Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah

Sati-rani Ed.1

Pal,jotindra Nath · 2010/04/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সতীরাণী যতীন্দ্রনাথ পাল প্রণীত ।

# 5 * *
বিছােদয়
প্রেস।
প্রিন্টার
ঐজিতেন্দ্রনাথ
সেন, বি,এ।
गरानी
যােবর নেন,
কলিকাতা।
©

যতীন্দ্রনাথ পাল প্রণীত
19
সতীরাণী
প্রাপ্তিস্থান
বরেন্দ্র লাইব্রেরী
২০৪, কর্ণওয়ালিস ঐট, কলিকাতা
মূল্য ১

আধুনিক সমাজের বিচিত্র চিত্রসূতন সামাজিক
যতীন্দ্রনাথ পাল প্রণীত--
যুগের আলাে
(যন্ত্র)

भनव मानो
नव-मा।
ran
per cuicktolla Street
CALEBITA.
উপহার প্রদত্ত হইল
बोरी
ALLERS

১ ন নকলাল মল্লিকের সেকেণ্ড লেন
গ্রন্থার কর্তৃক প্রকাশিত ও সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
২৭শে শ্রাবণ ১৩৫।

শাধশখি
दलान नागडी
E১৮শ।
1994, Ncaiektolla $tre
*.
আমার এ
“সতীরা জড়িয়ে দিলুম “ইন্দুরাণীর” সনে।
এ জীবনটা বদলে গেছে যার আগমনে।

No text on this page.

সতীরাণী প্রথম পরিচ্ছেদ দী ঘােষেরা যে এক সময় বেশ অবস্থাপন্ন লােক ছিল এ কথা হলপ করিয়া বলা যাইতে পারে তাহার পিতামহ প্রপিতামহের আমলে তাহাদের বাটীতে লােল দুর্গোৎসব পৰ্য্যন্ত হইয়া গিয়াছে কিন্তু এখন আর তাহার কিছুই নাই- সে রাষও নাই সে অবােধ্যা নাই। আছে কেবল তাহারই একটা ক্ষীণ স্বতির সহিত পৰ্বত প্রমান বংশ গর্ব। একদল উঠে অপর দল পড়ে এই ভাবেই প্রকৃতির নৃত্য পৃথিবীর বুকের উপর দিয়া চলিয়া আসিতেছে। কালের তরঙ্গে পড়িয়া তাল পুকুরের তালগাছ কয়টাই বজায় থাকে-পুকুরে বড় একটা ঘটী ভূবিতে দেখিতে পাওয়া যায় না। দীনবন্ধুরও অবস্থা কতকটা সেইরূপ হইয়া দাইয়াছিল। বলিবার মত তাদের বংণে অনেক জিনিষই ছিল, কিন্তু সাংসারিক লাভের হিসাৰে আৰু বড় একটা থাকিবার মত কোন জিনিষই ছিল না। তাহাদের জীর্ণ শর্ণ প্রকাণ্ড চকমিলান আটালিকাখানি ভূখিন আরম্ভ করিয়াছিল বটে কিন্তু পড়িয়া পড়িয়াও সেটা এখনও একেবারে ভূষিত হয় নাই।

সতী-রাণী
ঠাকুরদালানের ছাদটার কোন চিহ্ন ছিল না কিন্তু আসে
পাশের প্রাচীরগুলি এখন পর্যন্ত মিসর দেশীয় পিরামিডের
মত খাড়া হইয়া দাড়াইয়াছিল। দীনবন্ধু তাহাদের সেই
প্রকাও অট্টালিকার যে অংশটায় বাস করিতেছিল সেটা
জীর্ণ শীর্ণ ভয় হইলেও তখনও অবধি একেবারে বাসে
অপধুক্ত হয় নাই। সেই বিরাট ধ্বংসের ভিতর কতকটা
স্থান একটু পরিষ্কার করিয়া লইয়া মৃত্যুঞ্জয়ের মত দিন রাত্র
অভাৰ ও দৈত্যের জয় পেশিত হইয়া পত্নী ও কন্যাটাকে
লইয়া দীনবন্ধু দিন কাটাইতেছিল। তাহাদের অত বড়
বংশটা এখন একেবারে কংসের মত ধ্বংসের দিকেই
অগ্রসর হইতে ছিল।
ভােরর হাওয়া ঝিঝি করিয়া বহিয়া যাইতেছে,
পাখীদের ভােলাই গান তখনও একেবারে বন্ধ হয় নাই,
সুযি ঠাকুরের কড়া রংএর প্রতিবিম্ব পড়িয়া পূৰ্বদিক
ক্রমেই লালে লাল হইয়া উঠিতেছে। দীনবন্ধু বাটীর বাহির
মহলের একটা ধ্বংস কূপের উপর বসিয়া থেলাে হকায় মৃদু
মন টান দিতেছিল—আর মনে মনে আজ বাদে কাল
কন্যার গাত্রহরি তাহারই ভাল মন্দ অনেক কথাই চিন্তা
করিতেছিল। এই কটা তাহার অনেক সাধনার সামগ্রী,
-“সতীমায়ের দোর ধর। তাহার পত্নী বহুকাল পুত্র

সতী-রাণী
কন্যা হইতে বঞ্চিত ছিল। অনেক ঔষুধ-পাল, মাদুলি কবচ
ধারণের পর শেষ “সতীমায়ের দোর ধরিয়া এই কন্যাটী
লাভ করিয়াছে। ঐই কন্যাটী যখন প্রথম জন্ম গ্রহণ করে
তখন স্বামী স্ত্রীর আর আনন্দের সীমা ছিল না, কিন্তু সে
আনন্দ তাহাদের অধিক দিন স্থায়ী হয় নাই। কন্যা বড়
ইবার সঙ্গে সঙ্গে কন্যার বিবাহ চিন্তাটা বিকট রাক্ষসীর মত
সে আনন্দের সবটুকু যেন এক নিশ্বাসে একেবারে শুসিয়া
ফেলিল। বাঙ্গালীব কন্যার বিবাহ সেততা সহজ কথা নহে,
-সে কথা মনে হইলেই পিতা মাতার বুকের রক্ত শুকাইয়া
কাট হইয়া দাড়ায়,মুখে আর অন্ন জল উঠিতে চায় না।
কন্যার বিবাহ আজ কাল সেততা একটা উৎকট বিভীষিকা।
দীনবন্ধু আজ ঠিক দুই বৎসর হইতে কন্যাটীর বিবাহের জন্য
একটী সুপাত্র অনুসন্ধান করিতে ছিল কিন্তু কিছুতেই আর
সুবিধা করিয়া উঠিতে পারিতে ছিল না। পাত্র মেলে তাে
পণে মেলে না,পণে মেলে তাে পাত্র একেবারেই অপাত্র
হইয়া দাঁড়ায়। এই ভাবেই কন্যাদয়ের বােটার শুরু
বালাইয়া দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কাটি,
আসিয়াছে,এদিকে স্যাও দ্বাদশ হইতে ক্রমে চতুর্দশ বর্ষে
আসিয়া পদার্পণ করিয়াছে। কন্যার পিতা এ অবস্থায় আর
কেমন করিয়া স্থির থাকে? দীনবন্ধু একেবারে অস্থির হইয়া

সতী-রাণী
উঠিল। ভাল মন্দ বিবেচনার শক্তিটুকুও আর তাহার সহিত
না,সে তাহার যৎসামান্য বাহ কিছু জোতজমা ছিল
সমস্ত বন্ধক দিয়া সাত শত টাকা যােগাড় করিয়া ফেলিল
ও তাহাদেরই গ্রামের নিকটবর্তী অপর এক গ্রামের
একটা ছেলেকে আশীর্বাদ করিয়া আসিল। ছেলেটা
বিশেষ কিছু করে না,-গ্রামের স্কুলে কিছু দিন পড়িয়াছিল
মাত্র,বাপের কিছু জোতজমা আছে। দুই শত টাকা
নগদ ওপাঁচশত টাকার গহনা দিবার করে এই পাত্রটারই
সহিত দীনবন্ধু তাহায় কন্যার বিবাহ পাকাপাকি করিয়া
ফেলিল।
ভােরের হাওয়ায় তামাকের ধোঁয়ায় দীর চিন্তাটা বেশ
একটু জমাট বাঁধিয়া উঠিতেছিল, ঠিক সেই সময় পিতাম্বর
গলদঘর্ম হইয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে আসিয়া উপস্থিত হইল।
তাহাকে আসিতে দেখিয়াই দীনবন্ধু সদরের দিকে চাহিয়-
ছিল। পিতাষরের গলদঘর্ম মুর্তির দিকে চাহিয়া দীনবন্ধুর
সমস্ত বুকটা দূর দূর করিয়া কাপিয়া উঠিল,-তাহাকে কোন
প্রশ্ন করিতে তাহার যেন সাহসে কুলাইল না,সে কেবল
একটা ব্যাকুল দৃষ্টি লইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিতে
লাগিল। পিতার দীনবন্ধুর নিকটে আসিয়াই চীৎকার
করিয়া উঠিল, “খুড়ো এদিকে সর্বনাশ উপস্থিত, তােনার
৪

সতী-রাণী
অদৃষ্টটা দেখছি নিতান্তই মন্দ। বরের বাপ বিগড়ে বসেছে,
বুঝি এ পাত্রও ফকে যায়।”
এ পাত্রও ফস্কাইয়া যায় সে কি কথা? দীনবন্ধুর হাতে
পায়ে যেন খীল লাগিবার মত হইল। হস্তমুষ্টি শিথীল হইয়া
পড়ায়,হুকাটা হাত হইতে খসিয়া ভূমির উপর পড়িয়া
গেল,-সঙ্গে সঙ্গে কলিকা ভাঙ্গিয়া চারিদিকে আগু
ছিটুকাইয়া ছড়াইয়া পড়িল। সে কিছুক্ষণ কেমন যেন একটা
হতাশ দৃষ্টিতে পিতারের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিবার পর
আপনা হইতেই অতি মৃদুভাবে একটা ক্ষীণ স্বর তাহার কণ্ঠ
হইতে বাহির হইয়া আসিল, সে কি কথা? ফসকে যায় বল
বরের বাপ আবার বিগ ডেছে,সর্বনাশ
পিতাম্বরই এই সম্বন্ধের ঘটক। সে মুখখানা একবার
সকাইয়া বলিল,-“সর্বনাশ যে, সে কথার কোন দুই
নেই, কিন্তু বিগড়লাে যে কেন, সে কেবল বলতে পারেন
জনার্দন। আজ কালকার বরের বাপদের গতি বােৰই
তার।
তাদের কি আর কথাবার্তার কোন ঠিক ঠিকানা
আছে। তিনি এইমাত্র খবর পাঠিয়েছেন যে, পাঁচশাে টাকা
নগদ আর পাঁচশাে টাকার গহনার কম তিনি তার ছেলের
সঙ্গে তােমার মেয়ের বিয়ে দিতে পারেন না। যদি দুশাের
জায়গায় পাঁচশাে দিতে পারে তবেই তােমার মেয়ের সঙ্গে ও

সতী-রাণী
পাত্রের বিয়ে হয়, নইলে আর বিয়ের কোন আশা নেই ।
পাত্রটা ভালাে, যদি যােগাড কর্তে পার দেখ,নইলে আবার
অন্য পাত্রের চেষ্টা কর্তে হবে। পাত্রের বাজার একেবারে
আগুন। কাজেই পাত্রের বাপের সকল আবদারই সহ
কৰ্ত্তে হয়।”
পিতার তত পরিস্কার বলিয়া গেল পাত্রের পিতার সকল
আৰদানই সহ করিতে হয় কিন্তু অবস্থার সংস্কুলান হওয়া
চাইতাে। সে যে কষ্টে ও যে উপায়ে এই সাতশােটা
টাকা সংগ্রহ করিয়াছে তাহা কেবল জানেন অৰ্যামী। তিন
শত টাকা সে তাে অনেক দূরের কথা,ইহার উপর আর
একটী পয়সাও সংগ্রহ করা যে তাহার এক্ষণে সম্ভব নহে।
পিতাঘরের কথায় দীনবন্ধুর মাথার উপর যেন আকাশ
ভাঙ্গিয়া পডিলসে চক্ষে অন্ধকার দেখিল , অতি করুণ
স্বরে বলিল,-“পিতাম্বর তুমি তাে আমার আগাগােডা
সবই জান। কি করে যে এই সাতশাে টাকা জোগাড়
করেছি সে কেবল ভগবানই জানেন। এর ওপর আর একটা
আলাও আমার সংগ্রহ করবার ক্ষমতা নেই। অথচ মেয়ের
বিয়ে না দিলেও নয়,-মেয়ে তের ছেড়ে চোদ্দোয় পা
দিয়েছে। না আর জাত ধৰ্ম্ম রইলাে না। পিতার সবই
অদৃষ্টে করে।

সতী-রাণী
পিতারের কপালে তখনও বিন্দু বিন্দু ধর্ম বহির
হইতেছিল—সে তাহার অক্ষের চাদৰখানায় কপালের
ঘামটা মুছিতে মুছিতে বলিল, “খুড়াে আমার অপরাধ কি
বলল,-আমিতাে সব ঠিকঠাক করে ফেলেছিলুম,—বরের
ৰাপ যে শেষ সময়ে এমন বেয়াড়া গাইবে তা কি করে
জানবাে বল। তবে কথাটা হচ্ছে কি জান খুডো,-তােমার
মেয়ের বা বাস তাতে তাকে আর এক দিন ধরে রাখা চলে
। আগেকার মত দেশের সমাজ বন্ধন থাকলে কোন
কালে তােমার ধােপ নাপিত বন্ধ হতাে। কিন্তু তা বলে
তাে একটা সীমাও আছে। আমার মতে যেমন করে হােক
আর তিনশাে টাকা জোগাড় করে মেয়েটাকে আগে পার
করে দেওয়া উচিত। মেয়ে বড় হয়েছে,--নিন্দুকের তত
আর মুখ চাপা দিতে পাৰ্ব্বে না। দশজনে দশ কথা বলতে
কতক্ষণ। তখন মুখ দেখাবে কেমন করে? যখন সাতশাে
টাকা জোগাড় কর্তে পেরেছ তখন আর এ তিনশাে টাকাও
জোগাড় করে ফেল। পাত্রের বাজার তাে দু’বছর থেকে
দেখছ। এ পাত্র ফসূকে গেলে মেয়ের বিয়ে দেওয়া এরপর
দায় হয়ে দাড়াবে।”
পির যা বলিল তাহা যে মিথ্যা নহে দীনবন্ধু তা
মনে মনে বেশ বুঝিল। আজ দুই বৎসর ধরিয়া সে তাহার
৭

সত-রাণী
কন্যার জন্য পাত্র অনুসন্ধান করিতেছে, পাত্রের বাজার যে
কি তাহা তাহার জানিতে আর কিছুই বাকি নাই। এ পাত্র
ফাইলে সই কন্যার বিবাহ হওয়া দায় হইয়া পড়িবে,
কিন্তু তিনশত টাকা জোগাড় করে কি উপায়ে? সে তাহার
যে সামান্য জোতজমা বন্ধন রাখিয়াছে তাহার মূল বড় জোর
পাঁচ ছয় শত টাকা হইতে পারে। সে পাচ সাত দিন
পায়ে হাতে ধরিয়া কান্নাকাটা করায় গ্রামের জমিদার কেবল
মাত্র অগ্ৰহ করিয়া তাহাকে সাতশত টাকা দিয়াছেন।
আজ কালের বাজারে সেই অনুগ্রহটুকুই বা কয়জনা করিয়া
থাকে। ইহার উপর আরাে তিন শত টাকা চাওয়াও সম্ভব
নয়,-পাওয়াও সম্ভব নয়। দীনবন্ধু একটা দীর্ঘ নিশ্বাস
ফেলিয়া বলিল, “পিতাম্বর তােনার কথা যে মিথ্যে নয় তা
বাবা সবই বুঝছি কিন্তু বুঝে আর কিছু করবার আমার
কোনই ক্ষমতা নেই। কে আমায় তিনশাে টাকা দেবে?
আর তিনশাে টাকা জোগাড় হবার আমি কোন উপায়ই
দেখছিনি। কি কৰ্বো আমার যখন ক্ষমতা নেই তখন
কাজেই আমায় জাতিচ্যুত হতে হবে।
যে নিজের মেয়ের
বিয়ে দিতে পারে না তার মত হতভাগ্য আর কে আছে।
তুমি তাে আমার জন্যে চেষ্টা কর্তে ছাডনি, আমার অদৃষ্ট মন্দ
তুমি কি কর্বে বল। ভগবান তােমার মনে শেষ এই ছিল।

সতী-রাণ
শুৎ
একটা বড় দীর্ঘ নিশ্বাস দীনবন্ধুর বুকের সব ক’থানা হাড়
যেন ভাঙ্গিয়া চুরিয়া দিয়া বাহিরে বাহির হইয়া আসিল। সে
আব কোন কথা বলতে পারিল না। দুই হস্তে মস্তক
চাপিয়া ধরিল। পিতাম্বর তাহার চাদরখানা কোমরে বাঁধিতে
বাঁধিতে বলিল, “খুডাে আর একবার চেষ্টা করে দেখ যদি
জোগাড় হয়। আমি এখন চলুম, আমার আবার সকালেই
একটু কাজ আছে। রাত্রে যখন হয় খবর দিলেও হবে, আমি
তাদের কাল সকালে আসতে বলেছি।”
দীনবন্ধু কোন উত্তর দিল না। কেবল একটা ম্লান
দৃষ্টিতে পিতাম্বরের মুখের দিকে চাহিল। পিতারও আর
কোন কথা কহিল না,কোমর হইতে চাদরখানা খুলিয়া সেখান
আবার গলায় ঝুলাইয়া দিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিল।
দীনবন্ধু হতভম্বের মত কতক্ষণ তথায় বসিয়াছিল তাহাও
তাহার জ্ঞান নাই—সহসা পত্নীর পার কর্ণে প্রবেশ করায়
তাহার চমক ভাজিল। দীনবন্ধুর পত্নীর নাম অভয়া,অভয়ার
বয়স প্রায় চল্লিশ। চচলে মেয়েলী মেয়েলী গন-বর্ণটা
উজ্জল শ্যাম বলা যায়। সে স্বামীর মুখ চোখের ভাৰ
দেখিয়া একেবারে অবাক হইয়া গিয়াছিল,-মহা বিস্মিত
স্বরে স্বামীর মুখের নিকট মুখটা একটু নীচু করিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, হ্যাগা তােমার কি কোন অসুখ বিসুখ হয়েছে ?

সতী-রাণী
তােমার মুখ চোখের ভাবতো মােটই ভালাে নয়। মুখ
চোখ শুকিয়ে গেছে,-চোখ ছলছ করছে আজ বুঝি
শরীরটা ভালাে নেই।
দীনবন্ধু পত্নীর মুখের দিকে চাহিয়াছিল,—পত্নী নীরব
হইলে আবার একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া ম্লান হুরে উত্তর দিল,
“এ শরীরে কি অসুখ বিসুখ হয়,না হতে জানে। তাহলে
সংসারের এ যন্ত্রণা গুলাে কে সহ কৰ্বে বল। গিন্নি প্রথম
যখন মেয়ে হয় তখন না জানি কত আনন্দই হয়েছিল। তখন
তত একবারও মনে হয়নি যে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। গিন্নি
এত কষ্ট করে এত দিন ঘুরে সতীর যে বিয়ে স্থির করেছিলুম
সে বিয়ে ভেঙ্গে গেল। বরের বাপ এখন পাঁচশাে টাকা
নগদ ভিন্ন ছেলের বিয়ে দিতে রাজি নয়। কিন্তু পাঁচশাে
টাকা নগদ দেওয়া আমার ক্ষমতার বাহিরে। কাজেই আমার
মেয়েকে চিরকালই আইবুড়াে থাকতে হবে। পিতাম্বর
বল্পে একটু চেষ্টা করে এই তিনশাে টাকা যােগাড করে
ফেল। কিন্তু সেততা জানে না যে চেষ্টা করবার আমার
সব দ্বারই বন্ধ,—আমি চেষ্টা করি কোথায় ?
স্বামীর কথায় অভয়ার সমস্ত বুকটা একেবারে সাত হাত
বসিয়া গিয়াছিল, কিন্তু পাছে স্বামী আরও নিরাশ হইয়া
পড়েন এই ভয়ে সে প্রাণপণ শক্তিতে নিজেকে যতদূর সম্ভব

সতী-রাণী
সংষত করিয়া ফেলিল,-অতি মৃদুস্বরে বলিল, “পিতাম্বর
ঠিকই বলেছে,-পাত্রটী যখন ভালাে তখন ধার করে গে,
—ভিক্ষে করে হােক—যেমন করে তােক তিনশাে টাকা
জোগাড় করা উচিত, কিছুতেই এ পাত্ৰ'হাত ছাড়া করা
উচিত নয়। হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে কি কোন কাজ
হতে পারে। হাে না হােল্ক সে ভগবানের হাত কিন্তু চেষ্টা
সকলেরই করা উচিত। যাও এদিকে ওদিকে চেয়ে চিন্তে
দেখ যদি যােগাড হয়।
একটা হতাশাব্যঞ্জকশ্বরে দীনবন্ধু উত্তর দিল, আর
জোগাড হয়েছে। বলছ যাই একবার চেষ্টা করে দেখি।
হবার তাে আমি কোন আশাই দেখছিনি। যাও আমার
চাদখানা এনে দাও,দেখি দু'চার দোর ঘুরে আসি।”
স্বামীর কথা শেষ হইবা মাত্র অভয়া বেশ একটু সুউচ্চ
স্বরে ডাকিল, “সতীও সর্তী আনা থেকে তাের বাপের
চাদরখানা দিয়ে যানা মা।”
কন্যার নাম কর্ণে প্রবেশ করায় আর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস
যেন দীনবন্ধুর বুকের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিল
সে মনে মনে কি বলিল অৰ্যামীই বলিতে পারেন, তাহার
ঘাডটা ঈবৎ দুলিল। সতী পিতার গৃহের মেজেটা মুছিতে
ছিল জননীর আহ্বান বর কর্ণে প্রবেশ কৰিৰ মাত্রই,

সতী-রাণী সে গৃহ মার্জনা বন্ধ রাখিয়া আলনা হইতে পিতাব চাদরটা ইয়া বাহিবের দিকে অগ্রসর হইল। দীনবন্ধু গড়াইয়া উঠিয়াছিল,-সম্মুখে কন্যাকে চাদর লইয়া আসিতে দেখিয়া সে দুই তিন পা কন্যার দিকে অগ্রসর হইয়া কন্যার হস্ত হইতে চাদরখানা গ্রহণ করিল। সতী পিতার হতে চাদর- খানা দিয়া ফিরিয়া যাইতেছিল কিন্তু জননীর কথায় তাহাকে আবার ফিরিয়া দাড়াইতে হইল। অভয় জিজ্ঞাসা করিল, “হারে সতী, কি কচ্ছিলিরে এতক্ষণ ?” সতীর বটুকু গােলাপ ফুলের মত। মুখ চোখে বাহারও বড় কম নহে। তাহার আজানুলম্বিত কুঞ্চিত কেশ নাকে মুখে পিটে পড়িয়া দোল খাইতেছে। তাহার সমস্ত দেহটার উপর দিয়া যৌবন যেন পাজী দিবার জন্য স্বচেষ্ট হইয়া উঠিয়াছে,---তাহাতেই তাহার সমস্ত দেহটা যেন এক নব সৌন্দর্য্যে ঢলঢল করিতেছে। মাতার কথার উত্তরে সতীর মুখখানি মৃদু হাস্যে রঞ্জিত হইয়া উঠিল। সে মৃদুস্বরে বলিল, “কেন মা? আমি বাবার ঘর মুচ্ছিলুম।” অভয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “মা ঘরটা মুছে শিগগির শিগগির স্নান করে ফেলগে। বেলা ৰঙ কম হয়নি।” সতী আর কোন কথা কহিল না—ধীরে ধীরে পিতার গৃহের দিকে চলিয়া গেল। দীনবন্ধু চাদরখানায় সর্বাঙ্গে ১২

---
Shapa
সতী-রাণী
আচ্ছাদিত করিতে করিতে বলিল, “গিন্নি এতবড আইবুড়ো
মেয়ে ঘরে থাকলে কি আর বাপের ক্ষুধা তৃষ্ণা কিছু থাকে।
হা ভগবান আমার অদৃষ্টে এতও লিখেছিলে।”
দীনবন্দ্র টাকার চেষ্টায় বাড়ী হইতে বাহির হইয়া পড়িল,
-কন্যার অমঙ্গল চিন্তায় অভয়ার নয়ন ফাটিয়া কয়েক ফোটা
অশ্রু ঝরিয়া পড়িল।
* '
* 13
১।
শা

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
জমিদার বা মহাশয় ভরিটা অহিফেন সেবন করিয়া
বাহিরের বৈটকখানার ধপধপে ফরাশের উপর আসিয়া
উপবিষ্ট হইলেন। তখন আমাদের বেলাটা প্রায় শেষ
হইয়া আসিয়াছে। সমস্ত দিনের বিষম পরিশ্রমে সুয্যিঠাকুর
রক্তি নয়নে বিষম বিরক্ত হইয়া সে দিনকার মত পৃথিবীর
নিকট হইতে বিদায়ু লইতেছিলেন, তখনও লতায় পাতায়
প্রাসাদে কুটীরে তাহার রক্ত নয়নের প্রতিবিম্ব ঠিাইয়া
পডিয়া,—ঝিমি করিতেছিল। বাহিরের বৈঠকখানা
গৃহের ফরাশের উপর আরাে দুই একজন লােক বসিয়া গল্প
গুজব করিতেছিল, মহাশয়কে গৃহের ভিতর প্রবেশ
করিতে দেখিয়া সকলেই সমস্বরে বলিয়া উঠিল,-আনুন
বড়কর্তা আসুন।
বডকর্তা তখন ফরাশের মধ্যস্থলে আসিয়া উপবিষ্ট
হইয়াছিলেন। তাঁহার পেয়ারের ভৃত্য পদ্মলােচনও তাহারই
পাৎ পশ্চাৎ কলিকাতে ফু দিতে দিতে গৃহের ভিতর
প্রবেশ করিয়াছিল-সে সটকার উপর কলিকাটা বসাইয়া
দিধীরে ধীরে গৃহ হইতে বাহির হইয়া গেল। ব
১৪

