Maju Public Library, Howrah

Hitkotha

Roychoudhuri, Girijaprasanna · 2010/04/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

হিতকথা।
TAJU PUBLEBRARD,
WAJE. HOWBAH
কলিকাতাস্থ সেন্টাল টেষ্টবুক কমিটি কর্তৃক মধ্য বঙ্গ বিদ্যালয়ের
তৃতীয় শ্রেণীর পাঠরূপে অনুমােদিত।
প্রণীত।
{ STD. 1902
গিরিজাপ্রসন্ন রায়চৌধুরী বি. এল.
* * * *
একেদারনাথ বসু, বি. এ. কর্তৃক প্রকাশিত
৬৪ নং অখিল মিস্ত্রীর লেন-কলিকাতা।

PRINTED BY H. D. GHOSE, AT THL HINDU MACHINE PRESS, 6.4, AWHIL MISTRY'S LANE, CALCUTTA, হিতকথা উপক্রমণিকা। তােমরা এখন এদেশে যেরূপ শিক্ষাপ্রণালী প্রচলিত দেখিত পাও, পূর্বে এরূপ ছিল না। পূর্বে তােমাদের পূর্বপুরুষগণ বিনা বেতনে, গুরুগৃহে থাকিয়া, বিবিধ শাস্ত্রের উপদেশ লাভ করিতেন। প্রায় পঞ্চম বৎসর বয়সের সময়েই সেই প্রাচীন কালের শিশুগণের বিদ্যারম্ভ হইত। শৈশবেই তাহারা মাতা পিতা ভাই ভগিনীর সঙ্গ পরিত্যাগ করিয়া গুরুগৃহে বিদ্যাশিক্ষার্থ গমন করিতেন। অবস্থা যাঁহার যেরূপ হউক না কেন, শিক্ষার্থ রাজপুত্রই হউন, কিম্বা দরিদ্রপুত্রই হউন, গুরুগৃহে তাহাদিগের একত্র একভাবেই থাকিতে হইত। গুরুও তাহাদিগের অবস্থা- নির্বিশেষে শিক্ষা প্রদান করিতেন। সেখানে তাহাদিগের ভােগ বাসনা সমস্তই পরিত্যাগ করিতে হইত। কি আহারের আনন্দ, কি বসনের বিলাস, শিক্ষার্থী শিশু ইহার কিছুতেই আশ্রয় পাইতেন না। গুরু যাহা ভােজনে অনুমতি করিতেন, শি তাহাই ভােজন করিতেন; গুরু যাহা পরিধান করিতে বলি- তেন, শিন্য তাহাই পরিতেন। ফলতঃ সে সময়ে শিক্ষার্থিগণ সর্বতােভাবেই গুরুর অনুবর্তী হইয়া বিদ্যাভ্যাস করিতেন।

হিতকথা। গুরুও তখন শিষ্যগণকে অপত্যনির্বিশেষে শিক্ষা প্রদান করিতেন। তখন শিক্ষকগণ শিষ্যবর্গের পরিণামের মঙ্গলের দিকে চাহিয়া শিক্ষাপ্রদান করিতেন। সংসারে কি করিলে ধৰ্ম্ম প্রতিপালিত হইবে, প্রাচীনকালের আৰ্যগুরু সর্বদা শিষ্যের জন্য তাহাই ভাবিতেন। তাই, সেকালের শিক্ষাপ্রণালী কিছু ভিন্ন রকমের ছিল। সেই প্রাচীনকালের পরম পূজ্য ঋষিগণ শিষবর্গের শিক্ষার প্রতি যেরূপ লক্ষ্য রাখিতেন, বােধ হয় এখন তােমাদের মাতা পিতাও তােমাদের শিক্ষার প্রতি সেরূপ দৃষ্টি রাখতে পারেন তখন বিদ্যাশিক্ষার সহিত শিক্ষার্থীর চরিত্রও সুন্দররূপে গঠিত হইত। সুখলাভের জন্য সংসারে কষ্টসহিষ্ণুতা, ক্ষমা, তিতিক্ষা প্রভৃতি যে সকল গুণশিক্ষা আবশ্যক—সেই সকল গুণই প্রায় জ্ঞানী গুরু স্বকীয় শিষ্যগণকে অভ্যাস করাইতেন। মাদি শান্ত্রের উপদেশানুযায়ী কাৰ্য করিলে, সর্বাঙ্গীণ শিক্ষা প্রভাবে তখনকার শিষ্যগণ সর্বপ্রকার কষ্টসহিষ্ণু, জিতেন্দ্রিয়, সত্যবাদী, পরােপকারী, অহঙ্কারশূন্য, দয়াশীল, সূক্ষদর্শী এবং সর্বজনের প্রতি যথােচিত ব্যবহার হইয়া গুরুগৃহ হইতে প্রত্যাগমন করিতে পারিতেন বিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রণালী সংশােধন করিয়া যে এখন সেই রূপ শিক্ষাপ্রদান করা যাইতে পারে, এরূপ, সম্ভাবনা নাই। বিদ্যালয়ে যাহা শিখিতেছ, এখন তাহাই তােমাদিগকে শিখিতে হইবে; নতুবা সংসারে প্রতিষ্ঠিত হইতে পারিবে না। তবে যদি সংসারে সুখলাভের প্রত্যাশা কর, তবে সেই প্রাচীন কালের 1 এই পুস্তকে ঠিক তেমন দ্বিতীয়বারের বিজ্ঞাপন । এই স্কুলপাঠ্য পুস্তকখানি কিছু নূতন রকমের হইয়াছে। এই শ্রেণীর পুস্তকে যে ভাবে নীতি-উপদেশ লিখিত থাকে, ভাবে উপদেশগুলি লিখিত হয় নাই। আমরা এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানির নীতিগুলি এক ভাবে সম্পূর্ণ করিতেই চেষ্টা করিয়াছি। এই নীতিগুলির মধ্যে এমনই একটা শৃঙ্খলা বিদ্যমান রহিয়াছে যে, প্রবন্ধগুলি আপাতত বিচ্ছিন্ন বােধ হইলেও, প্রকৃত প্রস্তাবে পরস্পর বিশেষ সম্বন্ধযুক্ত। পুস্তকখানি পড়িলেই সেই সম্বন্ধ উপলব্ধি হইবে, ইহাই আমাদিগের বিশ্বাস। তবে যাঁহারা অর্থে বিজ্ঞাপনেই পুস্তকের উদ্দেশ্য ও মৰ্ম্মাদির কথা জানিতে চাহেন, তাহাদিগকে সেই সম্বন্ধ বিজ্ঞাপনেই বুঝাইবার জন্য কয়েকটি কথা এখানে বলিতেছি। আমরা উৎকৃষ্ট সুখ প্রাপ্তিকে মানবজীবনের মুখ্য লক্ষ্যস্বরূপে গ্রহণ করিয়া, তাহা পাইবার জন্য মানবের কিরূপ শিক্ষা, কিরূপ কাৰ্য্য আব- শ্যক, তাহাই যথাসম্ভব এই ক্ষুর পুস্তকখানিতে আলােচনা করিয়াছি। জীবনের এইরূপ লক্ষ্য গ্রহণে, কোন সং প্রদায়েরই আপত্তি হইতে পারিবে না, আমাদিগের এইরূপই বিশ্বাস। হিন্দুগণের মধ্যে যাহারা উচ্চাধিকারী, তাহারা সুখ ও দুঃখ উভয়ের ত্যাগই আদর্শ মানবের কাৰ্য, এইরূপ বলিয়া থাকেন; কিন্তু তাহারাও, নিম্নাধিকারিগণকে উৎকৃষ্ট সাত্বিক সুখের চেষ্টা করিতে পরামর্শ দিলে, তাহাতে আপত্তি করিবেন এমন বােধ হয় না। Honesty is the best policy এই নীতিবাদিগণ ও “ইহাতে তাহাদিগের মত অনুসরণ করা হইয়াছে দেখিতে পাইবেন। ফলতঃ আমাদিগের বােধ হয়, এই লক্ষ্য নির্দেশে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সকল শ্রেণীর সকল লক্ষ্যই বজায় রাখা হয়। এইরূপে শ্রেষ্ঠ সুখকে জীবনের লক্ষ্যরূপে গ্রহণ করিয়া, আমরা দেখাইতে চেম মিলি মে কতকগুলি শিক্ষা বিশেষ আবশ্যক। আমি প্রথম পরিচ্ছেদে শরীর সম্বন্ধীয় কতকগুলি শিক্ষার বিষয় বলিয়াছি। এই সকল শিক্ষা সবিস্তারে স্কুলপাঠ্য পুস্তকে বলা অসম্ভব—আমি ইহা ছাত্রপাঠোপযোগী করিয়াই বলিতে চেষ্টা করিয়াছি। শরীর ও মনের সর্বাঙ্গীন শিক্ষা ভিন্ন উৎকৃষ্ট সুখলাভার্থ সংসারীর আর যাহা যাহা আবশ্যক, তাহারই দুই চারিটি বিষয় তৃতীয় পরিচ্ছেদে বলিয়াছি। চতুর্থ পরিচ্ছেদে কয়েকটি মহৎ লােকের মহতী কাহিনী বর্ণনা করিয়াছি। যথাসাধ্য এই লােকগুলি ভিন্ন ভিন্ন দেশ, সম্প্রদায় ও জাতি হইতে নির্বাচন করিয়া লইয়াছি। হিন্দুগণের পৌরাণিক কোন আখ্যান গ্রন্থমধ্যে স্থান পায় নাই, কারণ হিন্দু ভিন্ন অপর ধর্মাবলম্বি গণের তাহাতে আপত্তি হইতে পারে। প্রবন্ধগুলির সম্বন্ধ দেখিয়া এবং পুস্তকের উদ্দেশ্যের কথা শুনিয়া গ্রন্থখানিকে আপাততঃ কঠিন ও ছাত্রপাঠের অনুপযােগী বলিয়া ধারণা হইতে পারে। কিন্তু আমাদিগের বিশ্বাস পুস্তকখানি পড়িলে সে ধারণা থাকিবে না। আমি উপদেশগুলি যথাসাধ্য বিশদ ও কার্যোপযােগী Practical করিতে চেষ্টা করিয়াছি। একটা দৃষ্টান্ত দেখাইতেছি। ক্রোধ সম্বন্ধে আমাদিগের কর্তব্য লিখিবার সময় ক্রোধ করা ভাল নহে এই কথা এবং ক্রোধের দোষ দেখাইয়াই আমরা বিরত হই নাই; যাহাতে এই ক্রোধের হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করা যায়, তাহার উপায় লিখিতে চেষ্টা করিয়াছি। ফলতঃ পুস্তকনিকে ছাত্রপাঠ্য করিতে আমাদিগের চেষ্টার ত্রুটি হয় নাই, তবে যাহা ক্ষমতাতীত, তাহা চেষ্টা করিলেও সম্পন্ন করা যায় না। এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ প্রণয়ন ও আমরা অনেকের নিকট সাতিশয় ঋণী হইয়াছি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রায় বাহাদুর C. 1. Lর নাম সেই মহাজনগণের তালিকায় সর্বপ্রথমে স্থাপন করিতে হয়। আমরা সকল বিষয়েই তাহার নিকট ঋণী-সুতরাং বিষয় প্রকাশ করিয়া তাহার নিকটে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতে পারিতেছি না। ফলতঃ এই ক্ষুদ্র স্কুলপাঠ্য গ্রন্থখানিতে একভাবে তাহারই শিক্ষা প্রচার করিতে চেষ্টা করিয়াছি। শ্ৰীযুক্ত বাবু রজনীকান্ত গুপ্ত মহাশয়ের নিকটেও আমি সাতিশয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। মহৎলােকের মহৎ কাহিনী লিখিতে আমি তাহার পুস্তক হইতে নানাপ্রকার সাহায্য পাইয়াছি। তিনি এ সম্বন্ধে আমাকে দুই তিনখানি পুস্তক প্রদান করিয়াও উপকার করিতে ত্রুটি করেন নাই। এসম্বন্ধে তাহার উদারতা বিশেষ ধন্যবাদাহঁ। ঢাকার নবাব আবদুল গণিজ ফ্রি এন্ট্রান্স স্কুলের হেড, পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত বাবু সীতানাথ সেনগুপ্ত মহাশয় এই পুস্তকখানির আদ্যোপান্ত প্রুফ দেখিয়া দিয়াছেন। আধুনিক লেখায় যেরূপ ব্যাকরণ দোষ চলিয়া থাকে, ছাত্ৰপাঠ্য গ্রন্থে সেরূপ কোন দোষ না থাকে, তাহা করিতে তিনি বিশেষ পরিশ্রম করিয়াছেন । এই জন্য তাহার নিকটেও কৃত, তা স্বীকার করিতেছি। শ্ৰীযুক্ত পণ্ডিত শম্ভুচন্দ্র স্যায়রত্ব মহাশয় লিখিত বিদ্যাসাগরের জীবন- বৃত্তান্ত ও শ্রীযুক্ত সত্যপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় লিখিত শিবাজীর জীবন, বৃত্তান্ত হইতে আমি কয়েকটি ঘটনা গ্রহণ করিয়াছি; তজ্জন্য তাহা- দিগের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। ঐগিরিজাপ্রসন্ন রায়।

তৃতীয়বারের বিজ্ঞাপন। “হিতকথা” সংশােধিত হইয়া পুনৰ্বার প্রকাশিত হইল। এই পুস্তকের স্থানে স্থানে ভাষার দোষ আছে, দুই চারি স্থানে অসত্য কথা (inaccurate expression) আছে'—এই বলিয়া আপত্তি উত্থাপিত হওয়াতে, গত বৎসর সেন্টাল টেষ্ট বুক কমিটি ইহাকে বালকগণের পাঠোপযােগী গ্রন্থ বলিয়া গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হয়েন নাই। যথাসাধ্য সেই সকল দোষ বিদূরীত করিয়া, পুনর্বার গ্রন্থখানি বিেক্ত কমিটিতে প্রদান করা গেল। এই সংশােধন কাৰ্যে আমি প্রাক্ত সভার দুইজন পরম শ্রদ্ধাস্পদ সভ্যের নিকটে সহায়তারূপ অনুগ্রহ প্রাপ্ত হইয়াছি। সৰ্ব্বথা পূজনীয় পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত রাজেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রী এম, এ, মহাশয় পুস্তকখানির আদ্যো- পাত্ত পাঠ করিয়া ইহার দোষগুলি দেখাইয়া দিয়াছেন এবং স্থলবিশেষে তাহা সংশােধনও করিয়া দিয়াছেন। পরম শ্রদ্ধাস্পদ শ্ৰীযুক্ত চন্দ্রনাথ বসু এম, এ, বি, এ মহাশয়, ইহার কতকাংশ বিশেষরূপে সংশােধন করিয়া দিয়াছেন। তাহাদের এই সহায়তাবলেই আমি গ্ৰন্থখানি এইরূপ সংশােধন করিতে সমর্থ হইয়াছি। তাঁহাদিগের নিকটে এই জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞ রহিলাম। আরও একটি কথা এইবারে বলা আবশ্যক মনে করিতেছি। কথাটি পূর্বের বিজ্ঞাপনেও বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তাহা সংক্ষেপে লিখিত “হিতকথায়” বালকদিগকে যাহা করিতে উপদেশ দিয়াছি, সুখের জন্য তাহা অনুষ্ঠেয় এইরূপই আমি প্রকাশ করিয়াছি। এ কথায় তর্ক উঠিতে পারে যে, সুখের উদ্দেশ্যে কাৰ্য্যানুষ্ঠানের উপদেশ হিন্দুর নিষ্কাম ধৰ্ম্ম-বিহিত নহে, অতএব তাহা এই গ্রন্থে নিবিষ্ট করা অন্যায্য হইয়াছে। এই তর্কের উত্তরে আমি এই স্থলেই দুই চারিটি কথা বলিয়া রাখি।

মুখের উদ্দেশ্যে কাৰ্যানুষ্ঠান হিন্দুর নিষ্কাম ধর্মবিহিত নহে, একথা স্বীকার করিলেও, ধর্মবিহিত সুখ বা সাত্ত্বিক সুখের উদ্দেশ্যে কাৰ্যানু- ষ্ঠান হিন্দুধর্ম বিরুদ্ধ, একথা আমি স্বীকার করিতে পারি না। আমার ইহাই মনে হয় যে, অজ্ঞানীকে এবং বালকদিগকে সকাম বা মুখের উদ্দেশ্যে কাৰ্যানুষ্ঠান করিতে হিন্দুশান্ত্রে উপদেশ দিয়াছেন। ইহা সপ্রমাণ করা সহজসাধ্য বলিয়াই আমার মনে হয় । আবার এদিকে প্রচলিত ব্যবহারাদিও দেখুন। হিন্দুর প্রধান ক্রিয়া দুর্গোৎসবাদির সংকল্প সকাম। আয়ু, ধন, যশ, ভাগ্য ইত্যাদি পাইবার প্রার্থনা হিন্দু- ধৰ্ম্মানুষ্ঠানে অনেক স্থলেই দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার তাৎপৰ্য আমি এই মনে করি যে, সুখভােগর বাসনা প্রথমেই একেবারে পরিত্যাগ করা সম্ভব নহে ভাবিয়া, অত্যল্প দুঃখমিশ্রিত সুখকে অর্থাৎ যাহাকে শাস্ত্রে সাত্ত্বিক সুখ বলা হইয়া থাকে এবং যাহাকে আমি উৎকৃষ্ট মুখ বলিয়া অভিহিত করিয়াছি সেই সুখকে লক্ষ্য করিয়া প্রথমে কার্যে প্রবৃত্ত হইতে হিন্দুশাস্ত্র উপদেশ দিয়াছেন। পরে জ্ঞান জন্মিলে, অধি- কারী হইলে, এবম্বিধ সুখকেও পরিত্যাগ করিয়া নিষ্কাম ধর্মের অনুষ্ঠানে ব্ৰতী হইতে হিন্দুশাস্ত্রে উপদেশ দেওয়া হইয়াছে। এ সুখও পরিত্যাজ্য -কেন না, ইহাতেও দুঃখ আছে—যাহাতে দুঃখের একেবারে নিবৃত্তি হয়, তাহারই অনুষ্ঠান শ্রেয়স্কর। নিষ্কাম ধর্মে তাহাই হয়। তাই নিষ্কাম ধর্মের এত শ্রেষ্ঠতা। নিষ্কাম ধৰ্ম্ম সুখের জন্য, এ কথায় বরং আপত্তি করিলে চলে, কেন না, এই ‘সুখ’ কথায় পূর্বোক্ত সুখেরই ধারণা জন্মা ইয়া থাকে। কিন্তু নিষ্কাম ধৰ্ম আনন্দ-লাভের জন্য—ইহা অনায়াসে বলা যাইতে পারে। অধিকারীভেদে কর্তব্যের বিভিন্নতার উপদেশ হিন্দুধর্মেরই একটা বিশেষত্ব। আমার লিখিত নীতিগুলিতে যদি অন্য দোষ না থাকে, তবে নিশ্চয়ই ভরসা করি, সুখের উদ্দেশ্যে তাহা অনুসরণীয় এ কথায় বিশেষ দোষ হইবে না। দুঃখ-নিবৃত্তি এবং সুখ-প্রাপ্তিই পূষকারের লক্ষ্য একথা অনেক হিন্দুগ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায়। লেখাপড়া করে যেই, গাড়ী ঘােড় চড়ে সেই” “লেখাপড়া যেই জানে, সৰ্ব্বলােকে তারে মানে” এ কথাগুলি ও পাঠ্যপুস্তকে চলিত আছে। এস্থলে গাড়ী ঘােড়ায় চড়িবার জন্য, সম্মান পাইবার জন্য, লেখাপড়ার আবশ্যকতা প্রকাশ্যরূপে বলা না হইয়া থাকিলেও, এই জন্য বালক লেখাপড়ায় মনােযােগ করুক, এমনই একটা গ্রন্থকারের ইচ্ছ। দেখা যায় না কি ? এ সম্বন্ধে বাহুল্য রূপে যুক্তি-প্রমাণ দেওয়া এরূপ স্থলে অসম্ভব। গতবারে সমিতি এইরূপ কোন তর্ক উত্থাপনও করেন নাই। যাহা হউক, যদি বাস্তবিকই এইরূপ উপদেশ হিন্দুশাস্ত্রবিরুদ্ধ হয়, সেই জন্য আমার এই গ্রন্থ উপেক্ষিত হউক, তাহাতে আমার আনন্দই হইবে। অন্যথা, অন্য দোষ না থাকিলে, আমার এই গ্রন্থখানি সেই বিশেষ জন্যই কিছু অনুগ্রহ দাবী করিতে পারে কি না, তাহা সুধীগণ বিবেচনা করিয়া দেখিবেন। কলিকাতা ; চৈত্র ৪,১৩৩। ঐগিরিজাপ্রসন্ন রায়।

সুচী উপক্রমণিকা। প্রথম পরিচ্ছেদ—শরীর । বিষয়। পৃষ্ঠা। বাস্থ্য ও বন ••• আর ••• ••• ••• ••• ••• ••• ১১ ব্যায়াম কষ্টসহিষ্ণুতা অপারগতা ••• ১৩ ১৬ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ—মন। ঈশ্বর ভক্তি ১৮ ক্রোধ পরশ্রীকাতরতা • ২৩ ••• তৃতীয় পরিচ্ছেদ—অপরাপর বিষয়। বিদ্য ••• ২৫ ২৮ ২ ••• धन কাৰ্যাকাৰ্য-বিচার—অধ্যবসায়, পরিশ্রম ইত্যাদি... মিতব্যয় • २ সূচীপত্র। পৃষ্ঠা। বিষয়। পরিজন প্রতিবেশী ইত্যাদি বাক্য ২ ••• । ব্যবহার ••• ••• 8२ : ৪৪ আপনার আপাতসুখের ইচ্ছাত্যাগ অপরের নিকট আত্মাভিমান পরিত্যাগ অপরের অন্যায়াচরণ সহ্য করা অপরের নিকট অপরাধ স্বীকার করা রাজা সর্বপ্রাণীর সুখ-দয়া চতুর্থ পরিচ্ছেদ—মহতী কাহিনী। ৪৫ ও । ৪৬ | • ৫৮ রামদুলাল রণা রায়মন্স রণজিৎ সিংহ শিবাজী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১১ ••• • • • • • 5 ••• চন্দ্রশেখর রায় = ৫ ••• . . . মহম্মদ মসিন ৭৮ ডেভিড হেয়ার ।

উপক্রমণিকা। সৰ্বাঙ্গীণ শিক্ষা সযত্নে গ্রহণ না করিলে হইবেই না। এখন আর,গুরুর নিকট সে শিক্ষা সম্যক্ প্রত্যাশা করিতে পার না সে শিক্ষা এখন নিজে নিজেই করিতে হইবে। অবশ্য, পি মাতা শিক্ষক প্রভৃতি হিতৈষী গুরুজন তােমাদিগকে সে শিক্ষা- লাভে সহায়তা করিতে পারিবেন, কিন্তু সে শিক্ষা প্রধানতঃ আত্মচেষ্টাসাপেক্ষই থাকিবে। তােমাদিগকে সেইরূপ শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা বুঝাইবার জন্য, এবং তাহাতে তােমাদিগের প্ররোচনা জন্মাইবার জন্য আমি আজ কয়েকটি কথা বলিব। সর্বপ্রথমে আমি তােমাদিগকে ভক্তিসম্বন্ধে কিছু বলি- তেছি। পিতা মাতা প্রভৃতি গুরুজন তােমাদিগের যে নিতান্তু ভক্তির পাত্র, তাহা সকলেই অবগত আছ। পিতা মাতাকে ভক্তি সকলেই করিয়া থাক; সে সম্বন্ধে আমার যাহা বলিবার, তাহা অন্যত্র বলিব। আমি এখানে শিক্ষকের প্রতি ভক্তির কথাই বলিতেছি। যাঁহার নিকট উপদেশ গ্রহণ করিতে হয়, তাহাকে একান্ত ভক্তি করা আবশ্যক তাহার কথায় সমুচিত বিশ্বাস রাখা আবশ্যক। শিক্ষকের শিষ্যের প্রতি এই ভক্তি বিশ্বাসের অভাব হইতে উপদেশ কার্যকর হইতে পারে না। শিক্ষকগণকে ভক্তি বিশ্বাস না করিলে তাহাদিগের যে পরিমাণে অসম্মান হইবার সম্ভাবনা, তপেক্ষা তােমাদিগেরই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হইবার আশঙ্কা। নীতিশিক্ষকগণকে ভক্তি বিশ্বাস না করিলে নীতিশিক্ষাই হইতে পারে না। একটা সাধারণ দৃষ্টান্ত দিতেছি। শিক্ষক বলিলেন “বৎসগণ। তােমরা কদাপি পাঠাৰ- ৪ হিতকথা । কালে নৃত্যগীতে অনুরক্ত হইও না, শৈশবে উহাতে অনুরক্তি জন্মিলে পরিণামে শিক্ষার ব্যাঘাত ও চরিত্রের স্থলন হইবার সম্ভাবনা।” তােমরা তাহাকে ভক্তি করিলে না, তাহার এই কথা বিশ্বাসও করিলে না, সুতরাং নৃত্যগীতস্পৃহাও পরিত্যাগ করিতে তােমাদের প্রবৃত্তি হইল না। কিন্তু ইহার ফল কি হইল? না, পরিশেষে হয় ত তজ্জন্য তােমাদিগকে অধঃপাতে যাইতে হইল। সকল কার্যের পরিণাম সকলে পরীক্ষা দ্বারা জানিতে গেলে সংসারে বিপদের সীমা থাকে না। অগ্নির দাহশক্তি অনুভব করিতে কি প্রত্যেকেরই অগ্নিমধ্যে হস্ত রাখিতে হইবে? বিষের প্রাণহারিণী শক্তি কি বিষদগ্ধ মনুষ্য না দেখিয়া বিশ্বাস করিবে না? এরূপ হইলে জগৎ চলিতে পারে না। অন্যের কথায় বিশ্বাস করিয়া তােমাদের অনেক কাৰ্য্যই করিতে হইবে। প্রঃ হইতে পারে, যিনি চরিত্রবান, নীতিপরায়ণ, তাহাকে যেন ভক্তিবিশ্বাস করা গেল; কিন্তু যিনি সেরূপ নহেন, তিনি শিক্ষক হইলে শিষ্য তাহাকেও কি ভক্তি করিবে? ইহার এক- মাত্র উত্তর আমি এই জানি যে, যিনি শিক্ষক, যাঁহার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে, তাহাকে ভক্তি করিতেই হইবে। ভক্তির একটা অসাধারণ গুণ আছে। ইহাতে ভক্তকে সেবকপদে রাখিয়া, ভঁহাকে নম্রতা, বিনয়, আত্মােৎসর্গ প্রভৃতি কয়েকটি সুন্দর অলঙ্কারে বিভূষিত করে। ভক্তের হৃদয় কি সুন্দর। নিরাকার ঈশ্বরভক্তই হউন, কি সাকার দেবভক্তই হউন, কি প্রত্যক্ষ মনুষ্যবিশেষের ভক্তই হউন, ভক্তের ভূক্তি বিস্ফারিত অন্তরে কি অপূর্ব আনন্দের লহরীই ক্রীড়া করিয়া .

