Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Dada

Basu, Bidhubhushan · 2009/09/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দাদা।
পল্লীসংস্কা
মূলক
সামাজিক গীতিনাট্য
ঐবিধুভূষণ বহু কর্তৃক রচিত ও প্রকাশিত।
গােবিন্দ প্রেসে,
দেবেন্দ্রনাথ রায় দ্বারা মুদ্রিত।
৩১নং রিসন মােড়, কলিকাতা।
মুল্য ১০

No text on this page.

No text on this page.

নিবেদন অনেক বাধা বিপত্তি এড়াইয়া “দাদা” প্রকাশিত হইল। "ব্রহ্ম চারিণী” ও প্রকাশিত হইয়াছে। পুরাণ কালে ভীমার্জুন, রামলক্ষ্মণ, সীতা সাবিত্রী, সুভদ্রা-দময়ন্তীর চিত্র লইয়া পল্লী-গৃহস্থের নাট মন্দিরে যাত্রা গান হইত, তাতে লােকে সমাজ তত্ত্ব, ধৰ্ম্ম তত্ত্ব পিতৃভক্তি তাগধৰ্ম্ম শিখিত এক্ষণেও যাত্রা গান সংস্কৃত হইয়া, নৃত্যগীতের পরিপাট্যপূর্ণ হইয়া লােকের মনােরঞ্জন করিতেছে, কিন্তু শিখিবার বুঝিবার,—চিত্তকে একটু উচ্চতার দিকে লইয়া যাইবার মত উপাদান তাহাতে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। এটা যেন বাঙ্গালীর বড় দুর্ভাগ্য ! সকল বিষয়েই কেবল সাজের চটক, বিলাসের আড়ম্বর ! বাংলার পল্লী শ্মশান হইয়া যাইতেছে। সহরে বসিয়া নেতারা দেশ উদ্ধারের চিন্তা করিতেছেন। পল্লী না জাগিলে যে বাংলার উদ্ধার হইতে পারে না। পল্লীবাসীকে কাজের দিকে টানিয়া আনিতে না পারিলে, দেশােদ্ধার কথাটা যে আকাশ-কুসুম । লেখক পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছে, পল্লীবাসী “দাদার” কথা বড় প্রাণ দিয়া শুনে । প্রতি পল্লীতে “দাদার” কথা শুনাইবার আকাথায় এই রুগ্ন অকর্মণ্য দেহে লেখক দাদা প্রকাশিত করিল। বােধ হয়, এই “দাদাই” আমার বঙ্গজননীর পায়ে শেষ বিশ্বাঞ্জলি। এই নাটকের অর্জিত অর্থ আমার পল্লীমঙ্গল” পাঠশালে ব্যয়িত হইবে, ইহাই আমার ইচ্ছা। অন্ধ-প্রায় লেখক, ক্ষীণদৃষ্টি, ভালরূপ মুদ্রণ-প্রমাদ লক্ষ্য করিতে পারে নাই। বহু ভ্ৰম প্রমাদ রহিয়া গিয়াছে। পাঠকগণ নিজগুণে মার্জন করিবেন। ১লা ভাদ্র ১৩৩২ পল্লীমঙ্গল পাঠশালা, বিষ্ণুপুর শ্ৰীবিধুভূষণ বস্তু ।

ভসর্গ। 0 অন্নবস্ত্ৰ-হারা, রােগ-শােকে জীর্ণ, সহরের শােষনে নিপীড়িত, কুটীরবাসী পল্লী-জননীর সন্তান,—যারা মাতৃভক্ত সন্তানের ন্যায় পল্লীর বুক আঁকুড়িয়া এখনও পল্লীর প্রাণ- স্পন্দন রক্ষা করিতেছেন, আমার সেই সকল সভ্যতা-সম্পদে উপেক্ষিত ভ্রাতৃগণের করেই “দাদা” উৎসর্গ করিলাম ২রা ভাদ্র ১৩৩২ বিষ্ণুপুর পল্লীমঙ্গল পাঠশালী। শ্ৰীবিধুভূষণ বসু

No text on this page.

No text on this page.

নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষ। মহেশ গণেশ ভাতৃ বৎসল গৃহস্থ। মহেশের মেঝ ভাই, নব্য শিক্ষিত। মহেশের ছােট ভাই। পরেশ হরিদাস মহেশের পুত্র। খ্যাপা 'ভােলানাথ নামে একজন ব্রহ্মচারী। রাকান্ত জমিদার। সরােজকান্ত রমাকান্তের পুত্র। কানাইপাল গ্রাম্য টর্নি মুহুরী । পরাণমণ্ডল কৃষক গৃহস্থ। জীবন দাস বিশ্বনাথ পুরােহিত ব্রাহ্মণ। ম্যাজিষ্ট্রেট, দারোগা, চাপরাশী, কনেষ্টবল, রাখাল, গাড়ােয়ান ইত্যাদি। দয়া পরিমল মহেশের স্ত্রী। গণেশের স্ত্রী ভক্তিমতী বৈষ্ণবী। পরিমলের ঝি। রাধা বিনােদা বেদে রমণী

দাদা।
প্রথম অঙ্ক।
১ম দস্য।
গ্রাম্য ধনবান রমাকান্ত মুখােপাধ্যায়ের বাড়ীতে রমাকান্ত বাবু
গ্রাম্য পাটোয়ারী মুহুরী কানাই পালের সঙ্গে
আলাপ করিতেছিলেন।
রমা।
মহেশ চক্রবর্তীকে দমন করা বিশেষ প্রয়ােজনই হয়ে
দাড়িয়েছে।
খুৰ বেড়ে উঠেছে লোেকটা। গােবিন্দ কবিরাজের ব্যাটা,
মহেশ চক্রবর্তী চৌদ্দ পুরুষে পচা বংশজ, সেও হলাে এখন বড়বাবু। ব্যাটা
আট টাকা মাইনের দপ্তরী হতে গিয়ে, এখন মস্ত নায়েব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একবারে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ। বাড়ীতে মণ্ডপ
নাকারী উঠেছে! আসছে বছর থেকে বােধহয় পূজা হবে। আরও ভাইটা
বি, এ, পাশ করেছে।
রমা। সুধু বি, এ পাশ করেছে, এই সেদিন তার বিয়ে হয়ে গেল
না ? কাতার কোন্ বড় মানুষের মেয়ে বিয়ে করে এনেছে, তার সঙ্গে
দান সামগ্রী সােনা রূপা ঘড়ি চেন কত কি।
কানাই। তাইত, শুনেছিলাম ঐ মেয়ের সঙ্গে আমাদের বড় বাবু
সমােজ কাকেরই সন্ধের কথা হচ্ছিল।
কানাই ।

দাদা। রমা । তবে বলছি কি, ব্যাটা আমার ছেলের সঙ্গে সম্বন্ধটা ভাঙ্গিয়ে দিয়ে নিজের ভাইটার সঙ্গে সম্বন্ধটা পাকা করে ফেলে, এটা কি তার উচিত হয়েছে, আমার সঙ্গে দিতে চায় আড়ি? আর মেয়ের বাবাটাও আহম্যক কম নয়, শুধু বি এ পাশ দেখেই ভুলে গেল, ভিতরের সংস্থানটা " দেখলে না। ব্যাটারাত হাবাতের বাচ্চা। পরের দুয়ারে খেটে না খেলেত ভাত যােটেনা। আমার সােজকে ত আর ভাত কাপড়ের জন্য পরের দোরে যেতে হবে না। তা একটা আধটা পাশ কৰ্ত্তে নাইবা পেরেছে। কানাই। সুধু তা নয় বড় বাবু, মহেশ চক্রবর্তীকে আপনি সহজ লােক মনে করবেন না। লােকে বলে ভারি নিষ্টে কাষ্টা লােক, ওর ভিতর বিষের হাড়ি লুকান। লােকটা আসল সয়তান, নিশ্চয়ই আপনার সররাজের বিরুদ্ধে অনেক কথা লাগিয়েছে । লেখা পড়া জানে না, নেশা টেসা করে, অমন কত কি বলে মেয়ে ওয়ালার মন ভার করে দিয়েছে । যা'ক আমরা গরীব মানুষ, অত কথায় কাজই বা কি, রমা । মহেশ চক্রবর্তী এত বড় ধনী লােক না কি ? কানাই। তা আমাদের চেয়ে ধনী বই কি,. দু পাঁচ ঘর রায়ত প্রজা আছে, আজকাল আবার চাষা মহলে বেশ লগ্নি দেখতে পাই। রমা। আবার দেনদারও ত আছে। এইত সেবার আমার কাছ থেকে একশত টাকা ধার নিয়েছিল, এখনও শশাধ কৰ্তে পারে নি। শুনেছি মহেশ এখন আরও অনেকের দেনদার আছে। পরের কাছ থেকে টাকা ধার করে, চাষাদের ধার দেয়। তাই চাষা লােক গুল ওর অত বাধ্য হয়ে পড়েছে। সে দুঃখের কথা আর বলিনা বড় বাবু। গায়ের চাষাদের দুট দশটা টাকা ধায় দিয়ে কিছু করে খেতু, মহেশ সে পথ কানাই । .

প্রথম অঙ্ক। বন্ধ করেছে। ওর ভাই পরেশ কি একটা ফন্দি করে, সরকার থেকে টাকা এনে চাষাদের নিয়ে একটা ব্যাঙ্ক খুলেছে, এখন তারা সেই খান থেকে টাকা ধার নেয়, কেউ আর কাছে ঘেসে না। রমা । এইত কথায় কথা বেরিয়ে পড়েছে, সাধে কি তােমায় ডেকে পাঠিয়েছি। দেখ কানাই বাবু, মহেশকে দমিয়ে দিতে না পারলে এ গায়ে আর পুরাণ মান সম্রম রেখে চলা যাবে না। কানাই। বড়ই সৌভাগ্য যে এতদিনে আপনি একথা বুঝতে পেরেছেন। রুমা। বােঝাবুঝি কিছু নয়, মােদা আজ থেকে মহেশের সঙ্গে আমার আড়ি, দেখে নিতে হবে, ব্যাটা কত বড় তালেবর ব্যক্তি। কানাই। এইত বটে মানুষের কথা; আপনি মনে কল্লে মহেশ চক্রবর্তীকে উচ্ছন্ন দিতে কতক্ষণ? রমা। এজন্য তােমায় কিছু খাটতে হবে । তুমি যদি আমার সহায় হও,তবে জেন, মহেশকে পথের ফকির কর্তে বেশী দিন আমার লাগবে না। কানাই। আজ্ঞে আমি আপনার খেয়েই মানুষ। আপনার কথা কি অমান্য কোনওদিন করেছি? রমা। শােন তােমায় যা কৰ্ত্তে হবে । আগে তার প্রজাদের গিয়ে ছলা দাও, যাতে সহজে খাজানা পত্র না দেয়। খাতকদেরও তেমনি হলা দিতে হবে। আর মহেশ যাদের দেনদার আছে, তাহাদিগকে বলে কয়ে নালিশ করিয়ে দিতে হবে। মহেশ যে জমিদারের চাকরী করে, তাকে জানিয়ে দিতে হবে, মহেশ তবিল তছরূপ করে, খুৰ টাকা লুটে আছে। এদিকে সমাজ নিয়ে আমি আছি, কে এক ঘরে কৰ্ত্তে হবেই হবে । গ্রামে রটাতে হবে, মহেশের ভাই যার মেয়ে বিয়ে, করেছে সে খৃষ্টান ব্ৰহ্মজ্ঞানী, প্যাজ মুরগী খায়। কেমন এসব করা উচিত নয় ।

দাদা।
কানাই। নিশ্চয়ই উচিত, অবশ্য উচিত। ছােট লােককে কি
বাড়তে দিতে হয়। এর সাথে আর একটা কাজ কর্তে হবে। মহেশের,
সাথে যাতে গণেশের মিলটা না থাকে তার চেষ্টা করা নেহাৎ উচিত ।
গণেশ না কি দেড়শত টাকা মাইনের একটা চাকরী পেয়েছে।
রম। এইত, সাধে কি তােমায় বুদ্ধিমান বলি। এটা ত কর্তেই
হবে। দেখ কানাই, তুমি কিন্তু আমার ডান হাত। ভাই ভাই ঠাই সই
তুমি করে দেবে। আর পরেশ ছােড়ারও চাষা মহলে খুব পশার ।
বাবার ব্যবসা ধরেছে, কবিরাজি করে, চাষারা একবারে আজ্ঞাকারী।
কানাই! ওই কথা, ওর সঙ্গে আর একটা ভবঘুরে খ্যাপ।
গোঁসাই জুটে গেছে, দিন দিন তাদের আডড ডারি হচ্ছে।
ওদের পুলিশে ধরিয়ে দিতে হবে। রটিয়ে দিতে হবে,
ওরা রাজদ্রোহী, গােপনে সরকারের রাজত্বটা তুলে দেবার চেষ্টা কচ্ছে ।
রমা।
পরেশ সহ সেবাশ্রমের সেবকগণ
গান করিতে করিতে মুষ্টিভিক্ষায় বাহির হইল ।
(গীত )
সেবকগণ।
জয় শিব শুদ্ধ সত্য নারায়ণ।
জ্ঞান-গুণ-রাশি অন আদি-করণ ।।
চন্দ্র সুৰ্য্য গ্রহ জগৎ ভাসন,
সিন্ধু সরিৎ হ্রদ বারি ৰহি পবন।
গিরি ত নিঝর, বিশ্ব মনােহর
ফং হি পরমেশ সৰ্ব্বভূত ভাবন।

প্রথম অঙ্ক।
রমা। এইত বাবাজির দল কুত কাওয়াজ কর্তে এসে উপস্থিত।
পরেশ। আজ্ঞে, আজ রবিবার, আমাদের ভিক্ষার দিন, কিছু
ভিক্ষার জন্য এসেছি।
রমা। কাজত ভালই কচ্ছ, দশ দোর থেকে ভিক্ষা শিক্ষা করে
নিয়ে গোঁসাই বাবজি আখড়া বাড়ী খুব জমিয়ে রেখেছেন ! নাম করবার
এ একটা বেশ ফন্দি বটে। চাচার আম দুধ, আমার সেলাম ! মাঝে
মাঝে শুনেছি সুবল বৈরাগীর আখড়া বাড়ীতে রাধা বােষ্টমীর দোরেই
খুৰ আখড়া জমে ওঠে।
পরেশ। মাপ করবেন বড় বাবু, সাধু খ্যাপা গোঁসাইকে বিজপ
কথা বলবেন না। জানেন, এই সেদিনকার কলেরার মহামারীতে
গেই ঠাকুর কি কাজটাই করেছিলেন। তিনি না থাকলে চাবা পাড়াত
উজাড় হয়েই যেত। নিজে একলা ঘাড়ে করে মড়া শ্মশানে নিয়ে দাহ
করেছেন।
কানাই। তা বটে, তা বটে, অমন দু একটা বুজুরকি না থাকলেই
বা লােকে মানবে কেন?
রমা। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি পরেশ, তােনার বড় দাদা
শুদ্ধ বামন, ত্রিসন্ধ্যা করেন, তােমার মেজদাদাত সাহেব হয়ে গেলেন,
আর তুমিত খ্যাপা গোঁসাইয়ের আখড়ায় ভেক ধারী বাবাজি। তিন ভাই
ধরলে ভিন ধারা, এযে দেখছি ত্রিবেনীর ত্রি-ধারায় প্রয়াগ তীর্থ হয়ে যাবে।
কানাই। এয়ােস্পর্শ জুটে গেল আর কি ?
পরেশ। ব্যঙ্গ করে আর কি ফল ! এই সাত দিনের সাত মুষ্টি
চাল দয়া করে দিন, আমরা চলে যাই।
ওরে দিয়ে দে এদের দুটো চাল : মােদ্দ। আর এসােনা,
আমার এ সৰ ভাল লাগেনা। যত জ্যাঠামি আর কি ? কানাই, আমি
রমা।

দাদা।
আসি ভিতর থেকে, তুমি বােস। না হয়, ওবেলায় একবার এসো। (প্রস্থান)
কানাই। বেশ তােমরা গাইতে জান, আর একটা গান করনা,
শুনি।
(গীত)
সেবকগণ।
হােট বড় ভেবে কেবল আপনারে করা ছােট।
ছােট বলে ফেলবে যারে, তার কাছে হবে খাটো।
করম-সুতে কাল-তরু-ডালে জীব সদা দোলে,
হাওয়া ভরে টুপ, টুপটুপ, ঝরছে ভূতলে,
হালকা বােটো ভার জমিলে অমনি ধুলায় লােট।
হালকা যত করবে আপন বুক, দুলতে তত সুখ,
ঝড় বাতাসে দুল দুলদুল খেলতে কি কৌতুক।
বাড়লে ওজন ঘটবে পতন উচু মাথা হবে হেট।
কানাই। বেশ, বেশ! সুন্দর গান ! বােধহয় সেই খ্যাপা বাজির
রচা গান ! কি আধ্যাত্মিক ভাব! কেউ বড় হয়ােনা, সব ছােট হয়ে থাক,
বড় হয়েছ কি মরেছ। কিনা নলিনী দলগত জলবৎ! কি ভাব! বােঝে
কে ? ছছাট বাবু! তুমি দেখছি দেশ পাগল করে দেবে,
( সবরাজের প্রবেশ )
সরােজ। কি কানাই দা পাগল হয়ে উঠলে না কি? বােষ্টম
পাড়ার দিকে গিয়েছিলে না কি? পরেশ দার দলে গায় ভাল ! জান পরেশ
দা! একটা কথা শােনত! তােমায় মাঝে মাঝে রাধা বােষ্টমীর ঘরের
কানাচে উকি মারতে দেখা যায় কেন ?

প্রথম অঞ্চ।
পরেশ। তা দেখতে পার। রাধা যখন সন্ধ্যা কালে ঠাকুর
আরতি করে, তা দেখতে আমি বড় ভাল বাসি । সময় পেলেই
দেখতে যাই
সরােজ। তােমরা না কি মেয়ে মানুষের ছায়া মাড়াও না।
তবে রাধার বাড়ী ঘাের যে।
পরেশ। আমি রাধাকে দেখতে যাই না, তার ভক্তি দেখতে যাই।
সে তার প্রেমের ঠাকুরকে সত্যিকার প্রেম দিয়ে আরতি করে, তখন
তার বুক বেয়ে ধরা পড়ে, একদিন দেখে এসাে, তােমারও চকে ধারা
ছুটবে।
(সেবকগণ সহ প্রস্থান)
তারপর কানাই দা ! পরেশের কথাই ঠিক, চকের
ধারাই ছুটেছে, এখন তােমার দয়া । তুমি এমন অকৰ্ম্মা তাত
জানতাম না।
কানাই। কি করি বড় বাবু, একটু সবুর করাে, ছুড়িটার খুব
জাকামি আছে।
সরােজ। পারবে?
কানাই। নিশ্চয়ই। শিবের অসাধ্য হলেও পারব।
সরােজ। আর কত দিনে ?
কানাই এই দশ বিশ জোর!
সরােজ। অত সইবে না। আমিত বলছি অত খেসামােদ কি,
জবরদস্তি করা যাক।
কানাই। আচ্ছা আর দশটা দিন যেতে দাও, জবর দস্তিতে
এসব কার্য কি সুখের হয় ?
সােজ। তা বােঝ দাদা, মােদ্দা মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পতন।

দাদা।
নিয়ে যাও আজ কিছু খরচা। আচ্ছা, তুমি বলছ টাকা দিলে নেয়, তবে
আর সবুর কেন?
কানাই। আরে নেয়ত, তাতে ন্যাকামি করে, বলে ঠাকুরের
ভােগে লাগাব, দাও।
সরােজ। কাল আর একবার যাবে।
( উভয়ের প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য। বাড়ীর ভিতরে দাওয়ায় বসিয়া মহেশ ও দাড়াইয়া দয়া কথাবার্তা বলিতেছেন। মহেশ। আজ আমি কত সুখী ! মা ভক্তবাঞ্ছা-পূৰ্ণ-কারিণী আমার বড় আশাই পূর্ণ করেছেন। মেঝ ঠাকুরপাে যেমন পরীক্ষায় পাশ পেয়ে চাকরী পেলেন, ছােট ঠাকুর পােও যদি তেমনি হতাে। মহেশ। না বড় বউ, এখন আর আমি সে জন্য দুঃখ করি না। পরেশ পরীক্ষায় পাশ করে বড় না হাে’ক, পরেশ প্রকৃত মানুষ হবে বলে আমার বিশ্বাস। কি স্বাধীন উচ্চ প্রাণ ওর। জান ত, বাবা চিকিৎসা ব্যবসা করিতেন। ব্রাহ্মণ কবিরাজ বলে সমাজে তাকে কত অবজ্ঞা, মাথা পেতে নিতে হয়েছিল। আবার অসীম সম্মানও ছিল তার দেশে। তিনি টাকার খাতিরে চিকিৎসা কৰ্ত্তেন না, চিকিৎসার খাতিরে চিকিৎসা কৰ্ত্তেন। কত দুঃখী দরিদ্র তার চিকিৎসায় প্রাণ পেয়েছে। পরেশ পিতার পথ অনুসরণ করেছে। দেশের সেবায় আত্ম- নিয়ােগ করেছে! দয়। সত্যি, আপন পর জ্ঞান তার নাই। আপনার আরাম বিরামেও লক্ষ্য নাই। কোলের বাড়া ভাত ফেলে পরের বিপদে ছুটে যায় ; রােগী পেলে দিন রাত তার সেবায় কেটে গেল, নাওয়া খাওয়া কখনও মনে আসে না, কত কলেরা বসন্তের রােগী ঘাটে, আমার ত ভয় করে। .

১০ দাদা। মহেশ। শােন দয়া, আজ অনেক পুরাণ কথা মনে আছে। বাবা যখন মারা গেলেন, তখন বয়স আমার ১৮ বৎসর, গণেশ ৮ বৎসরের আর পরেশ ৪ বৎসরের। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়’ল। নিজে লেখাপড়া ছাড়’লাম, ৮, টাকা মাহিনেয় জমিদার সরকারে ঢুকলাম। সকাল আটটায় খেয়ে কাছারী যেতাম, আর রাত আটটায় ফিরতে হতাে। এর মধ্যে পিপাসা লাগলে এক পয়সার বাতাসা কখনও মুখে দেই নাই। লক্ষ্য ছিল, ভাই দুটীকে মানুষ করূব । পরেশ একবার পরীক্ষায় ফেল করে স্কুলে ঢুকলাে না, গণেশ বি. এ. পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে পাশ করে গেল। দয়া। ব্রহ্মচারী খ্যাপা গোসাই দেশে এসেই তাকে এমন ধারা সন্ন্যাসী করে দিয়েছেন। মহেশ। না ছেলে বেলা থেকেই ওর মনটা ঐরকম ধাতুতে গড়া। শােন, ওর ছেলে বেলার একটা কথা। আমি যেবার প্রথম চাকরীর মাইেন পেলাম, সে বার মার জন্য এক খানা কাপড় আর ওদের দু’ভাইয়ের জন্য দুটী জামা কিনে আনলাম। পরেশ জামাটা পেয়ে বল্পে দাদা, শঙ্কর দাদার কাপড় কই, তার যে কাপড় ছিড়ে গেছে, আমার ত জামা ছিল। শঙ্কর ছিল তখন আমাদের বাড়ীর চাকর, খাওয়া পরার আবদার ওকে আমি কখনই কর্তে দেখি নাই। দয়া। আমি সব জানি, ৭ বছরের ছেলে যখন পরেশ তখন ত আমি এসেছি। আমাকে পেয়ে তার কি আনন্দ! পর বছরই, মা মারা গেলেন, পরেশ ত কেঁদে আকুল। তার কান্না দেখে আমি নিজে আর কাঁদতে পাল্লাম না, ওকে কোলে নিয়ে বল্লাম, ঠাকুর পাে, মা কি কারু চিরকাল থাকে ? আমিই তােমার মা ! সেই থেকে আমাকেই যেন তার মা’ বলে বিশ্বাস। এই আঠার বছরের ছেলে, এখনও সেই শিশুটীর মতন আমার উপর আবদার করে। কিন্তু এই যে কি খােটু ধরেছে, বলে প্রথম অঙ্ক। বিয়ে করবাে না। মহেশ। ওর জন্য বাড়াবাড়ি করার দরকার নাই। সত্যিই যদি ও বিয়ে কর্তে রাজি না হয়, তবে আমিও ওকে বিয়ে কর্তে জবর দস্তি করবাে না। দয়া। তােমার এ কেমন মত? বিয়ে কবে না, ঘর সংসার করবে না, এমনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে, এটা বুঝি ভাল। মহেশ। বিয়ে না করলে, আপনার স্ত্রীপুত্র নিয়ে সংসার না পাতালে বুঝি ঘর সংসার করা হলােই না। এর চেয়ে বড় রকমের ঘর সংসার আছে। ভায়া পরেশ যদি জগৎকে ভালবেসে, জগৎ জুড়ে ঘর সংসার পাতাতে পারে, সে বড় গৌরবের। আমরা যে রূপ নিরন্ন পরাধীন পতিত জাতি, তাতে এমনি উচ্চপ্রাণ বহু যুবকের অধিবাহিত থেকে, সমাজের ও স্বজাতির মঙ্গল চিন্তা করাই প্রয়ােজন। দয়া। কি জানি, আমরা অত বুঝি না। আমার ত বড় সাধ, ছােট যা’দের নিয়ে সংসার করবাে। মেঝ ঠাকুর পাে সহরের বড় মানুষের মেয়ে বিয়ে কল্লেন, নিজে হলেন সহরের চাকুরে, মেঝ বউকে নিয়ে ত আর আমার সংসার করা চলবে না। হ্যা, সত্যি মেঝ ঠাকুর পাে এবারই কি মেঝ বউকে সহরে নিয়ে যাবে ? মহেশ। না না, সে কি আর এখন হয়। দু চার বছর থাক, তর পর যা হয় করা যাবে। আমি ও এই যােল বছর বিদেশে চাকরী কচ্ছি, কখন কি তুমি আমার বাসা দেখতে পেয়েছ ; শােন দয় আমারও কয়টী সাধ আছে, আজ বলে ফেলি। আগে দেনাগুলি শােধ কৰ্ত্তে হবে, সামান্য দেনা হাজার দেড়েক টাকা। তার পর প্রতি বৎস বাবা আর মায়ের মৃত্যু তিথিতে এক এক বার সামাজিকদের পাতে দুটা ভাত দিতে হবে । আর বান্তর একবার মা দশভুজাকে ঘরে এনে,

১২
দাদা।
পিতৃপুরী যদি পবিত্র কর্তে পারি, তবে জীবনে আমার কোন আশাই
অপূর্ণ থাকলাে না। ঠাকুর দাদার আমলে এ বাড়ীতে পূজা হ'তে
শুনেছি, বাবার বড় ইচ্ছ ছিল, পূজা করবার ! শারদীয়া উৎসবের মতন
উৎসব হিন্দুর আর নাই।
(খ্যাপা গোসাই গান করিতে করিতে প্রবেশ করিলেন।)
খ্যাপা। (গীত) মা তাের মায়াকে নে ডেকে !
খেলা দিয়ে ভুলাইয়ে আমায় ফেছে পাকে।
মহেশ। এসাে দাদা! এসাে !
খ্যাপা। (গীত) মায়ার থােকা বানিয়ে বােকা ফেছে রিপুর মুখে।
মায়া বেটী হেসে কুটি, বিপুর রােখা দেখে।
মহেশ। আজ যে গানের ফোয়ারা ছুটে গেল। বসে নাও দাদা।
খ্যাপা। তােমার শুনতে ভাল লাগছে না, আমার গাইতে বড়
ভাল লাগছে।
(গীত )
বিষম খেলা খেলছে মায়া আশার নেশা দিয়ে
নেশা একবার ছুটলে আমার মাতায় পিছে পিছে থাকে।
পাগল বড় ভয় পেয়ে মা, মা মা বলে ডাকে।
(তাের) মায়ার ডুরি কাটতে আমার রক্ত উঠছে মুখে।
মহেশ। আজ আমার বড় আনন্দের দিন, তুমি ত সদানন্দ,
তােমায় পেয়ে আমার আনন্দ আজ আরও বেড়ে গেল !
খ্যাপা। তাই ত সুধু মুখে আনন্দ! বি. এ পাশ ভাইয়ের হয়েছে
চাকরী, দুট চারূটে মিষ্টান্ন ছড়াতে হয়, মিষ্টান্নমেতরে জনা ! কি বল
বউ না !

প্রথম অঙ্ক । দয়া। ( প্রণাম করিয়া ভিতরে চলিয়া গেলেন ) খ্যাপা। আর এক দিন তােমার বড় আনন্দ হয়েছিল ভায়া, যে দিন গণেশ কলকাতা থেকে সােণায় ঢাকা পরীর মতন বউটী এনে ঘর আলাে করেছিল ! আর এই আনন্দ বৃক্ষে ফুল ধরেছিল, যে দিন গণেশের বি. এ পাশের টেলিগ্রাম খানা হাতে পেয়েছিলে। মহেশ। সত্যি, গােসাই। এই ত আমার আনন্দ ? এই দুটী ভাইকে নিয়েই ত সংসারে মাথা দিয়েছি, জীবনের লক্ষ্য ভাই দুটীকে মানুষ করবাে। আজ আমার সেই আশা পূর্ণ হতে যাচ্ছে, আমি যে রাজত্ব পেলেও এর চেয়ে সুখী হ'তাম না। খ্যাপা। তবু একটু দুঃখ রয়ে গেল, পরেশ তােমার মনােমত মানুষ হলাে না। মহেশ। না দাদা, পরেশ মানুষ হবে, তাতে আর আমার সন্দেহ বােধ হয় গণেশের চেয়ে পরেশই মানুষ হবে খাটি, সে পেয়েছে খাটি গুরু। তবে দুঃখ একটা, আমাদের মা যদি আর গােটা কতক বছর বেঁচে যেতেন, কত কষ্ট পেয়েছেন, অপগও আমাদের নিয়ে । খ্যাপা। হয় ত, ভাগের মা হয়ে, তার গঙ্গা পাওয়াই ভার হতাে। এখন কি মায়ের আর সে মান আছে ? বিশেষ যেই পুত্র বধূ যরে আসেন তখন ত মা দাসী হয়েই পাড়ন। কেনই বা পড়বেন না । এখন ত আর কেউ শুধু শাখা সাড়ী পরা বউ ঘরে আনতে চান না। বউ আসেন গা ভরা সােণা নিয়ে, তার সঙ্গে দু’ পাচ হাজার টাকা। এমন দরের বউ কি শ্বশুর শ্বাশুড়ীর সেবা কর্তে পারেন, না, উনুনের আঁচে বসে ননীর অঙ্গ উনিয়ে ফেলতে পারেন? ঘর নিকেন বাসন মাজা দূরের কথা, স্বামী বেচারীর চাকর বামন রাখার শক্তি থাকে ভাল, নইলে আপন মাকে দাসী করে দেওয়া ছাড়া আর উপায় কি; আঠার নাই।

১৪
দাদা।
বিশ বছরের বউ মা লক্ষ্মীর শরীরটা নেহাৎ খারাপই থাকে, ষাট বছরের
বুড়ী মার শরীরটা কেন খারাপ থাকবে । আর একটা গান গাই,
কি বল ভাই ।
।
( গীত )
দেশের দশা দেখে বুক ফাটে।
বউটী বসে নভেল পড়েন, মাটী কুড়ান থুটে।
বউ পরেছেন সিল্কের সাড়ী, মতির মালা হীরার চুড়ী,
বাধা দিয়ে বাপ বেচারীব সাত পুরুষের ভিটে।
সায়া সেমিজ গাউন জ্যাকে বউ এসেছে এটে।
হাড়ি বেড়ীর ঠন্ ঠনি কি সে রাণীর করে খাটে ।
মাহশ। তুমি কি দাদা এই আধুনিক সভ্যতাকে একবার কিছু
বলতে চাও। তুমিও ত ইংরেজী শিখে পণ্ডিত হয়ে ছ ।
খ্যাপা। যখন শিক্ষার কোনও পথ নেই, তখন ঐ পথে চলা
ছাড়া আর উপায় কি ; তৰে ওতে যতটা মানুষ হয়, অমানুষ হয় তার
চেয়ে বেশী ।
(গীত )
ত্রিশ টাকা রুজি যাহার, তিনশ টাকার নেশা তাহার,
ভাতে মরার সাজে বাহার, চমৎকার ঢং বটে।
ভাতের থালা ঢাকাই থাকে, সাজেই ওজন রটে।
হায় রে আমার সােণার বাংলার কি আছে ললাটে ।
( দয়া দু থালা খাবার লইয়া প্রবেশ করিয়া স্বামী ও
অতিথিকে পরিবেশন করিলেন।)

প্রথম অঙ্ক। খ্যাপা। (খাইতে বসিয়া) গীত গাগল বলে বউ মা লক্ষ্মী, তােমায় আমি করছি সাক্ষী, বউ আছ মা হতে হবে, তাও কি মনে ওঠে। তখন ছেলের ঘরে পেটের অন্ন জোটে বা না জোটে হয় ত ছেলের ঘরে খেতে হবে বউএর দাসী খেটে । দয়। কেন ঠাকুর? আমরা কি শ্বশুর শ্বাশুড়ীর সেবা করি না। খ্যাপা। যা করেছ তােমরা করেছ। তােমরা যে শাখা শাড়ী মাত্র নিয়ে বাপের বাড়ী থেকে এসেছ, তুমি গরব করবে কি নিয়ে । তুমি কোনও দিন বাঁবুর বিবি হয়ে বাসায় বাসও করনি, তােলা জলে ‘নেয়ে বামনের রান্না খেয়ে কবিতা লিখতেও শেখ নি । হাল আইনের কি জাবে মা। বাঃ! বড় ভাল লেগেছে ত এই নাড়গুলি ! এই পেটুক কাঙ্গালটাকে শাকের ভুই দেখালে মা ! দেখ ভাই, মহেশ বাবু, আমার একটা বিশেষ গুণ, আমায় খেতে ডাকলে আমি এক বারও না বলি না। কি বল ? সে দিন মুখুয্যে বাড়ী যেতে রমাকান্ত একটু জলযােগ কর্তে বল্লেন। দিলেন দুটা সন্দেশ আর দুটী রসগােল্লা । আমি ত আঁতকে গেলাম। মিছি মিছি উদর টাকে খেপিয়ে নেব ? লজ্জা জিনিষটা ত, গীতার সূত্র পড়েই ছেড়ে দিয়েছি, বল্লাম চারটে চিড়া মুড়ি দাও না, আম কাটালের সময়। তার পর এক থালা কাঠাল। হা মহেশ, রমাকান্ত বাবুর সঙ্গে তােমার যেন খুব আড়াআড়ি বাধবে । কেন আমি তার কি করেছি ; খ্যাপা। মানুষ সাপের কিছু করে না, তবু তাড়িয়ে আসে কেন ; মহেশ। তা আর কি করূবাে। আমি এখন তাকে অত ভয় করি না। আমার ভাই দুটীও মানুষ হয়েছে। তুমি আশীৰ্ব্বাদ কর দাদা খ্যাপা। খুব সুখের ভুল বটে। তােমার দেনাগুলি শােধ করে ফেল।