সতী-রাণী
৮
মহাশয় সটকার নলটা তুলিতে তুলিতে একবার সমস্ত
ঘরখানার উপর দিয়া দৃষ্টিটা বুলাইয়া লইলেন। তাহার পর
সটকার নলটায় গােটা দুই টান দিয়া তাহার সম্মুখে
উপবিষ্ট ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের দিকে চাহিয়া বলিলেন,
“ভটচাজ—এই বর্ষার সময়টা কিছুতেই কাটতে চায় না
কেন বল দেখি? আচ্ছা এই যে বর্ষার সময়টা ধ্বংস করবার
সব চেয়ে সহজ উপায় কি?
অস্থি চর্মসার ভট্টাচাৰ্য মহাশয়-বড রকম এক টিপ
নস্য লইয়া জমিদারের কথায় তাড়াতাড়ি উত্তর দিল, “দেখুন,
—এই বর্ষার সময়টা অর্থাৎ বেলা কিছু বড় কিনা তাই সেটা
আর কিছুতেই কাটতে চায় না, কিন্তু কাটার এক
সােজা উপায়ও আছে।
বনু মহাশয় অহিফেনের মৌজে চকু মুদ্রিত করিষ্যা-
ছিলেন,ঈষৎ চকু উন্মুক্ত করিয়া বলিলেন, “সে উপায়টা কি?
সে উপায়টা আমার সব চেয়ে আগে জেনে রাখা উচিত।
এই বর্ষা, চারদিকে জল চারদিকে কাদা বাড়ী থেকে
বেরুবার জোটি নেই—অথচ আষাঢ়ের বেলাটা রবারের
মত ক্রমেই বেড় চলেছেনা একেবারে অস। বল
ভট্টচাজ, শুনি সে সহজ উপায়টা কি?
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় আর এক টিপ ন লইয়া বেশ একটু

সতী-রাণী
গম্ভীর হইয়া উত্তর দিল, “খােন গল্প। বর্ষার দিনে এমন
মজার জিনিষ আর কিছু নেই। সময়টা যেন জলের মত
কেটে যেতে থাকে। তার ওপর এই খােচ্ছ গল্পটা যদি পর
নিন্দা পর চর্চা হয়, তা হলে সময়টা যে কোন দিক দিয়ে
কেটে যায় ত মােটে ধর্তেই পারা যায় না।”
বসু মহাশয়ের মুখ দিয়া মাগতই অম্বরী তামাকের
একটা ক্ষীণ ধারা বাহির হইতেছিল, তিনি সটকার
নলটা মুখ হইতে বাহির করিয়া বলিলেন, “ৰা বলেছ
ভটচাজ, বর্ষার দিনে খােস গল্পই হলাে সময় ধংস করবার
সব চেয়ে সহজ উপায়। তবে সেটা পরনিন্দা-পর
'চর্চা নয়।
ভূতের গল্পই হলাে সব
চেয়ে ভালাে।
ভটচাজ, তুমি একটা ভুতের গল্প আরম্ভ কর।”
ভট্টচাজের ওই জিনিষটার উপর কেমন যেন একটা
বিষম আতঙ্ক ছিল। বনু মহাশয়ের আদেশে তার
বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ করিয়া উঠিল,-সে শুষ্ক কতে
উত্তর দিল, “আজ্ঞে ও জিনিষটার বিশেষ কোন অস
পাওয়া যায় না। যে বিষয়ের উপনে হৃদকম্প হয়
সে বিষয়টার যত আলােচনা না হয় ততই মঙ্গল—আর ও
বিষয়টায় মানুষের সুর-সঙ্গ-দুই করাই সম্ভব।
ও ভূত প্রেত নিয়ে
১৬

সতী-রাণী দ) ভট্টাচাৰ্য মহাশয় সবটা কথা শেষ করিতে পারিল না, গৃহের ভিতর প্রবেশ করিল অনিলকুমার বসু মহাশয়ের একমাত্র পৌত্র। তাহাকে গৃহের ভিতর প্রবেশ করিতে দেখিয়া,করাশে উপবিষ্ট সকলেরই ক হইতে যেন একই সুরে বাহির হইয়া আসিল, আন, হােটবাবু আসুন।” বা মহাশয় আবার চক্ষু মুদ্রিত করিয়া ছিলেন- আসুন ছােটবাবু আসুন শব্দটা কর্ণে প্রবেশ করায় , তিনি আবাৰ চকু মেলিলেন,-পৌত্রকে গৃহের ভিতর প্রবেশ করিতে দেখিয়া তিনিও মাখাটা নাড়িয়া বলিলেন,-“এস জয়া এস।” অনিলকুমার তাহার ঠাকুরদাদার সম্মুখে যাইয়া উপবিষ্ট কইল,বৃদ্ধ বসু মহাশয় সটকার নলে গােটা দুই টান দিয়া বলিলেন, “তায় বর্ষার বেলাটা আর কিছুতেই কাটতে চাইছে না,তাই ভটচাজকে বন্ধু একটা ভূতের গল্প বল,—কিন্তু ভটচাজ তাতে একেবারেই গররাজি, ভটচাজ, বলে যে জিনিষটায় বুকের ভেতরটা একেবারে কেঁপে ওঠে তাতে বলা হৰাই বেশী সম্ভাবনা। তুমি কি বল না তাই নাকি? অনিলকুমার কোন উত্তর দিল না তাহায় ই সতী-রাণী উত্তর দিল অপর এক ব্যক্তি,—সে তাড়াতাড়ি বলিল, “হুজুর এ বর্ষার দিনে প্রেমের গল্পটাই যেন জমে ভালাে।” বসু মহাশয় ঘাড় নাডিয়া বলিলেন, “আরে রামচন্দ্র, এ বয়সে কি আর আমাদের প্রেমের গল্প ভালাে লাগে ও সব ভাল লাগবে এখন এই আমার নাতিটীর। ও সব ভাল লাগবে ছেলে ছাোদের।” অনিলকুমার কথাটায় প্রতিবাদ করিল, বলিল, ঠাকুর দাদা প্রেমের গল্প, এখন আপনাদেরই ভালাে লাগা উচিত। ছেলে ছােরা প্রেম কর্তে এত ব্যস্ত যে প্রেমের গল্প শােনবার তাদের আর বড় ফুরমুৎ থাকে না। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় আর এক টিপ নখ জোর করিয়া লইয়া নাটা বার দুই নাডিয়া বলিয়া উঠিল, যা বলেছেন হােট- বাব, তারা প্রেম কর্তেই ব্যস্ত তাদের কি আর প্রেমের গল্প ভালাে লাগে। তারপর সে ব মহাশয়ের দিকে ফিরিয়া বলিল, “বড় কা, তারপর ছােটবাবুর বিয়ের কি কচ্ছেন? এইবার ছােটবাবুর বিয়ের একটা বিশেষ প্রয়ােজন হয়েছে। এই বার একটী নাতৃবৌ ঘরে আনুন।” অনিলকুমার তাড়াতাড়ি বলিলেন, “ভটচাজ মশাই এটাই মাপ কর্তে হবে। পৃথিবীতে সব কর্তে পারি শুধু ১৮

সতী-রাণী
বিয়ে কর্তে নারাজ। আমার মতে পৃথিবীতে বিয়ে
করাটাই হচ্ছে সব চেয়ে গর্হিত কাজ। লেখাপড়া শিখে এ
কাজে যে অগ্রসর হয় তার নিশ্চয় জাবেন মাথা খারাপ।
“তাই নাকি। লেখাপড়া শিখে এ কাৰ্যে অগ্ৰসৰ ।
হওয়ার মানেই হচ্ছে মাথা খারাপ, যা বলেছ ভায়া এতক্ষণে
একটা কথার মত কথা হলাে বৃদ্ধ বস্তু মহাশয় কথা
বেশ একটু বিদ্রুপ পূর্ণ স্বরে বলিয়া প্রকাণ্ড সটকার নটায়
আবার বার দুই টান দিয়া কিলেন, “বাবা পদ্ম লােচন,
ফকেটা আর একবার বলে দাও তত বাবা।”
অনিলকুমার তাহার ঠাকুরদাদার সম্মুখে ঘাড় কেট
করিয়া বসিয়াছিল, মুখটা তুলিয়া একটু মৃদু হাসিয়া উত্তর
দিল, “ওই তো আপনার দোষ দাদামশাই, আপনি
সকল কথাই ঠাট্টা করেন। ভেবে দেখুন দেখি যখন
ঠাকুমা জীবিত ছিলেন তখন আপনার অবস্থাটা কি ছিল।
চারি দিকে বন্ধন, নড়বার চডবার উপায় ছিল না। বিয়ে
করেছিলেন বলেই না আপনাকে এত শােক এত দুঃখ এত
চিন্তা সহ কৰ্ত্তে হয়েছে। আমার তো দৃঢ় বিশ্বাস দাদামশাই
বিয়ে করে মানুষের আর নিজস্ব বলে কিছু থাকে না, ঠিক
চেতনও নয় ঠিক জড়ও নয় সে একটা কিম্ভুতকিমাকার
হয়ে পড়ে।

गङ्ग-बाग
ঠাকুরমার কথায় বৃদ্ধের সমস্ত দেহের হাত ক'খানা যেন
একটা অতীতের স্মৃতির সজোর আঘাতে নডিয়া উঠিল,
৩৮ নম্বন পল্লৰ ভিজিবার মত হইল। তিনি উন্মুক্ত গৰাকে
গ্রামের পার্শ্বে ধানক্ষেতের প্রান্ত দিয়া একবার দিক সীমা
পৰ্যন্ত ধূ ধূ মাঠের দিকে চাহিলেন। একটা প্রকাণ্ড
দীঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “যা বলেছ ভায়া। কিন্তু
আমি আছি যে এত জমিজমা,—বিষয় সম্পত্তি এ সব
ভােগ কর্বে কে ? আমি তাে একেবারে নাগা সন্ন্যাসী,
এর ওপর তুমি যদি ভায়া আবার দেব সেনাপতি হও তবেই
তাে ফ্যাসাদ।”
বৃদ্ধ বসু মহাশয় নীরব হইবা মাত্ৰ অনিলকুমার কথাটায়
বেশ একটু জোর দিয়া বলিল, “দাদামশাই ৰংশের কেউ
লােগ না কৰে বুঝি আর সম্পত্তির ভােগ হয় না।
পৃথিবীতে এসে আমি প্রথম আপনাকেই চিনেছি,আপনার
কোলেই বড় হয়েছি—আপনার মেহ ও যত্নে লেখাপড়া
শিখে বি, এ, পাশ করেছি। এখন আমি অনায়াসেই আমার
নিজের উরায় সংস্থান করে নিতে পাৰ্বো। আপনি
আপনার এই বিপুল সম্পত্তি কোন সৎকাজে দান করুণ,
অনাথ এতি পালন হ’-আপনার এই অতুল কৃত্তি
পৃথিবী চিরদিনের জন্যে বুকে করে ধরে থাকুক।”

সতী-রাণী ভট্টাচাৰ্য মহাশয় মাথাটা নাডিয়া বলিয়া উঠিল, “ছােট- বাৰু যা বল্‌ছেন কথাটা নেহাত মন্দ নয়, বড়কর্তা আপনি যদি তা করেন তাহলে আর এ গাঁয়ে কেউ গরীব থাকে না,—যা হক দুবেলা দুটো খেয়ে বাঁচে। আর আমরা দুহাত তুলে আপনার জয় জয়কার করি।” অনিলকুমার একটু নীরব থাকিয়া আবার বলিল, “দাদামশাই তাই করুন,আমার জন্যে চিন্তা কৰ্বেন না। আপনার মৃত্যুর পর আপনার এই অতুল কৃর্তির কথা যখন লােক মুখে শুবাে, তখন সে আনন্দ আমার আর এ বুকে ধরবে না। আমি লােকেব সম্মুখে বড় গলায় জোর করে বলতে পাৰ্বো এমন ঠাকুরদাদার আমি নাতি।” বৃদ্ধ নাতির মুখের দিকে চাহিয়া ছিলেন,—ঘাডটা ঈসৎ নাডিয়া বলিলেন, “কথাটা শুতেও বেশ বলতেও খাসা কিন্তু পৈত্রিক ভীটেটা শেষ অনাথ আশ্রম হবে এই যা কথা। ঠিক সেই সময় ভৃত্য পদ্মলােচন সটকার কলিকাটা বদলাইয়া দিবার জন্য কলিকাতে ফু দিতে দিতে গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া সংবাদ দিল, “বাইয়ে ওপাভার রসিকবাৰু আর ক’জন ভদ্রলােক এসেছেন। তারা একবার আপনার সঙ্গে দেখা কর্তে চান।

সতী-রাণী
ক
বস্তু মহাশয় ভৃত্যের মুখের দিকে চাহিয়াছিলেন,
সটকার নলটা তুলিয়া লইতে লইতে বলিলেন, “এইখানেই
পাঠিয়ে দে।”
ভৃত্য সাকার উপর কলিকাটা বসাইয়া দিয়া গৃহ হইতে
বাহির হইয়া গেল। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা
করিল, “বডকর্তা রসিক এমন অসময় কেন ?”
বড়কা সটার নলে গােটা দুই টান মারিয়া খুব
খানিকটা তাম্রকূট ধূম শূন্যে ছাড়িয়া দিয়া কি একটা বলতে
ৰাইতে ছিলেন, কিন্তু বসি ও আরও তিন চার জন
ভদ্রলােককে গৃহের ভিতর প্রবেশ করিতে দেখিয়া তিনি
ঘাড়টা একটু তুলিয়া দরজার দিকে চাহিলেন।
ভিতর রসিক একজন মাতুব্বর লােক। মাথার চুলগুলা
একেবারে সমস্ত সাদা। বয়সটা বিলক্ষণই হইয়াছে।
রসিক এ বয়সেও সর্ব কাজেই অগ্রগামী। পরের উপকার
করিতে আজ পর্য্যন্ত রসিককে কেহ কোন দিন পশ্চাৎ পদ
হইতে দেখে নাই। রসিক গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া
লাঠীটা এক পাশে রাখিয়া ফরাশের উপর বসিতে বসিতে
বলিল, “বডকর্তা সর্বনাশ উপস্থিত। এখন তুমি না বক্ষে
করে দীর ঘােষের আর জাত থাকে না।”
রসিকের মুখ চোখের ভাব ভঙ্গি-কথাটা বলিবার
২

স ১৮ না।।
শাশক্তি
সতী-রাণী
ঢংয়ে বৃদ্ধ বসু মহাশয় বেশ একটু বিচলিত হইয়া পড়িলেন,
তিনি রসিকের মুখের দিকে চাহিয়া ছিলেন, তাহার কণ্ঠ
হইতে বেশ একটা গম্ভীর স্বর বাহির হইয়া আসিল,
“ব্যাপার কি সব ভেঙ্গে চুরে বল। এমন অসময় অবেলায়
হঠাৎ দীনুর আবার জাত যায় কেন?”
তারপর দীনবন্ধুর দিকে ফিরিয়া বলিলেন, কিহে দী
ব্যাপার কি ?
দীনবন্ধু অতি মিনতিপূর্ণ স্বরে কি একটা বলিতে যাইতে
ছিল,—কিন্তু রসিক তাহাকে বাধা দিয়া তাড়াতাড়ি উত্তর
দিল, বডকর্তা দীর মেয়ের বিয়ের কথাতাে তুমি
শুনেছ,—তারপর আগামী সােমবার যে দিন স্থির হয়েছিল
ভাওততা তােমার শােনা আছে। এখন হঠাৎ এক সর্বনাশ
উপস্থিত।
ছেলের বাপ খবর পাঠিয়েছে যে আর তিনশাে
টাকা না দিলে সে তার ছেলের বিয়ে দীনুর মেয়ের সঙ্গে
দিতে পারে না। তুমি তাে দীনুর অবস্থা ভাল রকমই
জান। এই সাতশো টাকা তাও সমস্ত বন্ধক রেখে তােমার
কাছ থেকেই কওঁ নিয়েছে—আর তার যা সম্পত্তি তা
রেখে তো পাঁচশাে টাকাও দেওয়া চলে না। তাও তে
তুমি এক কম দয়া করেই দিয়েছ। আর তিনশাে টাকা
তাকে কাটলেও পাবার সম্ভাবনা নেই। বেচাল সন্ত দিন

সতী-রাণী
মুখে জলটুকু পর্যন্ত দেয়নি,—খবরটা পেয়ে পর্যন্ত বাড়ী
বাড়ী এই তিনশােটা টাকা যােগাডের জন্যে এক রকম
ভিক্ষে কবে বেড়িয়েছে, কিন্তু কোথা থেকেও আর একটা
আলাও সংগ্রহ হয়নি। দী লজ্জায় তােমার কাছে
আসতে চাচ্ছিলাে না,কোন মুখেই বা আসবে। এই সে
দিন পায়ে হাতে ধরে সাতশাে টাকা নিয়ে গেছে,আব
কি তােমার কাছে চাইতে পারে ? আমি এক রকম জোর
করে তাকে তােনার কাছে নিয়ে এলুম-বেচারিকে এ
বিপদ থেকে তােমাকেই উদ্ধার কৰ্তে হবে।”
জমিদার বন্ধু মহাশয় এতক্ষণ বেশ গম্ভীর হইয়া
রসিকের কথাগুলা শুনিতে ছিলেন ও সটকার নলে টানের
উপর টান দিয়া সমস্ত ঘরখানাকে তাম্রকূট ধূমে পরিপূর্ণ
করিতে ছিলেন, তিনি সটকার নলটা রসিকের হতে দিয়া
বলিলেন,-“এই ব্যাপার? তাহলে তাে দেখছি মা
ফ্যাসাদের কথা।”
দীনবন্ধু অতি করুণকণ্ঠে বলিল, “আপনি আমাদের
গাঁয়ের জমিদার-দীনের আশ্রয়,সদাশয়। আপনি
কিছু সাহাৰ্য্য কল্লেই আমি এ দায় হতে উদ্ধার হতে
পারি।”
গগাধূলীর রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তখন ডালে ডালে
২৪

সতী-রাণী
রাজ্যের পাখী ডাকিয়া ডাকি সমস্ত আকাশ পাতাল
আলুথাল কয়িয়া যেন পাগল করিয়া দিতে ছিল-সন্ধ্যা-
রাণী কৃষ্ণ বসনে সৰ্বা ঢাকিয়া গাছের ফাঁকে ফাকে,
ঝােপের ভিতর দিয়া লুকোচুরি খেলা আরম্ভ করিয়া-
ছিলেন।
ভৃত্য গৃহে আললা দিয়া গেল, বৃদ্ধ বসু মহাশয়
গম্ভীর ভাবে বলিলেন, “করাতাে উচিত বুঝি কিন্তু এ
ক্ষেত্রে আমি কিছুতেই সাহাৰ্য্য কর্তে পারি না।”
রসিক আগ্রহ ভরে জিজ্ঞাসা কবিল, “কেন? কেন
বড়কর্তা?”
বস্তু মহাশয় উত্তর দিলেন, “দেখ যার কথার ঠিক
নেই তারা জোচ্চর,—সেই জোচ্চরদের প্রশ্রয় দেওয়া,
তাদের সেই কাজের সুবিধে করে দেওয়া আমি কোন
হিসাবেই ন্যায় সঙ্গত মনে করি না।”
রসিক বেশ একটু উত্তেজিত স্বরে বলিল, “তবে কি
বড়কর্তা তুমি বলতে চাও দীনুর মেয়ের বিয়ে বন্ধ থাক—
তার জাতিপাতই হােক।”
বা মহাশয় অবিচলিত স্বরে উত্তর দিলেন, “এমন কথা
আমি একবারও বলিনি,—এমন কথা আমি বলতেও
চাইনি। আমি বলি অন্য এক পাত্রের সঙ্গে দীর মেয়ের
সম্মন্ধ স্থির কব। আমি বরং তাতে কিছু দীনুকে সাহাৰ্য্য
২৫

সতী-রাণী
কর্তে প্রস্তুত আছি। কিন্তু জোচ্চরকে প্রশ্রয় দিতে আমি
একেবারেই নারাজ।
রসিক একটু কুদ্ধভাবে বলিল, “বডকর্তা বেশ সােজা
বলে দিলে অন্য পাত্র স্থির কর,অন্য পাত্র মেলে কোথায় ?
বড়কর্তা পাত্রের দরের তাে কোন খবর রাখােনা,-পাত্রের
বাজার আগুন,—এ রকম পাত্র হাজার টাকায় যে সে
লােক লুপে নেবে।”
বৃদ্ধ কণ্ঠের স্বরটা একটু উন্ধে তুলিয়া বলিয়া উঠিলেন,
“লুপে নেয় নেবে—তাবলে আমি এমন জোচ্চরের ঘরে
মেয়ের বিয়ে দিতে বলতে পারিনি।”
দীনবন্ধু মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল, আর কোথাও
তাহার টাকা পাইবার কোনই সম্ভাবনা নাই। কন্যার
বিবাহের বয়স বহু দিন পার হইয়া গিয়াছে,আর কিছু দিন
যাইলে সেটাকে ভদ্র ও অভদ্র কোন হিসাবেই চাপা দিবার
সময়টা পার হইয়া যাইবে। এ পাত্র হাত ছাড়া হইলে
শীগ্র কোন পাত্র মিলিবার, কোনই ভরষা নাই। এখন
উপায় ? তাহার কী হইতে একটা ক্ষীণ হতাশ স্বর বাহির
হইয়া আসিল, “তাহলে আমাকে কি কর্তে বলেন।
পাত্র হাত ছাড়া হলে কিন্তু
দীনবন্ধু আর বলিতে পারিল না,তাহার বুকটা যেন
২৬

সতী-রাণী
একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় যাটিবার মত হইল, তাহার নয়ন
পলব আদ্র হইয়া উঠিল।
রসিক সাহসে বুক বাঁধিয়া
বলিল, “বডকর্তা দীনবন্ধু তাে তােমার পাল্টা ঘর, -তুমিই
হয় তােমার নাতিটির সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দিয়ে
গরীবের জাত রক্ষা কর না কেন ? দীনুর মেয়েকে তো
তুমি দেখেছ অপূর্ব সুন্দরী।
রসিকের কথায় অনিলকুমার অবাক ভাবে তাহার
মুখের দিকে চাহিল। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় তাড়াতাড়ি বলিয়া
ফেলিল, “এটা একটা কথার মত কথা বটে।”
বৃদ্ধ ৰ মহাশয় ভট্টাচার্যের কথায় বাধা দিয়া জীব
অর্থ হস্ত পরিমাণ বহিষ্কৃত করিয়া মাথাটা নাড়িতে নাডিতে
বলিলেন, “ছি, ছি, অমন কথা মুখেও এনাে না,আমার
নাতি সে যে চিরকুমার।”
তাহার পর অনিলকুমারের দিকে ফিরিয়া বলিলেন,
“কি বল ভায়া,-এ কথা শুনলেও পাপ।”
অনিলকুমার কি বলিতে যাইতেছিল,বৃদ্ধ দ্বারা
তাহাকে বাধা দিয়া আবার বলিলেন,—“চেপে যাও দাদা,
চেপে যাও। আমরা বিশ্বের কাজে মন দিয়েছি,এ সব
পাড় গড়সির ছােট খাটো উপকার অনুপকার নিয়ে মাথা
ঘামাবার আমাদের প্রয়ােজন দেখা যায় না।”

সতী-বাণী
ল
দীনবন্ধুর আর ধৈৰ্য বলি না,-কন্যার বিবাহ চিন্তায়
তাহার মাথা বিকৃত হইয়া গিয়াছিল। আজ দুই বৎসর
যাবৎ পাত্র অন্বেসনের পর বহুকষ্টে এই নােমত পাত্রটা
মিলিয়াছিল,-সামান্য তিন শত টাকার জন্য তাহাও বুঝি
হাত ছাড়া হইয়া যায়। সে একেবারে দুই হতে ব
মহাশয়ের পদদ্বয় জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রুসিক্ত নয়নে বলিয়া
উঠিল, “আপনাকে আমায় এ দায় থেকে উদ্ধার কত্তেই
হবে।”
সহসা দীনবন্ধু পদদ্বয় জড়াইয়া ধরায় বন্দু মহাশয় মহা
বিচলিত হইয়া পড়িয়াছিলেন, তিনি তাড়াতাডি পদদ্বয়
সরাইয়া লইয়া বলিলেন, “আরে কর কি কর কি স্থির হও।
আমাৰ নাতিৰ সঙ্গে তােমার মেয়ের বিয়ে দিতে আমার
কোন আপত্তি ছিল না, কিন্তু আমার নাতি চিরকুমাৰ
এত গ্রহণ করেছে। সে জীবনে কোন দিন বিয়ে কবে
। তার বিয়েতে যেরূপ বিরাগ দেখতে পাচ্ছি তাতে
করে তােত আমার মনে হয় যে সে এ জন্মে তাে বিয়ে কলেই
না,—পর জন্মে যে কর্বে তাও বলে মনে হয় না। আমার
একমাত্র নাতি, শিব রাত্রের শতে, বুড়াের জীবন,
পৃথিবীর সম্বল,-আমি তার কোন ইচ্ছাই কোন দিন
অসম্পূর্ণ রাখিনি। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে আমি
২৮

