Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Archana
Front matter
No text on this page.
অজনা
বন্দনা’র কবি
শ্ৰীকিরণচন্দ্র দত্ত
সক্ষমী-নিবাস
বাগবাজার, কলিকাতা
প্রকাশক
রামশর দত্ত
শল্পী-নিবাস, ১, লক্ষ্মী দত্ত লেন,
বাগবাজার, কলিকাতা
আশ্বিন, ১৩৩৭
সেপ্টেম্বর, ১৯৩০
মূল্য এক টাকা
শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস,
প্রিন্টার-সুরেশচন্দ্র মজুমদার,
১১নং মির্জাপুর ধ্রুট, কলিকাতা।
,
৫৩০
প্রকাশকের কথা
যতদূর জানা যায়, ‘বন্দনা’ ও ‘অৰ্চনা’র কবি কবিতা
রচনা করিয়া, উহা প্রকাশার্থ কাহারও দ্বারস্থ হন নাই।
তিনি নিভৃতে অনাড়ম্বরে বাণী-সাধনায় চিরদিন ব্যাপৃত
থাকিতেন। অনুরাগী বন্ধুগণ অনুগ্রহ করিয়া তাহার
রচনা পাঠে আনন্দ প্রকাশ করিয়া নিজ নিজ পত্র বা
পত্রিকায় কতকগুলিকে সম্মানিত করিয়াছেন বা কোন
কোন সময়ে কবির নিজ সম্পাদিত পত্রিকায় কয়েকটা
স্থান পাইয়াছে। তঁাহার রচনাগুলির মধ্যে আগাগােড়া
এমন একটী সদ্ভাবের পরিচয় পাওয়া যায়, যাহা সমান
ভাবে অন্যত্র কদাচ দৃষ্ট হয়। আজকাল ভূমিকারূপ তিলক
না দিলে পুস্তক প্রকাশ ও প্রচার করা দুঃসাধ্য-বন্দনার
প্রকাশক দুইখানি পত্র প্রকাশ করিয়া সে সাধ মিটাইয়া-
ছিলেন—কিন্তু অর্চনায় প্রকাশের জন্য সেইরূপ মনীষীর
পরিচয়-পত্র দিতে কবি কুষ্ঠিত হওয়ায় আমরা এই
পল্লীর উদীয়মান লেখক, কবি ও সম্পাদক শ্রীযুক্ত
বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কবির ‘বন্দনা’ পাঠে
যে ‘কবি-প্রশস্তি রচনা করিয়া কায়স্থ-পত্রিকায় প্রকাশ
করিয়াছিলেন তাহাই এখানে অৰ্চ্চনার প্রথম অর্ঘ্যরূপে
উৎসর্গ করিলাম।
দেবীপক্ষ, ১৩৩৭
শ্রীরামশঙ্কর দত্ত
No text on this page.
কবি-প্রশস্তি
(সুকবি শ্রীযুক্ত কিরণচন্দ্র দত্ত মহাশয়ের ‘বন্দনা’ পাঠে)
‘সৌরভ’ যথার্থ আছে, তব কাব্য-ফুলে,
কবি-জ্যোতিষ্মন।
হাসিমুখে লহ আজি অন্তর-নিহিত মাের
শ্রদ্ধা ও সম্মান।
‘রাধিকার উক্তি যাহা একেছ সাহিত্যে, তাহা
নূতন নহেক, তবু আছে নব তান।
‘আয় শিশু প্রতিভার অপার্থিব দান।
হৃদয়ের অতি সত্য সুমধুর বাণী,
‘সারদার প্রতি’--
সুনিৰ্ম্মল নিঝরিণী বহে যথা অবিরাম,
সেই মত গতি।
‘পতিতার খেদ’ বলি’ যা’ দেছ সম্মুখে তুলি',
হক সে পতিতা—বহু ঊর্ধে তার গতি!
চাহি না বিফল গর্ব, করি তা’য় নতি ।
100 হায় রে সে ‘হারাধন’ গিয়াছে হারা’য়ে এ বঙ্গ হইতে । ‘সুশীলের’ দুঃশীলতা প্রতি গৃহে গৃহে হইছে সহিতে। বেজেছে কোমল-প্রাণে, তাই কাদি’ আনে, গেয়েছ আকুল-সুরে সবারে দহিতে! তুলনা তাহার আমি না পারি কহিতে । স্তুতি নাহি করি কবি, নিবেদন শুধু জানাই তােমায় ; তব সৃষ্ট ‘গুরু-স্তব জাগায়েছে মনে শেষের উপায় । ‘জীবন্মুক্ত’ তর্জমায় যে শক্তি করেছ ব্যয়, নাহি ক তাহার মূল্য- উচিত আছিল দিতে প্রথমে উহায়। -অমূল্য ধরায়। ‘ললনা-মহিমা’ আর ‘গিরিশ-গৌরব’ কাব্য-অলঙ্কার! তুলনার নাহি প্রয়ােজন, ধারে না ক বিচারের ধার । ভাষার ভাস্কর-রাগে ভাবের মুরতি জাগে, জননীর প্রতি শ্রদ্ধা সংসারের সার ! কবির সম্মান কবিউচিত বিচার ।
‘চারু-স্মৃতি’ যজ্ঞ-কুণ্ডে আপনা আহুতি
দিয়েছ সাগ্নিক।
মানবের প্রাণে এ যে, চির-ব্যথা দিবে,
(সত্য কথা) নহে ত অলীক।
বঙ্গবাণী-আঙিনায়
এমনি করিয়া হায়,
আঁক হে নূতন চিত্র—কি কব অধিক।
দয়াল করিয়া দয়া দীর্ঘ-আয়ু দিক।
বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
কায়স্থপত্রিকা, ফান, ১৩৩০
No text on this page.
No text on this page.
১২
শ্ৰীযুক্ত হরিপদ দত্ত
কালীকৃষ্ণ দত্ত
অশেষ ভক্তিভার্ষন অগ্রজ শ্রীযুক্তহরিপদ দত্তম অসীম দেই- প্রাণাধিক প্রিয়তম পুত্র কালীকৃষ্ণের সভক্তি-সেবা- ঋণ-স্মরণে উৎসর্গ সযত্ন-স্নেহের পাশে বাঁধিয়া আমায় যে রেখেছে মােরে আগুলিয়া । প্রাণভরা আশীর্বাদ ধরিয়া মাথায় আজো যার আছি গাে বাঁচিয়া। যার ভক্তিপূর্ণ সেবা ফুরা’য়ে অকালে করিতেছে ক্ষীণ প্রতিক্ষণে। পবিত্র-চরিত্র-টীকা যে পরিয়া ভালে বেঁধে গেছে সবে মহাঋণে! পিতৃতুল্য সে অগ্রজে শ্রদ্ধার চন্দনে পূজি আজি এই ‘অৰ্চনা’য়। প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হৃদয়-রঞ্জনে স্মরি হেথা ভুলি যন্ত্রণায়। ২৩-এ ভাদ্র, ১৩৩৭ কিরণ
No text on this page.
সূচীপত্র ১১৭ ১১৮ ২৪ ৭৯ বিষয় পূর্ব-সম্পর্ক পৃষ্ঠাঙ্ক অবসাদে আকাঙ্ক্ষা (পূর্ব-রচনা) অমর শিশিরকুমার (কায়স্থ-পত্রিকা, স্য) ১৩৪ অমরার পথ (অনুবাদ—স্য, বিশ্ববাণী) অমৃত অমৃতলােকে (সঘ, মাসিক বসুমতী) ১২৬ অমৃত-চক্র (সঘ) উদ্বোধন (কায়স্থ-পত্রিকা) উপদেশ-প্রকরণ–শঙ্কনুবাদ (ঘ) একাম্রকানন (মাসিক বসুমতী) খেলা মাের সাঙ্গ হল (অনুবাদস, উদ্বোধন) গিরিশ-গৌরব (কায়স্থ-পত্রিকা) গিরিশচন্দ্র, নাট্যসম্রাট (কায়স্থ-পত্রিকা) গিরিশচত্রের প্রতি (নাট্যশালার সুবর্ণ-জুবিলী উপলক্ষ্যে) ২৩ গােলাপ-যুগল (পূর্ব-অনুবাদ-সঙ্ঘ) ৪ চিন্তাকণা ১৪৮, ১৪৯ তত্ত্বমসি (কায়স্থ-পত্রিকা) ৪৬ দাতাকর্ণ মণীন্দ্রচন্দ্র (সঘ, বিশ্ববাণী) দেশবন্ধু-উদ্দেশে দু ফোটা অশ্রু (কায়স্থ-পত্রিকা) নবম নন (অনুবাদ-সঙ্ঘ, চক্র) ১৪৮ নাগ মহাশয়-দুর্গাচরণ (কায়স্থ-পত্রিকা) ৭৪ পুরুষ-সিংহ আশুতােষ (কায়স্থ-পত্রিকা) ৪১ ১৪৪ ৫৪ ০ ৭ ৪ ? বিষয় পূর্ব-সম্পর্ক পৃষ্ঠা প্রণয়-উন্মেষ (পূৰ্ব্ব-রচনাসঘ) প্রার্থনা (পূর্ব-রচনা) প্রার্থনা (সংস্কৃত-অনুবাদ) প্রিয়দর্শন জিতেন্দ্রনাথ (জিতু দত্ত) (সঙ্ঘ) বাঙ্গালী-কায়স্থ-মঙ্গল (কায়স্থ-পত্রিকা, কায়স্থ-সমাজ) ৮৭ বিদায় ও আন (কায়স্থ-পত্রিকা) বিশ্ববাণী (বিশ্ববাণী) ১০৮ বুদ্ধদেব-চরিত–প্রস্তাবনা (নাট্যমন্দির) ১৪ বােধন (কায়স্থ-পত্রিকা) ব্যোমকেশ ও বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ (সঘ) ভারতপূজ্য সুরেন্দ্রনাথ (কায়স্থ-পত্রিকা) ভূপেন্দ্র শ্রদ্ধাঞ্জলি (কায়স্থ-পত্রিকা) মধুপুর-মধুকথা (সঘ) মধু-স্তুতি (সনেট) (কায়স্থ-পত্রিকা) ৭০ মধু-স্তুতি (অমিত্রাক্ষরে) (কায়স্থ-পত্রিকা) মনীষী বিহারীলাল সুর (স) মহাত্মা অশ্বিনীকুমার (সজ্য, কায়স্থ-পত্রিকা) মহাত্মা শিশিরকুমার (সঘ, কায়স্থ-পত্রিকা) মহাপূজা (কায়স্থ-পত্রিকা, সঘ) ১০২ মহামনা মনােমােহন (ঘ) মেঘনাদবধ-প্রস্তাবনা (পুস্তিকা) ১২ রাধানগর-সাহিত্য-সম্মেলন (কায়স্থ-পত্রিকা) রায় যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী (কায়স্থ-পত্রিকা) ৭১ ৪৪ ৬০ ১১০ 82 २ ৭৫ ৮৫ বিষয় পূৰ্ব্ব-সম্পর্ক পৃষ্ঠাঃ লর্ড সিংহ, কায়স্থকুল-ভাস্কর (কায়স্থ-পত্রিকা) শান্তিতে সে লভুক বিশ্রাম (অনুবাদ-সঙ্ঘ, বিশ্ববাণী) ১১৫ মধুসূদন (সজঘ) শ্রীমধুসূদন দত্তকুলােদ্ভব কবি (কায়স্থ-পত্রিকা) শ্ৰীশ্ৰীকালী (অনুবাদ-- স্য, বিশ্ববাণী) শ্রীশ্রীগােবিন্দ-ধ্যান (অনুবাদ, পুস্তিকা) শ্রীশ্রচিত্রগুপ্ত (কায়স্থ-পত্রিকা) শ্ৰীশ্ৰীচিত্রগুপ্তদেব (কায়স্থ-পত্রিকা) শ্রীশ্রীরাধিকা-ধ্যান (অনুবাদ, পুস্তিকা) শ্ৰীশ্ৰসিংহবাহিনী-ধ্যান (অনুবাদ, পুস্তিকা) শ্রেষ্ঠ দান (সঘ, চক্র) সনাতন (গাথা) (Teachers' Journal, 707) সভব (সঘ) সমাধি-মন্দির ও গােলাপ (পূর্ব-অনুবাদ, সদ্য) সারদা-বন্দনা ১৮ সাহিত্য-পরিষৎ-পরিচয় (সত্য, বিশ্ববাণী) ১৪৬ সুস্বাগতম (কায়স্থ-পত্রিকা) স্নান-পূর্ণিমা (পূর্ব-রচনা) २० স্বাগতম (কায়স্থ-পত্রিকা) স্বাগত-সম্ভাষণ (কায়স্থ পত্রিকা) २१ স্বামী সারদানন—শ্রীমৎ (সঘ, বিশ্ববাণী) Poets Song ১৪৯ ১৪৫
কবির অন্যান্য গ্রন্থ পরিচয়
১। বন্দনা—(কবিতাবলী ও গাথাবলী) মূল্য-১০
(২৮০ পৃষ্ঠা, ডবল ক্রাউন ১৭২ ফৰ্ম্মা, ভাল এন্টিকে ছাপা)
২। সাধনা— শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ পরিচয়, তত্ত্ব ও
গীতাবলী) মূল্য
(১১২ পৃষ্ঠা, ৭ ফৰ্ম্মা, ভাল আইভরি ফিনিসে ছাপা)
Ol Girish Chandra Ghosh-A Biographical
Sketch (In Antique 16 pages,
Double
Crown) Price 1 anna.
৪। সুধীরা-শিবরাণী-স্মৃতি—( ৪৮ পৃষ্ঠা, ডবল ক্রাউন,
৩ ফৰ্ম্মা) মূল্য—দু’ ফোটা অশ্রু
সম্মাননা-(মহাত্মাগণের উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি)
আরাধনা—(গীতাবলী)
বঙ্গীয় নাট্যশালার প্রাথমিক ইতিহাস
৫৬৭ শীঘ্রই পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইবে
সজ কাৰ্যালয় হইতে প্রকাশিত-কালীকৃষ্ণ-কথা
প্রাপ্তিস্থান—লক্ষী-নিবাস—১, লক্ষী দত্ত লেন,
বাগবাজার,
কলিকাতা
: শ্রীকিরণচন্দ্র দত্ত
No text on this page.
অর্ধনা
শ্ৰীশ্ৰসিংহবাহিনী
সিংহাসনে উপবিষ্টা দুর্গতিহারিণী,
অর্ধেন্দুশেখরা দুর্গা, ত্রিনেত্রধারিণী ।
মরকতপ্রভাময়ী, কণ্ঠে মুক্তাহার,
চারিহাতে শঙ্খ-চক্র-ধনু-শর আর!
বাহুতে কেয়ূর, রণে শ্ৰীকরে কঙ্কণ,
রত্নের কুণ্ডল কিবা শ্রবণে শােভন।
কটিদেশে ঝলে কাঞ্চি মরি কি মধুর !
কিনি কিনি বাজিতেছে চরণে নূপুর !
অনুদিত—১৩০৫
শ্রীশ্রীগােবিন্দ
স্মর রম্য পীঠস্থান বৃন্দাবন-ধাম,
গােবিল, পুণ্ডরীকাক্ষ, বিহীন বিরাম
করেন বিহার যথা গােপীগণ-সনে,
বিমােহিতা যাঁ’রা হেরে মদনমােহনে।
ভ্রমর-চঞ্চল আঁখি কমল-বদনে,
ফুলশরে প্রপীড়িতা, উৎসুক মিলনে।
পীন তুঙ্গ স্তন-ভারে তনু অবনত,
সমুজ্জ্বল মুক্তাহার তায় বিলম্বিত।
শিথিল কবরী বাস, রসালসা বাণী,
দশনােজ্জ্বলবদনা সহস্র গােপিনী,
নানাভাবে, নানারূপে প্রার্থয়ে যাঁহারে,
ভজ সে পুরুষােত্তমে হৃদয়-আগারে।
প্রফুল্ল কমল সম সে বিধুবদন,
শিরে শােভে শিখি-চূড়া নয়ন-রঞ্জন।
উদার কৌস্তুভ অঙ্গে পীতাম্বর-পরা,
নয়ন-উৎপলে যাঁ’রে পূজেন গােপীরা।
গােষ্ঠের গাে-পাল আর গােপগণমাঝে
গােবিন্দ সুন্দর তিনি, মুখে বেণু বাজে।
অনুদিত—১৩০৫
শ্রীশ্রীরাধিকা
হেমাভা, দ্বিভুজা ভজ বরাভয়করা,
শ্যাম-ক্রোড়নিবাসিনী, রক্তাম্বরপা,
উজ্জ্বলা সিন্দুর-রাগে, লােলাক্ষী, চিন্ময়ী,
ভগবতী, শ্রীরাধিকা, নিত্যানন্দময়ী,
বিধুমুখী, বিম্বাধরা, নবীনা রমণী,
দিব্যাঙ্গনা, সালঙ্কারা, শ্যাম-বিলাসিনী ।
অনুদিত—১৩০৫
৩
গােলাপ-যুগল
( তরু দত্তের ‘Two Roses’এর অনুবাদ)
।
শ্যামল নিকুঞ্জে
অলি নাহি গুঞ্জে,
নীরব নিথর প্রকৃতি-কানন।
গােলাপসুন্দরী,
স্বভাব-বালিকা,
নীরবে কাঁদিছে, ঝরিছে নয়ন।
নিম্নে তার এক
অফুটন্ত কলি
দুলিছে মৃদুল মৃদুল অনিলে।
ফুটন্ত গােলাপ
কাঁদিছে কেবল,
ভাসিছে বয়ান নয়ন-সলিলে ।
এমন সময়ে
কবি ধীরে ধীরে
জিজ্ঞাসিল তায়—‘কেন কাদ বালা।
কহিল গােলাপ,
নিৰ্মলা বালিকা,
শুন ব্যথিজন হৃদয়ের জ্বালা’ ।
৪
গােলাপ-যুগল
‘উন্মুক্ত হইলে
“নিম্নে মম ওই,
কর দরশন,
রয়েছে একটী মুকুল সুন্দর।
থেকে থেকে কহে,
মুদিত হয় না কাহার(ও) অন্তর।
খুলেছে আমার
হৃদয়-কোরক,
ভয় হয় পাছে—ঝরে পড়ি হায়।
শুকা’য় পাপড়ি,
উড়ে যায় বাস,
শান্তিহীন হই আমি এ ধরায়।”
অনূদিত সন ১৩০৪, ইং ১৮৯৭
সঘ-কার্তিক, ১৩২৯
৫
সমাধিমন্দির ও গােলাপ
( তরু দত্তের ইংরাজি হইতে )
সমাধি-গহ্বর বলে,-
‘নিশির শিশির-জলে—
কি কর লইয়া তুমি-প্রভাতের ফুল’ ?
“কি কর লইয়া তারে—
পড়ে যাহা তবােদরে,
জিজ্ঞাসে গােলাপ—‘ওরে আবৰ্ত্ত অকুল ?
ধীরে ধীরে কহে বালা-
‘ল’য়ে সেই অশ্রুমালা
বিলাই সৌরভ—যাহা কবিরা আদরে।
উত্তরে কহিল তায়-
‘প্রতি আত্মা যাহা পায়,
একটি স্বর্গীয় জীব তাহে সৃষ্টি করে।
অনুদিত—সন ১৩০৪, ইং ১৮৯৭
প্রণয়-উন্মেষ
চিত্রাযুক্ত মধুময় সেই মধুমাসে,
বাসন্তী বসনপরা যৌবন-উন্মেষে,
তুলিতে তুলিতে ফুল দাড়াইল ধীরা,
আহিরিণী-বালা সে যে প্রাণমনােহরা !
কে যেন কাণের কাছে সুললিত স্বরে
কহিল কিসের কথা অতি ধীরে ধীরে।
কি যেন নূতন প্রীতি বাজিল মরমে,
আবেশে অবশ তনু হইল সরমে।
কোকিল কূজিল কুঞ্জে ললিত উচ্ছাসে,
গুঞ্জিল ভ্রমরকুল কুসুম-সকাশে।
মলয়-অচলবাহী অনিল বহিল,
মরমের কথা মনে সকলি মিলিল ।
শুনায়েছে দেবদূত কথা সুমধুর
প্রেম-ভালবাসা-মাখা প্রণয় প্রচুর।
রচিত-সন ১৩০৪, ইং ১৮৯৭
প্রার্থনা
( মহামারীতে )
বিশ্বনাথ কর রক্ষা এ বিশ্ব তােমার,
আর্তনাদে হাহাকারে পূর্ণ চারি ধার।
দেখিতে পারি না প্রভু এ ভীষণ দৃশ্য,
ছারখার কেন কর এই মহাবিশ্ব ?
সহিতে পারি না, দেব, এ হেন যন্ত্রণা,
ক্ষুদ্রমতি নরগণে কর হে করুণা।
সুতহারা জননীর রােদনের ধ্বনি,
মর্মভেদী আর সব বিলাপ-কাহিনী,
শ্রবণে না হয় সহকাতর কিঙ্কর,
ডাকিতেছি তাই তােমা’ ওহে বিশ্বম্ভর।
ভীষণ এ মহারােষ কর সম্বরণ,
কারে করিয়াছ লক্ষ্য -ক্ষুদ্র
জীবগণ!
কটাক্ষে করিতে পার বিশ্বের বিনাশ,
তবে কেন মহামারী -প্রেতের উল্লাস।
তুমি দেব বিশ্বপতি জগতের পিতা,
দূর কর জগন্নাথ তনয়ের ব্যথা।
প্রার্থনা
দুই
তুমি ওগাে জগন্মাতা দয়াময়ী কালী,
বিপদ-সময়ে কোথা আছ রক্ষাকালি !
এস মাতঃ কর রক্ষা সন্তানে তােমার,
প্রেতের তাণ্ডবলীলা নাহি সহে আর।
তুমি ও কি যােগ দেছ বিশ্বনাথ-সনে।
করেছ ক্রোধের পাত্র পুত্রকন্যাগণে!
কুপুত্র যদিও হয়, জননী কখন
নিঠুরা নহেন—জানে ত্রিভুবন-জন।
তবে কেন বিশ্বনাশ হয় মা-আমার!
তুমি না করিলে রক্ষা, কে রক্ষিবে আর!
ওই শুন কঁাদে তব সুতসুতাগণ,
কৃপাময়ি কৃপা-কণা কর বিতরণ
চারিদিকে হাহাকার রােল রােদনের,
এ দৃশ্য কি লাগে ভাল নয়নে মায়ের।
এস মাতঃ জগদম্বে জীবে দয়া কর,
বিশ্বের মঙ্গল মাগে কিরণ-কিঙ্কর।
প্রার্থনা
(পণ্ডিতবর বরদাকান্ত স্মৃতিভূষণ কৃত অনুবাদ)
হাহাকারসমাকীর্ণমাৰ্তনাদনিনাদিতং।
সমন্তাদৰ ভাে বিশ্বং বিশ্বনাথ দয়াময় ।
হে দেব ভীষণং দৃশ্যং ন শক্লোম্যবললাকিতুং।
কথং বা ত্বং মহাবিশ্বং বিনাশয়সি সাম্প্রং।
ভবেল্পমতীনান্তু নরাণাং যন্ত্রণাহস।
অতঃ পশুপতে দেব কৃপয়া করুণাং কুরু।
নষ্টপুত্রা চ জননী যদা বিলপতি প্রভাে।
মৰ্ম্মভেদী তদাসহঃ শ্রবণে লােদনধ্বনি।
কিং বিলক্ষ্য মহান্ ক্রোধাে জায়তে জগদম্বর।
কুরু সম্বরণস্য যাচতে কিঙ্করঃ প্রভাে॥
ত্বমবশ্যং কটাক্ষেণ বিশ্বমহো বিনাশিতুং।
কথং জীববিনাশায় মহামারীমুপাদিশঃ ।
ত্বমেব ধাতা পাতা বিশ্বমূৰ্তে দয়ানিধে।
বিশ্বপাবন দেবেশ বিদ্রয় সুতব্যথা।
প্রার্থনা
দুই
সমাগচ্ছ জগন্মাতঃ কালিকে করুণাময়ি।
বিপৎকালে মহামায়ে রক্ষ ত্বং নিজসন্ততী |
প্রেতানাং তাণ্ডবং ঘােরমসহং ভবভাবিনি।
রক্ষাকালি ধরাপালী ত্বমেব সুতবৎসলে।
বিশ্বনাথেন চ সমং ত্বং বিযুজ্য শবাসনে।
কিমকাষীম হাক্রোধং দারুণং অসুতেষু চ ॥
যদি পুত্র কুপুত্রঃ স্যাৎ জননী নিষ্ঠুরা কদা।
ন ভবেৎ কালিকে মাতৰ্বিদিতেতি জগজ্জনে।
কথং বিশ্ববিনাশঃ স্যাৎ তদ্বদস্ব দিগম্বরে।
যদি নাে রক্ষসি ত্বং বৈ কোবা ত্রাতা ভবেদিহ।
শৃণু প্রাজ্ঞে মহামায়ে ক্ৰন্তি চ সুতাস্তব।
কৃপাময়ি সুতে দেবি বিতরস্ব কৃপাকণাং।
হাহাকারশ্চতুর্দিষ্ণু ধ্বনিৰ্বা ক্রন্দনস্য চ।
ঈস্পিতঃ কিং ভবেতনয়নৈরবলােকিতঃ ।।
জীবশিবপ্রদে দেবি জগদম্বে দয়াং কুরু।
বিশ্বস্য মঙ্গলং যাচে কিঙ্কর কিরণঃ শ্রিয়া ।
রচিত—১৩০৫, ইং ১৮৯৮
১১
মেঘনাদবধ
( প্রস্তাবনা)
জগতের আদি কবি,
কবিকুল-মহারবি,
ক্রৌঞ্চ-দুঃখে হয়ে দুঃখী রচিল যে গান।
তাহার (ই) আভাস ল’য়ে, বাণী-প্রেমে মত্ত হয়ে,
জগতের কবিকুল তুলিতেছে তান!
অপূৰ্ব শ্রীরাম-কথা,
মহর্ষির মহাগাথা,
কি মাধুৰ্য্য, কি সৌন্দৰ্য ঢালিল ধরায়।
সৌন্দৰ্য্যতরঙ্গ-ভঙ্গ
লাগে-ভাসে ক্ষুদ্র বঙ্গ,
‘শ্রীমধুসূদন’ জাগে তাহার প্রভায় !
