Makardah Saraswat Library, Howrah

Ujan Srote

Bandyopadhyay, Haradhan · 2009/08/4

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

উজান স্রোতে
মহারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় বি,এ,
প্রণীত।

আশ্বিন-১৩৪৩
দেড় টাকা
প্রকাশক :-
ভুবন মােহন মজুমদার বি, এসসি,
শ্রীগুরু লাইব্রেরী
২০৪ নং কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট,
কলিকাতা।
প্রিন্টার -
শরৎ কুমার হােড়
শীগগাবিন্দ’প্রেস
পি ৫৫ নং (সি, আই, টি)
শােভাবাজার, কলিকাতা

“পিতা স্বর্গ পিতা ধর্মঃ পিতা হি পরমন্তপঃ।
পিতরি প্রতিমানে প্রায়ন্তে সর্বদেবতাঃ।”
সন্তানের প্রত্যক্ষ দেবতা পিতা,
তাহারই করকমলে প্রদত্ত হইল।
তারাগুণিয়।
সেবক
২৪ পরগণ।

No text on this page.

এই লেখকেরই অন্যান্য গ্রন্থাবলী-
-
শিক্ষা, দীক্ষা, ভক্তি, প্রেম, স্বদেশপ্রীতি প্রভৃতি সৰ্ব্ব-রসাশ্রিত,
উপন্যাস-রাখি-সমুদ্র-প্রমাণ না-স্রোতে প্লাবিত।
২। স্মৃতি রেখানূতন ধরণের লেখা—চিত্তাকর্ষক-৩
কৌতুক রসাত্মক। খাটি বাঙ্গালীর ঘরের কথা—প্লটটা গভীর
রহস্য-জালে সমাচ্ছন্ন।
২। মৃত্যুপণ—নব যুগের কাহিণী--তরুণের মৃত্যুপণ—
হিন্দু সমাজের অস্পৃশ্যতা ব্যাধির চিত্র-নূতন সমাজ গঠনের ইঙ্গিত
দেশপ্রেমের জ্বলন্ত কাহিনী।
৩। সাখী-প্রেম বড় কি সামাজিক অত্যাচার বড় ?
নারী-প্রেমের, মাধুরী—অপূর্ব সুষমায় মণ্ডিত।
বিচিত্রা, য়্যাডভান্স
আনন্দ বাজার, ভগ্নদূত, বিচিত্রা,
প্রভৃতি সংবাদ পত্রে উচ্চ প্রশংসিত।
গুরু লাইব্রেরী
২০৪ নং কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

No text on this page.

উজান স্রোতে

No text on this page.

-বাঙলার ছেলে-
বর্তমান যুগের আশা ও আকাঙ্ক্ষা
-বাঙলার ছেলে-
পল্লী জীবনের স্বাভাবিক ভাব
--বাঙলার ছেলে--
জাতি যে যুগ ধৰ্ম্মের সন্ধান পাইয়াছে
-বাঙলার ছেলে-
যুবকগণ দেশকে কিরূপে বরণ করিয়াছে
বাঙলার ছেলে-
অভিনব-উদ্দীপনাপূর্ণ—রােমাঞ্চকর ঘটনা-
—বাঙলার ছেলে।
ভাষা সুন্দর-বর্ণনা ভঙ্গী মনােরম
বাঙলার ছেলে।
উপন্যাস জগতের অপূর্ব সৃষ্টি
( শীঘ্রই দেখিতে পাইবেন)

No text on this page.

মেঘমেদুর দিবস। সারাদিন ধরার বক্ষে বৃষ্টি পড়ছে-টুপ টুপ টুপ, চুচড়া সহরতলীর দ্বিতল প্রকোষ্ঠে দাড়িয়ে একটী মেয়ে চেয়েছিল। দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নাতিদুরস্থ গঙ্গাবক্ষে ~ চক্ষু অশ্রুসিক্ত । সহসা দিগন্ত রাঙিয়ে, বিজলী চমক খেলে গেল ; আর সঙ্গে সঙ্গে কড়, কড় শব্দে নিখিল বিশ্ব যেন কেঁপে উঠলাে। মেয়েটা ভয়ে ও ত্ৰস্তে সরে এসে জানালার কবাট শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দাড়াল, অর ঝরে পড়লাে নিঃশদে বুকভাঙ্গা একটা দীর্ঘশ্বাস । “নমিতা।” মেয়েটা চমকে উঠে বললে,—“কে, দিদি ?” “সন্ধ্যে বয়ে গেল ; ঘরে এখনাে আলো জ্বললে না--এতে আর লক্ষ্মী ভাগ্যি হবে কোথা থেকে ?” ব’লৈ সরমা মুখখানা বেজার করে দাড়িয়ে রইলাে।

নমিতা ধরা গলায় বললে, এই যে যাচ্ছি দিদি।” থাক, তােমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। বিনা মাইনের এমন দাসী বাদী থাকতে তােমার আর কাজে মন লাগবে কেন? আয়ত চক্ষুযুগল বিস্ফারিত করে ছল ছল করুণ চাহনি নিক্ষেপ করে নমিতা বাধা দিয়ে বলে, “দিদি, তুমিই তো সব। দাসী বাদী যদি কেউ এ বাড়ীতে থাকে, সে তাে আমি। প্রচণ্ড রােষে সরমার চোখ দুটো জ্বলে উঠলো ধক ধক্ করে—বলে, বটে ! এতদূর! বেশ, তোমার সংসার তো তুমি ইচ্ছা করলে নিজেই বুঝে নিতে পার। আমার কি ? একটা পেট, যেখানে গতর খাটাবে। সেখানেই এক বেলা দু’মুটো ভাত জুটবে। আসুক আজ মণি ঠাকুরপো ; এরপর তােমার সংসার তােমাকে বুঝিয়ে দিয়ে তবে আর কাজ। { একে মনসা তায় ধূনাের গন্ধ। নমিতার বুকের মধ্যে গুড়, গুড়, করে কেঁপে উঠলাে—আসন্ন বিপদ সূচনায়। স্বামী তাে দিদির হাতের ‘পুতুল, ইঙ্গিতে চলেন ফেরেন। তবুও নমিতা বলে, তুমি কেন তা করতে যাবে দিদি? আমিই বরং তোমাদের সুখের অন্তরায়। আমাকে বিদেয় করে দাও—তােমাদের সংসারে সুখ শান্তি ফিরে আসুক। নমিতা, তাের মুখ যে একেবারে খুলে গেছে দেখছি। বলতে বুঝি আর বাধছে না। গোর স্বামী-তাের সংসার—আটি তাে পরগাছা মাত্র—আমাকে নিয়ে না পােষায় বলে কয়ে বিদেয় করে দিতে পারিস নমিতা শিউরে উঠে বললে, ও কথা মুখে এনাে না দিদি-সামিকে যে তিনি আমার কথা শুনবেন। আর কি অধিকারে আমি সেকথা বলতে যাব ? উজান স্রোতে

( nama
โทรสาร25
সরমা বিপপূর্ণ স্বরে বললে, ওঃ তাই নাকি! ন্যাক। সাজতেও
তার বাধে না দেখছি।
নমিতা কাতর আঁখি সরমার মুখের উপর নিবদ্ধ করে ছল ছল
নেত্রে বলে, তােমার পায়ে পড়ি দিদি। আর কেন ?
সরমা ঝঝের সহিত বলে, এ হ’ল তাের কেমন জানিস? বামুনকে
জুতাে মেরে গরু দান। স্বামীর ফিরবার সময় বুঝতে পেরে এখন দেখান
হচ্ছে যেন দোষটা সব আমার--না ? অর্থাৎ সমস্ত ঝড়টা আমার উপর
দিয়ে বয়ে যাক।
নমিতা ভীত ও শঙ্কিত হয়ে বললে,—স্বামীর উপর আমার কোন
জোর নেই দিদি।
সরমা তীক্ষস্বরে বলে,-তবে কার আছে শুনি? তাতো জানতাম না :
একেই বলে লেখাপড়া জানা মেয়ে বাপরে বাপ! একটা পাশ
করেই এই।
নমিতার সহের সীমা অতিক্রম করে গেল। সে ঈষৎ উত্তেজিত স্বরে
বলে, সে জোর যদি থাকতাে তাহলে এত হেনস্থা সহ্য করে আমাকে
থাকতে হতাে না।
সরমাও উদ্ধত স্বরে বললে, অর্থাৎ সে হেনস্থার কারণ আমি।
আমিই যেন তোর স্বামীকে বশ করে ফেলেছিন?
নমিতা কাঠের পুতুলের ন্যায় স্থির ও নিস্পন্দ হয়ে দাড়িয়ে রইলাে--
চক্ষে পলক ছিল না।
সরমা বলতে লাগলাে-ধন্যি মেয়ে তুই নমিতা। কলঙ্কের ছাপ
দিতেও বকটা একট' কাঁপলাে না। ছিঃ ছিঃ ! কি হবে গো-
*
উজান স্রোতে

কোথায় যাব গাে। বাকি ছিল কলঙ্কের ছাপ তাও দিতে ছাড় লি নে। আরাে কত কি সরমা বিনিয়ে বিনিয়ে বলতে সুরু করে দিল। নমিতা ব্যস্ত হয়ে বলে, কি বলছো দিদি ? গলার স্বরটা সপ্তমে চড়িয়ে সরমা বলে উঠলাে,-আর কি ববি ? না হয় আমি তাের মত লেখাপড়াই শিখিনি, তাই বলে তাে আর নাকে ভাত দিইনে। ওমা, কি হবে গাে ! স্বামী পুত্রহীনা বলে কি এত হেনস্থা! নমিতা ভয়ে জড়সড় হয়ে সরমার পায়ের উপর হাত রেখে বলে,- আমায় ক্ষমা কর দিদি। যদি না বুঝে কিছু বলে থাকি-- সরমা সজোরে পা সরিয়ে নিল, আর পায়ের আঘাত নমিতার কপালে লেগে লে দু’হাত ছিটকে গিয়ে পড়লো। সরমার সে দিকে লক্ষ্য ছিল না। সে বলতে লাগলাে,আর কি বতে বাকি রালি । শেষে ' কিনা মণিঠাকুরপাের সঙ্গে•••••তাও পর্যন্ত নিজ মুখে শুনিয়ে দিলি। নমিতা তখন কপালে হাত দিয়ে মেঝের উপর উপুড় হয়ে পড়েছিল, আর মনে মনে ভাবছিল নিজ দুর্ভাগ্যের কথা । সরমা সহজে নিস্কৃতি দিল না, আবার বলতে লাগলাে—ছিঃ ছিঃ ! কি ঘেন্নার কথা ! মা, কোথায় যাব গাে—আমার মুখের দিকে চাইবার যে কেউ নেই গাে। তারপর সে জোরে জোরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে দিল। আরক্ত আঁখিতারা ডাগর ডাগর করে নমিতা উঠে দাঁড়াল ও কম্পিত কণ্ঠে বলে, তোমার মুখের দিকে চাইবার লােক এল বলে। তারপর '. , 3 উজান স্রোতে ==== দু'জনে মিলে আমায় মারতে মারতে বিদেয় করে দিয়ে। এতদিন যদিও বা কোন ক্রমে এ বাড়ীতে মাথা গুজবার স্থান জুটেছিল, এরপর তাও আর জুটবে না। সরমা ক্রোধে আঁখি রক্তবর্ণ করে কাঁপতে কাঁপতে বলে, তাের স্থানের আবার অভাব। বাপ আছে—উইল মাছে—আর আছে প্রাণের সুভাষ ঠাকুরপাে। তবুও তাের অভাব! আমার কি আছে বল্ তাে? আমার যে শুধু গাছতলা সার। কি সর্বনেশে মেয়ে তুই ননি! আমি বিধব—আর আমার মুখের দিকে চাইবার লােক হ’ল তাের স্বামী। মুখে আগুন – মুখে আগুন। এই জন্যই তাের স্বামী তােকে দু’চোক্ষে দেখতে পারে না। মন গুণে ধন-জিভ খসে যাবে। ইতিমধ্যে মণিময় এসে পৌছে গেল। ঘর অন্ধকারময়, অথচ ঘরের মধ্যে তখন রুদ্র অভিনয় চলছিলাে। মণিময় চুপটী করে দরজার অন্তরালে দাড়িয়ে ছিল ; আর মাঝে মাঝে ক্ষুধিত ব্যাঘ্রের ন্যায় চক্ষুতারকা অন্ধকার ভেদ করে জ্বল জ্বল করে উঠতে লাগলো। নমিতা শঙ্কিত হরিণীর ন্যায় এন্তে দু’হাত পিছিয়ে গেল। মণিময় নজ্ব গম্ভীর স্বরে বললে,-ঘরে যে এখনও আলো জ্বলে নি ? সরমা কা-তে কাঁদতে ললে, সেই কথা ব.G এসেই তো কুরুক্ষেত্র বেধে গেল। তাের বউ বলে কিনা নমিতার বক্ষঃস্থল দুরু দুরু কেঁপে উঠলাে। বাধা দিয়ে গম্ভীর স্বরে মণিময় বললে,-আমি সব শুনিছি—তুমি যাও-ঘরে অলি দেবার ব্যবস্থা করগে। উজান স্রোতে সরমা জোরে জোরে ফেঁপাতে ফোপাতে বলে,-তা যাচ্ছি কিন্তু এত হেনস্থা স’য়ে আমি এখানে আর এক তিলও থাকতে রাজী নই—বলে কিনা আমি তাের- আবার বাধা দিয়ে তীব্র স্বরে মণিময় বললেহঁ। হাঁ, সেকথা আমি শুনিছি। আজই তার উপযুক্ত ব্যবস্থা করে তবে এ বাড়ীতে জলগ্রহণ করবো। তুমি যাও তােমার কাজে। নমিতার সমস্ত দেহটা থর থর করে কাপতে লাগলাে। উজান স্রোতে, MAKARDADHOWSAT. ক? ) মণিময় চুচড়া কোর্টের একজন জুনিয়র উকিল। জুনিয়র হ'লে কি হয়, অল্পদিনের মধ্যে ওকালতি লাইনে সে বেশ পসার করে ফেলেছে। তার উপর সে নিজে ও বেশ সুপুরুষ। সহজেই তার উপর অনেকের নজর পড়ে গেল, বিশেষ করে একজন অবসরপ্রাপ্ত সাৰ জজের নামটি তার সুধীর রঞ্জন ঘােয়। সুধীরবাবুর বিবাহযােগা একটী, কন্যা ছিল। নিজে ছিলেন তিনি বিপত্নীক, সংসারে একমাত্র অবলম্বন তার এই একমাত্র কন্যা-নমিতা। নমিতা তখন পড়তে। ইংরাজি স্কুলের প্রিপারেটরী ক্লাসে। সুধীরবাৰু মণিময়ের মাকে রাজী করিয়ে এক শুভ-দিনে (?) শুভ-মুহুর্তে নমিতাকে মণিময়ের হাতে তুলে দিলেন। বিবাহের সময় নমিতা যে দু’চারদিন স্বামী গৃহে কাটিয়ে গেল, তাতে তার এই নূতন জীবন বেশ ভালই লাগলো। সংসারে আর কেহই ছিল না—শুধু স্বামী, আর এক শাশুড়ী । স্বামীকে এত অল্প সময়ের মধ্যে চিনে উঠতে না পারলেও তার উপর যে তার ভালবাসার কোন অভাব আছে এ ধারণা তার মনের কোণে স্থান পায়নি, বরং তুচ্ছ দু’একটা ঘটনা পরম্পরার মধ্য দিয়ে তার এই প্রতীতিই জন্মেছিল। যে স্বামী তাকে পছন্দই করেছেন। তার উপর শমাতার অকৃত্রিম- উজান স্রোতে

আন্তরিক স্নেহের আবেষ্টনে এসে পড়ে নমিতার মনে হয়েছিল সে যেন
এতদিনে সত্য সত্যই তার নিজের মাকে ফিরে পেয়েছে।
ঠিক এই ধারণা মাথায় নিয়ে চারদিন শশুরবাড়ী ঘর করে নমিতা
বাপের কাছে ফিরে এল—হাসি মুখে—স্বচ্ছন্দচিত্তে। পিতার বুকটাও
আনন্দে দশহাত হয়ে গেল।
শ্রাবণ মাসে মণিময়ের বিবাহ হ’লআর আশ্বিন মাসের প্রথমে
মাতা পুত্রকে বলেন,—পূজার সময় বৌমাকে নিয়ে দেশে যেতে চাই।
তুই কি বলিস্?
পুত্রের আপত্তি করবার কিছু ছিল না; বিশেষ যখন পূজার ছুটীতে
কোর্ট বন্ধ থাকবে। মণিময় বলে,-বেশ তাে, যাওয়া যাবে।
মা বললেন,-তাহলে বেয়াইকে একবার বলে রাখা দরকার।
পুত্র বলে,-এখনও তাে দেরী আছে। আর এতে বলবারই বা
কি আছে মা—আমাদের দরকারে আমরা নিয়ে আবাে।
মাতা একটু ইতস্ততঃ করে বলেন, তা বটে; তবে ঐ মেয়েটা তার
সবে ধন নীলমণি-বেশী দিন দূরে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে। আগে
থেকে বলে অল্পে অল্প মনটাকে সইয়ে নিতে পারবেন।
পুত্র ঈষৎ গম্ভীর হয়ে বলে,-তাহলে মেয়ের বিয়ে না দিলেই
পারতেন।
মাতা জিভ কেটে বলেন,-ছিঃ বাবা ! তাের আগে মেয়ে
হােতার বিয়ে হােতখন বুঝবি।
থাক মা, তােমার আর ও আশীৰ্বাদ করতে হবে না-বলে মণিময়
ঘর ছেড়ে চলে গেল।
উজান স্রোতে

• মাতা তবুও বললেন,একবার বলে রাখিস্ বাবা—বুলি।
পুত্র দূর হ’তে বলে,-“আচ্ছা, দেখা যাবে।
*
পূজার এক সপ্তাহ পূৰ্বে হঠাৎ সুধীরবাবুর অসুখ হয়ে পড়লাে।
সংবাদ শুনে মণিময়ের মাতা বড়ই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বর্ধমাতাকে
নিয়ে, দেশে যাবেন—মনে কত আনন্দ। সব গােজগাজ, মাত্র আর
তিন দিন বাকি ; অথচ বৈবাহিকের অসুখ। এমন সময় নমিতাকে
তার কাছ ছাড়া করে নিয়ে এলে একেবারেই হৃদয়হীনতার পরিচয়
দেওয়া হবে। তার সব আশা—সব আয়ােজন যেন ব্যর্থতার গভীর
নৈরাশ্যে পূর্ণ হয়ে উঠলাে।
যাত্রার একদিন পূর্বে মণিময় এসে বলে,—শুছি শশুর মহাশয়ের
অসুখ। কি করা যায়?
মা ঢােক গিলে বললেন,—এ সময় বৌমাকে আনা কি ঠিক হবে ?
মণিময় গুম হয়ে বললে,—কিন্তু সব ঠিকঠাক করে ফেলে-
বাধা দিয়ে মা বললেন,—তা আর কি হবে-চল আমরা যাই।
বৌমাকে আর এক সময় নিয়ে গেলেই হবে।
মণিময় গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে রইলো।
মা বললেন,“তুই বরং একবার যা-বেয়াইকে দেখে আয় ; আর
বলে আয় আমরা দেশে যাচ্ছি--কেমন ?
পুত্র বলে,—তিনি তো সে কথা জানেন—যেচে বলতে গিয়ে
লাভ কি ? সে আমি পারবাে না।
মা বললেন,--না বাবা, সেটা ভাল দেখায় না। আর ইতিমধ্যে
উজান স্রোতে

4 যদি একটু ভাল হয়ে থাকেন, তাহলে না হয়— । একটা টেক্ি গিলে তিনি থেমে গেলেন। পুত্র গভীর বিরক্তিভরে বলে—গেলে অনেক কথাই উঠবে। এই তাে সে দিন গিয়েছিলাম-অসুখ এমন কিছু নয় যে মেয়ে পাঠান চলে না। কিন্তু তবুও অনেক কথাই শুনে আসূতে হল। আমি অত কথার ধার ধারি না মা। আমি মনে করি, না যাওয়াই ভাল- মিছে কথা কাটাকাটি করে লাভ কি ? * মা হাসতে হাসতে বললেন, তুই একবার যা না বাবা—আজ তো পাঠাবার কথাই আছে। ভাল বুঝি সঙ্গে করে নিয়ে আবি। বৌমাকেই না হয় একবার জিগ্যেস করিস। পুত্র মুখখানা লাল করে বলে,-, সব হবে জিগ্যেস করে কোন মেয়ে আবার ইচ্ছা করে শশুরবাড়ী আসতে চায়। তােমার } যেমন কথা। মা বলেন, একবার বলেই দেখ, না—বৌমা আমার তেমন নয়। ক’দিন বা বিয়ের সময় ছিল, কিন্তু কি যত্ন—কি টান। পুত্র গম্ভীর ভাবে বললে তুমি ঐ ধারণা নিয়েই আছ--বাপ আর শাশুড়ী অনেক তফাৎ। সেদিনই সে কথা খুব বােঝা গেছে। তুমি জান না মা-তােমার বৌও আসতে নারাজ। তারপর, গোভরে মণিময় চলে গেল। উজান স্রোতে এসেছ মণিময়—এসএস বাবা। ব’লে সুধীরবাৰু উঠে বসতে চেষ্টা করলেন। মণিময় সামনের একখানা চেয়ারে বসে পড়লো। নমিতা মাথায় ঈষৎ অবগুণ্ঠন টেনে দিয়ে পিতাকে শয্যায় শুইয়ে দিল ও ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মণিময় একবার চোখ তুলে নমিতার মুখের দিকে চেয়ে দেখলে ; পরে চোখের দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বললে—এখন কেমন আছেন? সুধীরবাবু বললে, পূৰ্ব্বাপেক্ষা অনেকটা ভাল, তবে বড় দুর্বল হয়ে গেছি। তারপর সঙ্কুচিতভাবে বললেন,—আজ তাে নমিতাকে পাঠানর কথা ছিল, কিন্তু-মনের কথা মুখ ফুটে তিনি বলতে পারলেন না-একটা করুণ চাহনি নিক্ষেপ করে মণিময়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। মণিময় মুখখানা নীচু করে বলে,-কাল তো আমাদের দেশে রওনা হ’বার দিন। মা বলে দিলেন যদি- সুধীরবাবু মুখখানা স্নান করে বেদনাপূর্ণ স্বরে বললেন,-তবে যদি এসময় না নিয়ে গেলে চলে তত বড়ই ভাল হয়। নমিতার মুখখানা অবগুণ্ঠনের ভিতর দিয়ে জলভরা মেঘের ন্যায় গুরুগম্ভীর দেখাতে লাগলাে। একবার সে স্বামীর দিকে কাতর আঁখিতারা মেলে, চেয়ে দেখলে। উজান স্রোতে মণিময় সে মুখের দিকে মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে দেখলে ; কিন্তু চকিতে দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বললে-যাত্রার আয়ােজন সব ঠিক—এমন কি ষ্টেসনে গাড়ী পাল্কী পৰ্য্যন্ত এসে ফিরে যাবে। না হয় পূজার ক’দিন- মণিময় নিঃশব্দে সুধীর বাবুর মুখের দিকে চেয়ে রইলো। সুধীরবাবু পাশ ফিরে শুয়ে কি একটু চিন্তা করলেন, পরে দুঃখ- কণ্ঠে বলেন,-তবে তাই হােল্ক। ইতিমধ্যে নমিতার মুখের অবগুণ্ঠন অল্পে অল্পে সরে গেল। সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বলে,—তা হতে পারে না বাবা, এ অবস্থায় তােমাকে ফেলে আমি কিছুতেই যেতে পারবো না। তারপর সে মুখখানা অন্য দিকে সরিয়ে নিল। মণিময় ঈষৎ ঝুঃস্বরে বলল,-তাহলে তো সবই মিটে গেল~-আমি এখন উঠি । সুধীরবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন,“না না, তাকি হয় ! তারপর দু’হাত বিস্তার করে কন্যার মুখখানি নিজের মুখের কাছে টেনে এনে মাথায় হাত বুলুতে বুলুতে বললেন,-ছিঃ মা! ওকথা বলতে নেই। আমি তো অনেকটা ভাল হয়ে উঠেছি। ভয় কি মা? পূজার ক’দিন বাদে ফিরে এসে দেখবি আমি সম্পূর্ণ সেরে গেছি। শশুর ঘর করা যে মেয়েদের সৌভাগ্য। নমিতার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল ঝরে পড়তে লাগলাে। সে আঁচল দিয়ে চোখের জল রােধ করতে চেষ্টা কচ্ছিল; কিন্তু উগত অশ্রু সকল বাধা অতিক্রম করে শ্রাবণের লারার ন্যায় দু’চোখ ছাপিয়ে অবিরত ঝরে পড়তে লাগলো। মণিময় অতিষ্ঠ হয়ে উঠে গম্ভীর স্বরে ১২ উজান স্রোতে বলে—যাবার কথায় যখন এত কান্নাকাটি, তখন না যাওয়াই ভাল। সুধীরবাবুর চোখ দুটো মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় ভাস্বর হয়ে উঠলাে। কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য, পরক্ষণেই ক্ষীণ ও কাতর কণ্ঠে বলেন,-পনেরো বছর যে সব সময় তার পিতাকে আঁকড়ে ধরে আছে, আজ সেই পিতাকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে যেতে তার যে কি মনের অবস্থা হচ্ছে তা তুমি বুঝবে না মণিময় । মণিময়ের চোখ দুটো রােষে ফুলে লাল হয়ে উঠলো। ঠোট দু’টো ঈষৎ কেঁপে উঠলো; পরে কম্পিত কণ্ঠে সে বলে,-কিছু মনে করবেন না। ওকথার উত্তরে এই বলতে হয় যে, তাহলে মেয়ের বিয়ে দেওয়া ঠিক হয় নি। বিয়ে দেওয়ার পর ও কথা বলা চলে না। সুধীরবাবুর মুখ দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য কথা বাহির হ’ল না। একটা দম নিয়ে তিনি বলেন—সে তাে ঠিক কথা বাবা। তারপন্যার মুখখানা ধরে কাতর কণ্ঠে বলেন,—যাও মা, প্রস্তুত হয়ে নাও গে । আশীর্বাদ কচ্ছি মনের সুখে স্বামীর ঘর কর গে। রুদ্ধ-আবেগ বুকে চেপে ধরে নমিতা বলে,—সে হয় না বাবা। কে তােমায় দেখবে ? তারপর তড়িৎস্পৃষ্টের ন্যায় সে খাট হতে নেমে পড়লাে.ও ক্ষিপ্র ও কম্পিত পদে পাশের ঘরে প্রবেশ করলে। সুধীরবাবু ব্যথিত কণ্ঠে বললেন, তুমি যাও বাবা, সব ঠিকঠাক করে নাও দেখছাে তাে আমি অসহায়—অপারক। মণিময় অবিচলিত কণ্ঠে বললে,-আমি আর কি ঠিকঠাক করে নেব ? যে যাবার, সেই যখন যেতে গররাজী, তখন মিছে চেষ্টা। আমি এখন আসি। বলে, মুণিময় উঠে দাঁড়াল ও দ্বারের দিকে দুই এক পা করে অগ্রসর হতে লাগলাে। উজান স্রোতে ১৩ আর সুধীরবাবু সম্পূর্ণ অসহায়ের ন্যায় বেদনাতুর আঁখি মেলে চেয়ে রইলেন। গ ৩ মণিময় কেবলমাত্র দরজার বহিভাগে পা দিয়ে দাঁড়াল; আর সঙ্গে সঙ্গে নমিতা এসে বলে যেও না—দু’টো কথা শুনে যাও। মণিময় চোখ তুলে নমিতার মুখের দিকে চেয়ে রইলাে। সে মুখখানা যেন বর্ষণক্ষান্ত মেঘের ন্যায় স্থির—অচঞ্চল, তবে ভাবধিক্যের গুরুত্ব হেতু তখনও বিজলী চমকের ন্যায় মাঝে মাঝে নাতিদীর্ঘ কপালের উপর দিয়ে ক্ষীণ চিন্তার রেখা ফুটে উঠে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। মণিময় গম্ভীর ভাবে বললে—বল----কি বলতে চাও? অবনমিত চোখ দুটো ঈষৎ উন্নত করে নমিতা বলে—এইখানে ? অদ্ধি কি ? বলে মণিময় মুখখানা ফিরিয়ে নিল। নমিতা গম্ভীর ভাবে বলে—তােমার না থাকতে পারে—কিন্তু • আমার আছে। মণিময় নমিতার মুখের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে কিন্তু তােমার আপত্তিই যে আমাকে মেনে চলতে হবে তার কি কোন মানে আছে ? হঠাৎ বৃশ্চিকদংশনে শিউরে উঠে ব্যথিত কণ্ঠে নমিতা বললেন- সত্যিই তার কোন মানে নেই—কিন্তু আমার মনে হয়, ঠিক এমনি ভাবে সঁড়িয়ে আমি যে কথা বলতে চাই সে কথা বলা সঙ্গত কৃবে না- অন্ততঃ সম্রমের দিক দিয়ে না-তাতে আত্মমর্যাদায় আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগতে পারে। মণিময় বিদ্রুপপূর্ণ কণ্ঠে বললে—কার সমকার আত্মমর্যাদা- তােমার আমার ? ১৪ উজান স্রোতে উভয়েরা—নমিতা নীরবে হাতের নখ খুঁটতে লাগলাে। মণিময় বললে—সে সন্ত্রম, সে আত্মমর্যাদা জ্ঞান থাকলে তুমি আজ এমন ভাবে কখনই আমাকে অপমান করতে পারতে না। নমিতা কোন জবাব দিল না ; মুখখানা আঁধার করে দাঁড়িয়ে রইল। মণিময় কলে-এর পরেও যে এখানে দাঁড়িয়ে তােমার কথা ছি-এই যথেষ্ট। এখনও বলকি বলতে চাও—জেনাে আমার সময়ের মূল্য আছে। নমিতা কি বলতে গেল ; কিন্তু রুদ্ধ আবেগে ভাষা ফুটে বেরুল না। পরে অতি কষ্টে মাত্র বলে,—সময়ের মূল্যবেশ, তােমার সময়ের ক্ষতি আমি করতে চাইনে। তাহলে আমি চল্লাম-ব’লে মণিময় দুই এক পা অগ্রসর হ’ল । নমিতা কবাট ধরে কল্পমান দেহটাকে আসন্ন আঘাতের হাত থেকে রক্ষা করে মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো। তারপর চোখ ফিরিয়ে দেখলে কেহ কোথাও নেই—শুধু বাড়ীর দাসী এসে বলছে- দিদিমণি এখানে দাড়িয়ে—দাদাবাবু কি চলে গেলেন? নমিতা মুখ চোখ উদ্ধান্তের ন্যায় করে বললে—চলে গেল—না ? তুই যা মােদা-জামাইবাবুকে ফিরিয়ে নিয়ে আয়হােক বাবার অসুখ। আমি যাব। যা—যা-ডেকে নিয়ে আয়—তবু যে বঁাড়িয়ে রইলি ? মােফদা ভয়ে ভয়ে বলে, কিন্তু জামাইবাবু যে চলে গেছেন? ও চলে গেছেন। আচ্ছা থাক্। ব’লে নমিতা টলতে টলতে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে। উজান স্রোতে

( 3 )
৪
পরদিন মণিময় মাকে নিয়ে দেশে রওনা হল।
বাড়ী পৌছিতেই বর্ষীয়সী অনেক স্ত্রীলোেকই এসে উপস্থিত হল,
কৌতূহলপরবশ হয়ে। কেউ বললেও দিদি, বৌমা কোথায়? এই
শুলাম ছেলে বৌ নিয়ে আছে।
আবার কেউ বলেও মণির মা, বৌমাকে দেখছি না যে।
পাড়াগা বলে বুঝি এলেন না ?
মণিময়ৈর মাতা বলেন, বৌমা আমার তেমন নয়। বাপের খুব
অসুখ-তাই রেখে আসতে হ’ল। তোমরাই বল দিদি-বুড়ো বাপকে
দেখবার তো একজন চাই ।
তবুও একজন নাসিকা কুঞ্চিত করে বলে,-তা হ’লই বা বাপের
অসুখ। এমন কি দূর দূরান্তরের রাস্তা যে, দু’চার দিনের জন্যও আসা
চলতো না।
সে কথার সমর্থন করে আর একজন বললে, -এই তাে সেবার
আমার বৌমার মায়ের কি অসুখটাই না হয়েছিল। বিপিন আতে
গিয়ে তাে ভেবেই আকুল। বৌমা কিন্তু চলে এলেন হাসি মুখে।
আমি বল্লাম, এ অবস্থায় তুমি কেন এলে মা। বৌমা বললেন, তাকি
হয় মা, আমার জোরের জায়গা যে শশুড়বাড়ী।
উজান স্রোতে

মণিময় এক পার্শ্বে দাড়িয়েছিল। কথাগুলি তার অস্থি পঞ্জর ভেদ
করে ম-লে গিয়ে পৌছে যেন জানিয়ে দিতে লাগলো-এও বৌ,
সেও বো ।
মণিময়েমাতা বলেন,-বেয়াইয়ের সংসারে ঐ এক মেয়ে ছাড়া
যে দ্বিতীয় মানুষ নেই। অসময়ে দেখবার জন্যই তো লােক ছেলে মেয়ে
কামনা করে।
একজন একটু ব্যঙ্গস্বরে বলে, ও কথা বলো না দিদি। ঈশ্বর
করুন, আজ যদি তােমারই একটা বড় অসুখ হয়ে পড়তো তাহলে
বাপের অসুখ বলে কি আর রেহাই দিতে? তা নয় দিদি, পাড়ার্শায়
আসার নাম হলে সহুরে মেয়েরা ছল ছুতেই খুজে বেড়ায়—এ তো
আবার বাপের অসুখ ।
মণিময়ের মাতা বিমর্ষমুখে বলেন,“বৌমা আমার একেবারেই
তেমন নয়। দেখাতে পারলাম না দিদি, কি করবাে। আশীর্বাদ
কর—মণি আর বৌমা বেঁচে থাক ও মনের সুখে ঘর সংসার করুক।
আমার , আর ক’দিন।
তাতো বটেই—তাতাে বটেই-বলতে বলতে সকলেই একে একে
চলে গেল।
৯
পরদিন
গ্রামের মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ এলেন দেখা করতে, সঙ্গে করে নিয়ে একটা
বিধবা যুবতী।
যুবতীর বয়স আঠার উনিশ, সুন্দর ছিপ ছিপে চেহারা; যাকে
উজান স্রোতে
১৭