সত
জge
কোন কাজই কর্তে পারিনি। তবে আমার সঙ্গে যদি
দী মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি থাকে,—আমার কোন
আপত্তি নেই। নাতি যখন বিয়ে কল্লেই না,-ভাবছি
বংশটা রাখবার একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবাে।”
বৃদ্ধের এই অপ্রত্যাশিত কথায় সকলেই একেবারে
হতভ হইয়া গেল। কেবল ভট্টাচাৰ্য মহাশয় মাথাটা
নাডিয়া বলিল, অতি মহৎ প্রস্তাব।”
দাদা মহাশয়ের এই প্রস্তাবে অনিলকুমার অবাক হইয়া
ঠাকুরদাদার মুখের দিকে চাহিয়াছিল, তাহার বৃদ্ধ ঠাকুর
দাদা উন্মাদ হইলেন কি না বােধ হয় সেইটাই সে পরীক্ষা
কৰিতেছিল ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের কথা কয়টা কর্ণে প্রবেশ
করিবামাত্র তাহার কষ্ঠ হইতে আপনা হইতেই একটা
বিকৃত স্বর বাহির হইয়া পড়িল, “মহৎ প্রস্তাব সে কি
বসু মহাশয় পৌত্রের কথায় কোন উত্তর দিলেন না
দীনবন্ধুর মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,-“এখন
কি বল দীনু-রাজি কি না ?”
বৃদ্ধের এই কথা কাটা বিশ্রুপের তীক্ষ বানের মত
দীনবর বুকের ঠিক মাঝখানে যাই আবাত করি-
তাহার নন ফাটি কয়েক ফোটা অঞ ট করিয়া

সতী-রানী
ঝরিয়া পড়িল। রসিক বেশ একটু উত্তেজিত স্বরে বলিয়া
উঠিল, “বড়কর্তা তােমার মত লােকের এ অবস্থায়
লােককে ঠাট্টা করা উচিত না।”
বনু মহাশয় হকিলেন, “বাবা পদ্মলােচন ককেটা
আর একবার পাটে দাও বাবা।”
তাহার পর রসিকের দিকে ফিরিয়া বলিলেন,-ঠাট্টা ।
এর এক বিন্দুটা পৰ্যন্ত ঠাট্টা নয় । এ অবস্থায় মানুষ
মানুষকে কখন ঠাট্টা কর্তে পারে ?
আমি একেবারে
সম্পূর্ণ ব্লাজি, -এখন দীনু রাজি হলেই হয়।”
দীনবন্ধুর আর ভালাে মন্দ বিবেচনা করিবার শক্তি
ছিল না।
এখন কোন ক্রমে কন্যা পার হইলেই হয়।
সে আজ দুই বৎসর হইতে কন্যার বিবাহের জন্য শত ভাবে
লাঞ্চিত হইতেছে—যাহার সহিত কথা কহিতে সে ঘৃণা
করিত তাহারও ভােসাম করিয়াছে। কন্যার অদৃষ্টে যাহা
আছে তাহাই হউক,-সে এক্ষণে কন্যার আইবুড়ো নাম
ঘুচাইতে পারিলেই এ দুর্ভাবনার হাত হইতে রক্ষা পাইতে
পারে। দীনবন্ধু বা মহাশয়ের কথার উত্তরে অতি বিষাদ
ভাবে বলিল, আপনাকে কন্যা দোৰ সেততা আমার
সৌভাগ্য।”
পদ্মলােচন সটকাৰ কলিকাটা বলাইয়া দিয়া গিয়াছিল,

मो-ब्राणौ
বৃদ্ধ সটকার নটা তুলিয়া লইয়া বলিলেন, “তবে আর
কি সােমবারেই দিন স্থির হলাে। পরশুই গায়ে হলুদ হক।”
দাদা মহাশয়ের এই কথায় অনিলকুমার একেবারে
উঠিয়া দাড়াইয়া ছিল,বল্প মহাশয় হাত নাড়িয়া তাকে
বসিতে ইঙ্গিত করিলেন;-বলিলেন, ‘ভায়া যে একেবারে
উঠে দাড়ালে-বস ক—বিয়ে হেন কাজ এতে একটা
সােজা ব্যাপার নয়,এখনি জিনিষ পত্র কি কি লাগবে না
লাগবে তার একটা ফপ্ত করে ফেলতে হবে।”
অনিলকুমার একটা অবাক দৃষ্টিতে একবার ঠাকুর
দাদার দিকে চাহিয়া ধীরে ধীরে আবার ফরাশের উপর
উপবিষ্ট হইল। বসু মহাশয় দীনবন্ধুর দিকে চাহিয়া
বলিলেন, “তাহলে কি বল দীনু এই কথাই পাকা ?
দীনবন্ধু একটা গাছ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া উত্তর দিল,
“আজ্ঞে হ্যা,-এর চেয়ে আর আমার মুখের কথা কি
হতে পারে ?
অনিলকুমার আর নীরব থাকিতে পারিল না,তাহার
সত্তর বৎসরের বৃদ্ধ দাদা মহাশয় এক এমােণ বর্ষিয়া
বালিকাকে বিবাহ করিতে উদ্যত,—সে স্পষ্টই বুঝিল তিনি
উন্মাদ হইয়াছেন। বালিকার নিশ্চিত বৈধ জানিয়া
তাহার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল—সে আর কিছুতেই নিজেকে
৩১

সতী-রানী
নীরব রাখিতে পারিল না বেশ একটু ব্যস্ত ভাবে বলিয়া
উঠিল, “আপনি বিয়ে কৰ্বেন,সে কি ঠাকুরদা? সে
যে আপনার চেয়ে ষাট বৎসরের ছােট।
বৃদ্ধ গম্ভীর ভাবে উত্তর দিলেন, তাতে কিছু আসে যায়
। হিন্দু শাস্ত্রে তাতে কোনরূপ বাধা নেই। তুমি চিরকুমার
থাকতে পার কিন্তু আমি যে বিয়ে কৰ্বো না এমন কোন
মানে নেই। ভায়া পরের মুখে বাধ সেধ না।”
ইহার উপর আর কথা নাই। কন্যার পিতাই যখন
এই সত্তর বৎসর বৃদ্ধ দেখিয়া ও কন্যা সম্প্রদান করিতে প্রস্তুত
তখন সে কেন তাহার ঠাকুরদাদার মুখে বাদ সাধিতে যায়।
রসিক বলিল, “একবার কন্যাটীকে দেখলে হয় না?”
বন্দু মহাশয় ঘাড় নাডিয়া বলিলেন, “কিছু প্রয়ােজন
নেই। সে দিন পুকুর থেকে জল নিয়ে যাচ্ছিল আহা-
(কি) চলে নীলশাড়ী নিজাডী নিজাড়ী
পরান সহিত মাের—
ঠিক সেই সময় দূরে ঠাকুরবাড়ীর আরতির কসর
ঘণ্টা ঝর বাজিয়া উঠিল। আষাঢ়ের পাগলা বাতাস
সহসা ফুলের গন্ধ বহিয়া আনিয়া সমন্ত গৃহটাকে মাতাল
করিয়া দিল।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
অশীতিপর বৃদ্ধ
ঠাকুলাঙ্গার একটা অনিলমানের হৃদয়ের ভিতর
যেন একটা বিদ্রোহের সুচনা কৰিল।
মােণ বর্ষিয়া বালিকার পানিগ্রহণ করিবে তাহা হিন্দু
শান্ত সঙ্গত হইতে পারে কিন্তু সেটা ন্যায় সঙ্গত কিছুতেই
নহে-এই কথাটাই বার বার কে যেন অনিলকুমারের
হৃদরের ভিতর হইতে বলিয়া দিতে লাগিল। এরূপ অন্যায়
কাৰ্য বে তাহার ঠাকুরদাদার দ্বারা কখন সব হইতে পারে
অনিলকুমার জীবনে কোন দিন সে কথা জাৰিতেও পারে
নাই। তাহার চিরকালই ধারনা ছিল তাহার ঠাকুরদাদা
শিবতুল্য ব্যক্তি। পরের দুঃখে তাহার প্রাণ সততই কাঁদিয়া
থাকে,-পরের উপকার করিতে চিরকালই তিনি মুক্তহস্ত।
তাহার দ্বারা এরূপ হীণ কাজ অসম্ভব। মনুষ্য চরিত্রের অদ্ভুত
বহু বুঝি স্বয়ং ভগবানও বুঝিতে অক্ষম। গভীর রজনী,
প্রকৃতি যখন একেবারে নিত্রার কোলে নিমখন মরে
সাড়া শব্দ একেবারে নি-কেবল বাহিরে বর্ষার
আকাশের টিপ টিপ বৃষ্টি ঝুপ ঝুপ করিয়া পড়িতেছে তখন
অনিলকুমার শান্ত পড়িয়া এই সকল কথাই চিন্তা করিতে

সতী-রাণী
ছিল। সে কেমন করিয়া তাহার ঠাকুরদাদাকে এই হীন
কাজ হইতে নিবারিত করিবে সেইটাই তাহার সর্বাপেক্ষা
শ্রেষ্ঠ চিত্ত হইয়া পাইয়াছিল। কিন্তু সে কিছুতেই স্থির
করিতে পারিতেছিল না যে কি উপায়ে তাহার ঠাকুরদাদাকে
এই কাৰ্য্য হইতে নিবারিত করে। শত যুক্তি তাহার মনের
ভিতর তাল পাকাইতেছিল বটে কিন্তু কোন যুক্তিই তাহার
মােপুত হইতেছিল না। এইভাবে শত চিন্তায় অর্ধ
জাগরণ অর্থ নিজার ভিতর দিয়া রাতটা তাে কাটিয়া
গেল, ভােরের আলাে পূর্ব কোণ হইতে উকি মাৰিব।
মাত্রই সে শয্যা ত্যাগ করিয়া উঠিয়া পড়িল। মধ্যে কেবল
একটা দিন—এক্ষণে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা অর্থে
একটা দুগ্ধপােন্ত বালিকার নিশ্চিত বৈধ। এই একটা
দিনের ভিতরই যেমন করিয়া হােৰু এই বিবাহ বন্ধ করিতে
হইবে-আজ বাদে কাল গাহৰিত্ৰা হইয়া গেলে আর
কোন উপায়ই থাকিবে না।
অনিলকুমার গৃহ হইতে বাহির হইয়া ধীরে ধীরে নীচে
নানিয়া গেল। তাহাদের একাং লিকার সম্মুখে
একটা ভােলা এন ছিল-সে টা হইতে বাহির হইয়া
এতে উপস্থিত হইবামাত্রই দেখিল তাহার ঠাকুরদা
সেই প্রাণে ধীরে ধীরে পাচালী করিতেছেন। আজ
৩০

সতী-রাণী
বাদে কাল বৃদ্ধের বিবাহ, কিন্তু সেজন্য বৃদ্ধের যে বিশেষ
কোন ভাবান্তর হইয়াছে,মুখে চোখে সেরূপ কোন
চিহ্নই নাই। সেই প্রশান্ত মুখ,-ঠিক সেইরূপই প্রশান্ত
বহিয়াছে, ভাবনা চিন্তার রেখাটা পর্যন্ত তাহাতে পড়ে
নাই। বৃদ্ধ আপন মনে ধীরে ধীরে পায়চারী করিতে
ছিলেন—একটা পা দিয়া ফিরিবামাত্রই তাহার
তাহার পৌত্রের উপর পতিত হইল। সঙ্গে সঙ্গে তাহার
মুখ চোখের উপর বেশ একটা আনন্দের জ্যোতিঃ কুটি
উঠিল। পৌত্রকে সম্মুখে আসিতে দেখিয়া তিনি বেশ
একটু গম্ভীর ভাবে বলিলেন, “এই যে ভায়া,-আজ যে
দেখছি বেশ সকাল সকালই উঠেছ। আজ বাদে কাল
গায়েহলুদ আমি জানি তুমি কি আর নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুতে
পারে। আমি বিয়ের বর-কাজেই এ সম্বন্ধে আমি আর
কতটুকু কর্তে পারি,আর কর্তে পাতেও করা উচিত
নয়, নিতান্তই সেটা বি দেখায়। তােমাকেই সব
করে কর্শে নিতে হবে-বুঝতেই তাে পাচ্ছ এটা তােমারই
কাজ। বুডে আর হােড় ও প্রায় একেই-আমায়
ছােড়ার সামিল করে রাখাই উচিত। ত কাটা যাতে
শুলাভালি শেষ হয় তার বা কিছু ব্যবস্থা তা তােকই
কতে হবে তা তাে বুঝতেই পাছাটা বেশীর অগ।”

मो-जानी
অলােদশ বৎসরের নাতিনীর সমান একটা কন্যাকে
বিবাহ করিতে বি দেখায় না, অথচ সেই বিবাহের
জিনিষ পত্র গুলা সংগ্রহ করিতে বি দেখায়। তাহার
ঠাকুরদাদা যে এটা কেমন করিয়া এমনশষ্ট বলিলেন
এইটুকুই অনিলকুমারের নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক আশ্চর্যের
বিষয় হইল। সে মাথাটা বার দুই চুলাইয়া আমতা আমতা
করিয়া বলিল, “এ বিয়েটা করা কি আপনার ঠিক হবে?
আমার মনে হয় এ বিয়ে করা আপনার মত লােকে একে
বারেই অন্যায়-
বৃজ পৌত্রকে তাড়াতাড়ি বাধা দিয়া বলিলেন, “কেন
ভায় একথা বলছ কেন? কেন কিসে ঠিক হবে না ?
আহা ভায়া তুমি পাত্রীটীকে দেখনি। ঢলঢলে মুখ,
টকটকে -মাংসাল গডন-ঠিক না হবার মত তো
কিছু নেই।
বৃকের কথায় কেমন যেন একটা বিঞ্জ স্বণা অনিল
কুমারের হৃদয়ের ভিতর হইতে উখিত হইতেছিল। সে
মৃদুস্বরে বলিল, আরে না আমি সে কথা বলছিনি।
ৰ সহায় ছাডটা নাড়িয়া বলিলেন, “বুঝলে ভায়া
এর ভেতর হবে বলে একটা জিনিষ কোন থানটারও নেই।

मणे-नानी
পাত্রী দেখতে ঠিক পরী,টাও বনেদী তখন এর
ভেতর আর তটে আসছে কোধেকে বল। তবে এর
ভিতর একটা কিন্তু আছে বটে, কিন্তু সে কি গােযােগ
যেটুকু আছে সেটুকু আমি আগেই শেষ করে ফেলবে।
তারা কোন চিন্তা করে না, তােনার যেটুকু ন্যায্য পাওনা
সে থেকে আমি তােমায় বধিত কৰো না। আমার বা
কিছু বিষয় সম্পত্তি আছে কাব্য মতে তােমার যা এখ
তা থেকে আমি তােমাকে কোন দিনই বঞ্চিত কৰো না।
সেজন্যে তােমার মুখ ভার কর্তে হবে না, তােমার
ঠাকুরদার বিয়ে,-এ সৌভাগ্য সকলের ভাগ্যে বড় একটা
হয় না। মুখ ভার করে না, আনন্দ কর শুধু আনন্দ
ঠাকুরদাদার কথায় অনিলকুমারের ভিতরটা এতটুকু
হইয়া গেল। পাছে সে বিষয় হইতে বৰিত হয় সেইজন্তু সে
তাহার ঠাকুরদাদাকে বিবাহ করিতে নিষেধ করিতেছে।
ছি-ছি-ঠাকুরদাদা শেষ এই ভাবিলেন। একটা তীব্র
অভিমান শক্তিশেলের মত অনিলকুমারের হদয়ে বেন
আঘাত করিল—তাহার মাটীর সহিত মিশতে ইচ্ছা হইল।
সে তাহার দাদার কথার কোন উত্তর দিতে পারিল
না-ইতাল ভাবে একবার আকাশের দিকে চাহিল।

সতী-রাণী
সেখানে রাঙ্গা রবি তখন রাজা হইয়া উঠিতেছিল,—সে
দিকে দৃষ্টি পড়িবামাত্র তাহার যেন মনে হইল প্রাতঃকালিন
সূৰ্য-খি রক্ত নয়নে অকৃতজ্ঞ বিষয় লােভী বলিয়া তাহাকে
ভৎসনা করিতেছে। পৌত্রকে নীরব থাকিতে দেখিয়া বৃদ্ধ
আবার বলিলেন, “ভাষা তােমার সেজন্যে কোন চিন্তা নেই
তুমি মুখ ভার কছ মিছে। যাক সে কথা এখন আর কথা
কাটাকাটি করবার সময় নেই,—যখন কথা পাকাপাকি
হয়ে গেছে তখন আর ভেবে কোন ফল নেই। এখন
গায়হলুদের জিনিষ গুলো যাতে আজই সব কেনাকাটা
শেষ হয় তার চিন্তা করা উচিত। ভায়া তুমি এই দুপুরের
গাড়ীতেই একবার কলকাতায় রওনা হও। গায়ে-
হলুদের কাপড় চপড গুলাে কিনে নিয়ে এস। আমরা
হলুম গাঁয়ের জমিদার,-যা তা জিনিষ তো আর দিতে
পারেনি। কাপড় জামা গুলাে ভালো হওয়াই দরকার ।
একটু খেলাে হয়েছে কি অমনি দুশাে নিন্দুকের মুখ খুলে
যাবে। ভায়া তুমি আমার একমাত্র নাতি, অনেক কষ্টে
তােমায় মানুষ করেছি, আমার এ আহলাদের সময় তুমি
আর এমন নিরানন্দ হয়ে থেক না। যাও মুখ টুক ধুয়ে
এক পেয়ালা চা খেয়ে সুস্থ হয়ে বিয়ের সব জোগাড় পাতি
কর্তে গেলে পড। আমরা হলুম গাঁয়ের জমিদার হয়ে

সতী-রাণী
নফরার মত যাতা করে তাে আর বিয়ে কর্তে পার্বো না।
একটু ধুম ধাম বাজি বাজনা সবই কর্নে হবে।
গুলাের তাে আজই বায়না টায়না দেওয়ার দরকার।
আমিও না হয় বুড়াে হয়েছি কিন্তু দীর মেয়ে তাে
আর বুড়ি হয়নি।
বুড়ি হয় নাই সত্য কিন্তু আপনার মত বৃদ্ধের
গলায় যাহাকে মালা দিতে হইবে, তাহার কি প্রাণে
কোন সাধ আলাদ থাকিতে পারে, আর একটু হইলেই
এই কথাটা আবার অনিলকুবের মুখ হইতে বাহির
হইয়া পডিতেছিল কিন্তু সে প্রাণপণ বলে নিজকে সংযত
করিয়া ফেলিল, ঘাড় নাডিয়া কেবল মাত্র বলিল, “আপনি
যেমন বলবেন তেমনিই হবে।”
বৃদ্ধ বস্তু মহাশয় ঘাড় নাডিয়া বলিলেন, “তেমনি হবে
বলেই চলবে না, এই সব তােমাকেই হওয়াতে হবে।
যাও আর দেরী করাে না, বিয়ের ব্যাপার এতে। একটা
সহজ ব্যাপার নয়। তার উপর আবার তুমি হলে
একা, তােমাকেই সৰ কৰ্তে হবে। যাও মুখটা ধুয়ে
চাটা চট করে খেয়ে নাও। এ সব কাজে দেরী করা
কিছু নয়।”
তাহার পর বরের মাত্রাটা একটু উদ্ধে তুলিয়া হাঁকিলেন,

শী-কাশী স্বাৰা পলােচন-তােমার ছােটবুর মুখ ধােবার হল- টল কি কি? পলােল একটা বাধান হকায় একটা কলিকা বাইয়া তাহাতে ফু দিতে দিতে আসিয়া সংবাদ দিল, আতে ছোট বাবুর মূখ খােৰার জল দেওয়া হয়েছে। অনিলকুমার মুখ ধুইতে যাইবার জন্য কয়েক পদ অগ্রসর হইছিল, বৃদ্ধ ভূতত্যর হস্ত হইতে হাটা লইয়া বলিলেন, “তারা, শােন শােন একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। পাত্রীটাকে আশীর্বাদ করে আপাতত দরকার, চিরদিনের প্রচলিত প্রথা সেটা নষ্ট করা ঠিক নয়। তাই বমি কি জান ভাঙ্গা তুমি একবার যাও পাত্রীটিকে আশীর্বাদ করে এস। এ কাজে কাজ হৰে অখন, পাত্রীটিকে আশীৰ্বাদও করা হবে নতুন ঠানটিকে দেখে আসাও হবে। সেই ভাল কথা তুমি একবার যাও। ঠাকুরদাদার এই কথায় অনিলকুমারের সহসা একটা কথা মনে পড়িল। ঠাকুরদাদাকে এই বিবাহ হইতে নিবারিত করিতে না পারিয়া সে বালিকার সত্যই অধীর হইয়া পড়িয়াছিল,-াদাদার কথা তাহার মনে হইল বিবাহ তাে অন্য দিক হইতেও ধ ৪

नो
হইতে পারে। পাত্রী আশীর্বাদ করার অছিলায় তার
এখনি দীনৰ ৰাটীতে উপস্থিত হওয়া উচিত, এবং তাহার
কলার ভবিষ্যৎ অবস্থার কথা বুঝাইয়া বলিয়া তাহাকে
এ বিবাহ হইতে নিবারিত করা সর্বতােভাবে কর্তব্য।
সে তাহার ঠাকুরদাদার কথার উত্তরে এবার বেশ
অৰিচলিত গরে উত্তর দিল, আহ দাদামশাই তাহলে
আমি মুখ ধুয়ে কেবল এক পেয়ালা চা খেয়ে পাত্রী
আশীর্বাদ করে আসি।”
পৌজের এ কথায় বন্ধু মহাশয় একবার পৌত্রের
মুখের দিকে চাহিলেন। ঘাড়টা নাড়িয়া বলিলেন, “কি
ভায়া মনটা কি বিমেটীতে ভাঙ্গচি টাচি দেবার
ইচ্ছে আছে নাকি। কিন্তু তারা এ বিয়ের আর ভাতি
দেবার আছে কি? তুমি বড় জোর পাত্রীর বাবাকে বলতে
পারে পাত্র বুড়ো শৰ্বার দেরী নেই,আজ বাদে কাল
তোমার মেয়ে বিধবা হবে। এ কথা বলাই বাল্য
পাত্রীর বাবা নিজের চোখেই সব দেখে গেছে,-পাত্রের
আগা গােড়া তার জানতে কিই বাকি নেই তখন
তুমি আর ভাতি দিয়ে কি কৰ্বে বল। আচ্ছা ভাষা
একটা স্পষ্ট কথা বলি আমার এ বিয়েতে সকলিই
আনন্দিত কিন্তু তুমি এমন হয়ে বাড়ছ কেন? বলি
৪১

সতী-রাণী
ঠাকুর দাদার এ জিনিষটিতে লােভ পড়লে নাকি হে?
স্পষ্ট বল তােমার লােভ হয়ে থাকে ,--আমি এখনি
ছেড়ে দিতে রাজি আছি। প্রাণে একটু কষ্ট হবে বটে
কিন্তু তােমার জন্যে এ ত্যাগটুকু স্বীকার কর্তে পার্লো।”
ঠাকুরদাদার এই কথায় যেন কেমন একটা ঘৃণা
অনিলকুমারের সর্ব শরীর রােমাঞ্চিত হইয়া উঠিল
সে উত্তেজিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, ঠাকুরদা আপনি যে
কি বলেন তার কোন ঠিক নেই। দুদিন আগে তাে
আপনি এমন ছিলেন না। আপনি আমায় এমনই হীন ভাবেন
যে আপনি যাকে বিয়ে কর্তে যাচ্ছেন আমি তার উপর
কুদৃষ্টি দেব। ছি, ছি, এমন কথাও আপনার মুখে
শুতে হলাে। আপনি কি জানে না যে আমি জীবনে
কখন বিয়ে কৰ্বো না। বিয়ে করাটা আমি কাপুরুষতা
মনে করি। ইচ্ছে করে যে নিজের পায়ে বেডী দিতে
চায় তার চেয়ে মুখ্য আর কে আছে।”
পৌত্রের সম্মুখে দাড়াইয়া বন্ধু মহাশয় হস্তস্থিত বাঁধান
হকায় মৃদু মৃদু টান দিতে ছিলেন-আর ফুর ফুর করিয়া
ঘােয় ছাডিতে ছিলেন,-নাতির মুখের সম্মুখে হাত
নাডিয়া বলিলেন, “হয়েছে ভায় যথেষ্ট হয়েছে। সকাল
বেলা,-বুডাে ঠাকুরদাদাকে যাচ্ছে তাই কতকগুলাে,
৪২

raria
দৰ লাভলী
৪ * ই
‘ম ১.৮ ।
খ বশত
সতী-রাণী
'
মুখ টুখ গালাগালি দিয়ে লাভ কি? তুমি যখন বিয়ে
কর্ধেই না,—তখন আমাকে তাে বংশটা রাখতে
হবে। চৌদ্দ পুরুষ যে একটু জলের জন্যে চাতক পাখীর
মত তেষ্টায় ছাতি ফাটিয়ে চেঁচাবে তাতে আর হতে
পারে না। তা তুমি আমায় ধাই বলেই গালাগালি দাও,
আমি যখন কথা দিয়েছি তখন আমায় বিয়ে কর্তেই হবে।”
অনিলকুমার ঠাকুরদাদার কথার উত্তরে আবার কি
একটা বলিতে যাইতেছিল কিন্তু সম্মুখে ভট্টাচার্য্য
মহাশয়কে আসিতে দেখিয়া সে মুখের কথা ঠোটেই
আবদ্ধ করিল। কল্যান হক কল্যান
বলিতে ভট্টাচাৰ্য মহাশয় বসু মহাশয়ের সম্মুখে আসিয়া
দাড়াইল। ভট্টাচাৰ্য মহাশয়কে সম্মুখে দেখিয়া বসু
মহাশয় আবার বলিলেন, “ভটচাজ, তােমাদের ঘােট
বাবু তাে সকাল থেকে আমায় যাচ্ছে তাই কচ্ছেন।
কিন্তু এ যাচ্ছে তাই করবার যে কি কারণ তাতে আমি
কিছুই খুঁজে পাইনি। আচ্ছা ভটচাজ, তুমিই বলল, আমি
যে দীর মেয়েকে বিয়ে কর্তে সম্মত হয়েছি,এটা
কি আমি অন্যায় কজ করেছি?”
ভট্টাচাৰ্য্য মহাশয়—ঘাড় নাডিয়া তখনই উত্তর দিল,
“আজ্ঞে না,-এর কোন জায়গাটাতে অন্যায় নেই, এটা
হ বলিতে
৪৩