শ্রেষ্ঠ কবি নব্য বঙ্গে,
তুলনা কাহার সঙ্গে,
অতুল রচনা তব বঙ্গ-কাব্যোদ্যানে।
তােমার মহিমা গাই
দীন মােরা—সাধ্য নাই,
চিরাঙ্কিত তব যশ বাঙ্গালীর প্রাণে।
মেঘনাদবধ
মধুচক্র অভিনব,
সার্থক রচনা তব,
নিরবধি পিয়ে সুধা যাহে গৌড়জন।
আজি অভিনয়ে তার অমৃত কি উঠে ক্ষার
দূর হতে দেখ কবি শ্রীমধুসূদন।
যদি হয় পরাজয়,
লভিব তব অভয়,
এই আশে, কবি তােমা’ করি আবাহন।
সকলে হলেও রুষ্ট, থাকিবে হে তুমি তুষ্ট,
দোষ ফেলে, গুণ তুমি করিবে গ্রহণ।
যে বেশে সাজাক সুতে, অবিধি বা বিধি-মতে,
পিতা সদা হৃষ্ট হৃদে তনয়ে নেহারে।
যদি অশিক্ষিত মূঢ়ে
মহাদেবে দৈত্য গড়ে,
‘মধু-পাশে পাবে মধু—এই আশা করে।
সােসিয়াল ইউনিয়নের
ভাদ্র-১৩১৬ ( ২২৮১৯০৯-বাগবাজার
মেঘনাদবধ অভিনয়কালে)
কবে-চাৱত
( প্রস্তাবনা )
যখন যখন হয়
ধরম কালিমাময়,
অধৰ্ম্ম জাগিয়া উঠে ধরণী-মাঝারে ।
জগৎ-ব্রহ্মাণ্ডপতি ভাবিয়া জীবের গতি,
অবতীর্ণ হন আসি’ অবনী উপরে।
নব নব মূৰ্ত্তি ধরি’
নব কাৰ্যে অবতরি,
দেখান জগৎ-জনে লীলা অগণন ।
সাধিতে বিশ্বের হিত সগুণ ত্রিগুণাতীত,
জীবােদ্ধার মহাব্রত করেন ধারণ
প্রচারিতে নীতি-মৰ্ম্ম, অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম,
অবতীর্ণ একদিন ‘বুদ্ধ-তথাগত।
যার
পূত
মহিমায়
মানব নির্বাণ পায়,
তারি কথা আজি নাট্যে হবে আলােচিত।
প্রতীচ্য পণ্ডিত কবি আঁকিল সুন্দর ছবি,
‘এসিয়া-আলােক’ নামে মহাকাব্য তাঁর।
হেরি’ সে অপূর্ব চিত্র, চিত্রিলেন এ চরিত্র
বঙ্গের গিরিশচন্দ্র শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ।
১৪
বুদ্ধদেব-চরিত
মহাকবি তুলিকায় সে চিত্র যা শােভা পায়
ক্ষীণা এ লেখনী তাহা প্রকাশিতে নারে।
নাটকের প্রতি পত্রে,
বেজে উঠে ছত্রে ছত্রে
স্বর্গীয় সঙ্গীত-ধ্বনি প্রাণ-মন হরে।
বঙ্গ-রঙ্গমঞ্চোপরি যার অভিনয় হেরি,
বুঝিল অহিংসা ধৰ্ম্ম শ্রেষ্ঠ সনাতন।
তুলে দেয় ‘বলিদান,
বাঁচে তায় পশু-প্রাণ,
‘হিংসায় কি কভু হয় ধৰ্ম্ম-উপার্জন।
আজি সেই নাট্যকারে
ভক্তিভরে পূজিবারে,
করিয়াছি মােরা এই শুভ আয়ােজন।
জানি বহু দোষ হবে, নির্দোষ কে আছে ভবে,
শিক্ষাদানে তৃপ্ত কর ওহে বুধগণ।
কিন্তু এই অভিনয়ে যদি কৃতকার্য হয়ে
সমিতির সভ্যগণ পায় যশ-কণা।
বুঝিবেন সুধীজনে, নহে সে তাদের গুণে,
যশের কারণ—সিদ্ধ-কবির রচনা ।
বাগবাজার সােসিয়াল ইউনিয়ন—৪র্থ বাৎসরিক অধিবেশন, রবিবার ১৮ই
ফাগুন, ১৩১৯, ইং ২রা মার্চ, ১৯১৩
নাট্য-মন্দির-চৈত্র, ১৩১৯
অবসাদে-আকাঙ্ক্ষা
বহু দিন হতে
হয়েছে নীরব,
সারস্বত-বীণা বাজে না আর।
সারদা-পূজার
‘জয়-জয়’-রব
ওঠে না ঝঙ্কারি’, ওঠে না তার!
অকালেতে জরা
পশিয়াছে দেহে,
ব্যাধির জ্বালায় পীড়িত প্রাণ।
দানব বসেছে
দেবতার গেহে,
কে আর তথায় গাহিবে গান।
শােকে-তাপে শত
জ্বলিয়াছে মন,
কাহারে কহিব সে সব কথা !
পিতা, মাতা, ভ্রাতা করিয়া হরণ,
নিঠুর শমন দিয়াছে ব্যথা।
অবসাদে-আকাঙ্ক্ষা
একমাত্র মাের
জীবন-সম্বল
অগ্রজের স্নেহ এ পান্থ-বাসে।
প্রাণে দিয়া শান্তি, দেহে আনি’ বল,
রেখেছে বাঁধিয়া মমতা-পাশে ।
কাজ নাই আর
সে সব কথায়,
কে আর শুনিবে মরম-গান।
স্বার্থ ল’য়ে সবে
মিছে হেথায়,
পর-তরে কা’র কাঁদিবে প্রাণ।
হেঁড়া তার জুড়ে
এ দীনা বীণার
ঝঙ্কার কি আর উঠিবে কভু।
বাজিবে কি আর,
গাইবে কি তব বন্দনা প্রভু।
রচিত–১৩২১
১৭
সাদা-বন্দনা
}
এস মা সারদা,
এস মা বরদা,
এস এ বিদ্যা-মন্দিরে।
যতনে পালিয়া, প্রাণ নিবেদিয়া
গড়িল ‘সিষ্টার’ ইহারে।
(২)
তব আগমনে,
নব জাগরণে,
উঠি মােরা সবে জাগিয়া।
বিদ্যা-আরাধনে
মহাবিদ্যা-ধনে
রাখি যেন হৃদে গাঁথিয়া।
প্রভু রামকৃষ্ণ,
জগতের ইষ্ট,
জবা দিল তব চরণে।
কি বুঝিব মােরা জ্ঞানবুদ্ধিহারা,
পূজিব তােমায় কেমনে।
১৮
সারদা-বলনা
(৪)
তােমার প্রসাদে মােরা মনসাধে
নরহিত-ব্ৰত ধরিয়া।
পদে রাখি ভক্তি, পাই যেন শক্তি,
থাকি যেন প্রাণ সপিয়া।
(৫)
জগতের লােকে
মা বলিয়া ডাকে,
আজি গাে তােমায় জননী।
দাও প্রাণে শান্তি, ঘুচে যাক ভ্রান্তি,
প্রেমে ভেসে যা’ক ধরণী ।
রচিত-১৩২২ সাল। নিবেদিতা বিদ্যালয়ের ছাত্রীগণের জন্য।
স্নানপূর্ণিমা
সেই মত চঁদিনী যামিনী,
সেই মত পূর্ণিমা রজনী,
সুধাকর পূর্ণ মুর্তি ধরি’
সমুজ্জ্বল শােভে নড়ােপরি
সেই মত নীরব অবনী,
সেই মত শােভিতা ধরণী,
কিন্তু প্রতি পৌর্ণমাসী-রাতে,
খোঁজে আঁখি কি বা চারিভিতে।
হারাইনু যে রতন সেথা,
কোথা পাব তাহা আমি হেথা
মধুপুরে এবার আসিয়ে,
যাবে তুমি প্রবাস যাপিয়ে :-
স্নান-পূর্ণিমা
ছিল সাধ ও কমল-মনে,
তাই খুঁজি কমল-আননে।
সেই হেথা ফুলের বিছানা,
হেথা কেন তােমায় দেখি না।
মধুপুরে এ ‘লমীনিবাসে
দেবী লক্ষনী কেন না নিবসে।
তব সাধে আসিয়াছি হেথা,
তাহে যদি দূর হয় ব্যথা !
বরষের কাৰ্য-অবসানে,
শরীরের স্বাস্থ্যের বিধানে,
বরাবর সঙ্গে তুমি দেবী,
পেতে সুখ ভগ্ন-স্বাস্থ্যে সেবি’!
পেয়ে তব আলম্বন-বল,
লয়ে তব প্রিয় শিশুদল,
বর্ষে বর্ষে যাই যথা তথা,
পাই নাই কভু কোন ব্যথা
অর্চনা সকলি ত সেই মত আছে, সব ফাকা কেন মোর কাছে। তুমিময় ছিল সব ঠাঁই, তােমাহারা এবে কিছু নাই। এই মত মধুর যামিনী, তব সনে কত গাে ভামিনি, কাটায়েছি মধুপুর-বাসে, এবে শুধু চোখে জল আসে। মাঘী-পূর্ণিমার সেই রাতে, ভাঙ্গিয়াছ শােক-শেলাঘাতে, অধমের এ হৃদয়-মন- আর না পূরিবে এ জীবন । রচিত-সন ১৩২৫, ইং-১৯১৮ २२
গিরিশচন্দ্রের প্রতি
প্রতিমা গড়িল যার শিল্পী ‘ধর্মদাস’
প্রাণপাতী পরিশ্রমে—আয়ােজনে যার
‘নগেন্দ্র’ প্রধান কর্মী—করিল প্রকাশ
‘অর্ধেন্দু ‘মহেন্দ্র’ যারে ‘মতিলাল’ আর,
‘শিশির’ দেবেন্দ্র’ ‘বেণী’ পরামর্শ-দানে
সুপথে চালিত করি’ রাখিল যাহারে,
‘যােগেন্দ্র’ ‘কিরণ ক্ষেত্র’ ‘মাধব’ ‘ভুবনে
নিজ নিজ শক্তি ঢালি’ সুরস সঞ্চারে,-
ত্রিধারা ‘অমৃত বহি পরে পরে যথা
নিত্য নব নাট্যরঙ্গ করিল লেপন ;-
হে আচাৰ্য—তুমি যার প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা,
পঞ্চাশৎ বৰ্ষ তার হইল পূরণ ।
তুমি কবি, তুমি গুরু-বঙ্গ-রঙ্গাঙ্গণে,
‘থাকিবে ‘গিরিশ’ নাম জাতির স্মরণে।
-
রচিত ই ডিসেম্বর ১৯২২-২১এ অগ্রহায়ণ ১৩২৭
বঙ্গীয় নাট্যশালার জন্ম সুবর্ণ-জুবিলি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত মহতী সভায়
পঠিত ও বিতরিত ইং ৯-১২-১২২, বাং ২৩৮-১৩২৯
উদ্বোধন
দিন আসে, দিন যায়, রেখে যায় স্মৃতিমাত্র তার।
শােক, সুখ, হর্ষ, ব্যথা, সুধামৃত, গরল-উদগার ।
বর্ষে বর্ষে, দেশে দেশে কত আশা জাগে মনে মনে
আকুল আগ্রহে কত ছুটাছুটি নিত্য নিশি-দিনে।
নিজ-নাভি-গন্ধ-মােহে ছােটে জীব ভূমানন্দ-আশে।
পায় যাহা লয় তুলে—হৃদে ধরে কত ভালবাসে।
কেটে যায় মােহ-স্বপ্ন, ছিড়ে যায় অনিত্যের জাল।
ব্যথিত মানব-হৃদি নিত্য নব জুটায় জঞ্জাল।
সংসারের রূপ-মােহে ঝাঁপ দেয় মৃগতৃষিকায়।
গঞ্জনা লাঞ্ছনা কত, তবু মােহ নাহি কাটে হায় ।
দেহকে সর্বস্ব ভাবি কত যত্নে তাহারে সাজায়।
অন্তরীক্ষে কাল-ব্যাধ প্রাণ-পাখী হ’রে লয়ে যায়।
জীবন-যৌবন-ধন—সার যাহা নর-আকাঙক্ষার।
ক্ষণস্থায়ী মরীচিকা-আত্মহারা মহাবৰ্ত্তে তার ।
২৪
উদ্বোধন
মিথ্যার সমাজ গড়ি সম্বন্ধ পাতিল শত শত।
বিজ্ঞ অজ্ঞ, সাধু হীন, বীর ভীরু, যােগী ভােগী কত।
রাজা প্রজা, উচ্চ নীচ, জাতিভেদ বৈষম্য অপার ।
ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম, মতামত, দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ চলে অনিবার।
বিশিষ্টতা লয়ে নিজ মহাদন্তে করে আস্ফালন।
আমিত্বের ক্ষুদ্র গণ্ডী আনে সদা বিপ্লব ভীষণ৷
চক্ষুষ্মন কেহ কেহ সত্য-তত্ত্ব পাইয়া সন্ধান।
আনন্দের অংশ ল’য়ে বিতরিতে হয় ধাবমান।
স্বার্থ-অন্ধ বদ্ধ জীব চণ্ড-নীতি করিয়া আশ্রয়।
সত্য নিত্যে দেয় বাধা, সুরে নাশি’ অসুরের জয়।
নিবিড় তমসাচ্ছন্ন পরস্পরে করিছে আলাপ।
কবে যাবে কেটে মােহ, বন্ধ হবে বিকার-প্রলাপ।
নিত্য-মুক্ত স্বভাবেরে কে পারে বাঁধিতে বিশ্বমাঝে।
অণীয়ানে, মহীয়ানে, সৎ-চিৎ-আনন্দে যে রাজে।
দূর কর দুর্বলতা, সঙ্কীর্ণতা, বৈষম্য-বিদ্বেষ।
স্বরূপ চিনিয়া লহ, তুমি নর অব্যয়, অশেষ ৷
সন্ত্রাসিত কেন হবে—হেরি’ নিজ প্রতিবিম্ব-ছায়া।
অমৃত-সন্তান তুমি, কার ভয়ে ভীত তব কায়া ॥
অৰ্চ্চনা
জাগিয়ে জাগাও সবে, স্বরূপের দাও পরিচয়।
তােমার দেবত্ব-পাশে পশুত্বের হবে পরাজয় ॥
দু’দিনের, ক্ষণিকের মােহ ফেলি’ জাগ সচকিতে।
শয়তান কভু নারে দেবতার সম্মুখে পশিতে।
অভীতি ইষ্ট-লাভে হও বীর, হও আগুয়ান।
কেহ না রােধিবে পথ, চিরমুক্ত তুমি শক্তিমান।
আত্মার অমৃত-দীপ জ্বালি’ এই আঁধারের পথে।
নববর্ষে লক্ষে লক্ষে দাও দীক্ষা, আনি’ নিজ-মতে।
রচিত-ফুল-দোল, সমবার, ১৭ই বৈশাখ, ১৩৩০-কায়স্থ-পত্রিকা,
বৈশাখ, ১৩৩০
স্বাগত-সম্ভাষণ স্বাগত বঙ্গের প্রথিত শৌৰ্য্য, স্বাগত বঙ্গের অমিত বীৰ্য্য, স্বাগত বঙ্গের বরেণ্য, পূজ্য বিরাট কায়স্থ-জাতি। অমিত প্রতাপ প্রতাপাদিত্য, সীতারাম রায়, ভূষণাদিত্য, চঁদ, কেদার, গণেশাদিত্য- যাদের মহিমা ভাতি। অক্ষয় পূরিল বাণীর ভাণ্ডার, সঞ্চারিল মধু মধুচক্রে তার, দীনবন্ধু দিল নাটক সম্ভার, গিরিশ গৌরব যার । রমেশ রচিল চারু উপন্যাস, (কালী) প্রসন্ন দানিল ‘চিন্তা’র রাশ, সত্যেন্দ্র ছড়া’ল ছন্দের সুবাস সারস্বত অলঙ্কার। २१
অর্চনা
মিত্র রাজেন্দ্র, হরিনাথ আর
বহুভাষাবিৎ জ্ঞানের আধার,
শব্দ ও প্রত্নের বহু অধিকার,
স্বজাতি-মহিমােজ্জ্বল।
বসু জগবন্ধু, সূৰ্য্য, সুরেশ,
দত্ত রাজেন্দ্র, দ্বারিকা, রমেশ,
চন্দ্র, সারদা কীৰ্ত্তি অশেষ,
জাতির গৌরবস্থল।
শােভিছে তারক দান-মহিমায়,
সে রাসবিহারী উজ্জ্বল আভায়,
এ যুগে তাদের তুলনা কোথায়,
দানবীর মহাতেজা
প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে দেবতা উজ্জ্বল,
বিবেকানন্দ জ্ঞান-প্ৰেমােজ্জ্বল,
ভক্তি ও কর্মে দিগন্ত প্রােজ্জ্বল,
সে যে গাে রাজার রাজা।
২৮
স্বাগত-সম্ভাষণ দেশ-সাধনায় শিশিরকুমার, সে রামগােপাল, মতিলাল আর, লালমােহনের বাকপটুতার- তুলনা কি কভু হয়। মনবিমােহন সে মনােমােহন, ঘােষ নগেন্দ্র প্রতিভারঞ্জন, আনন্দোজ্জ্বল আনন্দমােহন চির-কীর্তিমান্ রয়। ক’ব কত নাম বীর-মনীষীর, ছিল অলঙ্কার এ মহাজাতির, ক্ষাত্র মহিমায় উন্নত শির— বঙ্গের সুসন্তান। এই সে জাতির মহা-সম্মেলন, এস কায়স্থ-ধুরন্ধরগণ, প্রীতি ও অর্ঘ্যে করি আবাহন স্বাগত জাতির প্রাণ কায়স্থ-পত্রিকা–১৩৩০-বার্ষিক কাৰ্যবিবরণী, ৯ ২৯
বােধন
বসেছে বােধন, হবে আবাহন,
জগত-জননী আসিবে ঘরে ।
বরষে বরষে দেবী-আরাধন
করে গাে বাঙ্গালী প্রেমের ভরে।
কি জানি কি হয়, উঠে দেশময়
পূর্ণ আনন্দের তরঙ্গ-খেলা!
মরুভূমি-মাঝে ফুটে ফুলচয়,
বসে যায় যেন প্রেমের মেলা।
কি আছে, কি দিব, ও মা দশভুজা,
দীন-হীন মােরা জগত-মাঝে।
কি দিয়া করিব তব মহাপূজা,
কি দিব চরণ-রাজীবরাজে।
নাই মণি-মুক্তা, নাই আভরণ,
কি দিয়া সাজা’ব সােণার গায়।
হীরক-খচিত মুকুট-ভূষণ
ভিখারী তনয় কোথায় পায়।
রােগ-শােক-তাপে সদা জর্জরিত,
কাহার(ও) মতির স্থিরতা নাই;
মােহগ্রস্ত হয়ে বিপথে চালিত,
ভায়েরে হানিছে আপন ভাই।
কি জানি কি মােহে মােহিত সকলে,
আত্মশক্তি পরে বিশ্বাসহীন।
ভাবিত যাহারা সিংহ-শিশু ব'লে,-
আজ কেন তারা এতই দীন।
একমাত্র আছ—অন্য কেহ নাই,
তােমার (ই) এ কথা পুথিতে গায় ;
তবে কেন আজ পৃথক সবাই,
চিনিতে স্বরূপ কেহ না চায়।
অর্চনা
কবে মা, তােমার কৃপায় নরের
অন্তরের দ্বার খুলিয়া যাবে ।
ভেদ-বুদ্ধি কবে ঘুচিবে জীবের,
কবে আত্মতত্ত্ব স্বরূপ পাবে ।
এস মা, দীনের দুর্গতিহারিণী,
অসুরদলনী, অশুভইরা !
ত্রিবিধ পেতে তাপিত তারিণি,
এস বৈরিহন্ত্রী চণ্ডিকে, তারা ।
•
তব আগমনে যেন দেশময়
আত্মশক্তি আজ জাগিয়া উঠে
অমৃত-সন্তান হইয়া নির্ভয়—
জাতীয় মুক্তির সাধনে ছােটে।
বৃহস্পতিবার, ২৭এ ভাদ্র, ১৩৩০-কায়স্থ-পত্রিকা, আশ্বিন, ১৩৩০
একগমকানন
পুরাণ-কীৰ্ত্তিত কথা, পুণ্যময়ী সে বারতা,
যুগান্তের ইতিহাস অতীব উজ্জ্বল।
সুরম্য-কানন-শােভা, দেবতার মনোেলােভা,
রসালের রস-গন্ধ বহে অবিরল।
সুবিস্তৃত চূত-তরু,
অতি উচ্চ যেন মেরু,
প্রসারি’ সহস্র শাখা ছিল বিরাজিত।
ছিল পাদমূলে তার, বিরাট বিগ্রহাকার,
স্থানু, অচঞ্চল শিব, বিশ্ব-বিমােহিত।
২
এ কি অপরূপ দৃশ্য,
কে বুঝিবে এ রহস্য,
দশ শত পয়স্বিনী ঢালে ক্ষীর-ধারা।
প্রতিদিন মিলে তথা, ঈশ্বর অব্যক্ত যথা,
নিত্য অভিনব ভাবে প্রেম-মাতােয়ারা।
হেন কালে এল কে সে চারু গােপালিনী-বেশে
দিক্-আলােকরা রূপে মাতায়ে ভুবন।
অপূৰ্ব এ লীলা হেরি, ফিরে ধেনু সঙ্গে করি,
বারাণসী ফিরে যেতে চলে না চরণ।
অর্চনা
বুঝিলেন শ্রীপাৰ্বতী, দক্ষকন্যা, সাধ্বী, সতী,
এই সেই শিব-উক্ত গুপ্ত-বারাণসী ।
ত্রিভুবন-মহেশ্বর,
অপ্রকট লীলাধর,
গুপ্তভাবে গুপ্তলীলা করিছেন আসি।
সুবেশা গােপের নারী, মহারাজরাজেশ্বরী,
গুপ্তভাবে হইলেন লীলার সহায় !
ত্রিলােকের অগােচর, দেবতা-গন্ধর্বব-নর
শিবশক্তি-প্রেমলীলা সন্ধান না পায় !
৪
দৈত্য দুই ‘কীর্তি’ ‘বাস, নরনােক-মহাত্রাস,
অকস্মাৎ আসি' তথা আক্রমে দেবীরে ।
অসুরে ছলিয়া মাতা স্কন্ধোপরি অধিষ্ঠি,
পদে চাপি’ পাঠালেন যমের মন্দিরে !
ধীরে ধীরে ভক্তজন,
করি’ লীলা দরশন,
প্রচারিল লীলা-কথা ললিত ভাষায়।
প্রান্তরে নগর উঠে,
জয়গীতি-ব ফুটে,
গুপ্ত-লীলা কিছু ব্যক্ত ঈশ্বর-ইচ্ছায় ।
৩৪
একাম্রকানন
কেশরীবংশের রাজা
‘ললাটেন্দু মহাতেজা
রচিল দেউল রম্য ভাস্কৰ্য-কলায়
শত শত পরিপাটী, কঠিন প্রস্তর কাটি,
কালহৃত সে সৌন্দৰ্য্য আজো শশাভা পায় ।
ঘেরি’ ত্রিভুবনেশ্বরে
অপূৰ্ব দেউল ধরে,
শত শত দেব দেবী স্থাপি’ সারি সারি ।
প্রকটিল তীর্থস্থান, অনলাকসামান্য দান,
মন্দির হাজার সাতে দেশ গেল ভরি’ ।
৬
কোথা সেই শােভা আজ, এ যে বজ্রাহত সাজ,
গুপ্ত-কাশী লুপ্ত পুনঃ বিধির বিধানে ?
পচিহ্ন-অবশেষ, স্থিতমাত্ৰ কীৰ্ত্তিলেশ,
আঁখি-জল ঝরে হেরি’ দেব-প্রতিষ্ঠানে।
প্রাণ-চিত্ত-বিমােহন, কোথা কীৰ্ত্তি অগণন,
সুবর্ণাদ্রি আলােকরা সুচারু-ভাস্কৰ্য্য।
একাম্রকানন কোথা, কোটি লিঙ্গ ছিল যথা,-
কোথা গেল মন্দিরের সে মহাসৌন্দৰ্য্য ।
৩৫
অর্চনা
৭
শিব শবে পরিণত, নন্দন শ্মশানে নীত,
কত না করিল পাপ হতভাগ্য দেশ।
বিধর্মীর অত্যাচারে সেই পাপ ধ্বংস করে,
দেবতা-মন্দির শত স্তুপে অবশেষ।
পূর্ব-স্মৃতিচিহ্ন যত বিচূর্ণিত আছে শত,
ভগ্ন অঙ্গ, বিদলিত বিগ্রহ অশেষ ।
তাহারি দর্শন-আশে কোটী ভক্ত আজো আসে,
আঁখি-জলে ঈশ্বরের পূজা করে শেষ !
রামেশ্বর’ ‘মেঘেশ্বর’ ‘ব্রহ্মেশ্বর’ ‘সূৰ্য্যেশ্বর
‘সিদ্ধেশ্বর’ ‘মুক্তেশ্বর নানা দেবালয় ।
পঞ্চকুণ্ড-প্রতিষ্ঠান,
‘গৌরী-কেদারের স্থান,
আশেপাশে আরাে কত আছে শিবালয় ।
কোটিতীর্থ-কুগুতীরে, দেউল ভাঙ্গিয়া পড়ে,
কত না বিগ্রহ আজ যায় গড়াগড়ি।
মন্দির-অঙ্গন যত
শস্য-ক্ষেত্রে পরিণত,
ভগ্ন দেউলের অংশ পড়ে ছড়াছড়ি।
একাকাম
বিপুল বিশালকায় বিন্দুর শােভা পায়,
গঙ্গা-আদি পুণ্যতােয় বিন্দু বিন্দু ধরি’!
নষ্ট হত পাপরাশি যে করিত স্নান আসি
পবিত্র এ তীর্থোদকে শ্রদ্ধা ভক্তি করি।
আবর্জনা পূর্ণ বারি, ভগ্ন সােপানের সারি
পরিচ্ছন্ন নাহি করে, ঢালে মলারাশি।
ধর্মপ্রাণ হিন্দুগণ
আজো করে নিমজ্জন
মহাতীর্থ গণি’ সরে দূর হতে আসি’!
