,
এবং প্রভাত-নলিনীকে গালি দিয়া আপনি দ্বারে তালা বন্ধ করিয়
বলিয়া গেল-“কেমন ?”

চােরাবালি
প্রভাত-নলিনী রাগে-দুঃখে-ঘৃণায়-অপমানে চঞ্চল হইয়া
উঠিয়াছিল সে কেবল কম্পিতকণ্ঠে বলিল, “তুমিও দেখিবে,
কেমন।”
দুলাল সে কথা শুনিতে পাইল কি না, জানি না।
প্রভাত-নলিনী সঙ্কল্প করিল, অত অপমান আর সহ্য করিবে
না। সে পিতামাতার কাছেও যাইবে না—হাদিগকে বিব্রত
করিবে না। কেন, স্ত্রীলােক কি আপনার উপর নির্ভর করিতে
পারে না? কিন্তু এ অপমানের প্রতিশােধ সে লইবেই ।
তাহার পর মুক্তির কত উপায়—কত ষড়যন্ত্র ! সে সুদীর্ঘ
কথায় প্রয়ােজন নাই। শেষে এক দিন অবসর পাইয়া সে গৃহ ত্যাগ
করিল। অাপনার অলঙ্কার ও কোম্পানীর কাগজ সে সঙ্গে
লইয়া গেল। যখন তাহার পলায়ন-বার্তা প্রকাশিত হইল, তখন
বাড়ীর লােক দুলালকে সে সংবাদ দিতে সাহস পাইল না।
সে যখন তাহা জানিতে পারিল, তখন রাগে বাড়ীর ঝাড় ল্যাম্প
আয়না গৃহসজ্জা অনেক গুলা চূর্ণ করিয়া ফেলিল। একবার স্থির
হইয়া কৰ্তব্য-নির্ধারণ করিবার চেষ্টা করিল–পারিল না! কিন্তু
সংবাদ পাইয়া তাহার মা বাড়ীতে আসিলেন ; বধূর সংবাদ
পাইলেন, তাহাকে আনিবার প্রস্তাব করিলেন। দুলাল জুলিয়া
উঠিল--যে গিয়াছে, সেই ছােটলােকের মেয়েকে সে আবার ঘরে
আনিবে ? কখনই নহে। সে তাহাকে সমুচিত শিক্ষা দিবে।
মা বৃন্দাবনে ফিরিয়া গেলেন--চক্ষুর জল ফেলিতে ফেলিতে
গেলে।
২৩

চোরাবালি এ সব সংবাদই প্রভাত-নলিনী জানিতে পারিল । সে আশা করিয়াছিল, মােহিত তাহাকে লইতে আসিবে। তাহা হইল না। মােহিতের আর এক মেয়ে বিবাহযােগ্যা--এ সময় সে, প্রভাত- নলিনীকে আনিতে সাহস করিল না ; সমাজের ভয়ে নহে- দুলালের অত্যাচারের প্রতিশােধস্পৃহার ভয়ে। প্রভাতনলিনীর মন সংসারের উপর—মানুষের উপর একেবারে খড়গহস্ত হইয়া সে শুনিয়াছিল, দুলাল বলিয়াছে, সে তাহার সমুচিত শিক্ষা দিবে। কে কাহাকে শিক্ষা দেয়, তাহাই দেখিবার জন্য সে আপনার গৃহত্যাগ-সংবাদটা ঘােষণা করিবে বলিয়া রঙ্গালয়ে ‘চন্দ্রশেখরে’র অভিনয়ে দলনী বেগমের অংশ অভিনয় করিবার ব্যবস্থা করিল। সে কেবল প্রতিহিংসাবশে। নহিলে তাহার বঙ্গালয়ে অভিনয় করিবার কোনও কারণই ছিল না। এই প্রভাত-নলিনীর জন্যই বঙ্গালয়ে দর্শকের জনতার উঠিল। বাহুল্য। ২৪ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। বাহিরে রাজপথে যখন পুলিস জনতা সরাইয়া দিতেছিল— ভিতরে রঙ্গালয়ে তখন অভিনয় আরম্ভ হইয়াছে। দর্শকবৃন্দ দলনী বেগমের আবির্ভাবের জন্যই ব্যাকুল হইয়া ছিল। কয়টি দৃশ্যের পর যখন পটপরিবর্তন হইল-মুঙ্গেরের দুর্গমধ্যস্থ রঙ্গমহলে দীপালােকে গুলেস্ত-পাঠরতা দলনী বেগমকে দেখা গেল, তখন দর্শকমণ্ডলী প্রশংসায় মূক হইয়া গেল—তাহাদের নয়ন সৌন্দৰ্য- সুধা পান করিতে লাগিল। তাহারা দেখিল—সুন্দরী বটে—যে এই সৌন্দর্যের জন্য হৃদয়ভরা ভালবাসা দিয়া প্রেমের মূল্যে এই রূপরাশি কিনিতে না পারে, তাহার পক্ষে এ রূপ দুশ্চিন্তার কারণ হইতে পারে বটে। দলনী—এ দলনী-বঙ্কিমচন্দ্রের কল্পনার সৃষ্টি দলনী বেগমই বটে; কবির কল্পনা যেন মুর্তি পরিগ্রহ করিয়াছে-- “সুন্দরী—নবীনা—সবেমাত্র যৌবন-বর্ষায় রূপের নদী পুরিয়া উঠিতেছে, ভরা বসন্তে অঙ্গ-মুকুল সব ফুটিয়া উঠিয়াছে। বসন্ত বর্ষায় একত্র মিশিয়াছে।” প্রথম দৃশ্যে দলনী যেন চঞ্চল-যেন শঙ্কিত। কিন্তু সে দৃশ্যের বর্ণিত বিষয়ের সঙ্গে দলনীর সেই ভাবের অসঙ্গতি ছিল না। তাহার পর দলনীর অভিনয়ে আর কোনরূপ কুটী লক্ষিত হইল না। ২৫ ; চোরাবালি অভিনয় সৰ্বাঙ্গসুন্দর—অভিনয় বলিয়া মনেই হয় না। পরন্তু দলনী বেগমের অভিনয়ের তুলনায় আর সব অভিনেতার ও অভিনেত্রীর অভিনয়-ত্রুটী বড় উজ্জ্বল হইয়া উঠিতে লাগিল। এমন কি, “অগাধ জলে সাঁতার” দৃশ্যও আজ আর দর্শকদিগকে তেমন তৃপ্ত করিতে পারিল না। দর্শকদল যেন মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া দলনীর অভিনয় দেখিতে লাগিঠ। প্রভাত-নলিনী কি দলনীর অভিনয় করিতে করিতে দলনীর অবস্থা আপনার হৃদয়ে অনুভব করিতেছিল ? কে বলিবে ? শেষে দনী, দলিত ফণিনী । তখনও তাহার দেহে সেই রত্নালঙ্কার—এ রঙ্গালয়ের ঝুঠা হীরা পান্না নহে-রত্নরাজি দীপা- লােকে জ্বলিতেছে। দলনী ক্ষুদ্র দেহ উন্নত করিয়া দাঁড়াইয়া পাপিষ্ঠ মহম্মদ তকীকে বলিল-“যে তােমার মত পাপিষ্ঠের কাছে প্রাণদান গ্রহণ করে, সে তােমার অপেক্ষাও অধম।” দর্শকদিগের চিত্ত করুণায় ও প্রশংসায় পূর্ণ হইয়া গেল। তাহার পর তকীর পাপ প্রস্তাবে দলনী যখন তাহাকে পদাঘাত করিল--তখন দর্শক- দিগের মনে হইল, সে পাদুকার স্পর্শেও তকী ধন্য হইল-সে তাহারও উপযুক্ত নহে। তাহার পর যখন পট উঠিল তখন “দলনী আসনে উৰ্দ্ধমুখে, উদ্ধদৃষ্টিতে, যুক্তকরে বসিয়া আছে--বিস্ফারিত পদ্মপলাশচক্ষু হইতে জলধারার পর জলধারা গণ্ড বহিয়া বস্ত্রে আসিয়া পড়িতেছে সম্মুখে শূন্য পাত্র পড়িয়া আছে—দলনী বিষ পান করিয়াছে।”, সে দৃশ্যের গাম্ভীৰ্য্য দর্শকদিগের হৃদয়েও ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল।

; নাে-বালি দৃশ্যের উপর যখন যবনিকাপাত হইল, তখন অনেক দর্শকই চলিয় গেল। তখনও ‘চন্দ্রশেখরের’ অভিনয় শেষ হয় নাই ; তাহার পর আরও একখানি গােটা নাটক ছিল ; কারণ, বাঙ্গালী দর্শক --- আট আনা দিয়া টিকিট কিনিলে সারারাত্রি অভিনয় দেখিতে চাহে। মহিলারা ছেলের জন্য ফিডিংবটল লইয়া আইসেন ; পুরুষরা কেহ কেহ একেবারে গঙ্গাস্নান করি বাড়ী ফিরিবেন বলিয়া কাপড় গামছা লইয়া আসিয়া থাকেন। আট আনার পয়সা ওয়াশীল করাই অভিপ্রেত-তাহাতে স্বাস্থ্যনাশ হয়- হউক। ইহাই বাঙ্গালার রঙ্গালয়ে সাধারণ দর্শকদিগের হিসাব। সে দিন কিন্তু অনেক দর্শকই দলনীর অভিনয় শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই রঙ্গালয় ত্যাগ করিয়া গেল । প্রভাত-নলিনীও নাটকের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করিল না- আপনার অভিনয় শেষ হইয়া গেলেই চলিয়া গেল। প্রতিহিংসার প্ররােচনায় উত্তেজনাবশে সে অভিনয় করিতে চাহিয়াছিল এবং আসিয়াছিল। প্রথমে রঙ্গমঞ্চে আসিয়া-সহস্র চক্ষুর দৃষ্টির সম্মুখে সে যেন আপনাকে অবসন্ন ও বিপন্ন মনে করিতেছিল- কেবল চিত্তের দৃঢ়তায় সে সেই দৌর্বল্য জয় করিয়াছিল। তাহার পর সে দলনীর ভাবে তন্ময় হইয়াছিল-রঙ্গালয়, অভিনয়, শত এ সব সে যেন ভুলিয়া গিয়াছিল। যে মুহূর্তে অভিনয় শেষ হইয়া গেল, সেই মুহূর্তেই সে তন্ময়তা দূর হইয়া গেল ; রঙ্গালয়ের দর্শকদিগের দৃষ্টি যেন তাহাকে বিব্রত করিতে লাগিল-- লােকের প্রশংসা তাহার উপহাস বলিয়া মনে হইতে লাগিল। [== চক্ষুর দৃষ্টি- ২৭ গেরা-বালি - সে উঠিয়া তাহার চিত্তের দৃঢ়তা যেন তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া গেল পৃথিবী যেন কঁপিতে লাগিল। তাই সে আর অপেক্ষা না করিয়া চলিয়া গেল। যখন সে গৃহে গেল, তখন সে এমনই অবসন্ন যে, বেশ পরিবর্তন করিতেও তাহার ইচ্ছা হইল না। সে যে বেশে শেষ দৃশ্যে রঙ্গমঞ্চে দেখা দিয়াছিল, সেই বেশেই শয্যায় শয়ন করিল। যখন তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল, তখন মুক্ত বাতায়নপথে প্রভাত- সূর্যের রশ্মিমালা তাহার কক্ষে প্রবেশ করিয়াছে। বসিল। কক্ষপ্রাচীরে বিলম্বিত মুকুরে তাহার প্রতিবিম্ব দেখিয়া সে আপনি হাসিল। মুখে রং-কতকটা মুছিয়া গিয়াছে, কতকটা আছে ; বেগমের বেশ! সে আপনি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিল— দলনী কি মরিয়া আবার বাঁচিয়াছিল ? মনের মধ্যে কে যেন উত্তর দিল-“না, সে মরিয়াই বাঁচিয়াছিল।” তাই বটে—জীবন “যখন যাতনা, মৃত্যুই তখন শান্তি। গৃহত্যাগ করিয়া আসিয়া অবধি প্রভাত-নলিনী আপনার অসহায় অবস্থা অনুভব করিতেছিল; দেখিতেছিল, তাহার মত নিঃসহায়া ও অভিভাবকহীনা রূপসী কিশােরীর পক্ষে সংসার-পথ প্রলােভনের ও বিপদের ফাঁদে পূর্ণ। বড় সাবধান হইয়া আত্মরক্ষা করিতে হয়। এবার সেই বিপদের পরিমাণ ও মূর্তি দেখিয়া সে শিহরিয়া উঠিল। স্বামীর ব্যবহারে ও চরিত্রে তাহার হৃদয় ঘৃণায় পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল—সে গৃহত্যাগ করিয়া আসিয়াছিল। কিন্তু সে জানি না, ২৮ গেন্না-বালি জনারণ্য নগরে তাহার স্বামীই একা সে চরিত্রের লােক নহে; সে বহুজনের এক জন। তাহারা রমণীকে ভােগাৰ্থমাত্র মনে করে ; নারীত্বের উচ্চ আদর্শ তাহাদের ধারণাতীত। তাহারা মনে করে, ধনের অধিকারে তাহারা সমাজে যেমন ইচ্ছা ব্যবহার করিতে পারে। প্রতিদিন তাহাদের লালসার যুপে নারীর সর্বস্ব বলিদান করা হয়। মধ্যে মধ্যে এক একটি মােকর্দমায় এই ব্যাপার দেখিয়া লােক শিহরিয়া উঠে। তাহার পর আবার যে যাহার কাজে ব্যস্ত হয়। এই ভীষণ অবস্থার কোনও স্থায়ী প্রতীকার হয় । বিলাতে মিষ্টার ষ্টেড একবার এই ব্যাপারের আলােচনা করিয়াছিলেন—অকাট্য প্রমাণ দিয়া দেখাইয়াছিলেন, বিলাতের বিলাসী সমাজের পাপপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করিবার জন্য কত নারীর সৰ্ব্বনাশ হইতেছে। এ দেশে সুরবালা-গায়ত্রীর মােকর্দমায় এইরূপ ব্যাপারের পরিচয় পাওয়া গিয়াছিল। এ পাপ সহরেই প্রবল। বিলাসী ধনীরা অর্থের বলে সমাজের বক্ষে বসিয়া পাপের উৎস উৎসারিত করে। নাপিনী, তাতিনী, চাকরাণী--অনেকে ইহাদের অনীকিনী হইয়া কাজ করে; অর্থের জন্য প্রলােভনের ফাঁদ লইয়া রূপসী বালিকা, কিশােরী, যুবতী ধরিতে বাহির হয় । আমাদের সমাজ যে ভাবে গঠিত, তাহাতে পূৰ্ব্বে লােক সমাজের শাসনকে ভয় করিত। এখন তাহাও নাই; সমাজ দুৰ্বল-সেও সবকে ভয় করে। এখন কাঞ্চন-কৌলীন্যের শাসনে সমাজ অনাচারের লীলাক্ষেত্র হইয়াছে। এই দলের লােকের চররা প্রভাত-নলিনীর সন্ধান পাইয়াছিল।

জোনা-বালি যে নারী গৃহত্যাগ করিয়া আইসে, সে দুর্লভ হইতে পারে, কিন্তু অলব্ধ থাকিতে পারে না—এই বিশ্বাসে তাহারা কাৰ্ষে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। যাহার ভােগ ও লালসা ব্যতীত আর কিছুই বুঝে , মানুষের মনের জটিল তত্ত্ব বুঝিবার আশা তাহাদের কাছে কখনই করা যায় না। তাহাদের চরদিগের অত্যাচারে প্রভাত- নলিনী বিব্রত হইয়া উঠিয়াছিল। সে প্রথমে তাহাদের স্বরূপ বুঝিতে পারে নাই। কিন্তু বুঝিতে পারিবামাত্র সে তাহাদিগকে দূর করিয়া দিয়াছিল। তাহারা অবসরের অপেক্ষা করিতেছিল। অমন দ্বিধা সকলেরই হয়; কিন্তু যে পথে সে পা দিয়াছে সে পথ পিচ্ছিল-কাজেই তাহাকে পতিত হইতেই হইবে—পাপের পঙ্কে একবার পড়িলে, আর রক্ষা নাই । এবার প্রভাত-নলিনী যখন রঙ্গালয়ে অভিনয় করিল, তখন তাহারা বুঝিল—এবার তাহার নির্ভয়ে তাহার কাছে যে কোনও প্রস্তাব করিতে পারে—আর ভয় নাই। তবুও প্রভাত-নলিনী যখন তাহাদের প্রস্তাব ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করিল—তাহাদিগকে দূর করিয়া দিল, তখন তাহারা বিস্মিত হইল। আর তাহাদের প্রভুরা তাহাদের অসাফল্যে তাহাদের কাৰ্যদক্ষতার অভাব অনুমান করিয়া তাহাদিগকে তিরস্কার করিল। তাহার বলিল,“আমাদের কপাল। এত দিন এই ব্যবসা করতেছি--কখনও ত এমন হয় নি।” কিন্তু প্রভাত-নলিনী শঙ্কিত হইল। এ কি ? গৃহের বাহির হইলেই কি এত প্রলােভন ? দুশ্চরিত্র স্বামীর ঘরও দেবমন্দির চেন্না-বালি আর সে ঘরের বাহিরেই আবর্জনাস্ত,প! ভােগ ও লালসা, ইহা ছাড়া কি মানুষের কাজের আর কোনও কারণ নাই---থাকিতে পারে না ?' স্নেহ-প্রেম-ভালবাসা-আত্মসম্মান-অভিমান আত্মমর্যাদা, এ সব কি কেবল কথার কথা যে, বাস্তব জীবনে ইহাদের স্থান নাই ? না—এ সব দরিদ্রের জন্য ? ধনীরা কি স্বতন্ত্র জীব ? এমন কি, ধর্মের বা নীতির যে আদর্শ ও শাসন সাধারণ সমাজে গৃহীত ও প্রচলিত, তাহাও ধনীর জন্য নহে ? সে যাহাই হউক, সে যে প্রলােভনকে উপহাস ও অবজ্ঞা করিতে পারে—-পদদলিত করিতে পারে, আপনার ক্ষমতায় এমন বিশ্বাস প্রভাত-নলিনীর ছিল। সে বিশ্বাস তাহার সাংসারিক জ্ঞানের ও অভিজ্ঞতার অভাব-সঞ্জাত ; কি স্বামীর অনাচারের বিরুদ্ধে তাহার হৃদয়ের দৃঢ়তার ফল, তাহা কে বলিবে ? তবে প্রভাত-নলিনী ইহাও বুঝিল, মানুষের শত্ৰু মানুষ আপনি মানুষ বাহিরের সব আক্রমণ হইতে আপনাকে রক্ষা করিতে পারে, কিন্তু আপনার নিকট হইতে আপনাকে রক্ষা করিতে পারে । সে আপনার নিকট হইতে আপনাকে রক্ষা করিতে কৃত- সঙ্কল্প হইল। এখন তাহার সৰ্ব্বপ্রধান শত্রু—অবসর। পতিগৃহে তাহার কোনও কাজ ছিল না—কিন্তু চিন্তার অন্ত ছিল না; বৰ্ত্ত- ; মনে দুর্দশা ও ভবিষ্যতের ভাবনা তাহাকে ব্যাপৃত রাখিত। এখন বর্তমানের ভাবনাও নাই, ভবিষ্যতের ভাবনাও নাই। সব * শূন্য। সুতরাং সে কেমন করিয়া আপনাকে ব্যাপৃত রাখিবে ? সে বিশেষ করিয়া ভাবিয়া দেখিল—এক ছাড়া তাহার অন্য ১২২ ৩১ ; চেন্না-বালি উপায় নাই। সে লিখাপড়া লইয়া থাকিবে । বিদ্যালয়ে সে তাহার শ্রেণীতে কখনও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে নাই ; পাঠে তাহার বিশেষ অনুরাগও ছিল। কিন্তু বাঙ্গালীর মেয়ের লিখাপড়া -বিবাহের সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে জলাঞ্জলি দিতে হয়। তাহার উপর সে যে ঘরে পড়িয়াছিল সে ঘরে ও চর্চা ছিল না; সে ঘর লক্ষ্মীর মন্দির—সরস্বতীর তাহার চৌকাট পার হইবার সুযােগ ছিল না। কাজেই এ কয় বৎসর প্রভাত-মলিনীর পক্ষে বিদ্যাচর্চার বিশেষ সুযােগ হয় নাই। না হইলে ও পুস্তক-পাঠে সে অনেক সময় অশান্ত হৃদয়ের বেদনার যাতনা ভুলিয়াছে। সেই জন্য লিখাপড়ার উপর তাহার অনুরাগ ও শ্রদ্ধা বিবর্ধিতই হইয়াছিল। সেই এক সঙ্গী, যাহাকে পাইলে আর কাহাকেও প্রয়ােজন হয় না। তাই প্রভাত- নলিনী আজ অবসরযাপনের জন্য সেই সঙ্গীরই সন্ধান করিয়াছিল। সে রাশি রাশি পুস্তক আনাইয়াছিল। কিন্তু অবসর এত অধিক যে, পুস্তক শেষ করিতে বিলম্ব হয় না। প্রভাত-নলিনী শুনিয়াছিল, ইংরাজী সাহিত্য সমুদ্রের মত অসীম। ইংরাজী শিখিলে ত তবে কাজের অভাব হয় না। অতি সামান্যই ইংরাজী জানিত–মিশনারী বিদ্যালয়ে পড়িয়াছিল। সেই স্কুলের শিক্ষয়িত্রীরা ত বাড়ী বাড়ী যাইয়া পড়াইয়া থাকেন। তবে তাহাদিগকে লিখিয়া দিলেই হইবে। সে স্কুলের নাম ও গলির নাম জানিত ; স্কুলে স্কুলে পত্র লিখিতে বসিল। পত্র লিখিতে বসিয়া কত কথা তাহার মনে পড়িল! সেই শৈশব-সেই সব শৈশব-সঙ্গিনী। আজ তাহার ম ৩২ ? নাে-বালি কোথায় ? মিলির বিবাহ হইয়া গিয়াছে তাহার স্বামী পশ্চিমে ডাক্তার। সুরবালার বাপ কলিকাতা হইতে বদলী হইয়া গিয়াছিলেন। অনুপমাও আগেই স্কুল ছাড়িয়াছিল- স্কুলের উঠানে একটা বিলাতী “মাটী”র চাপ ছিল, পিপায় জল পড়িয়া মাটী জমিয়া গিয়াছিল ; তাই যে স্কুলকে ‘ছিমন্ত মাটীর স্কুল’ বলিত। যে গলিতে স্কুল---সে গলির পরের গলিতেই তাহার বাপের বাড়ী। বাপের বাড়ীর ছবি তাহার মানসপটে ফুটিয়া উঠিল। জীবনের সুখের দিন কয়টি সে সেই গৃহেই কাটাইয়াছে । তাহার শ্বশুর বাড়ীতে সে তাহার বাপের বাড়ীর দারিদ্র্যের ও দুঃখের কথা শুনিয়াছে ; কিন্তু সে ত কখন সে দারিদ্র্য ও দুঃখ অনুভব করে নাই। পিতা উদয়াস্ত পরিশ্রম করিয়া অর্থ উপার্জন করিতেন সত্য; কিন্তু তাহাতেও ত তাঁহার মুখে হাসি কোনও দিন দূর হয় নাই। তিনি গৃহদ্বার হইতে ছেলে-মেয়েদের নাম ধরিয়া ডাকিতে ডাকিতে গৃহে প্রবেশ করিতেন—হয় ত একটা খেলনা, নহে ত কিছু মিষ্টান্ন তাহাদের জন্য লইয়া আসিতেন; ছুটীর দিন তাহাদের সঙ্গে খেলা করিতেন—তাহাদিগকে গুল শুনাইতেন। মার স্নেহ অপরিসীম। যে দিন সে স্কুল হইতে পুরস্কার আনিতে যাইত, সে তাহার কত অনিন ; সাজ সজ্জার অভাব—কিন্তু যাহা ছিল, তাহাই দিয়া তিনি তাহাকে সাজাইয়া দিতেন - চুলটি কেমন আঁচড়াইয়া বাঁধিলে ভাল দেখাইবে, কত বার মাথাটি ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিতেন;-কপালে একটি খয়েরের টীপ দিবেন কি না,

চোরাবালি
তাহাই কতবার ভাবিতেন-ইত্যাদি । কেহ তাহার রূপের
প্রশংসা করিলে তাহার আনন্দ যেন চোখে মুখে ফুটিয়া বাহির
হইত। এমন কি, তাহাকে রাগাইবার জন্য মােহিত যদি কখনও
বিদ্রুপ করিয়া তাহার নিন্দা করিত, তাহাও মার সহ্য হইত না-
তঁাহার চক্ষু জলে ভরিয়া আসিত। কতবার সে-ই মাকে
বলিয়াছে—“ওমা, বাবা যে ঠাট্টা করেন—তুমি বুঝ না?” আর
পিসীম। পিসীমার কোলেই তাহারা পালিত। বিধবা পিসীমা
তাহাদিগকে লইয়াই থাকিতেন । যদি কোন রূপে তাহাদের
একটুকু অযত্ন হইত, পিসীমা তাহা সহ করিতে পারিতেন না—
মাকেও বকিতেন। মার অপেক্ষা পিসীমার আর যত্নই অধিক
ছিল। সেই বাবা, মা, পিসীমা—তাহারা কেমন করিয়া তাহাকে
ভুলিলেন ? শ্বশুরবাড়ীতে—যখন চেষ্টা করিয়াও সে তাহাদের
সঙ্গে দেখা করিতে পারিত না, তখন কতবার তাহার মনে হইয়াছে,
তাঁহার কি তাহাকে এমন করিয়া বিদায় করিয়া দিয়াই সুখী
হইয়াছেন? তখন সে আপনাকে আপনি বুঝাইয়াছে, সে সুখী
হইবে, এই আশায় তাহারা আপনারা অসুখ ভােগ করিয়াছেন।
কিন্তু আজ আজ কি বার স্নেহ-মার ও পিসীমার ভালবাসা
—সে সব বিলুপ্ত হইয়া গেল ? কেন ? সংসারে থাকিয়া সে
নরকভােগ করিতেছিল, সে ভাল ছিল ; আর সে সেই ন~-তাগ
করিয়া আসিয়াছে বলিয়াই সে অপরাধী! তাহার কি অপরাধ ?
তাহার ভাইভগিনী-সে শ্বশুরবাড়ী যাইবার সময় তাহারা কত
কাদিত! তাহারাও কি দিদিকে ভুলিয়াছে—বাবা, মা, পিসীমা

সােনা-বালি
কি তাহাদির বুঝাইয়াছেন, দিদি আর তাহাদের দিদি নাই ।
প্রভাতনলিনীর চক্ষু অপূর্ণ হইয়া আসিল।
দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া সে চক্ষু মুছিল, তাহার পর এক জন
শিক্ষয়িত্ৰী পাঠাইবার জন্য স্কুলে পত্র লিখিল ।
দুই দিন পরে স্কুল হতে এক জন শিক্ষয়িত্ৰী আসিলেন। তিনি
প্রথমেই জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার অভিভাবক কে ?” সে
বলিল, সে-ই তাহার অভিভাবক। শুনিয়া তিনি সন্দেহপূর্ণদৃষ্টিতে
প্রভাত-নলিনীর দিকে চাহিলেন। তাহার পর তাহার বাপের
বাড়ীতে কে আছেন, শ্বশুর বাড়ীতে কে আছেন, সব জিজ্ঞাসা
করিলেন। বাপ আছেন—স্বামী আছেন, নথচ সে একা-এ
কেমন ? তিনি নানা প্রশ্ন করিতে লাগিলেন।
শেষে বলিয়া
গেলেন, তিনি “বড় মেম”কে জিজ্ঞাসা করি। তাহাকে উত্তর
দিবেন ।
পর দিন “বড় মেম” সেই শিক্ষয়িত্রীর সঙ্গে আসিলেন। তাঁহার
প্রশ্নের ধারায় ও কথায় প্রভাত-নলিনীর হাসি পাইল।
সেও
তাহার সঙ্গে রঙ্গ করিতে লাগিল। তিনি/জিজ্ঞাসা করিলেন--
“টোমার স্বামী আছেন-বাপ আছে টুমি একা থাকে, এ
কেমন ?, টোমাদের দেশেটোও মেয়েরা এমন ঠাকে না।”
নলিনী বলিল, “স্বামীর বাড়ী আমার ভাল লাগে না।”
“সে কেমন কঠা ?”
“কেন এমন কি হয় না?”
হইলে টুমি বাপের বাড়ী যাও নাই কেন?”