সত-রাণী
অতি মহৎ কাজ। ভলােককে কন্যায় থেকে উন্ন
করার চেয়ে কি আর কিছু পুণ্যের কাজ আছে?”
অনিলকুমার একটা বিস্তৃতির দৃষ্টিতে ভট্টাচাৰ্য
মহাশয়ের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, পুণ্যের কাজ।
তের বছরের একটা মেয়েকে সতের বছরের একজন
বুজের বিয়ে করা পুণ্যের কাজ। না আর আমি কোন
কথা বলতে যাইনি। ঠাকুরদাদা আপনি শুধু হুকুম
করুশ আমাকে কি কৰ্তে হবে, আমি কচ্ছি।”
বৃদ্ধ বসু মহাশয় ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, “এই তত
ভায় কথার মত কথা। মিলে মিলে কাজ কর্ণ করাইতাে
তালে। যাও মুখ ধুয়ে চা খেয়ে পাত্রীটীকে আশীর্বাদ
করে এস,তারপর আবার বাজার কর্তে বেরুতে হবে।”
অনিলকুমার আর কোন কথা কহিল না। লোভে
দুঃখে তাহার কােধ হইয়া গিয়াছিল --সে ধীরে ধীরে
অবনত মস্তকে সেই স্থান পরিত্যাগ করিল।
৪৪

চতুর্থ পরিচ্ছেদ
অর্থ বণ্টার মধ্যে পাত্রীকে আশীর্বাদ করিবার জন্য
প্রস্তুত হইয়া অনিলকুমার বাহির হইয়া পড়িল। বহু
মহাশয় তখন কাছারি বাটীতে যাইয়া বসিয়াছিলেন,
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় সম্মুখে বসিয়া একখানা পঞ্জিকা খুলিয়া
বিবাহের লগটা স্থির করিতে ছিল। পৌত্রকে সম্মুখে
আসিয়া দাঁড়াইতে দেখিয়া বসু মহাশয় মাথাটা তুলিয়া
বলিলেন, “এই যে ভায়া,—একেবাতে প্রস্তুত হয়ে এসেছ,
এই তো চাই- এটা কি কম সৌভাগ্যের কথা,-বাপের
বিয়ে দেখাই লােকের অদৃষ্টে ঘটে না এ একেবারে ঠাকুর
দাদার বিয়ে। ওরে কে আছি শিগগির জুড়ীটা জুতে
আনতে বল।”
অনিলকুমারের প্রাণের ভিতর কি হইতেছিল সে
কেবল জানেন অন্তর্যামী, সে মাথাটা নাড়িয়া উত্তর
দিল, “না আর জুড়ীটা জুতে আনতে হবে না, আমি
হেটেই যাচ্ছি। এই তাে কাছেই,সকাল বেলা বেড়াতে
বেড়াতে বেশ যেতে পাৰ্বো।”
ব মহাশয় ঘাড়টা নাড়িয়া বলিলেন, “হে বেশ কথা
এক কাজে দুই কাজই হবে,—বেড়ানকে বেড়ান পাত্র।
৪৫

সতী-রাণী
আশীর্বাদকে পাত্রী আশীর্বাদ। দীর বাড়ীটা চেন
তে ভা,-না লােক সঙ্গে দিতে হবে?”
আপনা হইতে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস অনিল কুমারের
প্রাণের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিল, -সে ঘাড়
নাড়িয়া বলিল, “বাড়ী চিনি না বটে,-ঘােষ পাড়াটা
চিনি, সেখানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে ঠিক চিনে নিতে
পার্কে।
ভট্টচাৰ্য মহাশয় তাড়াতাড়ি বলিল, “ছাটবাবুর
সঙ্গে না হয় আমি যাই। আশীর্বাদের সময় একজন
ব্রাহ্মণের উপস্থিত থাকা বিধি।
বহু মহাশয় বেশ একটু চড়া পর্দায় বলিলেন, “ও
রেখে দাও তােমার বিধি-বুড়াের বিয়েতে কি আর অত
বিধি মানূলে চলে। তুমি যাবে কি ভটচাজ, সকলের
কি এখন এককাজে যাওয়া চলে। আজ বাদে কাল
গায়েহলুদ ব্যাপারটীতত বড় সােজা নয়। তুমি বরং
কাল গায়েহলুদে কি কি জিনিষ এয়ােজন তার একটা
ফর্ম করে ফেল—কাজ কতকটা এগিয়ে যাক। যাও
ভাষা আর দেরী করাে না দুপুরের ঐনেই তােমায় আবার
কাতায় যেতে হবে। কনের কাপড় জামা গুলাে কিনে
অন্য চাই তােক
c৬

সতী-রাণী
অনিলকুমার কোন কথা কহিল না কেবল একটা ক্ষুদ্র
ঘাড় নাড়িয়া দীনবর বাটীর উদ্দেশ্যে কাছারি বাটী হইতে
বাহির হইয়া পড়িল। পাড়া গাঁয়ের আবুড়ো বড়ো ইটের
পাকা রাস্তা,দুই ধারে থানা, ডােবা ও আগাছার বােন।
বর্ষার জলে তাহা একেবারে পরিপূর্ণ। তাহা হইতে ভেকুল
আয়রে ডাকিয়া উঠিতেছে। অনিলকুমার এই পৈশাচিক
বিবাহের কথা ভাবিতে ভাবিতে সেই রাস্তার উপর দিয়া
অগ্রসর হইতে লাগিল। তাহার কেবলই মনে হইতে লাগিল
হিন্দু সমাজের কি অধঃপতন। অশীতিপর বৃদ্ধ তাহাৰ শৰার
পত্নী বিয়ােগ হইলেও সে অনায়ালে আরাে দশবার বিবাহ
করিতে পারে কিন্তু বাদশৰৰিয়া বলিকাৰ যদি স্বামীর মৃত্যু
হয় তবে তাহার চিরদিনের জন্য ব্রহ্মচর্য প্রতিপালন করিতে
হইবে। একি বৈসম্য। যে সমাজের পুকৰ এত স্বার্থপর সে
সমাজের অধঃপতন অনিবাৰ্য। এই অশীতিপর বৃদ্ধ
এবােশষিয়া বালিকাকে বিবাহ করিতে যাইতেছে, সমাজ
এ বিবাহও ধর্গ বিবাহ বলির অনুমােদন কবিবে। হায়রে
সমাজ। এমন সমাজ না হইলে আজ আমাদের এত
অধঃপতনই হইবে কেন! যীলােকদিগের জন্য একরূপ
আর পুরুষদিগের এ অরুপ এই বৈষম্য প্রথা যাহা
এতিত করিয়াছিলেন,অনিলকুমার মনে মনে তাদের
T
০৭

সতী-রাণী আত নরকে গমনের নানারূপ সােজ এ প্রদর্শন করিতে লাগিল। এই সকল কথা যতই মনে মনে আলােচনা করিতে লাগিল ততই তাহার হিন্দু সমাজের উপর হিন্দু জাতির উপর একটা মর্মান্তির ঘৃণা হইয়া যাইতে লাগিল। সে এই সকল কথার ভিতর এমনি নিমগ্ন হইয়া পড়িয়াছিল, যে সে যে দীনৰ ঘােষের বাটী ৰাইৰার জন্য বাটী হইতে বাহির হইয়াছে সে খেয়ালটুকুও আর তাহার ছিল না। প্রায় পনাের কুড়ি মিনিট চলিবার পর সহসা সেই কথাটা মনে হওয়ায় সে রাস্তার মধ্যস্থলে সহসা থকাইয়া দাড়াইল- আসে পাশে একবার চাহিয়া দেখিল কতদূর আসিয়াছে। কিন্তু সে যে কোন পাড়ায় আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে ঠিক খেয়াল করিতে পারিল না,কারণ পাড়ার এক্ষণে বড় একটা পাডত্ব কিছুই নাই। চারিদিকে কেবলই শুধু ভয়প। রাস্তার দুই পাশেই অনেক বাড়ী আছে বটে, কিন্তু কোনটাতেই লােক নাই। কালের প্রকোপ দেখাইয়া প্রত্যেক বাটীর উপরেই বড় বড় বৃক্ষ ছাদ ফুড়িয়া ঠেলিয়া উঠিয়া যেন ধবংশের জয় পতাকা তুলিয়া ধরিয়াছে। রাস্তায় জনপ্রাণী নাই। অনিলকুমার মাপরে পড়িল। আর অগ্রসর হইবে কিনা এক্ষণে সেই চিন্তাটাই তাহার অধিক হইয়া দাড়াইল। কিন্তু রাস্তার একনে এরূপ ভাবে माडौ-बागी দাড়াইয়া থাকাও যুক্তি সঙ্গত নহে। সে আবার একটু একটু করিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিল। কিছু দূর অগ্রসর ইবার পর, অনিলকুমারের দৃষ্টি রাস্তার পাৰস্থিত একটা পুষ্করিণীর উপর পতিত হইল। পুষ্করিণীটা রাস্তার একেবারে নাগােয়া। চারিপাশে চারিটী সান বাধান ঘাট। ঘাটগুলি কালের প্রকোপে স্থানে স্থানে ভাঙ্গিয়া চুরিয়া গিয়াছে বটে কিন্তু এখন পর্যন্ত একেবারে ধ্বংস হইয়া যায় নাই। চারি পাডে বড় বড় বৃক্ষবৃক্ষের মােটা খােটা ডালগুলি সূর্যের উত্তাপ হইতে রক্ষা করিয়া পুষ্করিণীর জলটুকু যেন ঢাকিয়া রাখিয়াছে। এক সময় যে কোন ধনী ব্যক্তি এই পুষ্করিণীটা এ অর্থ ব্যয় করিয়া খনন করিয়াছিলেন, তা একবার পরিণীটির দিকে দৃষ্টি পডিলে কাহারও বুঝিতে অধিক বিলম্ব হয় না। সেই পুষ্করিণীর ঘাটের উপর একটা বালিকা স্নান কবিয়া সিক্ত বন্ত্রে একটা পিতলের কলসীতে জল ভরিতে ছিল। রাস্তায় জনপ্রাণী নাই, পল্লী জননীর নিস্তব্ধ নীর নিকুঞ্জের ভিতর হইতে দয়েল পাপিয়ার ভান মাঝে মাকে উখিত হইয়া যেন চারিদিকে শান্তি ছড়াইয়া দিতেছে। কোন পাড়ায় আসিয়াছে সেইটুকু তখন জানা অনিলকুমারের নিতান্তই প্রয়ােজন হইয়া পড়িয়াছিল, সে বাটী হইতে বাহিৰ এই প্রায় পােনর কুড়ী মিনিটের পথ অতিক্রম করিয়া ৪৯

अणे-बान
আসিয়াছে, এখন পর্যন্ত তাহার সহিত একটা লােকেরও
সাক্ষাৎ হয় নাই। সে আসে পাশে সমূখে ও দূরে আর
একবার চারিদিকে চাহিয়া দেখিল কিন্তু কোথায়ও মানুষের
চিহ দেখিতে পাইল না। এক্ষণে এই ৰালিকাকে জিজ্ঞাসা
করা ব্যতীত উপায় নাই। সেইটুকু বালিকার নিকট হইতে
জানিবার জন্য অনিলকুমারকে বাধ্য হইয়া সেই ঘাটের সম্মুখে
আসিয়া আবার চাইতে হইল। বালিকা নিজ মনে
কলসীতে জল ভরিতেছিল, সহসা ঘাটের উপরে চাহিৰা মাত্র
তাহার দৃষ্টি অনিলকুমারের উপর পতিত হইল। ঘাটের
উপর একজন অপরিচিত লােককে দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া
বালিকার সর্বাঙ্গ যেন লজ্জায় সংচিত হইয়া পড়িল। সে
তাহার অঙ্গের সিক্ত বস্তু যতদূর সম্ভব সংযত করিয়া লইয়া
জলের ভিতর কয়েক পদ নামি গেল ও কলসীৰ তাডনে
দুই পাৰে জল সরাইয়া দিয়া,কলসীটী জলের ভিতর
দুবাইয়া ধরিল। দুই চারির মাত্ৰ ৰগৰগ, করিয়া কলসী
জলে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল, বালিকা দুই হন্তে কীটী
ধরিয়া ঘাটের উপর আনিয়া রাখিল। অনিলকুমার এক দৃষ্টে
বালিকার দিকে চাহিয়া বালিকার এই কলসীতে জলভরা
দেখিতেছিল সহসা বালিকা তাহার উপরের দিকে চাওয়ায়
তাহার দৃষ্টি বালিকার দৃষ্টির সহিত সম্মিলিত হইল। ঠিক

সতী-রাণী
সেই সময় পুকুরের পাড়ের একটা গাছের মাথার উপর
হইতে একটা জংলা পাখী বে”কথা কও বলিয়া উড়িয়া
গেল। অনিলকুমারের মনে হইল প্রাণের একটা গুপ্ততার
কে যেন ঈষৎ নাডিয়া দিল, সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত বুকটা
দূর দূর করিয়া কঁপি উঠিল। বালিকার দিকে চাহিতে
তাহার কেমন হয় হইতে লাগিল। সে কয়েক পদ
অগ্রসর হইয়া ঘাটের এক পার্কে ধাইয়া দাঁড়াইল। বালিকা
ঘাটের উপর দাড়াইয়া সিক্ত বন্ত্র গুলি যথাস্থানে ঠিক
করিয়া দিয়া কসীটা কে তুলিয়া লইল। তার পর
ধীরে ধীরে ঘাটের সিডি ভাঙ্গিয়া উপরে উঠিতে লাগিল।
বালিকার তালে তালে পা ফেলিবার সঙ্গে সঙ্গে কলসীর
পরিপূর্ণ জল ছলাৎ ছলাৎ করিয়া ঘাটের উপর পডিয়া
বালিকার মরাল গতির প্রাধান দিতে লাগিল।
অনিলকুমারকে ঘাটের এক পার্শে দাড়াইয়া থাকিতে
দেখিয়া বালিকা লজ্জায় মহা সঙ্কুচিত ভাবে পাশ কাটাইয়া
চলিয়া যাইতেছিল,অনিলকুমার মহা ব্যস্ত তাৰে তা-
তাড়ি বলিল, ওগাে শােন।”
অনিলকুমারের স্বর বালিকার কর্ণে প্রবেশ করিবা
মাত্র বালিকা লজ্জায় মহা জড়সড় হইয়া ফিরিয়া দাড়াইল।
লাজ বিজড়িত নয়নে অনিলকুমারের মুখের দিকে অবাক

সতী-রাণী
ভাবে চাহিল। এতক্ষণ অনিলকুমার বালিকাকে ভালাে
করিয়া দেখে নাই,এইবার তাহার দৃষ্টি বালিকার
সর্বাঙ্গের উপর ছড়াইয়া পডিল। বালিকার সর্বাঙ্গের
উপর সৌন্দর্ষেরণী যেন তাহার সৌন্দর্য্যের ভাণ্ডার
খুলি ধরিয়াছেন। নারীর সমস্ত সুষমায় বালিকার
সর্বাল ঢলঢল করিতেছে,-যেমন মুখ চোক তেমনি
রংয়ের বাহার,ভ্রমরকালাে চুলগুলি পৃষ্ঠের উপর দিয়া
গড়াইয়া পড়িয়া পায়ের গােড়াটা চুম্বন করিতে উদ্যত।
নারীর এত রূপ,—এত চুল অনিলকুমার পূর্বে আর কখন
দেখে নাই। এই খানা ভােবা বন জঙ্গলের ভিতর এমন
সুন্দরী বালিকা যে থাকিতে পারে, সে ধারণাটুকুও সে
কোন দিন করিতে পারে নাই। পল্লীগ্রামের মেয়ে সুন্দরী
হইতে পারে না এইটাই ছিল তাহার আজন্মের সংস্কার।
কিন্তু একি। এ বনের ভিতর এ পারিজাত কেমন
করিয়া অনিলকুমারের মনে হইল সৌন্দর্যের
রাণী আজ যেন মুর্তিমতী হইয়া তাহার সম্মুখে আসিয়া
দাঁড়াইয়াছে। বালিকা যে অবিবাহিত লিকাকে দেখি-
মাত্রই অনিলকুমার সেটুকু বুঝিয়াছিল , তবে তাহার
বয়স যে কত তা ঠিক অনুমান করিতে পারিল না,
তবে তাহার মনে হইল বালিকার বস পরিপূর্ণ এয়ােদশ
ফুটিল।
৫২

সত-রাণী
কংবা সবে মাত্র চতুর্দশে পদার্পণ করিতেছে। অনিলকুমার
পল শূন্ত নয়নে বালিকার সেই অপূৰ্বরূপ দেখিতেছিল,
সে একেবারেই ভুলিয়া গিয়াছিল যে বালিকা তাহার
প্রশ্নের অপেক্ষায় দাড়াইয়া রহিয়াছে। সহসা কর্ণে যেন
অমৃত বর্ষণ হওয়ায় অনিলকুমারেব চমক ভাঙ্গিল। বালিকা
কিছুক্ষণ অনিলকুমারের দিকে চাহিয়া থাকিয়া তাহাকে
কান প্রশ্ন করিতে না দেখিয়া অতি লজ্জিত মৃদু স্বরে
জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি কি আমায় ডাকলেন?”
অনিলকুমাব মহা ফ্যাসাদে পডিল,—বালিকার স্বর
তার কর্ণের ভিতর প্রবেশ করিবার সঙ্গে সঙ্গে তাহার
প্রাণের ভিতরে যেন একটা ওলােট পালট আরম্ভ হইয়াছিল।
‘স যে বালিকাকে কেন ডাকিয়াছে সেটারই খেই হারাইয়া
বসিল যে, বালিকাকে কি যে প্রশ্ন করিবে কিছুই স্থির
করিতে পাৰিল না। অথচ বালিকা উত্তবের জন্য তাহার
নখের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে। অনিলকুমার তাড়াতাড়ি
একটা অর্থহীন প্রলাপের মত যাহা তাহা প্রশ্ন কবিয়া
বসিল, “তােমার এখনও বিয়ে হয়নি ?”
অনিলকুমাৰের এই প্রশ্নে বালিকা যে শুধু একটু অবাক্
হইল তাহা নহে, বেশ একটু সংকোচিত হইয়া পড়িল।
এই অপরিচিত যুবক, সহসা তাহার বিবাহ হইয়াছে কি না

সতী-রাণী
এ কথা জিজ্ঞাসা করিতেছে কেন? বালিকা ইহার ভাল
মন কিছুই বুঝিল না,সে একবার একটা বিস্মৃতির দৃষ্টিতে
অনিলকুমারের মুখের দিকে চাহিয়া ধীরে ধীরে বাটীর দিকে
অগ্রসর হইবার চেষ্টা করিতেছিল। কিন্তু অনিলকুমার
আবার তাহাকে বাধা দিল,—কথাটা বলিয়া ফেলিয়াই
অনিলকুমার বুঝিয়াছিল এ অষণা প্রশ্ন বালিকাকে জিজ্ঞাসা
করা তাহার ভালো হয় নাই। কোন অপরিচিত একাদশ
চতুর্দশ বৰিয়া বালিকাকে তােমার বিবাহ হয় নাই ইহা
অপরিচিত পুরুষের জিজ্ঞাসা করা শুধু অসঙ্গত নয় অভদ্রচিত।
সে দোষটাকে ঢাকিবার জন্য অনিলকুমার আবার তাড়াতাডি
বলিল, “রাগ করে একেবাৰে চলে যেওনা,একটু দাড়াও,
আমি তােমাকে অযথা প্রশ্ন করে যে অপরাধ করেছি ।
জন্যে একটু ক্ষমা চাইবার আমায় অবসর দাও। তােমাৰ
বিয়ে হয়েছে কিনা এ কথা তােমায় জিজ্ঞাসা করা শুধু
অসঙ্গত নয় অভদ্রচিত, কারণ তােমার বিয়ে হক আর না
হক তাতে আমার কিছু আবে যাবে না। আর তাছাড়া
আমার মতের ওপরও তােমার বিয়ে নির্ভর করে না। এই
জন্যে আমি যে অযথা প্রশ্ন করে অপরাধ করেছি—তার
জন্যে তুমি আমায় ক্ষমা কর।”
সত্তর বৎসরের ঠাকুরদাদা একটা এয়ােদশ বৰিয়া
৫৪

বৈশাখ।
শৰ ল'ৰী
১৪. না ।
कम
मण-बानी
বালিকাকে বিবাহ করিতে উদ্যত এইটুকু জানিবার পর
হইতেই তাহার সমস্ত মাথাটা বেঠিক হইয়া গিয়াছিল।
সে যে কি বলিল—তাহ বালিকা বুঝিতে পারিল কিনা
তাহ জানিৰাৰ ৰা বুঝিবার তখন তাহার অবসর ছিল না,
সে কথা গুলা তরতর করিয়া বলিয়া বালিকার মুখের দিকে
চাহিল। বালিকা অবাক হইয়া অনিলকুমারের মুখের
দিকে চাহিয়া ছিল অনিলকুমার নীরব হইবা মাত্র তাহার
ক) হইতে একটা বিশ্বতির পর আপনা হইতেই বাহির
ইয়া আসিল, পাগল নাকি?”
বালিকা ত্রুতপদে অগ্ৰসৰ হইবার জন্য ফিরিতে
উদ্যোগ করিয়াছিল,—কিন্তু অনিলকুমার মহা উত্তেজিত
ধরে বলিয়া উঠিল, “তুমি ঠিক ধরেছ,-আমার এ ছিট
হয়েছে হিন্দু সমাজের আৱেল দেখে। সত্তের বৎসরের
বুড়ো যার মরবার আর তিন দিন বাকি নেই, সে যদি
এটা তের বছরের মেয়ে বিয়ে করে তাহলে সমাজ
বলবে বেশ করেছ-একিই বলে মহৎ কাজ। হিল
শাও চমৎকার,সেও অমনি নজির দেখিয়া সায় দিয়ে
যাবে। কিন্তু মেয়ের বিয়ে যদি পয়সার অভাবে তের
বছরে দিতে না পারে তাহলে আর রকে নেই,
সজ অমনি ধােপা নাপিত বন্ধ করবেন। আব শায়

সতী
সঙ্গে সঙ্গে তাকে বেদাত করে দিবে। পুরুষের বেলা
দুটো বিয়েতেও দােষ নেই,যত দোষ মেয়েদের বেলা।
বালিকা অনিলকুমারের কথার কোনই অর্থ বুঝিল না,
সে এই লােকটা সত্যই পাগল কিনা তাহারই বােধ হয়
সঠিক মীমাংসা করিবার জন্য অবাক ভাবে আবার তাহার
মুখের দিকে চাহিতে লাগিল। অনিলকুমার আপন মনে
বলিয়া যাইতেছিল,-“তােমরা বলবে পুরুষের দোষ নেই,
আমিও বলি কিছু না, পুরুষরা যে দেতা, তাদের কি
কোন দোষ থাকতে পারে? তােমার সঙ্গে যদি একটা
সত্তর বছবের বুড়াের বিয়ে হয়, তাকে কি তুমি বর
বলে গ্রহণ কর্তে পার,—না তাকে তােমার পছন্দ হয়।
অনিলকুমারের কথায় বালিকার মুখখানি ভার হইয়া
উঠিল, সে ঠোটটা একবার ফুলাইয়া গমনের চেষ্টা করিল
অনিলকুব ঘাড় নাডিয়া আবার বলিল, “দাড়াও আমি
এ বিষয় তােমার সঙ্গে তর্ক কর্তে চাই। তুমি তাে
মেয়েটী, তােমার নামটা কি ?
বালিকার মুখ চোকের উপর একটা হাসির রেখা খেলিয়া
গেল, সে অতি মৃদুস্বরে উত্তর দিল, “আমাৰ নাম সতী।”
একটা দীর্ঘ নিশ্বাসের সহিত অনিলকুমারের যেন বুকের
ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিল, সতী। কি মধুর। যেন

সতী-রাণী
একটা উচ্ছাস। সেই লক্ষ্যে দুহিতা সতী-সেই শিবের
ঘরণী সতী,—সেই পতি পাগলিনী সতী। সেই সতী আর
এই সতী। বলতে পারাে এ দুয়ের মধ্যে কে মনাম ?
অনিলকুমারের দিকে সতী একটা বক্র দৃষ্টিতে
মাহিয়া ঠোট দুইখানা ইষৎ ফুলাইয়া দ্রুত গতিতে বাটি
দিকে অগ্রসর হইল। কথাটা জিজ্ঞাসা করিয়াই
অনিলকুমার আকাশের দিকে চাহিয়াছিল। ৰালিকা যে
তার সম্মুখ হইতে চলিয়া গেল তাহাও তার খেয়াল
হইল না। তার যখন চমক ভাঙ্গিল তখন বালিকা
তাহার নিকট হইতে বহুদূর চলিয়া গিয়াছে।
তাড়াতাড়ি সুউচ্চে স্বরে বালিকার দিকে চলিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “দীনবন্ধু থােষেব বাড়ী কোথায় জান ?”
বালিকা কোন উত্তর দিল না কেবল সন্মুখে অঙ্গুণী
দেখাইল। অনিলকুমারের মুখ হইতে দ্বিতীয় প্রশ্ন বাহিব
হইবাৰ পূৰ্বেই সতী রাস্তায় বাঁক ঘুরিল। অনিলকুমার
একটা দীর্ঘ নিশাস ফেলিয়া বলিল, “হায় নারী তােমাদের
লজ্জাটুকুই তােমাদের সর্বনাশের মূল। লজ্জা ছেড়ে পুরুষের
সঙ্গে লড়াই দিয়ে চীৎকার করে বল, তােমাদের জবরদস্তি
আর আমরা মানবাে না,মাতে পাৰ্বো না-মানা
উচিত নয়।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ
দীনবন্ধু প্রাতঃকৃত্য সমার্পণ করিয়া শয়ন কক্ষের
সমুখস্থ বাৰান্দার এক ধারে উচু হইয়া বসিয়া একটা
কলিকায় অগ্নি সংযােগ করিতেছিল, সেই সময় অত মান
করিয়া সিক্ত বন্ত্রে ঘাট হইতে একরাশ মালা বাসন লইয়া
ফিরিল। সে অতি প্রভূৰে উঠিয়া ঘর দোরের কাজ সারিয়া,
-বাসন মাঝিতে ঘাটে যাইত,আজও গিয়াছিল।
তাহার ইন্থিত মাজা বাসনগুলাে বারান্দার এক পার্কে
যাইয়া নামাইয়া রাখিল। দীনবন্ধুর প্রাণটা কাল হইতে একে-
বারে চিন্তায় ভরাট হইয়াছিল, বাসন রাখার শব্দে সে যেন
একটু বিচলিত হইয়া পেছন ফিরিয়া চাহিল। স্বামীকে
পশ্চাৎ ফিরিয়া চাহিতে দেখিয়া অভয়া বলিল, “ওগাে কি
স্থির কল্পে ? আমার তাে বাপু, বুকের রক্ত শুকিয়ে কাট
হয়ে গেছে। ওই দুধের বাছাকে কেমন করে ওই বুড়ােয়
গতে সপে দেবে। জেনে শুনে মেয়েটার এমন সর্বনাশ
কখন কি করা যায়। এর চেয়ে মুখ্য সখ্য যেমন তেমন
ছেলের হাতেও ধরে দেওয়া ভালাে,যাই হক মেয়ের
নােয় সি-টকৃতত বজায় থাকবে?