উপক্রমণিকা।
থাকে! ভক্ততে যে সুখ উৎপাদন করে, অর্থে তাহা পারে না।
এমন সুখের জিনিস সকলেরই আহরণ করিতে চেষ্টা করা
কৰ্ত্তব্য। অত এব একপ্রকার বলা যায় যে, তােমরা পাত্রপাত্র
বিচার না করিয়া যেখানেই এই বৃত্তির বিকাশ করিতে পার,
করিবে। অযােগ্য পাত্রে ভক্তি করিলেও ভক্তির ফল যে
আনন্দ তাহা লাভ করিতে পারিবে।
কেবলমাত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষককেই ভক্তি করিতে হইবে
এমন নহে। যাহার নিকটে কিছু মাত্র শিক্ষা পাইতে চাহ--
যাঁহার নিকটে সামান্য শিক্ষাও প্রাপ্ত হইয়াছ, তিনি বিদ্যালয়ের
শিক্ষক না হইলেও তাহাকে ভক্তি করিবে। যদি কোন গ্রন্থ
অধ্যয়ন করিয়া কোন ফল পাইতে চাই, গ্রন্থকারকেও উক্তি
করিবে। কারণ গ্রন্থকারও এক শ্রেণীর লােক-শিক্ষক।
যিনি নীতিপরায়ণ, তিনি যে ধর্মাবলম্বীই হউন না কেন,
তাহকে ভক্তি করিবে; যিনি জ্ঞানী তাহাকে ভক্তি করিবে;
এই প্রকার যাহাকে কোন বিশেষ গুণ অলঙ্কত দেখিবে,
তাহাকেই ভক্তি করিবে। এই প্রকার ভক্তি, নীতি, জ্ঞান ও
গুণের প্রতি ভক্তি, ব্যক্তিবিশেষের প্রতি ভক্তি নহে।
কিরূপে ভক্তিবৃত্তির বিকাশ করিতে হয়, তাহার সহজ
উপায় বলিয়া দিতে ছ। যাহার সহিত আলাপ হইবে, তঁাহারই
গুণভাগ অনুসন্ধান করিতে থাকিবে। তিনি বালকই হউন, আর
বৃদ্ধই হউন, স্ত্রীলােকই হউন, আর পুরুষই হউন, 'তাহার যে
সকল গুণ তােমাতে নাই বা থাকিলেও তাহাতে যে পরিমাণে
আছে, তোমাতে সে পরিমাণে নাই, তাহাই অতি সুক্ষভাবে
i;

হিতকথা। ; অনুসন্ধান করিতে থাকিবে। অনুসন্ধান করিয়া অহরহ পৰ্যালােচনা করিতে থাকিবে—দেখিবে, অতি অল্পদিন মধ্যেই তুমি তাহার অকৃত্রিম ভক্ত হইয়া পড়িয়াছ। যদি সেইভাবে তুমি ভক্তির বিকাশচেষ্টা করিতে পার, তবে বুঝিতে পারিবে ভক্তির কি ক্ষমতা-ভক্তির কি ফল। বুঝিতে পারিবে, ব্যক্তি মাত্রকেই কেন আমি ভক্তি করা সম্ভব ও কর্তব্য মনে করি। ভক্তি সম্বন্ধে অন্থ এই পর্যন্তই বলিয়া ক্ষান্ত হইলাম । ভক্তির চরম বিকাশ ঈশ্বর-ভক্তিতে। তাহা তােমাদিগকে এখন না বলিলেও চলিতে পারে ; পূর্বোক্ত প্রকায়ে ভক্তি- বৃত্তির অনুশীলন কর, সে জ্ঞান আপনা হইতেই আসিবে। দেখ বৎসগণ। এই সংসারে কি স্ত্রী, কি পুরুষ, সকলেই সুখলাভের প্রত্যাশায় কার্য করিয়া থাকে। যাঁহারা সন্ন্যাসী, বা সুখ দুঃখে অনাসক্ত মহাপুরুষ তাহাদিগের কথা স্বতন্ত্র, আমি সাধারণ গৃহস্থদিগের কথাই বলিতেছি। সুখ সকলেই চাহে, সুখ কিন্তু জল বায়ুর ন্যায় এমন পদার্থ নহে যে, তাহা বিনা যত্নে যেখানে সেখানে পাইতে পারা যায়। এ সুখের জন্য মানুষের চেষ্টা করতে হয়। চেষ্টা করিলেই যে সর্বদা সুখলাভ করা যায়, এমনও দেখা যায় না; আবার বিনা চেষ্টাতেও লােক সুখী হইতেছে, এমনও দেখা যাইতেছে। তথাপি এ কথা বলা যাইতে পারে যে, সুখের সকলেরই চেষ্টা করা কর্তব্য। চেষ্টা কিরূপে করিতে হইবে, তাহাই আমার বক্তব্য। একটু অনুধাবন করিয়া দেখিলেই দেখিতে পাওয়া যায়, উৎকৃষ্ট সুখলাভাৰ্থ আমাদিগের শরীর, মন ও অপরাপ কতক- উপক্রমণিকা। গুলি বিষয় সম্বন্ধে বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হয়। শরীর ভাল না থাকিলে, কোন প্রকার সুখজনক কাৰ্যই সুখকর বলিয়া বােৰ হয় না। বঁাহার শরীর রুগ্ন রাজার ন্যায় ঐশ্বর্যা, সাধুজনের ন্যায় নিৰ্ম্মল অন্তঃকরণ থাকিলেও, তাহার তাহাতে সুখ বােধ হয় না। আবার যাহার মন ভাল নহে, যিনি পরশ্রীকাতর, যিনি ক্রোধী, তঁাহার শরীর সুস্থ ও পৰ্বতের ন্যায় দৃঢ় হইলেও, তিনি সুখলাভে সমর্থ হন না। শরীর ও মনের এইরূপ স্বাভা- বিক সম্বন্ধ রহিয়াছে যে, একের অসুখে অন্যেরও অল্পাধিক অসুখ হইয়া থাকে। তার পরে কেবল এই শরীর ও মন ভাল থাকিলেও যে সংসারে সুখী হওয়া যায়, এমন নহে। সংসারে সুখলতাৰ্থ আরও অনেক বিষয় আবশ্যক। এই জন্য উপযুক্ত অর্থ আব- শ, উৎকৃষ্ট পরিজন নাবশ্যক, উৎকৃষ্ট প্রতিবেশী আবশ্যক, উৎকৃষ্ট স্বদেশী আবশ্যক। ফলতঃ যাহাদিগেরই সহিত এই সংসারে সম্বন্ধ । সংস্রব হইতে পারে, তাহাদিগের সকলেই তােমাদিগের সুখলাভের অনুকুল না থাকিলে, সর্বাঙ্গীণ সুখ প্রাপ্তির সম্ভাবনা নাই। উপযুক্ত অর্থ না থাকিলে, গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যও কষ্ট হইতে পারে। সংসারীর পক্ষে এ কষ্ট সাতিশয় দুঃসহ সন্দেহ এ সম্বন্ধে অধিক বলিবার আবশ্যকতা নাই—এ কথা সংসারী মাত্রই জ্ঞাত আছেন এমন কি, তােমরা বালক হইলেও, এ কথা না জান এমন নহে। আবার দেশ, উত্তম শরীর ও মন এবং উপযুক্ত অর্থ হইলেও নাই।

হিতকথা। যে সুখী হইতে পারা যায়, এমন নহে। যাঁহার পরিজন ভাল নহে, তাহার গৃহ অরণ্যস্বরূপ। তিনি প্রভূত ধন, সুস্থ শরীর, এবং নির্মল চরিত্রের অধিকারী হইলেও, সুখলাভে সমর্থ হন । অহর্নিশ যাহাদিগকে লইয়া সংসারব্যাপারে লিপ্ত থাকিতে হয়, যাঁহাদিগের সুখদুঃখে সুখদুঃখ ভােগ করিতে হয়, তাহারা উত্তম না হইলে, নিশ্চয়ই সুখলাভে বিল্প জন্মিবে। যাঁহার রাজ্যে বাস করিতে হয়, যাহার নিয়ম ও আজ্ঞা পালন করিয়া সংসার পথে বিচরণ করিতে হয়, তিনি যদি উৎ- কৃষ্ট না হন, তাহা হইলেও, সুখলাভে বিল্প জন্মিতে পারে। কত আর দেখাইব—ইহাই জানিয়া রাখিও, যাঁহাদিগের সহিত কোন কোন প্রকারে তােমাদিগের সম্বন্ধ রহিয়াছে, সম্বন্ধ উপস্থিত হইতে পারে, তঁাহার। ভাল বা মন্দ হইলে তোমাদিগের অল্প- ধিক সুখ বা দুঃখ হওয়া একান্ত সম্ভবপর। অামি অথ হইতে প্রতিদিন তােমাদিগকে ইহার এক একটি বিষয় সম্বন্ধে কিছু উপদেশ দিতে চাহি। আমার কথাগুলি জটিল মনে করিয়া, তাহা বুঝিতে ঔদাস্য করিও না। আমি ৰাহা বলিব, তােমরা যাহাতে বুঝিতে পায়, এমন করিয়াই বলি। আমার একান্তই বিশ্ব স আছে, চেষ্টা করিলে, ইহা তোমরা সকলেই বুঝতে পারিবে। এখন ভগবানের নিকটে প্রার্থনা করি, আমার কোন প্রকার উপদেশে যেন তােমাদের কোন প্রকার ক্ষতি সংঘটন না হয়।

প্রথম পরিচ্ছেদ—শরীর স্বাস্থ্য ও বল। যে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যথাসম্ভব পূর্ণ ও কর্মঠ, যে শরীর কষ্টসহিষ্ণু ও শ্রমক্ষম, তাহাকেই উৎকৃষ্ট শরীর বলা যাইতে পারে। শরীরকে উৎকৃষ্ট করিতে হইলে, সর্ব প্রথমে তাহার স্বাস্থ্য- রক্ষার জন্য যত্ন করিতে হইবে। আহার, পান, বিশ্রাম ও ব্যায়ামের নিয়ম রক্ষা করিতে পারিলেই, শরীর প্রায় সুস্থ ও নবান্ হইয়া থাকে। আহার। শরীররক্ষাৰ্থ সকল প্রাণীরই আহার আবশ্যক। এই অাৰ শ্যকতানবন্ধন মঙ্গলময় পরমেশ্বরের ইচ্ছায় আহারে প্রাণ এসক্তিও প্রবল। খাদ্যদ্রব্য সুজীর্ণ হইলে তাহাতে যেমৰ, শরীরের ক্ষয় পূর্ণ ও বলবৃদ্ধি হইয়া থাকে, রসনার তৃপ্তিকর হইলে, তাতে তেমনই এক অনির্বচনীয় সুখও লিয়া থাকে। যদি সকল প্রকারের অাহাৰ্য্য দ্রব্য সবসময়ে সমপরি- মাণে যুগপৎ সুখােৎপাদন ও শরীরের পুষ্টিবর্ধন করিতে পারি, তবে এ সম্বন্ধে বেণী কথা বলিবার আবশ্যকতা থাকিত না। কিন্তু স্বভাবের নিয়ম অন্যরূপ। যাহা বেশী পুষ্টিবর্ধক, হয়ত তাহা কম তৃপ্তকর—যাহা বেশী তৃপ্তিকর, হয়ত তাগ কম পুষ্টি বক। এই কারণে আহারেও বিচারশক্তি প্রয়ােগ করিতে হয়।

হিতকথা। নাই। প্রত্যুত কেবল স্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টি রাখিলেই শরীরের বল বাড়িবে না, বলবৃদ্ধির জন্য অন্য চেষ্টাও চাই। ব্যায়ামচর্চায় শরীরের বল বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। যাহার শরীর সুস্থ, তিনি যদি রীতিমত ব্যায়ামচর্চা করেন, তবে শীঘ্রই বলশালী হইতে পারেন। কিন্তু তােমরা এরূপ মনে করিও না যে, ইংরাজী প্রথানুযায়ী সমান্তরাল প্রভৃতি দণ্ডে শরীর সঞ্চালন করিতে পারিলে, প্রকৃত ব্যায়ামচর্চা হয় না। যাহাতে হস্ত, পদ, স্কন্ধ, মস্তক, বাহু, বক্ষ প্রভৃতি সুদৃঢ় হয়, যাহাতে মাংস- পেশী সকল সবল ও কর্মক্ষম হয়, তাহার দিকে লক্ষ্য রাখিয়া যে কোন প্রকার ক্রীড়া বা কুস্তি করিবে, তাহাতেই ব্যায়াম- চর্চার ফল হইবে। নৌকাসঞ্চালন, অশ্বারােহণ, দ্রুতভ্রমণ, নাদিতে সন্তরণ এই সকল কাৰ্য্য ও উত্তম ব্যায়াম। এতদ্দেশে পূর্বে হা ডুগ” প্রভৃতি অনেক প্রকার বাল্যক্রীড়া প্রচলিত ছিল—এখন তাহা বিলুপ্তপ্রায় হইয়াছে ; ঐ সকল ক্রীড়াও শরীরের বিশেষ উপকারী। বৈদেশিক ক্রীড়া হইতে এই সকল ক্রীড়া কোন অংশে নুন নহে। শারীরিক বল আবশ্যক বটে, কিন্তু শারীরিক বল সঞ্চয়ের * অন্যান্য বিষয়ের প্রতি অবহেলা করা কওঁ গ্য নহে। বিতা- বুজি না থাকিলে, ধনঞ্জন না থাকিলে, কেবল শারীরিক বলে সংসা-যাত্রা মুখে নির্বাহ করা যায় না। তোমাদিগের অনেকেই ব্যায়ামে বিশেষ মনােযোগী হইয়াছ। ইছাতে শরীরের বলবৃদ্ধি হইবে বলিয়া বিশেষ আহলাদিত আছি, কিন্তু সাবধান এই জন্য যেন বিদ্যাশিক্ষায় ত্রুটি না হয়।

. না। শরীর-কষ্টসহিষ্ণুতা। কষ্টসহিষ্ণুতা। শরীর কষ্টসহিষ্ণু না হইলে, উত্তম স্বাস্থ্য ও প্রভূত বল থাকিলেও সে শরীরকে অকর্মণ্য বলিতে হয়। সংসারে থাকিলে, আমাদিগের অনেক প্রকার কষ্টই পাইতে নিয়মমত সকল দিন সকলের আহারনিদ্রা ঘটিয়া উঠে এরূপ শলে যিনি কষ্টসহিষ্ণু নহেন, তাহার বড়ই ব্যতি- ব্যস্ত হইয়া পড়িতে হয়। পরিবারমধ্যে রােগশােক উপস্থিত হইলে আহারনিদ্রার নিয়ম প্রায় সকলেরই বিপর্যস্ত হইয়া পড়ে। রােগীর শুশ্রুষ যিনি করিবেন, তাহার ত কথাই নাই। যিনি পূর্ব হইতেই শারীরিক কষ্ট সহ্য করিতে অভ্যাস করিয়া আসিতেছেন, তঁাহার এ সকল বিষয়ে বিশেষ অসুবিধা হয় না। কিন্তু যাঁহারা তাহাতে অনভ্যস্ত, যাহারা কষ্টে অসহিষ্ণু, তাহা- দিগের হয় ত সুচারুরূপে কর্তব্য পালন হয় না, নতুবা কর্তব্য পালন করিতে গিয়া, শরীর রােগাক্রান্ত হইয়া পড়ে। যেমন মাতা পিত। ভ্রাতা ভগিনীর উৎকট পীড়া হইলে, তাহাদের শুশ্রুষা করা সকলেরই কর্তব্য। কিন্তু যিনি কষ্টসহিষ্ণু নহেন, তিনি হয় ত রাত্রি জাগরণে নিতান্ত কষ্ট বােধ করিয়া কৰ্তব্য- পালনে অশক্ত হন, অথবা যদি কষ্টে কৰ্তব্য পালন করিতে চেষ্টা করেন, হয় ত জ্বরাদি রােগে তাহাকে আক্রান্ত হইতে আহার নিদ্রার নিয়মিত সময় থাকা ভাল, কিন্তু তাই বলিয়া দু এক দিন সে নিয়মের লঙঘন হইলেই, তজ্জন্য বিশেষ কষ্ট বােধ করা উচিত নহে। ধীরে ধীরে অভ্যাস দ্বারা সকলই সহিতে পারা যায়। যে দেখ,

১৪
হিতকথা।
বিষপানে মানবের মৃত্যু ঘটে, বিন্দু বিন্দু করিয়া সেই বিষ পান
করিতে অভ্যাস করিয়া, অনেকে তাহা অতি রিক্ত পান করিলেও
মৃত্যুমুখে পতিত হন না, এরূপ দেখা গিয়াছে। প্রাচীন কালের
লােকে বাল্যবিধি উপবাসাদিতে অভ্যস্ত হইয়া ক্ৰমশঃ দুই তিন
দিবসও কিরূপ বিনাকষ্টে উপবাসী থাকেন তাহা তােমরা দেখি-
য়াছ। তােমরাও চেষ্টা করিলে, আহারনিদ্রাজনিত কষ্ট কতক
পরিমাণে জয় করিতে পার। “পরিব না—অত্যন্ত কষ্ট হইবে—
মরিয়া যাইব” ইত্যাদি অমুলক চিন্তাতেই লােককে অসহিষ্ণু ও
অকর্মণ্য করিয়া থাকে। নিশ্চয়ই করিতে হইবে”, এরূপ
ধারণা লইয়া কোন কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইলে, তাহাতে সে প্রকার
কষ্ট বোধ হয় না। তােমাদিগের একদিন উপবাস করিতে
যেরূপ কষ্ট হইবে, অল্পবয়স্কা হিন্দুবিধবাগণের “একাদশী” করি-
তেও তত কষ্ট হইবে না। কারণ তাহারা জানিতেছে যে ঐ
উপবাস তাহাদিগের করিতেই হইবে। কেবল মাত্র এই নিশ্চিত
ধারণার জন্য লােকের অনেক সময়ে কষ্ট অনেক কম হয়।
সংসারের যে পথেই বিচরণ কর না, তােমাদিগকে কোন
কোন প্রকার কাৰ্য অনুষ্ঠান করিতেই হইবে। যিনি
রাজাধিরাজ তঁাহাকেও রাজ্যশাসন করিতে হয়। এই সকল
কাৰ্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতে হইলে তােমাকে কষ্টসহিষ্ণু
হইতে হইবে। জগতের ইতিহাস অনুসন্ধান করিয়া দেখ, কষ্ট
স্বীকার না করিয়া, কষ্টসহিষ্ণু না হইয়া কেহই প্রায় ধন ও যশ
সঞ্চয় করতে সমর্থ হন না।
শারীরিক পীড়া হইলেও, বিবিধ প্রকার কষ্ট সহ করিতে

শরীর-কষ্টসহিষ্ণুতা।
হয়। অনেক পীড়াতেই চিকিৎসকগণ অন্নাদির আহার সহিত
করিয়ায় দেন। এরূপ স্থলে যিনি একবারে কষ্ট সহ্য করতে না
পারেন, তঁাহার কষ্টের পরিসীমা থাকে না। কুপথ্য গ্রহণ করিয়া
হয়ত তাহাকে এক দিবসের স্থলে দশ দিবস দুঃখ ভােগ করিতে
হয়। দুই এক জনের অকালে কালগ্রাসে পতিত হওয়াও
সব নহে।
শরীরে ব্রণাদি হইলে, দুই এক স্থলে তাহাতে অস্ত্রাঘাত
আবশ্যক হয়। এমন অনেক লােক দেখতে পাওয়া যায়,
যাহারা এই কষ্টের ভয়ে, সেই ব্রণাদির রীতিমত চিকিৎসা
করাইতে না পারিয়া অসীম যন্ত্রণা ভােগ করিয়া থাকেন।
সকল প্রকার কষ্টই অভ্যাসবলে সহ্য করিতে পারা যায়।
তােমরা এমন অনেক বালক দেখিয়াছ, যাহাদিগকে অত্যন্ত
প্রহার করিলেও, তাহারা কষ্ট বােধ করে না। অনবরত
প্রহার সহ করায় তাহাদের এইরূপ অভ্যাস হইয়া যায়।
অভ্যাস অনিচ্ছাবশতঃই জম্মি থাকে। যদি ইচ্ছা করিয়া
কেহ কোন বিষয় অভ্যাস করিতে যায়, ইহার অর্ধেক পরি-
মাণও কষ্ট ভােগ করিতে হয় না। আমি শুনিয়াছি, কোন এক
সুখপ্রতিপালিত ব্যক্তির কারাবাস সম্ভাবনা হইলে, কারাবাসে
যেরূপ থাকিতে হয়, পূর্ব হইতে তিনি সেইরূপ থাকিতে
অভ্যাস করিতে লাগিলেন। ঘটনাক্রমে উহার কারাবাস ভোগ
করিতে হইল না; কিন্তু যদি ভােগ করিতে হইত, তথাপি
বােধ হয় অন্যান্য কারাবাসী হইতে তাঁহার কষ্ট অনেক পরি
মাণে কম হইত।

হিতকথা। কখন কাহার কোন প্রকার বিপদে পতিত হইতে হয়, কেহই বলিতে পারে না। কখন কাহার কোন প্রকার শারীরিক কষ্ট পাইতে হয়, তাহার স্থিরতা নাই। এরূপ স্থলে সকলেরই শরীরকে এরূপ কষ্টসহিষ্ণু করিয়া রাখা কর্তব্য যে, কোন প্রকার কষ্টমধ্যে : ড়িলেও সহসা তাহার কোন পীড়া উৎপন্ন হইতে পারে। সাংসারিক সুখলাতের জন্য শারীরিক কষ্ট- সহিষ্ণুতা একান্ত আবশ্যক। এমপারগতা। শরীরের যেমন স্বাস্থ্য, বল ও কষ্টসহিষ্ণুতা থাকা আবশ্যক তেমন আর শ্রমপারগতা থাকাও আবশ্যক। সচরাচর শারীরিক কষ্টসহিষ্ণুতা গুণ থাকিলেই, শ্রমপারগতা গুণও বৰ্ত্ত- মান থাকে--কিন্তু দুই এক হলে তাহার ব্যত্যয়ও ঘটিয়া থাকে; এই জন্য ইহারও উল্লেখ আবশ্যক মনে করিলাম। পরিশ্রমে আপাততঃ কিছু কষ্ট বােধ হয়। এই জন্য মুখার্থিগণ সচরাচর পরিশ্রমে বড়ই বিমুখ হইয়া পড়েন। কিন্তু ঈশ্বরের এইরূপই নিয়ম যে, উৎকৃষ্ট সুখলাভ করিতে হইলে প্রায় প্রথমে কিছু কষ্ট স্বীকার করিতেই হইবে। এই পরিশ্রম দ্বিবিধ-শারীরিক ও মানসিক। যে পরিশ্রমে শারীরিক ক্রিয়া-অসঞ্চালনাদি অধিক পরিমাণে হইয়া থাকে তাহাকে শারীরিক পরিশ্রম বলা হইয়া থাকে। আমি এখন শরীরের কথাই তােমাদিগকে বলিতেছিসুতরাং আমার এই এবং শারীরিক পরিশ্রম সম্বন্ধে, মানসিক পরিশ্রম সম্বন্ধে নহে।

শরীর-শ্রমপারগতা। কৃষকাদির যে প্রকার শারীরিক পরিশ্রমের আবশ্যকতা, ভদ্ৰশ্রেণীর লােকের সচরাচর সেরূপ আবশ্যকতা নাই। তাহ- দের মানসিক পরিশ্রমই অধিক আবশ্যক; তাহা হউক, তথাপি তাহাদের শারীরিক পরিশ্রমেও পটু হওয়া কৰ্ত্তব্য। কারণ সচরাচর না হউক, সময়বিশেষে সংসারিমাত্রেরই শারীরিক পরি- শ্ৰম করিতে হয়। দুই একটি দৃষ্টান্ত দেখাইতেছি। মনে কর, কোন বিশেষ কাৰ্যবশতঃ কোন ব্যক্তির আজ অনেক দূরে যাওয়া নিতান্ত আবশ্যক। গন্তব্য স্থানে যাইতে উপযুক্ত যান পাওয়া যায় না-~~অথবা পা'-য়া গেলেও তাহাতে এত ব্যয় হয় যে, তাহার অবস্থায় তাহা চলতে পারে না এরূপ স্থলে যদি সেই ব্যক্তি গন্তব্য স্থানে পদব্রজে গমন না করিতে পারেন, তবে তাহার অসুবিধার সীমা থাকে না। বাড়ীতে কোন ক্রিয়া- কাও উপস্থিত হইলেও, প্রায় সকল শ্রেণীর ব্যক্তিরই অধিক শারীরিক পরিশ্রমের আবশ্যকতা উপলব্ধি হয়। এইজন্ম, সচরা- চর আবশ্যক না হইলেও, শরীরকে পরিশ্রমপটু করিতে অভ্যাস করা কর্তব্য। পূর্বে যে ব্যায়ামের কথা উল্লেখ করিয়াছি, তাহাতেই শরীর পরিশ্রমপটু হয়। কিন্তু ইহার মধ্যে যাহাতে দূরস্থান পদব্রজে গমনের ক্ষমতা জন্মে, তাহার প্রতিই বিশেষ লক্ষ্য রাখা তােমা- দিগের মারক। অন্যান্য গুণের স্থায় এই গুণও অভ্যাস দ্বারা জন্মিতে পারে। ক্ষীণকায়, দুর্বল ব্যক্তিগণকেও সুদূরনে অনায়াসে অতি অল্প সময়ের মধ্যে চলিয়া যাইতে দেখা গিয়াছে। কেবলমাত্র মা-