দাদা।
মহেশ। রমাকান্ত বাবুর কিছু দেনদীর আছি বটে।
( পরেশকে তাড়িয়ে গণেশের প্রাশ।)
পরেশ। দাদা! দাদা!
মহেশ। কি হয়েছে ? ছিছি! এখনও তােরা এমনি মারামারি
করিস্ ?
গণেশ। আপনি পরেশ ছাড়ার মাথাটা খেলেন। আদর দিয়ে
দিয়ে একবারে বাড়িয়ে তুলেছেন।
মহেশ । কেন কি হয়েছে ?
গণেশ। আমি সেই দুটোর সময়ে ওকে বাজারে পাঠিয়েছি,
আমার চা ছিল না, তাই দুপয়সার চা আনতে, আর ও এই ছটা বাজিয়ে
ঘরে আল ।
মহেশ। কেন পরেশ ? এত বিলম্ব করলি কেন ?
পরেশ। বাজারে একটা লােকের বড় ব্যাম, তাকে নিয়ে একটু
বিলম্ব হয়েছে।
গণেশ। শুনলেন পরেশটার বেয়াদবি ? আমি পাঠালাম চা
আনতে, আমার চা পানের সময় বয়ে যায়, আর ও কিনা কোন বাজারের
লােকের ব্যাম দেখতে গেল। বলি, ভাত কাপড় কি তােমার বাজারের
লােকে যােগায় ?
খ্যাপা । তাইত, মেঝ বাবু যে বড় চটে গেছেন, লােকটা মরূতে
পড়েছে, তার ওষুধ পথ্যের ব্যবস্থা কর্তে গিয়ে, বাবুর চা পানের সময়টা
সরিয়ে দিলে । কি অন্যায় ।
গণেশ। দেখ গোঁসাই ঠাকুর, যখন তখন অমন বাড়াবাড়ি কর্তে,
এসােনা। যার চাল নাই চুলাে নাই, তার ওসব সাজে। সবাইত ন্যাড়া
নেড়ীর দলে ভিড়তে পারে না।

প্রথম অঙ্ক।
১৭
মহেশ। ছি ছি! গণেশ, কি কচ্ছি! ওঁকে চেন না! দেবতার
চেয়ে ওঁর উন্নত প্রাণ, এখনই পায় পড়ে ক্ষমা চা।
গণেশ। ও সব আপনি করুন। অমন সাধু সন্ন্যাসীর ভণ্ডামি
আমাদের ভাল লাগেনা।
( প্রস্থানে উদ্যত )
খ্যাপা। কেন যাচ্ছ বাবু? দাঁড়াও একটু। শুক্লাম তােমার
চাকরী হয়েছে। তুমি সুশিক্ষিত যুবা, এখন উপার্জনক্ষম হলে, আমরা
দীন দরিদ্র প্রতিবাসী, তােমার কাছে অনেক আশা করি। গণেশ বাবু,
প্রত্যহ চায়ের টেবলে বসে, একটীবারও মনে করাে, তােমার গ্রামের বন্ধুর
দারূণ গ্রীষ্মে পানা পুকুরের পচা জলে তৃষ্ণা নিবারণ কচ্ছে, সহরের পাকা
রাস্তায় হাটতে হাটতে একটু ভেবে দেখাে, যেখানে তুমি ভুমিষ্ট হয়েছ,
সে খানে সারা বৎসর ম্যালেরিয়ার মহামারি চছে। নগরের সাজ সজ্জা
চাকচিক্যের মধ্যে ডুবে গিয়ে, ভুলে যেওনা এই দীন পল্লী কুটীর গুলির
কথা । এখানে সকলে দু’সন্ধ্যা পেট পুরে খেতে পায় না, অনেক কুটীরের
বর্ষায় ছাউনি যােটে না। প্রায় অর্ধেক মৃত্যু চিকিৎসার অভাবে ঘটে
বাজারে কার অসুখ রে পরেশ ?
পরেশ। মানিক ঝাড়দারের কলেরা হয়েছে, আমি দুজন সেবক
সেখানে রেখে এসেছি। আপনাকে খবর দিতে যাব ভাবছিলাম ।
খ্যাপা। আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। (প্রস্থান)
গণেশ। এই খ্যাপা গোসাইত সন্ন্যাসী হয়ে পাহাড়ে গিয়েছিল।
এখন আবার দেশে এসে ঘর বাড়ী পাতিয়েছে দেখছি।
মহেশ। ওনি বলেন, কৰ্ম্ম নইলে সন্ন্যাস হয় না। কৰ্ম্ম লােক
সেবা, তাই দেশে এসে সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠা করেছেন।
গণেশ। লােকটা গাজা গুলি খায় ?
মহেশ। ছি। চিনি না ওঁকে ?
( প্রস্থান)

তৃতীয় দৃশ্য।
রাস্তায় পরাণ মণ্ডল ও কানাই পাল।
?
কানাই। কোথা যাচ্ছিল পরাণ ? ভাল আছিসত ?
পরাণ। আজ্ঞে,খুব ভাল না। ছেলেটার আজ ক’দিন গা নরম
করেছে। ছােট বাবুর কাছে একটু ওষুধ আনতে যাচ্ছি।
কানাই। ছােট বাবু কে ? পরেশ চক্রবর্ত্তী ?
পরাণ । আজ্ঞে হ্যা! ওরই দৌলতে বেচে আছি। মানুষ
ছােট, কিন্তু কাজে যেন দেবতা। আর বাবাজিত সাক্ষাৎ মহাদেব ।
কানাই। তাই তােদর যে খুব বাগিয়ে নিয়েছে। চাষা লােক
কি না, মহেশ চক্রবর্তীর চালাকি বুঝবি কি ? পরেশ ত মহেশের ছােট
ভাই ? তােদের নেলিয়ে খেলিয়ে আপন কাজটা হাসিল করে নিচ্ছে।
পরাণ। কি বলছ মশাই ? পরেশ ঠাকুরের নামে কুচ্চ কথা
ৰলাে না। পরেশ ঠাকুর আসল ঠাকুর, গরীবের মা বাপ। মহেশ ঠাকুর
ও ভাল মানুষ।
কানাই। ভাল পরাণ, এবার তুই ক্ষেত খামার কচ্চিত্ না ?
পরাণ।
কেন করবাে না ? ছেলেটার ব্যামো বলেইত আজ
ক’দিন মাঠে যেতে পারি না।
কানাই। তাের সেই ভাল জমি বল যে জীবন দাসকে কারকিত
কৰ্তে দেখলাম।
পরাণ। ও জমিত আমার নয়, জীবন দাসের। গেল বছর তার
ব্যাম ছিল, চাষ আবাদ কর্তে পারে নাই। তাই আমায় লাগিয়েছিল।
এবার সে নিজে চাষ কচ্চে।

১৯ দাদা কানাই । তুই জমিটা ছেড়ে দিলি ? এমন জমি কেউ ছাড়ে? জমিত নয়, যেন লক্ষ্মীর হাড়ি। গত বছর কি ধানটাই ফলেছিল। পরাণ। তা বলে পরের জমিত আর কেড়ে নেওয়া যায় না। কানাই । কেড়ে নেওয়া কি, জমিতে যে তাের দখলি স্বত্ব জন্মেছে। আইনত জানি না। অমন জমি ছাড়লে ভূমি দেবী যে কুপি হবেন। তুই আগে জীবন দাসকে বেদখল কর, তারপর আমি আছি। ঐ জমি যদি তােকে কায়েম করে না দিতে পারি, তবে আমি কায়েতের ছেলে নই। তােকে চিরকাল ভালবাসি তাই বলি, নইলে আমার কি মাথাব্যাথা। পরাণ। না মুহুরী মশাই, তা হয় না। জীবন দাসের সঙ্গে আমার ধর্ম সম্পর্ক আছে। সে আমার কাকা হয়। বাবার শ্রদ্ধের সময় এক মন চাল আর এক কাদ কাচকলা দিয়েছিল। আর বুক দিয়ে পড়ে কত খেটেছিল। তার ক্ষেতি আমি কর্তে পারি না। কানাই। ও সব ভাবলে কি আর বিষয়কৰ্ম্ম চলেরে ব্যাটা ? বীর- ভােগ্যা বসুন্ধরা। শাস্ত্ৰত জানি না। যুধিষ্টির রাজা একশ জ্ঞাতি মেরে রাজত্ব নিয়েছিল, বিভীষণ ভাই হয়ে রাবণকে সবংশে মেরেই রাজ্য ভােগ করেছিল। তা দেখ, ভেবে, জমিটায় এক গােলা ধান হয়। মােদ্দা ও জমিটা ছেড়ে দিলে লােকে তােকে মন্দ বই ভাল বলবে না। বলবে, পরাণ মণ্ডল নেহাৎ কাপুরুষ, ভয়ে দখলি জমিটা ছেড়ে দিলে। আর তুমি হচ্ছ নমঃ ঐ বীর জাতি, জীবন ত হাবা কৈবর্ত ! পরাণ। যে যা বলে বলুক, ধৰ্ম্মেত কিছু বলবে না। আরও ওর মালেক হচ্ছে মহেশ বাবু। মহেশ বাবু যদিও আমার মুনিব ন, তবু মুনিব চেয়ে বড়। অমন ভাল মানুষ কি আর হয় । উনি না থাকলে, মুখুয্যে মশাইত চা পাড়া এতদিন উজাড় করে দিতেন। আর মানুষ

দাদা।
ছােট বাবু পরেশ ! বা পােরা ওযুধ, গরীবকে বাচাতে । ঘর থেকে
পয়সা দিয়ে পত্যি কিনে দেয়। বিপদ আপদে পড়লে বুক দিয়ে পড়ে ।
এ সব লােকের সাথে আড়ি বাধিয়ে শেষে ধনে প্রাণে মারা যাব ?
কানাই। তা দেখ ভেবে, উকিল মােক্তারের জন্য তাের ভাবনা
ছিল না। মুখের কথায় দশ জন জুটিয়ে দিতে পারি। জানিস ত, হরি
নঙ্করের কত বড় মামলাটা জিতিয়ে দিলাম ।
পরাণ। মশাই, ও সব মামলা মােকদ্দমা থাক। আগে
ছেলেটার ব্যামাের একটা পথ করে নি।
ছেলের অসুখের জন্য আবার পরেশের কাছে যাবি
কেন? আমার কাছে এমন ওষুধ আছে, যা একবার খাইয়ে দিলে, দশ
বছরের জ্বর ভাল হয়ে যায় ।
পরাণ। তােমার সেই কষা শেকড় ? না মশাই, ও হবে না।
যে খেয়েছে, সেই ভুগেছে। শাস্ত্রী ওষুধ খেয়ে, দুদিন সবুরে সারে, সেই
কানাই।
ভাল ?
( প্রস্থান)
কানাই । (স্বগত) চাষা মহলে পরশা ছােড়া কি আশাই গেড়ে
নিয়েছে। পশারটা একবারেই মাটী করে দিলে। কোনও ব্যাটা আর
কাছে ঘেঁতে আসে না। এত বড় গ্রামটার ভিতর, না আছে একটা
দেওয়ানী, না আছে একটা শান্তিভঙ্গ। সব যেন সাধুর দলে ভিড়ে বসেছে।
সর্বনাশ কঞ্জে ঐ খ্যাপা ভােলা ব্যাটা ।
( জীবনে প্রবেশ)
এই যে জীবন যে। ভাল ত ?
জীবন। গোঁসাই গায় গতরে এবার ভালই রেখেছেন। তবে
বড় টানা টানিতে পড়েছি। গেল বছর চাষ আবাদের সময় আপনি

প্রথম অঞ্চ।
২১
খালাম তিন মাস বিছানা ধরা, দুটো বলদ মারা গেল। অর্ধেক জমিও
আবাদ হলো না। ধান বা পাইলাম, তাতে এসাে জন বসাে জন নিয়ে
এক রকম বছর কেটে যাবে। তবে মুনিবের খাজনা বাকি পড়েছে। বড়
বাবু সে দিন নিজে বাড়ী পর্যন্ত এসে গেছেন। তাই মশাইএর কাছেই
যাচ্ছিলাম। যদি মুখুয্যে ঠাকুরের কাছ থেকে আমায় গােটা পচিশেক
টাকা ধার করে দিতে পার। আমি এই মাঘ মাসেই শােধ করব, নিদেন
ফাকুন ।
কানাই। জীবন, পরাঃ মণ্ডলের সঙ্গে তাের কিছু মন কষাকশি
হয়েছে বুঝি ?
জীবন। কই না ? তেমন কি? সে যে আমার আপন জন;
কাকা বলে ডাকে, বাবার চেয়ে বেশী মানে।
কানাই। তােমার খামারের এক খানা জমি গত বছর পরাণকে
লাগিয়েছিলে?
জীবন। হা ! গেল বছর আমার ব্যাম ছিল কি না?
কানাই। এবার তা তুমি ছাড়িয়ে নিয়েছ?
জীবন। ছাড়িয়ে নেওয়া কি; সে যে নিজেই ছেড়ে দিয়েছে ।
কানাই। ঘঁা! ছেড়ে দিয়েছে। গেল বছর খুব ধান হয়েছিল ?
জীবন। তা হয়েছিল, পরাণ খুব যত্ন করে সময় মত জমিটা তুলে
ছিল। নইলে আমার বছরের ধান হতাে না।
কানাই। তাইত পরাণের লােভ বাড়িয়েছে। সে যেন একটু
গােল বাধাবে।
জীবন। বল কি ? পরাণের সাথে আমার গােল ?
থাকতে হবে না।
কানাই। তুমি ভাল মানুষ কি না, বংশে ভদ্রলােক। পরাণ

দাদা
হাজার হলে ও নমঃ, চাড়াল।
জীবন। আমার এমন বিশ্বাস হয় না। পরাণের সঙ্গে আমার
বিবাদ হলে আর রইল কি ? সে যাক, তােমায় যা বল্লাম । আমি আট
আনা মুহুরিমানা দেব ।
কানাই। কি ! টাকা? টাকার এত কি দরকার ?
জীবন। মুনিবের খাজনা দেব। বড় বাবু সে দিন নিজে এসে-
ছিলেন।
কানাই। তুই মহেশ চক্রবর্তীর প্রজা না?
জীবন। হ্য।। মুনিব আমার বড় ভাল মনুষ। এত গুন টাকা
বাজনা বাকি, একটা কড়া কথাও নাই । মেজ বাবুর বিয়েয়, অনেক
গুলি টাকা খরচ হয়েছে কি না, তাই তার টাকার টানা টানি, নইলে
আমার এ বদ হালে তিনি এবারকার খাজনা চাইতেন না ।
খাজনার টাকার জন্য আবার টাকা ধার করে কে ?
যখন পারবে, তখন দেবে ।
জীবন। তা কি হয় ? মুনিবের খাজনা না দিলে ভাত হয় ?
কানাই। দূর মুখ! সাধে তােমাদের চাষা বলে । খাজনা
দিলে না হয় মুনিবে নালিশ করবে। আদালত করে, কমি জবাব
দিয়ে বসলেই হলো। আজ কালকার আইন ত জানিস না ।
জীবন। কি বছ তুমি ? মালেকের খাজনা দেব না, নালিস
কলে জবাব দেবে? আমার তেমন মুনিবও নয়, আমি তেমন প্রজাও
নই। যাও, তােমার ছলা নিতে চাই না। টাকা ধার না পাই,
গােলার ধান বেচে দেব, তার পর খেতে না কুলায়, মুনিবের দুয়ারে গিয়ে
(পরাণের পুনঃ প্রবেশ )
পরাণ। খুব ভদ্র লােক দেখছি তুমি ! আমার সাথে জীবন

২৩
কাকার মন কসাকসি? আড়ালে থেকে সব শুনে ফেলিছি। এই কর্তে
বুঝি পাড়ায় ঢুকেছ ! জীবন কাকা! ব্যাটাকে গলা ধাক্কা দিয়ে ভাড়াও।
পাঁজি ব্যাটা সয়তান, যে খানে যাবে, শনি ওর পিছে পিছে ঢুকবে।
পিতাম্বর কাপালিককে মামলার ছলা দিয়ে তার হাঁড়ি শিকেয় তুলেছে,
আবার আমাদের পোঁদে এসে লেগেছে। কত টাকার দরকার তােমার ?
আমার কাছে টাকা আছে, আমি দিচ্ছি ! ওগাে ভাল মানুষের পাে !
এই রাস্তায় রাস্তায় সরে পড়, গায়ে ঢুকেছ কি অপমানী হবে। দুচো
ব্যাটা কোথাকার !
কানাই। হ্যা ! হঁ ! তা’ না, তা না। দেখলাম তোমরা
ভাল মানুষ কি না।
পরাণ। ব্যাটা কত বড় বেইমানী ! লজ্জা বলে নেই । সে
দিন গিয়েছিল, বিশু ঠাকুরের বিয়ের ঘটকালী কৰ্ত্তে, তা বামণি এমনি
ঝাটা পিটাই করেছিল। না আছে এমন ঘটে নেই। সরে বা ব্যাটা
কোটনা কোথাকার।
কানাই। ( মৃদু হাস্ত করণ।)
জীবন। ছি পরাণ, ভদ্র লােককে অমন বলতে নেই ।
পরাণ।
ভদ্র লােক ! ও আবার ভদ্র লােক !
কিসের ভদ্র
লােক ! মিথ্যাবাদী জোচ্চর কোটনা ! সরে পড় বাবা, পরাণের হাত
কিন্তু নিসপিস কচ্ছে। এ বামণীর ঝাটা নয়, চালের চড়। ইচ্ছে হচ্ছে
একটা চড়ে দাতগুলি খুলে দেই। পাজি ব্যাটা, ঘর ভাঙ্গা বিভীষণ ।
(খ্যাপার প্রবেশ )
(গীত )
খ্যাপা রঙ্গের নয়, মানুষ চেনা দায়।
মুরত খালি মানষের বটে, মানুষ সবাই নয় ।

২৪
দাদা।
t.
কেউ এসেছে ফুলে ঢাকা মুখটা হাসি ভরা,
জিবটী মিষ্টি মধু মাখা বুকে ঢাকা ছােরা।
ও যে সাপের জ্ঞাতি ভাই, চুলে রক্ষা নাই।
সাপের মাথার মণি দেখে প্রেমিক তাতে হয় ।
চুপটি করে বসেরে ভাই কেউ পেতেছে আড়ি,
লােকে বলে মহা জ্ঞানী বিদ্যা বুদ্ধি ভারি।
একবার শিকার পেলে মুখে, ঝাপটা দেবে রুখে
ও যে বাঘের দাদা সিংহের জ্যাঠা কেবল রুধির চাই ।
সাপের বাঘের কাটতে মায়া মন্ত্র শেখা চাই,
মন্ত্র শিখতে গুরুর পদে মনটী বাঁধ ভাই।
সে যে ওঝার রাজা, কালকে ও দেয় সাজা ।
পাগল বলে আমার কেবল মায়ের নামে জয়।
কানাই। প্রাতঃ প্রণাম! আহা! সাক্ষাৎ মহাদেব ঠাকুর।
{ পদ ধূলি গ্রহণ)
পরাণ।
চরণ ধূলি দাও বাবাজি। গুরুর কৃপায় আমরা সাপ
বাঘ চিনেছি। ওগো ভাল মানুষের পাে, সরে পড় বাবা। নইলে
সাপ হও, নড়ির বাড়ী, বাঘ হও, সড়কির খােচা।
কানাই। হঁ্যা। হা ! জীবন যেও, তােমায় টাকা দিয়ে
দেব !
( প্রস্থান)
জীবন । গোঁসাই এ দিকে এলেন কোথা হতে ? আমি না
থাকলে পরাণের হাতে পাল মশাইএর হাড় গুড়ো হয়ে যেত।
খ্যাপা। পরাণ ! বােষ্টম পাড়ার রাধা বােষ্টমীকে চিনি।
পরাণ। চিনি, সেই পাগল মেয়েটা, সুবল বৈরাগর মেয়ে!

প্রথম অঙ্ক
যার বাড়ীতে সেই মদনমােহন ঠাকুর! সুবল ত মারা গিয়েছে, বন্ধু
ভাল লােক ছিল, স্বর্গে গেছে!
খ্যাপা। ও পাগলা মেয়ে রাধা কিন্তু আসল রাধা !
জীবন। হা গা, বাবা ঠাকুর, সুবল গােলাই ত বিয়ে সাদি
করেনি। মেয়েটা এলাে কোথা থেকে।
খ্যাপা : বৃন্দাবনে গিয়েছিল সুবল, সে খানে কুড়িয়ে পেয়েছিল
মেয়েটা !
জীবন। মেয়েটাকে কেন বিয়ে সাদি দিয়ে গেল না সুবল
গোঁসাই ?
খ্যাপা । ও সব মেয়ের কি বিয়ে হয় রে ? ওর যে দেবতা ।
ওদের বিয়ে হয় স্বয়ং ঠাকুরে সাথে !
পরাণ। তা ঠিক, রাধা ঠাকুরাণীকে আমি ঠাকুরের সাথে কথা
বলতে শুনেছি। তাই ত আমরা পাগল বলি। বাড়ী বাড়ী গান
গায়, মুন্দিরে বাজার; বােজ সন্ধ্যায় ঠাকুরের বৈকালী দিয়ে পাড়ার
ছেলে ডেকে প্রসাদ বিলিয়ে দেয়। আচ্ছ। ঠাকুর গোঁসাই, এ সব টাকা
পয়সা রাধা পায় কোথায় ?
জীবন। ওর দুটো গাই আছে, খুব দুধ হয়, ওনি নিজে মাঠে
বসে গরু চরান। পাড়ার সকলে সে দুধ বেটে নিয়ে আসে। বেচলে
রােজ ২, টাকা হয়। মেয়েটা লক্ষ্মী না, ভগবতী।
খ্যাপা। সে যাই হােক, ওর বাড়ীতে একটু পাহারায় থাকতে হবে ।
পরাণ। কেন গোঁসাই ? ওর উপর কেউ অত্যাচার কর্তে
আসবে না কি ?
খ্যাপা । সে যাই হােক, এখন থেকে একটু হুসিয়ার থাকবে।
পরাণ। সে আর বলতে? এমন কোনও হারাম জাদা কেউ

দাদা।
যদি থাকে, পরাণের হাতে তার জান দিয়ে যেতে হবে। গোঁসাই,
ছেলেটার বড় ব্যাম। একটু পায়ের ধূলা দেবেন?
খ্যাপা। আচ্ছ; তােমার ছেলেকে দেখতে যাব। তােমরা
যাও, আমি আসছি।
( পরাণ ও জীবনের প্রস্থান ।
“মা তাের মায়াকে নে ডেকে ।
খেলা দিয়ে ভুলাইয়ে আমায় ফেলে পাকে ॥,,
( গাইতে গাইতে খ্যাপার প্রস্থান।

চতুর্থ দৃশ্য।
( রাধার ঠাকুর বাড়ীর প্রাঙ্গনে পল্লীবালকগণীৰ্ত্তন
গাইতেছিল। রাধা শুনিতেছিল।)
কীৰ্ত্তন
প্রাণ সখা হরি, প্রাণ মনােহারী শ্যাম নন্দ দুলাল।
অধরে মধুর হাসি, ফুকারে মােহন বাঁশী প্রেমানন্দ নিত্যগােপাল ।
হৃদয় কদম্ব মুলে এসো রসরাজ ।
প্রেমানন্দ রসময় আনন্দে বিরাজ।
( আমি দেখতে চাই শ্যাম ) রাই ভুলান বঙ্কিম ঠাম
প্রাণ জুড়ান পীয ষ হাসি । আমি দেখতে চাই শ্যাম।।
আমায় করে না বঞ্চিত।
রুণু ঝুনু নুপুর বাজে নাচ হরি মনন-মাঝে
আমি তােমাতে মােহিত।
{ আমায় দেখতে হবে ) জীবনের সাধ ও রাঙ্গা পদ,
( আমায় দেখতে হবে ) দেখাও চর কমল।
যাহে জাহ্নবী জীবন লভিল।
যদি বল আমি মন্দ হীন অভাজন,
তবে কেন বলে তােমায় পতিত পাবন ।
| পতিত থাকব কেন) পতিত-পাবন পদ-পরশে
( পতিত থাকেন।
ঐ ত বাজে মােহন বাঁশী, ঐ এলাে মাের কাল শশী অঙ্গের সৌরভ ছুটিল।
( আর কি থাকতে পারে। আমার হরি আমার ডাকে,
( আর কি থাকতে পারে। সে যে প্রেমেরই পাগল।

দাদা
!
মুখে নাচরে তােরা, হরি হরি হরি বলে
সুখে নাচরে তােরা, আজ হরিবােল, হরি পেলাে।
হলাে জীবন জনম সফল।
( কানাই লালের প্রবেশ )
কানাই। আ হা কি মধুর ! কি মধুর : কৃষ্ণনাম কি মধুর।
ইচ্ছা করে এই খানে বসে কেবল হরি নাম করি, নয়ন মুদে ঐ বাঁক
রূপ ধ্যান করি। পারি না, সংসার পিছে লেগে আছে । কেমন আছ
রাধা ঠাকুরাণী !
রাধা। ভালই আছি
কানাই । আঃ! কি মিষ্টি কথা! প্রাণ শীতল হয় ! সাধে
কি এত বড় মানুষের ছেলে সরােজ বাবু পাগল হয়েছে। ধর্ম ! ধর্মে
পাগল করেছে তাকে। চেন রাধা, সরােজ বাবুকে।
রাধা। চিনি না ? খুব চিনি। সেই খুব সুন্দর পুরুষটা ।
কানাই। তার কি ইচ্ছা শুনেছ?
রাধা। বড় মানুষের কতই ইচ্ছে হয়।
কানাই। বড় সৎ ইচ্ছে তার ! তােমার ঠাকুর ঘরটা পাকা
করে দিতে তার বড় সাধ হয়েছে।
রাধা ! কাঙ্গালের ঠাকুর, কুড়েই ভাল থাকেন। দালান
কোঠায় তার কি ভাল লাগে ?
কানাই। না না, তুমি এতে আপত্তি করাে না।
ইচ্ছে, তাকে নিরাশ করা কি ভাল। দেখ, সরােজ বাবুর ইচ্ছা আছে
তিনি বােম ধর্মে দীক্ষিত হবেন। তােমাকেই হতে হবে তার গুরু।
কি বল রাধা !
রাধা। তাকে বলল, এ গুরুর বেত তার পিঠে সইবে না।
অন্যগুরু খুঁজে নিন্

প্রথম অঙ্ক।
কানাই।
কানাই। তিনি তােমার জন্য সব ছাড়তে, সব সইতে রাজি ।
এত তার অসীম দয়া দেখছি। তাকে বলল, এক গাছ
শ্যামা লতার মালা করে, তমাল গাছে ঝুলে পড়তে। নইলে তার এ
রাধা প্রেমের তুফান ঠাণ্ডা হচ্ছে না। এখন আর আমার সময় নেই,
গরু চরাতে যাব।
কানাই।
ওতেই সরােজ বাবুর প্রাণটা কালী হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি রাখাল রেখে গরু চরিয়ে নিতে। তার খরচের
এই দশটী টাকা দিয়েছেন।
রা। আহা! এতদূর! কিছু গয়না কাপড় পাঠান নি?
তােমার দয়া হলে,
রাধা। তাই ত, তাকে বলে তিনি ইচ্ছা ককূলে নিজে আমার
গরু চরাতে পারেন, অন্য রাখালে আমার গরু চরাতে পারে না।
রাধার রাখাল কেষ্টর মতন ধড়া চূড়া বেঁধে মাঠে মাঠে ঘােরা চাই।
( সুর করিয়া )
চৈত দুপুরে আগুন খরে, মাঠে চরাবে ধেনু,
তারই মাঝে মধুর রাগে ফুকরে উঠবে বেণু,
সেই রাগে ত অনুরাগে রাধার প্রাণ উদাসী।
সে যে আমার প্রাণের হাসি।
(প্রস্থান)
কানাই। পাগলা ছুড়ীটা দুষ্ট খুব। হবে, বাবা টাকার অসাধ্য
কিছু আছে ? মেয়ে বটে, যেমন রূপ, তেমনি গার! সাধে কি সমােজ
মজে গেছে! বুঝলাম লক্ষ্মী, রমাকান্ত মুখুয্যের জমিদারী তােমার পায়ই
( প্রস্থান)
ৰিকাৰে ।

পঞ্চম দৃশ্য।
মহেশের অন্তঃপুরে দয়া ও পরেশ।
দয়া। এইত, যে একা সেই একাই হলাম্। মেঝ বউ চলে গেল !
আজ যেন বাড়ীটা ফাকা ফাকা কচ্ছে। এখন একটী ছােট বউ থাকলে
কি এমনি ফাকা ফাকা লাগত ?
পরেশ। ছােট বউ বুঝি আর বাসায় যেতে পারত না? ছােট
বাবু তখনই অমনি একটা কবিরাজী ডিপেন্সারি ছেদে বস্ত গিয়ে
সহরে। কাজ কি বউ ঠাকুরূণ ওসব বাজে ঝঞ্চাট কুড়িয়ে ?
দয়া । মেঝ বউ, মেয়েটী বড় ভাল। সত্যি মেঝ বউ যেন ঘর
আলাে করেছিল; কেমন মিষ্টি স্বভাবটা ! কত মিষ্টি ছিল তার “দিদি”
ডাকটা। একে ছেলে মানুষ, তায় বড় ঘরের মেয়ে, যর কন্নার কাজ
জানে না ।এ কলাটা গিয়ে এখন কি সংসার ধর্ম করতে পারবে? মেঝ
ঠাকুরপােকে বল্লাম, কিছুদিন যাক, একটু ঘরকন্নার কাজ শিখিয়ে দেই
তা শুলে না। যাক আজ নিলেও নেবে, কাল নিলেও নেৰে। হাঁ !
ছােট ঠাকুরপাে, তােমাদের ব্রহ্মচারী ঠাকুরকে যে আজ ক’দিন দেখি না।
পরেশ। তিনি আজ ক’দিন আশ্রমে নাই। দক্ষিণ দেশে বড়
দুর্ভিক্ষ, তার জন্য ভিক্ষা কর্তে বেরিয়েছেন।
দয়া। আচ্ছা ! উনি শাক্ত না বৈষ্ণব ?
পরেশ । শাক্ত বৈষ্ণব ভেদাভেদ ওতে নাই। উনি সত্যধর্মী
সদাই শিশুর মতন সরল, তাই মা ডেকেই ইষ্টের আরাধনা করেন। আচ্ছ
বউ দিদি, তুমি তােমার ইষ্টকে কি বলে ডাকতে ভালবাস?
দয়া ; ইষ্টকে ইউ বলে ভাবি আবার কি

প্রথম অঙ্ক। রেশ। বুঝলে না ? কেউ বলে হরি, কেউ বলে কালী, কেউ বলে গােপাল, কেউ বলে শিব । ভক্তের কাছে ভগবান, ভক্তেরই মনােমত ভাবে প্রকাশিত। তুমি হচ্চ মা, গােপাল ভাবেই ভগবাকে ভাবা তােমার সহজ, মা যশােদা ত এমনি ভাবেই ভগবানকে পেয়েছিলেন। দয়। তাই ঠাকুরপাে তাই, আমি ব্ৰজ দুলালকে পুত্র ভাবে ভাবতেই সহজ মনে করি। কিন্তু মা যশােদার মতন প্রাণ-ভরা প্রীতি আমি কোথায় পাব ? পরেশ। অভ্যাস করতে থাক, অভ্যাসে সব হয়। আগে তুমি সকল ছেলেকে আপন ছেলের মতন দেখতে শেখ। হরিদাসকে যেমন ভাল বাস, বামন বাণী সকল ছেলেকেই তেমনি ভাবে ভালবাসতে শেখ হরিদাসকে একটী সন্দেশ বা একটু দুধের সর খাইয়ে তােমার যে আনন্দ হয়, ঐ ভিকারী ছেলেটাকে খাইয়ে তেমনি আনন্দ হবে। তখন আপন পর ভেদ কেটে যাবে। তবেই ত গােপাল আপন হবে। ( হরিদাস সহ রাধার প্রবেশ।) রাধা। (গীত) কুঞ্জের দুয়ার বন্ধ হেরে, হরি আমার কেঁদে ফিরে যায় । হায়! হায়! হায়! কি করিলাম ছার মানের দায় ! হরিদাস । এইত মা রাধা দিদি এসেছে : কত গান গাইবে । আমি সেই বাড়ীতে গিয়ে ডেকে এনেছি! আর কত ঠাকুরের প্রসাদ খেয়ে এসেছি ! কলা, পেয়ারা, শসা, বাতাসা ! দয়া। হাঁ! বােস রাধা। মেঝ বউটা চলে গেল, আমি কঁদ- ছিলাম। তাই ছেলেটা ছুটে গিয়েছে তােমার কাছে। বলে গিয়েছে, বিধা দিদি আলে তার গান শুনলেই তােমার মন ভাল হয়ে যাবে।

দাদা।
হরিসাস। হাঁ! মা, মেঝ কাকিমা আর আসবে না ?
দয়া। বালাই আসবে না কেন? পূজার ছুটিতে বাড়ী আসবে ।
হরিদাস। মেঝ কাকিমা বড় দুষ্ট।
দয়া। কেন তাের কি করেছে ?
হরিদাস। তার আতরের শিশি ভেঙ্গে দিয়েছিলাম, আমায় কত
কেছিল।
তা ববে না ?
হরিদাস। আমি কি ইচ্ছা করে ভেঙ্গেছিলাম ? হাত থেকে সরে
গেল। কাকা বাবু! আজ তােমার ঠাকুর ঘর খানি আমি ঠাক রাবা
দিদির ঠাকুর ঘরের মতন সাজাব। আহা কেমন সাজিয়েছে, রাধা দিদি
তার ঠাকুরকে! কত রকমের ফুল ।
পরেশ। আচ্ছা চল, এখন একটু পড়ে নাও।
হরিদাস। আজ কিন্তু তােমার সাথে আমি আশ্রমে যাব ।
শরেপ। আচ্ছা! ( উভয়ের প্রস্থান)
কেমন আছিস্ রাধা, আজ ক’দিনত আসি না?
রা। আমি কি করে মা! ঘরকন্নার কাজত কম নয় ?
দয়া। তাের আবার কিসের ঘর কন্না ! সে ধার ত তুই ধারলি
না! আচ্ছা রাধা ! তুমি একলাটা সেই গ্রামছাড়া আখড়া বাড়াতে পড়ে
থাক, তেমাের ভয় করে না ?
রাধা। আমি একলা থাকি কে বলে? আমি যার ঘর করি, সে
কি আমায় একলা থাকতে দেয় ? (হাস্য করণ ।
দয়। সেকি ! তুমি আবার কার ঘর করাে? তুই ত বিয়ে সাঙ্গ।
কল্পি না ?
রাধা । আমার বিয়ের কথা তুমি পােন নি?