সখী-রাণী
দীনবন্ধু পঙ্গীর মুখের দিকে চাহিয়া পত্নীৰ এই কথা
গুল স্থির হইয়া শুনিতেছিল। পত্নীর কথাগুলা যেন অগ্নি
গােলােক হইয়া এক একখানা করিয়া তাহার বুকে সব
কয়খানা পার ভাঙ্গিয়া দিবার চেষ্টা করিতেছিল। পত্নী
নীরব হইমাত্র সে হস্তস্থিত টিকাখানা ভাজি কলিকার
উপর দিয়া একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, গিন্নি বুঝি
সব, কিন্তু বুঝে কি কছি বলল। তেমন মুখ সুখই বা
ছেলে পাই কোথায়? এই দু’বছর থেকে চেষ্টা কচ্ছি,
কিন্তু কই সেই মুখ মুখ ছেলেই বা পেলুম কই ?
গিন্নি কোন দিন তো বিদ্যান কি বড়লােক পাত্র
খুজিনি। আমাদের যেমন অবস্থা তেমনি পাই খুজে
ছিলুম কিন্তু আমাদের অদৃষ্টের গুণে তাও মিললাে কই।
গিন্নি মিছে ভেবাে না,—বােস মশাইকে যখন কথা
দিয়ে এসেছি, তখন আর কথার খেলাপ করে কোন
লাভ নেই। মেয়ের অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে।
টার অদৃষ্ট যদি ভালােই হবে তবে আর সে আমাদের
ঘরে জন্মাবে কেন বলল। আইবুড়ো মেয়ে যখন বাড়ীতে
রাখা যায় না তখন আর কিছু ভাবার দরকার নেই।
যা থাকলে ভালাে মন্দ বিবেচনা করা চলে তাই যখন
আমাদের নেই, তখন সে কথা চিন্তা করবারও আমাদের

मडो-बाणौ
অধিকার কি? কোন দিন মেয়েটাকে ভালাে খাওয়াতেও
পারিনি, কোন দিন মেয়েটাকে ভালাে পরাতেও পারিনি
কিন্তু তবু মেয়েটার মুখে হাসি ধরে না। গিন্নি গরীবের
সংসারে অত গসি ভালাে নয়, এস আমরা দু'জনে মিলে
তার মুখের হাসি চিরদিনের মত ঘুচিয়ে দিই।”
অভায়া কাট হইয়া দাইয়াছিল, তাহার সিক্ত বস্ত্র
বহিয়া এতক্ষণ টষ্ট করিয়া জল ঝরিয়া পডিতেছিল ,
এইবার নয়ন ফাটিয়া গও বহিয়া টষ্ট করিয়া জল ঝরিয়া
পভিল, দীনবন্ধু আর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিতে
লাগিল, “গিন্নি চোখের জল ফেল না, চোখের জল
ফলে কি কৰ্বে বা ? চোখের জলে কফল ধুয়ে মুছে
যায় না। যেমন অদৃষ্ট করে এসেছ তেমনি তো তাৰ ফল
ভােগ কর্তে হবে। যা ভেব না,—বদ নী--বৃক্ক বাধ
আমার সবে এসে অনেক দুঃখ সহ্য কবেছ, এটুকু
সহ কব।”
অভয়া অঞ্চলে চক্ষু মুছিতেছিল, জড়িত কণ্ঠে বলিল,
মেয়েটা এমনি পােড়া অদৃষ্ট। ছেলে মেয়ে যখন ভগবান
আমার দেননি তখন তাে না দিলেই পার্তেন। সতীমার
কাছে মাথা ধুড়ে শেষ মেয়ে পেলুন। এমন মেয়েতে
তার না দেওয়াই ভালাে ছিল। আমি তাঁর কাছেতো

সতী-রা
শিক্ষ
কোন অপরাধ করিনি যে তিনি আমায় এত যন্ত্রণা
দিচ্ছেন। গরীবের উপর ভগবান মিয়!”
দীনবহু ঘাড় নাডিয়া বলিল, “ভগবান নিৰ্দর কারো
উপর নয়। আমাদেব কৰ্ম্ম ফল আমরা ভােগ কচ্ছি,
ভগবানের অপরাধ কি গিন্নী ?
অভয়া আবার কি একটা কথা বলিতে যাইতে ছিল
কিন্তু কন্যাকে সম্মুখে আসিতে দেখিয়া সে নীরব হইল।
সতী জননী ও পিতার সম্মুখীন হইয়া মৃদু গসিয়া বলিল,
“মা আমি নাইতে যাচ্ছি।”
অভৱ কন্যার মুখের দিকে চাহিল, মৃদু স্বরে বলিল,
সা, শিগগির আসি।”
সতী উঠানের মাঝখানে একটা দডিতে একখানা
গামছা ঝুলিতেছিল, সেইটা কাধে ফেলিয়া খিড়কিব
পুকুরের দিকে অগ্রসর হইতে বাইতেছিল, অভয়া কন্যার
দিকে চাহিয়া বলিল, “নাইতে যখন যাচ্ছি যা দীঘি থেকে
নিয়ে আয়। বেলা ঢের হয়েছে, আমি আর যেতে
পার্বো না, খাবার জল নেই, নেয়ে আবার সময় অমনি
পড কলসীটা করে এক কলসী জল নিয়ে আসি।”
সতী ঘাড় নাডিয়া জননীর কথাটায় সায় দিয়া বন্ধন
গৃহের পাক্তিত একটা গৃহের ভিতর প্রবেশ করি

সতী-রাণী
ও একটা প্রকাণ্ড কলসী লইয়া বাহির হইয়া আসিয়া
জিজ্ঞাসা করিল, “মা, এতে যে একটু জল রয়েছে।”
অভয়া কন্যার কথার উত্তরে বলিল, “ওই ভাল
ৰান্তীটাতে রেখে যা।”
সতী কলসীর জলটুকু উঠানের এক পার্কে রক্ষিত
একটা ভাঙ্গা বাতীতে ঢালিয়া রাখিয়া, কলসীটী কক্ষে
তুলিয়া লইয়া হেলিয়া দুলিয়া শত সৌন্দৰ্য্য ছড়াইয়া দিয়া
স্নান করিতে চলিয়া গেল। দীনবন্ধু তখন তাহার চির প্রিয়
থেলাে হাটায় মৃদু মৃদু টান দিতে ছিল। কন্যা চলিয়া
গেলে সে অভয়ার দিকে চাহিয়া বলিল, গিন্নি ঐ মেয়েকে
জবাই কৰ্তে হবে। কিন্তু না করেও উপায় নেই।
একবার ভাবি থাক মেয়ে আইবুড়ো,মায় জাত যাক।
কিন্তু আবার ভাবি সবই তাে গেছে,-জাতটাও শেষ যাবে।
আর ভাববাে না, মেয়ের অদৃষ্টে যা আছে তােক।”
দীনবন্ধু হুকাটা এক পার্কে রাখিয়া উঠিয়া দাড়া-
ইতে যাইতেছিল, সেই সময় বাহির হইতে রসিকের
কার ভিতরে আসিল বলি দী বাড়ী
আছ থে,
দী-ওহে দী।”
দীনবন্ধু তাড়াতাড়ি উত্তর দিল, “কে রসিক? দাড়াও
তাই যাচ্ছি।”

সতীরাণী
অভয় স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল,
“কে? এপাড়ার রসিকৰাৰু বুঝি। বড় ভালো লােক
আমাদের ঢের করেছে।
দীনবন্ধু ঘাডটা নাড়িয়া বলিল, “হা রসিকই বটে। যাই
শুনিগে বােস মশাই কি বলেন। রসিকের আজ ভেবেই
তার বাড়ী যাবার কথা ছিল। যাও গিন্নি আর তেৰ না,
কাজ কৰ্ম্ম করােগে যাও। মেয়ের বিয়ে যখন দিতেই
হবে, আর আমাদের যখন অবস্থা খারাপ তখন বুড়ো
হােড় বাছবার আমাদের কোন অধিকার নেই।
দীনবন্ধু পত্নীর দিকে আর না চাহিয়াই বসিকের
সহিত সাক্ষাৎ করিবার জয় তাড়াতাড়ি বাহিরের দিকে
চলিয়া গেল। রসিক বাহিরে ঠাকুরদালানের অর্ধভন্ন
চাতালটার উপর উঠিয়া বসিয়াছিল বাটী হইতে বাহির
হইয়াই বেশ একটু ব্যস্ত তাৰে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল,
“বােস মশাই, কি বছেন। বিয়েটা পাকাতাে ?”
রসিক ঘাড় নাডিয়া বলিল, একেবারে পাকা
আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা কর্তেই হলাে না, গিয়ে
দেখি ভটচাজ, বােসে গায়ে হলুদের ফর্দ কচ্ছে।
আমি বাৰ মাত্ৰ বােস মশাই নিজেই ৰৱেন-এসিক তুমি
ভাই শ পাচেক টাকা নিয়ে এখনি একবার দীর বাড়ী

সতী-রাণী
যাও। বুড়াের বিয়ে হলেও বিয়েতে বটে। নেম ক
গুলাে তো সবই কর্ভে হবে। দীকে টাকাটা দাও গে
আর বিয়ের যা যা বন্দোবস্ত দরকার তুমি তাই মেয়ের
তরফ থেকে সেগুলাে করগে যাও। নাও আর ভাববার
তাই সময় নেই। যা আয়ােজন দেখে এলুম তাতে
করে লােজন গায়ে হলুদের তত্ত্ব নিয়ে বড় কম
আসবে না। যাহ’ক তাদের খাওয়াবার বন্দোবটাতো
কর্তে হবে।”
রসিক কেঁচার খুটটা খুলিয়া এক তাড়া নােট বাহির
করিয়া সেগুলা এক একখানি করিয়া গুনিতে গুনিতে
আবার বলিল, “ভাই জন্ম মৃত্যু বিবাহ এ তিনই ভগবানের
গত, তিনি যা করেন ভালাের জন্যই করেন। এক
হিসেবে একথা আমি বল্‌তে পারি মেয়ে তােমার সুখে
থাকবে। আর তুমি যে জন্যে ভাবছ সে কথা কেউ
বলতে পারে না। আমি কত দেখেছি তা জোয়ান
তা জোয়ান কত মর্দ বিয়ের দশ দিনও যায়নি, পটল
তুলেছে। তােমার মেয়ে যদি অদৃষ্ট ভালাে হয় কে
বলতে পারে বােস মশাই আরে পচিশ তিরিশ বছর
বাঁচবে।
রসিক নােটের তাজটা দীনবন্ধুর হতে দিল-দীন
৬

সতী-র বন্ধ নােটের ডাটা বসিকের হাত হইতে লইতে লইতে বলিল, না ভাই আমি আর কোন কিছুই ভাবছিনি,ভগ- বান যা করেন আমিও জানি ভালাের জন্যেই করেন। আর ভাই ভেবেই বা কচ্চি কি বললা না। সে কথা যাক,আমি তাে ভাই কখন কোন কাজ কর্ম করিনি,তােমাকেই দাড়িয়ে থেকেআমাকে এদায় থেকে উদ্ধার করে দিতে হবে। রসিক দীনবন্ধুর মুখের সম্মুখে ডান হাতখানা নাড়িয়া বলিল, “সে জন্যে তােমার কিছু ভাবতে হবে না। বসিক একা এ রকম দশটা কাজ উদ্ধার করে দিতে পারে। কালকের বন্দোবস্ত আমি এখনি সব করে ফেলছি। তুমি ভাই চট করে একটা কঙ্কেতে একটু আগুন দিয়ে নিয়ে এসাে—অনেকক্ষণ গুড় খাওয়া হয়নি। এক ছিলিম গুড় খাও।” দীনবন্ধু গুড়কের চেষ্টায় বাটীর ভিতর যাইবার জন্য ফিরিতে যাইতেছিল, কিন্তু সম্মুখে অনিলকুমারকে আসিতে দেখিয়া সে বেশ একটু অবাক্ ভাবে আবার থাইয়া ডাইল। রসিকও পথের দিকে চাহিয়াছিল,—অনিল- কুমারকে দেখিবামাত্র সে যেন একটু সুউচ্চ স্বরে বলিয়া উঠিল, “ছােট বাবু যে। এসাে এসাে। আমি এই মাত্র তােমাদের ওখান থেকেই আছি।”

সতী-রাণী
অনিলকুমার রসিক ও দীনবন্ধুর সম্মুখে আসিয়া বেশ
একটু গম্ভীর হইয়া দীনবন্ধুর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল,
“ঠাকুর্দা আমায় আপনার কাছে পাঠালেন, আপনার
মেয়েকে আশীর্বাদ নানা আশীর্বাদ আমার দ্বারা
কেমন করে হবে। এই যাকে বলে পাকা দেখা,—সেটা
সেরে আসতে। এই নিন ফুল দশটা আর এই একখানা
চিকী-দেখে শুনে বুঝে নিন।
অনিলকুমার পকেট হইতে দুইটা বা বাহির করিয়া
দীনবন্ধুর সম্মুখে খুলিয়া ধরিল। একটা বাক্সতে দশটা
জড়ােয়া ফুল ও অপরটাতে একখানি জড়ােয় চিরুণী
জিনিষগুলি যে বিশেষ মূল্যবান তাহা তাহাব জজলে
পাথরগুলিই প্রমান দিতেছে। দীনবন্ধু অনিলকুমারকে
আসিতে দেখিয়াই মহা ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল, সে যেন
একটু কিন্তু ভাৰে বলিল, “আপনি বােস মশায়ের নাতি
আপনারা হলেন আমাদের গায়ের জমিদার-আপনাকে
বসার স্থান আমাদের এ ভাঙ্গা বাড়ীতে নেই, তবে যখন এ
গরীবের বাড়ীতে অনুগ্রহ করে এসেছেন তখন একটু না
বসিয়ে আপনাকে আমি কিছুতেই ছাড়তে পারিনি,একটু
অনুগ্রহ করে দাড়ান আমি আপনার বাবার জন্যে বাড়ীর
ভেতর থেকে যা হয় একটা কিছু এনে দিই।”

সতী-রাণী অনিলকুমার ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “আজ্ঞে আমার জন্যে আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি আপনার বাড়ীতে স্বইচ্ছায় আসিনি জাবেন। ঠাকুর্দা জোর করেই আমায় পাঠিয়েছেন। আমি তার নাতি,—তিনি আমায় মানুষ করেছেন কাজেই তাঁর হুকুম শুনতে আমি বাধ্য। নিন আপনাদের জিনিষ আপনারা বুঝে নিন- আমায় বিদেয় দিন। আপনাদের বাড়ীতে আমি বলতে আসিওনি বসতে চাইনি।” অনিলকুমারের এই রুক্ষ কথা গুলায় দীনবন্ধুর প্রাণে সত্যই আঘাত লাগিল। তাহার নন পব অশ্রু জলে ছলছল করিয়া উঠিল,—তাহার কী হইতে আর একটীও কথা বাহির হইল না,কে যেন তাহার কঠ চাপিয়া ধরিল। রসিক তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিল, “বতে চান না কেন? দীরা গৱীৰ বটে কিন্তু অনিলকুমার তাহাকে বাধা দিয়া তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “কিন্তু শুনতে চাইনি,—কিন্তু শুনূতে আমি আসিওনি। সিকবাবু বসতে কেন চাইনি এটা জিজ্ঞাসা কর্তে আপনার গলার স্বর বন্ধ হয়ে গেল না। বাপ- নার মানুষ না কি? একটা সত্তোর বছরের বুড়াের সঙ্গে ৬৭

সতী-রাণী
একটা তের বছরের মেয়ের বিয়ে দিনে কোন
শাস্ত্র হিসেবে ?”
রসিক অনিলকুমারের মুখের দিকে চাহিয়া ছিল -
ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “এই কথা। কেন হিন্দু শাস্ত্র হিসেবে।”
অনিলকুমার বেশ একটু উত্তেজিত স্বরে উত্তর দিল,
“আপনাদের এমন হিন্দু শাস্ত্রকে আমি সাড়ে চারশাে বার
বাবা দিই। ছি ছি,-একবারও কি ভেবে দেখে-
ছেন এ বিয়ের পরিণাম কি ? এর চেয়ে সে মেয়েকে
ফাঁসি কাটে ঝুলিয়ে দেওয়া সেও ছিল ভালাে।”
রসিক মৃদু হাসিয়া বলিল, “ছােটবাবু তােমাদের ইংরেজি
লেখা পড়া শিখে চাল চলন বলে দাড়িয়েছে। তােরা
এখন আর ধর্ম কর্ম কিছুই মানে না। আমরা বুড়াে
সুড়ো মানুষ আমরা ধর্মটাও মানি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি।
আমরা জানি যার যা অদৃষ্টে আছে তার তা হবেই।
তাছাড়া জন্ম মৃত্যু বিবাহ এটাতে সম্পূর্ণই ঈশ্বরের হাত,
তােমরা যতই লেখাপড়া শেখ আর যাই বলাে,-এর
উপর কলম চালাতে পারে, এমন মানুষ পৃথিবীতে
নেই। যার যে স্বামী যার যে স্ত্রী তা তার জন্মাবার
বহু পূর্বে স্থির হয়ে যায়, সেটা বদলাবার কোন
উপায় নেই।”

এ ল'ৰী
প
১ ।।
সতী-রাণী
ਵਰ
অনিলকুমার ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “আলবাৎ বাবে
আর সে বদলাবারও বেশী দেরী নেই। যখন একেবারে
অসহ হয়ে উঠবে যখন দেশের সমস্ত মেয়েরা এই
অধ্যায়ের বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে দাডিত্রে আপনাদের সঙ্গে
লডাই দিয়ে চীৎকার করে বলবে আমরা তােমাদের
এ অন্যায় মানবাে না তখন দেখবেন বদলায় কিনা। যা
আমায় মাপ কৰ্বেন আমি আপনাদের সঙ্গে এ কথা নিয়ে
আললাচনা কর্তে চাইনি। আপনারা যা ভালাে বােঝেন
করুণ,-আমি চম।”
অনিলকুমার আর ডাইল না, প্রাণের ভিতর
একটা মর্মান্তিক দাহ লইয়া সে তৎক্ষণাৎ সেই স্থান
পরিত্যাগ করিল। দীনবন্ধু এতক্ষণ পানের মত দাড়াই
ছিল রসিকের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “রসিক
বােস মশায়ের নাতি যা বলে মিথ্যা নয়।”
রসিক বাড় নাডিয়া বলিল, “আরে ওকথা শােন কেন
আজ কালকার ছেলে ইংরেজি পড়ে একেবারে এক
একটী কিম্ভুতকিমাকার হয়ে পড়ছে। ওদের কি কাও
জ্ঞান আছে। নাও আর দাঁডিও না যাও একটা কৰুেতে
একটু আগুন দিয়ে নিয়ে এস। এখনি গায়ে হলুদের
সব যােগাড় যত্ন করে ফেলতে হবে।”

সতী-রাণী
PAR
দীনবন্ধু আর কোন কথা কহিল না, একটা কলিকাতে
অগ্নি সংযােগ করিয়া আনিবার জন্য বাটীর ভিতর প্রবেশ
করিল। দীনবন্ধু বাটীর ভিতর প্রবেশ করিবামাত্র অভয়া
জিজ্ঞাসা করিল, “হাগা ও ছেলেটী কে এসেছিল ?
দীনবন্ধু উত্তর দিল, “ওটা বােস মশায়ের নাতি।
বােস মশাই ওকে দিয়ে পাকা দেখার আশীর্বাদ বাবদ
এই ফুল চিরুণী পাঠিয়ে দিয়েছেন।
অভয়া বলিল, “ছেলেটা কিন্তু বেশ।”
সতী উঠানের মাঝখানে দাঁড়াইয়া দড়িতে কাপড়
খাইতে দিতেছিল সে জননীর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল,
‘ও-মা পাগল।”
পতি ও পত্নী উভয়েই বেশ একটু বিশ্বত ভাবে কন্যার
মুখের দিকে চাহিল।
৭০

যষ্ঠ পরিচ্ছেদ অনিলকুমার বাড়ী আসিয়া উপস্থিত হইল, তখন শ্রাবণ মাসের রৌদ্র রীতিমত কড়া হইয়া উঠিয়াছে,-রৌদ্রের দিকে চাহিবার উপায় নাই—চারিদিক একেবারে ঝলসাইয়া পুড়াইয়া দিতেছে। অনিলকুমার যে গতিতে দীনবন্ধুর বাটী পরিত্যাগ করিয়াছিল বরাবর সেই গতিতেই চলিয়া আলি য়াছে। ঘৰ্ম্মে তাহার অঙ্গের পাঞ্জাবীটি একেবারে ভিজিয়া গিয়াছিল,—বাটীৰ ভিতর প্রবেশ করিয়া সে দেখিল বাটীতে তখন মহা ধূমধাম পডিয়া গিয়াছে। বাটীর উঠানের মাঝ- খানে সামিয়ানা টাঙ্গান হইতেছে। ফটকের দুই পারে দুই নহবৎনার সংস্কার প্রারম্ভ হইয়াছে। খোঁটা পুতিতে, সামিয়ানা টাঙ্গাইতে, মেরাফ বধিতে বহুলােক চারিদিকে লাগিয়া গিয়াছে। মহা উৎসবের মহা সুচনা—ইহারই মধ্যে রীতিমত ভাবে আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। বাটীর ভিতর প্রবেশ করিয়া এই সকল আড়ম্বরের ঘটা দেখিয়া, সে কেবল মাত্র একবার মুখটা সিটকাইল,তাহার পর পকেট হইতে রুমালখান বাহির করিয়া একবার মুখটা মুছিল। সে তাহার ঘসিক্ত জামাটা ছাড়িয়া ফেলিবার জন্য উঠান

সতী-রাণী
পার হইয়া উপরে উঠিবার জন্য সিড়ির নিকট উপস্থিত
হইয়াছিল সেই সময় ভূত্য আসিয়া সংবাদ দিল, “ছােটবাবু
আপনাকে বাবু একবার ডাকছেন।”
অনিলকুমারের আয় উপরে উঠা হইল না, তাহাকে
আবার ফিরিতে হইল,--সে ভূতত্যর মুখের দিকে চাহিয়া
জিজ্ঞাসা করিল, ঠাকুর্দা কোথায় আছেনরে?”
ভৃত্য উত্তর দিল, “আজ্ঞে তিনি ভেন ঘরে রহেছেন,
সেখানে উনুন টুনুন পাতা হচ্ছে কিনা,তাই সেখানে
সেই সব বন্দোবস্ত কছেন।”
অনিলকুমার ঘাড় নাডিয়া বলিল, “হু।”
তারপর ভৃত্যের মুখের দিকে চাহিয়া আবার জিজ্ঞাসা
করিল, সেখানে কে কে আছেরে ?”
ভৃত্য উত্তর দিল, “আজ্ঞে সেখানে বড়বাবু, ভট চার্জী
মশাই, আমরা কে কে সব রহেছেন।”
অনিলকুমার আবার একটা হ বলিয়া,-ভেন ঘরের
দিকে অগ্রসর হইল, ভৃত্যও নিজের কাজে চলিয়া গেল।
ভেন ঘরের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া অনিলকুমার দেখিল,
তাহার ঠাকুরদাদাকে ঘেরিয়া তথায় চারি পাঁচজন লােক
যেন সতা করিয়া বসিয়াছে। উনান কোন দিকে পাতিলে
হাওয়া প্রবেশের কোন বিষ হইবে না, সেই সভায়
৭২