। বলে তন্বী। পরণে ছিল তার ধােবদস্থ কাপড়, মুখখানা ঈষৎ অব শুনে ঢাকা-অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিরাভরণ। যুবতীটা জড়সড় হয়ে মাতঙ্গিী ঠাকরুণের একপার্শে এসে দাঁড়াল, নিজ রূপসৌন্দৰ্য্য জোর করে চেপে ধরে ; কিন্তু তবুও যেন তার দীপ্ত প্রভা চারিদিকে ঠিকরে পড়তে লাগল। মণিময়ের মাতা তখন পুত্রের সঙ্গে কি কথা কইছিলেন। হঠাৎ মাতঙ্গিনী ঠাকরুণের আগমনে তিনি বললেন,-এসএস দিদি। কেমন আছ ? এ মেয়েটী কে? তারপর দুঃদ্র কণ্ঠে বললেন,-- আহা ; এত অল্প বয়সে-সঙ্গে সঙ্গে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে কি যেন চিন্তা করতে লাগলেন। মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ গলাটা কাপায়ে বলেন,—আর দিদি গঙ্গা মুখে পা হয়েছে, এখন গেলেই হয়। মাঝখান থেকে অভাগী এসে ঘাড়ে পঙুলো। ফেবারও নয়—গিলবারও নয়। ত্ৰিকুলে কোথাও ঠাই জুটলাে না। আছে মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ—-ছাই ফেলতে ভাঙা কুলাে~- কাজে লেগে গেল। মণিময়ের দৃষ্টি তখন নিবদ্ধ ছিল মেয়েটীর উপর, যেন বুভুক্ষুর ন্যায় হ করে সে তার রূপসৌন্দৰ্য্য পান করছিল। কৌতুহলী মেয়েটীরও নয়নযুগল স্থির ছিল না, ভেসে বেড়াতে লাগলো ঘােমটার ফাকে ফাকে অনুসন্ধিৎসু-উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে। দুই একবার চোখে চোখে মিলন হ’বার সঙ্গে সঙ্গে নে অবগুণ্ঠনটা আরাে বেশী করে মাথার উপর টেনে দিল । মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ বললেন,-আঃ কপাল! মণিকে দেখে আবার একগলা ঘােমটা দিচ্ছি—ও যে সম্পর্কে তাের দেওর ইয়। দেখ দিদি, একবার সবাের কাণ্ড কারখানা। . উজান স্রোতে মণিময়ের মাতা একটু হেসে বলেন, চেনাশুনা নেই, লজ্জা হয় বৈকি। আহা! এমন মেয়ের কপালে এমনও ঘটে ! মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,ওর পােড় অদৃষ্ট দিদি-তাই কপালে সইলো না। ও আমাদের নিতাইয়ের বৌ- নিতাইয়ের কথা তাে তােমার মনে আছে। উত্তরে মণিময় বলে,-ওঃ নিতাই দা! কি আমুদে লোকই না ছিলেন। কি হয়েছিল তার ? মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ বললেন,—কি আর হবে? অমন অবস্থা-নেশা- ভাঙ করে সব উড়িয়ে দিল ; শেষে অভাগীকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে গেল। মণিময় নীরবে কি চিন্তা করতে লাগলাে। মাতা সহানুভূতি দেখিয়ে বলেন,—সত্যি দিদি, নিতাইয়ের গায়ে অসুরের মত জোর ছিল। কি চেহারা! সে যে এত শীগগির চলে যাবে—একথা কেউ কোনদিন ভাবতেও পারেনি। একমাত্র ভরসা তুমি আছ । আর দিদি ! আমার থাকা না থাকা দুই সমান। যম যে কেন স্কুলে আছে বুঝতে পারি নে। একে ওর সােমত্ত বয়েস, তায় পাড়াগা জায়গা ---সদাই ভয় হয় ওকে নিয়ে। তাই বলছিলাম কি—তােমার তাে লােকের অভাব—বৌমা তােমার ছেলে মানুষ—সবােকে না হয় এবার তােমার সঙ্গে পাঠিয়ে দেব। মণিময়ের মাতার মনটা কেমন ছাত্ করে উঠলাে, বলেন, কিন্তু (তামার তাে তাহলে কষ্ট হবে দিদি। বুড়াে বয়সে যা হক দু’টো বাধা ভাত পাচ্ছে। উজান স্রোতে বলে তন্বী। পরণে ছিল তার ধােবদস্থ কাপড়, মুখখানা ঈষৎ অব গুনে ঢাকা—অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিরাভরণ। যুবতীটা জড়সড় হয়ে মাতঙ্গিনী ঠাকরুণের একপার্শ্বে এসে দাঁড়াল, নিজ রূপসৌন্দৰ্য্য জোর করে চেপে ধরে ; কিন্তু তবুও যেন তার দীপ্ত প্রভা চারিদিকে ঠিকরে পরতে লাগল । মণিময়ের মাতা তখন পুত্রের সঙ্গে কি কথা কইছিলেন। হঠাৎ মাতঙ্গিনী ঠাকরুণের আগমনে তিনি বললেন,-এসএস, দিদি। কেমন আছ ? এ মেয়েটী কে? তারপর দুঃখা কণ্ঠে বললেন, আহা ; "এত অল্প বয়সে—সঙ্গে সঙ্গে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে কি যেন চিন্তা করতে লাগলেন। মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ গলাটা কাপায়ে বললেন,-আর দিদি ; গঙ্গা মুখাে পা হয়েছে, এখন গেলেই হয়। মাঝখান থেকে অভাগী এসে ঘাড়ে পঞ্চলে। ফোরও নয়-গিলবারও নয়। ত্ৰিকুলে কোথাও ঠাই জুটলো না। আছে মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ—ছাই ফেলতে ভাঙা কুলাে~- কাজে লেগে গেল। মণিময়ের দৃষ্টি তখন নিবদ্ধ ছিল মেয়েটীর উপর, যেন বুভুক্ষুর ন্যায় হাঁ করে সে তার রূপসৌন্দৰ্য্য পান করছিল। কৌতুহলী মেয়েটীরও নয়নযুগল স্থির ছিল না, ভেসে বেড়াতে লাগলো। ঘােমটার ফাঁকে ফাকে অনুসন্ধিৎসু-উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে। দুই একবার চোখে চোখে মিলন হ’বার সঙ্গে সঙ্গে সে অবগুণ্ঠনটা আরাে বেশী করে মাথার উপর টেনে দিল। মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ বললেন,-আঃ কপাল! মণিকে দেখে আবার একগল ঘােমটা দিচ্ছি—ও যে সম্পর্কে তাের দেওর হয়। দেখ দিদি, একবার সরাের কাণ্ড কারখানা। উজান স্রোতে মণিময়ের মাতা একটু হেসে বলেন, চেনাশুনা নেই, লজ্জা হয় বৈকি। মাহা! এমন মেয়ের কপালে এমনও ঘটে । মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,ওর পােড় অদৃষ্ট দিদি-তাই কপালে সইলো না। ও আমাদের নিতাইয়ের বৌ--- নিতাইয়ের কথা তত তােমার মনে আছে। উত্তরে মণিময় বলে,-ওঃ নিতাই দা! কি আমুদে, লোকই না ছিলেন। কি হয়েছিল তার ? মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ বলেন,—কি আর হবে? অমন অবস্থা-নেশা- ভাঙ করে সব উড়িয়ে দিল ; শেষে অভাগীকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে গেল। মণিময় নীরবে কি চিন্তা করতে লাগলাে। মাতা সহানুভূতি দেখিয়ে বললেন,—সত্যি দিদি, নিতাইয়ের গায়ে অসুরের মত জোর ছিল। কি চেহারা! সে যে এত শীগগির চলে যাবে—একথা কেউ কোনদিন ভাবতেও পারেনি। একমাত্র ভরসা—তুমি আছ । আর দিদি ! আমার থাকা না থাকা দুই সমান। যম যে কেন ভুলে আছে বুঝতে পারি নে। একে ওর সােমত্ত বয়েস, তায় পাড়ার্ম জায়গা সদাই ভয় হয় ওকে নিয়ে। তাই বছিলাম কি—তােমার তো লােকের অভাব—বৌমা তােমার ছেলে মানুষ—সবােকে না হয় এবার তােমার সঙ্গে পাঠিয়ে দেব। মণিময়ের মাতার মনটা কেমন হঁ্যাক করে উঠলাে, বলেন, কিন্তু তােমার তাে তাহলে কষ্ট হবে দিদি। বুড়াে বয়সে যা হ’ক দু'টো রাধা ভাত পাচ্ছে। উজান স্রোতে

তাতে পাচ্ছি দিদি , কিন্তু তাই বলে ওর আখেরের দিকেও'তে।
চাইতে হবে। তবু তােমার কাছে থাকলে সত্যিই আমি নিশ্চিন্ত
হই দিদি।
য়র মাতা আর কি করেন, অবশেষে বললেন,-আচ্ছা, দেখ।
রুবার তাে এখনও দেরী আছে।
নী ঠাকরুণ বললেন,-আমি কিন্তু নিশ্চিন্ত রইলাম দিদি।
তােমাকে করতেই হবে।
যুর মাতা হাসতে হাসতে বললেন,-আচ্ছা, তাই হবে।
২০
উজান স্রোতে

১e-ও মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ একদিন মণিময় ও তার মাকে নিমন্ত্রন করলেন। সরমা সকাল হতে বিপুল উৎসাহে রান্না শুরু করে দিল। মাতঙ্গিনী ঠাকরুণেরও তত্ত্বাবধানের ক্ৰটী ছিল না। ভাল রাঁধুনী বলে তার গ্রামের মধ্যে বেশ একটু খ্যাতি ছিল। কাজেই এক্ষেত্রে যাতে তার কোন ব্যতিক্রম না ঘটে সে দিকে তার সবিশেষ লক্ষ্য ছিল। মণিময় সকাল সকাল এসে হাজির হল। মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ বলেন,“ওরে সরাে, মণিময় এসেছে। মণিময় বলে,—এত ব্যস্ত কেন দিদিমা ? বেশী তাড়া দিলে হয়তাে তরকারীত নুন দিতেই ভুল হয়ে যাবে। তা যা বলেছিস ভাই। একে তাে তােক দেখলেই লজ্জায় একেবারে জড়সড় হয়ে পড়ে। তবে কি বা রান্না হচ্ছে যে ভুল হয়ে যাবে। সত্যি কি রান্না হচ্ছে, দিদিমা ? বেশ তাে দেখেই আয় না। সরে তো আর তাের ভাদ্দর-বৌ নয়। মণিময় হাসতে হাসতে রান্নাঘরের দিকে গেল ও দাওয়ায় উঠতে উঠতে বলে,—কি রাধছছা বৌদি ? উজান স্রোতে

সরমা আঁ করে মাথার উপর সামান্য একটু ঘােমটা তুলে ফিয়ে
নিজ কার্যে মন দিল, আর তার মুখখানা দেখাতে লাগলাে প্রভাত
বায়ুতাড়িত সদ্য ফোটা ফুলের মত--আনত ও খ্রীড়াময়ী।
মণিময় একটু ইতস্ততঃ করে বলে—আমি এলাম বৌদি রান্নার
খবর নিতে, আর তুমি কিনা মুখ ফিরিয়ে বসে রইলে—এমন কি মুখের
কথা-বতে পর্যন্ত বলে না। নেমতন্ন কোরে এনে এমন অপমান
করবে জালে কখনই আমি আসতাম না।
সরম। মুখ চোখ লাল করে অপ্রতিভ কণ্ঠে বলে,-হাতটা সড়
ছিল ঠাকুরপো। পরে হাতটা ধুয়ে ফেলে তাড়াতাড়ি একখানা খুরসী
এগিয়ে দিল ।
মণিময় বতে বসতে বললে,—কিন্তু মুখতো আর সড়ী ছিল না
।
বৌদি।
সরমার মুখের উপর দিয়ে এক ঝলক হাসির বিজলী খেলে গেল,
সে আরক্ত মুখে বলে,কি যে বল ঠাকুরপাে ।
মণিময় এবার হাসতে হাসতে বলে,-সত্যি বৌদি, ভাল রাধুনী
যারা তাদের হাত ও মুখ দুই চলে—হাত ব্যস্ত থাকে রন্ধন' কার্যে
আর মুখ ব্যস্ত থাকে, রন্ধন দ্রব্য চাতে।
সরমা হাসির বেগ চাপূতে না পেরে খিল খিল করে হেসে উঠলাে।
মণিময় বলে,—আচ্ছা তুমিই বল বৌদি, এ সত্যি কি না!
সরমা আয়ত চক্ষু যুগল ডাগর ডাগর করে বললে,-হা তুমি যেন
দেখতে গিয়েছিলে ?
মণিময় বলে, তুমি স্বীকার করছে না বৌদি ; কিন্তু ছেলেবেলায়
২২
উজান স্রোতে

বাড়ীর কাজকর্মে মা রাধতে রাধতে ছুটে এসে আমায় ডেকে নিয়ে
গয়ে বলতেন,-দেখত তরকারীটা চেকেন ঝাল সব ঠিক হ’ল
কি না। আমিও চাক্‌তে সুরু করে দিতাম। তাহলে বােঝা যাচ্ছে
বৌদি, তরকারী বেঁধে চাকার লােক একজন চাইই চাই। কিন্তু
যেখানে সে লােক নেই, সেখানে নিজে চাকা ভিন্ন-বুঝলে
কিনা বৌদি
সরমা বাধা দিয়ে হাতে হাতে বলে,-থাক ঠাকুরপাে, অনেক
দু’য়েছে। তােমার ও ওকালতির জেরার উত্তর দেবার ক্ষমতা আমার
নেই। ঐ যা, মাছের কালিয়ায় নুন দিলাম কিনা মনে পড়ছে না তো
বলে সরমা যেন গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে পড়লাে।
মণিময় হেসে উঠে বলে,—কেমন, হ’ল তাে বৌদি? আমার কথা
একেবারে বেদবাক্য-হাতে হাতে ফলে গেল। এবার হয় নিজে চাকতে
"ওঃ!
মাছের কালিয়া চাবো আমি ?
তাও তাে
বটে তাহলে তো বৌদি তােমাকে আমার
শরণাপন্ন হতেই হ’ল।
সত্যি ঠাকুরপো, একটু চেকেই দেখনা? কই—ধর।
অগত্যা, মণিময় বিনা বাক্যব্যয়ে হাতখানা বাড়িয়ে দিল।
সরমা হাতায় করে একটু তুলে ফু দিতে দিতে মুখখানা লাল
করে বলে,একটু সবুর কর ।
একটু সবুর কর। একেবারে যে জিভ দিয়ে জল পড়ে
যাচ্ছে। দেখছে না গরম—হাত পুড়ে যাবে যে। তারপর “নাও বলে”
মণিময়ের হার্তে ঢেলে দিল।
উজান স্রোতে

1.
মণিময় চেকে বললে,-বাঃ, ভারী সুন্দর হয়েছেন—য়াল
সব ঠিক। এমন চাকনদার কিন্তু তুমি আর পাবে না বৌদি।
সরমা ফিক্‌ করে একটু হেসেই বলে,-তা বটে, বিশেষ যখন
ছেলে বেলা থেকেই তুমি চেকে চেকে বেড়াচ্ছ।
মণিময় মুখখানা তুলে একবার বৌদির মুখের দিকে চেয়ে দেখলে।
সরমা তাড়াতাড়ি বলে—তারপর বে কেমন হ’ল ? ভালই
হয়েছে নিশ্চিত, দেখে শুনে পছন্দ করে যখন বিয়ে করেছ।
মণিময় গম্ভীর ভাবে বললে, সে কথায় আর কাজ নেই বােদি।
কথাগুলো সরমার মনের কোণে কোথায় গিয়ে যেন বেসুরাে বেজে
উঠলো। সে বলে,-সে কি ঠাকুরপাে ! এত ভাল চাকনদার হয়ে
কি নিজের বেলায় ভুল করে ফেললে ? তা অমন হয়- কথায় বলে
ঘরামীর মক। আগা।
মণিময় অবাক হয়ে বৌদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
সরমা বলে,“তা আর কি করবে ঠাকুরপো ?
পড়িয়ে মনের মত করে নাও।
মণিময় উদাসীন ভাবে বললে, সে আমার ক্ষমতায় নয় বৌদি।
তবে ভরসা এই তােমার কাছে থেকে যদি কোন দিন সে মানুষ
হতে পারে।
আত্মপ্রশংসায় সরমার চোখ দুটো প্রােজ্জ্বল হয়ে উঠলাে। বিস্ময়
প্রকাশ করে বলে,—কি বলছে ঠাকুরপাে !
মণিময় বলে,—সত্যি বৌদি, মা বলছিলেন তােমাকে সঙ্গে করে
নিয়ে যাবেন।
উজান স্রোতে
২৪
এখন শিখিয়ে
।

তাই নাকি? কিন্তু
মণিময় বলে,—বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি ?
তা নয়, তবে আমি হলাম মুখ পাড়াগেঁয়ে মেয়ে, আর সে হ’ল
লেখাপড়া জানা সহুরে মেয়ে।
তাহােক্ বৌদি, সে তােমার কড়ে আঙ্গুলেরও যােগ্য নয়।
এমন সময় মাতঙ্গিনী ঠাকরুণ এসে পড়লেন ও বললেন, আর দেরী
কত? মণির যে সকাল সকাল খাওয়া অভ্যেস।
এই যে হয়ে গেছে। বলে সরমা ঠাই করতে চলে গেল।
উজান স্রোতে
২৫

t এক সপ্তাহ পরে মণিময় মাতাকে নিয়ে চুচড়ায় ফিরে এল, সঙ্গে এল সরমা। মণিয়ের মাতার আদৌ ইচ্ছা ছিল না সরমাকে নিজের কাছে। এনে রাখতে ; কিন্তু মাতঙ্গিনী ঠাকরুণের বিশেষ অনুরােধ তিনি শেষ পর্যন্ত উপেক্ষা করে চলতে পারলেন না। চুচড়ার বাড়ীতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরমা সমস্ত কাজ নিজ হাতে তুলে নিল। মণিময়ের মাতা কত বাধা দিতেন; কিন্তু সে কোন ওজোর আপত্তি শুতে না। ক্রমে ক্রমে নিজ কৰ্ম্মনৈপুণ্যে সে তাকে ও পর্যন্ত নিজ আয়ত্তের মধ্যে এনে ফেললে। এ ছাড়া মণিময়ের খুঁটিনাটি সমস্ত কাজ নিয়মিত ভাবে এমনই নিপুণতার সহিত সে করে যেত যে, মণিময় কোথা দিয়েও একটু ত্রুটী খুঁজে পেত না। পূৰ্বে আইনের পুস্তকগুলি এলােমেলাে ভাবে টেবিলের উপর পড়ে থাকতাে। আজ কাল কোর্ট হ’তে ফিরে এসে সে দেখতে পায় বইগুলি টেবিলের উপর গুচ্ছাকারে সাজান। সর্বত্রই সবদিকেই একখানা নিপুণ হন্তের কারিকুরী তার চোখের সানে ভেসে বেড়াত। সময় সময় বৌদির অদৃষ্টের কথা ভেবে মণিয়ের প্রাণে ব্যথার রেখা ফুটে উঠতাে। মনে হ’ত এমনই একটা অমূল্য জীবন বিফলে চলে যাবে, আত্মাহুতি দিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়ে পরের সেবায় -পরের তৃপ্তি সাধনে। কিন্তু বিধবা রমণীর, তা ছাড়া আর কি কাম্য থাকতে পারে ? ও কি কষ্ট ! মনের সহস্র স্র বাসনা যা যৌবনের উজান স্রোতে = ২৬

নূতন আকর্ষণে মাথা খাড়া করে ওঠে, তাকে সবলে নিস্পেষিত করে
সংসারের বুকে চলা ফেরা করতে হবে। গভীর সমবেদনায় মণিময়ের
প্রাণটা আকুল হয়ে উঠতো।
সে দিন কোর্ট হতে ফেরার পর সরম খাবারের থালা ও গ্লাস
হাতে করে মণিময়ের সামনে এসে দাঁড়াল। মণিময় বলে,-আচ্ছা
বৌদি, তােমার কি কোন কাজে একটুও ভুল হয় না?
থালাখানা ও গ্লাসটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে সরমা বলে,
এতে আশ্চর্য হবার কি আছে ঠাকুরপাে ? তুমি যে মক্কেলদের কাজ
কর—কোন্ দিন কোন্ এজলাসে কার মকদ্দমা—কোন্ সময় উপস্থিত
থাকতে হবে--এ সব কি তােমার ভুল হয় ?
তুমি এত খোঁজ ও রাখ বৌদি—বলে মণিময় খিল খিল করে হাসতে
লাগলো। তারপর বলে, তুমি আবার বল বৌদি যে, তুমি শিক্ষিত।
নও। আজকালকার অনেক শিক্ষিত মেয়ের তুমি কাণ কেটে দিতে পার।
বৌদি হাসতে হাসতে বললে,—পারিনা?
নিশ্চিতই পার বৌদি—সে কথা আর বলতে।
কিন্তু সকলের নয়-কেমন ?
কেউ বাদ যাবে না-বৌদি।
একজন অবশ্য বাদে। সে পথ খােলা রেখেই বােধ হয় “অনেক”
Fথাটা ব্যবহার করেছ ?
মণিময় বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলাে; পরে বললে,এখন না হয়
স কথা প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।
জজে কিন্তু কথা শিনে নেবে না ঠাকুরপো।
উজান স্রোতে
২৭

মণিময় খিল্ খিল করে হেসে উঠলো।
সরমা বললে,একেবারে যে হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে দিলে
ঠাকুরপাে ?
উপায় কি বোদি--তােমর কথায় যে না হেসে থাকা যায় না।
এখনই এই, নমিতা এলে তাে আর হাসি রাখবার জায়গাই খুজে
পাবে না। বেশী হাসি কিন্তু ভাল নয়।
নমিতার নামােল্লেখে মণিময়ের মুখ হ’তে, হাসির ফোয়ােরা যেন
নিঃশেষ হয়ে গেল। সে বৌদির মুখের দিকে ব্যথিত করুণ চাহনি
নিক্ষেপ করে চেয়ে রইলো।
সরমা গম্ভীর স্বরে বলে,-এবার নমিতাকে নিয়ে এস। এখন
তাে বাপের অসুখ ভাল হয়ে গেছে। যাঃ, ওদিকে বােধ হয় ডালের
জল শুকিয়ে গেল। বলে দুড় দুড় করে সরমা ঘর ছেড়ে চলে গেল।
মণিময় অবাক হয়ে চেয়ে রইলাে। খাবারের থালা সামনেই ছিল।
লে দিকে মণিময়ের দৃষ্টি ছিল না। সে নীরব নিস্পন্দ হয়ে আকাশ
পাতাল চিন্তা করতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পরে সরমা ফিরে এসে বলে,এখনও খাওনি ? এদিকে
যে লুচিগুলো জুড়িয়ে গেল।
মণিময় অপ্রতিভ হয়ে বললে,-তাই তো কেমন ভুল হয়ে গেছে।
তুমি হাসালে ঠাকুরপাে। সামনে খাবার রেখে কারো ভুল হয়
নাকি? তারপর মৃদু হেসে পানের ডিবাটা টেবিলের উপর রেখে ধীর ও
মন্থর গতিতে ঘর ছেড়ে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল,“আর যেন
খাবার কোলে করে বসে ভেব না—উপস্থিত ছাড়তে ১নই ঠাকুরপো।
২৮
উজান স্রোতে

( ৭ ) দিনের পর দিন এইরূপ সামান্য সামান্য ঘটনার মধ্য দিয়ে মণিশয়ের সময় কেটে যেতে লাগলাে। আর তার আকর্ষণটা ততই যেন বৌদির উপর বদ্ধমূল হয়ে পড়তে লাগলাে। তুচ্ছ খুটিনাটি ঘটনা যাহা “সংসদে দিন রাত ঘটে, অথচ কেহই গ্রাহের মধ্যে আনতে চায় না, তারই মধ্য দিয়ে ভালবাসা অলক্ষ্যে নিজের মেহজাল বিস্তার করে দেখা দেয় এ চিন্তা কারো স্মরণ-পথেও পড়ে না। এক্ষেত্রেও সেই চিরন্তন ধারার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। মণিময় যে জিনিষটা তুচ্ছ উপেক্ষার বিষয় বলে মনে করেছিল, সেই জিনিষই যে কোন দিন তার নিকট গভীর ভাবনার বিষয় হয়ে দাড়াবে তা সে কল্পনায়ও আতে পারে নি। মণিময় সময় সময় চমকে উঠতে; চার ভাৰতত-সে যেন দিনের পর দিন ধাপে ধাপে নেমে চলেছে- কোথায় কতদুরে যে তার পরিসমাপ্তি তা যেন সে নিজেই জানে না। ঠিক এই ভাবনা মাথায় নিয়ে সে দিন মণিময় বাড়ী ফিরলো- সন্ধ্যার কিছু পরে ও নিঃশব্দে কোর্টের পােষাক ছেড়ে বৈঠকখানা ঘরে এসে বসলাে। এমন ভাবে দোটানার মধ্যে থেকে তার জীবনটা বেন হাঁপানী রােগীর ন্যায় দিনরাত হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিল। তাই সে আজ মনস্থ করেই ছিল একটা বােঝা পড়া করে ফেলতে হবে। টিজান স্রোতে যেমন ভাবেই হােক না কেন। যদি ডুবতেই হয়, ডুববে ; কিন্তু তবুও সে চায় নিজেকে মুক্তি দিতে-নিজের পথ বেছে নিতে। সংশয় ও সন্দেহের মাত্রা বাড়িয়ে তুলে সে আর একদিনও চলতে রাজী নয়। ঘড়ির কাটার ন্যায় যে তার নির্ধারিত সময়ের দিকে লক্ষ্য রেখে কাজ করে যেত, সেই সরমাও আজ ভেবে পেলে না—কেন আজ ঠাকুরপাের ফিরতে এত দেরী হচ্ছে ? রান্নাঘরের কাজ সেরে সে ধীর ও মন্থর গতিতে বৈঠকখানা ঘরের দিকে অগ্রসর হ’ল ও দরজায় পা দিয়ে “কে দাড়াল। মণিময় নিজ চিন্তায় বিভাের ছিল—বৌদির আগমন সে অনুভব করতে পারলে না। সরম নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে স্মিত হাস্যে বলে- কি ভাবছো ঠাকুরপাে? মণিময় উৎফুল্ল হয়ে বলে-তােমারই কথা বৌদি—একেই বলে providential সুরমা কৃত্রিম রাগভরে মুখখান ফিরিয়ে নিয়ে বলেনা হয় আমি ইংরাজী জানিনে ঠাকুরপাে-তাই বলে- সাময়িক উত্তেজনায় ঝোঁকের মাথায় মণিময় বৌদির হাত দু’খানা বিপুল আবেগে চেপে ধরে ভাব বিজড়িত কণ্ঠে বললে—সত্যিই বলছি। বৌদি তােমার ভাবনা--তুমি কি বুঝতে পার না? একটা বিপুল ঝাঁকুনি দিয়ে হাত দুখানা মুক্ত করে নিয়ে সরমা বলেছিঃ ঠাকুরপো ! তারপর উত্তরের কোন প্রতীক্ষা না করে, দ্রুত গতিতে সে ঘর ছেড়ে চলে গেল। মণিময় হতভম্বের ন্যায় চেয়ে রইলো. উদাস সকরুণ দৃষ্টি তুলে-- যতক্ষণ না সে দৃষ্টিপথের অন্তরালে গিয়ে জাল। আর মনের মধ্যে উজান স্রোতে এই প্রশ্ন বার বার আঘাত করতে লাগলাে--তবে কি আমি এত দিন ভুলই বুঝে এসেছি ? মণিময় ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লে ও গালে হাত দিয়ে কত রকম চিন্তা শুরু করে দিল। কিন্তু ব্যর্থতার ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে কে যেন তাকে জানিয়ে দিতে লাগলাে স্ত্রী চরিত্র বড়ই দুয়ে-- সম্পূর্ণ আয়ত্তের মধ্যে এসেও কোন রকমে ধরা দেয় না—দিতে চায় না। কিন্তু কি চায় সে ? ঠিক সেই মুহূর্তে সশব্দে সরমা ঘরে ঢুকলো, তার চিন্তা ধারার দিয়ে। মণিময় তাকিয়ে দেখলে-বৗদির এক হাতে একখানা খাবারের রেকাবী—অপর হাতে এক গ্লাস জল--অর মুখখানা যেন স্বচ্ছ-সুন্দর- উদ্বেগহীন। সরমা টেবিলের উপর রেকাবী ও গ্লাসটী সযত্নে রেখে দিয়ে মৃদু হাসির রেখা অধরে ফুটিয়ে তুলে বললে--বসে বসে ভাবলে তো আর পেট ভরবে না। মুখও চলুক-ভাবনাওঁ চলুক-নচেৎ যে একটা ইন্ধিয় পেরাক-অভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। মণিমর উদাস ও ক্ষীণস্বরে বলে—কিন্তু ঐ এক চিন্তাই যে সকল ইন্দ্রিয়কে দুর্বল করে ফেলে বৌদি খােরাক কোন মতেই যেন কাৰ্য্যকরী হতে চায় না। ঈষৎ অপসারিত মাথার কাপড়ের খুটটুকু সংযত করে দিতে। দিতে সরমা বলে--তা জানি গাে জানি—এখন যা বছি করে যাও-- একটা ইন্দ্রিয় তত সবল হয়ে উঠুক—তারপর না হয় অন্য ইন্দ্রিয়ের : ভাবনা ভেবে। উজান স্রোতে

মণিময় নিঃশব্দে খাওয়া শুরু করে দিল।
সরমা এবার মুচকি হেসে বলে-এখন বল তো ঠাকুরপাে—আমার
জন্য সত্যিই তােমার কি ভাবনা ?
মণিময়ের মুখ দিয়ে প্রথমটা কোন কথা সরলে না—ফ্যাল ফ্যাল
করে সে চেয়ে রইলো--দৃষ্টি অর্থহীন—আবেগ মাখা। তারপর বার দুই
বিড় বিড় করে বলে—ভাবনা-ভাবনা।
বিদ্যুৎবিকাশের ন্যায় সরমা চোখমুখ রাঙিয়ে তুলে বলে—এই
তোমার ভাবনা ঠাকুরপাে-র স্বরূপ কি নিজেই তুমি জান না।
তার চেয়ে নমিতাকে নিয়ে এস—সকল ভাবনার অবসান হয়ে যাবে ।
মণিময় বিস্ময় প্রকাশ করে বলে—কি বলছো বৌদি ? পরক্ষণেই
চোখ দু’টে। তার ধক ধক্ করে জ্বলে উঠলাে ও সুতীব্র কণ্ঠে
বললো-
ভালবাসা মনের নিজস্ব সম্পত্তি তাকে জোর করে বিভিন্নমুখী,
করা যায় না।
সরমাও ততােধিক উষ্ণকণ্ঠে বলে--তা যায় না সত্যি। কিন্তু
না-হ-তবু-না—তুমিই বল ঠাকুরপাে-কি করতে চাও? •
মণিময় ভীত ও কম্পিতকণ্ঠে ডাকলে,—বৌদি।
বলবল ঠাকুরপো—তােমাকে বলতেই হবে। ছিঃ এত দুর্বল
এত কাপুরুষ তুমি! সরমার সমস্ত দেহটা থর থর করে কাঁপতে লাগলো,
আর চোখের তীব্র জ্বালাময়ী দৃষ্টি শাণিত ছুরিকার ন্যায় ঝ ঝক্ করে
উঠলাে।
মণিময় ছুটে এসে বৌদির কম্পমান, দেহটাকে বিপুল আবেগে
চেপে ধরে স্নিগ্ধ কোমল স্বরে ডালে-বৌদি। সরমা উত্তর দিল না-
উজান স্রোতে

চোখ দুটো নিমীলিত করে নিজেকে সম্পূর্ণ তার আয়ত্তের মধ্যে ছেড়ে দিল। ঠিক এমন সময় মণিময়ের মাতা বাহির হতে ডাকলেন,-সরমা এই যে—যাই। বলে বিপুল ঝাঁকুনী দিয়ে সরমা উঠে পড়লাে ওটতে টতে একেবারে রান্নাঘরে প্রবেশ করলে। মণিময়ের মা নীরবে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে এসে মাথায় হাত দিয়ে বলেন। সুগৃহিণী বলে মনে মনে তার একটা ধারণা ছিল। সেই ধারণার মূলে আজ কে যেন কুঠারাঘাত করে তাকে সচেতন করে দিন। মর্মান্তিক অন্তু দাহনে তিনি মুড়ে পড়লেন। কিন্তু উপায় কি ? তিনিই তাে সরমাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। আবার তিনিই তো তাকে সর্ব বিষয়ে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের বিপদ স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছেন। বিষবৃক্ষ নিজ হাতে রােপণ করে আজ যখন তার শিকড় মাটীতে দৃঢ়ভাবে গ্রথিত হয়ে গেছে, তরুন তার মূল উৎখাত, করা কি সম্ভব? নিজ অবিমৃষ্যকারিতার ফলে আজ তার সোনার সংসার বিষে ভরে উঠেছে। অমন দুর্গা প্রতিমার ন্যায় বৌ পর হয়ে গেল। পুত্র মক্রমেও তাকে আনতে চায় না বললেও কথা কাণে তােলে না। দুর্ভাবনায় মাতার শরীর ভেঙ্গে পড়লাে। ঐ এক দুর্বহ চিত্ত, মাথায় ধরে তিনি দিন কাটাতে লাগলেন, শুধু শেষের দিনের প্রতীক্ষায় -যে দিন এক লহমায় সকল ভাবনার অবসান হয়ে যাবে । তবু মায়ের প্রাণ বােকে না। সে দিন কি মনে করে আবার তিনি উজান স্রোতে

বললেন,-বৌমাকে একবার নিয়ে আয় বাবা। আমার শরীরের অবস্থা
দিন দিন যে রকম হচ্ছে, তাতে বৌ নিয়ে ঘর করা বােধ হয় আমার
ভাগ্যে নেই।
মণিময় বলে,আতে গিয়ে একবার অপমানিত হয়ে ফিরে
এসেছি। তুমি কি বলতে চাও ফের অপমানিত হয়ে ফিরে আসি?
মাতা বলেন, সেবার বাপের অসুখ ছিল। এখন তাে তিনি
সেরে উঠেছেন।
মণিময় বলে,সে তত লােকের মুখে শােনা কথা—গেলেই আবার
হয় তত নতুন কোন অসুখের কথা শুনতে হবে।
ছিঃ বাবা! আকাশে খুঁটি দিয়ে কি কেউ ঘর করে ?
সরমা সেখানে উপস্থিত ছিল। সে বলে,—সত্যি ঠাকুরপাে, কবে কি
হয়ে গেছে, তাই মনের মধ্যে গিরাে দিয়ে বসে থাকা কি ঠিক ? তুমি
আজই চলে যাও ও নমিতাকে নিয়ে এস। তােমার সঙ্গে যখন আসবে,
তখন তাে দিন-অদিন দেখাই দরকার করে না।
মণিময় চক্ষুদুইটী বিস্ফারিত করে একবার সরমার মুখের দিকে
চেয়ে দেখলে। মনে হলাে মুখচোখের উপর দিয়ে যেন মুহু মুহু
তড়িৎপ্রবাহ খেলে যাচ্ছে ; আর ওষ্ঠে দুষ্টুমীভরা হাসির অস্ফুট বিকাশ।
মণিময় মুখখানা নীচু করে কি যেন চিন্তা করতে লাগলাে।
সরমা আবার বললে,-মিছে ভেবে কি হবে ঠাকু । ঘরের
বৌ কতদিন বাপের বাড়ী ফেলে রাখবে ?
মণিময় গম্ভীরভাবে বলে, কিন্তু আমি বলছি বৌদি, মিছে
যাওয়া—সে আসবে না। তুমি তাকে এন না।
৩৪
উজান স্রোতে

।
সরহ্মা মুচকি হেসে বললে—তা বটে; কিন্তু চেষ্টা তাে করতে হবে।
নচেৎ তােমাকেই লােকে দোষ দেবে। তারপর সরমা মুখখানা ঝটিতে
সরিয়ে নিল।
মাতার চক্ষুদ্বয় জ্বল জ্বল করে উঠলো। তিনি মুখখানা আঁধার
করে নীরবে বসে রইলেন।
মণিময় বলে,-বেশ, তােমাদের সকলের মতের বিরুদ্ধে আমি কিছু
করতে চাইনে। কিন্তু আজ আর হয় না। জানি না আবার কি
অপমান মাথায় করে ফিরতে হবে।
উজান স্রোতে