১৮
হিতকথা।
সেই এই গুণ লাভ করিবার একমাত্র উপায়। অতএব তােমরা
অভ্যাস দ্বারা যাহাতে শরীরকে পরিশ্রমপটু, পদব্রজে দূরস্থানে
গমনাদিতে সমর্থ করিতে পার, তাহার জন্য বিশেষ চেষ্টা
করিবে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ—মন
বােধ হয়, ঈশ্বরভক্তির ন্যায় মনের সুখজনক এমন বৃত্তি
এরি নাই। ইহা যে সময়েই হউক, যেরূপেই হউক, হৃদয়মধ্যে
সঞ্চারিত হইলে, কি যে অপূর্ব আনন্দে আপ্লুত হইতে হয়,
তাহা বর্ণনা করা যায় না। যখন হৃদয়ে এই ভক্তির উচ্ছাস
প্রবল হয়, তখন কোন প্রকার যন্ত্রণাই দুঃখজনক বলিয়া অনু-
ভূত হয় না কোন প্রকার কষ্টই কষ্ট বলিয়া বিবেচনা হয় না।
কি দুঃসহ দারিদ্র্যযন্ত্রণা, কি অসহ অপত্যবিরহ, কি মর্মান্তিক
মৃত্যুযাতনা, হৃদয়ে যখন প্রকৃত ভক্তির আবির্ভাব হয়, তখন
ইহার কিছুতেই চিত্ত বিচলিত হয় না। অহো! ঈশ্বরভক্তি
কি অপূর্ব আনন্দময়ী! পৃথিবীতে যত প্রকার সুখ আছে,
তাহার সমগ্ৰ একত্র করিলেও এই আনন্দের এক কণিকার
তুল্য
হইতে পারে না। এই আনন্দে সকলেই অধিকারী। কি
হিন্দু, কি মুসলমান, কি বৌদ্ধ, কি খৃষ্টান কি যু, কি বৃদ্ধ,
কি রাজা, কি প্রজা, কি ধনী, কি নির্ধন সকলেই ইচ্ছা কৰিলে
এ আনন্দ উপভােগে সমর্থ হন।
=

মন-ঈশ্বর-ভক্তি। এই ভক্তি কিরূপে বিকাশিত করিতে হয়, তৎসম্বন্ধে স্কুল- ভাবে কয়েকটি কথা তােমাদিগকে বলিতেছি। পূর্বে বলিয়াছি, যাঁহাকে ভক্তি করিতে হইবে, অনুক্ষণ তাঁহার গুণাবলী স্মরণ ও আলােচনা করিলেই, তাহার প্রতি ভক্তি বিকাশিত হয়। ঈশ্বরের অনন্ত গুণরাশি অহরহঃ পৰ্যালােচনা করিলে, তাহার প্রতি ভক্তির বিকাশ না হইয়াই থাকিতে পারে না। তাহার অনন্ত গুণের কথা মানবের ক্ষুদ্র বুদ্ধির বিষয়ীভূত নহে সত্য, তবে তাঁহার যে অপার করুণা-প্রস্রবণ নিরন্তর আমা- দিগকে সুখসুধায় সিক্ত করিতেছে, তাহার দুই একটি কথা ভাবিয়া দেখিলেও, তাঁহার প্রতি ভক্তির স্রোত হৃদয়করে সবেগে প্রবাহিত হইবে। কখন্ না তাঁহার এই করুণারাশির পরিচয় পাওয়া যায়? আহারে, নিদ্রায়—ভ্রমণে, শয়নে-প্রাতে, মধ্যাহে,সায়াহে, নিশীথেকখন না তাহার সেই অতুলনীয় দয়ারাশি আমাদিগকে ভােগ করিতে হয়? এই পৃথিবীতে যত প্রকার সুখ সন্তোগ করিতে পারিতেছি, সকলই তাহার কৃপা- বশতঃ জানিবে। ঐ যে রজনীপ্রভাতে সুশীতল সমীরণ মন্দ মন বহিয়া আমাদিগের শরীর শীতল করিতেছে, সুগন্ধি প্রসূন গন্ধবিতরণে আমাদিগের নাসিকা পরিতৃপ্ত করিতেছে, উহারা কঁহার আত্মার এইরূপ করিতেছে? তাঁহারই আজ্ঞায়। ঐ ৰে ধীরা কল্লোলিনী, মাতৃদুগ্ধের ন্যায় সলিলরাশি বক্ষে করিয়া আমাদিগের তৃষ্ণার সময়ে সলিল যােগাইতেছে, উহা কাহার আজ্ঞায় এইরূপ করিতেছে ?—তাহার আজ্ঞায়। এই যে শস্য- বন্ধুরা আমাদিগকে নানা প্রকার আহার যােগাইতেছে, ২০ হিতকথা। ইহা কাহার আজ্ঞায় হইতেছে ? তাহার আজ্ঞায়। অপার তাহার করুণা-অসীম তাহার গুণ। তাঁহার দয়ার কথা বিয়া দেখ, গুণের কথা চিন্তা করিয়া দেখ, হৃদয় স্বতঃই ভক্তিভরে প্রণত হইয়া পড়িবে। ক্রোধ। যেমন ভক্তি আমাদিগের অন্তরে বিকশিত হইলে আমরা পরম আনন্দ অনুভব করিয়া থাকি, তেমন ক্রোধ আমাদিগের হৃদয়ে সঞ্জাত হইলে আমরা ভয়ানক অশান্তি অনুভব করিতে থাকি। ক্রোধ বড় দুর্জয় রিপু। এই রিপুর এই রিপুর বশবর্তী হইয়া লােকে যে কত প্রকার কুকর্মের অনুষ্ঠান করে—তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। এই দুর্দমনীয় রিপু বড়ই অশাস্তিদায়ক। যদি এই বৃত্তি চরিতার্থ করিতে না পারা যায়—যদি যাহার উপর ক্রোধ জন্মিল, তাহাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান না করা যায় তবে অগ্নিকণিকার ন্যায় এই বৃত্তি হৃদয়কন্দরে থাকিয়া থাকিয়া সুখশান্তিকে ভস্মসাৎ করিতে থাকে। আর এই বৃত্তি চরিতার্থ করিতে পারিলেই কি প্রকৃত সুখ জন্মে। প্রায়ই তাহা নহে। যখন ক্রোধ হয়, তখন যাহার উপর ক্রোধ হইল, তাহাকে মন করিতে পারিলে, অতি অল্পকালের জন্য কিছু সুখবােধ হয় বটে, কিন্তু পরিণামে প্রায়ই সেই সুখ আমাদিগকে দ্বিগুণতর কষ্ট প্রদান করিয়া থাকে। অন্তু বড় ক্রোধ হইল-ক্রোধের বশবর্তী হইয়া একজনকে কটুক্তি করিলাম, কল্য সে ক্রোধের

মন—ক্রোধ।
নিবৃত্তি হইবামাত্র অনুতাপে ও লজ্জায়, যেমন মরমে মরিয়া
থাকিতে হইবে। কিন্তু এই যে কটুক্তির কথা বললাম, ইহা
ক্রোধের সহজ কাৰ্যমাত্র। ক্রোধ পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হইলে,
লােকে নরহত্যাদি করিতেও কুষ্ঠিত হয় না; এমন কি, এই
ক্রোধের বশে দুই এক জনকে এমনই ভ্রষ্টবুদ্ধি হইতে দেখা
যায় যে, তাহারা মাতা পিতা প্রভৃতি গুরুজনকেও কটুক্তি
করিয়া থাকে। ইহার অধিকও দেখিতেও পাওয়া যায়—আমি
সে সকল পাশব ক্রিয়ার কথা তােমাদিগের নিকটে উল্লেখ
করিতে চাহি না ।
তবেই দেখ, ক্রোধের ফল প্রায় সর্বত্রই অশান্তি ও কষ্ট।
যদি এই বৃত্তি চরিতার্থ করিতে না পারা যায়, তাহা হইলেও
কষ্ট-যদি ইহা চরিতার্থ করিতে পারা যায়, তাহাহইলেও প্রায়
কষ্ট পাইতে হয়।
তােমরা যতুপূর্বক ইহাকে দমন করিতে
চেষ্টা করিবে।
হৃদয়ে ক্রোধ জন্মিলে, ননা প্রকারে আমাদিগকে বিচলিত
করিয়া থাকে। তখন রসনা ঘাের অসংযত হইয়া পড়ে
নানা প্রকার অবাচ্য ও কটু কথা রসনা হইতে বহির্গত হইতে
থাকে। বুদ্ধিবৃত্তির স্থিরতা থাকে না। হস্তপদও যেন বিবাদের
জন্য অগ্রসর হইতে থাকে। এই রূপ সময়ে বিশেষ সতর্কতা
গ্রহণ না করিলে পরিণামে বড়ই কষ্ট পাইতে হয়। ক্রোধ
যাহাতে অনর্থক হৃদয়ে বিকাশ না পাইতে পারে, তজ্জন্য সর্বাগ্রে
চেষ্টা করা আবশ্যক। কিন্তু এ চেষ্টায় বিশেষ কৃতকার্য
হইলে ও ক্রোধের হস্ত হইতে সম্যক প্রকারে মুক্তিলাভ অসম্ভব।

২২ হিতকথা। আমি তােমাদিগকে এ সম্বন্ধে কয়েকটি পরামর্শ দিতে পারি বােধ হয়, সেই পরামর্শানুযায়ী কাৰ্য্য করিলে ক্রোধের কুফল অনেক পরিমাণে বিদূরিত হইতে পারে। যখন ক্রোধসঞ্চারের সম্ভাবনা বুঝিতে পারিবে, তখনই সেই ক্রোধবিকাশের স্থান পরিত্যাগ করিয়া যাইবে। যেমন পথিপার্শ্বে সর্প দেখিলে পথিক ভীত হইয়া তৎক্ষণাৎ সেই পথ পরিত্যাগ করে, তােমরাও তেমনই যেখানে ক্রোধসঞ্চারের সম্ভাবনা দেখিবে, সেই স্থান অবিলম্বে পরিত্যাগ করিবে। যদি এইরূপ করিতে পার, ক্রোধ তােমাদিগের কোন প্রকার অনিষ্ট সাধন করিতে পারিবে না। যদি একান্তই ইহা না পার, তখন সঙ্কল্প- পূর্বক রসনা সংযত রাখতে চেষ্টা করিবে। রসনা সংযত রাখিতে পারিলে, মৌনী হইয়া থাকিতে পারিলেও এই ক্রোধ- বিপু বিশেষ কোন অনিষ্ট সাধন করিতে পারিবে না। কিন্তু একবার রসনা উচ্ছল হইয়া পড়িলেই, ক্রমে বুদ্ধিপ্রভৃতিও উচ্ছল হইতে থাকিবে। এই পৃথিবীতে যিনি উৎকৃষ্ট সুখ সম্ভোগ করিতে চাহেন, অতি যত্নে ভঁহাকে এই প্রবল বৃত্তি সংযত করিতে হইবে। যাহার ক্রোধ সংযত নহে—তিনি অন্যান্য সহস্র প্রকার সুখােপ- করণের অধিকারী হইলেও ইহার বিষে সর্বদা জর্জরিত থাকেন। ইহাতে যেমন অগণ্য শত্রু জন্মাইয়া থাকে—তেমন অগণ্য পাপ- কাৰ্যেও এত কমায়। ফলতঃ ক্রোধের অসঙ্গত বিকাশ নানা প্রকারেই মানবের অনিষ্ট সাধন করিয়া থাকে।

মন—পরশ্রীকাতরতা।
পরশ্রীকাতরতা।
পরশ্রীকাতরতা’ শব্দে মাৎসর্য ও ঘেষ বুঝায়। যেমন ক্রোধ
তেমনই পরশ্রীকাতরতা। হৃদয়ে অশান্তি জন্মাইতে দুইই প্রায়
তুল্য। বরং ক্রোধের কারণ অল্প ঘটিতে পারে, পরশ্রীকাতরতার
কারণের অভাব নাই। অন্য এক ব্যক্তি আমার কোন অনিষ্ট
না করিলে, আমার কোন প্রকার বিরক্তিজনক কাৰ্য্য না করিলে,
তাহার প্রতি আমার ক্রোধ জন্মিতে পারে না কিন্তু কেহ
আমার সম্বন্ধে কিছু না করিলেও, পরশ্রীকাতরতার উন্মেষ
হইতে পারে। অপরের সুখ, অপরের ঐশ্বৰ্য্য, অপরের মান,
অপরের যশ, দেখিতে পাইলেই পরশ্রীকাতর জন যার পর নাই
ক্ষুব্ধ হইতে থাকেন। হয়ত তাহারও যথেষ্ট সুখ আছে, যথেষ্ট
ঐশ্বৰ্য্য আছে—যথেষ্ট যশ আছে, যথেষ্ট সম্মান আছে, তবু
তিনি অন্যকে এই সকল বিষয়ে অধিকারী দেখিলে মর্মপীড়ায়
জ্বলিতে থাকেন। আহা! সে কষ্ট কি মর্মান্তিক। নিজের
অভাৰ জন্য কষ্ট দূর করিতে নানা প্রকার সদুপায় অবলম্বন
করা যায়। কিন্তু এই পরশ্ৰজন্য কষ্ট
দূর
করিতে, অসদুপায়
অবলম্বন করিয়া পরশ্রী নষ্ট করিতে চেষ্টা করিতে হয়।
তাহাতেই কি কষ্ট দূর হয় ? পাপে পাপ বৃদ্ধি করিতে থাকে।
পরকাতরতা-পাপ পরের হিংসাজনক কাৰ্যে প্ররােচনা
জন্মায় ; ক্রোধও আসিয়া তাহাতে যােগ দেয়। কথাটা আর
একটু পরিষ্কার বলিতেছি।
মনে কর, গ্রামের মধ্যে রাখাল বড় দরিদ্র লোক। তাহার
অৰ্মসংস্থান হয় ত, বস্ত্রের সংস্থান হয় না। বন্ত্রের সংস্থান
;

২৪ হিতকথা। হয় ত, অন্নের সংস্থান হয় না। এ কষ্ট অবশ্য সামান্য কষ্ট নহে, তবু সে চেষ্টা করিয়া শারীরিক পরিশ্রম করিয়া নানা প্রকার উপায়ে অর্থোপার্জনের চেষ্টা করিয়া এ কষ্ট দূর করিতে পারে। কিন্তু গ্রামের মধ্যে যে শিরোমণি মহাশয় আছেন, তিনি অত্যন্ত পরশ্রীকাতর, তঁাহার কষ্ট দূর করিবার উপায় ত কিছু দেখা যায় না অন্যে চেষ্টা করিয়া অর্থশালী হইবে, বড় হইবে, তাহার তিনি কি করিবেন ? তিনি চেষ্টা করিয়া কয় জনের উন্নতি স্থগিত রাখিতে পারেন ? দেশে বিদেশে, যেস্থানে তিনি বড় লােক দেখিবেন, সেইখানেই তাহার ঈর্ষানল জ্বলিতে থাকিবে। মনের চিকিৎসা ভিন্ন কিছুতেই তাহার এ কষ্ট বিদূরিত হইতে পারে না। গ্রামের মধ্যে এই দরিদ্র রাখালও যদি কায়ক্লেশে অন্নবন্ত্রের সংস্থান করে, তাহাতেও তাহার কষ্ট হইবে; এমন কি, এই জন্য দুই এক দিন ভঁহাকে রাখালের প্রতি ক্রুদ্ধ হইতেও দেখা গিয়াছে। বল দেখি তাহার এই মনের কষ্ট কিসে দূর হইতে পারে ? এই জন্য তােমাদিগকে বড় সাবধানে এই বৃত্তিটিকে চিনিয়া সংযত রাখিতে বলিতেছি। একটু মনােযােগ করিলেই হৃদয়মধ্যে ইহার সঞ্চার বুঝিতে পারিবে ; তখন সাবধানে ইহাকে দমন করিতে চেষ্টা করিবে। এই বৃত্তি যে অশেষ দুঃখের আকর, ইহা সর্বদা স্মরণ রাখিতে পারিলে, বােধ হয় এই বৃত্তির আক্র- মণ হইতে উদ্ধার পাওয়া যায়। সংসারের সকল ব্যক্তিকেই আত্মবৎ দেখিতে পারিলেও, এই বৃত্তি আর কোন অশান্তি উৎ পান করিতে পারে না। তখন পরের মুখে আপনারই সুখ অপরাপর বিষয়—বিদ্যা। २९ বােধ হয়—পরের গৌরবে আপনাকেই গৌরবান্বিত মনে হয়। যাহাহউক, যেরূপেই পার, উৎকৃষ্ট সুখলােভে ইচ্ছা থাকিলে, এই বৃত্তিটিকে তােমাদিগের সংযত করিতেই হইবে। একে ত মানুষের নিজের অভাবজনিত কত কষ্টই ভােগ করিবার সম্ভাবনা, তাহাতে যদি আবার পরের সুখ দেখিয়াও মানুষের তাহাতে কষ্ট পাইতে হয়, তবে তাহার কষ্ট দূর হইবার সম্ভাবনা থাকে না। তৃতীয় পরিচ্ছেদ—অপরাপর বিষয়। বিদ্যা। এ সংসারে উৎকৃষ্ট সুখলাভের জন্য বিদ্যাশিক্ষা বিশেষ আবশ্যক। বিদ্যাশিক্ষার উপকারিতা বলিয়া শেষ করা যায় না। ফলতঃ মানবমাত্রেরই সর্বপ্রথমে বিদ্যাশিক্ষার জন্য যতুপর হওয়া কর্তব্য। যিনি বিদ্বান, সর্বত্রই তাহার সম্মান ও প্রতিপত্তি হইয়া থাকে। এই সম্মান ও প্রতিপত্তি সংসারে বড়ই সুখের জিনিস। বিদ্যা অর্থেপায়ের ও উপায়রূপ। বিদ্যাশিক্ষা করিতে পারিলে,রাজকীয় উচ্চ পদে অধিরূঢ় হইয়া যশ ও সম্মানের সহিত প্রভূত অর্থ উপার্জন করা যায়। ফলতঃ চরিত্র সন্তানের পক্ষে বিশিক্ষা অর্থোপায়ের এক প্রকার সহজ উপায়, ইহা বলিলে অত্যুক্তি হয় না। কোন ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইতে হইলে তাহাতে মূলধন আবশ্যক-দরিদ্রের পক্ষে সে মূলধন সংগ্রহ করা সহজ- হিতকথা। সাধ্য নহে। কন্তু দরিদ্র ব্যক্তি কোন উপায়ে যদি বিদ্যাশিক্ষা করিতে পারে, তবে তাহার আর্থিক উন্নতি অনেক পরিমাণে সুখসাধ্য হইয়া উঠে। একমাত্র দরিদ্রেরই যে বিদ্যাশিক্ষা আবশ্যক, তাহা নহে। বিদ্যাশিক্ষায় আমাদিগের বুদ্ধিবৃত্তি মার্জিত হইয়া থাকে, সুতরাং সংসারের সকল লােকেরই বিদ্যাশিক্ষায় বিশেষ উপকার হইয়া থাকে। যিনি যে কাৰ্য্যেই প্রবৃত্ত হউন—সকল কাৰ্যেই বুদ্ধির আবশ্যকতা স্বীকার করিতে হইবে। রাজার রাজকার্য হইতে কৃষকের কৃষিকাৰ্য্য পৰ্য্যন্ত সকল কাৰ্য্যেই বুদ্ধি না থাকিলে ভাল ফল হয় না। এই বুদ্ধি বিদ্যাশিক্ষায় বিকাশ প্রাপ্ত হইয়া থাকে ; সুতরাং যাঁহাদের অর্থ ও সম্মান আছে, তাহাদেরও বিদ্যাশিক্ষা একান্ত প্রয়ােজনীয় বিদ্যাশিক্ষায় আরও এক অসাধারণ উপকার লাভ করা যায়। এই পৃথিবীতে মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াই কেহ জ্ঞানলাভে সমর্থ হয় না। মানুষের কি কৰ্তব্য, তাহা অবধারণ করিতে অনেক শিক্ষা ও অনেক সময় আবশ্যক। এই জ্ঞান লাভ করিতে অপরের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সাহায্য লইতে হয়। বিদ্যাশিক্ষা দ্বারা এই সাহায্য সহজ প্রাপ্য হইয়া থাকে। এই পৃথিবীতে যত প্রধান প্রধান ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করিয়া বিবিধ উপায়ে জ্ঞান বুদ্ধি অর্জন পূর্বক পরলােকগত হইয়াছে, তাহা- দের অনেকের সেই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার ফল, নানাপ্রকার গ্রন্থাদি পাঠে অতি সহজেই লাভ করিতে পারা যায়। জীবিত ব্যক্তিগণের মধ্যেই বা কয় জনের সঙ্গে একটা লােকের সাক্ষাৎ অপরাপর বিষয়—বিদ্যা। হওয়া সম্ভব। কিন্তু বিদ্যাশিক্ষা দ্বারা অনেকের চিত্তের ভাৰ বুঝিতে সমর্থ হওয়া যায়। মহাপুরুষগণ সময়ে সময়ে আমা- দিগকে যে সকল উপদেশ প্রদান করিয়া গিয়াছেন, কল্যাণ- লাভার্থ আমাদিগের তাহা জ্ঞাত হওয়া একান্ত আবশ্যক। বিদ্যা- শিক্ষা না করিলে ইহার কিছুই জানা সহজসাধ্য হইতে পারে না। বিদ্যাশিক্ষা যেমন আমাদিগকে পরম্পরাসম্বন্ধে নানা প্রকার সুখের উপায় সংগ্রহ করিতে সমর্থ করিয়া থাকে, তেমন সাক্ষাৎ সম্বন্ধেও আমাদিগকে অল্পপরিমাণে সুখ প্রদান করিয়া থাকে । গ্রন্থাদিপাঠজনিত সুখকে পৃথিবীর এক প্রকার শ্রেষ্ঠ সুখ বলিয়া কীৰ্ত্তন করা যায়। এই জগতে অসংখ্য রহস্য বিদ্যমান আছে ; গ্রন্থাদিতে এই সকল রহস্য ব্যাখাত দেখিলে, যেমন জ্ঞান অর্জিত হয়, তেমন সুখেরও উৎপত্তি হইয়া থাকে। অধিক আর কি বলিব, বিদ্যাশিক্ষার উপকারিতা সহস্র মুখেও ব্যক্ত করা যায় না। এই বিদ্যাশিক্ষার জন্য এখন তােমরা এখানে সমবেত হই- য়াছ। কিন্তু তােমাদিগের মধ্যে দুই এক জনে ইহাকে বিশেষ কষ্টজনক ব্যাপার বলিয়াই মনে করিয়া থাকে। তাহারা মনে করে, এই স্কুলে যে কয়েক ঘণ্টা শিক্ষকের নিকটে থাকিতে হয়, ঐ সময়ে কত প্রকার ক্রীড়াজনিত আমােদলাভ হইতে পারে। সেই জন্য তােমাদিগের নিকটে বিদ্যাশিক্ষার উপকারিতা সম্বন্ধে আমি কিছু বলা আবশ্যক মনে করিলাম। একান্ত অধ্যবসায় ও প্রগাঢ় পরিশ্রম না হইলে কেহ সুচারু- রূপে বিদ্যাশিক্ষা করিতে পারে না। অধুনা ৰিশিক্ষার্থ কিছু

হিতকথা।
অর্থব্যয়ও আবশ্যক হয় বটে, কিন্তু এমন দেখা গিয়াছে যে, ইচ্ছা
ও অধ্যবসায় থাকিলে, অর্থহীনতা কাহারও বিদ্যাশিক্ষা সম্বন্ধে
অন্তরায় হইতে পারে না।
গৃহস্থমত্রেরই সংসার যাত্রা নির্বাহাৰ্থ অর্থের প্রয়ােজন।
এই অর্থ দ্বারা নানা প্রকার সুখের উপকরণও ক্রীত হইতে
পারে। এই সকল কারণে সকলেরই অর্থোপার্জনের চেষ্টা
করা আবশ্যক।
অর্থোপার্জনের চেষ্টা করিতে হইলে, কোন না কোন
প্রকারের কর্ম অবলম্বন করিতে হয়। ইহার জন্য কেহ বা
গবর্ণমেন্টের অধীনে কাৰ্য্য করিয়া থাকেন, কেহ বা গবর্ণমেন্ট
ভিন্ন জমিদার, মহাজন প্রভৃতি অন্যান্য অর্থশালী ব্যক্তিগণের
অধীনে কাৰ্য্য গ্রহণ করেন, কেহ বা বাণিজ্যবৃত্তি অবলম্বন
করিয়া স্বাধীন ভাবে অর্থোপার্জনের চেষ্টা করিয়া থাকেন।
এই সকল কাৰ্য্য কি প্রকারে অনুষ্ঠিত হইলে অভীষ্টফলপ্রদ
হইতে পারে তৎসম্বন্ধে এই প্রবন্ধেই তােমাদিগকে কিছু বলিব।
কাৰ্যাকাৰ্য্য বিচার—অধ্যবসায়, পরিশ্রম ইত্যাদি।
কোন কাৰ্য্য আরম্ভ করিবার পূর্বে তাহার ফলাফল কিরূপ
হইবার সাবমা, বিশেষরূপে বিচার করিয়া দেখা কর্তব্য।
কাৰ্য ভাল হইলেই যে তাহা সকলের পক্ষে সকল অবস্থায়