বাঙ্গালীর কীর্তি গায়, তীরে তা’র শােভা পায়
বিরাট দেউল এক সুন্দর দর্শন।
স্থাপিলা সে ‘ভবদেব’ এ ‘অনন্ত-বাসুদেব,
“রাম-কৃষ্ণ’ দুই ভাই নয়ন-শােভন।
যত যাও, দেখ তত, পড়ে আছে শিব শত,
নাম নাহি জানে তার অজ্ঞ দেশবাসী ।
দেবদেবী-মূর্তিভেদ, নাহি জানে ভেদাভেদ,
শিব-শক্তি-বিষ্ণু-রবি এক হেথা আসি।
৩৭
অর্চনা সম্মুখেতে উৰ্দ্ধ-চূড়া, অপূৰ্ব দেউল-বেড়া, ভুবন-ঈশ্বর রাজে ত্রিভুবন-শােভা! নয়নে চমক লাগে, পলক পড়ে না আগে, বিরাট সৌন্দৰ্য-ভরা প্রাণমনােলােভা। পঞ্চদশ-শত-বর্ষ ব্যাপিয়া উথলে হর্ষ- এ মহতী চারু-শােভা প্রস্তর-রচিত । গম্ভীর বিরাটকায়, বৰ্তমান লজ্জা পায় অতীতের স্মৃতি হেরি’ ভাস্কৰ্য্য-খচিত । দ্বারে শােভে প্রজাপতি, তার আগে ‘গণপতি, রয়েছে ‘বৃষভ-স্তম্ভ’ নয়নের আগে ! পরে তার ভােগালয়, সঙ্গে গাথা ‘নাট্যালয়, অপূর্ব ‘জগমােহন’ তার পুরােভাগে ! শেষ শােভে ‘শ্রীমন্দির, অপরূপ সে প্রাচীর, স্থাপত্যের, ভাস্কর্যের অপূর্ব গঠন। আজো শ্রেষ্ঠ শিল্লিগণ, হয়ে বিমােহিত মন, শতমুখে করে তার প্রশংসা কীৰ্ত্তন। ৩৮
একাকানন
‘কালাপাহাড়ের কীৰ্ত্তি এখানে উজ্জ্বল অতি,
যবন কোথায় লাগে ধর্মভ্রষ্ট-পাশে।
ভগ্ন-হস্ত, ভগ্ন-পদ, চূর্ণিত শােভা-সম্পদ,
কৰ্ম্মনাশা, কীর্তিনাশা কীর্তি দেব-বাসে।
হতশ্রী সুরসুন্দরী ‘সাবিত্রী ‘ভুবনেশ্বরী,
‘অন্নপূর্ণা’ ‘শ্রীপাৰ্বতী’ চারু মনােহরা।
বিশাল মন্দির-কায় ‘গুহ’ ‘গণপতি’ ভায়,
ভগ্ন-দেহা ‘উমা সতী পীন-পয়ােধরা।
১৪
বিমর্দিত আরাে কত
দেবদেবী শত শত
বিরাজিত চারিধারে ‘নর-সিংহ আদি।
‘লক্ষমী-নারায়ণ’ রাজে, বৃষরূপী নন্দী সাজে,
‘গঙ্গা’ ও ‘যমুনা’-কূপ—অমৃতের নদী।
সুবিশাল পাকশালা, সু-উচ্চ প্রাচীরমালা,
গম্ভীর তােরণ তিন-তিন দিকে তার ।
পশ্চিমেতে কুণ্ডে ধৃত
শিবজ্ঞান-পঞ্চামৃত,
অমৃতের প্রস্রবণ ছিল গর্ভে যার ।
অর্চনা
দক্ষিণ প্রান্তরমাঝে,
কাল-ভৈরবের সাজে,
কপিলেশ্বর-কালিকা বিরাজে শােভায় !
প্রাচীন কালের স্মৃতি রয়েছে উজ্জ্বল অতি,
কুণ্ড-কূপ-সুদেউল—অপূৰ্ব আভায়।
উত্তর প্রান্তরে নব,
অপরূপ সমুদ্ভব,
“ব্রহ্মানন্দ’-প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ-ধাম।
বিস্তৃত প্রাচীরে ঘেরা, মঠশােভা মনােহরা,
তপস্যা-সাধনালয় নয়নাভিরাম ।
ধ্যান-যােগে জানি’ সত্য, গুপ্তকাশী মহাতত্ত্ব,
প্রচারিল যােগিরাজ ভক্তের সকাশে।
তাই আজ হেথা সেথা মঠাশ্ৰম হয় গাথা,
আসিতেছে বহু ভক্ত সাধনার আশে ।
জ্ঞান হয়—অল্পদিনে,
পূৰ্ব্বকথা ল’য়ে জেনে,
হরগৌরী-হরিহর-মিলনের স্থানে
সাধন-ভজন-আশে, পবিত্র এ শিৰবাসে,
আসিবে অযুত ভক্ত নানা প্রতিষ্ঠানে।
রচিত—১১১২-৩১৩৩• ইং ২৫/২৬-৬-১৯২৩
মাসিক বসুমতী-কার্তিক, ১৩৩০
s
নাট্যসম্রাটমহাকবি গিরিশচন্দ্র
‘হরচন্দ্র’ ‘তারাচঁাদ’ নাটুকে ‘না’ণ,
‘লক্ষীনারায়ণ সুধী ‘হরলাল’ আর
মধুকর ‘মধু আনি’ বিদেশীর দান
করিল যে বিগ্রহের গঠন-সঞ্চার ;-
“দীনবন্ধু’ নব রঙ্গে করিয়া চিত্রণ
সাজাইল সুকৌশলে বর অঙ্গ যার ;-
তুমি গাে পূজারি-রূপে পাইয়া বরণ,
প্রতিষ্ঠিলে প্রাণ সেই নাট্য-প্রতিমার !
পাইয়া তােমার পূজা নানা উপচারে,
বঙ্গ-নাট্য-বাণী আজ দেবতা নির্মল।
প্রাণময়ী সে প্রতিমা রত্ন-অলঙ্কারে
নাট্যপীঠ আলাে করি’ করে ঝলম।
বঙ্গের গিরিশরূপে এবে সম্মানিত।
জগৎ চিনিলেহ’বে জগৎ-পূজিত !!
কায়স্থ-পত্রিকা-মাঘ, ১৩৩০
৪১
কুলােদ্ভব কবি মধুসূদন
( ১ )
বিপদে ডাকিল তােমা, হে মধুসূদন,
দীনা বঙ্গভাষা—পরিত্যক্তা, উপেক্ষিতা
আপন সন্তান-পাশেEমত্ত অনুক্ষণ
শ্বেতদ্বীপ-নিবাসিনী নবগৰ্বোন্নতা
বাণীর চরণ-পদ্ম-পীযূষ-সন্ধানে।
জীবনের উচ্চ-সাধে দিয়া জলাঞ্জলি
সাজাইলে মাতৃ-অঙ্গ—সেই নবােন্ধানে
বঙ্গবাণী-কুঞ্জবনে কোকিল-কাকলি
উঠিল পঞ্চমে, বীণার ঝঙ্কারে তব ।
আজো সে সুরের সুধা পিয়ে গৌড়-জন,
আনন্দ-গৌরব হৃদে করি’ অনুভব,
মহাকবি, তব নাম করিছে কীৰ্ত্তন!
শত বর্ষ আগে তুমি এসেছিলে কবি,
লহ শ্রদ্ধা, লহ অর্ঘ্য কবিকুল-রবি।
৪২
শ্রীমধুসূদন
( ২ )
মেঘ-মন্দ্রে মেঘনাদ উঠিল গজ্জিয়া
সাগর-কুন্তলা-লঙ্কা-প্রমােদ-উদ্যানে।
কত শত বর্ষ পরে পর্বত লঙ্ঘিয়া,
সে ধ্বনি পশিল বঙ্গ-কবিকুঞ্জবনে।
বীরনাদে হুঙ্কারিয়া শ্রীমধুসূদন
শুনাইল বীর-কথা বীরের ভাষায় ;
শব্দের ঝঞনা তার ধ্বনিয়া শ্রবণ,
সঞ্চারিল নবশক্তি কাব্য-মহিমায়।
মধুর সকলি মধু—কিবা ব্রজাঙ্গনা,
পদ্মবতী, বীরাঙ্গনা, সে কৃষ্ণকুমারী,
কবিতা চতুর্দশপদী—ছন্দের ব্যঞ্জনা,
সভ্যতা, শালিখ-চিত্র, শর্মিষ্ঠা-সুন্দরী।
প্রতিভা সততামুখী-কবি-কুলােজ্জ্বল,
তােমার সেবায় বঙ্গ-বাণী সমুজ্জ্বল।
বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের মধুসূদন-শত-বার্ষিক-জমােৎসব সভায় পঠিত
শনিবার, ১২ই মাঘ, ১৩৩০-কায়স্থ-পত্রিকা, মাঘ, ১৩৩০
৪৩
রাধানগর সাহিত্যসম্মেলন
বাণীর চরণ-কমল-সুধায়
এ পল্লী-নগরে তরঙ্গ খেলায়,
কি যে সে আনন্দ কহ নাহি যায়,
চঞ্চল সবার হৃদয়-মন।
ঘেরিয়া বাণীর পদারবিন্দ,
মিলিত সারদা-সেবকবৃন্দ,
বহিছে বিমল সাহিত্যানন্দ,
মুখরিত আজি পল্লী-ভবন ।
৪৪
সাহিত্য-সম্মেলন
এসেছিল সে যে এ-“রাধানগরে,
যাঁর কীৰ্ত্তিগান গায় সমস্বরে
ভারত-বঙ্গের নগরে নগরে,
মহাত্মা সে রামমােহন রায়’!
লইয়া জ্ঞানের নবীন কল্পনা,
এনেছিল দেশে অপূর্ব সাধনা,
ধৰ্ম্ম-অর্জনের নব-আরাধনা
আজিও যাহার মহিমা গায় ।
আসিয়াছে আজ সে মহানগরে,
তীর্থরূপে গণ্য বঙ্গের মাঝারে,-
গুণী, জ্ঞানী, সুধী মহানন্দভরে
সারস্বত-অর্ঘ্য করিতে দান।
ব্ৰহ্ম-সনাতনী গীর্বাণী-বাণী,
ভক্ত-সাধকের হৃদয়ের রাণী,
এস কৃপাময়ি, করুণা প্ৰদানি,
জীবন্মত মােরা জাগাও প্রাণ।
--
কায়স্থ-পত্রিকা-বৈশাখ, ১৩৩১
৪৫
মসি’
( ১ )
বিচিত্র সৌন্দৰ্য্যময় এ বিশ্ব-সংসার
সম্মুখে রয়েছে প্রকটিত।
তপনচন্দ্রমাযুত শােভার আধার,
কি সুন্দর ব্রহ্মাণ্ড কল্পিত।
অনন্ত বিমান ভরা
লক্ষ লক্ষ লােভে তারা,
কি অজ্ঞাত আলম্বনে কা’র--
শূন্যে দোলে অপরূপ বিপুল ব্যাপার!
( ২ )
বিচিত্র উন্নতশির গিরিশ্রণী শত
কোথা হতে এল আচম্বিতে।
নদ-নদী ছােটে কি বা প্রেমে অবিরত,
নাহি কাল কাল-বিলম্বিতে।
কাননকুন্তলা ধরা
ফলফুল-রসে ভরা,
মহােদধি চরণে লুটায় !
এ বিচিত্র চারু শােভা কার কল্পনায় !
তত্ত্বমসি
( ৩ )
স্থলচর, জলচর, বিমানবিহারী
অপরূপ কত জীবােদয় ।
ধীরে ধীরে আবিভূত নানারূপধারী
হ’ল ধরা কত শােভাময়।
অনন্ত কুসুমগন্ধে,
বিহঙ্গের গীতি-ছন্দে,
শান্তিসুখ কি যে ঢলঢল !
জানি কাহার এই প্রেম-পরিমল !
( ৪ )
অফুরন্ত সৃষ্টি বুঝি হ’ল পূর্ণ আজি,
ভাবে ধাতা আছে কি বা বাকী ।
সৌন্দৰ্য-সম্ভারে পূর্ণ এ বিচিত্র সাজি,
(কভু) আসে নাই কল্পনায় না কি।
ধাতার এ ভ্র-কুঞ্চনে
নর-সৃষ্টি ধরা-বনে,
এ কি হ’ল অপূর্ব গঠন !
জগৎ-সংসার কারে করিছে নন্দন ।
( ৫ )
বিশ্বস্রষ্টা বিশ্বরূপ স্বরূপ ধরিয়া
এল কি গাে নামিয়া ধরায়।
৪৭
অর্চনা
কোথা ছিল বর-বধু ধরা বিনােদিয়া
প্রকৃতি প্রণতা যা’র পায় ।
কত না সােহাগভরে,
কত মহাসমাদরে
ফুল-ফল প্রকৃতি যােগায় ;-
ঝঙ্কারি’ বিহঙ্গ কত সঙ্গীত শুনায়।
( ৬ )
যুগ যুগ ধরি’ নর নিল এই সেবা
তৃপ্ত তবু নহে মন-প্রাণ।
জানি কি তৃপ্তি দিবে কোথা হতে কে বা,
কোথা যেন পা'বে পরিত্রাণ ।
বিচঞ্চল সদা মন,
শান্তিহীন অনুক্ষণ,
এত সুখে সুখ নাহি পায় !
কি অজ্ঞাত সুখ-আশে কাহারে ধ্যেয়ায় ?
( ৭ )
ধ্যান-ভঙ্গে সচকিতে হেরিল বিস্ময়ে
বামে বসি’ অনিন্দ্যসুন্দরী।
বিশ্বের ছানিত শােভা নব মূর্তি লয়ে,
সেবা-আশে এসেছে কিঙ্করী।
৪৮
তত্ত্বমসি
এ কি তনু অভিনব,
লাবণ্যের অবয়ব,
জ্যোৎস্না কি মূৰ্ত্তি ধরে এল।
ধাতার মানসী-দেবী মর্ত্যে প্রকটিল।
( ৮ )
রূপ, কান্তি, লাবণ্য ও সৌন্দৰ্য্য, সুষমা,
যেই আখ্যা দাও সে বামারে
ধরণীর শ্রেষ্ঠ শােভা ধরে মনােরমা,
মুগ্ধ নর সে চিত্র নেহারে ।
মানস-আকাঙক্ষা তার,
ধরি’ মূৰ্ত্তি চমৎকার,
এসেছে কি বাসনা পূরাতে !
নাহি আকাঙক্ষার কিছু আর এ ধরাতে !
( 9 )
এই ভাবে নরনারী হ’ল সম্মিলিত,
প্রেমালাপে পাতিল সংসার।
ধীরে ধীরে প্রজা-সৃষ্টি হইল রচিত,
বিরাট এ নর-পরিবার।
ঋষি, মুনি, ত্যাগী,
কত না বিলাসী, যােগী
আসি’ করে পূর্ণ বসুন্ধরা !
মুখর নগর গ্রামে উদ্বেলিত ধরা!
ভােগী,
৪৯
s
( ১ )
তপােবন-শান্তি-শােভা ধরে না ধরণী,
স্নিগ্ধ-সৌম্য-শান্ত নহে আর।
কামনার মােহে দোলে চঞ্চলা অবনী
বুঝে না ক কি অভাব তার।
দর্শন-বিজ্ঞান কত,
বিচিত্র পুরাণ শত,
তন্ত্র-মন্ত্র কত আবিষ্কার
লক্ষ্যশূন্য শান্তিহারা শূন্য চারিধার।
( ১১ )
যােগী কহে ধ্যান ধর, কৰ্ম্মী চায় কৰ্ম্ম,
ভক্তি-পথে ডাকে ভক্তগণ ;
বৌদ্ধেরা বুঝায় আসি নির্বাণের মৰ্ম্ম,
শিব-শক্তি তন্ত্রের সাধন!
সাংখ্য, ন্যায়, মীমাংসায়
কত না রহস্য গায় ।
শত মত, পথের প্রচার।
কোথা’ শান্তি, কোথা’ শান্তি-মানব-আত্মার ।
( ১২ )
দেশ দেশান্তরে এল কত মহাজন
নবতত্ত্ব করিতে ব্যাখ্যান।
তত্বমসি
নিজ নিজ সম্প্রদায় করিল গঠন,
নব নব মতের উত্থান।
আপন ধারণা মত
বেছে লয় নিজ পথ,
রুচি-ভেদে হয় মতভেদ
স্মৃতি তন্ত্র ভিন্ন তাই—তাই ভিন্ন বেদ।
( ১৩ )
কে বা আমি, কি বা আমি, এনু কোথা হতে,
সদা নর নিভৃতে ধ্যেয়ায় ।
কোথা যাব, কি হইৰে, ভাবে কত মতে,
অহরহ কুল নাহি পায় ।
সনাতন এই ব্যথা
মানবের হৃদে গাথা,
নাহি জানে কোথা সমাধান।
এ তত্ত্ব-ব্যথার কবে হবে অবসান।
( ১৪ )
প্রাচীন নবীন মতে করিয়া ভ্রমণ
শ্রান্ত নর নিশ্চিন্ত নির্বাক ।
সে শুভ মুহূর্তে তার হ’ল জাগরণ,
শুনিল সে অন্তরের ডাক।
জীবাত্মা উদ্ব দ্ধ হ’ল,
পরমাত্মা প্রকটিল,
অর্চনা
শ্রুতি গায় ‘তত্ত্বমসি’-গীত ।
গর্জিয়া গাহিল জীব ‘শিবােহহম’ গীত।
( ১৫ )
নিত্য-মুক্ত-বুদ্ধ আত্মা দেহ-আবরণে
মায়া-গ্রস্ত হয় প্রতিভাত।
কোথা হতে এই ভ্রম এল জীব-মনে-
এ অজ্ঞান কেমনে সঞ্জাত।
শাস্ত্র কিছু নাহি বলে,
মীমাংসা না কিছু মিলে
জ্ঞানী দেয় সন্ধান ইহার,---
‘আত্ম-জ্ঞানে কোন স্থান নাহি ক মায়ার
( ১৬ )
ছিল শিবে, আছে শিবে, শিবেই প্রয়াণ,
শুদ্ধচিত্তে জ্ঞান প্রস্ফুটিত।
নাই মায়া, ছিল না ক, মিথ্যা মায়া-জ্ঞান
মায়া-ভ্ৰম মায়ার কল্পিত !
প্রকটিত শাস্ত্র-তত্ত্ব
‘জগন্মিথ্যা ব্ৰহ্মসত্য,
“তত্ত্বমসি'—জীবে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান।
গুরু-শাস্ত্রে শ্রদ্ধা আনে ইহার সন্ধান।
কায়স্থ-পত্রিকা-জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১
ভূপেন্দ্ৰশ্রদ্ধাঞ্জলি
রূপে-গুণে কুলে-শীলে ধনে-মানে সিক্ত,
সৌজন্য-বিনয়ে মাখা তােমার সমান,
যুগ-যুগান্তরে আসি’ ধরা করে দীপ্ত
অবনীর অলঙ্কার, মনীষি-প্রধান !
স্বদেশের, স্বজাতির শিরােন্নত করি,
শত্রু-মিত্রে সমভাবে হৃদয়ে ধরিয়া,
কয় জন যায় গৌরব-মুকুট পরি,
যা’র তরে পায় ব্যথা দেশবাসি-হিয়া !
ধীর, শান্ত, সৌম্য-মূর্তি প্রতিভা-মণ্ডিত,
পূত-চেতা, পুণ্যব্রত, পবিত্র, নির্মল,
পুণ্য-তেজে বরবপু করি’ উদ্ভাসিত,
রেখে গেলে পুণ্যাদর্শ কীৰ্ত্তি-সমুজ্জ্বল
বসু-বংশ বসু-সম হে ভূপেন্দ্রনাথ,
সর্বজন-প্রিয় বীর, লহ প্রণিপাত ।
রচিত--মহালয়া, ১৩৩১-বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ-স্মৃতিসভায় পঠিত
কায়স্থ-পত্রিকা-কার্ত্তিক, ১৩৩১
পুরুষসিংহ আশুতােষ
আকারসদৃশ প্রাজ্ঞ পুরুষ বিরাট,
তেজস্বী, মনীষিবর, কৰ্ম্মযােগিরাজ,
এ বিশাল কৰ্ম্মক্ষেত্রে, হে বুধ-সম্রাট,
তােমা সম কে শােভিবে এ প্রাচী-সমাজ।
স্থিতধী, আত্মবিশ্বাসী তােমার সমান
স্বাবলম্বী আসিবে কি আশু আশুতােষ ।
একছত্র-অধিপতি বাণী-প্রতিষ্ঠান,
বিশ্ববিদ্যালয়-শিরে ধাতার সন্তোষ ।
ধৰ্ম্মাধিকরণে লভি শ্রেষ্ঠ অধিকার
প্রতিভায় প্রতিষ্ঠিলে জাতীয় গৌরব !
নানাভাষা, নানাশাস্ত্ৰ আয়ত্ত তােমার,
চারিদিকে ব্যাপ্ত তব যশের সৌরভ।
স্বপক্ষ বিপক্ষ সবে, জাতি-নির্বিশেষে,
বিলাপিয়া গায় যশ আজি শােকাবেশে।
বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ-স্মৃতি-সভায় পঠিত
কায়স্থপত্রিকা-কার্তিক, ১৩৩১
মধুপুরমধুকথা
পুণ্যতােয়া ভাগীরথী তীরে কলিকাতা।
পশ্চিমে হাবড়া গ্রাম খালি রেলপাতা ॥
এ রেলের একদিকে কলিকাতাপুরী।
ছুটে হাঁপ ছাড়ে যথা ‘কাকা-নগরী ॥
পুরাণ ‘হুগলী’ গ্রাম পরে ‘বর্ধমান।
‘সীতাভােগ “মিহিদানা’ কেড়ে লয় প্রাণ
ভারতচন্দ্রের ছবি সে ‘বিদ্যাসুন্দর।
ফুটে ওঠে এ মালঞ্চে তাজ্জব সহর ।
‘অণ্ডাল’ ‘আসানসােল দুই জংসান।
‘রাণীগঞ্জ “সীতারাম’-কয়লার স্থান।
অর্চনা
ঘােট ঘােট জামে ভরা গ্রাম মিহিজাম।
খােল খােল ফলে জাম ‘জামতাড়া নাম।
কটমট কৰ্ম্মটাড় আছে এক পাশে।
পশ্চিমে রাবণেশ্বর বৈদ্যনাথ’-বাসে ।
মাঝে শােভে ‘মধুপুর’ খালি মধু-ভরা।
কূপ-জলে ছােটে সদা সুধার ফোয়ারা।
সাওতাল-পরগণা মাঝে এই গ্রাম।
বহু জাতি সমাবেশে বহুজাতি-ধাম।
ফিরিঙ্গি ও মাড়ােয়ারী, হিন্দু, মুসলমান।
বাণিজ্য ও হাওয়া-খেতে সবে আগুয়ান।
ঘাটোয়াল ‘টিকাইত’ আছে বটে রাজা।
‘ম্যানেজার সর্বেসর্বাশাসে সব প্রজা
“কুণ্ডুর বাংলায় জোড়া আধখানা গ্রাম।
‘নীলমণি মিত্র’ গঠে বহুবিধ ধাম।
পশ্চিমে ‘বাহান্ন-বিঘ’ ‘স্মিথে’র ভবন।
‘আর, মিত্র করে তা’রে নন্দনকানন ।
ফুল-ফল-শাকসজী ক্ষেত্রজ সম্ভার।
দেশ-মিত্র ‘হহম মিত্র দেখাল অপার ।
প্রদর্শনী খুলি গ্রামে নাম দিল তার।
অপূর্ব মিনায় ভরা সে ‘মিনাবাজার’ ।
মধুপুর-মধুকথা
‘পাণিখােলা’-মুখপাতে ‘ঠাকুর-কুটীর’ ।
‘বলাই-ঔষধালয় সুন্দর প্রাচীর ।
ধন্য হে ‘বলাই দত্ত’ বিপন্নের বন্ধু।
কত না করেছ হিত করুণার সিন্ধু ।
দক্ষিণ-পশ্চিমে শােভে সুবিশাল ‘বট।
যুগান্তের সাক্ষী এক পুরাতন নট।
‘পাথর-চাপটি সুরু ‘রেষ্ট বাঙলায়।
জজ ‘গুরুদাস’ গড়ে সুন্দর আলয়।
‘রাম মিত্র’ বেচে বাড়ী ‘ঝেরিয়া বাজারে।
‘সাধু স্থাপে ‘সাধু-সংঘ' ‘ফুলচির’ পারে ।
‘এওয়ার্ড বিদ্যালয়’ ‘পুলিশ’ ‘কাছারী।
সম্মুখেতে ওই দেখ ‘ম্যানেজার-বাড়ী
পাশে মাঠে ফুটবলে মত্ত যুবাদল।
খৃষ্টের গির্জায় ভজে ফিরিঙ্গিমহল।
ফিরিঙ্গি-বাঙ্গালী-ক্লাব, আছে থিয়েটার ।
মরুভূর মাঝে যথা মরূদ্যান সার।
মাড়ােয়ারী ‘রামযশ’ ‘লক্ষীনারায়ণ।
স্ববংশে ‘দ্বারকাদাস’ কত মহাজন।
‘হরি ঘােষ’ নামে অতি প্রাচীন ডাক্তার।
বাজারের পাশে গলি-আবাস তাহার ।
অর্চনা
বাজারের পাশে আছে সুন্দর মন্দির।
‘সীতারাম’ ‘মহেশ্বর’ শােভে ‘মহাবীর।
দুই এক মুদিখানা বাজারের পথে।
মিষ্টান্ন-বিপণি আছে বাঙ্গালীর হাতে।
‘জগু সাহ’ নামে এক তৈলিক-প্রধান।
নিত্য-প্রয়ােজন-দ্রব্য যােগায় নানান ।
সােম-শুক্রে বসে হাট সব জিনিষের।
হরেক রকম পাবে দূর দূরান্তের ।
যদিও শহর নহে, আছে ‘মুন্সিপাল।
জঞ্জাল নাশিতে সৃষ্টিজুটায় জঞ্জাল ।
ওদিকে পশ্চিমে দূরে শােভে ‘শেঠ-ভিলা’
মাঝখানে মামুলী সে ‘ডাকের বাঙলা ।
তা’র পাশে করে বাস ফিরিঙ্গিমণ্ডল।
নবীন-প্রবীণ যত রেল-কৰ্মিদল ।
লর্ড সিংহ রােড’ নামে প্রধান সড়ক।
কত না বাগান বাটী, কত না ফটক।
‘হাৰ্ম্মিটেজ’ পুরাতন ‘ম্যাকডাল’-কুঠী।
‘মারবেল-হল’ পরে অতি পরিপাটী ।
ভিলা, ভিলি, লজ,
উৎকট ।
নামাঙ্কিত কত কুঠী—যেন চিত্রপট।
কট, নূক
৫৮
মধুপুরমধুকথা
ভবন, আলয়, কুঞ্জ, গ্লেন্, ডেন্ নামে।
উদ্যান-আলয় কত দক্ষিণে ও বামে।
মনােহর ফলে ফুলে ভরা একবাস।
লক্ষীনারায়ণ-স্মৃতি সে ‘লক্ষী-নিবাস।
অসংখ্য গােলাপ-বেল-যূথিকা-চামেলি।
জয় করেছে আলাে–দেখ আঁখি মেলি ।
অতিবৃদ্ধ ‘শিশু’ গাছে ঘেরা চারিধার।
রসাল, শ্রীফল তরু কাতারে কাতার।
ফলসা, ডালিম আর সপেটা, লকেট।
রম্ভা, পেঁপে, পেয়ারায় ভরে যাবে পেট ।
বিদেশী লতা ও পাতা হরেক রকম।
পলাশ, শিমূল, নিম দেশী-মনােরম।
বড়-কূপে, হােট-কূপে কি সুন্দর জল।
মধুভরা মধু-উৎস পবিত্ৰ নিৰ্ম্মল ।
পশ্চাতে ‘অমৃত শীল’ মুন্সীপাল-কর্তা।
জমীদার-মহাজন-মুস্তাগীর-হর্তা।
রেলের ওপারে দূরে ‘আশুতােষ-ধাম'।
বাঙ্গালার, বাঙ্গালীর শিরােমণি নাম।
ক্রোশ দুই দূরে আছে ‘পাথরােল’ গ্রাম।
‘টিকাইত কৃষ্ণচন্দ্র’—তার রাজধাম।
অর্চনা
রাজার মন্দির মাঝে রণচণ্ডী-সাজে।
জগৎ-জননী কালী আদ্যা মা বিরাজে।
দূর দূরান্তর হতে নানা ভক্তগণ।
মঙ্গল ও শনিবারে করে আরাধন।
যােড়শােপচারে পূজি’ মায়ের চরণ।
অসংখ্য অজের বংশ করে গাে নিধন ।
ছাগরূপী নিজ রিপু দিয়া বলিদান।
করে না অজ্ঞান কেন মাতৃ-পূজাদান।
‘মধুপুর-মধুকথা অমৃত সমান।
শ্ৰীকিরণ দত্ত কহে -শুনে পুণ্যবান।
সংঘ-কার্তিক, ১৩৩১
৬০
প্রিম্নদর্শন জিতেন্দ্রনাথ
ল’য়ে প্রীতিপূর্ণ আঁখি বিস্ফারিত জ্ঞানে
জীবন-মধ্যাহ্নে এল যুবক নিৰ্ম্মল !