L1L.ii. Estd:-1919, MAKARDAH HOWRAH. সুধীরবাবু ইতিমধ্যে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেন; কিন্তু দুর্বলত নিবন্ধন এখনও পর্যন্ত চলাফেরা কব্বার ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ফিরে পাননি তিনি কয়েকবার মণিময়কে খবর দিয়ে পাঠালেন—একবার অন্তত কিছুক্ষণের জন্য দেখা করে যেতে। কিন্তু নানারকম কাজের অজুহাত দেখিয়ে মণিময় বারবারই তাঁর সে আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করেনি। অবশেরে সত্য সত্যই তিনি বড় চিন্তিত হয়ে পড়লেন। একবার চিন্তা মনের মধ্যে প্রবেশ করলে সহজে তার হাত থেবে মুক্তি পাওয়া ভার। ভাবতে ভাবতে তিনি এমনি এক জায়গায় এসে পৌছিলেন যেখান থেকে আর তিনি পথ খুঁজে বার হতে পারলে না মাঝে মাঝে তিনি কন্যার মুখের দিকে চেয়ে দেথতেন। মনে হ’ সে মুখখানাও যেন তারই মত চিন্তাক্লিষ্ট—যেন ক্ষীণ বিষাদের ছায় স্বচ্ছ সুন্দর চাদমুখখানাকে ঘিরে রেখেছে। তার বুকের মধে ততালপাড় করে উঠতে ও মুখখানা। অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে আপনমনে উদাসীন ভাবে চেয়ে থাকতেন। উজান তো নমিতার মন ডুকরে কেঁদে উঠতো; কিন্তু উচ্ছসিত আবেগ সংরুদ্ধ করে কাজের অছিলায় অন্যত্র চলে যেত। মণিময়ের অসন্তোষের কারণ পিতা ও কন্যা উভয়েরই সুপরিজ্ঞাত ছিল, অথচ কেহ সাহসী হ’ত না সে কথা মুখ ফুটে আলােচনা করতে--যে যার চিন্তা বুকে বহন করে নিঃশব্দে নিজ নিজ কাজ করে যেত। দুৰ্ব্বহ চিন্তার ভারে সুধীরবাবুর ভগ্নস্বাস্থ্য যেন আরাে ভেঙ্গে পড়তে লাগলাে। নমিতা মনে মনে শিউরে উঠলো। যে পিতার জন্য সে একদিন তার স্বামীর কথা অবহেলা করেছে, তারই চিন্তা আজ যদি তাকে অসুস্থতার শেষ সীমায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়, তাহলে তার বেঁচে থেকে লাভ কি ? স্বামীর উপর-ক্ষোভে-রােষে-অভিমানে নমিতার মন পূর্ণ হয়ে উঠলো। একটা অনুরোধ—এমন কি দু’টো কথা পৰ্যন্ত শুন্বার অবসর হ’ল না। সময়ের মূল্য ! মেহদয়—ভালবাসা-- প্রেম-প্রীতি—এসবের কি কোন মূল্য নেই? প্রীতির আকর্ষণ কি সময়ের মুল্যের অনুপাতে নির্ধারিত হয় ? দুই ফোটা জল নমিতার চোখ বেয়ে ঝরে পড়লো। নমিতা চোখের জল্প আঁচল দিয়ে মুছতে লাগলাে, আর ভাবতে লাগলো- এই মেয়েদের জীবন—একেবারে পরাধীন-নিজের স্বাধীন ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। একদিকে পিতা—অন্যদিকে স্বামী-একজন সম্পূর্ণ অসুস্থ -পরমুখাপেক্ষী,—আর একজন সম্পূর্ণ সুস্থ—আত্মনির্ভরশীল। দু’য়ে অনেক পার্থক্য—তবুও তিনি বুঝলেন না—বুঝতে চাইলেন না—কোথায় আমার ব্যথা—কেন আমি, তার আদেশ পালনে পরায়ুখ। কিন্তু সেই পিতা আজ আমারই জন্য চিন্তাক্লিষ্ট—আমারই জন্য দিনে দিনে তার উজান স্রোতে ৩৭ দেহ ভেঙ্গে পড়ছে। তাকে মুক্তি দিতে হবে—যেমন কোরেই হােক। অসমাপ্ত চিন্তাধারায় বাধা দিয়ে সুধীরবাবু এসে ডাকলেন—মা নমিতা। নমিতা থতমত খেয়ে বলে-“বাবা। পিতা সস্নেহে কন্যার মুখখানিতে হাত দিয়ে বলেন-মুখখানা এত ভার ভার কেন মা? কি হয়েছে আমায় বল ? নমিতা জোর করে মুখে হাসি এনে বলে-কই—কিছুনা। পিতা মৃদুহেসে বলেন সত্যিই কিছু না ? অমিতা পিতার হাতদু'খানা ঈষৎ চেপে ধরে স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো। পিতা একটু ঢোক গিলে বলেন—মণিময়কে খবর দিলে ও আসে না -সেই যে রাগ করে চলে গেল- নমিতা বাধা দিয়ে বলে—ভালকথা বাবা, সরকারম’শায় চিঠি দিরেছেন। তােমার কাশীর বাড়ী তৈরী হয়ে গেছে পিতা হাসতে হাসতে বললেন---আমার বাড়ী ! তের নয়—ন? তারপর কন্যার মুখখানি সস্নেহে আঁকড়ে ধরে বলেন-আমার কাশী গয়া-বৃন্দাবন সব যে তুই। নমিতার চোখদুটো আনন্দের আতিশয্যে জলভরা মেঘের ন্যায় ভারী দেখাতে লাগলো। পিতা মুহূর্তের জন্য কন্যার মুখপানে তাকিয়ে রইলেন, বললেন- কিন্তু মা, মণিময় একবার না এলে মনে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না। তােকে চিঠি পত্র দেয় তােত? ওকি মা, মুখখানা যে ঘুরিয়ে নিলি। ছিঃ মা! লজ্জা করিস্ নে বন্। উজান স্রোতে নমিত গম্ভীরভাবে মুখখানা নত করে দাঁড়িয়ে রইলাে। পিতা । ততোধিক গম্ভীরভাবে কি যেন চিন্তা করতে লাগলেন। পরে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত কণ্ঠে বললেন—তুই না বললেও, তাের মুখচোখের চেহারা দেখে আমি সব বুঝে নিয়েছি। আমি মনে করেছি, আজই একবার যাবো। নমিতা ব্যস্ত হয়ে কম্পিতস্বরে বলে—এই দুৰ্বল শরীর নিয়ে ! এখনও পর্যন্ত দুধ খাওনি—খাবে এস—অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। পিতা মৃদু হেসে বললেন—তা হােক মানা হয় আরো একটু হবে” কিন্তু তাই বলে— বাধা দিয়ে নমিতা উদ্দীপ্তকণ্ঠে বলে-যাওয়া কিছুতেই হতে পারে না। কেন তুমি যাবে ? না—যেতে আমি দেব না—এই শরীর নিয়ে তুমি যাবে,অথচ-নমিতার গলার স্বর স্তব্ধ হয়ে এল ও প্রবল উত্তেজনায় সমস্ত শরীরটা যেন ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো ! পিতা মন্ত্রমুগ্ধবৎ স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলেন। উত্তেজনার ফেঁকটা প্রশমিত হ’বার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেন—নমিতা মা আমার ; তােকে নিয়েই আমার সংসার। তুই ও যদি আমার মনের ব্যথা না বুঝিস- কে আর বুঝবে মা ? নমিতার ডাগর ডাগর চোখ বেয়ে মুক্তাবিন্দুর ন্যায় স্বচ্ছ দু’ফোটা জল সুধীরবাবুর হাতে এসে ঝরে পড়লো। নমিতা ধরাগলায় বললে- কৰ্তব্যটা কি শুধু ব্যক্তি বিশেষে সীমাবদ্ধ বাবা ? যদি তাই হয়, তাহলে আমার বাধা দেবার কিছু নেই। উজান স্রোতে ৩৯ সুধীরবাবু বিস্মিত হয়ে বললেন-তাকি কখন হয় মা ! তবে সব সময় কর্তব্যের গণ্ডী ধরে কাজ করা যায় নাস্তার ফল বরং খারাপই হয়ে থাকে। নমিতা বলে—তাই বলে আত্মমর্যাদা পর্যন্ত বলি দিতে হবে? সুধীরবাবু হাসতে হাসতে বললেন -স্নেহাস্পদের কাছে আত্মমর্যাদাও মাথা নীচু করে দাড়ায় মাতাতে আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন হয় না। নমিতা চোখদুটো বিস্ফারিত করে পিতার মুখের দিকে চেয়ে রইলাে। ৪০ উজান স্রোতে ( ক ) সুধীরবাবু সেই দিনই মণিময়ের সঙ্গে দেখা করলেন। নমিতাকে পাঠান সম্বন্ধে কথা উঠলাে। তিনি দ্বিরুক্তি করলেন না, এমন কি পরদিনই পাঠান স্থির হ’ল। নমিতা এল। শশ্রুমাতা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। নূতন করে বুক বেঁধে আবার তিনি সংসার আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার সমস্ত প্রয়াস যেন ভেসে যেতে লাগলাে। শুধু নিষ্ফলতা মূর্ত হয়ে তার চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগলাে, বুকভাঙ্গা হাহাকার নিয়ে ঘরের বৌ ঘরে এল বটে, কিন্তু যেন সকল অধিকার খুইয়ে। সবদিকেই সরমার কর্তৃত্ব—সবদিকেই তার সুকৌশলী চোখের কড়া শাসন -কোথ: দিয়েও চুচ চালাবার এতটুকু জায়গা ফাক ছিল না। পুত্রও সেই কড়া শাসনের ক্রীতদাস, যেন সরমার হাতের ক্রীড়নক-- ইঙ্গিতে ওঠে বসে। মাতার বুঝতে বাকি রইলো না যে, দিনে দিনে বৌমার মনের উপরও তার প্রতিক্রিয়া চলতে সুরু করে দিয়েছে। বৌমার হাসি হাসি মুখখানা তাপদগ্ধ ফুলের ন্যায় যেন দিন দিন স্নান হয়ে যেতে লাগলাে। মাতা বৌমার ভবিষ্যৎ চিন্তায় আবার মুড়ে পড়লেন ! উজান স্রোতে ৪১ ' প্রথম প্রথম দু'চার দিন নমিতা সরমার পিছন পিছন ঘুরে বেড়াল। তারও খুব ভাল লাগলো এই হাস্যকৌতুকময়ী দিদিটীকে। তবে একটা বিষয়ে তার মনে কেমন খটকা লেগে গেল। স্বামী যেন বৌদি বলতে অজ্ঞান। কোন কাজ উপযাচক হয়ে করতে গেলে অমনি তিনি বলেন,-বৌদি কোথায় ? তুমি সব জানি না—তাকে পাঠিয়ে দেও। নমিতা মুখখানা স্নান করে ফিরে আসতে ও বলতে—আমার কাজ তার পছন্দ হয় না দিদি। তুমি যাও তােমাকে ডাকছেন। সরমা হাসতে হাসতে বলতো-ওঃ এই ! এতেই এত মনভার । আচ্ছা, আমি যাচ্ছি—বেশ করে দু’কথা শুনিয়ে দিয়ে আছি। সরমা কোন একটা কাজের ভার দিয়ে চলে যেত ও কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলতো—খুব করে বলে এলাম নমিতা। আর কোনদিন যদি অমন করে তাে আমাকে বলে দিস্-বুঝলি ? নমিতা সব ভুলে গিয়ে আবার হাসিমুখে দিদির পিছন পিছন ঘুরে বেড়াত। নমিতা নিত্য রাত্রে আহারাদির পর কিছুক্ষণ শ্বতাকে, রামায়ণ অথবা মহাভারত পাঠ করে শােনাত। তারপর তার যখন ঘুম এসে যেত, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের শয়ন প্রকোষ্ঠের দিকে অগ্রসর হত। ঘরে ঢুকে সে দেখতে-শয্যা খালি—স্বামী তখনও পর্যন্ত ঘরে আসেন নি। প্রথম প্রথম সে জড়সড় হয়ে শয্যার একপার্শে শুয়ে পড়তো ও প্রতি মুহূর্তে স্বামীর আগমন প্রতীক্ষা করতাে। তারপর আস্তে আস্তে সে ঘুমিয়ে পড়তে ও সকালে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পরও সে স্বামীকে শয্যায় দেখতে পেত না। ৪২ উজান স্রোতে

এত দেরী
নমিতার মনে কেমন সন্দেহের ছাপ পড়ে গেল। রাত্রে তাে দেখ।
হয় না, এমন কি সকালে তার পূর্বে তিনি শয্যা ছেড়ে চলে যান ।
বিবাহের সময় যে দু’চার দিন সে এখানে ছিল, কই তখন তাে তিনি
কোনদিন এমন করেন নিনিত্য দেখা হত। তিনিই তো তার
আগমন প্রতীক্ষা করতেন। রাত্রে আতে দেরী হলে বলতেন—আজ
? এ ছাড়া সব সময় ছুতা-অছুতায় তার চোখ দুটো যেন
উৎসুক হয়ে তারই সন্ধানে ঘুরে বেড়াত। আর আজ ?
সেদিন রাত্রে নমিতা ঘরে এল যেমন রােজই আসে। আজ আর
তার চোখে ঘুম ছিল না। মিনিটের পর মিনিট কেটে যেতে লাগলো ।
ক্রমে ঘড়ি তে এগারটা বেজে গেল। নমিতা দ্বারের দিকে একবার
চেয়ে দেখ লে। তারপর একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে শয্যার উপর
ঢলে পড়লাে।
মিনিট পনেরাে পরে মণিময় দ্বার ঠেলে ঘরে ঢুকলাে। নমিতা
শয্যার উপর সচকিতে উঠে বলে।
মণিময় বলে, আজ যে এখনও ঘুমােও নি?
নমিতা চুপ করে বসে রইলাে—উত্তর দিতেও ইচ্ছা হল না।
অনেক রাত হয়ে গেছে। ঘুমিয়ে পড়। বলে মণিময় আলােটা
নিবিয়ে দিয়ে শয্যার একপার্শ্বে শুয়ে পড়লো।
শয্যা যেন আজ নমিতার নিকট কণ্টক স্বরূপ বলে মনে হল
-একবার এপাশ, একবার ওপাশ করতে লাগলাে।
মণিময় বিরক্ত হয়ে বললে, কি হ’ল আজ? নিজেও ঘুমােব না,
আমাকেও ঘুমুতে দেবেনা।
উজান স্রোতে
৪৩

কক্ষ অন্ধকারময়। নমিতা মুখের চেহারা মণিময়ের নিকট
অদৃশ্যমান রয়ে গেল। নচেৎ সে বুঝতে পারতাে কি দুঃসহ বেদনায়
তার মুখখানা ছেয়ে গেছে। ক্লিষ্ট ও ক্ষীণ কণ্ঠে নমিতা বললে,-ঘুম যেন
আজ আসছে না। তােমার অসুবিধা হয়, বল নীচে চলে যাচ্ছি ?
মণিময় বিরক্তিপূর্ণ স্বরে বলে,—যেতে হ’য় যাও। অভিমানটা
আছে দেখছি বিলক্ষণ। সমস্ত দিন খাটবো-ঘুমুতে না পারলে যে কি
কষ্ট হয় তুমি তার কি বুঝবে ?
নমিতশ কেমন বলে ফেললে,এতক্ষণ তো কোন কষ্ট হয়নি?
ও, আমার কাছে এলে তােমার যত কষ্ট হয়।
নমিতা-
কি বল ? সত্যিই যদি আমি তােমার কষ্টের কারণ হয়ে থাকি,
তুমিই বলে দাও কি করলে সে কষ্টের লাঘব হতে পারে ?
শােন নমিতা, রাত দুপুরে আমি তােমার গজর গজর শুনুতে রাজী
নই। তােমার না পােয়, বাবাকে লিথে স্বচ্ছন্দে চলে যেতে পার।
নমিতা তবুও সাহসে ভর করে বলে, কিন্তু কেন ? কেন আমি
যাব ?
মণিময় রুক্ষ্মস্বরে বললে,-কেন জানিনে, তবে সেই পথই তােগার
প্রশস্ত বলে আমার মনে হয়। যাও—মিছে বিরক্ত করাে নাসারমন
নাসারমন,
লেকচার শুর প্রবৃত্তি আমার নেই।
নমিতা বললে,—তা জানি, আমার কথা তােমার নিকট সারমন
লেকচার বলেই মনে হবে, কিন্তু আর একজনের কথা সমস্ত দিন রাত
শুলে ও
৪৪
উজান স্রোতে

চলতে হবে।
ছােট মুখে বড় কথা সাজে না নমিতা। মুখ সামূলে কথা বলে।
ণিময় বিপুল ঝাঁকুনী দিয়ে শয্যার উপর উঠে বসলো।
নমিতা প্রস্তুত ছিল না, তার বুকটা দুরু দুরু কেঁপে উঠলাে।
মণিময় বললে—এখানে যদি থাকতে চাও তো আমার মতানুযায়ী
তােমার ও সব ভাবের অভিব্যক্তি শুদার স্পৃহা আমার
এতটুকু নেই। তারপর মণিময় আবার শয্যা গ্রহণ করলে।
নমিতা কোন উত্তর দিল না, কম্পিত চরণে নীচে নেমে এল ও
মেঝের উপর উপুড় হয়ে পড়ে রইলাে, আর চোখের দরূবিগলিত
অশ্রুধারায় সিমেন্ট করা মেঝে সিক্ত ও আদ্র হয়ে উঠতে লাগলো।
উজান স্রোতে
৪৫

১০ ) নমিতার মনের কোণে যে ঈষৎ কালো মেঘের সঞ্চার হয়েছিল রাত্রের ঘটনার পর হতে সে মেঘ যেন তার সমস্ত মনের উপর ছড়িয়ে পড় লৈ—কোথাও একটু ফাক ছিল না—একেবারে ঘন কালো মেঘ, স্তরে স্তরে সাজান। নমিতার মন বিদ্রোহী হয়ে দাড়াল। এ বাড়ীর বাতাস যেন তার নিকট তিক্ত ও বিষাক্ত হয়ে উঠলাে। কি দুঃসহ অপমান! নিজের স্বামী, অথচ তার কোন অধিকার নাই। ও, কি অসম্বন্ধ আচরণ। ছিঃ ছিঃ, ঘৃণায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। আর চোখের সামনে নিত্য সেই দৃশ্য দেখে দিনের পর দিন এ বাড়ীতে মাথা পুজে থাকতে হবে ? কেন ? কিসের জন্য? কিন্তু স্বামীর ভিটাই তাে রমণীর কাম্য—সতী নারীর তীর্থক্ষেত্র। স্বামী চিরদিনই স্বামী-জীবন মরণের সঙ্গী। সতী নারীর কাজই তাে বিপথগামী স্বামীকে সুপথে ফিরিয়ে আনা। নমিতার চোখ ফেটে জল ঝরে পড়তে ও চোখের জলে বুকের ব্যথা ধুয়ে গিয়ে বুকটা যেন কতকটা হাল্কা হয়ে উঠতো। নমিতা ভাবতো—তারই স্বামী- তার উপর তার ন্যায্য অধিকার সম্পূর্ণ অবিভক্ত। যেমন করেই হোক ৪৬ উজান স্রোতে

কে সে অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে, নচেৎ মিছে তার নারীজন্ম
মিছে তার জীবন বহন।
আজকাল নমিতা সব সময় সরমার কথা শুনতে চাইতো না—সাহস
করে অগ্রসর হত স্বামীর অনেক কাজ নিজ হাতে করতে। কিন্তু
পরক্ষণেই ভৎসনার অপরিসীম ব্যথা বুকে ধরে ফিরে আস্ত মুখখানা
আঁধার করে। কিছু কিছু ঘটনা শ্বমাতার নজরে পড়তাে। তিনি
অনেক সময় সরমাকে বলতেন,-মণিময়ের কাজগুলাে তাে এখন বৌমার
উপর ফেলে দিতে পার—সেও যখন করতে চায়। তােমারই তো
উচিত মা তাকে শিখিয়ে নেওয়া।
সরমা মুখখানা আষাঢ়ের মেঘের ন্যায় জলদগম্ভীর করে বলতাে-
আমি তো বলি করতে। সেও তো করে না এমন নয়, কিন্তু তার
কোন কাজই যে আপনার ছেলের পছন্দ হয় না। আমাকে আবার
নতুন করে করতে হয় ।
মাতা বলতেন,তা বেশ তাে, তুমিই না হয় দু’চার দিন সঙ্গে পিঠে
করে শিখিয়ে দিও। বৌমা তাে আর বােক। মেয়ে নয় - যে, দেখিয়ে
দিলেও শিখতে পারবে না।
সমা ফোস করে উঠে বলতে আমার কি শিখাতে অসাধ ; কিন্তু
সব জায়গায় যে সে আমার উপর টেক্কা দিয়ে কাজ করতে যায়।
মাতা বলতেন,“বৌমা তাে তেমন নয়।
আর যায় কোথায়। সরমা একেবারে কেঁদে উঠতে ও বলতে
নমিতা আসার পর থেকে আপনি শুধু আমারই দোষ দেখে আসছেন।
আমি আর এখানে থাকৃতে চাইনে—আমায় আজই পাঠিয়ে দিন।
উজান স্রোতে
৪৭

আপনার ছেলে—আপনার বোঁ“আমি তাে পরগাছা মাত্র। তারপর
চোখের জল ফেলতে ফেলতে সে নিজের ঘরে গিয়ে গুম্ হয়ে বসে
থাতে ও কোন কাজে হাত দিত না।
এদিকে মণিময় এসে দেখতো--সব ব্যবস্থা ওলােট পালট ও সঙ্গে
সঙ্গে চীৎকার শুরু করে দিত।
নমিতার বুকের মধ্যে থেকে থেকে কেঁপে, উঠতে, বিপুল আশঙ্কায়।
নমিতা ভয়ে ভয়ে অগ্রসর হত—স্বামী কি বলছেন শুবার জন্য।
মণিময় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বতাে—তােমায় কে ডেকেছে।
মিছে কেন বিরক্ত করতে এস। কিছু জান না-কিছু পার না,
অথচ সব কাজেই এগিয়ে আসা চাই।
নমিতা বুঝে পেত নাকি তার অপরাধ। সে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা
করতে“তুমিই বলে দেও কি দোষটা হ’ল ?
মণিময় চীৎকার করে বলতো—সে সময় আমার নেই
কিছুদিন তােমার দিদির নিকট আপ্রেন্টিস্ খাটো, পরে এসে কাজ
করতে। যাও-যাও--অন্য কাজ দেখগে।
অগত্যা নমিতা মুখখানা স্নান করে ফিরে আস্ততা।
মণিময় বৌদি—বৌদি বলে চীৎকার আরম্ভ করে দিত, তবুও
কোন উত্তর পেত না।
ও মা বলতেন,—এত চেঁচাচ্ছিস কেন? বৌমা কোথায় গেল?
মণিময় মুখখানা বেজার করে বলতাে—যাবে আর কোথায় ?
আছে কোথাও খুঁজে দেখ। আর থেকেই বা কি? কাজের
তাে মা।
৪৮

তাের বাপু সব সৃষ্টিছাড়া কথা। সে যদি তোর কাছে একটুও
অল মুখ না পায়, তা হলে তাের কাজ সে করে কি করে বলতে
পারি?
মণিময় বলতো—যে কিছুই জানে না, সে আসে আবার কাজ
করতে। তোমার যেমন খেয়ে কাজ নেই, এসেছ আবার সুপারিশ
করতে ?
মাতা ঈষৎ রুষ্টস্বরে বলতেন,-কেন, সব কাজই তত বৌমা জানে।
ছিঃ বাবা! তাের সব কাজেই তাে বৌমার ন্যায্য অধিকার। সে
থাকতে অন্য কারাে সে কাজ করা শােভা পায় না।
মণিময় বিরক্তিপূর্ণ স্বরে বলতো,-যখন কাজ করতে শিখবে,
তখন যেন অধিকার ফলাতে আসে—তার আগে নয়।
মা বলতে,-কিন্তু গােড়া থেকে সে অধিকারুনা দিলে কেমন করে
শিখবে বল ?
তা আমি জানিনে--যাও। বলে মণিময় মুখ ফিরিয়ে নিত।
মা বলতেন,-বুড়ো বয়সে আমার বাপু এ সব কেলেঙ্কারী ভাল
লাগে না। তার চেয়ে আমায় কাশী পাঠিয়ে দে। তারপর তোরা যা
খুসী তাই করিস। নিজের বৌ হয়ে গেল পর, আর কোথায়
কে-গ্রাম সম্পর্কে বৌদি-সেই হ’ল তাের বেশী আপন ? লােকে
শুলে যে ছি-ছ্যাকার করবে। তারপর তিনি নিরুপায় হয়ে চলে
যেতেন।
মণিময় রাগে গর গর করতে করতে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে—সেই
ভাল, তুমি কাশী যেতে চাচ্ছ তাই যাও।
উজান স্রোতে
৪৯
৪

এক সপ্তাহ পরের কথা। স্ত্রী সব সহ্য করতে পারে ; কেবল পারে না স্বামীর ভাগ কাকেও দিতে। সে টায় স্বামীর হাসি ঠাট্টা যা কিছু সব তাকেই কেন্দ্র করে বর্ষিত হােক। তার ব্যতিক্রম ঘটলে কোন নারীই তা নির্বিবাদে সহ্য করতে পারে না। নমিতার বুকের মধ্যে দিনরাত আগ্নেয়গিরির অগ্নৎপাত চছিল। সজোরে বুক চেপে ধরে সে বুকের ব্যথা সহ করে আসছিল বটে, কিন্তু প্রতিমুহূর্তেই তার মনে হচ্ছিল—আর সে পারে না—ঐ বুঝি বুকের আগুন ছুটে বেরুল,—বিশ্ব-ধ্বংশকারী মুক্তি নিয়ে। তবুও শাশুড়ীর মুখ চেয়ে সে নীরবে সব সহ্য করে চলতে লাগলাে। তিনি ছিলেন যে তার একমাত্র সান্ত্বনাস্থল । সেদিন রাত্রে রামায়ণ পাঠ শুনতে শুনতে শাশুড়ী ঘুমিয়ে পড়লেন। নমিতা স্থির নিষ্কম্প হয়ে কিছুক্ষণ সে মুখের পানে তাকিয়ে রইলাে। তারপর আস্তে আস্তে সে উঠে দাড়াল, মুখখানা বেদনা মাখা। ধীরে ধীরে নমিতা অগ্রসর হতে লাগলো—নিজ কক্ষাভিমুখে। পা যেন তার আর চলে না। মাঝে মাঝে থম্‌কে দাড়াতে লাগলাে। উজান স্রোতে . পাশের ঘরে বড় ঘড়িতে বারােটা বেজে গেল। নমিতা চমকে উঠলা, মনে মনে বললে, বারােটা! না, শুতে বােধ হয় ভুল হয়েছে। তাই হবে। সে আবার কম্পিত পদে অগ্রসর হ’ল। পাশের ঘরে না এখনও কথাবার্তা চলছে ? নমিতার চোখদুটো অন্ধকারে জ্ব জল করে উঠলাে। বুকের মধ্যে অসহ বেদনায় কেমন তােলপাড় শুরু করে দিল। বুকখানা সজোরে দু’হাতে চেপে ধরে সে, কাণ খাড়া করে দাঁড়াল। আর ইস্পাতের ন্যায় ধারাল দৃষ্টি চক্ চক করতে করতে অন্ধকার ভেদ করে দুয়ারের উপর ঠিকরে পড়ে যেন প্রতিহত হয়ে ফিরে আসতে লাগলাে। আজ তাে আর ইংরাজীর পড়া দিলে না বৌদি ? তুমি দিতে দিলে কই ঠাকুরপো? অমন করে মাষ্টারী করা চলে না। তােমার মত মাষ্টারের কাছে লেখাপড়া হয় না ঠাকুরপাে-হয়- কি হয় বৌদি ? কি হয় জান না-না ? যাও- তা যাচ্ছি, কিন্তু এবার থেকে তােমায় বৌঠাম বলে ডাকবো। নমিতা উৎকৃর্ণ হয়ে দাড়াল, শুতে উত্তরে সরমা কি বলে। কিন্তু বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো। একটা চাপা হাসির আওয়াজ নমিতার কর্ণে এসে পৌঁছে গেল। নমিতা শুনতে পেলে সরমা বলছে--ওঃ! “চোখের বালী”র বোন পাতাতে চাও বুঝি। দুষ্ট কোথাকার। যাও—শােও গে—রাত যে, বারােটা বেজে গেল। উজান স্রোতে

!
ভয়ে ও এস্তে নমিতা দু’পা পিছিয়ে এল। কি জানি যদি স্বামী
বেরিয়ে এসে তাকে এই অবস্থায় দেখেন। ছিঃ ছিঃ ! কি লজ্জার কথা।
ধিক্কারে ও আত্মগ্লানিতে তার প্রাণ পূর্ণ হয়ে উঠলো।
স্বামী বলেন, বেশ, তাড়িয়ে দিচ্ছ, চলে যাচ্ছি। কিন্তু মনে থাকে
যেন, সাধলে ও আর আসছি না।
সরমা বলে,-দেখাই যাবে--জ’ল এগােয়---না তেষ্টা এগােয়
কই, তবু যে মুখের দিকে চেয়ে দাড়িয়ে রইলে?
মণিময় বলে,-এমনই সুন্দর ও মুখখানা।
যাও, আর দুষ্টুমি করতে হবে না। ভারী তো মুখ ! নমিতার
মত নয় নিশ্চয় ?
মণিময় খুব কাছে সরে এসে বললে, কই দেখি ।
যাও-আর দেখতে হবে না।
সত্যি, দেখি না একবার---কই ফের-ফিরবে না ?
নমিতার সর্বশরীর ঠক্ ঠক্ করে কেঁপে উঠে যেন অসাড় ও নিস্পন
হয়ে আসতে লাগলাে।
ঠিক এই সময় সরমা বলে,না ফিরবে না-এ মুখ আর
দেখাবো না। কি দেখবে আবার এ মুখের ?
তাহলে দেখতেই হ’ল বৌঠান। সঙ্গে সঙ্গে মুখখানা হাত দিয়ে সরিয়ে
নিজের মুখের কাছে টেনে এনে••••••বললে, কেমন হ’ল তাে? না
বলার এই শাস্তি। পরক্ষণেই মুখ চোখ লাল করে মণিময় দরজার দিকে
ছুটে এল ও ভেজান দরজা খুলতে খুলতে বলে,-কেমন, আর
চালাকি করবে ?
উজান স্রোতে

নমিত পালাতে গিয়ে পায়ে কাপড় জড়িয়ে পড়ে গেল ও সে শব্দ ঘরের মধ্যে গিয়ে পৌছিল। সরমা ও মণিময় কাণখাড়া করে স্থির হয়ে দাঁড়াল। মণিময় তাড়াতাড়ি দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বলে, কি শব্দ হল ? নমিতা তখন ছুটতে ছুটতে একেবারে শ্বমাতার ঘরে এসে দাঁড়াল ও মেঝের উপর নিজ দেহ এলায়ে দিয়ে চোখ বুজে পড়ে রইলো, ভীত ও স্পন্দিত বুকখানাকে দু’হাত দিয়ে সজোরে চেপে ধরে। উজান স্রোতে

সকালে ঘুম ভেঙ্গে উঠে শাশুড়ী দেখলেন যে, নমিতা খালি মেঝের
উপর অঘােরে নিদ্রা যাচ্ছে। তার বুকটা কেমন দলকে উঠলাে। চোখ
মুছতে মুছতে তিনি ডাকলেন—বৌমা–ও বৌমা
নমিতা তড়াক করে উঠে বসলে ও স্বপ্নাবিষ্টের ন্যায় কিছুক্ষণ ফ্যা
ফ্যাল করে চেয়ে রইলাে।
শমাতা বলেন,-কাল বুঝি শুতে যাও নি? মেঝের উপরই
ঘুমিয়ে পড়েছিলে ?
নমিতা ডাগর ডাগর চোখ দুটো মেলে ধরে শশ্রুমার মুখের দিকে
চেয়ে রইলাে, সে চাহনি কতই না ব্যথাভরা।
শাশুড়ী সহানুভূতিপূর্ণ স্বরে বললেন,-আজ থেকে আর অত রাত
করে কাজ নেই। সকাল সকাল গিয়ে শুয়ে পড়বে। এমন ভাবে
সারারাত মেঝের উপর পড়ে থাকলে যে অসুখ করবে।
না মা, কোন অসুখ করবে না। কাল রাতে আমি খুব ঘুমিয়েছি।
কখন যে সকাল হয়ে গেছে তা বুঝতে পারিনি-বলে নমিতা উঠে
দাড়াল।
৫৪
উজান স্রোতে
=

} । মায়ের প্রাণ বুঝে নিল বৌমার কোথায় ব্যথা। তিনি অলক্ষ্যে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেন, হ’বার হয়ে গেছে, আর কিন্তু কখনও এমন করাে না। নিজের দাবী একবার ছেড়ে দিলে তাকে ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে যায় মা। নমিতার আঁখিযুগল অবনমিত হয়ে পড়লাে। তার আবার দাবী ! তার আবার ফিরে পাওয়া! দাবী দাওয়ার চরম অভিনয় তাে কাল হয়ে গিয়েছে। এর পর আর কি দাবী তার থাকতে পারে? এর চেয়ে শত তিরস্কার—শত লাঞ্ছনা যে তার ছিল ভাল। সে বুক পেতে। সহ করতে। চুপ করে কি ভাবছে বোমা ? কাল মণি কি তােমায় কিছু বলেছে ? নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে,না মা, কিছু হয় নি। কেমন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরক্ষণেই সে ঘর ছেড়ে কলতলার দিকে চলে গেল। স্মাতার ‘নের সংশয় ঘুচুলাে না। তিনি নির্বাক হয়ে ভাবতে লাগলেন এমন সময় সরমা এসে ঘরে ঢুকলো। অনেক পূর্বে তার স্নান সারা হয়ে গিয়েছিল। এলায়িত কেশদাম পৃষ্ঠোপরি ছড়ান ছিল। পরণে ছিল তার কাল ইঞ্চিপাড় ধুতি। এখানে আসার পূর্বে থান কাপড় ভিন্ন সে পরতো না; কিন্তু এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে থানের পাট ঘুচে গেল। মণিময় একদিন মাকে বলেছিল—থান কাপড় আবার মানুষে পরে। মা উত্তরে বখেছিলেন, আমি তাহলে মানুষ না? পুত্র খিল উজান স্রোতে

খিল করে হেসে সে প্রসঙ্গ হালকা করে দিয়ে বলেছিল, তুমি যেন কি
মা! আমি কি তাই বছি। তবে বৌদি তো সরু নরুণ পাড়
কাপড় পরতে পারেন। আমি কত বাড়ীতে পরতে দেখিছি। মা
গম্ভীরভাবে বলেছিলেন,যার যেমন রুচি। তবে বিধবা-মানুষের পক্ষে
থান কাপড়ই প্রশস্ত। পুত্র হাসতে হাসতে বলেছিল—ও সব কথার
কথা মা। সেইদিনই তঁাতের বােয়া মুগার ধাক্কা দেওয়া চুলপড় ধুতি
বৌদির জন্য এসে গেল। এখন চুলপাড় গিয়ে ইঞ্চিপাড়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘরে ঢুকেই সরমা বলে,-নমিতা কোথায় মা ? তাকে তাে
ঘরে দেখলাম না।
মাতা বলেন, এই যে উঠে কতলায় গেল।
ওঃ! এখন উঠলো ! বলে মুখখানা বেজার করে সরমা চেয়ে রইলো।
সকালে উঠেই রা আর কি কবে ?
সরমা মুখখানা ঘুরিয়ে বলে,-ঠাকুরপাে তো এদিকে চা-চা করে
চেঁচামেচি করছেন।
স্নান করূতে গিয়ে আমার দেরী হয়ে গেল।
চা’টা তৈরী করে এতক্ষণ দিয়ে এলেই তাে হত। তা না, যতক্ষণে
আমি সব করবো। এই জন্যই তাে ঠাকুরপাে রাগ করেন। পুরুষ মানুষ,
তাদের সুখ সুবিধে দেখে একটু চলতে হয়।
মাতা একেবারে অবাক হয়ে সরমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
পরেবরক্ত হয়ে বললেন,-সে আমি বুঝবাে। দরদ দেখে যে আর
মার পােড় না পােড়ে মাসীর—ঝাল খেয়ে ম’ল পাড়া
প্রতিবেশী। বোমা নিপাট ভাল মানুষ। সকাল না হ’তে এলেন
কোমর বেঁধে ঝগড়া করতে। তুমি যাও, তােমার কাজ দেখ গে।
বচি নে।
• -
উজান স্রোতে

সরমা একেবারে হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলো। পরে চীৎকার
করে বলতে লাগলো,-তুমিই বল আমি নমিতাকে কোন কাজ করতে
দিই নে। আবার কাজ করতে ডাকতে এলে তুমিই যা তা শুনিয়ে
দাও। আমাকেই যে সব কাজ করতে হবে তার মানে কি ? আমারও
তাে সুখ-অসুখ আছে। এই যে আজ চা’টা সময় মত করে উঠতে
পারিনি, ফলে হ’ল এই যে, ঠাকুরপাে এখনও পর্যন্ত চা পেলেন না।
কিন্তু দোষটা সব হবে আমার—এই তো? এমন ভাবে এ বাড়ীতে
আমি আর থাকতে চাইনে।
ইতিমধ্যে চীৎকার শুনে নমিতা ও মণিময় এসে পৌঁছে গেল।
নমিতা মাতার একপার্শ্বে জড়সড় হয়ে দাড়াল।
মণিময় ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত স্বরে বললে,একটা লােক খেটে খেটে
মারা যাচ্ছে । আর একজন দোলার বিবি সেজে গায়ে ফু দিয়ে
বেড়াচ্ছেন। সব সময় যদি তােমরা এমন থিটিক খিটির কর,
তাহলে সে লােকটা থাকে কি করে ? তার উপর কাল একাদশী
গেছে।
মা বললেন,-ওঃ, বড় দরদ ! তবু যদি নির্জলা করূতে হত।
সরমা ক্রন্দন বিজড়িত স্বরে বললে,-দেশে তাই তো করতাম।
তােমাদেরই বলা কওয়া না হয় এখন করি না-পাছে তােমরা রাগ
কর। তােমাদের মনে এক, মুখে আর এক, তাতো জানা ছিল না।
এমন হবে জানলে-
মণিময় বাধা দিয়ে বললে,-তাতে আর কি হয়েছে ? সবাই যে
নির্জলা একাদশী করার এমর্ম কিছুই নিয়ম নেই।
উজান স্রোতে

মা বললেন,-তা বটে, নিয়মের মালিক যে তুমি।
সব দোষই
মা বললেন, কিন্তু সামান্য এই কাজ নিয়ে এত মাথাগরম কেন?
এই কাজ তো আমি বরাবর একাই করে এসেছি।
সরমা ঈষৎ ক্রন্দনের সুরে বলে,-আমিও তাে আসা অবধি করে
আসছি। কোনদিন কোন কথা ওঠে নি। আর আজ! না, তার
চেয়ে আমাকে পাঠিয়ে দাও—সব গােল মিটে যাবে।
‘আমার।
মণিময় আরক্ত নেত্রে কটমট করে একবার নমিতার মুখের দিকে
চেয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে,“ভাল আপদ হয়েছে নিয়ে এসে। নিজের তো
কোন ক্ষমতা নেই, আবার ঝগড়া বাধাতেও ওস্তাদ।
মা বললেন,--দেখ, মণি, না জেনে শুনে বৌমাকে কিছু বলিস নে ।
বৌমা হ’ল ঘরে লক্ষ্মী। অকারণে প্রাণে ব্যথা পেলে সংসার
ছারে খারে যাবে।
সরমা কঁদতে কাঁদতে বললে,--শুনলে—শুলে ঠাকুরপােয় এর
মানে আমিই সংসারের জঞ্জাল-অলক্ষ্মী ; কুলাের বাতাস দিয়ে আমাকে
বিদেয় করে দাও।
মণিময় চীৎকার করে উঠে বললে, তুমি কেঁদো না বৌদি
লক্ষ্মী-অলক্ষ্মী চিনতে আমার বাকি নেই। বাড়ী নিয়ে আসা অবধি
সংসারে আর শান্তি নেই। কিছু বলি না কিনা; তাই আম্পর্ধা বেড়ে
গেছে। দেখ মা, ওকে ভাল ভাবে চত বলল। এখনও সাবধান
করে দিচ্ছি, নচেৎ জুতাে মারতে মারতে বিদেয় করে দেব।
উজান স্রোতে

- নমিতার সহের সীমা অতিক্রম করে গেল। সে বললে,—তাই দাও, পাপ চুকে যাক। এত বড় আস্পর্ধা। আমার মুখের উপর কথা। বলে মণিময় আরক্ত আঁখি বিঘূর্ণিত করে পা হ’তে স্যাণ্ডেল একপাটী খুলে নমিতাকে প্রহারে প্রহারে জর্জরিত করে তুলে। আঘাতের বেগ সহ করতে পেরে নমিতা মুখ ছুবড়ে পড়ে গেল ; ক্ষে অশ্রু ছিল না। মা মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটু পরেই তার সম্বিৎ ফিরে এল। ছুটে এসে তিনি নমিতাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন ও পুত্রের মুখের উপর সুতীক্ষ্ম দৃষ্টি রেখে বললেন,“ছিঃ ছিঃ ! কি করলি—কি করলি? বিনা দোষে গৃহলক্ষ্মীর গায়ে হাত দিলি। গৃহলক্ষ্মী-গৃহলক্ষ্মী—বলতে বলতে পুত্র রােষকষায়িত চাহনি নিক্ষেপ করে ঘর ছেড়ে চলে গেল। সরমা তার কিছু পূর্বেই ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল ৪ উজান স্রোতে

এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই সুধীরবাবু এসে উপস্থিত হলেন।
সঙ্গে ছিল তার দু’জন ভারী, বহন করে নিয়ে এসেছিল কিছু
জিনিষপত্র।
বাহির হ’তে সুধীরবাবু ডাকলেন,-মণিময়।
মণিময় সবে-এস বৈঠকখানা ঘরে বসেছিল। হঠাৎ শশুরের কণ্ঠস্বর
শুনে চমকে উঠলে। পরে ত্ৰন্তে বাইরে এসে বললে ; ওঃ, আপনি !
আসুন !
সুধীরবাবু বলেন, ভারী দু’জনকে সঙ্গে করে বাড়ীর মধ্যে নিয়ে
যাও। আমি ততক্ষণ বৈঠকখানা ঘরে বসছি।
মণিময় ললে,—এত সব আনবার কি দরকার ছিল। তারপর
সে ভারী দু’জনকে সঙ্গে আতে ইঙ্গিত করলে।
সুধীরবাবু বললেন,-হাঁ, শােন মণিময়, এই হার ছড়াটাও নিয়ে
ও-বেয়ানকে দেখাবার জন্য। নমিতার ইচ্ছা ছিল ঠিক এই রকম
একছড়া হার পরুতে।
উজান স্রোতে

মণিময় এগিয়ে এসে হারছড়াটা গ্রহণ করলে ও বলে,বসুন- আমি এখনি আসছি। মণিময় বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করে গম্ভীরভাবে ডাকলে,-মা মাতা তখনও নমিতার কাছেই বসে ছিলেন ; আর নমিতা শুয়ে ছিল শয্যার উপর ; দারুণ প্রহারে পৃষ্ঠদেশ তার ফুলে উঠেছিল ও কপালের একপার্শ্বে রক্ত জমে গিয়েছিল। মণিময় বললে,—শশুর মশায় এসেছেন। মাতা উদ্বিগ্ন চিত্তে বললেন,-কে, বেয়াই? পরে স্থির ও অবিচলিত কণ্ঠে বলেন, বেশ, ভালই হয়েছে। বৌমাকে এই সঙ্গেই পাঠিয়ে দিই। মাতার কথাগুলো পুত্রের বুকে গিয়ে যেন বেজে উঠলাে। সে মুখখানা স্নান করে নীরবে কি ভাবতে লাগলাে। নমিতা কিন্তু তাকে সে ভাবনা থেকে নিষ্কৃতি দিল। ও সংযত স্বরে বললে,-না মা-আমি যাব না। মাতা বিষ্মিতকণ্ঠে বললে,-যাবি নে ! এমন ভাবে নির্যাতন সহ্ন করে থাকতে পারবি ? নমিতার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। শাশুড়ী বৌমার মুখ চুম্বন করে বললেন,-তুই যাবিনে জানি। তুই যে আমার ঘরের লক্ষ্মী। মণিময়, এখনও দেখে শেখ। লক্ষ্মীর অমর্যাদা করে অলক্ষ্মীকে বরণ করে নিস্ নে । তারপর দুঃখকষ্ঠে তিনি বললেন,—যাই, বেয়াইকে ডেকে নিয়ে আসি-স্বচক্ষে তিনি মেয়ের অবস্থা দেখে যান উজান স্রোতে

মণিময় বিচলিত হয়ে বলে,—তাই তো—তাই তাে মা।
মাতা বললেন,—পাপ করলে তার ফলভােগ আছেই। এখন
বিচলিত হলে চলবে কেন?
নমিতা ব্যথাহত করুণ দৃষ্টি তুলে শাশুড়ীর মুখের দিকে চেয়ে রইলাে,
যেন সে দৃষ্টি জানিয়ে দিল—আর কেন মা? অনেক হয়েছে—মিছিমিছি
ব্যথার বােঝ। বাবার মাথায় চাপিয়ে দিয়ে কোন লাভ হবে না। বরং
তার শান্ত হিয়া অশান্তিতে ভরে উঠবে।
শাশুড়ী বৌমার চিবুক স্পর্শ করে গদগদকণ্ঠে বলেন,-সতীনারী
এমনি ভাবে স্বামীকে তার সকল গ্লানি হ’তে মুক্তি দেয় ; কোন আওতা
গায় লাগাতে দেয় না। মণিময় তুই যা করেছিস, পশুতে ও এমন
করে না। পারিস তাে এখনও বোমার কাছে ক্ষমা চা। তাতেই নিজ
কর্মকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে। পরক্ষণেই তিনি ঘর ছেড়ে চলে
গেলেন।
মণিময়ের মনটা কিন্তু সংশয় দোলায় দোল খেতে লাগলো।
মটা
কি জানি যদি নমি,আবেগ ভরে সব কথা বলে ফেলে। নিঃসন্দেহ
হবার জন্য সে ডাকলে,-নমিতা।
নমিতা কান দু’টো খাড়া করে উৎসুক হয়ে চেয়ে রইলাে। কি
প্রাণারাম আহ্বান! সে ডাক যেন তার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে গিয়ে ঝঙ্কত
হয়ে ব্যথাহত অঙ্গে শান্তির প্রলেপ মাখিয়ে দিল।
মণিময় আবার ডাকলে--নমিত
নমিতার বুকের মধ্যে ফুলে ফুলে উঠতে লাগলাে-বিপুল পুলকে
আকুল উচ্ছাসে, কূলে কূলে ভরা নদীর ন্যায়।
উজান স্রোতে

ণময় কম্পিত কণ্ঠে বললে,-তােমাকে আর কি বলবো নমিতা--
নিমিষে নমিতার সকল আনন্দ কোথায় উবে গেল । এখনও স্বামীর
তাকে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস। স্বামী স্ত্রীর মনােভাব অনুভবে বুঝে নিতে
পারলেন না।
নমিতার গভীর নীরবতা মণিময়ের সংশয়াকুল চিত্তে সংশয়ের মাত্রা
দ্বিগুণতর বাড়িয়ে দিতে লাগলো। হয়ত এখনই শশুর মহাশয় এসে
পড়বেন। তখন-তখন যে তার আর কিছু বর থাকবে না।
মণিময়ের অস্থিরতা বেড়ে গেল ও আকুল কণ্ঠে বলে,নমিত, হাঁ
কিন্তু থাক্।
নমিতা স্থির ও সহজকণ্ঠে বলে,-ভয় নেই—আমি কিছু বলবো না।
কিন্তু যদি তােমার বাবা জিজ্ঞাসা করেন ?
নমিতা মুখখানা ফিরিয়ে নিয়ে ধরাগলায় বললে,-বলবো পড়ে
গেছি-কলতলায়।
সত্যি?
সত্যি মিথ্যে জানিনে, তবে সেই অসত্যই আজ আমার নিকট
সত্যের রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
কি ঠাকুরপাে; আজ বুঝি চা খাবার কথাই ভুলে গেলে ?বলতে
বতে ঠিক সেই সময় সরমা এসে ঘরে ঢুকলাে।
মণিময় বলে,-এই যে——শশুর মশায় এসেছেন কিনা
সরমা মুচকি হেসে বললে,-তা তাে জানি। তিনি তাে বাইরের
ঘরে।
উজান স্রোতে

মণিময় বলে,—সেই কথাই তাে বলতে এসেছি বৌদি।
বেশ—বেশ—বলে সরমা ঘরের বাহির হয়ে পড়লো।
মণিময় একটু ইতস্ততঃ করে বলে,-যাই চা খেয়ে আসি, আর
শশুর মশায়কে পাঠিয়ে দি নমিতা। হাঁ, ভাল কথা, তােমার বাবা
এক ছড়া হার এনেছেন তােমার জন্য—এই নাও-ধর।
রাখি বলে নমিতা গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালিশে মুখ গুজে
পড়ে রইলো।
৬৪
উজান স্রোতে

১৪ )
নমিতার পিতা ঘরে ঢুকে কন্যার মুখের দিকে চেয়ে বলেন,এমন
হ’ল কি করে ?
নমিতা অশ্রু সজল আঁখি মেলে ক্ষীণস্বরে বললে,-বড় পড়ে গেছি
বাবা কলতলায়।
কি করে পড়লি মা ? কপালটা যে ভয়ানক ফুলে উঠেছে।
কেমন পা পিছলে গেল-বলে নমিতা মুখখান। অন্যদিকে ফিরিয়ে
নিল ।
সুধীরবাবু বলেন,—আর কোথাও লেগেছে নাকি?
নমিতা কোন উত্তর দিল না।
মণিময় ব্যস্ত হয়ে বললে,-কপালটায় দেখছি বেশী লেগেছে।
সুধীরবাবু বললেন,—শুধু কপালে লাগলে কি মা আমার শুয়ে
থাকে ?
অন্য জায়গায় লাগাও অসম্ভব নয়। মণিময় নমিতার দিকে
একবার কাতর আঁখি মেলে চেয়ে দেখলে।
নমিতা বললে,-এই মাল পড়ে গেছি কিনা, তাই একটু শুয়ে আছি।
তার উপর মা কিছুতেই উঠতে দিলেন না।
উজান স্রোতে

মণিময়ের মাতা এতক্ষণ একপার্শ্বে দাড়িয়েছিলেন। সহিয়ার
প্রতিমূর্তি বধুমাতার উর বিপুল শ্রদ্ধায় তার মন ভরে উঠলো। মনে
হ’ল, এতেও কি তার ছেলের চোখ খুলবে না? তার বুকের মধ্যে
কেমন তােলপাড় করতে লাগলাে। এত বড় একটা মিথ্যা সত্যের রূপ
নিয়ে চোখের সামনে খেলা করবে, আর নীরবে তাকে তাই শুনে যেতে
হবে ? কি জানি যদি দুৰ্বল মুহূর্তে তিনি কিছু বলে ফেলেন। তাই
তিনি নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন।
সুধীরবাবু একটু চুপ করে থেকে বলেন, সত্যি বল্ মা, আর
কোথাও লেগেছে?
নমিতা একটু ঢোক গিলে বললে, কোমরটায় একটু লেগেছে—আর
পিঠের দু’চার জায়গায় একটু ছড়ে গেছে। ও সেরে যাবে বাবা-তুমি
অত ভেবাে না।
মণিময় যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলে।
সুধীরবাবু মণিময়ের দিকে চেয়ে বললেন, তাহলেও একজন ডাক্তার
ডেকে এনে দেখলে ভাল হয় না ?
মণিময় আমৃত আন্তা করে বলে,—তা মন্দ কি—বলেন যদি
নমিতা ব্যস্ত হয়ে বলে, না না, ডাক্তার এসে কি করবে বাবা?
একটু পড়ে গেলেই অমনি ডাক্তার।
সুধীরবাবু বলেন, মায়ের যখন অমত, তখন থাক। ঘঁ,
বলছিলাম কি মণিময়। বেয়ান ত চলে গেলেন। মা তাে প্রায় তিন
মাসের উপর হ’ল এসেছে। দিনকতষ্ণের জন্য যদি পাঠিয়ে দাও তো
বড়ই ভাল হয়।
উজান স্রোতে

মূণিময় বললে, বেশ তো। তাতে আর আপত্তি কি?
নমিতা গম্ভীর হয়ে বলে,-তা হয় না বাগা। আমি গেলে মার
বড় কষ্ট হবে। মাকে ফেলে আমি যেতে পারবাে না।
সুধীরবাবু বললেন,-শুলে মণিময়। এখন আর বুড়ো বাবা কেউ
নয়। তারপর তিনি হাে হাে করে হেসে উঠলেন।
মণিময় কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। পরে বলে,-বৌদি
যখন আছেন তখন অবশ্য মায়ের কোন কষ্ট হবে না। সে আপনি যা
ভাল বােঝেন করুন।
নমিতা চোখ দুটো ডাগর ডাগর করে বলে,-দিদি থাকলেও
আমি এখন যেতে পারবাে না।
সুধীরবাবু হাসতে হাসতে বললেন,-শােন মণিময়, সেবার আতে
গিয়ে তুমি ফিরে এসেছিলে, মা আমার আসতে চায় নি। আর
এবার ?
মণিময় নিঃশব্দে পঁড়িয়ে রইলাে।
সুধীরবাবু বললেন,-হার পছন্দ হয়েছে তাে মা? কই, এখনও যে
পরনি?
এই যে 'পরছি—-বলে নমিতা হার ছড়াটা শ্যা হ’তে কুড়িয়ে নিয়ে
গলায় দিল।
সুধীরবাবু আবার বললেন, কেমন মা --পছন্দ হয়েছে তো?
নমিতা বলে,পছন্দ আবার হবে না।
সুধীরবাবু বলেন, তাের দিদিকে যে দেখছি না?
নমিতা গম্ভীরভাবে বললে,-বােধ হয় রান্না ঘরে আছেন।
।
উজান
স্রোতে
৬৭

মণিময় বললে, রাতে বাড়তে সত্যিই বৌদি সিদ্ধহস্ত।
নমিতা মুখখানা অন্য দিকে ফিরিয়ে নিল ও মনে হ’ল বলে-কোন্
কাজে তিনি সিদ্ধহস্ত নন ?
এদিকে কথাটা বলে ফেলেই মণিময় কেমন অপ্রতিভ হয়ে পড়লাে।
তাই কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে সে আবার বলে,—বিধবা মানুষ-একটা
কাজ নিয়ে তাে থাকা চাই।
সুধীরবাবু সে কথার সমর্থন করে বললেন,—তা তো বটেই।
নমিতা আর চুপ করে থাকতে পারলে না, ঈষৎ রুষ্ট-স্বরে বলে,--
অরী তাে কাজ! তিন জন নিয়ে সংসার।
মণিময়ের মুখের উপর কেমন অসন্তোষের চিহ্ন প্রকটিত হয়ে উঠলো।
সে ভাব দমন করে সে বললে, আপনি বসুন। আমি একটু নিজের
কাজ সেরে আসি। তারপর ধীরে ধীরে মণিময় ঘরের বাহির হয়ে
পড়লাে।
সুধীরবাবু সংশয়াকুল চিত্তে কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
উজান স্রোতে

আরাে তিন মাস পরের ঘটনা।
নমিতার পক্ষে শশুর বাড়ী ঘর করা দিনে দিনে দুঃসাধ্য হয়ে উঠলো।
কথায় কথায় সামান্য কোন ছল ছুতা ধরে স্বামী এমন ভাবে অত্যাচার
সুরু করে দিলে যে নমিতার চোখ দিয়ে অঝােরে জল ঝরে পড়তে
ও মনে মনে ভাবতে-কত দিনে তার এ যন্ত্রনার অবসান হবে। স্বামীর
প্রহার তার অঙ্গের আভরণ হয়ে দাঁড়াল। তার একমাত্র সান্ত্বনা স্থল
ছিল শ্বমাতা। তিনিও আজ কাল অধিকাংশ সময় বলতেন,
আর কত লাঞ্ছনা সহ্য করবি ? তার চেয়ে দিন কতক বাপের কাছে
যা মা। তাের কষ্ট যে আমি আর দেখতে পারিনে।
নমি নীরবে শুনে যেত; আবার সময় সময় বতো-তােমাকে
ফেলে আমি যেতে পারবাে না মা। আর চোখ বেয়ে দুই এক ফোটা
অশ্রু ঝরে পড়তো।
আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে শাশুড়ী বলতেন—কিন্তু
আমার যে কোন ক্ষমতা নেই মা। তার চেয়ে চল তুই আর আমি
দেশে চলে যাই।
উজান স্রোতে
৬৯

নমিতার আয়ত নয়নযুগল বিস্ফারিত হয়ে উঠলাে; ' কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আঁখি তারান করে সে মেঝের দিকে চেয়ে থাকতো। শাশুড়ী বলতেন,-ওঃ ! সেখানে যাবার ইচ্ছা নেই। তবে তাের কপালে মার খাওৱা ভিন্ন আর কোন পথ নেই। এই বলে বিরক্তি ভরে তিনি মুখখানা সরিয়ে নিতেন। সারল্যভরা শিশুর দৃষ্টি তুলে নমিতা সঙ্গে সঙ্গে বলতাে-মা, রাগ করলে? সত্যি তুমি যদি রাগ করে বল যেতে হবে, তাহলে এখুনি আমি যেতে প্রস্তুত। শাশুড়ী ছুটে এসে নমিতার মুখখানা সস্নেহে আঁকড়ে ধরে চুমু দিয়ে বলতেন,-ছিঃ মা! ঘরের লক্ষ্মীকে সে কথা কি আমি বলতে পারি ? তুই যে আমার মা-মেয়ে—কুললক্ষ্মী। শুধু তােরই জন্যই যে এখনও আমি সংসারে আবদ্ধ আছি। তারপর টপ টপ করে চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়তাে। নমিতা সব ভুলে গিয়ে নীরব, নিস্পন হয়ে বসে থাকতাে। এই ভাবে নমিতার দিন কেটে যাচ্ছিল, কিন্তু মাঝখান থেকে আর এক নূতন উপদ্রব ধূমকেতুর ন্যায় দেখা দিয়ে সংসারে আরো অশান্তির অনল জ্বেলে দিল। দূর সম্পর্কে মণিময়ের এক জ্ঞাতি ভ্রাতা হঠাৎ একদিন লাকৌ হতে ডেরাডাণ্ডা নিয়ে এ বাড়ীতে এসে অতিথি হয়ে দাঁড়াল ! নামটী ছিল তার সুভাষ, লাকৌ ইউনিভারসিটি হ'তে সবে বি’এ পাশের তকমা সংগ্রহ করে কলকাতায় আসছিল, কোন কাজের আশায়। লােক পরম্পরায় সে শুনেছিল যে, মণিদা চুচড়ায় বেশ প্রাকটিস জমিয়ে ফেলেছেন ও ৭০ উএন স্রোতে গেল। সেখানে ফ্যামিলি নিয়েই আছেন। চুচড়া তাে ককাতার খুব কাছে, কাজেই বরাবর সে এখানেই এসে উঠলাে; সংলকে একেবারে চমক লাগিয়ে দিয়ে। তার উপর এটাও তার জানা ছিল যে, মণিদা সম্প্রতি বিবাহ করেছেন। নূতন বৌদির সঙ্গে হাস্য-পরিহাসে দিনগুলােও কাটবে ভাল। বাড়ীতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুভাষের কিন্তু সে ধারণা উন্টে সে দেখলে দাদা যদি যান একদিকে—বৌদি যান অন্য দিকে। সুভাষ গম্ভীর হয়ে একটু ভেবে নিল। তারপর মনে করলে--- দেখাই যাক, কোথার জল কোথায় গিয়ে দাড়ায়। তবে তার সূক্ষ্মদৃষ্টি এই তথ্যটুকু আবিষ্কার করে ফেলে যে, দাদার সন্ধানী চোখ দুটো ঘুরে বেড়ায় নিতাইদার স্ত্রীর পিছন পিছন । তবু তার মনে হ’ল, হয়ত তার ধারণাটা ঠিক নয়। নিতাইদার বৌ তাে সম্পর্কে বৌদি হয়-ঠাট্টা তামাসারই পাত্র। তাই বােধ হয় মণিদার সঙ্গে একটু মাখামাখি ভাব। এতে আর দোষ কি? সেও যদি মণিদার বো’এর সঙ্গে দু’টো হাসি ঠাট্টার কথাই বলে, তাতে সত্যই তাে কারাে কিছু বলার থাকে না-থাকতে পারে না। এ যে বড় মিষ্ট সম্বন্ধ। সুভাষ কিন্তু হতাশ হয়ে পড়লো, প্রথম দিনেই। বৌদি যেন কেমন খাপছাড়া। সে হন্তদন্ত হয়ে বৌফিছ গিয়ে দাড়াল । মুখের দু’টো মিষ্ট কথা শুনবার জন্য। ধোদি কিন্তু তাকে আমলই দিল না। একবার চেয়ে দেখেই মুখখানা সর্গিয়ে নিল। সুভাষ নাছােড়বান্দা। কথা না কহিয়ে ছাড়বার পাত্র সে আদৌ নয়। সে ফস করে বললে, তুমি আমায় চেন না বৌদি। আমি যে বেদি উজান Wোতে ৭১

তােমার লক্ষ্মণ দেবর, সম্বােধন শুনেই বুঝে নিয়েছ নিশ্চয়। তার অধিক
পরিচয় নিষ্প্রয়ােজন। বিশ্বাস না হয়, মণিদাকেই জিগ্যেস কর।
মণিময় বলে,-থাম—থাম—আর বক্ততায় কাজ নেই। এত
বতেও পারিস।
সরমা মুখ টিপে টিপে হেসে বললে, আমি কিন্তু আর কথা না বলে
পাচ্ছিনে। ভালই বল, আর মন্দই বল—কথার পিঠে কথা বলা আমার
একটা রােগ।
সুভাষ উৎসাহ ভরে বলে,—তাহলে তােমার সঙ্গে আমার মিবে
ভাল। আমারও ঠিক ঐ রােগ বৌদি।
মণিময় গুম হয়ে মুখখানা ফিরিয়ে নিল ।
সরমা হাতে হাসতে বলে, তােমার দাদাটাও কম যান না
দিনরাত মুখে খই ফুটছে।
নমিতা একপার্শ্বে জড়সড় হয়ে দাড়িয়েছিল; কিন্তু হঠাৎ তার
চোখের দীপ্তি চক্‌চক্‌ করে উঠলো।
৯. সুভাষের নজর ঠিক ছিল। সে চট করে বলে,তা বেশ হবে।
একদিকে দাদা--আর একদিকে আমি। তারপর খিল্ খি'করে হেসে
উঠলাে।
সরম হাতে ৬৩ বলে,—তুমি দেখছি ঠাকুরপাে, দাদারও ওপরে
যাবে। কিন্তু একটা বিষয়ে
সুভাষ একেবারেই ব্যস্ত হয়ে \'লে,-কি—কি বৌদি?
সরমা মুচকি হেসে বললে,-তােমর যে আর সবুর সইছে না
ঠাকুরপাে। তােমার সঙ্গে কথা বলতে হলে দেখছি দু’টো মুখ থাকা চাই।
উজান স্রোতে
৭২

সুভাষ একেবারে ভীষণ গম্ভীর হয়ে বলে,—দুটো মুখ— তাহলে
double headed ( ডবল হেডেড)। হাঁ, 'গকে তাে বলে দু’মুখাে
সাপ,। সেইটে বাদে বৌদি। আর যা কিছু তুমি হতে চাও, হও
কেবল ঐটা বাদে। দোহাই তােমার-বলেই সে আবার খিল খিল করে
হেসে উঠলাে।
সরমার চোখ দুটো বিষধর সর্পের ন্যায় ধ ধ করে জ্বলে উঠলাে।
নিমিষে সে-ভাব দমন করে সে মােলায়েম কণ্ঠে বললে,—আবার ভয়টাও
আছে দেখছি বিলক্ষণ ।
সুভাষ ব্যস্ত হয়ে বলে,থাকবে না ? একেবারে একজোড়া
বৌদির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা। একি কম বুকের পাটা। শেষে
কাণ দু’টো আস্ত থাকলে বাঁচি। এই বলে ভয়ে ভয়ে কাণে হাত বুলুতে
আরম্ভ করে দিল।
মণিময় ও সরমা যুগপৎ হেসে উঠলো। নমিতা মৃদু হেসে মুখখানা
সরিয়ে নিল।
সুভাষ হাতে হাতে বলে,দেখলে মণিদা, বৌদি যে বৌদি
হাতে চান না—তাকেও পর্যন্ত হাসিয়ে ছেড়েছি।
সরমা একটু টিপ্পনী দিয়ে বলে,বৌদি তে এখানে দু’জন,
কাজেই
বাধা দিয়ে সুভাষ বললে,-কাজেই একটু ভুল হয়ে গেছে। তা
একজনের মুখে তত কারণে অকারণে হাসি লেগেই আছে। তবুও
বারদিগর যাতে সংজ্ঞার অভাবে সে ভুল না হয়, তাও ঠিক করে
ফেলেছি।
উজান ক্ষেতে
१७

সরমা গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
সুভাষ ঘাড়টা ঘুরিয়ে বলে,—সংজ্ঞা নির্দেশ খুব সহজেই হয়ে
যাবে। তুমি হলে বৌদি—সাধারণভাবে। আর ঐ যে বৌদি
মুখে চাবী এটে আছেন ও চুপি চুপি এক একবার চেয়ে দেখছেন, ওর
গায় একটা নতুন কথা যােগ করে দিলেই হবে--অর্থাৎ কিনা নতুন
বৌদি।
মণিময় বললে,--আজ আর কেন? একদিনে সব বলে ফেললে,
পরে আর কি ববি ?
সুভাষ বলে, তুমি জান না মণিদা-এ একেবারে অফুরন্ত
ভাণ্ডার। তার উপর এমন সব বৌদির। থাকতে আমার আবার কথার
অভাব হবে? তঁারাই কথা যুগিয়ে দেবেন। সত্যি তােমরাই বল বৌদি ?
আচ্ছা, তুমিই বল নতুন বৌদি ?
নমিতা মুখখানা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
সুভাষ একেবারে নমিতার কাছে এসে বলে,—সে হবে না নতুন
বৌদি। বতেই হবে। কথা না বলে আমি ছাড়ছি না। বল।
নমিতার মুখ চোখ আরক্ত হয়ে উঠলো। কি করে বাধ্য হয়ে
সে ক্ষীণ ও কম্পিত কণ্ঠে বললে,-আগে দিদিই বলুন, তারপর তাে
আমি। বড় কাই থাকতে ছােট’র কোন কথা বলা সাজে না।
তারপর নমিতা যেন হাঁপাতে লাগলাে।
সুভাষ লাফিয়ে উঠে বললে, “ঠিক্ ,বলেছে নতুন বৌদি। তাহলে
তুমিই আগে বল বৌদি ?
সরমা ফিক করে একটু হেসে বললে,—হ্যা গো হা,তােমার কথা
সালে
৭৪
উজান স্রোতে

খুব ঠিক। তা না হয় হ’ল, কিন্তু তােমার গায়েও দেখছি আমাকৈ ঐ
“নতুন” কথা যােগ করে দিতে হবে।
সুভাষ পরম উৎসাহ ভরে বলে,—অর্থাৎ কি না আমি হ’ব তােমার
নতুন ঠাকুরপো। সত্যি বেশ হবে। একদিকে নতুন ঠাকুরপাে ও
নতুন বৌদি, আর একদিকে বুঝলে কি না—সব পুরাতন।
এমন সময় মণিময়ের মা এসে বললেন,-না, তােদের দেখছি আর
গল্প ফুরােবে না। রবিবার বলে কি আর ক্ষিধে তেষ্টা নেই ?
তাও তাে বটে। চল—চল-জ্যাঠাইমা-এস মণিদা—এ বৌদিরা'
চলে এস। বলতে বলতে সুভাষ অগ্রসর হ’ল।
r.
উজান স্রোতে
৭৫

GARASWAT LIEhAh. | . LARARDAH- HUWRAH. Ed;-1919. সুভাষের আগমনে প্রথম প্রথম সকলেই একটু সমূঝে চলতে গালো। কিন্তু একবার অসংযমের পথে পা দিয়ে সংযত ভাবে চলা মণিময়ের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। মণিময় ভেবেছিল যে, সুভাষ দু’চার দিনের অতিথি। কিন্তু দিনের পর দিন সে ধারণা ব্যর্থ করে দিয়ে যখন সে তার অধিকার পূর্ণ মাত্রায় এই গৃহে প্রতিষ্ঠিত করে নিতে চেষ্টা করতে লাগলো, তখন মণিময়ের মন তিক্ততায় ভরে উঠলাে। সরমার দিকে ছিল যেন তার তীক্ষ্ম দৃষ্টি। উভয়ের নিভৃত আলাপে সুভাষ এসে দাঁড়াত একটা কথা মুখে করে ও কথার পর কথা নানা কখার অবতারণা করে সে সময় কাটিয়ে দিত। মণিময় মনে মনে গােঙ, রাত; কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারতাে না। সরমারও মনের মধ্যে সময়ে সময়ে অসন্তোষের আগুন জ্বলে উঠতে ও তার কিরণচ্ছটা চোখ মুখের উপর দিয়ে খেলে্যুত; যেন ঠিকরে বাইরে পড়তে চাইছে। তবুও সুভাষ স্থির ও অবিচলিত চিজে অনর্গল বকে যেত; যেন এ সব তার লক্ষ্যেই পড়ে না। অথচ সকাল, সন্ধ্যা ও রাত্রে ঠিক এই ভাবে সুভাষ তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে চলতো, যতক্ষণ না মণিময় অথবা সরমা বিরক্ত হয়ে উঠে যেত। উজান স্রোতে দুপুরে মনিময় থাকতাে কোর্টে। এই সময়টা সুভাষ জ্যাঠাইমার কাছে এসে বস্ততা ও স্নিগ্ধমধুর আলাপে ঘণ্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিত। প্রথম প্রথম নমিতা উঠে পড়তে ও নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকতো। শ্বমাতাও নিষেধ করতেন না। তারপর দিনে দিনে সুভাষের উপর তার এমনি স্নেহের আকর্ষণ পড়ে গেল যে, তিনিই বধূমাতাকে চলে যেতে নিষেধ করতেন। কোন কোন দিন নমিত। সে আদেশ উপেক্ষা করতে সাহসী হত না—নীরবে বসে উভয়ের কথাবার্তা শুনে যেত। সুভাষের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ীর হাওয়া সত্যই অনেকটা বদলে গিয়েছিল। মণিময় আজকাল রাত্রি ৯টার পরেই নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়তাে। সরমাও বেশী কিছু মিশবার সুযােগ পেত না। কাজেই সুভাষের উপর তার যে একটা আন্তরিক টান পড়বে, তাতে আর বিচিত্র কি ? ঠাকুরপাের উপর একটা শ্রদ্ধার ভাব নমিতার প্রাণে যে জেগে ওঠে নি এমন নয়। তবুও সে তার সঙ্গ এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করতো। কি জানি যদি তাই নিয়ে আবার নুতন করে আর একটা অশান্তির সূত্রপাত হয়। কিন্তু, সুভাষ তাকে সে ফঁক দিতো না-~-নতুন বৌদি-নতুন বৌদি-বলে কারণে অকারণে অস্থির করে তুলতে। কাজেই বাধ্য হয়ে তাকে সময়ে সময়ে উত্তরও দিতে হত ও দু’চারটা কথা না বলেও পার তো না। সরমার দৃষ্টি সজাগ প্রহরীর ক্ষয় উভয়ের পিছু পিছু ঘুরে বেড়াত ও তুচ্ছ খুঁটিনাটি কথা অতিরঞ্জিত করে নিত্যই মণিময়কে অবসর মত শুনিয়ে দিতে সেক্রী করতাে না। মণিময় দিনের পর দিন নীরবে শুনে উজান স্রোতে ৭৭.

৫ যেত, কিন্তু কোন উচ্চবাচ্য করতাে না। সরমা একদিন কথায় কথায় বলে ফেললে—সুভাষ ঠাকুরপাে তাে দিন দিন খুবই বাড়িয়ে তুলছে- বাড়ীর উপর বসে—সকলের চোখের সামনে—এ সব কি ভাল হচ্ছে ? এ সময় তােমার মা কিছু দেখতে পান না। মণিময় কুটীভয়াল দৃষ্টি তুলে সরমার মুখের দিকে চেয়ে রইলো। সরমা একটু ঢােক গিলে বললে,-“তুমি তাে দুপুরে বাড়ী থাক না তাহলে বুঝতে। মণিময় গম্ভীর স্বরে বলে,—সুভাষ তাে জেকে বসেছে-সহজে নড়বে বলে মনে হয় না। মিছে গােলমাল না করে, ওকেই বরং দিন- কতুকের জন্য বাপের কাছে পাঠিয়ে দেবে বলে স্থির করেছি। সরমা বললে,-তাতে তাে ঠাকুরপাের পথ আরাে পরিষ্কার করে দেওয়া হবে। এখানে চলবে দক্ষিণ হস্তের ক্রিয়া—আর বাকি সময়টা ওখানেই হাস্য-পরিহাসে কেটে যাবে। মণিময়ের চোখদুটো জ্বল জ্বল করে উঠলো। সে তীক্ষ্ম স্বরে রলে—তা হলে তুমি কি করতে বল বৌদি ? সরমা বললে,আমি তােমায় বলে দেব—তুমি কি করবে ? তুমি না পুরুষ মানুষ । মণিময় বিস্ময়াবিষ্টের ন্যায় চেয়ে রইলাে, ফ্যাল ফ্যাল করে। সরম ঈষৎ মস্তক সঞ্চালন করে স্নিগ্ধকরােজল কটাক্ষ নিক্ষেপ করে বলেছিঃ ঠাকুরপাে! তুমি যে এত ভীতু তা তাে জানতাম না। থাক, তােমার ড়ে বােঝা গেছে। এর পর কিন্তু আর নমিতাকে বাগে আতে পারবে না—তােমার ঐ লক্ষ্মণ ভাইটীই হবে তার একমাত্র কারণ। ৭৮ উজান স্রোতে

-
মুণিময় স্থির ও অবিচলিত কণ্ঠে বললে,কিন্তু যার উপর আমি
কোন দাবী রাখিনে, কোন্ অধিকারে আজ তার উপর কর্তৃত্ব ফলাতে
যাব ? আর সেই বা আমার কথা শুবে কেন?
সরমা হতবুদ্ধির ন্যায় কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাে, দৃষ্টি অর্থহীন~-
সংজ্ঞাশূন্য। পরে বিপপূর্ণ কণ্ঠে বলে,-ওঃ, দাবীটা তাহলে বুঝি
সুভাষ ঠাকুরপোর ? কিন্তু তােমার ঐ উদাসীনতার ফল যখন ফলবে, তখন
স ফলের ভাগী হতে হবে তােমাকে-অপরকে নয়।
সমস্ত রক্ত মণিময়ের মস্তিস্কের ভিতর দিয়ে যেন চন্ চল্ করে বয়ে
গেল। সে দাতে দাত চেপে ধরে অর্ধস্ফুট স্বরে বললে অসহ্য
অসহ্য, কিন্তু কি করতে পারি কি করতে পারি আমি ?
সরমা শাণিত কটাক্ষপাত করে হাস্য বিজড়িত কণ্ঠে বলে,-
নিষ্কাম কর্মী তাে কোনদিনই ফলের আশা রেখে কাজ করে না। তাতেও
যদি ফল এসে কোন দিন গায়ে জড়িয়ে ধরে, সেজন্য সত্যিই তােমাকে
কেউ দোষ দিতে পারবে না ঠাকুরপো ।
মণিময় উত্তেজিত কণ্ঠে ডাকলে,-বৌদি
সরমা বিদ্যুৎবিকাশের ন্যায় মুচকি হেসে বলে,-কি ঠাকুরপাে,
অমন উত্তেজিত হয়ে উঠলে কেন ?
মণিময় রােষকষায়িত নেত্রে বললে,-শােন বৌদি, আমি আজই
স্ত্র ব্যবস্থা করবাে তবে আর কাজ। এখানে আর এক দিনের জন্যও
সুভাষকে স্থান দেব না—নিৰ্ম্মম হর তাড়িয়ে দেব—দূর দূর করে—শৃগাল
কুকুরের মত।
কাকে তাড়িয়ে দেবে মণিদা-বৌদিকে? এই বলে জোরে জোরে
উজান স্রোতে
৭৯

সুভাষ হেসে উঠলো। পরক্ষণেই আবার বললে,সত্যিই তুমি বড় রেগে গেছ মণিদা। ওঃ চোখ মুখ দিয়ে যে আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে ! দেখ— দেখ, বৌদি, নাকটা কি রকম ফুলে উঠেছে। এ বৌদি-তােমারই কাজ—বেটাছেলেকে একটু বুঝে কথা বলতে হয়-নইলে এমনি হয়। তুমি শুনন না মণিদা, বৌদির কথা—মাথা খারাপ—মাথা খারাপ। দিন রাত নিতাইদার কথা ভেবে ভেবে মাথায় কি আর কিছু আছে ? সরমার মুখখানা ঘন কালিমায় ছেয়ে গেল সে আর অপেক্ষা করলে -গেজ গোজ করতে করতে চলে গেল। মণিময় স্থির ও নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ৮০ উজান স্রোতে

( ১৭ )
অলস মধ্যাহ্নের শৈথিল্য ভরা মন নিয়ে নমিতা বসে ছিলো
কত কথা। জীবনটা যেন একটা স্বপ্ন। ঠিক স্বপ্নেরই মত কত রঙিন
কুসুম মনােরাজ্যে ফুটে উঠেছিল, নব নব আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলে।
কিন্তু ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ফুল ঝরে পড়ে গেল, নীরবে,
ব্যর্থতার আঘাত দিয়ে। কেন এ ঘুম ভেঙ্গে যায় ? যদি এ ঘুম না
ভাঙ্গতো, তাহলে স্বপ্নস্রোতে গা ভাসায়ে দিয়ে সে চলে যেত ; পিছন
কিরে ও দেখতে না—কোথায়—কতদূরে চলেছে।
ও নতুন বৌদি
নমিতা স্বপ্নোথিতের মত কম্পিত কণ্ঠে বলে-ক? তুমি !
মাপ করাে, নতুন বৌদি। অসময়ে এসে তােমার স্বপ্নের ঘাের
ভেঙে দিলাম। যদি, ঘূর্ণাক্ষরে জান্তাম মন তােমার বাঁধনহারা হয়ে
ঘুরে বেড়াচ্ছে-অসীমের সন্ধানে, তাহলে কোন বেয়াকুব আতো।
বলৈ সুভাষপ্রস্থানটদ্যত হ’ব।
নমিত থতমত খেয়ে বসে রইলাে।
উজান স্রোতে
৮১