প্রথম অঙ্ক
দয়া। কই তাের বরকে ত কখনও দেখি নাই।
রাধা। (খঞ্জনি বাজাইয়া গীত )
ঐত আমার বর !
বনমালী বংশী ধারী শ্যাম নটবর ।
সে যে আমার আঁচল ধরা, সদা অভিমানে ভরা,
আমি যে তার নয়ন তারা, আর সব আমার পর।
একটু যদি যাই আড়ালে, বুক ভাসে তার নয়ন জলে,
এমনি প্রেমের পাগল নিয়ে আমি করি, ঘর ।
দরা। রাধা তুমি সত্যিই রাধা।
রাধা। আচ্ছা দেখ বউ ঠাকুরূণ, আমি খুব সুন্দরী না?
দয়া। তােমার মতন সুন্দরী আমি দুটীত দেখি না।
রাধা। কেন? তােমাদের মেঝ বউ ঠাকরূণ ।
দয়া। সে ত সেজে গুজে সুন্দরী। তুমি বনফুলের মতন আপন
গৌরবে আপনি মাতােয়ারা, আপন সৌরভেই ভুবন মুগ্ধকর।।
রাধা। আমি কেমন সুন্দরী জান ? এই যেমন তােমাদের চিমনি
ঢাকা আলাে! এ দেখে কত পােকা ফড়িং ছুটে আসে, তারপর চিমনিতে
আছাড় খায়, আর পাখা পােড়া হয়ে জলে মরে। কেমন নয় ?
( খুব উচ্চ হাসি )
দয়। তাইত বলি, একলাটী থাকিস, তাের ভয় করে না?
রাধা। শুবে একটা মজার গল্প ! আমার যে পাকা ঘর, আর
সােনার বালা তাগা হার হ’তে যায় ! আহা, মুখুয্যে ঠাকুরের কি দয়া
আমার উপর ।
দয়া। কোন্ মুখুষ্যে! রমাকান্ত বাবুর ?
রাধা। দূর, সে যে বুড়ো! খােকা বাবুর।

38
দাদা।
রাধা ।
ও, তার ছেলে। শুনেছি, বড় দুরন্ত। রাধা, ওর অসাধ্যি
কিছু নেই। তাইত বলি, অমন তেপান্তর মাঠে একলাটী থাকিস। বড়
আয়ের কথা।
ভয় আমার ? না তার?
দয়া। হাজার হলেও মেয়ে মানুষ, মাটীর হাড়ি, টোকাট বাড়িটা
সয় না।
রাধা। কি বল না ! মেয়ে মানূষের এত ভয় ! কেন? তুমি
স্বামীর প্রণয়িনী সন্তানের জননী হয়ে তুমিও বল মেয়ে মানুষের ভয়? যারা
নাড়ী ছেড়া যাতনা সয়ে, সন্তানের প্রসব প্রতিপালন করে, ভগবানের সৃষ্টি
প্রবাহ অক্ষুন্ন রেখেছে, পুরুষ অভিধান করেছে তাদের নাম অবলা। মিথ্যা
পুরুষের দাম্ভিকতা মাত্র। হা হাঃ হাঃ! কি বলতে কি বলে ফেলেছি।
শােন একটা গান শুনাই।
(গীত )
সে যে আমার প্রাণের হাসি।
তারই হাওয়ায় হিয়ার কুঞ্জে ফোটে পুষ্পরাশি।
একলা পথে আঁধার রেতে তারই সনে দেখা,
তারই সনে এক সাথে এক গাছ তলাতে থাকা ।
সেই দিনেতে তারই সনে প্রাণ বেধেছে ফঁাসী।
আঁধার ঘরে এক দুর্দিনে জ্বল্লো নাক বাতি
ভরাবাদল মেঘের কেঁাদল কেউ ছিল না সাথী।
কোথা হতে ভাঙ্গা দীপটা সে জেলে দিল আসি।
সে যে আমার প্রাণের হাসি।( প্রস্থান)

দ্বিতীয় অঙ্ক।
১ম দৃশ্য।
।
সহরে গণেশের বাসা বাটীতে পরিমল উপন্যাস পাঠ
নিবিল্প । দাসী বিনােদা প্রবেশ করিল।
বিনােদা। আচ্ছা দিদিমনি। কেবলই ত বই পড়ছ, ঘরকন্নার
কাজত কিছু দেখলে না।
পরিমল ।
ওর আর কি দেখবে। ঠাকুরকে বলিস, একটু পুয়ের
চচ্চড়ি কর্তে, বাবু বলেছিলেন। জলখাবার তৈরী হয়েছে ?
বিনােদা। ল হয়েছে, চল না একটু মুখে দেবে।
পরিমল। না না, আমায় এখন খেতে হবে না। এই বইট। সারা
করে আর খাওয়া নেই। আহা, শৈবলিনী বেচারীর কি দুঃখ ।
বিনােদা। ওখানা কি পুঁথি দিদিমনি? রামায়ণ ? না বিদ্যে সুন্দর ?
পরিমল। ও সব কিছু নয়, এখানা হচ্ছে, বঙ্কিমচন্দ্রের চন্দ্রশেখর;
আহা শৈবলিনী বেচারীর দুঃখ দেখে বুক ফেটে যায়। বেচারীর দোষ
কি ? এমন রূপ, এমন গুণ, মনের মতন পুরুষে প্রাণ দিয়েছিল। তাকে
কিনা বুড়াে বামন চন্দ্রশেখর বিয়ে কল্লে। এমন হ'লে এমনিত হবে।
কেন বাপু? তাের এ সখ কেন! সমাজের মুখে আগুন।
বিনােদা। ওমা! তুমি দেখছি পুথি পড়ে পড়ে দেয়া হবে।
দেখেছ দিদিমনি, ও বাড়ীর ডেপুটী গিন্নী কেমন এক গাছ নেকলেস্
গ; ৮। আহা যেমন গড়, তেমনি, সাজ। দেখে চক্ষু জুড়ায়, তুমি
অ মন এক গাছা গড়ে নাও না দিদিমনি।
পরিমল। ডেপুটা গিন্নী মাসে পাঁচশ টাকা মাইনে পায়, তার
খি ত পরবেই। আমার কি অত সাজে?
*

দাদা।
বিনােদা। সাজবেনা কেন ? এমনই বা কি ? এখন পরবে না
ত পরবে কখন? এর পর খােকা খুকী হবে, খরচ বেড়ে যাবে । এখন
দুখানা জিনিষ পত্র করবে নাত করবে কখন? সত্যি দিদিমনি, অমনি
নেকলেস যদি তােমার গলে হত, তবে কি মানাত? ডেপুটী গিন্নী একে
গালফুলে গােবিন্দের মা, তায় আবার বুড়ী। তােমার বড় দিদির কেমন
ভাল ভাল গয়না দেখেছ ত ? তােমার বাবা যে কেন তােমায়
পাড়াগেয়ে বরের হাতে দিলেন ?
পরিমল । সে হবে, তুই যা এখন। আমার পড়ায় বাধা দিস না ।
এর পর বাবু অফিস থেকে এলে হবে না।
তা যাই ! বল্পে জানি কি ভাব ! তুমি যখন ঐ
সব ডেপুটী গিন্নী, মুনসেফ গিন্নী, উকিল গিন্নীদের সঙ্গে মিশে নিতি নেমতন্নে
যাও, তখন তারা আসে কত রকম রং বেরংএর সাজ পরে, তুমিত
যাও এই ন্যাড়া গায়ে, তখন সত্যি বলতে কি, আমাদের বড় লজ্জা করে ।
পরিমল। তা সত্যি, ওদের সঙ্গে মিশতে আমার বড় লজ্জা
করে। তা আর কি করবাে ! যেমন ঘরে পড়েছি। বাবা যা দুগাছা
চুড়ী বালা দিয়েছিলেন, তাই সম্বল।
বিনােদ। বাবু এত গুণ টাকা মাইনে পায়, তা করে কি ?
পরিমল । বাড়ীতে দাদার কাছে পাঠান। সেখানে যে এক
কুড়ী লােকের ভাত যােগাতে হয়। সে যদি দেখিস, । বােন ভাগনে,
মাসি, পিসি, খাবার সময় যায়গায় কুলােয় না ।
বিনােদ। তবেই তুমি করেছ । বুঝিয়ে দিতে পার না ? এমন
করে বাজে খরচ করে ফকির হওয়া কি ভাল! আমি আর কদিন ?
নেহাৎ তােমার বাবা বলে কয়ে পাঠিয়ে দিলেন, কিছুদিন থেকে তােমায়
একটু বুঝিয়ে সুজিয়ে মানুষ করে দিয়ে যেতে। আমার আর এ বাঙ্গাল

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৩৭
দেশ ভাল লাগে না। বােঝ মনি, আজ যেন চাকরী আছে। ভাল মন্দ
ত আছে, তখন কেউ কুলুবেনা, কেউ কুলুবেনা।
(গণেশ বাবুর প্রবেশ)
পরিমল। (ব্যাস্ত ভাবে উঠিয়া ) আজত খুব সকাল সকাল
অফিসের ছুটি হলাে। আজত মাইনে পাওয়ার দিন। ( স্বামীর বােম
খুলিয়া মুখ মােছাইলেন।
গনেশ। মাইনে পেয়েছি, নাও রেখে দাও। আসছে মাস
থেকে বােধ হয় গােটা পচিশেক টাকা বাড়বে।
টাকা বাড়বে। আমাদের ইনকি-
মেন্ট পাশ হয়ে গেছে ।
পরিমল। ঝি? জল খাবার সাজিয়ে আন। আর সরবৎটা
দিয়ে যাও। ঠাকুরকে বলল চায়ের জল চড়াতে।
বিনােদ; সরবত তৈরী হয় নাই; বলল নি।
পরিমল । বলিনি'; নিশ্চয় বলেছি।
বিনােদা। না, বল্লে কি আমার ভুল হয় ?
পরিমল। না হয় নাই বলেছি, তােমরা কি সৰ প্রসাদ পেতে
রয়েছ'? কেবল মুখে মুখে কথার জবাব !
গণেশ। যা’ফ ঝি, তুমি চা টা তৈরী করে নিয়ে এসাে।
( ঝি চলিয়া গেল।
পরিমল। এ মাসের মাইনের টাকা কটী কিন্তু আমি দেবাে না।
গণেশ। 'কেন? তােমার মাস হরা জলপানি দশ টাকা রাখ।
বাড়ীতে এবার একশ টাকা পাঠাতে হবে।
পরিমল।" তা পাঠাতে হয় পাঠাবে, আর কোনও দিন কি
চেয়েছি?
গণেশ। তা চাও নি, কিন্তু আজ এত জরুরি গরজ কিসে?

পরিমল।
সে বলবে, আগে বলল আমার কথা রাখবে ?
গণেশ। তােমার কথা কবে না রেখে থাকি? আগে বলােই না।
পরিমল। তিন সত্যি। আমার কথা রাখবে ত?
গণেশ। আহা, তাই হলাে, বল তােমার গরজটা ।
পরিমল। এবার আমায় এক গাছ নেকলেস গড়ে দিতে হবে।
গণেশ। এই বুঝি বড় গরজ ! কেন তােমার যে কড়ি হার আছে?
পরিমল । সে এখন পরতে লজ্জা করে। সে দিন সেই উকিলের
বউটা কি লজ্জাই দিলে। আমি আর দশ জুনের ভিতরে বার হবে না।
তুমি শুনে কষ্ট পাবে, তাই এতদিন বলি নি।
গণেশ। তাইত, দাদাকে যে এবার একশ টাকা পাঠাতে হবে ।
বাবার শ্রদ্ধের তিথিতে সামাজিক দের একটা ভােজ দেবার তার ইচ্ছে
হয়েছে ! এ যাবৎ তাকে ত বিশেষ কিছু দিতে পারি নাই। বাসা
খরচ, আসবাব পত্র করতে কুলিয়ে উঠতে পারি নাই।
পরিমল । আর আমাকে অনেক দিয়েছ
এইত দুটো বছর
তােমাদের ঘরে এসেছি, এর মধ্যে একটা নােয়র আংটিও কি আমায়
দিয়েছ ? আমার কপাল মন্দ, নইলে বাঙ্গাল দেশে আবাে কেন?
( রােদন )
গণেশ। ছি! ছি! কেঁদে ফেল্লে যে দুটো মাস আমায় সময় দাও।
পরিমল। থাক আমার কিছুতেই দরকার নেই। মরা বাপের
শ্ৰদ্ধ, এমন নয় যে গলা থেকে কঁচা নামেনি, না করুলে নয়। • বহরে
বছরে বার শ্রদ্ধে কে দু’শ পাচশ টাকা খরচ করে থাকে। আমরা
ত কোথাও দেখিনি। বাঙ্গাল দেশের সব আজগুবি। ভাল, এর আগে
তােমার দাদার বাবার শ্রাদ্ধ চলতাে কি করে ? নেহাৎ যেন বাবা,
সই সুপারিস করে চাকরীটী জুটিয়ে দিলেন। আমার অদৃষ্ট।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
গণেশ। দাদা পার্গেয়ে সেকেলে মানুষ, এ সব কুসংস্কার
সহজে ছাড়তে পারেন না।
পরিমল। তা কর, বাবার শ্রাদ্ধ কর, ভাজ ভাইপাের আদর
কর। আমায় বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দাও। আমার সেখানে দুটা
অন্ন যুটৰে।
(নেপথ্যে কানাইপাল। গণেশ বাবু, গণেশ বাবু।)
গণেশ। কে ? কে? বসাে, আসছি।
কানাই। ( প্রবেশ করিয়া') ভিতরে ঢুকে
পড়েছি, বেয়াদবি
মাপ হয়।
গণেশ। যাও ভিতরে যাও। (পরিমল সরিয়া গেলেন)
এসে দাদা। তুমি কোথেকে ?
কানাই। একটু শ্রীপাট নবদ্বীপ দেখতে যাব ভাবচি
সেখান থেকে একটু কালীঘাট মায়ের বাড়ীতেই একটী প্রণাম করে যাব
ইচ্ছা আছে। একটা হাইকোটের উকিল কি ব্যারিষ্টারের কাছেও
একটু দরকার আছে।
গণেশ। বেশ বড় খুসি হ’লাম, দেশের খবর কি?
কানাই। খর ভাল। তােমার দাদা ত এবার বাবার শ্রদ্ধের
বেশ আমােজন কচ্ছেন। যাবেত দেশে ?
গণেশ। দাদাত যেতে লিখেছেন, দেখি যদি চুটী পাই।
কানাই। যে ভায়া যেও, তােমার দাদা যে এবার কি কাণ্ড
বাধান, বলা যায় না
গণেশ। বাধা বাধি আবার কি
কানাই। তুমি ৰােধ হয় শােন নি। রমাকান্ত বাবু দল যােটাচ্ছেন,
যাতে তােমাদের বড়ীতে কোন সামাজিক না যায়।

৪ ০
দদি
গণেশ।না যায়, না যাক, ড্যাম সােসাইটী, যত যায়, ততই মঙ্গল।
কানাই। তা বটে, তবে এ সব বাধাবাধি কেন ? রমাকান্ত মুখুয্যে
গ্রামের বড় লােক, তার সঙ্গে আড় আড়ি কৰ্ত্তে যাওয়া কেন ? তােমরা
এখনও ত তার দেদার আছ।
গণেশ। এ কাজে কত খরচ হবে বলে বােধ হয় ?
কানাই। পঞ্চাশ টাকা কি পচাত্তর লাগতেও পারে।
গণেশ। দাদা যে তিনশ টাকার কথা লিখেছেন, আমার
কাছে দুশ টাকা চেয়ে পাঠিয়েছেন'।
কানাই। তা আর কেন চাইবেন না। চাকুরে ভাইয়ের কাছ
থেকে ঐ ভাবেই টাকা চেয়ে নিতে হয়। বাবার শ্রদ্ধে না লাগে, গিন্নীর
এক খানা গয়না না হয় এই ফাকে হয়ে গেল । ওতে কিছু ভেবাে না।
গণেশ। দাদা কি এখন বুড়াে বয়সে গয়না গড়তে মন দিলেন!
কানাই। কি জানি, পাঁচু শেকরাকে ত আনা গােনা, করতে
দেখতে পাই। মেঝ বউমার গা ভরা গয়না দেখে, বড় বউ ঠাকুরাণীর
কি দু একখানা গড়তে সাধ হয় না ?
গাণশ। আমাদের দেনার কিছু শােধ হলাে ?
কানাই। কই ? তারত কিছু দেখি না! শুনেছি, দেনা শােধের
ভারটা তােনার উপর ।
গণেশ। .. তাইত, দাদা বুঝে বসেছেন বেশ।
( চা আসিল, উভয়ে চা পান করিতে করিতে)
তাইত ! দাদা বােধহয়, আমার উপর চটে যাচ্ছেন ! মাসে ২২৫ টাকা
বইত তাকে দিতে পাচ্ছি না! তিনি হয়ত মনে কচ্ছেন, আমি দেড়শ
টাকা মাইনে পাই ! বিদেশে চাকরী করে খাওয়া যে কি ঝঞ্জাটু, তা কি
তারা বােঝেন?
/
:::::

দ্বিতীয় অঙ্ক। ৪১ --- কানাই। তা, তােমার উপর মহেশ দাদার একটু মন ভাই হয়েছে, তার ইচ্ছা ছিল না যে তুমি বাসায় পরিবার এনে, এতটা খরচ বাড়িয়ে দাও। তিনি ভাবছেন, দেনার দায়ে জমি জিরেট বিক্রী হয়ে যায়, তিন ভাইএরই যাবে, এখন থেকে কিছু পুজি পাটা গুছিয়ে নিতে পালে আখেরে কাজ হবে। গণেশ। কি জানি ? সংসারে মানুষ চেনাই দায় । কানাই। তােমরা হচ্ছ আধুনিক শিক্ষিত সরল-চিত্ত লােক। বিষয় কম্মের লােকের ভাব তােমরা কি বুঝবে ? এই রকম ব্যাপার ঘটেছিল আমার এক মামাত ভাইদের ভিতরে। ছােট ভাই বিরক্ত হয়ে দেশের বিষয় আসয় সব বড় ভাইকে লিখে দিয়ে গেলেন। গণেশ। তাতেই বড় ভাই তুষ্ট হলেন। কানাই। তুষ্ট অতুষ্ট কি ? ছছাট ভাই একবারে দেশ গায়ের সম্বন্ধ ছেড়ে দিলেন। ত্যাগ স্বীকার কম কল্লে না! নেহাৎ কম হাজার টাকার সম্পত্তি ছেড়ে দিয়ে, ভায়ের ঋণ শােধ করে দিলে । গণেশ। লােকটা বুদ্ধিমান সনেই নাই। কত আর পারা যায় ! সারা জীবন দাও, দাও, ঘ্যান্‌ ঘ্যান, তার চেয়ে এক দিনে সব অরিগেশনটা কাটিয়ে সুস্থ হয়ে সামন্দ কি! দুদিক সামলিয়ে আর কত পারা যায় । কানাই। তবে আসি এখন ভায়া ! গণেশ। না না, এখন যাবে কোথায়? আজ এখানে থাক। যাও বাহিরে গিয়ে কাপড় টাপড় ছেড়ে, হাত মুখ ধধাও গিয়ে আমিও কাপড় ছেড়ে আসছি ! ভাল মন্দ দুটো কথা বলবাে। আচ্ছা দাদা, পরেশটা এখন কি করে ? কানাই। ঐ যা করত, আর কি ? পাড়ার ডবকা ছেলেদের নিয়ে গান বাজনা আমােদ ফুর্তি; আর গোসাইর দলে ভিড়ে দেশ উদ্ধার।

১২
ফাদা।
গণেশ মদ গাজা ধরলে নাকি ?
কানাই। বিচিত্র নয়, দল 'বল ত তেমনই জুটেছে।
গণেশ। আচ্ছা, যাও দাদা,সুস্থ হয়ে নাও গিযে, আমি আছি ।
কানাই। আহা, তােমাদের প্রসাদেইত খেয়ে বেঁচে আছি ।
(স্বগত) ওষুধটা ধরিয়েছি কেমন? মহেশ চক্রবর্তীকে দমিয়ে না দিতে পারে
কি আর মায়ে ভাত করে খাবার যাে আছে? ভাই ভাই, ঠাঁই ঠাই হবেই
হৰে, আজ আর কাল ! ( প্রস্থান ।
( পরিমলের পুনঃ প্রবেশ ।
পরিমল। শুনলে কি? তুমি ভাবছ, দাদা আমার যুধিষ্ঠর !
গণেশ। তাইত, কিছুই বুঝলাম না, পরিমল।
পরিমল । আমিত বুঝেছি অনেক দিন। হাসি পায় আবার,
তােমার বৌ ঠাকুরাণীর মায়া বাড়ান ভাল বাসা দেখে, ঠাকুরপো বলতেই
অজ্ঞান।
গণেশ। ভাববার বিষয় বটে । অজস্ব আয় উপার্জন থাকত, যা
আবদার কৰ্ত্তেন, কুলিয়ে যেতাম। এমন সঙ্কীর্ণ উপার্জনে সকল দিক
বজায় রেখে চলা যায়না। কিন্তু দাদা করেছেন অনেক আমাদের জন্যে !
পরিমল। বাড়ী ভুইটাও অবিসম্বাদে ভােগ কচ্ছেন। এখানে
পাঁচ পয়সা একটা ডাব কিনে খেতে হয়। বাড়ীতে দু’শ টাকাব আব
কাঠাল নারীকেল কলা ফলে ।
গণেশ। যাক, ভেবে দেখি। সা জীবন টানা হ্যাচড়ার চেয়ে,
এক গনেই ছিড়ে ফেলা যেন ভাল। চল। ( প্রস্থান ।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় দৃশ্য ।
ঠাকুরঘরে শ্যামসুন্দর মূর্তির সম্মুখে পুষ্পভরণে সজ্জিতা
রাধা একাকিনী ।
;
রাধা। দেখেছ বঁধু কেমন সেজেছি ; সাজবাে না। তুমি যে সুন্দর
দেখতে ভালবাস ; তুমি আপনি সুন্দর কিনা? আমিও সুন্দর ভাল
বাসি ! সুন্দর মুখের সুন্দর হাসি, আহা কি সুন্দর ! বড় সুন্দর ভােমার
বশী ! তুমি বড় দুষ্ট ; ঘুমধােরে বাঁশী বাজিয়ে আমায় জাগিয়ে তােল !
তুমি মাঝে মাঝে আমায় লুকিয়ে থাক। আমায় বুঝি মনে ধরেনা !
আমি বুঝি সুন্দরী সুরূপা নই । আমি তােমায় মনের মতন আদর কর্তে
পারি না, তা বলে তুমি কি আমায় ছেড়ে যেতে পার ? গান শুনবে?
শােন ! বেসুর হলে হেসে আমার লজ্জা দিওনা ! আমিত তােমার মতন
গাহিতে পারি নে ! (গীত )
এসােগাে এসাে প্রাণ বধুয়া।
তােমারই তরে দেখ এ কুটীরে,
সিংহাসন রেখেছি পাতিয়া।
ভাঙ্গ। এ কুটীর দেখি, যাও বুঝি বধূ ফিরিয়া,
তুমি এসাে, ভেঙ্গে এ কুটীব কোঠা বাড়ী লও গড়িয়া ।
চীর বাস অঙ্গে হেরি যে ও নাক বধু চলিয়া
দাওনা তুমি হীরা মনি সােনা। ( বধুহে )
আমি রহিব সতত সাজিয়া।
( মত্ত অবস্থায় সরােজের প্রবেশ)
সরােজ। হৰা কি ?
রাধা। তােমার গান ভাল লেগেছে বুঝি।

১৪
দাদ।।
সােজ। গানটি। গানটি মধুময়। তার চেয়ে মধুময় তােমার
প্রাণটি।
রাধা। তুমি খুব মধুর সমঝদায় দেখছি! যেন মধুকর! এমনি
বােজ এসসা, গান শােনাব !
সরােজ। সুধু গানেও হয়না, প্রাণর্টির কথা বললা! প্রাণ দিয়ে
প্রাণ বাঁচাও পিয়ারী !
রাধা । এ প্রাণ ত পরের উচ্ছিষ্ট ! তুমি ব্রাহ্মণের ছেলে, উচ্ছিষ্টে
লােভ কৰ্তে কি আছে ?
সবােজ। না, আমি আর ব্রাহ্মণ থাকবাে না। বৈষ্ণব ধর্ম নেব :
রাধা।
বেশ ! আমি তােমার গুরু হলাম, তােমায় কৃষ্ণ নামে
দীক্ষিত করে দেবাে।
সরােজ। না রাধা, বাজে কথা নয়, আজ তােমার সঙ্গে একটা
রফা নিস্পত্তি হয়ে যাক। দেখ রাধা, আমি তেমায় বড় মানুষ করে
দেবাে।
রাধা।
ঐ খানে দাড়াও কুকুর, দেখ ছন এ দেবতার নৈবেদ্য !
সরােজ। নেহাৎ কুকুরই যদি হই, তবে দেবতার নৈবেদ্য আজ
কেড়েই খাব। ( অগ্রসর হইল।
রাধা । শান্ত হও সরােঙ্গ, মরণের পথে আর এগিওনা।
‘সমােজ। দেখ, আমি দেশের জমিদার ।
রাধা। বেশ।
সরোজ। আমি তােমায় যা ইচ্ছে তাই কর্তে পারি।
রাধা। ফিরে যাও সরােজ ঘরে, আমি তােমার পায় পড়ি,
মিনতি করি। অবােধ সন্তানের মায়ের মত আমি তােমার অপরাধ ক্ষমা
কছি! সচ্ছন্দে ঘরে যাও
'
*

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪.
সরােজ। সাবান দুষ্টা, যা তা মুখে আনিস না।
রাধা । তাইত, মায়ের ইজ্জৎজ্ঞান তােমার দেখি আছে।
কেন এ দুষ্পবৃত্তি, হে অবোধ সন্তান ?
সরােজ। যা থাকে কপালে! আজ তােমার একদিন, আর
আমার একদিন ! (রধাকে ধরিতে যাইয়া পদাঘাতে ভূমে পতিত হইল।
তৎক্ষণাৎ সরােজের অনুচরগণ উপস্থিত হইয়া রাধাকে আক্রমণ করিল।
রাধা।
। ঠাকুরকে আলিঙ্গন করিয়া দাড়িয়ে কি দেখছ প্রভূ!
এবারত রক্ষা কৰ্তে হবে। বাঁশী ছেড়ে অসি ধর; নইলে যে তােমার
রাখার মান যায়; মান গেলেত প্রাণ রাখবে না রাধা।
{ অন্যদিক হইতে পরেশ ও পরাণ মণ্ডল প্রভৃতি আসিয়া
আততায়ীদিগকে তাড়াইয়া সরােজকে ধরিল।)
পরাণ । হারামখাের পাজি ! আজ তাের শেষ দিন ।
সরােজ। এ ! এ্যা! কেও ? পরাণ ; আমি সােজ মুখুয্যে !
সরােজ বাবু! বড় বাবু।
পরাণ । কিসের বড় বাবু! তুমি কুকুরেরও অধম ।
টুকরা টুকরা করে বাওড়ে ভাসাব ।
সয়ােজ। পরণ আমি ব্রাহ্মণ ! ব্ৰহ্ম হত্যা করবে ?
পরেশ। একি সরােজ বাবু! এই কি ব্রাহ্মণের কাজ ? এই কি
ভদ্রলােকের কাজ ? এই কি বড় মানুষের কাজ?
সরােজ। তাই এবার আমায় মাপ করে। আর এমন কর্ম
করবােনা, অামি আজ থেকে গােসাই বাবাজীর শিষ্য হবে। এবার
রেহাই দাও।
পরাণ । রেহাই! তােকে আবার রেহাই ? হাড় গুড়া গুড়া
করবো, কাণ দুখানা কেটে নেব, তারপর ছাড়বে। হারামজাদ শয়ার
আজ কেটে

* * *
সরােজ। দোহাই ধৰ্ম্ম বাবা । পরাণ, ব্ৰহ্ম হত্যা করিস না।
পরেশ। সরােজ কান্ত! আর ব্রাহ্মণ বলে পরিচয় দিওনা। ব্রাহ্মণ
কুলের খুব মৰ্যাদা রেখেছ। তােমার মরণই মঙ্গল! কে আছ, তুমি
বিশ্বনিয়ন্তা। আর কেন এ বিশ্বলীলা! এ ভীষণ দানৰ-লীলার সংবরণ
কর; সৰ্ব্ব-সংহারী প্রলয়-বাত্যা বহিয়ে দাও। বিশ্ব সংসার প্রলয়
পয়ােধি জলে বিলীন হয়ে যাক।
( ভােলা ব্যাপার প্রবেশ।} -
খ্যাপা। (গীত) এ যে আনন্দ ধাম ধরা।
আনন্দময় দাড়িয়ে ধরে নিয়ে সুখের ভরা ।
আনন্দ-সিন্ধু মাঝে, আন কমল সাজে,
সদানন ভায় বিরাতে আনন্দে বিভােরা।
সেই আনন্দের বিষে ফোটে কোটি বসুন্ধরা।
সেই আনন্দের ফুলকি নিয়ে এমন রবি শশী গ্রহতারা।
ঐ যে দেখছ বিরাট আকাশ, আনন্দের বিরাট বিকাশ,
আনন্দের বইতেছে শ্বাস বিরাট বিমান জোড়া।
বইছে পন জলছে তপন, আনন্দে মাতােয়ারা।
আনন্দের বিরাট বীণা ওঝার ঝঙ্কার ,
পরেশ। একি! গুরুদেব কোথা হতে? আপনি না তীর্থভ্রমণে
গিয়েছিলেন।
খ্যাপা। গিয়েছিলাম ; যিনি ডেকেছিলেন, তিনি আবার ফিরিয়ে
দিলেন। কেন যাৰ তীর্থে? কিসের জন্য? পুণ্যের জন্য ? জন্মভূমি তীর্থের
কোল ছেড়ে আর কোন তীর্থে পুণ্য সঞ্চয় কর্তে যাব? আপন মায়ের
!!: হেড়ে আর কার দেবার আনন্দ পাল ও এই যে ছায়া শীতল শ্যাম
শশাভাময়ী কুসুম সুরক্ষুি , এইত আমার তীর্থ, এইত আমার
",

দ্বিতীয় অঙ্ক। স্বর্গ! এই যে তীর প্লাবনী তটিনীর বাপীযূষ ধারা, এইত আমার সুধা নিঝরিনী মন্দাকিনী। শত শত মহানগরী আমার পরী জননীর বক্ষপীযুষ পান করে, সম্পদে, শশাভায় গৱেঁ, ফুলে উঠছে। সে অট্টালিকা ধন সম্পত্তির মহাসমুদ্রের মধ্যে আমি দেখতে পেয়েছি, তাদের জীবন-প্রবাহের মূল প্রস্রবণ আমার পল্লী মায়ের বক্ষে! অবিরাম শশাষণ কচ্ছে। দুরন্ত রাক্ষস, ছেলেগুলি অবিরাম মায়ের বক্ষধা শশাষণ কচ্ছে, তবু তা (গীত) আপন মাকে ফেলে দুরে, যাব বা কোন পরের কোলে? মায়ের বুকের হে সুধা পরের কাছে কোথা মিলে ? মায়ের আদর কেউ জানে না, ছেলের দরদ কেউ বােৰে না, মায়ের মাটী আমার সােনা, পরের সােনায় মন না ভুলে। মায়ের বাতাস মলয় মাখা, মায়ের আকাশ মণি ঢাকা, মধুর সুধা ঝরছে আমার পঙ্গী রাণীর ফলে জলে। পরাণ । কি নাচ গান আরম্ভ কৰূলে গাের্সাই ? আগে এই জাত নাশা ৰামনটার কাঃ দুখানা কেটে নি, তার পয় আনন্দ করবে। খ্যাপা। এইত আনন্দের দিন ভাই। মায়ের মান রেখেছ, অনাথ। ভগনীর ধৰ্ম্ম রক্ষা করেছ, সতীর ইজ্জৎ বঁচিয়েছ, এর চেয়ে আনন্দের দিন আর কি আছে! ( রাধার প্রতি) রাধা ! মা আমার ? একি ? মা যে জ্ঞান হারা? পরেশ। আঁধাবে ভয়ে অচেতন। খ্যাপা। ভয়ে নয়, প্রেমে! মা যে আমার অনন্যাশ্রয় হয়ে হৃদয় দিয়ত প্রেমিকের আশ্রয় নিয়েছিল! মা! মা? (রাধারহাত ধরিলেন * •

৪৮
দাদা।
তি)
রাধা। (সম্বিত লাভ করিয়া । আহা! কত বড় লজ্জাটাই ঠাকুর
আমায় দিলেন। বড় বদ খেয়ালী পুরুষ যাই হক।
খ্যাপা । মা, আমরা সন্তান!
রাখী। বেশ, থাক, খাও দাও, আনন্দ কর।
খ্যাপ।। তােমার দুষ্ট ছেলে সােজকে ক্ষমা করে। ম।
রাধা। তা বেশ, ও ভাল হােক।
খ্যাপ। দাও ছেড়ে তােমরা সারাজকে। ( সবরাজের
সরােজ, যা ভেবেছ তা নয়। এজগৎ পাপের নয় ধৰ্ম্মের । মনের গতি
ফিরিয়ে দাও।
পরাণ। এক কাজ কবি ছােট বাবু। এই খোক' বাবুকে হাতে
পায়ে বেঁধে, বড় বাবুর দরজায় নিয়ে রেখে আসি। তিনি দেখুন তার
ছেলের গুণ পণ, আর মান ইজ্জং। কি বল ? গােসাই বাবাজি।
খ্যাপা।
যা হয় তােমরা কব। এখনও মায়ের আমার স সাব
জ্ঞান ফিরে আসে নাই। আমি একে নিয়ে ঐ কুটীরে যাই।
তবে তােমরা কিন্তু আর সরােজের গায়ে নখের আচড়টাও দিওনা।
( সকলের প্রস্থান)
1
তৃতীয় দৃশ্য
ৰমাকান্তের গৃহে গ্রামের প্রধান পণ্ডিত বাচস্পতি
ঠাকুরের সহিত রমাকান্তের আলাপ হইতেছে।
ৰাধা। কি বলেন, বাচস্পতি মশাই ? সাত পুরুষের মান যেতে
বসেছে, জাতি-ধৰ্ম্মত গিযেছে, আপনারা যদি এইসব কামে

