Makardah Saraswat Library, Howrah

Srimati Panchami Somipeshu Ed.1st

Roy, Sushil · 2009/08/4

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শ্রীমতী পঞ্চমী সমীপে
(উপন্যাস)
সুশীল রায়
প্রণীত
শ
পাবলিশিং কোম্পানী
৩৭৭,
বেনেটোলা লেন, কলিকাতা

প্রকাশক : অনিলচন্দ্র রায়
‘মান-মন্দির, রাজসাহী
.
প্রমীপঞ্চমী সমীপে
প্রথম সংস্করণ
ভাদ্র, ১৩৪৮ সাল
১. মূল্যদেড় টাকা
ক্যালকাটা ইউনাইটেড প্রিন্টার লিমিটেড, ৪৫-এ, মতি শীল ষ্ট্রীট হইতে
মণীন্দ্রনাথ দে কর্তৃক মুদ্রিত।

অনিলা সেন সরােজকুমার মজুমদার তবে, ১৩৪১ (ইং ১৯৩৪ সালে আমার প্রথম উপন্যাস একদা প্রথম প্রকাশিত হয়। একদা'র নায়িকা পঞ্চমীকে আপনার পাদপ্রদীপের সামনে মুখােমুখী পেয়েছিলেন। এ-বই সেই নায়িকাকে কেন্দ্র করেই লেখা। এখানৈসে আগাগােড়া নেপথ্যবাসিনী। এই সঙ্গে একটা কথা বলে রাখি: একটি মাসিক পত্রে যখন এই বইটি ধারাবাহিকভাবে বের হচ্ছিল, তখন জনকয়েক পাঠক লিখে ও মুখে আমার কাছে জানতে চান, উপন্যাসের কাহিনী কোনাে সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে গঠিত কি না। তখন তাদের কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। এই সুযোগে আজ বলা দরকার-যে কোনো কাহিনীই সত্য হয় না, যদি-না সত্যের ওপর তার ভিত্তি তবে, কল্পনাকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বেশি। থাকে। এখানে আর একটি সামান্য কথা লিখে রাখা প্রয়োজন। এই বই যখন লিখতে আরম্ভ করি তখন আমার দুই নিকটাত্মীয় আবাল্য- সহপাঠী ও পরমবন্ধু অনিলা সেন ও সরােজকুমার মজুমদার জীবিত ছিলা। পা লিপির খানিকটা তারা দেখে গেছে। অনিলা ছিলো আমার লেখার সমঝদার আর সরােজকুমার হিল্লো' সমালাে। এই দুই কনের মতামতের ওপর আমার পরিপূর্ণ বিশ্বাস ছিলাে। কারণ, অনিলা খাটি কবি : আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত কবিতার মাসিকপত্র জীবাণু অনেকটা তা লেখার ওপরই নির্ভর করতো; আর সরোজকুমার তার সাহিত্যবােধের পরিচয় দিয়েছে প্রবাসী বিচিত্রা ইত্যাদি পত্রে কয়েকটি অপুর্ব গল্প লিখে। এই দুই হিতাকাঙ্ক্ষী সমজদার ও সমালােচকের পরস্পর-বিরােধী মতামত আমায় লেখক-জীবনের মূল্যবান্ ঐশ্বর্য ছিলো। কিছুকাল আগে মাস তিনের

বাবধানে দু'জনেই নেহাৎ অকালে হঠাৎ মারা যায়। নিজের ব্যক্তিগত ক্ষতির
কথা তুলে লাভ নেই ; তবে, তারা এই বইটা শেষ দেখে যেতে পারলে আমার
ভালাে লাগতো। অসম্পূর্ণ ভাবেই লেখাটি কিছু দিন প'ড়ে থাকার পর
অাজ শেষ হয়েছে-এ-বই আজ তাদের নামেই উৎসর্গ করলাম ।
বালিগঞ্জ,
জন্মাষ্টমী, ১৩৪৮
}

শ্রীমতী পঞ্চমী সমীপেষু পত্রাকার উপন্যাস

No text on this page.

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু, যদি তােমার অত অজস্র প্রশ্নের জবাব দিতে হয়, তাহলে তােমাকে সবুর করতে হবে। আমার মতাে এমন-একটি মানুষের ওপর তােমার মতাে অমন-একটি মেয়ের এত আক্রোশ কেন, তা আমি জানিনে। পৃথিবীতে যত রকমের প্রশ্ন আছে সব উদয় হবে তােমারি মনে, আর তার জবাব দেওয়ার জন্যে দায়ী হতে হবে আমাকেই ? আমি ভেবে পাই না, পঞ্চমি, কেন তুমি আমাকে অনবরত এত জিজ্ঞাসার-সুচ ফোটাও। তবে, পাত্র-বিশেষের হাতের চিমটিটাও বড্ড মিষ্টি লাগে, এই যা রক্ষে। আমি বলি, যদি জবাবই তােমার দরকার, তবে দূরে বসে থেকে লাভ? তােমার সেই টাঙাইলেএমনকী মধু আছে জানিনে, যা ছেড়ে তুমি কিছুতেই আমাদের এই বিষময় কলকাতার মাটিতে পা ফেতে চাও না। মুখখামুখী ব'সে কি টুকিটাকি কথা হতে পারে না? যাক্ গে, যা ভালাে বুঝবে, তাই করাে। তােমার জিজ্ঞাসার জবাব তাহ'লে দিতেই হবে, নইলে তুমি রেহাই দেবে না আমাকে, পত্রাঘাতে বিব্রত করে তুলবে। তা যদি হয়ই, তবে সবুর করে- আমি ধীরে ধীরে একে একে এগােই। কৌমুদী, পম্বন্ধে এর আগে চিঠিতে আমি যা লিখেছি, তাতে তুমি তার জন্যে নিশ্চয়ি দুঃখিত। আমিও-যে দুঃখিত নই, তা নয়। হঠাৎ সে-যে অমন ভাবে নিশ্চিহ্ন হবে, একথা আমি কল্পনায়ও কেনাে দিন ভাবতে পারিনি। কিন্তু যখন সত্যিই সে মারা গেলােতখন বুঝলাম, আমাদের কল্পনাশক্তি কত ৩ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ক্ষীণ, তার বিস্তার কত সঙ্কীর্ণ। তার এই আকস্মিক অপমৃত্যুর জন্যে অনেকে তাকে বাহবা দিচ্ছে বটে, কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয়, আমি সে-দলে যােগদান করতে পারছি না। তার কারণ, কৌমুদীর জন্মের থেকে তার সব কথাই আমার জানা। আমার সন্দেহ হয়, . আত্মঘাতী হয়েছে তার সীমাহীন পতিব্রতার জন্যে নয়, এ হচ্ছে তার স্বকৃত অপ্নরাধের নিষ্ঠুরতম একটি শান্তি। কেন? সেই প্রশ্নের উত্তরই আজ দিতে বসেছি। একটা উপন্যাসের জন্যে প্রকাশক তাগাদা দিচ্ছে, দিক। আগে চিঠিটা শেষ করে নিই। যে-কাল আজ সাত বছর আগে রওনা হয়ে আমাদের ছেড়ে গেছে, যদি রুদ্ধশ্বাসে ছুটে গিয়ে তাকে ধরতে পারি তবে সেখানে আমরা পাব অতি স্নিগ্ধ ও নরম একটি পৃথিবী! এবং তার সঙ্গে কৌমুদীকে তত পাবােই, আরাে পাবে। বিজন বলে আর একটি ছেলেকে। একে তুমি চেনােনা, চেনার কথাও তােমার নয়। যদি একে চেনাতে হয়, তবে আমাকে সাত বছর আগের পুরােনাে ইতিহাস টানতে হবে। মনে মনে ছবি এঁকে নাও একটা বাড়ির। সামে তার খানিকটা নগ্ন মাঠ, রাস্তা থেকে মাঠটিতে তেরছাভাবে পায়েহাটা পথের শাদা দাগ পড়েছে। এই পথটির প্রান্ত এসে ঠেকেছে নৃনে-খাওয়া এক প্রাচীরের গায়ে, তার সঙ্গে একটা দরজা, দরজা খুললেই সােজা ইট-বসানাে পথ, ইটের গায়ে শ্যাওলা আর তার ফাকে ফাকে সবুজ ঘাসের সকাতর দৃষ্টি। তার দু'পাশে আগাছার মততা বেড়ে উঠেছে অজস্র গাছ, তার মধ্যে ফুলেরও কয়েকটা। থাকে-থাকে গায়ে-গায়ে বানাে এই ইটের শেষে তুমি পেলে একটি করগেটের চৌচালা ঘর। মেঝেটা পাকা নয়, কাচাও নয়, কাঠের পাটাতন দেওয়া। তার ফাক দিয়ে নিচে তাকালে নির্ঘাৎ তুমি ভয় পাবে। কারণ, আমি জানি, তােমার সাপাতঙ্ক বেজায়। পাড়াগাঁয়ের মেয়ে হয়েও সাপকে তুমি ডরাও বডড। কিন্তু এর নিচে শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু সাপ থাকলেও চাক্ষুষ পরিচয় কারাে ঘটেনি কোনােদিন সরীসৃপ-জাতীয় কোনাে জানােয়ারের সঙ্গে ; তবে, মাটি থেকে কি-রকম সব লতা মেঝে পর্যন্ত কিলবিল ক'রে উঠেছে, কাঠের ফাক দিয়ে যার দু’একটা অবাধ্য সবুজ ডগা ঘরের মধ্যে ট্ৰেপাস্ করেছে। দেওয়ালগুলাে তৈরি বাঁশের ঝাঁপ দিয়ে। জানলা আছে সবসুদ্ধ চারটে, আর প্রবেশপথ বাদেও আছে একটি দরজা পাশের ঘরে যাবার জন্যে। সেই ঘরে এই সংসারের হয় রান্না আর বান্না। সে ঘরের মেঝের ঠিক মাঝখানে কাঠের তক্তা গােলাকার-ধরণের করে কাটা, রান্না করে কিংবা বাসন মেজে জল ফেলার জন্যে। সব জল নির্বিবাদে জমূছে তিন হাত নিচের জমিতে, আর আগাছার জোগাচ্ছে খােরাক। সেই গােল গর্তের হাত তিন দূরে তােল-উনুনে বালি জ্বাল দিচ্ছে কৌমুদী। তার মুখে ছায়া পড়েছে প্রগাঢ় বিষাদের, সঙ্গে আতঙ্কেরও ছবি ফুটেছে নিখুঁং। পেতলের প্যাও ঈষৎ শাদা তরল পদার্থটি একটি পেতলেরই হাত দিয়ে সে অনবরত নাড়া দিচ্ছে, হাতার বাটিতে করে করছে ঢালা-উপুড়। পাশের ঘর থেকে সকরুণ ও সকতর উক্তি এলাে, কুমু-উ। কৌমুদী একটা নিশ্বাস ফেলে বললাে, যাই। ক্ষিদে পেয়েছে তােত? তারি যােগাড় করছি। এই এলাম বলে। শরৎ কালের নিস্তব্ধ সকাল। ঘরের পাশের ন্যাড়া নারকেল গাছের মাথায় বসে একটা কাঠ-ঠোকরা বেসুরাে ঠক্ ঠক্ করে এই নৈঃশব্দকে আরাে গাঢ় করে তুলেছে। আর শােনা যায়, বহুদূরের কোন্ এক বাড়িতে একটা শিশুর একটানা চীংকার, অস্ফুট । কিন্তু কৌমুদীর কানের পর্দায় আঘাত লাগে একটা গাঢ় নিশ্বাসের, আর তার সঙ্গে অতি ক্ষীণ মৃতপ্রায় আর্তনাদ শুনতে পায় সে স্পষ্ট। কৌমুদী নিজে থেকেই ব’ললাে এবার, আর দেরী নেই! একটু সবুর করো।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু পাশের ঘর থেকে সাড়া এলাে, আচ্ছা। অকস্মাৎ এই সমস্ত গুমট স্তব্ধতা ঝনঝন্ করে চুরমার হয়ে ভেঙ্গে গেল। অনতিদূরের রাজবাড়ির পেটা-ঘড়িতে বেলা বেজে উঠলাে না। কৌমুদী নিশ্বাস ফেললাে। কাপড়ের আঁচল জড়াে করে প্যানটির দু’কিনার দু’হাতে ধরে ঝাঁপের দরজা পা দিয়ে ঠেলা দিয়ে সে চ'লে এলো এ-ঘরে। ঘরে ঢুকেই সে আঁৎকে উঠলাে প্রায় : একি, তুমি আবার উঠে বসেছো? হাজারবার ডাক্তারবাবু বারণ করে গেছেন ! না, তােমাকে নিয়ে রুগী তখন উবু হয়ে বিছানার ওপর বসে ধুকছে। কৌমুদী বিছানার পাশে ভ্রন্ত হাতে প্যাটি রেখে তাড়াতাড়ি দু’হাতে রুগীকে ধরে বলল, : তারপর কৃত্রিম বিরক্তি প্রকাশ করলাে । আমাকে আর কত রকমে জালাতন করবে, বলতে পারাে ? যা তােমাকে বারণ করা যাবে- রুগী মৃতের মতাে হাসলে : জালাতন ? আর বেশী দিন ! কথাটা সত্যি হলেও এবং কৌমুদী মনে মনে এ-সত্য জানলেও, তার কানে কথাটা বড় নিষ্ঠুর ও অসহনীয় শােনালাে। সহসা তার সমস্ত মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠলাে, তার বুকের মধ্যে গর্জন করে উঠলাে সহস্র শাদূল, তার আয়ুর রক্তস্রোতে জেগে উঠলাে ঢেউ। কৌমুদী রুগীর কপালে হাত বুলাতে বুলাতে চালাে, বাবা! শেষ-রাত্রে ক্লান্ত দীপ-শিখার মত প্রভাহীন চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন সনাতন। আশ্চর্য মনের জোর এই সনাতনের। আজ এই মৃত্যুশয্যায় শুয়েও তিনি নিজে তাে হতাশ হই নি, মেয়েকেও তিনি সর্বদা উৎসাহিত করে সজাগ রাখছেন। কিন্তু মনের জোর সব সময় সমান থাকে না, রােগের যন্ত্রণা যখন বেশী ক'রে খোঁচা দেয়, তখন তার অজানিতেই মনের লাগামে কখন-যেন একটু ৩ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু আলগা পড়ে। এই অসতর্কতার সুযােগে তঁার হতাশা অমনি মেয়ের কাছেও ধরা পড়ে যায়। প্রবাদ, আজের এই দুর্বল অসহায় সনাতন নাকি এক কালে দারুণ দুর্দান্ত ছিলেন! এ-সত্যের পরিচয় তার জীবনের ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু সে ইতিহাসের অবতারণা আপাতত অনাবশ্যক। সনাতন মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে হাসলেন, বললেন, ছিঃ, কঁাদি কেন? চোখ মােছ । রুগীর সাম্নে বসে কি কাদতে আছে ? তাহলে রুগী ভাবে, তার বুঝি হয়ে এসেছে। যদি-বা তার জীবনের আশা থাকে, এমন ভাবে কাদলে সে-আশাও—ছিঃ, কাদিস না! আবার তুই ছুঁপিয়ে উঠলি ? একেবারেই পাগােল। দে দে, আমাকে খেতে দে। ক্ষিদেয় ; নাড়ি জ’লে গেল, কুমু! একটানা এতগুলাে কথা বলে সনাতন হাপাচ্ছিলেন। কৌমুদী চোখের কোণ পরিষ্কার করে বাটিতে বালি ঢেলে সনাতনের মুখের কাছে ধরলাে। সনাতন উঠে বসতে গেলে কৌমুদী বাধা দিয়ে ভিজা গলায় বলল, উঠোনা। চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁকরাে, আস্তে আস্তে ঢেলে দিচ্ছি। কিছুটা গ্রহণ করেই সনাতন মাথা নাড়লেন। কৌমুদী বাটি সরিয়ে নিলাে। এমন সময় বাইরের দরজার কজায় মৃদু আর্তনাদ শােনা গেলাে। এবং সঙ্গে সঙ্গে ই-বসাননা রাস্তায় জুতার শক উঠলাে বেজে। তাড়াতাড়ি কৌমুদী গায়ের কাপড় গুছিয়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে তৈরী হয়ে নিলাে। এবং সনাতনের বিছানার চাদর টেনে বর্ণহীন তােষকের কোণ দিলাে ঢেকে। ডাক্তারবাবু সরাসরি চলে এলেন ঘরে। মাথার হ্যাট বােগলদাবা করে বিছানার পাশের ছোট্ট মােড়ায় তিনি তাঁর আসন নিলেন। এবং কাঠের মেঝের ওপর চিং করে রাখলেন তার শশালার টুপি। ১১ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদীর দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন ? রুগী কেমন ? সংক্ষিপ্ত ভাবে সঙ্কুচিত জবাব দিলাে কৌমুদী : একই রকম। এবার রুগীর দিকে তাকিয়ে ডাক্তারবাবু বললেন, খেতে পারছেন, না, গলায় খুবই লাগছে। ক্যান্সারের তাে ওই এক বিষম ল্যাঠা। খেতে পর্যন্ত দিতে চায় না। একটু থেমে ডাক্তারবাবু বললেন, আর আপত্তি করবেন না, সনাতনবাবু। আপনি হাসপাতালেই চলুন। মিছামিছি এখানে এই মেঝের উপর একলা পড়ে থেকে লাভ কী? ওখানে গেলে চিকিৎসারও সুবিধে হয় অনেক। সনাতন কোনাে উত্তর না দিয়ে কাৎ হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। কৌমুদী চোখ নিচু করে চুপচাপ বসে রইলাে। ডাক্তারবাবু এবার কৌমুদীকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনিও আপত্তি করবেন না। হাসপাতালে কেন-যে আপনাদের এত আতঙ্ক, জানিনে। আমি বলতে পারি, ওখানে গেলে আপনি সুস্থ হতে পারবেন খুব তাড়াতাড়ি। এখানে থাকলে, বুঝতেই তাে পারছেন, অযুথা আপনাদেরও টাকা খরচ হচ্ছে, আমাদের দিক থেকেও টী হচ্ছে অনেক। হাসপাতালে রুগী ফেলে ঠিক দরকারের সময় হয়ত এসে পড়তে পারিনে! আপনি চলুন, চলুন। আমি আজ এই কথা বলতেই এসেছি। সনাতন একটু কাশলেন, তারপর বললেন, কিন্তু কৌমুদী একা এখানে থাকবে কেমন করে ? একটা বুড়ি ঝী রেখে দিন্! সেইটেই সুবিধে। অনেক দিনের অনেক আপত্তি আজ হার মানতে বাধ্য হ’ল। শেষ পর্যন্ত সনাতন হাসপাতালেই চললেন। কৌমুদী তার জীবনের এই নতুন সঙ্গীহীনতার কথা ভেবে মনে মনে অনেক-রকমে শঙ্কিত হলাে। কিন্তু উপায় নেই, চারদিক ১২ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু অবশ্য থেকে ভেবে দেখতে গেলে হাসপাতালে পাঠানাে খুবই সঙ্গত। পােস্টাফিসের পাশ বইতে যে-টাকা ছিলো, তা ভেঙে খরচ করতে করতে প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। আরও কিছুদিন এই হারে খরচ হ'লে শেষে চোখে ধোঁয়া দেখতে হবে। সনাতনের নিজের যখন আজ আর আপত্তি নেই, কৌমুদী তার নিজের হাজারাে রকমের অমতকে নির্বিবাদে বিসর্জন দিতে কুণ্ঠা করলাে না। তিন-কুলে তাদের আছে কে ?—যে এই দুর্দিনে সহায়তার জন্যে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসবে। এক সনাতনই তাে তার সম্বল। আর যে যেখানে আছে,, সকলকেই সনাতন আজ অনেকদিন আগে বর্জন করে নিজের পথ তৈরি করে অনেক .র এসে পৌছে গেছে। ২ ইতিহাসটাই এবার তুমি শশানো, পঞ্চমি। এদিকে সনাতনের হাতালে চিকিৎসা হ'তে থাক্‌, আর কৌমুদীর কাছে এসে থাকুক স্বনামধন্য গােলাপদি তার পরিচারিকা রূপে। সনাতনের গানের গলা ছিলাে অদ্ভুত! যে-কোনাে আসরে যখন-তখন সে যেমন-তেমন গান গেয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিতে পারতো। শিক্ষাগুরু ক'লে সে কাউকেজ্জীবনের কোনাে কাজেই মানেনি। কেউ যদি তার গানে মুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞাসা করত, থােকা, তুমি গান শেখাে কার কাছে? সনাতন প্রায় চমকে উঠতাে যেন, ব’লতত, শিখবাে কী ? গান আবার শিখতে হয় নাকি? একি অ আ ক খ ? সনাতনের বন্ধন ছিলাে না কিছুই। তার শৈশবে প্রথম জ্ঞান হওয়ার পর সে দেখলাে: একটি বাড়িতে সে লালিত আর পালিত হচ্ছে কিন্তু সে-বাড়ির কারুরই তার ওপর তেমন কোনাে মমতা নেই ! সনাতনও কাউকে ভােয়াক্কা না করে একা একা নির্বিবাদে বেড়ে উঠলাে, এবং বাড়ির মালিকের হুকুম পেয়ে তাকে সে ডাকতে আরম্ভ করলাে : মামা।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেযু সনাতনের মামী যিনি, তিনি সনাতনকে অথা লাঞ্ছনা করতেন বলে গুজব। কিন্তু তার কানের পদ। হয়ত একটু রসালাে ছিলাে, দুপুর বেলায় নিঃঝুম বাড়ির এক নিরালা ঘরে সনাতনকে ডেকে নিয়ে গিয়ে তিনি হুকুম করতেন কর্কশ ও কঠিন গলায় গান গা! গৃহকত্রীর নধর ও দিনে-ঘুমানাে চেহারার মধ্যে সব-চে স্পষ্ট ছিলাে জ্বল- জল চোখ দু’টি। সনাতন সেই দিকে তাকিয়ে সভয়ে বলতাে, কি গাইবাে? কেন? নতুন গান শিখিনি বুঝি ? সনাতনের আত্মসম্মানজ্ঞান অসীম। এ-কথায় সম্মানে তার আঘাত লাগতে বিষম। সে বলতে, গান বুঝি আবার শিখতে হয় ? শিখতে হয় না? . । সনাতন স্পষ্ট গলায় বলতাে। তবে যা ইচ্ছে গা। চিংপাং হয়ে শুয়ে জড়তা-ভরা গলায় বলতেন সনাতনের মামার স্ত্রী। সনাতন গাইতাে। এক মনে সে সহজ ও সচ্ছল গলায় পদের পর পদ এগিয়ে যেতাে। এ পদাবলীর অর্থ হয়ত সে জানতােনা আদৌ। তবু তার গলার স্বরে মনে হতাে, সনাতন তার সমস্ত প্রাণটুকু ঢেলে দিয়ে অর্থকে আরাে স্পষ্ট করে তােলার চেষ্টা করছে। হঠাৎ কখন তার মামার সহধর্মিনী ঘুমে অচেতন হয়ে যেতেন, সনাতন টের পেত না। কিন্তু যখন তার খেয়াল হ'তত সে গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে যেতে ঘর থেকে। সনাতন সােজা চলে আসতে ইঞ্চির-ঘাটে, যে-ঘাটে বর্ষায় নদীর জল কতটা বেড়েছে তা মাপার মাপকাঠি আছে। সনাতন নিজের মনে এই অলস মধ্যাহ্নে এক এক করে লােহার ফ্রেম-এ দাগ-কাটা ইঞ্চি গুণতে, আর নিজের মনেই অর্থহীন হিসেব করতাে নানা রকম । দিনের পর দিন চলেছে, হঠাৎ একদিন মামার টনক নড়ে ওঠে।

. শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু তাইত, সনাতনকে ইস্কুলে দিতে হয়, একেবারে মুগ্ধ করে রাখা কোন কাজের কথা হবে না। ইস্কুলের দিনগুলাে তার কাছে বড় কঠোর আর কঠিন ঠেকলো। চারদিকে কেবল প্রাচীরের বেড়া, তার বন্ধনহীন মন উধাও ঘুরে বেড়াবার পথে এ যে প্রকাণ্ড বিয়। ইস্কুলের পাশের বিস্তৃত মাঠে কোনাে-এক দুপুরে ঠকাঠক্ শব্দ করে তাঁবু খাটানাে হয়ে গেলাে। এলাে ভেড়া, ঘােড়, বানর, বাঘ আর সঙ্গে এলাে ক কড়া ঝাঁকড়া কটা চুলওয়ালা প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মানুষ। কয়েকদিন পরে রাষ্ট্র হ’লল, শহরে সার্কা দেখান হবে। সনাতন মনে মনে এদেরকে মহা ভাগ্যবান্ স্বীকার করে নিজে অতিরিক্ত ব্যথা ও গ্লানি অনুভব করলাে। কেন, সে কি ইচ্ছে করলে এদের একজন হতে পারে না? দেশে দেশে কেবল সে বেড়াবে ঘুরে, কোথাও থাকবে না কোনাে স্থিতি। সমুখে ভেড়ার পাল ধূলাে উড়িয়ে এগিয়ে চলবে, আর তার পিছনে ঘােড়ার পিঠে বসে সে-ও দল বেঁধে চলবে কোনাে এক অনির্দিষ্ট পথে। হঠাৎ একদিন এক জায়গায় গ্বিয়ে বাধবে একটি ডেরা। আচমৎকার! এই তাে জীবন । সেখানে দেখাবে অদ্ভুত সব খেলা, লাগাবে দর্শকের চোখে তাক্‌। কিন্তু পরদিন সেখান থেকে হাওয়া। পরিচয় নেই, নাম জানেনা কেউ, নিজেকে নিয়েই নিজের পরিপূর্ণতা, নিজের পরিসমাপ্তি। সনাতনের এ-স্বল্প কবে সফল হবে। ইস্কুল তার কাছে বিষময় হয়ে উঠলাে। এখানে সে দেখলাে শাস্তি আছে, শান্তি নেই। হাজার শাসন ও ভৎসনা উপেক্ষা করে সার্কাস্ পার্টির চারদিকে সে অজগর-আকর্ষিত ছােট একটি অসহায় পাখীর মত ছটফট করে উড়ে বেড়াতে লাগলাে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। একদিন আবার শব্দ উঠলে ঠক্ঠক্ করে, শহরে খেলা দেখানাে সাঙ্গ করে তাবু ভেঙে সেই যাযাবর দল কোথায় চলে গেল।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু সনাতন একা একা নদীর ধারে বসে গান গাইতে শুরু করে দিলো। নৌকার মাঝিদাড়ির সঙ্গে ক’রলাে ভাব, দেশ-বিদেশের নিলাে সংবাদ, এবং মনের হাহাকার দিলাে আরাে বাড়িয়ে। কিছুতেই কিছু হ’লােনা। কিন্তু একদিন তার কানে পৌছলাে একটি আহ্বান, পরদিন থেকে সনাতন হ’লল নিখোঁজ। . এদিকে তার খোঁজ-খবরে যখন লােকে হয়রান, সেই সময় বহুদূরের চিলমারি গ্রামের রথের মেলার সনাতন তার গান শুনিয়ে লােকদের করছে চমকিত। এই যাত্ৰাপটিতে সে যােগ দিয়েছে আজ প্রায় মাস তিন। অধিকারীর নজর তার ওপর পুরােদস্তুর। এক তিল তিনি একে চোখের আড়াল করতে রাজি নন্। বলা যায় না, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনাে নাট্যসমাজ একে ভুলিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেলেই তার পার্টি একেবারে কানা। অনেক দিনের সঞ্চিত সৌভাগ্য বলতে হবে তার, তাই তিনি হঠাৎ এক ইঞ্চির-ঘাটে একে আবিষ্কার করে বসেন। এবং একে নিয়ে চুপেচাপে হন রওনা। ছেলেটির গানের গলা অদ্ভুত, দূর থেকে গান শুনেই তিনি কিনারে ভিড়ালেন তাঁর নৌকা, এবং লাভ করলেন যে-ঐশ্বর্য তার তুলনা পাওয়া কঠিন। সনাতনের এ জীবন মন্দ লাগলাে না। এও তাে বেশ, কোনাে বাধা-ধরা নিয়ম মেনে চলায় দীনতা নেই এখানেও। আজ চিলমারীতে সুভদ্রা-হরণ, কাল আবার ধুবড়িতে গিয়ে গাও লক্ষ্মণের-শক্তিশেল। মন্দ কি ? সনাতন আজকাল হাসছে। অনেক দিনই, প্রায় বছর চার, সনাতন এই দলে টিকে ছিল বটে কিন্তু বৃদ্ধ অধিকারী যখন নতুন নাটক নলদময়ন্তী খাড়া করে জোর মহড়া দিচ্ছেন, এবং পুঠিয়া রাজবাড়ী থেকে তাদের নাংনীর বিয়েতে গান গাইবার s শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু জন্যে মােটা টাকার বায়না নিয়ে পরম আরামে কাং হয়ে বসে গড়গড়ার নল ফুকছেন, সেই সময় গৌহাটীর টিনের আটচালা থেকে সনাতন এক রাত্রে কোথায়-যে নিরুদ্দিষ্ট হয়ে গেলাে তা কেউ জানে না। তুমি হয়ত’ এত কথা বিশ্বাস করছে না, পঞ্চমি। ভাবছে, সবই আমার কল্পিত ঘটনা! হতে পারে কল্পিত, কিন্তু তার জন্যে দায়ী আমি নই, যদি দায়ী কেউ হন তাহলে আমাদের বৃদ্ধ বন্ধু নীলরতন বটব্যাল্। তিনি প্রাচীন লােক, অনেক তিনি জানেন, এবং তাই বলে বাজে-বকা অভ্যাস তার নাই। আমার এ ইতিহাস অবশ্য তার কাছ থেকেই শােনা। আরাে অনেক দিন কেটে যাওয়ার পর আসামের এক চা-বাগানে নাকি সনাতনকে পাওয়া গেলাে। তখন সে ভীষণ ভাবে গান গায়, এবং সর্বদা কোলে ছােট্ট একটি মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই মেয়েটিই অবশ্য আমাদের বর্তমান কালের কৌমুদী। দুষ্ট লােকে অবশ্য বলে, কৌমুদী সনাতনেরই মেয়ে। কিন্তু, নীলরতনদা চাপা-গলায় বলেন, ব্যাপারটি নাকি তা নয়। চা বাগানের ডাক্তার আর বাগানেরই এক পাহাড়ী মেয়েতে নাকি ঘটেছিলাে সাময়িক প্ৰণয়, কৌমুদীই তার পরিণতি। কৌমুদীর জন্মের পর পাহাড়ের গুহায় গুহায় শুরু হলাে বিষম দ্বন্দ্ব। কোনাে এক পাহাড়ী ছেলেতে আর সেই পাহাড়ী মেয়েতে একদিন বাধলাে সংগ্রাম ; কারণ, ছেলেটির একটু গােপন আসক্তি ছিল এর প্রতি ; আক্তারের পিছন পিছন ঘুরতাে সেই ছেলেটি ভীষণ আক্রোশ নিয়ে আর পাহাড়ী মেয়ে ডাক্তারকে সর্বদা সাবধান হতে বলতাে। তারপর সেই পাহাড়ের খাদে পাহাড়ী ছেলেটির মৃতদেহ পাওয়া গেলাে নাকি এক সন্ধ্যায়, এবং কৌমুদীর মা হ’লাে নিরুদ্দেশ। এর থেকেই নাকি প্রমাণিত-যে কৌমুদীর মা-ই হত্যশ করেছে তার প্রণয়ীকে। অসহায় সেই শিশুটি এখন যায় কোথায় ? আমাদের সুযােগ্য সনাতন তখন এগিয়ে এসে তাকে ১৭ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কোলে তুলে নিল নাকি। অবশ্য এত রহস্য বেশী লােকে জানে না, ওস্তাদ সনাতনের নানারূপ কেরামতিতে সব ঢাকা-চাপা আছে। কৌমুদী-যে সনাতনেরই মেয়ে, এই কথা রাষ্ট্র হওয়ায় সনাতন যেন মনে মনে বেশ গর্ব অনুভব করে। হতে পারে কপােল-কল্পনা, তবু তােমাকে বিশ্বাস করতেই হবে, পঞ্চমি ! কারণ, অবিশ্বাসীর দুঃখ অনেক। সােজাসুজি যদি বিশ্বাস করে চাও তাহলে মনের মধ্যে অযথা কোনাে আন্দোলন শুরু হবে না, অযথা বেদনার, কষ্ট থাকবে না, পৃথিবীর প্রবীণেরা সেই জন্যেই হয়ত’ নাস্তিক নন্। আশ্চর্য মনের জোর বলতে হবে সনাতনের। নিজে তাে সে বাউণ্ডুলে, তবে কোন্ সাহসে কিসেরই-বা ভরসায় এত ভয়ানক একটা দায়িত্ব সে মাথা পেতে গ্রহণ করলাে ! কিন্তু আরাে আশ্চর্য বলতে হবে, কৌমুদীকে গ্রহণ করার পর থেকেও সনাতনের জীবনের দুর্বার গতি থামলােনা। এখনও সে সর্বদা মনে মনে প্রার্থনা করে একটা ভ্রাম্যমান জীবন। অথচ সার্কাস- ওয়ালাদের জীবনের চলন্ত গতি দেখে মনে মনে সে করে করুণা! কেবল কোনাে যাত্রাপার্টির গান শুনলে তার মনে পড়ে সেই বৃদ্ধ অধিকারীকে, তাঁর মেহকে, তার মমতাকে! সনাতনের চোখে জল আসে। ফ্রক-পরা কৌমুদীকে পাশে বসিয়ে সে দেখে কৃষ্ণলীলা, আর নিজে নিজেই গুণ গুণ ক'রে গান গায়। পার্শ্বস্থ দর্শক এই অকারণ গুঞ্জনে বিরক্তিকর দৃষ্টিপাত করে সনাতনের দিকে পিছন ফিরে ঘুরে বসেন। সনাতনের কিন্তু এ-উপেক্ষায় এতটুকু দৃষ্টি নেই। বুকের ওপর কৌমুদীকে সামান্য তৃণরূপে গ্রহণ করে স্রোতের শ্যাওলার মতাে সে ঘাটে ঘাটে ভেসে বেড়ায়। এমন লােকের কাছে উপেক্ষার আবার দাম আছে নাকি? ১৮ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু এই তাে গেলাে সনাতনের জীবনের বিচিত্র ইতিহাস। এবার আমাকে মূল আখ্যায়িকায় ফিরে আসতে হবে। হাসপাতালের চিকিৎসা শেষ হয়ে গেছে। কৌমুদী এখন একেবারেই একা, তার পরিচারিকা গােলাপদি অবশ্য তার পিছনে ছায়ার মতাে ঘােরে। সারারাত শিয়রে বসে এই গােলাপদিই-না কৌমুদীকে নানা রকম সান্ত্বনার কথা বলছে! রাজবাড়ীর ঘড়িতে রাত বেজে যায় দু’টো, গােলাপদি বলে, কুমু, ঘুমুলি ? উত্তরে, কৌমুদী বলে, আমার কী হবে, গােলাপদি? আমার যে আর কেউ নেই। গােলাপদি একটু থেমে বলে, তাের বিজনদা। তার চিঠি তো আজের ডাকেও এলো না ! দ্যাখ, হয়ত কাল এসে পড়তে পারে। তার চিঠিতে আমার লাভ? গােলাপদি নিজের ভুল সংশােধন করে বলে, না না! চিঠি কেন, সে নিজেই আবে ! এ-কথায় ওকৗমুদী দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে গভীর, কোনাে প্রতিবাদ কিংবা কোনাে প্রত্যুত্তর করে না! অনেক দিন পরে, আজের এই একান্ত অসহায় অবস্থার মধ্যে কৌমুদীর মনে পড়ে বিজনের কথা অহােরহ। তন্দ্রা-জড়িত চোখে তার ভেসে আসে একটা, অপরূপ ছবি। সে দেখে, তার বিজনদা আচে। ক্লান্ত দুটি পা টেনে টেনে বহুদূর পথ হেঁটে বিজন আচে। মুখে তার সহানুভূতির সহজ প্রতিচ্ছবি, চোখে তার সরল মমতা, কপালে তার কৌমুদীর-প্রতি-মেহের সুস্পষ্ট প্রতিবিম্ব। আজ কতদিন বাদে কৌমুদী ভাবছে বিজনকে! বিজন যেন সদর-হাসপাতালের পিছনের শুকি-ঢালা রাস্তা দিয়ে জুতাের সর-সর শব্দ করতে করতে ক্রমশই এগিয়ে আসছে। তাদের বাড়ীর সাম্নের মাঠের সেই ১৯ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু । তেরছা পায়ে-হাঁটা পথে সে এবার শব্দহীন পদবিক্ষেপে প্রাচীরের গায়ে এলে পড়লো ! ওই তাে, সত্যিই তো! কৌমুদী স্পষ্ট শুনতে পেলাে দরজার কজায় মৃদু আর্তনাদ, তার পরেই এই তত ইট-বসানাে পথে জুতাের ঠক-ঠক শব্দ, ঘরের কাঠের তক্তায় তার মড়মড় শব্দে পদপাত! বিজন তার শিয়রে ব'সে কৌমুদীর মাথায় হাত বুলাচ্ছে। পরম আরামে, একান্ত নিশ্চিন্তে সে এই আদর উপভােগ করছে নিরিবিলি ! নিজের হাতটি দিয়ে সে সেই প্রণীহাত চেপে ধরে অক্ষুটে ডাকলাে, বিজনদা! গােলাপদি কৌমুদীর মুখের ওপর উপুড় হয়ে বললাে, “আসবে। ভাবিনি। কৌমুদী চমকে উঠলাে। স্নান আলােয় গােলালুদির মুখের দিকে তাকিয়ে সে নিশ্বাস ফেললাে গভীর ভাবে। কৌমুদীর ঘুম গেলাে কেটে। এই আলােয়-অন্ধকারে রচা ঘরের মধ্যে সে বিজনের প্রতিমূর্তি দেখতে পেলাে স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ। বিজন তার দিকে তাকিয়ে হাসছে নাকি? তার এই গভীর দুঃখের দিনেও বিজনের মুখে হাসি তাহলে ফুটছে ? সত্যি, কৌমুদীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন জ্বালা করে। যাক গে ! কৌমুদী পাশ ফিরে শুলল। আজ, এই মুহূর্তে, কৌমুদী নতুন করে বুঝতে পারল সনাতন নেই। সত্যি করে দেখতে গেলে পৃথিবীতে আপনার ব’লে দেখতে তার আর আছে কে?—বিজন? সে তাে অনেক দূরে! সনাতনই ছিলাে তার জীবনে জড়িত; এখন সে নেই। হাজার চেষ্টায়। এখন তাকে ফিরিয়ে আনা কৌমুদীর সাধ্য নয়। কোথায় গেলাে সনাতন, আর কোথায়ই-বা রইলাে কৌমুদী! মানুষের দুঃখের দিনে পরম-আত্মীয় বুঝি এমনি করেই দূরে সরে দাঁড়ায়। বিজন এখন একবার এলে পারে। নিজেকে কৌমুদী ভীষণ অসহার ব’লে ঠেছে। একটি অবলম্বন একান্ত প্রয়ােজন তার। চিঠি নিশ্চয় সে ২০ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু পেয়েছে, এ-চিঠি পথে মারা যাবার নয়। চিঠিতে কৌমুদী-তত কোনাে সুখের সংবাদ দেয় নি অমন ! আজ পাঁচ দিন হয়ে গেলাে সনাতনের মৃত্যুর পর। আর, চার দিন হ'লে গেছে তার চিঠি। যাই হােক্, সে মাঝে মাঝে মুষড়ে পড়লেও গােলাপদি তাকে আশ্বাস দিয়ে সােজা রাখছে, এমন দুর্দিনে এমন একজন সমব্যথীই-বা জোটে ক’জনের ভাগ্যে ! কৌমুদীর শশাকের মুখে এ-ও কম সান্ত্বনা নয় ! কৌমুদী আড় চোখে তাকিয়ে দেখলাে, গােলাপদি রীতিমত ঢুলছে। সহসা তার নিজেকে আরাে-যেন অসহায় মনে হলাে! এই দ্বিপ্রহর রাত্রে । অগণিত প্রেতাত্মার দন্তহীন বিভীষিকা তাকে যেন জড়িয়ে ধরলাে আষ্ঠেপৃষ্ঠে। একটা ভয়ের হিম তার শরীরের তন্ত্রীতে জাগিয়ে দিলো ঠাণ্ডা স্রোত। কৌমুদী ঝিমন্ত-গােলাপদির হাত চেপে ধরলাে। গােলাপদি চমকে উঠেই হাতের পাখা নাড়তে নাড়তে বললাে, উঃ, কি অসহ গরম, ঘুমও কি আসে চোখে? কুমু, ঘুমুলি ? কৌমুদী কোনাে সাড়া দিলাে না। সনাতনের গলার একটা গান তার কানে ঝঙ্কার দিচ্ছে। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আরাে যে-একজন গানটি গাইছে সে তাে অবশ্যই বিজন ! কৌমুদীর বুকের স্বচ্ছ ও শান্ত জলাশয়ে পাশাপাশি ছায়া পড়লাে দু’জনের : বিজন আর সনাতন। সেই গৌহাটীর ঘটনা। যখন বিজন রােজ কলেজ-ফেরত আস্তাে সনাতনের কাছে। সনাতন ছিলাে বিজনের ওস্তাদ। গীর্জার ঘড়ির শব্দের মতাে তানপুরাতে গম্ভীর সুর বাজিয়ে বিজন কত সহজে সনাতনের সুরে মেলাতে নিজের গলা। কৌমুদী অনেক দিন অনেক অজুহাতে নিজের উপস্থিতি দিয়ে সেই পরিবেশটিকে নিজের কাছে আর বিজনের কাছে করেছিলাে কত মধুময়। কটন্ কলেজের সঙ্গীত প্রতিযােগিতায় যেদিন বিজন প্রথম হ'লাে, উ, C আসি। শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু সনাতনের সেদিন কী বিষম পাগলামী। আদর করে বিজনের পিঠে চাপড় দিতে দিতে বিজনকে প্রায় শেষ করে ফেলেছিলাে আর কি। তখন ভাগ্যিস কৌমুদী কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে সনাতনকে ধমক দিয়ে ক্ষান্ত করেছিলে।। আর ভাগ্যিস সেই আদরের চোট বিজনকে ডিঙিয়ে পড়েছিলাে এই কৌমুদীর ওপর। এবং এই দিনের ঘটনা দিয়েই তাে কৌমুদীর জীবন হয়ে উঠলাে তৈরি ! সনাতনের পাগলামীর মুযযাগে দুদিকের দু’টো স্রোত এক জায়গায় মিলিত হয়ে ভীষণ আবর্তের সৃষ্টি সে-কথা সনাতন হয়ত টের পায়নি। তার পরও কিছুদিন সেখানেই ছিলাে তারা, কিন্তু দারুণ দুঃসংবাদের মতাে সনাতন একদিন এসে বললাে—চ কুমু, গৌহাটী পুরানাে হয়ে গেছে, কিছুদিন চাটগাঁ ঘুরে সনাতনের খেয়ালই এমনি। এতে কৌমুদী চমকায়না, তার এ-সব সহ হয়ে গেছে। জীবনের প্রথম দিন থেকেই তােত সনাতনের সঙ্গে সঙ্গে সে ঘুরছে এখান থেকে সেখানে। জীবনেও যেন কোনাে খানে স্থায়ী স্থিতি সহ হয় না। কিন্তু গৌহাটীকে কৌমুদী ভয়ানক আপনার বলে গ্রহণ করেছিলাে বলেই এ-জায়গা ছাড়তে তার রীতিমতাে কষ্ট হয়েছিলাে। গেলে তারা চাটগাঁ-সেখানকার জল বাতাস হ’লােনা সহ, চলে এলাে নােয়াখালি, থাক্লাে কিছুদিন ; তারপর ঘুরতে ঘুরতে এলে এখানে। এখানেই সনাতন হ’লাে শেষ, তার জীবনের শ্মশান আগে থেকেই হয়ত ছিলাে নির্বাচিত। কথাটি মনে হতেই কৌমুদীর বুকের স্বচ্ছ ও শান্ত জলাশয়ে প্রচণ্ড একটি আন্দোলন উপস্থিত হ'লাে, হােটো ছােটো অফুরন্ত ঢেউ-এর আঘাতে টুকরাে টুকরাে হয়ে ভেঙে গেলাে যিজন, * চূর্ণ : হ’লল সনাতন। কৌমুদীর এই অলস রাত্রির অবসর তার কাছে বােধ হ'লে শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু বিষাক্ত বিস্বাদ। এ-ক্ষেত্রে কৌমুদীর কি করা উচিত, কি সে করে- ছিলাে অত খুঁটিনাটি ঘটনা রচনা আমি করতে পারবােনা, পঞ্চমি ! জানাে তত আমাকে তুমি, চেনােও আমাকে ; আমার সাহিত্য সহ না করলেও আমার রচনার তুমি বড় ভক্ত। নাহলে তুমি দূরেও থাকতেনা, আর লম্বা একটি চিঠি লিখে তােমার কাছে পাঠানাের জন্যে বায়ুনাও ধরতেন। এ আমার এক পরম ঈশ্বর-আশীর্বাদ বলতে হবে। ধরাে, যদি তুমি উল্টোটি করতে : সঙ্গে সঙ্গে থেকে তুমি যদি নাক সিটকাতে আমার লেখা দেখে। উপুড় হয়ে শুয়ে যখন বেশ • জমাট একটা কবিতা ফেঁদে বসেছি, তখন যদি তুমি শত অনুনয়ে পরাস্ত হয়ে অবশেষে মরিয়া-সাহসে আমার দুটি কঁধ দু’হাতে টেনে ধরতে, আর বলতে : ‘আর লিখােনা, লিখে কি হবে? তার চেয়ে এই ব্যবধানে সমস্যার যে সমাধান করেছ তাই কি শুভ হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে। নইলে তুমি আমার হাজারাে ডাক উপেক্ষা করে তােমার টাঙাইল আঁকড়েউপুড় হয়ে পড়ে থাকতেন। কিন্তু বিজন কেন গৌহাটী আঁকড়ে কৌমুদীর এই দুঃসময়ে তাকে দূরে রেখে অযথা এই ব্যবধান সৃষ্টি করে সুখী হয়েছে, সে আবার আরেক নতুন সমস্যা। এ-সমস্যা তােমার আমার নয়, কৌমুদীর। সে বেচারী এক সনাতন-বিয়ােগে অস্থির, তার ওপর বিজনের নেই কোনাে সংবাদ। নেই সেই দুঃসংবাদবাহী চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার ! সারারাত কৌমুদীর চোখে ঘুম এলােনা, গােলাপদি কিন্তু তার অসহ গরমের কথা ভুলে গিয়ে নাক ডাকাতে সুরু করেছে। ভােরের কিছু আগে কখন-যেন কী করে কৌমুদী ঘুমিয়ে পড়লাে। কিন্তু একটু• বেলায় ঘুম ভাঙলে মানুষের যে এত অসহ চমক লাগে এ-সংবাদ তত এর আগে সে জান্তাে না! মেঝেয় কাঠের পাটাতনে থেকে শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু বিছানা বিছিয়ে সে আছে ঘুমিয়ে, গা মােড়মুড়ি দিয়ে একটু তাকাতেই সে দেখলাে, বাতার বেড়ার ফাক দিয়ে খানিকটা হদে রােদ্র ঘরে এসে ছড়িয়ে পড়েছে, আর একটু ভাল করে তাকাতেই—সে কি ? কৌমুদীর বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলাে। নাঃ, বিশ্বাস করা তাে মুস্কিল! কৌমুদী ধড়ফড় করে উঠে বললাে, ভ্রন্ত হাতে এলােমেলাে গায়ের কাপড় গােছ- গাছ করতে করতে চকিত চোখে তাকাতেই বিজন বললাে, অনেকক্ষণ এসেছি, ঘুমােচ্ছিলে তাই ডাকিনি। কি বলে গিয়ে, তােমার কাছে কে না থাকে, কি নাম যেন, টগর নাকি! সে কই ? কেন, গােলাপদি নেই ? কোথায় ? দরজা খােলা, হ্যা সদরও। আমি সরাসরি চলে এলাম। না, বাড়ি চিতে আবার বেগ ! জায়গায় তো বহুবার এসেছি, সবি প্রায় চেনা- কৌমুদী বিজনের কথায় ঠিকমত কান দিতে পারলােনা, গােলাপদি তবে গেলাে কোথায় ? সারা রাত সে কি তবে একলা কাটালাে ? কৌমুদী বিজনের কথায় হু দিতে দিতে বললাে, কিন্তু গােলাপদি সদরের দরজায় শব্দ হতেই কৌমুদী লাফিয়ে উঠে জানলা দিয়ে তাকাতেই—এই তত! গােলাপদি ভিজে কাপড়ের আঁচল নিঙড়াতে নিঙড়াতে অলস পায়ে ইটবসাননা রাস্তার ওপর এসে পড়েছে। কৌমুদী বললাে, গিয়েছিলে কোথায়, গােলাপদি ? নেয়ে এলুম। সারা রাত কি অসহ্য গরম, দুই চোখের পাতা এক করে কার সাধ্য। তুই ঘামিস, আর আমি হাওয়া করে রাত কাটাই। বিজন কৌমুদীকে বললাে, কথা শুনে মনে হচ্ছে লােকটা ভালাে- খুউব। কথাটার মধ্যে শ্লেষ আছে কি না, কৌমুদীর গলার স্বরে বােঝা গেলােনা। , : } ২৪