ভ। কিন্তু গেল না, সহসা দু’চার পা এগিয়ে এসে একটু ঢােক গিলে বললে,—ও সব মিছে ভাবনা ছেড়ে দাও, নতুন বৌদি। সত্যিকারের ভাবনা ভাবতে শেখো; নইলে চোখের সামনে শুধু অন্ধকারই দেখতে হবে। তােমার জন্য সত্যিই আমার বড় ভাবনা হয় কেঁদি। নমিতা ঈষৎ গম্ভীরভাবে বললে-পরের জন্য ভাবনা-মিছে সময় নষ্ট করা। এর চেয়ে নিজর ভাবনা ভাবলে কাজ হবে। সঙ্গে সঙ্গে নমিতার চোখমুখ অস্বাভাবিক লাল হয়ে উঠলাে ও লজ্জায় মাটীর সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছা হল সুভাষ বেদনাতুর চাহনি নিক্ষেপ করে বলে, কিন্তু নতুন বৌদি, তােমার মনের উপর দিয়ে যে দিন রাত একটা প্রবল ঝঙ্কা বয়ে চলেছে, সে আমি এ বাড়ীতে পা দিয়েই ধরে ফেলেছি। আমি বেশ বুঝতে পেরেছি-কোথায়-কোন খানে তােমার ব্যথা; কিন্তু তারপর উভয়েই নীরব। ঘরটা যেন মুহূর্তের জন্য সেই নীরবতা বুকে ধরে ছন্ছন্ করতে লাগলাে। নমিতা দম নিয়ে হঠাৎ বাধ বাধ স্বরে বলে,—কিসের ব্যথা ? না না—তুমি কিছু জান না-কিছু জান না। সুভাষ সে কথা চেপে দিয়ে বলে,-আচ্ছা নতুন বৌদি, এ তােমার । কি অন্যায় ? নমিতা বিম্বিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। সত্যি ভারী অন্যায়। আমাকে বা দেওয়াটা কি ভাল হ’ল ? নমিতা ততােধিক বিস্মিত হয়ে বললে,তােমাকে বাদ দেওয়া ! হাঁ, যেন আকাশ হ'তে পড়লে নতুন বৌদি, খিছুই জান না? উজান স্রোতে

“কন্তু ক্ষণিদার মুখ তো আর চাপা থাকে না। তিনি যে নিজেই অনাকে
বললেন।
কি বললেন, ঠাকুরপো ?
ওঃ, পাছে আমি যাই, না ? তা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে
কি আর ক্ষতি হত ? শান্ত ছেলের মত এক দিকে চুপ করে বসে
দেখতাম।
নমিতা অসহিষ্ণু ভাবে বললে,—কি বলছাে ঠাকুরপাে? সত্যি
আমি কিছু জানিনে। মিছে কেন দোষ দিচ্ছ ।
মিছে ! এই তাে সকালে মণিদা বললেন--আজ ছ’টার সাে’এ”
বায়স্কোপে যাবেন--তােমাকে নিয়ে।
আমাকে নিয়ে ! নমিতা বিস্ময় বিস্ফারিত চোখ দুটো ।
উত্তোলন করে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো
সুভাষ হাসতে হাসতে বললে,তােমাকে নিয়ে নয় তাে আর কাকে
নিয়ে ? বেশ নতুন বৌদি, সব জেনে শুনে আবার
নমিতা মুখের কথা কেড়ে নিয়ে উদ্দীপ্তকণ্ঠে বলে,-মিথ্যে কথা
ঠাকুরপাে তুমি ভুল শুনেছ।
ভুল শুনেছি। তাহলে যে নিজের কাণ দুটোকে অবিশ্বাস
করতে হয়, নতুন বৌদি।
কি-না—তাও বরং সম্ভব।
তাহলে নাচার, নতুন বৌদি।
বল—কি শুনেছ ঠাকুরপো ? নমিতা কঠোর জিজ্ঞাসুনেত্রে সুভাষের
মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাে।
উজান স্রোতে

?
সুভাষ একটু ইতস্তত করে বললে,-মণিদা বলছিলেন—আজ রাত্রে
তাের বৌদিকে নিয়ে বায়স্কোপে যাব ঠিক করেছি—ভাল বই আছে।
নমিতা একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে কেমন বলে ফেলে,
সে আমাকে নিয়ে নয় ঠাকুরপো। সে ভাগ্য আমি করিনি।
সে কি নতুন বৌদি! তবে কাকে নিয়ে ! ও বৌদিকে নিয়ে ?
সুভাষ বিরাগ ভরে মুখখানা সরিয়ে নিল। তারপর সে উদ্ধত স্বরে
বলে,
-তােমাকে ফেলে রেখে নিতাইদার বৌকে নিয়ে মণিদা যাবেন
বায়স্কোপে ? কি বলছো তুমি নতুন বৌদি
নমিতার বুকের মধ্যে তােলপাড় করে উঠলো। মনে হ’ল ঠাকুরপো
যেন তার মনের গােপন রহস্য একে একে সব মিংড়ে বার করে নিল।
সুভাষ গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেদনাপূর্ণ কণ্ঠে বলে,-
কি বলবো নতুন বৌদি? মণিদা রত্ন ফেলে কাচ নিয়ে খেলা করছেন।
কে রত্ন, আর কে কাচ, নতুন ঠাকুরপাে ? বলে মুচকি হেসে সরমা
[রের মধ্যে এসে দাঁড়াল।
নমিতার বুকটা বিপুল স্পন্দনে দুরু দুরু কাপতে লাগলো। আর
সুভাষ হতভম্বের ন্যায় চুপটী করে দাড়িয়ে রইলাে।
সরমা ঈষৎ বিপসূচক হাসি হেসে বলে,-এতক্ষণ তাে মুখে খই
ফুটছিলো, আর আমি আসতেই সব চুপচাপ। সত্যি বল না নতুন
ঠাকুরপো, কে রত্ন, আর কে কঁাচ ?
সুভাষ বলে,-তােমার যেমন কথা বৌদি। আমি কি বললাম,
আর তুমি কি শুলে। আমি বললাম—মণিদা যেন রত্ন, আর তার
তুলনায় আমরা যেন কাচ।
=
৮৪
উজান শ্রোতে

MALAUIT WAAH.
সৱমা খিল খিল করে হেসে উঠে বলে, তােমার কৃপক ଓ୩
আছে দেখছি, নতুন ঠাকুরপাে । হয়কে নয় পৰ্য্যন্ত করতে পার।
কে রত্ন, আর কে কঁাচ আমার কি আর বুঝতে বাকি আছে। তারপর
বিদ্রুপসূচক হাসি ওষ্ঠে ফুটিয়ে তুলে বলে, তােমার দোষ কি নতুন
ঠাকুরপাে? নতুন পুরান’য় অনেক তফাৎ।
নমিতার মুখখানা সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সুভাষ জোর করে বলে,—তুমি ভুল শুনেছ বৌদি—একেবারেই
তাহলে তােমার কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে হয়, নতুন ঠাকুরপো।
আমার কথা!
গাে হাততামারই কথা। একেবারে যে চমকে উঠলে !
তাহলে আমার কাণ দু’টোকে অবিশ্বাসী প্রতিপন্ন করা ছাড়া আর কোন ;
উপায় থাকে না। কি নতুন ঠাকুরপাে? মুখখানা যে শুকিয়ে গেল ?
তুমি কিছু মনে করাে না; ও চোখের নেশা—যার যাকে ভাল লাগে।
তারপর গর্বোদ্ধত, চাহনি নিক্ষেপ করতে করতে সরমা ঘর ছেড়ে
চলে গেল।
নমিতা স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইলো। আর সুভাষ নিঃশব্দ পদ-সঞ্চারে
ঘরের বাহির হয়ে পড়লাে।
5 }
ARY
:
ARA
। •
---
উজান স্রোতে

সেদিন বেলা চারটার কিছু পরে মণিময় কোর্ট হতে বাড়ী ফিরলাে,
হাসিমুখে। কিন্তু মােকর্দমার নথি পত্র বৈঠকখানা ঘরে রেখে যখন সে
পােষাক পরিচ্ছদ ছাড়তে নিজ প্রকোষ্ঠে ঢুকলাে, তখন তার মুখখান
দেখাতে লাগলাে ভীষণ কুটীমাখা।
নমিতা তখন সেই ঘরের পারিপাট্য সাধনে রত ছিল। সে একবার
স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে সচকিতে দৃষ্টি নামিয়ে নিল ও সন্ত্রস্পটে
দ্বারের দিকে অগ্রসর হ’ল।
মণিময় বজ্রগম্ভীর স্বরে বলে,—যেয়াে না–দাড়াও।
নমিতার পায়ের গতি থেমে গেল। সে স্থির ও অবিচলিত হয়ে
স্বামীর আদেশের প্রতীক্ষা করতে লাগলো।
মণিময় তীব্রকণ্ঠে বললে,-তুমি কি মনে করেছ ?
নমিতা অবনত মুখে বলে,—কি আর মনে করবে ?
মণিময় ছুটে এসে নমিতার গলাটা সজোরে চেপে ধরে বললে,
কিছু জান না-না?
নমিতার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এল। রুদ্ধশ্বাসে হাঁপাতে হাঁপাতে ৮
বললে, ছেড়ে দাও--সত্যিই আমি কিছু জানিনে।
উজান স্রোতে

মণিময় বিকৃতকণ্ঠে বলে,—জান না—আজ দুপুরে সুভাষের সঙ্গে
জান না—একেবারে ন্যাকা। তারপর পা হ’তে জুতা খুলে ঘা কতক
বসিয়ে দিল।
নমিতার চোখে জল ছিল না। নীরবে নিঃশব্দে সে স্বামীর দান
গা মাথা সর্বাঙ্গে বরণ করে নিল। তবুও মণিময় রেহাই দিল না ;
আবার দ্বিগুণ উৎসাহে হস্ত-চালনা সুরু করে দিল। শেষে নিরাশ হয়ে
নমিতা চেষ্টা করতে লাগলো আত্মরক্ষা করতে, কিন্তু ততই যেন
আক্রমণের বেগ বেড়ে চলতে লাগলাে।
অবশেষে নমিতা , অবরুদ্ধ
কণ্ঠে
বলে,-এমন ভাবে দগ্ধে দগ্ধে না মেরে আমায় শেষ করে
দাও। এ অপমান মাথায় ধরে আর এক মিনিটও বাঁচবার সাধ
আমার নেই।
মণিময়ের দেহের রক্ত যেন পাগল হয়ে নেচে উঠলো। ক্ষিপ্তের
ন্যায় রক্ত চক্ষু বিঘুর্ণিত করে সে বলে,-তাই তাের উপযু শাস্তি।
দুষ্টা স্ত্রীর মরণই মঙ্গল। বলে এত জোরে জুতা দিয়ে মাথার উপক্ক
আঘাত করলে যে, রক্ত ফিকি ধরে ছুটে বেরুল। আর নমিতা মাগো
চীৎকার করে মেঝের উপর ঢলে পড়লাে।
সে চীৎকার শুনে পাশের ঘর হতে সুভাষ ছুলে এল। এখনও
মণিময়ের বেহুস অবস্থা।
তবে রক্তের ধারা দেখে মুহূর্তের জন্য সে
স্থির হয়ে দাড়িয়েছিল, আর সর্বাঙ্গ বিপুল উত্তেজনায় ঠক্ ঠক্ করে
কাপতে লাগলাে
মণিদা, এৰি করেছ ? ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে
নমিতার ক্ষতস্থানটা সে কাপড় দিয়ে চেপে ধরলে।
উজান স্রোতে
৮৭

।
.
মণিময় আরক্ত নেত্রে বলে, তােমায় কে ডেকেছে এখানে?
যাও—চলে যাও–যাও বছি।
সুভাষ ভয়ে ভয়ে উঠে বঁড়াল, রক্তমাখা হাত দু'খানা নিরীক্ষণ
করতে করতে ও কম্পিত কণ্ঠে বলে,—কিন্তু মণিদা, দেখছো না কি
রক্ত? এমন ভাবে আর বেশীক্ষণ রক্ত পড়লে যে, সব শেষ হয়ে যাবে।
যার যা। সে আমি বুঝবে। মিছে তর্ক করো না সুভাষ ।
এখনও যাও বছি।
• নমিতা ক্ষীণ ও কাতর কণ্ঠে বলে, তােমার পায়ে পড়ি ।
নামায় শেষ করে দাও। তারপর চোখ চাইতেই সুভাষের উপর নজর
পড়লো ও উত্তেজিত স্বরে বললে,—তুমি—তুমি এখানে কেন ? দেখতে
এসেছ? কেন? কোন অধিকারে ? যাও চলে যাও।
সুভাষের চোখ দিয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
ও. কি অপমান! বলে নমিতা মেঝের উপর স্থির ও নিস্পন্দ হয়ে
পড়ে রইলাে।
মণিময় ব্যঙ্গস্বরে বললে,—অপমান ! সে জ্ঞান থাকলে তো !
গলা জড়িয়ে পিরীত করতে—প্রাণের কথা কইতে যার বাধে না, তার
আবার অপমান!
মধ্যাহ্ন সূৰ্য্যের ন্যায় নমিতার চোখ দুটো জ্যোতিষ্মান হয়ে উঠলাে।
সহসা এক ঝাকুনী দিয়ে মাথা উচু করে পাগলের ন্যায় চক্ষুতারকা
সঞ্চালিত করে সুতীব্র কণ্ঠে সে বলে,-মিথ্যে কথামিথ্যে কথা।
মণিময় ছুটে এসে নমিতার গলা চেপে ধরে বিকৃত্ন কণ্ঠে বলে,-
মিথ্যে কথা। শয়তানী ।
b৮
উজান স্রোতে

সঙ্গে সঙ্গে নমিতার মাথাটা মেঝের উপর ঠুকে গেল ও মুখ হতে একটা অস্ফুট মাগাে শব্দ নিঃসৃত হয়ে ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লাে। কি করছো মণিদা ? সত্যিই কি তােমার মাথায় খুন চেপে গিয়েছে? ছেড়ে দাও—ছেড়ে দাও--মরে যাবে যে-বলে সুভাষ মণিময়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে এল। মণিময় চীৎকার করে বলে উঠলাে-বড় দরদ—বড় দরদ। এখন রক্ষে করতে দেখি। ছেড়েদে বলছি, নইলে তােরও ঐ অবস্থা হবে। এক সঙ্গে দু’জনকে শেষ করে দেব। তারপর হাত খানা সজোরে ছাড়িয়ে নিয়ে সে আবার নমিতার দিকে ধাবিত হ’ল। সুভাষ ছুটে গিয়ে ধরে ফেলে। মণিময় সজোরে হাতখান ছাড়িয়ে নিল ও তড়িৎস্পৃষ্টের ন্যায় নমিতার দিকে হাতের গতি ছুটে গেল। সুভাষ সামনে এসে বাধা দিতে গিয়ে সজোরে সেই আঘাত এসে পড়লাে তার কপালের উপর ও সঙ্গে সঙ্গে চোখের কোণ কেটে গিয়ে রক্ত ঝরে পড়তে লাগলো। সুভাষ সেদিকে লক্ষ্য না করে সজোরে টানতে টাতে মণিমমকে ঘরের বাইরে নিয়ে এল ; চোখ বেয়ে তখনও তার রক্ত ঝরে পড়ছিল। তবে তুই ও জাহান্নমে যা—বলে চীৎকার করে উঠে মণিময় আবার ঘুসি বাগায়ে দাঁড়াল। কিন্তু সুভাষের মুখের দিকে নজর পড়ায় তার যেন সম্বিৎ ফিরে এল। ঠিক এই সময় মণিময়ের মা এসে এই দৃশ্য দেখে থম্‌কে দাড়ালেন। সুভাষ মণিময়কে ছেড়ে দিয়ে মুখখানা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলাে। উজান স্রোতে ৮৯

মাতা উদ্বিগ্নচিত্তে বলেন--একি ! কি হ’ল রে ? কেমন করে
কেটে গেল?
কেহই কোন উত্তর দিল না।
মাতা উৎকণ্ঠিত চিত্তে বলেন,-বৌমা কোথায় ?
সুভাষ ঘরের দিকে অঙ্গুলি সঞ্চালন করে দেখিয়ে দিল।
মাতা ডাকলেন-মণিময়।
তবুও কোন উত্তর এল না। মাতা চোখ ফিরিয়ে ডাকলেন ;
সুভাষ।
সুভাষ ইতিমধ্যে সে স্থান ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল। আর মণিময়
কষ্টপুত্তলিকার ন্যায় দাড়িয়ে ছিল।
মাতা শঙ্কাকুল চিত্তে ঘরে ঢুকলেন ও নিমিষে বৌমার অবস্থা দেখে
মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। তার পর ছুটতে ছুটতে গিয়ে
বধূমাতাকে কোলে তুলে নিয়ে ডাকলেন—বৌমামা আমার।
মা–মাগাে বলে নমিতা শমাতার মুখের দিকে চেয়ে রইলাে।
৯০
উজান স্রোতে,

অধিক রক্তমােক্ষণের ফলে নমিতা মাথা তুলতে পারলে না।
গুরুতর প্রহারে দেহের স্থানে স্থানে ফুলে উঠে রক্ত জমে গিয়েছিল ।
এমন কি দুঃসহ বেদনায় পাশ ফিরবারও পৰ্য্যন্ত ক্ষমতা ছিল না।
শাশুড়ী ভীত হয়ে চীৎকার করে ডাকলেন,-মণি --ও মণি।
কোন উত্তর এল না। তারপর সরম-সরমা বলে দু’একবার
ডাকলেন; কিন্তু তবুও কোন উত্তর এল না। নিরাশ হয়ে তিনি
সুভাষকে ডাকতে লাগলেন। সুভাষ ও সে ডাকে সাড়া দিল না।
তিনি ভীতি-বিহবল চিত্তে বধুমাতার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। আর
গভীর অতঙ্কে মনটা মুহুর্মুহু কেঁপে উঠতে লাগলো।
একটু পরেই মণিময় ঘরে ঢুকলো সশব্দে! মাতা আকুল হয়ে
বলেন, মণি, ভাল চা তো শীগগির একজন ডাক্তার ডেকে নিয়ে
আয়। কি করেছিস একবার দেখ দেখি।
মণিময় ফিরও চাইলে না। জামা কাপড় ছাড়তে ছাড়তে
গম্ভীর স্বরে ললে, ডাক্তার ডাতে হয়, তুমি ডাক গে। মিছে
বিরক্ত করে না।
উজান স্রোতে
৯১

মাতা কষ্ট হয়ে বললেন, তুই কি মানুষ? না, তাের দেহে যদি
মানুষের রক্ত থাকতাে, তাহলে এ কথা বলতে পারতিস্ নে। তুই পাষাণ
-হৃদয় বলে তাের কোন জিনিষ নেই।
মণিময়ের সমস্ত রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠলাে। সে বিকৃতকণ্ঠে
বললে,-না আছে নেই। তােমার তাে আছে। তুমিই ওকে আস্কারা
দিয়ে মাথায় তুলেছ।
মাতা উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,-একটা লােক মরে যাচ্ছে
বাধা দিয়ে মণিময় বলে,—যায় যাক, আমার তাতে কোন ক্ষতিবৃদ্ধি
নেই। তারপর সে আবার সশব্দে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
আর সঙ্গে সঙ্গে নমিতার স্ফুরিত অধর হ’তে গভীর মর্মভেদী ছােট্ট
একটা মা ডাক ঝরে পড়ে কাপতে কাপতে যেন তার বুকের উপর
আছাড় খেয়ে পড়লাে। মা ডাকলেন—বৌমা।
নমিতার চোখ দিয়ে দু'ফোটা অশ্রু নীরবে ঝরে পড়লো।
এদিকে মণিময় সরমার ঘরে ঢুকেই বলে,-কই চল বৌদি, সময়
হয়ে এল যে। এখনও প্রস্তুত হয়ে নেও নি।
সরমা স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইলো। পরে ধীরে ধীরে বললে,--আজ
থাক ঠাকুরপাে
সেকি বৌদি! টিকিট কাটা। ও সব বাজে ক ছেড়ে দাও।
চট করে তৈরী হয়ে নেও। কই, তবুও যে দাড়িয়ে রইলে?
ঠাকুরপো ।
উজান স্রোতে ,

তুমি বুঝঝাে না বৌদি। আর মিনিঠ কুড়ি সময় আছে। তুমি
দেখছি বায়স্কোপে যাওয়াটা পণ্ড করে দেবে।
সত্যি ঠাকুরপাে, আজ যেন বায়স্কোপে যেতে মন সরছে না। আজ
খাক লক্ষ্মীটী।
না। সে হবে না—যেতেই হবে। এত ভয় করতে গেলে
সংসারে থাকা চলে না। সত্যি, না গেলে কিন্তু আমি রাগ করবাে।
সুরমা মুচকি হেসে বললে,—সত্যি রাগ করবে ঠাকুরপাে ?
করবাে না-নিশ্চয়ই করবাে।
কিন্তু কতক্ষণের জন্য ঠাকুরপো ? বেশ, তাই ভাল। আজ যখন
রাগের পালা শুরু হয়ে গিয়েছে, তখন আমিই বা বাদ যাই কেন?
কিন্তু মুখে বললে কি হয়, তােমার উপর সত্যি বৌদি রাগ আসে না।
তাই বল—বলে সরমা কৌতুহলী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুখখানা ফিরিয়ে
নিল।
মণিময় বলে,—তবু যে নড়ছে না? শেষে কি জোর করে টেনে
নিয়ে যেতে হবে?
সরমা গম্ভীর ভাবে বললে,-সত্যি ছাড়বে না?
তা হলে এত খােমােদ করতাম না-বলে, মণিময় গম্ভীর ভাবে
কি চিন্তা করতে লাগলো।
সরমা বললে,-আচ্ছা, চল যাই।
গাড়ী দরজায় ছিল। উভয়ে পাশাপাশি গাড়ীতে এসে বসলো।
সুভাষ ছিল রার আর এক ধারে। গাড়ীখানা সামনে দিয়ে চলে
যেতেই, সুভাষ কটমট করে তাকিয়ে দেখলে। রমা এক নজর
উজান স্রোতে

দেখে নিল। মুহূর্তের জন্য তার মনটা যেন কেঁপে উঠলাে ও একটা
অস্ফুট ও অব্যক্ত শব্দ করে সে মণিময়ের কাঁধের উপর মাথাটা রেখে
স্থির ও নিশ্চল হয়ে চেয়ে রইলো।
মণিময় বিস্ময়াকুল চিত্তে বললে,—কি হ’ল বৌদি ?
সরমা সজোরে মাথাটা তুলে নিয়ে বলে,-কই কিছু না। মাথাটা
যেন কেমন ঘুরে গেল।
মণিময় ভীতিপূর্ণ কণ্ঠে বলে,—তবে চল আজ ফেরা যাক। কাজ
নেই বায়স্কোপে গিয়ে।
সে আর হয় না ঠাকুরপো-বলে সরমা বাহিরের দিকে নিষ্পলক
নেত্রে চেয়ে রইলো।
১৪
উজান স্রোতে

( ২০ ) সেদিন বায়স্কোপে গিয়ে কথাবার্তা যেন তাদের জলে না। কোন রকমে সময় কাটিয়ে দিয়ে তারা বাড়ী ফিরলো। সরমা বরাবর নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়লাে, কম্পিত চরণক্ষেপে, এদিক ওদিক চাইতে চাইতে। মণিময়েরও ঠিক সেই অবস্থা। তার মনে হতে লাগলাে বাড়ীখানা যেন গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে। কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই, শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাড়ীখানা ছম্ছ করছে। মণিময় উদ্বিগ্নচিত্তে মায়ের ঘরের দিকে তাকিয়ে রইলাে। একটা প্রবল ধাক্কায় তাবু মনটা অস্বাভাবিক রকমে কেঁপে উঠলো। নমিতা তাে এ সময় মাকে রামায়ণ মহাভারত পাঠ করে শােনায়। মণিময় জোর করে চোখ ফিরিয়ে নিল। কেমন আছে নমিতা? সে কি রক্ত! ফিণকি ধরে পড়তে লাগলো। সুভাষের দু’হাত রক্তে রঞ্জিত হয়ে গিয়েছিল সে রক্ত থামাতে। সুভাষই বা গেল কোথায় ? বৈঠকখানা ঘরে? মণিময় টলতে টলতে বৈঠকখানা ঘরে প্রবেশ করলে। যেমন ঘর তেমনই পড়ে আছে, সুভাষ তাে নাই। উজান স্রোতে কোথায় গেল সকলে ? উম্লান্তচিত্তে বিক্ষিপ্ত চরণসঞ্চারে মণিময় নিজ কক্ষে এসে দাঁড়াল। ঘর খালি পড়ে আছে। মণিময় তাড়াতাড়ি বাতিটী জেলে ফেলে ও আলােকদামে ঘরখানি উদ্ভাসিত হয়ে উঠলাে। ঘরে কেহ নাই; শুধু নজরে পড়লো নমিতার রক্তমাখা পরিধেয় কাপড়খানি। মণিময় ত্ৰস্তে চোখ ফিরিয়ে নিল ও ঘর ছেড়ে একেবারে সরমার ঘরে এসে কম্পিত কণ্ঠে ডাকলে,-বৌদিও বৌদি। সরমা শয্যায় উপুড় হয়ে শুয়েছিল। চমকে উঠে সে বললে,-কি ঠাকুরপাে। কি হল? ৫ মণিময় ক্ষীণ কণ্ঠে বললে,-ঘরে যে আলো জ্বলনি বৌদি? এই যে জালছি-বলে সরমা ক্ষিপ্র হস্তে বাতিটী জ্বেলে দিল । তারপর উভয়ে নীরব। কারাে মুখে কোন কথা ছিল না। বিরাট নিস্তব্ধতায় উভয়ের গা যেন ছন্ছন্ করতে লাগলাে। মণিময় ঈষৎ অস্ফুট স্বরে বলে,-কায়ো তো কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছি না। সরমা বললে,-আছে সব। কোথায় আর যাবে ? মণিময়ের কিন্তু এ উত্তর ভাল লাগলাে না। প্রাণের মাধ্য কোথায় যেন খচ, খচ, করে বিধতে লাগলো। সে উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে পড়লাে, মায়ের ঘরের দিকে। সরমা বলে,এত ব্যস্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছ ঠাকুরপাে ? নমিতার খোজে বুঝি ? তবে নাকি দরদ নেই? মণিময়ের চোখ দুটো দপ করে জ্বলে উঠলো ও পায়ের গতি থেমে গেল। উজান স্রোতে

রমা অপাঙ্গে চেয়ে বলে,-থেমে গেলে যে ঠাকুরপাে ? তা তােমার
দোষ কি ? মনের খেলা।
এমন সময় খচ, খচ, জুতার শব্দ উভয়ের কর্ণে এসে পৌছে গেল।
সরমা বললে,-বোধ হয় নতুন ঠাকুরপাে এল।
মণিময় বলে,-হবে। তারপর একটু থেমেই বলে,-হা,
সুভাষই। না, সঙ্গে আর কেউ নেই।
নরমা বলে, সঙ্গে আবার কে থাকবে ?
, তাই বছিলাম—বলে মণিময় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাে।
সরমা বললে,-বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কি হবে
যাও, হাত পা মুখ ধুয়ে এস। খাওয়ার কথাই যে ভুলে যাচ্ছ ?
হ; কিন্তু—বলেই মণিময় উৎকর্ণ হয়ে কি যেন শুতে লাগলো।
মা বলছিলেন,-বৌমা এখন কেমন আছে দেখে এলি বাবা?
সুভাষ বললে,একটু ভাল। মাথায় আঘাতটা একটু বেশী রকম
লেগেছে। ডাক্তার এসে ব্যাণ্ডেজ করে দিয়ে গেছেন।
মণিময় চমকে উঠলাে। সরমারও মুখ চোখে ভীতির চিহ্ন ফুটে উঠলো।
মা বলেন, ভাগ্যিস্ তুই ছিলি বাবা, নচেৎ কি যে হত বলা যায়,
না। আমি তো আর বেয়াইকে খবর দিতে পারতাম না।
সুভাষ সে কথার জবাব না দিয়ে বলে,-তালুই মশায় কি
ভদ্রলােক, জ্যাঠাইমা। অত বড় লােক। আমার তো ভয়ে পা
কাপতে লাগলাে। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো।
ভাবলাম সব কথা শুনে না জানি কি করেই বসেন। কিন্তু জ্যাঠাইমা,
মাটীর মানুষ—একেবারে মাটীর মানুষ।
উজান স্রোতে
৭

৫
মণিময়ের চোখ দুটো অন্ধকারে উল্কার মত জ্বলে উঠলো।
সুভাষ বলতে লাগলাে—তখনই আমার সঙ্গে বেরিয়ে চলে এলেন ;
দু’চোখে অশ্রুধারা। যা ভালই হয়েছে, তিনি নিজে এসে নিয়ে
গেছেন। এখানে থাকলে যে কি হত বলা যায় না। তারপর একটু
ঢোক গিলে বলে,--আমি এখন আসি, জ্যাঠাইমা।
মণিময়ের মাতা বিস্মিত হয়ে বললেন,—এত রাত্রে কোথায় যাবি
বাবা ?
৫
রাত কোথায় জ্যাঠাইমা ? আর এ বাড়ীতে একটুও থাকতে
পারছি না। প্রাণ যেন হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে উঠছে। যেখানে নারীর অপমান
চোখের উপর দেখতে হয়, সেখানে থাকতে আমায় অনুরোধ করবেন
জ্যাঠাইমা।
মণিময়ের মাতা বলেন,-তুইও যাবি ? তাই যা। আমি থাকতে
বলবো না ! এ বাড়ীর বিষাক্ত বাতাসে কেউ থাকতে পারবে না।
সরমার মুখ চোখের চেহারা ক্রুদ্ধা সিংহীর ন্যায় স্ফীত হয়ে উঠলাে
ও উত্যপ্ত নিঃশ্বাস মুহু মুহুঃ ঝরে পড়তে লাগলাে।
সুভাষ জ্যাঠাইমার পদধূলি গ্রহণ করে ধীরে ধীরে বৈঠকখানা ঘরের দিকে
অগ্রসর হ’ল ; নিজের জিনিষপত্র গুছিয়ে নিতে।
মণিময়ের মাতা বলেন, শুধু মুখে যাবি বাবা–মুখের ভাত দু’টো
খেয়ে যা।
সুভাষ বলে,—সে তো হয় না, জ্যাঠাইমা ; তালুই মশায় যে
ওখানে খাবার জন্য বিশেষ করে বলে দিলেন। আমি এই রাত্রের জন্য
যে তার অতিথি। ওখান থেকেই কাল সকালে কলকাতা রওনা হব।
৯৮
উজান স্রোতে

মণিময়ের মাতা বলেন,-তবে আর বাধা দেব না। ভগবান
তাের ভাল করবে। সময় সময় দু’একখানা চিঠি দিয়ে খোঁজ নিস্-
ভুলে যান যেন।
জিনিষ পত্র গুছিয়ে নিয়ে ফেরবার পথে মণিময় ও সরমার সহিত
সুভাষের দেখা হয়ে গেল। সুভাষ বলে,--আমি এখনই চলে যাচ্ছি,
মণিদা। তারপর সরমার দিকে চেয়ে বলে,-মনে কিছু করো না বৌদি,
অনেক বিরক্ত করে গেলাম। তারপর হন হন্ করে সে রাস্তায় বেরিয়ে
পড়লাে।
মণিময় ও সরমা নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে রইলাে।
—
উজান স্রোতে
৯৯

Lierung CARASWAT Estd:-1219, MAKARDAH HUWAH. ‘আরাে দু’বৎসর পরের কথা। এর মধ্যে কোন দিন নমিতা শশুরবাড়ী আসে নাই। ইতিমধ্যে পিতাকে বলে কয়ে আবার সে নূতন করে লেখাপড়া আরম্ভ করে ও মাস দু’ই হ’ল ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। এ সংবাদ মণিময়ের কাণে গেল। সেও গেজেটে নমিতার নামটী দেখে বিস্মিত না হয়ে পারলে না। মাতাও শুনলেন। আনন্দে তার মুখখানা প্রােজ্জ্বল হয়ে উঠলো; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস অন্তঃস্থল হতে ঝয়ে পড়লাে। সরমা ও শুনলে, কিন্তু যেন অতীব গম্ভীর হয়ে। মণিময়ের মাতার স্বাস্থ্য একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল। আজ কিছুদিন হ’ল তার খুব জ্বর, বুকে পিঠে ব্যথা। ডাক্তারে বলে গেছে নিউমনিয়া। একদিন মাতা পুত্রকে বলেন, বৌমাকে দেখবার বড়ই ইচ্ছা যায়। হয়তাে আর দেখা হবে না। কিন্তু—পরক্ষণেই তিনি যন্ত্রনায় অস্ফুট চীৎকার করে উঠলেন। মণিময় বলে,-তাহলে কাশীতে একটা টেলিগ্রাম করে দিতে হয়, কিন্তু সে আবে কি ?

মনে মনে
আসবে না?' আসবে না? তুই কি বলছিস? আমার অসুখ শুনলে
সেলাবে—হাঁ, সবে। ওঃ, বড় ব্যথা---উহুহু। বলে শীর্ণ হাত দু'খানা
দিয়ে বুৰীটা চোপ ধরলেন।
মণিময় একবার সরমার মুখের দিকে চেরে দেখলে।
সে শিউরে উঠলাে।
সরমা বলে,—আমার দিকে কি চাইছো? ঈশ্বর না করুন, মন্দ
কিছু হলে তখন তো আমাকেই দুষবে ?
মণিময়ের মাতার চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠলাে। পরে,
একটা অব্যক্ত শব্দ করে চুপ করে পড়ে রইলেন, শয্যার উপর।
মণিময় অনুনয়পূর্ণ স্বরে বলে, তুমি একটু বসো বৌদি। আমি
চট করে টেলিগ্রামটা করে দিয়ে আসি।
সরমা তীক্ষ্মস্বরে বললে, দিনরাতই তাে তােমার মায়ের কাছে
বসে আছি। নতুন করে একথা বলার তো মানে খুঁজে পাইনে।
মণিময় সঙ্কুচিত হয়ে বলে,-না না, তাই বছি।
সুরমা বলে,-তুমিও বােধ হয় মনে কর ঠাকুরপাে, আমার দ্বারা
তােমার মায়ের সেবা শুশ্রুষ হচ্ছে না। তা এত দিন নিয়ে এলেই
পারতে। আমি তো আর মাথার দিব্যি দিয়ে রাখিনি।
বৌদি
থাক, অনেক হয়েছে। তােমাদের কাউকে চিনতে আমার বাকি
রইলো না। তা নতুন ঠাকুরপােই বা আর বাদ যায় কেন? শেষে
হয়তাে মনে করিয়ে না দেওয়ার জন্য সব দোষটা আমার ঘাড়ে এসে
পড়বে। সরমা হন হন করে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
উজান স্রোতে
১৫

মাতা ক্ষীণস্বরে বলেন,-খাক বাবা। না বুঝে বলে ফেলে]ি ।
পােড়া মন বােঝে না। আমার বড় দুঃখ রইলো যে, হই তাকে চিনতে
পারলিনে।
মণিময় গম্ভীর হয়ে মায়ের বিশুষ্ক মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাে।
মনে হ’ল, শরতের শীর্ণ। নদীর ন্যায় কোন রকমে নিজের জীবনটাকে
তিনি বয়ে নিয়ে চলেছেন, ধিকি ধিকি, উচ্ছ্বাসহীন—উদ্বেগহীন ; আর
চোখের চাহনি যেন স্থির--নিশ্চ—নিষ্প-নিৰ্বাত দীপ শিখারই মত।
মণিময় ডালে,-মা।
অতিকষ্টে ক্ষীণস্বরে মা বললেন,—কি বাবা? তারপর মায়ের চোখে
'বিন্দু জল দেখা দিল ।
তুমি তাহলে মা একটু একলা থাক—আমি টেলিগ্রাম দু’টো করে
দিয়ে আসি।
সরমা কোথা হতে ছুটে এসে মুখ ঘুরিয়ে বললে,-একলা আবার
কবে আছেন তােমার মা ? এত করেও তােমাদের মন পাইনে।
তােমারও কি ও কথাটা মুখে আন্‌তে আটকাল না ?
মণিময় আমতা আমতা করে বললে,“তুমি ছিলে না বিনা বৌদি,
তাই--
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সরমা মুখখানা ঘুরিয়ে বললে,--আমি যেন
বাড়ী ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলাম। মুখের কথা বলে গেলেই
ততা হ'ত-বৌদি বল—আমি যাচ্ছি টেলিগ্রাম করতে। তােমার বৌ-
তােমার ভাই--তুমি করবে টেলিগ্রাম। আমার তাতে বাধা দি বার কি
আছে বলতে পার ঠাকুরপাে ?
---
১০২
উজান স্রোতে

মণিম স্থির ও অবিচলিত কণ্ঠে বলে,—তা ঠিক বৌদি। আমারই
ভুল হয়েছে।
সর- কেমড়ে গেল! হঠাৎ কথার ধারা বদলে নিয়ে শান্ত
ও সংযত কণ্ঠে বলে,-যাও ঠাকুরপাে। তবু যে বসে রইলে। যত
শীগগির টেলিগ্রামটা গিয়ে পৌছিবে, তত শীগগির এসে পড়তে পারবে।
একশ্রেন করে দিও-বুঝলে ? বিপদের সময় সব ভুল হয়ে যায়।
মণিময় গম্ভীর ভাবে বললে,—টেলিগ্রাম করতে হবে না।
সরমা মৃদু হেসে বলে,অমনি রাগ হ’ল বুঝি ? যাও বলছি
ঠাকুরপাে, মিছে দেরী হয়ে যাচ্ছে ।
মণিময় ততধিক গম্ভীরভাবে বলে,—কি হবে বৌদি আর
টেলিগ্রাম করে? মিছে ঝঞ্চাট বাড়ান।
ও, আমায় নিয়েই তো তােমার যত ঝঞ্চাট। বেশ তো, সে ঝঞ্চাট
বিদেয় করে দিও সকলে এলে। তারপর তেজোদ্দীপ্ত স্বরে সরমা বলে,-
মনে করাে না ঠাকুরপাে যে, তাই বলে মায়ের ইচ্ছা পূর্ণ হবে না।
সে আমি কিছুতেই হতে দিতে পারিনে। তুমি না কর, আমি নিজেই
টলিগ্রাম করে দেব।
মণিময়ের বিস্ময়ের সীমা যেন লঘন করে গেল-~-অবাক হয়ে
সে সরমার মুখের দিকে নিষ্পলক নেত্রে তাকিয়ে রইলো।
সুরমা স্নিগ্ধ মধুর চাহনি নিক্ষেপ করে অনুযোগপূর্ণ স্বরে বলে,-
কি ছেলে মানুষী করছে। ঠাকুরপাে?
মণিয়ের মনের দৃঢ়তা কোথায় ভেসে গেল সে দৃষ্টির সংস্পর্শে।
মণিময় উঠে দাঁড়িয়ে বলে,—তাহলে যাই বৌদি ?
উজান স্রোতে