দ্বিতীয় অঙ্ক। ৪৯ প্রশ্রয় দেন, তবে আজ বাদে কাল পরাণে নম বলবে, আমার বাড়ী পতা পেতে বােস ঠাকুর, আমি ব্রাহ্মণ ভােজন দেবাে। এ যে একাকার হলাে । বাচস্পতি। নিশ্চয় ! নিশ্চয়! একাকার, একাকার! কবে যে ভগবান অবতীর্ণ হয়ে, বেদ গায়ত্রীর উদ্ধার করবেন, তাই কেবল ধ্যান কচ্ছি! “ম্লেচ্ছনিবহ নিধনে ধৃতবানাসি খর করবালং’আহ! ভগবদবাণী কৰে সার্থক হবে। রমা। দেখুন, মেঝ ভাইটা বিয়ে কল্লে-কলকাতায় এক খ্রিষ্টানের মেয়ে,-ছােটটা রাধাৰােষ্টমীর উচ্ছিষ্ট খায় ! এতেও কি আপনারা বলবেন মহেশ চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ । বাচস্পতি। রাম ! রাম! পরেশ ত বেশ ভাল ছেলেই ছিল, তার এমন অধঃপাত ! পরেশ বেশ কবিরাজী চিকিৎসা করে, ডাকলেই রােগীর বাড়ী ছুটে যায়, পয়সা কড়ি ভিজিট ত চায়ই না, আমার দামটাও চায় না। রমা। তাই বলে ধৰ্ম্মটা খোয়াবেন ? আমিত মনে করেছি, দেশের উপকারার্থে একজন ভাল ডাক্তার এনে একটা ডিসপেনসারি করে দেই। পরেশ হাতুড়ে ছাড়া আর কিছু নয়। বাচস্পতি। তা বটে, তা বটে, তুমি মন করলে সকলইত পার। লক্ষ্মী তােমার উপর অনুকূল ! ছােট পুত্রটীর উপনয়ন কাৰ্যটাএবার- কার মার্গশীর্ষে সম্পন্ন করূব ভাবছি, মহেশ বলেছিল, একটা ব্রাহ্মণ মানবকের উপনয়ন সংস্কার বিধান করে পুণ্য সঞ্চয় কবে। রমা। কি বলেন আপনি?: জাতনাশা মহেশ চক্রবর্তীর দেওয়া উপনয়নে আপনার পুত্রের উপনয়ন হতে পারে? আমরা ভূরে আছি বাড়ীতে ওযুধের , t কেন? এ সব জমিজিরেট জমিদারী ত স্বধর্ম রক্ষার জন্য, সাধু ব্রাহ্মণ- দের পােষণ জন্য। বাচস্পতি। নিশ্চয়ই, স্বধৰ্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ, পরধর্ম ভয়াবহঃ ! কুলাঙ্গার ! কুলাঙ্গার ! মহেশ চক্রবর্তী কুলাঙ্গার । রমা। তবে আপনার নাম করে সামাজিকদের ভিতরে প্রচার করা যাক, মহেশের অন্নজল অখাদ্য, অস্পৃশ্য। কি বলেন ? বাচস্পতি। ফলাহারটা ভালই দিত। গ্রামবাসী খুব ক্ষুঞ্জ হবে। রমা। তার পরিবর্তে দুদিন বাদে আমিও কি লুচি সন্দেশের বন্যা ছড়িয়ে দিতে পার্বাে না? মােদ্দা মহেশকে যদি জাতিচ্যুত, পতিত কর্তে না পারি, তাহলে এদেশে আর বাসই করবােনা, কোন তীর্থবাসে বাবনবাসে গিয়ে থাকবে। আজ বলে যাবেন, আপনারা আমাকে চান, না মহেশ চক্রবর্তীকে চান ? বাচস্পতি। রাম ! রাম ! তােমার যখন এত নিৰ্বন্ধ ,তখন আর দ্বিধা কল্পে কি হয় ? মা কমলা তােমার অনুকূলা; গৃহিণীর বস্তাভাবে ভেবেছিলাম মহেশের বাড়ীতে সপুত্র পরিবার যে ভােজন দক্ষিণাটা পাব, তাতে এআত্যন্তিক অভাবের আপাততঃ নিরাকরণ হইবে। রমা। ঠাকুরাণীর এক ফোঁড়া সাড়ী আমি যে আনিয়ে রেখেছি। বাচস্পতি। রাম রাম ! তােমার লাল দাক্ষিণ্যশালী সদ্ধর্মনিষ্ঠ কজনই বা আছে ? (কানাই পালের প্রবেশ) রমা। এই যে পাল মশাই এসেছেন। কানাই একজন প্রকৃত নিষ্ঠাবান সৎশূদ্র, দেবদ্বিজে ওঁর অসীম : ভক্তি। শুনে দেখুন ওঁর কাছে মহেশের ভাই গণেশের ব্যবহার। কানাই। প্রাতঃ প্রণাম। আজ্ঞে স্বচক্ষে দেখে এসেছি। চক্ষু

দ্বিতীয় অঙ্ক।
;
কর্ণের বিবাদ মিটিয়ে দিয়েছি, হুবহু সাহেব বিবি দু’জন। বাবুর্চি
সাহেবের ইয়া দাড়ি, আমায় পেয়ে বাসায় নেমন্তন্ন, কত যত্ন। আছি
হয় শূদ্র, তা বলে দেখে শুনে স্লেজ্জের ভাত কিকরে খাই; ব্রাহ্মণ
অন্ন মাথার উপর থাক !
বাচস্পতি। রাম ! রাম! শ্রীবিষ্ণু! ঐবিষ্ণু! বাবাজির বাগানে
নাকি খুব বেগুন ফলেছে ?
বর। হঁা। আজই মালী নিয়ে দিয়ে আসবে।
বাচস্পতি। বড় পুত্রবধুটী
•বেগুণ পােড়া খেতে চেয়েছিলেন,
অন্তঃস্বত্তা কিনা; রামনারায়ণ । কমলা তােমার অনুকূল ! আসি
তবে। ( প্রস্থান)
রমা।
তার পর মঙ্গল ত কানাই !
কানাই। আপনার আশীর্বাদে মঙ্গলের চেয়ে মঙ্গল। দেখবেন
দুদিন সবুরে, আমি খাটি কায়স্থের বাচ্চা !
( ভােলা খ্যাপার প্রবেশ। )
রমা। একি ভােলানাথ গোসাই কি মনে করে ?
কানাই। প্রাতঃ প্রণাম বাবাজি।
খ্যাপা। গ্রামের সকল সামাজিকদের ডাক্‌ছেন, আমি বাদ
পড়লাম কেন, তাই জানতে এলাম।
রমা। বটে। গােয়েন্দাগিরি তশিখেছ বেশ! তুমি নাকি
সাধু সন্ন্যাসী মানুষ। তােমার এ সব ব্যাপারে কি প্রয়ােজন?
খ্যাপা। প্রয়ােজন, আমি এই পল্লীবাসী, ব্রাহ্মণ, পল্লীর মঙ্গল
অমঙ্গলের ভাবনা ভাবা আমার অবশ্য কর্তব্য
রমা। বেশ, আখড়ায় বসে ভাব গিয়ে।

দা। খ্যাপা। রমাকান্ত বাবু! তুমি এ গাঁয়ের প্রধান ধনবান ব্যক্তি, তুমিত এ গাঁয়ের রাজা হয়ে বসূতে পার। রমা। প্রজা হয়েই টিকতে পারিনা, আর রাজা। তােমরা আমায় রাজা বানাবার যােগাড়ই করেছ। সেদিনকার সরাজের অপমান ব্যাপারে তুমিই নেতা, সন্দেহ নাই। তুমি জান, সরােজ আমার পুত্র ! সে প্রতিহিংসা নিতে লক্ষ টাকাও আমার কাছে তুচ্ছ । কানাই। নিশ্চয়ই। যার প্রতাপে বাঘে ছাগে এক ঘাটে জল খায় ; তার উপর একি অত্যাচার। বড় বাবু নেহাৎ শিব, তাই এতকাল রক্ষা। খ্যাপা। আমি তার জন্য ক্ষমা চাইতে এসেছি! সে কথা লােক সমাজে ঘুণাক্ষরেও প্রচার হয় নি। তুমি ছেলে শাসন করবে এই মতলবে এরূপ করা হয়েছিল। রমা। কি স্পর্ধা! দেশের চাষা ছােট লােক, ডােম নমঃশূদ্র নিয়ে এই কাণ্ড! হতে পারে, বড় মানুষের ছেলে বয়সের দোষে একটা সামান্য অন্যায় কাজ করেছে, তার শাসন করবে পুরাণ মণ্ডল আর পরেশ চক্রবর্তী ! অপমানের বিষে, হিংসার আগুনে আবার বুক খাক হয়ে যাচ্ছে না? আচ্ছা, দেখা যাক। কানাই। মৰ্ম্মচ্ছেদী ব্যাপার! কি ভয়ানক! এর শাসন হওয়া চাই-ই চাই! এতক্ষণ ঘরে ঘরে আগুন জ্বলে নি, এটা বড় বাবুর অসীম সহিষ্ণু! খ্যাপা। চুপ রহ, অধম মােসাহেব। রমাকান্ত বাবু। আমার অতি বড় বিনয়, অকপট ভিক্ষা, গ্রামে অশান্তির আগুন জ্বালিও না। তুমি ব্রাহ্মণ, সমাজের শ্রেষ্ঠ বর্ণ, তায় ধনবলে আভিজাত্যশালী। তুমি গ্রামের নিতৃত্বগ্রহণ কর। অত্যাচারীকে দমন কর, পীড়িত নিগৃহীত

দ্বিতীয় অঙ্ক।
জনকে আশ্রয় দাও, সত্য ধর্মের বিস্তার কর। বৃথা অভিমানের বশীভূত
হয়ে দানববৃত্তির আশ্রয় নিও না । তােমার এই যে, ধন জন সম্পদ,
ষাকে তুমি অফুরন্ত মনে কচ্ছ, ও কিছুই নয়, দুদিনেই উড়ে ছুটে কোথায়
চলে যাবে। এ পল্লীতে তুমি ন্যায়ের আসন পেতে বসাে, আবালবৃদ্ধ
নরনারী তােমার আয়ত্ত হবে ।
রমা। চুপ রহ, লেকচার দিতে এসো না। মানে মানে সরে
পড়াে। কানাই, একটা দারােয়ান ডেকে ভণ্ডটাকে গলাধাকা দিয়ে
বার করে দাও।
খ্যাপা। তাইত, পতনের দিকে বড় বেশী ঝােত্ পড়েছে।
( গীত)
তুমি বনিয়ে গেছ ভেড়া।
মুখে বটে বটের পাতা, উন্ধে উচু খাড়া ।
চারিদিকে মন্ত্র জপা, রােশনচৌকি কিবা তােকা,
করতে তােমার দফা রফা, এত রােশনাই করা ।
ওত নয় পীরিতের গান, বলির মন্ত্র পড়া।
তােমার পশুলীলা ফুরিয়ে এলাে, এখনও তার পাওনি সাড়া না
যার কর্মফল, সে তা ভােগ করবেই। মহেশের দম্ভ সে সাধু,
সৎকর্মশীল,—এই অহঙ্কারে তার পতন নিশ্চিত। আর রমাকান্ত
ধনমনে অন্ধ, কাউকে চায় না বাড়তে দেখতে,তাই হিংসানলে তার দাহন
পতন অবশ্যম্ভাবী : আমার দম্ভ, আমি লােকহিত কামনায় যা করি,
তা অভ্রান্ত। তাই এই পতনের পথে আমি নিমিত্ত ! জয় জগদীশ্বরী !
তােমারই ইচ্ছ। ( প্রস্থান)
রমা। জ্বালিয়ে দাও, এই ভণ্ডতপস্বীর আশ্রম কুটীর! সেই
আগুনে একে জীবন্ত দগ্ধ কর! ( প্রস্থান)
.

৫৪
দাদা!
কানাই। এই ফাকে যা কিছু যােগাড় করে নিতে পারি।
বাজার নেহাত দমে গিয়েছিল, এই নিয়ে কিছুদিন তাজা হবেই
হবে।
(সরােজের প্রবেশ )
সরােজ। দাদা।
দাদা! যাই কর, একটা দিনের জন্য যদি রাধাকে
পাই!
!
কানাই। সেই লাতি খেয়ে, আবার ! ধন্য তােমার রাধা-
প্রেম!
সরােজ। যাই বল দাদা, রাধার লাল ঠোট দুখানির কথা মনে
হলে, আমার ক্ষীরের সন্দেশ আর রসগোল্লায় অরুচি ধরে যায় !
কানাই। তবে হবিষ্য আর কাঁচকলা ধর।
সরােজ। না দাদা, আসল কথা হচ্ছে,
পরেশের ঐ
চেহারাটায় ছুড়ী মজে গেছে । নইলে ওসব সতীপনা কথার কথা।
সে দিন আমার হীরের আংটীটে ইচ্ছা করে ফেলে এসেছিলাম, ওর
বাড়ীতে। ভেবেছিলাম চুরি গেছে বলে এজাহার করে, খানাতল্লাস
করিয়ে ধরে দেব। পর দিন দেখি তা আমাদেরই উঠানে পড়ে ! ব্যাটারা
খুব চালাক।
কানাই। আচ্ছা দেখা যাক।
দেখা যাক্। ( প্রস্থান)

দ্বিতীয় অঙ্ক।
চতুর্থ দৃশ্য।
মহেশের গৃহে মহেশ ও দয়া ।
মহেশ।
কি ব্যাপার! কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। গণেশ
লিখলে একশ টাকা পাঠাচ্ছি ! তার যে কোন খবরই পেলাম না।
আজ যে বিশ দিন হ'তে যায় ।
দয়া। তার কি কোনও অসুখ বিসুখ করলে ?
মহেশ। কি জানি। আমি খুব বিপদেই পড়লাম ! জিনিষ
পত্রের বায়না করে ফেলেছি, টাকার সংস্থান কিছু করিনি। গণেশের
একশ টাকা আসছে, নিজেও শতাবধি ব্যয় করেছি, বাকি একরূপ ধারে
থােরে কেটে যেত ! জমিদারের লাটের টাকাটা গেলে, নিজেরও
মাইনে গণ্ডা পাওনা আছে।
দয়া। আমার মনে হচ্ছে, মেঝ ঠাকুরপাের কোনও অসুখ
বিসুখ করেছে! আমার বড় ভয়ে যেন হাত পা সরছে না। তুমি
ছােট ঠাকুরপােকে পাঠিয়ে দাও।
মহেশ। তাইত, কোন্ দিকেই বা যাই । এদিকে রমাকান্তবাবু
সমাজে ঘােট কচ্ছেন। দেখি পরেশ ফিরে এসেই বা কি বলে। তাকে
পাঠিয়েছি, সামাজিকদের কাছে।
দয়া। আমার ত এ সব মােটেই ভাল লাগছে না। মেঝঠাকুরপাে
রইল বিদেশে, একাকী বিদেশে আছে কোনও আপদ বিপদে ঠেকল
নাকি কে জানে। আজ দশদিন পথ পানে চেয়ে আছি, মেঝ বউকে
নিয়ে মেঝ ঠাকুরপাে বাড়ী আছে, কত আহলাদে কাজ কর্ম করবাে !
মা কালী ! এ কি কর্ধে ?
( পরেশের প্রবেশ )
পরেশ।
কোনও সামাজিকই আমাদের বাড়ী আবে না।

দাদা।
কেন? আমাদের অপরাধ?
পরেশ। দেশের বড় লােক রমাকান্ত বাবুর যড়যন্ত্র। গ্রামময়
অপবাদ রটেছে, মেঝ দাদা অহিন্দুর মেয়ে বিয়ে করেছেন। কেবল
বিশ্বনাথ পুরােত বলছেন, তিনি ধনবানের অনুবােধ মানেন না, সত্যের
সম্ভম মানেন, তিনি অসবেন ।
মহেশ। বিশ্বনাথ গরীব ব্রাহ্মণ, রমাকান্তের ধন ধমকের ভয়
রাখে না ? তা যাক, এদিকে গণেশের যে এখন পর্যন্ত কোনও খবরই
পাচ্ছি না ! মনের আনন্দ স্ফ ৰ্ত্তি যে একেবারেই দমে আছে।
পরেশ। মেঝ দাদা বােধ হয় বাড়ীতেই আছেন, তাই চিঠিপত্র
লিখছেন না।
মহেশ। কি জানি? পিতৃ পুরুষের মনে কি আছে কি জানি !
পিতা ধর্ম পিতা স্বর্গ, পিতাহি পরমন্তপঃ, পিতরি প্রতিমাপন্নে প্ৰীয়ন্তে
সর্বদেবতাঃ ! ভােলানাথ ব্রহ্মচারীকে আসতে বলেছিলে ?
পরেশ। বলেছিলাম। তিনি কেমন উদাস ভাবে বল্লেন, যাব
সময় মত।
মহেশ। তাইত, তিনিও যেন আজ কদিন আমার আছে
ঘে’তে চাচ্ছেন না। নির্লিপ্ত যােগাচারী ব্রাহ্মণ, উনিও
গ্রাম্য দলাদলিতে যােগ দিলেন নাকি? প্রাণের ভিতর যেন অফ ৰ্ত্তি
নিরানন্দের আধার জমাট বেঁধে আসছে ! পিতৃপুরুষের না। দশজন
জ্ঞাতি বান্ধব নিয়ে আনন্দ করবাে ভেবেছিলাম, তা আর হলােনা।
মানুষ ভাবে এক, হয় আর। ভগবানের ইচ্ছা সব।
( গণেশের প্রবেশ)
পরেশ। এই যে, মেঝ দাদা এসেছেন।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
মহেশ। মা জগদম্বা ! ভেবে ভেবে হয়রাণ হচ্ছি, আসতে দেরী
হচ্ছে, একখানা চিঠি লিখলেই হত।
দয়া। আমিত তাই ভাবছি, মেঝ ঠাকুরপাে নিশ্চয়ই বাড়ী
আছে। আজই হরিতলায় পাঁচসিকার ভােগ দিতে হবে। ছােট
ঠাকুরপাে, পাক্কি পাঠাও, মেঝ বউ ৰােৰ হয় নৌকায় রয়েছে।
গণেশ। না, আর কার আসা হয় নি।
দয়া। সেকি, মেঝ বােউ আসে নি ? তাকে একলাটী রেখে এলে।
তােমরা কিযে বােঝ। বাড়ীতে যজ্ঞি, মেঝ ৰােউকে রেখে এলে! চল
ঘরে, মুখখানা দেখি শুকিয়ে গেছে। রাত্রিতে বুঝি খাওয়া দাওয়া
হয় নি।
গণেশ। হবে এখন, আগে শুনে নি ।
দয়া। ও আর এখন শুনবে কি ! রান করে কিছু খেয়ে দেয়ে
সুস্থ হয়ে নাও।
গণেশ। তারপর দাদা! এসব কি ব্যাপার!
মহেশ। বাবার মৃত্যু তিথি উপলক্ষে গ্রামের সামাজিকদের
একবার ডাব ভেবেছিলাম, রমাকান্ত বাবু যে গােল বাধিয়ে দিয়েছে।
বােধ হয় হবে না।
গণেশ। এ সব কেন!
মহেশ। সন্তান হয়ে পিতা মাতার উদ্দেশে কখনও কিছু
করি নি। পিতৃলােক তুষ্ট হইলে দেবলােক তুষ্ট হন, পিতৃ যজ্ঞের ন্যায়
বজ্ঞ নাই। পিতৃ মাতৃ আত্মার তৃপ্তি উদ্দেশে দশজনকে আহারে তৃপ্তকত্তে
পাল্লে, প্রাণে যে আনন্দ আসে, তা আর কিছুতেই আসে না।
গণেশ। এখন কি আপনার আনন্দ করার সময়।
মহেশ। নিশ্চয়ই। তােরা মানুষ হয়েছিল, এখন আমি

৮ে দাদা। আনন্দইত করুবাে। আমি মানস করেছিলাম, গণেশ উপজ্জনক্ষম হলে আমি আগেই বাবার উদ্দেশ্যে কিছু ব্যায় করবে। বাবা যখন মারা গেছেন, তখন তার জন্য আমি একমণ চাল ও খরচ কর্তে পারি নি। গণেশ। আপনি দেনা শােধের কি মতলব কচ্ছেন। মহেশ। পিতৃপুরুষের আর্শীবাদে দেনা আর আমাদের থাকবে কেন ? প্রতি বৎসরে সুদটা আমি শুবিয়ে রাখছি, এখন তুমি মানে শ’ টাকা করে দিতে পাল্লে বছর মধ্যেই দেনা শোধ হয়ে যাবে। কতই বা কেনা। গণেশ। আমি টাকা 'ব, আপনি দেনা শােধ করূবেন, খুব বুদ্ধি এটেছেন বটে। তার নমুনা ত এই দেখাচ্ছেন। আগে দেনাট। শােধ করে এ আমােদ ফুর্তি কল্লে ভাল হতাে না ? মহেশ। কি বলছিস গণেশ, তুইকি এতে অসন্তুষ্ট হচ্ছিস ? অমিত কোনও মন্দ কাজ কচ্ছি না। সকলের অগে দেবতার পূজা কৰ্তে হয় না? আমাদের যা উন্নতি, তা আমাদের বাবার পুন্যফলে । পুরুষের আর্শীবাদেই আমাদের সময় এসেছে, আগে পিতৃ কাৰ্য্য তৃ পূজা সম্পন্ন করে, অন্য কাজে হাত দেব । গণেশ। ড্যাম পিতৃপুরুষ ! কি প্রিজুডিস্। কবে পিতা মাতা নারী গ্যাছেন, তাদের চাল কলার পিণ্ডি খাওয়াতে হবে । এসব বাজে খরচে আমি নই দাদা। মহেশ। ছি ! গণেশ, ওরূপ বলতে নেই। পিতা মাতা প্রত্যক্ষ দেবতা : বাবার কথা তাের ভাল মনে না থাক, মায়ের কথা মনে অহে। অমন প্রাণভরা স্নেহ যত্ন কি আর কোথাও পাওয়া যায় রে ভাই! শত অপরাধে ও স্নেহময়,—রােগ যন্ত্রণায় অধীর-মরণের নিশ্বাস ফেতে ফেলতেও পিতামাতা চিন্তা করেন সন্তানের মঙ্গল ! মনে পড়ে দ্বিতীয় অঙ্ক। বাবার মরণ কালের সেই মুখখানি ? তােরই মুখপানে চেয়ে শেষ চক্ষের পলক ফেলেছিলেন । গণেশ। একটা বৃথা সেনসেটিব নেস ( Sensetiveness) মাত্র । তার জন্য এই তিন শ টাকা খরচের অয়োজন! টু স্পিক দি টুথ,। ( to speak the truth) এ রকম কল্লে আপনার সঙ্গে আমার বনিবনাও রেখে চলা দায় হবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা রােজগার করবে, আর আপনি এইভাৰে উড়িয়ে দেবেন। বা পুজি করবেন, এ সব আমি পেরে উঠব না। মহেশ। কি বছিস গণেশ ? তুই নেশা করে এসেছিস নাকি ! গনেশ। কি ইস্পার্টিনেন্ট ? ( impertinent) একজন ভদ্র- লােকের সঙ্গে কথা বছেন, তা বুঝে দেখবেন। মহেশ। হা অদষ্ট ! গণশ ! একি ! তুই আমার কত আদরের ভাই জানিস্ ? গণেশ। এমন আদর আমি চাহি না। ও সব আদর নয়, HalfpacaTAL ( Selfishness ) মেঝ ঠাকুরপাে, আমার মাথা খাও ঘরে চল। আর কথা বাড়িও না। গণেশ । কি বদারেশন ! আচ্ছা দাদা, পাঁচু স্যার আপনার কাছে কি টাকা পাবে ? মহেশ। গুরু-পুত্রবধূর মু দেখতে একজোড়া মাকড়ি গড়িয়ে ছিলাম, তার দুটী টাকা বাকী আছে । দেখুন, আমি ইডিয়ট নই, ( idiot) এজুকেটেড ম্যান। (Educated main) মহেশ : তুই এ সব কি বলছিস্ গণেশ? কে তােকে এ সব দয়া।

১০ দাদা। শিখিয়ে দিয়েছে? কে আমার সংসারে এমন শনি হয়ে ঢুকেছে? আমি যে অনেক কষ্ট করে, আপনি না খেয়ে, পরের ধারে বাঁধা হয়ে ভাইকে মানুষ করেছি, দুটো বছর যেতেও আষায় সময় দিলি না? গণেশ। ঐত কথা জুটিয়ে রেখেছ! আমার লেখা পড়া শিখিয়ে মানুষ করেছ। অবশ্য আমার বাবার কিছু ছিল না তা নয়। তা যাক তােমার ডেট (debt) আমি শােধ করে দিচ্ছি,আমিও আমার পৈত্রিক সম্পত্তির অংশ তোমার লেখা পড়া করে দিচ্ছি,সারাজীবন ওরূপ তাগিদ সহিতে আমি পারব না ! অত অরিগেশনে ( obligation) থেকে মানুষের জীবনে শান্তি পাওয়া যায় না। তার পর যা পারি সাহায্য করবাে। বাস্ তুমিও নিশ্চিন্তে থাক, আমিও হাপ ছেড়ে বাঁচি। পরেশ। কি বলছ মেঝ দা ! দেখছ না দাদার মুখের চেহারা ! ও সস্ত রক্তগুলো যেন মাথায় উঠেছে ! এ কি নিষ্ঠুরতা তােমার ! গণেশ। স্পষ্ট কথাই ভাল। দেখ আমরা রিফমড, ক্লাস্ ( reformed class ) cotatant 799 entretanto (uncultured) মূর্খদের সঙ্গে আমাদের কখনও গুড টার্মস্ (good terms ) থাকতে পারে না। দয়া। ঠাকুরপাে, আর কথা বাড়িও না। শ্রমকষ্টে মাথা খারাপ হয়ে গেছে, চল ঘরে চল। গণেশ। না না; এতে প্রত্যেকের ইণ্ডিপিণ্ডেন্স বজায় থাকবে যার যার ওজন বুঝে সেই সেই চলবে। দু’ হাজার টাকার বিষয় লিখে দিচ্ছি, এতে পুরাণ ঋণ অবশ্য আমার শােধ গেল। এখন বড় বউ দশখানা গয়না পরেন, বা মেঝ বউ পাচখানা পরে, কারুর দেখবার আবশ্যক নাই। মহেশ। গণেশ! গণেশ ! চুপ কর। আর না। আমার

দ্বিতীয় অঙ্ক।
খাস রােধ হয়ে আসছে। মাথা ঘুরছে, যা যা, আমার মুখ থেকে
সরে যা। ওঃ ! আমার যড় সাধের ঘরে আগুন লাগলাে। আমার
ইষ্টের আশীৰ্বাদ বজ্ৰ হ'য়ে শিরে নাম্লাে ! আমার এত সাধের সুখস্বপ্ন
আজ ভেঙ্গে গেল!
মা বসুন্ধরে, তুমি দ্বিধা হও, আমি তােমার বক্ষে
লুকিয়ে যাই।
( খ্যাপার প্রবেশ )
(গীত)
ছেলে পাশ করেছে বি-এ,।
কলেজ খরচ দিয়েছে বাবা বাস্তু বাধা দিয়ে।
গ্রাজুয়েট টাইটেল ধরা, এটিকেট রিফর্ম করা,
এ যে চোল ছেলের সেরা বিদ্যার বােঝা নিয়ে
পজিশনে ভারি বুঝি ব্যাস বশিষ্ঠ চেয়ে,
বুঝি স্বর্গ হতে দেবতা কেউ, এসেছেন সাপ ভ্রষ্ট হয়ে।
টাকা দিয়ে গুরুর কাছে, আপনার বুঝ বুঝে নেছে,
আপন ছাড়া আর কে আছে, সংসার আপনা নিয়ে,
আপনার বড় একজন আছে শ্বশুর মশার মেয়ে,
আর যত সব ভূতের বােৰা কাজকি ঝাট দিয়ে
জমা ছাড়া খরচ ভারি, চাকর বামন আসবার বাড়ী।
গিন্নীর সদা মনটী ভারি কতই আবদার নিয়ে।
বাবার শ্রাদ্ধ নয়কো বড় গিন্নীর মানের চেয়ে,
বাবার চেয়ে বউটী বহুৎ বড় লােকের মেয়ে ।
গাণশ ! এ কি ? বেয়াদব ইম্পাটিনেন্ট, ভদ্রলােকের বাড়ীর
ভিতর এসে এমনি গালাগালি করে গান গাচ্ছ ?
.
}

দাদা।
খ্যাপা। এও কি গালাগালি হলাে ? মানুষকে মানুষ বল্লে
কি তার গালাগালি হয়। পশুকে পশু বল্পে তার আপমান হয় ?
গণেশ । চুপ রও বেয়াদব, তুমি জান আমি তােমার নামে
ডিফামেসন কর্তে পারি? আমি একজন গ্রাজুয়েট।
খ্যাপা । তাত বটেই, কুলপাৰন পুত্র তুমি, ধন্য পতিত বাঙ্গালীর
ঘরে ! নেহাৎ অসার লতিয়ে বেড়ে যাচ্ছ, কবে গড়িয়ে পড়বে, বল।
যায় না।
গণেশ। হেঁদো কথা বতে জান বেশ দেখছি। তুমিইত
আমার একটা ভাইকে এমনি গােল্লায় দিয়েছ ।
খ্যাপ। ঠিক, আমি একটীকে গােল্লায় দিয়েছি, আর তুমি
একটীকে রাজা করে তুলেছ। ভাই গােল্লায় যাক, আর স্বর্গে চড়ক
তাতে তােমার কি
এসে যায় ভাই। সেক্স ছাড়াত তােমাদের হেল্প
করবার কেউ নাই।
গণেশ। থাক দাদা, আমি এখন আসি। এই চৈত মাসের
ভিতরই বিষয়ের কবলাটা রেজিষ্টারি করে পাঠাব ।
দয়া। ওগাে, মেঝ ঠাকুরপাে, ফের, ফের, আমার মাথা খাও,
দুটী খেয়েদেয়ে যা হয় করাে ! ( গণেশের হাত ধরলেন।
গণেশ। না না,—পথে আসতে সয়ােজ মুখুয্যে নেমন্তন্ন করেছে,
সেখেনে খেয়ে এই ট্রেনেই যেতে হবে। (হাত ছাড়িয়ে প্রস্থান)
মহেশ। উঃ! পৃথিবীটা যেন টলছে ! আকাশ যেন ঘুচ্ছে !
দীপ্ত সূৰ্য্য যেন আকাশে লুকোতে যাচ্ছে ! আহা হা! জীবন স্বপ্নময়
হয়ে যাওয়াইত সুখ ! কি হয় না? সেই যে আঠার বছর বয়সে
পিতৃহীন,অপগণ্ড দুটী ভাই, কি উপায়ে সে হ’তে এ পর্যন্তকার স্মৃতিটা
মুছে ফেলতে পারি ? এমনটা কি আর কারু ভাগ্যে ঘটে থাকে? বড়
৩

দ্বিতীয় অঙ্ক। বউ। বড় বউ, আমার মুখ থেকে সরে যা। তােকে দেখলে সেই কথাগুলি আমার বেশী করে এনে আসে। ভােলানাথ ব্রহ্মচারী ! দাদা। দেখতে এসেছ ? আমার আশালতার বিষফল ধরেছে, কণ্ঠের হার ভুজঙ্গ হয়ে দংশন করেছে, আশা করে যে সাধের ঘর বেঁধেছিলাম, আমার সে ঘরে আগুন লেগেছে ! তাই দেখতে এসেছ ! এমন কি আর কারু হয় ? উঃ! গণেশ কি চলে গেল.? দুটা খেয়েও গেল না। কি. এমন অপরাধ করেছি আনি! তােমরা ডেকে ফিরাও। অপরাধ করেছি, আমি তার কাছে ক্ষমা চার। চাইনা আমি. পিতৃকৰ্ম্ম দেবধৰ্ম্ম, আমি ভাই চাই! আমি সব ছাড়তে পারি, ভাইত ছাড়তে পারি ! ওঃ ! আমার কত আদরের ভাই ! ( মূৰ্জিত হইয়া পড়িলেন) দয়া। একি হলাে? একি হলো? ও ঠাকুরপাে? ও ঠাকুরপাে একি হলাে! খ্যাপা। জল আন। ভয় নাই! পতন তােমার হবে মহেশ জানি,—এত বড় পতন হবে তা ভাবতে পারি নাই । পরেশ। দাদা! দাদা একি হল! মেঝদা একি করে গেলে ! অবশেষে তুমি দাদাকে খুন করে চলে গেলে ! দাদার বড় কোমল প্রাণ। এ কঠোর আঘাত সহ্য হবে না। দাদা ! কেন অমন কচ্ছ? ভুলে যাও সব। মনে করাে গণেশ বলে তােমার কেউ ভাই ছিল না। যে ছিল, সে মরে গেছে। আমি আছি, -আমি তােমার ভাইএর সাধ মিটাব। তুমি আমায় জন্মভূমির কাজে দান করেছিলে। একটী রেখেছিলে নিজের জন্য। আর একটীকে দিয়েছিলে মা জন্মমাটীকে! আর আমি দেশের সেবায় যাব না। দেশের চেয়ে আমার দাদা বড়। দাদা! অশিক্ষিত হই, অসমর্থ হই,আমি দাসত্ব, কবুবাে, আড়কাঠির কাছে বিক্রীত হবো, তােমার স্নেহের ধার শােধ করবাে ।

!
**
মহেশ। উঃ! ( চৈতন্য হইল।}
খ্যাপা। এমন দুর্বল চিত্ত নিয়ে এত বড় আশার ঘর বেঁধে
সেছিলে !
মহেশ। আক! অমৃত বৃক্ষ বলে যত্ন করেছিলাম, ফল ধরলে
বিষ ! চুর্ণ হলাে আমার দত্ত অহঙ্কার ! দুরাশা ! এমনি কি সবারই
হয় ? ব্রহ্মচারী গোঁসাই ! তুমিত বিচক্ষণ পণ্ডিত ! বলতে পার এমন
কেন হলাে !
খ্যাপা। পারি বই কি! কিন্তু তােমার দুর্বল মস্তিষ্কে এখন কি
তা বুঝতে পারবে ।
মহেশ। পিরবাে । বলল ! বড় বউ, পরেশ তােমরাও শােন,
আমি না বুঝি তােমরা বােঝ ।
খ্যাপা । শােন। সকাল সকাল খাইয়ে, সাজিয়ে গুছিয়ে
আমরা ছেলে পাঠাই স্কুলে। ছেলে যদি স্কুলের পরীক্ষাটা ভালরকমে
পাশ করে যায়, তবে আমরা হাতে স্বগ পাই। তার পর তাকে
পাঠাই সহরের বড় স্কুলে, যার নাম কলেজ। সে হচ্ছে তেতালা কোঠা-
বাড়ী, সেখানে বিজলীর পাখায় হাওয়া করে। আর তার থাবার স্থান
মেল বা হােটেলগুলিও অতি সুন্দর। বাবা দাদা বাস্তু বাঁধা দিয়ে
খরচ যােগান, ছাত্র অবাধে আরামে বিদ্যা অর্জন করেন। সেই সঙ্গে
শিখে নেন, চা পান, সাবান আতর সেবন, আদব কায়দা, জামাজুতার
ক্যাসন আড়ম্বর। আর যে বিদ্যে, শিখতে যান তারা, তাতে দর্শন
বিজ্ঞান, কাব্য সাহিত্য সকলই আছে। কিন্তু সকলের আগে, সকলের
সঙ্গে মিশিয়ে শিখে চলতে হয়, self is all.,-আপনাকে সবার আগে
চিতে হবে। Survival of the fittest, যে যত চতুর সে
তত ভােগ করবার অধিকারী। Life is to enjoy.-জীবন
.
.