অপরাপর বিষয়—অধ্যবসায়, পরিশ্রম। ; তুল্যরূপে অনুষ্ঠেয়, এরূপ নহে। যেমন কার্য্যের ভালমন্দ ফলের বিচার আবশ্যক, তেমনই সেই কাৰ্যানুষ্ঠানে অনুষ্ঠাতার শক্তি ও আবশ্যকতা প্রভৃতিও সুন্দররূপে ভাবিয়া দেখা কর্তব্য। অনেকে কাৰ্যারন্তের পূর্বে এইরূপ কোন বিচার না করিয়া কাৰ্যানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হন। তাঁহাদিগের পরিণাম এই হয় যে, তঁাহারা কাৰ্যানুষ্ঠানে অশক্ত হইয়া অসমাপ্ত অবস্থাতেই কাৰ্য পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হন; নতুবা, কাৰ্য সমাপ্ত করিয়া নানা কারণে বিষম বিপজ্জালে জড়িত হইয়া পড়েন। এইরূপে অন- থক ভঁহাদিগের সময় ও শক্তির অপচয় হইয়া থাকে এবং কাৰ্য্যে সফলকাম না হওয়ায় তাহাদিগের মানসিক কষ্ট এবং অবসন্নতাও উপস্থিত হয়। অতএব যে কাৰ্যেই প্রবৃত্ত হইতে ইচ্ছা কর, অগ্রে তাহার ভাল মন্দ পরিণাম নিবিষ্টচিত্তে বিচার করিয়া দেখিবে বিচারান্তে যদি কোন কাৰ্য অনুষ্ঠেয় বলিয়া বিবেচিত হয়, তখন তাহার অনুষ্ঠানে কৃতসংকল্প হইতে হইবে। সঙ্কল্প সুদৃঢ় হওয়া আবশ্যক। অন্য কোন কাৰ্যানুষ্ঠানে সঙ্কল্প করিয়া তাহাতে প্রবৃত্ত হইলাম, কল্য আবার তাহা পরিত্যাগ করিলাম, এইরূপ ভাবে কৰ্ম্মানুষ্ঠান করিলে সেই কৰ্ম্ম ফলপ্রদ হইতে পারে না। নিতান্ত অব্যবস্থিতচিত্ত ব্যক্তিগণই ঐরূপ প্রতি মুহূর্তে সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিয়া সঙ্কল্পান্তর গ্রহণ করেন। ফলতঃ ভাই- জিগের কোন সঙ্কল্প সিদ্ধ হয় না। সঙ্কর সুস্থির রাখিবার শক্তি কেই অধ্যবসায় ৰলে। কৰ্ম্মানুষ্ঠানে অধ্যবসায় একান্ত আবশ্যক। আঁকা প্রতি মুহূর্তে কর্মের ফলের প্রতি সতৃষ্ণনয়নে দৃষ্টি- ৩০ হিতকথা। পাত করেন, প্রায় তাঁহাদিগেরই এই অধ্যবসায় বিলুপ্ত হইয়া থাকে। যাহা কৰ্তব্য, তাহার অনুষ্ঠানে চেষ্টা করিতে ঋকিবে, ফলের প্রতিমুহূর্তেই দৃষ্টিপাত করিবেন। ফলাফলের প্রতি দৃষ্টি যতদূর আবশ্যক, সে সম্বন্ধে চিন্তা যতদূর আবশ্যক, কাৰ্য্যা- রস্তের পূর্বেই তাহা করিতে হয়। কাৰ্যানুষ্ঠানে পরিশ্রম আবশ্যক। কোন প্রকার কায্যে শারীরিক পরিশ্রম, কোন প্রকার কাৰ্য্যে বা মানসিক পরিশ্রম অধিক করিতে হয়। অত্যন্ত আলস্যপ্রিয় ব্যক্তির কোন কাৰ্যই সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় না। এ সম্বন্ধে তােমাদিগকে অন্যত্র বিস্তৃতরূপে বলিব। কাৰ্য্যতৎপরতায় ইংরাজ-জাতি আমাদিগের আদর্শস্থানীয় । তাহারা যেরূপ সুদৃঢ় সঙ্কল্পে কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হয়, যেরূপ অবিচলিত অধ্যবসায়, অসাধারণ সহিষ্ণুতা ও পরিশ্রম সহকারে কাৰ্যানুষ্ঠান করিয়া থাকে, তাহা দেখিলে বিস্মিত হইতে হয়। ফলতঃ যেমন তাহাদের সাধনা, সিদ্ধিও সেইরূপ হইয়া থাকে। সুদূর সাগর- পার হইতে আসিয়া, কপর্দকমাত্র সম্বল না আনিয়াও তাহারা অনায়াসে যেরূপ প্রভূত অর্থোপার্জন করিতে পারিতেছে, এত- দ্দেশের অনেকেই প্রভূত মূলধন লইয়াও তাহা করিতে পারি- সুদৃঢ় সঙ্কল্প, অবিচলিত অধ্যবসায়, প্রাণপণ পরিশ্রমই তাহাদের এই সিদ্ধির প্রধান কারণ বলা যাইতে পারে। ইংরাজ যখন যে কাৰ্য্য করে, তাহার সমস্ত শক্তি, সমস্ত চিন্তা, সমস্ত শরীর, সমস্ত মন, তাহাতেই নিযুক্ত করিয়া থাকে। ইংরাজ প্রকৃতই কৰ্ম্মখীয়। কোন পরিশ্রমী, কেমন অপরাপর বিষয়মিতব্যয়। ৩১ ধীর, কেমন অধ্যবসায়ী, কেমন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যাহা ইংরাজ একবার করিতে মন করিবে, তাহা সে করিবেই। কাৰ্য- পথে যতই বিঘ্ন উপস্থিত হইবে, ততই তাহার চেষ্টা বাড়িতে থাকিবে। শরীর ও মনের ক্ষমতা অসীম, যতই তাহা বাড়াইতে থাক, ততই বাড়িতে থাকিবে। কর্মধীর ইংরাজ কাৰ্য্য দেখিয়া ভীত হয় না, বিপদ দেখিয়া পশ্চাৎপদ হয় না; প্রতিজ্ঞাপালনে এক একটি ইংরাজ যেন এক একটি ভীষ্মবতার । কাৰ্যানু- ষ্ঠানে তাহাদের এই দৃঢ়তা অনুকরণ করিতে চেষ্টা করিবে। তােমাদের কাৰ্যাকাৰ্য্য তাহাদিগের কাৰ্যাকাৰ্য্য দেখিয়া স্থির করিবে না, কিন্তু কাৰ্য্যতৎপরতা, কাৰ্য্যানুষ্ঠান-প্রণালী তাহা- দিগের নিকটই শিক্ষা করিবে। এমন জাজ্বল্যমান সুন্দর আদর্শ অন্যত্র পাওয়া দুষ্কর। মানমাত্রকেই প্রায় কাৰ্য্য করিতে হইতেছে, ও আজীবন হইবে, সুতরাং সর্বত্রই এই কাৰ্যানুষ্ঠান প্রণালী সযত্নে অভ্যাস করা কর্তব্য। মিতব্যয়। অর্থসঞ্চয়ে আর একটা বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হয়। পূর্বে যেরূপ কাৰ্যানুষ্ঠানের কথা বলিয়াছি, অর্থোপার্জনের চেষ্টায় তপ কৰ্ম্ম অবলম্বন করিলে অর্থোপায় হইতে পারে সত্য, কিন্তু অর্থ উপার্জন করিলেই অর্থ সঞ্চিত হয় না। ব্যয়ের প্রতি দৃষ্টি না রাখিলে পর্যাপ্ত অর্থাগমেও অভাব দূর হয় না। তােমরা প্রায় সকলেই এ বয়সে ব্যয় করিতে বিশেষ ইচ্ছুক।

৩২ হিতকথা। ইহার কারণ এই যে, তােমরা অর্থোপায়ের কষ্ট এখনও ভাল করিয়া অনুভব করিতে শিখ নাই—আর অর্থাভাবের যে কষ্ট তাহাও ভাল করিয়া বুঝিতে শিখ নাই। তােমরা মনে কর, অভাব হইলে মাতাপিতা বা অন্য অভিভাবকগণ তাহা পূরণ করিবেন, কিন্তু তাহাদের এজন্য যে কিরূপ কষ্ট, কিরূপ পৰিশ্ৰমাদি করিতে হয়, তােমরা তৎপ্রতি দৃষ্টিক্ষেপ কর না। ইহা তােমাদের অনুচিত কাৰ্য্য। এখন হইতেই তােমাদিগের বিবেচনা করা কর্তব্য যে, অন্যের পরিশ্রমজ্জিত অর্থ তােমা- দিগের বৃধা ব্যয় করা কর্তব্য নহে। তোমরা অনেক প্রকারে এই অর্থের বৃথা ব্যয়ে অগ্রসর হও। নানা প্রকার ক্রীড়া কৌতুকে অর্থের অপব্যয় করিয়া থাক; নানা প্রকার দ্রব্যাদির অপচয় করিয়াও অর্থ নষ্ট করিয়া থাক। অধিক আর কি বলিব, এই যে তােমাদিগের পাঠ্য গ্রন্থাদি, ইহাও তােমরা অনেকে যত্ন করিয়া রাখ না। ইহার যে মূল্য আছে, তাহা তােমরা অনেকেই সকল দ্রব্যেরই যে কিছু না কিছু মূল্য আছে, এই- রূপ ততদিগের ধারণা থাকা আবশ্যক। যত্ন করিয়া ক্ষুদ্র পিনটি রাখিলেও কালে বিশেষ উপকার পাওয়া যাইতে পারে। জিনিসের এইরূপ প্রয়ােজনীয়তা বুঝিলে অপব্যয়ের ইচ্ছাও অনেকটা কমিয়া যায়। • বুঝ না। পরিজন, প্রতিবেশী, ইত্যাদি। উৎকৃষ্ট সুখলাভার্থ উৎকৃষ্ট পরিজন চাই, উৎকৃষ্ট প্রতি বেশী চাই, উৎকৃষ্ট স্বদেশীও চাই। তােমরা বাক, তােমরা

অপরাপর বিষয়—বাক্য।
কিছু শিক্ষা প্রদান করিয়া ইহাদিগকে উৎকৃষ্ট করিতে পার না।
তােমাদিগের এসম্বন্ধে যাহা সাধ্য তাহাই আমি এখানে বলিতে
চাহি।
তােমরা সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ইহাদিগকে উৎকৃষ্ট করিতে আপা-
ততঃ চেষ্টা করিতে পার না সত্য, কিন্তু পরম্পরা সম্বন্ধে ইহা-
দিগের প্রতি সদ্ব্যবহার দ্বারা ইহাদিগকে অন্ততঃ তােমাদিগের
সম্বন্ধে উৎকৃষ্ট করতে পার। সেই সদ্ব্যবহারের জন্য তােমা-
দিগের যে সকল গুণের বিকাশ ও দোষের বিনাশ করিতে হয়
আমি তাহাই প্রথমে বলিব।
যাহাতে সকলের প্রিয় হওয়া যায়, তাহারই চেষ্টা করিলে,
সকলেই তােমাদিগের উৎকৃষ্ট সুখপ্রাপ্তির অনুকূল হইতে
পারেন। বাক্য ও কার্য দ্বারাই লােকের সহিত সাধারণত
প্রিপ্রিয় সম্বন্ধ ঘটিয়া থাকে।
বাক্য।
সত্যতা, সরলতা ও প্রিয়তা, এই সকল বাক্যের গুণ।
অসত্যতা, কপটতা ও অপ্রিয়তা, এই সকল বাক্যের দোষ।
বাক্যের এই দোষগুণ পৰ্যালােচনা করিয়া যিনি জিহ্বাকে
সংষত করিতে পারেন, তিনি পৃথিবীর সকলেরই প্রিয় হইতে
পারেন।
তােমরা যাহা বলিবে, তাহা সত্য হওয়া আবশ্যক। মিথ্যা
বলিয়া জিহ্বাকে কলঙ্কিত করা উচিত নহে। লোকে যখন
যাহা কিছু করে, তখন তাহা প্রায়ই সুখকর বলিয়া জ্ঞান

৩
হিতকথা।
করিয়া থাকে। লােকে যখন মিথ্যা কথা বলে, তখন সেই
মিথ্যা কথাতেই সে এক প্রকার না এক প্রকার সুখ বা সুবিধা
বিবেচনা করে।
দৃষ্টান্ত দেখাইতেছি।
মনে কর,
তােমরা
কোন অপরাধ করিয়াছ, আমি তােমাদিগকে তাহা জিজ্ঞাসা
করিলাম। তােমরা মনে করিলে, যদি অপরাধ স্বীকার কর,
তবে তােমাদিগকে আমি কটু কহিব—কি তােমাদিগের প্রতি
আমি অসন্তুষ্ট হইব—তাই তােমরা মিথ্যা কথা কহিলে। কেন
কহিলে? না—তােমরা দেখিলে, সত্য কহিয়া বিরাগভাজন
হওয়া অপেক্ষা মিথ্যা কহাই সে স্থলে সুখকর। এইরূপ বিচার
করিয়া দেখিও-প্রায় লােকেই সুখকর মনে করিয়াই মিথ্যা
কথা কহিয়া থাকে। লােকে যে মিথ্যা গল্প করে, তাহাও
প্রায় এই জন্য। সত্য কহিলে তাহার বাকপটুতা বা অভিজ্ঞতা
বিশেষ প্রকাশিত হয় না, তাই সে নানা প্রকার কল্পনা
করিয়া অতিরঞ্জিত করিয়া মিথ্যা কথা বলিয়া থাকে। যদি
মিথ্যাকথাজনিত এই সুখ পরিণামে কোন প্রকার দুঃখ আনয়ন
করিত, তবে না হয় মিখ্যাই বলা যাইত; কিন্তু তাহা ত
নয়—এ মিথ্যা যখন প্রকাশিত হয়, সাতিশয় কষ্ট, ক্ষতি ও
লাঞ্ছনা ভােগ করিতে হয়; এ সত্য না জানে এমন লােকও
নাই । তথাপি লােকের এই মত্ততা ও অদূরদর্শিতা এবং
আপাতসুখকর কার্যে এতই আসক্তি যে, তাহারা মিথ্যা কথা
প্রলােভন সহজে পরিত্যাগ করিতে পারে না।
মিথ্যা কহার কি দোষ, তাহা সেই বাঘ ও রাখালের গর
যতটা বুঝিয়াছ, তদপেক্ষা বেশী আমি বুঝাইতে পারি না

অপরাপর বিষয়-বাক্য। মিথ্যা কহার দোষ সম্বন্ধে সেই গল্পটা মনে রাখিও। সেই গল্পে দেখ, রাখাল কেবল কৌতুক দেখিবার জন্যই মিথ্যা কথা কহিয়া সেইরূপ ফল প্রাপ্ত হইল; যাহারা প্রবল স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিথ্যা কথা কহিয়া থাকে, তাহারা কিরূপ ফল পাইতে পারে, অনুমান করিয়া দেখিতে পার। একটা কথা তােমা- দিগকে আমি বলিয়া দিতেছি। মিথ্যাটাকে চিরদিন সত্যের আচ্ছাদনে আবৃত রাখা যায় না। রাজাধিরাজ মহারাজ চক্র- বর্তীই চেষ্টা করুন—কি ধার্মিকশ্রেষ্ঠ সৰ্বপূজ্য কোন মনীই চেষ্টা করুন, মিথ্যাকে চিরদিন সত্যের আবরণে লুকায়িত রাখিতে কেহ সমর্থ হইবেন না। যদি এই ধারণা হৃদয়ে বন্ধ মূল করিতে পার, তবে বোধ হয়, মিথ্যা কথার আসক্তি অনেক কমিয়া যাইবে। যাহা বলিবে তাহা বেশ সরল হওয়াও চাই। কথার উদ্দেশ্য, তারা অন্যকে নিজের মনের ভাব জ্ঞাপন করা। সুতরাং যাহাতে সে কথা অন্যে বুঝিতে পারে, সেই চেষ্টা থাকা চাই তােমরা হয়ত মনে কর যে, শব্দাড়ম্বর থাকিলে কথা অসরল বা কঠিন হয়, আর তাহা না থাকিলেই কথা সহজ বা সরল হয়; কিন্তু বাস্তবিক তাহা নহে। শব্দাড়ম্বর থাকিলে কথা অবােধ্য হইতে পারে, কিন্তু আমি যে অসরল কথার কথা বলিয়াছি, তাহা সেরূপ অবােধ্য কথা নহে। যেখানে কথার মধ্যে জটিলতা বা গুপ্ত কোন ভাব বা দ্বিভাব প্রভৃতি থাকে, সেইখানে সহজ কথাও অসরল হয়। মনে কর, আমি যেন তোমাদিগকে কোন বই পড়িতে দিয়াছি; বইখানি তােমরা

হিতকথা।
আরম্ভ ও উপসংহারই পড়িয়াছ, কিন্তু আমি যখন জিজ্ঞাসা
করিলাম-কেমন হে বইখানা পড়িয়াছ? তােমার উত্তর
করিলে-“হ। মহাশয়! আদ্যোপান্তই পড়িয়াছি।” তােমরা
মনে করিতে পার, তােমরা সত্য উত্তরই করিয়াছি, কিন্তু আমি
সে কথার যেরূপ অর্থ বুঝিলাম, তাহা কিন্তু সত্য নহে। এরূপ
পূলে এই কথা অসরল হইল। এই কথা যদি ইচ্ছাপূর্বক
আমাকে প্রতারণা করিবার জন্য বল, তবে তােমরা অসরল
ভাবে কথা বলিলে, আমি এইরূপ বলিব। বুঝিলে? বাক্যের
সত্যতা যেমন গুণ, সরলতাও তেমনই গুণ। যাহা বলিবে,
তাহার অর্থ যেমন সত্য হওয়া আবশ্যক, তাহাতে যে ভাব প্রকাশ
হইতে পারে, তাহাও সত্য হওয়া তেমনই আবশ্যক। সত্যের
আবরণে কোন মিথ্যাকে ঢাকিলে তাহাকে অসরলতা বলে।
নীতিবিগণ বলেন, সত্য কথা কহিবে প্রিয় কথা কহিবে,
সত্য অপ্রিয় কথা কহিবে না। ইহার অবশ্য এরূপ অর্থ নহে
যে যখন অপ্রিয় সত্য কথা বলিতে হইবে তখন সেই সত্যটীকে
মিথ্যার আবরণে প্রিয় করিয়া লইয়া বলিতে হইবে। ইহার
অর্থ এই যে, বিশেষ আৰশক না হইলে, অপ্রিয় বাক্য সত্য
হইলেও বলিবে না। লােকে কিরূপ অনাবশ্যক অপ্রিয় সত্য
কথা বলে, তাহা তােমাদিগকে বুঝাইতেছি। আমি যদি এই
রামচন্দ্রকে বলি, রামচন্দ্র দেখিতে কুৎসিৎ, এ কথাটা
সত্য হইলেও বড় অনাবশ্যক অপ্রিয় কথা হইল। এ কথা
যাতে আমায় এমন কোন আবশ্যকতা দেখা যায় না যে,
উহা না খলিলে কোনরূপ ক্ষতি হইতেছিল—এইরূপ হলে

অপরাপরবিষয়ব্যবহার। আমি ঐরূপ অপ্রিয় কথা বলিলে, রামচন্দ্রকে অনর্থক কষ্ট দেওয়া হয়। অপ্রিয় বা কর্কশ বাক্যে লােকে যেমন সাধারণের বিয়াগ ভাজন হয়, এমন বােধ হয় আর কিছুতেই নহে। গুণ থাকিলেও, কর্কশভাষী ব্যক্তি কদাচ লােকের শ্রদ্ধা বা ভালবাসা আকর্ষণ করিতে পারিবে না। এমন দৃষ্টান্ত তাে মা- দিগকে আমি অনেক দিতে পারি। লােকে বলিয়া থাকে যে, মিষ্টদ্রব্য অন্যকে প্রদান করিতে অর্থের প্রয়ােজন, কিন্তু মিষ্ট- বাক্য সকলেই সকলকে দিতে পারে; ইহাতে অর্থের প্রয়ােজন নাই। এই মিষ্টবাক্য বিতরণে যিনি কুণ্ঠিত, তাহাকে লােকে ভালবসিতেও কুণ্ঠিত না হইবে কেন ? অতএব যত্নপূর্বক জিহ্বাকে সংযত করিয়া কর্কশবাক্য পরিহার করিবে। ব্যবহার। যেমন বাক্য সত্য, সরল ও প্রিয় হওয়া আবশ্যক, তেমনই ব্যবহারাদি ও সুনীতিসম্মত, সরল বা অকপট এবং অপরের প্রিয় হওয়া আবশ্যক। যখনই যাহা করিবে, তাহা সুনীতিসম্মত হওয়া আবশ্যক। সচরাচর কাৰ্যের এই গুণ থাকিলেই ইহার অন্য দুইটা গুণ আনুষঙ্গিক ভাবে আসিয়া পড়ে। অর্থাৎ কাৰ্য্য সুনীতিসম্মত হইলেই তাহা প্রায় সরল ও অপরের প্রিয় হইয়া থাকে। কি দুই এক সময়ে ইহার অন্যথাও না হয়, এমন নহে। যখন গুরুজন কোন সুনীতিবিরুদ্ধ কাৰ্য করিতে আদেশ করেন,

হিতকথা।
তখনই বিশেষ বিবেচনা আবশ্যক। একদিকে গুরুজনের
অপ্ৰিয়সাধনের ভয়—তাহাও সুনীতিবিরুদ্ধ—আর একদিকে
সত্যের নিয়মলনের ভয়—তাহাও ধৰ্ম্মবিরুদ্ধ এরূপ স্থলে
তােমরা প্রথমে চেষ্টা করিয়া দেখিবে, যাহাতে কোন প্রকার
অন্যায়ানুষ্ঠান না করিতে হয়। এইরূপ চেষ্টা করিলে, অনেক
সময়েই কৃতকার্য হইতে পারা যায়, ইহাই আমার বিশ্বাস।
দুই এক স্থলে সহসা কৃতকাৰ্য্য না হওয়াও অসম্ভব নহে।
সেই সব হলে বিশেষ বিবেচনা পূর্বক কাজ করিতে হইবে।
ঔদ্ধত্য দেখাইয়া কখনও গুরুজনকে অপমানিত করিবে না--
আবার বিশেষ সুনীতিবিরুদ্ধ কোন কাৰ্য্যও কদাচ করিবে না।
উভয়েরই সামঞ্জস্য বিধান করিয়া গুরুজনের সম্মান রাখিতে
হইবে।
•
তােমরা যাহা নহ, অপরকে তাহাই বলিয়া বিশ্বাস জন্মাইতে
যদি কোন কাৰ্য কর, তাহা অসরল বা কপট কাৰ্য্য হইবে।
এইরূপ অপরল বা কপট কাৰ্য্য যত্নপূর্বক পরিত্যাগ করিবে
কারণ ইহার পরিণাম প্রায়ই বড় কষ্টদায়ক। যখন যে কাৰ্য
করিতে উদ্যত হইবে, বিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখিবে, সেই
কাৰ্য্যচীর মধ্যে কোন দুরভিসন্ধি আছে কি না। এই বিশ্লেষণ
ৰা বিচার করিয়া দেখিতে অভ্যাস করিলে, তােমাদিগের কাৰ্য্য
ক্রমে সরল ও অকপট হইতে থাকিবে। এ সম্বন্ধে আর অধিক
কিছু বলিতে চাহি না।
অনুষ্ঠিত কাৰ্য যেমন সরল ও সুনীতিসম্মত হওয়া আবশ্যক,
তেমনি তাহা অন্যের প্রিয় হওয়া আবশ্যক। এই জন্য

অপরাপর বিষয়—নিজের সুখেচ্ছা ত্যাগ ইত্যাদি। আপনার আপাতসুখেচ্ছা ত্যাগ করিয়া অপরের সুখের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে হইবে। অপরের নিকট সর্বদা আত্মাভিমান বিসর্জনপূর্বক নম্র থাকিতে হইবে। অপরের অন্যায়াচরণ বা অপরাধ সহিতে বা ক্ষমা করিতে হইবে। প, রের নিকটে সামান্য অপরাধ করিলেও তজ্জন্য বিশেষ দুঃখিত হইতে হইবে ও যাঁহার নিকটে অপরাধ করা হইবে, তাহার নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা: অকুণ্ঠিতভাবে অপরাধ স্বীকার করিতে হইবে। যথাক্রমে ইহা তােমাদিগকে বলিতেছি। আপনার অাপাতসুখেচ্ছা ত্যাগ করিয়া অপরের সুখের জন্য চেষ্টা করা। কথাটা বুঝিতে কিছু গােল হইতে পারে। সুখ লাভই হইল কার্যের উদ্দেশ্য, তবে যদি তাহাই ত্যাগ করিতে হইল, তবে সে কাৰ্য্যে লাভ?” এই আপত্তি বুঝিয়া আমি ‘আপাত’ কথাটা ব্যবহার করিয়াছি। সুখলাভ ইহার উদ্দেশ্য বটে, কিন্তু সে সুখ ত উৎকৃষ্ট হওয়া চাই। আজ খানিকটা সুরস দ্রব্য আহার করিয়া সুখলাভ করিলাম—কাল তজ্জন্য উদর স্ফীত হইলে ভয়ানক কষ্ট হইবে, ইহা কি বাঞ্ছনীয়? অন্যের সহিত ব্যবহারে আপনার আপাতসুখত্যাগের চেষ্টাতে মুলতঃ আপ- নার সুখই হইয়া থাকে। নিজের ইচ্ছামতে চলিতে আপাততঃ বড় সুখ বােধ হয়। গুরুজনের আজ্ঞাদি প্রতিপালন করিয়া, তাহাদিগের সন্তোষ সাধন করিতে হইলে, এই নিজের ইচ্ছাটি দুই এক মূলে ৪০ হিতকথা। পরিত্যাগ করিতে হয়। ইহা এক প্রকার কষ্টজনক সন্দেহ নাই, কিন্তু এই কষ্ট আপাত-কষ্ট ; এই কষ্টের ফলে, গুরু জনের প্রিয় হওয়া যায়। গুরুজনের প্রিয় হইলে, তাহাদের আশীর্বাদে ও স্নেহে অসীম আনন্দ লাভ করা যায়। এ স্থলে এই যে নিজের ইচ্ছামতে চলার আপাতসুখ, তাহাকে ত্যাগ করাই কৰ্ত্তব্য। প্রায় উৎকৃষ্ট সুখজনক কাৰ্যেরই আস্তে কষ্ট পাইতে হয়, আপাতসুখকে বিনাশ করিতে হয়; কিন্তু পরিণামে তাহাতে উৎকৃষ্ট সুখই ভােগ করিতে পারা যায়। এই লেখাপড়া শিক্ষার কথাটাই দেখ না কেন। বালকেরা যে বয়সে লেখাপড়া করিতে আরম্ভ করে, সে বয়সে খেলাই তাহা- দের প্রধান সুখ বলিয়া বিবেচিত হয়। তখন তাহার খেলা ছাড়িয়া লেখাপড়া করিতে চেষ্টা করিয়া কি উপস্থিত সুখ পরি- ত্যাগ করে না? রােগীর পথ্য উপস্থিত সুখবিরােধী—কিন্তু তাহার পরিণাম মঙ্গলজনক বলিয়া কি তাহা সেবনীয় নহে? সেইরূপ যদিও গুরুজনের আধীনতা বা তাহাদের জন্য আত্ম- সুখের বিসর্জন আপাততঃ কষ্টজনক বলিয়া বােধ হয়, তবু তাহ পরিণামে মঙ্গলজনকই জানিবে। ভক্তির কথা বলিবার সময়ে বলিয়াছি যে প্রকৃত ভক্তি- গুণের বিকাশ করিতে পারিলে, ভক্তির পাত্রের আজ্ঞা এতি- পালনে কিছুমাত্র কষ্ট বােধ হয় না; প্রত্যুত তাহাতে আনন্দই হইয়া থাকে। পরের আজ্ঞা প্রতিপালনে তােমাদের শারীরিক কষ্ট হইতে পারে। এই কষ্ট সহ করিবার জন্য পরিশ্রমী হইতে হইবে।