এই নাও।
সরমা বলে,এখনও মত চাইছে। ঠাকুরপাে।
মণিময় পকেটে হাত দিয়ে কি খুজতে লাগলাে
সরমা ব্যস্ত হয়ে বললে,-টাকা নেই পকেটে; তু/ এই যে
আমার আঁচলে পাঁচ টাকার একখানা নােট বাঁধা আছে।
আর হুঁ, ফিরবার পথে ডাক্তারকে একবার খবর দিয়ে এসাে। যে কাজটা
মনে করিয়ে না দেবে, তাতে আর করবে না। আবার বাড়ী এসেই
ছুটবে ডাক্তারের বাড়ী। এমন করলে শরীর থাকবে কি করে ? একে
এই ক’দিনে তাে শরীর আধখানা হয়ে গেছে। নতুন ঠাকুরপাে এলে তৰ
তােমার অনেকটা সুসার হবে।
মণিময় মুগ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে করতে ঘরের বাহির হয়ে পড়লাে।
১০৪
উজান'স্রোতে

নমিতা পিতার সঙ্গে গঙ্গাস্নান সেরে বাবা বিশ্বনাথের মন্দির ঘুরে
সবে বাড়ীতে এসে পা দিয়েছিল। ঠিক এমনই সময় দরজায় ঘন ঘন
কড়া নাড়ার শব্দে বিরক্ত হয়ে সে বলে,—কে ?
বাহির হতে উত্তর এল—টেলিগ্রাম মাইজী।
টেলিগ্রাম ! নমিতার বুকের মধ্যে কেঁপে উঠলো, পা উঠলো না।
দরজার নিকট যেতে।
সুধীরবাৰু কিছু পূর্বেই উপরে চলে গিয়েছিলেন। উপর হ'তে তিনি
জিজ্ঞাসা করলেন,—কে মা?
কম্পিত কণ্ঠে নমিতা বলে,-পিয়ন এসেছে-টেলিগ্রাম নিয়ে।
সুধীরবাবু ব্যস্ত হয়ে নীচে নেমে এলেন ও দরজাটা খুলে টেলিগ্রামটা
হাতে নিয়ে বলেন,-তােরই নমিতা। তাইতাে
নমিতা উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে, কে করেছে বাবা? কোথা হতে
আছে? খবর ভাল তো ?
তাতে এখনও দেখিনি মা ।
উজাস্রোতে

•
পিয়ন পেন্সিলটা এগিয়ে দিয়ে বলে,—এই কাগটায় একটা. মহি
করে দিন বাবু।
সুধীরবাবু যথাস্থানে সহি দিয়ে বাড়ার ভিতর ঢুকৗে ওভারের
মুখটা ছিড়ে ফেলেই এক নজর দেখে গম্ভীরভাবে বললেন, মণিময়
করছে--তােকে যাবার জন্য। মায়ের খুব অসুখ -তােকে দেখতে
চান। এই দেখ।
নমিতা এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললে, পরে নিশ্চল পাষাণ প্রতিমার
ন্যায় দাড়িয়ে রইলো।
পিতা বললেন,“কি করবি মা?
নমিত। উদাসীন ভাবে পিতার মুখের দিকে চেয়ে বলে,—যেতে
হবে বাবা-আজই।
তবু তুই যেতে চাচ্ছিস্? গত বারের কথা বুঝি মনে নেই ?
নমিতা মাথা নীচু করে হাতের নখ খুঁটতে খুটতে বলে,—তবু
যেতে হবে বাবা। ইচ্ছা ছিল আর কোনদিন যাব না; কিন্তু এ যে গুরু
আদেশ বাবা।
পিত কঠোর স্বরে বললেন,-গুরু আদেশ ! আবার তোর কপালে
অনেক দুর্ভোগ আছে। ইচ্ছা করে বরণ করে নিতে চাসনে। সেবার
আধমরা করে ছেড়ে দিয়েছিল—ভুলেও একবার খোঁজ নেয়নি। সুভাষ
ছিল তাই তােকে প্রাণে ফিরে পেয়েছিলাম। এবার বোধ হয় শেষ
করে দিয়ে নিষ্কন্টক হতে চায়।
নমিতার মনটা মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলো। পরক্ষণেই অবিচলিত
কণ্ঠে বললে,-তুমি অমন করে বলো না বাবা। এ যে স্বামীর আদেশ।
১০৬
উজান,স্রোতে,

ভাই হন, আর মদই হন, তিনি আমার স্বামী। একথা কোনদিন
আf: অস্বীকার করতে পারবাে না। এ যে অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ। যেতেই
হৰে বাৰ,-তুপ্রিস্তুত হয়ে নাও
প্রস্তুত ।
পিতা বিরাগভরে মুখখানা ফিরিয়ে নিয়ে কি যেন চিন্তা করতে
লাগলেন ; পরে বললেন, তাহলে যাওয়াই স্থির মা ?
হুঁ বাবা। তারপর ছল ছল করুণ আঁখি মেলে নমিতা ঈষৎ
ক্ষুঃস্বরে বলে,-গত জন্মের কি দুষ্কৃতির ফলে আজ আমি স্বামীহারা।
ইহকাল তো চলে গেল শুধু ব্যর্থতার পরশ নিয়ে। পরকালও কি তুমি,
সেইভাবে যেতে বল বাবা ?
কিন্তু-না না-তােরই ইচ্ছা পূর্ণ হোক্ মা। আমি বাধা দেব না।
তবুও ভয় হয়—পাছে তোকে হারাই—পাছে তােকে হারাই।
নমিতা-মা আমার--এত করে ও তােকে সুখী করতে পারলাম না ।
পিতা অপূর্ণ মুখে কন্যার মুখখানি সস্নেহে বুকের মধ্যে চেপে
পদোন ।
নমিতা নেহাৎ
শিশুর ন্যায় বক্ষে মুখ গুজে পড়ে রইলো—অপরিস্রীম
আনন্দে-বিপুল তৃপ্তিতে।
পরদিন সকালে এসে নমিতা চুচড়ায় পৌছে গেল। বাড়ীর সামনে
এসে গাড়ী দাঁড়াল। নাতে গিয়ে নমিতার পা যেন কাপতে
লাগলাে। তবু সাহসে ভর করে সে নেমে পড়লো ও ধীরে ধীরে দরজার
দিকে অগ্রসর হ’ল। সেই বাড়ী--সেই ঘর—সবই তার পরিচিত।
কোথাও কোন পরিবর্তন তার নজরে পড়লো না। তবু সমস্তই যেন
তার নিকট নূতন বলে মনে হতে লাগলাে।
নূতন বধূর ন্যায়
উজান স্রোতে
১০৭

লজ্জাবনত মুখে কম্পিত চরণে ধীরে ধীরে দরজা অতিক্রম করে সে বাড়ীর
ভিতর এসে দাড়াল।
সামনেই বৈঠকখানা ঘর। পাশেই সরমার ঘর । তাই পাশে
মায়ের ঘর। নমিতা উঁকি মারতে মারতে দু’এক পা করে অগ্রসর হতে
লাগলাে।
পিতাও সঙ্গে সঙ্গে আসছিলেন, মুখে গভীর চিন্তা ও উদ্বেগের চিহ্ন
নিয়ে--ভয়ে ভয়ে---সন্ত্রস্থভাবে পা ফেলতে ফেলতে।
কোথাও কোন সাড়া শব্দ নাই–বাড়ী ঘর গভীর নিস্তব্ধতায়
ভরে গিয়েছে। পায় পায় জড়িয়ে গিয়ে নমিতার গতি স্তব্ধ হয়ে
যেতে লাগলাে। একে সারারাত্রি ট্রেনে কেটে গিয়েছে।
বিপুল উদ্বেগ ও আশঙ্কা বুকে ধরে সে আছে। নমিতার মাথা যেন
ঘুরে গেল। সরমা মায়ের ঘরের নিকট এসে কাপতে কাপতে বসে
পড়লাে—মাথার চুল রুক্ষ—চক্ষুদ্বয় রক্তবর্ণ। তারপর ভীতিকাতর
স্বরে সে ডার্গে—মা-মা।
• সরমা ছিল ঘরে। ছুটে এসে বলে,-কে ? নবি ?
হাঁ, আমি দিদি। মামা কোথায় ?
মা নেই।
নেই ! মাগো বলে নমিতা মূৰ্জিত হয়ে মেঝের উপর ঢলে পড়লো।
Sob
উজা স্রোতে

শ্রাদ্ধশান্তি সব মিটে গেল। নমিতার ভাবনা হ’ল--এবার সে কি করবে? থাকবে কি চলে যাবে ? গর্ভধারিণী জননীর ন্যায় সব . যিনি নিজের স্নেহ কোমল বুকের মধ্যে ঘিরে রাখতেন, তিনি তো চলে গেলেন। তবে কি সুখের আশায় সে এ বাড়ীতে থাকবে ? যদিও অশৌচের একমাস নিরুপদ্রবে কেটে গেছে, কিন্তু কে জানে অদূর ভবিষ্যতের গর্ভে কি নিহিত আছে ? আরাে দু’চারদিন কেটে গেল। স্বামী যেন এবার বড় শান্ত ও স্থির বলেই নমিতার মনে হ’ল। সব দিকে সামঞ্জস্য রেখেই যেন চলতে লাগলেন। স্বামীর এই পরিবর্তন যদিও তার প্রাণে বিস্মরের সঞ্চার করতে লাগলো, তবুও নূতনত্বের আকর্ষণে তার মন যেন এক অপরিসীম তৃপ্তিতে ভরে উঠতে লাগলো। স্বামীর আদর কোন্ স্ত্রীর কাম্য নয় ? নমিতার মনে হত, স্বামী থেন চাইছেন তাকে ভালবাসতে-আদর যত্ন করতে। ঘুরে ফিরে কত সময় তার কাছে আসেন-তার মুখের দিকে চেয়ে থাকেন-পুলক- ভরা দৃষ্টি নিয়ে। আর তার হৃদয়বীণার তার গুলাে এক সঙ্গে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, অপূৰ্ব্ব পুলকে—তারি সাড়ায়। নমিতার খুব ভাল লাগে—প্রাণটা উজান স্রোতে ১০ নেচে ওঠে—শিহরণ আনে, সুখ তৃপ্তি মধুর হ’তে মধুরতর হয়। সে কিন্তু ফিরে তাকাতে পারে না; যদিও তার সমস্ত ইয়ি সজাগ হয়ে থাকে তারই প্রতীক্ষায়। কিন্তু সে কতক্ষণের জন্য ? ভয়ে ভয়ে পা ফেলতে ফেলতে পরক্ষণেই স্বামী চলে যান, স্নিগ্ধ করুণ চাহনি নিক্ষেপ করতে করতে। তার মুখে কথা ফোটে না—শুধু চেয়ে থাকে, আর আপনি আপনি গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা তপ্ত অশ্রুকণা, তার করুণ। আঁখিনীর হ’তে—হয়তো স্বামীর নজরে পড়ে না। । গ আজকাল স্বামীর অনেক কাজ নমিতা করে যায়, নীরবে, ভয়ে ভয়ে। গরম ছুটে আসে হাঁপাতে হাঁপাতে, বন্য হিংস্র-শ্বাপদের ন্যায়--তীব্র জ্বালাময়ী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। স্বামী যেন মুহূর্তের জন্য সন্ত্রস্থ হয়ে পড়েন—উপায় স্থির করতে না পেরে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে বসে থাকেন, বুকে চেপে ধরে সহস্র চিন্তাধারা। নমিতা বিনা বাক্যব্যয়ে নিজ কাজ সেরে চলে চায় ; ফিরেও দেখে না, কাণেও শােনে না--পরে কি হচ্ছে না হচ্ছে। সরমার তীক্ষ্মধার শাণিত দৃষ্টি ধক্ ধক্ করে জ্বলতে থাকে, ক্ষোভে, রােষে, অতিমানে। মণিময় সাহস করে চাইতে পারে না। বিস্ফোটকের জ্বালার ন্যায় তার দেহ যেন জ্বলে পুড়ে ঝলসে যাচ্ছে বলে মনে হয়। তবুও স্থির ভাবে সে বসে থাকেনিৰ্বাক নিস্পন্দ হয়ে। সরমার রাগের মাত্রা সপ্তমে গিয়ে পৌছােয়; স্ফীত নাসিকা ফুলে ফুলে উঠতে থাকে-ফুরিত অধর অস্ফুট অব্যক্ত যন্ত্রনায় যেন আর্তনাদ করতে চায়। কিন্তু মনের ব্যথা মনে রেখে দুপ, দাপ, করতে করতে - ১১০ উজান স্রোতে

সে ফিরে আসে—জানিয়ে দিয়ে তার অন্ত দাহ ও পরিণতি। মণিময়
মুহুর্তের জন্য অস্লামের নিশ্বাস ফেলে বাঁচে ; কিন্তু কি এক অতর্কিত
আতঙ্কে তার বুকটা যেন গুড় গুড় করতে থাকে।
কোথা হ’তে সুভাষ এসে বলে--কি ভাবছাে বসে এত মণিদা ?
মণিময়ের যেন চমক ভেঙ্গে যায়, অপ্রকৃতিস্থর ন্যায় সে বলে—এমনি
বসে আছি। কি আর করি ?
সুভাষ বলে-করবারই যখন কিছু নেই, তখন চল খুব খানিক গুরে
আসি। বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় মনটা ঝরঝরে হয়ে উঠবে।
মণিময় কোন আপত্তি না করে বেরিয়ে পড়ে। আর সরমার চোখ
দু’টে। জ্বলে ওঠে ফুৰিত সিংহীর ন্যায়, যেন মুখের গ্রাস কে ছিনিয়ে নিয়ে
চলে গেল।
মণিময় বাড়ী ফিরতে শঙ্কিত হয়ে ও চুপি চুপি নিজের ঘরে এসে
বতে। সুভাষ কিন্তু হাঁক ডাক শুরু করে দিত। কখন ডাকৃতে বৌদি
—বৌদি বলে,-অাবার কখন ডাক্ততা নতুন বৌদি—নতুন বৌদি
বলে। মােট কথা তার ঘন ঘন চীৎকারে বাড়ীখানা সরগরম হয়ে
০
উঠতে।।
প্রথম প্রথম কেহই সে ডাকে সাড়া দিত না। একদিন সরম বেরিয়ে
এসে বললে,—কি নতুন ঠাকুরপাে-বাড়ীতে ডাকাত পড়লাে নাকি ?
সুভাষ অস্বাভাবিক হাসির লহর তুলে বলে,--তুমি থাকতে অাবার
সে ভয় ?
সরমা মুখখানা ভার করে বলে—কেন? আমি কি ডাকাত
চৌকি দিয়ে বেড়াচ্ছি?
উজান স্রোতে

%
সুভাষ খিল খিল করে হেসে উঠে বলে,—সেই'তাে তােমার কাজ
বৌদি। তুমি ছাড়া আর কে তা করতে পারে ?
ঠাকুরপাে-
রাগ করলে তা বৌদি ? সত্যি বৌদি, তুমি যেন আজকাল
কথায় কথায় কেমন রেগে ওঠো-কেন বলতাে?
সরমা ক্রুর চাহনি নিক্ষেপ করে তীক্ষ্ণ স্বরে বললে,-“তােমরা কি মনে
কাছে ঠাকুরপাে? মনে ভাব আমি কিছু বুঝতে পারি না-না?
• সুভাষ বললে,তুমি আবার বুঝতে পার না? তােমার বুদ্ধির
মধ্যে ঢাকা আমার সাধ্য নয় বৌদি—একথা আমি হলফ করে বলতে
পারি ।
সরমা সুতীর কণ্ঠে বলে,-হলফ করতে তােমার তাে বাধূবে না
নতুন ঠাকুরপো-তুমি যে ফেরাে গোয়েন্দার চোখ নিয়ে। ধরা পড়লে
একবার নে-একশ’ বার হলক করবে। কিন্তু কি স্বার্থ নিয়ে তুমি
আমার পিছনে ঘুরে বেড়াও- তাও আমি জানি।
সুভাষ হাতে হাসতে বললে, তা আর জান না—সেইখানেই তো
তােমার সব চেয়ে বড় কৃতিত্ব। কিন্তু বৌদি, তােমার কদর এর চেয়েও
শত গুণ বেড়ে যেত যদি ঐ চোখ—ঐ বুদ্ধি নিয়ে গােয়েন্দা বিভাগে
ঢুকতে। মণিদাও মাঝখান থেকে অনেকটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে।
সরমা আরক্ত আঁখি বিঘূর্ণিত করে বলে,-মণিদা না বাঁচুক--
বাঁচতে তুমি-- আমি বিলক্ষণ জানি। আর মণিদা যদি আমায় নিয়ে
এত অসুখী, তাহলে তাকে বলে। সুখের পথ বেছে নিতে।
সুভাষ বললে ---ছিঃ! বাপরে বাপ-ওটা আমার দ্বারা হবে ন
১১২
উজান স্রোতে

বৌদি। আমি আর ক’দিন আছি-বড় জোর দু’চারদিন। তােমরাই ডেকেছিলে--হুকু তামিল করে পারিনি—আমি তাে হুকুমের দাস বৌদি। আবার এই যে চলে যাব, আর কখনও আসবে কিনা জানিনে, কিন্তু কি নিয়ে যাব বৌদি ? একটা কিছু সম্বল করে তাে নিয়ে যেতে সরমা মৃদু হেসে বললে—সেটা বুঝি আমারই উপর দিয়ে পুষিয়ে নিয়ে যেতে চাও? সুভাষ শশব্যস্তে বললে,—ঠিক তাই বৌদি-হুবহু ঠিক। এতে আর জ্যাঠাইমা নেই যে, তাঁর সঙ্গে খুব খানিক ঝগড়া করে চলে যাব এখন যে সে স্থান অধিকার করে আছ তুমি। নতুন বৌদি তাে নতুন করে সবে সংসারে ঢুকেছে—কি বা জানে, আর কি বা বােঝে ? তােমারই তাে কাজ হবে বৌদি তাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া—জ্যাঠাইমা বেঁচে থাকলে যেমনটী করতেন। সরমা স্থির ভাবে শুনে গেল ; উত্তরে মুখ ফুটে কিছু বলে না। সুভাষ বলে তােমার আর কি কাম্য থাকতে পারে বৌদি? বাসনা-কামনা—সবই তাে শেষ হয়ে গেছে সেইদিন যেদিন নিতাইদা চলে গেছেন। সুভাষের গলার স্বর থেমে এল, ঢোক গিলে করুণাদ্র কণ্ঠে বললে—সেই ছিল তােমর সেরা বন্ধন বৌদি—আজ তাে তুমি বাঁধনহারা—সীমাহীন সাগরের মত। ইচ্ছা করলে তুমি সব ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পার—কেউ তােমার গতিরােধ করতে পারে না। আবার তােমারই স্নিগ্ধ আবহাওয়ায় গড়ে উঠতে পারে দু’টো মধুর জীবন- ফুলে ফুলে সুশােভিত হয়ে। উজান স্রোতে ১১৩

=
?
সরমা চোখ দুটো বিস্ফারিত করে অপ্রকৃতিস্থর ন্যায় বলে,-আমি
আমি-আমি !
হঁ। তুমি তােমাকে আমি যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি বােদি। তােমার কি
দরকার এখানে পড়ে থাকা। তার চেয়ে বরং কাশী চল—নিজেকে সঁপে
দাও বিশ্বনাথের চরণ সেবায় । জান তাে তালুই মশায়ের কাশীতে
বাড়ী আছে-মেয়ের মত তার কাছে থাকবে। যাবে—যাবে বৌদি
সুভাষ মিনতিপূর্ণ দৃষ্টি তুলে চেয়ে রইলাে।
:: ঈৎ আরক্ত চোখ দু’টো ডাগর ডাগর করে সরমা তীব্র কণ্ঠে বলে,
কিন্তু কেন ? কেন আমি পরের গল গ্রহ হয়ে থাকবাে ? কে আছে
সেখানে আমার ? আর কেনই বা যাবাে? তার কারণ কি ? ওঃ, তুমি
চাও আমাকে তাড়িয়ে নিষ্কণ্টক হ’তে। তােমাকে আমি খুবই চিনি।
সুভাষ ভীতিব্যাকুল কণ্ঠে ডাকলে---বৌদি।
সরমা উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলে-তােমাকে কে ডেকেছে মধ্যস্থ করতে?
যাও—চলে যাও–যাও। তুমি যে কতদূর শয়তান
বাধা দিয়ে সুভাষ বলে,আমায় ভুল বুঝো না বৌদি।
প্রবল উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়ে সরমা কম্পিত স্বরে চীৎকার করে
বলে, তােমাকে আমি একটুও ভুল বুঝিনি। তুমি এসেছ আমার
ভুল দেখিয়ে দিতে-এ তােমার চরম স্পৰ্দ্ধা। এটা মনে রেখো—সবাই
নমিতা নয়।
গভীর চীৎকারে মণিময় এসে উপস্থিত হ’ল ও বিন্ময়বিহ্বল দৃষ্টে
উভয়ের পানে চেয়ে রইলাে।
সরমা ক্ষিপ্তের ন্যায় চোখদুটো লাল করে মণিময়কে লক্ষ্য করে
১১৪
উজান স্রোতে

বললে,-কি অধিকার আছে নতুন ঠাকুরপাের এমন ভাবে আমাকে
অপমান করে ? তােমাল, উপর কুৎসিৎ ইঙ্গিত করতে ও তার
আটকাল না।
মণিময় রুক্ষ্মস্বরে বললে-সুভাষ । এ বাড়ীতে তােমার আর এক
দিনও স্থান হবে না।
সুভাষ ক্ষীণ কণ্ঠে বললে,--আমি থাকতে আসিনি মণিদা। একদিন
স্বেচ্ছায় এবাড়ী ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম, আবার আসতে হয়েছে-
তােমাদেরই ডাকে। আমি যাচ্ছি—কিন্তু যাবার দিন একটা ওব
তােমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে যেতে চাই—সে কৰ্তব্য হচ্ছে তােমার
স্ত্রীর সম্বন্ধে ।
তারপর ধীরে ধীরে সুভাষ গৃহের বাহির হয়ে চলে গেল।
উজান স্রোতে
১১৫

; সুভাষ চলে গেল। যাবার সময় নমিতাকে বলে গেল—তুমি রইলে ‘নতুন বৌদি; কিন্তু জানিনা তােমার অদৃষ্টে কি আছে। নমিতা বলেছিল—সে তো বিচার বুদ্ধির বাইরে—তার জন্য এত চিন্তা কি ? সুভাষ বিস্মিত ভাবে বলেছিল—পারবে নতুন বৌদি অদৃষ্টের নিষ্ঠুর কষাঘাত সহ করে চলতে ? নমিতা ঈষৎ রুষ্টস্বরে জবাব দিয়েছিল—তুমি তাে পুরুষ মানুষ- তুমিই কি ইচ্ছা করলে তাকে এড়িয়ে চলতে পার ? সুভাষ বলেছিল, কিন্তু আমাদের কথা স্বতন্ত্র-কেন না আমরা স্বাধীন-নিজের ইচ্ছামত চলতে পারি। নমিত ততােধিক রুষ্ট স্বরে বলেছিল—তুমি কি তবে বলতে চাও সেই ভয়ে আমি স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যাই ? সুভাষ ধরা গলায় উত্তর দিয়েছিল—-না না—আমি কিছু বলতে চাই নে—তবে তােমার জন্য আমার দুঃখ হয়। ১১৬ উজান স্রোতে নমিতা বলেছিল--কি হবে আমার জন্য অযাচিত দুঃখ দেখিয়ে ? কোন লাভ হবে না—তাতে আমার চলার পথ আরাে দুর্গম হয়ে দাড়াবে। সুভাষ বিদায় নিয়েছিল শেষ কথা বলে তােমার আদেশ শিরােধার্য্য করে আমি চলে যাচ্ছি নতুন বৌদি—কিন্তু সামান্য কিছু দিনের মেলা-মেশায় এই ধারণা নিয়ে আমি যাচ্ছি তুমি মানুষ নও-দেবী। তােমাকে মণিদা চিনতে পারলে না। কোনদিন চিনতে পারবে কিনা জানি না। এই শেষ কথাগুলো মণিময় শুলে ঘরে ঢুকতে গিয়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে রাগে তার কর্ণমুল পর্যন্ত আরক্ত হয়ে উঠলাে। যেমন ভাবে এসেছিল, ঠিক তেমনি ভাবে উভয়ের অলক্ষ্যে সে চলে গেল, নিঃশব্দ পদসঞ্চারে। সরমা কোথা হতে এসে বলে-কি ঠাকুরপাে-গেলে আর ফিরে এলে ? মণিময় গম্ভীর ভাবে বললে—ভাল লাগলো না। কেন? কি হল ? মণিময় বললে,—কারণ জানি না বৌদি। আজ যাহ’ক তােমার কাছে একটা নতুন জিনিষ শিখলাম- অকারণেও কাজ হয়। মণিময় বলে,-কারণ হয়ত একটা আছে । কিন্তু সময় সময় তার স্বরূপ নির্ণয় করা যায় না। সরমা মুচকি হেসে বললে, সে তাে প্রেমের লক্ষণ ঠাকুরপাে, যা মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তা বেশ-বেশ। উজান স্রোতে ১১৭ = মণিময় মুগ্ধ হয়ে সরমার দিকে চেয়ে রইলাে, অর্থহীন দৃষ্টি নিক্ষেপ সরমা বললে,—কি দেখছো ঠাকুরপাে? কে দেখতে বেশী ভাল- না? মিছে দেখা—নূতনত্বের আকর্ষণ চিরদিনই বেশ । বােঠান-বলে মণিময় স্থির অপলক নেত্রে চেয়ে রইলাে। সরমা বলে, তােমাকে তাে কোনদিন বাধা দিইনি। কেন দেব ? সবই চোখের নেশা। • “ণিময় উদ্দীপনা পূর্ণ স্বরে বলে,—সেই নেশা যে সব সময় আমাকে মাতাল করে রেখেছে। সরম উত্তেজনা পূর্ণ কণ্ঠে বলে,-পুরুষ জানে শুধুই মাতলামি নেশার ঘােরে সে পারে না এমন কোন কাজ নেই, কিন্তু সেই ঘাের যখন কেটে যায়- বৌঠান—এত দিনেও কি তুমি আমাকে বুঝতে পারলে না? মণিময় ছুটে এসে সরমার হাত দু'খানা বিপুল আগ্রহে জড়িয়ে ধরলে। সরমার অসমাপ্ত কথা মুখেই রয়ে গেল। এমন সময় নমিতা এসে উপস্থিত হ’ল ও মুহূর্তের জন্য তার পায়ের গতি থেমে গেল। সরমার চোখ দুটো জ্বলে উঠলো—ধ ধক্ করে ; আর মণিময় হাত ছেড়ে দিয়ে পিছু হটে এল। নমিতা ন বযৌ ন তস্থে ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। সরমা চলে গেল, দীপ্ত সিংহীর ন্যায় ঘাড় ঘুরিয়ে। মণিময় অবিচলিত কণ্ঠে বলে,-দেবতা তাে চলে গেলেন—এখন দেবীর কি ইচ্ছা জানতে পারি কি ? ১১৮ উজান স্রোতে নমিতা আড়ষ্টের ন্যায় দাড়িয়ে রইলো মণিময় বলে,-ইচ্ছা হয়ত তুমিও তােমার পথ বেছে নিতে নমিতা ক্ষীণ কণ্ঠে বলে,--পারি—কিন্তু প্রাণ ধরে তুমি কি তা দিতে পারবে ? বল সত্যি দেবে ? সূর্য তখন পশ্চিম গগনে টলে পড়েছিল। জানালার ফাক দিয়ে ঈষৎ বিক্ষিপ্ত রক্তিম কিরণচ্ছটা নমিতার মিনতিভরা স্বচ্ছ কমনীয় মুখখানার উপর প্রতিভাত হয়ে ঝকমক কচ্ছিল, আর সান্ধ্যসমীরণ স্পশে তার অবিন্যস্ত অলকদাম চোখ মুখের উপর দিয়ে ফুর ফুর করে উড়ে বেড়াতে লাগলাে। মণিময় কি বলতে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাে। মনে হ’লকি সুন্দর ঐ মুখখানা,যেন শিশির সিক্ত সদ্যফোটা গােলাপ। মুহূর্তের জন্য প্রাণের মধ্য দিয়ে একটা তরঙ্গ খেলে গেল-~-সমস্ত শিরা উপশিরাকে ক্ষেপিয়ে তুলে। মণিময় স্নিগ্ধ মধুর কণ্ঠে ডাকলেনমিতা। নমিতার বুকের মধ্যে তােলপাড় করে উঠলো। চোখদুটো ঈষ্যৎ উন্নত করে সে চেয়ে রইলো। চোখে চোখে বিদ্যুৎস্ফুরণ খেলে গেল-নমিতার দেহের মধ্যে ঝিম্ ঝিম্ করতে লাগলো। আর অধর স্ফীত হয়ে ঈষৎ-কেঁপে উঠলাে, পরে অর্ধবিজড়িত স্বরে বললে,বল—সত্যি দেবে? মণিময় বিপুল আবেগ ভরে বলে,বল—বল—নমিতা তুমি কি চাও? নমিতা সজল চোখে কারুণ্যভরা দৃষ্টি তুলে বলে,-তােমর উপর উজান স্রোতে ১১৯

আমার কোন অধিকার নেই—সে অধিকার কোনদিন তোমার নিকট
দাবী করতে চাইনে---তবে এক ভিক্ষা যদি সম্ভব হয় তাে তােমার
কাজগুলো আমার নিকট হতে কেড়ে নিয়ে না। কেননা তাতেই
আমার চরম সুখ—চরম শান্তি। কি সেটুকু অধিকার দেবে না? বল
চুপ করে থেকো না।
নমিতা—বলেই মণিময় স্থির হয়ে দাঁড়াল। সামনেই সরমা ;
শ্যেন দৃষ্টি তুলে।
“ণময় চোখদুটো অবনমিত করে কি যেন চিন্তা করতে লাগলাে।
নমিত আর অপেক্ষা করলে না—ীর ও প্রশান্ত গতিতে রান্নাঘরের
দিকে চলে গেল।
আর সরমার রােদ্দীপ্ত চাহনি বিচ্ছুরিত হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে
জ্বল জ্বল করে উঠলো।
উজান স্রোতে

CLARAWAT LILIAN MAKARDAH- HUWRAH. Etd:-1919, এই ঘটনার পর ধূমায়িত বহ্নি এমনি ভাবে প্রজ্বলিত হয়ে উঠলো যে, পরস্পর পরস্পকে এড়িয়ে চলতে লাগলো। বাক্যালাপ বন্ধ—যে যার নির্দিষ্ট ঘরে অবরুদ্ধ আসামীর ন্যায় দিন কাটাতে লাগ্লাে-অনাহারে-- অনশনে। সরমার উপর ছিল বাড়ীর সকল ভার—এমন কি রন্ধন কাৰ্য্য পৰ্যন্ত । কিন্তু সেই সরমাই যখন সকল কর্তব্য ভুলে শয্যা গ্রহণ করলে, তখন নমিতা ব্যস্ত হয়ে পড়লো, স্বামীর কথা ভেবে। সে জোর করে রান্নাঘরের কাজ স্বেচ্ছায় নিজের হাতে তুy নিল; কিন্তু নেওয়াই সার হ’ল। তার আহ্বানে কেহ সাড়া দিল না। প্রস্তুত খাদ্য দ্রব্য চোখের সামনে অভুক্তই রয়ে গেল। শেষে নমিতাও হাল ছেড়ে দিয়ে স্থির হয়ে বসলাে। এমনি ভাবে দু’তিন দিন কেটে গেল। মণিময় নিয়মিত সময়ে কোর্টে বেরিয়ে যেত; আবার নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসতো। নমিতা কাষ্ঠপুত্তলিকার মত সামনে গিয়ে দাঁড়াত ও সময়ে সময়ে দু’চারটা কথা বতো; কিন্তু কোন জবাব না পেয়ে সে ধীরে ধীরে ফিরে আসতাে। উজান স্রোতে ১২১

একদিন মণিময় এসে সরমার ঘরে ঢুকলো। সমা তখন শয্যার উপর
নিজ দেহ এলায়ে দিয়ে পড়েছিল—আলুথালু বেশ—মুখখানা বিশুস্ক -
ললাটে ঘন চিন্তার রেখা। মণিময় মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে চেয়ে
রইলো। সরমাও একবার ক্ষীণ কাতর দৃষ্টি তুলে চেয়ে দেখলে ; আর
দু'ফোটা অশ্রু তার নয়ন কোণ হতে ঝরে পড়লো। মণিময় এগিয়ে এসে
শয্যার একপার্শ্বে বসে পড়লাে ও সরমার করাঙ্গুলি সােহাগভরে ঈষৎ
চেপে ধরে আদ্রকণ্ঠে বলে,—এমন ভাবে কতদিন চলবে বৌদি?
সরমা স্থির লক্ষ্যে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কি দেখে নিল ও সজল আঁখিতার।
মেলে ধরে কাতর কণ্ঠে বলে,আমাকে আর জড়াও কেন ঠাকুরপােশ
যতদিন পেরেছি ততদিন তোমার কাজে আত্মনিয়ােগ করে এসেছি।
সেদিন চলে গিয়েছে—এখন তাে পড়ে আছি একপার্শ্বেশুধু কৃপাপ্রার্থী
হয়ে। যদি তাও দিতে না চাও-বল চলে যাচ্ছি।
মণিময়ের নয়ন পলব বর্ষণােন্মুখ মেঘের ন্যায় ভারী দেখাতে
লাগলাে। ধরা গলায় সে বলে, কেন তুমি চলে যাবে সৌদি ?
রমা বলে,—আমাক আর কি দরকার ঠাকুরপাে ? তুমি না
বললে ও আমাকে যেতে হবে—শুধু নিজের পথ বেছে নিতে।
মণিময় উত্তেজিত হয়ে বলে-কিন্তু আমি তােমাকে যেতে দিতে
পারি না।
সরমা বলে,-তবে কি তুমি চাও আমাকে এখানে রেখে তিলে
তিলে দগ্ধে মেরে ফেলতে।
বৌঠান—বলে মণিময় সরমার মুখের কাছে মুখটী রেখে অপলক
নেত্রে চেয়ে রইলো।
১২২
উজান স্রোতে

রমা বলে—অশ্বিকে তােমার আর ভাল লাগবে না—লাগতে
পারে না। একবার মনের মধ্যে অসন্তোষের আগুন জ্বলে উঠলে তাকে
সহজে নিবন যায় না ঠাকুরপাে। আপাতদৃষ্টে মনে হয় আগুন নিবে
গেছে । কিন্তু তার ধূমচ্ছন্ন অনলশিখা কারণে অকারণে আত্ম প্রকাশ করে,
দ্বিগুণতর ভাবে ।
মণিময় বলে—কেন মিছে মন্দ দিকটা অমন করে দেখছে। বৌদি ?
আমাকে তুমি বিশ্বাস করাে না ?
সরমা বলে,—বিশ্বাস ! হাঁ, তার ফলেই তাে আজ আমি এখানে
আবদ্ধ। এর চেয়ে বিশ্বাস না করাই বােধ হয় ভাল ছিল।
মণিময়ের চোখ দিয়ে এক ফোটা অশ্রু ঝরে পড়লাে। সরমা
ব্যস্ত হয়ে মুখখানা চেপে ধরে কাঁদতে কাদতে ভাঙ্গা গলায় বলেছি।
কাছে। ঠাকুরপাে। তারপর কিছুক্ষণ নীরবে কান্নাকাটির পালা চললাে।
পরে উভয়ে বেরিয়ে এল, হাসি মুখে—সকল সমস্যা ভঞ্জন করে।
নমিতা দূর হতে সে দৃশ্য দেখে বুঝলে-- তার জীবন সন্ধ্যা ঘনায়ে
এসেছে।
পরদিন কোর্ট থেকে ফিরে এসে মণিময় বললে,--তােমার বাবা
বছিলেন—তােমাকে নিয়ে যেতে চা
নমিতা একটু ইতস্ততঃ করে ধরা গলায় বললে,-কেন?
মণিময় একটু ঢোক গিলে বললে,“তাতো বলতে পারিনে।
তবে-
নমিতা মুখখানা আঁধার করে বলে, --সে আমি কি জানি।
উজান স্রোতে
১২৩

মণিময় বলে,-না, তাই বলছিলাম। তােমারও তাে একটা মতামত
আছে।
নমিতা ভাবলে—পাঠান না পাঠান স্বামীর ইচ্ছার উপর নির্ভর
করে। কে সে? তাকে বলা না বলা দুই সমান। তবুও সাহসে ভর
করে বললে—আমার মতামতের দাম কি ?
সরমা উভয়ের অলক্ষ্যে এক নজর দেখে নিল ও ফিরবার সময় জোরে
জোরে পায়ের শব্দ করতে করতে চলে গেল।
• মণিময়ের চিন্তার ঘাের কেটে গেল ও উচ্চকিত হয়ে বলে,—যদি
পাঠাতেই হয়, তাহলে তাে তার ব্যবস্থা করতে হবে। সুভাষকে দিয়ে
তিনি কোর্টে খবর দিয়েছেন।
নমিতা বিস্মিত হয়ে বলে,-সুভাষ ঠাকুরপাে ! তিনি কি
এখানে ?
মণিময় গম্ভীর ভাবে বললে,-সে অনেক কথা। এখন বল তুমি
কি করতে চাও?
নমিতা ক্লিষ্ট কণ্ঠে বলপে—আমাকে নিয়ে না পােয় পাঠিয়ে দিতে
পার।
মণিময় পৌরুষ কর্থে ডালেনমিতা।
নমিতা সভয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে নীরবে হাতের নখ খুটতে লাগলাে।
মণিময় উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলে,—শাে নামতা, তােমার বাবা বলেই
আমি পাঠাতে পারি না। অধিকার কার ? তার না আমার ?
নমিতা ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বললে,-বাবা তো তােমার মত জাতে
চেয়েছেন মাত্র।
১২৪
উজান স্রোতে,

প, ওঃ, ভারী দরদযে! বাবার নাম করলে যে গায় ফোস্কা পড়ে
ওঠে। কিন্তু জাতে চাই—কি সাহসে তিনি এমন ভাবে আমাকে
অপমান করলেন ?
নমিতা যেন একেবারে আকাশ হ'তে পড়লাে ও বিস্ময় বিস্ফারিত
নয়নে বলে,--মত জান্‌তে চাওয়াও কি অপমান ?
মণিময় ক্রুদ্ধস্বরে বললে,-মত জানতে চাওয়া! সলা পরামর্শ সব
ঠিক করেন? এখন ন্যাকা সাজা হচ্ছে।
এমন সময় সরমা যেন কিছু জানে না এমন ভাব দেখিয়ে এসে
বলে,—কি চেঁচামেচি করছে। দু’জনে ? কি হল ?
মণিময় বললে,—কি আর হবে ? মেয়ের নামে উইল করা হচ্ছে,
আর তার একজিকিউটর হচ্ছে সুভাষ। সুভাষকে করার অর্থ আর
কি বুঝতে বাকি থাকে।
সরমা গালে হাত দিয়ে বলে,-সে কি! তিনি বেঁচে থাকতে
একজিকিউটর হবে নতুন ঠাকুরপােশ!
মণিময় বললো,-বেঁচে যতক্ষণ আছেন ৩ লক্ষণ তো সবই তিনি।
হঠাৎ যদি মরে যান তারই জন্য তাে উইল-একজিকিউটর।
সরমা বিপপূর্ণ হাসি অধরে ফুটিয়ে তুলে বলে,—তা ভালই
হ’ল, নতুন ঠাকুরগের যাহ’ক একটা হিল্লে হ’ল। তা তােমার এতে
এত রাগ কেন ?
মণিময় উদ্ধত স্বরে বলে, কিন্তু আমাকে বলে কয়ে করলে কি
দোষ ই’ত? শুধু তাই নয়, সুভাষ বাবুকে করা হয়েছে তার জমিদারীর
ম্যানেজার।
উজান স্রোতে

তাতে তােমার কি ? বেশ তো, ভালই হয়েছে। নতুন ঠাকুপ
বেচারা কাজের জন্য ঘুরে ঘুরে বেড়াছিল। যাহ’ক তৰু এখন একটা কাজ
জুটলো। ওঃ, তাই বুঝি ঝগড়া করে চলে যাওয়া হল। তা ভাল
ভাবে গেলেই তো হত।
মণিময় বলে,—একটা উপলক্ষ তো চাই।
পেটে পেটে এত ! তাতো জানতাম না। নিজের জামাই হয়ে
গেল পর; আর সুভাষ ঠাকুরপো হ’ল তার বড় আপন। উচিত ছিল
সুভাষ ঠাকুরপাের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া খাসা হত-ঘর জামাই
করে রাখতে পারতেন।
নমিতার মুখ লজ্জায় ও ঘৃণায় মাটীর সঙ্গে যেন মিশে যেতে লাগলো।
মনে মনে সে বলে,-ধরিত্রী তুমি দ্বিধা হও। এ অপমান আর সহ্য
করতে পারছিনে।
মণিময় কর্কশ কণ্ঠে দাঁতে দাঁত চেপে বললে,এখন বাপের বাড়ী
গিয়ে উঠতে পারলেই হয়। একেবারে সােণায় সােহাগা-মণিকাঞ্চন
সংযোগ। সেটী মনে স্থান দিব না। এইখানে রেখে তিলে
তিলে— তারপর তার সুরটা বদলে ফেলে বলে, আমাকে আবার
উইলের খসড়া গঠয়ে দিয়েছেন, দেখবার জন্য। ইচ্ছা হল জুতো
মারতে মারতে তাড়িয়ে দিই। সত্যি কি গ্র. যে সালে গেছি, তা আর
কি বলবাে?
সরমা বলে,-মিছে রাগারাগি করে লাভ কি ? তার চেয়ে
পাঠিয়ে দাও না। রেখে তো শুধু গােলমালের মাত্রাই বেড়ে যাবে।
এখানে কি আর মন ববে ? Cখানে রইলো ভালবাসার জন।
১২৬
উজান স্রোতে,

দিদি—বলে নমি থেমে গেল। এক সঙ্গে দুই জোড়া প্রজ্জ্বলিত চক্ষুর তীব্র অনলচ্ছটায় যেন তার সারা দেহ পুড়ে ঝলসে গেল। সরমা বিকৃত কণ্ঠে বলে,-“থাক, আর সতীপনা দেখাতে হবে না। আরে আমার সতীরে। তুমি চলে এস ঠাকুরপাে। বলে দিও-~-পাঠান হবে না—যা করবার থাকে, তিনি করতে পারেন। তাই ভাল। বলতে বলতে মণিময় সরমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ বাহির হয়ে গেল। নমিতা পাষাণ প্রতিমার ন্যায় স্থির ও অচল হয়ে দাড়িয়ে রইলো। উজান স্রোতে ১২৭ .