অতি অল্পদিনে সবে গাঁথি’ নিজ-প্রাণে,
বন্ধুগণে কিনে নিল সে চিত্ত সরল ।
রূপে গুণে সুশিক্ষায় ছিল সে মণ্ডিত,
পল্লীর আশার স্থল, 'নয়নের মণি।
জানি হইনু মােরা কি দোষে দণ্ডিত,
অকালে হারানু হেন রতনের খনি।
প্রেম-শ্রদ্ধা-বিমণ্ডিত তব পুণ্য-কথা
গৃহে গৃহে এ পল্লীর হ’তেছে ধ্বনিত।
হে অজাতশত্ৰু, সৌম্য কেন দিলে ব্যথা-
জীবন্মত দীনজনে চির-বিষাদিত।
জীবন-সঙ্গিনী সাধ্বী, বৃদ্ধ পিতামাতা
জানি কেমনে র’বে হয়ে বাত্যাহ।
অর্চনা দুই এখনও ধ্বনিছে কাণে তােমার সুস্বর- ‘পশ্চিমে আরক্ত ভানু অস্তাচলগামী’- প্রেমােন্মত্ত রাজ-চিত্র দেখালে সুন্দর ‘পাণ্ডব-গৌরব’ নাট্যে ‘অবন্তীর স্বামী। ‘কৃষ্ণ’ ‘পুণ্ডরীক’ ‘ভীষ্ম’ ‘দণ্ডী ‘যদুপতি’ ‘প্রবীর’ ‘প্রতাপাদিত্য’ ‘দত্ত নিমচঁাদ’ ‘সিং’ ‘ফি’—দেখাইলে পরিপাটী অতি ; দক্ষ অভিনেতা সম পেলে জয়বাদ। বহু আশা করেছিনু তােমারে লইয়া গঠিব পল্লীর মাঝে নাট্য-নিকেতন। সে সাধে ফেলিয়া বাজ লইল কাড়িয়া শ্রীহীন করিল ধাতা এ পল্লী-ভবন। হে আনন্দময় ‘জিতু’-স্নেহের পুতলি, লহ, লহ অন্তরের প্রেম-শ্রদ্ধাঞ্জলি। সঘ-ফান, ১৩৩১ স্মৃতি-সভায় পঠিত—শনিবার, ৭ই চৈত্র, ১৩৩১
গিরিশগৌরব
(১)
আজিকে তােমার মহিমা গাহিয়া ধন্য করিব মােদের প্রাণ।
কবিকুলরবি তুমি মহাকবি—এস গাে জাতির শ্রেষ্ঠ দান।
তুমিনটরাজ, নাট্য-অধিরাজ—তােমার সমান কোথায় পাই।
বঙ্গনাট্যের তুমি কালিদাস—চরিতাঙ্কনে তুলনা নাই।
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, কলাশিক্ষাদা, তুমি গাে নাট্যের আচাৰ্য্যবর,
পূজায় তােমার বাণীর প্রতিমা মহিমমণ্ডিত চিরভাস্বর ।
অর্চনা
(২)
নাট্য-যজ্ঞের তুমি, হে ঋত্বিক, করিলে প্রতিষ্ঠা প্রতিমা-প্রাণ,
নূতন ছন্দের সৃষ্টি করিয়া রাখিলে বঙ্গভাষার মান।
কলা-সৌন্দৰ্য রাখিলে অটুট, করিলে শতেক নাটক সৃষ্টি
পাঠক-দর্শক মুগ্ধ-মােহিত দৃশ্যকাব্যের পাইয়া দৃষ্টি !
নিত্য নূতন কবি-কল্পনা-ফুল্ল তােমার রচনারাজি
কত না আনন্দ করিল সৃষ্টি, সুগন্ধভরা ফুলের সাজি।
জাতীয় কাব্যের, জাতীয় ধর্মের নিত্যধারায় করিলে সিক্ত।
ধর্ম ও জ্ঞানের উদ্দীপনায় রচনা তােমার প্রকট দীপ্ত ।
হেলায় খেলায় তুমি যে অর্ঘ্য বাণীর চরণে করিলে দান,
যুগ-যুগান্তে না জানি বাঙ্গালী কত দিনে পাবে এ হেন মান!
এস মহাকবি, নটকুলচূড়া, ভক্ত, ভৈরব, আচাৰ্য্যবর।
লহ গাে প্রণতি চিরযশস্বী, বঙ্গগৌরব, অবিনশ্বর।
রচিত-জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১
কায়স্থ-পত্রিকা–ফান, ১৩৩১
স্বাগত
কালের আরম্ভ কোন কালে—কে বা জানে সে রহস্য-কথা।
অখণ্ডের খণ্ডিত বিভাগ নব নামে জানায় বারতা।
চির-পুরাতন ছিল যেই, কহে তা’রে নূতন বরষ ।
সুখ-আবরণে দুঃখ আসে, উদ্বেলিত প্রাণের হরষ ।
পুরাতনে দেয় বিসর্জন—জরাগ্রস্ত ভাবিয়ে তাহারে।
আজ যারে করে আবাহন, জানে না সে পূর্ণ যে বিকারে।
চক্রবৎ চলে এই মত-কাল-গতি জগত-বিস্ময় ।
শােক-জর্জরিত নিত্যরূপ যার, ভাবে তারে সুধাশ্রয় ।
নূতনের মােহ-অন্ধকারে অন্ধ করে মােদের নয়ন।
নবাগত অতিথিরে তাই প্রতি বর্ষে করি আবাহন।
দূরে যাও তুমি পুরাতন, অতীতের গভীর গহ্বরে।
নিয়ে যাও মুছে স্মৃতি-ব্যথা, কোন চিহ্ন রেখ না অন্তরে।
নবরূপে স্বাগত অতিথি, লহ নতি দলিত জাতির।
অধীনতা-আয়স-শৃঙ্খলে হস্ত-পদ-বাঁধা এ প্রাচীর।
মন-মাঝে কত নব আশা জাগে সদা-কি কব তােমায়।
প্রাণ খুলে অন্তরের জ্বালা কব মােরা—আছে কি উপায় ।
অর্চনা
রুদ্ধ-বা বহুদিন হতে, রুদ্ধ পুনঃ লেখনী-চালন ।
রাজা, প্রজা, জগতের ভাই শুনিল না প্রাণের বেদন।
ব্রহ্মচর্য্য-তপস্যাবিহীন বর্ণ-গুরু ভূদেব-সন্তান।
সূত্রে মাত্র দেয় পরিচয়, কিসে রক্ষা হবে শাস্ত্র-মান।
কোথা সেই মহাশূরবীর অস্ত্রধারী ক্ষত্রিয়-তনয়।
শত্রু-হৃদি-আতঙ্ক-সঞ্চারী কোথা সেই বীৰ্য্য-পরিচয়।
কোথা সেই কৃষি-পণ্য-প্রাণ মহাধনী বণিকের দল।
কোটী কোটী বিত্তের সঞ্চয়ে বাড়াইবে স্বদেশের বল।
কোথা সেই শ্রদ্ধা-অবনত পরিশ্রমী অনুন্নত জন।
অস্থি-মজ্জা দেশ ও জাতির, দেশ-দশ-সেবাপরায়ণ।
কেন হ’ল হেন বিপৰ্যয়কে লইছে সন্ধান তাহার ।
কার প্রাণ কঁদে নিরন্তর, কে প্রেমিক চায় প্রতীকার।
তারস্বরে হ’তেছে ধ্বনিত সনাতন ধৰ্ম্মের মহিমা।
মৌখিক এ বৃথা আস্ফালনে বাড়িৰে কি জাতির গরিমা
আব্রাহ্মণ বর্ণাশ্রমী জন—কে রেখেছে শুদ্ধ অনুষ্ঠান।
নিজের প্রাধান্য-অহঙ্কারে পরস্পরে হানে ঘৃণা-বাণ ।
অনুন্নত ঈশ্বর-সস্তানে যে পারে করিতে উন্নয়ন।
পদানত হয় তােক তার-রে কয় ব্রাহ্মণ সুজন।
ব্যক্ত করে আত্মার স্বরূপ—তাই হিন্দু-ধৰ্ম্ম সনাতন।
‘তত্ত্বমসি’ যার শেষ কথা, মহাসত্য শ্রুতির বচন ।
স্বাগতম
পূজা, পাঠ, অৰ্চ্চনা, বন্দনা, হােম, যাগ নানা অনুষ্ঠান।
মৰ্ম্ম-কথা নাহি বুঝ যদি, কিছুই না হবে ফলবান ॥
শৃঙ্খলিত এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিধাতার চরণের তলে।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জল-বিম্ব সব মিশে যাবে কারণের জলে ।
হে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বণিক, কেন কর বৃথা অভিমান।
‘শূদ্র’ নামে ঘৃণা বাস’ যারে তার’ হবে ব্রহ্মে অবস্থান।
দ্বেষ-হিংসা, বৃথা অহমিকা কর ত্যাগ—শ্রেয় যদি চাও।
বিশিষ্টতা পাবে মহতের, পতিত্বের হাত ধরে নাও।
যেই দিন, হে মাের স্বজাতি, এই ভাবে হবে অগ্রসর।
নববর্ষ নব জাগরণে সেই দিন হইবে ভাস্বর।
বহু আশে আহ্বানি তােমায়, এস, এস নব অভ্যাগত।
ভারতের নব-জাগরণ এনে দাও, হে চির-শাশ্বত ।
রচিত-১১১৩২-কায়স্থ-পত্রিকা-বৈশাখ, ১৩৩২
দু ফোটা অশ্রু
(দেশবন্ধু-উদ্দেশে)
নরমেধ মহাযজ্ঞে ‘জালিয়া-বাগে,
উত্তপ্ত ভারতবাসী নানাভাবে যবে
ক্ষুব্ধ, বিক্ষোভিত, বহু অভিমানে, রাগে
দেশবাসী মুক্ত-বাক্ বেদনার রবে;
ত্যজিয়া বিলাস-বাস চিত্ত-বেদনায়
ছুটেছিলে তুমি দেব, হে চিত্তরঞ্জন,
ঢালিতে প্রাণের ব্যথা দেশের ব্যথায়,
অন্বেষিতে প্রতিকার হে দেশরঞ্জন !
অভিমান-দৃপ্ত-বক্ষে ফিরে এলে দেশে
ফেলিয়া অজস্র অশ্রু ; রাজশক্তি-সনে
পরীক্ষিতে নিজ-শক্তি, নিলে তাবশেষে
‘গান্ধী’-প্রদর্শিত পথ সর্বম্বের পণে।
প্রেম-ত্যাগে উদ্ভাসিত হৃদয় তােমার,
ভারত-বেদনামূৰ্ত বিগ্রহ সাকার !
দু’ফোটা অশ্রু
দুই
রাজ্যের মহাযজ্ঞে ঋত্বি প্রধান,
তুমি আসি’ দিলে শেষ হবির অঞ্জলি,
‘লােকমান্য’-মহাব্রতে আত্মবলিদান ;
বঙ্গবাসী-হৃদে হানি’ ব্যথার বিজলী।
বীর তুমি, কেঁদেছিলে বীরের মতন
দেশ-যন্ত্রণায়, দলি’ স্বার্থ-সাধ-মানে
দীন সম দীন-মাঝে করিলে ভ্রমণ,
হরিয়া দীনের ব্যথা, ল’য়ে নিজ প্রাণে
হে আদর্শ দেশবন্ধু, কর আশীর্বাদ,
তােমার আদর্শ-ব্রত করিয়া সাধন,
তােমার স্বদেশবাসী ঘুচায়ে প্রমাদ,
স্বারাজ্যের মুক্তি-পথে হ’ক দৃঢ়-পণ !
পুণ্যকীৰ্ত্তি, বড় ব্যথা, ভাষা না যুয়ায়,
লহ অর্ঘ্য, দাও শক্তি তব মহিমায়।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ শােকসভায় পঠিত ( ২৭৩৩২
কায়স্থ পত্রিকা--আষাঢ়, ১৩৩২
মধু-স্তুতি
(সনেট)
দয়েল-সালিখ-শ্যামা-পাপিয়ার গানে
বঙ্গের কবিতাকুঞ্জ ছিল গাে কূজিত ;
তুমি আসি’ মাতাইলে পঞ্চমের তানে
পিক-শ্রেষ্ঠতব সুরে মৃত ক্ষরিত !
ললিত-বিভাস-গৌরী-পূরবী-ইমনে,
সারস্বত-সাধনায়, আলাপিয়া বীণা,
বঙ্গকবি গায় স্তুতি মৃদুমন্দ স্বনে
ঝরে শান্ত-দাস্য-সখ্য-মাধুৰ্য-করুণা!
ভৈরব-দীপকে তুলি’ অপূর্ব ঝঙ্কার,
নবমন্ত্রে পূজি’ বাণী সঞ্জীবিলে ভাষা,
উদ্দীপনাপূর্ণ রস করিয়া সঞ্চার,
বঙ্গবাসী-প্রাণে কবি জাগাইলে আশা ।
ইরম্মদ-মন্দ্রে শঙ্খ বাজিল তােমার,
উজ্জ্বল প্রতিমা আজি বঙ্গ-সারদার !
মধুগুভি
(অমিত্রাক্ষরে )
কি মহা-সৌভাগ্য-ফলে, বঙ্গকবি-কুঞ্জে
প্রবেশিয়া তুমি কবি শ্রীমধুসূদন,
দেখালে অপূর্ব সৃষ্টি, দীনতায় পূর্ণ
তব মাতৃভাষা লয়ে। ক্রীড়নক সম
ইচ্ছামত ছুটাইলে ; সাজাইয়া পুনঃ
গরে ললিত কলায় দেখাইলে শক্তি
অদৃষ্ট অশ্রুতপূর্ব !
কত না সৌন্দর্য্য
সৃষ্টি হইল ভাষার ! নব নব ছন্দে
কত উঠিল ঝঙ্কার প্রাণমনস্পর্শী।
নিত্য নব কল্পনার উদ্ভাবনী শক্তি
রচিল, গঠিল চারু সাহিত্য-সম্ভার ;
সাজাইল ডালি নব বাণী-পূজারির।
৭১
অর্চনা
সার্থক লেখনী তব, আঁকিল মনােজ্ঞ
চিত্র কাব্যে ও নাটকে। গরীয়সী আজ
তব স্বদেশের ভাষা, সাজাইতে যারে
ডুবিয়া অতলতলে প্রতীচী ভাষার,
নানারত্ন উপহার দিলে আহরিয়া।
অমিত্র-অক্ষরে রচি’ কাব্য-মধুচক্র,
গৌড়জন-তরে যাহা রেখে গেছ কবি,
যথার্থই চিরদিন পাবে তাহে সুধা,
আনন্দে করিবে পান পুরুষানুক্রমে !
শ্রদ্ধাপূর্ণ অর্ঘ্য ঢালি চরণে তােমার
এ শ্রাদ্ধবাসরে আজ ভাব-ভক্তিভরে ;
লহ নতি, মহাকবি, দীন স্বজাতির ।
;
বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ-স্মৃতিসভায় পঠিত-ইং ২৯৬২৫
কায়স্থ-পত্রিকা—আষাঢ়, ১৩৩২
१२
ভাৱতপূজ্য সুরেন্দ্রনাথ
বাঙ্গালার, ভারতের অর্ধশতাব্দীর
রাজনীতি-ক্ষেত্রে তেজস্বী ঋষির মত
হতভাগ্য স্বদেশের বিদলিত শির
উন্নয়ন-আশে—সদা উপদেশ রত
ছিলে তুমি বাগ্মিবর। যুগযুগান্তর
ধরি’ তব দেশবাসী মােহগ্রস্ত, জড়-
সম বিলুপ্তচেতন মেঘমন্দ্র স্বর
তব জাগা’য়ে তাদের তুলিয়াছে ঝড়!
নবজাগরণে উচ্চ-শিরে কহে কথা
সে পতিত জাতি—তব মন্ত্রণা-কৌশলে।
উচ্চ-কণ্ঠে চাহে বীরভােগ্যা স্বাধীনতা
দেবতাবাঞ্ছিত! আজি যাও কেন চলে
আজীবনব্যাপী তব অমােঘ সাধনা,
করতলগত সিদ্ধি-আসন্ন ঘােষণা।
কায়স্থ পত্রিকা-ভাদ্র, ১৩৩২
সাধু শ্রীমৎ নাগ মহাশয় ভারতের প্রাচ্য-প্রান্তে বাঙ্গালীর দেশে, ত্যাগ-দৈন্য-মূর্তিমান ভাবভক্তিভরে এসেছিল ভক্তবর দীন ছদ্মবেশে অপূর্ব চরিত লয়ে লােক-শিক্ষাতরে ! ধূলিমাখা মহামূল্য মরকত-মণি লােক-লােচনের দূরে লুকা’য়ে আত্মায় থাকে যথা অনাদরে, এই গুপ্ত খনি ছিল গুপ্ত কুটীরের অন্ধ-তমসায় ! দেবতা ‘গদাই’ আসি’ লুকান রতনে দিব্য-দৃষ্টিআকর্ষণে উদ্ধারি’ হেলায় স্থাপিলা আদর্শ ভক্তে লােকের নয়নে--- ফুটিয়া উঠিল ঋষি নিজ মহিমায় । জনমে জনমে তুমি রামকৃষ্ণ-দাস, জ্বলন্ত আদর্শে ভক্তি কর সুপ্রকাশ ! ঢাকার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার দেওভােগ গ্রামে গৃহীত-জন্ম শ্রীরামকৃষ্ণ- ভক্তরাজ সাধু, দুর্গাচরণ নাগ মহাশয়ের অশীতিতম জন্মতিথি উৎসব উপলক্ষ্যে কলিকাতার ‘এলবার্ট হলে অনুষ্ঠিত ২১৫৩২তারিখের বিরাট সভায় পঠিত। কায়স্থ-পত্রিকা-আশ্বিন, ১৩৩২ ৭৪
শ্রীশ্রীচিত্রগুপ্ত
ব্ৰহ্মকায়ােদ্ভব মূৰ্ত্তি দিব্য দীপ্তিমান,
দ্বিতীয় বিষ্ণুর কায়া করিয়া গ্রহণ,
আবির্ভূত হ’ল কে বা পুণ্য-জ্যোতি,
ধ্যান-ভঙ্গে ধাতা য’রে করিল নন্দন ।
অপূৰ্ব বিগ্রহ, মরি! কে তুমি দেবতা,
লেখনী ও মসিপাত্র অসি-দণ্ডধারী,
চতুভুজ সুশােভিত নবীন বিধাতা,
ভাগ্যলিপি-বিধায়ক শুভাশুভকারী।
ক্ষত্রিয়ের ধৰ্ম্ম-বিধি করি’ আচরণ,
কায়স্থ নূতন নামে হইয়া লাঞ্ছিত,
তব বংশ হবে খ্যাত ধরিত্রীভূষণ,
কুলে-শীলে-ধৰ্ম্মে-যশে হয়ে প্রতিষ্ঠিত।
বিরাট কায়স্থ-জাতি-পুরুষ-প্রধান,
তােমারে পূজিছে আজি তােমার সন্তান।
ভ্রাতৃ-দ্বিতীয়া, ১৩৩২--কায়স্থ-পত্রিকা-কার্তিক, ১৩৩২
ৱা যতীন্দ্রনাথ
দত্ত-কবি গেয়েছিল নিবিছে দেউটী
একে একে সমুজ্জ্বল নাট্যশালা-শিরে,
আজো সেই মত হেথা বাণী-প্রতিষ্ঠানে
নিবিড় আঁধারে ঘেরি, অবসাদে ছেয়ে,
নিবে যায় একে একে রত্নদীপ যত।
ব্যোমকেশ’ গেছে ব্যোমে পথ দেখাইয়ে
পরিষৎ-বক্ষ বিদারিয়া শিরে বজহানি’
‘আচাৰ্য রামেন্দ্র’ গেছে শিক্ষার গৌরব ।
আর এক ছিল রত্ন এমণিকোঠায়,
স্নিগ্ধ রশ্মিজালে যার অদূর অদৃষ্টে
হইত দেদীপ্যমান রমেশ-ভবন,
গেছে সে ‘মনােমােহন’ অঞ্চলের নিধি।
৩
রায় যতীন্দ্রনাথ
কিন্তু আজি যে মহাত্মা করিল প্রয়াণ
অকস্মাৎ ক্ষিপ্রগতি, বাণী-মন্দিরের
এ যে ছিল ভিত্তি-স্তম্ভ, আধার-আসন।
শিরে বুকে ক্রোড়ে ল'য়ে জন্মকাল হতে
যে ইহারে প্ৰদানিল শত শ্রদ্ধা প্রেম,
সাহায্যে সামর্থ্যে আর শিক্ষা ও দীক্ষায়
যে জন করিত নিত্য কল্যাণ কামনা,
মাতৃভাষা উন্নয়নে যার প্রাণ-পণ,
সুধীর, ধাৰ্মিকবর, পণ্ডিত-প্রধান,
যাহার অভাব পূর্ণ হবে না কখন,
নাই সে যতীন্দ্রনাথ জাতির গৌরব।
চির-বিরােধিণী সেই দুই দেব-ভগ্নী
ঢেলেছিল আশীর্বাদ য’র শিরােপরি
যুক্ত করে প্রেমাবেশে; ইঙ্গ-বঙ্গ-বাণী
আর সে দেবী গীর্বাণী ত্রিবেণী-সঙ্গমে
মিলিত করিয়াছিল যাহার মনীষা,
স্বজাতি, স্বধৰ্ম্ম আর মাতৃ-ভূমি-ভাষা
চির-সেবা-পরায়ণ, আদর্শ সুজন,
এ দুর্দিনে স্বজাতিরে কেন তেয়াগিলে ?
প্রাচীন ও নবীনের হে সংযােগ-সেতু,
৭৭
অর্চনা
পুরাতন বাঙ্গালীর শেষ দীপ-শিখা,
সামাজিক সৌজন্যের মূর্ত প্রতিচ্ছবি,
দশ ও দেশের তুমি ভরসার স্থল,
সদানন্দ, হে প্রেমিক, হে বন্ধুবৎসল,
তােমার অভাবে সবে মুহমান হেথা !