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
গােলাপদি কান খাড়া করে বললাে, ঘরে কে কথা বলে ?
কৌমুদী এর কোনাে উত্তর দিলাে না। কেবল বিজনের মুখের
দিকে তাকালো। বিজনও তাকালাে কৌমুদীর দিকে।
দ্রুত পায়ে গােলাপদি দরজার কাছে এসে উকি দিলাে। কে এ?
একে তাে গােলাপদি চেনেনা! প্রকাণ্ড দুটো বিস্ময় গােলাপদির দুই
চোখে প্রচণ্ড হয়ে ফুটে উঠলাে। বিজন সেদিকে তাকাতে সঙ্কোচ বােধ
করলো, কৌমুদীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল বিজন।
একে.
তাে গােলাদি চেনেনা! একটা বেডিং, একটা সুটকেশ! ওঃ, এইবার
সে চিনেছে। বললাে, কে তুমি?-বিজন ?
বিজন চমকে উঠলাে। সে কি, এ তাকে চিনলাে কি করে ?
কৌমুদীর দিকে তাকাতে কৌমুদী স্নান হাসলাে।
গােলাপদি পরম অন্তরঙ্গ গলায় বললো, বসাে বাবা বিজন, বসাে
আমি চট করে কাপড়টা ছেড়ে নি ! দে কুমু, লক্ষ্মীটি ! কাপড়টা ছুড়ে দে !
কৌমুদী কাপড় দিতেই গােলাপদি অন্তবান করলাে। বিজন বললাে,
আমাকে চিলােচ্ছ
পরম উদাসীন সুরে কৌমুদী বললো, নাম শুনেছে।
s
ওঃ !
আমি জানতেম তুমি আসবে। বলতে বলতে গােলাপদি ঘরের মধ্যে
চলে এলাে : কম বুঝিয়েছি কুমুকে ? বেচারী ভেবে সারা? বলে, বিজনদা
ভুলে গেছে ! আমি সে কতাে বােঝাই ! বলি, ভােলেনি, ভােলেনি।
কৌমুদী মনে মনে গােলাপদির ওপর জ্বলছে, বললাে, বাজে কথা
রেখে হাত মুখ ধধায়ার জল আনন, গােলাপদি!
আছি! সারা রাত রেলগাড়ির ধকল, মুখে কালী পড়েছে ! কুমুর
এবার মনে একটু শান্তি হলো। আহা, কচি মেয়ে ! সারাদিন বলে,

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
আপনার ব’লতে ওর নাকি আর কেউ নেই। আমি বলি—কেন তাের
বিজনদা আছে। তবে একটু থামে।
তুমি যাও গােলাপদি, দেরী করােনা! কৌমুদী গােলাপদিকে যেন
ঠেলে দিলো।
বিজন বললাে, যাবে অখন, তাড়াতাড়ি কি ?
না বিজনদা, ও বড় সব কাজে দেরী করে।
গােলাপদি বললাে, তাহলে আগেই দি, বাপু, জল !
হাত মুখ ধােয়ার পর পালা এলাে দুঃখের। বিজন “মুখ ম্লান করে
মাথা নিচু করে বলল চুপচাপ।
তার কিছু দূরে বসে রইলাে
কৌমুদী কথাহীন! গােলাপদি দরজার চৌকাঠে কোমর ঠেসান দিয়ে
ব’সে নিশ্বাস ফেলে বললাে, আহা!
কৌমুদীর চোখ দিয়ে জল পড়লাে কাঠের পাটাতনের ওপর।
বিজন কিছুক্ষণ তা লক্ষ্য করে বললাে, ছিঃ, কাদতে নেই! কেঁদে তাে
লাভ নেই কোনাে !
আর লাভ! গােলাপটি নিশ্বাস ফেললাে : থাকার মধ্যে ছিলাে এক
বাপ। মা-হারা মেয়ের সব অভাব ঢেকে রেখে মানুষ করে তুললাে-
বিজন বাধা দিয়ে বললো, থাক্‌ সে কথা ।
গােলাপদি বললাে, থাকবে বই-কি। এ-কথা কি আর বলার। কী
মানুষই ছিলেন। তার গান যে শুনেছে সে কি তাকে ভুলবে? এই
তাে রাজবাড়ীতে দোলের জলসায় গলার ঘা নিয়েও যা গাইলেন-যে
কুমার তক্ষুনি উঠে এসে কানে কানে কি-যেন বলে গেলাে, অমনি
তিনি তার সঙ্গে চলে গেলেন রাজবাড়ীর ভেতরে। শুনেছি তাে সব,
রাজবাড়ীতে চাকরি দিতে চেয়েছিলাে, নিলেন না। জীবনে কারাে
গােলামী করেননি, হু। মনটা ছিলাে কী উচু। এমন মানুষের কি না

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ধরলাে এই কাল রােগে ! ..কৌমুদী এবার ফুপিয়ে উঠল। বিজন বললাে, থাক্ গােলাপাদি! সে কথা তুলে আর লাভ কি ? গােলাপদি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করলাে : আর লাভ!--যাই এবার, তােমার জন্যে একটু খাবার জোগাড় দেখি ! বেশ ছেলে, লক্ষ্মী ছেলে, ব’সাে ! একা ঘরে বিজন আর কৌমুদী। দু’জনেই দারুণ নির্বাক। বাইরে। গােলাপদি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর আগে এ-বাড়ির বর্ণমা দেওয়ার সময় আমি তােমাকে সুধুমাত্র দু’খানি ঘরের ছবি দেখিয়েছি। কিন্তু এ-বাড়িতে আরাে-যে ঘর আছে, সে-কথা আমার বলা দরকার। মাঝখানে মস্ত একটা উঠোন, বড় বড় ঘাস আর আজে-বাজে গন্ধহীন ফুলের ঝােপে উঠোন একেবারে নিশ্চিহ্ন; উঠোনের তিন দিকে তিনখানি চৌচালা, একদিকে পাতকূয়াে। কৌমুদী যে-ঘরটায় থাকে তার কোমরে এখনাে জোর আছে সামান্য। বাকি দু’টোর ভিৎ পড়েছে কাৎ হয়ে, টিন পড়েছে ঝুলে। আমাদের গােলাপদি এখন সেই ভাঙা ঘরের ভেতর গেছেন, সেখান থেকে সংগ্রহ করছেন তিনি কাঠ, আর ঐ দিকের বারান্দায় কাঠের জালেই তিনি তৈরী করবেন চা। আজকাল কৌমুদীর শােবার ঘরের পাশের ঘরটি আর রন্ধনশালা নয়। কূয়ােক পাশের ন্যাড়া নারকেল গাছে এখন কাঠ-ঠোকরা বেসুরাে ঠক্ঠক্ করছে। এই নারিকেল গাছটিকে আমি বলি একটি মিনিয়েচার মনুমেন্ট, আর উঠোনটি গড়ের-মাঠ, শানবাঁধানাে কূয়াের সীমাটা যেন কলকাতার কেল্লা ! চমৎকার পরিবেশটি। একটা পড়াে বাড়ি হলেও এর ভেতর চমৎকার কাব্য আছে। ঐ যে কাঠ-ঠোকরা তার রঙ-চঙে পাখার গবে টইটুম্বর, বারে বারে গাছের ঠিক ডগার দিকের ফুটোর ভেতর २१ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপে থেকে নিজের মাথাটি বের করে চারদিকে অকাচ্ছে, সেখানেও পড়ে আছে একটি কবিতা। কিন্তু এখন সে-কবিতা নিয়ে কাব্য করার সময় কই? বিজন আর কৌমুদীকে অনেকক্ষণ একা রেখেছি, তাদের চোখের জল শুকাবার সুযােগ দিয়েছি অনেক, এবার এসাে, পঞ্চমি ! তুমি তােমার টাঙাইলের উচ্চসিংহাসন থেকে নেমে এসে আমার কাছে এই ‘করদরাজ্যের শহরতলীতে—এই কুচবিহারে। যেখানে বিজন আর অধুনালুপ্ত কৌমুদী পাশাপাশি আছে ব’সে। ভাবতে বড় খারাপ লাগছে, পঞ্চমি, এমন পরিপাটি এমন সুন্দর এমন শান্ত এমন লক্ষ্মী একটি মেয়ে কিনা মারা গেল অপঘাতে ! ওই শােনন গােলাপদির কথার ঝাঁজ। কাঠঠোকরা অত দূরে আর অত উচুতে বসে ঠোট বাজাচ্ছে, তাতে এর কী বা এলাে গেলো, গােলাপদির বাড়া ভাতে সে তত মুখ দিতে আসেনি ! কাঠের চাল। হাঁটু দিয়ে ভাঙতে ভাঙতে গােলাপদি খিচিয়ে উঠলাে : আরে, ম’লাে যাঃ। সুধু ঠক্ঠক্, সুধু ঠক্ঠক্ । পুলিশের ফাঁড়ির ঘড়িতে বেজে উঠলাে আটটা। তারি একটু পরে, কানকে বিশ্রাম দেওয়ার আগেই রাজবাড়ির ঘড়িও আটটা ঘণ্টা বাজিয়ে দিলাে। বিজন হাতের ঘড়ি দেখে নিজের কানে দিয়ে বললাে, চলছে তাে। তবে স্লো হলাে আবার কেমন করে ? কৌমুদী বললাে, কয়েকদিন থাকবে তত বিজনদা? পরীক্ষা তত হয়ে গেছে, থাকো কয়েকদিন। উপায় নেই, কৌমুদী। বিজন বিপন্ন মুখে বললাে: তুমি আমাকে হয়ত ভুল ভাবছে, কিন্তু তুমি চেনাে তােত আমার বাসার লােকদের। এখানে-যে এসেছি, তা কেউ জানেনা। আমি মিথ্যে কথা এসেছি। কি বলেছি জানাে?—আমার বন্ধুর বিয়ে লালমনিরহাটে। . বলে শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদী চুপ করে রইলাে। থাকার কি আমার অনিচ্ছে ? বিজন ধীরে ধীরে বললাে : তুমি কী ভীষণ বপদে পড়েছ তা কি আমি বুঝি না? তবু যেতে হবে ! ৪ •• আজই! , আজই নয়। কাল। বিয়ে তাে আর একদিনে হয়ে যায় না। বজন ম্লান হাসলাে। কৌমুদী বিজনের মুখের দিকে একটু তাকিয়েই মাথা নামালাে : যাও। না গিয়ে আর উপায় কী বিজনের ! তার মনে যদিও একান্ত ইচ্ছা সে অসহায় কৌমুদীর সম্বল হয়, কিন্তু অভিভাবকের অভাবনীয় শাসনে সে গুনে-গেঁথে ফেলে পা, ভেবে চিন্তে বলে কথা, গ্রাম গুনে খায় ভাত ! এমন কথা-তাই বলে আমি বলছিনা-যে তার অভিভাবক বিজনকে লাঞ্ছনা করেন। বিজনের বাবা তাে আর সনাতনের পড়ে-পাওয়া মামা নন্। তেমন হলে আজ হয়ত বিজনকে আমাদের এ-আখ্যায়িকায় স্থান দেওয়ার মতাে সুযােগই পেতাম না। সনাতনের মতাে মনের জোর থাকে ক'জনের। তেমন হলে বিজন কোন্ কালে হয়ত একটা বন্দুকের গুলিতেই নিজের মাথা ফুটো করে দিতে। তাহ’লৈ আমি, এই পত্রোপন্যাস-লেখক সুশীল রায় নয়- এই পত্ৰ-লেখক শ্রীযুক্ত সুশীল সেনগুপ্ত, আজ পাঁচ বছর আগে দেবতার আশীর্বাদরূপে-হঠাৎ-পাওয়া রাচী থেকে বাড়িমুখাে চির কামনার বিধবা কামিনী (চ’টোনা!) শ্রীমতী পঞ্চমী দেবীকে এমন ইলিরে বিনিয়ে টিপেটিপে এমন একটা লম্বা চিঠির মধ্যে শ্রীমান্ বিজনকুমারের সংবাদ কি দিতে পারতেম? লেখকদের ওপর ভগবানের অযাচিত আশীর্বাদ আছে, কেমন সুন্দর করে তিনি সাজিয়ে দেন ঘটনাগুলাে, কেমন পরিপাটি করে তৈরী করে রাখেন বলার কথা ! আমার সে ভগবান বস্তুটি কে, তা আমি ঠিক জানিনে। তিনি কি নারী-বেশে মর্ত্যের কোনাে সুদূর পল্লী গ্রামে . শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু পাড়ার মেয়েদের সেলাই শিখিয়ে দু’পয়সা রােজগার করে গ্রাসাচ্ছাদন চালাচ্ছেন, আর বহুদূরের শহরবাসী এক নগণ্য নাগরিকের ওপর পত্রযােগে চালাচ্ছেন তােবি ?—এবার নিশ্চয় তুমি চটেছে, তােমার গালের পালা চামড়া ছিড়ে রক্ত ছিটকে বেরিয়ে আসবে, যদি তোমাকে আর এক ডিগ্রি বেশি রাগাই! অতএব এসে, আমাদের দু'জনের কথা আপাতততা তুলে রেখে তৃতীয় ব্যক্তিকে নিয়ে বক্তৃতা দেওয়া যাক। কৌমুদীর চোখের লােনাজল তার গালের ওপর আঠার মতাে শুকিয়ে উঠেছে। উঠে গিয়ে বারান্দার বালতি থেকে চোখ মুখ ধুয়ে এলাে। বিজন বললাে, এখন তুমি কি করবে ? আমার কথা দিয়ে দরকার নেই ! বৌমুদী বেসুরো-গলায় বললাে, তুমি এখন কি করবে তাই আমাকে বলে যাও, বিজনদা! আমি? বিজন অতি সহজসুরে প্রত্যুত্তর দিলাে : বি.এসসি. যদি ভগবান-ইচ্ছায় পাশ করতে পারি তাহলে হয়ত’ ঝড়কি কিংবা শিবপুর- কৌমুদী বিস্ময়ে পাথর হয়ে মূঢ়ের মতো কালাে তার দিকে : তার মানে? বিজন মাথা নিচু করেই বললাে : বি. ঈ, পড়তে হবে।-বাবার ইচ্ছে, আমি ইঞ্জিনিয়ার হই; কিন্তু আমার ইচ্ছে, ডাক্তারী পড়ি। তােমার কী মত, - •• কৌমুদী? কৌমুদী নিরুত্তর। বিজন আবার পুনরুক্তি করলাে : ব’ললেন, তােমার কী মত? আমার মত ? 'কৌমুদী সশব্দে নিশ্বাসপাত করে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেলো, এবং নিজেকে গােপন করার জন্যে উচু গলায়, ডেকে উঠলো : গােলাপদি, এখনাে সামান্য একটু চা করতে পারলেনা?

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ভিজে কাঠে ধোঁয়া হচ্ছে, আগুন হচ্ছেনা। গােলাপদি জ্বালাতনে অস্থির হয়ে দাতে দাত রেখে বললো : যাই, একটু সবুর কর, লক্ষ্মীটি। “শিগগির এসাে। কৌমুদী আবার বিজনের দিকে মনােযােগ দিলো। কি ভাবতে ভাবতে কৌমুদী চোখের কোনায় আঁচল তুলে নিলাে। বিজন বললো, ছিঃ, অমঙ্গল হবে। ভিজে গলায় কৌমুদী বললাে, কার ? তার আত্মার। বিজনের গলার স্বরেও একটু বাষ্পের আভাষ বােধ হ'লো যেন! কৌমুদী একথার কোন উত্তর দিলােনা। আর কিছু তার মনে হচ্ছেনা, কেবলই মনে হচ্ছে, এ অসম্ভব। সনাতন-যে এমন নিষ্ঠুরের মত তাকে এমন একা ফেলে চলে যেতে পারে, এ কিছুতেই সত্যি হতে পারে না। কৌমুদীর মন এত নরম-যে তার তুলনা হয় না। কে বলবে, এ সেই মায়ের মেয়ে, যে তার-প্রতি-আসক্ত-একটি-ছেলেকে নির্মম হাতে খুন করেছে তার ডাক্তারের জন্যে। মনে হয়, কৌমুদী যেন আনকোরা • বাঙ্গালী গর্ভজাত। সত্যি পঞ্চমি, এই সব ক্ষেত্রে কৌমুদীকে পেলে নীলরতনবাবুর কথাগুলাে রীতিমতাে ঘটনা বলে মনে হয় না, মনে হয় রটনা। কিন্তু গুজবই যদি হবে তাহলে কৌমুদীর মুখের ছাদে পাহাড়িনীর গড়ন থাকতাে কিংবা গায়ের রঙ কি অমন লালচে-শাদা হতাে? গােলাপদি, অনেক কষ্টে চা নিয়ে এলাে। সঙ্গে আবার খানিকটা সুজিও। গােলাপদির গায়ে যেন কোথা থেকে জোর এসে গেছে, ঠাস্ করে সে বসে পড়লাে মেঝের ওপর, কাঠের তক্তা তার দেহের ভারে মৃদু মড়মড় শব্দ করে উঠলাে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
গােলাপদি দীর্ঘ নিশ্বাসের শেষে ব’ললাে, যাক্, এবার আমার ছুটি।
যার ধন তার হাতে সপে দিয়ে আমি এখন যেতে পারলেই বাঁচি।
বিজন আর কৌমুদী এ ওর মুখের দিকে তাকালাে। এ-কথার কোনাে
মানেই তারা যেন খুজে পেলােনা।
গােলাপদি বললাে, বিজন কি কুমুকে নিয়ে যাবে?
কোথায় ? বিজন আশ্চর্য হয়ে গােলাপদির ও কৌমুদীর মুখের দিকে
তাকালাে।
দ্যাখাে কথার ছিরি! গােলাপদি নড়ে বসলো ; কোথর নিয়ে যাবে
তা কি আমি জানি? তােমার দেশেও নিতে পারে, আবার
সে কী কথা! বিজন পেয়ালা থেকে মুখ সরিয়ে ব’ললল : আমি
আবার নিয়ে যাবাে নাকি? কি যে বলাে !
নিয়ে যাবেনা? তােমার জিনিষ তুমি নেবে না, তবে কি আমি চিরকাল
আগলে থাক্‌বাে?
বিজন এর কোনাে উত্তর দিলাে না, না বা কৌমুদী। এর কী উত্তর হ'তে
পারে তারা বুঝে পেলােনা। তবে, উত্তর একটা কিছু দেওয়া দরকার,
নাহলে বক্তব্য অসমাপ্ত থেকে যায়।
বিজন বললাে, নিশ্চয়, নিয়ে যাবে বই-কি ! চিরকাল আগলে থাকতে
হবে না, গােলাপদি! তবে, আর কয়েকটা দিন।
হু। গােলাপদির আনুনাসিক শব্দটায় বিস্তর রহস্য আছে মনে
।
কৌমুদী গােলাপদির দিকে আড়চোখে তাকালাে, কোনো কথা বললে
বিজন একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলাে।
হয়ত ধূমপানের জন্যে নয়,
হয়ত এখন
আর একটি অবলম্বনের দরকার ছিলাে। সিগারেটের

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু • ধোঁয়ায় যে আবহাওয়ার সৃষ্টি হ’লল, ধরে নেওয়া যাক, তার নেপথ্যে কোনাে নাটক শুরু হয়ে গেছে, প্রকাশ্য রঙ্গমঞ্চে যার আবির্ভাব আসন্ন। তুমি হয়ত বুঝতে পারলেনা, পঞ্চমি, আমি কি বােঝাতে চাই। তবে, বিজন-যে সে-নাটকের নট নয় এটুকু জেনে রাখলেই ঢের। পরদিন বিজন স্বদেশে যাত্রা করলাে। কৌমুদী নতুন করে সঙ্গীহীনতার বিষ হজম করতে আরম্ভ করলাে। কিন্তু বােঝার ওপর শাকের-আঁটি আছে, দংশনের পরেও জ্বালা আছে নতুন নাটকের নায়িকা-বেশে গােলাপদি প্রকাশ্য রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হলেন। নটীবেশে গােলাপকে তুমি ছাপােন। আমিও দেখিনি। গায়ের গােলাপী রঙ, ঠোটের 'রঞ্জন, চোখের অঞ্জন, পায়ের মখমলী হাল্কা লপেটাটি, সে যে এক স্বপ্নরাজ্যের ঘটনার মত ঠেকে, পঞ্চমি। ছিপছিপে দেহ, প্রতিটি কটাক্ষে অগ্নিবাণ, প্রতিটি নিশ্বাসে আশা আর নিরাশা, এই নাকি ছিলাে. গােলাপের বৈশিষ্ট্য। এরি জন্যে তার খ্যাতি নাকি বিস্তৃত ছিল সর্বত্র। ঘুঙুর আর ঘাগরা পরে যখন সে স্তবকের সভায় মৃদু মৃদু নাচতে ও মােলায়েম করে হাসততা, আর তবলার বােলের সঙ্গে ঠাণ্ডা সুরে বলতে ‘কুঁহু নন্দলালা, -উহু উহু বােদয়তি, মরমে হামারি বিষ-জ্বালা ! তখন তার অভিনয় করে কাবার ঢঙ, তার সঙ্গে গায়ে মৃদু ঝাকানি দিয়ে “উহু উহু' বলা কতজনকেই-না কাদিয়েছে। তার আসরে ললাকের সংখ্যা ছিলাে অগণ্য, কিন্তু তার বাসরে ঢােকার সৌভাগ্য লাভ করেছে মাত্র ক’জন। কী খ্যাতি, আর কী সে প্রতিপত্তি! এই ছিলাে গােলাপের পূর্বজীবন। তারপর ধীরে ধীরে বসন্ত গেলে, ফুরিয়ে, চৈত্র শেষ। আলাে এলাে নিভে, হ’লাে দিনান্ত ।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ! গােলাপের শেষ-অধ্যায় গােলাপদি। এযেন নর্মদা-দেবী থেকে নর্দমা-দেবীতে প্রমােশন । গােলাপদি জাহান্নমে যাক, তাতে আমাদের যায় আসে না। কিন্তু অন্য আরেকজনকে জাহান্নমে টাতে আরম্ভ করলে আমরা ঘােতর আপত্তি করবাে। তুমিই-না একদা আমায় বলেছিলে পঞ্চমি, যেখানেই আমি তােমাকে নিয়ে যেতে চাইনা কেন, তুমি যেতে রাজি আছে, কিন্তু গােল্লায় বাদে। ও-স্থানটিকে তুমি ভয় কর, না, ঘৃণা কর তা অবশ্য খুলে বলােনি। তবে সেখানে যেতে তুমি নারাজ। আমিও যেতে রাজি নই অবশ্য। আমরা যখন যেতে চাইনে, তখন কৌমুদীকেই-বা যেতে দেব কোন আক্কেলে? চলুক না গােলাপদির চক্রান্ত, আমরা দুজন জীবিত আছি, আমাদের লেখনী এখনাে বলবতী আছে, আমরা তাকে ঠেকাবাে। যেখানে খুশি সেখানে সে যাক্ বাধা দেবনা, কিন্তু সে যেন গােলাপদির সহযাত্রী না হয়। সেদিন নাকি বর্ষা। সকাল থেকে অনর্গল বৃষ্টি পড়ছে। আমাদের মিনিয়েচার মনুমেন্ট আর কলকাতার কেল্ল। অন্ত রূপ ধারণ করেছে, আগাছার ভিড় ডুবে গিয়ে কেল্লাটা সমুদ্রে রূপান্তরিত হয়েছে, আর মনুমেন্ট লাইটহাউস। বৃষ্টি দেখে কাঠঠোকরা লুকিয়েছে, লাইটহাউএর চূড়ায় বসে শিষ দিচ্ছে পাখী। কাকে যেন সাবধান হতে বলছে। কৌমুদীকে, না গােলাপদিকে? সংসারসমুদ্রই বলল, আর জীবনসিন্ধুই বলল, বিপদের অন্ত নেই এখানে; সতর্কতার সঙ্কেত মাঝে মাঝে পাওয়া ভালাে। কিন্তু এ সঙ্কেতে গােলাপদির হুস হ’লােনা। সে নিজের খেয়ালমত, উদাসীন ভাবে এগিয়ে যেতে লাগলাে। কৌমুদীও নিশ্চিন্ত মনে গােলাপদির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেই পাল তুলে চলেছিলো, কিন্তু খেয়াল হওয়া মাত্র হাল ৩৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু সে ঘুরিয়ে দিলাে। আর এক মুহূর্ত দেরী হ'লে ভরাতরি ভরাডুবি না হয়ে যেত না। কিছু বুঝলে? তােমাদের এই এক বদ-স্বভাব আছে, চট করে সব কথা বুঝতে পারােনা। মাথার বাইরেটা তােমাদের বড় বাহারে, কিন্তু ভেতরটা সত্যিই সাহারা। বৃদ্ধ বার্নার্ড বুদ্ধিমতী মহিলার জন্যে গাইড রচনা করেছেন। তার দেশে বুদ্ধিমতী মেয়ের একবচন কেন বহুবচন হওয়াও হত.সম্ভব, কিন্তু আমাদের একবচন ব্যবহার করতেই একাধিকবার ভাবতে হয়। চাটুকথাই না হয় হ’লল : মাঝে মাঝে চাটুকথাটাও দরকার, চাটনির মত : তুমি, অর্থাৎ শ্রীমতী পঞ্চমী দেবী, আমার কাছে সেই একবচনী বুদ্ধিমতী। তুমি হয়ত বুঝেছ, কিন্তু তােমার সগােত্র বান্ধবী- দের জন্যে আমাকে সব কথা খুলে বলতে হবে। বলা যায় না, হয়ত আমার এ চিঠি তােমার কাছে না পৌছে, সরাসরি তাদের আসরেই হাজির হবে। তােমার টাঙাইল-প্রীতি ও বন্ধু-প্রীতি বডড বেশি। তুমি তােমার দেশী মেয়েদের নিশ্চয় এ চিঠি দেখাবে। আমিও সেজন্যে প্রস্তুত হয়েই লিখছি। লিখছি, কৌমুদীর সঙ্গেই লিখছি। কৌমুদীরও রাত এখন দুপুর, আমার রাতও তদ্রুপ। আজ কৌমুদীর মনের অবস্থা ভালো না, আমারাে তথৈব। কৌমুদী বিজনকে চিঠি লিখছে, অযথাই লিখছে। সে জানে এ-চিঠি ডাকে দেওয়া হবে না। বিজনের নিষেধ আছে। কৌমুদীকে বিজনের অভি ভাবকেরা সুনজরে দেখেনা, না দেখারই কথা। কৌমুদীও তা অবশ্যই জানে। সৃষ্টিছাড়া মানুষের মেয়ে বলে পরিচিত সে, তাকে সম্মান করতে কেউ চায়না। কিন্তু নিষেধ সত্ত্বেও কৌমুদী বিজনকে মৃত্যু-সংবাদ জানিয়েছে, হয়ত সেটা ঠিক চিঠি পর্যায়ে পড়েনা বলেই। বিজন শাসনে মানুষ : ভয় তাই তার বেশি, মনের জোর তাই কম। আজের চিঠি কৌমুদী ডাকে দেবেনা অবশ্য, অথচ লিখবে। কথা বলার লােক এমন কেউ নেই যার শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কাছে সে মনের কথা খুলে বলে, অতএব তাকে এই পথ নিতে হয়েছে। কৌমুদী বিস্তর কথা লিখছে, মনের গ্লানি, মনের ময়লা সব সে কথা দিয়ে সাজাচ্ছে। কিন্তু অত কথায় আমাদের দরকার নেই। চিঠি লেখা তখনও শেষ হয়নি, কৌমুদী হঠাৎ গােলাপদির আচরণে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিপাত করলাে। কৌমুদী সশ্লেষে জিজ্ঞাসা করলাে, গােলাপদি, খবর কি? খবর আর কি দেব, ভাই! খবর আর কী আছে ? হঠাৎ ভাই-সম্বােধনে কৌমুদী হাসলো। কিন্তু হাসিটা পরমুহূর্তে গেল মিলিয়ে। দরজার দিকে তাকাতেই সম্মুখে কৌমুদী যেন প্রকাণ্ড একটি সাপ দেখতে পেলাে। ওখানে কে ? কৌমুদীর গলা দিয়ে ভয়ার্ত স্বর বের হলাে। মহিমবাবু। গােলাপদি নিলিপ্ত জবাব দিলাে। তিনি কে? কেন, চিনিস্ নে ? কদ্দিন না বলেছি এর কথা, টাকা পয়সায়— বুঝেছি। কি চান্ উনি? ন্যাকা সাজিনি, মাইরি। গােলাপদি দরজার দিকে তাকিয়ে অন্ধকারকে সম্বােধন করলাে : ভেতরে আসুন, বাইরে দাড়িয়ে কেন ? নে কুম, আলাপ কর। তার মানে ? কাকে ডাহ তুমি ভেতরে? জানিনে ! আমি চলে যাচ্ছি, বাপু, বাড়ি থেকে। তােরা বুঝে নে। আস্কারা দিতে হয় দে, নইলে পথ দেখাতে বল্। তুমি কোথায় যাবে? কৌমুদী গােলাপদিকে জিজ্ঞাসা করলো। আমি ? কোথায় আর যাবাে? ও-ঘরে। দ্যখ কুমু, তেজ করিনি, নরম হ। মেয়েমানষের তেজ অলক্ষ্মী। জানি। আনুন মহিমবাবু, ভেতরে আসুন। কৌমুদী সহজভাবে উঠে শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু দাড়িয়ে অভ্যর্থনা করলাে, গােলাপদির ওপর হঠাৎ চটে বললো, অদ্ভুত আক্কেল তােমার। আগে কিছু না বলে-কয়ে হাজির করতে হয় । বডড বিপদে ফেললা তুমি। মাহিমবাবু এলেন, নিঃসঙ্কোচে তিনি পাঞ্জাবীর গলা ঢিল দিতে দিতে ঘরে প্রবেশ করলেন। কৌমুদী ব’ললল, বসুন। কৌমুদীর সর্বাঙ্গে সূক্ষ্ম ও তীক্ষ দৃষ্টিপাত করে মহিমবাবু ধীরে ধীরে অনুচ্চ মােড়ায় বসলেন। বিনয়ে গলতে গলতে কৌমুদী বললো, গরিবের বাড়ীতে এর চেয়ে উচ্চ আসন আর নেই। কিছু মনে করবেন না। কী যে বলাে! মৃতের হাসি হাসলেন মহিম বাগচী। তারপর একটু বিব্রতভাবে চারদিকে তাকিয়ে : তুমি ব’সবেনা? বসবাে বই-কি। কৌমুদী নিজের বিছানার ওপর বসে পড়লাে। মহিমবাবুও ধীরে ধীরে মােড়া থেকে নেমে বসলেন। কৌমুদীর মনে কি আছে তা বােঝা গেল না, সে এতটুকু নড়লােনা পর্যন্ত। চারদিকে চুপচাপ। পাশের ঘরের গােলাপদির নিশ্বাস বুঝি এঘরেও শােনা যাচ্ছে। রাত্রির এখন সবে শৈশব। আকাশে তারা কাপছে হয়ত। বাতাস হয়ত এখন । সুন্দরী গােলাপ এখন গােলাপদির সব-শরীরে ঘুঙুর বাজিয়ে নেচে উঠেছে : কুহু নন্দলালা। কোথাও কিছু নেই, ধীরে ধীরে কোথেকে নিমেষের মধ্যে আকাশ ভরে আবার মেঘ করে এলাে, গাছের পাতা কাপিয়ে বাতাস গেলো বয়ে, এলো ঝড়। কটে-কৰাটে আঘাত উঠলাে বেজে, ঘুর্ণিবাতাসে চারদিক হলাে আচ্ছন্ন, পথ ঠিক রাখা যায় না। রাভির করে পাখীরা পড়েছে বেরিয়ে, নিরাপদ আয়- প্রশাখা নেই, শূন্যে পাক খাওয়া ছাড়া গতি নেই। এমন এমন সময় হঠাৎ

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
যদি পাখীরা বাসা পায়, কিংবা দূর সমুদ্রের নাবিক ধ্রুবতারা দেখতে
পায়, তখন তাদের যতটা আনন্দ হওয়ার কথা,আমাদের নায়িকার আনন্দ
হ’লল, এই বিপদেও তার আনন্দ হ’লল, তার চতুগুণ।
অন্ধকারে মহিমবাবুর হাত ধরে কৌমুদী রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো।
প্রেতের মত কে-যেন তাদের অনুসরণ ক'রে ক্রমশই এগিয়ে আসছে।
কৌমুদী পিছনে তাকাতে ভয় পেলাে! মহিমবাবুর হাত চেপে ধরে সে
বললো, আমার ভয় করছে।
ভয় কি? আমি আছি !
কোথায় যাবাে আমরা?
এখনাে ঠিক নেই।
কোন্ রাস্তায়, তাও ঠিক নেই ?
ট্রেনে।
০
৭
সদর সড়ক এড়িয়ে, কলেজের পিছনের পথ দিয়ে তারা চলেছে। তাদের
পিছন-পিছন কে-যেন আসছে। এবার মহিমবাবু টের পেলেন। তিনি একটু
থামলেন। বললেন, কেউ না। চুলাে !
কিন্তু মহিমবাবুর ভুল হয়েছে। এখন তিনি প্রায় অন্ধ। অনুসরণকারী
এবার অনেকটা কাছে এসে গেলাে, আচমকা মহিমবাবুর হাত ধরে ফেললাে।
বললাে, আমার টাকা।
কে তুমি? মহিমবাবু ভয়ার্ত চীৎকার করলেন।
চেনােনা আমাকে? তােমরা পালাচ্ছ, নিশ্চয় পালাচ্ছ।
পাগােল হ'লে নাকি, গােলাপদি ? পালাবে কোথায়?, মহিমবাবু
পকেটে হাত দিয়ে বিস্তর নােট বের করলেন।
করলেন। কৌমুদীকে প্রলােভন
দেখাবার জন্যে প্রয়ােজনেরও অনেক বেশি তাকে সঙ্গে নিতে হয়েছে। বললেন,
এই নাও। খুসি ?
•
৩৮

• শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু উত্তরে কৌমুদীকে ব’ললল গােলাপদি : কৌমুদী, খুসি ? নিশ্চয়। কৌমুদী জবাব দিলাে : তােমার সুখেই আমার সুখ, গােলাপদি। তুমি তাে এই চেয়েছিলে । সুনীতিরােডে পৌছে তারা একটি গাড়ি নিলাে। ট্রেনের তখন মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। গাড়ােয়ান ঘােড়াকে নির্দয় চাবুক কষে বাবুর ওপর সদয় ব্যবহার করলাে। ঘড়ঘড় শব্দের ভিতরে কৌমুদী ব’ললাে, অনেক দূর চলে যাবে কিন্তু। কতদূর? কৌমুদীর আব্দারকে প্রশ্রয় দিয়ে মহিমবাবু বললেন। যেখানে গােলাপদি নেই। যেখানে কেউ নেই। গােলাপদিকে অত ভয় কেন তােমার ? তাও জানােনা? কী তুমি একটা! মহিমবাবু বিজ্ঞের মত হাসলেন। এত শিগগির তিনি এতটা ভালাে- বাসা প্রত্যাশাও করতে পারেননি। এ-যেন তার পাওনার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া হয়ে গেছে। বললেন, তুমি এত মিষ্টি, তবু তােমার এই দুঃখ। কই, দুঃখ আর আমার নেই তাে! কপালের চুল দু’হাতে সরিয়ে কৌমুদী মহিমবাবুর দিকে পরিপূর্ণ তাকালাে। রাস্তার আলােয় দুজন দুজনকে সামান্য দেখতে পেলাে। অনেক সময় সামান্যটাই অসামান্যতা লাভ করে। আর এক মিনিট দেরী হলে ট্রেনটা ফকে যেতাে। অদৃষ্ট প্রসন্ন হলে সৱই ফলে যায়। আজ মহিমবাবুর সকাল হয়েছে কার মুখ দেখে, তা তঁার মনে নেই। তা না হলে তিনি তাকে পুরস্কৃত করতেন নিশ্চয়ি। ভালােবাসা দূরের কথা, প্রবেশাধিকার পাবেন কি না, এই ছিলাে তার সন্দেহ। এখন দেখছেন, তাঁর মত সৌভাগ্যবান্ ব্যক্তি দুটি নেই। দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরায় তারা দু’জন মাত্র যাত্রী : কোন্ সুন্দর সুদূর দেশে তার মধুযামিনী যাপনের সামিল ঠেকছে আজের এই যাত্রা।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপে ভীরবেগে ছুটেছে রেলগাড়ি। অস্বাভাবিক হলেও মনে হচ্ছে, রেল- গাড়িটা যেন কোনাে এক অদৃশ্য আতঙ্কের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে প্রাণভয়ে কিংবা মর্যাদাহানির ভয়ে ছুটে পালাচ্ছে। অস্বাভাবিক হলেও একে অস্বাভাবিক ভেবােনা, পঞ্চমি। গাড়ির মধ্যে কৌমুদী মহিমবাবুর দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। বাইরে থেকে কামরার মধ্যে কৌতুকভরা দৃষ্টি দিয়ে আমরা তামাসাটা উপভােগ করছি। কৌমুদী ব’ললো, বলাে না লক্ষ্মীটি, কোথায় যাবাে। পাহাড়ে। সেই পাইবন, সেই ঝনর গান না! কৌমুদী রীতিমতো মেয়েলি গলায় বললাে, পাহাড়ে আমি যাবােনা। মহিমবাবু কৌমুদীর হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, তবে কোথায় যেতে চাও বলো! সমুদ্রে। কৌমুদী চোখ দু’টি স্তিমিত করে বললাে, সমুদ্রের মতো জিনিষ আছে! আমি নকল সমুদ্র দেখেছি, আসল সমুদ্র দেখতে চাই। তার মানে? মহিমবাবু কৌমুদীর দিকে একটু এগিয়ে বসলেন। কৌমুদী মহিমবাবুর দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে বললাে, ব্রহ্মপুত্র। আমি ব্ৰহ্মপুত্র নদী দেখেছি। উঃ, কী ভীষণ, কী ভীষণ। চারদিকে সুধু জল, সুধু জল। সেও তত সমুত্রেরই মতাে, কিন্তু সত্যি তাে সে সমুদ্র নয়। পাহাড় আর সমুদ্রে পার্থক্য কি জাননা, একটা পাথর আরেকটা পাথার। পাথর বড় কঠিন,-আমি সমুদ্র দেখবাে। তাই চলল। পুরী। মহিমবাবু রাজি হয়ে গেলেন : ব্ৰহ্মপুত্ৰই তােমার মাথাটা খেয়েছে, মাথার মধ্যে সমুদ্রের স্বপ্ন ঢুকিয়ে। হ্যা, তা ঠিক। মাথাটা খেয়েছে বই-কি ! একটু থেমে কৌমুদী বললো, কিন্তু পুরী না। ৪০ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু বম্বে। বেশ তাে, তাই চলল। আরেকটু সরে বসলেন, কৌমুদীকে নিজের দিকে আকর্ষণ করলেন। ছিঃ কৌমুদী সস্নেহ ভৎসনা করলাে : একেবারে ধৈর্ষ নেই। বােম্বাই চলাে আগে। বড় দূর সে। মহিমবাবু মুখ বিকৃত করে ক্লান্ত গলায় বললেন। দূর? প্লাগােল নাকি ? এসে গেলাম বলে। কৌমুদী মহিমরাপুর হাত ধরে বললো : পাগলামি রেখে গল্প শােনে। ব্রহ্মপুত্র নদীর গল্প ভালো লাগে না এখন ! ছেলেমানুষের মতো মহিমবাবু, ব’ললেন। মেয়েমানুষের কাছে পুরুষমানুষ ছেলেমানুষীই ক'রে থাকে অবশ্য, মহিমবাবু আবার বললেন : গল্প এখন থাক্। কী করে তবে সময় কাটবে, বলো ! কৌমুদী অবুঝের মতো বললাে। কী করে? কেন- আবার ? ছিঃ ! বললাম না, এখন নয়। সেই নদী, কী চওড়া আর কী লম্বা! মস্ত মস্ত ঢেউ তুলে ব্ৰহ্মপুত্ৰ ছুটেছে। দারুণ জোরে, রেলগাড়ির চেয়েও জোরে। স্রোতে কত লােক-যে কতদিন ভেসে গেছে, কে জানে! • আমার ইচ্ছে করে, সেই নদীতে সাঁৎরে বেড়াই, সুধু দাঁৎরে বেড়াই। কেন বলাে তাে। এ বদখেয়াল কেন আমার ? কৌমুদীর চোখ ছলছল করে উঠলাে। মহিমবাবুব’ললেন, এ নদী কোথায় দেখলে ? কেন, গৌহাটীতে। তা-ও জানােনা, অদ্ভুত তুমি ! ৪১

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
মহিমবাবু লজ্জিত হয়ে বললেন, সত্যিই জানিনে। গৌহাটীতে ছিলে
বুঝি তােমরা?
হু। মর্মরমূর্তির মতাে স্থির ও অপলক কৌমুদী শব্দ করলাে ।
মহিমবাবু কৌমুদীর ভাবান্তর লক্ষ্য করে মূঢ়ের মতন বসে রইলেন
গাড়ি জাংশনে এসে দাড়ালাে। লালমনিরহাট। কৌমুদী উঠে গিয়ে
জালায় মুখ দিয়ে বসলাে।
কিছু খাবে ?
উহু।
ক্ষিদে পায়নি ?
।
মহিমবাবু ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসলেন। সেখান থেকেই
আবার বললেন, পার্বতীপুরে ভালাে খাবার পাওয়া যাবে। সেই ভালাে,
সেখানেই কিছু খেয়ে নেব।
কৌমুদী কোনাে উত্তর দিলােনা।
গাড়ি ছাড়লে কৌমুদী উঠৈ, এলাে, ব’ললো, শশাও। ঘুমােও তাে
একটু! জেগে থাকলেই মাথায় বদবুদ্ধি আসবে। ঘুমােও শিগগির!
অনুগত শিশুর মত মহিমবাবু শুয়ে পড়লেন। কৌমুদী তার মাথার
চুল নাড়তে লাগলাে। বললাে, বম্বে গিয়ে কাজ নেই, পুরীতেই চলল।
সময়টা এগিয়ে নিলাম।
শুয়ে শুয়েই মহিমবাবু কৌমুদীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, তােমার
ধৈর্য বুঝি কমে এসেছে!
দুষ্ট ! কৌমুদী মহিমবাবুর গালে রীতিমত টোকা দিলাে ! বললাে,
হয়েছে! এবার ঘুমােও তাে।
কৌমুদীর আদর উপভােগ করতে করতে ও পুরীর সমুদ্রতীরের
8२

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু রােমাঞ্চকর স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতে মহিমবাবু সত্যি সত্যিই অকাতরে ঘুমিয়ে পড়লেন। হাঁটুর ওপর থেকে মাথাটি নামিয়ে দিয়ে কৌমুদী স’রে বললাে ও ঘুমন্ত মহিমবাবুর নিরীহ মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলাে। কৌমুদীর চোখে মহিমবাবুর নিদ্রিত মূখ উপভােগ্য দেখালাে’ বােধ’য়। কৌমুদীর এই অদ্ভুত আচরণে তুমিও নিশ্চয় হাচো, পঞ্চমি। আবার তােমার হাসি দেখে আমারাে-যে বেজায় হাসি পাচ্ছে। পৃথিবীতে প্রত্যেকেই নিজেকে বুদ্ধিমান ঠাওরায়। বাঁকে বাঁকে ঝাঁকি খেতে খেতে ছুটে চলেছে ট্রেন্। ঝাঁকে ঝাঁকে অজস্র চিন্তা কৌমুদীর মনে পাক খেতে আরম্ভ করেছে : মনে মনে যে , সংকল্প নিয়ে সে মহিমবাবুর সঙ্গে পালিয়ে এসেছে, তা সফল হবে কি না । সফল হবার পথে তার বিপদ কতকটা ; গােলাপদি কেন তাকে এই অগ্নি- পরীক্ষায় ব্রতী করলাে ; তার ভবিষ্যৎ এখন তার নিজের হাতে, বেচারা মহিমবাবুর কোন দোষ সে দিতে পারে না; অথচ, সে নিজেও দোষী নয়। জাল্লা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কৌমুদী ব'সে রইলাে। ট্রেনের গতি অন্ধকার রাস্তার মধ্যে মন্থর হয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে কৌমুদীর বুকের আন্দোলন দ্রুত হয়ে উঠছে। বার বার সে তাকাচ্ছে মহিমবাবুর ঘুমন্ত তার হাত-পা যেন কাপছে! দূরে তাকিয়ে দেখলাে, সিগনালের লাল আলাে অন্ধকারের মধ্যে আগুনের মতাে জ্বলছে। পরিষ্কার না পেয়ে মাঝপথেই গাড়ি দাড়ালাে। বিােন বন্ধ করে মহিমবাবুর দিকে স্তব্ধ দৃষ্টি রাখলাে কৌমুদী। আলকাংরার মতো কুৎসিত রাত্রি। এটা লােকালয় না শ্মশান-বলা যায় না। কিন্তু কৌমুদীর অত বিচার করার সময় এ নয়। আমাদেরও কৌমুদীকে বিচার , করার সময় আসেনি। অতএব তার যা খুলি সে এখন করুক, আমরা . সে সম্বন্ধে নীরব থাকি। গাড়ি থেমে আবার গাড়ি চলে যাক, উপস্থিত মুখের দিকে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
আমরা সেদিকে মন দেব না। যত : অঘটন ঘটা সম্ভব, ঘটুক। আমি
নিরিবিলি চিঠি লিখি তােমাকে। তােমার গত
বারের লম্বা চিঠির
তাগাদায় তুমি কবিতা করে যে-সব ভণিতা করেছ, তা আমার মতো
কাঠ-খােট্টা লােকের ধাতে সহ্য হয় না, তাব’লে তাকে আমি অসহ্য বলে
উড়িয়ে দিতে পারিনে তাে! তার উত্তরে শুধু লিখতে পারি :
তুমি সবি জানাে : অনাবশ্যক ক্ষতিতে
অনেক বােঝা-ই হাল্কা করেছি অতীতে।
আজের কাজের ভিড়ে ডুবে যাই যত-না-
ক্ষতিকে খতিয়ে দেখি ক্ষতি মােটে ক্ষত না।
মুনােহর মােহ এর আগে যদি ছাড়িত
লাভ লােকশান ঘুচে যেত অবধারিত।
কিংবা
পান্থশালায় পড়ে আছি, উপঢৌকন চায় দেবতা-
দেবতাকে বলি : আমি যাহা দেব, শতগুণে ফিরে নেব তা।
মৌনে দেবতা সম্মতি দেয়, ভরসায় ভেট পাঠিয়ে
শেষবেশ দেখি, ঠকেছি দেকত? পালিয়েছে পাশ কাটিয়ে।
লাভে মুলে সব হারিয়ে এবং সম্বল সৰ খৈয়ায়ে
দেবতার দ্বারে বসে আছি তৰু সম্ভ্রমে মাথা নােয়ায়ে।
ঠিক এই লাভে লােকশানের কথা ভেবে ভেবে যখন আমি সার
হয়ে এসেছি তখন তােমার চিঠিটা পেলাম : মস্ত চিঠি লেখার আদেশ
এ-আদেশে উপকৃত হয়েছি, কেননা মেজাজটা কিছুদিন থেকে বড়ই
কাহিল এবং কাহিল মন-ই রচনা করার উপযুক্ত মন। কিন্তু লিখি কী
কথা আছে বিস্তর, কিন্তু তােমাকে লেখার মতাে কথা আমার যে
নেই। কিন্তু কথার খেই তুমিই ধরিয়ে দিয়েছ—কৌমুদী সম্বন্ধে
কথা জিজ্ঞাসা করে বিবিধ প্রশ্ন পাঠিয়ে ; তার উত্তর আমাকে গল্পের
.
*
৪৪

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ‘ছলে দিতেই হবে। তাই দিচ্ছি। কিছুক্ষণের জন্যে আমরা কৌমুদীকে একা ফেলে স’রে এলাম। কারণ তার কথা বলতে বলতে আমরা দু’জন বড় তফাতে পড়ে যাচ্ছিলাম। এই মুহূর্তে দৈনিক কাগজের প্রেরিত দূতের মত যদি ছুটে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা যায়, তার কিছু বক্তব্য আছে কি না। দ্রুত গতিতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থমকে দাড়ির নিশ্চয় সে বলবে । জীবনে এসেছে মাের বহুবিধ ধিক্কার- দুঃখের কী-বা কর, ঝুলি নেই ভিক্ষায়। সত্যিই তাই। খালি হাতেই তার এই যাত্রা। যাত্রার শেষ কোথায়, প্রথম বন্দর কত দূরে, সে জানে না। ওই লাইন দু’টো টুকেই দূতকে বিদায় নিতে হবে। যা বলছিলাম। আমরা তফাতে পড়ে যাচ্ছিলাম। যখন তােমাৰ কবিতাপূর্ণ তাগাদাটা পেলাম তখন আনন্দ হ'লো দারুণ। একটা চিন্তা এতদিন মনের মধ্যে বিশ্রী কলরব সুরু করেছিলাে। ফলে, মন একেবারে তেততা ঠেকছিলো। এমন সময় বহুদূর থেকে সহস্র প্রশ্নের শো, তােমার কয়েকটি ছােটো ও সাধারণ কথার শেষে তােমার নিজস্ব স্বাক্ষরটি পেয়ে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলাম। এতদিন ভাবছিলাম, আমি কে ? সত্যিই যেন জানিনে, কে আমি। তােমার চিঠিটা পাওয়ার পর প্রশ্নটা মােড় ঘুরে দাঁড়ালাে, মনে হ’লল: তুমি কে?-যে আমার এতগুলা আবর্জনা ঠেলে নির্বিবাদে বাইরে বেরিয়ে এলাে? সত্যি বলতে কী, তুমি কে তা আমি জানিনে। তােমাকে যদি বধু বলি তাহলে একেবারেই মিথ্যে বলবাে, বন্ধু বলে বেশি বলা হয়ে যাবে, প্রতিবেশ তুমি আমার নও—তবে যদি পরিচিত বলি তাহলে সে কিছুই বলা হ’লােনা! পরিচিত তত মানুষে কত রকমে হতে পারে ।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ট্রেন-এ, যেতে যেতে, পথ চলতে চলতে, হঠাৎ একদিন উপকার করে ফেলে, এমন কি জীবনে কখনাে দেখা না হয়ে পর্যন্ত। এক কথায়, পরিচিত কথাটির নিজস্ব কোনাে পরিচয় নেই। এ যেন অন্য কোনাে কথা পাওয়া গেলােনা বলে নিতান্ত দয়া করে তাকে ওই আখ্যা ভিক্ষারূপে দেওয়া। কথাটির মধ্যে দীনতা বড় বেশী স্পষ্ট। পরিচিত-কথাটি যেমন নিঃসম্বল, বন্ধু-টি আবার ঠিক তার বিপরীত। আর বধূ, সে-কথা উচ্চারণ করায় ব্যক্তিগত পরাধীনতা আছে এবং আইনের ভয় আছে। কিন্তু তুমি কে, তার উত্তর তুমি না দিলেও, এবং আমি কথা দিয়ে নানা কৌশল খাটিয়ে প্রকাশ করতে না পারলেও মনে মনে উপলব্ধি ও সঙ্গে সঙ্গে অনুভব অবশ্যই করতে পারছি। বহু দূরে বসে তুমিও হয়ত এই একই কথা নিয়ে খেলা করছো, ভাবছো : তুমি কে, আমি কে? মনে করে রাখাে, অবশ্য নিরুপায় হলে উপায় থাকে না বলেই মনে করে রাখাে : আমরা দুজন দু’জনের যা-ই হই-না কেন, তা যেন বাইরে প্রকাশ না হয়, তবে দু’জন দু’জনের একটা-কিছু। দ্যাখাে কাণ্ড, সব গােপন করতে গিয়ে সব-যে প্রকাশ করে ফেললাম। এই কথাটা কিন্তু বড় অসাবধান। কথাটা শক্রর প্রলােভন বলা যেতে পারে। তাদের অনুসন্ধিৎসা বাড়াবার এযে টনিক। তুমি যদি বলল, তােমার শত্রু নেই—আমি কিন্তু সে-কথা বিশ্বাস করবে না। মানুষের শত্রুপক্ষ ব’লে যদি কোনাে ঐশ্বর্য না থাকে, তাহলে মানুষ খুঁচবে কী-ভাঙিয়ে ? শত্ৰু মানুষের মূল্যবান সম্পদ। উপকারীর ওপর আমার আস্থা কম। তাদের মত অমন বেকুব তুমি পৃথিবীতে আর পাবেনা। তুমি অসুবিধেয় পড়েছ, অমনি সে এসে তােমাকে একটু সুবিধে দিয়ে গেলাে; হাতে অনেকগুলাে জিনিষপত্র নিয়ে ট্রামে উঠতে পারছেনা, তােমার হাতের জিনিষপত্র নিয়ে তােমাকে তুলে নিলাে ; টাঙাইলের টিকিট কাটবে, { শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু স্টেশনে অসহরকমের ভিড়, বললাে, আসুন না আমিও তাে টিকিট কাটবাে, এক সঙ্গে দু'টো। আমি স্বীকার করছি, তােমার মত ভাল মানুষ নেই, কিন্তু সেই জন্যেই তােমার-যে শত্রু নেই সে-কথা স্বীকার করি কেমন করে ? জানাে তাে, ভালমানুষ-হওয়া আর শত্ৰু-সংখ্যা সম-ততায় বাড়ে। বাড়ির মধ্যে সব চেয়ে যে ভালাে ছেলে বাড়ির শাসনের ভাগ তাকেই পেতে হয় বেশি করে। হাজার ভালােমানুষ হলেও শক্ত তােমার আছে। সৈই শত্রুর শক্তি বৃদ্ধি করে লাভ নেই : একটা-কিছু যদি আমরা পরস্পরের হই, তবু তা প্রকাশ করবে না। ধরাে, আমরা দুজন দু’জনের অবলম্বন। এই রে, সহজ করে বলতে গিয়ে একটা ভয়ানক কথা বলে ফেললাম দেখছি। এর-চে খােলাখুলিভাবে বন্ধু বলাও অনেকটা নিরাপদ ছিলাে মনে হচ্ছে। অবলম্বন ? তার মানে ? দু’জন দু’জনের ওপর নির্ভর করে আছি ? কি জন্যে ? কই, জানিনে তাে ! অবলম্বন কথাটা যেমন ছােটো, বড়ও সেই অনুপাতে। একটা ছােটে আপিন • এক টুকরাে কাগজের অবলম্বন হতে পারে, এই প্রকাণ্ড পৃথিবীট আধুনিককালের এই বিপুলকায় যন্ত্রশালার একটি অবলম্বন। কিন্তু এ তে গেলল সােজার ওপর দিয়ে। এর মধ্যে কোন মারপ্যাচ পেলামনা। কিন্তু যে মুহূর্তে আমি তােমাকে অবলম্বন বলে সম্বােধন করলাম, তৎক্ষণাৎ সমব 'বিশ্বের বিশ্বাস হলাে আমরা অবিশ্বাসী। আমরা দু’জন তবে দু’জনের কী। একটা উপসর্গ? হয়ত তা হবে। যদি তােমাকে নিয়ে কবিতা করা সম্ভ হ’তাে-তাহলে বলতাম, তুমি আমার কাব্যের মন্দাক্রান্তা, আর আ:ি তােমার কাব্যের কবি। কবি বলে তুমি যদি স্বীকার না-ই করাে, অন্ত তােমার চিঠি পাণ্ডুলিপিকার বলে নিশ্চয় মানবে। কারণ, জনসমাে তােমাকে পরিচিত করার জন্যে আমি একদা তােমার বিষয় বলতে গি, ৪৭ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু প্রথমেই বলেছি : জিভে জড়তা নেই। যার সঙ্গে মিল রেখে তুমি আমাকে পাল্টা আক্রমণ করে লিখেছ ; নিবে জড়তা নেই। অর্থাৎ কলম আমার থামেন।। আমি নাকি লিখে যেতে পারি অনর্গল ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তুমি যেমন জড়তাহীন জিভ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব’কে যেতে পারে। কিন্তু এখন যেহেতু তুমি আমার কাছে নও, তােমার কথা বলার সুযােগ নেই তােমার জিভ, এখন অকর্মণ্য ; এবং যেহেতু তুমি দূরে, আমার লেখার সুযােগ • আছে যথেষ্ট, আমার নিব, এখন কর্মমুখর। পরের স্টেশনে গাড়ি ব্রেক ক’সে দাড়াতেই ছােট্ট ঝাকি খেয়ে মহিমবাবুর ঠুকে ঘুমটি ভেঙে গেলাে। চারদিকে তিনি তাকালেন। তার আশেপাশে জনপ্রাণী নেই। হঠাৎ চাবুক খেয়ে তিনি যেন চমকে উঠলেন। নিশ্চয় এ তার স্বপ্ন নয়, তিনি নিশ্চয় জেগেছেন। তবে, সব তার অদ্ভুত ঠেকছে কেন? তিনি স্তব্ধ হ'রে ব'সে রইলেন—হয়ত কয়েক সেকেণ্ড কিংবা কয়েক মিনিট ; সময়ের মাপ বােঝার সময় এ তার নয়। হঠাৎ কি খেয়াল হলাে, তিনি উঠে ল্যাভেটরীর দরজা খুললেন : স্পষ্ট দেখতে পেলেন, সেখানেও কেউ নেই। তিনি তবু দেখছেন, গাড়ি আবার কখন চলতে আরম্ভ করেছে, তা তিনি জানেন । অদ্ভুত! মহিমবাবু মাথায় হাত দিলেন, চুল এলােমেলােই তত মনে হচ্ছে। মেয়েটা তাকে আদর করছিলাে না? তাই তো তার মনে পড়ে। তবে এমন অস্বাভাবিক ঠেকে কেন? আয়নায় দাড়ালেন। হ্যা, তিনিই—স্বয়ং মহিম বাগচী। গালের এইখানেই-না একটু মােলায়েম টোকা খেয়েছেন তিনি। কিন্তু কোথায় সে? টোকা-র সঙ্গে বােকা-র কাব্যগত একটা মিল তার মনে পড়ছে বটে! অথচ তা সম্ভব নয়—এই তার ধারণা। যকৃগে। তিনি বলেন। কিন্তু বলে চলবে কেন? উঠে দাড়ালেন। আচ্ছা মুস্কিল তো! গেলাে কোথায় ? তার ঘুমের ** ৪৮ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু . সুযােগ নিয়ে কোনাে শয়তান তাকে নিয়ে পালাতেও তাে পারে। কিন্তু মাঝে তত আর কোনাে স্টেশন ছিলাে না—তার হিসেব মত তত তা-ই মনে হয়। একি, ট্রেন-যে তাকে অযথা টেনে নিয়ে চলেছে! লাফিয়ে পড়বেন নাকি বাইরে? মহিমবাবু নিরুপায় হয়ে চেন্টালেন। চেঞ্জ টান পড়া মাত্রই ট্রেন্ দাড়িয়ে যাবে, বিজ্ঞান এমন ব্যবস্থা করেনি; কিন্তু মহিমবাবু সেই ব্যবস্থারই পক্ষপাতী, অন্ততঃ উপস্থিত তিনি . পক্ষপাতী না হয়ে পারলেন না। দাড়াতে দাড়াতেও গাড়ি। অনেকটা এনিয়ে এলাে। যখন সত্যিই গাড়ি দাঁড়ালাে, এবং গাড়ীর অধ্যক্ষ ও সহযাত্রীরা যখন নানারকম প্রশ্ন সুরু করলাে, তখন মহিমবাবু সমস্ত বক্তব্য ভুলে গেলেন। অজস্র প্রশ্নের একটি মাত্র অসমাপ্ত উত্তর দিলেন তিনি । আমার পার্স- কত ছিলাে? পড়লে কি করে ? হাতের লাল আলাে শাদায় রূপান্তরিত করতে করতে বাঙালী গার্ড ব্যস্ততা দেখালেন। মহিমবাবুর সে-ব্যস্ততায় মন উঠলােনা। নিতান্ত বিরক্তির সঙ্গে তিনি বলেন, যাক্‌গে। ট্রাশ ! চলুন ! · ব্যাগে ছিলাে কত ? গার্ডই প্রশ্ন করলাে। বিস্তর। ধরুন, যথাসর্বস্বই হয়ত। মহিমবাবু রীতিমত সজ্ঞানে বললেন। কখন পড়লাে ? টের পাইনি। ঘুমিয়ে ছিলাম। জেগে দেখি, নেই। বলেন কী ? আর কোনাে প্যাসেঞ্জার সঙ্গে ছিলাে না? মহিমবাবু একটু ভাবলেন, ভেবে বললেন, না। ছিলাম। আমি একাই ৪১ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেযু কৌমুদীর নামগন্ধ করার ক্ষমতাও তার নেই। বে-আইনী কাজ করার এই এক মস্ত অসুবিধে। মর্মে মর্মে মহিমবাবু এই মুস্কিলের কথা ভাবলেন, কিন্তু মুস্কিল আসান আর হলাে না। ভেবে চিন্তে তৈরি না হয়ে কাজ করলে এমন বিপদেই পড়তে হয় বুঝি। নাঃ, কৌমুদীর পালাবার আগ্রহটা বড়ই প্রবল ঠেকছিলাে তার প্রথম থেকে, প্রথমেই সে প্রস্তাব করে বললা: চলাে পালাই। মেয়েদের পালাই-পালাই 'বাইটাই খারাপ। মহিমবাবু গাড়িতে আবার চেপে বলেন। তার মস্তিষ্ক ও মাংসপেশী যেন তাকে চলাচ্ছে ও বলাচ্ছে না, একটা অদৃশ্য যন্ত্রের প্রভাবে যেন তিনি চছেন ও বল্‌ছেন। গাড়ি ছেড়ে দিলে, তার জ্ঞান আবার টনটনে হয়ে উঠলাে : তাই তাে! আর সব কামরা একবার খানাতল্লাসী করে দেখা তার উচিত ছিলাে। যাবে কোথায় সে? নিশ্চয় সাম্নের কিংবা পিছনের গাড়িতে সে আছে। আর, যাবেই-বা সে কেন? এইবার স্টেশন এলে তিনি আর একবার খুজবেন। কিন্তু মহিমবাবুর এ আশা দুরাশা ছাড়া আর কী, পঞ্চমি ? আমাদের নায়িকা কৌমুদী এখন মহিমবাবুর অনেক পিছনে লাইনের পাশের পায়ে- হাঁটা রাস্তা ধরে ট্রেনের উল্টো দিকে ছুটে চলেছে। কে যেন তার পিছনে পিছনে আচে। কৌমুদীর ভয় করছে বড্ড। যাবে কোথায় নে? তা সেও জানেনা। সেও গন্তব্যস্থান, তার নেই। অন্ধকায় রাত, অন্ধকারের মধ্যে লােহার লাইনগুলাে বিষধর সাপের মতাে চক্ করছে। কৌমুদী ছুটে চলেছে অনেকক্ষণ থেকে। লােকটা তার পিছু কিছুতেই ছাড়ছেনা। বড় মুস্কিল তাে! হঠাৎ সে থমকে দাড়ালো: কে তুমি? কিন্তু গলার স্বর তার বের হলােনা। ভালাে করে তাকাতেই কৌমুদী স্পষ্ট চিনতে পারলাে, সম্মুখে সশরীরে সনাতন দাঁড়িয়ে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদী যেন ডাক্লাে বাবা। সনাতন ব’ললাে, হ্যা রে, আমি । তুমি কেন ? কে? এমনি ! স্পষ্ট সনাতনেরই গলার স্বর । ব্যস্। এইটুকু মাত্র কৌমুদীর মনে পড়ে। তারপর আর এতটুকু তার মনে নেই। জ্ঞান হওয়ার পর সে দেখলো, একটি বাড়ির বারান্দায়, তাকে শুইক্সে রাখা হয়েছে। তার চোখের সাম্নে খাঁচায় ঝুলছে ময়না। উঠোন ভর্তি শলুপ শাক আর লাউয়ের মাচা। মাথার কাছে বসে ' , হাওয়া করছে একটি মেয়ে । কৌমুদীকে তাকাতে দেখে মেয়েটি চুপ ক'রে উঠে গেলাে। এবং তৎক্ষণাৎ ফিরে এসে বলো। অবিলম্বে আবির্ভাব ঘটলো এক বৃদ্ধের। উনি এবাড়ির মালিক। নাম একটা আছে, তবে পােদ্দার বলেই এর খ্যাতি। পােদ্দার কৌমুদীকে ব’ললল, মাগাে, একটু বকা দুধ খাও, কেমন? কৌমুদী এর কোনাে উত্তর দিতে পারলােনা। তাকিয়ে তাকিয়ে সে দেখতে পেলাে, এক এক করে ক্রমশই ভিড় জমছে। তার নিকটতম অতীতকেও তার মনে হচ্ছে সুদূর স্বপ্নের মতাে। কাল যা ঘটেছে তা যেন গত বছরের ঘটনা। নিঃসংকোচে সে ভিড়ের, প্রতিটি মানুষের মুখের দিকে তাকাচ্ছে, এদের মধ্যের সামান্য একজনও যদি স্বয়ং মহিম- “বাবু হন তাহলেও তার যেন তার বিরুদ্ধে বিন্দুবিসর্গ আপীল নেই। কিন্তু যদি সনাতন তেমনি সশরীরে এখন তার সাম্নে এসে দাঁড়ায়, কৌমুদী সাগ্রহে সে স্বপ্নকে সত্য বলে গ্রহণ করতে রাজি। এবার সে আর চেতনা হারাবে না কিছুতেই। পােদ্দারের অনুনয় ও বিনয়ে ভিড় ধীরে ধীরে পাৎলা হয়ে গেলাে।

: শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু পােদ্দারগৃহিণী প্রকাণ্ড নথ নাকে দিয়ে দুধের বাটি হাতে পাশে এসে বসলেন। বললেন, বাছা আমার! মাত্র দু'টি কথা। কিন্তু কৌমুদী এতেই অভিভূত হয়ে পড়লাে। তার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকাতে তাকাতে কৌমুদী উঠে বসলাে। বললাে, আপনারা কে ? তুমি কে বাছা? নাকের কাছ থেকে কাপড়ের পাড় সরিয়ে পােদ্দার- গৃহিণী জিজ্ঞেস করলেন। নিজের কি পরিচয় কৌমুদী দেবে ভেবে পেলােনা। কৌমুদী আবার বললাে, এ জায়গাটার নাম কি ? মেয়েটা বললাে, সােনামুখী। তােমার নাম? কৌমুদী মেয়েটাকে প্রশ্ন করলাে। শিবানী। তােমার নাম ? কৌমুদী একটু থেমে বললো, পূর্ণিমা। রূপখানা তাই বটে! পােন্দারগৃহিণী কৌমুদীর মুখের দিকে প্রশংস তাকিয়ে আবার বললেন, তা বাছা, তােমার আর কেউ নেই? কোখেকে এলে? আমাকে পেলেন কোথায় আপনারা ? পথের ধারে। অজ্ঞান হয়ে যেখানে পড়ে ছিলে, সেখানে। কোথায় যাচ্ছিলে, মা ? এ দুর্গতি হ’লল কি করে ? কৌমুদী তার জীবনের দিকে পিছন ফিরে তাকালাে মুহূর্তের জন্যে, স্মিত হেসে বললাে, দুর্গতি আবার কি? এই ভাবেই তাে আমার জীবন কাটছে। নাঃ, বাপ-মা কেউ নেই আমার। বেড়াতেই ভালােবাসি। অজ্ঞান হয়েছিলাম বললাে কে?' আমি ঘুমিন্তে ছিলাম। পথের মধ্যে যদি রাত্তির হয়, পথ ছাড়া আর ঘুমাবাে। কোথায় ? থাকি। যেখানে থাকার জায়গা পাই সেখানেই থেকে যাই। সুবিধে বুঝলে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। আমি অমনি ঘুরে শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু তুমি বুঝি সম্নেসী? মেয়েটি সবিস্ময়ে বললে। কৌমুদী হাস্লাে : সন্ন্যাসীর নাম কখনাে পূর্ণিমা হয় ? কেন হবে না ! আমার কাকার নাম তাে প্রাণবল্লভ, তিনি তাে কবে সন্নেসী হয়ে বেরিয়ে গেছেন। মেয়েটি সরল গ্রাম্য ভাষায় বলে গেলাে। কৌমুদী উত্তরে কী যেন ব’তে গিয়েছিল, কিন্তু পােদ্দারগৃহিণী বাটিটা তুলে ধরে বললেন : খেয়ে নাও! ঠাণ্ডা হয়ে গেলাে। দ্বিরুক্তি না করে নিঃশেষে দুধটুকু সে খেয়ে ফেললাে। কাছেই”। পোদ্দার ধানের ব্যবসায়ী। গােলা ভতি ধান . সে নৌকায় করে চালান্ দেয় এদিকে ওদিকে। তাছাড়া সে আধি-দারও বটে। ক্ষুদে জমিদারদের জমি তার তত্ত্বাবধানে থাকে। চাষ-আবাদ করে ও জন-মজুর খাটায় সে, ফসলের অর্ধেকটা জমির মালিকের বরাদ্দ, অর্ধেকটা ওর। শিবানীর সঙ্গে কৌমুদী নদী থেকে চান সেরে এলাে। শিবানীর বিবিধ প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে কৌমুদী প্রায় হয়রান হয়ে পড়েছে। প্রশ্নগুলাে এত সরল যে তার জবাব জটিল না হয়ে পারেনা। বিয়ে হয়নি তোমার? কৌমুদী উত্তরে বললাে, কেন বলাে তাে? অনেকদিন তাে বিয়ে হয়ে গেছে। তােমার ? আমাররা। কিন্তু তােমার হাতে লােহা, সিথেয় সিদুর কই ? তাও তত বটে! কৌমুদী সহাস্যে বললাে : তাতে মনে নেই। তােমার নেই কেন ? কথাটা বলেই কৌমুদী থতমত খেয়ে গেলাে : অজানিতে সে অশােভনীয় প্রশ্ন করে বলাে বুঝি ! মেয়েটি বললাে, খুইয়েছি। যে না আমার স্বামী তার আবার লােহা, তার আবার সিদুর !

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু তার মানে ? মাতাল ভাই এক নম্বরের। তার ওপর তার ওপর কী? কৌমুদী শিবানীর মুখের ওপর একটু যেন ঝুকলাে। তার ওপর বলে কিনা আমি নষ্ট মেয়ে। আমি বলি—না। আমার কথা পেত্যয়ই করে না। সত্যি? তারপর ? গণেশদার কাছে যুক্তি চাইলাম, সে বললে-- যানে। আমি আর যাইনে। স্বামী নিতে আসে না? . গণেশদা কে ? সে আছে, বল্‌বােনা! শিবানী রঙ্গ ও রসিকতা করে রহস্য গােপন করলাে। দু’পাশে গাছ, মাঝখানে কঁচা রাস্তা। নদী থেকে এই পথে আসাই সুবিধে। তারা দুই বন্ধুতে ধীরে ধীরে চলে আসছে। এদের দু'জনের পরিচয় যেন অনেক কালের। দু’জনের কাছে দু’জনের যেন এত- টুকু সংকোচ নেই। এত শিগগির তারা এমন ভাবে খাপ খেয়ে যাবে, ভাবিনি। তােমার কাছে হয়ত কিছুটা অস্বাভাবিক ঠেছে, কিন্তু লিখতে লিখতে আমি তা এতটুকু বুঝতে পারছিনে। সুধু শিবানীর সঙ্গে কেন, এই পরিবারের সঙ্গেও কৌমুদী মােলায়েম ভাবে খাপ খেয়ে গেছে। এ আশ্রয় তার যেন ছাড়ার ইচ্ছে নেই। কিন্তু সত্যি তাে তা নয়। তার প্রথম ইচ্ছে ছিলাে, গােলাপদির চক্রান্ত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া। তারপর বিজন ? বিজনের কাছে তার পেছন দরকার। কিন্তু আজই তাে আর রওনা হওয়া চলে না। বিজন আগে ৫৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু প্রস্তুত হােক্, কয়েকটা বছর সে এই ভাবে কাটিয়ে দিতে পারবে, এটুকু আশা তার আছে। এখন সে বিজনকে বিপন্ন করতে রাজি নয়। তা ছাড়া, বিজন যদি নিজে থেকেই আগ্রহ দেখায়, কৌমুদীই তা-তে বাধা দেবে। বিজনের ভবিষ্যৎ ব'লে যে জিনিষটা অন্ধকারে বাদুড়ের মতাে ঝুলছে, সে ভবিষ্যতের ওপর সকালের আলো পড়ুক—ততদিন কৌমুদী কোনাে রকমে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবে। অজ্ঞাতবাস করে কাটালে ক্ষতি কি? ইতিমধ্যে বিজন নিশ্চয় তাকে ভুলে যাবে না, অবশ্য কথার যদি তার দাম থাকে। আর এটুকু বিশ্বাস বিজনের ওপর তার আছে কিন্তু ক্ষতি হলে তার একদিক থেকে, বিজনের সংবাদ সে আদপেই . পাবে না। একদিন আচমকা কৌদী যদি “বিজনের সম্মুখে হাজির হতে পারে • একটানা কয়েকটা বছরকে এক ডুবসাঁতারে পেরিয়ে-তা হ'লে মন্দ কি ? মনে মনে এই রকম যুক্তি খাটিয়েও সে নিজেকে চাঙ্গা রাখতে পারলাে না। তিস্তানদী দেখে তার ব্রহ্মপুত্রের কথা অনবরতই মনে হয়। ইচ্ছে করে, এই নদীর কিনার ধরে ধরে সে হাঁটতে আরম্ভ করে। একদিন নিশ্চয় গৌহাটীর নাগাল পাবে। সবই তাে সে চেনে সেখানকার। গভীর রাত্রে গিয়ে সে চুপে চুপে বিজনের শােবার ঘরের জালায় টোকা দিয়ে ডাকবে : বিজনদা, জেগে আছে? জেগে, না, ঘুমিয়ে পুন্নিমেদি? এই, যে শিবানী, এসাে। জেগেই আছি, ভাই। কৌমুদী স'রে শুলল। • বললাে, ব’সস। এতক্ষণ ছিলে কোথায় ? তােমার যেন শরীর খারাপ, আমার তাে খারাপ নয় ; মহাভারত শুনছিলাম আর কুটনাে কুটছিলাম। শিবানী ব'সে পড়লাে। কে, পড়ছিলাে কে ? গণেশদা। । ( শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু । চলে গেলাে নাকি ? উহু। ভারি সুন্দর সুর করে পড়ে কিন্তু। সমস্কিত জানে কি না। বা রে, ও যে কবরেজি শেখে। শিবানী সগর্ব ঘােষণা করলো। তুমি পড়তে পারে না? পারি। কিন্তু পড়িনা, লজ্জা করে। অমন সুর কিছুতে বেরােয়না গলা দিয়ে। কৌমুদী একটু হাসলাে : ভারি মজা তাে ! সত্যি! কৌমুদীর গলা দিয়েও সুর কিছুতে বেরােয়না—সনাতনের পালিত বটে, তবু নয়। বিজন তাকে কতদিন গান শিখতে বলেছে। কিন্তু বিজনের অনুরােধ রাখতে না পারায় তার মনে দুঃখ আছে বটে, কিন্তু সে দুঃখকে মর্যাদা দেওয়ার মতাে সঙ্গতি এখন তার নেই। এখন সে নতুন উপদ্রব নিয়ে ব্যস্ত : বিজনের কাছ থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, কী করে এখন সে বিজনের নৈকট্য আয়ত্ত করবে—এই তার মহা সমস্যার বিষয় এখন। আজ কোথায় বিজন, কোথায় সে। 'এতটুকু ভাববার সময় সে পেলােনা, গােলাপদি তাকে তৈরী হয়ে নেবার ফুরসৎ দিলােনা পর্যন্ত, আচমকা নিয়ে এলাে মহিম বাগচীকে। আশ্চর্য, ভাবতেও এখন কৌমুদীর সমস্ত শরীরে কাটা দেয়। কিন্তু সে সেই দারুণ অবস্থাটা একা একাই সামলে আসতে পারলাে, তার কাছে এখন যেন বিশ্বাসযােগ্যই মনে হচ্ছে না তা। একেই হয়ত লােকে মনের জোর বলে। কি ভাবছে ভাই পুন্নিমেদি! শিবানী কৌমুদীর বুকের ওপর হাত রাখলাে। আবার সেই ভাই সম্বােধন। কৌমুদী একটু • হাসলাে, বললাে, ভাবছি তােমার গণেশদার কথা। বেশ সুন্দর সুর করে মহাভারত পড়ে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
শুনেছ তুমি? সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করলাে শিবানী।
হু।
কবে শুনলে ?
এই যে তুমি বলে ! কৌমুদী একটু রসিকতার সুরে বললাে।
পুন্নিমেদিটা আচ্ছা ফাজিল তাে! শিবানী কৌমুদীকে একটা চিমটি
কাটলাে।
পরিহাসপ্রিয়তা কৌমুদীর বেড়ে উঠলাে, বললাে, কবরেজি পড়ে
তােমার গণেশ, তাই না শিবানী ? টিকি আছে?
ধেৎ! শিবানী কৌমুদীর গালেই বুঝি একটা চাপড় দিলাে।
আচ্ছা শিবানী, গণেশদা তােমাকে বুঝি খুব ভালবাসে?
হু।
তুমি বাসাে?
-০.৭৫"= গ
কী জানি !
আচ্ছা, তােমা গণেশদা তোমাকে গল্প বলে ?
উহু!
আদর করে ? কৌমুদী অনেকটা এগিয়ে এলো।
“ইস, আস্পদ্দা! শিবানী হঠাৎ ফোস করে উঠলাে : আদর মানে ?
আদর করলেই হ’লল? দি তাে গায়ে হাত, দেবােনা ঠাস করে
গালে এক চড় বসিয়ে !
কৌমুদী একটু থেমে বলল, রাগলে কেন শিবানী?
শিবানী ধীর গলায় বলল, রাগ আবার কিসের? ভালােবাসলেই
সােহাগ করতে হবে ? অমন সােহগে কাজ নেই আমার!
ভালােবাসলে সোহাগ করবে না?
শিবানী এবার মর্মরমূর্তির মতন স্তব্ধভাব ধারণ করলাে। কৌমুদীর

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু দিকে ফিরেও তাকালাে না। কুলুঙ্গিতে প্রদীপটা দপ করে জলে উঠলাে। কৌমুদী শুয়ে শুয়েই ব্যস্ত হয়ে বলল, এ হেঃ, বুকটা জ্বলে উঠেছে বুঝি, দাওনা ভাই নিবিয়ে। শিবানী ত্রস্ত পায়ে উঠে গিয়ে হাত ঝাপটা দিয়ে বাতিটা নিবিয়ে দিলাে। ঘরের মধ্যে এলাে কালাে পাথরের মতাে ঠাণ্ডা অন্ধকার। শিবানীর জীবনের গম্ভীর পয়ারের মধ্যে হঠাৎ খানিকটা লঘুত্রিপদী চালান্ করে দিলাে যেন কৌমুদী। কৌমুদী জেনেশুনে এ-কাজ করেনি অবশ্য। আ’ল দিয়ে যে শক্তিশালী স্রোতকে বাঁধা হয়েছে, এ যেন অযথা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে তার মধ্যে ঘা করা, সেই বাধকে দুর্বল করা। দেওয়ালে রাধাকৃষ্ণের ছবি, বাইরের হারিকেনের আলােতে ছবির নিচেটা কেবল দেখা যাচ্ছে : অধ শায়িত অবস্থায় উধ্ব দৃষ্টি রাধিকা কার যেন চোখের দিকে তাকিয়ে আছে : অন্ধকারের মধ্যে কৃষ্ণ ফেরার। এই মাত্র গণেশও মহাভারত বগলদাবা করে অন্ধকার রাস্তায় হাততালি দিয়ে কাল্পনিক সাপ তাড়াতে তাড়াতে কবরেজবাড়ি চলে গেলাে। অভিমন্যুকে সপ্তরথী দিয়ে ঘেরাও করিয়ে . তবে গণেশের ছুটি হলো আজ। কেন, সে কি পাণ্ডবদের হৃতরাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে তারপর কবরেজবাড়ি যেতে পারতাে না? ও-বাড়িতে এত শিগগির যাবার এত কিসের টান ? কেবল অমৃতারিষ্ট আর চ্যবনপ্রাশ ! কেবল খল আর গাছের মূল। শিবানী। উ। গণেশদা চ'লে গেলাে বুঝি ? শিবানী উত্তর দিলাে না। একটু থেমে বললাে, আবার কাল আসবে। কৌমুদী ব’ললল, চমৎকার ছেলে কিন্তু গণেশদা। গলায় কী সুর। শুনতে হবে একদিন।

•।
শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
শুনেই এত সুখ্যাতি ! শিবানী একটু খোঁচা দিয়ে বললাে : অত
ঠাট্টা ভাল লাগেনা ভাই।
কৌমুদী বিব্রত হয়ে পড়লাে, বললো, মুস্কিল! ঠাট্টা কোথায় দেখলে ?
আমি প্রশংসা করলেই বুঝি ঠাট্টার মতো শােনায় ? বেশ, আর না-হয়
ওর কথা নাই-ই বললাম।
বলতে আবার মানা করেছে কে, শুনি।
তবে বলবে তাে? শােনাে, তুমি এক কাজ করে তােমার বাবাকে
বলে প্রকাণ্ড এক মাঠ নাও। আর অনেক টাকা চেয়ে নাও।
তারপর ?
গণেশদাকে ডাকো। ডেকে, মস্ত একটা কবরেজি ওষুধের কারখানা
বানাও। তােমরা দু’টিতে মিলে গ্রামের সব গরিব রুগীদের চিকিৎসা
লাগাও। ও হবে কবরেজ, তুমি হবে বাই।
এয়ারকি মারছাে বুঝি ?
কৌমুদী একটু না হেসে পারলােনা। বললো, ফাজলামাের মত
শােনালেও এ ফাজলামাে নয়। তিস্তা থেকে আরম্ভ করে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত
এতটা জায়গার ভার যদি তােমরা নাও, তবে আর ভাবনা কী।
থাক্‌ ভাবনা। দ্যাখাে পুন্নিমেদি, তােমাকে একটা কথা বলে রাখি :
আমাকে আর তাকে জড়িয়ে কোনাে কথাই বলােনা । জাননা তাে, আমার
বিয়ে হয়েছে, আমার স্বামী বেঁচে আছে। হতে পারে সে মদ খায়, সে
'মারে, সে অত্যাচার করে—তবু সে তো আমায় বিয়ে করেছে, আমি তো
তার বৌ!.' গণেশদাকে নিয়ে এভাবে যদি তােমরাই মস্করা করাে,
স্বামীর মনেই-বা বিষ কেন না ঢুকবে ?
তােমরাই যদি অবুঝ হও,
স্বামীই বা তবে বুঝৰে কেন ?
পােদ্দারগিন্নী ঘরে ঢুকলেন : কি কথা হচ্ছে তােদের?