দ্বিতীয় অঙ্ক। ০ ভােগের জন্য, যারা এই বিদ্যের গুরু মশাই, তাদের এইটাই প্রয়ােজন, ছাত্রকে শিখিয়ে নিতে হবে, জীবন ভােগের জন্য। নইলে তাদের মনােমত গােলাম গড়ে উঠে না। পাঁচ ছ বছর এই শিক্ষার চাপে পড়ে, যখন ছাত্রের স্বাধীন মনােবৃত্তি, দেহের স্বাভাবিক শক্তি, চাপাপড়া গাছের মতন একবারে মুশড়ে গলে আসে, তখন আবার এম-এ, বি-এ, পাশের বামে এসে দাঁড়ান এক একটা ধনবানের দুহিতা। দরিদ্র গৃহস্থ কন্যাকে এম-এ, বি-এ, বর কিনে দিতে পারে না। অনঙ্গ শাস্ত্রে যাকে বলে, soul's far better part, তার সেবায় তখন বাবুর রক্ত-মজ্জা শুকিয়ে যেতে লাগে। যাক, আর একদিন বলব। তুমি নিজহাতে ভাইকে বিষপান করিয়ে পাগল করেছ, তার দোষ কি! এখন পার সংসারধর্ম চালাও, না পার দর্প অহঙ্কার ত্যাগ করে, ফকির হও। যাও বউমা, খাবার আয়ােজন কর গিয়ে। মহেশ। তাই বটে। পরেশ, সামাজিক না আসুক, অন্য লােক, নমাে পােদ বাগদী কৈবর্তে আসবেত! এখন টাকার কি? তবে এখনই যাও জমিদারের কাছারী বাড়ীতে। লাটের টাকা সিন্ধুকে আছে, আমি চাবি দিচ্ছি, খাজাঞ্চিকে বলো, সিন্ধুক খুলে দেবে, তা থেকে দু’শ টাকা নিয়ে এলো। আর কাছারীর সব আমলা, পেয়াদা নিমন্ত্রণ করে এসাে। আমি কি একবার গণেশের কাছে গিয়ে, তাকে অকপটে সব জানিয়ে আসবে ? খ্যাপা। নানা কোনও লাভই হবে না। তার এখন বড় প্রয়ােজন, তােমার হাত হতে নিষ্কৃতি পাওয়া। তার পদের মান, বিদ্যার মান, পত্নীর মান, সেই সঙ্গে তােমার মান রাখা তার দেড়শ টাকায় কুলায় না। এ সময়ে তোমার মায়া কাটান তার বড় প্রয়ােজন, এ সুযােগ সে ত্যাগ কর্তে পারে না। তার সহায় বান্ধবও জুটেছে!গীত +:

দাদা।
খলের অতিশয় কুর, তাহা বল কে না জানে।
এত যে সুখের সংসার, ছারখার তাদের কারণে।
সাপেতে কামড়ায় যারে, সেই মাত্র মরে প্রাণে,
খলেতে কামড়ায় একেরে অন্যে মরে অকারণে।
সাপের আছে ঔষধ মন্ত্র, খণের নাই যে কোন তন্ত্র,
কৃষ্ণ ইন্দ্রের কঁপিছে অন্ত্র, জুতা বিনা উপায় দেখি নে।
( সকলের প্রস্থান)।
পঞ্চম দৃশ্য।
বিশ্বনাথ পুরােহিতের বাড়ীর সম্মুখে, বিশ্বনাথ ও অনুচরগণসহ
সরােজকান্ত।
ক
সরোজ। কোথা যাচ্ছ পুরুত ঠাকুর?
বিশ। যজমান বাড়ী।
সরােজ। কোন্‌ যজমানের বাড়ী ?
বিশ্ব। মহেশ বাবুর বাড়ী।
সরােজ। মহেশ সমাজে পতিত, তার বাড়ী গ্রামের কেউ যাচ্ছে
, তুমি যাচ্ছ ?
বিশ্ব। মহেশ আমার যজমান।
সরােজ। যে পতিত, ধর্মভ্রষ্ট, সে আবার যজমান কি?
বিশ্ব। আমি তাকে পতিত বলে জানি না।
সরােজ। সমাজের সকলে জানে, তুমি জান না। না জান,
আমাদের কাছে নলে।
৬
।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
বিশ্ব। সমাজে কেউ তাকে পতিত বলে জানে না। মহেশ
‘স্বধৰ্ম্ম-নিরত নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ, আপনারা তার হিংসা কচ্ছেন, আমি তার
হিংসা করি না।
সরােজ। সমস্ত সমাজিকগণের বিরুদ্ধে তুমি এই কাজ কচ্ছ।
বিশ্ব। আমার অন্তদেবতা আমায় করাচ্ছেন, কে স্বপক্ষ কে
বিরুদ্ধ তা আমি জানি না ।
সরােজ। গ্রামে আরও অনেক ব্রাহ্মণ কায়স্থ তােমার যজমান
আছে। এ কাজে সবাই তোমায় পরিত্যাগ কবে।
বিশ্ব। করেন, আমি নিরুপায়; কিন্তু দশজনের হিংসা বিদ্বেষের
অনুরােধে, আমি হৃদয়ের সত্য-দেবতার আদেশ অমান্য কর্তে পারি না।
সরােজ। তুমি পুরােত বামন মাত্র, পণ্ডিত নও, দেশের প্রধান
পণ্ডিত বাচস্পতি মশাইএর মতে মহেশ ধৰ্ম্মতঃ পতিত ।
বিশ্ব। আমার বুকের মধ্যে যিনি চিরসত্য, চিরপণ্ডিত,যার
আদেশ মেনে আমি এ বয়স পর্যন্ত চলে আছি, তিনি ত বলেন না।
আমি আর কোনও পণ্ডিতের আদেশ মেনে ত কখনও চলিনি।
'আমার শাস্ত্র আমার হৃদয়।
সরােজ। এক মহেশ চক্রবর্তীকে রাখতে গিয়ে তুমি গ্রামের
পঞ্চাশ ঘর যজমান হারাচ্ছ। ভবিষ্যতে তােমার অন্ন বস্ত্র যােগাবে
এক মহেশ চক্রবর্ত্তী ?
সে ভাবনা কৰ্ত্তে আর পারি কই ? ব্ৰহ্মণ্যদেব আমায়
চালিয়ে নিচ্ছেন ঐ দিকে। আমার প্রয়ােজন বলে ত, আমি সুৰ্য্য
দেবের গতি ফিরিয়ে দিতে পারি না। আমার গাছের ফলে, আমার
পেট ভচ্ছে না, তা বলে ত আমি ধরণীর সবখানি রস শুষে আতে
পারি না।
বিশ্ব।

मामा
৩৮
সরােজ। তােমার বয়স্থা অাইবুড় মেয়ে ঘরে, তা জান ?
বিশ্ব। জানি সব, যে সব ভাববার সময় আমার নেই। পথ ছাড়,
আমায় যেতে দাও।
সােজ। যাও, কিন্তু জেনে রেখাে, এ গা থেকে তােমার আস্তানা
তুলতে হবে। মুখুয্যে বংশের বিরুদ্ধে তুমি যাচ্ছ।
( বিশ্বনাথ চলিয়া গেলেন, সহচরসহ সােজও চলিয়া গেল)।
তৃতীয়
অঙ্ক।
প্রথম দশ
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার রাত্রিতে পরাণ মণ্ডল লক্ষ্মী পূজার নব পত্রিকা
ও সজ্জিত নৈবেদ্যাদি লইয়া যাইতেছে।
পরাণ। (স্বগত) না ; আর হিন্দু সমাজে ভিড়ে থাকা চলবে না।
কিসের হিন্দু আমরা চাঁড়াল পোঁদ ! হিন্দুর মধ্যে কোন্ অধিকার,
আমাদের আছে ? পূজা পার্বণ চলবে না! ঠাকুরের পায়ের ধুলি নিতে
গেলে ঠাকুর সরে দাঁড়াবেন ; ছুলে তার কাপড়খানা পর্যন্ত মারা
যায়! যাক কালই যাব পার্জি সাহেবের কাছে, বিশুর গির্জায় নাম
লেখাব, তবু একটা ধৰ্ম্মের ভিতর’ত থেকে যাব।
(বিশ্বনাথ পণ্ডিতের প্রবেশ )
বিশ্ব। কিরে পরাণ! এত রাবিতে কোথা যাচ্ছি।
পরাণ। যাচ্ছি আর কোথায় ? গাঙ্গে!
বিখ। কেন এত রাত্রিতে কেন ! লক্ষী পুজার নব পত্রিকা
রাত্তিতে বিসনি কর্তে নাই।

তৃতীয় অঙ্ক।
পরাণ। কোণায় লক্ষ্মী পূজা দেখছ ঠাকুর। চালের দ্বারা
লক্ষ্মী পূজা হয়। পূজা অর্চ যা করবার, তা এই কল্লাম। আর না।
বিশ্ব। তাের বাড়িতে বুঝি পুরােত ঠাকুর আসে নি।
পরাণ। হাঁ! এসেছে। একশ ঘর চড়ালের এক পুৱােত। ও গা
থেকে পূজা করে আসছিল, শুলাম পথে পেয়ে মুখুয্যেরা তাকে আটকে
রেখেছে। আমাদের উপর তাদের বেজায় আছি। আমাদের
এ গাঁয়ে থাকতেই দেবে না। তা করুক দেখি, আমরাও আর পার
ধূলা নিতে যাব না। এবার গির্জায় নাম লিখাব। সরাে ঠাকুর আবার
ছুয়েটুয়ে দেব।
বিশ্ব। দাড়া পরাণ! (হাত ধরিলেন)
পরাণ। অাহা কি কল্পে ? তােমার হাতে যে নারায়ণ ! আমায়
ছুয়ে দিলে।
বিশ্ব। ইনি আমারও নারায়ণ, তােমারও নারায়ণ । পরাণ। ফিরে
চল, আমি তােমার ঘরে লক্ষ্মী পুজা কৰে।
পরাণ। কি বল, তুমি হচ্ছ ভদ্রলােকের বামন। একে মহেশ
ঠাকুরকে নিয়ে একয়রে হয়ে আছ, আবার আমার ঘরে পূজা কল্লে
তােমার হাত থাকবে ? শুনছি তােমার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না।
বিশ্ব । সে সব পরের কথা। মা লক্ষ্মীর ভক্ত, তোমার ঘরে মা
লীর অধিষ্ঠান হয়েছে। চল, আমি পূজা করবাে।
পরাণ। এই জন্যেই তােমাকে লােকে এক ঘরে করে! কুর,
এতে তােমার পাপ হবে না?
বিশ্ব। পাপপুণ্য আমি মানি না, আমি মানি আমার বুকের
আদেশ। বড় ব্যাথা পেয়ে তুমি তােমায় আবাহন করা দেবতাকে
. বিসৰ্জন কৰ্ত্তে যাচ্ছ। এমনি ভাবে মরণােন্মুখ হিন্দু সমাজের এক একটা

নাড়ী ছিড়ে যাচ্ছে! 'দাও পরাণ তােমার নব পত্রিকা আর নৈবেদ্য, আমি তােমার ঘরে পুজা করূবো। এসাে। ( জীবন দাসের প্রবেশ), জীবন। পরাণ ! পরাণ ! তুই এখানে ? পরাণ। হা কাকা, এত রাত্রে কি খবর? জীবন। খবর অতি গুরুতর। তোমার সর্বনাশ হয়। পরাণ। কি সৰ্ব্বনাশ হয় ? জীবন। মুখুয্যে বাবুদের লােক, প্রাক্স ৩০৪০জন হবে, তাের বড় বন্দ ক্ষেতের কঁাচ ধান কেটে নেচ্ছে ! পরাণ। সেকি ? কেন ? জীবন। কেন, তা জানছিস। ওরা ত এ গাঁয়ে কারু রাখবে না। এই রাত্রেই লােক লাগিয়েছে, ধান লুট কৰ্ত্তে। ওটা ওদের তালুকের জমি, খাস দখল করে নিতে চায় । পরাণ। বল্লে কি কাকা। আমার সেই লক্ষীখােলায় ধান! তাতে যে এবার মালক্ষ্মী পায়ের ধুলা ঝেড়ে দিয়ে গেছে। তাতেই যে আমার গােলা ভরে যাবে! আজ লক্ষ্মীপূজার দিনে আমার লক্ষী কেড়ে নিতে এসেছে, ডাকাতের দল ! যাও ঠাকুর, লক্ষ্মীপূজা এই পৰ্যন্ত। (একখানা বাঁশ হাতে পাইল) এই! এতেই হবে! জীবন কাকা। দুটো ছেলে মেয়ে আর বউ রইল, পরাণের পরাণ এই পর্যন্ত। জীবন। দাড়া পরাণ! অত লােকের মধ্যে একা যাবি। পরাণ। কি বল তুমি! আমার কলজের হাড় তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আমি দাঁড়াব। মা লক্ষ্মীখােলার মাটীতে আমি রক্ত দেব, ওরই দানায় ত এ শরীরে রক্ত মাংস, তার রক্ত তাকে দিয়ে আসি। এই আজ আমার লক্ষ্মীপূজা! রক্ত দিয়ে পূজা! লক্ষ্মীখােলর মাটী আজ রক্তে লাল হয়ে যাবে ।

তৃতীয় অঙ্ক।
জীবন। সামলিয়ে যা, পরাণ। আদালতে গিয়ে দেখা যাবে, তােরই
হক, কাটি কাটা বিষয়।
পরাণ। আদালতে যাব ? আদালত কাদের? ঐ জামা-জুতা-পরা
ৰাবুদের। আদালতে সুবিচার হয়, টাকার ওজনে। থাক, সে সব পরের
কথা! মায়ের বুকে কাস্তে চালাচ্ছে আমার, সবুর আর করা যায় না। যা
করেন মা লক্ষ্মী।
(স্থান)
বিশ্ব। ব্যাপার বড় গুরুতর হলাে।
জীবন। তাই ত আমি এমন সময়ে খবরটা দিয়ে ভাল করিনি।
আমার বাড়ির নিচে ক্ষেতখানা। বড়ই ধানটা ফলেছে, আর ৮১ দিন
পরে থাটি পাবে। কি জানি ঘটে! পরাণে সােজা মরদ নয়, ত্রিশ
জনের মােহাড়া একলা দিতে পারে। খুন জখম নিশ্চয়ই হবে। আমি
এগিয়ে যাই
( প্রস্থান)
বিশ্ব। মা লক্ষ্মী। আমি কি করি। আমি তােমায় বিসর্জন দিয়েই
যাই। জালেম, এ গ্রামের লক্ষ্মীর বিসর্জনই হয়ে গেছে! রমাকান্ত
মুখুয্যে, আর কানাই পাল এ গ্রামটী শ্মশান না করে যাবে না। আমি
আজ এই শেষবার,এ গ্রামে, এই চণ্ডালের গৃহেই ক্ষ্মীপূজা করবে, তার
পরে লক্ষ্মী চিরতরে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে চলে যাব। এ গায়ে আর
লক্ষ্মীপূজার আবশ্যক নাই।
( প্রস্থান)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
আশ্রমে বসিয়া ভােলা খ্যাপা গান করিতেছিলেন।
খ্যাপা। (গীত ) আমার মরা হলোনা।
মরলে পরে এমনি করে, মা বলা হবে না ।

१२
জিহ্বারে তুই অন্তরঙ্গ, মা বকা দিও না তজ
মায়ের নামে কর না রঙ্গ, কুরতে মজো না ।
তবে আমি মরতে পারি, এই কর যদি সঙ্করী।
রেখে রাঙ্গা চরণােপরি, বলতে দাও সুধু মা! মা।
(রাধার প্রবেশ)
রাধা। (গীত। মায়ের নামে ভক্ত ছেলের মরতে কিবা ভয়।
মায়ের নামে মরলে ছেলে হয় যে মৃত্যুঞ্জয়।
মরি হায়, হায়, হায় ।
মাটীর বুকটা আকড়ে ধরে আটি, দাঁড়াতে পার যদি খাটি।
মরণ যে, তাের নতুন জীবন, পতন যে তাের জয়,
জয় গৌরাঙ্গ নিত্যানন্দ, জয় গৌরাঙ্গ জয়।
মরি হায়, হায়, হায়, ॥
খ্যাপ। খুব জবাব গেয়েছিস পাগলি! ওকি! মুখ খানা যে
ঝোড়ো মেঘের মতন কালাে।
রাধা। মহা প্রলয়ের ঝড় ছুটে গাছ পাহাড় লুঠিয়ে দিতে আসছে!
আর তুমি ব'সে ব'সে আনন্দে গান কচ্ছ ! এ ঝড় তুলেছে কে ?
তুমি ? না আমি?
খ্যাপা। তােমার আমার ঝড় তুলবার যদি শক্তি থাকতো, তবে
গােটা ভারতটা সাগরে ডুবিয়ে এতদিন একটা নতুন ভারত গড়ে
তুলতাম।
রাধা। এই যে গ্রামটা উলট পালট হয়ে গেল, এর জন্য তুমি
আমি কিছু মাত্র দায়ী নই ?
থ্যাপ।। হ’তে ৰি নিমিত্ত মাত্র ।

তৃতীয় অঙ্ক।
৭৩
রাধা। তােমার শিষ্য ভক্ত
যে সব যেতে বসেছে। এই কি
তােমার দেশসেবা!
খ্যাপা। হয়ত, একটা মস্ত বড় ভুল করে বসেছি। তার প্রতি-
বিধান কি ? যে প্রায়শ্চিত্ত বিধি হয়, শির পেতে নেব।
রাধা। কি বলো ঠাকুর? পরাণ মণ্ডল মানুষ জখম করে
জেলে গেছে। বিশ্বনাথ পুরােতের বাড়ী লুট হয়েছে। মহেশ চক্রবর্তী
তহবিল চুরিতে পড়েছেন। গা উজোড় হয়ে গেল না। সকলের মুলেই
আমি, না হয় তুমি।
খ্যাপা। পরেশের ত এখনও কিছু হয় নাই।
রাধা। আর বাকিই বা কি ?
খ্যাপা। আছে বই কি?
(পরেশের প্রবেশ)
সংবাদ কি ?
পরেশ। আর সংবাদ কি। আমরা জাহান্নামে যাচ্ছি।
আমাদের উদ্ধার নাই।
খ্যাপা। ব্যাপারটা কি বলত ।
পরেশ। সেই ত জানেন, বাবার শ্রাদ্ধে মেঝদা রেগে চলে
গেলেন, টাকা দিলেন না। কাছারীর সিন্দুকের চাবি দিয়ে দাদা
পাঠালেন আমায় টাকা আনতে। খাজাঞ্চি, চাবি খুলে আমাকে দু’শ
টাকা দিলেন। তার পর দাদা কাছারী গিয়ে দেখলেন, তহবিলে হাজার
টাকা কম। আমিই সর্বনাশ করেছি। খাজাঞ্চিকে নিজের লােক
ভেবে, চাবি খুলবার সময়ে কাছে থাকি নাই, সেই যােগে এ সর্বনাশ
ঘটেছে! তখনই দাদার মুচ্ছা হয়েছে। দু-দিন বাদে লাটের টাকা
জমা দিতে হবে। এখন উপায়?
খ্যাপা। তাই ত বটে, মহেশ চক্রবর্তীর পতনের গতি এত দ্রুত।
t

৭১ 1 পরেশ। একটা কিছু উপায় বলে দিন গুরুদেব । মেঝ দাদা, দাদাকে ছেড়ে গেছেন মাত্র,-কিন্তু আমি তার সর্বনাশ কম। আপনার কাছে দেশ সেবার টাকা আছে, তা থেকে অন্তত হাজার টাকা আমাদের ধার দিন। খ্যাপ।। দেশ সেবার টাকা দেশের, মহেশ চক্রবর্তীকে দান কর টাকা ত নয় । পবেশ। দান কেন ? আমাদের সমস্ত সম্পত্তি বন্ধক রাখছি। মেঝদা তার অংশ দাদাকে দান পত্রে লিখে দিয়েছেন, মােল আনা সম্পত্তির মালিক আমরা। ব্যাপা। অসম্ভব। দেশ মাতৃকার গচ্ছিত টাকা, দাদন কবার অধিকার আমার নাই পরেশ। এ সময়ে আপনিও একটু দয়া কৰ্ত্তে পারেন না ? হা জগদীশ্বর ! আচ্ছা ! আপনি ত বলেছেন, আড়কাটির মানুষ কিনে নেয়। বলে দিন, কোথায় গেলে আড়কাটির সন্ধান পাব। আমি সারা জীবন বিক্রীত হতে রাজি আছি, আমায় টাকার পথ বলে। দিন। আমার দাদার প্রাণ বাঁচান। খ্যাপ। মহেশের উদ্ধারের পথ নাই । মহেশের পতন, তার কৰ্ম্ম- ফলে, তা কেউ রােধ কৰ্ত্তে পারে না। পরেশ। কি বলেন, এমন কি কুকৰ্ম্ম দাদা করেছেন, যার জন্য তার এ দুর্গতি! জীবনে তিনি কারু উপকার ভিন্ন অপকার কখনও করেন নাই। আপনার দিকে না চেয়ে, আমাদের মানুষ করেছেন, কত স্নেহে কত আদরে । একজনও অন্ততঃ অন্নহীন অতিথিকে দাদা অন্ন দেন। নাই, এমন দিম তার কখনও যায় নাই। বউ ঠাকুরাণীকে আমি কোলেয় ভাত অতিথিকে দিয়ে সারাদিন উপবাসী থাকতে দেখেছি।

তৃতীয় অঙ্ক।
দাদা ত মতে
এমন সতীলক্ষ্মী বউ ঠাকুরাণীর শেষে এই দশা !
পড়েছেন। কোন্ পাপে তার এ দুর্দশা !
খ্যাপ। মহেশের পাপ, তার বড় অহঙ্কার!
পরেশ। এ সময়ে আপনার রসনা সংযত করুন। দাদার আমার
অহঙ্কার! তৃণের চেয়ে তাকে ছোট হয়ে থাকতে আমি দেখেছি।
এক দিনের জন্য তাকে কোনও বিলাসাড়ম্বরে যেতে দেখিনি
খ্যাপা।
শান্ত হও, পরেশ। তােমার দাদার সব কাজ অহঙ্কার
নিয়ে ! আপনার দিক ভুলে ভাইদের স্নেহ আদরে পালন করেছেন,
তাও অহঙ্কার নিয়ে। অহঙ্কার নিয়ে তার অতিথি ভােজন, পিতৃ-শ্রাদ্ধের
আয়ােজন। পাণ্ডবের রাজসূয় করেছিলেন, অহঙ্কার নিয়ে, তাই সে
প্রায় কুরুক্ষেত্রের সৃষ্টি ! পরেশ, তুমি বুঝতে পাচ্ছ না, কৃপণের বরং
অহঙ্কার নাই, সবার ছােট থেকে সে টাকার গণতি করে চুপে চুপে ;
কিন্তু দাতার অহঙ্কার অনেক! পাপীর অহঙ্কার নেই, কিন্তু পুণ্যবানের
অহঙ্কার আছে! কতির হচ্ছ কেন ? বিধাতার ইচ্ছা পূর্ণ হতে দাও।
পরেশ। বুঝলাম না আপনার এই অভিজ্ঞতার সীমা। অবশেষে
আমাদের যেতে হলাে, তবে রমাকান্তের আশ্রয়ে। টাকা আমাদের
চাইই চাই। রমাকান্ত বাবু ছাড়া আর কে হাজার টাকা এখন দিতে
পারে? কিন্তু আপনিও এ সময়ে আমাদের উপর দয়া কল্লেন না।
অবশেষে মাকান্তের হাতে যেতে হলাে।
খ্যাপা। ঐত, অহঙ্কর চূর্ণ হবার সুবর্ণ সুযােগ।
পরেশ। অহঙ্কার
অহঙ্কার মাৎসর্য বুঝি না, বুঝলাম আমাদের এই
পরিণাম। এক ভাইদের হতে দেবাঝা দাদার আমার এই দুর্গতি।
মেঝদা, যা করেছেন বরং ভাল ; তার দানপত্রে এ সময়ে উপকার

হবে। কিন্তু আমি কি কল্লাম ? আমিইত তার সর্বনাশ কর্লাম ?
কি নির্বোধ, কি অধম, বংশের কুলাঙ্গার আমি ! ( প্রস্থান)।
রাধা। আপনি কি পাষাণ?—এখনও আপনার বুক কাপছে না ?
চোক ফুটে পড়ছে না। কি দেখছ মুখশ্রী এ
মুখ৷ এ লােকটার? ও যে
মরণের চেয়ে ভীষণ ! আপনি নিশ্চিন্ত ?
খ্যাপা। তুমি কিছু কর্তে পার এর ?
রাধা। পারি বই কি? আমার বাবার আখড়া বাড়ী দোেেত্র
সম্পত্তি। তাই বেচে আমি মহেশ ঠাকুরকে টাকা দেবে ।
ব্যাপা। পার করো ! না না তা কর্তে যেও না। রাধা, নিষেধ
করি, দেবতার চেয়ে পরেশকে বেশী ভালবাসূতে যেও না। দেবতার
ধনে মানুষের সেবা করাে না। আমি তােমায় তা কত্তে দেবো না।
তােমায় নামতে দেব না পতনের দিকে। পরেশ সুরূপ যুবা, তুমি
দেবতার চেয়ে তাকে বেশী ভালবাসতে যাচ্ছ। সাবধান।
(রাধার প্রস্থান )
তারা পরমেশ্বরী ।
( প্রস্থান)
তৃতীয় দৃশ্য।
প্রান্তর মধ্যে টচ্ছায়ায় রাখালগণ ও হরিদাস ।
রাখাল। একি ভাই হরিদাস! তুমি ব্রাহ্মণের ছেলে, মাঠে গরু
রাখতে এলে কেন?
হরি। আমার বাবার ব্যামো, তিনিত টাকা রােজগার কর্তে পারেন
। আমাদের চাকর রাখাল চলে গিয়েছে। গরু আর কে রাখবে?
রাখাল । আহা তুমি কি গরু রাখতে পারবে? তুমি স্কুলে পড়তে
যাও না ?

তৃতীয় অঙ্ক।
৭৭
হমি। না, বাবা আমায় স্কুলে যেতে মানা করছেন।
আমি
বাড়িতে ছােট কাকার কাছে পড়ব। আর ও পাড়ার পুরুত ঠাকুরের
কাছে গিয়ে কৃষিকাৰ্য্য শিখব।
রাখাল। তােমার কটী গরু?
হরি। পাঁচটী,—তিনটী গাই, দুটা বাছুর।
রাখাল। আচ্ছা, তােমার গুরুগুলি আমরা রেখে দেব। তুমি ঐ
গাছের তলায় বসাে, রােদে আসতে তােমায় হবে না। হরিদাস ঠাকুর,
হরি ঠাকুরও গরু রাখতেন, তিনি ছিলেন রাখালের রাজা। তুমিও
আমাদের রাখাল রাজা। তুমি বড় ভাল গান কর, তােমার কাকা তােমায়
শিখিয়েছেন। সেদিন যে গানটি গেয়েছিলে, বড় ভাল গান, অমিরা প্রায়
শিখেছি। আজ আবার গাও, আমরাও তােমার সাথে গাই
(হরিদাস ও রাখাল বালকগণ গনি গাহিল )
পল্লিমাটী সােনা খাটী, বুকটী তাহার কাশী ঠাই ।
কালাে ছায়ার বাঁকা গাংটী ঐত আমার গঙ্গামাই ।
পায় পিষ্টক ক্ষীর নবনী, কালিয়া কোর্মা যতই খাই ।
সকল মধু জোগায় আমার পল্লী মাটীর লক্ষ্মী গাই।
হারে রাজা সাহেব বাবু মিষ্টার, (তােমাদের কল কলমের বাদসাই।
পল্লী যদি লাঙ্গল গুটায় তবে সফল হবে ছাই ।
(কানাই পালের প্রবেশ)
কানাই। একি? প্রাতঃপ্রণাম! এযে আমাদের হরিদাস ঠাকুর।
হরি। তা আমায় প্রণাম কেন! আপনি বুড় মানুষ।
কানাই। ও বাবা! বামন! দেবতা! বামন, সাপের বাচ্চা কখনও
ছােট হয়? তুমি এ ছােটলােকের ছেলেদের সাথে গরু রাখতে এসেছ

৭৮
দাদা।
কেন? তুমি মস্ত নায়েবের ছেলে, তােমার এক কাকা হচ্ছেন, বি, এ পাস
সাহেব! আর এক কাকা কবিরাজ! তােমরা হচ্ছ বাবু।
রাখাল। তাহা হােক মশাই, হরিদাসত আর গরু রাখছেনা, গরু
‘রাখি আমরা। হরিদাস খেলা কৰ্তে আসে। আমরা হরিদাসের কাছে
গনি শিখি, বই পড়ি!
কানাই। বেশ, হরিদাসের গরু ক’টি !
রাখাল। ঐত, দুটো লাল আর একটা সাদা গাই, আর দুটো সাদা
?
কানাই। (পেন্সিল কাগজ লইয়া) হাঁ! দুটী লাল আর একটা
সাদা গাই, আর বাছুর দুটো সাদা, কেমন ?
রাখাল। ওর আর লেখাপড়া কচ্ছেন কি !
কানাই। বুড় মানুষ, মনে থাকেনা, ট কে নিলাম। বাছুর দুটো
বনা না এড়ে
(মন্তকে ফলের ঝড়িসহ বিশ্বনাথের প্রবেশ)
বিশ্ব। পাল মশাই, মহেশ চক্রবর্ত্তীর গরুর হিসাব টকে নিচ্ছেন,
অস্থাবর ক্রোক দিতে হবে কিনা ?
কানাই। কে ? পুরােত ঠাকুর ! প্রাত: প্রণাম? এতবড় বােঝ।
মাথায় কোথায় যাওয়া হচ্ছে ?
বিশ্ব। বাজারে যাচ্ছি ?
কানাই। তাইত, আজ যেন বড়রকম বাজার খরচ হবে। মেয়ে
বিয়ে টিয়ে জুটল নাকি?
বিশ্ব। বিপ ত অনেক দিন করেছ কানাই, বিশেষ কিছু লাভ ত
কর্তে পাল্লে না।
কানাই। আজ্ঞে, না না, তা না। দেখুন কত সুখে ছিলেন

নীয় অঙ্ক। ! আপনি। পুথি বগলে যজমান বাড়ী যেতেন, চাল ডাল দুধ বাতাসায় ঘর ভরা থাকত। আর এই মাথায় মােটে কষ্ট বিশ্ব। এইটে যেন তার চেয়ে কিছু আরাম বলে বােধ হচ্ছে কানাই। যজমান বাড়ীতে গিয়ে দেবতার উদ্দেশে মন্ত্র পাঠ কাম,- সত্যই দক্ষিণা নৈবেদ্যর লােভে চাকরের মত বাধ্য হয়ে। অনেক স্থলে দেখেছি, আমি যখন যজমানের মণ্ডপে বসে, চণ্ডীর নমস্কার পড়ছি, যাদেৰী সৰ্ব্বভূতেষু শান্তিরূপেন সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমঃ নমঃ, তখন যজমান তার প্রজা খাতকের মুণ্ডপাত করবার জন্য মুহুরীর সঙ্গে ছলা পাকাচ্ছেন। আমি যখন শিবায় বিশ্ব- মঙ্গল-কারণায় নমঃ বলে শিবের মন্তকে অর্ঘ্য দিচ্ছি, যজমান তখন মদের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন। আমি যখন অতি কষ্টেও নারায়ণের স্বরূপ ধ্যানে আনতে পাচ্ছি না, যজমান তখন রূপসী কোনও গণিকার ধ্যানে মগ্ন। এমন ধারা অর্থের দাসত্ব পৌরহিত্ব যে আমার খসে গেছে, তাতে বরং আরাম পাচ্ছি। আর এই দেখছ, আমার বাস্তুমাটীর স্নেহের দান। এতে চলছে আমার ভাত কাপড়।-বড় আনন্দে। কানাই। তা বটে, তা বটে, আপনি সু-ব্রাহ্মণ। তবে মেয়েটার একটা সদ্গতি করে নেওয়াই ভাল ছিল। লােকে কত কথা বলে। বিশ্ব। মেয়ের বর জোটে নাই, বিয়ে হয় নাই। সেজন্য আমার ভাবনা কি। প্রজাপতির ইচ্ছা না হয়, বিয়ে হবে না। কানাই। তা যাই বলুন, আমি আপনার উপকারের চেষ্টা যথেষ্ট করেছি। সাতপুরুষের পুরুত আপনি। ভাল বরও জুটিয়ে দিয়েছিলাম, শ চারেক টাকা খরচ কল্লেই হতাে। টাকার জোগাড় করে দিচ্ছিলাম। সুধু একখানা নােট দিলেই হতো। বিশ্ব। কানাই। টাকা রয়ে, সেই টাকায় বর কিনে মেয়ে

দাদ।।
পাত্রস্থ করবাে ? এতে যে মেয়ের অসম্মান করা হয়, নারীত্বের অবজ্ঞা
করা হয়। মেয়ে যাবজ্জীবন যার দাসী হতে যাবে, তাকে আবার টাকা
সােনা রূপা দিতে হবে কেন!
কানাই। আজ্ঞে আপনাদের শাস্ত্রেইত বলে, নবম বর্ষে গৌরী দান।
বিশ্ব। যখন শিব ছিলেন, তখন গৌরী ছিল! এখন শিবের স্থলে
দানবের অধিষ্ঠান, গৌরীরও অন্তর্ধান। থাক, বাজারের সময় যায় ! নেরে
রাখাল ছেলেরা, এই দুটী শসা নিয়ে তােরা ভাগ করে খা। (প্রস্থান)
কানাই। জব্দ হয়ে এসেছে। বাবা ! ধৰ্ম্মগিরি ! চুলােয় যাবে সব!
আইন আদালতের পেঁচত বােৰ না।
( সকলের প্রস্থান)
তুর্থ দৃশ্য।
মহেশের গৃহে, মহেশ ও দয়া ।
পরে,
দয়া। এখন কেমন করে বাহিরে যাবে। সারাদিনরাত
এই মাত্র তােমার চৈতন্য হলাে ! একটু সুস্থ না হলে, পথে চলবে
কেমন করে ?
মহেশ। কি করবো দয়া ! পরেশ রাত্রিতে ডাক্তার ডাকতে গিয়েছে,
এখনও ফিরল না। তার নিশ্চয়ই কোন বিপদ ঘটেছে। আহ! আমার
বড় সুখের সংসার। ভরত লক্ষ্মণ ভাই। গণেশ আমায় ছেড়ে গিয়েছে,,
আবার পরেশকেও কি বিধাতা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবেন।
দয়া। অত কুভাবনা ভেব না। ভাবতে ভাবতে অমনি হয়ে
দাড়িয়েছে। আমি হরিদাসকে গোঁসাই ঠাকুরের কাছে পাঠিয়েছি।
ছােট ঠাকুরপাের সংবাদ নিয়ে আসবে।