৪১ অপরাপর বিষয় নিজের মুখেচ্ছা ত্যাগ ইত্যাদি। পরার্থপরতা যেমনই লােককে অপরের প্রিয় করিয়া থাকে, স্বার্থ- পরতা তেমনই লােককে অপরের অপ্রিয় করে। মানুষ কখন কোথাও একা থাকিতে পারে না। তাহাকে অপর লােকের সহিত সম্বন্ধ রাখিতেই হয়। অপরের সহিত ব্যবহারে যদি লােকে কেবল আপনার ভালটাই খুজিতে থাকে, তবে তাহাকে অপরে ভাল বাসিবে কেন ? শরীর যদি উৎকৃষ্ট থাকে, তবে তাহাকে সহজেই পরিশ্রম- সহিষ্ণু করা যাইতে পারে। শরীর পরিশ্রমসহিষ্ণু হইলে, অন্যের অজ্ঞাপ্রতিপালনজনিত শারীরিক কষ্টের দায় হইতেও মুক্তিলাভ করা যায়। কাহারও জন্য শারীরিক পরিশ্রম করিলে সেজন্য সে যেমন সন্তুষ্ট হয়, সহজে আর কিছুতেই সে তেমন সন্তুষ্ট হয় না। অর্থাদি দ্বারাও লােকের এমন সন্তোষ সাধন করা যায় না। কাহাকেও আত্মসুখবিসৰ্জন করিতে দেখিলে, তাহার প্রতি অপরের স্বভাবতঃই শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জন্মিয়। থাকে। তবেই দেখ, যেমন ইহাতে একটি উপস্থিত সুখ বিস- ৰ্জন করিতে হয়, তেমনই—তেমনই কেন,বােধ হয় ততােধিক একটি সুখের সামগ্রী তৎক্ষণাৎ লাভ হয়। এইরূপে পয়সা ব্যয় করিয়া যদি তদবিনিময়ে টাকা পাওয়া যায় তবে কোন্ বুদ্ধিমানমহাজন এ ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইতে অনিচ্ছা প্রকাশ করিতে পারেন ।

৪২ হিতকথা। অপরের নিকট আত্মাভিমান পরিত্যাগ পূর্বক নম্র থাকা। নম্রতায় লােক যত বাধ্য হয়, এত আর কিছুতেই নহে। অতি বড় পাপকৰ্ম্ম করিয়াও নরম হইয়া থাকিলে লােকে তাহাকে লােকের সাধারণতঃ অহঙ্কার বা অভিমান বেশী মাত্রাতেই থাকে। অহঙ্কারে আপনাকে অপর হইতে শ্রেষ্ঠ বলিয়া ধারণা জন্মায়। অন্যের অহঙ্কার আবার এই ধারাণার বিরােধী—কাজেই লােকে অন্যের অহঙ্কারের প্রতি বড়ই চটা। লােকের নিকট নরম হইয়া থাকিতে পারিলে যে সহস্র অপরাধও মার্জনীয় হয়, এ কথা নির্বিবাদে বলা যাইতে পারে। এর সর্বাগ্রে তােমাদিগের চরিত্রে এই গুণের বিকাশ জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতে হইবে। নিষ্কলঙ্ক হইতে চেষ্টা করা উচিত বটে, কিন্তু নিষ্কলঙ্ক হওয়া তত সম্ভবপর নহে—সহস্র চেষ্টা সত্বেও দুই একটা দোষ প্রায় সকলেরই থাকে। সুতরাং নিখুত হইয়া অন্যের প্রিয় হইতে চেষ্টা করিয়া বিশেষ কৃত- কাৰ্য্য হওয়া তত সহজ নহে। সেই হেতু আমি সহজে লােকের প্রিয় হওয়ার জন্য এই গুণের বিকাশ করিতে বিশেষ উপদেশ প্রদান করিতেছি। আপনার গুণ যিনি বেশী দেখিতে চেষ্টা করেন, তিনিই প্রায় অহঙ্কারী—আপনার দোষ যিনি বেশী দেখিয়া থাকেন, তিনিই প্রায় প্রকৃত নম্র। সামাজিক ব্যবহারে যে নম্রতা দেখিতে পাও, তাহাকেই অকৃত্রিম নম্রতা মনে করিও না ; ললাকে উহাতেই সন্তুষ্ট থাকে বটে; কিন্তু সে সন্তোষে মূল জিনিষের FIGU PUBHUTTBRARIES অপরাপর বিষয়-আত্মাভিমান পরিত্যাগ। ৪৩ মূল্যই জ্ঞাপন করিয়া থাকে। যাহার নকলেরও এত আদর, তাহার জাসলের মর্যাদা কি, ভাবিয়া দেখ। লােকে ব্যবহারে যে নম্রতা প্রদর্শন করে, তাহা সকল সময়ে আন্তরিক নহে। তবু অন্ততঃ ইহা ব্যবহারের নম্রতা সাধন করিয়াছে, বাক্যের নম্রতা সাধন করিয়াছে, এই জন্যও কিছু আদর পাইবার যােগ্য। আমি তােমাদিগকে এই প্রকার নম্রতার বিকাশ করিতে বলিয়া ক্ষান্ত থাকিতে চাহি না। তােমাদিগকে আন্তরিক নম্রতারই বিকাশ করিতে হইবে । এজন্য সর্বদা মনে করিবে, আমি সহস্র দোষে দোষী, আমি পৃথিবীতে একটা নগণ্য প্রাণী, আমার আবার অহঙ্কার কিসের ? এই নম্রতাগুণের বিকাশ- জন্য সর্বদা পরের গুণ ও নিজের দোষ দেখিতে যত্নবান্ হইতে হইবে। ভ্রমরের পুষ্পমধু অন্বেষণের ন্যায়, পরের গুণই অন্বে- যণ করিবে; আর মক্ষিকার ব্রণানুসন্ধানের ন্যায়, নিজের দোষই সর্বদা জিয়া বেড়াইবে। এইরূপ করিতে করিতে দেখিবে, নিজের গুণগরিমার প্রতি ক্রমশঃ বিশ্বাস কমিয়া আপ- নার অহঙ্কার কমিয়া যাইতেছে, এবং পরের গুণগরিমায় ক্রমশঃ বিশ্বাস জন্মিতেছে ও তৎসঙ্গে তৎপ্রতি শ্রদ্ধাও বৃদ্ধি পাইতেছে। এইরূপে ক্রমে পরকে বড় ভাবিতে শিখিবে, নিজকে ঘােট ভাবিতে আরম্ভ করিবে। ফলতঃ নিজের এই ক্ষুদ্রতাজ্ঞানই নবিকাশের প্রধান সহায়। নম্রতার বিপরীত গুণ অহঙ্কার বা ঔদ্ধত্য ইত্যাদি। ***

৪ঃ
হিতকথা।
অপরের আয়াচরণ সহ করা বা না করা।
অপরের প্রিয় হইতে হইলে, এই ক্ষমাগুণের বিকাশ বিশেষ
আবশ্যক। আমি যেন চেষ্টা করিয়া কাহারও নিকটে কোন
অপরাধ না করিয়া থাকিতে পারিলাম,-অপরের আমার নিকট
অপরাধী হওয়া অসম্ভব নহে। অন্যকৃত সেই অপরাধগুলি
মা করিতে না পারিলে অপরাধকারী ব্যক্তিও আমাকে অপ্রিয়
জ্ঞান করিবেন। এমনই সংসারের রীতি আমি তােমাদিগের
নিকটে একটা অপরাধের কাৰ্য্য করিলে, যদি তােমরা আমার
সে অপরাধ ক্ষমা না করিয়া, অপরাধীর সহিত যেরূপ আচরণ
করিতে হয়, আমার সহিত সেইরূপ আচরণ কর, তবে আমি
আমার অপরাধের কথা বিস্মৃত হইব, এবং তােমাদিগের প্রতিই
অসন্তুষ্ট হইব।
এই ক্ষমা কথাটি সকলের প্রতি প্রযুক্ত হইতে পারে না।
গুরুজনে যখন আমাদিগের প্রতি অন্যায্য ব্যবহার করেন, তাহ
সহ করিয়া থাকিতে হইবে। সমকক্ষ বা নীচব্যক্তিকৃত অন্যায়-
চরণ মা করিতে হইবে। বিষয়টা একই—কেবল কথায়
পৃথক মাত্র।
ক্ষমাগুণের বিকাশ করিতে হইলে, আপনাকে সহিষ্ণুতাগুণে
ভূষিত করিতে হইবে। যিনি অসহিষ্ণু, তিনি ক্ষমা করিতে ইচ্ছুক
হইলেও, ক্ষমা করিতে সমর্থ হন না। অন্যায্য ব্যবহার দেখিবা-
মাত্র তাহার শরীয় জ্বলিয়া উঠে—তঁাহার ঘােৱতর ক্রোধের
উদ্রেক হয়। এই ক্রোধের বশবর্তী হইয়া হয় ত তিনি যাহাকে

অপরাপর বিষয়-ক্ষমা প্রার্থনা করা। ক্ষমা করিবেন, তাহারই নিকটে ক্ষমাপ্রর্থনা করিবার উপযুক্ত হইয়া উঠেন—অর্থাৎ যে ব্যক্তি প্রথমে তাহার নিকটে অপরাধী ছিলেন, সেই ব্যক্তির নিকটে পরে তিনিই অপেক্ষাকৃত অধিক তর অপরাধী হইয়া পড়েন। সে যাহা হউক, পরের প্রিয় হইয়া চলিতে হইলে পরকৃত অপরাধগুলি সহ করিয়া থাকিতে হইবে—নহিলে পরের মন সন্তুষ্ট রাখিতে পারা যাইবে না। পরের মন সন্তুষ্ট না রাখিতে পারিলে, উৎকৃষ্ট সুখলাভে ব্যাঘাত জন্মিবে। অপরের নিকট অপরাধ স্বীকার করা- বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। সহস্র চেষ্টা করিলেও, একেবারে যে দোষশূন্য হইতে পারিবে, মনে এরূপ আশা করিও না। কতক ইচ্ছায়, কতক অনিচ্ছায়, অন্যের নিকটে অপরাধ করিতেই হইবে। অপরাধ না করিবার চেষ্টা সত্বেও যদি কাহার নিকটে অপরাধ করিতে হয়, আমি সে জন্য তােমাদিগকে বিশেষ তিরস্কার করি না। কিন্তু যদি সেই অপরাধ করিয়া তােমরা চুপ করিয়া বসিয়া থাক, সেজন্য কিছুমাত্র দুঃখিত না হও, বা ভবিষ্যতের অঙ্গ সতর্ক না ইও, আজি যাঁহার নিকট অপরাধ করিয়াছ, তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা, সুলবিশেষে অপরাধস্বীকার বা দুঃখপ্রকাশ না কর, আমি তােমাদিগকে দুৰ্জ্জন বলিয়া তিরস্কার করিতে উদ্যত হইব। এমন অনেক লােক দেখিয়াছি, যাঁহারা অন্যের নিকটে অপরাধ করিয়া মনে মনে অনুতাপ ভােগ করেন —কিন্তু যাঁহার

হিতকথা।
নিকট অপরাধের কাৰ্য্য করিয়াছেন, তাঁহাকে ইহা জানাইবার
আবশ্যকতা বােধ করেন না। তঁাহারা মনে করেন, মনে মনে
অনুতাপ ভােগ করিলেই অপরাধের যথেষ্ট প্রায়শ্চিত হইল
আমি কিন্তু এরূপ মনে করি না। যাঁহার নিকটে অপরাধ করি
লাম তিনি যদি গুরুজন হন, তাঁহার নিকট বিনীতভাবে ক্ষমা
প্রার্থনা করিয়া তাহার মন প্রফুল্ল করিতে চেষ্টা করিতে হইবে
সমকক্ষের নিকটে-ব্যক্তি বুঝিয়া কাহারও নিকটে বা ক্ষমা-
প্রর্থনা, কাহারও নিকটে বা অপরাধ স্বীকার, কাহারও নিকটে
বা তজ্জন্য দুঃখ প্রকাশ করিয়া তাহাকে সন্তুষ্ট করিতে হইবে।
রাজা ।
রাজা উৎকৃষ্ট না হইলে, প্রজাবর্গের কষ্টের অষধি থাকে
না। রাজাই দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করিয়া প্রজাবর্গের
সুখশান্তি বিধান করিয়া থাকেন-সুতরাং উৎকৃষ্ট সুখলভার্থ
উৎকৃষ্ট রাজা নিতান্ত আবশ্যক।
তােমরা সকলেই জ্ঞাত আছ, মহারাণী ভিক্টোরিয়ার
মৃত্যুর
পর সপ্তম এডওয়ার্ড আমাদের রাজা। এই প্রকার উৎকৃষ্ট
রাজা সচরাচর সকলের অদৃষ্টে ঘটে না।
কিন্তু রাজা উৎকৃষ্ট হইলেই প্রজার সুখশান্তি ঘটে না।
যেমন রাঙ্গা উৎকৃষ্ট, তেমনই প্রজাও উৎকৃষ্ট হওয়া চাই।
যেমন রাজা পুত্রের ন্যায় প্রজাপালন করিবেন, তেমনই প্রজা-
গণও পিতার ন্যায় রাজাকে ভক্তি করিবে। রাজা প্রজার এই
সম্বন্ধ—এই পিতাপুত্রের সম্বন্ধ যে দেশে বর্তমান, সেই দেশেই

অপরাপর বিষয়—রাজা। ৪৭ প্রজাগণ উৎকৃষ্ট রাজা পাওয়ার সুখ সমধিক সম্ভোগ করিতে সমর্থ হয়। রাজাকে ভক্তি করিতে হইবে ; তাহার বিধানগুলি প্রাণ- পণে পালন করিতে হইবে। রাজা যে বিধান করিলেন, প্রজা যদি তাহা পালন না করে, তবে রাজার প্রতি প্রজার ভক্তি রহিল কই? তাই সর্বাগ্রে তােমাদিগের এই রাজার বিধান- পালনে মনােযােগী হইতে হইবে। যেমন তােমরা পরিবার মধ্যে থাকিয়া পিতা বা অন্য কোন গুরুজনের আদেশ পালন করিয়া থাক, যেমন তাহাদিগের আদেশ লঙ্ঘন করিলে, তাঁহারা তােমা- দিগকে যে শাস্তি প্রদান করিয়া থাকেন, তােমরা সেই শান্তি অম্লানবদনে গ্রহণ করিয়া থাক—এই রাজার আদেশ স্বরূপ তৎপ্রচলিত আইনাদির বিধানও তােমাদিগকে সেইরূপই পালন করিতে হইবে—সেই বিধান লঙ্ঘন করিলে রাজা যদি তােমা- দিগকে শাস্তি প্রদান করেন, তােমাদিগকে ঠিক তেমনই অম্লান- বদনে সেই শান্তি গ্রহণ করিতে হইবে। রাজার প্রচারিত আইনের বিধান পালন করিয়া প্রজাগণের রাজভক্তি প্রদর্শন করিতে হয়। যেমন আঃ নারা রাজার সেই আইনের বিধান মানিতে যত্ন করিবে, তেমনই অন্যেও যাহাতে সেই বিধান পালন করে, তৎপ্রতি দৃষ্টি রাখিবে। যদি রাজা সেইরূপ কোন বিধানের লম্বনকারীকে শাস্তি দিতে সমুদ্যত হন, কদাচ তাহার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়া রাজাকে শাস্তি প্রদানে বাধা দিও । রাজার নিকটে কাঁদিয়া কাটিয়া স্বীয় দোষ স্বীকার করিয়া, s, হিতকথা। শাস্তি হইতে অব্যাহতি পাইতে চেষ্টা করিতে পার, কিন্তু কদাচ কুটিল, মিথ্যা ও শঠতাপূর্ণ ষড়যন্ত্রে, রাজার সুবিচার কার্যে বাধা দেওয়া, ভক্ত প্রহ্মার কর্তব্য নহে। যেমন শিষ্টের পালন রাজার ধর্ম; তেমন দুষ্টের দমন ও রাজার ধর্ম। রাজার সহিত ব্যক্তিগত কোন অপরাধীর কোন শত্রুতা নাই। রাজা যে অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করেন, তাহা তােমাদেরই মঙ্গলের জন্য। রাঙ্গদত্ত শাস্তি অপরাধীরও মঙ্গলজনক। অতএব রাজ- ভক্ত প্ৰজা যেমন যত্নে রাজার শিষ্টপালন কাৰ্য্যে সহায়তা করিবেন, তেমনই দুষ্টদমনকাৰ্যেও যথাশক্তি সাহায্য করিবেন। রাজা বড় দূরে আছেন; অপরাধী প্রায়ই তাহার সম্মুখে অপরাধ করে না। অপরাধী প্রায় তােমাদিগের সম্মুখেই সেই অপরাধের কার্য সম্পন্ন করিয়া থাকে; অতএব তােমরা যদি সকলে যত্নবান হইয়া এই অপরাধীর অপরাধগুলি রাজদ্বারে প্রকাশিত না কর, তবে আর রাজা দুষ্টের দমনরূপ প্রধান কর্তব্য পালন করিতে পারিবেন না। সেই কৰ্তব্যলঘনফলে, রাজার রাজ্য বিশৃঙ্খল হইবে, প্রজাগণের শাস্তি তিরােহিত হইবে। অতএব তােমরা যথাসাধ্য রাজার শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমনে সহায়তা করিবে। যেমন রাজাকে ভর্তি করিবে, তেমনই রাজার প্রতিনিধিকেও ভক্তি করিবে। মহামান্য গবর্ণর জেনেরল রাজার প্রতিনিধি- তাঁহাকে ত সকলে সম্মান করিয়াই থাক। তাহাকে যে সম্মান করা কর, তাহা সকলে সহজেই বুঝিতে পার ; কিন্তু এমন অনেক রাজপুরুষ আছেন, যাঁহাদিগকে সম্মান করা তােমরা অপরাপর বিষয়—রাজা। ৪১ অনেক সময়ে কর্তব্য বলিয়া বুঝিতে পারে না। সেইজন্য বলা আবশ্যক যে, রাজার রাজকার্যে যিনিই সহায়তা করিবেন, তােমরা তাঁহাকে? ভক্তি করিবে। তােমরা বালক-এ সকল কথা এখন না বলিলেও চলিত —কিন্তু এত বড় একটা বিষয়ের কিছু জ্ঞান বাল্যকালেই হওয়া উচিত মনে করিয়া এ সম্বন্ধে দুই চারি কথা এই স্থলেই সংক্ষেপে বলিলাম। আমাদের বর্তমান মহারাণীর গুণের অবধি নাই। প্রজার দুঃখের কাহিনী শুনিলে, তাঁহার হৃদয় করুণায় দ্রবীভূত হয়। যখন দেশে দুর্ভিক্ষ বা মহামারী উপস্থিত হয়,মহারাণী ভারতেশ্বরী প্রজার কষ্ট নিবারণ করিতে চেষ্টা করিয়া থাকেন। ভারত গবর্ণমেন্ট ভারতের প্রজাবর্গের সুশিক্ষা বিধানার্থ বৎসর বৎসর কত অর্থ ব্যয় করিতেছেন, তাহা দেখিলে কৃতজ্ঞতায় হৃদয় প্লাবিত হইয়া উঠে আমাদের দেশে দীন দরিদ্রের চিকিৎসার জন্য অর্থব্যয় হইতেছে না। কলিকাতা মেডিকেল কলেজ হাস- পাতালে কপর্দক মাত্রও প্রদান না করিয়া যে কত শত দীন দরিদ্র অতিযত্নে বিজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসিত হইতেছে, তাহার সংখ্যা করা যায় না। রাজা নিজ ভাণ্ডার হইতেই যে অর্থানুকুল্য করিয়া থাকেন, এমন নহে। টাকা যেখান হইতেই আসুক, রাজার দৃষ্টি না থাকিলে, এমন কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইতে পারে না। ফলতঃ আমাদিগের সুখশান্তির জন্য রাজা সর্বদাই চিন্তা করিতেছেন। এ হেন রাজার নিকট সর্বদা অভিযুক্ত না থাকিলে ঈশ্বরের নিকটেও পরম পাপী বলিয়া গণ্য হইতে হইবে। ৪ : T ৫০ হিতকথা । সৰ্বপ্ৰাণীর সুখ। দয়া। উৎকৃষ্ট সুখলাভাৰ্থ কেবল নিজের সুখদুঃখের প্রতি লক্ষ্য রাখিলেই চলে না, এ কথা তােমাদিগকে বলিয়াছি। যাহা- দিগের সহিত তােমাদিগের কোন না কোন প্রকার সম্বন্ধ রাখিতে হয়, সকলেরই উৎকৃষ্ট হওয়া বা অন্ততঃ তােমাদিগের অনুকূল হওয়া আবশ্যক। পরিজনের সহিত সম্বন্ধ সর্বাপেক্ষা নিকট- বৰ্ত্তী--তাহাদিগকে তােমাদের সুখপ্রাপ্তির অনুকূল করা সর্বাগ্রে আবশ্যক। কিরূপে তাহা করিতে হয়, স্থূলভাবে বলিয়াছি। প্রতিবেশী ও স্বদেশীর সহিত সম্বন্ধ-পরিজনের সহিত সম্বন্ধ অপেক্ষা দূরবর্তী—কিন্তু তথাপি তাহাদিগের সহিতও অনেক প্রকার সংশ্রব রাখিতে হয়—তাহাদিগকেও শিষ্টাচার ও সৌজ- স্যাদি দ্বারা তােমাদিগের অনুকূল করিতে হইবে। এই সকল কার্য সম্পন্ন করিলেও, সুখের অন্য এক প্রকার অন্তরায় থাকিয়া যায়, তাহাই অদ্য বলিতে চাহি। অপরের দুঃখ দেখিলে, আমাদিগের মনে স্বতঃই কষ্ট উপ- স্থিত হইয়া থাকে। এই কষ্ট দূর করিবার জন্য অপরের দুঃখ- দূরের চেষ্টা উৎকৃষ্ট সুখলাভার্থ নিতান্ত আবশ্যক। যে বৃত্তি হৃদয়ে সঞ্চারিত হইলে পরের দুঃখ দূর করিতে চেষ্টা হয়, উৎকৃষ্ট সুখ লাভাৰ্থ সেই বৃত্তির বিকাশ প্রয়ােজনীয়। সেই বৃত্তিকে দয়া বলে। তােমাদিগের দয়াবৃত্তি বিকাশেও যত্নবান হইতে হইবে। যেমন আমরা সর্বদা পরমেশ্বরের অসীম দয়া উপভােগ মহতী কাহিনী। করি, সেইরূপ আমাদিগের নিকটে যাহারা দয়াপ্রার্থী তাহা- দিগকেও আমাদিগেরও দয়া করা কর্তব্য। মানুষ মানুষের প্রতি দয়াপরবশ না হইলে, অন্যের উপকার করিতে তাহার ইচ্ছা হয় না। মানুষ মানুষের উপকার সাধন না করিলে, প্রতিমনুষ্য প্রায় স্বতন্ত্র জীব হইয়া পড়ে—তাহাদের আর সমাজ- বন্ধন থাকে না; যাহার যাহা স্বার্থ সে তাহাই অন্বেষণ করিতে থাকে,অন্যের সুখদুঃখের প্রতি কেহই দৃষ্টি করিতে চাহে না। এরূপ হইলে পশুতে ও মানবে ব্যবহারগত কোন বিশেষ প্রভেদ থাকে না। এই দয়াই সমাজবন্ধনের মূল । এই দয়া কেবল যে মনুষ্যেরই প্রতি প্রদর্শন করিতে হইবে, তাহা নহে। ইতর প্রাণিগণের প্রতিও দয়াশীল হওয়া কর্তব্য। যিনি ইতর প্রাণিগণের প্রতি দয়া দেখাইতে শৈথিল্য করেন, তিনি মনুষ্যের প্রতিও তাদৃশ দয়াপ্রকাশে সমর্থ হন না। মানবের হউক, কি ইতর প্রাণীরই হউক, দুঃখ দেখিলেই তাহা মোচনের জন্য চেষ্টা করা উচিত। চতুর্থ পরিচ্ছেদ—মহতী কাহিনী। সংসারে প্রকৃত সুখলাভ করিতে হইলে, যেরূপ শিক্ষার প্রয়ােজন, আমি তাহার অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তােমাদিগকে প্রদান করিয়াছি। এখন কয়েকটি মহতী কাহিনী তােমাদিগের নিকটে বর্ণনা করিব।