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদী উঠে বসলাে, বললাে, কিছু না, গল্প । পােদ্দারগৃহিণীর নাকে প্রকাণ্ড একটি গােলাকার নথ, শরু চেন দিয়ে, কানের সঙ্গে টানা দেওয়া। গা ময় গহনা। নথটা কিন্তু পােষাকী নয়, আটপৌরে। সর্বদার জন্যে নাকের সঙ্গে অতবড় একটা ঝামেলা ঝুলিয়ে চলাফেরা করতে দেখে অস্বস্তিতে কৌমুদীর দম আটকে আসে। তাছাড়া স্বামীপরিত্যক্তা বিধবা-বেশধারী স্বগর্ভজাত মেয়ের সামনে সােনায় সালঙ্কারা হয়ে তাকে ঘুরে বেড়াতে দেখে কৌমুদীর অবহাওয়াটা ভালাে লাগেনা। কিন্তু এ যে অহংকারের আতিশয্য নয়, এ সেনেহাৎ গ্রাম্য সরলতা—তার নমুনা মাঝে মাঝে সে পায় বটে, তবু এ সরলতা তার পছন্দসই লাগেনা। পােদ্দারগিন্নী পানের বাটার কাছে বলেন। চাকরটা ককেতে ফু দিতে দিতে হারিকেন এগিয়ে দিয়ে গেল। দেওয়ালেই চোখ আছে কৌমুদীর। অন্ধকারে-ফেরার কৃষ্ণ হারিকেনের আলােতে ধরা পড়ে গেলাে। দেখা গেল, অশায়িত রাধিকার চোখে চোখে তাকিয়ে সে হাসছে। হাসিটা ভারি দুষ্ট। কৌমুদী পলকের জন্যে বিজনের কথা ভেবে নিলাে। মুহূর্তের মধ্যে একটা নিশ্বাস ফেললাে। “ পােদ্দারগৃহিণীর হাতের ধাক্কা লেগে হারিকেন একটু সরে যেতেই ছবির কাছে প্রতি- ফলিত হয়ে আলাে ছিটকে বেরিয়ে আচে মনে হলাে, সেই চকচকে আবােতে রাধিকা হ’লাে ফেরার। মনে হ’লল, কৃষ্ণ অযথাই হাসছে একা! এই সামান্য দু’টি অক্ষরের একটি কথা তার বুকের ভিতর দারুণ জোরে ঘণ্টার বাড়ি দিয়ে তাকে সােনামুখী গ্রামের ধান্যব্যবসায়ী শ্ৰীযুক্ত অমুকচন্দ্র পােদ্দারের বিশাল এলাকার একটি প্রান্তের এই করগেটের চৌচালা ঘর থেকে কোন এক সুদূর করদরাজ্যের সুন্দর শহরতলীর আর একটি করগেটের চৌচালা ঘরে চালান্ করে দিলাে। যে-বাড়ীর সাম্নে খানিকটা শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু নগ্ন মাঠ, আর রাস্তা থেকে যে মাঠটিতে তেরছাভাবে পায়েহাটা পথের শাদা দাগ পড়েছে। কৌমুদী চুপচাপ শুয়ে। তার কানের মধ্যে সনাতনের খক্‌ খক কাশি ও বিজনের তানপুরা-হাতে গম্ভীর মুরালাপ যুগপৎ ধ্বনিত হচ্ছে। পৌদ্দারগৃহিণী বললেন, গণেশ আজ বেশ পড়লাে বটে! কাল পাণ্ডবদের রাজ্য-ফিরে-পাওয়া শােনাবে। শিবানী নিশ্বাস ফেলতে গিয়ে হঠাৎ শব্দ করে ফেললাে। কৌমুদী ব’ললল, বেশ ছেলে, তাই না? তা বতে! শিবানীর বাপ তাে গণেশ ব’লতে অজ্ঞান। বলে, এমন ছেলে জন্মেও দ্যাখেনি। যেমন জ্ঞান তেমনি বুদ্ধি, আর তেমনি নাকি চারিত্তির। এ গাঁয়ে আমাদের ওই কুমুদ-কবরেজের ভাত নাকি গণশাটাই মারবে। ছােড়াটার অবস্থা সুবিধের নয়, তাতে কি-পােদ্দারের টাকা আছে। মস্ত এক কবরেজখানা হ'লাে বলে গাঁয়ে। কিন্তু গণ শাটা যে আহাম্মক, মাগ না খেটে মরতে ভারি আয়েশ ওর। টাকে কড়ি গুজে রুগীর নাড়ি ধরবে—তা না। যে বলে আয়রে, তার সাথে যাইরে। • রােগের বিচার নেই, বসন্ত হােক কলেরা হােক—ডাক পড়তেই ছুট! রাত জেগে মরে—বিনিপয়সায়। একটানা অখ্যাতি-সুখ্যাতি করে পােদ্দারগৃহিণী পানের পিক ফেলতে উঠে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, যাই, এসেছে । পােন্দারমশাই অন্দরে ঢুকেছেন। নধর চেহারা বটে, জৌলুষ নেই : মাটি মাটি রং গায়ের। নধর বটে, তবে বড় বেঢপ চেহারা! ভুড়ির থেকে বুক শরু, গােলগাল মুখের তুলনায় চোখ দু’টি ঘােট ঘােট। তিস্তামুখঘাট, নারাণগঞ্জ, চাঁদপুর, আর ব্রহ্মপুত্রের উজানে গৌহাটি ও ধুবড়া, এই কয় জায়গায় কয়েকখানা ধানবােঝাই নৌকা পাঠিয়ে তাঁর মন একটু মতী পঞ্চমী সমীপেষু স্কা, আর টাক একটু ভারি, তাই মেজাজটাও বেশ সরিফ। বাড়ী ঢুকেই বললেন, গণেশ কই ? গৃহিণী বললেন, চ'লে গেছে ! এত শিগগির। শিবানী কই ? পূর্ণিমা ঘুমিয়েছে বুঝি ? ব’লতে বলতে পােদ্দার শােবার ঘরে ঢুকলেন, প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে গৃহিণী তার অনুগামিনী হ'লেন ! খাচার ময়নাটা কলরবে ঘুম থেকে জেগে অনুচ্চস্বরে দু’বার শব্দ করেই ক্ষান্ত হলাে। দিনের পর দিন কেটে গেলাে। গণেশের যাতায়াত নিয়মিত চলেছে। তার আদর ও প্রভাব এ-বাড়ীতে বেড়ে চলেছে দিন দিন। পােদ্দারমশাই গণেশের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করে ফেলেছেন, এবারে পরীক্ষায় পাশ করলেই তার ডিপেন্সরী খােলা হবে। খানিকটা জায়গাও সেজন্যে ঠিক হয়ে গেলাে। ঠিক নদীর ধারটায়। কয়েকটি হামনদিস্তা ও ওষুধের বােতল ইত্যাদি শহর থেকে আনবার ফরমাস পর্যন্ত হয়ে গেছে। গণেশ এখন যে বাড়ীতে থাকে ও আয়ুর্বেদ শেখে সে-বাড়ীও নদীর কিনারে। গণেশটা হয় ত কবি, সে চুপচাপ-নদী দ্যাখে আর ঢেউ গােণে। কবরেজ- বাড়ির বারান্দায় বসে সে সময় নষ্ট করে থাকে মাঝে মাঝে, সময় নষ্ট করবারও তার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে অবশ্য। অদূরেই স্নানের ঘাট, সেখানে বােজ শিবানী ও কৌমুদী স্নানে আসে। ফেরার মুখে দু'চারটে বাক্য বিনিময় হয়ে থাকে, তবে সে তেমন মারাত্মক কিছু নয়। কয়েকদিন থেকেই গণেশটা বড় গম্ভীর। মহাভারত পড়তে সে আজ কাল দেরী করে যাচ্ছে ও শিগগির করে ফিরে আসছে। এর কৈফিয়ৎ অবশ্য একটা আছে। তার পরীক্ষা হাতের কাছে এসে গেছে। কিন্তু শিবানী এ কৈফিয়ৎ শুনতে রাজি নয়। কৌমুদী শিবানীকে কারণটি জানার জন্যে বড় ব্যস্ত করে তুলেছে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
শিবানী ময়নাকে বলে, জানিস্ কিছু?
উত্তরে ময়না বলে, জানিস্ কিছু।
বিরক্ত হয়ে খাচায় একটা থাবা দিয়ে শিবানী বলে, দেখ !
কৌমুদী অভিনয়টা দেখে ফেলে, শিবানী লজ্জা পায়।
কয়েকদিন থেকে শিবানীও বড় গম্ভীর। আকাশে নতুন বর্ষা এসেছে,
নদীর জল হয়েছে ঘােলাটে। কৌমুদীটা বড় বিপদে পড়লাে। একটা সঙ্গী
সে পেয়েছিলাে, তার সঙ্গে কথা বলেও সময় কাটাতে, সেও কথা কম বলতে
আরম্ভ করেছে। এতে কৌমুদীর লাভ হলাে এই-যে বিজনটা তাকে পেয়ে
বসলাে। এত বিশ্রী লাগে বিজনের কথা ভাবতে, তবু রাতদিন তার কথাই
তাকে ভাবতে হচ্ছে আজকাল। মনের অবস্থা মাঝে মাঝে এমন চঞ্চল হয়-যে
তার ইচ্ছে করে, সে এখান থেকে একরাত্রে চুপচাপ রওনা হয়ে বিজনের কাছে
চলে চায় !
সেদিন শিবানী এসে বললাে, এবার চল্লেম পুন্নিমেদি।
কোথায় ?
শিবানী নিরুত্তর
কৌমুদীও কিছুক্ষণ চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকালো। দেখলাে,
শিবানী মেঝের ওপর ফঁাকা দৃষ্টি দিয়ে বসে আছে। ব’ললাে, কোথায়
চললে ?
শ্বশুরবাড়ী।
নিতে এসেছে বুঝি ?
।
শিবানী কৌমুদীর দিকে তাকিয়ে বললো, গণেশদা যেতে বলছে।
হঠাৎ!

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু জানিনে। আমার নাকি যাওয়া উচিত। গণেশদা হয়ত ভালাে কথাই বলেছে, আমার যাওয়াই উচিত। যে অবুঝ তাকে ছেড়ে চলে এসে তাকে বােঝাবাে কী করে? আমি যাব। সত্যি ভাই, আমি যাব। গণেশাদা কি বললাে ? কি আর বলবে ? ভাল কথাই বললাে। এতদিন তাকে ছেড়ে থেকে তাকে যথেষ্ট শাস্তি দেওয়া হয়েছে আমার, এবার যাওয়া দরকার। গণেশদার - পরামর্শমত চললে আমার ভালই হবে পুন্নিমেদি। জানাে তাে, সে আমাকে ভালবাসে। কিসে আমার ভাল হবে সে কি জানেনা? কিন্তু কিন্তু কি ? গণেশদার হয়ত খুব কষ্ট হবে এখানে একা থাকতে। ও বড় খেয়ালী, শরীরের ওপর একটু যত্ন নেয় না, সে জন্যে কম ধমক খায় নাকি আমার কাছে ? খুব ধমকাও বুঝি ? শিবানী থেমে বললাে, আমিও ভেবে দেখলাম যেতেই হবে, যদিও মন ঠিক সরছে না। বড় ভয় হচ্ছে, যদি খুব মারে! কৌমুদী অপলক শিবানীর মুখের দিকে তাকালাে, কথা বললাে না। মনে একটি চিন্তা ঢুকেছে। গণেশের কথা অত সে ভাবছেনা, সে ভাবছে নিজের কথা। শিবানীটা একান্তই যদি চলে যায় তাহলে তারই বা এখানে থাকার সার্থকতা কী? সেও তাহলে একদিক বলে চলে যাক। তারও যাবার জায়গার অভাব নেই। এক বছরের ওপর এই সােম্নমুখী গ্রামের সঙ্গে তার পরিচয়, এক মুহূর্তে সে এই পরিচয়ের কথা ভুলে যেতে পারবে। সনাতনের সঙ্গে থেকে থেকে তার মধ্যেও যাযাবর বৃত্তির বীজাণু সংক্রামিত হয়েছে, সেও স্থায়ীস্থিতি পছন্দ করেনা। আজকের আস্তানা কালকে ভেঙে ভেঙে তার মন মজবুত হয়েই আছে। যে-রাত্রে শিবনী রওনা হবে, : শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদীও সেই রাত্রেই যাত্রা করবে। নিশানা হত থাকবে গৌহাট, কিন্তু স্রোতের টানে কতদূর যাবে তা অবশ্য সে জানেনা। শিবানী সত্যি সত্যি তাহলে শ্বশুরবাড়ী চললাে। গণেশ শিবানীকে চুপ করে নাকি বলে গেছে যে,কারুর ওপর মমতা যখন খুব বেড়ে ওঠে, তখন মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই : বিশ্বাস ভঙ্গ হওয়ার আগেই মমতাভ করা দরকার শিবানীকে শ্বশুরবাড়ী যেতে বলার এও নাকি একটা কারণ। কথাটার মানে ঠিক-যে কী, শিবানী তা বুঝতে না পেরে কৌমুদীর শরণাপন্ন হলো। কিন্তু এর পরিষ্কার কোনাে ব্যাখ্যা করতে না পারায় শিবানীর কাছে কৌমুদী লজ্জা প্রকাশ করলে কেবল ! দু’জনে গল্প করতে করতে স্নান করতে চললো। তিস্তা আজ জলে থইথই ঢেউ এসে পাড়ে আছাড় খাচ্ছে। ঘাটে লােক বেশি নয় আজ। হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে দাড়িয়েই তারা গল্প করে চলেছে। কিছুদূরে একটি আধবুড়ো লোেক একখণ্ড পাথরের ওপর কাপড়ে সাবান দিচ্ছে। একটি বুড়ি গলাজলে দাঁড়িয়ে সূর্যপ্রণাম করছে। শিবানীরাও গলাজলে নেমে এলো। পিছন ফিরে কবরেজবাড়ির বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখলাে, বারান্দা জনহীন। গণেশ তখন সাংখ্যতীর্থ হবার চেষ্টায় মনােনিবেশ করে পড়ছে ভেতরের ঘরে। এর দু’জন নদীতে সাঁতারের চেষ্টা করছে তখন। শিবানী বললাে, গণেশদা দারুণ সারাতে পারে । এর বেশি বলার আর সুযােগ পেলােনা, কৌমুদীও শােনার ফুর পেলােনা। হঠাৎ তারা জলের টান অনুভব করলাে। তার পর আচমকা কী-যেন হয়ে গেলাে। যে-লােকটি সাবান কাচছিলাে, হঠাং সে সােজা হয়ে দাড়িয়ে উঠলে। ও চীৎকার করলে যে-বুন্ডিটা সূর্যপ্রণাম করছিলো তার ধ্যান ভাঙলল, তবে তার মুখ দিয়ে কথা বের হলােনা।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কবরেজবাড়ির বারান্দায় এমন সময় গণেশ গা: মােড়ামুড়ি দিয়ে পড়ার মাঝখানের বিরতিটা ভরাট করতে এসেছে। হঠাৎ সে স্তব্ধ হয়ে নদীর দিকে তাকিয়েই এক ছুট দিয়ে এসে জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাে। মেয়ে দুটো পাকে পড়েছে। পাক তাদের ঘুরাতে ঘুরাতে টেনে নিয়ে চলেছে, এইবার বুঝি তলিয়ে দেবে! গণেশ অশেষ শক্তি ধারণ করে। সাঁতারের কায়দাও জানে সে। দূরেকাছের মাঝিরা নৌকো নিয়ে এগিয়ে এসেছে। সাঁতারু গণেশ মেয়ে দু’টিকে উদ্ধার করে মাঝির হাতে তুলে দিয়েই মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে গেলাে ! অন্যকে সে ত্রাণ কয়লাে কিন্তু নিজেকে পরিত্রাণ করতে পারলাে না।—এ ঠিক যীশুখ্রস্টকে গাল-পাড়ার মত শােনালাে, তাই না, পঞ্চমি? গণেশ কি করবে বলাে! আবর্তের মুখের গ্রাস সে টেনে নিয়েছে, আবর্তের প্রতিহিংসা তাকে হজম করতেই তারা দু’জন বিস্তর জল খেয়ে আধমরা হয়ে পড়েছিলাে। মাঝিরা যখন নৌকো কিনারে লাগালো তখন গ্রামের অনেক লােক ঘাটে জুটে গেছে। ভবিষ্যতের বিখ্যাত কবিরাজ গণেশ, সান্তারার এই আকস্মিক শােচনীয় পরিণতির জন্যে কেউ দুঃখ ও বিস্ময় প্রকাশ করতে বাকি রাখলােনা। মাঝিরা নানামুনির পরামর্শমত জাল নিয়ে নানাদিকে মৃতদেহের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাে। পােন্দারমশাই, এমনকি পােদ্দারগৃহিণীও, ঘাটে এসে উপস্থিত। এদের জীবন রক্ষা পাওয়ার জন্যে কোনাে আনন্দোচ্ছাসই হতে, পেলােনা, শােকোচ্ছ্বাসেই সব চাপা পড়ে গেলাে। সােনামুখী গ্রামে এখন দুঃখের পালা চলেছে। এলাে ‘পঞ্চমি, আমরা এখান থেকে এখন পালাই। আদর্শ বন্ধু হতে আমরা চাইনে। দুঃখের , সময় সােনামুখীর মুখে মুখ দিয়ে পড়ে না থাকলেও সােনমুখীর ওপর অবিচার করা হবেনা আমাদের। দুঃখটা বড় পাজি জিনিষ : মানুষের আসল রূপ ক শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু দৈখিয়ে দেয়। পাছে আমাদের স্বরূপ বেরিয়ে পড়ে, তাই আমরা সােনামুখী গ্রামের নাম গন্ধ এখন করবােনা। ইচ্ছে করে, সশরীরে তােমার টাঙাইলে যাই : সেই বাবলা-বন আর বসন্তবহুরীর চমকে চমকে ডাক পাড়, সেই শাদা সি থির মতাে পায়েটা রাস্তাটি ও সেই সর্বশ্রেষ্ঠ তুমি ! সুধু ইচ্ছেই করে, যাওয়া আর হয়না। দিনের পর দিন কেটে যায় : কৌমুদীর ইচ্ছেও পূর্ণ হয়না। সােনামুখী গ্রাম থেকে শিবানী যেদিন যাত্রা করলাে, সেইদিন সন্ধ্যের পর থেকে কৌমুদী হলাে নিখোজ। আশপাশের গ্রামে পােন্দারমশাই লণ্ঠনহাতে লােক পাঠালেন, খবর পেলেন না। ' পােদ্দারগৃহিণীর মনেও নানারকমের কষ্ট, কৌমুদীর অন্তর্ধান কষ্টের আগুনে খানিকটা কাষ্ঠ যােগান দিল মাত্র। কিছুদিন খােজ "বর চললাে তীব্রভাবে, তারপর ধীরে ধীরে তেজটা কমে এলো। ইতিমধ্যে শিবানীর নিজ হাতে গােটা-গােটা বাঁকা-বাঁকা ও অসমান অক্ষরের একটি চিঠি এসেছে কৌমুদীর নামে, সেটা দেয়ালের বাতার গায়ে গোজাই আছে, রােদুর লেগে কাগজটার রং গেছে বলে। আশ্চর্য, চিঠির মধ্যে শিবানী সােনামুখী গ্রামের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর জানতে চেয়েছে, কিন্তু গণেশের নাম একেবারের জন্যেও উল্লেখ করেনি। গণেশকে এরি মধ্যে সে ভুলে গেলে নাকি ? পােদ্দার কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও গণেশকে ভুলতে পারলেন না। • গণেশের মধ্যে তিনি বিশেষ গুণ এমন কী-যে পেয়েছিলেন জানিনে। তাছাড়া, এই দুর্ঘটনার পর মৃত গণেশের ওপর তার টান আরাে বেড়ে গেছে। গণেশের গুণ-গ্রীন করতে তিনি পঞ্চমুখ । তার গভীর দুঃখ আরাে প্রকাশ • পেতত, যখন তিনি নিশ্বাস ফেলে জানাতে ন-যে তার মৃতদেহটা খুঁজে পেলে তিনি কত সমাােেহ করে তার সৎকার করতেন। আর, তাঁর সেই বিরাট প্ল্যান্—সেই আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠান! পােদ্দার এই কথা বলতে গিয়ে শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু • একেবারে গুম হয়ে বসতেন। আঘাতের পর সুধু আঘাত! শিবানীর শ্বশুরবাড়িতে লাঞ্ছনা, গণেশের আত্মােৎসর্গ, অবশেষে কৌমুদীর অতর্কিত অন্তধন! স্নেহ আর মমতা, এই দুটোর মতো মারাত্মক জিনিষ পৃথিবীতে আর নেই—পপাদ্দার বলেন। গভীর রাত্রে পােদ্দার নাকি গণেশকে ঘুমের ঘােরে ডেকে ওঠেন, পপাদ্দারগৃহিণী পাড়ার লােককে সকালে সুখবরটি দেন। পােদ্দারমশাই কিন্তু স্বীকার করেন না। অনেকদিন কেটে গেছে, পঞ্চমি ! সােনামুখী গ্রামে সহস্র সূর্যোদয় হয়েছে। এখনাে কবরেজবাড়ির বারান্দা আগের মতােই নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে, এখনাে অজস্র স্নানার্থী তিস্তানদীতে গলাজলে নেমে ডুব দেয়, কিন্তু কবরেজবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেউ উৎসুক দুটো চোখ নদীর জলের দিকে চালনা করেনা ; কোনাে আনার্থীও সতৃষ্ণ চোখে বারান্দায় দিকে তাকিয়ে দ্যাখেনা। আজ যদি তুমি তিস্তানদী দিয়ে নােকা করে সোনামুখী গ্রাম ঘেসে ভ্রমণে বের হও, তাহলে তার কিনারে একটা শাদা ছােট্টমঠ দেখতে পাবে। মঠটা পােদ্দারমশাইএর কীতি ও গণেশের গৌরব। মঠের ঠিক মাঝখানে আবক্ষ গণেশের মূর্তি। মঠের গায়ে বড় বড় হরফে লেখা আছে : গণেশচন্দ্র সান্তারা। জন্ম ভাদ্র ১৩১৮, মৃত্যু আষাঢ় ১৩৪৩ | এই মহাপ্রাণ যুবক দুইজন বিপন্না রমণীকে নদী হইতে উদ্ধার করিতে গিয়া নিজের জীবন বিসর্জন দিয়াছে । তাহার গুণমুগ্ধ, বন্ধু শ্রীবিপিনচন্দ্র পােদ্দার কর্তৃক এই স্মৃতিসৌধ স্থাপিত হইল। শাদা পাথরের ভেতর থেকে গণেশের শাদা দুইটি চোখ একদৃষ্টে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। শিবানী শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে আসে। নদীতে আসতে নে ভােলেনা। জলে নামার আগে অনেকক্ষণ দাড়িয়ে দাড়িয়ে সে গণেশকে দ্যাখে- ট . শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু অবিকল গণেশই যেন! সেই হাসি-হাসি মুখ, ঠোটের সেই নিখুং ভাঁজ, সবই ধরা পড়েছে। তারপর সে চান সেরে উঠে আসে। হাতের ঘটি থেকে জল ঢালে গণেশের বুকের কাছটায় ! চুপচাপ দাড়িয়ে থাকতে খাতে অস্ফুট গলায় বলে : গণেশদা, তুমি তাে যেতে বললে ! কিন্তু ওরা আমাকে বড় মারে। শিবানীর গলা কেঁপে যায়। কিন্তু গণেশ এখন পাথর, এ-কথার সে কোনাে জবাব দেয় না। শিবানী আস্তে আস্তে চলে যায়। কৌমুদীর কথা নিশ্চয় এখন, তার মনে পড়ছে। এখন সঙ্গে কৌমুদী থাকলে সে কিছুটা সান্ত্বনা পেতে। কৌমুদী বােধ’য় কত সুখে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু কৌমুদীর জীবনের ওপর দিয়ে ইতিমধ্যে কতবড় ঝড় বয়ে গেছে, শিবানী জানে না। আমরাও তা জানিনে, পঞ্চমি ! আমরা তার খবর অনেকক্ষণ রাখিনি। বহুদিন বাদে কৌমুদীকে আমরা আবিষ্কার করলাম এক হাসপাতালে মাথায় শাদা পট্টি বাঁধা, পরণে এপ্রন্। রুগী বুকে থার্মোমিটার দিয়ে সে ঘড়ির সেকেণ্ড গুছে! সে-কৌমুদীর ও এ-কৌমুদীর মধ্যে পার্থক্য বিস্তর । আজ তিন বছর আগে যে ট্রেনে সে সােনামুখী গ্রাম থেকে পালায়, সেই ঐনই এক বিদেশী নার্সের সঙ্গে তার ভাব হয়। কৌমুদীর সঙ্গে আলাপ-আলােচনার পর তিনি বুঝতে পারলেন, এই ধরণের মেয়েই এ-কাজের যােগ্য। তাই তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে টানা চলে এলেন কলকাতায়। কলকাতায় পৌছে কৌমুদী পালাবার চেষ্টা করেছিলাে, কারণ বিজনের খবর না নিয়েই সে আটক হতে রাজি নয়। যদিও বােগিসেবাব্রত দস্তুরমত তার পছন্দসই। বছরখানেক হাসপাতালে কাজ শেখার পর সে অসুখের ভান করলাে ও চেঞ্জও যেতে চাইলাে। ছুটি . ঘুরে বেড়ান। শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু মঞ্জুর হলে সে সটান চলে এলাে গৌহাটি। বুকে সাহস সঞ্চয় করে সে বিজনদের বাড়ি পর্যন্ত পৌছে মাথায় হাত দিলাে। বাড়িটা তালাবন্ধ । কৌমুদী গৌহাটিতে চেঞ্জে এসেছে, তারাও চেঞ্জে গেছে চেরাপুঞ্জিতে। আর এদের ছেলে বিজনকুমার এখন আছে রুড়কিতে। কৌমুদী গৌহাটি থেকেই বিজনের কাছে সংক্ষিপ্ত এক চিঠি দিলো, তার জবাবের প্রতীক্ষায় বসে রইলাে গৌহাটির হােটেলে। সেখানে তার সাক্ষাৎ হলো এক শিকারীর সঙ্গে। ভদ্রলােক কঁাধে ক্যামেরা আর বন্দুক ঝুলিয়ে চল্লিশের ওপর বয়েস হবে, কিন্তু চাঞ্চল্য ‘চোদ্দের। কৌমুদীই এখন হলাে তার বিগ-গেম। রুড়কি থেকে বিজন লম্বা-এক চিঠি পাঠালাে । এতদিন বাদে-বছর আড়াই নিশ্চয়ি—এমন অপ্রত্যাশিত চিঠিতে সে আশ্চর্য হয়ে গেছে।' এতটা দিন এমন আত্মগােপন করে থাকার নাকি কোনাে কারণই বিজন ভেবে পাচ্ছে না। গৌহাটিতে এসেও কৌমুদীকে হােটেলের আতিথ্য নিতে হ’লল, এর চেয়ে দুঃখের ও বিস্ময়ের কথা আর নাকি কিছু হতে পারে না। বিজন নাকি কৌমুদীর খোঁজ করে বিস্তর—কিন্তু কোনাে খবর না পেয়ে সে প্রায় জেনেই রেখেছিল-যে কৌমুদী আর নেই। কৌমুদীর মত ভাবপ্রবণ মেয়ে তাে বিজন আর দেখেনি! যাই হােক, সে আচে। আজ কাল পরশু—এই তিনটে দিন বাদ দিয়ে। এই তিন দিন নড়ার উপায় নেই। কেন? তা মুখেই বলবে সে। আর শেষে একটা অনুরােধ বিজন করেছে, ইতিমধ্যে তার বাবা-মা যদি চেরাপুঞ্জি থেকে ফিরে থাকেন তাহলে কৌমুদী-যেন হােটেল ত্যাগ করে বাসায় চলে যায়। এতে সংকোচের কিছু নেই, ভয়েরও কিছু নেই নাকি ! বিজন নাকি কৌমুদী সম্বন্ধে সব কথাই খুলে বলেছে এবং কৌমুদীর ওপর এখন তাদের সহানুভূতি জন্মেছে। চিঠি পড়া শেষ করে কৌমুদী বারান্দায় বেরিয়ে এলাে। ।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
শিকারী ভদ্রলােকটি বললেন, with your permission, may I take
a snap ?
কৌমুদী বললাে, তার মানে ?
মানে ? শিকারী ভদ্রলােকটি বললেন, আপনার অনুমতি চাচ্ছি,
আপনার একটা ছবি তুলবে।
কৌমুদী বললাে, ইংরিজির মানে জানতে চাইনে, অনুরােধের
মানে কি ?
ভদ্রলােকটি হাে-হাে করে হেসে উঠলেন : অনুরােধের আবার মানে থাকে
নাকি ?
কৌমুদী ঘরে চলে গেলাে।
কতদিন পরে বিজনের সঙ্গে এবার তার দেখা হবে। কৌমুদী চিঠিটা
আর-একবার খুললাে। বিজনের হাতের লেখাটা কিন্তু কিছুতেই ভালাে
হ’লােনা। অথচ, লেখার ধরণটা ভারি মিষ্টি : ইঞ্জিনিয়ারের ভাষা একেবারে
সাহিত্যিকের মতাে !
শিকারী ভদ্রলােকটি দরজার সামনে এসে দাড়ালেন আবার। বলেন,
With your permission, may I come in ?
তার মানে ? কৌমুদী সােফা থেকে উঠে দাড়ালাে।
একটু আলাপ করবাে।
আসুন ! বসুন ! করুন্ আলাপ !
শিকারী ভদ্রলােকটি চমকালেন। বিস্মিত চোখে তাকালেন কোমীর
দিকে : আপণার গলার স্বর বড় রুক্ষ কিন্তু!
কৌমুদী পাল্টা জবাব দিলো : আপনার আচরণ ভদ্রোচিত নয় কিন্তু ।
কেন? কিছু অভদ্রতা ক'রেছি ?
তা না করলেও, ভদ্রতাও কিছু করেননি।
৭১

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
মাপ করবেন। শিকারী ভদ্রলােক রীতিমতাে হাত জােড় করলেন :
উঠলাম তাহলে।
কৌমুদী আর কোনাে কথা বললেন।
ভদ্রলােকটি উৎসুক চোখে কৌমুদীর সর্বাঙ্গে নজর দিতে দিতে বেরিয়ে
গেলেন : কী-যেন অদ্ভুত-এক আকর্ষণ তিনি লক্ষ্য করেছেন চেহারায় ।
রাত্রে শােবার সময় একদিকের দরজার ছিটকিনি নেই দেখা গেলাে।
কৌমুদী ম্যানেজারকে ডেকে পাঠাতে তিনি সশরীরে এসে উপস্থিত হলেন,
কিন্তু দরজা খােলা থাকলে ভয়ের কারণ নেই—এই ভর দিয়ে নেমে
গেলেন।
রাত্রে কৌমুদীর হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো, ভয়ার্ত চীৎকার করে বললো, কে ?
মশারীর বাইরে একটি মানুষের ছায়া স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে ভাঢ়ে ।
কৌমুদী উঠে বসলাে, আবার বললাে, কে ওখানে?
ভয় নেই। ছায়ার গলা দিয়ে স্বর বের হলাে।
তার মানে ? কৌমুদী মশারী সরিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
ছায়াটি বিনীত গলায় বললো, with your permission,
ওঃ, আপনি? শিগগির বেরিয়ে যা। যাবেন না? কৌমুদী চীৎকার
করে উঠলো; ম্যানেজার, ম্যানেজার !
ম্যানেজারকে ডেকে কোনাে ফল হবেনা। ছায়াটি পথ রুখে দাড়ালো :
সব দরজা বন্ধ। তুমি এখন আমার হাতের মুঠোয়, তা জানো? ম্যানেজার,
আমার হাতের লােক। তাকে ডেকে লাভ নেই।
কৌমুদী নিরেট হয়ে দাড়ালাে। বালিশের তলা থেকে চকিতে কি-বেন
টেনে বের করলাে।
শিকারী দুলােক এবার শারীরিক বলপ্রয়ােগের জন্যে তৈরী হলেন।
,
१२

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদী কোনােদিকে না তাকিয়ে কি-যে করলাে তা জানেনা। শিকারী ভদ্রলােক একটা বিকট শব্দ করে উঠলেন। কৌমুদী দরজা খুলে দ্রুত বেগে সিড়ি দিয়ে নেমে গেলাে। কয়েকটি মুহূর্তের ঘটনা মাত্র। কৌমুদীর সমস্ত শরীরে কাটা দিচ্ছে। রাহার আলােয় সে ভুজালীটা মেলে ধরতেই দ্যাখে, রক্ত। তার শিরার রক্তস্রোত হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো যেন। সে-যে কী করবে কিছুই ঝতে পারলােনা। রাতের গৌহাটি। অদূরে ব্রহ্মপুত্রের ছলছল শব্দ। বহ্মপুত্রের মধ্যেই সে লাফ দিয়ে পড়বে নাকি ? আজ বিজনদা এখানে থাকলে এই বিপদ তার কখনােই হতােনা। কৌমুদী নদীর রাস্তা ধরেই চললাে। সনাতনও দি আজ বেঁচে থাকতাে! ভাবতে না ভাবতেই, একি! সম্মুখে সশরীরে সনাতন। সনতন বললো, আয়। কৌমুদী তার পিছন পিছন চললো। শহরের পাকা রাস্তা পেরিয়ে কৌমুদী সনাতনের সঙ্গে কঁচা রাস্তা ধরে চলেছে। রাস্তা হাঁটতে তার এতটুকু পরিশ্রম হচ্ছেনা। গাছে গাছে বাদুড় পাখা ঝাপটাচ্ছে। শুরু পাতায় সর-সর শব্দ হচ্ছে। নির্ভীক কৌমুদী, হেঁটে চলেছে। আজ তার আবার ভয় কিসের, সনাতন আজ তার সহায়। তারা একটা নৌকোয় উঠলো। নৌকোটা দেখতে বড় অদ্ভুত : ঠিক-যেন একটা বােয়ালমাছের আকৃতি। কী বেগ সে নৌকোর ! তীরবেগে নৌকো ছুটে চলেছে, কৌমুদী সনাতনকে কি-যেন জিজ্ঞাসা করতে গেলো। সনাতন ইসারা করে তাকে চুপ করতে বললো। জলের দিকে চোখ রেখে কৌমুদী বসে ছিলাে, হঠাৎ তার মনে পড়লাে, সে ছােট্ট ভুজালী দিয়ে দাড় টানতে লাগলো। ভুজালীর রক্ত তবু, হয়ত ধুয়ে গেলােনা। কৌমুদী ভালো করে ধুয়ে নিয়ে মাথা তুলেই দ্যাখে, সকাল। পাখীর ডাকে তার ঘুম ভেঙে গেলে বলে তার মনে হয়। এ আবার কোন জায়গা? একটা আশ্রম বলে মনে হচ্ছে এটাকে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কিন্তু সনাতন গেলো কোথায় ? তার ভুজালী, আর সেই নৌকোটা, অবিকল "বােয়ালমাছের মত যার আকৃতি ! আপনি কোখেকে আচেন? একজন মাঝবয়সী মেয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলাে। কৌমুদী বিনীত ভাবে ব’ললল, কোত্থেকে এসেছি তা জেনে লাভ নেই, কোথায় এসেছি সেই কথা আমাকে বলুন ! এটা একটা আশ্রম : নাম সত্যাশ্রম। এ-জায়গার নাম আগে ছিল মৌবন, এখন নাম হয়েছে সত্যপীঠ। আপনাদের গুরুদেব কোথায় ? প্রভু? প্রভু আছেন। মেয়েটি চোখ স্তিমিত করে বললাে: আসুন আপনি ! তঁার সঙ্গে দেখা হবে ? অবশ্যই। চোখ টেনে-টেনে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে মেয়েটি জবাব দিলাে। গুজব, এখানকার সাধুবাবা অলৌকিক শক্তি ধারণ করেন। শক্তির উপাসক ইনি, নিজেও শক্তিধর। এর শক্তি-সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনতে পাওয়া যায়। ভক্তরা গুরুদেবের গুণকীর্তন করে বেড়াবার ভার নিয়েছে। প্রধান ভক্তের নাম রাখাল। তিনি সপরিবারে মঠে থাকেন। সহধর্মিনী ইন্দুমতী রাখালের অভিভাবিকা, অর্থাৎ তার তঁাবে রাখাল থাকতে বাধ্য। ইনি সাষ্টাঙ্গে গুরুদেবকে প্রণাম করে বলেন, বাবা, আর কতদূর। অর্থাৎ স্বর্গ আর কত দূরে। সাধুবাবা বলেন, এসে গেছিস্ বেটি । সাধুবাবার , মুখের কথা, এ তােত মিথ্যে হবার নয়। সত্যের পূজারী ইনি। ক্ষমতা এর অনেক, অন্তদৃষ্টি তীক্ষ। কবে কে নাকি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে সংকল্প করে পকেটে বিষ নিয়ে সাধুবাবাকে শেষ প্রণাম করতে এসে ধরা পড়ে যায়। বেচারার মরা আজো হয়নি। সাধুবাবা নাকি তাকে শাসন করে বলেন, ফেলে দিয়ে আয়, পকেটে যা আছে ফেলে দিয়ে আয় শিগগির । ৭৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ‘আশ্চর্য, লােকটা হকচকিয়ে গেলাে। অনুগত শিশুর মতাে সে পকেট থেকে বিষ ফেলে সাধুর পায়ে উপুড় হয়ে পড়লাে, কাদ-কঁাদ হয়ে বললো, পতিতের মনের কথা কী করে জানলে বাবা । এ-কথার উত্তরে বাবা তাকে রুক্ষ স্বরে আশীর্বাদ করলেন, যার জন্যে মরতে চা, তা তুই পাবি। লােকটা নাকি এক মাসের মধ্যে চাকরি পেয়েছিলাে। রটনা এই রকম অনেক আছে, তবে সাধুবাবার আদেশে লােকের নাম-ঠিকানা বলা হয়না। কেবল লােকটা বলেই পরিচয় দেওয়া এ-আশ্রমের রীতি। একদিন তিনি উত্তর মােটারে আসছেন, মােটারের হেড লাইট জ্বলছেনা, পথে পুলিশ পাকড়াবে এই ভয়ে ভক্তরা বললাে, এখন উপায় । সাধুবাবা নাকি বললেন, চলাে ! প্রকাণ্ড শহর, মােড়ে মােড়ে পুলিশ। কী-এক শক্তি প্রয়ােগ করলেন সাধুবাবা, একটা পুলিশও মােটারের দিকে তাকালােনা পর্যন্ত। পশ্চিমের কোন্ এক নামকরা জায়গায় সারা ভারতবর্ষের ভক্তরা মিলিত হয়েছে, ভােজ হবে। এক কানাকড়ি হাতে নেই, কাপ্তেন ভক্তরা চাদা তখনাে পাঠায়নি। মধ্যবিত্ত ভক্তরা বললাে, এখন উপায় । সাধুবাবা বললেন, হয়ে যাবে । আশ্চর্য ব্যাপার, সত্যি সত্যি হয়ে গেলাে। সে কী ভােজ! সবাই প্রাণ ভরে খেয়ে খাবার ফুরাতে পারলােনা। এমনি এই সাধুবাবার অসাধারণ শক্তি। কোত্থান দিয়ে তিনি কী করেন বােঝা শক্ত। লােকের মুখ দেখে তিনি তার নাড়ী-নক্ষত্রের খবর বলেন। গল্প শুনে কৌমুদী প্রায় আধখানা হয়ে গেলো। সাধুবাবার সঙ্গে দেখা করার খ তার গেল উপে। বিজন থেকে আরম্ভ ক'রে শিকারী ভদ্রলােক পর্যন্ত সব খবরই তাে তিনি তাহলে রাখেন। কৌমুদীর ভন্ন করতে লাগলাে। তবু যেতে হবে। একবার যখন যাবার কথা বলেছে, না গেলে সাধুবাবা রুষ্ট হবেন তিনি যে সর্বজ্ঞ। কৌমুদী ভয়ে ভয়ে চললাে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
রাখাল আর ইন্দুমতী এই দিকেই আসছিলাে। বললো, বাবা এখন
ধ্যানস্থ। নতুন কেউ এলেই তিনি ধ্যান-ধারণ করেন, কিসে তার ভাল
হবে তারি উপায় বার করার জন্যে।
কৌমুদী বললো, বাবা ধ্যানস্থ ? না গেলাম তা হলে?
সে কি ? ইন্দুমতী শিউরে উঠলাে।
রাখাল সংক্ষেপে বললো, কাণ্ড!
সাধুবাবার সমুখে কৌমুদী করজোড়ে দাড়ালাে। সকলে তাকে ইসার।
করে চরসারণ করতে বলায় সে পায়ের ওপর উপুড় হয়ে পড়তেই বাবার
দুই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। তাকিয়ে বললেন, আহা।
ভরে কৌমুদীর গলা শুকিয়ে উঠলাে, বললো, অপরাধ ক্ষমা করুন।
কেন অন্যায় করলি? সাধুবাবা ক্রোধে অন্ধ হয়ে বললেন।
কোনাে অন্যায় তাে করিনি আমি। কৌমুদী সংশয়ে পাথর হয়ে বললো।
করি নি ? মিথ্যা। আশ্রমের কলঙ্ক । সত্যাশ্রমের দুর্নাম করতে চাস্?
ব, কি অন্যায় করেছিস্?
কৌমুদী মাথা নিচু করে বসে রইলো : সনাতন তাকে কোথায় ফেলে
চলে গেলো !
সােজা হয়ে দাড়িয়ে উঠলেন সাধুবাবা, ক্রোধে কাপতে কাপতে বললেন,
কেন পালালি ?
কৌমুদী তার মুখের দিকে অপরাধীর মত তাকালো। কিছু বলতে
পারলো না।
পর-পুরুষ না সে? সাধুবাবা বললেন, তুই-না হিন্দুর মেয়ে। তার
সঙ্গে পালালি? স্বামীর নিষেধ মানলি না। কোলের ছেলের ওপর এতটুকু
মমতা রাখলিনা তুই? তাকে ফেলে চলে এলি? ওই শশা, কান পেতে
শোন, সে ডাকছে, মা মা মা !
৭৬