চোরাবালি
স্বামীর বাড়ী ছেড়ে এসেছি ; বাপ তাই নিয়ে যান না।”
“ছাড়িয়া আসিয়াছ ! সে টে। ভাল কাজ কর নাই।”
“তা’র আর উপায় নেই।”
এখন টুমি কি করিতেছ?”
“করবার কিছু পাই না, তাই ত পড়তে চাই। একদিন
থিয়েটার করেছি—ভাল লাগে না।”
“থিয়েটার করিয়াছ! কি সৰ্ব্বনাশ! বড় মন্দ কাজ করিয়াছ।
ট্ৰাণকৰ্ত্তা টোমার উপর ডয়া করুন। আমরা টোমাকে পড়াইতে
পারিব না।”
প্রভাতনলিনী আর হাসি চাপিতে পারিল না। “বড় মেম”
তাহাতে আরও চটিয়া গেলেন। তিনি বকিতে বকিতে চলিয়া
গেলেন।
যে “ত্রাণকৰ্ত্তা” পাপীর উদ্ধারের জন্য আপনাকে বলি
দিয়াছিলেন, তঁাহায় ধৰ্ম্মের যাহারা প্রচারক, তাহারা পাপীকে এত
ঘৃণা করে যে, নিস্পাপকেও পাপী সন্দেহ করিয়া তাহার সংস্পর্শ
ত্যাগ করে! যিশুখৃষ্ট কিন্তু পতিতা রমণীকেও ঘৃণা করেন নাই।
প্রভাতনলিনী আর ভাবিতে লাগিল, তাহার অপরাধ?
তাহার স্বামী সমাজের শত নিয়ম ভঙ্গ করিলেও, ধৰ্ম্ম ও নীতির সব
অনুশাসন পদদলিত কারলেও দোষ হয় না; আর সে দোষে
অপরাধী! যত নিয়ম কি স্ত্রীলােকের জন্য—পুরুষ সব নিয়মের
অতীত? মিশনারী স্কুলের শিক্ষয়িত্রীরা তাহাকে পড়াইবেন না।
ভাল। সে পড়িবেই। সে মনকে দৃঢ় করিল–পড়িবেই।

গো-বালি :
মহিলা-শিক্ষক না পায়, পুরুষ শিক্ষকের অভাব হইবে না। সে
যদি আপনাকে আপনি বিশ্বাস করে, তবে তাহাতে ভয় কি ?
নিন্দা ? নিন্দা ত তাহার অঙ্গের ভূষণ হইয়াছে। যে, নিন্দার
কোনও কাজ না করিয়াও নিন্দাভাজন হইয়াছে, তাহার আবার
নিন্দাকে ভয় !
মনে ততটা দৃঢ়তা না থাকিলে সে কখনই
সমাজের সংস্কার ভাঙ্গিয়া গৃহ ত্যাগ করিয়া আসিতে পারি না।
সে সঙ্কল্প স্থির করিল।
৩৭

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
L
কার্তিকের শেষ-সকালে ও সন্ধ্যায় একটু শীতানুভব হয়,
মধ্যাহ্নে গরম কাপড় গাত্রে সহে না। ঋতু-পরিবর্তনের সময়
—একটু অসাবধান হইলেই সর্দি কাশি হয়। তাই সেকালে
লােক বলিত, কার্তিক মাসে যমের চার দরজা খােলা। সন্ধ্যা
হয় হয়, এমন সময় কলিকাতার হেদুয়া পুষ্করিণীর বাগানে অনেক
লােকের সমাগম হয়। তাহার মধ্যে সব বয়সের লােকই
থাকেন। একটা সেডের নিম্নে এত বৃদ্ধের সমাগম হয় যে,
এক জন একদিন রহস্য করিয়া বলিয়াছিলেন, “হেদুয়া কি যমের
জুরিশডিকশনের বাহিরে যে, বৃদ্ধেরা এখানে নির্ভয়ে থাকেন?”
অনেক যুবক এই সময় বাগানে আইসে-গল্প গুজব করে।
দুই জন যুবক দক্ষিসের দ্বারপথে বাগানে প্রবেশ করিল।
এক জন সবল যুবক—এবার বি, এ, পরীক্ষায় ইংরাজী সাহিত্যে
সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়া এম, এ,
আর এক জন তাহার সহপাঠী ছিল—একবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
হইতে না পারিয়া পিছাইয়া পড়িয়াছে, নাম--সুহৃদ।
একই মেসে থাকে । উভয়ে পুষ্করিণীর বেষ্টনপথে একবার
ও আইন পft
উভয়ে
.
৩৮

চেন্না-বালি :
'।
ঘুরিয়া আসিল-কোথাও বেঞ্চে বসিবার স্থান পাইল না।
তখন সুস্থ চট করিয়া গায় জড়ান টুসের চাদরখানা খুলিয়া
এক জায়গায় ঘাসের উপর পাতিয়া ফেলিল ; বলিল, “বসা
যাক।”
সরলকৃষ্ণ তিরস্কারপূর্ণদৃষ্টিতে সুহৃদের দিকে চাহিয়া বলিল,
করলে কি ?”
.সরল হাসিল, “ওতে দোষ নেই ; চাদরখানা সাত বছর আগে
আঠা) টাকায় কেনা ; পােকায় কেটে যেটুকু অবশিষ্ট আছে,
সেটুকু অবশ্যই পেন্স পাবার যােগ্য। ওর উপর দরদ করবার
কোনও কারণ নেই।”
“কারণ যথেষ্ট আছে—যেহেতু ভাল করে ব্যবহার করলে।
এখানা এখনও অনেকদিন চলতে পারে।”
“অত হিসেব করা আমার কোষ্ঠীতে লেখেনি।
হিসেবী হ’ব, তবে আমিও বি, এ, তে সবার উপরে হতে
পারতাম।”
“তা যে হওনি, সে জন্য দায়ী তুমি। কিন্তু কেবল চাদরখানা
মাটীতে পাতাই দোষ নয়। আমি কি পাবার জন্য তােমাকে
গরম চাদর গায় দিয়ে আসতে বলেছিণাম? চট করে ঠাণ্ডা লেগে
কে ত সর্দিতে ভুগছে।”
লেখা-ক—গে”—বলিয়া সুহৃদ চাদরের উপর বসিয়া পড়িল।
অগত্যা সরলও বসিল। বসিয়াই সে বলিল, “তুমি কি মনে কর,
মনে অনুভব না করলে কেউ ভাল অভিনয় কর্তে পারে ?”
অত যদি
}

চোরা-নালি
সুহৃদ বলিল, “অভিনয়-অভিনয়-অর্থাৎ নকল—সেটা
আসল নয়।”
“কিন্তু যেটা নকল—সেটা যে আসলেরই নকল ; কল যদি
ভাল না হয়, তবে সে নকলই হয় না।”
“এসব মন:ত্বর কথা—কেতাবেই শােভা পায়। আসলে
ও কিছু নয়। অভিনেতারা ও অভিনেত্রীরা যার যার ‘পার্ট’
কতকটা মুখস্থ করে আসে, বাকীটা প্রপটিং-এর উপর নির্ব
করে। কোন রকমে পালা শেষ করে যেতে পারলেই বা
বাড়ী গিয়ে রং ধুয়ে মনে করে, যা হােক দিন গুজরান হ’ল।”
“আচ্ছা—ধর, এই যে সেদিন একটি মেয়ে দলনী বেগমের
অংশ অভিনয় করলে, ওর কথা কি বল ?”
“সব সমান।”
“কিন্তু লক্ষ্য করেছিলে কি, শেষ দৃশ্যে বিষ পান করবার
আগে ওর চোখে সত্যি সত্যি জল এসেছিল ?
“চোখে ধূলাে পড়ে থাকবে বা রং গিয়ে থাকবে।”
“আচ্ছা চল,--অমরাবুকে জিজ্ঞাসা করবাে।”
অমরবাবু বাঙ্গালা প্রঙ্গালয়ে প্রসিদ্ধ লােক। তিনি স্বয়ং
কলিকাতার কোনও সম্রান্ত পরিবারের সন্তান-যৌবনেই রঙ্গালয়ে
আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। তিনি রঙ্গালয়ের অন্যতম স্বত্বাধিকারী,
নাট্যকার, অভিনেতা ও কাৰ্যাধ্যক্ষ। তাহার বাড়ীর ছে
একটা মেসে সরলকৃষ্ণ কিছুদিন ছিল। সেই সময় অমরবাবুর
সঙ্গে তাহার পরিচয়—সে সময় সময় তাহার সঙ্গে সেক্সপীয়রের,
৪০

চেন্না-বালি , মার্লোর, কালিদসের, অস্কার ওয়াইল্ডের নাটকের আলোচনা করিত—বাঙ্গালা নাটকের ও রঙ্গালয়ের সমালােচনা করিত। তদবধি তাহার সঙ্গে অমরবাবুর পরিচয় অক্ষুন্ন আছে। সরলকৃষ্ণ যে কাজটা করিবে, স্থির করিত, টো না করা। পৰ্য্যন্ত যেন স্থির হইতে পারি না। সুহৃদ সে কথা লইয়া তাহাকে ঠাট্টা করিলে সে বলিত, “জানই ত, যে কাজটা করবার উপ্রয়, সেটা ভাল করে করবারই উপযুক্ত। কাজ যদি কর, ভাল করই করবে, বেগারঠেলা করে কখনও কাজ করতে নেই। তা’তে (কাজও ভাল হয় না, যে কাজ করে--তা’রও ভাল হয় ।” সুহৃঊত্তরে হাসিয়া বলিত, “সে ত আমি হাড়ে হাড়েই বুঝি, এই দেখ না—ভাল করে পড়িনে বলে পড়াও ভাল হয় না— আমারও ভাল হয় না, যেহেতু আমি ‘ফেল’ হই। কিন্তু স্বভাব-- জানই ত, স্বভাব যায় মলে।” পরদিন সরলকৃষ্ণ সুহৃদকে সঙ্গে লইয়া অমর বাবুর কাছে গেল। অভিনেতারা অভিনয়কালে অভিনীত চরিত্র আপনার অনুভব করে কি না, সে বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইবার জন্য সুহৃদের মােটেই মাথাব্যথা ছিল না ; কথাটা উঠিয়াছিল বলিয়াই সে তাহার আলােচনা করিয়াছিল। কাজেই অমর র কুছে যাইবার জন্য তাহার আগ্রহ ছিল না। কিন্তু সরল- কৃষ্ণের পাল্লায় পড়িয়া তাহাকেও যাইতে হইল। অমর বাবু তখন রঙ্গালয়ে ছিলেন। রঙ্গালয়ের উঠানে একটা বাতাবী লেবুর গাছ ছিল ; তাহাতে একটা বিনােনিয়া লতা ; ৪১, -দলি তুলিয়া দেওয়া হইয়াছিল—সেটায় গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল ফুটিয়াছিল। সেই গাছের তলে বৃত্তাকারে আসন। সেই আসনে বসিয়া অমর বাবু আলবােলায় অম্বুরী তামাকের ধুম সেবন করিতেছিলেন, এবং বড়দিনের সময় কি নূতন প্রহসনের অভিনয় হইবে, সে বিষয়ে আপনর সহকারীদিগের সহিত পরামর্শ করিতেছেন। যে চিত্রকর রঙ্গালয়ের চিত্রপট অঙ্কিত করেন, তিনিও উপস্থিত ছিলেন—কি কি পট আঁকিতে হইবে, তাহা জানিয়া লইতে- ছিলেন। কলিকাতার ধনীর বৈঠকখানার একখানা চিত্র আঁকতে হইবে। তাহাতে বাতি বসান ঝাড় থাকিবে, কি গ্যাসের 'ল্যাম্প থাকিবে, তাহা লইয়া যখন তর্ক চলিতেছিল, তখন সুহৃদকে * লইয়া সরলকৃষ্ণ তথায় উপস্থিত হইয়া অমর বাবুকে নমস্কার করিল। প্রতি নমস্কার করিয়া অমর বাবু বলিলেন, “এই যে বাবাজী, ভাল ত ? লেখাপড়া হচ্ছে ভাল ?” সরল কৃষ্ণ বলিল, “মন্দ নয়।” “আচ্ছা, বাবাজী, তুমিই বল দেখি, হালের বড়মানুষের বৈঠক- খানায় বাতি বসান বড় দেওয়া যায়, কি গ্যাসের ল্যাম্প দেওয়া যায়?” “মাঝামাঝি রকমে গ্যাসের ঝাড় দিলেই ত হয়।” “বেশ বলেছ—বেশ। একেই বলে, ‘এদিক ওদিক ছুষ্টি । রেখে চুমুক দিলে দুধের বাটি। এ নইলে বিদ্যা! বিদ্বামৈ সব গুণ।” তিনি চিত্রকরকে বলিলেন, “শুলেন ত, গ্যাসের ঝাড় দিও।” #* * ৪২

চেন্না-বালি,
তাহার পর তিনি সলকৃষ্ণকে বলিলেন, “তার পর বাবাজী
কি মনে করে ?”
সরল ফুলিল, “আমার এই বন্ধুর সঙ্গে আমার তর্ক হয়েছি।”
“বন্ধু বলতে আমরা বুঝতাম—আপদে বিপ! সহায়, সুখে
-দুঃথে অংশী--তখন বন্ধুত্ব পারিবারিক সম্বন্ধে পরিণত হ’-
পুরুষানুক্রমে তার জের চত। এখন তােমাদের বন্ধু—বিলাতী
•এসেগু’—কেবল, দেখা হলে, “হাউডু ইউডু। বাস্। তর্ক কি
নিয়ে?”
অভিনেতারা যে অংশ অভিনয় করে, সেই অংশের অনুভূতি
তাদের সম্মক না,? অথাৎ, যে যে চরিত্রের অভিনয় করে,
সে আপনাকে সেই লােকই মনে করি কি না?”
“করাই হল আসল অভিনেতার নৈপুণ। কিন্তু আমাদের
অভিনেতারা যে তা করে না, তা তাদের অভিনয় দেখলেই বেশ
বুঝা যায়। করলে ত আমরা বেঁচে যাই।”
“আচ্ছা ধরুন, সেদিন যে মেয়েটি দলনী বেগম সেজেছিল,
শেষ দৃশ্যে যে তার চোখে জল এসেছিল, সে কেও ?”
“তা’ জানবার যদি ইচ্ছা কর, তাকেই জিজ্ঞাসা করতে
পার।”
রকৃষ্ণ বিস্মিতভাবে অমর বাবুর দিকে চাহিল।
ঘর বাবু বলিলেন, “সেদিন দর্শকের ভিড় দেখে আমাদের
লােভ হয়েছিল ; তাই যদি সে আর একদিন দলনী বেগম সাজে,
সে জন্য তাকে রাজি করতে আমি আজও তার কাছে গিয়ে
।
;
৪৩

না-বালি
ছিলাম।
সে সম্মত হ’ল না।
কেন সে একদিন-ঘেঁচে এসেছিল,
তাও বুঝতে পারলাম না। সে এখন ইংরাজী সাহিত্য পড়তে
চায়-বলে, এক জন ভাল শিক্ষক খুজে দিন। তুমি পড়
মাহিনা মােটাই দিবে।”
সরলকৃষ্ণ ভাবতে লাগিল।
অমর বাবু বলিলেন, “কিন্তু বাবাজী, বুঝে উত্তর দিও। ও
চোরা বালি--একবার পা একটু আটকালেই একেবারে অত।
সর্বদা ভয় ।”
ভয়! সরলকৃষ্ণের সঙ্কল্প-স্থির হইয়া গেল। সে বলিল, “আমি
পড়াতে রাজি আছি।”
অমর বাবু বলিলেন, “তবে তুমি কাল সকালে আমার কাছে
এলে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব। আমার সকাল কিন্তু
বেলা নটা, সেটা ভুলো না।”
“আচ্ছ,” বলিয়া—অমর বাবুকে নমস্কার করিয়া সরুলকৃষ্ণ
বিদায় হইল ।
• মেসে ফিরিবার পথ সুহৃদ বলিল, “সরল, এ কাজটা কি
ভাল করলেন ?”
সরল বলিল, “কোন্ কাজটা ?”
“এই চোরা বালিতে পা দেওয়া।
“তােমরা বে কাজটা ভাল বলবে না, তা আমি জানিন্তু
আমারও টাকার দরকার, আর ভয়ও আমার নেই। বরং আমার
মনে হয়, পরীক্ষা করে দেখলে আপনার ক্ষমতাটা বুঝা যাষ।”
৪৪.

৮ ।
চেন্না-বালি
“কিন্তু যেখানে ভয়ের ভয় আছে, সেখানে না হয় পরীক্ষাটা
নাই করলে। অনেক বড়লােকও প্রলােভনের পিছল পথে পড়ে
গেছেন। সে কথা তুমি জান।”
“জানি বটে; কিন্তু দেখা যাক।”
সুহৃদ আর কোনও কথা বলিল না—সে সরলকৃষ্ণকে বিশেষ
চিনিত ; প্রতিবাদে তাহার সঙ্কল্প দৃঢ় হইবার সম্ভাবনা যে অধিক,
: হা সে সুমিত। সে মনে করিল, পরে সময়মত আর একবার
তাকে বুঝাইবার চেষ্টা করিবে।
সবলকৃষ্ণ পল্লীগ্রামের লােক। যে গ্রামে তাহার বাড়ী, যে
গ্রামখানা তীর পুৰ্বপুরুষদিগের গাতি জমা ছিল, এবং সে অঞ্চলে
তাহাদের নাম সৰ্বজনবিদিত। ক্রমে অবস্থাহীন হইয়া আসিয়াছে।
গ্রামের গাতি জমা এখনও তাহার পিতার সম্পত্তি বটে, কিন্তু তাহা
বন্ধক পড়িয়াছে—“উৎরাইবার সম্ভাবনা অল্প ; কারণ সুদে আসলে
টাকাটা বাড়িয়াই চলিয়াছে, এবং মহাজনও গ্রামস্থ বলিয়া সম্পত্তির
লােভে জোর তাগাদা করেন না—একেবাৰে জড়াইয়া জাল
গুটাইয়া তুলিবেন। সম্পত্তি ফিরাইয়া লইবার আশার মধ্যে
কেবল সরলকৃষ্ণ। তাহার দুই দাদা কেহই লিখাপড়ায় অধিক
দূর অগ্রসর হইতে পারেন নাই; এক জন ডাকঘরে ও অন্য জন
সদালতে চাকরী করেন ; উভয়েরই বেতন অতি অল্প ।
সরলকৃষ্ণ ধারাল ছেলে—পরীক্ষায় বরাবরই বৃত্তি পাইয়াছে।
qাই পিতামাতা মনে করিতেছেন, সে “মানুষ” হইলে দুঃখ ঘুচিবে ।
সyঅনুসরণ করিয়া লক্ষ্মীর সেই পরিত্যক্ত গৃহে প্রত্যা-
;
-..
৪৫

চোরাবালি বর্তনের আর একটু সম্ভাবনাও দেখা দিয়াছিল। শরৎবাবু পাশের গ্রামের লােক, তিনি মুন্সেফ হইতে সরওয়ালা হইয়াছেন। তাহার কনিষ্ঠা কন্যার সঙ্গে তিনি সরলকৃষ্ণের বিবাহের প্রস্তাব করিয়াছেন। মেয়েটি রূপে একটু “মাটো” এবং মাথায় একটু খাটো হইলেও বাপ মা’র বড় আদরের। শরৎবাবু অপেক্ষাকৃত অধিক বয়সে বিপত্নীক হইয়া পুনরায় বিবাহ করিয়াছেন, এবং সে বিবাহের একমাত্র সন্তান-প্রমীলা। তাহার ন্য শরৎব 'লাল পা এর সন্ধান করিতেছিলেন। তিনি একদিন বলিয়াছিলেন, তিনি (তাহার বিবাহে তিন চার হাজার টাকা খরচ করিবেন! শুনি গৃহিণী বলিয়াছিলেন, “তবেই হয়েছে। তিন চার হাজার টাকায় ভাল সম্বন্ধ । সে ছিল তােমাদের যুবা বয়সে। তুমি তােমার বড় ছেলের বিয়ে দিয়ে কত টাকা পেয়েছ ?” বড় ছেলেটি যখন বি,এ, পড়ে, তখনই তাহার বিবাহ দিয়া শরৎবাবু বধূর সঙ্গে সঙ্গে নগদে ও গহনায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা ঘরে তুলিয়াছিলেন। তিনি গৃহিণীর কাছে হার নিলেন ; সৰ্ব্বদাই মানিয়া থাকেন। তিনি বলিলেন, “না হয় পাঁচ হাজারই দেওয়া যাইবে।” গৃহিণী বলিলেন, “তাতেও হবে না। তা যদি তুমি না-ই পার, তুমি যা পারবে, তাই দিও; আমার গহনা আমি সব প্রমীলাকে দেব। আমার এখন দু’হাতে দুগাছা মােটা বালা থাকলেই হল— হড়ী থাকলেও চলে।” সেতারের তার যখন বাঁধা থাকে, তখন তাহাতে ঝঙ্কার ভাল রকম বাজিয়া উঠে। গৃহিণীর বিরক্তির ভয়ে কৰ্ত্তার মনের তার বাঁধাই থাকিত, তাই গৃহিণীর এই কথা?vামলের ৪৬

চোরাবালি
ঝঙ্কার তাহাতে ঝন্‌ ঝন্ করিয়া বাজিয়া উঠিল। কৰ্ত্তা বলিলেন,
“সে জন্য তুমি ভেবাে না; যে পাত্র পসন্দ হবে, তার জন্য যত
খরচ করতে হয়, আমি করব।”
তেহয়,
তাহার পর প্রমীলার জন্য পাত্রের সন্ধান চলিতে লাগিল ;
দেশে ও বিদেশে ছেলে খোঁজা হইতে লাগিল। শরৎবাবুর এক
খুড়া তাহার কাছে সরল কৃষ্ণের কথা উত্থাপিত করিলেন। বেশ
Fল। জানা ঘর। তবে পয়সা নাই। কৰ্ত্তা “ভেবে দেখি
বলিয়া গৃহিণীর সঙ্গে পরামর্শ করিবার সময় লইলেন।
গৃহিণী সব শুনিলেন। বললেন, “খুঁতের মধ্যে, পয়সা নেই।
তা না থাকুক,--ও ছেলে পয়সা রােজগার করতে পারবে।”
শরৎবাবু আপনি প্রতিভাবলে দারিদ্র্য হইতে ধনী হইয়াছেন।
সেই জন্য বিদ্যার উপর গৃহিণীর বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। তিনি জিজ্ঞাসা
করিলেন, “একেবারে চাল চুলাে নেই, এমন হবে না ত?” কৰ্ত্তা
বলিলেন, “বাড়ী ঘর ভাল-~~গ্রামের গাঁতিটি ও লাভের ; তবে
বন্ধক পড়িয়াছে। নহিলে ভাত কাপড়ের সংস্থান ভালইক্ষহ .
গৃহিণী একবার ছেলেটিকে দেখিতে চাহিলেন ?
কৰ্মা পূজার ছুটীতে বাড়ীতে আসিয়া একদিন সরল কৃষ্ণের
পিতার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন, এবং বিবাহের প্রস্তাব করিলেন।
বিবাহেরু বাজারে ছেলের যে দর হইয়াছে, তাহা সরল কৃষ্ণের পিতা
বিহারীলাল জানিতেন। তিনিও একটু দরের কথায় আভাস
দিলেন। শরৎবাবু বলিলেন, “সে জন্য ভাবনা নেই—মেয়ে
জামাইকে,
মত দিতে হয়, তা আমার অজানা নেই।” দুইজনেই
৪৭

রাে-বালি ঝাঁকে ঝাঁকে কথা কহিতে লাগিলেম—পূরা দর ও পাকা কথা বলিলেন, “মেয়েকে যা’ দিবার দিবেন-ছেলেকে যা’ দিবার নগদে দিতে হবে; সেই টাকায় আমি গ্রামের জমা ছাড়িয়ে নেব।” শরৎবাবু পাকা কথা দিবার পূর্বে গৃহিণীর সঙ্গে পরামর্শ করিয়া পরে বলিলেন, “আমিই জমা ছাড়িয়ে দেব ; কিন্তু জমাটা আমার জামায়ের নামে দিতে হবে। তাতে যদি কিছু বেশী লাগে, আমি তাও দিতে প্রস্তুত।” বিহারীলালের এই প্রস্তাবে যতটা আপত্তি ছিল, সরলকৃষ্ণের তদপেক্ষা অনেক অধিক আপত্তি ছিল। এই প্রস্তাব শুনিয়া সে একেবারে বাঁকিয়া বসিল –সে কিছুতেই এ নির্বাহ করিবে না। বিহারীলাল সে কথা শরৎবাবুকে জানাইলে। এই সময় শরৎবাবুর গৃহিণী জগদ্ধাত্রী পূজার আয়ােজন করিলেন। তিনি আপনি আসিয়া বিহারীবাবুকে নিমন্ত্রণ করিয়া গেলেন, এবং গােপনে জানাইয়া গেলেন, এই সুযােগে গৃহিণী * এক বার সরস্ককে দেখিতে চাহেন। বিহারীলাল পুত্রকে চিনিতেন, প্রথমে তাহাকে কোনও কথা জানাইলেন না-আপনিই নিমন্ত্রণরক্ষা করিতে যাইবেন, বছিলেন। এদিকে দুর্গা পূজার ছুটী ফুরাইলে বড় দুই ছেলে চাকরীতে চলিয়া গেল-বাড়ীতে থাকিবার মধ্যে তিনি আর সরলকৃষ্ণ । নিমন্ত্রণে যাইবার দিন সক্ৰলে, উঠি তিনি বলিলেন, তাহার শরীর ভাল নাই, শরৎবাবু আপনি যখন নিমন্ত্রণ করিতে আসিয়াছিলেন, তখন যাইতেই হয় । সরল যায়, তবেই. তিনি অসুস্থশরীরে যাইবার- দায় হইতে এক যদি ৪

চোরাবালি
অব্যাহতি লাভ করেন। সরলকৃষ্ণ পিতার উদ্দেশ্য যে বুঝিল না,
এমন নহে; কিন্তু কৰ্ত্তব্যবুদ্ধিবশে আপনি যাইতে সম্মত হইল।
শরৎ বাবুর গৃহিণী ছেলে দেখিলেন। ছেলে দেখিয়া তিনি
বলিলেন, “যৈন কার্ত্তিক। যেমন রূপ, তেমনিই গুণ। আমি
ঐ ছেলেই জামাই করব।”
কর্তা বলিলেন, “তা’ ত করবে, কিন্তু বরকে যে টাকা দেব,
তাতে যদি সম্পত্তি ছাড়ান হয়, তবে ত তা’তে কয় ভাইয়েরই
"সমান অংশ হবে ?
“তা হ’কগে। তুমি বুঝ না, তাতে আমার মেয়ের আদর
বাড়বে; কারণ, বাড়ীর সকলেই ত মনে মনে জানবে, তার
টাকাতেই নিশ্চিন্ত হয়, ভাত খাচ্ছে।”
“তা তুমি বুঝে দেখ।”
দেখেছি গাে দেখেছি। আজকালকার ছেলেদের ত তুমি চেম
। এখন ঐ ভাব দেখিয়ে দিলে, এর পর যখন নিজে
রােজগার করবে, তখন যদি সে টাকার সিকি পণ্ডিভাইসেল
দেয়, তাতেও কেউ কোনও কথা বলতে পারবে না। গােড়ার
এই কথাটাই লােক জানবে।”
তাহার পর কর্তা বিহারী বাবুকে জানাইলেন, “তিনি জামাইকে
টাকা দেবেন—সে টাকা কিসে খরচ করা হবে সে কথা তিনি
জাতে চান না। তিনি টাকা দিয়েই খালাস।”
সুতরাং কথার কিছু অবশিষ্ট রহিল না।
বিহার সব কথা ছেলেকে বলিলেন। ছেলে বলিল, “ও
৪৯

চোরাবালি
কথা আমায় জিজ্ঞাসা করেন কেন? আপনি যা বলবেন,
তাই হবে। তবে আমার একটা কথা—আমি এম, এ, পাশ
করবার আগে বিয়ে করব না।” বিহারী বাবু বলিলেন, “আমি
পাকা কথা দিতে পারি ত?” ছেলে বলিল, “আপনি যে কথা
বলবেন, তাই পাকা।
প্রস্তাব শুনিয়া শরৎ বাবুর গৃহিণী বলিলেন, “দেখলে ত?
আপনি রােজগার করতে আরম্ভ করে-~-যখন বৌ নিয়ে যেতে
পারবে, তখন বিয়ে করবে। বৌকে বৌগাদায় রেখে যাবে না।
এই ত বুদ্ধিমানের কথা। তুমি কথা পাকা করে রাখ।”
তাহাই হইল। দুই পক্ষেই কথা পাকা হইয়া গেল-শরৎ বাবু
মেয়ের বিবাহের ভাবনার দায় হইতে এবং বিহারী বাবু দেনার
ভাবনার দায় হইতে অব্যাহতি লাভ করিলেন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। প্রথম দিন অমর বাবু যখন সরলকৃষ্ণকে সঙ্গে করিয়া প্রভাত- নলিনীর গৃহে উপস্থিত হইলেন, তখন সরল একবার ভাবিল, “কোনও অন্যায় কাজ করিলাম না ত?” কিন্তু পরমুহূর্তেই তাহার সব সন্দেহ দূর হইয়া গেল। সে বহুবার আপনার মনে আপনি এ তর্ক তুলিয়া তাহার মীমাংসা করিয়াছিল। আবার সন্দেহ কেন? সে এই দৌর্বল্যের জন্য আপনাকে তিরস্কার করিল । অমর বাবু সংবাদ দিয়া প্রভাত-নলিনীর সঙ্গে দেখা করিতে গেলেন। সরল একা এক ঘরে বসিয়া রহিল ; বসিয়া ঘর দেখিতে লাগিল। ঘরে সজ্জার অভাব-প্রাচীরে চিত্র নাই, ঘরে আসবাব অতি অল্প। বিলাসের কোনও চিহ্ন কোথাও খাওয়া যায় । একটা আলমারীতে বাঙ্গালা বহি ; সবগুলা নূতন, ঝক ঝক করিতেছে। অল্পক্ষণ পরেই অমর বাবু আসিয়া সরলকে ডাকিয়া লইয়া গেলেন।একখানা টেবলের একদিকে একখানা চেয়ার-প্রভাত- নলিনী বসিয়া ছিল—সরল আসিলে উঠিয়া নমস্কার করিল, তাহার পরই লজ্জায় তাহার দৃষ্টি নত হইয়া পড়িল—যেন সে চেষ্টা করিয়াও মুখ তুলিতে পারিল না। অমর বাবু টেবলের অপর দিকে ৫৫ চেন্না-বালি - একখানা চেয়ায়ে আপনি বসিয়া সরলকে আর একখানায় বসিতে বলিলেন। প্রভাত-নলিনীও বসিল। . সরল দেখিল—রূপ বটে আবার রূপের নদীতে যৌবনের জোয়ার পূর্ণতা সঞ্চার করিয়াছে—জল কূলে কূলে ভরিয়া উঠিয়াছে ; দেহে যেন আর রূপ ধরে না। নয়নের দৃষ্টিতে—অঙ্গের সঞ্চালনে রূপ ও লাবণ্য যেন উথলিয়া উঠিতেছে। কোন কোন নদীর জল গভীরতাহেতু স্থির, প্রবাহের বেগ অপ্রখর ; আবার কোন কোন নদীর জল অগভীর-স্বচ্ছ বালুকাস্তৃত পথে উপলে উপলে যেমন নূপুর বাজাইয়া বহিয়া যায়-বিকরে জ্বলিতে থাকে। রূপও তেমনই দুই প্রকারের। এক প্রকার রূপে গাম্ভীৰ্য আছে, তা শ্রদ্ধা আকৃষ্ট করে। আর এক প্রকার উজ্জ্বলতাহা প্ৰশ আকৃষ্ট করে— তাহাতে হৃদয় শ্রদ্ধায় নত হয় না—প্রশংসায় পূর্ণ হয়। প্রভাত- নলিনীর রূপ শেষােক্ত প্রকারের। অমর বাবু প্রভাত-নলিনীকে বলিলেন “এখন তুমি কি পড়বে, ঠিক করেন। ততক্ষণে প্রভাত-নলিনী আপনার সঙ্কোচ জয় করিয়াছে। সে মুখ তুলিয়া বলিল, “আমি ইংরাজী পড়তে চাই।” প্রভাত-নলিনী অপরিচিতা যুবতী। তাহাকে “আপনি” বলিবে কি “তুমি” বলিবে, প্রথমে সরল তাহা স্থির করিয়া উঠিতে পারিল না ; তাই পাশ কাটাইয়া জিজ্ঞাসা করিল—“ইংরাজী কতটা পড়া হয়েছে ?” প্রভাত-নলিনী বলিল, “যা হয়েছিল, তাও বােধ হয় এতদিনে -