২ হিতকথা। রামদুলাল। কলিকাতার উত্তরে দমদমা বলিয়া একটি রেলওয়ে ষ্টেশন আছে, তাহা তােমরা অবগত আছ। ঐ স্টেসনের নিকটে রেকজানি নামক একটি ক্ষুদ্র গ্রাম ছিল। ঐ গ্রামে পূর্বে রামদুলাল সরকার নামক এক ব্যক্তি বাস করিতেন। রাম, দুলাল দরিদ্র সন্তান। তাহার মাতামহী, মদনমােহন দত্ত নামক কলিকাতার অতি সম্রান্ত ও ধনী ব্যক্তির গৃহে পাচিকার কাৰ্য্যে নিযুক্ত ছিলেন। রামদুলাল বাল্যকালে এই মদনমােহন দত্তের বাড়ীতে মাতামহীর নিকটে থাকিয়া যৎসামান্য লেখা পড়া অভ্যাস করেন। তাহার দরিদ্রাবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া মদনমােহন ঘােড়শবৎসর বয়সকালে তাহাকে আপনার বাটীতে মাসিক পাঁচ টাকা বেতনে সরকার নিযুক্ত করেন। রামদুলাল আপনার সচ্চরিত্র ও পরিশ্রম বলে এই সামান্য অবস্থা হইতে ক্রমে এক জন অদ্বিতীয় ধনী হইয়া উঠিয়াছিলেন। আমি তাহার গুণ- রাশির দুই একটী পরিচয় তােমাদিগকে প্রদান করিতেছি। রামদুলাল যে দরিদ্র ছিলেন, তাহা তােমাদিগকে বলিয়াছি। দরিদ্রের ধনলােভ-সংবরণ বড় সহজসাধ্য ব্যাপার নহে। কিন্তু রামদুলাল দরিদ্রাবস্থায় থাকিয়াও কিরূপে এই লোভ সংবরণ করিতেন, তাহার একটী গল্প তােমাদিগকে বলিতেছি। রামদুলাল যখন মদনমােহন দত্তের বাটীতে সরকারী কার্যে নিযুক্ত ছিলেন, তখন জাহাজের বাণিজ্যদ্রব্যাদি ক্রয় করা তাহার একটী প্রধান কাৰ্য্য ছিল। রামদুলাল সময়ে সময়ে গঙ্গাতীরে যাইয়া জাহাজের দ্রব্যাদির অনুসন্ধান লইতেন। - মহতী কাহিনী—রামদুলাল। একদিন তিনি ঐ কাৰ্যে গমন করিয়া দেখিতে পাইলেন যে, একখানি জাহাজ ভাগীরথীর গর্ভে মগ্ন হইয়া আছে। রাম- দুলাল সাতিশয় বুদ্ধিমান লােক ছিলেন। জাহাজের মুল্যাদি নির্ধারণে তঁাহার অসাধারণ ক্ষমতা জন্মিয়াছিল। তিনি মনে মনে ঐ জলমগ্ন জাহাজের দ্রব্যাদির একটা মূল্য নির্ধারণ করিয়া লইলেন। কিছুদিন পরে রামদুলাল একদিন প্রভুর আজ্ঞায় কোন দ্রব্য নীলামে ক্রয় করিতে ভাগীরথীর তীরে আসিয়া দেখেন যে, পূর্বোক্ত জলমগ্ন জাহাজখানি নীলামে ধরা হই- য়াছে। ঐ জাহাজের কি মূল্য হইতে পারে, তাহা তাহার জানা ছিল। তিনি ইতস্ততঃ না করিয়া, দ্রব্য ক্রয় করিবার জন্য মদনমােহন তাহাকে যে চৌদ্দ হাজার টাকা দিয়াছিলেন, তদ্দারাই সেই জাহাজ ক্রয় করিলেন। ক্ষণপরেই জাহাজের প্রকৃত মূল্য কাহারও অবিদিত রহিল না। তখন অনেকেই ঐ জাহাজ রামদুলালের হস্ত হইতে আত্মসাৎ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। রামদুলাল কিলার পাত্র নহেন—তিনি প্রথমে ঐ জাহাজ কাহাকেও ছাড়িয়া দিতে সম্মত হইলেন না। পরে, অনেক তর্কবিতর্ক, অনেক উপরােধ, অনেক পীড়াপীড়ির পরে, রামদুলাল প্রায় লক্ষ টাকা লাভ করিয়া ঐ জাহাজ অন্যের নিকট বিক্রয় করিলেন। ব্যাপারটী ভাবিয়া দেখ–দরিদ্র পাঁচ টাকা বেতনের রামদুলালের হঠাৎ লক্ষ টাকা হস্তগত হইবার সম্ভাবনা হইল; প্রভু যে চৌদ্দহাজার টাকা তাহাকে দিয়াছিলেন তাহার এক কপর্দকও গ্রহণ না করিয়া রামদুলালের লক্ষ টাকা লাভ করিবার সুযােগ ঘটিল; কিন্তু রামদুলাল তাহা করিতেন ৫৪ হিতকথা। না। পাঁচ টাকা বেতনের চাকর হইয়াও, রামদুলাল সাধুতার বলে লক্ষ টাকা অনায়াসে তুচ্ছ মনে করিতে পারিলেন। তিনি মনে করিলেন “ঐ টাকা ন্যায়ত আমার প্রাপ্য নহে। আমি প্রভুর কাৰ্য্যে এই স্থানে আসিয়াছি। প্রভুর টাকার দ্বারা এই টাকা আমি পাইতেছিঅতএব এ টাকা আমার নহে, ইহা প্রভুর টাকা । মূলধন যহাব, লাভও তাঁহার।” তিনি এই মনে করিয়া বাটীতে প্রত্যাগমন পূর্বক, মদনমােহনকে বিশেষ নিবেদন করিয়া তাহাকে সেই লক্ষ টাকা প্রদান করিলেন। ব্যাপার দেখিয়া মদনমােহন সাতিশয় বিস্মিত হইলেন। ভৃত্য রামদুলালের এমন সাধুতা, এমন অসাধারণ লােভ সংবরণ দেখিয়া তিনি উদার চিত্তে ঐ সমস্ত টাকাই রামদুলালকে প্রত্য পণ করিলেন। যেমন ভৃত্য প্রভুর সহিত আচরণ করিল, প্রভুও সেইরূপ ভৃত্যের সহিত আচরণ করিলেন। উভয় দিকেই হৃদ- য়ের মহতী উদারতা প্রদর্শিত হইল। উভয়েই উভয়ের গুণে মুগ্ধ হইয়া অতুল আনন্দ অনুভব করিতে লাগিলেন। এখন ভাবিয়া দেখ, রামদুলাল যদি এই পন্থা অবলম্বন না করিতেন, তিনি যদি হৃদয়ের এইরূপ উদারতা ও সাধুতা প্রদর্শন করিতেন, তবে কি তাঁহার ঐরূপ অতুল আনন্দ-লাভ ভাগ্যে ঘটিতে পারিত ? রামদুলাল যদি গােপনে ঐ টাকা হস্তগত করিতেন, তাহার অর্থপ্রাপ্তি ঘটিত বটে, কিন্তু মনের সুখ ঘটিত না। তিনি ঐ টাকা হস্তগত করিতে চাহিলে, তাহাকে তজ্জন্য অবশ্যই প্রভুর নিকটে মিথ্যা কথা বলিতে হইত—তিনি যে প্রভুর অর্থ দ্বারাই জাহাজখানি কিনিয়াছিলেন, এ কথা তাঁহার মহতী কাহিনী-রামদুলাল। গোপন করিতে হইত। এই কথা যাহাতে প্রকাশ না পায়, তজ্জন্য তাঁহাকে সর্বদা চেষ্টিত থাকিতে হইত। কিন্তু সম্ভবত কালে একথা প্রকাশ হইয়া পড়িত। লােকসমাজে তাঁহার অত্যন্ত কলঙ্ক হইত—কেহ তাহাকে আর সেইরূপ বিশ্বাস করিত না। কত আর তােমাদিগকে দেখাইব—সাধুতার পথ লঙ্ঘন করিলে নিশ্চয়ই রামদুলালের আজীবন নানাপ্রকার কষ্ট পাইতে হইত। • কিন্তু দরিদ্র রামদুলাল ধনের ঐরূপ লােভ সংবরণ করায় যেমন প্রভুর সন্তোষ, জনসমাজে কীৰ্ত্তি, তেমনই প্রভূত অর্থও লাভ করিয়া পরম সুখে জীবন অতিবাহিত করিতে পারিয়াছিলেন। তঁাহার যশের কথা এখনও আমরা অন্যের নিকট কীৰ্ত্তন করিয়া থাকি। রামদুলালের বিনয়গুণও বিশেষ উল্লেখযােগ্য। রামদুলাল যদিও দরিদ্রসন্তান ছিলেন, তিনি নিজে প্রভূত অর্থোপার্জন করিয়া পরিশেষে একজন অদ্বিতীয় ধনী হইয়া উঠিয়াছিলেন। লােকপ্রবাদ আছে যে, নির্ধন ব্যক্তি ধনবান হইলে, জগৎকে তৃণবৎ জ্ঞান করে। স্থলবিশেষে এ কথা সত্য বলিয়াও স্বীকার করিতে হয়। কিন্তু রামদুলাল এই লােক প্রবাদের বিষয়ীভূত হয়েন নাই। তঁাহার অতুল ঐশ্বৰ্য্য থাকাতেও, তিনি অদ্বিতীয় বিনয়ী ছিলেন। সেই বিনয়ের দুই একটি দৃষ্টান্ত তােমাদিগকে প্রদর্শন করিতেছি। একদা কোন কারণ বশতঃ কোন এক ব্যক্তির সহিত তাঁহার পুত্রের কলহ উপস্থিত হয়। পুত্র ধনি-সন্তান- ক্রোধভরে সেই ব্যক্তিকে যৎপয়ােনাস্তি কটু বাক্য প্রয়ােগ হিতকথা। করিতে ত্রুটি করিল না—কিন্তু রামদুলাল ইহা জানিয়া, সাতি- শয় নম্রভাবে সেই ব্যক্তির নিকটে উপস্থিত হইয়া, যথার্থই কৃতাঞ্জলিপুটে তাহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। তিনি ধনের গবে গর্বিত হইয়া পুত্রের পক্ষ অবলম্বন পূর্বক সে ব্যক্তিকে অপদস্থ করিবার প্রয়াস পাইলেন না—প্রত্যুত সাতি- শয় বিনীতভাবে সেই ব্যক্তির নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। বিবাদও সহজে মিটিয়া গেল। তােমাদিগের নিকট বলিয়াছি, মনমােহন দত্তই রাম- দুলালকে প্রথমে প্রতিপালন করিয়াছিলেন। মদনমােহন দত্তের নিকটে যখন রামদুলাল পাঁচ টাকা বেতনে কাৰ্য করিতেন, তখনই তাঁহার ভাগ্যলক্ষী সুপ্রসন্ন হইয়াছিল। রামদুলাল এই প্রভুর নিকট আজীবন পরম কৃতজ্ঞ ছিলেন। তিনি এই প্রভুকে চিরদিনই প্রভুর ন্যায় দেখিতেন। অদ্বিতীয় ধনশালী হইয়াও রামদুলাল একদিনের জন্যও এ সম্বন্ধ বিস্মৃত হয়েন নাই। এই প্রভুর বাটীতে তিনি যখন গমন করিতেন, পাদুকা বহির্ভাগে রাখিয়া বাটীতে প্রবেশ করিতেন। পূর্বে যখন তিনি দরিদ্র, পাঁচ টাকা বেতনের সরকার ছিলেন, তখন প্রভুর বাটীতে সকলের সহিত যে ব্যবহার করিতেন, পরে অতুল ঐশ্বৰ্য্যাধি- পতি হইয়াও তিনি সে ব্যবহার পরিবর্তন করেন নাই। প্রভু মদনমােহন দত্তের নিকটে তিনি প্রতি মাসে পাঁচ টাকা বেতন লইতে বিস্মৃত হইতেন না। তিনি যে টাকার লােভে এরূপ বেতন গ্রহণ করিতেন, তাহা নহে। তখন তাহার অভাব ছিল । তিনি যে তখনও সেই প্রভুর ভৃত্যই আছেন, এই ধারণা মহতী কাহিনী--রামদুলাল। প্রভুকে ও অন্যান্য সকলকে জানাইবার জন্য তিনি এইরূপ কাৰ্য করিতেন। এ বড় সহজ গুণ নয়। রামদুলালের ন্যায় ধনবান হইলে, পূর্বের প্রভুর সহিত সম্বন্ধ গােপন করিতেই অনেকের চেষ্টা হওয়া সম্ভবপর। আমরা অনেক স্থলেই দেখি যে, দরিদ্র- সন্তান বড় মানুষ হইলে, সে পূর্বাবস্থা গােপন করিতেই সর্বদা সচেষ্ট থাকে, কিন্তু রামদুলাল সেই অবস্থা গােন করা দূরে পাকুক, যাহাতে তাহা অধিকতররূপে প্রকাশ পায়, তজ্জন্য প্রভু মদনমােহন দত্তের নিকটে পাঁচ টাকা বেতন গ্রহণ করিতে কুষ্টিত হইতেন না। বৎসগণ! এখন তােমরা ভাবিয়া দেখ, রামদুলালের এই বিনয়ে তাহার কিরূপ ক্ষতিবৃদ্ধি হইয়াছিল। রামদুলাল যদি বিনয় প্রকাশ না করিয়া গর্ব ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিতেন— যদি তিনি পূর্ব প্রভুর সহিত সম্বন্ধ একেবারে বিচ্ছিন্ন করিয়া তাহাকে প্রভুর ন্যায় সম্মান করিতে ক্রটি করিতেন, তবে তাঁহার কি লাভ হইত ? তাহাতে তাহার ধনও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইত না, যশ ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইত না; সামান্য একটু আত্মাভিমান- জনিত সুখ হইতে পারিত। কিন্তু তাহা হইলে লােকে তাঁহার কলঙ্ক রটনা করিতে ক্রটি করিত না। লােকসমাজে তিনি অকৃতজ্ঞ ও অবিনয়ী বলিয়া ঘােষিত হইতেন। স্থল বিশেষে লােকে তাহার সম্মুখেই তাহাকে দরিদ্র সন্তান বলিয়া উপহাস করিতে বিমুখ হইত না। তাহার পূর্ব অবস্থার দুই একটি কাহিনীও বর্ণনা করিয়া তাহাকে সমাজে লজ্জিত, করিতে ছাড়িত না। সুতরাং যে আত্মাভিমান জন্য তাহার কিঞ্চিৎ সুখ བ། | হইত, সেই আত্মাভিমান জন্যই তাহার কষ্টের পরিসীমা থাকিত তিনি যে আত্মাভিমানজনিত আপাতসুখ ত্যাগ করিয়া লােকসমাজে সর্বদা বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করিতেন, তাহাতে যেমন তাহার সদ্গুণ তেমনই তাহার বুদ্ধিও প্রকাশ পাইয়া- ছিল। সেই সদ্গুণ ও বুদ্ধিবলে তিনি যেমন অর্থ, যশ, তেমনই প্রচুর আনন্দও উপভােগ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। সেই যে লােকটীর সঙ্গে তাঁহার পুত্রের বিবাদ হইয়াছিল, যদি তিনি সেই লোকটাকে কোন প্রকারে অপদস্থ করিতে চেষ্টা করি- তেন, তাহা হইলে সে লোকটী তঁাহার অনিষ্টের ও অখ্যাতি রটনার চেষ্টা করিত। তিনি সামান্য বিনয় প্রকাশ করায়, সে তাহার শত্রু না হইয়া বােধ হয় আজীবন তাহার গুণের একান্ত পক্ষপাতী হইয়া রহিল। রাণা রায়ম। মিবারের অধিপতি মহারাণা রায়মল্লের জয়মল্ল নামক এক পুত্র ছিল। জলমল্ল একদা শুনিতে পাইলেন, টোডা নামক জনপদের পূর্বাধিপতি সুরতন রাও এরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন যে, যিনি লিল্লা নামক পাঠানের হস্ত হইতে টোডা উদ্ধার করিতে সমর্থ হইবেন, তাঁহাকে তিনি তদীয় তারাই না কন্যা সমৰ্পণ করিবেন। এই সংবাদ শ্রবণ করিয়া জয়মল তারা বাইর পরিণয় প্রার্থী হইয়া টোডা আক্রমণ করিতে যাত্রী করি- লেন। এই উলক্ষে লিল্লার সহিত তাহার ভীষণ যুদ্ধ উপস্থিত হইল। যুদ্ধে জয়মল্ল অসীম বলবীৰ্য্য প্রদর্শন করিলেও জয়লাভ মহতী কাহিনী—রাণা রায়মল্ল । করিতে পারিলেন না। সুতরাং ন্যায়তঃ তারাবাইর পাণিগ্রহণে তাহার আর কোন দাবি রহিল না। কিন্তু জয়মল্ল মহারণার পুত্র-সুরতন সেই মহারাণারই অধীন ব্যক্তি, এই মনে করিয়া জয়মল্ল বলপূর্বক তারাবাইকে বিবাহ করিতে চেষ্টা করিলেন। এইরূপে সম্মান নষ্ট হইবার উপক্রম হওয়াতে, সুরতন অত্যন্ত ক্রোধবশে জয়মল্লকে অসির আঘাতে নিহত করিলেন এই গুরুতর সংবাদ অচিরে মিবারের মহারাণার নিকটে উপস্থিত হইল। সংবাদ শুনিয়া মিবারের সমস্ত লোেক বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইল। তাহারা মনে করিত লাগিল, মহারাণা রায়- মল্ল না জানি পুত্রশােকে অধীর হইয়া কি ভীষণ প্রতিহিংসারই বিধান করেন। মিবারের মহারাণ। কটাক্ষ করিলে, মুহূর্ত মধ্যে সেই সুরতনের দেহশূন্য মস্তক তৎসমীপে আনীত হইতে পারিত। কিন্তু মহানুভব মহারাজ রায়মল্ল এমনই ন্যায়পর নরপতি ছিলেন যে, তিনি এ সম্বন্ধে সুরতনকে কিছুমাত্র দোষী বিবেচনা করি- লেন না। তিনি দেখিলেন যে, জয়মল্ল সুরতনের যেরূপ অপ- মান করিতে উদ্যত হইয়াছিল, সেইরূপ অপমান রাজপুতের দুঃসহনীয়। এই মনে করিয়া তিনি পুত্রশােকও বিস্মৃত হইয়া ন্যায়পরতাবশে সুরতনের প্রতি কিছুমাত্র রােষ প্রকাশ করি- লেন না। প্রত্যুত তিনি বলিলেন—‘জয়মল্ল কুলাঙ্গার, তাহাকে বধ করিয়া সুরতন ক্ষত্রিয়োচিত কাৰ্যই সম্পন্ন করিয়াছেন। শুদ্ধ এই কথা বলিয়াই তিনি ক্ষান্ত হইলেন না। তিনি সুরতনকে এই ক্ষত্রিয়ােচিত কার্যের জন্য পুরস্কার স্বরূপ বেদনাের রাজ্য প্রদান করিলেন।

একবার ভাবিয়া দেখ, এই কাস্যে কত বড় মহানুভবতা ও ন্যায়পরতা প্রকাশিত হইল। পুত্র অন্য কর্তৃক স্যায়তঃ তিরস্কৃত হইলেও, সাধারণ লােকে সেই তিরস্কারকারীর বিপক্ষে দণ্ডায়- মান হইয়া থাকে। কিন্তু প্রবল প্রতাপান্নিত মহারাণা রায়মল্লা প্রতিবিধানের ক্ষমতা সত্ত্বেও, পুত্রহত্যাকারী সুরতন রাওকে কিছুমাত্র দণ্ড প্রদান করিলেন না। তিনি দুর্জয় পুত্রশােক প্রাপ্ত হইয়াও, ন্যায়পরতার বিধান কণামাত্র বিস্মৃত হইলেন না। তিনি বিচার করিয়া দেখিলেন—পুত্র অপরাধী—এমন অপরাধী যে সুরতন রাও তাহাকে বধ করিয়া কোন অন্যায্য কাৰ্য্য করেন নাই। এইরূপ বিচার করিয়া মহারাজ সুরতন রাওর প্রতি ক্রোধ সংবরণ করিলেন এবং সেই ক্রোধ সংবরণের চিহ্ন স্বরূপ তাহাকে প্রকাশ্যভাবে রাজদত্ত পুরস্কারে ভূষিত করিলেন। এইরূপ কাৰ্য্যে যে মহারাজ কি পরিমাণে বিমল আনন্দ উপভােগ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহা বর্ণনীয় নহে। পুত্র- শােকে অধীর হইয়া সুরতন রাওকে বধ করিলে, তাহার কিছু মাত্র ফল হইত না। জিঘাংসা চরিতার্থতা জন্য ক্ষণকালের তরে তঁাহার এক প্রকার সুখ জন্মিলেও, অল্প সময় পরেই তাঁহার নানাপ্রকার কষ্ট উপস্থিত হইত। তিনি অন্যায়রূপে যে সুরতন রাওকে বধ করিয়াছেন, এ কথা তাঁহার মনে অবশ্যই উদিত হইত এবং এই হার মানসিক অশান্তিরও অবধি থাকিত না। আবার এ দিকে সুরতন রাওর সন্তান ও তাঁহার আত্মীয় বন্ধু বান্ধব ও প্রজাগণও এই কার্যের জন্য নিতান্ত অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত থাকিত। তঁাহার নিজরাজ্যস্থ ন্যায়পর ব্যক্তিগণও এই মহতী কাহিনী--রণজৎ সিংহ ' জন্য অসন্তুষ্ট থাকিত সন্দেহ নাই। এ সকল অসন্তোষে তাহার অনিষ্ট ঘটিবারও সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মহারাণা এমনই ন্যায়- পরতা প্রদর্শন করিলেন যে, রাজ্যস্থ শত্ৰু পৰ্যন্ত তাহা দেখিয়া তদীয় গুণের একান্ত বশীভূত হইয়া পড়িল । জগতে তাহার অনন্তকালব্যাপী যশও বিদ্যমান বহিল। তিনি যাবজ্জীবন এই ন্যায়পবতার উৎকৃষ্ট ফল প্রত্যক্ষে ও পরােক্ষে ভােগ করিতে লাগিলেন, রণজিৎসিংহ। পঞ্জাব প্রদেশে শিখ নামক এক জাতি আছে। বীরত্বে এই জাতি ইতিহাসে সাতিশয় প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। এই জাতিমধ্যে অকালী নামে এক বীরসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। যখন মহারাজ রণজিৎ সিংহ পঞ্জাবের অধিপতি ছিলেন, তখন ফুলসিংহ নামক এক ব্যক্তি এই সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন। ফুলাসিংহ এই অকালী সম্প্রদায়ের নেতা হইয়া নানাস্থানে নানাপ্রকার অত্যাচার করিতে লাগিলেন। যখন ভারতবর্ষের গবর্ণর জেনেবল লর্ড মিন্টো রণজিৎ সিংহের সহিত সন্ধিস্থাপনের জন্য পঞ্জাবে দূত প্রেরণ করেন, তখন এই ফুলসিংহ অমিত- পরাক্রমে দস্যুর ন্যায় এই ইংরেজ দূতের শিবির আক্রমণ করেন। আত্মরক্ষণে তৎপর ইংরেজ বীর অনায়াসে ফুলাসিংহকে পরাজিত ও বিতাড়িত করিয়া দিলেন। কিন্তু ইহাতে ফুলাসিংহের সাতিশয় ক্রোধ জস্মিল। তিনি সেই দুর্জয় ক্রোধবশে নিষ্কাশিত তরবারি হস্তে মহারাজ রণজিৎ সিংহের নিকটে উপস্থিত হই হিতকথা। লেন। তাহার নির্ভয় ব্যবহার ও প্রচণ্ড মূর্তি দেখিয়া বীরকেশরী রণজিৎ সিংহ একান্ত বিস্মিত হইলেন। ফুলসিংহ রণজিৎ সিংহের নিকটে গমন করিয়া অসি আস্ফালন পূর্বক উত্তে- জিত স্বরে কহিলেন, “মহারাজ আপনি যে ইংরাজের সহিত সন্ধিবন্ধনে প্রস্তুত হইয়াছেন, সেই ইংরেজ আজ আমাদিগের দুর্দশার একশেষ কবিয়াছে। তাহারা আমার এই দুর্জয় অকালী সম্প্রদায়কে পরাজিত করিয়া তাড়াইয়া দিয়াছে এবং আমাদিগের যারপর নাই দুরবস্থা করিয়াছে। আপনি নরপতি-- আপনার নিকট এই আবেদন করিতেছি, আপনি সত্বর আম- দিগের এই অপমানের প্রতিশােধ গ্রহণ করুন। যদি তাহা না করেন, তবে আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি, এই অসির ভীষণ আঘাতে আপনার বংশধরগণের এখনই প্রাণবিনাশ করিব ।” এই কথা বলিয়া পরাজিত ফুলসিংহ ক্রোধবশে হস্তস্থিত তরবারি আস্ফালন করিতে লাগিলেন। ফুলাসিংহ রণজিৎ সিংহের অধীন একজন সামান্য ব্যক্তি—তিনি রণজিৎ সিংহের সম্মুখে যেরূপ অবিনয় ও অসম্মান প্রদর্শন করিলেন, তঁাহাকে তৎ- ক্ষণাৎ দ্বিখণ্ডিত করিলেও, মহারাজকে কেহ কোন কথা বলিতে পারিত না। কিন্তু পৃথিবীর ন্যায় ধীর রাজাধিরাজ রণজিৎসিংহ ফুলাসিংহের এইরূপ ব্যবহার দেখিয়া, কিছুমাত্র ক্রোধ প্রকাশ করিলেন না। তিনি অবিচলিতচিত্তে, গম্ভীরভাবে ফুসিংহকে বলিলেন-“যুবক তােমার সাহসের আমি প্রশংসা করি, কিন্তু একথা নিশ্চয় জানিও, রণজিৎ সিংহ জীবিত থাকিতে ইংরাজ দূতের কেশাগ্রও কেহ স্পর্শ করিতে পারিবে না। আমি ইংরা-

মহতী কাহিনী-রণজিৎ সিংহ।
জের সহিত বন্ধুত্বপাশে আবদ্ধ ; আমাকর্তৃক ইংরাজদূতের
অনিষ্টসাধন ন্যায় ও ধৰ্ম্মবিরুদ্ধ। আমি কদাপি তাহা পারিব
। আমি আমার মস্তক তােমার সম্মুখে স্থাপন করিতেছি,
তুমি বরং এই মস্তকোপরি তরবারির আঘাত করিয়া তােমার
ক্রোধাগ্নির নির্বাণ কর।” ফুলাসিংহ মহারাজ রণজিৎসিংহের
এইরূপ দৃঢ়তা, গম্ভীরতা, ন্যায়পরতা ও অকুতােভয়তা নিরীক্ষণ
করিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্বক হস্তস্থিত তরবারি দূরে
নিক্ষেপ করিয়া রাজার পদপ্রান্তে পতিত হইলেন। মহারাজ
স্বহস্তে ফুলাসিংহকে উত্তোলন করিয়া তাহাংক এবং তাহার
অনুচরবর্গকে বিশেষ পারিতােষিক প্রদান করিয়া বিদায়
করিলেন।
এখন তােমরা ভাবিয়া দেখ, মহারাজ রণজিৎ সিংহ কি
প্রকার ন্যায়পর ও সংযমী ছিলেন। তাঁহার ক্রোধ হইলে,
ফুলাসিংহের এক খণ্ড অস্থিও অভগ্ন থাকিত না—ফুসিংহের
অনুচরবর্গের এক জনও জীবিত থাকিত না। কিন্তু মহারাজ
সংযমবলে ক্রোধবৃত্তিকে তাঁহার হৃদয় বিক্ষোভিত করিতে
দিলেন না। তিনি ফুলাসিংহের ঐরূপ দুর্বিনীত ব্যবহার-মধ্যেও
তাহার সাহস প্রত্যক্ষ করিয়া প্রীতিলাভ করিলেন, এবং
তাঁহাকে পারিতােষিক প্রদান করিয়া বিদায় করিলেন। মহা-
রাজের এই কাৰ্যে যে কি ফল হইল, তাহাই তােমাদিগকে
এখন বলিতেছি। মহারাজের ব্যবহার দেখিয়া ফুলসিংহ আজী-
বন তাহার পরম অনুগত এবং তাহার উপকারসাধনে প্রতিজ্ঞা
বন্ধ হইয়া রহিলেন। তাহার পূর্বে যে ঔদ্ধত্য প্রভৃতি নানা-