৩
মণিময় শশুরকে জানিয়ে দিল যে, নমিতা এখন এখানে থাকতে
চায়—যেতে রাজী নয়। অগত্যা কাশী ফিরবার আগে তিনি কন্যার সঙ্গে
দেখা করতে এলেন।
মণিময় খুব ভদ্র ব্যবহারই করলে। সব সময়ে কাছে কাছে থাকা-
কথাবার্তা বলা-কোন বিষয়ে কোন দিক দিয়ে তার একটুও ক্ৰটী হ’ল
। যেখানেই সুধীর বাবু, সেখানেই মণিময়। কন্যাকে নিভৃতে
যে কিছু জিজ্ঞাসা করবেন সে অবসর পর্যন্ত মণিময় তাকে দিল না।
সুধীর বাবু বললেন, আমি তাহলে মাসি মা। তােমার যখন যাবার
ইচ্ছা হবে তখন তােকে লিখাে।
নমিতা চুপ বার বুইলো, বিষন্ন মুখখানা অধিকতর বিষন্ন করে।
মণিময় উত্তরে বললে,—আমৱ অমনেই—যদি যেতে চায়, আপনি
নিয়ে যেতে পারেন। না হয় এক মাসাদেই আবে। তবে নিজের
সংসার--যাক, আমি কেন নিমিত্তের ভাগ হতে-যাই।
কন্যাস্নেহে অন্ধ হয়ে সুধীর বাবু বলেন, “তাই চল্ মা। একমাস
বাদে আমি আবার রেখে যাব«কমন ?
-
• ১২৮
উজান স্রোতে

নমিতার কণ্ঠ হতে এটা শুষ্ক ও নিরস না শব্দ বেরিয়ে ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। পিতার বড় মুখখানা একেবারে ছােট্ট হয়ে গেল। বিশুষ্ক মুখে তিনি বলেন, তবে তাই হােক। নমিতার বুকের মধ্যে যেন তুষানল জ্বলে উঠলাে। স্থিঃ ছিঃ ! সে কি কলে—কি করলে ! না বুঝে সে কি ভীষণ ব্যথা পিতাকে দিল । মণিময় তাড়াতাড়ি বললে,--আপনি নিজের কাণে শুনলেন। ভালই হ’ল। পরে আমাকে দোষ দিতে পারবেন না। নমিতার ইচ্ছা হ’ল বলে, না না, আমি যাব—প্রস্তুত, কিন্তু মুখের, কথা মুখেই রয়ে গেল, শুধু ডাকলে—বাবা । পিতা কন্যার বুকের ব্যথা বুঝতে পারলেন কিনা সন্দেহ, মাত্র বলেন,-তবে আসি মা। কন্যা ছুটে এসে পিতার চরণে প্রণত হ’ল। পায়ের উপর মাথা খে সে পড়ে রইলাে। উঠ, বার শক্তি যেন কে কেড়ে নিল, আর চোখের জলে পিতার চরণদ্বয় সিক্ত ও প্লাবিত হয়ে গেল। পিতা কন্যাকে তুলে ধরে বলন,-ছিঃ মা কাঁদে। আমাকে যে আজই যেতে হবে। নমিতা মুখ ফিরিয়ে দাড়িয়ে রইলো। পিতা ধীর ও মন্থর গতিতে ঘরের বাহির হয়ে পড়লেন। তার এতক্ষণে যেন হুস ফিরে এল ও ছুটে দ্বারের দিকে অন্যর,লৈ ৰ্দ্ধোচ্চারিত স্বরে বলতে বলতে যেও না-যেও না, আমায় ঙ্গে করে নিয়ে যাও বাবা । পিত তখন বাইরে এসে দাড়িয়েছেন। কন্যার কথা তার কর্ণে উজান স্রোতে

,
গেল কিনা বলা যায় না, তবে শেষের কাতর বাবা আব্বান তার
প্রাণের তারে তারে বেজে উঠলো। তিনি একবার মুখ ফিরিয়ে
দেখলেন, কিন্তু কাকেও দেখতে পেলেন না।
পিতা চলে গেলেন ; জেনে গেলেন মেয়েই আসতে নারাজ। কিন্তু
তিনি কি জাবেন নমিতার দুঃখের কথা। কোন কথা সে বলতে
পারলে না। এমনই কপাল সে করে এসেছিল।
৪.
আজ কাল দাসী বাদীর ন্যায় বাড়ীর সব কাজ নমিতা করে যেত,
নীরবে-নিঃশদে, আর রাত্রে শ্বমাতার ঘরে সে একা পড়ে থাকতাে,
স্তুপীকৃত চিন্তা বুকে ধরে। প্রথম প্রথম তার ভয় হত। কখনাে সে
এমনভাবে একা থাকেনি, বুকের মধ্যে গুড় গুড় করে উঠতো। মাঝে
মাঝে চমকে উঠে সে পাশ বালিশটা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতো,
আর চোখদুটো নিমীলিত করে ঘটার ঘণ্টা বিনিদ্র চনী
কাটিয়ে দিত।
এই তার স্বামীর ঘর করা! নানা,
নানা, এমন ভাবে সে পাতে পারবে
। আর তার স্বামী! ওঃ, কি দুঃ৭ জালা! বাবা বাবা—এস—দেখে
যাও তােমার নমির অবস্থা। এর qয়ে মৃত্যু সহস্র গুণে ভাল। হাঁ-
মৃত্যু-মৃত্যু-মৃ—অভিস্পিত বাক্তি মৃত্যুশােক দুঃখহারী মৃত্যু
কোথায় কত দূরে তুমি?
কিন্তু মরণেই কি সব শেষ হয়ে সে ? যদি না যায়, তাহলে ?
তবুও তা শ্রেয়, বর্তমান দুঃখের তো অবসান হয়ে যাবে। নমিতা
সে রাত্রে ভাবতে ভাতে উচু দাড়াল। আজ যেন সে নির্ভিক
।
?
-
১৩০
উজান স্রোতে

সােজা হয়ে দাড়িয়ে একবার চারিদিকে সে চেয়ে দেখলে ; তারপর
আস্তে আস্তে সে'সেলফের দিকে অগ্রসর হ’ল।
সেলফের উপরের তাকে থাকতো শ মাতার আফিংয়ের কৌটা
ঠিক সেই ভাবে কৌটাটা সেখানেই পড়ে আছে। নমিতার মনে হল,
কাটার মালিক চলে গেছে, কিন্তু কৌটাটী এখনও তার অস্তিত্বের কথা
স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এই তো জীবন ! এই আছে, এই নাই।
তবে তার জন্য এত আগ্রহ কেন?
কিছু না। বলেই নমিতা হাত বাড়িয়ে কৌটাটা পড়তে গেল।
অসাবধানবশতঃ একটা শিশিতে আঙ্গুল লেগে শিশিটা মেঝেতে পড়ে
চুরমার হয়ে গেল। ভয়ে কাপতে কাপতে সে শয্যায় এসে শুয়ে
পড়লাে ও বুকের মধ্যে বড়া ধড়াস্ করতে লাগলাে।
আবার ঢারিদিক নিস্তব্ধ । ঘড়িতে বারােটা বাজার শব্দ তার কর্ণে
এসে পৌছে গেল।
নমিত উঠে দাড়াল। প্রদীরে আলো তখনও মিট মিট করে
সছিল। সেই অস্পষ্ট আলাে তার চোখদুটো জ্বল জ্বল করে
উঠলো ও ধীরে-অতি ধীরে-অত সন্তর্পণে অাফিংরে কৌটাটা পেড়ে
চাখের সামনে খুলে ধরলে ও এক প্রকার কাল মণ পদার্থ দেখে
তার মনটা শিউরে উঠলাে।
আত্মহত্যা ?
কিন্তু এ, আফিংএ যদি মৃত্যু না হয় ? ওঃ,
তাহলে? নমিতআর ভাবতে পারলে না। কৌটাটী তাড়াতাড়ি
সে বিছানার নীচে সরিয়ে রেখে শয্যার উপর ঢলে পড়লাে।
উজান স্রোতে

নমিতার চোখে ঘুম ছিল না। আবার সে শষ্যার উপর উঠে বলে। তারপর ধীরে ধীরে সে দরজা খুলে বাইরে এল। পাশেই সরমার ঘর। চোখদুটো অন্ধকারে বিড়ালের চোখের ন্যায় অতে লাগলো। ঐ ঘরে নাএখনও আলাে জ্বলছে? ঐ ন! হাসির ফোয়ারা ভেসে আসছে ? ঐ না সরমা কি বলছে ? তাইতো তাইতো- সরমা তখন বলছিলো—আঃ, মা মরে গিয়ে যে তােমার সাহল বড়ে গিয়েছে। সত্যি, লজ্জা সরম সব যে জলাঞ্জলি দিলে ? যদি নমিত এখনও জেগে থাকে ও বাইরে এসে শােনে? শােনে শুনুক-লুকোচুরী তাে অনেক দিন ভেঙে গেছে। তা যতই যা ; মেয়েরা পুরুষের মত অত নির্লজ্জ হতে পারে না। কি লজ্জাবতী লতারে ! ঠাকুরপাে- সত্যি রাগ করলে বৌঠান ? t যাও। দিল। নমিতা আর দাড়াতে পারলে না, গড়াতাড়ি এসে দরজা বন্ধ করে মনে হ’মরণই তার একমা পথ। এখানে এমন ভাবে সে আর থাকবে থাকতে পারে না কিন্তু কোথায় যাবে? পিতার না কাছে ? কে আছে তাকে এই কায়ে সহায়তা করবে ? পিতা তো চিঠি দিয়েও খোঁজ নেন না, চিঠি দিলেও জবাব দেন না। সত্যিই কি তিনি এত নিষ্ঠুর হতে পারেন ? , অথবা তার কোন চিঠি তার হাতে আসে না? তবে কি এর জন্য দায়ী তার স্বামী ? হয়তো তাই- ১৩২ উজান স্রোতে নচেৎবাবা কখন ও এত নিষ্ঠুর হতে পারেন না। নমিতার মুখচোখ ঘৃণা ও দুঃখে ছেয়ে গেল। সে নীরব হয়ে কি চিন্তা করতে লাগলো, পরে কি মনে করে চিঠি লিখতে বসলাে। শ্রীচরণকমলেষু- বাবা, আর পারি না। চিঠি দিলে ও উত্তর দাও না। তুমি তাে এত নিষ্ঠুর ছিলে না বাবা। যাব না বলেছিলাম বলেই কি এত শাস্তি দিতে হয় ? এখানে আমার অসহ্য হয়ে উঠেছে। রাগ করে থেকো না বাবা। এই চিঠি পেয়ে সাতদিনের মধ্যে যদি আমায় না নিয়ে যাও; তাহলে জানবে-তােমার নমিতা নেই—ফাকি দিয়ে চলে গেছে। এই বুঝে কাজ করে। ইতি- হতভাগিনী কন্যা নমিতা তারপর নমিতা শয্যার উপর ঢলে পড়লো, তার ঘােরে; কিন্তু কেমন করে যে চিঠিখানা সে পােষ্ট করবে ? চিন্তা যেন তার মাঝেও তাকে উত্যক্ত করতে লাগলাে। উজান স্রোতে

( ২৭ )
পরদিন সকাল হতেই সুভাষ এসে দেখা দিল। নমিতা তখন সবে
ঠেছে। সে বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইলাে। সুভাষ বলে,—এই যে
নতুন বৌদি। শুধু তােমারই জন্যই আবার এ বাড়ী মাড়াতে হল। কিন্তু
সকাল বেলাই ঝগড়া না করে পারছি না। এই যে তালুই মশায়ের
চিঠি-পড়ে দেখলেই বুঝতে পারবে। ছিঃ, এমন করে !
নমিতা এদিক ওদিক চেয়ে সন্ত্রস্থ চিত্তে বলে,—দেখছি ঠাকুরপাে।
একটু দাঁড়াও। বলে ছুটতে ছুটতে সে ঘরের মধ্যে চলে গেল।
সুভাষ ভাবতে লাগলাে—এ কি! এ যেন অনেকটা উন্মাদের
লক্ষণ।
ইতিমধ্যে নমিতা ফিরে এল ও অদার চারিদিকে চেয়ে বলে,
হাঁ, এই চিঠিখানা ডাকে পােষ্ট করে বি ও-পবরদার যেন ভুলো না-
---
আজই--বুঝলে
সুভাষ চিঠিখানা হাতে নিয়ে বিক্ষিয়ে নমিতার মুখের দিকে চেয়ে
রইলাে।
।
নমিতা তিরস্কারপূর্ণ স্বরে বললে, হাঁ করে বােবার মত চেয়ে
রইলে যে? চিঠিখান লুকিয়ে ফেল-- তবুও হাতে করে দাঁড়িয়ে রইলে'!
১৩৪
উজান স্রোতে,

যা ও-যাও। তুমি দেখছি আবার একটা কাণ্ড না বাধিয়ে ছাড়বে না।
সুভাষ তাড়াতাড়ি চিঠিখানা পকেটে পুরে ফেলে আঙুষ্টের ন্যায়
দাড়িয়ে রইলো।
নমিতা কুদ্ধস্বরে বললে,আর দাড়িয়ে থেকো না-যাও—চলে
যাও ,
আমায় তাড়িয়ে দিচ্ছ নতুন বৌদি? সুভাষ মুখখানা আঁধার করে
অন্যদিকে চেয়ে রইলাে।
হাঁ হাঁ, দিচ্ছি। দেব না ? তােমরা সকলে দিন রাত , আমায়
উপর অত্যাচার করছে, আর আমি কিছু বললেই বড় বাজে-না ?
এখনও যাও বলছি-~-চলে যাও। কেন—কেন তুমি বাবার উইলের
এজিকিউটর দাঁড়ালে - কেন দাঁড়ালে ? কে তােমায় এ কাজ করতে
বলেছিল? আর তার বিষয় সম্পত্তির ম্যানেজার হতেই বা কেন গেলে?
কে মাথার দিব্যি দিয়ে সেধেছিল ? বাও-কোন কথা আমি তােমার
শুনতে চাইনে—চাইনে।
সুভাষ নির্বাচ্চ বিস্ময়ে দাড়িতে দাড়িয়ে ভাবতে লাগলাে—সত্যই
কি
নতুন
বৌদির মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। ক্ষুব্ধ ব্যাকুল কণ্ঠে সে
লে—নতুন বৌদি।
লজ্জা করে না ! না না, আমি
নতুন কি সাহসে তুমি
এ কাজ করলে ? যা ও-চলে যাও।
সুভাষ মুখখানা আনত করে ব্যথিত কণ্ঠে বললে,-তাহলে সত্যিই
আমাকে চলে যেতে হয়, তােমারই হুকুম শিরােধার্য করে। ছােট
ভাইয়ের কি সাধ্য আছে বড়দিদির হুকুম লঙ্ঘন করে।
বৌদি নই।
উজান স্রোতে
.

; নমিতার চোখ বেয়ে মুক্তা বিন্দুর ন্যায় দু’ফোটা অশ্রু ঝরে পড়লো। তারপর বড়দিদির ন্যায় স্নিগ্ধ কণ্ঠে সে বললে—কেন তুমি এ কাজ বাবাকে করতে দিলে ? সুভাষ বলে,-কে করতে দিয়েছে নতুন বৌদি? মাত্র খসড়া প্রস্তুত হয়েছিল ; সেই ভাবেই পড়ে আছে। তাই মশায় ভেবেছিলেন যদি ভয় দেখায়ে- একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে নমিতা নিজের মনেই বলে,--ভয় ! তারপর ব্যস্ততা প্রকাশ করে বলে,-না, তুমি যাও ঠাকুরপাে, আর দাড়িয়ে থেকো না। কেন মিছে অপমানের বােঝা মাথায় করে ফিরবে ? ওরা বুঝবে না-শুনবে না। ঐ যে দরজা খােলার শব্দ হল। পালা ও —পালাও—আমি চললাম। নমিতা চলে গেল, এস্তে ভয়ার্ত হরিণীর ন্যায় লাফাতে লাফাতে। সুভাষ স্থির হয়ে ভাবতে লাগলাে—নমিতার ভাগ্যের কথা। কিন্তু বেশীক্ষণ এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস হল না। নিজের জন্য তার কোন ভাবনা ছিল না। তাকে আর কি বলবে?' কিন্তু সমস্ত আক্রোশটা এখনি গিয়ে পড়বে নতুন বৌদির উপর। সুভাষ অগ্রসর হ’ লাগলো, ও সরমা দরজা খুলে চৌকাঠের বাহিরে পা দিয়ে দাড়িয়েছিল। আলুথালু কেশবেশ সম্বত করে নিতে নিতে সে একটু সরে এল ও শ্লেষপূর্ণ স্বরে বলে,-নতুন ঠাকুরপো যে! এত সকালে ! আমার মনে হত, তুমি বুঝি ডুমুরের ফুল হয়ে গেলে। উজান স্রোতে • ১৩৬

'সুভাষ উচ্চ হাস্য করে বলে,-ডুমুরের ফুল তো কখনো দেখিনি
বৌদি। সত্যি কেমন দেখতে?
সরমা বললে,-“দেখনি! অবাক করলে নতুন ঠাকুরপাে।
সত্যি বৌদি; সে ফুল শুনিছি রাতেই ফোটে, আবার রাতেই
মিলিয়ে যায়। সকালে তাে সে ফুল দেখা যায় না। সুভাষ খিল খিল
করে হেসে উঠলাে।
সরমা গম্ভীর স্বরে বললে--তা হবে।
ওঃ, তুমি বুঝি সন্ধান নিয়ে
নিয়ে বেড়াচ্ছ ?
সুভাষ এক গাল হেসে বলে, কি আর করি বৌদি ? কাজ তো
একটা চাই। তােমাদের মত বৌদিরা থাকতে
ওঃ, এই কথা নতুন ঠাকুরপো ! কিন্তু না, তুমি তো আজকাল
যে সে লােক নও—একটা জমিদারীর ম্যানেজার-এমন কি মালিকের
তরফ হতে তারই কন্যার অছি পৰ্যন্ত নিযুক্ত হয়ে গেছ।
ম্যানেজার সাহেব-প্রাতঃ নমস্কার ।
সুভাষ 'খিল খিল করে হতে হতে বললে,—প্রতি নমস্কার
বৌদি—সুপ্রভাত। আমিও তাই ভাবছিলাম—বৌদির তো এটিকেটের
ভুল হয় না। আজ কেন এমন এল ?
সরমা একবার অপাঙ্গে চেয়ে তীব্রকণ্ঠে বলে,-কি বুঝলে তুমি
নতুন ঠাকুরপো ?
বাপরে বাপ--মােকে সঠিক বােঝা আমার কাজ নয় বৌদি
মণিদা যে মণিদা যার অন্ত খুঁজে পেলেন না; নিতাইদার মত লােক বার
নমস্কার
.উজান স্রোতে
১৩৭

কাছে হার মেনে ছুটী নিয়ে পালিয়েছেন, তাকে বুঝবে আমি? সে স্পৰ্দ্ধা আমি রাখি না বৌদি। নতুন ঠাকুরপাে । কি মনে করে এসেছ আমি শুতে চাই? সুভাষ আম্‌তা আন্তা করে বলে,-কিছু না। তবে হাঁ, না— বল নতুন ঠাকুরপাে, তুমি কি বলতে চাও? এমন ভাবে অপমান করবার তােমার কি অধিকার আছে ? তা বটে। হঠাৎ নিতাইদার কথাটা কেমন মনে পড়ে গেল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল-না ? কিন্তু মণিদার কথা ? ও, মণিদার কথা ! ত। মণিদা তো ঘরের লােক—আপনার জন- মনে তো পড়বারই কথা। নতুন ঠাকুরপো, তােমার ও হেঁয়ালি আমার বুঝতে বাকি নেই। এসেছ আমাকে অপমান করতে। কিন্তু কেন? তােমাকে অপমান করতে ! তা কি পারি বৌদি ? কাল রাতে হঠ। নিতাইদাকে স্বপ্নে দেখলাম-অনেক কথা হ’ল। ওঃ, কি চেহারা। সত্যি তুমিই বল বৌদি, তােমার চেয়ে তা ভাল করে— বাধা দিয়ে সরমা বলে, তুমি চলে যাও-কে তােমাকে এমন ভাবে অপমান করবা তােমার কোন অধিকার নেই। কেন, আমি তোমার কি করেছি--কি করেছি—বলে সরমা চীৎকার করে কেঁদে উঠলো। নমিতা কাজ ফেলে ছুটে এল। মণিময়ও চোখ রগড়াতে রগড়াতে এসে হতভম্বের ন্যায় দাড়িয়ে পড়লো । সরমা ফেঁপাতে ফোপাতে ততই ক্রন্দনের মাত্রা বাড়িয়ে তুলে বিনিয়ে উজান স্রোতে তুমি (? বিনিয়ে বলতে লাগলো—দেখনা—সুভাষ ঠাকুরপো যা তাই আমাকে বছে। কেন ? আমি কি তার মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছি ? তারপর মণিময়ের দিকে জুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তীক্ষ্মস্বরে বললে,-তুমিই তো যত অনর্থের মূল। তখন নমিতাকে পাঠিয়ে দিলেই তো সব গােল চুকে যেত, আমার কথা তো শুনবে না। এখন বাড়ী বয়ে এসেছে অপমান করতে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! তলে তলে এত ব্যাপার তে, জানা ছিল না। আমার মাথা খাবে যদি না আজই পাঠিয়ে দেবে । মণিময় কর্কশ কণ্ঠে ডাকুলে—সুভাষ ? সুভাস মাথা নীচু করে দাড়িয়ে রইলো। নমিতার মুখ চোখ সাদী ফ্যাকাশে হয়ে গেল ও সমস্ত দেহটার মধ্যে যেন কম্পন শুরু হয়ে গেল। এসব কি ব্যাপার আমি শুনতে চাই ? কি বুকের পাটা নিয়ে তুমি বাড়ী চড়াও হয়ে এমন কাজ করতে সাহী হও? বল----উত্তর দাও ? সঙ্গে সঙ্গে মণিময় ছুটে এসে সুভাষের গলার টুটি চেপে ধরলে। সুভাষ রুদ্ধকণ্ঠে বললে,~-সব মিথ্যে কথা। ওঃ, এত বড় চোপ রও শয়তান—বলে মণিময় সুভাষকে দূরে ঠেলে ফেলে দিল ও ছুটে এসে সজোরে নমিতাকে এক প্রবল ধাক্কা দিয়ে বলে,-শয়তানী, তাকেও আজ শেষ করে দেব। মাগো চীৎকার করে নমিতা মেঝের উপর পড়ে গেল । কি করছো---কি করছে। মণিদা--বলতে বলতে সুভাষ ছুটে এল। মণিময় গলাধাক্কা দিতে দিচ্ছে তাকে বাড়ীর বাহির করে দিয়ে ভিতর হ’তে দরজা বন্ধ করে দিল। উজান স্রোতে সেই দিনই সন্ধ্যায় ঘরে আলো জ্বালা নিয়ে যে ব্যাপার ঘটে গেল তার বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। মণিময়ের ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা-নমিতার ব্যবস্থা মা করে সে এ বাড়ীতে জলগ্রহণ করবে না—অক্ষরে অক্ষরে সে প্রতিজ্ঞ। পালন করবার জন্য সে বদ্ধপরিকর হয়ে দাঁড়াল। বজ্র-গম্ভীর স্বরে সে বললে,--নমিতা, প্রস্তুত হও। নমিতা মরিয়া হয়ে বলে,শব সময়ই তো আমি প্রস্তুত। কিন্তু কি করিতে চাও তুমি ? তারপর কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল নমিতা কিছু বুঝতে পারলে না ; তবে শুধু এইটুকু তার অনুভূতিতে এল যে, সে গৃহ তাড়িতের ন্যায় রাস্তায় এসে দাড়িয়েছে, প্রহারের বেগ সহ্য করতে না পেরে। পরিধেয় বস্ত্র ছিন্ন ভিন্ন—দেহের স্থানে স্থানে কেটে ছিড়ে গিয়ে রক্ত ঝরছে। নমিতা সজোরে সদর দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো ; দরজা ভিতর হতে বন্ধ । সে চক্ষে অন্ধকার দেখলে। আজ সে শুধু নির্যাতিত নয়—বিতাড়িত ধূলিমুঠির ন্যায় অবলুষ্ঠিত রাস্তায় তার স্থান। নমিতার চোখ দুটে। ধ ধক্ করে জ্বলে উঠলো। ব্যস্ত হয়ে টিদেশে সে হাত দিয়ে দেখলে। সেই আফিংয়ের কৌটা ঠিক কটিদেশেই লগ্ন আছে ! মন ৫ উজান স্রোতে ১৪০ . প্রাণ যেন তার আশার আলােকে উৎফুল্ল হয়ে নেচে উঠলাে। তার শ্যে আশা-অন্তিমের সম্বল তত তার করায়ত্ত। তবে ভয় কি ? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নমিতার চোখের সামনে দুর্ভেদ্য ঘন অন্ধকার ঘনায়ে এল, ৬ষণ কুটী মেলে ধরে। নমিতা ভীতি ব্যাকুল চিত্তে দরজা ধরে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লো ও আৰ্ত্তকণ্ঠে বলে,দরজা খোল—শুধু দয়া করে মাথা গুজবার একটু স্থান-একটু স্থান দাও। আর কিছু চাই না-এই বাড়ীর এক কোণে শেষ নিঃশ্বাস ফোর একটু সুযােগ—একটু অবসর দাও। এ যে আমার স্বর্গ। দৈবে না-দেবে না ? তবু দয়া হ’ল না ? ওঃ, এত নিষ্ঠুর তুমি । এখনও-এখনও বলছি দরজা খােল। তােমার সম্মানে আমি আঘাত দিতে চাই না। খোল খােলখোল। তারপর নমিতা কিছুক্ষণের জন্য দরজায় কান পেতে কি শুতে Fাগৃণো ও চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল ঝরে পড়তে লাগলাে। তবু দজা খুললে না? তবে তােমার ইচ্ছাই পূর্ণ হােক। বলতে বলতে সে উঠে দাড়াল, চোখ দুটো বিস্ফারিত করে—দৃষ্টি উদাসীন ও স্থির। নমিতা এক এক করে পা বাড়াতে লাগলো-এক-দুই-তিন, আর পিছন ফিরে ফিরে দেখতে লাগলো। পরক্ষণেই সবুলে চোখ দুটো চেপে ধরে আবার পায় পায় অগ্রসর হতে লাগলাে। কে ? বলে সামনে এসে একজন দাড়াল। নমিতা ভয়ে দু’পা পিছু হটে এল। কে? নতুন বৌদি ? ঠাকুরপো, তুমি--তুমি! তুমি এখন এখানে কেন ? পালাও- উজান স্রোতে ১৪১ .

।
পালা ও। যাও—চলে যাও—চলে যাও। তারপর ছুটে এসে সুভাষের
হাত দু’খানা জড়িয়ে ধরে কম্পিত কণ্ঠে বলে,তুমি আমায় ছােট
ভাই—নিজ মুখে স্বীকার করেছ। হুঁ, আমায় নিয়ে চল। দেরী
করে না। ওরা (সােজা লোক নয়, এখনই এসে ধরে ফেলবে। ঐ না
কি শব্দ হ’ল ? ঐঐ বুঝি আছে—এসে পড়লো। নমিতা শক্ত
করে সুভাষকে জড়িয়ে ধরলে।
নতুন বৌদি।
না না, আমি আর নতুন বৌদি নই। বল দিদি-বড়দিদি। দেরী
করো না ভাই--চলে এস–চলে এস। টতে টতে নমিত
অগ্রসর হল । তারপর থকে দাড়িয়ে বলে, কিন্তু কোথায় যাব?
বাবার ওমানে ? না না-“তুমি যাও--চলে যাও। সেখানে যাওয়া
হবে না--বেতে পারি ন-সেখানে আমার স্থান নেই। পরক্ষণেই
ছুটতে ছুটতে সে অগ্রসর হ’ল ।
সুভাষ বলে,--ছিঃ বৌদি! কর কি ?
নমিতা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,~আবার বৌদি ! বৌদি মরে গেছে।
না না, তুমি ফিরে যাও–যাও। আমি যাব না---যাব না বাবার ওখানে।
সুভাষ এগিয়ে এসে বলে,তবে কোথায় যেতে চাও বল ?
নমিতা চোখ দুটো ডাগর ডাগর করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,-
আর যেখায়ে খুশী।
আচ্ছা, তাই চল।
মিছে কথা বলে বুঝি আমায় প্রবােধ দিচ্ছ ? না না, তোমাকে ও
বিশ্বাস নেই—তুমি ও তাে দাদার ভাই ।
১৪২
উজান স্রোতে

আমায় বিশ্বাস
কর বৌদি। আমি কথা দিচ্ছি—ঈশ্বরের নামে
শপথ করে বলছি—তুমি যা বলবে তাই করবাে।
যা বলবো তাই করবে ?
হ, তাই করূবাে।
সত্যি-সত্যি বলছো?
সঙ্গে সঙ্গে পাগলের ন্যায় উদা
উদাসীন দৃষ্টি তুলে নমিতা বলে,-তবে চল। দাঁড়িয়ে রইলে কেন ?
সুভাষের চৈতন্য ছিল না; সম্বিংহারার ন্যায় এলাে-মেলো অসম্বন্ধ
কত চিন্তাই তার হৃদয় দ্বারে এসে আছাড় খেয়ে প্রতিছ’ত হয়ে যেতে
লাগলো। কোথায় কার কাছে সে নমিতাকে নিয়ে গিয়ে উঠবে ?
নমিতা বলে,-তবুও যে দাড়িয়ে রইলে। ভয় হচ্ছে-না?
সুভাষের মুখ চোখ মুহূর্তের জন্য বিবর্ণ হয়ে গেল। তারপর ঈষৎ
কম্পিত স্বরে সে বলে,-এস বৌদি।
নমিতা উদ্ধান্তের ন্যায় বলে,-কোথায় ?
সুভাষ আবার চুপ করে ভাবতে লাগলাে। তার পর সহজ স্বরে
বলে,—তােমাদের নিজের বসত বাড়ীতে নয়—একথা, আমি জোর
করে বলতে পারি। তবে বৌদি, সব চেয়ে ভাল হয় যদি তুমি নিজের
বাড়ীতে গিয়ে ওঠ। যাবে ? তাই-তাই চল রোদি
ঠাকুরপাে।
সুভাষ মুখখানা আনত করে দাড়িয়ে রইলো।
নমিতা কম্পিত স্বরে বলে, তুমি যাও। আমার নিজের পথ
আমি নিজেই খুঁজে নিতে চাই। যাও--যাও।
. সুভাষ ছল ছল করুণ আঁখি মেলে ছুটে এসে বললে,বৌদি ;
2
উজান স্রোতে
১৪৩

তােমার পায়ে ধরে মিনতি করে বছি-আমায় বিশ্বাস ক। তােয়াকে একলা ছেড়ে দিতে পারি না-কিছুতেই নয়--তাতে যত বিপদই কেন আমায় বরণ করে নিতে হােক না কেন। আমায় বিশ্বাস কর বৌদি। নমিতা উৎকণ্ঠিত হয়ে বললে,-তবে চল; কিন্তু বাবার ওখানে অামি যেতে পারবো না-পারবাে না। আর যেখানে খুশী আমি যেতে প্রস্তুত আছি। বেশ, তাই হবে। সুভাষ অগ্রসর হ’ল ও নমিতাকে নিয়ে এসে উঠলাে, একখানা বাড়ীতে যে বাড়ীখানাও নমিতার পিতার, ভাড়া দিবার জন্য তখনও খালি পড়ে ছিল। উজান স্রোতে

বিপুল উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে মণিময় যে কাজটা করে ফেলে,
কিছুক্ষণ পরে তার পরিণাম ভেবে সে চম্‌কে উঠলো।
সরমা ছিল সামনে দাঁড়িয়ে। সে ও কার্য্যের গুরুত্ব ও তার ভাবী
পরিণাম ভেবে সশঙ্কিত চিত্তে মণিময়ের দিকে তাকিয়ে ছিল ।
মণিময় ক্রোধে ও ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে,-চলে গেন ?
সরমা ভয়ে জড়সড় হয়ে নীরবে কি চিন্তা করতে সাগলে।।
না যায় নি-যায় নি-কোথায় যাবে? বলতে বলতে মণিময়
দ্বারের দিকে অগ্রসর হ’ল ও ক্ষিপ্রহস্তে দরজার অর্গল খুলে ডালে--
নমিতা-নমিতা।
কোথায় নমিতা ? কোথায় নমিতা ? নিজের রুক্ষ কণ্ঠস্বরে
মণিময় চমকে উঠে বললে,—চলে গেছে—চলে গেছে। উপায়
সরমা পিছু পিছু এসেছিল। ক্ষীণকণ্ঠে সে বললে—পুলিশে ডায়েরী
করা।
উজান স্রোতে
১৪৫