পা বাড়বে
সতী-রাণী
সেই আলােচনাটাই তখন প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল।
অনিলকুমারকে সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইতে দেখিয়া বন্ধু
মহাশয় মাথাটা তুলিয়া বলিলেন, “এই যে ভায়া, তারপর
খবর কি? তুমি কোন কিছু না বলেই ওপরে উঠে
যাচ্ছিলে ব্যাপার কি হে। আশীর্বাদ হয়ে গেল?
তােমার তাে জানাই উচিত তখবরটা জানবার জন্যে আমি
বীতিমত চঞ্চল হয়ে রয়েছি। বিয়ের কাজ—এতে আছি
পড়তে কতক্ষণ? চারহাত এ না হলে
বিশাস নেই। মেমেতাে একেবার ভিখী হরেছে,
তাের কি আর হাটা হুটি পােয় তুমি হলে আমার
চির দিনের আদুরে নাতি। সে যাক তারপর এখন
শুনি পাত্রীকে আশীর্বাদটা করা হয়েছে তাে ?
এই বুড়ােদের সভার ভিতর কোন কথা কহিতে
অনিলকুমারের আদৌ ইচ্ছা দিল না। তাহার কেমন
একটা মনে মনে দৃঢ় বিশ্বাস হইয়াছিল যে এই বুড়াে-
রাই হিন্দু সমাজের সর্বনাশ সাধন করিতেছে। ইহার
যত দিন ধাঁচিয়া আছে ততদিন হিন্দু জাতি বা হিন্দু
সমাজের উন্নতির কোন সম্ভাবনা নাই। কেবল অনিষ্ট
সাধন করিয়া ধূমকেতুর মত ইহারা সমাজের উপর দিয়া
ল্যাজ নাড়িতে নাড়িতে আবহমান কাল হইতে একই
৭৩

সতী
ভাৰে চলিতেছে। ইহাদের ল্যাজের আঘাতে কত লােকের
সর্বনাশ হইয়াছেও এখনও কত লােকের সর্বনাশ হইবে
তাহার কোনই স্থিরতা নাই। তাই ঠাকুরদাদার কথার
উত্তরে যে অতি মৃদুস্বরে বলিল, “বিয়ের আনন্দে আপনার
দেখছি মাও বেঠিক হয়ে গেছে। আপনি যাকে বিয়ে
কর্নেন তিনি আমার ভক্তির পাত্রী, আশীর্বাদের পাত্রী
নন। আপনি আমায় কি বলে তাকে আশীর্বাদ কর্তে
পাঠিয়েছিলেন ?
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় ঘাড় নাডিয়া বলিল, “যথার্থ কথা
ছােটবাবুর তিনি হবেন গুরুলােক,-ঘােটর কি তাকে
আশীর্বাদ কর্তে পারেন।
আরও তিন চারিজন সঙ্গে সঙ্গে ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের
কথায় সায় দিয়া উঠিল, “তাতাে বটেই,-ছােটৰাবু তাকে
আশীর্বাদ কিছুতেই কর্তে পারেন না।”
বােস মহাশয় একটু বিরক্ত স্বরে বলিলেন, “পারেন
জানিহে জানি। তবে যাদের লােকজন আর তাদের
যে সই হয়। ভাবে বিয়েতে লােকে যখন দু’টাকা
দিয়ে বৌভাতে ছেলে পাঠিয়ে নেমন্ত্রণ রক্ষা করে তখন
এটাও চলে। এটা তাে ঠিক আশীর্বাদ নয়—এটা হলাে
সামাজিকহালােকাচার বুঝলে।”
৭;

সভা-রাণী সকলই অমনি বলিয়া উঠিল, “ভায়ের বিয়েতে ছেলেকে যখন দু’টাকা দিয়ে বৌভাতের নিয়ন্ত্রণে পাঠান চলছে, তখন এটা না চার তাে কোন হেতু নেই। লােক- জন কম হলে সবই চলে। ছােটবাবু, এ বিয়েতে অতি অবশ্যই আশীর্বাদ কর্তে পারেন।” বসু মহাশয় তাহার পৌত্রের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন। বুঝলে “ভায়া,লােক অভাবে সবই চলে। তুমি শুধু শুধু এ রােদে ঘেমে গেলে আর এলে কাজ কিছুই হলাে না।” অনিলকুমার ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “আজ্ঞে না একেবারে কাজ হয়নি এমন কথা বলা যায় না। কতটা কাক্ত হয়েছে।” ভট্টাচাৰ্য মহাশয় তাহার চোখ দুইটা বড় বড় করিয়া বলিয়া উঠিল, “যে কি রকম। আশীর্বাদের আবার অর্ধেক কি রকম করে হয় ? বসু মহাশয়ও বেশ একটু অবাকভাবে বলিলেন, “তাইতাে ভটচাজ এ তােমাদের ছােটবাবু বলে কি? আশীৰ্বাদ সেটাও আধাআধি হয়ে রইলে?” অনিলকুমারের প্রাণের ভিতরটা একেবারে বিরক্তিতে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল, সে মহা বিরক্তভাৰে তাহার দাদা

সতী-রাণী
মহাশরের কথায় আবার উত্তর দিল, কতকটা হয়েছে
তার মানে হচ্ছে এই যে আপনি বা আমায় দিতে পাঠিয়ে
ছিলেন সে গুলাে আমি দিয়ে এসেছি।”
“ তাহলেই হলাে।” ব মহাশয় চীৎকার করিয়া
হাকিলেন, “বাৰা পদ্মলােচন-কল্পেটা একবার পালটাও।”
তারপর নাতির মুখের দিকে চাহিয়া একটু মৃদু হাসিয়া
আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “তারপর পাত্রীটিকে দেখলে
কেমন ? দেখলে ভক্তি হয় তাে ?*
হু হু করিয়া চারিদিক হইতে মাঠের হাওয়া ছুটিয়া
আসিতেছিল, সেই হাওয়ায় অনিলকুমারের দেহের ঘামটা
অনেকটা মরিয়া গিয়াছিল,—সে পকেট হইতে রুমালখানা
বাহির করিয়া মুখটা মুছিতে মুছিতে তাহার ঠাকুরদাদার
কথার উত্তর দিল, “পাত্রীটি যে কেমন তা আমি দেখিনি
তা দেখবারও আমার সাধ নেই। আমি সে সকল জিনিষ
দীনবন্ধুবাবুকে দিয়ে এসেছি।”
পদ্মলােচন গুড়গুড়ির কলিকাটা বদলাইয়া দিয়া গেল,
-বসু মহাশয় তাহার নলটা তুলিতে তুলিতে বর্লিলেন,
“বেশ করেছ। পাত্রীটি দেখওনি, আর দেখবার সাধও
নেই,—এ কথাটা তত বড় ভালাে ঠেকছে না,যাকে নিয়ে
দুদিন বাদে সংসার কর্তে হবে তাকে দেখতে সাধ নেই
T
৭৬

সতী-রাণ
সে কেমন কথা হলাে ? ভায়া তুমি যে দেখছি আগে
থেকেই পৃথক হতে চাও। এ কথাটা তত বড় ভাল নয়।
এত করে তােমায় মানুষ কৱেম আমি আর তুমি কি
ভায়া আমারই সঙ্গে পৃথক হতে চাও।”
অনিলকুমার আর তার ঠাকুরদাদাকে অধিক দূর
অগ্রসর হইতে দিল না, বেশ একটু কৰুণ সুরে বলিয়া
উঠিল, “ঠাকুর্দা সত্যই আমার দুর্ভাগ্য যে আজ কাল
আপনি আমার কোন কথাই ঠিক ভাবে নেন না। আমি
আর যাই হই, এখনও এত হীণ হইনি যে আপনার সঙ্গে
পৃথক হবে। আপনি ছাড়া আমার কে আছে কাকে
নিয়ে আমি পৃথক হব? এ বিয়ে করা ন্যায় কি অন্যায়
যাই হােক আমি আর কোন কথা বলবাে না। আপনিও
আর আমায় এ সম্বন্ধে কোন কিছু কর্কে বলবেন না।”
ব মহাশয় ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, “এই তত ভায়া
রাগের কথা হলাে। আমার সুখে যদি তােমার প্রাণ হয়
সেটা আমারও দুঃখের কথা তােমারও দুঃখের কথা। তুমি
আমার একমাত্র নাতি, তুমি যদি মুখ বেকিয়ে থাক, তাহলে
কি আমার কোন কাজে মন সরে। আমার বিয়েতে তুমিই
কেবল মুখ বেকিয়ে ছিলে এ আক্ষেপ আমার জীবনে যাবার
নয়। তা ছাড়া তুমি যা ভাবছ যদি তাই হয়,-এই বুড়াে
৭৭

সতী-রাণী
বয়সে বিয়ে করে আমি যদি সত্যই মাগের ভেড়ড় হয়ে
পড়ি। যদি তােমায় আমার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করি
তাতেও তােমার এত বিচলিত হওয়া উচিত নয়। যখন
তােমার বাবা এবং মায়ের মৃত্যু হয় তখন তুমি খুবই ঘােট,
এই বুড়াে তােমায় বুকে করে মানুষ করেছে--লেখাপড়া
শিখিয়েছে, তা ছাড়া তুমি যখন বিয়েই কৰে না,তখন
আর তােমার কিসের ভাবনা,—নিজের খরচের মত অর্থ
তুমি চিরদিনই উপার্জন কর্তে পর্বে। বুডাের সে ঋণের
একটুও শােধ দাও,তার সুখে আর অসুখী হয়ে
থেক না।”
বৃদ্ধ ব মহাশয় রীতিমত গম্ভীরভাবে এই কথাগুলি
বলিয়া মুখখানা বেশ একটু তার করিয়া গুডগুড়ির নলে
মৃদু মৃদু টান দিতে লাগিলেন। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় মাথাটা
নাড়িয়া বলিল, “বটেই তাে ? ছছাটবাবুর মুখ ভার করে
থাকাটা ঠিক হচ্ছে না।
ঠাকুরদাদার এই গম্ভীর কথাগুলিতে অনিলকুমারের
প্রাণের সমস্ত তার একেবারে বেরা বাজিয়া উঠিল।
যথার্থই ত,বাহার যঙ্গের বিন্দুমাত্র কট হইলে সে
আর পৃথিবীর বুকের উপর এমনিভাবে দাঁড়াইয়া এমনিভাবে
কথা কহিতে পারিত না,তাহার মুখে সে কোন হিসাবে

এন লারী
c১. গ।
শশা ও
সতী-রাণী
অসুখী হয়। অনিলকুমার নতমস্তকে ঠাকুরদাদার সম্মুখে
দাঁড়াইয়াছিল, সে মৃদুস্বরে বলিল, “ঠাকুরদা আমায় মাপ
করুন, আপনার মুখে অসুখী হয়ে আমি যথার্থই অন্যায়
কাজ করেছি, আপনি ভালবাসেন,—সেই ভালবাসার দোহাই
দিয়ে বলছি আমায় এইবারের মত ক্ষমা করুন-আর
আমায় আপনার মুখে কোন দিন অসুখী দেখতে পাবেন
। লােকে পাছে আপনার কুশ গাম, পাছে লােকে
আপনাকে কুকথা বলে সেইজন্যই আমি এ বিয়ের বিরুদ্ধে
দাড়িয়েছিলুম। কিন্তু এখন বুঝছি আপনি যাতে সুখী
হন তাই করাই আমার জীবনের একমাত্র কর্তব্য হওয়া
উচিত।”
বৃদ্ধ বস্তু মহাশয় ঘাড় নাডিয়া বলিলেন, “এইতাে ভায়া
আমার নাতির মত কথা। পৃথিবীতে ঝগড়া বিবাদটা কিছু
নয় সব কাজেই আপােসে মিটমাট হয়ে যাওয়াই ভালো।
ওরে কে আছিস ভাষার বসবার জন্য একখানা চৌকি টোকি
নিয়ে আয়।”
ভৃত্য একখানা চৌকী আনিয়া বস্তু মহাশয়ের সম্মুখে
রাখিল,—তিনি তাহার পৌত্রের দিকে চাহিয়া বলিলেন,
“বােল ভরা বােস।”
অনিলকুমার নীরবে তাহার ঠাকুরদাদার সখে সেই
৭৯

সতী-রাণী
খ
চেয়ার দখল করিয়া বলি। ব হয় তখন এরী
তামাকের বােয়া ঘডিতে ছিলেন,-ভট্টাচার্যের দিকে
ফিরিয়া বলিলেন, “ভট্টাচাৰ্য্য এইবার তােমাদের ছােটবাবুকে
সেই কথাটা বল নাহে ?”
ভট্টাচাৰ্য্য তাহার জমিদারের মুখের দিকে চাহিয়া বিনীত
ভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “আজ্ঞে কোন কথাটা ?"
বসু মহাশয় উত্তর দিলেন, “আরে সেই কথাটা,এই
যে সকালে যে কথাটা তােমার সঙ্গে হচ্ছিলো সেই যে
কবিতার কথা। আজ কালকার বিয়েতে একটা কবিতা
লেখা প্রথা হয়েছে। আমায় যখন আবার সেই আজ কালই
বিয়ে কর্তে হলাে, তখন এটুকুই বা অঙ্গহীণ হয় কেন।
তার ওপর আবার আমার নাতি যখন বিদ্যান। কবিতা
লেখার তত আর কোন ভাবনা নেই। যখন সবই হচ্ছে
তখন এটুকুই বা অঙ্গহীণ হয় কেন?”
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল, “আজ্ঞে
সেতো যথার্থ কথাই। হােটবাৰু বড় কর্তার সাধ এ
বিয়েতে আপনি একটা কবিতা লিখুন। আজ কালকার
বিয়ের একটা প্রথাই হয়েছে কবিতা লেখা।
অনিলকুমার যেন আকাশ হইতে পড়িল,—সে ভট্টাচাৰ্য্য
মাশরের মুখের দিকে একটা বিশ্বতির দৃষ্টি নিক্ষেপ
০

সতী-রাণী
(1)
করিয়া বলিল, “আমি কবিতা লিখবাে ? কি সর্বনাশ।
আমি তাে কবিতা লিখতে জানি না।”
বনু মহাশয় ঘাড় নাডিয়া কহিলেন, “এই তত ভায়া
বাগের কথা তুলছ। সত্যি কথা শােন ভায়া যদি তুমি
আমার বিয়েতে একটা কবিতা লেখ তবেই বুঝবে তুমি
আমার সুখে যথার্থই সুখী হয়েছ। না হলে জানবব
তােমার মনে মনে এখন বেশ রাগ রহেছে।”
অনিলকুমার মস্তক চুলকাইতে চুলকাইতে উত্তর দিল,
“আজ্ঞে--আমি—কবিতা
ভৃত্য এখন দোয়াত কলম ও কাগজ লইয়া উপস্থিত
হইয়াছিল,বৃদ্ধ
পৌত্রকে বাধা দিয়া বলিলেন, “হা -তুমি-
কবিতা। রাখ ব্যাটা এই হােটবাবুর মুখে দোয়াত কলম
কাগজ। নাও ভায়া আর দেরী করাে না—কলম ধর।
বেশী নয় দু চাব লাইন যা হয় কিছু লিখে দাও। আরে তুমি
তাে ছেলেবেলায় লিখুতেহে। আমার যখন সাধ,—তখন
আর ছুতো করাে না।”
অনিলকুমার মনে মনে বলিল, “এ যে আপনার তোেড়
সাধ কিন্তু প্রকাশ্যে বলিল, আমি কবিতা,—আমার দ্বারা
কি কবিতা লেখা-
বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি কলমটা একবার দেয়াতে ডুবাইয়া

সতী-রাণী
লইয়া সেটা নাতির হন্তে গুজিয়া দিয়া বলিলেন, “খুৰ
হৰে ভায়া খুৰ হবে আর কথা কাটাকাটি করে না।”
অনিলকুমার মহা বিরক্তভাবে দাদা মহাশয়ের হত হইতে
কলমটা লইয়া মনে মনে কি একটু চিন্তা করিয়া লইয়া
কাগজ খণ্ড তুলিয়া লইল। দশ পােনের মিনিট কাদার মুখে
কোন কথা নাই,সহসা অনিলকুমার বলিয়া উঠিল,
“এ ঠিক হচ্ছে না,-না আমার দ্বারা হবে না।
ৰ মহাশয় ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, “খুব হবে,
লিখেছ তাই হবে। পভ পড় দেখি কি লিখলে।”
অনিলকুমার মহা বিরক্তি ধরে বলিল, “এ কিছুই হয়
নি—এ কি চলবে--
বইয়া পানি, আসে সতী-রাণী,
ধর ঠাকুর্দা ধর ,
সরলা বালিকা,
ফুটন্তু মালিকা,
আদরে গলায় পর।
বৃন্দাবন ছেড়ে,
কাকে লরে কেঁড়ে,
আসে যেন ওই রাধা ;
ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ড নাড়িয়া বলিল, “খালা-বাসা।
শুনতে খুব মিষ্টি কিন্তু অর্থ কিছু কঠিন।
অনিলকুমার গম্ভীর ভাবে উত্তর দিল, “এর ভেতর
২

সতী-রাণী কঠিন একটা শব্দও নেই। বাড়াইয়া পানি কিনা বাড়া- ইয়া হাত সারাণী আছে। সরলা বালিকা এর মানেতাে পড়েই আছে ফুটন্ত মালিকা কিনা ফোটা মাল ঠাকুরা গলায় পর।” বৃদ্ধ বসু মহাশয় ঘাড় নাভিয়া বলিলেন, “ও মানে ঠিক আছে,তারপর কি ভায়া তারপর কি পড়।” অনিলকুমার মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল, আজ্ঞে তারপর আর ঠিক হচ্ছে না। রাধার সঙ্গে শুধু রাধারই মিল হয়। কিন্তু—কি- বৃদ্ধ বসু মহাশয়-চেয়ারের উপর একেবারে খাড়া হইয়া উঠিয়া বসিয়াছিলেন, তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, “আহা তারপর অমনি দু'লাইন জুড়ে দাও- তেভার মতন অনিল রতন আচলে রহিবে বাধা।” ভৃত্য আসিয়া সংবাদ দিল, “স্নানের জল দেওয়া হয়েছে।” অনিলকুমার ঠাকুরদাদার কথায় অবাক ভাবে তার মুখের দিকে চাহিয়াছিল,—সে কোন প্রশ্ন করিবার পূর্বেই বৃদ্ধ ৰ মহাশয় উঠিয়া দাঁড়াইলেন বলিলেন, “চল ভায়া স্নান করে ফেলা যাগে,-বেলা ঢের হলে এখনি আবার তােমায় কলকাতায় রওনা হতে হবে।”

সতী-রাণী অনিলকুমার কি একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে যাইতে ছিল বৃদ্ধ হাত নাডিয়া বলিল, “আর কথার সময় নেই, এই গাড়ীতেই তােমায় কতায় যেতে হবে। চল শিগগির মানটা আহারটা শেষ করে ফেলা যাক। ৰ মহাশয় কথাটা শেষ করিয়া ভৃত্যের পশ্চাৎ পশ্চাৎ অগ্রসর হইলেন,—সভা ভাঙ্গিয়া গেল কাজেই অনিল- কুমারকেও বাধ্য হইয়া তাহার পাং পশ্চাৎ অগ্রসর হইতে হইল। -

সপ্তম পরিচ্ছেদ
গাত্রহরিদ্রা হইয়া গিয়াছে, আজ বিবাহ, বহু মহাশয়ের
প্রকাণ্ড অট্টালিকা পত্রে পুষ্পে পরিশােভিত হইয়া
আজ আবার বহু দিন পরে নবচাচিকে নববধূকে
বরণ করিবার জন্য যেন নূতন বেশে সাজিয়া -
ইয়াছে। ধুমধামের কোনই অভাব নাই-এ বিবাহে
বস্তু মহাশয় একেবারে মুক্ত হস্ত হইয়াছেন, এক
টাকায় অনায়াসে যে কাজ হইতে পারে তিনি সেই
কাজে দশ টাকা ব্যয় করিতেছিলেন। বাটীর ফটকের
উপরিস্থিত নহবৎখান হইতে চবিবশ প্রহর ব্যাপী রাগ
রাগিনীর উৎস্য ছুটিতেছে। কলিকাতা হইতে আলাে,
-ইংরাজি বাজনা, বরের জরির পােষাক সকলি আসিয়া
পড়িয়াছে, লােকের ভীড়ে,চীকারে রীতিমত বিবাহ
বাটী জাকিয়া উঠিয়াছে। গাত্রহরিদ্রার দিন হইতে বাটীর
বাহিরের উঠানের মাঝখানে দিন রাত্র পুতুল নাচ
চলিতেছে। মনে মনে নিতান্ত আপত্তি থাকিলেও অনিল

সভা-রাণী
জুত
কুমার আর কোন আপত্তি করে নাই—এই সকল বলো-
ৰন্ত তাহাকেই সয়ং করিতে হইয়াছেও এখন করিতে
হইতেছে। অনিলকুমার প্রাণের সহিত তুমুল যুদ্ধ করিয়া
নিজেকে একেবারে এই বিবাহের ভিতর ডুবাইয়া দিবার
চেষ্টা করিতেছিল, কিন্তু প্রাণ কিছুতেই ডুবিতে চাহিতে
ছিল না। বিবেক তাহার প্রাণের ভিতর হইতে মাঝে
মাঝেই তাহার সমস্ত প্রাণটাকে চঞ্চল করিয়া হুঙ্কার
দিয়া উঠিতেছিল, অনিলকুমার এরূপ বিবাহে উপস্থিত
থাকিতে তােমার একটু লজ্জা করিতেছে না। তুমি
মানুষ না পশু। তােমার কি নিজস্ব বলিয়া কিছুই নাই।
এই পৈশাচিক বিবাহে তুমি কোন হিসাবে এখনও উপস্থিত
রহিয়াছ। ধিকশতধিক্ তােমায়।
অনিলকুমার কেবল তাহার ঠাকুরদাদার মুখের দিকে
চাহিয়া বিবেকের এই উত্তেজনার বিরুদ্ধে নিজেকে
খাড়া রাখিবার প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছিল কিন্তু প্রাণ
কিছুতেই খাড়া থাকিতে চাহিতেছিল না,সে প্রতি পদে
পদেই ভাঙ্গিয়া একেবারে মুইয়া পড়িবার চেষ্টা করিতে
ছিল। সানায়ের মিলন রাগিণী তাহার কণেৰ ভিতর
যেন একটা করুণ হাহাকারের মত ধবনিত হইতেছিল।
হিন্দু বিধবার সেই বুক ভাঙ্গা কৰুণ প্রতিছবি ঘুরিয়া ফিরিয়া

সতী-রাণী
তার চক্ষের সম্মুখে ভাসিয়া উঠিতেছিল। ঠাকুরদাদার
তাহাকে সবই করিতে হইতেছিল বটে কিন্তু
ভিতরে ভিতরে তাহার সমস্ত প্রাণটা যেন একেবারে
তুষের আগুণে দগ্ধ হইয়া যাইতেছিল।
দিনের পর প্রত্যহ যেমন সূর্য ডুবিয়া যায় আজও
সেইরূপ ডুবিয়া গেল। সন্ধ্যার পর রাত্রি আসিয়া দেখা
দিল। চারিদিকে বর বাহির হইবার তাড়াহুড়া পড়িয়া
গেল। অনিলকুমার স্বহস্তে তাহার দাদা মহাশয়কে বর
সাজে সজ্জিত করিয়াছে। সত্তোর বৎসরের বৃদ্ধের অঙ্গে
লাল সাচ্ছার পােষাক এক অপরূপ শােভায় শাভিত
হইয়াছে। অন্তঃপুরের ভিতর লােক গিগিশ করিতেছে,
সেই ভীড়ের মধ্যস্থলে বস্তু মহাশয় একখানা কেদারার উপর
সেই অপূর্ব সাজে সজ্জিত হইয়া উপবিষ্ট। তিনি চক্ষু মুদ্রিত
কবিয়া একটা প্রকাণ্ড গুড়গুডির নলে মৃদু মৃদু টান দিতে
ছিলেন,-সহসা চক্ষু মিলিয়া সম্মুখে যাহাকে দেখিলেন
তাহাকেই জিজ্ঞাসা করিলেন, “অনিল কোথায় শিগগির
তাকে ডাক, নিতবর তাে চাই। শিগগির তাকে সেই
নাল পােষাকটা পােরে আসতে বল।”
অনিলকুমার তখন বাহিরে প্রসেসন সাজাইতে ছিল
বৃদ্ধ দাদা মহাশয়ের আদেশ অতি শীঘ্রই তাহার কর্ণগােচর
৮৭