তৃতীয় অঙ্ক।
৮১
দয়া।
মহেশ। কি আর সংবাদ আনবে! আমি সংবাদ পেয়েছি। রাত্রি
কালে পথে পরেশকে বাঘে মেরে খেয়েছে, না হয় সাপে কামড়ে মেরেছে।
আমার দাদা ডাক শোেনা ফুরিয়ে গেছে।
ও মা দুর্গা ! এ কি কল্লে।
মহেশ। আমার বলতে কেউ থাকবে না। পরাণ মণ্ডল ছিল বড়
অনুগত! উপস কৰ্ত্তে দেখলে ধান চাল দিয়ে বাঁচাত। সেত জেলে পচে
মছে।
তার জমি জিরেট লুটে নিয়েছে। তার মাগ ছেলে না খেয়ে
মরছে।
দয়। বিশ্বনাথ পুরােতের বয়স্থ কন্যার বিয়ে দিতে পাচ্ছেন না।
সে দিন নাকি মুখুয্যে বাবুরা গুণ্ডার দল লাগিয়ে সেই মেয়েটীকে চুরি
করে নেবার চেষ্টায় ছিল। পুরােত ঠাকুর ভয় পেয়ে মেয়ে ছেলেদের
শ্বশুর বাড়ীতে রেখে এসেছেন। এরা হলো কি
মহেশ। আর ভােলানাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমে ব'সে, আরাম
কচ্ছেন।
( ভােলা ব্যাপার প্রবেশ)।
খ্যাপা। মহেশ বাবু! সংসারটাকে তুমি কি মনে কচ্ছ ?
মহেশ। তীব্র : বিষময়। আমার পরেশের কোনও সংবাদ
রাখ দাদা ?
খ্যাপা। যে সংসারে এত ফুল ফুটছে, এত গন্ধ ছুটছে, এমন রবি
শশী অলছে। কোটী মুখ হাসছে, কোটী কণ্ঠে আনন্দের গীত গাচ্ছে।
তাকে তুমি বিষময় বলে মুখ ফিরাচ্ছ? তােমরও ত এমন দিন ছিল,
যখন বলতে সংসার আনন্দময়।
মহেশ। আগে জানতাম না, ভাই" গণেশের নির্মুল ভ্রাতৃ-হৃদয়ে
এমন নরককুণ্ড জেগে উঠবে, আগে জানতাম না, আমার প্রতিবাসীর
হাসিমাখা মুখের অন্তরালে, এমন ঈর্ষার বস্ত্র প্রচ্ছন্ন রয়েছে।

৮২
দাদা ।
খ্যাপা। তাই বুক ভরে আশায় কুয়াসা জমিয়ে নিয়েছ। এখন
কুয়াসায় আঁধার কেটে গেছে, সংসারের স্বরূপ ছবি ফুটে উঠেছে। তুমি
আপন বুকে আপনি আগুন জ্বেলেছ, সংসারের দোষ কি ভাই?
মহেশ। আমি কি অন্যায় করেছি ? ভাইকে আদর করে পান
করেছি, একি অন্যায় করেছি।
খ্যাপা। ভাইকে পালন করে অন্যায় করাে নি। সেই আদরের
প্রতিদান চেয়ে পালন করেছ।গাছ করে, সে ফল আপনি খেতে
আশা করে বসেছিলে। তাইত ফলের তীব্ৰাস্বাদে এখন পীড়িত হচ্ছ ।
তুমি মাতাল হয়ে উড়তে যাচ্ছিলে আকাশে, পড়ে গেছ, আঘাত
লেগেছে। আগে যদি দেহটাকে একটু আঘাত-সহ করে নিতে ?
মহেশ। তাই বটে, এখন বল, পরেশ কোথায় ?
খ্যাপা। তার প্রয়ােজন কি ? যার কাছে সংসাব বিষময়, সে
আবার সে বিষের বিন্দু বিসর্গ খুজতে যাবে কেন?
মহেশ। ক্ষমা কর দাদা, এ বিষ-কুণ্ড সংসারে সেই আমার একমাত্র
অমৃতবিন্দু।
খ্যাপা। . তাত বটেই, সে তােমার মুনিবের তহবিলের হাজার টাকা
উড়িয়ে দিয়ে, তােমার সর্বস্ব ক্ষমিয়ে দিয়েছে। তােমার চাকরী গিয়েছে,
মান গিয়েছে, সম্পদ গিয়েছে, প্রাণও যেতে বসেছে।
মহেশ। নানা দাদা! সে ত ইচ্ছে করে এমন অপরাধ করে নাই।
আমার অদৃষ্ট-চক্র। সত্যি দাদা, সেই থেকে পরেশের মুখে আমি
একটী দিন হাসি দেখলাম না, যেন কত অপরাধী সে। তার এমন
সােনার শরীর অর্ধেক হয়ে গেছে।
খ্যাপা। মনে কর গণেশের মত সেও তােমায় ছেড়ে গেছে।
মহেশ। নানা, অসম্ভ। কেন সে যাবে ছেড়ে ? আমি ত

তৃতীয় অঙ্ক । তাকে সেই টাকার জন্য একটা কটু কথাও বলি নি। পরেশ যাবে আমায় ছেড়ে ! অসম্ভব! আমার বুক থেকে এক যম বই আর কেউ পরেশকে কেড়ে নিতে পারবে না। তবে কি তাই হয়েছে ? পরেশকে থে খেয়েছে না সাপে কামড়িয়েছে ? খ্যাপা। অত মন্দ নয়, পরেশ দম-হস্তে বন্দী। মহেশ। জ্য! কোথায় ? তবে যে দ রমাকান্ত মুখুয্যে, অথবা কানাই পাল ? দয়া। হায়! হায়! তবে কি হবে! ঠাকুরপো, তােমার এ কি হলো গো! আমাদের যে আর কেউ নেই। খ্যাপা। এ কি বউ মা! তুমি ও এলিয়ে দিচ্ছ? তুমি ও এলিয়ে দিচ্ছ? শােন, তােমার স্বামী রুগ্ন, দেবর শত্রু-ষড়যন্ত্রে রাজদ্বারে চোর বলে অভিযুক্ত, এ সময়ে সতী তুমি, তােমার সতীশক্তির প্রয়ােজন। মহেশ। কি ?—চোর! আমার ভাই পরেশ চোর ?—চন্দ্র সূৰ্য খসে পড়ক,—পৃথিবী উল্টে যাক। খ্যাপা। কেন? অনন্তকাল ধরে এরা এমন কোটি কোটি ব্যাপার দেখে হাসছে, আজ তােমার সঙ্গে অসহিষ্ণু হয়ে উঠবে। শােন- কানাইপালের বাড়ী সিদ চুরি হয়েছে, টাকার বাস সমেত পরেশকে তারা চোর ধরেছে! এখন পুলিশে চালান দিচ্ছে। দয়া। ও ঠাকুর, বলল কি ? তাকে বুঝি খুব মেরেছে! তুমি কেমন করে তা দেখে সয়ে আছ ? ঠাকুর! পায়ে পড়ি রক্ষা কর ! যথাসর্বস্ব দাও মখুয্যে বাবুকে, পরেশকে বাঁচাও। পরেশ যে দেবতা, তােমারই হাতে গড়া। খ্যাপন। দেবতা নইলে দানবের সঙ্গে বিষদ হয় ? মা সতী ক্ষ্মী। এই তােমার পরীক্ষার দিন এসেছে। স্বামী পুত্র ভাসুর দেবর =

৮৪
দাদা।
যত দিন শক্তিশালী সক্ষম, স্ত্রী ততদিন তাদের রক্ষণীয়া অবলা। কিন্তু
যখন তারা রােগ, শােক, বিপদে অসমর্থ, তখন স্ত্রী অবলা নন, মহা
শক্তিশালিনী! কেঁদে আকুল হবার সময় এ নয়। আর কেউ নেই,
এখন তুমি আছ! এ বিপদ সাঁতরিয়ে পাড়ি দিতেই হবে। বেশী কথা
বস্থার সময় নেই।
(গীত)
এইত নারীর কাজের সময়।
সরম টুটে মরমের দায় ।
বুকে নিয়ে মাতৃশক্তি, স্নেহ প্রীতি দয়া ভক্তি,
। ধরম তেজে দাড়াও সতী, অসুর শক্তি লুটবে ধুলায় ।
সেইত দারুণ দানব দাপে, উঠেছিল ভূবন কেঁপে,
পুরুষ তখন আপন সপে লুটেছিল প্রকৃতির পায় ।
পড়লে সন্তান বাঘের মুখে, মা কি পালায় আঁচল টেকে,
একবার মায়ের মত পড় না রুখে, খ্যাপা গাবে মায়ের জয়।
(প্রস্থান)
দয়া। তাই, তাই ঠিক। এই ত কাজের সময় এসেছে। আর
লজ্জা সরমে পায় কি। আমি উদ্ধার করবাে আমার প্রাণের দেবরকে।
লক্ষ্মণ যেমন ভাইএর মান বাঁচাতে বক্ষে শক্তিশেল ধরেছিলেন,
আমার ঘােট ঠাকুরপােও তেমনি ভাইএর প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে এই ঘৃণিত
অপমান বুক পেতে নিয়েছে। আমি তাকে উদ্ধার করবে। আমি
আজিই যাব, মেৰু ঠাকুরপোর কাছে। অন্য সময়ে যা করুন, এমন বিপদ
শুনে কি ঠিক থাকতে পারবে? তারই বা দোষ কি ! দশজন কুলােকে
কথায় মন খারাপ হয়েছিল, আমরাও ত তাকে ফিরিয়ে আবার
কোনও চেষ্টা করি নাই।

তৃতীয় অঙ্ক । মহেশ। তাইত, তুমিও আমার তিরস্কার কর্তে লাগলে! গণেশকে ফিরিয়ে আনা আমার উচিত ছিল। কিন্তু ফুরসুত পেলাম কই ?—তার পরইত তহবিল চুরি! চাকরী খারিজ ! শিরঃপীড়া! বুদ্ধিলােপ ! যাক, যাও, গণেশের কাছে যাও। অনন্ত সমুদ্রে পতিত যে, তৃণের আশ্রয়ও তাকে নিতে হয়। জগৎ! দেখ দুরাশার পরিণাম ! ভরত লক্ষ্মণ ভাই যার, সেই মহেশ চক্রবর্ত্তী আজ নারীর রক্ষণীয়। বড় দম্ভ, বড় অহঙ্কারে মাথা উচু করেছিলাম কিনা ? খুব শাস্তি পেলাম, খুব খ্যাতি অর্জন কল্লাম -ব্রাহ্মণকুলে আমি জন্মে, মুনিবের তহবিল চোর,—ভাই পরেশ সিদচোর, -চোরেরই বংশ বটে! বাপের বংশ উজ্জ্বল হলো। ( মুচ্ছ। আসিল) (দয়া ধরিয়া ভিতরে লইয়া গেলেন) ! পম দৃশ্য। (বন্দী পরেশকে সঙ্গে লইয়া দারােগা কনেষ্টবল রাধার বাড়িতে খানা- তল্লাস করিতে আসিল, সঙ্গে সরােজ ও কানাই।) রাধা। বেশ সেজেছে। হাতে কড়ি, কোমরে দড়ি! যেমন কৰ্ম্ম তেমনি সাদা! দাবােগা। তাইত, পীয়ারী যে খুব হাছ! তােমার কি ? এক জন যাবে, আর এক জন হবে ! রাধা। তাইত, দারােগা সাহেব! দেখ দেখি আমায় কেমন দেখতে! দাবােগা। খুব সুন্দরী বটে, সহরে যেতে ত খুব আদর পেতে। রাধা। আমাকে তােমার মার মতন দেখায় না ? দারােগা। ছি! তুমিত বড় বেয়াদব !

লা।
কেন ? পরস্ত্রীকে মায়ের মতন দেখলে কি তােমাদের
বেয়াদবি হয় ?
দারােগা। এই চোর তােমায় কি ভাবে দেখে?
রাধা। ওত মায়ের মতন দেখে,—স্ত্রীজাতকে মায়ের মতন দেখতে
ও জানে। আর ঐ বড় বাবুটী,উনি আমায় দেখেন ওঁর সেবাদাসীর
মতন! কতই যে ওঁর সাধ ! তা এখানে.এ শােভাযাত্রা কেন ?
সবােজ। দারােগা বাবু ! এই হচ্ছে এ বদমাইসের আড়া। চোরাই
মাল সব এর ধরে আছ, খানাতলাসী করুন।
রাধা। সরােজ বাবু ! বৈষ্ণবী হলেই ক্রোধ হিংসা একবারে নিৰে
যায় না। নারীর সম্বরণ শক্তিরও একটা সীমা আছে ! সে সীমার বাঁধ
ভেঙ্গে গেলে, এ রাক্ষসী জাত না পারে এমন কৰ্ম্ম নাই!
সবােজ। সে দেখা যাবে কাল, সে পরাণে চাড়াল জেলে, এই
পরাণ-নাথকে ত এই দেখছ !
রাধা। তাই, কালই দেখা যাবে !—সরােজ ! কালই দেখা যাবে !
তবে যাও, আজকে কেন আর! ( তীব্র দৃষ্টিপাত )
সরোজ। যান দারােগা বাবু, ঢুকে পড়ুন। এর ঘরে চোরাই
মাল আছে!
দারােগা। আমি অসমর্থ !
সরােজ। কি বলেন !
দাবােগা। আমি দেখি নাই কখনও এমন প্রখর মুখজ্যোতি, নয়নে
এমন অগ্নি রশ্মি ! মা! মা! সত্যই তুমি মা ! আমি তােমায় মা
ডাছি।
রাখা। আশির্বাদ কৰি ৰা। জননী তােমার সন্তান গরবিনী
হউন। (পরেশের প্রতি) ছছাট বাবু! ভয় হচ্ছে ?

তৃতীয় অঙ্ক।
পরেশ। আর কোনও ভয় নাই, দাদা আমার মারা যাবেন।
রাধা। না মরবেনা, দুঃখের দেহ সহজে পাত হয় না।
ঠাকুরের প্রসাদ! প্রাণে বল আসবে।
পরেশ। (প্রসাদ লইয়া গান)
যা দিলে তা নিলাম আমি শিরে ধরি তােমারই দান।
তােমার জীবন তােমার, মরণ তােমার দেওয়া মান অপমান ।
আগের দেওয়া সেই যে যারা, মায়াড রি বেধে তারা,
আমায় করে পিছন-ফেরা সে যে বড় কঠিন টান ।
ভাঙ্গুক খেলা ফুরাক আশা, ভেসে যাক সব ভালবাসা
ছায়া-রচ। আকাশ বাসা উড়িয়ে দিল কালের তুফাণ।
( অদিক নেপথ্যে খ্যাপা)
গীত
খ্যাপ। নিরাশাতে ডুবাও না, ভাসিয়ে তােল জীবন-তরী,
কাটবে তুফান উঠবে ভেসে এ নয় এমন তুফান ভারী।
( আসামী লইয়া দারােগা কনেষ্টবলের প্রস্থান।
রাধা। (গীত) যে রচেছে বিশ্বখান!, তারে কি ভেবেছ কাণা।
সবার পিছে দিচ্ছে না হাসছে আপন বঙ্গ হেরি।
সরেজ। কি কাণ্ড দেখ, চারিদিকে গানের ধূয়া তুলে দিলে?
এরা কি যাদু জানে নাকি? দারােগাটা একবারে দমে গেল।
(খ্যাপার প্রবেশ
ব্যাপা। (গীত) বল দেছে যে বাঘের দাঁতে,
তীর দেছে সে মানূষের হাতে।
আলােক ফোটে রাত প্রভাতে,
এই ত রঙ্গের বাহাদুরী।

৮৮
দাদা।
সয়ােজ। বাকি এখন কেবল তুমি! এই মােমন্দময় তােমায়
আসামী কোরব, তবে ছাড়লো। হাড় জ্বালাতন করে খেলে তােমরা।
খ্যাপ।। সােজ! একটা খবর তােমায় দিতে এলাম। শুলাম
তােমাদের চ’কের প্রজারা বিদ্রোহী হয়েছে। আসছে লাটের টাকা
যদি না কুলান হয়, তবে আমার কাছে খোঁজ নিতে বলল তােমার
বাবাকে, আমি টাকা দেবো।
সরােজ। তুমি টাকা দেবে ?
খ্যাপা। হাঁ! আর ত স্বজন বান্ধব কেউ রইল না।
তােমাদের সঙ্গেই ভাব করি ; আর দেশ সেবার টাকা দিয়ে নিজে না হয়
একটী জমিদারীই কল্লাম।
(প্রস্থান)
সরােজ। ভড়কে গিয়েছে।
কানাই। নিশ্চয়ই। যাবে না? বাবা, বাঘের সাথে লড়াই ?
( সকলের প্রস্থান)
==
চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
গণেশবাবুর বাড়ীতে সাহেব ও মেমের সাজে গণেশ ও পরিমল
কলিকাতার থিয়েটার দেখিতে যাইতে ব্যস্ত।
পরিমল। বাস্তবিক, ট্রেণে দুজনে এক সাথে না গেলে, বড়ই
বেয়াড়া লাগে। সাড়ি পরেত পুরুষের গাড়ীতে চলা যায় না,কিন্তু

তৃতীয় অঙ্ক। কেমন যেন জজ্জা বোধ হচ্ছে ! কেমন মেম সেজেছি! চেনা লােকে দেখলে কিন্তু হবে। গণেশ। বাঃ! কার সাধ্য চেনে তােমায় বাঙ্গালীর মেয়ে বলে ? চুলগুলি একটু কটা হলেই হয়েছিল আর কি! আহা! যেন সদ্য- ফোটা গােলাপটী। পরিমল। যাও মেনে তুমি বড় বাহানা কর! বেরিয়ে পড়া যাক, আর দেরী করে কাজ নেই। গাড়ী টাড়ী ফেল হবাে শেষে। বাড়ী বােধ হয় আগে যাওয়া হবে না, বড় দিদি আর জামাই বাবুর সাথে থিয়েটারেই দেখা হবে! তারাত খাটি সাহেব বিবি। ধুতি সাড়ী একেবারেই ছেড়েছে। গণেশ। তারা কতবড় বড় লোেক! দেড় হাজার টাকা মাইনে মাসে। পরিমল! তুমি এখান থেকে কলকাতার অফিসে বদলী হলে, মাইনে ৪০ ০ হবে না? তার পর বছরে বছরে বাড়বে। তুমি যদি আগে থেকে বিলেত যেতে ! আজত থিয়েটার দেখবাে, কাল বায়স্কোপ দেখে মটর গাড়ীতে ফিরতে হবে। পরশুত সকাল দশটায় তােমার অফিস। ওকি তুমি অমন মুখ ভার করছে। কেন? তােমার, যেন ভালই লাগছে না ! কি হয়েছে তােমার ? গণেশ। আসছে রবিবারে একবারে দাদাকে দেখে আসতে হবে। চিঠি পেয়েছি, তার বড় ব্যারাম। পরিমল। সেই চিঠি ! ওসব তুমি বিশ্বেস কর? পাড়াগাঁয়ের লােক কি ভয়ানক! এখনও চিলে না—তােমার দাদা ও বউদিদিকে ? পণেশ। কি জানি আগে এমন জানতাম না। পরিমল। আমি দেখবামাত্রই চিনেছিলাম। তােমার বউ দিদি !

কি মুখমিষ্টি, ভিতরে ক্ষুরের ধার। হাজার হলেও আমরা জায়গার লােক, দশটা দেখে শুনে শিখেছি। আমাদের কাছে কি নুকোচুরি খাটে ? গণশ। তা সত্যি, সরস্বতীও তােমার কাছে বুদ্ধিতে খাটো হয়ে যায়। তবে দাদার সঙ্গে বনিবনাওটা রাখতে পাল্লাম না, এটা মনে আসলে ব্যাথা লাগে। তা কি কবো, আমার সাধ্য কি ? পরিমল। নাও মনে, তােমার দাদার কথা আর বলােনা। অমন দাদা আর দুটী দেখা যায় না। তিনি দেশে জমিজিরেট নিয়ে বেশ দুপয়সা পুজি করে বসেছেন। পাড়াগাঁয়ে অরি খরচ কি? ভদ্রলােকের মতনত থাকতে হয় না। নিজের একখানা ৮হাত ধুতি, গিন্নির সেই এক জোড়া ঠেটা সাড়ী, তিন মাস না হলে ধােপার বাড়ীতে যায় না। তােমার দাদার ইচ্ছে, তােমাদের বোকা বানিয়ে, কিছু জোট ঘােট করে নিতে পাল্লে বুড়ো বয়সের দিনটা রেশ চলে যাবে। ছােটচীকে গােলাম করেই নিয়েছেন, তােমাকেও চেষ্টায় ছিল, নেহাৎ আমি পিছে লেগেই মুস্কিল। তারই জন্যইত আমি শত্রু! ঐ যে গাড়ী আসছে, ঝি গাড়ি নিয়ে এসেছে। (বিনােদার প্রবেশ) বিনােদা। ওগাে দেখাে, একটা মাগী একটা ছেলে সাথে নিয়ে বাড়ীর ভিতর ঢুকছে। (দয়া ও হরিদাসের প্রবেশ) এ কারা গা ? হরিদাস না ? দিদি যে। হরিদাস। কাকী মা! আমরা এসেছি, বাবার বড় ব্যামাে। ছােট কাকাকে পুলিশে ধরেছে ! গণেশ। তাইত, বউ দিদি যে, সঙ্গে আর কে ? ফয়া। আর কেউ নেই ঠাকুরপাে।—আর কে আসবে? হােট, ঠাকুরপােনােদন) পরিমল ।

তৃতীয় অঞ্চ।
গণেশ। একলা এলে? এত পথ একলা ? কি বেইমানী কাণ্ড!
দয়া। বিপদকালে মান ইজ্জত কি ঠাকুরপো ! আমরা বড় বিপদে
পড়ে এসেছি।
পরিমল। তা বুঝতে পেরেছি, নইলে এই দুটো বছর,-একখানি
চিঠি লিখেও কি খৰব করেছ ?
দয়া। সে কথা পরে। শোন বাড়ীর খবর। তােমার দাদাত আজ
এক বছর বিছানা-ধরা, এখন একবারেই অচল। এদিকে গ্রামের মন্দ
লােকেরা ছােট ঠাকুরপােকে ধরে পুলিশে দিয়েছে।
গণেশ। পুলিশে দিয়েছে! কেন সে কি করছে ?
পরিমল। স্বদেশী বন্দেমাতরম কর্তে গিয়েছিল আর কি
দয়া। না সে সব কিছু নয়। তােমার দাদার জন্য রাত্রিতে ডাক্তার
ডাতে গিয়েছিল, পথে সরােজ মুখুয্যে আর কানাই পাল তাকে চোর
বলে ধরে বেঁধে নিয়েছে, তাকে কত মেরেছে। জেলখানায় কয়েদ করে
রেখেছে, পেছনে যাবার কেউ নেই।
গণেশ। ও তাই বল। ও ত আমি জানি। অমন গুণ্ডার দলে
মিশে বেড়ালেই তার পরিণাম এই। এইবার জব্দ হয়ে আসুক বংশের
কুলাঙ্গার।
দয়া। বল কি! পরেশ যে দেবতার মতন পবিত্র। সে যাবে চুরি
?
কর্তে।
হরি। মা বড় ক্ষিদে পেয়েছে।
দয়। মেঝ বৌ! হরিদাসকে দুটী খেতে দাও। সারাদিনের ভিতর
কিছু খায় নি।
পরিমল। বি! দেখত ঠাকুর কোথায় ? হাড়িতে ভাত আছে-
কি ?

দাদা।
বিনােদা। ভাত এখন কোথায় ? এইত আটটার সময়ে ভাত
হবে, তখন খাবে।
দয়া। তবে কিছু খাওয়ার থাকেত ওকে দাও।
পরিমল। এক পয়সার মুড়ি আর বাতাস এনে ওকে দাও।
বিনেদা। আমি এখন যাই কখন? ওকে দাও না দুটো পয়সা,-
ঐ ত মােড়ের কাছে মুড়ির দোকান, কিনে খেয়ে আসবে। তােমাদের
গাড়ী এলো।
পরিমল ! তাইত এমন দিনেও এসেছ দিদি। আমরাত বেরিয়ে
পড়ছি !
কোথা যাবে ?
পরিমল। কলকাতায় যাব, বড় দিদি এসে তার করেছে, না গেলে
"চলে না। এইত গাড়ীর সময় হলো।
গণেশ । তাইত, আজ আর কেমন করেইবা যাওয়া হয় ! বড়ই
মুস্কিল দেখছি।
পরিমল। ও মা, বল কি ? তাই কি হয় ? তার করেছ, তারা কি
ভাববে? ভদ্রলােকে এমন পারে ? এই নাও হরিদাস, পয়সা নিয়ে
খাবার কিনে খেয়ে এসাে।
দয়া। থাক এখন খেয়ে কাজ নি! ঠাকুরপো, বড় বিপদে পড়ে
বড় আশা কৰে, তােমার কাছে এসেছি। বড় ভাইটা যমের বাড়ীর পথে,
ছােট ভাইটা জেলে যেতে বসেছে ! আর কিছু না কর, পরেশকে ছাড়িয়ে
আন, তাকে বাঁচাও। তার জন্যই তােমার কাছে এসেছি। আট বছরের
ছেলে ছােট ঠাকুরপােকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি, তার
হাত লােহার কড়ি দিয়ে বেধেছে, গায়ে বেত মাছে। মাটিতে ভাত
ছড়িয়ে দিয়ে তাই খেতে বলছে। তাকে দিয়ে পাথর ভাঙ্গাচ্ছে।
!

চতুর্থ অঙ্ক।
6513
ঠাকুরপাে ! তােমার ভাইকে বাঁচাও, আমার প্রাণে যে, আর টানায় না।
আমি বিধবা হতে যাচ্ছি, তার জন্য তােমার কাছে কিছু বলবার নেই।
গণেশ। কি কাদাকাটি আরম্ভ করলে? এসেছ, থাক দুদিন, আমরা
ফিরে আসি, তার পর শুন্।
পরিমল। ছি ছি! কি লজ্জার কথা ! ভদ্র লােকের ছেলে
তাকে কিনা ভাই পরিচয় দিয়ে খালাস করে আনতে হবে । তোমার
দেখছি দিদি, দরদ ভারি, বড় গুণের দেওর কিনা ?
দয়া। কি বলছিস মেঝবউ ! সত্যই সে গুণের দেওর। লক্ষ্মণের
• মতন দেওর! তার কথাটা একটুকু’ভাব দেখি ! সে মাটীতে শুচ্ছে,
চট পরছে ; তাকে লােহার কড়া মারছে ! আমার হরিদাশ ময়ূতে পড়লেও
আমি এমন করে ছুটে আসতাম না, সে যে আমার মা-হারা ছেলে,
আমাকেই মা বলে জানে।
পরিমল। তাকে ভাই পরিচয় দিলে কি এদের চাকরী থাকবে?
ভাই
বন্দেমাতরমে ঢুকেছে জানলে,
সাহেব যে এখনই তাড়িয়ে
দেবে।
গণেশ। শেত এক সমস্যা বটে। আমার
আমার ত চাকরী ছাড়া,
জমি জিরেট বাড়ী ঘর নেই।
(গাড়ােয়ানের প্রবেশ)
গাছে। বাবু। মাের ভাড়া দিয়ে দ্যান।
গণেশ। তোমার আবার কি ভাড়া?
দয়া। ওর ভাড়া দেড় টাকা?
গণেশ। আমি এখন ভাড়া দেই কোখেকে?
আমার হাতে
ত টাকা পয়সা নেই। যা ছিল, গণে বেছে নিয়ে পথে বেরিয়েছি।
দেখছি আজ আর যাওয়া হয় না।

১৪ দাদ। নেই যে, পরিমল। তুমি না যাও আমার কিন্তু যেতেই হবে। তাদের তার করেছি, যাব। ওরা থাকুন না দু’দিন । ওরা থাকুন না দু’দিন। গাড়ীভাড়া দু’দিন পরে না হয় দেওয়া যাবে। আজ দিদি দিয়ে দিন না। দয়া। আমার হাতে একটা পয়সাও নেই। রেলের ভাড়া দিয়ে এমন পয়সাটা হরিদাসকে কিছু খাবার কিনে দেই । ঠাকুরপো, গাড়ােয়ানের ভাড়াটা দিয়ে দাও। গণেশ। গাড়ি ভাড়াটা হাতে নেই, তবে এ গাড়ি চড়ে বড়মানুষি করা ভাল হয় নি। বাড়ীর যথাসর্বস্ব তােমাদের ছেড়ে দিয়ে এসেছি। তবু তােমাদের আশা মেটে না। এইত মুজুরি করে খাচ্ছি—তােমরা ভাবছ আমি লক্ষপতি! দয়া। ঠাকুরপাে ! কি বলছ তুমি? তুমি কি আমার সেই মেঝ ঠাকুরপো ! গরমের দিন পড়তে গিয়ে তুমি ঘেমে গিয়েছ, আমি তােমার বাতাস করেছি। আমি বাল। বিক্রী করে তােমার পরীক্ষার খরচ দিয়েছি। তুমি ছুটিতে বাড়ী গেলে, তােমার সেবা যত্নে আবার অর্ধেক সময় কেটে গেছে। আমি স্বামী পুত্রের যত্ন নিতে পারি নাই। তুমি আমার সেই দেবর! সত্যি বলেছেন গােসাই ঠাকুর, তুমি বিষ খেয়ে পাগল হয়েছ! সারাদিনের উপসী ছেলে হরিদাসের শুকনাে মুখ দেখেও তােমার দয়া হচ্ছে না। মেঝ বউ, কি নেশায় তোদের ধরেছে! মেমের পােষাকে সং সেজে ভুলে গেছিস, নারী ধৰ্ম্ম, সেবা যত্ন ? নারীর প্রাণের এতটুকু কোমলতা তাের প্রাণে নাই। ( দ্বিতীয় গাড়ােয়ান নেপথ্যে ) বাবু! আর সময় নেই। সাড়ে তিনটা বাজে। পরিমল। তাইত, আর ত সময় নেই। গণেশ। থাকো, বউ ঠাকরণ, কালার দিনটা। নেহাৎ না গেলে

t
চতুর্থ অঙ্ক।
করি ? বিনােদা, বউঠাকুরাণীর যত্ন নিয়ে যাও
কোচম্যান তােমার ভাড়া সােমবার এসে নিও। না আর পায়।
যায় না। দু পয়সা রােজগার করে যে একটু সুখে স্বস্তিতে
থাকবে, তা আর চলবে না। এ দেশটার যে কি ধরণ, 'একজনে
দু’পয়সা রােজগার করলে পালে পালে মাছির মতন এসে জুটবে।
যে খেটে মরবে সে নেংটী পরুক, শাক চিংড়ি খাক। -আর দশ
জনকে বিলিয়ে পুস্তি করুক। না করিলে, দেশময় তার নিলে -
বাক! যাও, গাড়ীতে।
পরিমল।
মাটা হলো আজকার ফ,ত্তিটা।
গাড়ােয়ান। মা ঠাকুরণ, এ বাবু কি তােমার আপনার দেওর ?
দয়া। হ্যা বাপু!
গাড়ােয়ান। তােমার সােয়ামী আর এই বাবু একবাপের ছাওয়াল ?
আল্লা! দুনিয়ায় কারহানা দেহে দেহে, এথায় ত রইতে ৰাসনা হয়না।
মা ঠাকরুণ, তুমি ফিরে চল, এমন কুটমের বারীতে বইতে নেই। আমি
ভারার টাহা চাহি না, ভার। বায়েত এ বয়সে ঢের টাহাই কামাই
করছি, দুডা একডা টাহা না পাইলে কি অইবে! মা। তুই আমার ধর্মের
মা। তাের চোয়ের পাণি দেখতে আর বরদাস্ত হয়না। আমার সাথে
আইস মা। আমার গাইডে টাহা আছে, আমি বাজার করে, চাউল
ডাউল আছি, তুমি পাক করা ছাওয়ালরে খাওয়াইবে, আপনে খাইবে।
মা ঠাকরুণ আমি মােসলমান, কিন্তু তােমায় মা ডাকছি, কোন ভাবনা
করিস না।
এ দিন তাের রইবে না। আমি টাকা দিমু, রেলভারা দিমু,
তুমি ছাওয়াল নিয়ে বারী মাও! আয়রে দাদু! আমার কোলে। বাবু
তােমার রাত্যি হােক।
(প্রস্থান)

দাদা।
গণেশ। এই বেত মিজ নিকালাে হিয়াসে।
(সুটকেশ লইয়া বাহিরে গেলেন )
দয়া। তাই, তাই, ঠিক! গাড়ােয়ান। দাড়াও আমি তােমার
সঙ্গে ফিরে যাবো। তােমার কাছে দয়া চাবো। বাবা! তুমি হিন্দু
হও, মােসলমান হও, তুমি আমার সন্তান! তােমার আশ্রয়ে আমি যাবো।
তার পর আমার ছােট ঠাকুরপােকে, আমি উদ্ধার করৰই! আমি যে
কুলের কুলবধূ, পরেশ সেই কুলের গৌরব। আমি কুলের গৌরব উদ্ধার
করবো। হায় হায় ! কেমন করে, রাম লক্ষ্মণের দেশ, ভীমার্জুনের দেশ,
সীতা সাবিত্রীর দেশ বাংলার এ দুর্গতি হলেন?
( প্রস্থান)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
মহেশের বাড়ীতে, মহেশ, দয়া ও হরিদাস’
মহেশ। খুব কাতর হয়ে পড়েছ বড় বউ। আশা করে দেবরের
কাছে গিয়েছিলে, আশা ভঙ্গ হয়ে ফিরে এসেছ, বড় কাতর হয়ে পড়েছ ।
দয়া। না তাতে কাতর হই নি। সব অপমান বুক পেতে সহ
করেছি। কিন্তু আজ যে আর সহ্য কর্তে পারিনা। আজ ঘরে এক মুষ্টি
চালও নেই, তােমাদের উপােস করে থাকতে হবে
মহেশ। এই ?—এতেই এত কাতরতা ? এতদিন খেয়েছ, একটা দিন
না খেয়ে থাকতে পারবে না? আর কালই বা চাল আসবে কোথেকে।
পরাণ মণ্ডলের গােলাত নেই! শরীর থাকলে খেতেই হবে। যা'ক, চল
ছেলে সাথে নিয়ে স্ত্রী পুরুষে ভিক্ষা কর্তে যাই। শরীরে সামর্থ্য নেই যে,
খেটে অন্ন ষােটাব, ভিক্ষা এখন একমাত্র উপায় ! দোষ কি তাতে? চোর

৯৭ চতুর্থ অঙ্ক। পরিবাদে লজ্জা-নেই, ভিক্ষায় আবার লজ্জা কি ? ছিল একজন,পরেশ ছিল, সে থাকলে মুজুর খেটে হােক, ভিক্ষা করে থােক, এনে খাওয়াত, সে এখন জেলে পচে মরছে। আমি তার দাদা, সে আমার বড় অনুগত ভাই, আমি তার জন্য কিছুই কর্তে পাল্লাম না। আমার বল নেই, আমার টাকা নেই, আমি কিছুই কর্তে পার্লাম না। যাক পরের কথা ভেবে কি হবে? আপনার পেটে অন্ন নেই,“চল অন্নের যােগাড় করি গিয়ে। ভিক্ষায় অন্ন না মেলে, অনাহারে মরূবে। আগে ছেলে মরবে, তার পর তুমি মরবে। পরেশ জেলে মরেছে তার খবর পাব, তার পর আমি মরুবাে। মরুবে;—অনেক কষ্ট পেয়ে, তার পর মরব। রাস্তায় পড়ে তেষ্টায় ছাতি ফাটবে, জ্যান্ত থাকতে শেয়াল কুকুরে ছিড়ে খাবে, তার পর মরবে। তখন সব আলা জুড়িয়ে যাবে। না না, একালের আগুন সেকালেও সাথে যাবে ! ভাই ! দেখলে অনেক, শেখালে অনেক ! মা জগদম্বা। এইত তােমার শাসনের সীমা ! দয়া। হা জগদীশ্বর । মহেশ। চুপ কর দয়া ! জগদীশ্বর কে ? যার এই জগৎ ? তার নাম করে কাঁদলে কি হবে ? কাঁদলে কি সে তার কাজ ভােলে । তুমি চ’কের জলে নিমের গাছে আম ফলাতে চাও? তা হয় না। হরিদাস ! আজত ঘরে চাল নেই ! আজত আমি খাবার দিতে পারব না। নিজে চেষ্টা করে খেতে হবে। না ও একটা ঝুলি বানাও, দোরে দোরে মুষ্টি ভিক্ষা কর গিয়ে ! নিজের হয়ে বেশী হয়, আমায় দিও। না বাবা, আমারত ক্ষিদে পায় নি। মা, কাদছিস কেন? হরি ঠাকুরকে ডাক ! বাবাজি বলে গেছেন, ছােট কাকাকে খালাস করে আনবেন। তার কথা কি মিথ্যা হয় ? আমি ঠাকুর-ঘরটা ঝাট দিয়ে আসি। আজ ক’দিন ঠাকুর ঘর ঝাট দেওয়া হয় না, ছােট কাকা বাড়ী অাসূলে কত বকবে ! .