৩৪ হিতক থা । প্রকার চরিত্রের দোষ ছিল, মহারাজের ব্যবহার দেখিয়া ক্রমশঃ তাহ। কমিয়া যাইতে লাগিল। কালে তিনি মহারাজের একজন অতি বিস্ত প্রধান সেনাপতি হইয়া দাঁড়াইলেন। এই সেনা- পতির সাহায্যে রণজিৎ সিংহ কয়েকটী ভয়ঙ্কর যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছিলেন। দেখ, মহারাজের এক দিনের ব্যবহারে কি সুফল ফলিয়া- ছিল। তাহার ব্যবহার দেখিয়া ফুলাসিংহের ন্যায় দুর্বিনীত লােকও বিনয়ী ও অনুগত হইয়া চিরদিন তাহার হিতসাধনে তৎপর রহিল। মহারাজ প্রায় সেই ব্যবহারফলেই পেশার নামক স্থান অধিকার করিতে পারিয়াছিলেন; কারণ ফুলাসিংহ তাহার জন্য আত্মবিসর্জন না করিলে, সে যুদ্ধে তাহার জয়ের সম্ভাবনা ছিল না। শিবাজী। তােমর ইতিহাসে মহারাষ্ট্রাধিপতি শিবাজীর কাহিনী পাঠ করিয়া থাকিবে—যদি না পড়িয়া থাক, ভারতের ইতিহাস পাঠ- সময়ে তাহা পড়িবে। এই শিবাজী একজন অসাধারণ মানব ছিলেন ; ইহার মত বলিষ্ঠ, কর্মিষ্ঠ, দেশভক্ত, পিতৃভক্ত ও মাতৃভক্ত লােক সচরাচর দেখা যায় না। এই শিবাজীর জীবন- বৃত্তান্ত হইতে তাহার একটি রমণীয় গুণকাহিনী আজি তােমা- দের নিকটে বর্ণনা করিব। রামদাস স্বামী মহারাষ্ট্রাধিপতি শিবাজীর গুরু ছিলেন। শ্ৰীযুক্ত বাবু সত্যপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়, এই রামদাস স্বামীর মহতী কাহিনী--শিবাজী প্রতি মহারাষ্ট্রাধিপতির ভক্তির একটী অপূর্ব কাহিনী প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, এক সময়ে রামদাস স্বামী আপন মনে ভ্রমণ করিতে করিতে সাতারা নামক নগরে উপনীত হন। মহারাষ্ট্রাধিপতি শিবাজীও সেই সময়ে উক্ত নগরে উপ- স্থিত ছিলেন। রামদাস স্বামী রাজার গুরু হইলেও ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা জীরিকা নির্বাহ করিতে লজ্জা বােধ করিতেন না। ভিক্ষার জন্য রামদাস স্বামী এক গৃহস্থের দ্বারদেশে দণ্ডায়মান হইয়া, “জয় রঘুপতি” বলিয়া ভিক্ষা প্রার্থনা করেন। মহারাষ্ট্রা- ধিপতি শিবাজী নিকটবর্তী এক গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন। সেই সুর শুনিয়া শিবাজী রামদাস স্বামীকে চিনিতে পারিলেন। মহারাষ্ট্রাধিপতি তৎক্ষণাৎ নিকটস্থ কর্মচারীকে কি লিখিতে আদেশ দিয়া, দ্রুতপদে গুরু রামদাস স্বামীর পদ প্রান্তে পতিত হইলেন এবং তাহাকে সযত্নে নিজ গৃহে আনয়ন করতঃ পূর্বে কর্মচারীকে যে লিপি লিখিতে আদেশ করিয়াছিলেন, সেই লিপি স্বামীজীর ভিক্ষাপাত্ৰ অৰ্পণ করিলেন। স্বামীজী শিবা- জীকে চিনিতেন; তিনি তাঁহাকে বলিলেন “শিব্বা, তুমি এ কি কাগজ ভিক্ষাপাত্রে নিক্ষেপ করিলে ? কাগজ দ্বারা আমরা উদর পূর্ণ করি না, মুষ্টিমিত অন্ন হইলে আমাদিগের শরীরচিন্তা দূর হয়।” ইহা বলিয়া স্বামীজী পাশ্ববর্তী একটা লােককে ঐ লিপি পাঠ করিতে বলিলেন। যখন সেই লিপিপাঠ হইল, তখন সকলেই বিস্মিত হইয়া শ্রবণ করিল, শিবাজী ঐ লিপি দ্বারা তাহার যথাসর্বস্ব গুরুচরণে অৰ্পণ করিয়াছেন। পুরাণে যেমন হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যানে মহারাজ হরিশ্চন্দ্র বিশ্বামিত্রকে যথা- হিতকথা। সর্বস্ব দান করিয়াছিলেন, শিবাজীও তেমনই গুরুচরণে যথা- সর্বস্ব দান করিলেন। তখন রামদাস স্বামী হাসিয়া কহিলেন, “আচ্ছা শিববা, তুমি যথাসর্বস্ব আমাকে দিয়াছ, এখন তুমি কি করিবে ?” শিবাজী তৎক্ষণাৎ উত্তর করিলেন, “ভগব । আপনার শত শত শিষ্য আছে, আমি তাহাদিগের অধীন হইয়া আপনার চরণ সেবা করিব।” স্বামী কহিলেন, “ইহাতে কৌপীন ধারণ করিয়া দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিতে হয়। এ সকল কঠোর ব্ৰত তুমি কি পালন করিতে পারিবে ?” শিবাজী প্রত্যুত্তরে কহিলেন “দাস শ্রীচরণাশীর্বাদে সকল বিষয়েই প্রস্তুত আছে। স্বামীজী শিষের ভক্তি দেখিয়া পরম পুলকিত হইলেন এবং তিনি শিবাজীকে নানাপ্রকার ধৰ্ম্মনীতি সহকারে বুঝাইয়া বলিলেন, শিবাজীর রাজকাৰ্য্যই পরম ধর্ম। উপদেশ শ্রবণ করিয়া শিবাজী কহিলেন-“গুরুদেব, যাহা একবার আপনার চরণে সমর্পণ করিয়াছি, তাহা কিরূপে পুন- ববার গ্রহণ করিব ? আমরা ক্ষত্রিয়, প্রতিগ্ৰহ আমাদিগের ধৰ্ম্ম নহে।” তখন স্বামীজী শিবাজীকে তাহার প্রতিনিধিস্বরূপ রাজকাৰ্য্য করিতে অনুমতি করিলেন; শিবাজী অগত্যা তাহাতে সম্মত হইয়া রাজকাৰ্য্য করিতে স্বীকার করেন। সময় হইতেই রামদাস স্বামীর গৈরিক বসন মহারাষ্ট্রীয়দিগের জাতীয় পতাকার স্থান অধিকার করিয়াছিল। এই কাহিনী এমনই অদ্ভুত যে, ইহা কাল্পনিক বলিয়াই বিমাকরিতে প্রবৃত্তি হয়। কিন্তু ইহা ঐতিহাসিক সত্য কথা। রামদাস স্বামী শিবাজীর দীক্ষাগুরু ছিলেন এবং তিনি সর্বদা •• মহতী কাহিনী-ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাহাকে জীবনের কর্তব্যপথ বুঝাইয়া দিতেন। হিন্দুজাতি ভিন্ন অন্য কোন জাতি দীক্ষাগুরুকে ভক্তি করা বিশেষ গুণ বলিয়া স্বীকার না করিতে পারেন, কিন্তু সকলেই একবাক্যে এই প্রকার আত্মবিসর্জনের সুখ্যাতি করিবেন সন্দেহ নাই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। অদ্য তােমাদিগের সমাপে আমাদের বঙ্গদেশস্থ এক মহাসু ভৰ ব্যক্তির মহতী কাহিনী বর্ণনা করিব। তিনি রাজা ছিলেন সত্য, কিন্তু লক্ষ লক্ষ লােকের হৃদয়ে তাহার সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাহার নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । বিদ্যাসাগরের নাম তােমরা অবশ্যই শুনিয়াছ। অদ্য আমি তঁাহারই কয়েকটি গুণের কথা তােমাদিগকে শুনাইতে ইচ্ছ। করিয়াছি। কলিকাতার সন্নিকটস্থ কোন পল্লিতে এক সম্ভ্রান্ত ভদ্র- লােকের গৃহে, তাহার ভাগিনেয়ের ওলাউঠা রােগ হয়। ওলা- উঠা রােগের কথা জানিতে পারিয়া গৃহস্বামী মৃত্যুভয়ে আপনার কৰ্তব্যবুদ্ধি বিস্মৃত হইয়া ভাগিনেয়কে বাটীর বাহিরে সামান্য এক স্থানে শােয়াইয়া রাখিলেন। দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর মহাশয় লোকমুখে এই সংবাদ পাইয়া তৎক্ষণাৎ সুপ্রসিদ্ধ যুক্ত বাবু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতা সুপ্রসিদ্ধ বাবু দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে লইয়া সেই ভদ্রলােকের গৃহে উপনীত হইলেন। তাঁহারা সেখানে গিয়া দেখিলেন, রােগীকে বাটীর বাহিরে এক কদৰ্য লে মাদুরের উপরে শােয়াইয়া রাখা হইয়াছে। দেখিয়া দয়ার সাগরের হৃদয়ে দয়া উদ্বেলিত হইয়া উঠিল। তিনি অনতিবিলম্বে স্বীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা দীনবন্ধু ন্যায়রত্নকে বাজারে পাঠাইয়া দিলেন। দীনবন্ধু রাত্রিতেই বহুবাজার হইতে বালিস তােষক প্রভৃতি স্বীয় মস্তকে বহন করিয়া দেড় ক্রোশ পথ দূর সেই বাটীতে উপস্থিত হইলেন। দয়ার সাগর নিজে রােগীর শুশ্রুষা কার্যে নিযুক্ত হইলেন, নিজ হস্তে রােগীর মলমূত্রাদি পরিস্কার করিয়া দিলেন। যে পর্যন্ত রােগী আরােগ্যলাভ না করিল সে পর্যন্ত বিদ্যাসাগর সেই বাটা হইতে অত্র গমন করিলেন না। এই সময়ে বড়বাজার কোন এক মােক্তারেব বাটাতে তাহার ভৃত্যের ওলাউঠা হয়। মােক্তার বাবু সংবাদ জানিবামাত্র চাকরের হাত ধরিয়া উপর হইতে নামাইয়া রাস্তায় শােয়াইয়া রাখিলেন। ঘটনাক্রমে বিদ্যাসাগর ঐ রােগীকে দেখিতে পান। দেখিবামাত্র দয়ার সাগর তাহাকে নিজের বাটীতে লইয়া আসি- লেন এবং নিজের বাটীতে আনিয়া নিজের শয্যায় তাহাকে শােয়াইয়া চিকিৎসা করাইতে লাগিলেন। সুপ্রসিদ্ধ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম তােমরা শুনিয়া থাকিবে। এক সময়ে এই কবি বিলাত হইতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকটে টাকার জন্য বিনীতভাবে এক পত্র লিখেন । বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তখন হাতে টাকা ছিল না, কিন্তু তিনি ঋণ করিয়াও চারি সংস্র টাকা মধুসূদন দত্তকে পাঠাইয়া দিলেন। এই সকল দয়ার কাহিনী হইতে তােমরা দেখিতে পাইতেছ, বিদ্যাসাগর মহাশয় এমন দয়াশীল ছিলেন যে, দয়াবৃত্তি প্রণাে মহতী কাহিনী-ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। দিত হইলে, তিনি কি ধন, কি প্রাণ কিছুরই দিকে দৃষ্টিপাত করিতেন না। দয়াবলে তিনি মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করিতে পারিতেন—দয়াবশে তিনি সংসারের সর্বপ্রধান কষ্ট দারিদ্র- ভয়, ঋণভয়ও অবহেলা করিতে পারিতেন। যিনি প্রকৃত দয়াশীল, তঁাহার দয়া,বিচাব করিয়া কাৰ্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয় না। বিদ্যাসাগর মহাশয় কেবলমাত্র যে মনুষের প্রতিই দয়া- শীল ছিলেন, এমন নহে। তাহার দয়া পশ্বাদির প্রতিও সঞ্চা- রিত হইত। ইহার একটা সুন্দর গল্প তাহার জীবনচরিতে পাঠ করিয়াছি। তিনি এক দিন দেখিতে পাইলেন, এক স্থানে গাে- দোহন কাৰ্য্য সম্পন্ন হইতেছে। একজন লোেক গােবৎস ধরিয়া আছে অন্য একটি লােকে দুগ্ধ দোহন করিতেছে। গােবস দূরে থাকিয়া তাহার মাতৃস্তন্য নিঃসৃত হইতেছে দেখিয়া, পান করিবার জন্য সতৃষ্ণ দৃষ্টিপাত করিতেছে ও উচ্চৈঃস্বরে হারব করিয়া, সেই দিকে ছুটিবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে। দেখিয়া বিদ্যাসাগরের দয়ার সাগর উদ্বেলিত হইয়া উঠিল—দর দর ধারে নয়ন হইতে অশ্রু বিগলিত হইতে লাগিল । বিদ্যাসাগর মহাশয় এই ঘটনার পরে কিছুকাল গােদুগ্ধ এবং তদ্বারা প্রস্তুত দ্রব্যাদির ভোজন পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। তিনি এই দয়া- পরত-হইয়া একবার মৎস্যাহারও পরিত্যাগ করিয়াছিলেন । বিদ্যাসাগর স্বদেশস্থ পাঠশালায় পাঠ শেষ করিয়া অষ্টম বর্ষ বয়সে কলিকাতা মহানগরীতে বিদ্যাভ্যাস জন্য উপস্থিত হন। বিদ্যাসাগরের পিতা সাতিশয় দরিদ্র ছিলেন। তিনি বড়বাজারে জগদ্দল সিংহ নামক কোন এক ব্যক্তির বাসায়

৭০
হিতকথা।
འ |
বিদ্যাসাগরের সহিত অবস্থান করিতে লাগিলেন। ঐ বাসার
নিকটে এক পাঠশালা ছিল—বিদ্যাসাগর প্রথমে তাহাতেই
বিদ্যাভ্যাস করিতে প্রবৃত্ত হন।
কিন্তু কিছুদিন পরেই অষ্টম
বর্ষীয় বালক বিদ্যাসাগর তাঁহার পিতার নিকটে আসিয়া নিবে-
দন করিলেন—“মহাশয়, আমি দেশস্থ পাঠশালায় যাহা শিখিয়া
আসিয়াছি, এখানে তার অপেক্ষা কিছুই অধিক শিক্ষা হয়
প্রত্যহ অনর্থক তথায় যাইয়া সময় অতিবাহিত করিতে
হয়। অতএব যাহার নিকট নূতন বিষয় শিখিতে পারি, আমাকে
সেইরূপ গুরুমহাশয়ের নিকটে নিযুক্ত করুন, নচেৎ বিদেশে
থাকিবার আবশ্যকতা কি ?” কিছু কাল পরে, বিদ্যাসাগর
মহাশয় কলিকাতা সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাভ্যাসে প্রবৃত্ত হন।
বিদ্যাসাগরের জীবনচরিতে লিখিত আছে, এই সময়ে যখন
বিদ্যাসাগর স্বীয় মস্তকোপরি ছত্র ধারণ কবিয়া বড়বাজার হইতে
পটলডাঙ্গা সংস্কৃত কলেজে পড়িতে আসিতেন, তখন বােধ হইত
যেন একটী ছত্র সজীব হইয়া পথ দিয়া চলিয়া যাইতেছে। বিদ্যা-
সাগর সংস্কৃত কলেজে দিনের বেলা যাহা পড়িয়া আসিতেন,
রাত্রিতে তাহা তাঁহার পিতার নিকটে বলিতে হইত। বিদ্যাসাগর
এমনই ভাবে তাঁহার পিতার নিকটে পাঠ বলিতেন যে, বিদ্যা-
সাগরের পিতা সে সকল বিষয়ে অনভিজ্ঞ হইয়াও, অনায়াসে
তাহা বুঝিতে পারিতেন । কথিত আছে, এইরূপে বিদ্যাসাগর
মহাশয়ের পিতা এমন ব্যাকরণ শিখিয়াছিলেন যে বিদ্যাসাগর
মনে কঘিতেন, তাঁহার পিতার ব্যাকরণে ভাল অধিকার আছে।
সংস্কৃত ব্যাকরণ তিনি ইতিপূর্বে কিছুমাত্র অবগত ছিলেন

মহতী কাহিনী-ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।
। বিদ্যাসাগর বাসায় অনেক সময়েই একাকী থাকিয়া
পাঠাভ্যাস করিতেন—কারণ তাহার পিতা কৰ্ম্মস্থান হইতে
রাত্রি নয়টার পর বাসায় আসিতেন। তিনি বাসায় আসিয়া যদি
দেখিতেন যে, বিদ্যাসাগর ঘুমাইয়া রহিয়াছেন, অমনি তিনি
তাহাকে গুরুতর প্রহার করতেন। একারণ বিদ্যাসাগর রাত্রিতে
প্রদীপের সর্ষপ তৈল চক্ষে লাগাইয়া জাগরিত থাকতেন।
তৈল চক্ষে লাগিলে, চক্ষু জ্বালা করিত, সুতরাং বিদ্যাসাগরের
সহজে নিদ্রাকর্ষণ হইত না। এই শেষ রাত্রিতেও তিনি পিতার
নিকটে নানাপ্রকার কবিতা অভ্যাস করিতেন।
বিদ্যাসাগর যখন যে শ্রেণীতে পড়িতেন, তখন সেই
শ্রেণীতে সর্বোৎকৃষ্ট হইতে তাহার বিলক্ষণ জেদ ছিল ।
এজন্য প্রায় সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিয়া পাঠাভ্যাস করিতে
তিনি ত্রুটি করেন নাই। তিনি প্রায়ই তাঁহার পিতাকে বলি-
তেন আমি রাত্রি দশটার সময়ে আহার করিয়া শয়ন করিব,
রাত্রি বারটা বাজিলে আপনি আমাকে জাগরিত করিবেন।
এইরূপে দুই ঘণ্টা মাত্ৰ নিদ্রিত থাকিয়া বিদ্যাসাগর অবশিষ্ট
সমস্ত রাত্রি বিদ্যাভ্যাস করিতেন। এইরূপ অধ্যবসায় ও পরি-
এমবলে বিদ্যাসাগর বিশেষ প্রশংসার সহিত সকল পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হইতে লাগিলেন।
এই পাঠাভ্যাস কালেই কয়েকদিন বিদ্যাসাগরকে স্বহস্তে
পাকাদি করিতে হইত। তিনি এই সময়ে প্রত্যুষে কিছুকাল
পুস্তকাদি পাঠ করিয়া গঙ্গার ঘাটে স্নান করিতে যাইতেন।
স্নান করিয়া বাসাতে প্রত্যাগমনের সময় বাজার হইতে মৎস্যদি

৭২ হিতকথা। রন্ধনদ্ৰব্য সমস্ত ক্রয় করিয়া লইয়া আসিতেন। বাসায় পৌছিয়া, প্রথমতঃ ভােজনদ্ৰব্য সকল রন্ধনােপযােগী করিয়া সংগ্রহ করি- হরিদ্রা মরিচ প্রভৃতি ঝাল মসলা বাটিয়া পরে উনন ধরাইয়া পাকক্রিয়া সম্পন্ন করিতেন। আহারান্তে তাহাকেই উচ্ছিষ্ট মুক্ত ও ভােজন-পাত্র মার্জনা ও ধৌতাদি করিতে হইত। এইরূপ কাৰ্যে ভঁহার অঙ্গুলির ও নখের অগ্রভাগ প্রায় ক্ষয় পাইয়া যাইত। এইরূপ করিয়াও তিনি বিদ্যাভ্যাসে কিছুমাত্র ঔদাস্ত প্রকাশ করেন নাই। বিদ্যাশিক্ষা সম্বন্ধে এইরূপ চেষ্টা ও একাগ্ৰতানিবন্ধন বিদ্যাসাগর অতি অল্প বয়সেই সংস্কৃত শাস্ত্রে একজন অদ্বিতীয় পণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছিলেন। সংস্কৃত কলেজে পাঠ সমাপন করিয়া বিদ্যাসাগর যখন ফোর্ট- উইলিয়ম কলেজে মাসিক পঞ্চাশ টাকা বেতনে পণ্ডিত নিযুক্ত হন, তখন তাহার ইংরাজী ও হিন্দুস্থানী ভাষা শিখিবার আবশ্য- করা হয়। এই জন্য তিনি মাসিক দশ টাকা বেতন দিয়া এক জন হিন্দুস্থানী পণ্ডিত নিযুক্ত করিলেন এবং তাহার নিকটে প্রাতে ৯টা পর্যন্ত হিন্দীভাষা শিখিতে লাগিলেন। ইংরাজী ভাষা শিখিবার জন্য বিদ্যাসাগর তঁাহার পরম বন্ধু বাবু দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহায্য গ্রহণ করিলেন। দুর্গাচরণ বাবু প্রথমে নিজেই বিদ্যাসাগরকে ইংরাজী শিক্ষা দিতে লাগিলেন কিছুদিন পরে দুর্গাচরণ বাবুর একজন ছাত্র নীলমাধব মুখে- পাধ্যায় বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ইংরাজী শিখাইবার ভার গ্রহণ করিলেন। ইহার পরে বিদ্যাসাগর মাসিক নয় টাকা বেতন দিয়া মাষ্টার রাখিয়া, ইংরাজী ভাষা অভ্যাস করিতে লাগিলেন।

মহতী কাহিনী—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
৭৩
এইরূপ বাল্যকাল বিগত হইলেও, বিদ্যাসাগর অসাধারণ চেষ্টা
ও উদ্যম সহকারে অল্পকালের মধ্যেই ইংরাজী ভাষাতেও
ব্যুৎপন্ন হইলেন। তিনি এইরূপে এমন ইংরাজী লিখিতে
শিখিয়াছিলেন যে, তৎকালে ইরাজীভাষায় কৃতবিদ্য ব্যক্তিগণও
তাহার ইংরাজী লেখা দেখিয়া বিশেষ প্রশংসা করিতেন।
তােমরা কেহ কেহ মনে করিতে পার, দরিদ্র হইলে বুঝি
ব্যয়সাধ্য ইংরাজী ভাষা শিখিয়া বড়লােক হইবার উপায় নাই।
কিন্তু দেখ, এই বিদ্যাসাগর দরিদ্র সন্তান হইয়াও কেমন চেষ্টা
ও অধ্যবসায় বলে লেখাপড়া শিখিয়া বঙ্গদেশে একজন অদ্বি-
তীয় লােক হইয়াছিলেন। তিনি যেরূপ কষ্ট স্বীকার করিয়া
লেখাপড়া অভ্যাস করিয়াছিলেন, ঐরূপ উদ্যম ও একাগ্রতা,
থাকিলে, সকল অবস্থার লোকই বােধ হয় সংসারে প্রভূত
অর্থ ও যশ সঞ্চয় করিতে পারে।
ইহাও অনেকে মনে করিয়া থাকে যে স্কুল-কলেজের পাঠ
সমাপ্ত হইলেই লেখা পড়া শেষ হইল-বাল্যকাল অতীত
হইলে, আর বিদ্যাভ্যাসের সময় থাকে না। কিন্তু দেখ, এই
বিদ্যাসাগর যৌবনকালেও, চাকরী করিতে করিতেও, কেমন
উত্তম বিদ্যাভ্যাস করিয়াছিলেন। এই উদ্যম, এই অধ্যবসায়,
এই কষ্টস্বীকার, এই একাগ্রতা তােমাদিগের জীবনে প্রদর্শিত
হইলে, তােমারাও সুবিখ্যাত হইয়া জন্মভূমির মহােপকার সাধন
করতে পার এবং আপনার ও পরিবারবর্গের অশেষ মুখ ও
মঙ্গলের হেতু হইতে পার।
বিদ্যাসাগরের অশেষ গুণ ছিল। তাহার ব্যয় কৃতজ্ঞ পুরুষ

হিতকথা। অতি অল্পই দৃষ্ট হইয়া থাকে। তিনি বাল্যকালে যাঁহার নিকটে সামান্য উপকারও পাইয়াছেন, সুযােগ হইলে, তিনি তাহার মহােপকার সাধন করিয়াছেন। পাঠশালার পণ্ডিত হইতে উচ্চ- পদস্থ অনেক লােক তঁাহার এই কৃতজ্ঞতার ফলস্বরূপ মা সক মাসাহারা প্রাপ্ত হইতেন। ফলতঃ একদিনও যে ব্যক্তি বিদ্যা সাগবের উপকার করিয়াছে, যাবজ্জীবন বিদ্যাসাগব তাহার কিংবা তাহার পুত্রপৌত্রাদির সন্ধান করিয়া যথাসাথ্য প্রত্যুপ- কার করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। এই সকল মহৎ গুণের কাহিনী শুনিলেও হৃদয়ে মহত্ত্বের সঞ্চার হয়। এই সকল মহৎগুণের জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয় যেমন হৃদয়ে প্রচুর আনন্দ, তেমনই, লােক-সমাজে প্রচুর সম্মান ও যশ লাভ করিয়া গিয়াছেন। তাহার নিঃস্বার্থপরতা, তাহার লােভশূন্যতা, তাহার দয়া, তঁাহার ন্যায়পরতা দেখিয়া প্রধান প্রধান রাজপুরুষগণও তাহাকে বিশেষ সম্মান করিতেন। কিরূপ সম্মান, নিম্নলিখিত বৃত্তান্ত পড়িলে বুঝিতে পারিবে। হেলিডে সাহেব যখন বঙ্গের শাসনকর্তা ছিলেন, তখন তিনি সপ্তাহের মধ্যে প্রতি বৃহস্পতিবার বিদ্যাসাগরকে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য অনুরোধ করেন। এজন্য বিদ্যাসাগর প্রতি বৃহস্পতিবার ঘােটলাটের বাটীতে গমন করিতেন। এক- দিন তিনি ছােটলাটভবনে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে, ছােট- লাটের সহিত দেখা করিবার জন্য বহুসংখ্যক সম্রান্ত, পদস্থ, মান্যগণ্য, ব্যক্তি উপস্থিত হইয়াছেন। বিদ্যাসাগর তথায় গমন করিয়া চাপরাসীরা আপনার নামের টিকিট পাঠাইয়া দিলেন।

মহতী কাহিনী-ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।
৭৫
ছােটলাটের নিকটে টিকিট পাঠাইলে, চাপরাসী আসিয়া বলিল
বিদ্যাসাগরকে ছােটলাটসাহেব যাইতে বলিয়াছেন। তাহা
শুনিয়া উপস্থিত মান্যগণ্য ব্যক্তিবর্গ নিতান্ত লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ
হইলেন এবং আপনাদিগকে নিতান্ত অপমানিত ও মনে করি
লেন। কারণ অনেক সময় বসিয়া থাকিয়াও, তাহারা ছোট
লাটের সাক্ষাৎলাভ করিতে পারেন নাই। তাহারা ইহাতে
এমনই মর্মান্তিক কস্ট অনুভব করিলেন যে, এইরূপ ব্যবহারের
কারণ অবগত হইবার জন্য তাহারা ছােটলাট সমীপে এই কথা
উপস্থিত করিতে কুণ্ঠিত হইলেন না। তাঁহাদিগের কথা শুনিয়া,
ছােটলাট মহানুভব হেলিডে তাহাদিগকে বলিলেন--“আমি
বিদ্যাসাগরের নিকট অনেক উপদেশ ই এবং অনেক কাৰ্য্য
তদ্বারা অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে । কারণ, বিদ্যাসাগর নিঃস্বার্থ ও
দেশহিতৈষী, সকল বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান্। অন্য যাহারা
আমার নিকট আগমন কয়েন, তঁাহারা প্রায়ই আপনাদিগের
স্বার্থসাধনােদ্দেশেই আসিয়া থাকেন। এরূপ হলে বিদ্যা-
সাগরকে ইহাদের সকলের অপেক্ষাই আমি সম্মানাই মনে
করি।” এই উচিত কথা শুনিয়া সকলেই আপন আপন দোষ
গুণ বুঝিতে পরিয়া নিরস্ত হইলেন।
এখন দেখ, নিঃস্বার্থপরতায় কিরূপ সাংসারিক খ্যাতি ও
প্রতিপত্তি আনয়ন করিতে পারে।