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু সে কি কথা? ইস্। কৌমুদী এর কী প্রতিবাদ করবে? বিরাট সভার সকলে স্তব্ধ। সকলে শ্যেনদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। মাটির সঙ্গে কৌমুদী মিশে যেতে লাগলো। এই কি এর অলৌকিক সত্য ? এর চেয়ে লৌকিক মিথ্যা শত-গুণে ভালো যে ! কৌমুদীর ইচ্ছে হলাে, সে তার শরীয়ে পূর্ণদীর্ঘতার পূর্ণদীর্ঘতার দাড়িয়ে সহজ সপ্রতিভ গলার এই কথার বিমদ্ধে ঘােরতর আপীল করে। সাধুবাবা বললেন, একশ আট সন্ধ্যা তােকে আশ্রয় প্রদক্ষিণ করতে হবে। তবে, এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে তাের। ইন্দুমতী ফিক করে হেসে ফেললো। পুরুষ ভক্তেরা কৌমুদীর দিকে সতৃষ্ণ তাকিয়ে নিশ্বাস পাত করলো। রাখালের গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লাে, তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে সাধুবাবাকে ধরে বসালাে সে। বললো, বাবা, অনুতাপ ওর এসেছে। আপনি ক্রোধ নিবারণ করু! সাধুবাবা গদগদ গলায় বলে উঠলেন : আমার ইন্দুমতী, ইন্দুমতী মা আমার ! আমার সতী মা, সাধ্বী জননী ! এদিকে আয়, এদিকে আয়। আঁা, একি ? জ্ঞান হারালেন সাধুবাবা? আশ্রমের এ-আঘাত সইতে পারলেন না। সত্যাশ্রমে তার কালনাগিনী ঢুকেছে ! আশ্রমের পবিত্রত। আজ নষ্ট হয়ে গেল যে ! এ-আঘাত সহ্য করা। সাধুবাবার পক্ষে সম্ভব নয়। নিবারণ ইন্দুমতীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো, ইন্দুভাই এ কি হলো? ইন্দু তাকে চাপাগলার শাসন করলো : ফাজিল। এত কাণ্ড দেখে কৌমুদী পাথর হয়ে গেছে। চাক্ষুষ এ-দৃশ্য না দেখলে দৃশ্যের সম্পূর্ণ করুণতা আন্দাজ করা সহজ নয়, পঞ্চমি ! কৌমুদী । আচমকা চাক্ষুষ এই দৃশ্য দেখে মাছের মতাে বােবা হয়ে গেছে। বিজনের ৭৭ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু খোজে এসে সে আশ্রমে আটকা পড়ে গেলাে! এখান থেকে গৌহাটি যাবার রাস্তাই সে চেনে না, তা না হলে ফিরে ৰেতাে নিশ্চয়ি। রাস্তা চেনার দরকার নেই, সে এমনিই পালাবে। কিন্তু পালানাে তার হ’লােনা, পরুমি। আশ্রমকে কেন্দ্র করে চারদিকে কাচা বসতবাটি। তার একদিকে থাকে মেয়েরা, অন্য দিকে পুরুষ। মেয়ে-মহলে তার থাকার একটা ঘর ঠিক হয়ে গেলো। পুরুষের সংখ্যা বসুদ্ধ বাইশ, মেয়ের সংখ্যা একশ তেষট্টি-কৌমুদীকে বাদ দিয়ে। গ্রামের মাঝে একটা ছােট্ট শহর তৈরী হয়ে গেছে এখানে। শনিবার রাত্রটা এখানে খুব উৎসবে কাটে। সন্নিহিত শহর থেকে কাপ্তেন ভক্তরা সেদিন সাধুসঙ্গ করতে আসেন। এই উৎসবের দিনটা কৌমুদী কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারেনা। এদিনে সারারাত ধরে কীর্তন গান হয়, ভগবানকে ডেকে ডেকে ভােরের দিকে সবার গলা ধরে আসে, তখন সকলে বেসুরে গান করে : উর্বশী, তুমি স্বর্গ-বেশ্যা। জনৈকা উর্বশী এতে চ’টে যা, সুরসভার কবিকে সস্নেহ ভৎসনা করে বলেন : দেবশিশু, তুমি লম্পট-চূড়ামণি। স্বরটা যেন চেনাচেনা! রাখাল এখন সাধুবাবার কাছে ! সাধুবাবার কদর দিন দিন বেড়ে উঠছে। তার সাধুত্বের প্রমাণ ও সন্ন্যাসের সার্থকতা এই-যে তার ভক্তের সংখ্যার মধ্যে তিনজন ডেপুটি, একজন আই-সি-এস, জন পাচেক রায়বাহাদুর ও পঁচাত্তর জন কয়লাব্যবসায়ী, বাকী সকলে কেরানী কিংবা বেকার। অধস্তন ভক্তরা। এ নিয়ে বড় গ্ৰৰ ক'রে থাকেন। সাধুবাবার নাম প্রচারের সময় সগৌরবে তাঁর রায়বাহাদুর ও ডেপুটি প্রমুখ ভক্তদের নাম করেন সর্বাগ্রে ; এবং কয়লাব্যবসায়ীদের বার্ষিক আয় কত, সেই পরিমাণ দেখিয়ে সাধুবাবার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। • ভক্তদের কর্তব্যের ত্রুটি বা’র করা কঠিন। কৌমুদীর ঊনত্রিশবার আশ্রম প্রদক্ষিণ শেষ হয়েছে। এখনাে উনআশি ৭৮ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু সন্ধ্যা প্রদক্ষিণ করা বাকি। আশ্রম প্রদক্ষিণ করা মানে এক মাইল পথ, নীরস হাঁটা। এ-হাটায় কোনাে উৎসাহ নেই, আগ্রহ নেই। কোন্ পাপে তার এ-শান্তি, কৌমুদী বুঝেছে। সে মনে মনে বলে, এই আশ্রমে ঢােকার শাস্তি এটা। এক-একটা দিন যেতে যেন পূরাে একটি করে বছর লাগছে। বিজনরুড়কি থেকে এসে নিশ্চয় বিপদে পড়েছে। শিকারী ভদ্রলোকটি নিশ্চয় মরে গেছেন, তাঁকে হত্যা করার শাস্তি হয়ত ভােগ করছে বিজন। গৌহাটিতে পৌছে বিজন নিশ্চয় হােটেলে তার খোঁজ করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে, আলল আলামী তাে এখন ফেরার। অযথা বিজন, শাস্তি পাচ্ছে, তাই হয়ত কৌমুদীর ভাগ্যেও এই হেতুহীন শাস্তি এসে পড়েছে। বিজনের জন্যে কৌমুদীর বড় চিন্তা হচ্ছে। তােমার নাকি শরীর খারাপ : তােমার জন্যেও আমার বড় চিন্তা হচ্ছে, পঞ্চমি। আমি এই লম্বা চিঠিটা লিখতে আরম্ভ করার পর থেকে তােমার চারখানা চিঠি পেলাম। তার একটারও উত্তর দিইনি, ইচ্ছে করেই দিইনি। আমার চিঠি লেখা শেষ না হলে আমি তােমার অন্য চিঠির উত্তর দেব না। আমার জন্যেও তুমি নাকি বিষম ব্যস্ত। ব্যস্ততার কিছু নেই, আমি ভালােই আছি, কেবল চোখের যন্ত্রণা ও তার অনুষঙ্গী মাথা ধর। রােগটা মাঝে মাঝে আমাকে কাবু করে ফেলছে—যার জন্যে এই চিঠি লেখায় বাধা পড়ছে অনেক, না হলে এতদিনে কৌমুদীর জীবনবৃত্তান্ত লেখা, তথা, এই চিঠি লেখা শেষ হয়ে যেতাে। কিন্তু তােমার বােগটা কী বলে। তাে! মাঝে মাঝে শরীর এত খারাপ হচ্ছে কেন? ভুটা মনের রােগ : মনকে চাঙ্গা করাে, মনে জোর আনার চেষ্টা করে দেখবে, শরীরেও কোনাে রােগ নেই। আমার রােগ হচ্ছে চোখের পরিশ্রমজনিত। পরিশ্রম থেকে বিশ্রাম নিলে পঙ্গু হয়ে যাবাে। এটা নষযৌনতস্থে অবস্থা আর কি! আশ্চর্য ! এক্ষুনি তােমার আর একটা চিঠি এলো। লিখেছ, চিঠির C - শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু উত্তর না দিলে তুমি রক্ষে রাখবে না। আমি কিন্তু চরমতম শাস্তির জন্যে প্রস্তুত। জানি, এ-চিঠি লেখা শেষ হবার আগে তােমার আরাে চিঠি আসবে—যদি-না অভিমান করে চিঠি লেখা বন্ধ করে। কিন্তু উত্তর আমি কিছুতেই দেব না। এটা আমার জেদ। তুমি জানাে, আমার জে বড় বেশী। সত্যের পূজারী আমি নই, সত্যসঘের সভ্যও নই : তবে মুখ দিয়ে একবার যা প্রকাশ করি, তা পালন করিই। সাধু হতে চাইনে, তবে অসাধু যেন না-হই, এই আমার চেষ্টা। এদিকে কৌমুদী যখন প্রথম সাধুবাবার সম্মুখে উপস্থিত হলাে, সেই সময় গৌহাটিতে বিজনের পদার্পণ। হােটেলের ম্যানেজারের কাছে গিয়ে সে খবর নিলাে। হােটেলওয়ালা বিজনের নাম ঠিকানা আগে লিখে নিলেন, তার পর বললেন, মেয়েটি গত সন্ধ্যায় হােটেল ছেড়ে চলে গেছে। মেয়েটি তার মালপত্তর নিয়ে যায় নি, তা আর বললেন না। বিজন কিছুই বুঝতে পারলাে না। এমন আচমকা হােটেল ছাড়বার হেতু কি, সে ভেবে পেলে না। গেলাে কোথায় ? ম্যানেজার নাকি অত খবর রাখেন না। গেলাে, কোথায় গেলাে-অত খবর রাখার সময় নাকি তার নেই। একটা মেয়ে এসেছিলাে, চ'লে গেছে—এইটুকু মাত্র তিনি জানেন, ব্যস! ম্যানে- জারের মেজাজটা সুবিধের নয়। বিজন চলে গেলাে—সেই রুড়কি থেকে এই গৌহাটি—এতটা রাস্তা সে এলাে কি অযথা? কৌমুদী কেন এলো, চলেই বা গেলাে কেন? অদ্ভুত! বিজনের নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে , করলাে। চেরাপুঞ্জি থেকে তার বাড়ির কেউ ফেরে নি। সেই রাত্রেই বিজন চেরাপুঞ্জি যাত্রা করলাে। বলা যায় না, কৌমুদী সেখানেও যেতে পারে। তার তাে খেয়াল ! কৌমুদীর খেয়ালই বটে ! অন্ধকার ঘরে বেপরােয়া ভঁজালী চালিয়ে শিকারী ভদ্রলােকটির অবস্থা সে সঙ্গীন করে তুলেছে—এও তাে খেয়ালের শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু জন্যেই। একেও খেয়াল বলে বই কি! শিবানীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করলাে, "খেয়ালেরই বশে। সােনামুখী গ্রাম ছেড়ে ধাত্রী হ’লল, ছুটি নিয়ে এলাে বিজনের সঙ্গে দেখা করতে, তারপর সত্যপীঠে পড়লাে আটকা—এও খেয়াল। কৌমুদীর খেয়ালই এমনি! একটা খেয়ালের ওপরই তার জন্ম, আর খেয়ালী সনাই তার প্রতিপালক। নীলরতনবাবু এই জায়গায় বড় করুণ সুরে গল্পটা বলতেন। আমার লেখা পড়ার থেকে তার মুখে শুলে তুমি কৌমুদীর অবস্থা আরাে ভালাে করে বুঝতে পারতে। বুড়াের বলার বস। ভারি সুন্দর। কিন্তু খেয়াল তাে কৌমুদীর নয় : খেয়াল ম্যানেজারের, খেয়াল শিকারী ভদ্রলােকের। তাঁরা দু’জন বদ-খেয়ালের ঝোকে যুক্তি করে একটা কাণ্ড করতে গিয়ে কাণ্ড বাধিয়ে বলেন। ভদ্রলােকটি হলেন জখম আর ম্যানে- জার পড়লেন ফাপরে। ম্যানেজার ছিলেন দিব্যি আরামে ঘুমিয়ে, ঘুম ভাঙার পর টের পেলেন তার হােটেলের রঙ্গমঞ্চে একটা নাটক অভিনীত হয়ে গেছে। নাটকের সঙ্গে ফাটকের চমৎকার মিলের ভয়ে, তিনি একটা প্লট খাড়া করলেন। অবশ্য প্লটটা আহত শিকারীর সঙ্গে যুক্তি করেই খাড়া করা হলাে। এ-প্লট থেকে কৌমুদী একেবারে বাদ। কারণ, ভুক্তভােগীরা বলেন, মেয়ে-সংক্রান্ত বিষয়ে বিপদ অনেক। ম্যানেজার ঘােষণা করলেন, তার হােটেলে গত রাত্রে ছােটখাট ডাকাতি হয়ে গেছে। শহরে খানাতল্লাসী চললল। কেউ ধরা পড়লাে না। কারণ ডাকাত তখন শহর ছেড়ে সত্যাশ্রমে পৌছে গেছে। কিন্তু শিকারীকে পাঠাতে হলাে হাস্পাতালে। চেরাপুঞ্জিগ্নামী গাড়িতে বসে বিজন নানা কথার মধ্যে ডাকাতের কথাও ভাবছিলাে। বলা যায় না, কৌমুদী ডাকাতদেরই ভিকটিম্‌ হ’লল কি না! ম্যানেজার তাে খােলসা করে কোনাে কথাই বললেন না! মরুক গে, কোমর পর্যন্ত চাদরটা টেনে নিয়ে বিজন টান টান হয়ে শুয়ে পড়লাে। ৮১ । শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু বিজন যখন গাড়িতে টান টান হয়ে শুয়ে পড়লো, আশ্রম সংলগ্ন একটা মাটির ঘরে কৌমুদী তখন শুয়ে শুয়ে বিজনের কথাই ভাবছে, শিকারী-ভদ্র- লােকটির কথাও তার মনে পড়ছে। পাশ ফিরে শুতে গিয়ে কৌমুদীর গলা দিয়ে একটা স্বর হঠাৎ বেরিয়ে পড়লাে : বিজনদা। চলন্ত রেলগাড়ির কামরায় অর্ধনিদ্রিত বিজন চমকে উঠলাে, তাকে ডাকে কে? গায়ের চাদর সরিয়ে দিয়ে বিজন উঠে বসলেং। আড়াই বছর =গে যে-ডাক সে শেষবারের জন্যে শুনেছে, এই আড়াই বছরের গাঢ় অন্ধ- কারের স্তব্ধতা ভেদ করে সেই গলার স্বরই তাকে চকিয়ে দিলাে। জাল্লা দিয়ে ছুটন্ত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিজনকুমার সুদূর চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিপাতের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। রাস্তা আর যেন ফুরাতে চায় না। বিজন বড় বেশি অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে আজ। হবারই কথা। মনে মনে তৈরী হয়ে ও কি-কি কথা বলবে তার জোর মহড়া দিতে দিতে সে ছুটে এলাে গৌহাটির হােটেলে, এসে দেখলাে, কৌমুদী নেই ! তার ওপর, ঘুমের ব্যাঘাত পর্যন্ত হ’তে আরম্ভ করেছে তার ! এমন তাে হয়নি এর আগে। বিজন বেশ বুঝতে পারলাে, সে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু পুরুষের পক্ষে এ-ধরণের দুর্বলতা মার্জনীয় নয়, তা সে জানে। জানলেও, প্রতিকারের কোনাে উপায় তার নেই। যে-বিজন এতদিন কৌমুদীকে ভালােবাসতে পেরেও তার জন্যে অধৈর্য হয় নি, সে-ই বিজন এতদিন বাদে হঠাৎ আজ কেমন একটা নতুন রােমাঞ্চ অনুভব করছে। সেই রােমাঞ্চের সঙ্গে আবার কিছু পরিমাণ চাঞ্চল্যও যেন এসে পড়েছে। মনের বিশেষ অবস্থায় মনে বিপ্লব আসে। বিপ্লব ঐফর দেখা দিলে তা থামানাে হয়ে ওঠে কঠিন। তখন মানুষের এমন এক পরিবর্তন এসে যায়, যা কিছুক্ষণ আগে অপ্রত্যাশিত ছিলাে। বিজন নিজেই বুঝতে পারলে, সে যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চেরাপুঞ্জিগামী গাড়িতে একটি রাত্রির মধ্যে তার লম্বা যৌবনকালটা যেন ৮২ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু E ০ নিঃশেষে ফুরিয়ে গেলো। আশা উৎসাহ উদ্দীপনা ইত্যাদি নামক যে সব পদার্থ মানুষকে চাঙ্গা রাখে, হু-হু করে সব যেন খরচ হয়ে গেলাে এক রাত্রির মধ্যে। সারা রাত্রির চিন্তা গবেষণা ও বিশ্লেষণ ইত্যাদি তার এই ক্ষতির কারণ। সকালে যখন সে গাড়ি থেকে নামলাে, তখন গত-বৈকালের বিজন ও এই-সকালের বিজনে প্রভেদ এক মহাসমুদ্র। মুখে তিন দিনের দাড়ি, গায়ের জামায় তিনদিনের কয়লার গন্ধ, মেরুদণ্ড অনেকটা বাকা, চুলে তিনদিনের রুক্ষতা। তবুও, আশা উৎসাহ উদ্দীপনা যেটুকু অবশিষ্ট ছিলো তাও নিঃশেষ হ’লাে তখন, যখন বিজন চেরাপুঞ্জির বাঙলােয় পা দিলো। কোথায় কৌমুদী! কৌমুদী তখন সত্যপীঠের আশ্রমে বসে ইন্দুমতীর সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করছিলাে। ইন্দুমতীর আহাদের সীমা নেই, নতুন মেয়ে আশ্রমে ভর্তি হলেই কেন-যেন তার ফুর্তি বাড়ে। নিজের হাসি দিয়ে যত সহজে লােককে সে আপনার করে নিতে পারে, এত অনায়াসে এ-আশ্রমে তা আর কোনাে মেয়ে পারে না। সাধুবাবাও তার ওপর ভারি প্রসন্ন। রাখালের বিবাহিত স্ত্রী সে, আর বলতে গেলে রাখালই এ-আশ্রমের কর্ণধার, অর্থাৎ পাবলিসিটি অফিসার। ভদ্রাভদ্র মহলে সাধুবাবার নাম-প্রচার করার ভার রাখালের, এ-কার্যে সহযােগী তার যতীশ। রাখালের চেষ্টায় সত্য দিয়ে হােক মিথ্যে দিয়ে হােক সত্যাশ্রমের সুনাম বেড়ে চলেছে। সাধুবাবা অতএব রাখালের কাছে ঋণী, সেই জন্যেই ইন্দুমতীকেও খাতির করতে আইনত তিনি বাধ্য। ইন্দুমতীর কোনাে অপরাধ রাখাল টের পেলে আশ্রমে কুরুক্ষেত্রে লেগে যায়। সাধুবাবা তখন স্বয়ং এগিয়ে এসে বলেন, রাখাল, ছি। রাখাল থামে। তখন তিনি সন্দিহান রাখালের মনে এমন এক ধারণা বদ্ধমূল করার চেষ্টা করেন, • যাতে ইন্দুমতী ভয়ানক বিশ্বাসী বলে প্রতিপন্ন হয়। অগাধ ভক্তি রাখালের ০ ৮৩ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু সাধুর ওপর। নতশিরে সে মেনে নেয়। এতক্ষণে নিধারণ কিম্বা কল্যাণের বুক থেকে একটা ভারি পাথর নেমে যায় যেন। পাশের ঘরে কৌমুদী জেগেই থাকে, সব কথা শুনতে পায়। আশ্রমের ওপর তার ভক্তি এই জন্যে হু-হু করে বেড়ে ওঠে না। কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় আশ্রম প্রদক্ষিণ তাকে করতেই হচ্ছে। উনআশী থেকে এগার বাদ দিলে কত থাকে? আঙুলের কড় গুনে কৌমুদী বার বার হিসেব করছে। এখনাে আটষট্টি বার তাকে আশ্রম ঘুরতে হবে : অর্থাৎ এখনাে দু’মাসের ওপর ! এখান থেকে পালাবে, তারও কোনাে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিজনকে একটা চিঠি দেবে, তারও কোনাে সুবিধে নেই। আশ্রমটা যেন একটা জেলখানা। চারদিকে লাল প্রাচীর থাকলেও লাল শুরকির রাস্তাগুলােই এর বেড়া। ওর ওপারে যাবার আদেশ নেই কোনাে মেয়ের! কোথায়ই-বা পােস্টাপিস আর কোথায়ই-বা রেলস্টেশন! আটষট্টিবার আশ্রম-প্রদক্ষিণ মানে আটষট্টি মাইল পথ নীরস হাঁটা। এ হাঁটা যদি বাঁকে বাঁকে পাক খেয়ে হাঁটা না হয়ে সােঙ্গা রাস্তায় হাঁটা হ'তে তাহলে সে বাঁচতে। আশ্রমকে কেন্দ্র করে এই বৃত্ত-রচনা তার আর সহ হচ্ছে না। ছি ছি, নানা কারণে যত-না ইন্দুমতীর ওপর তার অনেক বেশি রাখালের ওপর তার ঘৃণা বাড়ছে। যে-পুরুষ তার স্ত্রীকে বশে রাখতে না পারে, তার পুরুষ হবার মানে কী? সুধু সাধুসঙ্গ করে স্ত্রীকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে এমন অন্ধ হয়ে থাকার অর্থ ? নিজের অক্ষমতা বুঝি সাধু- ভক্তির অছিলায় গােপন করার চেষ্ট এটা? কৌমুদী ভেবে ভেবে হতাশ হয়। সাধুজী ফকির লােক, তবে লােকে বলে, তিনি ফিকির জানেন। তার নামে মস্ত একটা মঠ তােলার জন্যে তার আগ্রহ ইদানীং বেড়েছে। তাই কাপ্তেন ভক্তদের তিনি বড় সুনজরে দেখছেন। যেহেতু লােককে না ? ৮৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ঠুকালে লােকে টাকা ঢালে না, তাই তিনি বড় বেশি আশীর্বাদ করতে আরম্ভ করেছেন সকলকে। মঠ প্রতিষ্ঠার জন্যে চারদিকে অর্থ সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠানাে হয়েছে। সাধুবাবা নাকি বলেছেন, হয়ে যাবে। তাই ভাবনা বিশেষ নেই, হয়ে যাবেই। তবে, চেষ্টা করতে হবে পুরােদস্তুর। দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে যদি কড়ি আদায় করতে হয়, তাও স্বীকার। সাধুবাবা যখন বলেছেন, হয়ে যাবে . তখন হয়ে যাবার জন্যে উঠে পড়ে লাগা দরকার। মঠের প্ল্যান তৈরী। জনৈক শিল্পীভক্ত কাঠ কু’দে মিনিয়েচার একটা মঠ তৈরী করে এনেছে। মঠের এই নমুনা দেখিয়েই চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। যে সব ভক্ত দূরে থাকেন, তাঁরাও অল্পদিনের মধ্যেই এখানে এসে যাবেন, তাদের স্বয়ং সাধুবাবা আহ্বান করেছেন। সেই জন্যে মঠের নমুনাটি একটি কাচের কেএ প্রকাশ্য জায়গায় রাখা হলাে। ইন্দুমতীর উল্লাসের অন্ত নেই, কেবল বলে, উঃ, কত টাকা। টাকার খই ছড়াচ্ছে সকলে। আমার সাধুবাবার নামে মঠ হবে। টাকার অভাব ! টাকা ! ইন্দুমতী টাকার বড় ভক্ত। জাননা পঞ্চমি, মেয়েদের টাকা- প্রিয়তা কত মারাত্মক ! তােমার মত অতটা নিরাসক্তি:যদিও অনুমােদন করিনে, তবে শ্রীমতী ইন্দুমতী দেবী চৌধুরাণীর মতাে নিবিড় আসক্তি যেন কারুর না থাকে। দেবী চৌধুরাণী বললাম অত্যধিক ভক্তিতে : তিনি আমার নমস্যা, প্রাতঃস্মরণীয়ও বটেন। প্রাতঃস্মরণীয়া, সেজন্যে অহল্যা কুন্তী তারা মন্দোদরী ও পঞ্চস্বামীসােহাগী পাঞ্চালী প্রাতঃস্মরণীয়া, ইনিও হয়ত সেই জন্যেই। ইন্দুমতীর বয়েস? ধরাে, পঁচিশ ! শারীরিক বয়েস পঁচিশ হলেও মানসিক বয়েস পনের ; অর্থাৎ যে-বয়েসে নতুন শিহরণ আসে, কথায় কথায় গায়ে কাট!দেয়, সর্বদা গা ছমছম করে, সেই বয়েস। তুমি এ ডেঞ্জার- শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু, জোন্ পেরিয়ে গেছে নিশ্চয় : তােমার মানসিক বয়েস এখন কতাে-- * আঠারাে না বিশ! হিসেবে দরকার নেই। নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে পাতা ভরাট করলে সমালােচকরা খাপ্পা হবেন। চলল, সত্যপীঠে চলাে। তিনজন ক্যাপিটালিস্ট ভক্ত এসে গেছেন। এরা মঠ নির্মাণের সম্পূর্ণ ভার নাকি নেবেন। অবশ্য আশ্রমে জনশ্রুতি এই। একজন তােমার প্রতিবেশী, অর্থাৎ টাঙাইলের দিক থেকেই এসেছেন, মুক্তাগাছার নামকরা বড়লােক, জমিজমা নাকি বিস্তর আছে, জমিদারই বলতে পারাে; দ্বিতীয়জন রিটায়ার্ড সিভিলিয়ান, তিনকুলে কেউ নেই—বিয়েও করেন নি,--জমানো টাকা অঢেল, কলির কুবের (এ আখ্যা ইন্দুমতীর দেওয়া ); তৃতীয়জন কুচবিহারের লক্ষপতি বলে খ্যাত, আসামের চা-বাগানের অধিকারী। আশ্রম উৎসাহে ঝকম করছে। প্রত্যেকের মুখ-চোখ দিয়ে উৎসব ফুটে বেরােচ্ছে। নারীকর্মীদের মধ্যে জোস্না ইন্দুমতী নীহার কণা আর মুকুল সবচেয়ে বেশী উৎসাহী, পুরুষদের মধ্যে রাখাল কল্যাণ নিবারণ ও যতীশ। ইন্দুমতীরা কৌমুদীকে টানাটানি করলাে, সে কিছুতেই দের সঙ্গে যােগ দিতে রাজী হলাে না। কর্মী এখন অবশ্যই দরকার : পূজোর জন্যে ফুল সাজানাে ও ফল কাটা, অতিথিদের জন্যে অভ্যর্থনা ও শিষ্টাচার, সাধুবাবার জন্যে তদারক ও তটস্থভাব।—এমন সময় কৌমুদী যদি কুঁড়ের মধ্যে কুড়ে হয়ে বসে থাকে তাহলে আশ্রমবাসিনী হয়ে লাভ কী? আশ্রম তত.. বিশ্রামখানা নয়! আর, বিশ্রাম মানে পরিশ্রমের পরের বিরতি। কৌমুদী কবে একটা খড় ভেঙে দু’টো করেছে, শুনি ! এরি মধ্যে তাঁর শরীর এত বিশ্রাম চায় ! জোস্না বললাে, রােদ লেগে রং জ’লে যাবে না, ভয় নেই। ইন্দু বললাে, রূপের দেমাক আমরাও করতে পারি, করিনে। ৮৬ ০ সব ভক্তই শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু নীহার আর কণা সমস্বরে বললাে, আদিখ্যেতা। মুকুল নীরবে হালাে। হাসিটা এমন, যেন অমন কত রূপ সে অবহেলা করে ছেড়ে দিয়েছে। সাধুবাবা সাদাসিধে ভদ্রলােক, স-ভক্ত বসে তিনি আসর জমাট করেছেন। কবে * ডেরাডুনে গিয়ে শাদা কাক ও লাল বক দেখেছিলেন, কাশ্মীরের মেয়েদের স্বাস্থ্য কেন অটুট থাকে, বদ্রিনাথে কবে এক সাধুর সঙ্গে দেখা যার জট পাঁচ ফুট লম্বা, ইত্যাদি নানারকম গল্প করছেন। সেখানে উপস্থিত। নবাগত ক্যাপিটালিস্ট ভক্তত্রয় কেবল দ্বিপ্রহরিক বিশ্রাম করছেন পাশের ঘরে। চিকের ওপাশে মেয়েরা ব’সেছে। ইন্দুমতী তখন চা-বাগানের আয় কত, আর ওর থেকে কত অজস্র পরিমাণে টাকা হাতে আসা সম্ভব, এই বিষয় আলােচনা করছে। বিঘে দশেক জমি খরিদ করা হবে। জমির সম্পূর্ণ ভার নিলেন মহিম বাগচী, মুক্তাগাছার ভদ্রলোেক ভার নিলেন ইটের, মসলার জোগান দেবেন সিভিলিয়ান ভদ্রলােক। এখন বাকি থাকলাে মিস্ত্রী। এ-খরচ চালাতে হবে অন্যান্য ভক্তদের। সেদিনের পরামর্শে এই প্রস্তাব পাশ হবার পর ইন্দুমতী ভারিকে নিশ্বাস ফেলে বললাে, বাব্বা! দশ বিঘে জমি ! চাট্টিখানি কথা নয় অমন। দাতার প্রাণ আছে! গৌহাটির অপর পারে ব্রহ্মপুত্রের পাঁচ মাইল উজানে জায়গাও ঠিক হয়ে গেলাে। এবঃ এই হাঙ্গামার মধ্যে এক অজ্ঞাত কারণে নিবারণে ও কল্যাণে রীতিমতো বক্সিং আরম্ভ হ'লো! ফলে, নিবারণের নাক ও কল্যাণের বা হাত একটু ক্ষতিগ্রস্ত হলাে। এত আনন্দের মধ্যে আকস্মিক এই বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধান করে যা জানা গেলাে তার প্রতিবিধান করার আগেই • কুচবিহারের ভদ্রলোেকটির যাবার তাগাদা পড়লাে। তাঁকে আর কিছুতেই ৮৭ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু. ধরে রাখা গেলাে না। তার প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে ইন্দুমতী হলো নিখোঁজ। আশ্রমের ইতিহাসে এমন দুর্ঘটনা এই নাকি প্রথম। মহিম বাগচী ! নামটা কৌমুদীর কানে যাওয়া মাত্র সে বুকের মধ্যে একটা হাতুড়ির ঘা খেলাে। কুচবিহার, আসামের চা-বাগান ! আর পরিচয়ের দরকার নেই। কৌমুদী চিনেছে। গােলাপদির কাছে এই চা-বাগানের গল্প লক্ষবার সে শুনেছে ! কৌমুদীর হাত পা কাপছে : সত্যি তত তিনি চলে গেছেন? আবার ফিরে আসবেন না তাে? ভগবান তাকে রক্ষা দ্ধি করেছেন। রাখাল সাধুবাবার সামনে বসে হাত জোড় করলাে। সাধুবাবা বললেন, ভাবিদনে। সে সুখে আছে। পাপের মধ্যে থেকে সাধ্বী মা আমার বিদায় নিয়েছে। ভগবান তাকে পথে ডেকে নিয়েছেন। কাজে লেগে যা ভােরা। কিসের মন খারাপ। আবার যদি মা আমার ফিরে আসে, দেখবি, সে দেবী হয়ে ফিরেছে। সে তাে মানুষী নয়, রাখাল! সেদিনের আশ্রম প্রদক্ষিণ করার সময় যতই ঘনিয়ে আচে, কৌমুদীর মন খারাপ হচ্ছে ততই। ঘর থেকে বের হতে তার ভয় করছে রীতিমত। বলা যায় কি, মহিম বাগচী না-ও যেতে পারেন! আশ্রম প্রদক্ষিণের মুখে মুখখামুখী যদি দেখা হয় দু’জনের! ভাবতেই কৌমুদীর শরীরে কাটা দিলাে। কিন্তু আশ্রম থেকে ইন্দুমতীর অন্তর্ধানের কথা ভেবে সে আশ্বস্ত হলো খানিকটা। কৌমুদী খুঁটিনাটি খবর শােনেনি, তবে তার * মনে হচ্ছে ইন্দুমতীর অন্তর্ধানের সঙ্গে নিশ্চয় মহিম বাগচী জড়িত আছেন। কৌমুদীর এটা অনুমান। কিন্তু পঞ্চমি, আমাদের অনুমান নিশ্চয় নয় : এ-আশ্রম থেকে এর বেশি আমরা আর কিছু আশা করতে পারিনে। আর ইন্দুমতী যে এমন একটা ঘটনা ঘটাবে তা আমরা সকলেই জানতেম, কারণ তার জীবনের bobo শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু পূর্বইতিহাসে এরই সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিলাে। তার জীবনের ঘটনাগুলি যদি একে একে বিশ্লেষণ করাে, তাহলে তুমি হতভম্ব হবে। সেকি, আজ আবার তুমি চিঠি দিলে? মন ভালাে ঠেকছেনা? তার আমি কি করবাে? আমার লম্বা চিঠিটা শেষ করতে দাও! মাঝে মাঝে যদি এমন চিঠির সুড়সুড়ি দিয়ে বিরক্ত করাে তাহলে এগােব কী করে? বাধা দিয়ােনা, লক্ষ্মীটি। অত ভাবপ্রবণতা ভালো নয়। অসুখ বাড়ছে লিখেছাে ! অসুখটা কী বলল তাে? বলেছি তাে, মনের অসুখ ওটা। চুপচাপ থাকো, মন খারাপককে দিয়ােনা। মন চঞ্চল হ'লে লেখায় মন বসেনা। তাতে ক্ষতি তােমার, আমার নয়। যত চিঠি দেবে, উত্তর পেতে তত দেরী হবে। জানাে, কৌমুদীটা কী সাংঘাতিক মেয়ে ! ইন্দুমতীর আশ্রম ছেড়ে পালানাের দু’দিন পরে আশ্রমপ্রদক্ষিণ করতে করতে হঠাৎ কোন ফঁাকে লাল শুরকির রাস্তা পার হয়ে সে কোথায় চলে গেছে। কোথায় সে গেছে তা আশ্রমবাসীরা জানে না। অতএব তারা অনায়াসে একে ইন্দুমতীর পর্যায়ে ফেলে নিশ্চিন্ত হলাে। কিন্তু কৌমুদী এসেছে গৌহাটিতে। কৌমুদীর বড় আশ্চর্য লাগছে। তার ধারণা ছিলাে আশ্রমটা বুঝি গৌহাটির ওপারে, কিন্তু তা তাে নয় ! সে কি তবে নৌকো করে নদী পার হয়নি সে-রাত্রে ! সেই নৌকো চেপে—অবিকল বােয়ালমাছের মতো যার আকৃতি ! সনাতন তাহলে তাকে বুঝি কেবলই ঠকাচ্ছে। সুধু সনাতন কেন, বিজনও তাকে ঠকাচ্ছে। গৌহাটিতে পৌছে সরাসরি সে বিজনদের বাসায় এসে উপস্থিত। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সে বাড়ির সামনের বাগানটা পার হয়ে বারান্দায় উঠেই অস্বস্তিকর আবহাওয়ার মুখখামুখী দাড়ালাে : বিজন নেই। শুধু নেই নয়, কোথায় আছে—তা-ও কেউ জানে না। কৌমুদীর বুক থেকে মস্ত একটা পাথর নেমে গেলাে যেন, ' সে-যেন হাঁফ ছাড়লাে : বাঁচা গেছে।

। শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু অতিথি-সৎকারের কোনাে ত্রুটি হ’লল না অবশ্য। কিন্তু কৌমুদীর মনে হচ্ছিলাে : এর চেয়ে অতিথিকে সৎকার করাই এদের যেন উচিত ছিলাে। মনে মনে সে বুঝেছে-যে বিজনের নিরুদ্দেশের জন্যে দায়ী কৌমুদীই। কৌমুদীর জন্যেই যখন এ অঘটন, তখন তার ওপর এই সদয় ব্যবহার তার গায়ে সূচের মতন ফুটছে। বিস্তৃত বিবরণ দিলাে উমা। নিভৃতে বসে কৌমুদীর কাছে একে একে সে সব বিবৃত করলাে : চেরাপুঞ্জিতে গিয়ে যখন তার দাদা পৌছয় তখন তার চোখ দুটো কী লাল। অচকা কলেজ কামাই করে অনয়ে চলে আসায় সবাই নাকি ভেবেছিল তার অসুখ। কিন্তু অসুখ নাকি তার নয় । তবে? কারণ কিছুই বলেনি তার দাদা। বার কয়েক শুধু চা খেলাে। চুপচাপ বসে থাকলাে। তারপর সেই-যে বেরুলাে আর তার দাদা ফিরলে । কোথায় গেছে কেউ জানে না। চারদিকে টেলিগ্রাম গেলাে, কেউ খবর দিতে পারলাে না। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হলাে, তাতেও কোনাে কাজ হলাে না। কৌমুদী সুধু শুনেছে, একটাও কথা বলেনি। বড় মুস্কিল তাে। গেলো কোথায় সে? আর গেলােই বা কেন? এমন ছেলেমানুষী বুদ্ধি তাে তার এর আগে ছিলাে না। এই গৌহাটীর ওই ঘরটীতে বসে যখন সে সনাতনের সুরে সুর মিলিয়ে গান করত, তখন তার মুখের ভাবে এমন সম্ভাবনা কোনাে দিনই ফুটে ওঠেনি-যে ওই ব্যক্তি একদিন নিরুদ্দিষ্ট হবে। কৌমুদী মাঝে, মাঝে যখন সনাতনের সঙ্গে আস্ততা, তখন সে বিজনের যে নির্ভাবনা ও সুপ্রসন্ন মুখের ছবি দেখেছে তার সঙ্গে আজকের নেপথ্যবাসী বিজনের চেহারার দারুণ গড়মিল সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে • না যে বিজন এমন অদ্ভুত হয়ে যেতে পারে। উমাকে সে সান্ত্বনা দিলাে, তাকে অযথা কাদতে বারণ করলাে। তার দাদা ফিরে আসবেই আসবে শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু বলে তাকে সে আশ্বাসও দিলাে। সান্ত্বনার কথা বলা খুব সহজ : সান্ত্বনা গ্রহণ করতে পারা আদৌ সহজ নয়। উমার কান্না কৌমুদী থামাতে পারলাে , কিন্তু নিজের ভিতরকার কান্নার বুদ্বুদ চেপে রাখলাে। মুখে প্রবােধবাক্য ব্যবহার করলেও মনে মনে কৌমুদীর যথেষ্ট সন্দেহ ও তভােধিক আশঙ্কা বিজন সম্বন্ধে। ভুল মানুষে করবেই : পূর্ণাঙ্গ মানুষ হ’তে গেলে ভুল করা ও ভূল বােঝা অবশ্যম্ভাবী। মাত্রার বেশি ভুল হলেই মানুষ মানুষের চোখে খাটো হয়ে যায়, জলাে হয়ে যায়। তখনই তাকে “বলা হয়-তরল-প্রকৃতির লােক। বিজনের ভুলের মাত্রা বেশি কি কম, সে- বিচার আমরা করতে চাইনে, পঞ্চমি। কিন্তু কৌমুদীর সন্দেহ ও আশঙ্কা যে সত্য, এটা আমরা মেনে নিলাম। বিজন আর ফিরবে না। তার বাবা-মা ভাই-বােন সকলে তাকে মন- প্রাণ দিয়ে দিনের পর দিন ডেকে গেলেও, সে ডাকে সে সাড়া দেবে না। বিজন এখন নতুন মানুষ, তার পৃথিবীর রঙ এখন আলাদা। এতে হঠাৎ মানুষের এমন অবিশ্বাস্য বদল এসে যেতে পারে, তা আমরা ভাবিনি। তার জীবন যেন উপন্যাসের নায়কের জীবন ; লেখকের খুশিমত যেমন চরিত্রের অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে, এও যেন তেমনি। কথিত আছে, মনুষের জীবনধারা উপন্যাসবর্ণিত চরিত্রের জীবনধারার চেয়েও অদ্ভুত। কথাটা নিজের জীবনের ঘটনা দিয়ে বিচার করে সত্যি বলেই বহুবার জেনেছি : আজ • বিজনের কল্যাণে নতুন করে তা জানলেম। বিজন আর বিজন নয়, সে জীবনযুদ্ধের সৈনিক। সে কথা পরে হবে, এখন কৌমুদীর কথায় ফিরে আসি। বিজন যখন গৌহাটিতে নেই : আর এখানকার হােটেলেই যখন সে একটা নিদারুণ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে গেছে, তখন কৌমুদীর গৌহাটিতে থাকতে রীতিমত আতঙ্ক হ’লাে। সেই শিকারী রসিক ভদ্রলােকটির পরিণতি কতদূর :