- দাদা ।
।
দয়া। না বাবা, ঠাকুর ঘর ঝাট দিতে তুমি যেও না । 'অনাহারে
থেকে পরিশ্রম সইবে না।
মহেশ । সইবে না কি? খুব সইবে । গরীবের ছেলের অনেক
সয়! যাও হরিদাস, ঠাকুর ঘর সাপ কৰ্ত্তে হয় কর গিয়ে, তার পর ভিক্ষে
কৰ্তে যাও। চাষ পাড়ায় যে, ভদ্র পাড়ায় যেও না।
(হরিদাসের প্রস্থান।
হরি। একি কর্লে ? ছেলেটাকে যথার্থই ভিক্ষা কর্তে পাঠালে ?
মহেশ। যথার্থ নয় কি মিথ্য" ! পরিহাস করবার সময় ত এ নয় ।
বুকে সহ্য হচ্ছে না? নরম বুক নিয়ে এসেছ, সংসারের গরম হাওয়া সহ
হয় না। তবে যেখানে নরম পাও, গরম নেই, এমন দেশে চলে যাও।
ছেলেকে একলা ভিক্ষায় যেতে দিতে ব্যাথা লাগে, নিজে সাথে সাও।
আমি চলতে পারি না, যাবাে কেমন করে?
খাদ্যাদি লইয়া রাধা ও সেবকগণের প্রবেশ ।
( সকলের গীত)
ভবের গাঙ্গে উঠল তুফান
দেখরে চেয়ে ভবের নেয়ে।
কোমর এটে ধর বটে, যেতে হবে তুফান বেয়ে ।
(মেঘের ঘটা বড় ভীষণরে )
তরঙ্গের রঙ্গ যে ভারি, বেধেছে বড় কড়া আড়ি-
কড়া উজান চড়া তুফান দিতে হবে পাড়ি।
চির দিন ত চলবে নাক সুখবায়ে বাদাম দিয়ে ।
(বাতাস ফিরবে ফিরবে রে ভাই।)
কাল ছিলে মুখের গানে ভোলা ,
আজ একটু খেল দুখের খেলা।

৯৯ চতুর্থ অঙ্ক। আলোক আবার কান্না হাসি এইত জীবলীলা। জয় পরাজয়, যখন যা হয়, নিতে হবে শির পাতিয়ে ! ( ভবের খেলার ধারা এই ) মহেশ। তাই, তােমরা আমার ভিক্ষা শিক্ষা দুই দিতে এসেছ ! তােমর। দশ দুয়ার থেকে ভিক্ষা করে এনেছ ত! ভিখারিণী মেয়ে রাধা, তুমি ও এসেছ আমায় ভিক্ষা ফিতে ? কাল থেকে তুমি আর এসাে না। আমার হরিদাস ভিক্ষে কর্তে গেছে। পরাণ মণ্ডলের ছেলেদের দুটি দিয়ে এসেছত ? তারাও আমার মত খেতে পায় না। (হরিদাস ও তৎপশ্চাৎ কানাইপাল সহ আদালতের চাপরাশির প্রবেশ ) হরি। বাবা! এরা কেমন ধারা লােক ? ঠাকুর ঘর থেকে ঠাকুর বার করে নিতে বলছে। বলে, এ আমাদের বাড়ী। মহেশ। আদালতের চাপরাশি, সঙ্গে রমাকান্তের গােমস্তা কানাই- পাল—আমার বাড়ী ঘর ক্রোক কৰ্ত্তে এসেছ? চাপরাশি। মুহাশয়, ছায়েল শ্ৰীযুত বাবু রমাকান্ত মুখােপধায়, তরফ ছানি মহেশ চন্দ্র, পরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী। আপনার বাড়ী নিলাম হয়ে গেছে। আমরা দখল নিতে এসেছি। আপনি দখল দিতে রাজি ? মহেশ। রাজি বই কি? ডিক্রি নিলামের খবরটা আগে পাই নাই। তা নাই বা পেলাম্। কানাই। প্রাতঃ প্রণাম, নায়েব মশাই, আমি পরের চাকর মাত্র। চাপরাশি। তবে আমি পরওয়ানা জারি কচ্ছি, এক মাসমধ্যে এখন হ'তে আপনার বসত বাস তুলে নেবেন। কানাই। নায়েব মশাই, একটা কথা শুনুন। আপনি যদি বলেন চাপরাশীকে কিছু জলপানি দিয়ে নাজারি লিখে দেই। আপনি ছানি দা। • করুন। লীলাম রদ হয়ে যাবে। আপাততঃ আজকে গােটা পাচেক টাকা খরচ করুন । মহেশ। মাপ কর পাল মশাই, আমি এই নিলামেই রাজি। গনেশ ! শুনে সুখী হবি, বাবার বাস্তু নিষ্প্রদীপ হয়েছে ! তুইত দিয়েছিলি আমায় দান পত্র লিখে,কত ভালবেসে। আমি রাখতে পাল্লাম না। যােগ্য বংশধর জন্মেছিলাম তিনটি ভাই, খ্যাতি অর্জন কল্লাম—চোর । বাবার ভিট্টায় ঘুঘু চরিয়ে তবে শান্তি ! ( চাপরাশি ও কানাইএর প্রস্থান) বা! কেমন হলাে বড় বউ? এখনত আশ্রয় গাছতলায় ? উঃ! বুক ভেঙ্গে কান্না আসে। বাস্তুও আমায় বিদায় দিলে ! আহা ! আমি যদি মহেশ চক্রবর্তী না হয়ে অপর কেউ হতাম ! চল চল বড় বউ, আজকার দিনের মত এ বাস্তুতে শেষ রান্না রাধ! এইত ভিক্ষের চাল পড়ে রয়েছে। তারপর চল, সংসারে অনন্ত রাস্তা পড়ে রয়েছে। অনন্ত বৃক্ষ শাখা বিস্তার করে, আমাদের বাসস্থান তৈরী করে রেখেছে। বড় বউ। হরিশ্চন্দ্র রাজার উপাখ্যান মনে পড়ে? আমার মনে পড়েছে। নলদময়ন্তীর কথা শ্রীবৎস চিন্তার কথা মনে পড়েছে। আমার সাহস হয়েছে। দয়া ! দয়া ! ভয় করোনা,আমার সঙ্গে যেতে ! আমি নল রাজার মত করবে । রাজ্য-ভ্ৰষ্টনল শনির কোপে পড়েছিল। তাই তার বুদ্ধিবংস ঘটেছিল। রাণীর কষ্ট দেখতে না পেরে, অর্ধবাসা দময়ন্তীকে অরণ্যে পরিত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিল। আমার তেমন কিছু হয় নি। আমি তা করব না। ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে হরিদাস তােমার কোলে এলিয়ে পড়বে ; ঝরা ফুলের মতন দেখতে দেখতে শুকিয়ে যাবে। আমি কাছে দাঁড়িয়ে দেখবে। তারপর তুমিও মরা পুত্র বুকে আঁকড়ে চেতনা হারাবে, মাথার উপর মধ্যাহু সূৰ্য্য অগ্নি বর্ষণ করবে। তােমাদের মা-পুতের শব শেয়াল

চতুর্থ অঙ্ক।
কুকুরে ছিড়ে খাবে । আমি কাছে দাড়িয়ে নির্জল, নিশ্চল নেত্রে দেখবে,
তার পরে আমি ছেড়ে যাব ! শপথ কচ্ছি, এর আগে তােমায় পরিত্যাগ
করূনােনা। হাের তারাগাে ! সাবাস্ বটে তোমার দানব-দলনী মূর্তি !
মুণ্ডমালী এলােকেশী, করে অসি, রক্ত মাখা চরণ, রক্ত আঁখি ! রক্ত
রসনা ল ল ! ওঃ ! কি ভীষণ ।
( মহেশকে মূচ্ছাবস্থায় দয়া ধরিয়া লইয়া চলিলেন)
তৃতীয় দৃশ্য।
অন্ধকার গ্রাম্য পথে রাধা একাকিনী ।
খ্যাপা প্রবেশ করিলেন।
খ্যাপা। একি রাধা ! অন্ধকার গভীর রাত্রি,চারিদিকে বন, তুমি
একাকিনী এখানে কেন ?
রাধা। আমার প্রয়ােজন আছে।
খ্যাপা। প্রয়ােজন না থাকলে কেউ কিছু করে না, তা জানি।
কিন্তু প্রয়ােজনটা কি ?
রাধা । পায় পড়ি গোঁসাই! এখান থেকে চলে যাও। আমার
কি প্রয়ােজন, তা বলবাে না।
খ্যাপা। এ পাগলও তা না শুনে যাবে না।
রাধ। ছি ! আপনি কেমন ধারা সন্ন্যাসী ? দেখছ না, আমি
ছােট লােকের মেয়ে, কঁচা বয়স। আমার কত প্রয়ােজন থাকতে পারে।
তুমি তার কি শুনবে ?
খ্যাপা। বেটীর বজ্জাতী দেখ। এ পাগল রাধা বৈষ্ণবীকে চেনে।

দাদা। রাধা। বেশ, যদি অন্তর্যামী হও, তবে সবই ত জাছ। যাও সরে পড়, আমার কাজে আজ বাধা দিতে পাবে না । খ্যাপা। বুকে ও কি জছে ঠাকরুণ ? বৈষ্ণবীর কি অস্ত্র স্পর্শ কৰ্ত্তে আছে ? রাধা । কেন থাকবে না? আমার ঠাকুর বাণী ধরেছিলেন বৃন্দাবনে, কংসের মাথা কেটেছিলেন মথুরায়, শিশুপালের রক্তে পা ধূয়েছিলেন হস্তিনায়। খ্যাপা। তাই ত, খুব ভেবে চিন্তেই ত পথ চিনে নিয়েছ ! অকাট্য বিশ্বাস, অসীম সাহস ! রাধা রাধা সুবল বৈরাগীর মেয়ে, দুনিয়ায় কারু খাতির সে রাখে না। খ্যাপা। তা বুঝেছি, সরােজ মুখুয্যের প্রতিহিংসা নিতে এসেছ ? রাধা। হ’তে পার তুমি অন্তর্যামী! কিন্তু এ আমাকে কর্তেই হবে। আমি কি অন্যায় কিছু কর্ডে যাচ্ছি ? দুরাচার গভীর রাত্রিতে এ পথ দিয়ে যাতায়াত করে, আমি জেনেছি। তার বুকে এই ছুরি বসাব। আজ থেকে এ গাঁয়ের লােকের হাড় জুড়াবে ? একি অন্যায় কাজ ? বাঘ মারা কি অধৰ্ম্ম ! খ্যাপা। তুমি দুর্বল বালিকা, তুমি কি সেই দৰ্বত্ত যুবকের সঙ্গে বলে আটুতে পারবে । রাধা। সে আমি বুঝবাে, রাত ভােরে এসে দেখাে, সরােজ মুখুয্যের মড়া রাস্তায় পড়ে আছে। খ্যাপা। তাই ত, বুকে মহাশক্তি জাগরিত হয়েছে। ভাল সে দিন ত তুমি সরােজের উপর এত আক্রোশ দেখাও নাই, তাকে ক্ষমা করেছিলে। রাধা। ভুল করেছি, সে দিন তাকে জীবন্ত ফিরতে দিয়ে ভুল করেছি। নইলে কি সে পরেশ ঠাকুরকে চোর বলে জেলে দিতে পারে ? শােন

চতুর্থ অঙ্ক।
গোসাই, পরেশ আমার মান, নারীর মান,--মায়ের মান বাঁচাতে
এসেছি। সেই আক্রোশেই ত সেই পাঁজী বামন রাস্তায় পেয়ে পরেশকে
চোর বলে জেলে দিয়েছে! সে যাচ্ছিল, ডাক্তার ডাকতে,—তার দাদা
মরণ শয্যায়। আপনার অপমান সইতে পেরেছি, কিন্তু পরেশ দেবতা,
তার অপমানের প্রতিশােধ নিতেই হবে । পরেশের মােকদ্দমার আগেই
আমি সরােজ মুখুয্যেকে খুন করবে। কেউ তাকে রাখতে পারবে না।
দেখ পারি কিনা ?
খ্যাপা। পারবে না কেন ?, সতীর হাতে খাড়া উঠলে, সেথা যে
দানবদলনী শক্তি জেগে ওঠে। কিন্তু মা, প্রয়ােজন নাই,নর হত্যার
প্রয়ােজন নাই। এতে মঙ্গল হয় না। হয় ত আরও অমঙ্গল হতে,
পারে। পাগলের কথায় বিশ্বাস কর, সবােজের কর্মফল পেকে উঠেছে,
দুদিন মধ্যেই দেখবে কি দুর্গতি তার ! চল, আমার সাথে চল ।
রাধা। কেন তুমি এমন আমার পিছে পিছে পাক ? তােমায়
লুকিয়ে পিরবার যাে নেই।
খ্যাপা।
( গীত )
মায়ের আদর বড় মিঠে, মায়ের মতন কেবা আছে,
(তাই) মায়ের আঁচল ধরে ধরে, সদাই ফিরি পিছে পিছে।
দুষ্ট ছেলে হলে তারে বাবা পাড়ে গালি,
ভাইয়ের সাথে মন না মিশলে, ভাই ছেড়ে যায় ফেলি।
সবায় যদি করবে হেলা, দাঁড়াব মায়ের কাছে।
দোষ পেলে মা করে রােখ যদি হয় কাছছাড়।
মা মা বলে কাঁদলে ছেলে, তখনই
দেয় সাড়া ।
ছেলের কান্না দেখলে মায়ের বুকে বড় বাজে।
খেলতে খেলতে মাখলে ধূলা মুছয় মা অঞ্চলে।

দাদা।
নরকে ও পড়লে ছেলে মা তুলে নেন কোলে।
মায়ের বুকটা আঁকড়ে ধরলে কাল ঘেঁসে না কাছে।
পাগল বড় মায়ের কাঙ্গাল, মায়ের আঁচল ধরা,
মায়ের নামে স্বাদ পেয়েছে, শীতল পীযূষ-ধারা।
মা-বলা মা-পাগলা ছেলে মা বলে আনন্দে নাচে।
রাধা। আমি তােমার মা ?
খ্যাপা। নইলে কি পিছে পিছে ঘুরি!
রাধা। না না, আমাতে কোনও স্নেহ মমতা নেই, আমি কাউকে
খাতির করি না, কাউকে ভালবাসি না। আমি কারু মা বােন নই।
খ্যাপা। তুই ত আমার মায়ের সত্যিকার প্রতিমা ! আমার মা
যখন বিশ্ব জীবকে অন্ন দান করেন, তখন তিনি অন্নপূর্ণা, আবার যখন,
অরিষ্ট নাশে উন্মত্ত হয়ে খাড়া ধরে নাচতে থাকেন, তখন তিনি করালী
মহাকালী। আমি ত এমনি মায়েরই সন্তান!
রাধা। ঠাকুর। এই যে গ্রামটী ছারে খরে গেল, মহেশ চক্রবর্ত্তী
গেল, পরাণ মণ্ডল গেল, রমাকান্ত ও যাবার মতন, এর জন্য দায়ী কে ?
তুমি নও? তুমি না পল্লীর নর নারীকে সুখ স্বাধীনতা লাভের পথ দেখাতে
এসেছিলে ! এই পথ দেখিয়ে দিলে ত? খুব আলে ধরেছ, খুব পথ
দেখিয়েছ ! এখন এ আঁধারে যে নিজেই পথ পাচ্ছ না !
খ্যাপা ।
গীত
আঁধারে ত ভয় করি না, আঁধার আমি বাসি ভাল,
আঁধার দৈখলে মনে পড়ে শ্যামা মা মাের অমনি কালাে।
আঁধারে ঘাের দেখলে পরে, মনে পড়ে শ্যামা মারে,
ছায়া পথে দেখতে পাই যে, মায়ের রাঙ্গা পায়ের আলো
রাঙ্গা আঁখি কালাে মুখে সুখ ঢেলে দেয় আমার বুকে,

চতুর্থ অঙ্ক । আলােক আঁধার কান্না হাসি সমান আমার শাদা কালো। রাধা। বেশ, আজ তােমার ফুৰ্ত্তি ধরছে না। দেখি তোমার পাগলামির দৌড় । ( উভয়ের স্থান ) দীনেশ। ? তুর্থ দৃশ্য। সহরের রাস্তায় গণেশ ও তাহার বন্ধু দীনেশ। ও কি! আজ যে এত সকাল আফিস থেকে বেরুলে ? গণেশ। কি জানি ভাই, বেয়ারা বাড়ী থেকে এসে পড়েছে, গিন্নির কি পত্র এসেছে, কেঁদেই অস্থির, কাজেই যেতে হলো। দীনেশ। জেনারল আফিসের সেই পােষ্ট টা তােমার হােত ? গণেশ। হা ! সে আর হলো ! আজ তাতে একবারে চূড়ান্ত নিরাশ ! সেই কোথাকার একটা ফিরিঙ্গি এসে জুড়ে বসেছে। জেনারল সাহেবের হুকুম, এ পােষ্ট ন্যাটিভ কে দেওয়া হবে না। কনফিডেনসিয়াল পােষ্ট কি না ? দীনেশ। কেন ? আগে ত দিয়েছে। গণেশ। এখন সে পথ সেরেছে, ঐ কতকগুলি অৰ্বাচীন দেশ উদ্ধারের পাণ্ডা। দেশ ত উদ্ধার কচ্ছেন ঘােড়ায় ডিম, কেবল দু দশ জন চাকরী বাক্‌রী করে খাচ্ছিল, তার পথটী বন্ধ করে দিচ্ছে ; এমন কল্লে ওরা নেটিভদের বিশ্বাস করবে কেন? প্রমােশনটার জন্য আমি ত তিন শ টাকা খরচ করে বসেছি। দীনেশ। হলে বড়ই ভাল হতাে। তােমার ওয়াইফ কল্কাতায় থাকতেই অভ্যস্ত। স্বচ্ছন্দে কলকাতায় থাকতে পেতে, লাইফটা এন- জয় করে নিতে পারতে ।

দাদী।
গণেশ। অর ভাই, বাঙ্গালীর লাহিফএর আর এনজয় কি ?
আঁধারে পড়েই মরতে হবে। এ খবরটা বাড়ীতে বলা হবে না, যে উইক
মেন্টালিটির মানুষ, শুনলে ফিট হয়ে পড়া আশ্চৰ্য্য নয়। কলকাতা যাবার
আশায় কি ফুর্তি ! আগে থেকেই বাড়ী ভাড়ার আয়ােজন হচ্ছিল।
( দিনু স্যাকরার প্রবেশ)
দী। নমস্কার বাবু !
গণেশ। তাই ত, দীননাথ যে।
দীনু। হঁ্যা, মশাই, আজ দশ দিন ঘুরে দেখা কন্ট্রে পাচ্ছি না।
আমার ত আর চলে না। আজকে টাকাগুলি দিয়ে দিতে হবে। আজ
মাস কাবারের দিন।
গণেশ। তাত বটে, দাও কথাটা বলা যত সােজা, দেওয়া ত অত
সােজা নয়।
যখন দিয়েছি তখন ত সােজা ভাবেই দিয়েছি, সে আজ দেড়
বছর হয়ে গেছে না? সেই একশ পনর টাকা,-এর মধ্যে ১৫ টা
টাকা দেওয়াও আপনার সােজ হলাে না ?
গণেশ। আচ্ছা, আজ ১৫ টাকাই দিয়ে দিচ্ছি।
দী। না মশাই, তা হবে না, আমার টাকা শােধরিয়ে দেবেন। এ ত
চাল ডালের টাকা নয়, গয়নার টাকা। ফেলে দেন টাকা।
গণেশ। কি বেয়াদব ? রাস্তায় এমনি টাকার তাগিদ ! যাও
তােমার টাকা আমি দেবাে না। ভদ্র লােকের মান বােঝ না ?
দী। ভালােকের মান অনেক দিন বুঝে নিয়েছি। বাবুয়ানাটা
ওজন বুঝে কর্পে ত এমন হয় না। মােদ্দা সপষ্ট কথা, আজ টাকা
দেবেন ভাল, নইলে কালকার কাছারীতে আমি নালিস দেবােআপনি
সাক্ষী রইলেন মশাই, আর ভদ্রতা মানুষেতা আমার নেই।
দী।

চতুর্থ অঙ্ক। দীণেশ। ওর টাকাটা দিয়া দিতে পারেই ভাল হয়। বড় বদরাগী লােক। ও এ সহরের বড় কারবারী, লাখ টাকার উপর ওর কারবার। অনেক লােককে ও বেইজ্জং করেছে। গণেশ। তাই ত,—নিয়ে যাও, তােমার টাকা দীনু। 'আর তােমার কাছে যাচ্ছি না গয়না গড়তে। দী। তা হলে ত দীনে স্যাকরা বেঁচে যায়। নমস্কার বাবু। { টাকা লইয়া প্রস্থান) দীনেশ। গােটা দুই কথা এখন বলি গণেশ বাবু তােমায় ! শুধু দী করা নয়, দরজি, মুদি, জুতাওয়ালা, আতরওয়ালা অনেকের দেনদার তুমি আছ। তােমার এই সব বাবুগিরি দেখে লােকে হাসে। একেবারে যাবার পথে উঠেছ তুমি। তুমি ২০০ টাকা মাইনে পাও, গিন্নিটা তােমার দু হাজায়ার চেয়েও বড়। এ যে মরবার পথ। দু হাত কাকুড়ের দশ হাত বীচি। আমি এই দশ বছর চাকরী কচ্ছি, ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকায় এসেছি। কিন্তু এখন ইচ্ছা করলে, এ গােলামি ইস্তফা দিয়ে স্বচ্ছন্দে পীর বাস্তুতে ফিরে গিয়ে ডাল ভাত খেতে পাই । মেয়ে মানুষের গয়নাও পড়ি নাই,-পাহাড় বেড়াতেও কোন দিন যাই নাই। একটু জমি জিরেট, ক্ষেত খামার করেছি। গােলামি কর্তে এসেছি, গােলামি ছাড়বাে বলে। আর তােমরা এখন গােলামি কর্তে এসো, চিতায় শুয়েওগােলামি করবে বলে ! এখনও সাবধান হও ভাই। ( প্রস্থান ) গণেশ ! কি অপমান । ( প্রস্থান) শুয়েও গাণ

পঞ্চম শ্য।
গণেশের বাড়ীতে গণেশ ও পরিমল ।
ও গো, দেখ, বউ দিদির পত্র ! দাদা বুঝি এত দিন নাই।
পরিম।
দাদ' গাে ।
গণেশ। : এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন ?
পরিমল। চিঠি এসেছে, দাদার ব্যান। তাকে যতক্ষণ চ’কে দেখতে
না পাচ্ছি, ততক্ষণ আর স্থির হতে পাচ্ছি না। আজই দার্জিলিং যাত্রা
কওঁ হবে, গিয়ে দেখতে ই কিনা ।
গণেশ। এত ব্যস্ত হলে চলবে কেন পরিমল ? তােমার দাদা আছেন
দর্জিলিংএ, এখান থেকে যেতে অনেক খরচ। নিজে ছুটি পাব এমন
ভরসা নেই, সঙ্গে লােক দিতে হবে। এদিকে টাকা পয়সার নেহাৎ
অব। এই ত তােমার সইএর সঙ্গে দেখা কর্তে কাশ্মীর পর্যন্ত ঘুরে
আসা গেল। বিশুর খরচ হলে তাতে । এখন একটী টেলিগ্রাম করে
খবর নাও, দার্জিলিং যাওয়া কি সহজ?
পরিমল ।
ও গাে বল কি ? পবর আবার জানব কি? যে রূপ
চিঠি এসেছে, দেখতে পাই কি না। আর কি দোশরা খবরের সময়
আছে ? ছি ! একি ভদ্র লােকের রীতি।
রীতি। ভাই মরুতে
ভাই মরুতে পড়েছে,
তাকে দেখতে যেতে দেবে না : দাদা! দাদা ! ও গো দাদা গো !
তােমায় চ’কে দেখতেও পেলুম না গাে ।
গণেশ। এ কি পরিমল ? তােমার দাদাকে দেখবার জন্য তুমি
এত কাতর হয়ে পড়েছ ? আমার দাদাও পীড়িত, ছােট ভাইটী জেলে,
বউ দিদি বাসা পর্যন্ত এসে গিয়েছেন, আমি ত সে দিকে লক্ষ্য করতে
পারি নাই।

-- চতুর্থ অঙ্ক। পরিমল । ও গো, আমার তেমন :দাদা নয় গো ! দাদা আমায় কত ভাল বাসতেন। তিনি একটা জেলার জজ সাহেব গাে? আমায় তুমি কলকাতায় রেখে এসে, সেখান থেকে একজন নিয়ে আমি যাব। গণেশ । তােমার দাদা তােমায় ভালবাসেন, আর আমার দাদা আমায় ভালবাসতেন না ? কিন্তু আমার যে টাকা নেই ! টাকা নেই পরিমল, আমি টাকার জন্য রাস্তা ঘাটে অপমানিত হচ্ছি। পরিমল। এ সময়ে টাকা নেই কি ? এ সময়ে টাকা না থাকলে চলে কি করে ? গণেশ। তা বটে ! টাকার কষ্ট কখনও পাও নি ! আমি টাকার কষ্টে দাদাকে ছেড়েছি, ভাই ছেড়েছি, বাস্তভিটা ছেড়েছি, তােমায় কখনও টাকার কষ্ট জানতে দেই নাই। কি বুঝবে তুমি পরিমল, অন্তরে কি কালিমা নিয়ে আমি সব ছেড়ে কেবল তােমার সেবা কচ্ছি । ও গাে, তুমি কি বলছ ? নেশা টেসা করেছ না কি ? গণেশ । না নেশা কেটে গেছে। পরিমল ! পরিমল ! তুমি যে আমার চোক ফুটিয়ে দিলে। সেই যে রাশীকৃত পুরাণ স্মৃতিগুলি তুমি জাগিয়ে দিলে আমার প্রাণে ! দাদা আমায় কত ভাল বাতেন ! পরিমল। আমি ত নিষেধ করি নি, তুমি তােমার দাদাকে ভাল- বেসসা না। তুমি আমার দাদাকে দেখতে যেতে দাও, তার পর তুমি ও যাও তােমার দাদাকে দেখতে। তােমরা পুরুষ, ভাই ভাই বিষয় নিয়ে বিবাদ করাে,আমরা ভাইএর অনাদর করবাে কেন ? গণেশ। না না, তােদর করো না, ভাইকে অনাদর করাে না; যাও, আমি টাকা দিচ্ছি, লােক সঙ্গে দিচ্ছি, ভাইকে দেখতে যাও। আমি সঙ্গে যেতে পারবে না, আমিও ভাইকে দেখতে যাব। আমার এক ভাই বমের, মুখে, আর এক ভাই জেলের ফটকে। আমি পরি। ।

কাকে আগে দেখতে যাই। পরিমল ! বড় সময়ে তােমার ভাইএর ব্যাম হয়েছিল, তাই আমার ভাইয়ের কথা মনে পড়লাে। পরিমল ! আজ তুমি আমায় যা শেখালে, তােমার এত কালের প্রেম ভালবাসা আদর যত্ন,-সবার চেয়ে এ অনেক বড়। আমি তােমার কাছে কৃতজ্ঞ ! টাকা আর কোথায় পাব? সামান্য কিছু টাকা সেভিং ব্যাঙ্কে আছে, আর এই ঘড়ি চেন দীনু খাকরার কাছে রেখে আমি এক শ টাকা এনে দিচ্ছি। তাই নিয়ে চলে যাও,আমার লাগবে মােটে ৩ টাক। গাড়ী ভাড়া। আমার চেয়ে তােমার গরজ অনেক বড়। হে জগদীশ্বর ! যদি হৃদয়ের ভুল ভেঙ্গে দিলে, তবে আর একটু দয়া করে।. দাদার মরণ শয্যায় পায়ের কাছে বসে যেন বলতে পাই—দাদা! গণেশ ফিরে এসেছে, তার ভুল ভেঙ্গে গেছে ! চাকরীর ছুটি এই পর্যন্ত! ( প্রস্থান) ( আস্তে আস্তে পরিমলেরও প্রস্থান) পঞ্চম অঙ্ক। ম দস্য। পল্লীর বাজারে এক খানি কুঁড়ের সামনে দাঁড়িয়ে ঝুলি কঁাধে হরিদাস । হরি। (সুরে) কোথা হরি, কোথা হরি, কোথা তুমি আমার হরি। এই দেখ না ভিক্ষার ঝুলি, বেড়াই দ্বারে দ্বারে ঘুরি। এত বড় রাজা তুমি কত টাকা কড়ি। আমি তােমার আপনারই জন, কেন এ ভিকারী । ক্ষুধার জ্বালায় জ্বলছে যে বুক, এইবার বুঝি মরি।

চতুর্থ অঙ্ক।
বেশ ভিক্ষা য়েছি, প্রায় আট আনা পয়সা, আর এই পাঁচ সের চাল।
এতে আমাদের তিন জনের যে তিন দিন চলে যাবে। অনেক দূরে
এসে পড়েছি। এখানে কেউ আমায় চেনে না। রাধা দিদি কেমন
গীত শিখিয়ে দিয়েছে।
(গীত)
এমনি এমনি এমনি করে আমি যদি মরি,
• আমার বাবা আমার যে মা, থাকবে অনাহারী।
তাদের তুমি আমার মতন খেতে দিও হরি।
মা আমার ভিক্ষা চাল দেখলে বড় কষ্ট পাবে। বলবো, বামণের
ছেলে দেখে আমায় লােকে দয়া করে দিয়েছে, ছােট কাকা ত কালই
আসবে। পরাণ দাদাও আসবে। তখন আর আমাদের কষ্ট হবে না।
যাই অনেক দূর যেতে হবে। যেতে দুপুর উতরে যাবে। রাধা দিদির
গানের সঙ্গে আমি একটা পদ জুড়েছি, তাই গাইতে গাইতে যাই।
সবাই ত দিয়েছে ভিক্ষা আমার ঝুলি ভরি,
তুমি ত দিলে না আমায় একটা মুঠও হরি।
তবু তােমায় বাসবো ভাল বাঁকা বণী-ধারী।
( প্রস্থান)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
মহেশের ভগ্ন বাড়ীতে মহেশ ও দয়া ।
মহেশ। দিন যাচ্ছে বেশ। তালুক মুলুক গেছে, তবু চাষারা খেতে
বাস্তুভিট্টা কিনে নিয়েছে রমাকান্ত মুখুয্যে, কিন্তু তাড়িয়ে দিচ্ছে
। ভােলা পাগল বলে, কোথাও যেও না, রমকান্তের জমিদারী আমার

১১২ দাদা। । হবে, তখন আমার প্রজা হয়ে তােমরা। আমিও পাগল, নইলে ভােলা পাগলের কথায় বিশ্বাস করি ! হরিদাস কোথায় ? আজ আবার ভিক্ষায় বেরিয়েছে নাকি ? দয়া। কি জানি, তুমি ছেলের মনে যেন কি ভাব জাগিয়ে দিয়েছ। সে রােজই চলে যায় রাধার বাড়ী, তার সঙ্গে পাড়ায় ভিক্ষে করে। আজ ত সকালেই চলে গেছে, এই দুপুরটা যায়, এখন ও ফিরলাে না। হা অদৃষ্ট ! এত ও ললাটে ছিল, দুধের ছেলে আমার পথে পথে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে ! হা মৃত্যু! তুমি কোথায়? মহেশ। মৃত্যুকে ডেকো না দয়া, মৃত্যুকে ডাকলে সে আসবে কেন ? আপনার ভাইকে ডেকে আনতে পারলাম না, আর মৃত্যু!--সে যে অনেক দূর,অনেক পর। দয়া ! রামায়ণ পড়ছ ? অন্ধ , মুনির কথা মনে আছে ? তারা পতি পত্নী দুইজন ছিলেন অন্ধ ! একটা ছেলে ছিল সিন্ধু, সে অন্ধ বাপ নাকে ফল জল এনে খাওয়াত। আমরা তেমনি না ? পরে একদিন রাজা দশরথ তাঁর বাণ ছােড়ার কসরত দেখাতে গিয়ে, সেই অন্ধের নড়ি গাছটী ভেঙ্গে দিলেন ! আমাদের যদি তেমনি হয় দয়া ! দেশের রাজা রমাকান্ত যদি আমার হরিদাসের বুকে বাণ মারে ? বড় বউ ! আজ আমার মূচ্ছ। আসছে না কেন? এতক্ষণ সজ্ঞানে থাকাত আমার সহ্য হচ্ছে না। তাজ পরেশের কদ্দমার দিন। এত বেলা মকদ্দমা হয়ে গেল। • দয়া। কি করবো, গোঁসাই ঠাকুর নিষেধ কল্লেন, নইলে আমি নিজে গিয়ে আদালতে দাঁড়াতাম, দেখতাম কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়। আমার বােধ হচ্ছে, ছােট ঠাকুরপাে খালাস হয়ে বাড়ী অসছেন । মহেশ। আর আমার মনে হচ্ছে, পরেশের তিন বছর জেল হয়েছে। এমনটা না হলে মা জগদম্বার অামার প্রতি ঘােল আন দয়া দেখান হবে ।