হিতকথা। চন্দ্রশেখর রায়। করিতেন। বাকরগঞ্জ (বরিশাল) জেলার সাহাজাদপুর নামে গরগণায় চন্দ্রশেখর রায় নামে একজন পরাক্রান্ত ভূম্যধিকারী বাস এখন ইংরাজ-শাসনে দস্য-তস্করের ভয় কমিয়া আসিয়াছে, তখন দস্যগণ দূব স্থান হইতেও অস্ত্রাদি লইয়া জলপথে ও স্থলপথে আসিয়া গ্রামবাসীর অর্থ লুণ্ঠনপূর্বক পলায়ন করিত। একদা এইরূপ একদল ‘দস্য গুপ্তবেশে চন্দ্রশেখর রায়ের বাড়ীতে আতিথ্য গ্রহণ করিল। তাহাদিগের উদ্দেশ্য, দিনের বেলা সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া রাত্রিকালে বাটী লুণ্ঠন করিবে। চন্দ্রশেখর রায় নিজে যেমন বলবান ছিলেন, তাহার অধীনে কয়েক জন পাইকও সেইরূপ বলবান ছিল। তখনকার জমিদারগণ বলবান ও লাঠিয়াল দেখিয়াই পাইক নিযুক্ত করিতেন। দস্যগণ পূৰ্বে চন্দ্রশেখর রায়ের নাম না শুনিয়াছিল এমন নহে—তাঁহাকে পরাক্রান্ত বলিয়াও তাহারা জানিত। তবু তাহার বাটী লুণ্ঠন করিতে তাহাদের বিশেষ আগ্রহ জন্মিয়াছিল। চন্দ্রশেখর রায় অতিথিপরায়ণ ছিলেন। তাঁহার বাড়ীতে অতিথির বিশেষ সমাদর ছিল। দস্যগণও বিশেষ সমাদর প্রাপ্ত হইয়া আহারাদি সমাপন করিল। এই আহারকালে চন্দ্রশেখর রায়ের একজন প্রাচীন ভৃত্য দেখিল যে, অতিথিগণ আহাৰ্য্য- দ্রব্য মধ্যে কিছুমাত্র লবণ গ্রহণ না করিয়া, সেগুলি স্থানান্তরিত করিল। সেকালের লােকে জানিত, দস্যগণ যে বাড়ীতে দতা করিবে, সে বাড়ীর নেমক তাহারা গ্রহণ করিবে না।

মহতী কাহিনী—চন্দ্রশেখর রায়। । ইহা দেখিয়া তাহার মনে বিলক্ষণ সন্দেহ উপস্থিত হইল। প্রাচীন, ভৃত্য তৎক্ষণাৎ এই কথা চন্দ্রশেখর রায়ের নিকটে নিবেদন করিল। শুনিয়া চন্দ্রশেখর রায় কিছুমাত্র ভীত বা চিন্তিত হইলেন না। তিনি অত্যন্ত উৎসাহের সহিত আত্ম- রক্ষাৰ্থ সচেষ্ট হইলেন। তাহার বাটীব চারিপাশেই তাহার জমিদারী ছিল। তিনি সংবাদ দিয়া দেশস্থ বলবান প্রজা- গণকে একত্র করিলেন। তখন বলবীৰ্য একটা বিশেষ গৌরবের বিষয় ছিল । চন্দ্র শেখর গ্রামস্থ সকল লােককে তাঁহার বাটীতে নিমন্ত্রণ করিলেন। বহির্বাটীতে এক বিস্তীর্ণ আস্তরণ বিস্তৃত হইল। গ্রামস্থ লােক তাহাতে উপবেশন করিলেন। সেই অতিথিবেশী দস্য- গণও আমন্ত্রিত হইয়া তথায় উপবেশন করিল। চন্দ্রশেখর রায় তখন সর্বসমক্ষে আপনার বলবীর্য্যের পরিচয় দিতে প্রবৃত্ত হইলেন। প্রথমে তিনি তাহার পাইক সর্দারগণের সহিত লাঠি খেলিতে লাগিলেন। লাঠি খেলা শেষ করিয়া চন্দ্রশেখব তাহা- দিগের সহিত মল্লযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি জমিদার, তাহারা নীচ লােক, এ ধারণা মন হইতে তখন দূর করিয়া, তিনি নিঃসঙ্কোচে তাহাদিগকে একে একে পরাস্ত করিলেন। পরে জয়ােল্লাসে উন্মত্ত হইয়া চন্দ্রশেখর সভাস্থ বলবান ব্যক্তিগণকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করিতে লাগিলেন। সেই দস্যুদলের মধ্যে যাহারা বিশেষ বলবান ছিল, তাহারা সেই আহ্বান শুনিয়া নিরস্ত থাকিতে পারিল না—তাহারা চন্দ্রশেখরের সঙ্গে একে

৭৮
হিতকথা।
একে মল্লযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল—চন্দ্রশেখর একে একে তাহাদিগকে
পরাস্ত করিয়া বিদায় করিলেন। তখন রােষে তাহার নয়নয়
ঘােরর রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল—তিনি পুনঃ পুনঃ সভাস্থিত
লােকদিগকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহার
শৌর্য্য ও বীৰ্য দেখিয়া কেহই আর অগ্রসর হইতে সাহস
করিল না।
তখন তিনি হাসিয়া ক্রীড়া প্রাঙ্গন হইতে অপসৃত
হইলেন।
লােক জন সকল আপন আপন আলয়ে প্রস্থান
করিল।
তাহার এইরূপ বীর্যবত্তা দেখিয়া দ্যগণ বিস্মিত, ভীত
ও পুলকিত হইয়া গােপনে তাহাদিগের পরিচয় ও সেখানে
আসিবার উদ্দেশ্য প্রকাশ করিল—এবং তাহার বলবিক্রমের
প্রশংসা করিয়া নীরবে তথা হইতে প্রস্থান করিল।
চন্দ্রশেখর ইচ্ছা করিলে, ইহাদিগকে গ্রেপ্তার করাইয়া
শাস্তি দিতে পারিতেন। কিন্তু তিনি তাহা না করিয়া এইরূপে
বলবীৰ্য দেখাইয়াই আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
মহম্মদ মসিন।
ইংরাজী ১৭৩২ খ্রীষ্টাব্দে হুগলী নগরে মহম্মদ মসিন নামক
এক মহাত্মা জন্ম গ্রহণ করেন। সর্বাঙ্গীন শিক্ষা, বদান্যতা ও
ভোগাস্পৃহতারজন্য ইহার যশ বঙ্গদেশে অক্ষয় হইয়া রহিয়াছে।
মহম্মদ মসিন শরীর ও মন উ ভয়েরই সাতিশয় উৎকর্ষ
সাধন করিয়াছিলেন। তিনি ব্যায়ামাদি দ্বারা শরীরকে এমনই
বলশালী, কষ্টসহিষ্ণু, মপারগ করিয়াছিলেন যে, তৎকালে

মহতী কাহিনী--মহম্মদ মসিন। শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদৃশ পুরুষ অতি অল্পই পরিলক্ষিত হইত। তিনি বিনা ক্লেশে বহুদূর পদব্রজে ভ্রমণ করিতে পারি- তৈন, ফলতঃ এই পৰ্যটনক্ষমতাবলে তিনি সেই সময়ে পৃথিবীর নানাদেশ পয্যটন করিয়া অশেষ জ্ঞানের ভাণ্ডার সঞ্চয়ে সমর্থ হইয়াছিলেন। ক্ষুধা-তৃষ্ণা তাহাকে অল্পে কাতর করিতে পারিত না—কোন প্রকার দস্যুভয় তঁাহাকে সহজে বিচলিত করিতে পারিত না। অসিসঞ্চালন'বদ্যায়ও তাঁহার বিলক্ষণ পারদর্শিতা জন্মিয়াছিল। অনেকস্থলে দেখিতে পাওয়া যায়, এইরূপ শারীরিক বল, বীৰ্য্যসম্পন্ন ব্যক্তি প্রায়ই গোয়ার ও অস্থির প্রকৃতি হইয়া থাকে। তাহাদের মানসিক শিক্ষা ও প্রায় পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় । কিন্তু মসিন সেরূপ ছিলেন না। তিনি যেমন বলবান ও অসিসঞ্চালনকুশল ছিলেন, আরব্য ও পারস্য ভাষায় তেমনই তাহার প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য জন্মিয়াছিল। মসিন যত্ন করিয়া মনােহারিণী কলাবিদ্যাও অভ্যাস করিতে বিমুখ হন নাই। চিত্রবিদ্যাতে তিনি সাতিশয় সিদ্ধ ছিলেন। তাহার হস্তলিপি এমন সুন্দর ছিল যে, যে তাহা দেখিত, সেই প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারিত না। মসিনের সময়ে হস্ত- লিপি সুন্দর হওয়া একটা গৌরবের কথা ছিল। মসিন আজীবন কৌমার ব্ৰত প্ৰতিপালন করিয়াছিলেন । প্রথমে তাদৃশ সঙ্গতিপন্ন না হইলেও, পরে তিনি তাঁহার ভগিনী মুজানের অতুল সম্পত্তির অধিকারী হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহাতেও তাঁহাকে সামান্য ভােগসুখে আকৃষ্ট করিতে পারে হিতকথা। তাহারা পরের কোন প্রকার কষ্ট বা অসুবিধার কারণ দেখিতে পাইলেই তাহার প্রতিবিশনে যত্নপর হইয়া থাকেন। দেশের এই অভাব দূরীকরণার্থ হেয়ার সাহেব যেরূপ চেষ্টা ও পরিশ্রম করিয়াছিলেন, যেরূপ অকাতরে অর্থব্যয় করিয়া- ছিলেন, তাহা ভাবিলে বিস্ময়ে ও কৃতজ্ঞতায় হৃদয় পরিপূর্ণ হইয়া উঠে। বস্তুতঃ এই সম্বন্ধে তঁাহার সাধনাও যেরূপ বিস্ময়কর, সিদ্ধও সেইরূপ অপূর্ব হইয়াছিল। হেয়ার সাহেব প্রথমেই মনে করিলেন, দেশস্থ মান্যগণ্য ব্যক্তিদিগের সহিত পরামর্শ না করিয়া, ভঁহাদিগের সহানুভূতি আকষণ না করিয়া তিনি এ কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিলে, তাহার মনােরথ পূর্ণ হইবার সম্ভাবনা নাই। সেই জন্য তিনি তখনকার দেশস্থ বড় বড় লােকের সহিত পরামর্শ করিতে লাগিলেন। সৎকার্যের অনুষ্ঠানে ঈশ্বরই সহায়তা করিয়া থাকেন। হেয়ার সাহেব বিনা বাধায় প্রথমতঃ আমাদের দেশস্থ সকল লােকের সহানুভূতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। দেশস্থ লােকের সহানুভূতি পাইয়া তিনি মনে করিলেন, এ সম্বন্ধে রাজকীয় সাহায্যও নিতান্ত আবশ্যক। সেই জন্য তিনি কলিকাতা সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি সার হাইড় ইষ্ট সাহেবের নিকটে এই বিষয়ের উল্লেখ করিলেন। ইষ্ট সাহেব অত্যন্ত সদাশয় পুরুষ ছিলেন। তিনি হেয়ার সাহেবের এই সদনুষ্ঠানে সাহায্য করিতে প্রতি- শ্রুত হইলেন। অবিলম্বে একটি উচ্চশ্রেণীর বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ হইতে লাগিল। কিন্তু তখন আর একটি বিল্প উপস্থিত হইয়া হেয়ার সাহেবের এই কাৰ্য পণ্ড করিতে উদ্যত হইল।

মহতী কাহিনী—ডেভিড় হেয়ার। সেই সময়ে রামমােহন রায় ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করেন। বিন্দুগণ ইহাতে তাহার প্রতি বিশেষ কোপাবিষ্ট হইয়া উঠিলেন। রামমােহন রায় প্রস্তাবিত বিদ্যালয়ের একজন অধ্যক্ষ থাকিবেন, পূর্বে এরূপ স্থির করিতে হইয়াছিল। ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের পর হিন্দুগণ এই আপত্তি উত্থাপন করিলেন যে, রামমােহন রায়ের সহিত বিদ্যালয়ের কোন সম্বন্ধ থাকিলে তাহারা সে সম্বন্ধে কোনপ্রকার সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইবেন না। এইরূপে বিদ্যালয় স্থাপন সম্বন্ধে বিশেষ বিঘ্ন উপস্থিত হইল। একদিকে রামমােহন রায়কে অধ্যক্ষ না করিলে তাহার অবমাননা করিতে হয়, এবং এই অবমাননায় তিনি ক্রুদ্ধ হইয়া বিদ্যালয় স্থাপন সম্বন্ধে প্রতিকূলতাও করিতে পারেন; অপর দিকে তঁাহাকে প্রস্তাবিত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ করিলে হিন্দুগণ ইহার প্রতিকূলতা করিবেন; সুতরাং বিদ্যালয় স্থাপন প্রায় অসম্ভব হইয়া উঠিবে। বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগিগণের প্রায় সকলেই এই পরিণাম ভাবিয়া ম্রিয়মাণ হইলেন। কিন্তু মহাত্মা হেয়ার সাহেব ইহাতে কিছুমাত্র বিচলিত হইলেন না। প্রকৃত ইংরাজের ন্যায় তিনি বিঘ্ন অতিক্রম করিতে বদ্ধপরিকর হইলেন। তিনি দেখিলেন, রামমােহন রায় সুশিক্ষিত লােক এবং তিনি প্রায় একা এক দিকে। তঁহাকে কোন প্রকারে বুঝাইয়া স্থির করিতে পারিলে, অন্য দল হইতে কোন বিপ্ন উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা নাই। এই জন্য তিনি রামমােহন রায়কে প্রস্তাবিত বিদ্যালয়ের সহিত সংস্ৰৰ পরিত্যাগ করিতে অনুরােধ করিলেন। রামমােহন রায় অনুদানপ্রকৃতি ছিলেন না। তিনি স্বদেশের উপকারার্থ আপ- হিতকথা। নার অভিমান অতি তুচ্ছ মনে করিলেন, এবং অম্লানবদনে প্রস্তাবিত বিদ্যালয়ের সহিত সংস্ৰৰ পরিত্যাগ করিতে সম্মত হইলেন। তখন উদযােগ কাৰ্য্যে পরিণত হইতে লাগিল। মহাত্মা হেয়ার সাহেব লােকের দ্বারে দ্বাবে ভিক্ষা করিয়া স্কুল স্থাপনের জন্য অর্থসংগ্রহ করিতে লাগিলেন। নানা স্থলে সভা সমিতি হইতে লাগিল। দেশস্থ বদান্য ব্যক্তিগণ হেয়ার সাহেবের সদনুষ্ঠানে সহায়তা করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন। এইরূপে খ্রঃ ১৮১৭ অব্দের ২০শে জানুয়ারী বলিকাতার হিন্দুকলেজ প্রথম স্থাপিত হইল। এই হিন্দু কলেজে শিক্ষালাভ করিয়া এ দেশস্থ বহুতর লােক দেশে প্রতিপত্তি ও প্রাধান্য লাভ করিয়া গিয়াছেন। এই বিদ্যালয়ের স্থাপনেই এ দেশে ইংরাজী শিক্ষার ভিত্তিস্থাপন হয়, এমন বলা যাইতে পারে। সুতরাং এক প্রকারে:মহাত্মা হেয়ারকেই এই ইংরাজী শিক্ষার প্রতিষ্ঠাতা বলিতে পারা যায় । নানা প্রকারে দেশস্থ প্রধান প্রধান ব্যক্তিদিগের সহানুভূতি আকর্ষণ করিয়া, তাহাদিগের নিকট হইতে অর্থানুকূল্য লাভ করিয়া এবং দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা দ্বারা অর্থ সংগ্রহ করিয়া হেয়ার সাহেব এই বিদ্যালয়ের স্থাপনা করিলেন। ইহাতে তঁাহার যত্ন, অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও সদনুষ্ঠানে মহত প্রবৃত্তিরই পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি ইহা করিয়াই ক্ষান্ত থাকেন নাই। তিনি এই বিদ্যালয় যাহাতে সর্বাঙ্গসুন্দর হইতে পারে, তজ্জন্য নিজের অর্থব্যয় করিতে কুষ্ঠিত হয়েন নাই। তিনি বিদ্যালয়ের গৃহনির্মাণ জন্য, পটোলডাঙ্গায় তাহার যে ভূমি সম্পত্তি ছিল, মহতা কাহিনী-ডেভিড় হেয়ার । তাহার কিয়দংশ আহলাদসহকারে দান করিলেন। ঐ স্থানে বিদ্যালয়ের বাটী নির্মিত হইল । বিদ্যালয় স্থাপনা করিয়া হেয়ার সাহেব দেখিলেন, যে, এতদ্দেশে অধ্যয়নােপযােগী গ্রন্থেরও বিশেষ অভাব রহিয়াছে। দেখিবামাত্র হেয়ার সাহেব এ অভাব দূর করিতেও অদম্য উৎ- সাহসহকারে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। এই জন্য এতদ্দেশে “স্কুলবুক সোসাইটী” নামে একটী সভা স্থাপিত হইল। বিদ্যা- লয়ের উপযােগী গ্রন্থসমূহ ইংরাজী ও বাঙ্গালা ভাষায় প্রণয়ন ও সঙ্কলনপূর্বক অতি অল্প মূল্যে বা স্থলবিশেষে বিনামূল্যে প্রচার করাই এই সভার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। ইংরাজীভাষা শিক্ষা করিয়া লােকে মাতৃভাষা বাঙ্গালা উপেক্ষা করে, তজ্জন্য হেয়ার সাহেব নিজে ইংরাজ হইয়াও, যাহাতে এদেশের লােক বাঙ্গালা ভাষায় ব্যুৎপন্ন হইতে পারে এবং বাঙ্গালা ভাষারও যাহাতে উন্নতি হয়, তজ্জন্য মনােযােগী ও যত্নপর হই. লেন। ফলতঃ তাহার চেষ্টার ফলে আমাদের দেশে ইংরাজী ও বাঙ্গালা উভয়বিধ ভাষাশিক্ষার বিশেষ বন্দোবস্ত হইতে লাগিল এবং দেশীয়গণ উভয়বিধ ভাষাতেই কৃতবিদ্য হইতে লাগিলেন। হিন্দু কলেজ স্থাপন করিয়া হেয়ার সাহেব এতদ্দেশীয়- দিগকে ইংরাজী প্রণালীমতে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা দিবার জন্য একটি কলেজ স্থাপন করিতে বিশেষ উদ্যোগী হইলেন। তৎকালীন গবর্ণর জেনের চর্ড উইলিয়ম বন্টিঙ্ক সাহেব এ বিষয়ে পৃষ্ঠপােষক হইতে স্বীকৃত হইলেন। এইরূপে এত- দ্দেশে মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হইল।

হিতকথা। হেয়ার সাহেব এতদ্দেশীয়দিগের বিদ্যাশিক্ষার্থ বিদ্যালয় স্থাপনা করিয়াই ক্ষান্ত থাকেন নাই। তিনি প্রকৃত অভিভাবকের ন্যায় শিক্ষার্থিগণের শিক্ষা ও চরিত্র পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করি তেন। তিনি প্রতিদিন বেলা দশটার সময়ে স্কুল ও কলেজ দেখিতে আসিতেন। তিনি স্কুলে আসিয়া ছাত্রগণের উপস্থিতি লিখিবার বহি পরীক্ষা করিতেন। যে সকল বালক অনুপস্থিত থাকিত, তিনি অবিলম্বে তাহাদিগের অনুসন্ধানে বহির্গত হই- তেন। এই অনুসন্ধানে বহির্গত হইয়া যদি দেখিতে পাইহেন, বা জানিতে পাইতেন, কোন বালক শারীরিক পীড়ার জন্য বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইতে পারে নাই, তাহা হইলে তিনি তাহার জন্য ঔষধাদির ব্যবস্থা করিতেন, এবং আবশ্যক হইলে শুশ্রুষা করিতেও কুণ্ঠিত হইতেন না। যে সকল বালক বিদ্যালয়ে যাইবার কথা বলিয়া বাটী হইতে বহির্গত হইত, কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে বিদ্যালয়ে গমন না করিয়া অন্য কোন স্থানে ক্রীড়া- কৌতুকের জন্য গমন করিত, তাহাদিগকেও তিনি অনুসন্ধান করিয়া বাহির করিতে চেষ্টা করিতেন। যদি তাহাদিগকে পাইতেন, বিবিধ সদুপদেশ প্রদানে তিনি তাহাদিগকে সুপথে আনিবার চেষ্টা করিতেন। ফলতঃ মহাত্মা হেয়ার সাহেবের প্রকৃত বাৎসল্য ও উৎকৃষ্ট তত্ত্বাবধানহেতু উচ্ছঙ্খল বালক- গণকেও সংযত হইতে দেখা যাইত। যে সাহেব দেখিলে বালকগণ ভয়ে শত হস্ত দূরে গমন করে মহাত্ম। হেয়ার সেই সাহেব হইলেও কোনও বালক তাহার নিকটে যাইতে সঙ্কুচিত হইত না। তিনি এমনই অকৃত্রিম মহতী কাহিনী-ডেভিড় হেয়ার । বাৎসল্যভাব প্রদর্শন করিতেন যে, তাহাতে বালকগণের ভয় করিবার কোন কারণ থাকিত না। ফলতঃ তাহার গৃহ, প্রায় সৰ্ব্বদাই শিশুগণে পরিবৃত থাকিত। হেয়ার সাহেব তাহাদিগকে লইয়া নিরন্তর পরম সুখে মগ্ন থাকিতেন। সাহেবের যেমন পরিকৃত পরিচ্ছন্ন থাকেন, এতদ্দেশের লােকেরা তেমন থাকিতে পারে না। হেয়ার সাহেব এতদ্দেশীয় দিগের এই পরিষ্কারপ্রিয়তা জন্মাইবার জন্যও কম চেষ্টা করেন নাই। তিনি এ জন্য যাহা করিতেন তাহা শুনিয়া তােমরা বিস্মিত হইবে। তিনি প্রতিদিন স্কুলের ছুটীর সময়ে একখানি তােয়ালে হাতে করিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান থাকিতেন, এবং যে সকল ছাত্রকে তিনি অপরিষ্কত দেখিতে পাইতেন, অবিলম্বে ঐ তোয়ালে দ্বারা তিনি তাহাদিকে পরিষ্কৃত করিয়া দিতেন, ইহাতে তিনি কিছুমাত্র অপমান বোধ করিতেন না—এই কাৰ্যে তাহার প্রভূত আনন্দের সঞ্চার হইত। তিনি হাসিতে হাসিতে মাতার ন্যায় শিশুগণের হাত মুখ মুছাইয়া দিয়া মুখচুম্বন করতঃ অনির্বচনীয় আনন্দ লাভ করিতেন। এতদ্দেশীয় কোন লােক কোন প্রকার বিপদে পতিত হই- য়াছে, এ সংবাদ শুনিতে পাইলে, হেয়ার সাহেব ক্ষণমাত্রও সুস্থির থাকিতে পারিতেন না। তিনি অবিলম্বে তাহার বাটীতে গমনপূর্বক সবিশেষ শ্রবণ করিয়া কৰ্তব্যাকৰ্তব্য অবধারণ করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। এক দিন বাগবাজারনিবাসী একটা ছাত্র জ্বররােগে আক্রান্ত হইয়াছে, এই সংবাদ হেয়ার সাহেবের কর্ণগােচর হইল। যখন তিনি এ কথা শুনিতে পাইলেন, তখন

৮৮
হিতকথা।
ঘােরতর বৃষ্টি হইতেছিল। কিন্তু সেই মহাপুরুষ তাহাতে
কটাক্ষপাত না করিয়া অবিলম্বে একখানি সামান্য গাড়ী ভাড়া
করিয়া সেই ছাত্রের গৃহে উপনীত হইলেন।
এই হেয়ার সাহেবের কাহিনী লিখিয়া শেষ করা যায় না।
তিনি দয়াধর্মে দীক্ষিত হইয়া আপনার আপাতসুখ ও সম্মানের
প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেন না। করিবেনই বা কেন ? যিনি
পরােপকার-ধৰ্ম্মের রসাস্বাদন একবার প্রাপ্ত হইয়াছেন, তিনি
তজ্জন্য সকলই বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হইতে পারেন।
হেয়ার সাহেব এমনই মহাপুরুষ ও এতদ্দেশীয়দিগের উপ
কারী বন্ধু ছিলেন যে, কেহ কেহ তাহার স্নেহ, পরম পবিত্র
মাতৃস্নেহের সহিত তুলনা করিতে কুষ্ঠিত হয়েন নাই।
দয়াশীল, পরােপকারী, কৰ্ম্মবীর বৈদেশিক অতি অল্পই এ দেশে
দেখিতে পাওয়া যায়।
হেয়ার সাহেবের কাহিনী এই স্থলেই উপসংহার করিয়া
তােমাদিগকে এ সম্বন্ধে কয়েকটী কথা বলিতে চাহি ।
তোমাদিগকে আমি যে সকল স্বতঃসুখজনক বৃত্তির কথা
বলিয়াছি, পরােপচিকিষা তাহার মধ্যে অন্যতম । হেয়ার সাহেব
এই বৃত্তিলব্ধ সুখে সর্বদাই মগ্ন থাকি?তন। তঁাহার শারীরিক
বল ও কষ্টসহিষ্ণুতা এমনই ছিল যে, তিনি কষ্টসাধ্য ব্যাপারও
অল্পায়াসে সম্পন্ন করিয়া পরােপকারের অসীম আনৗউপভােগ
করিতে পাবিতেন। পরবপকার করিতে অর্থের প্রয়ােজন, হেয়া
সাহেবের অর্থও যথেষ্ট ছিল। অর্থের সঞ্চয় করিয়া,মহামতি হেয়ার
এইরূপে অতি শ্রেষ্ঠ সুখ সম্ভোগের অধিকারী হইয়াছিলেন।

No text on this page.

No text on this page.

Hitkotha

Author
Roychoudhuri, Girijaprasanna
Title
Hitkotha
File name
Hitkotha
Text
OCR done
Citation
1901
Published
2010/04/6
Publisher
Kedarnath Basu,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
99
Library
Maju Public Library, Howrah
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Roychoudhuri, Girijaprasanna
DLI number
511093
Barcode
4990010018272.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
wBSUXPfipj7
Download PDF

Hitkotha