তােমার বিয়ােগ-ব্যথা হৃদয়ে ধরিয়া,
নগণ্য এ বন্ধু তব অনুজ-সমান,
মরমের শ্রদ্ধাঞ্জলি এ শ্রাদ্ধ-বাসরে
ঢালে পুনঃ পুনঃ তব স্মৃতির উদ্দেশে।
হে পূত-চরিত্র, পুণ্যপূত আত্মা তব,
চিরাভীষ্ট দেবতার সান্নিধ্যে থাকিয়া,
লভুক শাশ্বতী মুক্তি চির-অভীতি।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের স্মৃতি-সভায় পঠিত
কায়স্থ-পত্রিকা-বৈশাখ, ১৩৩৩
৭৮
শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য বিরচিত উপদেশ- প্রকণং তদনুবাদ যুক্ত্যব বৃত্তিভিঃ পূর্ণংরিক্তীকুরু মনােঘটম্। ন কশ্চিত্তবিতা তাত ব্ৰহ্মণা পূরণে শ্রমঃ ॥ ১ মনােঘট পূর্ণ তব বৃত্তিসমুদয়ে শূন্য কর তাহে তুমি সুযুক্তিনিচয়ে। শ্রম না হইবে বৎস, তাহায় তােমার, ব্ৰহ্ম-বারি মনােঘটে হইবে সঞ্চার ॥ ১ ত্যজ চিন্তাং মহাযুদ্ধে ভজ নিশ্চলতা-সখী ত্বয়াজ্জিতামিমাং চিন্তাং বদ কোহঃ পরিত্যজেৎ ॥২ হে সুবুদ্ধি, কেন কর চিন্তা আরাধনা, ভজ নিশ্চলতা-সখী, ক’র না ভাবনা। এ চিন্তারে করিয়াছ তুমিই অর্জন, তুমি না ত্যজিলে বল, ত্যজে কোন জন ॥ ২ ৭৯
অৰ্চ্চনা
চিন্তনীয়ং ত্বয়া বস্তু চিন্তা-রােগস্ত ভেষজম্ ৷৷
অথবা তাত চিন্তাখ্যবােগমেব পরিত্যজ ৷৷ ৩
চিন্তায়ােগ উপশম হইবে যাহায়।
কর সে ঔষধ চিন্তা, নহে ত্যজ তায়। ৩
বদ্ধিতা বর্ধতে চিন্তা ত্যক্তা নশ্যতি সত্বর।
ঈদৃশেনাপি রােগেণ দুর্ধিয়াে মরণং গতা। ৪
বাড়ালেই বাড়ে চিন্তা, ছাড়িলেই ছাড়ে।
তথাপি দুদ্ধিগণ চিন্তা-রােগে মরে ॥ ৪
কর্কশাঃ কলহং কৃত্বা বদ্ধা নিত্যমমঙ্গলা।
ত্যজ্যতাং কামনা-চণ্ডী ভুজ্যং মুক্তি-সুন্দরী।৫
কর্কশহৃদয় যারা কলহ করিয়া।
গড়ে নিত্য অমঙ্গল আবদ্ধ হইয়া।
কামনা ভীষণ নারী ত্যজি তার সেবা।
মুক্তির ভজনা কর সুরূপসী যেবা ৫
জনৈঃ পণ্ডিত ইত্যুক্ত প্রাপ্লেযি পরমং সুখম্।
মনসা কৰ্ম্মণা বাচা ভব পণ্ডিত একবৎ। ৬
পণ্ডিত বলিলে লােকে বড় সুখ পাও।
কৰ্ম্মে মনে বাক্যে তুমি সুপণ্ডিত হও। ৬
উপদেশপ্রকরণং তদনুবাদ
নিত্যমেব স্কুরপাে ননু ত্বং চিৎ স্বরূপতঃ।
স্ফুৰ্ত্তি-মুৰ্তেস্তবৈবেয়ং কাচিৎ স্ফুৰ্তিরিদং জগৎ। ৭
চিৎ-স্বরূপে নিত্য তুমি হও স্ফূৰ্ত্তিময়।
এ জগত সে মুৰ্ত্তির স্ফুৰ্ত্তি মাত্র হয়। ৭
ভাস্বত মম ভামাত্রমিতি জ্ঞাতে ভ্রমে গতে।
কৃ দ্বিতীয়ঃ ক সংসারঃ ক মায়া তৎ কৃতং কনু ॥ ৮
আমিই ভাস্বান, যাহা হয় দৃশ্যমান।
আমার আভাই তাহা, হলে এই জ্ঞান ৷
কোথায় দ্বিতীয় তার, কোথায় সংসার।
মায়া, মায়া-কৃত-জন্ম, কোথা থাকে আর ॥ ৮
জ্ঞত্ব-কর্তৃত্ব-ভােক্তৃত্ব-জড়-চৈতন্য-দৃষ্টয়ঃ ।
স্ফুরণানি স্বকীয়ানি মুনিভূ ত্বা বিলােকয়॥ ৯
আমি জ্ঞাতা, আমি কর্তা, আমি তােক্তা জ্ঞান।
জড়েতে চৈতন্য দৃষ্টি নিজের স্ফুরণ।
স্বকীয় প্রকাশ ভিন্ন নহে অন্য জন।
মুনি হয়ে জ্ঞান-নেত্রে কর বিলােকন। ৯
পরম্পরমবিজ্ঞা জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তয়ঃ।।
ত্বয়া তিথ্রিয়াে ভুক্তাস্তুরীয়াং ভজ সুন্দরী।১০
৮১
অর্চনা
সুষুপ্তি স্বপন আর নারী জাগরণ।
পরস্পরে নাহি জানে, করেছ ভজন।
চতুর্থ সুন্দরী হয় আর একজন।
তুরীয়া তাহার নাম করহ ভজন। ১০
জাগ্রৎস্বপ্নসুষুপ্ত্যাদ্যা অবস্থা নিত্যমীক্ষসে।
তুরীয়ং তব ধামৈব ন তৎ কিমিতি পশ্যসি। ১১
অবস্থা সুষুপ্তি স্বপ্ন আর জাগরণ
করে বাস পুরােভাগে ত্যজিয়া তােমায়।
তুরীয় অবস্থা তব আলয় আপন,
তথাপি দেখ না তুমি, কেন হে তাহায়। ১১
আধারঃ মুখহােতো স্তুং ধ্যায়সে ন সুখে সুখং
সুখিরূপে নিজরূপে সুখং তিষ্ঠ সুখী ভব৷ ১২
সুধাধার বস্তু লাভে সদা কর ধ্যান,
সুখে নাহি কোন সুখ—ইহা স্থির জ্ঞান।
সুখের আধার হয় স্বরূপ আপন
সুখী হয়ে সেই সুখে করহ ভ্রমণ ॥ ১২
ইতি শ্রাশঙ্করাচাৰ্য বিরচিত উপদেশ-প্রকরণং সমাপ্ত
ইতি শ্ৰকিরণচন্দ্রদত্তানূদিত উপদেশ-প্রকরণং সমাপ্ত
স—জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৩
৮২
মহামনা মনােমােহন
অশ্রুবিন্দু দুতী
এক
অসম্ভবে সবিয়া হে মনােমােহন,
তুমি কেন আগে গেলে অগ্রজে ফেলিয়া,
শেলে দীর্ণ করি’ হৃদি নিজ জন সনে
চিরশােকাচ্ছন্ন রাখি, শত্রুতা সাধিয়া !
তুমি ত নিঠুর নহ, হে সৌম্য-সুন্দর,
তবে কি হে বন্ধুভাবে বিপদ-সঙ্কুল
সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে, পথ দেখাইতে
হলে অগ্রসর তুমি, হইয়া আকুল !
কিংবা, পাছে রয়ে গেনু মােরা এ মরতে,
তব যােগ্য সমাদর করি নাই বলে,
অক্ষয় তােমার কীর্তি বিস্ময়ে হেরিয়া,
প্রায়শ্চিত্ত করিবারে ভাসি আঁখি-জলে
ভারত-স্থাপত্য-শিল্প-সৌন্দৰ্য্য অপার ।
প্রদানিতে পরিচয় জনম তােমার।
অর্চনা পরিষ-চিত্রশালা-তালিকা রচিয়া, কত না অজস্র শ্রমে রমেশ-ভবন’ গ’ড়ে গেলে তুমি শিল্পী, ললিত কলায়, প্রতিষ্ঠার দিনে কোথা থাকিবে তখন। ‘জাতীয় শিক্ষার’ সেই সৌম্য প্রতিষ্ঠান ঘােষিবে তােমার কীৰ্ত্তি বঙ্গে চিরদিন ‘যাদবপুরের সেই মরুভূ-মাঝারে মরূদ্যান সম সেই মন্দির নবীন । উড়িষ্যার হিন্দু-বৌদ্ধ-শিল্প-পরিচয়, গাঁথিয়া অমূল্য গ্রন্থে তুমি গেছ রেখে। বৌদ্ধ-ধৰ্ম্ম-রাজিক’ সে চৈতের বিহারে ভারতের চিত্রকলা রেখে গেলে একে। ভূমানন্দ-সৌন্দর্য্যের চির-উপাসক, সিদ্ধি করতলে ল’য়ে গিয়াছ সাধক। বাগবাজার পল্লীর অলঙ্কার, সুবিখ্যাত স্থপতি, অনন্যসাধারণ স্থাপত্য- শিল্প-বিশার, ঐতিহাসিক এবং অসাধারণ কর্মী চিরস্নেহাস্পদ মননামােহন গঙ্গোপাধ্যায় অকালে ৪৫ বৎসর বয়সে, চিরজীবন সৌন্দর্যের উপাসনায় সিদ্ধিলাভ করিয়া অনন্ত-সৌন্দর্য্যে মিলিত হইয়াছেন। তাঁহারই উদ্দেশ্যে এই প্রেম-শ্রদ্ধাঞ্জলি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শােকসভায় অপিত হইয়াছিল। সঙ্ঘ-আষাঢ়, ১৩৩৩ ৮৪
শ্রীশ্রীচিত্রগুপ্তদেব
হ্মা প্রজাপতি
মহাধ্যান ধরি
মানব-সমাজ করিলা সৃষ্টি।
পুনঃ ধ্যানমগ্ন
লােক-পিতামহ,
স্থানুর মতন সুবদ্ধ দৃষ্টি! ১
নর-সমাজের
কল্যাণ-চিন্তায়
বিধাতার মনে বাসনা আসে।
বিরাট সৃষ্টির কে বা কি বা করে-
কে রাখে সন্ধান বিশাল বাসে। ২
অপরূপ রূপ
ধ্যান-ছাঁচে গড়া,
ব্ৰহ্মকায় হতে প্রকট মুৰ্ত্তি।
দূর্বাদলশ্যাম,
নয়নাভিরাম,
অভিনব কায়া নবীন স্ফূৰ্ত্তি ! ৩
চতুর্ভুজে শােভে মহাপাশ, অসি,
মস্যাধার সহ লেখনী নব ।
দেবের দেবতা
এ কোন আসিল,
বিস্ময়ে নেহারে দেব সব। ৪
কি কাযে আমারে
আনিলে হে প্রভু,
কহু প্রজাপতি, জগৎস্রষ্টা।
কি কাৰ্য্য সাধিব,
কি ধৰ্ম্মে রহিব,
হে লােক-পালক মহান্ দ্রষ্টা। ৫
অর্চনা ‘তুমি চিত্রগুপ্ত করিবে চিত্রিত গুপ্ত থাকি জীব-কম্মের ফল। তুমি রবে সাক্ষী নর-অদৃষ্টের, তােমার বিধান তাদের বল! ৬ মম কায় হতে উত্তৰ তােমার, চতুবন তব করিবে পূজা! ক্ষাত্ৰধৰ্ম্মে ধর্মী রহিবে ধাৰ্মিক, ‘কায়স্থ’-আখ্যাত তােমার প্রজা! ৭ অসিজীবি-জনে মসিজীবি-সনে র’বে না পার্থক্য জগতী-তলে । লেখনী-চালনে মেদিনী মােহিয়া, কীৰ্ত্তিমান হবে প্রতিভা-বলে’! ৮ বিপুল গৌরবে কায়স্থ-সন্তান কর্মক্ষেত্রে আজো সদর্পে যায় । শিক্ষায়, দীক্ষায়, দান, তপস্যায় আজিও তাদের মহিমা ভায়! ৯ ‘কায়স্থ-ক্ষত্রিয়- ব্রহ্মার বচন, ইথে নাহি কা’র সংশয় আর ! চিত্রগুপ্ত হন ‘ক্ষত্রিয়’-দেবতা, পুরাণ গাহিছে মহিমা তার! ১০ = ভ্রাতৃ-দ্বিতীয়া, ১৩৩৩
বাঙ্গালী কায়স্থমঙ্গল
১
২
ক্ষত্রিয়-বঙ্গাজ-ভানু কায়স্থের কথা-
ইতিহাসে গাঁথা উজ্জ্বল অতি !
কাশ্মীরে কনােজে যাঁরা মিলাইল হেথা—
ঢাল শ্রদ্ধা আজ তাদের প্রতি।
জান না কি ভ্রাতৃগণ, বাঙ্গালীর শৌর্য,
ধরিত যাঁহারা অমিত বল !
এখন কি অবিদিত কায়স্থের বীৰ্য্য,
চিনিত যাঁদের মােগলদল।
হেথা ছিল মহারাজ আদিত্য প্রতাপ
রাজা সীতারাম, কেদার রায়।
সে চঁাদ, মুকুন্দ রায়, কন্দর্পনারাণ,
বিদেশী যাঁদের মহিমা গায় ।
হেথা ছিল ‘মেনাহাতী’, সেনাপতি কালী,
পলাশিতে ছিল মােহনলাল !
একে একে সবে দিছি দণ্ডধরে ডালি,
গ্রাসিল সকলে করাল কাল।
৩
৪
৮৭
অর্চনা
নাই সে কিঙ্কর সেন, জঁরে কালু,
শােভারাম সিংহ নাহি ক আর ।
সুরেশ বিশ্বাস ছিল—আছে মল্লবীর
শ্ৰীযতীন্দ্র গুহ কলিকাতার !
বাঙ্গালী কায়স্থ আজো প্রতিভা-শিখরে,
এখনাে তাহারা তুলনাহীন,
অগণিত কীর্তিগাথা গায় সমস্বরে,
কোননা ক্ষেত্রে তারা হয় নি দীন ।
সিংহকুল-ধুরন্ধর সে গঙ্গাগােবিন্দ,
সে গােবিন্দরাম পুরাণ কথা,
রায় রইয়া রাজা সে রাজবল্লভ
ছিলই ত এরা দেশের মাথা!
৭
এ যুগেও অগ্রগণ্য সে দত্ত রমেশ,
সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন তুলনাহীন,
দত্ত কৃষ্ণলাল, নৃত্য, জ্যোতিষ,
ভূপেন্দ্র,
কিরণ কিরণে নহে ত দীন!
বিচার ও ব্যবহারে দ্বারিকা, রমেশ,
সে চন্দ্ৰমাধব, সারদা বীর ।
পালিত তারক, মিত্র রাজ-নারায়ণ,
ব্রজেন্দ্র, বিনােদ, নৃপেন্দ্র ধীর।
৮৮
কায়স্থ-মঙ্গল
১১
বিখ্যাত গােলাপ শাস্ত্রী হিন্দু-ব্যবহারে,
যােগেন্দ্র তুলেছে দেশের মাথা।
রাসবিহারী বঙ্গের গৌরব-মুকুট,
সে গণেশ, কালী, নিমাই কোথা! ১০
সুবিখ্যাত চিকিৎসক বস্তু জগদ্বন্ধু,
সে সূৰ্য্যকুমার ভিষকবর !
সে রাজেন্দ্র দত্ত, দীপ্ত সুরেশপ্রসাদ,
মল্লিক শরত সেনানীবর !
বিখ্যাত মেজর’ বসু, শ্ৰীকৈলাসচন্দ্র,
কেদার দাসের গৌরব শত।
চিকিৎসায় বিশারদ নীলরতন,
মৃগেন্দ্র, বিধান কহিব কত?
জগতের দৃষ্টি আজি বিজ্ঞানের দিকে,
জগদীশ-যশ পৃথিবী ভরা!
রসায়নে কীর্তিমান আচার্য্য প্রফুল্ল,
জাগায়ে তুলিছে এ দেশ মরা !
কাশীপ্রসাদের নাম ইংরাজি শিক্ষার
প্রবর্তক-মধ্যে সমুচ্চ স্থান!
পিয়ারীচরণ সুধী দেব সরকার
পাঠ্যগ্রন্থ যাঁর অমর দান! ১৪
১২
অর্চনা
মিত্র সে পিয়ারীচাদ ‘টোদ’ রূপে
কথা-সাহিত্যের—করিল সৃষ্টি ।
কিশােরী, গিরিশচন্দ্র, সারদা, উমেশ
শিক্ষায় জাগায় দেশের দৃষ্টি !
রাজা রাধাকান্ত দেব ‘শব্দ-কল্পক্রমে
অক্ষয় করিল যশের দীপ্তি ।
বঙ্গ-হিন্দী-বিশ্বকোষে’-জাতি-ইতিহাসে
গাঁথা রবে চির নগেন্দ্র-কীর্তি।
প্রত্নতত্ত্ববিৎ রাজা মনীষী রাজেন্দ্র
অসংখ্য ভাষায় পণ্ডিত ছিল ।
প্রসন্নকুমার আর দেব হরিনাথ
কায়স্থের ভালে তিলক দিল।
১৭
সে-কালেও ভট্টাচাৰ্য শুকদেব মিত্র
করিল উজ্জ্বল কায়স্থকুল !
মহা মহা-উপাধ্যায় উপাধিমণ্ডিত,
এ-কালেও যার নাহি ক তুল!
১৮
ইতিহাসে অগ্রগণ্য রামদাস সেন,
গাঁথিল যে প্রত্নতত্ত্ব-কথা।
নিখিল ও যদুনাথ, শ্রীরমাপ্রসাদ
পুরাতত্ত্ব নিয়ে ঘামায় মাথা ।
১৯
কায়স্থল
২০
সিংহ কালীপ্রসন্নের নাম চিরােজ্জ্বল
সে ‘মহাভারতে’ রহিবে গাঁথা।
ঘােষ কালীপ্রসন্ন ও রাজনারায়ণ
বিতরিল ভক্তি-জ্ঞানের কথা।
অক্ষয়কুমার দত্ত, আচাৰ্য্য অক্ষয়,
বসু চন্দ্রনাথ সাহিত্য-থী ।
শ্রীমধুসূদন দত্ত চির জ্যোতির্ময়,
ভাষায় দানিল বীরত্ব জ্যোতিঃ ।
২১
সে মনােমমাহন বসু, মিত্র দীনবন্ধু
নাটকে অজ্জিল অপার যশ।
গিরিশ গিরীশসম কবিকুলদলে,
অমৃত ছড়ায় অমৃত রস!
২২
দর্শনে হীরেন্দ্রনাথ পণ্ডিত প্রধান,
যতীন্দ্রের জ্ঞান ছিল না দীন।
প্রসন্ন প্রতীচ্য তর্কে, রাজেন্দ্রের ন্যায়’
‘ভাষা-পরিচ্ছেদ’ তুলনা হীন।
গিরিশ উদ্ভিদ জ্ঞানে, স্বাস্থ্যে চুণীলাল,
প্রমথ বসুর ‘ভারত-কথা,
সুধীন্দ্র, বিনয়, নব্য নাগ কালিদাস,
এরাও তুলিছে দেশের মাথা।
0
২৪
অর্চনা
২৫
করে দান ‘অশ্রু-কণা’ গিরীন্দ্রমােহিনী,
সে অন্তঃপুরের নন্দন-বনে!
নগরে রচিল কাব্য রাণী মৃণালিনী,
সে মানকুমারী পল্লী-কাননে।
রামগােপালের যশ অসীম অপার,
সে লালমােহন তুলনা নাই।
আনন্দমােহন ধীর, অশ্বিনীকুমার,
সে মনােমােহন কোথায় পাই ।
মহাত্মা শিশির ঘােষ, ভাই মতিলাল
দেশবাসি-চক্ষু খুলিয়া দিল।
যােগেন্দ্রের ‘বঙ্গবাসী ধনী ও কাঙ্গাল
দেশের চিন্তায় টানিয়া নিল।
==
২৭
ভূপেন্দ্রনাথের নাম থাকিবে অক্ষয়,
সুরেন্দ্র বাড়ায় দেশের মান।
ঘােষ অরবিন্দ আজ মগ্ন তপস্যায়,
ভারত-কল্যাণে জীবন-দান।
২৮
‘ইণ্ডিয়ান নেশনের’ সে নগেন্দ্রনাথ
পাণ্ডিত্যে করিল দেশের সেবা।
দেবপ্রসাদের গুণ দেশ ও বিদেশে,
সে বাগ্মী বিপিনে জানে না কে বা। ২
কায়স্থ-মঙ্গল
বঙ্গের বাহিরে খ্যাত কায়স্থপ্রধান,
সে প্রমদা রাজা, বসুজ শ্ৰীশ,
এখনাে বিপিন পায় মহােচ্চ সম্মান,
মল্লিক বসন্ত বিচারাধীশ ।
৩০
দানে কল্পতরু সম দেবনারায়ণ,
স্বাবলম্বী দাতা রামদুলাল,
‘লালাবাবু’-কৃষ্ণচন্দ্র ঘােষে বৃন্দাবন,
প্রাতঃস্মরণীয় করিল কাল !
৩১
বিঘােষিত যশ ঘােষ রাসবিহারীর,
বসু শ্রীগােপাল শিক্ষায় দান।
সর্বস্ব করিল দান মহাত্মা তারক,
বঞ্চিয়া আত্মীয়ে সে মহাপ্রাণ !
৩২
কাশীরাম দাস কহি ভারতের কথা,
ব্যাসের আসন পেলেন দেশে।
সন্ধ্যাকর নন্দী সেই কলির বাল্মীকি
মণ্ডিত হলেন অপার যশে !
রায় রামানন্দ জ্ঞানী, দাস রঘুনাথ,
নরােত্তম দাস তুলনা নাই ।
স্বামী ব্রহ্মানন্দ সেই রামকৃষ্ণদাস,
এদের সমান কোথায় পাই ।
৩৪
অর্চনা
৩৫
চির-জ্যোতিষ্মন ওই আচাৰ্য প্রধান,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে বিবেকানন্দ।
জ্ঞান-ভক্তি-কৰ্ম্ম মূৰ্ত বিরাট বিগ্রহ,
সমন্বয় আনি’ মিটাল দ্বন্দ্ব।
আরণ্য-আশ্রম হতে বেদান্তেরে আনি’
করিল প্রচার নগর-মাঝে।
‘জীব-প্রেম—শিব-সেবা—যার মহাবাণী
অন্তরে অন্তরে এখনাে বাজে!