(চনা-বালি
৯
ভুলে গেছি ; কাজেই আপনাকে গােড়া থেকেই আরম্ভ করতে
হবে।”
“তবুও কতটা পড়া হয়েছিল ?”
“মিশনারী স্কুলে আমি প্রথম ভাগ “রয়েল রীডার’ পড়েছিলাম
সে অনেক দিন--বিয়ের আগে ।”
শেষের কথাটা বলিতে গিয়া প্রভাত-নলিনী যেন অন্যমনস্কা,
হইয়া গেল।
সরল লক্ষ্য করিতেছিল, সে কথায় যে স্বচ্ছন্দ
ভাব দেখাইতেছিল, সেটা কৃত্রিম। ঐ একটি কথায়--বিবাহের কথায়
সে ভাব আর রহিল না! কাজেই সামলাইয়া লইবার জন্য সে-ই
বলিল, “তাই হয়, বাঙ্গালীর মেয়ের লেখা পড়া বিয়ে হলেই শেষ
হয়। আবার কোন কোন বাড়ীতে ত বই হাতে করাও নিন্দার
কাজ।”
অমর বাবু বলিলেন, “নিন্দা প্রশংসার দাম যে কি, তা ঠিক
করাই দায়।”
সরল জিজ্ঞাসা করিল, “তা হলে কি খই আরম্ভ করা
যাবে ?”
অমর বাবু হাসিয়া বলিলেন, “তবেই তুমি মাষ্টারী করেছ ।
কি বই থেকে আরম্ভ করবে, তা ত তুমিই ঠিক করে নেবে।
যে ‘ক খল পড়তে পারে না, তাকে ত ‘বাত্ময় পড়ালে
চলবে না।”
“তবে প্রথমে প্রথম ভাগ ‘বুয়েল বীর’ এনেই দেখা যাক।”
“সেই ভাল।”

.
চোরাবালি
প্রভাত-নলিনী একখানা দশ টাকার নােট বাহির করিয়া দিল
--বই আবেন।”
সরল বলিল, “অত টাকা কি হবে ?
কি হবে ? এ থাক—আমি
বই আম্ব।”
সরল উঠিয়া পড়িল ।
অমর বাবু হাসিয়া কহিলেন, “বেশ মাষ্টার! কখন পড়াতে
আসবে, তাই যে ঠিক হ’ল না।”
সরল বলিল, “তাই ত ;
প্রভাত-নলিনী বলিল, “আপনার কখন সুবিধা হয় ?”
অমর বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার কলেজ কখন ?”
সরল বলিল, “বেলা তিনটার পর থেকেই আমার ফুরসৎ।”
প্রভাত-নলিনী বলিল, “আমার সারাদিনই ফুরসৎ—আপনি
তিনটার পরেই আসবেন।”
তাহাই স্থির হইল ।
--পরদিন দুহখানি পুস্তক কিনিয়া লইয়া যথাকালে সরল
প্রভাত-নলিনার বাড়ীতে উপস্থিত হইল। সে মনকে বেশ দৃঢ়
করিয়া আসিয়াছিল—তাহাকে শিক্ষকোচিত গাম্ভীৰ্য্য অবলম্বন
করিতে হইবে । পূৰ্বদিন সে ছাত্রীকে “আপনি” বলিবে, কি
“তুমি” বলিবে, স্থির করিতে পারে নাই । আজ তাহা স্থির
করিয়াছিল—ছাত্রীকে “তুমিই” বলিতে হইবে। কেন না, সে
শিক্ষক, এবং তাহাকে শিক্ষকের গাম্ভীৰ্য্য রক্ষা করিয়া এ ছাত্রীকে
পড়াইতে হইবে। সে লােকের নিন্দা-প্রশংসায় কাপ দিক আর

E চোরাবালি দিক-নিজের মনের নিন্দা-প্রশংসার দিকে তাহার বিশেষ লক্ষ্য ছিল। পড়াইতে আরম্ভ করিয়াই সরল বেশ বুঝিতে পারিল, প্রভাত- নলিনী পড়া ভুলে নাই। যত দূর পড়িয়াছিল, মনে আছে, দুই চারি দিনেই সে বহিখানা শেষ করিতে পারিবে। হইলও তাহাই-কয় দিনের মধ্যেই বহি শেষ হইল। বাস্তবিক, প্রভাত-নলিনী তাহার অনন্ত অবসর কেবল পাঠেই ব্যয় করিত। তাহাতেই সে শান্তি পাইত। জীবনের একটা উদ্দেশ্য না থাকিলে মানুষ বাঁচিতে পারে না। এখন অধ্যয়নই সে তাহার জীবনের উদ্দেশ্য করিয়া তুলিল। বিশেষ সে এক বিষয়ের অধ্যয়নে আত্মনিয়ােগ করিয়াছিল ; প্রিয় ও অপ্রিয় প্রীতিকর ও অপ্রীতিকর কতকগুলি বিষয়ের আলােচনায় তাহাকে মন দিতে হইত না। কাজেই সে উন্নতির পথে অতি দ্রুত অগ্রসর হইতে লাগিল। এত অল্প দিনের মধ্যে যে লােক এতটা অগ্রসর হইতে পারে, না দেখিলে বিশ্ব- বিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র সরলকৃষ্ণ তাহা কল্পনাও করিতে পারি না। সরলকৃষ্ণ মনকে দৃঢ় করিয়া আসিয়াছিল, মূত্রীর সহিত ব্যবহারে সৰ্ব্বতােভাবে ঘনিষ্ঠতা পরিহার করিবে, শিক্ষক-ছাত্রীর সম্বন্ধের সীমারেখা হইতে বিন্দুমাত্র অগ্রসর হইবে না। কিন্তু সে দেখিল, সে বিষয়ে ছাত্রীর দৃঢ়তা শিক্ষকের দৃঢ়তাকেও পরাভূত করে। প্রভাত-নলিনীর ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ নিঃসঙ্কোচভাব ছিল ; কিন্তু তাহাতে ঘনিষ্ঠতার স্পর্শমাত্র হইতে পারে না। দেখিয়া সরলকৃষ্ণ অনেকটা নিশ্চিন্ত হইল। যে সৈনিককে সর্বদা শত্রুর * চোরাবালি আগমন শঙ্কা করিয়া সতর্ক থাকিতে হয়, তাহার অবস্থা প্রলােভনীয় নহে ; প্রতি দিন উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা সহ করিয়া তাহার স্নায়ু দুল হয় -সে শ্রান্ত হইয়া পড়ে। কিন্তু যে সৈনিক জানে, শত্রুর আগমন- সম্ভাবনা নাই, সে নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে। এই নিশ্চিন্তভাবের উদ্ভবে সরলকৃষ্ণের শিখাইবার প্রণালীও আড়ষ্টভাব হইতে অব্যাহতি পাইল। ফলে—প্রভাত-নলিনীর অধ্যয়নও দ্রুততর অগ্রসর হইতে “লাগিল ; কেন না, অধ্যাপনাগুণে শিক্ষার বিষয় সরস হইয়া উঠিত এইরূপে মাসাধিক কাল কাটিয়া গেল, এবং এই সময়ের মধ্যে প্রভাত-নলিনী অধ্যয়নে এতটা অগ্রসর হইল যে, সবলকৃষ্ণ তাহাকে একখানা ইংরাজী কবিতা-পুস্তক পড়াইবার আয়ােজন করিল। এই সময় একদিন একটি অতর্কিত ঘটনা ঘটিল। সরলকৃষ্ণ পড়াইতেছে, এমন সময় ভৃত্য প্রভাত-নলিনীর নামে একখানা পত্র লইয়া আসিল—রসিদ-বহিতে সহি দিতে বলিল। প্রভাত-নলিনী আর স্থৈর্য রক্ষা করিতে পারিল না। তাহার পত্র! তবে কি বাবা পত্র লিখিয়াছেন? নামা বাবাকেও গােপন করিয়া পত্র পাঠাইয়াছেন? কে পত্ৰ আনি? সে ব্যস্ত হইয়া সরলকে জিজ্ঞাসা করিল, “কোথায় সই দিতে হয় ?” সরল স্থানটা দেখাইয়া দিলে সে তাড়াতাড়ি সহি করিয়া পত্ৰখানা খুলিয়া ফেলিল—দেখিল, ইংরাজী পত্র। পত্রখানা সরলকে দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কে লিখেছে ?” সরল দেখিয়া বলিল, “এ উকীল-বাড়ীর চিঠি।” “উকীল-বাড়ীর ?” “হ। তাই” বা.

চোরাবালি
“কি লিখেছে ?”
সরল চিঠিখানা পড়িয়া বলিল, “মৃত দুলালচন্দ্র চৌধুরীর ত্যক্ত
সম্পত্তি পাইবার জন্য তাহার জ্ঞাতি ভাতা কমলকুমার চৌধুরী,
দিগর আদালতে দরখাস্ত করিয়াছেন। কেন না,
সরল আর পড়িতে পারিল না, পড়িতে সঙ্কোচ বােধ করিল।
সে চাহিয়া দেখিল, প্রভাত-নলিনীর মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল।
সংবাদ এমনই অতর্কিত ।
দুলালচন্দ্রের মৃত্যুসংবাদ যে প্রভাত-নলিনী জানিত না, তাহা
সরলচন্দ্র জানিত না। সে সংবাদ সহরে রাষ্ট হইয়া গিয়াছিল।
যে দিন প্রভাত-নলিনী রঙ্গালয়ে অভিনয় করে, সেই দিন হইতে
সব ভাবনা ডুবাইবার জন্য দুলাল অনবরত মদ্য পান করিতে
থাকে ; ফলে সাত দিনের দিন তাহার মৃত্যু হইয়াছে।
প্রভাত-নলিনী কিছুক্ষণ পাতরের মূর্তির মত স্থির হইয়া
বসিয়া রহিল। তাহার পর সরলকৃষ্ণের দিকে তাহার দৃষ্টি পড়িল ।
সে যেন বিদ্যুতের স্পর্শে চমকিয়া উঠিল--বলিল, “আজ আমি আর
পড়ব না।”
“আচ্ছা,”~-বলিয়া সরল উঠিল ।
তথন প্রভাত-নলিনী বলিল, “পত্রখানার তর্জমা যদি করে
দেন, বড় উপকার হয়।”
সরল বার বসিল, এবং কাগজ কলম লইয়া পত্রের তর্জম
করিয়া দিল
“মৃত দুলালচন্দ্র চৌধুরীর ত্যক্ত সম্পত্তি পাইবার জন্য তাহার

চোরাবালি তিভ্রাতা কমলকুমার চৌধুরীদিগর আদালতে দরখাস্ত করিয়া- ছেন। কেন না, উক্ত দুলালচন্দ্রের পত্নী শ্রীমতী প্রভাত-নলিনী জীবিত থাকিলেও কুলত্যাগ করায় স্বামীর ত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধি- কারিণী হইতে পারেন না। সম্পত্তি যদি দুলালচন্দ্রের মাতাতে বর্তায়, তবে তিনি জীবন স্বত্বাধিকারিণী হইলেও হইতে পারেন । তাহার সম্পত্তি দান বিক্রয়ের কোন ক্ষমতা থাকিবে না-থাকিতে পারে না। কমলকুমারদিগরের দরখাস্তে কাহারও আপত্তি থাকিলে তাহা অদ্য তারিখ হইতে এক মাসের মধ্যে দাখিল করিতে হইবে। নহিলে সে আপত্তি নামঞ্জুর হইবে।” টেবলের উপর দুইটা কাচের কাগজ-চাপা ছিল--তাহারই একটা লইয়া কাগজখানা চাপা দিয়া সরলকৃষ্ণ বিদায় লইল। সরলকৃষ্ণ বিদায় লইবার পরও কিছুক্ষণ প্রভাত-নগিনী নিশ্চল- ভাবে বসিয়া রহিল। সে মনে করিয়াছিল, সে তাহার অতীত জীবন হইতে আপনাকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করিয়াছে। আজ দেখিল, সে তাহার মিথ্যা অভিমান ; নহিলে এই সংবাদের আঘাতে সে এমন চঞ্চল হইল কেন? সে আপনার দৌৰ্বল্যে আপ’িহাসিল—তাহার পর উকীলবাড়ীর পত্রের তর্জমা পাঠ করিল। সম্পত্তি-অর্থ, উহাই ত যত অনর্থের মূল। উহাতেই সুখ হয় ভাবিয়া পিতামাতা দরিদ্রের কুটীর হইতে তাহাকে ধনীর প্রাসাদে দিয়া আসিয়াছিলেন। সেই সম্পত্তি—সেই অর্থ সে ত ত্যাগ করিয়াইপলাইয়া আসিয়াছে। তবুও তাহা আজ এ অবধি তাহাকে তাড়া করিয়া আসিয়াছে। পলাইয়াও কি তাহার নিষ্কৃতি নাই।

| নানা-বালি কিন্তু এখন উপায় কি কৰ্ত্তব্য কি ? সেই সম্পত্তি—সেই অর্থ সম্বন্ধে এখনও কি তাহার কোনও কর্তব্য আছে ? সে যখন চৌধুরী-বাড়ীর ফটক পশ্চাতে রাখিয়া চলিয়া আসিয়াছে, তখন বার কেন? তবে তাহার কাছে এ পত্র পাঠাইবার উদ্দেশ্য কি ? প্রভাত নলিনী পত্ৰখানা আবার পড়িল । উকীল-বাড়ীর পত্র বলিলে কি বুঝায়—আইনের নিয়মে যে এমন পত্র পাঠাইতেই হয়, সে সব সে জানিত না। কিন্তু সরলকৃষ্ণের তর্জমার মধ্য হইতে একটা কথা যেন তাহার দিকে কঠোরদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিয়াছে, বােধ হইল। লিখা আছে—সে কুলত্যাগ করায় স্বামীর ত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হইতে পারে না। কেন ? সে কি কোন অপরাধ করিয়াছে ? অপরাধ করুক, আর না করুক, সে যে কাজ করিয়াছে, তাহাতে যে লােকনিন্দা হইবেই, তাহা সে জানিত, এবং জানিয়াও কোনও দিন বিচলিত হয় নাই। কেন না, তাহার বিশ্বাস ছিল, সে যাহা করিয়াছে, সে আত্মরক্ষার জন্য । আজ পত্রের এই কথায় তাহার এ ভাবান্তর কেন? সূরনকৃষ্ট ভাবিয়াছে ? সেও কি তাহাকে অপরাধী মনে করিয়াছে প্রভাত-নলিনী আজ আপনার অসহায় অবস্থা যেমন ভাব উপলদ্ধি করিল, তেমন আর কখনও করে নাই। আজ এই বিশাল বিশ্বে সে একা—তাহার বিপদে সাহায্য করিবার—এমন কি, পরামর্শ দিবারও কেহ নাই । তাহার শ্বশুরবাড়ীতে আবরুর কড়াকড়িতে বিরক্ত হইয়া সে যখন এক দিন সে কথা তাহার পিতাকে বলিয়া- ছিল, জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “মানুষকে এমন 'অবিশ্বাস করা হয়

গোল্লা-বানি
;
কেবল
ফৈন?” তখন মােহিত উত্তর দিয়াছিলেন—উহা সংস্কার, কোন
কোন পরিবারে কঠোর হইয়াছে মাত্র।
নহিলে--উহার
মূল সন্ধান করিলে দেখা যায়, হিন্দুশাস্ত্রকারেরাও স্ত্রীলােকের
স্বাতন্ত্রের বিবােধী ; তাঁহাদের ব্যবস্থা স্ত্রীলােককে কৌমারে
পিতা, যৌবনে পতি ও বার্ধক্যে পুত্রের রক্ষা করিবে। সে
দিন প্রভাত-নলিনী সে ব্যবস্থায়
অব্যবস্থা দেখিয়া-
ছিল—“কেন, এ পােড় জাতির কি রক্ষা করিবার কেহ না
থাকিলে ঢলে না ; স্ত্রীলােক কি আত্মরক্ষাও করিতে পারে
?” আজ সে দেখিল, তাই ত বটে। অভ্যাসে সংস্কার
মিলিত হইয়া স্ত্রীলােককে এমনই দুৰ্বল--এমনই অসহায়
করিয়াছে বটে । তাহারা গৃহমধ্যেই থাকে-~গৃহের বাহিরের কোনও
সংবাদই রাখে না। কাজেই বাহিরে আসিলেই অনভ্যস্ত অবস্থায়
একেবারে অসহায় হইয়া পড়ে।
কিন্তু এখন উপায় কি-কৰ্ত্তব্য কি ? সে কাহার কাছে
‘সর্শ লইবে? চৌধুরী-বাড়ী ত্যাগ করিয়া আসিবার পর হইতে
সে সুপরমর্শ দিবার লােক পাইয়াছে কি ? সে যে পিতার নয়নানন্দ
ছিল, সে পিতা তাহার সন্ধানও লয়েন নাই। আর যত লােক
আসিয়াছে--কেবল তাহাকে প্রলােভনের ফাঁদে ফেলিবার
সে নিয়মের ব্যতিক্রম হইয়াছে দুই জনে—অমর
বাবুতে আর সরলকৃষ্ণে। প্রতিশােধ লইবার উত্তেজনা যখন
তাহাকে “পাইয়া বসিয়াছিল, তখন সেই উত্তেজনাবশে সে-ই
অমর বাবুকে সংবাদ দিয়া আনাইয়াছিল । তখন তিনি তাহার
উদ্দেশ্যে।

জান্না-বালি
কট সম্পূর্ণ অপরিচিত। কিন্তু সেই প্রবীণ লােকটিকে দেখিয়াই
হার বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হইয়াছিল, এবং তাহার ব্যবহারে সে
বিশ্বাস বিচলিত না হইয়া বিবর্ধিত হইয়াছিল । তিনি তাহার :
বস্থা কতটা জানিতে পারিয়াছেন, তাহা সে জানে না। তিনি
তাহার পক্ষের কথা কখনই শুনেন নাই; তবুও তিনি তাহাকে
সদুপদেশই দিয়াছেন। তিনি যখন ব্যবসার খাতিরে তাহাকে
দ্বিতীয়বার রঙ্গালয়ে অভিনয় করিবার জন্য অনুরােধ করিতে
আসিয়াছিলেন, তখনও সে সে প্রস্তাবে অস্বীকার করিলে তিনি বলিয়া
গিয়াছিলেন, “তােমার উত্তর শুনে আমি পরম পরিতােষ লাভ
করলাম। তুমি অভিনয় করলে আমার ব্যবসার হিসাবে লাভ হত
বটে, কিন্তু আমি তা চাই না। তুমি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছ, সেখানে
আত্মগােপন ব্যতীত তােমার আত্মরক্ষার কোনও উপায় নেই।”
তবে কি সে অমর বাবুকেই ডাকিয়া পাঠাইবে ? কোন্
অধিকারে ? তিনি দয়া করিয়া উপদেশ দিবেন বলিয়া ? যে
দয়ায় তাহার অধিকার নাই, সে দয়া সে লইবে কেন—লই
বা পাইবার আশাই বা করিবে কেন?
সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হইয়াছে, আর এক জনেএসে
সরলকৃষ্ণ। অমর বাবু যাহাই কেন বলিয়া থাকুন না, সে কিছুতেই
বিশ্বাস করিতে পারে না, সরলকৃষ্ণ কেবল অর্থের জন্য তাহাকে
পড়াইবার কাজ লইয়াছে। তবে সে কেন সে কাজ লইয়াছে ?
কাজ তাহার ভাল লাগে বলিয়া ? তাহা হইলে সে ত
"অন্য স্থানে এ কাজ করিতে পারিত–পূৰ্ব্বে করিয়াছেও বটে।

গেনা-বালি ভৰে? এ “তবের কোন সঙ্গত উত্তর প্রভাত-নলিনী দিতে পারিল না। তবে কি সে তাহারই পরামর্শ লইবে ? ব্যাপারটা জানিতেই পারিয়াছে-সেই ত পত্রখানা অনুবাদ করিয়া দিয়া গিয়াছে। প্রভাত-নলিনী অনুবাদের কাজখানা আবার তুলিয়া লইয়া পড়িল। সেই কথা আবার চক্ষুতে পড়িল-“কুল- ত্যাগ করায়”—ইত্যাদি। সে কি সরলকৃষ্ণের পরামর্শ লইবে ? কিন্তু লােকটির ব্যবহারে এমন একটা বিচ্ছিন্ন ভাব আছে—লােকটিকে এমন অতিমাত্রায় আত্মস্থ বলিয়া মনে হয় যে, তাহার সঙ্গে পড়ার কথা ছাড়া আর কোনও কথা কহিতেই কেমন সঙ্কোচ বােধ হয় । পত্রে কি আছে, তাহা যদি সে বুবিতে পারিত, তাহা হইলে তাহাকে তর্জমা করিয়া দিতেও অনুরােধ করিতে পারিত কি না সন্দেহ। বরং অমর বাবুর সঙ্গে পরামর্শ করা যায়, তবুও সরলকৃষ্ণের সঙ্গে পরামর্শ করিতে কেমন যেন সঙ্কোচ উপস্থিত হয়। wajতবে সে কি করিবে ? প্রভাত-নলিনী যতই ভাবিতে লাগিল, কিছুই করিতে পারিল না। এমনই ভাবে দিন কাটিয়া গেল— বৃত্রি আসিল। অন্য দিন সন্ধ্যার বাতি জ্বালা হইলেই সে পড়িতে বসে ; আজ পুস্তক হাতেও করিল না ; বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল। তাহার পর শয্যায় শয়ন করিয়াও কেবলই ভাবিতে লাগিল। যে দিন সে চৌধুরী-বাড়ী ত্যাগ করিয়া অসহায় ও নিরাশ্রয় হইয়াছিল, সে দিনও সে এমন অস্থিরতা ভােগ করে নাই। সে দিন উত্তেজনার পর অবসাদে সে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল—রাত্রিতে *

চােরাবালি
অনিদ্রার যন্ত্রণা ভােগ করে নাই। তাহার পরও কোন দিন এমন
হয় নাই। রাত্রির শেষভাগে শ্রান্তির আধিক্যে সে যেন কেমন
অবসন্ন বােধ করিতে লাগিল—কিন্তু তাহার নয়নপল্লব নিদ্রায়
মুদিত হইল না। প্রভাতের আলাে ফুটিয়া উঠিতে না উঠিতে সে
শয্যাত্যাগ করিল। তখন তাহার মস্তকে যন্ত্রণা অনুভূত হইতেছে
-যেন সূচ বিদ্ধ হইতেছে। সে একটু সুস্থ হইবার আশায়,
তখন যাইয়া স্নান করিল—একটু সুস্থ হইল।
তাহার পরেই আবার ভাবনা আরম্ভ হইল। কিন্তু ভাবিয়া
ভাবিয়া-ভাবিয়া ভাবিয়া সে কিছুতেই কৰ্তব্য স্থির করিতে
পারিল না।
পরদিন সরলকৃষ্ণ যথাকালেই প্রভাত-নলিনীর গৃহে উপস্থিত
হইল। প্রভাত-নলিনী বলিল, “কাল আপনি নূতন পড়া বলে দিয়ে
যেতে পারেন নি ; আমিও তৈরী করতে পারি নি। বে
হাঙ্গামা?”
সরলকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করিল, “তবে আজ কি পুরাণ
খানিকটা পড়িয়ে নূতন পড়া বলে দিয়ে যাব ?”
তাই ভাল।”
সরল বহি লইবার সময় লক্ষ্য করিল, উকীল-বাড়ীর পত্র ও
তাহার তর্জমা টেবলের উপরই রহিয়াছে। সে জিজ্ঞাসা করিল,
“এ পত্র কি দেখা হয় নি ?”
প্রভাত-নলিনী কথাটা পাড়িবার সুযােগ পাইল; জিজ্ঞাসা
করিল, “আমাকে কি করতে হবে ?
৬৩

ব্লো-বালি
কেন বলিতে পারি না, বােধ হয়, অকারণ কৌতুহলবশে
বাড়ীতে ফিরিয়াই পূৰ্বদিন সরল আইনের কেতাব খুলিয়া বসিয়া-
ছিল---প্রভাত-নলিনীর পতির ত্যক্ত সম্পত্তিতে তাহার কোনও
অধিকার আছে কি না, তাহার আলোচনা করিয়াছিল।
সম্বন্ধে নানা কথা 'আইনে আছে। অধিকার অনধিকার প্রমাণের
উপরই নির্ভর করিবার কথা। অবশ্যই যাহার সম্পত্তি পাইবার
জন্য দরখাস্ত করিয়াছে, তাহার প্রভাত-নলিনীর বিরুদ্ধে নানা
প্রমাণ দাখিল করিবার চেষ্টা করিবে। আইনে কখনও অন্যায় হয়
কিন্তু প্রমাণ যে কত সময় সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য
করে, তাহা সরলের অবিদিত ছিল না। তাই আপনি আইনের
কেতাব পাঠ করিয়া সে কোনও মীমাংসা করিতে না পারিয়া পরদিন
সকালে তাহার কোন উকীল বন্ধুর সঙ্গে সে কথার আলােচনাও
করিয়াছিল। সে বলিল, “কিছু করা না করা-ইচ্ছার উপর
নির্ভর করে।”
কেন ?”
(কছু করতে ইচ্ছা না থাকে, তবে কিছু না করিলেই
“হয় ?—তাতে কোনও ক্ষতি হয় না; কোনও বিপদ নাই ?”
“না।”
প্রভাত-নলিনী যেন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। তাহার নয়নের
শঙ্কাপূর্ণ দৃষ্টি দূর হইয়া তাহাতে কৃতজ্ঞতার ভাব পরিস্ফুট হইল।
সেই দৃষ্টিতে সে সরলের দিকে চাহিয়া বলিল, “বাঁচলাম।”
উs

চোরাবালি
সরল জিজ্ঞাসা করিল, “সম্পত্তির জন্যে তােমার কোন লােভ
মত
“না আমার যা আছে, তাতেই আনার চলে যাবে। আমি
আর টাকা চাইনে।”
“তা হলে কিছু না করাই ভাল। কেন না—” একটু ইতস্তত
করিয়া সে বলিল, “কেন না—কিছু করিলে, নানা অপ্রিয় কথার
আলােচনা হবে। তা না হওয়াই ভাল।”
প্রভাত-নলিনীর সেই কথা মনে পড়িল। পত্রে আছে—সে
কুলত্যাগ করায় স্বামীর ত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইতে
পারে না। তাহার হৃদয় কানায় কানায় পূর্ণ হইয়া ছিল ;
সরলের এই কথায় কূল ছাপাইয়া গেল। সে আর আপনাকে
সংযত রাখিতে পারিল না ; বলিল—“কিন্তু আমার দোষ:কি ?”
সরল বলিল, “মানুষ মানুষের দোষটাই দেখে—তাহার পক্ষের
কথা শুনতেই চায় না।”
“তাই:কি ?” .
-
“আমি কোন অপরাধ করি নি-করি নি।” একটু অতিমাত্রায়
চাঞ্চল্য প্রকাশ করিয়া এই কথা বলিয়া প্রভাত-নলিনী বলিল,
“আমার কথা যে কেউ শুনে নি। তারা কি আমাকে অপরাধীই
ভাবছে ? আমার বাবাও একবার আমার খোঁজ নিলেন না---
এমনই আমার অপরাধ !”
তাহার কণ্ঠস্বর বেদনায় কম্পিত হইয়া উঠিল । তার প্রত্যেক
৫

রাে-বালি কথার আন্তরিকতা সরলকৃষ্ণ অনুভব করিল। সে সহানুভূতি ব্যঞ্জক স্বরে বলিল, “মানুষ সমাজের ব্যবস্থায় ও সংস্কারের কঠো- রতায় শেষে বিচারবুদ্ধিও পদদলিত করে ; স্নেহমমতাও বিসর্জন প্রভাত-নলিনী যেন অনিচ্ছাতেও বলিয়া ফেলিল, “কেউ যদি আমার সব কথা শুনে আমাকে অপরাধী মনে করেন—আমার অপরাধ বুঝিয়ে দেন, তবে হয় ত আমি ঠিক বুঝতে পারি। আপনি শুতে পারবেন কি ?” কৌতূহল ও করুণা সম্মিলিত হইয়া সরলকৃষ্ণকে বলাইল, “নিশ্চয়ই পারব।” তখন প্রভাত-নলিনী তাহার কথা আদ্যন্ত সব বলিয়া গেল। সরল যত শুনিতে লাগিল, ততই বিস্মিত হইতে লাগিল। বিপুল ইংরাজী সাহিত্যে সে অনেক বালিকার ও কিশােরীর পরিচয় পাই- আছে--তাহারা আপনাকে রক্ষা করাই মানুষের প্রথম ও প্রধান মনে করিয়া কাজ করিয়াছে, প্রলােভন ও অনাচার উভয় হইতেই ত্মিরক্ষা করিয়াছে, বাইবেলের উপদেশ স্মরণ করিয়া কাজকরিয়াছে—মানুষ যদি আপনার আত্মা নষ্ট করিয়া জগৎলাভ করে, তাহাতেও তাহার প্রকৃত লাভ নাই। সে কবিতার রাজ্যে বিচরণ করিয়াছে-সংসারের বাস্তব বাতাসে তাহার কল্পনা ম্লান হয় নাই; তাই সে সেই সব নারীর প্রশংসাই করিয়াছে। আজ প্রভাত নলিনীর কথা শুনিতে শুনিতে তাহার মনে হইতে লাগিল, সে যেন আজ কোন ইংরাজী নাটকের বা উপন্যাসের নায়িকার চোরাবালি সন্ধান পাইল, প্রভাত-নলিনী যেন ইংরাজী সাহিত্যের নন্দনকানন হইতে ভারতবর্ষে বাঙ্গালীর ঘরে আসিয়াছে, কোন ইংরাজী নাটকের পৃষ্ঠা হইতে কবির কল্পনা মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া আসিয়াছে। প্রভাত-নলিনীর কথা যখন শেষ হইয়া গেল, তখন সরল হৃদয়ে পরম আনন্দ অনুভব করিল। কোনও পাপ বে সেই নবােদ্ভিন্ন যৌবনাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই—সে যে এত ঘটনাবিপর্যয়ের মধ্যেও প্রভাতের নলিনীরই মত শুদ্ধ আছে, তাহাতে সরলের আনন্দ কেন ? আনন্দের কি কোনও কারণ নাই—কোনও কারণ থাকিতে পারে না? প্রভাতের রবিকরে যখন পদ্মের দল ফুটিয়া উঠে-কমল- কলি যেন নিদ্রাভঙ্গে চক্ষু মেলিতে থাকে ; সন্ধ্যার বাতাসে যখন বেলা প্রস্ফুটিত হয়—সান্ধ্য-সমীরণে আপনার সৌরভ বিলাইয়া দেয় ; শরতের পূর্ণিমায় যখন আকাশের চাঁদ কিরণের পিচকারী দিয়া পৃথিবীর উপর জ্যোৎঙ্গার জল ছড়াইয়া দেয় তখন মানুষের মনে আনন্দের সঞ্চার হয় কেন ? তেনই আবার পদ্মফুল যদি ফুটিবার পূৰ্বেই কীটদষ্ট হয়---বেলা যদি ফুটিয়া উঠিবার পূর্বেই বালক-নখব-.. বিচ্ছিন্ন হইয়া ধূলিতে লুটায়–পূর্ণিমার শশধর যদি মেঘে আত হয়, তবে মানুষের মনে দুঃখ হয় কেন ? এ “কেন”র উত্তর কে দিতে পারে ? মানুষ সৌন্দর্য্যের রূপের পবিত্রতার উপাসক। সে ভাব মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক, তাহা কেহ তাহাকে শিখায় না-- শিখাইতে হয় না। তাই আজ প্রভাত-নলিনীকে কোনও পাপ স্পর্শ করিতে পারে নাই জানিয়া সরল আনন্দিত হইল । সঙ্গে সঙ্গে তাহার চিত্তের দৃঢ়তায়, কর্তব্যনিৰ্দ্ধারণ-নৈপুণ্যে ও