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু গিয়ে ঠেকেছে, কোমুদী তা জানে না। সাংঘাতিক কিছু হলে এতক্ষণ সে হয়ত শুতে পেতত উমারই মুখ থেকে : অনেক প্রসঙ্গ নিয়েই তাে আলো- চনা হলাে তাদের। হােটেল-সংক্রান্ত কথাবার্তাও যে হয়নি, তা নয়। কৌমুদী হােটেলে ওঠায় তার দাদা চেরাপুঞ্জিতে গিয়ে দুঃখ জানিয়ে এসেছে, এ-সংবাদও উমা দিয়েছে। কৌমুদী হােটেলের গল্প ভালাে করে শােনার চেষ্টা করেছিলাে, কিন্তু সে-প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেলাে। এই তাে বিজনের ঘর। কৌমুদী মনে মনে নমস্কার করছে নাকি? তার চোখ দু’টি নমস্কারের ভঙ্গীতে বারবারই নত হয়ে আসছে বলে মনে হয়। দেওয়ালে তার ছেলেবেলার হাফপ্যান্ট পরা ছবি, টেবিলের ওপর স্কেল ও কম্পাস, কালীহীন দোয়াতদানি, ওইখানে এই হার্মেনিয়ামের বাক্সটা, সেই সনাতনী যুগে যেখানে যেমনটি থাকতাে, আজও সেইখানেই আছে, তবে তেমনটি নেই! কোথায়-যেন একটু ফাকা, কোথায়-যেন একটু ফাকি । কৌমুদী গৌহাটিতে আর থাকতে নারাজ। কিন্তু উমা তাকে বাধা দেবেই। কৌমুদী কোথায় যাবে, কোথায় এতদিন ছিলাে—সব সে উমার কাছে গােপন রাখতে চায়। উমা তাই তাকে অসহায় ছেড়ে দিতে রাজি নয়। উমার বাবা-মা মুখখামুখী বাধা না দিলেও, তাদের মেয়ের মারফৎ তারা অনুরােধ জানাচ্ছেন। বিপদ যখন আসে, তখন চারদিক থেকেই নাকি আসে! কৌমুদীর বিপদও কম হলাে না। এক মাসের ছুটি নিয়ে হাওয়া বদল করতে এসে সে নিজেই বদল হয়ে যাবে নাকি? নিশুর তার ওই সামান্য চাকরিটুকু! তা সে খােয়বে কী করে? একমাসের জায়গায় তিন মাস হতে চললাে যে ! কৌমুদী বিচলিত হয়ে পড়লাে। তা ছাড়া, বিজনের সন্ধানের জন্যে সে কিঞ্চিৎ ব্যাকুল। তার কেবলই মনে হচ্ছে, কলকাতার মতাে শহরে পৌছতে পারলে সে-যেন একদিনের মধ্যে বিজনকে খুঁজে বার করতে পারবে। এ-ধারণা হওয়া বিচিত্র নয়। কেন না, শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু “কলকাতা শহরটা যদুকর। তা ছাড়া, এখানে একটানা অনেকদিন থাকলে হাফ ধরে, কিন্তু একে কিছুদিন ছেড়ে থাকলে দম আটকে আসে। এ-জায়গাটা বাঙলাদেশের হৃৎপিণ্ড : আমার তত এই ধারণা। তােমার কথা যদিও হৃৎযন্ত্রকে একটানা বেশি খেলাও, হাঁফ ধ’রবে ; একটানা এর কাজ বন্ধ রাখাে, দম আটকাবে। আমার যুক্তি তুমি মানবেনা, কারণ তােমার কলকাতাতঙ্ক বেজায়, টাঙাইলাসক্তি অসাধারণ। কলকাতার পীচের রাস্তাকে তুমি বলল বিষধর সাপ, গম্বুজকে বলল বিস্ফোটক : তােমার দৃষ্টিকোণই আলাদা। আমার তাই ধারণা ছিলাে-যে মেয়েমাত্রেরই দৃষ্টিকোণ বুঝি এই। কিন্তু কৌমুদীকে দেখে আমার সে সিদ্ধান্ত টিকলােনা। হৃৎপিণ্ড যেমন পাম্প করে করে শিরায় শিরায় রক্ত চালান্ করে শরীরময় ছড়িয়ে দেয়, আবার নিজেরই মধ্যে সব রক্ত টেনে আনে,-কৌমুদীর ধারণা, বিজনকেও কলকাতা শহর তেমনি বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে আবার কেন্দ্রে টেনে নেবে। তার মনে হয়, কলকাতা মাধ্যাকর্ষণের লীলাভূমি। রুড়কির বিজন কলকাতার চুম্বকশক্তির নাগালের বাইরে হয়ত যাবেনা। জীবনে যেন কত কিছু করার ছিলাে, কত আশা ছিলাে, আনন্দ ছিলাে, কত সাধ ছিলাে—সব এক নিমেষের মধ্যে দপ করে নিবে যাওয়ার মত ফুরিয়ে গেছে যেন! কৌমুদীর এখন আর কোনাে বন্ধনই যেন নেই। সে মুক্ত। এখন সে যত কিছু করার ছিলাে, কিছুই যদি না করে—কাউকে তার কৈফিয়ৎ দেওয়ার আর কোনাে দরকার নেই। দিনগুলাে এখন-যেন খুব লম্বা, রাতগুলাে ততােধিক দীর্ঘ। অবসর তার দু’হাতে যেন ধরা যায়না, এত বড়। ভারি চমৎকার লাগছে কৌমুদীর। অদৃশ্য একটা কিসের ওজন তার কাধের ওপর ঝােলানাে ছিলো, এখন তা নেমে গেছে। নিজেকে বেশ স্বস্তিকর হাল্কা বলে তার বােধ,হয়। এতদিনের অভ্যাসগত প্রতীক্ষা, মজ্জাগত উৎকা- কোথায় গেলে সব? অপরিসীম আনন্দে রােমাঞ্চ বােধ করছে কৌমুদী।

কত-: শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু গণেশদা-হীন শিবানীর কথা অনেকদিন বাদে তার হঠাৎ মনে পড়লাে। সােনামুখী গ্রামের পাড়া-প্রতিবেশী চেনা-অচেনা জনের মুখ ভেসে উঠলাে তার চোখের সাম্নে। নিজেকে তুলনা করে দেখতে চেষ্টা করলে তাদের সঙ্গে। সেই তিস্তা- নদীতে যাবার বাঁকা শরু পায়েহাটা রাস্তাটি—আর সেই সঙ্গে কুচবিহারের সেই তেরছ পায়েহাটা রাস্তা, নৃনে খাওয়া ইটের প্রাচীর গোলাপদি, মহিম বাগচী, ইন্দুমতী! সকলে বায়স্কোপের ছবির মতােপর পরু, তার চোখে ফুটে উঠলাে। ইন্দুমতী-হীন রাখালের কথা ভেরে তার দুঃখ হ’লল প্রবল। রাখালের এ-যে স্ব-রচিত দুঃখ : সাধুপ্রীতি থেকেই-যে এই দুর্ঘটনার আবির্ভাব, আজো রাখাল তা বােঝেনি বলে কৌমুদীর মনে রাখালের জন্যে সমবেদনা জাগলাে। গৌহাটি ত্যাগ করে কিছুদিন আগে কৌমুদী কলকাতায় ফিরে এসেছে। তিনমাস নেপথ্যবাসের পর তার আগমনে হাসপাতালের কর্ণধারেরা কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন । কিন্তু শেষ-বেশ কৌমুদীকে তারা আবার-যে গ্রহণ করলেন, কৌমুদীর ভয়ানক সৌভাগ্য ব’তে হবে। কেউ কেউ বলে, কর্তৃপক্ষের এই পক্ষপাতের জন্যে দায়ী কৌমুদীর চেহারা। তার মুখের দিকে তাকিয়ে কেউ তাকে কাজ থেকে বরখাস্ত করে, এমন শক্তি নাকি কারো নেই। কথাটা কতটা সত্যি, জানিনে। তবে, বর্তমানে কৌমুদীর চেহারা আগেকাব মত তেমন নিটোল নিখুৎ নয়। নানারকমের অভিজ্ঞতার হাতুড়ির ঘা খেয়ে জায়গায় জায়গায় দাগ পড়েছে। সেই মাথায় পটি বাঁধা, সেই পরণে এপ্রন : সােনামুখী গ্রাম ছাড়ার তিন বছর বাদে আমরা তাকে এইরূপে পেয়েছি। এরি মাঝখানে তার জীবনে কয়েকটি ঘটনা ঘটে গেছে ; গৌহাটি-হােটেলের নাট্যাভিনয়, সত্যপীঠের আশ্রম-প্রদক্ষিণ, ও চূড়ান্ত ঘটনা—বিনের অন্তহিতি। কত দীর্ঘ রাত্রে t ৯৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু, বিছানায় চিৎপাৎ ভয়ে কৌমুদী এই সব কথা ভাবে। অনুশােচনা হয় তার। সামান্য একটু ভুলের জন্যে কত বড় ক্ষতি হয়ে যায় মানুষের ! কৌমুদী যদি পীড়াপীড়ি করে তখন ছুটি না মিতাে ও গৌহাটিতে না যেতাে—তবে তার এত বড় লােকশান কখনই হতােনা বুঝি! সে যদি কলকাতার এই হাসপাতালে বসে রুড়কির ঠিকানায় চোখ বুজে ঢিল ছুড়তাে, তা হলে বিজনকে এ ভাবে খােয়াতে হতােনা হয়ত। রুড়কিতে সে পড়বে, এ সম্ভাবনার কথা তার তাে জানাই ছিলাে—অতিমাত্রায় নিশ্চিত হতে যাবার যথেষ্ট পুরস্কার সে • পেয়েছে। এবার থেকে আর হিসেব করে কাজ নে করবেনা, এবার থেকে সে বেপরােয়া হবে! মেরুদণ্ডকে যথাসাধ্য শক্ত করে সে কাজ করবে : অল্পে হতাশ ও অল্পেই ব্যাকুল হয়ে যখন তার পুরস্কার কিছু পাওয়া যায়না—তখন হতাশ হয়ে ও ব্যাকুল হয়ে লাভ? চোখের জল ও দীর্ঘনিশ্বাস একজোড়া প্রতারক : এদের হাত থেকে সে রেহাই চায়। শুয়ে শুয়ে এই সব ভাবতে ভাবতে তার রীতিমত উত্তেজনা বােধ হ’লল : চোখের ঘুম হ’লাে পলাতক। ঘরের মধ্যে পায়চারী করে ঘুরে বেড়াতে লাগলাে। সন্ধ্যা দিব্যি ঘুমােচ্ছ, বেশ আছে ও। ঘুম কত সহজ : ওর জীবন কত সরল। জীবনে আনন্দ চাই, এই প্রতিজ্ঞা করে আনন্দ খুঁজতে বা’র হলেই জীবন পণ্ড হয়ে গেলাে : আনন্দ তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাগালের বাইরে গিয়ে নৃত্য কতে থাকে, তাকে আর ধরা যায় না। দূর দিগন্তের মত ক্রমশই সে পিছনে সরে যায়—যতই তাকে ছোঁয়ার জন্যে তার দিকে এগিয়ে যাবে, ততই ঠকবে ! সন্ধ্যার দিগন্ত তার রীতিমত আয়ত্তে। নিরিবিলি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে দিগন্ত নিয়ে খেলা করে। সে নিশ্চয় ধরি-ধরি করে তার পিছনে ধাওয়া করেনি, চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাকে বেঁধে রেখেছে, হাতের মুঠিতে ওর শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু চায়নি। সন্ধ্যা সুখী। কৌমুদীর হিংসে হয় সন্ধ্যার ওপর। কখন-কথন একই সঙ্গে তাদের ডিউটি পড়ে, একই ঘরে তারা দু’জন থাকে, বন্ধুত্বও দু’জনের কম নয়—তবু কৌমুদীর হিংসে হবেই। রাত্রে ডিউটি না থাকলে কৌমুদীর বড় কষ্ট হয়। যে-সপ্তাহে তার দিনের ডিউটি পড়ে সে-সপ্তাহে তার শরীর ও মন ভালাে থাকে না। রুগীদের সঙ্গে জেগে জেগে রাত কাটানাে এক রকম মন্দ নয়, কিন্তু গুমে-কাদা-হয়ে-যাওয়া সন্ধ্যার আবছা-আবছা মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে পায়চারী করে রাত কাটানাে অসহ। কোনাে রাত্রে সন্ধ্যার ঘুম ভেঙে যায়, আশ্চর্য হয়ে বলে : ওকি রে, r ঘুমােত্ নি ? উহু। ঘুম কিছুতে আসচেনা, ভাই। কৌমুদী পায়চারী করতে করতেই বলে। সন্ধ্যা হাই তুলে জড়িত গলায় বলে, জল খা। চোখে মুখে জল দে। শুয়ে পড়। কাল ডিউটি করবি না ? কথাটা কোনাে রকমে শেষ ক'রেই সন্ধ্যা পাশ-বালিশ সুদ্ধ উল্টে দেয়ালের দিকে মুখ করে শােয়। কৌমুদীর জবাব পায়না। কৌমুদী মুক্ত বটে, তবে তার মনে মারাত্মক একটি অভাব সব সময় তাকে সংকুচিত করে রাখে। এ-অভাবটা ঠিক কিসের, তা সে জানেনা। এ-অভূক মােচন হবে কিসে তা-ও সে বলতে পারে না। সিরিঞ্জে ওষুধ ভরে দ্রুত তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা কৌমুদীকে ধমক দেয় : এই বােস-দা, চটপট চার্ট করে নে, ভাবছি কী? মেট্রন এসে গেলাে বলে। সন্ধ্যা সাহুর আদি বাড়ি হয়ত উড়িষ্যায়, বর্তমানে যদিও খাটি বাঙালিনী। কৌমুদী তার অন্তরঙ্গ, সেও কৌমুদীর প্রধানতম সুহৃদ। এরা দুজন ১৬ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু হাসি-ঠাট্টাও যেমন করতে পারে, কর্তব্য-কাজও করতে পারে তেমনি , নিপুণতার সঙ্গে। সন্ধ্যার মুখ সব সময় হাসি দিয়ে উজ্জ্বল করা থাকে, কৌমুদীর মুখে হাসিটা কিঞ্চিৎ কম-এ-ই যা পার্থক্য। রুগীর গা ফুড়ে রক্তের মধ্যে ওষুধ চালান করে দিয়ে সন্ধ্যা ফিরতি পথে কৌমুদীর হাতে একটা চিমটি কেটে চলে যাচ্ছিলাে। চার্ট থেকে মুখ তুলে কৌমুদী ডাক্লাে : এই সাহু-দা, শােন্। আসছি। হাত-ইসারা করে সন্ধ্যা চলে গেলাে। একটু পরেই ফিরে এসে বললাে, মেট্রন এসে গেছে। ডাকছিলি কেন? বলছিলাম, পাঁচ নম্বর বেড় এর টেম্পারেচার কাল কে নিয়েছিলাে? পােড়ারমুখী তটিনীটা বােধ’য়, কেন? একশ’ তিন ? হতে পারে না কিন্তু। ওটা অম্‌নি। ডাক্তার সেনের পেট, ব’লেই চাকরিটি আছে, নইলে—চোখ দু’টো অদ্ভুত ভঙ্গীতে পাক খাইয়ে সন্ধ্যা সাহু পাশের বেড়ে গিয়ে দাড়ালাে দেখি জিভ। এরা দুটো দিব্যি আছে। প্রথম প্রথম আলাপের পর এ ওর নামের সঙ্গে দেবী শব্দটি জুড়ে সম্বােধন করতাে। তারপর সম্বােধন ভাই-এ ও তুমি-তে নেমে আসে। ক্রমে ঘনিষ্ঠতা যখন বেড়ে উঠলাে তখন তারা আপােষে মঘাংসা করে ঠিক করলাে, আর সেকেলে ভাই-টাই চলবে না, এবার থেকে তারা উভয় উভয়কে দাদা সম্বােধন করবে। নামের সঙ্গে দাদা না জুড়ে পদবীর সঙ্গে দাদার অপভ্রংশ যােগ করে তারা এ ওকে ডেকে থাকে। সাহু-দার কাছে কৌমুদীর কোনাে কথা গােপন নেই। গােলাপদি থেকে আরম্ভ করে সাধুবাবা, আর গৌহাটীর বিজন থেকে আরম্ভ করে চেরাপুঞ্জির বিজন, সব কথাই’সন্ধ্যা জানে। অতএব সন্ধ্যার কান্তিদাদা (যিনি সব্যসাচী সেন নাম ধারণ করে গল্প কবিতা লেখেন, তিনি এই সব কথা যে জাবেন, ৩ ।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু এ আর বিচিত্র কী? কান্তি সন্ধ্যার মামাতাে ভাই, সন্ধ্যার থেকে মাস দু’য়ের বড়, সেই দাবীতে দাদা। ছেলেটি অতি ছেলেমানুষ, নিরীহ, নম্র, বিনয়ী, তার ওপর ফুর্তিবাজ। লেখায় হাত ভাল। সন্ধ্যার মুখ থেকে কৌমুদীর ইতিহাস শুনে তার কল্পনা পাখা মেলে দিলাে : কৌমুদীর সঙ্গে সে আলাপ করলাে সশ্রদ্ধ বিনয়ের সঙ্গে। ভাবুকদের কাছে থেকে কৌমুদীর শ্রদ্ধা পাবারই কথা বটে। যারা কেবল জীবনের সিমেন্ট-করা পাকা রাস্তা দিয়ে সটান সিধে চলে যায়, তারা কৌমুদীকে কী ভাবে জানিনে। কিন্তু যারা প্রত্যেকটা অলিগলি তন্নতন্ন করে খুঁজে রাস্তা হাঁটে, তারাই শহরের আসল রূপ দেখতে পায় : কৌমুদী তাদের কাছে বিস্ময়। কিন্তু বিস্ময় বােধ করলাে কৌমুদীই প্রথম, যখন কান্তি তাকে দিদি বলে সম্বােধন করলাে। কান্তির ব্যবহারে, কথা বলার ভঙ্গীতে, তার বুদ্ধির প্রখরতায় ও ভাষার সরলতায় কৌমুদী দ্বিতীয়বার বিস্মিত হলাে। কান্তি বললাে, আমি অনেক কথাই শুনেছি আপনার সম্বন্ধে, কিন্তু সব চেয়ে ট্র্যাজিক ঘটনা মনে হয় সাধু-সংসদ, যদিও আপনার জীবনের ট্র্যাজিডি চেরাপুঞ্জি। তৃতীয় বিস্ময় কৌমুদীর। সন্ধ্যার ওপর মনে-মনে সে দারুণ চটুলল। বিশ্বাস করে একটা গােপনীয় কথা তার কাছে বলার উপায় নাই! হ'তে পারে কান্তি তার আত্মীয়, কিন্তু কৌমুদীর সে কে? কৌমুদীর সব কথা জানার তার কি অধিকার? সংকোচে কৌমুদীর গা শিরশির করছিলাে। অযাচিত অনুগ্রহের সুরে কান্তি ব’লে যেতে লাগলাে : আমার দ্বারা যতটা সম্ভব আমি করবাে। কৌমুদী সচকিত চোখে তাকালাে : কিসের কথা বলছেন? বিজনবাবুর কথা বলছিলাম, তার খোঁজ করা দরকার না? তিনি হয়ত আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, আর আপনি এখানে বন্দী হয়ে বসে আছেন ? •• শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কান্তি বলে কী? বন্দী ? কোথায় বন্দী সে? সে তত মুক্ত! তার মত.এমন মুক্ত ক’জন আছে ? কৌমুদী বললাে, অতটা কষ্ট স্বীকার আপনাকে করতে বলিনে। দেখুন কৌমুদী-দিদি, আপনিও অতটা ত্যাগ স্বীকার করবেন না। একবার চিন্তা করে দেখুন সেই ভদ্রলােক কত জায়গায় যেন আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, খুজে পাচ্ছেন না। তার মনের ভাবটা একবার কল্পনা করুন। -কান্তির দুই চোখ ধুসর দেখালাে, বললাে, উহু, তার খোঁজ করা দরকার। তবে করুন্ খোঁজ। কৌমুদী যেন তাকে অনুমতি দিয়ে উপকৃত করলাে, তার বলার ভঙ্গীটা এমন। করবাে। গভীর চিন্তার তল থেকে একটা বুদ্বুদের মতাে শব্দটি বেরিয়ে এলো। কৌমুদী কান্তির চোখের দিকে তাকালাে। তার দৃষ্টি তখন টেবিলের ফুলদানির গা ঘেষে টেবিল-ল্যাম্পের পাশ দিয়ে উন্মুক্ত জানলা পেরিয়ে বাইরে গিয়ে ফাকা হয়ে গেছে। সেই আবছা দৃষ্টি দিয়ে কান্তি দেখতে পাচ্ছে, একটি ছিপছিপে ছেলে তানপুরায় গম্ভীর সুর তুলে ডান হাত শূন্যে পাক খাইয়ে ধ্রুপদ আলাপ করছে। কান্তি প্রায়ই আসে। তার কবি-সুলভ সরলতার গুণে কৌমুদীর প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে সে পেরেছে। কান্তির জীবনের এটা লাভ কি ক্ষতি, তা জানিনে। তবে, কৌমুদীর সত্যি লাভ। সহানুভূতির গদগদ ভাষা সে কান পেতে ধৈর্য ধরে শুনতে পারে না বটে, তবে কান্তির নির্ভীক বাকপটুতায় সে মুগ্ধ। তটিনী জাতীয় কয়েকটি মেয়ে ইতিমধ্যে সরস পরিহাস করতে আরম্ভ করেছে : কিন্তু কৌমুদী সে পরিহাসকে তেমন আমল দিচ্ছে না। কান্তি বললো, আমি বিজনবাবুকে দেখার জন্যে সত্যি বড় ব্যাকুল হয়েছি। কলকাতার নাম করা গানের আঙ্গুলাে আমি খুজলাম, :

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু পেলাম না। আচ্ছা কৌমুদীদি, বিজনবাবু কলকাতায় আছেন, এ-কথা নিশ্চিত আপনার মনে হয়। কেন হবে না। কৌমুদী একটু থেমে আবার বললাে, হয়। কিন্তু কেন, তা জানিনে। কান্তি বললাে, আমারাে হয় কেন-যেন। মনে হয়, এই বুঝি আমার পাশ দিয়ে রাস্তা হেঁটে চলে গেলেন, এই বুঝি আমারি সঙ্গে ট্রামে উঠলেন। কৌমুদী ব’ললল, এ হলাে নিছক কবিতা। আপনারা কবি, আপনাদের ও-রকম কল্পনা করা কঠিন নয়। কিন্তু আমরা নীরদ-তরুবরও নই—একেবারে শুষ্ক-কাষ্ঠ, আমাদের মনে ও-সব অসম্ভব আশা ঢােকেই না। ঠাট্টা করলেন ? কান্তি হঠাৎ যেন চমকে উঠলাে। হাই তুলতে তুলতে সন্ধ্যা এসে গেলাে। রাত্রে রুগী পরিচর্যার পর দ্বিপ্রহরের নিদ্রাসুখ কতটা উপভােগ্য—সন্ধ্যার মুখে তার বিজ্ঞাপন আঁটা। সন্ধ্যা এসেই বললাে, বােস-দা, সাবধানে কথা বলিস ওর সঙ্গে, ও বড়ড সেসিটিভ। দুনিয়ার সমস্ত লেখক ওকে কেবল ঠাট্টাই করে ! কান্তির মুখ আরক্ত হলাে, তার মুখ দিয়ে প্রতিবাদের কথাই বার হ’লােনা। কাপড়ের কেঁচা জুততার ওপর ছড়িয়ে দিতে দিতে সে কী-যেন বলার চেষ্টা করে হঠাৎ বলে ফেললাে, চললেম। বলার সঙ্গে সঙ্গে উঠে সে চলতে আরম্ভ কবলাে, এক মুহূর্ত আগেও সে চলার জন্যে তৈরি ছিলােনা। তার অসতর্ক মুখ থেকে হঠাৎ কথাটা অজানিতেই বেরিয়ে পড়েছে। সাহু বললাে, এই কান্তিদা, যা কোথায় ? কৌমুদী বললাে, আচ্ছা মানুষ তাে! মাথায় ছিট আছে নাকি? } শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু • কান্তি ততক্ষণেপীচের রাস্তা ধরে হহ করে হেঁটে চলেছে। অদ্ভুত! একই সঙ্গে সন্ধ্যার আর কৌমুদীর মুখ দিয়ে শব্দটা বেরিয়ে পড়লাে। অদ্ভুত! সেই সঙ্গে আমার মুখ দিয়েও শব্দটা বেরিয়ে এলাে এইমাত্র, যখন খাম খুলে দেখলাম তােমার ফঁাপা ফাপা হস্তাক্ষর, তােমার অভিসম্পাতের ভাষা। অদ্ভুত ছাড়া আর কী বলবো? তুমি আমাকে অভিশাপ দাও ! নীরব থেকে যেভাবে তােমার মনে যন্ত্রণার সৃষ্টি করছি তার শতগুণ জ্বালায় আমাকে নাকি জ্বলতে হবে। হাসি পাচ্ছে। কান্তির অদ্ভুত আচরণের কথা লেখা স্থগিত রেখে এখন যদি তােমার অদ্ভুত আচরণের কথা লিখতে আরম্ভ করি, তবে, হে পঞ্চমি, আমার কাহিনীর গতি ঠিক রাখবাে কি করে ? এই মাত্র কান্তিকে রাস্তায় হনহন্ করে হটিয়ে দিয়েছি, ভেবেছি, তাকে নিয়ে এবার খানিকটা রহস্য করা যাবে। এমন সময় তােমার অভিশাপ ! চিঠিটা তুমি শেষ করতে দেবে না? জানি, তােমার জ্বর একশ’ ছয় ডিগ্রি। সামান্য ব্যাপার! শতকের ঘরে কেন, হাজার দু’হাজার জরই যদি না হলে, তবে তােমরা মেয়েঘানুষ কিসে? তােমরা তিলকে তাল করতে ভালবাসাে। অবিশ্বাস করছি ভেবােনা। স্বীকার করছি তুমি খুব অসুস্থ। শেলাই শেখানাে হচ্ছে না, তার ফলে রােজগার কমেছে অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে। ডাক্তার নাকি ডাকবেনা—আমাকে ভয় দেখিয়েছ। আচ্ছা, আর দশ দিন সময় দাও, এর মধ্যে চিঠি শেষ করবােই। এ-চিঠি শেষ করার আগে খুচরাে একটা চিঠি দেওয়া যায় বটে, কিন্তু দেব না। একবার যে-প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছি, তা এত সহজে ভেঙে লাভ নেই। এই, হয়ে এলাে বলে। আর দশটা দিন! এ কটা দিন সবুর করতে পারবে না? এবার দ্রুত চললাে আমার কলম, হহ করে কান্তিকুমারের মত। কান্তির পলায়নের পরের পরদিন সন্ধ্যা একটি চিঠি পেলাে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু,
কল্যাণীয়া, ঠাট্টা সারেগামা
নিখাদে নামায় হাস্যের নিধাপা-।
উদার উদারা ত্বরিতে তারা-য় উঠে
তারায় তারায় টিটকারী দিতে থাকে।
হয়ত পারেনি হয়ত মারেনি গাধা-
তবু তার কেন মানিনিরে সুরে সাধা?
তালান তাই কাদে সুধু পারমাধা।
বিজপ করে হলের সানি-কে।
সারিগমে আল সারিগান গাও, নাচো।
আমি ভাল আছি, তােমরা কেমন আছে ।
চিঠিটা পড়ে সন্ধ্যা আর কৌমুদী হেসে অস্থির। কবিরা সাধারণ শ্রেণীর
লােক নয়—এ কথা তারা স্বীকার করে ; তারা যে অস্বাভাবিকও, এতটা যেন
সন্ধ্যারা জান্তাে না।
কান্তিকুমারকে কেন্দ্র করে ক্রমশই তাদের মধ্যে নানারকমের আজগুবি
গল্প আরম্ভ হ'লল। কোন্ দেশের কোন্ কবি কবে কি কি অদ্ভুত আচরণ
করেন, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তারা অবসর সময়টা কাটাচ্ছে। তাদের গল্প
কবির পর্যায় থেকে শিল্পীর পর্যায়ে নেমে এলাে (যদিও কবি ও শিল্পী দুই
নামের একই জীব বলে তারা জানে)। স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে তখন
তারা পৌছে গেছে : শিল্পী ভ্যানগাে-র গল্পটা সন্ধ্যাকৌমুদীকে শােনালাে :
বেচারার সেই কানকাটার গল্পটা। একটা মেয়ের বায়নার জোগান্ দিতে
গিয়ে বেকুব শিল্পীটা নিজের কান কেটে সেই কাটা-কানটি পার্সেল করে
পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মেয়েটার কাছে। সন্ধ্যার কান্তিদা অবশ্য অতটা বেকুব
নয়-সন্ধ্যা সগর্বে তা কৌমুদীকে শুনিয়ে রাখলো। তবে কান্তি নাকি
একদিন একটা অচেনা মেয়েকে নিজের ছাতিটা দিয়ে তুমুল বৃষ্টি মাথায় করে
।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
ভিজতে ভিজতে বাসায় ফেরে। সে-
টিনী নাকি আজো কান্তিকে
শুনতে হয়।
'কৌমুদী ব’ললাে, কিন্তু সাহু-দী, এ তাের বড় অন্যায় ! কান্তিবাবুর
কাছে আমার গল্প করা তাের ঠিক হয়নি। উনি বিজনবাবু বিজনবাবু করে
আমাকে প্রায় ক্ষেপিয়ে তুলেছেন।
সন্ধ্যা হাতে হাতে ব’ললল, কেন, বলে কি?
বলবেন আর কি! উনি নাকি বিজনবাবুকে খুঁজে বার করবেনই।
বিজনবাবু নাকি যে ট্রামে উনি ওঠেন, রােজ সেই ট্রাম থেকে নেমে যা :
যে রাস্তায় উনি হাঁটেন সেই রাস্তা দিয়ে ওঁর গা ঘেষে চলে যান।
সত্যি? সন্ধ্যা আকাশ থেকে পড়লাে : কই, আমাকে তাে এ-কথা
বলেনি! আচ্ছা চাপা ছেলে তাে কান্তিদাটা !
কৌমুদী না হেসে পারলােনা: তুইও ক্ষেপলি, সাহু-দা? কল্পনা, কল্পনা !
তোর কান্তিদা নাকি বােজ কল্পনায় তাকে ওই ভাবে দেখেন।
সন্ধ্যা বললাে :এই ? আমি ভাবলাম বুঝি গদ্য, এ নিছক পদ্য তবে ?
যা বলেছিস! একেবারে নীরস পদ্য, সাহু-দা।
দরজার সামনে সশরীরে কান্তিকুমারের আবির্ভাব। সন্ধ্যাকে লেখা
তার চিঠিটা তখনাে কৌমুদীর হাতে। কৌমুদী সেটা
আঙুলে
জড়াচ্ছিলাে
আর গল্প করছিলাে।
নীরস, পদ্য ? কান্তিকুমার সলজ্জ অথচ উদ্ধত পায়ে এগিয়ে এলাে :
কোষ্টা নীরস পদ্য, কৌমুদী-দি ? আমার লেখাটার কথা বলছেন ? ওটা
তাে পদ্য নয়, ওটা চিঠি।
সাহু সহাস্য উল্লসিত গলায় বলে উঠলো : এখনাে সারেনি, এখনাে
সারেনি মাথা। আটকে গেলাম। মাথা-র সঙ্গে কি মিল দেব, কান্তিদা?
বললা! চুপ করে রইলে কেন?

।' শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু মাধা-র সঙ্গে? হঠাৎ এ-প্রশ্ন কেন ? কান্তি নিষ্প্রভ গলায় বললো : মাবা. মানে ? মাধা নয়, মাথা-তােমার মাথা। সারিগমের সুর এখনাে মাথার মধ্যে সরগরম বুঝি ? মাথার রােগ তােমার আর সারলাে না, কান্তিদা। বললে হয়ত বলবে-যে ঠাট্টা করছি, কিন্তু ঠাট্টা নয়। তুমি মাথার চিকিৎসা করাও। সন্ধ্যা সবিনয়ে অনুরােধ করলো। কৌমুদী বিপন্ন ভঙ্গীতে বসে ছিলো। প্রত্যেক মুহূর্তে সে আশঙ্কা করছে, এই বুঝি কান্তি তীব্র মন্তব্য করে তীর বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু কান্তি হালাে। আশ্চর্য, কান্তি ছেলেমানুষের মত ঠোট টিপে হাসছে। কান্তি ব’ললল, সন্ধ্যাটা দিন দিন চূড়ান্ত ফাজিল হচ্ছে। যথা? সন্ধ্যা একটু যেন কান্তির দিকে ঝুঁকলাে : ফাজিলটা কোথায় আমায় পেলে, বলল ! আচ্ছা বােদা, তুই-ই ব, আমি ফাজলামাে করলাম? কৌমুদী বললাে, কী জানি ! কার পক্ষ হয়ে কথা বলবো, সেটা আমাফে আগে বলে দিতে হবে তাহলে। উভয়পক্ষ হ'য়ে বলুন! কান্তি পরামর্শ দিলাে। কিন্তু কারু পক্ষ হয়েই কৌমুদী কথা বল্‌তে রাজি নয়। সে মনে মনে হাতে লাগলাে আর মনে-মনেই সন্ধ্যার রচিত লাইনটা আওড়াতে লাগলাে : এখনাে সারেনি, এখনাে সারেনি মাথা। সত্যিই, কান্তির পাগলামােটা বেশ উপভােগ্য লাগে কৌমুদীর। কবিদের বুঝি এমনি একটু আধটু মাথায় ছিট থাকে। কান্তি বলল, বললেননা তাে। বেশ, আমার পক্ষ হয়েই 'বলুন! স্বার্থ ! তাতে বােস-দার স্বার্থ কী? মাঝখান থেকে সন্ধ্যা আপত্তি জানিয়ে উঠলল : তার-চে আমার দিক টানলে লাভ আছে। আমরা সব সময় এক সঙ্গে আছি, এ ওর সাহায্য চাই। ১০৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ০ কেন? আমি কি কিছুই সাহায্য করতে পারিনে ? আচ্ছা, বেশ! এই শেষ কথা শুনে রাখুন কৌমুদী-দি, বিজনবাবুকে যদি কেউ খুঁজে বার করতে পারে, তবে সে এই সব্যসাচী:সেন। লজ্জায় কৌমুদীর মুখ আরক্তিম হ’লল। সে সঙ্কুচিত হলাে বেশি সন্ধ্যার কাছে। সন্ধ্যা হয়ত ভাবছে যে, কান্তিকে কৌমুদীই বিজনের খােজ করার জন্যে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। বিজনবাবু গান জানেন, আমি লিখি কবিতা। আচ্ছা আসি তবে। দুঠাৎ কান্তি সােজা হয়ে দাড়ালাে : আবার আবে, সুবিধে পেলেই। কান্তি চললাে, দ্রুত পায়ে সে চললাে। ঘরটা পেরিয়ে এক মিনিটের মধ্যে বারান্দা ডিঙিয়ে তরতর করে সিড়ি বেয়ে শুরকির রাস্তায় জুতাের সরসর শব্দ করতে করতে হাসপাতালের এলাকা পার হয়ে সে সদর রাস্তায় পৌছে গেছে। রাস্তায় দু’পা হাঁটার পরেই একজনের সঙ্গে তার রীতিমত ‘ধাক্কা লেগে গেলাে। মুহূর্তের জন্যে দু'জন দু’জনের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলাে, সব্যসাচীর পােষাক সাধারণ বাঙালীর মত, আরেকজনের পরনে খাকির হাফপ্যান্ট ও থাকির শার্টের ওপর পুরু কোট। উভয়পক্ষ একই সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিপরীত রাস্তা ধরে চললো। কেউ কাৰু পরিচয়টা পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করলােনা। কান্তি বিজনকে এতাে কাছে পেয়েও ছেড়ে দিলাে! এই মাত্র সে কিন্তু কৌমুদীর কাছে প্রতিজ্ঞা করে এলাে। সাহু-দা ও বােস-দা ভেবে অস্থির। অনেকদিন কান্তির কোনাে খবর পাওয়া যায়নি। ভাবপ্রবণ লােকদের নিয়ে কারবার করায় বিপদ অনেক। কোন্ সাধারণ কথা কিভাবে তারা গ্রহণ করে, বলা কষ্ট। আমি তােমার কাছে চিঠি লিখতে অক্ষরে অক্ষরে ভেবে অস্থির হচ্ছি : তুমিও-যে ভাব- প্রবণ। তার ওপর তুমি অসুস্থ। সুস্থ অবস্থাতেই যখন তােমার মেজাজ ঠিক থাকেনা, এখন তাে না থাকারই কথা। আমি লিখছি আর ভাবছি, D -- শ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু তুমি সুদুর টাঙাইল গ্রামের জনবিরল পল্লীতে তােমার লাঘেরা ঘরে শুয়ে একা একা কাত্যাচ্ছ। হয়ত এ আমার কল্পনা। হয়ত তুমি ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। কিন্তু ভাবতে আপত্তি কি? একজন আর-একজনের জন্যে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে, এই কথা যখন আর-একজন জানতে পারে, তখন সে মনে মনে কি গর্বিত হয় না? হয়। কিন্তু কৌমুদীদের হাসপাতালে যে-ভদ্রমহিলা গতকাল এসে ভর্তি হয়েছেন, এখন তার জ্ঞান নেই। অসহ যন্ত্রণায় তিনি অচেতন। তা না হলে তিনি হয়ত এই যন্ত্রণার মধ্যেও খানিকটা সান্ত্বনা পেতেন এই কথা ভেবে-যে তার স্বামী তার কুশলসংবাদের জন্যে উৎকণ্ঠ প্রতীক্ষায় ভিজিটারদের ঘরে বসে আছেন। বার বার তিনি হাতের ঘড়ি ও দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। তার মনে হচ্ছে, সময় যেন খোঁড়া হয়ে গেছে, চলতে পারছে না। প্যাসেজে কোনাে নাসের পায়ের শব্দ শুনতে পেলেই তিনি একটু সােজা হয়ে উঠছেন, পরমুহূর্তেই হতাশ হচ্ছেন। তার সাত বৎসরের বিবাহিত জীবনের এই প্রথম সন্তান হবার দিন আজ। সন্তানলাভের সমস্ত আশা যখন প্রায় নির্মূল হয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন ঈশ্মিতের আগমনের সূচনা দেখে তাদের কী আনন্দই-না হ’লল। মাসের পর মাস তারা কাটালেন উৎসবের পর উৎসব করে। তার ঐশ্চর্যের উত্তরাধিকারী ছিল না, আজ তার আগমনের দিন। কিন্তু এ-দিন এত উৎকণ্ঠায় তার কাটবে, তা তাে তিনি ভাবেন নি। নতুন অতিথিকে অভ্যর্থনা করার জন্যে তিনি কলকাতার উপনগরীতে নতুন গৃহ- নির্মাণের আয়ােজন করেছেন। হঠাৎ সেখানে ধূমকেতুর মত আবির্ভাব ঘটলে সন্ধ্যার। ভদ্রলােকটি তাড়াতাড়ি সােজা হয়ে দাঁড়ালেন। সন্ধ্যা বললো, কেবিন টুয়েটিটু। আপনি ? আসুন। কৌমুদী এখন তার ঘরে ঘুমােচ্ছ : সারারাত ডিউটি করে সে পরিশ্রান্ত। t ১০৬ : শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ঘুমের মধ্যে সে বিজনকে ভাবছে, না, কাতিকে ভাবছে? সত্যপঠের আশ্রম, শিকারী ভদ্রলােক অথবা উমার কথাও যে ভাবতে পারে বটে। সন্ধ্যা ডিউটির মাঝ থেকে ছুটে এসে কৌমুদীকে ধাক্কা দিলাে : এই বােস-দা, বােস-দা, ওঠ ! শােন, কেবিনের বৌ-টা মারা গেলো রে । কে? কে মারা গেলাে ! মুখের ওপর এলােমেলাে চুলের ভেতর থেকে স্তিমিত চোখে তাকিয়ে কৌমুদী উঠে বলে : কি বললি। চট করে ওয়ার্ডে আয়। ভদ্রলােকের কাণ্ড দেখে যা, আহা বেচারা। কেবল ইংরাজি আওড়াচ্ছেন আর লাফালাফি করছেন, বৌটা তার কথার জবাবই দিচ্ছে না।' বেবি ? আর বেবি! সন্ধ্যা তাচ্ছিল্যের সুরে বললো, বেবি আর হ'লে কই : হবার আগেই-যে ইতি! আসবি তত আয়, আমি চলেম। সন্ধ্যা চলে যাবার পাঁচ মিনিটের মধ্যে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে কাপড় বদলে মুখে থেকে চুল সরিয়ে কৌমুদী ওয়ার্ডে এসে হাজির। বৌ-টার মুখ থেকে অসই যন্ত্রণার ছায়া এখনাে মােছেনি। টেবিলের চারদিক ডাক্তারে ও নার্সে বােঝাই। ভিড় ঠেলে কৌমুদী আর একটু এগিয়ে গেলাে। যন্ত্রণার ছায়ার ভেতরেও বৌ-টার কষ্টসহিষ্ণুতার ছবিও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কৌমুদীর পাশ থেকে শব্দ এলাে : with your permission, ডাক্তারবাবু, আমি ওর মুখটা ঢেকে দিতে পারি ? কৌমুদী চমকে উঠলাে। শব্দ লক্ষ্য করে তাকাতেই দু’জন চোখাচোখী পড়ে গেলাে। শিকারী ভদ্রলােক অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে। কৌমুদী আশ্চর্য হয়ে গেলাে, ভুজালীটা তবে তাকে সেদিন প্রতারণা করেছে! ১০৭