সতী-রাণী
হইল। সহসা আবার ঠাকুরদাদা তাহাকে ডাকিতেছেন
কেন, সেইটা জানির জন্য সে তাড়াতাড়ি দাদা মহাশয়ের
সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। বৃদ্ধ নাতিকে সম্মুখে আসিয়া
দাঁড়াইতে দেখিয়া মৃদু স্বরে বলিলেন, “ভায় শিগগির
সেই নীল পােষাকটা পরে এস,-একটা নিবরত চাই।
সবই যখন হলাে তখন এইটুকুই বা আর অহীন হয়
কেন ?”
বৃদ্ধের এই অপ্রত্যাশিত কথায় অনিলকুমার অবাক
ভাবে বৃদ্ধের মুখের দিকে চাহিল, বিস্ময় ভরে জিজ্ঞাসা
করিল, “আমি নিতর হবে সে কি ঠাকুর্দা? চব্বিশ
পঁচিশ বছরের একটা সণ্ডা পুরুষ কি কখন নিতবর হতে
পারে,—না কখন হয়েছে। আপনার এ হলাে কি ?
ব মহাশয় মহা গভীর ভাবে উত্তর দিলেন, 'এ সময়
আর কথা কাটাকাটি করােনা ভাষা যা বলি শােন। বলি
নিতর তাে একটা ভাই। বিয়ের প্রথা গুলাে তো বজায়
রাখা চাই। সত্তোর বছরের বুড়ো বয়ে নিবর চব্বিশ
পচিশ হলে বিশেষ কিছু এসে যায় না। এমন সুখের
দিনে ভূমি আর ভায়া কথা কাটাকাটা করে সামান্যের জন্যে
অহীন করে না। যা করে সেই নীল রংএর পােষাকটা
পরে বেরিয়ে এস। শেষ কি তােমার জন্যে সব ভেস্তে
৫

সতী-রাণী
যাবে। আর দাড়িও না, দাড়িও না যাও। তবু
দাঁড়িয়ে রইলে।”
ঠাকুরদাদার কথায় সত্যই অনিলকুমাৰ মনে মনে
বিশেষ বিরক্ত হইয়া পড়িয়াছিল,—সে মহা বিরক্ত করে
উত্তর দিল, আপনি যে কি বলেন আমি তার কোন ভাৰ
পাইনি।”
বৃদ্ধ ঘাড় নাডিয়া বলিলেন, “ভাই বুডাের বিয়েতে
কি আর ভাব পাৰে। এই অভাবের ভেতর দিয়েই সৰ
সেরে নিতে হবে। যাও আর দাঁডিও না ভায়া -তুমি
আব এ সময় বাধ সেখ না।”
এই নাছােড়বান্দা ঠাকুরদাদার পাল্লায় পডি অনিল
কুমার এই কয় দিনে একেবারে পাগল হইবার মত হইয়া
উঠিয়াছিল। সে বেশ বুঝিল ঠাকুরদাদা যখন খেয়াল
ধরিয়াছেন তখন সহজে নিস্তার পাইবার উপায় নাই
সে মহা বিরক্ত স্বরে আবার বলিল, “আপনাকে সন্তুষ্ট
করা আমার সাধ্যি নয়। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলুম এ
বিয়েতে আমি আর কোন কথা কইব না,কেবল বিন
আপত্তিতে আপনার হুকুম শুনব, কিন্তু আমি দেখছি
আপনিও যেন প্রতিজ্ঞা করেছেন আমার প্রতিজ্ঞা
সাজাবেনই।
আপনার কখন কি যে খেয়াল হয় তা

সতী-রাণী
ভগবানেরও বােৰা অসাধ্য। আমি একটা বুড়াে মিলে
আমি হবাে কি না নিতবর। আমি ও নীল পােষাক পর্বে
পার্বো না,—নিতবরও হতে পার্ণো না। তাতে আপনি
রাগই করুন আর যাই বলুন।
বৃদ্ধ নাতির মুখের দিকে চাহিয়াছিলেন, পৌত্র নীরব
হইবামাত্র তিনি ঘাড়টা হঠাৎ নাডিয়া বলিলেন, “বেশ
ভান্স বেণ। তরতর করেতে এক রাশ কথা বলে ফেল্পে
কিন্তু যা বল্লে তারতাে একটা অর্থ হওয়া চাই। আমি
বেশ বুঝতে পাচ্ছি, যে দিন থেকে আমি বিয়ে কর্বো
বলেছি সেই দিন থেকেই তুমি আমার প্রতি কথায়
বেঁকে দাড়াচ্ছ। আমি তােমার প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গাবার কোন
দিন চেষ্টা করিওনি কোন দিন চেষ্টা কর্তেও চাইনি।
তুমি বলে ছিলে ঠাকুর্দা আমি প্রতিজ্ঞা করেছি—এ জীবনে
কোন দিন বিয়ে কৰ্বে না,—আপনি আমায় এ বিষয়ে
কোন দিন অনুরােধ কৰ্ব্বেন না। কেউ বলতে পারে যে
সে বিষয় আমি কোন দিন তােমায় অনুরােধ করেছি। আমি
নিজে বিয়ে কর্তে রাজি হইছি কিন্তু তবুও কোন দিন
তােমায় বিয়ে কর্তে বলিনি। আর তুমি কিনা ঝাঁ করে
বলে বসলে আপনি আমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ কর্তে প্রতিজ্ঞা বন্ধ
হয়েছেন। ভায়া আমায় বলতে পারাে আমি তােমায় এমন

সতী-রাণী
কি শক্ত অবােধ করেছি যাতে করে মহাভারত অশুভ
হয়ে পড়েছে। একটা মকমলের নীল পােষাক পর্বে
বলেছি এতে এমন কি অন্যায় কাজ করেছি বলােত।
আগে আমাদের দেশের রাজা রাজড়ারা দিন রাত্তির এই
পােষাক পরেই থাকতাে। আর তুমি আধঘণ্টার জন্যে
গায়ে দিলেই তােমার সর্বাঙ্গে ফোসকা পড়ে যাবে।
আমার ঝকমারী তাই মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে পড়েছে।
অন্যায় হয়ে থাকে না হয় আচ্ছা করে এই কাণ দুটো
মােলে দাও।”
বৃদ্ধ ব মহাশয়ের মুখখানা যেন একটু ভার হইয়া
পডিল,—তিনি মহা গম্ভীর ভাবে গুডগুড়ির নলে মৃদু মৃদু
গন দিয়া ধুৰ ছাডিতে লাগিলেন। ঠাকুরদাদার এই
প্রকাণ্ড বক্তিতার সম্মুখে অনিলকুমার ঘাড় হেট করিয়া
স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। সে বঙ্কিম নয়নে একবাৰ
ঠাকুরদাদার মুখের দিকে চাহিল। বৃদ্ধের মুখের ভাবান্তর
লক্ষ্য করিয়া তাহার প্রাণের ভিতরটা কেমন যেন করিয়া
উঠিল
। বসু মহাশয় একটু নীৰ থাকিয়া আবার বললেন,
“ভাষা তাহলে আর দাড়িয়ে আছ কেন,যখন তুমি আমার
কথা রাখবেই না তখন আর কথায় কাজ কি।”
অনিলকুমারের প্রাণের ভিতর তখন হুলুস্থুল পডিয়া

সতী-রাণী
গিয়াছিল,-সে মহা বিরক্ত ধরে ঠাকুদাদার কথার উত্তরে
বলিল, “আপনি রাগ কচ্ছেন অন্যায়। যা আপনার
যখন ইচ্ছে তখন না হয় আমি সেই নীল পােষাকটাই
পরে আছি।”
বসু মাশয় গভীর ভাবে বলিলেন, “এইতাে ভায়া
কথার মত কথা। যাও আর দাড়িও না শিগগির
সেই পােষাকটা পরে এসাে। বুডাের শেষ সাধটা পূর্ণ
করাে।”
যখন সে সকলই করিয়াছে তখন আর সামাতের জন্য
ঠাকুরদাদার প্রাণে কষ্ট দিয়া লাভ কি? কাজেই বাধ্য
হইয়া অনিলকুমারকে সেই নীল পােষাকটা পরিয়া
আসিতে হইল। তখন বৃদ্ধ গাড়ীতে উঠিয়া বসিয়াছিলেন,
অনিলকুমাৰ মহা বিরক্তির সহিত গাড়ীতে উঠিয়া
ঠাকুরদাদার পার্শ্বে যাইয়া উপবিষ্ট হইল। অসংখ্য বাজী
বাজনার সহিত,-আলােৱ আলাে করিয়া মহা ধূমধামে
গাড়ী বরকে লইয়া কনের বাড়ীর দিকে রওনা হইল।
জমিদারের এই ধূমধামের বিবাহ দেখিবার জন্য গ্রাম শুদ্ধ
লােক বরের গাড়ীর আসে পাসে ভাঙ্গিয়া পড়িল।
দীনবন্ধুর এ বিবাহে একটা পয়সাও ব্যয় হয় নাই,
৯২

t: *** সুরাণী জমিদারের পয়সায় তাহার সনটুকু আজ নানা সাজে সজ্জিত হইয়াছে। দ্বারে সানাই সারাদিন তাহার মধুর রাগিণীতে কাণে তালা ধরাইয়া দিতেছে। আমােজনের কোনই ক্ৰটী নাই। কন্যার বাটীর সমস্ত আয়ােজনের ভার বসিকের উপর। রসিক কাজ কর্ম ছাড়িয়া আডেহাতে লাগিয়াছে, কাজেই বন্দোবস্তের কোনই কটা হয় নাই। কন্যার বাটীতেও রীতিমত ধূমধাম লাগিয়া গিয়াছে। কিন্তু দীনবন্ধুর প্রাণে সুখ নাই। নিশ্চিত বৈধব্য জানিয়া প্রাণের কন্যাকে এক স্থবীর বৃদ্ধের করে অৰ্পণ করিয়া কাহার প্রাণে সুখ থাকিতে পারে? পত্নীর নয়নের জল এক মুহুর্তের জগও গুৰু নয় নাই- সরলা নিলা চিরহাস্যময়ী কন্যার মুখের হাসি চিরদিনের মত ঘুচিয়া গিয়াছে,আর যে কখন সে মুখে হাসি ফুটিবে তাহার আশাটুকুও আর নাই। নিমন্ত্রিত ভদ্রলােকের আগমনে তাহা জীর্ণ শীর্ণ ভদ্রাসনটুকুভরাট হইয়া গিয়াছে। সকলেই আনন্দিত,-কিন্তু যাহার মেয়ের বিবাহ সেই কেবল একটা নিরালা স্থানে বসিয়া একটা খেলাে হকায় মৃদু মৃদু টান দিতে ছিল আর মাঝে মাঝে এক একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া প্রাণের যন্ত্রণাটা একটু লঘু করিবার চেষ্টা করিতেছিল। এই ভাবে কিছুক্ষণ কাটিবার পর দীন- সতী-রাণী বন্ধু তাহার হাতের হকাটা একপার্শ্বে নামাইয়া রাখিয়া, আৰ একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে বলিল, “ভা- বান কি পাপ করেছিলুম যার জন্যে মেয়েটার অদৃষ্ট এমন করে। সনসা বর আসছে বর আছে শকে সমস্ত বাভীটা সােরগােল হইয়া উঠিল—দীনবন্ধু নিজেকে একটু সাদা- ইয়া লইয়া উঠিতে যাইতেছিল, সেই সময় রসিক মঙ্গ ব্যস্ত ভাবে আসিয়া বলিল, “ওহে দীং আরে এস এস বর এসে পড়েছে। লােকজনকে খাতির যত্ন করে এগিয়ে আবে এস। তােমার কাজ তােমার কি আর এখন এ রকম ভাবে বসে থাকা চলে ?” দীনবন্ধু রসিকের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “ভাই আমার যেন কেমন হাত পা উঠছে না।” রসিক তাড়াতাড়ি বলিল, “মেয়ের বিয়ে এখন কি আর হাত পা না উঠলে চলে। নাও নাও ওঠ -বর এসে পড়লাে। রসিক মহা ব্যস্তভাবে অগ্রসর হইল কাজেই দীন- বন্ধুকেও উঠিতে হইল। উঠিতে হইল। সে রসিকের পচাৎ পচাৎ বাড়ীর সদর দরজার বাইয়া দাড়াইল। সম্মুখে অসংখ্য ঢাক ঢােলের মহা শব্দ সঙ্গে লইয়া সমস্ত গ্রাম আলােয় ১৪

সতী-রাণী
আলাে করিয়া ঘন ঘন বােম বিদীর্ণ করিতে করিতে বর
আসিতেছে।
বর আসিয়া পড়িল-কোলাহল, গণ্ডগােল, উলুধ্বনি
ও শখধ্বনির মাঝখান দিয়া বর আসিয়া সভায় বসিল।
অনিলকুমার সেই নীল জরির পােষাকে অপূৰ্ব সাজে সজ্জিত
অবস্থায় অথবদনে ঠাকুরদাদার পাশেই উপবিষ্ট। হইল।
বিবাহ বাড়ী কাজেই বহুলােকের সমাগম হইয়াছে।
বর দেখি নানা জনে নানা কথা বলিতে লাগিল। কেই
কেহ বলিল, “বাৰা টাকার লােভ ৰড লােভ। কেহ কেহ
বলিল, “দেখে শুনে শেষ দীনবন্ধু এই কাজটা কল্লে।
আবার কেহ কেহ বলিল, “কি কৰ্বে অবস্থার মানুষকে
সবই কর্তে হয়।”
বৃদ্ধেৰ পাৰে উপবিষ্ট জরির পােষাক পরা অনিলকুমারকে
দেখিয়া অনেকেরই হাস্য সংরণ করা অসাধ্য হইল। কেহ
কেহ স্পষ্টই বলিল, “বাঃ, বা খাসা মানিয়েছে। যেমন
কচি বর নিতবরটীও তেমনি বেশ হােট হয়েছে।”
এইরুপ আরােও নানারূপ মতামত—সস্পষ্ট ও অস্পষ্ট
এত হইতে লাগিল। অনিলকুমারের মনে হইল, মা
বারে! তুমি বিশ্ব ইও,আমি তন্মধ্যে প্রবেশ করি।
আনন্দ ও নিরাননের মধ্য দিয়া সময় ঠিক চলিয়া যায়,

সতী-রাণী
তে
সে কখন কোন দিনই সুখ দুঃখের মুখাপেক্ষা করে না।
কাজেই যথা সময়ে লগ্ন উপস্থিত হইল। ভট্টাচাৰ্য মহাশয়
দীনবন্ধুকে ডাকিয়া বলিল, “আর কেন লয় উপস্থিত,
কন্যা পাত্রস্থ করুন।”
লগ্ন উপস্থিত অনিয়া সভায় আসিয়া অতি দীনভাবে
জোড় হাতে বরের নিকটে আসিয়া দীনবন্ধু বলিল, “লগ
উপস্থিত,—এইবার একবার গাত্রোখান করুন।”
বৃদ্ধ বসু মহাশয় চক্ষু মুদ্রিত করিয়া বর শয্যার উপর
বসিয়াছিলেন,চক্ষু মেলিয়া বলিলেন, “লগ্ন উপস্থিত
নাকি? কন্যা আনুন আমি যাচ্ছি। সমস্ত দিন উপবাসে
শরীরটা কেমন ঝিঝিম্ কছে।”
কি সর্বনাশ শরীর ঝিমঝিম্ কচ্ছে কি? কি যেন একটা
কিসের অজানিত আশঙ্কায় দীনবর সমস্ত দেহটা কাপিয়া
উঠিল। তাহার কষ্ঠ হইতে কথা বাহির হইল না। পা
হইতে একজন নিমন্ত্রিত ভদ্রলোেক সুস্পষ্ট স্বরে বলিয়া উঠিল,
-“দেখ বাবা! যে বর বিয়ের সভায়ই না টেসে যায়।”
কথা কয়টা অনিলকুমারের কর্ণে বেশ করিল, সে
একবার দৃষ্টিটা তুলিয়া সেই দিকে চাহিল। দীনবন্ধু
নিজেকে একটু সামলাইয়া লইয়া জড়িত কণ্ঠে বলিল,
বিশেষ কি কোন অসুখ কছে?”

সতী-রাণী
“বিশেষ-না এমন বিশেষ কিছু নয়-বৃদ্ধ বসু
মহাশয় একটা হাই তুলিয়া দুইটা তুড়ি দিয়া উঠিয়া
দাড়াইলেন। অনিলকুমারের দিকে ফিরিয়া বলিলেন,
“চল ভায়া শেষ কাজটা সেরে নেওয়া যাক।”
ঠাকুরদাদার কত ধর অনিল কুমারের কর্ণে প্রবেশ
করিবামাত্র সে অবাক ভাবে একবার তাহার ঠাকুরদাদার
মুখের দিকে চাহিল,—বিস্তৃত স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “আমি
যা তোর?
বা মহাশয় গভীরভাবে বলিলেন, “সম্প্রদানের জায়গায়।
আরে চল, বিয়েটা দেখবে চল।”
অনিল কুমারের সমস্ত প্রাণটা একেবারে ধিক্কারে
সংকোচিত হইয়া পডিতে ছিল,তাহার আর কথা
কহিতে একেবারেই ইচ্ছা ছিল না সে মৃদু স্বরে বলিল,
চলুন।
বর উঠিবার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই উঠিয়া দাড়াইয়া
ছিল-বিবাহ দেখিবার জন্য অনেকেই বরের পাৎ
পশ্চাৎ ভীড় বাড়াইয়া অগ্রসর হইল।
৫ লারী
পি

অষ্টম পরিচ্ছেদ
অন্তঃপুরের উঠানের মাঝখানে কন্যাদানের আয়ােজন
হইয়াছে। দুই পক্ষের দুই পুরােহিত বরের অপেক্ষায়
মহা ব্যগ্রভাবে দুই দিকে উপবিষ্ট। বিবাহের শ্রেষ্ঠ সাক্ষী
নারায়ন শীলা সম্মুখে চৌকীর উপর উপবিষ্ট হইয়াছেন।
আয়ােজনের সকলই প্রত কেবল বর কনের অপেক্ষা।
কন্যা পক্ষের পুরােহিত একবার তাহার দীর্ঘ শিকাটা
নাডিয়া সমূখে দয়মান একটা লােককে জিজ্ঞাসা
করিলেন, “বলি সময়টা একবার দেখুন দেখি মশাই,বােধ
হয় লয় উপস্থিত।”
ভদ্রলােকটী অর্ধ পৰু বৃদ্ধ-অঙ্গে একটা বেনিয়ান,
পুরােহিত মহাশয়ের প্রশ্নে তিনি আলাের নিকটে কয়েক
পদ অগ্রসর হইয়া সেই বেনিয়ানের পকেট হইতে একটা
প্রকাও সােনার ঘড়ী বাহির করিয়া বলিলেন, প্রায়
সাড়ে এগারটা বাজে-এগারটা বেজে সাতাশ মিনিট
পুরােহিত ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, “এগারটা আটত্রিশ
মিনিটে লগ্ন,এইবার বর আনবার বন্দোবস্ত করুণ।
১

সতী-রাণী লটা আবার নিতান্ত কম সময়,এক ঘণ্টাও নয়। বান বর আনবার বলােবও করুণ। পুরােহিত মহাশয়ের কথায় সেই অর্থ পৰু বৃদ্ধ বয় আনিবার বন্দোবস্ত করিবার জন্য কয়েকপদ মাত্র অগ্রসর হইয়াছিলেন, কিন্তু সম্মুখে দীনবন্ধুকে বর লইয়া আসিত দেখিয়া তিনি আবার থাকাইয়া পাডাইলেন। দীনবন্ধু বরকে লইয়া কন্যা সম্প্রদানের স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইল। বরের পচাৎ পশ্চাৎ অনিলকুমার ও প্রাৰ সমবেত সমন্ত লােক বিবাহ দেখিবার জন্য তথায় আসিয়া ভীড় করিয়া দাড়াইল। চারিদিকে গণ্ডগোেল পডিয়া গেল, অন্তপুর হইতে ঘঘন উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি উখিত হইতে লাগিল। নাপিত তাড়াতাড়ি বরের নিকট আসিয়া বরের পােষাকটা ছাড়াইয়া চেলীর জোড পাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিল। নাপিত বরের পােক ছাড়াইয়া চেলী রাইয়া দিল। বৃদ্ধ বসু মহাশয় চেলীয় জোড়ে ভূষিত হইয়া আলপনাযুক্ত পীডিতে বসিতে যাইতে ছিলেন- তিনি পীড়ির দিকে কয়েক পদ অগ্রসর হইয়া সহসা মস্তক নাড়িয়া কহিলেন, “না আর হওয়া অসম্ভব। এক ছিলিম তামাক না খেয়ে আমার দ্বারা আর কিছু হচ্ছে না। তিন চার ঘণ্টা তামাক না খেয়ে সমস্ত পেটটা একেবারে

সতী-রাণী
ফেপে ফুলে জয় ঢাকের মত হয়ে উঠেছে। না আর এক
ছিলিম তামাক না খেলেই নয়। বাবা পদ্মলােচন
বহু মহাশয়ের কথায় উপস্থিত সকলেই একেবারে
অবাক হইয়া বরের মুখের দিকে চাহিল। লগ্ন উপস্থিত,
বর বিবাহ করিতে বসিতে যাইয়া তামাক খাইবে বলে কি?
উপস্থিত সকলেই রীতিমত চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল।
ভাঁড়ের মধ্য হইতে এক ব্যক্তির সুস্পষ্ট কার বাহির হইয়া
আসিল, “দীনবন্ধু মেয়ের বরটি জুটিয়েছে বাবা খাস,—বিয়ে
কর্তে বসতে গিয়ে বর বলে কি না তামাক খাবাে? ঘাটের
মড়া,সাতকাল গিয়ে এককাল ঠেকেছে, এখনও প্রাণে
বস কত,-জরীর পােষাক পরে বিয়ে কর্তে এসেছেন।
ওগাে কে আছ বরকে এক ককে তামাক দাও—তামাক
দাও। দীনবন্ধু জামায়ের জন্যে এক কৰুে তামাক সেজে
এনে দাও।”
অনিকুমায় তার দাদা মহাশয়ের পশ্চাতেই দাড়াইয়া
ছিল,—এই কথাগুলা তাহার কর্ণের ভিতর যেন একটা
বিকট বিক্রপের মত ঝণঝণ, করিয়া উঠিল। এ সময়
ঠাকুরদাদার তামাক খাইতে চাওয়টা তাহার নিকট একে-
বারেই বি বিকট ঠকিল। কেমন যেন একটা দুর আগে
তাহার সমস্ত দেহটা থাকি থাকিয়া ফুলিয়া উঠিতে

मी-नागी লাগিল। ঠাকুরদাদা যে দিন হইতে বিবাহ করিতে চাহিয়া- ছেন সেই দিন হইতেই তাহার দাদামহাশয়ের উপর কোন যেন একটা অএ হইগিয়াহি-আজ এই বিবাহের পূর্বে তামাক খাইতে যাওয়ায় সেই অশ্র রাগে পরি- ণত হইল। সে ঘাড় তুলিয়া চাহিতে পারিল না। ঘুণায় তাহার মাথাটা মাটীর সহিত মিশিবায় জয় একে- বারে বুকিয়া পড়িল। বু ব মহাশয়ের কথায় দীন- বন্ধু মহা ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল, সে তাড়াতাড়ি বলিল, “তামাক খাবেন? বলেন কি? সর্বনাশ হলে যে লগ্ন অই হবে।” বৃদ্ধ গম্ভীর ভাবে বলিলেন, “তাওতো বটে, কিন্তু তামাক না খেলেও তাে আর আমি দাড়াতে পাছিনি। ছেলে বেলা থেকে কেমন বিগ্র স্বভাব তামাকের মৌতাৰ ধরে আর আমার কোন কাজ ভালাে লাগে না। পদ্মলােচন শিগগির এক কৰুে তামাক নিয়ে এলো দেখি বাপ। তামাক না খেয়ে হাই উটতে আরম্ভ হয়েছে, আর তামাক না খেলে কিছুতেই ভীড়ের ভিতর হইতে তখন ক্রমাগতই বিকৃত বিক্ষপের দর বাহির হইতে ছিল,-“দীনবন্ধু জামাইকে তালাক দাও—আমাক দাও गो-ब्रामी দীনবন্ধুর কঠ হইতে ভালাে মন্দ কোন কথাই বাহির হইল না,সে বরের ভাৰ ভলি দেখিয়া একটা বুক ভাঙ্গা তীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল—তাহা কী হইতে একটা করুণ বুৰুভাজা কর বাহির হইয়া আসিল, “হ ভগবান-অদৃষ্টে শেষ এতও লিখেছিলে।” রসিক বাহিরে ঠাকুর দালানে বলিগের পাতা করি বন্দোবস্ত করিতে ছিল-এই সংবাদটা তাহার কর্ণগােচর হইবামাত্র সে ছুটিয়া বন্ধু মহাশয়ের সম্মুখে আসিয়া বলিল, “বলল কি বড়কর্তা এখন তামাক খাবে সে কি কথা! এই কি তামাক খাবার সময়! এদিকে ল যে যায় শেষে কি একটা ভাললাকের জাত যাবে। আর দেরী কনা,—দেরী কর না।” বহু মহাশয় চক্ষু মুদ্রিত করিয়া পাড়াইয়া ছিলেন- কষ্টে চক্ষু মেলিয়া বলিলেন, “তাও তাে বটে—কিন্তু অনিলকুমার আর নীরব থাকিতে পারি না, চীৎকার করিয়া বলিল,-“হিন্দু সমাজ তােমার বাহাদুরী আছে—তা না হলে তুমি এখন বুড়ােয় বিয়ের ব্যবস্থা দাও। ছি-ছি-ছি—এমন বিয়ে চোখে দেখাও না