।
দয়া।
কেন? বড় বউ, একটা জীবনেপয় ঠিক করেছি, ছেলেকে আর ভিক্ষায়
যেতে দিও না। সহরে গিয়ে তুমি মুড়ি মুড়কি ভাজবে, আর আমি
বেচবো, হরিদাস রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করবে। কত লােক এমনি ভাবে
খেয়ে বাঁচে। পরাণ আর বিশ্বনাথ পুনরাতকে সাথে নেব।
অচেতন হরিদাসকে লইয়া পরাণের প্রবেশ
ওকি! ওকে ? দয়! দয়া, চক্ষু বুজে ফেল ! শুয়ে পড়, অচেতন, হও
মুচ্ছ। যা ! এইত সিন্ধুবধের ব্যাপার !
পরাণ। বড় বাবু! এ কি করেছেন? এই কচি ছেলেকে ভিক্ষা
কৰ্ত্তে দিয়েছেন? হায় ! হায়রে ?
মহেশ। তাইত, মরা নাকি ? কোথায় পেলি ?
ও হো ! হাে ! বাবা গাে ! একি হলােরে।
মহেশ। শান্ত থাক, শুনে নি ব্যাপার কি ? বল পরাণ, কি ঘটেছে ?
পরাণ । আমি জেল থেকে খালাস হয়ে বাড়ী আসছিলাম। রাস্তায়
বটগাছ-তলে হরিদাসকে দেখতে পাই, অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মাথায়
তেল জল দিয়েছি, তবু জ্ঞান হলো না। দেখুন খাস বচ্ছে যেন এখনও !
একি! না, এখন যেন শ্বাসও পাওয়া যাচ্ছে না। পায়ে একটা রক্তের
দাগ, কিছু বুঝতে পাচ্ছি না। (হরিদাসকে নামাইয়া রাখিল )
মহেশ। এইত রক্তের দাগ, ক্ষতচিহ্। সর্পাঘাত! হরিদাস সর্পাঘাতে
মরেছে! সিন্ধু বধেরই ব্যাপার !
দয়া। হায় ! হায়রে ! বাবা হরিদাস, তুই ও আমাদের ছেড়ে গেলি !
ও বাবা! তুমি যে ভিক্ষা করে মা বাপকে খাওয়াতে গিয়েছিলে,এখন
আমাদের কে খাওয়াবে ?
মহেশ। চুপ কর অভাগিনী, এতটাতেও তাের চোকের জল শুকায়
নি। চোক মােছ ! আর আমাদের শােক করবার সময় নেই।' চল

১১৪
দাদা।
ছেলে নিয়ে শ্মশানে নাই। আজ আর একটা অভিনয় হবে। রাজা
হরিশ্চন্দ্রের অভিনয় হবে। মা জগদম্বা ! জীবন-রঙ্গমঞ্চে কত রঙ্গেই
নাচালে । এখন যবনিকা ফেলবার সময় হলাে না ?
পরাণ । বিধাতার বিচার কি ? মহেশ চক্রবর্তীর এই দশা! তবে
ধৰ্ম্মাধর্ম সব মিথ্যে। জেল থেকে খালাস হয়ে আসছি, এই ছমাস পরে,
ছেলে মেয়ে দুটো, আর বউটাকে দেখতে তাড়াতাড়ি ছুটছি, পথে
পেলাম এই নূতন কাজ। আপনারা ব্যস্ত হবেন না, সাপে কাটলে
চিকিৎসা আছে, আমি ওঝা ডেকে নিয়ে আসছি। ( প্রস্থান)
দয়া। না, আর ওঝার দরকার নেই। ওঝায় যদি বঁচাবে, তবে
দুধের ছেলেকে িক্ষায় পাঠাব কেন ? ও বাবারে ! বুক যে ফেটে যায় !
ওগো ! আর এ জীবন রাখতে পারি না গাে ! স্বামী ! এই বার আমায়
ক্ষমা কর। আমি হরিদাসের সঙ্গে যাই।
বড় অসময়ে তােমায় ফেলে
চল্লাম ! কিন্তু মায়ের প্রাণের জাল বুঝে অামায় ক্ষমা কর। ও, বাবরে !
আমার মাথা-খোঁড়া বুক-যােড়া ধন ! যাদু । এক টীবার মা বলে ডাক !
মহেশ। আর ডাকবে না। চল শ্মশানে যাই।
ওঃ! ভার ত
কম নয় ! আমি ত পারি না। পর বড় বউ, বুকে, নাও ছেলে।
পর লােক এসে পড়বে । বিশু পুরােত শুলে ছুটে আসবে। একটা
গােল বাধাবে। সময় নষ্ট করে কাজ নেই। সাপে কাটা রােগী বাঁচে বলে,
মহেশ চক্রবর্তীর ছেলেও বাঁচবে? না না, তা হয় না।
দয়া। না, বাঁচবে না, চল চল তাই চলল, ললাকে না জানতে চল ।
আর লােকের সমুখে মুখ দেখিও না । চল আমি বাবাকে নিচ্ছি। আমি
রাণী শৈব্যা !. আর তুমি রাজা হরিশ্চন্দ্র !
(হরিদাসের মৃত দেহ লইয়া উভয়ের প্রস্থান
h

হতয়ি দশ্য ।
কোর্টে ম্যাজিষ্ট্রেট, আসামীর কাঠগড়ায় পরেশ, কোর্ট-দাবােগা,
উকিল মােক্তার, সরােজকান্ত, কানাই পাল,
রমাকান্ত প্রভৃতি।
( ভােলা খ্যাপা প্রবেশ করিলেন)
কানাই। হুজুর ! এই সেই সন্ন্যাসী, ডাকাতের দলের সর্দার ।
ভয়ানক স্বদেশী ! এর দলে অনেক গুণ্ডা আছে।
এর ভয়ে আসামীর
বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে লােক ভয় পায় ! একে আটক করার হুকুম করুন।
মজি। এর বিরুদ্ধে ত কোনও নালিস নাই ।
কানাই। আছে বই কি ? এজেহারে লেখা আছে চোরের দলে
বহু লােক। এ তার একজন, এই দলপতি, মকদ্দমার তদবির কৰ্ত্তে
এসেছে।
ম্যাজি। সন্ন্যাসী! তােমার এখানে আসবার কি প্রয়ােজন?
খ্যাপা। বিস্তর প্রয়ােজন। সত্যের আলােকে মিথ্যার আঁধার উড়িয়ে
দেওয়ার প্রয়ােজন,—ধৰ্ম্মের পেশনে অধৰ্ম্মকে চূর্ণ করবার প্রয়ােজন,-
ভ্রান্তি ঘুচিয়ে শান্তি সংস্থান করবার প্রয়ােজন।
ম্যাজি। আস্তে কথা বল, জান এটা কোর্ট ! তুমি আসামীর পক্ষে
ছাপাই দিতে এসেছ ?
খ্যাপা। না, আমি আসামীর সহযােগী, আমিই দলের নেতা।
ম্যাজি। বেশ, তুমি নিজে ধরা দিতে এসেছ ? একে আসামীর পাশে
দাড়িয়ে দাও। এর বিরুদ্ধে একটা ওয়ারেন্ট ইসু কর ।
কানাই। একি কাণ্ড ! ব্যাটার উদ্দেশ্য কি? মুখের দিকে তাকাতে
যে ভয় করে। চোক দুটো যেন জ্বলছে ।

দাদী। সােজ । লােকট। যাদু জানে। মন্ত্র দিয়ে ভুলাবে না কি ? আমারও বুক কাঁপছে । খ্যাপা। কানাই পাল ! সরােজকান্ত ! এল, আসামীর বিরুদ্ধে তােনাদের কি অভিযােগ ? মা ! জীবনে এই প্রথম দুরন্তপনা কচ্ছি ! কানাই । এ ! এ! তুমি কে ? তােমার হাঁতে দণ্ড! চক্ষে সহস্র সূৰ্য্য অলছে ! ওঃ! আগুন! আগুন ! সন্ন্যাসী! বাবাজি ! ক্ষমা কর, বাঁচাও। খ্যাপা। বাঁচবে, সত্য কথা বল। ম্যাজি। ব্যাপার কি ! তােমরা এমন কচ্ছ কেন ? কানাই । হুজুর ! এই পরেশ চক্রবর্তী নির্দোষ ! আমি সরােজ মুখুয্যের অনুরােধে মিথ্যা এজেহার দিয়েছি। ম্যাজি। বটে! সরােজ কান্ত তুমি কি বল ? সরােজ । আমি রাধা নামে এক যুবতীর ধনাশ কৰ্কে গিয়েছিলাম এই পরেশ তায় বাধা দিয়ে আমায় অপমানিত করে। সেই আক্রোশে আমি একে অন্যায় রূপে চোর বলে চালান দিয়েছি । পরেশ নির্দোষ ! বাবাজি : রক্ষা কর ? বাঁচাও ! নিবিয়ে দাও চ’কের আগুন । ( রাধার প্রবেশ) রাধা। আমিই সেই অনাথা যুবতী ভিখারিণী । বিচার কর্তা, বিচার করুন, আমার নালিশ নিতে হবে। যাতনায় আমার বুক পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে ! পাপীর’দণ্ড আমায় দেখতে হবে। নইলে এ জাল জুড়াবে না। তুমি মিচার না কর, আমি নিজে করবে। এই দেখ, ছুরি! এই ছুরি আমি পাপিষ্টের বুকে বিধাব। আমার যে দেহ আমি শ্রীকৃষ্ণে অর্পণ করেছি, ঐ দুরাত্মা,--ঐ দুরাত্মা আমার সেই দেহ স্পর্শ করেছে। ম্যাজি । শান্ত হও সতী ! সন্ন্যাসী, তুমি কি যাদু জান?

পঞ্চম অঙ্ক । ১৭ খ্যাপা। না যাদু জানি না, আমি ব্রাহ্মণ, আজন্ম ব্রহ্মচারী, ব্রাহ্মণ- ধর্মের কখনও অবমাননা করি নি। ব্রাহ্মণের সম্মুখে মিথ্যা বলে, সাধ্য কার ? ম্যাজি। পরেশ চক্রবর্তী নির্দোষ খালাস। কানাই পালকে মিথ্যা এজেহার দেওয়ার দরুন, ফৌজদারী সােপর্দ করা গেল ! আর এই যুবতীর অভিযােগে, সরােজ মুখুয্যেকে গ্রেপ্তার কর ! এমনই ব্রাহ্মণ তুমি হে ব্রাহ্মণ !—তবে ব্রাহ্মণের দৈশ ভারতের এমন দুর্গতি কেন? খ্যাপা। তুমিও ব্রাহ্মণ সন্তান,-ঋষি ভরদ্বাজের সন্তান, এখন মিষ্টার মুখার্জি হয়ে বিচারপতি ! এত বড় একটা জেলার কর্তা। এত গরমে চার পর্দা পােষাকের চাপে তােমার রক্ত সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, তুমি আইনের ধারা উপধারার বলে বিচার কচ্ছ। তােমার বুকের মধ্যের যে ব্ৰহ্মন্য দেব, তার দিকে তাকাবার অবসর পাও কি বিচারকালে ? বিচার ত ব্রাহ্ম- ণেরই কাজ, সত্যদর্শী ঋষিরই কাজ! সে সত্যের মর্যাদা, সে ব্রাহ্মণের মৰ্য্যাদা তুমি রাখ কি ? সংযত সমাহিত চিত্তে বুকের মধ্যকার সত্য দেবের সাথে আলােচনা করে থাক তুমি বিচার কালে?—হে ব্রাহ্মণ বিচার পতি! ম্যাজি। না না, আমি বিচার পতির অযােগ্য। দীর্ঘকাল বিচারাসন কলঙ্কিত করেছি মাত্র। কত নিরপরাধকে দণ্ড দিয়েছি, কত অপরাধীকে মুক্তি দিয়েছি ! কত পীঞ্ছিতের, লাঞ্ছিতের অভিযােগ অবজ্ঞা উপেক্ষা করেছি! জীবনে আমি সত্য বিচার বরুবার সুযােগ এই আজ পেলাম, হে ব্রাহ্মণ ! তােমার কৃপায় ! আজ আমি কি দেখছি ! এই যে বিশ বছর আমি জেলার কর্তা হয়ে, প্রজা পালনের ভার নিয়েছি রাজার দরবারে, আমি ত প্ৰজা পালন করি নি।—আপনাকে পালন করেছি ! দশটায় এসেছি বিচার স্থলে, পাঁচটায় ফিরেছি। অবসর সময় খেলা-ধূলা, পান। ভোজনে, ক্লাবে ডিনার পাটিতে কাটিয়ে দিয়েছি অখাদ্য আসুরিক ক ১১৮ দাদা। খায় আমার ভােজন, রাজসিক পরিচ্ছদ আমার সজ্জা ! আমার শক্তি কোথায় লুপ্ত হয়ে গেছে। আমার শাসনীয় প্রজার মধ্যে কত দুব্বল নিগৃহীত হচ্ছে, কত সতীর ধৰ্ম্মনাশ হচ্ছে, কত সাধুর অবমাননা হচ্ছে, আমি তার অনুসন্ধান করা কখন ও প্রয়ােজন মনে করি নাই। অনেক কথা ! ব্রাহ্মণ ! দয়া করে আমায় গৃহে একবার পদার্পণ করূৰে ? আর আমি বিচারাসন কলঙ্কিত করবাে না ! অনি ব্রাহ্মণ সন্তান, --- আবার রাহ্মণ হবার চেষ্টা করবাে। তুমি দয়া কবে ত? জ আমার কাছারি এই পর্যন্ত ! খ্যাপা। আচ্ছা যাব। যাও পরেশ, শীঘ্র বাড়ী রওনা হও । ( রমাকান্ত ও খ্যাপা ব্যতীত সকলে চলিয়া গেল ) রমাকান্ত বাবু! তুমি সে দাঁড়িয়ে রইলে । পাথরের মত নিশ্চল !. কি ভাবছ ? রম। ব্রাহ্মণ ! এত শক্তি তােমার ? আমার পাহাড়ের মত মানটা আজ তুমি ধূলি-চূর্ণ করে দিলে ! আর দেশে মুখ দেখাতে ইচ্ছা নাই । তাই ভাবছি, কোথা গিয়ে এ পােড়া মুখ লুকিয়ে রাখি। খ্যাপা। তা হলে তােমার জমিদারী রাখবে কে ? ছেলে ত জেলে আটক হলো। তােমার জমিদারীর আছে কাটের টাকার যে কুলান নাই। টাকা ধার করাে, জামিন দিয়ে ছেলে খালাস করাে। রমা। এত সংবাদ তুমি রাখ । যদি সংবাদই রাখ, তবে আর গােপন করে ফল কি? জমিদারী আমার থাকবে না। রাখবারও ইচ্ছে নেই। এবারকার লাটের টাকা সংগ্রহ আমার হবে না, ধার আমি কোথাও পাব না। তুমিই ত বুঝতে পাচ্ছ, আমার পাপ চরমে পৌছিয়েছে। খ্যাপা। থাকবে তােমার জমিদারী, আমি রেখে দেবাে। আমি দেবাে টাকা,চল আমার সাথে ।

পঞ্চম অঙ্ক । ১১৯ রমা। তুমি আমার উপকার করবে ? খ্যাপ করবে বলেই ত দাড়িয়েছি । দেশ সেবার জন্য ভিক্ষালব্ধ লক্ষ টাকার উপর, আমার সঞ্চিত আছে। তার আমি একটী কপর্দকও কাউকে দেই নাই। আমার প্রধান প্রিয়তম শিষ্য পরেশের বিপদ কালেও তাকে একটা পয়সা দেই নাই । মহেশের শিশু ছেলে ভিক্ষা করে পথে পথে বেড়াচ্ছে, একটী পয়সাও তাকে দয়া করে দেই নাই । তােমায় দেব বলে রেখেছি। তােমার সমস্ত দেনা আমি শােধ করে দেব, কিন্তু জমিদারী দশ বছরের জন্য আমায় ইজারা দিতে হবে। তুমি পাবে মাসিক এক শ টাকা মাত্র। রমা। এক শ টাকায় আমার খরচ চলবে ? খ্যাপা। চলতে হবে,--ব্রাহ্মণ তুমি ব্রাহ্মণের মতে চলতে হবে তােমায় ! আমি তােমায় ব্রাহ্মণ করবে। তােমার জমিদারীতে আমি আমার স্বরাজের প্রতিষ্ঠা করবাে। ( রাধার পুনঃ প্রবেশ) ও কি ! ফিরে এলি কেন রাধা ? রাধা। . দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে, শুছি, জমিদারী কিন্ছ । খ্যাপা। হঁা? জমিদারীর আমার দরকার হয়েছে । এমনি সমস্ত জমিদারীগুলি যদি আমরা হস্তগত কৰ্তে পাৰ্তাম, তবে আমাদের স্বরাজ আসত। এখনও এদুেশের জমিদার-শক্তি প্রজা-শক্তির পরিচালক যাক যাও, চল বড় বাবু ! রমা। কি মতলব তােমার কি জানি ? খ্যাপা। কিছু নয়, আমার চেয়ে বন্ধু তােমার এখন আর কেউ নাই। বিশ্বাস করাে। রমা। তুমি সত্যবাদী সন্দেহ নাই। আর এ ভিন্ন আমার গতিই বা কি? চল। সকলের স্থান) চতুর্থদৃশ্য। মহেশের ভগ্ন বাড়ীর সম্মুখে অন্ধকার সন্ধ্যায় একাকী গণেশ। গগেশ । এ কি ? এ আমি কোথায় এলাম ? এ যে শ্মশান । দাদা ! দাদা! কোথায়, দাদা? বউ ঠাকরুণ ! বউ ঠাকরুণ । না না, কেউ নেই ! হরিদাস ! হরিদাস ! ও হাে ! হাে। এ বাস্তু যে শ্মশান। এই ত আমার সেই বাস্তু,জন্ম মাটী। সেই শৈশবের লীলাভূমি, বাল্যের প্রমােদ- ভবন, এইত সেই স্থান ! যেখানে দাদার হাত ধরে, দাদার পিছে পিছে ঘুরে কত আবদার করেছি। কত খেলা করেছি ! এইত সেই রান্না ঘর, যে খানে আমার বউদিদি-অন্নপুর্ণ-রূপিণী বউদিদি রান্না কৰ্ত্তেন, কত গল্প শুনেছি, কত বিরক্ত করেছি তাকে। এক দিনের জন্য একটি রুক্ষ কথা তার কাছে শুনি নি। তারা কেউ নাই ! আঁধারে ভাঙ্গা ঘর গুলি অামায় ব্যঙ্গ কচ্ছে ! কেউ নাই ! প্রতিধ্বনি উত্তর দিল,-নাই! আমিই ত এর মুলীভূত ! সারা জীবনের শিক্ষা, শক্তি, উপার্জন কি একটা ছায়া, বাজির মােহে, অসীম অফুরন্ত বিলাসের সেবায় ক্ষয়িয়ে দিয়ে, রিক্তহৃদয়ে এসেছিলাম জুড়তে, জন্ম মাটীর বুকে, দাদার স্নেহে, বউ ঠাকরূণীর আদরে ! সব চূর্ণ হয়ে গেছে ! দাদা থাকলে আমায় ক্ষমা কনে, বউ দিদি এসে হাত ধরে ডেকে নিতেন : কিন্তু বিশ্বের বিচার যায় হাতে, তিনি ক্ষমা কর্তে পারেন না! এখন! এখন ১রণ ! তুমি আর কত দূর? { মুডা হাতে পরাণের প্রবেশ) পরাণ । তুমি কে? এ শ্মশানের বুকে কে তুমি নেচে বেড়াচ্ছ ? ভূত ? না দানা! হরিদাসের কচি মড়া চিবিয়ে খেতে এসেছ ? তবে যাও, এ শ্মশান ছেড়ে ঐ শ্মশানে যাও। চল, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি ! এখনও হরিদাসের মড়া চিতায় ছাই হয় নাই। এনও তার মা বাপ ছেলের চিতায় ঝাপিয়ে মরে নাই । চণ আমি, দেখিয়ে দিচ্ছি । !

! গণেশ। কে ? পরাণ ভাই ! এ কি? মাফ কুবিয়ে দে ভাই, এ কি! পরাণ।' কে? মেঝ বাবু! তুমি এখানে কেন ? দৈখতে এসেছ? মহেশ চক্রবর্তী নির্বংশ হয়েছে, তাই দেখতে এসেছ! বাপের ভিটায় চরছে, তাই দেখতে এসেছ ? দেখ, দেখে চক্ষু জুড়াও। গণেশ। পরাণ ! এরা সব মরেছে ? এমনি অব্যর্থ শব্দভেদী বাণ মেরেছি আমি, এক মাসে সব বাড়! আন এক খানা খাড়া আন, আনায় বিখণ্ড কর! জগৎ হতে গােবিন্দ কবিরাজের নাম লুপ্ত হয়ে যাক। পরাণ । একি মেঝ বাবু! এত আক্ষেপ কেন? যা চেয়েছ, তাইত পেয়েছ! এখন যাও, রমাকান্ত মুখুয্যের বাড়ী, —এ বাড়ী সে কিনে নিয়েছে। তার কাছে একটা বন্দোবস্ত করে নিয়ে এসে ? তার পর এখানে বাগান বাড়ী সাজাও, ভাইএরা আর সরিক হতে আসবে না। গণেশ। পরাণ! বিষ মাখা ছুরি আন, আমার সর্বাঙ্গে বিধিয়ে দে। আস্তে আস্তে বিধাবি, যেন তাড়াতাড়ি মরি না। অঙ্গের ক্ষত আস্তে আস্তে মাংস ছেড়ে মজ্জা পর্যন্ত খসিয়ে দেবে, তার পর যেন মরি! শূল, বিস্ফোটক, কুষ্ঠব্যাধি, এ সব কার জন্য সৃষ্টি করেছেন বিধাতা! পরাণ । একি মেঝ বাবু, তুমি এত উন্টে গিয়েছ ? কেন ? এ অসময়ে এত উল্টা ভাব কেন? রাত ভাের হয়ে গেছে, এখন বাতি জ্বেলে এনেছ কেন ? গণেশ। তাের হাতে মুড়ো, তুই কি আমার দাদা বউদিদির শ্মশানে যাচ্ছিস ? রাণ। , বামনের শ্মশানে আমি যাব কেন? আমি রমাকান্ত মুখুয্যের বাড়ী যাচ্ছি। এ মুড়ে। তার ঘরে লাগাব, পরি যদি, তার বংশ নাশ করব। জেল থেকে এসে এখনও ধরে যাই নাই, আগে আমার এই কাজ।

১২২
দাদা।
গণেশ। সে কি পরাণ । একি সঙ্কল্প !
পরাণ। শিহরে উঠছ কেন? পরের ঘর জ্বালালে অধৰ্ম্ম হবে? সে
ভয় রাখি না। ধৰ্ম্মের খাতির রাখি না। ধর্মাধর্ম মিথ্যা ! অধর্ম করব,
অধর্মেই জয়। চুরি করব, ডাকাতি করবাে, ঘর জ্বালাবাে, ব্ৰহ্ম হত্যা
করব,-গগা হত্যা, স্ত্রী হত্যা করবে, তাতেই বড় মানুষ হবে।
গণেশ। কবে মরেছে আমার দাদা বউ দিদি বলতে পারিস। তারা
কেমন করে মলাে? মরবার সময়ে আমার নাম কি করেছিল ?
পরাণ। তারা মরে নাই। মরেছে হরিদাস, সাপে কেটে মেরেছে ।
তারা ছেলের মড়া নিয়ে শ্মশানে গেছে। বুঝি তারা ও চিতায় পুড়ে মরবে।
এসাে, আমি এগিয়ে দিয়ে আসছি। ও দিকে এক চিতায় জলবে মা বা
আর ছেলের মড়া, আর এদিকে পরাণের হাতে জ্বলবে রাকান্তের ঘর
বাড়ী।—দাউ, দাউ দাউ । এসাে, এসো, ভাইয়ের চিতায় একখানা কাঠ
দেবে এসো।
চলো, সে চিতার পাশে আমারও কি স্থান হবে না?
(উভয়ের প্রস্থান)
পঞ্চম দস্য।
মৃত পুত্র কোলে লইয়া
দয়া ও মহেশ শ্মশানে এবেশ করিলেন।
মহেশ। আজ আর এক অভিনয় ! রাজা হরিশ্চন্দ্রের অভিনয় !
জীবন-রঙ্গমঞ্চের এইটাই বুঝি যবনিকা !
শ্মশানে এসে রাণী শৈব্যায় কহিদাস বেঁচে উঠেছিল না ?
আমারও হরিদাস বাঁচবে না? বাবা হরিদাস! কথা কও আমি কতক্ষণ

পঞ্চম অঙ্ক । তােমার মা ডাক শুনি না। ও, যাদুরে আমার তােমার ? পাঠশালা হতে আসতে দেরী হলে আমি ঘরে মন রাখতে পারি নাই, তুমি ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গেলে আমার ঘর শূন্য বলে বােধ হয়েছে, রাত্রিতে ঘুম ঘােয় তুমি যদি কখনও বুক থেকে সরে যেতে, আমি কেঁদে জেগে উঠেছি। আমার মাথাখোড়া বুক-ভরা ধন! আমি দেব না—দেব না। কৃতান্ত, তুমি যতই দুরন্ত হও না কেন আমার বুক ছিড়ে আমার বাছাকে নিতে পারবে না। ওগাে তুমি যাও, ঐ যে শ্মশানে একখানা মালসা আছে না, ওতে দুটা ভাত রাধ! আমার বাবা ঘুমিয়েছে, জেগে উঠে ক্ষিধে পেয়ে কেঁদে উঠবে । মরে নি হরিদাস ! এমন ছেলে কখনও মরে ? আমার যে আর নেই-মরবে কেন ? আমি যে হরিদাসের বিয়ে দিয়ে বউ আনব।-- মরবে কেন ? মহেশ। তা বুঝেছি, এখন তুইও পাগল হলি । বেশ, বেঁচে গেলি ( দয়া ছেলে কোলে লইয়া বসিয়া পড়িলেন, তার পর মুচ্ছিত হইয়া পড়িয়া গেলেন। ) এ কি ? একবারে মরেই গেলে বড় বউ? বড় অন্যায় : তুমিও গেলে ! এ বড় অন্যায় ! আমার একার উপর দিয়ে গেলে সকল ভার, বড় অন্যায় । এই ত একলা আমায় দুটো শব পােড়াতে হবে, কোথায় তার কাঠ ? আনতে হবে আমায় যেরূপে হােক ! ছেলে বউএর শব শেয়াল কুকুরে খাবে, তাত আর হয় না। মাথাটা বড় ঘুচ্ছে, ক্ষিদেও পেয়েছে, একটু বিশ্রাম করেনি, ব্যস্ত কি ? সাবাস বটে ওস্তাদি তার,—যার এই দুনিয়াটা ( মহেশ বসিয়া পড়িয়া আস্তে আস্তে অচেতন হইলেন) ( একজন বেদে রমণীর সাথে বিশ্বনাথের পবেশ) বিশ্বনাথ। একি! এরা যে সবই শব ! এত বড় ভীষণ পরিণাম ! বিশ্ব ধ্বংসী ভূমিকপেও' এমন পারে না! প্রলয়ের মহাঝটিকাও এমন

দাদা।
সম্ভবে না। এ দেখে যে সূৰ্য্য মুখ ঢাকছে ! ওঃ!
বেদেনী। হারে! কোন মানুষটা সাপে কাটল? এই তিনটে ?
বােধ হয়। যাও বেদেনী, পারবে না তুমি,-এ শিবেরও
অসাধ্য।
বেদেনী। হারে দেখি ! হারে ল্যাড়কা! ল্যাড়কা! মরবি কেন ?
সজাগ ব্যাটা, সজাগ !
ঝুলি মধ্য হইতে ফুল পাতার একটা তােড়া লইয়া হরিদাসের গায়ে
ঝাড়িতে লাগিল ও গান করিতে লাগিল ।
মা মা বুলিয়ে হামার পরাণ কাদালি।
পরাণ কাঁদালি, হামার পরাণ কাঁদালি।
হারে বাছা সােনিয়া, বােলত মা মা।
মাটি ছােড়কে খাটি করকে,
হামি কোলে লিব তুলি,-হামি কোলে লিব তুলি।
আউর কিয়া জ্বালা, টুট গিয়া সব মালা।
সুখ দেনেক দুষপ্ত আগ, হাত দিয়া আলি।
(হরিদাস বাঁচিল, বেদিনী কোলে তুলে লইল)
হরিদাস ।
বেদিনী। হারে। হামি কি তােহার মা? তােহার মা যে কাদিয়া
মরিয়া গৈল ।
হরিদাস। তুমি কে মা !
বেদিনী। যা ব্যাটা, নামিয়ে যা, তােহাৱা খাট্টি মাকে ডাক !
(হরিদাসকে দয়ার কোলে দিল।)
হরিদাস। মা ! মা ! ও মা ?
দয়া। এ ? আমার হরিদাস।
মা ! মা !
•

পঞ্চম অঞ্চ।
২৫
বিশ্বনাথ এতক্ষণ হত জ্ঞান স্তম্ভিত ভাবে দাঁড়াইয়া ছিলেন।
বেদেনী আস্তে আস্তে চলিয়া যাইতে লাগিল। সহসা সংজ্ঞা
লাভ করিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলেন।
বিশ্ব। যেও না, যেও না মা বেদের মেয়ে ! তুমি বেদের মেয়ে নও,
বেদাতী মেয়ে ! একটু পঁড়াও মা! দেখি !
বেদেনী। যা ব্যাটা! সেই দশ-ভাতা বাঘে-চড়া বেটীর পূজা করগে
যা । ( প্রস্থান ।
বিশ্ব। (চিৎকার করিয়া) মহেশ ! মহেশ ! দেখ ! দেখ !
বিশ্বনাথের চিৎকারে, মহেশের চৈতন্য আসিল।
মহেশ। এ। 'বিশুদাদা! এসেছ ? আমি তােমায় ডাব ভাব
ছিলাম ! একা পারব কেন ?
হরিদাস। বাবা !
মহেশ। (দাড়াইয়া কাঁপিতে লাগিলেন।
দয়া। (উঠিয়া দাড়াইতে পড়িয়া গেলেন ।)
(পরেশের প্রবেশ
পরেশ। দাদা! দাদা, আমি এসেছি ! এই যে আমার হরিদাস
বেঁচে আছে।
(হরিদাসকে কোলে লইল)
বিশ্বনাশ । একটা স্বপ্নের ব্যাপার! মহেশ, স্বপ্নে হারিয়েছিলে,
আবার স্বপ্নে ফিরে পেলে !
মহেশ। কে বাচালে হরিদাসকে ? কোন্ ওঝা?
বিশ্ব। একটা বেদের মেয়ে। রাস্তা দিয়ে চলছিল, আমি ডেকে
আনলাম
মহেশ। কোথা গেল সে?

দাদ।।
বিশ্ব। পালিয়েছে বেটী, রাখতে ‘াল্লা না। তােমায় ডাকতেই
পালিয়ে গেল।
মহেশ। তা যাক ? তুমি ত দেখেছ ? ওঃ! এতক্ষণ ছিলাম অজ্ঞান
হয়ে! সূর্ষ ডুবেছে, চাঁদ উঠেছে ! দয়া ! তুই দেখেছিস সে বেদের
মেয়েটাকে ?
দয়া। আমি দেখেছি, স্বপ্নের মত।
মহেশ। বেশ! আমার দেখে কাজ নেই ।
বিশ্ব ! এখন চল গৃহে ! তােমার যা গিয়েছিল, সব পেল।
মহেশ। না, সব পাইনি। গণেশকে ফিরিয়ে পাই নি ! সে যে
আমার সকলের প্রভু।
(পরাণ ও গণেশের প্রবেশ )
গণেশ। দাদা! দাদা! বউদিদি।
( উভয়ের চরণ প্রান্তে বসিয়া পড়িল)
মহেশ। সত্যি, সব পেলাম।
গণেশ। দাদা! আমায় ক্ষমা কর্তে হবে ! বউদিদি! আমি সেই
পাষণ্ড!
মহেশ। চুপ কর গণেশ! এ সময়ে ওসব কথা নয়। পরাণ ।
তুই এলি কোখেকে! তুই না থাকলে আমার সুখ সােল আনা হয় না,
তাও কি সে বেটা জানতে পেরেছে ?
পরাণ। আমি মনে করেছিলাম, আর হরিনাম করবে না। সংসারে
ধর্মকর্ম কিছুই নয়। এখন জালাম সেটা ভুল। চুল হরিদাস, আজ
তােমাদের বাড়ীতেই প্রসাদ পেতে হবে।
(হরিদাসকে কোলে লইয়া পরাণ আগে আগে চলিল),
গণেশ। দাদা! আমি মানস করে এসেছি, যদি তােমাদের সঙ্গে

পঞ্চম অঞ্চ।
১২৭
দেখা হয়, তবে এই শরতেই দুর্গাপূজা করবাে।
বিশ্বনাথ। তাই ত মায়ের আদেশ? পরশু বােধন আরম্ভ ! চল!
আমায় কিন্তু পুরােত কৰ্তে হবে। আমি চণ্ডালের ঘরে পুবােতগিরি
করেছি তা বলে আমায় ত্যাগ করি না।
(পরেশের উপর ভর দিয়া দয়া, ও গণেশের কাঁধে
হাত দিয়া মহেশ চলিলেন)
বিশ্বনাথ । যা যেবী সর্বভূতেষুপান্তিরূপেন সংস্থিতা।
নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমঃ নমঃ।
( প্রস্থান)
৬ষ্ট দৃশ্য।
মহেশের মণ্ডপে দশভূজা মূর্তি। বিশ্বনাথ চণ্ডী পাঠ করিতেছেন।
মহেশ ও রমাকান্ত মুখুয্যে করজোড়ে দাড়াইয়া
প্রতিমাপানে চাহিয়া। গণেশ পরেশ পেছনে, মেয়েরা
ফুলপত্র অঞ্জলি লইযা দাড়াইয়া,-খ্যা আসিয়া
গান ধরিলেন।
খ্যাপা।
( গীত। মাযের রূপে জগৎ আলো,
উছলে উঠছে ভুবন ছেয়ে ।
কত রবি কত শশী লুটায় আমার মায়ের পায়ে।
নবদুর্বাদলে দেখরে মায়ের রূপের ছায়া।
নীলাকাশে দেখরে আমার মায়ের বিরাট কায়া।
চমকি চলা খেলে মায়ের অঙ্গের বিশ্ব নিয়ে।
জলদে বরিষে বারি শীতল পীযুষ ধারা,

১২
}
।
ঐ ত জামার শীতলা মার চরণামৃত ধারা।
বিশ্বে পিয়াস শান্তি হয় যে সে অমৃত পিয়ে ।
কাল মেয়ে রুদ্র ঝঞ্চা গরঙ্গি ওঠে
ঐ ত আমার রুদ্রাণী মার রুদ্র লীলা ফোটে।
তাতে আমার ভয় কিরে ভাই, ছেলে মারে কোথা মায়ে।
পাগল জানে মা রে আমার কঠোরে কোমলা,
ইন্দ্র চন্দ্র বুদ্ধি হারা বুঝতে নায়ের লীলা।
বােঝাবুঝি কাজ কি আমার মা ডাকি আনন্দ পেয়ে
ঠাকুরপো, মেঝবউ এলাে কই? আমি এত বল্লাম
তােমাকে নিয়ে গিয়ে তাকে আনতে । মেঝবউ না এলে, আমি মায়ের
পায়ে অং
।
গণেশ
তার স্পষ্ট।
(পরিমলের প্রবেশ ।
পরিমল। দিদি ! দিদি ! আমি এসেছি। গামি মায়ের পায়ে
মঞ্জলি দিতে পাব না ?
দয়া। এসো বােষ্টা ! আহা করিস কি ? ও দিকে যে তাের
ভার।
পরিমল। (মূর্হিত হইয়া পড়িয়া গেল )
দয়া। (বাতাস কম্নিতে লাগিলেন।
বিশ্বনাথ। যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা,
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমঃ নমঃ।
স।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dada

Author
Basu, Bidhubhushan
Title
Samajik Giti-natya
File name
Dada
Text
OCR done
Citation
1925
Published
2009/09/19
Publisher
Bidhubhushan Basu,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Musial Drama
DLI number
512572
Barcode
4990010019634.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
wCu9YmIj0JZ
Download PDF

Dada