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
আপনি, আপনি এখানে? শিকারী ভদ্রলােক হয়ত কৌমুদীর দিকে এক
পা এগােলেন।
সন্ধ্যা কৌমুদীর দিকে তাকালাে, কৌমুদী তা লক্ষ্যই করলাে না,
ভদ্রলােকের প্রশ্নের জবাব দেবার কথাও তার হারিয়ে গেছে যেন। বললাে,
রুগী দেখতে।
এর কিছুদিন বাদে আর একটি কেবিনে অসুস্থ কৌমুদী জ্বরের ঘােরে
প্রায় অচেতন অবস্থায় শুয়ে ছিলাে, পাশ ফিরে তাকাতেই সে-যেন পরিচিত
একটা মুখ দেখে চমকে উঠলল, ভয়ার্ত চোখে সে বললাে, আপনি, আপনি
এখানে ?
শিকারী ভদ্রলােকটি বললেন, রুগী দেখতে।
তবে এখানে কেন ? যা! অনুনয়ও নয় আদেশও নয়, কৌমুদীর রুগ্ন
গলায় কোনো ভাবই ফুটলাে না।
কোথায় যাবাে ?
রুগী দেখতে।
রুগীই তাে দেখছি। কেমন বােধ করছেন এখন? ভদ্রলােক একটু ঘনিষ্ঠ
হ’য়ে বলেন : হঠাৎ এমন হলাে কেন? জবাব দিন! ওকি, চাদর সরান
মুখ থেকে ! নাঃ, আপনি বড় ছেলেমানুষ।
কৌমুদী নীরব। ভেতরে রােগের যন্ত্রণা, বাইরে থেকেও হাজির হলাে
আর একটি rogue, তার অসুস্থতাবােধ বেড়ে গেলাে।
অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর শিকারী ভদ্রলােক দার্শনিক গাম্ভীর্যে
বলতে লাগলেন, আমার স্ত্রীর অভিশাপ এটা। যেভাবে তাকে আমি
উপেক্ষা করেছি, সেই ভাবেই উপেক্ষা পাচ্ছি। আপনার দোষ নেই।
কৌমুদীর অসহ্ন বােধ হ’লল, বললাে, উঃ !
।
Job

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু খুব যন্ত্রণা হচ্ছে বুঝি? শুলাম ডানদিকের লাঙ এ প্যাচ দেখা গেছে। হঠাৎ এমন হবার মানে কি বলুন তাে! শিকারী ভদ্রলােক লক্ষ্য স্থির করে ভালাে হয়ে বসলেন। কৌমুদী শুয়ে শুয়ে যত দূরে তাকানাে সম্ভব তাকিয়ে সাহুদাকে খুঁজলাে। সাহু নেই, মার্গারেট তখন ওদিকে রুগীর মুখে ওষুধ ঢালছে। এই টাশ- মেয়েটির সঙ্গে তার বিশেষ বনিবনা না থাকায় সে তাকে ডাকলো না, কিন্তু তার বুকের ডানদিকের ব্যথাটা বেশি বােধ হ’তে লাগলাে। দুঃখের সময় পরম আত্মীয়ের দূরে স’রে থাকার চিরকালীন নিয়মের কথা একদা সে সনাতন- বিয়ােগের পর মনে ভেবেছিলাে, আজ অনেকদিন পরে সেই কথাটিই তার মনে খোঁচা দিলাে। অমন করছেন কেন? বিরক্ত হয়ে কোমুদী বললাে, কেমন করছি? আপনি আজ যা। কি অসুবিধে হচ্ছে, বলল ! শিকারী ভদ্রলােক একটু গদগদ গলায় বললেন, যাতে আরাম হয় তার চেষ্টা করতে পারি ! তুমি বলে ফেললাম, রাগ করােনা। রাগ বা অভিমান করার মত মনের বা শরীরের অবস্থা তার নয়। অথচ তার এখন ভীষণ রাগ হলাে। হাসপাতালের এক নিরালা কোণে নিরিবিলি সে শুয়ে ছিলাে, হঠাৎ সেখানে এভাবে সে এমন অনাহুতের আবির্ভাব আশা করেনি। কিন্তু মানুষ যা আশা করে তাই হয়, যা আশা করে তা দুরাশা মাত্র। সাহু-টা এখন উধাও হয়েছে। আপনি আমাকে একটু জল দি। জল ? শিকারী ভদ্রলােকের হৃদয় হয়ত জল হয়ে গেলাে, বললেন, এই সামান্য ব্যাপারের জন্যে এত ছটফট করছে, কিন্তু বলছ না! এই নাও। সে কি, আমি ঢেলে দিচ্ছি, শশাও।

• শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু সনাতনের মুখে এইভাবে কৌমুদী বালি ঢেলে দিতো। শিকারী ভদ্রলােকটি বললেন, শিকারে বেরিয়ে অনেকদিন পরে ফেরার পর আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করেছিলাে আমার বুকের ডান দিকে কাটা দাগটি এলাে কোথা থেকে : আমি কিছু বলিনি। কিন্তু তার ধারণা হয়েছিলাে, ওটা বাঘের থাবা। তাই আমাকে বলতাে, আর শিকার করে কাজ নেই। তাকে উপেক্ষা করেছি বরাবর, আজও সে অভ্যাস ছাড়তে পারিনি। সে-রাত্রে তুমি যেভাবে আচমকা আমাকে আক্রমণ করলে তা ভেবে আজও আমি ভয়ে কেঁপে উঠি। জানাে, রাগী, বাঘের চোখ দেখেও আমার নিশানা ঠিক থাকে, হাত কেঁপে যায় না, কিন্তু—যাগে। দোষ আমারি, ভেবে দেখেছি। আগে চাই আন্তরিক টান , সান্নিধ্য পরে। আমার হিসেব ভুল হয়ে গিয়েছিলাে, কিন্তু কী আশ্চর্য বলল, টান যদি না-ই থাকবে তাহলে আবার এভাবে দেখা হয় ? কি, আর একটু জল দেবে? । জল চাইনে। শ্রান্ত গলায় কৌমুদী বললাে, আমি একটু ঘুমবে। ঘুমােও। দেখি, বালিশটা ঠিক করে দিই। ভদ্রলােকটি কাজে লেগে গেলেন। বললেন, রােগের ওষুধের চেয়ে পরিপূর্ণ বিশ্রাম ও অপর্যাপ্ত ঘুম বেশি উপকারী। নাঃ! কিছুতেই তার রেহাই নেই। সাহু সাহু সাহু। আর যেন সে আসে। তার ওপর কৌমুদী ভয়ানক রেগে যাচ্ছে। সে কি জানেনা-যে, বন্ধু-হিসেবে না হােক না-হিসেবেও মাঝে মাঝে তার রুগী দেখে যাওয়া কর্তব্য। এমন সময় এলে কান্তি। বিনা ভূমিকায় সে ব’লে যেতে লাগলাে : আশ্চর্য, আপনার অসুখ? কী আশ্চর্য, কিছু জানিনে। দেখুন, দু-তরফা অভিমান হলেই সংসার অচল হয়ে যায়। আমি না-হয় আর্টিনে, আমাকে ডেকে পাঠাতে হয়। ১১০ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কান্তির অপ্রকাশিত আগমনে কৌমুদী অনেকটা হাল্কা বােধ করলাে। তার দু-বেণী করা চুল এলােমেলাে ও রুক্ষ হয়ে গেছে। কান্তি চুল সরিয়ে কপালে হাত দিলাে। শিকারীকে সে-যেন লক্ষ্যই করেনি। বললো, জ্বর এখনাে আছে। শুলাম প্লুরিসি। ছুটে এলাম। এখানে এসে মেট্রনের কাছে শুলাম নিমুনিয়া। চেয়ার ছিলাে বিছানার পাশে একটাই, সেটি শিকারী অধিকৃত। কান্তি হাসপাতালের নিয়ম জানে, তবু সে কৌমুদীর বিছানার একপাশেই বসে পড়লাে। কান্তি এতক্ষণে বললে, ইনি কে, কৌমুদী-দি ? কৌমুদীর জবাব দেওয়ার আগেই শিকারী ভদ্রলােকটি আত্মপরিচয় দিলেন : আমাদের আলাপ হয় গৌহাটীর হােটেলে। আমি এখানকারই বাসিন্দ যদিও। আপনি ? আমি? কান্তি নিজের বুকে বুড়ােআঙুল ঠেকিয়ে বললাে, আমার পরিচয় চান্? আমার পরিচয় কি দেব বলুন! আমি কেহ নই, আমি শুধু এক কবি ;-এ গল্পটা জানেন? জানেন না? তবে, সােজা করে বলি শুনুন, আমি ধূমকেতু! হঠাৎ আসি"হঠাৎ পালাই। চ'লে তো যাই, কিন্তু কিছু একটা কাণ্ড না করে যাইনে। অর্থাৎ? শিকারী ভদ্রলােকটি তার বয়সােচিত গাম্ভীর্য ধারণ করে ব’ললেন: একটু একটু বুঝতে পারছিলাম, আবার সব গােলমাল হয়ে গেলাে। কৌমুদী অনেকটা আরাম বােধ করছে। তার মুখ এখন একটু উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। কান্তি সেদিকে একটু তাকালাে, বললাে, গােলমাল হবার কিছু নেই। আমি একজন পরিচয়হীন যুবক,কবি কীটসকে চেনেন? • দেয়ার-ওয়াজ-এনটি-বয়,-অ্যাণ্ড-এনটি-বয়-ওয়াজ-হি-এ গল্পটা জানেন ? •• ৫ ১১১ 1 শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু জানেন না, তবে তো মুস্কিল। যদি বলি, আয়্যাম্ এ নিউফাউণ্ডল্যাণ্ড ডগ ওয়াগিং মাই লিটারারী টেল, তাহলে কিছু নিশ্চয় বুঝবেন ? বুঝবেননা? তবে শুনুন, আমি এর ভাই। এবার আপনি নিশ্চয় বুঝেছেন ? এখনাে আমি হয়ত সম্পূর্ণ ক্লিয়ার হইনি, কি-রকম ভাই, তা বলিনি। সেটা আর বলবােও না। হাচেন ? ঠাট্টা ভাবছেন? দেখুন, ভদ্রতাজ্ঞান আমার কত বেশি। আমি আপনার পরিচয় চাইলাম, আপনি দু’কথায় সংক্ষিপ্ত- সার জানালেন। আর আমি ! আমি খুটিনাটি করে একেবারে নিজেকে মেলে ধরলাম। কৌমুদী কান্তির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, তার ঠোট দুটো একটু ফাক করা। কান্তির আচরণ দেখে সে অবাক হয়ে গেছে। আজ হয়ত কান্তি মূডএ আছে। শিকারী ভদ্রলােকটি বললেন, এবার উঠি। আবার কাল আসবে। নমস্কার, আপনার নামটা কিন্তু কান্তি ব’ললল, পরিচয়টা নামের গণ্ডি টেনে সংকীর্ণ করে দেবেন না, আমার নাম কান্তি কুমার। অনেকে ভুল করে, বলে, কান্তকুমার।তারা পদবী জানতে চায়। কুমার আমার মধ্যমা নয়, প্রান্তিকা। আচ্ছা নমস্কার, আবার দেখা হবে। শিকারী ভদ্রলােক চলে গেলে কান্তি বললাে, এবার বলুন, কেন অসুখ করলাে । বা রে! অসুখ কেন করলাে! আজ কি হয়েছে আপনার, খুব ফুতি দেখছি। খুব কথা বলছেন। কোন শুভসংবাদ নিশ্চয় ! দারুণ শুভসংবাদ, কৌমুদী-দি। দিগ্বিজয় করে এসেছি : আমি অপবাদ বহন করে এসেছি। অসুখের মধ্যেও কৌমুদীর উৎসাহ কম নয়, বললাে, কি রকম? : ১১২ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কি রকম, শুনবেন ? বলতে নিজেরই ঘৃণা বােধ হচ্ছে। অনুন, না বললে আরাম পাচ্ছিনে। কিছুদিন আগে কোনাে-এক বন্ধুর বৌ-এর কোনাে এক গােপনীয় অসুখের জন্যে বন্ধুকে নিয়ে কোনাে-এক আত্মীয় ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তারটির ধারণা হয়, বন্ধু শিখণ্ডি, দায় আমার। তিনি টান কুৎসা। কুৎসা সংক্রামক ব্যাধির সামিল, আপনি জানেন।—অচিরে ছড়িয়ে পড়লাে আত্মীয়মহলে। সেই সুযােগে কোনো এক আত্মীয় অজ্ঞাত- কারণে কুৎসা-কাহিনী আরাে ফেনিয়ে তােলেন। এতেও আপত্তি ছিলােনা। দয়া করে, উদ্বৃত্ত দয়া ঠার, তিনি রটনা করেন, যা রটনা করেন বুঝতেই তাে পারছেন ! আর বলে লাভ কি? কি ব্যাপার জানেন, ঘৃণাবােধ কেন হয় জানেন? সেই আত্মীয়াটি আমারি সঙ্গে আমার বাল্যে কিছুকিছু ছেলেমানুষী করতেন। আমি তখন তার হাতে আত্মসমর্পণ করে আড়ষ্ট হয়ে তার পীড়ন সহ্য করতাম : প্রতিবাদের সাহস পেতাম না। আজ তিনি সাধ্বী সেজে এ-ভাবে আমাকে ঘৃণিত করবেন, এতটা আশা করিনি, কৌমুদী-দি। আত্মীয়াটি আমার চেয়ে হয়ত কিছু বড়, বয়সের সেই সুবিধে তিন্নি এভাবে নেবেন, এতটা আশা করা যায়না। অশেষ গুণ তার কৌমুদী-দি, অশেষ গুণ। আর ভাইএর, মৃত্যুর কারণ সে। একই সঙ্গে বহু প্রেমিকের লীলাসঙ্গিনী হবার দরুণ, তার প্রেমে অন্ধ তারই খুড়তুতাে ভাই অসহ্য আত্মগ্লানিতে আত্মহত্যা করে। বিয়ের পরেও এই ব্যাধি তার যায় না, ফলে একবার তার স্বামীও তাকে পরিত্যাগ করে কিছুদিনের জন্যে। কি নাম তার ? নাম শুনে কি করবেন বলুন ! নামটা গােপন থাক্। বলুন কৌমুদী-দি, পৃথিবীতে এমন মানুষ কেন থাকে? পৃথিবীর একী লীলা ! কৌমুদী হাসবার চেষ্টা করে পাশ ফিরে শুলাে। বললাে, কত রকমেরই মানুষ আছে ! যার মন যে-সুরে বাঁধা, সে সেই সুরই শুনবে।—ভিন্ন সুর থাকতে পারে, এ ধারণা তাদের থাকতে পারে না। ওর জন্যে মন খারাপ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু করে লাভ নেই। চঁাদেরও কলঙ্ক আছে, সেজন্যে চাদ কি মুখ ভার করে : বসে থাকে ? সে হাসিমুখে চলাফেরা করে, নিজের কলঙ্ক নিয়ে সে এতটুকু বিপন্ন নয়, এতটুকু ভাবিত নয়, কান্তিবাবু। কেন মন খারাপ করছেন? প্রতিশােধ চাই ! কৌমুদী-দি, কুনামের তাপে আমি জলছি না, প্রতি হিংসার আগুনে পুড়ছি। আমার ইচ্ছে করছে, কি করে আমি তার স্বরূপ প্রকাশ করে দিই। চুপ করুন। সাহু-দা নেই এদিকে ? একবার দেখুন না। । আমি এবার যাবাে। সন্ধ্যার সঙ্গে দেখা করতে গেলে সন্ধ্যে হয়ে যাবে, আমার অনেক কাজ,জানেন না তাে, কত কাজ আমার ! কান্তি উঠে দাড়ালাে। কৌমুদীর ভারি হাসি পােল কান্তির পাগলামােতে। সে তার মুখের দিকে তাকালাে, চোখ দুটো যেন জ্বলছে : রাগী বাঘের চোখের মত। কান্তি বসে পড়লো : না, কিছু কাজ নেই। কাজ কাজ কাজ। কি হবে, কাজ দিয়ে ? কিছুদিনের ছুটি নেব আমি—হয় পুরী, নয় নৈনিতাল—চ'লে যাব বেড়াতে। আচ্ছা কৌমুদী-দি, মানুষে কাজ করে কেন বলুন তাে? তাদের হাতে সময় অপর্যাপ্ত ; মানুষ কাজ চায় না, সময় খরচ করতে চায়। -তাই না? সময়ের সম্মুখের ঝুটি ধরার চেয়ে সময়ের টুটি টিপে মেরে ফেলাই আমাদের উচিত। এই যে কান্তিদা-যে। কি রে বােদা, আছিস্ কেমন? ছাই আছি। কৌমুদী সাহুর উল্টা দিকে পাশ ফিরলো। কান্তিদার এতদিন পাত্তা পাওয়া যায়নি কেন ? হঠাৎ কি মনে করে এলে ? কান্তি ব’ললাে, কৌমুদীদি কিন্তু চটেছে। তুমি জিজ্ঞেস করাে, আমি পালাই। ১১৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু বলা মাত্র সে সুত্যি সত্যি উধাও হয়ে গেলাে, এতটুক ত্বর সইলােনা। জানিস্ সাহু-দা, তাের কান্তিদা আমাকে কী বাঁচান বাঁচিয়েছে। কাহিল গলায় কৌমুদী বললো। সাহু তার দিকে সাতঙ্কে তাকালাে : আমি ছিলাম অপারেশন থিয়েটারে, আসতে পারিনি—তোর বুঝি ব্যথা বেড়ে গিয়েছিলাে? ব্যথাই বটে! শিকারী এসেছিলাে, যেতে চায়না ! কি যন্ত্রণা বল্ তাে! ওকে এখানে আসতে দিলাে কে ? বলিস্ কি? সরাসরি এখানে ? কি বলে সে ? পরে শুনি ভাই, টেম্পারেচারটা নে। কৌমুদী নিশ্বাস ফেললো। প্লুরিসিও নয়, নিমুনিয়াও নয়। যাকে বলে সর্দিজ্বর, কৌমুদীর তা-ই হয়েছিলো, তবে আক্রমণের তেজ ছিলাে কিছু বেশি। বলেছি তো, মেয়েদের তিলকে তাল করা স্বভাব। তুমি চছো নাকি, পঞ্চমি? তােমার অসুখ, ভগবান করুন, অমনি চট করে আরাম হয়ে যায় ! কান্তি কৌমুদীর মাথার কাছে বসে গল্প করছিলাে। কৌমুদীকে এখনাে কিছুদিন বিশ্রাম করতে হবে-ডাক্তারদের নির্দেশ। জ্বর এখনও নিরান্নব্বই পর্যন্ত উঠছে, নিরানব্বই-এর ধাক্কায় পড়েছে সে। তার জ্বর নিয়েই এদের আলােচনা চলেছে, এমন সময় শিকারীর আবির্ভাব, তার সঙ্গে ঝুড়িসহ একটি কুলী। ঝুড়িতে কিছু মেওয়া : কৌমুদীর রােগের পথ্য। যখন ভদ্র- লােকটি কুলীকে বিয়ে দিয়ে ঝুড়ি থেকে এক একটি করে ফল আর থােক। ধরে আঙুর বা’র করছেন, কৌমুদীর তখন হাসিও পেলােনা কান্নাও পেলােনা। সে কান্তির দিকে তাকালো। সযত্ন পারিপাট্যর সঙ্গে ফল ছাড়িয়ে আঙুর গুছিয়ে ভদ্রলােকটি বলেন, খা।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ক্ষেপেছেন? কৌমুদী মুখ সরিয়ে নিলাে : ওই দেখুন ফল সব পচছে, একেবারে খেতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে না বললে তাে শুনছিনে! বাঁচতে হবে তাে! শিকারী আন্তরিক গলায় বললেন। কৌমুদী ব’ললল, নতুন আর কি বললেন ? কিন্তু বাচার জন্যে খাব, খাবার জন্যে বাঁচতে নারাজ। আপনি রাখুন ও-সব। কেন অযথা আনলেন ? কান্তি বললাে, খান্ না। চাঙ্গা হয়ে উঠতে হবে তো! আপনি খা। কৌমুদী হয়ত একটু রেগে বললাে। শিকারী ভদ্রলােকও কান্তিকে অনুরােধ করলেন: বেশ মিষ্টি আঙুর, খান না। একটু টেস্ট করে দেখুন। আমাকেও রুগী পেলেন ? কৌমুদী বললো, রুগী না হলেই বুঝি খেতে নেই, খান্ । শিকারী ভদ্রলােক লক্ষ্য করলেন, কৌমুদী তার ভাইকে বরাবরই আপনি .. কলছে। এর কারণ তিনি কিছু বুঝতে পারলেন না জিজ্ঞাসা করতেও বাধ-বাধ ঠেকছে। ভদ্রলােকটি চেয়ারে বসলেন এতক্ষণে। চেয়ারে বসে ব’সে তিনি দেখতে লাগলেন, কান্তি অমায়িক গলায় কথা বলছে ও নির্বিকারে আঙুর খেয়ে চলেছে, থামছে না। অঢেল আঙুর তিনি আনেন নি, ঝুড়িটাও এমন-কিছু বড় ছিলােনা বা বােঝাইকরা ছিলােনা। কান্তিকে থামতে বলাও সঙ্গত নয়। কিন্তু একসঙ্গে এতগুলাে আঙুর খেয়ে ফেললে হজম করা কঠিন হবে যে। দেখেছ ! কান্তি উকি দিলাে আঙুরের দিকে : আমিই-যে প্রায় সাবাড় করে দিলাম। ভদ্রলােকটি করুণ মুখে যথাসম্ভব হাসি ফুটিয়ে বললেন, খান্ না! তাতে কি ?

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
কৌমুদী ব’ললো, কমলা খা। আবার লজ্জা দেখানাে হচ্ছে ! ন্যাশপাতি
• নিন্।
E
ভদ্রলােকটি কান্তির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এইটে খা, খেয়েই
দেখুন টেস্টটা! বাছাই করে আনিয়েছি, একেবারে টাটকা জিনিষ।
কমলা ও ন্যাশপাতি খেয়ে কান্তি থামলাে। শিকারী চেয়ারে হেলান
দিয়ে অবশিষ্টাংশের পরিমাণ দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন। কৌমুদীকে
বললেন, এবার দিই দু’টো আঙর !
কান্তি তখন প্রকেট থেকে কলম তুলে বললো, বলুন কি লিখব?
আমি কি জানি ! লিখুন,-সম্পাদকমশায়, আপনার আচরণে আপনার
ওপর বিশ্বাস হারিয়েছি, তাই, অগ্রিম দক্ষিণা না পেলে উপন্যাসের বাকি অংশ
পাঠানোসঙ্গত বিবেচনা করছিনা
কান্তি খস্ খস্ করে লিখ ছিলাে, বললো, আস্তে। রচনা পাঠানাে
সঙ্গত-তারপর কি ?
লিখুন, মনে করিনা।
আগে কি যেন বললেন? কান্তি কলম ঠোটের সঙ্গে ঠেকালাে।
আপনি লিখবেন, আমি ডিটেট করবে? তা হয় না। নিজে লিখুন
যা খুলি। কৌমুদী শিকারীর দিকে তাকিয়েও তাকালাে না। ভদ্রলোেকটি
তখন সিলিঙের পাখা ঘােরা, নার্সের যাতায়াত, উড়ন্ত পদার বর্ণ-বৈচিত্র
এবং কৌমুদীর মুখের চঞ্চল ভাবপরিবর্তন একই সঙ্গে লক্ষ্য করছিলেন।
সংক্ষিপ্ত চিঠিটা শেষ করে কান্তি পকেট থেকে খাম বের করে চিঠিটা
পুরলাে।
কৌমুদী বললো, ওই যে রামসিং।
যে রামসিং। ওকে ডেকে দিয়ে দিন, গেটের সাম্নেই ,
বাক্স আছে, ফেলে দেবে।

+ - । শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কিন্তু জুড়বাে কি দিয়ে ? থুতু দেওয়া হাইজিনিক, বিশেষত হাস্পাতালে। একটু জলও রাখেন না এখানে ? দেব আপনার মিশ্চার : দিয়ে জুড়ে ? ওষুধের শিশিটা কান্তি হাতে তুলে নিলাে। কৌমুদী বললে, পাগােল হলেন নাকি? কেন? ক্ষতি কি? যাকগে, দিন্ তো মশাই একটা আঙুর, যদি কিছু মনে না করেন। ভদ্রলােকটি অনুগতের মতাে বিষন্ন মুখে তার দিকে আঙুর কয়টি এগিয়ে দিলেন। কান্তি একটি মাত্র আঙুর নিয়ে তার এক কোণ দাত দিয়ে কাটলো ও আঙুরটা খামের আঠার ওপর ঘষে দিলাে। সহাস্যে কৌমুদীর দিকে তাকিয়ে কৃত্রিমগর্বে ব’ললো, উপস্থিত বুদ্ধি। শিকারী ভদ্রলােকের চোখের দৃষ্টি একটু করুণ হলো। কান্তির দিকে তিনি বিরক্ত চোখে মুহুর্তের জন্যে তাকিয়েই চোখ নামালেন। রামসিং-এর হাতে খাম দিয়ে কান্তি আরাম করে বসলাে। বললাে, আপনার সঙ্গে এতক্ষণ কথাই বলতে পারিনি। শুনেছি, আপনি একজন বিখ্যাত শিকারী। আমার একটি শিকার কাহিনী লেখার বড় সখ, একবার নিয়ে চলুননা আপনার সঙ্গে। যাবেন ! সংক্ষেপে জবাব দিলেন শিকারী। কৌমুদী বললাে, আর শিকারে গিয়ে কাজ নেই ! শিকারী ভদ্রলােকটি এবার উঠলেন। আজ তার মন বড় খারাপ হয়ে গেলো। কেন যেন, তাঁর বিকেলটা আজ বিস্বাদ মনে হচ্ছে। যাবার সম: তিনি কিছুই বলে গেলেন না। আজ দিয়ে দিন পাঁচেক তিনি এখানে এলেন, প্রত্যেক দিনই যাবার সময় আবার আসার প্রভিশ্রুতি দিয়েই যেতে। আজ তিনি নীরবে চলে গেলেন। ১১৮ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কান্তি বললো, মানুষের দুর্বলতা কোথায় লুকিয়ে থাকে বলা যায় না। চেহারা কি-রকম তেজী, শিকার করেন বাঘ, কিন্তু আপনার কাছেই কাবু। একটা ফল অন্তত আপনার মুখে দেওয়া উচিত ছিলো। আমার ব’য়ে গেছে ! তা বললে চলবেনা কৌমুদী-দি, তার চালচলন আপনি সহ্ন করতে না পারেন, কিন্তু আপনার আচরণে তিনি যেন কষ্ট না পান্—এটা দেখা দরকার। বেচারা! তার সব ফল আমি খেয়ে ফেললাম। আমার হয়ত মুণ্ডপাত করছেন তিনি! কান্তি প্রাণ খুলে হাসতে গিয়েই থেমে গেলো : হঠাৎ তার খেয়াল হলাে এটা যে হাস্পাতাল ! করুক্ গে যা-খুসি ! উহু, তা বললে শুনছিনে। তঁাকে আনন্দ দিতে না পারেন সেটা আপনার ইচ্ছে, কিন্তু কষ্ট দেবার অধিকার আপনার নেই। কেন দেবেন ৪ ? আগে যদি আনন্দ দিতে পারেন, তাহলেই কষ্ট দেওন্নার অধিকার আসে। আনন্দও দেবেন না, কষ্টও দেবেন, -এট। অন্যায় আব্দার কিন্তু ! কষ্ট! এতেই কষ্ট ! মনে মনে কৌমুদী- হালো। সাহু-দা তাহ'লে ভুজালীর কাহিনী-টুকু কান্তিকে বলেনি বুঝি ! ভালাে করেছে। এটুকু অনু গ্রহ-যে সে করেছে, এটা সাহুর মহানুভবতা নিশ্চয়ি। কোনাে কথাই তাে তার গােপন • রাখার স্বভাব নয়, বিশেষত কান্তির কাছে। কান্তি বললাে, ভদ্রলােকটির ধৈর্য দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। বাঘের আশায় বসে থেকে থেকে, আর-কিছু উপকার না হােক্, মন মজবুত হ'য়েছে। আমি বলতে পারি—ধৈর্যের পরীক্ষার উনি নােবেল পুরস্কার পাবেন। (একটু হেসে) তা না হলে যার কাছে ছােরা খেয়েছি, তার, মােহ আজো কাটে না! ১১৯

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
কৌমুদী হতাশ হয়ে পড়লাে। সাহুকে তাহলে সে ভুল বােঝেনি।
‘কৌমুদীর নিজেরও-যে একটা উগ্রমূর্তি আছে, সে-কথা কান্তি জানলে তার
আসে-যায় না। তবু তার একটু সংকোচ বােধ হলাে। কান্তির দিকে
ভালােমতাে সে আর চাইলাে না।
কান্তি ব’ললল, যাকে চাক্ষুষ দেখছি, তার ধৈর্যের তারিফ করছি বটে।
কিন্তু আমাদের আড়ালে আর একজন ভদ্রলােক হয়ত ধৈর্যের দিক থেকে
শিকামী ভদ্রলােকের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাড়িয়েছেন।
কৌমুদী বললাে, সে আবার কে ?
আপনি তাকে চেনেন না।
কান্তি গম্ভীর হয়ে বললে। : তার নাম
বিজনবাবু।
হাপাতালে হঠাৎ গাঢ় স্তব্ধতা নেমে এলাে। কান্তি ঘুরন্ত পাখার দিকে
তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইলো আর কৌমুদী কাৎ হয়ে শুয়ে তানপুরার
আওয়াজ শুতে লাগলাে।
কান্তি এবার উঠে পড়লাে। কৌমুদীর দিকে তাকিয়ে সে কোনাে কথা
বলার উৎসাহ পেলােনা। হাসপাতালের স্তব্ধতা ভেদ করে শব্দহীন পায়ে সে
কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো।
সিড়িতে সন্ধ্যার সঙ্গে দেখা। কান্তি বললাে, চললেম।
তা তো দেখছি, এলে কখন ?
ঘণ্টা দেড়েক আগে। অনেকক্ষণ কাটিয়ে গেলাম। কৌমুদী-দির মন
খারাপ করে দিয়ে তবে যাচ্ছি।
মন আবার খারাপ হলে কি সে? তাচ্ছিল্যের ভাবে সন্ধ্যা
বললাে।
কান্তি বললাে, হঠাৎ বিজনবাবুর কথা বলে ফেলেছি।
আমি আর আস্বাে না, সন্ধ্যা। বিজনবাবুর খোঁজ পেলে আবাে, নইলে
সত্যি,
১২০

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদী-দির সঙ্গে আর দেখা কিছুতেই করবাে না। আজ আমিও খুব লজ্জা পেয়েছি। সেদিন দম্ভ করে বলে গেলাম, বিজনবাবুকে খুঁজে বার যদি কেউ করে তবে সে আমি, এই সব্যসাচী সেন।—কিন্তু, তিনি কি ভাবেন বলাে তাে! ভাবে, না হাতি! ঠিকানা নেই, কিছু নেই—বা’র করলেই হলো? সন্ধ্যা সিড়ি দিয়ে উঠতে আরম্ভ করলাে। কান্তি ধীরে ধীরে নেমে গেলো। সেদিনের পরে দু’মাসের ওপর হয়ে গেলাে, কান্তি সত্যি আর আসেনি। কান্তির না আসার কারণ সাহুর কাছ থেকে কৌমুদী শুনেছে, ও দু’জনেই হেসেছে। আমরা হাসতে জানি বলেই-না বেঁচে আছি। মন নামক যে মারাত্মক জীবটি আমাদের মধ্যে অশরীরী দেহ নিয়ে বাস করে, তার ষড়যন্ত্রের হাত থেকে আমরা প্রায়ই রক্ষে পাই হাসির সাহায্যে। মন আছে বলেই আমরা মানুষ ; মানুষের দেহ নিয়েও যাদের মন নেই, ভগবান তাদের পশুর শরীর দেন নি, এটা মস্ত আশীর্বাদ। তারা যদি না হাসে, তাদের বাঁচায় বিঘ্ন হয় না। চাদ হাসে না, চাদের মন নেই, তাই চাদ বেঁচে আছে। চাদ হাসে না, আমরা হাসি—আমাদের হাসির চোখে দেখি বলে মনে হয়, চাদের মুখে হাসি। আসলে চাঁদ কি হাসে? বলো তাে পঞ্চমি, কবে তুমি চাঁদকে হাসতে শুনেছ? তার গায়ের রং সূর্যের মতাে প্রখর নয়, সােহাশার মতাে শাদা আর কাদার মতাে ঠাণ্ডা, • তাই আমরা সােহাগ করে বলি, হাসে তাে চাদ। চাদ বেকুবের মত গম্ভীর হয়ে আমাদের দিকে তাকায়, আমরা বলি, চাদ হেসেছে। হাসে না, তবু বাঁচে। আশ্চর্য লাগছে তােমার? আশ্চর্য হবার কিছু নেই, হাঁসও হাসে না, বাছে। কেন না, ওদের মন নেই। শরীরের মধ্যে মন ও ভাঁড়ারের মধ্যে ইদুর- -- ১২১ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু একই জিনিষ। মন আমাদের ভাবায়, আমাদের জিজ্ঞাসা করায়, আমাদের । দিয়ে খোঁজার ; সব সময় আমাদের মধ্যে খুটখুট করে আমাদের সচেতন,, রাখে। চেতনা দিয়ে, আমাদের ব্যস্ত রেখে সে আমাদের অজ্ঞাতে আমাদের শরীরের সার চুরি করে খায়। শরীরের ক্ষতি করলেও ক্ষতিপূরণ সে করে : আমাদের মানুষ করে। যারা ভাবতে জানেনা, পঞ্চম, তাদের সুখ দেখে হিংসে করােনা—তারা সুখী নয়, তারা সুখের প্রতারক ! কৌমুদীরা কান্তির কথা নিয়ে হেসেছে। এমনি এক-একটা অছিলা নিয়েই আমরা হাসি। তুমি যখন আমার এ-চিঠি পড়বে, তখন তুমিও হয়ত হবে। সাহু স্বভাবতই ফুর্তিবাজ, হাসির মাত্রাও তার বেশি। কিন্তু আজ এখনো কৌমুদীকে ফিরতে না দেখে তার হাসি ক্রমশই ফিকে হয়ে আসছে। হাসপাতালের বাইরে রুগী দেখতে যাওয়া কৌমুদীর আজ প্রথম নয়। এর আগেও অনেকবার সে গিয়েছে। কিন্তু এত দেরি কোনােদিন করেনি। গিয়েছে সেই বেলা দু’টোয়, রাত্তির হতে চললাে দশটা। সন্ধ্যা ভয়ানক দুশ্চিন্তায় পড়লাে। তার দুশ্চিন্তা ক্রমশই চরমে উঠছে। কোয়াটারে একা একা বসে থাকতে তার বিশ্রী৷ লাগলাে, হাসপাতালে আসার জন্যে রাস্তায় নেমে সে দেখলাে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে, মেঘও ডেকে উঠলাে। কাপড়ের প্রান্তটি মাথায় তুলে সে কিছুটা এগােতেই বৃষ্টি সশব্দে ঘােরতঃ হ’রে নেমে এলাে। বিদ্যুৎ চমকালাে। অন্ধকারে মেঘ এ-ভাবে লুকিয়ে ছিলাে, সে টের পায়নি। কোয়াটার থেকে হাসপাতালের রাস্তাটা এত লম্বা-সন্ধ্যা এর আগে তা জানতােনা। দৌড়তেও পারেন, সন্ধ্যা তাড়াতাড়ি আসতে লাগলাে। খানিকটা এগিয়ে আসার পর সেসমুখে দেখতে পেলাে, কে-যেন তীরবেগে গেট পার হয়ে ভেতরে ছুটে আসছে। সন্ধ্যার বুক হঠাৎ কেঁপে গেলাে। সে বৃষ্টির মধ্যেই দাড়িয়ে পড়লাে, লােকটা তার পাশ দিয়ে ছুটে

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু
যাচ্ছিলো, বিদ্যুতের আলােতে সন্ধ্যা চিনতে পেরেই ডাকলো, কি রে
কান্তিদা ?
কে, সন্ধ্যা ? কান্তি হাফাতে হাফাতে কাছে সরে এলাে, তার সর্বাঙ্গ
ভিজে, মাথার চুল চোখে মুখে ঝুলছে, চুল গড়িয়ে জল পড়ছে, কান্তি বললাে,
কৌমুদী-দি কই।
কেন বল্ তাে বুকে অজস্র আন্দোলন নিয়ে সন্ধ্যা বললো, কি, খবর
কি কান্তিদা ?
আছে। কৌমুদী-দিকে দরকার, কোথায় তিনি ?
বলছি। কি দরকার বল্ না আমাকে।
সন্ধ্যা কান্তির কাধ ধরে
ঝাঁকি দিলো।
কান্তি ঢোক গিলে বললো, বিজনবাবুকে পেয়েছি।
সন্ধ্যা বললাে, আর, এদিকে আয়, বারান্দায় উঠি গিয়ে।
যেতে যেতে কান্তি বললাে, তার বুঝি এখন ডিউটি ? শিগগির ডেকে
আন সন্ধ্যা ! খবরটা তাকে না জানানাে পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।
বারান্দায় উঠে সন্ধ্যা বললো, একেবারে ভিজে গেছিল, যে !
তা গেছি। তুইও কম ভিজিস নি। তাক, ডাক, ওঁকে ডেকে আন।
সন্ধ্যা বললাে, ডাকবো কি ? তার খোজেই তো এখন হাসপাতালে
এলাম। সেই গেছে দু’টোর সময়, এখনাে ফেরেনি।
কান্তি বললো, কএ গেছে বুঝি ?
হ্যা, ডেলিভারি কেন।
কৌমুদী তখন প্রকাণ্ড একটি বাড়ির চারতলার একটিমাত্র ঘরে নীরবে
বসে বৃষ্টির শব্দ শুনছে। দৃঢ় হয়ে বসে আছে সে। মনে মনে সে সংকল্প
করছে, বিচলিত সে হবেনা। দেখা যাক, কি হয় । কৌমুদী প্রতীক্ষা করতে ।
রাজি।
দেয়ালে একটি বৌ-এর মস্ত ছবি তার দিকে তাকিয়ে হাসতে,
১২৩

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু বৌ-টিকে কৌমুদী চেনে। দরজা দিয়ে তাকিয়ে সে দেখতে লাগলাে অপরিসর ছাদটি। ছাদের তিনদিক উচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, এক মানুষের চেয়েও উচু প্রাচীর। একদিকে এই ঘর। প্রাচীরের গায়ে গােটা তিনেক গােলাকার ছিদ্র, বিদ্যুৎ চমকালে ছিদ্রগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চেরাপুঞ্জিতেও এখন নিশ্চয় ভয়ানক বর্ষণ আরম্ভ হয়েছে। কৌমুদী এখানে বন্দী হলাে। এই উচু ছাদ, ছাদের মাথায় নীল আকাশটুকু। রাস্তা বা পথঘাট লােকজন গাড়িঘােড়া কিছুই দেখা যায় না এখান থেকে : প্রাচীর এত উচু। মাঝে মাঝে সে যখন দারুণ উতলা হয়ে ওঠে তখন ছিদ্রে চোখ দিয়ে কৌমুদী দাড়িয়ে থাকে। প্রাচীর উচুও যেমন, পুরুও তেমন। ছিদ্র দিয়ে হয়ত পাশের ছাদের চিলেকোঠা নজরে পড়ে, তার বাড়তি কিছু নয়। সারাদিন এখানে থাকে সে বন্দী, একজন লােকের দেখা পর্যন্ত মেলেনা। সময়মত গােলাপ এসে খাবার দিয়ে যায়। হাসি পায় কৌমুদীর। তার জীবন জুড়ে সুধুই গােলাপ। গােলাপ তার সঙ্গে দরকারী ছাড়া আর কোনাে কথাই বলেনা। এগগালাপের চেহারা গত গােলাপের মতাে অতটা নির্দয় বলে মনে হয়না। কৌমুদী হয়ত কখনন বলে, তােমার নামটি তাে বেশ। গােলাপ হয়ত উত্তর দেয়, ওই নামটুকুই মা। গুণ নেই একেবারে । তুমি খাও মা। না খেয়ে আর কতদিন কাটাবে ? শরীর ঠিক রাখে। নাহলে যুঝবে কি করে? ভােমার বাবু কোথায় ? বলতে নিষেধ আছে। তুমি খাবে কিনা শুনতে চাই। তুমি খাওনা তাতে আমার কি বলল তো! আমার মুখেও অন্ন রােচে না। ঠাকুরটা সুধুই বলে, গুলাপ, তুই খানে-যে একেবারে। বলি, শরীরে যুৎ পাইনে রে ঠাকুর। কোথা থেকে নিয়ে এসেছে তােমায় শুনি ! খাও। ১২৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদী কিছু মুখে দেয় অবশ্য, তবে সে না দেবার মতােই। চারদিন কেটে যাওয়ার পর শিকারী ভদ্রলােক ওপরে এলেন, এসেই বললেন, নাও সই করাে একটা,' করাে। তােমায়-আমায় আজ বিয়ে হ’লাে এ তারই কাগজ। করাে সই। দুর্ব্যবহার করতে চাইলে, ভালাে কথাই বলছি। } কৌমুদী কি-যেন ভাবলাে, তারপর শিকারীর হাতের কাগজে একটা সই দিলাে। কাগজ নিয়ে শিকারী নেমে গেলেন। তারপর আবার যখন উপরে উঠে এলেন তখন মৃতি তার আলাদা। ব’ললেন, ওই দেখ আমার স্ত্রী। তােমাকে দেখে হাসছে। ভারি দুষ্ট, ও, তা জানাে ? কৌমুদী ছবিটার দিকে তাকালো না, চুপচাপ বসে রইলাে। একটু পরে বললাে, আপনি আমাকে এভাবে আটক করলেন কেন ? কৈফিয়ৎ দিতে পারবাে না। তােমাকে আটক না করে উপায় ছিল না। হলে তুমি ধরা দিতে না। শিকারী ভদ্রলােক কৌমুদীর কাছে উঠে এলেন, গায়ের জামা খুলে বললেন, এই দ্যাখাে সেই ছােরার দাগ। এনেছ নাকি ছােরাটা ? না এনে কৌমুদী অন্যায়ই করেছে বুঝি ! সত্যাশ্রমের পথে সে-রাত্রে সেটা কোথায়-যে প'ড়ে গেছে, আজও কৌমুদী জানেনা। বললাে, দিন না একটা এনে। আপনি নয়, তুমি। এই মাত্র সই করে দিলে না? বেশ, তুমিই না-হলো। কৌমুদী শিকারীর দিকে একটু তাকালো : আমাকে এভাবে ছলনা করে নিয়ে এসে কত বড় বিপদ মাথায় নিয়েছেন, জানেন ?