বাঙ্গালী কায়স্থ যশ বিস্তৃত দিগন্ত
দু’চার কথায় কি ক’ব আমি।
তােমার কৃপায় পায় মহিমা অনন্ত,
করি প্রণিপাত জগৎস্বামি।
কারস্থ পত্রিকা–পৌষ, ১৩৩৩–কায়স্থ সমাজ-চৈত্র, ১৩৩৪
১০
মনীষী বিহারীলাল
সুবৃহৎ নগরীর উত্তর বিভাগে,
দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীর জ্ঞান-গুরু তুমি
ছিলে হে বিহারীলাল--শিক্ষালয়ে
বৃহস্পতি সম তুমি জ্ঞানের ভাণ্ডার
বিলাইলে অকাতরে শিষ্যগণে তব।
তােমার প্রসাদে হ’ল সুশিক্ষিত হেথা
পিতা, পুত্র, পৌত্র-জন এ তিন পুরুষ,
সার্ধ শত বর্ষ তব বাণী-সাধনায় ।
ইংরাজি ভাষার তুমি শ্রেষ্ঠ অধ্যাপক,
উচ্চ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সু-উচ্চ গৌরবে
অধিষ্ঠিত থাকি তুমি যশ-বিমণ্ডিত
হয়ে, পেতে শ্রদ্ধা চির এ দেশবাসীর।
তুমি বিনা এ পল্লীর জ্ঞান-পিপাসায়
কে ঢালিত শান্তি-বারি, আদর্শ শিক্ষক।
এ পল্লীর প্রতি গৃহে তােমার আসন,
প্রতি ছাত্র পূজে তােমা মনের মন্দিরে,
চিরস্মরণীয় তুমি ছিলে ও থাকিবে,
জ্ঞান-গুরু—শিক্ষাদাতা অন্তরে বাহিরে ।
অর্চনা
তােমার অভাবে কর্ণ শিক্ষা-তরণীর
কে ধরিবে আজি ওহে নাবিক-প্রধান।
কা’রে দিয়ে ভার তুমি হলে অন্তর্ধান,
অকুলে ভাসায়ে চিরপ্রিয় শিষ্যগণে।
হে পুণ্যাত্মা, পূতচেতা আদর্শ শিক্ষক,
তব পুণ্য-প্রেম-কথা, ভক্তির সাধনা,
কঠোর তপস্থা তব ভারতী-চরণে,
এনে দেয় স্মৃতি-পটে পােবনাশ্রমে
পুণ্য ঋষি করে ব্যাখ্যা উপনিষদের ।
লহ ভক্তি, লহ শ্রদ্ধা, এ দীন দাসের।
বাগবাজার ও শ্যামবাজার পল্লীর বহু বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ইংরাজি
শিক্ষায় অসাধারণরূপে ব্যুৎপন্ন, নানাধর্মশাস্ত্রবিৎ, বৈষ্ণবকুলচূড়ামণি, আদর্শ
চরিত্র স্বর্গীয় বিহারীলাল সুর মহাশয়ের পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সজঘ-ফালুন, ১৩৩৩
সুস্বাগতম
‘পদ্ম-পুরাণের
‘রেণুকা-মাহাত্ম্যে
যে জাতির কথা করেছে গান।
‘গারুড়ে’ প্রখ্যাত
চিত্রগুপ্ত-সুত,
লহ পূজা-অর্ঘ্য, লহ গাে মান ॥
‘স্কন্দপুরাণের
‘সহাখিণ্ডে’
যে জাতির কথা দেদীপ্যমান।
এস গাে কায়স্থ,
ক্ষত্রিয়-মনীষী
আবার জাগাও ভারত-প্রাণ।
‘গাগা ভট্ট সুধী
প্রতিষ্ঠা প্ৰদানি’
এ-যুগে য’দের গাহিল যশ।
কায়স্থ-ক্ষত্রিয়
সমাজের বাহু,
লেখনী ও অস্ত্রে সমাজ বশ ।
‘কলিতে বর্ণের
আদি ও অন্ত’-
এ কথা সাজে না সমাজ-কাছে।
কীৰ্ত্তি-বিমণ্ডিত
রাজপুতনায়
বীর-বংশধর এখনাে আছে।
সে দিন (ও) বঙ্গের কায়স্থ ‘ভূইয়া
রেখেছে বঙ্গের অমিত শৌৰ্য্য।
অর্চনা প্রতাপ, কেদার, চাঁদ, সীতারাম সে দিন (ও) দেখা’ল অমিত বীৰ্য্য। বঙ্গে আদিশূর ব্রাহ্মণ-কায়স্থ সমাজ গড়িয়া পাইল খ্যাতি। রাজা শ্যাম-বৰ্ম্ম বাস দান করি ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ে করিল স্থিতি। নীতি, সদাচার, দান, ধৰ্ম্ম-নিষ্ঠা কায়স্থ-কুলের গৌরব গায়। শৌর্য্য, বীৰ্য্য এখন (ও) অক্ষুন্ন কালের সাহায্যে প্রচ্ছন্ন হয়। যুগ-যুগান্তের ভারতেতিহাসে যে কোন অধ্যায় দেখিবে তুমি। কায়স্থের কীৰ্ত্তি সুবৰ্ণ-অক্ষরে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় রয়েছে চুমি। আজি এ ভারত যুগ-সমস্যায় আন্দোলিত-চিত, সংশয়-পর। মিলিত রাজন্য- ক্ষত্র-বংশধর বর্ণাশ্রম ধৰ্ম্ম প্রতিষ্ঠা কর। কায়স্থ-সভার দ্বাবিংশবাৰ্ষিক অধিবেশনে পঠিত কায়স্থ-পত্রিকা ঐ কাৰ্য-বিবরণে প্রকাশিত–ভাদ্র, ১৩৩১ ১৮
বিদায় ও আহবান
১
কল্পনায় রূপের তরঙ্গ তুলি’ আসে হেসে নূতন বরষ ।
নরনারী নিত্যনব আকাঙক্ষায় পেতে চায় নবীন পরশ ॥
ভাবে মনে—জীর্ণ পুরাতন আর দিবে কি বা অমূল্য রতন।
সব তার করিয়াছি আস্বাদন, শুষ্ক উহা মরুর মতন।
আন্দোলিয়া কিশােরীর কমকায়, এ নবীনা সােহাগ জানায়।
আশাভরা-যৌবনের রূপ-ডালি অপরূপ অলক্ষ্যে নাচায়।
প্রবীণার গলিত সুষমারাশি নাহি পারে আকৰ্ষিতে মন।
তবে কেন স্মৃতির বেদনা তার, সহে নর আর অকারণ।
তাই ডাকে—নবীন অতিথি এস, ঢাল শান্তি, তপ্ত স্মৃতি’পরে।
দাও তৃপ্তি, প্রেমের প্রলেপ তব, ক্ষত নাশি’ কিসলয় করে।
অচ্চনা
২
হে মানব, তুমি কি দেখ নি’ কভু নবাগত হয় পুরাতন।
আজ যাহা রূপের প্রভায় করে চমকিয়া নয়ন রঞ্জন।
কাল-গর্ভে একে একে হবে সেই বার্ধক্যের পতিত দশায়।
হেয়, ঘৃণ্য, সবাকার উপেক্ষিত, অদৃষ্টের ক্রুর তাড়নায় ।
তবে কেন নূতনের মােহবৰ্তে বার বার হও নিপতিত
দেখ ভেবে পরিণামে সবে এক নাম-রূপ-উপাধি বর্জিত।
জগতের আদি নাই, অন্ত নাই—স্রষ্টা, সৃষ্টি অনাদি অনন্ত।
আজ যাহা জড় নামে পরিচিত, কাল সেই হবে প্রাণবন্ত।
তাই বলি—প্রাচীনে বিদায় দিয়া, মত্ত কেন নবীন-আহ্বানে।
বিশ্লেষণে ফুটিয়া উঠিবে তত্ত্ব, ভেদ নাই নবীনে পুরাণে।
আজ যেবা সুকুমার-কান্তি ল’য়ে শিশুরূপে করে পদার্পণ।
কাল তারে জ্বরাগ্রস্ত স্থবিরের ক্লিষ্ট সাজে করিবে দর্শন।
আজ যারে বরণ করিছ নর সুমঙ্গল শঙ্খ বাজাইয়া।
বিদায় করিতে হবে কাল তারে অশ্রু জলে বক্ষ ভাসাইয়া ।
নূতনের আশু সুখে সুখী নর, পদে পদে পাইছ বেদনা।
তবু তুমি আকাঙক্ষার মােহ-পাশে বদ্ধ পুনঃ,একি বিড়ম্বনা।
হে নবীন, পুরাতন নবরূপে, মুগ্ধ কেন কর ছলনায়।
সনাতন, অখণ্ড তুমি যে কাল, কে খণ্ডিত করিবে তােমায়।
বলবান এ জগতে তুমি কাল, কুক্ষিগত সকলি তােমার।
নিত্য-নব, চির-পুরাতন তুমি, ও-রহস্য গােছর কাহার।
বিদায় ও আহ্বান
৪
দৃঢ় ব্রতে পুরাতন ভিত্তি’পরে নবীনের কর উদ্বোধন।
ভারতের অতীত অধ্যাত্ম-পীঠে বিজ্ঞানের মন্দির গঠন।
আপনার প্রাচীন গৌরব ভুলি’ কোন জাতি নহে প্রতিষ্ঠিত।
আভিজাত্য নিজবংশ মহিমার কোন্ নর না করে কীৰ্তিত।
ইতিহাস কাল-বক্ষে গাঁথিয়াছে পুরাতন কীর্তিকথারাশি।
হে নবীন, অনিন্দ্য তােমার মুখে ফোটে যেন গৌরবের হাসি
তাই বলি নবাগত, হে অতিথি, পুরাতনে কর অধিষ্ঠান।
পুণ্য-স্মৃতি তার রাখি’ হৃদি-মাঝে নব বলে হও বলীয়ান ।
নাহি কাজ বিসর্জন-আবাহনে, যা হবার হ’ক সে শাশ্বত।
কাল-চক্রে সকল(ই) হইবে লীন, বর্তমান, ভূত, ভবিষ্যৎ।
কায়স্থ পত্রিকা-বৈশাখ, ১৩৩৪
১০১
মহাপূজা
এই কি সে শরতের শারদীয়া মহাপূজা
পুরাণ-বর্ণিত সেই, বন্দিত-সুরথ-রাজা!
অষ্টোত্তর শতদিনে যে যজ্ঞ হইত শেষ ।
কালের প্রভাবে আজি ত্রিদিনে পৰ্যবশেষ।
শক্তি-পূজা, শক্তিলাভে সকলের অধিকার
আচণ্ডাল ব্রাহ্মণের—ইথে না সংশয় আর।
জগতের মহাশক্তি মূর্ত হয়ে প্রতিমায়,
আসে কি গাে বর্ষে বর্ষে এ শ্মশান বাঙ্গালায় ।
তা যদি হইত তবে কেন মােরা শক্তিহীন,
কেন মােরা রহিয়াছি দীন হীন চিরদিন।
কানন-কুন্তলা মাতা নদনদী-পরিপূর্ণ
আজ কেন মরুভূমি, আজ কেন জরাজীর্ণ।
শস্যক্ষেত্র জলাভাবে শুষ্ক দীর্ণ অতিদীন,
প্লাবনে নগর-গ্রাম নর-পশু-তরুহীন !
কোথা মধুভরা ফুল, কোথা সে রসাল ফল,
রূপ-রস-গন্ধহীন সে কমল-শতদল !
১০২
মহাপূজা
বীর-প্রসূ বাঙ্গালার কোথা বীর পুত্রগণ,
এবে হীনবীৰ্য সবে, নাহি কারাে দৃঢ়পণ।
বলহীন নাহি লভে আত্মতত্ত্ব সুমহান।
চাই সেই মনােবল উন্নত করিতে প্রাণ।
শক্তির সম্মান কোথা? শক্তির অবমাননা,
অসুর-লাঞ্ছিতা আজি শক্তিরূপা সে ললনা।
চারিদিকে জ্বালাতন, দেশব্যাপী হাহাকার,
স্থাপিতে মঙ্গলঘট পারিবে কি মাঝে তার।
মহাশক্তি আবাহনে যে তপস্যা প্রয়ােজন,
সঞ্চয় করেছ কি হে, সে মহাদুর্লভ ধন ।
পূতমনে, পূচিত্তে তাহারে স্মরণ করি
স্থাণুমত ব’স পণে—“লভিব নতুবা মরি।
জল-মাত্র নারায়ণ—এ কথা অসত্য নয়,
কিন্তু, তবু, সব জলে দেব-পূজা নাহি হয় ।
দেশের অবস্থা বুঝি হও তুমি অগ্রসর,
সব পথ—পথ বটে, বুঝিয়া গ্রহণ কর।
দেশেতে মানুষ চাই—মনুষ্যত্ব-মূর্তিমান্,
ত্যাগ ও তপস্যা ভিত্তি, হও তাহে বলীয়ান্।
নানা স্থানে নানা বীর দেখায় নানান পথ
অচল অটল হয়ে থেকো তুমি দৃঢ়ত।
অর্চনা
উচ্চ ব্রতে ব্ৰতী তুমি, ভয় কি তােমার সাজে,
চরিত্র গঠন করি লেগে যাও মহা কাজে।
অভী হয়ে জাগ বীর, নিজ প্রাপ্য বুঝে লও,
কার সাধ্য রােধে তােমা তুমি যদি স্থির রও!
শ্রী-পীঠ দক্ষিণেশ্বরে তােমার আদর্শ স্থিত,
শক্তি-পূজা-উদ্যাপন—রামকৃষ্ণ-রূপ-ধৃত ।
শক্তিপূজা-অধিকারী হবে তুমি সেই দিন,
প্রত্যেক স্ত্রী-মূৰ্ত্তি যবে মহামায়ে হবে লীন।
দাও দেবি, জয়দুর্গে, করিতে তােমার পূজা,
সেই শক্তি, সেই ভক্তি, মহাদেবী দশভুজা !
মৃন্ময়ী প্রতিমা তব স্থাপে লােক ঘরে ঘরে,
চিন্ময়ি প্রতিষ্ঠ হও, জগদম্বে, বিশ্বম্ভরে।
স—আশ্বিন, ১৩৩৪
কায়স্থ-পত্রিকা, কার্ত্তিক ১৩৩৪
১০৪
মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত
দেশমাতৃকার বীর বরেণ্য সন্তান
বরিশাল-দীপ্তসূৰ্য্য অশ্বিনীকুমার,
উচ্চকণ্ঠে দেশবাসী গায় যশােগান,
স্মরি তব কীৰ্ত্তি-কথা স্বদেশ-সেবার।
স্বল্পভাষী, বহুকৰ্ম্মী, অপূর্ব সাধনা,
মাতৃমন্ত্রে দীক্ষা তব নব জাগরণে
কত না আনিল দেশে আদর্শ প্রেরণা।
জাগে যদি সেই মন্ত্রে জনসাধারণে
অচিরে দেশের ঘুচে দীন-হীন-ভাব।
উচ্চ শিরে দাড়াইয়া স্বজাতি তােমার
জগতে দেখাতে পারে আপন প্রভাব,
পূৰ্বাদর্শ চিন্তাশীল বীর বাঙ্গালার।
বরিশালবাসী সনে মাতি’ সারা বঙ্গ।
হাসি মুখে গায় আজি তােমার প্রসঙ্গ।
অর্চনা
ল’বে কি স্বজাতি মাের সন্ধান তাহার,
কিসে এই মহাবীর স্বদেশরঞ্জন
স্থাপিল আপন কীৰ্ত্তি বঙ্গ-অলঙ্কার,
পরাজিত যার কাছে নিয়ম-শাসন।
আদর্শ চরিত্র তার স্বধৰ্ম্ম-রঞ্জিত,
জ্ঞান-ভক্তি-কৰ্ম্ম-পথে করিয়া সাধনা,
প্রকৃত মহত্ত্ব’পরে হয়ে প্রতিষ্ঠিত,
নানা কাৰ্যে প্রকটিত দেশ-হিতৈষণা।
প্রেম-কৰ্ম্ম-ভক্তি-যােগে পরিচয় তাঁর
আচির ঘােষিবে দেশে,—ঈশ্বর-কৃপায়
বাজাইতে হয় নাই স্বদেশ-সেবার
নিজ কণ্ঠে নিজ যন্ত্র নবীন প্রথায় !
দেশ-ভক্ত, বিভু-ভক্ত, শ্রেষ্ঠ কৰ্ম্মবীর,
লহ লহ শ্রদ্ধা-অর্ঘ্য আজ স্বজাতির।
বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের চিত্র-প্রতিষ্ঠা-সভায় পঠিত। ২০১১৩৪
কায়স্থ-পত্রিকা, চৈত্র, ১৩৩৪—স, চৈত্র, ১৩৩৪
কায়স্থ কুল-ভাৱ লর্ভসিংহ
পরাধীন ভারতের দুর্দিন-আঁধারে
অভ্রভেদী শির তুলি’ কে তুমি দাড়ালে,
দৈন্য-আবর্জনাপূর্ণ মরুভূ-মাঝারে,
জন্মভূমিহৃতমান কে তুমি বাড়ালে।
এখনাে যে বঙ্গমাতা রত্ন-প্রসবিনী
পরিচয় দিলে তার জগত-সকাশে।
আরােহিলে উচ্চাসনে হয়ে শিরােমণি,
প্রতীচ্য ও প্রাচ্যে তাই মহিমা প্রকাশে।
‘কায়স্থ' রাজার জাতি প্রকট করিয়া
পুনরায় ভালে টীকা করিলে গ্রহণ।
সন্ত্ৰমে বিদেশী তােমা ল’য়েছে বরিয়া,
বােগ্য ব্যক্তি যােগ্যাসনে—এ নহে নূতন।
হে সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন ধীর, মনীষি-প্রধান,
তিরােধানে বসুন্ধরা গায় যশােগান।
কায়স্থ-পত্রিকা, বৈশাখ, ১৩৩৫
১০৭
বিশ্ববাণী
ঐ ভারত-সিন্ধুর এ-পার থেকেই উঠেছিল বিশ্ব-বাণী।
শুনে সেই মহাবাণীর পুণ্য-ধ্বনি চমকিল জগৎপ্রাণী ।
জ্ঞান-সমুদ্র মন্থন করে,
গাহিল দ্রষ্টা সমস্বরে,
‘তত্ত্বমসি শ্বেতকেতাে’-আত্মতত্ত্বের মহাখনি।
হৈমরণ্যের কন্দর-কোণে,
নৈমিষের সে পুণ্য-বনে,
সত্যযুগের প্রথম হতে উঠছে আজো প্রতিধ্বনি।
সরস্বতী আর দৃষদ্বতী—
এরাই ছিল সরিৎ-সতী,
তাদের মাঝেই আৰ্য্যাবর্ত, উঠত যথা বেদ-ধ্বনি।
মহাঋষির মুখামৃত,
যােগবাশিষ্ঠের জ্ঞানামৃত,
রাম-বশিষ্ঠের প্রেমের দান—আজো যাহা সুধার খনি!
১০
বিশ্ব-বাণী
কুরুক্ষেত্রের রণের মাঝে,
পার্থসারথির মহাসাজে,
যােগৈশ্বর্যের মহাসঙ্গীত বিলায় যােগি-শিয়ােমণি!
এসে জগজ্জ্যোতিঃ তথাগত
দেখায় নূতন কৰ্ম্মপথ,
নির্বাণের সে মহানন্দ—সেই তত্ত্ববাণী পুরাতনী !
মন্দ্র-দেশের জগদগুরু,
মুক্তিতত্ত্বের জ্ঞান-মেরু,
অদ্বৈতের সিংহ-নিনাদ, বেদ-বেদান্তের তুৰ্য্য-ধ্বনি ।
পুনঃ শ্রীচৈতন্য প্রেমােন্মত্ত,
নাম-যজ্ঞের নবীন তত্ত্ব,
প্রেম-বন্যায় ভাসিয়ে দিলে আচণ্ডাল জগৎপ্রাণী।
সমম্বয়ের মহাবতার
ক’রুল আললা আবিষ্কার,
‘যত মত তত পথ’—কিন্তু এক সূত্রে গাঁথা মণি!
বিবেক-বাণী, অভেদ-বাণী
তুলছে ধীরে মুখ-জ্ঞানী,
মুক্তি-দ্বারের মুক্ত-পথে তবে এবার বিশ্বপ্রাণী !
বিশ্ববাণী-জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৫
১ কিসের এ সঙ্ঘ হেথা, কিসের উল্লাস, নানা লােক হয় সম্মেলন ? এ কি শুধু সুবিন্যস্ত বাক্যের বিন্যাস, রাজনীতি-বৃথা আস্ফালন ? নানা বর্ণ, নানা জাতি, কোলাহল দিবারাতি, এটা কি সে জাতি-সম্মেলন- অন্তরে বিদ্বেষ-বহ্নি, বাহিরে মিলন ? ২ সমাজের দুরবস্থা হেরিয়া নয়নে, মহাজন আসিয়া হেথায়, প্রাচীন বর্বর প্রথা দলিয়া চরণে, হরে কি গাে সমাজ-ব্যথায় ? বরপণ-নবপ্রথা, তুলনা ইহার কোথা। করিতে কি উচ্ছেদ সাধন- মিলিত কি হেথা আজি ধুরন্ধরগণ।
৩
স্বাস্থ্যের পতনে দেশ মৃতপ্রায় আজ,
চারিদিকে ব্যাধি মুর্তিমান ;
তার তরে করে কি গাে এর কাল ব্যাজ,
নিষ্কৃতির পাইতে সন্ধান ?
বসন্ত ও বিসূচিকা,
ম্যালেরিয়া প্রহেলিকা,
করিল কি এরা উদঘাটন।
তা হলে এদের বটে স্বার্থক জীবন।
৪
জলকষ্ট, অন্নকষ্ট, কত কব আর ।
চারিদিকে নগ্ন দেশবাসী,
সম্মিলিত উদ্ভাবিতে উপায় তাহার
হয়েছে কি ইহারা প্রয়াসী ?
গ্রামে গ্রামে সেবাগার,
সংস্কার দীর্ঘিকার,
কিম্বা নলকূপের খনন,
এ সঙ্ঘ কি তার তরে করে প্রাণপণ ?
অর্চনা
কত শাস্ত্র, কত নীতি, কত তত্ত্বকথা,
এ দেশের ছিল মজ্জাগত।
নবশিক্ষা তার দিল নাম বাতুলতা,
এবে সেই শিক্ষা-পদানত।
ঠেকিয়া শিখিয়া আজি
হ’ল কি ইহারা রাজি,
ফিরে যেতে নিজ ঘরপানে-
স্বার্থ-সনে পরমার্থ মিলিত যেখানে ?
কিম্বা এরা ধৰ্ম্ম-নামে করি ব্যবসায়,
অন্ধ হয়ে দিতে চায় জ্ঞান,
অন্ধ গুরু, অন্ধ শিষ, আঁধার বাড়ায়,
ব্রাহ্মণ্যের করে অপমান।
বুঝিয়া শাস্ত্রের মৰ্ম্ম,
আচরিয়া সেই ধৰ্ম্ম,
কয় জন হয় আগুয়ান ?
এ স কি করে সেই পথের সন্ধান।
৭
দেশাচার, লােকাচার শাস্ত্র-নামে চলে,
নিরক্ষরে পণ্ডিতের মান।
কোথা সে তপস্যাজাত অধিকার-বলে
শাস্ত্র-তত্ত্ব প্রকৃত সন্ধান!
এ সঘ-সেবকগণ
করিবে কি প্রাণপণ
মিলাইতে প্রাচীনে নবীনে ?
নহে তাহা অসম্ভব আজিকার দিনে ।
চাই ত্যাগ, সে’ বৈরাগ্য, নিয়ম, শাসন,
সে তপস্যা, সংযম, বাঁধন।
বিবেক-উজ্জ্বলা মেধা করিয়া অর্জন
যথা তথা কর বিচরণ।
সঙ্ঘ ও সাহিত্য-সেবা
ছড়া’বে উজ্জ্বল বিভা,
দেশে দশে ঘােষিবে সম্মান।
শ্রদ্ধাপূর্ণ হৃদে ল’বে এ সঙ্ঘের দান।
অর্চনা
সাহিত্যের স্বাস্থ্য চাই, চাই শালীনতা,
ধ্যানপূত লেখনি-চালন ;
লক্ষ্য স্থির, সসংযম, সহ ওজম্বি,
ধীরে ধীরে বক্তব্য বর্ণন।
ভাষা হবে সুমাজ্জিত,
উচ্চ-ভাব সুচিন্তিত,
দিতে হবে নূতন সম্পদ !
সাহিত্য-সাধনা নহে বিহীন বিপদ!
ভাষা যদি নাহি ধরে উচ্চ ভাবরাশি,
প্রাণহীন শবদেহ-প্রায়।
শব্দের ঝঋনা মাত্র শূন্যে যায় ভাসি,
অন্তরে না লেখা রাখে হায় ।
গ্রন্থকর্তা কবি-কাছে
সম্রমে দাড়ায়ে আছে
পাঠক-পাঠিকা, দেশবাসী।
দাও কিছু মূল্যবান তত্ত্ব অবিনাশী ।
সত্ব-শ্রাবণ, ১৩৩৫
১১৪
শান্তিতে সে লভুক বিশ্রাম
( আচাৰ্য শ্রীমৎ বিবেকানন্দের ইংরাজি হইতে )
চল আত্মা, শীঘ্রগতি, তারকা-খচিত তব পথে।
ধাও হে আনন্দময়, যথা নাহি বাঁধে মনােরখে।
কাল ও ভােগেচ্ছা দৃষ্টি-পথ নাহি করে আবরণ।
শান্তি ও আনন্দ যথা করে তােমা’ আচির বরণ
সার্থক তােমার সেবা, সফল হে তব আত্মদান।
অপার্থিব প্রেমপূর্ণ হৃদাসনে হ’ক তব স্থান ।
মধুময় তব স্মৃতি দেশ-কালে দিয়াছে বিদায়।
কুসুম-আস্তৃত পথ পাছে তুমি রেখে গেলে হায়
বিমুক্ত বন্ধন তব, পাইয়াছ আনন্দ-সন্ধান।
জীবন-মরণরূপে যাতায়াত করে যে মহান্ ।
হে সুহৃদ মহদাত্মা, আত্মত্যাগী চির এ ধরায়।
অগ্রগতি-প্রেমে সিক্ত করি’ ধরা পূর্ণ যন্ত্রণায়
নিজ শিয় জে, জে, গুডউইনের স্মৃতি-উদ্দেশে ১৮৯৮ খৃঃ রচিত
সঘ-ফান ১৩৩৫ ; বিশ্ববাণী-কার্তিক, ১৩৩৬
ব্যোমকেশ মুস্তফী
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ
নহে বিদ্যাবাচস্পতি, মনীষি-প্রধান,
অভিজাত সম্প্রদায়ে নহে সে ভূষণ,
সমাজের গণ্য মান্য শ্রেষ্ঠ সুসন্তান
ছিল না সে, কিম্বা কোন অপূর্ব রতন!
শ্রদ্ধা-অনুরাগপূর্ণ হৃদয় লইয়া,
মাতৃভাষা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠা-চিন্তায়
কাটাইত দিন সে যে উন্মত্ত হইয়া,
একনিষ্ঠ সে সাধনা হেরি নি কোথায় ?
প্রেমাবদ্ধ হয়ে তার ধনী ও বিদ্বানে
একত্র মিলিত হেথা বাণীর পূজায় !
মহতে পাইত ভয় যাহা অনুষ্ঠানে
সম্ভাবিত হ’ল তাহা দীনের চেষ্টায় ।
পরিষদ্ ব্যোমকেশ কভু ভিন্ন নয়
হৃদয়ের রক্ত ঢালি’ করেছে অক্ষয়।
রচিত-১৯১২৩৪—সঘ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৫
অমরার পথ
দীর্ঘ সুদীর্ঘ পথ সে চলিতে যে হবে
অমরায় ও ঈশ্বরে পহুছিতে।
পথিমাঝে দাড়াইয়া কথা নাহি কবে,
ক্ষিপ্রগতি ধাও সে ঈপ্সিতে।
প্রতি প্রাতে নানা বাধা রয়েছে সঞ্চিত,
সাখী-সম র’বে সর্বক্ষণ।
(অত্যাচারী) দুঃখপাশে জানুপাতি’ হও না পতিত,
তােল দৃষ্টি—সহাস্য বদন ।
মধ্যপথে অবসাদে ছেও না হৃদয়,
ফিরিও না যুদ্ধযাত্রা হতে !
ঈশ্বর করুণ—মােরা পাইব নিশ্চয়—
স্বর্গ-শৈল আগামী নিশিতে।
১৯২৮, অগাষ্টের ‘বেদান্ত-কেশরী’ হইতে অনূদিত—২১-৫-৩৫; ইং ৭২৮
সজ্জ—পৌষ, ১৩৩৫ ; বিশ্ববাণী—অগ্রহায়ণ, ১৩৩৬
১১৭
অমৃত-চক্র
র’চেছিল মধুচক্র শ্রীমধুসূদন,
গৌড়জন নিত্য যথা করে সুধাপান!
তােমার অমৃত-চাকে ক্ষরে অনুক্ষণ
নিত্য নব সুধা-বিন্দু অমিয়া সমান।
বঙ্গবাণী-নবকায়া-গঠন-উদ্যমে,
প্রাণপণে হ’ল ব্ৰতী বাণীপুত্র যত
প্রদানিতে নব শক্তি অসীম সম্রমে,
তােমার রচনা দিল তাহে সেবা শত!
তােমার চরিত্র-সৃষ্টি, তব চিত্রাঙ্কন,
তােমার ভাষার রম্যা লীলায়িত গতি,
কতই না প্ৰদানিছে মাধুরী-চিকন,
সুকৌশলে সঞ্চারিয়া নব ভাষা-জ্যোতিঃ।
নাট্যনভ-সুধাকর, হে অমৃতলাল,
তব দত্ত মহামৃত র’বে চিরকাল।
রচিত-৬ই বৈশাখ, ১৩৩৫; সভাদ্র, ১৩৩৫
‘অমৃত-চক্র-অনুষ্ঠিত নাট্যাচাৰ্য রসরাজ শ্ৰীযুক্ত অমৃতলাল বসু
নাট্যকলাসুধাকর মহাশয়ের প্রথম জন্মােৎসব সভায় পঠিত।
১১৮
শ্রীমধুসূদন
সমুদ্র মন্থন করি’ উত্থিত অমৃত
দেবগণ করে পান উল্লাসে মাতয় ;
শেষে আসি’ ভােলানাথ হয়ে চমৎকৃত,
পুনঃ মথি’ বিষপানে হ’ল মৃত্যুঞ্জয়।
বঙ্গবাণী-সিন্ধু মথি’ পূর্ব-কবিগণ
প্রেম-ভক্তি রস পানে হইল অমর।
মৃত্যুরে করিল জয় শ্রীমধুসূদন
রুদ্র-রস-পূৰ্ণ-সুধা পিয়ে পিকবর ।
অতিরিক্ত সুধাপানে রসপিপাসুরা
নিজ্জীব হইতেছিল, ক্রমে ক্ষীণ হিয়া ;
তুমি সঞ্চারিলে নব অমৃত-মদিরা,
সঞ্জীবিত গৌড়জন জাড্য বিদূরিয়া!