সত-বাণী
পৌত্রের কবর কনে প্রবেশ করিবামাত্রই বৃদ্ধ
মাথাটা একটু ঘুরাইয়া নাতির মুখের দিকে চাহিলেন,
তাড়াতাড়ি তাহার কথার মাঝখানেই বাধা দিয়া বলি-
লেন, “এই যে ভাষা। ভাষা যদি একটু উপকার কর
তাহলে ঝ। করে এক ছিলিম তামাক খেয়ে নিই।
তুমি তাে সবই জানাে ভায়া,-তামাকের মৌতাত ধরে
এক ছিলিম তামাক না খেয়ে আর আমি কোন কাজই
কর্তে পারিনি। ভায়া একটু উপকার কর—মহা বিপদে
পড়েগেছি —এদিকে লক্ষ্ম যার সঙ্গে সঙ্গে দীর জাত যায়
তুমি ততক্ষণ এই কাজটা সেরে নাও। বাবা পদ্মলােচন*
এই কাজটা সেরে নাও,-ইহার অর্থ কি অনিল
কুমার কিছুই বুঝিতে পারিল না। সে বিষয় বিস্ফারিত
নয়নে ঠাকুরদাদার মুখের দিকে চাহিল ,-বৃজ বেশ
একটু ব্যন্ত ভাবে আবার বলিলেন, “তায় গাড়িও না,
দাড়িও না, বােন পড়-বােসে পড়।
দাদার এই উপকারটুকু কর-এদিকে যে লগ্ন যায়।”
অনিলকুমার অবাক ভাবে ঠাকুরদাদা মহাশয়ের মুখের
দিকে চাহিয়া ছিল,একটা মহা বিতির বর তাহার কষ্ট
হইতে বাহির হইয়া আসিল, আমি কি উপকার কর্ণো,
তাও কি কখন হয়, কখন হতে পারে?
বুড়ো ঠাকুর

সতী-রাণী বুজ মাথা নাড়িয়া বলিল, “খুব ই ভায়া খুব হয়। বেকার দাড়িয়ে আছ তােত না হয় বুড়ো ঠাকুরদাদার এই উপকারটা কল্লে। কোন ভয় নেই আমি মাত্র এক ছিলিম তামাক খেয়েই আবার লাগছি।” অনিলকুমার আবার কি বলিতে যাইতেছিল,—কিন্তু বৃক্ষ আর তাহাকে কথা বলিতে দিলেন না, ঘাড় নাডিয়া বলিলেন, “আর কাজ কি কথায় ভায়া বােস পড়-বােস পড়। বা পদ্মলােচন ঝ করে এক ছিলিম তামাক- অনিলকুমার মহা বিরক্তস্বরে বলিয়া উঠিল, “কি যে ৰ মহাশয় মহা বিচলিত স্বরে বলিলেন, “আর কথা কাটাকাটি কর কেন? ভদ্রলােকের জাত যায় বােঝ না। বুঙ্গে ঠাকুরদাদার একটু উপকার না হয় কলেই। আমি ব্যা করে এক ছিলিম তামাক খেয়েই আবার লাগছি- বাবা পদ্মলােচন- চারিদিকে হট্টগােল পড়িয়া গেল,-বিজপের বান বর্ষার জলের মত সত্ৰ কঠ হইতে সহ তাৰে বাহির হইতে লাগিল। কেহ কেহ বলিল "লােতে পা-পাপে মৃত্যু কথা সতী-রাণী ততা পড়েই রয়েছেীনুর বড় বেশী লােভ কিনা, ঠিক হয়েছে, যেমন কর্ম তেমনি ফল।” ঠাকুরদাদার কথায় প্রতিবাদ করিবার জন্য অনিল- কুমার একেবারে উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু বসু মহাশর তাহাকে আর কোন কথা বলিতে অবসর দিলেন না,একরূপ জোর করিয়া তিনি তাহার নাতিকে সেই পড়ির উপর বসাইয়া দিয়া ঘাডটা নাডিয়া বলিলেন, “কোন ভয় নেই ভায়া,-এক ছিলিম তামাক খেয়েই আবার আমি লাগছি। বাবা পদ্মলােচন-- এদিকে লন্ত যায় দেখিয়া পুরােহিত মন্ত্র আরম্ভ করিয়া দিলেন—চারিদিকে মহা হট্টগােল পডি গেল। দীন কি হইল বা কি হইতেছে ভাল মন্দ কিছুই বুঝিতে পারিল নতাহার চক্ষের সখে জগতের সমস্ত আলাে একেবারে কালাে হইয়া গিয়াছিল। সে দুই হন্তে মাথাটা চাপিয়া ধরিয়া জড়ের মত বসিয়াছিল। কাহাকেও কোন কথা জিজ্ঞাসা করিবারও তাহার সাহস ছিল না,কেও কোন কথা তাহাকে বলিলও না। উলুধ্বনি, শনি, গণ্ডগােলে সমস্ত সম্প্রদানের স্থান একেবারে মুখরিত হইয়া গেল। কি হইল না হইল অনিলকুমারও ভাল কিছু বুঝিতে পারিল না। ঠাকুরদাদার তাড়াহুড় ঠেলাঠেলির মাঝখানে সতী-রাণী পড়িয়া সমস্তই তাহার যেন কোন গােলমাল হইয়া গেল। চারিদিকে গণ্ডগােল তাহারই মাঝখানে কার কোমল হাতখানি অনিলয়ের হাতের উপর আসিয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে কি যেন একটা কিসের স্পন্দনে একটা বৈদ্যুতিক ক্রীড়া তাহার সর্লাজের মধ্য দিয়া বহিয়া গেল। এই পুলক স্পন্দনের ভিতর দিয়া অনিলকুমার প্রাণে প্রাণে অনুভব করিল, কি যেন একটা দুর্লভ সামগ্রী ভগবানের আশীর্বাদের মত তাহাকে ধীরে ধীরে বেষ্টন করিয়া ধরিতেছে। দুইটা ভাসা ভাসা চোখের কালাে তার অনিল- কুমারের সমস্ত ভাবনা চিন্তার মাঝখানে তাহার আপন পদ্মাসন করিয়া লইল। শনি, উলুধ্বনির ভিতর দিয়া বিবাহ শেষ হইয়া গেল, বর কনে বাসরে চলিয়া গেল।

নবম পরিচ্ছেদ
বাসর ঘর,যুবতী কিশােরী, প্রো বৃদ্ধা,-নথ ও
নলকে হুড়াহুডি পড়িয়া গিয়াছে,—ঢাকাই বেনারসীর
খখসানী মলের-খুন-চুড়ীর টুনটুন শব্দে সমস্ত বাসর
ঘর মুখরিত। চাৰিদিকে সি—চারিদিকে আনন্দ যেন
হেলিয়া দুলিয়া সমস্ত বাসর ঘরে লুটাইয়া পড়িতেছে। এই
আনন্দ ও হাসির মাঝখান দিয়া অনিলকুমার বাসর ঘরে
প্রবেশ করিল,—তাহার যেন মনে হইল একটা পরীর
গাঁটছডার আবদ্ধ হইয়া সে এক পরীর রাজ্যে আসিয়া
উপস্থিত হইল। এ রাজ্য অনিলকুমারের একেবারে
নূতন,ইহার বাহার,ইহার সৌন্দৰ্য্য তাহাকে একেবারে
অবাক করিয়া দিল। এই মজলিসের ভিতর প্রবেশ
করিবার সঙ্গে সঙ্গে লজ্জারাণী এমনি সজোরে তাহার ঘাড়টা
চাপিয়া ধরিল যে সে কিছুতেই আর ঘাড় তুলিয়া চাহিতে
পারিল না। শত প্রশ্ন শত দিক হইতে ছুটিয়া আসিয়া
তাহার করে ঠিকইয়া পড়িতেছিল, সে প্রশ্ন এমন
নূতন,—এমন মধুর—এমন সুমিষ্ট যে তাহা কেবল শুনিবার,
১০৭

সতী-রাণী
উত্তর দিবার নহে। এই আনন্দ মজলিসের ভিতর পড়িয়া
অনিলকুমার যেন হাবুডুবু খাইতে লাগিল,-একটা প্রশ্নেরও
উত্তর তাহার মুখে জোগাইল না। সে ঘাড়টি হেঁট করিয়া
বােবার মত সেই মজলিসের মাঝখানে বসিয়া চিন্তা
দোলায় দুলিতে লাগিল। ঠাকুরদাদার এই আচরণে একটা
পর্বত প্রমান অভিমান তাহার সমস্ত বুকটা চাপিয়া ধরিয়া
ছিল-বাসরের আনন্দ কোলাহলে সেইটা যেন ধীরে ধীরে
সরিয়া যাইতে লাগিল। তাহার মন তখন কেবলই তাহার
প্রাণের নিকট প্রশ্ন করিতেছিল তাহার ঠাকুরদাদা, মানুষ
দেবতা। ঠাকুরদাদার আচরণ’ তাহার উপর তাহার
যেটুক অন্ধ হইয়াছিল তাহার শতগুণ শ্রদ্ধায় তাহার
সমস্ত প্রাণটা পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছিল। সহসা কমূলে
টান পড়ায় অনিলকুমারকে ফিরিতে হইল, একটা যুবতী
কোমল করপদ্মে তাহার কর্ণমূল সজোরে মর্দন করিতেছিল,
—অনিলকুমারকে ঘাড় তুলিতে দেখিয়া সে এক গাল হাসি
ছড়াইয়া দিয়া বলিয়া উঠিল, “বলি ও ভাই বর-মুখে কথা
নেই কেন তুমি কি ভাই বােকা।”
অনিলকুমারের কর্ণ দুইটা পাৰু খাইয়া লাল হইয়া
উঠিয়াছিল—যে একবার তাহার কাধে হাত দিয়া মৃদু স্বরে
কেবল মাত্র বলিল, “আয়ে-

লালী
এর
জামাণ
অনিলকুমারের মুখ হইতে ওই আটুেকু ৰাহিয়
হইবার সঙ্গে সঙ্গে একেবারে উপস্থিত সমবেত নারীর
ক) হইতে বাহির হইয়া আসিল, “ওরে শাখ
বাজা-
गौष दांचा বর কথা কহেবের কথা
কহেছে।
এই সমবেত নারীর কষ্ট নিত শব্দগুলি অনিল
কুমারের মনে হইলে পৃথিবীতে যত কিছু রাগ রাগিণী
আছে তার সমস্তই যেন একেবারে তাল লরে বনিত
হইয়া উঠিল। একজন কিশােরী অনিলকুমারের পাশেই
বলিয়াছিল,সে তাহার সম্মুখস্থ অপর একজন নারীকে
সােধন করিয়া বলিল, “ভাই এক কাণ মলাই যখন বরের
মুখ থেকে আজ্ঞে বেরিয়েছে,তখন আর দুটো জোরে
কাণে পাক দিলেই অনেক কথা ফরফর করে বেরিয়ে
আৰে। দে ভাই গঙ্গা জল বরের কাণে কড়া রকম দুটো
পা।
অনিলকুমারের কাণ দুইটা তখনও লাল হইয়াছিল
পুনরায় কর্ণে পাক খাইবার সম্ভাবনা দেখি সে যেন বেশ
একটু বিচলিত হইয়া পড়িল, তাড়াতাড়ি বলিল, “আজ্ঞে
আমি তো বােৰা নই যে আমায় পােবাগিরী যােবা
জন্যে আপনারা এত ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন, তবে আমি পুরুষ

সতী-রাণী
মানুষ আমার গলার স্বর খুব মিষ্টি নয় কাজেই চুপ
করে আছি।”
একটা কিশােরী গালে হাত দিয়া বলিয়া উঠিল, “ওমা
তা বলতে হয় তুমি পুরুষ মানুষ——
কিশােরী কথাটা শেষ করিতে পারিল না—ঘরের ভিতর
প্রবেশ করিল, পাবীদিদি। পায়রীদিদি গ্রামের সকলেরই
প্যাররীদিদি। বিধবা, -আটসাট গড়ন, বয়সটা
কিছু
ভারী। মাথার চুল পুরুষের মত ছােট করিয়া কাটা।
প্যারীদিদি গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া বলিলেন, “বলি
ও ফুডীর,-হাসি তামাসার তাে একেবারে বাহার ছুটিয়ে
দিয়েছিস,-বলি বরের কনে পছন্দ হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা
কছিস।”
কনের স্নানযাত্রা এক পার্কে বসিয়াছিল, সে তাহার
নলক নাড়িয়া বেশ একটু ঝঙ্কার দিয়া বলিয়া উঠিল,
“প্যায়নীদিদি সে কথা কি আর জিজ্ঞাসা কর্তে হয়, এ
কনে যার পছন্দ হবে না—তার জেন মােটে পছন্দই নেই।
আমার স্নানযাত্রার মত কনে পাওয়া অনেক ভাগ্যির কথা।"
অপর একজন যুবতী অপর পার্শ্ব হইতে বলিয়া উঠিল,
পছন্দ হয়েছে কি না হয়েছে, তুমিই না হয় প্যায়রীদিদি বরকে
জিজ্ঞাসা কর না।”
১১০

সত-রাণী প্যায়নীদিদি একটু বরের দিকে নীচু হইয়া বরের চিবুক ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “হ্যা ভাই বর কনে ঠিক খনের মত হয়েছে তাে?” অনিলকুমার একটু ঘাড়টা তুলিয়া প্যায়নীদিদির মুখের দিকে চাহিল,—বিশেষ কোন উত্তর দিল না। मानवाला একটু দেমাক ভারে বলিয়া উঠিল, “প্যায়নীদিদি মান- যাত্রার একবার মুখখানা ঘােমটা খুলে বরকে দেখিয়ে দাও না : দেখ বরের মুও ঘুরে যায় কি না।” চারি পাঁচজন ললনা অশনি কনের ঘােমটা খুলিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিল,—বলিল, “যা বলেছি ভাই। ক’নের মুখটা একবার ভালাে করে দেখে সত্যি কথা বলা তত ভাই বর কনে পছন্দ হয়েছে কিনা ? দুই চারিজন ললনাতে পডিয়া কনের ঘােমটা খুলির জন্য টানাটানি আরম্ভ করিয়া দিল,—কিন্তু কনে এমনি সজোরে দুই হন্তে ঘােটা চাপিয়া ধরিয়াছিল যে ঘােষ্টা খােলা অসম্ভব হইল। প্যায়ারী দিদি বিরক্ত স্বরে বলিল, একি বেয়া ক'নে বাপু-বক মুখ দেখাতে চার না। বনি হ্যালা ছুড়ি তাের যে ঢং দেখে আর বাঁচি না।” অনিলকুমার মৃদু স্বরে বলিল, “যােটা খােলবার জন্যে আপনাদের ব্যস্ত হবার প্রয়ােজন নেই। ও মুখ ১১১ সতী-রাণী যেন মনে হয়,কোথায় কবে যেন আমি দেবে ছিলুম।” একজন ললনা মৃদু হাসিয়া বলিলেন, ঠিক ধৰছ- দেখেছিলে বটে সে আজন্মে।” অনিলকুমার ঘাড় নাডিয়া বলিল, “আজ্ঞে না, আৰু জন্মে নয় এই জন্মেই। ঠিক বলতে পারিনি তবে এইটুকু মনে আছে,-যেন একটা পুকুর ঘাটে দেখে ছিলুম। ভিজে কাপড় পরা,-কলশী কে--সে যেন একখানি ছবি।” কনের স্নানযাত্রা গালে হাত দিয়া বলিয়া উঠিল, ওমা ক'নে আগে থাকতেই বরের সঙ্গে ভাব সাৰ করে রেখেছে। বলি হ্যা ভাই মানবালা, বরের সঙ্গে কোথায় কবে আলাপ করেছিলি ভাই?” প্যারিদিদি ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, “তাইতাে বলি সতীর মুখে হাসি ধছে না কেন? মনের মত বী পেয়েছে কিনা তাই প্রাণের হাসি মুখে উচ্ছলে উঠছে।” যখন বাসরের র তামাসা আনল হাসি-লহরে হরে হেলিয়া দুলিয়া চলিয়া পড়িতেছিল, সেই সময় দীনবন্ধুর কষ্ঠ, বাহির হইতে বাসরের ভিতর প্রবেশ করিল, আন—এই দিক দিয়ে আনুন। ওরে আলােটা সামনের দিকে ধর।”

সতী-রাণী
দীনবন্ধুর ক স্ব বাসর গৃহের ভিতর প্রবেশ কৰিব
মাত্র বাসরের আনন্দ কোলাহল একেবারে নীরব হইয়া
গেল। ললনাগণ লজ্জায় বেশ একটু সংযত হইয়া
পড়িল ও সকলেই খুব খানিকটা ঘােমটা মাথার উপর
টানিয়া দিয়া এক পার্থে কুণ্ডলী পাকাইল। দেখিতে দেখিতে
বাহিরের আলাে ভিতরে আসিয়া পড়িল,-অনিলকুমার
ঈষৎ বমি নেত্রে দরজার দিকে চাহিল। দীনবন্ধুর
পশ্চাৎ পচাৎ ঠাকুরদাদা ও রসিককে আসিতে দেখিয়া
অনিলকুমারের ঘাড়টা লজ্জায় আবায় অবনত হইয়া
পড়িল। বনু মহাশয়ের অস্পষ্ট ৰূর অনিলকুমারের কর্ণে
আসিল, “বাৰা পলােচন, আলােটা একটু বুত করে ধর
বাবা,হোঁচট না খাই।”
দীনবন্ধুর পশ্চাৎ পচাৎ বসু মহাশয় ও রসিক আসিয়া
বাসর গৃহের দরজার সম্মুখে দাড়াইল।
বাসর গৃহে
দরজার সম্মুখে আসিয়া দীনবন্ধু বলিল, “সতী মা আমার,
তােমার দাদা র মশাই এসেছেন তাকে প্রণাম কর।”
বসু মহাশয় একবার দীনবন্ধুর মুখের দিকে একটা
বিস্মৃতির দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন, “সে কি রকম
দী! দাদা শ্বশুর সে কি রকম হে? কথাটা তো ভালো
বলে মনে হচ্ছে না।”
১১৩

সতী-রাণী = তাহার পর অলিনকুমারের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, ‘ভায় আর কেন উঠে পড় আমার ভরপুর তামাক খাওয়া হয়েছে—উঠে পড় আবার আমি লাগছি।” রসিক ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “বড় কর্তা,-তােমার মত সদানন্দ লােক পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় নেই,-তুমি মানুষ নও দেবতা। দাও একটু পায়ের ধূলাে দাও।” ৰ মহাশয় ঘাড় নাডিয়া বলিলেন, বেশ আছ রসিক, আমি এক ছিলিম তামাক খেতে গেছি আর সমস্ত গােল- মাল করবার চেষ্টায় আছ। ভালাে মানুষ বুড়াে পেয়ে একটু ফাঁক পেয়েছ আর অমনি ঠকাবার মতলব ভায়া তুমিও তাে বেশ জমাট বেধে বসে রয়েছ,—উঠবার নামটাও কর না।” রসিক ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “বড় কর্তা তুমি এসে দরজায় দাডিয়েছ তােমার নাতি কি না উঠ থাকতে পারে। এবার যুগলে এসে তােমার পায়ের ধূলাে নেৰে।” সিক তাড়াতাড়ি খাইয়া বর কনেকে উঠাইয়া আনিল, —ব মহাশয় দীনবন্ধুর দিকে চাহিয়া বলিলেন, “দী শিগগির এক দু মালা এনে দাও-শমি করে কেন কথা শুনতে চাইনি, আমি নিজেই মালা ছড়াটা বদলে নিই। ভাষা এখন তাে মুখে কথা নেই-অথচ চাপা হাসি ফুটে বেরুচ্ছে। ৰলি ঠাকুরদাদার জিনিটা ১১

সতী-রাণী
এমন করে বেদখল করা কি কাজটা তােমায় ভালাে
হলাে ?”
রসিক তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “বড়কর্তা আর জালিও
,এখন নাতি নাতবউকে আশীর্বাদ কর, যেন তারা
তােমার মত - সংসারের সকল লােককে সুখী কর্তে পারে।
নাও হােট কর্তা,আজ এমন দিনে স্বামী স্ত্রী যুগলে মিলে
বড় কর্তার পায়ের ধুলাে নাও। এমন দিনে তার পায়ের
ধূলাে সকলের ভাগ্যে ঘটে না।”
বা মহাশয় মুখখানা
মুখখানা বিকৃত করিয়া বলিলেন,
রসকে তুই বাবা থা, তােমর যে সকলে মিলে এক
জোট হয়ে আমায় ঠকিয়ে দেবে সেটি হচ্ছে না। ভায়া
নিজের কাজে যাও, ঠাকুরদাদার জিনিষে আর কুনটা
দিও না।
অনিলকুমার সতীরাণীর সহিত আসিয়া বন্দু মহাশয়ের
পদধুলি গ্ৰহণ করিয়া উঠিয়া দাড়াই। তাহার মনে
হইল এই পদধূলিটুকু তাহার নিকট সত্যই দুল্লভ সামগ্রী;
ভক্তিতে তাহার প্রাণটা আপনা হইতেই নত হইয়া পড়িল।
সে তাহার ঠাকুরদাদার মুখের দিকে মুখ তুলিয়া চাহিতে
পারিল না। রসিক তাড়াতাড়ি বলিল, বড়কর্তা নাও নাও
এখন নাতি নাতবৌকে আশীর্বাদ কর।”

সতী-রাণী
ৰ মহা মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “তােমার জিনিষে
ভয় আর আমি কুনজটা দেব না। কিন্তু কাজটা তােমার
ভালাে হলাে না। দিদিমণি আমার এই পাগলা ভাষাটাকে
চোখে চোখে নেব। আর বােস বংশের গৃহলক্ষ্মী হয়ে এই
বুড়োকে দুটো দুটো খেতে দিও।”
আনন্দে দীনবর গও বহিয়া অশ্রু ঝরিতেছিল,
সে জড়িত কষ্টে চীৎকার করিয়া উঠিল, “গিন্নি তােমার
ভাঙ্গা ঘরের দোরে এসে দেবতা তার সব করুণাটুকু ছড়িয়ে
দিয়ে দাড়িয়েছে। সা যায় দয়ায় তােমার বড়
আদরের সতীরাণী রাণী হতে চল্লো এমন দিনে তার একটু
পায়ের ধুলাে নাও।”
অভয়া দরজার পাশেই দাড়াইয়া ছিল, যে বন্ত্রে সর্বাঙ্গ
আচ্ছাদিত করিয়া দ্বারের পার্শ্ব হইতে বাহির হইয়া আসিয়া
বসু মহাশয়ের পদধূলি গ্ৰহণ কৰিল।
ৰ মহাশয় এবার দীনবন্ধুর মুখের দিকে চাহিয়া
বলিলেন, “এইটা বুঝি দীনুর পরিবার। তা যাই বলাে
আপু কাটা কিন্তু তােমাদের একেবারেই ভালো হয়নি,
আমি এমন করে পােবা টোক এটে বিয়ে কর্তে এম
আর তােমরা সবাই মিলে জোট পাট করে আমায় কি না
এমনি ঠানটা ঠকিয়ে দিলে। তা তােমাদেরই বা দোষ

সতী-রাণী
দিই কেন-আমার নাতিটিও বড় দেখছি কম নয়-
চিরকাল বলে এলেন বিয়ে কৰ্বেন না আর যেমন একটু
ফাঁক পেয়েছেন আর অমনি মালাটা বলে বসেছেন।
ভায়া কাজটা তােমার একেবারেই ভালাে হয়নি। আমার
আশায় এমন করে বাদ সাধা তােমার ঠিক উচিত
হলাে না।
বসিক বলিল, “বড়কর্তা,আমি তােমার সাধ পুরিয়ে
দিচ্ছি—কেউ না তােমার গলায় মালা দেয় আমি তােমার
গলায় মালা দিচ্ছি।”
রসিক তাড়াতাডি এক ছড়া মালা আনিয়া ব মহা-
শয়ের গলায় পরাইয়া দিল। সমবেত ললনাগণ চারি-
দিক হইতে উলুধ্বনি দিয়া উঠিল। ৭ মার ঘাড়
নাড়িয়া বলিল, “হয়েছে-বেশ হয়েছে। ভায় তাহলে
আমি এখন যাই, তুমি তাের শালি শালা নিয়ে সরে
আনন্দ করাে। কিন্তু কাজটা যে তােমার ভালাে
হলে তা ঠিক বলা যায় না।
অনিলকুমার ও সতীরাণী আবার তাহার দাদা মহাশয়ের
পদধুলি গ্রহণ করিল-রসিক বলিল, “চল বড় কর্তা,
মেয়েরা বাসরে আনন্দ কর্তে এসেছে তাদের সে আনন্দে
আর বিষ দিয়ে কাজ নেই।

मडी-बानी
“চল তাই চল।” বসু মহাশয় ফিরিলেন, সঙ্গে সঙ্গে
'চারিদিক হইতে আবার উলুধ্বনি পড়িল। বাসরে আনন্দ
আবার নূতন প্রাণে পূর্ণাননে লুটোপুটি খাইতে লাগিল।
(সম্পূর্ণ)
A
#
১১

426,6 patektolla Street.
১.
সর্বজনপ্রিয় লেখক শ্ৰীযহীন্দ্রনাথ
পুস্তকাবলী
১। পাষাণে প্রাণ ( ছাপা নাই ।
২। বিয়ের কাসি (সুরঞ্জিত দ্বিতীয় সন্ত্রণ )
৩। বঙ্গ-বারিধি
৪। কুলবধু । দ্বিতীয় সংস্করণ
৫। সতীর স্বর্গ
५ मिनन
৭। ঘরের নী
৮। সঙ্গিনী (নারীনীতি )
৯। একে-আর (মনােমমানে অভিনীত )
১০। বিয়ের কনে
১১। বাবা
১২। বিধির বিধি
১৩। কালের কোলে
১৪। গৃহ বিচ্ছেদ
। थानाउन
১৬। সতীরাণী
১৭। ধর্ম পত্নী
১৮। মাতৃহারা
১৯। সমাজ-বিপ্লব
lpo
১l
ম
১
২||
১,

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sati-rani Ed.1

Author
Pal,jotindra Nath
Title
Sati-rani Ed.1
File name
Sati-rani Ed.1
Text
OCR done
Citation
1918
Published
2010/04/29
Publisher
Jotindra Nath Pal, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
139
Library
Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Classification
Bengali Novel
Keywords
Pal,Jotindra Nath
DLI number
515196
Barcode
4990010016827.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
wGC7oHtq1Dk
Download PDF

Sati-rani Ed.1