মতী পঞ্চমী সমীপে t, কোথায় তুমি হলাে? বিপদ তাে তুমি একটি বই দিয়ে সব উদ্ধার করে দিলে, আবার বিপদ কোথায় ? দ্যাখাে, মেয়েমানুষের তেজ অলক্ষী। একটু ঠাণ্ডা হও। একটু ভেবে দ্যাখো। ঠিক এই কথা কৌমুদী এর আগে একবার শুনেছে, বললাে, অনেক ভেবেছি, অনেক ভাবছি, কিনারা তাে মিলছে না। আমার আপনি ছেড়ে দি। কৌমুদীর গলার স্বর শেষের দিকে কেঁপে গেলো। ' ! ছেড়ে দেব ! শিকারী ভদ্রলােক একটি গুহার ভেতর থেকে আওয়াজ করলেন যেন : ছাড়ার জন্যে আনিনি। তুমি এখানে বন্দী থাকবে। যতদিন-না আমার নতুন বাড়িটা শেষ হ, ততদিন এখানে থাকতে হবে। নতুন বাড়িতে তােমার জন্যে এমনি দোতলার ওপর আলাদা ঘর করাচ্ছি। তার মানে সেখানেও এইভাবে বন্দী রাখতে চান ? কারণটা. আমায় জানাবেন ? কি চান আপনি আমার কাছে? কৌমুদী শিকারীর দিকে পরিপূর্ণ তাকালাে। ভদ্রলােকটি বললেন, কি চাই? তুমি ছেলেমানুষ নও, তুমি জান। সে মুক্ত, এই অহংকারে কিছুদিন আগে কৌমুদী উচাট ছিলাে। আজ তার সে গর্ব চূর্ণ হয়েছে। আজ সে নেহাৎ বন্দী। একটু ভেবে সে বললো, জানি বটে। তবে সে আপনার দুরাশা। আমায় স্বেচ্ছায় ছেড়ে দি, আমাকে ধরে রাখতে আপনি পারবেন না। বিজ্ঞের হাসি হাসলেন শিকারী, মহিম বাগচীর মুখে ঠিক এই হাসিই, কৌমুদী একদিন দেখেছে। সেদিন সে ভয় পায়নি, কিন্তু আজকের কথা আলাদা। গােলাপের ওপর কড়া আদেশ হয়ে গেলে কৌমুদীর ওপর কড়া পাহারা দেবার। মেয়েটার মন এখনো এখানে বসেনি। শিকারী হতাশ হলেন না। তার ধৈর্য আছে। তিনি ঠিক করলেন, প্রতীক্ষা করবেন। সারাদিন ১২৬ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু দারক করে গােলপ। রাত্রে অবশ্য শিকারী এই ঘরে থাকেন ও সারারাত কথা কাটাকাটি করেন। ফল কিছু হয় না। শারীরিক বল প্রয়ােগ করার চেষ্টা তিনি করেন না, এ-চেষ্টা করে তিনি ঠকেছেন। সারারাত প্রা: জেগেই কাটাতে হয় দু’জনকে। তিনি দুঃখের গলায় বলেন, সারাটা দিন কাটাই নানারকম অশান্তিতে, নানারকমের শত্রু নিয়ে : পাওনাদার আর দেনাদারের মধ্যে। কত কট,ক্তি শুনি ! কতজন কত রকমে শাসায়! তােয়াক্কা করিনে। রাত্রে নিশ্চিন্তে একটু ঘুমবে, তারও উপায় নেই। কৌমুদী নিজের বিছানা থেকে বক্র জবাব দিলো, শত্রুপক্ষ বুঝি অনেক ? এভাবে শরীর টিকবে না। কাল থেকে নিচে শশাবেন। না হয় আমাকে নিচে পাঠাবেন—একান্তই যদি ছেড়ে না দে। সকালে বিছানা থেকে উঠে ভদ্রলােকটি সর্বপ্রথম দেরাজ টেনে ক্ষুর সাবান -- বের করেন। অনেকক্ষণ ধরে দাড়ি কামান, তারপর কৌমুদীকে ছেড়ে . নিচে নেমে যান। তখন গােলাপ আসে ওপরে কৌমুদীর তদারকে। গােলাপ বলে, শরীর শুরু কেন? সারারাত বুঝি ঘুমােও নি? গােলাপের মুখে একটু রসিকতার সুর ফোটে। কৌমুদী বলে, ঠিক ধরেছ। তুমি আমাকে সাহায্য করবে গােলাপ? আমি পালাবে। গােলাপ হাসলো, মন বসছেনা বুঝি? আমি সাহায্য করার কে মা? ফটকের নেপালী দ্বারােয়ানরা এক একটা যমদূত। বাবু তাদের নাকি কি-নব বলে রেখেছে। তােমাদের বাবু বুঝি খুব কড়া? আমাদের সঙ্গে আর ব্যবহার করে না। কি করে বলি । গোলাপ একটু থামলাে, তারপর বললো, তুমি কে মা? তােমার ঘর কোথায় ? :২৭ ৩ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু এই তাে আমার ঘর। কৌমুদীও একটু থামলাে। যতক্ষণ গােলাপ থাকে, ততক্ষণ সে একটু ভাল থাকে। গােলাপ গেলেই কৌমুদীর মন আরাে খারাপ হয়ে যায়। গােলাপ চলে গেলে সে পথ খুঁজতে থাকে। চারতলা থেকে তেতলায় নামার পর্যন্ত হুকুম নেই তার। ঘরে সবসুদ্ধ চারটে জানলা, তার দু'টোই ছাদের দিকে, একটা বাথরূমের সঙ্গে, আরেকটা শিকারীর খাটের গায়ে ও একটু ওপর দিকে, সে জানলাটাও মাপসই বড় নয়। গােলাপের অবর্তমানে সে শিকারীর খাটের ওপর উঠে এই জালা দিয়ে বাইরে তাকায়। এ-জাল্লা দিয়েও বিশেষ কিছু দেখা যায় না, এই বাড়ির ফটক আর ফটকের দু’পাশে দু’টি ভুজালীবান্ যমদূত ছাড়া। খাটের ওপর দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে কৌমুদী সেই দৃশ্যই দেখে। এ-যেন নরক দেখে স্বর্গের দৃশ্য অনুমান করে নেওয়া। এদিকে কৌমুদী যতই বেঁকে বসছে, শিকারীও রুক্ষ হচ্ছেন সেই অনুপাতে। সিড়ির দরজায় তালা দিয়ে চাবি তিনি কাছে রাখছেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করছেন না। অথচ কৌমুদী তা জানতে পারছে। এইভাবে দিন ও রাত্রি একের পর এক কেটে গেল অনেকবার। তােমার মতলব কি বলল!' শিকারী একদিন তাকে চেপে ধরলেন : ধরা তুমি দেবে কি না! কৌমুদী তার থেকে তিন হাত তফাতে বসে ছিলাে, সেখান থেকেই সে শিকারীর দিকে বক্র দৃষ্টি দিলাে, বললাে, ঠাট্টার মতাে শােনালো আপনার কথা। যথা। উদাহরণ দিতে হবে? কৌমুদী ব্যঙ্গের সুরে বললাে, তবে শুনুন উদাহরণ। বনে ফাদ পেতে ধরা হলাে একটা বাঘ। লােহার মােটা ১২৮ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু মােটা শিক দিয়ে খাঁচা বানিয়ে তার মধ্যে তাকে পূরে তারপর বল। হ’লাে : ধরা তুমি দেবে কি না! খাসা উদাহরণ ! বুঝেছি তােমার পাণ্ডিত্য। দ্যাখাে, আর দু’দিন তােমাকে সময় দিলাম, এর মধ্যে যদি মত, করলে, ভাল। তা না হলে আমাকে শেষ করুন্ কথা! শিকারী ভদ্রলােক রেগে বেরিয়ে গেলেন। ঘননীল আকাশ মাথার ওপর। ছােট্ট ওটা কি-যেন দেখা যাচ্ছে- এরােপ্লেন না চিল? পাড়াটা এত নিস্তব্ধ কেন ? মানুষের মুখ না-হয় দেখা না-ই গেলে, গলার স্বর শুতেও কি বারণ। কৌমুদী খাঁচায় বন্দী তাজা বাঘের মতাে সারা ছাদ পায়চারি করে বেড়াতে লাগলো। বনের। গন্ধ এবাঘ এখনাে ভােলেনি। মুক্তি নিশ্চয় তার চাই। শক্তি চাই, বিজনদা, শক্তি চাই ! ছিদ্রে চোখ দিয়ে দাড়ালো কৌমুদী, পাশের বাড়ির চিলে- কোঠার মাত্র খানিকটা দেখা গেলাে। না, সে ফিরে গেলো। পূব ছেড়ে পশ্চিমের ছিদ্রে চোখ দিলো, একটা কারখানার চোঙ দেখা গেলাে কেবল, সঙ্গে একটু ধোঁয়া। শিকারীর তাে এত, শত্রু-শিকারী নিজেও স্বীকার করেছেন, গােলাপও আভাষ-ইঙ্গিতে তাকে বলেছে—তারা কি পারে না একটা ব্যবস্থা করতে ? কোনােরকমে যদি শেষ করে ফেলা যায় । হলে তার বন্দীজীবনের অবসান হবে না। কৌমুদী ঘরে গিয়ে খাটে উঠলে : নেপালী দ্বারােয়ান দু’টো ঝিমােচ্ছ, তীর বেগে একটা মােটর গাড়ি ঢুকলো, তার একটু পরেই পায়ে হেঁটে ঢুকলো একটা লােক—পরনে খাকির হাফ-প্যান্ট গায়ে খাকির শার্ট ও পুরু কোট। এত দূর থেকে ভালাে করে চেনা না গেলেও কৌমুদীর বুক এত জোরে কেঁপে উঠলাে-যে তার দম আটকে যাবার মতাে মনে হতে লাগলাে। ৯ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু কৌমুদী খাটের ওপর একটু বসে টাল সামলে নিয়ে আবার যেই উঠতে যাবে অম্‌নি বেলের পানা নিয়ে গােলাপের প্রবেশ। গােলাপ, একটা কাজ করবি ভাই?. তাের দু’টি পায়ে পড়ি। কৌমুদী খাট থেকে লাফিয়ে পড়লাে। সে কি কথা গাে ? কি কাজ এমন বলেই না আগে? কৌমুদী বললাে, বল্ করবি। তিন দিন রেগে মেগে না খেয়ে আছ, আগে এটা খেয়ে নাও। তারপর শুনছি। গােলাপ বেলের পানা এগিয়ে দিলাে। কৌমুদী তার হাত থেকে পাথরের গেলাশটি টেনে নিয়ে এক নিশ্বাসে সবটুকু খেয়ে ফেললাে, বললাে, দ্যাখ, খাকির প্যান্ট পরা গায়ে বেগনি কোট একজন ভদ্রলােক এইমাত্র এলেন, তাকে তুই চিনি কিনা দেখে আয় । তাগাদা কি? পুলিশের লােক নয়। পুলিশ-টুলিশ এ-বাড়িতে আসেনা বাপু। অত ভয় কিসের তােমার? তুমি দেখলে কোত্থেকে? দেখে ফেলেছি ওই জানলা দিয়ে। না হােল্ক পুলিশ, দুই যা ভাই। কৌমুদী গােলাপকে প্রায় ঠেলে দিলাে। গােলাপ ব’ললাে, যাচ্ছি। আগে তােমাকে জল দিয়ে নিই। জল থাক্। তুই যা। জল আমি নিয়ে নিচ্ছি। কৌমুদী নিজেই জল গড়াতে বসে গেলাে। কৌমুদীর এই ভাবপরিবর্তনে আশ্চর্য হতে হতে গােলাপ মিড়ি ভেঙে ধীরে ধীরে নামতে লাগলাে। আর কৌমুদী গিয়ে উঠ লােখাটে। কৌমুদীর এখন যে রকম অধৈর্য অবস্থা, আমার চিঠি পাবার জন্যে তােমার অবস্থা নিশ্চয় অতটা অধৈর্য নয়। যদিও তুমি অভিমান করে নিজে চিঠি না লিখে এবার তােমার এক বন্ধুকে দিয়ে চিঠি লিখিয়েছ। তিনি আমায় তােমার জবানীতে বার বার করে টাঙাইলে যেতে লিখেছেন, আর শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু লিখেছেন—তােমার নাকি অবস্থা খারাপ। কৌমুদীর এখন যে-রকম .অধৈর্য অবস্থা, এতটা খারাপ অবস্থা নিশ্চয় তােমার নয়। তুমি হয়ত জায়গাটা প'ড়ে রাগবে, ভাববে, আমার কাহিনীর নায়িকার ওপর আমার দরদ যতটা, তােমার ওপর ততটা দরদ নয়। কথাটা ভুল নয়, পঞ্চমি । যা’কে নিয়ে আমি এই গভীর রাত্রে রচনা কাজে ব্যস্ত তার ওপর এতটা টান হওয়া অস্বাভাবিক নয়। চিঠিটা তাড়াতাড়ি শেষ করবাে বলে রাত্রি জেগেও যখন লিখছি, তখন তােমার ওপর টানও কিছু কম নয় এমন। এ-কথা থা, কান পেতে শশানাে-সিড়িতে কার পায়ের শব্দ। গােলাপ ফিরে এলো বুঝি। পায়ের শব্দ শুনে কৌমুদাও খাট থেকে নেমে এলাে। গােলাপ বললাে, উনি তত বাবুর বাড়ি তােয়ের তোয়ের করছেন। উনি ইনজিনীয়ারবাবু- ছােট ইনজিনীয়ার। ওঁর ওপর তিন তিনটে বাবু আছে। উনি কুলী খাটান আর দেখাশুনা করেন, মিস্ত্রীরা যাতে না ফাকি দেয়। নাম জানি ? নাম তাে জানিনে না। তবে, গায়না-বাজনায় ওঁর বড় নাম। আমাদের বাবু ওঁকে ভারি ভালােবাসে। গােলাপ মেঝের ওপর বসে পড়লাে। খুব গান-বাজনা করতে পারে বুঝি? শান্ত ও পীরভাবে কৌমুদী বললাে। কানে তো শুনিনি। তবে লােকে বলে ! আমাদের ঠাকুর শুনেছে। আচ্ছা গােলাপ, আমি যদি তােকে একটা চিঠি দি—তুই ওঁর হাতে পৌছে দিতে পারি? কৌমুদীও গােলাপের পাশে মেঝেয় বসে পড়লাে। গােলাপ আঁৎকে উঠলাে : সে কি কথা গাে? ওটি পিরবােনা। নিমকহারামী কাজ আমার করতে ব’লােনা মা। যার খাই, যার পরি, তার অনিষ্ট আমায় করতে ব’লােনা। ।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু অনিষ্ট কি রে? ও-যে আমাদের দেশের লােক! গােলাপকে কৌমুদী বােঝাতে চেষ্টা করে। গােলাপ বললাে, বুঝেছি। ওঁকে তুমি জানাতে চাও-যে তুমি এখানে আছ, যদি তাতে কোনাে হিল্লে হয়। তাতে আমার বাবুর লাভ? আমাকে তিনি পাহারায় রাখলেন, আর আমিই কাটবে সিদ? আমি ও-কাজ পারবােনা মা। এ-গােলাপও তত কম নিদর নয়! কৌমুদী একে তাহলে ভুল বুঝেছিলাে বুঝি। এতদিন এত সহানুভূতি দেখিয়ে আজ তাকে করছে প্রতারণা? গােলাপের ওপর কৌমুদীর ভারি রাগ হলো। ব’ললাে, উনি থাকেন কোথায় ? বেশি দূর না তাে! বাবুর নতুন বাড়ির কাছেই তাবু খাটিয়ে থাকে। গােলাপ মন্তব্য করলাে : ও-ও এক হতভাগা লােক। চুলাের দুয়ােরে কেউ নাকি নেই, মানুষটাও আধপাগলা। ইনজিনীয়ার পড়ছিলাে পাশ হয়নি, তাই এই দুর্গতি-পাশ হলে নাকি মস্ত লােক হতে পারতাে। দুর্গতি কিসের ? দুর্গতি নয় তো কী ? ভদ্রলােকের ছেলে, থাকে কুলীদের সঙ্গে, চলে ফেরে ওদের দলে। কুলীদের সঙ্গে ভারি ভাব নাকি! করবেই বা কি, কামায় না তত বেশি। কৌমুদী উৎকর্ণ হয়ে শুনছিলাে, বললাে এত খবর পেলে কোথায় গােলাপ ? সবাই বলে। একটু পাগলাটে কি না, সবার নজর তা-ই ওর ওপর। কৌমুদী বললো, তােদের বাবুদের বাড়ি হচ্ছে এখান থেকে কত দূরে? দূর কি গাে? ফটক দিয়ে বেরিয়ে সােজা চলে গেলেই ডানে একটা পার্ক, তার দক্ষিণে। কেন, এত খবরে দরকার কি গাঁ? গােলাপ একটু বাঁকা চোখে তাকালাে।

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু দরকার আবার কি? তুই দিয়ে আয় ভাই, দিয়ে আয় ভাই একটা চিঠি তাের পায়ে পড়ি। কৌমুদী প্রায় তার পা-ই যেন ছুতে গেলো। পাপের ভাগী করােনা আমায়, বলে রাখছি। গােলাপ উঠে ছাতে চলে গেলাে। সেখান থেকেই বললাে, বাবুকে আমি জানাব সব। ভয় দেখাচ্ছিস্? কৌমুদী একটু হাসি মুখেই বললাে : বলি। রাত্রে শিকারী ভদ্রলােক বললেন, গােলাপ বুঝি চিঠি নিয়ে যেতে রাজি হ’লােনা? কিছুতে রাজি করাতে পারলে না ওকে ? ইনিই তাে তােমার খোঁজে গৌহাটিতে হােটেলে গিয়ে ম্যানেজারের দাবড়ি খেয়ে চলে আসেন ! তাই না? এই বিজনই সেই বিজন বুঝি? কি, চুপ করে রইলে কেন? কথা বললা - কি বলবাে বলুন! এতটা বাড়াবাড়ি কেন করছো? জালে, সব জিনিষেরই মাত্রা আছে। তােমার জালায় গােলাপ চাকরি ছেড়ে চলে গেলাে আজ। ব’লে গেলাে, তােমার কথা সে ঠেলতে পারেনা, আমার অনিষ্ট সে করতে পারেনা—এমন কাজের মধ্যে সে নেই। তাকে কিছুতে রাখতে পারলাম না। গােলাপ তাে গেলােই, তার সঙ্গে সঙ্গে গেলাে আমার বিশ্বাসী ঠাকুরটাও। এত জ্বালাতন করার স্বভাব তুমি পেলে কোথায় ? ওটা হয়ত সংক্রামক রােগ। কৌমুদী ভেবে ব’ললল : আপনার কাছ থেকে পেয়েছি বােধ’য়। তাই নাকি? শিকারী আজ প্রথম হো হাে করে হেসে উঠলেন, হাসিটা বড় নিষ্ঠুর শােনশলাে। হাসি থামিয়ে বললেন, এত বড় বিশ্বাসী, ঝী আমার, তাকে তুমি তাড়ালে ?

শ্ৰমতী পঞ্চমী সমীপেষু, চেড়িদের কেন সারা দিদি বলে ডাকেনা, এই আক্ষেপ করে যদি রাবণেরা বুক চাপড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে সীতারাই নেমকহারাম। তাই না? কৌমুদী,এইটুকু বলে থামলাে। একটু হেসে কৌমুদী আবার বললো, আপনার কাছে ভিক্ষা চাচ্ছি, আমায় ছেড়ে দি। আমায় যেতে দিন্ । আমি এখানে থাকতে পারছিনে। ওটা বাদে অন্য কথা বলল। শিকারী অস্বাভাবিক গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন। অন্য কথা আমার জানা নাই। আমি চাই মুক্তি। এই আমার একমাত্র মন্ত্র এখন। অন্য কী কথা থাকতে পারে?, অন্য কোন কথা আপনি শুতে চান? রীতিমতাে তেজের সঙ্গে বললে কৌমুদী। শিকারীর মনের মধ্যে আগুন জ্বলছিলাে, আগুন চাপা দিয়ে তিনি তাপের সঙ্গে বললেন, কি কথা শুনতে চাই ? কাগজ তুমি সই করেছ যে-কথা বলার অধিকার নিয়ে। বুঝেছি। আপনার দুরাশা সেটা, সে আপনার স্পা। রাগে কৌমুদী হাঁফাতে লাগলাে, বললাে, বলেছি তাে, আপনি আমাকে কিছুতেই আটকাতে পারবেন না। আমি চাই স্বাধীনতা, মুক্ত আমি হবই। আমিও একটু স্বাধীনতা চাই, পঞ্চমি। একক্ষণ আমি যা লিখে এলাম-- সবই নীলরতনবাবুর কাছে শােনা কথা। অবশ্য একটু পালিশ দিয়ে ও রং দিয়ে আমি তা-ই হুবহু লিখে গেছি। এতটা বাঁধাধরা রাস্তায় চলা অভ্যাস নেই, নিজের ইচ্ছেমত শেষটুকু লেখার তাগিদ ভেতর ভেতর অনুভব করছি। আমার এ প্রার্থনা মঞ্জুর করাে। রাত্রে শিকারী একটু ধােপদুরস্ত হয়ে ওপরে এলেন। “ তার দিকে তাকিয়ে কৌমুদীর আজ ভারি ভালাে লাগলাে। এতটা প্রশান্ত চেহারা এতদিন এ ১৩৪ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু চন্দনগন্ধ। ঢাকা ছিলাে ! জুটিল কাব্যরচনায় মগ্ন কবির চোখের মতাে তার চোখে অতল গভীর স্তব্ধতা। তার প্রতিটি রােমকূপ দিয়ে বা’র হচ্ছে স্নিগ্ধ চন্দনের গন্ধ। এ কী প্রেমিক-রূপ শিকারীর! কৌমুদী কিছুক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাে। কৌমুদী খাটে বসে ছিলাে, শিকারী ছিলেন দাড়িয়ে। শিকারীর ঠিক মাথার পাশেই তার স্ত্রীর মুখটি দেয়াল থেকে উকি দিয়ে আছে। কৌমুদীর মনে গভীর সমবেদনা ফুটে উঠলাে। পৃথিবীতে অনেক স্বামি-স্ত্রী সে দেখেছে, এতখানি মানানসই এক জোড়া নারী-পুরুষ, সে যেন দেখেনি। বড় আয়নার শিকারীর ছায়া পড়েছে, বলিষ্ঠ ঘাড় ও প্রশস্ত কঁাধের ছায়া দেখে কৌমুদীর চোখ সেদিকে থেকে যেন ফিরােনা। পলক না ফেলে অনেকক্ষণ কৌমুদী তাকিয়ে রইলাে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে দেয়ালের ছবিটার দিকে তাকাবার প্রবল ইচ্ছে হলাে তার। কিন্তু বার বার দৃষ্টি পরিবর্তন করতে সে সংকোচ বােধ করলাে। ভেদ করে মৃগনাভির গন্ধও যেন তার নাকে এসে প্রবেশ করছে। কৌমুদীকে দিয়ে আত্মসমর্পণ করিয়ে দেব নাকি, পঞ্চমি,—কি বল তুমি? কিন্তু তা সম্ভব কি করে, তাহলে কৌমুদীর জীবনের শেষাংশ মিথ্যে হয়ে যায়। নীলরতনবটব্যাল-বর্ণিত কাহিনী তাহ'লে ওলট-পালট হয়ে যায়। কিন্তু এ-রকম একটি লােভনীয় অবস্থার মধ্যে দু’জনকে পেলে কলমকে সংযত রাখা কষ্টসাধ্য। লেখক হিসেবে জীবনে এমন হার অনেকবার হেরেছি, যা ভেবে বসেছি, যে-ভাবে কাহিনী মনে মনে গুছিয়েছি, পরে দেখা গেছে—তার কিছুই নেই ; এক অপরিচিত ব্যক্তিত্বশালিনী নায়িকা এসে আমার অজানিতে কখন্ সমস্ত কাহিনী একাই গ্রাস করে বসেছে। কিন্তু কৌমুদীকে দিয়ে ধুমিত কাজ করানাে চলেনা। সে যে নেই মায়ের মেয়ে, যে তার-প্রতি- আসক্ত একটি ছেলেকে খুন করেছে তার ডাক্তারের জন্য। সেই কৌমুদীকে এতটা খেলাে হ'তে দেওয়া শােভা পায় না। ০ .

শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু শিকারী যখন কৌমুদীর পাশে এসে দাঁড়ালেন, তখনাে কৌমুদী , নড়লােনা। শিকারী তার কাঁধের ওপর একটা হাত রাখলেন, তখনাে কৌমুদী অনড়। শিকারী কৌমুদীর পাশে ঘন হয়ে বসে বললেন, কেমন আছ? শিকারীর মুখে তীব্র মদের গন্ধ। কৌমুদী স্প্রীংএর মত লাফিয়ে উঠলো, শান্ত হয়ে বললাে, এ কী ব্যবহার ? শিকারী তার দিকে করুণ চোখে তাকালেন ও জড়িত জিভে বললেন, রেগেন। স্তব্ধ ঘর। দু’জনেই চুপচাপ। চারতলার 'ছাদের ওপর দিয়ে বিকট আওয়াজ করতে করতে এরােপ্লেন উড়ে গেলাে। শিকারী কোনাে কথা না বলে নেমে গেলেন। কৌমুদী নিশ্বাস ফেলে একটু হাল্কা বােধ করার আগেই শিকারী উঠে এলেন। তার হাতে লেবেল-লাগানাে বােতল। তাক থেকে কাচের গেলাশ নামিয়ে পাশাপাশি রাখলেন। বােতল আর গেলাশ পাশাপাশি রাখায় দৃশ্যটা কৌমুদীর তুলনামূলক মনে হলাে। শিকারী ও শিকারীর স্ত্রী বলে মনে হলাে। গেলাশটি স্বচ্ছ ও নির্মল, বােতলটি গাঢ় কালাে ও কদর্য। এই জঘন্য লােকটির সঙ্গে অমন স্ত্রী মানায় না, সেই জন্যই বুঝি বৌটা মরে গেছে। ভালােই হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে এই স্বামি-স্ত্রীই আদর্শ যুগলমূর্তি ব’লে কৌমুদী ভেবেছিলাে, কিন্তু সে কেবল সৌন্দর্যের সাময়িক প্রভাব। ক্রমশ শিকারী নিজের আসল রূপ যতই প্রকাশ করে ফেলছেন, ঘৃণিত হচ্ছেন। আজ শারীরিক বল প্রয়ােগের দিন। শিকারী গভীর চিন্তা করতে করতে ধীরে ধীরে মদ খাচ্ছেন। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সাংঘাতিক জটিল এক গবেষণায় তার মন লিপ্ত। কৌমুদীও এদিকে চিন্তায় মগ্ন। ততই শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু ওপরে আসার সময় তিনি সিড়ির দরজায় চাবি দিয়ে এসেছেন কি না উঠে গিয়ে দেখে এলেন। তারপর এলেন কৌমুদীর কাছে। কৌমুদীর পাশে তিনি বসতেই কৌমুদী উঠে গিয়ে গেলাশে মদ ঢেলে নিয়ে এসে তার হাতে দিলাে। শিকারী বেশ ফুর্তি বােধ করলেন এতে। অত্যধিক আননে তিনি কৌমুদীর কঁাধের ওপর হাত রাখতে গেলেন। কৌমুদীর মনে আক্রোশ মারাত্মক মূর্তি নিয়েছে। সে অনেকটা সরে গিয়ে বললাে, খেয়ে নিন্। শিকারী ম্লান হেসে বললেন, খাবাে? খাচ্ছি। খান্। আরেকটু ঢেলে দিচ্ছি। ঢেলে দেওয়া আর খেয়ে যাওয়া—দু’জনের জীবনের এই যেন ব্রত। অনেকক্ষণ ধরে এই ব্রতপালন চললো। এদিকে রাত্রিও বেড়ে চলেছে। চাঁদ এখন দূরের কারখানার চোঙা ডিঙিয়ে চারতলার ছাদের ওপর এসে পৌছে গেছে। সাড়াশব্দও নেই কোনাে দিকে। যেখানে শব্দ নেই, চিন্তা সেখানে স্বভাবতই বেশি। শিকারীর মনের খবর তত রাখিনে, কিন্তু কৌমুদীর চিন্তা গভীর হচ্ছে ধীরে ধীরে। একটা দুরূহ কর্তব্য পালনের দায়িত্বের ছাপ তার মুখে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে। শাদা আলােটা নিবিয়ে কৌমুদী নীল আলাে জ্বেলে দিলো। ক্লান্ত ও অবসন্ন গলায় শিকারী বললেন, এই বেশ। বলবেন? কৌমুদী উত্তর দিলেন। তার ছাদে একটু পায়চারী করার ইচ্ছে হলাে। মনের মধ্যে তার স্বাধীনতার সংকল্প তাকে চঞ্চল করে তুলেছে। শিকারী তার বশে এলেছেন, এই ধারণা করে সে সামান্য একটু স্বাধীনতা, ভােগের ইচ্ছায় ছাদের দিকে পা বাড়ালাে ১৩৭ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু দরজা তখনাে সে পার হয়নি, শিকারী লাফিয়ে উঠে পড়লেন, এবং বলিষ্ঠ হাতে কৌমুদীকে ধরে ফেললেন, ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, যাচ্ছ কোথায় ? শান্ত ও সংযত ভাবে কৌমুদী ব’ললাে, যাইনি। ছাদ থেকে একটু ঘুরে আসবাে না ? দৃঢ় জবাব দিলেন শিকারী : না, যাবে না। বেশ, যাবাে না! ফিরে এসে কৌমুদী খাটের ওপর সহজ ভঙ্গীতে বসলাে। কিন্তু তার মনের মধ্যে তীব্রভাবে জাগলাে প্রতিহিংসার ইচ্ছা। এতদিন এতভাবে—গৌহাটিতে ও হাপাতালে—সে শিকারীকে অপদস্ত করেছে, শিকারী তারি প্রতিশােধ নিচ্ছেন তার ওপর। তা কৌমুদী জানে । প্রতিশােধেরও প্রতিশােধ আছে। এ-ও কৌমুদী জানে। সহজ ভঙ্গীতে সে বলাে বটে, অথচ মনােভাব তার সহজ থাকার কথা নয়। মৃগনাভির গন্ধ বা চন্দনগন্ধ এখন পাওয়া যায় না। বাতাসের প্রত্যেকটি স্তর এখন মদ্যগন্ধে ছাওয়া। বিষাক্ত আবহাওয়ায় কৌমুদীর দম আটকে আসছিলাে। ছাদ থেকে একটু নিষ্কলঙ্ক হাওয়া নিতেও তার বারণ। বেশ! শিকারীর মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কৌমুদী অনেকক্ষণ ব'সে রইলাে। এটা সত্যি ঘুম, না, ঘুমের ছলনা! কৌমুদী গেলাশে ও বােতলে অযথা একটু শব্দ করলে, অযথা শব্দ করে বিছানার ওপর হাত রাখলাে। শিকারী নড়লেন না। নীল আলাে নিবিয়ে শাদা আলাে জ্বেলে দিলাে— তবু তঁার দিক থেকে কোনাে সংকেত এলােনা। এবার কৌমুদী উঠে গিয়ে আয়নার সামে বসলাে, যেখানে বসে শিকারী দাড়ি কামান্। চেয়ার শব্দ করে সরালাে। তাকিয়ে দেখলাে, শিকারী অকাতরে ঘুমােচ্ছেনই। ১৩৮ ঘরময়। শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু দেরাজ টানতে গিয়ে তার হাত কেঁপে গেলাে। কিন্তু এ-সময় এমন দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেবার মেয়ে কৌমুদী নয়। কিছুক্ষণ পরে কৌমুদী পাগােলের মতাে পায়চারী করতে লাগলে। সারা সে ভুলে গেলাে-যে তাকে এখন এখান থেকে পালাতে হবে। আয়নায় নিজের ছায়া দেখে সে ভয় পেয়ে গেলো, তার ছায়া লক্ষ্য করে বােতলটা এত জোরে ছুড়লো-যে বােতল ও আয়না একই সঙ্গে ভেঙে পড়লাে। এবার সে স্বাধীন বটে, এবার সে মুক্ত বটে। শাদা আলাের নিচে দু'টো হাত মেলে ধরতেই তার মাথা ঘুরে গেলাে। আর নয়, এবার তাকে যেতে হবে। শিকারীর পকেট খুঁজে সে সিড়ির দরজার চাবি সংগ্রহ করলাে ।- ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদ পেরিয়ে সে তালায় চাবি পাক দিলো। টান দিয়ে খুলতেই, একি, সম্মুখে সশরীরে সনাতন। সনাতন বললাে, আমার সঙ্গে আয় । কৌমুদী চললাে। পরদিন সকালে পাড়ায় সাড়া পড়ে গেলাে। পুলিশের লােকে পাড়া জমজমাট। ওপরের ঘরে প্রথমে গিয়েছিলাে নন্দ চাকর। লে-বেচারার বিপদ কম হলো না ! কেন সে ওপরে গেলো, রােজ যার কিনা, গিয়ে সে দৃশ্যটি ঠিক কিভাবে দ্যাখে তার নিখুং বর্ণনা তাকে দিতে হলাে। সেখানে সে কৌমুদীকে দেখতে পায় না। সিড়িতে রক্তের দাগ দেখেই সে নাকি ওপরে ওঠে। এ-সব কৈফিয়ৎ দেবার পরও তার দুটি হলােনা। পুলিশের পাহারায় তাকে বলে থাকতে হলাে। এতক্ষণও কৌমুদীর খোঁজ পাওয়া যায়নি। সকলে লাগলাে, নতুন মেয়েটিই এমন করেছে। কিন্তু তাদের ভুল ভাঙলো তখন, যখন তারা একেবারে একতলার কোণের ঘরে কৌমুদীকে পেলো। - শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু বেলা তখন অনেক, সারাবাড়ি খানাতল্লাশী করতে করতে এই ঘরটি ভেতর থেকে বন্ধ দেখা যায়। অনেক ডাকাডাকি ধাক্কাধাক্কিতেও সাড়া পাওয়া গেলে সশস্ত্র পুলিশ চারদিকে মােতায়েম রেখে ঘরের দরজা কেটে ফেলা হলাে। মেঝেতে কৌমুদীর মৃতদেহ। ঘরের আর কোনাে প্রবেশপথ নেই। তাহলে এ বুঝি স্বেচ্ছামৃত্যু। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় তারপর জানা গেছে, শিকারীকে হত্যা করা হয়েছে এবং মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। কৌমুদীর আত্মহত্যা নাকি ভালােবাসার নিদর্শন। এ-অঞ্চলে তা-ই সকলের বিশ্বাস। শিকারীর শত্রুপক্ষদের ভেতর থেকে কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে ইতিমধ্যে। এদের মধ্যে কেউ শিকারীকে হত্যা করায় কৌমুদী নাকি এত বড় কষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজেই নিজেকে খুন করেছে। তার স্বীকারােক্তির কাগজ থেকেই প্রকাশ-যে মেয়েটি তার জীবনের যথাসর্বস্ব বর্জন করে শিকারীকে পতিত্বে গ্রহণ করে নিয়েছে। ভালােবাসা যদি এমন গভীরই না হবে, তাহলে এমন কথা কেউ নাকি লেখে না। কিন্তু পঞ্চমি, আমি প্রথমেই তােমাকে বলেছি। তার এই আকস্মিক অপমৃত্যুর জন্যে অনেকে তাকে বাহবা দিচ্ছে বটে, কিন্তু আমি সে-দলে যােগদান করতে পারিনে। বলেছি তাে, আমার সন্দেহ হয়, সে আত্মঘাতী হয়েছে তার সীমাহীন পতিব্রতার জন্যে নয়, এ হচ্ছে তার স্বকৃত অপরাধের শাস্তি। আমার সন্দেহ হয় বলেই আমি তার জীবনের শেষাংশের কাহিনী স্বাধীনভাবে লিখে দিলাম। এখন তুমি যেভাবে খুসি মনে মনে গঠন করে নিতে পার বটে, সেটুকু স্বাধীনতা তােমার অবশ্যই আছে। কৌমুদীর কথা শেষ হলাে। এখন বিজন। বিজনকে এ বাড়িতে ১৪০ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু আসতেই হয়, তা তুমি জাননা। সেদিনও সে এলেছিলো, মৃতদেহও সে দেখেছে। মৃতদেহটির ওপর যখন তার প্রথম চোখ পড়লাে, তখন আর পঞ্চমী নয়। এবার হে পাঠক হে পাঠিকা! আপনাদের কাছে আমার একটি সূংবাদ আছে। বিজনের কথা বলতে আরম্ভ করেই আমি থেমে গেছি, আপনারা দেখেছেন। থেমে যাওয়ার কৈফিয়ৎ আমি এখানেই দিচ্ছি। গতকাল সন্ধ্যার সময় আমি যখন ঠিক ওই পর্যন্ত লিখেছি, তখন আমার লেখায় বাধা দেয় একটি টেলিগ্রাম। টেলিগ্রামটা টাঙাইলের । পঞ্চমীর মৃত্যু সংবাদ বহন করে এনেছে। আজ একটা চিঠি পেলাম, চিঠিতেও ওই একই সংবাদ। আমারি ভুল হয়েছে, এখন বুঝতে পারছি। তার অসুখের খবর বা অবস্থা খারাপের খবর আমি তেমন বিশ্বাস করিনি অথবা বিশ্বাস করার সুযােগ পাইনি। আমি তখন লম্বা চিঠি শেষ করার জন্যে খুব ব্যস্ত। বহুদিন নীরব থাকার পর আচম্‌কা লঙ্গ চিঠিটা পাঠিয়ে, তাকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতলব ছিলাে, কিন্তু সেই আমাকে তাক লাগিয়ে দিলাে। তার স্বহস্তলিখিত শেষ চিঠিটার অভি সম্পাতের কথা ভেবে আজ ভীত হয়ে উঠছি। তার অভিশাপে আমাকে বুঝি ভুগতে হ’লল। দোষ আমার নয়, দোষ তার। এতদিন সে অপেক্ষা করতে পারলাে, আর মাত্র দশটা দিন সময় চেয়েছিলাম, এ ক’টা দিন সে সবুর করতে পারলােনা ! দশ দিন সময়ও আমার লাগেনি, সেদিনের পর গতকাল পঞ্চম রাত্রি গিয়াছে। আজ ষষ্ঠ দিন। দশ দিন অপেক্ষা করলে সে নিশ্চয় চিঠিটা পেয়ে যেতাে। আজ যদি বাণ্ডিল বেঁধে পাসেল করতাম, তাহলে কাল কিংবা পরশু ৱে পেতােই।' আরও যে দুটো দিন হাতে থাকতাে তার মধ্যে পড়াও শেষ হয়ে যেত। সে যাই হােক্, একটা উপন্যাসের জন্যে প্রকাশকের ১৪১ শ্ৰীমতী পঞ্চমী সমীপেষু তাড়া খাচ্ছি অনেকদিন থেকে । এই চিঠি থেকেই আপনারা সে খবর জানতে পারবেন। চিঠি লেখায় ব্যস্ত ছিলাম বলে উপন্যাস লিখে উঠতে পারিনি। সময়মত আজ প্রকাশক এসে উপস্থিত বাণ্ডিলটা তার হাতেই দিয়ে দিলাম। বাকি কথাটুকু এখানে সেরে নিই। বিজনের কাহিনীটা খুব ছােট। সে কৌমুদীর মৃতদেহ দেখে যখন চিনতে পারে, তখন একটু এগিয়ে গিয়ে সে নাকি তার পাশে বসে গায়ে ঝাঁকি দেয় ও নাম ধরে ডেকে বলে : চেরাপুঞ্জিতে গেলেনা কেন । তারপর উত্তরের জন্য এতটুকু অপেক্ষা না করেই সে নাকি সেখান থেকে উঠে হহ করে হাঁটা দেয়।

সুশীল রায় রাচত উপন্যাস একদা শ্ৰীযুত ধূর্জটিপ্রসাদ মুখার্জি বলেন- ‘সুশীলের টেনিকের দিক থেকে প্রমিস্ আছে...' শ্ৰীযুত প্রিয়রঞ্জন সেন বলেন—'লেখকের শক্তি আছে, দরদ আছে, চোখ আছে•••তাহার প্রথম • প্রকাশিত রচনা সাহিত্য-ক্ষেত্রে তাহার দাবী সপ্রমাণ করিয়াছে, Amrita Bazar Patrika 261-'It is not very easy to count the excellences... The first thing that comes up for praise is his technique....The characters are drawn especially that of Panchami.'

সুশীল রায়ের অন্যান্য বই
একদা (উপন্যাস)
মানময়ী গার্লস কলেজ (নাটিকা)
প্রেমপ্রণয়ের মর্মকথা (প্রবন্ধ)
সুচরিতা (কবিতা)

No text on this page.

No text on this page.

Srimati Panchami Somipeshu Ed.1st

Author
Roy, Sushil
Title
Srimati Panchami Somipeshu Ed.1st
File name
Srimati Panchami Somipeshu Ed.1st
Text
OCR done
Citation
1941
Published
2009/08/4
Publisher
Anilchandra Roy, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
149
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Other Genres.
Keywords
Novel as letter
DLI number
551686
Barcode
4990010021158.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
w1LibE65ags
Download PDF

Srimati Panchami Somipeshu Ed.1st