চেন্না-বালি
সঙ্কল্পের ঔচিত্য তাহার হৃদয় প্রশংসায় পূর্ণ হইল। আর এই যে
একটি কিশােরী—আপনাকে রক্ষা করিবার জন্য সংসারের গ্লানি
নিন্দা তুচ্ছ করিয়া--সংস্কারের নিগড় মানসিক বলে বিচ্ছিন্ন করিয়া
আসিয়াছে, ইহার জন্য তাহার হৃদয়ে করুণার উৎস উৎসারিত
হইল। তাহার মত যুবকের হৃদয়ে সুন্দরী কিশােরীর প্রতি
করুণার উৎস উৎসারিত হইলে, সে প্রবাহ কোথায় লইতে পারে,
তাহা কে বলিতে পারে ? কিন্তু সে কথা কে ভাবিয়া দেখিতে পারে ?
প্রভাত-নলিনী যখন তাহার কথা শেষ করিল, তখন তাহার
দুই চক্ষু হইতে গও বহিয়া অশ্রু ঝরিতেছে।
সে মুখ তুলিয়া
দেখিল, সরলের দুই চক্ষু হইতেও দুই বিন্দু অশ্রু ঝরিয়া পড়িল।
যে কথা বলিতে সে কঁাদিয়াছে, সে কথা শুনিতে সরল কাদিয়াছে।
সে যদি তাহা না দেখিত, তবে সে লজ্জায় কি মনে করিত, বলিতে
পারি না। কারণ, সে কথা শেষ করিয়াই সে মনে করিল—এ কি
করিলাম, এ সব কথা কেন বলিলাম, কাহাকে বলিলাম ? আপনাকে
আপুনি সামলাইতে পারিলাম না? এ কি দৌর্বল্য ! কিন্তু সে যখন
দেখিল সরলের নয়নেও অশ্রু, তখন তাহার সে লজ্জার দংশন
হইতে সে অব্যাহতি লাভ করিল।
তাহার পর সরল বখন বলিল, “তােনার কোনও দোষ নেই।”
তখন প্রভাত-নলিনী যেন অনুভব করিল, তাহার বুকের উপর
হইতে বােঝা নামিয়া গেল—সে দুই দিনের পর প্রথম একটু শান্তি
পাইল। যে এক জনকে সে তার সব কথা বলিতে পারিয়াছে,
তিনি মনে করিয়াছেন, সে অপরাধী নহে।

গেরা-বালি
তাহার পরই প্রভাত-নলিনী চক্ষু মুছিয়া ফেলিল--পুস্তকখানি
লইয়া লিল, “তবে কাল কোন পড়াটা পড়াবেন?”
সরলও পড়াইতে আরম্ভ করিল।
দুই জনেই আবার পূর্বের ভাব অবলম্বন করিল। কিন্তু যাহা
হইয়া গেল, তাহাতে উভয়ের মধ্যে কৃত্রি ব্যবধানের প্রাচীর ভাঙ্গিয়া
গেল—তাহা আর গঠিত হইল না। সেই ভাঙ্গা প্রাচীরের পথে
উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার উপায় হইয়া গেল।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। সংসারে অসহায় কিশােরীর যে কত বিষয়ে পরামর্শের প্রয়ােজন হয়, তাহা সাধারণ লােক কল্পনাও করিতে পারে না। এতদিন প্রভাত-নলিনী সে সব বিষয়ে কাহারও সহিত পরাশ করিবার উপায় করিতে পারে নাই। এখন ঘটনার স্রোত সে উপায় করিয়া দিল। কাজেই ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হউক, সে নানা বিষয়ে সরলের পরামর্শ লইত। প্রথম প্রথম প্রভাত-নলিনীর মনে হইত, সরলের স্বাভাবিক সদাশয়তার সুযােগ লইয়া তাহার দয়ার অপব্যবহার করিতেছে। কিন্তু সরলের ব্যবহারে তাহার সে সঙ্কোচ কয় দিনেই কাটিয়া গেল--তাহার পর সে নিঃসঙ্কোচেই সৰ্ব্ববিষয়ে সরলের নাম লইতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে এমন দাড়াইল যে, যে সব বিষয়ে কাহারও পরামর্শ না লইলেও চলে, সে সব বিষয়েও সে সরলের পরামর্শ লইতে লাগিল। সরলের কাছে তাহার কোনও কথাই অজ্ঞাত রহিল না। সরলও প্রভাত-নলিনীর ব্যবহারে আকৃষ্ট হইতে লাগিল। যে হ্রদের জল স্বচ্ছ, তাহার যেমন তল পৰ্য্যও দেখিতে পাওয়া যায়, তেমনই তাহার হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত সে দেখিতে পাইত- তাহাতে কোথাও আবর্জনার লেশমাত্র দেখিতে পাইত না।

সেনাবালি এ দিকে প্রভাত-নলিনী পাঠে এত দ্রুত উন্নতি লাভ করিতে লাড়ি যে, তৃতীয় মাসের শেষভাগেই সরল তাহাকে ইংরাজী কাব্যের আস্বাদ দিবার উপযুক্ত মনে করিল। সে ইংরাজী কাব্যের সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে বাঙ্গালা কাবাও পড়াইতে লাগিল—একের আলােচনায় অপরের রসাস্বাদনের সুবিধা হয়। এই কাব্য সাহিত্যের মধ্যে মানুষ নানা রসের আস্বাদ লাভ করে ; সে সব রস পরিস্ফুট করিয়া তুলাই কবির কাৰ্য। যে কবি . সে কাজে যত অধিক সাফল্য লাভ করেন, তিনি কবি হিসাবে তত বড়। কাব্যসাহিত্যের আলােচনায় প্রভাত-নলিনী যেন নুতন জগতের সন্ধান পাইল। যে সব ভাব সে হৃদয়ে অনুভব করিয়াছে, সে সব যেন মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া উপস্থিত হইতে লাগিল। যে সব চিন্তা মনের বাগানে প্রজাপতির মত কখন কখন উড়িয়া বেড়ায়, সে সব ধরা দিতে লাগিল। মানুষের মনের জগৎ বুঝি এই বিশাল বহির্জগতের অপেক্ষাও বড়—তাহার বর্ণবৈচিত্র্য, তাহার আবেগ, তাহার স্বরূপ সে নির্ণয় করিতে পারে ? এই কাব্যজগতে আসিয়া সরল ও প্রভাত-নলিনী পরস্পরের আরও নিকটবর্তী হইল। সে জগতে পরস্পরের মধ্যে কোন সংস্কারের ব্যবধান ছিল না। সে জগতই নন্দনকানন। সেখানে নিঝরাদগত জলরাশির কলনাদ, পবনে বিকাশিত শত কুসুমের সৌরভ, কুসুমে কুসুম্নেমধুপানরত মধুপের মৃদু গুঞ্জন, কুঞ্জে কুঞ্জে পাখীর গান, বেহীন গগনে চন্দ্রের জ্যোৎস্না। সে জগৎ কল্পনার বর্ণরঞ্জনে সুন্দরভাবের পবনহিল্লোলে আন্দোলিত।

গেরা-বালি
সেই সাহিত্য-জগতে সে কত ভাবেরই আস্বাদ পাইত—কে,
ভালবাসা, ভক্তি, প্রেম, এ সব যেন তাহার পক্ষে স্বপ্ন হইয়া
আসিয়াছিল ?
সে যেন মানুষের অবশ্য প্রাপ্য সে সব হইতে বঞ্চিত
হইয়া, এক স্বতন্ত্র জগতে অভিশপ্ত জীবন যাপন করিতেছিল।
কিন্তু কেন—কোন্ দোষে--কি অপরাধে ? সে তাহাই ভাবিত,
এবং ভাবিয়া কোন উত্তর পাইত না। কেবল সরল তাহাকে
বলিয়াছিল, সে মানুষ—এ সকলের জন্য তাহার আকাঙ্ক্ষা যেমন
স্বাভাবিক, এ সকলে তাহার অধিকারও তেমনই নিশ্চিত। কিন্তু
কই ? সে মনে করিত, তাহার প্রতি দয়াপরবশ হইয়া সরল তাহাকে
সে কথা বলিয়াছে। কারণ, যাহার পিতামাতাও তাহার সন্ধান
লয়েন না-কন্যা অকূলে ভাসিয়াছে, তাহার সহায় নাই--আশ্রয়
নাই জানিয়াও নিশ্চিন্ত হইয়া আছেন—তাহার আবার অধিকার ?
তাই সরলের কথাও তাহার অবিশ্বাস হইত। কিন্তু এখন সে
অবিশ্বাসের কারণ অন্তর্হিত হইতে লাগিল। মানুষেরও মনের
যে, জগৎ, তাহার সহিত বাহিরের জগতের সম্বন্ধ নাই। মানুষ
তাহার হৃদসেই নন্দনে নরক রচনা করিতে পারে, আবার নরককেও
নন্দনে পরিণত করতে পারে। সত্যই কত আশা--কত আকাঙ্ক্ষা
-কত তৃষ্ণা তাহার হৃদয়ে অনুভূত হইত। সে এতদিন মনে
করিত, তাহার জীবনে সে সব পূর্ণ হইতে পারে না--সে সে সব
আশাপূরণের সুখে অধিকার ত্যাগ করিয়া হাসিয়াছে। কোথায় ?
চৌধুরী-বাড়ীর ফটকে
যে গৃহে সে, কেবল নরক যাতনা ভােগ করিয়াছে--পাপের
?
৭২

সেনাবালি
জ্যে বাস করিয়াছে--প্রেমহীন দাসত্বের জীবন যাপন করিয়াছে
—কেবল ভােগাৰ্থমাত্র বিবেচিত হইয়াছে, সেই গৃহে বাসই কি
তাহার কর্তব্য ছিল ? কেন ? চৌধুরী-বাড়ীর কর্তা তাহাকে
পুত্রবধূ করিয়াছিলেন বলিয়া ? সে এ কথার সু মীমাংসা করিয়া
উঠিতে পারি না। এই সময় একদিন হেমচন্দ্রের কবিতা-সংগ্রহ
তাহার হাতে পড়িল। সে তার মধ্যে একটি কবিতায় পড়িল-~-
“হাতে সূততা বেঁধে কভু প্রেম বাঁধা যায় ?
বন্ধন দেখিলে প্রেম তখনি পলায়।
স্বাধীন মূকরকেতু
স্বাধীন প্রণয়,
না বুঝে অবােধ লােক চাহে পরিণয়।”
তাই কি ? তাহা হইলে পরিণয়সংস্কার হইল কেন ? তাহ
হইলে পরিণয়হীন প্ৰেণ অপবিত্র বলিয়া বিবেচিত হয় কেন?
সংস্কার—কিন্তু সংস্কার আসিল কোথা হইতে ? সে আপনার বাপের
বাড়ীর কথা মনে করিল। তাহার পিতামাতার সুখসমুজ্জ্বল
দাম্পত্যজীবনের কথা স্মরণ করিল। সে জীবনের সঙ্গে কবির ”
কথার সামঞ্জস্য সাধিত হয় কিরূপে? আর পিসীম—তিনি ত
বালবিধবা। তাঁহার বিবাহিত জীবন সুখের ছিল, কি দুঃখে
ছিল—তাহা সে জানে না। কিন্তু তিনি ত ধৰ্ম্মকৰ্ম্মেই জীবন
কাটাইতেছেন। তিনি কি পতিকে দেবতার আসনে বসাইয়াছেন ?
সেই দেবার্চনার মঞ্চে পতির অর্চনা স্থান পাইয়া—উভয়ে
অভিন্ন হইয়াছে ? এক বলিবে ?
তাহার পর সে আবার পুস্তকখানি তুলিয়া লইল

গেরা-বালি
“পরিণয়ে ধন হয়, নাম হয়, যশ ;
প্রণয় নহে ধন বিভবের বশ।”
পরিণয়ে ধন, নাম হয় কিন্তু ধন ও নামই সে যশের একমাত্র
সােপান নহে, তাহা সে বিশেষ করিয়া-আপনি ঠেকিয়া শিখিয়াছে।
কিন্তু প্রণয়—সে কি? সময় সময় সে হৃদয়ে যে অপরিমেয় শূন্য
অনুভব করে, এবং সেই শূন্যতা যখন তাহাকে পীড়িত করে, তখন
যাহাতে সেই বিরাট শূন্য পূর্ণ করিবার আকাঙ্ক্ষা তাহার হৃদয়ে
জাগিয়া উঠে-- যাহার চাঞ্চল্যে তাহার হৃদয় চঞ্চল হয়—সেই
অনির্দিষ্ট ও অনিৰ্দেশ্য ভাব—সে কি প্রেমেরই আভাস ? কিন্তু
সে কি তাহার প্রাপ্য—সে কি তাহাও সেই চোধুরী-বাড়ীর ফটক
পার হইয়া আসিবার সময় রাজপথে ধূলির উপর ফেলিয়া আসিয়াছে ?
কিন্তু কই, তাহা ত তাহার মনে হয় না। তবে ?
প্রেমেই কি সুখ ?--
“ভূমণ্ডলপতি যদি চরণে আমার
ধরে দেয় ভূমণ্ডল, সিংহাসন তার,
তুচ্ছ করে দূরে ফেলি ; মনে যদি ধরে
ভিখারীর দাসী হয়ে থাকি তার ঘরে।”
"n
এ কি সুখের অবস্থা! কি সে প্রেম, যাহার জন্য সিংহাসন তুচ্ছ
করিয়া মানুষ ভিখারীর দাসী হইতে চত? মানুষ যে সিংহাসন
ত্যাগ করিতে পারে, তাহা তাহার ধারণার অতীত নহে। কিন্তু
ভিখারীর দাবী হইতে আগ্রহ ! সেও কি কখন কখন হৃদয়ে
- ৪

নাই ?
রাে-বালি
সেইরূপ আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে নাই—সেই আকাঙ্ক্ষাও কি
সয় সায় তাহাকে চঞ্চল করিয়া তুলে
প্রেমিকের অবস্থাই কি সুখের ?
“পরাণে পরাণ বাঁধা প্রণয়ের ভরে,
পরিপূর্ণ পরিতােষ প্রেমীর অন্তরে।
আশার থাকে না ক্ষোভ, ভাষার যােজনা ;
হৃদয়ে হৃদয়ে কথা প্রকাশে আপনা।”
সে কি সুখের অবস্থা। সেই ত দিবব্যান্মাদ। কিন্তু এমন অবস্থা।
সে কি কখন অনুভব করিয়াছে-কখন অনুভব করিতে পারিবে ?
সে তাহার হৃদয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করিল। যেন কি দেখিতে
পাইল—তাহা অপরিস্ফুট, কিন্তু
সেই সময় ভৃত্য আসিয়া সংবাদ দিল, সরল আসিয়াছে।
সরল আসিয়া দেখিল, প্রভাত-নলিনী একখানা পুস্তক পাঠ
করিতেছে। সে জিজ্ঞাসা করিল, “কিছু?”
প্রভাত-নলিনী বলিল, “হেমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী”
সরল পুস্তকখানি লইয়া দেখিল—প্রভাজনলিন। “নদন
পারিজাত’ পড়িতেছিল। সে বলিল, “এই কবিতাটা ইংরা
একটি খণ্ডকবিতার ভাব নিয়ে লেখা।”
“ইংরাজী আসল কি বাঙ্গালা কবিতাটার চাইতেও ভাল ?”
“বােধ হয়।”
“আমাকে পাবেন ?”
সকল ইতঃপূর্বেই প্রভাত-নলিনীর জন্য ইংরাজ করি পােপের
৫

গনা-বালি গ্রন্থাবলী আনিয়াছিল; কিন্তু এ কবিতা পড়াইবে কি না-পড়ান সঙ্গত কি না, স্থির করিয়া উঠিতে পারে নাই। আজ আর স্থির করিতে বিলম্ব হইল না। প্রভাত-নলিনী আপনি বাঙ্গালা পড়িয়া ইংরাজীতে কবিতাটা পড়িতে চাহিয়াছে। সে বলিল, “পড়াব।” সে মনে করিল, হেমচন্দ্রের কবিতা পাঠ করিয়া কাব্যরসের আস্বাদন- জন্যই প্রভাত-নলিনী ইংরাজী কবিতা পাঠ করিতে চাহিয়াছে। সে কবিতার কয়টি চরণে যে প্রভাত-নলিনীর হৃদয়ের ভাবতন্ত্রী বাজিয়া উঠিয়াছিল, তাহা সে কল্পনাও করিতে পারে নাই। সরলকৃষ্ণ কবিতা পড়াইতে লাগিল। এ পুস্তক পড়াইবার কথা ছিল না—তাই সে আর একখানি পুস্তক আনে নাই—একই বহি দুই জনকে দেখিতে হইল। কাজেই টেবলের দুই দিকে দুই জনের বসার অসুবিধা ঘটিল। সে সমস্যার কিরূপ সমাধান হইবে সরল যখন তাহা ভাবিয়া স্থির করিতে পারিতেছিল না, প্রভাত-নলিনী তখন অতি সহজে তাহার সমাধান করিয়া ফেলিল। যে চেয়ারে সরল বলিয়া ছিল, সে আসিয়া তাহার পাশের চেয়ারে বসিল। এমনর্মিঃসঙ্কোচে সে আসিয়া পাশের চেয়ারে বসিল যে, তাহাতে পঙ্কোচ অনুভব করায় সরল আপনিই লজ্জিত হইল। তবুও কিন্তু সে সঙ্কোচ বােধ না করিয়া পারিল না। কাছাকাছি। প্রভাত-নলিনীর কেশের সৌরভ তাহার নাসিকায় প্রবেশ করিতে লাগিল—তাহার নিঃশ্বাস.এক একবার তাহার গাত্র স্পর্শ করিল। সরলের আবার মনে হইল এত কাছাকাছি। সঙ্কোচের হাত হইতে অব্যাহিত পাইবার জন্য সরল পড়াইতে "

ভোলা-বালি
লঘু পাখা তার
আরম্ভ করিল। একটু অগ্রসর হইয়াই সরল পড়িল-“এখন এই
আঁখি পারে কেবল পড়িতে আর কঁদিতে।” প্রভাত-নলিনী
ভাবিল, তাহারও ত সেই অবস্থা।
“আছে আজ নয়নের সম্বল কেবল
গ্রন্থ-অধ্যয়ন আর নয়নের জল।”
তাহার পর—যে স্থানটি পাঠ করিয়া সে প্রথম ভাবিতে আরম্ভ
করিয়াছিল, সরল সেই স্থানটিতে আসিল
“পবনের মত
স্বাধীন প্রণয়
নরের বন্ধন যবে দেখিবারে পায়,
মেলিয়া অমনি
মুহূর্তের মাঝে কোথা পলাইয়া যায়।”
সহসা প্রভাত-নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “এই কি সত্য ?”-~সে এই
প্রশ্নই কেবল মনে করিতেছিল। তাই এই প্রশ্ন যেন সে আর
গােপন করিতে পারিল না।
সরল এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল। তাই সে জিজ্ঞাস
করিল, “কেন?”
“যদি তাই হয়, তবে বিয়ে কেন ?”
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে অনেক কথার আলােচনা করিতে হয়,
সরল একবার ভাবিল, সে কি করিবে ? তাহার পর সে মনে করিল,
প্রভাত-নলিনীর মনে যদি সংশয় উপস্থিত হইয়াই থাকে, তবে তাহা
দূর করিয়া দিলেই হইবে। সে বুঝাইতে লাগিল, সংসারে
মানুষ সামাজিক বিশৃঙ্খলা ব্যতীত সমাজ রাখা যায় না।
৭৭

নাে-বালি
জন্যই সমাজে শৃঙ্খলার সৃষ্টি-সমাজের সব লােক সম্মত হইয়া
যে সব প্রথার সৃষ্টি করে, সেই সব কালক্রমে সংস্কারে পরিণতি
লাভ করে। বিবাহ সেইরূপ সংস্কার, এবং এই সংস্কারের উপরই
মানুষের গার্হস্থ্য জীবন প্রতিষ্ঠিত। সকল দেশেই-সকল সভ্য
দেশেই বিবাহ প্রচলিত। সুতরাং সামাজিক জীবের পক্ষে তাহার
প্রয়ােজন ও অস্বীকার করা যায় না।
প্রভাত-নলিনী আগ্রহসহকারে এ সব কথা শুনিল ; শুনিয়া
যেন একটু হতাশ হইল, তাহার পর সে জিজ্ঞাসা করিল, “তবে
কি কবির এ কথা মিথ্যা?”
সরল বলিল, “তা নয়। পারিজাতের মনের এখন যে অবস্থা,
তাতে তার পক্ষে এমন কথা মনে করাই ত স্বাভাবিক।
ছাড়া সে দেশে আমাদের দেশের মত মেয়েরা বাপ’র ইচ্ছায়
বিয়ে করতে বাধ্য নয়, তারা আপনারা ইচ্ছেমত বিয়ে করতে
পারে। তাই সে সব দেশে যে বাকে ভালবাসে, সে
তা’কে বিয়ে করতে পারে বিয়ের আগে ভালবাসা হয়—বিয়ের
পরে নয়।”
“পরেও কি গাঁলবাসা হয় ?”
- “হবে না কেন? যে আকর্যণ স্ত্রীলােককে ও পুরুষকে আকৃষ্ট
করে—সে বিয়ের আগেও যেমন সম্ভব, পরেও তেমনি সম্ভব। তবে
যে দেশে ভালবাসার পর বিয়ে হয় সে দেশে, বিয়ের পর ভালবাসা
হলে সংসার যে নরক হয়, সে নরকের ঈঙিইতে পারে না।”
“সে দেশের ব্যবস্থাই ত তবে ভাল ?”
৭৮

জেনা-বালি
সরল তাহার কোনও উত্তর দিল না। সেও ভাবিতেছিল।
এ বিষয় সে কখনও ভাল করিয়া ভাবিয়া দেখে নাই।
প্রভাত-নলিনীর প্রশ্নের তখনও শেষ হয় নাই।
সে জিজ্ঞাসা
করিল, “আর ঐ যে রাজার রাজত্ব ত্যাগ করে, তুচ্ছ করে-
-মনে যদি ধরে
ভিখারীর দাসী হয়ে থাকি তার ঘরে।
ও কি যথার্থ ?”
সরল বলিল, “তাতে কি আর সন্দেহ আছে ? তার দৃষ্টান্ত
ত আণর আমাদের দেশে সর্বদাই দেখতে পাই। এই যে আমাদের
দেশে দুঃখী পরিবারে মেয়েরা বৎসরে চারখানা কাপড় আর
দু’বেলা দু'মুঠা ভাত পেরে হাসিমুখে স্বামীর সংসারে দাসীর খাটুনী
খাটে, সেও ভালবাসার জন্যই ; ভালবাসে বলেই তারা স্বামীকে
আপনার ভাবতে পারে, স্বামীর সংসার আপনারই মনে করে।”
প্রভাত-নলিনীর মনের একট প্রশ্নের উত্তর মিলিল না।
বুঝিল, তাহার পিতামাতার সংসার যে সুরে সে ভালবাসার জন্যেই
উভয়ের প্রতি উভয়ের ভালবাসায় দুঃখের সংসার সুখের হইয়াছে
প্রেমের আলােকে দারিদ্রের অন্ধকার দূর হইয়াছে।
পিসীমা ? সে জিজ্ঞাসা করিল, “যাকে ভালবাসা যায়, সে কাছে না
থাকলে, এমন কি মরে গেলেও কি তাকে ভালবাসা যায় ?”
সরল উত্তর দিল, “নিশ্চয়। ভালবাসা স্থানকালের ব্যবধানে
বদ্ধ থাকে না।”
প্রভাত-নলিনী বুঝিল, তাহাই বটে।
৭৯

রা-বাসি
।
আজ প্রভাত-নলিনী সংশয় ঘুচাইবে, স্থির করিয়াছিল, কত
কথাই আজ তাহার মনে হইতেছিল ? সে সব কথারই সদুত্তর
পাইতেছিল। সে জিজ্ঞাসা করিল, “সকলের মনেই কি ভালবাসা
হতে পারে ?”
সরল বলিল, “পারে-নদী, হ্রদ, খাল, বিল সব জলেই ত সূর্যের
কিরণ পড়ে—জল জ্বলজ্বল করে।”
“তবে ভালবাসবার অধিকারও সকলের আছে ?”
“আছে।”
“তাতে কোনও অপরাধ হয় না।”
“ভালবাসলে অপরাধ হয় না, কিন্তু
প্রভাত-নলিনী বিস্মিত ভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “কিন্তু কি ?”
“কিন্তু ভালবাসা যেমন মানুষকে আত্মদান করায়—তেমনই
সৰ্বস্ব দান করায়। মন দিলে অপরাধ হয় না, কিন্তু যেখানে”
কথাটা আরও স্পষ্ট করিয়া বলিতে সরল ইতস্ততঃ করিতে লাগিল।
প্রভাত-নলিনী বলিল..“বলুন—বলুন। আমাকে শুতেই
তার আগ্রহে ও উত্তেজনায় সরল বিস্মিত হইল। বুঝিল,
সে যাহা বলিতে আরম্ভ করিয়াছে তাহাকে তাহা শেষ করিতেই
হইবে। সে বলিল, “যেখানে মন ছাড়া আরও সৰ্বস্ব দিতে হয়,
সেখানে সােজ তার আদর্শের মাপকাঠী নিয়ে আসে, মাপতে বসে,
ক্রটী পেলেই তার শাসনের বেতখানি ব্যর করে।”
“তা’র শাসন ত নিন্দা, ঘৃণা ?

সোনা-বালি “তাই বটে। কিন্তু সংসারে যারা কাক, তাদের পক্ষে সেটা অবহেলা করা চলে কি ?” “যারা সংসারে থাকে না, তাদের সে ভাবনা নেই।” সরল চুপ করিয়া রহিল ; ভাবিল, এসব কথার আলােচনা না করিলেই বােধ হয় ভাল হইত। প্রভাত-নলিনী বলিল, “আমাকে আর একটা কথা বলুন, ভাল- বাসায় কি কোনও অপরাধ হয় ?” সরল বলিল, “শুধু ভালবাসায় হয় না, কিন্তু “আচ্ছা শুধু মন দেওয়া কি সম্ভব নয় ?” “অসম্ভবও নয়। সেই ভালবাসাই স্বর্গীয় ভালবাসা। তাতে পৃথিবীর মলিনতা নেই।” প্রভাত-নলিনী আর কিছু জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়ােজন দেখিল না। সরল আরও কয় ছত্র পড়াইয়া সে দিনের মত পড়ান শেষ সে লক্ষ্য করিতেছিল, পড়ায় প্রভাত-নলিনীর মন বসিতেছিল না। সরল চলিয়া গেলে প্রভাত-নলিনী ভাবিতে লাগিল। সরল যখন আসিয়াছিল, তখন সে আপনার হৃদয় পরীক্ষা করিয়া দেখিতে ছিল—সে ভালবাসার অনুভূতি পাইয়াছে কি না? তখন তার মনে হইয়াছিল, সে যেন তাহার হৃদয়ে দূরে কোথায় একটু অনুভূতি পাইতেছিল। এখন সে দেখিল, তাহা দূরে নহে-নিকটে, অস্পষ্ট নহে—স্পষ্ট! এ কি ? ভালবাসিবার অধিকার যথন সকলেরই আছে, করিল। ৮১

গেরা-বালি
তখন সে শঙ্কিত হইবে কেন ? আর সেই যে অনুভূতি, সে যে
শঙ্কার বিরােধী—সে যে সুখের—সে যে আনন্দের ! সে ত জীবনে
বসন্ত আনে-হৃদয়ের যৌবন আনে ; তাহার স্পশে নীরস সরস
ইয়, শুষ্ক তরুও পত্রপুষ্পে শােভাময় হয়। বিহগের কণ্ঠে সে
মধুর কূজন ফুটাইয়া তুলে—অঙ্গে সে বিচিত্র বর্ণৱাগ রাঙ্গাইয়া
তুলে।
প্রভাত-নলিনী চক্ষু মুদিত করিল। অনুভব করিতে লাগিল,
যে ভাব এতদিন গােপন ছিল, তাহা এখন হৃদয়ে ব্যপ্ত হইয়া পড়িতে
লাগিল।
নিদাঘনিশীথে গিরিশিরে বিগলিততুষারপুষ্ট নদীর
প্রবাহ যেমন বালুকাস্তৃত তীর প্লাবিত করিয়া বিস্তৃত হয়, এও যেন
তেমনই। আজ সেই অনুভূতি কবির কথায় ও সরলের ব্যাখ্যায়
প্রবল হইয়াছে--তাহার হৃদয় প্লাবিত করিয়া তুলিল। সে ভাবের
প্লাবনে হৃদয় যেন মিগ্ধ হইল ।
তখনও ভবিষ্যতের জানা তাহার হৃদয়ে স্থান পায় নাই---
লীতের যাতনাদগ্ধ হৃদয়ে কেবল বর্তমানের এই স্নিগ্ধ অনুভূতি।
সে কত সুখের ! সে ত সে সুখের আশাও করিতে পারে নাই।
এ যেন নিদাঘের তাপতপ্ত ভূমিতে--দাবানলদগ্ধ কাননে মেঘের
বারিবর্ষণ ; এ যেন অভিশপ্ত জীবনে দেবতার আশীর্বাদ।
পাতিয়া তাহা গ্রহণ করিবে—গ্রহণ করিয়া ধন্য হইবে।
কিন্তু কাহার হেকমণ্ডলু হইতে এই স্রোতের উদ্ভব, তাহা সে
তখনও ভাবিয়া দেখিতে পায় নাই--বুঝি দেখিতে চাহে নাই।
মনে করিয়াছিল, জীবনে দুঃখই তাহার সম্বল, সে যদি সুখ পায়, তবে
সে বুক

জেনা-বালি
সে তার কারণ সন্ধান না করিয়াই কেবল সেই সুখে আপনাকে
ধন্য মনে করে। যে মনে করিয়াছিল, তাহাকে সমস্ত জীবন সঙ্গীহীন
ও সহায়হীন হইয়া অগ্নিশ্বাসী তপ্ত মরুভূমি পার হইতে হইবে,
সে যেন সহঙ্গা মলয়ান্দোলিততরুলতা -. নিঝরােদগতবারিস্নিগ্ধ
নন্দন-কাননে উপনীত হইল।
৮৩