মণিময়ের চোখ দুটো খুনী আসামীর ন্যায় জ্বলে জ্বলে ও হো হে করে হেসে উঠে বলে,—ঠিক বলেছাে বৌদি। অকাট্য যুক্তি। নিজে খুন করে, নিজে সাচ্চা সাজা। বড় চমৎকার যুক্তি—একেবারে অকাট্য। এক ঢিলে দুই পাখীই মারা পড়বে-কেমন—না? সরমা উৎকণ্ঠিত হয়ে বললে,—কি করছে। ঠাকুরপো। শেষে যে সব জানাজানি হয়ে যাবে। বিপদে মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ না করলে শেষে কিন্তু পস্তাতে হবে। ঠিক বলেছ বৌদি। উকিল যে উকিল সেও তােমার বুদ্ধির কাছে ঘাড় হেঁট করে দাড়ায়। তুমি যদি উকিল হ’তে বৌদি—বলে মণিময় বিকট হাস্যে সমস্ত ঘরটা মুখরিত করে তুললে। ঠাকুরপাে। ওঃ, হাঁ, বাচ্ছি। পুলিশে ডায়েরী। আর বলতে হবে না। এবার সুভাষ তােমায় দেখে নেব। ফুলে ঘরের বৌ বার করা। তাই না। দাড়াও ভেবেনি। . সরমা তীক্ষ্ণ ও ওজস্বিনী স্বরে বলে,-ভাববার কিছু নেই। -ভাবুবার শুধু দু’টো কথা—সুভাষ ষড়যন্ত্র করে তােমার স্ত্রীকে ফুলে বার করে নিয়ে গেছে—খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঠিক বলেছ বৌদি। তুমি না হলে এমন যুক্তি আর কে দেবে? বলতে বলতে মণিময় ঝড়ের বেগে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। সরমার বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। কি জানি ঠাকুরপো ঝোঁকের মাথায় প্রবল উত্তেজনায় কি বলে বসে। সৰ্ব্বনাশ! তাহলে একেবারেই চরম হয়ে যাবে। কিন্তু নিজের ভাল কি ঠাকুরপো বুঝবে ১৪৬ উজান স্রোতে

না? সামনে বিশদ জেনেও নিজের পায়ে নিজে কুঠারাঘাত করবে ?
সরম তাড়াতাড়ি 'অর্গল বন্ধ করে আড়ষ্টের ন্যায় মিনিটের পর মিনিট
কাটিয়ে দিতে লাগলাে।
৯টা বেজে গেল। সাড়ে নটা হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট।
এত দেরী ! কেন? তবে কি কোন বিপদ হল ? সরমা নিশ্চল হয়ে
'ভাবতে লাগলাে।
বাইরে না লােকের পায়ের শব্দ হচ্ছে? এত লােক কেন আছে ?
সরমা দেওয়াল ধরে দাড়িয়ে পড়লো।
না, মিথ্যা ধারণা। ওঃ! কি মনের বিকার !
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হ’ল। সরমার বুকটা অস্বাভাবিক ভাবে
স্পন্দিত হয়ে উঠলো। কম্পিত ও ভয়ার্ত কণ্ঠে সে বললে—কে ?
দরজা খোল।
কে ? ঠাকুরপাে? সঙ্গে সঙ্গে সরমা দরজা খুলে দাঁড়াল।
মণিময় বলে, তুমি ঠিক বলেছ বৌদি। সুভাষকেও পাওয়া :
গেল না। সেই--সেই নমিতাকে নিয়ে সরে পড়েছে ; নচেৎ নমিতার
বুকের পাটা হত না এমন কাজ করতে।
সরমা আত্মপ্রশস্তির ভাব দেখিয়ে বললে,-গড়াপেটা আগে হতেই
ছিল ঠাকুরপাে। তবে একটা উপলক্ষ তাে চাই। অনেক জিনিষই আমার
নজরে পড়তাে। বলতাম না—পাছে তুমি বিরক্ত হও।
মণিময় বলে,-শশুরকেও কাশীতে একটা একম্প্রেস টেলিগ্রম করে
দিয়ে এলাম। ভাল করিনি ?
সরমা উৎফুল্ল হয়ে বলে,--ও কথাটা বলে দিতে আমার বড়ই ভুল
উজান স্রোতে
১৪৭

হয়ে গিয়েছিল । এটা খুব বুদ্ধিরই পরিচয় দিয়েছে ঠাকুরূপা। এ বুদ্ধি যে
তােমার হবে, এতে আমার ধারণায়ও আসেনি। তার পর সরম:
উত্তেজিত স্বরে বললে,-এবার বাছাধনেরা যাবেন কোথায় ? যেখানেই
থাকুন না কেন, পুলিশের নজর এড়াতে হবে না।
মণিময় বলে,—তা বটে, কিন্তু আমাকেও যে একেবারে
বাধা দিয়ে সরমা বললে, তুমি কিছু ভেবো না ঠাকুরপাে। এখন
মুখ হাত পা ধুয়ে খাবে এস। যে চাল চালা গেছে এতে বাজীমাং না
হয়ে যায় না।
মণিময় ধীরে ধীরে সরমার অনুসরণ করতে লাগলো।
এস।
১৪৮
উজান স্রোতে

( 30 )
নতুন বৌদি।
ঠাকুরপাে, ডালে ?
হাঁ, বছিলাম কি
বাধা দিয়ে নমিতা বলে,“দেখ ঠাকুরপাে, অনেকদিনের ইচ্ছা যে
একখানা চওড়া লাল পাড় শাড়ী পরি—একেবারে টকটকে লাল। এনে
দিতে পার ভাই ?
সুভাষের মনটা কেমন চমকে উঠলো। একি অদ্ভূত ইচ্ছা।
! তার
পর একটু ঢোক গিলে স্নান মুখে বললে,—সত্যি বৌদি, এত দুঃখেও, যে
তােমার—তারপর হঠাৎ সে থেমে গেল।
নমিতা প্রচ্ছন্ন হাসি হেসে বললে,-সত্যি ঠাকুরপো, দাও না এনে ।
পরবার যে কিছু নেই।
সুভাষ দুঃখদ্র কণ্ঠে বললে,—কিন্তু এমন করে ক’দিন' চলবে বৌদি ?
তার চেয়ে---
বাধা দিয়ে নমিতা হাসি মুখে বললে—বশ তো। আজকের দিন
তো কেটেই গেল-সন্ধ্যেও হয়ে গেছে । কাল সকালে তুমি যা বলবে
উজান স্রোতে
১৪৯

তাই করতে রাজী আছি। আর কাপড় তাে চাই। না হয় আজই একখানা কিনে এনে দিলে। নষ্ট তো হবে না। সুভাষ বলে,—তব চট করে আমি ঘুরে আসি। কি বল বৌদি ? একা থাকতে ভয় করবে না তাে? নমিতা মনে মনে বললে,—সে ভয় অনেকদিনই কেটে গেছে । তারপর প্রকাশ্যে বলে,-কিছু না ঠাকুরপাে । কাল রাত্রেও তো তুমি দু’দু’বার বেরিয়েছিলে, আবশ্যকীয় জিনিষপত্র ও খাবার আনতে। তাে গা সওয়া হয়ে গেছে। নমিতা মৃদু হেসে স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো। সুভাষ চলে গেল। নমিতা আস্তে আস্তে দরজাটা বন্ধ করে দিল । তারপর কটিদেশ হতে আস্তে আস্তে সে আফিংয়ের কোটাটা বার করে আলাের সামনে খুলে ধরলে। বুকটা একবার কেঁপে উঠলো। পিতার স্নেহােজ্জল মুখখানা তার মনে পড়লো। স্বামীর কথা মনে পড়লো—ছােট ভাইয়ের ন্যায় সুভাষের অকৃত্রিম স্নেহপ্রবণতা মাখা মুখখানা তার চোখের সামনে জ্বল জ্বল করতে লাগলাে। তাকে সুখী করবার জন্য—তার মুখে সামান্য একটু হাসি ফুটিয়ে তােলবার জন্য সুভাষের কি প্রাণপণ প্রচেষ্টা। সব শেষে মনের কোণে ভেসে উঠলাে তার মাতার মুখখানা, যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে—আয়-আয়-আয়। অধিক ভাবলে পাছে সঙ্কল্পে বিঘ্ন ঘটে মনে করে নমিতা মুখের মধ্যে রফিংয়ের সমস্ত দলাটা ফেলে দিয়ে এক নিঃশ্বাসে গিলে ফেলে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তারপর দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে সে শয্যায় এসে বলো ও সুভাষের পরিত্যক্ত সার্টের পকেট হতে পেন্সিলটা বার করে ১৫০ উজান স্রোতে

তারই পকেটস্থ একখানা সাদা কাগজে খচ, খচ, করে কি লিখে
কাগজখানি তাড়াতাড়ি বিছানার নীচে রেখে দিয়ে শয্যার উপর শুয়ে
পড়লাে।
কিছুক্ষণ পরে সুভাষ ফিরলাে--হাতে একজোড়া চওড়া লাল পাড়
শাড়ী।
নমিতা টলতে টলতে দরজা খুলে দিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলে,
এনেছ--এনেছ ঠাকুরপাে। কই দাও।
কাপড়টা হাতে করে নিতে গিয়ে নমিতা মাথা ঘুরে সুভাষের গায়ের
উপর পড়তে পড়তে অতিকষ্টে নিজেকে সামলে নিল। পরে টতে
টতে সে পাশের ঘরে চলে গেল ও বস্ত্র পরিবর্তন করে যখন সে শয্যার
উপর এসে দাঁড়াল তখন তাকে যেন মুর্তিমতী লক্ষ্মীর ন্যায় দেখাতে
লাগলো। সে হাসতে হাসতে বলে,-এবার বা তাে ঠাকুরlেl, আমায়
কেমন দেখাচ্ছে ?
সুভাষ একবার চেয়েই সম্ভ্রমে, মুখখানা সরিয়ে নিল। তখনও
সুভাষের হাতে খাবারের ঠোঙা ছিল। সুভাষ বলে,একেবারে
খেয়ে নিয়ে উয়ে পড় বৌদি। আমি খেয়ে এসেছি।
নমিতা বলে,—সে কথা বলে শুনছি না ঠাকুরপাে। আজ আমি
তােমাকে সামনে বসিয়ে খাওয়াতে চাই। তুমি আমার জন্য যা করছে,
ত। নিজের ছােট ভাই ও করতে পারে না। দাও দেখি খাবারের
ঠোঙাটা।
সুভাষ বলে,—সত্যি বৌদি, আমি খেয়ে এসেছি। এ খাবার
তােমার জন্য এনেছি।
উজান স্রোতে

নমিতা ঈষৎ জড়িত কণ্ঠে বলে—তাহােক ঠাকুরপো। তােমাকে
খেতেই হবে। তবে দুঃখ এই যে, এ সব দোকানের খারার।
সুভাষ বলে,—আচ্ছা, সে আর একদিন হবে।
মুখখানা একেবারে স্নান করে নমিতা ক্ষীণ স্বরে বললে--সেদিন
, কই, ধর।
সুভাষ বলে,-আগে তােমার জন্য তুলে রেখে দাও বৌদি।
নমিতা অনুজ্ঞাপূর্ণ স্বরে বললে,—সে হবে এখন। যা বছি শােন।
কিছু খাওয়ার পর সুভাষ বলে,—থা বৌদি, আর না।
তুমি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়। আমি দেখতে পাচ্ছি ঘুমে তােমার চোখের
পাতা বুজে আছে।
নমিতার হাত হতে খাবারের ঠোঙাটা হঠাৎ পড়ে গেল। সে
চমকে উঠে জড়িত কণ্ঠে বলে,-সত্যি ঠাকুরপাে, বড় ঘুম পাচ্ছে।
তুমি যাও—শােও গে। তোমাকে অনেক কষ্ট দিলাম। তবে আর বােধ
হয়—নমিতার মুখ দিয়ে আর কথা বাহির হ’ল না !
সুভাষ ডাকলে—বৌদি।
নমিতা ঝিনুতে ঝিমুতে কোন রকমে বলে—কি ? বড্ড ঘুম--একটু
ঘুমিয়ে নেই।
সুভাষ বললে,—ঘুমিয়ে পড়লে যে আর খাওয়া হবে না বৌদি।
নমিতা বিরক্ত হয়ে মুখ তুলে বলে,-“খুব হবে—খুব হবে। তুমি
মাও-শাে গে। যাও—তারপর কি বলতে গেল, কিন্তু সে স্বর
একেবারেই অস্পষ্ট ও জড়তাপূর্ণ, আর সঙ্গে সঙ্গে নমিতার মুখখান।
শয্যার উপর মুড়ে পড়লাে।
উজান স্রোতে

বৌদি--বৌদি, কি হল? অমন করছো কেন? বলে সুভাষ
উৎকণ্ঠিত চিত্তে নমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাে।
জোর করে মাথাটা উঁচু করে নমিতা ক্ষীণ কাতর স্বরে বললে,
কিছু না ঠাকুরপাে । মাথাটা কেমন টলে এল।
সুভাষ ভীতি-বিহ্বল কণ্ঠে বলে, তােমার কথারও স্বর যে জড়িয়ে
আসছে বৌদি ?
নমিতা জোর করে বললে,—কই—না। এই তো—আবার কণ্ঠস্বর
থেমে গেল ও মাথাটা শয্যার উপর নূয়ে পড়লো।
সুভাষ বিবর্ণমুখে ডাতে লাগলো-বৌদিও বৌদি—বৌদি।
অতি কষ্টে একটা কথা বেরুল—কি? তারপর আবার নীরব--
।
নিস্তব্ধ।
সুভাষ ছুটে এসে মুখের কাছে মুখখানা এনে ছল ছল নেত্রে বলতে
লাগলাে—বৌদিও বৌদি-অমন করছো কেন? কথা কও। বল কি
হয়েছে?
নমিতা কোন রকমে চোখ খুলে একবার তাকিয়ে দেখতে ও
দু’ফোটা অশ্রু নয়ন কোণে এসে টলমল করতে লাগলো।
কি সর্বনাশ করলে বৌদি, কি সর্বনাশ করলে ? এত
এত করে ও
তােমাকে বাঁচাতে পারলাম না। কি কৈফিয়ৎ দেব তােমার বাবার
কাছে ? কি কৈফিয়ৎ দেব ?
পিতার কথায় নমিতার প্রাণ যেন বিপুল আনলে শিউরে উঠলো
ও সঙ্গে সঙ্গে একটা অস্ফ ট বাবা সম্বোধন ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো।
উজান স্রোতে

আর সুভাষ উন্মত্তের ন্যায় চক্ষুতারকা বিঘূর্ণিত করে ছুটতে ছুটতে ঘরের বাহির হয়ে গেল, ডাক্তারের খোঁজে। * তখন ভাের হয়নি। তবে ভােরের বাতাস একটু একটু করে বইতে শুরু করেছি। পূর্ব গগনে রক্তিম রেখার ছাপ সবে ফুটে উঠছিল ধিকি ধিকি। গঙ্গাবক্ষ হতে দাড় টানার শব্দ ভেসে আসছিল-মিষ্ট-মধুর তালে তালে—ছলাৎ ছলাৎছলাৎ । আর দাড়ী মাঝির গানের সুর বাতাসে কাপতে কাপতে এসে চু চড়া সহরের বৃত্বের উপর ছড়িয়ে পুড় ছিল। মণিময়ের সমস্ত রজনী বিনিদ্র কেটে গিয়েছিল—গভীর উদ্বেগে- দারুণ দুশ্চিন্তায়। মাঝে মাঝে তন্দ্রার ঘোরে নমিতার বিদায় কালীন বিষাদ মাখা মুখখানা তার মানস চক্ষে ভেসে উঠতে লাগলাে। কত কাতর হয়ে সে এই গৃহের এক কোণে একটু মাথা গুজবার স্থান চেয়েছিল দীন ভিক্ষুকের মত। তাও সে পায় নি। শেষে নিরাশ হয়ে সে চলে গেল । কিন্তু কোথায় ? কোনখানে? কত দূরে ? এর চেয়ে চরম নিষ্ঠুরতা আর কি হতে পারে ? তন্দ্রার ঘোরে একবার মণিময়ের বেন কাণে গেল কার কাতর অস্ফুট যন্ত্রণা-ধ্বনি। চোখ খুলে চাইতে গিয়ে আবছায়া নজর পড়লাে নমিতার মুখখানি, যেন ম্লান-নিষ্পভস্তিমিত দীপশিখারই মত। মণিময় শয্যা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ও বিস্ময়াকুল চিত্তে পদচারণা করতে করতে ভাবতে লাগলো--এ কি দেখলাম? তবে কি নমিতার জীবন বিপন্ন ? যদি তাই হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে কি তার নিজের জীবনও ১৫৪ উজান স্রোতে

বিল্প নয় ? নিজের হটকারিতার—নিজের অদূরদর্শিতার ফল সে ছাড়া
আর কে ভােগ করবে ? কিন্তু এর জন্য দায়ী কে ?
ঠাকুরপাে?
কে ? তুমি ? না-না--তুমি এখন যাও—আমাকে একটু ভাবতে
দাও—ভাবতে দাও। অন্ধকারে মণিময়ের চোখ দুটো যেন দপ দপ
করে জ্বলে উঠলো।
মার বুকটা এক অজানা আতঙ্কে কাপতে লাগলো, কম্পিত কষ্ট
আবার ডালে--ঠাকুরপাে ?
তুমি যাও–যাও–যাও। হাঁ, একটু-একটু স্থান সে চেয়েছিল—শুধু
মাথা ও জবার জন্য। কিন্তু তার বিনিময়ে ? না না--অসহ। তুমি
নারী ? তােমরা না কোমলতার আদর্শ ? ভুল-ভুল-ভুল ।
সরমা সাহসে ভর করে তীক্ষস্বরে বলে—কিন্তু কি তুমি বলতে চাও
ঠাকুরপাে ?
আমি বলতে চাই—না? আজ দু’রাত তার কোন সংবাদ নেই।
কি দেখলাম জান ? নমিতার শীর্ণ পাণ্ডুর মুখখানা—যেন পথের
যাত্রী। যা দেখলাম তাই যদি সত্যি হয়, তার জন্য দায়ী কে বলতে পার?
তুমিই বল তােমার মুখ দিয়ে শুনতে চাই—কে দায়ী ?
দায়ী তুমি।
তাতে বলবে—দায়ী আমি। পুরুষ তােমরা--বলতে তােমাদের বাধে
। কিন্তু জানতে চাই—কে আমাকে দিনে দিনে প্রলুব্ধ করেছিল ?
তুমিই নয় কি? নারী সহজে বিচলিত হয় না—সহজে পাপ পথে পা
দেয় না। কতক্ষণ--কতক্ষণ রক্ষা করে চলতে পারে সে নিজেকে পুরুষের
উজান স্রোতে
.
-

সন্ধানত শাণিত দৃষ্টির হাত থেকে পুরুষের শত প্রলােভন-শত
প্রেমনিবেদন উপেক্ষা করে? তবুও নারী কখন উপযাচক হয়ে প্রেম ভিক্ষা
করে না। তােমার মুখে একথা সাজে না-একথা বলতে পারে সুভাষ
ঠাকুরপাে যাকে আমি মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করি। বিষধর সর্পের ন্যায়
সরমার চোখ দুটো ধক ধক করে জ্বলে উঠলো। তারপর ঝড়ের বেগে সে
ঘর ছেড়ে চলে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে বাহিরের দরজায় ঘন ঘন কড়া নাড়ার শপ হ’ল। তখন
ভােরের আলাে জানালার ভিতর দিয়ে একটু একটু করে ঘরের মধ্যে
প্রবেশ কচ্ছিল। মণিময় ক্ষিপ্র পদে শঙ্কাকুল চিত্তে দরজা খুলে দাঁড়াল ?
ভয়ে ও আতঙ্কে শিউরে উঠে দু’পা পিছিয়ে এল।
আমার নমিতা-আমার নমিতা-বল কোথায় আমার নমিতা ?
কোথায় তাকে রেখেছ ?
মণিময় বেদনা বিহ্বল চিত্তে চেয়ে রইলাে, মুখখানা স্নান করে।
বলবে না? আমি যে এসেছি তাকে দেখতে। তারপর ছুটে এসে
মণিময়ের হাত দুখানা বিপুল আবেগ ভরে চেপে ধরে 'সুধীর বাবু
বলেন—চল--আমাকে নিয়ে চল আমার মায়ের কাছে—আমি
একবার দেখবাে-একবার দেখবাে।
মণিময় অর্ধবিজড়িত স্বরে বলে—আমি তাে টেলিগ্রামে সব
জানিয়ে দিয়েছি।
হাঁ, তা দিয়েছ বটে; কিন্তু তারপর কি মায়ের আমার কোন
সন্ধানই পাওনি? ওকি ! মুখ ফিরিয়ে নিলে যে ! বল ?
উজান স্রোতে,

পুলিশে সংবাদ দিয়েছি—একোয়ারী হচ্ছে।
খবর শীগগিরই
পাওয়া যাবে। 'সুভাষকেও পাওয়া যাচ্ছে না।
কিন্তু আমি যে কাল সারারাত মাকে রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে
বেড়িয়েছি। আর তুমি নিশ্চিন্ত মনে বসে আছ ? ওঃ, মা আমার ।
বলতে বলতে সুধীর বাবু গৃহের বাহির হয়ে পড়লেন ?
মণিময় একদৃষ্টে তার সচঞ্চল গতি ভঙ্গীর দিকে চেয়ে রইলাে।
একটু পরেই থানা হ’তে একজন পুলিশের লােক এসে হাজির হ’ল ।
মণিময় উদ্বিগ্নচিত্তে জিজ্ঞাসা করলে--খবর কি ?
লোকটী বলে—শীগগির আসুন—পয়জ কৈস্।
পয়জ কে!
হাঁ, অবস্থা একেবারেই ভাল নয়।
আর সুভাষ ?
তিনিও সেখানে আছেন। কোথায় আর যাবেন? দেরী করবেন
ন—ডাইং ডিক্লারেশন্ তাে নিতে হবে।
মণিময় ঘরে ঢুকে জামা কাপড় পরিধান করে বেরিয়ে পড়লো।
সরমা ও অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে সব শুনলে ও মণিময়ের প্রস্থানের সঙ্গে
সঙ্গে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে টলতে টলতে নিজের ঘরে এসে প্রবেশ
করলে।
£std:-1313.
MAKARDAN
HUWRAH.
উজান স্রোতে
১৫৭,

সেই রাত্রে সুভাষ ডাক্তার নিয়ে এল। রােগী পরীক্ষা করে ডাক্তার
বলেন,—পয়জ (বিষ) কেস্।
সুভাষ কঁদতে কাঁদতে বললে,বাঁচবে তো?
ডাক্তার বলেন--বাঁচা মরা ভগবানের হাত। তবে চেষ্টা করে
দেখা যাক।
সুভাষ ছেলে-মানুষের মত বলে,-বেনন করেই হােক বাঁচাতে হবে
ডাক্তার বাবু।
ডাক্তার বললেন,--ব্যস্ত হবেন না সুভাষবাবু, আমার সমস্ত শক্তি
নিয়োগ করে চেষ্টা করবাে।
সারারাত্রি ডাক্তার রয়ে গেল। ভােরের দিকে ডাক্তার হতাশ হয়ে
বলেন,—আর হ’ল না। রােগীর অবস্থা ভাল মনে হচ্ছে না। আশা
খুব কম।
সুভাষ ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠে বলে,“কি হবে ডাক্তার বাবু?
বাঁচান যাবে না? যত টাকা লাগে দেব ডাক্তার বাবু, বাচিয়ে দিন
বাঁচিয়ে দিন।
১৫৮
উজান স্রোতে,

ভাক্তার বলেন,টাকা দিলে কি প্রাণ মেলে সুভাষ বাবু? কেন
ছেলেমানুষী করছেন? অমন করলে রােগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে
পড়বে।
এমন সময় নমিতা একবার কেমন করে উঠলো। ডাক্তার গুম্
হয়ে নাড়ী দেখতে লাগলেন।
সুভাষ ব্যস্ত হয়ে বলে-কি হ’ল ডাক্তার বাবু?
ডাক্তার বাবু ইঙ্গিতে কথা বলতে বারণ করে দিলেন।
সুভাষের সন্দেহের মাত্রা হিগুণতর বেড়ে গেল। তবে কি সব
শেষ ? সুভাষ নেহাৎ শিশুর ন্যায় কাঁদতে কাঁদতে বললে--কি হবে
ডাক্তার বাবু ? কি জবাব দেব ওঁর পিতার কাছেওঁর আত্মীয় স্বজনের
কাছে ?
ডাক্তার বলেন, টাটা কেটে গেছে সুভাষবাবু। আপনি
স্থির হ।
সুভাষ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্থির হয়ে নমিতার মুখের দিকে
তাকিয়ে রইলো।
দেখতে দেখতে সকাল হয়ে গেল। সহসা দ্বার ঠেলে প্রবেশ করলে
পুলিশের লােক—পশ্চাতে মণিময় ও সুধীর বাবু। •
মণিময় চীৎকার করে বলে,-ঐ—ঐ সেই বদমায়েসটা।
সুধীর বাবু এক নজর দেখে পাষাণ হয়ে দাড়িয়ে রইলেন, পরে ছুটে
এসে কন্যার মুখখানা কোলে করে নিয়ে ডাকতে লাগলেন,-মা-মা,
চেয়ে দেখ আমি এসেছি। এই যে আমি। কথা কও—চেয়ে দেখ মা।
নমিতা একবার চোখ খুলে চেয়ে দেখলে ও জড়িত কণ্ঠে বলে-
উজান স্রোতে
১৫৯
.

বাবা--তুমি। আর চোখ হ’তে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলাে। মামা। কেন এমন করলি ? কেন এমন করলি ? আমি যে তাের মুখের কথা শুনবাে বলে ছুটে এসেছি। সুভাষের চোখ দিয়ে উস্ টন্ করে জল ঝরে পড়তে লাগলাে। আর মণিময়ের চোখ দুটো রাগে ক্ষুধিত ব্ৰাষ্ট্রের ন্যায় ফুলে ফুলে উঠতে লাগ্‌লো। পুলিশের লােকটী বলে,-কেমন অবস্থা বুঝছেন ডাক্তারবাবু? ডাক্তারবাবু গম্ভীর ভাবে বলেন, একেবারেই আশাপ্রদ নয়। পুলিশের লােকটী বলে,—সম্ভব হয়ত ডাইং ডিক্লারেশন্ নেওয়া ৫ ডাক্তার গম্ভীর স্বরে বলেন, চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তবে কদূর কৃতকার্য হওয়া যাবে বলা যায় না। অনেক করে চেষ্টা করায় মাত্র এই উত্তর এল নমিতার মুখ হতে দোষী-কেউ-নয়'—আমি। তারপর বিছানার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ " কি দেখাতে লাগলো। এমন সময় তার " নজরে পড়লাে মণিময়কে, জড়িত কণ্ঠে সে বলে,—এসেছ, নিতে, না, বস-~- তো-মার—কোন দোষ নেই। তারপর সে যেন আর কাকে খুঁজতে লাগলাে ও বিড় বিড় করে বলতে লাগলাে—সুভাষ-ভাই- কেঁদোনা। তারপর সব শেষ। সুধীর বাবু কন্যার মুখের উপর মুখখানা রেখে জোরে জোরে নমিতা নমিতা~~-মা আমার—বলে ডাকতে লাগলেন ও অঝােরে দু’চোখ ছাপিয়ে জল পড়তে লাগলো। • ১৬০ উজান স্রোতে ডাক্তার বাবু বলেন, আর ডেকে কি করবেন ? সব শেষ। শেষ !! সুধীর বাবু স্থির ও নিস্পন্দ হয়ে কন্যার মুখের দিকে নির্নিমেশ নয়নে চেয়ে রইলেন, সংজ্ঞাহীনের মত। ইতিমধ্যে পুলিশের লােকটী বিছানার মধ্য হতে পেন্সিলে লেখা কাগজ খানি বার করে ফেলে ও সকলকে পড়ে শুনিয়ে দিলে। লেখা ছিল :- ....আমি নিজের ইচ্ছায় চলে এসেছি। কেন জানি না। বােধ হয় খেয়াল ; নচেৎ কেন এমন কাজ করবাে ? সুভাষ আমার ছােট ভাইয়ের মত। তার চোখে ধূলি দিয়ে একা করেছি। তাকে বুঝতে দিই নি, পাছে বাধা দেয়। দিদির উপর তার যে অচলা ভক্তি। তাই আমার চাতুরী তার নজরে পড়েনি। তবু সে চেয়েছিল সব সময় আমাকে চোখে চোখে রাখতে; কিন্তু দিদির কথার উপর কথা বম্বার যে তার ক্ষমতা ছিল না। তাই কাল রাত্রে তাকে অনেক কৌশলে কাপড় কিনবার ছুতায় কাছ ছাড়া করে দিয়ে-- যাক সে কথা। স্বামীকে জাতে দিইনি যখন চলে আসি। কি জানি পাছে ধরা পড়ে যাই। আমার এ মৃত্যু ইচ্ছাকৃত—স্বামী সম্পূর্ণ নির্দোষী। একথা আমি মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে যাচ্ছি। শুধু দুঃখ আমার বাবার জন্য তাকে এত বড় একটা আঘাত স্বেচ্ছায় আমি দিয়ে যাচ্ছি বলে। বাৱা, হতভাগিনী কন্যার এই স্বেচ্ছাচার ক্ষমা করাে। আমি তােমারই প্রতীক্ষায় থাকবাে। মা--মা-মা। হতভাগিনী কন্যা নমিতা ১৬১, উজান স্রোতে , ১১ সুধীর বাবু উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,-মিথ্যা কথা। মা আমার, এত বড় মিথ্যা কথা কেমন করে লিখে গেলি? স্বামীকে মুক্তি দিতে কিন্তু, না--মণিময়, তােমারই নিৰ্যাতনে নির্যাতিত হয়ে মা আমার আত্মাহুতি দিয়ে চলে গেল, তােমাকে অমােঘ বাঞ্ছিত মুক্তি দিয়ে। কি দেখছো, মণিময় ? মাকে আমার চিনতে পারলে না ? না না আমি তােমায় মুক্তি দেব না—দিতে পারি না। মণিময়ের মুখ চোখ স্ফীত হয়ে উঠলাে। এক প্রকার অস্বাভাবিক উদাসীন দৃষ্টি তুলে সে হাে হাে করে হেসে উঠে বলতে লাগলাে—মুক্তি মুক্তি মুক্তি। এখনও অনেক দেরী। মুক্তি দিলেই কি মুক্তি পাওয়া যায় ? সুভাষ মণিময়কে জড়িয়ে ধরে বলে,-মণিদা, স্থির হও-প্রকৃতিস্থ মণিময় অস্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,-হ, হবাে--একেবারে স্থির একেবারে প্রকৃতিস্থ। কিন্তু এখনও-এখনও বাকি আছে ভাই। সুভাষ, মুক্তি—না—মুক্তি? বলে ছুটতে ছুটতে সে ঘরের বাহির হয়ে পড়লাে। সুভাষ শশব্যস্তে বলে,—আমিও চল্লাম। মণিদার মাথার ঠিক নেই। বলে পিছন পিছন ধাবিত হ’ল । মণিময় সরাসর নিজের বাড়ীতে চলে এল ও দরজা বন্ধ করে দিল। মাথার চুল রুক্ষ, অবিনীত—চক্ষু তারকা জবা ফুলের ন্যায় লাল, চাহনি ভীষণ কুটী মাখা। ঘরে ঢুকেই সে উচ্চৈঃস্বরে ডাকলে,-বৌদি। কোন উত্তর এল না। ১৬২ উজান স্রোতে । } মণিময় আবার বিকৃত কণ্ঠে ডাকূলে-বৌদি। ঘরটা গম্ গম্ করে উঠলাে মাত্র। তারপর সব নীরব—সব নিস্তব্ধ। মণিময় এঘর ওঘর সর্বত্র ঘুরে বেড়াল, উন্মত্তের ন্যায় টলতে টলতে ; আর মাঝে মাঝে চীৎকার করে ডাকতে লাগলো-বৌদি—বৌদি। শেষে নিরুপায় হয়ে কম্পিত চরণে সে সরমার ঘরে এসে দাড়াল। আর চোখ দুটো হিংস্র পশুর ন্যায় যেন শিকার সন্ধানে ফিরতে লাগলো। মণিময়ের নজর পড়ে গেল টেবিলের উপর। একখানা ভাজকরা কাগজ ? মণিময় ছুটে গিয়ে ভাজ খুলে ফেলে। এ যে বৌদির হস্তাক্ষরতারই চিঠি। লেখা ছিল :- ঠাকুরপাে, তােমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় কি মুহূর্তে তা জানি না। এখন বুঝছি দেখা না হলেই ভাল ছিল। তারপর কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল ; উজান স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে আজ এমন এক জায়গায় এসে দাড়িয়েছি যেখান থেকে পালান ভিন্ন আর কোন পথ নাই। তাই আজ আবার ঠিক সেই স্রোতের উজানে ভেসে চলেছি। ভেসে চলেছি। কোথায়-- কতদূরে—কিসের আশায় তা জানি না। তবু যেতে হচ্ছে, তােমাকে মুক্তি দিতে—পথের সন্ধানে। বুকটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে—মন চাইছে না অজানা, অচেনা, অনভ্যস্ত পথে পা দিয়ে দাঁড়াতে। কতদিন-~- কত দীর্ঘ দিন যে বাড়ী আঁকড়ে ধরে আমি পড়ে ছিলাম, আজ তাকে ছেড়ে যেতে আমার প্রাণের মধ্যে যে কি ভীষণ ঝড় বইছে তা ভুক্তভােগী ভিন্ন আর কেউ বুঝতে পারবে না। হাঁ, একজন বুঝেছিল--সে নমিতা, ননা তাকেও ঠিক এমনি ভাবে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল। উজান স্রোতে তাই আজ আমার মন তারই দুঃখের কথা ভেবে অনুকম্পায় ভরে উঠছে। জানিনা এখনও পর্যন্ত নমিতা আছে কিনা; কেননা তার অবস্থার কথা অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে আমি সব শুনিছি । যদি তাকে ফিরে পাও, বলো আমাকে ক্ষমা করতে ; কেননা তার কাছে ক্ষমা চাইবার অধিকার আমার নাই। নতুন ঠাকুরপাে একদিন বলেছিল—তুমি চল বৌদি কাশীতে বিশ্বনাথের সেবা আরাধনায় জীবনটা কাটিয়ে দেবে। আজ থেকে থেকে কেবল সেই কথাই মনে পড়ছে। তখন যদি সে কথা শুতাম, তাহলে আজ এমন ভাবে রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হত না, একেবারে সহায়হীন-- কপর্দক হীন—শত সহস্র লােকের দৃষ্টির সামনে। কিন্তু ঠাকুরপাে, এই আমার উপযুক্ত শাস্তি উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত। আজ যদি একবার সুভাষ ঠাকুরপাের দেখা পেতাম। না না, সে আশা করি না। হাঁ, তবু তাকে একবার দেখবার সাধ যায়। কিন্তু মনের আশা মনেই পুষে রেখে আমি বেরিয়ে পড়লাম, অনির্দিষ্ট পথে। তাতেই আমার সুখ—তাতেই আমার শান্তি-যদি কোনদিন সুভাষ ঠাকুরপাের নির্ধারিত পথে গিয়ে পৌছিতে পারি। সুভাষ ঠাকুরপাে আমার দীক্ষা গুরু। তাকে বলে। আমায় ক্ষমা করতে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে ক্ষমা আমার মিলবে। তােমাকে বার আমার কিছু নাই। মনে করো বেদি মরে গেছে। তবু তােমাকে ফেলে চলে যেতে যে আমার একেবারে কষ্ট হচ্ছে , একথা আমি জোর করে বলতে পারি না। সে কষ্ট স্বাভাবিক। দীর্ঘ-সংমিশ্রণের আকর্ষণ অনেক চেষ্টা করেও মন থেকে মুছে ফেলে দেওয়া যায়না। সে আকর্ষণ যে হৃদয়ের প্রতি তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে জড়িগে ১৬৪ উজান স্রোতে থাকে। তােমার কাছে আমার শেষ অনুরােধ এই যে, কোনদিন আর আমার খােজ করাে না--আর প্রার্থনা করে যেন আমি পথেরই সন্ধান পাই। বিদায়—বিদায়-বিদায়। ইতি বৌদিদি মণিময় পত্র পড়ে মুহুর্তের জন্য স্থির ও নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পরে অট্টহাস্যে ঘরখানা মুখরিত করে তুলে বিকৃত কণ্ঠে বলে—সব শেষ—বাকি আমি। নমিতা চেয়ে দেখ । বে মুক্তি তুমি নিজের জীবন দিয়েও দিতে পারনি—আজ সেই মুক্তি আমার একেবারেই করায়ত্ত হাতের মুঠোর মধ্যে। হাঃহাঃহাঃ। মুক্তি--মুক্তি--মুক্তি। ঠিক এই সময় সুভাষ দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকলো। মণিময় হো হো করে হাতে হাসতে বললে, যে মুক্তি পত্র। পড়ে দেখ সুভাষ । সুভাষ ছুটে গিয়ে কম্পিত হস্তে চিঠিখানা কুড়িয়ে নিল ও পড়তে পড়তে চোখ দিয়ে টস্ টন্ করে জল ঝরে পড়তে লাগলো। উজান স্রোতে

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ujan Srote

Author
Bandyopadhyay, Haradhan
Title
Ujan Srote
File name
Ujan Srote
Text
OCR done
Citation
1936
Published
2009/08/4
Publisher
Bhubanmohan Mazumdar, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
189
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
551830
Barcode
4990010021171.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
w7vsCa6bM1F
Download PDF

Ujan Srote