তাই তব মধুচক্রে সুধা নব নব
পিয়ে তব দেশবাসী করিছে উৎসব।
রচিত-২৯এ জুন, ১৯২৬-সঙ্ঘ—আশ্বিন, ১৩৩৫
খেলা মােৱ সাল হল
( স্বামী বিবেকানন্দের ‘My play is done হইতে)
চির উঠে, চির পড়ে
কালের তরঙ্গসনে
এখন(ও) গড়া’য়ে চলেছি আমি।
চলচ্চিত্র, ক্ষণস্থায়ী
অস্থির জীবন-স্রোতে
জোয়ারে উঠিয়া ভাটায় নামি। ১
শেষ-হীন এ রহস্য
আর নাহি লাগে ভাল,
এই সব দৃশ্য টানে না আর।
ছুটিয়া চলেছে চির,
পৌছে না গন্তব্যে কভু
পায় একটু আভাস(ও) তার। ২
জন্মজন্মান্তর হ'তে
দ্বারে অপেক্ষায় আমি,
নাহি খােলে হায় প্রবেশ-পথ।
নিভে এল আঁখি-জ্যোতি, দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত সূত্র
ধরিতে নিষ্ফল আয়াস শত। ৩
খেলা মাের সাঙ্গ হল ক্ষুদ্র জীবনের স্ফীত ক্ষীণ-সেতুস্থিত হয়ে, নীচেতে তাকা’য়ে কি দেখি আর । কঁদে, সম্মিলিত নরনারী, নাহি পায় কেহ সন্ধান তার । ৪ হাসে, যুঝে কেন সম্মুখে তােরণ-দ্বার অন্ধকার বিভীষিকা তুলি’ বলে—পথ পাবে না আর। এইখানে স্থির হও, ভাগ্যে না প্রলুব্ধ করি’ কর সহ তুমি যতটা পার । ৫ হও সাথী উহাদের, এ পেয়ালা পান করি হও গে প্রমত্ত ওদের মত। কে জানিতে চায় উহা দুঃখেরে বরণ করি’ স্থির হও—লও ওদের পথ ॥ ৬ দুর্ভাগ্য আমার হায়! বিলম্বিতে নারি আমি, ভাসমান এই বুদবুদ ধরা। অন্তঃসারশূন্য ইহা মর্ত্য নামে নামাঙ্কিত, মিথ্যা সে মরণ-জীবনভরা। ৭ মাের পক্ষে কিছু নয়, নাম-রূপ-আবরণ অতিক্রমি আমি যাইতে চাই। খুলে যা’ দ্বার শীঘ্র, উহা ভিন্ন মাের উপায় নাই। ৮ নিশ্চয় হইব মুক্ত, অর্চনা দেখাও আলােক-পথ শ্রান্ত তব পুত্রে মাতঃ, পারি না থাকিতে হেথায় আর । স্বধাম-প্ৰয়াসী-চিত্ত গৃহপানে ছুটেছে, মা, সাঙ্গ হ’ল খেলা এখানকার । ৯ পাঠাইয়া দিলে তুমি আঁধারে খেলিতে, মা গাে, ধরিয়ে সম্মুখে ভীষণ ছবি। সব আশা মুছে গেল, সভয়ে কঁপিছে প্রাণ, খেলা নহে—গুরু কৰ্তব্য সব(ই)। ১০ ইতঃস্তত সুবিক্ষিপ্ত দুঃখ-লালসায়-ভরা সাগর তরঙ্গে না পাই পার। আছে দুঃখ-হবে সুখ, এই নিয়ে বাঁধি বুক, নাহি দেখি কোন উপায় আর ॥ ১১ জীবনে মরণে আর হয় ছাড়াছাড়ি যথা, নয় ইহা সেইকেই বা জানে। দুঃখ-সুখ-ভরা-চক্র, চির পুরাতন সেই, বারেক ঘুরিবে আপন মনে। ১২ শিশুদল হেরে যথা উজল সােণার স্বপ্ন ; ধূলিসাৎ যাহা অচিরে হয়। দীর্ঘ পরিত্যক্ত আশা- আশে যথায় প্রয়াস, জীর্ণ এ জীবন অসারময়। ১৩ ১২২
খেলা মাের সাঙ্গ হল
বহুশেষে জ্ঞান-আঁখি
জানায় রহস্য-কথা
তখন(ও) বন্ধন হয় নি চ্যুত।
যখন আসিয়া পুনঃ
নবীন যৌবন-শক্তি
সে চক্রে ঘুরায় আবার দ্রুত ॥ ১৪
দিনে দিনে বর্ষে বর্ষে
ঘুরে যাহা অবিরত,
মায়ার পুতুল বইত নয়।
মিথ্যা-আশা-সঞ্চালিকা বাসনা-নাভির 'পরে,
সুখ দুঃখ যার যােজক হয় । ১৫
ভাসিয়া চলেছি আমি অনির্দিষ্ট দিকপানে,
বাঁচাও আমায় এ-জ্বালা হ’তে।
ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি মােরে দয়াময়ী মা আমার,
আর নাহি ভাসি বাসনা-স্রোতে। ১৬
বিভীষণা মূৰ্ত্তি তাের দেখাসূনে এ সন্তানে,
পারি না সহিতে-না কর বােষ।
সদয় হও মা, দেবি,
কৃপা করি’ পুত্রে তব,
ক্ষমা করি’ তার অশেষ দোষ। ১৭
যে পারে লইয়ে যাও
এ তব তনয়ে মাতঃ,
জীবন-সংগ্রাম যথায় শেষ।
ল’য়ে চল দুঃখ-পারে,
অশ্রু যথা নাহি ঝরে,
মর্ত্য-সুখ যথা নাহি মা লেশ। ১৮
অর্চনা
অপার মহিমা যাঁর
সুধাংশু তপন কিম্বা
ক্ষণিক উজ্জ্বল তারকামাল।
প্রকাশিতে নাহি পারে সে তীব্র বিদ্যুৎ-ভাতি,
ধরে যারা তার আভাস-জ্বালা । ১৯
মায়া-স্বপ্ন যেন আর
মুখ-চন্দ্রমা তব
নাহি রাখে ঢেকে আমার কাছে।
খেলা মাের হ’ল শেষ,
কাট মা বন্ধন-রাশি,
মুক্ত কর দেবি—এ দাস যাচে। ২০
রচিত-২৪৬৩৫-ইং ১০১০২৮; সদ্য-অগ্রহায়ণ, ১৩৩৫
উদ্বোধন-চৈত্র, ১৩৩৫ (৩১ বর্ষ, ৩য় সংখ্যা)
১২৪
মহাত্মা শিশিরকুমার
দেশমাতৃকার সে যে বরেণ্য সন্তান,
জনমিয়া বাঙ্গালার ক্ষুদ্র পল্লীকোণে,
তুলিল জাতির নাম, জাতির সম্মান,
জাতির হৃদয়-ব্যথা জগতের কাণে।
শত শত শতাব্দীর মূৰ্ত্ত সে বেদনা,
পুঞ্জীকৃত ছিল যাহা জাতির অন্তরে,
হৃদয়ের রক্ত দিয়া দিল সে আল্পনা
‘পত্রিকা’র পুণ্য-পীঠে অক্ষয় অক্ষরে।
অন্তরের মাঝে বহে ভক্তি-ফনদী,
বাহিরে অদম্য বীর করি’ প্রাণ পণ,
স্বজাতির শ্রেয়, হিত সাধি’ নিরবধি
দাসত্ব-মুক্তির আশে করে গেছে রণ।
শূর-ভক্ত, হে তপস্বি, প্রেমিক-প্রধান,
লহ লহ স্বজাতির প্রেম-অৰ্য-দান।
-জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৬; কায়স্থ-পত্রিকা-বৈশাখ, ১৩৩৬
অমৃত অমৃতলােকে
১
এই ছিল, এই নাই,
এ কি হ’ল কোথা যাই,
অমৃত হইল মৃত, এ কেমন দায়।
সত্য কভু মিথ্যা হয়,
অজ্ঞাত এ বিপৰ্যয়,
মৃত্যুজয়ী বীর কেন শ্মশানে লুটায় !
জরা যারে নাহি পারে
অবসন্ন করিবারে,
বার্ধক্যেও
নবযুবা
ছিল যে ধরায়,
বৃদ্ধ-শিশু মহারথী,
বাণী-ধ্যানমগ্ন যতি,
আজন্ম কাটায় কাল ভারতী-সেবায়।
'রে লয়ে গেল কাল,
বাঙ্গালীর দগ্ধ ভাল,
সকল( ই) সম্ভব এই অভিশপ্ত দেশে।
শােক-তপ্ত যার চিতে পারে নাই নােয়াইতে,
কালে যে করিত হেলা, মুখে হাসি হেসে !
অমৃতলাল
৪
কোথাকার সেই হাসি শেফালিকা-পরকাশি,
কেহ কি বলিতে পার সন্ধান তাহার।
প্রেম-মন্দাকিনী-ধারা পবিত্রিয়া পৃথী সারা
রসরাজ-মুখে-বুকে হ’ল কি সঞ্চার।
শ্বেতাজবাসিনী বাণী
তনয়ে অভয় দানি’
বরপুত্র-হৃদাসনে হ’ল অধিষ্ঠান।
অন্তর বাহিরে আলাে তাই তার জ্বলে ভালাে,
শুভ্র জ্যোতিঃ ভারতীর পাইয়া সন্ধান।
শুভ্র কেশ, শুভ্র বেশ,
মলিনতা নাহি লেশ,
শুভ্র হাসি আনন্দের সৌরভ ছড়ায়।
সুধাময় রসালাপ
নাশ করে মনস্তাপ,
জ্ঞানগর্ভ প্রবচন অমৃত বিলায় ।
৭
সামাজিক দুরাচার,
দুর্নীতির ব্যবহার,
অন্তদৃষ্টি করে তার অন্তর চঞ্চল।
হয়ে বদ্ধপরিকর
সাজিল সে নটবর,
লােক-শিক্ষা মূল-মন্ত্র—অমৃতে গরল !
১২৭
অর্চনা
নিজ হিয়া জ্বলে যার
দংশন কি সাজে তার,
অন্তরে কাঁদিয়া কবি-বাহিরে হাসায়।
হৃদি যে পাঠক
পড়ে তার সে নাটক,
কবি-সনে ফেলে অশু হৃদয়-জ্বালায়।
লােকে হেরে অভিনয়
কেবল আনন্দময়,
আনন্দে লুকান অশ্রু না পায় সন্ধান!
কত বড় কবি-প্রাণ
বুঝে কার আছে জ্ঞান,
নিজে সঙ সেজে আঁকে সমাজ-বিজ্ঞান।
ব্যঙ্গচিত্র শত শত
একেছে সে মহাব্রত,
রঙ্গ-ছলে দেখায়েছে বাস্তবের ছবি ।
দেখিয়া না দেখ যদি,
থাক মত্ত নিরবধি,
কেমনে বুঝিবে অন্ধ, কি দিয়াছে কবি ।
১১
বাঙ্গালার পথে ঘাটে, পল্লীর সে মাঠে-বাটে,
সুসভ্য সে সহরের বৈঠকখানায়
সমিতি ও সম্মেলনে,
বক্তৃতার রণাঙ্গনে,
আফিস ও আদালতে, আড্ডা ও আখড়ায়-
১২৮
অমৃতলাল নিবিষ্ট দর্শকমত ছাত্র অধ্যয়নরত, মহাযােগী ধ্যান-রত সুধী বিজ্ঞবর- ছিল সে অমৃতলাল, ভারতীর সে দুলাল, আঁকিল অমূল্য চিত্র বর-চিত্রকর। ‘হীরকের চুর্ণ দিয়া সারদারে আরাধিয়া- প্রথম প্ৰকটে সুধী মাতৃভাষা-সেবা। তিলেতে তৰ্পণ করি’ ‘ডিসমিস্-চিত্র ধরি, ‘চাটুয্যে-বাঁড়ুয্যে’ ছবি একে দেয় যেবা! ১৪ ‘বিবাহ-বিভ্রাট যার রহে চির-চমৎকার, আধুনিক বাঙ্গালার অপরূপ ছবি। ‘তাজ্জব-ব্যাপার’ যত, লেখনী আঁকিল তত, নিতুই নূতন চিত্রে বাঞ্ছারাম’-কবি । ‘রাজা বাহাদুর’ রঙ্গ মাতায় সারাটি বঙ্গ, ‘কালাপানি’ করে পার লেখনী যাহার । “বৌমা আর সেই ‘বাবু’ সমাজে করিয়া কাবু, ‘গ্রামেতে বিভ্রাট’ আনি’ করে ‘একাকার।
অর্চনা
‘সাবাস-আটাশ পরে ‘যাদুকরী খেলা করে,
অবতীর্ণ অবতার’, ‘কৃপণের ধন’!
‘খাস দখলে’র সনে ‘ব্যাপিকা-বিদায়’ আনে,
‘সাবাস-বাঙ্গালী আর সে ‘নব-জীবন।
১৭
‘দ্বন্দ্বে মাতন চিত্র,
যশঃ গায় শত্রু-মিত্র,
‘কৌতুক-যৌতুক’ কত দিয়াছে রসিক।
‘সম্মতি-সঙ্কট ছবি, ‘বিলাপ করেছে কবি,
‘বৈজয়ন্ত-বাস’ পাশে ‘বাহবা-বাতিক।
১৮
চিলি যে কুলবালা
অপরূপ ‘তরুবালা',
করুণ বিষাদ ছবি ‘বিজয়-বসন্ত।
প্ৰকটে ‘আদর্শ বন্ধু
উথলি প্রেমের সিন্ধু,
সে ‘নব-যৌবন’ নাট্য করে প্রাণবন্ত।
১৯
‘যাজ্ঞসেনী’ বিরচিয়া,
নাট্যে অবসর নিয়া,
প্রবন্ধ, নিবন্ধ শত প্রসবে লেখনী ।
অফুরন্ত সে ফোয়ারা, ‘বসুমতী’ মাতােয়ারা,
পা’ব কি আবার দেখা, ওহে গুণমণি।
অমৃতলাল
‘বিদূষক’, ‘পূর্ণরাম, অপূৰ্ব্ব সে নসীরাম’,
সাহেব ‘ফষ্টর’, ‘ফিস্ কৌতুকে খেলা’লে।
তুমি যা দেখালে নট, আছে হৃদে চিত্রপট,
মাতাল ‘বিহারী খুড়া কি হাসি হাসা’লে ।
২১
যে নট ‘রমেশ’ সাজে, তারে কি ‘নিতাই সাজে,
বিপরীত হেন রস কে ফুটাতে পারে।
কোথা ‘মামা তিনকড়ি, কোথা ‘কৃষ্ণকান্ত’ মরি,
অমৃতই শুধু উঠে অমৃত-পাথারে!
রচিয়াছ শত গান,
ঢালিয়াছ নিজ প্রাণ,
গদ্য পদ্য সম তব চক্র অমৃতের।
‘অমৃত-মদিরা পিয়া
চিত্ৰিল প্ৰমত্ত হিয়া
নিজের, পরের চিত্র, ব্যথা ব্যথিতের।
দিলে তুমি শত শত,
মহিমা গাহিব কত,
অগণন শিষ্য তব আজি দেশময়।
শ্রদ্ধার লেখনী লয়ে,
তব প্রেমে মুগ্ধ হয়ে,
ভক্তিভরে সমস্বরে গা’বে জয়, জয় ।
অর্চনা
২৪
আদরের ‘পরিষদ
ওহে নাট্য-বিশারদ,
কত না প্রেমের দান দিলে রসরাজ।
সে প্রেম স্মরিয়া মনে,
শ্রদ্ধাপূর্ণ অসনে
ক্ষীণ-কণ্ঠে দীন কবি গায় স্তুতি আজ!
কৰ্ম্মময় জীবন
করি দীর্ঘ পৰ্য্যটন,
জন-সেবা বহু মতে করিলে প্রবীণ !
শিক্ষার বিস্তারে পণ
ছিল তব আজীবন,
কত মতে জ্ঞান দিলে আচাৰ্য্য প্রাচীন।
সমাজে আদর্শ চিত্র
ধরিলে হে দেশমিত্র,
আচার ও অনুষ্ঠানে আদর্শ বাঙ্গালী।
সনাতন ধৰ্ম্ম-ধারা
পালিলে জীবন সারা,
মিশিলে সকল সনে ছেড়ে চতুরালী।
২৭
মহাশক্তি-মহাধার
‘রামকৃষ্ণ-অবতার,
চরণে আশ্রয় তার নিলে ভক্ত বীর।
অনুভবি’ তার শক্তি
করিলে অশেষ ভক্তি,
‘বাল্যলীলা’-অর্ঘ্যে শেষে লুটাইলে শির!
১৩২
অমৃতলাল
২৮
যাও দেব অমরায়,
চিরােজ্জ্বল অলকায়,
কবিদেবদল সদা করে যথা বাস !
সারস্বত-বীণা ধরে
গীর্বাণীর সেবা করে,
অন্তিমে মিলিতে যথা বাঞ্ছ করে দাস।
মাসিক বসুমতী-অমৃত-স্মৃতি-সংখ্যা, শ্রাবণ, ১৩৩৬; সত্ব-শ্রাবণ, ১৩৩৬
বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ মন্দিরের স্মৃতি-সভায় ও ইউনিভারসিটী
ইনষ্টিটিউটের স্মৃতি-সভায় পঠিত
অমর শিশিৱকুমার
এ-মর-জগতে
মৃত্যু অনিবাৰ্য্য,
কীৰ্ত্তিমান মাত্র বাঁচিয়া রয়।
জন্মিলে মরিবে— ইহা চির ধার্য্য,
অন্যথা ইহার কভু না হয় !
সে-সত্য যুগের
প্রারম্ভ হইতে
ধরিত্রী ধরিল কত যে বক্ষে !
কালের কবলে
হয় নাই যেতে
এমন কিছুই পড়ে না চক্ষে ।
নশ্বর সংসারে
কিসের লাগিয়া
কোটী কোটী নর কেন গাে আসে।
চিরনিদ্রা-মাঝে
দু’দিন জাগিয়া
জলের বুদ্বুদ জলেতে মিশে।
পুরা ইতিহাস শিশিরকুমার এ পুণ্যভূমির কত না ভাম্বর, কত না দীপ্ত । কিন্তু কোথা আজ সব কীৰ্ত্তিবাস, অনন্ত কালের কুক্ষিতে লিপ্ত ! শত শত বর্ষ থাকি’ পরাধীন তেজ বীৰ্য সব গিয়েছে চলে । নাই সাধ্য কার করে কোন হিত, কি বা হবে আর সে সব বলে। - মোগল-আমলে ছিল নানা বীর- প্রতাপ, শিবাজী, আদিত্য আদি । নাই আশা আর ফিরিবে তাহারা, ভারতের বিধি হয়েছে বাদী। দেশের বেদনা হ’ল প্রকটিত বাঙ্গালীর মাঝে দু’চার স্থানে। পরাধীনতার ব্যথায় ব্যথিত, করিল চঞ্চল মহৎপ্রাণে! যশােরের এক ক্ষুদ্র গণ্ডগ্রামে ঘােষবংশােজ্জ্বল মনীষী ধীর। হৃদয়ের রক্তে লিখি’ অবিরামে জাগাইল দেশে দুর্ধর্ষ বীর ।
অর্চনা
জননীর নামে
করে নামাঙ্কিত
জনম-ভূমির দিল সে নাম ।
‘অমৃতবাজার’
হ’ল প্রতিষ্ঠিত,
সুমণ্ডিত যশঃ নূতন ধাম !
সেই নামে হ’ল ‘পত্রিকা স্থাপিত,
দেশমাতৃকার মরম-কথা !
ছত্রে ছত্রে তার
হইল লিখিত
জনম-ভূমির প্রাণের ব্যথা !
দেশের পূজায়,
দেশের সেবায়
সমকক্ষ তার কোথায় পাই।
জনম অবধি
একই ধারায়
প্রাণ-পণ সেবা কোথাও নাই।
যথা আৰ্ত্তজন,
যথায় বিপন্ন
কঁদে অত্যাচারে নিভৃত কোণে।
শিশিরকুমার
করি’ তন্ন তন্ন
জগতের কাণে সে কথা আনে।
অক্লান্ত উদ্যমে
লেগেছিল বীর দেশের কাজে।
জাতীয়তা-ভাব
স্বজাতি-সেবায় অগ্রণী সে যে !
নির্ভীক, অদম্য,
গাঁথিল মরমে,
শিশিরকুমার = রাজার নূতন নিয়ম-বাঁধনে বন্ধ করে যবে তাহার গতি- বিদেশী ভাষার সাহায্য-সাধনে, প্রচারে ‘পত্রিকা’ সে স্থিরমতি। স্বদেশসেবায় ‘অমৃতবাজার’ আজন্ম অগ্রণী—তুলনা নাই। সচকিত দৃষ্টি প্রজার, রাজার করে অনুক্ষণ—কোথায় পাই। বাহিরে হাসায়, অন্তর জ্বালায়, খুব চিনে তারে বিজেতা জাতি। বাঁধিতে তাহারে পায় না উপায়, কত না ভেবেছে দিবা ও রাতি! বাঙ্গালা দেশের, বাঙ্গালী জাতির শিশিরকুমার আদর্শ ছবি । প্রেমে ভরা বুক সে ভক্ত সুধীর, বাহিরে কঠোর কর্তব্য-রবি । যে পড়েছে তার ‘অমিয় নিমাই’, বিকায়েছে তাঁর চরণ-তলে! প্রেমের ঠাকুর, তুলনা যে নাই, একেছে তাহারে নয়ন-জলে। ১৩৭
पकना
কোমলে কঠোরে
এমন মিলন
অমর শিশিরে দেখিবে মূর্ত ।
প্রেমােন্মত্ত ভক্ত,
ধনুর্ভঙ্গপণ,
ব্যথিতের ব্যথী, শঠের ধূৰ্ত্ত !
দেশের সেবক,
প্রেমিক-প্রধান
আচরি’ তােমার অপূর্ব নীতি!