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। সে দিন পড়াইয়া ফিরিবার সময় সরল ভাবিতে ভাবিতে গেল, প্রভাত-নলিনী তাহাকে এ সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিল কেন ? সে সকলের সঙ্গে ত কবিতার সম্বন্ধ নাই—সে সব মানুষের হৃদয়ের কথা। সে যখন প্রভাত-নলিনীকে পড়াইতে স্বীকৃত হইয়াছিল, ‘তখনই অমর বাবু তাহাকে সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন-চোরা- বালিতে একবার পা পাড়িলে আর রক্ষা থাকে না। সে কি সতর্কতা পরিহার করিয়াছে—অসাবধান হইয়াছে ? চোরাবালি ! সে প্রভাত-নলিনীর জীবনের ইতিহাস শুনিয়াছে। সে যাহা বলিয়াছে তাহার এক বর্ণও যে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত নহে, সে বিষয়ে তাহার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। তাহার পরও কি সে তাহাকে চোরাবালি মনে করিতে পারে? তাহার মনের মধ্য হইতে উত্তর শুনা গেল--না, কখনই মা। তবুও তাহার পক্ষে সাবধান হওয়াই ভাল। আত্মশক্তিতে প্রত্যয় ভাল ; সে বরাবরই আত্ম- শক্তিতে প্রত্যয়ের পক্ষপাতী। কিন্তু অতি-প্রত্যয় মানুষকে অসাবধান করিলে, তাহার বিপদ ঘটিতে পারে। এ কথা সে এত দিন কখন মনে করে নাই—মনে করিতে পারিলে, কখনই প্রভাত- নলিনীকে পড়াইবার কাজ লইতে পারিত না। আর ; ৫ চোরাবালি কেহ যে সাহস করিবে না-তাহা: সে জানিত'; সুহৃদের কথায়ও সে তাহাই বুঝিয়াছিল। সে দিন দৃঢ়ভাবে আপনার শক্তিতে প্রত্যয় করিয়া সে কাজ লইয়াছিল। এতদিন পরে আজ কেন যে তাহার মতে এটুকু পরিবর্তন হইল, তা সে বুঝিতে পারিল না। সে বুঝিতে পারিল না, অপ্রত্যাশিত ঘটনায় তাহার হৃদয়ের সে দৃঢ়তা কোমল হইয়াছে - যে পটে রেখাপাত হয় নাই, তাহাতে যেন বর্ণপাতের আভাস পাওয়া যাইতেছিল। সে যেন নিশাশেষের ধূসর গগনে প্রথম দিবালােক বিকাশের সূচনা-ধুসর কেবল গাঢ় হইতে ফিকা হইয়া আসিয়াছে, আর তাহারই পশ্চাতে—দূরে অতি কোমল—অদৃশ্য প্রায় রক্তাভা ধূসরে অঙ্গ মিশাইয়া দিতেছে। করুণ। স্নেহে এবং স্নেহ প্রেমে পরিণতি লাভ করে । সে পরিণতি এনন ধীরে ধীরে---- এমন স্বাভাবিক নিয়মে হইয়া যায়, যে মানুষ তাহা বুঝিতেই পারে না। তাহার পর কয় দিন সরল ঐ কবিতাটিই প্রভাত-নলিনীকে পড়াইল। দ্বিতীয় দিনই সে আর একখানি পুস্তক আনিয়াছিল ; সুতরাং উভয়ের পক্ষে আর পাশাপাশি বসিবার কোনও প্রয়ােজন ছিল না। কিন্তু প্রভাত-নলিনী তাহার পূর্বদিনের অধিকৃত আসনেই আসিয়া বসিয়াছিল। সরল কেমন করিয়া তাহাকে বারণ করিবে—কি বলিয়া বারণ করিবে ? এক একবার সরল লক্ষ্য করিত, প্রভাত-নলিনী পুস্তক ছাড়িয়া তাহার দিকে চাহিয়া আছে —তাহার, নয়নে দীপ্তি। সে মুখ তুলিলেই প্রভাত-নলিনীর দৃষ্টি e

গোলা-বালি
পারিত ?
পত হইয়া পড়িত, এবং তাহার মুখের উপর বেন রক্তাভা ছড়াইয়া
পড়িয়া মিশাইয়া যাইত।
কয় দিনে কবিতাটি শেষ হইল। সে দিন প্রভাত-নলিনী সরলকে
জিজ্ঞাসা করিল, “ভগবানের আরাধনা কি প্রেম হতেও পবিত্র ?”
সে বােধ হয় মনে করিত, সরল সৰ্ব্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত—সে সব
কথারই সদুত্তর দিতে পারে। নহিলে কি সে এমন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে
যে প্রশ্নের উত্তর দর্শনের অনুশীলনকারীরা—তত্ত্বদর্শীরাও
দিতে পারেন না, প্রভাত-নলিনী আজ সরলকে সেই প্রশ্ন করিল।
সরল বলিল, “যাঁহারা ধৰ্ম্মালােচনা করেছেন, তাঁরাই তােমার
এ প্রশ্নের সদুওর দিতে পারেন।” .
“এ কথা কি এত জটিল ?”
“তাই বটে। তবে শুনেছি, মানুষ তার সীমাবদ্ধ হৃদয়ে সহসা
অসীম ভগবানের ধারণা করতে পারে না; তাই বুঝেই হিন্দু
শাস্ত্রকাররা সাকার থেকে নিরাকারের পূজার ব্যবস্থা করেছেন ; তাই
স্ত্রীলােকের কাছে স্বাণীইঈশ্বর---স্বাণী থেকে ঈশ্বরে পৌঁছান সহজ।”
“তবে যাকে ভালবাসা যায়, তাকে অবলম্বন করে সহজে
ভগবানের কাছে পৌঁছান যায় ?
“বােধ হয়।”
প্রভাত-নলিনীর নয়নে যেন আনন্দের কিরণ ফুটিয়া উঠিল ।
সে জিজ্ঞাসা করিল, “যে ভালবাসে, সে-ই তবে সে আশা
করতে পারে ?”
“পারে।”

চোরাবালি “এই কবিতার নায়ক নায়িকার বিয়ে হয়নি। কিন্তু তা এই যে ভালবাসা—এও ত পবিত্র ?” “এতে অপবিত্রতা নেই-আত্মত্যাগই আছে। কাজেই এ ত পবিত্রই।” সে দিনও সরল যাইবার সময় ভাবিতে ভাবিতে গেল, প্রভাত- নলিনী এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে কেন ? আর তাহার জিজ্ঞাসায় এত আগ্রহই বা কেন? তাহার পর সরল অনেক ভাবিয়া কোন্ কবিতা পড়াইবে স্থির করিল। সে বায়রণের ‘সিলনের বন্দী’ কবিতা পড়াইতে আরম্ভ করিল। সে কবিতায় করুণরসের বন্যা আছে ; কিন্তু প্রেমের সংস্পর্শও নাই। সেই জন্যই বাছিয়া বাছিয়া সরল সেই কবিতাটি পড়াইতে আরম্ভ করিল। প্রভাত-নলিনীকে প্রেমের কবিতা পড়াইতে তাহার সঙ্কোচ যেন অতিমাত্রায় বাড়িয়া উঠিল। কখনও এমন সঙ্কোচ অনুভব করে নাই—তাহার হৃদয়ের দৃঢ়তা যেন সে আর রক্ষা করিতে পারিতেছিল না। তাহার প্রকৃতি যেন পরিবর্তিত হইয়া যাইতেছিল। কিসে এমন হয় ; কি ভাবের , সঞ্চারে সাহসী সরল যুবক লাজুক হয়, আর স্বভাবতঃ সঙ্কুচিত কিশােরী যুবতী সাহসী হয়—তাহা সরল তখনও বুঝে নাই। যে কবিতা সে পড়াইল, তাহা পাঠ করিতে করিতে প্রভাত- নলিনী কত কাদিল ; জিজ্ঞাসা করিল, “মানুষ মানুষের উপর অত্যাচার করে কেন?” সরল বলিল, “মানুষের দুষ্ট স্বভাব।”

গা-বালি “কেন, সব মানুষ মানুষকে ভালবাসতে—দয়া করতে পারে ? তা হলে ত জগতে এত দুঃখ কষ্ট থাকে না।” “সকলের মনের ভাব যদি তেমন হয়, তবে ত পৃথিবীই স্বর্গ হয়।” “তাই কেন হয় না ?” সরলের মনে হইল, সে প্রভাত-নলিনীর হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত দেখিতে পাইলসেখানে কেবল সেই বাসনা, পৃথিবীতে সকলেই সকলকে ভালবাসুক। যাহার হৃদয় এমন বাসনায় পূর্ণ, সে দুঃখ পায় কেন ? বিধাতা বল—অদৃষ্ট বল-~-এমন বিধান করেন কেন? সরল ভাবিয়া এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারিল না। তাহার মনে কেবল অবিশ্বাসের সঞ্চার হইতে লাগিল। সরল ও প্রভাত- নলিনী, উভয়েরই মনে যে একটা পরিবর্তন-একটা চাঞ্চল্য—একটা অনিশ্চয়ের ভাব অনুভূত হইতেছিল, তাহা উভয়েই বুঝিতেছিল। যখন ভূমিকম্প হয়, তখন কে তাহা বুঝিতে না পারে ? কিন্তু সে চাঞ্চল্য কিসের পরিচায়ক, সে অনিশ্চয়তার কারণ কি, তাহা বুঝিতে সরলের যত বিলম্ব হইল, প্রভাত-নলিনীর তত বিলম্ব হইল না। সরলের আগমনপ্রতীক্ষায় অধীরতা—তাহার আগমন-বিলম্বে চাঞ্চল্য—এ সব যেন প্রভাত-নলিনীৱ দিন দিন বাড়িতে লাগিল। যতক্ষণ সরল তাহার কাছে থাকিত, ততক্ষণ সে যেন অমৃতের আস্বাদ পাইত, সে চলিয়া গেলেও—ফুল ঝরিয়া পড়িলেও তাহার সৌরভের মত সে আনন্দ বহুক্ষণ তাহার হৃদয় পূর্ণ করিয়া রাখিত। এ ভাব যত বাড়ীতে লাগিল, তত প্রভাত-নলিনী ভাবিতে লাগিল, এ কি! তাহার পর যে দিন সে তাহার আপনার হৃদয় পরীক্ষা করিতে ।

নো-বালি গেল, সেদিন দেখিল, যে হৃদয়-পট পূর্বে শূন্য ছিল, তাহাতে বিচিত্রবর্ণে এক জনের মূর্তি ফুটিয়া উঠিয়াছে। সে কে, তাহা চিনিতে তাহার একটুকুও বিলম্ব হইল না। এ চিত্র কে—কবে আঁকিয়া দিল? সে ত জানিতেও পারে নাই ! কোন কোন বর্ণে চিত্রিত চিত্র প্রথমে অদৃশ্য থাকে, তাহার পর একটু তাপ পাইলেই আত্মপ্রকাশ করে। এও কি তাহাই ? প্রেমের বর্ণে চিত্রিত সেই চিত্র কি তবে ঘটনার তাপে ফুটিয়া উঠিয়াছে ? কারণ যাহাই হউক না কেন-সে চিত্র কি সুন্দর ! সে চিত্র দেখিতে কত সুখ ! সে চিত্র কি সে মুছিতে পারে? না-না-না। সে ছবি মুছিতে চেষ্টাই বা সে করিবে কেন ? ভালবাসিবার অধিকার ত সকলেরই আছে। যখন সে অধিকার তাহার আছে, এবং ভালবাসিয়াই তাহার:সুখ, তখন সে সে ছবি মুছিবে না। সে যে সেই পটের পূজা করিতে পাইলেও আপনাকে ধন্য মনে করিবে ! ভালবাসা মানুষের পক্ষে একান্তই স্বাভাবিক-~-তাহা পাইবার জন্য মানুষের হৃদয় ব্যাকুল হয়, না পাইলে হৃদয় মরুমাত্র হয়। সেই ভালবাসা সে পাইয়াছে—যাহ পাইবার আশা ত্যাগ করিতেছিল, তাহাই তাহার হস্তগত হইয়াছে ; সে কি তাহাকে ফেলিয়া দিতে পারে? ফেলিয়া দিয়া সে কেন করিয়া দগ্ধজীবনে ফিরিয়া যাইবে ? একবার সুখের আস্বাদ পাইয়া দুঃখ ভােগ করা যে বড় দুঃখের। দরিদ্র অপরিসীম ধন রত্ন পাইলে যেন সাগ্রহে ও সযত্নে তাহ রক্ষা করে, প্রভাত-নলিনী এই ভালবাসা তেমনই ভাবে হৃদয়ে রক্ষা করিতে লাগিল। তাহার হৃদয় সেই ভালবাসায় পূর্ণ হইয়া চােরাবালি ; গেল। কবিতায় সে যে নূতন জগতের সন্ধান পাইয়াছিল, সে যেন সেই জগতে—সেই কল্পনারাজ্যে বাস করিতে লাগিল। সরল যখন কথা কহিত, তখন সে যেন কর্ণময় হইয়া সেই কথামৃত পান করিত; সে যেন দৃষ্টিময় হইয়া সরলের সৌন্দৰ্য্য দেখিত। এই যে ভাব, ইহারই কথায় বৈষ্ণব কবি বলিয়াছেন-- “ব্রজগােপী-নেত্র যেন ভ্রমরের পাতি, কৃষ্ণ-মুখ-নীলপদ্মে পড়ে মাতি মাতি।” তাহার পর--সরল যখন চলিয়া যাইত, তখন সে তাহার কথা ভাবিত। সেই ধ্যান! যে সময়টা সরল কাছে থাকিত, সে সময়টা যে কোথা দিয়া চলিয়া যাইত, তাহা প্রভাত-নলিনী বুঝিতেই পারিত না। সে চলিয়া গেলেই মনে করিত—এত শীঘ্র ! কিন্তু আপনার মনের পরিবর্তন উপলব্ধি করিতে সরলের কিছু বিলম্ব হইল। এইরূপ ভাবান্তর স্ত্রীলোেক যত শীঘ্ৰ বুঝিতে পারে, পুরুষ তত শীঘ্ন পারে না। এই উপলব্ধির চাঞ্চল্যই অনেক স্ত্রীলােকের বিপদের কারণ হয়। সরল আপনার ভাবান্তর বুঝিবার পূৰ্বে প্ৰভাত-নলিনীর ব্যবহারে পরিবর্তন লক্ষ্য করিল। সে দেখিল, বসন্তের বাতাসে যেমন প্রকৃতির কুঞ্জে সৌন্দৰ্য্য বিকশিত হয়, তেমনই কোনও অজ্ঞাত কারণে প্রভাত-নলিনীর চিন্তাকুল মুখে হর্ষোজ্জ্বল দীপ্তি ফুটিয়া উঠিয়াছে ; প্রভাতের রবিকরে যেমন সুপ্ত হ্রদের জলরাশি জ্বলিতে থাকে, কোনও অজ্ঞাত ভাবের স্পর্শে তেমনই প্রভাত-নলিনীর নয়নের দৃষ্টি হৃদয়ানুভূত আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। জলের উপর হইতে মেঘের ছায়া সরিয়া গেলে গেনা-বালি নদীর জল যেমন দেখায়, তাহার দৃষ্টি তেমনই মধুর হইয়াছে। সরল ভাবিত---কেন প্রভাত-নলিনীর এই পরিবর্তন—কিসে তাহার এই ভাবান্তর হইয়াছে ? প্রভাত-নলিনীর নয়নালােকে সরল আপনার হৃদ- য়ের রহস্য দেখিতে পাইল; বুঝিতে পারি, তাহারও ভাবান্তর ঘটিয়াছে —তাহার হৃদয়পটে তাহারও অজ্ঞাতে এ কি ছবি ফুটিয়া উঠিতেছে ? আপনার হৃদয় দেখিয়া প্রভাত-নলিনী শঙ্কিতা হয় নাই--সে আপনার আনন্দের অনুভূতিতে বিভাের হইয়াছিল। সরল শঙ্কিত হইল—ভাবিল, এ কি হইল! আপনার উপর তাহার ধিক্কার জন্মিল। শিক্ষা ও সাধনা কি তাহার হৃদয় সবল করিতে পারে নাই ? সে কি আপনাকে আপনি চিনিতে পারে নাই? তবে আপনাকে বিশ্বাস কি ? আর ত বিশ্বাস করিয়া অবিচলিত থাকা সঙ্গত নহে ! পিতামাতার প্রতি তাহার কৰ্ত্তব্য আছে~~-আপনার প্রতিও আছে। তবে সে চোরাবালিতে পড়ে নাই ; সে তাহার অভ্যস্ত সংযম ক্ষুন্ন হইতে দিবে না। সরল আপনার জীবনকে সৰ্ব্বতভাবে সুনিয়ন্ত্রিত করিয়াছিল পরীক্ষার পড়া, প্রভাত-নলিনীকে পড়ান- সবই যেন ঘড়ির কাটার মত চলিতেছিল। ইহার মধ্যে কখন্ যে তাহার মনের মধ্যে নূতন ভাব আসিয়া বসিয়াছে, সে জানিতে পারে নাই। " বুঝি এমনই করিয়া ফাল্গুনমাসের একদিন বসন্ত অজ্ঞাতভাবে আসিয়া হিমকঠিন পৃথিবীর বুক জুড়িয়া বসে। কিন্তু যখনই সরল আপনার অবস্থা জানিতে পারিল, তখনই কর্তব্যনির্ধারণে প্রবৃত্ত হইল। সে দিন সন্ধ্যার পর সে যখন আপনার কক্ষে বসিয়া ভাবিতেছিল,

চোরাবালি
তখন সুহৃদ তাহার কাছে আসিল। শরৎ বাবুর এক ছেলে
তাহার সঙ্গে পড়ে। সে কোথায় শুনিয়াছিল, সরল একটি যুবতীকে
পড়াইতেছে। ব্যাপারটা কি, জানিবার জন্য কৌতূহলবশে সে
সুহৃদকে সে কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিল। এক সুহৃদই আসল কথা
জানিত। কিন্তু সে সরলকে এতই ভালবাসিত যে, পাছে বন্ধুর
নিন্দা রটে, এই ভয়ে সে কাহাকেও সে কথা বলে নাই—শরৎ
বাবুর ছেলেকেও বলে নাই। কিন্তু সরল যে প্রভাত-নলিনীকে
পড়ায়, ইহা তাহার একান্তই ইচ্ছাবিরুদ্ধ ছিল। সুঙ্গদ আসিয়া
দেখিল, সরলের মুখ চিন্তায় অন্ধকার—কপাল কুঞ্চিত। সুহৃদ
জিজ্ঞাসা করিল, “কি এত ভাবছ ?”
সরল উত্তর দিল, “ভাবছি, মেয়েটিকে পড়ান ছেড়ে দেব।”
“রাম বল, বাঁচা গেল।”
“কেন, এত নিশ্চিন্ত হলে কেন?”
“চিন্তা যে আমার গােড়া থেকেই ছিল, তা ত তুমি জান।
তার পর আবার---
“কি বলই না?”
“তার পর, লােক এ কথা নিয়ে আলােচনা করতে আরম্ভ করেছে।”
অন্যদিন হইলে এই কথাতেই সরল বিদ্রোহী হইয়া উঠিত--
বাধা পাইলে সঙ্কল্পে দৃঢ় হওয়াই তাহার স্বভাব। কিন্তু আজ আর
তাহা হইল না। কেন না, লােকের কথা সরল যত তুচ্ছই কেন
মনে করুক না, সে আপনার দৌর্বল্য আপনি জানিতে পারিয়াছিল ।
সে বলিল, “তাই না কি?”
,

ভোলা-বালি সুহৃদ বলিল, “হ। আর কেনই বা পড়ান ?--তােমারও ত পরীক্ষার পড়া পড়ৰে।” সরল চুপ করিয়া রহিল। সুহৃদ তাহার কথা শুনিয়া সত্যসত্যই আনন্দলাভ করিয়াছিল। বন্ধুর সম্বন্ধে লােক কোন অপ্রিয় কথা বলে, ইহা তাহার পক্ষে কষ্টের কারণ হইত; কারণ, প্রতিভাবান সৰ্ব্বকাৰ্যে পদ্ধতিবদ্ধভাবে কাৰ্য্যকারী বন্ধুটিকে সে শ্ৰদ্ধ, করিত, এবং তাহার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কালে সরল দেশে প্রসিদ্ধি লাভ করিবে। সেই জন্যই সে শরৎ বাবুর পুত্রের কাছে আসল কথাটা গােপন করিয়াছিল। সৌভাগ্যক্রমে শরৎ বাবুর ছেলেও তাহাকে সে বিষয়ে জেরা করে নাই। বিমাতার ব্যবহারে সে বিরক্ত হইয়াই ছিল, সুতরাং বৈমাত্রেয় ভগিনীর ভাবী পতির সম্বন্ধে বিশেষ সন্ধান লওয়া সে কৰ্তব্য বলিয়াই মনে করে নাই--সে কৰ্তব্য পিতার ; বিশেষ, সে কোনও কথা কহিলে বিমাতা হয় ত বলিয়া বসিবেন—সে ঘােড়া ডিঙ্গাইয়া ঘাস খাইতেছে। তাহার অত কথায় কাজ কি ? সরল যখন বলিল, সে প্রভাত-নলিনীকে পড়ান ছাড়িয়া দিবে, তখন সুহৃদ সে বিষয়ে আর আলােচনা নিষ্প্রয়ােজন মনে করিয়া চুপ করিল। সে সরলের ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। সরল ভাবিতে লাগিল। এ বিষয়ে কর্তব্য স্থির করিতে তাহার অধিক বিলম্ব হইল না ; সে পড়ান ছাড়িয়া দিবে--এই কয় মাসের ব্যাপারটা ভবিষ্যৎ জীবনে স্বপ্ন বলিয়াই বােধ হইবে। সে কেমন করিয়া সে কথা প্রভাত-নলিনীকে জানাইবে, সে তাহা ভাবিতে * চোরাবালি লাগিল। "আর ভাবিল, প্রভাত-নলিনী কি তাহাকে ভালবাসিয়াছে ? তখন তাহার মুখের সেই প্রফুল্লতা, নয়নের সেই দীপ্ত দৃষ্টি তাহার মনে পড়িল। সে কি প্রেমেরই পরিচায়ক ? যাহাই হউক, সে প্রভাত-নলিনীর সান্নিধ্য ত্যাগ করিবে। কি পত্র লিখিয়া সে কথা জানাইবে ? কেন ? একদিন বাইয়া সে কথা বলিয়া আসিতে পারে, আপনার উপর কি তাহার ততটুকু বিশ্বাসও নাই ? বিশেষ, এতদিনের পরিচয়ে সে কোন দিন প্রভাত- নলিনীর উপর বিরক্ত হইবার কোনও কারণই পায় নাই--আজ একবার বিদায়ও লইবে না ? সে দিনও সরল অন্য দিনেরই মত প্রভাত-নলিনীকে পড়াইল। তাহার পর প্রভাত-নলিনী যখন জিজ্ঞাসা করিল, “কাল কি পড়া, হবে ?” তখন সরল বলিল, “কাল থেকে আমি আর আসব না।” সহসা প্রভাত-নলিনীর মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল—তাহার চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিল, সে কম্পিতকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “কেন?” এ “কেন”র উত্তর সরল কেমন করিয়া দিবে ? প্রভাত-নলিনীর বিবর্ণ মুখ, অপূর্ণ নয়ন তাহার হৃদয়ে যে মূক নিবেদন জানাইল, তাহা তাহাকে বিচলিত করিল। আজ সত্যসত্যই তাহার হৃদয়ে কর্তব্যে ও ভালবাসার বিরােধে সংগ্রাম বাধিল। সে কি করিবে ? কিন্তু সে সঙ্কল্প স্থির করিয়া আসিয়াছিল—বলিল, “আমার আর পড়ান সঙ্গত নয়।” প্রভাত-নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “আমার অপরাধ ?” : আর এক দিন আর এক জনকে সে এই প্রশ্ন করিয়াছিল-সে দিন দুলালের উত্তরে তাহার হৃদয় ঘৃণায় পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল।

রো-বালি
সরল ধীরে ধীরে উত্তর দিল, “তােনার কোন অপরাধ নাই।”
প্রভাত-নলিনীর মনে যেন আশার অবকাশ হইল। সে জিজ্ঞাস।
করিল, “তবে কেন আসবেন না ?”
সরল নিরুত্তর রহিল ।
প্রভাত-নলিনীর আশা আরও বাড়িল। সে বলিল, “আমি
অসহায়া ; আপনার উপদেশে আণি অকূলে কূল পেয়েছি। যদি
আনার কোনও অপরাধ না থাকে, আমায় অকূলেই ফেলে
দেবেন না—যদি অপরাধ করেও থাকি, ক্ষমা করবেন—ক্ষম।
করবেন।”
প্রভাত-নলিনীর দৃষ্টির কাতরতা সরলকে তাহার সঙ্কল্পের
ভ্রান্তি বুঝাইয়া দিল। ' তেমন কাতরতা সরল আর কখনও কাহারও
দৃষ্টিতে দেখে নাই। সে বলিল, “অপরাধ তােনার নয়---আমার।”
প্রভাত-নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “আপনার!” সরল কি কোনও
অপরাধ করিতে পারে ?
সরল বলিল, “হ। আমি যখন তােমাকে পড়াতে স্বীকার
করি, তখনই অমর বাবু আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন---
আমার বয়স ও তােনার অবস্থা বিবেচনা করে বলেছিলেন—যেখানে
চোরাবালি, সেখানে বড় সাবধান হতে হয়।”
“কিন্তু কই, আপনি ত কোন রকমে অসাবধান হন নি।”
| “কিন্তু অসাবধান না হলেও সাবধান থাকতে পারিনি—সে
কথা আমি আপনার মনে আপনি বুঝতে পারছি।”
প্রভাত-নলিনীর মুখের বিবর্ণতা দূর হইয়া গেল-নিশাবসানে

গেস্না-বালি পূৰ্ব্বগগনে অরুণাভাবিস্তারের মত তাহার মুখেও রাভা ছড়াইয়া পড়িল। সে বলিল, “এই কি অপরাধ ? কই, আমি ত এ অপরাধ বলে ভাবতে শিখিনি—পারিনি! আমি ত এ জন্য আপনাকে কখনও অপরাধী মনে করিনি।” সরল যেন চমকিয়া উঠিল । তবে তাহার সন্দেহই সত্য-- প্রভাত-নলিনী তাহাকে ভালবাসিয়াছে। তাহার মনে হইল, যে কবিতা অবলম্বন করিয়া ভালবাসা সম্বন্ধে তাহার সঙ্গে অত আলােচনা না করিলেই বােধ হয় ভাল হইত। তাই কি? প্রভাত- নলিনী সেই কবিতা অবলম্বন করিয়া তাহাকে যে সব প্রশ্ন করিয়াছিল, সে সব জিজ্ঞাসার ব্যাকুলতায় ও আগ্রহে সে সেই সময়েই বিস্মিত হইয়াছিল। আজ তাহার কারণ বুঝিল। সে বলিল, “আমার প্রধান কর্তব্য পিতামাতার প্রতি।” প্রভাত-নলিনী বলিল, “ভাল, যদি আমাকে চোরাবালি বলিয়াই মনে হয়--আপনি যা ভাল মনে করেন--করুন। কিন্তু আমার অনুবােধ-আমার ভিক্ষা, যেন বিপদের সময় আপনার উপদেশ পাই। আমি আর কিছু চাই না। আপনি নিকটেই থাকুন, আর দূরেই থাকুন, আমি আপনাকে ভক্তি করেই সুখ পাব। সে সুখ থেকে আপনিও আমাকে বঞ্চিত করতে পারবেন না---সে অধিকার আমার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।” প্রভাত-নলিনীর স্বরের দৃঢ়তা তাহার হৃদয়ের—সঙ্কল্পের দৃঢ়তারই পরিচয় দিতেছিল।

রাে-বালি
সরল বলিল, “আমি আর একবার ভেবে দেখি।”
সে চলিয়া গেলে প্রভাত-নলিনী অপনার অবস্থা উপলব্ধি
করিতে চেষ্টা করিল-পারিল না। তাহার হৃদয়ে অব্যক্ত বেদনা-
বুক ছাপাইয়া নয়নে অশ্রু ঝরিতে লাগিল। সে সরলকে কত
ভালবাসিয়াছে, তাহা সে আজ বুঝিতে পারিল ; কারণ, তাহাকে
হারাইবার কল্পনাতেই সে জীবন শূন্য ও ভবিষ্যৎ অন্ধকার
দেখিতে লাগিল। সে অন্ধকারে কোথাও আলাে ফুটিবার সম্ভাবনা
নাই, যেন ঘনমেঘাচ্ছন্ন অমাবস্যার রজনীর অন্ধকার।
সে ধীরে ধীরে দিনে দিনে আপনাকে এমন ভাবে সরলকে
দিয়াছে যে, আপনার জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট রাখে নাই--
রাখিতে চাহেও নাই।
আজ সে মনে করিল, তাহার অদৃষ্টেরই দোষ, নহিলে সে
আজও এ দুঃখে পড়িবে কেন? সে ত আর কিছুই চাহে না ;
সে সরলকে দেখিতে পাইলে—তাহার কথা শুনিতে পাইলে-দূর
হইতে তাহাকে পূজা করিতে পাইলেই কৃতার্থ হয়, সুখী হয় ।
সে কি সে অধিকারেও বঞ্চিত হইবে ? কোন্ অপরাধে, কোন্
পাপে?
সে ত জ্ঞানতঃ কোনও পাপ করে নাই। যে সকল রমণী সুখের
ও শান্তির সব উপকরণ পাইয়াও প্রকৃতির তাড়নায় অসংযত হয়,
তাহারা পাপী ; যে সব পুরুষ গৃহে পূজা পদাঘাতে পরিহার
করিয়া কলুষিত জীবনপথে অগ্রসর হয়, তাহারা পাপী।
সে ত’ তেমন কোনও কাজ করে নাই। বরং বাহিরের পাপে

নাে-বালি
সংক্রামিত হইয়া দুলাল যখন সে পাপ ঘরে আনিয়াছিল, তখন সে
তাহার প্রতিবাদকল্পে গৃহের পবিত্রতা রক্ষা করিয়া--আপনার
পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখিয়া আপনি অকূলে ভাসিয়াছে। তবুও
তাহার এ দুঃখ কেন ?
সারা রাত সে বিনিদ্র হইয়া কাদিল । সকালে উঠিয়া
অনিশ্চয়ের যাতনা ভােগ করিতে লাগিল। সরল ভাবিয়া কি
স্থির করিল ? সে কি তাহার ভালবাসা—তাহার পূজা ঘৃণায়
পদদলিত করিবে ? ভালবাসার সে অপমান কি প্রভাতনলিনী
সহ করিতে পারিবে !
তাহার পর অন্য দিনেরই মত সরল যখন আসিল, তখন কি
।

সপ্তম পরিচ্ছেদ। প্রভাত-নলিনীর কথার অপেক্ষাও তাহার কাতর দৃষ্টি সরলকে অধিক চঞ্চল করিয়াছিল। সে বলিয়া গিয়াছিল—সে ভাবিয়া সে ভাবিতে আরম্ভ করিলে নানা যুক্তি দেখা দিতে লাগিল। সে যে সঙ্কল্প করিয়া গিয়াছিল, তাহার স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি বিচারের অবসর হইল । এ অবস্থায় যুবকের মন কোন্ যুক্তি প্রবল করিয়া তুলে, তাহা বলাই বাহুল্য। সে ভাবিল, মানুষের প্রতি মানুষের যদি কোনও কর্তব্য থাকে, তবে ত প্রভাত-নলিনীর প্রতিও তাহার কর্তব্য আছে। তাহার সহিত প্রভাত-নলিনীর যে সম্বন্ধ, তাহাতে অনাবিল আকর্ষণই আছে। সে অসহায়, সম্পূর্ণরূপে তাহারই উপর নির্ভর করিয়াছে। সে তাহার হৃদয়ের যে কথা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছে, সে কথা কি বিশেষ অস্থিরতা ব্যতীত কোনও নারী প্রকাশ করিয়া বলিতে পারে? বাস্তবিক সে ছাড়িয়া গেলে প্রভাত-নলিনীর উপায় কি হইবে ? সে যদি সংসারের স্রোতে ভাসিয়া পঙ্কিল আবর্তে নিমগ্ন হয়, সে জন্য কোনরূপ দায়িত্ব কি তাহাকেও স্পর্শ করিবে না ? কিন্তু পিতামাতার প্রতি তাহার কর্তব্য ? সে কৰ্তব্য সে চোরাবালি পালন করিবে। তাহাদের প্রথম অভাব-অর্থের। সেই অভাব হইতে মুক্তি পাইবার জন্যই পিতা শরৎবাবুর কন্যার সহিত তাহার বিবাহের সম্বন্ধ করিয়াছেন। কিন্তু কুটুম্বের টাকায় কি অভাব ঘুচিবে? সে টাকা কি সে উপার্জন করিতে পারে না? বিশ্ব- বিদ্যালয়ের যে ছাপ লইয়া সে বাহির হইয়াছে—বিশেষ ইংরাজী সাহিত্যে তাহার যে অধিকার, তাহাতে সে যদি অর্থপুস্তক লিখে ? সে তাহার পরিচিত এক জন যুবক প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করিল। তিনি তাহার প্রণীত অর্থপুস্তক প্রকাশ করিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। সে যদি শরৎবাবুর মেয়েকে বিবাহ না করে, তাহাতে তাহার কোনও ক্ষতি হইবে না। তিনি যে টাকা দিবেন, তাহাতে তাহার কন্যার জন্য সুপাত্রের অভাব হইবে না। সে যদি প্রভাত-নলিনীকে বিবাহ করিত, সবে সামাজিক হিসাবে তাহার পিতার বিরক্ত হইবার কারণ ঘটিতে পারিত ; কিন্তু যদি বিবাহ না করে ? স্ত্রীলােকের সঙ্গে পুরুষের ঘনিষ্ঠতার সম্বন্ধ কি বিবাহ ব্যতীত হয় না? ভালবাসা কি ভাবের বিনিময়েই প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে না? পরদিন যখন যথাকালে সরল প্রভাত-নলিনীর গৃহে উপস্থিত হইল, তখন আনন্দে প্রভাত-নলিনীর হৃদয় পূর্ণ হইয়া গেল। সে বুঝিল, সরল তাহার প্রার্থনা শুনিয়াছে। সে বিষয়ে সে কোনও কথাই বলিল না-বলা প্রয়ােজন মনেই করিল না। সরলও সে বিষয়ের আলােচনা করিল না। কিন্তু উভয়েরই হৃদয়ের গােপন কথা উভয়ে চোরাবালি জানিয়াছিল। এ অবস্থায় উভয়ের মধ্যে পূর্বে যেটুকু ব্যবধান ছিল, তাহাও আর থাকা সম্ভব রহিল না। উভয়ের সান্নিধ্যে উভয়ে পরম আনন্দ লাভ করিতে লালিল। এ দিকে সরল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য পুস্তকের অর্থপুস্তক লিখিতে প্রবৃত্ত হইল—কঠোর শ্রম করিতে লাগিল। সে সুহৃদকে বলিয়াছিল, সে ভাবিতেছে, প্রভাত-নলিনীকে পড়ান ছাড়িয়া দিবে। তাহার পর তাহাকে এই নূতন কাজে হাত দিতে দেখিয়া সুহৃদ মনে করিল, পড়ান ছাড়ায় যে আয় কমিল, তাহা পূরাইয়া লইবার জন্যই সরল এ কাজ করিতেছে। কিন্তু সে লক্ষ্য করিল, পূৰ্বে যখন সে পড়াইতে যাইত ও ফিরিয়া আসিত, এখনও ঠিক সেই সময়ে সে বাহির হইয়া যাইত ও ফিরিয়া আসিত। শেষে একদিন সে সরলকে জিজ্ঞাসা করিল, “পড়ান ছেড়ে দিলে ?” সরল বলিল, “না।” “কিন্তু মানের বই ত লিখছ।” “। ওটা অতিরিক্ত কাজ। “ওতে ওকে আর পড়ার দরকার হবে না।” “পড়ানটা এখন আর টাকার জন্য নয়।” “তবে কিসের জন্য ?” সে বিপব্যঞ্জক স্বরে বলিল- “ছাত্রীটির জন্য ?” সরল বলিল, “ঠিক তাই। “তাই?” “হ। তাকে আমার ভাল লাগে তার যাতে ভাল হয়, গেন্না-বালি তা আমি করব ; অন্ততঃ যাতে তার মন্দ না হয়, তা করবই।” সরল সত্য কথা বলিত। সুহৃদ তাহা জানিত। সে স্তম্ভিত হইয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি তাকে ভালবাস?” তাই ত মনে হয়।” “কি সর্বনাশ! শেষে তুমিও চোরাবালিতে ডুববে ? আমি তখনই বলেছিলাম।” সরল চুপ করিয়া রহিল ল--তর্ক করিতে তাহার ইচ্ছা হইল না। সুহৃদ বলি, “কিন্তু তােমার আর সব কৰ্ত্তবা—সে কথা ভেবে দেখেছ ?” “যত দূর পেরেছি, দেখেছি। যাতে কৰ্তব্যভ্রষ্ট না হই, সে জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা আমি কব; যদি দরকার হয়, আমাকে সাহায্য “তুমি কি মনে কর, এই মেয়েটাকে বিয়ে করা তােমার পক্ষে সঙ্গত-শােভন ? তুমি—তােমার সামনে যশ--- মান-সম্পদ- পদ সব আছে।” “এ সব থাকলে যে অমন মেয়েকে বিয়ে করা যায় না, তা আমার মনে হয় না। বিলাতে স্ত্রীর প্রভাবে লােকের চাকরীতে বা পদে সুবিধা হয়েছে, শুনা যায় বটে; কিন্তু মেয়েদের যা কিছু প্রভাব, সে ত অন্দরে-ভাঁড়ারঘরে, রান্নাঘরে ; আর যা কিছু ঝঙ্কার, সে শয়নমন্দিরে। এ দেশে ও কথা বলাই চলে না। কিন্তু আমি যে বিয়েই কব, এমন কথাই বা কে বলছে।”

রাে-বালি
নেই।
“বিয়ে কবে না?”
“না করতেও পারি। বিয়ে না হলে কি ভালবাসা অসম্ভব ?
“তা নয়—সমাজের নিয়ম ত সামাজিক মানুষকে মানতে হবে।”
“মানূলে কি ভালবাসা অসম্ভব হয় ?”
“তুমি বচ, প্লেটোনিক প্রেমের কথা—যাতে লালসার গন্ধ
এ সব কেতাবেই পাওয়া যায়—দর্শনের অসম্ভব-কল্পনা-
লােকের কল্পবৃক্ষে ও সব ফল ফলে। কিন্তু এই ধূলিময় জগতে
-এই রক্ত মাংসের দেহে ও হয় না।”
“একেবারে ফতােয়া দিয়ে দিলে হয় না?”
“তাই। তুমি যাই কেন বল না—তােমার এ ভাবটা আমার
একেবারেই ভাল লাগছে না। তুমি রাগ করতে হয় কর
আমি এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করলাম। আমার যা সাধ্য,
তা আমি করব—তােমাকে এ পথ ছাড়াবার চেষ্টা করব।
আমার শক্তি কম—কিন্তু আমার চেষ্টা যে আন্তরিক, তা তুমি
বিশ্বাস করো।”
“সে বিশ্বাস আমার আছে।”
আর কোনও কথা না বলিয়া সুহৃদ বন্ধুর ঘর হইতে বাহির
হইয়া গেল।
সেই রাত্রিতেই সুহৃদ কোথায় গেল । “মেসে” বলিয়া গেল,
বাড়ীর জরুরী চিঠি পাইয়া সে যাইতেছে, ফিরিতে পাঁচ ছয় দিন
বিলম্ব হইতে পারে। সরল আপনার কাজে এতই ব্যস্ত ছিল
যে, সুহৃদের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করিতে পারিল না। তাহার

রাে-বালি " জেরও অন্ত ছিল না-ভাবনারও অন্ত ছিল না। কারণ, সে মনে করিতেছিল, শরৎবাবুকে তাহার সঙ্কল্পের বা মত-পরিবর্তনের কথা জানাইতে আর বিলম্ব করা সঙ্গত নহে। তিনি ত আবার মেয়ের জন্য পাত্র দেখিবেন। তাহাকে সে কথা জানাইতে হইলে তাহার পিতাকেই জানাইতে হইবে। সে সংবাদ তিনি পাইলে বাড়ীতে কিরূপ আতঙ্কের সঞ্চার হইবে, তাহা সে কল্পনা করিতে পারিল, এবং সেই জন্যই সে পিতাকে সংবাদ দিতে বিলম্ব করিতে লাগিল । কিন্তু যখন সে স্থির করিয়াছে, বিবাহ করিবে না, তখন আর বিলম্ব করাও ত সঙ্গত নহে ! সে পিতাকে পত্র লিখিল—লিখিয়া ছিড়িয়া ফেলিল ; আবার লিখিল-লিখিয়া আবার ছিড়িল। পূৰ্ব্বে কখনও তাহার এমন হয় নাই। শেষে যে দিন সে একখানা পত্র লিখিয়া ডাকে ফেলিয়া দিল, সেই দিনই সন্ধ্যার সময় তাহার পিতা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সঙ্গে সুহৃদ ! সুহৃদ যখন দেখিল, সরলকে সঙ্কল্পচুত করা তাহার ক্ষমতায় কুলাইবে না, তখন সে মনে করিল—এই ব্যাপার সরলের পিতাকে জানান তাহার কর্ত্তব্য। কারণ, সে সরলকে ভালবাসিত, এবং শ্রদ্ধা করিত। সরলের কুশাগ্র বুদ্ধি—সর্বকাৰ্যে শৃঙ্খলাপ্রিয়তা চিত্তের দৃঢ়তা, এ সব তাহার প্রশংসা আকৃষ্ট করিয়াছিল। (म সরলের বন্ধুত্ব বিশেষ মূল্যবান বলিয়া মনে করিত, এবং সরলকে বিপদ হইতে রক্ষা করা আপনার কর্ত্তব্য বিবেচনা করিত। তাই সে সরলের বাড়ীতে গিয়াছিল। তথায় ধাইয়া সে তাহার । ১০৪ নো-বালি পিতাকে সকল কথা জানাইয়াছিল, এবং তাঁহাকে কলিকাতায় যাইয়া সরলকে বুঝাইয়া নিবৃত্ত করিবার চেষ্টা করিতে বলিয়াছিল। শুনিয়া সরলের পিতা যেন হতবুদ্ধি হইয়া গেলেন। সরলকে অবলম্বন করিয়া তিনি অকূলে কূল পাইবার, আশা করিয়াছিলেন। শরৎ বাবু তাহাকে যে টাকা দিবেন, তাহাতে গ্রামের সম্পত্তিটুকু উদ্ধার হইবে--তিনি “ঋণ পাপ” হইতে অব্যাহতি লাভ করিবেন-- জীবনের সায়াহ্নে নিশ্চিন্ত হইয়া “হরিনাম করিবার অবসর পাইবেন। তাহার পর--সরল যেরূপ ধারাল ছেলে, তাহাতে হয় ত তিনি তাহাকে কোনও উচ্চ পদ বা সম্পদ লাভ করিতে দেখিয়া মরিতে পারিবেন। তখন তাঁহার সব দুঃখ ঘুচিবে- বংশের লুপ্ত গৌরবের পুনরুদ্ধার হইবে। কত আশা ! সে সব আশা কি তবে স্বপ্নের মত অসার হইয়া গেল ? তিনি কি সত্যসত্যই জাগিয়া স্বপ্ন দেখিয়াছেন ? সরল যদি কুলত্যাগিনীকে বিবাহ করে, তবে তিনি কেমন করিয়া লােকসমাজে মুখ দেখাইবেন? সুহৃদ তাহাকে আশ্বাস দিল, তিনি বুঝাইলে সরল বুঝিবে—তাহার কর্ত্যব্যবুদ্ধি অত্যন্ত প্রবল। কৰ্ত্তা সুহৃদের পরামর্শে স্থির করিলেন, এ কথা এখন কাহাকেও জানাইবেন না শেষে কিন্তু গৃহিণীকে না বলিয়া থাকিতে পারিলেন না। শুনিয় গৃহিণী অশ্রুবর্ষণ করিতে করিতে শিরে করাঘাত করিয়া বলিলেন, “সবই আমার অদেষ্ট। নইলে এমন হবে কেন ? বলে—“আমি যাব বঙ্গে, আমার কপাল যাবে সঙ্গে।” কৰ্ত্তা বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “কি আপদেই পড়েছি! এ কথা জানাজানি হলে কি

;
গেন্না-বালি
আর মুখ দেখান যাবে? তা তুমিই দেখছি পাড়ায় কথা রাষ্ট
করবে,-না করে ছাড়বে না!” তখন গৃহিণী চুপ করিলেন।
সহসা পিতাকে উপস্থিত হইতে দেখিয়াই সরল বুঝিল, তিনি
কোন সূত্রে সংবাদ পাইয়াছেন। তখন সূত্রের সন্ধান করিতেও
তাহার বিলম্ব হইল না। কিন্তু সে সুহৃদের উপর রাগ করিবার
কোনও কারণ পাইল না—সে ত মন্দ ভাবিয়া এ কাজ করে নাই।
তাহার মনে হইল, বাবা আসিয়াছেন--ভালই হইয়াছে ; সব
কথার মীমাংসা হইয়া যাইবে; তিনি তাহাকে ভুল বুঝিবার অবসর
পাইবেন না।
রাত্রিতে পিতাপুত্র এক কক্ষে শয়ন করিলেন । পিতার
শয্যা রচনা করিয়া দিয়া সরল যখন অর্থপুস্তক লিখিতে বসিবে,
তখন পিতা বলিলেন, “সরল, আমি শরৎ বাবুর এক পত্র
পেয়েছি।” তিনি এ দিক দিয়া কথাটা পাড়িবার আয়ােজন
করিলেন--কথাটা সহজ ভাবে ছেলেকে কি বলা যায় ?
সরল বলিল, “আমি আজই আপনাকে
একখানা চিঠি
লিখেছি। আপনি এসেছেন,
ভালই হয়েছে। শরৎ বাবুকে
জানাতে হবে, আমি বিয়ে করব না। তিনি যেন আমার
অপেক্ষায় না থাকেন।”
“সে কি কথা সরল ! সব কথা হয়ে গেছে, কেবল ত সাতপাক
বাকী। এখন তােমার মত বদলান কেন?”
“কিন্তু তাতে তার কোনও অসুবিধা হবে না। তিনি টাকা
দেবেন—ভাল পাত্রই পাবেন।”
--

সেরা-বালি
“তাও কি হয়?”
“কিন্তু উপায় কি ?”
“আর আমিও ঐ আশায় মহাজনকে বলে রেখেছি—তাই
সে স্থির হয়ে আছে।”
“সে জন্য ভাববেন না। আপনি শরৎ বাবুর কাছ থেকে পেয়ে
যে টাকা মহাজনকে দিতেন, সে টাকা আমিই দেব। তবে
দিনকতক দেরী হবে।”
“তুমি কোথা থেকে দেবে?”
“আমি মানের বই লিখছি ; তাই থেকে দেব।”
“তােমার পাশের পড়া—এ সময় ও দিকে সময় দিলে পারবে
কেন ?”
“তাতে কোনও ক্ষতি হবে না।”
“কিন্তু তুমি শরৎ বাবুর মেয়েকে বিয়ে করবে না কেন?
মেয়ে মন্দ নয়। আর যদি তেমন সুন্দরী না-ই হয়, তবে
চলনসই থেকে কালো পর্যন্ত মেয়েগুলিরও ত বিয়ে হওয়া চাই।”
“আপনি যখন আমার সম্বন্ধ ঠিক করেছিলেন, তখন কি
একবারও আমি কোনও কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যে আজ ও
কথা বলছেন?”
“তবে?”
“তার পর এমন কারণ হয়েছে যে, আমি এ বিবাহ করতে
পারি না-ক’রব না।”
“আমি শুছি, তুমি নাকি একটি
১০৭

চেন্না-বালি
পিতা প্রভাত-নলিনীর সম্বন্ধে কিরূপ কথা বলিতে পারেন,
সরল তাহা অনুমান করিয়া লইল, এবং তিনি কথা শেষ করিবার
পূৰ্বেই বলিল, “আপনি যা শুনেছেন, তাই ঠিক।”
“তােমার এমন প্রবৃত্তি হ’ল! লেখাপড়া শিখে--সকলের
কাছে প্রশংসা পেয়ে, তুমি--*
বাধা দিয়া সরল বলিল,-“আপনি যদি তিরস্কার করেন,
আমি তা মাথা পেতে নেব। তবে জানবেন, আমি কোনও অন্যায়
কাজ করব না।”
“এতে যে লােক হাসবে-মুখে চূণকালি পড়বে।”
“যাতে লােক না হাসে, তা আমি করব। তবে আমি
লােকের হাসির ভয় করিনে—কেবল আপনার জন্যই তা
গ্রাহ্য করি।”
পিতা দেখিতে লাগিলেন, তিনি যত বুঝাইবার চেষ্টা করেন
পুত্র ততই সঙ্কল্পে দৃঢ় হয়। শেষে নিরুপায় হইয়া তিনি বলিলেন,
“তুমি বড় হয়েছ--বিদ্বান হয়েছ। তুমি যা ভাল বুঝ কর।
fন্তু তুমি যদি শরৎ বাবুর মেয়েকে বিয়ে না কর—আর—যা
সে কথা, তােমার গর্ভধারিণীকে নিয়ে আমাকেই দেশত্যাগী
হতে হবে।”
পিতার সহিত তর্ক করা সরলের অভ্যাস ছিল না—তাহাতে
তাহার প্রবৃত্তিও ছিল না। সে কোনও উত্তর দিল না, চুপ করিয়া
রহিল। তাহার পর পিতা চুপ করিলে সে কাগজ কলম লইয়া,
অর্থপুস্তক-রচনায় মনােনিবেশ করিল। পিতা পথশ্রমে শান্ত
/
yolor

সেরা-বালি ও উৎকণ্ঠার উত্তেজনায় অবসন্ন হইয়াছিলেন—অল্পক্ষণ পরেই তাহার নাসিকা-গর্জন নিদ্রার জয় ঘােষণা করিল। অনেক রাত্রি পর্যন্ত লিখিয়া সরল শয়ন করিল, এবং ঘুমাইয়া পড়িল । সকালে উঠিয়া সে দেখিল, পিতা শয্যাত্যাগ করিয়া গিয়াছেন। বাহিরে যাইয়া সে দেখিতে পাইল, তিনি তাহার ঘরের পার্শ্বে, সুহৃদের ঘরে—সুহৃদের সঙ্গে মৃদুস্বরে কি পরামর্শ করিতেছেন। সে আপনিই যে পরামর্শের বিষয়, তাহা বুঝিতে অবশ্য সরলের বিলম্ব হইল না। সকালেই পিতা কালী দর্শন করিবেন বলিয়া কালীঘাটে গেলেন-সুহৃদ সঙ্গে গেল। সরল বুঝিল, “মেসে” সব ছেলের মধ্যে পরামর্শ করিবার অসুবিধা হইবে বলিয়াই দুই জনে কালীঘাটে গেলেন। তাহার জন্য সুহৃদের ব্যাকুলতায় সে সুহৃদের প্রশংসা করিল। তাহার স্নেহ নিঃস্বার্থ ।

অষ্টম পরিচ্ছেদ।
সরলের মুখ দেখিয়া প্রভাত-নলিনী শঙ্কিত হইল—তাহার
মুখের চিন্তার অন্ধকার। যে দিন সে তাহাকে বলিয়াছিল, সে আর
আসিবে না, সে দিনও প্রভাত-নলিনী তাহার মুখে এমন ভাব
দেখে নাই। তবে আজ কি হইয়াছে ? তাহার অদৃষ্ট কি তাহার
অন্ধকার জীবনের সুখালােক নিবাইয়া দিবার কোনও নূতন
আয়ােজন করিয়াছে ?
প্রভাত-নলিনী সরলকে জিজ্ঞাসা করিল, “আপনার কি
দুশ্চিন্তার কোনও কারণ হয়েছে ?”
সরল বিস্মিত হইল। প্রভাত-নলিনী তাহার মনের কথা
কেমন করিয়া জানিল ? সে কি প্রেমের শক্তিতে তাহার হৃদয়
নখদর্পণে দেখিতেছে? সে জিজ্ঞাসা করিল, “কেন?”
“আপনার মুখ কালবৈশাখীর মত অন্ধকার দেখলে ভয় হয়।”
সরল বলিল, “বাবা বাড়ী থেকে এসেছেন।”
“কেন?”
“আমি জীবনের বুকটা বলে ফেলব শুনে।”
প্রভাত-নলিনী কথাটা ঠিক বুঝিতে পারিল না; কিন্তু তাহার
আশঙ্কা যেন বাড়িতেই লাগিল।
| ১১০

চোরাবালি
৮
;
সরল বলিল, “একদিন তুমি আমাকে তােমার জীবনের ইতি-
হাস বলেছিলে, তাতে আমি তােমার স্বরূপ ধরতে পেরেছিলাম।
তােমার সম্বন্ধে আমার যদি কোনও ভ্রান্ত ধারণা থেকে থাকে, তা
দূর হয়ে গিয়াছিল। বােধ হয়, আমার জীবনের কথাও তােমার
শুনা দরকার-শুনলে ভাল হয়। কারণ, আমরা দুজন এখন
যেখানে এসে উপস্থিত হয়েছি, তাতে আমাদের পক্ষে পরস্পরের
জন্য জগতের আর সব ছাড়া দরকার হতে পারে। সে অবস্থায়
আমার ইতিহাস তােমার কাছে অজ্ঞাত থাকা ত সঙ্গত নয়। তা
শুনে তুমি আমার দুশ্চিন্তার কারণও বুঝতে পারবে।”
সরলের জীবনের ইতিহাস শুনিবার কোনও প্রয়ােজন প্রভাত
নলিনীর ছিল না; সে কখনও সে প্রয়ােজন অনুভব করে নাই
কেন না, তাহার কাছে বর্তমানই সব ; আর যদি কিছু থাকে, সে
ভবিষ্যৎ। আপনার অতীত সে ত সরলকে দেখিয়া অবধি
ভুলিয়াছে—মুছিয়া ফেলিয়াছে। সে দিন হইতে সে ত বৰ্তমানেই
আছে ; এমন কি, ভবিষ্যতের ভাবনাও ভাবে নাই । এই বৰ্ত্তমানই
তাহার কাছে যথার্থ। এই বর্তমানে সে আছে, সরল আছে,
প্রেম আছে, সুখ আছে। তাই পারস্যের কবির মত মনে
করিয়াছে-বর্তমানের পর সবই অনিশ্চিত
“আজ আমি আছি যবে, জগত-চুষিয়া
প্রাণপণে প্রাণ ভরি’ করি সুধাপান।”
--কিন্তু সরল যখন তাহার জীবনের কথা বলিতে চাহিতেছে, তখন
সে তাহা শুনিবেই।
১১১

চোরাবালি
সরল সব কথা বলিল—আপনার দারিদ্র্য ; শরৎবাবুর কন্যার
সহিত তাহার বিবাহ-সন্বন্ধ ; প্রভাত-নলিনীর সঙ্গে পরিচয় ফলে
বিবাহ করিতে তাহার আপত্তি ; সেই আপত্তির আভাস পাইয়া
তাহার পিতার আগমন; পিতার সহিত তাহার এ কথার আলােচনা;
আপনি পরিশ্রম করিয়া অর্থসংগ্রহ করিবার তাহার সঙ্কল্প--কোনও
কথাই সরল গােপন করিল না। সে সে সব কথা গােপন করিবে
কাহার কাছে ? সে যে প্রভাত-নলিনীকে ভালবাসিয়াছে। যাহার
জন্য সে সব ত্যাগ করিতে সম্মত—তাহার কাছে কি কিছু গােপন
করিতে আছে ? সেরূপে কোনও কথা গােপন করা সরলের প্রকৃতি
বিরুদ্ধতাহার প্রণয়ের বিরােধী।
প্রভাত-নলিনী যেন মন্ত্রমুগ্ধবৎ সে কথা শুনিল—সরলের কথা
সে অমৃতের মত পান করিত। তাহার পর সরলের কথা যখন
শেষ হইল, তখন সে বলিল, “আমি বড় স্বর্থপর। অমরবাবু সত্য
সত্যই বলেছিলেন, আমি চোরাবালি। যে দিন আপনি আপনার
বিপদের আশঙ্কা করে বলেছিলেন, আর আমাকে পড়াতে
আসবেন না-সে দিন আমি কেবল নিজের সুখের জন্য,
আপনাকে দেখতে পাব—আপনার কথা শুনতে পাব বলে
আপনার কাছে ভিক্ষা চেয়েছিলাম—আমাকে ত্যাগ কবেন না।
আপনি দয়াবশে আমার প্রার্থনা পূর্ণ করেছিলেন। কিন্তু তাইত,
আপনার কত কবিতা আমি একবার ভেবেও দেখিনি। আমাকে
ক্ষমা করিতে পারিবেন কি ?
প্রভাত-নলিনীর নয়ন অপূর্ণ হইয়া আসিল। সরল বলিল,
|

গেনা-বালি
“সে দিন কি মনে করেছিলাম, বলতে পারি না; কিন্তু আজ
বলিতে পারি, সে দিন দয়াবশে তােমার প্রার্থনা পূর্ণ করিনি।
আপনাকে আমি ততটা উদার মনে করিতে পারিনে। আমি
তোমাকে ভালবেসেছিলাম বলেই তােমার কথা শুনেছিলাম।
তােমার কথা শুনা আমার একটা ছল মাত্র হয়েছিল।
“আপনার ভালবাসাই যে আমার পক্ষে দেবতার দান।
দেবতা দয়া না করলে কি দেবতার দান পাওয়া যায় ?
আপনি আশীর্বাদ করুন, আমি যেন সে দানের উপযুক্ত হই—
ভুলেও সে দানের অপমান না করি। আমি সে দানের উপযুক্ত
নই--নই।”
প্রভাতের বাতাসে কম্পিত ফুল হইতে যেমন ঝর ঝর করিয়া
শিশির ঝরিয়া পড়ে, যেমন শেফালি ফুল ঝরিয়া পড়ে—তেমনই
প্রভাত-নলিনীর নয়ন হইতে অশ্রু ঝর-ঝর করিয়া ঝরিতে লাগিল।
সরলের ইচ্ছা হইল, সে সেই অশ্রুসিক্ত নয়ন মুছাইয়া দেয়। (म
প্রভাত-নলিনীকে ভালবাসিয়াছে--সে ভালবাসা কেবল
লইয়াই সন্তুষ্ট ; কিন্তু সেই ভালবাসাই কি তাহাকে সে অশ্রু
মুছাইয়া দিবার অধিকার দেয় নাই ? সে স্থির বুঝিতে পারিল না।
সে স্থিরদৃষ্টিতে প্রভাত-নলিনীর সেই অশ্রুসিক্ত
সেই অশ্রুসিক্ত আননের
সৌন্দর্য দেখিতে লাগিল। তাহার মনে পড়িল, কয় দিন
পূৰ্বে সে প্রভাত-নলিনীকে এক জন ইংরাজ কবির কবিতা
পড়াইয়াছে
১১৩

গো-বালি
“গােলাপ সুন্দরতম ফুটফুট করে যবে ধীরে ;
আশা সমুজ্জ্বলতম ভীতি হতে মুক্তি যবে তার ;
গােলাপ মধুরতম সিক্ত যবে প্রভাত-শিশিরে ;
প্রেমিকা সুন্দরীতমা নেত্রে যবে ঝরে অশ্রুধার।”
এ সৌন্দৰ্য্য স্বর্গীয়—কিন্তু ইহার জন্য নয়নের যে তৃষ্ণা, অধরের
যে স্পৃহাসেও ত ভালবাসারই লক্ষণ। তবেই ত ভালবাসা
হৃদয় হইতে হৃদয়ের আধারেও বিস্তৃতি লাভ করে। তবে কি
সুহৃদের কথাই সত্য, প্লেটোনিক প্রেম দার্শনিকের কল্পনা
রক্তমাংসের শরীরের জন্য তাহা নহে-তাহা শুভ নহে ? যদি
তাহাই হয় ? তবে সে কি কেবল স্বপ্নই দেখিয়াছে ? তাহার
মনের উপর তাহার দৃঢ় বিশ্বাস বিচলিত হইয়াছিল—তাহার পর
বিমল বুদ্ধির উপর বিশ্বাস—এ কি ?
প্রভাত-নলিনী বলিল, “আপনাতে আর আমাতে কত প্রভেদ,
তা আমি আজ বুঝতে পারলাম। আমি আপনাকে পেয়ে সব
পেয়েছি—যা পাবার আশাও করতে পারিনি, সেই প্রেমসুখ
পেয়েছি ; আর আপনি আমার জন্য সব হারাতেও প্রস্তুত
হয়েছেন। আমার জন্য আপনি কেন এত ত্যাগ স্বীকার করবেন
। চোরাবালিতে আপনার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে
দেবেন না।”
“আমিও নিজের সুখের জন্য এ কছি। এ তােমার উপর
দয়ার জন্য নয়—নিজের জন্য।”
১১৪

চোরাবালি
;
“তা হোক। আপনি এমন করে আপনার ক্ষতি করবেন
। আমার ভাগ্যে সুখ নেই—সেটা ভুলে যাওয়াই আমার ভুল
হয়েছিল। তবে আপনি জানবেন—বিশ্বাস করবেন, আপনি
যেখানেই কেন থাকুন না, আমার দেবতা বলে আমি আপনাকে
পূজা করব। কখনও ভুলতে পারব না।”
“তুমি ও কথা মনে করাে না। তুমি আমায় ছেড়ে যেতে
পার কিন্তু আমি তােমাকে ছেড়ে যাব না।” সরল আর
তাহার অভ্যস্ত গাম্ভীৰ্য্য রক্ষা করিতে পারিতেছিল না—সে
উত্তেজিতভাবেই এ কথা বলিল। প্রভাত-নলিনী তাহার মুখের
দিকে চাহিয়া ছিল। সরলের এই কথায় তাহার মুখে চোখে
আনন্দের দীপ্তি উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
সে দিন সরল চলিয়া গেলে প্রভাত-নলিনী বসিয়া ভাবিতে
লাগিল। সে বর্তমানেই আপনার চিন্তা ও কল্পনা নিবদ্ধ
রাখিয়াছিল ; ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবে নাই। আজ সে আর
তাহা পারিল না। আজ তাহাকে ভবিষ্যতের ভাবনাই পীড়া
দিতে লাগিল--তাহার মনের অন্ধকার ভাঙ্গিয়া কত ভাবনাই
দেখা দিল। আজিকার এ ভাবনা কেবল আপনার ভবিষ্যতের
ভাবনা নহে-তাহার সঙ্গে সরলের
সঙ্গে সরলের ভবিষ্যতের ভাবনাও
ছিল।
ভালবাসা মানুষকে স্বার্থত্যাগ করিতে শিখায়—প্রেমাস্পদের
সুখের জন্য আপনার সুখ পদদলিত করিতে প্রবৃত্ত করে। তাই
১১৫