বীরভক্ত-মত
হক আগুয়ান
শতধা বিধ্বস্ত তােমার জাতি।
স,
চৈত্র-১৩৩৫
কায়স্থ-পত্রিকা, কার্তিক, ১৩৩৬
১৩৮
ঐশ্রীকালী
( শ্যামসুন্দরের মাতৃ-মূর্তি )
আমি ক্ষিপ্ত বহুধা নিন্দিতা হিন্দুর দেবতা সেই কালী।
প্রতিক্ষণে প্রকাশি স্বরূপ, নাহি করি কোন চতুরালী।
মুৰ্তি মাের করিছে প্রকাশ যােগ্যতম-উদ্বর্তন-চিত্র।
আধুনিক বিজ্ঞান-সম্মত সঠিক সে সদা সুপবিত্র।
কালীঘাটে শােণিতের বিন্দু আজ সভ্যতা বিস্মিত করে।
চারিদিকে করে আন্দোলন, শতমুখে বহু নিন্দা ঝরে।
ভােলে নি মেদিনী আজ(ও) সেই শেষ মহাযুদ্ধ-মহামারী।
সাময়িকী—তাই চলে হেথা আজ এত নিন্দা টিটকারী।
শক্তিতে বিশ্বাস নাই কারাে, আর সেটা মিথ্যা প্রবঞ্চনা।
নরের প্রকৃত দুঃখে নাই তার দীর্ঘশ্বাস অশ্রুকণা।
দয়াহীনা আমি হত্যাকারী, মূৰ্ত্তি মাত্র সে ত শূন্যময়।
শূন্যে আমি থাকি মহানন্দে, মাের শূন্যই বসন হয়।
শূন্য হ’তে সৃষ্টির আরম্ভ, মাঝে করে শূন্যে অবস্থান।
শূন্যে উহা হয় পরে লয়,-সৃষ্টি-সূত্রে নাহি করি আন।
শূন্য হ’তে করি সৃষ্টি আমি, করি পুনঃ শূন্যে স্থানান্তর ।
চক্রাকার অসি-সঞ্চালনে আনে মাত্র এই ভাবান্তর।
অর্চনা
নহি আমি চিত্তহরা সুশ্ৰী শােভাগৃহ-শােভার-পুতুল।
করিয়াছি ধূলিসাৎ কত কুঞ্জ-হুম্মা চরণ-বর্ভুল।
মুণ্ডমালা দোলা’য়ে খেলাই, শ্রেষ্ঠ শির চরণে গড়াই।
লেলিহান রসনায় আমি সর্বনাশী সকলে জানাই।
ঝা’পরে দামিনী দলকে-ইরম্মদ ল’য়ে খেলা মাের।
চণ্ডী আমি অসুরনাশিনী-গর্ব-খৰ্বে আনন্দে বিভাের।
প্রতিমা বা প্রতীক নহি গাে, তথাপিও আমি বিদ্যমান।
চিন্ময়ীর না হলে প্রতিষ্ঠা, মৃন্ময়ীরে করি খান্ খান্।
গেয়েছিনু ভৈরব-হুঙ্কারে একদিন ‘হর’ ‘হর’ ‘ব্যোম্।
ব্যোমকেশ ফেলে দিল ছুঁড়ে সুসভ্য সে দীপ্ত “গ্রীস' নােম।
পণ্ড করে মম অভিপ্রায় বহু লজ্জা পেয়েছিল তারা।
কাল-চক্রে সেই মহাজাতি অতিদ্রুত হ’ল ভাগ্যহারা ।
‘সক্রেটিস’ বিষপান করে, ‘খৃষ্ট’ করে ‘কুশে অবস্থান।
প্রতিহত মানব-সভ্যতা হেরিয়া সে বিধির বিধান।
কেটে গেলে মােহের প্রভাব জড় ল’য়ে পুনঃ খেলা করে।
স্বরাজ্য ও সাম্রাজ্যের স্বপ্নে পূৰ্ব্ব পথে আবার সে ফেরে।
প্রেম, বিধি, ন্যায় নিষ্ঠা আর—জীর্ণ তিন পথ পুরাতনে।
নাহি স্থান আর তাহাদের প্রাণহীন ব্যর্থ এ মিলনে।
বুদ্ধিমান চাহে যেই রূপ এ জগৎ মােটে তাহা নয়।
ঘটিয়াছে যে পরিবর্তন, মম ইচ্ছা জানিহ নিশ্চয়।
১৪০
ঐশ্রীকালী
উঠে পড়ে, প’ড়ে উঠে পুনঃ মায়ানাশা এ মম কৃপাণ ।
যতকাল ব্যক্তি কিম্বা জাতি অহঙ্কারে নাহি পায় ত্রাণ ।
শান্ত হয় প্রমত্ত সে মন, চঞ্চলতা দূরে তার যায়।
চিরাভ্যস্ত নিজ পূর্ব-ভাব তখন সে দেখিবারে পায়।
সেই শান্তি ও ধৈর্য্যের পরে দ্বৈত-ভাবে খেলে সে প্রকৃতি।
নিত্যে অনিত্যতা, দুয়াে সে, “মায়া’-নামে যাহার বিবৃতি।
পূর্ব হ’তে জড়াচ্ছন্ন সে যে, দেহ-বুদ্ধি বাড়াইয়া তােলে।
অভিমানে প্রমত্ত থাকিয়া ছুটে যায় মরণের কোলে।
পবিত্র সে বনস্পতি-মধু উপেক্ষিত লালসার করে।
করে গাে মন্থন প্রেম-পূৰ্ণ-হৃদি মম কাঞ্চনের তরে।
সমুঙ্খিত বিষপান করি’ প্রভু মম নীলকণ্ঠ হায়।
আত্ম-অভিমান-রূপ-অজে উৎসর্গিতে তবুও না চায়।
শক্তি আমি পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত, জড়-পদে মাথা নত করে।
মম ভক্তে ‘দেবতা-গােলাম’-কহে তা’রা অবজ্ঞার ভরে।
অনুমিলে সে সত্য প্রণবে—বহু পূর্বে বেদের ঘােষণা।
ক্ষণস্থায়ী বিজ্ঞান-কুটীর যখনন গাে হয় নি জল্পনা।
বায়ুযানে আকাশে উড়িতে, কিম্বা পার সমুদ্র মথিতে।
প্রহেলিকা জিজ্ঞাসে মানবে—হবে কিম্বা না হবে’ জানিতে।
আসা, ফেরা, স্থিতির রহস্য—নিত্য বটে সন্ধান-বিষয়।
নানা ভাবে বহু সাধনায় জ্ঞান-গম্য নাহি তবু হয়।
১৪১
অর্চনা
বসুন্ধরা ক্ষুদ্র গ্রহ মাত্র, কিম্বা সূৰ্য্য, ক্ষুদ্র সে তারায় ।
পার যদি জানিতে এদেরাে, তবু তত্ত্ব ভেদ নাহি হায় ।
পার যদি জানিতে ঈশ্বরে, সব তত্ত্ব প্রকটিত হবে।
আমাকে বা তাহাকে জানিতে কিছু আর বাকি নাহি রবে।
রিপু-বশীভূত যে মানব—যার আঁখি কামনায় ভরা।
হেরে মাের অসি-সঞ্চালন—জ্বালামুখী আমি ভয়ঙ্করা।
করালিনী—তাদের নিকটে ক্ষেপে নাচি দিগম্বরী-সাজে।
স্বার্থ-শূন্য তনয়-আহ্বান মাত্র মাের হৃদয়েতে বাজে।
রুদ্ধ করি অগ্নি-বরিষণ, সহ্য করি তার অত্যাচার।
সে আমার প্রভুর দুলাল, এ্যস্ত হই শক্তিতে তাহার।
কাপালিক করাল সে করে শঙ্কর করিল আত্মদান।
ছুটেছিনু তার প্রাণ-তরে রাখিবারে পুণ্যভূমি-মান।
প্রিয় পুত্র রামপ্রসাদেরে একদিন দেখাই ভয়।
উত্তরিল--তােমারে খাইব’—‘ডরে কি মা তােমার তনয়।
প্রিয় শিশু জানে মাের রীতি, হেরে মাের আচরণ ভেদি।
কহে—‘রক্ত আঁখি হেরিয়া মা, ভীত কেন হবে মাের হৃদি।
বিভীষণা বাঘিনী করালী মৃত্যু যে গাে সকলে বিলায়।
সন্তানের আগমনে তার(ও) ভীষণতা সব লােপ পায়।
প্রাকৃতিক নিয়মের বশে শাবকেরে স্তন্য দান করে।
সর্বব-ক্রোধ প্রেমে পরাজিত, প্রেম(ই) হেথা ভাগ্য নাম ধরে ॥
১৪২
শ্ৰীশ্ৰীকালী
বৃন্দাবনে এনেছিল প্রেম, অসি হ’তে বাঁশীর উদ্ভব।
প্রতিমা ও ‘মহামন্ত্র’ মম গােপী-প্রেমে হ’ল পরাভব ।
সর্বগ্রাসী সধ্বংশী লীলা হেরি মাের হইয়া ব্যথিত।
কালী ছেড়ে মজিল অৰ্জ্জুন কৃষ্ণে সখ্য করিয়া স্থাপিত।
রাধা দেয় অঞ্জলি চরণে, কালী হয়ে দাড়াই আবার।
সঙ্গোপনে আয়ান যখন চতুরে সে চায় ধরিবার।
শ্রীরাধা সে হলাদিনী আমার, ব্রজগােপী-কুল-শিয়ােমণি।
দুয়াে সে, অনন্ত-মহিম বংশীধারী-প্রেমসােহাগিনী ।
প্রবেশি’ সে নিষ্কাম অন্তরে, যথা মিলে নদী সিন্ধুসনে।
প্রমাণ হের সে পূর্ণত্বের প্রতিমূর্তি পতিত চরণে।
হিমালয়ে করি আমি বাস, মহাদেব প্রাণেশ্বর মম।
চলি আমি ইঙ্গিতে তাহার, প্রভু-পাশে কৃতদাসী সম।
তিনি মাত্র এ সংসারে এক, বাকি সব শূন্যে শূন্যময়।
অসি মম সবাই ডরায়, কাপুরুষ বা বীর দুর্জয়।
কাল মােরে নাহি করে স্পর্শ—ভক্তগণ চেনে যারা মােরে।
যে উৎপাত অন্যেরে মজায়, পুত্র মম তুচ্ছ গণে তারে।
মুক্তির সে রহস্য অদ্ভুত ক্রুর ভাবে প্রকট আমায় ।
চির-সত্যে উপহাসে নর, সাবধান জীব পুনরায় ।
সজ-কার্তিক, ১৩৩৬
বিশ্ববাণী—৩য় বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, পৌষ, ১৩৩৬
১৪৩
দাভাকর্ণ মণীন্দ্রচন্দ্র
সৌম্য শান্ত ঋষিকল্প ত্যাগমূৰ্ত্তিমান,
বঙ্গের মরুভূ-মাঝে কে নরেন্দ্রবর
সৃজিলে অমৃতচক্র স্নিগ্ধ-মরূদ্যান,
ছায়াবারি দান করি’ হইলে অমর ?
জ্ঞান-ভক্তি-কৰ্ম্ম-যােগে আনি’ সমন্বয়,
ভারতীয় ধৰ্মধারা অক্ষুন্ন রাখিয়া,
এ যুগে আদর্শ ধরি’ হলে মৃত্যুঞ্জয়,
পাবে শান্তি দেশবাসী তােমারে স্মরিয়া
শিক্ষা-শিল্প-ব্ৰহ্মচৰ্য্য-সাধন-আলয়-
স্থাপিলে হে কৰ্ম্মযােগী শত প্রতিষ্ঠান।
শত শত বিদ্যার্থীর জীবন-আশ্রয় ;
কোটি কণ্ঠে গায় আজি তব যশােগান।
হে রাজর্ষি, নরােত্তম, বৈষ্ণব-প্রধান,
তবাশ্রিত বাণী-পীঠ করে শ্রদ্ধাদান।
বিশ্ববাণী-৩য় বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, ১৩৩৬; স-অগ্রহায়ণ, ১৩৩৬
বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের শ্রদ্ধা-সভায় পঠিত
১৪৪
শ্রীমৎ স্বামী সাৱদানন্দ
বিশ্বমাতৃ-অঙ্কস্থিত কে পুত্র মহান
এলে আজ ধরা’পরে-বাজে মহাৰ্য্য,
দাসরূপে ফিরে সাথে রিপু বলবান
কাম-ক্রোধ-লােভ-মােহমদ ও মাৎসর্য্য।
জ্ঞান-কৰ্ম্ম-ভক্তি-শ্রোত বহে একাধারে,
শ্রীগুরুর মহাশিষ, অন্তরঙ্গবর,
করিয়াছ ইষ্টপূজা নানা উপচারে,
সে’ ‘লীলা-প্রসঙ্গে তুমি রহিলে অমর।
‘মা’র চরণে বসি’ ধরিয়াছ ধ্যান,
রচিয়াছ ‘শক্তি-পূজা’-ভারত-সাধনা।
‘গীতাতত্ত্ব’ নবভাষ্যে অপূর্ব ব্যাখ্যান,
রামকৃষ্ণ-তত্ত্বালােকে—সার্থক রচনা।
লােকহিত-যুগধৰ্ম্ম-প্রধান-ঋত্বিক।
দাসের প্রণতি লহ প্রধান প্রেমিক।
রচিত-পৌষ-শুক্লা-সপ্তমী, ৪ঠা মাঘ, ১৩৩৫
সমাঘ, ১৩৩৫ ; বিশ্ববাণী-অগ্রহায়ণ, ১৩৩৬
১৪৫
বঙ্গীয় সাহিত্য-পৱিষৎ-পৱি
দীনা-হীনা বঙ্গভাষা এই শুনি পরিচয়।
নাই কিছু রত্ন-ধন বহু লােকে সদা কয়।
দুই চারি দশ জন কিছু লিখিয়াছে বটে।
জগতের ভাষা-মধ্যে ’তে নাহি নাম রটে ।
এ-কথায় ব্যথা পেয়ে মাতৃভাষা-অনুরাগী
বাণীর মন্দিরে মিলে রত্ন-আহরণ লাগি ।
হেঁড়া-পুথি কীট-দষ্ট গ্রাম-গ্রামান্তর হতে
পেতে ছােটে বাঙ্গালার গৃহ-কোণে ঘাটে পথে |
চেয়ে দেখ দেশবাসী বাণীর মন্দির-পানে।
ভারে ভারে রত্নরাজি শতেক সেবক আনে।
পদাবলী, গীত, গান, গাথা, দোহা শত শত।
পাঁচালী ও নাট্যগীতি বাহিরিছে অবিরত।
পুথি ও তামার লিপি, শিলালিপি অগণন
ইতিহাস করে গান জাগায় দেশের মন ।
সাহিত্য-সম্পদ-রাশি বাঙ্গালার তুচ্ছ নয়।
দেশ-দেশান্তরে আজি গাহিছে তাহার জয়।
‘কৃষ্ণ-কীৰ্ত্তনের’ ধ্বনি বেজেছে জগত-কাণে।
‘বৌদ্ধ-গান’ ‘দেহাবলী’ বিশ্বদৃষ্টি হেথা আনে।
১৪
পরিষৎ-পরিচয়
বঙ্গবাণী-রত্নাকরে মাণিক-মুকুতা-পাতি।
দ্যুতিমান মরকত দীপ্ত মণি নানা জাতি।
ভগ্ন-পে, কুঁড়ে ঘরে, গুপ্ত গুহা, বনমাঝে।
অযত্ন-রক্ষিত কত আজো মহারত্ন রাজে ।
অগণন ছিল, আছে—সবে কর অন্বেষণ।
বাড়িবে জাতির মান পাইলে সে সব ধন ।
হে রাজা ‘বিনয়কৃষ্ণ, মনীষী রমেশ দত্ত।
‘চক্রবর্তী ক্ষেত্রপাল’ মাতৃভাষা-প্রেম-মত্ত,
হে ‘রামেন্দ্র’, ‘বব্যামকেশ’, ‘চৌধুরী যতীন্দ্র রায়
মাতৃ-পীঠ-সেবা ছাড়ি’ কোথা চলে গেলে হায়।
পরিষ-প্রতিষ্ঠাতা, পােষ্টা, স্রষ্টা, পালয়িতা।
একনিষ্ঠ হেন সেবা কে আর দানিবে হেথা ।
এস শত ভক্ত আজি স্মরিয়া জনম-তিথি
মাতৃভাষা-পুণ্যতীর্থে সেবা করি নিতি-নিতি ।
হে সাহিত্য-পরিষদ, বঙ্গবাণী-মন্দির,
অর্ঘ্য ল’য়ে দাস আজি নতজানু, নতশির।
পরিষদ-জন্মােৎসব-সভায় পঠিত, ই শ্রবণ, ১৩৩৬
সঙ্ঘ-শ্রাবণ, ১৩৩৬; বিশ্ববাণী-মাঘ, ১৩৩৬
১৪৭
নবম নন্দন
নয় স্বর্গে আছে আট নন্দন কানন।
নবম কোথায়? খোজ মানবের মন।
নন্দনে করেন বাস কৃপাপ্রাপ্ত নরে।
কৃপা মুর্তিমতী কিন্তু মানব-অন্তরে।
সৃষ্ট জীব করে বাস স্বর্গের নন্দনে।
আনন্দে থাকেন স্রষ্টা শুদ্ধ-স্বত্ত্ব মনে ।
সে আট নন্দনে তুমি চাহ কি মানব।
নবম বিহীন হয়ে থাক ইচ্ছা তব ।
পেতে পার নর তুমি সে আট নন্দনে।
নবমে পাইবে কিসে খােজ নিজ মনে ॥ *
চিন্তাকা
মাতৃভূমি, মাতৃভাষা, স্বধৰ্ম্ম, স্বজাতি-
হয় যেন আমাদের ধ্যান দিবারাতি।
* আরবীয়ের ইংরাজি হইতে—চ, ২য় সংখ্যা, ১৩৩৭
স—এাবণ, ১৩৩৭
১৪৮
শ্রেষ্ঠদান
সযত্ন-সঞ্চিত মম ক্ষুদ্র কোষ হতে
দিনু এক ভিখারীকে সুবর্ণের দান।
নিঃশেষিয়া সব তার ফিরে এল পথে-
পুৰ্বমত ক্ষুধার্ত সে, দেহ কম্পমান।
দিলাম-এবার তারে আমি কিছু তত্ত্ববাণী-
সাধিয়া সে উপদেশ হ’ল সে যে মহাপ্রাণী।
দেবাশীষ ল’য়ে শিরে, তেজস্বী সে ভদ্রবেশে
ভ্রমে হেথা সগৌরবে, আজ নহে ভিখারী সে। *
চিন্তাকা
দেবতার অন্বেষণে খুজে মরি ত্রিভুবন
দেখেও দেখি না মােরা নর মাত্র নারায়ণ।
* ইংরাজি হইতে—চক্র, ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ১৩৩৭
সদ্য-শ্রাবণ, ১৩৩৭
১৪৯
সনাতন (গাথা ) হাহাকার রবে উড়িষ্যায় যবে দুর্ভিক্ষ দানিল সাড়া, শুষ্ক চারিভিত, তৃণ-বিরহিত, বাজিল শমনকাড়া। তপন-তাপিত, দগধ, দলিত, পল্লববিহীন তরু, কূজে না ক পাখী, শূন্য সব শাখী, নাহি দেশে মােষ গরু। তিন বর্ষ ধরি’, অজম্মায় ঘেরি’ রাখিল এ পােড়া দেশ— নাই বারিপাত, মৃত্যুর উৎপাত, প্রাণ-আশা নাহি লেশ। সনাতন-নামে কোন এক গ্রামে আছিল অনেক যুবা। বৃদ্ধ মাতাপিতা, সহােদর ভ্রাতা—ছিল না ক অন্য কেবা ! জনমে ধান কণা-পরিমাণ, দু'বছর ছােট ক্ষেতে গৃহ-পশু বেচি’, রহে তা’রা বাঁচি-বিনিময়ে পেয়ে খেতে । কয় মাস যায়, পিতামাতা, হায়, খাইয়া গ্রাসেক ভাত- সন্তানের তরে বাকী রাখে ধরে,যারা কাঁদে দিনরাত ।
সনাতন
‘আমি বেশী খাই, যদি চলে যাই, পাবে খেতে ওরা বেশী’
স্বামি-বাক্য শুনে প্লাবিত নয়নে স্ত্রীর হৃদি যায় ভাসি।
‘তুমি ছেড়ে গেলে, কাঁদিয়া সে বলে,
কি হবে যে আমাদের
‘জান নাকি তুমি? তার চেয়ে আমি চলে গেলে বাঁচে ঢের!
‘আছে অলঙ্কার যা কিছু আমার—সহরে বেচিতে যাও;
‘খাদ্য কিছু আন, যাহে বাঁচে প্রাণ, বাছাদের গাে বাঁচাও।
তাজিল না তারে, বেচি অলঙ্কারে সামান্য তণ্ডুল পায়
গ্রামে নাই খাদ্য, সংগ্রহ দুঃসাধ্য, মাত্র কয়বার খায় ।
সনাতন ভাবে—পরে যে কি হবে, পিতামাতা নাহি জানে ;
ভিক্ষা-তরে যাই, যদি কিছু পাই—ছুটিল বাহির পানে।
রৌদ্রতপ্ত দিনে ভ্রমে একমনে, কিছু যদি কোথা পায়,
বন-ফল, পাতা নাহি মিলে কোথা, ফেরে আর্ন্ত বুভুক্ষায়।
অবসন্ন দেহে যবে আসে গেহে, মা দেন সামান্য অন্ন,
তেজস্বী-হৃদয়, মাথা নেড়ে কয়—তৃপ্ত আজি, নহি ক্ষুন্ন ।
কাল বনে গেলে, কিছু না পাইলে, রাখ উহা, খাব পরে-
চলে যায় মাতা, বুঝি’ সুত-ব্যথা, বিরলে নয়ন ঝরে।
ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদিয়া ভাসায় ছােট ভাই অবিরত
জননী তখন দেয় সে’ অশন, সনাতন আনন্দিত।
প্রতি প্রাতঃকালে সনাতন চলে, পাতা শাক কভু পায় ;
কিম্বা তৃণ দুটী, মরে নি যে ক’টি প্রচণ্ড তাপেও হায় !
অর্চনা ভাল কিছু পেলে ছুটে ঘরে চলে, বলে হেসে মার কাছে তােমাদের তরে এনেছি ইহারে, পেট মাের ভরিয়াছে। এইরূপে হায়, দুর্দিন কাটায়, অস্থিচর্মসার পিতা- পারে চলিতে, কঁপে পা ফেলিতে, ট’লে পড়ে যথাতথা! কোন উপকার পারে না সে আর করিতে আপন জনে- ‘আমি চলে গেলে,মম অংশ পেলেহ’বেভালভাবে মনে পত্নীরে ডাকিয়া কহে বীর হিয়া,-“কিছু দূরে যাব আমি, ‘ভাল আমি র’ব, ভাবনা কি তব, বাসিও না ভয় তুমি’! নারী ভাগ্যহীনা, বচন সরে না, বুঝিতে পারিল মনে কোন যাত্রাপথে স্বামী চায় যেতে, ফেলি’ প্রাণপ্রিয়-জনে! পরদিন প্রাতে হাঁটি পায়ে হাতে ছাড়ে সে কুটীর দুখে— পিতৃপিতামহে আছিল যে গেহে—নিজে ছিল যথা সুখে। পাছু পানে ফিরি’, বারেক নেহারি’ আশীৰ্বাদ ভিক্ষা চায় । পরে দেহ টেনে চলে যায় বনে-আর দেখা নাহি পায় । সনাতন-মাতা ক্রমে শয্যাগতা, হৃদে পেয়ে দুখ নব- তাহে অন্ন কষ্ট করে প্রাণ নষ্ট, হেরে মৃত্যু উৎসব। মাত্র সনাতন লইল তখন সব ভার নিজ শিরে! মাতৃ-সেবা করি’, ভিক্ষাপাত্ৰ ধরি’ বাহিরায় গ্রামে ধীরে ! কভু গিয়ে দূরে রিক্ত হস্তে ফেরে, মুঠা দুই কভু পায়— আনন্দ-উল্লাসে মায়ের সকাশে ল’য়ে উহা ত্বরা ধায় ।
সনাতন - মাতাও তখন উল্লসিত মন, সুস্থ কিছু বােধ করে- একে একে হায়, সকলি ফুরায়, ভােগ করি’ ক্ষণ-তরে। ক্রমে দুঃখ বাড়ে, পেটে নাহি পড়ে কাহারাে দু’গ্রাস ভাত- লােক দলে দলে অনশনে জ্বলে, করে শিরে করাঘাত! সনাতন ভাবে কেমনে বাঁচাবে তাহার দুঃখিনী মায়ে নিজে ত সে জীর্ণ, কেঁদে হয় শীর্ণ, কিসে বা বাঁচাবে ভায়ে। তবু নরােত্তম নহে ভগােছম, ক্ষীণ পদে ভ্রমে দূরে— বুকে আশা বাঁধি’, দুই গ্রাস যদি দেয় কেহ দয়া করে। একদিন হায়, বহুদূরে যায়, চলে না চরণ আর উত্তপ্ত সে পথে পারে না টানিতে অবসন্ন দেহ-ভার। বৃক্ষতলদেশে আশ্রয় লয় সে জুড়াইতে কিছুক্ষণ নিজ-জন-তরে অন্নপাক করে কাছে নারী একজন। এনেছে সে নারী কিছু ক্রয় করি’ নিকটের গ্রাম হতে যথা আজো অন্ন হয় নাই শূন্য—তথা হতে কোন মতে। গন্ধ পেয়ে তার করিল চিৎকার ক্ষুধার জ্বালায় যুবা- ‘তিন দিবানিশি আছি উপবাসী, দাও মােরে কিছু সেবা। পাক-পাত্র হতে কিছু তুলে হাতে দিল নারী দয়াময়ী ভাবিল নিঃশেষে খাবে সে হরষে--চিনে নাই লােভজয়ী। উঠে সেই দণ্ডে বাঁধি ব-খণ্ডে নারীর অমূল্য দান- কৃতজ্ঞ ভাষায়, শত প্রশংসায় গাহিয়া তাহার গান।
অর্চনা যায় সনাতন, চঞ্চল চরণ যদিও টলিয়া পড়ে গতা মাতার মুখ-ছবি তার হৃদয়ে আঘাত করে। কতদূরে তা’র আছে গৃহদ্বার স্মরণ করিতে নারে মা’র ক্ষুধা স্মরি’ আপনা পাশরি’, ত্যজে লােভ বারে বারে। দিবা অবসান, বহু ব্যবধান, তখনাে হাঁটিছে পথ— দিল দেখা রাত্রি, অবসন্ন যাত্রী, পূরে নাই মনােরথ ! অবশেষে বীর নােয়া’য়ে শরীর শুইল পথের পাশে ভাবে সনাতন—এবে কিছুক্ষণ শুইব বিশ্রাম-আশে ! তারকা-খচিত বিমান বিস্তৃত, একটি তারার পানে চাহি অনিমিখে পিতারে সে দেখে কাছে—যেন অনুমানে পিতার আহ্বান শুনে যেন কান, চঞ্চল হইল মন- নিদ্রার বাসনা করে আনমনা, ভুলে সব সনাতন ! তবুও যতনে অতি সন্তর্পণে লুকাল জামার মাঝে- অন্নের পুটুলি, ভাবি’ রত্ন-ঝুলি, যেন মণি-মুক্তা রাজে! এখন(ই) উঠিব, গৃহে পঁহুছিব-সঙ্কল্প করিয়া মনে ক্লান্ত সে নয়ন মুদিল তখন, ক্ষিপ্র হারা’ল চেতনে । পরদিন-প্রাতে বৃদ্ধ সেই পথে এক, গ্রামান্তর হতে, দাড়াল বিস্ময়ে দয়ার্দ্র হৃদয়ে—হেরি’ যুবা শুয়ে পথে ! হাঁটু গেড়ে বসে, তুলে ল’য়ে ঘসে মরণ-শীতল কর হৃদয়-স্পন্দন বুঝিতে তখন দেয় হাত বঙ্গোপর ! ১৫৪ সনাতন ৭ হেরি’ অন্ন-থলি, হয়ে কুতূহলী ভাবে বৃদ্ধ মনে মনে অন্ন ল’য়ে সাথে, মরে বুভুক্ষাতে-নাহি বুঝে কি কারণে। ছিল না সেখানে কেহ যে বাখানে-মরেছে কেন এ যুবা- আত্মত্যাগ তার নহে তুলনার, দ্বিতীয় কোথায় কে বা। মরণ-বরণ করে সনাতন অটল অচল-প্রায়, রুগ্না মা’র জন্য ল’য়েছে যে অন্ন-কণা তা’র নাহি খায় ? জগৎ-বিস্ময় এ কীৰ্ত্তি অক্ষয়—রাখিল যা’ সনাতন- দেশে দেশে কবি পাইলে এ ছবি গা’বে গাথা অগণন। সঞ্জ-১০ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ভাদ্র, ১৩৩৭; Teachers Journal, 1980. ইংরাজি হইতে
THE POET'S SONG.
(A Parody)
Sing my Muse, sing the poet's song,
Grammar and rhyme -right or wrong,
Meaningless words though they may be,
You must sing--that's my hobby.
Sing my Muse, sing the poet's song,
To be a Milton or Byron, that's what I long.
I care not for metre, I care not for thought,
All my copies the 'Grub Street'
has bought.
Sing my Lute, I want a poet's lane,
A thing-an honour I do not try in vain !
Thanks from the worthies for loyal lines
That twinkle in my desk, as a star shines.
THE POET'S SONG.
Stop ! behold! what the papers say of me,
They call me a poet, I'm in
maddened glee.
'Poet', 'poet', that is what I dream,
Stanzas flow from
my
brain like a stream.
I might admire, I might abuse,
I might conceive, I might produce,
Play the fool, blow hot and cold,
I am always notoriously bold !
On hobby I fight, on whims I write,
Do not see whether dark or bright!
Agitate and oppose whether right or
wrong
That's the principle of the poet's song!
No text on this page.
No text on this page.