গো-বালি
সে কি
•
আজ প্রভাত-নলিনী কেবলই ভাবিতে লাগিল, সে আপনি সব দুঃখ
লইয়া কেমন করিয়া সরলের সুখের উপায় করিবে ? তাহার বুক
চিরিয়া সেই রক্তে সে যদি সরলের সাফল্য-বৃক্ষ বর্ধিত করিতে
পারে, তবে সেই বৃক্ষের ফুল ফল দেখিলে সে ধন্য হইবে। তাহার
হৃদয় বিদীর্ণ করিলে যে যন্ত্রণাসে ত কেবল তাহারই।
তাহা সহ্য করিতে পারিবে না? সে বেদনা সহ্য করিলে যে তাহার
নারী-জন্ম সার্থক হইবে ।
দিন গেল-সন্ধ্যা আসিল। তখন প্রভাত-নলিনী উঠিল
যাইয়া শয্যায় শয়ন করিল। বাতাবিক্ষুদ্ধ সাগরের জলে তরণী
যেমন অস্থির হয়, সে শয্যায় শয়ন করিয়া তেমনই এপাশ-ওপাশ
করিতে লাগিল। কত ভাবিতে লাগিল--কিন্তু ভাবিয়া কিছুই
স্থির করিতে পারিল না। সে বলিলেই যে সরল তাহাকে ত্যাগ
করিয়া যাইবে, তাহা নহে। সরল ত তাহার সঙ্কল্পের কথা
বলিয়াছে। সরলের সেই সঙ্কল্প জানিয়া সে কত সুখ অনুভব
করিয়াছে। কিন্তু তাহার অদৃষ্টে তত সুখ সহিবে কি? সে যদি
কেবল সরলকে লাভ করিতে পারে, তবে তাহার আর কিসের
অভাব থাকে ? কিছুরই নহে। তখন সে আর কিছুই চাহে না।
সে তাহার হয়ে সরলকে দেবতার আসনে বসাইয়াছে—তাহাকে
আপনার ভালবাসার কুঞ্জগৃহে তাহারই করিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু
সে ভাব—তাহাতেই ত সে তৃপ্ত থাকিতে পারে নাই। সে ত
সরলের সান্নিধ্য 'চাহিতেছে! কিন্তু সে সরলকে হৃদয়ে পাইয়াই
১১৬

গেন্না-বালি
তৃপ্তিলাভের চেষ্টা করিবে—তাহাই তাহার পক্ষে যথেষ্ট বিবেচনা
করিয়া সন্তুষ্ট হইবে। পিসীমার কথা তাহার মনে পড়িল ।
কথা সে এক দিন সরলকে জিজ্ঞাসাও করিয়াছিল। সরল উত্তর
দিয়াছিল—“ভালবাসা স্থানকালের ব্যবধানে বদ্ধ থাকে না।”
তাহার ভালবাসা কি সেরূপ নহে ? সে কেমন করিয়া সরলের
কল্যাণ সাধন করিবে, কেবল তাহাই ভাবিতে লাগিল । কিন্তু
ভাবিয়া শেষ পর্যন্ত কিছুই স্থির করিতে পারিল না। কেবল সে
স্থির করিল, যদি আপনার জীবন দিয়াও সে সরলের কল্যাণ সাধন
করিতে পারে, তাহা করিবে ; ভালবাসার কাছে জীবন অতি
তুচ্ছ।
;
নিশশেষের শীতল সমীরণ যখন তাহার অনিদ্রা ও চিন্তাতপ্ত
ললাটে স্নিগ্ধ স্পর্শ দিতেছিল তখন তাহার একটু নিদ্রাকর্ষণ
হইল। সেই তন্দ্রাবস্থায় সে স্বপ্ন দেখিল,—সরল মন্দিরে বেদীর
উপর উপবিষ্ট ; সে তাহার চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিতেছে। তাহার
নিদ্রাভঙ্গ হইল—সে চাহিয়া দেখিল, দিবালােক রজনীর অন্ধকার
ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করিয়া আত্মপ্রকাশ করিতেছে।
সে শয্যা
ত্যাগ করিল। তাহার পর অভ্যাসবশে স্নানাগারের দিকে গেল।
স্নান করিয়া আসিয়া সে আবার ভাবিতে লাগিল –ভিজ
চুল শুকাইবার কথা তাহার মনেই হইল না।
সে বসিয়া
ভাবিতেছে, এমন সময় ভৃত্য আসিয়া সংবাদ দিল, অমরবা;
তাহার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছেন।
১১৭

চোরাবালি
;
অমরবাবু। তিনি অনেক দিন তাহাকে দেখিতে আইসেন
নাই; বােধ হয়, যে দিন তিনি সরলকে সঙ্গে করিয়া আনিয়াছিলেন
সেই দিনই শেষ আসিয়াছিলেন। আজ তিনি আবার আসিয়াছেন
কেন? তিনি জানিয়া গিয়াছেন, সে আর অভিনয় করিবে।
না, এবং তিনি তাহার সেই সঙ্কল্পেরই অনুমােদন
করিয়া গিয়াছেন। তবে ? সে ভৃত্যকে বলিল, “আসতে
বল।”
অমরবাবু আসিয়া বলিলেন, “আমি একটু বিশেষ কাজে
আসিয়াছি। তােমাকে স্থির হয়ে শুনতে হবে।”
প্রভাত-নলিনী বলিল, "বলুন।”
“সরল ত এখনও তােমাকে পড়ায় ?”
“হ। আপনি ত তার কাছে মধ্যে মধ্যে আমার খোজ
খবর নেন।
“তাকে আমিই তােমার কাছে এনেছিলাম। আজ আবার
তার জন্যই তোমার কাছে এসেছি।”
প্রভাত-নলিনীর বুক কাপিয়া উঠিল। তবে কি সে এত দিন
জাগিয়া স্বপ্ন দেখিয়াছে—তাহার সুখ কি স্বপ্নের ?
“নিশার স্বপন-সুখে সুখী যে কি সুখ তার ?”
জাগে সে কাদিতে।
ক্ষণপ্রভা প্রদানে বাড়ায় মাত্র আঁধার
। পথিকে ধাঁধিতে।”
১১৮

ভোলা-বালি
তবে কি সরলের সম্বন্ধে তাহার ধারণা একান্তই ভ্রান্ত-সরল
তাহাকে যাহা বলিয়া গিয়াছে, সে সব মিথ্যা? সে যে আর
আসিবে না, সে কথা তাহাকে না বলিয়া অমর বাবুকে বলিয়াছে ;
তিনি তাহাই বলিতে আসিয়াছেন? তাহার নয়নে অশ্রু যেন
উথলিয়া উঠিতে লাগিল। সে ভাবিল, কেমন করিয়া সে তাহার
সেই দৌর্বল্য অমরবাবুর কাছে গােপন করিবে ?
অমরবাবু বলিলেন, “সরল যখন তােমাকে পড়াতে আসতে
চায়, আমি তখনই তাকে সাবধান করে দিয়েছিলাম।”
প্রভাত-নলিনী বলিল “আপনি বলেছিলেন—চোরাবালি
বড় বিপদের।”
“তাই বটে । সে কথা বােধ হয় সরল তােমাকে
বলেছে ?”
“তিনিই বলেছেন।”
“তখন আমি যে ভয় করেছিলাম, শেষে তাই হলে: । তুমি
জান কি না জানি না ---সে তােমাকে ভালবেসেছে।”
প্রভাভ-নলিনীর দৃষ্টি নত হইয়া পড়িল। সে বলিল, “আমি
তা জানি।”
“এর ফল কি হবে, তা বােধ হয় সেও বুঝে নি। তাই তার
বাপ তাকে বুঝাতে এসেছেন। কিন্তু তিনি তাকে বুঝাতে
পারেন নি। তার পর তিনি আমার কাছে এসেছিলেন--একবার
তােমার সঙ্গে দেখা করিবেন।”
১১৯

সো-বালি
প্রভাত-নলিনী মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তিনি
কোথায়?”
“তিনি আমার সঙ্গেই
এসেছেন ;
বাইরে দাঁড়িয়ে
আছেন।”
“তিনি আমাকে কি বলবেন ?”
“তা” তিনিই জানেন। তিনি বলেন, তার যা বার, তা
তিনিই ব'লবেন।”
আপনি আমায় কি করতে বলেন ?”
“আমি বলি, তিনি যদি কোনও কথা বলতে পেলেই
তৃপ্ত হন, তবে তােমার তা শুনূতে ক্ষতি কি? বরং তার
কথা শুনে তার পর তুমি যা ভাল মনে কর, করাে।”
প্রভাত-নলিনী দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া যেন অন্যমনস্কভাবে
বলিল, “তবে তাই হােক।”
অমরবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “তবে আমি তাকে ডেকে
আনি ?”
“আনুন।”
অমরবাবু বাহির হইয়া গেলেন, এবং অল্প ক্ষণ পরেই সরলের
পিতা বিহারীবাবুকে লইয়া ফিরিয়া আসিলেন সুইদ সঙ্গে
আসিল।
প্রভাত-নলিনী বসিয়া ছিল। কক্ষে
প্রবেশ করিয়াই
বিহারীবাবু থমকিয়া দাড়াইলেন। এ কি মানুষ, না দেবীপ্রতিমা ?
১২০

নাে-বালি
মানুষের দেহে কি এত রূপ থাকিতে পারে ? এ যেন
কোনও শিল্পী নির্জনে বসিয়া সােনার কল্পনাকে ফুটাইয়া
তুলিয়াছে।
প্রভাত-নলিনী উঠিয়া সরলের পিতাকে প্রণাম করিল।
অমরবাবু তাহাকে বসিতে বলিলেন, এবং আপনি বসিলেন।
প্রভাত-নলিনী দাঁড়াইয়া রহিল—টেবলখানা ধরিল।
হাত কাপিতেছিল—সে একটা অবলম্বন ব্যতীত দাড়াইতে
পারিতেছিল না। বিহারীবাবু কি বলিবেন--কেমন করিয়া
বলিবেন, সে সব কথা বিশেষ করিয়া ভাবিয়া আসিয়াছিলেন।
কিন্তু প্রভাত-নলিনীকে দেখিয়া সে সব যেন গােলমাল হইয়া
গেল । কেন না, তিনি প্রভাত-নলিনীর যে কল্পনা করিয়া
আসিয়াছিলেন, তাহাতে তাহার প্রতি তাহার ঘণা ও ক্রোধই
উৎপন্ন হইয়াছিল। তিনি সেই ঘৃণা ও ক্রোধই হৃদয়ে পােষণ
করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি যে বিলাসিনী, চতুর, লালসাদীপ্ত
দৃষ্টিশালিনী, লজ্জাহীনা, স্বার্থসৰ্বস্ব যুবতীর কল্পনা করিয়া আসিয়া
ছিলেন, তাহাকে ত দেখিতে পাইলেন না! তাহার সম্মুখে
কিশােরী--বালিকা বুলিলেও অত্যুক্তি হয় না তাহার বেশে
বিলাসের বা ব্যবহারে অসম্ভ্রমের কোনও পরিচয়ই পাওয়া যায় না ;
তাহার নয়নে কাতর দৃষ্টি—তাহাতে সরলতা ও আন্তরিকতাই
সপ্ৰকাশ ; তাহার মুখে যেন সম্ভ্রমের ও সঙ্কোচের ভাব ফুটিয়া
আছে ; রমণীসুলভ লজ্জার আভাসে তাহার রূপ লাবণ্য-সংযােগে
•
১২১

চেন্না-বালি মুক্তার মত আরও মনােরম হইয়াছে। তাহার উপর রাগ, তাহাকে দেখিলেই দূর হইয়া যায় । তাই সরলের পিতা যে সব কথা বলিবেন মনে করিয়া আসিয়াছিলেন, সে সব বলিতে পারিলেন না কেমন করিয়া কথাটা পাড়িবেন, ভাবিতে , লাগিলেন। এই সঙ্কোচ হইতে অমরবাবু তাহাকে উদ্ধার করিলেন। তিনি প্রভাত-নলিনীকে বলিলেন, “মা, ইনিই সরলের বাবা।” তাহার পর তিনি সরলের পিতাকে বলিলেন, “তা হলে আপনার যা ব’লবার থাকে, আপনি বলুন।” বিহারী বাবু প্রভাত-নলিনীর দিকে চাহিয়া বলিলেন, বিপদে পড়ে আজ তােমার কাছে এসেছি।” প্রভাত-নলিনী মুখ তুলিল না—যেমন দাড়াইয়াছিল, তেমনই দাড়াইয়া রহিল। কেবল তাহার দেহের কম্পন তাহার বসনের চাঞ্চল্যে অনুভূত হইতে লাগিল। সরলের পিতা বলিলেন, “এ বিপদ হইতে কেবল তুমিই আমাকে উদ্ধার করূতে পার। তাই আমি তােমার কাছে এসেছি।” প্রভাত-নলিনী বলিল, “আমি কি কতে পারি ?”- তাহার আপনারই মনে হইল, তাহার কণ্ঠস্বর যেন দূরাগত- যন্ত্রোথিত। “শ্ন, আমি বড় ১২২ রাে-বালি • অমরবাবু লক্ষ্য করিলেন, সে কঁপিতেছে। তিনি তাহাকে বসিতে বলিলেন। সে বসিল। বিহারীবাবু বলিলেন, “সরল আমার ছেলেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ; সে আমার অন্ধের যষ্টি ; আমার সব আশা ভরসা তারই উপর নির্ভর করছে। তার দ্বারাই আমার দুঃখ দূর হবে—এই ভরসায় আমি আছি।” প্রভাত-নলিনী বলিল, “তা আমি জানি।” “জান ? তবে আমি আর বেশী কি বলব। সে যদি বিয়ে করে—যেখানে তার বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হয়েছে, সেখানে বিয়ে না করে, তবে আমার গ্রামের সম্পত্তিটুকুও বিক্রী হয়ে যাবে ; আমরা পথে দাড়াব।” প্রভাত-নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “শুধু কি তাই ?” সে তখনও সব আশা ত্যাগ করিতে পারিতেছিল না। “সে যে বড় কথা।” টাকাটা পেলেই আপনার বিপদ যায় ? সরলের পিতা বুঝিলেন, তিনি আপনার কথায় আপনি ঠকিয়াছেন--ইহার সঙ্গে ঢাকাঢাকি চলিবে না; সব কথা সরল- ভাবে বলাই ভাল। তিনি বলিলেন, “সে বলেছে বটে, সে যেমন করে পারে, সে টাকা যােগাড় করে দেবে, কিন্তু তাতে তার পড়ার ক্ষতি হবে—সে যেমন করে আগে রূব পরীক্ষায় পাশ রো-বালি V ক হয়েছে, তেমন করে পাবে না। তা হলে ভবিষ্যতে তার উন্নতির আশাও তেমন থাকবে না।” প্রভাত-নলিনী . বলিল, “সে কথা কি তিনি ভেবে দেখেন নি ?” “সে বলে, পরীক্ষায় প্রথম হওয়াই মানুষের জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য নয়।” “তবে?” “সে সংসারের কি বুঝে ? এখন মােহে পড়ে সে যা’তে সুখ ভাবছে, শেষে তাকে তাতেই কত দুঃখ পেতে হবে, তা সে ভেবে দেখুঁছে না। আর প্রভাত-নলিনী এইবার মুখ তুলিয়া চাহিল। বিহারীবাবু বলিলেন, “আর, দেখ—সমাজের কাছে সে কতটা হীন হয়ে যাবে ! লােক তাকে দেখলে ঘৃণায় হবে-~~-সমাজ তা’কে বর্জন করূবে। তার অবস্থা তখন কি হবে ? যে সমাজের অলঙ্কার হতে পারে-হবে এমন আশা করছি, তার এমন সৰ্ব্বনাশ কি করতে আছে ? পূৰ্ব্বরাত্রির চিন্তাতেই প্রভাত-নলিনীর মন নরম হইয়া- ছিল-~-সে আপনি সব দুঃখ সহ্য করিয়া সরলের কল্যাণ- সাধনেই আপনার ভালবাসার সার্থকতা মনে করিয়াছিল। সে বলিল, “আমি কি করতে পারি, করব।” বলুন! আমি ১২৪

গেনা-বালি
বিহারীবাবু আশার অবকাশ পাইয়া পরম আনন্দিত হইলেন।
তিনি বলিলেন, “তুমি তাকে বুঝিয়ে বল।”
প্রভাত-নলিনী ক্ষীণ হাসি হাসিল—যেন রজনীতে হ্রদের
অন্ধকার জলের উপর বিদ্যুতের আলাে ঝকিয়া গেল।
বলিল, “আপনি অবশ্যই বুঝিয়ে দেখেছেন—পারেন নি। আমার
কি সাধ্য যে তাকে বুঝাই?”
বিহারীবাবুর চক্ষু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন,
“তবে কি আমার আর কোনও আশাই নেই—আমার সর্বনাশই
হবে ?”
প্রভাত-নলিনীর হৃদয় তঁাহার দুঃখে সহানুভূতিতে চঞ্চল হইয়া
সে বলিল, “আপনি আমাকে যা করূতে বলেন, আমি
তা’ করতে স্বীকার করছি।”
সরলের পিতা উঠিয়া দাড়াইলেন, বলিলেন, “আমি আশীর্বাদ
কছি, তােমার মঙ্গল হবে। তুমি আমায় রক্ষা কর-একটা
বিপন্ন পরিবারকে বিপদ থেকে উদ্ধার কর। তুমি তাকে
মােহ থেকে মুক্তি দাও।”
প্রভাত-নলিনী কেবল জিজ্ঞাসা করিল, “আমি কি
উঠিল।
পাব ?
সরলের পিতা বলিলেন, “পারবে—তুমিই তা পাবে।”
প্রভাত-নলিলী বলিল, “আমি যা পারি তা করব--না
পারলেও করব। আপনি নিশ্চন্ত থাকুন।
১২৫

গো-বালি
সে আর আপনাকে সংযত রাখিতে পারিল না—যেন ভাঙ্গিয়া
পড়িল, দুই করে মুখ ঢাকিয়া কাদিতে লাগিল।
সকলেই কিছুক্ষণ নিৰ্ব্বাক হইয়া রহিলেন। তাহার পর
অমর বাবু বলিলেন, “তবে আমরা এখন আসি।”
প্রভাত নলিনী মুখের উপর হইতে হাত সরাইয়া লইল। যেন
অকালবর্ষণে ক্লিন্ন শতদল জলের উপর মুখ তুলিল।
অমর বাবুকে বলিল, “আপনার সঙ্গে আমার একটু কথা
আছে।”
অমর বাবু সরলের পিতাকে বলিলেন, “তবে আপনি যান।
আমি পরে যাচ্ছি।”
সরলের পিতা ও সুহৃদ চলিয়া গেলে, প্রভাত-নলিনী অমর
বাবুকে বলিল, “এ কাজ আমি করব। আপনি দেখবেন, চোরা-
বালি কেবল নষ্টই করে না-রক্ষাও করে।
অমর বাবু যেন একটু লজ্জিত হইলেন।
প্রভাত-নলিনী বলিল, “কিন্তু তাকে যুক্তিতর্কে হারান আমার
অসাধ্য ; বরং তিনিই যুক্তিতর্কে আমাকে হারিয়ে তার মতে
লওয়াবেন। কাজেই সে পথে যাওয়াই হতে পারে না।”
“তবে কি করবে ?”
তখন প্রভাত-নলিনী যে প্রস্তাব করিল, তাহাতে অমর বাবু
বিস্ময়ে স্তম্ভিত ও প্রশংসায় মূক হইয়া গেলেন। তাহার পর
তিনি বলিলেন, “তুমি যা করবে ব’লছ, সে মেয়েরাই পারে ;
১২৬

নো-বালি পুরুষে তা পারে না। এতটা স্বার্থত্যাগ—এতটা আত্মত্যাগ পুরুষের ধাতুতে নেই, মেয়েদের কিন্তু তা মজ্জাগত। যাদের পূর্ববর্তীরা স্বামীর চিতায় হাসিমুখে পুড়ে মরেছেন-এ তারাই পারে। শক্তির অংশ তােমরা—তােমরা এ পার; এ পার ; আমরা পারি না।” তিনি মনে করিলেন, সত্যসত্যই স্ত্রীলােক ত্যাগে পুরুষের অপেক্ষা কত বড় ! প্রভাত-নলিনীর সঙ্গে আর কয়টি কথা বলিয়া অমর বাবু বিদায় লইলেন। বিহারী বাবু ও সুহৃদ রাজপথে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতে- ছিলেন। তাহাদের কাছে যাইয়া অমর বাবু বলিলেন, “প্রভাতের নলিনীই বটে!” বিহারী বাবু বলিলেন, “তা বটে--অমন রূপ ত আর দেখি নি। অমর বাবু বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “রূপ ত তুচ্ছ ; গুণেই প্রভাতের পদ্ম ফুল।” তাহার পর তিনি বিহারী বাবুকে বলিলেন, “আপনি আজ রাত্রির গাড়ীতেই বাড়ী চলে যান। আপনি যে প্রভাত- নলিনীর সঙ্গে দেখা করেছেন, সে কথা সরল যেন ঘূণা- ক্ষরেও জানতে না পারে। তা হলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা।” ১২৭ চোরাবালি বিহারী বাবু তাহার কথা ঠিক বুঝিতে পারিলেন না। সুহৃদ বলিলেন, “তা’ই হবে।” এ দিকে অমর বাবুকে বিদায় দিয়া প্রভাত-নলিনী কাদিতে লাগিল। যে সঙ্কল্প সে পাথরের মত বুকে চাপিয়া ধরিয়াছিল, তাহার ভারই তাহাকে ব্যথিত পীড়িত করিতে লাগিল। হায়, কৰ্তব্য—-ভালবাসার কর্তব্য, তুমি যখন অপ্রিয় হইয়া উঠ, তখন তুমি মানুষকে কি যন্ত্রণাই দিতে পার ! তােমার পেষণে কত তরুণ হৃদয় পিষ্ট হইয়া গিয়াছে~-নষ্ট হইয়াছে। কত যুবক তােমার জন্য জীবনে উচ্চাশার স্বপ্ন ত্যাগ করিয়াছে- জীবন হইতে কল্পনার বর্ণরঞ্জন মুছিয়া ফেলিয়া সুখহীন-বৈচিত্র্যহীন জীবন যাপন করিয়াছে! কত যুবতী তােমার জন্য সমস্ত জীবন অশ্রুসিক্ত—ব্যর্থ করিয়াছে ! তবুও তুমি সকলের অপেক্ষা বড়। তােমাকে ত্যাগ করিলে মানুষের জীবনে আর কি থাকে? সুখ ? সে সুখ মানুষের বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মানবের সুখ নহে ; তাহা পশুর সুখ। তাহা লইয়া মানুষ তৃপ্ত থাকিতে পারে না। সে সুখের মুরদাহ হৃদয় দগ্ধ করে। তাই তুমি যে দুঃখ দাও, তাহাও পূত বলিয়া বরণ করিতে হয়। প্রভাত-নলিনীর প্রেম-অনাবিল ভালবাসা তাহাকে যে কৰ্তব্যপথ দেখাইয়াছে, সে সেই পথেই অগ্রসর হইবে। সে পথ কণ্টকাকীর্ণ দুর্গ-ভীতিভীষণ হইলেও তাহাকে সেই পথেই ১২৮ গেরা-বালি পরিভ্রমণ করিতে হইবে। মৃত্যু পর্যন্ত সে পথের শেষ নাই । আজ তাহার জীবনের বিরাট শূন্যভাব তাহাকে পীড়িত করিতে লাগিল। তাহার আশার স্বপ্ন কল্পনার নন্দনকানন মৃগতৃষ্ণিকার মত তাহাকে প্রলুব্ধ করিয়া মিলাইয়া গেল ! বুকভাঙ্গা বেদনা কি, প্রভাত-নলিনী আজ তাহা অনুভব করিল-ঘূর্ণীবায়ু যেন তরু- গাত্রাবলম্বী লতাকে ছিন্ন ভিন্ন করিয়া কর্দমে ফেলিয়া গেল। প্রভাত-নলিনী যাইয়া শয্যার আশ্রয় লইল-শয্যায় লুটাইয়া কঁদিল। সে কঁদিল বটে, কিন্তু সঙ্কল্প অটল রহিল। সরলের আসিবার সময় হইলে সে উঠিল—মুখ ধুইয়া ক্রন্দনের চিহ্ন বিলুপ্ত করিল—আপনাকে সংযত করিল। তাহার পর সরল আসিলে সে বলিল, “মন-পারিজাত’ যে ইংরাজী কবিতা অবলম্বনে লিখিত, সে সেইটি আবার পড়িবে। সরল বিস্মিত হইল ; কিন্তু কিছু বলিল না-পড়াইয়া গেল। আর এক কারণে সে আরও বিস্মিত হইল। প্রথম দিন এই কবিতা-পাঠকালে যে প্রভাত-নলিনী তাহার পার্শ্বে ই আসিয়া বসিয়াছিল, সে দিন হইতে সে আর সে আসন ত্যাগ করে নাই। পর দিনই সে আর একখানি পুস্তক আনিয়াছিল! কাজেই একই পুস্তক দেখিয়া দুই জনের পড়িবার জন্য উভয়ের পাশাপাশি বসিবার কোনও প্রয়ােজন ছিল না। তবুও প্রভাত-নলিনী তাহার পাশের আসনেই বসিত। আজ সে তাহার সম্মুখে--টেবলের অপর দিকের আসনে যাইয়া বসিয়াছিল, এবং তাহার দৃষ্টি পুস্তকের পৃষ্ঠায় বদ্ধ না থাকিয়া কেবল তাহার দিকেই ; ৯

চোনা-বালি
ছিল। প্রভাত-নলিনী যে তাহাকে ভাল করিয়া দেখিবার জন্য
সে আসনে বসিয়াছিল, তাহা সে বুঝে নাই ।
সরল চলিয়া গেলে সে টেবলের উপর মাথা রাখিয়া দিল ।
সন্ধ্যার পর অমর বাবু আসিলেন। তাহার সঙ্গে প্রভাত-নলিনী
সে গৃহ ত্যাগ করিল। চৌধুরী-বাড়ী ত্যাগ করিবার সময় সে মুক্তির
আনন্দ অনুভব করিয়াছিল—আজ সে কেবল কঁাদিল ।
তাহার পরদিন যথাকালে আসিয়া সরল ভূতের কাছে
শুনিল, প্রভাত-নলিনী গােকুলগঞ্জের রাজার সঙ্গে চলিয়া গিয়াছে।
সরল যেন আর তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবার চেষ্টা বা আশা না
গগাকুলগঞ্জের রাজাকে বঙ্গদেশে সকলেই প্রসিদ্ধ মদ্যপ ও
দুর্নীতিপরায়ণ বলিয়া জানে ও ঘৃণা করে।
সরলের মাথা ঘুরিতে লাগিল।

দশম পরিচ্ছেদ। প্রভাত-নলিনী চলিয়া গিয়াছে ! এ কথা বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয় না। তবুও বিশ্বাস করিতে হইল—কেন না, বিশ্বাস না করিয়া উপায় নাই। ইহার অপেক্ষা প্রভাত-নলিনী মরিল না কেন ? সরল যদি মরিত--সেও ভাল ছিল, তাহা হইলে তাহাকে এ আঘাত পাইতে হইত না। তবে জগতে কাহাকেও বিশ্বাস নাই। সে যাহার হৃদয় স্বচ্ছ ও অনাবিল বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছে, তাহার হৃদয় এত আবিল ! সে তাহাকে এমন ভাবে ভুলাইয়া ছলনা করিয়াছে ! সরল আপনাকে ধিক্কার দিল- আপনার বুদ্ধিকে ধিক্কার দিল । অমরবাবু সত্যই বলিয়াছিলেন, সে চোরাবালিতে পা দিয়াছিল। নহিলে কি এমন হয় ? সমাজের শাসন-সংস্কার এ সকলের সার্থকতা আছে। এ সব ত্যাগ করা যায় না। যদি আপনার ভুলে সরল আপনার উপর ক্রুদ্ধ না হইত, তবে বােধ হয়, তাহার পক্ষে প্রভাত-নলিনীর এই ব্যবহারের বেদনা অসহই হইত। হইত। এখন আর তাহা হইল না। সে মনে করিল, সে ভুল করিয়াছিল; যাহাকে ভালবাসিয়াছিল, সে ; ভালখাসিয়াছিল,

সেনা-বালি
অপধু ;
ভালবাসার
৫ে চন্দনজ্ঞানে ললাটে পঙ্ক ধারণ
করিয়াছিল।
আজ তাহার মনে হইল, এই জন্য সে পিতার নয়নে অশ্রু
দেখিয়াও বিচলিত হয় নাই। এই প্রভাত-নলিনীর জন্য ! পিতা
পূৰ্বদিন তাশের বেদনা বক্ষে বহিয়া গৃছে ফিরিয়া গিয়াছেন।
তাহার সোনার জন্য দায়ী-তঁাহার পুত্র।
কোন্ পথে কেমন করিয়া সে যে ছাত্রাবাসে ফিরিল, সরল
তাহা জানিতেও পারিল না। আসিয়া সে সুহৃদের সন্ধানে
তাহার ঘরে গেল। সুহৃদ কে ওড়া কাঠের তক্তাপােযের উপর
“অনন্ত শয়ন” বিছাইয়া তাহাতে শুইয়া একখানা পস্তক পাঠ
করিতে করিতে পা নাচাইতেছিলেন। সেটা তাহার “মুদ্রাদোষ।”
সরল কক্ষে প্রবেশ করিলে সে বহিখানা ফেলিয়া উঠিয়া বসিল।
সরলের মুখ দেখিয়া তাহার ভয় হইল। তাহার মুখ শুষ্ক—
নয়নে অস্বাভাবিক দৃষ্টি। সে কোনও কথা কহিবার পূর্বেই সরল
বলিল, “সুদ তুমিই ঠিক বুঝেছিলে। ভুল আমার। আমাকে
রক্ষা কর। বাবাকে লিখে দাও, আমি তাকে যা বলেছি, তিনি
যেন সব ভুলে যান। আমি তার সব আদেশ পালন করব।”
সুহৃদ বলিল, “তা হবে। তুমি বড় উত্তেজিত হয়েছ।
-একটু বসে ঠাণ্ডা হও!”
সরল বলিল, “না, আমি ঘরে যাচ্ছি।”
ঘরে বসিয় সরা কুঁজা হইতে ঢালিয়া এক গ্লাস জল পান
এসি

গো-বালি করিল ; তাহার পর শান্ত ও অবসন্ন ভাবে শষ্যায় শুইয়া পড়িল। কত কথা ভাবিতে চেষ্ট করিল—সব যেন অস্পষ্ট বােধ হইতে লাগিল। জগতে কি সবই মিথ্যা—সবই ভ্রান্তি ! তবে কি কাহাকে ও বিশ্বাস নাই ? না সে চোরা বালিতেই ঘর বাঁধিবার চেষ্টা করিয়া- ছিল ~~~ তাই এখন হতাশ হইয়াছে ? সে রাত্রিতে সে আর শষ্যা ত্যাগ করিল না --- বিনিদ্র হইয়া কেবল ভাবিতে লাগিল। সুহৃদ দুই তিন বার আসিয়া তাহাকে দেখিয়া গেল। এদিকে সুহৃদের পত্র পাইয়া বিহারীবাবু আবার কলিকাতায় আসিলেন। তিনি সুহৃদের কাছে সব শুনিয়া প্রথমেই কালীঘাটে পূজা দিতে গেলেন। তাহার পর আসিয়া সুহৃদকে সঙ্গে লইয়া অমর বাবুর সঙ্গে দেখা করিতে গেলেন। অমর বাবু বললেন, “আপনার ছেলেকে রক্ষা করিলাম বটে, কিন্তু যাকে মারিয়া তাহাকে রক্ষা করিলাম--আপনার ছেলে তাহার পদধূলির ও যােগ্য নহে।” বিহারী বাবু কথাটা ঠিক বুঝিতে পারিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সশেকৃষ্ট ছাত্র--সচ্চরিত্র, বিদ্বান, শিমলবুদ্ধি সরল সেই কূলত্যাগিনীর চরণধূলির যােগ্য নহে ! এ কি কথা? বিহারী বাবু এক বিপদ হইতে মুক্তি পাইয়া ভাবিলেন~-আবার যেন বিপদের সম্ভাবনাও না ঘটে সাবধানের বিনাশ নাই। কোনরূপে শরৎ বাবুর মেয়ের সঙ্গে সরলের বিবাহটা দিয়া ফেলিতে পারিলে তিনি নিশ্চিন্ত হয়েন। যাহাকে দিয়া শরৎ বাবু বিবাহের ;

গনা-বালি
কথা চালাচালি করিয়াছিলেন, বিহারী বাবু তাহাকে বলিলেন, শুভ
শীঘ্রংগিন্নী ত কেবলই বলেন, কথা হয়ে গেল—আর না বিলম্ব
করে বিয়েটা দিয়ে ফেল্লেই হয়। তিনি যথানিয়মে সে সংবাদ
শরৎ বাবুকে জানাইলেন। শরবাবু তাহার দ্বিতীয় পক্ষের
গৃহিণীর সঙ্গে সে বিষয়ে পরামর্শ করিলেন। গৃহিণী বলিলেন,
“বেশ ত। অমন ছেলে—কত জন মেয়ে দিতে ঝুকবে।
হয়ে গেলেই নিশ্চিন্ত।”
শরৎ বাবু বলিলেন, “কিন্তু ছেলে যে বলেছিল, পড়া শেষ
করে বিয়ে করবে, সেই ত ভাল ছিল।”
“না গাে না—একজামিনের ত আর বেশী দেরী নেই। মধ্যে।
এই কটা মাস। আমি বলি, ও ‘নাপিত পাবে যখন ক্ষৌরী হবে
তখন। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেই ভাল। তার পর এম, এ,
পাশ হলে লােকে আরও বেশী টাকা নিয়ে সাধবে।
দেখছ
শরৎবাবু বলিলেন, “তা ত বটেই।” গৃহিণীর কথায়
তাহার প্রায় ঐ একই জবাব ছিল।
তাহার পর বিহারী বাবু যখন সরলকে বলিলেন, শরৎবাবুর
ইচ্ছা—তঁাহারও ইচ্ছ। সরলের বিবাহ আর বিলম্ব না করিয়া শেষ
হয়, তখন সরল আর কোনই আপত্তি করিল না।
সে মনে
করিল, সে পিতা মাতার প্রতি কর্তব্যের কাছে মাথা নত করিয়াই
বিবাহে সম্মত হইয়াছিল—কোনও বিচার বিবেচনা করে নাই।
১০

গেরাবালি
চে
তাহার পর যখন সে কৰ্ত্তব্যের বিপক্ষে বিদ্রোহ ঘােষণা করিয়া,
ছিল, তখন সে আপনিই ভুল করিয়াছে। সে আর সে ভুল
করিবে না।”
বিহারী বাবু নিশ্চিন্ত হইয়া বিবাহের আয়ােজন করিতে
লাগিলেন। অনেক দিন পরে আপনার জীৰ্ণ পৈত্রিক গৃহের
সংস্কারের ব্যবস্থা হইল—কার্ণিশের উপর হইতে অশ্বথ গাছ •
ও গুদামঘর হইতে চামচিকা দখলী স্বত্বে আঘাত পাইয়া স্থানচ্যুত
হইল। গ্রামের পুরুষরা মুখে বলিলেন, “এত দিনে বিহারী বাবুর
দুঃখ ঘুচল-~-যাক-একটা বনেদী ঘর, তবু রক্ষে হ’ল।” তাঁহারা
মনে মনে বলিলেন, “বাড়ীতে আবার পোঁচড়া টানা হচ্ছে; যেন
আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ! অত বাড়াবাড়ি ভাল না ; তবু যদি
লােক না জাত, কুটুম্বুর পয়সা অত লপচপানি।” মহিলারা
কেহ বলিলেন, ছেলে পেটে ধরলেই হয় না; ধন্যি গর্ভ সরলের
মা’র-এমন ছেলে পেটে ধরেছিল যে, এক ছেলে
ঘুচল। আহা বেঁচে থাক।” আবার কেহ বা বলিলেন, “হ’ল
বটে; কিন্তু সমানে সমানে কাজ না হলে কি কুটুম্বিত সুখের
হয়? দেখ না, আরও ত দুই ছেলের বিয়ে হয়েছে; তখন
কাকে বকে জানতে পারেনি; এবার বড় মানুষের মেয়ে
আবে--তারা ভাঙ্গা
ভাঙ্গা বাড়ীতে মেয়ে পাঠাবে কেন?”
তাহার পর কথা হইতে লাগিলবিহারী বাবু কত টাকা পাইলেন?
কেহ বলিল, “দশ হাজারের কম নয়—নইলে মহাজনের টাকা
হতেই দুঃখ
১৩৫

চোরাবালি
না।
শােধ করে আবার বাড়ী সারা চলত না।” কেহ বলিল, “টাকা অত
সস্তা নয়—লাখ টাকা লাখ টাকা দু’কুড়ী দশ টাকা! কত টাকা
মাইনে পায় শরৎ বাবু যে, এক মেয়েকে দশ হাজার টাকা দিবে।
হলই বা শেষ পক্ষের এক মেয়ে ; চাকরী ত অন্তিম দশায়—-মাসে
হাজারের কাছাকাছি। অত কেন ?”
বিহারী বাবু লােকের কথা শুনিতেন, কোনও কথা বলিতেন
সরলের যে মতি ফিরিয়াছে, আর শরৎ বাবু যে মধ্যের ঘটনা
জানিতে পারেন নাই, ইহাতেই তিনি আপনাকে পরম ভাগ্যবান
বলিয়া বিবেচনা করিয়াছিলেন। এখন কোনরূপে বিবাহটা
হইয়া গেলে—চার হাত এক হইলেই তিনি নিশ্চিন্ত হইতে
পারেন।
চা’র হাত নির্বিঘ্নেই এক হইয়া গেল। বিহারী বাবু
ভাবিলেন, তিনি খুব জিতিলেন শরৎ বাবু ভাবিলেন, তিনি খুব
জিতিলেন ।
জিত যাহাই হউক, বিহারী বাবুর বুকের উপর হইতে একটা
বিষম ভার নামিয়া গেল~-পৈত্রিক সম্পত্তিটুকু মুক্ত হইল আর
ইহার পর যাহাই কেন হক না, আর কয় ছেলেরও মাথা গুজিবার
জায়গা এবং মােটা ভাত মােটা কাপড়ের সংস্থান বহিল।
বিবাহের পর এক বৎসর বিহারী বাবুদের বধূ আনিতে নাই
শরৎ বাবুরও স্ত্রী বলিলেন, “বাচা গেল~~এই বছরের মধ্যেই ত
জামাইয়ের এজামিন হয়ে যাবে। তা হলেই জামাই যা
;
•
C

চোরাবালি
বলেছিল, তাই হবে—মেয়ে একেবারে স্বামীর কাছে ঘর করতে
যাবে।”
প্রায় এক বৎসরের মধ্যেই দুইটী পরীক্ষা। এম, এ, পরীক্ষার
আর বড় বিলম্ব ছিল না। বিবাহের পর কলকাতায় ফিরিয়
যাইয়াই সরল সমধিক মনােযােগসহকারে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত
হইতে লাগিল। সরল সর্বদাই পদ্ধতিবদ্ধ ভাবে কাজ করিত ;
এতদিনও পড়িয়া আসিয়াছে। কাজেই অন্যান্য পরীক্ষার ন্যায় এবারও
পরীক্ষা দিয়াই সে বুঝিল, পরীক্ষায় সাফল্য সম্বন্ধে কোনও সন্দেহই
নাই। সে সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হইয়া ওকালতী পরীক্ষার জন্য
পড়িতে লাগিলেন।
যথাকালে পরীক্ষার ফল বাহির হইল—সরল অন্যান্য পরীক্ষার
মত এ পরীক্ষাতেও প্রথম স্থান অধিকার করিয়াছে । সরল
জানিত, ওকালতীর প্রথম অবস্থায় বহু বাধা—সে সময় অতিক্রম
করিয়া সাফল্য লাভ করিতে অধ্যবসায়ের, ধৈর্য্যের, পরিশ্রমের
ও অর্থের প্রয়ােজন। অধ্যবসায়, ধৈৰ্য্য ও শ্রমক্ষমতা তাহার
ছিল ; ছিল না কেবল অর্থ। কিন্তু যখন সে শরৎবাবুর কন্যাকে
বিবাহ করিবে না বলিয়াছিল, তখন সে অর্থের অভাব পূর্ণ
করিবার উপায় দেখিয়াছিল—সে অর্থপুস্তক লিখিবে ।
বাৰু বারণ করিলেন-যে যদি হাইকোর্টে ওকালতীই করে, তবে
দুই এক বৎসর যে খরচ, তাহা তিনিই দিবেন। সরল সে সাহায্য
লইতে অস্বীকার করিল।
;

সেরা-বালি ; বাস্তবিক, আর এক বৎসর পরে সে যখন ওকালতী পরীক্ষাতেও অনন্যসুলভ সাফল্য লাভ করিয়া হাইকোর্টে ওকালতী করিবার জন্য আয়ােজন করিল, তখন সে শ্বশুরের নিকট হইতে কোনওরূপ অর্থসাহায্য না লইয়াই কলিকাতায় বাস করিয়া সপরিবারে বাস করিবার উপায় করিয়াছে। ওকালতীতে সাফল্য লাভ করিতেও তাহাকে অধিক দিন অপেক্ষা করিতে হইল না ; ভাগ্যলক্ষ্মী তাহার প্রতি প্রসন্ন হইয়া দুর্গম পথও সুগম করিয়া দিলেন-কঙ্কর কণ্টকাকীর্ণ পথও যেন কুসুমাস্তত হইল। তাহার সংসারের মুখে একটু অন্তরায় ছিল-শরৎ বাবুর কন্যা সৰ্ব্বদাই মনে করিত, তাহার পিতার অর্থে শ্বশুর-পরিবারের বিশেষ উপকার হইয়াছে। সেই গর্বের ঔদ্ধত্যও কিন্তু সরলকে বিচলিত করিতে পারিত না। প্রেমের যে আবেগ ও উচ্ছাস এই গৱেঁ আহত হইয়া তাহাকে ব্যথিত করিতে পারিত, সরল সে আবেগ ও উচ্ছাস হতাশাতেই ব্যয় করিয়া সংসারে প্রবেশ করিয়াছিল। তাই সে কেবল স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য পালন করিতেই ব্যস্ত থাকিত। স্ত্রীর এই গর্বের ঔদ্ধত্যটুকুও সে অনায়াসে এবং প্রসন্নচিত্তে উপেক্ষাও করিয়া সংসারে শান্তির পথ সুগম করিতে পারিত। কাজেই সংসারের কোনরূপ অশান্তি তাহাকে একনিষ্ঠ হইয়া ব্যবসায়ের শীর্ষস্থান অধিকার করিবার পথে বাধা দিতে পারিত না।

একাদশ পরিচ্ছেদ। ; বিশ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে--এই সময়ের মধ্যে সংসারে কত ঘটনা ঘটিয়াছে ; কিন্তু ব্যবসায়ে সরলের সাফল্যপথে কোনও বিঘ্নই উপস্থিত হয় নাই। তাহার সাফল্য দেখিয়া বিহারীবাবু অনন্ত নিদ্রায় নিদ্রিত হইয়াছেন। মা প্রায় দেশেই থাকেন। কর্তব্যনিষ্ঠ সরলের সাহায্যে তাহার ভ্রাতৃদ্বয় এখন গ্রামের বাড়ীতে আসিয়া জীজ দেখিতেছেন, চালানী কারবার ফাদিয়াছেন; কলিকাতার বাসায় সরলের পত্নীই গৃহিণী—তাহার অনেকগুলি ছেলেমেয়ে, নাতিনাতিনীও হইয়াছে। লোেক বলে “সুখের সংসার বটে।” এই অবস্থায় সরলের মন হইতে প্রভাত-নলিনীর স্মৃতি বুঝি মুছিয়া গিয়াছে। সে ঘটনা যাঁহারা জানিতেন, তাহাদের মধ্যে বিহারীবাবু, আজ পরলােকে ; মা সে কথার উল্লেখও করেন না। অমরবাবু আজও বাঁচিয়া আছেন, কিন্তু সে বিষয়ে তাহার সহিত সরলের কোনও আলাে- চনা হয় না। সুহৃদ মফঃস্বলে জিলা-আদালতে ওকালতী করিতেছে —সরলের সঙ্গে তাহার প্রায়ই দেখা হয় না। আপনার ব্যবসা ক্ষেত্রে সরলের সাফল্য বহু উকীলের ঈর্ষার উদ্রেক করিয়াছে। সে যে অচিরে জজ হইবে, সে বিষয়ে কাহারও সন্দেহ নাই।

চেন্না-বালি দুর্গাপূজায় হাইকোর্টের দীর্ঘ অবকাশ। কয়েক বৎসর হইতে এই সময় সরল সিমলায় বাইয়া থাকে। সিমলা শৈল ভারত সরকারের লীলাভূমি—আমাদের বর্তমান ভাগ্যবিধাতারা হিমালয়ে গিয়া এই সিমলায় বাস করেন। ইহাই নবভারতের কৈলাস। এই কৈলা- সের প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য ও দেবলীল উভয়ই বর্ণনার উপযুক্ত কবিকল্পনাকেও পরাভূত করে। লােকে বলে, জজ হইবার চেষ্টায় ( আপনাকে qualify করিতে । সরল সিমলায় যায়--বড় হােটেলে থাকে, “বড় সাহেব’দের সঙ্গে দেখা করে। বাঙ্গালীর মধ্যে যাহারা প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন, তেমনই দুই একজনকে--যথা ািষ্টার সেন বা নিষ্টার মিত্র দেখা দেয় ; তাহার পর চলিয়া আইসে। এবার সে যখন সিমলায় যায়, তখন তাহার এক বন্ধু তাহাকে একবার ধরণপুরে যাইতে বলিয়া দিয়াছিলেন—তাহার পীড়িত পুত্র তথায় আছে। সিমলা হইতে ফিরিবার পথে তাই সরল ধরমপুরে আসিল। ধরমপুর যক্ষ্মারােগীর পক্ষে স্বাস্থ্যকর স্থান ; তাই এই স্থানে যক্ষ্মানাের্গীদিগের জন্য চিকিৎসাগার ও উপনিবেশ স্থাপিত হইয়াছে। সে বাড়ীতে সরলের বন্ধুপুল ছিল, সে বাড়ীর সন্ধান লইয়া সে তথায় গেল, এবং তাহাকে দেখিয়া আসিল। সে যখন ফিরিয়া যাইতেছিল, তখন পথের পাশে আর একখানি গৃহের এক জন চাকর আসিয়া তাহাকে জানাইল, সেই বাড়ীতে রােগিণী আছেন, তিনি তাহাকে একবার যাইবার জন্য অনুরােধ করিতেছেন।

-বালি বিস্মিতভাবে সরল জিসাজ্ঞা করিল, “আমাকে ?” ভৃত্য বলিল, “হ।” সরল বাড়ীতে গেল-সােপান অতিক্রম করিয়া বারান্দায় উঠিল । সেই বারান্দায় একখানা রােগীর খাটে রােগিণী শুইয়া আছেন--- দেহ অস্থিচর্মসার ; মুখের বর্ণ এমন যে, স্বকের নিম্ন হইতে যেন ঔজ্জ্বল্য ফুটিয়া বাহির হইয়াছে--সেই মুখে চক্ষু দুইটি অস্বাভাবিক বড় দেখাইতেছে। সরলকে দেখিয়া সেই চক্ষুতে যেন নুতন উজ্জ্বল দৃষ্টি ফুটিয়া উঠিল। রােগিণী জিজ্ঞাসা করিল, “আমাকে কি চিনতে পারেন ? সরল চিনিতে পারিল না। কিন্তু নিঃস্তব্ধ নিশীথে দূরাগত বংশীরবে যদি কোনও পুরাতন পরিচিত সুর শুনা যায়, তবে যেমন মনে হয়, তাহার তেনই মনে হইল। এ কণ্ঠস্বর সে কোথাও শুনিয়াছে; কিন্তু কবে শুনিয়াছে—কোথায় শুনিয়াছে, মনে করিতে পারিল না। মনে কোন অশান্তি অনুভব করিতে লাগিল। রােগিণীর শীর্ণ পাণ্ডুবর্ণ ওষ্ঠাধরে ক্ষীণ হাসি দেখা দিল। সে যেন শরতের মেঘে শীর্ণ বিদ্যুতের রেখা—যেন পরলােকের পার হইতে বিদ্রুপের ব্যঞ্জনা। সে বলিল, “আমি চোরাবালি।” সরল স্তম্ভিত হইয়া গেল। অদৃষ্টের এ কি উপহাস যে, এত দিন পরে এই অবস্থায় এমন অতর্কিতভাবে প্রভাত-নলিনীর সঙ্গে ' তাহার সাক্ষাৎ! যাহা স্বপ্নস্মৃতিতে পর্যবসিত হইয়াছিল, তাহাই আবার সত্য হইয়া দেখা দিল ! আর, অদৃষ্টের এ আবার ১৪১ নাে-বালি কি উপহাস যে, সেই প্রভাত-নলিনী, যাহার দেহে রূপ ধরিত না, সে আজ শীর্ণ অস্থিচর্মসার—মৃত্যুশয্যালীন রাগিণী । রােগ রূপের শত্রু ; কিন্তু এ স্থলে রােগ কি শত্রুতাই সাধিয়াছে ! আজ এক মুহূর্তে কত কথাই তাহার মনে পড়িল। অরুণােদয়ে যেন সহসা কত পদার্থ দৃষ্টিগােচর হয়, তেমনই আজ স্মৃতির আলােকে কত অদৃশ্য ঘটনা দেখা দিল ! তখন যৌবনে সে প্রভাত-নলিনীকে ভাল- বাসিয়াছিল ; তাহার পর সে তাহাকে প্রতারণা করিয়া কি বেদনাই দিয়াছিল—মানুষের উপর তাহার বিশ্বাসে কি আঘাতই করিয়াছিল। আজ এভাত-নলিনীর সান্নিধ্যও সে ঘৃণা করে। কিন্তু এই রােগজীণা—মরণহতা ইহার উপর কি রাগ হয়, ঘৃণা থাকতে পারে ? শয্যাপাশ্বে চেয়ার ছিল। প্রভাত-নলিনী তাহাকে বসিতে ইঙ্গিত করিল। সরল বসিল। তথন প্রভাত-নলিনী বলিল, “আজ ক’দিন থেকে কেবল মনে হচ্ছিল—যদি মরবার আগে একবার আপনার দেখা পেতাম! যিনি অন্তর্যামী, তিনি আমার প্রার্থনা শুনেছেন ; নইলে আজ এখানে আপনাকে পাব কেন ? মরবার আগে যে আপনাকে সব কথা বলবার অবসর পেলাম, তাতেই আমি ধন্য হলাম।” কাশিতে কাশিতে তাহার শ্বাসরােধের উপক্রম হইল—যে কাশ তুলিল, তাহাতে রক্ত। সরল বলিল, “তুমি আর কথা বলল না।” প্রভাত-নলিনী বলিল, “বলবার আর বেশী সময় নেই। এমন সময় ১৪২ চোরাবালি আমাকে বারণ করবেন না। যে ব্যথা বুকে নিয়ে এই বিশ বছর সাপের দংশন সহ্য করিতেছি, সে ব্যথা এইবার যাবে। আর কষ্ট পােব না। বেশী কথা বলবারও নেই। জানবেন--বিশ্বাস করবেন, আপনার কাছে বিশ্বাসহন্ত্রী হইনি।” সরল বিস্মিতনেত্রে চাহিয়া রহিল। একটু বিশ্রাম করিয়া প্রভাত-নলিনী বলিল, “যে কথা আণি মরে গেলে জাতেন, আজ তাই বলে যাব। তা হলে আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করতে পারবেন ! বােধ হয় আমাকে আর ঘণা করবেন না।” সরল তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। প্রভাত-নলিনী বলিল, “যে দিন আপনি আমার জন্য অনেকই ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, সে দিন আমি ধন্য হয়েছিলাম-স্বর্গ হাতে পেয়েছিলাম—মনে করেছিলাম, আমার মত সুখ জগতে আর কারও নেই। কিন্তু তার পরদিনই আমার সে সুখের স্বপ্ন ভেঙ্গে গিয়েছিল। আপনার বাবা অমর বাবুর সঙ্গে এসে বলেছিলেন, আমাকে ত্যাগ না করলে আপনার সর্বনাশ হবে, তারও সৰ্ব্ব- নাশ হবে। তখন আমি ভাবলাম, আমার ভালবাসা কি আপনার সুখের জন্য আমাকে সব দুঃখ সহ্য করাতে পাবে না ? পাবে।” সরল বলিল, “তা’র পর ?” “কিন্তু আমি ভেবে দেখলাম, আপনি আমাকে ত্যাগ করবেন । আমি পালিয়ে গেলেও যদি আপনি আমার সন্ধান পান, ১৪৩

সো-বালি
আর ভাবেন—তবে আমিও না এসে থাকতে পারব না। তাই,
যাতে আপনি আর আমার সন্ধানও না করেন, সেই জন্য আপনার
কাছেও মিথ্যা কথা বলে গেলাম। সে মিথ্যা কথা বলতে কি কষ্ট।”
যন্ত্রণায় প্রভাত-নলিনীর মুখ বিকৃত হইয়া গেল। সে আবার কাশিতে
লাগিল---রক্ত ভুলিল।
তখন সরলের হৃদয়ে ঘৃণার স্থানে শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।
প্রভাত-নলিনীর স্বার্থত্যাগে-আত্মত্যাগে সে আত্মহারা হইয়াছে।
প্রভাত-নলিনী বলিল, “সেদিন থেকে অমর বাবু আমার বাবার
কাজ করেছেন, আমাকে সব দরকারে সাহায্য দিয়েছেন। তিনি
আমার সব কথা জানেন। আজ আপনার দেখা পেলাম-সুখে
রব। যদি কোনও অপরাধ করে থাকি, ক্ষমা করবেন।”
উদ্বেলিত-আবেগে সরল বলিল, “তাের তাপরাধ । আমি
সাধারণ মানুষের আদর্শে বিচার করে তােমার প্রতি কি অবিচারই
করেছি! তুমি সে আদর্শ থেকে অনেক উচ্চে। তাকে আমি
একদিন যে আদর্শের মনে করেছিলাম—তুমি সেই আদর্শের। তুমি
মানুষের দৌর্বল্য পরিহার করেছ। আমার অপরাধ ক্ষমা করাে।”
প্রভাত-নলিনীর মুখে হর্যদীপ্তি বিকশিত হইল—সে বলিল,
“তবে আর শেষ অনুরােধ, আশার যথাসর্বস্ব আমি অমর বাবুকে
দিয়ে আপনাকে দিতে বলেছি। আপনি তাতে কোনও সনুষ্ঠানের
ব্যবস্থা করবেন। তা হলে সময় সময় আপনার আমাকে এনে
পড়বে।”
১৪৪

রে-বালি সরল বলিল, “তােমাকে কি আমি কখনও ভুলতে পাব। এই আত্মত্যাগ কি ভুলবার ?” প্রভাত-নলিনী কি বলিতে যাইতেছিল। ডাক্তার আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বলিলেন, প্রভাত-নলিনীর সহিত আর কথা কহা সঙ্গত নহে। সে তখনই হাঁফাইতেছিল। সে নিৰ্ণিমেষ- নয়নে সরলকে দেখিতে লাগিল। সরল সে দিন আর কলিকাতায় ফিরিল না, ধরমপুরেই রহিল । কিন্তু প্রভাত-নলিনী শেষ সময়েও তাহার কোনও অসুবিধা করিল । সে মরিয়াও তাহার উপকার করিয়া গেল—একটা বৃহৎ সদনুষ্ঠানের জন্য অর্থ তাহাকে দিয়া তাহার যশের পথ প্রশস্ত করিল। রাত্রি শেষ না হইতেই প্রভাত-নলিনীর দগ্ধহৃদয়ের জালা জুড়াইল ; সে সরলের কাছে, তাহাকে দেখিতে দেখিতে অনন্ত নিদ্রায় নিদ্রিত হইল। ফিরিবার পথে সরল কেবল ভাবিতে লাগিল, সে জীবনে ভুল করিয়াছে কি ? সে তাহার বর্তমান যশঃসমুজ্জ্বল জীবনের কথা মনে করিল-সমাজে তাহার সম্মানের কথা স্মরণ করিল—ভবিষ্যতে হার গৌরবের সম্ভাবনা লক্ষ্য করিল। সে চোরাবালিতে সংসার সৌধ নির্মিত করিলে এ সব কি সম্ভব হইত? একবার তাহার মনে হইল, তাহার পিতা কেন তাহার সঙ্গে লুকোচুরি করিলেন? কিন্তু সে তাহার উপর রাগ করিতে পারিল না ; তিনি ত তাহার মঙ্গলের জন্য ভাবিয়াই তাহা করিয়াছিলেন । ১৪৫ ১০

ভোলা-বালি
কেবল প্রভাত-নলিনীর জন্য করুণায় এবং তাহার প্রতি শ্রদ্ধায়
তাহার হৃদয় পূর্ণ হইয়া রহিল।
ট্রেণ যখন হাওড়া ষ্টেসনে পৌছিল, তখন তাহার পুত্র তাহার
কামরার ধারে আসিয়া দাঁড়াইল—একটি দৌহিত্রী ডাকিল “দাদা ?”
সরল তাহার বিশ বৎসরের পরিচিত সংসারে ফিরিয়া আসিল—সেই
সংসারেই সে অভ্যস্ত হইয়াছে। চোরাবালিতে কি এই সংসার
রচিত হইতে পারিত ? সে ঠিক বুঝিতে পারিল না।
সম্পূর্ণ।
১৪৬

কমলিনী-সাহিত্য-মন্দিরের
উপন্যাস-সিরিজ !
উপন্যাস-সিরিজ।
১৩২৬ সালের আশ্বিন মাসের ১লা তারিখ হইতে
ধারাবাহিকরূপে প্রতি মাসের ১লা তারিখে “কমলিনী-
সাহিত্য-মন্দির” হইতে ১১ এক টাকা সংস্করণের সম্পূর্ণ
বাছাই উপন্যাস একখানি করিয়া বাহির হইতেছে।
প্রত্যেক পুস্তকই বহু মূল্যবান লেড এন্টিকে ছাপা,
হাফটোন চিত্রভরা এবং স্বর্ণমণ্ডিত রেসমী কিংখাপে
মােড়া হইয়া অতুলন স্বর্ণ সংস্করণ আকারে বাহির হইতেছে।
আজই আমাদের উপন্যাস সিরিজের
গ্রাহক শ্রেণীভুক্ত হউন।
উপন্যাস-সিরিজের বার্ষিক গ্রাহক হইলে
মাশুল, গ্রাহকের লাগিবে না।
১। প্রতিমাসের ১লা তারিখে নুতন উপন্যাসের নূতন সংস্করণ
বাহির হইলেই নিয়মিত গ্রাহকের নামে কেবল মাত্র ১১ এক টাকা
• ধার্য্য করিয়া ভিঃ পিঃতে পুস্তক পাঠান হয়।

No text on this page.

আশ্বিন সংখ্যার প্রথম উপন্যাস
দার্শনিক পণ্ডিত সুরেন্দ্রমােহন ভট্টাচাৰ্য প্রণীত
পাষাণী
মূল্য ১, এক টাকা মাশুল • তিন আনা।
আশ্বিন হইতে গ্রাহক হইলে মাশুল সমেত ১১ এক টাকা।
কার্তিক সংখ্যার দ্বিতীন্ন উপন্যাস
“মালঞ্চ” সম্পাদক শ্ৰীযুত কালীপ্রসন্ন দাস গুপ্ত এম, এ প্রণীত
বাসন্তী
মূল্য ১ এক টাকা মাশুল • তিন আনা।
আশ্বিন হইতে গ্রাহক হইলে মাশুল সমেত ১, এক টাকা ।
অগ্রহায়ণ সংখ্যার তৃতীম্ন উপস্যা
বসুমতী সম্পাদক-সাহিত্য-কুবের শ্ৰীযুত হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘােষ প্রণী
নাবালি
মূল্য ১, এক টাকা মাশুল • তিন আনা।
আশ্বিন হইতে গ্রাহক হইলে মাশুল সমেত ১, এক টাকা
কমলিনী সাহিত্য মন্দির।
১১৪ নং আহিরীটোল স্ট্রীট, কলিকাতা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Chora - Bali

Author
Ghosh, Hemendraprasad
Title
Chora - Bali
File name
Chora - Bali
Text
OCR done
Citation
1919
Published
2009/08/6
Publisher
Gosto Bihari Dutta And Sarat Chandra Pal, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
169
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Other Genres.
Keywords
Novel
DLI number
512564
Barcode
4990010019627.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
voIRBxpbkKF
Download PDF

Chora - Bali